Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Ritumangal
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
খাতুন ।
শ্ৰকালিদাস রায়
এরাজেন্দ্রনারায়ণ ঘোেষ বি, এ,
সম্পাদিত।
১নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট,
কলিকাতা।
শ্রীহৃষীকেশ মিত্র
কর্তৃক প্রকাশিত
১৩২৩। রাস-পূর্ণিমা
উলীপুর। রঙ্গপুর।
প্রিন্টার-কুলা
শপ্রচার
৫ন, ছিদাম
কলিকা
উৎসর্গ
“সন্ধ্যাতারা”র কবির শ্রীচরণকমলে
ভক্তি নিবেদন।
No text on this page.
খাতুন।
ঋতুরাণী।
নিদাঘের ঘোর পিঙ্গলরূপ, বরিষার ঘননীল,
শরতের শােভা জ্যোৎস্নধৌত অবদাত অনাবিল
শ্যামল স্নিগ্ধ হেমন্ত শােভা, শীতের আ-পীত রাগ,
মাধবের রূপ তাম্র পাটল, উড়ে ফুলরেণু ফাগ;---
আম্র জন্ধু মুকুলে কষায়, তিক্ত নিৰ ফুলে,
অম্ন আঙুরে, কটু লবঙ্গে, দারুসিতা
তাম্বুলে
বধুর অধরে মধু মদ ধারা কুসুম পাত্রে সীধু-
নব বরযার আসার জনিত গন্ধ সে মৃদু মৃদু,
চাপায় বকুলে উগ্র মাদক, ধুপের গন্ধ পূত
পীতচন্দন উশীরে স্নিগ্ধ গন্ধ যা, অনুভূত ;--
দখিন অনিল অঙ্গে যা’ আনে মঞ্জরী শিহরণ,
তরুছায়া আর জ্যোছনা যা করে শ্রমজলনিবারণ
পূরবের যেই পবন, কদম ফুটায়রে প্রাণে প্রাণে,
অরুণ কিরণ উত্তর-বায়ু-বেপথু থামায়ে আনে ;-
গগনে “ফটিক জল’ ক্ষীণ ডাক,-গুরু গুরু মুহু মুহু
রুণু রুণু, শন্ শন, কল কল, ঘুঘু ঘু ঘু কুহু কুহু,
রচে রূপে রসে গন্ধ পরশে মােন প্রতিমা খানি,
বরষ কল্প তরুজাত-ভূষা পরিহিতা ঋতুরাণী।
চোখে মরীচিকা, চপলার মালা মেঘে রচা বেণীটিতে
কাশের শুভ্র বসনে ভূষিতা, শ্যাম শালি কঁচলীতে;
শস্যে, পত্রে, সরিষার ফুলে, হামিদ অঙ্গরাগ,
বাঁধুলী পারুলে চারু কিসলয়ে চরণে আলতা দাগ ;
হস্তে তাহার লীলারবিন্দ, কুন্দ অলক পরে,
লেব্রের ফুলে গও তাহার পাণ্ডুর শোভা ধরে ;
চূড়া পাশে তার নব কুরুবক, কর্ণে শিরীষ দুল,
চারু সীমন্তে পুলকাঞ্চিত শােভিছে কদম ফুল ।
ঋতুমঙ্গল সঙ্গীত তার গা’ব সে পুরাণে তানে
পুয়া কবিগণ-পদতলে বসি চরণামৃত পানে।
বর্ষবরণ (ইন্দ্ৰবজা ছন্দে ) বন্দে জগদ্বন্দ্য নবীন রম্য। এস-মন্দাকিনী--শীকর-সুপ্তিভঙ্গে, অশ্বখনিশ্ৰিত শৈত্য সঙ্গে, শ্রীখণ্ড-কাশ্মীর-উলীর অঙ্গে, চম্পাশিরীষস্মিতব, সৌম্য । কর’-দুঃখী কৃপার্থজন-সন্নিধানে, পীযূষ নিস্যন্দিত দৃষ্টিদানে, নৈরাশ্য-দগ্ধম্রিয়মান-প্রাণে সঞ্জীবনানন্দ সুখাধিগম্য। এস--নির্মদাবানল দগ্ধ-পর্ণে, বৈশাখ-ঝঞ্জা-বিপিঙ্গবর্ণে, দ্বন্দ্ব-দ্বিধা-রােগ-বিমােহ-জাড্য- বীজাণুপুঞ্জে দহি’ রুদ্র নম্য। ০
ঋতুসংহার ও কুমারসম্ভব
(১)
মত্ত করি করভকে,
ফুল্লকরি’ কুরুবকে,
বসন্ত আসিল চারিদিকে ;
এক পাত্রে মধুব্রত,
প্রিয়া সহ পানে বত,
কানন ভরিল শুকপিকে।
রুধিয়া ইন্দ্রিয় গণে,
উপবেশি’ যােগাসনে,
মগ্ন তুমি মহাসাধনায় ।
কর্ণে দুল কর্ণিকার,
গলে বনধুলহার
উমা তব অর্ঘ্য আনে পায়।
(২)
সহসা ভাঙ্গিল তপ,
জ্বলে গেল দপ দপ,
অকস্মাৎ তৃতীয় নয়ন ;-
শুষ্ক পত্র মর’ মর’,
নিদাঘ আসিল খর,
ভন্ম হলাে যুকরকেতন।
বহ্নি কুণ্ড মধ্যগতা,
উমা তপস্যায় রত
সূৰ্য্যপানে রাখি দুই আঁখি ;
তরু পর্ণ হিমবারি,
তােমা লাগি তাও ছাড়ি
অস্থি চর্ম আছে তার বাকী।
ঋতুসংহার ও কুমার সম্ভব বরিষার বারি ঝরে, শুষ্ক ধরণীর পরে, চাতকীর দীর্ণ কণ্ঠ মাঝে ;- তপঃ শীর্ণ গিরিজারে, তুমি এলে ছলিবারে, নীরদের কুহেলির সাজে! জল ভরা টল মল, আঁখি তার ছল ছল পূর্ণ হলো চির মনােরথ । তােমার করুণাধারা ঝরিল বাঁধন হারা, চপলাচকিত বনপথ। (৪) আসিল শরৎ সিত, চারিদিক আলােকিত ভরিল মরালে ফুলে কাশে ; শুভ কৈলাসের পরে লীলা শতদল করে গৌরী আজি হাসে তব পাশে। সুরভি লহরী ঠেলি, অবিশ্রান্ত জলকেলি, রচে মীন মেখলা সুন্দর! মরকত শিলা মাঝে উমার নূপুর বাজে সিংহ পায়ে দুলায় কেশর। (৫) হেমন্ত আসিল ধীরে, মধুর সঙ্কোচ ঘিরে শেফালির আরক্ত বয়ানে। পাণ্ডুর বদন খানি তুলিয়া তােমার রাণী চাহে লজ্জাবিনম্র নয়নে। ৫
ঋতুমঙ্গল
শস্যগর্ভা শালি সমা দাঁড়ায়ে সে মনাের
দোহদ লক্ষণ সারা গায়।
পল্লবিনী অঙ্গলতা,
পীণ শ্রোণিরান,
শ্যামাঞ্চলে জড়ায়েছে কায়।
(৬)
শীত এল পথে ঘাটে, স্বর্ণ শস্য মাঠে মাঠে,
শঙ্খ বাজে উটজ প্রাঙ্গনে।
লাজ বর্ষ গেহে গেহে, কলহর্ষ দেহে দেহে
রােমাঞ্চ ফুটায় ক্ষণে ক্ষণে।
হলুদ কাজল মাখা
দুকূলেতে আধ’টাকা
কুমারে সে কোলটি উজল ;
উমা হাসে তব পাশে তােমার নয়নে ভাসে।
শিশিরা পুলকচঞ্চল।
চিরমিলন।
*
নিদাঘে তোমারে, স্বামি, কেমনে ছাড়িব আমি
দাহে যেগগা পুড়ে হ’বাে ছাই ;
শীতল চরণ বিনা,
কেমনে বাঁচিবে দীনা
ভুবনে শরণ যার নাই।
পাখা খানি ধরি’ করে, বসিয়া শিয়র পরে
যদি নাহি কুরগগা ব্যজন,
চির মিলন
শীতল আঙুল দিয়ে, নাহি দাও বুলাইয়ে
অন্ধ হবে অনিদ্ৰ নয়ন।
বরিষার দিনে, প্রিয়,
হৃদি পরে বরণীয়
রক্ষণীয় পরাণের পুরে,
দুৰ্যোগ তামসী নিশি,
কাঁপিবে যে দশদিশি
কেমনে তােমারে রাখি দূরে ?
গৃহ খানি নিরজন,
শুনি মেঘ গরজন
আতঙ্কে যে শিহরিবে কায় ;
কাহারে আঁকড়ি ধরি, আঁধারে শয়ন পরি
অভয় লভিব বল হায় ?
শরতের দিনে, প্রভু, ছাড়িতে পারি কি কভু ?
জ্যোৎস্নায় ভাসিবে ধরাতল,
তব কোলে রাখি শির পিয়ে সেই সুধানীর
শুনিব পাখীর কল কল।
উৎসব বাঁশরী বাজে,
গেহে গেহে হিয়া মাঝে,
সবে চুমে প্রিয়ের বয়ান।
জনগণ কোলাহলে
মায়ের দেউল তলে
মাের কিগো হবে বলিদান ?
হেমন্তের দিনে, বঁধু, হে মাের জীবন-মধু,
তােমারে ছাড়িব কোন্ দুখে ?
খামে ভরে যাবে ধরা রাসে বিশ্ব রসভর।
মােরি শ্যাম রহিবে না বুকে ?
৭
ঋতুমঙ্গল
শেফালি পড়িবে ঝরি’ আমি বা কাহারে ধরি ?
তারি সাথে পড়িব যে ঝরে।
এ নারী-জীবন মম
শুকাবে নীহার সম
তুমি যদি নাহি রাখ ধরে।
হে নাথ, শীতের দিনে বাঁচিব কি তােম বিনে
কে দিবে গাে তাপ আর আলাে ?
হে মাের অরুণ নব
করুণা কিরণ তব
মুখে চোখে যদি নাহি ঢাললা ?
ভালে গঙে ঘনশ্বাস
উষ্ণ তব বাহুপাশ
তপ্ত চুমা অধর পাতায়,
হৃদয় কুলায় ছাড়া পাখী হবে প্রাণ হারা
দেখিবে পালক উড়ে বায়।
বসন্ত বাসরে, সখে
মল্লিকা চম্পকে বকে
ধরণী হাসিয়া হবে সার,
তুমি যদি কাছে রহি’ ব্যাকুল কামনা সহি,
আমারে না কর’ আমি-হারা;
তাহলে দেখায়ে দিও, এ মিনতি পায়ে প্রিয়,
দীঘির গভীর কালােজল,
কোকিল মরিবে কেন, আমারে পাঠায়ে। যেন
পত্রপুটে
ফণীর গরল!
নি দা ঘ
নিদাঘ ।
মধু যামিনীর প্রণয়ােৎসব-মদিনাপাত্ৰ ভাঙি',
দীর্ঘশ্বসনে মরীচিকা জালি কাতর বিদায় মাঙি',
শুষ্ক চম্পা মালার পুষ্প ছড়াইয়া পথে পথে,
লয়ে ধনুঃশর রক্ত কেতন মাধব ফিরিছে রথে।
আর পথ দিয়া আসিছে নিদাঘ উদাস নয়নে চাহি,
‘বাহারের’ তান না যেতে মিলায়ে ‘দীপক'রাগিনী গাহি',
অঙ্গে শিরীষ ওড়না জড়ায়ে উড়ায়ে পাটল রেণু,
বনমরমর বীথি বাহি’ ঐ বাজায়ে বিরহ বেণু।
বসন্ততি শ্বসিয়া বেড়ায় নিষের কটু ফুলে,
ঘুঘুর উদাস আতুর ধ্বনিতে ব্যাকুল কণ্ঠমূলে।
মাধবী রাতির মদিরা নেশায় চরণ আজিকে টলে,
শ্লথ ভূ বেশে অলস আবেশে পড়িয়াছে সবে ঢলে।
রজনী জনিত গুরু প্রজাগর-রাগ-কষায়িত অখি;
ডুলিয়া পড়েছে তরুণ তরুণী তরুমূলে শির রাখি।
ঋতুমঙ্গল
কে ওই হারিদ উষ্ণীষ শিরে, শিথিল সুনীল বাস,
‘গােলাপের মত রাঙা গাল তাপে. ছাড়িল আমার শ্বাস!
মরু নিঝরে ‘ইরাণী রূপসী ভরি’ লয়ে হেম ঝারি,
তরুণ পথিক অঞ্জলি পরে ঢালি’ দেয় শীত বারি।
মিঠে সরবৎ' নিয়ে আয় সাকি, তরমুজ রস ছানি
স্ফটিক-পাত্রে নিঙাড়িয়া আন আঙুরের মধু-পানি।
‘বিমেনের এলা দারুচিনি দিয়ে রচে’ আন্ তাম্বুল,
‘হদ্রমঠের’ মৃগমদবাসে ‘দীল’ কর ‘মশগুল।
‘আদীনের বন উপবন শ্যাম বল্লী বিতান হতে,
‘গুলের’ বক্ষে আন বুল বুল খর্জুর বীথি পথে।
‘আসমানী’ রঙ ‘ওড়না’ উড়ায়ে ভুর ভুর হেন বাসে,
আয়, আয়, বাধ, ‘ওমানের’ চারু মুক্তামালার পাশে।
দশ শত এক ‘আয়েষা’ ‘লয়লা’ কাসিদা গজল’ গানে
ঘিরেঘিরে নাচ, ফিরেফিরে আয়, ‘তর’ করে’দে’রে প্রাণে।
‘মেহেদি পাতায় রঞ্জিত কর, চুয়ারসে আঁকা ভুরু,
কপূর আর কস্তুরীবাসে হিয়া নাচে দুরু দুরু।
পাকা দাড়িমের মতন গণ্ড, গােলাপী কাজল চোখে
হুরী লােক হ’তে চামর চুলা’য়ে আয় আয় নর লােকে।
খুলে দেরে আজি ‘শীষমহলের সব বাতায়ন গুলি,
জোছনা নিশীথে যমুনার জলে তরীখানি দেরে খুলি।
‘াজমহলের’ সােপানে লভ'রে শীতল শয়ন সুখ,
সব স্নানাগারে দেরে দে খুলিয়া স্ফটিক উৎসমুখ।
নিদার
কুঙ্কুম রাঙা ‘গালিচা’র পরে ‘বসাের গােলাপ আনি’,
বিছাও, ছিটাও,—পিচকারী’ করি’ ছুটাও গােলাপী ‘পানি।
আজি এ নিদাঘে সকল কুণ্ঠা, গুণ্ঠন দাও ফেলি’
প্রকাশ করগাে তনুর তনিমা মিছে আবরণ ঠেলি'।
এলাইয়া দাও চিকুরের ভার ;--মেখলা শিথিল করি’
মুক্তার চুণে রচা তাম্বল-সুরসে কণ্ঠ ভরি।
4
দাহ দৈত্যের হাত হতে আজি কূপমাত নানা ছলে,
লুকাইয়া রাখে সুধার ভাণ্ড বুকের আঁচল তলে,
কণ্ঠের তৃষা মিটাতে তথায় তরুণ তরুণী জুটে,
জননীর স্নেহ আশীষের ছায় হিয়ার তৃষাও টুটে।
অমৃতাঞ্জন শলাকার মত প্রিয়ের আঙুল গুলি,
পরশে, প্রিয়ার জ্বালাময় অাখি ঘুমঘােরে পড়ে ঢলি।
কাতর অঙ্গ ঢলে ঢলে পড়ে, স্বলিত মেখলা হার,
প্রিয় করে রচা মেখলা মালিকা ধরে তারে বার বার।
ব্যজন করিয়ে প্রিয়, সুষুপ্তা প্রিয়ার শিয়র 'পরে
শৈত্য পরশে সহসা প্রেয়সী আঁখি মেলে লাজে মরে।
আজিকার দিনে পরীর খেলায় গৃহে গিরিবনে দূরে
নরনারী প্রেম গােলক ধাঁধায় পথ ভুলে ভুলে’ ঘুরে।
মন্দাকিনীতে তরী বেয়ে আজ দেব এসেছে নামি’
ডুবি আকুণ্ঠ মানস সরসে রহিয়াছে দিবাস্বামী।
ঋতুমঙ্গল
.
ভােগবতী হ’তে নাগবালা উঠি’ মিলিয়াছে তার সাথে
জলকেলি করে হাসিয়া হাসিয়া ধরি’ তার দুটী হাতে।
t
অসহ কবচ আজিকে অঙ্গ করিয়াছে পরকাশ
উষ্ণীষ আঙ্গি করেছে প্রকট কুঞ্চিত কেশপাশ।
অশ্ব পশেছে মরা মাঝে, হস্তী সে গৃহে তা’র !
যােদ্ধা আজিকে ফেলেছে হারা’য়ে অসি-তুণ-তরবার।
প্রিয়ার হসিত গণ্ডের কূপে ডুবিয়া মরিবে বীর,
অলক পবনে ঘুচাবে তাহার ললাটের শ্রমনীর ।
শরীর ছাড়িয়া প্রাণমন সব বেড়ায় পরীর দেশে,
অরাতি আসিয়া ভিতর বাহির জয় করে হেসেহেসে।
G
দূরদিগন্তে গত বসন্ত, কোকিল তবুও ডাকে
বহি বহি’ ঐ নিম্বের শাখে, তমালের কঁাকে কঁাকে।
মকরকেতন মাধবের সাথে জিনিয়া বিশ্বখানি
রেখে গেছে তারে প্রহরী করিয়া ঘােষিতে বিজয়বাণী।
কে ওই রমণী লতা মণ্ডপে শিলাতলে ফুলশেষে ?
লীলারবিন্দ পড়িছে ঝলসি’ নিশ্বাস দাহতেজে।
সখীগণ ঢালে গোপীচন্দনপল্লবরস গায়
নলিনীপত্রে চলিছে ব্যজন তবু না তৃপ্তি পায়।
দূরে গেছে সব লজ্জা, জড়িমা, গিয়াছে সজ্জার,
উশবিলেপ সরসিজ রেণু ঠাই নেছে আজি তা'।
নিদাঘ
কুমুদের মালা, মৃণালের বালা, অগুরু পত্ৰলেখা,
আজিকে হয়েছে ভূষণ, শােভিছে স্বেদজলে বলীরেখা।
শিরীষফুলের অবতংসটী কর্ণোৎপল দু’টী
গণ্ডের তাপে দিবসের দাহে ঝলসিয়া পড়ে লুটি;
শিলার পট্টে লুটায় রমণী ত্যজি’ রাঙ্ক শেষ
কদলী বিতানে জুড়ায় কেহবা দেহের দাহের তেজ।
শ্বেত মৰ্ম্মর শীত শিলাতলে হংস কাকলী জিনি’
তুলি’ রুণুঝুনু মঞ্জীর ধ্বনি পদ ফেলে গরবিনী।
মণি কুটিম রাঙাচরণের চুমিয়া লাক্ষারাগ,
একে লয় বুকে শিহরি’ শিহরি’ অরুণ চরণ দাগ।
শ্যাম রমণীর অলস লুলিত দুর্বল দেহলতা,
অশিথিল পরিরন্তে আজিকে লভিছে সার্থকতা।
ইন্দ্রনীলের মত ঢলঢল চঞ্চল ঢেউ তুলি’
কুজন ব্যাকুল স্ফীত কম্পিত কপােত কণ্ঠগুলি,
স্ফটিক স্তম্ভ উপরে মিলিয়া ধারাষন্ত্রের পাশে,
অভিমানিনীরে করে চঞ্চল নিষ্ঠুর পরিহাসে।
কনক মরাল কণ্ঠ বেড়িয়া কোন বির্ভনারী
তাপিত হৃদয় করিছে শীতল মাখিয়া পাখার বারি ?
আজি এ নিদাঘে অচ্ছােদ-কূলে তাপসের পরাজয়,
একাবলী সাথে অক্ষ-মালিক হয়ে যায় বিনিময়।
এলায় দুকুল বনবালা কুল অগ্রসর ঘাটে,
তরুণ শিকারী রাজার তনয় চঞ্চল বনবাটে
ঋতুমহল
যমুনার জলে আজি গােপনারী অন্তর দেহদাহে
মিছে দেরী করি’ আনিয়া সন্ধা পরাণ জুড়াতে চাহে।
কদমের মূলে আসিতে ছলকে সলিল কনকঘটে
যমুনার ঢেউ ফিরে ঘুরে যায় আঘাতি উয়ােজ তটে।
v
ডান হাতে তব চাম-পত্ৰ বামে ঘটভরা বারি,,
নিদাঘের দিনে দেবী হয়ে তুমি এসেছ গো পুরনারী।
মিছে তৃষ্ণার ছল করে আমি ফিরি যে আকুল বুকে,
সাধ যায় হই আম্রের শাখা তব কলসের মুখে।
প্রিয়ার কণ্ঠে দুলিতেছে হার, বক্ষের প'রে লুটে,
যেন মৰ্ম্মর সােপানে সােপানে রােহিতের শ্রেণী উঠে।
এলায়িত তা’র চিকুরের মেলা যেন শৈবালরাশি,
সরসীর বুকে কলতরঙ্গ মুখে উজ্জ্বল হাসি।
খেলিছে শফরী কেলি-চঞ্চল নীলপদ্মের পুটে,
কনককুম্ভ দুলে তরঙ্গে-চরণ-পদ্ম ফুটে।
বাহুর মৃণালে, মরালকণ্ঠে হিরণ ভূষণ বাজে,
গৌরবরণ চাদের জোছনা উল হয়ে বাজে।
যৌবন তটে বাঁধা লাবণ্য-সরসীর শীত বুকে
আজি এ নিদানে সাধ হয় শুধু ঝাঁপ দিয়ে পড়ি সুখে।
আজি মাদকস সারস মরাল পাখার সলিল দিয়া,
সজীব সরস করিয়া রেখেছে পুণ্ডরীকের হিয়া।
নিদাৰ
সুনীল আকাশ তারা দীপভরা চন্দ্রাতপেয় তলে,
রচিয়া রেখেছে নিশার আগার শীতল শম্পদলে।
ইলুকিরণ ঝরণায় নিতি প্রাণভরে করি স্নান,
বেঁচে রয় কবি চন্দ্রকান্ত-মণিজল করি পান।
আলবালে আজি সোঁচিতে সলিল দেহে জাগে কাতরতা,
তরুশখে কিবা ফুটিবে আশীষ, সার্থক করি ব্যথা।
আজি জীবলােক সারা বরষের স্মৃতির শম্পদলে
করে রােমন্থ নয়ন মুদিয়া নিদাঘের ছায়াতলে।
পূর্ব পুণ্যে যদি বা ইন্দ্র দিতে চায় আজি বর,
চেয়ে লই তবে কদলীকুঞ্জে আজি একখানি ঘর ।
তুষার-প্রাচীর, উশীরের চাওয়া, চন্দন কাঠে গড়া,
শীত মর্মরে কুটিম রচা, কমল গন্ধে ভরা।
সঙ্কোচভয়ে আছিল যে বধূ শিশিরে বেপথুমতী,
মধুমাসে কা’র পরশ লভিয়া হ’ল রােমাঞ্চবতী।
আজিকে তাহার শীতল ললাটে তপ্ত শ্বসন পড়ে।
প্রিয়ের উষ্ণ পাটলচুষ—তাহার বিম্বাধরে!
কিছুদিন পরে স্বেজলে তনু অবশ হইবে তার,
অভিমানে আঁখিসলিল ঢালিতে হবে বুঝি অধিকার।
(গ)
নীরবে নিভৃতে সেবাপরায়ণ। স্নেহছলছল আঁখি,
ধূধুসৈকশুত্রবসনে জ্বালাময় তনু ঢাকি
ঋতুমঙ্গল
নিদাঘ তটিনী বহে ধীরে ধীরে হিন্দু বিধবানারী,
স্তন্য নাহিক, কঁাখে আছে তবু ঘটভরা শীতবারি।
রূপ যৌবন দহিয়া ফেলেছে হৃদয়ের চিতানলে,
নির্মল শীত শুভ্র যা কিছু বহিছে মমতলে।
কর্মক্ষেত্রে সহি শত আলা, লাঞ্ছনা শিরে শত,
ছায়াময় তরুগুলি আজিকার, বঙ্গসুতের মত,
বিবরে, কোটরে, ঘন পল্লবে, কুলায়ে, ছায়ার তলে,
পােষিতেছে ক’টি অসহায় জীবে লুকায়ে’ নয়ন জলে।
অজ্ঞ সরল তারা ত জানেনা তরুর বেদনা কত,
কালবৈশাখী ঝঞ্চায় কোথা বক্ষ হয়েছে ক্ষত!
হ্রদের বক্ষ শুকায়েছে আজ শফরী পঙ্কে লুটে,
অতিদানে সাধু হয়েছে নিঃস্ব অন্ন নাহিক জুটে।
অরুণকিরণকনক চিত্ত আজি মৃত্তিকা সার,
প্রাণ ভরে’ দীনে দিতে যে পারেন। তাই করে হাহাকার
বুক চিরি’ শেষবিন্দু শােণিত তাহাও বিলায়ে হায়,
এখন কেবল দুখ হেরি’ তার বক্ষ ফাটিয়া যায়।
প্রাঙ্গণপরি পুণ্যতরুটী, ঝলসিত তার পাতা,
প্রান্তরমাঝে পথিকের লাগি’ কে পুড়ায় ঐ মাথা ?
করুণাপ্রবণ কমলাঙ্কিা ওগো ভারতের নারী,
কোশা হ'তে তব দাওগাে একটু করার গঙ্গাবারি ।
নিদাঘ
ভারতের নদী পুণ্যসলিল-বুঝে প্রত্যয়হীন,
আর বুঝে সে গাে অশথের মাঝে কি দেবতা আছে লীন।
নদী হ্রদে আজি নামেনি চাতকী, তারে তবু দূষিও না,
বারিকণা সাথে দিতে কি পারিবে তারে তুমি প্রেমকণা?
হেলাভরে সেত ঘুরে আকাশে ত্যজি’ নদীবন,
নিয়ে গেছে সে যে কষ্ঠ ভরিয়া জগতের আবেদন।
প্রিয়ের সকাশে হতাশ হলেও প্রার্থনা ভাল তবু,
অন্যের কাছে না চাহিতে পাওয়া তাও ভাল নহে কভু।
ত্রিলোেকরমার মণিদর্পণ বাপীর স্বচ্ছ নীরে,
ডুবিয়া তপ্ত প্রতিবিম্বটা আসিতে চাহেনা ফিরে।
অলস আবেশে সিন্ধুবেলায় উদাস পরাণে আজি,
হেলায় খেলায় বেড়ে যায় রাতি গণিয়া লহরীরাজি।
অঙ্গ এলায়ে শ্রান্ত তাপিত পান্থ, অশথ মূলে,
উন্মনা আজি অলস পবনে যাত্রা গিয়াছে ভুলে।
ঝিল্লীমুখর পল্লীকাননে বসালের চারি ধারে,
আরতি করিয়া গুঞ্জরে অলি দু’পল ছাড়িতে নারে।
তাল, নারিকেল, তরমুজ আর রসালের হৃদিপুটে,
স্নেহের দুগ্ধে জাত ক্ষীর পূরি’ ধরা ধরিয়াছে মুঠে।
তালীবন ঘেরা দীঘির সলিলে ছায়াগুলি নােয় মাথা,
আলসে নামিয়ে আসে কালাে চোখে যেন গাে নয়নপাতা!
ঋতুমঙ্গল
পল্লীমায়ের পীযুষ স্তন্য টলমল তাহে জল,
ডুবে রহি তা’য়, অথবা নয়নে পিয়ে নিই অবিরল।
দাহের গরলে সুনীল জম্বু ডুবে ডুবে তা’য় মরে,
বধূরা তথায় দিনের ক্লান্তি বিরহ-শ্রান্তি হরে।
সরসীর বুকে প্রতি তরঙ্গে মা’র যেন পাই সাড়া,
পূর্ণকুন্ত-পয়ােধর-মুখে ঝরে পীষুষের ধারা।
কলস ছলকি’ জল ভরি’ সাঁঝে কৃষক বধূটি ফিরে,
মাঠ হ'তে গৃহে ফিরিছে কৃষক শ্রান্ত সে ধীরে ধীরে।
চলিছে নীরবে চতুর যুবক শব্দ করে না পায়,
পাছে সে রমণী লাজ চমকিত আগে যেতে নাহি চায় !
সিক্ত বসন-শীতল-পবনে জুড়ায় শ্রান্ত হিয়া,
তৃষায়ত আঁখি তৃপ্ত তাহার সিক্ত সে রূপ পিয়া।
কণ্ঠের তৃষা আকুল হইয়া হৃদয় অবধি ছুটে,
গ্রামপথে সেই চরণের দাগে তাপিত মৰ্ম্ম লুটে।
পিয়াল তরুর মঞ্জরীরেণু ফেলেছিল চোখ ঢাকি,
নমেরুর তলে মৃগ-কদম্ব আজি মেলিতেছে অাখি।
হিন্তাল-তলে কোল নরনারী মাদকানন্দে মাতি
হাতধরাধরি নাচিয়া নাচিয়া কাটাইছে সারারাতি।
মহুয়ার মদে মাতােয়ারা তারা বাজায় মাদল বাশী,
শিরে তাহাদের ঝরিছে বাদল,-সেদাল ফুলের রাশি।
বৃক্ষের শাখে কিরাত ঘুমায় ধনুশর পড়ে ডুয়ে,
ডালে ডালে পাখী,-গহন গুহার পশু স’র জলে শুয়ে।
১৮
নিদাঘ
-
বালু খুড়ে জল পিয়িছে পান্থ গৈরিক সঙ্কটে,
পাখীর পিয়াসা মিটিছে আজিকে তালীবন তরুঘটে।
(ঘ)
বারণবরের দেহের ছায়ায় কেশরী মলিন মুখে,
গ্রীষ্মের দাহে সর্প ঘুমায় ময়ূরের ক্রোড়ে সুখে,
যদিও, ক্ষুধিত, ক্লান্ত ময়ুর স্পর্শ করে না তায় ;
নিয়েছে শ্রান্ত তেক আশ্রয় ফণীর ফণার ছায়।
তৃষিত তাপিত কৃকলাসগুলি না পেয়ে তৃষায় জল,
অজগর ফণী স্বেৰধার তাই পিইতেছে অবিরল।
পলে নিজ অঙ্গ ডুবা’য়ে শূকর জুড়ায় প্রাণ,
কর্দমময় নিপান সলিল মহিষ করিছে পান।
তরু আলবালে তাপিত ময়ূর ফেলিছে তপ্তশ্বাস,
ফুলের শীতল বক্ষ ভেদিয়া ষট্পদ করে বাস।
কমলের পরে বারিবিহঙ্গ ত্যজিয়া তপ্তজল,
পিঞ্জরে শুক তৃষার সলিল বাচিতেছে অবিরল।
কুম্ভযােনির তৃষার মূর্তি উষ্ট্রের শ্রেণী শত,
চলিয়াছে যেন শােষিবার লাগি সিন্ধুর বারি যত।
কাঠঠোকরাটী ঠোটের ঠোকরে গণিছে দ-পল,
গগনের ক্ষীণ কাতর কণ্ঠে বাজিছে ফটিক জল।
দীর্ঘ দিবসে খণ্ড করিতে ঝি ঝি চিরে চিরে ডাকে ;
অবশ দীর্ঘ করে তােলে তায় বিরামবিহীন পাকে।
ভ্রান্ত পথিকে শ্রান্ত হরিণে আজি দিগন্তমীয়া
দিন্তে মরীচিকা রাতে আলেয়ায় ঘুরা’য়ে মারিছে, আহা!
ঋতুমাল
অন্তঃপুর-উপবন মাঝে নৃপতি নিয়েছে বাস,
মন্ত্রী সে ভুলে, উচ্চৈঃস্বরে কহে মন্ত্রণা ভাষা।
সম্মুখে ফেলি গােপন যাকিছু কর্মী সে পড়ে চুলে,
প্রেমিক ছাত্র কণ্ঠ খুলেছে আজিকে নদীর কূলে।
সবাই খুলেছে আজিকে হিয়ার দ্বার বাতায়ন যেন,
মনের কথাটী বাহির করিতে সুযােগ হয়না হেন!
ঝঞ্চা পলায় ভাঙি’ রথধ্বজা উড়ায়ে ভস্মচয়,
হয়ে যায় যেন বেণীসংহার নাটকের অভিনয় !
দূত অবধ্য,শঙ্খ চিলেরে রােষে কেহ নাহি দহে,
মেঘের বার্তা আনিতে তাহার ঝড়ের বাৰ্তা কহে।
অগ্নিকুসুমে ভরেছে আজিকে শমী, শােণা শাল্মলী,
পল্লবহীন শাখা ভেদ করি শিখায় উঠেছে জ্বলি'।
দুশ্চর তপে কঙ্কালসার উমার গণ্ড’পরে,
হর চুম্বন শােণিত পুঞ্জে শােভিতেছে থরে থরে ।
এ নিদাঘ যেন প্রেমনাটকের বিরহের অভিনয়,
দুর্বাসা যেন শাপের অনলে ব্যবধান বিরচয়।
বিলম্ভে সঞ্চারী ভাব সঞ্চরে বুকে হানি’
নিৰ্বেদ, মােহ, দৈন্য, জড়তা, অলসতা স্মৃতি গ্লানি।
অসহ হয়েছে বিরহ বেদনা, রামগিরি চুড়া’ পরে,
দাঁড়ায়েছে অজি অক্ষযুবক দূত সন্ধান তরে।
ধূসর বসন করি পরিধান ব্রত উপবাস ক্ষীণ।
কা’র লাগি’ আজি ধরে এক বেণী প্রকৃতি বিরহদ্রীনা
নিদাঘ
নদীর মােহনা শুকায়ে তটিনী সিন্ধুতে ছাড়াছাড়ি,
সিন্ধুর মাঝে পড়েছে মকর, নদীতে মকরী তারি।
অনল নদীর দুইতীরে ডাকে মিলিবারে চখাচখী,
বিরহ মরুর দুই দিকে কঁদে তরুতলে সখাসখী।
শান্তকরুণ এক অধ্যায়, আদি শৃঙ্গারে আর,
এই নিদাঘের বীর রৌদ্রের অধ্যায় মাঝে তার।
এই অধ্যায়ে কুরুপাঞ্চাল বীরগণ আসে সাজি’
কঁপিছে লঙ্কা, কঁপে চেদী, ছুটে অশ্বমেধের বাজি।
জামদগ্ন্য কি উঠিল জাগিয়া নয়নে অগ্নি যার,
ধরা জননীরে বধিতে পরশু তুলিল কি আজি তার?
অর্জুন-ভুজ কানন ছেদিয়া চলে কি বিদেহ গেহে।
লুকায়ে রাখিছে জনক, বক্ষে রামের ললিত দেহে।
রক্ষোবীরের রথ কি ধরেছে জটায়ু চঞ্চুপুটে
অহিবংশের ধ্বংসের লাগি বৈনতেয় কি ছুটে ?
জন্মেজয় কি প্রতিহিংসার জলিল যজ্ঞানল,
গরল শ্বসিছে হাজার ফণায় অনন্ত অবিরল।
দাহ রাজা আজি প্ৰজার রক্ত শােষিতেছে নিদয়,
উপপ্লবে যে রাজ্য তাহার এখনি পাইবে লয়।
বিদ্ৰোহানল জ্বলে গৃহে গৃহে গিরির রন্ধ্রভাগে,
শমীবন হ'তে ছুটে দাবানল,-সাগরে বাড়ব জাগে।
স্বরগে বিশ্বকর্মার আজি বিকট কৰ্মশালে,
ক্লোপবশে হেন গলিত তাপিত ধাতুরস কেবা ঢালে ?
ঋতুমঙ্গল
ত্বষ্টার বরে বৃত্ৰ আজিকে ব্রিলােক করেছে জয়,
দেব-ঋষি-নর স্বর্গে মর্ত্যে পাইয়াছে সবে ভয়।
অনল অনিল সবিতার সহ রাঙায়ে হাজার আঁখি,
বাসব আপন অনুচরগণে মাঝে মাঝে উঠে ডাকি।
যে দেব জুড়ায় দাহ জ্বলা তারে দেবর রাজা কয়,
গিরি হিমবান গুরুর গুরু যে আজি তার পরিচয়।
আজিকার দিনে কোন্ সে তাপিত ঝাঁপ দিয়ে পড়ে’ জলে,
সুর তটিনীরে কহিল জননী সেই হ'তে লােকে বলে।
পুণ্যদ বলি প্রথম গণ্য হইল নিদাঘ দিনে,
তীর্থ সরসী সলিলে সিনান, সেই হ'তে সবে চিনে।
পিরামিড স্তুপ দেউল দরগা শীতল ছায়ার তলে,
দেবতার সাথে ভক্তেরে আজি বাঁধিয়াছে দৃঢ় বলে।
কোন সে ভক্ত প্রাণের ঠাকুরে ফুলচন্দন দিয়া,
অভিষেক করি’ জুড়াল তাহার শিলার তপ্ত হিয়া।
আজো সুশীতল পাষাণ দেউলে ব্যজন চলিছে তার,
গােপীচন্দন উশীর বিলেপ অর্চনা উপচার।
ধরা, হিম-বারি পর্ণ ত্যজেছে উগ্রতপের লাগি
কাতর পরাণে নীলকণ্ঠের করুণার ধারা মাগি।
প্রান্তর মাঝে ধরাজননীর স্তন্যের হবি দানে,
হােমানল পাশে করিছে কে যাগ চাহি’ সবিতার পানে ?
२२
নিদাঘ
ডাকিয়া আনিবে শুষ্ক ধরায় যাহার পূর্ণাহুতি,
পর্জন্মের পীযুষের ধারা,-আশীষের অনুভূতি।
চাতকী শিখীর কণ্ঠে কণ্ঠে কেতকীর বুক মাঝে,
প্রিয়ক তরুর নিভৃত পরাণে পুলকাঙ্কুর সাজে!
হেমসৈকত মন্দাকিনীর,-নন্দন তীরে তীরে,
বরিষার শুভ সান্ত্বনারস জমিতেছে ধীরে ধীরে।
একোন্ দধীচি বসিয়াছে তপে দিতে তনু যােগাসনে ।
অশনি অস্থি করিবে বাসবে জয়ী অসুরের রণে।
কোন পাণ্ডব দহি’ খাণ্ডবে তুষিতেছে দেবতারে,
লতি’ গাণ্ডীব কাপাবে বিশ্ব বর্জের টঙ্কারে।
দুঃশাসনের হদিবিদারণ হেরিছে যাজ্ঞসেনী,
চপলাশশাণিতরঞ্জিতকরে রচা হবে তার বেণী।
থামিবে ঝঞ্চা, রুদ্রদেবের পিণাকের টঙ্কার,
ললাট আঁখির অনল নিভাবে করুণা নয়নাসার ;
কণ্ঠে রহিবে সকল গরল বদনে আশীষবাণী,
অমৃতে ভরিবে শিবশর হাতের কয়রীটীখামি!
মেঘের বক্ষে গিরির শৃঙ্গে হইবে শৃঙ্গনাদ,
নদীর কণ্ঠে ঘােষিবে ডমরু মঙ্গল পরসাদ।
রবেনা শুস্ক পর্ণের পুট বেশীদিন ঘরে ঘরে,
কড়ি দিয়ে চা সিন্দুর ঝাপি ফিরিবে রমার করে।
দুগ্ধে ভরিবে ধেপুর আপীন দূর্বার দলে মরু,
আঁচলে ঝরিবে কনক ধান্য, পুষ্পে ভরিবে তরু।
চক্র গদায় আজিকে ধরার অরাতি করিয়া ক্ষয়,
শঙ্খা পদ্মে শ্যামসুন্দর বিতরিবে বরাভয়।
তপনেরে মােরা করিব আপন স্বস্তি বাচন কয়ে’
অনলে তুষিব স্বাহার মন্ত্রে, ভক্তি বিনয়ে, ভয়ে।
মােরা তপ কৰি জাগাবে জীবন আবার ভস্মতলে
করুণার স্বেদ ঝরাব প্রভুর চরণকমলদলে !
যাট সহস্র জাগিবে তনয় শুভ শঙ্খের নাদে,
সার’ পড়িবে মকরের গায় ভক্তির উন্মাদে!
নিয়ে বগলা তারার কুটী-অনল, নিখিলরাণী
কমলাত্মিক দাড়াবে, বারণ কুন্তের জল দানি।
দেবতা আমার হাসিয়া দাঁড়াবে বরাভয় লয়ে করে,
শীতল স্বচ্ছ সলিলের’পরি মরাল কমল পরে।
বরুণ দেবতা তােরণ খুলিবে নিরাপদ নির্ভয়ে,
করুণার ধারা ঝরিবে রাজার হাজার চক্ষু বয়ে।
২৪
নাই
বর্ষারাণী
এসো—অগণন
জনগণ মনােহরণী
বাহি’-ছলছলকলকল জলে তরণী।
এসাে—সুস্বপন শিহরিত নীপ ফুল পুঞ্জে,
ধাতকী-চেতকী-যুথী কেতকীর কুঞ্জে,
চাতকেরা বিহরিয়া চিতে সুধা ভূঞ্জে,
এসাে-মনােহর মরকত শ্যামবরণী।
এসাে-খরতর নীর ধারা ঝরণারি হর্ষে
ভুবনে জীবন রস অবিরল বর্ষে
শােভি শুভ শ্যাম সুখে চরণের স্পর্শে
আর-অমল কমল কুলে ভরি ধরণী।
এসােহরষিত কৃষাণীর খল খল হাস্যে
পুলকিত কৃষীকুল সুবিমল আস্যে,
চপলায় চমকিত আলােকিত লাস্যে
অই-ঘন ঘন মুখরিত ত সরণী।
বরষা
মেঘ মালাময় মেদুর মধুর স্নিগ্ধ গগন তলে
সুন্দরী শ্যামা প্রকৃতি লােভনা নব যৌবনে ঢলে।
পুলকী বকুলে
মন্ত্রী
মুকুলে দুকূল দোলায়ে আজি,
কাননের রাণী হাসিছে কেতকী পরাগে অঙ্গ মাজি।
চপল চমকে দিগ, বধু হাসে গলে বলাকার মালা
ভূধর লক্ষ্মী ধরেছে সাদরে আউচফুলের ডালা।
তিন্দুকবনে নাচে মৃগযুথ কন্দলীদল দলি
নব অর্জুন মঞ্জরী মধু সেবনে পাগল অলি।
মৃণাল কন্দ পাথেয় লইয়া মরাল মানসে চলে
দাদুরী আজিকে মাধুরী বিলায় তমাল তিমির তলে।
বন্যার পরে তরণী নাচিছে পণ্য পূরিত বুকে।
ধন্যা জননী ধরণী চুমিছে কৃষকে ধীবরে সুখে।
**
বিলােলা বল্পী তরুরে জড়ায় শিহরি কেশরকুলে
লুটে মদালসা ময়ুরী আজিকে ময়ূরের পাদমূলে।
শিহরিয়া উঠে ধারা কদম্ব কার গুঞ্জন গানে,
কলকল বহে অমৃতানন্দ মেঘমল্লার তানে।
চাতকী গরবে চাহে না ভূতলে নেচে ঘুরে নবঘনে
ডাহুকী সারসী খুঁজে প্রিয়জন মদকল নিকূজনে।
বরষা
কৃপাভাণ্ডার দুহাতে আজিকে ছড়াইছে ভগবান,
আজি বিধাতার প্রেম গঙ্গায় আসিয়াছে যেন বান।
আকাশে বাতাসে গিরি নদীবনে ঘাটে মাঠে চরাচরে,
স্নেহালিঙ্গনে, প্রেমে করুণায়, আশীষে গিয়াছে ভরে।
কুটীরে প্রাসাদে ক্ষেতে তরীপরে আনন্দ কলরােল।
এক সনে যেন মিলেছে ঝুলন রাসরথ আর দোল।
যূথী প্রিয়জুকলিদের কে ফুটিতে কি আছে বাকী ?
আজিকার এই উৎসব দিনে কে মুদিবে বলল আঁখি ?
ইন্দ্রধনুর তােরণের তলে চলে ইন্দ্রের রথ
মুখরিয়া উঠে গুরুগর্জনে চপলা চকিত পথ
প্রকৃতির গৃহে আজি কোন পূজা এত কেন উৎসব ?
ধূপগুগুলুগন্ধমােদিত পবনের কলরব।
সকল নিখিল চঞ্চল করা বরিষা এসেছে যে,
পুলকে মাতিয়া অর্থ্য রচিয়া তাহারে বরিয়া নে।
ধ্যানভাঙি কবি আজি ধরি বীণা গেয়ে ফিরে দ্বারে দ্বারে,
মানিনী প্রেয়সী চাহিয়াছে ক্ষমা ক্ষমিতে হইবে তারে।
আঁখিজলে সবে কলহ হারাও বরিষা এসেছে যে।
প্রেম উৎসবে পাগল না হয়ে আজিকে বাঁচিবে কে ?
২৭,
আষাঢ়স্য প্রথম দিসে।
নব আষাঢ়ে প্রথমদিন আবার এলাে ফিরিয়া,
নিবিড় হয়ে মদিরমােহ আসিল পুন ঘিরিয়া,
ভুবন-আঁখে সলিল ঝরে,
আবেশে পাতা নমিয়া পড়ে,
ঘনায় মেঘ এমনি করে অতীত-স্মৃতি হরিয়া।
নব আষাঢ়ে প্রথম দিন আবার এলো ফিরিয়া ।
কে কোথা আজি বিরহী আছ জড় হতে জাগরে।
মেঘের তরী ভেসেছে আজ বেদনা-শােক-সাগরে।
কূটজ স্কুলে ভরিয়া ডালা,
বকুলে আজি গাঁথিয়া মালা,
অর্ঘ্য রচি কাতরে আজি মেঘের কৃপা মাগ'রে,
কে কোথা আজি বিরহী আছ রূঢ় হ'তে জাগরে
দরদী সে যে ঘুনিয়ে তাই ঘনায়ে আসে পা’টিপে,
ব্যথার মত আঁধার করি নিয়ে গৃহ প্রদীপে।
জগতে যেন আড়াল করি,
নিভৃত রচি, দুহাতে ধরি,
শুধায় তােমা কি কথা তুমি পাঠাবে প্রিয়া-সমীপে,
দরদী তাই ঘুনিয়ে সে যে ঘনায়ে আসে পা’টিপে।
আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে
প্রিয়ার কথা বলিছে যবে গেমারাে কথা বলিবে,
ভববিদিত বংশে জাত কখন নাহি ছলিবে।
কুক্ত হয়ে বারতা-ভারে
চলেছে 'আহা, দেখনা তারে ?
সবার লিপি বিদ্যুতেরি আঁখিরে কিবা জ্বলিবে,
বলনি যাহা তাহাও সে যে আঁখির জলে বলিবে।
কাশ্লেষ-প্রণয়ী কেবা রহেছ আজি পুলকে,
সুখীরে শুনি হৃদয় টলে নামিলে মেঘ ভূলােকে।
বিরহী আজি রহে যে জন
তাদের লাগি অশ্রুকণা
ফেলিতে আজি ভুলােনা যেন রহিয়া সুখলােকে
মুকুতা সম দুলিবে তাহা প্রেমের হারে পুলকে।
যক্ষ তুমি বক্ষে আর পারনি ব্যথা পােষিতে
মুখর হয়ে প্রাণের কথা পাঠালে তব যােষিতে
মােদের আর কুণ্ঠা নাই
তাহারি প্রতিলিপিটি তাই
নিজের বলি প্রিয়ারে দেই কণ্ঠে রহি ঘােষিতে,
পানি তুমি মােরাও তাই পারিনা আরো, পােষিতে
নিখিল হৃদি-রক্তে, কবি, সিক্ত তব লেখনী,
বিশ্ব তাই শিহরি উঠে আষাঢ় আসে যখনি।
প্রিয়ারে তুমি পরম প্রিয়া,
করিয়া আজি মাতালে হিয়া,
নিখিলে কোন দুখীর কথা বলিতে বাকী রাখনি
ত্রিলােক লাগি লিখেছ তুমি একের লাগি লেখনি।
হে কবি তুমি জানিনা কোন্ অলকাপানে চাহিয়া।
করুণতম আবেদনের বেদনা গেছ গাহিয়া।
উজ্জয়িনী-সৌধশিরে
কিসের ব্যথা? চাহিতে ফিরে
জুড়াতে তাই কোন অলকানন্দানীরে নাহিয়া,
যক্ষ অভিশপ্ত হয়ে কি গান গেলে গাহিয়া ?
হে কবি তাই শাপের কথা শিখেছি আজি ভাবিতে,
প্রতি আষাঢ়ে নব আশারে হৃদয়ে রহি সেবিতে,
অলকাতি স্বপন প্রায়
নয়ন হ’তে মিলায়ে যায়
শঙ্কা শুধু আবার কি গাে পারিব তাহা লভিতে,
প্রতি আষাঢ় প্রথমদিনে রহিগাে তাই ভাবিতে।
বরিষার প্রতি।
লাে বরিষা, তুই বুঝি,
আমার সে পাগলিনী,
বিরহিণী প্রিয়া ।
এসেছিস সন্তাপিত হিয়া।
ছুটে এসেছিস আজ ছিড়ে ফেলে ভূষা সাজ,
দীর্ঘশ্বাস তেয়াগিয়া করি হা হুতাশ।
গণ্ড বেয়ে নেত্রাসার
ঝরে শুধু অনিবার
হেলায় এলায়ে দিয়ে কালােকেশপাশ,
মাের দরশন ছলে
এলি বাতায়ন তলে
বরিষা হইয়া
ওরে মাের বিরহিনী প্রিয়া।
বিদ্যুতে চমকি উঠে
তাের ঐ রাঙা অাখি,
রজনী জাগিয়া,
নিশিদিন আমারে মাগিয়া।
বিস্ত বসন তাের
টুটিয়া লাজের ভাের
সুটিয়া লুটিয়া পড়ে আজি যথা তথা।
বক্ষ তাের দুরুদুরু
মৰ্ম্ম ভাঙি গুরুগুরু
গুমরি গুমরি কাজে বিরহের ব্যথা।
বরিষার রূপ ধরি
পার হয়ে গিরিদরী
পড়িলি আসিয়া
ওরে মাের বিরহিনী প্রিয়া।
ঋতুমঙ্গল
এলি যদি পাগলিনী
আয় তবে বুকে আয়
বাতায়ন দিয়া
ওরে মাের বিরহিনী প্রিয়া।
এ বুকে লইয়া টানি
একবার নিজ সাজে
নিভৃত এ গৃহমাঝে
আসিয়া জুড়ারে সখি তাপিত এ বুক,
অশ্রুসিক্ত মুখখানি
চুমিয়া চুমিয়া আনি মিলনের সুখ।
হিমবিকশিত কায়
দিব অঙ্ক-উষ্ণতায়
তাপিত করিয়া
আয় মাের বিরহিনী প্রিয়া।
“প্তানাং ত্বমসি শরণং”।
সন্তপ্তশরণ মেঘ, বন্ধু তুমি দ্বিধা নাহি তায়
একই দশা দুজনের ব্যথাময় এই বরষায়।
তুমিও গাহিছ বন্ধু মােরই মত বিরহের গান ;
থেকে থেকে চপলায় চমকিয়া উঠে তব প্রাণ।
গুমরি গুমরি বক্ষে গুরুব্যথা তােমারে বিহরে
বজ্র গর্জে মােরি মত তােমায়ােত হৃদয় বিদরে।
আমারি মতন তব বেদনায় সকলি আঁধার
কালিমায় ডুবে যায় কৰ্ম্মহারা নিখিল সংসার।
কঁদিতে কাদিতে তুমি মােরি মত ঘুমাইলে হায়।
সুখস্বপ্ন হের বন্ধু ইন্দ্রধনু বর্ণের আভায়।
৪
৩২
যৌবনের অভিশাপ
মুখচন্দ্রে বক্ষে ধরি যামিনীতে বিনিদ্রনয়ন,
চন্দ্রিকায় রচ’ তুমি কল্পনার মিলন ভবন।
দূরে রহি মােরি মত বিরহিনী তােমায়াে শিখিনী
মিলনের উৎকণ্ঠায় উৎকলাপা কাঁদে একাকিনী।
যৌবনের অভিশাপ।
আজিকে বরষারাণী উড়ায় অঞ্চল
উচ্ছলিয়া উঠিতেছে জীবনের রস,
শিরায় শিরায় রক্ত হইল চঞ্চল,
অনুভবি’ অলকার পবন পরশ।
ক্ষম’ আজি স্বাধিকার-প্রমত্ত যৌবনে,
আজি তার অভিশাপ ফিরাইয়া লও,
বসন্তের রক্ত-রাগােচ্ছ সিত জীবনে
যেমন করিয়া প্রভু ক্ষমা করি সও।
কুকুঞ্জে ভ্রমরেরে, বসন্তে কোকিলে,
ক্ষমিতেছ দ্রোহ মোহ আকুল তৃষায়,
নিত্য তুমি উদ্দামত সহিছ নিখিলে
যৌবনের অভিশাপ ফিরাবে না হয় ?
পরধনে নাহি লােভ, মত্ত স্বাধিকারে,
অবুঝ অবােধ আহা ক্ষমা কর তারে।
শ্রাবণ প্রশান্তি।
বাসব-ভবন হতে এসাে নামি বিলাসী শ্রাবণ,
নটবর হে প্রেমপ্রবণ।
কলকণ্ঠে কল্লোলিনী দূতী তব শ্রেণিরানতা
দুকূল দোলায়ে চলি দিগদিগন্তে বহিছে বারতা।
সাজিল গগণরাণী এলােকেশে বিজলীর সাজে,
কপােলে চুম্বন দিলে, মেঘে স্নান চাঁদ হয়ে রাজে
ধরণীরে সাজাইলে শ্যামশম্পতিশােভা দিয়া
কদম্ব কূটজে কত কুসুমেতে কবরী ভূষিয়া।
বন্ত অঞ্চল চুমি মুগ্ধ অলি মাতিছে গুঞ্জরি’,
কর্ণে দেহ ককুত-মঞ্জরী।
মধুর মিলনময় মৃদুমদ যৌবন জীবন
লয়ে তুমি এসেছ শ্রাবণ।
মদালসা ময়ুরীর নৃত্য গীতে দিলে মধুরিমা,
ভূধর রাণীরে দিলে স্তন্য উৎসে জননী গরিমা।
চাতকীরে তৃপ্তিমদ, কেতকীরে প্রাণের উচ্ছাস,
দেছ ওগাে প্রাণপ্রিয় পল্লীপ্রাণে জীবন্ত উল্লাস,
নবীন পল্লব-ভূষা বল্লরীরে তরু আলিঙ্গন,
সমীরণে, প্রকৃতির সিক্তালকে স্নানা চুম্বন।
দেছ অন্ধকার পথ, অভিসারে চলেছে কামিনী
পরে আলো দিয়াছ দামিনী।
৩৪
শ্রবণ প্রশক্তি
পরক্ষণে তােমা হেরি হে শ্রাবণ রাখালের বেশে
ইন্দ্রধনু শিখীচুড়া কেশে।
শাঙলী ধবলী ধেনু ছাড়ি দিয়া শ্বেত শিলাপরে,
গলে বলাকার মালা বসে আছ উদাস অম্বরে।
তােমার বাঁশরী তানে শিহরিয়া মল্লিকা আকুল,
সিন্ধু পানে ছুটে নদী সচকিয়া ভাঙ্গিয়া দুকূল।
ধাতকী শিহরি কঁপে কামনায় নিকুঞ্জ বিতানে,
কেতকী কত কি কথা কামিনীর কহে কানে কানে
কি যেন ভুলিয়াছিল কার কথা আছিল পাশরি’
বাঁশী তানে স্মরিছে শিহরি।
তােমার মাদক মােহে, ছিল যারা মুদিত মােহিত
জেগে উঠে সহসা চকিত।
উদাস বাঁশরী তানে স্মরিয়াছে সবে প্রিয়জন,
মিলন কামনা জাগে ফুটে উঠে বিরহ বেদন।
চাতকী চাতক যাচে, চক্রবাকী চক্ৰবাকে চাহে,
দাদুরী ডাহুকী আজি ছাতিফাটা কত গান গাহে
মরালী মরাল মাগে, মৃগী মৃগ, ময়ূরী ময়ুর।
নবমেঘবৃত রচে যুবা কবি বিরহ বিধুর।
আঁখি জলে পত্র রচে বিরহিনী জনপদনারী,
মানিনীর ঢালে অখি বারি।
ঋতুমঙ্গল
তারপর একি:হের যুবরাজ হে বীর শ্রাবণ
কোথা তব বিলাস ভবন ?
একি সাজে সেজে এলে ত্যজি বংশী বনফুলহার,
বৰ্ম্মে আবরিয়া তনু, ধনুষ্পণি, ধরি তরবার।
চতুরঙ্গে রণবঙ্গে শত শত তুরঙ্গ কুঞ্জরে,
বৃংহণে হ্রেষণে অস্ত্র ঝনঝনে রথের ঘর্ঘরে,
তােমার সমরসজ্জা। নিনাদিছে কোদণ্ড টঙ্কার
জ্বালায় বাড়ব বহি, ভয়ঙ্কর উঠে হুহুঙ্কার,
দিগ, গজ শির টুটি তরতরে ছুটে মদধারা
স্বেদ বরে নভােজ্যভরা।
এ মূৰ্ত্তি হেরিয়া তব রণমত্ত মহান্ শ্রাবণ,
কাপিয়াছে ভয়ে ত্রিভুবন।
তব পথ ছাড়ি ধরা পার্শ্বে স্থিত জুড়ি দুই পাণি,
দাঁড়ায় কুজনহীন উৰ্দ্ধদৃষ্টি নিঃস্পন্দ বনানী।
সন্তান ছুটিয়া গিয়া মাতৃ বক্ষে লভিছে আশ্রয়
প্লিয়েরে আঁকড়ি ধরে প্রিয়া সে যে কম্পিত সভয়।
পথঘাট জনশূন্য রুদ্ধ দ্বার ভবনে ভবনে,
বিবরে কোটরে নীড়ে পশুপাখী, মৃগ, ঘাের বনে,
ধীরে চুপি নীলবাসে নামে ঊষা মানব আলয়ে,
দিবসের আঁখি মুদে ভয়ে।
শ্রবণ প্রশস্তি
তারপর একি হেরি হে শ্রাবণ, হে প্রেমপ্রবণ
ঢলটল লাবণ্য প্লাবন।
কীৰ্ত্তনে নৰ্ত্তন তব হেরি আজি ভব নদীয়ায়
শােভন সােণার অঙ্গ ধূসরিত ধূলায় কাদায়,
প্রেমাশ্রু ঝরিছে তব দরদর আনন্দ উন্মাদে,
ভুবন বিভাের আজি সুমধুর মৃদঙ্গ নিনাদে।
চরণ চুম্বনে তব ধন্য ধরা উঠেছে মাতিয়া
চঞ্চল চরণ তলে শ্যামাঞ্চল দিয়াছে পাতিয়া,
বিটপী লতায় নদী পারাবারে, প্রেম বিতরণ
মেঘে মেঘে আজি আলিঙ্গন।
নাচিয়া উঠেছে বিশ্ব, একি দৃশ্য, তােমার কীৰ্ত্তনে
হৃদি নাচে তােমার নৰ্ত্তনে।
কল্লোলিনী কুলে কুলে নাচে ঐ উল্লাসহিল্লোলে,
ময়ুর ময়ুরী নাচে তরী নাচে সাগর কল্লোলে,
পল্লী মালঞ্চের তলে নাচে সুখে পল্লীবালাগণ,
কুম্ভিকা কলম্বী জলে নাচে লভি নবীন জীবন।
সারস সরাল নাচে ছিটাইয়া প্রেমবারি কণা
মেখলা দুলায়ে নাচে সুযৌবনা প্রকৃতি ললনা,
নাচিছে নিখিল জন তােমা সনে মত্ত অমরার
তার সনে হৃদয় আমার।
ঋতুমদল
অকস্মাৎসবশেষে একিরূপে আসিলে শ্রাবণ,
শান্ত সৌম্য নয়নপাবন।
লমান জটাজুট বক্ষ শােভা শুভ্র শ্মশ্রুভার,
রুদ্রাক্ষ-বলয় করে, দীপ্তচক্ষু করেতে ভৃঙ্গার,
যজ্ঞভন্ম ত্রিপুণ্ডক ভালে ভাতি করিছে প্রকাশ,
পদ্মগন্ধি স্বেদবিন্দু সিক্ত করে কৃষ্ণাজিনবাস,
মূর্ত তপঃফল সম, যজ্ঞশেষে আঁখি ধুমাকুল
ছিটাইলে শান্তিবারি কমণ্ডলু হতে ফুলফুল।
নিমেষে মুমূর্ষ বিশ্ব হের নব জীবন লভিয়া
পদতলে পড়িল নমিয়া।
যজ্ঞ হতে পৰ্জস্যের, অন্ন হতে জীবের জীবন
জন্ম দিলে দেবর্ষি শ্রাবণ।
তারপর একি হেরি রােমাঞ্চে যে কণ্টকিতকায়,
বসিয়াছ যােগাসনে রুদ্ধশ্বাস, কোন সাধনায় ?
অনাবৃষ্টি শােষ দাহ দ্রোহ আদি সুরারি বিনাশে
আপন অশনি অস্থি দিতে চাহ ভৈরব উল্লাসে ?
সিন্ধুতে স্বনিল শঙ্খ, মর্তে ডঙ্কা, দ্যুলােকে দুন্দুভি
ধূপগন্ধ ইন্দ্রালয়ে, পুষ্পবৃষ্টি করে চরবি,
আপন জীবন দিয়ে বাঁচাইলে তুমি ত্রিভুবন
জয় জয় জয়তু শ্রবণ।
৩৮
জগজ্জীবন
তুমি শুধু ধূমজ্যোতিঃ সলিল বায়ুর,
সমিপাতে সঞ্চারিত জড় অচেতন,
এ কথা ভাবিতে মাের পরাণ বিধুর,
এ কথা মানিতে মাের সজল নয়ন।
কে তবে সজীব বন্ধু তুমি যদি জড় ?
জীবন 'ভাণ্ডার তুমি মৃতসঞ্জীবন,
তােমার জীবনে বাঁচে বিশ্বচরাচর,
তােমার পরশে জাগে শ্যামশিহরণ।
মরুতে ফুটাও ফুল পাষাণে অঙ্কুর,
শ্মশানে জীবন জাগে নরকে উদ্ধার,
হে পর্জন্য, লতি তব অন্ন সুমধুর,
জীবনে জাগ্ৰত আছে মানব সংসার।
জড় হয়ে রও যদি একটি বরষ,
সমস্ত নিখিল হবে নির্জীব নীরস।
ভাদরে।
আজিকে মধুর ভরা ভাদরে।
দরদর বার বয়
সুধারস ঘরাময়,
দাদুরী মুখরা হলে আদবে।
ঋতুমঙ্গল
গিরিরী বিদরিয়া জলধারা চলিছে
নদনদী গদ্গদূ নাদে আজি মিলিছে
কৃষাণী আদুরী হয়ে পতি কোলে ঢলিছে
ভাঙিল সকল বাধা বাদরে।
কুলায়ে ঘেষিয় বসে গায়ে গায়ে পাখীরা,
নিশীথেও মিলে আজি যত চােচখীরা,
গৃহে করে কলরব সব সখাসখীরা,
নবীন মাধুরী বধূ-অধরে ॥
হৃদয়ে বেদনা লয়ে মিলনের পিয়াসী,
কোন পাপে আছ আজি আনমনা উদাসী,
সব বাধা ভেঙে মিল’ সুদূরের প্রবাসী ;
মিছে কেন মেঘদূতে সাধ'রে।
ঝাক ছেড়ে আজি মীন ঘুরেনাক সরসে।
আধ ঘােমটার আড়ে ধরা কার পরশে
শ্যামল দুকূলে ঢাকে লাজে গিরি উরসে।
করী শিরে ঝরে ধারামদ রে ।
N শ শরতের গান। বরিষ গত! মরালরথে শরৎ এলো বঙ্গে, কমল এলো, কুমুদ এলাে আরো কত কি সঙ্গে। নীরব করি ডাহুকীডাক মিলনে গাহে চক্রবাক ; কীচকবনে পবন আজি বাজাল শুভ শঙ্খ, লাজ বরষে ভরিল আজি হ্রদসরসীঅঙ্ক। লালকরবী অপরাজিত শেফালি হলাে ফুল্ল, সিত বকের শাখায় শত বকের শিশু দুল্লো। বাতাবি নাগরঙ্গ-বনে পশিল চোর সঙ্গোপনে, আলােকে আজি পড়িল ধরা যা ছিল যেথা গুপ্ত- পুলকে,আজি শিহরি জাগে অবশ সব সুপ্ত । ৪১
ঋতুমঙ্গল
গগনরাজ খুলেছে আজ তারার দাস,
শীর্ষে তার শােভিছে কিবা সিত-নীরদ ছত্র।
অর্ধ লয়ে পর্ণ-পুটে
হাজারেলাখে আজিকে জুটে
মরকতের চরণ পীঠে বৈতালিক ভৃত্য,
হেরিছে রাজা চটুলনটী-কলতটিনী-নৃত্য।
কাননরাণী মাতিল আজি সপ্তচ্ছদ সঙ্গে,
সর্জ নীপ সহিল, দুখে দিলনা কঁাটা অঙ্গে।
কাশের ক্ষেতে চাহগাে যদি
দেখিবে ছুটে দুধের নদী ।
দোয়েল শুকে মুখর করি’ পাপিয়া শ্যামাকণ্ঠে,
প্রখরফুধাপিপাসাহর কে আজি সুধা বন্টে
?
•
কোবিদারেরি মধুমদিরামত্ত মধুমী-
অধররাগে বন্ধুজীবে ফুটালে বনলক্ষ্মী
লভিয়া তার চরণতল,
বিক থলকমলদল।
কর্ণে তার কণিকা-র দুলিল অবতংস,
গাহিল শুভশংসি তানে সারস কলহংস।
শরতের গান
গর্ভতারে বিবশা শালি আজিকে কৃপাভিক্ষু-
ভূতলে সে যে পড়িবে ঢলে’, না ধরে যদি ইক্ষু ;
চুলকি আজি শফরী আঁখি,
সরসী কথা কহিছে ডাকি।
মলিন জল হলাে অমল আবিলক্লেশূন্য,
দুরিল অহিষাগের পাপ যথা ভারত পুণ্য।
মেঘের মত শ্যামল লয়ে ধরণী হলাে ধন্যা,
ভূতলে বান শুকিয়ে হলাে আকাশে আলােবন্যা।
চাতক কিগাে অলির বেশে
লুকিয়ে নামে ফুলের দেশে ?
ইন্দ্রধনু পড়িল লুটে বনকুসুমকুঞ্জে,
চপলা আজি অচলা হলে সন্ধ্যারাগপুঞ্জে।
আজি জননী শ্যামলমণি ধরেছে কিবা বক্ষে,
আঁচল ঘেরি তনয়গুলি তৃপ্তি ভরা চক্ষে ;
শাসন মানে বাসনা রাজি
ভরসা ভালে ভাতিছে আজি
মাদক লােল লালসাদ্রোহ হয়েছে সব ক্ষান্ত
সত্ত্বসিত সৌম্য আজি সকলি শুভ শান্ত।
শারদ লক্ষী ।
তু
চরণ পরশে প্রাঙ্গণে জাগে স্বর্ণের আলিপনা।
আলো করে দীপ তুলসীকুঞ্জ,
কূজন-ব্যাকুল কপােতপুঞ্জ,
শঙ্খ-স্বননে ভবন-অঙ্কে প্রাণে প্রাণে মূরছনা।
তুমি নীলাকাশে নীল নয়ন মেলিলে অলােকে ভূলােক ভায়,
শিথিল করিলে কোরকের মুঠি
কনক কমল উঠিল যে ফুটি’
তব কণ্ঠ কপিলে তেয়াগি কুণ্ঠা লাখ লাখ পাখী গায়।
এস মা, সারদা শারদলক্ষ্মী করি বরাভয় দান,
বিতরিয়া সুধা, হরি’ তৃষা ক্ষুধা, তুষিয়া তাপিত প্রাণ।
আঁচল লুটিলে কনক-কিরণে নীহারে মাণিক জ্বলে।
টুটিনে চিকন চিকুরবন্ধ,
দিকেদিকে ছুটে শ্যামলানন্দ,
কঙ্কণ স্কুণে কূলে কূলে লুটি’ কল কল নদী চলে।
হাস্যে প্রবাল মৌক্তিক ক্ষরে মরকত ঝরণায়।
বুলাইলে কর তনু নিরাময় ;
কান্তি পুষ্টি তুষ্টির জয় ;
আশীষ-বরষে শালির স্তম্ব নমিছে চুম্বি’ পায়।
এস মা, সারদা শারদলী করি' বরাভয় দান,
বিতারিয়া সুধা, হরি’ তৃঙ্গুধা, তুষিয়া শিতগ্রাণ ।
K
৫ ৪৪
.
আগমনী ।
এসগাে জননী ফিরিয়া আবার জীর্ণভগ্ন কুটীর বক্ষে,
গৃহের হাস্য কল কোলাহলে, শিশুর আস্যে, স্নেহের চক্ষে।
এস প্রবাসীর আকুলানন্দদুরুদুরুবুকে, মাতার হর্ষে,
এস মা লক্ষ সুতের কণ্ঠে, পুণ্য ঘটের সলিল বর্ষে।
জননী তােমার পরশে ধরার ধান, ধন, প্রাণ পাক মা বৃদ্ধি,
আন মা পুষ্টি, দীপ্তি তুষ্টি, আন মা শুদ্ধি, তৃপ্তি, ঋদ্ধি।
এসমা অভ্র-উজল গগনে, এসমা শুভ্র কাশের ক্ষেত্রে,
এস অজের অরুণ চিত্তে, অপরাজিতার করুণ নেত্রে।
এসমা ইন্দ্রধনুর তােরণে, চন্দন ধূপ উশীর গন্ধে ;
এস কুমুদীর হৃদয় তরীতে, কৌমুদী নীরে পরমানন্দে।
জননী তােমার পরশে ধরার ধন, ধান, প্রাণ’ পাক মা বৃদ্ধি।
আন মা পুষ্টি দীপ্তি, তুষ্টি, আন মা শুদ্ধি, তৃপ্তি, ঋদ্ধি।
এসমা মরাল কমল মালায়, পণ্য পূরিত তরণী পুঞ্জে,
শালি শস্যের শ্যাম সম্পদে, ছাতিম বাতাবী আতার কুঞ্জে।
এসমা তরুণ অরুণােজ্জ্বল নীহারনিচিত শম্প অঙ্গে,
এস বােধনবংশী স্বননে গৃহে গৃহে আজি এসমা বঙ্গে।
জননী তােমার পরশে ধরার ধন, ধান, প্রাণ, পাক মা বৃদ্ধি,
আন মা পুষ্টি, দীপ্তি, তুষ্টি, আন মা শুদ্ধি, তৃপ্তি, ঋদ্ধি।
পত্রপুষ্পে পুণ্য পুলকে ও পদ পরশে পূরুক পল্লী,
বিসকিসলয়ে করে বাপী, শিহরি উঠুকাবিটপী বল্লী।
৪৫
ঋতুমঙ্গল
তব কপূর দৃষ্টিতে ধেনু আপীন উছসি ঢালুক দুগ্ধ,
আজি জীবলােক চরণে তােমার লুটিয়া পড়ক মন্ত্রমুগ্ধ।
জননী তােমার চরণে ধরার ধন, ধান, প্রাণ পাক মা বৃদ্ধি
আন মা পুষ্টি, দীপ্তি তুষ্টি, আন মা শুদ্ধি, তৃপ্তি, ঋদ্ধি।
শােকহত লাগি আন’ সান্ত্বনা পিতের লাগি পরমশান্তি,
পীড়িতের লাগি সুধার ভাণ্ড, নিরাময়বাণী মােহনকান্তি।
বন্যামগন সন্তানে রাখি অঞ্চল ছায়ে কর মা ধন্য,
আনমা শুন্য অন্নসত্ৰ, তৃষিত ক্ষুধিত এ জনারণ্য।
জননী তােমার পরশে ধরার ধন, ধান, প্রাণ পা’ক না বৃদ্ধি,
আন মা পুষ্টি, দীপ্তি তুষ্টি আন মা শুদ্ধি, তৃপ্তি ঋদ্ধি।
পূজার আহ্বান।
এখনো বােধনসানায়ের তান পশেনিক কাণে তাের ?
ওরে পরবাসী ভাঙরে শিকল তুচ্ছ কাজের ডাের।
গুটাও গ্রন্থ সুবােধ ছাত্র ;
উঠাও যন্ত্র ঝাড়িয়া গাত্র,
সকল যন্ত্ৰী সকল তন্ত্রী সকল পরের দাস
আজি উদ্ধত স্পর্কিত প্রাণে ছিড়ে ফেল সব পাশ।
ছুড়ে ফেলে দাও সব দায়িত্ব প্রভুর গৃহের চাবি,
নিয়ে এস কাজ অটল অবুঝ সব আবদার দাবি,
পূজার আহ্বান
হােক শত গােল ভুল কাটাকাটি
বােক গোঁজামিল, থাক খাটাখাটি,
হিসাব নিকাশ চুলােয় পলাক, সকল বাঁধন হারা,
তুমি ছুটে আজি বাতাসে বেরোও ভাঙ্গিয়া লৌহকারা।
বাঁশরীতে বাজে বারোয়া রাগিণী গৃহদ্বারে থাকি-থাকি
সব আয়ােজন হইয়াছে শেষ, তুমি শুধু আছ বাকী।
একমাস হতে পথপানে চাওয়া
জননীর নাই খাওয়া-পরা-নাওয়া।
লক্ষ কাজের মাঝেও কে যেন বাতায়নে থাকে চেয়ে,
দিগন্তে প্রতি তরী পানে অনিমেষ তব মেয়ে।
শিউলি কুসুমে আঙিনা ভরেছে আলিপনা আধ ঢাকা,
অলিপাখীফুলে আবাহনসভা রচেছে দাড়িমশাখা।
কদলীকুঞ্জ কাদিভারে নত,
আঙিনায় ফল সঞ্চিত কত।
বুধুগাই গৃহে ঢলিতেছে দুধ কেঁড়েতে ধরে না আর,
উড়ুউড় প্রাণে দুরুদুরু বুকে কত ব’বে পর?
এখনাে নগর বিবরে ঘৰ্ম্ম মুছিছ, ফেলিছ শ্বাস ?
পিজর দুয়ারে পঁাড়ায়ে ওপাখী হের আজি নীলাকাশ,
আসুক ঝঞ্চা আসুক বৃষ্টি
রসাতলে যাক সকল সৃষ্টি,
এসে ধর’ ঈড় নিজে টান’ গুণ, ঠেল শকটের চাকা,
কিছু বা খায়ে কিছু নিজ কাঁধে লড়েছুট’ কাদামাখা ।
৪৭
খতুমঙ্গল
কত ভুল হলে কি হবে ভাবিয়া ? কত রয়ে গেল পড়ে
তালিকামতন বরাতী কয়টি কিনেছত ভাল করে ?
বাকী থাকে থাক—নাই হলো টেড়ি,
কাপড়ের পাড় নিয়ে মিছে দেরী,
হাসিমুখে শুধু গৃহদ্বারে এস গােধূলির ধূলি মাখি ;
হেথা যে হৃদয় বড়ই ক্ষুধিত, তৃষিত যে বড় আঁখি।
অনুনয়
বােধন বাঁশী শুনে মাগো, মনটা আমার কেমন করে,
আসছে পূজা বলে আমার আহাদ যে আর না ধরে!
বাবা আমার আসবে বাড়ী, জামা জুতা আনবে কত ;
বুকটা আমার উঠছে নেচে, ভাবনা আমার জুটছে যত।
আজ হতে আর পড়বে না মা, মাষ্টারটা যা মা চলে,
শরীর আমার নাইকো ভাল মিথ্যা করে পাঠাও বলে।
আজকে আমি লাফাই যদি আদে’ তায় বলাে নাক’ ;
মা তােমার আজ পায়ে পড়ি, গাল দিওনা কথা রাখ।
দুর্গাপূজার দালান ঘরে গড়ছে ঠাকুর কুমাের দাদা,
ময়লা হবে তােক মা কাপড়, মাখবো আমি তাহার কাল
অসুর আছে দাত খামুটে, সিংহ আছে কামড়ে তায়,
মা তুমি তা দে যদি, ভয়ত তােমার পায়ই পায়।
৪৮
অনুনর
মুখে তাদের হাত দেই মা, ভয় পায় না আমার দেখে,
খুকী ভয়ে আর আসে না, দূরে থেকে পলায় ডেকে।
ভাত খেতে মা ভুলিই যদি, নিজে যদি তুমিই ডাক,
মা তােমার আজ পায়ে পড়ি, গাল দিও না কথা রাখ’
কুসুম ফুলে রং করা সেই কাপড়খানি জড়িয়ে গায়,
খুকী যদি আমার সাথে ওপাড়াতে যেতেই চায় ।
ননীর ঠাকুর কেমন হ’ল, আসবে কবে ভুতাের দাদা,
তাদের বাড়ী আটচালাটি তালের পাতে হচ্ছে বাঁধা,
এসব জেনে আসতে আমার দুপুর যদি বয়েই যায়,
খুজতে আসে রাখাল যদি বাড়ীর লােকে কেউ না খায়,
তুমি যদি তেলের বাটি গামছা হাতে চেয়েই থাক,
মা তােমার আজ পায়ে পড়ি, গাল দিওনা কথা রাখ।
পদ্ম আমি তুলবাে আজি, কবাে পথে ছড়াছড়ি,
আহাদেতে কাশের ক্ষেতে আজকে দেব গড়াগড়ি ;
সবুজ সবুজ ঢেউ খেলেছে ধানের ভুয়ে, অবুঝ আমি,
ঝম্ফ দিয়ে দুড়মুড়িয়ে নদীর জলে পড়বাে নামি।
সানাই বাঁশী ডােল কাশীতে লেগে যাবে বড়ই ধুম,
চক্ষু বুজে ভাববাে শুয়ে, দুপুর রাতে নাইক’ ঘুম।
নতুন কাপড় চাই মা আমার, পুরাণােতে হবেনাক’
মা তােমার আজ পায়ে পড়ি, গাল দিও না কথা রাখ।
৪১
রাঙা চুড়ি।
জনক আসিল বাড়ী,
এনে দিল রাঙা চুড়ী
পূজাদিনে মেয়েটিরে তার,
পরি’ তাই দুটি হাতে
সে আজ পুলকে মাতে,
দেখায়ে বেড়ায় দ্বার-দ্বার।
সানাই শুনিয়া কাণে
পূজার মণ্ডপ পানে,
ছুটে যেতে পড়িল ধূলায়,
আঘাতে কাচের চুড়ী একেবারে হলাে গুড়ি,
চেয়ে দেখ, একি হায় হায়।
উঠিবে না ধূলা ছাড়ি,
ফিরিবে না আর বাড়ী,
কাদে শুধু গলা ছাড়ি’ দিয়া ;
ভাঙা চুড়ি বার বার
জোড়া দেয় কাদে আর,
চুল ছিড়ে লুটিয়া লুটিয়া।
পিতা আসি তুলে বুকে,
চুমা দিয়া বলে মুখে,
‘এতে আর কিসের কঁাদন ?”
ভয়ে খুকী মুদে আঁখি, মা কি বলিবে ডাকি।
নষ্ট হ’ল বহুমূল্য ধন !
পিতা কহে, 'মা আমার, কেন মিছে কঁাদ আর
এনে দিব—ভারি এর দাম।
থামিবে না কোনরূপে,
তবু খুকী ফুলে ফুপে
কাদিয়া চলিবে অবিরাম।
বিজয়ার আহ্বান
কে বুঝিবে তার ব্যথা? কহে সবে বাজে কথা,
মূল্য শুধু ভাবে পয়সায় ;
আকুল বাঞ্ছার যাহা
যত ক্ষুদ্র হােক তাহা,
মিলিবে কি হাজার টাকায় ?
সমগ্র বালিকা-প্রাণ
চুড়ী সনে খান খান।
দাম দিবে কেবা বল তার ?
এমন পূজার দিনে সেই রাঙা চুড়ী বিনে
তার যে গো সকলি আঁধার ।
বিজয়ার আহ্বান
আজি এস ওগাে এস বুকের সকাশে কে আছ দাঁড়ায়ে দূরে,
মিল’রে শূন্য বেদীর নিকটে,-জননী-শূন্য পুরে।
ভাল হয় মিল আঁখির সলিলে,
ভাই বলে আজ ভায়েরে ডাকিলে,
আজিকে হৃদয়ে হৃদয় মিলিলে কভু নাহি ভাঙে চুরে।
এস ওগাে এস প্রাণের নিকটে, কে আছ দাঁড়ায়ে দূরে।
ওরে ও কাঙাল কে আছ দুয়ারে নয়ন করিয়া নীচু
কেগে শােকাতুর মুছিছছ অশ্রু দাঁড়ায়ে সবার পিছু।
ধনী দীন আজি নাহি ব্যবধান,
মা’র স্নেহ সবে করেছে সমান,
ঋতুমাল
বিদ্যাবুদ্ধি ধন জাতি জ্ঞান প্রভেদ নাহিক কিছু,
ছাড়’ সঙ্কোচ মুছ’ আঁখি ভাই নয়ন করােনা নীচু।
এখনো যজ্ঞবিভূতির কেঁাটা ললাটে বিতরে ভাতি,
শােভিছে হস্তে অপরাজিতার শ্যামল বলয় পাঁতি,
মার চঞ্চল অঞ্চল বায়
পুলকাঞ্চনে শিহরিছে কায় ;
চন্দনরাগ চন্দ্রের প্রায় উজলি রয়েছে রাতি,
মায়ের আশীষ হবে আমাদের সারা বরষের সাথী।
আজি শূন্য যদিও বাহিরের বেদী অন্তরে তাতাে নয়
তবে কেন খেদ, তাই এ মিলনে বুঝে কর শােকজয় !
মা বলে ডাকিতে দিয়ে অধিকার,
করেছে জননী সবে একাকার ;
বছর বছর দীন হীন লাগি মার স্নেহ দেহময়
সবে তারি ছেলে বুঝাতে তাহার বাহিরে অভ্যুদয় !
আজি লয়ে এস শুধু প্রেমের বন্যা লয়ে এস কোলাকুলি
আজি ক্ষমা কর সারা বরষের সব অপরাধ গুলি।
দূরদেশে আছে বন্ধু যে জন,
স্নেহভরে তারে করহ স্মরণ ;
লােকান্তরের প্রিয় জনটিকে স্মরিতে যেও না ভুলি,
ঘৃণা কর যারে তাহারাে সহিত কর আজি কোলাকুলি ।
{
হে ম স্ত
হেমন্তোৎসব
(১)
মিল’-মঞ্জুল প্রাণে মঙ্গল দিনে বঙ্গের ভাই ভগ্নী
আজি-মন্থন কর অন্তরভরা পঞ্চ যাগের অগ্নি,
এস—সুহ্মনপূত, সস্নেহ চিতে গৌরবধূত রঙ্গে,
এসকুন্দদশনে মন্দহসনে শুভ্র বসন অঙ্গে,
ওগাে–বিশ্বে আজিকে নিঃস্ব কে আছে, বিত্ত কি শুধু অর্থে?
ওগাে-ভগ্নী ভ্রাতার সম্প্রীতি হতে সম্পদ কিবা মর্ত্যে ?
সবে-চিত্তে আজিকে সঞ্চার কর’ ঐক্যের অনুরক্তি,
আজি-বাক্যে করমে জাগ্রত কর’ শ্রদ্ধা, নিষ্ঠা, ভক্তি,
মিল’-মঞ্জুল প্রাণে মঙ্গল দিনে বঙ্গের ভাই ভগ্নী
আজিমন্থন কর অন্তর ভরা পুণ্য যাগের অগ্নি।
ওগাে-শুদ্ধ যে নামে আহ্বানে হয় চক্ষু সলিল পূর্ণ,
কভু-গণ্ড যাদের পাণ্ড হেরিলে বক্ষটি হয় চূর্ণ,
হের—অদ্য তাদের হৃদ্য মিলনে বিশ্বে নেমেছে স্বর্গ,
ঐ-পুণ্য নয়ন পল্লবস্থায় সঞ্চিত অপবর্গ।
ঋতুমল
রহ-ভগ্নীভাতার সখ্যে যেন গাে অদ্যাপি একই গর্ভে,
কুর-অন্তক দ্বারে কন্টক আজি নিক্ষেপ কর’ গর্বে,
ঐ—অন্তরতম প্রার্থনা পশে নিশ্চয় বিভু কর্ণে,
তঁার-সন্তান তরে অশ্রুশিশির সঞ্চিত আঁখি পর্ণে,
মিল’—নিৰ্মল প্রাণে মঙ্গল দিনে বঙ্গের ভাই ভগ্নী
আজিমন্থন কর অন্তরভরা পঞ্চ যাগের অগ্নি ।
আহা—নিষ্ঠার দুধে শ্রদ্ধার ক্ষুদে পক যে পরমান্ন,
কর’—দীর্ঘ আয়ুর যজ্ঞীয় চৰু অৰ্য বলিয়া মান্য।
লাজ-কুষ্ঠি অবগুণ্ঠন ফেলি’ সঙ্কোচ বাধা বন্ধ,
বাজ—হিন্দুর এই পুণ্য প্রথায় অর্পিল প্রেমানন্দ।
কার,-যত্নের ধন রত্ন পরম মৃত্যু সাগরে মগ্ন,
আহা—অদ্য সে শােক সদ্য হইয়া কণ্ঠের স্বরে লগ্ন,
ঘন-দুঃখের মেঘে অশ্রু বরষে লুপ্ত আঁখির দীপ্তি,
লভ-অন্যের ভায়ে ভ্রাতৃ মননে আংশিক পরিতৃপ্তি।
মিল—সুন্দর প্রাণে মঙ্গল দিনে বঙ্গের ভাই ভগ্নী,
আজিমন্থন কর অন্তর ভরা পুণ্য বাগের অগ্নি।
{
ঐ—অন্তর-ঘন মন্তরে বােন রক্ষার টীকা অঙ্কে,
তাহে—কুগ্রহ যত নিগ্রহ লভে কল্যাণময় শখে,
তার-চন্দন চুয়া বিন্দুর ভাতি ভাস্বর করে মূর্তি
শুধু তাম্বুল যার সম্বল, তার অন্তরে ক্ষতি পূর্তি।
কর—ভক্তি আনত কুন্তলে তার ধান্য দূর্বা বৃষ্টি।
তার—গুপ্ত সহন-দুঃখ দহন নির্বাণে রাখ’ দৃষ্টি।
হেমন্তোৎসব
কর’-প্রার্থনা, যেন ভগ্নীর গৃহে লক্ষ্মীর কৃপা বর্ষে
তার—সিন্দুর যেন সুন্দরতর অক্ষয় হয় হর্ষে।
'মিল’-নন্দিত প্রাণে মঙ্গল দিনে বঙ্গের ভাই ভগ্নী
আজিমন্থন কর অন্তর ভরা পঞ্চ বাগের অগ্নি।
( ২ )
আজিকে বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনের পরম মিলনের দিবসে,
সকল বাধাহারা হিয়ার রসধারা, প্রাণের পাই সাড়া হরষে।
শাস্ত্ৰ আজি তার রুক্ষ আঁখি তুলি
শাসন করেনাক, ধরে না দোষগুলি ;
হিয়ার অন্তরে মন্ত্র জাগে যাহা, আজিকে নহে তাহা ঘৃণ্য,
প্রেমের অন্ত্রে যে সকল শাস্ত্রের বাঁধন শৃঙ্খল ছিন্ন।
ললাটে লেপি চুয়া অৰ্পি পানগুয়া বিপ্রে গােপবালা পরশে,
রঙীন আনকোড়া লতিয়া শাড়ীজোড়া বাবুর শিরে প্রীতি বরষে।
ভৃত্যে বলি দাদা আজিকে ধনিবালা
সমুখে ধরে পরমান্নভরা থালা।
দাসীর কর হ’তে আশীষ লভে আজি প্রভুর পুত্রেরা সাদরে,
আজিকে বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনের পরম মিলনের বারে।
নগর হ'তে আজি এসেছে ধনিজায়া কাঙ্গাল ভ্রাতাটির ভবনে,
ভাতার ব্যথা স্মরি সােণার শেজ’পরি রুচেনি তার সুখ সেবনে ;
সােহগে ঢল ঢল, নয়ন ছল ছল,
মুক্তা বরষে সে আজিকে অবিরল।
ঋতুমাল
যেজন ধনবান প্রতুল করে দান বঙ্গে বাজে ব্যথা কত না,
দুখিনী ভগিনীর মুছায় আঁখিনীর সারাটি বরষের যাতনা।
আজিকে হেন দিনে শ্বশুরগৃহ কোণে ভাসিছে কে গাে আঁখি সতি
শাশুড়ী নিষ্ঠুরা রাগিয়া জ্ঞানহারা, বাপের বাড়ী যাবো বলিলে।
যতনে কত কি যে সকলে বঞ্চিয়া,
বুকের অঞ্চলে রেখেছে সঞ্চি,
একটি দিন তরে বিদায় মাগে সে যে কাঁদিয়া সকলের চরণে,
সারাটি বরষেরে আঁধার করােক একটি দিবসের কারণে।
আজিকে সাত ভাই চম্পাসম জাগি রহ এ বঙ্গেরে উজলি’
ভ্রাতৃগরবিনী পারুল ভগিনীর উঠুক হৃদিসুধা উছলি,
কাহার ভাই নাই কে কাদে ধূলিতলে,
মুছাও অঞ্চলে তাহার আঁখিজলে,
একের অভাবেরে ডুবাও সাতটির স্নেহের সাত সুধা সাগরে,
আজিকে বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনের পরম মিলনের বাসরে।
হেমন্তের শস্যক্ষেত্রে
দিগন্ত বিশ্রান্ত ঐ শ্যামসিন্ধু করে টলমল
পদ্মদশে তথা নারায়ণ শ্যামলষন্দর,
শ্যামাঞ্চল ঘেরা অঙ্গ, লক্ষ্মী তার সেবে পদতল
পারিজাত পরাগের অঙ্গরাগে বরাজ ধূসর।
t
নবান্ন
সমীর সাঁতারি চলে বহি বহি অমৃতের কণা
মরকতে পদ্মরাগ ফলাইছে কৌস্ত ভের জ্যোতিঃ,
উচ্চৈঃশ্রবা ঐরাবত ছুটাছুটি করে আনাগােণা
বরুণের রত্নাগার লুটে লুটে আনে রত্ন মােতি।
অঞ্চল মাণিকে ভরা বিচ্ছুরিছে তার রশ্মিমালা
ভরেছে কড়ির ঝাঁপি আশীর্বাদে, মঞ্জ ষা, কল্যাণে
দুগ্ধে ভরা স্বর্ণকুন্ত অন্নে ভরা রতনের থালা।
প্রাণেশের বরাভয়, পুত্র-স্নেহ ভাতিছে বয়ানে,
সমাপি পতির সেবা চলে লক্ষ্মী সন্তানভবনে
দ্রোণপুষ্পে লাজবৰ্ষ, বাজে শঙ্খ প্রাঙ্গনে প্রাঙ্গনে।
নবান্ন
আজি বঙ্গের পল্লী আলয়ে নবীন ধান্তে নবান্ন,
পুরাতন আজি লভিছে বিদায় নূতনের আজি প্রাধান্য।
বাজায় শঙ্খ কুলবধুগণ, ঘরে দ্বারে আজি রচে আলিপন,
ভিক্ষুকও আজি করে বিতরণ কৃপণেও আমি বদান্য।
আজি বঙ্গের পল্লী আলয়ে, সােণার ধান্যে নবান্ন।
অতিথিরে আজি ডেকে আনে গৃহী সমাদরে সে যে আরাধ্য,
কাকে কুকুরেও সকলের আগে লভিছে আজিকে সুখাদ্য।
গিন্নীর রূপে আজিকে কমলা আনপূত
শুচি থকুন্তলা
ধরেছেন হাতে অন্নের থালা ব্যঞ্জন তাহে বাহান্ন।
আজি বঙ্গের আলয়ে আলয়ে পরমােৎসবে নবান্ন।
}
ঋতুমঙ্গল
দেবগণ আর পিতৃপুরুষ আছেন যাঁহারা পরতে
তাঁহাদের সনে পংক্তিভােজন হয় আজি হেথা একত্রে।
নিঃস্ব বলিয়া ছিল যে মলিন, পেলেও প্রতুল পুনঃ দানে দীন,
আজি তারা তাই করে বিতরণ প্রতাত হইতে সায়াহ।
পরমােৎসবে হাসি কলরবে আজিকে বঙ্গে নবান্ন।
বহুদিন হতে অর্ধ অশনে দেহ হয়ে গেছে বিশীর্ণ,
খেতে পাওয়া চেয়ে দিতে না পারিয়া হৃদয় তাদের বিদীর্ণ।
এ দানপত্রে এই শুধু ব্যথা, ভাবে না বাঙ্গালী আখেরের কথা,
লক্ষ্মীর সুত ভিক্ষা যে মাগে দুঃখ কি ইহা সামান্য ?
আজি বঙ্গের পুণ্য ভবনে নবীন ধান্যে নবান্ন।
শেফালি
অশুভ আমার পরশ-বাতাস—আমি গো দুখিনী শেফালি।
চুয়াে না, আমি যে কানন-রাণীর সদ্যোবিধবা দুলালী।
কালি ছিল মাের বাসর-শয়ন,
প্রিয় সনে রাতে হইল মিলন,
কত রসাবেশ, কথা সে অশেষ, রাতি জাগি হাসি কত বা।
প্রভাতের সনে ঝরিয়া পড়েছি, হয়েছি অভাগী বিধবা।
এখনাে রয়েছে তাম্বুল-রাগ অধরের’ পরে লাগিয়া,
এখনাে এ দেহে জাগে রােমাঞ্চ প্রিয় সনে রাতি জাগিয়া ;
স্বেদকণাগুলি রহিয়াছে গায়ে
নীহারের মত, যায়নি শুকায়ে,
4
৫৮
হেমন্ত নিশার
}
এখনাে প্রিয়ের চুম্বনরাগ শােণিতে রয়েছে জমিয়া।
তবু প্রাতে, বালা, হয়েছি বিধবা পড়িয়াছি ধূলি চুমিয়া।
রসাবেশে যবে ভরপূর প্রাণ কালি কিসলয়-শয়নে,
ইন্দ্রধনুতে ভরেছে পরাণ, তাজড়িমা নয়নে,
কালকীটে নাথে দংশিল শিরে,
ফুরাল সকলি, নীল তনু ধীরে,
বাসর-শয়নে বিধবা জগতে-হেন অভাগিনী নাই রে।
রৌদ্রচিতায় সহমৃতা হতে চলেছি, বালিকা, তাই রে।
ছুয়াে না বালিকা, আমিরে অভাগী, শুধু যে মরণ চাহি গাে,
তােমার পুণ্যপুকুরের ব্রতে মাের তরে ঠাই নাহি গাে।
যদি চাও তবে লহ ডালা ভরে
প্রিয় লাগি’ বুকে যে শােণিত ঝরে,
বসন রঙায়ে পরিও লভিবে জয় তবে নারী-জীবনে,
প্রেমবিজয়ের বারতা ঘােষিবে সে পীতকেতন ভুবনে।
হেমন্ত নিশায়
তুমি আমায় জাগাইতে করতে ডাকাডাকি
তবু আমার ভাঙত নাক ঘুম,
হাতে করে পাতায় ধরে খুলে দিতে আঁখি
গণ্ডে আমার খেতে শতেক চুম।
তুমদ
হতাশ হয়ে ছেড়ে দিতে অঙ্গ দুলানন,
ঘুমত আমার ভাঙত নাক ত্বরা।
এমনি তােমার পরশ প্রিয় সকল ভুলানাে
এমনি মােহন, ঘুমে মগনকরা।
হেমন্তের এ দীর্ঘনিশা ঘুমটি নাহি মােটে,
শষ্যাতে আজ রাত্রি সারা লুটি,
শেষ রাতেতে তাটুকু যদিই বা সে জোটে,
চম্কে আবার আপনি জেগে উঠি
আজকে তুমি এসাে প্রিয় হতাশ হবে না,
সারানিশি রইব আমি বসি,
পড়বে চুলে-রাত্রি জাগা তুমিই স’বে না
হেরব কোলে সুপ্ত মুখশশী।
আজকে হঠাৎ এসাে যদি আমার গৃহদ্বারে
ডাকৃতে মােরে হবেইনাক স্বামী
হবেনাক দ্বারে আঘাত দিতেই একেবারে
পায়ের ধ্বনি চিবাে শুনে আমি।
তুমি যখন কাছেই ছিলে—এমনি পােড়া বিধি
ঘুমে পড়ে তােমায় হারাতাম,
স্বপনেও পাইনা বুকে আজকে তােমা নিধি
আজকে নাহি স্বপনেরও নাম।
শিশির
শীতের প্রতি
ওগো জ্ঞানী ওগো বৃদ্ধ স্তব্ধধ্যানী হে শীত মহান
আড়ম্বর-আন্দোলনশূন্যচিত্ত গন্তীর ধীমান।
করেছে নিবিড় চিন্তা তব শিরে খালিত্য প্রকট,
চর্মে চিহ্ন রেখে গেছে জীবনের সহ সঙ্কট।
ইন্দ্রিয়ের দুর্গগুলি চুর্ণ কৰি সমরে আকুলি,
শােক-তাপ একে গেছে ও ললাটে বলীরেখাগুলি,
পেলব কামনারাজি তব আজি পলিত গলিত,
ব্ৰচৰ্যদৃঢ় আর যােগজয়ী যা ছিল ললিত।
আজি নাই দৃপ্ত কণ্ঠে বজ্র-গৰ্জ ঘাের ঘনলে,
বিদ্যুৎ কুটী রােষে আঁখিপুটে আজি নাহি জলে।
তরঙ্গের চললাস্যে আজি নাই যৌবন বিলাস
কুজনের কলহাস্যে নাহি আজি প্রমত্ত উল্লাস।
অােক কদম্ব চম্পা মুচুকুন্দ মল্লিকার মালা,
শুকাইছে উপবনে, শূন্য আজি প্রেমােৎসবশালা।
ঋতুমঙ্গল
তোমার দেউল শূন্য, পূর্ণ শুধু শুষ্ক পত্রহারে,
দশা-তৈলহীনদীপে, শুন্য কুম্ভে, ধূপভস্ম ভরে।
একে একে শেষ এবে জীবনের পৰ্বপূজা সব,
শূন্য দোল রাসমঞ্চ থেমে গেছে শঙ্খঘণ্টারব।
গৃহধৰ্ম্ম করি শেষ ওগো ত্যাগি চিত্ত করি স্থির,
আচার্যের দর্ভাসনে বসিয়াছ বস্তুজয়ী বীর।
ললিত শ্যামল মােহে, তব জ্ঞাননেত্র মেলে চাও,
দুঃখের নীহার দিয়ে ঝরাইয়া উড়াইয়া দাও ।
টুটাইয়া দাও তুমি যৌবনের সােন্দাল স্বপন,
ঘুচাও আঁখির পুটে পুষ্পসবে অরুণ বরণ।
অপূর্ণেরে পূর্ণ করি অপকেরে পক করে তুলি,
পরিণত করাে তুমি, অপুষ্ট ও চিত্তবৃত্তি গুলি।
ঝরাইয়া দিয়া ভ্রান্তি কুসুমের চিত্রবর্ণ দল,
বাহির করিয়া আনে। তার মাঝে সত্য তত্ত্বফল।
মোগমগ্ন গৃহিজনে তেয়াগিতে ফুলধূলি খেলা
ডেকে বলল, দিন যায় শেষ প্রায় জীবনের বেলা।
উচ্ছজ্বলে শান্ত করি বিশৃঙ্খলে গুছায়ে জমায়ে,
ছিন্নে ভিন্ন শৃঙ্খলিয়া উদ্ধতের গতিটি কমায়ে,
শেষ দিবসের কথা শ্মশানের ভৈরব সংবাদে,
গর্বেরে কপায়ে তুলল কঁদাইয়া দাও অপরাধে।
ভাবাও, নীরব কী কর বিশ্বে ওগাে দার্শনিক।
হট্টগােল, কোলাহল, তকদ্বন্দে দাও শত ধিক্।
শীতের প্রতি
কুশুভ্র কর আজি তমােময় পাপিষ্ঠের মন,
হউক বিস্ময়ে ভয়ে লােপাণ্ড, অবিশ্বাসী জন,
শস্য দূর্বা শুভাশীষে আশ্বাসিত হােক অনুতাপ,
কৃচ্ছ কণ্টকিত বৃন্তে ফুটে থােক ভক্তির গােলাপ।
জীবনের নীলজলা অর্ক সম কণ্ঠে ধরি আর
দ্রোণপুষ্প সম কর শুভ্র তব জ্যোতির বিস্তার।
সত্য বটে হবি দিয়া কে কোথায় নিভাবে অনল?
প্রবৃত্তির পরিপাকে যে নিবৃত্তি তাহাই অটল।
প্রকৃতির গতিপথ ধার শেষে আসুক কাননে,
অবশ্য ডাকিবে তুমি ভােগক্লান্ত অধিকারী জনে
মিটিয়াছে সব তৃষ্ণা ভোগতাপে অলস মন্থর,
এখনাে সংসারে তবু জড়াইয়া রেখেছে অন্তর,
তাহাকে ডাকিতে হবে, পুনর্জন্মে কি হবে তাহার
সঞ্চিত প্রাক্তন তপ কিছু যদি নাহি থাকে আর,
ধুতুরা ফুলের পাত্রে পান করি নীহারের নীর,
ভক্ষিয়া গলিতপত্ৰ আজি তারা হােক তপোবীর।
নিঃশেষিয়া রসপাত্র মােহরাজ্যে ক্লান্ত মায়াভ্রমে,
ব্যসনী সে নিক’ দীক্ষা তত্ত্বশিক্ষা তােমার আশ্রমে।
অন্তঃপুর হতে ডাক’ ভােগরত বৃদ্ধ মহারাজে,
যােগব্রত আচরিতে আসে যেন জটাচীর সাজে,
জ্ঞানকাণ্ড ধম্মতথ্য কহ যােগি। দাও যােগবল
বসুক তােমারে ঘেরি যত ব্ৰহ্ম-জিজ্ঞার দল।
ইন্দিরা
আজি-ইন্দিরা মাগাে মন্দিরে তব শব্দিত জয়,
কর-মঙ্গলময় বঙ্গের গৃহ-প্রাঙ্গণ-তল-অঙ্ক,
আজি-বর্ষণ কর হর্ষসরস কাঞ্চন-চু-
তবকঙ্কণ রব সঙ্গীতে কর’ অন্তর পূর্ণ,
ঐ-জাগ্রত সব মুপ্ত,
আজি,-দুঃখের তমলুপ্ত
অই-ইঙ্গিত নব দর্শনে তব উল্লাসে নিঃশঙ্ক,
আজি-ইন্দিরা মাগো মন্দিরে তব শব্দিত জয়শখ।
আহা—স্তন্যের ধারা কণ্ঠের মাঝে সন্তান চায়-গাে,
ডাক’-অন্নের মুঠি বণ্টিয়া তারা লুষ্ঠিছে পায়-গাে,
হরাে-রক্ষের ক্ষুধা চুষে,
আর,-বক্ষের সুধাকুম্ভে
দেবি-অঞ্চলে তব মার্জন কর দুঃখের যত পঙ্ক।
আজি-ইন্দিরা মাগো মন্দিরে তব শব্দত জয়শখ।
ওগাে-দৈন্যজনিত দুর্দিন-জাত কল্মষ-হারিণী
মাগাে-ভগ্নহৃদয় ক্লগ্নের শত-যন্ত্রণা বারি-নী,
দিয়া-সান্ত্বনা আর শান্তি,
তুমি,-নিৰ্ম্মল কর কান্তি
দেবি-বঙ্গের প্রাণ-অঙ্গেরে কর উজ্জ্বল অকলঙ্ক।
আজি-ইন্দিরা মাগাে মন্দিরে তব শব্দিত জয়শখ।
৬৪
লক্ষী-মা
আজি এ লসীমাসে,
ধুলিমাখা পায়ে শত শত ভারী পসারা লইয়া আসে।
‘ইতু ঘট’ আর ‘মুটের’ মন্ত্রে হলো আবাহন মা’র,
মাঠ হ'তে গৃহে পড়িল তখন চরণের ধুলি তার,
নবান্নে তার করুণা সুধার প্রথম আস্বাদন,
তার পর এলাে ভারে ভারে কার তত্ত্ব প্রেরিত ধন,
সবে এ লক্ষ্মী মাসে,
পরসেবা আর মার সেবা দু’য়ে প্রভেদ হেরিয়ে হাসে।
বাড়ীতে আসেনি মা,
এ কথা বলিলে আজিকে ত আমি কিছুতে শুনিব না।
বেগুনের ক্ষেতে দেখেছি শিওরে তাহার শুন্য পিতে।
সীমমাচাতলে তনয়গুলির নয়নে কাজল দিতে,
বিনায়িত বেণী হেরিয়াছি তার “মড়ায়ের পাকে পাকে,
মটর-শুটীর গুচ্ছে ঐ মা আঙুল নাড়িয়া ডাকে,
মা যদি আসেনি রে
এতদিন পরে ঢেকির উপর তবে পা’র দিল কে ?
ঘুরিছে মা কাছে কাছে,
নখগুলি র হেরেছি উজল অতসীর গাছে গাছে
গাঁদা বনে তার মাথার সিদুর কুন্দের শাখে শাখা
উঠানে দুয়ারে আলিপনা দাগে চরণচিহ্ন আঁকা।
চারিদিকে চাহি কেমনে বলিব জননী আসেনি যে,
বাজে কেন শখ তুলসীর তলে প্রদীপ জ্বালিল কে ?
বাড়ীটির আশে পাশে
উড়ে অঞ্চল বায়ু-চঞ্চল ‘শফুলকোর’ হাসে।
আর এক কথা এই,
অন্নাভাবের দৈন্যদাহের দুখের লেশটি নেই,
এত যে অভয় আশীষের রাশি কোথা হতে একেবারে ?
কতক খামারে কতক ক্ষেত্রে কিছু বা নদীর ধারে,
কিছু বা পৰু কিছু বা ফুল্ল কিছুতে ধরেছে ফল,
ইক্ষুতে টল টল।
মা যদি আসেনি বলল,
সারা বছরের সুখের বিধান কোথা হতে তবে হলাে?
জননীর স্নেহ-চুম্বনসুধা
লক্ষীমাসে
আজিকে আমার ভরেছে ‘খামার’ কনক বৈভবে
হাসিভরা মুখ, সুখভরা বুক পরম উৎসবে।
পালায়-গােলায়-আঁটিতে-আঁটিতে,
লক্ষ্মীমায়েরে বেঁধেছি বাটীতে,
অঞ্চল তার পড়েছে লুটিয়া উটজ প্রাঙ্গণে
আজি দৈন্যের দুঃখ শাসন হয়েছে সাঙ্গ যে।
সীমাসে
কম্পিত কলকঠে কপােত মেতেছে নর্থনে,
আজি হাঁসগুলি করে কোলাকুলি প্রেমের কীৰ্ত্তনে
টানিছে কাহার বসন আঁচল,
আজি চঞ্চল ছাগশিশু দল,
মম গৃহে শুনি আজি শুধু ধ্বনি মায়ের মঞ্জীরে।
চরণকমলে হৃদয়ভৃঙ্গ লুটিছে গুঞ্জি’-রে,
ধানের ধূলায় ঢাকিও না নাসা আজিকে অঞ্চলে,
মেখে লও গায়ে মায়ের পায়ের ধূসর-মঙ্গলে।
অমাসন্ধ্যায় সূৰ্প-পবনে,
দিয়ে হুলুধ্বনি ভবনে ভবনে,
আজি অলক্ষ্মী পিশাচীরে দাও তাড়ায়ে প্রান্তরে,
গৃহ কমলার রচিত-বচন মােচন-মন্তরে।
এসেছে সুদিন ঘুচাইব ঋণ সকল ঝাটে,
সুদ সহ কর শােধব, ডরি না নবাবে সম্রাটে।
নূতন-করিয়া ছাওয়া হবে ঘর,
কমলার লাগি খুজি ভাল বর,
দিতে হবে শুভ বিবাহ তাহার প্রথম ফানে।
আর’-কত-কি যে সঙ্কল্পের রেখেছি জাল বুনে। •
ভবন অঙ্কে বাজাও শঙ্খ সন্ধ্যা মন্দিরে,
কঙ্কণকরতালিতে নাচুক স্নেহের ধন ধীরে।
তীর্থের ব্যয় দিব আজি মায়,
আটবেঁকী দিব গৃহিণীর পায়,
পথভিখারীবে ডেকে নিয়ে আয় দাতার গৌরবে;
তুলসী-কুঞ্জ করে আমােদিত
ধূপের
সৌরভে।
গাভীগুলি মাের ঢালিত না দুধ তৃণটি মিলিত না ;
আজি গৃহে উঠে দুগ্ধদোহনমুখর মূৰ্ছন।
থােকারে খাওয়াব আজি দুধে-ভাতে,
স্বর্ণের বালা দিব দুটি হাতে।
আজি শুভযােগ কমলার ভােগ পায়সে পিষ্টকে,
ইফুরসের মধুর ধারায় সকলি মিষ্ট যে।
তেল-হলুদের উৎসব আজি সরিষা অঙ্গনে,
মটরের চারা পিচকারি দেয় বেগুনী রঙ্গনে,
বরবটি শুটী পড়ে লুটি লুটি,
শীণে পালং হেসে কুটিকুটি,
অতসী দোপাটী গাঁদারে ঘেরিয়া সীম সে ফলরা
যেন রামধনু গৃহ আঙ্গিনায় লুটিছে মনহরা।
সিন্দাঝাপি ভরি লয়ে রমা ফিরেছে মন্দিরে,
‘পালায়’ ‘গােলায়’ ‘ডালায়’ সােহাগ আজিকে বন্দী
ঘাটে বাটে মাঠে কেবলি ধান্য,
নিতি নিতি নৃহে আজি নবান্ন,
গৃহদ্বার চাল উঠান মাচান ভরেছে সম্পদে,
কেত কুড়ানীরে পরাণে জেগেছে পুলক কম্প রে।
৮
যেন
পদতলে ধান গায়ে শিরে ধান ধান যে চৌপাশে,
মােরা আছি জননীর কোলে অভয় আশ্বাসে,
তবু মাগাে তব সুত বারমাস,
অন্নের লাগি অন্যের দাস,
আজিকার সুখ সম্পাদ হেরি মনেতো হয় না গাে,
তারা যে মাগিয়া কাঁদিয়া কাটিয়া বাচিয়া বয় মাগাে।
শুভ সন্ধ্যায় করগাে আরতি গাহগাে বন্দনা,
কর’ ‘মুঠ’-পূজা বেদীগৃহদ্বারে আঁকগগা আলপনা।
লক্ষ্মীর জীবে বলনাকে কিছু,
ইতুঘট পাশে কর মাথা নীচু,
দাও গােলাতলে উঠানে খামারে গােময়মণ্ডলী
এসেছে আজিকে গৃহে দুখ পাপ ত্ৰিতাপ খণ্ডনী।
মকরপ্রাতে অখির কোণে অশ্রুকণা ভেটিয়া,
কুঞ্জমাঝে কু আমি উঠেছি আজ ফুটিয়া।
চেয়েছে কোে হৃদয়পানে, পশেছে আলাে বা প্রাণে,
রুদ্ধ মম মৰ্ম্মকোষ গিয়াছে তাই টুটিয়া,
ধন্য হ'তে পুণ্য-ধরা-চরণ-ধূলি লুটিয়া।
মঙ্গল
সমীর তুমি এস না হেথা লভিবে শুধু নিরাশা,
ভ্রমর তুমি গুঞ্জ'বৃথা মিটিবে নারে পিয়াসা।
মানব অাঁখি এসনা ভাই, পাবে না সুখ, সুষমা নাই।
যা কিছু ধন দীনতা, লাজ, হীনতা শুধু মরমে,
কুসুমভরা জগৎ হেরি ঝরিতে চাহি সরমে।
রাখি না সাধ ঋষিবালক সাজীতে লবে তুলিয়া,
চন্দনে যে ভূষিয়া রবাে দেবতা পদে ঢলিয়া।
মন্দাকিনী সলিলে ভাসি, বারিধি পানে যাইব হাসি।
গরি সে সুখ শিহরে বুক, লাজে যে মরি সুকায়ে,
নিখিল রুম স্পর্ধা মম, এখনি যাব শুকায়ে।
গাওরে পাখী গাওরে গান মধুর তান তুলিয়া,
গােলাপ, গাঁদা গুরুগরবে হরষে পড়াে গলিয়া।
ও আভা পড়ি হৃদয়ে মম
অশ্রু হােক ভূষণসম।
উলসি নাচ, ময়ূরী শ্যামা এ আঁখি সুখে হেরিবে
পুলকে মাের প্রেম-বিভাের ফুলজীবন ঝরিবে।
জগতে যদি জনম মম নিষ্ফল’ত হবে না।
প্রতি কণারই যথায় ঠাই, প্রতি কণারই সাধনা।
যে টুকু বল আমার প্রাণে লজ্জা কিসে সে টুকু দানে ।
জগৎভরা জগদীশের উজল ফল শয়নে,
নখের তার জ্যোতিকণাটি বহিব প্রেম নয়নে।
বস বসন্তরাণী ( ইবাচ্ছন্দে সঙ্গীত) বলে অনিন্দ্যাঙ্গি বসন্তরাণী। এস-পুষ্পসবারক্তিম নেত্ৰপর্ণে চারু প্ৰবালােলরম্যবর্ণে, জাতীপরাগাস্ক ভৃঙ্গাঙ্গিনাবৃন্দ সংঘুষ্যমানা তব পুণ্যবাণী । এস—সৌগন্ধমত্তাম্র লবঙ্গকুঞ্জে, মন্দার চম্পা-নব মল্লীপুঞ্জে, রােমাঞ্চনােপক্ষ বৈতালিক, প্ল- বৃক্ষস্থ পক্ষীশত ঐক্যতানী। এস-অশ্রুপ্লুত শ্রীন—পাণ্ডুগণ্ডে, প্রত্যুষপাংশূন্মুখ-চখণ্ডে, সঙ্গে তপোভক্ত- কারী প্রিয়ান, লােলাক্ষিভঙ্গে ছলি’ বিশ্বপ্রাণী। মন্দিতা বলি বসন্তরাণী।
বসন্তবাণী
এস এস মন্দিরে জননি।
এস-শীতশিশিরাহতে ভীতনীরবনতে
গীতসুমুখরিত করি’ চির এমনি।
এস-পিকককুহরিতকুঞ্জে,
এস-দিককুলে রবির পুজে,
এস–অলিকুলগুঞ্জনে কলিকুলখনে
ফুলমধুভুঞ্জনে পুলকিয়া ধরণী।
এস বনকান্তারে জননি ।
এস-আম্রমুকুল মৃদু গন্ধে
এস-তাম্রপ্রবাললীলানন্দে,
এস-অনাগতত মন্দচল মারুতে
চন্দ্ৰজ্যোছনাপূত করি তমােহরণী।
ছায়াপথ বাহি এস জননি
এস-কোটিকোটিকবিকুলকণ্ঠে,
এস—তটেতটে কৃপামুধাবণ্টে,
এস-অঙ্ক তমসাবৃত
মধীমােহমৃত
পীড়িতদে ধরি ধ্যানসরণী।
এস এস অন্তরে জননি।
१२
বসতৃভারতী
শীতেরমাঝে ঋতুর রাজে মাতায়ে তুলি বনে বনে,
শঙ্কাশােক সঙ্কোচেরে ঘুচায়ে এস মনে মনে,
এস-আলােকজ্ঞানশলাকা দিয়া
নিখিল আঁখি উন্মীলিয়া।
বল্মীকের গুল্মঘেরা শিহরি উঠে ক্ষণে ক্ষণে।
আজিএসমা সামপ্রণব ঋক্ নাদিনি!
পাখীহারানাে শাখীরাে দেখি ফুটালে আঁখি শতশত,
অসাড় দেহ শিহরি, শিশুপ্রবাল কাপে পতপত,
মাগাে-মূকেরে মুহু মুখর করি’
কণ্ঠে এস কুণ্ঠা হরি’
বধিরে আজি অধীর করি শুনালে সুর কতমত।
মাের—জ্ঞানজীবনে জাগাও বাগবাদিনি।
ফাল্গুনে।
ফাগুন এসেছে আগুন জ্বালায়ে গগনে গহনে অন্তরে,
দীপক গাহিয়া অরণি বহিয়া অগ্নিমন্থ মন্তরে।
অশােক পাটল শাখায় শাখায়,
আলায়ে তুলেছে শিখায় শিখায়,
নাচায়েছেমরীচিকার রেখায় দূর দিগন্ত প্রান্তরে।
সান্ধ্য রবির অভ্র চিতায় সারা বরষের জঞ্জালে,
তরুণ-হিয়ার উদ্দীপনায় অতীত স্মৃতির কঙ্কালে,
বিরহীর বুকে জ্বলেছে অনল,
জাগরণজ্বল চোখে ঝরে জল,
দীর্ঘ শ্বসনে হৃদয় বিকল আগুনের জলে সন্তরে।
গতকুজ্ঞটি ধূমউজ্জ্বল যজ্ঞে, উষার আশ্রমে,
ধূর্জটিভাল-নয়ন তপনে মধ্যদিনের সংক্রমে,
স্মর-মন্দিরে জ্বলে উঠে ধূপ,
অনলের ধূলি ধরে ফাগরূপ,
হােলীর লীলায় তাতায় মাতায় যতেক আবেশমন্থরে।
৭৪
মধুমাসে
আজি এই মধুমাসে
সার ধরা মৃদু হাসে
বধূর মধুর ভাষে অধরে মদিরাধারা।
পিয়ালের পিয়ালাতে
সখী সহ অলি মাতে,
মহুয়া মলয় বাতে টলে মদমাতােয়ারা।
ঋতায়তে মধুবাতা সিন্ধুতে মধু বর্ষে
ছায়াপথে মধুগাথা ইন্দুতে গলে হর্ষে।
পথধূলি ফুলরেণু
মধুধারা ঢালে ধে
বনে বাজে মধুবেণু গােপীজনহৃদিহার।
গােলাপের রাঙা গালে বুলবুল বুনে লজ্জা
বকুলের ডালেডালে দোয়েলের ফুলশয্যা
মুকুলের মধুহাসে
কোকিলের স্বর ভাসে,
পাপীয়ার প্রেমপাশে পারুল পাগলপারা।
নিখিল মিলন মাগে হৃদেহৃদে মধুআশা।
পথেপথে রাঙাফাগে, উড়ে ঘুরে ভালবাসা।
অশােকেরা মধু রাগে
ফুটে উঠে বাগে বাগে
শ্মশানকুসুমমা জাগে পাষাণে হাসিয়া সারা।
বসন্তে।
কাননমাঝে একটা কেমন চলছে যেন কাণাকাণ,
কি-যেন কি গােপনকথা হয়ে গেছে জানাজানি।
বকুল ভাবে আকুল হয়ে অকালে আজ ফুটবনাকি ?
ভ্রমর বলে কোমর এটে আগেই আমি উঠ ব ডাকি !
কুঁড়ির ভিতর গুমরে মরে পলাশ আজি দিচ্ছে উকি,
ব্যাপার দেখে হাসছে আজি বনের যত খোকা খুকী’
কি হয়েছে বললে পরে ফ্যালফেলিয়ে কেবল চায় ।
প্রজাপতি আপন মনে ফলের বনে মধুই খায়।
গাই-কিনা-গাই ভেবে যখন করছে দোয়েল আহাউহু,
চমক ভেঙে ধমক দিয়ে হঠাৎ কোয়েল ডাল’ কুহু।
পবন আজি কেমন কেমন করছে বড় মাখামাখি
নূতন পাতা গাবের গাছে করছে তখন তাকাতাকি,
বন-বাণীর হঠাৎ এ কি বাদাম পাতায় অধর রাঙা।
সারী দেখে শুকের আজি কথা কেমন ভাঙা-ভাঙা।
আমি বলি পথের তরু বলনা কি গো কথাই শুন,
মুকুলভরা আকুল পরাণ রসাল আজি হেসেই খুন।
করীবরের সকল শরীর আজকে মদের গন্ধময়,
জলের ছায়ায় মরাল হেরে মরালী ত মন্দ নয়।
বুলুবুলিটির গান শুনে আজ গােলাপ সুখে ঢলতে রয়,
সবাই আজি উদাস পরাণ নাইক বনে চলতে ভয়।
বানরদলে হাত বুলাবার পড়ে গেছে বৈ ধুম,
শিঙের কোমল ক য়নে মেযের চোখে আসছে ঘুম।
আমি বলি ‘হরিণবালা ব্যাপার কিগো বল না হয় ?”
মৃগনাভির গন্ধে ভরা মৃগের গা সে চেটেই যায়।
সারস আজি বৈবাগী ঘাের ঠেলে চলেন মাছের ঝাঁক,
বেড়ে গেছে আজকে রাতে চক্রবাকীর করুণ ডাক।
কিরাত ফিরে ফুলের বনে হারিয়ে ফেলে ধনুক বাণ।
রাখাল ছেড়া দুপুর রাতে বাঁশরীতে ভাজছে তান ,
বাঘিনীব আজ হিয়ার ক্ষুধা পেটের ক্ষুধা গেছে কমে
কৃষ্ণসারেব নয়ন দুদী পরশে কার পড়ছে নমে।
ব্যাপারখানা জিজ্ঞাসিলে কয়না কথা ব্যাধের মেয়ে,
নদীর ঘাটে গা ডুবিয়ে গান গায় আর হাসে চেয়ে।
কৃষকবালার ভিজছে বসন কলস ভেসে যাচ্ছে জলে,
চাষার ছেলে বল নিয়ে আসছে ভুলে লাঙ্গল ফেলে।
বৌ-মা আজি পােড়ান ভাজা চূণ না দিয়ে সাজেন পাণ,
গিন্নী আজি কিসের ঘােরে গালটা দিতে ভুলেও যান।
চড়ায় জোরে নৌকা ঠেকে, হুস তবে পায় আজকে মাঝি,
মাছটা ছুড়ে শামুকগুলাে করছে জড়’ জেলে আজি।
শুধাই যদি গুরুমশাই ব্যাপারখানা কি রকম ?
গুরু মশাই শােনেন শুধু পায়রা গুলাের বক্কম।
ত’বিল গােল' ঠিকের ভুল আফিস বানুর ঝরছে ঘাম,
বড় সাহেব নাম সহিতে লেখেন নিজের মেমের নাম।
উকিলবাবু টানেন শুধু গুড়গুড়িটে, তামাক নাই,
কোটে বসেই গুণগুণাচ্ছেন কড়া হাকিম, দেমাক নাই
ছাত্র দেখেন Calculus এ কথ ঋষির তপােবন,
খাতার পাতায় পত্র রচে চতুষ্পাঠীর শিষ্যগণ।
আমরা দেখি হঠাৎ ভোদা কবি হ’ল লিখছে গান
কবি আজি বেজায় ভাবুক গাইতে গাইতে লিখেই যান।
বসন্তে কাননরাণী
দাড়াল আজ কাননরাণী নদীর তটে, আলােকে,
মুরছিছে ঢেউগুলি তার চরণ তলে পুলকে।
ঝিমিকানাে নয়ন হরা,
কিসলয়ের বসন পরা,
পরশে তা’র শিউরে ধরা, মঞ্জরী ফুল মুকুলে।
হরষ তাহার বাসক চাপায়, বাসনা তার বকুলৈ।
অঙ্গে তাহার উর্ণনাভের স্বর্ণজালের ওড়না ;
হাস্য,যেন রক্তশিলায় কুন্দ ফুলের ঝরণা।
কল্পতরু সজ্জা দিয়ে,
রয় যে শুধু লজ্জা নিয়ে
অগুরুরস, মৃগমদের গন্ধ ছুটে তনুতে
লক্ষকোটি জোনাক জ্বলে নখের প্রতি অণুতে।
;
বসন্তে কাননরাণী
খঞ্জনেতে কটাক্ষ তার চায় সে মৃগনয়ানে,
অঞ্জনেতে সুপ্ত অলি, গুঞ্জনহীন বয়ানে।
দৃষ্টিতে তার সৃষ্টি করা,
ময়ুর বধু,
নৃত্যপরা।
নিশ্বাসে তার বাতাস ভরা, ফুলের মধু রেণুতে
কয় সে কথা পাখীর গানে, গায় সে যে গান বেণুতে।
উল্লসিত বল্লীবিতান ঘুরছে ছায়া বিতরি
ঝিল্লীনুপুর বাজে পায়ে আকাশ বাতাস মুখরি ;
শুকনাে পাতা মুরমুরিয়ে
পায়ে পায়ে যায় গুড়িয়ে,
ঢেলে মধু ঝুরঝুরিয়ে আঁচল রহে লুটিতে ;
ঝুমকো লতার মেখলাটী খসে পড়ে কটিতে।
ব্যাঘ্র চাটে পা’দুখানি, সর্প নমে চরণে
করীকরভ করে সেবা কমল উপহরণে।
মুগ্ধ করি বীণার স্বরে
সিংহে আনে কেশর ধরে’
তমাল ঝাউয়ের অন্ধকারে, ছড়িয়ে দিয়ে চিকুরে।
কাননরাণী দেখছে আনন নদী জলের মুকুরে।
ঋতুমঙ্গল
বসন্ত লমী
কুহু কুহু কুহরিল
সে দিনাে মাধবী রাতি, নিখিল উঠিল মাতি
হৃদয় ফুটিল লুটি গঙ্গে,
সৰ হিয়া পূবণিমা
সব রঙ অরুণিমা
সব গতি হ’ল মৃদুলাস্যে ।
চকোরী চেতনা পেয়ে দিলিল গো গান গেয়ে
বােলক লাঢ ঢ চনদ,
সব রসধারা নিশি ছুটি বে দশ দিশি-
টুলি বে সব বালু বান্ধে।
পিকবধূ শিহরিল
সাধু হরি’ শিহরিল ভৃঙ্গ,
চােচখা মোহে দুই মূবছিল মুহু মুহু
রাতপতি ফুকরল শৃঙ্গ।
গরেণ ফুটো ফুলে
উড়াইল দুলে দুলে
হেলী-লীলা লােল রসঙ্গে ;
কিসলয় কনবাগে
পুকাঞ্চন জাগে
প্রসাবেশে বন রাণী গঙ্গে।
তােমার বরণ রে বাজিল দেউল ঘরে
বে, বীণা শখ তার ঘণ্টা,
দূরাগত কণঝুণ
শুনি মাের লাখ গুণ
হৃদয়ে বাড়িল উৎকণ্ঠা
কষ্ট লক্ষ্মী তব,আগমন বীথি ভরা শন শন গীতি, সূচিল যে কোটি মধুমক্ষী মম মনােমন্দিরে এলে তুমি ধীরে ধীরে নবীন বসন্তের লক্ষ্মী। ছিলে বিধু মল্লীতে ছিলে মধু বল্লীতে নখরুচি কিংশুক কুঞ্জে, ছিলে তুমি গুঞ্জনে বনভরা শিঞ্জনে নিখিলের সব শােভাপুঞ্জে। পটলের ডালে ডালে পিকরুত তালে তালে পা ফেলিয়া এলে হৃদিসদ্মে, মধুঋতু বৈভব, মধুরেণু সৌরভ হ'য়ে জাগে তব লীলাপদ্মে। তব দুকূলাঞ্চল- ভরা মৃদু চঞ্চল মলয় আসিল ধীর মন্দ্রে, মরমের বেণু বনে পশি সে যে খনে খনে বাজাইল শত কোটি রন্ধে। তব মধু দিঠি পাতে সে দিনের মধুরাতে নয়নের গেল জরালস্য, তােমার চিকুর চুমে জীবনের মরুভূমে শিহরিল নীলফুল শস্য। •
ঋতুমঙ্গল
বাসনার শিখিনীরে নাচাইল ধীরে ধীরে
কঙ্কণ তব মণিবন্ধে,
বনভরা মরমর
বিহগের কলস্বর
জাগিল যে কবিতার ছন্দে।
তােমার হরিণ-আঁখি মুদে এল রেণ মাখি
প্রিয়ের পিয়াল মধুচুষে,
সে রজনী কিবা শুভ ভাষা মাের ডুব’ ডুব’
আশাভরা সুধারস কুম্ভে।
বাহিরের ঋতুবাজে
আনিলে এ হৃদিমাঝে
যথা তার
চিরসিত ছত্র,
সেই হতে রাজ-রমা তুমি আছ প্রাণ সমা
খুলি সুষমার দানপত্র।
কোকিল
কুহু কুহু মুহু মুহু উহু উহু উহু কি বেদনা,
কার ঐ মৰ্ম্মব্যথা তব কণ্ঠে লভিল মূচ্ছ না ?
• হৃদয়ে লুকাতে ছিল ব্যথা কার লজ্জায় কুণ্ঠায়
আত্মহারা কণ্ঠ তব কেন পিক জগতে জানায় ?
প্রফুল্ল বসন্ত বুকে কোন ব্যথা বহিছে গোপনে,
জীবনের রক্তরাগে কোন ব্যথা প্রেমের স্বপনে ?
চুম্বনে গুঞ্জনে গানে মধুপানে অতৃপ্তি না যায়,
ক্ষণে ক্ষণে অবসাদে দীর্ঘশ্বাসে করে হায় হায় !
৮২
কোকিল
কি ব্যথা উদাসরূপে চুপে চুপে বহে সমীরণে,
কেন আসে শিথিলতা ক্ষণে ক্ষণে দৃঢ় আলিঙ্গনে ?
কিংশুক কোরমাঝে কোন ব্যথা ফুটিবারে চায়,
কোন্ অধীরতা পদ্মে বার বার ফুটায় মুদায় ?
শিশু পল্লবেরা কেন অকারণে করে ম্লান মুখ
কোন্ ব্যথা গুমরিয়া তুলিতেছে কাননের বুক ?
কি ব্যথায় ফুল মধু তিত হয়ে কাটায় গড়ায়,
অশােকে ফুটালাে রক্ত, মুকুলের করিলে কষায়।
ফুলশর ক্ষতে হয় বিন্দু বিন্দু শােণিত সঞ্চার
ফুটন্ত যৌবন যেন বৃন্তপরে হয়ে আসে ভার!
হাস্য মাঝে কি বিষাদ ভােগমাঝে রােগের মতন,
কাশ্লেষী প্রণয়ীও কি ব্যথায় হয় আনমন!
সবব্যথা এক হযে কুহু কুহু উহু উহু উহু
হে বসন্ত-কণ্ঠ তােমা জেগে উঠে মুহু মুহু মুহু !
বিষের বুদ্বুদ বেন, সুপাদে তস্তল হতে,
পূরবীর তান যেন প্রভাতীর বংশার পথে !
এ-কি বিরহীর ব্যথা সব সুখে করিয়াছ ম্লান ?
একি কোন অভিশাপ ধীরে দহে সৌভাগ্যের প্রাণ?
একি-গগা অলর্কবিষ লালসার রক্ত মাঝে ফিরে
অনিত্যে অধ্ৰুবে একি রাখিয়াছে নিরাশায় ঘিরে ?
কুহু কুহু উহু উহু রে কোকিল আহা কি বেদনা।
কি দুরিবে ? সবে ব্যখী ! ও বধির বিশ্বের সেধনা !
ঋতুমঙ্গল
বসন্ত বিদায়
পাংশুল হইয়া আসে ফিংশুকের কুঞ্জ সুশােভন
পাওর, ভাণ্ডীর-চম্পা-মুচুকুন-সম্পাককানন।
নীরক্ত, বনশ্রী - যেন সদ্যোজেব প্রসূতির মত
পিঙ্গল, কামনাবহ্নি হুশেষ দহি অবনত।
সহসা গম্ভীর রুক্ষ, কিশলয় চিক্কন চপল,
আনন্দ মুকুল বুকে শিলাসম নুয়ে পড়ে ফল।
আজিকে চৈতালি ক্ষেত্র ভুলি মধু উৎসববার,
শুষ্কপত্রপুষ্পেকহে ধরিত্রীর দগ্ধোরকথা।
যৌবনের বাধাহীন নৃত্যগত তানন্দ মেলায়
সহসা কি অবিবেকী গুরুজন দেখা দিল হায় ?
লাললে চৰণেরে থামাইয়া অনে লজ্জাভার,
মাঝখানে থেমে আসে অানন্দের বসবাহার।
বাজিছে ঘৃণুর কণ্ঠে সুকরুণ বেহাগের সুব,
প্রকৃতি-সীম ক্রমে স্লান হয় সিমুল সিদূর।
হায়রে তিত্তিরি পুক সুর করি কথা গায়,
পেচক কাজের কথা স্বপ্নরাজ্যে কেবল শুনায়।
জ্ঞানাঞ্জনশলাকায় কে রে 'আঁখি করে উন্মীলন ?
‘চোখ গেল চোখ গেল বিশ্বময় উঠিল রোদন।
৮৪
বসন্ত বিদায়
হৃদয়ের দানসত্রে কে আনিল হিসাব নিকাশ ?
ছাড়িছে নালিনী বন ঋষিশাপে মৰ্ম্মর নিশ্বাস।
সারল্যের মুক্তি মাঝে দ্বন্দ্ব দ্বিধা সংশয়ের ছায়া,
বিরস বিজ্ঞতা কহে এ জীবন স্বপ্ন আর মায়া।
নিভৃতে ডাকিয়া কহে তত্ত্ববাদী দর্প উষ্ণ বায়ু,
‘বন্ধু, 'ত্যজ চপলতা ফুরাল যে যৌবনের আয়ু।
অরের ক্রর বাণী কে শুনা’ল গােয়ালায় গায় ?
বনমালা বাঁশী ত্যজি নিল 'আজি বসন্ত
d
বিদায়।
ব্রজবেণু— মুল্য ॥৪০ ) মতামত পুস্তক ধানি কেমন লাগিয়াছে, তাহার অল্প কথায় উত্তর- “রন্ধে রন্ধে এ পুস্তকে ভক্তিরস পড়ে ঝরি ঝরি দর দর ঝরিয়াছে হেথা তব তপ্ত অশ্রুধারা। আর পাঠ করিয়া “এবে শুধু ভাবমগ্ন কাদি ঝর ঝর গলে যায় হৃদয়ের শিলা।” অধ্যাপক, শ্ৰীযুক্ত ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় “শুধু মানব প্রকৃতিতে নহে, বিশ্ব প্রকৃতিতেও যে পুরাতন অথচ নিত্য নুতন লীলা চলিয়া আসিতেছে—রাধাশ্যামের গােকুললীলাকে আশ্রয় করিয়া কৰি অতিনিপুণ ভাবে বর্ণনা করিয়াছেন।” প্রতিভা। “কৃষ্ণবিষয়ক কবিতাওনিতে চিত্তারিণী মাধুরীর প্রাবল্য। আমার মনে হয়, এইখানেই কবির বিশেষত্ব” দেশমান্য অশ্বিনীকুমার দত্ত। ‘বিখ্যাত বৈষ্ণব কবিগণের পর বােধ হয় রাধাকৃষ্ণেৰ লীলাবর্ণনায় কালিদাসবাবু অদ্বিতীয়। তাহারা কবিতা পড়িতে পড়িতে মনে হয়, কেন আমরা বৈষ্ণব কবিগণেরই ভাববাজ্যে বিচরণ করিতেছি--পার্থক্য বাহা কিছু ভাষাগত। এই সুনধুব মর্মস্পর্শী কবিতাগুলির স্থানে স্থানে পড়িতে পড়িতে, চিত্ত প্রেমে গদগদ হইয়া উঠে নয়ন দিয়া প্রেমা বিগলিত হয়। অতিবড় পাপীহৃদয়ও বােধ হয় ভক্তিভবে অবনত হইয়া পড়ে। কাব্যরচনার উদ্দেশ্য ইহা অপেক্ষা আর কত সফল হতে পারে বলিতে পারি না।
কালিদাসবাবু আমাদের জাতীয় কবি। তাঁহার কবিতায় স্বজাতি ও স্বধর্মের প্রতি এরূপ গাঢ় অনুরাগ, এরূপ প্রবল স্বদেশপ্রীতি লক্ষিত হয়, যে মনে হয়, কোন জাতির জাগরণের সময় ভগবান্ এরূপ কবিকেই তাঁহার উদ্দেশ্য সফল করিবার জন্য ধরাতলে পাঠাইয়া দেন। বাঙ্গালীর জাতীয়ত্ব ও বৈশিষ্ট্য বজায় রাখিবার জন্যই, জাতিকে তাহার পিতৃপিতা- মহের ধারা অক্ষুন্ন রাখিয়া উন্নতির পথে অগ্রসর করিবার জন্য এই শ্রেণীর কবিদের অভুদয়। কালিদাসবাবুর কবিতার ছন্দোমাধুৰ্য কর্ণে সুধা বর্ষণ করে। রসভাব, ছন্দ ও অলঙ্কার সকল দিকেই তাহার বিশেষ দৃষ্টি আছে। তাঁহার সৌন্দৰ্য-বােধও অসাধারণ। ভাষার উপর এরূপ আধিপত্য খুব অল্প কবিরই দেখিতে পাওয়া যায়। কবির ভাষা নদীর স্রোতের ন্যায় ইচ্ছামত নাচিয়া নাচিয়া আঁকিয়া বাঁকিয়া তালে তালে চলিয়াছে। ভাবে, ভাষায় ও ছন্দের ভঙ্গীতে চেষ্টার লেশমাত্র নাই। ভাব কোথাও ভাষার ভারে চাপা পড়ে নাই। ভাষাও কোথাও আড়ষ্ট বা প্রাণহীন নহে। এই প্রবন্ধে উদ্ধত অংশগুলি হইতেই এই সব গুণের যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। ভাষার বৈচিত্র্য মাধুৰ্য্য, লালিত্য, ঝঙ্কার, সরলতা, স্বতঃপ্রবৃত্ত ও স্বাভাবিকত্ব অতুলনীয়। যমুনা। ব্রজবেণু “মরমে পশিল মাের আকুল করিল সারা প্রাণ”। যখন সাময়িক পত্রে এর এক-একটি কবিতা বাহির হইত, তখন রােমাঞ্চিত প্রাণে পাঠ করিতাম ; কিন্তু আজ একটির পর একটি সজ্জিত, গ্রথিত হইয়া এক নুতন জিনিষেব নবীনতা লইয়া আমায় সম্ভাষণ করিয়াছে। ফুল যখন বিচ্ছিন্ন, বিস্ত, তখনও সে ফুল বটে, কিন্তু মালা নহে; কবির এ কাব্য-কণ্ঠহার আজ বক্ষে—বক্ষের তলে যে সােনার সিংহাসন —যেখানে দেবতাকে সে বসায়—সেইখানে চলিয়া গিয়াছে -- আধুনিক কবিকুলে কালিদাসই একমাত্র ব্রজকবি। ব্ৰজের ভাব যুগ-যুগ হইতে কত সাধক, কত শিল্পী, কত কবি তৈয়ারী করিয়া আসিতেছে – এ কবির বিশেষত্ব এই যে ইনি ব্ৰজের মধ্যে ব্রহ্মাণ্ড দেখিয়াছেন। ব্রজেশ্বর শুধু গােপিকার নন-কবি সেই রাখালরাজকে নিখিলবাজরূপে দেখিয়াছেন। কবির কবিতায় আধ্যাত্মিকতার রূপক আছে মানি- কিন্তু উহা বক্তৃতা নহে—কবিতা। কবি-বেমালুম জালিয়াৎ। ধর্মকে এমন কৰ্ম্মজগতের উপযােগ সরস সরল স্বাভাবিক করা উচ্চ শ্রেণীর কবির কাজ—এ কবি তাই। কিন্তু কবির মনে রাখা উচিত—এইখানেই শেষ নহে -সুধু first divisionএ পাশ হইলে হবে না—বৃত্তি পাওয়া চাই। পথের শেষ নাই—অগ্রসর হইতে হইবে। কবির ‘পর্ণপুটে কবির মধ্যে শ্রেষ্ঠ শিল্পীর যােগ্যতার বীজাণু বা জীবাণু দেখিয়া যেমন সন্তুষ্ট হইয়াছিলাম-তেমনি গতানুগতিক দেখিয়া ক্ষোভে আঘাতও করিয়াছিলাম—উদ্দেশ্য ঘা, দিয়া কবিকে জাগান। কবি স্নেহভরে অনেকবার কনিষ্ঠের ন্যায় জিজ্ঞাসা করিয়াছে “পথ কোথায় ?” আমি বলিয়াছিলাম-“পথ ছিয়া লও।” কিন্তু এ কি ? এত শীঘ্র এমন সুন্দর ভাবে কবি নিজের বাঁশীটি কুড়াইয়া আলাপ জুড়িয়া দিয়াছে—এতে শুধু আমাকে আকুল করে নাই—অবাক করিয়াছে। এ কবির আধ্যাত্মিকতা নীরস যোগীর আত্মগত ধ্যান নহে—উহা মানবতার বিচিত্র রসে সরস, সজীব ও সার্থক। কবির ‘নবােত্তমে” উহা পরিস্ফুট ও প্রকট। অন্যান্য কবিতায়ও এ মহামানবতার ভাবই পরিস্ফুট। (ভারতবর্ষ অগ্রহায়ণ ১৩২৩) শ্রীপ্রমথনাথ রায় চৌধুরী।
বল্লরী— মূল্য ৩, বাঁধাই ৮০ ) কবির কুন্দ ও কিসলয়, দুই একত্রে দ্বিতীয় সংস্করণ। কবির কুদ পাঠ করিয়া স্বর্গীয় মহাকবি নবীনচন্দ্র সেন বলিয়া- ছিলেন “কুন্দ পড়িলান। ক্ষুদ্র অণু প্রমাণ বীজের মধ্যে যেমন বনস্পতির জীবনেশ্বৰ্য্য নিহিত থাকে, ক্ষুদ্র ডিবের মধ্যে বেনন পক্ষিরাজের গগনাে- থী বিক্রম ও প্রতাপ প্রচ্ছন্ন থাকে, এই ক্ষুদ্র পুস্তকখানিতে তেমনি একজন ভবিষ্যতের সাহিত্যরখীর জীবনাঙ্কুব ও মুকুলিত শক্তি নিরীক্ষণ করিতেছি” কালীপ্রসন্ন বিদ্যাসাগর “তােমার কবিতা আমার কর্ণে সুধাবর্ষণ করিল।” ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়—“র, ভাব, ছন্দ, অলঙ্কার সকলদিকেই গেমার বিশেষ দৃষ্টি আছে—আণী করি দীর্ঘজীব ও যশস্বী হও।” সুরেশচন্দ্র মাজপতি-“তোমার কুন্দ সুৰভি ও সুন্দর শুভ্র ও নির্মল।” আচাৰ্য্য চন্দ্রশেখর—ইহার “মৌলিকতা ও সৌন্দৰ্যবােধের”—চন্দ্রনাথ বসু ইহার “আন্তরিকতা, ভক্তিনিষ্ঠা ও হিন্দুভাবের, অধ্যাপক যদুনাথ—ইহার ‘ভাবের উৎকর্ষ ও অসাধারণতার,” দ্বিজেন্দ্রলাল ইহার ছন্দোমাধূর্য্যর ও ভাষাচাতুর্যের” ও শ্রীযুক্ত শশধর রায় ইহার ‘ভাবের গভীরতা ও মৰ্ম্মপাতা’র প্রশংসা করিয়াছিলেন। কবির কিসলয় সম্বন্ধে প্রবাসী বলেন-“এই সকল ক্ষুদ্র কবিতায় কবিত্বে। অবসর অতি অল্প। খুব বড় দক্ষ কারুকর ভিন্ন এই শ্রেণীর épigrannatic কবিতায় সাফল্য লাভ করিতে পারে না। নবীনকবি
কালিদাস এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছেন। অধিকাংশ কবিতাই
কবিত্বসংযােগে রসমধুর। বল্লরী সম্বন্ধে-ভারতীর মত,-“কবিতা-
গুলির অধিকাংশই ভাবে স্নিগ্ধ, ভাষায় সুন্দর, ঝঙ্কারে রমণীয় ছন্দের
অপরূপ লীলায় মনােহর ; শব্দচয়নেও লেখকের দক্ষতা অপূর্ব। ' এই তরুণ।
কবির কলঝঙ্কারে এমন একটা আন্তরিকতা আছে যে, প্রাণের তার সে:
ঝঙ্কারে সঘন স্পন্দিত হইয়া উঠে।”
মালঞ্চ-“প্রত্যেকটি হীরকখণ্ডেব ন্যায় উজ্জ্বল, স্রোতের মত
বেগবিশিষ্ট, তীরের ফলার ন্যায় তীক্ষ—অথচ সে ফলা বিষাক্ত নহে,
যেখানে গিয়া লাগে সে স্থানকে আলােকিত করিয়া তুলে।”
হিতবাদী—“এই কবিতগুলির প্রধানগুণ এই যে, ইহা পাঠমাত্র
বােধগম্য হয়, ভাষা ও ছন্দের পারিপাট্য অপূৰ্ব। ইহা খাঁটী বাংলা
ভাষাতেই রচিত” ইত্যাদি।
বসুমতা--“বল্লরী সম্বন্ধে কবির কথাতেই বলি—
মুক্তামালার ফাঁকে ফাঁকে যেন নীলমণিগুলি রাজে,
ইন্দীবরের শােভা যেন শ্বেতপদ্মের মাঝে মাঝে।
যেন ছায়ালীন চন্দ্র আলােক আঁধার বক্ষে আঁকা,
হরিচন্দন রচনার সাথে যেন কালাগুরুমাখা।"
•
বঙ্গসাহিত্যের পরমবন্ধু সাহিত্য বিলাসী সুধীবর প্রিয়নাথ সেন মহােদয়ের পত্র। ** আপনার পুস্তকদ্বয় উপহার পাইয়া আপ্যায়িত হইলাম। সাময়িক পত্রে প্রকাশিত আপনার কবিতাগুলি আমার বড়ই ভাল লাগি- আছে এবং তৎসম্বন্ধে পরম স্নেহভাজন যতীন্দ্রমােহনের নিকট কত আনন্দ প্রকাশ করিয়াছি। আপনার পুস্তকগুলি পাঠ করিবার জন্য কতদিন হইতে আগ্রহের সহিত অপেক্ষা করিতেছি। আপনি এবং আপনায় ২৩টি সহযােগী নূতন সম্প্রদায়ের কবিদের রচনায় রবিবাবুর প্রভাব লক্ষিত হয়, তাহা হইলেও তাহাদের ভিতরে দিব্য মৌলিক সৌন্দৰ্য্য প্রস্ফুটিত। আমার বড়ই ইচ্ছা ইহার সমালােচনা করি, সে ইচ্ছা যতীনের নিকট প্রকাশ করিয়াছি।” •
;
কালিদাস এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছেন। অধিকাংশ কবিতাই
কবিত্বসংযােগে রসমধুর। বল্লরী সম্বন্ধে-ভারতীর মত,-“কবিতা-
গুলির অধিকাংশই ভাবে স্নিগ্ধ, ভাষায় সুন্দর, ঝঙ্কারে রমণীষ্ম চুলের
অপরূপ লীলায় মনােহর ; শব্দচয়নেও লেখকের দক্ষতা অপূৰ্ব্ব। এই তরুণ
কবির কঝঙ্কাবে এমন একটা আন্তরিকতা আছে যে, প্রাণের তার সে:
ঝঙ্কারে সঘন স্পন্দিত হইয়া উঠে।”
মালঞ্চ-প্রত্যেকটি হীরকখণ্ডেৰ ন্যায় উজ্জ্বল, স্রোতের মত,
বেগবিশিষ্ট, তীবেব ফলার ন্যায় তীক্ষ—অথচ সে কলা বিষাক্ত নহে,
যেখানে গিয়া লাগে সে স্থানকে আলােকিত করিয়া তুলে।”
হিতবাদ—“এই কবিতগুলির প্রধানগুণ এই যে, ইহা পাঠমাত্র
বােধগম্য হয়, ভাষা ও ছন্দের পারিপাট্য অপূৰ্ব্ব। ইহা খাটী বাংলা
ভাষাতেই রচিত” ইত্যাদি।
বসুমতা—“বল্লরী সম্বন্ধে কবির কথাতেই বলি-
মুক্তানালার ফাঁকে ফাঁকে যেন নীলমণিগুলি রাজে,
ইন্দবিরের শােভ যেন শ্বেতপদ্মের মাঝে মাঝে।
যেন ছায়ালীন চন্দ্র আলােক আঁধার বক্ষে আঁকা,
হরিচন্দন রচনার সাথে যেন কালাগুরুমাখা।
বঙ্গসাহিত্যের পরমবন্ধু সাহিত্য বিলাসী সুধীবর প্রিয়নাথ সেন মহােদয়ের পত্র। * * আপনার পুস্তকদ্বয় উপহার পাইয়া আপ্যায়িত হইলাম। ‘সাময়িক পত্রে প্রকাশিত আপনার কবিতাগুলি আমার বড়ই ভাল লাগি- য়াছে এবং তৎসম্বন্ধে পরম স্নেহভাজন যতীন্দ্রমােহনের নিকট কত আনন্দ প্রকাশ করিয়াছি। আপনার পুস্তকগুলি পাঠ করিবার জন্য কতদিন হইতে আগ্রহের সহিত অপেক্ষা করিতেছি। আপনি এবং আপনার ২৩টি সহযােগী নূতন সম্প্রদায়ের কবিদের রচনায় রবিবাবুর প্রভাব লক্ষিত হয়, তাহা হইলেও তাহাদের ভিতরে দিব্য মৌলিক সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত। আমার বড়ই ইচ্ছা ইহার সমালােচনা করি, সে ইচ্ছা যতীনের নিকট প্রকাশ করিয়াছি।” ly.
পর্ণপুট । ( দ্বিতীয় সংস্করণ—মূল্য ২০ না) পর্ণপুটে কবির নানাশ্রেণীর কবিতা আছে ; ৬টি পর্যায়ে বিভক্ত- ১ম পৰ্য্যায়ে সত্যের রুদ্র ও শিং-এই দ্বিবিধ বিকাশেব কথা ২য়ে-পল্লীগীতি, ৩য়ে প্রেমগীতি ৪র্থে বৃন্দাবনগাতি ৫মে বঙ্গমনীষিগণের প্রশস্তিমালিকা উঠে বর্ণনাত্মক কবিতা। নৰভারত- ভাৰতবৰ্ষ, অৰ্যাবর্ত, যমুনা বিজয়া ইত্যাদি পত্রিকায় পর্ণপুটের প্রবন্ধকারে তাশ্র প্রসংসা প্রকাশিত হইয়াছিল। হিতবাদী বাসী বসুমতী, প্রবাহিনী ইত্যাদি সাপ্তাহিক পত্ৰ মুক্তকণ্ঠে পুস্তকের প্রশংসা করিয়াছে ; সাহিত্যাচাৰ্য্য অক্ষয়চন্দ্র, শ্ৰীযুক্ত অশ্বিশীকুমার দত্ত শ্ৰীযুক্ত চিত্তরঞ্জনদাস, “মনোরঞ্জন গুহ ঠাকুরতা শ্রীযুক্ত জ্যোতিরিন্দ্র নাথ ঠাকুর, পণ্ডিত যাদবেশ্বর তর্করত্ন মহামহোপাধ্যায় গণনাথ সেন ইত্যাদি মহাত্মাগণ পপুটের ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছেন। ইহাদের মতামত কবির অন্যান্য পুস্তকের শেষে সংযোজিত হইয়াছে। • পুস্তকগুলি চক্রবর্তী চ্যাটার্জী,-মিত্র কোং, গুরুদাস লাইব্রেরী ইত্যাদি পুস্তকালয়ে ও উলাপুর (রঙ্গপুর মুক্ত শিবপ্রসাদ ভট্টাচার্যের নিকট পাওয়া যায়। অনিন্দ্যা—(স্ত্রীপাঠ্য ক্ষুদ্র উপন্যাস) ভাগলপুর কলেজের অধ্যাপক কৃষ্ণবিহারী গুপ্ত প্রণীত মূল্যiyo { বারুণী—(ছােট গল্প সমষ্টি) শ্রীশরৎচন্দ্র ঘােষাল এম, এ, বি এল শ প্ৰণাত ১২। বীথি—একতারা উজানী—কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক প্রণ, মূল্য যথাক্রমে ৩, ৭, 19”। loo ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.