Bally Sadharan Granthagar

Palli Lakshmi Ed. 3rd

Bandyopadhyay Rakhaldas · 2009/09/7

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

- শুচি-শুদ্ধ সজীব পল্লী-চিত্র পল্লী-লক্ষ্মী ‘এস সােনার বরণী রাণী গাে, শঙ্খ-কমল করে, এসসা মা লক্ষী, ব’সসা মা লক্ষী, থাকো মা লক্ষী ঘরে। অলওয়ে লিরি তৃতীয় সংস্করণ ১৪ কাব্যানন্দ- রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ১) এক টাকা সর্বষ ও আলােকচিত্রাভিনয়-স্বত্ব প্রকাশকের।

শ্রীকিরীটিকুমার পাল,
শ্রীকুমারকৃষ্ণ দত্ত।
নির্মল-সাহিত্যপীঠ
৯. কর্ণওয়ালিস্ট, (ঠনে কালীতলা)
কলিকাতা।
= =
১
:
আগামী সংখ্যার নূতন উপন্যাস
গােলাপ-গন্ধামােদিত-উপন্যাস-সাহিত্যের-নূতন ধারা
অন্ধলক্ষ্মী
**
‘গােলাপ সুন্দরতম, ফুটো-টো করে যবে ধীরে
আশা সমুজ্জ্বলতম, ভীতি হতে মুক্তি যবে তার ;
গােলাপ মধুরতম, সিক্ত হবে প্রভাত-শিশিরে
প্রেমিকা সুন্দরীতমা, নেত্রে যবে বহে অশ্রুধার !
ধন্য গ্রন্থকার!--ধন্য সুবিচার !
কৌশলের বাকী কোথা আর?
| প্রতি পত্রাঙ্কে-প্রত্যেক রেখাপাতে-আগ্নেয়গিরির অগ্নৎপাৎ! [
- অঙ্ক-লক্ষী -
এ বৎসরে প্রকাশিত ১,০০০ উপন্যাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ।
ইহাতেই আছে, যামিনীবাবুর চিত্তচমকপ্রদ চিত্র-বৈচিত্রের বর্ণ-বৈশিষ্ট্য।
E
আনন্দময়ী-প্রিন্টিং-ওয়াকস
কলিকাতা-৫ নং নিমতলা ঘাট দ্বীট হইতে
চুনিলাল শীল ছারা মুদ্রিত।

No text on this page.

ল।®•|•।
এত আহবৃড়ে। ঝি•••••
বিবাহ না দিলে পরে লােকে কবে কি ?
পৃষ্ঠা)

প্রীতি উপহার

-রেল ওয়ে সিরিজে
- অতঃপর -
প্রকাশিত হইতেছে
‘বসুমতীর’-সম্পাদক-চাণক্য
শ্রীযুক্ত হেমেন্দ্রপ্রসাদ যােষ প্রণীত
bz-বালি
চিত্রশিল্পী-শ্রীনরেন্দ্রনাথ সরকার ইতাদি
ক
কিমাশ্চৰ্য্য অতঃপর! *

পল্লী-লক্ষ্মী (ধর্ম-উপন্যাস) প্রথম পরিচ্ছেদ গােপাল এক মনে অনেকক্ষণ গীতা পাঠ করিল, পড়িতে পড়িতে গােলমাল বােধ হইল। সে আপন মনে কহিল, “ভগবানের কথায় তত ভ্ৰমবিরুদ্ধবাদ থাকবে না; গীতায় যে আগা গােড়া বিরুদ্ধ কথা। এই বলিয়া গােপাল অনেকক্ষণ নীরবে ভাবিল- আবার একমনে গীতা পড়িতে লাগিল-গীতা ছাড়িয়া আবার ভাবিতে লাগিল। সে একবার পড়ে-একবার ভাবে, আবার পড়ে—আবার ভাবে। অবশেষে উচ্চকণ্ঠে কহিল, “না, এ কিছু বুঝবার যাে নাই। এই কি ভগবানের বাক্য! তাই তাে, এতে ধর্মের কথা তাে. কিছুই বুঝলেম না। মানবজীবনে ধর্মটা যদি না বুঝলেম তবে আর বুঝলেম কি, আর জীবনটাই বা কেন?

পল্লী-লক্ষী
মানব-জীবনে আর কীট পতঙ্গের জীবনে প্রভেদ রইল কি?
একটু পরে প্রবােধ আসিয়া কহিল, ‘এত ভাবছ কি? ধর্মের
কথা ভেবে ভেবে তুমি দেখছি মাথা খারাপ করে ফেলবে।
গােপাল হাসিয়া কহিল, ‘ধৰ্ম্মের কথা ভাবলে যে মাথা
খারাপ হয়, সে মাথায় দরকার কি। ধর্মের কথা ভাববার জন্যই
তাে মানুষের মাথা।
প্রবােধ কহিল, ‘পরমহংসদেব তাই বলতেন। আর পণ্ডিত
শাস্ত্রী ঠিক ঐ উত্তরই দিয়েছিলেন। শাস্ত্রী বলেন--ভগবানের
কথা বেশী ভাবলে মাথা খারাপ হয়।
গােপাল কহিল, ‘তা হয় হােক। সার সত্য ছেড়ে আসার
অসত্য ভাবতে পারি না।
প্রবােধ সদর্পে কহিল, ‘যদি ভগবানকে সার সত্য
বলে বুঝে থাক, তবে তার তৈরি সংসার-সমাজকেও সার
সত্য বলে ধরাে না কেন? সে গুলাে তাে প্রত্যক্ষ।
প্রত্যক্ষকে ধরে কাজ করে যাও।
গােপাল কহিল, কোমট তাই ধরে পজিটিভিজমের
প্রকাণ্ড অট্টালিকা গাঁথতে চেষ্টা করেছিলেন। শেষটা
পড়ে গেল।
প্রবােধ ভাঙলাে কেন ?
গােপাল বনেদ কঁাচা ছিল বলে। গােড়ায় ভগবানকে
না ধরলে, কিছু গাঁথা যায় না।
প্রবােধ... প্রকৃতিকে ধরেই ধর্মের সিড়িতে উঠতে হয়,
সােল এজেন্ট- কমলিনী-সাহিত্য মন্দির

পল্লী-লক্ষী
আমাদের পক্ষে এখন সেইটাই পথ। দেশ-মাতৃকাই এখন
আমাদের প্রকৃতি-জননী জগদ্ধাত্রী।
গােপাল-কেবল কাব্য-কথায় প্রাণ ঠাণ্ডা হয়, মাখা
মানতে চায় না।
প্রবােৰ-মাখা প্রাণকে জোর করে মানিয়ে নিতে হবে।
দেহের জড়তা ভাঙ্গিয়া গােপাল কহিল, দেখা যাক। তুমি
তো একজন বড় ডাক্তার ; তােমার হাতে পড়িছি কোথায় গিয়ে
দাড়াই। তুমি কলকাতা যাচ্ছ কবে?
প্রবােধ...আজই, একটু পরেই । উঠি, আমার বেলা হলাে।
চিঠি লিখলে জবাব দিও। ছেলেগুলােকে নিয়ে, পুকুরটা যাতে
পরিষ্কার হয় তার বিশেষ চেষ্টা করাে, পচা পাতা আর
পানায় পুরে আছে—ঐটাই গায়ে ম্যালেরিয়ার গােড়া।
গােপাল কহিল, ‘গা ত’ মরেই গেছে আর ম্যালেরিয়ায়
করবে কি?
প্রবােধ“না না, এখনও গ্রামটা সম্পূর্ণ মরেনি, এখনও
চেষ্টা কল্লে বাঁচতে পারে। গা বাঁচাতে গেলে আগে ম্যালেরিয়াকে
তাড়াতে হবে-কেরোসিনে মশার বনেদ মারতে হবে।
গােপাল.••ও থিওরিটা আমার বড় ভাল লাগে না।
প্রবােধ উঠিয়া কহিল, “যাক্ সে তর্কের সময় এখন
আমার নেই দাদা, আমি চল্লেম। বৌদিদিকে আমার
নমস্কার দিও। বলল, তাড়াতাড়িতে এবারে তাঁর পায়ের
ধূলে নিতে পাল্লেম না।
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

ল্লিী-লক্ষী
নিদাঘের নবীন নীরদের ন্যায় শান্তি-বারি বক্ষে করিয়া
মৃদু-মধুর হাস্যময়ী নয়নবৌ আসিয়া উভয়ের সম্মুখে দাড়াইল।
প্রবােধ তাড়াতাড়ি বৌদিদির পায়ের ধূলা লইয়া মাথায় দিল।
নয়নবৌ ব্যস্তভাবে প্রবােধকে বাধা দিয়া ব্যগ্রকণ্ঠে কহি,
‘ওকি, ওকি ঠাকুরপাে, আমার পায়ের ধূলাে তুমি নেবে!
প্রবােধ অস্ফুট স্বরে কহিল, “তােমার মত সতী সাবিত্রীর পায়ের
ধূলােয় ধরা ধন্য হয়, আমি তাে কোন ছার!' প্রকাশ্যে কহিল,
‘শুধু পায়ের ধূলােয় তাে পেট ভরবে না, ঘরে খাবার কিছু আছে
তাে দাও, অনেকদিন তােমার হাতে কিছু খাইনি। মা মরে
অবধি তােমার হাতে ছাড়া মিষ্টি জিনিষ আর দুনিয়ায় কোথাও
খাইনি বৌদি। মনে মনে কহিল, সত্যই তুমি অমৃতময়ী
অমৃত-রূপিণী। যেমন দেবতা—তেমনি দেবী। মণিকাঞ্চন
সংযােগ—হরগৌরী মিলন। ধন্য গােপালদা, ধন্য তােমার
জীবন! আর ধন্য তুমি দেবী, ধন্য তােমার ধরায় অবতরণ।
নয়ন কহিল, “ঠাকুরপাে, আমার রান্না হয়েছে, শীগগির
স্নান করে দু'টো খেয়ে যাও। অনেকদিন তােমাদের দুই
ভাইকে একসঙ্গে খাওয়াইনি। তবে তরকারি-পাঁতি তেমন
নেই ভাই, দেখছ-ইতাে গায়ের দশা। কিছু কি কিনবার যাে
আছে আর।
গােপাল সহাস্যে কহিল, “তুমি স্বয়ং লক্ষ্মী ঠাকরুণ থাকতে
গাঁয়ের দশা যে কেন এমন হলো বৌদি, কিছুই বুঝতে পারি না।
সবই আমাদের ভাগ্য।
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির
শ

পল্লী-লক্ষী
নয়নবৌ ভীতকণ্ঠে কহিল, “তাইতো ঠাকুরপাে, লােকপুর
.এমন সােণার গাঁ, পৃথিবীর মধ্যে যেন ইন্দ্রপুরী, তার এমন
দশা। বেশী দিনের কথা নয়-পাঁচ সাত বছরের মধ্যে কেন
এমন হলাে ঠাকুরপাে? কথায় বলে, ‘রেতে কা-কা, দিবা
শিবা’ রেতে কাকের ডাক আর দিনে শিয়ালের ডাক যে গায়ের
প্রহরী, সে গা সত্বর শ্মশান হয়ে পড়ে--সে গায়ে বাস করতে
নেই।
প্রবােধ সজোরে কহিল, ‘তুমি কল্যাণময়ী পল্লী-লক্ষ্মী। তুমি
থাকতে গাঁ কখন মরবে না—লােকপুর আবার লােকে ভরপুর
হবে। লােকপুর আমাদের জন্মভূমি—আবার লােকপুর বাঁচবে
-আবার জাগবে—আবার ধন-ধান্যে পূর্ণ হবে।
বিষন্ন বদনে নয়নবৌ কহিল, “তা তাে হবে, কিন্তু তােমরা ।
ছেড়ে গেলে লােকপুরকে কে বাঁচাবে-কে জাগাবে? যে কটা
লােক গাঁয়ে আছে, তারা কতকগুলাে মরা, বাকিগুলাে শিয়াল
কুকুর। যদি গাকে বাঁচাতে চাও, তােমরা কজন গাঁয়ের ছেলে
বিদেশ ছেড়ে দেশে এসাে। জীবন্ত মানুষ যে ক’জন,
তারা টাকার লােভে—আপনার স্বার্থ, সুথের লােভে
বিদেশে বাস করলে গা কখনও বাঁচবে না। দূর থেকে
মুখের চীৎকার কল্লে মরা দেশ জাগবেও না--বাচবেও না। গাঁয়ে
ঘরে এসে দেশের জন্য হাতে-কলমে কাজ করতে হবে, কাজ
করাতে হবে। খালি মুখে ‘ম্যালেরিয়া ম্যালেরিয়া করলে
কোন ফল ফলবে না।
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।

১০
পল্লী-লক্ষী
:
প্রবােধ কহিল, ‘তা বটে বৌদি। প্রাণে শক্তি নেই, তাই
প্রাণের কান্না মূখে কাদি। মহাশত্রু ‘ম্যালেরিয়াই-তো
দেশটাকে খেলে। তাকে কি করে মারি, সেই চিন্তায় পাগলের
মত পথে ঘাটে কঁদি! জেগে কাদি—ঘুমিয়ে কঁদি—দেশে
কাদি-বিদেশেও কঁদি।
নয়ন কহিল, কেবল এক ম্যালেরিয়াকে মারলে ইবে না
ঠাকুরপাে। জঙ্গল সাফ করে—এঁদো ভােবা ভরাট করে,
পেঁকো-পুকুর পরিষ্কার করে, মশা মেরে যেমন ম্যালেরিয়ার
বীজ মারতে হবে, তেমনি আর একটা বড় শত্রুর জড়কেও
মারতে হবে।
প্রবােধ.. আর তেমন বড় শত্রু কি বৌদি ?
নয়ন..সব চেয়ে বড় শত্রু অনাহার। দুৰ্বল দেহের ঘাড়েই
ম্যালেরিয়ার বেশী অধিকার, অনাহারের গােড়া হচ্ছে পয়সার
অভাব।
দেশের যে দশা দাড়িয়েছে, তাতে গােলামীতে আর
পয়সা হচ্ছে না। দেখতেই পাচ্ছ, বি-এ এমএ পাশ করে
পঁচিশ ত্রিশ টাকার চাকরী মিলছে না। পাশ করাতে যে খরচ
হয়, তাতে ছেলেকে ব্যবসা করবার পুজি বেশ করে দেওয়া
যায়—এ মােটা কথাটা এখন খুব মােটা বুদ্ধির লােকেও বুঝতে
শিখেছে। জিনিস পত্রের যে দাম চড়েছে, তাতে আগেকার
চার পাঁচ গুণ খরচে এখন অতি কষ্টে ভাত কাপড়টা মেলে।
তার উপর একটা মহাগ্ৰহমেয়ে। তার বিয়ে, বেহাই
বেহানের বাড়ী তত্ত্ব-তল্লাস, তার ওপর উপগ্রহ—ডাক্তার
সােল এজেন্ট—কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী - এ। কুইনাইন, সাগু, বেদানা। এ সব ছাড়া নিত্য দেবসেবা-- চা বিস্কুট পান সিগারেট ইত্যাদি উপকরণ আছে, সকলের ওপর উপসর্গ-ঘড়ি, ছড়ি, জামা, জুতা ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সকলের ওপর আবার রকমারি ভােগবিলাস আছে- অন্দরে, বাইরে, কাণে নাম শুনেছি, চোখেও দেখিনি মনেও রাখতে পারিনি। নানারকমের নানা উপদ্রবে এখন এ দেশের জীবনটা এত ভারী—এতে বিড়ম্বনার বােঝ হয়ে দাড়িয়েছে যে, বাঙালীর দেহের চেয়ে বিড়াল কুকুরের শরীর স্বর্গের সামগ্রী বলে বােধ হয়। আর দু'দিন পরে খালি ভাত খেয়ে প্রাণ রাখা দায় হয়ে দাড়াবে। এমন অনেক কথাই নয়নবো’র গলিত কণ্ঠস্বর হইতে বীণারবে গােপাল ও প্রবােধের শ্রবণে সুধাধারা বর্ষণ করিতে লাগিল। উভয়ে অনিমেষ নয়নে গৃহলক্ষ্মীর মুখপানে চাহিয়া মুগ্ধ প্রাণে স্বর্গের সুধাধারা পান করিতে লাগিল। প্ৰবােধ ব্যাকুল কণ্ঠে সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করিল, “বৌ-ঠাকুৰুণ, তুমি সাক্ষাৎ দেবী অন্নপূর্ণা। বল তাে, এ দেশে এ দারুণ অন্ন- সমস্যার উপায় কি ? নয়ন কহিল, 'মহাজনরা যা বলেছেন তাই এখন পন্থা, আর কিছুই নয়। আর্যাবর্তের ধর্মক্ষেত্রে-ধৰ্ম্ম-পথই পথ। সে পথের গতি-সােজা চাল-চলন আর উচু ভজন-সাধন। এই বলিয়া নয়ন একটু মধুর হাসি হাসিয়া কহিল, “তােমরা tapta a 1976-( plain living high thinking ) ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

পল্লী-লক্ষী
তাহলে মনে প্রাণে গােলামী ছাড়তে হবে-বিদেশী জিনিস
খাবে না—ছোঁবে না। ভগবানের শ্রীমুখের বাণী জীবনের
মূলমন্ত্র বলে সত্যাগ্রহে জড়িয়ে ধরতে হবে;
যুক্তাহার বিহারস্য যুক্ত চেষ্টসু কর্মসু।
যুক্ত স্বপ্নবিবােধশ্য যােগাে ভবতি দুঃখহা।
প্রত্যেককে এইরূপ সাধক, কর্মযােগী হতে হবে। যারা
যারা দেশকে বাঁচাতে, জাগাতে চায়, তাদের সহরের মােটা টাকার
গােলামী ছেড়ে দেশের ঘরবাড়ীতে এসে বসবাস করতে
হবে, দেশের চাষ বাসের উন্নতি করতে হবে। মাঠের জমীতে
নিজের হাতে ধান, ছােলা, কলাই, সরষে বুনতে হবে, বাড়ীর
বাগানে কলা, বেগুন, পেঁপে, আলু আজাতে হবে তার সঙ্গে
সব বাড়ীতেই বেশী পরিমাণে কাপাস গাছ কইতে আর ঘরে
গৰু পুষতে হবে। আপনি মাঠে বেড়িয়ে গরু চরাতে লজ্জা
বােধ করলে চলবে না। দেশের চাষাদের যৌথ কারবারে
উৎপন্ন শস্যাদির ব্যবসাই প্রাণপণে চালাবার চেষ্টা করতে হবে।
প্রত্যেক পুরুষকে লােহার মানুষ হতে হবে। সঙ্গে
অন্দরে মেয়েদের ঠিক তেমনি ছাঁচে গড়ে তুলতে হবে ।
খালি গাল-গল্প আর বৃথা চর্চা ক'রে এখনকার মত তারা কুডেমী
করে কাল কাটাতে না পারে। কথাটা সকল সময় প্রাণে
জপতে হবে-heaven helps those who help themselves'।
প্রবােধ দিব্যদৃষ্টিতে দেখিল, সে চিত্ত-বিনােদিনী মনপ্রাণ
বিমােহিনী চির মধুর হাস্যময়ী বৌদি আর নাই ; নয়নের
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির
সঙ্গে

পল্লী-লক্ষী সুধা-অঞ্জন-স্বরূপিণী নয়নবৌ আর নাই। তাহার স্থলে এক অপূৰ্ব দিব্য কান্তি স্বর্গের অনল-শিখা, বাংলার পাপ-তাপ বিদগ্ধ করিবার জন্য ধরায় অবতীর্ণ হইয়া দাউ দাউ জ্বলিতেছে! প্রবােধ উদ্ৰান্ত ভাবে আপন মনে আপনি কহিল, ‘এ পাপ তাপের বাঙালী-সংসারে যদি কেউ সুখী, সৌভাগ্যবান্ থাকে, তবে এমন রমণী-রত্ন যার ঘরে সেই একমাত্র জন। গােপাল, তুমি ধন্য-তােমার গৃহ যথার্থই পবিত্র স্বর্গ। খাওয়াইবার জন্য প্রবােধকে লইয়া নয়ন প্রস্থান করিল, গােপাল উদাস প্রাণে কত কি ভাবিতে লাগিল। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ‘গােপাল, ভাই, একখানা চিঠি আমায় লিখে দেবে? গােপাল ব্যস্ত-চক্ষে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কোথায় রজনী দিদি? রজনী, নানাভাবে নানা ভঙ্গীতে গােপালের মুখপানে চাহিয়া কহিল, “সে অনেক কথার কথা ভাই। রায়-গা জানই- ততা কি দুষ্ট জায়গা? গােপাল বােধ হয় রজনীর মুখে সবে এই প্রথম ‘রায়-শা’র নাম শুনিল। রজনীকে সে ভালরূপই জানিত, তাই রায়-গর ১১৪নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা।

১০ পল্লী-লক্ষী কথায় বেশী বাড়াবাড়ি না করিয়া কেবল জিজ্ঞাসা করিল, ‘তার পর ? রজনী বহ্যাড়ম্বরে কহিল, তার পর আর কি বলব আমার মাথা মুণ্ডু ! হতভাগাটা মরে গেল—ছারে-গােল্লায় গেল- আমায় জন্মের মত খেয়ে গেল ! যদি মরবার আগে বিষয়টা বেচে আমার হাতে নগদ টাকাগুলাে দিয়ে যেতে কি একখানা কাগজ করে যেতো, তা হলে আমায় এত ভােগ ভুগতে হতে । অনায়াসে পায়ের ওপর পা দিয়ে বসে দু’টো খেতে পেতাম। হতভাগার গয়ায় পিণ্ডি দিয়ে, বছর বছর ছেরাদ্ধ-শান্তি করে, প্রেতযোনি থেকে উদ্ধার করতাম। মরুক মরুক-এখন গাছে। গাছে ঘুরে ঘুরে মরুক।' গােপাল বুঝিল যে, বিধবা রজনী মৃত স্বামীর উৰুেশে সকল বিশেষণের ব্যবস্থা করিতেছে। বিধবা পত্নীর পরিণামের জন্য অর্থসঞ্চয় না করিয়া, স্বামী যে তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া চিরতরে প্রস্থান করিয়াছে, সেই অভিমানে ক্রোধে রজনী আত্মহারা হইয়া, যখন তখন যাহার তাহার কাছে শ্বশুরের সপ্তম কুল পর্যন্ত অভিশপ্ত করিয়া থাকে। এইরূপ স্বামী-তর্পণের মন্ত্র আওড়াইতে আরম্ভ করিলে, গােপাল প্রবােধ-বাক্যে অনেক বুঝাইয়া রজনীকে প্রশান্ত করিল। রজনী উচ্চ কণ্ঠস্বর নীচু করিয়া যেন আপন মনে কহিতে লাগিল, ‘বিদ্যেসাগর বড় ভাল পথই বার করেছিল, দেশের হতভাগা লােক গুলো তা বুঝলে না ! নইলে আজ আমার সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দিৰ পল্লী-লক্ষী ১৫ ভাবনাটা কি?' ‘আমার কথাটা বলবার সময় রজনী বিকট ভঙ্গীতে গােপালের পানে তীব্র কটাক্ষপাত করিল। কটাক্ষের অর্থ গােপাল বুঝিল না, অথবা বুঝিয়াও বুঝিতে চাহিল না। গােপাল প্রবােধ-ভাষে কহিল, রজনী-দিদি, মিছে আর রাগ-অভিমান করে আপনাকে কষ্ট দিয়ে ফল কি? মরণ জীবন তো ভগবানের হাত। সে বেচারী কি ইচ্ছে করে প্রাণটাকে ঘুচিয়েছে ? তােমায় সুখী করতে কি তােমায় নিয়ে ঘর সংসার করতে কি তার প্রাণে সাধ ছিল না ? কি করবে, সে হতভাগ্য- তােমার অদৃষ্টে স্বামীর সংসার নেই, নইলে অমন বয়সে সে মরবে কেন? রজনী সদর্পে কহিল, “মরেছে, আপদ গ্যাছে, সেজন্য কোন দুঃখ নেই।' বলিয়া রজনী আবার এক বিকট কটাক্ষে গােপালের মুখপানে চাহিল। গোপাল এবারে সে কটাক্ষের অর্থ সুস্পষ্ট বুঝিল-রজনীর হাব ভাবে চমকিক ব্যগ্রকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, ‘তােমার চিঠি কি এখন লিখতে হবে ? রজনী কহিল, “না, তত তাড়াতাড়ি নেই। সন্ধ্যের পর তােমার সময় হবে? একবার আমাদের বাড়ী যেতে পারবে? গােপাল অন্যমনস্কভাবে কহিল, সন্ধ্যার পর ? কেন, এখন লিখে দিই না কেন ? রজনী সহাস্যে আবার সেই বিকট কটাক্ষপাত করিয়া কহিল, “না, এখন না, একটা কথা আছে। আধ-আধ ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীঠ, কলিকাতা হইল! সে

।
পল্লী-লক্ষী
ভাষে কথা কয়টি বলিয়া রজনী হেঁটমুখে মাটীর পানে চাহিয়া
পায়ের আঙ্গুলে দাগ দিতে লাগিল। রজনীর দুষ্ট অভিপ্রায়
গােপাল সম্যক্ বুঝিয়া তীব্রকণ্ঠে কহিল, “কি কথা? আমার
তােমার কি কথা? রজনী ঈষৎ হাসিয়া মুক্তকণ্ঠে
কহিল, “সে মনের কথা—আমি মনে মনে বলেছি, তুমি
মনে মনে বুঝেছ। বুঝে আবার ন্যাকামি করছ কেন?
বলিয়া দুষ্টা রজনী দুষ্ট-হাসি হাসিল। গােপাল সদর্পে কহিল,
‘আমি তােমার মনের কথা বুঝতে পারিনি—বুঝতে চাইও
। তুমি এমন কথা আর বলে আমি হারুদাদাকে সব
বলে দেব।' তীব্র কণ্ঠে কথা কয়টা কহিয়া গােপল দ্রুতপদে
প্রস্থান করিল। রজনী দলিতা-ফণিণীর ন্যায় মস্তক উত্তোলন
করিয়া দাড়াইল : রজনী প্রাণের মধ্যে প্রাণের ভাষে কহিল,
‘এর ঠিক শােধ নিতে পারি তবে এ জীবন রাখব, নইলে
তােমার কথার মত আগুনে এ ফাকা অসাড় জীবনটাকে দগ্ধে
দগ্ধে মারব।'
আপন মনে বকিতে বকিতে রজনী মৃতপ্রায় অসাড় দেহটাকে
বহিয়া লইয়া প্রস্থান করিল।
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী • তৃতীয় পরিচ্ছেদ মেয়ে খুব বাড়ন্ত। বয়সও বার পার হইয়া তেবােয় পডিল। গাঁয়ের লােক ঘাটে পথে বলাবলি করিতে লাগিল বুড়া বুড়ীরা বলিতে আরম্ভ করিল‘এখনকার ওসব সাহেবী চালচলন। বাপ পিতাম’র পিণ্ডিতে ছাই পড়ুক --লােকে যা ইচ্ছে বলুক, মেয়ের বে’ কিছুতেই দেখে না, তাতে জাত জন্ম থাক, আর যা। আর কি সমাজ আছে, না সমাজে সে সব তেজী লােক আছে? এ সব অন্যায় অনাচার কখনই স্বর্গীয় কর্তারা সহ্য করতো না। অজই গােপাল বােসকে একঘরে করতাে, তার ধােপা নাপিত বন্ধ করে দিতে।' এই- রূপ নানাভাবের নানা কথা লােকপুরের ঘাট পথ তােলপাড় করিয়া ফেলিল। বাংলার পাড়াগা এখন মৃতপ্রায় নীরব নিস্তব্ধ ! ধন-ধান্তের প্রাচুর্যে, গহনা-বাজনা খেলা-ধূলায় আমােদ আহলাদে যে সকল গ্রাম সর্বক্ষণ মুখরিত থাকিত, সে সকল পল্লী এখন ম্যালেরিয়ার মড়ক আর অভাব অনাটনের হাহাকারে দিবানিশি মাটীতে নিশিয়া রােদন করিতেছ! বেশী দিন নয়-বেশী দিনের কথা ন—বিশ বৎসর আগে যে সকল গাঁয়ের আড়ম্বর ঐশ্বৰ্য্য দেখিয়া মন প্রাণ আনন্দে উৎসাহে আকাশের উর্দ্ধে নাচিয়া উঠিত, সেই সকল বড় বড় গ্রামের বড় বড় বাড়ী এখন ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা ২

১৮
পল্লী-লক্ষী
ভাঙ্গিয়া জঙ্গলে পুরিয়াছে! ন্যাকড়া-বাঘ, বুনা-শুয়ার আর
শিয়ালের আনন্দ-কোলাহলের আখড়া হইয়াছে। এই
সকল মৃতকল্প গাঁয়ের ও সমাজের হৃদয় হইতে বড় বড়
লােক, ভাল ভাল লােকের চিহ্নও মুছিয়া গিয়াছে। কেবল
দুষ্ট কুরমতি কতকগুলা লােৰু সামাজিক দলাদলি মামলা
মােকদ্দমা আর বিবাদ বিসম্বাদের আগুণ জ্বালাইয়া মৃত
পল্লীভূমিটাকে এখনও কথঞ্চিৎ জাগাইয়া রাখিয়াছে। এই
সকল দুষ্ট প্রকৃতির লােকগুলার মধ্যে লােকপুরের হারু রায়
একজন প্রধান ব্যক্তি। হাৰু রায় বুক ফুলাইয়া সৰ্বত্ৰ বলিয়া
বেড়াইতে লাগিল, ‘সাহেবী চাল করে গােপাল বােস দেশ
ছেড়ে চলে যা। সমাজের বুকে বসে এমন দাড়ি উপড়ালে কে
সইবে? হারু বেঁচে থাকতে লােকপুর এখনও তেমন-মরা
যে, যে যা মনে করবে, তাই করবে। বাংলার পাড়াগাঁয়ে
একটা কথা আছে, ‘গ’য় মানে না আপনি মােড়ল। হারু রায়
স্বয়ং সেই প্রচলিত কথাটার এক সমুজ্জ্বল সজীব প্রমাণ।
রায় কর্কশ-ভাষী দুষ্ট প্রকৃতি। সে নিতান্ত দরিদ্র-মূখ। তাহাকে
মানে কে? তবে সে আকাশে লাফাইয়া আপনাকে বড়
দেখিত এবং পরের কাছেও আপনাকে তেমনি বড় বলিয়া বড়াই
করিয়া বেড়াইত। তাহার কথায় চতুর লােকে মুখ টিপিয়া
হাসিত আর নির্বোধ আহাম্মুখ—প্রতিদ্বন্দ্বী সাজিয়া আস্ফালনে
হারু রায়ের সহিত বৃথা গলাবাজি করিত। রজনী, হারু
রায়ের বিধবা ভগ্নী, তাহার সংসারেই থাকে। সে বয়সে
সােল এজেন্ট-কমলিনীসাহিত্য-মন্দির

১৯
পল্লী-লক্ষী
হারুর ঘােট, কিন্তু গলাবাজিতে হয়কে নয় করিতে, নিরীহ
নির্দোষ গরীবের জাতি নাশ করিতে, সতীর কুৎসা কলঙ্ক
রটাইতে, দাদা অপেক্ষা অনেক বড় ভিন্ন ঘােট কোন অংশেই
নয়। গােপাল বসুর কন্যার বয়ােবৃদ্ধির জন্য হারু রায় যেমন
যেখানে সেখানে পুরুষ সমাজে নানা কথা নানা ভাবে রটাইয়া
কুৎসার আগুন জ্বালাইতে লাগিল, তাহার ভগ্নী রজনীও মেয়ে-
মহলে তেমনি কেলেঙ্কারীর বিকট হলাহল ছড়াইয়া জলন্ত আগুণে
ঘৃতাহুতি প্রদান করিল।
একদিন জলের ঘাটে দশটা মেয়ের মাঝে রজনী, গােপাল
বসুর পত্নী নয়নমণিকে প্রথমতঃ মিঠাকড়া ভৎসনায়, পরে বিকট
গালি-গালাজে, অবশেষে উচ্চকণ্ঠে কঁদিতে দিতে অভিসম্পাতে
অভিনন্দিত করিল। রজনী কাদিতে লাগিল,-ঘাটে তােমরা
এতগুলো মেয়ে আছ, তােমরা দশে ধর্মে বিচার করে বল।
বল তােমরা কার দোষ ? কলিকাল ! একালে কাৰু ভাল
করতে নেই। কাকেও ভাল কথা বলতে নেই। আমি তােমার
ভালর জন্যই বল্লাম—এত বড় আইবুড়াে মেয়ে ঘরে রেখে মুখে
ভাত উঠছে কি করে--এই তাে কথা! এই কথায় আমার
গালমন সাপাসাঁপি! তা ক—তাের যা মনে আছে—তাই
কর--তাই বল। আমি মাটির মানুষ—আমার শরীরে সব
সয়—আমি সব সইলাম । মাথার উপরে ভগবান্ আছেন।
তাঁর ধর্মের রাজ্যে এখনও চন্দর-সূয্যি উঠছে—এখনও দিন
রাত হচ্ছে—তিনি কথন সইবেন না। তিনি অবিডি এর
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা

লমী বিচার করবেন। একদিন না একদিন এর ফল ফলবেই বে। গােপাল বসুর পত্নী নয়নমণি পরমা সুন্দরী। নয়নের শরৎ-শশী সম সুন্দর মুখখানিতে মৃদু-মধুর হাস্য-রেখা ভিন্ন ক্রোধ বা বিষাদ-কালিমার ছায়া-সম্পাত এ পর্যন্ত লােকপুরের কেহ কখন দেখিতে পায় নাই। মেয়ে পুরুষ, ছােট বড় সকলেরই মাতৃস্থানীয়া মমতাময়ী নয়নমণি গােপাল বসুর হৃদয়ের আরাধ্যা দেবী। অন্তরাত্মার পরম পবিত্র নিভৃত নিকেতনে প্রতিষ্ঠিত সেই আরাধ্যা দেবীকে লাভ করিয়া গােপাল জীবনটাকে এতই সার্থক এমনই কৃতাৰ্থ বলিয়া মনে করে যে, বিশাল জগতের মধ্যে এমন কোন জিনিস সে দেখিতে পায় না, যাহার অভাবে এত বড় প্রাণটার কোন স্থান তিল পরিমাণ খালি থাকিতে পারে বা থাকিলেও কোন সামগ্রীতে শূন্য স্থানের অভাবটাকে পূরণ । করিতে পারে। কি রূপের সৌন্দর্য্যে, কি প্রাণের ঐশ্বর্য্যে, কি মনের মাধুর্যে নয়নমণির তুলনা জগতে এক নয়নমণি ছাড়া আর কোথায় ? এক নয়নকে পাইয়া গােপাল সংসারের সকলই ছাড়িতে—সকলই ভুলিতে পারে। ক্রোধের ধারা কিরূপ, বিসম্বাদের প্রবাহ কেমন, তাহা নয়ন- মণি কখন স্বপ্নেও অনুভব করে নাই। চিরমধুর-হাস্যময়ী নয়ন, উগ্রচণ্ডা রজনীর কথাবার্তা শুনিয়া ও তাহার ভাবভঙ্গী দেখিয়া স্তম্ভিত হইল। হঠাৎ ব্যাঘ্রের সম্মুখে পড়িলে কুরঙ্গিনী যেমন ভীত এ্যন্ত হয়, নয়নের দশাও তেমনি সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির .

হইল। পল্লী-লক্ষী নয়ন প্রথমে কিছুই বুঝিতে পারিল না। হঠাৎ কিরূপে কালভুজঙ্গিনীর মস্তকে পদক্ষেপ করিল, তাহা ঠিক করিতে না পারিয়া নয়ন বাহতের মত অসাড় মড়ার ন্যায় পড়িয়া রহিল। তাহার নিতুই-নব মূখখানির সৌন্দৰ্যরাশি, মরুমাঝে নিক্ষিপ্ত প্রফুল্ল কমলের ন্যায় নিমিষে নিভিয়া গেল ! তাহার চির-মধুর সুধা-ধারা সম হাস্যরেখা বিদাধর প্রান্তে লুকাইয়া পড়িল। কত ক্ষণে একটু প্রকৃতিস্থ হইয়া অতি কুষ্টিতকর্থে নয়ন কহিল, “ঠাকুরঝি, আমি জানতে পারিনি, হঠাৎ আমার পায়ের জল ছিটকে পড়েছে। ক্ষমা কর দিদি, পায়ের ধূলাে দাও।' এই বলিয়া একটু ব্যঙ্গ-ছলে হাসিয়া কহিল, “জলে দাড়িয়ে পায়ের ধূলাে দেবে কি করে, একটু পায়ের জল দাও। চরণামৃত খেয়ে পাপ দেহটা পবিত্র করি। ঘাটের সকল মেয়ে অবাক হইয়া পরস্পরের মুখ চাওয়াচায়ী করিতে লাগিল। নয়ন যে রজনীকে কখন কি বলিল, তাহা কেহ শুনিতেও পায় নাই-বুঝিতেও পারে নাই। নয়নের কথা নয়ন নিজেও জানে না--তাহার সৃষ্টিকর্তা বিধাতাও জানেন না। অথচ ঘাটের মাঝে রজনী এমন একটা তুমূল কাণ্ড বাধাইয়া দিল, যাহাতে সকল লােক স্তম্ভিত হইল। রজনীকে গ্রামের সকল মেয়ে পুরুষ সবাই জানিত—সবাই বুঝিত। সে আকাশে ফাদ পাতিয়া বাতাসের সঙ্গে ঝগড়া বাধাইয়া দেয়, এ কথাটা জানিতে কাহারও বাকি ছিল না। লােকপুরের গ্রামবাসীরা নয়নমণিকে জানিত। ঘাটের মেয়েরা নয়নকে চুপে চুপে বাড়ী যাইতে কহিল। ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা পল্লী-লক্ষী ‘রজনী-ঠাকুর ঝি পাগােল’ বলিয়া হাসিতে হাসিতে নয়ন তাড়াতাড়ি স্নান সানিয়া গৃহে গমন করিল। রজনীর তর্জন গর্জনে আকাশ পাতাল আলােড়িত হইল। আমি পাগােল অত বড় ধেড়ে মেয়েটাকে ঘরে পুষে যে কাণ্ড কারখানা করছে, তা লােকে জানে না? লােক সব কানা? এর শােধ কেমন করে তুলতে হয়, তা দেখাচ্ছি-রও। এইরূপ নানা কথা কহিতে কহিতে রজনী বাড়ী আসিয়া হারু দাদার সম্মুখে আছ- ডাইয়া পড়িল। হারু বুঝিল, তাহার শূর্পনখা ভগিনীঘাটে নিশ্চয়ই কোন বিষম কাণ্ড বাধাইয়াছে। রজনী বাল-বিধবা-- সুন্দরী হউক না হউক কদাকার নহে। রজনী মাঝে মাঝে বৎসরের মধ্যে দুই একবার কলিকাতায় যাতায়াত করিত। যে কোন আত্মীয় স্বজনের বাড়ী যাইয়া থাকিত—তাহা লােক- পুর অঞ্চলের কেহ জানিত না। রজনী গলা বড় করিয়া গ্রামে আসিয়া বলিয়া বেড়াইত-তাহার দেবর হাইকোর্টের একজন বড উকিল। লােকপুরের লােকেরা তাহার কথা কাণ পাতিয়া শুনিত আর মুখ টিপিয়া হাসিয়ানীরবে থাকিত। কলিকাতায় যাতা- যাতের ফলে রজনী হাতে কিছু টাকা জমাইয়াছিল। সেই কারণে আর হারু রায়ের তৃতীয় পক্ষের পত্নী নাবালিকা বলিয়া রজনী হারুর ঘরে সর্বেসর্বা হইয়াছিল। হারু ও রজনী দুই ভাই ভগ্নীর মধ্যে আন্তরিক মায়া মমতা ছিল কি না তাহা তাহারা নিজেরাও অনুভব করিতে পারিত না। বাস্তবিক পক্ষে উভয়ে আপন আপন স্বার্থের বশে পরস্পরের প্রতি স্নেহের ছলনা প্রকাশ করিত। সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির পল্লী-লক্ষী রজনী হারুর সম্মুখে পড়িয়া উচ্চৈস্বরে কাঁদিতে কাদিতে কহিল, ‘আজ ঘাটের মাঝে দশ-ধর্মের সামনে নয়নবৌ অপমান করেছে, তার প্রতিশােধ যদি নিতে পার, তবেই দাদা তােমার ঘরে থাকব, নইলে বিষ খেয়ে মরব, নয় তােমার সংসার ছেড়ে যে দিকে দু’ চক্ষু যায় সেই দিকেই চলে যাব। যদি রজনীর প্রাণের প্রত্যেক শিরা চিরিয়া চিরিয়া পরীক্ষা করিয়া দুনিয়ার কেহ কিছু বিশ্লেষণ করিয়া পাইয়া থাকে, তবে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি এক হারু ছাড়া আর কেহ নহে। হারু রজনীর কথা নীরবে শুনিয়া কিছুকাল নীরবে রহিল। নয়ন বৌ কি বলিয়াছে, কেন বলিয়াছে সে সকল কথা কিছুই জিজ্ঞাসা করিল —করিবার প্রয়ােজনও কিছু বােধ করিল না। কেবল দম্ভভরে গগন ফাটাইয়া কহিল, “তার যােগাড় আমি করেছি। গােপাল বােস মেয়েটাকে দিয়ে সংসার চালাচ্ছে এ অঞ্চলে এখন কে তা জানে? সমাজ আর ক'দিন তার এ পাপের অত্যাচার সইবে? মিত্তির-বাড়ী ভােজের দিন তাকে কে রক্ষা করে দেখবাে। সে ভেজে সমাজের কোন গা নেমন্তন্নে বাদ পড়বে না। সেই দিনে তাকে বুঝে নােব। হারু নানা প্রবােধের ছলে ভগ্নী রজনীকে উঠাইল। হারুর সংসারে পাকশালার প্রধান কার্যভার ছিল, রজনীর হাতে। রজনী দাদার কথায় আশ্বস্ত হইয়া ধীরে ধীরে মন্থর গমনে পাক- শালায় গমন করিল। ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

২৪
পল্লী-লক্ষী
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
গােপাল বসু লোকপুরের সাধারণ গৃহস্থ ব্যক্তি। তাহার
বিষয় সম্পত্তি কিছু আছে, কিন্তু তদুপরি চাকরী না করিলে সচ্ছল
ভাবে সংসার চলে না। গােপালের পি পাল-চৌধুরীদের
নায়েবী করিয়া যাহা কিছু করেন, তাহাতে গােপালকে বি-এ
পর্যন্ত পড়াইতে সব খরচ হইয়া যায়। তিনি যখন মৃত্যুশয্যায়
পড়িলেন, তখন গােল কলেজ ছাড়িয়া বাড়ী আসিল, মাতার
গহনাপত্রে ও নগদ যাহা কিছু ছিল সব পিতার চিকিৎসার
গােপাল ব্যয় করিল। পূজী সবই খরচ হইয়া গেল, অথচ
পিতাকেও বাঁচাইতে পারিল না। পিতার মৃত্যুকালে গােপালেব
মাতা মৃত স্বামীর পদতলে পড়িয়া কঁদিতে কঁদিতে কহিলেন,
‘আমি রইতে পাববনি আমায় শীগগির ডেকো। সতীর
ক্রন্দন ধর্মরাজের সিংহাসন টলাইল। উপর হইতে গােপালের
জননীর ‘তলব’ আসিল। স্বামীর মৃত্যুর পর তিন দিনের মধ্যে
পত্নীও পরলোক প্রস্থান করিলেন। গােপাল বেশ ব্যয়ভূষণ
করিয়া পিতামাতার শ্রাদ্ধ করিল। গােপাল দেনদার হইল—
তাহার ভূমি-ভদ্রাসন বন্ধক দিল।
গােপাল পড়ার আশ ছাড়িল, পত্নী নয়নমণি ও কন্যাকে
লইয়া বাড়ী বসিয়া সসার-ধৰ্ম্ম করিতে লাগিল। দেখিতে
দেখিতে মেয়ের বয়স প্রায় পনের হইল। পিতৃ-মাতৃদায় শেষ
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

^^^* * * * * * * * *
হইলে কন্যাদায়ে গােপাল বড় বিব্রত হইয়া পড়িল। নানা লােকে
নানা কথা নানা ভাবে বলিতে লাগিল। গােপাল আপনার
কথা পরের মুখে শুনিয়া মৃতপ্রায় হইয়া ঘরের কোণে অবরুদ্ধ
রহিল।
নয়ন আসিয়া নীরবে রহিল। পাছে নিরীহ পতির প্রাণে
দারুণ আঘাত লাগে এই ভাবিয়া ঘাটে রজনীর সহিত তাহার
যে কাণ্ড ঘটিয়াছিল, তাহার কিছুই উল্লেখ করিল না।
বিষন্ন বদন হইতে মৃদুমধুর হাসির রেখাটুকু যেন চিরতরে বিলুপ্ত
হইল। চির-বসন্ত-রূপিণী মাধুৰ্য্যময়ী নয়নের নিতুই নব ভাবটুকু
লুকাইয়া গেল, কিন্তু পতির প্রণয় দৃষ্টিতে তাহা সহজেই ধরা
পড়িল। পত্নীগত-প্রাণ গােপাল বুঝিল, ব্যাপার কিছু গুরুতরই
ঘটিয়াছে। নতুবা এমন মাধুৰ্যময়ী সৌন্দর্যের সায়র—নিমিষে
শুকাইল কেন!
রন্ধনের পূর্বে নয়ন স্বামীকে প্রতিদিন ‘কি রান্না হইবে’
জিজ্ঞাসা করিত। আজ কোন কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া সে
বিরস বদনে একমনে বন্ধন করিতে লাগিল। নয়নমণি সত্যই
নয়নমণি।
নয়নের বিরস বদন দেখিয়া গােপালের চক্ষে জগৎ
সংসার আঁধারময় বােধ হইল। নয়নকে লইয়া গােপাল দরিদ্র
সংসারের গুরুভার তুলার মত হালকা বােধে হাসিমুখে বহিয়া
বেড়ায়। এ জীবনে যে ভাবিবার কোন কথা বা অভাবের কোন
সামগ্রী আছে বা থাকিতে পারে, ইহা স্বপ্নের ঘােরেও তাহার
মনের কোণে উদয় হইবার অবসর পায় না।
সে জীবনে
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

২৬ পল্লী-লক্ষী জগতের সবই সহিতে পারে, সবই বহিতে পারে, পারে না কেবল একটা জিনিস নয়নের বিষাদ-কালিমাখা মুখখানি। তাহাও এতদিন তাহার সুদীর্ঘ জীবনে—বিবাহের পর প্রায় পঁচিশ বৎসর কাটিয়া গেল—এতকালের মধ্যে কখনও ঘটে নাই। গােপাল যখনই কোনও দায়ে ঠেকিয়াছে, যখনই কোন ভাবনার স্রোতে ভাসিয়াছে, তখনই নয়ন মাথা পাতিয়া তাহার দায়ের বােঝা- ভাবনার ভার আপনার ঘাড়ে চাপাইয়া স্বামীকে শান্তির শয্যায় শােয়াইয়া রাখিয়াছে। আজ তাহার ভারাক্রান্ত জীবনের দৃঢ় খােটী কেন হঠাৎ এমন মচকাইল? গােপাল অধীর হইয়া উৎ- কষ্ঠিত প্রাণে নয়নের নিকট রান্নাঘরে উপস্থিত হইল। নয়ন তখন শূন্যপ্রণে একদৃষ্টিতে শূন্য আকাশের পানে চাহিয়াছিল। গােপাল সম্মুখে উপস্থিত হইলে নয়নের উদাস জড়তা ভাঙ্গিয়া গেল, সে পতির মূর্তি আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিল। স্বামীর উৎকণ্ঠিত ব্যাকুলতা দেখিয়া নয়নেরও সুগভীর প্রশান্ত প্রাণ বিচলিত হইল। স্বামীর মুখাপনে চাহিতে চাহিতে নয়নের নয়ন হইতে দরদরধারে অশ্রু ঝরিয়া পড়িল। যে দুঃখের প্রতিকার অসম্ভব দুঃসাধ্য, তাহার বিনিময় দরিদ্রের পক্ষে নীরব অশ্রু ব্যতীত জগতে আর কিছুই নাই। গােপাল কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “কথাটা কি, কি হয়েছে নয়ন ? নয়ন অঞ্চলে অশ্রু মুছিয়া রুদ্ধ স্বরে কহিল, কৈ, না, কিছুই তো হয় নি! গােপাল কহিল, ভূমিকম্প ভিন্ন পৰ্বত কাপে সােল এজেন্টকমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী
। নিশ্চয় কোন গুরুতর ব্যাপার ঘটেছে। কি হয়েছে
বল।
নয়ন স্বয়ং শান্তি-রূপিণী। বিবাদ বিসম্বাদে সে নিতান্তই
নারাজ। আসল কথাটা চাপা দিবার অছিলায় সে বাজালে
বাজে কথা তুলিল। গােপালের মন তাহা মানিল না—গােপাল
তাহা বুঝিল না। গােপাল স্বভাবতঃ ধীর প্রকৃতি! তাহার অটল
প্রাণ অনায়াসে সকলই সহিতে পারে, কেবল নয়নের সামান্য
যন্ত্রণা তাহার বক্ষে শেল বিদ্ধ করে। নয়নের চক্ষে জল তাহার
পক্ষে বিষম বজ্রাঘাৎ। সে বজ্রাঘাৎ নিবারণ করিতে গােপাল
আপন হাতে হাসিতে হাসিতে আপন হৃৎপিণ্ড ছিড়িয়া ফেলিতে
কিছুমাত্র কুষ্ঠিত নয়—নয়ন তাহা জানিত। তাই সে বুঝিয়া
ছিল, ঘাটের ব্যাপার স্বামী জানিতে পারিলে লােকপুর-অঞ্চল
প্রলয়ের ঝড়ে প্রকম্পিত হইবে। সে প্রবল-বন্যার বেগ বালির
বাঁধে রুদ্ধ হইবে না। নয়ন মৃত পিতা মাতার কথা, শ্বশুর
শ্বাশুড়ীর কথা তুলিয়া বিষম প্রলয়ের আগুন নিভাইবার
চেষ্টা করিতে লাগিল। নয়ন যতই চেষ্টা করিতে লাগিল,
গােপালের জেদ ততই বাড়িতে লাগিল। গােপাল দৃঢ় কণ্ঠে
কহিল, “তােমার ওসব ফাঁকা মুখের ফাকা কথা আমি শুনব
, কথাটা কি, তােমায় বলতে হবে। ভূকিকম্প সহজে হয়
না ! তােমার চখে জল কখনও সহজে আসে নি।
নয়ন বড় দায়ে ঠেকিল। কথাটা বলিলেও দায়, না বলিলেও
দায়। পাষাণ-প্রতিমার ন্যায় নয়ন স্থির হইয়া ভাবিতে লাগিল,
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

भदो-नको
।
গােপাল উত্তেজিত হইল। নয়নের জন্য কি-নয়নের কাছেও
তাহার জীবনের এমন উত্তেজনা কখনও ঘটে নাই। গােপাল
গম্ভীর গর্জনে আকাশ পাতাল কঁাপাইয়া কহিল, তােমার চখে
জল কে এনেছে, বলতে হবে।
নরন নবনীসম কোমল প্রাণকে দৃঢ় পাষাণে বাঁধিল। সে
দৃঢ় কণ্ঠে কহিল, চোখের জল সহজে আসে না, পরেও
আনে না। বড় কষ্টে আপনার কপালের ফলে চ’খে জল
আসে।
গােপাল কহিল, ‘হঠাৎ আজ কপালে এমন কি ফললাে যে,
তােমার চখে জল এলাে?' স্বামীর মুখ হইতে চক্ষু ফিরাইয়া
অবনত দৃষ্টিতে দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়িয়া নয়ন কহিল, “যতই দিনের
পর দিন যাচ্ছে ততই উষার ভাগ্যের ভাবনা জলন্ত আগুনের মত
আমার প্রাণের মধ্যে দাউ দাউ জ্বলে উঠছে। দৃঢ় দেহ দীর্ঘ
বাহু গােপাল~-লােহার মত কঠোর কঠিন করিয়া মাথা ঘাড়
নাড়িয়া কহিল, “উহু উহু, তা নয়—তা নয়, কথাটা লুকিও না।
আমার কাছে লুকোতে হয় এমন কথা তােমার প্রাণে কিছু নেই
–কিছু থাকতে পারে কি?
নয়ন কহিল, “তােমার কাছে লুকিয়ে যে জীবনে কথা রাখতে
হবে, সে জীবনে তো কোন দরকার দেখি না।
গােপাল, তবে বল কথাটা কি ?
নয়নমণির মুখমণ্ডল জলভরা শ্রাবণের মেঘের মত ভারা-
ক্রান্ত হইল। নয়ন অঞ্চলে চক্ষু মুছিয়া ভগ্ন কণ্ঠে কহিল, “উষা
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

হয়েছে আমার বুকের কাটা। তার জন্যই দশ জনের দশ কথা
শুনতে হচ্ছে।
গােপাল.."হাঁ, সে ত নূতন কথা নয় ; আজ দু’ তিন বছর
থেকে সে কথা শুনছি। আজ নূতন কথা কে কি বল্লে, তাই
বল। লুকিও না।
নয়ন ছােট ছােট হাত দু’পানিতে স্বামীর হাত দুখানি
ধরিল। কাতর কণ্ঠে কহিল, “দেখ, আমার দিব্যি—কথাটা
বলবাে, কিন্তু কোন গােলমাল করবে না তাে? আগে
শােন, আমার মাথার দিব্যি, বল, কোন ঝগড়া-ঝাটি
করবে না?'
গােপালের মুখে হাসি আসিল। গােপাল হাসিমুখে কহিল,
‘তুমি যে কাজ বারণ করবে, জগতে আর কেউ আমায় তা
করাতে পারে?
নয়নের বুকের পাথর নামিল। তাহার অধরপ্রান্তে আবার
সেই চির-সুধাময় মৃদুহাস্যের প্রভা ফুটিল। হাস্যময়ী নয়ন
কহিল, “দেখ, তােমার ভাব দেখে আমার সময়ে সময়ে বড়
গােপাল বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল,‘আমার ভাবে তােমার
ভয় হয়, এমন কোন্ দিন কি ভাব আমার দেখলে।
নয়ন-জীবনে দু' একদিন যেন দেখেছি। যে দিন হরে-
চাষার দুঃখিনী মাকে গায়ের জমিদার সত্যবাবু বিনা অপরাধে
মেরেছিলাে, সে কাদতে কাদতে এসে তােমার পায়ের তলে
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

৬০
नमो-मको
পড়েছিলাে সেই দিন দেখেছিলাম তােমার ভীষণ মূর্তি, আর
একদিন রাধী-ঠাকরুণ মরা-ছেলে কোলে করে কাঁদছিলো,
গায়ের লােক ফেলতে বার হয়নি, সেই দিন দেখেছিলাম তােমার
করাল মূর্তি ! তােমাকে দেখে আমার ভয় হয়েছিল। মনে হয়,
সে মূর্তি দেখে স্বয়ং যমেরও ভয় হয়। তাই সব কথা তােমায়
বলতে সাহস হয় না।
গােপাল সিতে হাসিতে কহিল, “তুমি অনায়াসে বলতে
পার, কোন ভয় নাই। কি কথা হয়েছে ?
নরন কহিল, “উষার কথা তুলে রজনী-ঠাকুরঝি কত কি
বল্পে ?
গােপাল কি বল্লে ?
নয়ন: জাত মারবে, একঘরে করবে, আরও কত
দেখালে ।
গােপাল : তাতে তুমি কি বলে ?
নয়নতার কথায় আমি কি বলব? আমি চোরের মত
চুপে চুপে চলে এলেম। নিজেরা যখন দোষী—তখন পরকে কি
বলব?'
গােপাল সদম্ভে কহিল,
নিজেরা দোষী
কিসে?
নয়ন:: এত বড় মেয়ে ঘরে, হিন্দুর ঘরে সাজে কি
গােপাল সগর্বে কহিল, ও সব সেকেলের ভাব—সেকেলে
কথা ছেড়ে দাও। এখন আর সমাজ থােকা খুকীর বিয়ে দিতে
সােল এজেন্টকমলিনী-সাহিত্য-মন্দির
‘কেন?
?

পল্লী-লক্ষী ভালবাসে না। সেকেলে গৌরী-দান আর আদরের জিনিষ বলে সমাজে চলছে না। নয়ন হাসিয়া কহিল, ‘দেশময় তত বে-সমাজ বনেনি, ঘরে ঘরে কেশব সেন, শিবনাথ শাস্ত্রীও জন্মায়নি। বহু হিঃ বুকে ধরে এখনও হিদুর সমাজ বেঁচে আছে। গােপাল যখন বি-এ পড়া ছাড়িয়া প্রেসিডেন্সি কলেজ হইতে বিদায় গ্রহণ করে, তখন বাংলায় শিক্ষিত যুবকগণের মধ্যে ব্রাহ্ম সমাজের প্রভাব খুব প্রবল হইয়াছিল। ‘বিধবা বিবাহ ‘বালিকা বিবাহ প্রভৃতি প্রশ্ন লইয়া তখন এদেশে শিক্ষিত সমাজে একটা প্রবল আন্দোলনের স্রোত বহিয়াছিল। গােপাল ও বহু সতীর্থের সহিত সেই স্রোতে গা ঢালিয়া দিয়াছিল। গােপাল স্বীয় অৰ্ধাঙ্গিনীকে আপনার মনের মত করিয়া গড়িবার পক্ষে সাময়িক শিক্ষা দীক্ষা দিতে কিছুমাত্র কটি করে নাই। হি দুর মেয়ের স্বাভাবিক সহজাত সংস্কার সহজে ঘুচে না। নয়ন সকল বিষয়ে গােপালের উন্নতিশীল মতের বা প্রকৃতির অনুবর্তন করিতে পারে নাই। বিশেষ বালিকা বিবাহ, বিধবা বিবাহ সম্বন্ধে তাহার প্রাণে আনিক সমুন্নত অভিমতের প্রতি একটা বিকট বিষে বদ্ধমূল গােপাল যখন ‘বিধবা বিবাহের প্রসঙ্গ তুলিয়া তাহার সহিত আলােচনা করিত, তখন নয়নের অত্মত্ম শিহরিরা উঠিত। কথাটা ভাবিতে স্বামীর মৃত্যুর পর আর একটা স্বামী গ্রহণ—স্ত্রীলােকের পক্ষে কি বিকট ব্যাপার- ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা s৫০

পল্লী-লক্ষী
কথাটা ভাবিতেও সতীসাধ্বী আদর্শরূপিণী নয়নের প্রাণ থরথর
কাপিত।
মেয়েকে বয়স্থা করিয়া বিবাহ দেওয়াও নয়নের পক্ষে ভাল
বলিয়া বােধ হয় না। নয়ন কহিল, সে তুমি যাই বল, যাই
কর, উষাকে আর রাখা ভাল দেখায় না। আমি নিজের চখেই
ভাল দেখি না, পরে দেখবে কেন? পরে পাঁচ কথা বলতেই
পারে।
গােপাল কুদ্ধ কণ্ঠে কহিল, বলে আমায় বলবে--আমার
সামনে বলবে। তােমায় বলবে এমন মাথা কার ঘাড়ে?
নয়ন কহিল, “তুমি আমি কি ভিন্ন ? তােমায় কথা বলা আর
আমায় বলা একই।
গােপাল সদর্পে কহিল, 'কি বলব, তােমার কাছে প্রতিজ্ঞায়
বন্ধ হয়েছি, নইলে কেমন মেয়েকেমন হারুরায়ের বােন্ রজনী
আঝ বুঝে নিতুম।
কথা কয়টা কাপিতে কাপিতে কহিয়া গােপাল কাপিতে
কপিতে বেগে চলিয়া গেল। নয়ন জানিত, গােপালের কথা ও
কাজ একই। যখন গােপালের মৃখ হইতে একবার বাহির
হইয়াছে, তখন আর সে কথা নড়িবে না।
সােল এজেন্ট-নি-সাহিত্য-মন্দির

भनौ-मी পঞ্চম পরিচ্ছেদ লােপর কিছুদিন পূর্থে সে অঞ্চলের খুব বড় গণ্ডগ্রাম। ছল। রাস্তা-ঘাট, বাজার-হাটের খুব জাঁকজমক ছিল। বহু জাতীয় বহু লােক বাস করিত। বহু বড় বড় ব্যবসায়ী, বড় বড় মহাজন, বড় বড় চাকুরে, বহু ধান-ভরামরাই, শস্য-বােঝাই গােলা-পালাওয়ালা কৃষক মহাজনগণের কাজ কারবারে লােকপুর বড় সহরের মত সর্বক্ষণ মুখরিত থাকিত। লােকপুরের সে উন্নতির দিন আর নাই, তাহার সৌভাগ্য- সূর্য অস্তমিত ! ভীষণ ম্যালেরিয়ার মড়কে লােকপুর মানুষের পরিবর্তে শিয়াল শকুনির আবাসস্থান হইয়া উঠিয়াছে। অনেক লােক, বহু পরিবার, বাড়ীকে-বাড়ী মায়া পড়িয়াছে। বড় বড় বাড়ী জঙ্গলে ছাইয়া ফেলিয়াছে। যাহাদের অবস্থা কিছু ভাল, তাহারা দেশ ছাড়িয়া কলিকাতায় বা অপর কোন সহরে বাস কৈরিতেছে, কতকগুলি বনিয়াদি বাসিন্দা পৈতৃক-বাস্তু মাতৃভূমির মায়ায় বা ভূমি সম্পত্তির লোভে, অপর কতকগুলি বাজে লােক অক্ষমতা ও অভাবের পীড়নে গ্রাম ছাড়িতে পারে নাই। এই অধিবাসীগণের মধ্যে গােপাল বন্ধু প্রথমােক্ত দলের আর হারু রায় শেষােক্ত দলের লােক। গােপাল বসু পিতা, পিতামহের ভূসম্পত্তির মায়ায় আর হারু রায় অক্ষমতা অভাবের পীড়নে গ্রাম ও বাস্তবাটা ছাড়িয়া যাইতে পারে নাই। লােকপুরে এখন ‘ভাল লােক প্রায় নাই। যে দুই চাৰিজন নির্বাণােম্মুখ দীপশিখার ন্যায় মিট মিট অলিতেছিল, গােপাল ১১৪ নং আহিরীটোলা ফ্রীট, কলিকাতা

৩০
পল্লী-লক্ষী
বসু তাহাদের মধ্যে সর্বপ্রধান। অভাবের তাড়নে তথাকার
অধিকাংশ লােক প্রায় মলমতি—দুষ্টচরিত্র হইয়া দাড়াইয়াছে।
যেমন রূপে তেমনি গুণে-হীনদেহ ক্ষীণপ্রাণ ঐ-ভ্রষ্ট হইয়া,
তাহারা শিয়াল শকুনির মত আপনা আপনি খাওয়াখায়ি,
মারামারি করিয়া ভারাক্রান্ত জীবনকে বিড়ম্বিতকণ্টকিত
করিয়া অতি কষ্টে শুষ্ক শীর্ণ পরমায়ুকে ক্ষয় করে।
মামলা মােকদ্দমা, বিবাদ বিসম্বাদ বা দলাদলির কথা শুনিলেই
তাহাদের অসাড় দেহ, নির্জীব প্রাণ সজীব হইয়া উঠে।
সুবিধামত আত্মীয়ের ঘরে চুরি করা বা চোরের সাহায্য
করা, পুলিশের মামলা সাজানির পােষকতা করা, আদালতে
মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া সেই সকল পতিত পাপমতিগণের জীবনের
নিত্য নৈমিত্যিক কাৰ্য। গাজা, চরস আদি নিকৃষ্ট নেশা সেবন
তাহাদের জীবনের পরম আনন্দ-চরম উদ্দেশ্য। সামান্য কিছু
অর্থ পাইলে তাহারা যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারে। দুই
চারিটা টাকায় বশীভূত হইয়া তাহার হাসিতে হাসিতে সাধু
জাত মারিতে—কুলবতীর কুল কলঙ্কিত করিতে
নিরীহ ব্যক্তির হাতে মাথা কাটিতে কিছুমাত্র কুষ্ঠিত হয় না।
ইহাদের মধ্যে অনেকেই পােষ পালিত কুকুরের মত হারু রায়ের
বাড়ীতে ঘুরিয়া বেড়ায়। রজনীর রূপ যৌবন অর্থ ও ভাবভঙ্গী
তাহার একটা প্রধান কারণ।
ঘাটের মাঝে নয়নবৌকে বিনা কারণে অনেক কথা
শুনাইয়া--পদ্মফুলে বাঘাৎ করিয়া-রজনী বাড়ী আসিয়া, ভাই
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্যমন্দির

হারু রায়ের সহিত পরামর্শ আঁটিতে লাগিল। রজনী, কহিল,
“দাদা, তুমি জনা চাটুয্যকে হাত কর, টাকায় পিছিও না।
টাকা আছে-আমি আছি।
হারু, ভগ্নীর উৎসাহ পাইয়া লােকপুরের বদমায়েশ-দলের
সর্দার জনা চাটুয্যে ও তাহার দলস্থ অপর পাঁচ জনকে হত
করিল। রজনী দুই হাতে টাকা ছড়াইতে লাগিল। গােপাল
বসুর বিরুদ্ধে সত্বর একটা বিষম বৈরীদল ও ভীষণ ষড়যন্ত্র হইল।
গােপাল কলেজ ছাড়িয়া লােকপুরের কয়টি সুশীল তরুণ
বয়স্ক ছাত্রকে লইয়া আপনার বৈঠকখানায় একটি পাঠাগার
প্রতিষ্ঠা করিয়াছিল । গােপালের চরিত্রগুণে সহৃদয় ছাত্রগণ
তাহাকে যেমন হৃদয় ভারয়া ভক্তি করিত, তেমনি প্রাণ দিয়া
ভালবাসিত। তাহারা গােলাপের জন্য দুপুর রাত্রে জলে ডুবিতে
পিছাইত না। ছাত্রগণের মধ্যে পিতৃহীন ছেলে বিজন
অনেক সময় গােপালের বাড়ীতে থাকিত। গ্রাম সম্পর্কে
গােপাল তাহার খুড়া। তাই উষা, বিজনকে দাদা বলিয়া ডাকিত।
বিজন, উষাকে ছােট বােনের মত স্নেহ করিত। এই পবিত্র
স্নেহ মমতাকে বিকট সাজে সাজাইয়া ‘হারুর দল’ লােকপুরে
একটা ভীষণ আন্দোলনের আগুণ জালাইয়া তুলিল। ঘাটে
পথে নানাস্থানে নানাজনে নানা ভাবে গােপালের ঘরের কুৎসা
কলঙ্কের কথা বাহির করিতে লাগিল। তাহার ফলে নয়নের
ও ঊষার ঘর হইতে বাহির হওয়া বিষম দায় হইয়া ইঠিল।
উষার মুখে বড় একটা কথা কেহ কথন শুনিতে পায় না।
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

গােপাল সময়ে সময়ে হাসিয়া উবাকে ‘দেবকন্যা বলিয়া ডাকে। দেবক নরলােকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে না বলিয়া, গােপাল সময়ে সময়ে কন্যা উষার সহিত ব্যঙ্গালাপ করিয়া থাকে। একেই উষার মুখে সাত-চড়ে কথা নাই, তদুপরি বিজন সম্বন্ধে তাহার প্রাণঘাতী কথার রটনা হওয়ায়, উষা মরমে মরিয়া একেবারে নাটতে মিশিয়া গেল। গােপালের সুন্দর সুপ্রশস্ত মুখের হাসি, উজ্জল চক্ষের প্রতিভা লুকাইল- --তাহার শরীর শুষ্ক, শীর্ণ হইল। যে নয়নকে সম্মুখে দেখিলে, গােপাল হাসিমুখে স্বৰ্গ-সুখকে পায়ে ঠেলিতে পারিত, সেই নয়ন আজ তাহারশূন্য দৃষ্টিতে মহাশূন্যে ভাসিয়া গেল। কয়দিন পরে গ্রীষ্মের ছুটিতে স্কুল কলেজ সব বন্ধ হইল। গােপালের প্রাণের বন্ধু প্রবােধ সেই ছুটি উপলক্ষে বাড়ী আসিল। প্রবােধ গােপালের বাল্য-সহচর, সমপাঠী, এক গ্রামবাসী। গােপাল পাড় ছাড়িয়া নয়নকে হৃদয়ে ধরিয়া অভাবের সংসারে দুঃখের ভাত পরম সুখে খাইতেছিল। প্রবােধও পড়া ছাড়িয়া কলিকাতায় স্কুল-মাষ্টারী করিতেছিল। প্রবােধ বাড়ী আসিয়া, পত্নীর মুখে গােপালের পারিবারিক ব্যাপার শুনিল। গােপালের সহিত তাহার বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল। সে গােপালকে ও তার স্ত্রী কন্যাকে ভালরূপেই জানিত। গ্রামের দুরাচারগণের ব্যবহারে প্রবােধ প্রাণে বড় ব্যথা পাইল। প্রবােধ নিদাঘের মেঘের মত মূখখানা বিষন ও ভারাক্রান্ত সােল এজেন্ট-কমলিনীসাহিত্য-মন্দির

করিয়া গােপালের কাছে আসিল। গভীর কণ্ঠে কহিল,
‘কি ঠিক কল্লে? আমি তাে বলেছিলেম, গায়ে
থেকো না।'
গোপাল মৃত-চক্ষে প্রবােধের
রহিল-তাহার মুখ হইতে কোন কথা
গােপালের অসাড় গায়ে ধাক্কা দিয়া করি
মন খারাপ করাে না। ওরা তাে কতৃক
কথা কে ধরে?'
এতক্ষণে গােপালের অসাড় চেত
উত্তেজিত কণ্ঠে কহিল, “এখন কি আর
তাে এখন শিয়াল কুকুরে ভরে গেছে। ওদের কথাই এখন
কথা, ওদের কাজই কাজ। এবােধ কহিল, “তা হলে বল,
লােকপুর মরে গেছে। এমন মরা-গায়ে থাকতে নাই। গােপাল
কহিল, “কতগুলাে শিয়াল কুকুরের ভয়ে গা ছেড়ে চলে যাওক্সাও
তাে বড় লজ্জার কথা।
প্রবােধ সদর্পে কহিল, “যদি শিয়াল কুকুর বলে তাদের বুঝে
থাক, অত ভয় সঙ্কোচ কিসের?
গােপাল...মিথ্যা ভয়, মিথ্যা সঙ্কোচ তাও জানি, তাও বুঝি।
সমাজের কুসংস্কার কুপ্রথা দূর করতে অনেক সহগুণ চাই তাও
মানি। হিন্দুর প্রাণে কি যে জাতীয় দুর্বলতা-সে অনায়াসে
সব সইতে পারে, পারিবারিক গানি কুৎসা সে কিছুতেই সইতে
পারে না।
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা

A + + + + +
প্রবােধ কহিল, 'তা না পারবে তাে আগে সতর্ক হলে না
মন উচ্ছন্ন গেছে তা আগে বুঝতে
এখন কর্তব্য কি ঠিক
মীর কহিতে লাগিল, আমি
এখন এ গ্রাম ত্যাগ করাই
গায়ের কোলে পালিত হয়ে এত বড়
হলেম, যে মায়ের মত বুকের দুধ খাইয়ে মানুষ করলে তাকে
মরণের দশায় ফেলে আপনার সুখ সাচ্ছন্দ খুঁজতে যাওয়া
কি মানুষের কাজ? তা নয়, কাজটা খুবই মন্দ। মানুষের দেহ ধরে
মানুষের জীবন পেয়ে যে দেশের জন্ম-জন্মভূমির জন্য কিছু না
ক'রে কেবল আপনার ভােগ আপনার ঐশ্বৰ্য্য নিয়েই চিরজীবন
ব্যস্ত থাকে, সে কখনই মানুষ-নামের যােগ্য নয়। মৌমাছি পিপড়ে
পৰ্যন্ত দশটায় মিলে আপন আপন জায়গার জন্য খাটে, মানুষ
হয়ে যে তা বােঝে না, মানে না, সে যে মানুষের আকারে ইতর
জানােয়ার—এ কথা খুবই মানি—কিন্তু ভাই, দেশ তাে আর
নেই, দেশ মরে গেছে-কঙ্কাল হয়েছে। সেই কঙ্কাল নিয়ে
কতকগুলাে ভূত পেত্নী হেঁড়াছিড়ি করছে।
গােপাল কহিল, “কথাটা আমি কোনকালেই মানতে
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী
রাজী নই। এখনও আমাদের পাড়াগাঁয়ে দু'একটা ভাল
প্রাণ আছে-তারাই দেশের শক্তি। তাদের নিয়ে গায়ের জন্য
খাটতে পাল্লে এখনও মরা দেশকে বাঁচানাে যায়। আমিও তাই
মনে করেছিলাম আর তাই মনে করেই এত স’য়েও গাঁয়ের
কোলেই মাথা দিয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, প্রাণ দিয়ে
গাকে জাগাবাে। গা-গুলাে জাগলে, দেশ জাগবে। বাস্তবিক
কথাটা খুবই সত্য যে, যে গা সেই দেশ। গাঁ-গুলােকে না
জাগালে কখনই দেশ জাগবে না। জাতটা সহরে বাস করে
—জাতটা দেশে গায়ে-ই থাকে।
প্রবােধ, গােপাল দুই জনেরই দেহে এখনও যৌবনের খুব
গরম রক্ত বহিতেছে। এখনও কলেজের গন্ধ তাহাদের ধমনী
বহিয়া ছুটিতেছে। সংসারের স্বার্থপরতা বা দেশের আবহাওয়ার
জড়তা এখনও তাহাদিগকে সম্পূর্ণরূপে বাংলার মৃত মাটিতে
মিশাইতে পারে নাই। দেশের জন্য, জাতিটাকে জাগাইবার
জন্য প্রত্যেক শিক্ষিত ব্যক্তির জীবনে যে একটি বিশেষ দায়ীত্ব
আছে—এ কথাটা তাহাদের প্রাণের প্রত্যেক পরমাণুতে অনু
প্রাণিত রহিয়াছে। লােকপুর গ্রামে এখনও পর্যন্ত আরও
কয়জন শিক্ষিত যুবক আছে। তাহাদের মধ্যে কেহ মুনসেফ হইয়া
কথন শলদীপে কখন বারিপুরে ঘুরিতেছে, আর বদলি হইবার
সময় প্রত্যেকবার হাইকোর্টের সপ্তম পুরুষ অভিশপ্ত করিতেছে।
কেহ ওকালতি আরম্ভ করিয়া আদালতের বৃক্ষতলে ঘুরিতেছে
আর শূন্য চক্ষে, হতাশ প্রাণে, মান মুখে উনিভারসিটীকে নরক
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা

০
।
পল্লী-লক্ষী
করিতেছে। দেশের কথা ভাবিবার বা বুঝিবার জন্য তাহাদের
সময়ও নাই প্রয়ােজনও নাই। অবশিষ্ট যে দুই একজন, প্রবােধ
ঘােষের মত স্কুলমাষ্টারী বা অন্য কোন কাজ করে, তাহারা
ছুটি উপলক্ষে গ্রামে কখন আসিয়া সখের সভা সমিতি করে ও
বক্তৃতার গলাবাজীতে ও স্বদেশীসঙ্গীতে দেশ উদ্ধারের সংসারী
প্রহসন অভিনয় করিয়া থাকে--গােপাল ও প্রবােধ তখন
তাহাদের মাথা হইয়া দেশের জন্য কিছু করাইয়া লইবার
চেষ্টা করে।
গােপাল ও বােধ মনের আবেগে আপনাদের দেশ গ্রাম
সম্বন্ধে কিছুকাল কথাবার্তা-আন্দোলন আলােচনা চালাইল।
অবশেষে উঠিবার সময় অবােধ উৎসাহভরে কহিল, “কিছু
ভেবাে না, কিছু মনে করাে না। শীগগির এ ঝড়াে-মেঘ উড়ে
যাবে ও আবার ফরসা হবে।
গােপাল ঈষৎ হাসিয়া কহিল, “আমায় যে একঘরে
করতে চায়।
‘একঘরে না হয় দু'ঘরে হয়ে থাকবে' বলিয়া প্রবােধ হাসি
মুখে প্রস্থান করিল।
সােল এজেন্ট-কমলিনীসাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী যষ্ঠ পরিচ্ছেদ হারু রায়ের ঘরে একটা খুব জাকজমকের মজলিস জমিয়াছে। জনা চাটুয্যে, হরি রায়, মতি বােস প্রভৃতি দলবল লইয়া গােপালের গৃহ-পরিবার সম্বন্ধে একটা তুমুল আন্দোলন আরম্ভ করিয়াছে! মতি বসু, গােপালের জ্ঞাতি-শত্রু। গােপালের বাস্তুভিটার সহিত গােপালের বাস্তু সংলগ্ন। গােপাল, বিষয় সম্পত্তি টাকা কড়ি সম্বন্ধে চিরদিনই উদাসীন, আবার এক আঙ্গুল জমি, মতি বসুর পাঁজরার হাড়। একটা ভোণ্ডার বেড়া, মতিও গােপালের বাড়ীর বাগান দুইটাকে দুই ভাগ করিয়া রাখিয়াছে। সেই বেড়ার গােড়ার সীমানা লইয়া, কখন আগার সীমানা লইয়া মতি প্রায়ই গােপালের সহিত গােলযােগ বাধাইয়া থাকে। দিন মতি দুই চারিটা ভেরেণ্ডার গােড়া গােপালের জমির দিকে এক বা আধ-আঙ্গুল আগাইয়া দেয়, সেই দিনই তাহার সীমানার বিবাদ খুব সজোরে জাগিয়া উঠে; সেই দিন সে লক্ষে ঝক্ষে ভুমিকম্প করিয়া, চীৎকারে গগন ফাটাইয়া গাঁয়ের পাঁচজন জড় করে। গােপাল যেমন বিষয় বিরাগী তেমনি বিবাদের বিষয় বৈরী। বিবাদ বাধিবার উপক্রম হইলে পাছে মতি স্ত্রী কন্যা সহ সংগ্রাম-ক্ষেত্রে উপস্থিত হয়, পাছে কাৰ্য-গতিকে কোন প্রকারে কূল-ললনার কিঞ্চিতন্মাত্র গ্লানি বা মান সন্ত্ৰমের হানি ঘটে, এই আশঙ্কায় জড়সড় হইয়া গােপাল এক পাশে নীরবে দাড়াইয়া ১১৪ নং আহিরীটোলা ট, কলিকাতা ;

২ পল্লী-লী থাকে। মতির কথা নিতান্ত অসহ বােধ হইলে, গােপাল ক্ষণিক উত্তেজনার বশে প্রতিবাদ করিতে উদ্যত হয়, নয়ন দ্রুতপদে আসিয়া তখন গােপালের হাত ধরিয়া টানিয়া গৃহে লইয়া যায়। গায়ের যে পাঁচজন দেখিতে শুনিতে আসে, তাহারা মতির দাপে ভীত হইয়া ‘গােপালের সবই অন্যায় অত্যাচার’ বলিয়া মতির . স্বপক্ষে রায় প্রকাশ করিয়া প্রস্থান করে। তি-সম্পর্কে গােপাল মতিকে দাদা বলিয়া ডাকে। ভূমি সম্পত্তি লইয়া এইরূপ বিরােধ হিসাবে ও স্বাভাবিক জ্ঞাতি শত্রুতার হিসাবে মতি বহু- কাল হইতে গােপালের বদ্ধ-বৈী হইয়া দাঁড়াইয়াছিল, সে যে কিরূপে গােপালের বিষম অনিষ্ট সাধন করিয়া সেই শত্রুতার শােধ লইবে, তাহাই দিবানিশি চিন্তা করিতেছিল, সেই চিন্তায় সে উন্মত্তের ন্যায় হইয়া উঠিয়াছিল। এমন সময়ে সুবর্ণ সুযােগ সমুপস্থিত। মতি আকাশের চাঁদ হাতে পাইয়া আনন্দে নাচিতে লাগিল। জনা চাটুয্যেকে কহিল, “হরি ঘােষের মায়ের শ্রাদ্ধ খুব জাঁকিয়ে হবে। সমাজ নিমন্ত্রণ করবে, পাঁচগাঁয়ের লােক জড় হবে—সেই ভােজে পাত পাড়বার সময় হাটে হাঁড়ি ভাঙবাে। ওর ঘরের কথা বার করে হাত ধরে পাতা থেকে উঠিয়ে দেবব।••আমায় বলে বায়েস লােক। মতি কহিল, “তাতে ও জব্দ হবে না, কলকাতায় চলে যাবে। ওকে কাণা করে ঘরে পুরে রাখতে হবে—ওর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিয়ে জ্বালাতে হবে—তবে মনের রাগ মিটবে। সােল এজেন্টকমলিনী-সাহিত্য-মন্দির निको ৩ করে। হা রায় কহিল, “সে কি পেরে উঠবে? দেশের সর ছােট লােক ওর হাতে। আবার মহকুমার মেজেষ্টর মফস্বলে এলে আগে ওর খোঁজ করে, ব্যাটার সঙ্গে দেখা করে সব পরামর্শ ওকে মারা-ধরা বড় কঠিন কাজ। ই করতে হাজার লােক ওর পিছু হাজির হয়। দলের মধ্যে হরি রায় কিছু ভীরু। সে ভীত কণ্ঠে কহিল, ‘ও সব ফোজদারী হাঙ্গামায় দরকার নেই। তার ওপর ওকে পারবে না। খয়রাতি চিকিৎসের জোরে দেশের সব হােট- লােক ওর হাতে। হারু কহিল, “শুধু চিকিচ্ছে নয়, ওসুদ, পথ্য সব খয়রাতি তারপর আপদ বিপদে দেশশুদ্ধ সব লোকের ঘরে সে দাখিল হরি••এধারে দিলটা ভাল, দান ধ্যানও আছে। বরাত গুণে বোটা আর মেয়েটাও তেমনি হয়েছে। হরির কথায় মতি বােস তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া উঠিল। গােপালের সুখ্যাতির কথা তাহার প্রাণে বিষের কাটার মত বিদ্ধ মতি হরি রায়ের পানে তীব্র কটাক্ষে চাহিয়া উগ্রকণ্ঠে কহিল, “তাবা তুলসী হাতে করে যখন এর পক্ষে সাক্ষী দেবে, তখন ও সব কথা বলে। ক’ টাকা ঘুষ খাইয়েছে বল তাে? হরি ভীতভাবে সঙ্কুচিত কণ্ঠে কহিল, 'না না ভায়া, আমার তামাসার কথাটা বুঝতে পাল্লে না, আমি হতভাগার বুজরুকির কথাটা বলছি। কত রকম ভঙ্গি যে জানে আর কতভাবই করে, ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

পল্লী-লী
ধরে সাধ্য কার। আমি বল্লেম এক ভাবে, তুমি কথাটা নিলে
আর একভাবে।
হরি রায়কে দলের সকলে চিনিত। সে অতি ভীরু---
অবস্থা অনুসারে ভাব অনায়াসে বদলাইতে পারে বুঝিয়া সকলে
মনে মনে হাসিল। জনা চাটুয্যে কহিল, “তােমার মত লােকের
কোন ভাল কাজে থাকতে নেই,ঘরে ঘােমটা দিয়ে ঘুমােত হয়।
হরি রায় নীরবে ভীত-চক্ষে ইহার উহার মুখের পানে
চাহিতে লাগিল। তখন জনা চাটুষ্যে স্পষ্টই কহিল, “হরি তুমি
ঘরের ছেলে ঘরে যাও-কোন কথায় থেকো না।' হরিকে
ইতস্ততঃ করিতে দেখিয়া, জনার্দন কঠোর কণ্ঠে তাড়না করিয়া
কহিল, “যাও যাও, উঠে যাও।
জনা চাটুয্যের গঞ্জিকা-রক্ত চক্ষু ও কঠোর গর্জনে ভীত
হইয়া হরি রায় উঠিয়া ধীরে ধীরে প্রস্থান করিল। বেশী দূর সে
যাইতে পারিল না, একটু আড়ালে আসিয়া দাড়াইল-যাহা
শুনিল, তাহাতে সে স্তম্ভিত হইল।
জনা কহিল, গােপালকে একেবারে শেষ করে দেওয়া
যা! কথায় বলে, রােগের শেষ আর শক্রর শেষ রাখতে নেই।
জনার প্রস্তাবে হারু রায়, মতি বসু একটু স্তম্ভিত হইয়া
ভাবিতে লাগিল। হারু কুঞ্চিত কণ্ঠে কহিল, “কথায় বলে,
ঢাক বাতাসে বাজে। যদি একটু সুতাের আগায় বেরিয়ে পড়ে,
তবেই সর্বনাশ! হয় ফাসি নয় দীপান্তর!
জনা সদর্পে কহিল, ‘শান্ত্রেই বলে, কাপুরুষের বিড়ম্বনা পায়-
সােল এজেন্ট কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

जमी-मको
পায়। ভীরু দুর্বল লােক ঘরের কোণে বসে বসে পরের পয়জার
হজম করে-হাজার ঝাটা-লাথী মারলেও তাদের লজ্জা হয় না।
জনার কথায় হারু উত্তেজিত হইয়া কহিল, “তা বটে। জন্ধু-
ভায়া ঠিক কথাই বলেছ। চোখ বুজে আর গর্তে পড়ে ঘুমােল
চলছে না। গােপাল বােসের ভারি বাড়ানি হয়েছে; বাড়ানিটা
ভাঙলে আর চলছে না। কথায় বলে, “যাক প্রাণ থাক
মান। যায় প্রাণ যাবে—একে ঠিক করা চাই-ই।
মতি কহিল, “ওকে ধনে-প্রাণে মারতে হবে, তার উপায়
কি তাই ভেবে ঠিক কর।
জনা চাটুয্যে তীব্র হাসি হাসিয়া প্রকাও লম্বা গোপ জোড়াটায়
তা’ দিতে দিতে কহিল ; ‘শমার মুখ দিয়ে বাজে কথা কোন কালে
বের হয়নি। কাজের জোগাড় না করে আমি মুখের কথা বের
করি না। বাঁশবেড়ের রেসসা-বাগীকে না জানে কে? সে
অঞ্চলে সে ডাকাতের সর্দার—গুণ্ডার দলপতি। রেসে আমার
মুঠোর মধ্যে। সেদিনে শুনেই সে বলে, “দা-ঠাকুর, তােমার
জন্যে হাসতে হাসতে মাথা দেব, কথা রইলাে।
মতি কহিল, “শুনলেম, তুমিও সেদিন তাকে খুব বাঁচিয়ে-
রেসসা রায়গার রায়দের বাড়ী ডাকাতি করে ফিরবার
সময় প্রায় ধরা পড়েছিলাে—তাকে পিছু পিছু অনেক দূর তাড়িয়ে
এনেছিলাে। ধরে ধরে—এমন সময় বনের পথ থেকে বেরিয়ে
পড়ে তুমি লােকটাকে ক’ কোপে শেষ করলে, তাই রসাে
বেচে গেল।”
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা
ছিলে।

৬
জনা সগর্বে কহিল, ‘ক’ কোপ কি? মানুষের মাথায় কি
আর এক কোপের বেশী লাগে, যদি অন্ত্রনা একটু ধারাল হয়?
মতি কহিল, ‘রেসােকে নিয়ে কি করবে?
জনা কহিল, ‘গােপালের বাড়ী ডাকাতি করাবে—তাকে
ধনে প্রাণে মারব। ওই শালাই হচ্ছে গাঁয়ের শর—দেশের
রজনী একটু আড়ালে দাড়াইয়া সমন্ত শুনিতেছিল। সে দ্রুত
পদে আসিয়া কহিল, 'না না, অতটা নয়। প্রাণে মারতে হবে না।
বেশী বাড়াবাড়ী করে শেষটা নিজেদের বিপদ টেনে আনবে।
ওর বাড়ী ডাকাতি করে কোন ফল ফলবে না, ওর ধরে কিছু
নেই। মিছে কেবল বিপদ ডেকে আনবে।
জনা চাটুষ্যে সদর্পে কহিল, “যা কিছু ওর ঘরে আছে সব
লুটে আন্ধ। অবশেষে আগু-বাচ্ছা সব এক-গড় ক'রে কেটে
রেখে আসব।'
জনার ভাবে, কথায় ও কণ্ঠস্বরে রজনীর রমণী-প্রাণ থর থর
কাপিয়া উঠিল। রজনী ভীত কাতর স্বরে কহিল, “জনা
দাদা, অমন কথাটা আর মনেও ভেবাে না--মুখেও এনাে না।
অন্য রকমে সমাজে একঘরে করে—কুৎসা বদনাম করে
গােপালকে যাতে জব্দ করতে পার তার চেষ্টা কর—তাতে যত
টাকা লাগে, আমি আছি। নইলে, ওসব কুপরামর্শে কুচক্রে
আমি নেই।
জনা একটু মুচকি হাসিয়া, রজনীর পানে একটু আড়নয়নে
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

চাহিয়া কহিল, ‘গােপাল শালা যে কি গুণ জানে—চোখে
দেখলেই মেয়েমানুষ ভুলে যায়।
রজনীও তেমনি হান্তে তেমনি ভঙ্গীতে জনার প্রতি চাহিয়া
একটু চুপে চুপে কি কহিল—অপরে তাহা শুনিতে পাইল না।
হারু, ভগ্নীর রসভাষে সুবিধা সুযােগ প্রদানের জন্য বাহিরের
দিকে চলিয়া গেল। জনার্দন ও রজনীর ভাবভঙ্গী দেখিয়া মতি
কহিল, “আমি একটু আসি দাদা। জনার্দন সদর্পে কহিল,
‘ভাল খাবার সময় সব-শালা, আর মাথা দেবার সময় জনা
চাটুয্যে, কেমন?
মতি কুণ্ঠিত কণ্ঠে কহিল, “না দাদা ; ধর্ম সাক্ষী করে
বলছি—মাথার উপর চলেদার সূয্যি—তুমি যা বলবে-প্রাণ পণ
করে বলছি, তা করতে এক পা পিছােব না।
জনার্দন কহিল, হাঁ, খালি ফাকা মুখের কথায় কাজ
মিটবে না। আজ রাত-দুপুরে মা শবাসনার মন্দিরে ধর্মঘট
করে সব প্রতিঙ্কে করতে হবে।
মতি অত্যন্ত আনন্দভরে কহিল, ‘বেশ কথা-শ
নিপাত ধৰ্ম্মেরই কথা। ধর্মেরই কথায়—ধর্মঘটই শাস্তোর
বাকি। বলিয়া মতি প্রস্থান করিল। জনার্দন গােপালের
কথা তুলিয়া রজনীকে ভৎসনা করিতে লাগিল।
১১৪ নং আহিরীটোলা এট, কলিকাতা

সপ্তম পরিচ্ছেদ
লােকপুরে কলেরা আরম্ভ হইল। গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে
বাগীপাড়া। লােকপুরের বান্দীপাড়ায় আর হাড়িপাড়ায়
এখনও বহু লােকের বাস। নিষ্ঠুর নির্মম সর্বগ্রাসী ম্যালেরিয়া
আজিও এই দুইটা পাড়া কিছুমাত্রও খালি করিতে পারে নাই।
এখনও ঐ দুইটা পাড়া লােকজনে মুখরিত। হাজার হাজার
হাড়ি বাদী এই দুইটা পাড়ায় জীবিত থাকিয়া লােকপুরকে
সজীব করিয়া রাখিয়াছে। গােপাল এই দুই পাড়ার আবাল
বৃদ্ধ বণিতার প্রাণ-স্বরূপ। গােপালের পায়ে একটি কাটা ফুটিলে,
তাহাদের প্রাণ কাঁদিয়া উঠে।
সর্বপ্রকার মহামারী দেশের ইতর-পল্লীতেই মূল শিকড় গাড়ে ;
কলেরা সর্বাগ্রে বাঙ্গীপাড়া আক্রমণ করিল। ভোলা বান্দী,
বাগী-পাড়ার মাথা। পাড়ার মধ্যে তাহার অবস্থা সকলের অপেক্ষা
এখন বাগীদের সকলেরই অবস্থা বেশ স্বচ্ছল।
পূর্বের সে দুর্দশা এখন আর তাদের নাই। সে ছেড়া ময়লা
কাপড়, কাঁথা আর অনাহারে শীর্ণ শুষ্ক মুখ আর তাহদের মধ্যে
বড় একটা দেখতে পাওয়া যায় না। কারণ, তাহারা এখন
কাজের লােক হইয়া দাড়াইয়াছে। এখন আর তেমন জন
মজুরি খাটিয়া আট আনা আনিয়া আগেই ছয় আনার
তাড়ি খায় না, অথবা একদিন খাটিয়া পাঁচদিন বসিয়া খরশান
সােল এজেন্ট—কমলিনী-সাহিত্য মন্দির

नौ-लकको টানিতে টানিতে মিছা গাল-গল্পে কাল কাটায় না। এখন তাহারা দিন-তাের পরিশ্রম করে। পরের ঘরে মজুরি করে, আপন ঘরে চা-বাস তরকারি-পাতি করে। উৎপন্ন ফসল নিজের সুখে ভােগ করে—অবশিষ্ট অংশ গ্রামের হাটে-বাজারে বিক্রয় করে। তাহাদের খাওয়া পরা চালচলন আর সাবেক রকম ময়লা অপরিষ্কার নাই। বিশেষতঃ রাতে তাঁত চরকা চালাইয়া তাহারা খদ্দরের কাপড়, চাদর, জামা, বিছানা পৰ্যন্ত পর্যাপ্ত ও উন্নত করিয়া তুলিয়াছে। শারীরিক খাটুনি খাটিয়া যে সময় টুকু বাঁচাইতে পারে, সেটুকু লেখা পড়ার চর্চায় আনন্দে কাটাইয়া দেয়। যখন কাশীদাসী মহাভারত ও কীৰ্ত্তিবাসী রামায়ণ সুর করিয়া পাঠ করিতে করিতে তাহারা রাম যুধিষ্ঠিরের নীতি ধর্ম, লক্ষ্মণ ও ভীমার্জুনের ধৈৰ্য্য বীৰ্য পরস্পরকে বুঝাইয়া দেয় ও আললাচনা করে, তখন ইহসংসারেই তাহারা স্বর্গসুখ উপভোেগ করে। শতমুখে গাঁজা-তাড়ি ও মদের নেশায় নির্বিবাদে হৃদয়ের অনুতাপ উদগীরণ করিতে থাকে। এক কথায় পূর্বে তাহারা মানবদেহ, মানবজীনকে যেমন অতি অসার তুচ্ছ সামগ্রী বােধে অনায়াসে মরণকে বরণ করিতে পারিত, এখন আর তাহা পারে না। এখন হাসিমাখা-স্ত্রী-পুত্রের মুখগুলা লইয়া সুখের সংসারকে খুব দামী বলিয়া অনুভব করিতে শিখিয়াছে। তাহাদের এই অভাবনীয় পরিবর্তন ও শিক্ষা দীক্ষার মূলীভূত কারণ, গােপালের অদম্য উদ্যম ও সহানুভূতি। গােপালের উদ্যোগ যত্ন ও চেষ্টায় লােকপুরের হাড়ি-পাড়াও এখন ভদ্র-পল্লীতে পরিণত ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

भदौ-नको
হইয়াছে। এখন তাহাদের মধ্যে অনেকে খবরের কাগ পড়ে,
দেশের • কথা সমাজের কথা আলােচনা করে এমন কি
বাংলার বাবুদের মত কংগ্রেসের আন্দোলন লইয়া আপনাদের
মধ্যে তর্ক বিতর্ক করিতে ‘ছােট মুখে বড় কথা বলিতে আর
এখন আর লজ্জা বা কুণ্ঠা বােধ করে না। তাহাদের দেখাদেখি
পার্শ্ববর্তী অন্যান্য গ্রামের ইতর লােকেরাও অনুকরণ করিয়া ‘ভদ্র’
হইয়া উঠিল দেখিয়া দেশের ব্রাহ্মণ কায়স্থ ও ব্যবসায়ী—তিলি
তাম্বুলি ইত্যাদি ধনী সম্প্রদায় অত্যন্ত কুপিত ও ইর্ষান্বিত হইয়া
গােপাল ও তাহার দলবলকে অভিশপ্ত করিতে আরম্ভ করিল।
দেশ ব্যাপিয়া কথা উঠিল, কাশী বােসর ছেলে গােপাল বােস
দেশটার মাথা খেলে। কুলি-মজুর মিলবে না, আপনাদের
মাথায় মােট বইতে হবে। হাতে লাঙ্গলের মুট ধরে চাষবাস
করতে হবে। আরও জাত্যাভিমানী সম্প্রদায় এইরূপ নানা
ভাবের নানাকথা বলিয়া-তদুপরি নানাপ্রকার ভয় প্রদর্শন
করিয়া ইতর শ্রেণীর লােকদিগকে এবং গােপাল, প্ৰবােধ প্রভৃতির
দলকে দমন করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাহারা যখন খুব
বেশী রকম পীড়াপীড়ি করিতে আরম্ভ করিলেন, তখন
দুই একজন ছাড়া, প্রবােধ প্রভৃতি যুবকদল দেশ ছাড়িয়া
কলিকাতায় পলায়ন করিল। গােপাল অটল অচলভাবে
সমান উদ্যমে কাজ চালাইতে লাগিল। তাহার ‘নাইট-স্কুল’
আরও অধিক রাত্রি পর্যন্ত চলিতে আরম্ভ করিল। তাহার
ফলে এই গড়াইল-গােপাল বস্তু যতই দেশের ভদ্র
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্যমন্দির

লােকদিগের বৈরী ও অপ্রিয় হইতে লাগিল, ততই সে হােট
লােকদিগের প্রাণের দেবতা হইয়া উঠিল। তাহারা সত্যই স্বর্গের
দেবতা জ্ঞানে
গােপালকে প্রাণের পূজা প্রদান করিতে
লাগিল। গােপাল যেন তাহাদিগের জন্মদাতা পালন কর্তা পিতা
ও গােপালের পত্নী নয়নমণি তাহাদের গর্ভধারিণী জননী হইয়া
গড়াইল। হাড়ি-বাঙ্গী-পাড়ায় কাহারও ক্ষেতে একটি নৃতন
বেগুন বা কাহারও কলাগাছে কলা ফলিলে, দেবতা ব্রাহ্মণকে না
দিয়া তাহারা নূতন ফলটি লইয়া মহা আনন্দভরে ছুটিয়া সর্বাগ্রে
গােপালের ঘরে দিতে আইসে। নয়ন লইতে অনিচ্ছা বা কুণ্ঠা
বােধ করিলে তাহারা প্রাণের মধ্যে দারুণ আঘাতের বেদনা
অনুভব করে। অগত্যা গােপাল, তাহাদের হৃদয়ের ভক্তি অর্থ
দুই হাতে গ্রহণ করিয়া তাহাদের বুকভরা ভালবাসার
প্রতিদান—আশীর্বাদে পরিতৃপ্ত করিত।
ভােলার বাড়ীতে এক ছেলে। ভােলা কয়দিন পূর্বে খুব জাক
জমকে ছেলের বিবাহ দিয়া মৃতন বৌ ঘরে আনিয়া সংসার সার্থক
ও জীবন ধন্য করিয়াছে। ভােলার একমাত্র ছেলেকে রাত্রি
দুই প্রহরের সময় কলেরা আক্রমণ করিল। ভােলা ছুটিয়া
গােপালেব বাড়ী আসিল, পাগলের মত বকিয়া, গোল
করিয়া গােপালকে ডাকিল। ভােলার গােলে গােপালের
ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। গােপাল তাড়াতাড়ি উঠিয়া বাহিরে আসিয়া
ভােলার মুখে সংবাদ শুনিয়া কহিল, ‘ভােলা-দা, তুমি পরে
যাও, আমি ডাক্তার নিয়ে এখনই যাব।
১১৪ ন আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

গােপাল গ্রামের ডাক্তারকে লইয়া অতি সত্বর ভােলার
বাড়ী আসিল। সমস্ত রাত্রি জাগিয়া গােপাল ভােলার
ছেলেকে হােমিওপ্যাথিক ঔষধ খাওয়াইতে লাগিল। একটু
বেলা হইলে বিজন প্রভৃতি কয়টি ছাত্র আসিয়া গােপালকে
ছাড়িয়া দিল ! তাহারা ভােলা ছেলের চিকিৎসা সুবা
চালাইতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে বাগী-পাড়ায় আরও
কয় ধরে কলেরা দেখা দিল। গােপাল ডাক্তার লইয়া
ছুটাছুটি করিতে লাগিল।
কলেরার আবির্ভাবে বাগী-পাড়ার মেয়ে পুরুষ সকলের মুখ
শুকাইয়া গেল।
গােপালকে দেখিয়া তাহারা মৃত দেহে জীবন
লাভ করিল। তাহাদের মনে হইল, যেন কোন স্বর্গের দেবতা
তাহাদের বিপদরাশি দুই হাতে তাড়াইবার জন্য নীচে নামিয়া
আসিয়াছেন। গােপাল বহু চেষ্টা করিয়াও সকলকে বাঁচাইতে
পারিল না। প্রায় পঁচিশটা রােগীর মধ্যে পাঁচটি মারা পড়িল ।
অবশিষ্টগুলি যে বাঁচিয়া উঠিল সে কেবল গােপালের যত্ন ও
৩ষার ফলে। ভােলার বড় সাধের একমাত্র ছেলেটি মারা
পড়িল।
ভােলার স্ত্রী ঘন ঘন মূচ্ছিতা হইতে লাগিল,
ভােলা পাগলের ন্যায় অধীর হইয়া মাটীতে মাথা খুড়িতে
লাগিল। বাগী ও হাড়ীপাড়ার উন্নতিকল্পে ভােলা গােপালের
দক্ষিণ হস্ত।
সেজন্য গােপাল দুপর রাত্রে জলে ডুবিতে বলিলে
ভােলা সেই মুহূর্তেই ডুবিয়াছে। গােপাল ভােলার প্রাণের
দেবতা। গােপাল ভােলাকে সবলে কোলের মধ্যে ধারণ
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পীগৰী
করিয়া প্রবােধ বাক্যে বুঝাইতে লাগিল। গােপাল কহিল,
ভােলা-দা, জানই তাে, জন্ম মৃত্যু সবই ভগবানের হাত।
এখানে যতদূর সাধ্য ততদূর চিকিৎসা করানাে হয়েছে সেজন্য
তােমার দুঃখের কারণ নেই। ভগবানের জিনিষ ভগবান নিলেন
এই ভেবে এখন মনকে বুঝােও। ওষুদে ও ডাক্তারে বদি মরণ
বন্ধ হত, তা হলে মহারাণীর ছেলে মরত না। যার যখন সময়
ফুরােবে তাকে তখন যেতেই হবে। কালের মুখ থেকে স্বয়ং
ভগবানও ফিরিয়ে নিতে পারেন। মহাভারতে পড়েছ ত,
অর্জুনের মত ক্ষমতা মানুষের মধ্যে নেই, আর কৃষ্ণ স্বয়ং
ভগবান। সেই অর্জুনের ছেলে—আর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভাগনে
অভিমন্যুর অকালমৃত্যু তাে কৈ বন্ধ হলাে না! গােপালের
প্রবােধ বাক্যগুলি তড়িৎশক্তির ন্যায় ভােলার মৃতপ্রায়-প্রাণে
প্রবেশ করিয়া তাহাকে সজীব করিয়া তুলিল। গােপালের
প্রাণপণ চেষ্টায় বাগী-পাড়া হাড়ি-পাড়া প্রভৃতি ইতর পল্লী হইতে
কলেরা বিদূরিত হইল। তথাকার অধিবাসীগণ সুস্থ সবল
হইয়া গােপালের নিকট চিরঋণী-চিরকৃতজ্ঞ রহিল।
।
১১৪ নং আহিরীটোলা এট, কলিকাতা

भनी-मनौ অষ্টম পরিচ্ছেদ লােকপুরে এক মহাসমারােহের ক্রিয়া আরম্ভ হইয়াছে। হরিষ ঘােষ তখন তথাকার একজন খুব বড়লােক। হরিষবাবু নানারকম ব্যবসা ও কন্ট্রাক্টরী কাৰ্য্য করিয়া বহু অর্থ উপার্জন করিয়াছেন। তাহার পুরাতন ভাঙ্গা খড়ো-ঘরের যায়গায় এখন প্রকাণ্ড অট্টালিকা মাথা খাড়া করিয়া গগন স্পর্শ করিতেছে। অট্টালিকার বাহির-অংশ ও মধ্যভাগে অতি সুন্দর মার্বেল-প্রস্তুত-মণ্ডিত পূজার দালান। দালানের দুই পার্শ্বে দুই বৈঠকখানা। বৈঠকখানা দুইটি নানা রকমের কৌচ, কেদারা, আয়না, ছবি ইত্যাদিতে পরিশােভিত। পূজার দালানের সম্মুখে অতি প্রকাণ্ড ইষ্টক-সিমেন্টবধান অঙ্গন। তততাধিক লােক অনায়াসে সে অঙ্গনে বসিয়া ভােজন করিতে পারে। সেই বৃহৎ অঙ্গন আজ বহুলােক পরিপূর্ণ। অঙ্গনের উপরিভাগ নীল-চাতপে আচ্ছাদিত হইয়াছে। তাহাদের বৈঠকখানার একটিতে বহু প্রাচীন লােক, নানা বর্ণের চিত্র বিচিত্র গালিচা-দুলিচা-মােড় চৌকিতে উপবিষ্ট । তাহাদের মধ্যে কতগুলি বিজ্ঞ বৃদ্ধ ব্যক্তি হরিষবাবুকে ঘেরিয়া অযাচিত অমূল্য উপদেশ—পরামর্শ প্রদান করিয়া কর্মকর্তাকে কৃতার্থ • করিতেছেন। হরিষবাবুর মাতৃ-শ্রাদ্ধ। মহাসমারােহে দানসাগর সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী
জিরা! তদুপলক্ষে হরিষবাবু বিদেশে কর্মস্থল হইতে বহুকাল
পরে গৃহে আসিয়াছেন।
বিজ্ঞ বৃদ্ধগণের গ্রাম-পণ্ডিত প্রসিদ্ধ শিরােমণি মহাশয়
কহিলেন, “হরিষ, ভগমানের কৃপায় তােমার অবস্থা এখন
খুবই ভাল। তুমি পিতৃ মাতৃভক্ত অতি সচ্চরিত্র ব্যক্তি। পিতা
মাতা লােকের একবারই মরে। সাধু-শাস্ত্রে বলে, সকল ঋণ।
শােধ হয়, মাতৃঋণ শােধ হয় না ! মাতৃশ্রাদ্ধ উপলক্ষে পিণ্ড
প্রদানে আর ভূরিভােজনদানে সে মহাঋণের আংশিক
পরিশােধ সম্ভব। মাতৃ আশীর্বাদে কমলার কৃপায় তুমি জীবনে
সে শুভ সুযােগ লাভে সমর্থ হয়েছ। এমন সুযােগ হেলায় হারিও
বাপু।
হরিষবাবু সত্যই অতি
সৎপাত্র।
হরিষবাবু অতি
সামান্য অবস্থা হইতে অতি উন্নত অবস্থা লাভ করিয়াছেন।
তাহার অবস্থা বদলাইয়াছে, কিন্তু মতিগতি চালচলন কিছুমাত্র
গুম হয় নাই, একইরূপ নরম আছে। হরিষবাবু চিরদিনই
দীনভাবাপন্ন সদাশয় ও বিনীত। শিয়ােমণি মহাশয়ের কথায়
হরিষবাবু বিনীত কণ্ঠে কহিলেন, আপনারা মহাত্মা মহাজন।
আপনাদের শুভ আশীৰ্বাদ অবশ্যই সফল হবে। আমি তাে
এখন বিদেশী-বিদেশবাসী। আপনারা দয়া করে দেখা শুনা
করুন, যাতে কাজ হয় তার ব্যবস্থা করুন।
শিয়ােমণি কহিলেন, ‘তােমার মাতাঠাকুরাণী মহা পুণ্যবতী
ছিলেন। তাঁর কাজ সুচারুরূপেই সম্পন্ন হবে তাতে আর
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

পল্লী-লক্ষী
সন্দেহ কি
? তবে তুমি একটা কাজ কর বাপু। হরিষবাবু
করঘােড়ে কহিলেন, 'আজ করুন।
শিরােমণি.. “তুমি' দীনু বাডুষ্যেকে একত্র করে। দী
দেশের অনেক কাজে কর্তৃত্ব করেছে। সে বড়লােকের ছেলে,
নিজেও অনেক বড় কাজ করেছে। দীং তােমার এ বৃহৎ কাজ
খুব ভাল ভাবেই সমাধা করে দেবে।
নারায়ণ রায় গ্রামের বুনিয়াদী বংশের লােক। তাহাদের
বাড়ীতেও পূর্বে বহু বড় বড় কাজ কর্ম হইয়া গিয়াছে। এখন
আর রায়বংশের তেমন অবস্থা নাই—
-তেমন কাজ কর্মের
অনুষ্ঠানও নাই। তাল-পুকুরের তাল আর নাই—আছে মাত্র
নাম। রায় মহাশয়দের নাম, মাত্র নামে আছে—কাজে আর
কিছুই নাই। বাস্তবিক যখন বনিয়াদি বংশের অর্থগত কাৰ্য্যগত
শক্তি বিনষ্ট হয়, তখন তাহার আভিজাত্যের অভিমানটা সতেজে
ফুটিয়া উঠে। শিরােমণি মহাশয় রায়দের নাম করিলেন না।
দী বাডুষ্যেকে বাড়াইয়া বড় করিলেন। তাহার কথাটা,
গ্রামের বনিয়াদি বংশের লােক নারায়ণ রায়ের প্রাণে বড়
বাজিল। তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না, কহিলেন,
‘কাজ তাে করবেন, কিন্তু কাজ হবে কি করে?
গ্রামের অন্য জনৈক প্রৌঢ় কৈলাস হালদার, নৃতন বড়লােক
হরিষ ঘােষের মােসাহেবী উমেদারী করিতেছে, সে সঙ্গে সঙ্গে
গর্জিয়া কহিল, “কেন? কাজ হবে না কেন? কে আটক
করবে এ কাজ? এ তাে যে সে লােকের বাড়ীতে যে সে কাজ
সােল এজেন্ট—কমলিনী-সাহিত্য মন্দির

পল্লী-লক্ষী
নয়। এ কাজে কে বাধা দিতে পারে—কার বাপের ঘাড়ে
ক’টা মাথা ?
নারায়ণ রায় কহিলেন, ‘গায়ে যে দলাদলির ঘোঁট উঠেছে,
তাতে কাজ যে সুচারু রূপে সমাধা হয়, এমন তাে মনে হয় না।
হরিষবাবু ভীত হইলেন, ভীতকণ্ঠে কহিলেন, “আমার দূরদৃষ্ট !
এমন আমি মহাপাপী, আমার কাজ সহজে সফল হবে কেন?
শিরােমণি সদর্পে কহিলেন, “কে বলে দলাদলি ? কেন,
কি ঘটনা কোথা ঘটেছে যে গায়ে একটা দলাদলি ঘটবে?
যদু রায়, নারায়ণ রায়ের স্বপক্ষের ও সবংশের লােক। যদু
গর্জিয়া কহিল, “সে দেখে নেবে। যখন ঘটবে, তখন দেখে
নেবে সব, কেন-আর কোথা থেকে কি ঘটলাে।
শিয়ােমণির চতুম্পাঠীর ছাত্র কয়জন স্ফীত বক্ষে স্ফীত কণ্ঠে
কহিল, “হুঁ হুঁ ! দেখা যাবে কে কি করে?
যদু কহিল, 'দেখার আগে সাবধান হওয়াই ভাল, কৃতীর
অর্থনষ্ট আর লােকের মনকষ্ট-কথাটা তত ভাল নয়।
টাকা খরচ হবে, শেষটা যদি কাৰ্য্য পণ্ড হয়, তবে দুঃখের
পরিসীমা থাকবে না।
হরিষবাবু কাতর কণ্ঠে কহিলেন, তবে আপনারা আমায়
অনুমতি করুন, আমি গঙ্গাতীরে যে কোন রকমে মায়ের পিণ্ড
দান করি।
শিরােমণি একটু চিন্তিত হইলেন। তিনি ভাবিতে ভাবিতে
জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন? হয়েছে কি, ব্যাপারটা কি এমন
১১৪ নং আহিত্ৰীটোলা ঐট, কলিকাতা
এত

পল্লী-লক্ষী
ঘটলাে যে, গায়ে এমন সময় একটা দলাদলি বাধবে ?
বাধাবে? হরিষ অতি সজ্জন ব্যক্তি। গায়ের কেন—দেশের
যাতে মঙ্গল হয় সে জন্য হরিষ বহু টাকা মুক্ত হস্তে দান করছে।
ভগবান তাকে যেমন দিয়েছেন, তেমনি অর্থের সদ্ব্যবহারও সে
সর্বক্ষণ করতে প্রস্তুত।
থােসামুদে কৈলাস হালদার উচ্চৈস্বরে কহিল, “এই
সেদিনে সাধারণের রাস্তা মেরামতের জন্য বাবু অনায়াসে পাঁচ
হাজার টাকার চেক কেটে দিলে। গাঁয়ের লাইব্রেরীর জন্য
পরশু পাঁচশ টাকার বই কিতে দিলেন। তাছাড়া গােপনে
যে কত—সে আর কত মুখে কত বলব? কত অনাথ বিধবার
অন্ন বস্ত্র দান করছেন বাবু, তা তাে চখের মাথা খেয়ে ব্যাটা-
টেরা দেখতে পায় না ।
এমন পুণ্যাত্মা ব্যক্তির বাড়ীতে
এত বড় একটা ক্রিয়া উপলক্ষে যে-ব্যাটা গােযােগ উপস্থিত
করবে, ভগবান নিশ্চয়ই তার মাথায় বিনা মেঘে বজ্রাঘাত
করবে।'
শিরােমণি কহিলেন, ‘একটু স্থির হও। এখন তােমরা কেউ
কোন রকম গােলমাল করাে না। আমাকে ভিতরি-ভিতরি
সব অাগে জানতে দাও, আর কোন কথায় এখন প্রয়ােজন
নাই।' এই বলিয়া শিরােমণি মহাশয়, হরিষবাবুর অসাড় হাত
ধরিয়া সঙ্গে লইয়া প্রস্থান করিলেন। অপর সকলে তাহার
পশ্চাৎ পশ্চাৎ প্রস্থান করিলেন।
নারায়ণ রায় ও যদু রায় উচ্চৈস্বরে নানা কথার আললাচনা
সােল এজেন্ট—কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী
করিতে করিতে প্রস্থান করিল। হরিবাবুর উৎফুল ভবন
নীরব-নিরানন্দময়।
বাহিরে গরীব লােকেরা দল বাধিয়া স্থানে স্থানে আচ্ছা
করিয়া হরিষবাবুর বাটীর শ্রাদ্ধ উৎসব সম্বন্ধে আলােচনা করিতে
লাগিল। তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ আনন্দ উৎসাহ ভরে
কহিল, ‘ভারি ঘটা! দান সাগর শ্রাদ্ধের এমন কাণ্ড এদেশে
কেউ দেখেনি—শােনননি। গােরামিস্ত্রি লুচি ভাজবে! এইরূপ
নানাজনে নানা কথা কহিতে লাগিল।
নবম পরিচ্ছেদ
লােকপুরের জেলে-ঘাট মেয়েদের একটা খুব বড় মজলিস্।
পশ্চিম-গগনে সূৰ্য হেলিলে গ্রামের অনেক মেয়ে, যুবতী, প্রৌঢ়া
বৃদ্ধা কক্ষে কলসী লইয়া—ঘরে কলসী-ভরা-জল ফেলিয়া জল
আনিতে এই জেলে-ঘাটে আসে। গল্প-গুজবে, পরচর্চায়, পরের
কথায় আনন্দ উপভােগই উদ্দেশ্য—জল আনাটা অছিলা।
বিশেষতঃ, গ্রামের নূতন বড়লােক হরিষবাবু মাতৃশ্রাদ্ধ উপলক্ষে
বাড়ী আসা অবধি মেয়েঘাটের মজলিস্ বেশী রকম জমিয়াছে।
হরিষবাবুর বাড়ীর বৌ ঝি নানা বেশভূষায়—নানা অলঙ্কারে
সাজিয়া সন্ধ্যার আগে এই ঘাটে আসে আর হাত মুখ চোখ
১১০ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

০ नमो-नक्यो নাড়িয়া নানা ছাদে নানা কথা বলে। তাহাদের মধ্যে অনেকে স্বামীর সঙ্গে নানা স্থানে বাসায় বাসায় ঘুরিয়া থাকে—অনেকে বর্তমান বঙ্গের বিলাস-সভ্যতার কেন্দ্র কলিকাতায় বাস করে। তাহাদের মুখের বহু ভাবের বহু কথা শুনিবার জন্য, বহু রকমের তাবভঙ্গী দেখিবার জন্য, লােকপুরের অনেক মেয়ে—যাহারা সচরাচর এ ঘাটে আসে না, তাহারাও আসিতে আরম্ভ করিয়াছে। সন্ধ্যার কিছু পূর্বে জেলে-ঘাটে--দেখিতে দেখিতে অনেক মেয়ে উপস্থিত হইল। হরিবাবুর বাড়ীর অনেক মেয়ে, বউ আসিয়া ঘাটের মেয়ে-মজলিসে যােগদান করিল। অনেক নূতন বৌ, ঝি হাঁ করিয়া তাহাদের বসন ভূষণের বৈচিত্র-বাহুল্য দেখিতে লাগিল । তাহাদের মধ্যে কয়েকজনের স্বামী হাকিম, কেহ ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট, কেহ মুসেফ, কাহার স্বামী উকীল। হাকিমের যাহারা পত্নী, তাহারা হাকিমী-চালচলনে মেজাজ খুব ভারী করিয়া দুই একটা কথার অমূল্য রত্ন নরলােকে নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। যে ভাগ্যবতী পল্লী-রমণীর পানে চাহিয়া তাঁহারা কথা কহিলেন, তাহারা আপনাগিকে কৃত-কৃতার্থ মনে করিল। যখন স্বদেশিনী ও বিদেশিনীগণের নানা কথায় মেয়ে মজলিস ভরপুর জমিয়া উঠিল, তখন মড়ার মত জড়সড় হইয়া স্বলিত চরণে ভগ্নপ্রাণে নয়ন ঘাটে আসিল। ঘাটের একপাশ হইতে জল লইয়া নয়ন সত্বর দ্রুতপদে প্রস্থানের উপক্রম করিলে, রজনী ঘাটে আসিল। রজনী একাই একসহস্র। ঘাটে পৌছিবার সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

भली-मकी
পূর্ব হইতেই সে উচ্চকণ্ঠে কথা কহিতে আরম্ভ করিয়াছিল।
তাহার উচ্চ কথায় বাট তােলপাড় হইয়া উঠিল। তাহার
দর্পে ও রবে আর সকলের স্বর ও কথা ডুবিয়া গেল। রজনী
গলার স্বর সপ্তমে চড়াইয়া কহিল, “বড় শুভক্ষণে হরিষ-কাকার
বাড়ী ধুমধামের ক্রিয়া আরম্ভ হয়েছে। এ জে আর এক
মহাপাপীর শ্রাদ্ধ পর্যন্ত হয়ে যাবে।
হরিষবাবুর বড় বৌ, রজনীকে চিনিতেন। সবজান্তা রজনীকে
কেবল লােকর নয়, পার্শ্ববর্তী আরও আট দশখানি গ্রামের
লােক পৰ্য্যন্ত ভালরূপেই জানিতেন। ফলে রজনী, নিজ গুণে
নিজ শক্তিতে দেশমধ্যে আপনাকে বিলক্ষণ অস্থির করিয়া
তুলিয়াছিল। রজনীকে দেশের সকল সৎ-সাধু ব্যক্তি ভয়ও
করিত, ঘৃণাও করিত। গ্রামের সাধ্বী রমণীগণ রজনীকে দেখিয়া
হাড়ে হাড়ে কঁপিতেন। বাঘ দেখিলে কুরঙ্গিণী যেমন ভীত
চকিত হইয়া উঠে, রজনীর সম্মুখে পড়িলে তাহাদের সেই দশা
ধটিয়া দাড়ায়। রজনী কি বলিতে কি বলে-কাহার নামে কি
কুৎসা কলঙ্কের অপবাদ রটনা করে—এই ভয়ে তাহারা সর্বক্ষণ
ঝাপিতেন। হরিষবাবুর বড় বৌ-বড় লােকের বধূ হইলেও
মনে মনে রজনীকে ভয় করিতেন। বড় বৌ-বহুদিন পরে
দেশের বাড়ীতে আসিয়াছেন। রজনীকে ঘাটে দেখিয়া তিনি
তাহাকে মঙ্গলামঙ্গল জিজ্ঞাসা করিবার আগেই রজনী পরের
শ্রদ্ধের ব্যবস্থা করিল। দেখিয়া বড়বৌ উৎকণ্ঠিত হইলেন,
ভীতভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কার শ্রাদ্ধ রজনী ?
১১০নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা

রজনী কহিল, “বল্লেম যে, একটা মহাপাপীর শ্রাদ্ধ এই সঙ্গে
ঘাটের সকল মেয়ে রজনীর কথায় স্তম্ভিত হইল। তাহারা
চকিত নয়নে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাষী করিতে লাগিল।
বৌ কহিলেন, তােমার কথা তত ভাল বুঝতে পালুম না রজনী।
রজনী উগ্রকণ্ঠে কহিল, কেন? লােকে কি জানে না? দেশের
কোন লােকটা সে কথা শােনননি-কোন লােকটা তা জানে
? বড় বৌ কহিলেন, “আমরা তাে দেশে থাকি না, দেশের
খবর কি করে রাখবে বাছা? নয়ন আগেই রজনীর ভাব
রজনীর কথার ভাব বুঝিয়াছিল। সে দ্রুতপদে প্রস্থান করিল।
কুৎসা, পরনিন্দা-প্রিয়া রমণীর রজনীকে উৎসাহ দিয়া কহিল,
‘কথাটা খুলেই বলনা, রজনী দিদি ! সত্য কথা বলতে ভয় কি?
রজনী তাহাদের কথায় আরও উৎসাহিত হইয়া কহিল,
‘ধৰ্ম্মের ঢাক বাতাসে বাজে। দশমুখে ধৰ্ম্ম-দশজনেই বলছে।
গােপাল বােসের বাড়ীর কাণ্ড কারখানা-কেলেঙ্কারী কে না
জানে ? কে না বলছে ? তাই তাে গায়ে এত গােলমাল
উপস্থিত হয়েছে। সকলেই বলছে, ‘গােপাল বােসকে একঘরে
করতে হবে। তাকে নিয়ে আর সমাজে বসে খাওয়া হবে না।'
রঙ্গিনীদেবী প্রায় রজনীর সমকক্ষা-সমজাতীয়া। সে একটু
মুচকি হাসি হাসিয়া কহিল, ‘তা অত বাড়াবাড়ি কল্লে সমাজ
মানবে কেন?
রজনী উচ্চকণ্ঠে জেলে-ঘাট তােলপাড় করিয়া কহিল,
সােল এজেন্ট—কমলিনীসাহিত্যমন্দির

भावो-मयको
“বলবাে কি বস্তু-দিদি, দিনে দুপুরে ছোড়াগুলােকে নিয়ে যে
কাণ্ড ক'রে--ছিঃ ছিঃ, ভয় লােকের ঘরে-বামুন কায়েতের
ঘরে এমন সর্বনেশে কাজ—গলায় দড়ি ! ছিঃ ছিঃ, দেখবে,
শ্রাদ্ধ-ভােজের দিনে কি কাণ্ড হয়।
হরিষবাবুর বড় বৌ কথাটা শুনিয়া বড় চিন্তিত হইলেন।
তিনি কহিলেন, তাই তাে রজনী, তােরা পাঁচজন থাকতে সেই
দিনে গণ্ডগােল বাধবে ? আমরা তাে দেশে থাকি না।
দিন পরে এই ক্রিয়া উপলক্ষ করে দেশে এলেম। ভাবলেম,
এমন কাজটা আপন দেশে করাই ভাল। দশটা আপনার লােক
নিয়ে আমােদ আহলাদ লােক-লৌকতা করা হবে। দেখতে
শুনতে সব দিকেই ভাল। তা এমন হলে এখানে কাজ বন্ধ
করতে হয়। গায়ের যে এমন কপাল পুড়েছে তা জানলে কি
আমরা দেশে আসতেম, না গায়ে এ কাজের উদ্যোগ করতেন।
পােড়া লােকে আর সময় পেলে না? আমাদের বাড়ীর কাজের
সময় তাদের যত মনের ময়লা জেগে উঠলাে।
রজনী কুদ্ধা ফণিণীর ন্যায় গর্জিয়া কহিল, ‘লােকের দোষটা
হ’লল কি? যে দোষী তাকে কিছু বলবে না, নির্দোষীকে
নিয়ে টানাটানি! নইলে আর কালটাকে ‘কলি’ বলবে কেন?
হায়রে ধর্ম! কি দশাই দেশের হয়েছে। এমন দেশে কি
থাকতে আছে ? না না, কখনই না। দেশ ছেড়ে চলে যাব,
আগে কাজটা মিটে যাক। দেখি কোথাকার জল কোথায়
দাড়ায়। তারপর এর ব্যবস্থা করবেই করবাে।
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

৩
भनी-मको
কে কি
রঙ্গিনী কহিল, “তা বটেই তাে। যার যা মনে আসবে
সেই তা করবে, আবার তাদের সঙ্গে তাদের হাতে খেলে
তাতে হিঁদুর জাতজন্ম থাকবে কি করে?
সধবা অবস্থায় রজনী বাগী-পাড়ার দুইটা যুবককে লইয়া
একবার বহুদিনের জন্য রাস দেখিতে গিয়াছিল। সেই কথা।
ঈঙ্গিত করিয়া তেজস্বিনী মােহিনী দেবী কহিলেন, কেন?
কথাটা কি? গােপাল বােস কি এমন কুকাজটা করেছে?
তার মেয়ে, বউ কি কেউ বেরিয়ে গেছে? কত লােকের
বৌ যে দুলে-বাণী নিয়ে রাস দেখতে যায়-আবার বাইরে
গিরে রাস-লীলাও করে আসে, তাদের কে কি করে ?
বলে ? যত চোদায়ে ধরা পড়লাে গোপাল বােস আর তার
বৌ-টা। তারা কি না নেহাৎ ভাল মানুষ।
দেশের হিত
হয় কিসে তাই নিয়ে ঘুরে মরে--তাই তাদের যত শত্রু! ও,
কালের কি ধৰ্ম্ম !
রজনী তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া উঠিল। সে প্রচণ্ড উগ্রমূর্তি
ধারণ করিয়া কহিল, তা দেখা যাবে সেদিন কে তাকে রক্ষা
করে। দেশের লােক একসঙ্গে জমবে--সমাজের সব লােকই
তাে আসবে-বিচারে কি হয়, কি দাড়ায় তা দেখা যাবে। কার
সাধ্যি, কার ঘাড়ে সাতটা মাথা তাকে রক্ষা করে সেদিন, সেইটে
একবার বুঝে নােব।
হরিবাবুর বড় বৌ ভীতা হইলেন। তিনি কুণ্ঠিত কঠে
কহিলেন, “দেখ মা রজনী, তােমাদের হাতে ধরে বলছি, এ
সােল এজেন্টকমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী
সময়টা আঃ কেউ কিছু কোরােনা। এবারে আমাদের মুখ চেয়ে
সবাই চুপ করে থাকে। আর না হয় বলো, আমরা দেশ ছেড়ে
চলে যাই।
মােহিনী দেবী চিরদিনই ন্যায় ও ধর্মের পক্ষে মুক্তকণ্ঠে কথা
কহিয়া থাকেন। অন্যায় অত্যাচার তিনি কোনকালেই নীরবে
সইতে পারেন না। লােকে সেজন্য তাঁহাকে কর্কশ-ভাষিনী’
বলিয়া আখ্যা দিয়াছে। মােহিনী দেবী বড় গলা করিয়া উচ্চকণ্ঠে
কহিলেন, “বেশ তাে, দেখা যাবে কে গােপাল বােসের কি করে?
আহা, বেচারী দিন রাত মাথা ঘামাচ্ছে, কিসে দেশ ভাল হয়—
কি উপায়ে ছােট বড় সবাই সুখে থাকতে পারে। আহা মানুষ
ততা নয়, যেন সদানন্দ পুরুষ-স্বর্গের দেবতা। সদাই ঘাড় হেঁট
কত নরম, কত শান্ত। তারই অনিষ্ট চেষ্টাওঃ! পদ্মফুলে
বজ্রাঘাত! দেশ যে উচ্ছন্ন যাবে। এমন দেশ যে জ্বলে পুড়ে
মরুভূমি হয়ে যাবে?
এই বলিয়া মােহিনী দেবী জল লইয়া জুতপদে প্রস্থান
করিলেন। তাঁহার পশ্চাৎ অপর সকলেই একে একে চলিয়া
গেলেন। কেবল রজনী-রঙ্গিনীকে লইয়া মতলব ও পরামর্শ
আঁটিতে লাগিল। রজনী কহিল, “তুমি বাড়ীতে ঠিক থেকে।
মনে রেখাে, রজনী এখনও মরেনি। অন্ধ নােক টাকা খরচ
করবে, রজনী একেবারে মরে থাকবে না।
হরিপুরের কাশীবাবুকে হাত কল্লে, কোথাকার গােপাল বােস
একপাশে মরে থাকবে। একশ টাকা কাশী বাবুর হাতে গুজে
১১৪নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

পল্লী-লক্ষী
দিলে সে-ই সমাজ ঠিক করে নেবে। গরীব হলেও এখনও
তার বংশ-মৰ্যাদা একেবারে ঢাকেনি, এখনও সমাজের অনেকে
তাকে মানে-চেনে। এই বলিয়া রঙ্গিনীর পানে চাহিয়া একটু
কটাক্ষ করিয়া মুচকি হাসি হাসিয়া রজনী কহিল, ‘কাশীবাবু আমা-
দেরই হাতের লােক। প্রায়ই আমার বাড়ী যাওয়া আসা করে।
রঙ্গিনী কহিল, না ভাই, এ বড় অসহ-অপমান। প্রাণ
থাকতে এ অপমান সইবে না। এর প্রতিশােধ নিতেই হবে।
টাকা লাগে তাতে আমিও পিছােবাে না। আমরা নেহাত
আজও মরিনি দিদি।
রঙ্গিনীর স্বামী তেজারতি মহাজনী কারবার করিয়া-লােকে
বলে, বিশ পঁচিশ হাজার জমাইয়াছে।
দশম পরিচ্ছেদ
হরিশবাবুর মাতৃশ্রাদ্ধ উপলক্ষে বিরাট ভােজর আয়ােজন
হইয়াছে। সমাজের সকল ব্রাহ্মণ কায়স্থাদি ভদ্রগণ নিমন্ত্রিত
হইয়াছেন, ভুরিভােজনের ব্যবস্থা হইয়াছে, অসংখ্য কাঙালী
সমাগত হইয়াছে। কাশী, কাঞ্চী, দ্রাবীড়, নবদ্বীপ, ভাটপাড়া
প্রভৃতি স্থান হইতে বহু পণ্ডিত বহু শিষ্য লইয়া আসিয়াছেন।
বাহির বাটিতে বসিয়া তাহারা শারে কথা তুলিয়া পরস্পর
সােল এজেন্টকমলিনীসাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী তর্কযুদ্ধে বিভাের-আত্মহারা। বাটীর বাহিরে কাঙালীগণ স্থানে স্থানে দল বাঁধিয়া চীৎকারে গগন ফাটাইতেছে। তষ্যিদারগণ নানাভঙ্গিতে নানাস্বরে গান গাহিয়া স্বর্গ হইতে পুষ্প-রথ আনিয়া হরিষবাবুর মৃত জননীকে সশরীরে বৈকুণ্ঠে। পাঠাইবার ব্যবস্থা করিতেছে। গ্রামের নানা স্থানে নিমন্ত্রণ বাড়ীর অঙ্গনে নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগণ বসিয়া ধূমপানসহকারে কত খােসগল্পে মাতিয়া কৰ্ম্মবাড়ী মুখরিত করিয়া তুলিতেছে। কর্মকর্তা মহাপণ্ডিত বিজ্ঞ-প্রবর শিরােমণি মহাশয় চতুর্দিকে ঘুরিয়া ফিরিয়া তত্ত্বাবধান ও পরিদর্শন করিতেছেন ও হাস্যবদনে মিষ্টবাক্যে সকলকে আপ্যায়িত ও পরিতুষ্ট করিতেছেন। মধ্যে মধ্যে তিনি পণ্ডিতমণ্ডলীর নিকটে আসিয়া সকলকে সর্বপ্রকার দোষ ত্রুটি ক্ষমা করিবার জন্য অনুরােধ করিতেছেন। কৰ্ম্মী হরিষবাবু অতি বিনীত ভাবে করযােড়ে শিরােমণি মহাশয়ের পিছু পিছু ঘুরিতেছেন। ক্ষমা করবেন দয়া করে মার্জনা করবেন বলিয়া সকলের নিকট প্রার্থনা করিতেছেন। যেখানে কতকগুলি লােক একত্র জুটিয়া চুপে চুপে কোন কথা কহিতেছে, সেইখানেই শিরােমণি মহাশয় হরিষবাবুর সহিত দ্রুতপদে অতি ব্যগ্রভাবে উপস্থিত হইয়া তাহাদিগকে শান্ত সংযত হইতে সনির্বন্ধ অনুরােধ করিতেছেন। বাড়ীর পশ্চিমে বড় বড় চালাঘরে বামুন ঠাকুরের দল বাঁকুড়া মানভূম জেলা হইতে আসিয়া লুচি,কচুরি, নানারকমের মিঠাই, সন্দেশ, তরকারি পাক করিতেছে ও সুবিধা সুযােগ বুঝিয়া বাটি-বাটী ঘটি-ঘটি ঘি, ময়দা সরাইবার যােগাড় করিতেছে ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

नी-मको
ও ধরা পড়িবার ভয়ে ভীত চক্ষে চারিদিকে চাহিতেছে।
তাহাদের কেহ কোনরূপ কাৰ্য্যে অবহেলা বা চৌৰ্য্য অপরাধে
ভৎসিত কিম্বা অপমানিত হইয়া আপনাদের পুরুষপরস্পরাগত
কুলমৰ্যাদার অভিমান করিয়া আর্তনাদ করিতেছে। ভাঙার ঘর
বহু রকমের প্রচুর খাদ্যদ্রব্যে ভরপুর হইয়া, ক্ষুধার্ত ঔদরিকগণের
সতৃষ্ণ দৃষ্টি ও লােলুপ রসনা—অতি তীব্র ভাবে আকর্ষণ
করিতেছে। হরিষবাবুর বাটা তিন মহলে বিভক্ত। সর্ব
পশ্চাতে রন্ধন মহল। বন্ধন মহল আজ মহিলাগণের কণ্ঠস্বরে ও
কথাবার্তায় মুখরিত। পাকশালার মধ্যে পাক-ক্রিয়ায় পরিপকা
অভিজ্ঞ গৃহিণীগণ বিবিধ অ-ব্যঞ্জন পাকে নির। বাহিরে,
অঙ্গনে গৃহের দাসী বা গ্রামের ‘রেমাের মা’ ‘হরের মা জোঠ
বাঁধিয়া কোনাে স্থানে বসিয়া মাছ কুটিতেছে—কোথাও তরকারি
বানাইতেছে ও গ্রামের বা বাটীর বৌ ঝি দিগের গুণ, ব্যবহার
বর্ণনা করিয়া শ্রোতৃবৃন্দের মন মুগ্ধ করিতেছে। চারিদিগকে
গােলমাল। চারিদিকে মহাগােল—‘দাও' ‘খাও। বৃষােৎসর্গ
দানসাগর প্রভৃতি বিরাট ব্যাপার সমাধা হইলে দু'দিকে
বৃহৎ অঙ্গনে ভােজর আয়ােজন হইতে লাগিল।
ব্রাহ্মণদিগের অপর অঙ্গনে কায়স্থগণের ভােজন অনুষ্ঠানের পাতা
লবণ লইয়া পরিবেশক দল উপস্থিত হইল।
এই সময় নিমন্ত্রিত সমাগত ব্যক্তিগণের মধ্যে একটা বিষম
গােলমাল আরম্ভ হইল। গোপাল তখন গম্ভীর ভাবে নীরবে
এক পার্শ্বে বসিয়াছিল। জনা চাটুয্যে চীৎকার করিয়া কহিতে
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির
এক অঙ্গনে

পল্লী-লক্ষী লাগিল, আপনারা সবাই গােপাল বােসের বাড়ীর কেলেঙ্কারীর কথা শুনেছেন! সে সকল কুচ্ছা-কেলেঙ্কারী এদেশে কে জানে? এই কথা শুনিবামাত্র সমবেত লােকদিগের মধ্যে চারিদিকে হৈ-হৈ রৈ রৈ রব উঠিল। শিয়ােমণি মহাশয় হরিবাবুকে লইয়া জনার সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। হরিষবাবু কাতর কণ্ঠে অনুনয় করিয়া কহিতে লাগিলেন, জনার্দন, বাবা, এবারে ক্ষান্ত হও। আমায় দয়া করে ক্ষমা কর। দেখ বাছা, আমি দেশে থাকি না। বহুদিন পরে মা ঠাকরুণের কাজটা করতে দেশে এসেছি। মনে দেখ, তিনি তােমাদের কত ভালবাসতেন- কত যত্ন করতেন। তার নাম স্মরণ করে, আমার পানে চেয়ে আজকের দিনটা স্থির হও। ‘চোরা না মানে ধর্মের কাহিনী। জনার্দন আহত ভল্লুকের মত গর্জন করিতে করিতে কহিল, “ওসব কথা কে শুনবে? ওসকল কথা আপনি রেখে দিন। কেন? আপনাকে তাে পূর্বেই বলা হয়েছিল—আগেই আপনাকে সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল। আপনি কৈ আমাদের কথা শুনলেন, কৈ দশজনের মান রাখলেন ? জেনেছিলেন-ই তাে, গােপাল বােসকে নিমন্ত্রণ ক'লে একটা ভয়ানক গােযােগ বাধবে। গােপাল একপার্শ্বে বসিয়া নীরবে শুনিতেছিল, তাহার পার্শ্বে কয়জন নব্য যুবক বসিয়াছিল। তাহারা কুদ্ধ হইয়া গৰ্জন করিতে লাগিল। তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ ১১৪ নং আহিরীটোলা ঐট, কলিকাতা।

৭০
পল্লী-লক্ষী
কহিল, “না, আর সইতে পারা যায় না, এ বড় অসহা ব্যাপার।
ছােট মুখে এত বড় কথা সইতে পারা যায় না।
গােপাল তাহাদিগকে শান্ত করিবার জন্ধ কহিল, “দেখ,একটা
মােটা কথায় বলে-পাগােলে কি না বলে,
মালে কিনা খায়।
ও কি আর একটা মানুষ বলে গ্রাহ—ওর কথা কে শােনেকে
গ্রাঙ্ক করে? আজ হরিবাবুর বাড়ীতে মহা সমারােহে কাজ।
এ কাজে কোনরূপ বাধা হলে তার কষ্টের সীমা থাকবে না।
গােপালের কথায় যুবকদল শান্ত হইল। শিরােমণি মহাশয়,
দলাদলির কথা শুনিয়া একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া উঠিলেন,
তিনি ক্রুদ্ধকণ্ঠে কহিলেন, “জনা, দেখ, তােকে বলি-বেশী কথা
তুই বলিস না। খেতে এসেছি, চুপে চুপে খেয়ে চলে যা।
জনা চীৎকারে গগন ফাটাইয়া কহিল, “কেন, আমরা
কি ভিখিরি বামুন যে, দেশে-দেশে বাড়ী-বাড়ী ভিক্ষা মেগে
খেয়ে বেড়াই। কৃষ্ণকায় লােমশ-দেহ জনার্দন দত বাহির
করিয়া চীৎকার করিতে তাঁহার মুক্তি প্রকৃতই ক্রুদ্ধ ভল্লুকের মত
হইয়া উঠিল। বালকগণ করতালি দিয়া হাসিতে হাসিতে
কহিতে লাগিল, ‘ওরে, জনা-ভালুক ক্ষেপেছে রে-জনা-ভালুক
ক্ষেপেছে। লােকপুরের বালক বৃদ্ধ বহু লােক জনার্দনকে
পশ্চাতে ‘ভালুক-চাটুয্যে’ বলিয়া নামকরণ করিয়াছিল।
শিরােমণি মহাশয়ের কথায় ও বাকদিগের উপহাস্যে জনার্দন
ক্ষিপ্ত-কুকুরের ন্যায় হইয়া উঠিল। সে শিয়ােমণি মহাশয়ের
মুপের নিকট হাত নাড়িয়া কহিল, “তুমি টিকি নেড়ে বেশী
সােল এজেন্টকমলিনীসাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী
বড়াই করাে না। ভিখিরি বামুনের আবার এত বাড়াবাড়ি
কিসে? যখন শিরােমণি মহাশয় অপমানিত হইলেন, তখন
অনেক লােক ক্রোধে গর্জিতে লাগিল। শিরােমণি মহাশয়
সমাজের মাথা—আদর্শ মহাপুরুষ। গুণে জ্ঞানে তিনি লােকপুর
অঞ্চলের ঘােট বড় সকল লােকের প্রাণের দেবতা। তাহার
অপমানে সমবেত লােকসকল ক্রুদ্ধ হইয়া জনা চাটুষ্যেকে
নানা ভাবে গালি বর্ষণ করিতে লাগিল। কেহ কেহ তাহাকে
প্রহার করিতে উদ্যত হইল, গােলযােগ ক্রমে ভীষণ হইয়া
দাড়াইল। জনার্দনের পক্ষে মতি বসু প্রভৃতি আরও অনেক
ব্যক্তি উত্তেজিত হইয়া বিষম বিবাদ বাড়াইবার উপক্রম করিতে
জনতা দুইভাগে বিভক্ত হইয়া পড়িল । উভয় পক্ষ হইতে
গগনভেদী ‘মার’ ‘মার’ শব্দ উখিত হইয়া হরিষবাবুর বৃহৎ ভবন
ছাইয়া ফেলিল। মহিলাগণ যিনি যে অবস্থায় ছিলেন তিনি
সেই অবস্থায় উপর ছাদে দাড়াইয়া ভীত চক্ষে ব্যাপার দেখিতে
লাগিলেন। বাঁকুড়া, মানভূমের বামুন ঠাকুরেরা ঝাঝরা, ছাতা
হাতে লইয়া ছুটিয়া আসিল। তাহারা উচ্চকণ্ঠে কেহ কেহ
বলিতে লাগিল, ‘আমি বিষ্ণু-ঠাকুরের সন্তান’ কেহ কহিল,“আমি
সাধুর সন্তান কেহ কহিল, “আমি ভগীরথের বংশের তিলক’-
আমরা উপস্থিত থাকতে আবার ব্রাহ্মণ ভােজনের ভাবনা?
ঠাকুরদের মধ্যে দোলগােবিন্দ মুখুয্যে সর্বত্র খুব কুলের গৌরব
করিয়া বেড়ায়। তাহার পিতা কোথা হইতে আসিয়া মানভূম
জেলায় দশ পনের খানি গ্রামে আপনার কূলের বড়াই করিয়া
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা

পল্লী-লক্ষী
দশ পনেরটি বিবাহ করিয়া কোথায় প্রস্থান করে। সে কোথায়
জন্মে, কোথায় মরে তাহা এ পর্যন্ত কেহ জানিতে পারে নাই।
দোলগােবিনের মাতা, স্বামীর প্রস্থানের বহুবৎসর পরে
দোলগােবিন্দকে প্রসব করে ও মাথায় মসলার ডালা লইয়া
গায়ে-গাঁয়ে বেচা-কেনা করিয়া দোলগােবিন্দকে মানুষ করে।
দোলগােবিন্দ চারি পাঁচ বৎসরের হইলে, জননী শিবাভূমিজকে
লইয়া গ্রাম ছাড়িয়া বিদেশে আসিয়া এক হােটেলে পাচিকার
কার্যে নিযুক্ত হয়। শিবাভূমিজ মরিলে, দোলগােবিন্দের মাতা
হাতে কিছু টাকা করিয়া গায়ে ফিরিয়া আসে ও একটা ভােজ দিয়া
সমাজে উজ্জ্বল রূপে ধৰ্ম্ম বজায় করে। দোলগগাবিন্দ মানুষ হইয়া
হাতা, বেড়ী, ঝাঁঝরা সম্বল করিয়া ‘ঠাকুর’ বৃত্তি অবলম্বন করে।
গলায় ময়লা কাল পৈতা ছাড়া তাহার ব্রাহ্মণক্তের অপর কোন
পরিচয় পাইবার যাে নাই।—সে সদরে ছুটিয়া আসিল।
মুণ্ডিত-মস্তক হরিষবাবু অঙ্গনে যাইয়া নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণমণ্ডলীর
পদতলে পড়িয়া রােদন করিতেছিলেন। দোলগােবিন্দ
তাহাকে সান্ত্বনা করিবার জন্য উচ্চকণ্ঠে বলিতে লাগিল, বাবু,
ভয় কি আপনার, আপনি কোন চিন্তা করবেন না। আমি
সাক্ষাৎ বিষ্ণু-ঠাকুরের সন্তান। একা আমাকে খাওয়ালে
আপনার দশহাজার বামুন-ভােজনের ফল হবে। আপনি
কোন চিন্তা করবেন না। আমার ভাবে আরও অনেক ভাল
ভাল কুলীন বামুনের ছেলে আছে, উনি আপনি, আপনার
জাতকে আর খােমােদ করতে হবে না। জনা চাটুয্যের দল
সােল এজেন্ট-কমলিনীসাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী
।
তখন ক্রোধে জলিত অগ্নির স্যায় জ্বলিতে লাগিল। জনা
উত্তেজিত কণ্ঠে উচ্চৈস্বরে কহিল, “আপনারা এখন ভেবে
চিন্তে দেখুন, মানুষের খাতির করবেন কি জাত ধর্ম বজায়
রাখবেন। মানুষ গেলে মানুষ মিলবে কিন্তু জাত ধৰ্ম্ম একবার
গেলে আর তা ফিরে পাওয়া যায় না। বিশেষ এমন কাজ—এত
বড় দুরূহ কাজ করে লােকে যদি অনায়াসে হাসতে হাসতে পার
হয়ে যায়, তবে সমাজের তাে আর কোন ক্ষমতাই থাকে না।
তা হলে যার যা মনে লাগবে, সেই তা করতে থাকবে।
জনার কথায় নিমন্ত্রিত লােকদিগের মধ্যে একটা
খুব গােলমাল বাধিয়া উঠিল। কতকগুলি অজ্ঞ মূখ লােক
বলিয়া উঠিল, তাই তাে বটে, সমাজ কি এমন মরা ?
যাহারা নামে গন্ধে কুলীনের বংশধর ছিল, তাহারা কহিল,
‘সমাজের কুলীনের ছেলেরা কি মরেছে? রাজা বল্লালসেনের
নাম কি এমনি করে এর মধ্যে ডুবে যাবে ? বটেই তাে! যার
যা মনে লাগবে সে কখন তা করতে পারবে না। গােপাল
বােস সমাজের বুকে বসে এত বড় কাজ করে যে হাসতে
হাসতে পার হয়ে যাবে, তা কখন হবে না। না-কখন না !
জন এই সময় চীৎকার করিয়া কহিল, ‘একা কি গােপাল?
গােপালের মেয়ে বৌতে না করছে কি?
গােপাল এতক্ষণ নীরবে এক পাশে বসিয়াছিল। তাহার ধৈৰ্য্য
সহ-সীমা ছাড়াইয়া উঠিল, সে উন্মত্তের ন্যায় উঠিয়া দাড়াইল। বহু
যুবক তাহার সঙ্গে উঠিয়া জনার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল, তাহাদের
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

। পল্লী-লক্ষী মধ্যে কেহ কেহ জনাকে ধরিয়া প্রহার করিবার উদ্যোগ করিল। গতিক ভাল নয় বুঝিয়া জনা সদলে চলিয়া গেল। শিরােমণি মহাশয় উচ্চকণ্ঠে কহিলেন, ‘পাতা করিয়া দাও, ভােজন ক্রিয়া আরম্ভ হােক, যার খুসি হয় খাবে। পরিবেশক- দল কলাপাতা ও লবণ লইয়া বাহির হইল। হরিষবাবুর ভােজনের বিরাট আয়ােজন। কতকগুলি প্রকৃত ভদ্রলােক জনার দলের অন্যায় বুঝিয়া, গােপাল বসুর সততা জানিয়া কহিল, “আমরা গােপাল বােসকে চিনি, পাতা পাতিয়া দিন, আমরা বসি। এই বলিয়া অনেক লােক বসিয়া গেল। বৃহৎ অঙ্গনের দুই অংশে দুই ভাগে ব্রাহ্মণ ও কায়স্থদিগের ভােজনের স্থান নির্ধারিত হইয়াছিল, ব্রাহ্মণ কায়স্থ দুই ভাগে দুই দল বসিয়া গেল। যাহারা গােল বাধাইবার জন্য উৎসুক উৎফুল্ল হইয়াছিল, তাহারাও হরিষবাবুর আয়ােজন দেখিয়া লােভ সামলাইতে পারিল না। মােণ্ডা মিঠাই সন্দেশ রসগােল্লার পাহাড় ভূপ দেখিয়া অনেকের রসনা লক লক করিতেছিল। তাহারা পাতার উদ্যোগ দেখিয়া বসিয়া পড়িল। কেবল কাশীনাথের কথা শুনিয়া কতকগুলি লােক জনার দলে যােগ দিবার জন্য প্রস্থান করিল-ফলে সমাজে দুইটা দল হইয়া দাঁড়াইল। হরিবাবু বালকের ন্যায় উচ্চকণ্ঠে কাদিয়া কহিলেন, ‘আমার মা-ঠাকরুণ পুণ্যবতী ছিলেন, তাঁর কাজে এমন হলাে কেন? আমি মহাপাপী। আমারই পাপের ফলে—আমারই দূরদৃষ্টে এই রকম ঘটুলল।' এই বলিয়া তিনি সজোরে বুক সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লী
চাপড়াইতে লাগিলেন। শিরােমণি তাঁহাকে সানা করিয়া
কহিলেন, “বৃহৎ কর্মে গােল হয়েই থাকে। জান তত বাপু, বড়
কাজ করতে গেলেই হিমালয়ের মত পাষাণ—অচল অটল হ'তে
হয়। জানই তাে, যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে দুষ্ট শিশুপাল কি
গােলযােগ বাধিয়েছিল। সে তত কাল ছিল দ্বাপর-আর
এটা হচ্ছে ঘাের কলি।
হরিষাবু শিরােমণির পায়ে ধরিয়া কাদিতে কাদিতে
কহিলেন, “ওঃ, আমার
যে মাথা ঘুরছে! চারিদিক
অন্ধকার দেখছি। আমার একি হলাে! শিরােমণির উৎসাহ
বাক্যে হরিশবাবু প্রশান্ত ও প্রবুদ্ধ হইয়া চারিদিকে করযােড়ে
ঘুরিতে লাগিলেন। মহাসমারােহের কাৰ্য মহাসমারােহে
সুসম্পন্ন হইল। চারিদিকে সন্দেশ, রসগােল্লার ছড়াছড়ি-মােণ্ড
মিঠাইএর শিলাবৃষ্টি। হরিষবাবুর বৃহৎ ভবন “দিয়তাং ভােজ্যং
রবে মুখরিত।
একাদশ পরিচ্ছেদ
নয়ন বৌ নীরব-নিস্তব্ধ নিস্পন্দ। ঘরের দাওয়ায় দাঁড়াইয়া
উৰ্দ্ধদৃষ্টে বিশাল শূন্য আকাশের পানে শূন্য দৃষ্টিতে শূন্য প্রাণে নয়ন
কত কি ভাবিতেছে। নয়নকে দেখিলে মনে হয়, যথার্থ শুত্র
১১৪ নং আহিরীটোলা জট, কলিকাতা।

৭৩
-
পল্লী-লক্ষী
প্রস্তরখণ্ড বুঝিয়া কোন অপাথিশিল্পী এ অপার্থিব সুন্দর সৌম্য
‘মূর্তি বাহির করিয়াছে, যেন এ অপূৰ্ব্ব মূর্তি কোন অজ্ঞাত-রাজ্য
গুপ্ত ভাবে লুকায়িত ছিল, স্বয়ং বিধাতাও তাহার সন্ধান জানিতেন
না। গােপাল দূর হইতে, নয়নের সে অলৌকিক মূর্তি দেখিয়া
ভীত হইল। তাহার চরণযুগল মৃত্তিকা মধ্যে প্রােথিত
হইয়া রহিল। সত্যই গােপালের নড়িবার বা চলিবার শক্তি
যেন নিমিষে তিরােহিত হইল। সে যেখানে ছিল সেইখানে
নীরবে দাড়াইয়া একমনে কত কি ভাবিতে লাগিল। ভাবনার
ভীষণ স্রোত-প্রবাহে গােপাল আপনাকে ভাসাইয়া দিল,
ভাবিতে ভাবিতে গােপাল এক অপূর্ব দৃশ্য দেখিল সে আবার
দেখিল, যেন শরতের সান্ধ্য-গগনে, স্নােঘমণ্ডল-মধ্যবর্তী অপূৰ্ব্ব
জগজ্জননী জগদ্ধাত্রী মূৰ্ত্তি তাহার গৃহে বিরাজিতা ! নয়ুনের এই
আনন্দময়ী মূর্তি দেখিয়া গােপালের হৃদয় আনন্দে নাচিয়া উঠিল।
গােপাল সাহসে ভর করিয়া, নয়নের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল।
গােপালকে দেখিয়া নয়ন সরলা বালিকার ন্যায় কঁদিয়া উঠিল।
নয়নের আজ এ কি ভাব—এ কি মূর্তি! নয়নের সে হাস্যময়ী
চির বসন্তময়ী মধুর ভাব আজ কোথায়? কোথায় সে অপূর্ব
ভাব আজ হঠাৎ লুকাইল? কুসুমাদপি-নয়ন সত্যই আজ
বাদপি কঠোর! নয়নের সুবর্ণময়ী মূর্তি আজ কঠোর
বময়ী।
নয়ন আজি অশ্রুভরা ! অপূর্ণাক্ষী
নয়ন, কাঠার দৃষ্টিতে পতি-মুখপানে চাহিয়া রহিল। গােপাল
বিগলিত হৃদয়ে, করুণ কণ্ঠে, নয়নের হাত দুখানি ধরিয়া
সােল এজেন্টকমলিনী-সাহিত্য-মন্দির
'
নয়নের

भनौ-नौ
৭৭
কহিল, নয়ন আমায় ক্ষমা কর—আমায় দয়া কর। আমি
অধম—আমি পতিত—আমি চণ্ডাল। তুমি স্বয়ং লক্ষ্মী-রূপিনী
-তুমি কমলা—এ অধমের গৃহ তােমার উপযুক্ত স্থান নয়।
জানি না, কোন জন্মের পুণ্যে—কোন সৌভাগ্যে তােমার মত
নহারত্ন আমার গৃহ উজ্জ্বল করেছে—কোন তপস্যার ফলে তােমার
মত দেবী আমার পাপ-সংসারে উদয় হয়েছে। সত্যই তুমি
রূপে লক্ষ্মী, গুণে স্বরস্বতী। এ গৃহের, এমন সংসারের যােগ্যা
তােত তুমি নও! এ মাটীর পৃথিবীর উপযুকাও তুমি নও। বিধাতা
বড় দয়া করে তােমার মত অমূল্য রত্ন আমাকে দিয়েছিলেন,
আমি পাপী, তােমায় রাখতে পারব কেন?' বলিতে বলিতে
নয়নজলে গােপালের হৃদয় ভাসিয়া গেল।
গােপাল দিতে দিতে পুনরায় কহিল, “নয়ন আমি তােমায়
চিনি—তােমায় ভালরূপেই জানি, জানি তুমি এঁদো-ডােবায়
সােনার কমল। আমার এই অন্ধকূপে তােমার মত সােনার
শতদল-ফুলে সংসার আলাে করবে, স্বর্গের সৌরভ বিলাবে, এ তাে
কল্পনার অতীত। তুমি দেবলােকের সুধা-স্বরূপিণী ! অসুরের
এ অমৃত কথন সুখভােগ্য হতে পারে না! আজ আমার ঘরে
পড়ে কমলের বক্ষে বজ্রাঘাত সইতে হলাে।
এ দৃশ্য যে আর
দেখতে পারি না বলিয়া গােপাল বসিয়া পড়িল। এ কি! গােপাল
যে সংজ্ঞাহীন—মূচ্ছিত।
নয়ন পাগলিনীর ন্যায় ভীত এ্যন্তভাবে উঠিয়া গােপালকে
সুশ্রষা করিতে লাগিল। দেবী-
কম্পর্শে মৃতদেহে জীবন সঞ্চারিত
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

৭
পল্লী-লক্ষী
হইল। গােপাল ধীরে ধীরে উঠিয়া বসিল কিন্তু তাহার
নয়নেপলক নাই-মুখে কথাটিও নাই। গােপাল নীরব-নিস্তব্ধ
প্রস্তর-পুত্তলিকার ন্যায় নীরবে, হৃদয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর
সম্মুখে বসিয়া রহিল। নয়ন বৌ কহিল, “দেখ, আমাদের দেশে
একটা প্রসিদ্ধ কথা চলিত আছে-‘বিপদিধৈৰ্য্যম। মানুষ যে
কেমন মানুষ—সে যে কতটা পশুত্ব ছেড়ে মনুষ্যত্ব লাভ করেছে-
কতটা উচুতে উঠে বড় হয়েছে, তা বুঝে নেবার মাপকাটি—বিপদে
সাহস, বিপদে ধৈৰ্য্য। শত্রুকে বিনষ্ট করতে হলেও আগে ভাবতে
হয়—আগে তার ব্যবস্থা বন্দোবস্ত ঠিক করতে হয় তাতে প্রবল
ধৈৰ্য্য চাই। ধৈৰ্য্য নইলে মাথার ঠিক থাকে না। মাথা ঠিক
রাখতে না পারলে কোন ছােট কাজের ব্যবস্থা করা যায় না,
বড় কাজের সাধনা তাে বহুদূরের কথা। গােপাল রূদ্ধ কণ্ঠে
কহিল, “আর কাজ করতে জীবনে সাধ নাই। যে জগতে
বিচার নাই, যে সংসারে সৎকার্য্যের পুরস্কার অভােগতি-বিড়ম্বনা
অসৎকার্যের পরিমাণ সম্পদ-সুখ-সম্ভোগ, সে জগতেসে
সংসারে আর কাজ করবার ইচ্ছা নাই। মনে হচ্ছে, সে সংসারে
এই ভারী জীবনটাকে বয়ে বেড়ানও মহা বিড়ম্বনা।
নয়নের ম্লান মুখে এতক্ষণে হাসির শুভ্র সমুজ্জল রেখা
সমুদ্ভাসিত হইল।
নয়ন স্বভাবসঙ্গত মৃদুহাশ্যে কহিল, “তুমি যে
বহু সময় বহুবার বলেছ, ভগবানের সেই অমৃতবাণ—
‘কণ্যে রাধিকারান্তে মা ফলেষু কদাচন।
বাস্তবিক জীবনের এতদিন কেটে গেল, এখন যদি ভগবানের
সােল এজেন্টকমলিনীসাহিত্য-মন্দির

s मझौ-मको সেই মহৎ বাণীর অর্থ প্রাণের মধ্যে না বুঝতে পারি, যদি সংসারের কর্মক্ষেত্রে এতটা ভূক্তভােগী হয়েও না অনুভব করতে পারি যে কর্মেই মানুষের অধিকার, অন্য অধিকার তার একটুও নাই, তবে এতদিন এ জীবনটা বয়ে বেড়ানই যে বৃথা হলাে। গােপাল, গভীর হৃদয়ের গভীর অন্তস্তল হইতে কহিল, “আর ফাকা মুখের ফাকা কথায় চিড়ে ভিজে না। আর আমি কিছুই বিশ্বাস করি না--কিছুই আর মানতে চাই না। ভগবান- ভগবানের রাজ্যে ধর্মাধর্ম কৰ্মকৰ্ম্ম বলে কিছু যে ভেদাভেদ আছে—পাপ পুণ্য বা পাপ পুণ্যের ফলাফল কিছু যে আছে, তা আর প্রাণ যেন কিছুতেই মানতে চায় না। নয়ন গােপালের মুখে আজ কথাটা শুনিয়া প্রাণে বড় ব্যথা পাইল। সে জানিত, গােপাল ভগবানে একান্ত বিশ্বাসী ভগবানের প্রতি একান্ত অনুরাগী। এমন বিরল বিশ্বাসী ভক্ত সাধ স্বামীর প্রাণে হঠাৎ কেন এ বিষম পরিবর্তন ঘটিল ! স্বর্গের পবিত্র শীতল বাতাসে কেন নরকের এমন বিকট পুতিগন্ধময় বায়ু বহিল ? এ কি হইল ! নয়ন আকুল হৃদয়ে সন্ধেহে নীরব-ভাবে ভগবানকে ডাকিল, প্রাণের ভাষে কহিল, “ভগবান, দয়া কর প্রভাে, এ ঘাের সঙ্কট হতে রক্ষা কর। ব্যাকুল কণ্ঠে স্বামীকে কহিল, “কেন, তুমি যে সকল সময় বলতে, ভগবানের পথ রহস্যময়। সাধু কেম্পিনের এ কথাটা তােমার জীবনের মুলমন্ত্র ছিল। আজ কোথা গেল স্বর্গের সে মহামন্ত্র ? গােপাল বিরকরে উত্তেজিত কণ্ঠে কহিল, “চুলােয় গেল সে ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা

০
পল্লী-লক্ষী
মন্ত্র-চুলােয় যা সে মন্ত্র। ম-ফয় সব মিছে। বক্ষ যেন বিদীর্ণ
করিয়াগােপালের মুখে বাহির হইল, ‘ভগবানের অস্তিত্বে আজ
আমার অবিশ্বাস হয়েছে-তার বিধানে আজ অভক্তি জন্মেছে।
নয়ন কহিল, “ছি ছি, অমন কথা আর মুখে এনাে না।
গােপাল উচ্চ কণ্ঠে সপষ্টে বজ্র নির্ঘোষে ক্ষিপ্তের ন্যায় বলিয়া
উঠিল, ‘আনবাে-শতবার সহবার আনবাে। নইলে তােমার
মত নিষ্কলঙ্ক চন্দ্রে কলঙ্ক, এও কি প্রাণে সহ হয় ? দুর্বিসহ
বিষাক্ত-ক্ষতে অমৃত প্রলেপের ন্যায় নয়ন সহাস্যে কহিল,
‘সহ সকল গুণের—সমূদয় শক্তির শ্রেষ্ঠ গুণ- শ্রেষ্ঠ শক্তি।
সহই সাধনা-সহই তপস্যা-সহই যােগ। সমগ্র গীতা, সাধনার
শ্রেষ্ঠ অঙ্গ, ধীর ভাবে, অচল অটল ভাবে-সহ্য করা। তাতেই
মানুষের মনুষত্ব বিকশিত হয়। দগ্ধ-সহিষ্ণুতাই মুখ্য সাধনা,
সেই বলেই মানুষ ধৈৰ্য্য বীৰ্য্যবান মহা মানুষ হয়ে থাকে, সেই
মানুষের নাম, লৌহমানব’ যাকে পাশ্চাত্যেরা আজকাল অতি-
মানব superman বলে ব্যাখ্যা করছে। এদেশে বহুকাল
পূর্বে ভগবান অতিমানবের গুঢ়তত্ত্ব বুঝিয়ে গেছেন। যােগী-
জনই অতিমানব। যােগ এ জগতে সুখ দুঃখের অতীত
মহাপুরুষ। তিনিই পরমানন্দের অধিকারী। একমাত্র স্থিতি
প্রজ্ঞ স্থিতিধমুনিই মহাপুরুষ-মহাযােগী । ভগবান তার স্বরূপ
লক্ষণ তুলে বলছেন :-
প্রজাহাতি যা কামান সন্ধান পার্থ মনােগন।
আত্মবােত্মনা তুষ্ট স্থিত-প্রজ্ঞ তদোচ্যতে ।
সােল এজেন্টকমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

, भली-नको ৮১ দুঃখখনুদ্বিগ্নমনা সুখে বিগত শৃহ। বীতরাগে ভয়ক্রোধ স্থিতিধী মুনিরুচ্যতে। গােপাল মুগ্ধনেত্রে দেখিল—তাহাদের সম্মুখ হইতে জগদ্ধাত্রী মূর্তি তিরােহিত হইয়াছে, তাহার স্থলে বীণাপাণি ভারতী মূর্তি আবির্ভূত হইয়া তাহাকে হন্তে বিনামৃত বিতরণ করিতেছেন। গােপাল বিস্ময়ে কৌতুহলে অভিভূত হইয়া সাক্ষাৎ ভারতীর সম্মুখে নীরবে-নিস্তব্ধভাবে দাড়াইয়া রহিল। ক্ষণকাল গােপাল আত্মসম্বরণ করিয়া কহিল, নয়ন, সত্যই তুমি স্বর্গের দেবী, তুমি যথার্থই বৈকুণ্ঠের লক্ষ্মীরূপিণী । আমার বহু পুণ্য ফলে—আমার বহু জন্মের তপস্যা আর মহৎ সৌভাগ্য ফলে তুমি মর্তলােকে এসে আমার মত দীন হীনের কুটির আলােকিত করেছ। আমি বুঝলেম, তুমি স্বয়ং বাগদেবী- তুমি সাক্ষাৎ সীতারূপিণী। তােমার মত রমণী-রত্ব যে পুণ্যবান, যে ভাগ্যবান লাভ করে, তার আর অভাব কি-তার আবার দুঃখ যন্ত্রণাই বা কি? এই বলিয়া গােপাল মুগ্ধনেত্রে নয়নের অপার্থিব সৌন্দৰ্য- মণ্ডিত মূখপানে চাহিয়া রহিল। চাহিতে চাহিতে গােপালের মতিভ্রম ঘটিল। উচ্চকণ্ঠে চীৎকার করিয়া গােপাল কহিল, ‘নয়ন, তােমার মত দেবীর অতি শুভ্র অতি পবিত্র নামে কলঙ্ক! এও কি প্রাণে সহ্য হয় ? না না, এ সহ্য হয় না- কখনই না! প্রাণ থাকতে এ সহ হয় না। এর প্রতিশােধ পূর্ণরূপে নিতে পারি তাে এ জীবন রাখবে, নইলে'—এই বলিয়া ১১৪ নং জাহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

পল্লী-লক্ষী
গােপাল ক্ষিপ্তের ন্যায় দ্রুতপদে গৃহ হইতে প্রস্থান করিল।
উৎকণ্ঠিতপ্রাণে নয়ন শয্যায় শায়িত উষার পার্শ্বে আসিয়া
বসিল।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
উষা বয়স্থা। উষা প্রায় তের চৌদ্দ বর্ষ বয়ক্রম অতিক্রম
করিয়া পঞ্চদশে পদার্পণের উপক্রম করিয়াছে। কমল-কলিকা
পূর্ণাঙ্গ বিকাশােখ—এয়ােদশীর শশধর-পূর্ণিমার পানে
প্ৰধাবিতা।
নয়ন কন্যার পার্শ্বে বসিয়া ডাকিল, উযা! উষা উত্তর
করিতে পারিল না-নীরবে রহিল। মা দেখিল, মেয়ের চক্ষের
জলে বালিস ভিজিয়া গিয়াছে। উষা তখনও শয্যায় পড়িয়া
নীরবে রােদন করিতেছিল। মা একবার দুইবার তিনবার
মেয়েকে ডাকিল, মেয়ে আর স্থির থাকিতে পারিল না,
বালিকার ন্যার কাদিয়া মায়ের পা-দুখানি জড়াইয়া ধরিল ।
ভগ্নকণ্ঠে ভগ্ন-ভাষে কহিল, “মা, চলাে, আর আমরা এখানে
থাকব নালােকপুরে আর মানুষের থাকতে নাই। গা এখন
শিয়াল কুকুরের বাসা হয়েছে।
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী
নয়ন দেখিল, বড় সঙ্কট। চারিদিকেই মহা সঙ্কট। গাঁয়ে
নানা কথা নানা লােকের মুখে-ঘরে স্বামী উম্মত্তের ন্যায়-কন্যা
মৃতপ্রায়—ঘরে বাহিরে বিপদ! এখন এ অবস্থায় কোথা যাই,
কি করি! নয়ন ভাবিয়া ভাবিয়া বুঝিল, এ সময় বড় ধৈৰ্য্য ধরিতে
হইবে—বড় কঠিন হইতে হইবে। কোমলে কঠোরে মিশিয়া
এক অপূৰ্ব্ব মূর্তি আজ নয়ন ধারণ করিল। নয়ন ধীর গম্ভীর স্বরে
কঠোর কণ্ঠে কহিল, “উষা, তুই তাে এখন আর কচি মেয়ে নস।
ছিঃ, অমন ছেলেমি করােনা। কিসের ভাবনা ? কান্না কেন?
তুই তাে জানিস—তুই তাে বল্লি বাছা, গাঁ এখন শিয়াল কুকুরের
বাসা। শিয়াল কুকুরের কথায় কি এসে যায় মা?' ঊষা দিতে
কঁদিতে কহিল, “না মা, তাদের কথা ধরি না, এখানে
আমার বড় ভয় করছে। আজ বড় ভয়ের কথা শুনেছি।
নয়ন ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, ‘কি কথা?
পাছে মা ভয় পায় বলিয়া কথাটা বলিতে উষা ইতঃস্তত
করিতে লাগিল। মনে মনে বলিতে লাগিল, কথাটা এখনি বলি
কি না। মায়ের কাছে এখনই বলি, কিম্বা বাবা আসিলে
সকলের কাছে বলি। এই ভাবিয়া উষা নীরবে বসিয়া রহিল।
কিছুক্ষণ পরে গােপাল হাসিমুখে ঘরে ফিরিয়া আসিল। পতির
হাসিমুখ দেখিয়া নয়ন সশরীরে স্বর্গের সিড়িতে পদার্পণ করিল।
গােপালের এমন হাসিভরা মুখখানি নয়ন কিছুদিন হইতে
দেখিতে পায় নাই। বহুক্ষণ পরে তৃষিতা-চাতকিনী-নবীন মেঘ
দেখিয়া আন-নীরে ভাসিতে লাগিল। গােপাল আসিয়া
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

কহিল,, এতক্ষণে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম, বুকের বােঝাপাথর
নেমে গেল।
নয়ন কহিল, “কেন হ’লল কি? হঠাৎ এমন কি স্বর্গ
ধরে ফেল্পে যে, সকল দুঃখ-সকল যন্ত্রণা জুড়িয়ে গেল, ব্যাপার
কি?
গােপাল কহিল, ‘শিরােমণি মহাশয়ের কাছে গেছলুম।
নন:••তারপর ?
গােপালতারপর বল্লেন, কোন চিন্তা নেই। আমি
তত তােমায় জানি, তােমার খবরও সব রাখি, বাজে লােকের
বাজে কথায় তুমি মন খারাপ করেন। জনা চাটুষ্যেকে--তার
দলবলকে এ অঞ্চলে না জানে কে-না চিনে কে ? তুমি
স্বর্গ—তারা নরক। তারা কি তােমায় ছুঁতে সাহস করতে পারে
গােপাল?
ঊষা কলিল, “বাবা, ওসব কথা শুনােনা। এখানে কাউকে
আর বিশ্বাস নেই।
গােপাল দৃঢ় স্বরে কহিল, “সে কি! কি বলিস উষা?
শিরােমণি মহাশয় কি মানুষ? তিনি যে দেবতা-দেবতা কি,
আমি তাে বলি, তিনি স্বয়ং ভগবানের অবতার। তাঁর কথা
বিশ্বাস করব না, তার কথা মানব না তত কাকে মানবব--
কার কথা নববা মা ?
উষা দিতে দিতে কহিল, “আমি হর-পিসির কাছে
শুনলুম, জনা চাটুষ্যে এক ভয়ানক ডাকাতের দল তৈরি
সােল এজেন্ট—কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

को
করেছে, সে ডাকাতের দল নিয়ে আমাদের বাড়ী ডাকাতি
করবে।
গােপাল হাসিয়া কহিল, ‘কি জন্য ডাকাতি করবে, আমাদের
কি আছে? টাকা কড়ি গহনা-পাতি থাকলে সেই লােভে
ডাকাতি করে। আমাদের তাে টাকা কড়ি গহনা-পাতি কিছুই
নেই, কি জ ডাকাতেরা আসবে?
উষা কহিল, ‘শত্রু কি কেবল টাকা নিতে আসে ? তােমার
যে পায়-পায় শত্রু বাবা? তােমার টাকা না পেলেও জীবন নিতে
পারে তাে।
গােপাল ঊষার কথা শুনিয়া একটু হাসিল। নয়নের প্রাণ
চমকাইয়া উঠিল-মুখ শুকাইয়া গেল। গােপালের মুখে হাসি
দেখিয়া নয়ন মনে মনে বিরক্ত হইল। নয়ন বিরক্ত কঠে
কহিল, ‘তােমার সবই অগ্রাহ। তুমি কিছু গ্রাহ্য করতে চাও
। বিপদ ঘটতে বেশীক্ষণ লাগে না। ভগবান রক্ষা করছেন।
তাই এমন জায়গায় আজও প্রাণে বেঁচে আছি।
গােপাল হাসিয়া কহিল, “কথাটা সকল সময় মুখে বল, কাজে
দেখাতে পার কৈ? রাখে হরি মারে কে,মারে হরি রাখে কে!
—কথাটা কতদিন কতবার তােমার মুখে শুনতে পাই।
কথাটা কাজে দেখাও, নইলে ফাকা-মুখের কঁকা-কথার
দাম কি?
নয়ন গােপালের কথার ঠিক উত্তর খুঁজিয়া পাইল না?
বাস্তবিক সে মনে প্রাণে বুঝিত ও বিশ্বাস করিত যে, ভগবান
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

পত্নী-লক্ষী যাহা করিবেন তাহাই হইবে, তাহা রদ করে এমন কলি-জগতে আর কিছুই নাই। এইটা নয়নের প্রাণের ধারণা—হৃদয়ের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস লইয়াই নয়ন নিতান্ত ভারাক্রান্ত প্রাণটাকে বহিয়া গােপালের আঁধারময় কুটীর আলাে করিয়া রহিয়াছে। গােপাল হাসিয়া কহিল, ‘যে দিন দুনিয়ার মালিক বুঝবেন, এ জীবনটাকে এ সংসারে রাখবার আর দরকার নাই, সেদিন তিনি নিশ্চয়ই এটাকে টেনে নেবেন। সে জন্য তােমার আমার ভাবনা নিস্ফল, তুমি আর ভেবােনা। তুমি আমি ভাবনা-সাগরে ডুবে মলে মেয়েটার উপায় হবে কি? দেখছ কি ঊষার দশা কি হয়েছে। দিন দিন সে যে শুকিয়ে উঠছে। নয়ন দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া কহিল, “উষার বােধ হয় অসুখ হয়েছে। রেতে ওর গা’টা গরম বলে আমার বােধ হয়েছিল। ঊষা কহিল, “না না, আমার গাটা কিছু গরম হয়নি। বড় বিষম স্বপ্ন দেখেছিলাম, ভয়ে আমার প্রাণ কঁপতে লাগলাে। আমার দেহটা যেমন জল হয়ে গেল। গােপাল উৎকণ্ঠিত প্রাণে জিজ্ঞাসা করিল, “কি স্বপ্ন দেখেছিলে উষা ! উষা ব্যাকুল কণ্ঠে কহিল,‘সে কথা তােমার শুনে কাজ নেই বাবা। গােপাল ছাড়িল না, জেদ করিয়া কহিল, “না মা, সে আমি কিছুতেই ছাড়ব না। স্বপ্নের কথাটা তােমায় বলতেই হবে। উষা অগত্যা কহিল, “বড় ভয়ানক স্বপ্ন বাবা, এমন স্বপ্ন আমি জীবনে কখন দেখিনি। আমার মনে হল, জনা-জলন্ত মশান থেকে আমাদের বাড়ী এলাে। মনের আগুন জলতে জ্বলতে সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির ।

পল্লী-লক্ষী জনার মত চেহারা হলাে, তারপর হাজার হাজার মানুষ জলন্ত- জনা হয়ে উঠলাে, তারা সকলের ঘরের চালে আগুন হয়ে-হয়ে ঘুরতে লাগলাে। গা-ময় আগুন—দেশময় আগুন—চারি দিকে আগুন হু হু জলতে লাগলাে। চারিদিকে বেড়া-আগুন, কোথাও পালাবার পথ নেই। তারপর আকাশ থেকে আগুন নেবে এসে মাকে তুলে নিয়ে গেল। বাবা, তুমি আমি কেবল সেই আগুনের মধ্যে পড়ে রইলুম। তারপর গা আগুনে জ্বলতে লাগলাে।' বলিতে বলিতে উষা কপিতে লাগিল, তাহার মখে আর কথা বাহির হইল না। গােপাল, প্রবােধ দিবার জন্য মেয়ের মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে কহিল, আর ওসব কথা মনে করােনা। স্বপ্নের কথা সব মিথ্যে। মিথ্যে ভাবনা ভেবাে না, এস আমরা ওঘরে গিয়ে গান করি।' গােপাল উষার হাত ধরিয়া বাহিরের ঘরে যাইয়া উষার হাতে হারমনিয়ম দিল,পরে পিতা পুত্ৰীতে গান গাহিতে লাগিল। ঊষা গানের সঙ্গে হারমনিয়ম বাজাইতে আরম্ভ করিল। গােপাল পত্নী ও কন্যাকে যেমন লেখাপড়া শিখাইত তেমনি তাহা দিগকে লইয়া সঙ্গীতেরও অনুশীলন করিত। কেবল নিজের ঘরে নয়, বাহিরে বাগীদিগের পাড়ায়ও সে লেখাপড়ার সঙ্গে গহনা-বাজনার শিক্ষা দান করিত। এই কারণে তাহার শিক্ষা নিম্নশ্রেণীর মধ্যে বড় আমােদর জিনিষ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। ১১৪ নং আহিরীটোলা ষ্ট্রীট, কলিকাতা।

.
भदौम्मको
stry
এয়ােদশ পরিচ্ছেদ
লােকপুর গায়ে খুব গুজব উঠিল, গােপালের ঘরে সত্ত্বর
ডাকাত পড়িবে। জনা যেরূপ সাহসে বলে বলিয়ানকূট
বুদ্ধিতে তেমনি হীন, দুর্বল। তাহার বুদ্ধির বিড়ম্বনায়, পরামর্শের
দোষে কথাটা বাহির ও জাহির হইয়া পড়িল। দেশের সকলেই
জনাকে ও তাহার দলবলকে জানিত। বিশেষতঃ হরিষবাবুর
মাতৃদ্ধ উপলক্ষে জনার্দন কর্তৃক যে একটা বিরাট গণ্ডগােল
বটিয়াছিল, তাহাতে লােক-পুর সমাজের অনেকেই জনাকে
চিনিয়াছিল। জনাই যে একজন যে সে লােক নহে, এই
বিশ্বাস হৃদয়ে ধরিয়া সেদিন বহু লােক ঘরে ফিরিয়াছিল।
লােকপুরঅঞ্চলে বহু স্ত্রী পুরুষ সেদিন হরিষবাবুর বাটীতে
উপস্থিত হইয়াছিল। স্ত্রীলােকদিগের অনেকেই মনে করিয়া-
ছিল, জনা চাটুয্যে মনে করলে অনায়াসে রাজার রাজত্ব
ঘুচাইয়া দিতে বা কাড়িয়া লইতে পারে। যাদব শিরােমণি মহা-
শয়ের মধ্যস্থতায় ও গােপালের আপনার সৎগুণে ও সদাশয়তায়
বিশেষতঃ হরিবাবুর মুখ চাহিয়া সেদিনে ভােজের ব্যাপারে বিশেষ
কোন গােলযােগ ঘটে নাই এবং দলাদলির প্রসঙ্গে জনা-ই পরাজয়
ঘটিয়াছিল, তথাপি উপস্থিত লােকদিগের মধ্যে অনেকই মনে
মনে বুঝিয়াছিল,জনা একজন অসাধারণ সাহসী ও বলবান পুরুষ।
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পল্লী-সনী স্ত্রীলােকদিগের মধ্যে অনেকেই মুক্তকণ্ঠে ব্যক্ত করিয়াছিল, জনা- চাটুযয্য সত্যিই কলির ভীম। অনেকেই কহিতে লাগিল,জনার্দনের দুই আঙ্গুল পরিমাণ লাঙ্গুল কেহ কেহ নাকি চক্ষে দেখিয়াছে। জনা যথার্থ ই হনুমানের অবতার বিশেষ কেহ বলিতে লাগিল, জনাকে লাঠির ভর করিয়া লাফাইয়া দু'তলার উপরিস্থ ছাদে উঠিতে অনেকে দেখিয়াছে। কেহ কহিল, জনা পিশাচ-সিদ্ধ। সে অমা- বস্তায় শনি মঙ্গলবারের রাত্রিকালে শ্মশানে যাইয়া মড়া জাগাইয়া তাহার সহিত কথা কয়। এইরূপ জনা সম্বন্ধে নানাজনে নানা কথা কহিতে লাগিল। ফলে জনা দেশমধ্যে অচিরেই একজন অতি প্রসিদ্ধ ব্যক্তি বলিয়া পরিচিত ও প্রচারিত হইয়া উঠিল। দেশের বহু বদমায়েস-যাহাদের চুরি জুয়াচুরি ভিন্ন উদরায় সংস্থানের আর উপায়ান্তর নাই, তাহারা অনেকেই জনার্দনের বিজয় নিশানের তলে আসিয়া আশ্রয় লইল। জনার্দনের দল বিলক্ষণ পুষ্টি লাভ করিল। জনার্দন মনে করিল, এখন সে শিখ- পাহারা-পরিবেষ্টিত ধনবান হরিবাবুর বাড়ী পর্যন্ত অনায়াসে লুট-দরাজ করিতে সক্ষম। জনা কতকগুলি লােক লইয়া রজনীর ঘরে আসিয়া উপস্থিত হইল, তখন রাত্রি প্রায় দুই প্রহর। আকাশ মেঘাবৃত, গাঢ় যন অন্ধকারে ভীষণ রাত্রিটা যেন বিষম ভারাক্রান্ত ও স্তম্ভিত হইয়া নীরবে ঠিক একই জায়গায় নিশ্চল অবস্থায় দাড়াইয়া রহিয়াছে। জনার দলের লােকের পদশকে ও নিশ্বাসে রাত্রির গভীর নিস্তব্ধতা ভাঙ্গিয়া গেল। বৃক্ষশাখে পক্ষী সকল ব্যাকুলকণ্ঠে ডাকিয়া উঠিল ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

১০
লক্ষী
১; ২ জন
একটা পেচক ঘনাবৃত পত্রের মধ্য হইতে ধূ ধূ রবে গভীর ডাক
ছাড়িল। রজনী তখন গাঢ় নিদ্রায় নিমগ্না। নিদ্রার ঘােরে তাহার
কিছু সংজ্ঞা ছিল না। রাত্রির নিস্তব্ধতা ভঙ্গের সহিত তাহার
নিদ্রা ভাঙ্গিয়া গেল। জন তাহার দ্বারে আঘাত করিয়া ডাকিল,
-“রজনী, ও রজনী?' রজনী ঘুমের ঘােরে জনার কণ্ঠস্বর ভাল
বুঝিতে পারিল না, বলিল, কে ?
জনা কহিল, ‘চিন্তে পাচ্ছ না, আমি গােপাল বােস। রজনী
তাড়াতাড়ি দুয়ার খুলিল । দুয়ার খুলিয়া দেশলাই জ্বালাইয়া
প্রদীপ ধরাইল।
জনা সদলে রজনীর গৃহমধ্যে আসিয়া তাপপাষে বসিল।
ঘরের মধ্যে হুকা, কলিকা, তামাক, টাকা সকলই ছিল, জন।
কহিল, “মা শালা মড়ার মত চুপ করে বসে রইলি কেন?
তামাক সাজ না। রমা জনার পূর্বপরিচিত জনৈক বদমায়েস,
রমাই জনার হুকুম তামিল করিতে প্রবৃত্ত হইল। তামাক সাজিয়া
রমাই জনার হাতে হুকা দিল, জনা তখন গাজার নেশায় চক্ষু
লাল করিয়াছিল। তামাক সেবন করিয়া জনাই রজনীর দিকে
চাহিয়া কহিল, “আর দেরি করলে সব কাজ পণ্ড হবে।' রজনী
কুটী করিয়া কহিল,“আমি কি দেরী করতে বলছি? গোপালের
সর্বনাশ যেদিন দেখব, সেদিন থেকে চার-গাঁয়ে বুক ফুলিয়ে
বেড়াব’ বলিয়া একটু থামিয়া স্বর গাঢ় করিয়া পুনরায় বলিল,
ততাদের দিয়ে কি আমার সে দিন আসবে ; তােরা মেয়েমানুষের
অধম। তা নইলে গােপাল বােসের দামড়া-মেয়ে, নিশ্চিন্তে
সােল এজেন্ট.কমলিনীসাহিত্য-মন্দির

১১
পল্লীলমী
বাবাে-গাঁয়ে খেয়ে পরে বেড়াচ্ছে! বলিয়া বাপাকূল নয়ন
অঞ্চল দিয়া ঢাকিল।
জনাই রজনীর হাতে ধরিয়া কহিল, “কাদিসনে ভাই, তাের
জনাই থাকতে ভাবনা কিসের! এ কি গােপাল বােস! তুই
একটু সহায় হ’ ত, দেখি একবার ব্যাটা কোথায় যায়? রজনী
সােজা হইয়া বসিয়া কহিল, “আমি সহায় না হলে এতদিন তুই
কোথায় থাকতিস জানিস!
জনাই কহিল, “থাক ওসব কথা পরে হবে।
পরে উভয়ে অনেক রাত্র পর্যন্ত যে সমস্ত পরামর্শ করিল,
তাহার উল্লেখ নিষ্প্রয়ােজন।
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
সেদিন প্রভাতে পূজা অর্চনা সমাপন করিয়া নয়ন বৌ সবে
মাত্র রান্নাঘরে প্রবেশ করিয়াছে, এমন সময় প্রবােধ,—বৌদিদি
কোথায়’ বলিয়া অন্দরের প্রাঙ্গণে আসিয়া দাড়াইল ।
নয়ন বৌ এ্যস্ত মস্তকে অঞ্চল টানিতে টানিতে পাকশালার
বাহিরে আসিয়া সহাস্য আননে কহিল, “ঠাকুরপাে যে! এতদিনে
মনে পড়ল বৌদিদিকে?
“তােমাদের ভুলে যাব বৌদিদি বলিয়া নিকটে আসিয়া
তাঁহার পদধুলি গ্রহণ করিয়া কহিল, “তারপর, কেমন আছ
বৌদিদি, খবর ভাল ত?
১১৪নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

নয়ন বৌ স্নানমুখে কহিল, ‘খবর আর মন্দ বলি কি করে।
ভগবান যা করেন সবই ত’ আমাদের ভালর জন্য। কাজেই
খবর খারাপ বলতে পারি না। বলিয়া শুষ্ক হাসি হাসিলেন।
প্রবােধ কহিল, ‘তােমার মত বৌদি’র উপযুক্ত কথা। ঊষা
কোথায়, সে কেমন আছে? নয়ন বৌ বলিল, সে বােধ
হয় স্নান করতে গেছে, উষা! ও উষা—তাের কাকা এসেছে
রে, এদিকে আয়। নয়ন কহিল, “ঠাকুরপাের এবার ক'দিন
থাকা হবে? শরীরটাকে ত’ অর্ধেক করে এসেছ।'
প্রবােধ হাসিয়া কহিল, “তােমরা পৃথিবীর কোন আপনার
লােককে কখনও মােটা দেখলে না। এবারে থাকব বােধ হয়
একমাস! আচ্ছা, যাবার আগে তােমাকে দিয়ে বলিয়ে নেব যে,
আমি মােটা হয়েছি’,বলিয়া হাসিতে লাগিল। এমন সময়ে গােপাল
রাত্রি-জাগরণ-ক্লান্ত শুষ্ক রুক্ষ মূর্তী লইয়া অন্দরে প্রবেশ করিয়া
সম্মুখে প্রবােধকে দেখিয়া বিস্মিত কণ্ঠে কহিল, এই যে
প্রবােধ, কখন এলে ভাই! তােমার কথাই ভাবতে ভাবতে
আসছিলাম। প্রবােধ কহিল, ‘তােমার এ মুর্তী কেন? কোথাও
মড়া পােড়াতে গিয়েছিলে? গােপাল কহিল, “না গাে না, ও
পাড়ার বসুদের বড় ছেলের কাল রাত্রি থেকে কলেরা, সেই
খানেই সারারাত্রি তার শুশ্রুষা করে তাকে সম্পূর্ণ নিরাপদাবস্থায়
দেখে এখন ফিরছি।' বলিয়া মূহুর্তেক থামিয়া বলিল, ‘প্রবােধ,
তােমার সঙ্গে বিশেষ গােপনীয় কথা আছে, যাবার সময় দেখা
করে যেও।' বলিয়া পরের দিকে চলিল।
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

১৩
भद्रो-मको
নয়নবো প্রবােধকে কহিল, “আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে?
এস, এখানে বস।' বলিয়া সেখানে একখানা আসন পাতিয়া
দিল। এবােধ বসিয়া কহিল, দেশের খবর কি বৌদি? নয়ন বৌ
শুষ্ক হাসি হাসিয়া কহিল, ‘দেশের খবর কি তা তােমার বৌদিদি
গ্রামের এক কোনে বসে কিছুই জানতে পারে না।
গ্রামের খবর যথাপূৰ্ব্বম্। তারপর যা কিছু, ওঁর কাছে শুননা।
‘কিছু কিছু শুনেছি সেই শ্রাদ্ধের সময়ে জনার কীর্তি।
বৌদিদি, এ আমি তােমায় বলে রাখলুম, আমি একটু সুবিধে
পেলেই বেটাদের বদমাইসির ইতি করব।
ভগবানের ইচ্ছে থাকলে সে সুবিধে মিলতে কষ্ট হবে না।
থাক সে কথা, এখন মেয়েটার একটা বিয়ে না দিতে পারলে
অন্য আর কোন কথা মনে আনতে পারি না। যে সমাজ,
সমাজের নিয়ম না মানলে চলবে না ঠাকুরপাে। সমাজ যে
চায় এই বয়সে কিম্বা এর আগেই মেয়েদের পাত্রস্থ করা।
আমি যদি না করি, না পারি, সমাজ যে রাগ করবে সেটা
অন্যায় নয়। যে ক'রে হােক, এমাসে না হয় ওমাসে উষার
বিয়ে আমি দেবােই এ তােমায় বলে রাখলুম। এরূপ সময়ে
সদরগৃহ হইতে গােপাল ডাকিল, ‘প্রবােধ, বৌদিদির কাছ
থেকে দুর্গ নিয়ে একবার এদিকে এস। নয়নবৌ মৃদু হাসিয়া
কহিল, “যাও যাও ঠাকুরপাে, ওনার আর তর সইছে না।'
প্রবােধ উঠিয়া ধীরে ধীরে সদরের দিকে চলিল। এবােধ ঘরে
প্রবেশ করিতেই গােপাল কহিল, “বসাে, তােমার সঙ্গে একটা
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা

s, , , ,
১ঃ
পী-লক্ষী
পামর্শ আছে। প্রবােধ গােপালের নিকট উপবিষ্ট হইয়া
কহিল, “কেন বল ত? ব্যাপার কি?
গােপাল বলিতে লাগিল, “তুমি বােধ হয় জান, নানা কারণে
জনাই আমাদের নানা রকমে বিপদগ্রস্ত করবার চেষ্টা করছে।
* সে যে রকম ভীষণ প্রকৃতির লােক, তাতে একটা কিছু করা
তার পক্ষে অসম্ভব নয়, তার লােকবলও যথেষ্ট।
কাল রাত্রে
কলু-বাড়ীতে রােগের জন্য গিয়েছিলাম, মাঝরাত্রে একবার
ডাক্তার ডাকবার প্রয়ােজন হয়। ডাক্তারবাড়ী যাবার সময়
দরজা দিয়ে যখন যাই, তখন সেখানে জনাইকে দেখে আমার
সন্দেহ হয়। আমি আড়ালে থেকে শুলাম, আমার বাড়ী ডাকাতি
করি এবং আগুন লাগাবার পরামর্শ হচ্ছে। আজ রাত্রেই
তারা তাদের কার্যসিদ্ধি করবে ঠিক করেছে। এখন বল কি
করি।”
প্রবােধ স্থির চিত্তে গম্ভীর ভাবে কহিল, “জনাই বেটা যে
ক বড় পাজি তা আমি জানি। আচ্ছা, দেখা যাক তার বুদ্ধির
কত বড় দৌড়। দেখ গােপাল, এখানকার যে দারােগা, সে
আমার পরম বন্ধু। কলেজের বন্ধু হলেও এখনাে সে আমার
খাতির রাখে। আমি গিয়ে তাকে সব কথা খুলে বলি, সে
আমার সাহায্য করবেই আর তার করাও উচিৎ। তারপর
কতদূর
কি করতে পারি দেখা যাক।' বলিয়া উঠিয়া পড়িল।
সেদিন অপরাহ্নে নয়ন বৌ আপনার গৃহে বসিয়া রামায়ণ
পাঠ করিতেছিল। উঠি উঠি করিয়াও কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড সমাপ্ত
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য মন্দির

পত্নী-লক্ষী করিয়া উঠিতে পারিতেছিল না। এরূপ সময়ে উষা গৃহে প্রবেশ করিয়া কহিল, “মা, তােমায় ডাকছে। নয়ন বৌ পুস্তকের পৃষ্ঠা হইতে মুখ তুলিয়া কহিল, “কে মা? তাহার কথা শেষ হইতেই বিজন গৃহে প্রবেশ করিয়া তাহার পদধূলি গ্রহণ করিয়া কহিল, “মা, আমি কাল কলকাতায় চলে যাব, তাই আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। নয়ন বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “সে কি বাবা, হঠাৎ তুমি দেশ ছেড়ে কলকাতায় যাবে কেন? বিজন নতমুখে স্তব্ধভাবে দাঁড়াইয়া রহিল। নয়ন পুস্তকখানি মুড়িয়া উযাকে কহিল, “মা, বিজনকে একটা আসন এনে দাও। উষা আসনখানি আনিলে নয়ন বৌ বিজনকে কহিলেন, ‘বােসস বাবা, বােসস। বিজন বসিলে নয়ন বৌ কহিলেন, হঠাৎ তােমার চলে বার কারণ বুঝতে পারছি না বাবা। বিজন ধীরে ধীরে কহিল, “মা, আমার জন্যেই আপনাদের এই লাঞ্ছনা। ঊষা ধীরে ধীরে সেস্থান হইতে প্রস্থান করিল। নয়ন বৌ বিস্মিত হইয়া উত্তর করিল, “আমাদের লাঞ্ছনা তােমার জন্যে ? ছি ছি, ও কথা বলল না বাবা। সুখ-দুঃখ, মান- অপমান লাইনা এ যে দেবার :তিনিই দেন, তবে ভাল এবং মন এই দু'টোর মধ্যেই তার শুভ ইচ্ছা দেখতে পেলেই ভাবনা চিন্তা কষ্টের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। ১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

ত
পল্লী-লক্ষী
আমাদের এই অপমান লানা যে মঙ্গলের জয়ে নয়, তা
তােমায় কে বল্পে? তবে তুমি এ জন্যে কেন দুঃখ পাও আর
নিজেকেই বা এর কারণ বলে ভেবে কষ্ট পাচ্ছ কেন?
বিজন রুদ্ধ কণ্ঠে কহিল, কিন্তু লােকে যে বলে।
নয়ন বৌ মৃদু হাসিয়া কহিল, 'যে লােকেরা বলে, তারা
দুশ্চরিত্র, ইতর, এ জেনেও যারা তাদের কথা অগ্রাহ্য করতে
পারে না, তারা ঠিক পুরুষের মত কাজ করে না বাবা, আর
তুমি নিজেকে বেশ জান, তােমাকেও আমার ভাল করে জানি।
কোন দিক দিয়েই ত’ তােমার কোন কষ্টের কারণ থাকতে
পারে না। দেশ ছেড়ে মিথ্যা বিদেশ যাবার অনর্থক কল্পনা
ছেড়ে দাও—তােমরাই ত’
দেশের ভরসা। দেশ থেকে
দেশের এবং সঙ্গে সঙ্গে দশের সেবাই যে তােমাদের ধর্ম। কথায়
কথায় দেশ ছেড়ে যাওয়া আর আত্মহত্যা এ দুই-ই সমান।
দেশের কথা কয়টি নয়ন বৌ একটু জোর করিয়াই
বলিয়াছিল, “কে আত্মহত্যা করলে আবার বৌদি বলিতে
বলিতে প্রবােধ উঠান হইতে বারান্দায় উঠিল এবং যে ঘরে
নয়ন বৌ বসিয়াছিল, তাহার সম্মুখে আসিয়া বিজনকে
দেখিয়াই কহিল, “বিজন যে রে! বিজন আসন ছাড়িয়া
উঠিয়া দাড়াইল, কহিল, “বন প্রবােধ কাকা! প্রবােধ আসন
গ্রহণ করিয়া কহিল, “হাঁ, আত্মহত্যার কথা কি বলছিলে?
নয়ন বৌ.মৃদু হাসিয়া কহিল, “বলছিলুম, তুমি আত্মহত্যা
করেছ। প্রবােধ বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে কহিল, “আমি!
সােল এজেন্ট কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

এখন
भली-नको
‘হ্যা গাে হ্যা, তুমি। বিজনকে বলছিলাম, দেশ ছেড়ে বারা
অনর্থক বিদেশে যায়, তারা আত্মহত্যা করে। প্রবােধ উচ্চ
হাসিয়া কহিল, “ওঃ, এই ? পরে গম্ভীর হইয়া কহিল, “কিন্তু কি
করি বলুন। পেটকে ত’ আপনারাই বলেন বড় বালাই।
যাক, এই নিয়ে পরে একদিন আপনার সঙ্গে কথা হবে।
বলুন, গােপাল-দা কোথায়।
নয়ন বৌ কহিল, “উনি বােধ হয় ঘটকের সঙ্গে ও-পাড়ায়
গেছেন। আসতে সন্ধ্যে হবে নিশ্চয়ই।
প্রবােধ কহিল, “ওঃ, বটে। আচ্ছা, সন্ধ্যের সময়ই এসে
দেখা করবে অখন? তা হলে আমি বৌদি বলিয়া প্রবােধ
প্রস্থান করিল।
তখন সবে মাত্র সন্ধ্যা হইয়াছে, নয়ন বৌ সংসারের কাজ
সারিয়া, তুলসী-তলায় গঙ্গাজল ও আলাে দিতেছিল।
সময় গৃহ-প্রাঙ্গণে প্রবােধ প্রবেশ করিল। বাহিরের বারানায়
একথানি মাদুরের উপর গা এলাইয়া দিয়া গােপাল বিশ্রাম
করিতেছিল, প্ৰবােধকে আসিতে দেখিয়া কহিল, ‘এস, ভাই
প্রবােধ বারান্দায় উঠিয়া মাদুরের এক পাশে বসিয়া কহিল,
কতক্ষণ এলে?
গােপাল কহিল, “এই ত, এইমাত্র এলুম। তারপর
এদিকের তুমি কি করলে?
এবােধ কহিল, “আমি এদিকের সব ঠিক করেছি। আজ
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

Sbe
পল্লী-লক্ষী
।
সকালে দারােগাকে গিয়ে সব খুলে বলেছি, তিনি যতদূর
করবার করবেন, সেজন্য তুমি ভেবাে না। আমি খাওয়া-দাওয়া
সেরে এখানে এসে আজ শােবাে ! দারােগা--পুলিশ-পাহারা
নিয়ে গুগবেশে আসে-পাশে লুকিয়ে থাকবে। বেটারা আজ
যদি এদিকে আসে ত’ নিস্তার নেই জেনাে।
গােপাল কহিল, ‘নিজের জন্য কখন ভাবিনি ভাই, কারণ,
চিরদিনই জানি, ভগবান রক্ষে করলে মানুষের সাধ্য নেই
কাউকে বিপদে ফেলে, কিন্তু ভাবনা যত মেয়েদের নিয়ে।
কারণ, কতকগুলাে লক্ষ্মীছাড়া ইতর-সমাজের দোহাই দিয়ে
মিথ্যা আচারের ভান দেখিয়ে–নিরীহ নারীদের কি লাঞ্চনাই
না করে-তার যে কোন প্রতীকার নেই।
প্রবােধ কহিল, সে কথা পরে হবে, এখন আসন্ন বিপদের
জন্য প্রস্তুত থাকে, সেই কথাই বলতে এলাম। আমি যাই,
খাওয়া দাওয়া সেরে আসছি' বলিয়া সে প্রস্থান করিল।
নয়ন বৌ ধীরে ধীরে গােপালের নিকটে আসিয়া কহিল,
‘তােমাদের এত পরামর্শ কিসের?
‘পরামর্শ একটু ছিল, সে তােমার শুনে কাজ নেই।' বলিয়া
গােপাল চিন্তিত মনে অন্যদিকে চাহিয়া রহিল।
নয়ন বৌ কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া কহিল, ‘ও-পাড়ায় যে
গেলে, তার কি হল ?
‘কই, কিছুই হলাে না। একবার দেখে আসা দরকার বলেই
ঘটকের সঙ্গে গিয়েছিলাম।
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পল্লীগী
কয়েক মুহূর্ত মৌন থাকিয়া সে কহিল, এ তােমায় বলে
রাখছি নয়ন, উপযুক্ত পাত্ৰ ছাড়া, উষাকে আমি বিয়ে দিতে
পারব না।
নয়ন বৌ মৃদুকণ্ঠে ধীরে ধীরে কহিল, “দেখ, তােমাকে
একটা কথা জিজ্ঞেস করব বলে ক’দিন থেকে ভাবছি।
গােপাল কহিল, ‘তােমার মনের কথা স্বচ্ছন্দে আমায় বলতে
পার। তােমার কোন কথা বা ইচ্ছার বিরূদ্ধে কখনও কোন
কথা ত’ বলিনি নয়ন।
নয়ন বৌ বলিতে লাগিল, দেখ, আমার ইচ্ছে, বিজনের
সঙ্গে ঊষার বিয়ে দি। বিজনকে আমি এতদিন দেখে
আসছি, তার হাতে ঊষাকে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারব।
লেখা পড়া ও স্বভাব চরিত্রে বিজন চিরকালই ভাল। আর
সে ত তােমারই ছাত্র, ওদের অবস্থাও বেশ সচ্ছল, সব দিক
দিয়েই বিজনকে উপযুক্ত পাত্র বলে আমার মনে হয়।
তােমার কি মত?
গােপাল হাসিয়া কহিল, ‘ত ত’ আমার ভিন্ন হতে পারে
। তবে ওর মা বাপের মতটা যে আগে জানা দরকার।
কহিল, ‘তােমরা বেটাছেলে, তার ভর
তােমার ওপর।
গােপাল অন্যমনস্কভাবে উত্তর করিল, “আচ্ছা দেখি।
নয়ন বৌ কি কাজে উঠিয়া অন্দরের দিকে প্রস্থান
করিল।
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা
নয়ন বৌ

नही-सली
বাহিরে তখন প্রকৃতির চারিধারে অন্ধকার গাঢ় হইয়া
জমিয়া উঠিতেছিল। ঝিল্লির অবিরাম কর্কশ-ধ্বনি ঘন অন্ধকারের
বুক ভরিয়া তুলিতেছিল। জোনাকির ম্লান আলােটুকু
ইতস্তত জলিতেছিল—আবার নিভিতেছিল। দিবসের শান্ত
কোলাহল—অন্ধকার-আবরণের অন্তরালে ধীরে ধীরে নিস্তেজ
হইয়া, স্তব্ধ হইয়া আসিতেছিল।
গােপাল এতক্ষণ বাহিরে বসিয়াছিল। বিভিন্ন চিন্তার
ঘাত-প্রতিঘাতে সে সেই সময় দেশ কাল বিস্মৃত হইয়া গিয়াছিল।
বাহিরের অন্ধকারের দিকে চাহিয়া, সে এ্যন্তে উঠিয়া পড়িল
এবং ধীরে ধীরে আপনার শয়নকক্ষে প্রবেশ করিয়া তাহার
বহুদিনের পুরাতন বিশ্বস্ত লাঠি গাছটাকে যেন সচেতন করিবার
জন্য দৃঢ় মুষ্টিতে ধারণ করিয়া নির্নিমেষ নয়নে তাহার পানে
চাহিয়া রহিল। অতীত কালে নিজের এবং পরের কত
ভীষণ বিপদের সম্মুখে এই লাঠি গাছটাকেই নির্ভর করিয়া বুক
ফুলাইয়া সে দাড়াইয়াছে। তাহার বাহ-শক্তি এই লাঠি
গাছটিকেই কেন্দ্র করিয়া নিরীহের উপর দুর্জনের অত্যাচারকে
পরাহত ও বিদ্ধস্ত করিয়াছে। আজ পুনরায় বিপদের সূচনা
হওয়ার পূর্বে তাহার চির বিশ্বস্ত লাঠি গাছটিকে বন্ধুর মতই
বক্ষের পাশে রাখিয়া ধীরে ধীরে বাহিরের বারান্দায় ফিরিয়া
আসিয়া মাদুরের উপর উপবেশন করিল।
নয়ন বৌ কিছুকাল পরে আসিয়া জানাইল, “আহার
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী
গােপাল কহিল, ‘তুমি আর উষা খেয়ে নাও, আমি একটু
পরে খাব, প্রবােধের আসবার কথা আছে, তার জন্যে অপেক্ষা
করছি।
নয়ন বৌ ফিরিতেছিল, হঠাৎ স্বামীর পার্শ্বে লাঠি
গাছটাকে দেখিয়া সে উৎকন্ঠিত স্বরে জিজ্ঞাসা করিল, ‘আবার
লাঠি বার করেছ। তােমার পাশে ওকে দেখলে বড় ভয়
করে। কি হয়েছে বল না শুনি’ বলিয়া সে বসিবার
উপক্রম করিতেই গম্ভীর কণ্ঠে গােপাল কহিল, “তােমরা
খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম করগে। এখন তােমায় আমি কিছু
বলতে পারব না। স্বামীর এইরূপ উত্তরে তাহার অন্তরখানি
এক অজানিত আশঙ্কায় ভরিয়া উঠিল।
নয়ন বৌ স্বামীর কথার কোন উত্তর না দিয়া ভারাক্রান্ত
অন্তরে অন্দরের দিকে চলিয়া গেল। কিছুকাল পরেই
প্রবােধ গােপালের নিকট আসিলে, দুই জনে নানারূপ পরামর্শে
রত হইল।
চতুশ পরিচ্ছেদ
রাত্রি যখন প্রায় দুইটা, তখন হঠাৎ গােপালের বাড়ার
সম্মুখে ভীষণ গােলমাল আরম্ভ হইল। ধর, পাকড়াও, মার
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ত্রীট, কলিকাতা।

১০২ পল্লীজী ইত্যাদি শব্দে পল্লীবাসী সচকিত হইয়া উঠিল। গােলমাল কিয়ৎ পরিমাণে থামিলে জানা গেল—জনাই, রমাই প্রভৃতি। গােপালের বাড়ীতে ডাকাতি করিতে আসিয়াছিল। পুলিশ- প্রহরী তাহাদিগকে সদলবলে ধরিয়া ফেলিয়াছে। গােপালের বাড়ীর সম্মুখে তখন ভীষণ জনতা শৃঙ্খলাবদ্ধ জনাইয়ের দলকে লইয়া ব্যস্ত। এইরূপ সময় কয়েকজন ‘আগুন’ ‘আগুন’ বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। দেখা গেল, ঘােষালের বাড়ীর পশ্চাতে আগুন লাগিয়াছে। জনাইয়ের দলকে কড়া পাহারায় রাখিয়া সকলের বাড়ীর পশ্চাৎ দিকে যাইতেই অনেকে দেখিল, এক মনুষ্য মুর্তি বাড়ীর পশ্চাতে বনের ভিতর দিয়া পলাইবার উপক্রম করিতেছে। সমাগত লােকদিগের মধ্য হইতে অবােধ ছুটিয়া মনুষ্য মূর্তির অনুসরণ করিল এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই তাহাকে ধরিয়া গােপালের বাড়ীর সম্মুখে আনয়ন করিলে দেখা গেল, মনুষ্য মুক্তি আর কেহ নহে—স্বনামধন্যা রজনী। এদিকে অগ্নি ভীষণ ভাব ধারণ করিয়া বিশেষ ক্ষতি করিবার পূর্বে সমবেত সকলে তাহা নিবাইয়া দিতে সক্ষম হইয়াছিল। তখন সকলে মিলিয়া রজনীকে জেরায়-জেরায় অস্থির, করিয়া তুলিল--“তুমি কেন আসিয়াছিলে? বাড়ীর পশ্চাৎ দিকে তােমার কি কাজ, পলাইতেছিলে কেন?’-ইত্যাদি ইত্যাদি। রজনী নিতান্ত নিরীহের মতন উত্তর করিল যে, গােলমাল শুনিয়া এবং বাড়ীর সম্মুখে জনতা দেখিয়া সে সােল এজেন্ট—কমলিনী সাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লক্ষী
খিড়কীর দুয়ার দিয়া বাড়ীর স্ত্রীলােকদিগের নিকট হইতে
গােলমালের কারণ জানিতে গিয়াছিল, প্ৰবােধ তাহাকে
অন্যায় ভাবে ধরিয়া অপমানিত করিয়াছে।
জনাই তাহা শুনিয়া চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, ওর
আবার অপমান! ওই ত’ আমাদের লােভ দেখিয়ে গােপাল
বােসের বাড়ী ডাকাতির মতলব দিয়েছে। বলিয়া সে রমাই
প্রভৃতির দিকে লক্ষ্য করিয়া কহিল, “কেমন কিনা, তােরাই
বল না রে?' সকলে একবাক্যে বলিল, “ওরই মতলবে ত’ আজ
এখানে এসে ধরা পড়লুম। ছাড়া পেলে এখনই ঐ মাগীর
নাক, আর কান দুটো কামড়ে ছিড়ে ফেলে দি।
উপস্থিত গ্রামবাসীরা উচ্চৈস্বরে হাসিয়া উঠিল।
দাবােগাবাবু গােপালের নিকট উপস্থিত হইয়া
কহিলেন, আপনার বাড়ীতে ডাকাতি হবার সংবাদ পূর্বে
পেয়ে আমি বদমায়েদের ধরবার। সুযােগ পেয়েছি।
আমি বিলম্ব করতে পারব না। এদের নিয়ে আমি থানায়
চল্লাম’ বলিয়া তিনি প্রহরীদিগকে আসামীদের লইয়া থানায়
বাইতে আদেশ দিলেন।
পরদিন প্রভাতেই এবােধ গােপালকে কহিল, “মানুষের
মত মানুষ থাকলে জনাই এতদিন সমাজের ভেতর থেকে মাথা
নাড়তে পারত না এইটেই আমরা ভাল করে বুঝিয়ে দিলাম।
এখন কথা হচ্ছে, উঘার বিয়ে। আমার মত যে, তুমি যত শ
পার ওর বিয়ে দেবার চেষ্টা কর—আমিও দেখছি এদিকে।
১১৪ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, কলিকাতা

১০
পল্লী-লক্ষী
গােপাল উত্তর দিল, উষার বিয়ের সম্বন্ধে তুমি নয়ন
বউয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে যা বােঝ, কর-তার ইচ্ছে, বিজনের
সঙ্গে উষার বিয়ে হয়।
প্রবােধ মৃদু হাসিয়া কহিল, 'ও, এই? আচ্ছা দেখি, কি
বলেন বউদিদি, বলিয়া অন্দরের দিকে প্রস্থান করিল।
রাত্রি জাগরণ-ক্লান্ত নয়ন বৌ ঘরের এক কোণে বসিয়া
পূৰ্ব্ব রাত্রির ঘটনা
স্মরণপথে আনিবার চেষ্টা
করিতেছিল। প্রবােধ ঘরে প্রবেশ করিতেই নয়ন বৌ মন্তকে
অবগুণ্ঠন টানিয়া দিয়া গভীর ভাবে কহিল, “খুব দেখলুম
ঠাকুরপাে তােমার দেশের’••••••
প্রবােধ কহিল, আর আমরা যা দেখলুম, তা বুঝি মনে
ধরলাে না?
নয়ন বৌ মৃদু হাসিয়া বলিল, সেই কথাই ভাবছিলুম
এতক্ষণ।
প্রবােধ কহিল, “কিন্তু আমরা সে ভাবনা অনেক্ষণ ছেড়ে
দিয়েছি। বাজে জিনিস ভেবে আমরা মাথা নষ্ট করি না।
আমি ভাবছি এখন উষার বিষয়ের কথা। এইবার উষার বিয়ে
দিয়ে আমরা নিশ্চিন্ত হবে। শুনলুম, তুমি নাকি বিজনের
সঙ্গে উষার বিয়ে দেবে ঠিক করেছে ?
নয়ন বৌ কহিল, “ঠিক কিছু করিনি, তবে মনে করেছি।
যতক্ষণ না তার বাপ মায়ের মত হয় ততক্ষণ এর কিছুই ঠিক
হতে পারে না।
সােল এজেন্ট-কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

p
পল্লী-লক্ষী
১০
প্রবােধ কহিল, 'আচ্ছা, তবে তাঁদের মত করবার ভার
আমিই নিলাম।
নয়ন বৌ, তা হলে ত’ ভালই হয়। তােমরা একটু
উঠে পড়ে লাগ না ঠাকুরপাে।
সে তােমায় বলতে হবে না বৌদি। আচ্ছা, আমি তবে
এখন আসি, তােমরা রােজ যেমন কাজকর্ম কর, আজকেও
তেমনি ভাবে করে যাও। মনে করাে, যেন কিছুই ঘটেনি।
বলিয়া প্রবােধ চলিয়া গেল।
সেইদিন বৈকালেই প্রবােধ হাসিমুখে নয়ন বৌ’র নিকট
আসিয়া কহিল, “তাদের কখনও অমত হতে পারে?
নয়ন বৌ হাসিতে হাসিতে কহিল, “কাদের গাে?
প্রবােধ কহিল, “কাদের আবার ? বিজনের বাপ মা
দুজনেরই। তাদের মত করিয়ে তবে আমি এইখানে
তােমাদের খবর দিতে এলুম।
উল্লিখিত ঘটনার প্রায় দুইমাস পরে উষার সহিত
বিজনের শুভবিবাহ সম্পন্ন হইয়াছিল।
বিচারে তাহাদের ডাকাতি প্রমাণ হওয়ায়জনাই প্রভৃতি
সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশে আদিষ্ট হইয়া জেলে প্রেরিত
হইয়াছিল। রজনীও দণ্ডাদেশ হইতে অব্যাহতি পায় নাই।
যতদিন জনাই প্রভৃতি নিঃসঙ্ক চিত্তে গ্রামে ঘুরিয়া বেড়াইত,
নিরীহ সকলে ভয়ে তাহার বিরুদ্ধে কোন কথা বলিতে সাহস
করিত না। যাহারা কাহারও কিছু অনিষ্ট বা সর্বনাশের
১১৪ নং আহিরীটোল ষ্ট্রীট, কলিকাতা

চেষ্টায় থাকিত, জনাই ছিল তাহাদের ভরসা। জনাইয়ের কারাদণ্ডাদেশে গ্রামে অনেক পরিমাণে শান্তি স্থাপিত হইল। কারণ, নিরীহ সকলে স্বচ্ছন্দচিত্তে গ্রামের ভিতরে আপনার এবং পরের কাজ নিৰ্বিয়ে করিবার অবসর পাইল। যাহারা দুষ্ট প্রকৃতি, তাহারা জনাইয়ের সাহায্য হইতে বঞ্চিত হইয়া, যাহারা কিছু ভাল তাহাদের বিরুদ্ধে কাজ করিবার সৌভাগ্য হারাইল। গােপাল এবং গােপালের ছাত্রের দল প্রবােধের সহায়তায় গ্রামের ভিতরে সদনুষ্ঠানের প্রতিষ্ঠায় তাহাদিগের সকল প্রচেষ্টা নিযুক্ত করিল। এমনই করিয়া দিনের পর দিন গ্রামের উন্নতি, পৰােপকার, লােকহিতকর অনুষ্ঠান করিয়া তাহারা অচিরেই গ্রামের সাধারণের শ্রদ্ধা ভক্তি আকর্ষণ করিতে সক্ষম হইল। গােপালের কন্যার সহিত বিবাহ সম্বন্ধ উত্থাপিত হওয়ায় বিজনের পিতা মাতা প্রথমে সর্বান্তকরণে অনুমতি না দিলেও শেষে গ্রামের ভিতরে গােপালের ক্রিয়া কলাপাদি দেখিয়া এবং তাহার গুণসকল স্বচক্ষে দেখিয়া এবং বুঝিয়া তাহার কন্যাকে গৃহলক্ষ্মীরূপে বরণ করিতে কোন প্রকারে অমত করিতে পারিলেন না। বিবাহক্রিয়া সম্পন্ন হইয়া গেলে নয়ন বৌ-গােপাল এবং প্রবােধকে সজল চক্ষে কহিল, “মনের মতন পাত্রের হাতে উষাকে দিতে পেরেছি বলে কেবলই আমার মনে হয়, ভগবানের কৃপা থেকে আমি কখনও বঞ্চিত হব না। সােল এজেন্ট—কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির

পল্লী-লী
১০৭
প্রবােধ কহিল, ঐ বিশ্বাসটুকু আছে বলেই কোন
বিপদকে কখন গ্রাহ করিনি।
গােপাল কহিল, মায়ের আমার বিয়ে দিয়ে সংসারের
কাছে হিসেব নিকেশ চুকিয়েছি। এক নয়ন বৌ-তার জন্য
আমি কোন দিন ভাবি না। এখন বাইরে ঝাপিয়ে ।
পড়েছি।
সেখানে কোন বাধা বিপ্ন আর আমার, শক্তিকে
পরাস্ত করতে পারবে না ।
1
১১৪ নং আহিরীটোলা , কলিকাতা

১০
উজ্জ্বল পরিচ্ছেদ
তাহাদিগের মধ্যে যখন এইরূপ কথাবার্তা হইতেছিল,
তখন পল্লীর আর একদিকে একটি বাড়ীর একখানি গৃহে
বিজন উষাকে কহিতেছিল, আমার জন্যেই ত’ তােমাদের এত
কষ্টভােগ করতে হলাে।
উষা স্বামীর মুখে হাত রাখিয়া তাহার কথায় বাধা দিয়া
কহিল, ‘আবার ওকথা বলছে? তুমি আমাদের বিপদের
কারণ, না সম্পদের কারণ? তুমি আমাকে পায়ে স্থান দেবার
পর থেকেই, দেখনি কি যে, এ গ্রাম দিনের পর দিন কেমন
উন্নতির দিকে এগিয়ে চলেছে। আর ত’ কোথাও কোন
গােলমাল নেই। চারিদিকে কেমন সুখ, শান্তি। এর কারণ
কি জান?—তুমি!
ইহা শুনিতে শুনিতে বিজন তাহাকে দুই হন্তে আলিঙ্গন
করিয়া বুকের নিকট টানিয়া আনিবার পূর্বেই—গলায় আঁচল
দিয়া উষা স্বামীর পায়ের উপর মাথা রাখিয়া প্রণাম করিল।
All rights reserved by Publishers.

তমসাচ্ছন্ন উপন্যাস-সাহিত্যাকাশে বিদ্যুৎ বিকাশ। - - নবাব আলীবর্দীর নেহ-পুত্তলি - বাংলমসনদের সৌখীন-আলাল- বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার-নবাব-দুলাল নবাব-তক্তের বনিয়াদি নবাব সেই নবাব সিরাজউদ্দৌলা ! কমলিনীর’—“রাজপুতের মেয়ে প্রণেতা যুক্ত প্রমথনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সাধের রচনা চিত্রবহুল নবাবীউপাখ্যান নবাব সিরাজউদ্দৌলা বিশ্ববিশ্রুত-চিত্রশিল্পীগণের বিশ্বৰিমােহন চিত্রাবলী ভূষিত হইয়া শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে।

প্রেম-রঙ্গ-তরঙ্গায়িত উপন্যাস-প্লাবিত বঙ্গে- ধর্মসঙ্গত—পরিপূর্ণাঙ্গ সৎসাহিত্য আজ উপন্যাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় সু-প্রচারিত! পরিব্রাজক ভিক্ষু অকিঞ্চনের প্রাণপাত পরিশ্রমে প্রস্তুত সৎসাহিত্য-রসকরা বাখাদিনী বীণাপানির প্রসাদি সাহিত্য-পয়সা -আজ- সৎসাহিত্যামােদী ভক্তদের পংক্তিতে পংক্তিতে অপরিষ্যাপ্ত পরিবেশিত! সে আবার কি ? স্বামী-তীর্থ যত ইচ্ছা, এ সাহিত্যমহামৃত পান করিয়া যুগে যুগে অমর হইয়া থাকুন, কিন্তু সাবধান, এ অমৃত যেন মাটিতে না পড়ে। সাহিত্য-সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র ও দার্শনিক পণ্ডিত সুরেন্দ্রমােহন ভট্টাচার্যের পর-উপন্যাস-সাহিত্য-ক্ষেত্রে স্বামীতীর্থের উপমা ‘গঙ্গাজলে’ গঙ্গাপূজার মত কেবল স্বামীতীর্থ” উপন্যাস পাঠেই হইবে, নচেৎ, কথার শকতি নাই, বুঝাতে ইহায়! হিন্দু মাত্রেরই “আশীতীর্থ পাঠের একান্ত প্রমােন হইলেও পয়সা খরচ করিতে নারাজ—অথচ পাঠেচ্ছা-প্রবল সাহিত্যামােদীগণ, স্থানীয় লাইব্রেরী হইতে চাহিয়া লইয়াও একবার পড়িবেন, ইহাই প্রকাশকের বিনীত অনুরােধ। ভারতের সমস্ত পুস্তকালয়ে

নিৰ্ম্মল সাহিত্য-পঠের নূতন প্রস্থ
রেলওয়ে সিরিজ।
প্রথম গ্রন্থ :
শ্রীমতী চারুশীলা মিত্রের
হিন্দু-নারী
জাহ্নবী-যমুনার মত দু’টি চক্ষের প্রতিধারায় বইখানির লেখা
শেষ হইয়াছে। আরম্ভের দিকের পরিচয়ে গ্রন্থকী সুলেখিকা
শ্ৰীযুক্তা চারুশীলা মিত্র মহােদয়ার নামই আড়ম্বরপূর্ণ অতিরঞ্জিত
বিজ্ঞাপনের অপেক্ষা অধিক কাজ করিবে, আর এই গ্রন্থের মূল
উদ্দেশ্য ও মধ্যভাগের রচনা-কৌশল পড়িয়া পাঠকপাঠিকা,বলুন ত,
এই ধরণের উপন্যাস আপনি মােট ক’বানি পড়িবার সুযােগ
জীবনে পাইয়াছেন? মহিলা-সাহিত্যের পর্দানশীন-আসরে এই
গ্রন্থকীর আসন আপনারা কোথায় নির্দেশ করিলেন, পাঠাতে
“হিন্দু নারীর প্রত্যেক পাঠক পাঠিকাকে সরল সত্য কথায়
“নির্মল-সাহিত্য-পীঠে” জানাইতে হইবে, এইটুকুই আপনাদের
নিকট প্রকাশকের বিনীত অনুরােধ ! ইতিমধ্যেই হিমালয় হইতে
কুমারীকা পৰ্যন্ত এই বইখানির নাম সকলের মুখস্থ হইয়া
গিয়াছে-
হিন্দু-নারী!
হিন্দু-নারী !

নােকর ভিটেভউপন্যাস—“মিলন-মাত্রি!
মহিলা-খনােহারিণী সুলেখিকা
এমতী কমলাবালা দেবী বিরচিত
মিলন-রাত্রি
মহিলা-মনােমন্দিরে মন্দিরা-মন্দ্রে—মােহন-সুন্দরে
সুন্দরী মােহিনী মিলনের এক রাত্রি ;-
মিলনাত্রি
এ ফুল্ল নিশীথে-ধরি হাতে হাতে-জীবনের পথে
মিলিয়া-মিশিয়া সুখী হও ! জাননা?—এ যে মিলন-পূর্ণিমা।
'বুঝি এমনি নিশীথে সই'রে,
প্রথম প্রণয়ী ধরে প্রিয়া কর,
প্রথম পিকের জাগে কুহু স্বর
প্রথম বাঁশীর রাধা রাধা স্বর
কু-কুটীরে ফুকারে!
কে কোথায় আছ, মিলন-রাত্রির আনন্দ-যাত্রী, এ শুভ যাত্রায়
সাথী হও। আমরা শুভ-মিলনের চারু-ফুলতরী খুলিয়া দিয়াছি,
আর বিলম্বে কাজ কি?
দীর্ঘ বিরহের পর মিলনানন্দের আরামপ্রদস্থানে শরীর রােমাঞ্চ
হইবার সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তে পরিবর্তনশীল উপন্যাসের পৃষ্ঠা-সৌখীন
গােয়ের বিভীষিকাময়ী বন্দী-বন্ধনেপাঠকের মগজের রক্ত
চকাইয়া দিবে—এমেিলখিকার লিপি-চাতুর্য !

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Palli Lakshmi Ed. 3rd

Author
Bandyopadhyay Rakhaldas
Title
Palli Lakshmi Ed. 3rd
File name
Palli Lakshmi Ed. 3rd
Text
OCR done
Citation
1927
Published
2009/09/7
Publisher
Sri Kiritikumar Pal
Language
Sanskrit
Pages
124
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Novel
DLI number
513019
Barcode
4990010020037.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
BcDVsE48xAK
Download PDF

Palli Lakshmi Ed. 3rd