Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Path Chalte Ghaser Phool Ed.1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পথ চলুতে ঘাসের ফুল
শ্ৰীসজনীকান্ত দাস
প্রণীত
রঞ্জন প্রকাশালয়
২০৬, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
১৩৩৬ সাল
গ্রন্থকার কত্তক সৰ্ব্ব স্বত্ব সংরক্ষিত
১ম সংস্করণ-ভাদ্র, ১৩৩৬ সাল
মৃল্য এক টাকা
এ শুধু তােমাৱি ভৱে ভুমিই বুঝিবে সখি,
ঘাসের ফুলের কিবা মূল্য,
সার্থক হবে ফুল
নিমিষেৱও ভৱে যদি
তুমি হয়ে ওই উৎফুল্ল।
No text on this page.
পথ চলতে ঘাসের ফুল প্রেয়সী বল্লেন, নেই আগা তার নেইকো মূল-ওই যে কথায় বলে, তােমার হয়েছে তাই- দু’চোখ বুজে একটা হাই তুলে বল্লাম, দেবী, কিবা অপরাধ কহ প্রিয়া বলেন, ন্যাকামি রাখ, ‘অহরহ তােমার পরের লেখার প্রুফ দেখা দেখে আমি অস্থির হয়েছি, নিজে কিছু লেখ না যে বড়! বললাম, ফরমাস কর। খবর রাখ কি, যে দুনিয়ার যত শ্রেষ্ঠ কবিদের লেখার মূলে তাদের প্রেয়সীদের তাগিদ ! হতে পারে, কিন্তু তুমি যে জিদ করে বসে আছ যে লিখবে না কিছু, নইলে আমার কি অসাধ- বারান্দা থেকে পত্নীর সহােদর ভাই প্রসন্ন সিংহনাদ করে উঠল, ওই রে, আবার লেগেছে! সত্যি সরি, তুই ভারি কুঁদুলে । দাদার অনুযােগে বােনের চোখের কূলে কূলে জল, বলে, তুমি আমার দোষটাই দেখলে, দাদা! আমার লজ্জাটা তাে বুঝলে না- আমি বললাম, কিসের দুঃখ, কিসের দৈন্য, কিসের লজ্জা কিসের থাম। উনি আজকাল কিছু লেখেন না বলে সবাই আমায় খোটা দেয়, বলে, আমি নাকি ওঁকে গ্রাস
ঘাসের ফুল
কাল?
সর্বনাশ, এবার লিখতেই হ’ল দেখছি। মিথ্যা অপবাদ রটতে
দেওয়া ভাল না, কিন্তু লিখব কি নিয়ে?
তােমার যা খুসী, বেশ ক'রে মন দিয়ে বসলে কি আর
ঢের হয়েছে। আচ্ছা, মহাকাব্য না চুটকী ?
মহাকাব্য লেখবার কি আর সময় পাবে ?
সময়ের অভাবে
আজকালকার কবিরা তাে সব ড্যাশ আর ফুটকি দিয়েই কাজ সারে।
তুমি চুটকীই লেখ। কিন্তু কাল চাই, তা-
আচ্ছা, আমি তেতলার ঘরে যাচ্ছি, এক কাপ চা আর
বৰ্মা চুরুট কিছু পাঠিয়ে দাও। তুমি যেও না কিন্তু, তাহলেই সব
গুলিয়ে যাবে।
রাগ করে প্রেয়সী বললেন, তােমার কাছে না গেলে যেন কারু
ঘুম হচ্ছে না।
তেতলায় গেলে আর হবে কি? পেটে কবিতা নেই লিখব কি ?
তার ওপর আবার এদিক-ওদিকে প্রেয়সীর জাত-ভাইরা চুল শুকোবার
অছিলায় এসে পদে পদে ভুল ঘটাতে সুরু করেছেন। চুরুট টানতে
টাতে হতাশ হয়ে ভাবলাম, থাকে কপালে, চুরি করি।
রবীন্দ্রনাথকে গায়েব করা যাবে না। প্রাচীন কবি, বিশেষ করে বৈষ্ণব
কবিদের কিঞ্চিৎ রচনা আলমারীতে ছিল, তাদের লেখা থেকে বেছে
বেছে টুকলেই বেশ একটি ছন্দ-মঞ্জরী গড়ে তােলা যেতে পারে।
সত্যেন দত্তর ছন্দ-সরস্বতী’র কথা মনে হ’ল। কিছুক্ষণ চেষ্টা
করে দেখলাম, classification এক মহা যন্ত্রণা, নমুনা জুটলেও
ঠিক মত সাজাতে হলে কিঞ্চিৎ বিদ্যার প্রয়ােজন, সুতরাং সে
ঘাসের ফুল চেষ্টা ছেড়ে নানা ধরণের চুটকী পদ সংগ্রহ করে মালা গাঁথবার মতলব হল- প্রথমেই কবি রামপ্রসাদের ‘দুর্গাপঞ্চরাত্র চোখে ‘দুর্গাপঞ্চরাত্র চোখে পড়ল, একটা জায়গা লাগলও ভাল- বাজত কত শত মৃদঙ্গ। যােগিনীগণ নাচত সঙ্গ চলিত ললিত গৌর অঙ্গদামিনী জনু দমকে। কটিকিঙ্কিনী রণ রণ রণ কর-কঙ্কণ ঝম ঝন ঝন, বােলয় অসি ঠন ঠন ঠন সঘনে অসি চমকে। গােবিন্দদাসে দেখি- নন্দনন্দন-চন চন্দন-গন্ধনিন্দিত অঙ্গ। জলদসুন্দর কম্বুন্ধর নিন্দিতসিন্ধু-তরঙ্গ । এর চাইতে এক ডিগ্রি বেশী জগদানন্দের মঞ্জুবিকচ কুসুমপুঞ্জ মধুপ শবদ গঞ্জি গুঞ্জ, কুঞ্জরগতি-গঞ্জি গমন মঞ্জুল কুল-নারী। ঘনগঞ্জন চিকুরপুঞ্জ, মালতী ফুল মালে রঞ্জ, অঞ্জন যুত কঙ্গনয়নী খঞ্জন-গতি-হারী। অথবা কবিশেখরের কাজর রুচিহর রজনী বিশালা। তছুপর অভিসার করু নববালা । আবার জগদানন্দে অবিরত বাদর, বরিখত দরদর বহই তরলতর বাত, বিষধর নিকর-ভরল পথ অরু কত, অজর বজর বিনিপাত।
ঘাসের ফুল হরি হরি—কৈছে চলব কুহুরাতি। অসম্ভব, এ-সব ছন্দ আত্মসাৎ করা একেবারে পুকুরচুরির সামিল। ব্রজবুলিতে কোন প্রকারে হয়। কিন্তু বাঙলা-বৃথা চেষ্টা না করে নিজেই কলম ধরব ভাবছি, হঠাৎ শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের কথা মনে পড়ে গেল- প্রথম যৌবন মাের মুদিত ভাণ্ডার। হৃদয়ে কাথুলী গজ-মুকুতার হার । অথবা- নেত পাটোল না পিন্ধির্বে পিন্ধিবো সিসত সিন্দুর। বাহের বলয় না পিন্ধিবো পিন্ধির্বে পএর নূপুর । নীলজলদ সম কুন্তলভারা। বেকত বিজুলি শােভে চম্পকমালা। বিষয়-সামঞ্জস্যে একেবারে পূর্ববঙ্গ-গীতিকার কথা মনে এল। দেখি- পুষ্করিণীর চাইর পারেরে ফুটল চাম্পা ফুল। ছাইরা দেরে চেংরা বন্ধু ঝাইরা বাতাম চুল। পুষ্করিণীর পারে বন্ধু পাতার বিছানা। রাইতে আইও রাইতে যাইও বন্ধু দিনে করি মানা। নায়কের উত্তর- চইক্ষেতে অপরাজিতা গায়ে চাম্পা ফুল। আমি যে পাগল হইয়াছি কন্যা দেইখ্যা তােমার মাথার চুল । ১২ ঘাসের ফুল কন্যার কথা হাত ছাড় সােনার বন্ধু রে লাজে মইরা যাই। অথবা- ক আসমানেতে কাল মেঘ ডাকে ঘন ঘন। হায় বন্ধু আজি-বুঝি না হইল মিলন। বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর বাইরে কেন ভিজ। ঘরের পাছে মানের পাতা কাইট্যা মাথায় ধর। আবার- লাজেতে হইল কন্যার রক্তজবা মুখ। পরথম যৌবন কন্যার এই পরথম সুখ । এও অসম্ভব। ছন্দ না হয় আয়ত্ত করলাম, কিন্তু এই সহজ ভাবটি আয়ত্ত করি কি করে ? হতাশ হয়ে আধুনিক কালের কবিতা লেখার যা সব চাইতে সহজ উপায় তারই সাহায্য নিলাম, অর্থাৎ অনুপ্রাসের সাহায্য নিয়ে লাইনের পর লাইন লেখা। তিনটে চুটকীও লিখে ফেললাম। (১) ফর্মার পরে দেখছি ফৰ্ম্মা বৰ্ম্মা চুরুট মুখে, গলদঘর্মা প্রেয়সী অদূরে, মধুরে হাঁকিয়া কহে, মানুষ-চৰ্মা নহ তুমি ওগাে, তুমি অকৰ্ম্মা ধাড়ী। খুকী কয়, মােরে কোলে কক্ মাগাে। চড় মারিতারে প্রিয়া
ঘাসের ফুল
দাসীরে কহেন, সর সর মাগী ; দরুমা বেড়ার ফাকে
দেখে পদি পিসি। পরমান্নের গন্ধ ভাসিয়া আসে।
( ২ )
ফ্যাক্টরী fat করি’ দিতেছে বণিকে,
ডাক্তার, ডাক তার এদিকে-ওদিকে।
টীচার বিচার করে জুরী-রূপ ধরে,
প্লীডার লীডার হ’ল জাতীয় সমরে।
(৩)
সৰ হ’ল গন্ধ পেনু, কন্ধকাটা অন্ধকার,
আসতে পথে কাস্তে হাতে পাশ থেকে কে বললে, “স্যার
গর্ব করা নয় তো ভাল, তিমিরঘন শর্বরী,
ক্ষণে ক্ষণে ক্ষণপ্রভা ডাকছে মেঘে ঘর্ঘর ।
বিন্তি যদি খেলবে এস আমরা আছি তিন জনা,
তিন-কোণা এক বাগান, সেথা একটি যে গাছ সিঙ্কোনা।”
ধমূকে দিয়ে চমকে চেয়ে থকে গেনু তক্ষুণি,
লজ্জা হ’ল শয্যা পরে কামড়েছে এক মৎকুণী।
সুবিধা হ’ল না। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন আর পূর্ববঙ্গ-গীতিকা মাথার মধ্যে
কেশ একটু নেশার সৃষ্টি করেছিল। তাছাড়া প্রেম ছাড়া প্রেয়সী তুষ্ট
ঘাসের ফুল হবে না। কি করি ! কল্পনাকে ছেড়ে দিলাম, সে তত পথ চলতে লাগল—যত বুননা পাহাড়-ঘেরা দেশ, আফ্রিকা-আমেরিকা-অষ্ট্রেলিয়া। পথের ধারে ধারে ঘাসের ফুল। তাই তুলে নিয়ে মালা গাঁথা সুরু হ’ল, কিন্তু শেষ হল না। যে কটা ফুল গাঁথা হ’ল তাই প্রিয়াকে দেখালাম, আর অসম্পূর্ণ মালা তার গলায় তুলে দিতে গেলাম। প্রেয়সী বল্লে, আগে শেষ হােক, তারপর মালা পরব। সময় নিলাম, আর এক মাস। কিন্তু ইতিমধ্যে পাঠককেও বঞ্চনা করা যায় না। সুতরাং শুনুন। (১) পােপােকেটাপেটেলে তিনতলা হােটেলে, দিন ভর গায় গান সাজ্জন স্মিথ, “দোস্ত, তারে কহিও, আমি গেছি Ohio, নাই যদি যায় মান- যাব মটিথ।” ইহুদিনী জুলিয়া এল দ্বার খুলিয়া, ঘাসের ফুল চোখ মেরে বিল খান ধরে সুমুখে ধরি তার কোমরে স্মরি’ কবি ওমরে কহে স্মিথ, “দিলজান- এক চুমুকে ও-ঠোঁটের পেয়ালা করি শেষ।” “কি জ্বালা”, জুলী কয়, লজ্জায় লাল হ’ল গাল। পােপােকেটাপেটেলে তিনতলা হােটেলে স্মিথ বসে গর্জায়, সুর কঁাকতাল। = ( ২ ) মাদাগাস্কার, মাদাগাস্কার সেথা বাস কার, আমার প্রিয়ার সেথা বাস কার ? মন ভার ভার- বল নাম কার শুলে।
ঘাসের ফুল
“মাদাগাস্কার
মাদাগাস্কার”-
শেষ শ্বাস কার,
শেষ শ্বাস কার !
সুনীল পাহাড়
সবুজ পাতার
কে সে মায়াজাল বুলে !
তুমি কি
ভাবি যে
চিনি চিনি,
দারুচিনি ?
চলিতে একলা পথে চকিতে নিবল বাতি,
আসিল আঁধার ঘন, কাফ রি-কালাে রাতি।
বিজনে
বলে একা,
বুকেতে উলকী-লেখা-
দুরে ওই পাগলা-ঝােরা যেন রে বুনাে হাতী,
অথবা
হরিণ ছানা,
ভাবি যে
মেনে মায়ের মানা
পড়িতে বাঘের মুখে লাগিল দাত-কপাটী।
চিনি চিনি।
তুমি কি
কাবাব চিনি ?
বুকে তাের হঠাৎ কখন, গজাল ব্যাঙের ছাতি!
চলিতে একলা পথে চকিতে নিবল বাতি।
১৭
২
ঘাসের ফুল
( ৪ )
বনের মেয়ে, ভয় কি তুমি আসবে অভিসারে,
তােমার লাগি রইব ব'সে কঙ্গো নদীর ধারে।
চিরে পাহাড়টারে
সখি,
ভীষণ হুহুঙ্কারে
ঝরণা ঝরে ঝরঝরিয়ে হাজার খর-ধারে,
বনের মেয়ে, ভয় কি তুমি আসবে অভিসারে।
যেখা,
বনের মেয়ে, বাঘ ভালুকে তােমার কি বা ভয়,
মারছে যে বােজ দশটা বাঘে করলে তারে জয়!
তোমার
জানলে পরিচয়,
তােমার সঙ্গে যাবে, নয়
ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়ে যাবে যােজন দু’চার ছয়,
বনের মেয়ে বাঘ ভালুকে তােমার কিবা ভয়।
বনের মেয়ে, পায়ে যদি বনের কটাই ফোটে,
ব্যথা তােমার দূর করিব ঝরণা-জলের চোটে।
তুমি ভয় কোরাে না মােটে
যাব, যেথায় ‘চোঙার’ ফোটে,
আর শুশুক-ছানা থেকে থেকে ঘাপটি মেরে ওঠে,
বনের মেয়ে, পায়ে যদি বনের কটাই ফোটে।
।
১৮
ঘাসের ফুল
বনের মেয়ে, বৃষ্টি এল সকল আকাশ ছেয়ে,
জলের ধারা গড়িয়ে আসে পাহাড় বেয়ে বেয়ে।
আমি রয়েছি পথ চেয়ে
এস বনের মেয়ে,
আমি ভিজা দেহেই তপ্ত হব তােমায় বুকে পেয়ে,
বনের মেয়ে, বৃষ্টি এল সকল আকাশ ছেয়ে।
তুমি
( ৫ )
তােমরা আছ সুখে
হাসি মুখ ভরা বুকে,
আমাদের ভুলে চুকে
হাসিয়া কুটিকুটি।
তােমরা আঙুর ক্ষেতে
এসেছে আঙুর খেতে,
আমরা দিনে রেতে
খেটে যাই, নাইকো ছুটি
বসেছ ভূয়ের আলে
কাচা রােদ পড়চে গালে,
ঘাসের ফুল
আমাদের নাজেহালে
মনেতে বড়ই খুসী,
তোমাদের চোখের শরে
চকিতে থালে পরে,
বুড়াে জন কঠোর স্বরে
আমাদের করছে দুষী।
তােমাদের শুধুই খেলা
এসাে না কাজের বেলা,
তােমাদের অবহেলা
করিতে পারি না যে,
পােষাকের বাহার দিয়া
যাও না গ্যালিসিয়া,
সেখানে অনেক মিয়া
হবে ঘাল সকাল-সাঝে।
( ৬ )
নড়বড়ে হাড় তাের বুড়ি তুই,
দুধ দিতে কেন এলি,
কোথা গেল ব সােমত্ত তাের
দুলাল কন্যা নেলী ?
২৫
ঘাসের ফুল
সে বুঝি শেখেনি দুধে দিতে জল ?
ক্ষতি কি, নজরে করে যে পাগল !
আঙুলে আঙুলে ছোঁয়াছুয়ি হলে
দুনাে দাম দিয়ে ফেলি।
‘ফুনেনে’ সে যদি যায় কব তায়
ফিরে যেতে বেলা-বেলি।
আমি না কি প্রিয়া, মাতাল হয়েছি,
কে বলল,
আমি টলছি ?
এ যে খাটি ভূমিকম্প প্রেয়সী,
বাপের দিব্য বলছি।
সাধনার পথে এগিয়েছি কিছু
খুলেছে দিব্য চক্ষু
যখন যা খুসি করি ; দেখ, এই
করিলাম বমি, অ্যাক-থু।
(৮)
কালিফোর্নিয়া,
এনে দেব চুল-বাঁধা রাঙা ডোর, প্রিয়া,
আজ থাক, কাল যাব কালিফোর্নিয়া।
ঘাসের ফুল
গাছ পালা জঙ্গল সােনার খনি,
সব চেয়ে প্রিয় মাের প্রিয়া সে ‘বনি’!
কালাে সে চুলের রাশি, ভালবাসি মৃদু হাসি,
লক্ষ হীরার দুতি সে হাসি গণি।
বাইরে কি ডাকছে ও, বাহিরেতে নাহি যেও,
কাজ কি দরজা খুলে, দাও দোর দিয়া,
আজ থাক কাল যাব কালিফোর্নিয়া।
শােন শােন, বনি ধনি, শােন মাের প্রিয়া,
কালিফোর্নিয়া।
(৯)
রিয়ােদোজেনিরাের হাটে,
মাঝ পথে ‘
কির্ণ’ মাঠে-
দেখি মনােহর ঠাটে
চলেছে পাহাড়িয়া মেয়ে,
সােনার মত এলােচুল,
তাতেই গোঁজা বনফুল,
ঘটিল কি যে মােহ-ভুল,
রহিনু আমনে চেয়ে।
ঘাসের ফুল
,
হাটের বেলা বয়ে যায়,
সে-কথা ভুলে গেনু, হায়-
চরণ-ছোঁয়া সে ধূলায়
একলা রহিলাম বসি’--
বালিকা ঘরে গেল ফিরে,
আঁধার ঘনাইল ধীরে,
উঠল উদয়াচল চিরে
বাদুড়-চোষা পাকা শশী।
(১)
‘অরেঞ্জ কঙ্গো নীল লিম্পপাে সব চেয়ে
সব চেয়ে কার নাম বেশী?
-“জাম্বেসী”—
;
হাতীর ছানারা তীরে,
কভু ঝাঁপ দেয় কালাে নীরে
সেথা সিংহ, সিংহিনীরে ;
খুজে, খুজে পায় শেষাশেষি-
জাম্বেসী ।
ঘাসের ফুল
কোথা বাঘের বাচ্চা কাদে
হঠাৎ পড়িয়া কাটার ফঁাদে,
কোথা ঝরণার জল-হঁদে
নাচে গরিলার স্নায়ু-পেশী
জাম্বেসী।
কোথ। জিরাফ বাড়ায় গলা,
বােকা বােঝে না চিতার ছলা-
কোথা হিপাে-গণ্ডার-চলা—
পথে হেথা হোথা মেশামেশি-
জাম্বেসী।
সেই মধুজাম্বেসী তীরে
কচি পাতা-ছাওয়া সে কুটীরে-
একা চেয়ে চেয়ে কালাে নীরে
রহে প্রিয়া মাের এলােকেশী
জাম্বেসী।
=
আমি শিকার খুঁজিয়া ফিরি
যেথা জল বহে ঝিরি ঝিরি-
আর গান গাই ধরি ধরি
সে যে কত ধুয়া পরদেশী-
২৮
২৪
ঘাসের ফুল
“অরেঞ্জ কঙ্গো নীল লিম্পপাে সব চেয়ে,
সব চেয়ে কার দাম বেশী?”
-“জাম্বেসী।”—
(১১)
প্রথমে রাত্তির ঝম্ ঝম্ বৃষ্টি,
ডুবল কি পথ-ঘাট ডুবল কি সৃষ্টি,
ডুবল কি প্রেইরী, হারাল কি খেই রে,
নীল মেঘ-বনানীর আঁধারিল দৃষ্টি।
ঝুপ ঝুপ ঝুপ ঝুপ, জলধারা ঝরছে,
দুনিয়ার কলটায় পড়বে যে মরূচে,
পাগলা আকাশটার আজ জানি হ’ল কি,
আপনারে নিঃশেষ কবে কি খরচে !
প্রিয়ার আমার মাঝে জল থৈ থৈ রে,
এই সালে ছাওয়ানাে তত হয় নাই ছই রে।
এলােকেশে ঝরে তার আকাশের কান্না,
চোখে জল ছলছল, মুখে, “প্রিয় কই রে!”
ঘাসের ফুল
(১২)
সােনার বরণ চুল
উপল পথে চপল যেন
ঝরণা কুলুকুল।
কাণে মােতির দুল,
যেন রক্ত-রাঙা ফুল !
কানে দুলছে দোদুল দুল !
সিকা পারী মাগদালেনে
নেইকো তাহার তুল
সােনার বরণ চুল,
ঢেউয়ের বুকে ফেনার ফণা
হাওয়াতে গুগল।
ঘটচে মনের ভুল,
আমি হারিয়ে গেছি কূল,
গােছা দুলচে দোদুলদুল।
সুদের রসে মন ভুলেছে
ঢাইনেকো আর মূল
ঘাসের ফুল (১৩) দুফুট বহর বরফের ঘর, তাহারি শহর “ওরে বেটা হিমি মরণ নিকট যত খুসী জোরে চেল্লা। তীরেতে দাড়ায়ে তাের চেঁচামেচি ওই দ্যাখ, প্রিয়া শুনছে, আমারে সে চেনে, ভাবে মিছামিছি তিমি কেন জল ধুনছে।” ধবধবে সাদা মাৰ্বল্ দাদা, ঠিক যেন হাঁদা পর্ব- “ওরে বেটা তিমি ক ছটফট প্রিয়া চর্বির খাবে সর্ববৎ। ২৭।
ঘাসের ফুল
তাের চামড়ায় হবে তাহার পিরাণ
কাবাব বানাবে মাংসে,
যত খুসী জোরে ছেড় লেজখান
বরফের চাপ ভাঙ, সে!”
আমাদের ঘরে
রৌদ্রের করে
ঝন্ মল্ করে
স্বর্ণ
“ওরে বেটা তিমি
মিছামিছি জল
তুই করিস ঘােলা বিবর্ণ ।
প্রিয়া, তাের চামড়ার পিরাণ খুলিয়া
দেয়নি পৰ্শ অঙ্গে,
সে যে হ’ল কত কাল, গিয়াছি ভুলিয়া
ভেসেছি জলতরঙ্গে।”
সেই ঘরে আলাে
চোখ দুটি কালাে
কারে বাসি ভালাে
নিত্যি-
ঘাসের ফুল “ওরে বেটা তিমি চুপচাপ, চল ওই পড়ে বুঝি তার পিত্তি! ছ'মাস জোগাবি মােদের আহার- সেটা তাের কম গৌরব, থাম্ থাম, দেখি প্রিয়ার বাহার লই তার দেহ-সৌরভ।” . (১৪) আজিকে আমার এসেছে সহেলি, পহেলি এলাহী রাতিয়া, মাের অঙ্গের ক্ষেতে জ্বেলে দে জ্বেলে দে হাজারাে রঙী বাতিয়া। মেহমান আজ বহুত এসেছে আমার দেহের আঙনে। আঁখ-ওঠ-ছাতি সাঙাতি করেছে পহেলি পাগল শাঙনে। সখিরে—তুহারে বনাব শরাব, শরাব বনাব সখি রে, বেহুস হইবে বেবাক দুনিয়া, ও-শরাব বিখ, ভখি রে। মাের আঙুরের ক্ষেত মেদিরায় আছে, মেদিরা সে বহু দূর- তুহার দেহের শিরীন্ শরাবে নেশায় হইব চুর। আজিকে আমার এসেছে সহেলি, পহেলি এলাহী রাতিয়া, মাের অঙ্গের ক্ষেতে জ্বেলে দে জেলে দে হাজারো রঙীন বাতিয়া। ২৯
ঘাসের ফুল
(১৫)
জাগাে সখি জাগাে রে, বটিক সাগরে
উঠল সূৰ্য্য যেন গােল পাঁউরুটিটি—
জাগাে সখি জাগগা রে, হিমজল-সাগরে
গােল রুটি সূৰ্য, সেকা তার দু পিঠই।
শ্লেজ-টানা হরিণেরা দাড়িয়েছে বাইরে,
জাগগা জাগাে প্রিয় সখি, রাত আর নাই রে-
যেতে হবে বহু দূর, ঝকায় যােদ্দর
চোখ যেন ঝলসায় বাধা পেয়ে তুন্দ্রায়,
যেতে হবে বহু দূর, বরফে হানিয়া ক্ষুর
হরিণেরা ডাকে, জাগাে, থেকো নাকো তন্দ্রায়
জেলেরা বাহির হ’ল শীল তিমি ধরূতে,
মরূবে কি মারবে যে শুধু এই সৰ্তে !
জাগাে সখি জাগগা রে, বটিক সাগরে
ফিরবার কালে যেন না ডােবে ও সূৰ্য্য।
জাগাে সখি জাগাে রে, নেকড়েরা হাঘরে
রাত হলে মানবে না বন্দুক-তূর্য।
ঘাসের ফুল
(১৬)
(ক)
হটেন্ট ! ভীষণ শঠ,
নেই ধম দেও মঠ।
বাঘের সাথ দিবস রাত
খেছে কোন্ বীরের জাত ?
বনের মাঝ শিরে বাজ
সেখােয় কে সকাল সাঁঝ ?
হাতীর শির কাহার তীর
ক্ষুর সমান খাওয়ায় চিড়,
পশু-রাজার ঠিক সাজার
মালিক কে, খুন 'তাজার ?
(খ)
হটেষ্ট! নামাও ঘট,
ভয় কিসের, নে চট্ পটু।
সােয়ামী তাের বান্দা মাের,
চোখে আমার লাগল ঘাের।
মিথ্যা ছ! করব বল,
করে পিয়ার ভবি জল!
ভাই তােমার সে কোন ছার,
আসে আসুক বাপ এবার।”
হটেনট! ভীষণ শঠ,
নেই ধরম দেওতা মঠ।
(১৭)
আজ সাঝে চঁাদ সই, উঠল বনের ফঁাকে ধবধবে পথঘাট
জোছনায়,
লাগছে আঁধার ঘাের তবু সই চোখে মাের, এস তুমি জ্বেলে
দেবে রােশনাই।
৩১
ঘাসের ফুল রূপার ওড়না কার পড়েছে বনের পথে হেথা-হােথা ছােট- খাটো টুকরায়, আবছা আলােক দেখে চমকিয়ে বােকা পাখী থেকে থেকে ওই শােন ভুকরায়। হঠাৎ পরশে কার ঝরণার জলধারা কঠিন তুষার হ’ল থকে, তিয়াষী বনের পশু জল খেতে সেথা এসে ওই দেখ ফিরে যায় চকে। তুমি এস বনপথে হেঁয়াও সােনার কাঠি ঝুরু ঝুরু বয়ে যা ঝরণা, ডাকছে পাহাড় বন ডাকছে এ দেহ-মন, ফেলে দিয়ে এস ঘর-করণা। দুজনে বসব যেথা ফোটা ফুল বাস দেয় নিবিড় আঁধারে লতা-কুঞ্জে, দেখব মুখানি তব রহি’ রহি’ চকানাে চঞ্চল খদ্যোৎপুঞ্জে। ডুববে পাহাড় বন ডুবে যাবে জোছনা ধরণীর উন্মাদ নৃত্যে, অদূরে গুহার মুখে সিংহের গর্জন শিহর তুলিবে তব চিত্তে। চুমায় চুমায় শুধু ছাইব অধর দু’টি ভুল হবে চরাচর সৃষ্টি, চকিতে হইবে মনে চঁাদ শুধু ঢালে সুধা, সে সুধা তরল আর মিষ্টি।
ঘাসের ফুল
‘এস এস এস সখি, ডাকে ওই জ্যোৎস্না ঝরণার কুলু কুলু ছন্দে,
আবছা রূপার আলাে আজকে পড়ল বাঁধা, ঘন তিমিরের
বাহুবন্ধে।
পূর্ণিমা-চঁাদ ওই উঠল বনের চুড়ে ধবধবে পথ-ঘাট জোছনায়,
আমার নয়নে সখি আঁধার শ্রাবণ রাতি, এস এস জ্বেলে দাও
রােশনাই,
“পথ চলতে ঘাসের ফুল” এই পর্যন্ত পড়ে বন্ধুবর শ্ৰীযুক্ত
অশােক চট্টোপাধ্যায় যে protest করেছিলেন, সেটাও তার
অনুমতিক্রমে এখানে মুদ্রিত হল।
কবি ওগাে কবি,
উত্তপ্ত তােমার কাব্য-গগাবি
ছড়াইয়া আছে হের দিগন্ত আগুলি—
সিদ্ধি ভাঙ কিম্বা গাঁজা গুলি
যাহা কিছু খাই
কাব্য-অনন্তের তব কিনারা না পাই।
নই আমি তব সম কবি-
ভারতীর Sole-Agency লভি
এ জগতে আমি আসি নাই,
স্বভাব-সুলভ-মােহে ভালবাসি নাই
ছন্দ-ধারাপাতে
সখা, তাই জলে স্থলে উঠানে কি ছাতে
সৰ্ব্বঘটে অবাধে অক্লেশে
মগজ-চোয়ান তীক্ষ শ্লেষে
৪
ঘাসের ফুল ভরাতে পারি না খাতা মুহূর্তেকে, ছন্দ মম তিন ঠ্যাঙে চলে একেবেঁকে, বেজে ওঠে কেঁদে কেঁদে, কে যেন সেতারে কাচা হাতে গৎ ভেজে ছড়ায় বে-তারে। অতএব ক্ষমা, তব মৰ্ম্ম-Ledger-এতে কর কিছু জমা আমার Credit-পাতে, কবিতা ধরেছি বলে তােমার সাক্ষাতে। তব প্রেম fatal-urgeএ পড়ে কল্পনায় চড়ে কত দেশে কর বিচরণ, দুনিয়ার অন্দরেতে ফেল ঐচরণ বেপথু বর্জিয়া, মত্ত ছন্দ confidenceএ সঘনে গর্জিয়া। কিন্তু সখা, যদিও সকল চখীদের—তুমি একা চখা, তবু হেরি তব partiality- এ শনিবারের চিঠি Record করে না তব ভীম প্রণয়ের সার্বভৌম আবেগের জের।
ঘাসের ফুল
সব দেশ ঘুরে এলে
বিবাহিতা পত্নীটিকে ফেলে,
কিন্তু গেলে নাকো চীনে,
জাপানী গেইশাগণও তব প্রেম বিনে
মরে খেয়ে খাবি।
আমি তাই ভাবি
কি কারণে কবি, তুমি
মঙ্গোলিয়া ভূমি
বাঁচাইয়া তির্যক গতিতে
দেশে দেশে ঘর ভাঙ, সতীতে-পতিতে
বিচ্ছেদ ঘটাও,
Puritan পিতা 'পরে কন্যারে চটাও !
নিপ্পনে কেপ্পন কেন তব ভালবাসা ?
পিকিঙে ক্যান্টনে কেন বাধে নাকো বাসা
তােমার হৃদয়খানি ?
কেন বাণী
বীণা-হীনা হন গেলে ব্যাঙ,কক, সাংহায়ে?
বল কবি আমারে সমঝায়ে,
খাদা নাক ফুটো ঠ্যাং বলে
তুমি কি গাে যাও নাকে। গলে?
ঘাসের ফুল
হেরিয়া ইয়ােকোহামা-মঠবাসিনীরে,
আঁখি তব যায় নাকো কভু ভাসি নীরে!
টোকিও ওশাকা কোবে শুভ্র ফুজি-ক্রোড়ে,
পঞ্জর হৃৎপিণ্ড চাপে ওঠে নাকো নড়ে ?
কঙ্গো, মিসিসিপি
লভে তব লিপি-
হােয়াংহে ইয়াংসিকিয়াং বয়ে যায়,
বিরহে হতাশ চীন-সাগরেতে ধায়,
তব অবিচারে জর জর।
ইহার কিনারা কর কর।
হে বিশ্ব-প্রণয়ী, যক্ষ,
রফ রফ,
মেলিয়া কাব্যের পক্ষ।
বিদীর্ণ কলিজা বক্ষ
খাদা বোঁচা লক্ষ লক্ষ
রমণীরা তব সখ্য
নাহি লভি, লভে মােক্ষ।
অতএব রেখাে লক্ষ্য
কাব্য-মরু-সাহারার হে কবি-হৰ্যক্ষ,
তারা যেন ভুলে গিয়ে ভক্ষ্য,
4
৩৭
ঘাসের ফুল
ইজের কিমােনাে ফেলি স্বর্গে যায় দ্রুত,
আর ফেলি যায় গে-বেণুজাত জুতাে !
সুলেমানী salt খেয়ে উঠে পড়ে লাগি
কর সুবিচার-শুধু এই ভিক্ষা মাগি।
বন্ধুবর protest করেছেন, আমার মন না কি পথ চলতে গিয়ে ফাকি দিয়েছে, যত বুনাে পাহাড়ে দেশে, মায় উত্তরমেরুতে পৰ্যন্ত সে দিয়েছে পাড়ি, কিন্তু চীন আর জাপানে কিকু, হানা, সাকুরা ফুটেছে আর ঝরেছে, পথের দুধারে সারি সারি ফুলের গাছ আমার নজরে পড়েনি। জাপানী গেইশার বেণীবন্ধন আমি উপেক্ষা করেছি, ইয়ােকোহামার মঠবাসিনীর শান্ত মূর্তি আমার চোখে ‘নীর’ আনেনি। বন্ধু ভুল করেছেন, ইচ্ছে ছিল শুধু ঘাসের ফুলের মালা গাঁথব, প্রেয়সীর চুলে জড়াব সেই মালা। ফুল পৃথিবীতে অনেক ফোটে, আমার অর্ঘ্যথালায় তাদের ঠাঁই দেব না। বনের মানুষের মনের কথা শুনতে চেয়েছি, পাহাড়-দেশের মেয়েদের বাহার দেখতে গেছি। সভ্যতার সৃষ্টি গ্রাম নগর রাজপথের ধারে চলতে ভরসা পাইনি—তারা তাে নিজেদের কথা নিজেরাই বলেছে, আজও বলছে নিত্য নৃতন ছন্দে, অপরূপ ভঙ্গিতে-গান গেয়েছে সুর গেঁথেছে, মাল্য রচনা করেছে, মহাকাব্য সৃষ্টি করেছে। সৌধের পর সৌধ, অপূৰ্ব্ব, বিচিত্র ; ফলফুলশােভিত উদ্যান, নিভৃত নিকুঞ্জ, কুসুমিত উপবন। প্রেয়সীকে তারা শুধু চোখ দিয়ে দেখেনি, শুধু স্পর্শ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার মনকে জাগিয়েছে, বলেছে- অর্ধেক মানবী তুমি, অর্ধেক কল্পনা- 760765-Where my heart lies, let my brain lie also ! আমি তাই সভ্য দেশগুলিকে পাশ কাটিয়ে সন্তর্পণে পাহাড়-
ঘাসের ফুল
।
বনের অন্ধকার, প্রান্তর-কান্তারের নির্জনতা খুঁজে খুঁজে চলেছিলাম ;
যেখানে আদিম মানুষ মুগ্ধ হয়ে চেয়েছে তার সঙ্গিনীর দিকে,
তার দেহকে ভালবেসেছে, মনের নাগাল চায়নি। নইলে শুধু
চীন জাপান কেন, সেক্সপীয়ার, শেলী, ব্রাউনিংএর ইংলণ্ড; হুগাে,
বােদলেরের ফ্রান্স; গ্যেটে, হাইনের জাৰ্মানী ; রবীন্দ্রনাথের বাংলা ;
হুইটম্যানের আমেরিকাতে আমি যাইনি। ভারতবর্ষে বাল্মীকি, বেদব্যাস,
কালিদাস, ভবভূতি, অমরু, জয়দেব, বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস প্রেমের মহিমা
কীৰ্ত্তন করে গেছেন; পারস্যে সাদি, হাফিজ, ওমর ; গ্রীসে হােমর,
সাফো, থিওক্রিটাস ; ইতালীতে দান্তে, ভার্জিল, ওভিড প্রাচীন ও
মধ্যযুগে প্রেমকে জয়যুক্ত করেছেন। এসব দেশের মানুষ তাদের ভাষা
পেয়েছে, মানব-মানবীর চিরন্তন প্রেম এখানে পাথরে গাঁথা হয়ে
গেছে। এখানে পুরুষ শুধু প্রেমের মন্দিরে আহুতি জোগায়নি,
মেয়েরাও বলেছে-
And wilt thou have me fashion into speech
The Love I bear thee, finding words enough.
And hold the torch out, while the winds are rough
Between our faces, to cast light on each ?
I drop it at thy feet. I cannot teach
My hand to hold my spirit so far off
From myself-me-that I should bring thee proof
In words, of love hid in me out of reach.
Nay, let the silence of my womanhood
Commend my woman-love to thy belief,-
৪০
ঘাসের ফুল
Seeing that I stand unwon, however wooed,
And rend the garment of my life, in brief,
By a most dauntless, voiceless fortitude
Lest one touch of this heart convey its grief.
এখানকার মেয়েরাও তাদের চরমতম বাসনা প্রকাশ করে বলেছে-
When I am dead, my dearest,
Sing no sad songs for me ;
Plant thou no roses at my head,
Nor shady cypress tree ;
Be the green grass above me
With showers and dew-drops wet ;
And if thou wilt, remember,
And if thou wilt forget.
I shall not see the shadows,
I shall not feel the rain ;
I shall not hear the nightingale
Sing on as if in pain :
And dreaming through the twilight
That doth not rise nor set,
Haply I may remember
And haply may forget.
তাই নমস্কার করি গ্রীস নােম পারস্য ভারতবর্ষ চীন জাপান ইংলও
জার্মানি ফান্স আমেরিকাকে—সকল সভ্য দেশকে; নমস্কার করি,
82
ঘাসের ফুল ভাষায় প্রকাশিত মানুষের প্রেমকে, দেহকে ছাড়িয়ে দেহাতীতে যা পৌছেছে। প্রেম সম্বন্ধে চরম কথা তারা বলেছেন- সখি কি পুছসি অনুভব মােয়, সেহাে পিরিতি অনুরাগ বখানইত তিলে তিলে নূতন হােয় ॥ জনম অবধি হম রূপ নিহারল নয়ন ন তিরপিত ভেল। সেহাে মধুর বােল শ্রবণহি শুনল শ্রুতিপথে পরশ ন গেল । কত মধু যামিনি রভসে গমাওল ন বুঝল কৈসন কেল। লাখ লাখ যুগ হিয় হিয় রাখল বইও হিয়া জুড়ল ন গেল । । কিন্তু আলােক আর অন্ধকার এই দুই নিয়ে জগৎ। আঁধারের মানুষ এখনো পথ খুঁজে ফিরছে। সৃষ্টির আদিম যুগের বিস্ময়ের ঘাের এখনাে তার কাটেনি। সে মুগ্ধ হয়ে প্রেয়সীর পানে চেয়েছে, অর্ধব্যক্ত ভাষায় বলেছে—ভালবাসি। যা দেখি, যা ছুই, যা ভােগ করি তাকেই ভালবাসি। এই মুগ্ধ দৃষ্টি, এই স্পর্শ-লােলুপতা, এই ভােগস্পৃহাই আমার ঘাসের ফুল। আমি এরই সন্ধানে যাত্রা করেছিলাম। ইচ্ছা ছিল, “বাকী আমি রাখব না কিছুই। ৪২ ঘাসের ফুল এমন সময় বন্ধু protest করলেন। চীনে জাপানে যেতে হবে। গেলাম। শাম্পানে চেপে সূর্যোদয়ের দেশের ঘাটের পাশের শাম্পানে গলুয়ের কাছে দাড়িয়ে ভারী গলায় এক জন গান ধরেছে- কুলে পৌছেচি, নীল আকাশে তিন-কোণা হালকা মেঘের আলপনা মেঘ নয়কো তুষার ও, সেলাম ফুজিসান। নামিয়ে দে রে পালগুলাে নিবিয়ে দে রে সব চুলাে, তীরের কাছে ভিড়ব গিয়ে, সাবাস্ রে শাম্পান! নিথর নীল সাগর জল, দাড়ের ঘায়ে ছলাৎ ছল- ঢেউ নেইকো সাগর বুকে, আমার বুকে ঢেউ। কে জানে সে আসবে কি ? আবছা ছবি কার দেখি, ঢঙ দেখে ভয় জাগছে মনে আর বুঝি বা কেউ! তীরের কাছে গাছের সার, ভােরের আলােয় অন্ধকার সাবাস ভাই, এই তাে চাই, জোসে ফেল দাড়! ৪৩ ঘাসের ফুল নীল রুমাল,—প্রিয়াই ঠিক। ওদিক নয়, চল, এদিক- দোহাই বাবা ফুজিসান, তােমায় নমস্কার । তীরে নামা গেল। কুরুমার (১) যেন ভিড় লেগেছে। আমাকে একেবারে ছেকে ধরল। উঠে পড়লাম একটাতে। গান গাইতে গাইতে বাহক চলল বড় ভিড়, জোসে চল, সাবাস বীর চল, সিধা-- হা হুইদা, হাে হুইদা, ওয়াহো, হা হুইদা। ছাড়িয়ে এনু সাগর-তীর নয় কুরুমা, উড়তি তীর-- সাতটি সিকা না দিই যদি গিন্নী আমার করূবে মান ! এক পলকে কাবার রি (২), দশটা পথের মােড় ফিরি, সাকের (৩) খেয়াল নয়কো এ, দিই না কভু হঁচকা টান। ডাইনে নয়, বয়সে কি ? সামনে যাই, নাই দ্বিধা! হা হুইদা, হাে হুইদা, ওয়াহহা, হা হুইদা। মাঝ পথে ওই গেইশারা (৪) নাচছে যে পাগল-পারা, মুখপুড়ীরা সর না রে, শুনি না কি ? নাই কি কান ? (১) রিক্স। (২) প্রায় ২ মাইল। (৩) মদ। (৪) নর্তকী। ৪৪
ঘাসের ফুল
দেমাক দেখে পায় হাসি, টাটকা ফুল কাল বাসি,
গিন্নী তাজা নিত্যি রে, তাইতে খাবি খাচ্ছে প্রাণ !
মিষ্টি আজ কাল কটু, তাইতে তাে যায় না ক্ষিদা-
হা হুইদা, হাে হুইদা, ওয়াহহা, হা হুইদা।
হঠাৎ এক জায়গায় দেখি আর একটা কুরুমা সঙ্গ নিয়েছে। দুই
কুরুমার পাল্লা লেগে গেল। আমি একা, অন্য কুরুমায় দুঞ্জন, একটি
পুরুষ একটি স্ত্রী, সম্ভবতঃ স্বামী-স্ত্রী। স্ত্রী উত্তেজিত হয়ে স্বামীকে কি
যেন বলছে, স্বামী দুটি-একটি কি প্রশ্ন কচ্ছে। কান পেতে সেই
হট্টগােলের ভিতরেই শুলাম—
স্ত্রী।
ওকি ও,
ও-কি ও,
স্বামী।
স্ত্রী।
স্বামী।
এসে গেছি তােকিও।
পথে ওই দাড়িয়ে কে?
মাের প্রিয় সখি ও।
দু-পথের মােহনায়
ও কে ?
স্ত্রী
হেঁকে কয়,
ও যে ওহানা !
‘সখি
দুধ তবে দোহা না।
এল,
৪৫
ঘাসের ফুল ছি। স্বামী। স্ত্রী। ঘর নয়, স্বামী। আহা, ছাড়, কর কি ? দেখবে কে, সর, সাপ নই ব্যাঙ নই, ওঠ কেন গরজি ? যাচ্ছি কি পালিয়ে ? খালি এ- ঘরে চল তােমাকেই মারব যে জ্বালিয়ে। বুঝেছি তা ধরণে, থাকব কি স্মরণে? ফিবে মাতিয়ে পাড়া চঞ্চল চরণে! গেল পাঁচ বর্ষে আসি নাই ঘর সে, তাই ভয় মােরে বুঝি ভুলবে সে হর্ষে। স্ত্রী। স্বামী। কি মীমাংসা হ’ল শুতে পেলাম না। ছাড়িয়ে এলাম। খানিকটা যেতেই দেখি একটা আটচালার মত ঘরে বসে একদল ছােরা মদ খাচ্ছে আর সবাই এক সঙ্গে গান গাচ্ছে- ৪৬
ঘাসের ফুল
জীসান সাকে নােন্দে যােপ্পারাত্তেরে, (১)
সাকে দে সাকে দে সাকে দে দে রে।
তােকোনােমায় (২) আছে বােতল ভােলা,
ভেঙে দে, ভেঙে দে, মিছে খােলা,
(কিছু) বেগনী কি ফুলুরী ভাজা ছােলা
আনিয়ে নে এই বেলা, আনিয়ে নে নে রে।
জীসান সাকে নাে েয়ােপ্পারাত্তেরে ।
হােটলে যাবে কে, দর যা বেশী,
চুষবে রেস্ত সবই শেষাশেষি ।
গেইশা দু-চারটাকে আন্ না ধরে,
চুমুকে হবে কি টা না জোরে,
হাস্ছে কেন ওরা দাড়িয়ে দোরে—
(কিছু) আছে বাকী ? ওদের দে দে দে দে রে।
জীসান সাকে নাে েয়ােপ্পারাত্তেরে।
মনটা চাঙ্গা হয়ে উঠল। গানের সুর আমার মগজেও নেশা
ধরিয়ে দিলে। কত কি যে ভাবতে লাগলাম । বনের মানুষ সভ্য হ’ল,
শহর পত্তন করলে, নিজেকে রেখে ঢেকে চলতে লাগল। কলে বাঁধা
(১) মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বুড়ো গেল গড়িয়ে। (২) কুলুঙ্গী।
৪৭
ঘাসের ফুল
নিয়মের দাস শিক্ষিত মানুষ, তার সহস্র বাঁধন, অসংখ্য গণ্ডী। কিন্তু
প্রকৃতি প্রতিশােধ নিতে ছাড়বে কেন? মাটির বুকে গজাল ধান,
গজাল আঙুর। তাই পচিয়ে মদ হ’ল। মদ খেয়ে সভ্য মানুষ সভ্যতা
ভুলল। ফিরে এল সেই আদিম বর্বরতা। মাতালের Philosophy
হ’ল পৃথিবীর সেরা philosophy। বিস্মৃত অতীতের কথা ভিন্ন রূপে
আবার তার মনে পড়ে গেল।
যাদৃশী ভাবনা যস্য—দু পা যেতে না যেতেই দেখি আর একটা
জায়গায় মেয়ে পুরুষে খুব হল্লা করছে—সবাই তরুণ আর তরুণী। নাচ
গান চলছে
পড়েছি ঘূর্ণী পাকে,
নাচি গাই পথের বাঁকে
হাতে হাত কাঁখে কাঁখে
ফুৰ্ত্তি চালাও।
বসিয়া দুয়ার পাশে,
বুড়ােরা মুচকে হাসে-
খুক খুক কেউ বা কাশে-
ফুর্তি চালাও।
৪৮
ঘাসের ফুল
বুড়ীরা বলছে কারে
এত আর ঢলাস্ না রে,
রূপসী ঘাড়টি নাড়ে-
ফুর্তি চালাও।
দুখে আজ মারাে লাথি
আজিকে পােহাক রাতি-
হবে হােক কালকে সাথী-
ফুর্তি চালাও।
আজিকে হল্লা খালি
পােড়া রে মনের কালি,
সুরা আর সুর দে ঢালি-
ফুৰ্ত্তি চালাও।
হা হা হা হাে হাে হো হাে
নাইবা কাল মােহ
করেছি সমারােহ
ফুৰ্ত্তি চালাও
।
৪৯
৪
ঘাসের ফুল কুরুমাটাকে বিদায় দিয়ে একটা বাগানে গিয়ে বসলাম। খোড়ার পা খানায় পড়ে। সেখানেও দেখি একদল ইয়ােরােপীয় ছাত্র গােলাপী নেশায় মশগুল হয়ে একটা জায়গায় গােল হয়ে বসেছে। একজন গান ধরেছে- কাঁচা প্রেমে অহহ দুনিয়াটাকেই দেখায় রঙীন দেখায় রে, ট্রালালালা লা ট্রালালালা লা ট্রালালালা লা-লা- পথে যেতে যেতে চুমুকে সে সুরা পান করে কেবা যায় রে-- টালালালা লা ট্রালালালা লা ট্রালালালা লা-লা- পরাণ তাহার প্রেমের কিরণে ঝলমল করে ঝলমল আঁখিতে এখনাে ঝরেনি অশ্রু করে নাই আঁখি ছল ছল, বেদনা কোথায় পড়ে আছে চাপা আজো যৌবন ঢল ঢল- সােনার স্বপন দেখি সে আজিও ঘুমঘােরে চমকায় রে— ট্রালালালা লা টালালালা লা টালালালা লা-লা- । বয়স যেমন বেড়ে ওঠে বিষ হয় সেই প্রেম হায় রে— টালালালা লা টালালালা লা টালালালা লা-লা- গাঁজিয়ে ওঠে সে সুরার পেয়ালা ভয়ে উৎকণ্ঠায় রে— টালালালা লা ইলালালা লা টালালালা লা-লা-
ঘাসের ফুল
০
অতীত তাহার সােণার কিরণে ঝলমল করে ঝলমল
সুখের দিনের স্মরণে নয়নে দুখের অশ্রু ছল ছল,
ভাঙা যৌবন যেটুকু রয়েছে তাও যে করিছে টলম
সুমুখে তখন রুদ্ধ যে পথ পিছু পানে তাই চায় রে।
টালালালা লা টালালালা লা টালালালা লা-লা।
যৌবনের হররার মধ্যেই বিষাদের ঘাের, শুধু কি গানের খেয়াল!
অন্ধকার ঘনিয়ে এল। বাগান ধীরে ধীরে জন-বিরল হ’ল। একলা
বসে বসে ভাবছি—এবারে কোথায় যাওয়া যায়, পাশের একটা
ঝােপে যেন ফিসফিস আওয়াজ শুলাম। অন্ধকারে কিছুই দেখা
গেল না। শুধু শােনা গেল কে একজন কাকে বলছে-
তব বাতায়ন তলে আমি সখি, নীরবে দাড়ায়ে রহিব,
যখন। জ্যোৎস্না হইবে ম্লান,
আবছা আলােয় ঢাকিবে মেদিনী, ভয়ে ভয়ে আমি রহিব,
আমি
মধুরে
গাহিব গান।
কোমল শয্যা 'পরে শুয়ে তুমি সােনার স্বপন দেখিবে,
মুখে ফুটিবে ঈষৎ হাসি,
ঘাসের ফুল
ভাঙিলে নিদ্রা বাতায়ন খুলে চকিতে চাহিয়া দেখিবে
শুধুই উদ্ধে’ তারকারাশি।
ঘুমের আবেশে ফেলিবে ছুড়িয়া দলিত কবরী-কুসুমে
কত মধুর সে অবহেলা।
সষতনে সখি লইব কুড়ায়ে ধূলিলুষ্ঠিত কুসুমে
তােমার কবরী খসায়ে ফেলা।
ভােরের তুষার সমীর তােমার ললাট যাইবে পরশি
তুমি পারিবে কি সখি জানিতে,
হৃদয় আমার হইল শীতল তােমার অধর পরশি
সে কোন্ দীরঘ নিশাসখানিতে।
সখি কি জবাব দিলেন শাের বাসনা হ’ল না। জাপান ছেড়ে
দ্রুত সূৰ্য-করের সাথী হয়ে চীনে পাড়ি দিলাম। জাপানে যে চাঞ্চল্য
দেখে এলাম এখানে তার কিছুই নাই, সব শান্ত সমাহিত। যে যার
আপন কাজে বেরিয়েছে। কারু মুখে হাসি নেই, গম্ভীর মুখে
পথিকেরা পথ চলেছে-সবাই যেন এক একটা বুদ্ধমূর্তি। এদের মনে
আশা আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্ব আছে কিনা বােঝা যায় না। সহস্র সহস্র বৎসরের
অভিজ্ঞতা এদের চোদ্দ বছরের ছেলের মুখেও যেন মাখা রয়েছে।
পথ চলতে এক জায়গায় গান শুনে চমকে উঠলাম। চীনের।
৫২
ঘাসের ফুল
গান গায় ! দেখি একটা প্রকাণ্ড কাঠের বাড়ী তৈরী হচ্ছে। সর্দার
গান গাচ্ছে আর সেই তালে তালে সব কুলীরা কাজ করে যাচ্ছে—
কে যাবি রে সাংহায়ে
আংরাখা নে রাঙ্গায়ে,
ঠক্ ঠকাঠ ঠো হাতুড়ি
তােল কড়ি আর বর্গা তােল,
হেঁইয়াে জোয়ান হেঁইয়াে জোয়ান,
করিস্ মিছা গণ্ডগােল।
মিথ্যা কাজের দাঙ্গা এ
মনটাকে নে চাঙ্গায়ে,
বেড়ায় যারা ফুলিয়ে ভুড়ি
হােক না তাদের চামড়া লােল,
হেঁইয়াে জোয়ান হেঁইয়াে জোয়ান,
হাতের টানে পাহাড় তোেল।
তুলতে হবে চার তলায়
হক রে সবাই জোর গলায়-
হেঁইয়াে জোয়ান হেঁইয়াে জোয়ান,
পীত সাগরে ভাসূছে ঘর,
ঘাসের ফুল
কান পেতে কে শুছে গান
হিসাব করি ছুটির পর।
ধন্য সড়ক কা’র চলায়
পলার মালা কার গলায়,
চাচে কাঠের মাজছে ওই
ঝুলিয়ে দু পা জলের পর,
হেঁইয়াে জোয়ান হেঁইয়াে জোয়ান,
ঠো ঠকাঠ জলদি কর।
সময় অতি মাঙ্গা রে,
কার বিয়ে কার সাঙ্গা রে !
হেঁইয়ো জোয়ান হেঁইয়াে জোয়ান,
কে ভরেছে প্রিয়ার কোল,
আমার হাতের তৈরী দোলা
চোখ বুজে কে খাচ্ছে দোল !
কে যাবিরে সাংহায়ে
আংরাখা নে রাঙ্গায়ে,
ঠক্ ঠকাঠ ঠোকু হাতুড়ি
তােল কড়ি আর বগা তােল,
৫৪
ঘাসের ফুল
হেঁইয়াে জোয়ান হেঁইয়াে জোয়ান,
করিস্ মিছা গণ্ডগােল।
মুটে মজুরের গান, তার মধ্যেও তেমন উচ্ছ্বাস নেই, আশ্চর্য্য দেশ!
রাস্তা ছেড়ে একটু নিরিবিলিতে বিশ্রাম করব ভেবে একটা চায়ের
দোকানে চা খেতে ঢুকলাম। একটা ঘর, মধ্যে একটা কাঠের পার্টিশন
দেওয়া। চা খেতে খেতে পার্টিশনের ওপারে শুনি বিশ্রম্ভালাপ চলছে
স্ত্রী ও পুরুষ কণ্ঠে। স্ত্রী কণ্ঠ বলছে-
যদি
আমার
তবে
কহি,
আমায় বাসাে ভালাে-
নয়ন দুটি কালাে
আমার কালাে চুলের রাশি
শােনাে প্রিয় শােনাে,
গােপন কথা কোনও,
ভেবে ফুটছে মুখে হাসি।
তােমার লাগি প্রিয়,
হবই রমণীয়
বল, কে চায় কুসুম বাসি?
আমি
ঘাসের ফুল তােমার লেগে আমি শুধু তুমি পায়ে গেতার মত রইব অবিরত, কভু হাওয়ার মত ভাসি, হন পরশ গায়ে চলব তােমার গাঁয়ে, তুমি হও যদি উদাসী, এইটুকু জানিও একলা নহ প্রিয় কানে বাজবে অনেক বাঁশী ? বরূবে সমাদরে আছি তাদের তরে যারা বলবে ভালবাসি, তখন বােকার মত, দেখিয়ে বুকের ক্ষত, আমায় বলবে, সর্বনাশী । বলব শুধু হেসে নাওনি ভালবেসে পাশে হাজির ছিল দাসী। যারা আমি তুমি দেখাে আমি যুক্তিটা মন্দ নয়, কিন্তু এ নায়িকা প্রগলভা, প্রেমিক-বরের জবাব এত মৃদু যে চেষ্টা করেও শুনতে পেলাম না। দোকান ছেড়ে ঘুরতে ৫৬
ঘাসের ফুল
ঘুরতে একটা সুবৃহৎ বাগানের হাতায় ঢুকে পড়লাম, কোনাে সম্রান্ত
লােকের বাগান নিশ্চয়। একটা গাছের তলায় একটা পাথরের আসনে
বসে আছি। একটু তন্দ্রার মত এসেছে। তার ঘােরেই শুলাম
একটা অত্যন্ত ব্যথিত মিষ্টি সুর-নারীকণ্ঠ। কোনাে কুঞ্জে আত্মগােপন
করে কে যেন গাইছে-
এসাে না এসাে না, শােন মিনতির কথা।
তুমি আমনে এসে আমার গােপনকুঞ্জে
যদি নয়ন মেলিয়া না হের কুসুমপুঞ্জে।
সেও ভাল, তবু দলিত কোরাে না লতা।
আমি রহি না কো হেথা সকাল সন্ধ্যা রহি না,
তরু-আলবালে জল সেচিবারে জল বহি না,
আমি ভালবাসি শুধু দুপুরের আর নিশীথের
নীরবতা।
এসো না এসাে না, শােনাে মিনতির কথা।
তব চরণের ঘায়ে মরে যদি লতা দুখ নাই মাের দুখ নাই,
জননী আমার পশিয়া কুঞ্জে দেখে যদি শুধু ভাবি তাই
ঘাসের ফুল
তাহারে বলি বা কি
‘কুঞ্জে আমার এসে ফিরে গেছে অকাল-বৈশাখী,
ধূ ধূ গােবি-মরু উত্তরি’ মাগাে হিম আলতাই হতে
চকিতে আসিয়া ফিরেছে চকিতে চরণ-চিহ্ন রাখি,
সে তত বােঝেনি আমার ব্যথা।
এসাে না এস না, শােনাে মিনতির কথা।
বড় ভয় ভয় করতে লাগল। ব্যথার ভয়ে বাংলা দেশ ছেড়ে এখানে
এসেছি, এখানেও সেই ব্যথা! বাগানে থাকতে আর ভরসা হল না,
একছুটে একেবারে চীন পেরিয়ে অনেক পাহাড় জঙ্গল নদী ছাড়িয়ে
একটা জায়গায় এসে পড়লাম-জায়গাটার নাম জানি না। দেখি
পাঁচজন ন্যাড়ামাথা লােক সামনে এক এক বা মদ আর একটা
করে পেয়ালা নিয়ে বসে আছে। মদ খাচ্ছে, ন্যাড়া মাথা নাড়ছে
আর গাইছে-
ভর রে সুরা ধর পেয়ালা
আঁধার জীবন কর রে আলা,
মুখ ক্ষণিকের সুখ দেয়ালা,
দণ্ড দুয়ের হররা চালা,
বাস !
৫৮,
ঘাসের ফুল
নিশির শিশির রয় না রােদে
মেলেই আঁখি নয়ন মােদে,
কি প্রয়ােজন নীতির বােধে ?
শান্তি কি ছাই মন-নিরােধে
পাস!
জ্বলছে বুকে বিসুবিয়া,
যীশুর বাণী কনফুসিয়াস
মেটায় কি সে মনের তিয়াষ,
ধৰ্ম্ম কারাে পূরায় কি আশ,
কও ?
ভ্রমর বেড়ায় ফুলে ফুলে
ফোটায় সে হুল সব মুকুলে,
রাখ মনের দরজা খুলে
পাচ্ছ যা’ তা দু হাত তুলে
লও
জন্ম আগের স্মরণ-খানি
মনে তােমার নেই তা জানি।
ভবিষ্যতের ভাবনা টানি
মিথ্যে এ সব হানাহানি
ঘাসের ফুল সবই যখন ভুলবে দাদা, সুরার ‘সূরা’ ভুলতে বাধা সামনে পিছে বেবাক সাদা ! দণ্ড দুয়ের রঙ জেয়াদা নয়। শুনে একটু সুস্থির হওয়া গেল। কিন্তু এবারকার যাত্রায় সেই সহজ প্রেমের সন্ধান আর মিলল না। ঘাসের ফুল শুকিয়ে ঝরে পড়েছে। শুধু আঙুরের ক্ষেত দেখলাম। প্রেয়সীর কাছে সময় নিয়েছিলাম এক মাস, কিন্তু মালা আর সম্পূর্ণ করতে পারলাম না। ভবিষ্যতেও আর চেষ্টা করব না। জানি, চেষ্টা বিফল হবে, মানুষ সভ্য হয়েছে। তার মনের সে সারল্য নেই। অসম্পূর্ণ মালাই প্রেয়সীকে নিবেদন করলাম, সঙ্গে নিবেদন-লিপি তােমার লাগিয়া সখি, গিয়েছিনু বহু দূর পার হয়ে নদী- গিরি-সিন্ধু, আঁধার তিমির ভেদি গহন বনের মাঝে আহরিতে ফুল- মধু-বিন্দু বাঘের গুহার মুখে ক্ষুদ্র ঘাসেরা যেথা আপনিই ফুল হয়ে ফুটছে, বনের মেয়ের পায়ে সবল বনের যুবা অসহায় যেথা মাথা কুটছে, ৬০
ঘাসের ফুল
যেখানে সাপেরা চলে রেখে যায় ঘাসবনে মসৃণ বক্ষের চিহ্ন,
কচিৎ আলােকরেখা ভয়েভয়ে পশে যেথা তিমিরাবরণ
করি ছিন্ন।
যেখানে জলের ঢেউ উদ্দাম-উত্তাল, যেখানে জলের ঢেউ
রহি’ রহি’ ওঠে যেথা তিমির লেজের ঘায়ে বরফের
চাপভাঙ্গা শব্দ।
যেখানে কঁাটার গাছে ফুটেছে রঙীন ফুল বিতরিছে মৃদু মধুগন্ধ,
কাটা-ঘায়ে আঙুলের মুখে রক্তের লাল রঙ দেখে
মহানন্দ।
তুষিতে প্রিয়ার মন অবােধ যুবক যেথা ক্ষুরধার নদী
যায় সাতরে,
হাতি-বাঘ-গণ্ডার-সিংহের বাসভূমে নির্ভয়ে ধায় কুহুরাত্রে।
যেখানে ঘাসের বুকে ক্ষুদ্র শিশিরকণা ঝলমল করে ক্ষীণ
রৌদ্রে,
আঁখিতে আঁখিতে প্রেম, প্রকাশের ভাষা আজো
পায় নাই পদ্যে কি গদ্যে।
ঘাসের ফুল
সেই ফুল সেই ভাষা সেই শিশিরের কণা গাঁথিয়া
এনেছি মাের ছন্দে,
কণ্ঠে পরহ মালা কানে-কানে কহ কথা ধরা দিয়ে দুটি
বাহুবন্ধে।
এ-শুধু তােমারি তরে তুমিই বুঝিবে সখি ঘাসের ফুলের
কিবা মূল্য,
সার্থক হবে ফুল নিমিষেরও তরে যদি তুমি হয়ে ওঠ উৎফুল্ল।
[ “পথ চলতে যাদের ফুল” ‘শনিবারের চিঠি'তে প্রকাশিত হইয়াছিল। ]
&
৬২
প্রবাসী প্রেসে, ৯১, আপার সার্কুলার রােড,
কলিকাতা, শ্ৰীসজনীকান্ত দাস কর্তৃক মুদ্রিত,
রঞ্জন প্রকাশালয়ের পক্ষ হইতে
শ্ৰীসজনীকান্ত দাস কর্তৃক প্রকাশিত। রঞ্জন
প্রকাশালয়ে
ডি এম লাইব্রেরী,
কর্ণওয়ালিস ষ্ট্ৰীটে প্রাপ্তব্য।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.