Bally Sadharan Granthagar
Shastrasar-sangrah Vol. 1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ওঁ নমঃ শ্রীগণেশায়।
শাস্ত্ৰস রসংগ্রহ
বেদান্তপ্রস্থান-প্রথম অনুষ্ঠান
_L = = = = = acter
প্রথম খণ্ড।
অর্থাৎ
অতৈদিদ্ধি- মধুসূদন সরস্বতী কৃত)... ১ ৩২ পৃঃ।
সিদ্ধান্তলেঃ-( প্যয়দীক্ষিত কৃত)
অনুবাদক-মহামহােপাধ্যায় শ্রীযুক্ত প্রমথনাথ তর্কভূষণ।
খণ্ডনৰখাদ্যম – শ্রীশ্রীহর্ষ কৃত)
প্রত্যকতপ্রদীপিকা-( বা চিৎমুখী।
( শ্ৰীশ্ৰীচিৎসুখাচাৰ্য কৃত)
মহামহােপাধ্যায় শ্রীযুক্ত লক্ষ্মণ শাস্ত্রী দ্রাবিড়ী।
।
সম্পাদক
শ্ৰীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র মুখােপাধ্যায়, বিদ্যাভূষণ এ, সি, ই,
শ্ৰীযুক্ত রাজেন্দ্রনাথ ঘোষ।
স্বত্বাধিকারী ও প্রকাশক
জে, পি, ব্রাদাস”এণ্ড কোং।
৫নং বলরাম বসুর ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
পা ১৮৩৭, মাঘ মাস, ইরানী ১৯১৬
No text on this page.
গণেশায় নমঃ। পরমহংসপরিব্রাজকাচাৰ্য্য শ্রীমধুসূদন সরস্বতী-বিরচিত অদ্বৈত-সিদ্ধিঃ। ( মিথ্যানুমানসমর্থনং নাম ) প্রথম পরিচ্ছেদঃ মঙ্গলাচরণম্। মায়াকল্পিতমাতৃতামুখমৃষাদ্বৈতপ্রপঞ্চাশ্রয়ঃ সত্যজ্ঞানসুখাত্মকঃ শ্রুতিশিখােথখণ্ডধীগােচর। মিথ্যাবন্ধবিধূননেন পরমানকৈতানাত্মকং মােক্ষং প্রাপ্ত ইব স্বয়ং বিজয়তে বিষ্ণুবিকল্লোজ্জিতঃ ॥১॥ অন্বয়-মায়াকল্পিতমাতামুখমৃষাদ্বৈতপ্রপঞ্চাশয়ঃ সত্যজ্ঞানসুখাত্মকঃ শ্রুতিশিখােথখণ্ডথী- গােচর পরমানলৈক তানাত্মকং মোক্ষং মিথ্যাববিধুননেন প্রাপ্ত ইৰ বিকল্পোজুঝিতঃ বিষ্ণু স্বয়ং বিজয়তে। ১। অনুবাদ।—যাহা মায়াকল্পিত সুতরাং মিথ্যাস্বরূপ, এবং যাহা মাতা, মান ও মেয়—এই তিন ভাবে ব্যবহৃত হয়, সেই এই ভেদপ্রপঞ্চ ( অর্থাৎ সংসারের যিনি আশ্রয়, যিনি সত্য, জ্ঞান ও সুখস্বরূপ, উপনিষদ পাঠদ্বারা উৎপন্ন যে নির্বিকল্প জ্ঞান, তাহা দ্বারা যাহার স্বরূপ বুঝা যায়, মিথ্যা যে সাংসারিক বন্ধ, তাহার নিবৃত্তি হইলেই যাহা পরমানন্দঘনরূপে প্রকটিত হয়, সেই মােক্ষ যাহার নিকটে অদ্বৈতসিদ্ধি। সর্বদাই যেন প্রাপ্ত বলিয়া প্রতীত হয়, সেই বিকল্পহীন ভগবান্ বিষ্ণু সর্বপ্রকার উৎকর্ষের সহিত বিরাজমান আছেন। ১। তাৎপর্য।—এই শ্লোকটীর দ্বারা গ্রন্থকার এই গ্রন্থের প্রতিপাদ্য পরব্রহ্মের স্বরূপ নির্দেশ করিতেছেন এবং গ্রন্থের আরম্ভকালে অবশ্যকর্তব্য যে মঙ্গলাচরণ, তাহাও করিতেছেন। এই গ্রন্থের প্রতিপাদ্য পরব্রহ্ম, সেই পরব্রহ্ম কি, তাহা বুঝাইবার জন্য শাস্ত্রকারগণ দুইপ্রকার লক্ষণের আবশ্যকতা উপলব্ধি করেন, যথা- তটস্থ-লক্ষণ ও স্বরূপ-লক্ষণ, এই দুইটা লক্ষণের স্বরূপ জানিতে হইলে প্রথমতঃ লক্ষণ কাহাকে বলে, তাহা বুঝা আবশ্যক। যে ধর্মের দ্বারা কোন একটা বস্তুকে তাহার সমান-জাতীয় ও বিজাতীয় অন্য-বস্তু হইতে পৃথক্ বলিয়া বুঝা যায়, তাহারই নাম লক্ষণ। যেমন, পৃথিবীর লক্ষণ গন্ধ, এই গন্ধরূপ লক্ষণের দ্বারা আমরা পৃথিবীর সজাতীয় জল প্রভৃতি দ্রব্য হইতে, এবং পৃথিবীর বিজাতীয় গুণ বা ক্রিয়া প্রভৃতি বস্তু হইতে পৃথিবীকে পৃথক্ বলিয়া বুঝিতে পারি। কারণ, এই গন্ধ কেবল পৃথিবীতেই থাকে, জল অথবা গুণ ও ক্রিয়া প্রভৃতি পৃথিবী-ব্যতিরিক্ত বস্তুতে থাকে না। এক্ষণে—লক্ষণের যে দুইটা প্রকারভেদ পূৰ্বে উক্ত হইয়াছে, অর্থাৎ তটস্থ-লক্ষণ ও স্বরূপ-লক্ষণ, তাহাই বুঝা যাউক। প্রথম, তটস্থ-লক্ষণ কি, তাহা বলি। যে ধৰ্ম্ম লক্ষ্যবস্তুকে ইতর বস্তু হইতে পৃথক্ করিয়া দেয়, অথচ যাহা লক্ষ্যবস্তুর সহিত সৰ্ব্বদা সম্বদ্ধ নহে, অর্থাৎ কোন সময় লক্ষ্য- বস্তুর সহিত সম্বদ্ধ থাকে, আবার কোন সময় সেই লক্ষ্যবস্তুর সহিত সম্বদ্ধ থাকেও না, সেই ধর্মেরই নাম তটস্থ-লক্ষণ। মনে কর, আমরা দুইজনে কোন এক রাজপথ দিয়া যাইতেছি, রাজপথের দুই ধারের বাটী গুলি প্রায় একই আকারের ; পথের ধারের একখানি বাটীর সম্মুখে একটী বলদ দাঁড়াইয়া আছে, আমরা যাইবার সময় দুই জনেই লক্ষ্য করিলাম যে, ঐ বাটীর সম্মুখে ঐ বলদটী দাড়াইয়া আছে। আমরা যথাসময়ে বাটী ফিরিয়া আসিলাম, কিছুদিন পরে আমার সেই বলদচিহ্নিত বাটীতে কোন বিশেষ প্রয়ােজন হওয়ায়, আমার সহচরকে বলিলাম যে, “দেখ, তুমি অমুক পৰে সেদিন যে বাটীর সম্মুখে একটা বলদ দেখিয়াছিলে, সেই বাটীতে তােমাকে যাইতে হইবে”। আমার এই কথা শুনিয়া—আমি যে বাটীকে লক্ষ্য করিয়া সহচরকে এই কথা বলিলাম, সে তৎক্ষণাৎ সে বাটীটীই মনে মনে স্থির করিয়া লইল এবং বিন আয়াসে আর কাহাকে জিজ্ঞাসা না করিয়াও সেই বাটীতে উপস্থিত হইতে - প্রথম পরিচ্ছেদ। ( তাৎপৰ্য্য)-পারিল। এইক্ষণে দ্রষ্টব্য এই যে, উক্তবাটীটীর এই বলদরূপ যে লক্ষণ, তাহারই নাম তটস্থ-লক্ষণ, কারণ, ঐ বলদটী অন্য সকল বাটী হইতে ঐ বাটীটীকে পৃথক করিয়া বুঝাইয়া দিবার উপায় হইলেও ঐ বাটীর সহিত উহার সম্বন্ধ সর্বদা থাকে না, কোন এক সময়েই উহার সহিত ঐ বাটীর সম্বন্ধ ঘটিয়াছিল মাত্র ; সুতরাং, ঐ বলদটী এই স্থলে উক্ত বাটীরূপ লক্ষ্যবস্তুর তটস্থ-লক্ষণ হইল। এইক্ষণে স্বরূপ-লক্ষণটী কি তাহা বুঝা যাউক। যে লক্ষণের সহিত লক্ষ্যের সম্বন্ধ স্বতঃসিদ্ধ, অর্থাৎ যাহা লক্ষ্যে সর্বদা বিদ্যমান থাকে, তাহার নাম স্বরূপ-লক্ষণ। যেমন, অগ্নির লক্ষণ উষ্ণতা। অগ্নি আছে অথচ হাতে উষ্ণতা নাই—ইহা কখনই সম্ভবপর নহে। এই কারণে উষ্ণতাকে অগ্নির স্বরূপ-লক্ষণ বলা যায়। এই শ্লোকটীতেও, এই গ্রন্থের প্রতিপাদ্য বস্তু যে ব্ৰহ্ম, তাহার তটস্থ ও স্বরূপ এই দ্বিবিধ লক্ষণই প্রদর্শিত হইতেছে ; তাহার মধ্যে যাহা তটস্থ-লক্ষণ, তাহা শ্লোকটীর প্রথম চরণে এবং যাহা স্বরূপ-লক্ষণ, তাহা দ্বিতীয় চরণে উক্ত হইয়াছে। তন্মধ্যে তটস্থ-লক্ষণে বলা হইল, প্রত্যক্ষাদি লৌকিক প্রমাণ দ্বারা যাহা সিদ্ধ, সেই প্রপঞ্চের আশ্রয়ই ব্ৰহ্ম। সেই প্রপঞ্চকে তিনভাগে বিভক্ত করা যায়, যথা- মাতা, মান ও মেয়; ব্যবহারদশাতে আমাদের যে কোন জ্ঞানই হউক না কেন, সেই জ্ঞানে এই ত্রিবিধ বস্তুই প্রকাশ পাইয়া থাকে। আমরাও বলিয়া থাকি যে, আমি এই প্রমাণের দ্বারা এই বস্তু বুঝিতেছি। ইহার মধ্যে ‘আমি’ বলিয়া আমরা যাহা বুঝি, তাহাই মাতা বা মাতা ; এই মাতাকেই আমরা জীব বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকি ; যে উপায় দ্বারা আমরা বুঝি, তাহারই নাম ‘মান বা প্রমাণ ; আর যে বস্তুকে আমি প্রমাণের সাহায্যে বুঝিয়া থাকি, তাহাকে ‘মেয়’ বলা যায় ; এই মান, মেয় ও মাতাকে জ্ঞানই প্রকাশ করিয়া থাকে, তাহার নিজের কোন আকার নাই; এই তিনটীই তাহার কল্পিত আকার, এই ত্রিবিধ আকারকেই প্রপঞ্চ কহে। এই প্রপঞ্চ কোথা হইতে আসিল? ইহার উত্তরপ্রসঙ্গে অদ্বৈতবাদিগণ বলেন, ইহা অজ্ঞান বা মায়া হইতেই উৎপন্ন হয় ; অজ্ঞান হইতে যে সকল বস্তু উৎপন্ন, তাহাদের বাস্তব কোন সত্তা নাই ; যে অধিষ্ঠানের উপর তাহারা কল্পিত, সেই অধিষ্ঠানের সত্তাই তাহাদের উপর আরােপিত হইয়া থাকে । একটা উদাহরণ দ্বারা ইহা বুঝিতে পারা যাইবে; যদি কোন ব্যক্তির সম্মুখে নিপতিত একগাছি বন্দুর স্বরূপ-বিষয়ে জ্ঞান থাকে, তাহা হইলে, সেই অজ্ঞান তাহার পক্ষে দ্বিবিধ ;
৪ অৱৈসিদ্ধি। (তাৎপৰ্য)-কাৰ্য্য করিয়া থাকে, ইহা সাধারণতঃ উপলব্ধ হয়; এই কাৰ্য্য দুইটা কি ? একটী আবরণ, দ্বিতীয়টী বিক্ষেপ। সম্মুখে রঞ্জু থাকিলেও আমরা বলি যে, এখানে রঞ্জু নাই বা আমার সমক্ষে রঞ্জু প্রকাশ পাইতেছে না, ইহাই হইল অজ্ঞানের আবরণ; আর আমরা যে বলি—ইহা সর্প, ইহাই হইল অজ্ঞানের বিক্ষেপ। এক কথায় বলিতে গেলে, যে বস্তুর যাহা স্বরূপ তাহাকে প্রকাশিত না করা, আর যে বস্তুর যাহা স্বরূপ নহে তাহাই তাহার স্বরূপ বলিয়া প্রকাশিত করা—এই দুইটী কাৰ্য্যকেই যথাক্রমে অজ্ঞানের আবরণ ও বিক্ষেপ বলা হয়। এই স্থলেও দেখান হইতেছে যে, ব্রহ্মের অজ্ঞান বশতঃই তাহার যাহা প্রকৃত স্বরূপ তাহ ব্যবহারদশাতে প্রতিভাত হইতেছে না, এবং সেই সঙ্গে মান, মেয় ও মাতা এই তিনভাগে বিভক্ত যে প্রপঞ্চ, তাহা অজ্ঞানের বিক্ষেপ শক্তির কাৰ্যরূপে প্রকাশ পাইতেছে ; এই কাৰ্য্যের প্রকৃত আশ্রয় কে? সেই ব্ৰহ্মই ইহার আশ্রয়, যেমন ভ্রম বশতঃ কল্পিত সর্পের বাস্তব আশ্রয় রঞ্জুই হইয়া থাকে, প্রকৃত স্থলেও মায়ার বা ব্ৰহ্ম- বিষয়ক অজ্ঞানের কল্পিত যে এই প্রপঞ্চ, ইহার আশ্রয়ও সেই একমাত্র ব্রহ্মই হইয়া থাকেন ; যেমন, কল্পিত বা মিথ্যা সর্প কিয়ৎকালের জন্য রঙ্গুর লক্ষণ হইয়া থাকে, এবং সেই লক্ষণকে রঞ্জুর তটস্থ-লক্ষণই বলা যায়, সেইরূপ প্রকৃত স্থলে এই মাতা, মান ও মেয়-রূপে প্রবিভক্ত পরিদৃশ্যমান নিখিল প্রপঞ্চও ব্যবহারদশাতেই ব্রহ্মের লক্ষণ হইয়া থাকে এবং এই লক্ষণটীকে ব্রহ্মের তটস্থ-লক্ষণ বলা যায় । সুতরাং, ইহা সিদ্ধ হইল যে, এই শ্লোকের প্রথম চরণটী দ্বারা ব্রহ্মের যাহা তটস্থ-লক্ষণ তাহাই প্রতিপাদিত হইতেছে। ব্রহ্মের যাহা স্বরূপ-লক্ষণ তাহাই বুঝাইবার জন্য উক্ত শ্লোকের দ্বিতীয় চরণে বলা হইতেছে –“সত্য-জ্ঞান-সুখাত্মক?” ইত্যাদি; অর্থাৎ সৎ, চিৎ ও আনন্দ-ইহাই ব্রহ্মের স্বরূপ-লক্ষণ ; এই সৎ, চিৎ ও আনন্দ পৃথক তিনটী বস্তু নহে; যাহা সৎ তাহা চিৎ এবং তাহাই আনন্দ ; সেই ব্ৰহ্ম যে কারণে অসৎ বা কল্পিত নহে, সেই কারণে, তাহাকে সৎ বলা যায় ; যেহেতু তাহা জড় নহে, সেই কারণে তাহাই চিৎ; এবং যে কারণে তাহা দুঃখস্বরূপ নহে, সেই কারণেই তাহার নাম আনন্দ। এই সচ্চিদানন্দরূপতাই ব্রহ্মের স্বরূপ-লক্ষণ। এই ভাবে ব্রহ্মের দ্বিবিধ লক্ষণ নির্দেশের পর, কিরূপ প্রমাণের সাহায্যে সেই ব্ৰহ্মকে বুঝিতে পারা যায়, তাহাই বুঝাইবার জন্য বলা হইতেছে যে “তিশিখােথ- প্রথম পরিচ্ছেদঃ ; (তাৎপৰ্য)—খণ্ডধী-গােচর”; ইহার অর্থ এই যে, শ্রুতি শব্দের অর্থ-বেদ; সেই শ্রুতির যে শিখা অর্থাৎ শিরােভাগ বা শেষভাগ, তাহা বেদান্ত বা উপনিষদ; সেই উপনিষদ হইতে উৎপন্ন যে অখণ্ড-ধী, অর্থাৎ মাতা, মেয় ও মান এই ত্রিবিধ উপাধি- বর্জিত যে সন্মা-বিষয়ক বুদ্ধি, সেই বুদ্ধির যে গােছর অর্থাৎ বিষয়, তাহাই “শ্রুতি- শিখােখাশগুপী-গােচর” অর্থাৎ ব্রহ্ম ; সেই ব্ৰহ্ম সর্বদা সকল প্রকার বন্ধ হইতে বিনিম্মুক্ত ; তাহাই বুঝাইবার জন্য বলা হইতেছে যে, মিথ্যা অর্থাৎ কল্পিত যে বন্ধ, অর্থাৎ কর্তৃত্বভােক্তৃত্ব প্রভৃতি, তাহার যে বিধূনন অর্থাৎ নিবৃত্তি, সেই নিবৃত্তি দ্বারা নিরুপাধিক যে আনন্দময় সত্তা, সেই সত্তার প্রকাশরূপ যে মােক্ষ, তাহা যেন তিনি সৰ্ব্বদাই প্রাপ্ত হইয়া আছেন। তৃতীয় চরণের দ্বারা মােক্ষের স্বরূপ প্রকাশ করিয়া গ্রন্থকার ইহা প্রতিপাদন করিতে চাহেন যে, বন্ধ এবং মােক্ষ এই দুইটী বস্তুই কল্পিত। এক সচ্চিদানন্দ ব্ৰহ্মই যদি বিদ্যমান থাকেন এবং তাহারই সত্তা যদি পারমার্থিক সত্তা হয়, তাহা হইলে তাহার বন্ধ কখনও সম্ভবপর নহে। বন্ধু যদি অসম্ভব হয়, তাহা হইলে, বন্ধনিবৃত্তিরূপ যে মােক্ষ, তাহাই বা কি প্রকারে বাস্তব হইতে পারে ? এই যে জীবভাবে অবস্থিত ব্রহ্মের বন্ধ ও মােক্ষ, ইহা ব্যবহারিক মাত্র। ইহাই বুঝাইবার জন্য গ্রন্থকার বলিতেছেন, যে “মােক্ষং প্রাপ্ত ইব” অর্থাৎ যেন মােক্ষ প্রাপ্ত হইয়াছেন। এই ভাবে বন্ধ ও মােক্ষের স্বরূপ নির্ণয় করিয়া এক্ষণে গ্রন্থকার উপসংহার করিতেছেন যে, সেই পরব্রহ্মই বিষ্ণু। বিষ্ণু”শব্দের অর্থ, ব্যাপক ; অর্থাৎ সৰ্বাত্মা। সেই বিষ্ণু সকল কালে সর্বপ্রকার বিকল্প হইতে বিনিম্মুক্ত, অর্থাৎ মানবের যত প্রকার বিকল্প হইতে পারে, সেই সকল প্রকার বিকল্প তাহাকে স্পর্শ করিতে পারে না। কারণ, তিনি স্বরাঢ়, অর্থাৎ স্বয়ং প্রকাশমা। তিনি আপনিই প্রকাশ পাইয়া থাকেন ; সুতরাং, অন্য কাহারও মনােবৃত্তিরূপ যে বিকল্প, তাহা দ্বারা তাঁহার প্রকাশ হওয়া কখনই সম্ভবপর নহে। এই শ্লোকে এই ভাবে যে কয়টী সিদ্ধান্তের সংক্ষেপে অবতারণা করা হইল, সমাপ্তি পর্যন্ত পরবর্তী গ্রন্থের দ্বারা তাহাই বিশদভাবে প্রতিপাদিত ও ব্যবস্থাপিত হইবে । ১ | অবৈতসিদ্ধি। ঐরাম-বিশ্বেশ্বর-মাধবানা- মৈকেনি সাক্ষাৎকৃতমাধবানা। স্পর্শেন নিৰ্দ্ধত-তমােরজোভ্যঃ পাদোখিতেভ্যোহস্তু নমাে রজোভ্যঃ ॥২॥ বহুভিিিহতা বুধৈঃ পরার্থ বিজয়ন্তেহমিতবিস্তৃতা নিবন্ধা। মম তু শ্রম এষ নূনমাত্ম- রিতাং ভাবয়িং ভবিষ্যতীহ ॥ ৩॥ শ্রদ্ধাধনেন মুনিনা মধুসূদনেন সংগৃহ শাস্ত্রনিচয়ং রচিতাহতিযত্নাৎ। বােধায় বাদিবিজয়ায় চ চত্বরাণা- মদ্বৈতসিদ্ধিরিয়মস্তু মুদে বুধানাম্ ॥ ৪। অয়।ঐক্যেন সাক্ষাৎকৃতমাধবানাং শ্রীরামবিশেরমাধবানাং পাদোখিতেভ্যঃ স্পর্শেন নিধুততমোরজোভ রজোভ্যঃ নমঃ অন্তু। ২। বহুভিবু ধৈঃ পরার্থং বিহিতা অমিতবিস্তৃত নিবন্ধ (বৰ্ত্তন্তে ইতি শেষঃ)। মম তু ইহ এষ শ্রমঃ আত্মম্ভরিতাং ভাবয়িতুং নুনং ভবিষ্যতি । ৩। শাস্ত্রনিচয়ং সংগৃহ শ্রদ্ধাধনেন মুনিনা মধুসূদনেন অতিযত্নাৎ রচিত ইয়ং অদ্বৈত-সিদ্ধি বোধায় বাদিবিজয়ায় চ সত্বরাণাং বুধানাং মুদে অন্তু । ৪। অনুবাদ।—যাহারা ভগবান্ বিষ্ণুকে আত্মা হইতে অভিন্নভাবে সাক্ষাৎকার করিয়াছেন, সেই শ্রীরাম, বিশ্বেশ্বর ও মাধব নামক আমার পরাপরগুরু, পরম- গুরু ও শ্রীগুরুর চরণ হইতে উথিত ধূলি, যাহা স্পর্শে তমঃ ও রজোগুণ সম্পূর্ণ- ভাবে নিবৃত্ত হইয়া থাকে, সেই ধূলি সমূহকে আমার নমস্কার । ২। পরকে বুঝাইবার জন্য অনেক পণ্ডিত অতি বিস্তৃত নিবন্ধ সমূহ (অর্থাৎ অদ্বৈত- তত্ত্ব বুঝাইবার জন্য বহু গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন এবং ঐ সকল গ্ৰন্থ উৎকৃষ্টভাবে (লােকমধ্যে বিরাজমানও রহিয়াছে। এই কারণে আমার এই অদ্বৈত-সিদ্ধি নামক নুতন গ্রন্থ রচনা বিষয়ে যে শ্রম, তাহা নিশ্চয়ই আমার আত্মমিতা এবাশ করিবে-ইহা আমার আশঙ্কা হয়। ৩।
প্রথম পরিচ্ছাে। (অবৈতসিদুপায়নির্দেশঃ) তত্র অদ্বৈতসিদ্ধেদ্বৈতমিথ্যাত্বসিদ্ধিপূর্ববকত্বাৎ দ্বৈতমিথ্যাত্বমেব প্রথম উপপাদনীয় ৫ উপপাদনং চ স্বপক্ষসাধন-পরপক্ষ নিরাকরণাভ্যাং ভবতি-ইতি তদুভয়ং বাদ-জল্প-বিতণ্ডানাম অন্যতমাং কথাম আশ্রিত্য সম্পাদনীয়।৬ অনুবাদ।-শ্রদ্ধা (অর্থাৎ, গুরু ও বেদান্ত-বাক্যের উপর বিশ্বাস-ই) যাহার ধন, সেই মধুসুদন-নামক মুনি, শাস্ত্ৰসমূহ সংগ্রহ করিয়া অতি যত্নে এই অদ্বৈতসিদ্ধি নামক গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। যাহারা (অদ্বৈততত্ত্ব কি প্রকার, তাহা) বুঝিবার জন্য অথবা বিচারে বাদিগণকে বিজয় করিবার জন্য আগ্রহপরায়ণ, এই অদ্বৈত সিদ্ধি নামক গ্রন্থ সেই সকল পণ্ডিতগণের আনন্দ প্রদান করুক ॥ ৪। (অবৈতসিদ্ধির উপায়-নির্দেশ।) সেই এই অদ্বৈতসিদ্ধি নামক গ্রন্থে প্রথমতঃ দ্বৈতের (অর্থাৎ ব্রহ্ম ব্যতিরিক্ত আর সকল বস্তুরই) মিথ্যারূপতা উপপত্তি দ্বারা ব্যবস্থাপিত হইবে। কারণ, অদ্বৈতবস্তুর সিদ্ধি করিতে হইলে, তাহার পূৰ্ব্বে, দ্বৈত যে মিথ্যা, তাহা প্রতিপাদন করা আবশ্যক ।৫ (কোন একটা বস্তুর স্বরূপ) উপপাদন করিতে হইলে (অর্থাৎ উপপত্তি দ্বারা ব্যবস্থাপিত করিতে হইলে) স্বপক্ষের সাধন ও পরপক্ষের নিরাকরণ করা একান্ত আবশ্যক। এই কারণে এই দুইটী (অর্থাৎ স্বপক্ষের সাধন ও পরপক্ষের নিরাকরণ) বাদ, জল্প ও বিতণ্ডা নামক ত্রিবিধ ‘কথার মধ্যে কোন একটা কথাকে (অর্থাৎ উক্ত বাদ প্রভৃতি বিচার প্রণালীকে) আশ্রয় করিয়াই করিতে হয়।৬ তাৎপৰ্য।এই গ্রন্থের প্রতিপাদ্য ব্রহ্মের স্বরূপ কি, তাহা বুঝিতে হইলে সর্বপ্রথমে শ্রুতিরই আশ্রয় গ্রহণ করিতে হয়। সেই শ্রুতি বহুবিধ-যথা “একমেবাদ্বিতীয়” ‘সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম” “প্ৰজ্ঞানং ব্ৰহ্ম” ইত্যাদি। এই সকল শ্ৰতিদ্বারা প্রতিপাদিত হইয়া থাকে যে,-ব্ৰহ্ম জ্ঞান-স্বরূপ, এবং তাহাই একমাত্র সৎ, “অর্থাৎ ব্রহ্ম ব্যতিরিক্ত অন্য কোন বস্তুরই বাস্তব সত্তা নাই”। এক্ষণে দেখিতে হইবে যে, শ্রুতি যে ভাবে ব্রহ্মের তত্ত্ব প্রতিপাদন করিতেছেন, তাহা সম্ভবপর কি না ? যদি ইহাই সম্ভবপর হয়, তাহা হইলে, এই পরিদৃশ্যমান প্রত্যক্ষাদি-প্রমাণসিদ্ধ-জগতের যে অস্তিত্ব-বুদ্ধি হইয়া থাকে, তাহারই বা উপপত্তি কি প্রকারে সম্ভবপর হয় ?
৮ অৱৈসিদ্ধি। ( তাৎপৰ্য্য)—এই প্রকার বহুতর সংশয় মনের মধ্যে উদিত হইলে, তাহা নিরাকরণ করিবার জন্য শ্রুতির অনুকূল যুক্তি সমুহের সাহায্যে ব্যবস্থাপন করিতে হইবে যে, শ্রুতিতে যে ভাবে ব্ৰহ্মতত্ত্ব প্রতিপাদিত হইয়াছে, তাহা কল্পনাপ্রসূত নহে, কিন্তু, প্রমাণসিদ্ধ ; যেহেতু, এই জন্যই শ্রুতিতে উক্ত হইয়াছে যে “আত্মা বারে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যে। মন্তব্যো নিদিধ্যাসিতব্যঃ” অর্থাৎ শ্রুতিবাক্যের দ্বারা প্রথমত আত্মতত্ত্ব কি, তাহা শ্রবণ করিতে হইবে, পরে যুক্তি-সমন্বিত অনুমানের সাহায্যে সেই শ্রুতি- প্রতিপাদিত আত্মার স্বরূপ ভাল করিয়া বুঝিতে হইবে, তৎপরে এইভাবে শ্রুতি এবং অনুমানের দ্বারা আত্মার স্বরূপ কি তাহা হৃদয়ঙ্গম করিয়া, তাহার সাক্ষাৎকার করিবার জন্য একনিষ্ঠ হইয়া ধ্যান করিতে হইবে। বস্তুতঃ, এইরূপ করিতে করিতে আত্মার (অর্থাৎ ব্রহ্মের সাক্ষাৎকার লাভ হয়। এই অদ্বৈতসিদ্ধি নামক গ্রন্থে, শ্রুতি- মধ্যে যে ভাবে আত্মতত্ত্ব প্রতিপাদিত হইয়াছে, তাহাই অনুমানের সাহায্যে ভাল করিয়া ব্যবস্থাপন করা হইয়াছে। সেই অনুমান দুই প্রকার, প্রথম স্বার্থানুমান, দ্বিতীয় পরার্থানুমান। কোন ব্যাপ্য- হেতু দর্শন করিয়া যদি কোন ব্যক্তি মনে মনে কোন একটী ব্যাপক বস্তুর অস্তিত্বের অনুমান করে, তাহা হইলে সেই অনুমানকে স্বার্থানুমান বলা যায়। আর আমি কোন একটী বস্তু নিজে বুঝিয়াছি, তাহা পরকে বুঝাইবার জন্য যদি অনুমানরূপ প্রমাণের আশ্রয় গ্রহণ কবি, তাহা হইলে সেই অনুমানকে পরার্থানুমান বল। যায়। এই পরার্থানুমান করিতে হইলে,—অপর ব্যক্তিকে বুঝাইবার জন্য যে সকল বাক্য প্রয়ােগ বা বিচার করিতে হয়, তাহাকেই ন্যায়-শাস্ত্রে “কথা” বলা হয়। সেই কথাকে” নৈয়ায়িকগণ তিন ভাগে বিভক্ত করিয়া থাকেন। যথা- বাদ, জল্প ও বিতণ্ডা। যে স্থানে বাদী ও প্রতিবাদী উভয়েরই কোন প্রকার বিজিগীষা থাকে না, (অর্থাৎ মনে যাহাই থাকুক না কেন, ‘বিচার ক্ষেত্রে নিজের পক্ষ কোন প্রকারে ব্যবস্থাপন করিয়া আমি জয়লাভ করিব’ এই প্রকার ইচ্ছা থাকে না), প্রমাণের সাহায্যেই যাহা সত্য, তাহাই বুঝিব ও বুঝাইব, এই প্রকার সংকল্প করিরাই যে স্থলে বাদী ও প্রতিবাদী বিচারকার্যে প্রবৃত্ত হইয়া থাকেন, তাহারই নাম “বাদ” কথা। জল্প ও বিতণ্ডা—এই দ্বিবিধ কথাতেই বিজিগীষা থাকিতে পারে ; তাহার মধ্যে “জল্প’ কথাতে বাদী এবং প্রতিবাদী উভয়কেই স্বপক্ষের স্থাপন ও পরপক্ষের নিরাকরণের জন্য প্রমাণ ও তর্কের • প্রথম পরিচ্ছেদ। (তাৎপৰ্য)—উদ্ভাবন করিতে হয়। কিন্তু, বিতণ্ডাতে সে প্রকার নিয়ম নাই। ইহাতে কেবল পর-কর্তৃক উদ্ভাবিত প্রমাণ ও তর্কের উপর দোষােদ্ভাবন করিয়া মধ্যস্থকে বুঝাইতে হইবে যে, পরকীয় পক্ষটী যুক্তি ও প্রমাণ-সঙ্গত নহে; ইহাতে নিজপক্ষ স্থাপনের জন্য স্বতন্ত্রভাবে কোন প্রকার যুক্তি ও তর্কের আবশ্যকতা থাকে না। এই তিন প্রকার কথার মধ্যে কোন্ কথাটীকে অবলম্বন করিয়া বিচার করিতে হইবে, তাহা বিচারারম্ভের পূর্বে ঠিক করিয়া লইতে হয় । তাহাই বুঝাইবার জন্য গ্রন্থকার প্রথমেই এই বিষয়ের নির্দেশ করিয়াছেন। ৬। * * টিপ্পনী—গ্রন্থারন্তেই গ্রন্থকার বলিলেন “অদ্বৈতসিদ্ধেদ্বৈতমিথ্যাত্বসিদ্ধিপূৰ্ব্বকত্বাৎ” অর্থাৎ, পুর্বে দ্বৈতের মিথ্যাত্ব-জ্ঞান হইলে অদ্বৈত-সিদ্ধি হয়। কিন্তু, কেন তাহা হয়, তাহার কারণ কি, তাহা আর তিনি এস্থলে প্রদর্শন করিলেন না, অথচ কথাটী অতি গভীর। আমরা পণ্ডিত পাঠকের চিত্তবিনোদনার্থ টীকাকার-বাক্য হইতে উহা সংকলন করিলাম। প্রথম দেখা যাউক, “অদ্বৈত-সিদ্ধি” পদের অর্থ কি ? দেখা যায়,-“একমেবাদ্বিতীয় অর্থাৎ, ব্ৰহ্ম একই এবং অদ্বিতীয়, ইত্যাদি শ্রুতির উদ্দেশ্য, লক্ষণ দ্বারা কেবল-ব্ৰহ্ম-বিষয়ক জ্ঞানোৎপাদন নহে। কারণ, শ্রুতিবাক্য হইতে সাধারণরূপে ব্ৰহ্মচৈতন্যের জ্ঞান সকলেরই হইয়া থাকে। সাধারণরূপে ব্ৰহ্মচৈতন্যের জ্ঞান দ্বারা সংসাররূপ অনর্থ-নিবৃত্তি হইতে পারে না। ব্ৰহ্মচৈতন্যের যেরূপ জ্ঞান দ্বারা অনর্থ-নিবৃত্তি হইবে তাহা, ব্রহ্মচৈতন্য-বিষয়ক বিশেষ-জ্ঞানই হওয়া চাই, তাহা সাধারণ জ্ঞান হইলে চলিবে না। এখন দেখ, ব্রহ্মচৈতন্য-বিষয়ক বিশেষ জ্ঞানটী কি প্রকার ? এতদুত্তরে আপাততঃ বলিতে হইবে, প্রকার ভ্ৰমটী ব্ৰহ্ম-চৈতন্য সম্বন্ধে আমাদের হইয়া থাকে, ব্ৰহ্মচৈতন্থ-বিষয়ক তদ্বিরোধি-প্রকার বিশেষ-জ্ঞানটাই সেই ব্ৰহ্মচৈতন্য-বিষয়ক বিশেষ-জ্ঞান হইবে এবং তাহা হইলেই সেই অনর্থ-নিবৃত্তি হইবে। এখন দেখা আবশ্যক, ব্রহ্মচৈতন্য-বিষয়ক কি প্রকার ভ্রম আমাদের হইয়া থাকে এবং উক্ত শ্রুতিবাক্য দ্বারা তাহা কিরূপে নিবারিত হয়। দেখ, আমাদের ব্রহ্মচৈতন্য-বিষয়ক যে ভম রহিয়াছে, তাহা “আমি অজ্ঞ”, “আমি সুখী” “আমি দুঃখী” “আমি কা” “আমি ডােক্তা” অর্থাৎ “আমি দ্বৈতবা” অর্থাৎ “ব্রহ্ম দ্বৈতবৎ” ইত্যাকারক জ্ঞান। এখন, এই জ্ঞানটী ‘বিশিষ্ট জ্ঞান। অর্থাৎ, ইহাতে বিশেষ্য ও বিশেষণের স্থান হইয়া থাকে। সুতরাং, এই বিশিষ্ট জ্ঞানের যাহা বিরােধী অথচ নিশ্চয় জ্ঞান, তাহাই ঐ ভ্রমের নিবর্ভক হওয়া উচিত। কারণ, ন্যায়শাস্ত্র মধ্যে একটী নিয়ম স্থির হইয়া গিয়াছে যে, যৎ-প্রকারক ও যদ-বিশেষ্যক ভ্রম হয়, তাহার নিবৃত্তির জন্য তদভাব-প্রকারক এবং তদবিশেষ্য নিশ্চয় জানের আবশ্যকতা হয়। যেমন, “ভূতলে ঘট অবৈতসিদ্ধি। (টাপ্পনী) --আছে” এই ঘট-প্রকারক ভূত-বিশেষ্যক জ্ঞানের বিরােধী হইবে “ভূতলে ঘট নাই” অর্থাৎ ঘটাভাব-প্রকারক ভূতল-বিশেষ্যক জ্ঞানী। এখন তাহা হইলে দেখা আবশ্যক, উক্ত ভ্রমজ্ঞানের বিরোধী নিশ্চটী কিরূপ? উপরে দেখা গিয়াছে--ব্ৰহ্ম-বিষয়ক ভ্রমটী “ব্রহ্মদ্বৈতবৎ” ইত্যাকারক। সুতরাং, ন্যায়শাস্ত্রের উক্ত সৰ্ববাদিসম্মত নিয়মানুসারে উক্ত “ব্ৰহ্মদ্বৈতবৎ” জ্ঞানের অর্থাৎ দ্বৈতকারক ব্ৰহ্মবিশেষ্যক জ্ঞানের বিরােধী হইবে দ্বৈতাভাব-প্রকারক ব্ৰহ্ম-বিশেষ্যক জ্ঞান। কিন্তু, বেদান্ত-সিদ্ধান্তে এই বিশিষ্ট নিশ্চয় জ্ঞানটী দ্বৈজ্ঞানের বিরােধী হইলেও এতদ্বারা অনর্থের সর্বথা নিবৃত্তি হয় না বলা হয়। কারণ, যেমন দেবদত্ত- স্বরূপের অজ্ঞান যাহার আছে, তাহার পক্ষে দেবদত্ত বিষয়ক বিশিষ্ট নিশ্চয় জ্ঞান সেই অজ্ঞানের নিবৰ্ত্তক হয় না, অর্থাৎ “কে দেবদত্ত ? এতদুত্তরে “দেবদত্ত নীলবস্ত্রধারী” অথবা “দেবদত্ত দণ্ডী” ইত্যাকারক বিশিষ্ট জ্ঞান, “দেবদত্ত নীলবস্ত্রধারী নয়” অথবা “দেবদত্ত দী নয়” ইত্যাকার বিশিষ্ট জ্ঞানের বিরােধী হইলেও, দেবদত্ত কে, তাহা বুঝাইয়া দেয় না, অর্থাৎ দেবদত্তের স্বরূপ-বিষয়ক অজ্ঞানের নিবর্তক হয় না, পরন্তু “যে নীলবস্ত্রধারী বা দণ্ডী দেবদত্ত, সেই দেবদত্ত এই” এইরূপ বাক্য তাহা বুঝাইয়া দেয়, এবং তজ্জন্য উক্ত বাক্যের প্রত্যেক পদের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ থাকিলেও তাহা প্রকৃত স্থলে বিবক্ষিত বলিয়া লক্ষণা-সাহায্যে শুদ্ধ-দেবদত্ত বিষয়ক নির্বিকল্প জ্ঞান আবশ্যক হয়, অর্থাৎ দেবদত্তের প্রকার ও বিশেষ্যতা-বিহীন জ্ঞানটী লক্ষণা-সাহায্যে উক্ত বাক্য হইতে হইলেই সেই দেবদত্তের স্বরূপ-মা-বিষয়ক অজ্ঞানের নিবৃত্তি হয়, দেবদত্তের বিশেষণ যে দণ্ড বা নীলবস্ত্র, তাহার জ্ঞান দ্বারা এই অজ্ঞান নিবৃত্তি হয় না, অর্থাৎ অজ্ঞান- প্রযুক্ত সপ্ৰকাৰক যে ভ্ৰম, সেই ভ্রমের নিবর্তক প্রকার জ্ঞান হইলেও স্বরূপ-বিষয়ক যে অজ্ঞান, তাহা নিবৃত্তির জন্য সপ্রকারক জ্ঞানের যেমন সামর্থ্য নাই, পরন্তু তাহার নিবৃত্তির জন্য যেমন শুদ্ধ দেবদত্তের স্বরূপ বিষয়ক জ্ঞানের আবশ্যকতা আছে, যে শুদ্ধ-দেবদত্ত- বিষয়ক জ্ঞানটীকেই নির্বিকল্পক জ্ঞান বলা হয়। কারণ, তাহাতে বিশেষণের ভন বিবক্ষিত নহে? যেহেতু, প্রশ্নকর্তার এই বিশেষণ-জ্ঞান পুর্ব হইতেই হইয়া থাকে, পরন্তু “দেবদত্ত এই” এই স্বরূপ- বিষয়ক জ্ঞানটীই তাহার থাকে না, সুতরাং, যেমন দেবদত্ত-স্বরূপ-বিষয়ক নির্বিকল্প জ্ঞানই দেবদত্তের স্বরূপ-বিষয়ক অজ্ঞানের নিবৰ্ত্তক হয়, তদ্রুপ প্রকৃতস্থলেও বুঝিতে হইবে। অর্থাৎ ঠিক সেইরূপ করিয়া এই দ্বৈতাভাববদ ব্ৰহ্ম” এই বিশিষ্ট জ্ঞানটী “দ্বৈতবদ ব্রহ্ম” এই বিশিষ্ট জ্ঞানের বিরোধী হইলেও এই ভ্রমের উৎপাদক যে মুল অজ্ঞান অর্থাৎ ‘শুদ্ধ ব্ৰহ্ম কি এতদবিষয়ক যে জ্ঞান, তাহার নিবৰ্ত্তক হইতে পারে না। কারণ, এই অজ্ঞান শুদ্ধ ব্ৰহ্মকেই বিষয় করে। এই অজ্ঞানে বিশেষ্য ও বিশেষণের ভান নাই। লোকে জ্ঞানকে যেমন কিঞ্চিৎ প্রকারক ও কিঞ্চিৎ-বিশেষ্যক বলিয়া বুঝে, সেইরূপ অজ্ঞানকেও কিঞ্চিৎ-প্রকার ও কিঞ্চিৎ বিশেষ্য বলিয়া বুঝিয়া থাকে। যথা—“ঘটকে আমি জানি না এলে ঘট-প্রকারক ঘট-বিশেষ্যক অজ্ঞানবান আমি--এইরূপ বিশঃ অজ্ঞানেরই অনুভব হয়। কিন্তু, ঘটে ঘটহের মত ব্ৰক্ষে কোন প্রথম পরিচ্ছে। ১১ কারণ, (টপ্পনী)-ধৰ্ম্ম নাই বলিয়া কিঞ্চিৎ-ধৰ্ম প্ৰকাৰক ব্ৰহ্ম-বিশেষ্যক অজ্ঞানরূপ সকল ভ্রমের কারণ- ভূত মূল যে একটী অজ্ঞান আছে, তাহা সিদ্ধ হইতে পারে না। এইজন্য সকল ভ্রমের মূল কারণ যে অজ্ঞান, তাহা কেবল ব্ৰহ্মকেই বিষয় করে, ব্রহ্মের কোন বিশেষ ধর্মকে বিষয় করে না, পরন্তু ব্রহ্মে এই অজ্ঞানের অধ্যাসের পর ব্রহ্মে অজ্ঞান-কল্পিত ধৰ্ম্ম অধ্যন্ত হইলে তবিষয়ক যে অজ্ঞান, তাহাই কেবল সকারক ও সবিশেষ্যক হইতে পারে। তৎপূর্বে ব্রহ্মে যেহেতু কোন ধর্ম নাই, সেই হেতু সেই সময়ের অজ্ঞান কেবল ব্ৰহ্মকেই বিষয় করে, আর উহাকে এইজন্য নির্বিকল্পক অজ্ঞান বলা হয়, এবং এই অজ্ঞান-নিবৃত্তির জন্য এইরূপ নির্বিকল্পক জ্ঞানই আবশ্যক। জ্ঞান-নিবৰ্ত্ত অজ্ঞানের সমান-বিষয়কত্ব থাকাই নিয়ম। অজ্ঞান যখন কেবল ব্ৰহ্মকেই বিষয় করে, তাহার অনুভব তখন আমি ব্ৰহ্মকে জানি না” এইরূপ ; অর্থাৎ তাহা ব্রহ্ম-বিশেষ্যক অজ্ঞান-প্রকারক হইলেও অজ্ঞানটী স্বয়ং নিকারক ও নিৰ্বিশেষ্যক হয়। ফলতঃ, এত দ্বারা জ্ঞানও দুইরূপ অজ্ঞানও দুইরূপ ইহাই সিদ্ধ হয়। এখন ইহাই যদি হয়---তাহা হইলে প্রকৃতস্থলে শুদ্ধ ব্রহ্মবিষয়ক স্বরূপাবরক অজ্ঞানের নিবৃত্তির জন্য শুদ্ধ স্বরূপবিষয়ক জ্ঞান আবশ্যক হয়। আর এই জ্ঞান সেই মূল অজ্ঞানকে নিবৃত্ত করিয়া সেই অজ্ঞান-জন্য দ্বৈতভ্রমের সর্বথা নিবৰ্ত্তক হয়। ইহাকে অখণ্ডাকারবৃত্তি ও নির্বিকল্প জ্ঞান বলা হয়। ইহাই মোক্ষহেতু, ইহাই তত্ত্বজ্ঞান, ইহাই অদ্বৈতসিদ্ধি। এই জ্ঞানে ব্ৰহ্ম ভিন্ন কোন বাধিত বা বিখ্যা বস্তুর ভান হয় না। সপ্ৰকাৰকজ্ঞান যাহা কিছু হইবে, তাহ৷ ব্ৰহ্ম ভিন্ন বস্তুকে অবশ্যই বিষয় করিবে; অতএব তাহা ব্রহ্মতত্ত্বজ্ঞান হইতে পারে না এবং তাহার দ্বারা মূল অজ্ঞানও নিবৃত্ত হয় না। তত্ত্বজ্ঞানই অজ্ঞান-নিবৰ্ত্তক হয়—ইহাই সৰ্ব্বত্র নিয়ম। এজন্য ব্রহ্ম-বিষয়ক অজ্ঞান ব্ৰহ্মতত্ত্বজ্ঞান দ্বারা নিবৃত্ত হইবে, এবং এই জন্য পূর্বোক্ত একমেবাদ্বিতীয় প্রভৃতি শ্রুতির প্রত্যেক পদের লক্ষণা দ্বারা এইরূপ নির্বিকল্প জ্ঞানের উৎপাদনে তাৎপৰ্য আছে বুঝিতে হইবে। কিন্তু, তাই বলিয়া একেবারেই এইরূপ জ্ঞান প্রথম হইতে জন্মিতে পারে না। এই তত্ত্বজ্ঞান হইল দ্বৈতাভাব-উপলক্ষিত ব্রহ্মজ্ঞান, ইহা দ্বৈতাভাববিশিষ্ট ব্রহ্মজ্ঞান নহে। লোকে সৰ্বত্ৰ উপলক্ষিত বুদ্ধির প্রতি বিশিষ্ট জ্ঞানকে কারণ বলে ; যেমন, কাকোপলক্ষিত দেবদত্তের গৃহ বিষয়ক বুদ্ধির প্রতি কাকবিশিষ্ট দেবদত্তের গৃহের নিশ্চয়টা কারণ হয়। সেইরূপ প্রকৃতস্থলে অদ্বৈতসিদ্ধি শব্দ দ্বারা প্রতিপাদ্য দ্বৈতাভাব-উপলক্ষিত ব্ৰহ্মবিষয়ক নির্বি- কল্পক বুদ্ধিতেও দ্বৈতাভাব-বিশিষ্ট ব্ৰহ্ম-নিশ্চয় কারণ হয়। অর্থাৎ, প্রথমতঃ “একমেবাদ্বিতীয় শ্রুতির দ্বারা দ্বৈতাভাব-বিশিষ্ট ব্ৰহ্ম, অর্থাৎ “দ্বিতীয়াভাববৎ ব্ৰহ্ম” এইরূপ বিশিষ্ট জ্ঞান হয়, তাহার পর উক্ত দ্বৈতাভাব-উপলক্ষিত ব্ৰহ্ম-বিষয়ক নিৰ্ব্বিকল্পক বুদ্ধি হয়। ইহা অবশ্য উক্তবিধ সমস্ত পদের লক্ষণার দ্বারাই নিষ্পন্ন হইবে। এইরূপ বিশিষ্ট নিশ্চয়পূর্বক যে উপলক্ষিত বুদ্ধি, তাহারই নাম অদ্বৈতসিদ্ধি। এই অদ্বৈতসিদ্ধিই এস্থলে গ্রন্থকার লক্ষ্য করিয়াছেন, এবং এই জন্যই সেই অদ্বৈতসিদ্ধির জন্য দ্বৈতমিথ্যাত্ব নিশ্চয়কে কারণ বলিয়া বুঝিতে হইবে। এখন এই অদ্বৈতর্সিদ্ধির প্রতি দ্বৈতমিথ্যাত্ব-নিশ্চয়টী কিরূপে কারণ হয়, তাহা এইবার অষ্টব্য। কারণ, অবৈতসিজি ; (টাপ্পনী)-দেখ, পূর্বোক্ত উপলক্ষিত বুদ্ধির কারণীভূত যে বিশিষ্ট নিশ্চয়, তাহা দ্বৈতের নিষেধবুদ্ধি ভিন্ন আর কিছুই নহে, এবং নিষেধবুদ্ধি প্রসক্তি ভিন্ন হয় না, অর্থাৎ যাহার যাহাতে আরােপ থাকে, তাহারই তাহাতে নিষেধ হইতে পারে। পরমাণুতে মেরুর নিষেধ হইতে পারে না, কিন্তু দ্বাণুকের নিষেধ হইতে পারে; রঞ্জুতে সর্পের নিষেধ হয়, হস্তির নিষেধ হইতে পারে না। কারণ, রজ্জুতে হস্তির প্রসক্তি নাই। প্রকৃতস্থলেও দ্বৈতের নিষেধ করিতে হইলেই পূর্বোক্ত দ্বৈতের প্রসক্তি প্রদর্শন আবশ্যক হয় ; সুতরাং, এই অদ্বৈতসিদ্ধি করিতে হইলে দ্বৈতের প্রসক্তি আবশ্যক হইবে। বস্তুতঃ, প্রকৃতস্থলে এই প্রসক্তি উক্ত “একমেবাধিতীয়” শ্রুতিবাক্যের অব্যবহিত পূর্বে বৰ্ত্তমান যে “সদেব সৌমেদম অগ্ৰ আসীৎ” বাক্যটী, তাহা হইতেই লব্ধ হয়। তাহার দ্বারাই ব্রহ্মেতে সকল দ্বৈতের তদাত্ম-প্রাপ্তি ঘােষণা করা হইয়াছে, অর্থাৎ এই জগৎ সন্ধ্রপ ব্ৰহ্মরূপে ছিল— এই কথা দ্বারা সৎ-পদার্থের সহিত জগতের অভেদ প্রতিপাদন করা হইল। আর তাহারই ফলে সকল দ্বৈতের প্রসক্তিও প্রদর্শিত হইল। এখন এই দ্বৈতপ্রসক্তিকে অবলম্বন করিয়া উত্তর- বাক্যে অর্থাৎ একমেবাদ্বিতীয় বাক্যে দ্বৈতবিশিষ্ট ব্ৰহ্মকে উদ্দেশ্য করিয়া দ্বৈতভাবের বিধান হইতেছে ইহা বুঝিতে হইবে। কিন্তু, যেমন “ধনী সুখী” বলিলে ধনী হয় উদ্দেশ্য এবং সুখ হয় বিধেয়, এবং ধন হয় উদ্দেশ্যতাবচ্ছেদক, এবং এই উদ্দেশ্যতাবচ্ছেদক ধনের যে কাল,-“তৎকালাবচ্ছিন্নত্ব” অর্থাৎ তৎকালবৃত্তিত্ব, তাহা সুখরূপ বিধেয় মধ্যে ভাসমান হয়, এবং ইহা অনুভবসিদ্ধ বলিয়া বিধেয় মধ্যে উদ্দেশ্যতাবচ্ছেদক-কালাবচ্ছিন্নত্বটী ভাসমান হইবে—এইরূপ নিয়ম আছে। কারণ, এই নিয়ম না মানিলে নিৰ্দ্ধন অবস্থাতেও সুখ স্বীকার করিতে হয়, তপ প্রকৃতস্থলে একমেবা- দ্বিতীয় বাক্যে দ্বৈতাভাবরূপ বিধেয় মধ্যে উদ্দেশ্য তাবচ্ছেদক যে শ্বৈতপদার্থ, তাহার ৰে কাল, সেই কালবিচ্ছিন্নত্বটী ভাসমান হইবে। অর্থাৎ, দ্বৈতবিশিষ্ট ব্ৰহ্ম দ্বৈতকালাবচ্ছেদে দ্বৈতা- ভাবযুক্ত এইরূপ অর্থ সিদ্ধ হইবে। আর তাহা হইলেই এই বিশিষ্ট নিশ্চয়টী দ্বৈতমিথ্যাত্ব-নিশ্চয়- রূপও হইয়া গেল। কারণ, মিথ্যাত্বটী কি? ইহার অর্থ- যদ্দেশাবচ্ছেদে যৎকালাবচ্ছেদে যাহার সে অধিকরণে প্রতীতি হইতে পারে, তৎকালাবচ্ছেদে তদ্দেশাবচ্ছেদে তাহার অভাব থাকা। সুতরাং, “একমেবাদ্বিতীয়” এই শ্রুতি জন্য যে বিশিষ্ট-বােধ, তাহাও দ্বৈতকালাবচ্ছেদে দ্বৈত বিশিষ্ট ব্রহ্মে দ্বৈতকালবচ্ছেদে দ্বৈতাভাবকে বিষয় করিতেছে। এই জন্য এইরূপ বিশিষ্ট নিশ্চয়টী দ্বৈতমিথ্যাত্ব নিশ্চয় হইল এবং তাহা উক্ত দ্বৈতাভাব-উপলক্ষিত নির্বিকল্পক বুদ্ধির কারণ। অতএব, এই অদ্বৈতসিদ্ধি হইতে হইলে দ্বৈতমিখ্যাত্ব-নিশ্চয়-পূৰ্ব্বকই হইয়া থাকে, আর এই জন্যই গ্রন্থকার মূল গ্রন্থে “অদ্বৈতসিদ্ধেদ্বৈতমিথ্যাত্বসিদ্ধিপুৰ্বকত্বাৎ” এইরূপ বাক্য প্রয়োগ করিয়াছেন। যদি বলা হয়---দ্বৈতকে উদ্দেশ্যতাবচ্ছেদক এবং দ্বৈতাভাবকে বিধেয় করিয়া “দ্বৈতবৎ ব্রহ্মদ্বৈতাভাববৎ” এইরূপ নটী ব্যভাববিশিষ্ট পৰ্বতে বহ্নিজ্ঞানের ন্যায় আহাৰ্য্য জ্ঞান হইয়া বাইবে, প্রত্যক্ষন ভিন্ন শব্দবোধ কিংবা অনুমিতি আহাৰ্যজ্ঞান হয় না, ইহা সিদ্ধান্তে স্বীকৃতই আছে, এখন এখানে অহাৰ শব্দবােধ স্বীকার করিলে উক্ত নিয়মের বিরােধ ঘটিবে। তাহা হইলে প্রথম পরিচ্ছে। (টঙ্গিনী)—তাহার উত্তর এই যে, এখানে ঐ জ্ঞানটী আহাৰ্য্য জ্ঞানই নহে বলিব। কারণ “সদেব ইত্যাদি শ্রুতিতে “ইদং” পদের দৃশ্য-পদার্থমাত্রেই শক্তি আছে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষাদি প্রমাণ আর। দৃশ্যমাত্ৰ যাহা জ্ঞানের গোচর হয়, ইদং পদ তাহারই বােধক হয়। অতএব ইদং পদ দ্বারা দৃশ্যের যে উপস্থিতি, তাহা দৃশ্যত্বরূপেই হইয়াছে, এবং দ্বিতীয় পদদ্বার দ্বিতীয়ত্ব রূপে দ্বৈতের উপ- স্থিতি হইয়াছে বলিতে হইবে। “দ্বৈতবৎ ব্ৰহ্ম দ্বৈতাভাববৎ বলিলে আহাৰ্য্য হইত, ইহা কিন্তু সেইরূপ হইল না। ইহা হইল দৃথবৎ ব্রহ্মদ্বৈতাভাববৎ। সুতরাং, ভিন্ন ভিন্নরূপে অর্থাৎ দ্বৈত এবং দ্বৈতভাব এতদুভয়ের এক ব্রহ্মে যথাক্রমে উদ্দেশ্যবচ্ছেদকরূপে এবং বিধেয়রূপে ভান স্বীকার করা হইল, আর তাহার জন্য আহাৰ্যত্ব ঘটিল না। যেমন “ঘটবৎ পর্বত” দ্রব্যাভাববৎ এইরূপ বোধস্থলে আহাৰ্যত্ব থাকে না, এস্থলেও তদ্রুপ দ্বৈত এবং দ্বৈতাভাবটী ভিন্ন ভিন্নরূপে ভাসমান হইয়াছে, এবং তজ্জন্য ঐ জ্ঞানের আহাৰ্য্যতা থাকিল না, ইত্যাদি। অথবা বলিতে পারা যায় যে আরােপ্যেয় যে জাতীয় সত্তা, আরোপ্যাভাবেরও সত্তা যদি সেই জাতীয় সত্তা হয় এবং এই প্রকার আরোপ্য এবং আরোপ্যাভাব যদি একই ধৰ্মীতে একই কালে প্রতীত হয়, তাহা হইলে সেই স্থলে জ্ঞানকে আহাৰ্য্য বলা যায়। প্রকৃতস্থলে আরােপ্যকে জগৎ এবং তাহার সত্তাচীকে ব্যবহারিকসত্তা বলা হয়। কিন্তু, তাহার যে অভাব, তাহার সত্তাটী পারমার্থিক সত্তা এই স্থলে অভিপ্রেত। সুতরাং, ব্যবহারিক দৃশ্যযুক্ত ব্রহ্মে যদি সেই দৃশ্যের পারমার্থিক অভাব আছে বলা যায়, তাহা হইলে এইরূপ বাক্য দ্বারা যে জ্ঞান হয়, তাহা আহাৰ্য্য হইতে পারে না। এখন ইহার উপর আর একটী আশঙ্কা উথাপিত করা হইয়া থাকে, এবং তাহারও উত্তরটা এস্থলে লিপিবদ্ধ করা গেল। আশঙ্কাটী এই যে, বিধেয় মধ্যে যে উদ্দেশ্যবচ্ছেদক কালাবচ্ছিন্ন- দের ভানের কথা পূর্বে বলা হইয়াছে, তাহা যে সাৰ্বত্রিক—তাহা কে বলিল? কারণ, সাদা- কালীন দণুককে পক্ষ করিয়া জন্যতাসম্বন্ধে কৰ্ত্তাকে বিধেয় (সাধ্য) করিলে সেই কর্তাতে উদ্দেশ্য- ভাবচ্ছেদকের যে কাল—“তৎকালাবচ্ছিন্নত্ব” তাহার ভান হয় না,কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন কর্তার ভান হয়। সুতরাং, ইহা সাৰ্বত্রিক নিয়ম হইল না। অতএব, উক্ত “একমেবাদ্বিতীয় শ্রুতি দ্বৈত- বিশিষ্ট ব্রহ্মে কালান্তরাবচ্ছেদে দ্বৈতাভাবকে বোধ করাইতেছে এইরূপ বলিব। দ্বৈতকাল- বচ্ছেদে দ্বৈতাভাবকে বোধ করাইলেই ত দ্বৈতবৎ ব্ৰহ্ম দৈতকালাবচ্ছেদে দ্বৈতভাববৎ এই রূপ বোধটী দ্বৈতের মিথ্যাত্ব নিশ্চয়রূপ হইত। কিন্তু, এরূপ বােধ স্বীকার করিবার পক্ষে কোন প্রমাণ নাই। এই শ্রুতির তাৎপৰ্য্য ভিন্নকালে দ্বৈতবিশিষ্ট ব্রহ্মে, অর্থাৎ যে কালে দ্বৈত নাই, তৎ- কালাবচ্ছেদে দ্বৈতাভাব প্রতিপাদন ; অতএব অদ্বৈতসিদ্ধি শব্দ-প্রতিপাদ্য উক্ত উপলক্ষিত নিশ্চয়ের কারণীভূত বিশিষ্ট নিশ্চয়টী দ্বৈতমিথ্যাত্ব নিশ্চয়রূপ হইল না ; সুতরাং, দ্বৈতমিখ্যাত্ব উপপাদন অনাবশ্যক। ইহার উত্তর এই যে, এই শ্রুতি যদি কালান্তরাবচ্ছেদে দ্বৈতাভাবকে বােধ করাইতে প্রবৃত্ত হয়-স্বীকার করা যায়, তাহা হইলে এই শ্রুতিই ব্যর্থ হইয়া যাইবে। ইহার কোন প্রয়োজন থাকিবে না। কারণ, “তরতি শােকমাত্মবিৎ” আত্মবিৎ শোকমুক্ত হয়, “বিদ্বান নাম ১। অদ্বৈতসিন্ধি। (বিপ্রতিপত্তিবাক্য বিচারাঙ্গত্বনিরূপণ) তত্র বিপ্রতিপত্তি-জন্য-সংশয়স্য বিচারাঙ্গত্বাৎ মধ্যস্থেন আদৌ বিপ্রতিপত্তি প্রদর্শনীয়া। যদ্যপি বিপ্রতিপত্তি-জন্য-সংশয়স্য ন পক্ষতা-সম্পাদকতয়ােপযােগঃ ৮ সিসাধয়িষা-বিরহসহকৃত-সাধক-মানা- ভাবরূপায়াঃ তস্যাঃ সংশয়াঘটিতত্বাৎ ১ অন্যথা শ্রুত্যাত্মনিশ্চয়তা (মধ্যস্থ কর্তৃক বিপ্ৰতিপত্তিপ্রদর্শন বিচারের অঙ্গ।) তনুবাদ।—সেই কথাতে-যে পরস্পর বিরুদ্ধোক্তিবশতঃ সংশয় হইয়া থাকে, সেই সংশয়টী বিচারের অঙ্গ অর্থাৎ অনুকূল। এই কারণে বিচার আরম্ভ হইবার পূর্বে মধ্যস্থের প্রথমে বিপ্রতিপত্তি (অর্থাৎ যেরূপ বাক্য দ্বারা সংশয় উদিত হয় সেই বাক্য) প্রদর্শন করা উচিত। এই প্রকার বিপ্রতিপত্তি-বাক্যের দ্বারা যে সংশয় উদিত হয়, তাহা ( ভাবি অনুমানের কারণ যে ) পক্ষতা, তাহাকে সম্পাদন করিয়া দেয় । এই কারণ এইরূপ বিপ্ৰতিপত্তি-বাক্যের যে ( অনুমিতির পক্ষে ) কোন প্রকার উপযােগিতা আছে, ইহা বলা যায় না। কারণ, পক্ষতা, ( যাহাকে নৈয়ায়িকগণ অনুমিতির কারণ বলিয়া নির্দেশ করেন) তাহা অনুমিতি রূপাৎ বিমুক্ত” অর্থাৎ বিদ্বান ব্যক্তি নাম ও রূপ হইতে বিমুক্ত হয়, “জ্ঞাত্বা দেবং মুচ্যতে সৰ্ব্ব পাশৈঃ” অর্থাৎ তাঁহাকে জানিয়া সকল পাশ হইতে মুক্ত হয়, ইত্যাদি শ্রুতির দ্বারা দ্বৈতের জ্ঞান- নাস্তত্ব কথিত হইয়াছে। তজ্জন্য ইহাই সিদ্ধ হইল যে, ভিন্নকালে দ্বৈত নাই। এইরূপ দৃশ্যত্ব- রূপ হেতুদ্বারা জ্ঞান-নাশ্যত্বের অনুমান করিলে সে অনুমান-প্রমাণ দ্বারা জ্ঞানােত্তর কালে দ্বৈতের অভাব আছে-ইহা জ্ঞাত হওয়া যায়। এই সব পূর্বোক্ত শ্রুতি এবং অনুমানাদি দ্বারা যেরূপ ভিন্ন কালে অর্থাৎ জ্ঞানােত্তর কালে দ্বৈতের অভাব প্রতিপাদিত হয়, সেইরূপ “একমেবাদ্বিতীয় এই শ্রুতিও যদি ভিন্নকালে দ্বৈতাভাবকে বােধ করায়, তাহা হইলে এই শ্রুতির কোন প্রয়ােজন থাকে না। এই শ্রুতির প্রয়োজন রক্ষা করিতে হইলে বলিতে হইবে যে, শ্রুত্যন্তর হইতে এই শ্রুতিতে এইটুকুই বিশেষ যে, ইহা দ্বৈতবত্ব কালাবচ্ছেদে ব্রহ্মে দ্বৈভাবকে প্রতিপাদন করে, এবং তাহা হইলেই এই শ্রুতির সার্থকতা থাকিল । নচেৎ ভিকালীন দ্বৈত এবং দ্বৈতাভাব-প্রতিপাদক শ্রুতি বহুই আছে। অতএব, প্রকৃতস্থলে দ্বৈতবিশিষ্ট ব্রহ্মে দ্বৈতব- কালাবচ্ছেদে দ্বৈতাভাব-বিষয়ক বিশিষ্ট বােধটী দ্বৈতমিথ্যাত্ব-নিশ্চয়রূপ হইল। ইহাই হইল "তেসিদ্ধেদ্বৈতমণ্যাত্বসিদ্ধিপূর্বকৎ” বাক্যটীর সংক্ষিপ্ত অর্থ।
প্রথম পরিচ্ছে। অনুমিৎসয়া তদনুমানং ন স্যাৎ, বাছাদীনাং নিশ্চয়বনে সংশয়া- সম্ভবাৎ, আহাৰ্য্যসংশয়স্য অতি প্ৰসঞ্জকত্বাচ্চ ১০ নাপি বিপ্ৰতিপতে স্বরূপত এব পক্ষ প্রতিপক্ষ-পরিগ্রহ-ফলকতয়ােপযােগঃ১১ ত্বয়েদং সাধনীয়ম, অনেনেদং দূষণীয় ইত্যাদি মধ্যস্থবাক্যাদেব তল্লাভেন বিপ্রতিপত্তিবৈয়র্থাৎ ১২ তথাপি বি প্রতিপত্তিজ-সংশয়স্ত-অনুমিত্য- নঙ্গত্বেহপি বুদিসনীয়তয়া বিচারাঙ্গত্ব অস্ত্যেব।১৩ (অনুবাদ)—হউক এইপ্রকার ইচ্ছার অভাবযুক্ত যে সাধ্যসিদ্ধি (অর্থাৎ পক্ষে সাধ্য আছে এইরূপ জ্ঞান), তাহারই অভাব। সুতরাং, এইপ্রকার পক্ষতার মধ্যে সংশয় প্রবিষ্ট নহে, অর্থাৎ সংশয় না থাকিলেও এইপ্রকার পক্ষতা থাকিতে পারে। আর (সংশয়ই যদি পক্ষতা হয়,তাহা হইলে শ্রুতিবাক্যের দ্বারা যাহার আত্মার স্বরূপ নিশ্চয় আছে ; তাহার ‘অনুমিতি হউক এই প্রকার ইচ্ছা বশতঃ আবার আত্মবিষয়ে যে মনন (অর্থাৎ অনুমান) করিবার বিধান আছে, তাহা সঙ্গত হইতে পারে না; যেহেতু, বাদী ও প্রতিবাদীর নিজনিজ পক্ষ বিষয়ে (প্রায়ই) নিশ্চয় থাকে। (আর তাহাই যদি হইল তবে) তাহাদের এই বিপ্ৰতিপত্তি-বাক্য শ্রবণ করিয়া সংশয় উৎপন্ন হইতে পারে । অতএব, সংশয় উৎদন দ্বারা বিপ্রতিপত্তি-বাক্যের অনুমিতি-হেতুত থাকতে পারে না। (যদি বল) আহাৰ্য্য সংশয় (অর্থাৎ সংশয়ের বিরােধী নিশ্চয় থাকিলেও ‘আমার সংশয় হউক এই প্রকার ইচ্ছা দ্বারা প্রসূত যে সংশয়, তাহ) তাহাদের হইতে পারে । সুতরাং, সেই সংশয়কে অনুমিতির কারণ স্বীকার করিলে তদ্বারা বিপ্রতিপত্তিবাক্য অনুমিতির প্রতি উপযােগী হইবে? ইহাও বলা যায় না। কারণ, আহাৰ্য্য-সংশয়কে অনুমিতির কারণ বলিয়া স্বীকার করিলে তুল্যযুক্তিবলে আহাৰ্য্য-পরামর্শও অনুমিতির কারণ হইয়া যাইবে। কিন্তু, তাহা অভীষ্ট নহে।১০ (যদি বল) সংশয় উৎপাদন দ্বার। বিপ্রতিপত্তিবাক্যের উপযােগিতা না থাকিলেও, বিপ্রতিপত্তিবাক্য শ্রবণ করিয়া দুই পক্ষের মধ্যে যাহার যে পক্ষ ইষ্ট—সে তাহা গ্রহণ করিয়া বিচার করিতে প্রবৃত্ত হইবে, এই ভাবে বিপ্রতিপত্তি বাক্যের অনুমিতির প্রতি উপযােগিতা থাকিতে পারে।১১ ইহাও ঠিক নহে। কারণ, বিপ্রতিপত্তি-বাক্য প্রয়ােগ না করিয়া- মধ্যস্থ যদি বলেন যে, তুমি এই পক্ষ স্থাপন করিয়া বিচার কর, আর তুমি ( অপর পক্ষ স্থাপন করিবার জন্য) এই পক্ষের উপর দোষের উদ্ভাবন কর, ১৬ অবৈতশিন্ধি। (অনুবাদ) -তাহা হইতেই বাদী ও প্রতিবাদী নিজ নিজ পক্ষ-স্থাপনের জন্য বিচারে প্রবৃত্ত হইতে পারে। সুতরাং, বি প্রতিপত্তি বাক্যের প্রয়ােগ না করিলেও বিচার- কাৰ্য্যের আরম্ভ হইতে পারে; আর তাহা হইলে অনায়াসে বলা যাইতে পারে যে, বিচারের পূর্বে বিপ্রতিপত্তি-বাক্যের প্রয়ােগ নিম্প্রয়ােজন।১২ (এই প্রকার পূর্বপক্ষের উত্তর এই যে), বিপ্রতিপত্তি-বাক্য দ্বারা যে সংশয় উৎপন্ন হয়, তাহা প্রকৃতপক্ষে অনুমিতির অঙ্গ। অর্থাৎ, পক্ষতার সাধক হইয়া অঙ্গ না হইলেও, অনুমিতির দ্বারা যেহেতু সেই সংশয় নিরাকৃত হইয়া থাকে, সেই হেতু তাহ অনুমিতির অঙ্গ। কারণ, যদি সংশয় না থাকে, তাহা হইলে বিচার দ্বারা কাহার নিবৃত্তি হইবে? এই নিমিত্ত সেই সংশয় প্রদর্শনের জন্য বিপ্রতিপত্তি-বাক্যের প্রয়ােগ আবশ্যক। সুতরাং, এই ভাবেই বিপ্রতিপত্তি-বাক্য বিচারের অঙ্গ বলিয়া পরিকীৰ্ত্তি ত হইতে পারে।১৩ তাৎপৰ্য।এই গ্রন্থের তৃতীয় শ্লোকে গ্রন্থকার ইহা সূচনা করিয়াছেন যে, যাহার নিঃসন্দিগ্ধভাবে অদ্বৈততত্ত্ব নিজে বুঝিতে চাহেন, তাহাদের জন্য যেমন এই অদ্বৈত-সিদ্ধি নামক গ্রন্থ বিরচিত হইতেছে, সেইরূপ সভাতে প্রতিবাদীকে সুবিচার দ্বারা নিরস্ত করিয়া স্বতস্থাপনও কিরূপে হইতে পারে, তাহাও এই গ্রন্থের সাহায্যে অনায়াসে আয়ত্ত করা যাইতে পারে। এক্ষণে প্রতিবাদীর সহিত কিরূপে বিচার দ্বারা স্বপক্ষ ব্যবস্থাপন করা যায়, সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ পরিচয় প্রদান করা যাউক। যে স্থানে এই প্রকার বিচারকার্য সাধিত হয়, তাহাকে সভা কহা যায়। এই সভামধ্যে চারি প্রকারের লােক সমবেত হইয়া থাকে, যথা-মধ্যস্থ, বাদী, প্রতিবাদী ও দর্শক বা সভ্য। বাদী, প্রতিবাদী ও সভ্যগণ যাহাকে সত্যবাদী ও পক্ষপাতবিহীন বলিয়া বিশ্বাস করেন, যে বিষয়ে বিচার হইবে, সেই বিষয়ে বাদী ও প্রতিবাদী কর্তৃক যে সকল প্রমাণ ও যুক্তি প্রযুক্ত হইবে, তাহা শীঘ্র যথাযথ ভাবে বুঝবার ও বুঝাইবার শক্তি যাঁহার অপ্রতিহত, এই প্রকার সুপণ্ডিত ব্যক্তিকেই মধ্যস্থ বলা যায় । মধ্যস্থ, দুইটী বিচাৰ্য পক্ষের বিষয় স্পষ্টভাবে নির্দেশ করিয়া দিলে সেই দুইটী পক্ষের মধ্যে কোন একটা অভিমত পক্ষ অবলম্বনপূর্বক যে ব্যক্তি প্রথমে বিচার করিতে উদ্যত হয়, তাহাকে বাদী বলা যায়। বাদীকর্তৃক স্বপক্ষের স্থাপনার অনুকূলে প্রমাণ ও যুক্তি প্রদর্শিত হইলে, যে ব্যক্তি উক্ত পক্ষকে খণ্ডন করিতে প্রথম পরিচ্ছে। (তাৎপৰ্য) -উগ্রত হয়, তাহার নাম প্রতিবাদী ; এবং এই সকল বিচার-পদ্ধতি সভায় বসিয়া যাহারা অবলোকন করেন, তঁাহাদিগকে সভ্য কহে। মধ্যস্থ, প্রথমে যে বাক্যের দ্বারা বাদী ও প্রতিবাদীর পরস্পর বিরূদ্ধ মত কি, তাহা প্রকাশ করেন, সেই সংশয়-জনক বাক্যকেই বিপ্রতিপত্তি-বাক্য কহে। বাদী ও প্রতিবাদীর মতে যাহা অসিদ্ধ, এইরূপ কোন বস্তুর স্বরূপ, যে বাক্য দ্বারা প্রকাশিত হইতে পারে, মধ্যস্থ সেইরূপবিপ্রতিপত্তি-বাক্য কখনও বলিবেন না। একটা উদাহরণ দেখিলেই ইহা বেশ বুঝিতে পারা যাইবে। মনে করুন, একটী সভায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি না—এই বিষয়ে বিচার হইবে। যিনি বাদী, তিনি কিন্তু,ঈশ্বর বলিয়া যে কোন বস্তু থাকিতে পারে, তাহা অঙ্গীকারই করেন না। এইরূপ বিচারের প্রারম্ভে মধ্যস্থ কি প্রকার বিপ্রতিপত্তি-বাক্য প্রয়ােগ করিতে পারেন, তাহা দেখা যাউক। তিনি যদি বলেন,“ঈশ্বর আছেন কি না,তাহা হইলে তাহার এই প্রকার বাক্যকে বিপ্রতিপত্তি- বাক্য বলা যায় না। কারণ, এই বাক্যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি না—এই প্রকার সংশয় প্রকটিত হইতেছে। প্রতিবাদী বলিবেন, যে, এইবাক্যে যে ঈশ্বর’ শব্দটী প্রযুক্ত হইয়াছে, আমার মতে তাহার কোন অর্থই প্রসিদ্ধ নাই। যদি তাহা প্রসিদ্ধই থাকিত, তবে তাহার অস্তিত্ব ও নাস্তিত্ব-বিষয়ে সংশয়ই বা কি প্রকারে হইবে ? যাহা সিদ্ধ বস্তু, তাহা আছে কি না”—এই প্রকার সংশয়ের বিষয় কি প্রকারে হইবে? সুতরাং, এস্থলে মধ্যস্থকে “ঈশ্বর আছেন কি না—এই প্রকার বিপ্রতিপত্তি-বাক্য প্রয়ােগ না করিয়া বলিতে হইবে যে, “এই পৃথিবীর নির্মাণ কোন চেতন-কর্তৃক হইয়াছে কি না ?” এই প্রকার বিপ্রতিপত্তি-বাক্য প্রয়ােগ করিলে বাদী ও প্রতিবাদী কেহই পূর্বোক্ত প্রকারে কোন প্রকার আপত্তি করিতে পারেন না। কারণ, এই বাক্যে এমন কিছু বলা হয় নাই, যাহা বাদী বা প্রতিবাদীর নিকটে অসিদ্ধ বলিয়া প্রতীত হইতে পারে। পৃথিবী একটী প্রসিদ্ধ বস্তু, চেতনও প্রসিদ্ধ বস্তু, কর্তাও প্রসিদ্ধ বস্তু, ঘটপটাদি বস্তুতে চেতন-কর্তৃত্বৰূপ বস্তুও প্রসিদ্ধ আছে, পরমাণু প্রভৃতি নিত্য বস্তুতেও চেতন-কর্তৃকত্বের অভাবও প্রসিদ্ধ আছে। এইরূপে দেখা গেল যে, এইরূপ বিপ্ৰতিপত্তিবাক্যের মধ্যে যতগুলি পদ বা বিশেষণ আছে, সকলেরই অর্থ বাদী ও প্রতিবাদী এই উভয়ের মতেই সিদ্ধ। সুতরাং, এই প্রকার বিপ্রতিপত্তি-বাক্যই যুক্তিসঙ্গত হইয়া থাকে। যেমন, বহ্নি ও তাহার অভাব-এই দুইটা বস্তুই প্রসিদ্ধ, এবং পৰ্বতরূপ যে বস্তু, তাহাও প্রসিদ্ধ, :
১৮ অবৈতসিঞ্চি। (তাৎপৰ্য) -লােকমধ্যে সেই পৰ্বতে বহ্নি ও তদভাবের যেরূপ সংশয় হইয়া থাকে, সেইরূপ প্রকৃতস্থলেও প্রসিদ্ধ অনিত্য পৃথিবী মাত্রেরই চেতন-কর্তৃকত্ব বা তাহার অভাব এই দুইটী পরস্পর-বিরুদ্ধ প্রসিদ্ধ বস্তুরও সংশয় হইতে কোন বাধা নাই । এইরূপ বিপ্রতিপত্তি-বাক্যের প্রয়ােগ করিবার আবশ্যকতা কি, তাহাই বুঝাইবার জন্য গ্রন্থকার এই স্থলে প্রযত্ন করিতেছেন। তিনি, পূৰ্বপক্ষী ন্যায়ামৃত-গ্রন্থকারের মতানুসারে প্রথমতঃ ইহাই বলিতেছেন যে, এই প্রকার বিপ্রতিপত্তি- বাক্য বিচারারম্ভের পুর্বে মধ্যস্থ যদি প্রয়ােগ না করেন, তাহা হইলে কোন ক্ষতি নাই। বিপ্রতিপত্তি-বাক্য হইতে যে সংশয় উৎপন্ন হয়, তাহা দ্বারা প্রকৃত বিচারের কোন উপকার হয় না। অনেকে বলেন, বিচারের ফল এই যে, বাদী বা প্রতিবাদী, যুক্তি ও প্রমাণের দ্বারা বিবাদ-বিষয়ীভূত কোন একটী বস্তুরই অনুমিতি করাইয়া দিবেন মাত্র। আর ইহাই যদি বিচারের ফল হয়, তাহা হইলে, কোন একটী বস্তুর অনুমিতি করিতে হইলে যে সকল কারণ থাকা একান্ত আবশ্যক, তাহা আছে কি না, ইহাই অগ্রে প্রদর্শিত হওয়া উচিত। এক্ষণে দেখা যাউক, অনুমিতি করিতে হইলে, কি কি কারণের আবশ্যকতা আছে ? নৈয়ায়িকগণ বলিয়া থাকেন, অনুমিতির তিনটী কারণ, যথা-ব্যাপ্তিজ্ঞান, পরামর্শ ও পক্ষা। যেহেতু” দ্বারা সাধ্যের অনুমান করা যায়, সেই হেতুতে সাধ্যের যে অবিনাভাবরূপ একটী সম্বন্ধ (অর্থাৎ যেখানে সাধ্য থাকে না সেখানে হেতু থাকে না, এবং হেতু যেখানে থাকিবে সেখানে নিশ্চয়ই সাধ্য থাকিবে—এই প্রকার সাধ্য ও হেতুর যে সম্বন্ধ, সেই অবিনাভাবরূপ সম্বন্ধটীর জ্ঞানকেই ব্যাপ্তিজ্ঞান কই যায়। এই প্রকার ব্যাপ্তিরূপ সম্বন্ধ যে হেতুতে আছে, সেই হেতুকে “ব্যাপ্য হেতু” কহা যায়। সেই ব্যাপ্য হেতুটী পক্ষে বিদ্যমান আছে, এই প্রকার যে জান, তাহাকেই পরামর্শ কহে। যে স্থানে হেতু দ্বারা সাধ্যের অনুমিতি হয়, তাহাকেই “পক্ষ” কহে। এক্ষণে “পক্ষতা” কাহাকে কহে, তাহা বুঝা যাউক। অনেক সময় দেখিতে পাওয়া যায় যে, পক্ষে সাধ্য আছে-এই প্রকার জ্ঞান যদি আমার থাকে, তাহা হইলে, সেই সময় ব্যাপ্তিজ্ঞান ও পরামর্শ হইলেও অনুমিতি হয় না, বা হইবার আবশ্যকতা থাকে না। এক্ষণে জিজ্ঞাস্য এই যে, পক্ষে সাধ্যের নিশ্চয় থাকিলে ব্যাপ্তিজ্ঞান ও পরশি এই গুয় কারণ থাকিলেও সাধ্যের অনুমিতি হয় না কেন ? নৈয়ায়িকগ প্রথম পরিচ্ছে। (তাৎপৰ্য)-ইহাতে এই প্রকার উত্তর দেন যে,অনুমিতির প্রতিসাধ্য পক্ষে রহিয়াছে” এই প্রকার নিশ্চয়ী প্রতিবন্ধক হয়। অর্থাৎ, এই প্রকার নিশ্চয় থাকিলে ব্যাপ্তিজ্ঞান ও পরামর্শরূপ দুইটী কারণ বিদ্যমান থাকিলেও প্রতিবন্ধকসদ্ভাব-বশতঃ সাধ্যের অনুমিতি হয় না। প্রকৃতস্থলে অনুমিতির পূর্বেই এখানে সাধ্য আছে—এই প্রকার নিশ্চয়টী হইয়াছে বলিয়া, উক্ত নিশ্চয়টী অনুমিতির প্রতিবন্ধক হইল। প্রতিবন্ধকের অভাবও কার্যের কারণ হইয়া থাকে। প্রকৃতস্থলে অনুমিতির প্রতিবন্ধক সাধ্য- নিশ্চয়; সুতরাং,ঐ সাধ্য-নিশ্চয়ের অভাবকেও অনুমিতির কারণ বলিতে হইবে। এই সাধ্য-নিশ্চয়ের অভাবরূপ যে কারণ,তাহাকেই নৈয়ায়িকগণ পক্ষতা” বলেন। পক্ষতা সম্বন্ধে আর একটী বক্তব্য এই যে, কেবল সাধ্য-নিশ্চয়ের অভাবকেই পক্ষতা বলিলে চলিবে না। কারণ, অনেক স্থলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, অনুমিতির পূর্বে প্রত্যক্ষ কিংবা শব্দাদি প্রমাণের দ্বারা সাধ্য-নিশ্চয় থাকিলেও যদি এইরূপ ইচ্ছা হয় যে, আমার অনুমিতি হউক বা অনুমিতি দ্বারা এই জিনিষটী ভাল করয়া বুঝি, তাহা হইলে এইরূপ স্থলে সাধ্য-নিশ্চয় থাকিলেও অনুমিতি হইয়া থাকে। এই কারণে অনুমিতির ইচ্ছা না থাকিলে যে, সাধ্য-নিশ্চয় থাকে, সেই নিশ্চয়ের অভাবকেই পক্ষতা বলিতে হইবে। ফলে দাঁড়াইতেছে যে—অনুমিতি হউক-এই প্রকার ইচ্ছা যদি থাকে, তাহা হইলে সাধ্য-নিশ্চয় থাকিলেও অনুমিতি হইবে, আর অনুমিতির ইচ্ছা না থাকিলে, যদি অন্য কোন প্রমাণের দ্বারা পূৰ্বেই সাধ্য- নিশ্চয় হইয়া যায়, তাহা হইলে, ঐরূপ সাধ্য-নিশ্চয় অনুমিতি হইতে দিবে না। এই জন্যই মূলে উক্ত হইয়াছে যে, “সিষাধয়িষা-বিরহ-সহকৃত যে সিদ্ধি (অর্থাৎ সাধ্য-নিশ্চয়) তাহার অভাবই পক্ষতা ;” ইহাই হইল পক্ষতা-লক্ষণের নিষ্টার্থ। এখানে যে “সিষাধয়িষা” শব্দটী আছে, তাহার অর্থসিদ্ধি অর্থাৎ ‘অনুমিতি হউক, এই প্রকার ইচ্ছা। কেহ কেহ বলিয়া থাকেন—‘পক্ষে সাধ্য আছে কি না এই প্রকার যে সংশয়, তাহাই পক্ষতা। বাস্তবিক পক্ষে এই প্রকার মত সঙ্গত হইতে পারে । কারণ, সংশয়কে যদি পক্ষতার কারণ বলিয়া অঙ্গীকার করা যায়, তাহা হইলে বলিতে হয়, যেখানে সংশয় নাই সেখানে অনুমিতি হইতে পারে না। ইহা কিন্তু, ঠিক নহে। কারণ, অনেক স্থলে আমরা দেখিতে পাই যে, সংশয় নাই অথচ অনুমিতি হইয়া যাইতেছে। উদাহরণ এই যে, আমরা যখন গৃহের মধ্যে অবৈতনিধি। (তাৎপৰ্য)—বসিয়া থাকি এবং হঠাৎ মেঘের গর্জন আমাদের কর্ণে প্রবিষ্ট হয়, তখন বাহিরে মেঘ আছে কি না—এই প্রকার সংশয় আমাদের মনে উদিত না হইয়াই একেবারে মেঘের অনুমিতি হইয়া যায়। ইহা দ্বারা সিদ্ধ হইতেছে যে, সংশয় অনুমিতির কারণ হইতে পারে না, এবং এই জন্যই গ্রন্থকার দেখাইয়াছেন যে, পক্ষতা-লক্ষণের মধ্যে সংশয় প্রবিষ্ট হইতে পারে না। তবে এক্ষণে জিজ্ঞাস্য এই হইতে পারে যে, যদি সংশয় অনুমিতির কারণ না হইল, তবে বিচারারম্ভের পূৰ্বে সংশয়ের বােধক যে বিপ্রতিপত্তি-বাক্য, তাহার প্রয়ােগ করা হয় কেন ? ইহার উত্তরে গ্রন্থকার ইহাই বলিতেছেন যে, সংশয় অনুমিতির কারণ না হইলেও বিচার দ্বারা কোনও একটী পক্ষ সিদ্ধান্তিত হইলে, আর সংশয় থাকিতে পারে না। সুতরাং, মধ্যস্থ বিপ্রতিপত্তি-বাক্য দ্বারা সংশয়ের উল্লেখ করিয়া থাকেন। সংশয় বিচারের কারণ না হইতে পারে, কিন্তু, বিচারের দ্বারা সংশয় নিরাকৃত হয় বলিয়া, বিচারারম্ভের পূর্বে সেই নিরাকরণীয় সংশয়ের উল্লেখ করা উচিত। কেহ কেহ বলেন যে, বিপ্ৰতিপ্ৰত্তি-বাক্য দ্বারা যে সংশয় হইতে পারে, তাহা অনুমিতির কারণ না হইলেও বাদী এবং প্রতিবাদীর মধ্যে কে কোন্ পক্ষ গ্রহণ করিবেন, তাহা বুঝাইবার জন্য বিপ্রতিপত্তি বাক্যের প্রয়ােগ, করা কর্তব্য। গ্রন্থকার কিন্তু এ প্রকার যুক্তির খণ্ডন করিয়াছেন। তিনি বলেন, যে মধ্যস্থ বিপ্রতিপত্তি বাক্যের প্রয়ােগ না করিয়াও যদি “বাদী এই পক্ষ গ্রহণ করিবেন ও প্রতিবাদী এই পক্ষ গ্রহণ করিবেন”, এইরূপ বাক্য-প্রয়ােগ করেন, তবে তাহার দ্বারাই বাদী ও প্রতিবাদী নিজ নিজ পক্ষ অবলম্বন পূর্বক বিচারে প্রবৃত্ত হইতে পারেন। সুতরাং, এইভাবে বিপ্ৰতিপত্তি--বাক্যের কোন উপযােগিতা থাকিতে পারে না। গ্রন্থকার নিজ মত উপরে বলিয়াছেন। আসল কথা এই যে, বিচার-প্রবৃত্তির প্রতি ফলজ্ঞানই কারণ ; এস্থলে ফল হইল সংশয়াভাব অর্থাৎ সংশয়-নিবৃত্তি। সেই সংশভাবের জ্ঞান হইল একটা বিশিষ্টজ্ঞান। এই বিশিষ্টজ্ঞানে বিশেষণীভূত সংশয়ের জ্ঞান আবশ্যক। বিপ্ৰতি- পক্তি-বাক্য শ্রবণ করিলে সন্দেহ উৎপন্ন হয়, আর সন্দেহ হইলেই আমি সন্দেহযুক্ত এইরূপ অনুব্যবসায় দ্বারা সংশয়রূপ বিশেষণের জ্ঞান হয়, এবং তখন সেই সংশয়- নিবৃত্তিরূপ ফলনও হয়। সেই ফলের ইচ্ছা বশতঃ বিচারে প্রবৃত্তি হইবে।
প্রথম পরিচ্ছে। তাদৃশসংশয়ং প্রতিবিপ্রতিপত্তেঃ কুচিৎ নিশ্চয়াদিপ্রতিবন্ধাৎ অজনক- হেপি স্বরূপযােগ্যত্বাৎ ১৪ বাদাদীনাং চ নিশ্চয়বত্ত্বে নিয়মাবাৎ নিশ্চিতে হি বাদংকুরুত ইত্যাভিমানিক-নিশ্চয়াভিপ্রায়ং।১৫ পর- পমাল্য অপি অহঙ্কারিণা বিপরীতনিশ্চয়বতে জল্লাদৌ প্রবৃত্তি- দর্শনাৎ ১৬ তস্মাৎ সময়বন্ধাদিবৎ স্বকৰ্তব্য-নির্বাহায় মধ্যস্থেন বিপ্রতিপত্তি প্রদর্শনীয়েব।১৭ (তাৎপৰ্য্য)—এইরূপ পরম্পরার বিচারে বিপ্রতিপত্তি-বাক্যের উপযােগ অর্থাৎ অঙ্গত্ব স্বীকৃত হয় ; সুতরাং, বিচারক্ষেত্রে বিপ্রতিপত্তি প্রদর্শন আবশ্যক।:৩ অনুবাদ।-কোন কোন স্থলে বাদী প্রভৃতির নিশ্চয়রূপ প্রতিবন্ধক থাকা নিবন্ধন, যে সংশয় বিচারের দ্বারা নিরাকৃত হইয়া থাকে, তাদৃশ সংশয় বিপ্ৰতি- পত্তি-বাক্যের দ্বারা উৎপন্ন না হইলেও, প্রতিবন্ধক না থাকিলে বিপ্রতিপত্তি-বাক্য দ্বারা তাদৃশ সংশয় হইবার যােগ্যতা আছে বলিয়া, সেরূপ স্থলেও বিপ্ৰতিপত্তি- বাক্যের প্রয়ােগ হইয়া থাকে।১৪ (আরও এক কথা এই যে ) বাদী এবং প্রতি বাদীর ( সকল বিচার আরম্ভ হইবার পূর্বে ) যে নিশ্চয় থাকিবেই তাহাও সম্ভব- পর নহে। “যাহাদিগের নিশ্চয় আছে এইরূপ বাদী এবং প্রতিবাদী বাদ-কথাতে প্রবৃত্ত হয়, এই প্রকার যে লােকে মনে করে, তাহার তাৎপর্য এই যে, প্রকৃত নিশ্চয় না থাকিলেও অভিমানবশতঃ আমার নিশ্চয় আছে—এই প্রকার ভান করিয়া বাদী ও প্রতিবাদী বাদ-কথাতে প্রবৃত্ত হইয়া থাকেন।১৫ (স্থলবিশেষে এরূপও দেখিতে পাওয়া যায় যে) যে ব্যক্তির “আমি যাহা ইচ্ছা তাহাই বিচারের দ্বারা ব্যবস্থাপন করিতে পারি”। এই প্রকার অহঙ্কার আছে, সে, যে পক্ষ প্রতিপাদন করিতে যাইতেছে, তদ্বিষয়ে তাহার প্রতিকূল নিশ্চয় থাকিলেও, সেই অনভিমত পক্ষ অবলম্বন করিয়াও জল্প ও বিতণ্ডাতে প্রবৃত্ত হইয়া থাকে।১৬ এই কারণে ইহা সিদ্ধ হইতেছে যে, “সময়-বন্ধ করিয়া দেওয়া যেরূপ মধ্যস্থের কর্তব্য কৰ্ম্ম, অর্থাৎ এই মত অবলম্বনে উভয়কে এই সময়ের মধ্যে বিচার করিতে হইবে, এইরূপ নির্দেশ করা যেমন মধ্যস্থের কর্তব্য কৰ্ম্ম, সেইরূপ বিপ্রতিপত্তি-বাক্যের প্রয়ােগও মধ্যস্থের পক্ষে একটী কৰ্তব্য-কৰ্ম্ম বলিয়া বিবেচিত হইয়া থাকে।
অবৈতসিদ্ধি। তাৎপর্য।-এখানে বলা হইল যে, বাদী ও প্রতিবাদীর বিপ্রতিপত্তি বাক্য শ্রবণ করিয়া সংশয় হইলে এবং তৎপরে সে নিজেকে সন্দেহবিশিষ্ট বলিয়া জ্ঞান করিলে, সংশয়রূপ বিশেষণ-জ্ঞান-নিবন্ধন সংশয়নিবৃত্তিরূপ ফলজ্ঞান-প্রযুক্তই সে বিচারে প্রবৃত্ত হইবে—এইরূপে বিপ্রতিপত্তি-বাক্যের বিচারে উপযােগিতা আছে। এস্থলে জিজ্ঞাস্য হইতে পারে যে, বাদী ও প্রতিবাদীর নিজ নিজ পক্ষ নিশ্চয় কালে কি করিয়া বিপ্ৰতিপত্তি-বাক্য শ্রবণ দ্বারা সংশয় হইবে ? ইহার উত্তর এই যে, নিশ্চয়রূপ প্রতিবন্ধক থাকিলে সংশয় উৎপন্ন হয় না বটে, কিন্তু যেখানে নিশ্চয়জ্ঞানরূপ প্রতিবন্ধক নাই, সেখানে সংশয় হইবার কোন বাধা নাই। অতএব নিশ্চয় কালে বাদী প্রতিবাদীর বিপ্রতিপত্তি বাক্য দ্বারা সংশয় না হইলেও সংশয়- কারণত্ব-জ্ঞানবশতঃ অর্থাৎ ‘সংশয়টী কাৰ্য্য, বিপ্রতিপত্তি তাহার কারণ, এইরূপ কাৰ্য্য- কারণভাবসম্বন্ধ পূর্বে জানা থাকায়, সম্প্রতি এই সম্বন্ধিদ্বয়ের মধ্যে এক সম্বন্ধীর অর্থাৎ বিপ্রতিপত্তি-বাক্যের জ্ঞান হইলেই অপর সম্বন্ধী যে সংশয়, তাহার স্মরণাত্মক বিশেষণজ্ঞান হইতে পারে, আর তজ্জন্য উক্ত বিশিষ্ট-জ্ঞানাদি-প্রকারে বিচারে প্রবৃত্তিও হইতে পারে, এবং তাহার ফলে বিপ্রতিপত্তি-বাক্যের বিচারে উপ- যােগিতাই সিদ্ধ হইতে পারে। বাদী প্রতিবাদীর স্বস্ব পক্ষ নিশ্চয়কালে নিজ নিজ সংশয় নিবৃত্তিরূপ ফলকে উদ্দেশ্য করিয়া বিচারে প্রবৃত্ত না হইলেও সভাপতি ও সভ্য প্রভৃতির সংশয় নিবৃত্তির জন্য তাহাদের বিচারে প্রবৃত্তি হইতে পারে। সুতরাং, সেই স্থলে সেই ফলজ্ঞানের জন্য সংশয়াভাবের বিশেষণরূপ সংশয়-জ্ঞানের আবশ্যকতা থাকে, এবং সেই জন্য উক্ত প্রকারে বিপ্ৰতিপত্তি-বাক্যের প্রয়ােজন হইবে । কিন্তু ইহাতেও এরূপ জিজ্ঞাস্য হইতে পারে যে, যেখানে সভ্য প্রভৃতি কাহারও সংশয় নাই, সেখানে কিরূপে সংশয়-নিবৃত্তির উদ্দেশ্যে বিচার হইবে। অতএব এস্থলে বিজয় উদ্দেশ্যেই বিচারে প্রবৃত্তি হইবে বলিতে হইবে। তাহা হইলে এখানে বিপ্ৰতিপত্তি-বাক্যের উপযযাগিতা থাকিল না। ইহার উত্তর এই যে, উক্ত স্থলে স্থলে তৎকালে সংশয়াভাব নিশ্চিত থাকিলেও এই নিশ্চয়-জন্য সংস্কারের কোনও কালে উচ্ছেদ হইতে পারে এজন্য, যাহাতে ভবিষ্যতে সংশয় হয়, এই ইচ্ছাবশতঃও বিচারে প্রবৃত্তি হইতে পারে। কেবল বিজয়- ইচ্ছা থাকিলেই বিচারে প্রবৃত্তি হইবে—ইহাও বলা যায় না। আরও সময়-বন্ধ” প্রথম পরিচ্ছেদ। ২৩ (মিথ্যাকোটিক-বিপ্রতিপত্তিনির্দেশঃ।) তত্র মিথ্যাত্বে বি প্রতিপত্তি ব্ৰহ্ম প্রমাতিরিক্তাবাধ্যত্বে সতি সনে প্রতীত্যহং চিঞ্জিং প্রতিপদ্মোপাধৌ ত্ৰৈকালিক-নিষেধ-প্রতিঘােগি, ন বা পারমার্থিকত্বাকারেণোক্ত-নিষেধপ্রতিযােগি ন বেতি।১৮ (তাৎপৰ্য)- অর্থাৎ তুমি এই মত অবলম্বন করিয়া এই সময়ের মধ্যে বিচার কর) ইত্যাদি মধ্যস্থ না বলিয়া দেন, তাহা হইলে বাদী ও প্রতিবাদী বিচার করিতে করিতে অন্য কোন প্রাসঙ্গিক মত অবলম্বন করিয়া অপরে অপরকে পরাজিত করিতে পারে। আরও বাদী ও প্রতিবাদীকে পরীক্ষা করাও মধ্যস্থের কর্তব্য কৰ্ম্ম। অন্যথা মূখের সহিত পণ্ডিতের বিচার হইলে মধ্যস্থই উপহসিত হইবেন। এইজন্যও বিপ্রতিপত্তি প্রদর্শন করা মধ্যস্থের কর্তব্য কৰ্ম্ম। নচেৎ প্রাসঙ্গিক বিষয় লইয়া একতরের জয় অথবা পরাজয় হইলে প্রকৃত বিষয়ের জয়-পরাজয়-নির্ণরূপ মধ্যস্থের কৰ্ত্তব্য কৰ্ম্ম নিৰ্বাহ হয় না। কিন্তু, বিপ্রতিপত্তি-বাক্যের উল্লেখ করিলে সকলেই তাহা শুনিয়া বুঝিবে যে, সে দিন বিচাৰ্য্য বিষয় কি? সুতরাং, বাদী ও প্রতিবাদী তাহার অপলাপ করিতে সাহসীও হইবে না। এজন্য সার্বকালিক সংশয় নিবৃত্তিরূপ ফলনিষ্পত্তির জন্য এবং জয়-পরাজয় ব্যবস্থাপনরূপ স্বকৰ্তব্য-সাধনের জন্য, মধ্যস্থকে বিপ্ৰতিপত্তি-বাক্য প্রয়ােগ করিতেই হইবে। সুতরাং, সিদ্ধ হইল যে বিচারে বিপ্ৰতিপত্তি-বাক্যের উপযযাগিতা আছে ।১৭ অনুবাদ—সেই বিচারের আরম্ভকালে এইরূপবিপ্রতিপত্তি-বাক্যের প্রয়ােগ করিতে হইবে, যথা—যে বস্তু সৎ বলিয়া প্রতীতিযােগ্য, যাহা ব্ৰহ্ম হইতে ভিন্ন, এবং যাহা ব্রহ্মবিষয়ক প্রমাজ্ঞান হইতে ভিন্ন কোন প্রকার প্রজ্ঞানের দ্বারা বাধিত নহে, সেই বস্তু ( অর্থাৎ পরিদৃশ্যমান ক্ষিতি, জল প্রভৃতি জগৎ) প্রতিপন্ন-উপাধিতে ত্ৰৈকালিক নিষেধের প্রতিযােগী কি না ? অথবা, পারমার্থিকত্বরূপে যে বৈকালিক নিষেধ তাহার প্রতিযােগী কিনা ?।১৮ তাৎপৰ্য-“বিপ্রতিপত্তি-বাক্য বিচারের অঙ্গ” ইহা যদি সিদ্ধ হইল তাহা হইলে এস্থলে বক্ষ্যমাণ-বিচারের বিপ্রতিপত্তি-বাক্যটী কি তাহা বুঝা যাউক। কিন্তু, এই বিপত্তিপত্তিবাক্য বুঝিতে হইলে প্রম, পারমার্থিক, উপাধি, অবৈতসিদ্ধি। ২৪ (তাৎপৰ্য)—নিষেধ, বাঁধ, ও প্রতিযোগী এই কয়টী দার্শনিক শব্দের কি অর্থ, তাহা ভাল করিয়া বুঝিতে হইবে। এই কারণে অগ্রে এই কয়টী শব্দের অর্থ কি, তাহ, প্রদর্শন করা যাইতেছে। “মা” এই শব্দটীর অর্থ যথার্থ জ্ঞান, অর্থাৎ যে জ্ঞানের দ্বারা আমরা যে ভাবে যে বস্তুকে বুঝিয়া থাকি, সেই বস্তু যদি সেই ভাবেরই হয়, অর্থাৎ যে জ্ঞানের দ্বারা আমরা এই বস্তুটীকে যেমন বুঝিয়াছি, “এ বস্তুটী ঠিক সেরূপ নহে” এই প্রকার বিপরীত জ্ঞানের দ্বারা যদি সেই জ্ঞান বাধিত না হয়, তাহা হইলে সেই জ্ঞানকে প্রমা বা যথার্থ জ্ঞান বলা যায়। যে বস্তু সৰ্ব্বদা একরূপে বিদ্যমান থাকে, কোন কালেই যাহার অবস্থান্তর প্রাপ্তি হয় না,যাহার বিনাশ বা উৎপত্তি নাই,তাহাকেই পারমার্থিক বলা যায়। এইরূপ পারমার্থিকের যাহা স্বভাব বা স্বতঃসিদ্ধ ধৰ্ম্ম, তাহাই “পারমার্থিকত্ব” এই শব্দ দ্বারা প্রতিপাদিত হইয়া থাকে। উপাধি” শব্দের এখানে এই অর্থ যে “যে বস্তুর উপর অন্য কোন আর একটী বস্তু আধেয়রূপে প্রতিভাসমান হইয়া থাকে, সেই বস্তুই *এই স্থলে উপাধি” শব্দের প্রতিপাদ্য ; বস্তুর আশ্রয়ভাবে যাহা আমাদিগের জ্ঞানের বিষয় হইয়া থাকে, তাহাই এই স্থলে উপাধি শব্দের দ্বারা প্রতিপাদিত হইতেছে। “নিষেধ” শব্দের অর্থ অভাব। সচরাচর আমরা বলিয়া থাকি এখানে অমুক বস্তু নাই এইরূপ কথা শুনিয়া এই কথার মধ্যে প্রবিষ্ট “নাই” এই শব্দটীর যে অর্থ আমরা বুঝিয়া থাকি, সেই বস্তুকে নিষেধ বা অভাব কহা যায় । যাহার অভাবকে আমরা বুঝিয়া থাকি, তাহাকে প্রতিযােগী” কহ যায়। যেমন ঘটাভাবের প্রতিযােগী হয় ঘট। প্রতিযােগীর যে ধৰ্ম্ম, তাহার নাম “প্রতিযােগিতা, এই প্রতিযােগিতাকে অভাবের দ্বারা বিশেষিত করা যায় বলিয়া ইহাকে অভাবের প্রতিযােগিতা অথবা অভাব-নিরূপিত প্রতিযােগিতা কহা যায়। এই প্রতিযােগি- তাকে অভাব দ্বারা বিশেষিত করা যায় বলিয়া ইহাকে অভাবীয় প্রতিযােগিতা বলা যায়। সম্বন্ধেও প্রতিযােগী থাকে। যেমন ঘট-সংযােগ সম্বন্ধে ভূতলে আছে, যখন বলা হয় তখন ঘটটী হয় ঐ সংযােগ-সম্বন্ধের প্রতিযােগী। কিন্তু এস্থলে তাহার কথা অভি- প্রেত নহে। যাহা হউক, “বাধ্য” শব্দের অর্থ কি এক্ষণে তাহাই বুঝা যাক। বাধ শব্দের অর্থ বিপরীত জ্ঞান, সেই বিপরীত জ্ঞান হইলে পূৰ্বজ্ঞাত যে বস্তুর নিবৃত্তি হইয়া থাকে, অর্থাৎ পূৰ্ব্বে সত্য বলিয়া প্রতিভাত বস্তুকে আমরা “ইহা মিথ্যা বাইহা নিবৃত্ত হইয়াছে” এইরূপ বুঝিয়া থাকি, সেই বস্তুকেই “বাধ্য” বা “মিথ্যা” বলা যায়। কোন একটী বুৰ্জ্জুতে আমাদিগের ইন্দ্রিয়ের দোষ বশতঃ সময়ে সময়ে আমরা সর্প প্রথম পরিচ্ছেদ। '. } । সেই বস্তুর (তাৎপৰ্য)-বলিয়া বুঝিয়া থাকি, পরে “ইহা রঞ্জু, সর্প নহে”, এই প্রকার বিপরীত জ্ঞান হইলে, আমরা পূৰ্ব্বে সত্য বলিয়া যাহাকে বুঝিয়াছিলাম, সেই সর্পের নিবৃত্তি হইয়া থাকে। এই কারণে এরূপ স্থলে ঐ ভ্ৰম-কল্পিত সৰ্পকে “বাধ্য” বলা যাইতে পারে। এক্ষণে এই বিপ্ৰতিপত্তি-বাক্যের প্রকৃত তাৎপর্য কি, তাহা বিস্পষ্ট ভাবে বুঝিতে হইলে আমাদের প্রথমতঃ “সত্তা” সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ জ্ঞান লাভ করা উচিত গ্রন্থকারের মতে সত্তাকে চারিভাগে বিভক্ত করা যায়, যথা,-পারমার্থিক সত্তা, ব্যবহারিক সত্তা, প্রতিভাসিক সত্তা ও তুচ্ছ সত্তা। যে বস্তু কোনও কালে অবস্থার প্রাপ্ত হয় না, যাহার উৎপত্তি বা বিনাশ নাই এবং যাহা সর্বদাই এক রূপে বিদ্যমান থাকে, সেই বস্তুর যে সত্তা, তাহাকে ‘পারমার্থিক সত্তা” বলে। যাহা লৌকিক ব্যবহারের জন্য ‘সৎ বলিয়া অঙ্গীকৃত হয়, ব্রহ্মজ্ঞান না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোন প্রকার বিপরীত জ্ঞানের দ্বারা যাহার নিবৃত্তি হওয়া সম্ভবপর নহে, যে সত্তা, তাহাকে ‘ব্যাবহারিক সত্তা” বলা যায়। যেমন ঘট, পট, মঠ, পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু ও আকাশ প্রভৃতির যে সত্তা, তাহাই ব্যবহারিক সত্তা। যে বস্তু কোন প্রকার আদান-প্রদানাদি ব্যবহারের গােচর হয় না, অথচ যাহা প্রত্যক্ষের বিষয় হয়, এবং যাবৎ সেই প্রত্যক্ষ বিদ্যমান থাকে, তাবৎকাল পর্যন্ত যাহার অস্তিত্ব অঙ্গীকার করা যায়, সেই বস্তুর যে সত্তা, তাহার নাম “প্রাতিভাসিক সত্তা”। যেমন—শুক্তিতে রজতভ্রান্তিকালে রজতের যে সত্তা, তাহাই রজতের প্রতিভাসিক সত্তা। যে বস্তুর উক্ত ত্রিবিধ সত্তার মধ্যে কোন সত্তাই নাই, অথচ আমরা কথা-প্রয়োগকালে দৃষ্টান্ত-স্বরূপে যাহার উল্লেখ করিয়া থাকি, সেই বস্তুর সত্তাকেই “তুচ্ছ সত্তা” বলা যায় । যেমন কোন একটী পদার্থ যেখানে হয় নাই, বা যাহা হইতে পারে না, তাহার স্বরূপ লােককে বুঝাইবার জন্য আমরা সময়ে সময়ে বলিয়া থাকি—এই বস্তুটী গগন-কুসুমের ন্যায়। এইরূপ স্থলে দৃষ্টান্তরূপে আমরা যে গগন- কুসুমের উল্লেখ করিয়া থাকি, বাস্তবিক পক্ষে সেই গগন-কুসুমের কোন সত্তাই নাই। আমরা মনে মনে একটী তাহার অবিদ্যমান-স্বরূপ-কল্পনা করিয়া লােককে বুঝাইবার জন্য “গগন-কুসুম” এই প্রকার শব্দ প্রয়ােগ করিয়া থাকি। এইরূপ স্থলে গগন-কুসুমের যে সত্তা, আমাদিগের মনে প্রতিভাত হইয়া থাকে, তাহাকেই তুচ্ছ সত্তা বলে। ইহাই হইল চারি প্রকার সত্তা।
অথৈসিদ্ধি। (তাৎপৰ্য)-এক্ষণে এই বিপ্ৰতিপত্তি-বাক্যের তাৎপৰ্যাৰ্থ কি, তাহা বিশদভাবে বুঝিবার চেষ্টা করা যাউক। অদ্বৈতবাদীদিগের মতে ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকার উৎপন্ন হইলে, * প্রপঞ্চের অর্থাৎ এই পরিদৃশ্যমান বিশ্বের নিবৃত্তি হইয়া থাকে। যেমন, শুক্তির সাক্ষাৎকার হইলে শুক্তির উপর কল্পিত যে প্রতিভাসিক রজত, তাহার নিবৃত্তি হইয়া থাকে, সেইরূপ ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎকার হইলে ব্রহ্মের অজ্ঞান দ্বারা পরিকল্পিত এই যে বিশ্ব-সংসার, ইহারও নিবৃত্তি হইয়া থাকে। কিন্তু, ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকার ভিন্ন অন্য কোন প্রকার জ্ঞানের দ্বারা এই প্রপঞ্চের নিবৃত্তি হয় না। সুতরাং, ব্যাবহারিক বস্তু মাত্রেই ব্ৰহ্মজ্ঞান ব্যতিরিক্ত অন্য কোন প্রকার জ্ঞানের দ্বারা নিবৃত্ত হইবার নহে। ব্যাবহারিক বস্তু মাত্রকে মিথ্যা বলিয়া প্রমাণ করিতে হইলে তাহাকেই অনুমানের পক্ষরূপে এবং মিথ্যাকে সাধ্যরূপে নির্দেশ করা উচিত। যাহাতে কোন সাধ্যের অস্তিত্ব অনুমান করা যায়, তাহাকেই নৈয়ায়িকগণ “পক্ষ” এবং যাহার অনুমান করা হয়, তাহাকে “সাধ্য বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন। এখন মিথ্যাত্বরূপ সাধ্য ব্যাবহারিক বস্তুমাত্রেই অনুমিত হইবে, এই প্রকার অভিপ্রায়ে, অদ্বৈতবাদিগণ সেই অনুমিতির পক্ষ” এই ভাবে নির্দেশ করিতেছেন যে, “ব্ৰহ্মপ্রম। ব্যতিরিক্ত অন্য কোন প্রকার জ্ঞানের দ্বারা যাহা অবাধিত” তাহাই এস্থলে পক্ষ। ইহার অর্থ, ব্ৰহ্মপ্রম হইতে ভিন্ন যে জ্ঞান, তাহা ঘট-পট প্রভৃতি বস্তু-বিষয়ক জ্ঞান। সেই জ্ঞানের দ্বারা কোন্ বস্তু বাধিত নহে? অর্থাৎ, এই পরিদৃশ্যমান ব্যাবহারিক জগৎই ঐ প্রকার জ্ঞানের দ্বারা বাধিত নহে। সুতরাং, উক্ত বিশেষণের দ্বারা গ্রন্থকার ব্যাবহারিক জগৎই যে তাঁহার অনুমানে “পক্ষ” হইল তাহাই বুঝাইয়াছেন। ইহার উপর এরূপ আশঙ্কা হইতে পারে যে, যে ব্ৰহ্মবস্তুটী কোন প্রকার জ্ঞানের দ্বারা বাধিত নহে, যাহা অবিনাশী ও পরমার্থ সত্য, তাহাও ত ব্ৰহ্ম প্রমা- ব্যতিরিক্ত অন্য কোন প্রকার জ্ঞানের দ্বারা বাধিত নহে, অধিকন্তু, তাহা ব্ৰহ্মপ্রমা দ্বারাও বাধিত নহে। উক্ত “পক্ষ” মধ্যে যে বিশেষণটী দেওয়া হইয়াছে, তাহা দ্বারা ত ব্রহ্মের স্বরূপও প্রতিপাদিত হইতে পারে, তবে কি ব্ৰহ্মও পক্ষের মধ্যে প্রবিষ্ট ? যদি বল, ব্ৰহ্ম পক্ষের মধ্যে প্রবিষ্ট হইলে ক্ষতি কি ? তাহার উত্তর এই যে, ব্ৰহ্ম যদি পক্ষের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়, তাহা হইলে ‘যাহা পক্ষের মধ্যে প্রবিষ্ট তাহারই মধ্যে সাধ্যের অনুমান হইয়া থাকে এই নিয়মানুসারে ব্রহ্মের উপরও মিথ্যাত্ব সম্ভাবনা হয়। সুতরাং, ক্ষতি আছে বৈ কি ?
প্রথম পরিচ্ছে। ২। (তাৎপৰ্য) -এই প্রকার আশঙ্কা নিরাকরণ করিবার জন্য গ্রন্থকার পক্ষ-মধ্যে *চিদ্ভিন্ন” এই বিশেষণটী দিয়াছেন, অর্থাৎ ব্রহ্ম চিৎস্বরূপ, তিনি চিৎ হইতে ভিন্ন নহেন। ব্যাবহারিক প্রপঞ্চ কিন্তু, চিৎ হইতে ভিন্নই হইয়া থাকে। সুতরাং, চিভিন্ন এই বিশেষণটী আছে বলিয়া ব্ৰহ্মকে পক্ষ-রূপে ধরা গেল না। এক্ষণে আর একটী শঙ্কা হইতে পারে যে, যে সকল বস্তুর তুচ্ছ-সত্তা আছে বলিয়া পূর্বে প্রদর্শিত হইয়াছে, সেই সকল বস্তু, অর্থাৎ গগন-কুসুম প্রভৃতিও ত চিদ্ভিন্ন, এবং কোন কালেও সে বস্তু নাই বলিয়া তাহাকে বাধ্য-বস্তুর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। উহা বাধ্যও নহে, অবাধ্যও নহে। সুতরাং, ব্ৰহ্মপ্রমা ভিন্ন অন্য কোন প্রকার জ্ঞানের দ্বারা তাহা বাধ্য নহে, আর তাহাই যদি হইল, তাহা হইলে উক্ত বিশেষণদ্বয়ের দ্বারা তাহাকেও বুঝা যাইতেছে, এই কারণে ঐ গগন- কুসুমাদিও পক্ষের মধ্যে প্রবিষ্ট হইতে পারে। যদি বল, গগন-কুসুমাদি পক্ষের মধ্যে প্রবিষ্ট হইলে ক্ষতি কি? তাহার উত্তর এই যে, পক্ষের একদেশেও যদি সাধ্যের বাধ থাকে, তবে অবচ্ছেদাবচ্ছেদে সাধ্যের অনুমান দুষ্ট হইয়া থাকে। প্রকৃতস্থলে যদি গগন-কুসুমকেও পক্ষের মধ্যে প্রবিষ্ট হইতে দেওয়া যায়, তাহা হইলে তাহার মিথ্যাত্ব নাই বলিয়া অনুমানে আংশিক বাধ-দোষের প্রসক্তি হইতে পারে। এই প্রকার আশঙ্কা নিরাকরণের জন্য গ্রন্থকার পক্ষ-মধ্যে আর একটা বিশেষণের উপন্যাস করিয়াছেন। সে বিশেষণটী সনে প্রতীত্যহত্ব” ; অর্থাৎ যাহা সরূপে প্রতীত হইবার যােগ্য। গগন-কুসুম কখনই সৎ বলিয়া প্রতীত হইবার বােগ্য নহে। এই কারণে তাহা পক্ষের মধ্যে প্রবিষ্ট হইতে পারে না। এই স্থলে বিশেষ দ্রষ্টব্য এই যে, সাধারণতঃ অনুমানের নিয়ম এই যে, যাহ। সাধ্য হইবে, তাহা দুই ভাবে সাধিত হইতে পারে। প্রথম যতগুলি পক্ষ থাকিবে, তাহার প্রত্যেকেই সাধ্যের সিদ্ধি হওয়া; দ্বিতীয়, পক্ষ মধ্যে পরিগণিত কোন একটা বস্তুতে ঐরূপ সাধ্যের সিদ্ধি হওয়া আবশ্যক। এই দুইটী পক্ষের মধ্যে বাদীর ইচ্ছানুসারে কোন একটী পক্ষ পরিগৃহীত হইয়া থাকে। প্রত্যেক পক্ষতেই সাধ্যসিদ্ধি যদি বাদীর উদ্দেশ্য হয়, তাহা হইলে সেই অনুমানকে অবচ্ছেদাবচ্ছেদে অনুমান কহে। আর পক্ষান্তৰ্গত কোন এক স্থলে সাধ্যসিদ্ধি যদি বাদীর উদ্দেশ্য হয়, তাহা হইলে সেই অনুমানকে সমানাধিকরণ্যে অবৈতসিদ্ধি। 7" (তাৎপৰ্য)—অনুমান কহে। অবচ্ছেদাবচ্ছেদে সাধ্যের অনুমান যেস্থলে বাদীর অভিপ্রেত হয়, সেস্থলে সাধ্য যদি প্রত্যেক পক্ষে বিদ্যমান না থাকে, তাহা হইলে উক্ত অনুমান দূষিত হইয়া থাকে। প্রকৃতস্থলেও মিথ্যাত্বের অনুমান করিতে প্রবৃত্ত বাদীর যদি অবচ্ছেদাবচ্ছেদে অনুমান করাই অভিপ্রেত হয়, তবে, যদি তুচ্ছ বস্তুকেও পক্ষের মধ্যে প্রবিষ্ট করিয়া লওয়া হয়, তাহা হইলে, যে সাধ্য অর্থাৎ মিথ্যাত্ব পরে সাধিত হইবে, তাহার সিদ্ধি তুচ্ছ বস্তুর উপর হওয়া উচিত। বাস্তবিক গ্রন্থকারের প্রদর্শিত যে মিথ্যাত্ব, তাহার প্রতিভাসিক ও ব্যাবহারিক এই দ্বিবিধ বস্তুর উপরেই থাকে। কারণ, মিথ্যাত্বের যেরূপ নিৰ্বচন পরে করা হইবে, তাহ! দ্বারা স্পষ্টই বুঝা যাইবে যে, এই মিথ্যাত্বরূপ সাধ্য গগন-কুসুমাদিরূপ তুচ্ছ বস্তুর উপর থাকিতে পারে । সুতরাং, প্রকৃতস্থলে তুচ্ছ বস্তুকে যদি পক্ষের মধ্যে প্রবিষ্ট করিয়া দেওয়া হয়, এবং অবচ্ছেদাবচ্ছেদে অনুমান করাই যদি বাদীর উদ্দেশ্য হয়, তাহা হইলে পক্ষের অন্তর্গত তুচ্ছবস্তুতে মিথ্যাত্বরূপ সাধ্য থাকিতে পারে না বলিয়া, এই অনুমান দূষিত হইবে। এই কারণে “সনে প্রতীত্যই” অর্থাৎ সপে প্রতীতির যােগ্য এই প্রকার বিশেষণের দ্বারা গ্রন্থকার গগন-কুসুমাদিরূপ তুচ্ছ বস্তুকে পক্ষ হইতে বহিস্কৃত করিয়াছেন। পক্ষ মধ্যে “প্রতিপনােপাধি” এই একটী শব্দ প্রযুক্ত আছে। তাহার অর্থ- আশ্রয় স্বরূপে প্রতিভাসমান যে ধৰ্মী অর্থাৎ পক্ষ, তাহাই। সেই প্রতিপন্ন উপাধিতে যে ত্ৰৈকালিক নিষেধ অর্থাৎ সর্বদা বিদ্যমান যে অভাব, তাহার প্রতি যােগিত্ব। ফলতঃ এই দাড়াইতেছে যে, এই পরিদৃশ্যমান প্রপঞ্চের যাহা আধার বলিয়! আমাদের নিকট প্রতীয়মান হইয়া থাকে, সেই আধারে বাস্তবিক সর্বদা ইহাদিগের অভাব বিদ্যমান আছে কি না? যদি সৰ্ব্বদাই ইহাদিগের অভাব থাকে, এবং তাহা অনুমানের দ্বারা সিদ্ধ হয়,তাহা হইলেই অদ্বৈতবাদীর অভিপ্রায় সিদ্ধ হয়। তাহারা বলেন যে, যদি একমাত্র ব্রহ্মই “সং” হন, তাহা হইলে এই যে “আধার ও আধেয় ভাবের ব্যবহার আমরা করিয়া থাকি, ইহা পারমার্থিক হইতে পারে না। আমাদিগের অনাদি পূৰ্ব্বসংস্কারের বশে আমরা বস্তুতে আধার ও আধেয় ভাবের কল্পনামাত্র করিয়া থাকি এবং সেই কল্পনামূলক আধার ও আধের বলিয়া ব্যবহার করিয়া থাকি। ফলত, যুক্তি ও প্রমাণের দ্বারা ইহা ব্যবস্থাপিত হইবে যে,এই আধার ও আধেয় ভাব পারমার্থিক সত্য নহে। .
প্রথম পরিচ্ছেদ। . ( বিপ্ৰতিপত্তির স্বরূপ নির্ণয়।) অত্র চ পক্ষতাবচ্ছেদক-সামানাধিকরণ্যেন সাধ্যসিদ্ধেরুদ্দেশ্যৎ পকৈদেশে সাধ্যসিদ্ধাবপি সিদ্ধসাধনতেতি মতে, শুক্তিরূপপ্য সিদ্ধ সাধন-বারণায় ব্রহ্মজ্ঞানেরবািধ্যত্বং পক্ষবিশেষণ।১৯ যদি পুনঃ পক্ষ- বচ্ছেদকাবচ্ছেদেনৈব সাধ্যসিদ্ধিরুদ্দেশ্যা, তদৈকদেশে সাধ্যসিদ্ধাবপি সিদ্ধসাধনাভাবাৎ তদ্বারকং বিশেষণমনুপাদেয়।২০ ইতরবিশেষণ- দ্বয়ং তু তুচ্ছে ব্ৰহ্মণি চ বাধবারণায় অাদরণীয়মেব।২১ (তাৎপৰ্য)—অন্য ভাবেও সাধ্যের নির্দেশ করিতে পারা যায়, তাহাও দেখাইবার জন্য গ্রন্থকার নির্দেশ করিতেছেন যে, পারমার্থিকত্ব-রূপে যে অভাব, সেই অভাবের প্রতিযােগিত্ব এই প্রপঞ্চে আছে কি না ? ইহার তাৎপৰ্য্য এই যে, আধারে আধেয় ব্যাবহারিকভাবে বিদ্যমান থাকিলেও পারমার্থিকত্ব-রূপে আধেয়ের যে অভাব, তাহা আধারে সর্বদাই বিদ্যমান থাকে, এই ভাবে যদি সাধ্যের সিদ্ধি হয়, তাহা হইলেও এই অনুমানের বলে গ্রন্থকারের অভীষ্ট অর্থাৎ “অদ্বৈত- সিদ্ধি” হইয়া যায়। কারণ, অদ্বৈতবাদী এই পরিদৃশ্যমান প্রপঞ্চের পারমার্থিক সত্তারই অপলাপ করিয়া থাকেন, ইহার ব্যাবহারিক সত্তা স্বীকারে তাহার কোনও বাধা নাই। দ্বৈতবাদিগণ কিন্তু, ইহার পারমার্থিক সত্তাই স্বীকার করিয়া থাকেন। ইহা যে কল্পিত, বা অধ্যস্ত অথবা ব্যাবহারিক, তাহা তাঁহারা অঙ্গীকার করিতে চাহেন । এই বিষয় আরও বিশদ ভাবে অগ্রিম গ্রন্থের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে প্রদর্শিত হইবে।১৮ অনুবাদ—এই স্থলে পক্ষতাবচ্ছেদক যে ধৰ্ম্ম, তাহার, কোন একটা আশ্রয়ে সাধ্যের সিদ্ধি হইলেই অনুমানের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইবে, এই কারণে পক্ষের এক দেশেও যদি অনুমানের পূর্বেও সাধ্য সিদ্ধ হইয়া যায়, তাহা হইলে, এই অনুমান সিদ্ধসাধনরূপ দোষগ্রস্ত হইতে পারে ; সুতরাং, সেই সিদ্ধসাধনতা-রূপ দোষ- বারণ জন্য অর্থাৎ শুক্তিরূপে (প্রাতিভাসিক রজতে সিদ্ধসাধনরূপ দোষ-বারণ জন্য ) “ব্ৰহ্মজ্ঞানেতরাবাধ্যত্ব”রূপ পক্ষ-বিশেষণটী দেওয়া হইয়াছে ।১৯ যদি পক্ষতাবচ্ছে- দুকের অবচ্ছেদে অর্থাং প্রত্যেক পক্ষতেই সাধ্যসিদ্ধি উদ্দেশ্য হয়, তাহা হইলে উক্ত প্রকারে পক্ষের এক দেশে সাধ্যসিদ্ধি হইলেও সিদ্ধ-সাধনরূপ দোষের সম্ভাবনা নাই বলিয়া সেই পক্ষে সিদ্ধসাধনবারক উক্ত বিশেষণের উপন্যাসের আবশ্যকতা নাই ।২ আর দুইটী বিশেষণ,“তুচ্ছ”, এবং “ব্রহ্মে” বুধবারণ জন্য আদরণীয়।২২ অবৈতসিদ্ধি। প্রত্যেকং বা বিপ্রতিপত্তি, বিয়স্মিথ্যা ন বা, পৃথিবী মিথ্যা ন বা ইতি।২২ এবং বিয়দাদের প্রত্যেক পক্ষহেপি ন ঘটাদৌ সন্দিগ্ধা- নৈকান্তিকতা, পক্ষসমাৎ ঘটাদে, ২৩ তথাহি পক্ষে সাধ্যসন্দেহস্য অনুগুণত্বাৎ পক্ষভিন্ন এব তস্য দূষণত্বং বাচ্যম্।২৪ অতএব উক্ত “সাধ্যাভাবনিশ্চয়বতি হেতুসন্দেহে এব সন্দিগ্ধানৈকান্তিকতে’তি।২৫ পক্ষন্তু সাধ্যসন্দেহবত্ত্বং সাধ্যােচর-সাধকমানাভাবৰং বা ২৬ এতচ্চ ঘটাদিসাধারণম্।২৭ অতঃ তত্রাপি সন্দিগ্ধানৈকান্তিকত্বং ন দোষঃ ২৮ পক্ষ সমবেক্তিস্তু প্রতিজ্ঞাবিষয়বমাত্ৰেণ ২৯ ন চ তহি প্রতিজ্ঞা বিষয়ত্বমেব পক্ষম, স্বার্থানুমানে তদভাবাৎ।৩০ (অনুবাদ)—অথবা সামান্যভাবে পক্ষ-নির্দেশ না করিয়া বিশেষ বিশেষরূপে পক্ষের নির্দেশ করিয়াও বিপ্রতিপত্তি-বাক্য প্রদর্শিত হইতে পারে; যথা-আকাশ মিথ্যা কি ? পৃথিবী মিথ্যা কি না? ইত্যাদি।২২এই ভাবে বিশেষরূপে বিপ্ৰতিপত্তি-বাক্য দ্বারা পক্ষরূপে আকাশাদির প্রয়ােগ হইলে,ঘট-পট প্রভৃতি বস্তুর অন্তর্ভাবে হেতুতে সাধ্যের ব্যভিচার-সন্দেহরূপ-দোষ হইবে ইহা যদি বল, তাহাও ঠিক নহে। কারণ,এরূপ স্থলে ঘট-পটাদি বস্তুও পক্ষের সদৃশই হইয়া থাকে।২৩অর্থাৎ বক্তব্য এই হইতেছে যে,পক্ষে যদি সাধ্যের সন্দেহ হয়, তাহা হইলে সেই সন্দেহ অনুমিতির অনুকূলই হইয়া থাকে, এই কারণে পক্ষ হইতে যে বস্তু বিলক্ষণ, তাহাতে যদি হেতুর সংশয় থাকে, এরূপ স্থলে উক্ত প্রকারে দর্শিত যে সন্দিগ্ধ ব্যভিচার, তাহা অনুমিতিকে দুষিত করিয়া থাকে ;২৪ এই জন্যই বলা হইয়াছে যে, যেখানে সাধ্যাভাবের নিশ্চয় আছে,সেই স্থানে যদি “হেতু আছে কিনা” এই প্রকার সংশয় হয়, তাহা হইলে সেইরূপ স্থলেই সন্দিগ্ধ ব্যভিচার হয়।২৫ যেখানে সাধ্য-সন্দেহ আছে বা সাধ্যের সিদ্ধি নাই তাহাই পক্ষ।২৬ এই প্রকার পক্ষ এখানে ঘটাদিও হইতে পারে।২৭ সুতরাং,এস্থলে সন্দিগ্ধানৈকান্তিকত্ব- রূপ দোষটী হইল।২৮ তাহা হইলে ঘট-পটাদি বস্তুকে পক্ষ-সম বলিয়া নির্দেশ করা হইল কেন, ইহা যদি বল, তাহার উত্তর এই যে, প্রতিজ্ঞা-বাক্যে পৃথভাবে ঘট- পটাদির উল্লেখ করা হয় নাই বলিয়াই তাহাদিগকে পক্ষ-সম বলা গিয়াছে মাত্র।২৯ আর যদি প্রতিজ্ঞার বিষয় হইলেই পক্ষ হইবে বল, তাহাও ঠিক নহে। কারণ, প্রথম পরিচ্ছেদঃ। (অনুবাদ) -স্বার্থানুমান-স্থলে কোন প্রকার প্রতিজ্ঞাই থাকে না। অতএব, প্রতিজ্ঞা বিষয়ত্বই পক্ষ নহে, এই কারণে সন্ধিগ্ধানৈকান্তিকত্ব দোষ এস্থলে হইল না)। ২৯ তাৎপৰ্য-পূৰ্বেই প্রদর্শিত হইয়াছে যে, সাধ্য-নিশ্চয় থাকিলে অনুমিতি হয় না। এই সাধ্য নিশ্চয় কি ভাবে অনুমিতির প্রতিবন্ধকতা করিয়া থাকে, তাহাও জানা আবশ্যক। পৰ্বতে বহ্নির অনুমান করিতে হইলে, পক্ষ বলিয়া পরিগৃহীত যে পৰ্বত, তাহাতে বহ্নিরূপ সাধ্যের অনুমিতি দুই ভাবে হইতে পারে। প্রথম-পৰ্বতত্ব-রূপে প্রতিভাসমান যত বস্তু আছে, সকলেতেই অনুমিতি হউক” এই প্রকার ইচ্ছা যদি থাকে, তাহা হইলে অনুমিতির পূর্বে যদি কোন একটী পৰ্ব্বতে সাধ্যবহ্নি নিশ্চিত থাকে, তাহা হইলে ঐ অভীতি অনুমিতির প্রতি এই জাতীয় সাধ্য-নিশ্চয় প্রতিবন্ধকতাচরণ করে না। এইরূপ অনুমিতিকেই পক্ষতাবচ্ছেদকা- বচ্ছেদে সাধ্যানুমিতি কহে। কিন্তু, যদি সকল পর্বতেই বহ্নিরূপ সাধ্য আছে, এই- প্রকার নিশ্চয় পূৰ্বে থাকে; তাহা হইলে এইরূপ অনুমিতি অর্থাৎ পক্ষ লবচ্ছেদকা- বচ্ছেদে যে অনুমিতি, তাহা হয় না। দ্বিতীয়-যদি সামানাধিকরণ্যে বহ্নির অনু- মিতি অভীপ্সিত হয়, অর্থাৎ কোন একটী পৰ্ব্বতে বহ্নির অনুমিতি হউক—এই প্রকার যদি বাদীর উদ্দেশ্য হয়, তাহা হইলে কোন একটী পৰ্বতেও সাধ্যের নিশ্চয় থাকিলে ঐ সমানাধিকরণ্যে অনুমিতি হয় না। পক্ষাবচ্ছেদক অর্থাৎ যে ধৰ্ম্ম পুরস্কারে পক্ষটী প্রতিজ্ঞাবাক্যে প্রতিভাসমান হয়, সেই ধর্মের কোন একটী আশ্রয়ে যদি অনুমিতি উদ্দেশ্য হয়, তাহা হইলে সেই অনুমিতিকে সমানাধিকরণ্যে অনুমিতি কহা যায়। ফলে, এই সিদ্ধ হইতেছে যে, পক্ষতাবচ্ছেদক-সামানাধিকরণ্যে অনুমিতির প্রতি যেরূপ সিদ্ধি হউক না কেন, অর্থাৎ অনুমিতির পূর্বে যৎকিঞ্চিৎ যে কোন পক্ষে সাধ্য-নিশ্চয় থাকুক, অথবা সকল পক্ষেই সাধ্যনিশ্চয় থাকুক, উভয় স্থলেই উভয়বিধ সাধ্যনিশ্চয়ই এইরূপ অনুমিতির প্রতিবন্ধকতা করিবে। কিন্তু, পক্ষতাবচ্ছেদকাবুচ্ছেদে অর্থাৎ সকল পক্ষতেই যদি সাধ্যের অনুমিতি উদ্দেশ্য হয়, তাহা হইলে সেই অনুমিতির প্রতি পক্ষতাবচ্ছেদকাবুচ্ছেদে যে সাধ্যনিশ্চয়, অর্থাৎ সকল পক্ষেই সাধ্য আছে—এইপ্রকার যে জ্ঞান, তাহাই প্রতিবন্ধক হইয়া থাকে। সামানাধিকরণ্যে সাধ্য-নিশ্চয়, অর্থাৎ কোন একটী পক্ষে সাধ্য আছে—এই প্রকার জ্ঞান, এইরূপ অবচ্ছেদাবচ্ছেদে অনুমিতির প্রতিবন্ধক হয় না। এখানে যে বিপ্রতিপত্তি-বাক্য রচিত হইয়াছে, তাহাতে যে কয়টা বিশেষণ আছে, তাহাদের } ৩২ অবৈতসিন্ধি। {তাৎপৰ্য্য) প্রত্যেকের সার্থকতা ভাল করিয়া বুঝিতে হইলে এই প্রকার সিদ্ধি ও অনুমিতির প্রতিবধ্য ও প্রতিবন্ধক-ভাবটী (অর্থাৎ কিরূপ অনুমিতির প্রতি কিরূপ সিদ্ধি প্রতিবন্ধক হয় ) তাহা বিশদভাবে বুঝা আবশ্যক। এই জন্যই এস্থলে এ বিষয়টীর এত বিস্তৃতভাবে আলােচনা করা গেল। এক্ষণে মূলগ্রন্থের প্রকৃত তাৎপৰ্য্য কি, তাহা বুঝা যাউক। দ্বৈতপ্রপঞ্চের মিথ্যাত্ব সিদ্ধ করিবার জন্য যে বিপ্রতিপত্তি-বাক্যটী গ্রন্থকার রচনা করিয়াছেন, তাহাতে পক্ষের তিনটী বিশেষণ দেখিতে পাওয়া যায়। যথা—১। ব্রহ্মপ্রমাতিরিক্ত প্রমার অবাধ্য, ২। সদ বলিয়া প্রতীতিযােগ্য এবং ৩। চিদ্ভিন্ন। এই তিনটী বিশেষণ সমন্বিত যে বস্তু,তাহাই হইল 'প্রকৃতস্থলে পক্ষ-পদবাচ্য। এই পক্ষ কে? ব্যাবহারিক বস্তুমাকেই এই পক্ষের অন্তর্গত বলিয়া বুঝিতে হইবে। এক্ষণে দেখা যাউক, পক্ষে এই প্রথম বিশেষণটা যদি না দেওয়া যায়, তাহা হইলে কি ক্ষতি হইতে পারে। এই বিশেষণটী না থাকিলে বুঝিতে হইবে যে, আর দুইটী বিশেষণযুক্ত যে বস্তু, তাহাই পক্ষ-পদবাচ্য হইয়া পড়ে। সেই দুইটী বিশেষণ -চিদ্ভিন্ন এবং সদ্ বলিয়া প্রতীতির যােগ্য। সুতরাং, এই দুইটী বিশেষণ-বিশিষ্ট বস্তুই পক্ষ হইল। এখন সে বস্তুটী কি ? বেদান্তমতে প্রতিভাসিক রজতাদি বস্তু এবং ব্যবহারসিদ্ধ ঘটপট প্রভৃতি বস্তু, এই দুইটী বিশেষণ-যুক্ত হইতে পারে। কারণ, তাহারা চৈতন্যস্বরূপ নহে, এবং সময়ে সময়ে আমাদের নিকট সৎ বলিয়া প্রতীতির যােগ্যও হয়। এক্ষণে যদি সামানাধিকরণ্যে মিথ্যাত্বরূপ সাধ্যসিদ্ধিই অনুমানের উদ্দেশ্য হয়, তাহা হইলে প্রাতি- ভাসিক রজতরূপ পক্ষের এক দেশে এইরূপ সাধ্য প্রসিদ্ধ আছে বলিয়া এই সামানা- ধিকরণ্যে সাধ্য-নিশ্চয় তাদৃশ অনুমিতির প্রতি প্রতিবন্ধক হইতে পারে। এইজন্য এই প্রথম বিশেষণটা দিতে হইবে। এই বিশেষণের প্রতিপাদ্য কি? ইহার প্রতিপাদ্য-ব্ৰহ্মজ্ঞান ব্যতিরিক্ত আর যত প্রকার প্রমাজ্ঞান, আমাদের নিকট প্রসিদ্ধ আছে, সেই সকল প্রমাজ্ঞান দ্বারা যে বস্তু বাধিত না হয়—তাহাই। প্রাতিভাসিক রজত অর্থাৎ শুক্তিতে রজত, যেহেতু, ব্ৰহ্মপ্রমা ব্যতিরিক্ত যে ইহা রজত নহে’ এইপ্রকার প্রমাবােধ দ্বারা বাধিত হয় সেইহেতু, এই প্রথম বিশেষণ দ্বারা শুক্তি রৌপ্যের বােধ হইতে পারে না। সুতরাং, বুঝা গেল—এই বিশেষণটীর দ্বারা, গ্রন্থকার সাৰানাধিকরণ্যে অনুমিতি-নির্বাহের জন্য শুক্তিরৌপ্যকে পক্ষ হইতে বহিত করিয়া দিতেছেন।
ওঁ নমঃ গণেশায় অদ্বৈতবিদ্যচাৰ্য্য শ্ৰীমদ্ অপ্যয়দীক্ষিত-বিরচিত সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ। প্রথম পরিচ্ছেদ অধিগতভিদা পূৰ্বাচাৰ্যানুপেত্য সহস্ৰধা, সরিদিব মহীভেদান্ সংপ্রাপ্য শৌরিপদোতা। জয়তি ভগবৎপাদ-শ্ৰীমন্মুখাম্বুজ-নিৰ্গতা, জননহরণী সূক্তিব্ৰহ্মায়ৈপরায়ণা। ১। অন্বয়। মহীভেদা সংপ্রাপ্য শৌরিপদোদণতা সরিদ ইৰ পূৰ্বাচাৰ্যান্ উপেত্য সহস্রধা অধিগতভিদা জননহরণী ব্ৰহ্মাদয়ৈপরায়ণ ভগবৎপাদ শ্ৰীমন্থখাম্বুজ-নিৰ্গত। সূক্তি জয়তি। ১ অনুবাদ-শ্ৰীমন্নারায়ণের চরণ-যুগল হইতে উদ্ভূত সরিৎ, অর্থাৎ গঙ্গা, বিভিন্ন প্রদেশকে প্রাপ্ত হইয়া যেরূপ নানা প্রকার রূপ ধারণ করিয়া থাকেন, সেইরূপ ভগবৎপাদ শ্ৰীশংকরাচার্যের মুখাম্বুজবিনিঃস্থত জীবগণ- জন্মহারিণী ব্ৰহ্মায়ৈপরায়ণা যে সুললিত বাণী পূৰ্বাচাৰ্য্যগণকে প্রাপ্ত হইয়া সহস্ররূপে বিভিন্ন বলিয়া প্রতীয়মান হয়, তাহা সর্বোৎকৃষ্ট রূপে বিরাজমান হউক। তাৎপৰ্যপূৰ্বাচাৰ্যগণ এস্থলে গ্রন্থকার অপ্যয়দীক্ষিতের পূর্ববর্তী এবং আচাৰ্য ভগবান শঙ্করের পরবর্তী। যথা-পদ্মপাদ, সুরেশ্বর, বাচস্পতিমিশু, আনন্দবােধেন্দ্র ভট্টারক, চিৎমুখ, বিদ্যারণ্য, শঙ্করানন্দ, অমলানন্দ, সর্বজ্ঞাত্ম- মুনি প্রভৃতি। এতদ্ব্যতীত বহুনাম এই গ্রন্থ মধ্যেই পাওয়া যায়। ইহাদের গ্রন্থ এক্ষণে সব পাওয়া যায় না।
২ সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ । ( তাৎপৰ্য)—ব্রহ্মায়ৈপরায়ণা—এই পদের সমাস বাক্যটী লক্ষ্য করিবার বিষয়। ব্ৰহ্ম চ তদদ্বয়ং চ-ব্ৰহ্মাদ্বয়ং, ব্ৰহ্মাদ্বয়ং চ তদেকং চ ব্ৰহ্মায়ৈকং, ব্ৰহ্মা- দ্বয়ৈকং পরায়ণং পরম-তাৎপৰ্যবিষয়ে যস্যাঃ সূক্তেঃ সা ব্ৰহ্মদ্বয়ৈপরায়ণা । এই বিশেষণটীর দ্বারা অদ্বিতীয়, প্রপঞ্চশূন্য, একরূপ, সত্য, জ্ঞান ও আনন্দ- লক্ষণ ব্রহ্মই যে সূক্তিপদ-ভাষ্যাত্মক শাস্ত্রের প্রতিপাদ্য অর্থাৎ বিষয় ইহা বলা হইল। ? } - জননহরণী--এই বিশেষণটীর দ্বারা এই শাস্ত্রের প্রয়ােজন যে মুক্তি, তাহাও কথিত হইল। এবং এই মুক্তি যিনি কামনা করেন, তিনিই যে এই শাস্ত্রের অধিকারী, তাহাও বলা হইল। আর-এই অধিকারী ও মুক্তির সহিত যে প্রাপ্য-প্রাপক-ভাবরূপ একটী সম্বন্ধ আছে, তাহাও এতদ্বারা কথিত হইল। সকল শাস্ত্রেরই বিষয়, প্রয়ােজন, অধিকারী ও সম্বন্ধ এই অনুবন্ধ-চতুষ্টয়ের উল্লেখ করা আবশ্যক, তাই গ্রন্থকারও মঙ্গলাচরণ শ্লোক মধ্যে তাহা কৌশলে প্রদর্শন করিয়াছেন। এই শ্লোকে এইরূপও ধ্বনিত হইতেছে যে, যেমন পথের মধ্যে গঙ্গা সহস্র- ভাগে বিভক্ত হইলেও, তাহার চরম গন্তব্য এক সমুদ্র ভিন্ন আর কিছুই হয় না, তদ্রুপ ভগবৎপাদেরও সুললিত উপদেশাবলী—পূৰ্বাচাৰ্য্যগণ-প্রদর্শিত ব্যাখ্যানুসারে নানা আকার ধারণ করিলেও, তাহাদের একমাত্র লক্ষ্য সেই সচ্চিদানন্দ ব্ৰহ্ম ভিন্ন আর কিছুই নহে। পারমার্থিকতত্ত্ব নিরূপণাংশে উক্ত আচাৰ্যগণের কোন মতভেদ নাই। ইহাই ব্যঞ্জনা দ্বারা গ্রন্থকার সূচনা করিলেন। উক্ত প্রাচীন আচাৰ্যগণের মধ্যে উক্ত মতবিরােধী এস্থলে তাঁহাদের অজ্ঞান বা ভ্রান্তি হেতুক নহে, পরন্তু, তাহা এই শাস্ত্রের অলঙ্কার স্বরূপ, এই কথাটী বুঝাইবার জন্যই এই দ্বিতীয়শ্লোকের অবতারণা। এইরূপ মতভেদ ব্ৰহ্মপ্রাপ্তির উপায়ভূত ব্যবহার বিষয়েই ঘটিয়াছে, ব্ৰহ্মতত্ত্ব বিষয়ে নহে; যেহেতু, সাধকের প্রজ্ঞাবৈচিত্র্য বশতঃ কোনপথটী কাহারও পক্ষে সুকর এবং কোনটী কাহারও পক্ষে দুস্কর হইয়া থাকে। আচাৰ্য সুরেশ্বর এ বিষয় একটী সুন্দর শ্লোক বলিয়াছেন, বয়া অয়া ভবেৎ পুংসাং ব্যুৎপত্তিঃ প্ৰভ্যগায়নি। সা সৈব প্রক্রিয়েহ স্যাৎ সাধ্বী সা চাইনবস্থিত ।
প্রথম পরিচ্ছেদঃ। ৩ প্রাচীনৈর্ব্যবহারসিদ্ধবিষয়েম্বাত্মৈক্যসিদ্ধৌ পরং সহদ্ভিরনাদরাৎ সরণয়াে নানাবিধা দর্শিতাঃ । সম্মুলানি সংগ্রহেণ কতিচিৎ সিদ্ধান্তভেদান্ ধিয়, শুদ্ধ্যৈ সংকলয়ামি তাতচরণব্যখ্যাবচঃখ্যাপিতাম্ ॥২॥ তেপপাদনাপেক্ষান্ পক্ষান্ প্রায় যথামতি। যুক্ত্যোপপাদয়বে লিখাম্যনতিবিস্তরম্ ॥৩ অম্বয়। আত্মেক্যসিদ্ধো (কর্তব্যায়াং) পরং সন্নহাভিঃ প্রাচীনৈঃ ব্যবহারসিদ্ধবিষয়ে অনাদরাৎ নানাবিধা সরণয়ঃ দৰ্শিতা, ইহ তন্ম লান্ তাতচরণব্যাখ্যাবচংখ্যাপিতা কতিচিৎ সিদ্ধান্তভেদান্ ধিয়ঃ ন্ধ্যৈ সংকলয়ামি । ২ তেষু উপপাদনাপেক্ষান্ পক্ষানু যামিতি যুক্তা উপপাদয়বে প্রায় অনতি- বিশুরং যথামতি লিখামি। ৩ ( তাৎপৰ্য )—অর্থাৎ যদ্বারা লােকের প্রত্যগ আত্মাতে ব্যুৎপত্তি লাভ হয়, তাহাই তাহার পক্ষে উত্তম পথ, ইহা ব্যক্তিভেদে বিভিন্নই হইয়া থাকে। গ্রন্থকার নিজ পিতার নিকট হইতে লব্ধ ব্যাখ্যার উল্লেখ করিয়া তিনি যাহা এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করিতেছেন, তাহা যে সম্প্রদায়লব্ধ সিদ্ধান্ত, তাহাই বলিলেন ; যেহেতু, সম্প্রদায়-বিহীন বিদ্যা বিফল কলিয়া শাস্ত্রে তাহার নিন্দা শ্রুত হয়। নিজ বুদ্ধিশুদ্ধির জন্য এই গ্রন্থ রচনা করা হইল—বলিয়া গ্রন্থকার বিনয় প্রদর্শন করিলেন। বস্তুতঃ, ইহাতে লােকানুগ্ৰহ-সাধনও গ্রন্থকারের লক্ষ্য বুঝিতে হইবে। অনুবাদ--কি প্রকারে আত্মার একত্বসিদ্ধি হইতে পারে, তাহারই জন্য যাহাদিগের একান্ততৎপরতা ছিল, সেই সকল প্রাচীন পণ্ডিতগণ, ব্যবহারসিদ্ধ বিষয় সমূহে (অর্থাৎ জীবেশ-বিভাগ, জীবের নানাত্ব, জীবের প্রতিবিম্ব-রূপত্ব ইত্যাদি ব্যাবহারিক বিষয় সমূহে) বিশেষ আস্থা স্থাপন করিয়া যাহাতে সরলভাবে আত্মতত্ত্ব বুঝা যায়, তাহারই জন্য, নানা প্রকার বিরুদ্ধপথ অবলম্বন করিয়া গিয়াছেন, তাহাদিগের প্রদর্শিত পথে, আমার পিতৃদেবের প্রদর্শিত ব্যাখ্যার অনুসরণ করিয়া আমি যাহা বুঝিয়াছি- এইরূপ কতিপয় সিদ্ধান্ত-বিশেষ আমার নিজের বুদ্ধির শুদ্ধতার জন্য এই গ্রন্থে সংকলন করিতেছি। ২ ৪ সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ। আত্মতত্ত্বশ্রবণে বেদবিধি। তত্র তাবৎ “আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যো মন্তব্য” ইত্যধীত- সাঙ্গস্বাধ্যায় বেদান্তৈঃ আপাতপ্রতিপন্নে ব্ৰহ্মাত্মনি সমুদিতজিজ্ঞাসস্য তজ জ্ঞানায় বেদান্তশ্রবণে বিধিঃ প্রতীয়মান কিংবিধ ইতি চিন্ত্যতে।৪ বিধিবিভাগ। তিঃ খলু বিধের্বিধাঃ- অপূর্ববিধিঃ, নিয়মবিধিঃ, পরিসংখ্যা- বিধিশ্চেতি। ৫ অপূৰ্ব বিধি। তত্র কালয়েহপি কথমপি অপ্রাপ্ত প্রাপ্তিফলকো বিধিঃ আছঃ। যথা“ব্রীহী ক্ষেতীতি।” নাহত্র ব্রীহীণাং প্রােক্ষণস্য সংস্কারকৰ্ম্মণণা বিনা বিনিয়ােগং মানান্তরেণ কথমপি প্রাপ্তিরস্তি। ৬ অনুবাদ-পূৰ্বাচাৰ্য্যগণ যে সকল পক্ষ স্থাপন করিয়া গিয়াছেন, সেই সকল পক্ষের মধ্যে যে গুলি আরও অধিক যুক্তির দ্বারা ব্যবস্থাপনের যােগ্য, প্রায় সেই সকলগুলিকে আমি নিজ মতি অনুসারে যুক্তি দ্বারা স্থাপন করিয়া এই গ্রন্থে প্রতিপাদন করিব। ৩ ( এই গ্রন্থের প্রথমে ইহাই নিরূপিত হইতেছে যে, ) বেদে এইপ্রকার বিধিবাক্য শ্রুত হইয়া থাকে যে, “অরে আত্মার দর্শন কৰ্তব্য,” ( এবং সেই দর্শন করিতে হইলে) শ্ৰবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন কৰ্ত্তব্য। যে ব্যক্তি, অঙ্গের সহিত সমগ্র বেদ অধ্যয়ন করিয়াছে, সে বেদান্ত বাক্য দ্বারা ( বিশেষরূপে বিচারের পূর্বে ) শ্ৰবণ মাত্রে আত্মার স্বরূপ সামান্যভাবে বুঝিয়া থাকে। তাহার পর ভাল করিয়া আত্মস্বরূপ বুঝিবার জন্য তাহার যখন জিজ্ঞাসার উদয় হয়, তখনই, তাহার পক্ষে পূর্বোক্ত বেদান্ত শ্রবণ বিষয়ে বিধি প্রতীতি হইয়া থাকে। এক্ষণে এই যে বিধি (অর্থাৎ শ্রবণ করিতে হইবে, ইত্যাদি) তাহা কি প্রকার বিধি, তাহারই চিন্তা করা যাইতেছে। ৪ বিধি তিন প্রকার, যথা-অপূৰ্ব্ব-বিধি, নিয়ম-বিধি এবং পরিসংখ্যা- বিধি। ৫ প্রথম পরিচ্ছেদঃ। ৫ নিয়ম-বিধি। পক্ষপ্রাপ্ত অপ্রাপ্তাংশ-পরিপূরণ-ফলকো বিধিৰ্বিতীয়ঃ । যথা “ব্রীহীনবহন্তী”তি। অত্র বিধ্যভাবেহপি পুরােডাশ-প্রকৃতি-দ্রব্যাণাং ব্রীহীণাং তণ্ডুলনিষ্পত্তাক্ষেপাদেব তবহনন-প্রাপ্তি-ভবিষতি ইতি ন তৎপ্রাপ্ত্যর্থোহয়ং বিধিঃ। কিন্তু আক্ষেপা অবহননপ্রাপ্তেী ত- বদেব লােকাবগত-কারণবিশেষাৎ নখবিদলনাদিরপি পক্ষে প্রাপ্ত যা ইতি অবহননাপ্রাপ্তাংশ সম্ভবাৎ তদংশপরিপূরণফলক। ৭ অনুবাদ-তন্মধ্যে যে বস্তু ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান এই ত্রিবিধ কালেই (অন্য কোন প্রমাণ দ্বারা যে ভাবে ) প্রতীত হয় না, ( সেই ভাবে ) সেই বস্তুর স্বরূপ, যে বিধিবাক্য দ্বারা প্রতিপাদিত হয়, সেই বস্তু বিষয়ে সেই বিধিকে অপূৰ্ব্ববিধি বলা যায়। উদারণ, যেমন “ব্রীহির ( অর্থাৎ শরৎ কালে পক্ক বান্যের ) প্রেক্ষণ করিবে” অর্থাৎ “তাহার উপর জল ছিটাইবে।” এই স্থলে ব্রীহি সমূহের যে প্রােক্ষণ বিহিত হইয়াছে, এই প্রেক্ষণ দ্বারা যে ব্রীহিতে কোন এক প্রকার সংস্কাররূপ কাৰ্য্য উৎপাদন করা হয়, তাহা এই বিধিবাক্য ব্যতিরিক্ত অন্য কোন প্রমাণ দ্বারা জানা যায় না। এই কারণে, এইরূপ বিধিকে অপূৰ্ব্ব-বিধি বলা যায়। ৬ পক্ষে প্রাপ্তের পাক্ষিক অপ্রাপ্ত অংশকে যাহা পূরণ করিয়া দেয়, এইরূপ যে বিধি, তাহারই নাম নিয়ম-বিধি। যেমন --“ব্রীহি সমূহের আঘাত করিবে।” এই বিধি যদি না থাকিত, তাহা হইলেও পুরাে- ভাশের প্রকৃতি স্বরূপ যে ব্রীহিরূপ দ্রব্য, তাহা হইতে তণ্ডুল-নিষ্পত্তির আবশ্যকতা আছে বলিয়া তাহার অবঘাত স্বতঃই প্রাপ্ত হইতে পারে। সুতরাং, সেই অবঘাতের প্রাপ্তির জন্য যে এই বিধি হইয়াছে, তাহা বলা যায় না। কিন্তু, তণ্ডুল করিতে হইবে এইজন্য যেমন অবঘাতের প্রাপ্তি আছে, সেইরূপ লোকাবগত কারণ বলিয়া নখবিদলনাদিরও পাক্ষিক প্রাপ্তি হইতে পারে, এবং (এইরূপে নখবিলনের প্রাপ্তি হইলে যদি আর অবঘাত নিষ্প্রয়ােজন বলিয়া না করা হয়, তাহা হইলে) অবহননের অপ্রাপ্তিও সম্ভবপর হইল। সেই অপ্রাপ্তির পরিহার করিবার জন্য এই প্রকার বিধি কল্পিত হইয়া থাকে। এই ভাবে পাক্ষিক অপ্রাপ্তিকে নিয়ত ভাবে পূরণ করিয়া দেয় বলিয়া, এই বিধিকে নিয়ম-বিধি বলা যায়। ৭ ৬ সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ । তাৎপৰ্য-দর্শপূর্ণমাস নামক একটী যাগ শাস্ত্রে বিহিত আছে। ঐ যজ্ঞ করিতে হইলে ব্রীহি অথবা যবের দ্বারা পুরােডাশ অর্থাৎ পিষ্টক- বিশেষ করিতে হয়। ব্রীহির দ্বারা পুরােডাশ করিতে হইলে ব্রীহিগুলি তুষবিহীন করা আবশ্যক। এই তুষগুলি হইতে ব্রীহিকে পৃথক্ করিতে হইলে—হয় উহাকে অবঘাত অর্থাৎ কড়াইতে হইবে অথবা, নখ দ্বারা উহাকে ছাড়াইতে হইবে, কিংবা প্রস্তরাদিতে রাখিয়া উহাকে কোন কঠিন বস্তুর দ্বারা ডলিতে হইবে। এই ত্রিবিধ উপায়েরই ফলে ব্রীহিগুলি তুষবিহীন হয়। যদি কেবল অবঘাত করিলেই তুষ বিহীন করা যায়, তাহা হইলে নখ দ্বারা বা বিদলন দ্বারা তুষ বিহীন করিবার আবশ্যকতা থাকে না, অর্থাৎ এই তিনটি উপায় মধ্যে কোন একটির দ্বারা কৰ্ম্ম সিদ্ধ হইলে অপর দুইটি উপায়ের অনুষ্ঠান কেহই করে না, ইহাই লােক সিদ্ধ রীতি। শাস্ত্রে কিন্তু এই পুরােডাশ নিৰ্মাণ করিবার সময় এই প্রকার একটি বিধিবাক্য শ্রবণ করা যায় যে, ব্রীহিগুলির অবঘাত করিবে। কারণ, ব্রীহিগুলি পুরােডাশের প্রকৃতিভূত দ্রব্য। যে উপাদান হইতে পুরাে- ডাশ প্রস্তুত হয়, তাহাকেই পুরােশের প্রকৃতি-দ্রব্য বলা যায়। এক্ষণে দেখিতে হইবে যে, শাস্ত্র এইরূপ বিধান করিতেছে কেন? অবঘাত যে একটি তুষ-বিমােকের উপায়, অর্থাৎ তুষ ছাড়াইবার উপায়, ইহা জানি- বার জন্য শাস্ত্রীয় কোন বিধানের আবশ্যকতা নাই। সকল লােকই ইহা প্রায় জানে। তবে শাস্ত্র ভূষ-বিমােকের জন্য এইরূপ অবঘাতের বিধান করে কেন ? ইহার উত্তর এই যে, যদি শাস্ত্রে অবঘাতের বিধান না থাকিত, তাহা হইলে কোন ব্যক্তি হয়ত অবঘাত না করিয়া নখদ্বার ছাড়াইয়া বা বিদলন করিয়া তুষ-বিমােক করিতে পারিত, এবং সেইরূপ স্থলে তাহার পক্ষে আর অবঘাতের আবশ্যকতা থাকিত না। এই যে অনাবশ্যকতা বােধ ইহারই নাম পাক্ষিক অপ্রাপ্তি। এই পাক্ষিক অপ্রাপ্তিকে নিরাকরণ করিবার জন্য যে বিধির আবশ্যকতা হয়, তাহাকেই নিয়ম-বিধি বলে। এক্ষণে জিজ্ঞাস্য এই যে, ব্রীহি দ্বারা যে পুরােডাশ নির্মাণ করা হয়, সেই পুরােডাশ দ্বারা যজ্ঞাহতি প্রদান করিলেই যজ্ঞ সিদ্ধ হইয়া থাকে, ইহাই যদি শাস্ত্ৰসিদ্ধান্ত হয়, তাহা হইলে যে কোন উপায়েই হউক না কেন, তুষবিমােক করিয়া আমি যদি পুরােভাশ উৎপাদন করি, তাহা হইলে ক্ষতি কি ? শাস্ত্রকার কি কারণে অবঘাতের দ্বারা তুষ বিমােক প্রথম পরিচ্ছেদঃ । ৭ পরিসংখ্যা বিধি। দ্বয়ােঃ শেষিপণারেকস্য শেষ বা, একস্মিন্ শেষিণি দ্বয়াের শেষয়ােৰ্বা, নিত্যপ্রাপ্তেী শ্যেন্তরস্য শেষান্তরস্য বা নিবৃত্তিফলকো বিধিস্তৃতীয়ঃ। যথা, অগ্নিচয়নে “ইমামগৃভণশনামৃতস্য ইতি অশ্বাভি- ধানীমাদত্তে” ইতি, যথা বা চাতুর্মাস্যান্তৰ্গতেষ্টিবিশেষে গৃহমেধীয়ে “আজ্যভাগৌ যজতীতি।” অগ্নিচয়নে অশ্বরশনাগ্রহণং গর্দভরশনা- গ্রহণং চেতি দ্বয়ম্ অনুষ্ঠেয়ম্ । তত্র অশ্বরশনা-গ্রহণে “ইমামগৃভণন্নিতি” মন্ত্রে লিঙ্গাদেব রশ-গ্রহণ-প্রকাশন-সামর্থ্যরূপান্নিত্যং প্রাপােতীতি ন তৎপ্রাপ্ত্যর্থঃ তদপ্রাপ্তাংশ-পরিপূরণার্থো বা বিধিঃ। কিন্তু, লিঙ্গাবি- শেষাৎ গর্দভরশনাগ্রহণেপি মন্ত্র প্রাপ্তয়াদিতি তন্নিবৃত্ত্যর্থ। তথা গৃহমেধীয়স্য দর্শপূর্ণমাসপ্রকৃতিক ত্বাং অতিদেশাদেব আজভাগো নিত্যং প্রাপ্তত ইতি ন তত্র বিধিঃ তৎপ্রাপ্ত্যর্থ, তন্নিয়মাথো বা। কিন্তু অতিদেশাৎ প্রজাদিকমপি প্রাপ্তয়াৎ ইতি তন্নিবৃত্ত্যর্থঃ। গৃহমে- ধীয়াধিকরণ-পূর্ববপরীত্যেদম্ উদাহরণং কচিদুদাহৰ্তব্য ইদাহৃতম্। ৮ যত্র ( তাৎপৰ্য করিতে হইবে এইরূপ বিধান করিতেছেন ? ইহার উত্তর এই যে, নিয়মবিধির ফল যে কেবল দৃষ্ট, তাহা নহে, ইহার যে একটু অদৃষ্টফল আছে তাহাও স্বীকাৰ্য্য, নচেৎ নিয়ম-বিধির কোনরূপ সার্থকতা থাকে । অর্থাৎ অবঘাতের দ্বারা তুষ-বিমুক্ত যে তণ্ডুল, সেই তণ্ডুল হইতে নিষ্পন্ন পুরােডাশ দ্বারা যদি যজ্ঞে আহুতিপ্রদান করা যায়, তাহা হইলেই যজ্ঞ সিদ্ধ হইবে। নখবিলনাদির দ্বারা তুষ-বিমােক করিয়া পুরােডাশ নিৰ্মাণ করিলে তাহার দ্বারা যে আহুতি দেওযা যায়, তারা যজ্ঞ সিদ্ধ হইবে না। এরূপ অদৃষ্ট কল্পনাকেই নিয়মাদৃষ্ট কল্পনা বলা যায়। ৭ অনুবাদ—দুইটা প্রধানে একটী অঙ্গের অথবা একটী প্রধানে দুইটা অঙ্গের যেখানে নিত্য প্রাপ্তি আছে, সেইরূপ স্থলে প্রধানান্তরের বা অঙ্গান্তরের নিবৃত্তি বুঝাইবার জন্য যে বিধি শ্রুত হয়, তাহারই নাম পরিসংখ্যা-বিধি। উদাহরণ, যথা—অগ্নিচয়নপ্রকরণে “এই শনাকে অমৃতফল লাভের জন্য সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ। } ( অনুবাদ)---( দেবতারা) গ্রহণ করিয়াছিলেন এই মন্ত্র পাঠ করিয়া অশ্ব- রশনাকে গ্রহণ করিবে”। অথবা দ্বিতীয় উদাহরণ, যথা—চাতুর্মাস্যর অন্তর্গত গৃহমেধীয় নামক কোন যাগ বিশেষে “আজ্যভাগ নামক দুইটী যাগ করিবে” ইত্যাদি। এখন, অগ্নিচয়ন করিতে হইলে অশ্ববন্ধনের বশনা অর্থাৎ রজু এবং গর্দভ বন্ধনের রজ্জ্ব এই দ্বিবিধ রজ্জর গ্রহণই অনুষ্ঠেয়। সেই স্থলে ‘এই বশনা- গ্রহণ করিয়াছিলেন ইত্যাদি যে মন্ত্র আছে, সেই মন্ত্রে রশনারূপ অর্থপ্রকাশকত্ব- রূপ যে লিঙ্গ, তাহার দ্বারা অশ্বশনা-গ্রহণের-কৰ্ত্তব্যতা অনায়াসে বুঝিতে পারা যায়; সুতরাং, “এই মন্ত্র পড়িয়া অশ্বশনা গ্রহণ করিতে হইবে” ইত্যাদি যে বিধি, তাহা অপ্রাপ্তের প্রাপকরূপ অপূৰ্ব্ব-বিধি হইতে পারে না, এবং অশ্বশনা গ্রহণের পাক্ষিক অপ্রাপ্তি না থাকা প্রযুক্ত, সেই গ্রহণ বিষয়ে নিয়মবিধিও হইতে পারে না। কিন্তু, মন্ত্রলিঙ্গের দ্বারা প্রাপ্ত (অর্থাৎ অশ্ব বশনার ন্যায় ) যে গর্ধভ-রশন-গ্রহণ, তাহারই নিবৃত্তি করিবার জন্য এই বিধি-বাক্যটী পঠিত হইয়া থাকে। এইরূপ গৃহমেধীয় নামে যে যাগ, তাহা যেহেতু দর্শ-পূৰ্ণ-মাস নামক যাগের বিকৃতিভূত, সেই হেতু প্রকৃতির ন্যায় বিকৃতি করিবে” এইরূপ নিয়ম থাকা প্রযুক্ত দর্শপূর্ণমাসের অঙ্গ যে আজ্যভাগ নামক যাগদ্বয়, তাহা দর্শপূর্ণমাসের বিকৃতিভূত গৃহমেধীয় যগে নিত্যই প্রাপ্ত আছে। সুতরাং, ঐ যাগ দুইটীর পাক্ষিক অপ্রাপ্তি-সম্ভাবনা নাই। এই কারণ এই বিধিবাক্যটী আজভাগ-বিষয়ে অপূৰ্ব্ব-বিধি বা নিয়ম-বিধি হইতে পারে না। কিন্তু “প্রকৃ- তির ন্যায় বিকৃতি করিতে হইবে” এই অতিদেশ-বাক্য-বলে দর্শপূর্ণমাস নামক যাগে অন্যান্য প্রজাদি যে সকল অঙ্গ আছে, তাহারও প্রাপ্তি গৃহ- মেধীয় যুগে সম্ভাবিত। সেই সম্ভাবনাকে নিরাকরণ করিবার জন্য অর্থাৎ গৃহমেধীয় যুগে দর্শপূর্ণমাসের অঙ্গ আজ্যভাগেরই অনুষ্ঠান করিতে হইবে, প্রজাদিরূপ দর্শপূর্ণমাসের অঙ্গের অনুষ্ঠান করিতে হইবে না, ইহাই বুঝাইবার জন্য এই প্রকার পরিসংখ্যা-বিধি শ্রুত হইয়া থাকে। গৃহমেধীয় অধিকরণ নামে প্রসিদ্ধ যে বিচার মীমাংসা-দর্শনে কৃত হইয়াছে, সেই বিচারের যে পূৰ্বপক্ষ প্রদর্শিত হইয়াছে, তদনুসারেই এই উদাহরণ প্রদর্শিত হইল। যে কোন পরিসংখ্যা হইলেই এই উদাহরণ প্রযুক্ত হইতে পারে ; এই কারণে, এই স্থলে (বিশেষ করিয়া) ইহা উদাহৃত হইল। ৮ তাৎপৰ্য-মূলে যে পরিসংখ্যার উদাহরণ প্রদর্শিত হইয়াছে, তাহা মীমাংসা- দর্শনে দশমাধ্যায়ের সপ্তমপাদের চতুর্বিংশতি হইতে ত্রয়ন্ত্রিংশৎ সুত্ৰ পৰ্য্যন্ত প্রথম পরিচ্ছেদঃ। ( তাৎপৰ্য)—যে একটী অধিকরণ আছে, তাহা হইতেই গৃহীত হইয়াছে। এই অধিকরণটীর নাম গৃহমেধীয় অধিকরণ। গৃহমেধী নামে প্রসিদ্ধ মরুগণ নামক কতকগুলি দেবতা আছেন। সেই সকল দেবতাগণের উদ্দেশে যে একটী যাগ বিহিত হইয়াছে, তাহারই নাম গৃহমেধীয় যায়। এই গৃহমেধীয় যাগটি দর্শপূর্ণমাস যাগের বিকৃতি। এই “বিকৃতি” শব্দের অর্থ এই যে, যে যাগের কর্ত্তব্য অঙ্গগুলি তাহার নিজ প্রকরণে উল্লিখিত হয় না, অথচ অন্য কোন যাগের প্রকরণ হইতে অবগত হওয়া যায়, সেই যাগকে বিকৃতি- যাগ কহে। আর যাহার প্রকরণ হইতে ঐ যাগের অঙ্গগুলি বুঝিতে পারা যায়, তাহার নাম প্রকৃতি। দর্শপূর্ণমাস নামক প্রকৃতি-যাগে অনেকগুলি অঙ্গের বিধান আছে। যথা,-আজ্যভাগ, প্রযাজ প্রভৃতি। শাস্ত্রে এইরূপ নিয়ম আছে যে প্রকৃতির ন্যায় বিকৃতির অঙ্গগুলি অনুষ্টিত হইবে।” এই সামান্য নিয়মানুসারে দর্শপূর্ণমাসের প্রকৃতিতে যে আজ্যভাগ ও প্রজাদি অঙ্গের বিধান আছে, সেই সকল অঙ্গ গৃহমেধীয় রূপ বিকৃতি-যাগেও উক্ত নিয়মানুসারে স্বতঃই প্রাপ্ত হইয়া থাকে। কিন্তু, দেখিতে পাওয়া যায় যে, এই গৃহমেধীয় যাগের বিধান করিবার পর উহারই প্রকরণে, এইপ্রকার বাক্য রহিয়াছে যে, “অজ্যভাগে যজতি” অর্থাৎ অজ্যভাগ নামে প্রসিদ্ধ যে দুইটী অঙ্গ, তাহারও অনুষ্ঠান গৃহমেধীয় যাগে করিতে হইবে। এক্ষণে এই প্রকার সংশয় স্বতঃই উদিত হয় যে, গৃহমেধীয় যাগে দর্শপূর্ণমাসের অঙ্গ যে আজ্যভাগ, তাহার ত সাধারণ নিয়মানুসারে প্রাপ্তি রহিয়াছে, তবে আবার কেন শাস্ত্রে এই প্রকরণে আজ্যভাগের বিধান করা হইল ? তবে কি ইহা কোন নূতন কৰ্ম্ম ? অথবা “প্রকৃতির ন্যায় বিকৃতি করিবে” এই নিয়মানুসারে প্রাপ্ত যে আজ্যভাগ, তাহার অনুবাদ মাত্র ? এইরূপ সংশয় হইলে কোন কোন মতে এই ভাবে পূৰ্বপক্ষ উত্থাপন করা হয় যে,এই গৃহমেধীয় যাগে যে আজ্য- ভাগের বিধান করা হইল, তাহা অনুবাদ নহে। কিন্তু, “প্রকৃতিবৎ বিকৃতি করিতে হইবে” এই নিয়মানুসারে দর্শপূর্ণমাসের আজ্যভাগ ও প্রজ প্রভৃতি যতগুলি অঙ্গের প্রাপ্তি হইয়াছিল, তাহাদের মধ্যে কেবল আজ্যভাগ নামক অঙ্গেরই অনুষ্ঠান করিতে হইবে, অর্থাৎ প্রজ প্রভৃতি অঙ্গের অনুষ্ঠান করিতে হইবে না,—ইহাই বুঝাইবার জন্য “আজ্যভাগ করিবে” এই প্রকার বিধান করা হইয়াছে। সুতরাং, এই বিধিটী নিয়ম বা অপূৰ্ব্ব-বিধি হয় না, ইহার নাম পরিসংখ্যা-বিধি বলা হয়।
সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ। নিয়ম ও পরিসংখ্যার প্রভেদ। ন চ নিয়মবিধৌ অপি পক্ষপ্ৰাপ্তাবহনন অপ্রাপ্তাংশপরিপূরণে কৃতে তদবৰুদ্ধত্বাৎ পক্ষিকসাধনান্তর নখবিদলনাদের নিবৃত্তিরপি লভ্যতে-ইতি ইতর-নিবৃত্তি-ফলকত্ববিশেষাৎ নিয়ম-পরিসংখ্যয়াের ফলতাে বিবেকো ন যুক্ত ইতি শঙ্ক্যম্। বিধিতােহবহনননিয়মং বিনা আক্ষেপলভ্যস্ত নখবিদলনাদের নিবৰ্ত্তয়িতুম্ অশ্যতয়া অপ্রাপ্তাংশ- পরিপূরণরূপস্য নিয়ম প্রাথম্যাৎ বিধেয়াবহননগতত্বে প্রত্যাসন্নত্বাৎ চ তস্যৈব নিয়মবিধিফলত্বেপগমাৎ। তদমুনিষ্পদিন্যা অবিধেয়গত- ব্দেন বিপ্রকৃষ্টয়া ইতরনিবৃত্তেঃ সন্নিকৃষ্টফলসম্ভবে ফলত্বানৌচিত্যাৎ। ৯ ( তাৎপৰ্য )—যদিও, মীমাংসাদর্শনে গৃহমেধীয় অধিকরণে এই পূৰ্ব্বপক্ষটি খণ্ডিত হইয়াছে, তথাপি পরিসংখ্যা কাহাকে বলে, তাহা বুঝাইবার জন্য এই উদাহরণই যথেষ্ট। বস্তুতঃ, গৃহমেধীয় অধিকরণে ইহা পূৰ্বপক্ষরূপে বলা হই- য়াছে বলিয়া যে, ইহা স্থলবিশেষ একেবারেই পরিসংখ্যার উদাহরণ হইবে না, তাহ বলা যায় না। শ্রৌত-পরিসখ্যা বুঝাইতে হইলে এই উদাহরণটী সর্বত্র আদৃত হওয়া উচিত। ইহাই হইল গ্রন্থকারের অভিপ্রায়। তবে সেস্থলে যে, ইহা কেন পরিসংখ্যা নহে, তাহার কারণ ভাল করিয়া বুঝিতে হইলে ঐ অধি- করণটীর বিস্তৃত আলােচনা আবশ্যক। গ্রন্থবিস্তার ভয়ে উহা এস্থলে আর প্রদর্শিত হইল না। ৮ অনুবাদ—নিয়মবিধি-স্থলেও অবহনন পক্ষপ্রাপ্ত [ অর্থাৎ ধান্য হইতে তুষবিমােক করিতে হইলে উহা যেমন অবঘাতের দ্বারা হয়, সেইরূপ অন্য উপায়েও হইতে পারে, এইজন্য অন্য উপায়-গ্রহণস্থলে অবঘাত না করিলেও চলে।] অতএব অবঘাতের অপ্রাপ্তি সম্ভাবনার পরিহার নিয়ম-বিধির দ্বারাই কৃত হইতেছে। এজন্য সেই অংশেই বিধি অবরুদ্ধ হয়। এই হেতু পাক্ষিক অন্য সাধন যে নখবিদলনাদি, তাহাদিগেরও নিবৃত্তি বুঝা যায়। অতএব এই বিধির ফল যে ইতর-নিবৃত্তি, তাহার সহিত পরিসংখ্যা-বিধির ফলের কোন বিশেষ না থাকায় নিয়ম এবং পরিসংখ্যা বিধির ফলগত যে কোন বিশেষ আছে, তাহা যুক্তিযুক্ত হইতেছে না। এই প্রকার শঙ্কা করাও উচিত নহে। কারণ, বিধি যদি অবহননকে নিয়ত না করিয়া দেয়, তাহা প্রথম পরিচ্ছেদঃ । ( অনুবাদ -হইলে প্রয়ােজনবশতঃ উপাদেয় নখবিলনাদির নিবৰ্ত্তন অসম্ভব হয়। এই কারণে অপ্রাপ্তি-সম্ভাবনার পরিহাররূপ যে নিয়ম, তাহাই প্রথমতঃ বুদ্ধির বিষয় হয়, এবং বিধেয়রূপে অবগত যে অবহনন, তাহারই সহিত সাক্ষাৎ বিধির অন্বয় হইতেছে বলিয়া তাহাই ( অর্থাৎ অপ্রাপ্তাংশের পরিপুরণই) যে নিয়ম-বিধির ফল, তাহা অঙ্গীকার করিতে হয়। এইরূপে প্রয়ােজন না থাকায় ইতর-নিবৃত্তি আপনিই হইয়া পড়ে বলিয়া, অর্থাৎ তাহা সাক্ষাৎ বাক্যের দ্বারা প্রতীত হয় না বলিয়া, তাহা বিপ্রকৃষ্ট অর্থাৎ দুরবর্তী হইয়া পড়ে, এবং বিধেয় বস্তুর সহিত তাহার অন্বয়ও হয় না। এ কারণে এইরূপ সাক্ষাৎ ফল দেখিতে পাওয়া যাইতেছে বলিয়া ইতর-নিবৃত্তি যে নিয়ম- বিধির ফল হইবে—এ প্রকার কল্পনা করা উচিত নহে। ৯ তাৎপৰ্য-এক্ষণে এইরূপ একটী শঙ্কা হয় যে, বাস্তবিকপক্ষে নিয়ম-বিধি এবং পরিসংখ্যা-বিধির মধ্যে কোন প্রভেদ দেখা যাইতেছে না। কারণ, পরিসংখ্যা-বিধির স্থলে যে প্রকার ইতরের নিবৃত্তি টী ফল বলিয়া অঙ্গীকৃত হয়, নিয়ম-বিধির স্থলেও দেখিতে পাওয়া যাইতেছে যে, যে অঙ্গটীকে নিয়ত করিয়া দেওয়া হইল, তাহা হইতে পৃথক্ যে সকল অঙ্গ, তাহাদিগেরও নিবৃত্তি হইয়া যাইতেছে ; সুতরাং, উভয় বিধিতেই বিহিত বস্তু হইতে যাহা পৃথ, তাহার নিবৃত্তিরূপ যে ফল, তাহা অপরিহার্য। প্রকৃতস্থলে যে দুইটা উদাহরণ দেওয়া গিয়াছে, সেই দুইটীর প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেই এই শঙ্কার তাৎপৰ্য বেশ বুঝিতে পারা যায়। নিয়ম-বিধির যে উদাহরণ প্রদর্শিত হইয়াছে, অর্থাৎ “ব্রীহির অবঘাত করিবে,” ইত্যাদি, তাহাতে অবঘাতকে কর্তব্য বলিয়া নির্দেশ করিতেছে, এবং সেই সঙ্গেই ইহাও বুঝিতে হইতেছে যে, অবঘাত ব্যতিরিক্ত অন্য যে সকল উপায় দ্বারা তুষ-বিমােক হইতে পারে, তাহাদের পরিহার করিতে হইবে। সুতরাং, ইহাই দাড়াইল যে, অবঘাত যেরূপ বিধেয়, সেইরূপ অবঘাত ব্যতিরিক্ত যে উপায় তাহাও প্রতিষিদ্ধ হইল। এইরূপ পরিসংখ্যা-বিধির উদাহরণেও যে বস্তুটীকে বিধেয় বলিয়া নির্দেশ করা হইতেছে, তাহা হইতে যে পৃথক্ উপায়, অন্য প্রমাণ দ্বারা প্রাপ্ত হয়, তাহার পরিহারও যে অবশ্যকর্তব্য, তাহাও বুঝা যায়। আর তাহাই যদি হইল, তবে এই দুইটী বিধির মধ্যে ফলগত কোন প্রকার বিশেষ কোথায় ? ইহাই হইল শঙ্কা-গ্রন্থের তাৎপৰ্য্য। এতদুত্তরে গ্রন্থকার বলিতেছেন যে, সত্য বটে যে, উভয় বিধি স্থলেই ১২ ১ সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ । ( তাৎপৰ্য)-ইতর-নিবৃত্তি হয়, কিন্তু, নিয়ম-বিধির স্থলে ইতর-নিবৃত্তিকে শব্দের প্রতিপাদ্য অর্থ বলিয়া অঙ্গীকার করিবার আবশ্যকতা নাই, পরন্তু, পরিসংখ্যাবিধিস্থলে ইতর-নিবৃত্তিকেই বিধিবাক্যের অর্থ বলিয়া অবশ্যই অঙ্গীকার করিতে হইবে। কারণ, পরিসংখ্যা-বিধির স্থলে ইতর-নিবৃত্তি যদি বিধির অর্থ না হয়, তাহা হইলে ঐ বিধিবাক্যের কোন প্রকার সার্থকতা থাকে না। ইহা বুঝিবার জন্য একটা উদাহরণ গ্রহণ করা যাউক। শাস্ত্রে আছে “পঞ্চপঞ্চ-নখা ভক্ষ্যাঃ” অর্থাৎ পঞ্চনখ বলিয়া যে সকল পশু প্রসিদ্ধ আছে, তাহাদিগের মধ্যে শশক ও শল্যকী প্রভৃতি পাঁচপ্রকার পঞ্চনখ পশুকেই ভক্ষণ করিবে। এক্ষণে দ্রষ্টব্য এই যে, যে ব্যক্তি মাংস-ভক্ষণে অনুরাগবশতঃ পঞ্চনখেরও মাংস ভক্ষণে উদ্যত হয়, সে, এরূপ বিধিবাক্যের কোনপ্রকার অপেক্ষা না করিয়াও স্বতঃপ্রবৃত্তিরই বশে শশক-শল্যকী প্রভৃতি পঞ্চনখ পশুর মাংস ভক্ষণ করিয়া থাকে। সুতরাং, শশক-শল্যকী প্রভৃতি পঞ্চনখপশুর মাংস সে ভক্ষণ করিবে, এইপ্রকার বিধি নিস্পয়ােজন বলিয়া প্রতীত হইয়া থাকে। ইহা যদি অপূৰ্ব্ব-বিধি হইত, তাহা হইলে ইহার সার্থকতা থাকিতে পারিত কিন্তু, বাস্তবিক ইহা অপূৰ্ব বিধি নহে। কারণ, অপূৰ্ব্ব-বিধিস্থলে সেইরূপ বস্তুই বিধেয় হইয়া থাকে, যাহার অনুষ্ঠান করিলে অপূৰ্ব্ব বা পুণ্যের লাভ হয়, রাগবশতঃ মাংস-ভক্ষণে প্রবৃত্ত পুরুষের পক্ষে মাংস-ভক্ষণ, কোন প্রকার অপূৰ্ব্ব বা পুণ্যের সাধক হইতে পারে না; সুতরাং, ইহা অপূৰ্ব্ব-বিধি বলা যায় না। এরূপ স্থলে এই বিধিবাক্যের সার্থক্য রক্ষা করিতে হইলে এই প্রকার কল্পনা করাই সঙ্গত যে, ইহা বাস্তব পক্ষে রাগবশতঃ প্রাপ্ত যে পঞ্চ- নখ পশুর মাংস-ভক্ষণ, তাহার বিধান করিতেছে না; কারণ সেরূপ বিধান নিষ্প্রয়ােজন, কিন্তু, শশক শল্যকী প্রভৃতি পঞ্চনখ ভিন্ন অন্য যে পঞ্চনখ ( অর্থাৎ বানর প্রভৃতি পশু আছে,) তাহাদের মাংস-ভক্ষণ করিতে যদি কোন ব্যক্তি রাগবশতঃ প্রবৃত্ত হয়, তাহা হইলে তাহার পক্ষে সেইরূপ মাংস-ভক্ষণ অনিষ্টের কারণ হইবে বলিয়া, তাহা হইতে তাহাকে নিবৃত্ত করিবার জন্যই, শাস্ত্র “পাঁচটী পঞ্চনখ ভক্ষণ করিবে” এইপ্রকার ব্যপদেশে সেই পাঁচটী হইতে ভিন্ন অন্যপ্রকার পঞ্চনখের ভক্ষণই নিষেধ করিতেছে। ফলতঃ, এই বিধি বাক্যকে ঘুরাইয়া ইহার এইরূপ অর্থ করিতে হইবে যে, পঞ্চবিধের পঞ্চন ভক্ষণ করিবে না। ইহাই হইল পরিসংখ্যা ও অপূৰ্ব্ব-বিধির পার্থক্য। এইবার দেখা যাউক, পরিসংখ্যা ও নিয়ম-বিধির মধ্যে প্রভেদ কি ?
প্রথম পরিচ্ছেদঃ । ( তাৎপৰ্য)—নিয়ম-বিধির যে উদাহরণ, যেমন “ব্রীহির অবঘাত করিবে” ইত্যাদি, এইস্থলে যদি নিয়ম-বিধি না থাকিত, তাহা হইলে ব্রীহি হইতে তুষ-বিমােক করিবার জন্য উদ্যত ব্যক্তি কদাচিৎ নখবিদলনাদির দ্বারা একাৰ্য সম্পাদন করিয়া লইত, এবং তাহার পক্ষে নিম্প্রয়ােজন বলিয়া সেইরূপ স্থলে আর অবঘাতের আবশ্যকতাও থাকিত না। এরূপ ক্ষেত্রে অবঘাত একেবারেই পরিত্যক্ত হইতে পারিত, ইহারই নাম অবঘাতের পাক্ষিক অপ্রাপ্তি। কিন্তু, পরিসংখ্যা-বিধির স্থলে আপাততঃ বিধেয় বলিয়া প্রতীয়মান যে শশক-শল্যকী প্রভৃতির মাংস-ভক্ষণ, তাহাতে এই প্রকার পাক্ষিক অপ্রাপ্তির সম্ভাবনা নাই। কারণ, যে রাগবশতঃ মাংস ভক্ষণ করিতে প্রবৃত্ত হয়, সে শশক-শল্যকী ব্যতিরিক্ত অন্য পঞ্চনখের মাংস-ভক্ষণ কালে শশক-শল্যকী প্রভৃতির মাংস-ভক্ষণ পরিহার করিবে এপ্রকার কল্পনা করা যায় না। এরূপ স্থলে, তাহার পক্ষে সুখের বা তৃপ্তির কারণ বলিয়া, উভয়- বিধ পঞ্চনখের মাংস-ভক্ষণই প্রাপ্ত হইয়া খাকে। এই কারণে শশক ও শল্যকী প্রভৃতির মাংস-ভক্ষণে পাক্ষিক অপ্রাপ্তি নাই। কিন্তু নিয়ম-বিধির স্থলে অবঘাতের পাক্ষিক অপ্রাপ্তি আছে। তাহাই যদি হইল, তবে ইহা বেশ স্পষ্টভাবে বুঝাগেল যে, নিয়ম বিধির যাহা বিধেয়, তাহাতে পাক্ষিক অপ্রাপ্তি আছে এবং পরিসংখ্যা-বিধির বিধেয় বলিয়া যাহা প্রতীয়মান, তাহাতে পাক্ষিক অপ্রাপ্তির সম্ভাবনা নাই। যে বস্তুয় পাক্ষিক অপ্রাপ্তির সম্ভাবনা নাই, তাহার বিধান করিবারও কোন আবশ্যকতা নাই। এজন্য তাহার যে বিধান, তাহার তাৎপৰ্য এই যে, তদিতর বস্তুর বর্জন। কিন্তু, নিয়ম- বিধির স্থলে পাক্ষিক অপ্রাপ্তিকে পরিহার করিবার জন্য যে বিধান করা হয়, তাহা নিরর্থক বলা যায় না। সুতরাং, এরূপ স্থলে যে বিধি, তাহার সহিত বিধেয়ের সম্বন্ধ অবিচ্ছিন্ন, কিন্তু পরিসংখ্যার স্থলে যাহা বিধি বলিয়া প্রতীয়মান, তাহার সহিত বিধেয়ের কোন সম্বন্ধ নাই। প্রত্যুত বিধির অর্থ নিষেধরূপে পৰ্যবসন্ন হইয়া থাকে। ফল কথা এই যে, পরিসংখ্যা-বিধিস্থলে মুখ্যার্থ পরিত্যাগ করিয়া বিধিবাক্যের অর্থ করিতে হয়, নিয়মবিধির স্থলে তাহা করিতে হয় না। পরিসংখ্যা-বিধির স্থলে ইতর-নিবৃত্তিটী শব্দের মুখ্যার্থ না হইলেও, লক্ষণা দ্বারা তাহা শব্দের অর্থ বলিয়া কল্পনা করিয়া লইতে হয়, নিয়ম-বিধির স্থলে তাহা শব্দের অর্থ বলিয়া গৃহীত হয় না, প্রয়ােজন না থাকা নিবন্ধন আপনা হইতেই লােকের ১৪ সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ । ( তাৎপৰ্য্য )ইতর-নিবৃত্তি হইয়া থাকে। ইহাই হইল নিয়ম-বিধি ও পরিসংখ্যা-বিধির পার্থক্য। ফল কথা এই ;—নিয়ম-বিধি হইল পক্ষপ্রাপ্ত অবহননাদি ক্রিয়ার বিধায়ক, এবং পরিসংখ্যা হইল নিত্যপ্রাপ্ত ক্রিয়ার নিষেধ। অতএব এই দুই বিধির স্বরূপতঃ ভেদ স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতেছে। ইতর-নিবৃত্তিরূপ ফল উভয়েরই সমান, এজন্য, ফল দ্বারা উভয়ের একরূপতা হইল—এই যে শঙ্ক। পূৰ্বে করা হইয়াছিল, তাহার উত্তর এই যে, নিয়ম-বিধির অপ্তাংশ-পরিপূরণ রূপ নিয়মকেই নিয়ম-বিধির ফল বলিতে হইবে, ইতর-নিবৃত্তিকে ফল বলা চলিবে না। তাহার কারণ এই যে, নিয়মটী প্রথমােপস্থিত এবং তৎপরে বিধেয়-অবহননাদি-রূপ ক্রিয়াগত; এজন্য বিধির প্রতি প্রত্যাসন্ন, অর্থাৎ সমীপবর্তী। যাবৎ পৰ্যন্ত বিধির দ্বারা অবহননের নিয়ম হয় না, তাবৎ পৰ্যন্ত ইতরের নিবৃত্তি প্রাপ্ত হওয়া যায় না। অতএব, ইতর-নিবৃত্তিটী নিয়মের পশ্চাদ- ভাবিনী। এজন্য, প্রথমােপস্থিত হইল নিয়ম, এবং ইতর-নিবৃত্তির হইল বিলম্বিত উপস্থিতি। আর নিবৃত্ত পদার্থটিকে অননুষ্টেয় কিংবা অনঙ্গ বলিতে হইবে। সুতরাং, সেই নিবৃত্তিটা অবিধেয়-নখবিদগনাদি-নিষ্ঠ হইল, আর তজ্জন্ত তাহার সহিত বিধির নৈকট্য সম্বন্ধ নাই। বিধি হইল লিঙ, তৎসহচরিত হইল ধাতু। সুতরাং, ধাত্ব এবং লিঙ, অর্থের অব্যবহিত সম্বন্ধ থাকাই হইল সাধারণ রীতি। নিয়মকে নিয়মবিধির ফল বলিলে নিয়মটী সেই ধাত্বৰ্থভূত অবহননাদি-ক্রিয়ানিষ্ঠ হয়, অতএব বিধির সহিত অব্যবহিত সম্বন্ধ থাকে। আর যদি পরিসংখ্যা-বিধির মত ইতর- নিবৃত্তিই ইহার অর্থ বলা হয়, তাহা হইলে তাহা অবহননাদি-নিষ্ঠ হইতে পারে না। অতএব বিধির সহিত তাহার অব্যবহিত সম্বন্ধ থাকে না। তাহার তখন দূর সম্বন্ধ হইয়া যায়। অতএব ইহাই স্থির হইল যে, নিয়ম-বিধির নিয়মই ফল, এবং তাহার হেতু দুইটী, যথা—প্রথমােপস্থিতত্ব, এবং বিধির সহিত সেই নিয়মের নিকট সম্বন্ধ, এবং ইতর-নিবৃত্তি তাহার ফল নহে। তাহারও কারণ দুইটী, তাহারও কারণ দুইটী, যথা—তাহার পশ্চাদ্ভাবি, এবং বিধির সহিত ব্যবহিতত্ব। সুতরাং, পরিসংখ্যার সহিত ইহার যথেষ্ট ভেদ রহিল। আরও জানিয়া রাখিতে হইবে যে, পরিসংখ্যা-বিধি দ্বিবিধ, যথা- শ্রৌত-পরিসংখ্যা এবং অপরটি লাক্ষণিক পরিসংখ্যা। শ্রৌত-পরিসংখ্যা প্রথম পরিচ্ছেদঃ এবং বিবিক্তা তিস্যু বিধাসু কিংবিধঃ শ্রবণবিধিঃ আশ্ৰীয়তে। ১০ প্ৰকটাকার প্রভৃতির মত। বেদান্তস্রবণের অপূৰ্ব্ব-বিধিত্ব। প্ৰকটার্থকারাদয়ঃ কেচিদাহুঃ—অপূর্ববিধিরয়ম্ ; অপ্রাপ্তবাৎ। ন হি“বেদান্তশ্রবণং ব্রহ্মসাক্ষাৎকারহেতুঃ ইতি অন্বয়ব্যতিরেকপ্রমাণ অস্তি। লােকে কৃতশ্রবণস্যাপি বহুশঃ তদনুৎপত্তেঃ অকৃতশ্রৰণস্যাপি গর্ভগতস্য বামদেবস্য তৎপত্তেঃ উভয়তঃ ব্যভিচারাৎ। ন বা শ্রবণমাত্রং শ্রোতব্যার্থ-সাক্ষাৎকারহেতুরিতি শাস্ত্রান্তর-শ্রবণে গৃহীতঃ সামান্থনিয়মােহস্তি। যেন অত্র বিশিষ্য হেতু গ্রাহকাভাবেইপি সামান্য-মূখেন এব হেতুং প্রাপ্যতে ইত্যাশঙ্কেত। গান্ধর্বদিশাস্ত্র- শ্রবণস্য ষড় জাদি-সাক্ষাৎকার-হেত্বাভপগমেহপি কর্মকাণ্ডাদি- শ্রবণাৎ তদর্থ-ধৰ্ম্মাদি-সাক্ষাৎকারদর্শনেন ব্যভিচারাৎ। তস্মাৎ অপূৰ্ব্ববিধিরেবায়ম্। ভাষ্যেহপি “সহকাৰ্যন্তরবিধিঃ পক্ষেণ তৃতীয় তদ্বততা বিধাদিবৎ” (বে, সূ ২৪৪৭) ইত্যধিকরণে বিদ্যাসহকারিণাে মৌনস্য বাল্যপাণ্ডিত্যবদ বিধিরেব আয়িতব্যঃ, অপূৰ্বত্বাং ; ইতি পাণ্ডিত্য-শব্দশব্দিতে শ্রবণে অপূর্ববিধিরেবাঙ্গীক্ৰিয়তে” ইতি। ১১ ( তাৎপৰ্য)—স্থলে “অত্রৈব উদ্ভাবয়তি” বাক্যের মত “এব” কারাদির দ্বারা ইতর-বর্জন করা হয়, এবং লাক্ষণিক-পরিসংখ্যা স্থলে “এব”কার প্রভৃতি ইতর- নিবৃত্তিবাচক শব্দ থাকে না। সুতরাং, লক্ষণ-দ্বারাই ইতর-নিবৃত্তি হয়। উপরে যাহা বলা হইল, তাহা লাক্ষণিক-পরিসংখ্যার উদাহরণ অবলম্বন করিয়া বলা হইল। এস্থলে আরও লক্ষ্য করিতে হইবে যে, এস্থলে যে পরিসংখ্যার উদাহরণ প্রদত্ত হইয়াছে, তাহা বস্তুতঃ প্রকৃত পরিসংখ্যার দৃষ্টান্ত নহে। উহাকে মীমাংসা-দর্শনে নিয়মবিধিই বলা হইয়াছে। পরিসংখ্যা-বিধির প্রকৃত দৃষ্টান্ত উক্ত “পঞ্চপঞ্চখা ভক্ষ্যা” ইত্যাদি স্থল বুঝিতে হইবে। অনুবাদ—এইভাবে বিধির তিনটি প্রকারভেদ নিরূপিত হইয়া গেল। এক্ষণে শ্রবণবিধি অর্থাৎ “শ্রাতব্য” ইত্যাদি শ্রুতিতে যে শ্রবণবিধি আছে, তাহা উক্ত তিন প্রকার বিধির মধ্যে কোন প্রকার বিধি বলিতে হইবে, (তাহাই বিচাৰ্য)। ২৭ সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ । (অনুবাদ)-প্ৰকটাৰ্থকার নামে কোন কোন শংকরভাষ্যের টীকাকার এই- রূপ বলিয়া থাকেন যে, এই বিধিটী (অর্থাৎ “শ্রোতব্য”ইত্যাদি বিধিটী) অপূৰ্ব্ব- বিধি। কারণ, ইহা অপ্রাপ্ত। অর্থাৎ বেদান্তবাক্যের শ্রবণ, যে ব্ৰহ্মসাক্ষাৎ- কারের হেতু, তাহা এই বিধি ব্যতিরিক্ত কোন প্রমাণ দ্বারা বুঝিতে পারা যায় । বেদান্তবাক্য-শ্ৰবণ ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের হেতু, এই বিষয়ে অন্বয় বা ব্যতি- রেকরূপ কোন প্রমাণ নাই। লােকে দেখাযায় বহুবার বেদান্তশ্রবণ করিলেও ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকার হয় না, এবং বেদান্তশ্রবণ না করিয়াও গর্ভগত বামাদবেরও ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকার হইয়াছিল। একারণ উভয় দিকেই অন্বয় এবং ব্যতিরেকের ব্যভিচার দেখিতে পাওয়া যায়। যাহাই শ্রোতব্য, তাহারই সাক্ষাৎকার করিতে হইলে তৎপ্রতিপাদক শাস্ত্রের শ্রবণ কৰ্ত্তব্য—এই ভাবে শাস্ত্রান্তর, শ্রবণ-স্থলে অবগত কোন যে সামান্য নিয়ম আছে, তাহাও বলা যায় না। যদি ঐ প্রকার নিয়ম থাকিত, তাহা হইলে প্রকৃতস্থলে বিশেষভাবে, অর্থাৎ বেদান্তবাক্যশ্রবণ ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকারের হেতু—এই ভাবে কারণতার গ্রাহক কোন প্রমাণ না থাকিলেও সামান্য নিয়মানুসারেই হেতুতা ( অর্থাৎ ব্ৰহ্ম- সাক্ষাৎকারের প্রতি বেদান্তবাক্য শ্রবণের কারণত) বুঝা যাইতে পারে- এই প্রকার আশংকা হইতে পারিত। গন্ধৰ্ব্ব-শাস্ত্র-শ্রবণ ষড়জ, প্রভৃতি স্বরের সাক্ষাৎকারের প্রতি কারণ হইয়া থাকে—ইহা স্বীকৃত হইলেও কর্মকাণ্ডের শ্রবণ করিলে তাহার অর্থ যে ধৰ্ম্ম প্রভৃতি, তাহার সাক্ষাৎকার হয় না বলিয়া উক্ত নিয়মের ব্যভিচার দেখিতে পাওয়া যায়। সেইজন্য এই বিধি অপূৰ্ব্ব- বিধি হইতেছে। শাঙ্করভাষ্যেও “সহকাৰ্য্যন্তরবিধিঃ পক্ষেণ তৃতীয়ং তদ্বতঃ বিধাদিবৎ” এই সূত্রের ব্যাখ্যা-প্রসঙ্গে বিদ্যালাভের সহকারী কারণ যে মৌন অর্থাৎ নিদিধ্যাসন, তদ্বিষয়ে বাল্য এবং পাণ্ডিত্যের ন্যায় অর্থাৎ শ্রবণ ও মননের ন্যায় বিধিরই আশ্ৰয় করিতে হইবে। কারণ, ঐ নিদিধ্যাসন অপূৰ্ব্ব অর্থাৎ প্রমাণান্তর দ্বারা অপ্রাপ্ত। ( অর্থাৎ বিধি ব্যতিরেকে) ব্ৰহ্ম- সাক্ষাৎকারের কারণ বলিয়া নিদিধ্যাসনকে বুঝা যায় না, ভাষ্যকারের এইরূপ বাক্যের দ্বারা পাণ্ডিত্য শব্দের অর্থ যে শ্রবণ, তদ্বিষয়ে যে অপূৰ্ব্ব-বিধি স্বীকার করিতে হইবে, তাহাই প্রদর্শিত হইয়াছে। (অর্থাৎ ইহাই হইল প্ৰকটার্থ- কারদিগের অভিপ্রায় )।১১ তাৎপৰ্য-উপনিষদে এইরূপ একটী বাক্য আছে যে, “আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতব্যা মন্তব্যে। নিদিধ্যাসিতব্য” ইত্যাদি। ইহার অর্থ এই যে, প্রথম পরিচ্ছেদঃ। ( তাৎপৰ্য)-আত্মার সাক্ষাৎকার করিতে হইবে, আত্মাকে শ্রবণ করিতে হইবে, আত্মার মনন করিতে হইবে, আত্মার নিদিধ্যাপন করিতে হইবে। এই বাক্যে চারিটি বিধি শ্রুত হইতেছে। অর্থাৎ, প্রথম, দর্শনের বিধি, তাহার পর সেই দর্শনের উপায়স্বরূপ শ্রবণবিধি, তৎপরে মননবিধি এবং তৎপরে নিদিধ্যাসন অর্থাৎ ধ্যানের বিধি। এই বিধি কয়টীর মধ্যে শ্রোতব্য অর্থাৎ শ্রবণবিধিটী কি প্রকার, তাহা নিরূপণ করিতে উদ্যত হইয়া গ্রন্থকার প্রথমেই প্রকটাৰ্থকারের মত কি, তাহা বলিতেছেন। প্ৰকটাৰ্থকারের মতে ইহা অপূর্ব-বিধি। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, যে। বস্তু প্রমাণান্তর দ্বারা অপ্রাপ্ত, তাহারই যে বিধি, তাহারই নাম অপূৰ্ব্ববিধি। প্রকৃতস্থলে ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকার করিতে হইলে বেদান্তবাক্য শ্রবণ কর্তব্য, এইরূপ বিধি বাক্যের অর্থ হইতে ইহা বুঝিতে পারা যায়, বেদান্ত-বাক্য-শ্রবণ ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের কারণ। এক্ষণে জিজ্ঞাস্য এই যে, বেদান্ত-বাক্য-শ্রবণ যে ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের কারণ, তাহা এই বিধিবাক্যের দ্বারা বুঝিতে পারা যায় বা অন্য কোন উপায় দ্বারা বুঝিতে পারা যায় ? অন্য কোন উপায় দ্বারা বুঝিতে হইলে সে উপায় কি হইতে পারে ? সাধা- রণতঃ লােকে কোটী কাৰ্য্য এবং কোটী কারণ ইহা বুঝিবার জন্য যে উপায় অবলম্বন করে, শাস্ত্রে তাহার নাম অন্বয় ও ব্যতিরেক বলা হইয়াছে। অন্বয় শব্দের অর্থ একের সত্তায় অপরের সত্তা, ব্যতিরেক শব্দের অর্থ একের অভাবে অপরের অভাব। যেমন ধূমকে আমরা বহ্নির কাৰ্য্য বলিয়া জানি। কেন জানি ? যেহেতু ধূম যেখানে থাকে তথায় পূর্বে নিশ্চয়ই বহ্নির সত্তা থাকে। অর্থাৎ বহ্নি থাকিলে ধুম উৎপন্ন হয়। ইহারই নাম ধূমে বহ্নির অম্বয়। এইরূপ যেখানে বহ্নি নাই সেখানে ধূম উৎপন্ন হইতে পারে না ইহারই নাম ব্যতিরেক। এইরূপ অন্বয় ও ব্যতিরেক দেখিয়া, আমরা সাধারণতঃ কাৰ্য-কারণভাবের নিশ্চয় করিয়া থাকি। এক্ষণে দেখিতে হইবে যে, বেদান্তবাক্য-শ্রবণরূপ কারণের সহিত ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকাররপ কার্যের এই প্রকার অন্বয়-ব্যতিরেক আছে কি না? কারণ, এইরূপ অন্বয়-ব্যতিরেক দ্বারা যদি আমরা বুঝিতে পারি যে, ব্ৰহ্ম- সাক্ষাৎকার বেদান্তস্রবণের ফল, তাহা হইলে শ্রবণবিধি কখনই অপূৰ্ব্ববিধি হইতে পারে না। আর যদি অন্বয় ও ব্যতিরেকের দ্বারা বেদান্তবাক্যশ্রবণ ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের কারণ এই প্রকার বুঝিবার সম্ভাবনা না থাকে, তাহা হইলে অপ্রাপ্ত অর্থের বিধায়ক বলিয়া শ্রবণবিধিকে অপূৰ্ব্ববিধি বলা যাইতে পারে।
সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ । ( তাৎপৰ্য)—প্ৰকটাৰ্থকার বলিতে চাহেন যে, এই প্রকার অন্বয় ও ব্যতি- রেক দ্বারা বেদান্তবাক্যশ্রবণ যে ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের কারণ, তাহা বুঝিতে পারা যায় না। যেহেতু, অনেকস্থলেই এই প্রকার দেখিতে পাওয়া যায় যে, অনেক ব্যক্তি বারবার বেদান্তবাক্য শ্রবণ করিতেছে, অথচ তাহার ব্রহ্মসাক্ষাৎকার হইতেছে না। এবং কেহ কেহ বেদান্তবাক্যশ্রবণ জন্মে কখনও না করিয়া ব্ৰহ্ম- সাক্ষাৎকার লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছে। ইহাও পুরাণাদিতে দেখিতে পাওয়া যায়, যেমন-বামদেব। তিনি মাতৃগর্ভে অবস্থান কালেই ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎ- কার লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন—এইরূপই পুরাণে কথিত হইয়াছে। সুতরাং, দেখা যাইতেছে, বেদান্ত-শ্রবণ করিলেও ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকার হয় , এবং বেদান্ত-শ্রবণ না করিলেও ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকার হয়, অর্থাৎ ব্রহ্ম- সাক্ষাৎকারের প্রতি অন্বয় প্রতি অন্বয় ও ব্যতিরেক দ্বারা বেদান্তবাক্য-শ্রবণের হেতু বুঝিতে পারা যায় না। সুতরাং, এই হেতু অপ্রাপ্ত হইল। এই কারণে অর্থাৎ উক্ত শ্রবণবিধি এই অপ্রাপ্ত হেতুতার বােধক বলিয়া ইহাকে অপূৰ্ববিধি বলাই উচিত। ইহাই হইল প্ৰকটাৰ্থকারের মত। এখন ইহার উপর এইরূপ আপত্তি উত্থাপিত হইতে পারে যে, বাধিত যে অর্থ, তাহা বেদেরও সামর্থ্য নাই যে বুঝাইয়া দেয়। যেমন বেদে আছে যে “গ্রাবাণঃ প্লবন্তে” অর্থাৎ প্রস্তর ভাসিয়া থাকে। কিন্তু ইহা বেদের কথা বলিয়া কি আমরা বিশ্বাস করি ? কখনই নহে। কারণ, আমরা প্রত্যক্ষাদি প্রমাণ দ্বারা বুঝিতে পারি যে, পাথর কখনই ভাসে না। অতএব এই স্থলে বাধ্য হইয়া বেদবাক্যের মুখ্যার্থ পরিত্যাগ করিয়া লক্ষণা আশ্রয় করিয়া অন্য অর্থ করিতে হয়। সেইরূপ প্রকৃত স্কুলে আমি যদি দেখিতে পাই যে, বেদান্ত-বাক্য-শ্রবণ ব্যতিরেকেও ব্ৰহ্ম- সাক্ষাৎকার হয়, তাহা হইলে ব্যতিরেক-ব্যভিচার দ্বারা ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎকারের প্রতি বেদান্ত-বাক্য-শ্রবণের হেতু নাই ইহা বুঝা গেল। সুতরাং, বেদান্ত- বাক্য-শ্রবণ ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারে যে “হেতু” তাহা বাধিত হইল। এখন এই বাধিত অর্থ যদি বেদ প্রতিপাদন করে, তাহা হইলে তাহা কখনই গ্রাহ্য হইতে পারে না। সুতরাং, এক্ষণে জিজ্ঞাস্য হইবে যে, অন্বয়-ব্যতিৱেক-ব্যভিচার দ্বারা যে কারণ বাধিত, অর্থাৎ যাহা কারণ হইতে পারে না বলিয়া নিশ্চিত তাহাকে কারণ বলিয়া বুঝাইবার জন্য যে শ্রবণ-বিধিকে অপূৰ্ববিধি বলিয়া অস্বীকার করা হইতেছে, তাহার প্রমাণ থাকে কি প্রকারে ? ।
প্রথম পরিচ্ছেদঃ। ১৯ ( তাৎপৰ্য)–এতদুত্তরে তাহারা বলেন যে, এইপ্রকার প্রত্যক্ষসিদ্ধ অম্বয় ও ব্যতিরেকের ব্যভিচার দ্বারা বেদবােধিত কারণ খণ্ডন হইতে পারে না। কারণ, তাহা হইলে আবহমানকাল হইতে প্রচলিত যে সকল বৈদিক যাগ- যজ্ঞাকি, তাহার উচ্ছেদ হইয়া যাইতে পারে। কিন্তু, বাস্তবিক তাহা হয় না। বিষয়টী ভাল করিয়া বুঝা যাউক। বেদে আছে “অগ্নিহােত্ৰং জুহুয়াৎ স্বর্ণকামঃ” অর্থাৎ যে স্বর্ণকামনা করে তাহার অগ্নিহােত্র যাগ করা কর্তব্য। এই বাক্যের দ্বারা আমরা বুঝিতে পারি যে, স্বর্গ অগ্নিহােযাগের ফল। কিন্তু, ইহাতে অন্বয় ও ব্যতিরেক এই উভয়েরই ব্যভিচার দেখিতে পাওয়া যায়। কারণ, যে কালে অগ্নিহােত্র যাগের অনুষ্ঠান হয় সেই কালেই স্বর্গ হয় না, অথচ যখন স্বর্গলাভ হয়, তখন অগ্নিহােত্র যাগও নষ্ট হইয়া যায়। এইরূপ স্বর্গফলের প্রতি অগ্নি- হােত্র যাগের অন্বয় ও ব্যতিরেক ব্যভিচার থাকা প্রযুক্ত, উহাকে স্বর্গলাভের কারণ বলিয়া গণ্য করিতে পারা যায় না। এখন ইহাই যদি হইল তবে অগ্নিহােত্র যাগের অনুষ্ঠান, বেদ-প্রমাণের উপর নির্ভর করিয়া আমরা করি কি প্রকারে ? ইহার উত্তরে মীমাংসকগণ এই প্রকার সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে, প্রমাণ দ্বারা কোন একটী বস্তু কোন অপর একটি বস্তুর কারণ বলিয়া ব্যবস্থাপিত হইলে, পরে যদি ঐ কার্য-কারণের মধ্যে অন্বয় ও ব্যতিরেক-ব্যভিচার আশংকিত হয়, তাহা হইলে ঐ কাৰ্য্য এবং কারণের মধ্যবর্তী আর একটা অদৃষ্টব্যাপার কল্পনা করিয়া উক্ত আশংকিত ব্যভিচারের পরিহার করিতে হয়। যেমন লােকমধ্যে রোগ-নিবৃত্তি জন্য বৈদ্য যখন দীর্ঘকাল কোন ঔষধ- বিশেষ সেবনের ব্যবস্থা করে এবং দীর্ঘকাল পরে সেই রােগের নিবৃত্তি হইয়া থাকে, তখন প্রথম দিনের ঔষধ-সেবন যদিও রােগ-নিবৃত্তির অব্যবহিত পূৰ্বে থাকে না, তথাপি তাহা রােগ-নিবৃত্তিরই কারণ হইয়া থাকে বলিতে হইবে। কারণ, উক্ত রােগটী দীর্ঘকাল-ব্যাপি ঔষধ-সেবনের ফলেই প্রশমিত হইয়াছে। অতএব প্রথম দিনের ঔষধ সেবন ও রােগ-নিবৃত্তির মধ্যে এমন একটী সম্বন্ধস্থাপন করিতে হইবে, যাহার দ্বারা প্রথম দিনের ঔষধ সেবনটী রােগনিবৃত্তির কারণ বলিয়া গৃহীত হইতে পারে। এই সম্বন্ধ ঔষধ-সেবন- জন্য একটী অদৃষ্ট-সংস্কার ভিন্ন আর কি হইতে পারে ? সুতরাং, এস্থলে যেমন প্রমাণসিদ্ধ কাৰ্য-কারণ-ভাবকে রক্ষা করিবার জন্য একটা অদৃষ্ট কল্পনা করিতে হয়, তদ্রুপ অগ্নিহােত্র এবং স্বর্গের বেদবাক্যরূপ প্রমাণ- ২০ সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ । ( তাৎপৰ্য)-সিদ্ধ যে কাৰ্যকারণভাব, সেই কাৰ্যকারণ-ভাবকে উপপন্ন করিবার জন্য একটী অদৃষ্ট কল্পনা করিতে হয়। সুতরাং, বলিতে হইবে পূর্বোক্ত বামদেবের বেদান্ত-শ্রবণ ভিন্ন ব্ৰহ্ম- সাক্ষাৎকার হওয়ায় বেদবাক্য কোন বাধিত অর্থের বােধক হইতেছে না, অর্থাৎ বামদেবের ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎকারটী পূর্বজন্মের বেদান্ত-শ্রবণজনিত অদৃষ্টের ফল ইহা কল্পনা করিতে হইবে। সুতরাং, শ্রবণবিধি যদি অপূৰ্ব্ব-বিধি হয়, তাহা হইলে তাহা বাধিত অর্থের বােধক বলিয়া যে, তাহা অপ্রমাণ-এরূপ শঙ্কা কখনই উদিত হইতে পারে না। বেদান্তবাক্য-শ্রবণ ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎকারের কারণ, ইহা অন্বয় ও ব্যতিরেক দ্বারা বুঝিতে না পারা যাইলেও অন্য উপায়েও বুঝিতে পারা যায়। এই- প্রকার শঙ্কা করিয়া গ্রন্থকার বেদান্ত-শ্রবণবিধিটী যে অপূৰ্ব্ব-বিধি হইতে পারে না, এই প্রকার একটী আপত্তি-উত্থাপন করিয়া তাহার পুনরায় একটী উত্তর দিয়াছেন। আপত্তিটী এই,সামান্যতঃ লােকমধ্যে এইপ্রকার একটী নিয়ম দেখিতে পাওয়া যায় যে, যে শাস্ত্রের যাহা প্রতিপাদ্য, সেই বস্তুর সাক্ষাৎকার করিতে হইলে সেই শাস্ত্র-শ্রবণের আবশ্যকতা আছে। যেমন, সঙ্গীতশাস্ত্রের শ্রবণ, সেই সঙ্গীতশাস্ত্রের প্রতিপাদ্য স্বর-তারতম্য-বিষয়ে সাক্ষাৎ- কারের কারণ হইয়া থাকে, সেইরূপই বেদান্তশাস্ত্র-শ্রবণ, বেদান্তশাস্ত্র-প্রতি- পাদ্য ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎকারের কারণ হইবে না কেন? এই প্রকার সামান্য নিয়মানুসারে যখন সকলেরই ইহা বোধগম্য হইতে পারে যে, বেদান্তবাক্য- শ্রবণ ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎকারের কারণ, তখন ইহা নিশ্চয়ই সিদ্ধ হইতেছে যে, এই কার্যকারণ-ভাব অপ্রাপ্ত নহে। যদি অ প্রাপ্ত না হয়, তাহা হইলে তাহার বােধক যে বিধি, তাহাকে অপূৰ্ব্ব-বিধি কি প্রকার বলা যাইতে পারে। প্ৰকটাৰ্থকার বলিতে চাহেন যে, এই প্রকার আপত্তিও অকিঞ্চিৎকর। কারণ, “শাস্ত্র-প্রতিপাদ্য অর্থ-সাক্ষাৎকারের প্রতি শাস্ত্রের শ্রবণই হেতু” এই প্রকার সামান্য নিয়ম কল্পনা করা যাইতেই পারে না। সঙ্গীতাদি শাস্ত্রের ন্যায় কোন কোন শাস্ত্র-শ্রবণ তদীয় প্রতিপাদ্য অর্থ-সাক্ষাৎকারের কারণ বলিয়া অঙ্গীকৃত হইলেও শাস্ত্রমাত্রেরই পক্ষে এই নিয়ম প্রযুক্ত হইতে পারে না। কারণ, কর্মকাণ্ডাত্মক বেদভাগ ধৰ্ম্মকে প্রতিপাদন করিয়া থাকে, সেই ধৰ্ম্ম অতীন্দ্রিয় বস্তু ; সুতরাং, তাহার সাক্ষাৎকার হইবার সম্ভাবনা নাই। অতএব, অবশ্যই ইহা অঙ্গীকার করিতে হইবে যে, শাস্ত্ৰাৰ্থ-সাক্ষাৎকারের প্রথম পরিচ্ছদঃ । ২১ ( তাৎপৰ্য)—প্রতি যে শাস্ত্রশবণ একটী হেতু—এই সামান্য নিয়মের এইস্থলে ব্যভিচার হইতেছে। তাহা হইলেই ইহা সিদ্ধ হইল যে, এ প্রকার নিয়ম বলে বেদান্তবাক্য:শ্রবণকে ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের হেতু বলিয়া বুঝা যায় না। অতএব উক্ত আপত্তি অকিঞ্চিৎকর। সুতরাং, পূৰ্ব্বে যাহা বলা হইয়াছে যে, গােতব্যবাক্যে যে বিধি, তাহা অপূৰ্ব্ববিধি, তাহাই অক্ষুন্ন রহিল। ইহার পর শ্রবণবিধি যে অপূৰ্ব্ববিধি, তদ্বিষয়ে আচাৰ্য্য শঙ্করেরও যে সম্মতি আছে, তাহাই দেখাইবার জন্য শারীরকসূত্রের যে সূত্রে ভাষ্যকার এই প্রকার সম্মতি প্রকাশ করিয়াছেন, প্রটার্থকার তাহাই উদ্ধৃত করিয়া নিজ মতের উপসংহার করিতেছেন। সূত্রটী এই “সহকাৰ্যন্তরবিধিঃ পক্ষেণ তৃতীয়ং তদ্বতাে বিধ্যাদিবৎ।” ৩। ৪। ৪৭ ইহার অর্থ এই—“সহকাৰ্যন্তর বিধিঃ” অর্থাৎ ব্রহ্মসাক্ষাৎকারের অন্য - তম সহকারী কারণ যে নিদিধ্যাসন অর্থাৎ ধ্যান, তাহাতেও বিধি অঙ্গীকার করিতে হইবে। কোন সহকারী কারণ-বিশেষে বিধি অঙ্গীকার করিতে হইবে, তাহা দেখাইবার জন্য বলা হইতেছে “তৃতীয়”। অর্থাৎ, শ্রবণ, মনন এবং নিদিধ্যাসন এই ত্রিবিধ ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎকারের কারণের মধ্যে যাহা তৃতীয়, অর্থাৎ মৌন অর্থ নিদিধ্যাসন, তাহাতেই বিধি অঙ্গীকার করিতে হইবে। যদি বল শ্রোতব্য-বস্তু-বিষয়ের সাক্ষাৎকার করিতে হইলে সমাহিত হৃদয়ে ধ্যান-ব্যতিরেকে তাহা হয় না, ইহা ত লােকমধ্যেই প্রসিদ্ধ আছে, তবে আবার তাহার জন্য বিধি স্বীকারের আবশ্যকতা কি ? তাহার উত্তর দিবার জন্য সূত্রে বলা হইয়াছে “পক্ষেণ”। অর্থাৎ শ্রবণের পর নিদিধ্যাসনের যে প্রাপ্তি, তাহ পাক্ষিক প্রাপ্তি ; সাধক যদি বিষয়ান্তর-চিন্তনে ব্যাপৃত হইয়া ধ্যানের দিকে অগ্রসর না হয়, তাহা হইলে, ধ্যানের অপ্রাপ্তিরও সম্ভাবনা আছে। সুতরাং, এই পাক্ষিক অপ্রাপ্তিকে পরিহার করিবার জন্য ধ্যানে বিধির আবশ্যকতা আছে। ইহারই দৃষ্টান্ত-প্রদর্শনার্থ সূত্রে আবার উক্ত হইতেছে, যে “তদ্বতল বিধাদিবৎ”। অর্থাৎ “তৎ” শব্দের অর্থ বিদ্যা, অর্থাৎ শ্রবণাদি- জনিত ব্ৰহ্মবিদ্যা। সেই ব্ৰহ্ম-বিদ্যাশালী ব্যক্তির পক্ষে যেমন শ্রবণ ও মননে বিধি আছে, ইহাও তদ্রুপ। ইহাই হইল উক্ত সূত্ৰাৰ্থ। এই সূত্রের সহিত সমার্থ একটী শ্রুতিও বৃহদারণ্যক উপনিষদে দেখিতে পাওয়া যায়। সেই শ্রুতিটী এই,- ২২ সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ। ( তাৎপৰ্য)-“তন্মাৎ ব্রাহ্মণঃ পাণ্ডিত্যং নির্বিদ্য বাল্যেন তিষ্টাসেৎ। বাল্যs চ পাণ্ডিত্যং চ নির্বিদ্য অথ মুনিরিতি।” ইহার অর্থ এই যে, সেই কারণে অর্থাৎ ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকার ব্যতিরিক্ত অন্য কোন উপায় দ্বারা মােক্ষ লাভ হইবার সম্ভাবনা নাই বলিয়া, ব্রাহ্মণ, পাণ্ডিত্য অর্থাৎ শ্রবণ করিবে। এই শ্রবণের পর বাল্য অবলম্বনপূৰ্ব্বক থাকিবার চেষ্টা করিবে। অর্থাৎ বালকের প্রকৃতি যেমন দম্ভ ও অহংকার বর্জিত এবং যেমন সতত সত্য-পক্ষপাতিনী হইয়া থাকে, সেইরূপ প্রকৃতি অবলম্বন করিয়া আত্মতত্ত্ব-সাক্ষাৎকারার্থী ব্যক্তির শ্রোতব্য-অর্থবিষয়ে মনন অর্থাৎ অনুমান করিতে হইবে। এই প্রকার মননের পর সে মৌন অবলম্বন করিবে, অর্থাৎ মুনিজনােচিত বৃত্তি যে ধ্যান, তাহাই করিবে। এই উপনিষদেরই অন্যত্র আবার দেখিতে পাওয়া যায় যে, শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনরূপ তিনটী সহকারী কারণই তত্ত্বসাক্ষাৎকারের জন্য বিহিত হইয়াছে। এক্ষণে দ্রষ্টব্য এই যে, উক্ত সূত্রে “পক্ষেণ” এই শব্দটী থাক-নিবন্ধন বুঝাইতেছে যে, নিদিধ্যাসনে যে বিধি স্বীকার করিতে হইবে, তাহা নিয়ম-বিধি। কারণ, পাক্ষিক অপ্রাপ্তি-পরিহারের জন্য যে বিধি অঙ্গীকার করা হয়, তাহা নিয়ম-বিধি, ইহা পূৰ্বেই বলা হইয়াছে। তাহাই যদি হইল, তবে এস্থলে এইপ্রকার শঙ্কা হইতে পারে যে, নিদিধ্যাসনে যে বিধি আছে, তাহার দৃষ্টান্তস্বরূপ যখন সূত্রে “বিধাদিবৎ” বলা হইয়াছে, তখন দৃষ্টান্তীভূত যে বিধি, অর্থাৎ শ্রবণের যে বিধি, তাহাও নিয়মবিধি হওয়া উচিত। আর তাহাই যদি হইল তবে, এই এই সুত্রটী, শ্রবণের অপূৰ্ব্ব-বিধিত্বের সাধক বলিয়া প্রকটাৰ্থকার যে মত প্রকাশ করিতেছেন, তাহা কিরূপে সঙ্গত হয় ? ইহার উত্তর এই যে, নিয়ম-বিধিতে পাক্ষিক যে অপ্রাপ্তি এবং অপূৰ্ব্ব- বিধিতে যে একেবারে অপ্রাপ্তি—এই দ্বিবিধ অপ্রাপ্তিতেই অপ্রাপ্তিস্বরূপ সামান্য ধৰ্ম্ম দেখিয়া উভয়ের সাদৃশ্য আছে--এইমাত্রই সূত্র বুঝাইতে চাহে। পরে বিচার পূর্বক দেখিলে বুঝিতে পারা যায় যে, যদি বিধি মানিয়া লওয়া গেল, তবে পাক্ষিকপ্রাপ্তি অংশ যাহা আছে, সেদিকে দৃষ্টিপাত না করিয়াই কেবল অপ্রাপ্তি অংশকে লইয়াই এইপ্রকার দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইলে প্রকৃতস্থলে কোন ক্ষতির সম্ভাবনা নাই। এইরূপ তাৎপৰ্য ভাষ্যকারের হৃদয়স্থিত, ইহা মনে করিয়া প্রকটাৰ্থকার এইরূপ মত প্রকাশ করিয়াছেন।
প্রথম পরিচ্ছেদঃ। বেদান্তশ্রবণে অপূর্ব-ৰিধিত্ব খণ্ডন। বেদান্ত-শ্রবণস্য নিত্যাপরােক্ষ-ব্ৰহ্ম-সাক্ষাৎকার-হেতুত্বং ন অপ্রা- স্তম্। অপরােক্ষ-বস্তুবিষয়-প্রমাণত্বাবচ্ছেদেন সাক্ষাৎকারহেতুত্বস্ত প্রাপ্তেঃ শাদাপরােক্ষবাদে ব্যবস্থাপনাৎ। তদর্থমেব হি তৎপ্রস্তাবঃ। ন চ তাৰ ব্ৰহ্মপ্রমাণনে আপাতদর্শন-সাধারণ-ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকার- হেতুত্ব-প্রাপ্তে অপি অবিদ্যানিবৃত্ত্যর্থ ইষমাণ-সত্তা-নিশ্চয়রূপ-তৎ- সাক্ষাৎকারহেতুত্বং শ্রবণস্য ন প্রাপ্তমিতি বাচ্যম্। বিচারমাস্য বিচাৰ্যনিৰ্ণয়-হেতু ব্ৰহ্ম-প্রমাণস্য তৎসাক্ষাৎকারহেতুত্বস্য চ প্রাপ্তেী বিচারিত-বেদান্তশব্দ-জ্ঞানরূপস্য শ্রবণস্য তদ্ধেতুত্বপ্রাপ্তেঃ। ন চ উক্ত উভয়তঃ ব্যভিচার। সহকারি-বৈকল্যেন অন্বয়-ব্যভিচারস্য অদোষ- হৃৎ, জাতিস্মরণস্য জন্মান্তরশ্রবণাৎ ফলসন্তবেন ব্যতিরেক-ব্যভিচারা- ভাবৎ। অন্যথা ব্যভিচারেণৈব হেতুবাধে শ্রুত্যাপি তৎসাধনতা- জ্ঞানসম্ভবাৎ। ঘটসাক্ষাৎকারে চক্ষুরতিরেকেণ ত্বগিন্দ্রিয়মিব ব্ৰহ্ম- সাক্ষাৎকারে শ্রবণাতিরেকেণ উপায়ান্তরমস্তীতি শংকায়াং ব্যতিরেক- ব্যভিচারস্যাপি অদোষত্বাৎ। তথা চ প্রাপ্ত ন অপূর্ববিধিঃ। বেদান্তশ্রবণে অপূৰ্ব্ব-বিধিত্ব খণ্ডন। অনুবাদ—নিত্য অপরোক্ষ অর্থাৎ সর্বদা প্রত্যঙ্গরূপে প্রকাশমান ব্ৰহ্ম- সাক্ষাৎকারের হেতুতা যে, বেদান্ত-বাক্যশ্রবণে আছে, তাহাকে অপ্রাপ্ত বলা যায় না। কারণ, শব্দাপরােক্ষবাদীর মতে (অর্থাৎ শব্দের দ্বারা প্রত্যক্ষ- মােগ্য বস্তুর যে জ্ঞান হয়, তাহাও প্রত্যক্ষস্বরূপ এই মতে) ইহা ব্যব- স্থাপিত হইয়াছে যে, অপক্ষে বস্তুবিষয়ক যত প্রমাণ আছে তাহা, সকলই সাক্ষাৎকারের হেতু হয়। এই প্রকার সিদ্ধান্তটী বুঝাইবার জন্যই শব্দা- পরােক্ষবাদের প্রস্তাব হইয়াছে। শাদাপরােক্ষবাদের নিয়মানুসারে বেদান্ত- বাক্য ব্রহ্মস্বরূপ নির্ণয়ের প্রমাণ হইলেও তাহা ব্রহ্মের ব্যাবহারিক-দর্শনের সমান সাক্ষাৎকারের হেতু ইহাই বুঝা যায়। এইরূপ সাধারণ দর্শনটী বেদান্ত- বাক্য-শ্রবণ দ্বারা হইলেও অবিদ্যা-নিবৃত্তির জন্য যাহা অভীতি, সেই ব্রহ্মের সত্তা-নিশ্চয়রূপে যে সাক্ষাৎকার, তাহার হেতু যে বেদান্তবাক্য- শ্রবণে আছে, তাহা ত প্রাপ্ত নহে। (সুতরাং, এই অপ্রাপ্ত অংশকে ২৪ সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ। (অনুবাদ)বােধ করাইবার জন্য শ্রবণ-বিধির আবশ্যকতা আছে ; তজ্জন্য ইহাকে অপূৰ্ববিধিও ত বলা যাইতে পারে) এইপ্রকার শঙ্কা করা উচিত নহে। কারণ, বিষয়মাত্রেই বিচাৰ্যবস্তু-নির্ণয়ের কারণ হইয়া থাকে, এবং ব্ৰহ্মবিষয়ক যে প্রমাণ, তাহা ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের কারণ হইয়া থাকে-- এই দুইটী নিয়মানুসারে ইহা সিদ্ধ হইতেছে যে, বিচারিত বেদান্তবাক্য হইতে যে জ্ঞান উৎপন্ন হইবে, তাহা নিশ্চয়ই বিচাৰ্য্য-ব্রহ্মবিষয়ে সাক্ষাৎ- কারাত্মক নিশ্চয়ের কারণ হইবে। এই নিয়মানুসারে বিচারাত্মক বেদান্ত- বাক্য-শ্রবণ নির্ণায়াত্মক-ব্রহ্মসাক্ষাৎকারের যে কারণ, তাহা প্রাপ্তই হইতেছে। সুতরাং, এই বিষয়ে যে বিধি, তাহা অপূৰ্ব্ব-বিধি হইবে কি প্রকারে ?) যদি বল বেদান্তবাক্য-শ্রবণ ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের যে কারণ, তাহা লৌকিক কোনপ্রকার প্রমাণের দ্বারা বুঝিতে পারা যায় না; যেহেতু, অন্বয় এবং ব্যতিরেক ব্যভিচার পূর্বেই উক্ত হইয়াছে। (অন্বয় ও ব্যতিরেক ব্যভিচার থাকিলে লৌকিক প্রমাণ দ্বারা কাৰ্যকারণ-ভাবসিদ্ধ হয় না, ইহা সকলেই বিদিত আছেন, সুতরাং, বেদান্তবাক্য-শ্রবণ ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের যে কারণ, তাহা কোন লৌকিক প্রমাণের দ্বারা যখন পাওয়া যাইতেছে , তখন বেদান্তবাক্য-শ্ৰবণ-বিষয়ে যে বিধি, তাহা অপূৰ্ব্ব-বিধি কেন না হইবে ?) এইপ্রকার শঙ্কাও সঙ্গত নহে। কারণ, সহকারী কারণ-বিশেষ না থাকানিবন্ধন অন্বয়-ব্যভিচার দোষ বলিয়াই গৃহীত হইতে পারে না। বামদেবাদিও জাতিস্মর ছিলেন এবং তাহারও জন্মান্তর হইয়াছিল—ইহা যখন শাস্ত্রে পাওয়া যায়, তখন তাঁহার জন্মান্তরীয় শ্রবণ হইতেই ব্ৰহ্ম- সাক্ষাৎকাররূপ ফল উৎপন্ন হইয়াছিল, এইরূপ মত অবলম্বন করিলে ব্যতিরেক ব্যভিচারও থাকে না। অন্যথা অর্থাৎ ব্যভিচারমাত্র দেখিয়াই যদি হেতুত্বের বাধ কল্পনা করিতে হয়, তাহা হইলে বেদও যদি তাদৃশ হেতুবােধ করায় তাহা হইলে তাহারও বাধ সম্ভাবনা আসিয়া পড়ে। ঘটের সাক্ষাৎকার করিতে হইলে যেমন চক্ষুঃ ব্যতিরিক্ত ত্বগিন্দ্রিয়ও কারণ হইয়া থাকে, সেইরূপ ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকার করিতে হইলে বেদান্তবাক্যের শ্রবণ ব্যতিরেকে অন্য কোন উপায়ও থাকিতে পারে, এই প্রকার শঙ্কা হইলে উক্ত ব্যতিরেক ব্যভিচারও দোষ বলিয়া পরিগৃহীত হইতে পারে না। তাৎপৰ্য-বেদান্ত-শ্রবণ ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের হেতু ইহা অপূর্ব-বিধি দ্বারাই প্রতিপাদিত হয়, এইরূপ প্রকটাৰ্থকারের মত। এক্ষণে তাহা প্রথম পরিচ্ছেদঃ। ২৫ ( তাৎপৰ্য)-খণ্ডিত হইতেছে। এই খণ্ডনটী বিবাণাচাৰ্য প্রভৃতির মতা- সারে হইতেছে বুঝিতে হইবে। ইহা বুঝিতে হইলে প্রথমতঃ শব্দাপরােক্ষবাদ এই শব্দটীর অর্থ টী বুঝিতে হইবে। দার্শনিকগণের মধ্যে দুইপ্রকার মত দেখিতে পাওয়া যায়। একটী মত এই হইতেছে যে, জ্ঞানের প্রত্যক্ষ-রূপ বা পরােক্ষরূপতা বিষয়পরতন্ত্র নহে, কিন্তু, কারণপরতন্ত্র। অর্থাৎ যদি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা জ্ঞান উৎপন্ন হয়, তাহা হইলেই, সেই জ্ঞানকে প্রত্যক্ষ- জ্ঞান বলা যাইবে। আর ইন্দ্রিয় ব্যতিরিক্ত অন্যকোন প্রমাণ দ্বারা যে জ্ঞান উৎপন্ন হইবে, তাহা পরােক্ষই হইবে, অর্থাৎ প্রত্যক্ষ-পদবাচ্য হইবে না। ইহার অভিপ্রায় এই যে, “এখানে রূপ আছে” এই শব্দ দ্বারা যদি আমার রূপের জ্ঞান হয়, তাহা হইলে শব্দরূপ পরােক্ষপ্রমাণ দ্বারা ঐরূপ জ্ঞান হইল বলিয়া, উহা রূপের প্রত্যক্ষ-জ্ঞান হইতে পারে না। যদিচ রূপটী প্রত্যক্ষ-যােগ্য বস্তু, কিন্তু, রূপজ্ঞানের প্রত্যক্ষতা, কেবল রূপ- স্বরূপ-বিষয় দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হইতে পারে না, কিন্তু, প্রত্যক্ষের কারণ বলিয়া যে সকল ইন্দ্রিয় প্রসিদ্ধ আছে, সেই সকল ইন্দ্রিয় দ্বারাই রূপাদি প্রত্যক্ষ-যােগ্য বস্তুর যদি জ্ঞান হয়, তাহা হইলে ঐ জ্ঞানকে প্রত্যক্ষ বলা যাইতে পারে। নৈয়ায়িক, বৈশেষিক প্রভৃতি দার্শনিকগণ এইরূপ মতেরই ব্যবস্থাপন করিয়া থাকেন। আর একটী মত এই যে, বিষয় যদি প্রত্যক্ষ-যােগ্য হয়, প্রত্যক্ষের কারণসমষ্টি বিদ্যমান থাকিয়াও যদি কোন দোষ বা প্রতিবন্ধক- বশতঃ ঐ প্রত্যক্ষ-যােগ্যবস্তুর প্রত্যক্ষাত্মক জ্ঞান না হয়, তাহা হইলে শব্দাদিরূপ পরােক্ষপ্রমাণ দ্বারা ঐ বস্তুর তৎকালে যে জ্ঞান হয়, তাহা শব্দাদিরূপ-পরোেক্ষ-প্রমাণজনিত হইলেও প্রত্যক্ষই হইয়া থাকে। ইহা একপ্রকার সৰ্বানুভব-সিদ্ধ বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। দুই একটা উদাহরণ দেখিলে ইহা আরও স্পষ্ট করিয়া বুঝিতে পারা যাইবে। প্রথম দেখ, দশজন মুখলােক কোন একটী নদী পার হইবার পূর্বে স্থির করিল যে, এই নদী পার হইবার পূর্বে আমরা কয় জন আছি, তাহা একবার গণিয়া লওয়া আবশ্যক। তাহারা কিন্তু, কেহই ভাল করিয়া গণিতে জানে না, সম্মুখে একজন বিজ্ঞলােককে দেখিয়া বলিল,-“ভাই আমরা কয়জন আছি গণিয়া দেও দেখি।” সে ব্যক্তি তাহাদিগের প্রার্থনা অনুসারে গণিয়া ৪ সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ। ( তাৎপৰ্য)-বলিল যে, “তােমরা দশজন আছ এবং সেই সঙ্গে তাহাদিগকে এক হইতে দশ পর্যন্ত গণিতেও শিখাইয়া দিল। তাহারা তখন, আমরা দশজন আছি, এইপ্রকার নিশ্চয় করিয়া, সন্তরণ দ্বারা নদী পার হইল। পরপারে গিয়া তাহারা স্থির করিল যে, এইবার যখন আমরা পারে আসিয়াছি, তখন আমরা সকলে আসিতে পারিয়াছি কি না, তাহা এক- বার গণিয়া দেখা অাবশ্যক। এই ভাবিয়া তাহাদের মধ্যে কোন এক জন গণনা করিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু, গণনা করিতে যাইয়া সে নিজেকে পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক অবশিষ্ট কয়জনকে গণনা করিয়া দেখিল যে, তাহারা নয়জনমাত্র পারে আসিয়াছে। তখন সে ব্যাকুল হইয়া আর একজনকে বলিল, “ভাই তুমি একবার গণনা কর, আমি ঠিক বুঝিতে পরিতেছি না, আমাদের আর একজন কোথায় গেল, সে কি ডুবিয়া গিয়াছে ?” ইহাতে সেই ব্যক্তিও গণনা করিয়া প্রথম ব্যক্তির ন্যায়ই দেখিল যে, বাস্তবিক নয় জনই হইতেছে। এইরূপে একে একে সকলই গণনা করিয়া দেখে যে, একজনকে পাওয়া যাইতেছে না। অবশেষে স্থির হইল যে, নিশ্চয়ই তাহাদের মধ্যে একজন জলে ডুবিয়াছে। ইহাতে তাহারা ব্যাকুল হইয়া ক্রন্দন করিতে লাগিল। অবশেষে দৈবযােগে সেখানে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি আসিলেন। তিনি তাহাদের ক্রন্দনের কারণ অবগত হইয়া তাহাদের ভ্রান্তির স্বরূপ বুঝিতে পারিলেন, এবং বলিলেন, “তােমরা সকলে দাঁড়াও, আমি গণনা দ্বারা তােমা- দের দশজনকে মিলাইয়া দিতেছি।” তখন সকলে শ্রেণীবদ্ধ হইয়া দাড়াইল এবং সেই অভিজ্ঞব্যক্তি একে একে—তুমি এক, তুমি দুই, তুমি তিন—এই- ভাবে গণনা করিয়া শেষ ব্যক্তির নিকটে আসিয়া বলিলে যে “তুমিই দশম।” অভিজ্ঞব্যক্তির এইপ্রকার বাক্যের দ্বারা তাহাদিগের দশম-ব্যক্তি-বিষয়ক যে ভ্রান্তি, তাহা নিরাকৃত হইল এবং দশমত্বরূপে সেই দশম ব্যক্তির প্রত্যক্ষা- ত্মক জ্ঞানও হইল। এইরূপ স্থলে এই যে দশম ব্যক্তি বিষয়ক প্রত্যক্ষাত্মক জ্ঞান, তাহা “তুমি দশম” এই প্রকার শব্দরূপ প্রমাণ দ্বারা উৎপন্ন হইলেও ইহার প্রত্যক্ষ রূপতা সকলেরই স্বীকাৰ্য হয়। আরও একটী দৃষ্টান্ত দেখ—যে ব্যক্তি সঙ্গীত শাস্ত্রে অনভিজ্ঞ, সে যদি নিজেই সেতারের চারিটী তার মিলাইতে চেষ্টা করে, তাহা হইলে কৃতকাৰ্য্য হয় না। প্রত্যেক তারের শব্দের মধ্যে উচ্চ নীচ ভাবপ্রযুক্ত পার্থক্য থাকিলেও এবং ঐ পার্থক্যের সহিত তাহার শ্রবণেন্দ্রিয়ের সন্নিকর্ষ বিদ্যমান থাকিলেও প্রথম পরিচ্ছেদঃ । s ( তাৎপৰ্য)—সেই পার্থক্য-বিষয়ে শ্রাবণ প্রত্যক্ষ করিতে সে সমর্থ হয় না। কিন্তু, কোন অভিজ্ঞ ব্যক্তি যখন উহা উপদেশ বাক্য দ্বারা উহা বুঝাইয়া দেন, তখন সেই উপদেশ বাক্যের প্রভাবে সে উহা প্রত্যক্ষভাবে বুঝিতে পারে। এই দুইটা উদাহরণ দ্বারা ইহা স্পষ্টই বুঝিতে পারা যাইতেছে যে, পরােক্ষ প্রমাণ দ্বারা জ্ঞান উৎপন্ন হইলেই যে জ্ঞানটী পরােক্ষ হইবে, এই নিয়মটী সর্বত্র প্রযুক্ত হইতে পারে না। স্থলবিশেষে প্রত্যক্ষযােগ্য বস্তুর জ্ঞান কোন কারণ দ্বারা প্রতিরুদ্ধ হইলে, পরোক্ষ প্রমাণের সাহায্যেও ঐ প্রত্যক্ষ-যােগ্য- বস্তুর জ্ঞানও প্রত্যক্ষাত্মক হইয়া থাকে। ইহাই হইল শব্দাপরােক্ষবাদ । অতৈবাদিগণ, এই শব্দাপরােক্ষবাদ অবলম্বন করিয়া থাকেন। প্রকৃত স্থলে বিবরণ মতানুসারিগণ বলিতে চাহেন যে, ব্ৰহ্মবস্তু স্বয়ং প্রকাশমান, এবং সর্বদা সকলের আত্মরূপে তাহা প্রত্যক্ষ সিদ্ধ। কেবল অবিদ্যার আবরণ- রূপ প্রতিবন্ধকবশতঃ সাংসারিক জীবের নিকট তাহার প্রত্যক্ষ হয় না। এইরূপ স্থলে যদি বেদান্তবাক্যরূপ পরােক্ষ প্রমাণের দ্বারা আমাদিগের অন্তঃকরণে ব্রহ্মাকার বৃত্তি উৎপন্ন হয়, তাহাহইলে ঐ বৃত্তি অবিদ্যার আবরণ- রূপ প্রতিবন্ধকের অপসারণ দ্বারা ফলতঃ ব্রহ্মের অপবােক্ষ জ্ঞানরূপেই পরিণত হইয়া থাকে। এইভাবে বেদান্তবাক্য দ্বারা ব্রহ্মের যে অপরােক্ষ জ্ঞান হইতে পারে, তাহা বুঝিবার জন্য কোনপ্রকার বিধিবাক্যের আবশ্যকতা আছে, তাহা বিবরণমতানুসারী আচাৰ্যগণ স্বীকার করেন না। তাহারা বলেন যে, শব্দাপরােক্ষবাদের নিয়মানুসারে ইহা অনায়াসেই বুঝিতে পারা যায় যে অপরােক্ষ বস্তু বিষয়ে যে প্রমাণ, তাহা ইন্দ্রিয়ই হউক বা শব্দই হউক, সৰ্ব্বথা তাহার দ্বারা অপরােক্ষ জ্ঞানই জন্মিবে, ইহাই লােক সাধারণের অঙ্গীকৃত নিয়ম। সুতরাং প্রকটাৰ্থকার যে, এই শ্রবণ বিষয়ে অপূৰ্ব্ব-বিধি স্বীকার করেন, তাহা যুক্তিসঙ্গত হয় না। অর্থাৎ প্ৰকটাৰ্থকার বলিতে চাহেন যে, বেদান্ত- বাক্যরূপ যে প্রমাণ, তাহা পরােক্ষ প্রমাণ, তাহা হইতে ব্রহ্মের প্রত্যক্ষাত্মক জ্ঞান হইবে, ইহা লৌকিক কোন যুক্তি দ্বারা পাওয়া যায় না। সুতরাং ব্রহ্ম সাক্ষাৎকারের প্রতি বেদান্ত বাক্য শ্রবণ কারণরূপে অপ্রাপ্তই থাকিল, বেদান্ত শ্রবণে তাহার মতে অদৃষ্ট উৎপন্ন হয়, সেই অদৃষ্টবশতই ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকার হইয়া থাকে। সুতরাং, বাধ্য হইয়া প্ৰকটাৰ্থকারকে বেদান্ত বাক্য শ্রবণে অপূৰ্ব বিধিই অঙ্গীকার করিতে হইয়াছে। কিন্তু, বিবরণকারের মতানুসারে ২৮ সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ। e ( তাৎপৰ্য) –এই প্রকার সিদ্ধান্ত যুক্তিসহ নহে। কারণ শব্দাপরােক্ষবাদের নিয়মানুসারে ইহা ব্যবস্থাপিত হইয়াছে যে, পরােক্ষ প্রমাণ হইতেও প্রত্যক্ষ যােগ্য-বস্তুর প্রত্যক্ষাত্মক জ্ঞানই জন্মে। সুতরাং, বেদান্তবাক্য পরােক্ষ প্রমাণ হইলেও নিত্য প্রত্যক্ষযােগ্য ব্রহ্মরূপ বস্তু বিষয়ে তাহা প্রত্যঙ্গাত্মক জ্ঞান উৎপাদন করিয়া দিতে পারে, ইহা লৌকিক যুক্তি অনুসারেও যখন স্পষ্ট বুঝা যাইতেছে, তখন বেদান্তবাক্য শ্রবণ ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের কারণ এই প্রকার সিদ্ধান্ত অপ্রাপ্তই হইতে পারে না। আর তাহাই যদি না হইল তবে বেদান্ত বাক্য শ্রবণে যে বিধি শ্রুত হয়, তাহা কি প্রকারে অপূৰ্ব্ব বিধি হইবে ? সুতরাং, ইহা অপূৰ্ব্ববিধি নহে ইহা বাধ্য হইয়া স্বীকার করিতেই হইবে । ইহাই হইল বিবরণকারমতে প্ৰকটাৰ্থকারমতখগুনের প্রথম মুক্তি। প্ৰকটাকার মতাবলম্বনে আর একটী যে আশঙ্ক। হইতে পারে, গ্রন্থকার এক্ষণে তাহার উল্লেখপুৰ্ব্বক বিবরণকারের মতেরই অনুসরণ করিয়া তাহার খণ্ডন করিতেছেন। আশঙ্কাটী এই,উপরে যে প্রকার যুক্তি প্রদর্শিত হইল, তাহার দ্বারা ইহাই সিদ্ধ হইল যে, বেদান্ত বাক্য শ্রবণ ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎ- কারের কারণ-ইহা লৌকিক প্রমাণ দ্বারা বুঝা যায়, তদনুসারে বেদান্তবাক্য শ্রবণ হইতে যে জ্ঞান উৎপন্ন হইবে, তাহা যে অবধারণাত্মক অর্থাৎ মূল অজ্ঞা- নের নিবৰ্ত্তক তাহা কে বলিল ? সামান্যতঃ ব্রহ্মের সাক্ষাৎকার ত আমাদিগের সর্বদাই হইতেছে, ইহা অদ্বৈতবাদিগণ সকলেই স্বীকার করেন। জীব যেহেতু ব্ৰহ্ম হইতে ভিন্ন নহে, সেই ব্রহ্মই যেহেতু ব্যবহার দশাতে জীবভাবে প্রকাশিত হন, সুতরাং জীবের স্বরূপ বিষয়ক যে সাক্ষাৎকার, তাহাও একপ্রকার ব্রহ্মসাক্ষাৎকার। তবে এইরূপ ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকার অবিদ্যায় নিবৰ্ত্তক নহে। অবিদ্যানিবৃত্তির জন্য অবধারণাত্মক যে ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎবার, তাহাই অপেক্ষিত। সেই অবধারণাত্মক ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকার যে বেদান্তবাকা শ্রবণ হইতে উৎপন্ন হয়, তাহা লৌকিক কোন প্রমাণ দ্বারা যেহেতু বুঝিতে পারা যায় যায় না, সেই কারণে, সেই অবধারণা- ত্মক ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকরের প্রতি বেদান্তবাক্য শ্রবণের যে কারণ আছে তাহা অপূৰ্ব বিধির সাহায্যেই বুঝিতে হইবে। কারণ ঐরূপ সাক্ষাৎকারের প্রতি বেদান্তবাক্য শ্রবণরূপ যে কারণ, তাহা অপ্রাপ্ত। এইরূপ আশঙ্কার উত্তরে বিবরণ মতানুসারিগণ এইরূপ বলিয়া থাকেন যে, ব্রহ্মের অবধারণাত্মক নিশ্চ য়ের প্রতি বিচার সহকৃত বেদান্তবাক্য শ্রবণ যে কারণ, তাহা লৌকিকযুক্তি প্রথম পরিচ্ছেদঃ। ২৯ ( তাৎপৰ্য)—অনুসারেই বেশ বুঝিতে পারা যায়। সেই যুক্তিটী এই যে, সামান্যতঃ ব্রহ্মবিষয়ক”প্রমাণমাত্রই ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকারের কারণ,ইহা যেমন একটা শােকসিদ্ধ নিয়ম, সেইরূপ বিচাৰ্য বস্তু বিষয়ে অবধারণাত্মক জ্ঞানলাভের উপায় যে বিচার, তাহাও লােকসিদ্ধ। এক্ষণে দেখিতে হইবে যে, এই দুইটা নিয়মের অনুসারে ইহা বুঝা যায় যে, বিচার-বিচাৰ্য বস্তু বিষয়ে নিশ্চয়ের কারণ, এবং অপরােক্ষবস্তুবিষয়ক প্রমাণ—অপরােক্ষ বস্তুর সাক্ষাৎকারের কারণ, অর্থাৎ বিচারের দ্বারা জ্ঞানের নিশ্চয়ৰূপতাসিদ্ধ হইয়া থাকে এবং অপরােক্ষ বস্তু বিষয়ক প্রমাণ দ্বারা জ্ঞানের অপরােক্ষরূপতা অর্থাৎ প্রত্যক্ষরূপতা সিদ্ধ হইয়া থাকে। এই সাধারণ নিয়মদ্বয়ানুসারে বিচার সহকৃত যে বেদান্তবাক্য শ্রবণ তাহা বিচাৰ্য অথচ অপরােক্ষ যে ব্রহ্মবস্তু, তদ্বিষয়ে অবধারণাত্মক সাক্ষাৎ কারকে উৎপাদন করিয়া দেয়, ইহা সিদ্ধ হইতেছে। সুতরাং বিচারসহকৃত বেদান্তবাক্য শ্রবণ যে, ব্রহ্মের অবধারণাত্মক সাক্ষাৎকার উৎপাদন করিবে, তাহা লােকসিদ্ধ যুক্তির অনুসারেই এইভাবে সিদ্ধ হইয়া যাইতেছে। এই কারণে অবধারণাত্মক ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকারের কারণ যে বিচার সহকৃত বেদান্ত বাক্য শ্রবণ, তাহা কোন প্রকারেই অপ্রাপ্ত হইতে পারে না। যদি অপ্রাপ্তই হইল তবে তদ্বিষয়ে অপূৰ্ব বিধি স্বীকার করিবার অবসরই বা কোথায় ? সুতরাং প্রকটাৰ্থকারের মতানুসারে যে শঙ্কাটী প্রদর্শিত হইয়াছে, তাহা যুক্তি- সঙ্গত নহে। তাহার পর প্রকটাৰ্থকারের মতে আর একটা শঙ্কা এই যে, বেদান্ত বাক্য শ্রবণ যে ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের কারণ হইতে পারে না, তাহার কারণ যে অন্বয় ও ব্যতিরেক ব্যভিচার, তাহাও পূৰ্বেই প্রদর্শিত হইয়াছে, সুতরাং, লৌকিক প্রমাণ দ্বারা বেদান্তবাক্য শ্রবণ যে ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকারের কারণ, তাহা প্রাপ্ত হওয়া গেল না। এই শঙ্কার উত্তর এই যে, অন্বয় ও ব্যতিরেক এই দ্বিবিধ ব্যভিচারের মধ্যে যে অন্বয় ব্যভিচার প্রদর্শিত হইয়াছে, তাহা অকিঞ্চিৎকর। কারণ, কাৰ্য- মাত্রেই এইরূপ অন্বয় ব্যভিচার দেখিতে পাওয়া যায়। যেহেতু, কোন কাৰ্য্যই উৎপন্ন হইতে গেলে একটা কারণ হইতে হয় না, অনেকগুলি কারণের মিলন ঘটিলে তবে কাৰ্য্য উৎপন্ন হয়। এরূপস্থলে ঐরূপ একটী কারণ আছে অথচ কাৰ্য্য হইল না দেখিয়া, যদি কেই বলে যে, এই কারণ সত্ত্বেও কাৰ্য্য হইল না, সুতরাং এস্থলে অন্বয় ব্যভিচার রহিয়াছে, অতএব এইটী অমুকের সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ। ( তাৎপৰ্য)---কারণ নহে, তাহা হইলে তাহাকে উপহাসাম্পদই হইতে হয়। যেমন দণ্ড, চক্র, সলিল ও সূত্র ইহারা সকলেই ঘটের কারণ, এক্ষণে মাটিতে একটী দণ্ডপতিত রহিয়াছে, অথচ ঘট উৎপন্ন হইতেছে না দেখিয়া,কখনই ইহা নির্ধারণ করা যায় না যে, দণ্ড ঘটের কারণ নহে। তদ্রুপ এস্থলেও বুঝিতে হইবে যে, ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকারের প্রতি বেদান্তবাক্য শ্রবণ যে একমাত্র কারণ, তাহা নহে,পরন্তু, বিচার অর্থাৎ মনন ও নিদিধ্যাসনও তাহার কারণ। সুতরাং, যেস্থলে বেদান্তবাক্য শ্রবণ করিয়াও ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকার হইল না এরূপ দেখা যায়, সেস্থলে, অন্য কারণ মননাদির সমাবেশ হয় নাই বলিয়াই ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকার হইল , এইরূপই কল্পনা করা উচিত। সুতরাং এইরূপ অন্বয় ব্যভিচার আছে বলিয়া, কখনই বেদান্তবাক্য শ্রবণের কারণতার ব্যাঘাত হইতে পারে না। এইরূপ ব্যতিরেক ব্যভিচার দেখাইয়া প্ৰকটাৰ্থকার বলিয়াছিলেন যে, বেদান্তবাক্য শ্রবণ ব্রহ্মসাক্ষাৎকারের লােকসিদ্ধ কারণ হইতে পারে না। এক্ষণে বিবরণ মতাবলম্বীগণ তাহারও খণ্ডন করিতেছেন। তাহারা বলেন যে বামদেব জাতিস্মর ছিলেন, এবং জন্মান্তরে তাঁহার বেদান্ত শ্রবণের কথা ও শাস্ত্রে শুনা যায়, সুতরাং, তাঁহার পূৰ্ব্বজন্মে যে বেদান্ত শ্রবণ হইয়াছিল, তাহা অনায়াসেই বুঝিতে পারা যায়। সুতরাং, বেদান্ত শ্রবণ ব্যতিরেকে যে বামদেবের ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকার হইরাছিল ইহা ঠিক নহে। আরও এক কথা এই যে, যদি ব্যতিরেক ব্যভিচার বাস্তবিকই বিদ্যমান থাকে, তাহা হইলে, সেই ব্যভিচার থাকা নিবন্ধন-যে কারণ তা বাধিত হইয়া যায়, তাহাকে বােধ করাইবার সামর্থ্য শ্রুতিরও নাই, ইহা পূৰ্বেই কথিত হইয়াছে। এইজন্য অপূৰ্ব্ব বিধিবাদীকেও অঙ্গীকার করিতেই হইবে যে, এস্থলে বাস্তবিক ব্যতিরেক ব্যভিচার নাই, যাহা ব্যতিরেক ব্যভিচার বলিয়া পূৰ্ব্বপক্ষী প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা ব্যতিরেক ব্যভিচারাভাস মাত্র ইহাই বলিতে হইবে। একথা প্রকটাৰ্থকার কে বাধ্য হইয়াই অঙ্গীকার করিতে হইবে। কারণ, তিনি প্রথমতঃ ব্যতিরেক ব্যভিচার দেখাইয়া--অর্থাৎ বামদেবের শেষ জন্মে বেদান্তবাক্য শ্রবণ ব্যতিরেকেই ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকার হইয়াছিল এই কথা বলিয়া, বেদান্ত শ্রবণের ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকারের প্রতি কারণ নাই ইহা বলিয়াছিলেন এবং এই ভাবে ঐ কারণ লৌকিক প্রমাণের দ্বারা যেহেতু অপ্রাপ্ত, সেইহেতু, অপূৰ্ব্ব বিধি কল্পনা করিয়া, তিনি সেই কারণ স্থাপন করেন।
প্রথম পরিচ্ছেদঃ। হইল। ( তাৎপৰ্য)—কিন্তু, এইভাবে কারণ স্থাপনের পরও উক্ত ব্যতিরেক ব্যভি- চার দেখিয়া লােকে যদি ঐ শ্রুত্যুক্ত কারণতর ব্যাঘাত যদি শঙ্কা করে, তবে সেই শঙ্কা নিবারণের জন্য তিনিই উক্ত ব্যতিরেক ব্যভিচারকে ব্যভিচারাভাস বলিয়া কল্পনা করিতে বাধ্য হন। অর্থাৎ বামদেবের জন্মান্তরে বেদান্ত শ্রবণ হইয়াছিল,ইহা তিনি বাধ্য হইয়া কল্পনা করিয়াছেন। তাহার একল্পনা নিশ্চয়ই এখন বিচিত্র কল্পনা বলিতে হইবে। কারণ, যে ব্যতিরেক ব্যভিচার বেদান্ত বাক্য শ্রবণের দ্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের প্রতি কাৰণতার ব্যাঘাতক হইল, তাহাই আবার তিসিদ্ধ কারণতায় ব্যবস্থাপনের জন্য আভাস বলিয়া স্থিরীকৃত হইল। এরূপ কষ্ট কল্পনা অপেক্ষা শাস্ত্ররূপ প্রমাণের সাহায্যেই বামদেবের জন্মান্তরে বেদান্ত শ্রবণ হইয়াছে—এই কথা প্রথম হইতে স্বীকার করিয়া লইলে, উক্ত ব্যভিচারেরও প্রসক্তি থাকে না, অথচ লােকসিদ্ধ নিয়মানুসারে বেদান্তবাক্য শ্রবণের ব্রহ্মসাক্ষাৎকারের প্রতি কারণও সিদ্ধ হইয়া যায়। সুতরাং এরূপস্থলে উক্ত উভয়বিধ ব্যভিচার দেখাইয়া প্ৰকটাৰ্থকার যে বেদান্তবাক্য শ্রবণে অপূৰ্ব্ব-বিধি কল্পনা করিয়াছেন, তাহা নিতান্ত অসঙ্গত অতএব বেদান্তবাক্য শ্রবণে যে অপূৰ্ব্ব-বিধি নাই ইহা তাহাকে বাধ্য হইয়াই অঙ্গীকার করিতেই হইবে। (৩) আরও এক কথা বিবরণমতানুসারিগণ বলেন যে, প্রত্যক্ষরূপ কার্যের প্রতি যে স্থলে দুইপ্রকার ইন্দ্রিয় কারণ বলিয়া গৃহীত হয়, সেস্থলে একটীমাত্র ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ঐ প্রত্যক্ষরূপ কাৰ্য্য যখন হয়, তখন অপরেন্দ্রিয়ের ব্যতিরেক ব্যভিচার থাকিলেও, বাস্তবিক পক্ষে ঐ ব্যতিরেক ব্যভিচার- তাদৃশ প্রত্যক্ষের প্রতি ঐ ইন্দ্রিয়ের যে কারণ আছে তাহার ব্যাঘাত করিতে পারে না। যেমন যে ঘটবস্তুর সাক্ষাৎকার চক্ষু দ্বারা এবং গিন্দ্রিয়ের দ্বারাও হয়, তাহাকে অন্ধকার গৃহে যখন ত্বগিন্দ্রিয়ের দ্বারা আমরা প্রত্যক্ষ করি, তখন চক্ষুরিন্দ্রিয়ের দ্বারা তাহার প্রত্যক্ষ হইল না বলিয়া,অর্থাৎ সেই প্রত্যক্ষের পূর্বে চক্ষুরিন্দ্রিয় কাৰ্য্য করিল না বলিয়া, ঘটপ্রত্যক্ষের প্রতি চক্ষুরিন্দ্রিয় যে কারণ হইবেই না—ইহা কেহই স্বীকার করে না, তদ্রুপ, এ স্থলেও বেদান্তবাক্য শ্রবণ ব্যতিরেকে অন্য কারণের দ্বারা ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকার হয় বলিয়া, বেদান্তবাক্য শ্রবণ যে একেবারে ব্রহ্মসাক্ষাৎকারের কারণ হইতে পারে না—এরূপ বলা যায় না। ফলকথা এই হইতেছে যে, যেমন ঘটসাক্ষাৎকার চক্ষুরিন্দ্রিয় হইতেও হয় এবং ত্বগিন্দ্রিয় হইতেও হয় বলিয়া,উভয়বিধ ইন্দ্রিয়জন্য দ্বিবিধ ঘটসাক্ষাৎকারে যেমন সিদ্ধান্তলেশসংগ্রহঃ। নিয়মবিধির যুক্তি প্রদর্শন। অতএব “আবৃত্তিরসকৃদুপদেশা”-ইতি অধিকরণভাষে দর্শন- পৰ্যবসানি হি শ্রবণাদীন্যাবৰ্তমানানি দৃষ্টার্থানি ভবন্তি। যথা অবঘাতাদীনি তণ্ডুলনিষ্পত্তি-পৰ্যবসানি-ইতি শ্রবণস্য ব্ৰহ্মদর্শনার্থ দৃষ্টাৰ্থতয়া দার্শপূর্ণমাসিকাঘাতন্যায় প্রাপ্তাবৃত্তপদেশঃ। অপূর্ব- বিধিত্বে তু ন সঙ্গচ্ছতে সর্বেলৗষধৌ---অবধাতবৎ। অগ্নিচয়নে “সবে- যধস্য পূরয়িত্ব অবন্তি অথ এতদুপদধাতি” ইতি উপধেয়ােলুখল সংস্কারার্থনে বিহিতস্য অবঘাতস্য দৃষ্টাৰ্থৰ্বাভাবাৎ ন আবৃত্তিরিতি হি তন্ত্রলক্ষণে স্থিত। অতত নিয়মবিধিরেবায়ম্ । ( তাৎপর্ষ)- একটু বৈজাত্য অঙ্গীকার কয়া যায়,সেইরূপ বেদান্তবাক্য শ্রবণ জন্য ব্রহ্মসাক্ষাৎকার হইতে কারণার জন্য ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারে ঐরূপ বৈজাত্য কল্পনা করিলেই প্রদর্শিত ব্যভিচারাশংকা থাকে না। এস্থলে ইহাও লক্ষ্য করিতে হইবে, যেমন ঘটম্বরূপের সাক্ষাৎকার গিন্দ্রিয় হইতে হউক বা চক্ষুরিন্দ্রিয় হইতেই হউক না কেন, সেই সাক্ষাৎকারের বিষয় যে ঘটরূপ দ্রব্য সেই অংশে কোন বৈলক্ষণ্য থাকে না—এবং উভয়বিধ সাক্ষাৎকারই ঘটবিষয়ক অজ্ঞানের সমানভাবে নিবৰ্ত্তক হয়, সেইরূপ বেদান্তবাক্য শ্রবণ জন্য যে ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকার কারণান্তর জন্য ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকার হইতে তাহা বিলক্ষণ হইলেও এই উভয়বিধ সাক্ষাৎকারের বিষয় যে ব্রহ্ম তদংশে ঐ জ্ঞানের কোন বৈলক্ষণ্য থাকে না। কারণ এই উভয়বিধ সাক্ষাৎকায়ই সংসার হেতুভূত যে ব্ৰহ্মবিষয়ক অজ্ঞান, তাহার নিবৰ্ত্তক হইয়া থাকে। সুতরাং ব্যতিরেক ব্যভিচার দেখাইয়া, বেদান্ত- বাক্য শ্রবণ ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকারের কারণ হইতে পারে না, এইরূপ সিদ্ধান্ত যে প্ৰকটাকায় কহিয়াছেন, তাহা যুক্তিসঙ্গত হইতে পারে না, অর্থাৎ শ্রোতব্য শ্রুতিতে যে বিধি আছে, তাহা অপূর্ব-বিধি নহে। ইহাই হইল বিবরণমতানু- সারিগণের অভিপ্রায়। অনুবাদ—এই কারণেই “আবৃত্তিরসদুপদেশাৎ” ৪।১।১ এই বেদান্ত- সূত্রের ভাষ্যে ইহা উক্ত হইয়াছে যে, শ্ৰৰণ, মমন ও নিদিধ্যাসন, যেহেতু ব্ৰহ্মসাক্ষাৎকাররূপ ফলের কারণ, সেইহেতু ইহাদিগের আবৃত্তি অর্থাৎ বারবার অনুষ্ঠান করিতে হইবে। কারণ, এই কয়টী উপায়ের যাহা ফল, তাহা দৃষ্ট। যেমন, ততুলের নিষ্পত্তি করিবার জন্য ব্রীহিতে যে অবধাতাদি ০ ওঁ নমঃ গণেশায়। কবিতার্কিককুলচূড়ামণি শ্রীমৎ-শ্রীহর্ষবিরতি খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্য। প্রথম পরিচ্ছেদঃ। মঙ্গলাচরণম্। অবিকল্পবিষয় এক স্থাণু: পুরুষঃ তােহস্তি যঃ শ্রুতি। ঈশ্বরমুময়া ন পরং বন্দে মু ময়াপি তমধিগতম্ ॥১॥ অম্বয়-অবিকল্পবিষয়ঃ এক স্থাণু: যঃ পুরুষঃ শ্ৰতি শ্ৰতঃ অস্তি, তম্ উময় পরম অধিগত এব ন, অনু (পশ্চাৎ শ্রবণানন্তরং) ময়াহপি (শ্রীহর্ষেণীপি) অধিগত এব। (অথবা ) পর (কেবল) উময়া অধিগতং ন, নু* ময়া (শ্রীহর্ষেণপি অধিগত)। (অথবা) অনুময়া (অনুমানেন) অধিগতম [ অথবা } উময়া (গৌৰ্য্যা) ময়া (লক্ষ্ম্যা) অপি অধিগং, [ ] ঈশ্বরং বলে। ১। অনুবাদ—যিনি অবিকল্প-বিষয় অর্থাৎ বিকল্প-জ্ঞানের ( সংশয়ের) অবিষয়, ‘এক' অর্থাৎ স্বগত-সজাতীয়-বিজাতীয় ভেদ-রহিত, স্থাণু অর্থাৎ কূটস্থ নিত্য, যে পুরুষ শ্রুতিতে শ্রুত হইয়া থাকেন, যিনি কেবল উমা অর্থাৎ পার্বতী দ্বারা প্রাপ্ত হন নাই, কিন্তু ‘ময়া’ অর্থাৎ লক্ষ্মী দ্বারাও অধিগত হইয়াছেন। অথবা কেবল পাব্বতী দ্বারা অধিগত হন নাই, কিন্তু ‘অনু’ অর্থাৎ শ্রবণানন্তর ‘ময়া অর্থাৎ আমার দ্বারাও যিনি অধিগত হইয়াছেন, অথবা “ ময়া” অর্থাৎ উমা এবং আমার দ্বারা যিনি অধিগত হইয়াছেন, অথবা “অনু- ময়া” অর্থাৎ অনুমানদ্বারা অধিগত হন, সেই পরমাত্মাকে আমি বন্দনা করি । তাৎপর্য-খণ্ডনকার শ্রীহর্ষ এই স্থলে বৈতণ্ডিক + হইলেও অর্থাৎ পরমত-খণ্ডন-মাত্ৰ-কার্যে ব্যাপৃত হইলেও নিজ প্রেীঢ়ি-প্রকটন। পূৰ্ব্বক স্বমত- * এই পক্ষে নু শব্দ সম্বন্ধনীৰ্থক অর্থাৎ সমুচ্চয়ার্থক জানিবে । + বিতণ্ডা অর্থ বিচারকালে নিজ পক্ষ স্থাপন না করিয়া পরপক্ষ খণ্ডন করা। গৌতম সূত্র। ১। ২। ৩। দ্রষ্টব্য। ! প্রৌঢ়ি-প্রকটন অর্থ—নিজ বুদ্ধিবল প্রদর্শন। এস্থলে মঙ্গলাচরণ-মুখে স্বপক্ষ স্থাপনই ঐ প্রৌঢ়িপ্রকটন।
২ খগুন-খণ্ড-খাদ্য। ( তাৎপৰ্য)—স্থাপন অর্থাৎ ব্রহ্মাদ্বৈতমতস্থাপন এবং মঙ্গলাচরণ করিবার অভিপ্রায়ে এইশ্লোকটী গ্রন্থমধ্যে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। মঙ্গলাচরণ করা শিষ্টাচার, ইহার প্রয়ােজন-নির্বিঘ্নে গ্রন্থ-সমাপ্তি এবং কেমধ্যে এই গ্রন্থের প্রচার। ইহাকে গ্রন্থমধ্যে লিপিবদ্ধ করিবার উদ্দেশ্য—শিষশিক্ষা। “অবিকল্প-বিষয়”—এই স্থলে বিকল্প অর্থ সংশয় ; তাহার অবিষয়—অবি- কল্পবিষয়। এক-বিষয়ক বিরুদ্ধ নানাপ্রকার জ্ঞানের নাম সংশয়। অদ্বৈততত্ত্বে এবং সর্বসিদ্ধ বস্তুতেও তাহার অবকাশ নাই বলিয়া অদ্বৈততত্ত্বই অবিকল্প বিষয়। অথবা বিকল্প অর্থ বিশিষ্ট-জ্ঞান, তাহার অবিষয়-অবিকল্পবিষয়, এরূপ অর্থও সম্ভব ; যেহেতু, অদ্বৈততত্বে কোন প্রকার বিশেষণ নাই ; সুতরাং, তাহাতে সপ্ৰকারজ্ঞান উৎপন্ন হইতে পারে না। সপ্রকার জ্ঞানের নামই বিশিষ্ট-জ্ঞান। অথবা অবিকল্প অর্থ নির্বিকল্প-জ্ঞান, তন্মাত্রেরই বিষয় —অবিকল্পবিষয়, এরূপ অর্থও সম্ভব। কারণ, ব্রহ্ম-জ্ঞান সবিকল্পক হইতেই পারে না। অথবা বিকল্প অর্থ কল্পনা, অর্থাৎ মিথ্যা-জান, তাহার অবিষয়— অবিকল্পবিষয় , এরূপ অর্থও সঙ্গত। যেহেতু, ব্রহ্ম পারমার্থিক সত্য বস্তু। অথবা নির্বিকল্প জ্ঞান হইয়াছে বিষয় যাহার তাহা—অবিকল্পবিষয় ; এরূপ অর্থও সঙ্গত; কারণ, যাহা স্বপ্ৰকাশ ও চিদ্রপ, তাহা জ্ঞান দ্বারা প্রকাশ্য হইতে পারে না। কিন্তু, তাহার দ্বারাই জ্ঞান প্রকাশিত হয়। “ঈশ্বর”। এখানে পুরুষকেই ‘ঈশ্বর’ বলায় পুরুষ শব্দ দ্বারা ঈশ্বরের সহিত জীবের অভেদ সূচিত হইল। ত’ এই পদদ্বারা ঈশ্বর যে শ্রুতি-প্রমাণ-গম্য, তাহাও কথিত হইল। “শ্রুতি এই বহুবচন দ্বারা কর্মকাণ্ডেরও যে ব্ৰহ্মপরত্ব আছে, তাহাও প্রতিপাদিত হইল। অর্থাৎ কর্মকাণ্ড দ্বারা চিত্তশুদ্ধ হইলে লােকে ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভে উপযুক্ত হয়। “অস্তি” এই শব্দ দ্বারা স্বসাক্ষিক বিদ্যমানৈকরূপতা প্রতিপাদিত হইল। অর্থাৎ ব্রহ্ম স্বয়ংপ্রকাশ ও সােপ ইহাই কথিত হইল। ইহা ছয় প্রকার ভাব-বিকারের মধ্যে অন্যতম নহে। ; 2 + ছয় প্রকার ভাববিকার অস্তি, জায়তে, বর্ধতে, বিপণিমতে, অপক্ষীয়তে, বিনতি। ইহা নিরুক্ত নির্ঘটকান্ত প্রথম অধ্যায়ে ভ্রষ্টব্য। এস্থলে অপিদে এই ভাং-বিকারকে বুঝাইতেছে না।
• প্রথম পরিচ্ছেদ। ( তাৎপৰ্য)—“উমা” এবং “মা” এই উভয় দ্বারা অধিগত এইরূপ বলায় লক্ষ্মী- পতি এবং পার্বতীপতির অভেদ কথিত হইল। এখানে বিরােধাভাস-নামক অলঙ্কার; কারণ, এক বস্তু স্থাণু ও পুরুষ ইহা বিরুদ্ধ কথন। যেহেতু, যিনি স্থাণু তিনিই পুরুষ অথচ তিনি বিকল্প অর্থাৎ সংশয়ের বিষয় নহেন—ইহা একটী বিরােধ। আর যিনি শ্রুতিতে শ্রুত আছেন অথচ তিনি বিকল্প অর্থাৎ বিশিষ্ট- জ্ঞানের অবিষয়—ইহাও পরস্পরবিরােধ-বােধক। এবং উমার দ্বারা যিনি অধিগত, তিনিই “অনুম”-অধিগত,অর্থাৎ তিনিই আবার উমার দ্বারা অধিগত নহেন—ইহাও পরস্পর বিরুদ্ধ। কিন্তু, বস্তুতঃ ইহাদের মধ্যে বিরােধ নাই, অথচ ইহা এই ভাবে কথিত হইল; এই জন্য ইহাই এস্থলে অলঙ্কার। এখানে “পুরুষ” শব্দের সঙ্গে উচ্চারিত “এক”পদের কৈবল্যরূপ অর্থ লাভ হইয়াছে, এজন্য পুরুষের কৈবল্যই যে মুখ্য প্রয়ােজন—তাহাই কথিত হইল। “এক” শব্দটী সংখ্যাৰ্থক স্বীকার করিলেও পুরুষ শব্দবাচ্য ব্রহ্মের একত্ব অর্থাৎ অদ্বৈতত্বই যে এই গ্রন্থের প্রতিপাদ্য, তাহাও কথিত হইল। এবং “অনুমা-অধিগত” এই শব্দ বশতঃ মনন দ্বারা অধিগতত্ব যে এই গ্রন্থের অবান্তর প্রয়ােজন—তাহাও কথিত হইল।“এক পুরুষ”বলায় ব্রহ্ম যে অদ্বিতীয়, তাহাই প্রতিপন্ন হইল। যেহেতু, শ্রুতিমধ্যে এইরূপ বাক্যই শ্রুত হইয়া থাকে। এস্থলে যে অনুমানটী করা হয়, তাহাতে ব্ৰহ্ম “পক্ষ” একত্ব অর্থাৎ অদ্বিতীয়ত্ব—“সাধ্য ; শ্রুতিতে অদ্বিতীয়রূপে প্রতিপাদিতত্বই—“হেতু” ; যে বস্তু, শ্রুতিতে যেরূপ প্রতিপাদিত হইয়া থাকে, তাহা তৎস্বরূপ হইয়া থাকে, যেমন ব্রহ্মের আনন্দময়ত্ব, ইহা হইল উক্ত অনুমিতির করণ ব্যাপ্তিজ্ঞান ইত্যাদি। যাহা হউক, মঙ্গলাচরণ দ্বারা এইরূপে ব্রহ্মের অদ্বিতীয়ত্ব-স্থাপনা- মানের সূচনা করা হইল বুঝিতে হইবে। স্থাণু” অর্থ স্থাণুর ন্যায় স্থাণু, প্রকৃত স্থাণু অর্থাৎ ‘মুড়াগাছ’ নহে, অর্থাৎ সুখ দুঃখাদি সম্ভেদ-শূন্য কুটস্থ নিত্য। এইরূপে প্রয়ােজন ও বিষয় যখন কথিত হইল, তখন প্রয়ােজন-কামই অধিকারী এবং প্রতিপাদ্য-প্রতিপাদকভাবই যে সম্বন্ধ, তাহাও কথিত হইল। অধিকারীর লক্ষণ মধ্যে যে সাধন-চতুষ্টয়-সম্পন্ন হইবার কথা আছে ; তাহা বেদান্তাদি গ্রন্থে স্পষ্টভাবে কথিত হইয়াছে। ॥১॥ ; ;
খগুন-খণ্ড-খাদ্য। মানাপনােদনবিনােদনতে গিরীশে, ভাসেব সঙ্কুচিতয়ােরুচিতদিন্দোঃ । ভেং ভবানিশচিতং দুরিতং ভবানি, নম্রীভবানি ঘনমজি সরেজয়ােস্তে || ২ অষয়-হে ভবানি। গিরীশ মানাপনোদনবিনােদনতে সতি দিলাে ভাসা ইব উচিত যথা স্যাৎ তথা, সঙ্কুচিতয়োঃ তে অভিন্ন সরোয়াের ভৰানিশচিতং দুরিতং ভেন্তু ঘনং যথা স্থাৎ তথা অহম্ নক্সী ভানি। ২ অনুবাদ-হে ভবানি। মহাদেব যখন তােমার মানাপনােদন রূপ ক্রীড়ায় তােমার চরণযুগে অবনতমস্তক হইয়াছিলেন, তখন তাহার মস্তকস্থিত চন্দ্রমার জ্যোতিতেই তােমার যে চরণ-কমল সঙ্কুচিত হইয়া ছিল, সেই চরণকমলে আমি, এই সংসারে নিরন্তর সংবর্ধিত এবং অন্য উপায় দ্বারা সর্বতােভাবে নাশের অযােগ্য পাপকে নাশ করিবার জন্য, নিরন্তর শ্রদ্ধা ভক্তিপূর্বক প্রণাম করিতেছি। ২ তাৎপর্য—প্রথম শ্লোকে শিবের প্রণাম করা হইয়াছে। কিন্তু, পার্বতীদেবী সকল-সৌভাগ্য-সম্পাদনকারিণী ; ; এজন্য গ্রন্থকার নিজের কৃতিরূপ যুবতীর সৌভাগ্য-সিদ্ধির উদ্দেশ্যে এই দ্বিতীয় শ্লোকে পাৰ্ব্বতীদেবীর প্রণাম করিলেন। এস্থলে পাৰ্ব্বতীদেবীর মানাপনােদন ক্রীড়াটী এই-মহাদেব, সকল যুবতী- কুলের-তিলক স্বরূপ পাৰ্ব্বতীদেবীকে ক্রোড়ে ধারণ করিয়াছেন এবং গঙ্গাকে মস্তকে ধারণ করিয়াছেন। এইজন্য যখন পাৰ্ব্বতীদেবীর অভিমান হয়, তখন সেই অভিমান অপনােদন করিবার জন্য পাৰ্ব্বতীদেবীর চরণকমলে প্রণাম উদ্দেশ্যে মহাদেব শিরঃ অবনত করিয়াছিলেন। এখন ভর্তা প্রণিপাত করিতে উদ্যত হইলে পত্নীর সংকোচ হওয়াই উচিত ; পাৰ্ব্বতীদেবীরও তাহাই ঘটিয়াছিল। কিন্তু, সেই সংকোচ এই স্থলে মস্তকস্থিত চন্দ্র-কিরণ-সম্পর্কজনিত, অন্য কারণ-জন্য নহে; ইহা এস্থলে কবির উৎপ্রেক্ষা বুঝিতে হইবে। অতিদূরস্থ চন্দ্রকিরণে যখন কমলের সংকোচ হয়, তখন শিবের শিরস্থিত চন্দ্রমা অতি সমীপবর্তী হওয়ায় পার্বতীর চরণ-কমল যে সঙ্কুচিত হইবে,তাহাই ত স্বাভাবিক। ইহাই হইল উক্ত উৎপ্রেক্ষার উদ্দীপন।
প্রথম পরিচ্ছেদ। শব্দার্থনির্বচনখণ্ডনয়া নয়ন্তঃ সর্বত্র নির্বচনভাবমখৰ্ব্বগৰ্বান্। ধীরা যথােমপি কীরবদেতভুক্ত। লােকে দিগ্বিজয়কৌতুকমাতনুধ্বম, ॥ ৩ গ্রন্থারম্ভঃ। ( সবদি-মতােপন্যাসঃ।) অথ কথায়াং বাদিনো নিয়মম্ এতাদৃশং মন্তে—“প্রমাণাদয়ঃ সর্বতন্ত্রসিদ্ধান্ততয়া সিদ্ধাঃ পদার্থাঃ সন্তীতি কথকাভ্যাম্ অভ্যুপেয়ম্।” অম্বয়-হে ধীরাঃ। সর্বত্র শব্দার্থ-নির্বচনখণ্ডনয়া অখর্বগন্ধান নির্বচনভাব নয়ঃ যথােমপি এতৎ কীরবৎ উক্ত। লোকে দিগ্বিজয়কৌতুকম্ আতনুধ্ব। অনুবাদ—হে পণ্ডিতগণ ! সর্বত্র বিবাদ স্থলে শব্দ এবং অর্থের সে নির্বাচন অর্থাৎ ব্যাখ্যান, শুক পক্ষীর ন্যায় এই শাস্ত্র আবৃত্তি দ্বারা তাহার খণ্ডন করিয়া অর্থাৎ তাহার অনুপপন্নত্ব ব্যবস্থাপন করিয়া দুর্দান্ত অহংকারী বাদিবৃন্দকে নির্বচনভাব অর্থাৎ নিৰ্বাক্ করিয়া আপনারা লােকের মধ্যে দিগ্বিজয় কৌতুহল বিস্তার করুন। এক্ষণে “কথা” মধ্যে সদ্বাদিগণ এইরূপ নিয়ম স্বীকার করিয়া থাকেন যে,—সর্বতন্ত্র-সিদ্ধান্ত রূপে সিদ্ধ প্রমাণাদি-পদার্থগুলি বাদী ও প্রতিবাদীর স্বীকার করা আবশ্যক।”8 ( তাৎপৰ্য )—মহাদেবই জগদ্বন্দ্য, সেই মহাদেবের বন্দনীয় যখন পাৰ্ব্বতী- দেবীর চরণকমল, তখন তাহা যে অত্যন্ত বন্দনীয় এবং তাহার প্রণাম করিলে যে সকল অভীষ্ট সিদ্ধ হইবে, তাহাতে আর সন্দেহ কি? ইহাই এই শ্লোকের অভিপ্রায় ॥২॥ তাৎপর্যা-বিরক্ত পুরুষগণের এই গ্রন্থে প্রবৃত্তি হইবার জন্য এই গ্রন্থের মনন রূপ প্রয়ােজনটী প্রথম ও দ্বিতীয় শ্লোক দ্বারা প্রদর্শন করা হই- য়াছে। ইদানীং বিজিগীষু মনীষীর এই গ্রন্থে প্রবৃত্তি উৎপাদন করাইবার জন্য এই গ্রন্থের বিজয়রূপ প্রয়ােজনও কথিত হইল। দিগ্বিজয় অর্থ—অসৎ শাস্ত্রাভ্যাস দ্বারা অত্যন্ত অভিমানী প্রতিবাদিগণকে খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্য। ( তাৎপৰ্য)-পরাজয় করা। কিন্তু, তাহার উপায় এই শাস্ত্র অধ্যয়ন। কারণ, এই গ্রন্থ এরূপভাবে রচিত হইয়াছে যে, যদি কেহ ইহা সম্যক্ না বুঝিয়াও সভামধ্যে শুক পক্ষীর ন্যায় আবৃত্তি করিতে পারেন, তাহা হইলেও তিনি বাদিগণকে নিরস্ত করিতে পারিবেন “কথা” অর্থ-বাদ, জল্প ও বিতণ্ডা। অর্থাৎ এই কথায়ের মধ্যে শব্দ অর্থাৎ লক্ষণ এবং অর্থ’ অর্থাৎ লক্ষ্য, এতদুভয় বিষয়েই বাদিগণ এই যুক্তি সকল শ্রবণ করিলে মূকতাকে প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। অর্থাৎ বাক্য প্রয়ােগ করিতে অসমর্থ হন। অদ্বৈত-ব্যবস্থাপন অথবা বাদিবিজয় এই দুইটী এই গ্রন্থের ফল, ইতিপূৰ্ব্বে উক্ত হইয়াছে। এই উভয়ের সিদ্ধি পঞ্চাবয়ব-মুক্ত বাক্য রূপ “কথা” ভিন্ন হইতে পারে না। আর এই কথাতে বৈতণ্ডিকের অধিকার নাই। কথা মাত্রই প্রমাণাদির সত্তা স্বীকার করিয়াই সম্ভব হইয়া থাকে, বৈতণ্ডিক প্রমাণাদির সত্তা স্বীকার করেন না, এবং প্রমাণাদির সত্তা স্বীকার যদি করেন, তাহা হইলে অদ্বৈত-ব্যবস্থাপন তাহার সিদ্ধ হইবে না; কারণ, উহা ব্রহ্মাতিরিক্ত পদার্থ। আর তাহা হইলে অদ্বৈতমত-স্থাপন-প্রযুক্ত অপরকে বিজয় করা রূপ যে ফল, তাহাও সিদ্ধ হইবে না। অতএব কথামাত্রই যে প্রমাণাদি-পদার্থ সন্তাভপগমাধীন, তাহা খণ্ডন করিবার জন্য গ্রন্থকার উপক্রম করিতেছেন। “অথ” শব্দ মঙ্গলবাচক অথবা আরম্ভাৰ্থক বুঝিতে হইবে। “কথা” শব্দের অর্থ-বহু ব্যক্তিকর্তৃক বিচার বিষয়ক বচন-সন্দর্ভ। উহা তিন প্রকার যথা,-বাদ, জল্প ও বিতণ্ডা। বাদ অর্থ—তত্ত্ববুভুৎসুর বচন-সন্দর্ভ, জল্প অর্থ-বিজিগীষুর বচন-সন্দর্ভ ; এবং বিতণ্ডা অর্থ–স্বপক্ষ স্থাপন-শূন্য পরপক্ষ খণ্ডনার্থ বচন-সন্দর্ভ। গৌতম সূত্ৰ ১২১-২-৩ দ্রষ্টব্য। এই কথাত্ৰয়ে বাদী এবং প্রতিবাদী উভয়কেই একটা নিয়ম স্বীকার করিতে হয়। সে নিয়মটী এই যে—গৌতম সূত্রোক্ত প্রমাণাদি যে যােড়শ পদার্থ—ইহা সৰ্ববাদিসিদ্ধ এবং সৎ। ইহা স্বীকার না করিলে বাদ, জল্প, বিতণ্ডা কোন কথাই সম্ভব নহে। ইহাই সদ্বাদীর অভিমত। অবশ্য, বৈতণ্ডিক-গ্রন্থকার এই মত স্বীকার করেন না, এবং তজ্জন্য ইহা তিনি পরে খণ্ডন করিতেছেন।
প্রথম পরিচ্ছেদঃ। ৭ (সদবাদিমত-নিরাসার্থং বিকল্পচতুষ্টয়ম্।) উপরে ন ক্ষমন্তে। তথাহি—প্রমাণাদীনাং সত্ত্বং যত্ অ্যুপেয়ং কথকেন, তৎ কস্য হেতাের? (১) কিং তদনভাপগচ্ছ- ভ্যাম, বাদি প্রতিবাদিভ্যাং তদভপগম-সাহিত্য-নিয়তস্য বাগ ব্যবহারস্য প্ৰবৰ্ত্তয়িতুম, অশ্যত্বাৎ, (২) উত কথকাভ্যাং প্রবর্তনীয়-বাগব্যবহারং প্রতি হেতুদ্বাৎ, (৩) উত লেকসিদ্ধত্বাৎ, (৪) অথবা তদনভপগমস্য তত্ত্বনির্ণয়বিজয়-ফলাতিপ্ৰসঞ্জকৎ |৫ অনুবাদ-ইহা কিন্তু অপরে অর্থাৎ অদ্বৈতবাদিগণ স্বীকার করেন না। যেহেতু, প্রমাণাদি পদার্থের সভা কথককে স্বীকার করিতে হইবে এই নিয়ম স্বীকার করিবার হেতু কি? বল দেখি, তাহা কি (১) প্রমাণাদি পদার্থের সত্তা স্বীকার না করিয়া বাদী ও প্রতিবাদী নিজ নিজ বাগ-ব্যবহার ( যে বাগ-ব্যবহার প্রমাণাদি পদার্থের সত্তাভপগমের অবিনাভাবী) করিতে পারেন না বলিয়া স্বীকৃত হয় ? (২) অথবা প্রমাণাদি পদার্থসত্তা স্বীকার, বাদী ও প্রতিবাদী প্রবর্তিত বাগব্যবহারের কারণ বলিয়া স্বীকৃত হয় ? (৩) কিংবা ইহা লােক-ব্যবহার সিদ্ধ বলিয়া স্বীকৃত হয়, (৪) অথবা প্রমাণাদি পদার্থ স্বীকার না করিলে তত্ব-নির্ণয় এবং বিজয়রূপ যে ফল, তাহার অতি প্রসঙ্গ হইবে বলিয়া স্বীকৃত হয় ? ৫ ( তাৎপৰ্য)—সর্বতন্ত্র-সিদ্ধান্ত অর্থ,—প্রামাণিক রূপে স্বীকৃত অর্থের নাম সিদ্ধান্ত। উহা চারি প্রকার,যথা—-সৰ্ব্বতন্ত্র,প্রতিতন্ত্র,অধিকরণ এবং অভ্যুপগম। সৰ্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত অর্থ-সৰ্ব্বশাস্ত্রের অবিরুদ্ধ অথচ এক শান্ত্রোক্ত অর্থ। যেমন, প্রমাণ, প্রমেয় প্রভৃতি। প্রতিতন্ত্র সিদ্ধান্ত অর্থ-এক শাস্ত্র মাত্র সিদ্ধ অর্থ। যেমন, নৈয়ায়িকের মতে অসৎ-কাৰ্যবাদ। অধিকরণ-সিদ্ধান্ত অর্থ,—যে ‘হেতু অথবা পক্ষের সিদ্ধি হইলে অন্য কোন অনুক্ত অর্থেরও সিদ্ধি হইয়া যায় তাহা। যেমন, দর্শনেন্দ্রিয় ও স্পর্শনেন্দ্রিয় দ্বারা একই অর্থের গ্রহণ হয় বলিয়া ইন্দ্রিয়- ব্যতিরিক্ত আত্মা সিদ্ধ হয়। এই স্থলে হেতু সিদ্ধ হইলেই আনুষঙ্গিক ইন্দ্রিয়ের নানাত্ব এবং নিয়ত-বিষয়ত্ব সিদ্ধ হইয়া যায়। এইরূপ সিদ্ধ হওয়ায় নাম অধি- করণ সিদ্ধান্ত। অপগমসিদ্ধান্ত অর্থশাস্ত্রে সাক্ষাৎ ভাবে কথিত নাই, ৮ খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্য। •• (তাৎপৰ্য)—অথচ কোন কথিত অর্থের সামর্থ্য দ্বারা যাহার সিদ্ধি হয় তাহা। যেমন মনের ইন্দ্রিয়ত্ব ; কারণ, মন ইন্দ্রিয় ইহা গৌতম-সুত্রে উক্ত হয় নাই ; পরন্তু, প্রত্যক্ষের ইন্দ্রিয়ার্থ-সন্নিকর্ষ জন্য স্বরূপ যে লক্ষণী করা হইয়াছে, মনকে ইন্দ্রিয় স্বীকার না করিলে সুখাদি-প্রত্যক্ষে এই লক্ষণের অব্যাপ্তি হইবে, অতএব মনের ইন্দ্রিয়ত্ব সূত্ৰকারের অভিমত ইহা সিদ্ধ হইল। যাহাহউক, প্রমাণাদি সৰ্বতন্ত্র-সিদ্ধান্ত-সিদ্ধ বলিয়া তাহার সত্তা সকলেরই স্বীকার্য। প্রমাণাদি পদার্থ, যথা—প্রমাণ, প্রমেয়, সংশয়, প্রয়ােজন, দৃষ্টান্ত, সিদ্ধান্ত, অবয়ব, তর্ক, নির্ণয়, বাদ, জল্প, বিতণ্ডা, হেত্বাভাস, ছল, জাতি ও নিগ্রহস্থান । ইহাদের বিবরণ গৌতম-সূত্র-মধ্যে দ্রষ্টব্য। উক্ত “সৰ্বতন্ত্র-সিদ্ধান্তরূপে সিদ্ধ প্রমাণাদি পদার্থগুলি বাদী ও প্রতিবাদীর স্বীকার করা আবশ্যক” এই নিয়মটীর বিষয় গৌতম সূত্রের বাৎস্যায়ন ভাষ্যের প্রারম্ভে উক্ত হইয়াছে। ইহা পরে গ্রন্থকারই প্রদর্শন করিতেছেন। সুতরাং, এস্থলে পুনরুক্তি নিষ্প্রয়ােজন। “কথক” অর্থ—বাদী এবং প্রতিবাদী বুঝিতে হইবে।৪ তাৎপর্য-এখন গ্রন্থকার পূর্বোক্ত সদ্বাদীর মত খণ্ডনের অভি- প্ৰায়ে চারি প্রকার বিকল্প উত্থাপন করিতেছেন। বিকল্প চারিটী কি, তাহা অনুবাদমধ্যে কথিত হইয়াছে। কিন্তু ইহাদের উদ্দেশ্য এই যে,সবাদীর মতে প্রমাণাদি পদার্থের সত্তা স্বীকার কথামাত্রেরই অঙ্গ, বলিয়া বিতণ্ডা-কথা করিতে হইলেও তাহাদের মতে প্রমাণাদি পদাৰ্থর সত্তা স্বীকার করিতে হয়। এতদুত্তরে যেন গ্রন্থকার বলিতেছেন যে, প্রমাণাদি পদার্থের স্বীকার করা, অর্থাৎ তাহাদের সত্তা স্বীকার করা,বিতণ্ডার যে অঙ্গ, তাহা কে বলিল ? তাহাতে কোন প্রমাণ আছে কি ? বিতণ্ডার জন্য উহাদের সত্তা না থাকিলেও উক্ত পদার্থের স্বরূপমাত্রই প্রয়ােজক হইতে পারে; উহাদের সত্যতা স্বীকারের প্রয়ােজন কি ? বল দেখি—অসদ্বাদী বা শূন্যবাদীর কোন কথাতে কি অধিকার অতএব কথাতে অসদ্বাদী ও শূন্যবাদীর যখন প্রবেশাধিকার আছে, তখন অনির্বচনীয়-বাদীরও কেন কথাতে অধিকার থাকিবে না ? এই অভিপ্রায়ে প্রথমতঃ অসদ্বাদীর পক্ষাবলম্বন করিয়া উক্ত বিকল্প চতুষ্টয় আরম্ভ করা হইল। অর্থাৎ, গ্রন্থকার ব্যবহার-সিদ্ধির জন্য ? নাই ?
প্রথম পরিচ্ছেদঃ । (তাৎপৰ্য)-প্রমাণাদি-পদার্থ স্বীকার করেন, কিন্তু, তাহাকে পারমার্থিক সত্য বলিয়া স্বীকার করেন না, উহারা হার মতে মিথ্যা। সদ্বাদী তাহাদের ; সত্তা স্বীকার করিয়া থাকেন। ইহাই সদ্বাদী এবং বৈতণ্ডিকের মধ্যে প্রভেদ, অবশ্য, ব্যবহার উভয় মতেই সমান। “কথক” শব্দে এস্থলে যে একবচন প্রয়ােগ দেখা যায়, তাহাতে গ্রন্থকার নিজেকেই লক্ষ্য করিয়াছেন। এইবার দেখা যাউক, উক্ত চারিটী বিকল্পের তাৎপৰ্য্য কি। প্রথম বিকল্পের তাৎপৰ্য্য এই যে, যেমন ব্রাহ্মণত্ব যেখানে যেখানে থাকে সেই সেই স্থানেই মনুষ্যত্ব দেখা যায়, অতএব তাহাদের মধ্যে একটা ব্যাপ-ব্যাপকভাব আছে, সুতরাং ব্রাহ্মণত্বের জ্ঞান হইলেই ব্যাপকীভূত মনুষ্যত্বের জ্ঞান হয়, এবং যেমন মনুষ্যত্বের অভাব হইলে ব্রাহ্মণত্বের অভাব হইয়া যায়, তদ্রুপ যে-কোন ব্যক্তি কথক, তাহারা সকলেই প্রমাণাদির সত্তা স্বীকার করেন, অথবা যে-কোনটী কথা-পদবাচ্য সকলই প্রমাণাদি-পদার্থ- সত্তা-স্বীকার-কর্তা কর্তৃক পরিদৃষ্ট হয়, অথবা যেখানে কথকতা আছে, সেই সেই স্থলে প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার করা হইয়া থাকে, এইরূপ ত্রিবিধ ব্যাপ্তি-বল দ্বারাই বাগব্যবহাররূপ ব্যাপ্য দর্শন করিয়া ব্যাপকীভূত প্রমাণাদি -পদার্থের সত্তা স্বীকার সিদ্ধ হইবে কি না ? অর্থাৎ উক্ত প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা না থাকিলে ব্যাপকভাববশতঃ ব্যাপ্যাভাব হইবে অর্থাৎ ব্যাপ্য বাগ- ব্যবহার অসিদ্ধ হইবে কি না জিজ্ঞাসা করা হইল। দ্বিতীয় বিকল্পের অর্থ এই যে,-যেমন জ্ঞানরূপ কাৰ্য দেখিয়া তাহার কারণের সত্তা স্বীকার করা হয়, তদ্রপ বাগব্যবহাররূপ কাৰ্য্য দেখিয়া উহার কারণীভূত প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকৃত হয় কি না ? কারণীভূত প্রমা- দি পদার্থের সত্তা স্বীকার যদি না করা হয়, তাহা হইলে কাৰ্যই সিদ্ধ হয় না। যেহেতু, কারণভাবে কাৰ্যাভাব হইয়া থাকে—ইহা সৰ্ববাদিসিদ্ধ। কিন্তু, যেহেতু, কাৰ্য-বাগব্যবহার রহিয়াছে, সেই হেতু, কারণস্বরূপ প্রমা- শাদি-পদার্থের সত্তাও আছে—ইহা বলিতে হইবে। যদি বল, তাহা হইলে এই দ্বিতীয় কল্পের সহিত প্রথমকল্পের প্রভেদ কি ? কাৰ্য্য দেখিয়া কারণানুমানও ত ব্যাপ্যব্যাপকসম্বন্ধেই সিদ্ধ হয় ? তাহার উত্তর এই যে, প্রথমকল্পে কেবল ১০ খগুন-খণ্ড-খাদ্য। (তাৎপৰ্য—ব্যাপ্যব্যাপক সম্বন্ধ দ্বারা উহাদের কাৰ্যকারণ-সম্বন্ধ না মানিয়া, বাগব্যবহার দেখিয়া প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা অনুমান অভিপ্রেত, কিন্তু, এই দ্বিতীয়কল্পে কাৰ্যকারণ-ভাব দ্বারা তাহা সিদ্ধ হয় কি না জিজ্ঞাসা করা হইল। এরূপ করিবার তাৎপৰ্য এই যে, অনুমান ত্রিবিধ বলিয়া প্রসিদ্ধ। প্রথম--স্বভাব-লিঙ্গক, দ্বিতীয়—অনুপলব্ধিলিঙ্গক, এবং তৃতীয়—কাৰ্যলিঙ্গক। এস্থলে এই পরকীয় (বৌদ্ধ ) প্রসিদ্ধরীতি অবলম্বন করিয়া দ্বিতীয়কল্প রচিত হইয়াছে মাত্র।* তৃতীয় বিকল্পের অর্থ এই যে–প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকারের প্রতি অন্য কোন হেতু নাই,—উহা লােকব্যবহার সিদ্ধ, অর্থাৎ লােকে বলে উহার সত্তা আছে, তজ্জন্য উহাদের সত্তা স্বীকার্য হয় – এই মাত্র কি না জিজ্ঞাসা করা হইল। চতুর্থ বিকল্পের,তাৎপৰ্য এই যে–প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার না করিয়া কথাতে প্রবৃত্ত হইলেও যদি বাদ-ফল তত্ত্ব-নির্ণয়, এবং জল্প ও বিতণ্ডার ফল বিজয় প্রভৃতি সিদ্ধ হয়, তাহা হইলে, যেহেতু, উন্মত্তেরও বাগব্যবহারে কোন প্রমাণাদির সত্তা স্বীকৃত হয় না, সেই হেতু, তাহারও এই সব ফললাভ হওয়া উচিত; কিন্তু, উন্মত্তের বাগ ব্যবহারে কোন ফললাভ হয় না। অতএব প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার করিয়াই কথাতে প্রবৃত্ত হইতে হইবে- এইরূপ নিয়ম মানিতে হইবে কি না জিজ্ঞাসা করা হইল। ইহাই হইল চারিটী বিকল্প। ইহাদের অভিপ্রায় এই যে, বাদী ও প্রতিবাদী বিচারে প্রবৃত্ত হইবার সময় প্রমাণাদি-পদার্থকে সত্য বলিয়া স্বীকার করিয়া প্রবৃত্ত হইবেন—এমন কোন নিয়ম স্বীকার করিবার কারণ আছে কি না জিজ্ঞাসা করা হইল। যাহা হউক, এইবার গ্রন্থকার একে একে তাহাদের খণ্ডন করিতে আরম্ভ করিতেছেন ৫ * এই ত্রিবিধ অনুমানের বিশেষ বিবরণ সর্বদর্শন সংগ্রহ মধ্যে চার্বাক ও বৌদ্ধদর্শনে এবং ধৰ্ম্মকীর্তির ন্যায়বিন্দু ও ধৰ্মোত্তরের তৎকামধ্যে দ্রষ্টব্য।
প্রথম পরিচ্ছেদ। ১১ প্রথম বিকল্প-নিরাস। ন তাবদ আদ্য, তদনভপগচ্ছতােহপি চার্বাক-মাধ্যামিকাদে- বাগ,বিস্তরাণাং প্রতীয়মানত্বাৎ। তস্যৈব বা অনিষ্পত্তৌ ভবতস্তন্নিরাস- প্রয়াসানুপপত্তেঃ। সােয়মপূর্বঃ প্রমাণাদিসত্তানভপগমাত্মা বাস্তম্ভন- মন্ত্রো ভবতা অভূহিতে নূনং, যস্য প্রভাবাদ ভগবতা সুরগুরুণা লােকায়তকানি সূত্রাণি ন প্রণীতানি ! তথাগতেন বা মধ্যমাগম নাে- পদিষ্টাঃ! ভগবৎপাদেন বা বাদরায়ণীয়েষু সূত্রে ভাষং নাভাষি !৬ অনুবাদ-পূর্বোক্ত চারিটী বিকল্পের মধ্যে প্রথম বিকল্প হইতে পারে । কারণ, চার্বাক এবং মাধ্যমিক প্রভৃতি প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার করেন না, তথাপি তাহাদের বাগব্যবহার বিস্তৃতরূপে দেখা যায়। চার্বাকাদির বাগব্যবহারই যদি না হইত, তাহা হইলে তাহাদের মত-নিরাকরণের জন্য তােমার চেষ্টা অনুপপন্ন হইত। অতএব দেখা যাইতেছে, পরকীয় বাস্তম্ভনের জন্য তুমি, “প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার না করা” রূপ একটী অভিনব মন্ত্রের আবিষ্কার করিয়াছ ; তাহার প্রভাবে সুরগুরু বৃহস্পতি) চার্বাক-দর্শন প্রণয়ন করেন নাই ! বুদ্ধদেব শূন্যবাদের উপদেশ করেন নাই। এবং পূজ্যপাদ ভগবান শঙ্করাচাৰ্য মহর্ষি-বাদরায়ণ-প্রণীত বেদান্ত-সূত্রের উপর ভাষ্য- রচনাও করেন নাই বলিতে হইবে । তাৎপৰ্য—“বাগব্যবহারটী প্রমাণাদির সত্তা-স্বীকারের ব্যাপ্য; অতএব প্রমাণাদির সত্তা স্বীকার না করিলে ব্যাপকভাবে ব্যাপ্যাভাব” এই ন্যায়ানু- সারে বাগব্যবহারের অনুপপত্তি হয় ; অতএব যেহেতু, বাগব্যবহার দৃষ্ট হয়, সেইহেতু,প্রমাণাদিসত্তা-স্বীকারের অনুমান করিতে হইবে”—এই প্রথম কল্পের খণ্ডন করিবার জন্য গ্রন্থকার বিকল্প করিতেছেন যে, ব্যবহার-মাত্রের সহিত প্রমাণাদির সত্তা-স্বীকারের ব্যাপ্যব্যাপকভাব স্বীকার করিয়া উক্ত নিয়মটী স্বীকার করিতেছ ? কিংবা বিশিষ্ট-ব্যবহারকে ব্যাপ্য বলিয়া তাহা স্বীকার করিতেছ? প্রথম পক্ষ অবলম্বন করিলে চার্বাকাদির ব্যবহারে ব্যভিচার * ব্যভিচায়--সাধ্য যে স্থলে নাই, সেস্থলে হেতু থাকিলেই ব্যভিচায় দোষ হয়, যথা—প্রমেয়ত্ব হেতুদ্বারা বহি সাধন করিতে গেলে বহ্নিশুন্য হ্রদাদিতে প্রমেয় আছে বলিয়া এই হেতু ব্যভি- চারী হয় এই দোষের উদ্ভাবন হইলে ব্যাপ্তিজ্ঞান হয় না, ইহাই ইহার ফল।
১২ খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্য। (তাৎপৰ্য)—হয়। কারণ, তাঁহারা প্রমাণাদি-পদাথের সত্তা স্বীকার করেন । অতএব, ব্যবহারত্বরূপ হেতুটী চার্বাকাদির বাগব্যবহারে আছে, সেখানে প্রমাণাদি-সত্তা-স্বীকার-পূৰ্ব্বকত্বরূপ সাধ্য নাই বলিয়া ব্যভিচার হইল। যদি তাহাদের (চার্বাকাদির) বাগব্যবহারকে পক্ষকোটিতে প্রবেশ করিয়া পক্ষে কিম্বা পক্ষতুল্যে ব্যভিচার উদ্ভাবন করা শাস্ত্রনিষিদ্ধ বলিয়া এই দোষ হইতে পারে না-বল ; তাহাও ঠিক নহে। কারণ, তাহা হইলে পক্ষের এক- দেশে অর্থাৎ চার্বাকাদির বাগব্যবহারে বাধ” * রূপ হেতু-দোষটী হইবে। কারণ, পক্ষৈকদেশ চার্বাকাদির বাগব্যবহারে প্রমাণাদিসত্তা স্বীকার-পূৰ্ব্বকত্ব- রূপ সাধ্য নাই। যদি বল - চার্বাক কেবল প্রত্যক্ষ প্রমাণ স্বীকার করেন, এবং মাধ্যমিক সৰ্ব্বশূন্যবাদী বলিয়া তাহার মতে কোন ব্যবহারই নাই ; অতএব “বাধ” কিম্বা “ব্যভিচার” হইতে পারে না; কারণ, বাধ কিংবা ব্যভিচার উদ্ভাবন- যােগ্য স্থলই নাই। তাহা হইলে তাহার উত্তরে গ্রন্থকার বলিতেছেন যে, যদিও চার্বাক কেবল প্রত্যক্ষ প্রমাণ স্বীকার করেন, তথাপি সেই প্রত্যক্ষের প্রামাণ্য অনুমানগম্য, ইহা তাহাকে স্বীকার করিতে হইবে। অনুমান প্রমাণ স্বীকার না করিলে প্রত্যক্ষ স্বীকার করিলেও তাহার ( প্রত্যক্ষের) প্রামাণ্য সিদ্ধ হয় না ; অতএব, প্রত্যক্ষ প্রমাণও যে নাই—ইহাই তাহার মতে পৰ্যবসন্ন হয় ; আর সেই জন্যই চার্বাকাদির বাগব্যবহারে পূর্বোক্ত ব্যভিচার প্রদর্শন করা হইয়াছে। অথবা—“যৎকিঞ্চিৎ-প্রমাণাদির সত্তা-স্বীকার-পূৰ্ব্বকত্বকে সাধ্য করিতেছ, কিম্বা সকল প্রমাণাদির সত্তা স্বীকারপূৰ্ব্বকত্বকে সাধ্য করিতেছ,” এইরূপ বিকল্প মনে করিয়া প্রথমে চার্বাকের বাগব্যবহারে এবং তৎপরে মাধ্যমি- কাদির বাগব্যবহারে ব্যভিচার প্রদর্শন করা হইয়াছে-বুঝিতে হইবে। কিম্বা বলা যাইতে পারে যে, চার্বাকাদির বাগব্যবহারে যে উক্ত ব্যভিচার প্রদর্শন করা হইয়াছে, তাহা সাধ্যকোটিতে প্রমাণাদি পদের আদি” * বাধ-পক্ষে সাধ্যের অভাব থাকিলে তাহার নাম বাধ বলা হয়। যথা-ব্যত্ব হেতুদ্বারা বহ্নিতে উষ্ণত্বাব সাধন করিতে ।ইলে প্রত্যক্ষ প্রমাণ দ্বারা তাহা বাধিত হয়। এই ধরূপ দোষ থাকিলে অনুমিতি হয় না; ইহাই এই দোষের ফল। ;
১৩ প্রথম পরিচ্ছেদ। (তাৎপৰ্য)—শব্দদ্বারা তর্কাদিরও পরিগ্রহ করিয়া হইয়াছে। ইহার অভিপ্রায় এই যে, চার্বাকমতে প্রমাণ থাকিলেও তর্কের স্বীকার নাই বলিয়া প্রমাণ- তর্কাদি-সত্তা-স্বীকার-পূৰ্ব্বকত্ব রূপ সাধ্যের ব্যভিচার প্রদর্শন করা হইয়াছে। অথবা বলা যাইতে পারে যে, উপরে যে ব্যভিচার প্রদর্শিত হইয়াছে, তাহা চার্বাকৈকদেশীর মতে; অথাৎ যে সকল চার্বাক প্রত্যক্ষকেও স্বীকার করে না, তাহাদেরই মতে, সকল চার্বাকের মতে নহে। ফলতঃ, গ্রন্থকার এতদ্বারা এই অভিপ্রায় প্রকাশ করিতেছেন যে-চার্বাক- মতে প্রত্যক্ষ মাত্রের স্বীকার থাকিলেও অনুমানাদি দ্বারা ব্যবহার হইয়া থাকে, অথচ অনুমানাদির সত্তা তাঁহার মতে নাই; সুতরাং, তাঁহাদের মতে ব্যভিচার হইল। মাধ্যমিক মতেও বাগব্যবহারের সত না থাকিলেও কল্পিত-ব্যবহার আছে ; কারণ, মিথ্যাভূত ব্যবহারও না মানিলে প্রসক্তি না থাকায় তাঁহাদের মতের প্রতিষেধ হইতে পারে না, অতএব তাহাদের মতেও ব্যবহার আছে। আর সেইজন্য পূর্বোক্ত ব্যভিচার প্রদর্শন সঙ্গত হইল। তদ্রুপ, ভগবান্ শঙ্করাচাৰ্য অদ্বৈতবাদী বলিয়া তিনিও কোন প্রমা- ণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার করেন না, কিন্তু কল্পিত ব্যবহার তাঁহার মতেও আছে ; অতএব তাহার মতেও বাগব্যহারে ব্যভিচার দোষ প্রদর্শিত হইল। উপরে যে বাস্তম্ভনমন্ত্রের কথা উক্ত হইয়াছে, তাহাতে গ্রন্থকার বাদীকে শ্লেষ করিয়াছেন। অভিপ্রায় এই যে, বাস্তম্ভন মন্ত্রের উচ্চারণ করিলে পরের বাক্য নির্গত হয় না, কিন্তু বাদীর বাস্তম্ভনমন্ত্রের ইহাই নূতনত্ব যে, তাহা উচ্চারণ না করিলেও প্রতিবাদী বাক্যয়ােগ করিতে পারে না। ইহাকে মন্ত্র নামে অভিহিত করিবার তাৎপৰ্য এই যে-মন্ত্র গােপনে বলিতে হয় নচেৎ মন্ত্রই হয় না। বাদীর কথাও তদ্রুপ গােপনে বলা আবশ্যক, নচেৎ তাহা শুনিয়া লােকে উপহাসই করিবে ; অতএব বাদীর কথাও মন্ত্রবিশেষ হইল। এই স্থলে গ্রন্থকার যে তিনটা উদাহরণ দিয়াছেন, তাহা দ্বারা তিন জন প্রধান খণ্ডনবাদী-ইহা সূচিত হইল। চার্বাক সম্বন্ধে পুরাণে এইরূপ কথা আছে যে, সুরগুরু বৃহস্পতি দৈত্য- দিগের নাশ করিবার জন্য চার্বাক শাস্ত্র প্রণয়ন করিয়াছিলেন। ইহার প্রচার-বলে দৈত্যদিগের নাশ ঘটিয়াছিল। সেই চার্বাকের মত এই যে, স্বর্গ, খগুন-খণ্ড-খাদ্য। (তাৎপৰ্য)-নরক, মুক্তি, দেবতা প্রভৃতি কিছুই নাই। প্রত্যক্ষ ভিন্ন অন্য কোন প্রমাণ স্বীকাৰ্য নহে। যে কোন প্রকারে সুখানুভব করাই স্বর্গ। ইহলােকের দুঃখানুভবের নামই নরক। দেহ নাইমােক্ষ, ইত্যাদি। বিস্তৃত বিবরণ সর্বদর্শনসংগ্রহে দ্রষ্টব্য। উপরে যে বৌদ্ধমতের উল্লেখ দেখা যায়, তাহা প্রধানতঃ চারি প্রকার। কারণ, বুদ্ধদেব চারিপ্রকার ভাবনার উপদেশ করিয়াছিলেন। প্রথম—সকল জগৎ ক্ষণিক; দ্বিতীয়—দুঃখরূপ ; তৃতীয়—জ্ঞানস্বরূপ ও চতুথ-শূন্যরূপ। এই উপদেশ অনুসারে চারিটী মত উৎপন্ন হইয়াছে। যথা—প্রথম বৈভাষিক। ইহার মতে জ্ঞান ও জ্ঞেয় উভয়ই প্রত্যক্ষবেদ্য, কিন্তু ক্ষণিক। দ্বিতীয়—সৌত্রা- স্তিক। ইহার মতে বাহ্যবস্তুর প্রত্যক্ষ হয় না, কিন্তু তাহা অনুমেয় এবং ক্ষণিক। তৃতীয়-যােগাচার। তাহারই নাম বিজ্ঞানবাদী। তিনি জ্ঞানভিন্ন জ্ঞেয় স্বীকার করেন না এবং সেই জ্ঞান ক্ষণিক ও স্বয়ংপ্রকাশ্য, অথাৎ নিজেকে নিজেই বিষয় করে,পরের দ্বারা বিষয় হয় না। এই জ্ঞানটী দ্বিবিধ, যথা—প্রবৃত্তি-বিজ্ঞান এবং আলয়-বিজ্ঞান। প্রথমটী ঘট-পটাদির জ্ঞান। দ্বিতীয়টীর ধারার নাম আত্মা। প্রবৃত্তি-বিজ্ঞানধারার নাশপূৰ্ব্বক বিশুদ্ধ আলয়- বিজ্ঞান-ধারা উৎপাদন করার নাম মােক্ষ। চতুর্থ শূন্যবাদী। তাহার মতে জ্ঞান ও জ্ঞেয় কিছুই বস্তুতঃ নাই। অতএব বিজ্ঞানবাদি-স্বীকৃত বিশুদ্ধ জ্ঞান ধারারও যে নাশ, তাহাই মােক্ষ। এই চারি প্রকার বৌদ্ধমত বস্তুতঃ ত্রিবিধই হয়। কারণ, সৌভ্রান্তিক ও বৈভাষিককে এক শ্রেণীভুক্ত করা যায়, কারণ, তাহাদের মতভেদ কেবল বাহ্য পদার্থের প্রত্যক্ষত্ব এবং অনুমেয়ত্ব লইয়া। এজন্য ইহারা একই মতবিশেষ বলা যায়। অপর, বিজ্ঞানবাদী এবং শূন্যবাদীকে সুইটী বলা যায়। সৌভ্রান্তিক ও বৈভাষিক জাগ্রত অবস্থার ব্যবহারকে অব- লম্বন করিয়া নিজমত স্থাপন করিয়াছেন, বিজ্ঞানবাদী স্বপ্নকে অবলম্বন করিয়া নিজমত স্থাপন করিয়াছেন। যেহেতু; জাগ্রত অবস্থার ন্যায় স্বপ্নে বাহ বিষয় নাই, অথচ জ্ঞানমাত্রই তত্তাদাকার হইয়া থাকে। অতএব, স্বপ্ন দৃষ্টান্ত দ্বারা জাগ্রত অবস্থাতেও বিষয় না থাকিলেও তত্তদাকার জ্ঞান এবং ব্যবহার হইতে পারে। এজন্য জ্ঞানভিন্ন বিষয় স্বীকার করিবার প্রয়ােজন নাই। শূন্যবাদী, সুষুপ্তি অবস্থাকে লক্ষ্য করিয়া নিজমত স্থাপন করেন।
প্রথম পরিচ্ছেদঃ। ( প্রথম কল্পের দ্বিতীয় বিকল্প ) বিশিষ্ট বাশ্বব্যবহারহেতুভ্রাশঙ্কা ও তাহার নিরাস। প্রমাণাঘনত্যুপগম্যাহপি প্রয়ন্তু নাম তে বাচেভঙ্গী। তাস্তু সাধন-বাধন-ক্ষমা ন ভবন্তি তাবতা, ইতি ক্ৰম, ইতি চেৎ ? ন, প্রমাণানভপগম্য প্রবর্তিতত্বং তদীয়-সাধন-বাধনক্ষমতায়াং ন নিয়ামক। কিন্তু সবচনাভাসলক্ষণযােগি ইতি অবশ্যাভপেয়ং ভবতা, যেন অভ্যুপগম্যাপি প্রমাণাদীনি প্রবর্তিত মতান্তরানুসারিভিঃ ব্যব- হারা অ্যুপগত প্রমাণাদিসত্বৈ মতান্তরব্যবহারিভিঃ অপরৈঃ তথাভূত ইতি কথ্যন্তে। (তাৎপৰ্য)—তাহার অভিপ্রায় এই যে, সুষুপ্তিতে জ্ঞান-জ্ঞেয় কিছুই থাকে না, কিন্তু হঠাৎ উত্থান হইলে যেমন জ্ঞানজ্ঞেয়াত্মক জাগ্রতাদি আবির্ভূত হয়,সেইরূপ সৃষ্টির পূর্বে কিছুই ছিল না, কিন্তু ভ্ৰমবশাৎ জ্ঞানজ্ঞেয়াত্মক জগতের আবি- ভাব হয়। অতএব, এই ভ্রমের নাশ হইলে কিছুই থাকিবে না। ইহাই মােক্ষ। অবশ্য ভগবান শঙ্করাচার্য্যেরও মত কতকটা বিজ্ঞান ও শূণ্যবাদীর মতানু- রূপ বলিয়া বােধ হয়। কিন্তু, বস্তুতঃ তাহা নহে। বিজ্ঞানবাদীর মতে বিজ্ঞানটী ক্ষণিক এবং স্বয়ংপ্রকাশ্য, কিন্তু উহাতে কৰ্ম্মকর্তৃ-বিরােধ হয় বলিয়া শঙ্কর- মতে উহা নিত্য এবং স্বয়ংপ্রকাশ, স্বয়ংপ্রকাশ্য নহে। শূন্যবাদীর মতে জ্ঞান-জ্ঞেয়াত্মক জগতের অভাব হয় ; মােক্ষদশাতে কিছুই থাকে না। কিন্তু, শঙ্করমতে জ্ঞানজ্ঞেয়াত্মক-ভেদ-কল্পনার অধিষ্ঠানভূত যে এক শুদ্ধ চৈতন্য, তাহা থাকে। তাহাতেই এই সকল জগতের আরােপ হইয়াছে। অর্থাৎ শূন্যবাদী নিরধিষ্ঠানক ভ্রম স্বীকার করেন, কিন্তু শঙ্কর মতে তাহা স্বীকৃত হয় না। তাহার মতে অধিষ্ঠান সত্য না হইলে ভ্রমও হইতে পারে না। ইহাই উভয়মতের প্রভেদ। শূন্য বাদীরই নাম মাধ্যমিক, ইহার প্রচারিত আগমের নাম মধ্যমাগম। কিন্তু-এই সকলের মূল উপদেষ্টা বুদ্ধদেব। তিনি একরূপই উপদেশ করিয়াছেন, তথাপি শিষ্যগণ নিজ নিজ অভিপ্রায়ানুসারে তাহার প্রচার করাতে মতভেদ হইয়াছে। অনুবাদ—চার্বাক প্রভৃতি প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার না ১৬ খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্য। (অনুবাদ)করিয়াও বাগব্যবহার করুন, (অথাৎ বিচার করিতে প্রবৃত্ত হউন) তথাপি তাহাদের সেই বিচার প্রমাণাদি-পদাথের সত্তা স্বীকার না করাতে স্বপক্ষের সাধন কিম্বা পরপক্ষের নিরাকরণ করিতে সমর্থ হইতে পারে না, ইহা আমার অভিপ্রায়-এইরূপ শঙ্কা করা সঙ্গত নহে। কারণ, তােমাকে এই কথা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে যে, তাহাদের সেই বিচার প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার না করিয়া প্রবৃত্ত হইয়াছে, বলিয়াই যে. তাহা স্বপক্ষ-সাধন ও পরপক্ষ-নিরাকরণে সমর্থ হইতে পারে না—তাহা নহে। কিন্তু, যাহার বাগব্যবহারে ব্যবহারাভাসের( অথাৎ দোষযুক্ত বাগব্যবহারের) লক্ষণ (অর্থাৎ দোষ ) থাকিবে, সেই বিচার পূর্বোক্ত সাধন-বাধনক্ষম হইবে না। অতএব, প্রমাণাদি-পদাথের সত্তার অস্বীকারই যে এই সাধন-বাধন-অক্ষমতার নিয়ামক, তাহা হইতে পারে না। যেহেতু প্রমাণাদি-পদাথের সত্তা স্বীকার করিয়াও যিনি একটী মতের স্থাপনা করিয়াছেন, সেই মতের বিরােধী অপর মতবাদী সেই প্রমাণাদি- পদার্থের সত্তা স্বীকার করিয়া তাহাদের খণ্ডন করিতেছেন -ইহা দেখা যায়। এই স্থলে উভয়বাদীই প্রমাণাদি-পদাথের সত্তা মানিয়া প্রবৃত্ত হইয়াছেন, তথাপি একজনের কথা স্বপক্ষ-সাধন ও পরপক্ষ-নিরীকরণে সমথ হইল, কিন্তু অপরের কথাটীসমর্থ হইল না। ইহার কারণ কেবল দোষ এবং দোষরাহিত্য ভিন্ন অন্য কিছু বলা যায় না। অতএব, প্রমাণাদির সত্তা- স্বীকার করা হউক বা না হউক, ফলতঃ ইহার কোন উপযােগ নাই। তাৎপ—এস্থলে বাদী শঙ্কা করিতেছেন যে, যে চার্বাকাদির বাগব্যবহারে প্রমাণাদির সত্তা স্বীকার-পূৰ্ব্বকত্ব-রূপ সাধ্য নাই, অথচ বাগব্যবহারত্ব রূপ হেতুটী আছে বলিয়া ব্যভিচার প্রদর্শন করা হইয়াছে, সেই চার্বাকাদির বাগব্যবহার উন্মত্ত-প্রলাপের মত অগ্রাহ; অতএব, সামান্যতঃ বাগব্যবহারত্বরূপ হেতু দ্বারা প্রমাণাদি সত্তাস্বীকার-পূৰ্ব্বকত্বরূপ সাধ্যের অনুমান করিতে প্রবৃত্ত হইব না, কিন্তু সাধন কিম্বা বাধনেতে সমর্থ যে বাগব্যবহার তাহাকেই হেতু করিব ; অতএব, চার্বাকাদির বাগব্যবহারে এতাদৃশ বিশিষ্ট হেতু নাই বলিয়া ব্যভিচার হইবে না; অতএব যদি প্রমাণাদির সত্তা স্বীকার না করা যায়, তাহাহইলে বাগব্যবহারে প্রতিবােধ না হইলেও ১৭ খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্য। ( তাৎপৰ্য-তাহার কোন ফল হইতে পারে না, আর সাধন-বাধনক্ষম কোন ব্যবহারই এরূপ নাই, যাহাতে প্রমাণাদির সত্তা স্বীকার করিবার আবশ্যকতা থাকে না। অতএব ব্যভিচার হইল না,অর্থাৎ তাহা হইলে অনুমানের অবয়বটা হইল এই—কথকবাগব্যবহারটা প্রমাণাদি সত্তাস্বীকার পূর্বক, যে হেতু, সাধন কিংবা বাধনক্ষম ব্যবহারত্ব তাহাতে থাকে। যেমন, মীমাংসকাদির আগব্যবহার। সুতরাং, প্রমাণাদি-পদার্থ-সত্তাস্বীকারপূৰ্ব্বকত্বৰূপ সাধ্য যদি না থাকে, তাহা হইলে সেই বাগব্যবহার সাধন-বাধনক্ষম হইতে পারে না। অতএব প্রদর্শিত ব্যভিচার সিদ্ধ হইল না। ইহা হইল সদবাদী অর্থাৎ নৈয়ায়িকের শঙ্কা। এস্থলে দেখা যায়, সাধন এবং বাধন এত উভয়ের ফল একই হয়। স্বকীয় হেতুতে সদ্ধেত্ব-ব্যবস্থাপন দ্বারা বিজয়াদিরূপ যে ফল হয়, বাদীকর্তৃক স্বকীয় হেতুতে উদ্ভাবিত দোষের বাধন দ্বারাও সেই ফলই হয়, অতএব সাধন-বাধন অভিন্ন হয়। তথাপি লােক প্রসিদ্ধি অনুসারেই সাধন এবং বাধনকে পৃথক করিয়া গ্রন্থকার বলিয়াছেন বুঝিতে হইবে। মূল গ্রন্থে যে বাচেভঙ্গী পদটী আছে। তাহার অর্থ বাপ্রকার, অর্থাৎ বিবিধ প্রকার কথােপকথন। এক্ষণে উপরি উক্ত আশংকার উত্তরে গ্রন্থকার বলিতেছেন যে, বিষম- ব্যাগুহেতুসাধ্যের অন্বয়ব্যাপ্তি যে প্রকার থাকে, ঠিক বিপরীত ব্যতিরেক- ব্যাপ্তি হওয়াই নিয়ম; কিন্তু এই নিয়মটী বুঝিতে হইলে প্রথমে আমাদের বিষমব্যাপ্তহতুর অর্থ টী বুঝিতে হইবে। ইহার অর্থ—হেতু দুই প্রকার হইয়া থাকে—একটী সমব্যাপ্ত এবং অপরটী বিষমব্যাপ্ত। প্রথমটীর দৃষ্টান্ত যথা—“তদ্রুপবান তদ্রসাৎ” অর্থাৎ ইহা সেই “রূপ”-বিশিষ্ট, যেহেতু সেই “বস” রহিয়াছে। এখানে সাধ্য ও হেতু সমানদেশব্যাপী অর্থাৎ যেখানে যেখানে ‘তদ্রুপ’ থাকে, সেই সেই স্থানে তরল থাকে, এবং যেখানে যেখানে ‘তদ্রস’ থাকে, সেই সেই স্থানে তদ্রুপ থাকে, এবং ইহাদের পরস্পরের অভাবও ঐভাবেই সমদেশব্যাপী হয়। বিষমব্যাপ্তের দৃষ্টান্ত, যথা-বহ্নিমান ধূমাৎ। অর্থাৎ ইহা বহিবিশিষ্ট, যেহেতু ধূম রহিয়াছে। এখানে দেখা যাইবে। যেখানে ধুম সেই স্থানে বহ্নি থাকে বটে, কিন্তু যেখানে বহ্নি সেই স্থানে ১৮ প্রথম পরিচ্ছেদং। (তাৎপৰ্য, ধূম থাকে না, অথবা ব্যভাব ও ধূমাভাব সমদেশব্যাপী হয় না। এই বিষমব্যাপ্তহেতুর সাধ্যের-সহিত অন্বয়-ব্যাপ্তি থাকিলে তাহার যে ব্যতিরেক ব্যাপ্তি হইবে, তাহা ঠিক তদ্বিপরীত হইবে, অর্থাৎ যেখানে যেখানে ব্যভাব থাকে, সেই সেই স্থলে ধূমাভাব থাকে এইরূপ হইবে; তাহা হইলে প্রকৃতস্থলে সাধন-বাধনক্ষম-ব্যবহারস্বরূপ হেতুটা প্রমাণাদি-সত্তা-খীকার- পূৰ্ব্বকত্বরূপ সাধ্যের বিষমব্যাপ্ত বলিতে হইবে; অতএব, প্রমাণাদি-সত্তা স্বীকার-পূৰ্ব্বকত্বাভাবকে ব্যাপ্য এবং সাধন-বাধনক্ষম-ব্যবহারত্বাভাবকে ব্যাপক বলিতে হইবে। সুতরাং, সাধনবাধনক্ষম-বাধ্যবহারত্বরূপ হেতুকে প্রমাণাদিসত্তা-স্বীকারপূৰ্ব্বকত্বরূপ সাধ্যের ব্যাপ্য বলিলেই সাধন-বাধনক্ষম ব্যবহারত্বভাবকে ব্যাপক মানিয়া, প্রমাণাদি-সত্তা-স্বীকারপূৰ্ব্বকত্বাভাবরূপ সাধ্যাভাবকে ব্যাপ্য বলিতে হইবে। আর তাহার ফলে চার্বাকাদির ব্যবহারে প্রমাণাদি-সত্তা-স্বীকার-পূৰ্ব্বকত্বাভাবরূপ সাধ্যাভাব আছে। এই জন্য সেই ব্যবহারটী, সাধন কিংবা বাধনক্ষম হইল না—ইহা শঙ্কাকারীকে এস্থলে দেখাইতে হইবে, কিন্তু ইহা দেখাইতে পারা যায় না। কারণ, “চার্বাকাদির বাগব্যবহারটী সাধন-বাধনক্ষম হয় না; যেহেতু, তাহা অনভিজ্ঞ লােকের বাক্য-প্রয়ােগের মত প্রমাণাদি-সত্তার স্বীকার না করিয়া প্রবর্তিত হই- আছে ”—এই অনুমান দ্বারা চার্বাকাদির বাগব্যবহারে সাধন-বাধনক্ষমত্ব- ভাবরূপ সাধ্যেরসাধন করা যায় না; তাহার কারণ এই যে, এই পূর্বোক্ত অনুমানে সবচনাভাস-লক্ষণযােগিত্বরূপ উপাধি আছে। কিন্তু, এই কথাটা বুঝিতে হইলে এই সবচনাভাস-লক্ষণযােগিত্বের অর্থটা কি, তাহা বুঝিতে হইবে। ইহার অর্থ,—সবচন অর্থাৎ নির্দোষ বাক্য, তাহার ন্যায় আভাস অর্থাৎ প্রকাশমান, অর্থাৎ যাহা বস্তুগত্যা নির্দোষ বাক্য নহে, এইরূপ দুষ্ট বাক্যের যে লক্ষণ, অর্থাৎ অসিদ্ধাদি যে সকল হেত্বাভাস আছে, সেই সকল হেত্বাভাস যে বাক্যে থাকে, তাহাই হইল সবচনাভাস- লক্ষণযােগী, তাহার যে ধৰ্ম্ম তাহাই সদবচনাভাস-লক্ষণযােগিত্ব। অথবা এরূপও বলা যায় যে, সবচনাভাস অর্থাৎ স্পষ্ট হইয়াছে আভাস অর্থাৎ অবভাস যাহার তাহাই সবচনাভাস। অর্থাৎ ব্যভিচারাদি যে সকল হেত্বাভাস আছে, তাহাদের যে সকল লক্ষণ, যথাসাধ্যাভাবত্তিকাদি, খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্য। ( তাৎপৰ্য-তাহাই যাহাতে আছে, তাহাই হইল সবচনাভাস-লক্ষণযােগী। তাহার ধর্ম সবচনাভাস-লক্ষণযযাগিত্ব। অথবা সবচনাভাস অর্থ নিগ্রহস্থান, তাহার লক্ষণ অর্থাৎ হেতু, অর্থাৎ যাহা, কথার অঙ্গভূত সময়বন্ধাদির তত্ত্বজ্ঞান- রাহিত্য-বিশেষের সাধন, যথা—এই বাদী কথাঙ্গ সময়বন্ধাদি-জ্ঞানাভাব- বিশিষ্ট, যেহেতু প্রতিজ্ঞাহান্তাদিরূপ নিগ্রহস্থান আছে। এইরূপ প্রতিজ্ঞা হান্থাদি যখন বাক্যে থাকে, তখন সেই বাক্যটী হয় সবচনাভাস-লক্ষণযােগী, তাহার ধর্ম সবচনাভাস-লক্ষণযােগিত্ব। এখন এই সবচনাভাস-লক্ষণ-যােগিত্বকে উপাধি বলায় কি বলা হইল, তাহা দেখা যাউক। উপাধি অর্থ যাহা সাধ্যের ব্যাপক হইয়া হেতুর অব্যাপক হয় তাহাই উপাধি। যেমন “ধূমবান্ বহেঃ” যখন বলা হয়, তখন সাধ্য যে ধূম, তাহার অব্যাপক হয়, আট্রেন্ধনসংযােগ, এবং হেতু বহ্নির আবার তাহাই অব্যাপক হয়; কারণ, যেখানে ধূম থাকে সেই স্থানেই আদ্রে ঋনসংযােগ থাকে, যথা—মহানসাদি, এবং যেখানে বহ্নি থাকে, যথা -তপ্ত-অয়ােগােলক, তথায় আদ্রে নসংযােগ নাই। সুতরাং, আর্জে- ঋনসংযােগটী ধূমের ব্যাপক হইয়া বহ্নির অব্যাপক হইল। ইহার ফল হইল যে “ধুমবা বহেঃ” স্থলের হেতুতে ব্যভিচারদোষ প্রদর্শন করা যাইতে পারে। বিস্তৃত বিবরণ মুক্তাবলী গ্রন্থ মধ্যে দ্রষ্টব্য। এখন প্রকৃত স্থলে দেখ, যে যে ব্যবহার, সাধন কিম্বা বাধনক্ষম হয় না, অর্থাৎ স্বপক্ষ-স্থাপন ও পরপক্ষ-নিরাকরণ করিতে সমর্থ হয় না, সেই সকল ব্যবহারে সবচনাভাস-লক্ষণযােগিত্ব উপাধি আছে, অর্থাৎ সাধনাভাসত্ব কিংবা দূষণাভাসত্ব আছে। অতএব, সাধন-বাধনক্ষমত্বভাবরূপ সাধ্যের প্রযােজক পূর্বোক্ত উপাধিকেই বলিতে হইবে। বাদী কথিত হেতু যে প্রমাণাদ্যনভাপগমপূৰ্ব্বকত্ব, তাহা উহার প্রযােজক নহে। যদি বল, সাধনবাধনক্ষমভাবটী ঘটাদিতে আছে, তথায় সবচনাভাস- লক্ষণযােগিত্ব উপাধিটী কোথায় ; সুতরাং, উক্ত উপাধি ত সাধ্যের ব্যাপক হইল না, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে যে, এস্থলে এই উপাধিটী * যাহার দ্বারা বাদীর অশক্তিসূচনা হয় তাহার নাম নিগ্রহস্থান, তাহা একবিংশতিকার যখা-প্রতিজ্ঞাহায্যাদি। যাহাৰ বাক্যেতে প্রতিজ্ঞাহান্থাদি থাকে, সেই পুরুষ পরাজিত হয়।
২০ প্রথম পরিচ্ছেদঃ। (তাৎপৰ্য) - সাধনাবচ্ছিন্ন-সাধ্যব্যাপকরূপ উপাধি হইয়াছে। বস্তুত, এরূপ উপাধিও প্রসিদ্ধ। কারণ, গর্ভস্থ মিন্নাতনয়টী শ্যাম, যেহেতু সে মিত্রার তনয়, বর্তমান মিত্ৰাতনয়ের মত। ইত্যাদি স্থলে শাকপাজত্বটীকে উপাধিরূপে উদ্ভাবিত যখন করা হয়, তখন শ্যামত্ব ঘটাদিতে আছে; কিন্তু সেখানে শাক- পাকজষ্যত্বরূপ উপাধি নাই বলিয়া সাধ্যব্যাপকত্ব হয় না, এজন্য মিত্ৰাতনয়ত্ব- বিশিষ্ট শ্যামত্ব যেখানে যেখানে আছে, সেই স্থলে শাকপাজত্ব আছে, বলা হয়, তদ্রুপ এস্থলেও বাগব্যবহারবিশিষ্ট সাধনবাধনমত্বভাবরূপ সাধ্য যেখানে যেখানে আছে, সেই সেই স্থলে সবচনাভাসলক্ষণযােগিত্বরূপ উপাধি আছে বলিতে হইবে। অতএব উক্ত সাধনবাধনক্ষমভাবটী ঘটা- দিতে থাকিলে কোন ক্ষতি হইল না। এস্থলে গ্রন্থকার “ভবতা” এই শব্দ দ্বারা বুঝাইতেছেন যে, সবচনাভাস- লক্ষণযােগিত্বরূপ উপাধি যে সাধনবাধনক্ষমত্বাভাবের প্রয়ােজক, ইহা বাদীকে স্বীকার করিতে হইবে, কিন্তু নিজের মতে তাহা করিতে হইবে না। অতএব বাধের কোন শঙ্কাই থাকিবে না। যদি বল, প্রমাণাঘনত্যুপগম-পূৰ্ব্বকত্ব, এবং সবচনাভাসলক্ষণযােগিত্ব এই উভয়ের মধ্যে কাহাকে প্রযােজক বলিব ? ইহার কোন নিয়ামক ত প্রদর্শিত হয় নাই ? তাহা হইলে বলা যায় যে, প্রমাণাঘনত্যুপগমকেই বাদী প্রযােজক বলিতে পারে ? এই শঙ্কাও করিতে পারা যায় না; কারণ, মীমাংসক “শব্দের” দ্রব্যত্ব সাধন করেন, এবং নৈয়ায়িক তাহার বিরুদ্ধে “শব্দের” গুণত্ব সাধন করেন। এইস্থলে উভয়ই প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার করেন। এখন উভয়ের মতে প্রমাণাদ্যপগম অংশে সাম্য থাকিলেও একের হেতু দ্বারা অপরের হেতু খণ্ডিত হইতেছে। ইহার কারণ এই যে, একের হেতু দুষ্ট এবং অপরের হেতু দুষ্ট নহে, ইহাই বলিতে হইবে, প্রমাণাদ্যনস্যুপগম-পূৰ্ব্বকত্বকে ইহার কারণ বলিতে পার না; কিন্তু, সাধনা- ভাস এবং দূষণাভাসকেই ইহার কারণ বলিতে হইবে। আর তাহা হইলেই পূর্বোক্ত ব্যভিচার স্থির হইল। ইহাই হইল পূর্বোক্ত আশংকার নিরাস। ৭ ২১ খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্যম। সবচনাভাসলক্ষণযােগি উপাধির সাধনাব্যাপকত্ব প্রদর্শন। যদি তু অম্মদবচসি সবচনাভাসলক্ষণং ন ভবান্ দয়িতু ঈষ্টে, তদা অনস্যুপগম্য প্রমাণাদীনি ভবতা প্রবর্তিতােহয়ং ব্যবহারঃ-ইতি শতকৃত্বঃ ত্বয়ােচ্যমানেহপি নস্মাক অদিরঃ। অন্যথা অভ্যুপগম্য প্রমাণা- দীনি ভবতা প্রবর্তিতােহয়ং ব্যবহারঃ ইত্যেতবতা ভবদীয়ে ব্যবহার- ভাসঃ—ইত্যস্মাভিরপি বক্ত শকত এব। ৮ অনুবাদ-যদি তুমি আমার বাক্যে উক্ত সবচনাভাস-লক্ষণ- যােগিত্ব দোষটী দেখাইতে না পার, তাহা হইলে প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার না করিয়া তােমার এই বিচার প্রবর্তিত হইয়াছে, ইহা তুমি শতবার বলিলেও আমাদের আদরণীয় হইবে না। এইরূপ স্বীকার না করিলে তুমি প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার করিয়া বিচার করিতেছ এবং এই জন্য তােমার বিচারই দুষ্ট এইরূপ আমরাও বলিতে পারি। ৮ তাৎপৰ্য-এইবার গ্রন্থকার স্বয়ং পূর্বোক্ত সবচনাভাসলক্ষণযােগিত্বরূপ উপাধির সাধনাব্যাপকত্ব দেখাইতেছেন যে, বৈণ্ডিকের কথাতে অথবা মাধ্য- মিকাদির কথাতে প্রমাণানভপগমপূৰ্ব্বকত্ব রূপ হেতু আছে, কিন্তু সবচনা- ভাসলক্ষণযােগিত্বরূপ উপাধি নাই। অতএব, সাধ্যের ব্যাপক হইয়া সাধনের অব্যাপক হইতেছে বলিয়া পূর্বোক্ত অনুমানে উপাধি রহিল। ইহার উপর যদি বাদী আগ্রহ-প্রকাশপূৰ্ব্বক বলেন যে, তােমার এই ব্যবহার সাধন-বাধন- ক্ষম হইতে পারে না; যেহেতু প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা অস্বীকার পূর্বক ইহা নিষ্পন্ন হইয়াছে। তাহা হইলে বাদীর অনুমানের উপর গ্রন্থকার সৎপ্রতিপক্ষ দেখাইয়া বলিতেছেন যে, তােমার এই ব্যবহারটী সাধন-বাধন-ক্ষম হইতে পারে না; কারণ, ইহা প্রমাণাদ্যভ্যুপগম-পূৰ্ব্বকই হইয়াছে। ইহাতেও দৃষ্টান্ত আছে। কারণ, যেরূপ মীমাংসক এবং নৈয়ায়িক দুই জনই প্রমাণাদির সত্তা স্বীকার করেন, অথচ এক জন অপরের মত খণ্ডনও করেন দেখা যায়। এই মত- • বাদী যখন শ্রাবণ হেতু দ্বারা শব্দত্বকে দৃষ্টান্ত করিয়া শব্দের নিত্যত্ব সাধন করিতে প্রবৃত্ত হন, তখন প্রতিবাদী তাহার বিরুদ্ধে ঘটাদিকে দৃষ্টান্ত করিয়া কাৰ্যহেতু দ্বারা শব্দেতে অনিত্য- সাধন করিতে প্রবৃত্ত হইলেই সৎপ্রতিপক্ষ দোষ হয়। উভয় হেতু পরস্পরের দ্বারা দুই ইলে কোন অনুমানই নিজের পক্ষসাধন করিতে সমর্থ হয় না, ইহাই সৎপ্রতিপক্ষ উদ্ভাবনের ফল।
প্রথম পরিচ্ছেদ। প্রমাণাদি না থাকিলে ব্যবহারের অসিছি শঙ্কা। ন যদি প্রমাণাদীনি ন সন্তি, তদা ব্যবহার এব ধর্মী কথং সিদ্ধ্যেৎ। দূষণাদি-ব্যবস্থা বা কথং স্যাৎ। সৰ্ববিধিনিষেধানাং প্রমাণাধীনত্বাৎ। ৯ (তাৎপৰ্য)-ভেদকে দৃষ্টান্ত করিয়া যে সৎপ্রতিপক্ষ হইতে পারে, তাহা এই ; -তােমার ব্যবহার-সাধনবাধনাক্ষম, যেহেতু, প্রমাণাদিসত্তা-স্বীকারপূর্বক ব্যবহারত্ব তাহাতে আছে। যেমন অন্য ব্যবহার দৃষ্ট হয়, ইত্যাদি। অতএব, যেরূপ প্রমাণাদ্যভপগমপূৰ্ব্বকত্বটী সাধন-বাধন-ক্ষমতার প্রযােজক নহে, সেইরূপ অন্যুপগমপূৰ্ব্বকত্বও প্রযােজক নহে। এক্ষণে ইহাই অনিষ্ট, এবং ইহাই গ্রন্থকার “অন্যথেত্যাদি” গ্রন্থদ্বারা দৃঢ় করিতেছেন। “অন্যথা”—অর্থ দোষ না থাকিলেও আমার কথা প্রমাণাদির অনভ্যুপগম- পূৰ্ব্বক হইয়াছে বলিয়াই যদি সাধন-বাধন-ক্ষম না হয়, তাহা হইলে-ইত্যাদি বুঝিতে হইবে। অর্থাৎ আমার কথা নির্দোষ হইলেও কেবল প্রমাণাদি- পদার্থের সত্তা স্বীকার না করায় যদি সাধন-বাধনক্ষম না হয়, তাহা হইলে তােমার কথাও প্রমাণাদি-স্বীকার-পূৰ্ব্বক প্রবৃত্ত হইয়াছে বলিয়া সাধন-বাধন- ক্ষম হইল না, ইহাও যদি আমি বলি তাহা হইলে বাদী কি করিয়া ইহাতে বাধা দিবেন ? অতএব সাধন-বাধন-ক্ষমাভাবের প্রয়ােজক কেবল দোষকেই বলিতে হইবে। অর্থাৎ যাহার কথাতে দোষ থাকিবে,তাহা প্রমাণাদি-পদাথ - সভা-স্বীকার-পূৰ্ব্বকই হউক, অথবা না হউক, তাহার কথা সাধন-বাধনক্ষম- হইবে না। আর যাহার কথাতে দোষ থাকিবে না, তাহার কথা প্রমাণাদি- পদাথের সত্তা স্বীকারপূৰ্ব্বক না হইলেও সাধন-বাধনক্ষম হইতে পারিবে। অতএব, পূর্বোক্ত অনুমানের উপাধিটী সিদ্ধ হইল, অথাৎ কথাতে প্রমাণাদি- পদার্থের সত্তা স্বীকারের প্রয়ােজন নাই। সুতরাং, অদ্বৈতবাদী গ্রন্থকার বিচারে প্রবৃত্ত হইলে প্রমাণাদি-পদাথের সত্তা স্বীকার করা হয় না। ৮ অনবদ-যদি প্রমাণাদি-পদার্থসত্তা স্বীকার না করা যায়,তাহা হইলে ব্যবহাররূপ পক্ষের সিদ্ধি কিরূপে হইবে? এবং সাধন ও ব্যবস্থাই বা কি রূপে হইবে? যেহেতু সকল প্রকার বিধি অথবা নিষেধ প্রমাণাধীনই হয়। ৯ তাৎপর্যা--এক্ষণে বাদী পুনরায় জিজ্ঞাসা করিতেছেন যে, বাগ- দূষণাদির ; খণ্ডন-খণ্ড-খাগম। পূর্বোক্ত ব্যাঘাতরূপ দোষের নিরান। মৈবং, ন মম বয়ং ন সন্তি প্রমাণাদীনি–ইতি স্বীকৃত্য কথা অরিভ্যেতি। কিং নাম সন্তি ন সন্তি বা প্রমাণাদীনি ইত্যস্যাং চিন্তায়াম উদাসীনৈঃ, যথা স্বীকৃত্য তানি ভবত ব্যবহ্রিয়তে, তথা ব্যবহারিভিরেব কথা প্রবর্ত্ততামিতি। অন্যথা ন সন্তি প্রমাণাদীনীতি মত অস্মাক আরােপ্য যদু ইদং ভবত দূষণমুক্ত, তদপি ন বক্তং শক্যম্। ১০ অনুবাদ—এইরূপ শঙ্কা করিতে পার না ; কারণ, প্রমাণাদি-পদার্থ সরূপ নহে—ইহা প্রথমে স্বীকার করিয়াই কথা আরম্ভ করিতে হইবে—এই কথা আমি বলি নাই। কিন্তু, প্রমাণাদি-পদাথ সদরূপ কিম্বা অসদুরূপ—এই চিন্তায় উদাসীন থাকিয়া যেরূপ প্রমাণাদি-পদার্থকে আপনি স্বীকার করিয়া ব্যবহার করেন, সেইরূপ (বাদী ও প্রতিবাদী উভয়ভিমত ব্যবহারের অঙ্গভূত নিয়ম স্বীকার পূর্বক ব্যবহারেতে প্রবৃত্ত হইয়া বিচারের আরম্ভ করুন। আর এইরূপ স্বীকার না করিলে প্রমাণাদি-পদার্থ নাই—ইহাই আমাদের মত—এইরূপ আরােপ করিয়া আমাদের উপর যে এই দোষ দিয়াছেন, তাহাও বলিতে পারেন না। ১০ ( তাৎপৰ্য) ব্যবহারকে লক্ষ করিয়া । যে পূর্বোক্ত অনুমান করা হইয়াছে, তাহা প্রমাণ-দ্বারা সিদ্ধ হইয়াছে কি না; যদি বল—না, তাহা হইলে, আশ্রয়সিদ্ধি দোষ হইল। কারণ, বাগব্যবহারই আশ্রয়, সেই যখন নাই, তখন কাহাতে কি সাধন করিবে ? আর যদি এই জন্য পক্ষের প্রতীতি প্রমাণসিদ্ধ বল, তাহা হইলে যে প্রমাণ দ্বারা ধৰ্মীর অথাৎ পক্ষের সিদ্ধি হইল, সেই প্রমাণ দ্বারাই তােমার অনুমান বাধিত হওয়ায় অনুমানের উত্থানই হইতে পারে না। আর প্রমাণাদি পদার্থ নাই এইরূপ তােমার যে প্রতিজ্ঞা, সেই প্রতিজ্ঞারও হানি হয়, অর্থাৎ, যদি তুমি প্রমাণ স্বীকার না কর, তাহা + পক্ষেতে যাহা বিশেষণ দেওয়া হইয়াছে, সেই বিশেষণ যদি পক্ষেতে নাথাকে, তবে তাহার নামই আশ্রয়সিদ্ধি পক্ষসিদ্ধি। যথা—যদি কেহ আকাশকুমকে পক্ষ করিয়া কুসুমত্বরূপ হেতু দ্বারা সুগন্ধের সাধন করিতে প্রবৃত্ত হয়, তখন আকাশকুসুমরূপ পক্ষেতে বিশেষণীভূত আকাশের সম্বন্ধ নাই বলিয়া ইহাকে আশ্রয়াসিন্ধি দোষ বলা হয়। এই দোষের উদ্ভাবন হইলে অনুমিতি হয় না—ইহা এই দোষের ফল।
২৪ প্রমথঃ পরিচ্ছেদঃ। (তাৎপৰ্য)—হইলে কথার সিদ্ধি এবং সাধন-দূষণ-ব্যবস্থা কিছুই হইতে পারে ? এই জন্য প্রমাণাদি পদাথের সত্তা বাধ্য হইয়া তােমায় স্বীকার করিতে হইবে। ইহাই হইল বাদীর পুনরায় শঙ্কা। ৯ তাৎপর্যপূর্বোক্ত বাদী-প্রদর্শিত ব্যাঘাতের উপর গ্রন্থকার উত্তর দিতেছেন যে, আমি প্রমাণাদি-পদার্থের পারমার্থিক সত্তা স্বীকার করি না বটে, কিন্তু তাহার ব্যাবহারিক স্বরূপ নাই এ কথা বলি না। অতএব ব্যব- হাররূপ ধৰ্মীর (পক্ষের) প্রতীতি হয় বলিয়া তাহার সিদ্ধি হইতে পারে ; যদি প্রমাণাদি আকাশকুসুমের ন্যায় অত্যন্ত অসৎরূপ হইত, তাহা হইলে প্রমাণদ্বারা কোনপ্রকারে পক্ষের প্রতীতি হইত না। কিন্তু, তাহা ত আমি বলি না। মিথ্যা হইলে যাহা ভ্রমাত্মক, তাহার প্রতীতি হইতে পারে। এই জন্য বলি—যথার্থ জ্ঞানেরবিষয় হইলেই যে তাহা পক্ষ হয়, অন্যথা হয় না-ইহাতে কোন প্রমাণ নাই। কারণ, জ্ঞানের বিষয় হইলেই পক্ষ হইতে পারে, কিন্তু জ্ঞানে যথার্থ রূপ বিশেষণের কোন প্রয়ােজন নাই। বস্তুতঃ, কথাতে প্রবৃত্তি হইবার পূর্বে প্রমাণাদির সত্তা স্বীকার কথারম্ভের প্রয়ােজক নহে—এইরূপই আমি বলি, কিন্তু সেই সময়ে প্রমাণাদি নাই এইরূপ বলি না। প্রমাণাদি সৎ হউক অথবা অসৎ হউক, বিচারানন্তর তাহার সত্তা কিংবা অসত্তা, যাহা সিদ্ধ হয় হইবে, সেই চিন্তা কথা- প্রবৃত্তির সময় নিষ্প্রয়ােজন। কেবল তােমার মতে যেরূপ সেই পদাথ গুলিকে স্বীকার করিয়া ব্যবহার হইয়া থাকে, সেইরূপ আমিও প্রমাণাদি-পদাথ সৎ কি অসৎ এই চিন্তা উপেক্ষা করিয়া প্রমাণ-মাত্ৰ-মূলক ব্যবহারকে স্বীকার করতঃ কথায় প্রবৃত্ত হই। অতএব, ধৰ্মী অথাৎ পক্ষের সিদ্ধি এবং দুষণাদি ব্যবস্থা সকলই সিদ্ধ হইতে পারে। প্রমাণাদি-পদার্থই যদি না থাকিত, তাহা হইলে আপনি যে দোষ দেখাইয়াছেন, তাহা হইতে পারি, কিন্তু আমার * প্রমাণাদির সত্তা স্বীকার না করিলে কথায় প্রবৃত্তি যদি না হয় তাহা হইলে আমি বলিয়াছি যে আমার মত-প্রমাণাদি সত্তা স্বীকার কথাপ্রবৃত্তিতে অপ্ৰযােক, কিন্তু তুমি আমার উপর আরােপ করিয়াছে যে আমার মতে প্রমাণাদি পদার্থ ব্যাবহারিকও নাই; অতএব ব্যাবহারিক এমাণাদি না মানিলেও কথার প্রবৃত্তি হইতে পারে—অতএব এইরূপ আরােপ করিয়া প্রমাণাদি না থাকিলেও তৎপ্রযুক্ত দূষণাদি ব্যবস্থা মানিলে আমার বাক্যে ব্যাঘাতরূপ দোষ সঙ্গত নহে।
ধন-খাদ্য। অসম্ভব উপপাদনাৰ্থ বিকরায়। কীদৃশীং মৰ্যদা আলষ্য প্রবর্তিতায়াং কথায়ামিদং দূষণমুক্ত ? কিং প্রমাণাদীনাং সত্ত্বম্ অভ্যুপগম্য উভাভ্যাং বাদিভ্যাং প্রবর্তিতায়াং কথায়াম্ ? উত অসম্ অপেত্য ? অথ একেন সম অপরেণ চ অসম অঙ্গীকৃত্য ? ১১ (তাৎপৰ্য) মতে ব্যাবহারিক পদার্থ আছেই, অতএব সাধন-দূষণাদি-ব্যবস্থা ও ব্যবহাররূপ ধর্মিসিদ্ধি হইতে বাধা হইতে পারে না। ১০ অনুবাদ- কিরূপ মৰ্যাদা অর্থাৎ নিয়ম অবলম্বন করিয়া আর কথাতে পূর্বোক্ত ব্যাঘাত দোষ কথিত হইয়াছে ? বাদী এবং প্রতি- বাদী কি উভয়েই প্রমাণাদিপদার্থকে সত্য বলিয়া স্বীকার করিয়া আর কথাতে উক্ত দোষ প্রদর্শন করিয়াছেন, কিংবা উভয়েই প্রমাণাদি-পদার্থের অসত্যতা স্বীকার করিয়া আর কথাতে উক্ত দোষ উদ্ভাবিত করিয়াছেন ? অথবা একজন অথাৎ, বাদী প্রমাণাদি-পদার্থের সত্যতা স্বীকার করিয়া এবং অপর অর্থাৎ প্রতিবাদী, উক্তপ্রমাণাদি-পদাথের অসত্যতা স্বীকার করিয়া প্রবর্তিত কথাতে দোষ প্রদর্শন-করিয়াছেন।” ১১ তাৎপৰ্য-প্রমাণাদি-পদার্থ না মানিলে ব্যবহাররূপ ধৰ্মীর অর্থাৎ পক্ষের সিদ্ধি হইবে না এবং প্রমাণাধীন যে দূষণাদি-ব্যবস্থা, তাহাও সিদ্ধ হইবে না, আর প্রমাণ না থাকিলেও যদি দূষণাদি-ব্যবস্থা মানা যায়, এ তাহা হইলে ব্যাঘাত হইবে - এই শংকার সমাধান পূর্বে এইরূপ করা হইয়াছে যে, প্রমাণাদি-পদার্থ যে আমরা মানি'না,তাহা নহে, কিন্তু কথার পূর্বে প্রমাণাদির যে সত্তাস্বীকার করিতে হইবে, এবং সেই সত্তাধীকার যে কথার অঙ্গ, তাহা আমি স্বীকার করি না। যেরূপ বাদী প্রমাণাদিকে মানিয়া বিচার করে, আমিও তদ্রুপ সেই প্রমাণাদিকে অবলম্বন করিয়া বিচার করিয়া থাকি ; আর এজন্য প্রমাণাদির সত্যতা স্বীকারের আবশ্যকতা নাই। প্রমাণাদি-পদার্থ থাকিলেই হইল, তাহার সত্যতার কোন আবশ্যকতা নাই। সত্যতা না থাকিলেই যে পদার্থস্বরূপের হানি হইবে, তাহা বলা যায় না। * প্রৰ্ত্তিয়া= প্রবৃত্তায়াম্। ৪ প্রথম পরিচ্ছেদ। (তাৎপৰ্য –যদি বল,প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার না করিলে বিচারে প্রবৃত্তি হইতে পারে না, তাহা হইলে এই দোষ হয় যে, পূর্বে যে ব্যাঘাত দোষ উক্ত হইয়াছে, তাহাও কোন কথাতেই ত উদ্ভাবনীয় বলিতে হইবে। সুতরাং, সেই কথার অঙ্গ প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার কি করিয়া বলিতে পারা যায় ? যেহেতু, আমি প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার করি না বলিয়াই তুমি আমার কথায় ব্যাঘাত নামক দোষের উদ্ভাবনা করিয়াছ, অতএব প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার না করিয়াই সেই কথা প্রবর্তিত ইহা বলিতে হইবে। সুতরাং, সেই ব্যাঘাতদোষদুষ্ট কথার ন্যায় অন্য কথাও কি হইতে পারে না? ইহাই পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে। এক্ষণে এই ব্যাঘাত রূপ দোষের যে উদ্ভাবন করা যায় না—ইহাই প্রমাণ করিবার জন্য গ্রন্থকার প্রশ্নমুখে তিনটী বিকল্প করিতেছেন। ইহাদের মধ্যে প্রথম বিকল্পটী এই—প্রমাণাদিপদার্থের সত্তাকে কি বাদী এবং প্রতিবাদী উভয়েই স্বীকার করিয়া কথার আরম্ভ করিয়াছে এবং তাহাতে কি এই দোষ দেখান হইয়াছে ? দ্বিতীয় বিকল্পটী এই যে–প্রমাণাদিপদার্থের অসত্যতা কি, বাদী এবং প্রতিবাদী উভয়েই স্বীকার করিয়া কথা আরম্ভ করিয়াছেন এবং তাহাতে কি এই দোষ দেখান হইয়াছে? এবং তৃতীয় বিকল্পটী এই যে—বাদী ও প্রতিবাদীর মধ্যে একজন প্রমাণাদি-পদার্থের সত্যতা স্বীকার করিয়া এবং অপরে তাহার অসত্যতা স্বীকার করিয়া কি কথা আরম্ভ করিয়াছেন এবং তাহাতে কি এই দোষ দেখান হইয়াছে ? ইহাই হইল তিনটী বিকল্প। ইহাদের মধ্যে প্রথম বিকল্পে যে অস্বরস-নিবন্ধন কল্পান্তর করিয়াছেন তাহা এই যে, যে বৈতঙিক প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা স্বীকার করে না, সেই যদি বাদীর সহিত বিচার করিবার জন্য কথার হেতুভূত প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তাকে স্বীকার করে, তাহা হইলে সেই বৈতণ্ডিক কথারম্ভ-কালেই “অপসিদ্ধান্ত” নামক নিগ্রহস্থান দ্বারা নিগৃহীত হইয়া যাইবে। যেহেতু, তাঁহার নিজের সিদ্ধান্ত এই-যে, প্রমাণাদি-পদাথের সত্যতা নাই, এবং * নিগ্রহস্থান একবিংশতি প্রকার। তাহা পূর্বে কথিত হইয়াছে। তন্মধ্যে. উক্ত অপসিদ্ধান্ত নামক নিগ্রহস্থানটীর দৃষ্টান্ত এই-সাংখ্য মতাবলম্বন করিয়া আমি বিচার করিব।
খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্য। ২৭ উক্ত বিকল্পজয় নিরাস। ন তা আন্তঃ। অভপগতপ্রমাণাদিসত্ত্বং প্রতি এতাদৃশপৰ্যৰু-: যােগানবকাশাৎ। দ্বিতীয়ে তু স্বতােহপি আপত্তেঃ।:ন: তৃতীয়। তথৈব কথান্তরস্যাপি প্রসক্তে, উভয়াভপগমানুরােধিত্বাৎ চ কথা- নিয়মস্য। অন্যথা স্বাভিপ্রায়, আল্য তেনাপি তৃবচসি যৎকিঞ্চি বাগাত্মনি দূষণেহভিহিতে কস্য জয়াে ব্যবতিষ্ঠতাম্। প্রমাণাদ্যভপগন্তু- রেব যাৰন্নিয়মভরযন্ত্রণা মহতী স্যাৎ। ১২ (ভৎপৰ্য)—তাহা কথার অঙ্গও নহে। কিন্তু, কথারম্ভে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রমাণাদি-পদার্থের সত্যতা স্বীকার করা হইতেছে। এইজন্য বাদীর নিগ্রহ অথাৎ পরাজয় হইলে কথার প্রবৃত্তিই হইতে পারে না। ইহাই হইল প্রথম বিকল্পের অস্বরস এবং এই জন্যই দ্বিতীয় কল্পটী গৃহীত হইয়াছে। দ্বিতীয় কল্পের অস্বরসটী এই যে- এই কল্পে বৈণ্ডিকের পক্ষে কোন দোষ থাকে না; কারণ, তাঁহার যে মত, তদনুরূপই কথা আর হইয়াছে, কিন্তু যে বা বস্তুগত্যা প্রমাণাদির সত্তা স্বীকার করিতেছে, সেই যদি অসত্যতা-স্বীকার-পূৰ্ব্বক কথা আরম্ভ কণে, তাহা হইলে সে-ই পূৰ্ব্ববৎ কথারম্ভকালেই অপসিদ্ধান্ত নামক নিগ্রহস্থান দ্বারা নিগৃহীত হইবে। কারণ, সে বস্তুগত্যা প্রমাণাদির সত্যতা স্বীকার করিয়া সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধ অসত্যতা এখন স্বীকার করিতেছে। তৃতীয় কল্পে এইজন্য একজন প্রমাণাদি-পদার্থের সত্যতা স্বীকার করে এবং অপরে তাহাদের অসত্যতা স্বীকার করে, এইরূপ বাদী ও প্রতিবাদীর কথার সম্ভাবনার জন্য বলা হইল যে-একজন প্রমাণাদির সত্তা স্বীকার করে এবং অপরে তাহা স্বীকার করে না, ইত্যাদি। ইহাই হইল উপরি উক্ত তিনটী কল্পের উদ্দেশ্য। এইবার গ্রন্থকার এই বিকল্প তিনটীর খণ্ডন করিয়া নিজ মত স্থাপন করিতেছেন। ১১ অনবাদ-প্রথম বিকল্পটী হইতে পারে না। কারণ, যে ব্যক্তি এইরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়া যদি বিচারে কেই প্রবৃত্ত হয় এবং তাহাতে সাংখ্য-সিদ্ধান্ত-বিরুদ্ধ মত পরে স্বীকার করিয়া বসে, তাহা হইলে অপসিদ্ধান্ত নামক নিগ্রহস্থান প্রকাশ পায় । এরূপ স্থলে বাদী বা প্রতিবাদী ইহা দেখাইয়া অপরের পরাজয় ঘােষণা করেন।
প্রথম পরিচ্ছে । অনুবাদ—প্রমাণাদি-পদার্থকে সত্য বলিয়া স্বীকার করিয়া কথাতে প্রবৃত্ত হইয়াছে, তাহার প্রতি—“প্রমাণাদি যদি না মান, তাহা হইলে ব্যবহাররূপ পক্ষের সিদ্ধি হইবে না, এবং সাধন-বাধনেরও সিদ্ধি হইবে না; আর সকল পদার্থের নিষেধ অথবা বিধান কিছুই হইতে পারে না”—এইরূপ যে পৰ্যনুযােগ, অর্থাৎ যে দোষারোেপ, তাহার অবকাশ নাই। অার যদি দ্বিতীয় বিকল্প গ্রহণ করা যায়,তাহা হইলে যেরূপ ব্যাঘাত দেয় আমার অর্থাৎ বৈতণ্ডিকের হইয়াছে, সেইরূপ তােমারও হইবে। কারণ, তুমিও প্রমাণাদি- পদার্থের সত্ত্বা না আনিয়া কথাতে প্রবৃত্ত হইয়াছ, অতএব আমার যদি ব্যাঘাত হয়, তাহা হইলে তােমারও এই দোষ হইবে। সেইরূপ তৃতীয় বিকল্পটীও হইতে পারে না। কারণ, তাহা হইলে ঐরূপ অপর কথারও সম্ভাবনা হইতে পারে। ইহার অন্য একটী হেতু এই যে, বাদী ও প্রতিবাদী উভয়েই যদি কোন নিয়ম স্বীকার করেন, তাহা হইলেই তাহাকে নিয়ম বলা যাইতে পারে। তাহা না হইলে নিজের অভিপ্রায় অনুসারে বাদী যদি তােমার কথাতে যৎ- কিঞ্চিৎ শব্দাত্মক দোষ প্রদর্শন করে, তাহা হইলে কোন্ পক্ষের জয় হইবে ? প্রত্যুত, প্রমাণাদি-পদার্থের সত্তা যে স্বীকার করে, তাহাকেই অনেকগুলি নিয়- মের ভার বহন করিতে হইবে, এবং তজ্জন্য মহৎ যন্ত্রণা সহ্য করিতে হইবে।১২ তাৎপর্যপূর্বে যে তিনটী বিকল্প করা হইয়াছে, এক্ষণে গ্রন্থকার একে একে তাহার খণ্ডন করিতেছেন। দেখ, প্রথম বিকল্পটা ছিল এই যে- প্রমাণাদি-পদার্থের সত্যতাকে বাদী এবং প্রতিবাদী উভয়েই স্বীকার করিয়া কথা আরম্ভ করিয়াছেন এবং তাহাতে সেই ব্যাঘাতাদি দোষ দেখান হইয়াছে ? এতদুত্তরে গ্রন্থকার বলিতেছেন যে, এই বিকল্পটী সঙ্গত হইতে পারে না। কারণ, যে বাদী কিংবা প্রতিবাদী প্রমাণাদি-পদাথের সত্যতা স্বীকার করেন, তাহাকে লক্ষ্য করিয়া যদি ব্যাঘাত দেখান হয়, তাহা হইলে তাহা সম্ভব হয় না। কারণ, তিনি ত প্রমাণাদি-পদার্থের সত্যতা স্বীকারই করিয়া থাকেন। অতএব, সেই বাদীর প্রতি প্রমাণাদি না মানিলে ব্যবহারাসিদ্ধি অথবা সাধন-বাধন-ব্যবস্থার অসিদ্ধি কিরূপে প্রদর্শিত হইতে পারে ? যদি এরূপ দোষের উদ্ভাবন করা হয়, তাহা হইলে নিরযােজ্যানুযােগরূপ নিগ্রহস্থান হইয়া উঠিবে। অথাৎ, দূষণানী যে খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্ধা। ২৯ (তাৎপৰ্য-ব্যক্তি, তাহার উপর দোষারােপ ঘটিবে। সুতরাং, প্রথম কল্পটী সম্ভব নহে। আর এই জন্য যদি দ্বিতীয় কল্প গ্রহণ কর,অর্থাৎ বাদী ও প্রতিবাদী উভয়েই প্রমাণাদি-পদার্থের অসত্যতা স্বীকার-পূৰ্ব্বক যে কথাতে প্রবৃত্ত হইয়া- ছেন, সেই কথাতে পূর্বোক্ত দোষের উদ্ভাবন করা হইয়াছে -–এরূপ বল, তাহা হইলে যে ব্যক্তি অসত্যতা স্বীকার করিয়াছে, তাহার পক্ষে যেরূপ ব্যঘাতাদি দোষ ঘটিবে, সেইরূপ তােমার পক্ষেও কেন ঘটিবে না? কারণ, তুমিও ত প্রমাণাদি-পদাথের অসত্যতা স্বীকার করিয়াই কখাতে প্রবৃত্ত হইয়াছ। আর তােমার, যদি প্রম ণাদি-পদার্থের সত্যতা না থাকিলেও ব্যবহাররূপ পক্ষসিদ্ধি এবং ব্যাঘাতাদি দোষ না হয়, তাহা হইলে আমারই বা কেন দোষ হইবে ? অতএব, তােমার প্রদর্শিত দোষ উভয়েরই সমান হইল, আর তজ্জন্য ইহাকে জাত্যুত্তর বলিব। অথাৎ, স্বব্যাঘাতক উত্তর বলিব। স্বব্যাঘাতক অসদুত্তরের নামই জাত্যুত্তর। ঐরূপ তৃতীয় কল্পটীও সঙ্গত বলিয়া প্রতিপন্ন হইতে পারে না। কারণ, এক জন প্রমাণাদি-পদার্থের সত্যতা স্বীকার করে এবং অপরে তাহা করে , এস্থলে তুমি ব্যাঘাতাদি-দোষের উদ্ভাবন করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছ। কিন্তু, এই কথা, যেরূপ প্রমাণাদি-পদাথকে একজন সত্য না মানিলেও প্রবৃত্ত হই- য়াছে, সেইরূপ অন্য কথাও, (অর্থাৎ, আমি প্রমাণাদি-পদার্থের সত্যতা স্বীকার করি না, তুমি কর এইরূপ যে আমার তােমার বিচার, ইহাও ) সম্ভব হইতে পারে। অথাৎ, ইহার অভিপ্রায় এই যে, প্রমাণাদি-পদাথের সত্তা না মানিলে কি এই কথাটী উপপন্ন হয় না ? অথবা অন্য কথা উপপন্ন হয় না? প্রথমে, অথাৎ যে কথাতে এই ব্যাঘাতাদির প্রদর্শন করিয়াছি, তাহার অনুপপত্তি যদি উদ্ভাবন কর ? তাহা হইলে তাহা কিরূপে হইবে ? কারণ, তাহা ত আরব্ধই হইয়াছে। আরম্ভ যাহার হইয়াছে, তাহার আর ব্যাঘাত কি ? আর যদি কথা সম্ভব নহে বল ? তাহাও বলিতে পার না। কারণ, আমি এই কথাকে দৃষ্টান্তরূপে গ্রহণ করিয়া এইরূপ অনুমান করিতে পারি যে,প্রমাণাদি-পদাথের ) * জাতি কাহাকে বলে তাহার বিস্তৃত বিবরণ গৌতমীয় ন্যায়দর্শন মধ্যে পঞ্চমাধ্যায় প্রথমাহিকে অষ্টব্য। জাতি চতুর্বিংশতি প্রকার, প্রতেকের লক্ষণ বিভিন্ন, বাহুল্য ভরে তাহার উল্লেখ আর এখন করা হইল না।
৩০ খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্য। (তাৎপৰ্য)-সত্তা না স্বীকার করিলেও অন্য কথা সম্ভব, যে হেতু, এইরূপ কথার আরম্ভে কোন প্রতিবন্ধক নাই। যেরূপ, ব্যাঘাত-দোষের উদ্ভাবন-যােগ্য এই কথা হইল, সেই রূপ অন্য কথাও হইবে। সুতরাং, তৃতীয় পক্ষটাও ঠিক নহে, বলিতে হইবে। বস্তুতঃ, তৃতীয় কল্পটী স্বীকার করিয়া এই দোষ বলা হইয়াছে, অথাৎ এক জন সত্যতা স্বীকার করে এবং অপরে তাহা করে না, এইরূপ কথাতে যদি ব্যাঘাত বলা হয়, তাহা হইলে তৃতীয় কল্পে যাহা বলিয়াছি যে, এই কথার ন্যায় অন্য কথাও হইতে পারে--ইত্যাদি, তাহাও এইরূপ কথাকে স্বীকার করিয়াই বলিয়াছি, কিন্তু, এইরূপ কথার সম্ভাবনা নাই। কারণ, কথার নিয়ম এই যে, বাদী ও প্রতিবাদী উভয়কেই একটা নিয়ম স্বীকার করিয়া কথাতে প্রবৃত্ত হইতে হইবে। একজন কোন নিয়ম মানে, এবং একজন তাহা মানে না, এরূপ স্থলে কথার সম্ভাবনাই হয় না। অথাৎ, তুমি সত্যতা মান, আর আমি মানি না—এস্থলে তােমার আমার সঙ্গে বিচার হইতেই পারে না। যদি বল, বাদী প্রতিবাদী উভয়কেই এই নিয়ম স্বীকার করিতে হইবে, ইহার প্রয়ােজন কি ? কোন একজন ঐ নিয়মটী স্বীকার করিলেই হইল অতএব উভয়কে স্বীকার করিতে হইবে—এই বিশেষণটী ব্যর্থ হইতেছে ? তাহা হইলে আমি বলিব যে, যদি কথার নিয়ম উভয়ানুৱােৰী না হয়, তাহা হইলে তার্কিকগণ নিজের অভিপ্রায়ানুসারে নির্দষ্ট বলিয়া পঞ্চাবয়ব অনুমানের উল্লেখ করিলে তাহার উপর ধ্যবয় বানুমানবাদী বৌদ্ধ, নিজের অভিপ্রায় অনুসারে নৈয়ায়িককে লক্ষ্য করিয়া আধিক্যরূপ নিগ্রহস্থানের যদি উদ্ভাবন করে, তাহা হইলে কোন্ পক্ষের জয় হইবে ? কারণ, বস্তুগত দোষ ত কিছুই নাই। অথচ, বৌদ্ধ, নৈয়ায়িকের উপর দোষােভাবন করিতেছে। সুতরাং, এস্থলে বলিতে হইবে যে, এখানে দোষ হইতে পারে না। কারণ, এই আধিক্য-প্রদর্শন নৈয়ায়িকসম্মত নহে। উভয়বাদিসম্মত এই দোষ যদি হয়, তাহা হইলে নৈয়ায়িকের নিগ্রহ হয় ; সুতরাং, সিদ্ধ হইল যে, বাদী-প্রতিবাদী উভয়ই বিচারকালে কোন একটা নিয়ম মানিয়াই বিচার করিবেন। অতএব তৃতীয় কল্পটা সম্ভবই হইতে পারে না। বরং দেখা যায় যে, যদি উভয়ের অননুমতও দোষটী হয়। তাহা হইলে •• প্রথম পরিচ্ছেদ। তাৎপৰ্য-প্রমাণাদির সত্তা স্বীকারকারী যে তুমি, তােমার পক্ষে একটা গৌরব দোষ হয়। কারণ, যাহা কিছু কথার নিয়ম বলিয়া অগ্রে বলিব, যাহা ব্যতিরেকে কথার প্রবৃত্তি হইতে পারে না, সেই গুলিও যেমন তােমার স্বীকাৰ্য, তদ্রুপ প্রমাণাদি-পদাথের সত্তাও তােমার স্বীকাৰ্য্য হইবে। কিন্তু, আমার এই দোষ হইবে না। কারণ, আমি নিয়ম মাত্র স্বীকার করিয়া কথাতে প্রবৃত্ত হইব, প্রমাণাদির সত্তা স্বীকারের আবশ্যকতা থাকিবে না। সুতরাং, আমার পক্ষটী লঘু হইল এবং তােমার পক্ষটী গৌরব-দোষদুষ্ট হইল। শঙ্কর মিশ্র, কিন্তু মূলের “উভয়াভপগমানুরোধিত্বাৎ” ইহাদি গ্রন্থের অথ অন্যরূপ করিয়াছেন। যথা—এই কথার ন্যায় অন্য কথায় প্রবৃত্তি হইলেও ব্যাঘাত দোষের ত সমাধান এখনও হইল না। কারণ, প্রমাণাদি-পদার্থের সত্যতা ত একজন স্বীকার করে না। এই আশঙ্কা নিবারণজন্য গ্রন্থকার বলিতেছেন যে, প্রমাণাদি না থাকিলে ব্যবহারের অসিদ্ধিরূপ যে ব্যাঘাত তুমি দেখাইয়াছ, তাহা আমি স্বীকার করি না। যে দোষকে উভয়বাদী স্বীকার করে, সেই নিয়মানুসারে যাহাতে দোষ সিদ্ধ হইবে, তাহারই দোষ স্থির হইবে। যদি বল, তুমি সেই দোষকে না মানিলেও তাহা কি দোষ হইবে না? দোষের যে দোষত্ব, তাহা যে তুমি মানিলেই হইবে, নচেৎ হইবে না, তাহা কে বলিল ? অতএব, তুমি না মানিলেও তােমার উপর দোষ হইবেই। তাহার উত্তরে গ্রন্থকার “অন্যথা” ইত্যাদি বাক্যের দ্বারা বলিতেছেন যে, যদি দোষটী উভয়সম্মত না হইলেও দোষ পদবাচ্য হয়, তাহা হইলে বাদী “খ” ইত্যাদি যথেচ্ছােচ্চারিত শব্দকেই দোষ মনে করিয়া প্রতিবাদীর উপর প্রয়ােগ করে, তাহা হইলে কি সেই প্রতিবাদীর পরাজয় হইবে ? কখনই নহে। সুতরাং, সিদ্ধ হইল যে, যাহা দোষ বলিয়া উভয়মত- সিদ্ধ হয়, তাহা যদি কাহারাে কথায় থাকে, তাহা হইলে একের নিগ্রহ হইবে, নচেৎ নহে। আরও উভয়ানমত যদি দোষ হয়, তাহা হইলে প্রমাণাদি- পদার্থের সত্যতা স্বীকারকারী তুমি হইল, অতএব তােমাকে প্রামাণিক দোষেরই অনুসরণ করিতে হইবে,আর উদ্ভাবিত দোষের প্রামাণিকত্ব-ব্যবস্থা- পনের জন্য প্রয়াসও করিতে হইবে, কিন্তু আমার তাহা করিতে হইবে না। অতএব, দেখা গেল যে, বাদীর প্রদর্শিত পুর্বোক্ত ব্যাঘাত দোষ অসিদ্ধ। ১২ ৩২ খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্য। পূৰ্ববিচারের উপসংহার। তৎ প্রমাণাদিসত্ত্বাসত্ত্বাভপগমৌদাসীন্যেন ব্যবহারনিয়মেন সময় বদ্ধ। কথায়াং প্রবর্তিতায়াং ভবতা ইদং দূষণম্ উক্ত ইতি উচিতমেব তথা সতি স্যা। যােইয়ং ভবা স্বাভিপ্রায় অপি নবধারয়িং শব্লোতি দূরতঃ তস্মিন্ পরাভিসন্ধানবধারণ-প্রত্যাশা। ১৩ অনুবাদ—অতএব প্রমাণাদি-পদার্থের সত্যত্ব স্বীকার অথবা অসত্যত্ব স্বীকার বিষয়ে উদাসীন থাকিয়া ব্যবহারের নিয়মানুসারে সময়বদ্ধ করিয়া প্রবর্তিত কথাতে আপনি এই পূর্বোক্ত দোষ প্রদর্শন করিয়াছেন, এজন্য যদি এই দোষ উভয়ের স্বীকৃত হয়, তাহা হইলে তাহা উচিতই হইবে। যিনি নিজের অভিপ্রায়কেও জানিতে সমর্থ হন নাই, তিনি পরের অভিসন্ধি জানিতে সমর্থ হইবেন, ইহা তাহার সম্বন্ধে প্রত্যাশা করা যায় না। ১৩ তাৎপর্য—এইবার গ্রন্থকার পূর্বোক্ত বিষয়ের উপসংহার করিতে- ছেন। অথাৎ, যেহেতু, প্রমাণাদি-পদাথের সত্যত্ব ও মিথ্যাত্ব চিন্তা পরিত্যাগ করিয়া সময়বন্ধপূৰ্ব্বক আর কথাতেই পূর্বোক্ত দোষের উদ্ভাবন, বাদী করিয়াছেন—ইহা স্বীকার করিতে হইবে, সেই হেতু, এই দোষের উদ্ভাবন যােগ্য কথার ন্যায় ইতর কথাও হইতে পারে এইরূপ বিচার-ফলের উপসংহার করিতেছেন। কিন্তু, এই উপসংহার বাক্যের অথ নানাজনে নানারূপ করিয়া থাকেন। প্রথম, বিদ্যাসাগর-মতেই দুইটী অর্থ দেখা যায়, এবং শঙ্করমিশ্র-মতে ইহার অন্যবিধ অর্থ দেখা যায়। প্রথম, বিদ্যাসাগর-মতের প্রথম অর্থ অনুসারে বলিতে হইবে যে, এই উপসংহার-বাক্যে বলা হইল যে, বাদীর প্রদর্শিত পূর্বোক্ত ব্যাঘাত-দোষ প্রমাণাদি-পদার্থের সত্যাসত্য চিন্তা-পরিত্যাগ-পূৰ্ব্বক কেবল সময় বন্ধানু- রােধে প্রবৃত্ত কথাতেই প্রদর্শিত হইয়াছে, ইহা স্বীকার করিতে হইবে। যদি বলা যায়, এই নিয়মটী অর্থাৎ কেবল সময়বানুরােধে প্রবৃত্ত কথাতেই, দোষ প্রদর্শন করা হইয়াছে, ইহার কারণ কি ; তাহা হইলে তাহা উচিতই হইয়াছে বলিতে হইবে। কারণ, এইপক্ষে পূর্বোক্ত বিকল্প-ত্রয়ে যে দোষ হইয়াছিল, তাহা এই পক্ষে নাই। বিদ্যাসাগর-মতে ইহার দ্বিতীয় ॐनमःमनीचा পরমহংস-পরিব্রাজকাচাৰ্য-ভগবৎ-পূজ্যপাদ- শ্ৰীশ্ৰীচিৎসুখমুনি-বিরচিতা প্রত্যতত্ত্ব-প্রদীপিকা। (চিৎখী) (সমম্বয়া) প্রথম পরিচ্ছেদঃ। মঙ্গলাচরণ। স্তম্ভাভ্যন্তর-গর্ভভাব-নিগদ-ব্যাখ্যাত-বৈভবে যঃ পাঞ্চানন-পাঞ্চজন্য বপু ব্যাদিষ্ট-বিশ্বাত্মত। প্রহলাদাভিহিতার্থ-তৎক্ষণ-মিলষ্ট-প্রমাণং হরি, সােহব্যাবঃ শরদিন্দু-সুন্দর-তমুঃ সিংহাদ্রিচূড়ামণিঃ ॥১ অয়- অভ্যন্তর-গর্ভভাব-নিগদ-ব্যাখ্যাততদ্বৈতব, পাঞ্চানন-পাঞ্চজনা-পুষ কাষ্টিবিশ্বাত্মত, প্রহলাদাভিহিতার্থ-তৎক্ষণমিলষ্টপ্রমাণং সঃ শরদিন্দুম্বন্দরত সিংহতি চুড়ামণি হরিঃ বঃ অব্যাহ্। অনুবাদ-যিনি স্তম্ভাভ্যন্তরে অনভিব্যক্ত রূপে অবস্থিত এবং উপায়ান্তর- নিরপেক্ষ হইয়া নিজ বৈভব অভিব্যক্ত করিয়াছেন, এবং যিনি সিংহ ও মানুষ- এতদুভয়াত্মক শরীর ধারণ করিয়া নিজের বিশ্বাত্মতাকে বিশেষ রূপে পরিব্য করিয়াছেন, যিনি নিজ ভক্ত প্রহলাদ কথিত বাক্যকে প্রমাণিত করিবার জন্য তৎক্ষণাৎ প্রত্যক্ষ প্রমাণ রূপে উপস্থিত হইয়াছিলেন, সেই শরৎকালীন চন্দ্রমার ন্যায় সুন্দর তনু সিংহগিরির চুড়ামণিস্বরূপ অর্থাৎ সিংহগিরি নিবাসী। ভগবান নৃসিংহদেব আপনাদিগকে রক্ষা করুন। তাৎপৰ্য-ই মঙ্গলাচরণ শ্লোক। নিৰ্বিয়ে গ্রন্থের সমাপ্তি এবং লােকমধ্যে তাহার প্রচার কামনা করিয়া শিষ্টাচারসম্মত মঙ্গলাচরণ করিয়া শিষ্যশিক্ষার জন্য হা গ্রন্থমধ্যে লিপিবদ্ধ করা হইল।
প্রত্যক্তত্বপ্রণীপিকা। (তাৎপৰ্য)-“হরি” অর্থ যিনি হরণ করেন ; অর্থাৎ, যিনি অজ্ঞান এবং তৎকাৰ্য্য হরণ করেন তিনিই হরি। এই হরি শব্দ দ্বারা অজ্ঞান এবং তৎকাৰ্য্য রহিত জ্ঞাত শুদ্ধ ব্ৰহ্মই যে প্রয়োজন, তাহা সূচিত হইল। “ব্যাদিষ্টবিশ্বাত্মতঃ শব্দ দ্বারা সেই ব্রহ্মে মায়া ও তৎকাৰ্য্য প্রপঞ্চের অভভদা- রােপ প্রদর্শন করায় ব্রহ্ম অজ্ঞানের বিষয় হইলেন, আর তজ্জন্য অজ্ঞাত ব্ৰহ্মই যে এই গ্রন্থের ‘বিষয়” তাহা প্রদর্শন করা হইল। “প্রহলাদ” শব্দে প্রহলাদের মত বিশিষ্ট অধিকারীই যে এই শাস্ত্রের অধিকারী তাহার সূচনা করা হইল। “গ” শব্দ দ্বারা অনভিব্যক্ত হইয়া থাক। বুঝাইল। গৃহাভ্যন্ত৷বস্থিত দেবত্তের ন্যায় প্রকটরূপে থাকা বুঝাইল না। ইহার দ্বারা ভগবানের সর্বান্তর- তাব এস্থলে বিবক্ষিত বুঝিতে হইবে। অন্যথা “অভ্যন্তরভাৰ পদের অর্থের সহিত পুনরুক্তি দোষ হইবে। প্রথম বিশেষণ শুম্ভাভ্যন্তর” ইত্যাদি দ্বারা ব্রহ্মের সর্বগত সিদ্ধ হইলেও নৈয়ায়িকাদি-মতের ন্যায় বস্তু-পরিচ্ছিন্নত্বের নিবারণ হয় না, এজন্য গ্রন্থকার শ্লোক মধ্যে দ্বিতীয় বিশেষণ প্রদান করিলেন। দ্বিতীয় বিশেষণ, অর্থাৎ “পাঞ্চানন” ইত্যাদি পদারা সেই ব্রহ্মের সর্বাত্মকত্ব কথিত হইল। তৃতীয় বিশেষণ “প্রহলাদাদি” পদদ্বারা পরমকারুণিক ভগবানের ভক্তানুগ্রহ- কারিত্ব কথিত হইল। কারণ, প্রহলাদ সর্বাত্মক পরমেশ্বরের সর্বব্যাপিত্ব বলিয়া- ছিলেন ; ইহাতে পরমেশ্বরের সর্বব্যাপিত্ব সম্বন্ধে আগম অথবা অনুমান প্রমাণের উপন্যাস করা যায়; কিন্তু তাহা হইলেও সে সব প্রমাণ পরােক্ষ প্রমাণই হইবে, এজন্য ভগবান “ভক্ত যে কথা বলিয়াছে তাহা প্রত্যক্ষসিদ্ধ করিয়া দিব” এইরূপ ইচ্ছা করিয়া স্তম্ভের ভিতর হইতে নির্গত হইয়াছিলেন। তৃতীয় বিশেষণের ইহাই অভিপ্রায়। ফলত, এতদ্বারা শাস্ত্র এবং ফলের সহিত হেতু ও হেতুমভাবরূপ সম্বন্ধ, শাস্ত্র এবং তত্ত্বজ্ঞানের সহিত, তত্ত্বজ্ঞান এবং তাহার ফলের সহিত কাৰ্য-কারণ- ভাবরূপ সম্বন্ধ, এবং তত্ত্বজ্ঞান ও তত্ত্বের সহিত বিষয়-বিষয়ী-ভাব-রূপ সম্বন্ধ, এবং শাস্ত্র ও তত্বের সহিত প্রতিপাদ্য-প্রতিপাদক-আবরূপ সম্বন্ধ - এইরূপ পঞ্চবিধ সম্বন্ধ প্রদর্শন করা হইল। অতএব, অনুবন্ধ চতুষ্টয় ইহাতে থাকায় এই প্রকরণ প্রস্থের আরন্তু যে প্রয়ােজন, তাহাই প্রদর্শন করা হইল।
প্রথম পাচ্ছে। জ্যোতির্য-দক্ষিণামূৰ্ত্তি-ব্যাস-শঙ্কর-শব্দিত। জ্ঞানােত্তমাখ্যং তদ বন্দে সত্যানন্দপদোদিতম্ ॥২ বিপ্রতিপত্তি-ব্রাত-ধ্বস্ত-ধ্বংস-প্রগলভ-বাচালা। ক্ৰিয়তে চিৎসুখ-মুনিনা প্রত্যক্ত-প্রদীপিকা বিদুষা। ৩ অমষ-জ্যোতিঃ দক্ষিণামূর্তি-ব্যাস-শঙ্কর-শঙ্গিতং জ্ঞানােত্তমাখ্যং সত্যানন্দপলোহিত উদ বলে। বিহুধা চিৎমুখ-মুনিনা বিপ্ৰতিপত্তি-ব্রাত-ধ্বান্ত-ধ্বংস-প্রগল্ভ-বাচাল প্রত্যক্ত-দীপিকা জিতে। ৩ অনুবাদ-যে জ্যোতিঃ বেদান্তববদ্য বস্তুস্বরূপের উপদেশ করিবার জন্য দক্ষিণামূৰ্ত্তি শিবরূপে, এবং বেদান্তার্থ-নিৰ্ণায়ক ন্যায়-সূত্র রচনা করিবার জন্য ব্যাস রূপে, এবং সেই সূত্রের অর্থবিষ্করণের জন্য শঙ্করাচাৰ্য রূপে, এবং তদভাষ্যার্থ বিবরণের জন্য জ্ঞানােমাচাৰ্য-গুরুরূপে অবতীর্ণ হইয়াছেন, সেই সত্যানন্দ পদদ্বারা প্রকাশিত গুরুরূপ জ্যোতিঃকে বন্দনা করি। ২ পণ্ডিত চিৎসুখ মুনি, বিপ্রতিপত্তি সমূহ রূপ অন্ধকারের ধ্বংসাৰ্থ প্রগলভ বাচালা অর্থাৎ দৃঢ়তর ন্যায়-প্রদর্শিনী প্রত্যক্ত-প্রদীপিকা নামক এই গ্রন্থ রচনা করিতেছেন।৩ তাৎপৰ্য—প্রথম শ্লোকদ্বারা পরদেবতার পূজা করা হইয়াছে। এইবার গুরু-পুজা প্রয়ােজন, যেহেতু শ্রুতি আছে- “য দেবে পয়া ভক্তি যথা দেবে তথা গুরো। তস্যৈতে কবিতাহৰ্থঃ প্রকাশন্তে মহাত্মনঃ। সুতরাং, দেবতাভক্তির ন্যায় গুরুভক্তিরও বিদ্যা প্রাপ্তিতে অন্তরঙ্গত্ব আছে, ইহাই প্রদর্শন করিবার জন্য গুরু প্রণাম করিতেছেন। ২ শারীরক-সূত্রের যে বিষয় এবং প্রয়ােজনাদি তাহারই বিবরণ এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হইয়াছে বলিয়া সেই সব বিষয়াদিই ইহারও বিষয়াদি বলিয়া সিদ্ধ হয়, অতএব পৃথক ভাবে ইহার বিষয় ও প্রয়ােজনাদি-কথন নিয়ােজন; সুতরাং, ইহার অসাধারণ বিষয়-প্রয়োজনাদি পৃথক ভাবে কথিত না হইলে ইহার পৃথক আরম্ভ ব্যর্থ হইয়া যাইবে, এইজন্য এই তৃতীয় শ্লোকের অবতারণা করা হইতেছে। অর্থাৎ যদ্যপি শারীরক-ভাষ্যাদি গ্রন্থদ্বারা জীব ব্রহ্মের ঐক্য রূপ বিষয়-জ্ঞানের প্রধান কারণ যে বেদান্ত,তাহার বিচারে নানা প্রকারের বাদি বিপ্রতিপত্তি-কলুষিত প্রত্যক্তপ্রদীপিকা। প্রমাণ-নখ-নিভিন্ন-মহামােহামরারয়ে। নমস্কুৰ্ম্মো নৃসিংহায় স্বপ্ৰকাশ-চিদাত্মনে। ৪ অম্বয়মাণ-নখ-নিভিন্ন-মহামােহামরায়ে প্রকাশচিদাত্মনে নৃসিংহায় নমস্তুৰ্মঃ। অনুবাদ-যিনি প্রমাণ-রূপ নখ দ্বারা মহামােহ নামক অসুরকে বিনাশ করিয়াছেন, সেই স্বপ্ৰকাশ-চৈতন্য রূপ নৃসিংহদেবকে অনুকুল করিবার জন্য প্রণাম করিতেছি। (তাৎপৰ্য)-অনর্থ-নিবারণে অনেক উপকার হইয়াছে, তথাপি তারা অভিনব বাদিগণ-কর্তৃক উদ্ভাবিত বিপ্ৰতিপত্তি সমুদায়ের নিবারণ হয়না; এজন্য এই গ্রন্থ দ্বারা তাহাই করা হইতেছে। অতএব, ইহাই এই গ্রন্থের অসাধারণ প্রয়ােজন হইল। সুতরাং, এই বিপ্রতিপত্তি-নিবন্ধন যে অজ্ঞাত ব্ৰ, তাহাই হইল এই গ্রন্থের “বিষয়” অর্থাৎ প্রতিপাদ্য, এবং এই ব্রহ্মজ্ঞান যিনি কামনা করেন, তিনিই তাহা হইলে হইলেন ইহার অধিকারী। প্রত্যক” শব্দের অর্থ-জীব, তাহার তত্ব-প্রত্যক্তত্ব, অর্থাৎ পারমার্থিক রূপ নিরতিশয় আনন্দরূপ যে ব্ৰহ্ম, তাহার প্রদীপের মত প্রকাশক বলিয়া এই এহের নাম হইয়াছে প্রত্যক্তত্ব-প্রদীপিকা। “প্রগলভ-বাচালা” এই বিশেষণ দ্বারা অসম্পূর্ণতার পরিহার করা হইয়াছে। অর্থাৎ অভিনব বিপ্ৰতিপত্তিগুলি অতি বিস্তৃতভাবে যে ইহাতে খণ্ডিত হইয়াছে, তাহাই এতদ্বারা কথিত হইল। ৩ তাৎপৰ্য-গ্রন্থমধ্যে পরে যে বিষয় আলােচিত হইবে, নৃসিংহদেবের নমস্কার ছলে তাহারই আভাস প্রদর্শন করিবার জন্য এই শ্লোকটী রচিত হইয়াছে। “তত্বমসি” ইত্যাদি বাক্য-জনিত জীব-ব্রহ্মক্যাকার চিৎপ্রতিবিম্বযুক্ত যে বুদ্ধিবৃত্তি, অথবা বুদ্ধিবৃত্তি-প্রতিবিম্বিত যে চৈতন্য, সেই চৈতন্যই এখানে প্রমাণ শব্দ- বচ্য। তাহার দ্বারা ব্ৰহ্মবিষয়ক অজ্ঞান মাত্রেরই নিবৃত্তি হইবে। কিন্তু, তাহার প্রকাশ হইতে পারে না; এইজন্য প্রকাশ-চিদাত্মনে পদটী প্রযুক্ত হইয়াছে বুঝিতে হইবে। ইহার দ্বারা স্বপ্ৰকাশরূপ চৈতন্যের বেদান্তরূপ প্রমাণ দ্বারা প্রকাশ সম্ভব না হইলেও মােহনিবৃত্তি রূপ অতিশয় ফল হয়, এবং তারা প্রকাশ-ব্রহ্মে বেদান্তের প্রামাণ্য এবং প্রমাণের প্রয়ােজন উপপাদিত হইল। এইরূপে আত্মার জ্ঞানরূপ এবং প্রকাশত্বের যে প্রতিজ্ঞা করা হইল, তাহারই বিষয় অর্থে এমধ্যে বিচারিত হইতেছে। ৪ প্রথম পরিচেছদ। ; প্রকাশ-শব্দার্থ বিকল্প। অথ কোহয়ং স্বপ্ৰকাশ-শব্দার্থ ? কিং সুশ্চাসৌ প্রকাশশ্চেতি প্রকাশঃ (১); স্বস্য স্বয়মেব প্রকাশ ইতি বা ? (২); সজাতীয়- প্রকাশাপ্রকাশ্যত্বং বা? (৩); স্ব-সত্তায়াং প্রকাশ-ব্যতিরেক-বিরহিতত্বং বা ? (৪); স্ব-ব্যবহার-হেতু-প্রকাশ বা ? (৫); জ্ঞানাবিষয়ত্বং বা ? (৬); জ্ঞানাবিষয়ত্বে সতি অপরােক্ষত্বং বা? (৭); ব্যবহার-বিষয়ত্বে সতি জ্ঞানাবিষয়ত্বং বা? (৮); স্ব-প্রতিবদ্ধ-ব্যবহারে সজাতীয়-পরান- পেক্ষত্বং বা? (৯); অবেষ্যত্বে সতি অপরােক্ষ-ব্যবহার-বিষয়ত্বং বা? (১০); তযােগ্যত্বং বা? (১১)। ৫ অনুবাদ-“অথ” শব্দ দ্বারা পূর্বোক্ত গ্রন্থারম্ভ সূচনা করিয়া মঙ্গল-শ্লোকে উক্ত যে স্বপ্ৰকাশ শব্দ, তাহার অর্থ-নিৰ্ণয়-মানসে, তদবিষয়ক বিকল্প করিতে যথাস্বত্ববিশিষ্ট যে প্রকাশ, তাহার নাম স্বপ্রকাশ (১)? অথবা নিজেই নিজেকে প্রকাশ করে, অর্থাৎ তাহার প্রকাশক অন্য কেহ নাই বলিয়া তাহা প্রকাশ (২)? কিম্বা সজাতীয়-প্রকাশান্তর দ্বারা অপ্রকাশ্য অর্থাৎ প্রকাশিত হয় না বলিয়া তাহা প্রকাশ (৩)? অথবা নিজের সত্তাকালে প্রকাশের অব না থাকাই স্বপ্ৰকাশ শব্দের অর্থ (৪)? অথবা নিজের ব্যবহারে কারণীভূত প্রকাশরূপই স্বপ্ৰকাশত্ব (৫)? অথবা যাহা জ্ঞানের বিষয় হয় না, তাহাই স্বপ্রকাশ (৬)? কিংবা জ্ঞানের অবিষয় হইয়া অপরােক্ষ-রূপত্বই প্রকাশ (৭)। কিন্তু ব্যবহারের বিষয় হইয়া জ্ঞানের অবিষয় হওয়াই স্বপ্ৰকাশত্ব (৮)? কি স্বপ্রযুক্ত ব্যবহারে সজাতীয়-অন্যকে যাহা অপেক্ষা করে না, তাহাই প্রকাশ (৯)? অথবা জ্ঞানের বিষয় হইয়া প্রত্যক্ষ-ব্যবহারের বিষয় হওয়াই স্বপ্ৰকাশ (১০)? কি জ্ঞানের অবিষয় হইয়া প্রত্যক্ষ-ব্যবহারের যােগ্য হওয়াই স্বপ্ৰকাশ শব্দের অর্থ (১১)। ৫ তাৎপৰ্য-এই “অথ” শব্দটী আনন্তৰ্য্যাৰ্থক; অর্থাৎ অনুবন্ধ-চতুষ্টয়ের সিদ্ধির অনন্তর; অথবা ইহাকে আরম্ভাৰ্থক বলিয়া বুঝিতে হইবে। স্বপ্ৰকাশত্বরূপ পদার্থ টী এখনও বাদি-প্রতিবাদিমতে সিদ্ধ হয় নাই, এজন্য পূর্বোক্ত চতুর্থ শ্লোকের “স্ব- প্রকাশ” শব্দকে ধৰ্মীরূপে অবলম্বন করিয়া এস্থলে একাদশ প্রকার বিকল্প করা হইল। এস্থলে পূর্ব পূৰ্ব্ব কৱে অস্বাস-প্রযুক্ত উত্তরােত্তর কল্পের অবতারণা করা হয় নাই বুঝিতে হইবে, পরন্তু যে পক্ষে যে দোষের সম্ভাবনা হইতে পারে, শিষ্য-বুদ্ধি- প্রত্যক্তপ্ৰদীপিকা। (তাৎপৰ্য) -বৈশদ্যের জন্য যথাসম্ভব সেই সেই দোষ এবং প্রত্যেক লক্ষণের প্রত্যেক পদের প্রয়ােজন প্রদর্শিত হইতেছে। তন্মধ্যে প্রথম বিকল্পে স্বত্বমাত্রকে স্ব প্রকাশের অর্থ বা লক্ষণ বলিলে ঘটাদি পদার্থেও স্বত্ব আছে বলিয়া ঐ লক্ষণের অতিব্যাপ্তি হইবে; অতএব লক্ষণ মধ্যে প্রকাশ-পদটি গৃহীত হইয়াছে। দ্বিতীয় বিকল্পে “নিজেই নিজেকে বিষয় করে এই বিশেষণটী প্রদত্ত হইয়াছে। ইহা না দিলে জ্ঞানের পরপ্রকাশ্যত্ববাদীর মতানুসারে জ্ঞানটী স্বয়ংপ্রকাশ না হইলেও প্রকাশরূপ হইতে পারে ; অতএব স্ব প্রকাশনুমানে অর্থাত্তর-দোষ হয়, অর্থাৎ জ্ঞানের পর প্রকাশ্যত্ব থাকিলেও প্রকাশরূপতার কোন বাধা থাকে না। অতএব স্বপ্ৰকাশত্ববাদীর পর প্রকাশ্যত্বাভাবরূপ স্বাভিমতটী সিদ্ধ না হইয়া কেবল প্রকাশরূপত্বটী সিদ্ধ হইবে, এই দোষ-নিবৃত্তির জন্য “স্বয়মেব এই বিশেষণটী দেওয়া হইয়াছে। “শব্দ ইত্যাকার যে শব্দ, তাহা সকল শব্দের প্রতিপাদক হইয়া সকন্তর্গত নিজেরও প্রতিপাদক হইয়া থাকে; অতএব তাহাতে অতিব্যাপ্তিরূপ দোষ-বারণের জন্য প্রকাশ” পদটী এই লক্ষণে দেওয়া হইয়াছে। এই লক্ষণ দ্বারা প্রকাশ অর্থ যে, নিজেই নিজের প্রকাশক, তাহার বিধান এবং প্রকাশা- স্তরের যে নিবৃত্তি, তাহাই কথিত হইল। তৃতীয় কল্পের উথাপন প্রদীপের স্বপ্ৰকাশ-বাদিমতে বুঝিতে হইবে। কিন্তু, পূর্ববং এ স্থলেও অর্থান্তর দোষ হয়, এবং তাহা বারণের জন্য “সজাতীয় পদটীকে প্রকাশের বিশেষণ রূপে প্রদত্ত হইল। অন্যথা জ্ঞানটী ববদ্য হইলেও প্রদীপরূপ প্রকাশ দ্বারা অপ্রকাশ্যই থাকে। অতএব, সামান্যত প্রকাশা- প্রকাশ্যত্বসাধন করিতে যাইলেই অর্থান্তর হইবে। চতুর্থ কল্পের অর্থ-যে যে কালে জ্ঞানের সত্তা আছে, সেই সেই কালে প্রকাশের সহিত তাহার অসম্বন্ধ নাই, অর্থাৎ কোন কালেও প্রকাশকে ছাড়িয়া জ্ঞান থাকে না। যাহার মতে জ্ঞান পরপ্রকাশ্য, তাহার মতে (উৎপত্তিক্ষণে ) অর্থান্তর যথা,-“স্বাভিমতাসিদ্ধি” অর্থাৎ যে উদ্দেশ্য-সাধনের জন্য অনুমানে সাধ্যের প্রয়ােগ করা হয়, তাহা যদি পরকীয় মতখন অথবা স্বপক্ষসাধনরূপ সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ না করিয়া অপর কোন বস্তুর (সাধ্যের) সিদ্ধি করিয়া দেয়। তৃথা-ত্যিাদিকং সকর্তৃক কাষত্বাৎ, ঘটব--এই অনুমান দ্বারা নৈয়ায়িকগণ সর্বজ্ঞ এবং সর্বশক্তি এইরূপ কর্তৃবিশেষ সাধন করিতে প্রবৃত্ত হইলে এই স্থলে যথাক্রত সকর্তৃত্ব শব্দ দ্বারা জীবেরও কর্তৃত্বসিদ্ধি হইতে পারে। অথচ তাহা নৈয়ায়িকগণের ভিমত নহে, যাহাহউক এইরূপ হইলে অর্থার বলা হয়।
প্রথম পরিচ্ছেদ। (তাৎপৰ্য) -প্রকাশকে ছাড়িয়াও জ্ঞান থাকিতে পারে, অতএব জ্ঞানের সহিত প্রকাশের অসম্বন্ধ আছে, এই জন্য এই কল্পে অর্থান্তর হইল না। পঞ্চম কল্পের অর্থ --জ্ঞান না হইলে ব্যবহার হয় না; অতএব ব্যবহারের কারণ যে জ্ঞান, সেই জ্ঞানরূপই স্বপ্ৰকাশত্ব কি না তাহাই জিজ্ঞাস্য । ষষ্ঠ কল্পের অর্থ-জ্ঞানের স্বপ্ৰকাশত্ববাদী জ্ঞাকে অবিষয় বলেন, আর প্রকাশ্যত্ববাদী জ্ঞানকে জ্ঞানস্তরের বিষয় বলেন; অতএব জ্ঞানের অবিষয়ত্ব সাধন করিলেই তাহাদের মত নিরাকরণ করা হইল। সপ্তম কল্পের অর্থ পাতঞ্জলমতে শশ-বিষাণাদি শব্দদ্বারা শশ-বিষাণাদিপ অলীক পদার্থেরও প্রতীতি হয়, এবং তাহা বিকল্প-বৃত্তিমাত্ৰ , কিন্তু জ্ঞান বণিয়া পরিগণিত নহে; এখন তাহা হইলে শশ-বিষাণাদি রূপ অলীক পদার্থেরও জ্ঞান- বিষয়ত্ব থাকে, অতএব তাহারও স্ব প্ৰকাশত্ব হইবে। অতএব তাহা, নিবারণের জন্য অপরােক্ষত্ব এই পদের সন্নিবেশ করা হইল। প্রদীপটী প্রদীপরূপ-সজাতীয়-প্রকাশদ্বারা অপ্রকাশ্য হইলেও জ্ঞানের অবিষয় নহে; অতএব তৃতীয় এবং ষষ্ঠকল্পের সাঙ্কৰ্য-দোষ হইল না। সপ্তম কল্পের -“জ্ঞানবিষয়ত্বে সতি অপরােক্ষত্ব” এই বাক্যমধ্যস্থ অপরােক্ষ শব্দের অর্থ অপয়ােঙ্গ-জ্ঞানবিষয়ত্ব কিংবা অপরােক্ষ-জ্ঞানরূপ ? প্রথম পক্ষে, ব্যাখ্যাত দোষ হয়, অর্থাৎ এক জ্ঞানেই জ্ঞানবিষয়ত্ব এবং জ্ঞানবিষয়ত্ব এইরূপ বিরুদ্ধ ধৰ্ময়ের সমাবেশ হয়। দ্বিতীয় পক্ষে-সকল জ্ঞানই স্ব প্রকাশ বলিয়া সেই জ্ঞানে অপরােক্ষত্ব বিশেষণটী নির্থক হয় এইজন্য অষ্টমকল্পের অবতারণা করা হইল। অষ্টম কল্প -যে জ্ঞানে অপরােক্ষত্ব নাই, এইরূপ কোন জ্ঞান বৈদান্তিকগণ স্বীকার করেন না। কারণ “যং সাক্ষাদপরােক্ষা ব্ৰহ্ম”এই ঐতিদ্বারা অপরোক্ষ- জ্ঞানরূপ ব্ৰহ্মই প্রতিপাদিত হইয়াছে ; অতএব বৃত্তিরূপ জ্ঞানের জ্ঞানত্ব স্বীকার করা হয় না এই অম্বরস নিবন্ধন অষ্টম কল্পে অপরােক্ষত্ব বিশেষণকে পরিত্যাগ করিয়া লক্ষণ করা হইল। নবম কল্প—প্রভাকর, ভ্ৰম-জ্ঞান স্থলে বিশিষ্ট জ্ঞান স্বীকার না করিয়া তাহার স্থলে জ্ঞানদ্বয় স্বীকার করেন, অতএব শুক্তির সহিত রজতের যে সম্বন্ধ, তাহাতে ব্যবহার-বিষয়ত্ব থাকিয়া জ্ঞানের অধিষয়ত্ব থাকে। এজন্য তাহার স্বপ্ৰকশত্ব বারণ করা হইতেছে। এই নবম কল্পে ‘সজাতীত্ব বিশেষণ না দিলে সকল জ্ঞানই স্ব-প্রযুক্ত ব্যবহারে ভিন্ন-পদার্থের অর্থাৎ অয়মনঃসংযােগদিরূপ দৃষ্ট, এবং প্রত্যক্তপ্রদীপিকা। পুর্বোক্ত প্রকাশণার্থ খণ্ডন। ন আদ্যঃ, বেছস্যাপি জ্ঞানস্য স্বপ্ৰকাশস্বাভপগমাৎ। দ্বিতীয়, কৰ্ম্ম-কর্তৃভাব-বিরােধেন লক্ষণস্য অসম্ভবাৎ। ন তৃতীয়, প্রদীপাদেঃ সজাতীয়-প্রকাশা প্রকাশ্যস্য অস্বয়ম্প্ৰকাশনে লক্ষণস্যাতি- ব্যাপ্তেঃ, ঘটাদেরপি সজাতীয়-প্রকাশা প্রকাশ্যস্য স্বপ্ৰকাশত্ব-প্রসঙ্গাচ্চ। অনুবাদ-প্রথম পক্ষটী হইতে পারে না; কাণ, জ্ঞানকে বােদ্য স্বীকার করিলেও এইরূপ স্বপ্ৰকাশত্ব অঙ্গীকৃত আছে। দ্বিতীয় কল্প সম্ভবপর নহে, যেহেতু, এক পদার্থে কৰ্মত্ব এবং কর্তৃত্ব এইরূপ বিরুদ্ধ ধর্ম থাকিতে পারে ; অর্থাৎ এইজন্য লক্ষণে অসম্ভব দোষ হইবে । তৃতীয় পক্ষও সঙ্গত নহে; কারণ, প্রদীপাদি, প্রদীপরূপ-সজাতীয়-প্রকাশের প্রকাশ না হইলেও স্বয়ং প্রকাশ বলিয়া স্বকৃত হইতে পারে না; আর এইজন্য লক্ষণের অতিব্যাপ্তি হইবে। তাহার পর শটাদি পদার্থেরও স্বজাতীয় প্রকাশদ্বারা অপ্রকাশ্যত্ব আছে বলিয়া অতিব্যাপ্তি (তাৎপৰ্য)—অদৃষ্টের অপেক্ষা করে, অতএব অন্যানপেক্ষিত্ব লক্ষণের অসম্ভব হয়, এইজন্য জাতীয় পদটী লক্ষণের মধ্যে নিবেশ করা হইয়াছে। দশম কল্পে—জ্ঞানবিষয়ত্বে সতি অপরােক্ষত্ব” এই সপ্তমকল্লো, অপরোক্ষ বলিয়া অপরােক্ষ ব্যবহার-বিষয়ত্ব বলা হইয়াছে ; এইজন্য সপ্তম এবং দশম কল্পের সাৰ্য্য দোষ হইল না। একাদশ কল্পে—মুক্তিদশাতে কোন প্রকার ব্যবহার নাই, অতএব ব্যবহার বিষয়ত্বকাপ স্বপ্ৰকাশত্ব-লক্ষণের মুক্তিকালীন আত্মাতে অব্যাপ্তি হয়, এইজন্য “অবেদ্যত্বে সতি অপরােক্ষ-ব্যবহার-বিষয়ত্বযােগ্যত্ব” এইরূপ লক্ষণটী করা হইল; মুক্তিদশাতে ব্যবহার-বিষয়তা না থাকিলেও যােগ্যতা আছে, অতএব অব্যাধি হইল না বুঝিতে হইবে। অথবা-পূর্বোক্ত অর্থান্তর নিবারণের জন্য দ্বিতীয়কল্প; বিরােধ-পরিহারের জন্য তৃতীয় কল্প ; ঘটাদিতে অতিব্যাপ্তি-বারণের জন্য চতুর্থ কল্প; সুখাদিতে অতি ব্যাপ্তি-বারণের জন্য পঞ্চম কল্প; প্রদীপে অতিব্যাপ্তি-বারণের জন্য ষষ্ঠ কয় বলা যাইতে পারে। সপ্তম বা অষ্টম এবং নবম কল্পের প্রয়ােজন পূর্বেই বলা হইয়াছে। প্রদীপে অতিব্যাপ্তি-বারণের জন্য দশম কল্প। একাদশ কলের প্রয়ােজনও পূৰ্বে কথিত হইয়াছে, এইরূপ সকল কল্পেই অনুপপত্তি- বারণের জন্য পরপর কল্পের উপন্যাস করা হইয়াছে বুঝিতে হইবে।
প্রথম পরিচ্ছেদ। ন হি প্ৰদীপাদৌ জ্ঞানে বা ঘটাদিজাতিরস্তি, যেন ঘটাদয়ঃ সজাতীয়- প্রকাশ প্রকাশ্য ভবেয়ুঃ। সত্তয়া সজাতীয়ত্বং তত্রাপ্যস্তি ইতি চেৎ, ন, বিশেষণ-বৈয়ৰ্থাৎ সত্তাবিরহিণঃ প্রকাশস্যৈৰ অসম্ভবাৎ,প্রকাশাপ্রকাশ্য ত্ব-ইত্যেবতৈব চরিতার্থাৎ। নাপি চতুর্থঃ, সুখদাবতিব্যাপ্তে, সুখাদেরপি স্বসত্তায়াং প্রকাশাব্যভিচারাৎ। ন পঞ্চমঃ, প্রদীপদাবতি- ব্যাপ্তেঃ, প্রদীপাদেরপি ব্যবহারে হেতুৎ প্রকাশাচ্চ। ৬ (অনুবাদ)হইবে; কারণ, জ্ঞান কিংবা প্রদীপ দ্বারা ঘটাদি প্রকাশিত হইলেও জ্ঞান এবং প্রদীপ, ঘটের সজাতীয় হইতে পারে না, এই জন্য প্রকাশত্বের আপত্তি হইবে। প্রদীপাদিতে কিংবা জ্ঞানে ঘটত্বাদি জাতি যদি থাকিত, তাহা হইলে ঘটাদির সজাতীয় যে প্রদীপ প্রকাশ, তাহার প্রকাশ্য ঘটাদি হইত। দ্বারা ঘটাদির সজাতীয় প্রদীপ এবং জ্ঞান হইবে-এই যদি বল, তাহাও ঠিক নহে; কারণ, তাহা হইলে ‘সজাতীয় এই বিশেষণটী ব্যর্থ হইয়া যাইবে, সত্তা যাহাতে নাই এইরূপ প্রকাশই অসম্ভব। কেবল প্রকাশাপ্রকাশ্যত্ব এই রূপ বলিলেই অভিমত সিদ্ধ হয়। চতুর্থ কল্পও হইতে পারে না; যেহেতু, তাহা হইলে সুখাদিতে অতিব্যাপ্তি হইবে। কারণ, সুখাদিও নিজের সত্তাকালে প্রকাশকে ছাড়িয়া থাকে না, এবং প্রদীপাদিতে অতিব্যাপ্তি হয় বলিয়া পঞ্চম কল্পও সঙ্গত হয় না; যেহেতু, প্রদীপাদিও নিজের ব্যবহারে কারণ এবং প্রকাশরূপ। তাৎপৰ্য-প্রথমকল্পে, জ্ঞানটী জ্ঞানের বিষয় হইলেই যে তাহাতে স্বত্ব ও প্রকাশ থাকিবে না -ইহা বলা যায় না। সুতরাং, তাহাতে স্বত্ব এবং প্রকাশ দুই ধৰ্ম্ম আছে, অতএব স্বাভিন্ন প্রকাশরূপ স্বপ্ৰকাশত্ব সাধন করিলে অভিমত সিদ্ধ হয় না; এজন্য প্রথমকল্প পরিত্যক্ত হইল। দ্বিতীয় কল্পে, নিজেই নিজের প্রকাশক এই কথাদ্বারা কৰ্ম্মত্ব এবং কর্তৃত্ব একজ্ঞানে স্বীকার করা হইল, কিন্ত বিরুদ্ধ ধর্মের একত্র অবস্থান কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না। অতএব “স্বন্য স্বমেব প্রকাশ, এই লক্ষণটী অসম্ভব হয়, এই জন্য দ্বিতীয় কল্পটীকে পরিত্যাগ করা হইল। যপি ‘স্ব” এই যজ, সম্বন্ধমাত্রের বাচক, অতএব কৰ্ম্ম-কর্তৃতাবটী আশংকিত হইতে পারে না, তথাপি সন্ধুমাত্র গ্রহণ করিলে কোন বিশেষের গ্রহণ না হওয়ায় কোন ব্যবহারই সম্পন্ন হইতে পারে না; যেহেতু, লােকমধ্যে কেবল সামান্তভাবে কিছু বলিলে আকাং- ক্ষার নিবৃত্তি হয় না-দেখা যায়। এই জন্য সন্নিহিত প্রকাশরূপ ক্রিয়ার অনুরােধে কর্মেই উক্ত বিশেষের ব্যবস্থাপন করিতে হইবে, অর্থাৎ নিজেই কৰ্ম্ম এবং কর্তা ১০ প্রত্যক্ত-প্রদীপিকা। ( তাৎপৰ্য)—এইরূপ কৰ্ম্ম-কর্তৃত্ব সম্বন্ধ বলিতে হইবে। আর তাহা হইলে কৰ্ম্ম-কর্তৃভাবই আসিল। অতএব দ্বিতীয় কল্পও ঠিক নহে। তৃতীয় কল্পে প্রদীপে অতিব্যাপ্তি হইবে। কারণ, প্রদীপ নিজের প্রকাশের জন্য প্রদীপান্তরের অপেক্ষা করে না, অতএব তাহাতে স্বজাতীয়-প্রকাশা- প্রকাশ্য আছে। যদ্যপি জ্ঞানটী প্রদীপের প্রকাশক,সুতরাং প্রদীপটী প্রকাশান্তরের অপ্রকাশ্য হইল না, তথাপি জ্ঞানরূপ প্রকাশটী প্রদীপের সজাতীয় হয় না, কিন্তু বিজাতী হয়, এইজন্য জাতীয় প্রকাশ শব্দদ্বারা জ্ঞান ধরা যায় না। সুতরাং সজাতীয় প্রকাশাপ্রকাশ্যত্ব তাহাতে আছেই। আর যদি বলা যায়--প্রদীপেরও স্বপ্রকাশ আমি অঙ্গীকার করিতেছি, সেইজন্য লক্ষ্যত্বনিবন্ধন উক্ত লক্ষণের অতি- ৰাপ্তি হয় না; এ কথা ঠিক নহে। কারণ, ভৌতিক পদার্থের প্রকাশত্ব স্বীকার করিলে অনুভব-বিরােধ হয়; যেহেতু প্রদীপও ত চক্ষুদির প্রকাশ্য হয়; তাহাকে যে লােকে প্রকাশ বলে তাহা ভ্রান্তি মাত্র। কারণ, ঘটাদি পদার্থনিচয় প্রদীপ এবং চাদির সাহায্যে প্রকাশিত হয় এবং প্রদীপ কেবল চক্ষুরাদির প্রকাশ্য হয়, অর্থ আলােকের অপেক্ষা করে না। বস্তুতঃ, এইজন্য উক্ত ভ্রান্ত ব্যবহার হইয়া থাকে। সুতরাং, প্রদীপকে প্রকাশ বলা উচিত নহে। এতদ্ব্যতীত এই কল্পে আর একটী দোষ হইবে, অর্থাৎ ঘটাদিরও স্বপ্ৰকাশপত্তিরূপ দোষ হইবে; যেহেতু,প্রদীপাদিতে কিংবা জ্ঞানে ঘটত্বাদি জাতি থাকে না। যদি থাকিত, তাহা হইলে স্বজাতীয় প্রকাশ শব্দ দ্বারা প্রদীপ কিংবা জ্ঞানকে গ্রহণ করিয়া স্বাসজাতীয় প্রকাশ যে জ্ঞান এবং প্রদীপ, তারা--অপ্রকাশ্যত্ব ঘটাদিতে নাই এই জন্য স্বপ্রকাশতের আপত্তি হইতে পারে না, ইহা তুমি বলিতে সমর্থ হইতে; কিন্তু তাহা বলিতে পার না। আর এই দোষ-বারণের জন্য সত্তারূপ ধৰ্মহারা সাজাত্য-নিবেশ করিয়া ঘটাদির সত্তারূপ ধৰ্ম্মদ্বারা সজাতীয় প্রদীপাদিও হইল, অতএব তাহার অ প্রকাশ্য ঘটাদিতে নাই, ইহা যদি বল ; তাহা ঠিক নহে; কারণ, তাহা হইলে সজাতীয় এই বিশেষণটী ব্যর্থ হয়। সারহিত প্রকাশ নামক পদার্থ ই অপ্রসিদ্ধ। যদি সত্তরহিত প্রকাশ পদার্থ থাকত, তবে সজাতীয় এই বিশেষণ দ্বারা সেই প্রকাশের ব্যাবৃত্তি করিয়া লক্ষণের সমন্বয় করা যাইত, কিন্তু তাহা অপ্রসিদ্ধ। অতএব, এই বিশেষণের কোন প্রয়ােজন নাই, কেবল প্রকাশাপ্রকাশ্য এই বলিলেই চলে। অতএব, তৃতীয় কল্পও পরিত্যাজ্য হইতেছে। চতুর্থকল্পও সুখাদিতে অতিব্যাপ্তি হয় বলিয়া পরিত্যক্ত হইল। কারণ, সুখ- দিও নিজের সন্তাৰকাল প্রকাশকে পরিত্যাগ করিয়া থাকিতে পারে না। যে ;
প্রথম পরিচ্ছাে। art অথ জ্ঞানব্যবহারহেতু-প্রকাশং বিবক্ষিত? তদপিন, অনু- ব্যবসায়ে অতিব্যাপ্তেঃ ; তস্য বেষ্যত্বেহপি ব্যবসায়জ্ঞান-ব্যবহার-হেতু প্রকাশত্বাৎ ; প্রদীপজ্ঞানমিদমিতি ব্যবহারহেতে প্রদীপ-প্রকাশে অতিব্যাপ্তে। কিঞ্চ ব্যবহারহেতুত্বং বিশেষণমুপলক্ষণং বা?ন আদ্য, মুক্তি প্রলয়াদৌ অপ্রাপ্তে। ন দ্বিতীয়ঃ, উপলক্ষিতত্বস্যাপিঃবিশেষণত্বে প্রাগুক্তদোষামুঙ্গাৎ। স্বরূপমাত্রত্বে তু জ্ঞানং প্রকাশ ইত্যবস্যা, তথা সতি ন লক্ষণ-সিদ্ধিঃ।৭ অনুবাদ-পঞ্চমকল্পে) স্বব্যবহারহেতু শৰার জ্ঞানব্যবহারের কারণীভূত প্রকাশ অভিপ্রেত, এইরূপ শঙ্কা করা যায় না; কারণ, তাহা হইলে অনুব্যবসায়ে অতিব্যাপ্তি হইবে; যেহেতু, অনুব্যবসায়রূপ জ্ঞান নিজে জ্ঞানান্তরের বিষয় হইলেও, ব্যবসায় অর্থাৎ প্রথম জ্ঞানের ব্যবহারে কারণ, অথচ প্রকাশরূপ, এবং ইহা প্রদীপের জ্ঞান” এইরূপ ব্যবহারের কারণীভূত প্রদীপ-প্রকাশে অতিব্যাপ্তি হইবে। আরও একটী দোষ এই যে, যে ব্যবহার-হেতুত্বটী লক্ষণে সন্নিবেশিত হইয়াছে, তাহা কি প্রকাশের বিশেষণ ? কিংবা উপলক্ষণ? আদ্য পক্ষ অবলম্বন করা যায় ; কারণ, মুক্তি এবং প্রলয়কালে আত্মাতে কোন ব্যবহার হয় না। দ্বিতীয় পক্ষও সম্ভব হয় না। কারণ, উপলক্ষিতত্বকে যদি বিশেষণ বল, তবে পূর্বোক্ত দোষ আর স্বরূপমাত্র বলিলে ব্যবহার-হেতু শব্দার জ্ঞানরূপই প্রকাশ এইটা সিদ্ধ হইবে। কিন্তু তাহা লক্ষণ হইবে না। (তাৎপৰ্য্য)—সুখী জ্ঞান-গােচর নহে, তাহা অপ্রসিদ্ধ। অতএব, স্বসত্তাকালে প্রকাশের অভাব না থাকা এই রূপ চতুর্থকল্পকথিত স্বপ্ৰকাশত্ব সুখাদিতে থাকিল, অর্থাৎ চতুর্থকপ্পোক্ত স্বপ্ৰকাশ লক্ষণের অতিব্যাপ্তি দোষ হইল। পঞ্চম কল্পে প্রদীপাদিতে অতিব্যাপ্তি হয়। কারণ, প্রদীপাদিও নিজের ব্যবরে কারণ এবং প্রকাশরূপ। কারণ, প্রদীপাদির ব্যবহার প্রদীপাদি দ্বারাই হয়। ব্যবহার শব্দের অর্থ তদ্বিষয়ক শব্দপ্রয়ােগ কিংবা হানােপাদানাদি। তাৎপৰ্য- পঞ্চম কল্পের দোষ-বারণের জন্য পৃৰ্ব্বপক্ষী, শঙ্কা করিতেছেন যে, স্বব্যবহার-হেতুপ্রকাশ এই পঞ্চমকল্পে স্ব-শব্দদ্বারা জ্ঞান অভিপ্রেত, যে-কোন বিষয়মাত্র অভিপ্রেত নহে, আর তাহা হইলে প্রদীপাদিতে অতিব্যাপ্তি হয় না । * জ্ঞানবিষৰু জ্ঞানের নাম অনুব্যবসার প্রত্যক্ত-প্রদীপিকা। - (তাৎপৰ্য)--কারণ, জ্ঞান-বিষয়ক ব্যবহারের কারণ প্রদীপাদি হয় না। যেহেতু, জ্ঞানের ব্যবহারকে উৎপন্ন করিবার সামর্থ্য প্ৰদীপাদির নাই ; অতএব প্রদীপাদিতে অতিব্যাপ্তি হইতে পারে না—এরূপ শঙ্কা করা সঙ্গত হইবে না। কারণ, এরূপ বলিলে অনুব্যবসায় এবং ঈশ্বর-জ্ঞানে উক্ত জ্ঞান-ব্যবহার-হেতু-প্ৰকাশত্বরূপ লক্ষণের অতিব্যাপ্তি হইবে; যেহেতু, অনুব্যবসায় ও ঈশ্বর-জান উভয়ই জ্ঞান- ব্যবহারের কারণ এবং প্রকাশরূপ। অতএব উভয় অতিব্যাপ্তি হইল। আর যদি কেহ এইরূপ শঙ্কা করে যে, স্বপ্ৰকাশবাদীর মতে অনুব্যবসায় নামক কোন পদার্থই নাই, যাহাতে উক্ত অতিব্যাপ্তির উদ্ভাবন হইবে, অর্থাৎ, তাহা হইলে আর কোন দোষ হইল না ; কিংবা অনুব্যবসায় নামে একটি জ্ঞান থাকিলেও তাহাকে ব্যবসায়-জ্ঞানের ন্যায় পক্ষ-কোটিতে প্রবেশ করিয়া তাহাতেও স্বপ্রকাশ সাধন করা যাইবে; অর্থাৎ তাহা উক্ত হইলে অতিব্যাপ্তি হইতে পারে না, ইত্যাদি, তাহা হইলে এই অস্বরস প্রযুক্ত মূলে ‘কিঞ্চ প্রভৃতি দ্বারা দোষান্তর প্রদর্শন করা হইতেছে বুঝিতে হইবে। সে দোষটী এই, যথা- যে কোন বিশিষ্টজ্ঞান, সকলই বিশেষণ-জ্ঞানজন্য ও বিশেষণ-বিষয়ক—এইরূপ নিয়ম অনুভবসিদ্ধ ; যেমন, দেবদত্ত দগুবান্—এই জ্ঞানে বিশেষণ হইল দণ্ড। এই বিশিষ্ট জ্ঞানে যদি বিশেষণের ভান না হয়, অথবা এই বিশিষ্ট-জ্ঞান হইবার পূর্বে বিশেষণ-দন্তের জ্ঞান যদি না হয়, তাহা হইলে বিশিষ্ট-জ্ঞান হয় না, আর তাহা হইলে প্রদীপজ্ঞানের যে ব্যবহার, অর্থাৎ এই প্রদীপজ্ঞান’ এইরূপ যে শব্দ প্রয়ােগ, অথবা তাহার অনুব্যবসায়, তাহাতে প্রদীপ-প্রকাশটা কারণ হইয়াছে ; কারণ, ইহা প্রদীপজ্ঞান ইত্যাকার যে জ্ঞান, তাহা হইল বিশিষ্ট ব্যবহার। অতএব, ইহাতে প্রদীপটা বিশেষণ হইল। আর সেই জন্য তাহাকে কারণ বলিতে হইবে, এবং কারণ বলিলেই ‘জ্ঞানবিষয়ক ব্যবহার’ শব্দদ্বারা এই প্রদীপজ্ঞান” ইত্যাকারক জ্ঞানরূপ ব্যবহারও পাওয়া গেল ; আর তাহার কারণ প্রদীপও হইল বলিয়া তাহাতে অতিব্যাপ্তি স্থির হইল, অর্থাৎ “জ্ঞানব্যবহার-হেতু-প্রকাশ”ই যদি সুপ্রকাশের লক্ষণ হয়, তাহা হইলে প্রদীপটীও স্বপ্ৰকাশ-পদার্থ বলিয়া সিদ্ধ হইবে, অর্থাৎ পঞ্চম কল্পটী দুষ্ট হইয়া যায়। তাহার পর, আরও জিজ্ঞাস্য এই যে, লক্ষণে ব্যবহার-হেতুত্বটা প্রকাশের বিশেষণ অথবা উপলক্ষণ? বিশেষণ বলিলে জ্ঞানে সর্বদা ব্যবহারহেতুত্ব থাকা চাই। ফোন সময়ে থাকিয়া যাহা পদার্থের ব্যাবৰ্ত্তক হয়, তাহা উপলক্ষণ শব্দে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যাহা সর্বদা বৰ্তমান হইয়া বস্তুকে পদার্থান্তর হইতে ভিন্ন করিয়া দেয়, প্রথম পরিচ্ছেদ। নাপি ষষ্ঠঃ। স্বয়ং-প্রকাশ-সাধকানুমানাগমাদি-জন্য-জ্ঞানবিষয়- দেন লক্ষণস্যাসন্তবিত্বাৎ। তস্যাপ্যবিষয়ত্বে কথা-প্রবৃত্ত্যনুপপত্তেঃ। নাপি সপ্তমঃ। অবিষয়ত্বস্যৈবাসবেন নিরস্তাৎ। বিষয়ত্বশব্দেন কর্মবিব, ক্ষায়াং গুরুমতানুসারিণাম আত্মত্যতিব্যাপ্তেশ্চ, তস্য গ্রাহকতয়া সিদ্ধস্য অবিষয়ত্বেহপ্যপঝােতায়াঃ তৈরঙ্গীকারাৎ। নাপি অষ্ঠমঃ। প্রাচীন- ( তাৎপৰ্য)--তাহাই বিশেষণ ; সুতরাং, বিশেষণ-পক্ষে যে কালে ব্যবহার-হেতুত্ব নাই, সেই সময়ে বিশিষ্ট থাকে না, ইহা স্বীকাৰ্য্য হইবে; কিন্তু তাহা হইলে মুক্তি এবং প্রলয়-কালে আত্ম-স্বরূপজ্ঞানে কোন ব্যবহার-হেতুত্বরূপ বিশেষণ থাকে না, আর তজ্জন্য ব্যবহার-হেতুত্ব-বিশিষ্ট-প্রকাশকারপ এই লক্ষণের অব্যাপ্তি হইবে। দ্বিতীয় পক্ষে অর্থাৎ উপলক্ষণ পক্ষে জিজ্ঞাস্য এই যে, উপলক্ষিতত্ব কি উপ- শক্ষিতের ধর্ম অথবা স্বরূপ? ধর্মপক্ষে,সেই ধর্মটী উপলক্ষণ কিংবা বিশেষণ ? প্রথম পক্ষে অবস্থা হইবে, আর বিশেষণ-পক্ষে পূর্বোক্ত দোষ হইবে,অর্থাৎ উপলক্ষিতত্ব ধর্মটী যদি বিশেষণ হইল, তখন মুক্তি এবং প্রলয়ে আত্মাতে অব্যাপ্তি হইবে। এই জন্য উপলক্ষিতত্ব প্রকাশের স্বরূপ ইহা যদি বল—তাহা হইলে “নবাবহার- হেতুত্ব উপলক্ষিত” এই লক্ষণ দ্বারা জ্ঞানচী প্রকাশস্বরূপ,ইহা বুঝা যায় । আর তজ্জন্য লক্ষণের সিদ্ধি হইল না ; কারণ, লক্ষণটী লক্ষ্যের স্বরূপ হইলে,অর্থাৎ লক্ষণ লক্ষ্যের ধর্ম না হইলে তাহাকে লক্ষণই বলা যায় না। সুতরাং, স্বপ্রকাশের লক্ষণ নির্ণয়-কালে যদি তাহার লক্ষণ তাহার ধর্ম না হয়, তাহা হইলে জ্ঞানকে যাহারা জড় বলে, তাহারাও জ্ঞানের স্বরূপতা অঙ্গীকার করিল, অর্থাৎ এই স্থলে নূতন কি সিদ্ধ হইল ? সুতরাং, পঞ্চম কল্পটী স্বপ্রকাশের লক্ষণ হইতে পারে না। অনুবাদ-ষষ্ঠ কল্পও:হইতে পারে না; কারণ, স্বয়ংপ্রকাশত্ব-সাধক অনুমান এবং আগমজন্যজ্ঞানের বিষয় জ্ঞান হয়; অতএব, জ্ঞানবিষয়ত্বরূপ লক্ষণটী অসম্ভব-দোষগ্রস্ত হইল। যদি স্বয়ং-প্রকাশত্ব-সাধক অনুমান এবং আগমের বিষয়, জ্ঞান হয় না-এই কথা বল, তাহা হইলে “কথায়” প্রবৃত্তি হইতে পারে না। সপ্তম কল্পও বলিতে পার না ; কারণ, জ্ঞানাহবিষয়ত্ব’রূপ বিশেষণটী অসম্ভব হয়। বিষয়ত্ব” এই শব্দৰাৱা কৰ্ম্মত্ব অভিপ্রেত হইলে প্রভাকর মতাবলম্বীদিগের মতে আত্মাতে অতিব্যাপ্তিও হইবে। যেহেতু, তাহারা, জ্ঞানায় রূপে সিদ্ধ আত্মাতে নকৰ্ম্মরূপ বিষয়ত্ব না মানিলেও তাহার অপরােক্ষত্ব স্বীকার করিয়া থাকেন। অষ্টম কল্পেরও পূর্বোক্ত দোষ দ্বারা নিরাস্ত হইল। অখ্যাতি-বাদিমতে শুক্তির • ;
প্রত্যক্ত-প্রীপিকা। দোযানুযঙ্গাৎ।' শুক্তিরজতাদিসংসর্গেহখ্যাতিবাদিন অতিবাপেক্ষ। তস্য ব্যবহারবিষয়ত্বেহপি তৈজ্ঞানবিষয়তানঙ্গীকারাৎ। নাপি নমঃ। স্বপ্রতিবদ্ধব্যবহারে সজাতীয়পরানপেক্ষত্বস্য প্রদীপাদৌ ঘটাদৌ চ ভাবেনতিব্যাপ্তেঃ। সত্তয়া সজাতীয়ত্ববিবক্ষায়াং তু ব্যবহারস্যাপি সত্তয়া সজাতীয়দৃষ্টাদিজন্যতয়া তদপেক্ষত্বে লক্ষণস্য অসন্তুবিত্ব- সঙ্গাৎ। নাপি দশমঃ। অবেদ্যত্বেহনুমানাগােচরতয়া কথানবতার- প্রসঙ্গস্য দর্শিতত্বাৎ। অপরােক্ষব্যবহারবিষয়ত্বমিতি শব্দেন প্রত্যক্ষজ্ঞান- বিষয়ত্বস্য কঠোক্তত্বাৎ তদবিপরীতাবেষ্যত্বাভিধানে ‘মে মাতা বন্ধ্যা ইতি ব ব্যাঘাচ্চ। সুষুপ্তি প্রলয়মােক্ষেব্যাপ্তেশ্চ। তদা ব্যবহারস্যৈ- বাসবেন তদৃবিষয়তাভাবৎ। নাপি একাদশঃ। উক্ত ব্যবহার- যােগ্যতায়াঃ ধৰ্ম্মেত্বে অদ্বৈতবাদিনা অপসিদ্ধান্তাপাতাৎ। স্বরূপত্বে চ জ্ঞানস্বভাবস্যাত্মনাে ব্যবহারনিরূপণীয়ত্বাৎ সপ্রতিযােগিকত্বপ্রসঙ্গাৎ। তদেবং ন স্বপ্ৰকাশলক্ষণং পশ্যামঃ ৮ (অনুবাদ)-~~-সহিত রজতের যে সম্বন্ধ, তাহাতে অতিব্যাপ্তিও হয়। কারণ, শুক্তি- রজত সম্বন্ধের ব্যবহার-বিষয়ত্ব থাকিলেও জ্ঞান-বিষয়ত্ব তাহাদের অস্বীকার্য। নবম কল্প-প্রযুক্ত ব্যবহারে: সজাতীয় এবং স্ব-ভিন্ন যে পদার্থ, তাহার অপেক্ষা না থাকা-রূপ স্বপ্ৰকাশত্বটী প্রদীপাদি এবং ঘটাদিতে আছে। অতএব, এই লক্ষণেরও অতিব্যাপ্তি হইবে। অর্থাৎ এই জন্য নবমকল্পও হইতে পারে না। আর পূর্বোক্ত দোষ নিবারণের জন্য নবম কল্পে সত্তারূপ ধৰ্ম্মদ্বারা সাজাত্য স্বীকার করিলে জ্ঞান-ব্যবহারেও সত্তারূপ ধৰ্ম্মদ্বারা সজাতীয় যে অদৃষ্টাদি, তাহার অপেক্ষা আছে বলিয়া লক্ষণই অসম্ভব দোষগ্রস্ত হইবে। দশমকল্পও অনুপপন্ন হয়। কারণ, জ্ঞানটী অববদ্য—ইহা স্বীকার করিলে তাহাকে স্বয়ম্প্ৰকাশ-সাধক অনুমান এবং শব্দ-প্রমাণেরও অগােচর বলিতে হইবে। আর তাহা হইলে বিচারের উত্থাপনই হইতে পারে না। ইহা অবশ্য পূৰ্ব্বে কথিত হই- আছে। আরও একটি দোষ হইবে যে, অপরােক্ষব্যবহার-বিষয়ত্ব এইরূপ শব্দদ্বারা জ্ঞানটা প্রত্যক্ষজ্ঞানের বিষয় বলিয়া ইদানীং তদ্বিপরীহ অবেদ্যত্ব বলিলে “আমার মাতা বন্ধ্যা” এই বাক্যের ন্যায় ব্যাঘাত দোষ উপস্থিত হইবে। আর সুষুপ্তি, প্রলয় এবং মােক্ষে অব্যাপ্তিও হইবে। যেহেতু, সেই সময়ে ব্যবহার অসম্ভব, তখন ব্যবহারবিষয়ত্ব কি প্রকারে থাকিতে পারে ?
প্রথম পরিচ্ছেদ। অনুবাদ-একাদশ কল্পেরও এইরূপ অনুপপত্তি হয়। পূর্বোক্ত ব্যবহার-যােগ্য- ত্বকে ধৰ্ম্ম বলিলে অদ্বৈতমতে অপসিদ্ধান্ত হয়। কারণ, এই ধর্ম ব্ৰহ্মাতিরিক্ত হয়। এই জন্য উক্ত মােগ্যতাকে আত্মস্বরূপ বলিলে আন-স্বভাব আত্মা ব্যবহার নিরূপিত হইল; আর উজ্জন্য সপ্রতিযোগিকত্বের প্রসঙ্গ হয়, অর্থাৎ আ আর সবি- যমকত্বের আপত্তি হয়। অতএব, স্বপ্রকাশের নিৰ্দষ্ট লক্ষণ স্থির হয় না। তাৎপৰ্য্য-জ্ঞানাবিষয়ত্বরূপ ষষ্ঠ কল্পও প্রকাশের লক্ষণ হইতে পারে না । যেহেতু, জ্ঞানের স্বপ্রকাণত্ব-সাধক যে, অনুমান এবং আগম প্রমাণের উপন্যাস করা যাইতেছে, তাহা অনুপপন্ন হইবে। অর্থাৎ জ্ঞান যদি বেঙ্কই না হয়, তাহা হইলে তাহাতে স্বপ্ৰকাশত্ব-সাধনার্থ বিচারের প্রবৃত্তি হইতে পারে না। সপ্তম কল্পে -“জ্ঞানবিষয়ত্বে সতি’ এই যে নিষেধ করা হইতেছে, সেই জ্ঞান- বিষয়ব শব্দের কি অর্থ? বেদত্ব কিংবা জ্ঞান-কৰ্ম্মত্ব ? প্রথম পক্ষে অসম্ভব প্রদর্শন করা হইয়াছে ; দ্বিতীয়পক্ষে প্রভাকর মতে জ্ঞানাশ্ৰয়ত্বরূপে আত্মার সিদ্ধি হইয়া থাকে, জ্ঞানকর্মত্ব রূপে তাহার সিদ্ধি আর হয় না। তথাপি তন আত্মার অপরােক্ষত্ব আছে বলিয়া জ্ঞান-বিষয়ত্ব শব্দে জ্ঞান-কৰ্মত্বভাব বলিলে আত্মাতে জ্ঞানকর্মত্বা ভাব আছে বলিয়া অতিব্যাপ্তি হয়। এজন্য সপ্তম কল্প পরিত্যক্ত হইল। অষ্টম কল্প -স্ব প্রকাশের লক্ষণ “ব্যবহারবিষয়ত্বে সতি জ্ঞানবিষয়ত্ব ইহা বলিলে মুক্তিদশাতে জ্ঞানরূপ আত্মাতে ব্যবহার বিষয় অসম্ভব হয়, এবং তাহা স্বপ্রকাশ-সাধক অনুমান এবং আগম-জন্য জ্ঞানের বিষয় হ বলিয়া তাহার জ্ঞানবিষয়ত্বের সম্ভাবনা থাকে না,—ইহা ষষ্ঠ কল্পে কথিত হইয়াছে। আর ভ্ৰমস্থলে প্রভাকর জ্ঞানদ্বয় স্বীকার করেন, অর্থাৎ একটী 'ইদং হত্যাকারক ও অপরটা ‘জতম’ ইত্যাকারক জ্ঞান! ইহারা যথাক্রমে প্রত্যক্ষ ও স্মরণাত্মক। দোষপ্রযুক্ত এই জ্ঞানদ্বয়ের ভোদগ্ৰহ হয় না, এই জন্য সত্যরজত স্থলের ন্যায় মস্থলেও 'ইহা রজত এইরূপ শব্দ প্রয়ােগ এবং রজতার্থীর শুক্তিতে প্রবৃত্তি হয়। জ্ঞানদ্বয়ের মধ্যে কোনও জ্ঞান বাধিত নহে; তাহাতে ভ্রমত্ব এই যে-এই জ্ঞানদ্বয়টী বিপৰীত ব্যবহারকে উৎপাদন করে, কিন্তু কোন বিষয়ের বাধপ্রযুক্ত তাহারা ভ্রম নহে—এইরূপ প্রভা- কর মতানুসারিগণ অখ্যাতিবাদের উপপাদন করেন। তাহাদের মতে শুক্তি এবং বুজতের পরস্পর যে সম্বন্ধ, তাহা ভ্রমজ্ঞানের অর্থাৎ জ্ঞানয়ের অগােচর, পরন্তু শব্দ , প্রয়ােগরূপ কিংবা প্রবৃত্তি-নিবৃত্তিরূপ ব্যবহারের গােচর। আর তাহা হইলে শুক্তি- রজতসম্বন্ধ-হলে জ্ঞানবিষয়ত্বে সতি ব্যবহারবিষয়’ রূপ লক্ষণটী মাইল বলিয়া অতিব্যাপ্তি হইবে। অতএব, অষ্টম কল্প ঠিক নহে।
} প্রত্যক্তপ্রদীপিকা। (তাৎপৰ্য-নবম কল্পে-প্রদীপ কিংবা ঘটাদির ব্যবহারে স্বভিন্ন জ্ঞানের অপেক্ষা থাকিলেও জ্ঞান এবং প্রদীপটী ঘটাদির সজাতীয় নহে, এজন্য স্বজাতীয় যে পর, তাহা জ্ঞান এবং প্রদীপ হইল না; সুতরাং “স্বপ্রযুক্ত-ব্যবহারে স্ব-সজাতীয়- পরানপেক্ষত্ব আছে বলিয়া নবম কল্লোক্ত লক্ষণের অতিব্যাপ্তি হইতেছে। এই দোষ- নিবারণের জন্য সত্তারূপধৰ্ম্ম দ্বারা সক্ষণমধ্যে সাজাত্য নিবেশ করিলে সত্তারূপধর্মটী ঘটাদিতে যেরূপ থাকে,সেইরূপ জ্ঞানেও থাকিবে; অতএব জ্ঞান স্বাসজাতীয় হইল, আর-তদনপেক্ষত্বটী প্রদীপও ঘটাদিতে নাই বলিয়া অতিব্যাপ্তি হয় না—এই যদি বল, তাহা হইলে লক্ষণের অসম্ভব দোষ-হয়; কারণ জ্ঞানের ব্যবহারেও অদৃষ্টাদি কারণের অপেক্ষা আছে, অদৃষ্টাদি স্বভিন্ন হইয়া সত্তারূপধৰ্ম্মদ্বারা জ্ঞানের জাতীয় হইয়াছে ; অতএব সত্তারূপধৰ্ম্ম দ্বারা স্বজাতীয় যে পর অর্থাৎ, তদনপেক্ষত্ব কুত্রাপি থাকিল না। এজন্য নবম কল্পও ঠিক নহে। দশম কল্পের ঘটক অবেদ্যরূপ বিশেষণ কোন জ্ঞানে নাই; কারণ, তাহা হইলে বিচারের সম্ভাবনা হইতে পারে না -- ইহা পূর্বেই কথিত হইয়াছে। আরও একটী দোষ হয় যে, যদি কোন শব্দ দ্বারা উৎপন্ন জ্ঞানের বিষয় জ্ঞান না হয়, তাহা হইলে অপরােক্ষ-ব্যবহার-বিষয়” এই শব্দের উচ্চারণ করা ব্যর্থ হয়। আর যদি জ্ঞানকে জ্ঞানের বিষয় বলা যায়, তবে তাহাকে জ্ঞানের অবিষয় বলিলে ব্যাঘাত দোষ হইবে। সুষুপ্তি, প্রলয় এবং মােক্ষ-কালে ব্যবহার সর্বথা অসম্ভব, অতএব ব্যবহার-বিষয়ক ঘটিত লক্ষণের অব্যাপ্তি দোষও হইবে। সুতরাং এই কল্প ও ঠিক নহে। একাদশ কল্প-ব্যবহার-যােগ্যতা যদি অতিরিক্ত ধৰ্ম্ম হয়, তবে ব্ৰহ্মাতিরিক্ত যােগ্যতা নামক পদার্থান্তর আছে বলিয়া অদ্বৈতহানি হয়। যােগ্যতাকে জ্ঞান- স্বরূপ বলিলে ব্যবহার দ্বারা সেই জ্ঞানরূপ ঘােগ্যতার নিরূপণ করিতে হইবে । অতএব জ্ঞানরূপ আত্মার সপ্রতিযােগিকত্ব অর্থাৎ সংযােগদি সম্বন্ধের ন্যায় সসম্বন্ধিকপত্তি হইবে। যেমন, সম্বন্ধিদ্বয় ভিন্ন সংযােগাদির নিরূপণ হয় না, সেইরূপ আত্মারও ব্যবহার-ব্যতিরেকে নিরূপণ হইবে না। অর্থাৎ, জ্ঞানরূপ আত্মাও সংযােগদি পদার্থের ন্যায় নিয়ত অন্য পদার্থাধীন নিরূপনীয় হইবে; অথচ তাহা অভীষ্ট নহে। এইজন্য কোন রূপেই স্বপ্রকাশত্বের লক্ষণ হইতে পারে না। ফলকথা এই স্থির হইল যে, গ্রন্থারম্ভেই যে গ্রন্থকার স্বপ্ৰকাশশব্দের অর্থনির্ণয় ছলে স্বপ্রকাশের লক্ষণ বলিলেন, তাহার একটি স্বপ্রকাশের নির্দোষ লক্ষণ হইল না। যাহাহউক, এইবার আমরা উপসংহারচ্ছলে উক্ত একাদশটি লক্ষণ ও তাহার গুনটি একত্র করিয়া বুঝিতে চেষ্টা করিব। ৮ প্রথম পরিচ্ছে। প্রকাশলক্ষণ-বিচারের উপসংহার। ১। দেখ, স্বপ্রকাশ পদার্থের যে একাদশী লক্ষণ করা হইয়াছে, তাহার প্রথম লক্ষণটী হইল “স্বাসৌ প্রকাশশ্চেতি স্বপ্রকাশঃ”। ইহার অর্থ—যাহা “স্ব” তাহাই প্রকাশ; অর্থাৎ স্বপ্রকাশ শব্দে এমন একটা পদার্থকে বুঝায়, যাহার ধর্ম ‘স্বত্ব’ এবং প্রকাশত্ব’ উভয়ই হয়। এরূপ পদার্থ কি ? বেদান্তিগণ ইহাকে জ্ঞান বলেন। এখন বেদাত্তমতে ইহাই যদি স্বপ্রকাশের অর্থ হয়, তাহা হইলে একজন নৈয়ায়িক বলিতে পারেন যে, তাহা হইলে এতদ্বারা বেদান্তীরই অভিমত সিদ্ধ হয় না। কারণ, বেদান্তীর মত হইতেছে যে, জ্ঞানটী কখন জ্ঞানান্তর দ্বারা প্রকাশিত হয় না। যেমন, প্রদীপ-প্রকাশের জন্য প্রদীপান্তরের আবশ্যকতা হয় না, তােপ জ্ঞানের জন্য জ্ঞানান্তরের প্রয়ােজন নাই। অর্থাৎ, ঘট-প্রকাশের জন্য অয়ং ঘট” এইরূপ জ্ঞানের আবশ্যকতা আছে। “অয়ং ঘট” এইরূপ জ্ঞান না হইলে ঘটের কোনরূপ ব্যবহার হইতে পারে না। তদ্রুপ, ঘটজ্ঞানের ব্যবহারের জন্য জ্ঞানান্তরের আবশ্যকতা নাই। জ্ঞান উদিত হইলেই সে যাহাকে বিষয় করে, তাহার সে, যেরূপ প্রকাশক এবং ব্যবহারের কারণীভূত হয়, তদ্রুপ জ্ঞান নিজের ব্যবহারের জন্য অন্য জ্ঞানকে অপেক্ষা করে না। অন্য জ্ঞান না থাকিলেও জ্ঞান নিজের ব্যবহার-হেতু হয়। ইহাই হইল বেদান্তীর মত। এখন এই বেদান্তী যদি বলেন যে, জ্ঞানের স্বপ্রকাশত্ব অর্থ—যাহা স্ব, তাহাই প্রকাশ, অর্থাৎ স্ব-পদার্থ হইতে অভিন্ন যে প্রকাশ, তাহাই স্ব প্রকাশ, তাহা হইলে বেদান্তী, নৈয়ায়িকের মতানুসরণ করিয়া জ্ঞানকে জ্ঞানান্তরের প্রকাশ্য বলিলেও তাঁহার উক্ত লক্ষমমধ্যে কোন দোষ হইতে পারে না। কারণ, নৈয়ায়িক বলেন যে, জ্ঞানটী বিষয়াদিকে প্রকাশ করিলেও স্বয়ং আবার জ্ঞানান্তরের প্রকাশ হয়। যেমন, “অয়ং ঘট” এই জ্ঞানটী ঘটের প্রকাশক এবং অহং ঘটং জানামি” এই জ্ঞানের আবার বিষয় বা প্রকাশ হয়। সুতরাং, নৈয়ায়িকের এই জ্ঞানেও বেদান্তীর উক্ত প্রকাশ-লক্ষণী প্রযুক্ত হইতে পারে। কারণ, এই ‘অয়ং ঘট” জ্ঞানটী ঘটের প্রকাশক, অর্থাৎ প্রকাশরূপ, এবং তাহাতে স্বত্ব অর্থাৎ নিজত্বও আছে। যেহেতু, বস্তুমাত্ৰেতেই নিজত্ব আছে। অতএব, বেদান্তী যদি স্বপ্রকাশের লক্ষণ “শ্চাসৌ প্রকাশশ্চেতি” বলেন, তাহা হইলে তাহা নৈয়ায়িকেরও অভিমত হইবে, অথচ উভয় ‘মত যে অভিন্ন, তাহাও নহে। উভয় মতে প্রভেদ যথেষ্ট আছে। কারণ, নৈরারিক জ্ঞানকে বিষয়ের প্রত্যক্ত-প্রদীপিকা। প্রকাশক এবং জ্ঞানস্তরের প্রকাশ্য বলেন; কিন্তু, বেদান্তী জ্ঞানকে বিষয়ের প্রকাশক, কিন্তু জ্ঞানান্তরের অপ্রকাশ্য বলেন। অতএব, এই লক্ষণ দ্বারা নৈয়ায়িকের অভিমত পরপ্রকাশুত্ব-খণ্ডন-পূৰ্ব্বক বেদান্তীর স্বাভিমত অর্থাৎ জ্ঞানটী পরপ্রকাশ্য না হইয়া অন্যের প্রকাশক–এইরূপ যে স্বপ্রকাশ, তাহা সিদ্ধ হইল না। এজন্য, যথাশ্রত এই স্বপ্ৰকাশ-লক্ষণটী স্বপ্রকাশের প্রকৃত লক্ষণ হইতে পারে না। ২। এখন দেখ, স্বপ্ৰকাশ-পদার্থের যে দ্বিতীয় লক্ষণটী করা হইল, তাহার অর্থ কি? এবং তাহা কেন স্বপ্রকাশ-পদার্থের নির্দোষ লক্ষণ হইতে পারে না। দেখ, দ্বিতীয় লক্ষণটী হইতেছে “স্ব স্বয়মেব প্রকাশঃ স্বপ্রকাশঃ”। ইহার অর্থ-নিজের নিজেই যাহা প্রকাশ, তাহাই স্বপ্রকাশ। অর্থাৎ, যাহা নিজের প্রকাশের জন্য অন্য প্রকাশের অপেক্ষা করে না—নিজেই নিজেকে প্রকাশিত করে, তাহাই স্বপ্রকাশ। এখন দেখ, কিরূপে নৈয়ায়িক বলিতে পারেন, এই লক্ষণটীও বেদান্তীর অভিমত প্রকাশের লক্ষণ হইতে পারে না। কিন্তু, একথাটী বুঝিবার পূর্বে দেখা আবশ্যক, প্রথম লক্ষণের সহিত ইহার প্রভেদ কি হইল। ইহার প্রভেদ এই যে, প্রথম লক্ষণী ছিল পশ্চাসৌ প্রকাশশ্চেতি স্বপ্রকাশ, এবং এখন লক্ষণটী হইল স্বাস্থ্য স্বয়মেব প্রকাশঃ স্বপ্রকাশঃ।” সুতরাং, দেখা যাইতেছে যে, প্রথম লক্ষণে জ্ঞানটী পরপ্রকাশ্য কি না তাহার কোন উল্লেখই নাই, এবং তজ্জন্য তাহা জ্ঞানের স্বয়ংপ্রকাশ-পক্ষ এবং পর- প্রকাশকৃপক্ষ উভয় পক্ষেই প্রযুক্ত হইতেছিল, কিন্তু এই দ্বিতীয় লক্ষণে “এব” পদ দ্বারা জ্ঞানের পরপ্রকাশ্যত্বটী নিষেধ করা হইল। অর্থাৎ, প্রথম লক্ষণে যে কুটী হইয়াছিল, দ্বিতীয় লক্ষণে তাহাই সংশােধন করিয়া লক্ষণ করা হইল। অর্থাৎ এ লক্ষণে জ্ঞানের পরপ্রকাশ্যত্ব স্বীকারের অবকাশ রহিল না। অর্থাৎ, জ্ঞানের পর- প্রকাশ্যত্ব না মানিলেই এই লক্ষণটা যাইবে, নচেৎ নহে। ইহাই উভয় লক্ষণের মধ্যে প্রভেদ। এখন দেখ, নৈয়ায়িকের চক্ষে এ লক্ষণটাও বেদান্তীর অভিমত কেন হয় না। দেখ, বেদান্তী বলেন যে, জ্ঞান যেরূপ পরপ্রকাশ্য নহে, তদ্রুপ নিজেকেও সে প্রকাশ করে না, কিন্তু সে বিষয়ের প্রকাশক হয় মাত্র। বৌদ্ধমতে বলা হয় যে, জ্ঞান নিজেকে প্রকাশ করে। বেদান্তী কিন্তু তাহা বলেন না। কারণ, লােকে এইরূপ নিয়ম দেখা যায় যে, যে ক্রিয়ার যে কর্তা, সেই কা সেই ক্রিয়ার কৰ্ম্ম হয় না। অর্থাৎ, প্রক পরিচ্ছে। কর্তা ও কর্ম বিভিন্ন হয়। যেমন, “চৈত্রঃ গ্রামং গচ্ছতিলে গমন-ক্রিয়ার কর্তা যে চৈত্র, সে গমন-ক্রিয়ার কর্মভূত গ্রাম হইতে বিভিন্ন হয়, ইত্যাদি। যদি একটা ক্রিয়ার কর্তা ও কর্ম এক হয়, তাহা হইলে“চৈত্রঃ গ্রামং গচ্ছতি যেরূপ প্রয়ােগ হয়, তদ্রুপ চৈত্রঃ চৈত্রং গচ্ছতি” এইরূপ প্রয়ােগও হইতে পারিত। কিন্তু, যেহেতু তাহা হয় না, সেই হেতু, কর্তা ও কর্ম বিভিন্ন বলা হয়। জ্ঞান নিজের প্রকাশক হইলে, প্রকাশ-ক্রিয়ার কৰ্ম্মও জ্ঞান হয়, কর্তাও জ্ঞান হয়। এইজন্য বেদান্তী বলেন যে, জ্ঞান নিজের প্রকাশক হয় না। বৌদ্ধগণ জ্ঞানের স্বপ্রকাশ্যত্ব স্বীকার করেন। আর তজ্জন্য তাহার মতে এই দোষটী থাকে। এখন “স্বস্য স্বয়মেব প্রকাশ” এইরূপ স্বপ্রকাশের লক্ষণ করিলে জ্ঞানের পরপ্রকাশ্যত্ব নিরাকৃত হইলেও নিজের অভিমত স্বপ্রকাশ্য-রূপ যে বৌদ্ধমত, তাহা স্বীকার করিতে হয়। অর্থাৎ, এই দ্বিতীয় লক্ষণে বৌদ্ধমতের সহিত বেদান্তমতের অভেদ ঘটিয়া যায়। অথচ, তাহা বেদান্তীর অভিমত নহে। সুতরাং, দেখা যাইতেছে, স্বপ্ৰকাশ-পদার্থের “স্ব স্বয়মেব প্রকাশ স্বপ্ৰকাশ” এই দ্বিতীয় লক্ষণটী নির্দোষ লক্ষণ হইল না। যদি বল, এস্থলে লক্ষণটী ‘স্ব স্বয়মেব প্রকাশ স্বপ্রকাশঃ এইরূপ হওয়ায় “স্য পদের ষষ্টী বিভক্তি বশতঃ সম্বন্ধমাত্রেরই জ্ঞান হইবে; যেহেতু, ষষ্ঠী, সম্বন্ধ মাত্ৰেতেই বিহিত হয়। সুতরাং, অর্থ হইল-স্বসম্বন্ধী প্রকাশ হইতে অভিন্ন যে স্বয়ং-তাহাই স্বপ্ৰকাশ। এখন এস্থলে যদি এরূপ অর্থহইত যে—স্বকৰ্ম্মক প্রকাশ ক্রিয়া কৰ্ত্তা স্বয়ং, তাহা হইলে জ্ঞানের স্বপ্রকাশ্য অর্থাৎ জ্ঞানে কৰ্ম্ম-কর্তৃবিরােধ উপস্থিত হইত। যেহেতু, উক্ত যষ্ঠী-বিভক্তি-বশতঃ কেবল সম্বন্ধমাত্রেরই ভান হইয়াছে, এবং সেই হেতু, এ লক্ষণে উক্ত দোষ সিদ্ধ হইতে পারে না। এতদুত্তরে নৈয়ায়িক বলিবেন যে, বেদান্তী এভাবে “অ” পদের ষষ্ঠী বিভক্তির অর্থ করিয়া এ লক্ষণটীকে নির্দোষ করিতে পারেন না। কারণ, ললাকে কোন অর্থকে সামান্তরূপ অবগত হইয়া তাহার ব্যবহার-সম্পাদনে সমর্থ হয় না। বিশেষ জ্ঞান না হইলে তাহার ব্যবহার অসম্ভব হয়-তাহার জিজ্ঞাসার নিবৃত্তি হয় না। যেমন, “এই মনুষের সহিত এই ঘটের সম্বন্ধ আছে” বলিলে স্বামিত্ব প্রভৃতি কোন সম্বন্ধের যাবৎ জ্ঞান না হয়, তাবৎ তাহাকে এই বিষয় সবিশেষ জিজ্ঞাসা করিতে হয়, এবং যাবৎ তাহার এই বিশেষ জ্ঞান না হয়, তাবৎ তাহার ঘট-ব্যবহারে সামর্থ জন্মে না। অতএব, লােকে কোন অর্থকে সামান্যভাবে অবগত হইলে তাহার ব্যবহার-সম্পাদনে সামর্থ্য হয় না। সুতরাং, যদি এস্থলে “স্বস্য পদের ষষ্ঠী বিভক্তির অর্থ সম্বন্ধমাত্র হয়, তাহা হইলে হওকাশ-পদার্থের সক্ষণ জিজ্ঞাসা প্রত্যক্ত-প্রীপিকা। নিবৃত্তি হয় না ; অর্থাৎ স্ব-পদার্থের সহিত স্বয়ং-পদার্থের সম্বন্ধটা কিরূপ, তাহা বিশেষ ভাবে জানা গেল না। আর তাহা যাবৎ পৰ্য্যন্ত জানা না যাইবে, তাবৎ স্বপ্রকাশ- পদার্থের এইরূপ লক্ষণ বুলিলেও তদ্বারা কোন ফললাভ হইতে পারে না। এইজন্য, অবশ্য “স্ব” এবং “স্বয়ং” পদার্থের কৰ্ম্ম-কর্তৃ-ভাবরূপ সম্বন্ধটী স্বীকার্য। যদি বল, এস্থলে এই কর্মকর্তৃ সম্বন্ধীই কেন স্বীকাৰ্য্য? তাহার উত্তর এই যে, প্রকাশরূপ ক্রিয়ার সহিত তাহার সম্বন্ধী যে “স্ব” এবং “স্বয়ং” পদার্থ, তাহাদের এস্থলে অন্য সম্বন্ধ দূরবর্তীই হইয়া থাকে। ক্রিয়ার সহিত কৰ্ত্তা ও কর্মেরই সম্বন্ধ সৰ্ব্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ—ইহা সৰ্ববাদিসম্মত। অতএব, “স্ব স্বল্পমেব প্রকাশঃ স্বপ্রকাশঃ”—এই দ্বিতীয় লক্ষণটী নৈয়ায়িকের অভিমত পরপ্রকাশ্য হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিতে পারিল না। অর্থাৎ, এই দ্বিতীয় লক্ষণীও তজ্জন্য স্বপ্রকাশ-পদার্থের নির্দোষ লক্ষণ হইল না। ৩। এখন দেখা যাউক, স্বপ্ৰকাশ-পদার্থের যে তৃতীয় লক্ষণী করা হইল, তুহার অর্থ কি, এবং তাহা কেন নির্দোষ লক্ষণ হয় না ? দেখ, তৃতীয় লক্ষণটী হইতেছে “সজাতীয়প্রকাশা প্রকাশ্যত্ব”। ইহার অর্থ-সমান-জাতীয় প্রকাশের যাহা অপ্রকাশ্য, তাহাই স্বপ্রকাশ পদার্থ। যেমন, প্রদীপটী সমানজাতীয় যে প্রকাশ অথাৎ প্ৰদীপান্তর, তদ্দারা প্রকাশিত হয় না বলিয়া প্রদীপটীকে স্বপ্ৰকাশ বলা হয় ; তদ্রুপ জ্ঞানও নিজের সমান-জাতীয় যে প্রকাশ অর্থাৎ জ্ঞানান্তর, তদ্বারা প্রকাশিত হয় না বলিয়া জ্ঞানটী স্বপ্ৰকাশ-পদবাচ্য হইবে। এস্থলে সজাতীয়-পদটীর বিশেষ প্রয়ােজন আছে। ইহা দিলে লক্ষণটী প্রকাশপ্রকাশ্যত্ব মাত্র হইত, আর তজ্জন্ত বেদান্তীর নৈয়ায়িক মতের খণ্ডন পূর্বক নিজ অভিমত-স্থাপন সিদ্ধ হইত না, অর্থাৎ জ্ঞানের পরপ্রকাশ্যত্ব, নিবারণ-পূৰ্ব্বক স্বাভিমত স্বপ্ৰকাশ-লক্ষণ সিদ্ধ হইত না। কারণ, প্রকাশের অপ্রকাশ্য বলিলে প্রথম প্রকাশ-শব্দে প্ৰদীপকেও ধরিতে পারা যাইত। যেহেতু, প্রদীপও প্রকাশ-পদার্থ, এবং জ্ঞানটী জ্ঞানান্তরবেদ্য হইলেও প্রদীপরূপ প্রকাশের দ্বারা অপ্রকাশ্যই থাকে। সুতরাং, প্রকাশের অপ্রকাশ্য মাত্র বলিলে জ্ঞানী প্রদীপের অপ্রকাশ্য মাত্র হইয়া জ্ঞানান্তরের প্রকাশ্য হইতে কোন বাধা থাকিবে । অতএব, নৈয়ায়িকের অভিমত পর-প্রকাশ্যত্ব অংশটী এরূপ লক্ষণ দ্বারা খণ্ডিত হইল না। এইজন্ত, সজাতীয়-পদ দ্বারা তাহার সম্ভাবনা নিরাকৃত হইল। অর্থাৎ, প্রদীপটী জ্ঞানের সজাতীয় নহে বলিয়া প্রদীপ-প্রকাশের নিরাকরণে পরপ্রকাশ্যত্বও নিরাকৃত হইল বুঝিতে হইবে।
প্রথম পরিচ্ছেদ। এখন দেখা যাউক, ইহার সহিত প্রথম ও দ্বিতীয় লক্ষণের পার্থক্য কি হইল? দেখ— প্রথম লক্ষণটী হইল-সুশ্চাসৌ প্রকাশশ্চেতি স্বপ্রকাশ, দ্বিতীয় লক্ষণটী হইল-স্বস্য স্বয়মেব প্রকাশঃ স্বপ্রকাশ, তৃতীয় লক্ষণটী হইল—সজাতীয়প্রকাশাপ্রকাশ্য স্বপ্রকাশ। এখন তাহা হইলে দেখা যাইতেছে যে, এতদ্বারা প্রথম লক্ষণের অভিমতাংশ ‘পরপ্রকাশ্যত্ব’ এবং দ্বিতীয় লক্ষণের অনভিমতাংশ ‘স্বপ্রকাশ্যত্ব’ এই দুইটাই এতদ্বারা নিবারিত হইল; কারণ, যাহা সমান-জাতীয় প্রকাশের অপ্রকাশ্য হয়, তাহ পরের প্রকাশ্য যেমন হয় না, তেমনিই স্বপ্রকাশ্যও হয় না। এইবার দেখা যাউক, একজন নৈয়ায়িক, বেদান্তীর কথিত এই তৃতীয় লক্ষণী কি করিয়া বেদান্তীর অনভিমত বলিয়া প্রমাণিত করিয়া থাকেন। দেখ, লক্ষণটী হইল—“সজাতীয়প্রকাশাপ্রকাশ্যত্বই স্বপ্রকাশত্ব”। ওদিকে, বেদান্তী বলিয়া থাকেন যে, স্বপ্ৰকাশত্বটী জ্ঞানেরই কেবল আছে। প্রদীপের স্বপ্ৰকাশত্ব তাহাদের মতে স্বীকৃত হয় না। যদি প্রদীপ প্ৰদীপান্তর দ্বারা অপ্রকাশ্য হয়, তথাপি তাহা জ্ঞান দ্বারা প্রকাশ্যও হয় বলিয়া স্বপ্রকাশ পদবাচ্য হইতে পারে না। ভৌতিক-পদার্থে স্বপ্ৰকাশত্ব নাই। লােকে যে বলে প্রদীপটী স্বয়ংপ্রকাশ, তাহা প্রকৃতপক্ষে ভ্রান্তি মাত্র। সুতরাং, স্বপ্ৰকাশ কেবল জ্ঞানই হয়। এখন ইহাই যদি বেদান্তীর মত হইল, তাহা হইলে “সজাতীয়-প্রকাশ প্রকাশ্যত্বকে স্বপ্ৰকাশত্ব বলিলে প্রদীপটীও স্বপ্ৰকাশ-পদার্থ মধ্যে পরিগণিত হইয়া যাইবে। অথচ, প্রদীপটী বেদান্তমতে স্বপ্রকাশ হয় না। সুতরাং, এই লক্ষণে অতিব্যাপ্তি দোষ হইল, অর্থাৎ অলক্ষ্যে লক্ষণ যাইল। কারণ, প্রদীপটী প্রকাশ-পদার্থ এবং সজাতীয় প্রকাশান্তর যে প্রদীপ, তাহার দ্বারা প্রকাশ্য নহে, আর তজ্জন্ত তাহার অপ্রকাশ্য হইয়াছে। সুতরাং, এ লক্ষণটীও নির্দোষ লক্ষণ হইল না। আর যদি প্রদীপকে বেদান্তী স্বপ্ৰকাশই বলেন, সুতরাং, তাহাতে লক্ষণ যাইলে কোন দোষ হইবে না, অর্থাৎ ইহা যদি বেদান্তীর অভীষ্ট বলা হয়, তাহা হইলে ঘটেও ত স্বপ্ৰকাশত্ব সিদ্ধ হইবে, এবং তজ্জন্ত এই স্বপ্ৰকাশ-লক্ষণের অতিব্যাপ্তি হইবে। কারণ, ঘটটী জ্ঞান কিংবা প্রদীপ দ্বারা প্রকাশিত হয়, পরন্তু, জ্ঞান কিংবা প্রদীপ, ঘটের সমনজাতীয় পদার্থ নহে। ঘটে যেরূপ ঘটত্ব জাতি ।
প্রত্যক্তক-প্রদীপিকা। থাকে, সেইরূপ জ্ঞান এবং প্রদীপে যদি ঘটত্ব জাতি থাকিত, তাহা হইলে ঘটের সমান-জাতীয় জ্ঞান ও প্রদীপ হইত। আর তাহা হইলে সমান-জাতীয় প্রকাশ-শব্দ দ্বারা জ্ঞান এবং প্রদীপের গ্রহণ হইত; আর তাহার ফলে সজাতীয় প্রকাশের অপ্রকাশ্যত্ব ঘটে নাই বলিয়া ঘটকে স্বপ্রকাশ বলা যাইতে পারিত না। কিন্তু, যেহেতু, ঘটত্বজাতি জ্ঞান ও প্রদীপে নাই, অর্থাৎ ঘটটী জ্ঞান ও প্রদীপের সমান- জাতীয় পদার্থ নহে, সেই হেতু, “সজাতীয়-প্রকাশ” শব্দ দ্বারা জ্ঞান ও প্রদীপ ধরা গেল না, আর “সজাতীয়-প্রকাশ” পদে যাহাকে পাওয়া যাইবে, তাহার অপ্রকাশ্য ঘট হইল। অর্থাৎ, বিজাতীয়-প্রকাশ প্রদীপ ও জ্ঞানের প্রকাশ্য ঘট হইলেও তাহাতে সজাতীয়-প্রকাশের অপ্রকাশত্ব থাকিল। সুতরাং, ঘটেও এই স্বপ্রকাশ লক্ষণী যাইল। অতএব এই তৃতীয় লক্ষণীও নির্দোষ হইল না। যদি বল, ঘট ও প্রদীপ এবং জ্ঞান সমান-জাতীয়ও হইতে পারে। কারণ, সত্তারূপ জাতিও এই তিন পদার্থেই আছে। সুতরাং, সত্তাজাতি ধরিয়া ঘট, প্রদীপ ও জ্ঞান—এই তিনটী পদার্থই সমান-জাতীয় হইল, আর তাহা হইলে ঘটে সমান-জাতীয় প্রকাশের অপ্রকাশ্যত্বই থাকিল না। সুতরাং, ঘটে স্বপ্রকাশ লক্ষণটী যাইল না, অর্থাৎ প্রদর্শিত অতিব্যাপ্তিও হইল না। তাহা হইলে তদুত্তরে বলিতে হইবে যে, তাহা হইলে সজাতীয় এই বিশেষণটীই ব্যর্থ হইয়া যাইবে। কারণ, অসৎ অর্থাৎ ‘সত্তাহীন প্রকাশ এরূপ কোন পদার্থ যদি থাকিত, তাহা হইলে উক্ত সত্তাজাতি অবলম্বন করিয়া তাহার নিষেধ করা সম্ভবপর হইত। কিন্তু, যেহেতু তাহা নাই, সেই হেতু সজাতীয় পদটীই ব্যর্থ হয়। অতএব, বলিতে হইবে যে সজাতীয় পদুটী থাকায় সত্তারূপ জাতি অবলম্বন করিয়া ঘটের সাজাত্য গ্রহণ করা যায় না, আর তাহার ফলে ঘটে এই লক্ষণের অতিব্যাপ্তিই দৃঢ়ীকৃত হইল। সুতরাং, বলিতে হইবে এই তৃতীয় লক্ষণীও নির্দোষ লক্ষণ নহে। ৪। এইবার দেখা যাউক, বেদান্তীর অভিমত স্বপ্রকাশের চতুর্থ লক্ষণটা কি? এবং তাহা নৈয়ায়িকের নিকট কেন দুষ্ট বলিয়া বিবেচিত হয়? দেখ, এই চতুর্থ লক্ষণটী হইল—“স্বসত্তায়াং প্রকাশব্যতিরেক-বিরহিতত্ব।” ইহার অর্থ—নিজ সত্তায় প্রকাশের যে অভাব তাহার অভাব, অর্থাৎ, জ্ঞানের সত্তাকালে জ্ঞান অপ্রকাশিত না থাকাই স্বপ্ৰকাশত্ব। যেমন, ঘূটজ্ঞান যে ক্ষণে উদিত হয়, সেই ক্ষণে তাহা প্রমাতার নিকট অপ্রকাশিত ভাবে থাকে না ; কোন ব্যক্তি এরূপ বলে যে, তাহার কোন কিছুর জ্ঞান জন্মিয়াছে, কিন্তু প্রথম পরিচ্ছে। তাহা তাহার নিকট অপ্রকাশিত রহিয়াছে। এজন্য জ্ঞানটী জ্ঞাতসত্তক হইয়া থাকে। বেদান্তী ইহাকে অজ্ঞাতসত্তাক বলেন না। অর্থাৎ, অপ্রকাশমান অবস্থায় জ্ঞান থাকে—ইহা তাহারা স্বীকার করেন না। এখন দেখা যাউক, ইহার সহিত প্রথম তিনটী লক্ষণের প্রভেদ কি ? দেথ,- প্রথম লক্ষণটী-স্বাসৌ প্রকাশশ্চেতি স্বপ্রকাশ, দ্বিতীয় স্বস্থ স্বমেব প্রকাশঃ স্বপ্রকাশ, তৃতীয় সজাতীয়-প্রকাশাপ্রকাশ্য, এবং এই, চতুর্থ -স্বসভায়াং প্রকাশ-ব্যতিরেক-বিরহিতত্ব। এখন, তাহা হইলে ইহাতে প্রথম লক্ষণে আপতিত জ্ঞানের ‘পরকত্ব’ দোষটী আসিল না ; কারণ, যাহা ‘নিজ সত্তাতে প্রকাশের অভাবের অভাব স্বরূপ হয় অর্থাৎ নিজ সত্তাতে প্রকাশ স্বরূপ হয়—তাহা আর পরকাশ্য কি করিয়া হইবে ? জ্ঞানটী বেদ্য ইহা স্বীকার করিলে প্রথম ক্ষণে জ্ঞান উৎপন্ন হইবে, এবং দ্বিতীয় ক্ষণেই তাহাকে বেদ্য বলিতে হইবে। কারণ, যাহা যে ক্ষণে উদিত হয়, সেই ক্ষণেই তাহা কখনই বেদ্য হইতে পারে না। নিজে না থাকিলে সে কি করিয়া বেদ্য হইবে? এবং সেই উৎপত্তিকালে অন্য জ্ঞান উৎপন্ন হয় না বলিয়া, তাহা অন্ত জ্ঞানের বেদ্য হইতে পারে না। অর্থাৎ, বেদ্য বলিলে গ্রাহ্য বুঝায়, এবং তাহা হইলে সে যাহার দ্বারা গ্রাহ্য হইবে তাহা হইবে গ্রাহক। এখন গ্রাহ্য জ্ঞান ও গ্রাহক জ্ঞান একক্ষণে উৎপন্ন হইতে পারে না। যেহেতু, জ্ঞানদ্বয়ের যৌগপদ্য নিষিদ্ধ। এজন্য জ্ঞানকে বেদ্য বলিলে ইহাই স্বীকার করিতে হইবে যে, প্রথমক্ষণে জ্ঞান উৎপন্ন হইল, এবং তখন তাহার প্রকাশ নাই, কিন্তু দ্বিতীয়ক্ষণে সেই প্রথম জ্ঞান বিষয়ক যে জ্ঞানান্তর হইল, তদ্বারা সেই প্রথমক্ষণােৎপন্ন জ্ঞান প্রকাশিত হইল। জ্ঞানের বেদ্যত্ববাদী অর্থাৎ নৈয়ায়িককে এইরূপ স্বীকার করিতে হইবে। আর তাহা হইলে অনবস্থা দোষ হইবে। অর্থাৎ, সেই দ্বিতীয় জ্ঞানের প্রকাশের জন্য তৃতীয় জ্ঞান আবশ্যক হইবে, ইত্যাদি প্রকার হইবে। এস্থলে বেদ্য-পক্ষে জ্ঞানের সত্তা থাকে,কিন্তু তাহা অপ্রকাশ-স্বরূপ থাকে,আর যদি এই চতুর্থ পথে স্বপ্রকাশের লক্ষণ করা যায়, তাহা হইলে কোন কালেই জ্ঞান অপ্রকাশ নহে—ইহা প্রতিপন্ন হইবে । আর তাহার ফলে জ্ঞানের বেদত্ব নিরস্ত হইবে। সুতরাং, প্রথম লক্ষণে আপতিত জ্ঞানের পরপ্রকাশ্যত্ব দোষটী চতুর্থ লক্ষণে আসিল না । ঐরূপ দেখ, দ্বিতীয় লক্ষণে আপতিত জ্ঞানের বৌদ্ধগণসম্মত প্রকাশ্য দোষটা আর এ লক্ষণে আসিবে না। কারণ, নিজের সন্তাতে যাহার প্রকাশের অভাব নাই ২৪ প্রত্যক্তত্ব-প্রদীপিকা। এইরূপ এই চতুর্থ লক্ষণী হওয়ায় নিজে নিজের প্রকাশক ইহা ত বলা হইল না। অভাব ধারায় সে যে অপ্রকাশ থাকে না—তাহাই বলা হইল, তাহার প্রকাশকই ত ঘােষণা করা হইল না। যেমন, “লাল নহে বলিলে “কাল” কি “সবুজ” প্রভৃতি কিছুই বলা হয় না, এস্থলেও তদ্রুপ বুঝিতে হইবে। সুতরাং, দ্বিতীয় লক্ষণে আপতিত বৌদ্ধগণসম্মত জ্ঞানের স্বপ্রকাশ্য দোষটী এই চতুর্থ লক্ষণে প্রবিষ্ট হইল না। ঐরূপ আবার দেখ, তৃতীয় লক্ষণে আপতিত প্ৰদীপাদি প্রকাশ-পদার্থে এবং ঘটাদি অপ্রকাশ-পদার্থে অতিব্যাপ্তি দোষটী এই চতুর্থ লক্ষণে হইতে পারে না। কারণ, নিজের সত্তাতে যাহার অপ্রকাশ নাই—এইরূপ এই চতুর্থ লক্ষণটী হওয়ায়, বুঝাইল যে, প্রদীপ কিম্বা ঘটাদির সত্তা অপ্রকাশিত অবস্থাতে থাকে বলিয়া তাহা স্বপ্রকাশ পদবাচ্য হইল না। যদ্যপি প্রদীপের সকালে প্রদীপ অপ্রকাশিত থাকে না, তথাপি তাহার সত্তা জ্ঞানরূপ-প্রকাশের নিকট কখন কখন অপ্রকাশিত থাকে। কারণ, গৃহাভ্যন্তরে প্রদীপ আছে অথচ আমি তাহাকে জানি না—এরূপ ত সম্ভব হইয়া থাকে। ঐরূপ ঘট-পক্ষেও একই কথা হইতে পারে। অতএব, নিজের সত্তাতে অপ্রকাশ নাই—বলায় স্বপ্ৰকাশ-পদে ঘট বা প্রদীপকে বুঝাইল না, অর্থাৎ তৃতীয় লক্ষণে আপতিত উক্ত অতিব্যাপ্তি দোষটী এ লক্ষণে হইল না। ইহাই হইল প্রথমাদি তৃতীয় লক্ষণের সহিত এই চতুর্থ লক্ষণের প্রভেদ। এইবার দেখা যাউক, নৈয়ায়িকের বিচারে ইহা বেদান্তসম্মত স্বপ্রকাশের লক্ষণ কেন নহে ? দেখ, এই চতুর্থ লক্ষণটী হইতেছে—“স্বসত্তায়াং প্রকাশ-ব্যতিরেক-বিরহিতত্ব।” কিন্তু, বেদান্তমতে বলা হয় যে, জ্ঞানই কেবল স্বপ্রকাশ, সুখ-দুঃখাদির স্বপ্রকাশ নাই। এখন যদি নিজের সত্তাতে অপ্রকাশের অভাবই স্বপ্রকাশের লক্ষণ হইল, তাহা হইলে দেখ, সুখ-দুঃখাদিতেও এই লক্ষণটী যাইবে। কারণ, সুখ ও দুঃখাদি যখন উৎপন্ন হয়, তখন তাহাও জ্ঞানের ন্যায় প্রমাতার নিকট অপ্রকাশমান অবস্থায় থাকে না। যেরূপ, জ্ঞান জন্মিলেই ‘আমি জানি না এরূপ ব্যবহার হয় না, সেইরূপ মুখাদি জন্মিলেই তাহা বােধ হয় না-এরূপ সম্ভব হইতে পারে না। সুখ হইলেই তাহা প্রকাশিত হইয়া পড়ে। সুতরাং, জ্ঞানের প্রকাশ্যত্ব যদি বেদান্তের অভিমত হয়, তাহা হইলে এই লক্ষণে সুখাদিতে অতিব্যাপ্তি দোষ হইবে। এতদ্বারা বলা হইল যে, বেদান্তীর অনভিমত যে জ্ঞানের পরপ্রকাশ্যত্ব এবং স্বপ্রকাশ্য, তাহাদের নিরাস হইলেও এবং প্রদীপ ও ঘটাদিতে স্বপ্রকাশের লক্ষণের গতিরােধ করিলেও নৈয়ায়িক-সম্মত আত্মধৰ্ম্ম যে সুখ দুঃখাদি, তাহা হইতে প্রকাশ প্রথম পরিচ্ছেদ। শ জ্ঞানকে এই লক্ষণ দ্বারা পৃথক্ করিয়া বুঝিতে পারা গেল না । লক্ষণের প্রয়ােজন- অপর হইতে লক্ষ্যকে পৃথক্ করিয়া দেওয়া,তাকিন্তু এস্থলে হইল না। কারণ, যে লক্ষণ দ্বারা তুমি লক্ষ্য স্বপ্রকাশকে অপর হইতে পৃথক্ করিতেছে, তাহা লক্ষ্য মাত্র- বৃত্তি না হইয়া অপর সুখাদিতেও প্রযুক্ত হইল। সুতরাং, এই চতুর্থ লক্ষণীও নির্দোষ হইল না। ৫। এইবার দেখা যাউক, স্বপ্রকাশের উক্ত পঞ্চম লক্ষণটী নৈয়ায়িকের চক্ষে কেন বেদান্ত সম্মত নহে বলিয়া বিবেচিত হয় । দেখ লক্ষণটী হইল-স্বব্যবহার-হেতু-প্রকাশত্ব। ইহার অর্থ—নিজের ব্যবহারে “হেতু” যে প্রকাশ পদার্থ--তাহাই স্বপ্রকাশ, অর্থাৎ নিজের ব্যবহারের হেতু যে প্রকাশ, তাহা হইতে যাহা অভিন্ন, তাহাই স্ব প্রকাশ। দেখ, যে কোন বস্তুর ব্যবহার হয়, সর্বত্র তাহার জ্ঞান অবশ্য আবশ্যক হইয়া থাকে। যেমন, ঘটের জ্ঞান যদি না হয়, তাহা হইলে তাহার ব্যবহার হয় না। এই ঘট-ব্যবহারের কারণ যে ঘট-জ্ঞান, তাহা ঘাট হইতে ভিন্ন হয়। কারণ, ঘট হইল দ্রব্য, এবং জ্ঞান হইল গুণ, অর্থাৎ নৈয়ায়িকমতে ইহা আত্মধৰ্ম্ম। অতএব, তাহাদের অভে অসম্ভব। কিন্তু, জ্ঞানের ব্যবহার অর্থাৎ “এই জ্ঞান” ইত্যাদি যে শব্দ-প্রয়ােগ তাহা সম্ভব। তাহার কারণ, যাহা প্রকাশ, তাহা জ্ঞান ভিন্ন অন্য কিছু নহে, তাহা নিজেই হইয়া থাকে। অর্থাৎ জ্ঞানরূপ প্রকাশটী নিজেই নিজের ব্যবহারে কারণ হর। ইহাই হইল পঞ্চম লক্ষণের অর্থ। এইবার দেখা যাউক, ইহার সহিত প্রথমাদি চারিটা লক্ষণের প্রভেদ কিছু আছে কি না ? দেখ- প্রথম লক্ষণটা --স্বাসৌ প্রকাশশ্চেতি স্ব প্রকাশঃ, দ্বিতীয় স্বস্ত স্বমেব প্রকাণঃ স্বপ্ৰকাশঃ, তৃতীয় সজাতীয়প্রকাশাপ্রকাশ্যত্ব, চতুর্থ --স্বসত্তায়াং প্রকাশব্যতিরেকবিহিতত্ব। এবং এই পঞ্চম -স্বব্যবহার-হেতু-প্রাশত্ব। এখন, তাহা হইলে ইহাতে প্রথম লক্ষণে আপতিত জ্ঞানের প্যপ্রকাশ্য দোষটা আসিল না। কারণ, যাহা নিজের ব্যবহারহেতু প্রকাশরূপ পদার্থ হয়, তাহা পর- প্রকাশ্য কেন হইতে যাইবে ? পদ্মপ্রকাশ্য হইলে নিজের ব্যবহারে কারণীভুত প্রকাশরূপ নিজে হইতে পারে না, তাহা পরেই হইয়া থাকে। যাহা প্রকাশক হয়, তাহাই কারণ হয়। যেমন,ঘট-ব্যবহারে করণীভূত যে প্রকাশ—অর্থাৎ ঘট-জ্ঞান,তাহ। ৪ প্রত্যক্ত-প্রদীপিকা। ঘট হইতে পৃথকই হয়। প্রকৃতস্থলেও ঘটের স্থায় জ্ঞানকেও বেদ্য বলিলে জ্ঞানটী নিজ ব্যবহারের কারণীভূত প্রকাশ স্বরূপ যে জ্ঞান,তাহা হইতে ভিন্ন হইবে। অর্থাৎ, নিজে প্রকাশাভিন্ন হইবে না। আর লক্ষণীও ঐরূপই হইয়াছে। সুতরাং, প্রথম লক্ষণে আপতিত নৈয়ায়িকসম্মত জ্ঞানের পরপ্রকাশ্যত্ব দোষটী আর এই পঞ্চম লক্ষণে আসিল না । এইবার দেখ, দ্বিতীয় লক্ষণে আপতিত বৌদ্ধসম্মত স্বপ্রকাশ্যরূপ দোষটীও এই পঞ্চম লক্ষণে আসিবে না। কারণ, এস্থলে স্বপ্রকাশ অর্থ--নিজের ব্যবহারের হেতুভূত প্রকাশরূপ বলা হইয়াছে, নিজের প্রকাশের হেতুভূত প্রকাশরূপ বলা হয় নাই। প্রকাশ ও ব্যবহার এক পদার্থ নহে। সুতরাং, দ্বিতীয় লক্ষণের দোষটী এস্থলে আর আসিল না। ঐরূপ তৃতীয় লক্ষণে আপতিত প্ৰদীপাদি প্রকাশ-পদার্থ এবং ঘটাদি অপ্রকাশ। পদার্থে অতিব্যাপ্তিরূপ দোষটীও এই পঞ্চম লক্ষণে হইতে পারে না। কারণ, এই লক্ষণটী হইল—নিজ ব্যবহারের হেতু প্রকাশাভিন্নত্ব। এখন তাহা হইলে বলা হইল যে, প্রদীপ, সজাতীয় প্রকাশের অপ্রকাশ্য হইলেও স্বব্যবহার-হেতু প্রকাশের অভিন্ন হইল না। কারণ, প্রদীপাদির ব্যবহার “ইহা প্রদীপ” ইত্যাকার শব্দ-প্রয়ােগ প্রভৃতি। তাহার কারণ, প্রদীপ-জ্ঞানই হইবে। সেই জ্ঞান হইতে প্রদীপ অভিন্ন হইল না। ঐরূপ ঘটও বুঝিতে হইবে। সুতরাং, দেখা গেল যে, উক্ত তৃতীয় লক্ষণ- সংক্রান্ত দোষ দুটী এই পঞ্চম লক্ষণে আসিল না। ঐরূপ চতুর্থ লক্ষণে আপতিত যে সুখদুঃখাদিতে অতিব্যাপ্তি দোষ, তাহাও এই লক্ষণে ঘটিল না। কারণ, এই লক্ষণটী হইয়াছে—নিজের ব্যবহারের হেতু প্রকাশ হইতে যাহা অভিন্ন তাহাই স্বপ্রকাশ। সুখদুঃখ কিন্তু নিজের ব্যবহারহেতু যে প্রকাশ, তাহা হইতে অভিন্ন হয় না, প্রত্যুত ভিন্নই হইয়া থাকে। অবশ্য ইহা সত্য যে, মুথসত্তাকালে সুখ অপ্রকাশিত থাকে না, কিন্তু তাই বলিয়া তাহা প্রকাশের সহিত অভিন্নরূপও হয় না। সুখদুঃখটী বিষয় এবং তাহার জ্ঞানটী হয় বিষয়ী। বিষয় ও বিষয়ী কখন এক হইতে পারে না। জ্ঞানের ব্যবহারে কারণীভূত প্রকাশ কিন্তু জ্ঞানই হয়। সুতরাং, দেখা গেল—পুর্বোক্ত চতুর্থ লক্ষণে আপতিত সুখদুঃখাদিতে অতিব্যাপ্তিরূপ দোষটী আর এই পঞ্চম লক্ষণে ঘটিল না। এইবার দেখা যাউক, এই পঞ্চম লক্ষণে নৈয়ায়িকের চক্ষে এমন কি দোষ ঘটে যে, ইহা বেদান্তীর অভিমত প্রকাশের লক্ষণ হইতে পারে না। দেখ, বেদান্তী বলেন--যে, জ্ঞানমাত্রই কেবল স্বপ্রকাশ, প্রদীপাদি পদার্থের প্রথম পরিচ্ছে। স্বপ্ৰকাশব্দ নাই। এখন, স্বপ্রকাশের লক্ষণ যদি হয়-স্বব্যবহার-হেতু-প্রকাশ, তাহা হইলে এই লক্ষণটী প্রদীপেও প্রযুক্ত হইতে পারে। যদ্যপি প্রদীপ-বিষয়ক শব্দ-প্রয়ােগরূপ ব্যবহারে কারণীভুত যে প্রদীপ-জ্ঞান-রূপ প্রকাশ, তাহার অভেদ প্রদীপে নাই, তথাপি ব্যবহার যে কেবল শব্দ-প্ৰয়ােগাত্মকই হইয়া থাকে,তাহার এমন কোন নিয়ম নাই। ব্যবহার অনেক রূপই হইয়া থাকে। যথা—প্রদীপের প্রত্যক্ষাত্মক জ্ঞান, অথবা তাহার গ্রহণ বা পরিত্যাগ প্রভৃতি। ইহারাও “প্রদীপ এইরূপ শব্দ-প্রয়ােগের ন্যায় ব্যবহার-বিশেষ। সুতরাং, শব্দ-প্রয়ােগ-রূপ ব্যবহারে প্রদীপটী কারণ না হইলেও প্রদীপের প্রত্যক্ষাত্মক জ্ঞান এবং তাহার আদান-প্রদানাদি ব্যবহারে প্রদীপ ত কারণই হয়। সুতরাং, প্রদীপে স্বব্যবহারহেতুত্ব এবং প্রকাশ উভয়ই পাওয়া গেল। লক্ষণমধ্যে যে ব্যবহার-শব্দ প্রযুক্ত হইয়াছে, তাহা হইতে যে, শব্দ-প্রয়ােগ-মাত্র ব্যবহারই গ্রহণ করা যাইবে, অন্য কোনরূপ ব্যবহার গ্রহণ করা হইবে না—এরূপ কোন নির্দেশ করা হয় নাই। লক্ষণমধ্যে যে ব্যবহার-শব্দ রহিয়াছে, তাহা ব্যবহার-সামান্ত-মত্রি-বােধক। সুতরাং, তারা প্রদীপের উক্ত অন্ত- বিধ ব্যবহার যে গৃহীত হইবে না, তাহার কোন হেতু নাই। আরও দেখ, প্রকাশ শব্দ দ্বারা যদি জ্ঞান-মাকেই বুঝাইত, অর্থাৎ প্রকাশ-শব্দ যদি এইজন্য জ্ঞানমাত্রের বাচক বলিয়া গৃহীত হইত, তাহা হইলেও স্বপ্ৰকাশ-লক্ষণের প্রদীপে অভিব্যাপ্তি হইত না। কারণ, প্রদীপে স্বব্যবহারহেতুত্ব থাকিলেও প্রকাশত্ব নাই, অর্থাৎ প্রকাশ শব্দ বাচ্য জ্ঞানত্ব নাই। কিন্তু, লােকে প্রকাশ-শব্দের যে কেবল জ্ঞানেই প্রয়ােগ দেখা যায়, তাহা নহে। প্রকাশ-শব্দে সূৰ্য্য-প্রকাশ, প্রদীপ-প্রকাশ প্রভৃতি নানাবিধ প্রকাশই বুঝায়। সুতরাং, জ্ঞান যেরূপ প্রকাশ, প্রদীপও সেইরূপ একটী প্রকাশ- বিশেষই হইল। অতএব, প্রদীপে স্বব্যবহারহেতু ও প্রকাশরূপত্ব এতদুভয়ই থাকিল, এবং তজ্জন্ত এই পঞ্চম লক্ষণটীর প্রদীপাদিতে অতিব্যাপ্তি-দোষ দুর্নিবাৰ্য্য হইল। অর্থাৎ, তৃতীয় লক্ষণে যে দোষ হইয়াছিল, এই লক্ষণে প্রকারান্তরে সেই দোষই আসিয়া উপস্থিত। যদি বল, কি করিয়া তৃতীয় লক্ষণের দোষটী এই লক্ষণে প্রকারান্তরে হইল ? তাহা হইলে স্মরণ কর—যে, তৃতীয় লক্ষণী ‘সজাতীয়প্রকাশা প্রকাশ্যত্ব ছিল বলিয়া এবং প্রদীপ সজাতীয় প্ৰদীপান্তর হইতে প্রকাশিত হয় না বলিয়া লক্ষণের অতিব্যাপ্তি হইয়াছিল, এবং ঘটেও সেই একই কথা উপস্থিত হইয়াছিল। এখন কিন্তু, স্বব্যবহারহেতু-প্ৰকাশত্ব তাহাতে থাকায় অতিব্যাপ্তি প্রদর্শিত হইল। প্রভেদ কেবল প্রকাশ ও ব্যবহার এই দুইটী সামান্যার্থক শব্দের অর্থে।
২ প্রত্যক্তত্ব-প্রদীপিকা। এখন যদি বল যে, এস্থলে স্বব্যবহার-শব্দে যে-কোন পদার্থের ব্যবহার বুঝায় , কিন্তু জ্ঞান-ব্যবহারই এস্থলে লক্ষ্য। আর তাহা হইলে এই লক্ষণটী হইল “জ্ঞানব্যবহারের কারণীভূত যে প্রকাশ, তাহাই হইল স্বপ্রকাশ”। সুতরাং, প্রদীপ-ব্যবহারের কারণীভূত প্রকাশটী প্রদীপরূপ প্রকাশ হইলেও জ্ঞানব্যবহারের কারণীভূত যে প্রকাশ, তাহা প্রদীপরূপ প্রকাশটী হইল না। কারণ, প্রদীপাদি জ্ঞানের প্রকাশক হয় না, জ্ঞানই প্রদীপের প্রকাশক হয়। সুতরাং, প্রদীপে এই লক্ষণের অভিব্যাপ্তি হইল না । ইহার উত্তরে তাহা হইলে বলিতে হইবে যে, তাহা হইলে অনুব্যবসায়ে এই লক্ষণের অভিব্যাপ্তি হইবে। আর তজ্জন্য এ লক্ষণের ঐরূপ অর্থ ঠিক হইতে পারে না। কারণ, দেখ “ঘটমহং জানামি” ইত্যকারক অনুব্যবসায়াত্মক যে জ্ঞান, তাহাকে স্বপ্রকাশ না মানিলেও, অর্থাৎ তাহাও অন্য জ্ঞানের প্রকাশ্য বলিলেও সেই ব্যবসারাত্মক যে “অং ঘটঃ” ইত্যাকারক জ্ঞান,তাহার যে ব্যবহার—যথা “ইদং ঘটজ্ঞান” এইরূপ শব্দ-প্রয়ােগ, তাহার কারণ হইবে অনুব্যবসায়ই। সুতরাং, জ্ঞানব্যবহারের হেতু যে প্রকাশত্ব, তাহা অনুব্যবসায়ে আসিয়া উপস্থিত হইল। প্রকাশত্ব অনুব্যবসায়েও আছে, ইহা সৰ্ববাদিসম্মত। সুতরাং, এরূপে অনুব্যবসায়ে য়ে অতিব্যাপ্তি হইবে, তাহা নিবারণের উপায় নাই। আর যদি বলযে, অনুব্যবসায়ই আমার মতে নাই, আমি জ্ঞানের স্বপ্রকাশ বাদী, তাহা হইলে তােমার প্রদর্শিত উক্ত অতিব্যাপ্তি ঘটিল না, ইত্যাদি। তাহার উত্তরে তাহা হইলে বলিতে হইবে যে, পুনরায় প্রকারান্তরে প্রদীপেই অতিব্যাপ্তি হইবে। কারণ, বিশিষ্ট জ্ঞানমাত্রই যেমন বিশেষণজ্ঞানজন্ত হয়, তদ্রুপ বিশেষণ-বিষয়কও হয়—ইহা সৰ্ববাদিসম্মত। যথা, দণ্ডী দেবদত্ত, ইত্যাদি স্থলে বিশেষণ-দণ্ডের জ্ঞান যদি পূৰ্ব্বে না হয়, তাহা হইলে বিশিষ্ট-দেবদত্তের জ্ঞান হইতে পারে না, এবং সেই বিশিষ্ট জ্ঞানটী যদি দণ্ডকে বিষয় না করে, তাহা হইলেও তাহা বিশিষ্ট-জ্ঞান হইবে না। অতএব, বিশিষ্ট-জ্ঞান মাত্রই বিশেষণ-বিষয়ক হয়। এখন “ইদং প্রদীপজ্ঞান” ইত্যাকারক যে প্রদীপ-জ্ঞানের জ্ঞান, তাহাও বিশিষ্ট-জ্ঞান হইবে। কারণ, তাহাতে বিশেষ হইল প্রথম জ্ঞান, এবং বিশেষণ হইল প্রদীপ। অতএব, “প্রদীপজ্ঞানমিদং” ইত্যাকার যে জ্ঞান ইহা হইল বিশিষ্ট-জ্ঞান। এই “প্রদীপজ্ঞানমিদং জ্ঞানের বিষয়ভূত যে জ্ঞান, তাহাতে বিশেষণ হইল প্রদীপ, এবং সেই প্রদীপ-বিষয়ক এই জ্ঞানটী হওয়ায়, অর্থাৎ প্রদীপজ্ঞানকে যেরূপ এই জ্ঞানটা বিষয় করে, তদ্রুপ সেই জ্ঞানের বিশেষণীভূত প্রথম পরিচ্ছেদ। প্রদীপকেও বিষর করে। অতএব, এস্থলে জ্ঞানব্যবহার-শব্দে প্রদীপ-জ্ঞানের জ্ঞানরূপ ব্যবহারকে গ্রহণ করিয়া সেই ব্যবহারের হেতু যে প্রকাশ, তাহা প্রদীপই হইবে। যেহেতু, এই প্রদীপ-বিষয়ক জ্ঞানে প্রদীপরূপ বিষয়টী কারণ। অতএব, জ্ঞানব্যবহারহেতুপ্রকাশিত্বই স্বপ্রকাশত্ব বলিলেও “প্রদীপজ্ঞানমিদ” ইত্যাকারক প্রদীপজ্ঞান-বিষয়ক ব্যবহারে কারণীভূত যে প্রকাশরূপত্ব, তাহা প্রদীপে থাকে বলিয়া প্রদীপে অতিব্যাপ্তি হইবে। সুতরাং, দেখা যাইতেছে “স্বব্যবহারহেতুপ্রকাশরূপত্ব”রূপ স্বপ্ৰকাশক্ষণকে যদি জ্ঞানব্যবহারহেতুপ্রকাশরূপ অর্থ করা যায়, এবং অনুব্যবসায়কে যদি অস্বীকার করা যায়, তাহা হইলেও এই পঞ্চম লক্ষণে অতিব্যাপ্তিই হইবে। আরও দেখ, এ লক্ষণে অন্ত দোষও আছে। দেখ, এই যে ব্যবহারহেতুত্ব এবং প্রকাশত্ব একত্র পঠিত হইতেছে, ইহাদের হইতেছে, ইহাদের মধ্যে ব্যবহার-হেতুত্বটী প্রকাশের বিশেষণ কিংবা উপলক্ষণ ? দেখ, বিশেষণ অর্থ-যাহা একের ধর্ম হইয়া অপরের সহিত সেই ধৰ্ম্মীকে পৃথক্ করিয়া দেয়—অর্থাৎ যাহাকে বিশেষণ অপর হইতে পৃথক্ করিয়া দিবে, তাহাতে সেই বিশেষণের অস্তিত্ব সৰ্ব্বদা থাকা চাই, নচেৎ তাহা বিশেষণ নহে। যেমন কৃষ্ণবর্ণ দেবদত্ত। উপলক্ষণ অর্থ-ঐ বিশেষণের মত ধর্মকেই বুঝায় বটে, কিন্তু তাহা সর্বদা ধৰ্ম্মীতে থাকে না, কোনও কালে ভাহ থাকিলেই হইল। যেমন, কাক যেখানে বসিয়াছে,সেই দেবদূত্তের গৃহ বলিলে কাকটী হয় দেবদত্তের গৃহের উপলক্ষণ। এখন যদি ব্যবহারহেতুত্বকে প্রকাশের বিশেষণ বল, তাহা হইলে সর্বদা সেই প্রকাশ হইতে ব্যবহার হওয়া চাই। অন্যথা তাহাতে ব্যবহারহেতুত্ব সর্বদা থাকিল না। এখন দেখ, মুক্তি-দশ। কিংবা প্রলয়-দশাতে কোন ব্যবহারই থাকে না ; সুতরাং, সেই সময়ে কি জ্ঞানস্বরূপ আত্মার বেদান্তমতে স্বপ্রকাশ অস্বীকৃত হইবে? কখনই নহে। কিন্তু ব্যবহারহেতুত্বকে বিশেষণ বলিলে সেই সময়ে কোন ব্যবহার হয় না বলিয়া ব্যবহারহেতু প্রকাশস্বরূপ প্রকাশ জ্ঞানে থাকিল না। অতএব, বলিতে হইবে যে, ব্যবহারহেতুত্বকে প্রকাশের বিশেষণ বলিলে বেদান্তমতেরই বিরুদ্ধাচরণ করা হয়। আর যদি বল-উহা বিশেষণ নহে, পরন্তু উহা প্রকাশের উপলক্ষণ মাত্র ; কারণ, তাহা হইলে মুক্তি কিংবা প্রলয়-দশীতে ব্যবহার না থাকিলেও কোন সময়ে পূর্বে ব্যবহার থাকার ব্যবহারহেতুত্বটী উপলক্ষণরূপে প্রকাশে থাকিল, ; প্রত্যতত্ত্ব-প্রদীপিকা। আর তজ্জন্ত মুক্তি বা প্রলয়-দশাতে এই লক্ষণের অব্যাপ্তি হইল না? তাহ হইলে বলিব, লক্ষণটী হইল—ব্যবহারহেতু-উপলক্ষিত-প্রকাশরূপত্বই স্বপ্রকাশ। কিন্তু, তাহা হইলে বল দেখি, এই উপলক্ষিতত্ত্বটী সেই প্রকাশের ধর্ম কিংবা স্বরূপ ? যদি বল,তাহা ধৰ্ম্ম,অর্থাৎ ব্যবহারহেতুত্ব-উপলক্ষিী প্রকাশের ধর্ম ? তাহা হইলে বল দেখি, সেই ধৰ্ম্মনী উপলক্ষণ কি বিশেষণ ? যদি বল-তাহা উপলক্ষণ ? তাহা হইলে অবস্থা হইয়া যাইবে, অর্থাৎ সেই দ্বিতীয় উপলক্ষিতত্বটী আবার ধর্ম কিংবা স্বরূপ বলিয়া জিজ্ঞাসিত হইবে; অতএব, ইহার ক্রম অনন্ত হইয়া উঠিবে। আর যদি বল, ঐ ব্যবহারহেতুত্ব-উপলক্ষিতত্বটী প্রকাশের বিশেষণ? তাহা হইলে মুক্তি ও প্রলয়-দশাতে আবার সেই অব্যাপ্তিই থাকিয়া যাইবে। কারণ, সেই অবস্থাতে জ্ঞানস্বরূপ আত্মাতে কোন বিশেষণই নাই। অর্থাৎ, উপলক্ষিতত্বরূপ একটী ধৰ্ম্মও হাতে বিশেষণরূপে নাই। আর যদি বল, ব্যবহারহেতুত্ব-উপলক্ষিতত্বটী প্রকাশের স্বরূপ, তাহা ধৰ্ম্ম নহে, সুতরাং, বিশেষণ বা উপলক্ষণ কিছুই হইল না, তাহা হইলে ‘জ্ঞান এই শব্দ দ্বারা যে অর্থ কথিত হইল, ব্যবহারহেতুপ্রকাশিত্ব দ্বারাও তাহাই বুঝাইল। অর্থাৎ লক্ষণ এবং লক্ষ্যের কোন প্রভেদ রহিল না। আর তাহার ফলে জ্ঞানের লক্ষণ কি জিজ্ঞাসা করিলে উত্তরে বলিতে হইবে যে, জ্ঞানই জ্ঞানের লক্ষণ। অর্থাৎ, নিজেই নিজের লক্ষণ, অর্থাৎ এতদ্বারা বেদাতী নিজমত স্থাপন ও পরমত খণ্ডন কিছুই করিতে পারিলেন না। যাহার জ্ঞানের পরপ্রকাগুত্ববাদী, অথবা যাহার জ্ঞানের স্বপ্ৰকাত্ববাদী, তাহাদের মতেও জ্ঞানটী জ্ঞানই হয়, এবং যাহার মতে জ্ঞান :স্বপ্রকাশ, তাহার মতেও জ্ঞানী জ্ঞানই হইল, ইহাদের মধ্যে কোন ভেদ থাকিল না ; অর্থাৎ জ্ঞানের লক্ষণই প্রকৃতপ্রস্তাবে কিছুই বলা হইল না বুঝা গেল। সুতরাং, দেখা গেল যে, নৈয়ায়িক প্রমাণ করিলেন যে, এই পঞ্চম লক্ষণটীও বেদান্তীর মতে নির্দোষ লক্ষণ হইল না। ৬। এইবার দেখা যাউক, স্বপ্রকাশের যষ্ঠ লক্ষণটী কি, এবং তাহাও কেন নৈয়াযিকের পরীক্ষায় বেদান্তসম্মত নহে। দেখ, ষষ্ঠ লক্ষণটী হইল “জ্ঞানাবিষয়ত্ব স্বপ্ৰকাশত্ব”। ইহার অর্থ—যাহা জ্ঞানের অবিষয় তাহাই স্বপ্ৰকাশ। সুতরাং, জ্ঞানী জ্ঞানের প্রকাশ্য নহে বলিয়া তাহাতে জ্ঞানবিষয়ত্ব থাকিবে। অতএব, জ্ঞানই স্বপ্রকাশ- পদবাচ্য হইল।
প্রথম পরিচ্ছে। এখন দেখ পূর্বোক্ত প্রমাণাদি পাঁচটী লক্ষণের সহিত ইহার প্রভেদ কি ? দেখ লক্ষণগুলি হইল এই, ১। স্বাসৌ প্রকাশশ্চেতি স্বপ্রকাশঃ। ৪। স্বসভায়াং প্রকাশব্যতিরেক বিরহিতত্ব। ২। শস্য স্বয়মেব প্রকাশঃপ্রকাশ। ৫। স্বব্যবহারহেতুপ্রকাশম, এবং ৩। সজাতীয়প্রকাশাপ্রকাশ্যম্। ৬। জ্ঞানবিষয়ত্ব প্রকাশ। এস্থলে দেখ, প্রথম লক্ষণে আপতিত আপতিত যে পরপ্রকাশ-দোষ, তাহা আর এ লক্ষণে আসিল না। কারণ, জ্ঞান যখন জ্ঞানেরই অবিষয় হইল, তখন সে আর পর অর্থাৎ অন্য জ্ঞানের আবার প্রকাশ্য কি করিয়া হইতে পারে ? ব্যবসায়াত্মক-জ্ঞান অনুব্যবসায়াত্মক জ্ঞান দ্বারা প্রকাশিত হয় বলিয়া নৈয়ায়িক তাহাকে পরপ্রকাশ্য বলেন। কিন্তু, জ্ঞানবিষয়ত্বকে স্বপ্ৰকাশ বলায় জ্ঞান আর পরপ্রকাশ্য হইতে পারিল না। এতএব, প্রথম লক্ষণ-সংক্রান্ত দোষটীও আসিল না । এইবার দেখা যাউক, দ্বিতীয় লক্ষণের সহিত এই যষ্ঠ লক্ষণের প্রভেদ কি ? অর্থাৎ, দ্বিতীয় লক্ষণে আপতিত দোষটী এই লক্ষণে কি করিয়া নিবারিত হয়। দেখ, দ্বিতীয় লক্ষণটী হইয়াছে “স্ব স্বয়মেব প্রকাশ স্বপ্রকাশঃ”। ইহাতে বৌদ্ধসম্মত জ্ঞানের স্বপ্রকাশ্যত্বটী স্বপ্রকাশ লক্ষণে সংক্রামিত হইয়াছিল। অথচ বেদান্তীর তাহ অনভিমত। এখন দেখ, এই ষষ্ঠ লক্ষণে জ্ঞানাবিষয়ত্বকে স্বপ্রকাশ বলায় জ্ঞান আর নিজের বিষয় হইল না, আর তাহার ফলে জ্ঞানের স্বয়ংপ্রকাশ্য সিদ্ধ হইতে পারিল না। অতএব, দ্বিতীয়লক্ষণ-সংক্রান্ত দোষটী এই ষষ্ঠ লক্ষণে আসিল না। ঐরূপ তৃতীয়লক্ষণ-সংক্রান্ত দোষটী, দেখ, এই লক্ষণে নাই। কারণ, তৃতীয় লক্ষণটা ছিল -সজাতীরপ্রকাশাপ্রকাশ্যত্ব। ইহাতে স্বপ্রকাশ্যত্ব, প্রদীপ এবং ঘটেও অতিব্যাপ্তি অাসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল। এক্ষণে জ্ঞানাবিষয়ত্বকে স্বপ্রকাশ বলায় আর তাহা হইল না ; কারণ, প্রদীপ কিম্বা ঘট জ্ঞানের অবিষয় নহে। সেইরূপ চতুর্থলক্ষণ-সংক্রান্ত দোষটীও, দেখ এই লক্ষণে নাই। কারণ, চতুর্থ লক্ষণটী হইল—“স্বসত্তায়াং প্রকাশব্যতিরেকবিহিতত্ব”। ইহাতে স্বপ্রকাশ্যত্ব সুখা- দিতে ও থাকে বলিয়া স্বীকার করিতে হইয়াছিল। এখন জ্ঞানবিষয় বই প্রকাশত্ব বলায় তাহা আর হইতে পারিল না। কারণ, সুখাদি জ্ঞানের অবিষয় নহে। জ্ঞানের অবিষয় যদি সুখাদি হয়, তাহা হইলে তাহা সুখই হয় না। জ্ঞানের অবিষয়ের সত্তা অস্বীকার্য। সুতরাং, এই যষ্ঠ লক্ষণে চতুর্থলক্ষণোক্ত দোষটী ঘটিল না। তদ্রুপ পঞ্চম লক্ষণে আপতিত দোষটীও এই লক্ষণে হইবে না। কারণ, পঞ্চম লক্ষণটা হইল ব্যবহারহেতুপ্রকাশ”। ইহাতে যে দোষ হয়, তাহা প্রথম- প্রত্যক্ত-প্রদীপিকা। প্রদীপাদিতে অতিব্যাপ্তি, দ্বিতীয়-স্বপদে জ্ঞান গ্রহণ করিলে অনুব্যবসায়ে অতি- ব্যাপ্তি, তৃতীয়–অনুব্যবসায় না মানিলে পুনরায় প্রকারান্তরে প্রদীপেই অতিব্যাপ্তি, চতুর্থ-ব্যবহারহেতুত্বের বিশেষত্ব বা উপলক্ষণত্ব সিদ্ধ না হওয়ার মুক্তি ও প্রলয়- দশাতে এই লক্ষণের অব্যাপ্তি, এবং পঞ্চম-ব্যবহারহেতুত্বকে স্বরূপ বলিলে লক্ষণ ও লক্ষ্যের অভেদ-নিবন্ধন লক্ষণহানি, ইত্যাদি দোষ হইয়াছিল। এক্ষণে জ্ঞানা- বিষয়ত্বকে প্রকাশের লক্ষণ বুলিলে—প্রথম,প্রদীপাদিতে অতিব্যাপ্তি হয় না; কারণ, তাহা জ্ঞানের বিষয়ই ইয়-অবিষয় নহে। দ্বিতীয়, অনুব্যবসায়ও জ্ঞানের অবিষয় নহে বলিয়া ইহাতে দ্বিতীয় দোষটিও হয় না। তৃতীয় দোষটীও উক্ত কারণবশতঃই হইবে না। চতুর্থ দোষটাও আর থাকিল না, যেহেতু এলক্ষণে ব্যবহারহেতুত্ব অংশটী আদৌ নাই ; অতএব, তাহার বিশেষণ বা উপলক্ষণ শঙ্কাই অসম্ভব। সুতরাং, অব্যাপ্তি শঙ্কাও হইবে না। সেইরূপ পঞ্চম দোষটীও হইবে না কারণ, উক্ত ব্যবহার- হেতুত্বটী লক্ষণে না থাকায় তাহার স্বরূপত্ব বা ধৰ্মত্ব-সূচক প্রশ্নই সম্ভাবিত নহে। সুতরাং, দেখা গেল প্রথমাদি পাঁচটী লক্ষণেরই ক্ৰটী এই ষষ্ঠ লক্ষণে আসিল না। এইবার দেখা যাউক, নৈয়ায়িকের চক্ষে এই যই লক্ষণটীও কেন বেদান্তসম্মত স্বপ্রকাশের লক্ষণ হইতে পারে না। দেখ, বেদান্তী বলেন যে, জ্ঞান প্রকাশ পদার্থ। তাহা জ্ঞানের অবিষয়। কিন্তু ইহা হইলে এই ষষ্ঠ লক্ষণটা অসম্ভব দোষদুষ্ট হইবে। কারণ, জ্ঞানের স্বয়ংপ্রকাশত্ব-সাধন করিবার জন্য অনুমান ও শব্দ প্রমাণ, বেদান্তী উপন্যাস করিয়া থাকেন। অতএব, জ্ঞানটা অনুমান ও শব্দ-জন্য জ্ঞানের বিষয়ই হইল। সুতরাং, তাহাতে জ্ঞানবিষয়ত্ব কিরূপে সম্ভব হইতে পারে। যদি জ্ঞানকে জ্ঞানের বিষয় নহে বল, তাহা হইলে বেদান্তী যে জ্ঞানের প্রকাশ-সাধন করিতে প্রবৃত্ত হইতেছেন, তাহা পণ্ডশ্রম মাত্র হইল। অধিক কি, বেদান্তী তাহা হইলে জ্ঞানসম্বন্ধে কোন কথাই বলিতে পারেন না। অর্থাৎ, জ্ঞানকে স্বয়ংপ্রকাশ বলিলে জ্ঞানের অস্তিত্বেরই লােপ সাধিত হইবে। যেহেতু, তাহ। অন্ত জ্ঞানের বিষয় নহে, এবং তাহা নিজেও নিজেকে বিষ করে না ; অতএব, এই যষ্ঠ লক্ষণটী প্রকাশের লক্ষণই হইতে পারিল না। অর্থাৎ, অন্ত দোষ নিবারণ করিভে যাইয়া বেদান্তী নিজের পাদদেশে নিজেই কুঠারাঘাত করিলেন। ৭। যাহা হউক,এইবার দেখা যাউক,সপ্তম কল্পে, স্বপ্রকাশের লক্ষণের অর্থ কি ? এবং তাহার সহিত প্রথমাদি ছয়টা লক্ষণের প্রভেদ কি ? এবং তাহাই বা আবার নৈয়ার্মিকের চক্ষে বেদান্তসম্মত স্বপ্ৰকাশ-লক্ষণ কেন হইতে পারে না?
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.