Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Prafulla-nirmmalya

2010/01/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

প্রফুল্ল-নিৰ্মাল্য।
"__Trailing clouds of glory, do we come
From God, who is our home.”
প্রকাশক, প্রভাসচন্দ্র পাল, বি, এল

PRINTED BY
K. P. CHAKRAVARTI AT THE JAYANTI PRESS,
25, PATALVANIA STREET, CALCUTTA.

No text on this page.

1
LA 9CHOOL
ফাগুবাবু

No text on this page.

No text on this page.

উসর্গ।
ত্রিদিব হইতে শিশু! এসেছিলে ধরাতলে,
প্রফুল্ল-কোমল কান্তি, তুমি শান্তি-প্রস্রবণ ;
রচিয়াছি যে নিৰ্ম্মাল্য তব পুণ্য স্মৃতিলে,
তোমারি উদ্দেশে তাহা করিলাম সমর্পণ।
“কনে কাকা”।

No text on this page.

শ্রীশ্রীদুর্গা
শরণং
চিরজীবেধু
ভাই মুনীন্দ্র !
তােমার “প্রফুল-নিৰ্মাল্য” সংশােধনের ও ভূমিকা
লেখার ভার তুমি আমায় দিয়াছিলে। কিন্তু আমি
ছাপার ভুল ছাড়া আর কিছুই সংশােধন করিতে পারি
নাই,—ভূমিকাও লিখি নাই, । ইহার ভূমিকা নিষ্প্রয়োজন।
ইহা তোমার হৃদয়ের অন্তস্তল ভেদ করিয়া উঠিয়াছে,
ইহা তোমার প্রাণের ভাষা, ইহাতে কাহারও হস্তক্ষেপ
ইহা পড়িবার সময় পাঠককে নিঃশব্দ ও
নিস্পন্দ হইতে হয় ।
প্রফুল্ল একটা স্বর্গীয় পারিজাত, মর্ত্যে আসিয়া ঈষৎ
প্রস্ফুটিত হইয়া অপূধ্ব সুষমায় ও সৌরতে সকলকে বিমুগ্ধ
করিয়। চলিয়া গেল। এই স্বল্প-দিনে সকলের হৃদয়ে
চলে না।

• যে একটু দিব্য জ্যোতিঃ রাখিয়া গেল, তাহার ধ্বংস নাই। শুনিয়াছি,-যোগারূঢ় মহাত্মারা ঘটনাক্রমে যোগ- ভ্রষ্ট হইয়া মহাকুলে আসিয়া জন্মগ্রহণ করেন, এবং মানব- হৃদয়ে এক অপূৰ্ব দেবভাব সঞ্চারিত করিয়া মুক্তিধামে প্রস্থান করেন। একি সেই যােগষ্ট দেবশিশু! কলিকাতা। ২৪শে আশ্বিন, স্বস্তি শীতারাকুমার শর্মা ১৩১৪ সাল।

প্রফুল-নিৰ্ম্মাল্য
উন্মেষ।
ভক্ত কবি বলিয়াছেন
“মন্ত্রে তন্ত্রে জপে তপে ব্রতে প্রতিমায়,
কিম্বা তীর্থে কভু কেহ নাহি পায় তঁায় ;
ভকতবৎসল হরি ভকত-জীবন,
কেবল ভকতি দিলে মিলে সেই ধন।”
এমন ‘ভকতি কত দিনে হয়—এমন ভক্ত কত দিনে
ইতে পারা যায় ? ঐ যে কেবল ভকতি’, সে কি এক

২ প্রফুল্ল-নিৰ্মাল্য। দিনের—এক বৎসরের—না, এক জীবনের ? তুমি সারা জীবনটা হরিনামের মালা ঠক্ঠকাইলে ; তুমি উঠিতে বসিতে, খাইতে শুইতে, “হরি হে দীনবন্ধু, পার কর ভবসিন্ধু” বলিয়া লােকসমাজে ভক্তশ্রেষ্ঠ নামে অভিহিত হইলে ; তুমি ‘গােবিন্দ-ভবন’, ‘কেশব-নিবাস’, ‘জনার্দন- মন্দির স্থাপিত করিয়া অনায়াসলভ্য মুক্তির আয়ােজন করিলে কিন্তু মুক্তি ত বহুদূরের কথা তুমি যখন মহাপ্রস্থানের প্রশস্ত পথে দণ্ডায়মান হইয়া সংসার হইতে বিদায় লইবার উদ্যোগ করিতেছ, তখন তােমার কি অবস্থা ? সেই তপ্ত শ্বাস, সেই হা হুতাশ, সেই মায়া, সেই অশ্রুজল, সেই মৃতু-বিভীষিকা-সেই সব। একজন চিরকাল মহাপাতক করিয়া আসিয়া মৃত্যুকালে যে কষ্ট পাইয়াছিল, যেরূপ মুখব্যাদান করিয়া অন্যের ভীতির কারণ হইয়াছিল, তুমি আজীবন পুণ্যধৰ্ম্ম করিয়া আসিয়াও মৃত্যুকালে হয় ত সেইরূপই-মহাপাতকীর মত হৃদয়-দৌর্বল্য প্রকাশ করিয়া ফেলিলে ! তবে, হে পুণ্যাত্ম, পুণ্যাত্মা তােমাতে ও মহাপাতকীতে প্রভেদ কি ?

উন্মেষ
মৃত্যুটাকে আমি সুদীর্ঘ বিরহ বলিয়া মনে করি।
তুমি এই বিরহের ভয়ে, আত্মীয় স্বজনকে আর দেখিতে
পাইবে না, ধন দৌলত আর ভােগ করিতে পাইবে না,
এই ভাবিয়া মুমুষু অবস্থায় একবারে অস্থির হইয়া
পড়িলে যাহার কৃপায় তুমি এ সংসারে আসিয়াছ,
যাহার দয়ায় তুমি এত দিন সংসারে থাকিয়া সুখৈশ্বৰ্য্য
ভোগ করিলে, বঁাহার অনুকম্পায় তােমার সালােক্য,
সামীপ্য, সাযুজ্য মুক্তির লাভ হইতে পারে, আর যাহারি
বিধানে তােমায় সংসার হইতে বিচ্ছিন্ন হইতে হইবে;
মায়া জড়িত হইয়া, সংসার হইতে বিদায় লইবার কালে,
তুমি তাহাকে একবার চিন্তা করিবারও অবসর পাইলে
তখন কোথায় রহিল তোমার সেই কেবল
তকতি’ ?
‘কেবল ভকতি থাকিলে চরমসময়ে কি
আর এমন অবসন্ন হইতে হয় ? যাহার ‘কেবল ভকতি
আছে, সে মৃত্যুকে বন্ধু মনে করে, সে মৃত্যুতে শান্তি
পায়, সে মৃত্যুতেও সৌন্দর্য দেখিতে পায়। তাই
জিজ্ঞাসা করিতেছিলাম, ঐ যে কেবল ভকতি’, সে কি
একদিনের ? না, একজীবনের? বুঝি এ ভক্তি এক

৪ প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য। জীবনের নহে, বুঝি এ উক্তি অনন্ত জীবনের ! এ তক্তি একজীবনের হইলে, তুমি হরিনামের মালা ঘুরাইয়াও মৃত্যুমুখে আপনাকে ভুলিয়া যাও কেন? আর একজনই বা সুখশান্তিতে ভবের বাসা তুলিয়া দেয় কেন? তুমি হরিনাম করিয়া চুল পাকাইলে, তথাপি তােমার মায়া- ঘোর কাটিল না, তুমি জাগিয়া ঘুমাইয়া রহিলে,তােমার সেই জ্বালা, সেই যন্ত্রণা—সুখ নাই, শান্তি নাই-সংসার- সুখ উপভােগ করিবার জন্য তুমি সর্বদাই ব্যাকুল। আর একজন সংসারে আসিল,—আপনি হাসিয়া, অপরকে হাসাইয়া দিন কাটাইল, সংসারের জ্বালাযন্ত্রণা বুঝিল , সুখে দুঃখে উদাসীন রহিল ; তাহার পর, ভবের খেলা সাঙ্গ করিয়া জীবন-সন্ধ্যায় হাসিতে হাসিতে আপন দেশে চলিয়া গেল। সে সময়ে তাহার এতটুকুও মুখবিকৃতি ঘটিল না ; সে যদুকুল-নলিন-দিনেশ’ নাম লইয়া সংসারাম হইতে অবসর গ্রহণ করিল। তাহার অনন্ত জীবনের কৰ্ম্মফলে এবং কেবল ভকতি’-গুণে সে তাহার ‘সেই ধনকে চিনিয়াছে ;--তাহার আর ‘মন্ত্র তন্ত্র ব্রত জপের প্রয়ােজন কি ? তাহার হৃদয়-রাস-মন্দিরে ;

উন্মেষ।
সচ্চিদানন্দ অহরহঃ বিরাজ করিতেছেন,--আর অন্য
তীর্থে কাজ কি ? যে রত্ন চিনিয়াছে, সে কাচখণ্ডে রঃ
দেখিবে কেন ?
একটী পবিত্র বালক, অলৌকিক চরিত্র লইয়া দিন
কয়েকের জন্য ‘ভবে এসে, খেতে বসে’, এই ‘কেবল
ভকতি’র মহিমা, তাহার আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবকে
বুঝাইয়া দিয়া গিয়াছে। তাহার মধুময় জীবনকাব্যের
অতীত ঘটনাবলী, ভগবদ্ভক্তির মধুরতা বিকাশ করিয়া,
স্মৃতি-মন্দিরে যে চিত্রপট সংরক্ষিত করিয়া গিয়াছে,
এ প্রবন্ধ তাহারি প্রতিকৃতি মাত্র। সহৃদয় পাঠক,
মনশ্চক্ষে দেখিয়া লও, কি এক অপূৰ্ব্ব প্রভায় সে সম্মোহন
ছবি ধীরে ধীরে আবরণমুক্ত হইতেছে! এ যে সেই
চিরপ্রিয় চিরমধুর প্রফুল্লকান্তি বালযোগী অশরীরী
আত্মার দীপ্তি-উন্মেষ !!!

জন্ম। ১৩০২ সালের ফাল্গুন মাস-দোলযাত্রা। চারিদিকে তুমুল কোলাহল। অতি প্রত্যুষকাল হইতেই সে আনন্দ- রােল উথিত হইয়াছে—বিশেষতঃ পশ্চিম দেশে। পশ্চিমে ফাগুয়া’র দিনে, আনন্দ-তুফানে দেশটা তােলপাড় হইয়া উঠে। সে অবাধ আনন্দের তুমুল ধ্বনি দূর হইতে শুনিলে মনে হয়—বুঝি রণ-কোলাহল! এ উহার গাত্রে পিচকারি মারিয়া ‘লালে লাল করিয়া দিতেছে, সে প্রতিদ্বন্দ্বী গলা চাপিয়া ধরিয়া ‘শুখা ফাগে’ আচ্ছা করিয়া মুখটী রঞ্জিত করিয়া শাখামৃগের কমনীয় মূর্তি লােকসমাজে প্রকটিত করিতেছে—সে মূর্ত দেখিয়া সম্ৰান্তবংশীয় মহিলাগণ পৰ্যন্ত হাসি চাপিয়া রাখিতে পারিতেছেন না। একজনু একজনের পশ্চাদ্ধাবনে মুক্তকচ্ছ;-পশ্চাদ্ধাবিত লােকটী ব্যাঘ্ৰভয়ে ভীত শশজাতির ক্ষিপ্রগতি অনুকরণ করিয়া সুদীর্ঘ পদসঞ্চালনে যত্নবান্ ; অবশেষে দুই- জনেই ফাগ মাখিয়া রঞ্জিতকলেবর-নয় ত আ মৃত্তিকায় কাশীধামের ভযোগী সাজিয়া হাস্যোদ্দীপক হাবভাবে নৃত্য করিতেছে। পশু পক্ষী; তরু লতা, নদী নালা, সব লালে লাল হইয়া গিয়াছে। ‘ফাগুয়া’র দিন পশ্চিমে কি আর কালাে থাকিবার যাে টী আছে ? যে থাকিবে, সে হিন্দু নহে। এইরূপ আনন্দের দিনে ভাগলপুরে চন্দ্রকুমার পাল মহাশয়ের বাটীতে আনন্দোৎফুল্ল শঙ্খধ্বনি হইল। বেলা তখন ৮টা। আত্মীয়েরা সে শঙ্খধ্বনিতে আকৃষ্ট হইয়া, যথায় শঙ্খধ্বনি হইতেছিল, সেই স্থানে উঠি পড়ি ভাবে ছুটিল। তথায় উপস্থিত হইয়া সকলে কি দেখিল ? পাল মহাশয়ের আর একটী দৌহিত্রসন্তান ভূমিষ্ঠ সরিৎ সরোবর, ৮ প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য। এ পুত্র- হইয়াছে ;-নবজাত শিশু প্রতির পার্শ্বে অবস্থান করত বালার্কের ন্যায় গৃহস্থল আলােকিত করিয়াছে। পাল-পরিবারে আজ আনন্দের সীমা নাই। কেহ বলিলেন, “আজ গৌরাঙ্গের জন্মদিন, সন্তান যখন আজিকার দিনে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, তখন ইহাকে সেই আখ্যায় আখ্যাত করিব।” কেহ সেই কথায় সায় দিতেছে, কেহ বা একটা নূতন উপমার— নূতন কথার অবতারণা করিতেছে। কিন্তু কিছুতেই কাহারাে পরিতৃপ্তি হইতেছে না। অনেক বকাবকি ঝকঝকির পর শিশুর স্নেহময়ী মাতামহী স্থির করিলেন, যখন ‘ফাগুয়ার দিন এই সুসন্তান জন্মগ্রহণ করিয়াছে, তখন ইহাকে ‘ফাগু’ বলিয়া ডাকা যাইবে । এ কথায় আর কেহ অন্যমত করিল না। আর একবার আনন্দ-কোলাহল উখিত হইল, আর একবার শঙ্খনিনাদে চারিদিক্‌ নিনাদিত হইল—সে কোলাহল ‘ফাগুয়ার আনন্দ-কোলাহলের সহিত মিশিয়া গেল। একজন পরমাত্মীয় সেই সময়ে এক মুঠা ফাগ লইয়া সদ্যপ্রসূত সন্তানের গাত্রে ছড়াইয়া দিয়া হাসিয়া বলিলেন-

জন্ম।
৯
‘ফাগের দিনে এসেছ, যাদু,
মখি চাট্টি ফাগ ;
খেও বেশী ঘরের ভাত
কর যদি রাগ ?
সকলে হো হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল। সদ্যোজাত
সন্তানও বুঝি সে কৌতুক বুঝিতে পারিল বুঝিলে
ঠিক সেই সময়ে “টা করিয়া কাঁদিয়া উঠিয়া সে জননীর
নিকট নালিশ করিল কেন ?

হাঁটি হাঁটি পা পা ।
শিশু চন্দ্রকলার ন্যায় দিন দিন বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইতে
লাগিল। যথাকালে নামকরণ কাৰ্যাদি সুসম্পন্ন হইয়া
গেল। তাহার সুন্দর অধরে সুমধুর হাসিটুকু সৰ্ব্বদাই
ঝিকমিক্‌ করিতে লাগিল। এই কারণে, তাহার মাতা
আদর করিয়া নাম রাখিলেন, প্রফুল্ল। প্ৰফুল্লের ভ্রাতা-
দিগের নামের পাশে একটী করিয়া ‘চন্দ্র আছে-শরচ্চন্দ্র,
নিৰ্ম্মলচন্দ্র, প্রভাতচন্দ্র ইত্যাদি। সেই ‘চ’টী প্রফুল্লর
সহচর হইবার লােভ সধরণ করিতে পারিল না-ধীরে
ধীরে আসিয়া প্রফুল্ল’র সহিত মিশিয়া গেল। “চন্দ্রের

হাঁটি হাঁটি পা পা । ১১ সহিত মিলিত হইয়া শ্রীমান্ ফাগু এখন প্রফুল্লচন্দ্র হইয়াছে -সোণায় সােহাগা! প্রফুল্লচন্দ্র শিশুভাযায় এখন অনেক কথাই কহিতে পারে। তাহার সেই বিশাল ললাট কুঞ্চিত করিয়া, সমুজ্জ্বল নেযুগল বিস্তৃত করিয়া, ভ্রমরকৃষ্ণ কুঞ্চিত কেশগুচ্ছগুলি টানিয়া টানিয়া সে যখন বলে, “তু কোলাে না, বাবা মালবে”, তখন তাহাতে আর শিশুমূৰ্ত্তি থাকে না। সে মূৰ্ত্তিতে এক দিব্য প্রভা পড়িয়া তাহাকে অলৌকিক করিয়া তুলে। বড় বড় চক্ষু দুইটী স্থির করিয়া যখন সে আকাশ- পানে চাহিয়া থাকিত, তখন মনে হইত সে চক্ষু বুঝি এ জগতের নহে। আবার যখন সে চক্ষুতে চপলতা প্রকাশ পাইত, তখন মনে হইত সে চক্ষু যেন কিছু অন্বেষণ করিতেছে,-যেন তাহা খুজিয়া পাইতেছে না, প্রশান্ত নীলিমায় তাহার আকাঙ্ক্ষার ধন যেন লুকোচুরী খেলিতেছে, সে তাহা ধরিতে চাহে, সেসে নীলিমায় মিশিতে চাহে। সে প্রফুল্ল নয়নে কি কমনীয়তা, কি মধুরিমা, কি পবিত্রতা ! প্রফুরে চক্ষু দেখিয়া তাহার

প্রফুল্ল-নিৰ্মাল্য।
মেজ জেঠা মহাশয় বলিতেন--“He has a dreany
far-away look, , which is not of this worlel."
কথাটী সম্পূর্ণ সত্য। সে চাহনি দেখিয়া, যাহার
বুঝিবার, তঁাহারা বুঝিলেন,-এ দেবশিশু-মরজগতের
নহে-শীঘ্রই মায়া কাটাইবে।
প্রফুল্ল এখন বঙ্গভঙ্গ করিয়া আপনি হাসে ও পরকে
হাসায়। উঠিতেছে, বসিতেছে, চলিতেছে, পড়িতেছে ;-
কিন্তু যেমনি তাহার কার্যের প্রতি অন্যের চক্ষু পড়িল,
অমনি সে একটু ফিক্‌ করিয়া হাসিয়া অন্যত্র চলিয়া
গেল ;সে শিশু হইয়াও একটু নির্জনতা ভালবাসিত।
সে যখন প্রথম চলিতে শিখিয়াছিল, তখন তাহার
জননী তাহাকে শিখাইয়াছিলেন, হাঁটি হাঁটি পা পা।
এ কথা শিশু বিস্মৃত হয় নাই। যখনি তাহার অপেক্ষা
অল্পবয়স্ক শিশুকে সে নিকটে পাইত, তখনি তাহার হস্ত
ধরিয়া বলিত, “হঁতি হাতি পা পা তোলে তোলে
বালী দা!” এই কথা বলি আর কু কু করিয়া
হাসিত। শিক্ষকের পদে আসীন হইয়া শ্ৰীমান্ প্রফুল্লচন্দ্র
যখন তাহার শিষ্য—অন্য এক মাকে ‘হতি হাতি

হাঁটি হাঁটি পা পা ।
পা পা শিখাইতে আগ্রহ প্রকাশ করিত, শিষ্যটা হয়ত
অল্পবয়স্ক গুরুর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করিতে কুণ্ঠা বােধ
করিত। কিন্তু গুরুমহাশয় ছাড়িবার পাত্র নহেন।
কাজেই যুদ্ধের সূচনা হইত।, শিষ্য গুরুর হস্ত হইতে
পরিত্রাণ পাইবার আশায় ক্রন্দনের সুর তুলিত। তখন
গুরু দয়াপরবশ হইয়া শিষ্যকে ছাড়িয়া দিত। কিন্তু
নিষ্কৃতিলাভের পরেও অনেক সময়ে শিষ্যের রােদন
থামিত না। উপায়ান্তর না দেখিয়া কিছু খাদ্যসামগ্রী
আহরণ করিয়া কিম্বা একটা খেলানা লইয়া গুরু শিষ্যকে
উপহার দিত। যদি তাহাতেও শিষ্যের মন না উঠিত,
তাহা হইলে গুরু শিষযার গলা জড়াইয়া বলিত, “গাং তুবি,
• বাই ?” এই বলিয়া, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোমল হাত দুখানি
ঘুরাইয়া, গুরু গান জুড়িয়া দিত
“হলি তাকুল ব’তে তাকে
কত গাতের দালে ;
দে তেলে বন্দ কঁদে
বাল বাতেনা তালে।”

১৪
প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য ।
গুরুর মুখে এই অভিনব শাস্তির কথা শুনিয়াই হোঁক
কিম্বা সম্মোহন সঙ্গীতমন্ত্রেই হোক, শিষ্যের রােদন
থামিয়া যাইত। গুরু শিষ্যে আবার ভাব হইত।
গুরুর হস্ত ধরিয়া ‘হাতি হাতি পা পা করিতে শিষ্য
আর কোনাে আপত্তি করিত না।

খেলা-ধূলা।
“His blood is hot, his blow is strong,
-Cruelty all around;
Meddled wi' the nest, passing along,
Killed whate'er he found."
এরূপ কীড়াপ্রবৃত্তি প্রফুল্লচন্দ্রের কোমল হৃদয়ে দখল
সাব্যস্ত করিতে পাইত না। সে যখন অতি শিশু, তখন
হইতেই জীবজন্তুর প্রতি তাহার কেমন একটা ভালবাসা
ছিল।
সে ভালবাসাকে যদি উদার অনন্ত বলিতে
দোষ না থাকে, তবে তাহা তাই। প্রফুল্ল পিপীলিকাটীর
পৰ্য্যন্ত কখনাে প্রাণবধ করে মাই। অন্য কেহ করিলে,

প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য।
তাহার কষ্ট হইত। ইহা যদি সহজ ধর্মভাবের লক্ষণ হয়,
তবে তাহা হইতে প্রফুল্ল বঞ্চিত ছিল না।
পক্ষীর মধ্যে তাহার বড় ভালবাসার সামগ্রী ছিল ‘টিয়া।
একদিন প্রফুল্ল ও তাহার জ্যেষ্ঠ সহােদর প্রভাতচন্দ
পথের ধারে একটী অর্ধমৃত টিয়া পাখী দেখিতে পায় ।
বােধ হয়, কোনাে গৃহস্থ পক্ষীটীর অন্তিমকাল উপস্থিত
দেখিয়া অকালে রাজপথেই তাহার সজ্ঞান গঙ্গাযাত্রার
ব্যবস্থা করিয়াছিল। ভ্রাতৃযুগল করুণাবশে পক্ষীটিকে
সযতনে আপনাদের বাটীতে আনিল। প্ৰফুল্লের পুণ্যময়ী
পিতামহী পৌত্রদিগের এইরূপ শৈশব-করুণা দেখিয়া
সবিশেষ প্রতিলাভ করিলেন এবং আগ্রহ সহকারে
স্বয়ং পক্ষীটীর পরিচর্যার ভার লইলেন। পক্ষী সুস্থ ও
সবল হইয়া, প্রফুল্ল ও তাহার সহােদর প্রভৃতিকে প্রফুল
করিতে লাগিল; পিতামহীর পক্ষিপালন সার্থক হইল।
শিশু প্রফুল্ল ‘গঙ্গারাম’কে হরিনাম শিখাইতে সবিশেষ
আগ্রহ প্রকাশ করিত। প্রফুল্ল ও তাহার পিতামহীর
যত্নে পক্ষীর কিছু শিক্ষালাভও ঘটিয়াছিল।
কিন্তু যে
‘শিকল-কাটার জা’, তাহার কৃতঘ্ন না হইবার কোনাে •

খেলা-ধুলা।
কারণ নাই। শুক রাজ একদিন পিঞ্জরদ্বার মুক্ত পাইয়া
পলায়ন করিল। প্রত্ন । সে দিন বড় কাতর হইয়া
পড়িয়াছিল। পক্ষীর পলায়নের নিমিত্ত সে কাতর হয়
নাই—পথের ধারে পড়িয়া আবার পাছে ‘গঙ্গারাম”
অপমৃত্যুর মুখে পড়ে, এই ভাবিয়া প্রফুল্ল ব্যাকুল হইয়াছিল।
পক্ষীটাকে পুনবৃত করিবার জন্য তাহার সমস্ত পুজিপাটা
খরচ করিতেও সে প্রস্তুত ছিল। পক্ষীও যেন ধরা দিবার
জন্য দুই এক দিন বাটীর আশেপাশে ঘুরিয়াছিল। কিন্তু
ব্যাধের দল দেখিয়া সে বনান্তরালে চলিয়া গেল ।
এ ঘটনা ভাগলপুরে ঘটে।
চিত্রবিদ্যার উপর প্রকুল্লের সবিশেষ অনুরাগ দেখা
যাইত। সে এখন পাঁচ বৎসরের ;-বড় গাছ’, ‘ছােট
পাতা’, ‘লাল ফুল’ প্রভৃতি পড়িয়া সে সেই শৈশবেই
বুঝিল,—শুধু তােতাপাখীর মত পড়া পড়িলে চলিবে
না। আপনার ‘কিণ্ডারগার্টেন’ সে আপনিই করিয়া
লইল। বড় গাছ, ছােট পাতা, লাল ফুল চিত্রিত করিয়া
বালক অপার আনন্দ ভােগ করিত। অন্যে তাহার
চিত্রকে কাকের ঠ্যাং ‘বকের ঠ্যাং বলিলেও চিত্রাঙ্কনে
৩

১৮ প্রফুল-নিৰ্ম্মাল্য। সে কিছুতেই উদাসীন হইত না। মধ্যে মধ্যে নুমেন্টের চিত্র অঙ্কিত করিয়া, সে সকলকে দেখাইত এবং হাসিয়া বলিত, “এটা স্বগের সিড়ি।” আর একটী চিত্রের, অঙ্কন করিতে তাহার আগ্রহ- তিশয্য দেখা যাইত। ধীর লহরীমালায় বিশোভিত হইয়া নিঝরিণী ধীরে ধীরে বহিয়া যাইতেছে-একখানি ক্ষুদ তরণী তরঙ্গের মাথায় মাথায় হেলিতেছে, দুলিতেছে-- কর্ণধারও তৎসঙ্গে তালে তালে উঠিতেছে, নামিতেছে। কল্লোলিনীর বেলাভূমি-সান্নিধ্যে একখানি পর্ণকুটীর দেখা যাইতেছে, তাহার আশেপাশে বৃক্ষ লতা গুল্মাদি জন্মিয়া স্থানটীকে একরূপ বনভূমিতেই পরিণত করিয়াছে। ইহা কবিকল্পনার চিত্র—এ চিত্র অঙ্কিত করিতে বালক, কোথা হইতে শিখিল। এক দিন বহুবাজারের রাস্তায় ‘মােট ট্রাম’ দেখিয়া আসিয়া হুবহু সেই চিত্র অঙ্কিত করিয়া প্রফুল সকলকে চমৎকৃত করিয়াছিল। মােটর টাম অঙ্কিত করিয়াও সে পরিতৃপ্ত হইল না;-ভাবিল, মােট ট্রাম চালাইতে হইবে। কিন্তু কি করিয়া তাহার চিন্তা খেলা-ধূলা'। কৰ্যে পরিণত হয় ? অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া সে এক উপায় স্থির করিল। তাহার দাদা প্রভাতের একখানি কাঠের গাড়ী ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছিল। সেখানি ঘােড়ায় টানা ট্রামগাড়ীর অনুরূপ। প্রফুল অনেক কৌশলে সেখানিকে মোটর ট্রামে পরিণত করিল। তৎপরে সুতা ঝুলাইয়া, মােটর ট্রামের অনুকরণে গাড়ীর মাথায় Trolly ও rod লাগাইয়া, ফাগুবাবু মােট ট্রাম চালাইতে লাগিল। রাঙ্গা রাঙ্গা পুতুলগুলি ড্রাইভা, কন্ডাক্টার ও আরােহীর স্থান অধিকার করিত ; টুকরা টুকর। নীলবর্ণের কাগজ ট্রামের টিকিট হইত। আবােহি- বর্গকে অবশ্য টিকিটের মূল্য দিতে হইত—সেগুলি মাটির ছে। বালক মাটির ঢেলাটাই ভাল চিনিয়াছিল। বলিতে ভুলিয়াছি, ফাগুবাবু গাড়ীর মাথায় স্বহস্তে লিখিয়া দিয়াছিল, Calcutta Motor Car Cuy. Proprietors-Sarbadhikari Bros.” যে সময়ের কথা বলিতেছি, সে সময়ে এরূপ নামের কোনাে কোম্পানির অস্তিত্ব পৰ্যন্ত ছিল না। এই নামটী বালকের স্বকপােল- ঐল্পিত। গাড়ীখানি এখনও গৃহে বিদ্যমান।

২০ প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য। কলকজা লইয়াই প্রফুল্ল সারাদিন নাড়াচাড়া করিত। এটা ভাঙ্গিতেছে, ওটা গড়িতেছে, সেটা মেরামত করিতেছে —ইহাই তাহার দৈনিক কাৰ্য ছিল। কল- কজা মেরামত কালে যদি কেহ ফাগুবাবুকে ডাকিয়া ডাকিয়া রুদ্ধকণ্ঠ হইত, তথাপিও বালকের উত্তর পাইত না। মধ্যে মধ্যে ফাগুবাবু বেশ মুরুব্বিয়ানাভাবে তাকিয়ায় ঠেস দিয়া বাম হস্তের উপর বাম গণ্ডটী রাখিয়া, দক্ষিণ করের অঙ্গুলিগুলি সঞ্চালন করিত। সেটা ক্রমান্ প্রফুল্লচন্দ্রের জমীদারি চা। কিন্তু প্রফুলের পিতা, পুত্রের এই জমীদারি চাল দেখিয়া মনে মনে ভীত হইতেন—ভাবিতেন, বালক কি এই বয়সেই সকল সাধ, পূর্ণ করিয়া লইতেছে ! প্রফুল্লচন্দ্রের একটী খেলার ‘ডাক্তারখানা ছিল। সে তাহার নাম দিয়াছিল ‘স্বদেশী ফার্মাসী। বালক যখন তাহার ‘ফার্মাসী’র এইরূপ নাম দিয়াছিল, তখন স্বদেশী আন্দোলন উপস্থিত হয় নাই। এই ঘটনার অনেক পরে স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রপাত। প্রফুল্ল বাছিয়া বাছিয়

খেলা-ধূলা।
কোথা হইতে এবং কেন যে এ নামের সংগ্রহ করিয়াছিল,
তাহা ভাবিবার বিষয়। আর এক কথা--‘ফার্মাসী
কথাটার বর্ণশুদ্ধি বিষয়ে বালকের ভ্রমপ্রমাদ না ঘটিলেও
সে—কথাটার উচ্চারণ জানিত না। সেই জন্য সে ‘স্বদেশী
ফাৰ্ম্মসী’ না বলিয়া ‘স্বদেশী পণ্ডিচারী’ বলিত। ভূগোল
পাঠ করিয়া কি অন্য কোনো কারণে বালক ‘পণ্ডিচারা’
কথাটার ব্যবহার করিত, গ্রন্থকারের তাহা জ্ঞাত নহে।
পণ্ডিচারী’ লইয়া অনেকেই প্রলকে বিদ্রুপ করিত।
কিন্তু তাহাতেও পণ্ডিচারীর উপর সে শ্রদ্ধাহীন
হয় নাই।
সে যাহা হউক, অনেকগুলি পুরাতন ঔষধের শিশি
বােতল সংগ্রহ করিয়া প্রফুল্ল তাহার ডাক্তারখানাচী সজ্জিত
করিয়াছিল। ডাক্তার সাজিয়া, চেয়ারে বসিয়া সে
ঔষধ দিবার ভান করত। এ দৃশ্য দেখিয়া বালকের
আত্মীয়েরা না হাসিয়া থাকিতে পারিতেন না।
‘স্বদেশী ফাৰ্ম্মাসী’ হইতে একদিন একটু উপকার ও
পাওয়া গিয়াছিল। প্রফুল্ল ও তাহার ভ্রাতৃবর্গ বাটীসংলগ্ন
মাঠে ফুটবল খেলিতেছে, এমন সময়ে একটী বালক

প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য। গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হইল। প্রফুল্লের মেজদাদার ধারণা ছিল, এইরূপ আঘাতে ‘সায়েনা সবিশেষ উপকারী। কিন্তু তখনি সায়োনা কোথায় পাওয়া যায় ? প্রফুল্ল সে কথা শ্রবণানন্তর বাটীর মধ্যে চলিয়া গেল এবং তাহার ‘স্বদেশী পণ্ডিচারী’ হইতে একটী শিশি লইয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, সেইটী সায়ােনার শিশি কি না। সেইটাই সায়ােনার শশি বটে। তৎক্ষণাৎ ঔষধ আঘাত- প্রাপ্ত বালকটীর ক্ষতমুখে লাগাইয়া দেওয়া হইল। আহত বালকের হাতে বেশ উপকার হইয়াছিল। ক্রীড়া- ব্যপদেশেও যে লােকের উপকার করিতে পারা যায়, ইহা তাহার একটী উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্ৰফুলের আর একটী মজার খেলা ছিল—“ইঞ্জিন দাদা। ৬ বৈদ্যনাথে বেড়াইতে যাইয়া সে এই ক্রীড়ারঙ্গের উদ্ভাবন করিয়াছিল। বৈদ্যনাথ-জংশন হইতে দেওঘর দেওঘর পর্যন্ত Burn কোম্পানীর রেল আছে। প্রফুল যে সময়ে বৈদ্যনাথে বেড়াইতে যায়, সেই সময়ে ঐ রেলে পাঁচু সিং নামে একজন গার্ড (Guard ) ছিল। পাঁচু সিং প্রফুলকে খেলা-ধূলা। এত ভালবাসিয়া ফেলিয়াছিল যে, তাহার কথা শুনিয়া সে না করিতে পারিত, এমন কাৰ্যই ছিল না। পাঁচু সিং যখন ট্রেন লইয়া বৈদ্যনাথ-জংশন হইতে দেওঘর-অভিমুখে যাত্ৰা করিত, “ইঞ্জিন দাদা-দাড়া, দাদা! ইঞ্জিন দাদা- দাড়া, দাদা!” বলিয়া, ‘লাল নিশান’ হস্তে, প্রফুল্ল তৎ- পশ্চাৎ ছুটিতে থাকিত। পাঁচু সিং বালকের দুর্জয় সাহসে প্রীতিলাভ করিয়া ট্রেন থামাইত এবং প্রফুল্লকে তুলিয়া ফাগু বাবু ‘লাল নিশান, ? ‘নীল নিশান উড়াইয়া পাঁচু সিংএর মাথা খারাপ করিয়া দিত। ইহাকেই বলে ভালবাসার অত্যাচার ! এ অত্যাচার আরাে অনেকের উপর হইত। অনেকের মধ্যে একজন ছিল—‘সিরিয়া। সিরিয়া • প্রফুল্লর ন কাকার উৎকল ভৃত্য। সে ল চুল রাখে, ‘মু পারিমু ’ বলে, আর ‘প জগড়নাথের নাম শ্রবণ করিলে ভক্তিভরে প্রণাম করে। প্রফুল্ল ভবিল, সিরিয়া ‘কঁধা বহিবার উপযুক্ত বটে ; কিন্তু তাহার পৃষ্ঠে কিম্বা স্কন্ধদেশে চাপিয়া ‘ঘোড়া ঘোড়া খেলিলেও মন্দ হয় না। এরূপ ভাবিবার কারণও ছিল। ফাগুবাবু গাড়ী ঘোড়াটাই ২৪ প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য। অধিক ভালবাসিত। সে সেই কারণেই সিরিয়াকে ‘কঁধা বহা’ হইতে অব্যাহতি দিয়া তাহাকে ‘ঘোড়া করিয়া লইল। বালক সিরিয়াকে মন্ত্রমুগ্ধ করিয়া তাহার স্কন্ধে চাপিয়া, তাহার দীর্ঘ কেশগুচ্ছ গুলি ‘লাগাম' করিয়া, ঘোড়া হাঁকাইবার অভিনয় করিত। অন্য কেই এ অত্যাচার করিলে হয় ত সিরিয়া ‘মু পারিমু না’ বলিয়া বাকিয়া দাড়াইত; কিন্তু ফাগুবাবুর নিকট ‘পারিমু না’ খাটত না। ফাগুবাবুর সংসর্গে যে আসিত, তাহাকেই ফাগুবাবু স্নেহ-মন্ত্রে বশীভূত করিয়া ফেলিত। যে দিন ফাগুবাবু সিরিয়ার স্কন্ধে না চাপিত, সে দিন ভক্তের প্রাণ কাতর হইত। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রফুল্লচন্দ্রের খেলার আসবাব- পত্রও যথেষ্ট বাড়িতে লাগিল। এক্ষণে তাহার জীর্ণ কাঠের বাক্সে হাতুড়ি, পেরে, ভাঙ্গা টিন মাটির ঢেলা, ছুরী, কাচি, অপি, টুকরা টুকরা কাঠ প্রভৃতি অনেক দ্রব্যই স্থান পাইয়াছে। কোন্ দ্রব্য প্রস্তুত করিতে, কি জানি কখন কি আবশ্যক হয়, তাহার ত ঠিক নাই। তাহা ছাড়া প্রফুল্লর জেঠা কাকাদের যখনি কোনো খেলা-ধূলা। দ্রব্য আরক হইত, বিশ্বকর্মা প্রফুল্লচন্দ্র সংবাদ প্রাপ্তি- মাত্রেই তাহা প্রফুল্লচিত্তে সরবরাহ কৱিত। গ্রন্থকারের একদিন গোটা কয়েক পেরেকের দরকার হয়। প্রফুল্লর ‘ন্যাতা, ক্যাতার হাঁড়ি’র কথা স্মরণপথে উদিত না হওয়ায়, সেগুলি বাজার হইতে সংগ্রহ করিবার কথা হইতেছিল। এ কথা প্রচন্দ্রের কর্ণগোচর হইলে সে অবশ্য ক পদার্থগুলির সুব্যবস্থা করিয়া দিয়া বলিল, “কাকা, তুমি কি জান না, আমার মিস্ত্রিখানায় সকল জিনিসই পাওয়া যায় ?” আর এক দিনের ঘটনা-গ্রহকার একটী গ্রামােফো ক্রয় করিয়া আনিয়া, ‘আয় রে আয় হরি বােলে বাহু তুলে নাচি আয়’ রেকর্ডধানি বাজাইতেছিলেন। প্রফুল্ল মন্ত্রমুগ্ধের মত গানটী কর্ণমুখে গিলিতেছিল। যখন সে গানটীর শেষ হইয়া গেল, তখনো বালক নীরব নিস্পন্দভাবে দাঁড়াইয়া রহিল। পরে যখন আর এক- খানি রেকর্ড কলে বাইয়া দেওয়া হইল, প্রফুল্ল তখন বলিল, “ঐ খানাই (‘আয় রে আয় হরি বোলে’ ) আবার বাজাও।” একজন সে কথায় বাধা প্রদান করিয়া বলিল,

প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য।
“না, না, নতুন গান শােন্ ।” এ কথায় বালকের ক্রোধ
হইল—কি, দুঃখ হইল, বুঝিতে পারা গেল না; কিন্তু সে
তৎক্ষণাৎ স্থান ত্যাগ করিল। তৎপর দিবসই দেখা গেল,
টিনের গ্রামােফো প্রস্তুত করিয়া বাজাইবার ভানে, প্রফুল্ল
মুখে ‘আয় রে আয় হরি বলে বাহু তুলে নাচি আয়’
গাহিতেছে। প্রফুল্ল যখন এই গানখানি গাহিতেছিল,
তখন সে ভাবে বিভাের—কপাল বহিয়া অল্প অল্প ঘৰ্ম্মবিন্দু
ঝরিতেছে—চক্ষু জলসিক্ত, যেন পদ্মপত্রে বারিকণা, নাড়া
পাইলেই পড়িয়া যাইবে। ইহাকেই কি সহজ প্রেমা বলে!
অন্যান্য খেলার মধ্যে সে দাদাদের সঙ্গে ‘ড্রিল শিক্ষা
পল্টনের পাকা সেপায়ের মত ফাইলে
দাড়াইয়া; সে যেরূপ ভাবে অঙ্গসঞ্চালনাদি-ক্রিয়া করিত,
তাহার ক্রীড়া-সহচরেরা এ পর্যন্ত তাহার অনুকরণ
করিতে পারে নাই।
প্ৰফুল্লের আর এক খেলা ছিল-কাগজে হরিনাম
লিখিয়া বাটীর দেয়ালে দেয়ালে লটকাইয়া দেওয়া।
ফাগুয়ার দিন আধখানা আলুতে ‘গাধা’, ‘বাদর’ প্রভৃতি
খোদিত করিয়া কালি লাগাইয়া, লােকের গায়ে ‘ছা’
করিত।
।

খেলা-ধূলা ।
২৭
দিয়া, কৌতুকশীল ক্রীড়াসক্ত দুষ্ট বালক যেরূপ অনিন্দ
করে, প্রফুল্ল সেইরূপ হরিনামের ‘ছা’ সাইয়া নিরতিশয়
অ নন্দিত হইত। কলিকাতায় প্লেগের ভয়ে যখন
হরিনাম সংকীর্তনের তুমুল আন্দোলন, সেই সময় হইতে
বালকের এই খেলাটীর আরম্ভ হয়। এ খেলায় যদি
কেহ তাহাকে বিদ্রুপ করিত,
করিত, কিম্বা কোনাে কথা
জিজ্ঞাসা করিত, তাহা হইলে সে অতি গম্ভীর ভাবে
বলিত, “তুমি চুপ কর, ঠাকুর রাগ কৰ্ব্বেন।”
• তাহার অপেক্ষা অধিক বয়স্ক বালকগণের সহিত সে
বড় একটা মিশিতে চাহিত না। ফাগুবাবুর খেলার
সাথী—মােহন, মলিন, বিমান, বিকাশ, ‘নীনজাবাল।
( নীরজাবালা), মাধুরী, মঞ্জরী প্রভৃতি দুই তিন চারি
বৎসরের বালক বালিকা। গান শুনিবার ইচ্ছা হইলে
‘ওদো’দাদার সঙ্গে ভাব হইত। শিশুর স্বভাবতঃ
পবিত্ৰাত্মা।
সেই জন্যই শিশু-বন্ধু পাইলে
ফাগুবাবুর এরূপ উচ্ছ, স্থল আনন্দ হইত।
প্রফুল্ল কিছুতেই অধানতা স্বীকার করিতে চাহিত না।
স্বাধীনতার প্রবল প্রবৃত্তি তাহার প্রত্যেক কার্য্যে

২৮
প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য।
লক্ষিত হইত। প্রফুলের মতেই তাহার খেলার সাথীদের
চলিতে হইত। সে কখনাে কাহাকেও বলে নাই যে,
তাহার মতে সকলকে চলিতে হইবে। কিন্তু তাহার
প্রকৃতিতে এমন একটী শক্তি ছিল যে, তাহারই প্রভাবে
সকলেই তাহার মতে চলিতে বাধ্য হইত। এটা বুঝি
Wili Force—ইহাই বুঝি মনের চৌম্বক বল, ইচ্ছাশক্তির
অজেয় আকর্ষণ।

বিদ্যাভ্যাস ও চরিত্রবৈচিত্র্য।
অনেক সময়েই দেখা যাইত, প্রফু ল নাচিয়া খেলিয়া
বেড়াইতেছে। শান্ত শিষ্ট বালকেরা যেমন দিবারাত্র
পুস্তক-হস্তে গৃহের কোণে বসিয়া থাকে, প্রফুল সেরূপ
থাকিত না; সে সেরূপ প্রকৃতির ছিল না। যখন সে
খেলা করিত, তখন সে খেলাই করিত; যখন সে
পাঠ করিত, তখন সে একান্তভাবে পাঠই করিত।
শিক্ষক কিম্বা অন্য কোনাে গুরুজন যখন কোনাে বিষয়
তাহাকে বুঝাইয়া দিতেন, তখন তাহার সমস্ত ইন্দ্রিয়
একীভূত হইয়া যেন বিষয়টীর ভিতর প্রবেশ করিতে
চেষ্টা করিত। অন্য বালকে যাহা দশবার পড়িয়াও,
দশবার জিজ্ঞাসা করিয়াও বুঝিতে পারে না, প্রফুল্ল তাহা

প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য একবার পাঠ করিয়া, একবার জিজ্ঞাসা করিয়া বুঝিয়া লইত। তাহার মেধা, বুদ্ধি ও প্রতিভা অলৌকিক ছিল। তিনের সমন্বয়ে তাহার কাৰ্যও অলৌকিক ছিল। অধিক- ক্ষণ পাঠাদি কাৰ্য করিতে হইলে সে বড় বিরক্ত হইত। তাহার পিতা তাহাকে পড়িবার কথা বলিলে, সে প্রথমতঃ হাসিয়াই উড়াইয়া দিত। অধিক পীড়ন করিলে, বালক পুস্তকখানি দুই চারি বার উল্টাইয়া পাল্টাইয়া বলিত,-“এই নি, পড়া হয়েছে।” পড়া বলিবার সময়ে তাহার একটুও আটকাইত না। সকল বিষয় সে তন্ন তন্ন করিয়া বুঝিবার চেষ্টা করিত ; “এটা কেন এমন হইল, ওটা কেন অমন হইল”,—এইরূপ প্রশ্ন তাহার পক্ষে স্বাভাবিক ছিল। যতক্ষণ একটা বিষয় ভাল করিয়া না বুঝিত, ততক্ষণ সে কিছুতেই ছাড়িত না। এক দিনের কথা বলি। প্রফুল্ল শিক্ষকের নিকটে অঙ্ককসার সূত্রে বলিল,-“নয়ের (ইংরাজী ৯) পুটুলি নাবে।” ছাত্রের ‘পুটলি’র কথা শুনিয়া শিক্ষক হাসিয়া উঠিলেন এবং নয়ের পুটলি যে নাবে না, তাহ

বিদ্যাভ্যাস ও চরিত্রবৈচিত্র্য।
বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন। কিন্তু ছাত্র তাহা বুঝিতে
চায় না। সে বলে, নয়ের পুটলি নাবিয়া যাইলেই,
হাতে এক থাকে। এ কথার মীমাংসা করিতে শিক্ষক
মহাশয় গলঘৰ্ম্ম হইয়া উঠিলেন।, প্রফুল্ল অবশেষে বুঝিল,
নয়ের পুটলিটা আর নাবে না-সেটা যেখানকার জিনিস
সেইখানেই থাকে। প্রফুল্লের ‘পুটুলি লইয়া তাহার
‘জুইলি দাদা’ ‘খোকা দাদা’ প্রভৃতি বন্ধুবান্ধবেরা প্রায়ই
রহস্য করিত। তাহাতে সে চোটী নাড়িয়া, হাত
দুইখানি দুলাইয়া, মৃদু হাসিয়া বলিত “আঁ!”
‘নয়ের পুটুলিনাবা’ ব্যতীত প্ৰফুলের শব্দভাণ্ডার
অনেক নবােদ্ভাবিত রহস্যপূর্ণ শব্দে পরিপূর্ণ ছিল।
তাহার অলৌকিক প্রশ্ন এবং কৌতুকোব্দীপক কথাটায়
স্বভাবকবি ওয়াডওয়ার্থের সেই মধুময় ভাবটী মনে
পড়ে-
“Those obstinate questionings
Of sense and outward things,
Falling from us, vanishings ;.
Black misgivings of a creature
Moving about in worlds, not realizeal."

প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য।
ওয়ার্ডসওয়ার্থ বােধ হয় প্রফুল্ল-প্রকৃতির বালক
দেখিয়া কবিতার এই অংশটীর রচনা করিয়াছিলেন।
প্রফুল্লচন্দ্রের সংস্কৃত, বাংলা এবং ইংরাজী পড়িবার
ধরণ-ধারণ অতীব প্রশংসনীয় ছিল। পড়িবার কালে
মাত্রার প্রতি ও উচ্চারণের প্রতি তাহার এরূপ তীক্ষ্ণ
দৃষ্টি থাকিত যে,
তাহা ভাবিলেও
চমৎকৃত হইতে
হয়। atay otrs "The boy stood on the
burning deck, ‘উঠ মা উঠ মা ভারতজননী, ‘জয়
ভারতের জয়, একবার তােরা মা বলিয়ে ডাক্
প্রভৃতি কর্ণকুহরে বীণার ঝঙ্কার করিতেছে—এখনাে
তাহার পড়িবার কালের ভাবভঙ্গী স্মৃতি-মন্দিরে
জাগরূক আছে—তাহা বিস্মৃত হইবার নহে।
প্রফুল্ল যেমন মিষ্টভাষী ছিল, তেমনি বিনয়ী ছিল।
তবে আপনার কাৰ্যোদ্ধারের সময় সে নাছােড়বা
হইয়া পড়িত। কিন্তু সে ‘নাছােড়বন্দাপণায়’ কিছুমাত্র
কঠোরতা প্রকাশ পাইত না। তােমার নিকটে কোননা
কাৰ্যোদ্ধারের আবশ্যকতা হইলে সে তােমার কাছছাড়া
হইবে না, তােমার মুখপানে চাহিয়া থাকিয়া দশবার

বিদ্যাভ্যাস ও চরিত্রবৈচিত্র। “আঁ, আঁ করিবে, তােমার মনে করুণার উদ্রেক করিবার নিমিত্ত শত প্রকার চেষ্টা করিবে, আপনি হাসিয়া তােমায় সাইবে;—সে না করিবে, এমন কাণ্ডই নাই। ইহাই ছিল তাহার স্বভাবজ কৌশল। এরূপ ব্ৰহ্মাস্ত্র যাহার অধিকারে আছে, তাহার আর কার্যোদ্ধারের ভাবনা কি ? সে কাৰ্যোদ্ধার করিয়া হাস্যোলাসে নাচিতে নাচিতে চলিয়া যাইত ;-আর, যাহার নিকট হইতে কাৰ্যোদ্ধার হইল, তিনি অনিমিষ নয়নে বালকের কুরঙ্গের মত কুর্দন দেখিতে দেখিতে বিমুগ্ধ হইতেন। সত্যে তাহার প্রবল অনুরাগ ছিল। বালকবুদ্ধিতে সচরাচর অনেক বালক যেরূপ মিথ্যা কথা বলিয়া থাকে, কিম্বা দোষ করিয়া দোষ ঢাকিবার চেষ্টা করে, প্রফুল্ল কদাচ সেরূপ করিত না; সে মিথ্যার দিক দিয়াও যাইত । তাহার পিতা তাহাকে পড়াইয়াছিলেন- "Speak the truth and speak it ever, Cost it what it will. He who seeks to hide the truth, Does the wrong thing still."

৩৪ প্রফুল্ল-নিৰ্মাল্য। ধর্ণে বর্ণে সে এই উপদেশ পালন করিত। সে দোষ করিয়া সরলভাবে তাহা স্বীকার করিত, এবং ভবিষ্যতে যাহাতে সেরূপ দোষ আর না বটে, তাহার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিত। এই চেষ্টার ফলে বালকের আত্ম- মৰ্যাদা-জ্ঞান বিশেষরূপে পরিপুষ্ট হইয়াছিল এবং উৎকর্ষ লাভ করিয়াছিল। সে উৎকর্ষসাধনের মূল, প্রফুল্লর জনকজননী। তাহারা পুত্রকে বেত্রাঘাতে জর্জরিত না করিয়াও, কখনাে কোনােরূপ কর্কশ বাক্য প্রয়ােগ না করিয়াও, সুশাসনে রাখিবার শক্তি ধারণ করেন ; সদা- লাপে, গল্পচ্ছলে, নৈতিক উপদেশটুকু শিশুর কোমল হৃদয়ে খোদিত করিয়া দিতে তাহারা সদা সুদক্ষ ; শিশুর সহিত শিশু সাজিয়া, সহজভাবে সৎশিক্ষা দিতে তাঁহার সদা সচেষ্ট; সে পক্ষে পটুতা তাহাদের বিলক্ষণ আছে। অতএব প্রফুল্লর আত্ম-মৰ্যাদা-জ্ঞান না থাকিবে কেন, বুদ্ধি-প্রখরতা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত না হইবে কেন, সত্যে অনুরাগ মা জন্মিবে কেন? যাহার পুত্রকে চোরের অধিক শাস্তি দিয়া ‘পাঠশেলে গুরু মহাশয়েরও কাণ কাটিয়া ছাড়িয়া দেন, তঁাহারা প্রফুল্লর পিতামাতার দৃষ্টান্তটী মনে

বিদ্যাভ্যাস ও চরিত্রবৈচিত্র্য।
রাখিলে তাহাদের দুই সন্তান শিষ্ট হইয়া আত্মীয়বর্গের
ও সমাজের আনন্দ বর্ধন করিতে পারে।
প্রফুল নিতান্ত সরল প্রকৃতি হইলেও দারুণ অভিমানী
ছিল। কিন্তু সে অতিমান লােকসমাজে প্রকাশ পাইত
না। যদি তাহাকে অভিমানের কান্না কঁদিতে হই,
তবে সে ছাদের উপর কিম্বা অন্য কোনাে নির্জন স্থানে
চলিয়া যাইত। “হিঁচ-কানুনে’ অভিমানের সে বড়
তােয়াক্কা রাখিত না। আর একটা কথা;-বৃথাভিমান
তাহার আদৌ ছিল না।
এই বয়সে বালক অকৃত্রিম বন্ধুত্ব-সুখের উপভােগ
করিবার অধিকারী হইয়াছিল। নির্মলচন্দ্র ও অমিয়নাথ
প্রফুল্লের সহপাঠী ও প্রাণের বন্ধু। প্রবীণ বয়সে লােকের
যেরূপ বন্ধুত্ব ঘটিয়া থাকে, ইহাদের বন্ধুত্বও সেইরূপ
ঘটিয়াছিল। পরস্পরে মনের কথা কহিত, পরস্পরে
সমবেদনা সহানুভূতি প্রকাশ করি,
মধ্যে দ্রব্যাদির আদানপ্রদান চলিত, এবং পরস্পপ্নে
বন্ধুত্বের হিসাব নিকাশ করিত। নির্মলের নির্মলতা
দেখিয়া এবং অমিয়ের অমিয়ধারায় পরিতৃপ্ত হইয়াই,

প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য। বােধ হয়, প্রফুল্ল তাহাদের সহিত সখ্য গাপন করিয় ছিল। তাহার আর একটা বন্ধু ছিল—'গি ঞ দাদা। গিঞ দাদার নাম, তুলসীচরণ। তুলসী অভ্রভেদী শালবৃক্ষ না হইয়াও অতি পবিত্র। সে পবিত্রতায় দীনতা ভাসিয়া যায়, সুকুমার ভাব মনে উদিত হয়, করুণার উৎস ফুটিয়া উঠে। পবিত্ৰপ্ৰাণ প্রফুল্লচন্দ্র তুলসীকে বন্ধু ও আত্মীয়রূপে পাইয়া অনির্বচনীয় আনন্দের উপভােগ করিত। তুলসী-সংযােগে প্রফুল্লর, প্রফুল্ল শতগুণে স্মৃক্তি পাইয়াছিল। প্রফুল্ল সৰ্ব্বদাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকিত এবং কাহাকেও অপরিষ্কার দেখিলে তাহাকে পরিষ্কার থাকি। বার জন্য অনুরােধ করিত। দেবশিশু বুঝিয়াছিল- পরিচ্ছন্নতাই পবিত্রতা। সেইজন্য পরিচ্ছন্নতায় তাহার এত অনুরাগ ছিল। ‘গুছানাে স্বভাবটুকুও তাহার বিলক্ষণ ছিল। কবে কোন্ পুতুলটী তাহার মাতা তাহাকে দিয়াছিলেন, কবে কোন্ আত্মীয় একটি খেলানা দিয়া শিশুর ক্রন্দন থামাইয়াছিলেন, কোন কালে সে একখানি রঞ্জিত বস্ত্র ।

বিদ্যাভ্যাস ও চরিত্রবৈচিত্র্য। ৩৭ উপহার পাইয়াছিল—সেগুলি এখনাে সেইরূপ অবস্থাতেই বৰ্তমান। পিতার নিকট হইতে দুই এক টাকা করিয়া পাইয়া সে যাহা জমাইতে পারিয়াছিল, তাহা এখনাে সেভিংস ব্যাঙ্কে রহিয়াছে। তাহার অধীত পুস্তকগুলি এখনাে এরূপ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন যে, তাহা দেখিলে নূতন বলিয়া ভ্রম হয়। পরিত্যক্ত বস্তুগুলি, সেই পবিত্র বালকের ‘গুছানাে স্বভাব ও পরিচ্ছন্নতার স্মৃতি রক্ষা করিয়া এখনাে গৃহে শােভমান। হায়, সে স্মৃতি কুল- কাষ্ঠের জ্বলন্ত অঙ্গারের মত জ্বালাময়ী প্ৰফুলের অপূৰ্ব উদ্ভাবনী শক্তি ছিল। সে সমস্ত বিষয়েই, ঘাটিয়া ঘুটিয়া, তলাইয়া মূলাইয়া, একটা কিছু নূতনত্ব বাহির করিবার চেষ্টা করিত। বাড়ী দেখিয়া সে বাড়ী প্রস্তুত করিত, পুষ্করিণী দেখিয়া পুষ্করিণী বানাইত, কুঞ্জকাননের অনুকরণে কানন তৈয়ারী করিত কিন্তু তাহাতে এমন একটা কিছু নূতন সামগ্রীর সমাবেশ করিত যে, লােক-দৃষ্টির অগোচরে তাহা থাকিতে পারি না। বালকের একটী খেয়ালের কথা ছিল—“না ত”। যখন সে ঘাড় নাড়িয়া, সুচঞ্চল চক্ষু অচঞ্চল করিয়া,

প্রফুল-নিৰ্ম্মাল্য ।
বলিত—“না ত”, তখন মনে হইত, সে বুঝি দেবলােকের
কথা-নহিলে তাহাতে এত মিষ্টতা থাকিবে কেন!
ফাগুবাবুর আনন্দময়ী ন কাকীমা বালকের মুখে
এই “না ত” কথাটী শুনিয়া অতীব আনন্দ উপভােগ
করিতেন। সেই কারণে, ফাগুৰাবু যাহাতে সেই কথাটী
পুনঃপুনঃ বলে, তাহারও তিনি চেষ্টা করিতেন ;-বে
সকল কথার উত্তরে “ না বলিয়া “না” বলিতে হয়,
এমন কথা কহিতে থাকিতেন। ফাগুবাবু তাহা
বুঝিয়াছিল। সেই জন্য, সে সাধ্যপক্ষে ন কাকীমার
কর্ণগােচরে “না ত* বলি না। প্রফুল্ল তাহার ন কাকী-
মার সমধিক প্রিয় ছিল। কিন্তু তাই বলিয়া মেহের প্রতি
দানে “না ত” কথাটীর নবীনত্ব, বিশেষত্ব ও মাধুৰ্য্য নষ্ট
করিতে সে কিছুতেই রাজী হইত না। “না ত” না
বলিলে ন কাকীমা তাহার সঙ্গে খেলা করিতে
চাহিতেন না। কিন্তু ফাগুবাবু কাকীমার অঞ্চল ধরিয়া,
গায়ে পড়িয়া তাঁহাকে খেলিতে বাধ্য করিত।
প্রফুলের বয়স এখন নয় বৎসর। স্বদেশী আন্দো-
লনের আরম্ভ হইয়াছে। আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই

বিদ্যাভ্যাস ও চরিত্ৰবৈচিত্র্য। “বন্দে মাতরম্‌” মন্ত্রে অনুপ্রাণিত হইয়া, দেশের হিতসাধন কাৰ্যে মনপ্রাণ ঢালিয়া দিয়াছেন। প্রখর আতপপে , দগ্ধ হইয়া, প্রবল বৃষ্টি ধারায় অভিষিক্ত হইয়া স্বদেশ- সেবকগণ দলে দলে মিলিয়া সভাসমিতি করিতেছেন। ভারতসন্তান যাহাতে জননী জন্মভূমির সেবায় ভারত- ভূমির হিতে মনপ্রাণ উৎসর্গ করে, যাহাতে একতাবন্ধন হয়, যাহাতে ভ্ৰাতৃভাব অক্ষুন্ন থাকে, যাহাতে দেশের দ্রব্যই দেশে ব্যবহৃত হয়, সকল ভারতসন্তান এই সকল বিষয়ের । আন্দোলন করিতেছেন। প্রফু ও মাতৃমন্ত্রে মাতিয়া উঠিল। দাদাদের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজিয়া, রৌদ্রে পুড়িয়া, “বন্দে মাতরম্‌” নিশান ঘাড়ে করিয়া, সেও সভাসমিতিতে ঘােগদান করিল; ৩০শে আশ্বিন-বঙ্গচ্ছেদের দিনে-- সে অন্ন গ্রহণ করিল না; পাকা পরিত্যাগ করিয়া ‘রাখীবন্ধন’ করিল। সভাসমিতির পর যখন সে বাটী প্রত্যাগমন করিত, তখন তাহার শুষ্ক মুখ, রূক্ষ্ম কেশ, ধূলিধূসরিত চরণ; আত্মীয়েরা নয় বৎসরের বালকের এরূপ দৃঢ়তা দেখিয়া, বিমুগ্ধ হইতেনবালক প্রফুল্ল পর্যন্ত স্বদেশভক্তির মৰ্ম্ম বুঝিতে পারিয়াছে।

৪০
প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য।
এ সকল সমিতি-সভায়, সম্মিলন-সমবায়ে যোগ দিয়াও
বালক তৃপ্ত হইত না-ইহাতে তাহার মনন্তুষ্টি হইত না।
সে তাহার মা, ন কাকীমা প্রভৃতিকে নির্জনে জাকিয়া
লইয়া যাইয়া-মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’, ‘সােণার
বাংলা আমি তােমায় ভালবাসি’, ‘অয়ি ভুবনমােহিনী’
প্রভৃতি স্বদেশসঙ্গীত গাহিত। কিন্তু তাহাতে একটুও
প্রগল্‌ভতা থাকিত না।
‘নারায়ণী সাধনচক্রে’, নারায়ণীগণ সম্মিলিত হইলে,
প্রফুল দেশের কথা আন্দোলন করিত এবং সেও যে
দেশের কাৰ্যে প্রাণ মন উৎসর্গ করিবে একথা—ধীর
গম্ভীরভাবে বলিত। “চক্ৰটী তাহার নূতন কাকা কর্তৃক
স্থাপিত এবং সেই চক্রের বালকগণের নাম ‘নারায়ণী”।
চক্রের উদ্দেশ্য মহান্। সে চক্রে প্রবেশ করিতে হইলে
বালগণকে প্রতিজ্ঞা করিতে হয়, “কৃষ্ণে ভক্তি রাখিব,
“গুরুগণে ভক্তি করিব”, “বিলাস বর্জন করিব”, “দেশের
হিতে প্রাণমন উৎসর্গ করিব।” চক্ৰটী সুব্যবস্থায়
চালিত হইলে, এক দিন দেশের মহৎ কাৰ্য্য সাধন
করিবে।

বিদ্যাভ্যাস ও চরিত্রবৈচিত্র্য।
৪১
বালক প্রফুলের হৃদয়-বলও যথেষ্ট ছিল। তাহার
স্বাধীন-সৎপ্রবৃত্তিকে কেহ বড় বাধা দিতে পারিত না।
সে এককার যাহা সঙ্কল্প করিয়াছে, তাহা কার্যে পরিণত
করিবেই করিবে। নিম্নোক্ত ঘটনায় রহস্য প্রকাশ
পাইবে।
প্রফুল্ল আত্মীয়গণের সঙ্গে মধুপুরে বেড়াইতে
গিয়াছে—বয়স তখন চারি বৎসর মাত্র। মধুপুরের
‘বট গাছ দেখিবার জন্য সকলে বাটী হইতে বহির্গত
হইতেছেন, এমন সময়ে প্রফুল্ল, বায়না ধরিল, “আমিও
বটগাছ দেখিতে যাইব।” কিন্তু চারি বৎসরের শিশুকে
এতটা পথ হাটাইয়া লইয়া যাওয়া কেহই সমীচীন মনে
করিলেন না।
অতএব প্রফুল্লের প্রস্তাব অগ্রাহ, হইল।
আর কিছু না বলিয়া বালক বাটীর মধ্যে চলিয়া গেল।
সকলে বটবৃক্ষাভিমুখে যাত্রা করিলেন। প্রায় এক মাইল
পথ অতিক্রম করিয়া সকলে দেখিতে পাইলেন, শ্রীমান্
ফাগুচন্দ্র উলঙ্গাবস্থায় উদ্ধশ্বাসে তাঁহাদের অনুসরণ
করিতেছে। তখন সকলে আর কি করেন—শ্রীমাকে
ক্রোড়ে তুলিয়া গন্তব্য স্থানে চলিলেন।

৪২
প্রফুল-নিৰ্মাল্য।
আর এক দিনের কথা ;-প্রফুল্ল পিতামহীর সহিত
কাশীধামে গিয়াছে। বেণীমাধবের ধ্বজায় উঠিবার দিন
সে বলিল, “আমিও ধ্বজায় উঠিব । পিতামহী আদর
করিয়া বলিলেন, “তুমি বড় হ'লে উঠবে দাদা।” কিন্তু
সে কথায় কে তখন কর্ণপাত করে ? বালক বেণীমাধবের
বজার অত্যুচ্চ দেশে উঠিয়া তবে ছাড়িয়াছিল। এ ঘটনা
মধুপুরে ‘বটগাছ’ দেখিবার অব্যবহিত কাল পরেই ঘটে।
ভয় কাহাকে বলে—প্রফুল্ল আদৌ তাহা জানিত না।
অন্ধকারময় নিশীথে সঙ্গিবিহীন হইয়া সে জনহীন স্থানে
ঘাইতে পারিত। কেহ ভয় দেখাইলেও ভয় পাইত না।
প্রকুল্লের পিতা পুত্রগণের সাহসের পরিচয় গ্রহণে ইচ্ছুক
হইয়া, এক রাত্রিতে প্রভাতচন্দ্রকে একটু ভয় প্রদর্শন
করিয়া বলিলেন, ‘মেঘা, (প্রভাতের ডাক নাম), ওটা কি
বল দেখি?” মেঘ, সে কথায় যেন একটু থতমত খাইয়া
গেল। কিন্তু ফাগুবাবুকে জিজ্ঞাসা করিবামাত্র সে
বলিল, “ওটা ? ওটা আবার কি ? কিসের একটা ছায়া
পড়ে ঐ রকম নড়ছে। দাদা ভয় পেয়েছিল বুঝি ?”-
ফাগুবাবু ঘেন মেঘ বাবুর দাদা !
।

বি দ্যাভ্যাস ও চরিত্রবৈচিত্র।
৪৩
কিন্তু মেঘ, তাহাতে অসন্তুষ্ট ছিল না। পরন্তু, ফাগু-
বাবুর মতেই সে মত প্রকাশ করিত। মেকে কেননা
কথা জিজ্ঞাসা করিলে সে বলিত, “ফাগু জানে।” নূতন
পরিচ্ছদাদি প্রস্তুত করিবার সময়ে কিম্বা কোনাে নতুন
স্থানে বেড়াইতে যাইতে হইলে মেঘূ, ফাগুবাবুর বিজ্ঞতার
উপর নির্ভর করিয়া, আপন স্কন্ধ হইতে দায়িত্বের বােঝা
নামাইয়া ফেলিত—এবং আহারাদি ব্যাপারের নূতনত্বের
কথা উথাপিত হইলে, সে ভারও ফাগুবাবুর উপর
চাপাইয়া দিয়া নিষ্কৃতি লাভ করিত।
মেঘবাবুর
অপেক্ষা ফাগুবাবু তিন বৎসরের ছােট। দুই ভা’য়ে
বড় ভাব-একজন অন্য জনকে ছাড়িয়া থাকিতে পারে
না। তাহারা এক বৃন্তের দুইটা পবিত্র স্কুল।
ফাগুবাবুর দুর্জয় সাহসের পরিচয় ‘ইঞ্জিন দাদা'তে
পাওয়া গিয়াছে। এই প্রসঙ্গে আরো দুই একটী কথা
বলিলে বােধ হয়, অপ্রাসঙ্গিক বা অনাবশ্যক বলিয়া
অগ্রাহ হইবে না।
প্রকুল্লের ঋষিকল্প পিতামহ কাৰ্য্যক্ষেত্র হইতে
বাটী প্রত্যাগমন করিয়া গাড়ী ছাড়িয়া দিলেই প্রফুল্ল

এক দিন
৫
৪৪
প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য।
ঝটিতি সে গাড়ী দখল করিয়া বসিত।
কোচুম্যান কৌতুক করিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিল,
“ফাগুবাবু কোন অধিকারে গাড়ী চড়িয়া বসে। প্রফুল্ল
তাহাতে একটুও অপ্রস্তুত বা কুণ্ঠিত না হইয়া
বলিল, “তুই আমার দাদামণিকে চিনিস?” কোচম্যান্
হাসিয়া বলিল, “না, হুজুর, কেমন করিয়া চিনিব ?”
সে কথায় বালক গম্ভীর ভাব ধারণ করিয়া বলিল,
“আশ্চৰ্য, দাদামণিকে সবাই চেনে, আর তুই চিনিস
না! আমার দাদামণি অক্তার সূৰ্য্যকুমার সৰ্বাধিকারী।
তাঁর গাড়ী, তাই চড়ি-তুই ধমকাইবি কেন?” সে
স্থানে যাহারা দণ্ডায়মান ছিল, তাহারা বালকের
বাক্যকৌশলে চমৎকৃত হইয়া তাহার পানে তাকাইয়া
রহিল।
আর এক দিন প্রফুল্ল যখন গাড়ী দখল করিয়া
বসিয়াছিল, সেই সময়ে ঘােটকরাজ নিদারুণ দাসত্ব
শৃঙ্খল হইতে মুক্তিলাভ করিবার আশায় একটু
লাফালাফি আরম্ভ করে। কিন্তু কোচম্যান তাহাকে
মুক্তি-প্রদান করিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করায় অশ্ববর

বিদ্যাভ্যাস ও চরিত্রবৈচিত্র্য।
৪৫
অবশেষে শান্তভাৰ ধারণ করিল। তখন প্রফুল্ল গাড়ী
হইতে মুখটা বাড়াইয়া কোম্যানকে বলিল, “দ্যা,
তুই যখন ঘােড়া সামলাইতে না পারিবি, তখন রাস
আর চাবুকগাছটা আমায় দি। যত বড় বজ্জাত
ঘোড়াই হউকু, আমার হাতে পড়লেই দোরস্ত হবে।”
এই বলিয়া বালক হাে হো করিয়া হাসিয়া ফেলিল।
হাসিটা তাহার গে !
প্রফুলের অপরিসীম সঙ্গীতানুরাগ ছিল। সঙ্গীতের
মূচ্ছনায় তাহার ভাব-বিলাস বিল হৃদয়-সরােবর উথলিয়া
উঠিয়া নেত্ৰদ্বারে শান্তি-প্রস্রবণ সৃষ্টি করিত। বিশুদ্ধ
সঙ্গীত শ্রবণ করিলে সে আত্মহারা হইয়া পড়িত।
একদা সন্ধ্যাসমাগমে বাটীতে ধ্রুপদ , সঙ্গীত
হইতেছে-ৰাটীর অন্যান্য বালকেরা আলস্যবশতঃ
হাই তুলিতেছে। কেহ বা
কেহ বা খেলায় মত্ত রহিয়াছে।
প্রফুল্ল কিন্তু দ্রবময়ী সঙ্গীতধারায় আপ্লুত ও আত্মহারা
হইয়া গিয়াছিল। সে সময়ে তাহাকে ডাকিয়াও
তাহার সাড়াশব্দ পাওয়া যায় নাই।
বাটীর দাসদাসী পথের ভিক্ষুকের প্রতি
শু

। প্রফুল্ল-নিৰ্মাল্য। ধালকের অসীম দয়া ছিল। ফাগুবাবু বাটীর দ্বারে দাড়াইয়া থাকিলে অতিথিকে কখনো রিক্ত হস্তে ফিরিতে হইত না। দাসদাসীরা ফাগুবাবুর কথায় মরিত বাচিত। যে দাসীটীর ক্রোড়ে, প্রফুল্ল লালিত হইয়াছিল, তাহার নাম ‘শলির মা। শকুলির মা প্রফুলকে প্রাণ ভরিয়া ভালবাসিত। ফাগুবাবুও দশগুণ ভাল- বাসিয়া তাহার ভালবাসার প্রতিদান করিত। শলির মা’র সহিত কেহ কঙ্ক’শ ব্যবহার করিলে ‘ফাগিয়া বেটী’ অশ্রুধারায় তাহার বেদনায় উপশম করিত। এই মােহমন্ত্রে পড়িয়া শক্‌লির মা ‘ল্যাড়কা ছাওয়া ভুলিয়া ফাগিয়ারাণী’র পরিচৰ্য্যায় আত্মসমর্পণ করিয়া সে বইকলি দেশের মুখ দেখে নাই। অন্য কাহারাে সম্মুখে কটিদেশ হইতে বসন খসিয়া যাইলে লজ্জায় প্রফুল্লচন্দ্রের গণ্ডস্থল আরক্তিম হইত । কিন্তু শলির মা’র সম্মুখে ‘ফাগিয়া উলঙ্গ হইতেও ক্ষুণ্ঠাবােধ করি না। কারণ, পরস্পর পরস্পরকে চিনিয়াছিল। ছিল।

বিদ্যাভ্যাস ও চরিত্রবৈচিত্র্য।
84
ফুল সৌন্দর্য্যের উপাসক ছিল। চকিরণে স্নাত
হইয়া প্রকৃতিসুন্দরী যখন মোহনবেশে স্থাবর জঙ্গমের
উপর আধিপত্য করিত তখন শিশু প্রফুল্ল চন্দ্ৰমা-পানে
চাহিয়া চাহিয়া ঘুমাইয়া পড়িত। যখন কাকলীচ্ছলে
বিহগকুল জগদীশনাম কীৰ্ত্তন করিত, তখন প্রফুল্ল সে
সুবধিারা অকণ্ঠ পান করিয়া ভাব-বিভাের হইয়া পড়িত।
প্রবল বাত্যাসংযোগে অবিরল বৃষ্টিধারা ঝমঝম শব্দে
পতিত হইয়া যখন প্রকৃতির সহিত বিপৰ্যয় যুদ্ধ করিত,
তখন, প্রফুল্ল ভাবাবেশে ঢলিয়া পড়িত; কামিনীর উদ্দাম
চাপল্য দেখিয়া সে ভাবি-দামিনী কি সুন্দরী।
ব্যোমবিহারিণী কাদম্বিনী দেখিয়া প্রফুল্ল মনে করিত,
তাহারা দেবহস্তী-শুগুযোগে জলধারা নিক্ষেপ করে ।
জীমূতগর্জন শুনিয়া বালক আনন্দে অধীর হইত; সে বুঝি
কল্পনা করিত, ইহাই যোমের ওঙ্কারধ্বনি।
প্রফুল্ল বড় একটা কাহারাে সঙ্গে মিশিতে চাহিত না।
অনেক সময়েই সে আপন মনে আপন কার্যে নিযুক্ত
থাকিত। অথচ, এমনি ভাবে সে আপনাকে চালাইত
যে, তাহার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কেহ মনে করিতে

৪৮ প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য। পারে নাই—সে কাহারও অবাধ্য কিম্বা অশিষ্টাচার- দুষ্ট। তাহার মতের সহিত যদি কাহারাে মতের অমিল হইত, তবে ধৈৰ্য্যচ্যুত না হইয়া সে এমনি সহজ সরল সরস কোমল ভাবে, এমনি মিষ্ট ভাষায় আপন মত প্রকাশ করিত যে, অবশেষে সকলেই তাহার মতের পক্ষপাতী হইয়া পড়িত। এই কথাপ্রসঙ্গে একদিনের ঘটনা মনে পড়িয়া গেল। সরস্বতীপূজা—জেঠা কাকাদের নিকট হইতে চাঁদা আদায় করিয়া বালকেরা সরস্বতী পূজা করিবে। তাহারা দল বাঁধিয়া বড় জেঠাবাবুর নিকট উপস্থিত হইয়া তাহাদের প্রাপ্য গণ্ডা দাওয়া করিল। “জেঠা বাবু কৌতুক করিয়া বলিলেন, “যা, তােরা পয়সা নষ্ট করিস, তােদের একটী পয়সাও দিব না।” অন্যান্য বালকেরা থতমত খাইয়া সরিয়া দাড়াইল। প্রফুল্ল ভাবিল, জেঠাবাবুর এ মতটী অভ্রান্ত নহে—অতএব তাহার মত বদলাইতে হইবে। বালক অগ্রসর হইয়া তাহার প্রতিভা-উদ্ভাসিত মিন্ধ বিশাল নেযুগল জেঠাবাবুর মুখের উপর স্থিরভাবে ন্যস্ত করিয়া শান্ত অথচ দৃঢ়

}
বিদ্যাভ্যাস ও চরিত্রবৈচিত্র্য।
৪৯
স্বরে বলিল, “টাকা আপনাকে দিতে হবে যে ! না দিলে
চলবে না।” জেঠা বাবু আর দ্বিরুক্তি না করিয়া ফাগু
বাবুর মতেই মত দিলেন।
ফাগুবাবুর সাধ ছিল-রুগ্নাবস্থাতেও, “ভগবতি
ভারতি দেবি নমস্তে” বলিয়া বাণী বিদ্যাপ্রদায়িনী
সরস্বতীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করিবে। তাহার সে
সাধ অপূর্ণ রহিয়া গিয়াছে। তবে, দেবীকে প্রণাম করিতে
প্রফুল্ল বিস্মৃত হয় নাই।
প্রফুল্ল জীবিত থাকিলে, . বােধ হয়, কবি হইতে
পারিত। এক দিনের ঘটনা মনে পড়ে। গ্রন্থকারের
এক ভ্রাতুস্পুত্রীর বিবাহ। সেই বিবাহােপলক্ষে, অনুরুদ্ধ
হইয়া, তিনি একটি কবিতা রচনা করিয়াছিলেন। তাহার
অনুকরণে ফাগুবাবু একটা কবিতা লিখিয়া গ্রন্থকারকে
দেখায়। শ্রীমানের ‘য়স তখন নয় বৎসর মাত্র। সে
কবিতাটী মুদ্রণযোগ্য না হইলেও উল্লেখযোগ্য বটে-
কারণ, বালক-হৃদয়ের কমনীয় ভাবগুলি সে কবিতায় এক
প্রকার বেশ প্রকাশ পাইয়াছিল। শিশুকবি' ফাণ্ডবাবু
মধ্যে মধ্যে কবিতা লিখিত।
৩

প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য।
প্রফুল্ল-চরিত্রের আর একটু বৈচিত্র্য ছিল।
অগাধ নিদ্রায় অভিভূত-ঢাকা-নিনাদেও তাহার নিদ্রার
ব্যাঘাত ঘটিবে না; কিন্তু পথে হরিনাম-সংকীর্তনের দল
নাম কীর্তন করিয়া যাইতেছে, সে তৎক্ষণাৎ বৈদ্যুতিক
বেগে উঠিয়া পড়িবে। বালকের হরিভক্তি অপরিসীম।
ধ্রুব-প্রহ্লাদ-ভাব অনেক শিশুচরিত্রে যেন স্বভাবতই
অঙ্কুরিত হয়। অনুকূল উপদেশ-সলিল পাইলে অনেক
শিশু-হৃদয়েরই ঐ পবিত্র অঙ্কুর পূত পাদপে পরিণত
হইতে পারে।

রােগ-শয্যায়।
কাল-বৈশাখীর দিনে দিবাবসানে এক খণ্ড ক্ষুদ্ৰ মেঘ
আকাশ-প্রান্তে উদিত হইয়া : যেরূপ সমস্ত গগন ছাইয়া
ফেলে, পরে প্রবল ঝটিকা-সহকারে প্রশান্ত তটিনী-হৃদয়কে
যেরূপ তরঙ্গ-সমাকুল করে, সেইরূপ এক ক্ষুদ্র ব্যাধি-বিন্দু
প্রফুলের শরীরে প্রবিষ্ট ও উদিত হইয়া ভীষণ মূর্তি ধারণ
করিল-সৰ্বেন্দ্ৰিয়-সমন্বিত সমস্ত শরীরকে আকুল করিল।
রােগ-প্রফুরে একার নহে। প্রভাত ও প্রফুল্ল—দুই
ভাইয়ে অপার্থিব ভালবাসা, দুষ্ট রােগ কি একজনকে
ছাড়িয়া অন্য জনকে আক্রমণ করিতে পারে? প্রফুল্লচন্দ্র
ও প্রভাতচন্দ্র সেই একই রােগ কর্তৃক আক্রান্ত হইল।

প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য।
রােগ—Typhoid fever, আৰ্য আয়ুৰ্বেদিকের। বলিতে
পারেন, “ত্রিদোষজ সান্নিপাতিক আন্ত্রিক বিকার।
রােগ-শয্যায় দুই ভাইয়ে পাশাপাশি শয়ন করিয়া
আছে। চিকিৎসার ক্রটি নাই, চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত
পরিচর্যার পরিসীম। নাই; কিন্তু তথাপি বােগ দিন দিন
বৃদ্ধি পাইতেছে। ইহা অবশ্য ভয়ের কথা;-আত্মীয়েরা
অবসন্ন হইয়া পড়িলেন। কিন্তু প্রফুল্ল রােগ-শয্যাতেও
প্রফুল্ল। তাহার মুখ দেখিয়া স্বতই মনে হইত, যেন
তাহার শরীরে কোনাে রােগই নাই। সেই স্থির প্রশান্ত
নয়ন, সেই কোমল মধুর হাসি, সেই সদানন্দ প্রকৃতি,
লােকের কেমন করিয়া বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্তি হইবে যে,
ফাগুবাবু বিষম ব্যাধি-বিক্লিষ্ট। ক্রমে প্রভাত অপেক্ষা
প্রফুরে রােগ ভীষণতর আকার ধারণ করিল। আত্মীয়-
স্বজনদিগের হৃদয় আতঙ্কে অভিভূত হইল। প্রফুচন্দ্রের
তাহাতেও কাতৰ্য্য নাই—তেমন বােগও প্রক্ষেপ নাই।
শরীরে রােগসুলভ বিষম যন্ত্রণা নিয়ত উপস্থিত হইতেছে ;
কিন্তু যখনি হে জিজ্ঞাসা করিতেছেন, “ফাগু, কেমন
আছ”, ফাগুবাবু তখনই বলিতেছে, “ভাল আছি।”

রােগ-শয্যায়।
শিশুর সহজ হৃদয়-বল রােগে আরও ঘনীভূত হইয়াছে।
এই অদ্ভুত গুণ টীকে কি বলিব ? ধৈর্য, সহিষ্ণুতা না
আর কিছু ? যদি আর কিছু হয়, তবে তাহার ভাষা
আমার জ্ঞাত নহে। অমি তবলিতেছি, প্রকৃত প্রকট
হৃদয়-বল। যিনি প্রকৃত যােগী, তিনিই বােধ হয় সদুত্তর
প্রদান করিতে পারেন। যিনি নিজের অমর আত্মাকে
মরদেহ হইতে পৃথক্ করিয়া কূট ৪ রাখিতে পারেন,
ব্যাপিক্লিষ্ট প্রফুল্লচন্দ্রের হৃদয়-প্রফুল্লত। তিনিই হৃদয়ঙ্গম
করিতে সমর্থ ।

দীপনির্বাণ।
পঁয়তাল্লিশ দিনের পর রােগ আজ চরমে উঠিয়াছে
প্ৰফুলের প্রফুল্ল জীবন নির্বাপিত হইতেছে। বালক
বুঝিল, তাহার মহাসমাধির সময় আসিয়াছে।
কালরাত্রি আর পােহায় না! আত্মীয়গণ নিশা-
বসানের অপেক্ষা করিতেছেন। হতাশের আশা; ঘাের
অমঙ্গলেও মঙ্গল-চিন্তা--কাল রাত্রির অবসানে যদি কিছু
সুরাহা হয়। আত্মীয়েরা শ্বাস থাকিতে কি কখনাে
আশা ছাড়তে পারেন?

দীপনির্বাণ।
দুই ভাইয়ে এখনাে পাশাপাশি শয়ন করিয়া আছে।
প্রভাতকে এখনাে স্থানান্তরিত করা হয় নাই—পুছে
প্রভাত কিংবা প্রফুল্ল কারণ বুঝিতে পারিয়া অতি-
ব্যাকুল হয়। কিন্তু অবস্থা ব্যৱস্থা বুঝিতে কি আর
প্ৰফুল্লের বাকী ছিল ?—সে যে সাক্ষাৎ দেবশিশু।
প্রফুল্ল এখনাে বেশ কথাবার্তা কহিতেছে । কথা
কহিতে কহিতে তাহার তন্দ্রা আসিল। তন্দ্রাবেশে সে
দ্রুত অঙ্গুলিসঞ্চালন করিতে লাগিল। 'ভগ্নহৃদয় পিতা
পুত্রকে বাহুবেষ্টিত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “ফাগু,
ও কি কচ্চ, বাবা?” পুত্র স্থিরকণ্ঠে বলিল, “বাবা, আমি
তারা গণছি।” যাহা বুঝিবার, তাহ। সকলেই বুঝিলেন।
“আশাতন্তুর সঙ্গে সঙ্গে সকলেরই জাদয়তন্ত্রী ছিন্ন হইল।
অল্পক্ষণ পরেই প্রফুল্ল তাহার জননীর গলা জড়াইয়া
ধরিল। সে সময়ে বালকের মুখ হইতে একটী শব্দও
স্ফুরিত হইল না, একটা দীর্ঘশ্বাসও পড়িল না--চক্ষের
পলক স্থির, মুখের ভাব শান্ত-গম্ভীর। জননী কণ্ঠের
স্বর অতিকষ্টে সংযত করিয়া বলিলেন, “কি, ফাণ্ড ?”
ফাগুবাবু তাহার উত্তরে বলিল, “না, কিছু না।” বালক
।

৫৬ প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য। সেই যে জননীর গলা জড়াইয়া ধরিয়াছিল, তাহা বুঝি বিদায়ের চরম অভিনয় ; কিন্তু মাতাকে তাহা বুঝিবার অবসর দিল না। অল্পক্ষণ পরেই বলিল, “মা, আমার কাটা চুল গুলাে ভাল করে রেখেছ ত? সে গুলাে ঠাকুরদের দিতে হবে।” মাতা “আচ্ছা” বলিয়া কৰ্ত্তনাবশিষ্ট কেশ- গুলি গুছাইয়া রাখিলেন। প্রসাদপুরের মানসিক চুল- প্রসাদপুরে পাঠাইতে হইবে । রাত্রি তৃতীয় প্রহরে ম্রিয়মাণ পিতা বর্তিকালােকে পুত্রের মুখভাব নিরীক্ষণ করিতে করিতে আকাশ পাতাল কত কি ভাবিতেছিলেন। পুত্র বলিল, “আলােটা সরাও , বাবা।” পিতা আকুল ভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আলােটা কি তােমার চোখে লাগছে, বাবা ?” পুত্ৰ উৰ্দ্ধ- দিকে চাহিয়া গনগদ স্বরে বলিল, “না, চোখে লাগবে কেন? আমি কত আলাে দেছি। ঐ কেমন আলাে! কেমন বাগান! কত ফুল ! কেমন গন্ধ!” প্রফুল্ল তখন দেবলােকের অালােক দেখিয়া, মন্দার পারিজাতের সৌরভ পাইয়া, দেবলােকের কথাই কহিতেছিল। বৰ্ভিকালােক সরাইয়া রাখা হইল।

দীপনির্বাণ।
৫৭
রাত্রির অবসান হইয়াছে।
ব্রাহ্মমুহূর্তে বিকশিত
স্বরে দেবশিশু বলিল, “আমার এ দেশটা আর ভাল
লাগছে না।” সঙ্গে সঙ্গে নাড়ীর অবস্থা। মন্দ হইতে
মন্দতর হইতে লাগিল। আত্মীয়েরা বাষ্পকুললােচনে
প্রভাতচন্দ্রকে ধরাধরি করিয়া গৃহান্তরে লইয়া গেল।
প্রফুল্লের তখনাে চৈতুত লোপ হয় নাই ; সে একবার
দাদাকে দেখিয়া লইল, মুহমান আত্মীয়গণের মুখপানে
চাহিয়া দেখিল,—সে চাহনি তখনাে হাসি-মাখা। তাহার
পর সে যুক্তকরে কাহার উদ্দেশে কি বলিল ; তাহার পর
হৃদয়ােপরি হস্ত দুইখানি সংরক্ষিত করিল ; তাহার পর
শিবনেত্র –সব শেষ! দীপ নিৰ্বাণ ।

বিসর্জন।
ফাগুবাবু মহাযােগে মগ্ন হইয়াছে। আত্মীয়েরা
পার্শ্বে বসিয়া তপ্ত নিশ্বাস ফেলিতেছেন, আর নিঃশব্দে
অশ্রুজল মুছিতেছেন। এখন শােকপ্রকাশের সময়
নহে—প্রভাতচন্দ্র যে এখনাে রােগ-শয্যায় ।
শােক বিদগ্ধা জননী পর্যন্ত এ কথা বুঝিয়াছেন।
তাই তিনি বােদন-কাতর নয়নের উচ্ছলতা রােধ
করিয়া প্রভাতচন্দ্রের নিকটে যাইয়া উপবেশন করিলেন।
প্রভাত মাতাকে জিজ্ঞাসা করিল, “ফাগু কোথা, মা ?”
এ প্রশ্নের উত্তর প্রদান করিতে হইলে অন্য মাতা কি
করিতেন, জানি না—কিন্তু প্রভাতের জননী স্থিরবচনে,

বিসর্জন। সহজ কণ্ঠে বলিলেন,-“অস্ত্র কত্তে হবে, তাই তােমার ন কাকা তাকে অন্য বাড়ীতে নিয়ে যাচ্চেন। ভাল হলেই সে আর এখানে আসবে।” রােগ-ক্লিষ্ট প্রভাত তাহাই বুঝিয়া স্থির হইল। ধন্য জননীর হৃদয়-বল! वय তাহার কর্তব্যপরায়ণতা। ফাগুবাবু বড় ফুল ভালবাসিত। বিদায় কালেও সে বলিয়াছিল, ‘কেমন ফুল! কেমন বাগান। সেই জন্য তাহার জেঠা কাকারা পূষ্প-মাল্যে প্রফুল্লের বর বধু সুশােভিত করিলেন; পরে, নিঃশব্দে দ্বিতল হইতে নিতলে শবদেহ বহন করিয়া লইয়া আসিলেন। যােগ মগ্ন পুত্রের সংযতবুদ্ধি পিতা, পুত্রকে বিদায় দিবার সময়, করুণকণ্ঠে বলিলেন, “ভগবান, তােমার জিনিস, তুমি রাতে দিয়েছিলে-বুকে করে রেখেছিলেম ; এখন নিচ্চ, নাও।” এই কথা বলিয়া বিগত-জীবন পুত্রের মস্তক স্পর্শ করিয়া পিতা আশীর্বাদ করিলেন। অমনি কোথা হইতে লুক্কায়িত আঁখিবারি অজ্ঞাতভাবে, সহ- ধারায় বহিতে লাগিল। খট্টাশায়িত শবদেহ স্কন্ধে লইয়া সকলে ধীরপদবিক্ষেপে শ্মশানাভিমুখে যাত্রা করিলেন।

প্রফুল্ল-নিৰ্ম্মাল্য। আত্মীয়া-কুটুম্বিনীগণ নয়নবারি নয়নে মিলাইয়া গৃহাভ্য- স্তরে চলিয়া গেলেন। পিদাদা মােহনচন্দ্র এবং খেলার অন্যান্য সাথী প্রফুল্লকে কতকটা পথ । আগাইয়া দিল। ফাগুবাবুর মেজদাদা ও সেজদাদা খুল্লতাতবর্গের সহিত শ্মশান পৰ্যন্ত চলিল। কে বলে মৃত্যুতে সুখ নাই! ফাগু- বাবুর ‘নূতনকাকা’ বলিয়াছিলেন, “ফাগুবাবুই মজা করে নিলে—আমরা শুধু কঁধা বয়েই মলুম।” কথাটী বড় গভীর। প্রফুল্ল যে আজ মর জগৎ হইতে বিদায় গ্রহণ করিল-সে আজ কোন্ দিন ? ১০১৩ সালের ১৬ই ফাল্গুন, বৃহস্পতিবার। সেই দোল-পূর্ণিমা, সেই গৌরাঙ্গের জন্মোৎসব, সেই ফাগুয়া, সেই সময় সেই সব ! দোলােৎসবের আনন্দ-কোলাহলের মধ্য দিয়া মহাযােগমগ্ন পবিত্ৰাত্মা প্রবাস হইতে আপন দেশে ফিরিয়া যাইতেছে ! জন্ম-মৃত্যু-চক্রের এমন মহামিলন সুদুল্ল ভ বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। কে জানে প্ৰফুল্লের ভাগ্যে কেন এমনটী ঘটিল। ৬

বিসর্জন।
শবদেহে অঙ্গবিকৃতির লক্ষণ পর্যন্ত নাই। এখনো
সেই হাসিমুখ, সেই কি-জানি-কেমন চক্ষু, সেই নিদ্রাবস্থার
শ। ন্ত ছবি ! সে আনন্দময়-আনন্দধামে চলিয়া গিয়াছে।
নিরানন্দ কেবল তাহার মায়াযুগ্ধ আত্মীয়স্বজন।
ফাগুবাবুর রাঙ্গাকাকা, ছোটকাকা প্রভৃতি অস্ফুট
হরিধ্বনি দিয়া শবদেহ ঐ চিতায় তুলিয়া দিলেন। প্রফুল্লর
ফুল্লবপু আজ চিতাগ্নিতে বিসজ্জিত তাহার পবিত্র
আত্মা কিন্তু ঐবলােকে।
“প্রয়াণকালে মনুসাহচলেন
ভক্ত। যুক্তো যােগবলেন চেব।
বোমধ্যে প্রাণমাবেশ সম্যক্‌
স তং পরং পুরুষমুপৈতি দিব্যম্ ।”
সমাপ্ত ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Prafulla-nirmmalya

Author
Not Available
Title
Prafulla-nirmmalya
File name
Prafulla-nirmmalya
Text
OCR done
Citation
1907
Published
2010/01/13
Publisher
Prabhash Chandra Pal
Language
Sanskrit
Pages
79
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Prafulla-Nirmmalya
DLI number
511275
Barcode
4990010018438.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
B5OfTrt0I8x
Download PDF

Prafulla-nirmmalya