Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Surer Kabar
Front matter
No text on this page.
TH11
No text on this page.
---
সুরে কবল
বাসবেন্দ্র ঠাকুর
প্রণীত
মূল্য এক টাক
No text on this page.
প্রকাশক
হরিপদ ভট্টাচার্য
ফিউচারিষ্ট পাবলিশিং হাউস
৩৫ঈ, কৈলাস বােস ষ্ট্রীট,
কলিকাতা ।
প্রিন্টার
যতীনাথ বহ
শ্ৰীধর সে
২৩নং মমছুয়াবাজার থ্রট,
কলিকাতা।
প্রুফ সংশােধনের ভার ছিলাে যাদের ওপর তাদেরই
দোষে কয়েক যায়গায় একটু আধটু ভুল রয়ে গেছে। আশা
করি সে জন্য বিশেষ কোথাও রসভঙ্গ হবে না। তাই আর
শুদ্ধিপত্র দিয়ে বৃথা এ বইয়ের সৌন্দর্য নষ্ট করা হয় নি।
এই সুযােগে প্রচ্ছদপটের ছবি ও লেখার জন্যে শিল্পী
কমলকৃষ্ণ ও শিল্পী নিৰ্ম্মল দের কাছে আমরা আন্তরিক
ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
সন ১৩৪৫ সাল
প্রকাশক
গ্রন্থকার প্রণীত আরও একটী পুস্তক শীঘ্রই বাহির হইতেছে-
সিগারেট
—মূল্য এক টাকা
(কয়েকটী অতি আধুনিক ছােট গল্পের সমষ্ঠি)
সুভদা'কে দিলাম। স্নেহের বাসু
No text on this page.
সুরু
জীবনের বন্যায়
কতদিন ভেসে গেল অকূল পানে-
এ জীবন শেষ কবে হবে কে জানে!
ফুলের বাগানে দেখি
সবি ঝরে গেছে একি
চামেলি বকুল আর মালতি বেলা
ভ্রমর কাদিছে তার ফুরা খেলা।
সােণার খাচাটি ঝোলে-
কবে কে দুয়ার খােলে
রূপপার পাখিরা তাই গেছেগগা উড়ে ;
একে একে দীপগুলো গিয়েছে পুড়ে।
জনহীন মাঝরাতে
অাপনার বেদনাতে
যতসুর বেঁধে ছিনু বেসুরা হল ;
সেতারের তার বলে বাঁধন খােল ।
শীতের কুয়াসা রাশি
শরতের মেঘ আসি
জীবন আঙ্গিনা দিয়ে গেছেগাে চলে ;
আমিও নামিনু পথে চলিব বলে।
শ্রাবণ রজনী কত
কেটে গেল আশাহত
বসন্ত ফিরে গেল দুয়ারে এসে ;
এবার চলেছি তাই অচিন দেশে।
দু
“বেদুইন”
এ চলার শুরু করেছিনু হায় যাদের সাথে,
কেহ ফিরিয়াছে আগায়েছে কেহ প্রদীপ হাতে;
পথের সাথীরে হারায়েছি
তাই একাকী আজ,
মরুর মাঝারে সেরে চলি শুধু চলার কাজ।
চলার নেশায় চলিয়াছি একা জীবন পথ,
ইরাণী রূপসী আসিয়াছে পরি’ সােণার নথ ;
বাজায়েছে বীণ, শুনিয়াছি তাও নীরব থাকি,
বাঁশীর বেহাগে সুরের দেবীরে কতুবা ডাকি।
নগরের সীমা নদীর ঘাটের কিনারা কত,
পথের দুপাশে ফেলিয়া এসেছি ছবির মত।
তিন
চলনের পথে কোনখানে কতু অচিন দেশে,
কালো কেশ জাল অসীম আকাশে এলায়ে এসে,
পান্থশালার দুয়ারে দাঁড়ায়ে রূপসী নারী,
শুধায়েছে মােরে “কোথা যাবি তুই শুনিতে পারি ?”
কেহ বাতায়নে ডাগর নয়নে তাকায়ে রহে,
কেহ পিছু ডেকে যাবার বেলায় ফিরিতে কহে ;
কভুও বা কেহ ফেলেছে দু'ফোটা অখির জল,
সবারে বলেছি “অসীমের পানে যাবিত চল।”
কভু আসে নাহি কভুও বা সাথে এসেছে কেহ,
কেহ পথ মাঝে বাঁধিয়া লয়েছে আপন গেহ ;
ভুল পথে কেহ ভুলাতে আমায় করেছে ছল,
সবারে বলেছি “অসীমের পানে যাবিত চল।”
প্রাণের ভিতরে কহিছে কে যেন মিনতি করি,
জীবনের পথ বাঁশীর বেহাগে নিওগো ভরি ;
চাঁদের আলােক হাসিয়া দিয়াছে দুগালে চুমা,
সাঁঝের তারাটি বলিয়াছে হেসে “ঘুমারে ঘুম;”
শীত পবনের হংসের পাতি যাবার বেলা,
দেখায়েছে মােরে অসীমের মাঝে রূপের মেলা।
মরীচিকা মাের নীল অঞ্জন নয়নে আঁকে,
চাতকের সাথে চলিতে আমায় মেঘের ডাকে ;
চার
কালের শিশুরা খেলিয়াছে খেলা সাগর তীরে,
সুধায়েছে মােরে “এই খেলা তুই খেলবি কিরে ?”
সাঁঝের আলােয় অকূলের পানে ভেসেছে নাও,
রূপের সাগরে ডুবিতে আমায় ডেকেছে তাও।
ফাগুন ফুরায় পিক উড়ে যায় শুকায় ফুল,
অশেষ ভাবিয়া ছিনু এ জীবন সে শুধু ভুল ;
স্বপন মিলায় বুক পুড়ে যায় তাহার পর,
এই দুনিয়ার কোন খানে তাই বাঁধিনি ঘর ।
মরীচিকা ভাসে ঐ মােহে কত পথিক ভুলে,
হারায়ে ফেলেছে আপনারে চোরা বালির কূলে ;
অসীমের গানে মিলাইতে সুর গাহিতে গীতা,
আমি চলিয়াছি মরীচিকা তাই হয়েছে মিতা ;
যৌবন মম গেছে তবু আজও আসেনি জরা,
সুরের পরীরা বাঁশীর বেহাগে দিয়াছে ধরা ;
ঐ মরীচিকা নিতুই আমারে অকূলে টানে,
যাযাবর আমি ভেসেছি অচিন দেশের পানে।
পাঁচ
অর্ঘ্য
অকাযের যাদুঘরে
কহিব কেমন করে
কতকাল জেগে বব আর ;
সারাদিন মাঠে মাঠে
রজনীতে বাজাই সেতার।
ঘুরে ফিরে দিন কাটে
সেদিন গােধুলি বেলা
খেলিতে খেলিতে খেলা
হেরিলাম দেউলের দ্বারে।
নব নব রাজ বেশে
শতেক সাধক এসে
ডালি দিল শত অভারে।
হয়
সােনার দেউলে তব হে দেবী! আসিছে নব
সাধকের অর্ঘ্য কত শত।
তবু দেবী কৌতুহলে অনাহুত হয়ে চলে
এসেছিনু ভিখারীর মত।
সুদূরের চক্ৰবালে
ঘন নীল সন্ধ্যাকালে
নেমে আসে মসীমাখা ছায়া।
বীণার তন্ত্রিতে মাের জাগে নাহি ঘুমধাের
জেগেছিল রাগিণীর মায়া।
ডালিশূন্য অর্ঘ্যহীন করে লয়ে ছিন্নবীণ,
না শুনিয়া কাহারাে আহ্বান।
তাই দেবী আসিয়াছি
চরণের কাছাকাছি
শুনাইতে কয়খানি গান।
নীল নদী পারে হায়
জীবন তরী যায়
নদীপথে চলিল যে যায়।
আমি শুধু উদাসীন ভাবিলাম দ্বিধাহীন
কিবা হবে দাড় বহে আর।
দিন যায় রাত্রি আসে পড়ে থাকি এক পাশে
অন্ধকারে হাসে নভ নীল
লয়ে ছিন্ন বীণাখানি গান শুনাইতে রাণ
মরি খুজে রাগিণীর মিল।
পথহারা বিহগিনী ফিরে যায় পথ চিনি
দীপগুলাে নিভে এল প্রায়।
দিবসের পুষ্পরাশি
একে একে হল বাসি
ধূপগন্ধ মিলাল কোথায়।
তবু জনহীন রাতে গানের মালিক হাতে
বসে আছি ঘর আঁধিয়ার ;
সুরের কুসুমগুলি
আঁধিয়ারে বুকে তুলি।
গীতাঞ্জলী লবে কি আমায় ?
আট
গ্রামের পথে
কাদায় গাথা ঘর; খড়ের চাল।
সুমুখে
বাঁশঝাড়
কাজল দীঘিপাৱ
এমনি ছােট গ্রাম চিরটাকাল ।
সুদূর ভিগায় মিশেছে পথ।
তাহারি এককোনে
পড়িয়া দিনগগণে
রতণ রায়েদের পুরাণ রথ ৪
চলন বিলখানি
কাজল রেখাটানি
করুণ আঁখি তুলে আকাশে চায়।
উহারি কালােজলে
বধূরা দলে দলে
দুবেলা জল নিতে আসিত প্রায়।
নয়
সারাটা দিনমান
বাঁশীতে গাহে গান
রাখাল ধেনুপাল সুদূরে লয়
অাঁধার ঝাউবনে
কভুবা আমনে
আপনি অকারনে বসিয়া রয়।
ফুল বােনে
ননদী গৃহকোনে
কঁাথায়
শাশুড়ী ছাড়াইছে সুতার জাল।
বালিকা বধূগুলাে
ফেলিয়া খেলাধূলাে
বসিয়া বাতায়নে গুনিছে কাল।
পথিক পথে যেতে
চলার মােহে মেতে
পথের ধূলি সনে কি কথা কও ?
হইলে পথ চলা
রয়েছে
বটতলা
ক্ষণিক ছায়াতলে বসিয়া লও।
ফুলের মুখ চেয়ে
গ্রামের বুক বেয়ে
ফাগুন ফিরে গেছে অচিন দেশ।
শ্রাবণ মেঘে মেঘে
বিজলি উঠে জেগে
শরৎ ফিরে এল সবার শেষ।
দশ
পড়িয়া পাঠশালে শিশুরা শেষ কালে
মাটির গুলি খেলে ভাবনা হীন ।
বাউল পথে ঘাটে
কখনাে ছড়া কাটে
কতুবা সুর ধরে বাজায় বীন্।
দিনের হাট সেরে
পসারি গৃহ ফেরে
রেলের বাঁশী বাজে করুণ সুর।
জেলেরা ঘূরে মরে
মাছের ডিঙ্গি গেছে অনেক দূর ।
নদীর বালুচরে
৭
পারের মাঝি বসে হুকোর ধোঁয়া শেষে
কখন গায় বসি বেসুরা গান।
সুদূর
অজানায়
বলাকা ফিরে যায়
দিনের আলো হল ধুসর ঘ্রান।
উঠিছে ভঁদ পূৰে
তপন গেছে ডুবে
পবনে দুলে উঠে হেনাব বন।
গাভীরে বেঁধে নেলে। রাখাল ফিরে এল
নিরালা বসে তাের বাঁশরী শােন।
এগার
চাঁদের আলাে পেয়ে
বধূরা থাকে চেয়ে
আঁচিলে রুনুঝুনু চাবির গােছ।
গােলাপ আঁখি খােলে বঁধুরা এল বলে
বিরহী বালিকারা নয়ন মােছ।
কাঠাল বন-চুরে
সােনার আলাে ছুড়ে
সাঁঝের তারাগুলি নীরবে চায়।
আসিবি কি
যেথায় ঝিকিমিকি
চাদের আলো খেলে নদীর গায় ।
বন্ধুরা
বিদায়
ওরে আমার স্বপন ভরা করুণ গানের সুর ;
আজকে রাতেই বিদায় নিয়ে চলবাে অনেক দূর।
ঐ যেখানে আকাশ চিরে
সন্ধ্যাতারা উঠছে ধীরে
ওর পানতেই উধাও হয়ে আসছে আমার প্রাণ ;
ওরে আমার স্বপন ভরা করুণ সুরের গান !
এই যে নীরব পথের ধূলাে
দোলন চাপার গন্ধগুলাে
এর বুকেতে এম্নিধারা গােপন হয়েই থাক;
সুদূর আমায় চতে পথে আজ পাঠাল ডাক্।
আজকে দখিন বাতাস হেন
মনের মাঝে কইছে কেন
বাঁশীর সুরে শেষ করে নেও করুণ গানের খেলা ;
সুরের বাঁধন ভাঙ্গতে হবে আজকে বিদায় বেলা।
*
অাজকে যদি যেতেই হবে
কোন পথে হায় চলবে তবে
কোন খানে তুই খাবি পড়ে করুণ সুরের গান
বিদায় স্মৃতির চিহ্ন তােকে করবে কি আর দান?
যেথায় শুধু ভগ্ন বাঁশী
সাঁঝের ঝরা কুসুম
রাশি ;
আজ যেখানে রইল পড়ে ছিন্ন বীণার তার
সেইখানেতেই বাজবে কি তাের ছন্দ বেদনার ?
কিম্বা যেথায় সাঁঝের শেষে
অপ্সরীদের আত্মা এসে
নিত্য সরাব পান করে যায় ভগ্ন পেয়ালায়
থাকৃবি কি তুই সেই হারেমের একটী কিনারায় ?
দিগ্বধূরা আমায় ডেকে
হাত ছানি দেয় আড়াল থেকে
এবার আমায় চলতে হবে সুদূর হতে ও দূর ;
বিদায় তবে বিদায় ওরে করুণ গানের সুর।
চোদ্দ
জীবন-জুয়া
সাকীরে।
I;
নিশিদিন শুধু সিরাজের সুরা ঢাল ;
মিছে ভেবে কেন মরিস্ কি হবে কাল ;
সিরাজের সুরা পাত্র ভরিয়া রাখ ;
আর দুনিয়াতে যত কাজ আছে থা—
বাকীরে।
সাকীরে।
কভু আর কোন পরদেশী নির্ভিক ;
সমরকন্দ জিনে যদি নেয় নি ;
তুই ভেবে কেন মিছে হােস্ চঞ্চল,
আমাদের তাতে ভয় কিবা আছে বল
আজিরে ?
সাকীরে?
আমাদের কাজ আনাগােনা শুধু জানি ;
তাই বলি ওরে ভরেদে পেয়ালাখানি ,
সন্ধ্যার সুর প্রভাতে কোথায় যায় !
সুধাইলে হায় অন্ত কে তার পায়-
হকিরে ?
পনের
সাকীরে। আজি রজনীর শেষ হতে হতে যদি, কভু থেমে যায় নব জীবনের নদী ; ওখায়ে না চলে মরু মরীচিকা বেয়ে, ক্ষণে ক্ষণে তাই আকাশের পানে চেয়ে থাকিরে। সাকীরে ! কেন বলি আর পাত্রটি এনে ধর ; চলনের পথে অতি ছােট অবসর। যত আছে হাতে আজিকে রাজার বল, লুটে নিতে পারে কালিকে দস্যুদল জানিরে । সাকীরে ! জাননাকি তব নবীন কুসুম রাজি, নিমেষে ফুটিয়া নিমেষে টুটিবে আজি ; জীবনে মরণে জুয়া খেলা হয় তাই, সুরার পেয়ালা রাখিয়াছি ভয় নাই- বাজীরে। ষােল
ক্ষণিকের পরিচয়
বনে একদিন এসেছিনু পথ ভুলে,
ক’টি শেফালির ফুল নিয়েছিনু তুলে ;
চির প্রিয়তম বাঁশের বাঁশরীখানি—
কোন তরুতলে ফেলিয়াছি নাহি জানি।
সতের
২
মন্দির পথে তখনাে দুয়ার দেয়া,
ভেসেছিল শুধু ঘাটের মাঝির খেয়া ;
দুটী নীড়-হারা বলাকা রাতের শেষে
ঘুমায়ে পড়েছে আপন কুলায়ে এসে।
সরমে মরিয়া নিশীথ রাতের চাদ—
ম্লান মুখে বসে করিছে আর্তনাদ।
পূৰ্ব আকাশে জেগে আছে দুটী তারা,
আমারি মতন ওরা-ও কি পথহারা ?
সেই সবে রাত ফুরায়ে হয়েছে ভাের,
কদম্ব বনে হারায়েছি বেণু মাের ;
পথের দুপাশে হেনা রঙনের গাছে—
ফুলে ফুলে শুধু ফাগুন জাগিয়া আছে।
আকাশ ফেলিছে গােধূলি-অাঁচল খুলে,
বনে একদিন এসেছিনু পথ ভুলে।
তখন আকাশে জাগিছে ঘুমের মায়া,
সন্ধ্যার মুখে গােধূলি ও ধূপছায়া।
আঠার
অন্তদিনের অবগুণ্ঠন টানা, এ পথের সীমা কোথা নাহি মাের জানা। অচিন দেশের বন-বীথিকায় আসি, হারায়েছি পথ-হারায়ে গিয়াছে বাঁশী। ক’টি শেফালির ফুল তাও গেছে চুরি, সীমাহীন পথে সারাদিন ঘােরাঘুরি। একেলা তখন শ্যামল তরুর ছায়, ব্যাকুল সাঁঝের অলস দখিন বায়। মালতী বনের বিজন বীথিকাটীতে, তুমি এসেছিলে দুটী ফুল তুলে নিতে। ঝরা শ্রাবণের ঝুমকো ফুলের মত, স্বপনের ঘাের দু’নয়নে অবনত। বাণী-ভরা ভয় তােমার অধর পুটে, ক’টি আধফোটা গােলাপের মত ফুটে। কাজলের মত কাল কুন্তল-ভার, চরণে আসিয়া লুটায়ে পড়েছে, আর- কঁচুলী বিহীন নিটোল বুকের পরে, স্খলিত আঁচল দুলিয়া দুলিয়া মরে ! দিন ফুরায়েছে—গগনে অচঞ্চল, পথ চেয়ে আছে রূপসী তারার দল । উনিশ
নব শশী আর ফুটিল না তবু রাতে,
আমি শুধু জেগে রহিনু তােমার সাথে ।
চারিপাশে আর জাগিয়া ছিল না কেহ,
বনের কুটিরে মােদের বাসর গেহ ;
শুকসারী ঘুমে হারায়েছে কলকথা,
ভুলিয়াছে তারা দিবসের চপলতা।
কুসুম শয়নে প্রদীপ নিভায়ে দিয়া,
হৃদয়ে চাপিয়া রহিনু তােমার হিয়া ;
যেন সিরাজীর পূর্ণ পেয়ালা আনি,
তুমি মোের ঠোঁটে রাখিয়া দিয়াছ রাণী ;
কাড়িয়া লয়েছি তােমার গলার মালা,
তাই দিয়ে রচা হয়েছে বরণ ডালা।
ফুরায়েছে গান কঁদিছে সুরের রেশ,
মিলন রাতের উৎসব হল শেষ।
দাড়াইনু পথে আবার নবীন প্রাতে,
হারায়েছি সব কিছু নাহি আর সাথে
কুড়ি
অসীমের পানে সুরু হল চলাচলি,
চির বিরহের কথা হবে বলাবলি।
সন্ধ্যা যখন রাতের কাজল টানে
জানি-চেয়ে রবে হয়ত পথের পানে,
গােধূলি-ধূলায় কুলায় ফিরিবে ধেনু,
নবীন পথিক বাজাইতে পারে বেনু।
দু’টা ফোটা লােঢ় হয়ত বিজন বনে,
ঘনাবে তখন কাজল আঁখির কোণে।
হারায়েছি মালা হারায়ে এসেছি প্রাণ,
বাঁশরীর সাথে ফেলিয়া এসেছি গান ;
ভুলিয়াছি পথ তবু পাগলের পারা—
সীমাহীন পথে ভাসিয়াছি পথহারা।
একুশ
আশা
কানে কানে কথা কও,
কোন ভাষাহীন বাণীর মায়ায় আমারে ভুলায়ে লও
এই সংসার-সাহারায় পথ
হারায়ে ফেলেছি যবে ;
তুমি নব পথ দেখায়ে বলেছ,
‘নব পরিচয় হবে।
বাইশ
আখির উপরে মাের ;
নবীন পরশে বুলায়ে দিয়েছ রঙ্গিন ঘুমের ঘোের।
পথ অবসানে যবে নিরাশায়
শুধায়েছি ‘পথ কই ?
শত ছলনায় আমারে ভুলায়ে
লয়েছ ছলনাময়ী
“ওগাে আঁখি তুলে চাও,
কভু এই বলে সােণার নগর সহসা দেখায়ে দাও।
অাখি আগে মাের খুলিয়া দিয়াছ
রঙ মহালের দ্বার ;
আকাশের গায় ক্ষীণ হয়ে যায়
নিগূঢ় অন্ধকার
বলিতে পার কি প্রিয়া ;
আর কত কাল চলিতে হইবে এই ছায়া পথ দিয়া ?
আর কত দূরে চলিতে চলিতে
হবে এ চলার শেষ ;
বলিতে কি পার কোথায় তােমার
রয়েছে সােনার দেশ ?
তেইশ
ঐ দেখা যায় ঐ !
জনম অবধি দেখিতেছি শুধু ধরিতে দিতেছ কই ?
বাতাসের মত শূন্য ও তাের
ক্ষণিকের উচ্ছাস,
জানি তবু ওরে চলিয়াছি হায়
তুই যেথা লয়ে যা।
ওলো ছলনার রাণী ;
মায়া দিয়ে গড়া তন্বী অতনু জানি ওরে তাের জানি।
আকাশের মত মিথ্যা ও তাের
অঙ্গুলি নির্দেশ ;
জানি তবু হায় তারি ইঙ্গিতে
চলেছি নিরুদ্দেশ।
চব্বিশ
ইরানের রাণী
পূবে উঠে চাঁদ গেছে বহুখণ বেলা
সিরাজ সহরে বসেছে রূপের মেলা।
এসেছে হাজার মলিন বসনা বাদী ;
তাঞ্জামে চড়ে আসিয়াছে সাহাজাদী।
এসেছে বেগম, তারি মাঝে দিনহীনা-
কোথা হতে এক আসিয়াছে বেদুইনা।
সাহাজাদী বাদী রূপসী বেগম রাণী,
কবরী বাঁধিয়া নয়নে কাজল টানি,
পঁচিশ
যতনে বসন, ভূষণে, রতনে সাজি,
রূপের গরবে মাতাল সকলে আজি ।
তারি মাঝে বসি একা বেদুইন বালা
গলায় দুলিছে দু’খানি বকুল মালা।
মরুর বালুকা জড়িত বসন গায় ;
কাজল বিহীন সজল নয়নে চায়।
চঁপার গন্ধে ঘন নীল হল রাতি,
সেই সবে হেঁসে উঠিয়াছে যুথি যাথী,
রক্তিম ঠোটে হেসেছে গােলাপ বালা,
নীলিম আকাশে চঁাদের প্রদীপ জ্বল।
দূর সহরের শুভ্র মিনার গুলি,
নীরবে দাড়ায়ে রহেছে নয়ন তুলি।
কোন অজানায় কে জানে পথিক কেবা,
করুণ বাঁশীতে করিছে সুরের সেবা।
এমন সময় অরুণ ধূসর পথে,
ইরাণের রাজা আসিয়া সােণার রথে,
করুণ কণ্ঠে শুধাল সরমে হেঁসে,
কে তুমি রূপসী বসিয়া মলিন বেশে ?
ছাব্বিশ
কপােল ভরিয়া গােলাপ গুচ্ছ তব,
দুলিতেছে দোল কুন্তল অভিনব,
ঐ দু'নয়নে কোন স্বপনের ঘাের,
কে তুমি বসিয়া রয়েছ হৃদয় চোর ?
এত রূপ তব এত অপরূপ তুমি,
কেমনে পরশ করিলে কঠিন ভূমি !
এস তবে রাখ এই হাতে দুটি কর,
দাও মাের পরে তােমার তনুর ভর,
এস উঠে এস নীরবে সােণার রথে,
ফিরে গেল রথ রঙমহলের পথে।
হয়ে গেল শেষ নিমেষে রূপের মেলা,
প্রণয় সে শুধু ক্ষণিক কালের খেলা।
বেদুইন শেষে হল ইরাণের রাণী,
শুনে কেহ কেহ ফুঁসে উঠে “জানি জানি”।
কেহ কথা বলে কেহ কিছু নাহি বলে,
অভিমানে মালা দেয় ভিখারীর গলে,
শুধু বেসরম ছুড়িগুলাে চারি পাশে,
সারাটা সহর গুলজার করে হাসে।
সাতাশ
তারার প্রতি।
গভীর রাতের তারা ;
কোন বেদনায় নয়ন ঢেকে
অন্ধকারের আড়াল থেকে
কার পানে তুই আছিস চেয়ে
অমন উদাস পারা ?
আঠাশ
গভীর রাতের তারা;
আঁধার কালাে আকাশ তলে
দৃষ্টি কি তাের আঁখির চলে
দেখতে কি পাস জগৎ খানা
স্বপ্নে মাতােয়ারা ?
গভীর রাতের তারা ;
সামনে কনক চাপার গাছে
যে ফুল আমার ফুটে আছে
দেখায় তােকে তারি মতন
একটী ফুলের পারা।
গভীর রাতের তারা;
নিঝুম রাতে এমনি কি তুই
একলা বসে ঝুরবি নিতুই
সঙ্গী বিহীন রাতগুলি তাের
কাটবে কেমন ধারা ?
গভীর রাতের তারা।
উনত্রিশ
বসন্তের বিদায়
কোন্ অজানার নবীন উষায়
ফাগুন ফিরিতে চায় ;
এই জীবনের ক্ষণিক আলােয়
ধরা তারে নাহি
;
মাধবী লতার পাতা ক’টি ধরে
নীরবে দাড়ায় বনে
ভ্রমর বঁধূর সজল নয়নে
ফুলের মিনতি শশানে।
ত্রিশ
আর কত মধু চাও আজি ওগাে
আর কত মধু চাও !
এই ফাগুনের বিদায় বেলায়
মােদেরাে বিদায় দাও।
দখিন বাতাস পথ ভুলে গেছে
কিছু নাহি জানা যায় ।
পিকের কণ্ঠ নীরব কেন গাে
সে কোথায়, সে কোথায় ?
ঘন নীল মেঘে চৈত্র রাতের
ঐ হল অবসান ;
বকুল ফুলেয় গন্ধ গাহিছে
শেষ বিদায়ের গান।
ভােরের পথিক বাণীতে বাজায়
বড় সকরুণ সুর;
আজি ফাগুনের ফুলের সহিতে
যাবে সেও বহুদূর
একত্রিশ
ফাগুন গিয়াছে সাথে লয়ে প্রাণ
পিক সেও পলাতক ;
ঝরা ফুলগুলি আজি তবে তার
স্মৃতির কণিকা হক।
নবীন দেশের আলােয় আবার
ফাগুন ফিরিতে চায় ;
এই জীবনের ক্ষণিক আলােয়
ধরা তারে নাহি যায়।
বত্রিশ
সন্ধ্যায়
আয়লো সখি জলকে যাবি
চলতে পথে দেখতে পাবি
বকুল তলায় ফুল ঝরেছে শুভ্র অতি,
তার পরেতেই বইছে রে তাের ময়নামতী।
তেত্রিশ
সন্ধ্যা হতেই কলসী নিয়ে
মুখ ভরা নীল ঘােমটা দিয়ে
জল তুলে সব ফিরতি গেছে গাঁয়ের বধূ ;
পেয়েছে তারাও চলতে পথে ফুলের মধু।
চিকণ কালাে মুক্ত কেশে
বাতায়নের বুকটা ঘেসে
ওর পানে তুই মিছেই চেয়ে আকুল পারা।
ঐ যেখানে উঠছে জ্বলে সন্ধ্যা তারা।
ক্ষণিক ডুবে নদীর তলে
বুকের কাপড় ভিজাস জলে
আয়লাে সখি ঐ জনহীন নদীর তীরে ;
স্রোতের মুখে এলিয়ে দেহ ভাসবি ধীরে
চলতি পথের সীমায় এসে
চাদ যদি তাের দাড়ায় হেসে
দেবতা দেবীর দেউল, গুলােয় ঝঝির বাজে ;
বনের পাখী
ঘুমােয় যদি
কুলায় মাঝে।
চৌত্রিশ
আঁধার যদি হয়েই থাকে
অশথ বনের বাঁকে বাঁকে
রাখাল যদি ওপার থেকে বাজায় বেণু।
গােঠের পানে ফিরেই চলে মাঠের ধেনু।
নীল শাড়ী তাের সবুজ পেড়ে
পরিস ভিজে কাপড় ছেড়ে
চুলগুলি তাের অমন করেই রাখিস খুলে ;
ফেরার পথে আনিস দুটো বকুল তুলে।
পয়ত্রিশ
স্মৃতি
ঘনায়ে এসেছে সঘন অন্ধকার
পথ চলা হল ভার ;
ওলাে সাহারার পাগলিনী বেদুইনা
বাজাবি কি তাের ভুবনমােহনী বীণা ?
আকাশের দিকে ছলছল চোখ চেয়ে
কি দেখিতে চাস্ অনামীমরুর মেয়ে
জ্বলিছে সন্ধ্যা তারা
ভাসিয়া এসেছি মােরা দুটী পথহারা।
ছত্রিশ
কে জানিতে চায় কোথা এপথের শেষ
মােরা পথহীন চলিয়াছি এই বেশ ;
ততার সাথে মাের যদি ছাড়াছাড়ি হয় ;
তাহাতে কিসের ভয়।
আমি যেথা যাব গাহিতে গাহিতে গীত
যদি চলে যাস তুই তার বিপরীত,
নূপুরের ধ্বনি শুনিতে না পারি হায় ;
তাহাতে কি আসে যায় ।
কে জানিছে মাের চলিতে চলিতে কবে
দূর পথে কোথা সুরের কবর হবে,
যদি একদিন নিঃশেষ হয় প্রাণ ;
গাহিতে না পারি গান
মাের প্রিয়তম বাঁশীটী পড়িয়া থাকে
যদিরে পথের বাঁকে ;
কখনাে নিকটে কখনাে অনেক দূরে,
যদি একদিন মরুমহাদেশ ঘুরে
সাঁইত্রিশ
কী তমুভার এলায়ে কাহারাে হাতে
অজানা জনের সাথে,
এই পথে যেতে বাঁশীটী দেখিতে পাস।
পড়িবে কি তাের একটা দীর্ঘশ্বাস ?
আটত্রিশ
দুনিয়ার ঘর
নাইক বুকে
এই দুনিয়ার একপাশে মাের পাতায় বাঁধা ঘর।
একটানা মোর জীবন আমি চরম স্বার্থপর।
চিত্তে আমার ভাবনা অনেক-বিত্ত আমার সব।
উচ্চ আশার তুচ্ছ কলরব।
সােনার খাঁচায় বন্ধ আমার পােষমানা এক পাখী।
আকাশ পথের পক্ষী তারে নিত্য পালায় ডাকি।
ঐ বহুদূর অন্তবিহীন নীল আকাশের কূলে
কিসের আশায় চলছে ওরা সকল বাঁধন খুলে।
উনচল্লিশ
খাঁচার ভিতর সবাই ওরা দেয়না কেন ধরা-
যেথায় ওদের চিরদিনের আহার আছে ভরা।
বাতায়নের বুকটী ঘেসে ঝুলবে নিরিবিলি।
ভাবনা-ভােলা মনটী নিয়ে থাকবে সবাই মিলি।
ঐ যে পথে বাজার বসে নিত্য কেনে বেচে।
মাের আঙ্গিনার কোণটী ঘেষে সুদূর পানে গেছে।
ওর বুকেতেই লক্ষ পথিক লক্ষ্য বিহীন হয়ে।
পথ হারিয়েও কিসের আশায় পথ চলেছে বয়ে।
একতারা কেউ বাজিয়ে চলে সঙ্গে কারাে বাঁশী।
চক্ষে কারাে কান্না কারাে ওষ্ঠে মধুর হাসি।
কেউ বা খানিক পঁড়িয়ে পড়ে ময়নামতীর ধারে।
আপন গানেই মুগ্ধ হয়ে আপনি মাথা নাড়ে।
পাগল ওরা বক্ষে ওদের নানান রকম আশা।
পথের পাশের পান্থশালায় নিত্য ওদের বাসা।
কেউ বা বলে অপ্সরী সে তার পানেতেই ছােটে।
কেউ বা খোঁজে কোন পুকুরে সােনার কমল ফোটে।
শুষ্ক পথের ধূলায় কেহ মাণিক খুজে মরে।
কেউ বা ভাবে আকাশটাকে ধরবে কেমন করে ।
পাগলা গুলাের কাণ্ড দেখে বড় হাসি পায়।
ঘরের কাজে কিন্তু হাসার সময় যে নাই হায় ।
চল্লিশ
বিশ্বপেলেও কাটবেনা এই ক্ষুদ্র গৃহের মায়া।
ছাড়বােনা মাের আম্রতরুর স্নিগ্ধশীতল ছায়া।
ঘর সাজানাের কাজেই আছে আনন্দ মাের বাঁধা।
জীবনবীনার তারটা আমার সরল সুরেই সাধা।
পাগল যারা মরুক ঘুরে জীবন মরুর চরা।
মিলবে না যা তাহার খোজে মিথ্যা ঘুরে মরা।
একচল্লিশ
অজানা
অসীম কালের ক্রীড়নক মােরা যা কিছু ভেবেছি মনে,
যুগ যুগ ধরে ব্যর্থ হয়েছে তাই।
কুসুমের কুঁড়ি ফুটিতে ফুটিতে ঝরিয়া পড়েছে বনে,
ভ্রমর কহিছে গন্ধ কোথায় পাই।
চির নবীনের নীল অঞ্জন কালের নয়নে আঁকা,
আজিকে যেথায় সােনার নগর কালি হবে তাই কঁকা
আজি অসীমের যাত্রীরা, যার মােহন বাঁশরী শােনে
কালের খেয়ালে কালিকে সে আর নাই।
বিয়াল্লিশ
এই নশ্বর নয়নে যখন যা কিছু লেগেছে ভাল
এ পরাণ শুধু তারি পিছু পিছু ধায়।
কখনাে ঘনায়ে এসেছে আঁধার কখনাে জ্বলেছে আলাে,
হারায়েছে যারে তাহারে খুঁজিয়া পায়।
হৃদয় মাঝারে দুবাহু বাড়ায়ে ধরিতে গিয়াছি যারে
এই জীবনের ক্ষণিক আলােয় ধরা নাহি যায় তারে।
কখনাে সাকীরে নীল পেয়ালায় কয়েছি সরাব ঢাল
কভু ও বা তাই’ হেলায় শুখায়ে যায়।
এই মানবের মনের গহনে চিরকাল চলে খেলা
অসীম কালের খেলার নাহিক শেষ।
কখনাে স্বপনে কনক কিরণে করিয়া গিয়াছি হেল
মাটির মাধুরী নয়নে লেগেছে বেশ।
আলসে বসিয়া চলিতে চেয়েছি সুধায়েছি কোথা পথ
অসীম কালের দেবতা রয়েছে বসি নিশ্চলবৎ,-
নীরবে হাসিয়া করিয়াছে শুধু সুদূরে যাবার বেলা
অজানার পানে অঙ্গুলি নির্দেশ।
তেতাল্লিশ
দেবদাসী
দেবতার নামে বন্দিনী আছে
আজ দেবদাসী যে কয়জনা।
সেও তারি মাঝে সুন্দরী এক
স্বপনের জাল দুচোখে বােনা।
চুয়াল্লিশ
ক্ষণিকের তরে দেখাহল শুধু
সেই ফাগুনের প্রথম দিন।
শ্রাবণ মেঘের মায়াসিম তার
কুন্তল ভার বিনুনী হীন।
নীলাম্বরীতে ঢেকেছে নিচোল,
রামধনু আঁকা আঁচল গায়।
নূপুরের ধ্বনি বাজে রিনিঝিনি
ফুলকলি:সম চপল পায়।
বকুল চয়নে ব্যাপৃত বালিকা
বন কুসুমের ভৃঙ্গসমা।
সখীদের মুখে নাম শুনেছি
অতি সুমধুর সুরঙ্গমা।
ঐ কুসুমের পরাগেরি মত
ক্ষণ ভঙ্গুর সে যেন অতি।
আমি মহারাজ বিজয় রাঘব
প্রণয়াসক্ত তাহার প্রতি।
পঁয়তাল্লিশ
মাটির দেউলে কে তুমি দেবতা
বেঁধেছ তােমার পুজার ঘর।
ঐ জড়জীব শিলার কণায়
বন্দী কি তুমি পূৰ্ব্বাপর ?
এ কি মানুষের ছলনা শুধুই
এ কি মানুষের কেবলি ছল ?
জগতেরে লয়ে জুয়া খেলিবার
মানব রচিত এ কৌশল।
ওগাে ব্রাহ্মণ ধম্মদত্ত
দেব পুরােহিত পুণ্যবান ;
আমি রাজা, তবু তুমি মাের বড়,
নহে কি গাে মাের এ অপমান ?
রাজার গর্ব খর্ব করেছ
ওগাে সুচতুর সুকৌশলি।
এই দেউলেরে স্বর্গ করেছ
অর্ঘ্য নিয়েছ সবারে ছলি।
ছেচল্লিশ
জড় পাষাণের পিণ্ডে জীবন
দেবতারে এনে বেঁধেছ আজ।
আমি তােমাদেরি কৌশলে শুধু
হয়েছি বিজয় রাঘব রাজ।
আমি এদেশের মহারাজ তবু
বেঁধেছ আমারে এ কোন ছলে।
মাটির দেউলে অবনত অমি
জড় পাষাণের চরণ তলে।
দেবদাসী রূপে বন্দী যাহারা
জীবন যাদের কামনাহীন।
আমি তারি মাঝে একটী নারীকে
ভালবাসি উৎসবের দিন ।
এ শুধু রূপের ক্ষণ মােহ নয়
এ যে গো প্রণয় প্রলয় সম ?
ভালবাসিয়াছি দেবদাসী তব
ক্ষমা কর দেব ক্ষমহে ক্ষম।
সাতচল্লিশ
আমি মহারাজ বিজয় রাঘব
এ দেশের যাহা সকলি মাের।
শুধু মন্দির জানি এ দেশের
আমি তবু কেহ নহেগাে ওর।
মাটির দেব একি তব খেলা
কাড়িয়া লইতে নৃপের বল।
নারীর জনম ব্যর্থ করিতে
এ তব আবার কি কৌশল
এ বুকের মাঝে বাজায়েছে বীণ,
এ বুকে যে মাের গেয়েছে গান।
ভালবাসিয়াছি হৃদয় ভরিয়া
এ প্রণয় যারে করেছি দান।
জানি আমি রাজা তবু যারে নাহি
মিলিলে জীবন বিফলে যায়।
মাটির দেউলে বাঁধিয়াছ তারে
ওগাে পাষাণের দেবতা হায়।
আটচল্লিশ
যদি নশ্বর পাষাণেরি মাঝে
বিশ্ব-দেবতা বন্দী হও,
দেবদাসী রূপে তাহারেও যদি
মাটির দেউলে বাঁধিয়া লও,
তবে রাজ বেশে কনক মুকুটে
বেঁধ নাগাে মােরে বেঁধ না আর,
ভালবাসি তারে সেই বেদনায়
ছিড়েছে বুকের
বীণার তার
ঐ অসীমের পথে ঘুরে হবে
এই ক্ষণিকের জীবন শেষ ,
মাটির দেবতা এই লও তবে
অঞ্জলি দিনু এ রাজ বেশ
উনপঞ্চাশ
৪
তুরাণী মেয়ে
এই তুরাণী মরুর বুকে,
গান গেয়ে তুই আপন সুখে,
ফুলের মতন ফুটলি দখিন বায় ;
চৈত্র রাতের বকুল বেলা
ফুল পিয়াসী করবে হেলা,
তাের অধরের পরশ যদি পায়।
পঞ্চাশ
পান করে তাের রূপ-মদিরা
রূপের রাণী অপ্সরীরা
স্বর্গে ফিরে করবে সবাই লাজ;
সুম্মা টানা আঁখির কোণে
স্বপ্ন যে তাের কি জাল বােনে,
রচবি কি তুই স্বর্গ মরুর মাঝ ?
ঘােমটা বিহীন মাথার কালাে
কোন ফুলে তুই করলি আলে?
বকুল কিবা শিউলি ওত নয় ;
বাঁধনহারা চুলের মাঝে
গন্ধ যে তার ছড়িয়ে আছে
বসরা দেশের গােলাপ যদি হয় ।
চুল-বিলাসী মরুর মেয়ে
তাের চরণের পরশ পেয়ে
মরুর বেলায় জাগে জীবন-ছায়া ;
তাই বুঝি সে তােরি পানে
ক্লান্ত পথিক ভুলিয়ে আনে
জাগায় পথে মরীচিকার মায়া।
অশথ শাখে, পাতার ফাঁকে,
ফানে যে কোকিল ডাকে—
তাের মত হায় কণ্ঠ তাদের নাই ;
অচিন পথের যাত্রী যারা
তাের রূপে হয় মুগ্ধ তারা
আমার চলন থমকে আসে তাই।
আমার পানে চোখ বুলিয়ে,
চিকন কালাে চুল দুলিয়ে,
মাথায় যে গােলাপ গােটা দুই,
নীল কঁচুলি, হলুদ-পেড়ে
ঘাগরা ঢাকা নিচোল নেড়ে,
মরুর মাঝে মন ভুলালি তুই।
বাহান্ন
উপলব্ধি
অচল পথের বুকে ফেলি পথ চলনের চিন্
ক্ষণিকের খেলা শেষে ফিরে যায় পান্থ উদাসীন।
সহসা গভীর রাতে,
বিদায়ের বেদনাতে,
নিজ মনে গাহে গান, কণ্ঠ তার হয়ে আসে ক্ষীণ।
তিপান্ন
প্রতিটি ধূলির কণা কহে ডাকি নাহি হ'তে পাের,
--উদাস পথিক ফিরি কোথা যাস্ ? দেরি আছে তাের
দূর অতীতের স্মৃতি
কত পূর্ণিমার তিথি,
বিদায় বিধুর পদে বাঁধে আসি কুসুমের ভাের।
কেতকি বকুল বন মর্মরিত বিথীর আহ্বানে,
সাদর ফুলের ডালি অশ্রুজলে ভিজাইয়া আনে।
তবু সে মানে না বাধা,
পশ্চাতের হাসা-কাদা-
আজি এ বিদায় ক্ষণে কিছু তার নাহি আসে কাণে
কাজল কুয়াসা রাশি আঁখি আগে স্বপনের মত
আপনার দেহভারে আপনি সে হ’ল অবনত।
বিমলিন চাদ বধু,
তবু ছড়াইছে মধু,
ধরণীর বেদনাটি উঁদ যেন নহে অবগত।
চুয়ান্ন
সহসা ঘুমের ঘোরে অন্ধকারে জেগে দিশে হারা,
ময়ূর, পাপিয়া, কুহু একই সাথে ডেকে উঠে তারা।
হারায়ে গিয়াছে বাসা,
তবু তাহাদের আশা-
চিরন্তন খোঁজাখুজি একদিন হবে—হবে সারা।
অজানা সুদূর হতে সুদূরিকা বধুর বাঁশরী,
কতদিন কতকাল ডাকিয়াছে দিবা বিভাবরী।
আজি সে মরুর পারে-
খুঁজিতে চলেছে তারে,
অতীতের খেলাঘর পিছে তার মরিছে গুমরি।
উচ্ছসিয়া কহে কভু আরাে সাকী—আরাে-সুরা ঢালাে
সুদূরে ছড়ায়ে গেছে আপনার নয়নেরি আলাে।
বক্ৰ ক্ষীণ পথ বাহি,
চলিয়াছে—অন্ত নাহি,
সচকিতে ফিরে দেখে কেহ তারে বাসে নাহি ভালাে।
পঞ্চায়
ওখানেতে রাত্রি শেষে ঝড়ে-পড়া কদমের বনে,
নবীন পথিক বেণু বাজাইছে সবে তাই শােনে।
কত হাসি কত গান,
নাহি তার অবসান,
সে শুধু ফিরেছে তাই তারে কেহ রাখে নাহি মনে।
ছাপ্পান্ন
সমস্যা
গাঁয়ের লােকেরা সুধাইছে মােরে সারাক্ষণ
উহারে দেখিয়া কেমনে আমার মজিল মন?
ওত এত কিছু ভুবন মােহিনী রূপসী নয়,
চোখ দুটো ওর যদিই বা সুধু ডাগর হয়,
আর মেঘ সম কুঞ্চিত কালাে অলকদাম,
তাতে কিবা আসে, সৌরভিদাসী যাহার নাম,
থাকে ওপাড়ায়, তাহারাে ত আছে উহার চেয়ে
শতগুণ চুল, তবু সে কি আর রূপসী মেয়ে !
সাতান্ন
গায়ের রংটা সাদা ওর শুধু একটু তাও,
সাদা রংটাই বড় কি তােমর বলিতে চাও?
কত সাদা ওরা, ধবল যাদের হয়েছে গায়,
গায়ের রংটা সাদা হলে আর কি আসে যায়
ধীরে একজন বৃদ্ধ আসিয়া নিকটে মাের
বলিলেন, ভায়া “কি দেখে ভুলেছ—কি আছে ওর ?
দেখিতে হে যদি আমারি মেয়ের মেয়েটি আজ
বলিতে হইত মেহের উন্নিসা অথবা তাজ।
যদিও তাহার গায়ের রংটা কালােই তবে,
গড়ন দেখিয়া নিশ্চয়ই তুমি অবাক হবে
তবে কোন খানে পাত্র না পেয়ে ছেড়েছি হাল”
বলিনু তাহারে--“মনেরে সুধায়ে বলিব কাল।”
পথে একদল যুবক আসিয়া নিকটে ফের
বলিল আমারে-অমন মেয়ে ত দেখেছি ঢের।
কি লাগি উহারে ভালাে বাসিয়াছ বল ত ভাই
বন্ধু আমরা—সেই দাবীতেই শুনিতে চাই।
জানিতাম যদি মন মজাইবে সহজে এত
ছিল ওপাড়ায় যমুনা—সেও ত সুবিখ্যাত।
মলিনা রয়েছে সে ত একেবারে সােণার থাল।
সবারে বলি—“মনেরে সুধায়ে বলিব কাল।”
আঠান্ন
ক্ষণিকের খেলা
মিছে হাসাহাসি, মিছে ভেবে রাখা
প্রেম সে অচঞ্চল,
রাত্রির আগে দীপ নিভে যাবে-
এই জীবনের ছল।
ক্ষণিকের আলাে কিবা তার আয়ু
নিভাইবে যারে ঝঙ্কার বায়ু,
চির আঁধারের মরিচীকা শুধু
জেগে র’বে উজ্জ্বল,
এই জীবনের ছল।
নগরের সেরা রাজধানী যাহা,
কালের চরণ চুমি,
কালি হবে তাই প্রান্ত বিহীন
শশ্মানের মরুভূমি।
উনষাট
মিলনের হাসি ভালবাসা বাসি,
নয়নের জলে মিলাইবে আসি ;
চির বিরহের আকুল পাথারে
ভাসিয়া মরিবে তুমি ;
কালের চরণ চুমি।
রাজপ্রাসাদের ময়ুর আসনে
বসিয়া যে রাজা, রাণী,
কণ্ঠে দুলিছে মণি-মুকুতার
বিজয় মাল্য খানি,
হ’তে নাহি হ’তে রাত্রির শেষ,
স্বপনের মত মিলাবে ও বেশ,
ভিখারীর বেশে পথ হতে পথে,
ঘুরিয়া মরিবে জানি।
আজি যারা রাজা, রাণী
শারদ রাতের শেফালি কুসুম,
যত শতদল সব,
ফানে ফোটা বকুল বেলার
নব নব সৌরভ
যাট
•
শীত গ্রীষ্মের পরশে কঠিন,
জানা আছে ঝরে যাবে একদিন
কোকিলের কুহু মিলাবে, রহিবে
শকুনির কলরবে।
একদিন যাবে সব।
কিশােরের খেলা নব-যৌবন
সবি স্বপনের মায়া,
দুনিয়ার মাঝে সত্য সে শুধু
মৃত্যু-মলিন ছায়া।
জানি একদিন কিছু নাহি রবে,
এ ধূলার দেহ ধুলি-লীন হবে ;
নব-যৌবন ক্ষয় হবে, যাবে
রূপ-উজ্জ্বল কায়া।
সবি স্বপনের মায়া।
একষট্টি
ফাল্গুনে
নীল আকাশের অসীম ছায়ে চাদ উঠেছে বাঁকা,
ধরার চোখে আজ যেন কোন মায়ার কাজল মাখা।
ওলল বকুল ফুলের ডালি,
আজকে আমার মন ভুলালি,
বনের প্রিয় বসন্ত সই তাের বুকেতেই বাঁধা,
ওগাে পথিক, শেষ করে দাও বাঁশীর সুরে কঁাদা।
বাষট্টি
আকাশ ভরা চাঁদের হাসি-
আজ ফাগুনের পূর্ণমাসী,
নীল আকাশেও ফুটলাে বনের ফুলের মতই তারা,
ওরাও চঁাদের হাসির সাথেই সুর মিলিয়ে সারা।
ওই সুদূরের আবছায়াতে
আজকে নীরব নিঝুম রাতে
ওগাে ফাগুন এই দুনিয়ার পাঁকের পুকুর হতে
হৃদয় আমার নাও ভাসিয়ে দখিন হাওয়ার স্রোতে।
আমায় নিয়ে যাওগাে ভেসে,
ঐখানে ঐ নীলের দেশে,
কুঁড়ির চোখে স্বপ্ন যেথায় কঁপছে গভীর রাতে,
সেথায় আমার মােহন বাঁশী বাজবে সাহানাতে।
পাতায় পাতায় লক্ষ কুহু
ডাকবে সেথায় মুহু মুহু,
ওগাে ফাগুন ফুলবাগানের দুয়ারখানা খােলল।
হান্নাহানার গন্ধে আমার মন যে পাগল হােলাে।
তেষট্টি
কিম্বা যেথায় নভস্থলে।
লক্ষ্য তারার মাণিক জ্বলে,
কিম্বা যেথায় গুমরে মরে অল বীনার তার,
ওই যে সুনীল শূন্য আকাশ ওই যে পারাবার।
আমায় নিয়ে সাঁঝের শেষে
ঐ খানে ঐ রূপের দেশে,
দখিন হাওয়া ভিড়াও তােমার স্বপ্নেরি সাম্পান,
ঐ খানেতেই শুনবাে গিয়ে সন্ধ্যাতারার গান।
সঙ্গে নেব বাঁশের বেণু,
দখিন হাতে গােলাপ রেণু,
অপর হাতে রইবে কটি বকুলমালা গাঁথা
সঙ্গে নেবে আর কবিতার ছিন্ন কয়েক পাল।
ওগো চকোর নয়ন মেলে,
চাদের আলােয় বন্যা এলো,
আকাশ জুড়ে আজ বসেছে অপ্সরীদের মেলা ;
আমায় বারেক ডাক দিয়ে যেও তােমর যাবার বেলা।
চৌষটি
স্বপ্ন
এই সিরাজীর সােনার পেয়ালাটিরে
কানায় কানায় পূর্ণ করিয়া দাও;
বুকের বীণার তার যদি যায় ছিড়ে
সুরের পরশে ভরিয়া উঠিবে তাও।
“ইষট্টি
হাঁসির ফোয়ারা ঝরিছে যেথায় আজি,
বাঁধিবে রে ঘর সেই দেশে মাের। চল ;
নবীন কুসুমে ভরিয়া উঠিবে সাজি,
সহিতে পারিনা বিরহ, চোখের জল।
আঙ্গুরের ক্ষেতে ফাগুন রহেছে বাঁধা
আমাদের প্রিয় বসরা দেশের ফুল।
হাঁসো হাসে। আজ, মিছে বসে বসে কাদা,
সােনার শিকলে বেঁধে রাখাে বুলবুল।
ঢুলে ঢুলে পড়ে দুটি চুর চুরে অাঁখি,
আকাশে হেঁসেছে রুপােলি রাতের চাদ
শুধু এক ফোটা সুরার বদলে সাকি
দিয়ে দিতে পারি ‘বােখারা’ ও ‘ববাগদাদ।
ছেষট্টি
প্রতিশােধ
জীবন যমুনা ব’হে
দিন মাের গেছে ক্ষয়ে,
যৌবন আজি মাের বেদনা-হতা
এই মুখে মুখ রেখে,
এই চোখ দেখে দেখে
কত জন ভালােবেসে কয়েছে কথা।
আমি শুধু ভালো বেসে
উপহাস পাই শেষে,
বুক ভাঙ্গা আঁখি-জল এসেছে নামি ;
এই দেহ এইরূপে,
কভুওবা চুপে চুপে
আপনাতে অপরূপা হয়েছি আমি;
সাতষট্টি
এ অধর শুধু একি
অপরের দেখা দেখি
অাখি ভরা জল নিয়ে মরিবে হেঁসে ?
কার দোষে, কার পাপে,
কার রূঢ় অভিশাপে
এজনম এই মত গিয়েছে ভেসে ?
এইরূপ, এই দেহ,
এই অকারণ স্নেহ
বিলাইতে চহিলেও নিলিনে তােরা ;
আমিও যে আজি তাই
রূপ দিয়ে রুপাে চাই,
জগতের বুকে চাই বিধিতে ছােরা।
যা হবার হােক তবে,
মাের ব্যথা জেগে রবে ;
আঁখি হতে মুছে গেছে স্নেহের ছবি
ব্যথা ভরা বুকে মোর
বুক যবে দিবি তাের,
এই মত হায় তুই ব্যথিত হবি।
আটষট্টি
পিয়াসী
কোথা গেলি আয় সাকি পেয়ালা নিয়ে,
দুনিয়ার রূপ-হাটে কি হবে গিয়ে।
ওরে সাকি আয় আয়,
প্রাণ যায় প্রাণ যায়
ফিরে যাস্ দুটি ফেঁাটা সিরাজী দিয়ে।
উনশাত্তর
যদি নীল পেয়ালাটি ভরে যায় তাে
ভৃঙ্গারে সিরাজের সুরা এনে থাে ;
যতাে দিবি ততাে চাই,
তিয়াসার শেষ নাই,
এ জীবন মরুভূমি হয়ে গেছে গাে।
কোথা গেলি আয় সাকি আয়না ফিরে,
হাস, হাস মিছে ভাসা নয়ন-নিরে,
বুক যার পুড়ে গেছে,
আর যারা দেহ বেচে
তারাইতো চায় শুধু পেয়ালাটিরে।
ভােরের চাদ
রজনীর জ্যোতির্ময়ী তারকারা কোথা গেলাে সব ?
রাত্রি শেষে ধ্বনি উঠে মরণের কোলাহল রব।
যৌবনের বিষ পিয়া বাসনার নীলকণ্ঠ হয়ে,
লীলায়িত বাহু-পাশে এই দেহ জড়াইয়া লয়ে,
এ মিলন চিরন্তন একদিন বলেছিলি যারে,
তুচ্ছ যৌবনের শেষে অকস্মাৎ ভুলেছিস্ তারে?
একাত্তর
অদূরে জ্বলিছে চিতা, জ্বালাময়ী হলে অস্তাচল,
শােক-বস্ত্র পরিহিত ভ্রাম্যমাণ ভ্রমরের দল,
জাগাইছে অশ্রুভেজা ধরণীর পুষ্প-চক্ষুগুলি।
জ্বালাময়ী মৃত্যু-চিতা জ্বলি উঠে লক্ষ বাহু তুলি।
কোথা গেল তারকারা জ্যোতির্ময়ী রূপসীর দল ?
রজনীর ভালবাসা তাহাদের শুধুই কি ছল?
রূপের পূজারি তারা যৌবনের সহচরী খালি,
রূপের পূজার তরে বহে আনে প্রণয়ের ডালি।
যৌবনের অবসানে রূপহীন দেহ যবে হয়—
প্রণয়ের স্বপ্ন ভাঙ্গে আর তারা কেহ তব নয়।
শারদ রাত্রির শেষে জীবনেরে চিনিয়াছি আমি
নয়নের প্রান্ত হতে অশ্রু তাই আসিতেছে নামি।
মরণের করস্পর্শে নিভু নিভু নয়নের আলো।
রূপ মুগ্ধ রূপসীরা কেহ মােরে বাসে নাহি ভালো।
বাহাত্তর
মরুর পথে
মােরা বেদুইন ছিড়িয়া এসেছি
দুনিয়ার মায়াপাশ ;
ওরা পিছু হতে মিছে ডেকে কয়,
“কোথা যাস্ কোথা যাস্
মােরা কোথা যাই কে বলিবে ভাই
পথের ঠিকানা কিছু জানা নাই,
অসীমের ডাক শুনিয়াছি তাই
অসীমের পানে ছুটি
চির অজানারে খুজিয়া বেড়াই
ধূলায় ভরিয়া মুঠি
তিয়াত্তর
;
সারা দুনিয়াই আমাদের প্রিয়,
কোনখানে কেহ নাহি আত্মিয় ;
মরুপথে যেতে মিলেছে যাদের
তাহারাই ভাই বােন্ ;
পথের সাথীরা সখা সখী হয়
যবে যাহা প্রয়ােজন।
সকলি সমান ধূলি আর সােনা,
মােরা মরুময় করি আনাগােনা ;
আপনার মনে বাঁশরী বাজায়ে,
আপনার। তাই শুনি ;
বেদুইনাদের কোলে মাথা রেখে
আকাশের তারা গুনি।
চাদের আলােয় কেহ ভুলে রয়,
কেহ গান গায়, কেহ ক থা কয়
কেহ অকারণে আকাশের পানে
দু’বাহু বাড়ায়ে দিয়া
চাদেরে ডাকিয়া হেসে হেসে কয়
হেথা নেবে আয় প্রিয়া
চুয়াত্তর
নীল আঁখি তুলে বেদুইন মেয়ে
বলে দয়িতের
মুখপানে চেয়ে
”ওগগা বল দেখি এই পথে যারা
গিয়াছে অপর ধারে,
সাঁঝের তারাটি বাঁশীর বেহাগে
ধরিয়া নিতে কি পারে ?”
চলার নেশায় চলি সকলেই,
বেদুইনদের বেণী খুলে
দেই ;
খেয়ালের বশে গান গাহি আর
গান শুনি চিরদিন ;
মােরা মুসাফির মরুপথে পথে
ঘুরে মরি দ্বিধাহীন।
চির অজানার পিছে পিছে ঘুরে
রূপের নেশায় আঁখি চুরচুরে ;
বুকের বাগিচা ফুলে ফুলে যেন
হয়ে গেছে লালে লাল ;
মােরা মুসাফির মরুপথে পথে
ঘুরে মরি চিরকাল।
পঁচাত্তর
স্রোতের ফুল
'চলেছি আজ নামহারা কোন
নিরুদ্দেশের পানে••••••
সন্ধ্যাতারাই জানে ;
ওগাে অতীত স্মৃতি এবার
আমায় তুমি ভােলাে ;
বাঁশীর সুরে কেঁদে যে আজ
বিদায় নিতেই হােলাে।
ছিয়াত্তর
চোখ-ভরা মাের আলাে ছায়ার
চলেছি পথ হাওয়ার স্রোতে
খামখেয়ালীর মত
বাঁশির সুরে ওগাে তােমার
নয়ন যদি খােল,
স্বপন পরী সেই কথাটি
যেও আমায় বােলে।
কোন পথে ঐ
সুদূর আমার
আরাে সুদূর হবে ;
ওগাে অতীত বিদায় নিও
বিদায় নিও তবে।
গানের সুরে বহে এলেম
সােনার তরি মাের
সারা জীবন তাের,
ঝরা ফুলের মালা আমার
স্মৃতির খেয়াঘাটে
রইল পড়ে কোন অতীতের
অন্ধকারের হাটে।
সাতাত্তর
দূর আলেয়ার আশায় ভুলে
শূন্য হাওয়ায় মেশা-
কণ্ঠ ভরে করেছি পান
অারাে চলার নেশা।
বলেছি তার অচিন আলাের
আঁচল খানি ধরে ;
“পথ ভুলিয়ে দেগাে আমায়
আরাে উদাস করে”।
কোন অগােচর দেশের তরে
সুরের পুষ্প রথে
চলেছি আজ পথে •••••
ওগাে অসীম সুদূর তুমি
সুদূর হয়েই থেকো ;
আলো ছায়ার হাতছানিতে
ওমি করেই ডেকো।
ভেবে ছিলেম সবার কাছে
বিদায় নিয়েই নেবাে ;
দূর অজানার শূন্যে আমার
সুরের কবর দেবাে।
আটাত্তর
বিদায় নেবার আগেই আমার
বিদায় বেলা এলাে;
ওগাে অতীত ! বুকের থেকে
আমায় মুছে ফেলো।
উনআশী
শেষ বিদায়
এবার খেয়া বইতে হবে
ডাকছে আমায়নীল ;
অসীম স্বপন লােকের পানে
উধাও আমার দিল.....
হয়তাে অনেক দিনের পরে,
তােমায় আমায় বালির চরে
আবার হবে এম্নি করে
এম্নি চোখের মিল ;
দূরের মায়ায় মুগ্ধ হয়ে
স্বপ্নে দিশাহীন,
কেই বা জানে পাগল পারা
ঘুরবাে কত দিন।
আজকে নীরব নিঝুম রাতে,
বিদায় করুণ বেদনাতে,
রেখে গেলাম তােমার হাতে
আমার বুকের বীণ।
-
আশী
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.