Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Cheleder Rabindranath

Som,jaminikanta · 2010/01/17

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ছেলেদে ব্ৰবীন্দ্রনাথ

প্রকাশকঃ-
ঐকালীকিঙ্কর মিত্র
ইণ্ডিয়া প্রেস লিমিটেড
এলাহাবাদ।
প্রিন্টার
শ্ৰীঅপূৰ্ব্বকৃষ্ণ বসু
ইণ্ডিয়া প্রেস লিমিটেড,
বেনারস-ব্রাঞ্চ।

ঙুেলের
স্নরন্দ্রনাথ
• ves - গলফ গn
যামিনীকান্ত সােম
প্রকাশক
ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস
২২১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট
কলিকাতা
১৯২৬
সব্বস্বত্ব সংরক্ষিত
{ মূল্য ৭০ বারাে আনা

No text on this page.

=
আশা
এ যুগের শ্রেষ্ঠ মনীষী রবীন্দ্রনাথ, গানের রাজা
রবীন্দ্রনাথ, জগৎ-কবিসভার মুকুটমণি রবীন্দ্রনাথ –
আমাদেরই। তার তুলনা তিনি নিজেই। তার
মূর্তি সুন্দর, তাঁর বাক্য সুন্দর, তাঁর কাব্য সুন্দর -
তিনি সৰ্বাঙ্গসুন্দর। তাঁর জীবন-প্রসঙ্গ আলােচনা
করতে গিয়ে এই কথাগুলিই কেবল মনে আসছে,
“এই লভিনু সঙ্গ তব,
সুন্দর, হে সুন্দর !
পুণ্য হ’ল অঙ্গ মম,
ধন্য হ’ল অন্তর,
সুন্দর, হে সুন্দর ॥
আলােকে মাের চক্ষু দুটি
মুগ্ধ হয়ে উঠল ফুটি,
হৃদ্‌গগনে পবন হ’ল
সৌরভেতে মন্থর,
সুন্দর, হে সুন্দর । '
}
।
০ ০ ০
এই অনন্যসুন্দরের অন্তরতম প্রতিকৃতিটি আমাদের
ছেলেমেয়েদের সরল শুভ্র চিত্তে প্রতিফলিত হয়ে
তাদের নবীন প্রাণগুলিকে বিকশিত করুক, উন্নত
করুক, ধন্য করুক—এই আশা।
দিল্লী বেঙ্গলি কুব,
আশ্বিন-১৩৩৩
শ্ৰীযামিনীকান্ত সােম

No text on this page.

সুচি ১ •• এ : ৩ • • • ••• ১৬ ••• ••• ৩৪ সূচনা মনের খেলা বংশ-পরিচয় লেখাপড়ায় বাড়ীর বাহিরে বাড়ীর শিক্ষা বিলাতে মিলনের সুর গানের রাজা স্বর্ণ মুকুট বিশ্ববিজয় পূৰ্ব্ব এসিয়ায় শান্তিনিকেতন ••• ••• ৪ ৭ ৫৭ ••• ৭১ ... ৮ ০ ••• ••• ••• ১৮ চিত্র-সুচি . . মুখপত্র ১। শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২। রবীন্দ্রনাথ-কৈশােরে ৩। দ্বারকানাথ ঠাকুর ••• • • • ৮ ••• ১৬

[ ২ ]
০ ০ ০
৪। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫। রবীন্দ্রনাথের গানে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সুর-সংযােজন ৪২
৬। বাল্মীকির ভূমিকায়—রবীন্দ্রনাথ
দ্যসর্দার—অবনীন্দ্রনাথ ; দস্তগণ-গগনেন্দ্রনাথ,
অরুণেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ, সুরেন্দ্রনাথ প্রভৃতি
৭। শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৮। শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্বর্ধনা-সামগ্রী
৯। চু-চেন-তাং
১০। শান্তিনিকেতন-ছাতিমতলা
১১। শান্তিনিকেতন—আশ্রম-তরুতলে
১২। শান্তিনিকেতন—গাছতলায় ছেলেরা পড়িতে ১১৮
৮২
১০৬.
১১১
১১৮

No text on this page.

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
இன்ஜாமின்
(14)

ছেলেদের
বীন্দ্রনাথ
তােমরা সবাই কবিতা ভালবাস নিশ্চয়।
উপর সে কবিতা যদি তােমাদের মনের মতাে হয়,
তা হলে তাে আর কথাই নেই! তােমাদের ভেতর
এমন কি কেউ আছ, যে, মেঘের উপর মেঘ জমেছে
দেখে, ভাই-বােনে হাত ধরাধরি করে নাচতে-নাচতে
বল না !
দিনের আলাে নিবে এল, সূর্ষি ডােবে ডােবে ।
আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চঁাদের লােভে লােভে ।
মেঘের উপর মেঘ করেছে, রঙের উপর রঙ।
মন্দিরেতে কাশর ঘণ্টা বাজল ঠং ঠং
ও-পারেতে বিষ্টি এল ঝাপসা গাছপালা।
এ-পারেতে মেঘের মাথায় একশাে মাণিক জ্বালা।

২
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
বরি সঙ্গে মনে পড়ে মেঘলা দিনের গান
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদী এল বান।"
বাঁশী, ফুটবল, বন্দুক, এ সব
তােমাদের কতই
প্রিয় ! কিন্তু মেল্লা
দিনের ঐ গানটি, এই সবের
চেয়ে কি কোন অংশে কম । রবিবারের ছুটিতে
তােমাদের কতই না আমােদ! কবে রবিবার আসবে
এই আশায় সােমবার থেকেই তােমরা দিন গুণতে
আরম্ভ কর,
“সােম মঙ্গল বুধ এর সব আসে তাড়াতাড়ি,
এদের ঘরে আছে বুঝি মস্ত হাওয়া-গাড়ি ?
রবিবার সে কেন, মাগো, এমন দেরি করে ?
ধীরে ধীরে পৌঁছয় সে সকল বারের পরে ।
সােম মঙ্গল বুপের যেন মুখ গুলাে সব হাড়ি,
ছােট ছেলের সঙ্গে তাদের বিষম আড়াআড়ি।
কিন্তু শনির রাতের শেষে যেনি উঠি জেগে,
রবিবারের মুখে দেখি হাসিই আছে লেগে।”

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
তারপর, পড়া বলতে না পারার দরুণ মাষ্টার
মশায়ের কাছে বকুনি খেয়ে কাঁদতে-কাদতে এসে মাকে
যখন বল,
সাত-আটে সাতাশ,' আমি বলেছিলেম বলে
গুরুমশায় আমার পরে উঠল রাগে জলে।
মাগো, তুমি পাচ পয়সায় এবার রথের দিনে
সেইযে রঙিন পুতুলখানি আপনি দিলে কিনে
পাতার নীচে ছিল ঢাকা ; দেখালে এক ছেলে,
গুরুমশায় রেগে মেগে ভেঙে দিলেন ফেলে।"
তােমার ছােট ভাইটি যখন পড়া করতে করতে
ছুটে পালিয়ে এসে মায়ের কাছে বায়না ধরে,
-
মাগাে আমায় ছুটি দিতে বল
সকাল থেকে পড়েছি যে মেলা।
এখন আমি তােমার ঘরে বসে
করব শুধু পড়া-পড়া খেলা !
তুমি বছ দুপুর এখন সবে,
না হয় যেন সত্যি হল তাই
এদিননা কি দুপুরবেলা হলে
বিকেল হল মনে করতে নাই ?”

৪ ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ --- আর শেষটায় তুমি নিজে যখন লেখা, পড়া, অঙ্ক- কষা—এগুলাের একটাকেও কাবু করতে না পেরে ভারী বেজার হয়ে মাকে গিয়ে বল,- “নাই যদি হই ভালাে ছেলে, কেবল যদি বেড়াই খেলে, তুতের ডালে খুঁজে বেড়াই গুটি পােকার গুটি, মুখু হয়ে রইব তবে? আমার তাতে কিই-বা হবে, মুখু যারা তাদেরি ত সমস্ত খন ছুটি।” আর এই সব-তাতেই সায় দিয়ে মা তােমায় কোলে তুলে নিয়ে আদর করে যখন বলেন, “বাছারে, তাের চক্ষে কেন জল ? কে তােরে যে কি বলেছে আমায় খুলে বল্ !" তখন তােমাদের কতই না আহলাদ হয়। তখন তােমাদের আর কোন ভয় থাকে, না ভাবনা থাকে । আচ্ছা, এই কবিতাগুলি তােমাদের খুবই ভাল লাগছে নিশ্চয়। কেননা, এতে তােমাদেরই যে মনের কথা রয়েছে। তােমরা হয়তাে ভাবছে, এগুলি যার লেখা, তিনি তােমাদেরই একজন, হয়তাে বা তিনি তােমাদের মতােই ছেলেমানুষ । এই কবিতাগুলি যার, তিনি বয়সে এখন তােমাদের মতাে ছেলেমানুষ

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
v -
না হলেও, তিনি তােমাদের খুবই আপনার। তােমাদের
কথা তিনি আরাে কি বলেন শুনবে ?
“খােকা আমার কতখানি
সে কি তােমরা বােঝ?
তােমরা শুধু দোষ গুণ তার খোঁজ!
আমি তারে শাসন করি
বুকেতে বেঁধে,
আমি তারে কাদাই যে গো
আপনি কেঁদে !”
আর বলেন--
বলেন
“খােক বলেই ভালবাসি
ভাল বলেই নয় !”
এমন ধারা যাঁর দরদ, তিনি যে তােমাদের কত
আপনার, সে কথা আর বলতে ? ইনি কে, তা তােমর
এবার বুঝতে পেরেছ কি? তােমাদের ভেতর যারা বড়,
এই কবিতাগুলি শুনেই তারা একে চিনেছ নিশ্চয়।
অনেকে হয়তাে এঁকে দেখেওছ। ইনি আমাদের এই
সােনার বাংলা দেশেই জন্মেছেন। নামেতেই এর পরিচয়
—ইনি আমাদের শ্রবীন্দ্রনাথ কুর।
রবীন্দ্রনাথ একজন কবি। কিন্তু শুধু কবি বললে

** «« এই সব ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ কিছুই বলা হয় না। তিনি একজন শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী আর শ্রেষ্ট ভাবুক। তিনি তাঁর গান আর কবিতার ভেতর দিয়ে এই বিশ্বজগতের মিলনের কথা এমন সুন্দর করে বলে এসেছেন, যা আর কেউ বলেন নি। ইনি যখন ইংলণ্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, চীন, জাপান, আমেরিকা দেশে গেছলেন, তখন সে সব দেশের পণ্ডিতদের কাছ থেকে যে ভক্তির অর্ঘ্য তিনি পেয়েছিলেন, কোন কবির জীবনে তেমন আর কখনাে হয় নি। ঐ সব মহাদেশের বড় লােকেরা আর গুণী লােকেরা তাকে এ রকম সম্মান দেখিয়েছিলেন যে, সে রকম সম্মান সে সব দেশের সম্রাটরা পৰ্য্যন্ত কখনাে পেয়েছেন কিনা সন্দেহ। তিনি তার লেখার ভেতর দিয়ে, গান আর কবিতার ভেতর দিয়ে এমন সব উঁচু ভাবের কথা বলেছেন যে, তা কেবল তােমার-আমার কথা নয়—তাকে এই সমস্ত পৃথিবীর, সমস্ত মানব- জাতির মনের কথা, প্রাণের কথা বলা যেতে পারে ; আর তা এমনই এক মিলনের সুরে বাঁধা যে, তা সমস্ত পৃথিবীর সমস্ত জাতির ঝগড়া-বিবাদ, জাতিভেদ, মারামারি, কাটাকাটি মিটিয়ে দিয়ে সকল মানুষকে দেবতা করে তুলতে পারে।

ছেলেদের বীন্দ্রনাথ
৭
তােমরা এখন থেকে তাঁর কবিতা পােডাে, পড়ে
বুঝতে চেষ্টা করাে, বুঝতে না পারলে বুঝিয়ে নিও ;
দেখবে তা কত সুন্দর! যতই তােমাদের জ্ঞান বাড়বে,
তার লেখা পড়ে ততই তােমরা মুগ্ধ হবে। দেখবে
তিনি শুধু কবি নন, --তিনি তপস্বী, তিনি ত্যাগী আর
সর্বোপরি তিনি একজন ঋষি। রবীন্দ্রনাথের ছবিটি
একবার ভাল করে দেখ দেখি। এ রকম চেহারা আর
কোথাও কি দেখেছ ? ছবিটি দেখলে ঋষি বলেই কি
মনে হয় না? এই ঋষি রবীন্দ্রনাথের কথাই আজ
তােমাদের শােনাব।

১২৬৮ সালের ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়,
তার বাল্যজীবন বড়ই বিচিত্র। তিনি যখন ছেলেমানুষ
--যখন তিনি তােমাদের মতােই শিশু, তখনই তিনি
এই পৃথিবীকে এমন এক চোখে দেখতেন, যা তােমরা-
আমরা সচরাচর দেখি না। এই বিশ্বপ্রকৃতির সমস্ত
জিনিষ, যেমন গাছপালা, পাখীর গান, আকাশবাতাস
মেঘবৃষ্টি, ফলফুল, এমন কি রাস্তার লােকজন—যা তিনি
দেখতেন, তার ভেতর পৰ্য্যন্ত দেখতে পেতেন।
এই সমস্ত জিনিষ জীবন্ত হয়ে তাঁর চোখের সামূনে
ফুটে উঠতে—বিশ্বপ্রকৃতির প্রত্যেক জিনিষ যেন তার
সঙ্গে কথা বলতে। কি রকম করে, তা তাঁরই লেখা
দু-একটি কবিতায় তােমাদের শােনাই--
মেঘের মধ্যে মাগাে, যারা থাকে
তারা আমায় ডাকে, আমায় ডাকে।
বলে, “আমরা কেবল করি খেলা,
সকাল থেকে দুপুর সন্ধ্যেবেলা !
সােনার খেলা খেলি আমরা ভাের,
রূপপার খেলা খেলি চঁাদকে ধরে !

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
*
!
রবীন্দ্রনাথ-কৈশােরে– ৮ পৃঃ

No text on this page.

মনের খেলা আমি বলি যাব কেমন করে ? তারা বলে ‘এস মাঠের শেষে । সেইখানেতে দাড়াবে হাত তুলে আমরা তােমায় নেব মেঘের দেশে !” “ঐ যে রাতের তারা জানিস কি, মা, কারা? সারাটিখন ঘুম না জানে চেয়ে থাকে মাটির পানে যেন কেমনধারা ! আমার যেমন নেইক ডানা, আকাশপানে উড়তে মানা, মনটা কেমন করে, তেনি ওদের পা নেই বলে পারে না যে আসতে চলে এই পৃথিবীর পরে। ভাবে ওরা, আকাশ ফেলে হত যদি তােমার ছেলে, এইখানে এই ছাতে দিন কাটাত খেলায় খেলায় তারপরে সেই রাতের বেলায় ঘুমােত তাের সাথে। * * * ৩ । ৮৫। রবীন্দ্রনাথ খুব বড় ঘরের ছেলে। তার বাপ- পিতামহ মস্ত ধনী। যে বংশে তিনি জন্মেছেন তা মানে, বিদ্যায়, পদগৌরবে সব রকমেই বড়। কলিকাতার জোড়াসাঁকোয় জোড়াসাঁকোয় এদের বাড়ী।

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ীর মত বিখ্যাত বংশ শুধু
কলিকাতা বা বাংলাদেশে কেন, আর কোথাও আছে
কিনা সন্দেহ। এ বংশের সবাই গুণী । অনেক বিখ্যাত
লােক এই বংশে জন্মেছেন। এক কথায় বলতে গেলে
এই বংশটি লক্ষ্মী আর সরস্বতীর মিলন-স্থান।
বড় ঘরের ছেলে হলেও ছােট বেলায় রবীন্দ্রনাথকে
খুব সাদাসিধে ভাবে থাকতে হােত । বাবুগিরির
নাম-গন্ধও তখন ছিল না। নিজেই তিনি এ সম্বন্ধে
বলেছেন—“আহারে আমাদের সৌখিনতার গন্ধও ছিল
না । কাপড় চোপড় এতই যৎসামান্য ছিল যে
এখনকার ছেলের চক্ষে তাহার তালিকা ধরিলে সম্মান
হানির আশঙ্কা আছে। বয়স দশের কোঠা পার
হইবার পূর্বে কোনো দিন কোনাে কারণেই মােজা পরি
নাই। শীতের দিনে একটা শাদা জামার উপরে আর
একটা শাদা জামাই যথেষ্ট ছিল ।... আমাদের চটি
জুতা এক জোড়া থাকিত, কিন্তু পা দুটা যেখানে থাকিত
সেখানে নহে। প্রতিপদক্ষেপে তাহাদিগকে আগে
আগে নিক্ষেপ করিয়া চলিতাম...।”
তাদের বাড়ীর নিয়ম-কানুনও ছিল ভারী কড়া।
বাড়ীর বাইরে যাওয়া একেবারেই বারণ। বেশীর ভাগ

মনের খেলা ১১ সময় তাকে চাকরদের শাসনেই থাকতে হােত। বড় কড়া শাসন। তাদের এক ছােকরা চাকর ছিল- তার নাম শ্যাম। সে ভারী মজা করতাে। সে করতে কি, রবীন্দ্রনাথকে একটি ঘরের ভেতর বসিয়ে খড়ি দিয়ে তার চারদিকে গণ্ডি কেটে দিত আর খুব গম্ভীর মুখ করে বলে যেত--খবরদার, এই গণ্ডি পার হয়েছ কি বিপদে পড়েছ । রবীন্দ্রনাথ বিপদের ভয়ে গণ্ডির বাইরে যেতে সাহস করতেন না। তিনি ঘরের ভেতর চুপটি করে বসে বসে জানালার ভেতর দিয়ে বাহিরের জিনিষ তন্ময় হয়ে দেখতেন। এ সব রবীন্দ্রনাথের নিজেরই কথা—নিজেই তিনি এ সব বলেছেন। জানালার নীচেই একটি ঘাট-বাঁধানাে পুকুর ছিল। পুকুরপাড়ে একধারে ছিল প্রকাণ্ড একটা বটগাছ আর এক সারি নারিকেল গাছ। তিনি জানালার খড়খড়ি খুলে সেই পুকুরটাকে একখানা ছবির বইয়ের মত দেখে- দেখে প্রায় সমস্ত দিন কাটিয়ে দিতেন। কত লােক আসতাে, স্নান করতে। কত রকম ভঙ্গীতে তারা ডুব পাড়তাে, তা তিনি খুব মনােযােগের সঙ্গে দেখতেন। তার পর দুপুর বেলা পুকুর-ঘাট জনশূন্য হয়ে গেলে পর, সেই প্রকাণ্ড বটগাছের তলাটা তার সমস্ত ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ ••• ne, মনখানিকে দখল করে নিত। বটগাছটার গুড়ির চারধারে বিস্তর ঝুরি নেমে সে জায়গাটা অন্ধকার করে রেখেছিল। তার চোখে সেই বটতলার অন্ধকার জায়গাটা তখন ভারী রহস্যময় ঠেক্ততা। বড় হয়ে তিনি এই বটকেই উদ্দেশ করে লিখেছিলেন- “নিশি-দিসি দাড়িয়ে আছ মাথায় লয়ে জট, ছােট ছেলেটি মনে কি পড়ে, ওগে। প্রাচীন বট ? মনে কি নেই সারাটা দিন বসিয়ে বাতায়নে, তােমার পানে রইত চেয়ে অবাক দু-নয়নে ? তােমার তলে মধুর ছায়া তােমার তলে ছুটি, তােমার তলে নাচত বসে শালিখ পাখী দুটি। ভাঙা ঘাটে নাইত কারা তুলত কারা জল, পুকুরেতে ছায়া তােমার করত টলমল । জলের উপর খােদ পড়েছে সােনামাখা মায়া, ভেসে বেড়ায় দুটি হাঁস দুটি হাঁসের ছায়া। ছােট ছেলে রইত চেয়ে বাসনা অগাধ, মনের মধ্যে খেলাত তার কত খেলার সাধ।" শুধু যে বাড়ীর বাইরে যাওয়াই তার বারণ ছিল তা নয়, বাড়ীর ভেতরেও সব জায়গায় যেমন-খুসী

মনের খেলা
তঁার যাওয়া চলত না। কিন্তু এই রকম বাঁধা-ধরার
মধ্যে থেকেও তার মনের মধ্যে এতটুকু আনন্দের
অভাব ছিল না। তিনি বিশ্বপ্রকৃতিকে ফাঁক-ফুকর
দিয়ে উকিঝুকি মেরে দেখতেন, আর তাইতে তার
শিশুমন উল্লাসে ভরে উঠতাে। বাড়ীর ভেতরে একটি
বাগান ছিল, সেটি যে খুব বড়, তা নয়। সেখানে
খুব বেশী গাছপালা ছিল না। একটা বাতাবি নেবু,
একটা কুলগাছ, একটা বিলাতি আমড়া আর এক সার
নারিকেল গাছ নিয়েই ছিল এই বাগানটি। কিন্তু
এই বাগানটিই ছিল তার স্বর্গের বাগান। ভােরবেলা
ঘুম
ভাঙ্গলেই তিনি এই বাগানে এসে হাজির হতেন।
একটি শিশির-মাখা ঘাসপাতার গন্ধ ছুটে আসতাে,
আর পূর্ব দিকের পাঁচীরের উপর নারিকেল পাতার
ঝালরগুলির ভেতর দিয়ে সােনালি বােদ মুখ বাড়াতে
থাকতাে।
দুপুরবেলা চতুর্দিক নিস্তব্ধ হয়ে গেলে পর বাহিরের
দিকে চেয়ে-চেয়ে কত রকমই তিনি ভাবতেন! মাথার
উপরে নীল আকাশ, রােদ একেবারে চক্‌চক্‌ করছে-
আকাশের কোণ থেকে মাঝে মাঝে চিলের তীক্ষ ডাক
তার কানে এসে পৌঁছত। রাস্তা দিয়ে ফেরিওয়ালা

১৪
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
“চাই, চূড়ী চাই, খেলােনা চাই” বলে হেঁকে যেতাে।
মাথার উপরের নীল আকাশ, চচকে রোদ, নারিকেল
গাছের সারি, মাটি, জল, দূরের ঘর-বাড়ী এই সব
জড়িয়ে তার সমস্ত মনটাকে একেবারে উদাস করে
দিত। তার মনটি তখন বােধ হয় এই কথাই বলতাে-
“আমার যেতে ইচ্ছে করে
নদীটির ঐ পারে,
যেথায় ধারে ধারে
বাশের খোটায় ডিঙি নৌকো
বাঁধা সারে সারে।
কৃষাণেরা পার হয়ে যায়
লাঙল কঁাধে ফেলে ;
জাল টেনে নেয় জেলে ;
গরু মহিষ সাঁৎরে নিয়ে
নায় রাখালের ছেলে।
‘আমি যাব রাজপুত্রু হয়ে
নৌকোভরা সােনামাণিক বয়ে,
আশুকে তার শ্যামকে নেব সাথে,
আমরা শুধু বাব মা তিনজনে :

মনের খেল।
আমি কেবল যাব একটিবার
সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার !”
“দাদার জন্যে আম্ব মেঘে-ওড়।
পক্ষীরাজের বাচ্ছা দুটি ঘােড় ।
বাবার জন্যে আবে আমি তুলি
কনকলতার চারা অনেকগুলি
তাের তরে মা দেব কৌটা খুলি
সাত-রাজার-ধন মাণিক একটি জোড়।”
ছােট বেলাতেই রবীন্দ্রনাথের মন কি বিচিত্র
কল্পনার ভেতর দিয়েই ঘুরে বেড়াতে !

বংশ-পনি
রবীন্দ্রনাথের বাপ-পিতামহ খুব ধনী ছিলেন এ কথা
আগেই বলেছি। কিন্তু তাঁরা যে কত মহৎ ছিলেন
সে কথা বলা হয় নি। এবার তা বলবাে।
রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর একজন
অসাধারণ লােক ছিলেন। ১৭৯৪ সালে তার জন্ম
হয়।
দ্বারকানাথের জীবনের ইতিহাস ঠিক উপন্যাসের
মতাে। তাঁর সমান ধনী তখনকার দিনে বাংলাদেশে
আর একজনও ছিল কি না সন্দেহ। নিজের চেষ্টায়
তিনি ক্রোড়-ক্রোড় টাকা উপার্জন করেছিলেন। তাঁর
উপার্জনশক্তি যেমন অদ্ভুত, দানশক্তিও তেমনি অদ্ভুত
এ সম্বন্ধে একটি গল্প বলি-
একবার এক জজ সাহেব ছুটি নিয়ে বিলাত
যাচ্ছিলেন। যাবার সবই ঠিক, এমন সময় তার
পাওনাদারেরা তাকে খবর দিল যে, তার লাখ টাকার
উপর ধার ।
সে ধার শােধ না দিলে জজ সাহেবকে
জেলে যেতে হবে। তিনি তখন মহাবিপদে পড়ে
দ্বারকানাথ ঠাকুরকে চিঠি লিখে সব কথা জানালেন,
৪।
ছিল।

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ,
';
।
দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৬-—পৃঃ

No text on this page.

বংশ-পরিচয়
আর টাকার সাহায্য চাইলেন। দ্বারকানাথ জজ
সাহেবের পাওনাদারদের ডাকিয়ে সমস্ত ধার শােধ করে
দিলেন আর তাদের কাছ থেকে খতের কাগজপত্রগুলি
চেয়ে নিলেন। তার পর নিজে চললেন জজ সাহেবের
সঙ্গে দেখা করতে। জজ সাহেব যখন নিজের দুঃখের
কাহিনী তার কাছে বলতে আরম্ভ করলেন, তিনি তখন
তাকে খতের কাগজপত্রগুলি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন যে,
এবার তিনি সচ্ছন্দে বিলাত যাত্রা করতে পারেন।
জজ সাহেব তাে অবা। তিনি এই টাকা ধার বলে
নিয়ে খত লিখে দিতে চাইলেন কিন্তু দ্বারকানাথ কোন
রকম খত নিতে রাজি হলেন না। তাঁর দানের এই
রকম অনেক গল্প আছে।
দেশের কাজে তিনি লাখ-লাখ টাকা দিয়ে গেছেন।
এদেশের কত ভাল ভাল কাজের তিনি গােড়া পত্তন
করে গেছেন তার ঠিকানা নেই। হিন্দু কলেজ যখন
খােলা হয়, তিনি তার উদ্যোগী ছিলেন। মেডিক্যাল
কলেজের বাড়ী তৈরীর জন্য তিনি বিস্তর টাকা
দিয়েছিলেন।
ইংরেজ মহলে তার খুব খাতির ছিল। সকল
কাজেই তিনি ইংরেজ সরকারকে পরামর্শ দিতেন।

১৮
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
•
তারই পরামর্শে ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট পদের সৃষ্টি হয়।
ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট কি, তা এখন সবাই জানে, কিন্তু
তিনিই যে এর সৃষ্টিকর্তা তা এখন খুব কম লােকেরই
জানা আছে। দ্বারকানাথকে ইংরেজ সরকার জষ্টিস্
অব দি পিস্ (Justice of the Peace) করে দেন,
তখনকার দিনে এর চেয়ে বড় সম্মানের পদ আর কিছু
ছিল না।
১৮৪২ সালে তিনি বিলাতে যান। বিলাতের
ধনী আর বনেদি লােকদের ভেতর তিনি খুব খাতির
পেয়েছিলেন। তাঁর ধন-দৌলত, জাঁক-জমক, রাজপুত্রের
মত চেহারা, ভদ্র ব্যবহার, উচু মন, এই সব দেখে
ইংলণ্ডের বড় বড় লােক থেকে মহারাণী ভিক্টোরিয়া পর্যন্ত
সেখানে তিনি রাজার ঠাটে থাকতেন
আর খুব খরচপত্র করতেন। এই জন্যে সেখানকার
ললাকেরা তাকে ‘প্রিন্স’ এই নাম দিয়েছিল।
তােমরা হয় তাে মনে করছে, দ্বারকানাথ বিলাতে
গিয়ে সাহেবদের সঙ্গে মিশে একেবারেই সাহেব হয়ে
গেছলেন।
তা কিন্তু নয়। সেখানে তিনি দেশী
পােষাকই পরতেন। আলবােলার নল সর্বদা তার
হাতে থাকতাে। সেখানকার কেউ যদি তার দেশের
মুগ্ধ হয়েছিলেন ।

বংশ-পরিচয়
কোনকিছুকে খাটো করবার চেষ্টা করতাে, তিনি
তা সহ্য করতেন না, সঙ্গে সঙ্গে অমনি প্রতিবাদ
করতেন।
নিজের দেশের উপর তার গভীর শ্রদ্ধা
ছিল।
দেশের জন্য ভাল কাজে তার উৎসাহের অন্ত ছিল
। দ্বিতীয় বার যখন তিনি ইংলণ্ড যান, তিনি
ঠিক করলেন মেডিক্যাল কলেজের কয়েকজন ছাত্রকে
নিজের খরচায় ইংলণ্ডে নিয়ে গিয়ে শিক্ষিত করে
আনবেন। চারজন ছাত্র জুটলাে, তার ভেতর দুজনের
খরচের ভার তিনি নিজে নিলেন। কিন্তু এই যাত্রাই
তাঁর শেষ যাত্রা। বিলাতে তার ভয়ানক ব্যারাম হয়
আর সেখানেই তিনি ৫২ বৎসর বয়সে মারা যান।
রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাণ্ডিত্যে, জ্ঞানে, সততায়, চরিত্রের বলে মানুষের
সেরা ছিলেন। তিনি আদি ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা
করে যান। তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষ আর একজনও ছিল
, এ কথা বললে বেশী কিছুই বলা হােল না। তার
ধৰ্ম্মভাব এ রকম অসাধারণ ছিল যে, গুণী লােকেরা
তাকে ‘মহর্ষি’ আখ্যা দিয়েছিলেন। তার চরিত কথা
শুনলে বহু পুণ্য লাভ হয়। ফুলের সুবাস নাকে

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
এলে মন যেমন প্রফুল্ল হয়ে উঠে, মহর্ষির কথা শুনলেও
মন তেমনি আপনা আপনি ভক্তি ও আনন্দে ভরে
উঠে। তার অপূৰ্ব্ব চরিত কথা অল্পের ভেতর বলা
অসম্ভব। বড় হয়ে তােমরা তঁার সম্বন্ধে বিশেষ করে
জেনে। তিনি যে কত মহৎ, কত উদার ছিলেন
কেবল সেই সম্বন্ধে দু-এক কথা তােমাদের শােনাব।
দ্বারকানাথ ঠাকুর যখন মারা গেলেন তখন তার
বিস্তর টাকা দেনা। বিলাতে তিনি রাজার ঠাটে
থাকতেন, তা ছাড়া তাঁর দান ছিল অসাধারণ রকমের।
এই সব কারণে তার প্রায় এক ক্রোড় টাকা দেনা
হয় । দেবেন্দ্রনাথের বয়স তখন ৩০ বৎসর। হিসাব
পত্র করে দেখা গেল, পাওনা সােত্তর লক্ষ টাকা, দেনা
কিন্তু এক কোটি টাকা। পিতার এই দেনা কি করে
তিনি শােধ দেবেন ভেবে
আকুল হলেন। তিনি
সকল পাওনাদারকে ডেকে পাঠালেন
আর সমস্ত
ব্যাপার খুলে বললেন। দেবেন্দ্রনাথের নিজের জন্যে
কিছু সম্পত্তি তার পিতা রেখে গেছলেন।
সম্পত্তিতে পাওনাদারদের হাত দেবার কোনই অধিকার
ছিল না। দেবেন্দ্রনাথ জানতেন, দেনার জন্যে তার
এই সম্পত্তির কোনই ক্ষতি হবে না, আর এই সম্পত্তি

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ,
।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর—২০পৃ:

বংশ-পরিচয়
* - -
* * *
থাকলে তার কিছুরই অভাব থাকবে না। কিন্তু
নিজে তিনি সম্পত্তি ভােগ করতে থাকবেন, আর
পাওনাদারেরা তাদের নায্য টাকা পাবে না, এ কি
হতে পারে ? তিনি অন্য সব বিষয়-সম্পত্তির সঙ্গে
নিজের এই সম্পত্তিটিও পাওনাদারদের হাতে ছেড়ে
দিতে চাইলেন। পাওনাদারেরা তাে এই দেখে অবাক্‌।
অনায়াসে তিনি এই সম্পত্তি বাঁচাতে পারেন, কিন্তু
তা না করে যথা-সৰ্ব্বস্ব ছেড়ে দিয়ে ইচ্ছে করে ফকির
হতে বসেছেন। তার আত্মীয়েরা কত করে তাকে
বােঝালেন, এ সম্পত্তিটিও ছেড়ে দিলে একেবারেই
যে তিনি পথে বসবেন! কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ কি বললেন
শুনবে ? তিনি বললেন, “যাবৎ অঙ্গে একটি চীর
পৰ্যন্ত থাকিবে, তাবৎ বলিতে পারিব না যে সব
দিলাম। এমনি সকলই দিব। ঈশ্বর ও ধর্ম
আমাদিগকে রক্ষা করুন।” তিনি সব দিলেন।
তার হাতে একটি দামী আংটি ছিল। তিনি বললেন
“এই আংটিটা আমার আছে ; আমার বিষয়-সম্পত্তির
তালিকার মধ্যে এটাকেও ধরা উচিত।” পাওনাদারেরা
তাঁর অসাধারণ সরলতা দেখে মুগ্ধ হলেন। অনেকের
চোখে জল এল। আজ এরা রাজপুত্র, কাল কিন্তু

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
হবেন পথের কাঙাল। তারা বুঝলেন, এরা সম্পূর্ণ
নির্দোষ। শেষে দেনা-পাওনার একটা মীমাংসা
হােল। পাওনাদারেরা সমস্ত বিষয় দেবেন্দ্রনাথের
হাতেই রাখলেন। ঠিক হােল, দেবেন্দ্রনাথ নিজেই
সব দেখবেন আর ক্রমশ দেনা শােধ করবেন।
বিপদ এই ভাবে কেটে গেল—সাধুতারই
হােল ।
দেবেন্দ্রনাথ ধনী ছিলেন—বিষয়ী ছিলেন, কিন্তু
বিষয়ের দাস ছিলেন না। তাঁর দিদিমার
তাঁর দিদিমার মৃত্যুর পর
একদিন বৈঠকখানায় বসে তিনি সকলকে বলেছিলেন
“আজ আমি কল্পতরু হইলাম, আমার কাছে যে যাহা
চাহিবে তাহাকে আমি তাহাই দিব।” এই বলে
বড় বড় আয়না, সুন্দর সুন্দর ছবি, জরির পােষাক,
দামী আসবাব-পত্র যা তার ছিল, সব বিলিয়ে
দিলেন।
একদিন একজন লোক এসে দেবেন্দ্রনাথকে
বললেন, “মহাশয় অাপনার পিতা আমাদের দাতব্য
সমিতিতে এক লক্ষ টাকা দান করবেন বলে
কথা দিয়েছিলেন। তিনি সে টাকা দিয়ে যেতে
পারেন নি। আপনি এখন আমাদের সেই টাকা

বংশ-পরিচয়
৭ 1 = = = -
- * * * * *
*
দিন।” দেবেন্দ্রনাথ তখন কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
পাওনাদারদের দেনা তখনাে মাথার উপর।
টাকা দেওয়ার অবস্থা তার তখন নয়। এই টাকা
তিনি নাও দিতে পারতেন। দিলে কেউ তাকে
অপরাধী করতাে না। কিন্তু তার পিতা একবার যখন
কথা দিয়ে গেছেন, তখন একে তিনি পিতৃ-ঋণ বলেই
ধরে নিলেন। কিছু দিন পরে তিনি এক লক্ষ টাকা
সুদসমেত সেই দাতব্য সমিতিকে দিয়েছিলেন।
দেবেন্দ্রনাথ দান করতেন, কিন্তু নামের জন্যে নয়।
যে লােককে যা দিতেন, আগে তা ঈশ্বরকে নিবেদন
করে পরে তা নৈবেদ্যের মতাে সেই লােককে দিতেন।
কোন লােককেই তিনি ফেরাতেন না। সমস্ত জীবন
ধরে তিনি অনেক দান করে যান। নানারকমের ধার
শােধ করা ছাড়া তিনি প্রায় বাইশ লক্ষ টাকা সমস্ত
জীবনে দান করেছিলেন।
স্বদেশকে তিনি খুব শ্রদ্ধা করতেন। তার অন্তরে
দেশী ভাব অত্যন্ত প্রবল ছিল। তার কোন এক
আত্মীয় একবার ইংরাজিতে তাকে একখানি চিঠি
লেখেন। চিঠি খুলে যেমন দেখলেন
ইংরাজিতে লেখা, অমনি না পড়েই সে চিঠিখানি ফেরৎ
যে সেটি

২৪ ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ পাঠিয়ে দিলেন। মাতৃভাষার উপর তার এমনই ছিল অসাধারণ শ্রদ্ধা। সংসারে থাকতে হলে মানুষকে যা যা করতে হয়, তার সবই তিনি করতেন, কিন্তু তার জীবনের লক্ষ্য ছিল ঈশ্বরের আরাধনা। তিনি বলতেন—পারে যাতে সুখী হবে, এখন তা কর, কিন্তু অনন্তকাল ধরে যাতে সুখী হতে পার, তা আজীবন ধরে করে যাও। সুখের ভেতর, বিলাসের ভেতর থেকেও আজীবন ধরে তিনি ঈশ্বরেরই আরাধনা করে গেছেন। এ জন্যে লােক-জনের ভীড় থেকে আলাদা হয়ে নির্জনে থাকতেই তিনি ভাল- বাসতেন। কখনাে থাকতেন নৌকায় করে নদীতে, কখনাে জনশূন্য মাঠে তাবু ফেলে, কখনাে বা হিমালয় পৰ্বতের চূড়ায়। এই সব জায়গায় তিনি মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কেবল ঈশ্বরের আরাধনা করেই কাটিয়ে দিতেন। শেষ বয়সে তার মন দিন-রাত ঈশ্বরে মগ্ন হয়ে থাকতাে। তিনি তখন বলতেন—“এখন আমি নীড়ে মায়ের পাখার নীচে শুয়ে রয়েছি। শীঘ্রই আমার পাখা উঠবে, তখন মায়ের সঙ্গে অনন্ত আকাশে উড়ে বেড়াবাে। এ আনন্দ আর আমার মনে ধরে না।”

বংশ-পরিচয়
মৃত্যুর কয়েক দিন আগে কেবলই তিনি বলতেন
“এখন আমি কেবল তাকেই দেখছি—তাকেই দেখছি।”
কখন বলতেন “আমি বাড়ী যাব, আমি বাড়ী যাব।”
৮৭ বৎসর বয়সে দেবেন্দ্রনাথ আনন্ত লােকে গমন
করেন। কেমন করে, কি প্রণালীতে, বাইরের হাজার
হাজার আকর্ষণ কাটিয়ে তিনি নিজের মধ্যে নিজেকে
মগ্ন রেখেছিলেন, তা জানবার বিষয়। বড় হয়ে
তােমরা তা জানবার চেষ্টা করো—জীবন সার্থক হবে।

লেখাপড়ায়
রবীন্দ্রনাথের পিতার কথা –পিতামহের কথা
তােমরা শুনলে। তারা কত বড় ছিলেন, তা দেখাবার
জন্যেই তাদের কথা বিশেষ করে বললুম।
এবার
রবীন্দ্রনাথের কথাই বলি।
রবীন্দ্রনাথের বাল্য জীবন বিচিত্র ছিল। বাড়ীর
বাইরে যেতে না পেলেও মনে তার আনন্দের অভাব
ছিল না। গাছপালা, ফুলফল, পাখীর গান, মেঘ,
জল এই সব দেখেই তিনি আনন্দে ভরপূর হয়ে
থাকতেন। এ সমস্তই তার সঙ্গে কথা কইতে ।
পর আর একটু বড় হয়ে তিনি অবশ্য তােমাদের মতােই
স্কুলে যেতে আরম্ভ করলেন। কিন্তু বাঁধাবাঁধির
ভেতরে থেকে স্কুলের পড়া পড়তে তার মােটেই ভাল
লাগতাে না। স্কুলের শাসন ছিল বিঘুটে ধরণের।
পড়া বলতে না পারলে বেঞ্চের ওপর দাড় করিয়ে
দেওয়া হােত, আর হাতের উপর যত রাজ্যের শ্লেট
চাপিয়ে দেওয়া হােত। দুপুর রােদে খালি পায়ে
ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাড়িয়ে থাকতে হােত। আর মারধাের
তাে ছিল কথায় কথায়।

লেখাপড়ায়
২৭
একদিকে চাকরদের শাসন,
আর একদিকে
মাষ্টারদের মারধাের,—এতে তার মনটিতে বেদনা
লাগতাে নিশ্চয়, কিন্তু তা বলে তার আনন্দস্রোতে
বাধা পড়ে নি। অতি সামান্য, তুচ্ছ জিনিষও তার
কাছে আনন্দময়, রহস্যময় ঠেকতাে। বারান্দার এক
কোণে আতার বীচি পুতে বােজ তিনি জল দিতেন।
সেই বীচি থেকে যে গাছ গজিয়ে উঠতে পারে এ কথা
মনে করে তার কতই না বিস্ময়, কতই না আনন্দ
হােত। এই পৃথিবীটাকে কেবলমাত্র উপরের তলাতেই
বরাবর দেখে আসছেন। ভেতরের তলাটাতে
না জানি কি আছে, এই কথাটা তিনি কতদিন
ভাবতেন। কি করলে পৃথিবীর উপরকার এই মেটে
রএর মলাটটাকে খুলে ফেলা যেতে পারে, তার কত
প্ল্যান্ই ঠাওরাতেন। ভাবতেন, একটার পর একটা
তার পর আর একটা বাঁশ যদি ঠুকে ঠুকে পোঁতা যায়
আর এমনি করে অনেকগুলাে বাঁশ পুঁতে ফেল্লে পর,
পৃথিবীর নীচের তলাটার হয়তাে নাগাল পাওয়া যেতে
পারে। মাঘােৎসবের সময় কাঠের থাম পোঁতবার
জন্যে উঠানে মাটি কাটা হােত। এই মাটিকাটা
ব্যাপারটা তাঁর কাছে বড়ই কৌতুকজনক ছিল। তিনি

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ । দেখতেন, গৰ্ত্ত বড় হতে হতে একটু একটু করে সমস্ত মানুষটাই গর্তের নীচে তলিয়ে যেত, অথচ তার ভেতর দিয়ে যে পাতালপুরীতে যাওয়া যেতে পারে তার কোনই সম্ভাবনা দেখা যেত না। তার মনে হােত গর্তটা যেন আর একটু বড় করলেই ঠিক হয়; কিন্তু বড়রা সে দিকে গা করতেন না দেখে তার ভারী তাপশােষ হােত। স্কুলে তিনি যেতেন বটে, কিন্তু স্কুলের কোন কিছুই তার ভাল লাগতাে না—ছেলেদেরও না, মাষ্টারদেরও একজন মাষ্টারের ব্যবহার এতই মন্দ ছিল যে, তিনি তার ক্লাশে সকল ছাত্রের নীচে চুপটি করে বসে থাকতেন। মাষ্টারের কোন প্রশ্নেরই জবাব দিতেন । সমস্ত বছরটা এই ভাবে কেটে গেল। তার পর যখন বাংলার পরীক্ষা হােল, তিনি সকল ছেলের চেয়ে বেশী নম্বর পেলেন। তাঁর সেই মাষ্টারটি কিন্তু এটা মানতেই চাইলেন না। তিনি বললেন, পরীক্ষা ঠিক- মতাে নেওয়া হয় নি, দ্বিতীয় বার পরীক্ষা নেওয়া হােল। এবারেও তিনি সকলের উপরে হলেন। শুধু স্কুলের পড়াতে কি হয় ! বাড়ীতে অনেক বেশী গুঁকে পড়তে হােত। চারুপাঠ, বস্তুবিচার, লেখাপড়ায় প্রাণিবৃত্তান্ত থেকে আরম্ভ করে মেঘনাদবধ কাব্য পর্যন্ত । এ ছাড়া আরাে অনেক কিছুই ছিল । ভােরে অন্ধকার থাকতে উঠে লঙটি পরে প্রথমেই এক কাণা পালােয়ানের সঙ্গে কুস্তি করতে হােত। তার পর সেই মাটিমাখা শরীরের উপর জামা পরে পদার্থবিদ্যা, মেঘনাদবধ কাব্য, জ্যামিতি, গণিত, ইতিহাস, ভূগােল এই সব পড়তে হােত। স্কুল থেকে ফিরে এসেই ড্রয়িং আর জিষ্টি করতে হােত, সন্ধ্যার সময় ইংরাজি পড়তে হোত ; তার পর রাত্রি ন’টার পর ছুটি। রবিবার সকালে গান শিখতে হােত। স্কুল-কলেজের পড়া বেশীদূর না। এগুলেও বাড়ীতেই তার শিক্ষার যা আয়ােজন ছিল তা খুবই বেশী । বিষয়ে তিনি অনেক ছেলের চেয়েই বেশী ভাগ্যবান। আর এক মস্ত সুবিধা এই ছিল যে, অনেক গুণী লোক সদাসর্বদা তাদের বাড়ীতে যাতায়াত করতেন। তাদের কেউ বা কবি, কেউ বা গায়ক, কেউ বা সাহিত্যিক, কেউ বা দার্শনিক, কেউ বা মহা- ধাৰ্ম্মিক। এরা সকলেই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের নিকট খুব সমাদর পেতেন। বড় বড় পণ্ডিত—যেমন রাজ- নারায়ণ বসু, অক্ষয়কুমার দত্ত ঠিক একেবারে তাদের

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
আপনার লােক হয়ে গেছলেন। বই পড়ে যা শেখা
যায় তার চেয়ে ঢের বেশী শেখা যায় মানুষের সঙ্গ
থেকে। নিজের বাড়ীতেই রবীন্দ্রনাথ যে রকম শিক্ষ।
পেতে লাগলেন, সে রকম শিক্ষা স্কুলেও হয় না—
কলেজেও হয় না।
রবীন্দ্রনাথের কাব্যজীবনের আরম্ভ হয়, তার বয়স
যখন মাত্র সাত আট বছর। এই আরম্ভটি ভারী
সুন্দর। তিনি বলেছেন “আমার এক ভাগিনেয় শ্ৰীযুক্ত
জ্যোতিপ্রকাশ আমার চেয়ে বয়সে বেশ একটু বড়।•••
একদিন দুপুরবেলা তাহার ঘরে ডাকিয়া লইয়া বলিলেন
তােমাকে পদ্য লিখিতে হইবে।.. পদ্য জিনিষটিকে এ
পর্যন্ত কেবল ছাপার বহিতেই দেখিয়াছি।...এই পদ্য
যে নিজে চেষ্টা করিয়া লেখা যাইতে পারে এ কথা কল্পনা
করিতেও সাহস হইত না।” তারপর গােটা কয়েক
শব্দ নিজের হাতে জোড়াতাড়া দিতেই যখন তা পদ্য
হয়ে উঠলাে, তখন তিনি ভারী আশ্চর্য্য হয়ে গেলেন।
ভয় একবার যখন ভাঙ্গলো, তখন আর পায় কে ?
দপ্তরখানার একজন আমলাকে ধরে অনেক কষ্টে
একখানি নীলকাগজের খাতা জোগাড় করলেন আর
তাতে নিজের হাতে পেন্সিল দিয়ে কতকগুলাে অসমান

লেখাপড়ায়
লাইন কেটে বড় বড় অক্ষরে পদ্য লিখতে শুরু করে
দিলেন ।
পদ্য লিখে যতক্ষণ পর্যন্ত না অপরকে শােনান
যায় ততক্ষণ কি আর মজা হয়। রবীন্দ্রনাথও এ বিষয়ে
অলস ছিলেন না। তিনি যাকে তাকে ধরে পদ্য
শােনাতে আরম্ভ করলেন। তাঁর দাদা ছােট ভাইটির
পদ্য রচনায় ভারী গর্ব বােধ করলেন আর বাড়ীর
সবাইকে এক ধার থেকে তা শােনাতে লেগে গেলেন।
বাড়ীর সবাই তাে অস্থির ! শুধু কি বাড়ীর লােক।
তাদের জমিদারী কাছারীর আমলারা পৰ্যন্ত বাদ গেল
। তার সেই নীল খাটি বাঁকা বাঁকা লাইনে আর
সরু মােটা অক্ষরে ক্রমেই বাের বাসার
ভরে উঠতে লাগলাে। তিনি যে কবিতা লেখেন তা
বাড়ীর বাহিরেও যাতে রটে যায়, এমন কি স্কুলের
মাষ্টারদেরও যাতে কাণে যায় সেদিকেও তার লক্ষ্য
ছিল। তােমরা এই দেখে বােধ হয় মনে মনে হাসছে।
কিন্তু তােমরাও কি ঠিক এই রকমটি কর না? তার
তখনকার কবিতা দু-একটি শুনবে ?
মীনগণ হীন হয়ে ছিল সরােবরে
এখন তাহারা সুখে জলক্রীড়া করে ।

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ A. 'আমসত্ত দুধে ফেলি, তাহাতে কদলী দলি, সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে-- হাপুস্ হুপুস্ শব্দ, চারিদিক নিস্তব্ধ, পিপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে। বড়দের ভেতর সমঝদার শ্রোতা তিনি খুব বেশী পেতেন না। নেকেই আবার তার কবিতা শুনে হাসতেন। একবার কেউ হাসলে, আর তিনি সেদিক মাড়াতেন না। কিন্তু শ্রোতার অভাব তার মােটেই হয় নি। একটি খুব ভাল শ্রোতা তিনি পেয়েছিলেন। ইনি একজন বৃদ্ধ; নাম একণ্ঠ সিংহ। ইনি রবীন্দ্র- নাথের পিতার একজন ভক্ত বন্ধু। এ রকম শ্রোতা আর মেলে না। ভাল লাগবার ক্ষমতা তার অসাধারণ রকমের ছিল। এই বৃদ্ধ একেবারে পাকা বােম্বাই আমটির মতো—কোথাও এতটুকুও আঁশ ছিল না। মাথা-ভরা টাক, গোঁফদাড়ি-কামানাে, মুখের মধ্যে দাতের কোন বালাই ছিল না। রবীন্দ্রনাথ একে মনের সাধ মিটিয়ে কবিতা শােনাতেন। স্বভাবটি ছিল ভারী মিষ্টি। মিষ্টি স্বভাবের গুণে মানুষ মাত্রেই ছিল তার আপনার। সৰ্ব্বদাই হাসি মুখ । দিন রাত একটি সেতার তার কোলে কোলেই

লেখাপড়ায়
৩৩
ফিরতােকণ্ঠে গানের আর বিরাম ছিল না। গান
সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তার শিষ্য। এ সম্বন্ধে
রবীন্দ্রনাথ বলেন, “হার একটা গান ছিল—‘ময়,
ছােড়ে। ব্রজকি বাসরী।' ঐ
ঐ গানটি আমার মুখে
সকলকে শােনাইবার জন্য তিনি আমাকে ঘরে ঘরে
টানিয়া লইয়া বেড়াইতেন। আমি গান ধরিতাম,
তিনি সেতারে ঝঙ্কার দিতেন।”

বাড়ীর বাহিরে
ছেলেবেলায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতার কাছ থেকে
দূরে-দূরে থাকতেন। তাঁর পিতা তখন বাড়ীতেই
প্রায় থাকতেন না, দেশ-বিদেশে বেড়িয়ে বেড়াতেন।
পৰ্বত, নদী, নির্জন মাঠ এই রকম সব জায়গা ছিল
তার অতি প্রিয়। অনেক দিন বিদেশে থাকার
পর অল্প কয়েক দিনের জন্য যখন তিনি কল্কাতায়
আসতেন তখন সমস্ত বাড়ী যেন গম্ গম্ করতে
থাকত। সকলেই সাবধান হয়ে চলতেন। রবীন্দ্রনাথ
বলেন, “পাছে বারান্দায় গােলমাল ও দৌড়াদৌড়ি করিয়া
তাঁহার বিরাম ভঙ্গ করি এজন্য পূৰ্বেই আমাদিগকে
সতর্ক করিয়া দেওয়া হইয়াছে। আমরা ধীরে ধীরে
চলি, ধীরে ধীরে বলি, উকি মারিতে আমাদের সাহস
হয় না।” এই রকম ভাবে দূরে দূরে থেকেই তাঁর
কৌতূহল মিটততা, পিতার কাছ অবধি আর পোঁছানাে
ঘটে উঠত না। কিন্তু হঠাৎ একদিন আশ্চর্য রকমে
এই ব্যবস্থা বদলে গেল।
রবীন্দ্রনাথের তখন উপনয়ন হয়ে গেছে। তাঁর
মাথাটি একেবারে নেড়া। নেড়া মাথা নিয়ে স্কুলে

বাড়ীর বাহিরে
যাবেন কি করে, এই হয়েছে তার মহা ভাবনার কথা।
এমন সময় হঠাৎ একদিন তেতলার ঘরে ডাক পড়লাে।
তার পিতা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি তার সঙ্গে
হিমালয়ে যেতে চান কি না। রবীন্দ্রনাথের তখন
যে কি আনন্দ, তা বলে বােঝান শক্ত। তিনি বলেন,
“চাই” এই কথাটা যদি চীৎকার করিয়া আকাশ
ফাটাইয়া বলিতে পারিতাম তবে মনের ভাবের উপযুক্ত
উত্তর হইত।
হিমালয়ে যাবার দিন তিনি পােষাক পরে তার
পিতার সঙ্গে গাড়ীতে উঠলেন। তাঁর বয়সে এই প্রথম
তিনি পােষাক পরলেন। একটা জরির-কাজ-করা
মখমলের টুপি হয়েছিল। মনে মনে আপত্তি থাকলেও
সেটা তাকে নেড়া মাথার উপরেই পরতে হােল ।
আগে তিনি কখন রেলগাড়ীতে চড়েন নি। ষ্টেশনে
পৌছে তার বেশ একটু ভয় করতে লাগলাে। কারণ
তিনি শুনেছিলেন, রেলগাড়ীতে চড়া এক ভয়ঙ্কর
ব্যাপার-পা ফসূকে গেলে আর রক্ষে নেই। কিন্তু
অতি সহজেই রেলগাড়ীতে উঠতে পারলেন দেখে, তিনি
ভারী আশ্চর্য হয়ে গেলেন।
তারপর গাড়ী ছুটে চললাে। মাঠ, গাছপালা,

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ ক * * গ্রাম ঠিক যেন ছবির ঝরণার মতাে রেলগাড়ীর দুদিক দিয়ে ছুটতে লাগলাে। সন্ধ্যার সময় তিনি বােলপুরে পৌঁছলেন। এখানে কিছু দিন তাদের থাকবার কথা। বােলপুর সম্বন্ধে শুনে শুনে আগে থেকেই তিনি এর এক সুন্দর ছবি মনে মনে একে রেখেছিলেন। সন্ধ্যার ঝাপসায় অল্প-স্বল্প দেখলে পাছে সকাল বেলায় দেখবার পূরােপূরি আনন্দ না পাওয়া যায়, এই ভয়ে তিনি পাল্কীতে উঠেই চোখ বুজে রইলেন। ভােরে উঠে বােলপুরের ছবি তার কল্পনার সঙ্গে হয়তাে মেলে নি, কিন্তু এখানে যা তিনি পেলেন, তাইতে তার আনন্দের সীমা রইলাে না। এখানে চাকরদের শাসন ছিল না। চারদিকে মাঠ ধূ ধূ করছে। মাঠে যেখানে খুসী তিনি ঘুরে বেড়াতে পেতেন। বােল- পুরের মাঠে মাঝে মাঝে খােয়াই আছে। এই খােয়াই থেকে তিনি নানা রকমের পাথর জড় করতেন, আর সেগুলাে জামার আঁচলে ভরে পিতার কাছে উপস্থিত করতেন। তা দেখে তাঁর পিতা ভারী খুসী হয়ে বলতেন –কি চমৎকার ! সব তুমি পেলে কোথায় ? রবীন্দ্রনাথ আহলাদে উথলে উঠে বলতেন—এমন আরাে কত আছে। কত হাজার হাজার। আমি রােজ এনে

বাড়ীর বাহিরে
দিতে পারি। তার পিতা বলতেন, তা হলে তাে বেশ
হয়। ঐ পাথর দিয়ে আমার এই পাহাড়টা তুমি
সাজিয়ে দাও।
খােয়াইয়ের ভেতর এক জায়গায় মাটি চুইয়ে একটা
গর্তের মধ্যে জল জমা হােত। এই গর্ত ছাপিয়ে ঝি
ঝিক্ করে জল বয়ে যেত আর গর্তের মুখে ছােট ছােট
মাছ খেলা করে বেড়াত। তিনি তাই দেখে আদে
অধীর হয়ে পিতাকে এসে বলতেন, ভারী সুন্দর জলের
ধারা দেখে এসেছি, সেখান থেকে আমাদের স্নানের
জল আর খাওয়ার জল আনলে বেশ হয়। তার
পিতাও তাকে উৎসাহ দেবার জন্যে সেখান থেকেই জল
আনাবার ব্যবস্থা করে দিতেন।
এখানে যে তিনি শুধুই বেড়িয়ে বেড়াতেন, তা নয়,
কবিতাও লিখতেন। একটি ছােট নারিকেল গাছের
তলায় মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে আপন মনে রাশি রাশি
কবিতা লিখে যেতেন।
বােলপুর থেকে বেরিয়ে সাহেবগঞ্জ, দানাপুর,
এলাহাবাদ, কানপুর এই সব জায়গা হয়ে শেষে
অমৃতসরে পৌছলেন। অমৃতসরে মাসখানেক থেকে
ড্যালহৌসি পাহাড়ে গেলেন। তাদের থাকবার জায়গা

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
ঠিক হয়েছিল একটি পাহাড়ের সব চেয়ে উচু চূড়ায়
এখানেও তিনি নিজের মনে যেখানে খুসী যখন
বেড়িয়ে বেড়াতেন। তাদের বাসার নীচের পাহাড়ে
ছিল মস্ত এক কেলুবন।
এই বনে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড
গাছ বিরাট দৈত্যের মতাে মাথা উচু করে কত
শত বৎসর ধরে যে দাড়িয়ে ছিল তার ঠিক নেই।
গাছগুলাের গা ঘেঁসে বেড়াতে তার একটুও ভয় করত
। তিনি লম্বা একগাছা লাঠি নিয়ে প্রায়ই এই
বনে বেড়াতে যেতেন।
শুধু খেলা আর বেড়িয়ে বেড়াননা নয়। তাঁর
পিতা তাঁকে লেখাপড়াও শেখাতেন। এখানে সব
কাজই তাকে নিয়ম ধরে করতে হােত, যদিও তার
ভেতর বাঁধাধরার ভাব ছিল না।
খুব ভােরে তার পিতা তাকে ঠেলে তুলে দিতেন।
তখনাে রাত্রির অন্ধকার থাকতে ; সেই পাহাড়ের
শীতে কম্বলের মুড়ি থেকে বেরিয়ে তত ভােরে তাকে
নরঃ নরৌ নরা মুখস্থ করতে হােত।
সূৰ্য উদয়ের সময় তাঁর পিতা তাঁকে পাশে নিয়ে
দাড়িয়ে উপাসনা করতেন। তার পর তাঁকে নিয়ে
বেড়াতে বেরুতেন। বেড়িয়ে ফিরে এসে ঘণ্টাখানেক

বাড়ীর বাহিরে
ইংরাজি পড়া চলছে, তার পর বরফ-গলা ঠাণ্ডা জলে
স্নান। এই স্নান তার বড়ই কষ্টের ছিল।
দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়ার পর তার পিতা তাঁকে
আর একবার পড়াতে বসাতেন। কিন্তু তখন যত
রাজ্যের ঘুম এসে হাজির হােত। ঘুমে তিনি কেবলই
চুলে পড়তেন। তাঁর অবস্থা বুঝে তাঁর পিতা তাকে
ছুটি দিতেন। ছুটি পাওয়া মাত্রেই ঘুম কোথায় ছুটে
পালাতে, তার পর লাঠি হাতে করে এক পাহাড় হতে
আর এক পাহাড়ে ছুটোছুটির পালা শুরু হােত।
এমনি করে মাস কয়েক কাটলে পর তাঁর পিতা
একজন লােকের সঙ্গে তাকে কলকাতায় পাঠিয়ে
দিলেন।

বাড়ীর শিক্ষা
হিমালয় থেকে ফিরে এলে পর বাড়ীতে আর
আগেকার ভাব রইলাে না। চাকরদের শাসন গেল।
বাড়ীর ভেতর যেখানে খুসী যাবার অধিকার পেলেন।
তাঁর মায়ের ঘরের সভায় খুব একটা বড় আসন তিনি
দখল করে বসলেন। তার পর গল্প আর গল্প—দিনরাত
কেবল ভ্রমণের গল্প। ছাদের উপর সন্ধ্যাবেলায় তাঁর
মায়ের বায়ু সেবনের সভায় তিনিই হলেন প্রধান বক্তা।
তার মা তার মুখে ভ্রমণের গল্প শুনে শুনে ভারী খুসী
হতেন।
বাড়ীর শাসনও যেমন ভেঙ্গে গেল, স্কুলে যাবার
টানও ভার তেমনি কমে আসতে লাগলাে। স্কুলের
আইন-কানুন যা, তাতে সেটাকে ঠিক জেলখানা বা
হাসপাতাল বলেই তার মনে হােত। কিছুতেই তিনি
নিজকে এর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারতেন না। ছেলে-
বেলার এই কথা মনে করে বড় হয়ে তিনি বােলপুরে
নিজের মনের মতাে করে এক স্কুল করেন। কড়াকড়ির
ভেতর ছেলেদের মন কি রকম মুড়ে থাকে তা
নিজে তিনি ভাল রকম বুঝেছিলেন বলেই এই স্কুলটি

বাড়ীর শিক্ষা
৪১
তিনি বসান। বােলপুরের তার এই স্কুলের কথা
সবাই জানে।
এ সম্বন্ধে বিশেষ করে পরে তােমাদের
বলবাে।
বার বছর বয়সের সময় তার মা মারা গেলেন।
এর পর তাকে স্কুলে পাঠানাে একেবারেই শক্ত হয়ে
উঠলাে। স্কুলের পড়ায় যখন কিছুতেই তাকে বাঁধতে
পারা গেল না, তখন বাড়ীতেই ভাল করে পড়াবার
ব্যবস্থা হােল। সংস্কৃত, ইংরাজি, বাংলা বাড়ীতেই
তিনি পড়তে লাগলেন। স্কুলে যাওয়া বন্ধ হলেও
পড়ার তার বিরাম ছিল না। এমন কোন বাংলা
বই তখন ছিল না, যা তিনি তত ছােটবেলাতেই ভাল
করে পড়ে ফেলেন নি। কিন্তু লেখাপড়ার চেয়ে এক
বিষয়ে তার খুব বেশী ঝোঁক ছিল, সেটি হােল কবিতা
রচনা। তাঁর বয়স যত এগুতে লাগলাে, কবিতা-চৰ্চ্চাও
তত বেড়ে চলল । শুধুই কি কবিতা ! যেমন
কবিতা-চৰ্চা, তেমনি গান-চর্চা। তাদের বাড়ীতে
দিনরাত গানের হাওয়া বইতে বললেই চলে। গান
শুনে শুনে আর লিখে লিখে তার মন গানের রাজ্যেই
ঘুরে বেড়াতে।
অনেক গুণী লােক তাদের বাড়ীতে যাওয়া আসা

৪২ ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ করতেন এ কথা আগেই বলেছি। তাঁর দাদারাও ছিলেন সবাই গুণী। তারা সাত ভাই। রবীন্দ্রনাথ সকলের ছােট। সমস্ত পরিবার এক সঙ্গে করলে ভাইবােনে তারা আরাে অনেকগুলি। রবীন্দ্রনাথের বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ তাঁর স্বপ্ন-প্রয়াণ’ কাব্যের এক জায়গায় রূপক করে তার গুণী-ভাইদের পরিচয় বেশ সুন্দরভাবে দিয়েছিলেন, “ভাতে যথা সত্য হেম, মাতে যথা বীর গুণ জ্যোতি হরে যথা মনের তিমির । নব শােভা ধরে যথা সােম আর রবি সেই দেব-নিকেতন আলাে করে কবি ।” এদের বাড়ীটি সত্যই একটি দেব-নিকেতন—গানবাজনা, হাসিগল্প, নির্দোষ আমােদ-আহ্লাদে সদাই ভরপূর থাকত। কত লােকের যে আনাগােনা ছিল তার ঠিক- ঠিকানা নেই। এই বৃহৎ পরিবারের ছেলে-মেয়েরা সবাই গুণী, অনেকেই এরা বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। কাব্যে, গানে, চিত্রে, নাটক অভিনয়ে এদের উৎসাহের অন্ত ছিল না। দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন কবি ও দার্শনিক । সত্যেন্দ্রনাথ, হেমেন্দ্রনাথ, বীরেন্দ্রনাথ, গুণন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, সােমেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ।-মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ।

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথের গানে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের
সুর-সংযােজন- ৪২ পৃঃ

No text on this page.

বাড়ীর শিক্ষা
৪৩
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সাহিত্যের ও সঙ্গীতের ওস্তাদ। শ্ৰীমতী
স্বর্ণকুমারী দেবী শিক্ষায় ও জ্ঞানে বাংলার মেয়েদের
গৌরব। অবনীন্দ্রনাথ জগতের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন।
এ দেশে ছবি আঁকার ধারা বদলে দিয়ে নিজে তিনি
এক নূতন ধারার সৃষ্টি করেছেন। এদের বাড়ীটি গুণি-
লােকের, জ্ঞানিলােকের তীর্থস্থান বললেই চলে।
আর একটি খুব বড় জিনিষ এদের বাড়ীতে ছিল,
সেটি হােল স্বাদেশিকতা। স্বদেশের উপর রবীন্দ্রনাথের
পিতার একটি আন্তরিক শ্রদ্ধা ছিল, সে কথা বলেছি।
এই স্বদেশ প্রীতির ভাবটি তার বাড়ীর অপর সকলের
মধ্যেও জেগে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথের দাদারা
সকলেই স্বদেশের ভক্ত ছিলেন। অথচ সে যুগটাকে
মােটেই স্বদেশী যুগ বলা যেতে পারে না। তখন
ইংরাজির দিকেই সকলের ঝোঁক। দেশের ভাব
আর দেশের ভাষা এ দুটোই তখন দেশের লােকের
কাছ থেকে দূরে দূরেই থাকতাে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের
দাদারা তখনকার দিনে স্বদেশী ব্যাপার নিয়ে যে রকম
মাতামাতি করতেন তা দেখলে ভারী আশ্চর্য হতে হয়।
রবীন্দ্রনাথের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এক স্বদেশী
সভা করেছিলেন। একটা গলির মধ্যে এক পােডাে

৪s ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ বাড়ীতে সেই সভা বস্ততা। বৃদ্ধ রাজনারায়ণ বসু মহাশয় ছিলেন তার সভাপতি। রাজনারায়ণ বসুর মতাে পণ্ডিত তখনকার দিনে অল্পই ছিল। তার তখন চুল দাড়ি সবই প্রায় সাদা হয়ে গেছে। কিন্তু পাকা চুল আর পাণ্ডিত্য নিয়ে ছেলেদের সঙ্গে তিনি ঠিক ছেলের মতােই মিশে যেতেন আর ছেলেদের সুরে সুর মিলিয়ে গাইতেন- এক সূত্রে বঁধিয়াছি সহস্রটি মন, এক কার্যে সপিয়াছি সহস্র জীবন । রবীন্দ্রনাথও এই সভার সভ্য ছিলেন। তারা সব দুপুর বেলায় বাড়ী থেকে বেরুতেন আর চুপি চুপি সভা করতে যেতেন। সভার কাজও হােত চুপি চুপি। সভার উদ্দেশ্য ছিল দেশী শিল্পের উন্নতি করা আর কলকারখানা বসানাে। কলকারখানা নিয়ে ভারী মজার মজার ব্যাপার ঘটতে। একবার সকল সভ্য একমত হয়ে ঠিক করলেন, স্বদেশী দেশালাই তৈরী করতে হবে। করে, অনেক পরীক্ষা করে কয়েক বাক্স দেশালাই তৈরী হােল। কিন্তু এক এক বাক্সে এ রকম খরচ অনেক চেষ্টা

৪৫
বাড়ীর শিক্ষা
.
পড়তে লাগলাে যে সে খরচে গােটা একটা পাড়ার
পূরাে এক বছর ধরে উনুন ধরান চত। তা ছাড়া
সামান্য একটু অসুবিধা এই ছিল যে, কাছে-পিঠে
আগুন না থাকলে সে দেশলাই জ্বালাতে পারা যেতে
। এই ধরণের আরাে কত মজার কাণ্ড ঘটতে।
তাদের বাড়ীর চেষ্টায় ‘হিন্দুমেলা’ বলে একটি
মেলার আয়ােজন হয়। এই
এই মেলাতে দেশী শিল্প
ব্যায়াম দেখান হােত, দেশের সাহিত্য আর সঙ্গীতের
চৰ্চ্চা হােত আর দেশী গুণী লােকদের পুরস্কার দেওয়া
রবীন্দ্রনাথ এই হিন্দুমেলায় একটি গাছের
তলায় দাড়িয়ে দেশের প্রতি অনুরাগের একটি কবিতা,
পড়েছিলেন । এই হিন্দুমেলা আমাদের দেশের
একটি প্রধান ঘটনা। আমাদের এই দেশ অর্থাৎ
ভারতবর্ষকে স্বদেশ বলে ভক্তির সঙ্গে ধারণা করবার
চেষ্টা এই প্রথম। এই থেকে দেশের মধ্যে স্বদেশী
আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়।
সব রকমেই এরা দেশের আদর্শ। কলিকাতার
ভদ্র আর শিক্ষিত সমাজের চাল-চলন, আদব-কায়দা
এদের আদর্শে ই তৈরী হয়। শিল্পে, নাটকে, কাব্যে,
সাহিত্যে এরাই দেশকে সব
চেয়ে বেশী

৪৬
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
করেছেন, এ-কথা বলে বেশী কিছুই বলা হােল
। আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে এরাই সব
শ্রেষ্ঠ করে তােলেন।
তােলেন। ভারতী’ পত্রিকা
অনেকেই তােমরা দেখেছ। এখন যে-সব বড় বড়
মাসিক পত্ৰ তােমরা দেখতে পাও, ভারতী’ হােল তার
ভেতর সব চেয়ে পুরাতন। পঞ্চাশ বছর ধরে এই
কাগজ চছে।
রবীন্দ্রনাথের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ,
বড় দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথকে সম্পাদক করে এই কাগজ বার
করেন। ভারতী বার করে এরা নিজেদের বাড়ীতেই
সাহিত্যের একটি চমৎকার আবহাওয়া সৃষ্টি করে
তােলেন। রবীন্দ্রনাথের এই ছিল এক মস্ত সুযােগ।
ভারতীতে তিনি মহা উৎসাহে লিখতে আরম্ভ করলেন।
তার কবিতা, গান, কাব্য, নানা রকমের প্রবন্ধ ভারতীতে
বেরুতে লাগলাে। সে সময় তার বয়স ঠিক মােল।
তার সেই বয়সের বিস্তর কবিতা পৃথিবীর সেরা
কবিতা বলে গণ্য হয়েছে।

বিলাতে
রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন সতেরাে, তার মেজদাদা
সত্যেন্দ্রনাথ বলেন তিনি রবীন্দ্রনাথকে বিলাতে নিয়ে
যাবেন। তার পিতাও এতে মত দিলেন। বিলাত
যাবার কথায় রবীন্দ্রনাথ একেবারে বিস্মিত হয়ে গেলেন,
এ যে একেবারে আশাতীত।
বিলাত যাবার আগে তিনি তার মেজদাদার সঙ্গে
আমেদাবাদ গেলেন। তিনি ছিলেন সেখানকার জজ।
এখানে একটি কথা বলা দরকার। রবীন্দ্রনাথের মেজ
দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন এ দেশের প্রথম সিভিলিয়ান।
তার আগে আর কেউ বিলাতে গিয়ে সিভিলিয়ান
হয়ে আসেন নি।
আমেদাবাদে শাহিবাগে ছিল
জজের বাসা। এটি ছিল বাদশাহি আমলের এক
প্রাসাদ। বাদশাহের জন্যেই এই প্রাসাদটি তৈরী
হয়েছিল। প্রাসাদের গা ঘেঁসে সাবরবতী নদী তরতর
করে বয়ে যাচ্ছিল। নদীর তীরের দিকে প্রকাণ্ড এক
খােলা ছাদ। রবীন্দ্রনাথের বৌদিদি ছেলেদের নিয়ে
তখন বিলাতে। তার মেজদাদা আদালতে চলে গেলে
পর তত বড় বাড়ীতে তিনি ছাড়া
তিনি ছাড়া আর কেউ

৪৮
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
= = =
থাকতাে না। সেই প্রকাণ্ড বাড়ীটা তার কাছে বড়ই
রহস্যময় ঠেকতাে। মহা কৌতূহলে তিনি এ ঘর
থেকে ও ঘরে ঘুরে বেড়াতেন। বড় বড় অক্ষরে ছাপা
ছবিওয়ালা অনেক ভাল ভাল ইংরাজি বই ঘরের
দেওয়ালে খােপে খােপে সাজানাে ছিল। এই হােল
তার সঙ্গী। তিনি এর ছবিগুলি বারবার দেখতেন।
শেষে পড়া শুরু করে দিলেন।
কতক বুঝতেন,
কতক বুঝতেন না; কিন্তু তাতে তার পড়ার কোন বাধা
হােত না। এই রকম করে এখানে তার ইংরাজি পড়া
আপনা-আপনি অনেক দূর এগিয়ে গেল।
এখানে কয়েক মাস থেকে তিনি তাঁর মেজদাদার
সঙ্গে বিলাত যাত্রা করলেন। তার বয়স এই সময়
সতের। এত অল্প বয়সে বিলাত যাওয়ার ফল তার
পক্ষে খুবই ভাল হয়েছিল। ছােট বেলায় ঘরের গণ্ডির
ভেতর বন্ধ থেকে থেকে, যা কিছু বিদেশের, যা কিছু
দূর দেশের, তাই তাঁর মনকে খুব বেশী রকম করে
টেনে নিত। এতে তার মনটি এ রকমের তৈরী হয়েছিল
যে, যা কিছু ভাল তা স্বদেশের হাে বিদেশের হাে
চট করে তা তার মনের সঙ্গে গেঁথে যেতে। বিলাতে
যাবার আগে সে দেশ সম্বন্ধে খুব বড় একটা ধারণা

বিলাতে ৪৯ * * * * তিনি মনে মনে একে নিয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছে সে দেশটা তঁার কি রকম লেগেছিল, তা তাঁর নিজের লেখা থেকেই বেশ ভাল রকম জানা যায়। সে কথা এবার তােমাদের বলছি। তা ভারী চমৎকার। বিলাত যাবার পথে তিনি প্রথমে ইটালিতে যান। ইটালিতে পৌছে তিনি তার দাদাকে লিখলেন-- এই ত প্রথম য়ুরােপের মাটিতে আমার পা পড়ল । জানােই ত আমি কি রকম কাল্পনিক। মনে করে- ছিলেম, য়ুরােপে পৌছেই কি এক অপূৰ্ব দৃশ্য চোখের সুমুখে খুলে যাবে। কিন্তু ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি, কল্পনার সঙ্গে সত্য রাজ্যের প্রায় বনে না।••• কোন নূতন দেশে আসবার আগেই আমি তাকে এমন নূতনতর মনে করে রাখি যে, এসে আর তা নূতন বােলে মনেই হয় না। য়ুরােপ আমার তেমন নৃতন মনে হয় নি। ইটালী থেকে যান প্যারিসে। ভারী জাল সহর এই প্যারিস। সেখান থেকে লিখলেন- সকাল বেলায় প্যারিসে গিয়ে পৌঁছলেম। কি জকাল সহর!..মনে হয়, প্যারিসে বুঝি গরিব লােক নেই। আমার মনে হােল, এই সাড়ে তিন হাত ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ মানুষের জন্যে এমন প্রকাণ্ড জকালো বাড়ীগুলাের কি আবশ্যক। একটা হােটেলে গেলেম, তার সমস্ত এমন প্রকাণ্ড কাণ্ড যে, ঢিলে কাপড় পােরে যেমন সােয়াস্তি হয় না, সে হােটেলে থাকতে গেলেও আমার বােধ হয় তেমনি অসােয়াস্তি হয়। একটা ঘরের মধ্যে কোথায় মিশিয়ে যাই তার ঠিক সেই। স্মরণস্তম্ভ, উৎস, বাগান, প্রাসাদ, পাথরে বাঁধানো রাস্তা, গাড়ি, ঘােড়, জন-কোলাহল প্রভৃতি দেখে অবাক্ হয়ে যেতে হয়। বিলাতে পৌছে প্রথমটায় তিনি ভারী নিরাশ হলেন। তিনি ধারণ করে রেখেছিলেন ইংলণ্ড এতটুকু একটু দ্বীপ আর এই দ্বীপের এ-ধার থেকে ও-ধার পৰ্যন্ত বড় বড় কবিদের কবিতায় আর বড় বড় পণ্ডিত- দের বক্তৃতায় দিনরাত তােলপাড় হচ্ছে, আর তিনি এই দু-হাত জায়গার যেখানেই থাকুন না কেন, তা শুনতে পাবেন। তিনি ভেবেছিলেন, সেখানে সকলেই নানা রকম বিদ্যার আলােচনাতে দিনরাত মগ্ন। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তিনি দেখলেন মেয়েরা বেশ-ভূষা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, পুরুষেরা কাজকর্ম করছে, সংসার যেমন চলে থাকে তেমনি চলছে। তার ধারণার সঙ্গে কিছুই

বিলাতে
মিললাে না দেখে তিনি হতাশ হলেন। সেখানকার
ভীড়ভাড় আর বাইরের আড়ম্বর তার কাছে বড়ই
অদ্ভুত ঠেলল। তিনি বলছেন—
ইংলণ্ডে এলে সকল চেয়ে চোখে কি পড়ে জান ?
লােকের ব্যস্তভাব। রাস্তা দিয়ে যারা চলে তাদের
মুখ দেখতে মজা আছে—বগলে ছাতি নিয়ে হুহু
কোরে চোলেছে, পাশের লোেকদের ওপর ভ্রুক্ষেপ নেই,
মুখে মহা ব্যস্তভাব প্রকাশ পাচ্চে-সময় তাদের ফাকি
দিয়ে না পালায় এই তাদের প্রাণপণ চেষ্টা। এখানে
যে কত রেলওয়ে আছে তার ঠিকানা নেই, সমস্ত
লণ্ডনময় রেলওয়ে—প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর টেণ
যাচ্চে।...দেশ ত এই একরত্তি, নােড়ে চোড়ে
বেড়াবার জায়গা নেই, দু-পা চল্লেই ভয় হয় পাছে
সমুদ্রে গিয়ে পড়ি, এখানে এত ট্রেণ যে কেন ভেবে
পাইনে !••••••এ দেশের লােক প্রকৃতির আদুরে ছেলে
নয়—কারুর নাকে তেল দিয়ে তাকিয়া ঠেসান দিয়ে
বােসে থাকবার যাে নেই—একে ত আমাদের দেশের
মত এদেশের জমিতে আঁচড় কাটলেই শস্য হয় না,
তাতে শীতের সঙ্গে মারামারি কোরতে হয়—প্রথমত,
শীতের উপদ্রবে এদের কত কাপড় দরকার হয় তার
ঠিক নেই--তারপরে কম খেলে এদেশে বাঁচবার যে

৫২
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
* * *
নেই, শরীরে তাপ জন্মাবার জন্যে অনেক খেতে হয় ;
আমাদের বাংলার খাওয়া নাম মাত্র ; কাপড়
পরাও তাই।
এখানকার সমাজের চালচলন আর ব্যবহার
প্রথমটায় তার ভাল লাগেনি। কিন্তু এ ভাব বেশী দিন
রইলাে না। এখানে থাকতে থাকতে এখানকার যা ভাল,
তা একে একে তাঁর চোখে পড়তে লাগলাে। সব চেয়ে
তার ভাল লাগলে এখানকার স্বাধীনতা। আমাদের
দেশের লােকজনের ভেতর কেমন একটা অবসন্ন ভাব
—কারাে ভেতর যেন ঘূৰ্ত্তি নেই। কিন্তু এখানকার
ছেলেপিলে, এখানকার লােকজন দেখে তার ভারী
ভাল লাগলাে। তিনি তার দাদাকে লিখলেন—
এখানকার ছেলেদের এক রকম স্বাধীন ও পৌরুষের
ভাব দেখলে অবাক্‌ হােয়ে যেতে হয়। তার প্রধান
কারণ, এখানকার গুরুললাকেরা তাদের প্রতিপদে বাধা
• দেয় না, আর অনেকটা সমানভাবে রাখে।...এখানে
চাকরদের মধ্যে দাসত্বের ভাব যে কত কম, তা
হয় ত তুমি না দেখলে ভালাে করে বুঝতে পারবে
। এখানকার পরিবারে স্বাধীনতা মূৰ্ত্তিমান, কেউ
কাউকে প্রভুভাবে আজ্ঞা করে না, ও কাউকে অন্ধ

বিলাতে আজ্ঞা পালন করতে হয় না। এমন না হােলে একটা জাতির মধ্যে এত স্বাধীনভাব কোথা থেকে আসবে? •••আমাদের সমাজের আপাদমস্তক দাসত্বের শৃঙ্খলে বদ্ধ। সাহেবিয়ানা জিনিষটাকে রবীন্দ্রনাথ একবারেই অপছন্দ করেন। বিলাতে গিয়ে তিনি সাহেব হয়ে যান নি। তােমরা শুনে আশ্চর্য হবে যে তিনি বিলাতে বরাবর দেশী পােষাকই পরতেন। এর দরুণ তাঁকে কত যে হাসি-ঠাট্টা সহ্য করতে হয়েছে তার ঠিক নেই। তিনি বলছেন- আমাদের দিশি কাপড় দেখে, রাস্তায় এক একজন সত্যি সত্যি হেসে উঠে, এক এক জন এত আশ্চৰ্য্য হয়ে যায় যে তাদের আর হাসবার ক্ষমতা থাকে না। কত লােক আমাদের জন্যে গাড়ী চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছে। তারা আমাদের দিকে এত হাঁ করে চেয়ে থাকে যে পেছনে গাড়ী আচে হুস নেই । ইস্কুলের ছােকরা এক একজন আমাদের মুখের ওপর হেসে উঠে, এক একজন চেঁচাতে থাকে—Jack, look at the blackies. কিন্তু আমি সে সব কিছুই গ্রাহ্য করি নি, আমার এক তিলও লজ্জা করে না। বিলাতে পৌঁছে অল্পদিনের ভেতর সেখানকার এক ৫৪ ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ স্কুলে তিনি ভর্তি হলেন। স্কুলের ছেলেরা তার সঙ্গে কিমাত্র খারাপ ব্যবহার করে নি। অনেক সময়ে তারা তাঁর পকেটের মধ্যে কমলালেবু, আপেল এইসব গুজে দিয়ে ছুটে পালাতে। তিনি বিদেশী বলেই তারা বােধ হয় এই রকম ব্যবহার করতাে। সেখানকার শিক্ষকদের তার খুব ভাল লেগেছিল। তাদের শিক্ষার ভেতর প্রাণের যােগ ছিল। এ জন্য তিনি এদের শ্রদ্ধা করতেন। বিলাতের সাধারণ লােকদের সম্বন্ধেও তার ভাল ধারণা হয়েছিল। তিনি বলছেন- একবার শীতের সময়... আমি দেখিলাম একজন লােক রাস্তার ধারে দাঁড়াইয়া আছে ; তাহার ছেড়া জুতার ভিতর দিয়া পা দেখা যাইতেছে, পায়ে মােজা নাই, বুকের খানিকটা খােলা। ভিক্ষা করা নিষিদ্ধ বলিয়া সে আমাকে কোন কথা বলিল না, কেবল মুহূর্তকালের জন্য আমার মুখের দিকে তাকাইল। আমি তাহাকে যে মুদ্রা দিলাম তাহা তাহার পক্ষে প্রত্যাশার অতীত ছিল। আমি কিছুদূর চলিয়া আসিলে সে তাড়াতাড়ি ছুটিয়া আসিয়া কহিল, “মহাশয় আপনি আমাকে ভ্রমক্রমে একটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়াছেন” বলিয়া সেই মুদ্রাটি আমাকে ফিরাইয়া দিতে উদ্যত হইল।

বিলাতে । * -- - - - এই রকমের আর একটি ঘটনাও তিনি বলেছেন- •••ষ্টেশনে প্রথম যখন পৌছিলাম একজন মুটে আমার মােট লইয়া ঠিকাগাড়ীতে তুলিয়া দিল। টাকার থলি খুলিয়া পেনি জাতীয় কিছু পাইলাম না, একটি অৰ্দ্ধক্রাউন ছিল সেইটিই তাহার হাতে দিয়া গাড়ী ছাড়িয়া দিলাম। কিছুক্ষণ পরে দেখি সেই মুটে গাড়ীর পিছনে ছুটিতে ছুটিতে গাড়ােয়ানকে গাড়ি থামাইতে বলিতেছে। আমি মনে ভাবিলাম, সে আমাকে নির্বোধ বিদেশী ঠাহরাইয়া আরাে কিছু দাবী করিতে আসিতেছে। গাড়ি থামিলে সে আমাকে বলিল, আপনি বােধ করি, পেনি মনে করিয়া আমাকে অৰ্দ্ধক্রাউন দিয়াছেন। দেশে ফিরিবার কয়েকমাস আগে তিনি ডাক্তার স্কট নামে এক গৃহস্থের বাড়ীতে ছিলেন। এই বাড়ীর চাল-চলন তার বড়ই ভাল লেগেছিল,এরা ঠিক যেন নিজেরই লােক। এদের সম্বন্ধে তিনি বলেছেন- অতি অল্পদিনের মধ্যেই আমি ইহাদের ঘরের লােকের মত হইয়া গেলাম । মিসেস্ স্কট আমাকে আপন ছেলের মতই স্নেহ করিতেন। তাহার মেয়েরা আমাকে যেরূপ মনের সঙ্গে যত্ন করিতেন তাহা আত্মীয়দের কাছ হইতেও পাওয়া দুর্লভ।

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
এদের এখানে থাকতে থাকতেই তার বাড়ী ফিরবার
সময় হােল। দেশের আলাে, দেশের বাতাস তাকে
ভেতরে ভেতরে ডাক দিচ্ছিল। এদের সকলের কাছ
থেকে বিদায় নেবার সময় মিসেস্ স্কট তার হাত দুখানি
ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,—এমনি করেই যদি চলে
যাবে, তবে এত অল্প দিনের জন্য তুমি এলে কেন ?
রবীন্দ্রনাথ এক বছর পরে বিলাত থেকে ফিরলেন।
বিলাতের মাটিতে পা দিয়ে সেখানকার লােকজন আর
সে দেশের চালচলন গােড়ায় তার ভাল লাগেনি বটে,
কিন্তু যখন তিনি দেশে ফিরলেন তখন অনেক জিনিষ
শিখে, আর সে দেশের লােকজনের উপর বেশ একটি
শ্রদ্ধা মনে মনে পােষণ করে দেশে ফিরলেন। সে দেশ
থেকে যা তিনি নিয়ে এলেন, তার ভেতর সব চেয়ে বড়
একটি জিনিষ ছিল, সেটি হােল মানুষের প্রতি মানুষের
ভালবাসা। দেশের হােক বা বিদেশের হাে মানুষের
প্রকৃতি, মানুষের মন সব দেশেই সমান।-এ-দেশ,
ও-দেশ সব জায়গাতেই সমস্ত
মানুষের মন এক।
সুতরাং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধ জগতে সব চেয়ে
বড় সম্বন্ধ এই সত্যটি তাঁর মনে দৃঢ় হয়ে গেল।

মিলনের সুর
বিলাত থেকে ফিরে এসে রবীন্দ্রনাথ গান আর
কবিতার মধ্যে ডুব দিলেন। কবিতা চর্চা আর গান
চর্চা ছাড়া অপর কোনই কাজ আর তার রইলাে
। তিনি কখনাে বা সমুদ্রের ধারে, কখনাে পাহাড়ে,
কখনাে বা নৌকায় গঙ্গার
উপর বাস
লাগলেন। এই সময়টা ঘরের কোণে, চুপটি করে বসে
থাবার মতাে তার মনের অবস্থা নয়। কেবলই তাঁর
মনে হােত--
নিমেষ তরে ইচ্ছা করে
বিকট উল্লাসে
সকল টুটে যাইতে ছুটে
জীবন-উচ্ছ্বাসে।
থাকিতে নারি ক্ষুদ্র কোণে
আম্রবন ছায়ে,
সুপ্ত হয়ে লুপ্ত হয়ে
'গুপ্ত গৃহ-বাসে।

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
এই রকম উন্মত্ততার ভেতর দিয়ে মাসের পর
মাস, বছরের পর বছর কেটে যেতে লাগলাে। কবিতার
আর বিরাম নেই–গানেরও বিরাম নেই। গানের সুর
অনবরত তখন তার কণ্ঠে লেগে থাকত। প্রহরের
পর প্রহর গান গেয়েও তার ক্লান্তি বােধ হােত না।
তার কণ্ঠের গান যে কি মধুর তা যে শুনেছে, সেই
জানে। তার গান শুনে মুগ্ধ হয়ে, তার পিতা মহর্ষি
দেবেন্দ্রনাথ একবার তাকে পাঁচশাে টাকা পুরস্কার
দিয়েছিলেন। এই ব্যাপারটি ভারী সুন্দর। রবীন্দ্রনাথেরই
মুখে তা শােন—
একবার মাঘােৎসবে সকালে ও বিকালে আমি
কতক গুলি গান তৈরী করিয়াছিলাম।•••পিতা তখন
চুচুড়ায় ছিলেন । সেখানে আমার এবং জ্যোতিদাদার
ডাক পড়িল। হাশ্মোনিয়মে জ্যোতিদাদাকে বসাইয়।
আমাকে তিনি নূতন গান সবকটি একে একে
গাহিতে বলিলেন। কোনাে কোনাে গান দুবারও
গাহিতে হইল। গান গাওয়া যখন শেষ হইল তিনি
বলিলেন, দেশের রাজা যদি দেশের ভাষা জানিত ও
সাহিত্যের আদর বুঝিত তবে কবিকে ত তাহারা
পুরস্কার দিত। রাজার দিক হইতে যখন তাহার কোনাে
সম্ভাবনা নাই তখন আমাকেই সে কাজ করিতে হইবে ।

No text on this page.

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
.
বাল্মীকির ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ

মিলনের সুর
AF- * - - - -
এই বলিয়া তিনি একখানি পাঁচশাে টাকার চেক
আমার হাতে দিলেন।
রবীন্দ্রনাথ বিলাতে যখন ছিলেন, সেখানেও তাঁর
গান চর্চা আর কবিতা চর্চা বন্ধ ছিল না। গানের জন্য
বিলাতের ভদ্রসমাজে তার খুব আদর হয়েছিল। তিনি
বিলাতী গানও বেশ আয়ত্ত করেছিলেন।
দেশে ফিরে
দেশী আর বিলাতী সুর মিলিয়ে তিনি এক গীতিনাট্য
লিখলেন—তার নাম ‘বাল্মীকি-প্রতিভা। এই বাল্মীকি-
প্রতিভা তাঁদের বাড়ীতে অভিনয় হয়—নিজে তিনি
বাল্মীকি সেজেছিলেন। তার বয়স তখন বাইশ বছর,
সে সময় তার বিয়ে হয়।
তঁার তখনকার দিনগুলি ছিল আনন্দের দিন,
নির্ভাবনার দিন। এই বিশ্বসংসারের সবকিছুই তখন
তার কাছে সুন্দরতঁার মন তখন আনন্দে একেবারে
ভরপূর। ছােট শিশু যেমন ধূলাে, বালি, ঝিনুক,
শামুক, যা খুশি তাই নিয়ে খেলতে পারে আর তাতেই
তার আনন্দ উথলে উঠে, তিনিও তেমনি চোখের
সামনে যা দেখতেন, তারই সঙ্গে নিজের মনের সুর
মিলিয়ে দিতেন। রাস্তা দিয়ে মুটে মজুর চলে যাচ্ছে,
মা ছেলে কোলে নিয়ে দাড়িয়ে আছে,
একটা গরু

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
আর একটা গরুর গা চেটে দিচ্চে,—এ সকল তাে অতি
তুচ্ছ ব্যাপার! এ সব তত তােমার আমার চোখের
সামনে দিনরাত ঘটছে, আমরা তা দেখেও দেখি না।
কিন্তু এই সব তুচ্ছ জিনিষই তার মনে যে কি অপূর্ব
ভাব জাগিয়ে দিত, তা আর বলা যায় না! কি
রকম তা শুনবে ? তিনি গাইছেন,
হৃদয় আজি মাের কেমনে গেল খুলি !
জগত আসি সেথা করিছে কোলাকুলি ।
ধরায় আছে যত
মানুষ শত শত,
আসিছে প্রাণে মম, হাসিছে গলাগলি।
এসেছে সখা-সখী
বসিয়া চোখােচোখী,
দাড়ায়ে মুখােমুখী হাসিছে শিশুগুলি ।
এসেছে ভাই বােন
পুলকে-ভরা মন,
ডাকিছে “ভাই ভাই” আঁখিতে আঁখি তুলি।
পরাণ পূরে গেল, হরষে হােল তাের,
জগতে কেহ নাই, সবাই প্রাণে মাের।
প্রভাত হল যেই, কি জানি হল এ কি !
আকাশপানে চাই, কি জানি কারে দেখি।

মিলনের সুর * - - - - রবীন্দ্রনাথের মনের ভিতরের এই যে সুর, এইটিই হােল বিশ্বজগতের মিলনের সুর। তাঁর সমস্ত গান আর কবিতার ভেতর দিয়ে এই সুরটিই ক্রমশ বেজে উঠতে লাগলাে। জীবনের পথে যেমন-যেমন তিনি এগিয়ে চললেন, এই মিলনের সুরও তেমনি উচু হােতে আরাে উচু পর্দায় উঠতে লাগলাে। মিলনের গান গাওয়াই হােল তাঁর সমস্ত জীবনের সাধনা। তিনি গাইলেন- যত প্রাণ আছে ঢালিতে পারি, যত কাল আছে বহিতে পারি, যত দেশ আছে ডুবাতে পারি, তবে আর কিবা চাই, পরাণের সাধ তাই। হৃদয়ের কথা কহিয়া কহিয়া, গাহিয়া গাহিয়া গান, যত দেব’ প্রাণ বহে যাবে প্রাণ, ফুরাবে না আর প্রাণ। এত কথা আছে, এত গান আছে, এত প্রাণ আছে মাের, এত সুখ আছে, এত সাধ আছে, প্রাণ হয়ে আছে ভাের !

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
এই রকম শুধু গান গেয়ে-গেয়েই তার জীবনের
তিরিশটি বছর কেটে গেল। বাকি জীবন বােধ হয়
তার এমনি ভাবেই কেটে যেতাে, কিন্তু তার পিতা
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ এই সময় তার উপর জমিদারি কাজ
দেখবার ভার দিলেন। কাজকর্মের নামে প্রথমটায় তাঁর
ভয় হােল, কিন্তু পিতার আদেশ। শেষে তিনি রাজি
হয়ে তাদের জমিদারি শিলাইদাতে গেলেন।
শিলাইদা অতি সুন্দর স্থান।
প্রকাণ্ড পদ্মানদী
পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। খােলা মাঠ, খােলা আকাশ ।
সহরের গােলমাল এখানে নেই। জায়গাটি তার
বড়ই ভাল লাগলাে। সব চেয়ে ভাল লাগলাে
পদ্মা। তিনি নৌকোতে করে পদ্মার উপরেই বাস
করতে লাগলেন। নৌকোতেই শােয়া, বসা, ঘুমান,
খাওয়া, কাজ-কর্মকরা—অর্থাৎ নৌকোই ছিল তার
বাড়ী। শুধু থাকা নয়, নৌকোয় করে প্রায়ই তিনি
বেড়াতেন । ছােট-খাট গ্রাম, ভাঙাচোরা ঘাট,
টিনের ছাতওয়ালা বাজার, বাখারির বেড়া দেওয়া
গােলাঘর, বাঁশ ঝাড়, আম, কাঠাল, কুল, খেজুর,
সিমুল, কলা, আকন্দ, ওল, কচু, ঝােপ-ঝাড়, জঙ্গল,
ধানের ক্ষেত এই সকলের পাশ দিয়ে নৌকায় করে

মিলনের সুর
বেড়িয়ে বেড়িয়ে সত্যিকারের বাঙলা দেশের সঙ্গে
তাঁর পরিচয় হােতে লাগলাে। তা ছাড়া আর
এক জিনিষ তিনি এখানে পেলেন,—সে হােল বাঙলা
দেশের মানুষ।
কাজের নামে গােড়াতে তাঁর ভয় হয়েছিল বটে,
কিন্তু কাজের ভেতর গিয়ে পড়াতে, সে ভাব আর
রইলাে না। জমিদারির কাজে অল্পদিনেই তিনি
পাকা হয়ে উঠলেন। গরীব প্রজাদের দুঃখের দুঃখী
হয়ে কিসে তাদের ভাল হবে সেদিকে তিনি মনােযােগী
হলেন। তাঁর কাব্যজীবন আরম্ভ হয়েছিল শিশুকালেই,
এবার থেকে কর্মজীবন আরম্ভ হােল।
কৰ্ম্মজীবনে প্রবেশ করে তার কবি-মন সংসারকে
কি চোখে দেখতে লাগলাে, তার কয়েকটি ছবি এবার
তােমাদের সামনে ধরতে চাই। সেগুলি অতি অপূৰ্ব্ব।
কবির নিজের কথাতেই তা শশানাই। তিনি কি
বলছেন শােন
যত বিচিত্র রকমের কাজ হাতে নিচ্ছি ততই
কাজ জিনিষটার পরে আমার শ্রদ্ধা বাড়ছে। কৰ্ম্ম যে
অতি উৎকৃষ্ট পদার্থ সেটা কেবল পুথির উপদেশরূপেই

৬৪
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
জানতুম। এখন জীবনেই অনুভব করচি কাজের
মধ্যেই পুরুষের যথার্থ চরিতার্থতা ; কাজের মধ্য দিয়েই
জিনিষ চিনি, মানুষ চিনি, বৃহৎ কর্মক্ষেত্রে সত্যের
সঙ্গে মুখখামুখি পরিচয় ঘটে।•••
আমি বিকেলে সন্ধ্যার দিকে•••অনেকক্ষণ
বেড়াতে থাকি—পূৰ্বদিকে যখন ফিরি এক রকম
দৃশ্য দেখতে পাই, পশ্চিমে যখন ফিরি আর এক রকম
দেখতে পাই—আকাশ থেকে আমার মাথার উপরে
যেন সান্ত্বনা বৃষ্টি হতে থাকে—আমার দুই মুগ্ধ চোখের
ভিতর দিয়ে যেন একটি স্বর্ণময় মঙ্গলের ধারা আমার
অন্তরের মধ্যে প্রবেশ করতে থাকে। এই বাতাসে
আকাশে এবং আলােকে প্রতিক্ষণে আমার মন ছেয়ে
যেন নতুন পাতা গজিয়ে উঠচে—আমি নতুন প্রাণ
এবং নতুন বলে পরিপূর্ণ হয়ে উঠচি। সংসারের সমস্ত
কাজ করা এবং লােকের সঙ্গে ব্যবহার করা আমার।
পক্ষে ভারি সহজ হয়ে পড়ছে।
গ
ইচ্ছে করে জীবনের প্রত্যেক সূর্যোদয়কে
সজ্ঞানভাবে অভিবাদন করি এবং প্রত্যেক সূৰ্যান্তকে
পরিচিত বন্ধুর মত বিদায় দিই।আমার মনে হয়

মিলনের সুর ****** ৬ ৭ ৮r - - - - এমন সুন্দর দিনরাত্রি গুলি আমার জীবন থেকে প্রতিদিন যাচ্চে—এর সমস্তটা গ্রহণ করতে পারচিনে।••• পল্লীগ্রামের লােজন আর তাদের সাধাসিধে চাল- চলন বড়ই তার ভাল লাগলাে— যতই একলা আপন মনে নদীর উপরে কিংবা পাড়াগায়ে কোনো খােলা জায়গায় থাকা যায়, ততই প্রতিদিন পরিষ্কার বুঝতে পারা যায়, সহজভাবে আপনার জীবনের প্রাত্যহিক কাজ করে যাওয়ার চেয়ে সুন্দর এবং মহৎ আর কিছু হতে পারে না। মাঠের তৃণ থেকে আকাশের তারা পৰ্যন্ত তাই করচে।•••বাস্তবিক, বড় বড় উদ্যোগ এবং লম্বা-চৌড়া কথার দ্বারা নয়, কিন্তু প্রাত্যহিক ছােট ঘােট কৰ্তব্য- সমাধাদ্বারাই মানুষের সমাজে যথাসম্ভব শােভা এবং শান্তি আছে।••• সকাল থেকে সুন্দর বাতাস দিচ্চে•••নদীর জল অনেকটা শুকিয়ে এসেছে, •••তাই বােটটাকে নদীর প্রায় মাঝখানে বেঁধে রাখা কিছুই শক্ত হয় নি। আমার ডান দিকের পারে চরের উপরে চাষারা চাষ 5

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
করচে এবং মাঝে মাঝে গরুকে জল খাইয়ে নিয়ে
যাচ্চে—আমার বামপারে শিলাইদহের নারকেল এবং
আমবাগান, ঘাটে মেয়েরা কাপড় কাচে, জল তুলচে,
স্নান করছে এবং উচ্চৈঃস্বরে বাঙাল ভাষায় হাস্যালাপ
করচে-যারা অল্পবয়সী মেয়ে তাদের জলক্রীড়া আর
শেষ হয় না। একবার স্নান সেরে উপরে উঠচে আবার
ঝুপ করে জলে ঝাপিয়ে পড়চে।•••
ম
দুপুরবেলাটা বেশ লাগে। ছােট ছােট ধানের
গাছগুলো বাতাসে ক্রমাগত কাপচেপাতিহাঁস জলের
মধ্যে নেবে ক্রমাগত মাথা ডুবাচ্চে এবং চক্ষু দিয়ে
পিঠের পালক সাফ করচে।•••বটগাছের তলায়
নানাবিধ লােক জড় হয়ে নৌকোর জন্যে অপেক্ষা
করচে-নৌকো আসবামাত্রই তাড়াতাড়ি উঠে পড়চে-
অনেকক্ষণ ধরে এই নৌকোপারাপার দেখতে বেশ
লাগে। ওপারে হাট; তাই খেয়া নৌকোয় এত
ভীড়। কেউ বা ঘাসের বােঝ, কেউ বা একটা
'চুপড়ি, কেউ বা একটা বস্তা কঁাধে করে হাটে যাচ্চে
এবং হাট থেকে ফিরে আস•ে••
এই সমস্ত•••অনুরক্ত প্রজাদের মুখে বড় একটি কোমল
মাধুৰ্য আছে। বাস্তবিক এরা যেন আমার একটি

মিলনের সুর
- - * * * * * *
* *
দেশজোড়া বৃহৎ পরিবারের লােক। এই সমস্ত নিঃসহায়
নিরুপায় নিতান্ত নির্ভরপর সরল চাষাভুষােদের আপনার
লােক মনে করতে একটা সুখ আছে।•••এদের উপর
যে আমার কতখানি শ্রদ্ধা হয়, আপনার চেয়ে যে
এদের কতখানি ভালো মনে হয় তা এরা জানে না।•••
সরলতাই মানুষের স্বাস্থ্যের একমাত্র উপায়—সে যেন
গঙ্গার মত, তার মধ্যে স্নান করে সংসারের অনেক
তাপ দূর হয়ে যায়।
পদ্মার উপর তার অসাধারণ টান। পদ্মর কথা
তিনি কত রকমে কতভাবে যে বলেছেন, তা বলে
শেষ করা যায় না।
এখন আমি বােটে। এই যেন আমার নিজের
বাড়ি। এখানে আমিই একমাত্র কর্তা। এখানে আমার
উপরে আমার সময়ের উপরে আর কারাে কোননা
অধিকার নেই।•••যেমন ইচ্ছা ভাবি, যেমন ইচ্ছা কল্পনা
করি, যত খুসি পড়ি, যত খুসি লিখি, এবং যত খুসি
নদীর দিকে চেয়ে টেবিলের উপর পা তুলে দিয়ে আপন
মনে এই আকাশপূর্ণ, আলােকপূর্ণ, আলস্যপূর্ণ দিনের
মধ্যে নিমগ্ন হয়ে থাকি।•••বাস্তবিক পদ্মাকে আমি বড়
ভালবাসি। ইন্দ্রের যেমন ঐরাবত, আমার তেমনি

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
পদ্মা, আমার যথার্থ বাহন—খুব বেশী পােষমান। নয়,
কিছু বুননারকম ;—কিন্তু ওর পিঠে এবং কাধে হাত
বুলিয়ে ওকে আমার আদর করতে ইচ্ছে করে।•••
খানিকরাত্রে জলের শব্দে আমার ঘুম ভেঙে
গেল। নদীর মধ্যে হঠাৎ একটা তুমুল কল্লোল এবং
প্রবল চঞ্চলতা উপস্থিত হয়েছে।•••নদী
ছলছল কল
করে জেগে উঠেছে আর সবসুদ্ধ খুব একটা ধুমধাম পড়ে
গেছে। বােটের তক্তার উপর পা রাখলে বেশ স্পষ্ট
বােঝা যায় তার নীচে দিয়ে কতরকমের বিচিত্র শক্তি
অবিশ্রাম চচে ; খানিকটা কাপচে, খানিকটা টছে,
খানিকটা ফুচে, খানিকটা আছাড় খেয়ে পড়চে-
ঠিক যেন আমি সমস্ত নদীর নাড়ির স্পন্দন অনুভব
করচি।•••
৫।
নির্জন চরে বােট লাগিয়ে বেশ আরাম বােধ
হচ্ছে। দিনটা এবং চারিদিকটা এমনি সুন্দর ঠেছে
সে আর কি বলব । অনেক দিন পরে আবার এই
বড় পৃথিবীটার সঙ্গে যেন দেখাসাক্ষাৎ হল। সেও
বলে “এই যে !” আমিও বল্লুম “এই যে !” তার
পর দুজনে পাশাপাশি বসে আছি, আর কোন
কথাবার্তা নেই।•••

মিলনের সুর
পদ্মার উপর তার ভালবাসার আর সীমা নেই।
শেষে তিনি প্রাণের আবেগে বলছেন—
হে পদ্ম আমার !
তােমায় আমায় দেখা শত শত বার।
= = =
কতদিন ভাবিয়াছি বসি’ তব তীরে
পরজন্মে এ ধরায় যদি আসি ফিরে,
কত গ্রাম, কত মাঠ, কত ঝাউঝাড়,
কত বালুচর, কত ভেঙেপড়া পাড়,
পার হয়ে এই ঠাই আসিব যখন
জেগে উঠিবে না কোনাে গভীর চেতন?
আর বার সেই তীরে, সে সন্ধ্যাবেলায়
হবে না কি দেখা-শুনা তােমায় আমায় ?
আর এই সমস্ত ব্যাপারের ভেতর দিয়ে তিনি
আমাদের বাংলা মায়ের যে সুন্দর ছবিটি দেখেছেন তার
তুলনাই নেই—
আজি কি তােমার মধুর মুরতি
হেরিনু শারদ প্রভাতে।
হে মাতঃ বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ
ঝলিছে অমল শােভাতে।

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
পারে না বহিতে নদী জল-ধার;
মাঠে মাঠে ধান ধরেনাক আর,
ডাকিছে দোয়েল, গাহিছে কোয়েল
তােমার কানন-সভাতে।
মাঝখানে তুমি দাড়ায়ে জননী
শরৎকালের প্রভাতে।
মাতার কণ্ঠে শেফালি-মাল্য
গন্ধে ভরিছে অবনী ।
জলহারা মেঘ আঁচলে খচিত
শুভ্র যেন সে নবনী ।
পরেছে কিরীট কনক কিরণে,
মধুর মহিমা হরিতে হিরণে,
কুসুম-ভূষণজড়িত-চরণে
দাড়ায়েছে মাের জননী।
আলােকে শিশিরে কুসুমে ধান্যে
হাসিছে নিখিল অবনী ।

গানের রাজা এক একজন মানুষ এক এক রকম কাজের অধিকার নিয়ে পৃথিবীতে জন্মায়। রবীন্দ্রনাথ ধনবান। জমিদার। কিন্তু ধনের হেপাজত করা বা জমিদারি নিয়ে থাকাই তার জীবনের প্রধান কাজ নয়। অপর কোন একজন সাধারণ মানুষের জীবনে এ সকলের সংযােগ হলে তার জীবন ধন্য হয়ে যেতে,—সে মনে করতে জগতে আর কিছুই তার করবার নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাছে এ সকল অতি তুচ্ছ-এগুলাে কেবল এক একটা অবলম্বন মাত্র। ধন-সম্পদ আর পদ- গৌরবকে উপলক্ষ্য করে তার জীবন ক্রমাগত বড়র দিকেই এগিয়ে চললল। আগেই বলেছি, পল্লীগ্রামে এসে রবীন্দ্রনাথ একেবারে সমস্ত বাংলাদেশকে পূনরাপুরিভাবে পেলেন। শুধু কেবল বাংলাদেশকে পাওয়া নয়, সমস্ত পৃথিবীটাকেই তিনি এই সঙ্গে পেয়ে গেলেন বলতে হবে। কি রকম ভাবে পেলেন, তা তাঁর নিজের কথাতেই শােন— ঐ যে মস্ত পৃথিবীটা চুপ করে পড়ে রয়েছে, ওটাকে এমন ভালবাসি! ওর এই গাছপালা, নদী, মাঠ, १२ ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ কোলাহল, নিস্তব্ধতা, প্রভাত, সন্ধ্যা সমস্তটা সুদ্ধ দু’হাতে আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, পৃথিবীর কাছ থেকে আমরা যে সব পৃথিবীর ধন পেয়েছি, এমন কি কোনাে স্বর্গ থেকে পেতুম ? স্বর্গ আর কি দিত জানিনে কিন্তু এমন কোমলতা, দুৰ্বলতাময়, এমন সকরুণ আশঙ্কাভরা অপরিণত এই মানুষগুলির মত এমন আপনার ধন কোথা থেকে দিত ! আমাদের এই মাটির মা, আমাদের এই আপনাদের পৃথিবী, এর সােনার শস্যক্ষেত্রে, এর স্নেহশালিনী নদীগুলির ধারে, এর সুখ-দুঃখময় ভালবাসার লােকালয়ের মধ্যে এই সমস্ত দরিদ্র মর্ত্য-হৃদয়ের অশ্রুর ধনগুলিকে কোলে কোরে এনে দিয়েছে।••••••আমি এই পৃথিবীকে ভারি ভালবাসি।••••••স্বর্গের উপর আড়ি করে আমি আমার দরিদ্র মায়ের ঘর বেশী ভালবাসি।... এই ভালবাসার কি তুলনা আছে ! এই পৃথিবীর গাছ-পালা, নদী, মাঠ, লােকজন সবাই তাে দেখে, কিন্তু দেখে এমন করে ভালবাসে কজন ? এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে স্বর্গেও তিনি যেতে চান না। তাই তিনি বলেছেন- মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই । * -

গানের রাজা
এই সূৰ্যকরে এই পুষ্পিত কাননে,
জীবন্ত হৃদয় মাঝে যেন স্থান পাই।
তার এই ভালবাসা কত বিচিত্র ভঙ্গিতে যে প্রকাশ
পেয়েছে, তা বলে শেষ করা যায় না। পদ্ম যেমন
চল্ চল্ ছল্ ছল্ করে অবিশ্রান্ত চলেছে, তার প্রাণের
ভাবও তেমনি নানা ছন্দে, নানা তালে ফুটে উঠেছে—
অফুরন্ত গানে আর অজস্র কবিতায়,—পদ্মার জলধারার
মতাে তার আর বিরাম নেই।
তিনি গানে আর কবিতায় আমাদের এই মাতৃভূমিকে
কত ভাবেই না পূজা করেছেন !
ও আমার দেশের মাটি,
তােমার পরে ঠেকাই মাথা।
তােমাতে বিশ্বময়ীর,
(তােমাতে বিশ্বমায়ের)
আঁচল পাল।
, , ,
তােমার কোলে জনম আমার,
মরণ তোমার বুকে ;
তােমার পরেই খেলা আমার,
দুঃখে সুখে।

৭৪
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
তােমরা তার “কথা” কাব্যটি পড়েছ নিশ্চয়।
এই “কথা” কাব্যের ভেতর দিয়ে আমাদের দেশের
বীরপুরুষদের বীরত্বের কাহিনী কি চমৎকার করেই
তিনি বলেছেন।
শুনলে মন একেবারে মেতে ওঠে।
তার এক-আধটি মনে। করিয়ে দিই। তােমাদের
অনেকেরই হয় তাে মুখস্থ আছে,
পঞ্চনদীর তীরে
বেণী পাকাইয়া শিরে
দেখিতে দেখিতে গুরুর মন্ত্রে
জাগিয়া উঠেছে শিখ—
নির্মম নির্ভীক্।
হাজার কণ্ঠে গুরুজীর জয়
ধ্বনিয়া তুলেছে দিক্‌ ।
নূতন জাগিয়া শিখ
নৃতন উষার সূর্যের পানে
চাহিল নিৰ্ণিমি।
পঞ্চ নদীর তীরে
ভক্ত দেহের রক্তলহরী
মুক্ত হইল কিরে ।
লক্ষ বক্ষ চিরে

গানের রাজা
৭৫
ঝাঁকে ঝাঁকে প্রাণ পক্ষী সমান
ছুটে যেন নিজ নীড়ে।
বীরগণ জননীরে
রক্ত-তিলক ললাটে পরা’ল
পঞ্চনদীর তীরে।
তার কবিতা আর গান রূপ ধারণ করে আমাদের
সামনে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে, তার এক একখানি বইয়ে।
যেমন—সন্ধ্যাসঙ্গীত, প্রভাতসঙ্গীত, মানসী, সােনার
তরী, চিত্রা, চৈতালি, কল্পনা, ক্ষণিকা, নৈবেদ্য, খেয়া,
উৎসর্গ, গীতাঞ্জলি, গীতিমাল্য, গীতালি, বলাকা—আর
কত নাম করবাে ! এই সকল বই যে কি অমূল্য
সম্পদ আমাদের মধ্যে বিতরণ করছে, তা বুঝতে
পারাও মহা ভাগ্যের কথা ।
রবীন্দ্রনাথের ছােট ছােট গল্প আর এক অপূর্ব
জিনিষ। কবিতায় আর গানে যেমন তিনি সমস্ত
বিশ্বপ্রকৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছেন, ছােট ঘােট গল্পে,তেমনি
তিনি সমস্ত মানুষের মনের কথা বলেছেন। অনেকেই
তােমরা তার ঘােট ঘােট গল্প পড়ে থাকবে।
যে কত চমৎকার, সে কথা কি আর বলতে হবে ? তাঁর
উপন্যাস আর নাটক এত উচুভাবের যে, তা আমাদের
সে গুলি

৭৬
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
সাহিত্যের ধারাকে একেবারে বদলে দিয়েছে। আর
তার গানের তাে তুলনাই নেই। রবীন্দ্রনাথের গান সারা
বাংলা দেশকে ছেয়ে রেখেছে। তার গান আমাদের
মাঠে ঘাটে রাখাল বালকেরা গেয়ে বেড়ায়। সভায়,
মজলিসে তার গান না হলে লােকের আনন্দ হয় না।
দেশের পূজায় তাঁর গানেরই স্থান সকলের আগে।
গান দিয়ে তিনি বাংলা দেশকে আর বাঙালীকে মুগ্ধ
করে রেখেছেন।
আমার সােনার বাংলা, আমি তােমায় ভালবাসি ।
চিরদিন তােমার আকাশ, তােমার বাতাস,
আমার প্রাণে বাজায় বাশী ।
ও মা, ফাগুনে তাের আমের বনে
ঘ্রাণে পাগল করে, (মরি হায় হায় রে)
ও মা, অঘ্রাণে তাের ভরা ক্ষেতে,
কি দেখেছি মধুর হাসি।
এতে এমন কে আছে যে আনন্দে নেচে উঠেনা! আর
জননীর দ্বারে আজি শুই
শুন গাে শঙ্খ বাজে।
থেকো না থেকো না, ওরে ভাই,
মগন মিথ্যা কাজে ।

গানের রাজা
৭৭
অর্ঘ্য ভরিয়া আনি,
ধর গাে পূজার থালি,
রতন-প্রদীপখানি
যতনে আন গাে জ্বালি,
ভরি লয়ে দুই পাণি
বহি আন ফুল-ডালি,
মা’র আহ্বান-বাণী
রটাও ভুবন মাঝে ।
জননীর দ্বারে আজি এই
শুন গাে শঙ্খ বাজে।
এই শঙ্খ-রব শুনে এমন কে আছে যে ঘরের কোণ
থেকে বেরিয়ে পড়তে চায় না।
মায়ের ডাকে ভাইয়ের সঙ্গে ভাইকে তিনি যেমন
করে মিলিয়েছেন, তেমনটি আর কি কেউ পেরেছে ?
মিলেছি আজ মায়ের ডাকে।
ঘরের হয়ে পরের মতন
ভাই ছেড়ে ভাই ক’দিন থাকে ।
০ ০ ০
যেথায় থাকি যে যেখানে
বাঁধন আছে প্রাণে প্রাণে,

৭৮
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
প্রাণের টানে টেনে আনে,
প্রাণের বেদন জানে না কে ।
মান অপমান গেচে ঘুচে,
নয়নের জল গেচে মুছে,
নবীন আশে হৃদয় ভাসে
ভাইয়ের পাশে ভাইকে দেখে ।
বাংলার ভাইবােনকে কি সুন্দর করেই না তিনি
এক করেছেন।
বাঙালীর প্রাণ
বাঙালীর মন
বাঙালীর ঘরে যত ভাই বােন,
এক হউক
এক হউক
এক হউক
হে ভগবান ।
কিন্তু শুধু কি তিনি বাংলারই কবি! শুধু কেবল
বাংলার ভাই বােনকেই কি তিনি এক করতে চেয়েছেন?
তা নয়। সমস্ত জগৎটাই যে তাঁর আপনার।
সব ঠাই মাের ঘর আছে, আমি
সেই ঘর মরি খুঁজিয়া :

গানের রাজা ৭৯ দেশে দেশে মাের দেশ আছে, আমি সেই দেশ লব যুঝিয়া । পরবাসী আমি যে দুয়ারে চাই- তারি মাঝে মাের আছে যেন ঠাই, কোথা দিয়া সেথা প্রবেশিতে পাই সন্ধান লব বুঝিয়া। ঘরে ঘরে আছে পরমাত্মীয়, তারে আমি ফিরি খুজিয়।। এই রকম করে জগতের প্রত্যেককে তিনি এক সুরে বাঁধতে চেয়েছেন। এই এই জন্যেই তিনি জগতের কবি—এই জন্যেই তিনি বড়।

স্বর্ণমুকুট
রবীন্দ্রনাথের বয়স পঞ্চাশবৎসর পূর্ণ হলে পর
বােলপুরে তার স্কুলের ছাত্র আর শিক্ষকেরা মিলে তার
জন্মােৎসব করেন আর তাকে শ্রদ্ধা ও প্রীতির অর্ঘ্য
দেন। তারপর কলিকাতার টাউনহলে সমস্ত বাঙালী
একত্র হয়ে এক বিরাট সভার আয়ােজন করেন।
কবিকে সম্মান দেখানাে আর সম্বর্ধনা করা এই সভার
উদ্দেশ্য। রবীন্দ্রনাথ জীবনের পঞ্চাশটি বছর পূর্ণ
করেছেন আর এই পঞ্চাশ বৎসর ধরে কাব্য, কবিতা,
গান, বক্তৃতার ভেতর দিয়ে এত রকম ভাব, এত রকম
নূতনত্ব এত রকম শক্তি আমাদের সাহিত্যে তিনি
দিয়েছেন যে তার প্রভাবে বাঙালীর মুখ জগতের কাছে
উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথকে সম্বর্ধনা করবার যে
রকম আয়ােজন হয়েছিল, সে রকম আয়ােজন এর আগে
কেউ দেখেন নি। সম্বর্ধনার দিন প্রকাণ্ড টাউন হলের
কোনখানে একটি তিল রাখবারও ঠাঁই ছিল না
সমস্তই লােকে ভরে গেলাে। একটু দেরীতে এসে
বিস্তর লােককে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে কিংবা ফিরে

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ, শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-৮০ পৃঃ

স্বর্ণ মুকুট
৮১
যেতে হয়েছিল। সে সভায় বাংলা দেশের যত বড়
বড় লােক একত্র হয়েছিলেন। দেশের মধ্যে যারা
জ্ঞানে, মানে, অর্থে, বিদ্যায় শ্রেষ্ঠ সে রকম অনেক
লােক সেদিন উপস্থিত ছিলেন। জজ,
জজ, ব্যারিষ্টার,
রাজা, মহারাজা, কবি, শিল্পী, দার্শনিক, ঐতিহাসিক,
বৈজ্ঞানিক, শিক্ষক, অধ্যাপক, মহামহােপাধ্যায় পণ্ডিত
অর্থাৎ দেশের যারা সেরালােক, এই সম্বর্ধনায় সবাই
তঁারা যােগ দিয়েছিলেন। বালক, বৃদ্ধ আর
স্ত্রীলােকেরাও বাদ ছিলেন না। লােকের এ রকম
আগ্রহ আর দেখা যায় নি। সব চেয়ে বেশী উৎসাহ
দেখা গেছলাে ছেলেদের ভেতর আর যুবকদের
ভেতর। কবিকে সম্বর্ধনা করবার সুযোেগ পেয়ে
বাঙালীর আনন্দ যেন আর ধরছিল না।
“বঙ্গদেশের ইঙ্গিতে মােরা
হে কবি ! তােমায় বরি হে আজি,
বঙ্গের ফুলে মাল্য রচিয়া
বঙ্গের ফুলে ভরিয়া সাজি।
অযুত আঁখির উজল আলােকে
হে কবি! তােমায় আরতি করি,
অযুত হিয়ার শুভ-কামনার
শুভ্র-শােভন চাদোয়া ধরি।”
(

৮২
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
এই কথাগুলিই ছিল সেদিনকার সকলের প্রাণের
কথা। কবিকে প্রথমে রৌপ্য পাত্রে করে অর্ঘ্য
দেওয়া হােল। তারপর একটি স্বর্ণ সূত্রের হার আর
একটি ফুলের মালা তার গলায় পরিয়ে দেওয়া হােল।
সােনার থালাতে করে উপহার দেওয়া হােল একটি
বহুমূল্যবান সােনার পদ্ম ও হাতীর দাতের ফলকে
খােদাই-করে-লেখা সুন্দর এক অভিনন্দন,আর এই
সকলের সঙ্গে দেওয়া হােল সমস্ত বাঙালীর শ্রদ্ধা,
প্রীতি আর সম্মান। কবিকে অভিনন্দন করে বাঙালী
সেদিন গর্বে উঁচু হয়ে উঠে বলেছিল--
“জগৎ-কবি-সভায় মােরা তােমার করি গৰ্ব্ব,
বাঙালী আজি গানের রাজা, বাঙালী নহে গৰ্ব ।
দর্ভ তব আসনখানি
অতুল বলি’ লইবে মানি’
হে গুণী, তব প্রতিভা-গুণে জগৎ-কৰি সৰ্ব্ব ।”
রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা সত্য সত্যই অসাধারণ ।
তিনি শুধু কবি নন, তিনি বক্তা, তিনি একজন ভাল
অভিনেতা, তিনি সমাজ-সংস্কারক, তিনি ধৰ্ম্মসংস্কারক,
তিনি দেশহিতৈষী--একাধারে তিনি সব।
ভাবের সমাবেশ, এক রবীন্দ্রনাথ ছাড়া পৃথিবীতে অপর

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ, শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্বর্ধনা-সামগ্রী-৮২ পৃঃ

No text on this page.

স্বর্ণ মুকুট
৮৩
LA
+ + + 4.
কোন মানুষের জীবনে বােধ হয় আর দেখা যায় নি।
তাঁর প্রতিভা শুধু বাংলার মধ্যেই যে আটকে রইলাে
তা নয়, বাংলা দেশ ছাড়িয়ে -দিগ্‌বিদিকে তা ছড়িয়ে
পড়লাে—শেষে, সাগরের ও-পারে ইংলণ্ডে আর
ইউরােপের অন্য সব দেশেও সাড়া পড়ে গেল।
১৯১২ সালের মে মাসে রবীন্দ্রনাথ বিলাত যাত্রা
করলেন। এই সময় তিনি তার কতকগুলি কবিতা
ইংরাজিতে অনুবাদ করে ইংরাজি গীতাঞ্জলি বার
করলেন। এই গীতাঞ্জলির গানগুলি সে দেশের লােককে
একেবারেই মাতিয়ে তুলে।
“তােরা শুনিস্ নি কি শুনিস্ নি তার পায়ের ধ্বনি,
সে যে আসে, আসে, আসে!
যুগে যুগে পলে পলে দিনরজনী
সে যে আসে, আসে, আসে।
এ ভাবের গান সে দেশের লােকে আগে তাে
কখনাে শােনে নি।
কত অজানারে জানাইলে তুমি,
কত ঘরে দিলে ঠাঁই,
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।

৮৪
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
তােমারে জানিলে কেহ নাহি পর
নাহি কোনাে মানা, নাহি কোনাে ডর,
সবারে মিলায়ে তুমি জাগিতেছ
দেখা যেন সদা পাই।
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই ।”
পরকে এ রকম করে আপনার করে নিতে আর তাে
কেউ তাদের বলে নি !
“বিশ্বসাথে যােগে যেথায় বিহারে
সেইখানে যােগ তােমার সাথে আমারে।
নয়ক বনে, নয় বিজনে,
নয়ক আমার আপন মনে,
সবার যেথায় আপন তুমি, হে প্রিয়,
সেথায় আপন আমারাে।”
এই বিশ্বব্যাপী মহামিলনের গান শুনে তারা স্তব্ধ
হয়ে গেল।
“আমার মাথা নত করে দাও হে তােমার
চরণ-ধূলার তলে।
সকল অহঙ্কার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে।

স্বর্ণ মুকুট যাচি হে তােমার চরম শান্তি, পরাণে তােমার পরম কান্তি, আমারে আড়াল করিয়া দাড়াও হৃদয়-পদ্ম-দলে। সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে । গীতাঞ্জলির এই স্তব শুনে তাদের সকল অহঙ্কার চূর্ণ হয়ে গেল। ভারতের কবির কাছে ইউরােপের কবিরা নতি স্বীকার করলে। ভারতের কবি রবীন্দ্র- নাথ জগতের কবি-সভায় শ্রেষ্ঠ আসন পেলেন। তারপর তার গৌরব আরাে চরমে উঠলাে। বিদেশী- দের কাছ থেকে উচ্চ সম্মান লাভ করে দেশে ফিরে আসবার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি পৃথিবীর সব চেয়ে বড় পুরস্কার ‘নােবেল-পুরস্কার লাভ করলেন। এই ‘নােবেল’ পুরস্কারটি কি, তা একটু বিশেষ করে বলা দরকার। ‘নােবেল’ সুইডেনের একজন বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার ও রাসায়নিক ডাক্তার। এর পূরাে নাম আলফ্রেড নােবেল। ইনি খুব সহজ উপায়ে ডিনামাইট তৈরী করবার কৌশল বার করেন, আর এই থেকে কোটি-

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
কোটি টাকা উপার্জন করেন। কিন্তু তিনি তার
উপার্জনের টাকা নিজের আত্মীয়-স্বজনকে না দিয়ে
জগতের হিতের জন্যেই সমস্ত দান করে যান।
সম্বন্ধে এক সুন্দর যুক্তি তিনি তাঁর উইলে লিখে
গেছেন। তিনি বলেছেন, নিজে উপার্জন না করে
কেউ যদি উত্তরাধিকার সূত্রে খুব বেশী টাকা পায়, তবে
সে অলস হয়ে ওঠে আর তার মস্তিষ্কের ভাল রকম
বিকাশ হয় না। কাজে কাজেই ধনীলােকদের উচিত,
ছেলে মেয়েদের খুব বেশী টাকাকড়ি না দেওয়া।
কারণ, বিনা চেষ্টায় অনেক টাকা পেয়ে তারা অলস
হয়ে পড়বে—জগতের তা হলে কোন উপকারেই আসবে
।
আলফ্রেড নােবেল উইল করে যান যে, তার
সম্পত্তির আয় থেকে প্রত্যেক বৎসর পাঁচটি বিষয়ের
জন্যে পাঁচটি করে পুরস্কার দেওয়া হবে। সে পাঁচটি বিষয়
এই—সাহিত্য, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র,
আর জগতে শান্তি-স্থাপনের চেষ্টা। এই পাঁচটি বিষয়ে
সব চেয়ে উন্নতি করেছেন বা আদর্শের সৃষ্টি করেছেন,
এ রকম পাঁচজন লােক প্রত্যেকে এক লক্ষ বিশ হাজার
করে টাকা প্রতি বছর পুরস্কার পেয়ে থাকেন।

স্বর্ণ মুকুট
৮৭
১৮৯৬ সালে ৬৩ বছর বয়সে আলফ্রেড নােবেলের
মৃত্যু হয়।
নােবেল-পুরস্কার দেওয়া আরম্ভ হয় ১৯০১
সাল থেকে। এতদিন পর্যন্ত ইউরােপের লােকেরাই
পুরস্কার পেয়ে আছিলেন। ভারতবর্ষের মধ্যে
শুধু ভারতবর্ষ কেন, সমস্ত এসিয়ার মধ্যে আমাদের
রবীন্দ্রনাথই ১৯১৩ সালে সব প্রথম এই পুরস্কার
পান।
তারপর থেকে আজ অবধি এ দেশের কেউ
এখনাে এই পুরস্কার পান নি। নােবেল-পুরস্কারের
এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা নিজে না নিয়ে, সমস্তই
তিনি তার বােলপুর স্কুলে দান করেন।
নােবেল-পুরস্কারে রবীন্দ্রনাথ একাই যে সম্মানিত
হয়েছেন তা নয়, তার এই সম্মানে সমস্ত বাঙালীর, এমন
কি সমস্ত ভারতবাসীর
মুখ
উজ্জ্বল
হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ
বাংলা ভাষাকে জগতের সাহিত্য-সভার শ্রেষ্ঠ আসনে
বসালেন, একি বাঙালীর কম গৌরব! কিছুদিন
আগে সম্বর্ধনা-সভায় যে বলা হয়েছিল—
জগৎ-কবি-সভায় মােরা তােমার করি গৰ্ব্ব,
বাঙালী আজি গানের রাজা, বাঙালী নহে খৰ্ব্ব ।
এই কথাগুলি অক্ষরে-অক্ষরে মিলে গেল।

bb ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ . *** তারপর, আমাদের কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও রবীন্দ্রনাথকে ডি-লিটু (ডক্টর অব লিটারেচার) অর্থাৎ সাহিত্যাচাৰ্য উপাধি দেন। এ উপাধিতে ভঁর সম্মান বেশী আর কি বাড়বে! তঁাকে উপাধি দিয়ে বিশ্ব- বিদ্যালয়ের নিজেরই বরং ধন্য হওয়ার কথা। গবর্মেন্ট থেকে তিনি ‘নাইট’ উপাধি পান। কিন্তু কিছুদিন পরে তিনি ঐ উপাধি গবর্মেন্টকে ফিরিয়ে দেন। পাঞ্জাবে তার দেশের লােকের উপর অত্যাচারের কথা শুনে তিনি এই উপাধি ত্যাগ করেন। তিনি বলেন, তাঁর অসহায় দেশী ভাইদের পাশেই তিনি দাড়াতে চান, উপাধি ধারণ করে তাদের কাছ থেকে তিনি আলাদা হয়ে সরে থাকতে চান না। তিনি সকল উপাধির উপরে। তার কোন উপাধি থাকলেই বা কি, না থাকলেই বা কি ?

বিশ্ববিজয়
কিসে ?
শুধু নােবেল-পুরস্কার লাভই যে রবীন্দ্রনাথের সেরা
গৌরব, তা নয়।
১৯২০ সালে আবার তিনি ইউরোেপ
ভ্রমণে যান। বিদেশের শিক্ষা ও সভ্যতাকে শুধু তিনি
ঘৃণাই করেন না, সে সকলে আমাদের কোনই দরকার
নেই এমন কথা তিনি বলেন না। কিন্তু তা বলে আমরা
বিদেশের খালি নকলই করবাে, এ অবশ্য তিনি চান না।
পৃথিবীর অপর সব জাতির তুলনায় আমাদের সভ্যতা
অনেক পুরাতন,“আমরাই বা খাটো
ভিখারীর মতাে আমরা বিদেশীদের কাছ শুধু চাইবার
জন্যেই যাবাে কেন ? আমরাও তাদের কাছ থেকে
নেব, তারাও আমাদের কাছ থেকে নেবে। এই
দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ এ-যাত্রায় বিদেশের
কাছে জয়মাল্য পেয়েছিলেন।
কিন্তু এবার তার ইউরােপে গিয়ে পৌছবার ঢের
আগেই তার গীতাঞ্জলির বাণী সেখানকার নানা দেশে
ছড়িয়ে পড়েছিল। তার গীতাঞ্জলি সে সব দেশে যে
কি রকম আদর পেয়েছিল, তা বলে শেষ করা যায় না।
৫)

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ গুণী লােকেরা যে যে-রকমে পারেন গীতাঞ্জলির রস গ্রহণ করেও যেন তৃপ্ত হচ্ছিলেন না। এই নিয়ে রকমের আলোচনাই সেখানকার লােকেরা করতেন। ফরাসীদেশের এক কাগজে রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে ভারী সুন্দর সুন্দর কথা একবার বেরিয়েছিল। লেখক একজন ফরাসী—ফরাসী ভাষাতেই তিনি লিখেছিলেন। প্রবাসী’পত্রিকায় এর অনুবাদ বেরিয়ে ছিল,তার কতক কতক এখানে তুলে দিচ্ছি। ফরাসী ভদ্রলােকটি লিখছেন— ‘ঠাকুর-মহাশয় মা সরস্বতীর একজন বরপুত্র। তিনি এমন সুন্দররূপে নিজ ভাষাতে তাহার গানগুলি রচনা করিয়াছেন যে মা সরস্বতীর কৃপায় ও সহায়তায় তাহার অনুবাদকগণও সুচারুরূপে ভাষান্তর করিতে পারিয়াছেন।••• আমি সময় সময় পারী সহরের বিখ্যাত প্রাচ্য- ভাষার বিদ্যালয়ে গিয়া লেখাপড়া করিতাম। সেই * বিদ্যালয়ে একটি অল্পবয়স্ক। ফরাসী মহিলার সহিত আলাপ হইয়াছিল। गिनि সযত্নে বাঙ্গলা ভাষা শিখিতেন। কেন শিখিতেন, জানেন? ঠাকুর- মহাশয়ের গীতাঞ্জলি নামক পুস্তক কবিবরের নিজ ভাষাতে পড়িবার নিমিত্ত, আর কি !

বিশ্ববিজয়
১১
* * *
আমি শুনিয়াছি যে ঠাকুর-মহাশয় আপন দেশে
ঋষিস্বরূপ পূজনীয়। সমস্ত বাঙ্গালী জাতি তাহার
কবিতা মুখস্থ করিয়া থাকেন।•••ছেলেপিলে পৰ্যন্ত
তাহার গীত গাহিয়া আনন্দলাভ করে। মেয়ে-মানুষ
সকল ঘরকন্না করিতে করিতে তাহার গীত দ্বারা শ্রম
দূর করিয়া থাকেন। পুরুষেরা গঙ্গার প্রসারিত বক্ষে
নৌকা চালাইয়া তাহারই গান জপ করিয়া থাকেন।
কিন্তু মনে করিবেন না যে তিনি একজন একলসেঁড়ে
মুনি। তিনি লােক-সমাজের মধ্যে সর্বদা চলা-ফিরা
করেন। তিনি পশ্চিম দেশের সাহিত্য
একাগ্রচিত্তে অধ্যয়ন করিয়াছেন।•••তিনি অনেকবার
আমাদের দেশে পর্যটন করিয়াছেন।...
এই গীতাঞ্জলির ইতিহাস কোন্ যুগে বা কোন্
স্থানে স্থিত হইয়াছে, তাহা বলা যায় না ।
ঘটনা-বৃত্তান্ত সৰ্ব্ব দেশের সকল সময়ের ।
কেবল মানব-হৃদয়ের ইতিহাস নয়, ইহার মধ্যে
প্রকৃতির লীলা-খেলা উপস্থিত। ইহাতে দেখা যায়
কেমন করিয়া মানব-জীবন আপন মিষ্ট রসে মুগ্ধ হইয়া
যায়।•••এই কবিতাতে অনেক অসাধারণ গুণ আছে ।
ইহাতে সরলতা, মধুরতা, মৃদুতা, আমােদ, কৌতুক,
অনেক ভাব ও অনেক চিন্তা, ভাবনা, প্রেম, শােভা,
সৌন্দৰ্য্য পাইবেন। কিন্তু যেন এ কথা মনে থাকে যে
ইহা

৯২
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
এ সকল কবিতা অনেক দূর থেকে আসিয়াছে।
সভ্যতা ইহাতে ব্যক্ত হইয়াছে, তাহা আমাদের
ফরাসী সভ্যতা নয়।
এমন গান কি আমরা কখনও
বুঝিয়া উঠিতে পারিব ? ইহার ভিতর অতি প্রাচীন,
অতি গুপ্ত কথা রহিয়াছে। ইহা একটি পুরাতন
সাহিত্যের নিদর্শন। কিন্তু মনে রাখিবেন যে, আমরা
এখন পর্যন্ত এই সাহিত্য জানি না।
রবীন্দ্রনাথ এবার ইউরােপের মাটিতে পা দিতে না
দিতেই নানা জায়গা থেকে নিমন্ত্রণ পেতে লাগলেন।
প্রথমে তিনি গেলেন ইংলণ্ডে। সেখান থেকে গেলেন
আমেরিকায়। আমেরিকা থেকে ফিরে আসতে না
আসতেই জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, সুইডেন, হল্যাণ্ড,
বেলজিয়ম, অষ্ট্রিয়া, সুইজারল্যাণ্ড, এই সব দেশ থেকে
তার নিমন্ত্রণ এলো। এই সব জায়গায় তিনি যে রকম
সম্মান আর সম্বর্ধনা পেয়েছিলেন তা দেখে অবাক্‌
হয়ে যেতে হয়। এ রকম সম্বর্ধনা কোন দেশের
কোন কবি তত পান নি, কোন সম্রাটও কখন পেয়েছেন
কি না সন্দেহ। কয়েক জায়গার সম্বর্ধনার কথা
তামাদের শােনাই।
ডেনমার্কের কোপেনহেগেন সহরে যখন তিনি

বিশ্ববিজয় ৯৩ s এসে পৌঁছলেন, তাঁকে দেখবার জন্যে রেল ষ্টেশনে অসংখ্য লােক জমা হয়ে গেল। সেখানকার বিশ্ব- বিদ্যালয় তাঁকে বক্তৃতা দেবার। নিমন্ত্রণ করেছিলেন। সন্ধ্যে বেলায় বক্তৃতা শেষ করে তিনি বেরিয়েছেন, এমন সময় সেখানকার অসংখ্য ছাত্র বড় বড় বাতির আলাে হাতে নিয়ে তাঁকে ঘিরে দাড়ালাে,ছাত্রদের সঙ্গে সহরের লােকেরাও যােগ দিলে। তারপর কবিকে মাঝখানে রেখে অসংখ্য বাতির আলাের শােভাযাত্রা করে ও সমস্ত পথ ডেমার্কের জাতীয় সঙ্গীত গাইতে-গাইতে তাঁকে তাঁর বাড়ী পর্যন্ত নিয়ে গেল। তারপর তার বাড়ীর সামনে সে কি ভিড়! লােকের লােকের সে কি উল্লাস! রাত্রি দশটা হয়ে গেল, তবু তাদের উল্লাস আর জয়ধ্বনি থামে না। কবি তখন বারান্দায় বেরিয়ে এলেন, তাদের সেই আনন্দে যােগ দিলেন, আর মহা উল্লাসে বলে উঠলেন,—“জয়, ডেনমার্কের জয় ! জয়, ডে- মার্কের জয় ! নােবেল-পুরস্কার সুইডেন্ থেকেই তিনি পেয়ে- ছিলেন। পুরস্কার নির্বাচন করবার জন্যে এখানে বড় বড় পণ্ডিতদের এক সভা আছে। এই পণ্ডিত- ১৪ ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ সমাজ রবীন্দ্রনাথকে তাদের সভায় নিমন্ত্রণ করে- ছিলেন। এখানে বিখ্যাত-বিখ্যাত পণ্ডিতেরা রবীন্দ্র- নাথকে অভিনন্দন করেন। এই সভায় কোন-কোন পণ্ডিত বলেন যে, নােবেল-পুরস্কার আজ পর্যন্ত অনেকেই পেয়েছেন বটে, কিন্তু সাহিত্যের ভেতর দিয়ে শিল্প ও সাধনা এ দুয়ের আদর্শ রবীন্দ্রনাথ যে রকম ভাবে সৃষ্টি করেছেন, তেমনটি আর কেউ পারেন নি। সুইডেনে এক অতি পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্রনাথকে অভ্যর্থনা করেন। এই উপলক্ষ্যে সেখানকার ধৰ্ম্মমন্দির থেকে এক শােভা- যাত্রার আয়ােজন করা হয়। এই শশাভযাত্রার নেতা হয়েছিলেন ধর্মমন্দিরের প্রধান পুরােহিত মহাশয় নিজে। জার্মানির বার্লিন সহরে তার বক্তৃতার বিরাট আয়ােজন হয় আর এই সময় ভারী মজার ব্যাপার ঘটে। বার্লিনের বিশ্ববিদ্যালয় তাকে নিমন্ত্রণ করে- করেছিলেন-বক্তৃতা দেবার জন্যে। বেলা বারােটার সময় বক্তৃতা হবে ঠিক হয়েছিল। কিন্তু দু’তিন ঘণ্টা আগে থেকেই লােক জমতে শুরু হয়ে গেল। দেখতে দেখতে সমস্ত হল ভরে গেল, কোনখানে তিল রাখবারও জায়গা রইলো না, এমন কি বারান্দা আর সিঁড়িতে

বিশ্ববিজয়
পৰ্য্যন্ত লােকে ভরে গেল। বারােটার সময় কবি
যখন এলেন, রাস্তায় তখন হাজার হাজার
দাড়িয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ তাকে অভ্যর্থনা
করে ভিড় সরিয়ে দরজা অবধি নিয়ে এলেন, কিন্তু
বক্তৃতার হলে আর ঢুকতে পারেন না। বক্তৃতার
জায়গা উপরে। সিঁড়ির ধাপে ধাপে লােক গিস্ গিস্
করছে। এগােয় কার সাধ্যি! পথ ছেড়ে দেওয়ার
কথা বলা হােল। কিন্তু যারা সিড়ির উপর দাঁড়িয়ে-
ছিল তারা পিছু হতেই পারে না—পিছনেও যে ভিড় !
কর্তৃপক্ষ নিরুপায় হয়ে পুলিসের ভয় দেখালেন।
লােকেরা এতে ভয়ানক চটে গেল। তারা এসেছে
ভারতের কবিকে দেখতে আর তাঁর বক্তৃতা শুনতে-
এতে তাদের অপরাধ ! কিন্তু যিনি বক্তৃতা দেবেন,
তিনি যে
এদিকে বক্তৃতার জায়গাতেই ঢুকতে
পারছেন না, সেদিকে কারাে খেয়াল নেই। কর্তৃপক্ষ
ভয়ানক মুস্কিলে পড়লেন। শেষে বিশ্ববিদ্যালয়েরই
একজন অধ্যাপক সকলকে বললেন, কবিবরকে যদি
ফিরে যেতে হয়, তা হলে বার্লিনের লােকের লজ্জার
আর সীমা থাকবে না। জায়গা কোন রকম করে
খালি করতেই হবে। যাঁরা এসে ভিড় করে দাড়িয়ে

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
আছেন বক্তৃতা শােনবার জন্যে, তাদের অবশ্য তিনি
কিছুই বলছেন না, তবে তিনি নিজে আর তার
ছাত্রেরা বেরিয়ে যাচ্ছেন, এতে জায়গা
এতে জায়গা অনেকটা
খালি হয়ে যাবে। এই বলে তিনি বাইরে গেলেন,
আর তাঁর পিছু পিছু প্রায় পাঁচ-ছ’ শ ছাত্র বেরিয়ে
চলল। রবীন্দ্রনাথ এই সময় ছাত্রদের বললেন যে,
তাদের নিরাশ হতে হবে না। কাল তিনি আলাদা করে
তাদের সকলের সঙ্গে আলাপ করবেন।
তারপর বক্তৃতা শেষ করে কবিবর যখন বাইরে
বেরুলেন, দেখা গেল প্রায় চোদ্দ-পােনের হাজার লােক
রাস্তার দু'ধারে কাতার দিয়ে দাড়িয়ে আছে—তাকে
দেখবার জন্যে। তিনি চলে যেতে লাগলেন, আর
লােকেরা তাঁকে দেখে বিপুল জয়ধ্বনি আর উল্লাসে
রাস্তা একেবারে কঁপিয়ে তুলতে লাগলাে।
জার্মানির লােকেরা তাঁকে দেখবার জন্যেও যেমন
পাগল, তাঁর বই পড়বার জন্যেও তেমনি পাগল।
রবীন্দ্রনাথের “সাধনা” বইখানির জার্মান অনুবাদ ছাপা
হয়। এই বই জার্মানির লােকের এত ভাল লাগে
যে, তিন সপ্তাহের ভেতর এর পঞ্চাশ হাজার খানা
বিক্রী হয়ে যায়।

বিশ্ববিজয়
=ๆ
রবীন্দ্রনাথ যেখানেই গেছলেন, সমাদরের আর অন্ত
ছিল না। এবার ফ্রান্সের কথা বলি—এখানেই তিনি
সব প্রথম বক্তৃতা দিয়েছিলেন।
ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বক্তৃতার
আয়ােজন হয়। সেখানকার অধ্যাপক সিলভা লেভি
মহাশয় বিরাট আয়ােজন করেন। বক্তৃতার দিন
কবিবরকে দেখবার জন্যে, তার বক্তৃতা শােনবার জন্যে
সমস্ত সহর একেবারে ভেঙ্গে পড়লাে। ভারতবর্ষের
অনেক ছাত্র সেখানে থাকেন। তাঁরা সবাই সেদিন কবি-
বরের সঙ্গে ছিলেন। কবিবর নিজে কোন দিন বিদেশী
পােষাক পরেন না, তা তােমরা জান। ছাত্রেরাও সেদিন
মাথায় পাগড়ী পরে তার সঙ্গে সঙ্গে চলছিলেন। কবিবর
ধীরগম্ভীরপদে বক্তৃতা-মঞ্চের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন,
আর তাকে ঘিরে চলছিলেন পাগড়ী-পরা তাঁর স্বদেশের
যুবকেরা। তখনকার সে দৃশ্যটি ভারী চমৎকার। তার
সেই শান্ত মহিমান্বিত মূর্তি দেখে দর্শকেরা আনন্দে
হাততালি দিয়ে তাকে অভ্যর্থনা করতে লাগলেন।
কবিবরের পরিচয় দিতে উঠলেন স্বয়ং অধ্যাপক
সিল্ভা লেভি মহাশয়। তিনি যা বললেন, তা অতি
সুন্দর। তিনি বললেন,

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে কে, তাহা আপনাদের বলিয়া আমি মূঢ়তার পরিচয় দিব না; তার নাম ও তার গ্রন্থাবলী বিশ্বব্যাপী গৌরবের অর্ধ লাভ করিয়াছে।••• ঠাকুর মহাশয়ের যে প্রতিভা, তাহা স্বয়ং ভারতেরই প্রতিভা—যে প্রতিভা বুদ্ধদেব, ব্যাস, বাল্মীকি, অশ্বঘােষ, কালিদাস প্রভৃতিতে প্রকাশ পাইয়াছিল এবং যাহা কালে কালে নব নব উজ্জ্বল নামে আত্ম- প্রকাশ করিয়া আসিয়াছে, তাহাই আজ এই কবির মধ্যে মূর্তি ধরিয়াছে।••• আজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সম্বর্ধনা করিয়া ঘ্রার্গ ইউনিভারসিটি কেবল যে একজন প্রতিভা- বান কবিকে ও এক মহাজাতির যুগপ্রবর্তক প্রতিভাকে সম্মান করিল তাহা নয়, ষ্ট্রাসবুর্গের ফরাসী ইউনিভার- সিটি ভারতের ভগিনী ‘বিশ্বভারতী’কে সম্মান করিল। ...কবির নামের অর্থ রবির রাজার রাজা এবং তার বংশগত উপাধির অর্থ দেবতা। যারা তার রচনা পড়ে, যারা তাকে দেখে, যারা তার বাণী শােনে তারাই অনুভব করে, এমন দম্ভভরা নাম কোনাে ব্যক্তির সঙ্গে কখনাে এর চেয়ে সুসঙ্গত হইতে পারে না। যিনি রবীন্দ্রনাথ ও ঠাকুর তিনি ভারতের কবীন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ও ভারতের জনপুঞ্জকে রক্ষা করুন।

বিশ্ববিজয়
৫৯
সেই মুগ্ধ জনপুঞ্জকে কবিবর তার
“তপােবনের বাণী শােনালেন। শ্রোতারা নীরব হয়ে,
বিনয়-নম্র হয়ে তার সে বাণী শুনলেন। তাঁর বাক্যের
ছন্দ আর
আর তাল তার অসাধারণ কণ্ঠস্বর সকলকে
অভিভূত করে ফেললে। কেউ কেউ এত বেশী মুগ্ধ
হােল যে প্রবন্ধ পড়া শেষ করে যখন তিনি চলে যেতে
লাগলেন তখন তারা তার লম্বা জোব্বার কিনারার
ধূলো ভক্তির সহিত চুম্বন করে করে মুছে নিতে
লাগলো। আমাদের দেশের জ্ঞান আর বিদ্যার
কাছে সে দেশের নতি স্বীকারের একেবারে চরম
দৃষ্টান্ত।
রবীন্দ্রনাথ যে-দেশেই পা দিয়েছিলেন, ভক্তির
চরম অর্ঘ্য লাভ করেছিলেন। আমেরিকার লােকে
তত তাকে যীশুখৃষ্টের অবতার বলেই পূজো করেছিল।
কিন্তু এই ভক্তি, এই অর্ঘ্য কিসের জন্যে ! কি
তিনি তাদের দিয়েছিলেন! কি তাদের বলেছিলেন।
তিনি তাদের কি দিয়েছিলেন, শুনবে? তিনি তাদের
দিয়েছিলেন, শান্তির বাণী। সে বাণী পরকে আপনার
করে, আর জাতির মধ্যে জাতির, মানুষের মধ্যে
মানুষের ভালবাসা জন্মায়, দূরকে নিকটে নিয়ে আসে।

১০০
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
5 4 - -
বলেছিলেন
শুনবে ?
তিনি
তিনি তাদের কি
বলেছিলেন,
এস হে আৰ্য, এস অনাৰ্য,
হিন্দু মুসলমান।
এস এস আজ তুমি ইংরাজ,
এস এস খৃষ্টান ।
মা’র অভিষেকে এস এস ত্বরা,
মঙ্গলঘট হয়নি যে ভরা
সবার পরশে পবিত্ৰ-কর।
তীর্থনীরে
আজি ভারতের মহামানবের
সাগরতীরে ।
৫
তাঁর এই ডাকে দিদিগন্তে সাড়া পড়ে গেছলাে, তাই
পশ্চিমে আজি খুলিয়াছে দ্বার,
সেথা হতে সবে আনে উপহার,
দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে
যাবে না ফিরে,
এই ভারতের মহামানবের
সাগরতীরে ।

বিশ্ববিজয়
১০১
বিশ্বমানবের মধ্যে মৈত্রী স্থাপনা করে আর তাঁর
পুণ্যতীর্থ “বিশ্বভারতী”র জন্যে জগতের গুণিলােকের
শ্রদ্ধা, প্রীতি আর ভক্তি উপহার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ দেশে
ফিরে এলেন। তাঁর এই বিশ্বভারতীর কথা আর
শান্তিনিকেতনের কথা এবার তােমাদের শােনাব।
কিন্তু তার আগে কবিবরের এসিয়া ভ্রমণের কথা
সংক্ষেপে তােমাদের শুনিয়ে দিই।

পূর্বএসিয়ান্ন
পশ্চিমদেশ রবীন্দ্রনাথের কাছে শুধু যে শান্তির
বাণীই শুনেছিল তা নয়, মুক্তির বাণীও শুনেছিল।
পশ্চিমের লােকেরা ধন-দৌলত, ঐশ্বৰ্য্য নিয়েই উন্মত্ত,
তারা শুধু জড়-বিজ্ঞানেরই খবর রাখে, মুক্তির সন্ধান
তারা পাবে কোথয় ?
রবীন্দ্রনাথের কাছে এর অল্প
একটু শুনেই তারা ধন্য হয়ে গেছলাে।
ইতিহাসে তােমরা পড়েছ যে অতি প্রাচীনকালে
আমাদের এই ভারতবর্ষের সভ্যতা এ রকম উন্নত ছিল
যে, চীন দেশে, জাপানে আর প্রশান্ত ও ভারত মহা-
সাগরের দ্বীপ সকলে সেই সভ্যতার প্রভাব বিস্তৃত
হয়েছিল।
ঐ সকল দেশের সঙ্গে তখন আমাদের
হৃদয়ের আর মনের বেশ একটি সম্বন্ধ ছিল।
এতে
তাদেরই যে শুধু উপকার হােত তা নয়, আমাদেরও
উপকার হােত। তারপর অনেক বছর থেকে ঐ সব
দেশের সঙ্গে আমাদের সকল রকম সম্বন্ধ একেবারে
ছিন্ন হয়ে যায়।
ইউরােপ থেকে ফিরে আসার পর চীনের পিকিন
বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্রনাথকে নিমন্ত্রণ করেন। সেই

১০৩ পূর্ব এসিয়ায় উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ চীন-ভ্রমণে যান। যাবার পথে তিনি রেঙ্গুন, মলয়দ্বীপ, যবদ্বীপ এই সব জায়গা হয়ে যান। প্রত্যেক জায়গাতেই তিনি রাজার সম্মান পেয়েছিলেন। চীন দেশেও যে তার সম্বর্ধনার চূড়ান্ত হয়েছিল, তা আর বলতে হবে না বােধ হয়। রবীন্দ্র- নাথ নিজেই বলছেন,-“..তাহারা তাহাদের অতিথি- বাৎসল্যের আতিশয্যে আমাকে ভাসাইয়া দিয়াছে। আমার সঙ্গীরা তথায় বর-যাত্রীর আদর লাভ করিয়া- আমাদের সন্তোষবিধানের জন্য, অভাব অভি- যােগ দূর করিবার নিমিত্ত সৈন্যদল আমাদের সঙ্গে গিয়াছে, প্রত্যেক ষ্টেশনে ষ্টেশনে খবর লইয়াছে, যে, ভারতবাসী অতিথিদের কোন প্রকার অসুবিধা আছে ছেন। কিনা-- রবীন্দ্রনাথ যখন পিকিন সহরের মধ্যে প্রবেশ করলেন, তখন সেখানকার শিক্ষিত অশিক্ষিত, ভদ্র ইতর, সকল রকমের লােকই তার অভ্যর্থনায় যােগ দিয়েছিল। চীন দেশ আমাদের কাছ থেকে সকল রকমেই এখন পৃথক্‌। ইংলণ্ড, আমেরিকা আজকাল আমাদের এ পাড়া ও-পাড়ার মতাে। চীনদেশ অনেক কাছে হলেও তাদের ভাষা ভিন্ন, চাল-চলন ভিন্ন, সকল বিষয়েই ১০৪ ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ তারা আলাদা। সেখানকার লােকেরা আমাদের দেশের ভেতরকার কোন খবরই রাখে না। তবু যে তারা আমাদের কবিকে এ ভাবে অভ্যর্থনা করলাে, তা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার নয় কি ? রবীন্দ্রনাথকে পেয়ে চীনের ছাত্রদের উৎসাহের আর সীমা ছিল না। পিকিনের ছাত্ররা সেখানকার গবর্মেন্টের কাছে আবেদন করেছিল যে রবীন্দ্রনাথ এলে পর তাঁকে যেন চীন-সম্রাটের প্রাসাদের কাছে থাকতে দেওয়া হয়। ছাত্রদের এই আবেদন মঞ্জুর হয়েছিল। পিকিনের প্রায় পাঁচ হাজার চীনা-ছাত্ৰ একত্র হয়ে তঁাকে অভ্যর্থনা করে। রবীন্দ্রনাথ এই অভ্যর্থনা- সভায় এসিয়ার প্রাচীন সভ্যতা আর চীন ও ভারত- বর্ষের ঐক্য সম্বন্ধে বক্তৃতা করেন। চীনের ভূতপূৰ্ব সম্রাট হুয়ান্ তাং রবীন্দ্রনাথকে অভ্যর্থনা করেন। সম্রাট প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তার সঙ্গে আলাপ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে তিনি একটি ছবি উপহার দেন। ছবিখানি প্রায় চারশ বছরের পুরাতন। রবীন্দ্রনাথ চীনদেশে গেছলেন, মৈত্রীর ভাব স্থাপন করতে। তিনি বলেছেন-

পূর্ব এশিয়ায়
“ভারতের ক্ষতি-বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বা প্রচারকল্পে
আমি তথায় যাই নাই—গিয়েছিলাম, শুধু সহজ
মানুষের মতন—মানুষের সঙ্গে মানুষের যে স্বাভাবিক
সম্বন্ধ বর্তমান সেই সম্বন্ধের দোহাই দিয়েই গিয়েছিলাম।
মানুষের অন্তরতম গভীরতা বুঝতে গেলে, নত
হয়ে, নম্র হয়ে, সাধক হয়ে যেতে হবে, উচু মাথায়
যাওয়া চলে না।••••••আমি তাই নত হয়ে গিয়েছিলাম।
মানুষের কাছে মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি
বলেছিলাম,••••••ভাই, আমি সামান্য কবি মাত্র, আমি
তােমাদের অন্তরের মধ্যে প্রবেশ করতে চাই, মাথার
উপরে উঠতে চাই না।••••••আমি জানি, উচ্চ নীচে
কখন প্রেমের সম্বন্ধ স্থাপিত হয় না। তাই, তাদের
মধ্যে সমান হয়ে মিলতে গিয়েছিলাম।”
চীনদেশে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পড়েছিল।
চীনারা তাকে নববস্ত্র আর অনেক রকম উপঢৌকন
দিয়েছিলেন। নীল পায়জামা, কমলা লেবুর রঙের
আলখাল্লা আর বেগুনে রঙের টুপি এই সব তঁাকে
পরতে দেওয়া হয়। তিনি এইগুলি পরে সকলকে
দেখান, আর প্রার্থনা করেন যেন সূর্যের মতাে প্রতি-
দিন নূতন জীবন লাভ করে নূতন নূতন ভাবে সকলকে

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
তিনি উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। চীনারা তার নামকরণ
করেন, “চু-
চেতাং” এর অর্থ—বজের ন্যায় পরা-
ক্রান্ত ভারত-সূৰ্য্য। এই নামটি চীনা তাক্ষরে এই
ভ
"
"
চু-চে--তাং
রকম। চীন দেশ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ জাপান, ধলীদ্বীপ,
শ্যাম, কাম্বােডিয়া—এই সব জায়গাতেও গেছলেন।
জাপানের লােকেরা তাঁর বক্তৃতা শুনে বলেছিল—
আমরা ভারতবর্ষেরই শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সত্য লাভ
করবে। অন্য দেশের কাছে যা পাব, তাতে বারে বারে
মুগ্ধ হব, আর বারে বারে ভুল করবাে।
ইউরােপ-আমেরিকা থেকে রবীন্দ্রনাথ যে ভক্তির
অর্ঘ্য এনেছিলেন, চীন-জাপান ভ্রমণ করেও সেই অর্ঘ্য

পূর্ব এশিয়ায় = নিয়ে তিনি দেশে ফিরলেন। পশ্চিমের মতাে পূর্বের জন্যেও তাঁর সাধনার দ্বার খােলা ছিল- সেই সাধনার সে আরাধনার যজ্ঞশালার খােল। আজি দ্বার, হেথায় সবারে হবে মিলিবারে আনত শিরে,- এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে ।

শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- হে মাের চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগরে ধীরে— এই ভারতের মহা-মানবের সাগরতীরে। তার এই পুণ্যতীর্থ শান্তিনিকেতনের কথা এবার তােমাদের বলব। শান্তিনিকেতনের কথা বলতে গেলে আবার গােড়ায় ফিরে যেতে হয়। শান্তি- নিকেতনে এখন বিশ্বের মেলা বসে গেছে। হিন্দু, খৃষ্টান, বৌদ্ধ, মুসলমান সকল জাতের লােক মিলে এটিকে এখন তীর্থস্থান করে তুলেছে। কিন্তু গােড়াতে এটি ছিল একটি জনশূন্য মাঠ। কি করে এই জনশূন্য মাঠে বিশ্বের মেলা বসে গেল, তা বড়ই অপূর্ব। এই শান্তিনিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা হলেন রবীন্দ্র- নাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। মহর্ষি একদিন বােলপুর ষ্টেশনে থেকে এই মাঠ দিয়ে রায়পুরে যাচ্ছিলেন নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। এই মাঠের উপর

শান্তিনিকেতন
চারদিক ধূ-ধূ
তখন প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড দুটি ছাতিম গাছ ছাড়া আর কোন
গাছই ছিল না। তিনি অল্পক্ষণের জন্য ছাতিমের
ছায়ায় দাড়ালেন। বিস্তীর্ণ মাঠ।
করছে। বাড়ীঘর নেই, গাছপালা নেই—গাছপালা
দূরের কথা, সবুজ রঙের চিহ্ন পৰ্যন্ত নেই। খালি
ঐ দুটি ছাতিম গাছ মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে ।
উপরে নীল আকাশ, নীচে প্রকাণ্ড খােলা মাঠ।
দূর দৃষ্টি যায়, এ ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়ে না।
এই নির্জন স্থানটি মহর্ষির বড়ই ভাল লাগলাে—এই
ছাতিমের ছায়াটি সাধনার উপযুক্ত জায়গা বলে তার
মনে হােল। এর পর থেকে মাঝে মাঝে এই জায়গায়
তঁার তঁাবু পড়তে শুরু হােল।
এই জায়গার নাম
ছিল ভুবনডাঙ্গা। কাছেই ছিল একদল ডাকাতের
তারা এখানে ডাকাতি করতাে। বােলপুর
থেকে চারদিকের গ্রামে যাবার এই হােল পথ।
পথের মাঝে এই মাঠ। মাঠে লােজন নেই, কাজেই
ডাকাতির পক্ষে এমন সুবিধামত জায়গা আর হয় না।
কত লােককে যে ডাকাতেরা খুন করে ঐ ছাতিমগাছের
তলায় পুতে রেখেছিল তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেই
কিন্তু ঐ ছাতিমতলাই হয়ে দাড়ালাে মহর্ষির নির্জন

১১০
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
১ ল ,Frr। AL n . - - -
...
rh
সাধনার স্থান। তারপর ডাকাতের দলের সর্দার ধরা
দিল। ডাকাতি ছেড়ে দিয়ে সে মহর্ষির সেবায় লেগে
যেটা ছিল বিষম ভয়ের জায়গা, সেইটা হয়ে
দাড়ালাে পরম আশ্রয়ের জায়গা—আশ্রম।
মহর্ষি এই জায়গার নাম দিলেন শান্তিনিকেতন।
তারপর তিনি এখানে আশ্রম রচনা করবার জন্যে ব্যস্ত
হয়ে উঠলেন। অন্য জায়গা থেকে মাটি আনিয়ে সেই
মাটি শান্তিনিকেতনে ফেলে তিনি এক সুন্দর বাগান
তৈরী করলেন। গােলাপ, যুঁই, বকুল, বেল, মাধবী,
মালতী, গন্ধরাজ এই সব ফুলের গাছ—আম, জাম,
কাটাল, পেয়ারা এই সব ফলের গাছ এই বাগানে
দেওয়া হােল। যেটা ছিল মরুভূমি, সেখানে শাল,
মহুয়া, দেবদারু এই সব বড় বড় গাছও দেখতে দেখতে
বেড়ে উঠতে লাগলাে। ফুল ফুটলাে, সৌরভ ছুটলো,
ছায়া নামলাে। পাখীর দল ঝাঁকে ঝাঁকে এসে উৎসব
জমিয়ে তুললাে।
শান্তিনিকেতন সকলের পক্ষেই
শান্তির নিকেতন হয়ে উঠলাে। ফলে, ফুলে, গাছে-
ভরা এখনকার শান্তিনিকেতন দেখলে তখনকার
জনশূন্য
মাঠের কল্পনা করা শক্ত হয়ে ওঠে। সেই
ছাতিমগাছ দুটি : এখনাে আছে। ছাতিম তলায়

No text on this page.

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ, শান্তিনিকেতন-ছাতিমতলা-১১১ পৃঃ

শান্তিনিকেতন
১১১
মার্বেলের বেদীটি মহর্ষির নির্জন সাধনার জায়গাটির
এখনাে সাক্ষী দিচ্ছে। এই বেদীতে লেখা আছে-
তিনি
আমার প্রাণের আরাম
মনের আনন্দ
আত্মার শান্তি।
মহর্ষি এই জায়গায় দিনের পর দিন, মাসের পর
মাস ঈশ্বরের উপাসনা করে কাটিয়েছেন। তিনি
এখানে যে সাধনার বীজ বপন করেছিলেন, তার
ফলে শান্তিনিকেতনের প্রান্তর আজ পুণ্যতীর্থ হয়ে
দাড়িয়েছে।
অনেক টাকা খরচ করে তিনি এখানে একটি মন্দির
তৈরী করান। মন্দিরটির মেজে মার্বেলের তৈরী।
নানা রকম রঙিন কাচের দেওয়াল। দেয়ালে অনেক
গুলি দরজা। দরজাগুলি মেলে দিলেই চারদিক
একেবারে খােলা। ধৰ্ম্ম-উপাসনার জন্যেই এত আয়ােজন
করে এসব তৈরী হয়। আশ্রমে যার ইচ্ছে এসে সাধনা
করবেন, থাকবেন, তারই ব্যবস্থা হয়। সাধনা আর
উপাসনা ছাড়া আশ্রমে একটি গ্রন্থাগার আর বিদ্যালয়

১১২
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
একটি স্কুল
স্থাপন করা হবে এ ইচ্ছাও তার ছিল। মহর্ষির এই
ইচ্ছা পূর্ণ করলেন রবীন্দ্রনাথ।
১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ এখানে
খুললেন।
তখন চার পাঁচটির বেশী ছাত্র ছিল না।
রবীন্দ্রনাথ নিজেই পড়াতেন, আর নিজেই সব দেখা
শুনা করতেন। দেখতে দেখতে ছাত্র-সংখ্যা বেড়ে
চললাে। তার পর দশ পনেরাে বছরের ভেতর দেশ
বিদেশ থেকে শত শত ছাত্র এসে স্কুলে ভর্তি হােল।
শান্তিনিকেতনের মাঠ বিদ্যালয়ের কুটীরে কুটীরে
ছেয়ে গেল । বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর মহর্ষি একদিন
বলেছিলেন—আমি মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছি সমস্ত
মাঠ ছেলেতে ছেলেতে ভরে গেছে। শুধু তাই নয়,
শান্তিনিকেতন সম্বন্ধে কেউ কোন রকম নিরাশার ভাব
দেখালে তিনি বলতেন—তােমরা কিছু ভেবাে না,
এখানকার জন্যে কোন ভয় নেই—আমি ওখানে শান্তং
শিবং অদ্বৈতংকে প্রতিষ্ঠা করে এসেছি।
এই শান্তিনিকেতন-স্কুলটি ভারী মজার। স্কুল
বললে আগেই তােমাদের মনে পড়ে যায় মাষ্টার-পণ্ডিতের
বকুনি, আর মার-ধাের। স্কুলে যাবার নাম হলেই
মনটি তােমাদের দমে যায়। এখানকার স্কুল কিন্তু

শান্তিনিকেতন ১১৩ * ১০০% । সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের বকুনি বা মারধােরের নাম-গন্ধও এখানে নেই। লেখাপড়ার নামে ছেলেদের মন খেলাধূলাের মতই আহলাদে নেচে উঠে। কেন ? এখানে তারা খােলা মাঠে হুটোপাটি করে বেড়ায়। গাছের ছায়ায় বসে লেখা পড়া করে। শিক্ষকমশায়দের সঙ্গে স্বছন্দে মিশতে পায়। বড় আনন্দেই এখানে তাদের দিন কাটে। তারা বলে, “আমাদের শান্তি নিকেতন, আমাদের সব হতে আপন। আকাশ ভরা কোলে মােদের দোলে হৃদয় দোলে, মােরা বারে বারে দেখি তারে নিত্যই নূতন । মমাদের তরুমূলের মেলা, মমাদের খােলা মাঠের খেলা মােদের নীলগগনের সােহাগ-মাখা সকাল সন্ধ্যাবেলা। মােদের শালের ছায়াবীথি বাজায় বনের কলগীতি, সদাই পাতার নাচে মেতে আছে আমলকি কানন । মােদের প্রাণের সঙ্গে প্রাণে সে যে মিলিয়াছে একতানে, ভাইয়ের সঙ্গে ভাইকে যে সে করেছে এক-মন।” মােদের ৪ ১১৪ ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ এখানে তাদের থাকবার, লেখাপড়া করবার ধরণ- ধারণ, ব্যবস্থা একেবারে আলাদা রকমের—আর তা ভারী চমৎকার। সে সব কথাই এবার তােমাদের এক এক করে শােনাই। ভাের চারটার সময় ঘন্টা বাজিয়ে ছােটবড় সকল ছেলেকেই ঘুম থেকে তোেলা হয়। ছেলেরা মুখ হাত পরিষ্কার করে শােবার ঘর নিজে নিজেই সাফ করতে লেগে যায়। তারপর ভােলা জায়গায় সবাই কিছুক্ষণ ব্যায়াম করে। ব্যায়ামের পর স্নান। অাশ্রমের ভেতরেই ইদেরা। ইদেরা থেকে ছেলেরা নিজে নিজেই জল তুলে স্নান করে নেয়। স্নানের পর ধ্যান ধারণা আর উপাসনা। প্রথমে ধ্যান। সকল ছেলেকেই স্থির হয়ে বসে ঈশ্বরের কথা একটু-আধটু চিন্তা করতে হয়। এ সময় কথা কওয়া বা ছুটোছুটি করা একেবারেই বারণ। ধ্যানের সময় পনের মিনিট। ধ্যানের পর উপাসনা। সকল ছেলে এক জায়গায় জড় হয়ে সারবন্দি হয়ে দাড়িয়ে যায়, আব এক সুরে প্রার্থনা করে,- ওঁ পিতা নেহিসি পিতা নােবােধী। নমস্তেহস্ত। মা মা হিংসী। -

শান্তিনিকেতন
১১৫
বিশ্বানি দেব সবিতরিনি পরাসুব।
যদ্ভদ্রং তন্ন আসুব ৷৷ ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ওঁ ।
[ তুমি আমাদের পিতা। তুমিই যে আমাদের
পিতা, এই বােধ আমাদের মধ্যে জাগরিত কর।
তােমাকে নমস্কার। তুমি আমাদিগকে আঘাত করিও
। হে সৃষ্টিকর্তা দেবতা, আমাদের যাবতীয় পাপ
তুমি দূর কর। যা কিছু মঙ্গল, যা কিছু কল্যাণ, তাই
তুমি আমাদের মধ্যে প্রেরণ কর।]
উপাসনার পর ছেলেরা কিছু খাবার খেয়ে নেয়,
তারপর সাতটার সময় পড়ার ক্লাশ বসে। ক্লাশের
কোন নির্দিষ্ট ঘর নেই। আশ্রমের ভেতর বড় বড়
গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টি বাদল না
থাকলে এই সব গাছের তলাতেই ক্লাশ বসে। ঘণ্টা
চারেক ক্লাশ হয়, তারপর ছুটি। বেলা বারটার সময়
খাওয়া হয়।
খাওয়াদাওয়ায় নিরামিষের ব্যবস্থা
কড়াক্কড়। খাওয়ার পর ছেলেরা নিজের নিজের ঘরে
বসে যে যার পড়া তৈরী করে। এ সময় শুয়ে থাকবার
বা ঘুমােবার নিয়ম নেই।
বেলা দুটো থেকে আর একবার ক্লাশ বসে। তারপর
পাঁচটার সময় ছুটি । বিকেলের জলখাবার খেয়ে

১১৬
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
ছেলেরা খেলাধূলােয় মেতে যায়। খেলার কোন
বাঁধাধরা নিয়ম নেই। কেউ টেনিস্ফুটবল খেলে,
কেউ ব্যায়াম করে। কেউ বা এ সকলে যােগ না
দিয়ে বাগান তৈরী করে, যেমন—ফুলগাছের গােড়া
খুড়ে দেওয়া, ফুলগাছে জল দেওয়া—এই সব।
কেউ বা দল বেঁধে বেড়াতে যায়—একেবারে অনেক
দূর পর্যন্ত। কিন্তু যে যেখানে যাক্, সন্ধ্যার আগে
সকলেরই ফেরা চাই। সন্ধ্যার সময় হাতমুখ ধুয়ে
পরিষ্কার হয়ে আবার সকলকে সকালের মতাে
উপাসনার জন্যে এক জায়গায় জড় হতে হয়। সন্ধ্যা
উপাসনার মন্ত্র এই,--
ওঁ যাে দেবােহগ্নৌ যােহল্প
যাে বিশ্বং ভুবনমাবিবেশ।
য ওষধীষু যাে বনস্পতি
তস্মৈ দেবায় নমাে নমঃ।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ওঁ ।
[ যে দেবতা অগ্নিতে আছেন, জলে আছেন, যিনি
সমস্ত বিশ্বভুবন পরিব্যাপ্ত করিয়া আছেন, যিনি ওষধি-
সমূহে বিরাজ করিতেছেন, সেই চরাচরব্যাপী ভূমাকে
বার বার নমস্কার করি। ]

শান্তিনিকেতন
১১৭
***** - *
সন্ধ্যা উপাসনার পরের সময়টি বড়ই আনন্দের।
যারা ছােট, তারা রবীন্দ্রনাথের কাছে বা শিক্ষক
মােয়দের কাছে বসে নানা রকমের গল্প শােনে।
রবীন্দ্রনাথ নিজে যে দিন গল্প করতে বসেন, সে দিন
ছেলেদের আনন্দের আর সীমা থাকে না। এই গল্পের
ক্লাশে বড় বড় ছেলেদের যােগ দেবার নিয়ম নেই, কিন্তু
গল্প শােনার লােভ তারা ছাড়তে পারবে কেন ? গল্প
শুনতে কে না চায় ? তারা বাইরে
দাড়িয়ে ফাক-ফুকর
দিয়ে উকিঝুকি মারতে থাকে।
শুধু গল্প শােনা নয়, এই সময় ছেলেরা গানও
শেখে-অবশ্য যাদের গলার সুর আছে। কোন কোন
দিন ম্যাজিক লণ্ঠনের সাহায্যে বক্তৃতা হয়, এতে তারা
কত নূতন-নূতন জিনিষ শেখে। কোন কোন দিন বা
ছেলেরা ছােটখাট নাটক অভিনয় করে।
রাত্রি সাড়ে নটার মধ্যে খাওয়াদাওয়া শেষ করে
শুয়ে পড়াই নিয়ম। তবে যারা বড় ছেলে তাদের
কথা ভিন্ন। চঁদনি রাত হলে তারা খােলা মাঠে
বেড়িয়ে বেড়ায় আর গান গেয়ে আমােদ করে অনেক
রাত্রি পর্যন্ত কাটিয়ে দেয়। ছেলেরা গান দিয়ে কাজ
আরম্ভ করে, আর গান দিয়েই কাজ শেষ করে।

১১৮
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
স্কুলে কোন হেডমাষ্টার নেই। শিক্ষকেরা সবাই
সমান। ছেলেরা অবাধে তাঁদের সঙ্গে মিশতে পায়।
সকল বিষয়েই ছেলেদের স্বাধীনতা। ছেলেরা নিজেদের
ভেতর থেকে একজনকে বেছে নেয়। সেই হয় তাদের
নেতা বা কাপ্তেন। নিজেদের কাজ নিজেরাই দেখে।
কেউ কোন অন্যায় করলে কাপ্তেনই তার বিচার
করে। কাপ্তেন যা বলে, সবাইকে তা মেনে চলতে
হয়।
আগেই বলেছি, এখানে ক্লাশের জন্যে কোন নির্দিষ্ট
ঘর নেই। খােল মাঠে ঘাসের উপর, না হয় গাছতলায়
ছায়ার নীচে ক্লাশ বসে। ছেলেরা নিজের নিজের
ছােট আসনখানি পেতে সার বেঁধে পড়তে বসে যায়।
চেয়ার-টেবিলের হাঙ্গামা নেই। পরীক্ষার সময়ও এই
ব্যবস্থা। ছেলেরা যার যেখানে খুসি বসে উত্তর লেখে।
এমনাে দেখা যায়, কোন ছেলে হয়তাে গাছের উপর
চড়ে উঁচু ডালে বসে উত্তর লিখছে। ছাত্রদের উপর
শিক্ষকদের অগাধ বিশ্বাস। ছেলেরা অবিশ্বাসের কাজ
করেছে, এমন ঘটনা খুব কম দেখা গেছে।
খােলা হাওয়া আর বাইরের আলাে বাতাসে থেকে
থেকে ছেলেদের মন সুন্দর হয়ে গড়ে উঠে। তারা
খােলা মাঠ,

ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ,
.
{}
শান্তিনিকেতন আশ্রম-তরুতলে
শান্তিনিকেতন—গাছতলায় ছেলেরা পড়িতেছে—১১৮ পৃঃ

No text on this page.

শান্তিনিকেতন
১১৯
* 5 6 * * * - -
আশ-পাশের জিনিষ নূতন চোখে দেখতে শেখে। এক
বারের একটি ঘটনা বলি,
একদিন সকাল বেলা গাছের ছায়ায় বসে ছেলেরা
পড়া করছে, এমন সময় হঠাৎ একটি ছেলে পাখীর
গান শুনে মহা খুসী হয়ে উঠলো আর আঙ্গুল বাড়িয়ে
পাখীটিকে দেখিয়ে দিল। শিক্ষকমশায় দেখলেন,
সুন্দর একটি পাখী গাছের ডালে বসে রয়েছে আর
মাঝে মাঝে গান করছে। ছেলেটি বললে, পাখীটির
গান শুনে তার মন হঠাৎ যে কি এক আনন্দে ভরে
উঠেছে তা সে বুঝিয়ে বলতে পারে না।
অন্য শিক্ষক
হলে এই কথায় ভয়ানক রেগে উঠতেন। কিন্তু
এখানকার শিক্ষকেরা একেবারে
একেবারে ভিন্ন ধরণের।
ছেলেটির কথায় তিনি ভারী খুসী হলেন আর পড়ানাে
বন্ধ করে দিয়ে অন্য ছেলেদের সঙ্গে মিলে অনেকক্ষণ
পর্যন্ত পাখীর গান শুনতে লাগলেন। তারপর এই
নিয়ে ছেলেদের কত উপদেশ দিলেন, কত আলােচনা
করলেন।
আশ্রমটিকে ছেলেরা নিজেদের বাড়ীর চেয়েও বেশী
মনে করে। আশ্রম ছেড়ে যেতে তাদের একদিনের
জন্যেও মন চায় না। আশ্রমকে যে তারা কতখানি

১২০
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
আপনার ভাবে, তার একটি গল্প বলি। এটি অবশ্য
গল্প নয় সত্য ঘটনা ।
যাদব বলে ছােট একটি ছেলে এখানে পড়তাে।
ছেলেটি লেখাপড়ায় যেমন, অন্য সব বিষয়েও তেমনি।
লতা পাতা ফুল এই সকল ছিল তার খুবই প্রিয়।
গল্পের ক্লাশে সে চমৎকার চমৎকার গল্প বলতে পারতাে।
ছােট ঘােট ছেলেদের সে ইংরাজীতে গল্প শােনাতে।
দিনরাত হাসি
হাসি খুসী, আলাদ।
ছেলেটি যেন
আনন্দ-মূর্তি।
হঠাৎ তার অসুখ করলাে। দিনকয়েকের মধ্যেই
বাড়াবাড়ি। তখন তাকে চিকিৎসার জন্যে কলকাতায়
নিয়ে যাওয়ার কথা হােল। একদিন সকালবেলা
বড় বড় কয়েকজন ছেলে তাকে বিছানা সমেত আস্তে
আস্তে কাধে তুলে নিয়ে ষ্টেশনে রওনা হােল। ছেলেটি
এতক্ষণ এসব বুঝতে পারেনি। খানিকদূর গেলে পর
যখন সে টের পেলে যে তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া
হচ্ছে, তখন সে চেঁচিয়ে উঠলাে, “আমায় কোথায় নিয়ে
যাচ্ছ ? আমি যাব না—আশ্রম ছেড়ে আমি কোথাও
যাব না।—আমায় ফিরিয়ে নিয়ে চল।” সঙ্গে যে
ডাক্তারটি ছিলেন, তিনি বললেন, এভাবে যদি ও অস্থির

শান্তিনিকেতন ১২১ হয়, তাহলে বড় খারাপ হবে। তখন তাকে আশ্রমে ফিরিয়ে আনা হােল। কলকাতা থেকে ভাল ডাক্তার আনিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা হােল। ছেলেরা দিন নেই রাত নেই, প্রাণ দিয়ে তার সেবা করতে লাগলাে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হােল না। ছেলেটি শেষে মারা গেল। মারা যাওয়ার খানিক আগে ছেলেটি কেবলই বছিল, “সে ফুলটি আর তােত ফুটবে না—আর তত ফুটবে না!” পাশে যে শিক্ষক মশায় বসেছিলেন, তিনি চোখের জল মুছে বললেন, “ভয় নেই, থােকা সে ফুলটি ফুটবে।” বড় বড় ছেলেরা কত রকমের কাজ নিয়েই থাকে । আশ্রমের নিকটে যে সকল গ্রাম আছে, সেখানকার লােকজনদের সঙ্গে তারা মেলামেশা করে তাদের লিখতে পড়তে শেখায়। অসুখ বিসুখ করলে ওষুধ- পথ্য দেয়—সেবা-শুশ্রুষা করে। আপদ বিপদে তাদের সাহায্য করে। গ্রামে একবার আগুন লেগে ছিল। গ্রামের লােকেরা কিছুই না করতে পেরে খালি চেঁচামেচি করতে থাকে। শেষে আশ্রমের ছেলেরা গিয়ে আগুন নিবিয়ে দেয়। ছেলেরা কত দিক দিয়ে যে কত জিনিষ শিখতে ১২২ ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ নেই। পায়, তা বলা যায় না। সময় সময় তারা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ে। আর বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে নানা রকমের লতা পাতা ঘাস ফুল ফল সংগ্রহ করে কত নূতন নূতন বিষয় শেখে। কাটা খোঁচা লেগে পায়ের তলা তাদের ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়, তাতে কিন্তু হৃক্ষেপ এখানে একটা কথা বলা দরকার। আশ্রমের ছেলেদের জুতাে পায়ে দেওয়ার নিয়ম নেই। খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে তাদের পা খুব শক্ত হয়ে উঠে। ছেলেরা ফুলের বাগান, শাক সজির বাগান তৈরী করতে শেখে, আর এই সকল কাজে তাদের কতই না নন্দ। মাঝে মাঝে এখানে নাটক অভিনয়ের আয়ােজন হয়। এতে ছেলেরাও যােগ দেয়, মেয়েরাও যােগ দেয় ! অভিনয় এতই সুন্দর হয় যে কলকাতা থেকে অনেক গুণী লােক আসেন, তা দেখবার জন্যে। রবীন্দ্রনাথ নিজে যখন অভিনয়ে নামেন, তখন তাে কথাই নেই। ছেলেরা এখানে চিত্রবিদ্যা শেখে, গান- বাজনা শেখে, শেখে, অভিনয় করতে শেখে আর দেশ- বিদেশের গুণী লােকদের সঙ্গে মিশে সত্যিকারের মানুষ হওয়ার সুযােগ পায় ।

শান্তিনিকেতন ১২৩ রবীন্দ্রনাথ যখন আশ্রমে উপস্থিত থাকেন, ছেলেদের আরাে বেশী আনন্দে দিন কাটে। তারা যখন-তখন তাঁর কাছে যায়—তাঁর মুখে গল্প শােনে, গান শােনে। এতে যে তাদের কি লাভই হয়, তা আর বলবার নয়। এই হােল শান্তিনিকেতন সম্বন্ধে মােটামুটি কথা । কেমন ? একেবারে নূতন ধরণের নয় কি ? এখানে তােমাদের মতাে শত শত ছেলে এখন পড়ছে। রবীন্দ্র- নাথ ছেলেবেলায় শিক্ষকদের কাছে কি রকম মন্দ ব্যবহার পেতেন আর তাতে তার মনে কি রকম ব্যথা লাগতাে, সে কথা গােড়াতেই তােমরা কিছু কিছু নিজের ছেলেবেলার কথা মনে করে, ছেলেদের উপর যাতে কোন রকম জুলুম না হয়, সে রকমের ব্যবস্থা তিনি এখানে করেছেন। প্রথমে গুটিকয়েক মাত্র ছেলে নিয়ে তিনি এই বিদ্যালয়টি আরম্ভ করেছিলেন। তারপর ক্রমে বাড়তে বাড়তে এখন বিরাট ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। পঁচিশ বছর আগেকার ঘােট বিদ্যালয়টি এখন এক বিশ্ব- বিদ্যালয় হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের এই বিশ্ব বিদ্যালয়টির নাম “বিশ্বভারতী”। এর সঙ্গে এখন বিশ্ব- ১২৪ ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ মানবের যােগ স্থাপনা হয়ে এটি এখন বিশ্বের সামগ্রী হয়ে দাড়িয়েছে। বিশ্বভারতীর গ্রন্থাগারটি জগতের দুর্লভ-দুর্লভ গ্রন্থে পূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই সকল গ্রন্থ ইউরােপ, আমেরিকা, চীন, জাপান প্রভৃতি নানাদেশ থেকে উপহার এসেছে। একটা সাম্রাজ্যের চেয়েও এই গ্রন্থাগারটি অধিক মূল্যবান। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন সমস্ত বিশ্বকে এখানে নীড় করব, সমস্ত বিশ্ব এখানে এক-নীড় হবে, তাহলে মানুষের মধ্যে সেই অসীমকে, সেই ভূমাকে উপলব্ধি করব। বাইরের সঙ্গে যাওয়া- আসার পথ প্রশস্ত করতে পারলে, নির্মল প্রাণপরিপূর্ণ হাওয়া সকল কলুষ দূর করবে। এখানে সকল দেশের সকল জাতির ছাত্রেরই স্থান আছে, আর সব রকম ভাষারই চর্চা হয়, যেমন- বাংলা, সংস্কৃত, ইংরাজি, পালি, হিন্দী, গুজরাতী, মারাঠী, মৈথিলী, সিংহলী, ফরাসী, জাপানী, গ্রীক, চীনা, ইতালিয়—আর কত নাম করব ? এই সব ভাষায় জ্ঞান আলােচনা করবার জন্যে এই সব দেশ থেকে বড় বড় সব পণ্ডিত বিশ্বভারতীতে এসে থাকেন। এর ফলে বিশ্বভারতী এখন বিশ্বের যত সব গুণী লােকের, জ্ঞানী লােকের মিলন-স্থান হয়ে দাড়িয়েছে। এদের এই শান্তিনিকেতন মিলনের ফলে এমন এক আদর্শ সভ্যতার, আদর্শ জ্ঞান- বিজ্ঞানের সৃষ্টি হবে যাতে জগতের অশেষ কল্যাণ হবে। রবীন্দ্রনাথ যে একদিন বলেছিলেন, হেথায় নিত্য হের পবিত্র ধরিত্রীরে, এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে । তা সার্থক হয়েছে। হেথায় আৰ্য, হেথা অনাৰ্য্য হেথায় দ্রাবিড়, চীন- শক হুন-দল পাঠান মােগল এক দেহে হ’ল লীন । ০ ০ + তপস্যা-বলে একের অনলে বহুরে আহুতি দিয়া বিভেদ ভুলিল, জাগায়ে তুলি একটি বিরাট হিয়া। এ কথা বর্ণে বর্ণে সত্য হয়েছে

১২৬
ছেলেদের রবীন্দ্রনাথ
বাঙলা দেশ ধন্য, যে তাঁর মতাে সাধক এখানে
জন্মেছেন। বাঙালী আমরা ধন্য, যে তাকে আমরা
আমাদের মধ্যে পেয়েছি। তিনি আমাদের বাঙলা মায়ের
মুখ উজ্জ্বল করেছেন—বাঙালীর গৌরব বাড়িয়েছেন।
তিনি আরাে দীর্ঘকাল ধরে আমাদের মধ্যে বিরাজিত
থাকুন তার প্রভাবে জগৎ আরাে বেশী ধন্য হােক্।
আবার তিনি ইউরােপ ভ্রমণে
বেরিয়েছেন, আর বিদেশীদের কাছে সর্বত্রই শ্রদ্ধাঞ্জলি
লাভ করছেন। তাঁর এই যাওয়া-আসার ফলে ও-দেশের
সঙ্গে এ-দেশের মিলনের পথ আরাে বেশী প্রশস্ত হচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথের কথা এতক্ষণ তােমরা শুনলে, কিন্তু
এত বলেও তাঁর সম্বন্ধে কিছুই বলা হােল না। তাকে
বুঝতে হলে, তার সঙ্গ করতে হবে—তঁার বই পড়তে
হবে। গােড়াতে যা বলেছি, সেই কথাই এখানে আবার
বলি। তােমরা এখন থেকে তাঁর কবিতা পােড়া, পড়ে
বুঝতে চেষ্টা কোরাে, বুঝতে না পারলে বুঝিয়ে নিও।
যতই তােমাদের জ্ঞান বাড়বে, তার লেখা পড়ে ততই
তােমরা মুগ্ধ হবে। দেখবে, শুধুই কি তিনি কবি ?
তিনি তপস্বী, তিনি ত্যাগী। আর গানের ভেতর দিয়ে
তিনি সত্য-সুন্দরকে পেয়েছেন তাই তিনি ঋষি।

শান্তিনিকেতন ১২৭ ‘গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি, তখন তারে চিনি, আমি তখন তারে জানি।” তােমর। পুণ্যতীর্থ শান্তিনিকেতনে যেয়াে, আর এই তীর্থের ঋষি রবীন্দ্রনাথের চরণে প্রণত হয়ে হােয়াে। ইউরােপ-আমেরিকার মহিলা-সমিতি এই মহা- পুরুষকে যে বলে অভিনন্দন করেছিলেন, এস আমরাও সকলে মিলে তাকে সেই বলে অভিনন্দন করে, তার চরণে ভক্তি-প্রণত হয়ে বিদায় হই, “অন্তরে তুমি দিলে আনন্দ- নব আনন্দ-ধারা ; প্রাণে সুগভীর দিলে প্রশান্তি গ্লানি সন্তাপ-হারা। আত্মারে তুমি যে দান দিয়েছ সে দান সবার সেরা, সে তার অলােক-উদ্ভব-স্মৃতি, স্বর্গ-আলােকে ঘেরা।”

No text on this page.

No text on this page.

Cheleder Rabindranath

Author
Som,jaminikanta
Title
Cheleder Rabindranath
File name
Cheleder Rabindranath
Text
OCR done
Citation
1926
Published
2010/01/17
Publisher
Sri Kalikinkar Mittra, Alahabad
Language
Sanskrit
Pages
158
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Essay
Keywords
Shantiniketan
DLI number
512550
Barcode
4990010019614.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
BiqeGoA3UEs
Download PDF

Cheleder Rabindranath