Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Pashan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
প্রমথনাথ রায়চৌধুরী মূল্য-৩:আট আনা
৬ নং সিমলা ঠুটি প্যারাগন প্রেসে,
ঐবিষ্ণুপদ হাজরা কর্তৃক মুদ্রিত।
বার, ১৩৩১ সাল।
২০১ নং কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট
বেঙ্গল মেডিকাল লাইব্রেরী হইতে
এগুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত
ভe সাপ।
সাহিত্য-ভক্ত
শ্ৰীযুক্ত প্রফুল্লনাথ ঠাকুর
সক।
No text on this page.
সূচী পৃষ্ঠা ৪ বিষয় তুষার যাত্রা যাদুর পাষাণ হিমালয়ে দুর্গোৎসব আমার টুনটুনি পাখী ধবলের স্বপ্ন ••• ৭ ••• ১৪ = ৩০ ২; গান ভিক্ষা তুমি ও আমি পাষাণ যােগী মাতার প্রতি ••• ২৪ ••• ••• কাব্যের প্রাণ ••• ২৯ ** ••• ••• ৪১ আমরা কি কম নব জীবন বাঙ্গালীর মা বাহবা বাঙ্গালী সাবাস বাঙ্গালিনী কালা পল্টন ••• ••• ৪৮ } বিষয় পৃষ্ঠ ••• ••• । । । ••• ৬৭ সাহসী হাবিলদার খার সঙ্গী ভাইফোঁটার গান জাগ্রত পাষাণ খােদার মিনার পাষাণ পীর দুনিয়ার বােনাই হিমালয়ে প্রভাত হিমালয়ে হােলী হিনায়ে বৃন্দাবন হিমালয়ে মধুরাত্রি উদয়াস্ত, না দুটী কবিতা বিদায়ের অশ্রু ••• ৩৮ ••• ৭১ ••• ৭৩ ••• ৭৫ ৭ ••• ••• ০ ০ ০ ৮০
তুষার যাত্রা
দেখিতে দেখিতে প্রিয়ে, এ কোথায় আসিলাম,
কে ঘুরায় কুহকের চাকা?
যে দিকে ফিরাই আঁখি অবাক চাহিয়া থাকি,
রাশি রাশি ছবি দেখি আঁকা।
বাষ্পরথ উঠে ঘুরে, মনােরথ চলে উড়ে
ভাঙ্গি ভাঙ্গি ঘন মেঘর,
নিবাত নিষ্কম্প শােভা দাড়াইয়া পথে পথে,
মাঝ দিয়া চলেছে ঘর।
ওই দেখ প্রকৃতির
গম্বুজের দীর্ঘ সারি
শােভিতেছে পাষাণ-নগরে,
শৈবাল-মখমল চা
যেন লক্ষ রথবা
ছায়া রৌদ্র ল’য়ে খেলা করে।
লতার ঝালর ঝােলে, ফুলের থােবনা দোলে
শরতের মৃদুমন্দ বায়,
শিলার সােপান বেয়ে
উপত্যকা গেছে নেমে
সমতলে যেন পাম পাম!
পাষাণ
পাহাড়ের থাকে থাকে শ্যামা নেচে নেচে ডাকে,
শিষ দেয় দোয়েল কি মিঠে,
হেথা, চা-গাছের শ্রেণী সেথা, গুল্ম-লতা-বেণী
দুলিতেছে পাষাণের পিঠে,
পােষ পারাবত প্রায়
মেঘ উড়ে ভেসে যায়,
থেকে থেকে গায়ে এসে পড়ে,
গৈরিক বসনে কভু
লাগায় রেশমী পাড়,
কখনও শিখর-চূড়ে চড়ে।
রৌদ্র পরি নীলাম্বরী
যেন নববধূ যায়
দুর্গোৎসবে পিত্রালয়ে হাসি,
কাঠুরিয়া কাঠ কাটে, ঝরণার জল নিতে
পল্লীবধূ জুটিয়াছে আসি।
নেপালীর ছোট মেয়ে
পরিয়া ওড়না-শাড়ী
চন্দন-তিলক ভালে টানি
শিরে বাধা শিখীপুচ্ছ, বলয়-লতার গুচ্ছ,
সাজিয়াছে পাহাড়িয়া রাণী ।
=
লােমশ গভীরা চেয়ে
ঢল ঢল আঁখি দিয়ে
ছল ছল করিছে কাকুতি,
আপনারে বিলাইয়া
ক্ষুদ্র প্রাণে বাদল
দধীচির লভে অনুভূতি।
তুষার যাত্রা উলঙ্গ বালক ওই ধায় করতালি দিয়া বাজী ধরে বাষ্পন সনে, ওই দেখ, পুন থেমে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাইয়া ব্যঙ্গ-ছলে হাসিছে কেমনে? গেরুয়া বসনাবৃত মুণ্ডিতমস্তক লামা স্ফটিকের মালা করে জপ, উন্ধে নিয়ে ঘন বন- যেন বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ করিতেছে নির্বাণের তপ। দেখ দেখ, উর্ধপথে কি অপূর্ব দৃশ্য এক ছবি নয়—সজীব মহিমা, অভ্রভেদী শুভ্র শির মহা শূন্যে আছে স্থির, অসীমের করিতেছে সীমা। ওই শােভা-শৈলতটে ‘পাইন’-পাড়ার মঠে আরাম-আস্তানা বাঁধি গিয়ে, হই কোয়াশার দেশী তুষারের প্রতিবেশী, ধবলে ডুবি গে চল, প্রিয়ে।
যাদুর পাষাণ
ডানে পাহাড়, বামে পাহাড়,
পাষাণ-ভুবন আগে পাছে
এদিক ওদিক নাসপাতির ঝাঁক
বাদুড় যেন ঝােলে গাছে।
কমলালেবুর কুঞ্জে কুঞ্জে
খুলে গেছে লালের বহর,
পেয়ারা-বনে ঢেউ খেলে যায়
সবুজ শােভার মিঠে লহর।
ঝ ঝ ঝ ঝরণা ঝরে
শিলার বুকে মায়ের স্তন,
দিনের আলাে ঘুমিয়ে পড়ে
শুনতে শুনতে কলম্বন।
ভুটীয়ার এক পল্টন, না এ
শােভে দূরে ‘পাইন’-শ্রেণ ।
সেনানীর সঙ্কেত তরে
দাড়িয়ে আছে মুক্তবেণী ?
যাদুর পাষাণ
যেন বিরাট দৈত্য-শিরে
ডায়মণ্ডকাটা উচু তাজ,
ফলায় তাতে রবির কর
সােণার উপর মিনার কাজ।
জ্যোৎস্না-রসাল মধুরাতি
নবরতন গড়ে যেথা,
কাচ্ছা-বাচ্ছা নিয়ে সদ্য
অবাক, এসে উঠলাম সেথা !
দেখতে দেখতে চারটি পাশে
গড়ে উঠল রূপের বেড়া,
মাঝে ঘুরছি বন্দী মােরা,
শৈল-ইন্দ্রজালে ঘেরা !
মখমল-মােড়া শিলা-প্রাচীর,
আকাশ তার আশমানী ছাদ,
বাসের কার্পেট পাতা মেজে
ভােজের এ কি মায়া-প্রাসাদ।
ঢেউ-খেলান সােপানসারি
হরিৎ গালিচাতে মােড়া,
শিলার টবে ডেলিয়া, ডেইজি,
থাকে থাকে পাহাড় জোড়া!
৬
পাষাণ
হিমের শিরায় রক্ত নাচে,
জড়ের মাঝে কাপে প্রাণ,
পাথর ফেটে ভাষা উঠে,
শুনছি কত যুগের গান।
রূপের কঠিন পটী যেন
কমল-কোমল আস্তরণ,
হিমের বন্ধে অনুবন্ধে
তপ্ত প্রেমের সম্ভাষণ।
২
হিমালয়ে দুর্গোৎসব
গিরিরাজ, আজ তােমার ঘরে এত ঘটা কিসের তরে ?
এল তােমার উমাশশী বুঝি একটি বছর পরে !
হঠাৎ এ কি মােহন সাজে সাজল তােমার তুষার-পুরী,
পাষাণ-বুকে মানূলে কে আজ অশ্রু-গড়া প্রেমের ছুরি।
পাতার আড়ে সারে সা’রে ঝুলছে ফল-ফুলের মালা,
তােমার পাঁচটি পরাণ দিয়ে সাজালে কার বরণডালা।
হাসিতে আজ ফেটে গেছে যেন তােমার সকল রােদন,
হিমালয়ে দেখছি যে আজ বিজয়াতে অকালবােধন।
ওই আসে ওই মহামায়া মেঘবাহন মায়ারথে,
অযুত উৎস ভল কুম্ভ হৈমবতীর যাত্রাপথে।
মেঘের মাঝে নৌবত বাজে শৃঙ্গ হতে শৃঙ্গান্তরে,
তাতে সানাই নিয়ে সাহানা-সুর আলাপ করে !
ঝরণা দিচ্ছে উলুধ্বনি বাতাস বাজায় শুভ শাখ,
বজরবে কেশরী আজ ছাড়ছে ঘন ঘন হাঁক।
পীত রৌদ্র ছড়িয়ে দেছে আঙ্গিনাময় গােযােচনা,
বরফ গলে যাত্রাপথে দিয়ে গেছে আলিপনা।
পাষাণ
বাজিয়ে বিষাণ নাচে ঈশান, ঈশান কোণে ত্রিশূল জ্বলে,
বৃষভ চামর পুচ্ছ তুলে গর্জে, নাচে কুতূহলে।
নন্দী ভৃঙ্গী বব বম্ বাজায় গাল গুহার মাঝে,
শিখর 'পরে শ্মশান-সেনা কুহেলিকার আড়ে সাজে।
বিজয়া না আগমনী ? কৈলাস, না এ হিমালয় ?
সারা হৃদয় কৈলাস আজ, সকল বিশ্ব হিমালয়।
মায়ের আমার চিরবােধন, তাঁহার ত নাই বিসর্জন!
আমরা মূঢ়, বেদী গড়ি, আসন যাঁহার ত্রিভুবন।
শুষ্ক তর্কের ঝুলি খুলে শক্তি-পূজার ব্যাখ্যা করি,
চিরদিনের মাকে তুলে তিনটি দিনের পুতুল গড়ি।
বীরের শষ্যা রেখে লজ্জায় ফুলবাবু তাই ষড়ানন,
সিদ্ধিদাতা সিদ্ধি খেয়ে ঢুলু ঢুলু দু’নয়ন!
বাণী গেছেন সিন্ধুপারে নিতে আবার হাতে খড়ি,
পৌরুষ যেথা, লক্ষ্মী সেথায় উড়ে গেছেন পেঁচায় চড়ি।
উঠছে কলুষ-মহিষাসুর শ্মশান-শব হতে আজ,
দশ হস্তের প্রহরণও হয়ে গেছে ডাকের সাজ।
দশমীতে ডুবিয়ে ভরা ধরি সবাই গলাগলি,
দু’দিনে যায় কোলাকুলি, পাকিয়ে তুলি দলাদলি !
আসিস্ যদি, আসিস্ বঙ্গে শ্মশান-রঙ্গে দশভূজা,
আমরা ভক্ত, আমরা শাক্ত কব সেদিন শক্তিপূজা।
হিমালয়ে দুর্গোৎসব
তােমার ছেলে বলে সেদিন পূজা পাব ঘরে ঘরে,
উচু মুখে ছাতি ঠুকে জায়গা নেবে চরাচরে।
মােদের পূজা অভিনয়, সপ্তমীতেই বিসর্জন,
পাষাণ, জান দুর্গোৎসব, তােমার ঘরে চিরবােধন।
ওই শােন, ওই রাঙ্গা পায়ে ঝুমুর ঝুমুর নুপূর বাজে,
আকাশে, না বাতাসে, না তােমার প্রতি শিলার মাঝে ?
জলে, না ও স্থলে ? না, না, নিখিল-চিত্ত-অন্তঃপুরে!
রাঙ্গা পায়ে ঝুমুর ঝুমুর নুপূর বাজে ভুবন যুড়ে।
আমার টুনটুনি পাখী
বাবা কোথায় যায়? ও কি। বাবা কোথায় যায়?
কি কথা আজ বলে থােকা টুলটুলিয়ে চায়!
যার হাসিতে জগৎ হাসে, চোখের জলে পাষাণ ভাসে,
তার মুখে যে মেঘ করেছে খুসীর আকাশ ছেয়ে,
টুনটুনি মাের শুনাে মুখে টুলটুলিয়ে চেয়ে।
কি ব্যথা আজ ঢেউ খেলে যায় ও একরত্তি প্রাণে,
আকাশ বুঝি বােঝ তাহা, বাতাস বা তা জানে!
কে বলে রে বরফ গলে ?
হিমালয় আজ অশ্রুজলে
রবির কিরণ পাংশুমুখে পাহাড় ছেড়ে যায়,
টুনটুনি মাের শুনাে মুখে টুলটুলিয়ে চায় ।
পাইন্দলের আমার ওপর আজকে বেজায় রাগ,
কেন না ওই কঁাচা প্রাণে যাচ্ছি দিয়ে দাগ,
তেলিয়া-ডেজির শুকনাে মুখ,
ফেটে যাচ্ছে মেঘের বুক,
চোখের জলে ভেসে ঝরণা খেদের গীত গায়,
টুনটুনি মাের শুনাে মুখে টুলটুলিয়ে চায়।
১১
আমার টুনটুনি পাখী
চেয়ে রইলি আমার পানে মেলে উদাস আঁখি,
আমি চলে এলাম দিব্বি দিয়ে তােরে ফাকি
এনি ফাঁকির ফাঁদে পড়ে আমাদের এ দুনিয়া ঘােরে,
ভবসিন্ধুর ছােট ভেলার তুইও ত এক নেয়ে,
টুনটুনি মাের টুলটুলিয়ে তবে কেন চেয়ে।
আঘাত দিয়ে তােরে যেমন মাথায় হাত বুলাই,
মুখের গ্রাসটি কেড়ে শেষে খেলনা দিয়ে ভুলাই,
মােদের জীব-যাত্রার পাছে ভাগ্য এমনি লেগে আছে,
আসল নিয়ে নকল দিয়ে সংসার এনি ঠকায়,
টুনটুনি মাের টুলটুলিয়ে তবু কেন চায় ?
ঠোঁট কেন তাের কাঁপে, যাদু, জল কেন তাের চোখে ?
ঘুরছে শূন্যে কালের চাকা, মাফ করবে কি তােকে ?
যুগযুগান্তর গেছে চলে কত ব্যথার কলজে দলে’!
কে বলে হয় ক্ষতির পূরণ ? যায় যা, তা কি ফিরে।
টুনটুনি মাের টুলটুলিয়ে বৃথা আঁখিনীরে।
বেলার বাহুডােরটি খুলে কিরণ-চোর ওই ভাগে,
নীরদ-বঁধু হিমানীর ঠাই হঠাৎ বিদায় মাগে।
ঝর ঝর’ পাঁপড়ি ওই
জাত না যে বোঁটা বই,
পাশ কাটায় সে বাঁধন ছিড়ে নূতন কোলটী পেয়ে,
টুনটুনি মাের টুলটুলিয়ে হায় রে তবু চেয়ে!
পাষাণ
ও গিরিরাজ, দেখাে, রইল আমার বুকের ধন,
বহুরূপী সাজ দেখিয়ে ভুলিয়াে তাহার মন।
ও আকাশ, ও মেঘের মালা, রইল আমার রূপের ডালা,
নিও কোলে, যাদু বলে’ আদর করে তা’য়,
টুনটুনি মাের শুনাে মুখে টুলটুলিয়ে চায় ।
ও হিমানী, বাছার ভার তােমায় সঁপে যাই,
দুটি গালে ফুটিয়াে গােলাপ দেখব এসে তাই!
সন্ধ্যা হলে ঘুমের গান
শুনিয়াে তারে, ওগাে পাষাণ,
শীতল হাতটী বুলিয়ে দিও মণির সারা গায়,
টুনটুনি মাের শুনাে মুখে টুলটুলিয়ে চায় !
‘বাবা কোথায় ? বলে’ ক্ষ্যাপা জেগে উঠবে যখন,
ভুলিয়ে রেখাে দেখিয়ে তােমার গিরিপুরের স্বপন,
সারাটা দিন খেলা দিয়ে রেখাে স্মৃতির সীমায় নিয়ে,
বরফ সে খুব ভালবাসে দেখতে তােমার চূড়ায়,
টুনটুনি মাের শুকনাে মুখে টুলটুলিয়ে চায়!
ছুটল গাড়ী, শুছি পাছে—বাবা কোথায় যায়?
তােতা পাখীর সজল আঁখি আমার পানেই ধায়।
জড়িয়ে জ্যোৎস্নার পাতে পাতে দুটি আঁখি চল সাথে,
কার রূপে আজ সারা ভুবন গেছে হেন ছেয়ে ?
টুনটুনি মাের শুকনাে মুখে টুটুলিয়ে চেয়ে !
১
আমার টুনটুনী পাখী
পড়লাম সেই আঁখিতারায় জীব-জন্ম-ধারা,
দেখলাম ব্যোম, সূৰ্য্য সােম, কত গ্রহ তারা।
সে আঁখিতে দিল দেখা
জন্ম জন্মান্তরের লে
চপল, পাগল-যুগল আঁখি চলল সাথে ধেয়ে,
টুনটুনি মাের শুকনাে মুখে টুলটুলিয়ে চেয়ে।
ধবলের স্বপ্ন
তােমায় আমায় এবে ছাড়াছাড়ি, গিরি,
তােমার ধবল তবু আছে মােরে ঘিরি !
কাল নিশি দ্বিপ্রহরে
ঘুমায়ে ছিলাম ঘরে,
নিদ মাঝে সিদ কেটে দিলে দরশন,
দেখিনু ত্রিভঙ্গ-বাঁকা রূপের স্বপন।
আপনারে চিনিলাম সেই মধুরাতে,
আমি আর আমি নাই, মিশেছি তােমাতে!
তােমার বরফ হয়ে গলে’ ঝরে যাই বয়ে,
কখনও বা নীল অঙ্গ, কভু রাঙ্গা ছবি,
কভু বাষ্প, শষ্প, পুষ্প, তােমার অটবী।
মেঘ হয়ে ঘুরে ফিরে ঘুমাই ও বুকে,
জাগিয়া পাথরে তব মরি মাথা ঠুকে।
আবার সাজিয়া মালী চারা গাছে জল ঢালি,
ফুল হয়ে ঝরি কভু কলি হয়ে ফুটি,
কখনও নিঝর হয়ে গান গেয়ে ছুটি।
ধবলের স্বপ্ন
রাকা জ্যোৎস্না হয়ে কভু জগৎ ভাসাই,
গম্ভীর, তােমারে আমি কঁাদাই হাসাই।
তােমার আকাশে চড়ে তারার বুলনা গড়ে
দোল দোল দুলি আমি, খেলি লুকোচুরি,
কখনও গ্রহের সাথে নেচে নেচে ঘুরি!
পীত রৌদ্র হয়ে ছায়া-সখীরে সাজাই,
সূর্য-ঘড়ি হয়ে তব প্রহর বাজাই।
হিমের হিমাংশু সাজি’ ভাের করি কভু বাজি,
কখনও বাদল হয়ে শিল ছুড়ি খালি,
গুহায় গুহায় ফিরে’ দিই করতালি।
তবু আমি ক্ষণেকের অতিথি তােমার,
একদিন তােমা মাঝে পাতিব সংসার।
সেদিন কহিব প্রাণে, চু, চুপ, রহ ধ্যানে,
আপনারে সাজাইব ও মৌন-আশীষে,
তােমার পাষাণ-স্তরে রব আমি মিশে।
মেঘ
সাজ সাজ, নব জলধর,
বহুরূপী, তুমি যাদুকর !
কখনও সাজিছ ছুড়ী,
কভু থুরথুরি বুড়ী,
কোথাও বা সাজ হরিহর।
কভু কালিন্দীর বেশ,
কখনও নারীর কেশ,
কোথা গৌরী গৈরিক-বসন,
গঙ্গা-যমুনার সাজ,
সােণাতে মিনার কাজ,
কভু পীত, পাটল বরণ !
কোথাও কাটালিচাপা
পর’ জাফরাণি ছাপা,
কোথা শ্বেতচন্দন-তিলক,
কোথাও গােলাপগুচ্ছ, কোথা বা কলাপী-পুচ্ছ,
কোথা যেন এক ঝাঁক বক।
কোথাও বা কুম্ভকর্ণ,
ঐরাবত শ্বেতবর্ণ,
কোথা তােল ইন্দ্রধনু গড়ি,
কোথা দীর্থ কৃষ্ণকায়
অসি হাতে বীর ধায়
রক্তবর্ণ অশ্বিনীতে চড়ি।
মেঘ
কখনও বা বাত্যাহত
ঘুরিতেছ ইতস্তত,
লুকাইছ উপত্যকা কোলে,
কখনও বা ক্লান্তিভরে
সারা গায়ে ঘৰ্ম্ম ঝরে,
পড়’ তুমি মধ্য-পথে ঢলে।
কোথাও পাথার-ফেনা, কোথাও আঁধার-সেনা,
বহুরূপী, সেধে এই শাজা!
কখনও বর্ষণ সারি’
রৌদ্রে দাও পথ ছাড়ি,
ঘড়ি ঘড়ি এ কি সঙ, সাজা?
কখনও বা দিগভ্রান্ত
স্বরগের শান্ত পান্থ
কোন দেশে যাও ভেসে ভেসে ?
কখনও বিশ্রাম তরে
শিলার অতিথি-ঘরে
গুহাদ্বার ঠেল তুমি এসে!
কভু সাজি কৃষ্ণসার
চর্ম খুলে আপনার
রচ’ শৈল-আত্মার আসন,
কখন পিঙ্গলা গাভী।
হিমাদ্রি জননী ভাবি
টানে তব পরিপূর্ণ স্তন!
পশি কভু ঝােপে ঝাড়ে ঢেউ-খেলা শৃঙ্গ-আড়ে
ঘাের হিমে পােহইছ রােদ,
রবিতাপতপ্ত মাথা
বিটপীর তুমি ছাতা,
শূন্য পথে সুৰ্য কর রােধ।
পাষাণ
নিঝরকে বারি দিয়ে
সেই জলে নেয়ে গিয়ে
শােন বসে কুলু কুলু তান,
কখনও কাপাস ধােননা,
নীলিমার জাল বােনাে,
কভু বায়ুস্পর্শে খান্ খান্।
কখনও নাশিতে সৃষ্টি কর রােষে শিলাবৃষ্টি,
জ্বলে অসি বিজলী-ছটায়,
পুন পুরুভুজ মত
এক ভেঙ্গে হও শত,
প্রতি অণু রক্তবীজ প্রায় ।
যেথায় ফুলের গাছে
রবিতাপ লাগিয়াছে,
সেথা মেঘ, নাম’ ঝ ঝ,
ও মালী, তােমার বাগে কত জল বল লাগে ?
এততেও ভেজে না পাথর !
কি জালা শীতের দেহে ?
বরফের যতুগৃহে
রাবণের চিতা বুঝি জ্বলে!
হিমানী নিতেছে চুষে, পাষাণে যেতেছে শুষে
দরধারা পলে পলে পলে।
ফোট’-ফোট কত কলি, নাম’ সেথা গলি’ গলি’,
ঢাল জল, ওগাে মালাকর,
শুষ্ক পাতা, শীর্ণ তৰু,
পিয়াও তােমার চরু,
অশ্রু সম বর’ দর দর্।
মেঘ
চাতকী কি জল যাচে? সে যে ধ্বনি শুনে বাঁচে,
নটবর, ডাকো, তুমি ডাকো,
শুনি তােমার বাণী
চলে যায় অভিমানী,
চাতকীর প্রাণ মান রাখাে।
ডাকো তুমি গুরু গুরু,
শুনে’ হিয়া দুরু দুরু,
নেচে নেচে দিবে করতালি,
খুলেছি গৃহের দ্বার,
কর এসে অভিসার,
ওগাে মাের শ্যাম বনমালী।
কি লাগি পাষাণ-বুকে
মরিতেছ মাথা ঠুকে ?
কারে খোঁজ বৃথা কূয়াশায়।
আকাশ আমার গৃহে
শয্যা পাতিয়াছে স্নেহে,
এস উড়ে প্রেমের পাখায় !
বাতাস আমার ঘরে
বাষ্প আনি তব তরে
স্বপ্নজাল করিছে বয়ন,
আমারও কুঞ্জের গাছে
আকাশকুসুম আছে,
এস দোহে করিব চয়ন।
গান ভিক্ষা
ও পাষাণ, ও চিরমোন পাষাণ,
শিখাও আমায় নীরবতার গান।
যে সুরে যায় হারিয়ে কথা,
উথলে উঠে প্রকাশ-ব্যথা,
যে গান করে মরমে সন্ধান,
আমি তােমার পড়া-পাখী, মনের ভুলে উঠি ডাকি,
ভেঙ্গে ফেলি বিশ্বতানের ধ্যান!
ও পাষাণ, ও চিরমৌন পাষাণ,
শিখাও আমায় মানবতার গান।
যে সুর মেতে পরকে মাতায়, যে তান কেঁদে পরকে কাঁদায়,
যে গান আনে মৃতদেহে প্রাণ,
যার ধ্বনিতে ঘাতক গলে, যার বাণীতে পাতক টলে,
ঘাের পাতকী পায় পরিত্রাণ!
ও পাষাণ, ও চিরমোন পাষাণ,
শিখাও আমায় মরণ-জয়ী গান ।
যে সুরে পায় বধির শ্রবণ, মূকের মুখে ফোটে বচন,
জন্মান্ধ হয় হঠাৎ চক্ষুম্মান,
যার ইঙ্গিতে শােক জুড়ায়,
যার ভঙ্গিতে ভোেগ পালায়,
সেই সঙ্গীত কর আমায় দান!
গান ভিক্ষা
২১
ও পাষাণ, ও চিরমোন পাষাণ,
শিখাও আমায় সুরেশ্বরের গান,
সােণাঢালা তােমার চুড়ায়, যে মূচ্ছনায় আলাে গড়ায়,
সেই সুরের সুধা করাও পান।
কি তােমার বিরাট কোলে, মেঘ-সমুদ্র যে তান তােলে,
সে সুর-স্রোতে করাও আমায় স্নান!
তুমি ও আমি
বিশ্বের আমি পায়ের কাদা, তুমি হচ্ছ মাথার চুড়া,
তুমি যদি ভর কর, ত সে চাপে হই আমি গুড়া।
তুমি ঠিক সেই বােম্ ভােলা, একেবারেই বেহুস্ খােলা,
শিখলে নেশাখােরের ধরণ-কবির সঙ্গে বাসর জাগা,
কিন্তু ও ভাই, এ যে তােমার কাকের ওপর কামান দাগা !
আধি-ব্যাধি জরা-মরণ ভুলে গিয়ে অকস্মাৎ
ভাবি যখন সৃজন কুঞ্জে আমরা গন্ধরাজের জাত,
দেখিয়ে তখন বিরাটরূপ
করাও এসে আমায় চুপ,
চা-পাত্রে যে ঝড় ভােলা এ! উচিত কি ভাই, অত রাগ ?
একেই বলে থাকে লােকে, কাকের ওপর কামান দাগা !
হঠাৎ আবার লুকিয়ে পড় ঘন বাষ্পের অন্ধকূপে,
সত্য যেমন চাপা পড়ে ক্ষণেক মিথ্যার ভস্ম স্তুপে!
দেখেছি ভাই, অভ্র ছিড়ে
উঠে আসা ধীরে ধীরে,
দেখতে দেখতে তখনই ফের মধুর হয়ে বিদায় মাগা,
আমার পক্ষে এটা যে ঠিক কাকের ওপর কামান দাগা ।
তুমি ও আমি
তুমি বিশাল, আমি বামন, তােমায় আমায় হয় কি যােগ ?
তােমার এটা গ্রহের ফের, আমার এটা রাশির ভােগ।
তােমার তুঙ্গ মধুশৃঙ্গে
আমার মত্ত মনােভৃঙ্গে
কি করে যে মিলন হ’লবলতে পার হাঁ গা?
যাই কেন না বল, এটা কাকের উপর কামান দাগা !
শত পাকে ঘুরায় ভাগ্য বেঁধে মায়ার সূতাগাছি,
গরীবের এই মনটা নিয়ে তুমিও খেলবে কানামাছি ?
ঘুছি মােরা কার ইঙ্গিতে ?
কোন্ ভুবনের কি সঙ্গীতে?
এর উপরে কষছে তােমার পাষাণ-প্রেমের মরণ-তাগা।
সত্যি বল, এটা কি নয় কাকের উপর কামান দাগা ?
ওগাে গৈরিক-ধারী, আমায় নিবে যদি সাধন-গুহায়,
শিখাও তােমার তপের তন্ত্র, মন্ত্রশিষ্য কর আমায়।
বব বব বাজবে গাল,
রবি-শশী দিবে তাল,
নাচবে গ্রহ-উপগ্রহ তােমার মতই ক্ষ্যাপা নাগা,
যদিও এটা স্বীকার করি, কাকের ওপর কামান দাগা !
ওই যে আভের বাঁধন কেটে ছুটে আসছে রবিকর,
তােমার পাকা চুলের ওপর বসিয়ে দেবে সােণা-টোপর,
মখমল পাতা মেজো তােমার
বাসর-সজ্জা হবে দোহার,
হিয়া-বধূর সাধ্য কি ও কঠিন কোলটী হ’তে ভাগা।
সাধে বলি, এটা তােমার কাকের উপর কামান দাগা।
পাষাণ যােগী
মাথায় দিব্যি বরফ ঠেসে যেন পক্ষাঘাতের রােগী,
কোয়াশার লেপ মুড়ি দিয়ে যােগ কছ কি পাষাণ-যােগ ?
তিন কাল গিয়ে এক কাল আছে, কি ফল ফল্বে বুড়াে গাছে ?
তােমার জপ-তপ স্বর্গ ছেড়ে ধাইছে রসাতল,
বিশ্ব-সুধা আজকে যেমন ক্ষুধার হলাহল !
এক সূচাগ্র ভূমির জন্যে ভায়ে ভয়ে আড়াআড়ি,
রুটীর টুকরা নিয়ে হচ্ছে মায়ে ছায়ে কাড়াকাড়ি ।
বইছে ধরায় রক্তগঙ্গা, তুমি ওগাে কাঞ্চনজঙ্ঘা,
দেখছাে চেয়েজন যাচ্ছে প্রলয় পথে ধেয়ে,
তুমি আছ আপন ধ্যানে শূন্য পানে চেয়ে!
‘বড়’ আজ যে চেপে মাছে চরণ তলে ‘ছােটর প্রাণ,
ক্ষুদ্র ভাবে, বৃহতের জাঁক কবে কিসে খা খা !
দ্বিপদ চতুষ্পদের প্রায় জাতির মাংস ছিড়ে খায়,
রক্তমাখা খাণ্ডা হাতে নাচে, অট্টহাসে,
নরকের ক্লেদ মনে-প্রাণে ভরা শ্মশান-বাসে।
পাষাণ যােগী
২৫
যক্ষ্মা-রােগীর ঝাঁঝরা বুকে প্রাণের আশা যেমন প্রবল,
চক্ষু বুজে ধ্বংসমুখে যাচ্ছে হতভাগার দল।
এ দুর্দিনে না-ই ছিল ভাত, হত না তায় অপঘাত,
এ দুর্ভিক্ষে, ভুখ-সমস্যার হ’ত সমাধান,
থাকত যদি আত্মার খাদ্য, প্রাণের অঙ্গ-পান।
স্বার্থপর, বাঁধূলে তুমি লােকালয়ের প্রান্তে বাসা,
ছেড়ে দিলে জীবের সঙ্গ, ভুলে গেছ জীবের ভাষা।
হাসি-কান্না তােমার দ্বারে মিছে ঘােরে বারে বারে,
খােলে না ওই পাষাণ-বাঁধ, দোলে না ও হৃদয়,
রুক্ষ সাধু, মুক্তি তােমার কভু হবার নয়।
ফিরে এস, ফিরে এস, হে বিরাগী, লােকালয়ে,
দশের বােঝা সবার সাথে যাও না তুমি মাথায় বয়ে,
উড়াও তােমার শান্তি-নিশান, বাজাও সত্যের জয়-বিষাণ,
সমাধিটী ভাঙ্গ, জাগ দিয়ে অঙ্গ নাড়া!
তােমার তাড়ায় বিশ্বভূমে পড়ুক আবার সাড়া!
নূতন সৃষ্টির মত সেদিন মানব হবে ভােলানাথ,
কোলাকুলি পরস্পরেশত্রু-মিত্র এক সাথ।
সবল নেবে গর্ব ভুলে’ দুর্বলেরে মাথায় তুলে
আসবে সেদিন নব-প্রলয় শুভ-যুগান্তর,
তােমার চূড়ায় রাখবেন চরণ সেদিন বিশ্বেশ্বর।
মাতার প্রতি
শৈশবে এই শিরােপরে হাত বুলিয়ে খেদের স্বরে
শুনাতে মা, গিরিপুরের লীলা,
ভাতে তুমি অশ্রুজলে মেনকা মার শােকানলে
অশ্রু হত গলে যেন শিলা।
তে কি এই হৃদয় ফেটে বন্ত শিশুর মর্ম কেটে
বিজয়ার এক বিশ্বজয়ী ব্যথা ?
আজকে কত দিনের পরে বসে মা, সেই হিমের ঘরে
মনে উঠছে সেদিনের সব কথা।
কত বাঞ্চা ব লয়ে কত প্রলয় গেছে বয়ে
তাের সন্তানের মাথার ওপর দিয়ে,
মাতৃ-আশীর্বাদের জোরে কোথায় সে সব গেছে সরে
দেখছি আমায় শৈশবের চোখ নিয়ে।
যদিও সেদিনের ছেলে
খেলা-ঘরটী ভেঙ্গে ফেলে
বেঁধেছে আজ নূতন গৃহস্থালী,
পু তােমার, পিতা সাজি খেতে খেতে কালের বাজি
মায়ের কোলটী খুঁজছে তবু খালি :
মাতার প্রতি
সে যেন গাে মেনকা মা’র
প্রাণ জুড়ান’ মেহগার,
হিয়া আমার হৈমবতী হয়ে
কতযুগ-যুগের টানে ছুটছে যেন তােমার পানে
শৈশবটিরে প্রাণের মাঝে লয়ে।
আজ তুমি মা, নিবিয়ে বাতি দিচ্ছ পাড়ি আঁধার রাতি,
সােণার অতীত কখন হল শেষ?
হে বিধবা, পতিব্রতা,
মূর্তিমতী পবিত্রতা,
ওই বরফের মত তােমার বেশ ।
ছায়া আছে কায়া নাই, পেয়েও তােমায় নাহি পাই,
এ পার থেকে ওপার পানে চোখ,
সওদা কছ জমাট-হাটে, মিশছ বটে নানা নাটে,
তবু তুমি নও এ দেশের লােক।
এই পালাও, এই এস ফিরে, ছাড়তে বুকটা যায় কি চিরে ?
মেহ তােমায় আনে গৃহে ধরে’!
পাশ কাটিয়ে যেতে সাধ, কোথায় যেন শক্ত বাধ,
আগলে দাঁড়ায় পথটি রােধ করে।
জানি আমি তােমার কথা, বুঝি আমি তােমার ব্যথা,
একরত্তি সেই শিশুর এ প্রতাপ !
পিতামহীর মাতৃহিয়া
মেনকা মা’র ব্যথা দিয়া,
সে করেছে লাল-টুকটু গােলাপ।
২৮
পাষাণ
কাড়ল সে ওই মালার থলি, ছিড়ে ফেল্লে নামাবলি,
দেবতার ভােগ দুষ্ট ছোঁড়া খায়,
শঙ্খ-ঘণ্টা শুনে এসে
আরতি লয় হেসে হেসে,
টাটের ঠাকুর ভুলে’ ভজছ তা’য় !
পাঁচটি প্রাণে পাঁচটী বাতি জ্বালিয়ে আছ দিবারাতি,
কাকে বতে বরণ কছ কারে?
আমরা মূঢ়, ভাবি আন্, মেহের নাম যে ভগবান
শিশু হয়ে ফেরে দ্বারে দ্বারে।
ব্যের প্রাণ
সংসার ছেড়ে পালিয়ে এসে কবি
লােকালয়ের প্রান্তে বাঁধল বাসা,
সেথায় অষ্টপ্রহর কোলাহল,
ভালে হেথায় স্তব্ধতা কি খাসা !
কোয়াশা থেকে আবছায়া ভাব নেব,
কুঞ্জ হেঁকে নব-রসের-সুধা,
ঝণার সুরে বাঁধব ভাষার তার,
মিটিয়ে দেবাে ভবের কাব্য-ক্ষুধা।
চাদ থেকে উপমার-ফাঁদ বুনে
গড়ে তুলব ঘন স্বপন-জাল,
মেঘের স্তবক ভেঙ্গে রূপক নিয়ে
কল্প-ডিঙ্গায় উড়িয়ে দেবাে পাল
ডায়মণ্ডকাটা পাষাণের এক সার,
নিঝর নেমে চলে গেছে বেঁকে,
সেথায় কবি গাঁথছে বসে শ্লোক,
মাল-মশলা নিচ্ছে স্বভাব থেকে।
পাষাণ
গ্রামে তাহার মহামারী তখন,
ভিটের পরে ভিটে হচ্ছে উজাড়,
কবি গড়ছে মিলের পরে মিল,
আদর্শ তার-বন, ঝর্ণা, পাহাড় !
পাড়ায় পাড়ায় উঠছে হাহাকার,
চিতার ধূমে ছেয়ে গেছে গগন,
কবি আপন ধ্যানের কোণে পড়ি
প্রকৃতিরে কচ্ছে অধ্যয়ন।
ছন্দের পরে ছন্দ গেঁথে গেঁথে
গড়ে তুললে ভাষার তাজমহল,
কই মহিমা ? প্রতিমা আর সাজ !
কোথায় এতে প্রাণের কোলাহল ?
কঁদে কবি, হা পাষাণী বাণী,
দূরে তােমার নুপূর শােনা যায়,
আঁখির আলো ঝিলিক মেরে সরে,
আঁচলের বায় লাগে এসে গায়।
আগুন জ্বেলে শােণিত সম প্রিয়
রচনা সব ককূলে ভস্মসার,
ভাবলে কবি, উঁচু পাহাড় হতে
নামাবে তার ব্যর্থ জীবনভার :
কাব্যের প্রাণ
তখন উঁদ ছিড়ছে মেঘের জাল,
পথে যেতে শিউরে উঠলো কবি,
পড়ে আছে জ্যোৎস্না আলাে করে’
চাদের বাড়া রূপের একটি ছবি।
মুমূর্ষ, সেই বালিকারে দেখে
ভাবলে আহা, কার এ ননীর পুতুল?
কোলে তুলে বয়ে আনূলে ঘরে
যেন একরাশ কঁচা বেলফুল
।
আহার-নিদ্রা ভুলে গিয়ে তারে
বাঁচিয়ে তুললে অনেক সেবা করে,
দেখছে কবি জীবন-বীণে হঠাৎ
উঠছে একটা নূতন সুর ভরে।
এবার গানে নড়ছে প্রাণের সাড়া,
হৃদপিণ্ডের উঠছে ধুক ধুক,
শশাণিত নাচে শিরা-উপশিরায়,
একার গানে দশের জুড়ায় বুক।
পড়ছে তাতে বিশ্ব-মনের ছাপ,
রূপের কঙ্কাল রসে টস টস,
ধ্যানের ধোঁয়ায় মূর্তি ফুটে উঠে,
বিপুলতায় বিচিত্রতায় সরস!
৩২
পাষাণ
বুঝলে কবি, মানবতা বিনা
রসের সৃষ্টি চোখ ভুলান’ আখর,
হৃদয়-রক্তের রং ফলে না যাতে,
সে সব ছবি তুলির ঝাপসা আঁচড়।
ডাক্তার
যনিবাস বানিয়েছিলাম গিয়ে
ধন্বন্তরী হিমালয়ের কোলে,
জীবাণুরা পান না যেথায় রক্ষা,
রােগ যেথা দৃশ্য দেখে ভােলে।
ঔষধ-পাতির ধারতেম না ক ধার
ফার্মাকোপিয়াই যাচ্ছি ভুলে,
পকেট-কেসে মরচে ধরতে চায়,
দেখা হয় না একটাবারও খুলে।
মৃত্যু বড় দেখতে হয় নি বটে,
মনটা তবু বিলিষ্টারের মত,
আসে রােগী প্রায়ই ফেরে সেরে,
মুস্কিল-আসান পাষাণের প্রেম ও তো ?
সহরেরই একচেটে এ রােগ,
নারীর প্রতিই এর বেশী দরদ,
বাইরের আলাে দেখতে যাদের বারণ,
মকূলে যারা, ঘরে আসে নগদ।
কাব্য-গ্রন্থাবলী
লক্ষপতি বাবা ছিলেন যক্ষ,
ক্রোরপতি হবে না তার ছেলে?
ব্যবসার বুদ্ধি ছেলেবেলা হতে,
সে উচ্চাশা বাড়িয়ে তুললেম পেলে।
আমার কিন্তু রােগীর দলই বেশী,
একদিন একটী রােগিণীরে লয়ে
এলেন একটি আধ-বয়সী বাবু,
তখন সন্ধ্যা যাচ্ছে সবে ব’য়ে।
বলেন বাবু—ইনি আমার স্ত্রী,
রেখে যাব আপনার এ আশ্রমে,
আমার বড়াই কলেন শতমুখে,
যােগ্য যার নই আমি কোন ক্রমে।
বদান্যতা নয় ত, এ যে ব্যবসা,
আরাম বেচি পেয়ে পণের-কড়ি,
‘ব্রিফের’ বাজার কেউ বলে না মাগি !
চোরের মাল কি মােদের পাচন-বড়ি।
রােগিনীরে গছিয়ে আমার হাতে,
মাসের টাকা আগাম দিলেন গুণে,
বললেন—মাস মাস চুকিয়ে দেববা বিল,
ঘাড় নাড়লেম কাজের কথা শুনে।
দু’মাস যেতে থামূল রক্ত পড়া,
বিলের টাকাও থেমে গেল হঠাৎ,
টাকার বেলায় গা-ঢাকা দেন সাধু,
মােদের বদনাম -চুরী-ধরা ডাকাত !
ভদ্রলােকের কলমে যা ওঠে,
লিখে ফেললাম, মেজাজ বেজায় গরম !
চোর-জোচ্চোরের যত জ্ঞাতি-ভাষা
কোটিং দিয়ে কলেম মিছে নরম।
রােগিনীরে দেখৃতে গিয়ে সেদিন
খােলা-চিঠি গেলাম ভুলে রাখি,
পরদিন দেখি, রােগীর বিছনা-কাপড়
তাজা রক্তে সদ্য মাখামাখি ।
চিঠিখানি চোখের জলে ভিজা,
কথা বলে প্রেতের মত ভাষায়,
শুলেম-গরীব কেরাণী মাের স্বামী,
বড়মানষী নােগে পেলে আমায় !
সেই দিনই ফুরিয়ে গেল সব,
আমার ব্যবসাও সে দিন হতে শেষ,
আজ সাধি রােগীর ঘরে গিয়ে
আয় তাপী, জুড়াব তাের ক্লেশ।
পাষাণ
জোরপতি হই নি, উলটে আরও
ডানের শূন্য ছাড়ছে ক্ৰমে মােরে,
রােগী-ভগবানের সেবা দিয়ে
বুকের শূন্য উঠছে কিন্তু ভরে।
আমরা কি কম
আমরা কি কম? আমরা একটি
বহুদিনের মহাজাতি,
আমরাই প্রথম এনেছিলাম
সারা বিশ্বে আলােক-ভাতি।
আমরাই প্রথম দ্বিপদ-পশুর
খুলে ফেলি চোখের ঠুলি,
আমরাই প্রথম সত্য-মণি
আঁধার-খনি হ’তে তুলি।
মােদের ওঙ্কার দিয়ে হুঙ্কার
প্রথম দেখায় সাধন-পথ,
বাঁধলে প্রথম ভক্তি-সূত্রে
মহামায়ার মুক্তি-রপ।
আমরাই প্রথম শিখিয়েছিলেম
কৰ্ম্মের নামই ধৰ্ম্ম-ধন,
আমরাই দেখলাম জড়ে জীবন,
জীবের মাঝে জনার্দন!
•
পাষাণ
বিজ্ঞান-রসায়নের চাবি
খুলে দেখাই মায়াগার,
গ্রহ-তারার রঙ্গশালা
আমাদেরই আবিষ্কার।
আমরাই ধরে নাড়ীর কম্প
পেয়েছিলাম ব্যাধির নিদান,
যােগাসনে বসে আমরা
দিয়েছিলাম ভাষার প্রাণ।
আজও গিয়ে দূর বিদেশে
দেখাই দেহের মনের শক্তি,
মুগ্ধ জগৎ হঠাৎ জেগে
ঢেলে দেয় তার স্তুতি-ভক্তি;
ছিলাম বড়, হব বড়,
মাঝে যদিই থাকি পড়ে,
উঠৰ যখন, সাথে সাথে
ভৰু দুনিয়া তুলব গড়ে।
নবজীবন
পাষাণ, তােমার পানে চেয়ে চেয়ে
উঠব আমরা নব জীবন পেয়ে।
ভাগ্য-স্রোতের ঘূর্ণি টানে ছুটু না আর ধ্বংস পানে,
বেছে লব আপন বলে আপন অধিকার,
আমরা যদি বাঁচি, তবে বাঁচবে এ সংসার।
ছড়িয়ে যাব ঘরে ঘরে ঘরে,
সব চিন্তায়, সকল অবসরে,
নারীর প্রেমে নরের তেজে,
উঠব প্রাণে প্রাণে বেজে,
গড়ব আমরা নূতন সমাজ মানুষের ধাতু দিয়া,
আমরা যদি উঠি, তবে উঠব বিশ্ব নিয়া।
৮
তােমার মত নীচে শিকড় মেলে
উঠব পাষাণ, বাধার স্তর ঠেলে।
টা রস পাতাল থেকে, আব আলাে আকাশ ঘেঁকে,
সারা বিশ্বে লুটিয়ে দেবো মােদের জয়ফল,
আমরা যদি টিকি, তবে টিকবে ভূমণ্ডল।
পাষাণ
দেবতা গিয়ে করুন্ স্বর্গে বাস,
দানবের দল পাতাল করুকু গ্রাস,
আমরা রক্ত-মাংসের মানুষ হই না ছবি, স্বপ্নের ফানুষ,
স্বলন-পতন গলিয়ে ঢালবাে দয়া-মার ছাঁচে,
আমরা যদি বাঁচি, তবে জগৎসমাজ বাঁচে।
প্রতি পলে প্রতিশ্বাসে মিশি
বিশ্ব-মনে ফি দিবানিশি,
গুণীর গুণে, জ্ঞানীর জ্ঞানে,
সাধুর সেবায়, দানীর দানে,
আব শক্তি, আব ভক্তি—আবার একটা জোয়ার,
আমরা যদি পড়ি,
তবে বিশ্ব
চুরমার!
শােন পাষাণ, মনের কথা কই,
প্রাণের বােঝ আশার নেশায় বই।
হঠাৎ কখন ঘুবে চাকা,
পাব আমরা নূতন পাখা,
ধরূব আকাশ, ধূলায় পড়ে লুঠতে নাহি চাই,
আমরা আছি পড়ে, তাই বিশ্ব হচ্ছে ছাই।
পাষাণ, কবে পূবে বল সাধ!
অভিশাপ কি হবে আশীর্বাদ ?
শিখিয়ে দাও সে নূতন মত,
চিনিয়ে দাও সে সাধন-পথ,
আপন-পণে জীবন-রণে আনি সিদ্ধি জিনে,
পৃথিবীর যে রিজি নাই মােদের বৃদ্ধি বিনে!
বাঙ্গালীর মা হিমাদ্রি তােমার শিরে তুষারের শ্বেত ছত্র ধরে, মেঘের ঝালর তায় ঢেউ খেলি দিক্ শােভা করে। গর্কে নিয়ে গর্ গর লক্ষ-ফণা অজগর- বঙ্গসিন্ধু পদযুগ শিরে রাখি যতনে ধােয়ায়, অঙ্গে অঙ্গে পুষ্পগন্ধ, মিষ্ট বায়ু চামর চুলায় । তব মুক্তবেণী সম শােভা পায় সুনীল অটবী, কাঞ্চী সম কটি বেড়ি ধ্বনিতেছে নাচিয়া জাহ্নবী। হিরণ-হরিতে গড়া সরিতে সরিতে ভরা, আনন্দ-ভুবন তব আমােদিত কল কল গীতে, স্বর্গ নামে তব দ্বারে তােমার ও ধূলায় লুটিতে। চরে তব শ্যাম গােঠে বেণু-রবে ধবলী শ্যামলী, কুঞ্জ দেয় ফুলপুঞ্জে পাদপদ্মে পরাণ অঞ্জলি। রবি দের নিত্য প্রাতে কিরণ-কমল হাতে, জ্যোৎস্না নামে মৃদুপদে ঝাঁপি ল’য়ে লক্ষ্মীর মতন, রঞ্জিতে অলক্তরাগে তােমার ও রাতুল চরণ।
পাষাণ
তােমার গহন মাঝে প্রতিদিন নূতন পরব,
মেলি সকরুণ আঁখি দেখিতেছ বােবার উৎসব।
ময়ূর পেখম ধরে,
খঞ্জন নাচিয়া চরে,
করভের সনে খেলে শিশু সাজি করিনী রঙ্গিনী,
শাৰ্দলে লেহন করে প্রেমভরে প্রিয়া ভঙ্গিনী।
ব্ৰহ্মপুত্ৰ দামােদর বৈতালিক দুটি জল-সখা,
নাচে পদ্মা ঝঞ্চা সনে শিরে লয়ে অশনি-করকা।
‘অজয়’ ‘ভৈরব’ ঘুরি’
বাজায় বিজয়-তুরী,
তব মেঘ-ধারাযন্ত্রে ঝর ঝর ঝরিছে অমিয়,
ক্ষুধিতে জোগায় অন্ন, পিপাসিতে শীতল পানীয়।
নিখিল-সাগর-অঙ্কে তুমি যেন কমলে কামিনী,
বসে আছ পদ্মাসনে মহাধ্যানে দিবস যামিনী।
বিদ্ধি সিদ্ধি দুই করী
শান্তি-ঘট শূন্যে ধরি
ঢালিতেছে তব শিরে দেবতার পাদোদক-সুধা,
নিজে রহি অনশনে হরিতেছ জগতের ক্ষুধা ।
কিরণের ছড়া উষা দিয়ে যায় তব আঙ্গিনায়,
সন্ধ্যা ধূপ-দীপ জালি করে আসি আরতি তােমায়,
মন্দিরে মন্দিরে শখ
‘মা’ বলিয়া দেয় ডাক,
তুমি যেন অমরার পুঞ্জীভূত দুর্বা আর ধান,
তােমারে আণীষি পুন নমেন আপনি ভগবান।
বাহবা.বাঙ্গালী
অধােমুখে, কালী-ধূলাে মাখা,
আঁধার ভালে পদচিহ্ন আঁকা,
খুজে একটা বিরাট রসাতল
পড়েছিল হতভাগার দল,
কোন্ মা দিলি ঝেড়ে গায়ের ধূলি,
কখন্ নিলি খুলে চোখের ঠুলি ?
যেমনি পড়ল ডাকবাংলায় স্বেচ্ছাসেবক চাই,
কার আগে কে আসবে ছুটে, নড়ে উঠল সারা দেশটাই।
সাবাস বাংলা, বাহবা তাের ছেলে,
মানুষ কলি বাঙ্গালারে পেলে,
মায়ের মতন লাগিয়ে কখন্ তাড়া,
বিশ্বরঙ্গে কলি তাদের খাড়া !
মা জননী, তােমার দুটী শুনে
ডেকেছিল সুধার বাণ কি ক্ষণে?
যেমনি পড়ল ডাক বাংলায় স্বেচ্ছাসেবক চাই,
কার আগে কে আসবে ছুটে নড়ে উঠল সারা দেশটাই!
সাবাস বাঙ্গালিনী !
ধন্য, ধন্য বাঙ্গালিনী, তােমায়,
প্রাণের ধনকে রণে দিচ্ছ বিদায়।
বলছ শুধু প্রিয়জনে,
রাখবে মান পরাণপণে,
দেশের মুখ ফিরাে উজল করে’!--
বাঙ্গালিনী কর্তব্যে আজ বেঁধেছে তার প্রাণ,
বাঙ্গালী আজ যাবে দিতে প্রাণ, বাঙ্গালী আজ আতে যাবে মান !
হাজার হােল্ক নারীর ত প্রাণ-কঁদে,
পাথর দিয়ে কাতর মন বাঁধে।
বলে,—দেশের আশীৰ্বাদ, কোটী প্রাণের একটী সাধ—
জয়-গৰ্ব নিয়ে এস ফিরে,
বলতে বলতে আঁখি ভাসে নীরে।
বাঙ্গালিনী কর্তব্যে আজ বেঁধেছে তার প্রাণ,
বাঙ্গালী আজ যাবে দিতে প্রাণ, বাঙ্গালী আজ যাবে আতে মান!
নারীর বুক ত—কত সয় ? যায় ফেটে
বুক বেঁধে দিচ্ছে পাঁজর কেটে।
বলে,-ঘরে ফিরূবে যখন,
পারি যেন কতে বরণ,
সাবাস বাঙ্গালিনা
৪৭
দেখাে দেখাে, শক্ত নাহি হাসে।
বতে যেন কজে উপড়ে আসে।
বাঙ্গালিনী কর্তব্যে আজ বেঁধেছে তার প্রাণ,
বাঙ্গালী আজ যাবে দিতে প্রাণ, বাঙ্গালী আজ আন্তে যাবে মান!
নারীর প্রাণ ত—এ যে বজ্রাঘাত!
মনের লড়াই রক্ত-মাংসের সাথ,
বলে,ভগবানের নামে শপথ কর,বলেই থামে,
পলায়নের চেয়ে শ্রেয় মরণ !
বতে বল্তে হারিয়ে যাচ্ছে বচন।
বাঙ্গালিনী কর্তব্যে আজ বেঁধেছে তার প্রাণ,
বাঙ্গালী আজ যাবে দিতে প্রাণ, বাঙ্গালী আজ আনুতে যাবে মান।
কালাপল্টন
(বর্তমান যুনানী মহাসমরে ভারতসেনা যে
বিক্রম দেখাইতেছে, তদবলম্বনে রচিত।
(১)
প্রলয়-ধূম কচ্ছে ধরা গ্রাস,
শান্তি-আকাশ ছাড়ছে হাহা শ্বাস,
খাণ্ডা হাতে নাচছে সৰ্ব্বনাশ !---
তােপের মুখে কালাপল্টন লড়ে,
ভারত-সেনা মরণ নাহি ভরে।
( ২ )
দূরে দুষমন ঘুরায় মরণ-কল,
ভারত-সেনা নাহি জানে ছল,
ভাবছে—বীর কে? এরা খুনীর দল,
তােপের মুখে কালাপল্টন লড়ে,
ভারত-সেনা মরণ নাহি ভরে।
কালাপল্টন
(৩)
শত্রুর শেলে’ পাষাণ দুর্গ ধ্বসে,
গৰ্ত্ত হয়ে মাটীর পাহাড় বসে,
আশে পাশে হাত পা মুণ্ডু খসে!
ততাপের মুখে
কালাপল্টন
ভারত-সেনা মরণ নাহি ডরে।
লড়ে,
( ৪ )
ওপর থেকে আসছে চোরা-শর,
ভারতবাসীর শ্মশান খেলা-ঘর,
দুঃখ,—কেন ওদের প্রাণের উর।
তােপের মুখে কালাপল্টন লড়ে,
ভারত-সেনা মরণ নাহি ডরে।
(৫)
বোঁ বোঁ করে কালের চাকা ঘােরে,
এক এক চোটে হাজার জোয়ান ওড়ে,
খালি জায়গা তখনই যায় ভরে।
তােপের মুখে কালাপল্টন লড়ে,
ভারত-সেনা মরণ নাহি ভরে।
পাষাণ
( ৬ )
পূবের ফৌজ হাসছে মনে মনে,
লড়াই হচ্ছে চোর-ডাকাতের সনে,
বীর যে হয়, দাড়ায় সমুখ-রণে!
ততাপের মুখে কালাপল্টন লড়ে,
ভারত-সেনা মরণ নাহি ডরে।
(৭)
হতের সঙ্গী খুঁচিয়ে মাছে জান্,
কামান শুনে’ ডাকছে তাদের প্রাণ,
মুক্ত-কৃপাণ রক্ত-লেলিহান ।
তােপের মুখে কালাপল্টন লড়ে,
ভারত-সেনা মরণ নাহি ভরে।
(৮)
!
না, ওদের থাকলে বুকের পাটা
কত, কিম্বা হ’ত কচুকাটা,
কোথায় শত্ৰু ? এ যে মরা ঘাটা ।
ততাপের মুখে কালাপল্টন লড়ে,
ভারত-সেনা মরণ নাহি ভরে।
কালাপল্টন
ও কি! ওদিক শত্রু দিল দহি’!
বর্ষাধারী প্রাচীর অশ্বারােহী
ঘূর্ণিবায়ুর মত গেল বহি!-
তােপের মুখে
কালাপল্টন
শত্রু মেরে হাসতে হাসতে মরে।
=
লড়ে,
(১০)
শত্রুদল হ’ল ছারখার,
পালায় তারা তুলে হাহাকার,
তাড়িয়ে তাদের কোথায় করূলে পার !
বাহবা,
কালাপল্টন লড়ে,
শত্রু মেরে হাতে হাসতে মরে ।
বা!
(১১)
বারুদমাখা রক্তরাঙ্গা পাগল,
অবশিষ্ট
যমদূতের দল,
কিল যখন, উঠল কোলাহল !
বাহবা, বা! কালাপল্টন লড়ে,
শত্রু মেরে হাসতে হাসতে মরে।
পাষাণ
(১২)
ইতিহাসের একটি নূতন পাতে,
মরণ লিখল, ‘অমর’ আপন হাতে,
জাতির মুখ উজল হ’ল তাতে !
বাহবা, বা। কালাপল্টন লড়ে,
শত্রু মেরে হাসতে হাসতে মরে
সাহসী হাবিলদার
অরাতি শােণিত মাখি’
জ্ঞানসিংহের
গর্বিত শির
জাগাল জগতে ডাকি।
একা অসি করে
বুহ ভেদ করে,
প্রাণের মায়া না রাখি,
শত জার্মান
মুক্ত-কৃপাণ,
আসিল ঘুরায়ে আঁখি।
রাজপুত বীর
কাটে অরি-শির
রক্তে রাঙ্গা সে খাকী,
‘ভারতের জয়,
ভারতের জয়।
গরজিছে থাকি থাকি।
সাহসী হাবিলদার।
উঠে লাফ দিয়া, হাঁটু গাড়ি পুন
ঘুরাইছে তরবার।
অঙ্গে দরধারা
শােণিফোয়ারা,
ক্ৰক্ষেপ নাহি তার।
৫০
পাষাণ
অসি পড়ে খসি, বৈরীর অসি
কেড়ে করে মহামার।
পলে পলে এসে
মৃত্যু ধরে কেশে
ছাড়ে পুন মেনে হার,
‘ভারতের জয়
ভারতের জয়।
ছাড়িতেছে হুঙ্কার।
ভাবে অরি সবিস্ময়,
শক্তির দানব
খাকী-পরা সব,
কালা ত সামান্য নয়।
গণতরে তারা যেন আত্মহারা,
দাড়াইল তন্ময়,
জ্ঞানসিং হাসে-
এরা ইতিহাসে
বীর বলে’ পূজা লয়!
শুধু ছল-কল
এদের সম্বল।
নহে এরা কোথা রয়?
অস্ত্রাঘাত বুকে-
গর্জে হাসিমুখে,
‘জয়, ভারতের জয়।
রণ-নীতি পরিহরি
ঘিরিয়া একারে
সহষে প্রহারে
ভীম প্রহরণ ধরি,
সাহসী হাবিলদার
রণস্থলময়
রক্তগঙ্গা বম,
যুঝে বীর শবে চড়ি,
অসি ভেঙ্গে পড়ে
খালি হাতে লড়ে,
গেল শেষে ভূমে পড়ি।
প্রতি ক্ষত থেকে
উঠে ঘন ডেকে
মর্ম বিদার করি,
ভারতের জয়,
ভারতের জয়।
রটিল ভুবন ভরি।
গুখার সঙ্গীন
সারি দিয়া, উচ্চ করি শির,
খর্বাকৃতি শ্যামবরণ বীর,
গােল টুপী, খাকী-পােষাকপরা,
দাড়িয়ে গেছে যেন জ্যান্ত-মরা,
হাতের বন্দুক করছে জ জ্বল,
খাপের ভেতর ক্ষুকরি টক্ মল,
‘চালাও সঙ্গী’ যেমনি হুকুম,—সঙ্গী সব তুলি’
উঠল যেন ভস্ম থেকে আগুন, ছুটুল যেন বারুদ হতে গুলি!
ভাবছে এদের—আফ্রিদীরা যত
দৈত্যের কাছে বালখিল্যের মত,
এরা সইবে মােদের রণ-রঙ্গ ?
সুরু থেকেই দেবে রণে ভঙ্গ ।
এ কি ? এ যে এক এক যমদূত,
কি ক্ষিপ্রতা, কি বীৰ্য্য অদ্ভুত!
‘চালাও সঙ্গী যেমনি হুকুম,-সঙ্গীন সব তুলি’
উঠল যেন ভস্ম থেকে আগুন, দুটুল যেন বারুদ হতে গুলি।
গুখার সঙ্গী
সাবাস্ সাবা! কিবা সঙ্গী চলে,
পদভরে গিরি ঘন টলে,
মুষলধারে হচ্ছে গুলিবৃষ্টি,
সঙ্গী-দল মরছে, নাহি দৃষ্টি।
তাদের শবের সিড়ী বেয়ে বেয়ে
পাহাড় ভেঙ্গে উঠছে সােজা ধেয়ে,
‘চালাও সঙ্গী যেনি হুকুম,—সঙ্গী সব তুলি
উঠল যেন ভস্ম থেকে আগুন, ছুটল যেন বারুদ হ’তে গুলি!
চলে সঙ্গী আগে ডানে বাঁয়ে,
তিন চার বিধে এক এক ঘায়ে,
রক্ত-উৎস ক্ষত-মুখে উঠে,
সারাপথে রক্ত-গঙ্গা ছুটে,
নিজের লহু পিয়ে নিজে মাতাল,
ধায় শুনে’ রণবাদ্যের তাল,
‘চালাও সঙ্গী যেনি হুকুম,সঙ্গী সব তুলি’
উঠল যেন ভস্ম থেকে আগুন, ছুটুল যেন বারুদ হতে গুলি।
• সামনের রাস্তা কতে করতে সাফ
পাহাড়ে পথ উঠছে দিয়ে লাফ,
কাস্তের আগে ধানগাছের মত,
ক্ষুরির মুখে পড়ছে শত্ৰু কত,
পাষাণ
সাবাস্ নেপাল ! বাহবা তাের ছেলে!
পালায় শক্ত হাতিয়ার সব ফেলে।
‘চালাও সঙ্গী যেমনি হুকুম,সঙ্গী সব তুলি
উঠল যেন ভস্ম থেকে আগুন, ছুটুল যেন বারুদ হ’তে গুলি।
চারিদিকে চিরনিদ্রাঘাের
শত্রু-মিত্র জড়াজড়ি করে,
কালাে পাষাণ আজ যে লালে লাল,
রণবাদ্যে ঘােষে প্রলয়-তাল,
শত্রু-দুর্গ করে’ অধিকার,
ছাড়ল গুখা বিজয় হুহুঙ্কার ।
খাপে খাপে সঙ্গীগুলি পড়লাে একত্তর,
(থমে গেল যেন একটা ঝড়, শান্ত হল যেন একটা সাগর।
আফ্রিদির শৈল-দুর্গ চূড়ে
বৃটনের জয়-পতাকা উড়ে,
ধন্য থা! বুকের রক্তে লিখে
বটল যশ আজকে দিকে দিকে,
মিতভাষা স্মিত বদন যত,
বিনয়ভরে হচ্ছে অবনত ।
বাজছে তুরী গভীর রবে পাষাণ বিদায় করে,
সাবাস বৃথা! মুখে মুখে ফেরে, গুমূখার জয় শৃঙ্গে শৃঙ্গে ঘােরে!
ভাইফোটার গান
ও নেপালী, বাঙ্গালী তাের ভাই,
তােদের না হয় হিমালয়ে বাস,
আমরা না হয় সমতলে পড়ে
দারুণ গ্রীষ্মে করি হাঁস-ফাঁস।
তােরা না হয় আবহাওয়ার গুণে
বীরের জাতি বলে’ পাস মান,
আমরা না হয় জলবায়ুর দোষে
কলম পিষে হচ্ছি হয়রাণ ।
আমাদের এই সমতলে মিশল তােদের গিরিমালা,
আমরাও যেমন কালাে রে ভাই, তােরাও তেমনি কালা
তােরা না হয় বনমৃগের মত
মনের সুখে বেড়া লাফে লাফে,
চলে কিনা চলে মােদের চরণ,
বুক ফুলিয়ে চলতে হৃদয় কাপে :
তাের না হয় সােজা কথার মানুষ,
বেশী কি?
এ সবলেরই ধরণ।
পাষাণ
আমরা না হয় খেলি লুকোচুরি
‘চাচা, আপন বাঁচা’ মােদের বচন !
আমাদের এই সমতলে মিশল তােদের গিরিমালা,
আমরাও যেমন কালাে রে ভাই, তােরাও তেমনি কালা!
তােদের ভরা-গালে স্বাস্থ্যের লাল,
মােদের গণ্ড না হয় পাণ্ডু, ভাঙ্গা,
মমাদের না হয় কুজ দেহভার,
তােরা না হয় মেয়ে পুরুষ চাঙ্গা !
নেপালিনী না হয় কাজের সাথী,
বাঙ্গালিনী না হয় সাজের পুতুল,
নেপালিনী হ’লই বা গাছ-গােলাপ,
বাঙ্গালিনী না হয় ন্যাড়ার ফুল!
আমাদের এই সমতলে মিশল তােদের গিরিমালা,
আমরাও যেমন কালাে রে ভাই, তােরাও তেমনি কালা ।
তােদের না হয়, নিজস্ব বেশ আছে,
আমরা না হয় পরিই ময়ুর-পাখা,
তােদের আঁধার না হয় আলাে-থচা,
মােদের আলাে না হয় কালীমাখা।
ভাইফোঁটা আজ হিমালয়ের কোলে,
ও নেপালী, বাঙ্গালীরে ডাক্,
ভাইফোঁটার গান
মেহের ডাকে পড়ক বিশ্বে সাড়া,
ভাই, তুই আজ ভাইকে বুকে রাখ,!
আমাদের এই সমতলে মিশল তােদের গিরিমালা,
আমরাও যেমন কালাে রে ভাই, তােরাও তেমনি কাল।।
জাগ্রত পাষাণ
বল দেখি, হে পাষাণ, ধরা-গর্ভ করি বিদারণ,
কবে বিকাশিলে তুমি মহাকায় রূপটী আপন ?
তদবধি একমনে যােগাসনে আছ কি নিশ্চল,
উঠেছে বল্মীকসম লােমকূপে তরুগুল্ম দল ?
সহিছে তুষার পাত অবিরত তােমার মস্তক,
তৈল বিনা রুক্ষ জটা পক্ক আজ, তপশুষ্ক ত্বক।
অঙ্কিত সহস্র বলী, ললাটে থােদিত চিন্তারেখা,
তবু ধ্যান ভাঙ্গে নাই সমাধিতে সমাহিত একা!
কে তুমি গো শৈল-আত্মা? ওগগা মৌনী তাপস পাষাণ,
তুমি কি ভারত-স্তম্ভ ? না না, তুমি জগৎ-নিদান ।
!
মূঢ় তােমা ভাবে জড়, বলে তুমি পুঞ্জীভূত শিলা,
জড় হতে এল জীব, প্রকৃতির বিবর্তন-লীলা
পুন আত্ম বলি দিয়ে দেয় জীব জড়ের জীবন,
এইরূপে ঋণশােধ, প্রকৃতির হরণ-পূরণ !
কিছু নয় ব্যর্থ বিশ্বে, শ্মশানের অণু-পরমাণু,
নবসৃষ্টি তরে গড়ে পলে পলে কীটাণু জীবাণ।
জাগ্রত পাষাণ
কেবল আত্মাই নয় এ জগতে অমর অক্ষয়,
পঞ্চভূত রেণু তার নাহি দেয় হইতে বিলয় ।
হতেছে ঢালাই নিত্য প্রকৃতির গড়া-ভাঙ্গা ঘরে,
একই ধাতু নানা ছাঁচে, নামান্তর শুধু রূপান্তরে।
পলে পলে জড়’ করি’ কত জড়-জীবের কঙ্কাল
গড়ে কি তুলিল তােম তিলে তিলে বিশ্বকৰ্মা কাল ?
কত নরমুণ্ডমালা কত নারী-হৃদপিণ্ড দিয়া
কত সুখ কত দুঃখ মিলি তােমা তুলিল গড়িয়া।
তাই হিম শিলা মাঝে ত ত সদ্য রক্তময়
হইতেছে আলােড়িত প্ৰেমতপ্ত কোমল হৃদয় !
প্রত্যেক প্রস্তর তব পলে পলে ক’য়ে উঠে কথা,
পরতে পরতে তব জীবনের আনন্দ-বারতা।
প্রলয়ে প্রকৃতি রাখে কারণের বীজ ও গুহায়,
তােমার জীবনীকোষে সৃজনের ধারা বয়ে যায় ।
তুমি যদি জড়, গিরি, তবে তুমি সে জড়ভরত,
ষটচক্র ভূমে পড়ি, ধায় শূন্যে তব যাত্রারথ।
বাহিরে মৃতের ঠাট, অন্তরে প্রাণের কোলাহল,
আসে গ্লানি-অভিশাপ, ফিরে যায় হইয়া মঙ্গল।
বাঁধিল কালের উই তােমা পরে জঞ্জালের ঢিপি,
সে জঞ্জাল সােণা আজ ভারতের কীর্ভিস্মৃতিলিপি।
পাষাণ
প্রত্যেক পাষাণে তব জড়াইয়া প্রাণের রসান
দানবে মানব করে, মানবেরে ঋষিত্ব প্রদান।
কে তুমি হে শৈল-আত্মা, হয়ে আছ পাষাণের স্তুপ ?
আত্মারে বলিছ ডাকি,-- থাম থাম’, চুপ,চুপ চুপ!
খােদার মিনার
পাহাড়, তুমি খােদর গড়া মিনার,
তােমার গম্বুজ বইছে মাথায় আশমানের এক কিনার।
যায় কুয়াশার আড়াল থেকে
রবি-শশী প্রহর হেঁকে,
হুকুম পেলে বেরিয়ে এসে করে কভু সেলাম,
আমাের চাবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খােলে তােমার হেরাম।
!
বরফ-পানি তােমার মাথায় ধারা দিয়ে গােসল করায়,
হাজার নিঝর হামাম তােমার রাখছে গুলজার,
বাজায় কভু জলতরঙ্গ, কভু সুরবাহার।
তােমার জুম্মা-ঘরে গিয়ে উষা আসে নেমা দিয়ে
ঝিল্লি-মােল্লা সাঁঝের কোরাণ পাই-মসজিদে পড়ে,
' র-মহলে মেঘের বহর হরীর স্বপন গড়ে।
দোয়েল মা সরস ভাষায় তােমার দােয় সিন্নি চড়ায়,
পালা করে চেরাগ বলে নিশা দিবা এসে,
মাথা পেতে দোষ নেয় মশগুল হয়ে শেষে।
৬৬
পাষাণ
ডায়মণ্ডকাটা তাজটী মাথায়, শৈবালমখমল জোব্বা গায়
তাতে রেশমী পশমীফুল প্যান্ত্রী মিগ্লোনেটের,
বাপণফর খাটায় তােমার মশারীটী নেটের।
চাদনী এসে ফোয়ারা খােল, হাওয়া কুঞ্জ-দোলায় দোলে,
তারা-জরীর নীল চাঁদোয়া-আশােন টাঙ্গায় রাতে,
দুনিয়া ঘাসের নরম গালচে বিছায় আজিনাতে।
পাষাণ-পীর
পাহাড় ত নও, তুমি আমার পীর,
তুমি আমার সব মুস্কিলের আসান,
‘হত্যা’ দিয়ে দরজায় এ ফকির,
মুষ্টি ভিখ—তাও আশমান সমান।
বাদশা, তােমার তরে এমনি ধার,
বুড়া এসে জােয়ান বনে যায়,
হাট বাট হাসিতে গুলজার,
শৃঙ্গে শৃঙ্গে ফুর্তির ঢেউ গড়ায় ।
ও ঠাঙাইতে কোন্ আনাইর আগ,
শিরায় শিরায় গরম সহ ছােটে,
গরু-ঘােড়র চোখে খুসি ফোটে,
খেলছে দি সারা বেলই ফাগ ।
জড়িয়ে জড়িয়ে তাই ও থাকতে চাই,
গড়িয়ে গড়িয়ে কেন নেমে খাই।
দুনিয়ার রােশনাই ও সফে , তাের সাফাই পানে চেয়ে ঠাউরেছি এই দুনিয়া পয়দা যার, তাঁরই সাফাইর একটু ছিটা পেয়ে তাের সফেদ রােশনাই দুনিয়ার। ও বাদশা, তাের দরিয়ানুর আজ, আশ মানের গায় খুললে যে আড়ং, বাশার বাশার তাজের একটু রেওয়াজ দিলে তাতে ও আশ মানী ঢং! তাই ত তােমার আদত,—পরকে ভােলা, আমার আয়েব, আপন মাঝে বাস, তাই ত আমার দিলের গলে ফাঁস, তােমার কাছে ভরদুনিয়া খােলা। তাই ত নীচে নামতে আমার আসান- ভােমার আয়েস উচায় উঠা, পাষাণ।
হিমালয়ে প্রভাত
মরি কি রূপ হয়েছে আজ কনকচাপা উষার,
পাহাড়ের থাক বেয়ে বেয়ে ছেয়ে গেছে তুষার।
কাঞ্চন শৃঙ্গ সােণা মােড়া, সপ্ত আকাশ যেন জোড়া,
তিন ভুবনের শােভা জমে, ওই খানে কি হচ্ছে লুঠ?
বিশ্বের মাথার মণি কি ও? না ও বিশ্বনাথের মুকুট।
যত শুভ্র চিন্তারাশি জমাট হয়ে বাঁধল স্তুপ,
যত ভালাে যত কালো ধল কি ও আলাের রূপ?
ধুয়ে যাচ্ছে মনের কাদা, শাদায় নেয়ে জীবন শাদা,
চরণ-তলে পড়ে ঊর্জে চেয়ে দেখছি বিরাট-মূৰ্ত্তি,
ধীরে ধীরে ধ্যানের তীরে নিখিল-জগত পাচ্ছে সৃত্তি।
কোন্ পাহাড়ের গুহার আড়ে লুকিয়ে আছে শিশু-রবি,
রবি কে চায়? দেখছি আমি ছবির মত একটি ছবি।
ছবি উঠছে সজীব হয়ে, কোথায় যাচ্ছে আমায় লয়ে ?
বলছে,কবি, দেখছিস্ ও যে মহাশিল্পীর চিত্রপট,
ওঙ্কারের ও সূতিকাগার, ঝঙ্কারের ও পুণ্য-মঠ।
৭৩
পাষাণ
মানুষ ছিল দ্বিপদ-পশু, দেবতা ছিলেন ঘটে পটে,
এখানেই ত রূপের সাথে অরূপ মিল অকপটে ।
লােমশ-খােল গেল খুলে,
দাড়াল’ নর মাথা তুলে,
অজ্ঞান তার স্কন্ধ ছেড়ে আঁধার রাজ্যে করল প্রয়াণ,
এই পাহাড়ে মানব পেল মানবতার চক্ষু দান।
হিমালয়ের হােলী
খুসীর আবির মেখে মেখে সারাটা দিন হ’ল সাজা,
সাঁঝের বেলা দেলাম তোমায় যেন মেটে-হােলির রাজা।
মাথায় ভাঙ্গা রাঙ্গা-টাগর, খছে কুহেলিকার কাপড়,
পায়ে মাটী, গায়ে ছাই, মনটাই শুধু কাচা তাজা,
মুখে গড়ায় বরফ-লা। ' নিখুত মেটে হোলির রাজা।
দেখায় তােমায় আঙ্গুল দিয়ে ‘পাইন’-পাড়ার পড়শাদল,
ছােট বড় সবাই তারা তােমায় পেয়েছে কি পাগল?
তােমার আশে পাশে ঘুরি’ মেঘরা খেলছে লুকোচুরি,
ওরা পাড়ার দুষ্ট ছেলে মেটে হােলীর দলবল,
দুয়ো দিয়ে পালিয়ে যায় ছিটিয়ে তােমার গায়ে জল ।
ঝরণার সব নেচে নেচে দিচ্ছে হেসে করতালি,
ঝর ঝর ঝর্ স সর সর শালের তফিল হচ্ছে খালি।
জল-ভরা মেঘ ঝাঝরি নিয়ে চারা গাছের যােগান দিয়ে
বাগে বাগে ছুটছে যেন প্রেমের বেগার দেওয়া মালী
ভােরা সেজে করূছে এরাই তােমার সাথে চাতুরালী।
१२
পাষাণ
ব
বােবা-রাজ্যের মূক পাখী সব ধরূলে হঠাৎ হােলির বােল,
ধ্যানের আসন ভেঙ্গে পবন বাধিয়ে দিলে হট্টগােল।
আজ পাহাড়ে’ পশমী-ফুল সমতলের বাসে আকুল,
গুহায় গুহায় শৃঙ্গে শৃঙ্গে বাজে মৃদঙ্গ, গাজে খােল,
ঝিল্লী-ঝাজ তুলছে আজ তালে তালে মিঠে বােল!
অনুরাগের ফাগ খেলে শেষ রবি গেল কোথায় ভাগি
তারার ঝাক কি উঠে এল সারারাতের বাসর লাগি ?
এদিক খালি-আসর পেয়ে
চাদটী এল রংয়ে নেয়ে,
করূবে সে ভাের কোজাগর হােরি-খেলায় নিশি জাগি ।
লালের সাগর নিয়ে এল সারা রাতের বাসর লাগি।
চরণ হতে নূপুর খুলে গ্রহ উপগ্রহের সার,
নেচে নেচে ঘুরে ঘুরে থেছে খুসীর পিচকারী !
আড়াল থেকে উঠছে হাসি, পদধ্বনি আছে ভাসি,
গাছ পাথর জীবের ভাষা নিচ্ছে বুক হতে কাড়ি,
নেচে নেচে ঘুরে ঘুরে খেলছে খুসীর পিচকারী।
আকাশ, বাতাস, মেঘ, ঝরণা, দোলের বাজনা বাজা,
তারায় তারায় ঝুলন বাপ, আভ, দিয়ে আজ কুঞ্জ সাজা!
শবাণ গালে জল হয়ে লালে লাল যাচ্ছে বয়ে,
কোথায় শীত? মধুমাস, এ হিমের পুরী করূছে তাজা !
সারা ভুবন ফাগের রাজ্য, পাষাণ মেটে-হোলির রাজা।
হিমালয়ে বৃন্দাবন
এস কাচ্ছা-বাচ্ছা নিয়ে সাজি প্রিয়ে ব্রজবাসী,
ও নয় শৈলমালা, ও যে চিকণকালা বাজায় বাঁশী ।
শিষ দেয় প্রাণ শ্যামার মতন নাচে আবার হয়ে খঞ্জন,
ঘর-গেরস্তি ভাসিয়ে দিয়ে এস আঁখির নীরে ভাসি,
শৃঙ্গে শৃঙ্গে চিকণকালা বাজায় শােন মােহন-বাঁশী ।
দ্যাখ দাড়িয়ে নধর শ্যাম কিবা ঠাম ত্রিভঙ্গবাঁকা,
রঙ্গিন বরফ নয় ত, ও যে শােভে শিরে শিখীপাখা।
কটিতটে রৌদ্র-গড়া
কিবা চারু পীতধড়া,
ফুলের সাবি চক্রাকারে বনমালার মত রাজে,
নিঝর ত নয়, কালার পায়ে ঝুমুর ঝুমুর নূপুর বাজে।
মেঘ নয়—ও চরে বেড়ায় সেই ধবলী শ্যামলী পাল,
চাদ ত নয়-মধুর তিলক শােভ করে বঁধুর ভাল ।
বাষ্প নয় ও ধেনুর সুরে
* সােণা গােঠের রেণু উড়ে,
ওই শােন ওই বেণু, বাজে প্রেম পাঠাচ্ছে নিমন্ত্রণ,
কে বলে এ হিমালয় ? -এ যে সাধের বৃন্দাবন।
বরফ গলে নামছে ?-না, না, কালিন্দী বয় হয়ে শাদ
মান করেছে মানময়ী কালরূপ হেরবে না রাধা :
৭৪ পাষাণ তােমরা বছো জ্যোৎস্না-ঢেউ, জানাে না ঠিক কথা কেউ, কালাে হ’ল আলাে-ছুঁয়ে কঁচা-সােণা রাধার চরণ, সাধে গৈরিক পরে’ সাজল প্রেমের যােগী কালােবরণ ! · তুমি বলছ ‘পাইনের’ সারি আমি দেখছি তাল-তমাল, তুমি বছ দারুণ শীত, আমার এ বসন্ত কাল। জলপ্রপাত, শিলা, কানন- শ্যামকুণ্ড, নিধুবন, তুমি বলছ ঝিল্লী ডাকে, আমি শুছি কুহরণ, কে বলে এ হিমালয় ? এ যে সাধের বৃন্দাবন। - মূষল ধারে জল ?—ভয় কি ? ধরূবে বাকা গােবর্দ্ধন, পাহাড় ধ্ববে ? কে না জানে শ্যামের প্রেম বিঘ্নহরণ? করুক আকাশ শিলাবৃষ্টি কেটে যাবে সকল রিষ্টি, কাল প্রভাতে হবে সুদিম পরীর মুখে হাসি যেমন, কে বলে এ হিমালয় ?-এ যে সাধের বৃন্দাবন । মান-অভিমান ভুলে প্রিয়ে, এস আমরা শ্যামে ভজি, মথুরার ভয় কার প্রাণে নাই, চল ব্ৰজের প্রেমে মজি। জানি বটে পাষাণ কালা, থাতে বৃন্দাবনের পালা, এস কাচ্ছা-বাচ্ছা নিয়ে পরি’ কালাে রূপের ফাসী, কেঁদে কেঁদে ডাকছে শােন, শৃঙ্গে শৃঙ্গে পাগল বাশী।
হিমালয়ে মধুরাত্রি
জ্বলে উঠল হঠাৎ শিলার মালা,
হিম বুকে পাঁজার আগুন জ্বালা।
শত শত চাদের কোণা
ফলায় কঁাচা তরল ঘৃেণ,
তারার ফিকি পলে পলে জ্বলে নভােময়,
হিমালয়ে মধুরাত্রি শােভারাত্রি উদয় ?
আগুন ধরে উঠল পাইনের ঝাঁকে,
ছড়িয়ে গেল মেঘের থাকে থাকে,
পাহাড়ে পােষ-পাখীর দল
ঘুরছে আঁখি ছল ছল,
বােবাধনদের বুক ফেটে মানব ভাষা বেরয়,
হিমালয়ে মধুরাত্রি শোভারাত্রি উদয় ।
বান ডেকেছে চাদের মায়া দেশে,
সােণার ছবি আসছে ভেসে ভেসে,
গা ঢেলেছে জ্যোৎস্নার সাথে রঙ্গিন বরফ হাজার খাতে,
দাড়িয়ে কালের কষ্টিপাথর সে সােণা-ঢেউ লয়,
হিমালয়ে মধুরাত্রি শােভারাত্রি উদয় !
৬
পাষাণ
অকালে আজ অতিথ, ঋতুরাজ,
বাঘের গাল হরিণ চাটে আজ,
শ্বেত ভালুকে কালাে ভােমরায় মধু লুটে’ আপােসে খায়,
শিখীর গলা জড়িয়ে ফণী প্রেমের কথা কয়,
হিমালয়ে মধুরাত্রি শােভারাত্রি উদয় !
ওকি! কখন্ তুষারের ওই স্কুপে
আগুণ ধরে উঠল চুপে চুপে ?
সে রূপে যে খুনী গলে মুনীর মন যে ওতে টলে,
সারা জগত প্রেমের স্বপন, জীবন জ্যোৎস্নাময়,
হিমালয়ে মধুরাত্রি শােভারাত্রি উদয় !
২
‘উদয়াস্তনা দুটী কবিতা।
( দ্বিতীয়বারের সিঞ্জল-স্মৃতি )
আহা মরি পূবের দিকে রূপের কি এক ভাতি,
বিদায় নিতে গিয়ে যেন থমকে দাড়ায় রাতি!
আকাশ, না এ মায়ার আবাস, লালের একটা স্বপন।
আবেগে কি করবে সৃষ্টি সােণার একটি তপন ?
রােজই রবি মরে বুঝি গড়িয়ে পাষাণ তটে,
আবার নূতন জনম লভে শােভার আকাশ-পটে।
রক্ত পীত ধূম্র পাটল রঙ্গের কারু-লীলা,
শৃঙ্গে শৃঙ্গে রেখায় রেখায় ফুটছে চারু-শিলা
কে আসে ওই, কে আসে ? থাম্ বুকের ধুক ধুক,
গুলিয়ে দিস্ নে চোখের দৃষ্টি, ওরে চোখের সুখ।
এস এস, তুমি এস, আলাের দেশবাসী,
তােমার তরে জনম জনম আছি উপবাসী।
সারা বিশ্বের হৃদপিণ্ড কি আঁধারের বুক চিরে
জগৎ মাঝে উদয় হচ্ছে কিরণ-কিরীট শিরে ?
সমতলের সাগর হতে কাঁপতে কাঁপতে ওঠে,
বিশ্বকোষের জীবানুল কমল-সম ফোটে।
ওই এল, ওই উঠে এল বিশ্বনাথের রথে
তরুণ অরুণ সারথী আজ নিখিল-রাজপথে।
৭
পণি
গৌরীশঙ্কর দেখা দিচ্ছে,-ও কি ধরার ত্রিদিব ?
শৃঙ্গ ত নয়, শিলার মঠে তুষার গড়লে শিব !
কেঁপে কেঁপে উঠছে যেন শােণিততপ্ত স্নায়ু,
লাফে লাফে বাড়ছে সাথে প্রাণের পরমায়ু !
ধন্য আমি, আছি বেঁচে এমন সুপ্রভাতে,
ধন্য আমি, মরি যদি এই আলােকের সাথে ।
কোথায় ? ওগাে, কোথায় যাও ভেঙ্গে জমাট হাট ?
এরই মধ্যে তুছ কেন আলাের দোকান পাট !
কোন্ প্রাতে কে গড়িয়ে দিল তােমায় জ্যোতির গােলক ,
কোথা হতে কোথায় যাচ্ছ, কালের ক্রীড়নক ?
তুমি বুঝি পথশ্রান্ত দিগভ্রান্ত এক পথিক
ছায়াপথে মায়ারথে খুঁজে মছ দি ?
কার ইঙ্গিতে বিদায়-সঙ্গীত উঠছে ঝিল্লী-বীণায়,
বনানীর নীলপ্রান্তে সে গান ঘুমের মত নায় ।
হিমানীর বুকচেরা মাণিক-অপ্রস্তুত ওই চাঁদ
বুনছে কুহকপুরী হ’তে সবে স্বপন-ফাঁদ!
ভাঙ্গা তােমার রথের চাকা, রাঙ্গা তুমি লাজে,
স্তব্ধতা আজ গান বেঁধেছে তােমার বিদায়-সাঝে।
মুখে ও কি যাদুমন্ত্র, না ও বিদায়-আশীষ ?
যাচ্ছে সুধায় প্রাণের ক্ষুধা, হছে বিশ্ব-বিষ।
উদয়াস্ত, না দুটী কবিতা ?
শৃঙ্গে শৃঙ্গে আলাে গড়ছে লাল পাথরের মঠ,
তুলির আঁচড় পড়ে না আর, আদ্র চিত্রপট।
কবির শুধু আসছে মনে, এমন মােহন, সাঁঝে
শয়ন পাতা যায় না কি ওই চির তুষার মাঝে ?
দিবার শটী বুকে করে জল তােমার চিতা,
ভাবছি এ কি উদয়াস্ত, না দুটা কবিতা ?
বিদায়ের অশ্রু
বিয়ের গান ও পাষাণ, পায়,
চরণরেণু-গৈরিক মাটী মাথি সাবা গায়।
আজ যে হিয়া উদাসিনী
তােমার প্রেমে বিবাগিনা,
বিদায় নিতে গিয়ে তার কলজে ফেটে যায়,
প্রেমের ঠাকুর, ‘আসি’ বলতে পরাণ নাহি চায়!
তোমায় আমায় এ দিন কয়ে
অনেক কথা গেছে হ’ষে,
সে সব একে যাচ্ছি লয়ে মানস-শতদলে,
পাথর-পূজা ছড়িয়ে দেবাে মােদেব সমতলে।
থাকে যদি ভাগ্যে লেখা,
আবার দোহার হবে দেখা।
তোমায় ছাড়লে মরি আমি, তােমায় পেলে বাঁচি,
তােমার তপে গাঁথা আমার জপের মালাগাছি।
তােমার কাছে আবার কালে নাচল পরাণ মােহন তালে,
যাচ্ছে সে তাল ধোয়া হয়ে তােমার বাষ্পে মিশে,
তুমি আমার জীবনকাঠি তুলব তাহা কিসে?
ওইশােন, ওই বাজে হােরা, বিদায় দাও গাে মনােচোৱা,
তােমার কী হতে খসে’ গা চেলেছি নীচে,
তােমার ভুবন-রূপের হাট ফেলে যাচ্ছি পিছে!
বিদায়ের অশ্রু
চোখে ঝাপসা, কাণে তালা,
সারা গায়ে গরল-জ্বালা,
যত নাছি, সাথে সাথে খাদে হৃদয় নামে,
দেয় কি না দেয় সাড়া নাড়ী, হৃদপিণ্ড কি থামে ?
দাও গাে তােমার দাওয়াই দাও, সেই মিঠে ঠাণ্ডি পিয়াও,
তুমি আমার জীবনদাতা, প্রভু, সখা, পালক,
আমি রােগী, তুমি আমার দয়াল চিকিৎসক।
তােমার বেড়ী এমনি, পাষাণ, ছাড়তে প্রাণে লাগছে টান,
যাই, আবার ফিরে চাই, আঁখির জলে ভাসি,
বড় ভালবাসি তােমায়, বড়ই ভালবাসি।
তােমার কোলে পিঠে চড়ে মানুষ হয়ে উঠলাম গড়ে,
কি না তুমি আমার ? তুমি প্রভু, সখা, পালক,
আমি রােগী, তুমি আমার দয়াল চিকিৎসক।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.