Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah

Pujar Tattya Ed.1

Das, Shashibhushan · 2010/05/3

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পুজার
O, CHITRASYVE HOUR
( সামাজিক উপন্যাস)
LIBRARY
c53
শ্ৰীশশিভূষণ দাস
১ম সংস্করণ সন ১৩৩ পৌষ।
পাঁচ সিকা

প্রকাশক- নগেন্দ্রনাথ দাস। সৎ-সাহিত্য-মন্দির ও দীননাথ মিত্র লেন, বিডন ষ্ট্রীট, কলিকাতা প্রাপ্তিস্থান বরেন্দ্র লাইব্রেরী ২০৪ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা। ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ পুস্তকালয় সমূহ প্রিন্টার নগেন্দ্রনাথ দাস। আদিত্য প্রিন্টিং ওয়ার্ক ও দীননাথ মিত্র লেন, কলিকাতা।

উৎসর্গ ।
নগেন্।
এই
তােমার
আপণ
করিলাম।

No text on this page.

P. O. CHITRASENPUR, HOW A..!
উপহার।
{। ৬.
' IBA
{{; 2
{{{.. :3
মান তর্দৈব মুলাের
विदि कम सुन
হত্ত"
সন-১৪৫৭
অs
s

No text on this page.

নিবেদন। নৈবেদ্য, মাতৃমন্দির প্রভৃতি অনেক পত্রিকায় “পূজার তত্ত্ব” নামক আমার যে ক্ষুদ্র গল্পটা প্রকাশিত হইয়াছিল, অনেকের অনুরােধে সেই গল্পটা বদ্ধিতাকারে এই উপন্যাস রূপে প্রকাশিত হইল। পুস্তকখানির নাম পরিবর্তনের জন্য অনেক অনুরাগী বন্ধু অনুরােধ করিয়াছিলেন কিন্তু বর্তমানে পুস্তকের নামকরণ লেখকের পক্ষে বডই সমস্যার ব্যাপার হইয়া দাড়াইয়াছে। অনেক লেখক একমাসের মধ্যে একখানি বৃহৎ গ্রন্থ অনায়াসে লিখিয়া ফেলিতে পারেন কিন্তু পুস্তকের নামকরণ সময়ে ছয়মাসকাল ভাবিয়া অস্থির হইয়াও পুস্তকের উপযুক্ত নাম খুঁজিয়া বাহির করিতে পারেন না। সন্তানের নামকরণ ব্যাপারে যত বিভ্রাট না ঘটে, ততটা বিভ্রাট লেখকের পক্ষে পুস্তকের নামকরণ লইয়া। যাহা হউক অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়াও যখন আমি মনােমত নামকরণে অক্ষম হইলাম, তখন ইহার নাম পরিবর্তনে অনর্থক মাথা ঘামাইবার কষ্ট স্বীকার না করিয়া পূজার তত্ত্ব নামেই পুস্তক- খানি জন সাধারণের নিকট উপস্থিত করিলাম কানা মেয়ের নাম পদ্মপলাশলােচনা রাখিলেই পিতামাতার তৃপ্তি ঘটে বটে কিন্তু অপরে তাহাতে হাস্য করে মাত্র। বিশেষতঃ বর্তমান যুগে সাহিত্য রথী-মহারথী- গণ উপন্যাসের এমন অদ্ভুত নামকরণ করেন যে পুস্তকের সহিত তাহার বিন্দুমাত্র সামঞ্জস্য থাকে না। আমি নবীন সাহিত্যিক নই, কাজেই বর্তমানের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাইয়া দিতে আমার প্রবৃত্তি হইল না। পূজার তত্ত্বের বিভ্রাট লইয়া এই উপন্যাসের সৃষ্টি, কাজেই সেই নামে পুস্তকের নামকরণ সমীচীন বলিয়া আমি মনে করিলামবন্ধুগণ আমার কটি মার্জনা করিবেন। চাঁপাপুকুর বিনীত ২৪ পরগণা গ্রন্থকার।

X ঐ ১া ঐ ১০ ঐ ১া ১৮ গ্রন্থকারের অন্যান্য পুস্তকাবলী ১। জ্যোতিঃ ( উপন্যাস) ২। মানের পাহাড় ৩। ঋণ পরিশােধ ৪। ভবসুন্দরী ৫। সােণার প্রতিমা ঐ ৬। যুগল মিলন ৭। দিদিমণি ৮। সত্যাগ্রহ সংগ্রাম ঐ ১। স্বদেশী চাবুক ( ১৮ পর্ব ) ১০। বিসর্জন ১১। রেলযাত্রী (গল্প ও উপন্যাস) ১২। সমাজ চিত্র (২০ সংখ্যা) ১৩' মডারেটের মতিভ্রম ( গল্প ) , ( উপন্যাস) ly ১০ ( কাব্য ) My• | ১৪। বন্দী x

" i... :::. 2. "
, {} s;
A
B???
f
3
.......
( ১ )
ছেলের বিয়ের পাওনা কড়ায় গণ্ডায় যােলআনা হিসাব করিয়া লইয়া
পূজার সময় তত্ত্ব হইল না বলিয়া পটলডাঙ্গার রাজারাম ঘােষের পৌত্রবধূ
শ্ৰীমতী হরসুন্দরী রাগে ‘গর গর’ করিতে করিতে বৈবাহিকের পিতৃ
পিতামহের অনেক কুৎসা লােক-সমাজে অম্লানবদনে প্রকাশ করিতে দ্বিধা
বােধ করিল না। বৈবাহিকের প্রপিতামহ যে চামার ছিল এবং তাহার বংশে
যে মুফাসের জন্ম হইয়াছে, সহসা অষ্টমী পূজার দিন বেলা সাড়ে আটটার
সময়ে হরসুন্দরী তাহা ‘গেজেট করিয়া দিল।
পটলডাঙ্গার লােক
সেই অভাবনীয় অশ্রুতপূর্ব অভিনব সংবাদ শ্রবণ করিয়া অবাক হইয়া
রহিল।
শ্ৰীমতী হরসুন্দরী রাজারাম ঘােষের পৌত, বাহরাম ঘােষের পুত্র,
অশীতিবর্ষীয় মান নফরচ ঘােষের তৃতীয় পক্ষের গৃহিণী। বৃদ্ধ বয়সে

পূজার তত্ত্ব কায়স্থ-কুল-তিলক নফরচদ্র আফিঙ্গের পূরামাত্রা চড়াইয়া দিয়া তৃতীয় পক্ষের গৃহিণীর অঞ্চল ধারণ করিয়া বড় জাহাজের গাধাবােটের মত সর্বদা অন্দরমহলে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। হরসুন্দরীর বয়স চল্লিশের অতি সন্নিকটে উপস্থিত হইয়াছিল। বড় মানুষের ঘরের ঘৃত দুগ্ধ ও উপাদেয় খাদ্যের বরাদ্দ বৃদ্ধি করিয়া শ্ৰীমতী তাহার গৌরবর্ণ কলেবর খানির পরিপুষ্টি অতিমাত্রায় বজায় রাখিয়াছিল এবং সেই হৃষ্ট-পুষ্ট কলেবরের সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া অলঙ্কার গড়াইতে দশ বিশ ভরি অধিক স্বর্ণের অপব্যয় হইয়া গিয়াছিল। অন্ধের নয়ন, খঞ্জের যষ্টি, ইহকালের সম্বল, ভবপারের ভেলা হরসুন্দরীকে লইয়া শ্ৰীমান নফরচন্দ্রের শেষ বয়সটা পরম সুখে বিনা গােলযােগে ঝিমাইতে ঝিমাইতে কাটিয়া যাইতেছিল। সহসা অষ্টমীপূজার দিন প্রভাতে যখন হরসুন্দরী বে-আকেল বেহাইএর বেয়াদপির কথা নফর- চন্দ্রের কাণে তুলিয়া ঘুমন্ত গৃহস্থের ঘরে ডাকাত পড়ার মত সহসা ঋষভ নিনাদে চীৎকার করিয়া উঠিল, তখন বেচারা নিতান্ত হতভম্বার মত গৃহিণীর নগ-শােভিত পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় মুখখানার দিকে তাকাইয়া বলিল, তাইত গা! ব্যাপারখানা কি? গৃহিণী বারান্দার উপর পা ছড়াইয়া বসিয়া দুই একবার ফোস ফোস করিয়া যেন হারমনিয়মের ‘বেলাে’ টানিয়া সুর বাহির করিয়া বেহাগ রাগিনীতে আলাপ করিতে লাগিল, ওগাে, আমার প্রকাশ সে দিনের ছেলে-তার কিসের বয়স? সখ করে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলাম, এখন মান-মৰ্য্যাদা সব যে যায় দেখছি? কৰ্ত্তা আলবােলায় তামাক টানিতে টানিতে বলিল, তখনত বলেছিলাম, মৌলিকের ঘরে ছেলের বিয়ে দিয়ােনা। তা এ বুড়াের কথা কেউ নবে না? এখন এ হ’ল কি বলত ?

সেতারে ঝঙ্কার তুলিয়া গৃহিণী বলিল, হ'বে আর কি? ছােটলােক দত্তের ঘরে ছেলের বিয়ে দিয়ে যা হবার তাই হচ্ছে। চামারের বশে মুফরাস জন্মেছে, ব্যবহারটাও সেই রকম করেছে। কর্তা ঝিমাইতে ঝিমাইতে হঠাৎ বলিয়া ফেলিল, বিয়ের সময় পাওনাটা কিন্তু নেহাত মন্দ হয় নি। গরম তেলে কই মাছ ভাজার মত লাফাইয়া উঠিয়া গৃহিণী বলিল, রেখে দাও তােমার বিয়ের পাওনা। তত্ত্ব-তাবাসের পাওনাইত আসল পাওনা—যেমন প্রজার কাছে খাজনার উপর উপরি পাওনা আদায়। গুরুঠাকুরের বার্ষিক বন্ধ করে’ জামাইএর বাড়ী তত্ত্ব পাঠাতে হয়, ঘােটলােক তার খবর রাখে না ? ঠিক সেই সময়ে পােদ্দার বউ, যিনি পটলডাঙ্গা অঞ্চলের রয়টারের টেলিগ্রাম—লােকের ঘরের হাঁড়ির খবর যিনি কটাক্ষমধ্যে সহরময় রাষ্ট্র করিয়া থাকেন, তিনি স্বীয় বিশাল বপু বহন করিয়া মাতঙ্গিনী-গমনে মেদিনী কম্পিত করিয়া সশরীরে ঘােষ-গৃহিণীর সম্মুখে আবির্ভূত হইলেন। ঘােষ-গৃহিণী হরসুন্দরীর মুখখানা তখন ঠিক যেন আগুনে পোড়া ভীমরুলের চাকের মত। পােদ্দার বউকে দেখিয়া হরসুন্দরী পােড়ামুখ নীচু করিয়া রাখিল। পােদ্দার বউ বলিল, দেখে এলাম বােসদের বাড়ী পূজার তত্ত্ব এসেছে। হা—দেখবার মত তত্ত্ব বটে। বিশজন ভারীর কাধে হাজার রকমের জিনিস-ঘরে রাখবার স্থান কুলাচ্ছে না। বােস-গিন্নির বুকের পাটা আজ দেখে কে ? বড় ঘরে কাজ করেছে বটে! আর যাবে কোথায়? ধূনার গন্ধে মনসা-কাণী নাচিয়া উঠিল। একে বােসদের সঙ্গে চিরকালের বিবাদ। তাহার উপরে পূজার তত্ত্বে পূজার ৩ ‘টেকা দিয়া তাহারা আজ মুখ ঝলসাইয়া দিল। গৃহিণ হরসুন্দরী রাগে অগ্নিশর্মা হইয়া চীৎকারে পাড়া মাতাইয়া তুলিল। বােসদের বাড়ীর তত্বের কথা শুনিয়া ঈর্ষায় বুকের মাঝে দাবানল জ্বলিয়া উঠিল। মূতন বেহাইকে সবংশে নিপাত যাইবার আশীর্বাদ করিয়া হরসুন্দরী গােরা সাপের মত গর্জন করিতে লাগিল।

( ২ ) ঘােযেদের আর বােসেদের বাড়ী পাশাপাশি। অপরাহে পাশের বাড়ীর বােস-গিরী ছাদের উপর উঠিয়া ঘােষেদের বাড়ীর ক্ষ্যান্ত চাকরাণীকে ডাকিয়া বলিল, ক্ষ্যান্ত ! ঘােষ-গিয়ী আজ ডুমুরের ফুল হ’ল নাকি--একটাবারও ছাদে উঠলাে না যে! সমস্ত দিন ধরে বেহাইএর বাড়ীর পূজার তত্ত্ব গুছিয়ে ঘরে তুলছে বুঝি ? ক্ষ্যান্ত দাসী ব্যঙ্গ বুঝিলমনে মনে তাহার বড় রাগ হইল কিন্তু তাহার মত ঝি-চাকরাণী বড় ঘরের গিন্নীর মুখের উপর সমান উত্তর দিলে দোষের হইবে ভাবিয়া মনের গরম চাপিয়া রাখিয়া অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া শুনাে কাপড় গােছাইতে লাগিল। সে কোন উত্তর দিল না বটে, কিন্তু অত্যন্ত ক্রোধে তাহার কণ্ঠ হইতে একটা অব্যক্ত বনি বাহির হইল।

পূজার তত্ত্ব বােস-গিন্নী হাসিয়া বলল, কিরে! তত্ত্বের ঢেকুর তুছি নাকি? এবার ক্ষ্যান্ত রাগ সামলাইতে না পারিয়া বােস-গিন্নীর দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিল, পরের বাড়ীর তত্ত্বের ‘পিত্যেশে’ ‘পিত্যেশে সম্বৎসর আমাদের হা করে বসে থাকতে হয় না মা! আমরা রােজই এমনি ঢেকুর তুলে থাকি। বােস-গিন্নীর অন্তরে খোঁচা লাগিল—চাকরাণীর মুখে এমন উত্তর শুনিয়া রুষ্ট হইয়া বােস-গিল্পী বলিল, ক্ষান্তি! আমরাই বুঝি তত্ত্বের আশায় হা করে বসেছিলাম ? ক্ষ্যান্ত বলিল, তা যদি না থাকবেন, তবে এমন ঢাক বাজিয়ে লােক জানাজানি কবৃছেন কেন? আজ কাল ছােটলােকের ঘরেও পূজার সময় তত্ত্ব এসে থাকে। বােস-গিন্নী রােষভরে বলিল, বটে। তাের ছােট মুখে এত বড় কথা! আমরাও কি ঘােটলােকের দলে ? ক্ষ্যান্ত বলিল, কারাে গায়ে ছােট লােক ভদ্রলােকের ‘ছাপ দেওয়া থাকে না। আপনি ভদ্রঘরের গিন্নী—আমি ছােটােক চাকরাণী। আপনি আমার সঙ্গে ঠাট্টা বিদ্রুপ আরম্ভ করে দিয়েছেন, আপনার ভদ্রতা কেমন ? ঠিক সেই সময় রণরঙ্গিণী মূর্তিতে ছাদের উপর দেথা দিল, শ্ৰীমতী হরসুন্দরী। বােসী-গিন্নীর সব কথা তাহার কানে গিয়াছিল—আগুন-ভরা বােমার মত উপরে উঠিয়া আসিয়া হরসুন্দরী গর্জন করিয়া বলিল, বােস-গিন্নি! তােমরা কি ভদ্রলােক ? ঘােষ-গিন্নীকে কোন্দলে পরাজয় করা বােস-গিন্নীর সাধ্যাতীত বেগতিক দেখিয়া পলায়নােদ্যত হইয়া বােস-গিল্পী বলিল, আমর পুজার ভদ্রলােক হ’ব কি করে? আমরা ত চামার কাইএর সঙ্গে কুটুম্বিতে করিনি? ঘােষ-গিল্পী নিজ মুখে নিজের কুটুম্বকে চামার কসাই বলিয়া ঘােষণা করিয়াছে, বােস-গিল্পী সেই কথার খোঁচা দিয়া ছাদ হইতে পলায়ন করিয়া আত্মরক্ষা করিল। হরসুন্দরী নিজের কথায় নিজে ঠকিয়া বেয়াকুবের মত মুখভার করিয়া নীচে নামিয়া গেল। হরসুন্দরী নফরচন্দ্রের কাছে গিয়া গৰ্জন করিয়া বলিল, এমন ছােটলােকের বাড়ীর পাশে তােমার বাপ ঠাকুরদা বাড়ী করে- ছিলেন? কাল বৈশাখী মেঘের গর্জন শুনিয়া নফরচন্দ্র ভীতভাবে বিজড়িত স্বরে বলিল, কেন, হয়েছে কি ? হরসুন্দরী বলিল, হবে আর কি ? বােস-গিন্নী ছােট মুখে বড় কথা শুনিয়ে গেল। এক হতভাগার সঙ্গে কুটুম্বিতা করে বসেছ। পূজার সময় মান রাখলে না, এখন লােকের কাছে মুখনাড়া সইতে হচ্ছে। ইচ্ছা করে, গলায় দড়ি দিয়ে মরি। যথার্থই যদি গিন্নী গলায় একটা ফাসি লাগাইয়া দেহত্যাগ করে, তাহা হইলে নফরচন্দ্রের উপায় ! আশী বছর বয়সে আর ত চতুর্থ-পক্ষের আশা নাই। মহাতীতভাবে নফরচন্দ্র বলিল, বল কি। তুমি গলায় দড়ি দেবে? না-—অমন কৰ্ম্ম করাে না গিন্নি! তাহলে আমি হাফিয়ে মারা যাব। বলিয়াই নফরচন্দ্র হরসুন্দরীর হাত ধরিল। ভজি দেখিয়া হরসুন্দরী সবলে হাত টানিয়া লইয়া বলিল, মরণ আর কি! ধাক্কা খাইয়া নফরচন্দ্র গৃহিণীর পদতলে লুটাইয়া পড়িল ।

পূজার জরা-জীর্ণ বৃদ্ধ নফরচন্দ্রের হাত ধরিয়া তুলিয়া হরসুন্দরী স্বামীর পায়ের ধূলা মাথায় লইল। অমনি বৃদ্ধের মুখে গালপােরা হাসি বাহির হইল। আশীর্বাদ করিয়া বলিল, বেঁচে থাকবেঁচে থাক শক্রর মুখে ছাই দিয়ে তােমার এক শ বছর পরমায়ু হক। ঠিক সেই সময় নফরচন্দ্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র অনুকুল চন্দ্র একখানি পত্রিকা হন্তে লইয়া সেইখানে উপস্থিত হইল।

) হরসুন্দরী জিজ্ঞাসা করিল, কোথার পত্র ? অনুকুল বলিল, মা ? প্রকাশের শ্বাশুড়ীর কঠিন ব্যারাম হয়েছে, জীবনসঙ্কট অবস্থা। সিমলা থেকে পত্র এসেছে। সেইজন্য প্রকাশের শশুর পূজার তত্ত্ব করতে পারেন নি। তিনি লিখেছেন, তত্ত্বের পাওনাটা পরে কড়ায় গণ্ডায় মিটিয়ে দেবেন। বিকৃতকণ্ঠে রুষ্টস্বরে হরসুন্দরী বলিল, ও সব সেয়ানামি কার কাছে ? পূজোর সময় তত্ত্ব পাঠালে না—পরে কি আমার শ্রদ্ধের তত্ত্ব পাঠাবে ? ছােট লােক জানে না, বড় ঘরে কাজ করলে বড় রকম খরচ করতে হয়? বিরক্তভাবে অনুকুল বলিল, হ্যা মা! বিপদে পড়ে তত্ত্বটা করে উঠতে পারেন নি বলে তুমি কুটুম্বকে এত গালিগালাজ করছ? ক্রোধভরে হরসুন্দরী বলিল, কেন গাল দেব না--এক শ বার দেব, সে ঘােটলােক, তার চোদ্দ পুরুষ ঘােটলােক। অনুকুল বলিল, নিজের কুটুষকে নিজে ঘােটলােক বলছ, আর পরের কাছে তারই খোঁটা' খেয়ে মহ। এইমাত্র বােস-গিল্পী তােমাকে কি উত্তরটা দিয়ে গেল, শুনে লজ্জা হ’ল না? ছি!

পূজার তত্ত্ব বেহাইএর বিপদের কথা শুনিয়া কৰ্ত্তা সহানুভূতির স্বরে বলিল, তাইত ! বেহাইএর বড় বিপদ দেখছি ! ছােট খাটো বিপদ নয়- বেহানের অসুখ। যদি তেমন কিছু ঘটে, সর্বনাশ হবে যে ! গৃহশূন্য হওয়া যে কি দায়, তা যে আমি দু’বার ভুগে বুঝতে পেরেছি। আহা! বেহাইএর বড় বিপদ গাে বড় বিপদ! হরসুন্দরী চোখ রাঙ্গাইয়া ধমক দিয়া বলিল, কিসের বিপদ! বাড়ী শুদ্ধ মরে’ উজাড় হয়ে যাক না কেন, তবু তত্ত্বের ভুল হবে? অনুকুল বলিল, বল কি মা! দায়ে পড়ে কি লােকের দোষ ঘাট হয় না ? আমাদের বােন পুটুর ত সে দিন বিয়ে দিয়েছ ? এবার পুজোর সময় কতটা তত্ত্ব করেছ, বলত ? অন্তরে একটা খোঁচা খাইয়া দুই একটা ঢােক গিলিয়া হরসুন্দরী বলিল, যদি না করে থাকি, হয়েছে কি অনুকল বলিল, তারা যদি এমনিভাবে আমাদের গাল দেয় ? পুটু নিকটেই দাঁড়াইয়া ছিল। সে বলিল, না বড়দা ! আমার শ্বশুর তেমন অভদ্র লােক নন্। জ্যৈষ্ঠ মাসে আম কাঠালের তত্ত্ব হয়নি কিন্তু তিনি একটুও গাল-গালাজ করেন নি। আমার শ্বশুড়ীকে বলেছিলেন, বেহান্ আমার মেদিনীপুরের মেয়ে উড়ের দেশের নিকটে বাস, তত্ত্ব-তাবাস কি করে করতে হয়, ভাল করে’ শেখেন নি। ভদ্রতা শিখতে এখনও ঢের দেরী। অনুকুল মৃদুহাস্য করিয়া মুখ নীচু করিল। সে হাসি দেখিয়া হরসুন্দরীর গা আলিয়া উঠিল। রাগে অগ্নি-অবতার হইয়া হরসুন্দরী কন্যাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, গাল দেবে তাদের সাধ্য কি ? জানিস্ , আমার ঘরের মেয়ে নিয়ে তার চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার হয়েছে? আমরা কি ছােটনােক দাস, দত্ত? শুদ্ধ তিনি = মেয়ে। পূজার তত্ত্ব অমনি অনুকুল বলিল, তুমি ত মা ! হাখালির দত্তদের ঘরের তােমাকে ঘরে এনে আমার ঠাকুরদাদার কত পুরুষ উদ্ধার হয়েছে ? পিতার কুলে আঘাত পড়াতে হরসুন্দরীর কণ্ঠস্বর পঞ্চম হইতে কড়িমধ্যমে নামিয়া আসিল। কিন্তু পরক্ষণেই সপ্তমে সুর চড়াইয়া গৃহিণী বলিল, অনু! তােদের ভাগ্য ভাল, তাই হাঁসখালির দত্তদের মাতুল পেয়েছিলি? অনুকুল বলিল, কেন মা! দাস দত্ত হঠাৎ গরম হয়ে উঠলাে কি করে ? হরসুন্দরী বলিল, ওরে তাদের আট ঘাট বাঁধা। কত ঘােস বােস মিত্তির তাদের আস্তাকুড়ে গড়াগড়ি যাচ্ছে। অনুকুল বলিল, বটে! শুনেছি, হাঁসখালির দত্তরা নাকি জেলে পাটনীর বংশ। প্রবাদ বা অপবাদ আছে, হাঁসখালির দত্তদের কোন পূর্বপুরুষ মাছের ব্যবসা করিয়া প্রচুর অর্থ উপার্জন করিয়া বড়লােক হইয়াছিলেন। অনুকুলের মুখের কথা সমাপ্ত হইতে না হইতে হরসুন্দরী উঠিয়া দাঁড়াইয়া বাগেশ্রী আলাপ করিয়া বলিল, পাজি ! নচ্ছার ! তাের ছােট মুখে বড় কথা ? মাথা নীচু করিয়া অনুকুল বলিল, সত্যি কথা বললে, রাগ কর কেন? তােমার পিতৃকুলে এ অপবাদ নাই মা? দুনিয়ায় হরসুন্দরীকে সকলেই ভয় করিয়া চলিত, কেবল এই পেটের ছেলে অনুকুলচন্দ্রই মাঝে মাঝে তাহার উপর দৌরাত্ম্য করিত। পুত্রের ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হইয়া নফরচন্দ্র বলিল, অনুকুল! অপবাদ পূজার তত্ত্ব সত্যই হক, আর মিথ্যাই হক, গর্ভধারিণীর সঙ্গে কথা কাটাকাটি কোন ভদ্র-সন্তানের কবৃতে নাই, তা তুমি জান ? পিতা কষ্ট হইয়াছেন, কাজেই আর কথা বলা উচিত নয় ভাবিয়া অনুকুলচন্দ্র পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিল। হরসুন্দরী অনেকক্ষণ বকাবকি করিল। চীৎকারে যখন গলা ভাঙ্গিয়া গেল, তখন তাহার সুর নরম হইয়া আসিল। হরসুন্দরী শেষে মীমাংসা করিল, বউ বেটা আগে ঘরে আসুক, এর শােধ নিয়ে ছাড়বে। বাধ্য হইয়া কর্তাকেও গৃহিণীর সেই এক তরফা মীমাংসায় গোঁজামিল দিতে হইল।

{ } } :: '৪": ?? . ( ৪ ) প্রকাশচন্দ্রের শ্বশুর হেমবাবু সিমলা পাহাড়ে বড়লাটের আফিসে হােম ডিপার্টমেন্টে চাকরী করেন। গত বৈশাখ মাসে তিনি ছুটী লইয়া কলিকাতায় আসিয়া চারি পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় করিয়া পটলডাঙ্গায় ‘বড়ঘরে আদরের কন্যা শৈবলিনীর বিবাহ দিয়াছেন। কন্যার বিবাহের পর যথাসময়ে সপরিবারে তিনি সিমলায় ফিরিয়া গেলেন। হঠাৎ হেমবাবুর স্ত্রী সুরবালা কঠিন রােগে আক্রান্ত হইল। প্রথমে তাহার বুকে সর্দি লাগে সামান্য বলিয়া অগ্রাহ করিয়া অত্যাচার করিল। রােগ, ঋণ আর আগুন যত সামান্যই হক না কেন, প্রথমে অগ্রাহ্য করিলে পরিনামে ভয়ঙ্কর হইয়া উঠে। অত্যাচারের ফলে সেই সামান্য সর্দি বুক জুড়িয়া বসিল-ফুস ফুস আক্রান্ত হইল। বিজ্ঞ চিকীৎসক বুক পরীক্ষা করিয়া মুখভার করিয়া বলিলেন, যক্ষ্মার লক্ষণ। হেমবাবুর মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল। কন্যার বিবাহে অনেক অর্থ ব্যয় হইয়াছে-সঞ্চিত ধন ফুরাইয়া গিয়াছে—কিছু ঋণও হইয়াছে। পত্নী সুরবালার যে অসুখ, তাহাতে প্রচুর পূজার তত্ত্ব অর্থ ব্যয় প্রয়ােজন। সিমলা পাহাড় স্বাস্থ্যকর স্থান হইলেও ডাক্তারে ব্যবস্থা করিল, আলমােরা কিম্বা কাশ্মীর প্রদেশে রােগীকে সত্বর স্থানান্তরিত করা প্রয়ােজন। হেমবাবু ভাবিয়া অস্থির হইলেন, কি প্রকারে পত্নীকে স্থানান্তরে লইয়া যাইবেন। পরাধীন চাকরী, কন্যার বিবাহে একবার ছুটা লইয়াছেন। আবশ্যক হইলে যদিও পুনরায় দুই এক মাস ছুটী লইতে পারেন কিন্তু সেই অল্প সময়ের মধ্যেই যে তাঁহার পত্নী দুরারােগ্য ব্যাধির হস্ত হইতে নিস্তার লাভ করিতে পারিবে, তাহারই বা স্থিরতা কি? হেমবাবু বড় বিপন্ন হইলেন। পত্নী সুরবালা তাঁহাকে চিন্তিত দেখিয়া বলিল, তুমি ভেব না—আমাকে স্থানান্তরিত করতে হবে । এইখানে ঔষধ খেয়ে ভাল হয়ে যাব। সুরবালার মনের উদ্দেশ্য কি, তিনি বিলক্ষণ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলেন। সুরবালা বুঝিয়াছিল, তাহাকে কাল-রােগে ধরিয়াছে, নিস্তার পাইবার কোন উপায় নাই। তাহার সুচিকীৎসার জন্য ব্যস্ত হইলে স্বামীকে অর্থাভাবে বিপন্ন হইতে হইবে—রােগ সারিতে কিম্বা তাহার মৃত্যু ঘটিতে বিলম্ব হইলে হয়ত তাঁহার চাকরী যাইবার আশঙ্কা উপস্থিত হইবে। শেষে কি স্বামীকে ধনে প্রাণে মজাইয়া পথের ভিখারী করিয়া যাইবে ? তাহাই সুরবালা জেদ করিয়া বসিল, সিমলার পাহাড় ছাড়িয়া সে এক পাও নড়িবে না। হেমবাবু বলিলেন, অন্যায় জেদ কছ কেন সুরবালা? সুরবালা বলিল, অন্যায় নয়, আমি বেশ বুঝতে পেরেছি, আমাকে কালে ধরেছে, আমার অব্যাহতি নাই। তবে অনর্থক অর্থ ব্যয় করে কেন সর্বস্বান্ত হবে ?

REH WAT
পূজার তত্ত্ব
হেমবাবু বলিলেন, যদি তুমি চলে যাও, আমার সর্বস্বান্তের বাকি
কি থাকূবে ?
বরং যতক্ষণ খাস—ততক্ষণ তল্লাস', শ্লেষ্মরােগে কি
লােক বাঁচে না ? ডাক্তার সাহেব বলেছেন, এখনও আশা আছে।
সুরবালা বলিল, ডাক্তার সাহেব তােমাকে যতই ভরসা দিন না
কেন, আমার শরীরের অবস্থা আমি বেশ বুঝতে পারছি, আমার নিস্তার
নাই। তুমি বুক বাঁধ।
সুরবালা যাহাই বলুক, হেমবাবু কিন্তু বুক বাঁধিতে পারিলেন না।
রােগিনীর মনের এ দুর্বলতা তিনি রােগেরই একটা লক্ষণ ভাবিয়া
লইলেন। কাজেই তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইলেন, সুরবালা যতই আপত্তি
করুক না কেন, তাহার সুচিকীৎসার ব্যবস্থা করিতেই হইবে, নতুবা
তাহার কর্তব্য হানি হইবে।
তাহার কতকগুলি পুত্র-কন্যা।
শৈবলিনী তাঁহার জ্যেষ্ঠা কন্যা-
তাহার বয়স চতুর্দশ বর্ষ। সে বিবাহিতা হইয়াছে, দুদিন পরে শ্বশুরালয়ে
চলিয়া যাইবে। যদি সুরবালার কোন অমঙ্গল ঘটে, তিনি নাবালক
পুত্র-কন্যাগণকে লইয়া কি প্রকারে সংসার-যাত্রা নির্বাহ করিবেন ?
সুরবালার সহস্র আপত্তিতে কর্ণপাত না করিয়া তিনি দুই মাসের ছুটীর
দরখাস্ত করিলেন—দুটী মঞ্জুর হইয়া গেল। এক মাসের (বতন পাইয়া
ও ঋণ করিয়া কিছু অর্থ সংগ্রহ করিয়া তিনি ডাক্তারের উপদেশ মত
সপরিবারে আলমােরায় যাত্রা করিলেন।
=
(2 , ' , '{{BE
$ ,, :9
2 :
P,
০,
Chris

( ৫ ) যে আলমােরায় গেলে মরা রােগী বাঁচিয়া যায়, সেই আলমােরা উপস্থিত হইয়া সুরবালার রােগ আরােগ্য হওয়া দূরে থাকুক, অধিকতর বৃদ্ধি পাইল। পূর্বে সুরবালা চলিয়া ফিরিয়া বেড়াইতে পারিত, এখানে আসিয়াই একেবারে শয্যাগত হইল। রােগ উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পাইতে লাগিল, হেমবাবুর আশা ভরসা সব গেল কিন্তু তবুও তিনি হাল ছাড়িয়া দিলেন না। ঝড়ে নৌকা দরিয়ার বুকে ডুবিতে বসিয়াছে, তবুও জোর করিয়া হাল ধরিয়া বসিয়া আছেন, যদি তুফানের বুক ভাঙ্গিয়া একটা ঢেউ আসিয়া তরী কূলে তুলিয়া দিয়া যায়। তিনি মনস্থ করিলেন, আলমােরা ত্যাগ করিয়া কাশ্মীরে যাইতে হইবে। তিনি মনস্থ করিলেন বটে কিন্তু আর অর্থ নাই। সুরবালা বলিল, আর কেন, ঢের হয়েছে। তােমার ছুটাও ফুরিয়ে এসেছে—আমার দিনও নিকট হয়েছে। চল, সিমলায় ফিরে যাই। হেমবাবু তাহাতে কর্ণপাত না করিয়া অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু এই পূজার বন্ধু-বান্ধবহীন অপরিচিত স্থানে অর্থ পাইবেন কোথায়? তিনি চিন্তিত হইলেন। তখনও তিনি আশা করিয়াছিলেন, হয়ত কাশ্মীরে গেলে সুফল ফলিতে পারে। শঙ্কর নামে হেমবাবুর এক বিশ্বস্ত ভৃত্য ছিল। যােত বৎসর পূৰ্বে হেমবাবু যখন প্রথম চাকরী পাইয়া সপরিবারে সিমলার আসিয়াছিলেন, তখন তিনি পথে রেল-ষ্টেশনে এই ভৃত্যটাকে কুড়াইয়া পাইয়াছিলেন। ত্রিসংসারে শঙ্করের ত্রিসংসারে শঙ্করের কেহ ছিল না। রুগ্ন অবস্থায় সে ষ্টেশনে পড়িয়াছিল—লােকের কাছে হাত পাতিয়া ভিক্ষা করিয়া সে দিন কাটাইতেছিল। তাহার দুঃখের কথা শুনিয়া হেমবাবুর স্ত্রী সুরবালার দয়া হইল। তাহাকে সিমলার পাহাড়ে আনিয়া চিকীৎসা করাইতে লােগ ভাল হইয়া গেল। সেই অবধি সে হেমবাবুর পরিবারভুক্ত হইয়া মাসিক দশ টাকা বেতনে তৃত্যের কাৰ্য্য করিতে লাগিল। শঙ্কর পশ্চিম দেশীয় হিন্দুস্থানী-বর্তমানে তাহার বয়স চল্লিশের সে হৃষ্টপুষ্ট ও বলিষ্ট। সুরবালাকে সে মা বলিয়া ডাকিত। সুরবালার পুত্র-কন্যাদের সে কাঁধে পিঠে করিয়া মানুষ করিত। সুরবালাকে আজ মৃত্যুশয্যায় শায়িত দেখিয়া কৃতজ্ঞ প্রভুভক্ত শঙ্করের বুক ফাটিয়া গেল। আলমােয় আসিয়াও যখন সুরবালার রােগের প্রতিকার হইল না, তখন শঙ্কর চোখের জলে বুক ভাসাইতে লাগিল। সুরবালাকে কাশ্মীরে লইয়া যাইবার জন্য যখন হেমবাবু আকুল হইয়া পড়িলেন, কিন্তু অর্থাভাবে সক্ষম হইতেছিলেন না, তখন শঙ্কর ধীরপদে হেমবাবুর সম্মুখে উপস্থিত হইয়া বলিল, কাশ্মীরে গেলে মা আমার ভাল হবেন? উপর। ১৭ হেমবাবু কাতর দৃষ্টিতে শঙ্করের মুখের দিকে তাকাইয়া বলিলেন, শেষ চেষ্টা করে দেখা আমার কর্তব্য কিন্তু আমার যে অর্থ নাই শঙ্কর বস্তুমধ্য হইতে একটা টাকার থলে বাহির করিয়া হেমবাবুর সম্মুখে রাখিয়া বলিল, বাবু। টাকার ভাবনা নাই, আপনি আমার মাকে ভাল করুন। শঙ্কর বালকের মত কাদিয়া ফেলিল। হেমবাবু বিস্মিতভাবে শঙ্করের মুখের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। শঙ্কর পুনরায় বলিল, একদিন আমি মরতে বসেছিলাম, মা আমাকে কত যত্নে সেবা করে বাঁচিয়েছিলেন। আমার এতকালের সঞ্চিত অর্থ আজ আমি মার সেবায় ব্যয় করে ঋণ পরিশােধ করবাে বাবু। হেমবাবুর দুই চক্ষু হইতে দর দর ধারায় অশ্রু ঝরিতে লাগিল। অদূরে রােগ শয্যায় শায়িত সুরবালার চক্ষু হইতেও অশ্রু ঝরিয়া পড়িল। সুরবালা ক্ষীণকণ্ঠে বলিল, শঙ্কর! শঙ্কর! শৈবলিনী নিকটে দাড়াইয়া ছিল—ছুটিয়া গিয়া শঙ্করের হাত ধরিয়া অশ্রুসিক্তনয়নে বলিল, শঙ্কর দা! তুমি যথার্থই আমাদের বড় ভাই। শঙ্কর বলিল, দুনিয়ায় আমার কেউ নাই। তােমরাই আমার যথাসর্বস্ব। আজ যদি মা আমাদের ত্যাগ করে চলে যান, আমরা কোথায় ভেসে যাব দিদি। সুরবালা বলিল, শঙ্কর। অনর্থক অর্থ ব্যয় করে না বাবা। বেশ বুঝতে পারছি, আমি বাঁচবে না। টাকাগুলাে রেখে দাও, তােমার ত একটা পরিণামের চিন্তা আছে ? শঙ্কর বলিল, যদি নাই ৰাঁচ, আমাদের আপশােষ থাকে কেন, একবার শেষ চেষ্টাটা করে দেখা যাক।

পূজার তত্ত্ব অবিলম্বে হেমবাবু আমাের হইতে কাশ্মীর যাত্রা করিলেন। হ্রদের ধারে একটা বাংলাে’ ভাড়া করিয়া বাস করিতে লাগিলেন। স্থানের গুণে প্রথমে রাগিনী অনেকটা উপকার বােধ করিল কিন্তু অল্পদিনের মধ্যে আবার পূর্বের অবস্থা ফিরিয়া আসিল। ব্যয় করিয়া অনেক সেবা-শুশ্রুষা করিয়া কিছুই ফল হইল না। হেমবাবু পরিণাম বুঝিতে পারিলেন। হতাশ হইয়া তিনি সপরিবারে পুনরায় সিমলায় চলিয়া আসিলেন। সুরবালার অবস্থা অত্যন্ত অত্যন্ত শশাচনীয়—হেমবাবু কপর্দক শূন্য হইয়াছেন। ঠিক সেই সময় দুর্গাপূজা উপস্থিত। সহসা তাহার মনে পড়িল, সম্প্রতি শৈবলিনীর বিবাহ হইয়াছে, তাহার শ্বশুরবাড়ী পূজার তত্ত্ব পাঠাইতে হইবে—না পাঠাইলে বড় ঘরের মর্যাদা-হানি হইবে। কিন্তু উপায় কি? প্রতি মুহূর্তে সুরবালার মৃত্যু হইবার সম্ভাবনা, তাহার উপর দারুণ অর্থকষ্ট উপস্থিত হইয়াছে। বিপদে পড়িয়া কৃতজ্ঞ প্রভুভক্ত ভৃত্য শঙ্করের সঞ্চিত অর্থ গ্রহণ করিয়া আত্মরক্ষা করিতে হইতেছে। কাজেই নিতান্ত বিপন্ন অবস্থায় পড়িয়া তিনি ত্রুটি স্বীকার করিয়া পটলডাঙ্গার বৈবাহিককে পত্র প্রদান করিলেন। নিজের বিপদের কথা জানাইয়া পরমাত্মীয়ের কাছে সহানুভূতি পাইলেন না, পটলডাঙ্গার ঘােষেরা একখানা পােষ্টকার্ড লিখিয়া তাহার মঙ্গলমঙ্গলের সংবাদ সইল না। হেমবাবুর মনােকষ্টের অবধি রহিল না।

( ৬ ) কন্যা শৈবলিনী দিবারাত্র মূমুর্ষ, জননীর পার্শ্বে বসিয়া সেবা করিতে লাগিল। ঘােট ঘােট ভাই ভগিনীগুলির মুখের দিকে তাকাইতে আর কেহ নাই। হেমবাৰু পুনরায় চাকরীতে যােগদান করিয়াছেন, কাজেই বালিকা হইলেও শৈবলিনীই তাহাদের একমাত্র অবলম্বন হইয়াছে। শঙ্কর চাকর হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করিয়া সংসারের সব কাজ করিতেছে, ছেলেমেয়েরা দুষ্টামি করিলে তাহাদের চোখ রাঙ্গাইয়া ঠাণ্ডা করিয়া দিতেছে, আবার তাহারা ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদিয়া উঠিলে সস্নেহে তাহাদের বুকে তুলিয়া লইয়া চোখের জলে নিজের বুক ভাসাইতেছে। সুরবালা ক্ষীণকণ্ঠে বলিল, শৈবলিনি। মা আমার, এত অল্প বয়সে তুই এমন সেবা করতেও শিখেছিস? নােগের যাতনা আমি একটুও বুঝতে পারি নে। মা । দেবতার মত স্বামী, তােমার মত কন্যা, শঙ্করের মত ভৃত্য যা আছে, মরণেও তার দুঃখ নাই। কেবল দুঃখ হচ্ছে অই অপগণ্ডগুলাের জন্য। তুমি শশুর ঘরে চলে গেলে কে ওদের মানুষ কবে ? সুরবালার কোটরাগত চক্ষু জলে ভরিয়া গিয়া গওহুল প্লাবিত করিতে লাগিল।

পূজার তত্ত্ব শৈবলিনী নিজের চোখের জল মুছিয়ানীয় বনাঞ্চলে জননীর চোখের জল মুছাইতে লাগিল। ইতিপূর্বে শঙ্কর চাকর বালক বালিকাদের লইয়া পাহাড়ের উপর বেড়াইতে গিয়াছিল। এই সময় সে বাড়ী ফিরিয়া আসিল। একটা বালক তাহার স্কন্ধে, একটা বালিকা তাহার কক্ষে, অপর বালকের হাত ধরিয়া সে ধীরপদে কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করিল। শঙ্কর •িজের অর্থ ব্যয় করিয়া তাহাদের খাবার কিনিয়া দিয়াছিল, তাহারা মনের আনন্দে খাইতেছিল। সে দৃশ্য দেখিয়া সুরবালা অবাক হইয়া রহিল। শৈবলিনী বলিল, শঙ্কর দা! ওরা ত বড় হয়েছে, চলতে পারে। তবে কেন তুমি ওদের ঘাড়ে পিঠে করে বয়ে বেড়াও? শঙ্কর বালক বালিকাদের নামাইয়া দিয়া বলিল, তােদর ঘাড়ে পিঠে করে বয়ে বেড়াবার জন্যই যে ভগবান আমাকে সংসাকে পাঠিয়েছেন। তুই ভুলে গেলি দিদি ! আমার কাঁধে পিঠে চড়ে ত তুই এত বড়টা হয়েছিস। শৈবলিনীর লজ্জা হইল। সে পিতামাতার প্রথম সন্তান শঙ্কর চাকর তাহাকে যত কোলে পিঠে করিয়াছে, আর কাহাকেও তত করে নাই। অপর ভাই ভগিনীগুলি যদি সে অধিকার পায়, তাহার ত ঈর্ষা করা উচিত নয়। কিন্তু শৈবলিনী ঈর্ষাভরে কথাগুলি বলে নাই। শঙ্করের ত্যাগ ও কর্তব্যপরায়ণতায় শৈবলিনীর হৃদয় তাহার উপর প্রায় ভরিয়া গিয়াছে। শঙ্করকে সে আজ সামান্য ভৃত্য মনে করিতে পারে না—সে যেন তাহাদের পরমাত্মীয়। শৈবলিনী বলিল, শঙ্কর দা। মার অসুখ—আমি দিনরাত্রি মার সেবা করছি। সংসারের সব কাজ এখন তােমাকে করতে হয়।

তুমি দাদা! অবসর মত একটু আধটু বিশ্রাম করাে, নয়ত শরীর ভাল থাকবে কেন ? শঙ্কর বলিল, বড় দরদী বােন্ হয়েছি যে! আমার ঘােট ঘােট ভাই বােন্গুলাের যদি কষ্ট হ’ল, তবে আমার শরীর ভাল থেকেই বা লাভ কি? শৈবি। তােকে কোন চিন্তা করতে হবে না, আমি ওদের নিয়ে বেশ আছ। যথার্থই শঙ্কর ছেলেমেয়েদের ভালবাসিত—তাহাদের যত্ন করিত কিন্তু তাহার একটা দোষ ছিল, সে তাহাদের দুষ্টামি আদৌ বরদাস্ত করিতে পারিত না। যখনই তাহারা দুরন্তপণ করিত, শঙ্কর চোখ রাঙ্গাইয়া তাহাদের পেটের পিলে চমকাইয়া দিত অথবা গণ্ডে এমন চপেটাঘাত বসাইয়া দিত যে পাঁচ মিনিট কাল হা করিয়া তাহারা চীৎকার ছাড়িয়া কাদিত। পরক্ষণে শঙ্কর নিজেই সন্দেশ রসগােল্লা কিনিয়া আনিয়া আবার তাহাদের হা বুজাইয়া দিত। সুখে দুঃখে এইভাবে কিছুদিন কাটিয়া গেল। তাহার পর, একদিন সুরবালা পুত্র-কন্যাগণকে অকালে মাতৃহীন করিয়া স্বামীকে অনন্ত শােকসাগরে ডুবাইয়া শঙ্কর চাকরের বুক ভাঙ্গিয়া দিয়া পরলােকে প্রস্থান করিল। হেমবাবু কাদিয়া আকুল হইলেন-- শৈবলিনী পাগলিনীর মত হইল—আর শঙ্কর চাকর ঘােট ছেলে মেয়েদের বুকের মধ্যে চাপিয়া রাখিয়া বালকের মত রােদন করিতে লাগিল। অবিলম্বে বন্ধু বান্ধবেরা আসিয়া মৃতদেহ সৎকারের জ® শশানে লইয়া গেল। পাহাড়ের উপর ক্ষুদ্র ঝরণার ধারে চিতা এলিয়া উঠিল। শঙ্কর চাকর ছেলেমেয়েদের বুকে করিয়া দুরে বসিয়া সেই পূজার তত্ত্ব চিতার পানে একদৃষ্টে তাকাইয়া রহিল। সে মনে মনে ভাবিতে লাগিল, মার সােনার অঙ্গ এমনি করে চিতার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। মা আমার কোন্ স্বর্গরাজ্যে চলে গেল। পড়ে র’ণ, মার এত সাধের সাজানাে সংসার। সে সংসারও যে আজ শান হয়ে যায়! মাগাে। সােনার রথে উঠে স্বর্গরাজ্যে চলে যাচ্ছ, একবার আমাদের দিকে ফিরে চাও। ক্রমে চিতা নিভিয়া গেল। শঙ্কর ঝরণার জলে ছেলে মেয়েদের স্নান করাইয়া তাহাদের কোলে পিঠে লইয়া ঘরে ফিরিয়া গেল। শৈবলিনী তখন ধূলায় গড়াগড়ি দিয়া কাঁদিয়া আকুল হইতেছিল। হেমবাৰু তাহার পার্শ্বে বসিয়া সান্ত্বনা প্রদান করিতে গিয়া নিজেই চোখের জলে বুক ভাসাইতে ছিলেন।

( ৭ ) পীর শ্রাদ্ধ শান্তির জন্য পুনরায় কিছুদিনের ছুটী লইয়া হেমবাবু সপরিবারে কলিকাতায় আসিলেন। ভবানীপুরে তাহার পৈতৃক বাস-ভবন ছিল। তাহার আত্মীয় স্বজনগণ চারিদিক হইতে ছুটিয়া আসিয়া সহানুভূতি দেখাইল-অনেক আহা উহু করিল, কেবল আসিল না, পটলডাঙ্গার বড় ঘরের পরমাত্মীয় ঘােষেরা। একদিন হেমবাবু নিজে তাহাদের দ্বার হইলেন, তাঁহার ত্রুটির জন্য বৈহিকের হাত ধরিয়া ক্ষমা চাহিলেন কিন্তু তবুও বড় ঘরের মনের গরম মিটিল না। শ্রদ্ধের সময় নিমন্ত্রণ হইল কিন্তু সে নিমন্ত্রণ রাজারাম ঘােষের পৌত্রবধূ হরসুন্দরীর গ্রাহ হইল নাঘােষ পরিবারের একটা প্রাণীও নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে গেল না। একে পত্নীলােকে হেমবাবু কাতর হইয়াছেন, পটলডাঙ্গার ঘােষদের দুর্ব্যবহারে তিনি আরও মর্মাহত হইলেন। এতে তিনি পুনরায় কর্মস্থলে যাইতে উদ্যোগী হইলেন। সেই সময় পটলভাঙ্গার ঘােযেদের বাটী হইতে সংবাদ আসিল, তাঁহার কন্যাকে ২

শ্বশুরালয়ে পাঠাইতে হইবে। হেমবাবুর ইচ্ছা ছিল, শৈবলিনীকে
পুনরায় সঙ্গে লইয়া সিমলায় যাইবেন।
সংসারে আর কোন বয়
খ্রীলােক নাই—চারিদিকে বিশৃঙ্খলা। শৈবলিনী এখন তাহার
ছেলে মেয়েদের একমাত্র অবলম্বন হইয়াছে—তঁাহার দুই বছরের
শিশু পুত্রটা শৈবলিনীর গলার হার হইয়া পড়িয়াছে। শৈবলিনী
কিছুদিন তাহার সঙ্গে থাকিলে অনেক সুবিধা হইবে, এই ভাবিয়া
কন্যাকে শ্বশুরালয়ে পাঠাইতে প্রথমে আপত্তি করিলেন। অমনি
পটলডাঙ্গার অঞ্চল হইতে জোর ওলপ আসিল, পাঠাইবে কি না,
স্পষ্ট জানাইবে ।
হেমবাবুর হৃদয়ে বিদ্রোহের আগুন জ্বলিয়া উঠিল—তিনিও
যেন চোখ রাঙ্গাইয়া উত্তর দিতে প্রস্তুত হইলেন, যদি না পাঠাই।
কিন্তু পরক্ষণেই তিনি আত্মসংবরণ করিলেন।
পরের ঘরে দিয়াছেন, তখন আর ত তাহার উপর কোন দাবী
দাওয়া চলিতে পারে না। তিনি বুঝিয়াছেন, পটলভাঙ্গার
পরমাত্মীয়দের যেমন প্রবৃত্তি, তাহাতে তাহারা হয়ত কেলেঙ্কারী
ঘটাইতে পারে। এমন কি, হয়ত তাহাদের পুত্রের বিবাহ অন্য স্থানে
দিয়া বসিতে পারে। কাজেই কন্যার কল্যাণ কামনায় তিনি আর
দ্বিরুক্তি করিলেন না। কন্যাকে শ্বশুরালয়ে পাঠাইয়া দিবার ব্যবস্থা
করিলেন।
শৈবলিনী বসন ভূষণ পরিধান করিয়া কাঁদিয়া আকুল হইতে
লাগিল-ঘােট ঘােট ভাই বােন্গুলি তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া
কঁদিতে আরম্ভ করিল—সর্ব কনিষ্ঠ শিশু ভাইটা তাহার কোলে
উঠিয়া গলা জড়াইয়া ধরিল। শৈবলিনীর বুক ভাঙ্গিয়া যাইবার
কন্যাকে যখন
২৫

উপক্ৰম করিল। শিশুর মুখচুম্বন করিয়া তাহাকে নামাইতে গেল, সে কিছুতেই নামিতে চাহে না, তাহার বক্ষে মুখ লুকাইয়া দিদি ‘দিদি' বলিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিতে লাগিল। নিকটে দাঁড়াইয়া হেমবাবু সে দৃশ্য চোখে দেখিলেন, বুকে যেন কামানের গােলার আঘাত লাগিল। তিনি হাত বাড়াইয়া শিশুকে কোলে লইতে গেলেন—সে কোলে আসিল না, জোরে দিদির গলা জড়াইয়া ধরিল। তখন নিতান্ত নিষ্ঠুরের মত তিনি সবলে শিশুর হাত ধরিয়া টানিয়া জোর করিয়া তাহাকে ছাড়াইয়া লইলেন। শিশু উচ্চ চিৎকার করিয়া দিয়া উঠিল, পিতার বুকের উপর আছাড়ি পিছাড়ি করিতে লাগিল। শৈবলিনী বুক বাঁধিয়া পিতার চরণে প্রণাম করিয়া জুতপদে কক্ষ ত্যাগ করিল। শৈবলিনী বুদ্ধিমতী বালিকা। সম্প্রতি মাতৃহীনা হইয়াছে, আজ তাহার বড় আদরের ভাই ভগিনীগুলি ত্যাগ করিয়া শ্বশুরালয়ে চলিয়াছে। বালিকার ক্ষুদ্র হৃদয়খানি যেন একটা প্রবল ভূমিকম্পে ভাঙ্গিয়া যাইবার উপক্রম করিল। মেহময়ী স্বর্গীয়া জননীর মুখখানি মনে পড়িল--পিতার বিষন্ন মুখ ছল ছল দৃষ্টির উপর লক্ষ্য হইল- শঙ্কর দাদা বাঁশের লাঠি হাতে লইয়া মাথা নীচু করিয়া অত্যাগ করিতেছে, তাহাও তাহার নয়নগােচর হইল। শৈবলিনীর সূত্র হৃদয় আর কত সহ করিতে পারে? সে রােদমান ভাই ভগিনী- গুলির মুখচুম্বন করিল। তাহার পর, শৈবলিনী একটা সুদীর্ঘ নিখাস ত্যাগ করিয়া—আত্মীয় স্বজনগণকে পশ্চাতে রাখিয়া- রমণী জীবনের চির দাসত্বের বােঝা মাথায় করিয়া চক্ষু মুছিতে মুছিতে অশ্বনে গিয়া আনােহন করিল। শশুরবাড়ীর ক্যান্ত চাকরাণীও গাড়ীতে উঠিল। হেমবাবুর আদেশে শঙ্কর চাকরও কোচবাক্সে কোচমানের পাশে গিয়া বসিল। শৈবলিনী গাড়ীর জানালা খুলিয়া আর একবার পশ্চাতে চাহিল। সে দেখিল, তাহার পিতা শিশু পুত্রকে বুকে জড়াইয়া প্রস্তরমূর্তির মত অচলভাবে দ্বিতলের বারাণ্ডায় দাড়াইয়া আছেন—শিশু দিদি দিদি বলিয়া কাঁদিয়া আকুল হইতেছে। অন্য ভাই বােগুলি রেলিং জড়াইয়া ধরিয়া গাড়ীর দিকে চাহিয়া আছে—চোখের জলে তাহাদের বুক ভাসিয়া যাইতেছে। শৈবলিনী সে দৃশ্য আর সহ্য করিতে পারিল না। ধৈৰ্য্যহীন হইয়া সে নিজেই উচ্চকণ্ঠে বলিল, শঙ্কর দাদা! দেরী করছ কেন, গাড়ী হাঁকাও। গাড়ী দুটি-বিষাদের ভরা বুকে পূরিয়া শৈবলিনী শ্বশুরালয়ে চলিয়া গেল। অমনি হেমবার শিশুকে বুকে করিয়া হােট ছেলে মেয়েদের লইয়া শয্যার উপর গিয়া আছাড় খাইয়া পড়িলেন। আজ তিনি ভালরূপ বুঝিতে পারিলেন, একমাত্র সুরবালার অভাবে এ সংসার তাহার পক্ষে অন্ধকারময় হইয়াছে।

( ৮ ভবানীপুর হইতে অশ্বনে উঠিয়া শৈবলিনী পটলডাঙ্গায় উপস্থিত হইল। গাড়ী শ্বশুরালয়ের অন্তঃপুরের পার্শ্বে ফটকের নিকট দাড়াইল। ক্ষ্যান্ত দাসী প্রথমে গাড়ী হইতে নামিল, তাহার পর, শৈবলিনীকে হাত ধরিয়া নামাইল। শঙ্কর চাকর কোচবাক্স হইতে নামিল। সে শৈবলিনীকে শ্বশুরালয়ে রাখিয়া যাইবার জন্য সঙ্গে আসিয়াছিল। তাহার কাৰ্য শেষ হইয়া গেল। এইবার তাহাকে বিদায় গ্রহণ করিতে হইবে। বাঁশের লাঠি হাতে লইয়া ধীরপদে সে শৈবলিনীর সম্মুখে গিয়া দাড়াইল। তাহার চক্ষু জলে ভরিয়া আসিল। কোমল কণ্ঠে কাতর ঘরে শঙ্কর বলিল, দিদিমণি ! বাড়ী যাই ? শৈবলিনী অবগুণ্ঠন অল্প অপসারিত করিয়া শঙ্করের মুখের দিকে তাকাইল। তাহার পর, একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল, দাদা - শৈবলিনীর কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হইয়া গেল—চক্ষু হইতে অশ্রু ঝরিয়া পড়িল—সে মাথা নীচু করিল।

শঙ্কর শৈবলিনীর অতি নিকটে আসিয়া মূখ নীচু করিয়া তাহার
মুখের দিকে তাকাইয়া অত্যন্ত মেহসূচক বাক্যে বলিল, কি বলতে
চাও, বল দিদি?
শৈবলিনী মুখ তুলিয়া বলিল, আমার বাবাকে যত্ন করো দাদা!
শঙ্কর বলিল, করবাে।
শৈবলিনী বলিল, আমার ভাই বােনদের মেলােনা দাদা!
শঙ্কর বলিল, না দিদি। আর তাদের মাব না-একটা
রূঢ় বাক্যও আর তাদের বলবাে না।
শৈবলিনী বলিল, তারা বড় অভাগা। তাদের ভালবেসাে দাদা?
“ভালবাসবাে।
শঙ্করের মুখে আশ্বাসের বাণী পাইয়া শৈবলিনী যেন কতকটা
স্বস্তি অনুভব করিল। সে বলিল, মাঝে মাঝে আমার সংবাদ
নিয়ে দাদা!
শঙ্কর বলিল, নেব।
তবে আমি দিদি
মাথা নীচু করিয়া মৃদুস্বরে শৈবলিনী বলিল, এস। বলিয়াই
সে অন্তঃপুরের পথে একপদ অগ্রসর হইল—শঙ্করও কয়েকপদ চলিয়া
গিয়া আবার দাড়াইল—আবার শৈবলিনীকে দেখিবার জন্য অন্তঃপুরের
পথে আকুল দৃষ্টিতে তাকাইল। সে দেখিল, শৈবলিনী তাহার দিকে
তাকাইয়া দাড়াইয়া আছে।
শঙ্কর আবার বলিল, তবে আমি দিদি ?
শৈবলিনী বলিল, এস দাদা।
শঙ্কর আবার কয়েক পদ চলিয়া গেল—আবার পশ্চাতে চাহিল।
তখনও দেখিল, শৈবলিনী ঠিক সেইখানে সেইভাবে দাড়াইয়া তাহার
?
২১

দিকে চাহিয়া আছে। দূর হইতে শঙ্কর উচ্চকণ্ঠে পুনরায় বলিল, তবে আমি দিদি ? শৈবলিনী কথা কহিল না-শুদ্ধ ঘাড় নাড়াইয়া জানাইল, এস। শঙ্কর অনেক দূরে চলিয়া গেল—শৈবলিনীও একপদ একপদ করিয়া অন্তঃপুরের দিকে চলিল। শঙ্কর আবার দাড়াইল-পশ্চাতে ফিরিল-দেখিল, শৈবলিনী মুখ বাড়াইয়া তাহার দিকে তাকাইয়া আছে-তাহার দুই চক্ষু হইতে দর দর ধারায় অশ্রু ঝরিয়া পড়িতেছে। অতিদূরে দাড়াইয়া উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করিয়া শঙ্কর বলিল, দিদি। আসি তবে? সে কি কাতর কণ্ঠধ্বনি! সে কি বুকভাঙ্গা বিদায়ের বাণী যেন গভীর বিষাদভরা বেহাগের বাঁশী বাজিয়া উঠিল-কাপিয়া কাপিয়া সে কণ্ঠধ্বনি শৈবলিনীর ক্ষুদ্র বুকে প্রবল আঘাত করিল। শৈবলিনী দূর হইতেই মাথা নাড়িয়া জানাইল, এস। শঙ্কর গলিপথ ঘুরিয়া দৃষ্টির বাহিরে চলিয়া গেল। আর সে পশ্চাতে ফিরিয়া চাহিল না। বাঁশের লাঠি কাঁধের উপর ফেলিয়া সে হন্ হন্ করিয়া চলিতে লাগিল, অনেকদুর গেল। বড় রাস্তায় উঠিয়াই সে স্থির হইয়া দাঁড়াইল। আর যেন তাহার চরণ চলিতে চাহে না। কি যেন এক অমূল্য পদার্থ সে পশ্চাতে ফেলিয়া আসিয়াছে—ফিরিয়া গিয়া আবার যেন তাহা বুকে তুলিয়া লইতে ইচ্ছা করিতেছে। দিদির মুখখানা আবার একবার দেখিতে সাধ হইয়াছে। কিন্তু সে আর ফিরিল না-রাস্তার ধারে বারাণ্ডার উপর সে বসিয়া পড়িল। এক পয়সার কাবুলী মটর ভাজা কিনিয়া খাইতে গেল-মূখে যেন বিস্বাদ ঠেকিল। কাগজের ঠোঙ্গা দূর

পূজার
করিয়া ফেলিয়া দিল। একটা কুকুর ছুটিয়া আসিয়া ঠোঙ্গাটা দুই
একবার তাকিয়া সেও বােধ হয় বিস্বাদ মনে করিয়া চলিয়া গেল।
শঙ্কর বসিয়া বসিয়া মনে মনে বলিতে লাগিল, দিদি ! কত
যত্নে তােমাকে মানুষ করেছি, না খেয়ে তােমাকে খাওয়ায়েছি,
আজ তােমাকে ঠাকুর বিসর্জনের মত পরের হাতে সমর্পণ করে’
চলে যেতে হ’ল। তােমাকে না দেখে কি করে যে আমি বেঁচে
থাকবাে, ঠিক করে উঠতে পারছি নে। হতভাগা আমি—সংসারে
আমার কেউ নাই। তােমার পিতামাতা এ পথের জঞ্জালটাকে
কুড়িয়ে এনে গলগ্রহ করেছিলেন—আমিও এ যাবৎ তােমাদের
গলার হার করে’ পরম সুখে ছিলাম। কিন্তু আমার কপাল পােড়া-
মা ফাঁকি 'দয়ে চলে গেলেন—তুমিও পরের ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিলে ।
কার মুখের দিকে চেয়ে আমি বাঁচবাে? দিদি। তােমাকে যে
আমি কত ভালবাসি, কি করে তা জানাবো ?
হতভাগা শঙ্করের দুই চক্ষু হইতে দর দর ধারায় অশ্রু ঝরিতে
লাগিল। সে অনেকক্ষণ সেইখানে বসিয়া দিল। তাহার পর,
আস্তে আস্তে উঠিয়া বাঁশের লাঠি কাধে লইয়া ভবানীপুরের দিকে
হাঁটিয়া চলিল।

( ১ ) বিবাহের পর শৈবলিনী আর কখনও শ্বশুরালয়ে আসে নাই- এই তাহার দ্বিরাগমন। ক্ষ্যান্ত দাসী শৈবলিনীকে অন্তঃপুরে লইয়া গেল। অন্য কোন পরিজন আসিয়া আদর করিয়া শৈবলিনীর সহিত একটা কথাও কহিল না-তাহার মুখের দিকে কেহ ফিরিয়াও চাহিল না। শৈবলিনী দ্বিতলে একটা প্রকোষ্ঠের সম্মুখে অবগুণ্ঠনবতী হইয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। ঘােষ-গৃহিনী হরসুন্দরী প্রথমে দেখিয়া লইল, দ্বিরাগমনে শৈবলিনীর সঙ্গে কি কি জিনিস-পত্ৰ আসিয়াছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হেমবার অধিক কিছু দিতে পারেন নাই। কেননা, পত্নীর শ্রাদ্ধে অনেক অর্থ ব্যয় হইয়া গিয়াছে-বর্তমানে তাহার যথেষ্ট হাতখালি হইয়াছে। সুতরাং দুই দুইবার হেমবাবুর বিশেষ জুটি হইয়া গেল। প্রথমে পূজার তত্ত্ব হইল না, শেষে দ্বিরাগমনে ঘােষ বংশের মান গােছানো হইল না, হনুমীর আপাদমস্তক কালিয়া উঠিল।

পূজার তত্ত্ব অনতিবিলম্বে প্রবল প্রতাপশালিনী ঘােষ-গৃহিণী কড়া হুকুম জারি করিয়া বসিলেন, বাড়ীশুদ্ধ কোন লােক মূতন বউএর সঙ্গে আলাপ করিতে পারিবে না। খােদ ব্রিটিশ গবর্ণমেন্টের আইন অমান্য করা যাইতে পারে—শাস্ত্রের বিধানগুলিও অগ্রাহ হইতে পারে, কিন্তু ঘােষ- পরিবারে কাহারও সাধ্য নাই, হরসুন্দরীর আদেশের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করিতে সাহস করে। সুতরাং মূতন বউএর উপর এই কঠোর শাস্তির এক তরফা রায় বহাল হইয়া গেল, তাহার বিরুদ্ধে কোন আপীল আদালত হইল না, মুখে একটা বিরক্তিভাব প্রকাশ করিতে কাহারও সাহসে কুলাইল না। কক্ষের সম্মুখে শৈবলিনী অনেক্ষণ একাকী দাঁড়াইয়া রহিল- কেহ তাহার কাছে আসিল না-বাক্যালাপ পৰ্য্যন্ত করিল না। ক্রমে সন্ধ্যা হইয়া আসিল। বাধ্য হইয়া বালিকা ধীরপদে প্রকোষ্ঠ-মধ্যে প্রবেশ করিল। কক্ষ-মধ্যে একখানি পালঙ্ক ছিল, সে তাহার একপার্শ্বে গিয়া বসিল। বালিকার বিষাদ-পূৰ্ণ ক্ষুদ্ৰ বুকখানার উপর ফোটা ফোটা চোখের জল পড়িতেছিল। সুন্দর মুখখানি বর্ষাবিধৌত পদ্মফুলের ন্যায় অশ্রুসিক্ত হইয়াছিল। বালিকার প্রাণ মাঝে মাঝে ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিয়া উঠিতেছিল। কিন্তু হায়! কেহই বালিকার দুঃখ বুঝিল না—কেহই একটা সুমিষ্ট সান্ত্বনা-বাক্য বলিল না—মুখের কথাটী পৰ্যন্ত কেহ কহিল না। বালিকা মনে মনে ভাবিতেছিল, কেন ইহারা আমার উপর এমন ব্যবহার করিতেছে—আমার অপরাধ কি ? তাহাকে তাহার অপরাধের গুরুত্ব বুঝাইয়া দিবে? বালিকা নীরবে অত্যাগ করিতে লাগিল। ক্ষণকাল পরে একজন দাসী কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করিয়া ঘরে আলাে কিন্তু হায় !

পূজার তত্ব জালিয়া দিল। শৈবলিনী কাতরদৃষ্টিতে তাহার মুখের দিকে তাকাইল দাসীটিও কেমন বিষন্নবদনে বালিকার পরম সুন্দর মুখখানার দিকে তাকাইয়া রহিল। কিন্তু যেইমাত্র শৈবলিনী মুখ ফুটিয়া তাহার সহিত কথা কহিতে গেল, অমনি সে দ্রুতপদে কক্ষত্যাগ করিয়া চলিয়া গেল। মুখের কথা মুখেই রহিয়া গেল—শৈবলিনী একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিল। বালিকা ভাবিল, দাসীটা পর্যন্ত কথা কচ্ছে না কেন? ক্ষ্যান্ত দাসী আমাকে টেনে-কত বার আমার বাপের বাড়ী সে গেছে। আজ আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার কেন করছে ? বালিকা অবাক হইয়া রহিল। কেহই কথা কহিল না-আদর-যত্ন করিল না বটে কিন্তু শৈবলিনী মনে মনে চিন্তা করিল, একজন আছেন, তিনি নিশ্চয় কথা কহিবেন- আদর-যত্ন করিবেন। তিনি ত আমাকে পায়ে ঠেলিতে পারিবেন না। কিন্তু কোথায় তিনি--কখন তাঁহার সঙ্গে সাক্ষাৎ হইবে ? হায় । অভাগিনী বালিকা সেই একজনের আশায় বুক বাঁধিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল-নব জলধরের আশায় যেন তৃষ্ণার্ত চাতকিনী উৰ্দ্ধমুখে চাহিয়া থাকিল। ক্রমে রাত্রি নয়টা বাজিয়া গেল। একজন দাসী আসিয়া কক্ষতলে একখানি আসন পাতিয়া এক গ্লাস জল রাখিয়া চলিয়া গেল। পরক্ষণেই পাচক ব্রাহ্মণ অব্যঞ্জন-পূর্ণ থালা রাখিয়া নিঃশব্দে প্রস্থান করিল । শৈবলিনী ভাবিল, এ আহারের আমােজন নিশ্চয় তাহার স্বামীর জন্য । এখনই তাহার স্বামী কক্ষ-মধ্যে আসিবেন—তাহাকে আদর করিয়া বক্ষে ধারণ করিবেন। লজ্জায় হর্ষে জড়-সড় হইয়া অভাগিনী স্বামীর আগমন প্রতীক্ষা করিতে লাগিল।

পূজার তত্ত্ব মনে রাত্রি দশটা বাজিয়া গেল, অন্নব্যঞ্জন ঠাণ্ডা হইতে চলিল কিন্তু কেহই কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করিল না। শৈবলিনী ভাবিল, ব্যাপার কি? এখনও তিনি আসিতেছেন না কেন ? পােড়াকপাল আমার—তিনিও কি আমার উপর বিরূপ হইলেন? তিনি ত তেমন প্রকৃতির লােক নহেন। মনে পড়িল, বিবাহের রাত্রিতে বাসর ঘরের কথা। তিনি তাহাকে কত আদর করিয়া বক্ষে ধারণ করিয়া মুখচুম্বন করিয়াছিলেন । পড়িল, ফুলশয্যার রাত্রির কথা, যে দিন তিনি তাহাকে আদরিণী—-চির জীবনের প্রিয় সঙ্গিনী বলিয়া সম্বােধন করিয়াছিলেন—কত ভালবাসার কথা বলিয়া তাহার অতি ক্ষুদ্র হৃদয়ে স্বর্গরাজ্যের পবিত্র আশার আলো জালিয়া দিয়াছিলেন এবং অভাগিনী এ যাবৎ সেই সুখের স্বপ্নে বিভােব হইয়াছিল। এই অল্পদিনের মধ্যেই তিনি কি এত নিষ্ঠুর হইতে পারিয়া- ছেন, যে তাহাকে একেবারে ভুলিয়া গিয়াছেন? শৈবলিনার চক্ষে জল আসিল—সে উপাধানে মুখ লুকাইয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কঁদিতে লাগিল। সহসা কক্ষের বাহিরে হরসুন্দরী চীৎকার করিয়া বলিল, ও ক্ষ্যান্ত । মূতন বউটাকে বামুনঠাকুর ঘরে ভাত দিয়ে এসেছে ত? শৈবলিনী চমকিত হইয়া উঠিয়া বসিল। সে ভাবিল, ও হরি। এ অন্নব্যঞ্জন যে আমার জন্য রেখে গেছে! কেন, আমি ঘরের বউ- রান্নাঘরে যাব, আমার জন্য এ ব্যবস্থা কেন হ’ল ? কক্ষের বাহিরে পুনরায় গৃহিণীর কণ্ঠবীণায় ঝঙ্কার উঠিল, রাগ করিনে তােরা। ঘােটলােকের মেয়ে হলেও দুটী খাবে পরবে ত? ওর বাবা শুনেছি, চামার। তা চামারের মেয়ের কি ক্ষিদে তেষ্টা নেই ? সরলমতি বালিকা ভাবিল, কি আশ্চর্য! আমি ত কায়স্থের কন্যা আমার পিতা চামার হলেন কি করে? ৫

পূজার তত্ত্ব
অভাগিনী জানে না, অর্থের অভাবে আজ কত পিতাকে চামার
কসাই পৰ্য্যায়ভুক্ত হইতে হইয়াছে—কন্যাদায়ে যথাসর্বস্ব খােয়াইয়াও
নিস্তার পাইতেছে না, তাহার উর্দ্ধতন পুরুষকেও পরলােকে বসিয়া
কুৎসিত নিন্দা শ্রবণ করিতে হইতেছে—বার্ষিক শ্রাদ্ধে বংশধরের হস্তে
জলপিণ্ডদানের ব্যবস্থা হইবার পূর্বে কুটুম্বের প্রদত্ত অখাদ্যে তাহাদের
উদর পূর্ণ হইয়া যাইতেছে।
শৈবলিনী আকাশ পাতাল ভাবিতে লাগিল। ভাবিতে ভাবিতে
তাহার চক্ষে জল আসিল-বালিকা শয্যার উপর শুইয়া পড়িল। অচিরে
নিদ্ৰা আসিয়া তাহার সকল জলার অবসান করিয়া দিল।

( ১০ ) দুই চারিদিন কাটিয়া গেল—শৈবলিনী সেই নির্জন কক্ষে নীরবে কাল কাটাইতে লাগিল। পাষাণ-হৃদয় শ্বাশুড়ী একটা নিরীহ বালিকার উপর এ প্রকার কঠোর শাস্তি বিধান করিল। বালিকার প্রাণ হাফাইয়া উঠিতে লাগিল। সে আর সহ্য করিতে পারে না। একজন দাসী যদি তাহার কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করে, শৈবলিনী ছুটিয়া তাহার কাছে যায়— কাতরভাবে তাহার মুখের দিকে তাকায়। সে করুণ দৃশ্যে দাসীরও বুক ফাটিয়া যায় বটে কিন্তু মুখ ফুটিয়া তাহার সহিত কোন কথা বলিতে পারে না, কেন না, গৃহিণী যদি জানিতে পারে, বাঘের মত লাফাইয়া তাহার ঘাড়ের উপর পড়িবে—তাহাকে ছিড়িয়া খাইবে। কাজেই দাসী শৈবলিনীর সহিত বাক্যালাপ না করিয়া পলায়ন করে। শৈবলিনী হতাশ হইয়া শয্যার উপর গিয়া বসিয়া পড়ে। গৃহিণীর কন্যার নাম উষারাণী, ডাক নাম পুটু। সে শৈবলিনীর সমবয়স্কা। মায়ের আদুরে মেয়ে। গৃহিণী পাহারায় রাখিয়াছিল, তাহার কন্যাকে। কন্যা অলক্ষিতে থাকিয়া সর্বদা লক্ষ্য রাখিত, কেহ নূতন বউএর সহিত গােপনে কথা কয় কি না। পুটুর গােয়েন্দাগিরি বড়। সাংঘাতিক ছিল। জানালার ফাঁকে, দরজার আড়ালে সর্বদা তাহার পূজার তত্ত্ব নয়ন দুইটা সজীব হইয়া থাকিত। যদি কেহ ইসারা-ঈঙ্গিতেও মূতন বউএর সঙ্গে আলাপনের চেষ্টা করিত, সে ছুটিয়া গিয়া তাহার জননীকে সংবাদ জ্ঞাপন করিত। অমনি গৃহিণী সিংহী-গর্জনে সে বিশাল অট্টালিকা কাপাইয়া তুলিত, ভয়ে পুরবাসীর অন্তরাত্মা কাপিয়া উঠিত। সরকারের গােয়েন্দা বিভাগে আজও এমন কোন খ্যাতনামা কর্মচারীর নাম শুনিতে পাওয়া যায় নাই, যিনি ভূয়ােদর্শন ও সূক্ষ্মানুসন্ধানে ঘােষ-নন্দিনীকে হারাইয়া দিতে পারেন। কোন দাসী বা পুরবাসী নূতন বউএর কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করিবার পূৰ্ব্বে পুটু অতি সঙ্গোপনে আলমারীর আড়ালে কিম্বা ঘরের কোণে গুটানাে মাদুরের মধ্যে আত্মগােপন করিয়া বসিয়া থাকিত, কখন কখন বা পালঙ্কের নীচে পলাইয়া থাকিত। কাজেই এত সতর্ক পাহারায় ধরা পড়িবার ভয়ে অত্যন্ত ইচ্ছা সত্ত্বেও কেহ নূতন বউএর সহিত অতি গােপনেও দুটো সান্ত্বনার কথা বলিতে সাহস করিত না। সহসা একদিন শৈবলিনী পুটুকে গেরেফতার করিয়া ফেলিল। ঘােষ-নন্দিনী অতি গােপনে তাহার কক্ষে প্রবেশ করিয়া আত্মগােপন করিতেছিল, শৈবলিনী তাহা জানিতে পারিয়া ছুটিয়া গিয়া তাহার হাত ধরিয়া ফেলিল। সে পলায়নের চেষ্টা করিল কিন্তু শৈবলিনীর হাত ছাড়াইতে পারিল না, টানাটানি আরম্ভ করিয়া দিল। শৈবলিনী কাতর কণ্ঠে বলিল, ঠাকুর-ঝি! একটা মুখের কথা বল, কেন তােমরা আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছ ? কথা বলবার লােক না পেয়ে আর যে বাচিনে ভাই ? পুটু কোন উত্তর না দিয়া কেবল জোর করিয়া হাত ছাড়াইয়া লইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। শৈবলিনী আজীবন সিমলা পাহাড়ের পূজার তত্ত্ব স্বাস্থ্যকর স্থানে বাস করিয়াছে, কাজেই তাহার চেয়ে শৈবলিনীর শরীরে শক্তি অধিক ছিল, সে বাঘে ধরা ছিল, সে বাঘে ধরা ছাগলের মত কেবল ছটফট, করিতে লাগিল। শৈবলিনী আবার বলিল, ঠাকুর-ঝি। বিয়ের সময় যখন এসেছিলাম, আমার সঙ্গে কত হেসে হেসে কথা বলেছিলে, দিন রাত্রি আমার পাশে পাশে থাকতে কিন্তু আজ কেন তুমি এমন হলে আমাকে সত্য বল ভাই ? কিন্তু ঠাকুর-ঝির মুখে কোন কথা নাই—সে বসনাঞ্চলে মুখ ঢাকিয়া শুদ্ধ পলায়নের জন্যই প্রাণপণ চেষ্টা করিতে লাগিল। যখন কিছুতেই সে শৈবলিনীর সবল সুদৃঢ় মুষ্ঠি হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিতে পারিল না, তখন সে মুখ গুজিয়া গোঁ গোঁ করিয়া কেমন একটা অব্যক্ত চিৎকার করিয়া উঠিল। অমনি ভীতভাবে শৈবলিনী তাহার হাত ছাড়িয়া দিল পু টুউদ্ধশ্বাসে পলায়ন করিল। পরক্ষণেই ঘােষ-গৃহিণী কক্ষের বাহিরে তর্জন গর্জন আরম্ভ করিয়া দিল, কি সর্বনেশে ঘােটলােকের পাহাড়ে মেয়ে গাে! গায়ে যেন পালাে- যানের শক্তি। জোর করে আমার দুধের মেয়ের ননীর মত হাতখানা ধরে রাখে, এত বড় বুকের পাটা তার? হতভাগিনী জানে না, তার বাপের ঘরে ছেলের বিয়ে দিয়ে ঘােষ-বংশের উচু মাথা নীচু হয়ে গেছে। পূজার সময় তত্ত্ব করে না—দ্বিরাগমনে বড় ঘরের মান রাখে না, এত বড় ছােটলােক যার বাবা, সে আমার মেয়ের হাত ধরে, তার সঙ্গে কথা কইতে সাহস করে ? তাহার যে অপরাধ কি, আজ ঘােষ-গৃহিণী জনান্তিকে স্পষ্টভাবে শৈবলিনীকে শুনাইয়া দিয়া গেল। আজ অভাগিনী বালিকা বুঝিতে পারি, তাহার পিতার ক্রটিতে তাহার উপর এ শাস্তির ব্যবস্থা হইয়াছে।

পূজার তত্ত্ব কিন্তু সে ক্রুটীর প্রতিকার করিতে শৈবলিনীর কি শক্তি আছে ? তাহাকে যদি এমনিভাবে নির্জন কারাগারে বন্দী করিয়া রাখে-যন্ত্রণা দেয় পলে পলে মৃত্যুর মুখে জোর করিয়া ঠেলিয়া ফেলিয়া দেয়, তাহা হইলে কে তাহার মুখের দিকে তাকাইবে? বালিকা মরণের ভয়ে ভীত হইয়া পড়িল। শৈবলিনী এ কঠোর শাস্তি অম্লানবদনে মাথায় পাতিয়া লইতে পারিত, যদি এক মুহূর্তের জন্যও একজনের সেই সুন্দর মুখখানি একবার চক্ষে দেখিতে পাইত-যদি একদিনের তরেও সে তাহার সম্মুখে আসিয়া একটা আশার বাণী বলিত। শৈবলিনীর দুইটী চক্ষু তৃষিত চাতকের মত দিন রাত্রি কাহাকে অনুসন্ধান করিত; বাহিরে পুরুষের কণ্ঠস্বর শুনিলেই যে কোন ছলে বারাণ্ডার উপর গিয়া দাঁড়াইত, কিন্তু হায় ! অভাগিনীর এ কামনাটুকুও পূর্ণ হইল না। এতদিনের পরে বাস্তবিক তাহার বুক ভাঙ্গিয়া পড়িল। ;

FO, CHlinir. । ! ( ১১ ক. । কার্তিক মাসের পড়ন্ত বেলায় ক্ষ্যান্ত দাসী ছাদের উপর উঠিয়া যখন আসী শুকাইয়া হাঁড়ি ভরিতেছিল, তখন বােসেদের ছাদে সশরীরে দেখা দিল, বােস-গিন্নী। বােস-গিন্নীর বয়স চল্লিশের নিকটে-দোহারা গঠন, দেখিতে সুশ্রী—তাহার নাম মহামায়া। মুখখানি সর্বদা হাসিমাখা বটে কিন্তু মহামায়ার বুকখানা যেন দুষ্ট বুদ্ধিতে ভরা। ক্ষ্যান্ত দাসী পূর্বে অনেককাল বােসদের বাড়ী দাসী-গিরি করিয়াছিল, কাজেই সে বােস-গিন্নীকে সম্ভ্রমের চক্ষে দেখিত। মহামায়া নিজেদের ছাদের ‘আলিসা ধরিয়া দাড়াইয়া ক্ষ্যান্তকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, ওরে ক্ষ্যান্ত! শুনেছি, তােদের মূতন বউমা এসেছেন, ছাদের উপর বেড়াতে আসেন না কেন? ক্ষ্যান্ত দাসী মহামায়ার প্রকৃতি ভালরূপ জানিত। একটা কথার সূত্র ধরিয়া বােস-গিন্নী যে ঘােষ-গিন্নীকে দু’কথা শুনাইয়া দিতে আসিয়াছে, সে বেশ বুঝিতে পারিয়াছিল। দুই ঘর বড়লােক পাশাপাশি বাস করে দুই ঘরের দুই গিন্নীতে দিন রাত্রি বিবাদ চলে। এই বিবাদের সূত্রপাত হইতে দুই ঘরেই পরস্পরে মনােমালিন্য চলিয়াছে। অবশেষে কান ভাঙ্গানিতে পুরুষেরা পর্যন্ত সেই বিবাদে যােগদান করিয়া বসিয়াছে। পূৰ্বে দুই ঘরে সম্ভাব ছিল—পরস্পরের সুখে দুঃখে সহানুভূতি ছিল আমােদে উৎসবে নিমন্ত্রণ চলিত—দুই পরিবারে যেন হরিহর আত্মা ৪১ পূজার তত্ত্ব ছিল। কিন্তু কি কুক্ষণে হরসুন্দরীর সহিত মহামায়ার দেখা সাক্ষাৎ হইল—তাহারা আদায় কঁচকলার সম্বন্ধ পাতাইয়া বসিল, নানাকারণে ঝগড়া বিবাদ চলিতে লাগিল। ঘােষ-গৃহিণী হরসুন্দরী যেমন অহঙ্কারী তেমনই কলহপ্রিয় ছিল। সামান্য একটা কথার আঘাত সহ্য করিতে পারিত না—উচ্চ চীৎকারে পাড়া মাইয়া তুলিত। বােস-গিন্নী মহামায়া কাটু-পিপড়ের মত কটাস্ করিয়া একটা কথার কামড় দিত-ঘােষ-গিন্নী রাগে উন্মত্ত হইয়া লাফালাফি আরম্ভ করিয়া দিত। সয়তানি বুদ্ধিতে মহামায়া অজেয় ছিল—ঘােষ-গিন্নীকে রাগাইয়া দিয়া দূরে দাঁড়াইয়া সে ‘মজা’ দেখিত। এই প্রকারে মজা দেখিতে দেখিতে শেষে দুই পরিবারে যথার্থই ববাদ বাধিয়া গেল--মুখ দেখাদেখি পৰ্যন্ত বন্ধ হইল। তবে ছাদের উপর উঠিলেই দুই গিন্নীতে যে গজকচ্ছপের লড়াই বাধিয়া যাইত, ইহা নিবারণের কোন উপায় রহিল না। বােস-গিন্নী দুষ্টবুদ্ধিতে বিশেষ পরিপক্ক ছিল, সেই প্রথমে কথার কামড়ে জ্বালা ধরাইয়া দিত—দাম্ভিক সুন্দরী সে জালা সহ্য করতে না পারিয়া ইতর লােকের মত গালি-গালাজ করিয়া ভূত ভাগাইয়া দিত। ক্ষ্যান্ত দাসী প্রথমে বােস-পরিবারে চাকরী করিত—তাহার যথেষ্ট সুনাম ছিল। বােস গিন্নীর উপর রাগের বশে হরসুন্দরী অধিক বেতন স্বীকার করিয়া ক্ষ্যান্ত দাসীকে ভাগাইয়া লইল। মহামায়াও ছাড়িবার পাত্রী নহে। ক্ষ্যান্ত দাসী যখন ভাগিয়া গেল, তখন সে ঘােষ-গিন্নীর খাস চাকরাণী বামাকে ভাগাইয়া আনিল। এই প্রকারে চাকরাণী ভাগাভাগি হইতে চাকর ভাগিতে লাগিল—দ্বারবান ভাগিতে লাগিল, সরকার কর্মচারীও অনেক ভাগাভাগি হইয়া গেল। অবশেষে দেখা গেল, বােসেদের চেয়ে ২ পূজার তত্ত্ব ঘােষেদের ক্ষতি বেশি হইল। ঘােব-গিন্নী হরসুন্দরী অন্তরে অন্তরে জ্বলিতে লাগিল। ক্ষ্যান্ত দাসী অনেককাল বোসেদের বাড়ী চাকরী করিয়াছিল— মহামায়াকে সে ভালরূপ চিনিত। বােস-গৃহিণী যতই দুষ্ট প্রকৃতির লােক হউক না কেন, তাহার হৃদয় মন্দ ছিল না। মুখের কথার কামড় খুব ছিল বটে কিন্তু দাস দাসীর উপর মায়া-মমতাও যথেষ্ট ছিল। ক্ষ্যান্ত অর্থের প্রলােভনে ঘােষ-পরিবারে ঢুকিয়া বসিয়াছে বটে কিন্তু ঘােষ-গৃহিণীর প্রকৃতি দেখিয়া এখন সে একেবারে বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছে। ক্ষ্যান্ত দাসী-গিরি করে সত্য কিন্তু সে কায়েতের ঘরের মেয়ে—পেটের আলায় সে আজ হীনভাবে স্বজাতির দ্বারে পড়িয়া আছে। সে আজ বুঝিয়াছে, সামান্য অর্থের লােভে বােসদের বাড়ী ত্যাগ করিয়া অন্যায় কাজ করিয়াছে। ক্ষ্যান্ত হাতের কাজ ফেলিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, আমি চাকরাণী মানুষ—বড় ঘরের বউ-গিন্নীর কথা আমি কি জানি মা ? মহামায়া হাসিয়া বলিল, কেন, বড় ঘরে ঢুকে ভালমন্দ খেয়ে ঢেকুর তুলতে পারি, তাদের ঘরের খবর জানি না ? ক্ষ্যান্ত বলিল, কথায় বলে, বাঘ ভালুকে যুদ্ধ হয়, নল-খাগড়ার প্রাণ যায়। আমরা গরীব লােক, অর্থের পিত্যেশে আপনাদের দোরে পড়ে থাকি। আমাদের কেন ঝগড়া বিবাদের মাঝখানে টেনে আনেন ? ঘােষ-গৃহিণীর হুকুম হয়েছে, মূতন বউ যেন ছাদে না আসে। বােস-গৃহিণী বলিল, কেন বল দেখি? মূতন বউ ত কপূর নয়, যে হাওয়া লেগে উভে যাবে? ক’দিন বউমা এসেছেন শুনেছি, একটু দেখবাে বলে দিন রাত্রি ছাদের উপর ছুটোছুটা করছি। বিয়ের সময় ১৩ পূজার তত্ত্ব দেখেছিলাম, বউ দেখে সত্যই চোখ জুড়িয়েছিল। হারে ক্ষান্ত! এমন বউকে তােরা নাকি অযত্ন করিস? ক্ষ্যান্ত নূতন বউএর বর্তমান দুরবস্থায় বড় কাতর হইয়াছিল। একটা বালিকা বউএর উপর ঘােষ-গৃহিণীর অমানুষিক অত্যাচার দেখিয়া দাসী হইয়াও ক্ষ্যান্ত অন্তরে অন্তরে বিদ্রোহী হইয়া উঠিয়াছিল কিন্তু ঘােষ-গৃহিণীর বিরুদ্ধে কথা বলিবার সাহস স্বয়ং কর্তার নাই, সেত সামান্য দাসী মাত্র। ক্ষ্যান্ত বােস-গৃহিণীর কথার কোন উত্তর না দিয়া মাথা নীচু করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। পশ্চাতে শাল-গজ্জনের ন্যায় শব্দ হইল, ক্ষ্যান্ত! হচ্ছে কি? কার সঙ্গে কথা কচ্ছিস? ক্ষ্যান্ত চমকিত হইয়া ভীতভাবে বসিয়া পড়িল, তাহার পর তাড়াতাড়ি হাতের কাজ সারিতে লাগিল। ঘােষ-গৃহিণী নিঃশব্দে ছাদের উপর উঠিয়া দাসীকে বােস-গৃহিণীর সঙ্গে কথা কহিতে দেখিয়া আগুনে ধূনা পড়িলে যেমন দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠে, সেইভাবে রাগে অগ্নি-অবতার হইয়া দাসীকে ধমূকাইয়া উঠিল। হরসুন্দরী আবার বলিল, তােকে শতবার নিষেধ করেছি, ছাদে উঠে কারাে সঙ্গে কথা ববিনে। আমার কথা কেন শুনি না বল দেখি? ক্ষ্যান্ত দাসী কোন উত্তর না দিয়া তাড়াতাড়ি কাজ সারিয়া ছাদ হইতে নামিয়া গেল।

( ১২ ) অপর ছাদের উপর বােস-গৃহিণী নিকটেই দাড়াইয়া ছিল। বােস- গৃহিণী মাথা উচু করিয়া বলিল, তোমার সঙ্গে না হয় দাসীর নূতন পীরিত হয়েছে, কিন্তু আমার সঙ্গে পুরাণে পীরিত ছিল, তাই একটু কথা বলেছে, তাতে দোষ কি হয়েছে ? রাগতভাবে হরসুন্দরী বলিল, বুড়ােবয়সে অত পীরিতের ধার ধারিনে। বােস-গিন্নি! তােমাকে নিষেধ করছি, আমাদের বাড়ীর কোন লােকের সঙ্গে কথা বলাে না। মহামায়া বলিল, আমি ত তােমার খাস তালুকের প্রজা নই, যে তােমার নিষেধ আমাকে শুনতেই হবে? আদেশ করতে হয়, ঘােষ- কর্তার উপর চালিয়ে—তিনি শুনবেন, কেননা, তুমি যে তার তৃতীয় পক্ষ—গলার হার—অন্তরের মাণিক। হরসুন্দরী বলিল, আর তুমি বুঝি বােসকর্তার দুয়ােরাণী? মহামায়া বলিল, বােসকৰ্ত্তার বােসৰ্ত্তার পক্ষদোষ নেই—আমিই একে চন্দ্র হয়ে আছি। কিন্তু ঘােষকৰ্তার দুই এ পক্ষ ছাড়িয়ে গিয়ে তুমি যে তিন এ নেত্র হয়ে বসেছ। কথায় বলে, ১৫ পূজার তত্ত্ব এক-বরে স্বামীর স্ত্রী চিংড়ী মাছের খােসা, দোজবরে স্বামীর স্ত্রী নিত্য করেন গোসা। তেজবরে স্বামীর স্ত্রী পাতে বসে খায়, চতুর্বরে স্বামীর স্ত্রী কঁাধে চড়ে যায়। ঘােষ-গিন্নি! যদি এক ধাপ পিছিয়ে আসতে একেবারে গাধার পিঠে শেতলা ঠাকরুণ হয়ে বসতে। ক্রোধে গর্জন করিয়া হরসুন্দরী বলিল, কি—আমার স্বামী গাধা? ছােট মুখে এত বড় কথা? মহামায়া বলিল, আমার মুখ ছােট হতে পারে সত্য কিন্তু কথা ছােট হবে কেন ঘােষ-গিন্নি? যে পুরুষ মানুষ স্ত্রীর কথায় ওঠে—বসে, সে গাধা নয়ত কি ? হরসুন্দরী যদি যথার্থই ব্যাঘ্রী হইত, এতক্ষণে ছাদের আলিসা ডিজাইয়া লাফ দিয়া মহামায়ার ঘাড়ের উপর পড়িত—তাহাকে টুকরা টুকরা করিয়া ছিড়িয়া খাইত কিন্তু ভগবান তাহাকে গড়িয়াছেন মানুষ প্রকৃতি দিয়াছেন বাঘিনীর মত। সে লাফাইতে পারল না—শুদ্ধ গর্জন করিয়া পাড়া মাইয়া তুলিল। খাচায় পােরা সিংহিনীকে খোঁচা মারিয়া লােকে যেমন গর্জন শুনিয়া কৌতুক দেখে, মহামায়াও তেমনইভাবে হরসুন্দরীকে রাগাইয়া দিয়া দূরে দাড়াইয়া মৃদুহাস্য করিতে লাগিল। ক্রোধভরে হরসুন্দরী বলিল, বােস- গিন্নি! তুমি নেহাত ঘােটলােক-বেইমান। মহামায়া বলিল, আমি ঘােটলােক কি তুমি ছােটলােক হিসাব করে বলল ঘােষ-গিন্ধি ! চোদ্দ বছরের একটা বালিকা বউকে ঘরে এনেই কোন ভদ্রলােকে তাকে হালা-যন্ত্রণা দেয় বলত? ত তাতে পূজার তত্ত্ব হরসুন্দরী বলিল, আমার বউএর উপর আমি যেমন ব্যবহার কণি না কেন, আড়ি পেতে ঘরের খবর নিতে যায়, কোন্ ভদ্রলোকে বলত ? মহামায়া বলিল, গলাবাজি করে যখন নিজের কুটুম্বকে চামার কসাই বলে’ ঘােষণা কর, সেটাও কি আড়ি পেতে শুনতে হয় ? হরসুন্দরী বলিল, কুটুষের আক্কেলকে বলতে হয়, যার ব্যবহারে ছােটলােকের মুখনাড়া সহ্য করতে হয়, তাকেই গাল দিতে হয়। তােমার আঁতে ঘা লাগে কেন বােস-গিন্নি ? মহামায়া বলিল, আঁতে ঘা লাগে এইজন্য, চামার কসাই যার কুটুক, কে স্বজাতি বলে পরিচয় দিতে হয়। হরসুন্দরী গর্ব করিয়া বলিল, পটলডাঙ্গার ঘােষেদের হাওয়া গাযে লেগে কত মেথর মুফরাস বােস-কায়েত হয়েছে। মহামায়া মৃদুহাস্য করিয়া বলিল, তার সাক্ষী আছে, হাঁসখালির জেলেরা দত্ত-কায়েত হয়ে গেছে। পিতার কুলে লােহার মুগুরের আঘাত পড়িল--ক্রোধে অভিমানে হরসুন্দরীর চক্ষে জল আসিল। উত্তেজিত হইয়া হরসুন্দরী বলিল, মুখ সামলে কথা বলল, বােস-গিন্নি? তােমার নামে আদালতে মানহানির চার্জ আবাে। মহামায়া বলিল, আর আমিও তােমার কুলের কথা গেজেট করে দেব। বুননা ওল বাঘা তেঁতুলের কাছে হার মানিল। হরসুন্দরী বােস- গৃহিণীকে অকথ্য ভাষায় গালি দিতে দিতে নীচে নামিয়া আসিল। প্রথমেই তাহার লক্ষ্য হইল, শৈবলিনী বিষাদময়ী প্রতিমার মত করে দাড়াইয়া আছে। তাহাকে দেখিয়া হরসুন্দরীর নয়ন হইতে যেন বিষুবিয়সের অগুগম হইল। বাঘের সম্মুখে ছাগ-শিশু যেমন ভীত 7 পূজার তত্ত্ব কম্পিত হয়, হরসুন্দরীর ভীষণ মূর্তি দর্শন করিয়া শৈবলিনীর অন্তরাত্মা তেমনিভাবে কাপিয়া উঠিল—সে ভয়ে দূরে সরিয়া দাঁড়াইল। হরসুন্দরী কক্ষের বাহিরে গৰ্জন করিতে করিতে বলিল, সর্বনাশীর মেয়ে আমার ঘরে এসে জাত কুল সব গেল। যদি মরে যেত, আমার হাড় জুড়াতে আবার আমি ছেলের বিয়ে দিতাম। অমনি শৈবলিনী কাদিয়া উঠিয়া বলিল, মাগাে! কোথায় আছ তুমি? আর যে আমি সহ্য করতে পারিনে—আমাকে পায়ে স্থান দাও। বলিয়াই অভাগিনী বালিকা শয্যার উপর গিয়া আছাড় খাইয়া পড়িল।

? ? ( Hi. 1;;
s,
LIBRAT
1C
।
... ::),
( ১৩
অনুকুলচন্দ্র ব্যস্তভাবে নিজের কক্ষে প্রবেশ করিয়া পত্নী সুরমাকে
বলিল, সুরমা ! তােমরা কি মানুষ নও?
সুরমা স্বামীর ভঙ্গি দেখিয়া ব্যঙ্গ স্বরে বলিল, আমরা যদি মানুষ
হই, তােমার মত মানুষটী আমাদের দলে ঢুকে বলে কেন?
অনুকুল বলিল, তােমাদের দলে ঢুকে বসে যে বেয়াকুবী হয়েছে,
তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই।
সুরমা বলিল, তাহলে নিজের হাতে নিজের কান মলে বেয়াকুবীর
শান্তি নিয়ে আমাদের দল থেকে সরে দাঁড়াও না?
অকুল বিরক্তভাবে বলিল, সরে যাই যে কোন্ চুলােয় ভেবে
পাইনে। সুরমা ! হােট বউমাটী দুধের বালিকা-সম্প্রতি মাতৃহীনা
হয়েছে-বড় শােক পেয়েছে। তাকে ঘরে এনে তােমরা আলা-
যন্ত্রণা দিচ্ছ—মড়ার উপর খাড়ার আঘাত কছ, এ কি ব্যবহার
তােমাদের?
সুরমা বলিল, কথাগুলাে আমাকে না বলে তােমার গর্ভধারিণীকে
গিয়ে বল না? সে দিকে মাড়াতে ত সাহস হয় না, কেবল আমার
উপর দিন রাত্রি হকী।
৪

পূজার তত্ত্ব
অনুকুল বলিল, তুমি আমার কথা শােন না কেন?
“কি শুনবাে?”
“আমি হুকুম দিচ্ছি, তুমি বউমার কাছে যাও—তার সঙ্গে কথা
কও—তাকে আদর-যত্ন কর।”
সুরমা বলিল, তারপর যখন তােমার জননী বাঘের মত আমার
ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়ে আমাকে ছিড়ে খাবেন, তখন
উপায় ?
অনুকুল বলিল, তােমাকে ছিড়ে খাবেন কি করে ? মা ত
রাক্ষসী নয় ?
সুরমা বলিল, রাক্ষসীদেরও মায়া-মমতা থাকে শুনেছি।
রাক্ষসী জরাসন্ধ রাজাকে না খেয়ে যােড়া-তাড়া দিয়ে বাঁচিয়েছিল।
কিন্তু বাঙ্গালীর ঘরের গৃহিণী যারা, তার বালিকা বউএর কচি মাথা
চিবিয়ে খায়, তার ঢের নজির আছে। কোন রকমে এ যাবৎ
নিজের মাথাটী বাঁচিয়ে রেখেছি, তুমি ইচ্ছা কর, সেটা তােমার
গর্ভধারিণীর উদরে ঢুকে যাক ?
অনুকুল বলিল, যদি প্রকাশ্যে সাহস না কর, গােপনে বউমার
সঙ্গে সাক্ষাৎ কর—দুটো মিষ্টি কথা বলে সান্ত্বনা দাও। তা না হলে
পরের মেয়ে দম আটকে মরে যাবে যে?
সুরমা বলিল, তাতে ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি হবে।
অনুকুল বলিল, কেন ?
সুরমা বলিল, তা আর বুঝতে পাছ না? তােমার ভায়াটা
আবার চতুর্দোলায় উঠে, গােরা বাদ্যি বাজিয়ে বউ আনতে যাবে।
আবার বরপণের দর কষাকষি হবে, দানসজ্জায় তােমাদের অট্টালিকা

পূজার তত্ত্ব ভরে যাবে। তারপর, পূজার তত্ত্ব, শীতের তত্ত্ব, গাে-ফাগুনের তত্ব পৰ্যন্ত ঘরে উঠবে। তােমর। পুরুষজাতি, যতবার বউ মরে তােমাদেব তত লাভ। যদি তার প্রমাণ চাও, আমাকে অনুমতি দাও, একভরি আফিং গিলে মরে দেখাই। অনুকুল বলিল, না গাে না, তােনাকে মরে দেখাতে হবে না। তুমি বেঁচে থেকে গৃহিণী হও। তারপর, ছেলের বউ ঘরে এনে তাকে এমনিভাবে সাজা দাও। কিন্তু মনে থাকে যেন, বউরা যখন বড় হয়ে গৃহিণী হবে, তখন এই জ্বালা-যন্ত্রণা সুদে আসলে আদায় করে ছাড়বে। সুরমা বলিল, তুমি সতর্ক করে দিচ্ছ বটে কিন্তু ওটা যে আমাদের জাতির ধর্ম। অনুকুল বলিল, জাতির ধর্ম হ’ল কি করে? সুরমা বলিল, জাতির ধর্ম বই কি! কুকুর যখন বাচ্চা থাকে, তখন শেয়ালে তাকে ধরে খায় কিন্তু যেই সে বাচ্চা বড় হয়, অমনি সে শেয়াল তাড়িয়ে ছিড়ে খায়। অনুকুল বলিল, তুমি বলতে চাও, স্ত্রীলােক কুকুরের জাতি ? সুরমা বলিল, তা আবার জিজ্ঞাসা কছ ? কুকুর প্রভুভক্ত হয়, আমরাও পুরুষভক্ত হই। কুকুর প্রভুর পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ে, উচ্ছিষ্ট খায়, আমরাও পুরুষের পদসেবা করি, পাতের প্রসাদ খাই। কুকুর প্রভুর ঘর চৌকী দেয়, চোর ডাকাত তাড়ায় বলে দুবেল। দুমুঠো খেতে পায়। আমরাও পুরুষের দাসী-গিরি করি শুদ্ধ পেটের জালায়। কুকুরকে ‘তু বলে ডাকলে কাছে এসে মুখের পানে চেৰে লেজ নাড়ে, আবার দুরু বলে তফাৎ যায়। আমরাও কখন পুরুষের

পূজার তত্ত্ব
আদর পেয়ে আহলাদে গলে যাই, আবার কখনও চোখরাঙ্গানি সহ
করে চোখের জলে বুক ভাসাই। শুদ্ধ এক বিষয়ে কুকুরের সঙ্গে
আমাদের মিল নাই।
অনুকুল বলিল, কি ?
সুরমা বলিল, কুকুর প্রভুর এত করেও ইজ্জত বজায় রেখে
ছাই গাদায় নেয় সজ্জা, আমরা নারী পুরুষের পাশে থেকে লুটিয়ে
দেই মান ইজ্জত আর লজ্জা। কুকুরের চেয়েও নীচ কিনা, তাই
বাঙ্গালীর ঘরের বউ আমরা এত নিৰ্যাতন সহ্য করি, অম্লানবদনে-
আনতমস্তকে। কুকুর যদি ব্যথা পায়, সেও ঘাড় ফুলিয়ে গর্জন করে,
কিন্তু আমরা নারী পায়ের তলায় মাড়িয়ে গেলেও মুখের কথাটী
ববার অধিকার আমাদের নাই।
অনুকুল
উতেজিত কণ্ঠে বলিল, নারীর উপর সমাজের এ অন্যায়
অত্যাচার।
অমনি সুরমা বলিল, চুপ, কর গাে চুপ, কর। মনে রেখাে
তুমি সমাজপতি নওসমাজপতি তােমার মা।
অনুকুল বলিল, কিছুতেই না--মার কথা শুবাে না—একট
দুগ্ধপােষ্য বালিকার উপর এ অত্যাচার হতে দেব না।
সুরমা অনুকুলের হাত ধরিয়া বলিল, ক্ষেপে গেলে নাকি? তু
কি করতে চাও, বল দেখি ?
অনুকুল বলিল, আমি এখনই বউমার কাছে যাব—তার স
কথা বলবো, তাকে কোলে তুলে নেব।
সুরমা হাসিয়া বলিল, পাগল তুমি। জান, তুমি ভাশুর,
ভাদ্রবধূ ? তাকে স্পর্শ করবার অধিকার তােমার নাই।
৫২

পুজার তত্ত্ব
অনুকুল বলিল, আমার যদি সে অধিকার না থাকে, আমার
ইকুম, তােমাকে তার কাছে যেতেই হবে।
সুরমা বলিল, তােমার হুকুম আমি পালন করূতে বাধ্য কিন্তু মনে
থাকে যেন তােমার মার হুকুমে কাল আমাদের গাছতলাতে দাড়াতে
হবে।
অনুকুল বলিল, আমার বাবা বেঁচে থাকতে না আমাদের উপর
এ হুকুম চালাতে পাবেন?
সুরমা বলিল, তােমার বাবা যে বেঁচে আছেন, এ বিশ্বাস আমার
নাই—তাহলে তার চোখের সম্মুখে এত বড় অত্যাচারটা ঘটতে
পারে? তারপর, তােমার ভাইটা নেহাত ছেলে মানুষ নয়-সে
বিদ্বান বুদ্ধিমান। তার স্ত্রীর উপর এত অত্যাচার হচ্ছে, সে নীরবে
আছে নে? তুমি যাও, আগে গিয়ে দেখ, তােমার পিতা ও
ভ্রাতা মৃত কি জীবিত।
স্ত্রীর কথা শুনিয়া অনুকুল শান্ত হইয়া ধীরপদে গৃহত্যাগ করিল।

( ১৪ ) বালিকা শৈবলিনীর উপর অত্যাচার আরও বাড়িয়া চলিল—সে দিন রাত্রি শ্বাশুড়ীর গালি-গালাজ সহ করিতে লাগিল। তবুও বালিকা এতকাল আশা করিয়া বসিয়াছিল, তাহার স্বামী হয়ত তাহার কাছে আসিবে, তাহার সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণার অবসান করিয়া দিবে কিন্তু দিনের পর দিন চলিয়া গেল, অভাগিনী একদিনের তরেও স্বামীর সাক্ষাৎ পাইল না। সে তখন ভাবিল, তাহার স্বামীও তাহাকে পায়ে ঠেলিয়াছে। বালিকা হতাশ হইয়া পড়িল—তাহার মরণের সাধ জন্মিল। দিবা দ্বিপ্রহের সময় শৈবলিনী পালঙ্কের উপর বসিয়া বাম করতলের উপর গণ্ডস্থল রক্ষা করিয়া কত কি চিন্তা করিতেছিল। সম্মুখে গবাক্ষ-দ্বার উন্মুক্ত—নিম্নে বিশাল রাজপথে অবিরত জনস্রোত চলিয়াছে। কিন্তু শৈবলিনীর দৃষ্টি সে দিকে নিবদ্ধ থাকিলেও তাহার মানসপটে সিমলা পাহাড়ের একটা দৃশ্য প্রতিফলিত হইয়াছিল। শৈবলিনী দেখিতেছিল, তাহার পিতা আফিস হইতে বাসায় ফিরিয়া ৫৪ আসিয়া বিষয়বদনে পােষাক পরিচ্ছদ ত্যাগ করিতেছেন-হাত মুখ ধুইবার জল পাইতেছেন না–সামান্য একটু জলযােগের দ্রব্যও কেহ আনিয়া হাতে দিতেছে না। তাহার ছোট ভাই ভগিনীগুলি চারিদিকে কাদাকাটি করিতেছে, আর শঙ্কর চাকর চোখ রাঙ্গাইয়া তাহাদের ধমক দিতেছে। দুঃখে শোকে ক্ষোভে শৈবলিনীর হৃদয় ফাটিয়া যাইতেছিল--অশ্রুজল বাদলের বারিধারার মত বাম করতল প্লাবিত করিয়া বসুন্ধরা সিক্ত করিতেছিল। এমন সময় এক পরম সুন্দর যুবাপুরুষ অতি সন্তর্পণে প্রকোষ্ঠের দ্বার খুলিয়া ধীরপদে কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করিল, শৈবলিনী তাহার বিন্দুবিসর্গও অবগত হইল না। যুবক সন্নিকটে দাড়াইয়া শৈবলিনীর সেই অনিন্দ্যসুন্দর মুখখানি দর্শন করিয়া মুগ্ধ হইল। ইচ্ছা হইল, ছুটিয়া গিয়া বালিকাকে বক্ষে ধারণ করিয়া তাহার অশ্রুসিক্ত গণ্ডলে শত চুম্বন প্রদান করে তাহার হৃদয়ের সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণার অবসান করিয়া দেয়। কিন্তু যুবক সাহসী হইল না-মায়ের কঠোর আজ্ঞা। সে শুদ্ধ নিকটে দাড়াইয়া তৃষিত চাতকের মত শৈবলিনীর রূপসুধা পান করিয়া নিজের ক্ষুধা নিবৃত্তি করিতে লাগিল। যুবক ভাবিতে ছিল, শৈবলিনীর এত রূপ—এত সৌন্দৰ্য্য। এ স্বৰ্গ-পারিজাত কি এমনিভাবে অনাদৃত হইয়া ধূলায় গড়াগড়ি যাইবে ? করুণাভরা একটা কোমল দীর্ঘশ্বাস শৈবলিনীর অঙ্গে আসিয়া লাগিল—তাহার প্রাণ যেন পুলকে ভরিয়া গেল। তাহার চিন্তা- ভাঙ্গিয়া গেল—সে মাথা তুলিয়া চমকিত হইয়া দেখিল, যেন শত জন্মের সাধনায় পরিতুষ্ট হইয়া তাহার ইষ্টদেবতা সশরীরে তাহার পাৰে সহাস্যবদনে দণ্ডায়মান। শৈবলিনীর ইচ্ছা হইল, ছুটিয়া গিয়া হইল। পূজার ইষ্টদেবতার চরণতলে আছাড় খাইয়া পড়িয়া নারীজন্ম সার্থক করে- যুবকের ইচ্ছা হইল, দুই বাহ তুলিয়া বালিকাকে আলিঙ্গন করিয়া তাহাকে বুকে তুলিয়া লইয়া উধাও হইয়া উড়িয়া যায়। হর্ষ-বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া শৈবলিনী উঠিয়াও উঠিতে পারিতেছিল না—যুবক আবেগভয়ে ছুটিতে গিয়াও ছুটিতে পারিতেছিল না—যেন পশ্চাৎ হইতে লজ্জা ভয় ও সঙ্কোচের একটা প্রবল আকর্ষণ তাহাকে টানিয়া ধরিয়া রাখিয়াছিল। সহসা কক্ষের বাহিরে কাহার কণ্ঠের সাড়া পাইয়া যুবক ভীত চমকিত অমনি সে করুণ দৃষ্টিতে শৈবলিনীর মুখের দিকে তাকাইল। তাহার পর, সুন্দর আননে মৃদুহান্যের রেখা ফুটাইয়া শৈবলিনীর বিশুষ্ক হৃদয়ে ধার ধারা ঢালিয়া দিয়া শশব্যস্তে প্রকোষ্ঠ হইতে বাহির হইয়া গেল। যেন ঘন ঘটাচ্ছয় আকাশে সহসা সহ বিদ্যুৎ চমকিত হইয়া লুকাইত হইল—শৈবলিনীর গভীর অন্ধকারময় হৃদয়ের মধ্যে আলেয়ার মত আশার আলাে জ্বলিয়া উঠিয়া নির্বাপিত হইল। সে মূর্তি কাহার শৈবলিনী বিলক্ষণ চিনিতে পারিয়াছিল-সে মুখ যে তাহার অতি পরিচিত-হৃদয়ের স্তরে স্তরে অঙ্কিত। কেন এটা আনন্দ, আশা, অপরিতৃপ্ত লালসা বালিকার হৃদয়সমুদ্র আলােড়িত করিয়া তুলিল। যুবক প্রকাশচন্দ্র কক্ষ হইতে করিতপদে বহির্গত হইয়া পলায়ন করিতে উদ্যত হইল, অমনি সম্মুখে দেখিল, সিংহিনী মুক্তিতে দণ্ডায়মান তাহার জননী। জননীর পশ্চাতে দাড়াইয়া তাহার ভগিনী পুষ্ট নতমস্তকে মৃদুহান্য করিতেছিল—সেই গােয়েন্দাগিরি করিয়া স্বামী- খ্রীর মিলন-সংবাদ তাহার ঘুমন্ত জননীর কর্ণগােচয় করিয়াছিল। .

পূজার হরসুন্দরী সংবাদ শ্রবণ করিয়া শয্যাত্যাগ করিয়া ছুটিয়া আসিয়াছিল- সম্মুখে যুবক প্রকাশচন্দ্রকে দেখিয়া গৰ্জন করিয়া বলিল, বেহায়া ছেলে । লজ্জায় ঘৃণায় ম্রিয়মান হইয়া যুবক মাথা নীচু করিয়া দাড়াইয়া রহিল। হরসুন্দরী আবার বলিল, শােন্ প্রকাশ ! যদি তুই অই চামারের মেয়ের সঙ্গে কখনাে কথা বলি, তুই আমার কুসন্তান। প্রকাশচন্দ্র একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া নতমস্তকে প্রস্থান করিল। হরসুন্দরী লক্ষ্য করিল না, তাহার দুই চক্ষু হইতে টপ টপ করিয়া অশ্রু ঝরিয়া পড়িল। কথাগুলি শৈবলিনীরও কর্ণগােচর হইয়াছিল। অমনি সে শয্যার উপর শয়ন করিয়া চোখের জলে উপাধান সিক্ত করিয়া মনে মনে বলিল, তবে আর কেন, ভগবান! আমার সকল জলার অবসান কর। ৩

( ১৫ )
যেইমাত্র প্রকাশচন্দ্র চলিয়া গেল, অনুকুলচন্দ্ৰ ক্রুদ্ধভাবে মাতার
সম্মুখে আসিয়া বিরক্তিসূচক বাক্যে বলিল, যদি কথা না কইবে,
তবে বিয়ে দিয়েছিলে কেন?
হরসুন্দরী ক্রোধভরে বলিল, বিয়ে দিয়েছিলাম বটে কিন্তু ও যে
চামারের মেয়ে সেটা আগে সন্ধান পাইনি।
অনুকুল বলিল, একটা কচি মেয়ে, তাকে এত জালাতন কেন
কছ ? তার নিজের অপরাধ কি আছে বল ত
হরসুন্দরী বলিল, সে নিজে অপরাধ না করলেও তার পিতামাতার
অপরাধের শাস্তি তাকেই গ্রহণ করতে হবে।
অনুকুল বলিল, পিতামাতার পাপের শান্তি যদি সন্তানকে গ্রহণ
কতে হয়, তাহলে ভয় হচ্ছে, কতকাল আমাদের অসহ নরক যন্ত্রণা
ভােগ করতে হবে!
“তােমরা নরক-যন্ত্রণা ভােগ করবে কেন?”

পূজার তত্ত্ব
“তােমাদের মহাপাপের ফলে। একটা নিরপরাধ পরের মেয়ে
ঘরে এনে তাকে যন্ত্রণা দিচ্ছ—তাকে অবিরত খুচিয়ে মাছ। তার
বুকভাদা যে দীর্ঘশ্বাস উঠছে, তাতে সমগ্ৰ সংসাব বিষিয়ে উঠছে,
ঘােষ-পরিবারের শির লক্ষ্য করে ভগবান বজ্রপাতের উদ্যোগ
করছেন। যদি তাকে মেরে ফেলতে চাও, এক কোপে কেটে ফেল,
না হয়, তাকে খানিকটা বিষ গিলিয়ে দাও। এমন করে খুঁচিয়ে
যন্ত্রণা দিয়ে কেন তাকে মাছ ?
পৈশাচিক হাস্য করিয়া হরসুন্দরী বলিল, মরে কই? তাহলে
ত আবার ছেলের বিয়ে দিতাম, বারাে মাসে তের পার্বণের তত্ত্ব
বুঝে নিয়ে ঘরে তুলতাম।
উৎকট ঘৃণাভরে অনুকুল বলিল, আগে জানতাম, হাঁসখালির
দত্তরা জেলে পাটুনী, শুধু মাছ ধরে খায় কিন্তু এখন দেখছি,
কসাই-গােখানায় গরু
জবাই
তাদের
ব্যবসা।
হরসুন্দরী গর্জন করিয়া বলিল, পাজি! নচ্ছার! মুখ সামলে
কথা বলিস। আমার যা খুশী তাই করবাে, তুই কথা বলতে আসিস
কোন্ সাহসে?
অনুকূলচন্দ্রের হৃদয় বিদ্রোহে ভরিয়া গিয়াছিল। সে রুক্ষ মেজাজে
উত্তর করিল, কেন সাহস থাকবে না? আমি ত তােমার পিতার
অয়ে পালিত হই না ?
কালসর্পের ন্যায় গর্জন করিয়া হরসুন্দরী বলিল, এত স্পর্ধা
তাের—তুই যখন তখন আমার বাপ মা তুলে কথা বলিস? তুই
যে কার অমে পালিত হচ্ছিস, আজ তােকে ভাল করে মালুম করে’

পূজার তত্ত্ব
দেব। বলিয়াই কালসপিনী হেলিয়া দুলিয়া ফোস ফোস করিয়া
চলিয়া গেল।
সম্মুখে পুটু দাঁড়াইয়া ছিল। অনুকুল কুদ্ধভাবে তাহার দিকে
তাকাইয়া বলিল, পুটি! যত অনর্থের মূল তুই।
ঘাড় বাঁকাইয়া মুখভঙ্গি করিয়া পুটু বলিল, কেন,
কেন, আমি কি
করেছি ?
অনুকুল বলিল, তুই কেন দিন রাত্রি গােয়েন্দাগিরি করিস?
পুটু বলিল, বেশ করেছি-তুমি আমাকে মারবে নাকি ?
অনুকুল বলিল, ইচ্ছা করে, তাের চুলের গােছ ধরে’ দুই গালে
দুটো চড় বসায়ে দেই।
পুটুও সহজ মেয়ে নয়-সে দূরে সরিয়া দাড়াইয়া বলিল, তুমি
আমাকে মারবে কেন বলত? আমি কি তােমার খাই, না, তােমার
পরি ?
ছোট বােনের মুখে এমন উত্তর শুনিয়া অনুকুলের অত্যন্ত রাগ
হইয়া গেল। অনুকুল বলিল, বেহায়া মেয়ে। তাের এত বুকের
পাটা হয়েছে, তুই আমার সঙ্গে সমান উত্তর করিস? পাড়া তুই,
তােকে শিখিয়ে দিচ্ছি। বলিয়াই যেই অনুকুল অগ্রসর হইল, অমনি
পুটু কান্নার সুরে চীৎকার করিয়া বলিল, মাগাে! আমাকে মেরে
ফেলে গাে-বড় দাদা মদ খেয়েছে বুঝি গাে। বলিয়াই সে দৌড়িয়া
পলায়ন করিল।
অবিলম্বে বৃদ্ধ নফরচন্দ্র অনুকুলের সম্মুখে আসিয়া দাড়াইল।
নফরচন্দ্র বলিল, অনুকুল! এ কি ব্যবহার তােমার?
অনুকুল নতমস্তকে বলিল, কি করেছি বাবা?

পুজার তত্ত্ব
“তুমি নাকি তােমার গর্ভধারিণীকে দুবাক্য বলেছ
বিরক্তভাবে অনুকুল বলিল, গর্ভধারিণীকে মিষ্ট কথা বলার
সুযােগ পাইনে বাবা।
নফরচন্দ্র বিরক্তভাবে বলিল, ছিঃ ! কোন ভদ্রলােকের সন্তানের
মুখে এমন কথা বা’র হওয়া উচিত নয়। তুমি তােমার গর্ভধারিণীর
অবাধ্য হয়েছ?
হয়েছি।”
“অন্যায়।
“কিন্তু ন্যায় অন্যায় আজ আপনাকে বিচার করতে হবে বাবা।
একটা পরের মেয়ের উপর কি অত্যাচার হচ্ছে, হয়ত আপনি সন্ধান
রাখেন না?”
বৃদ্ধ নফরচন্দ্র বলিল, সব সন্ধান রাখি অমুকুল! কিন্তু ন্যায়
অন্যায় বিচার করবার ক্ষমতা আজ আমার নাই।
অনুকুল বলিল, কেন নাই ? আপনি কি এ সংসারের কেউ
ন?
বৃদ্ধ বিচলিতভাবে বলিল, আমি কেউ নই—আমি সাইফার,
শূন্য-ফাঁকা।
আমি নাম মাত্র ঘােষ-পরিবারের কর্তা—প্রকৃত
কী হচ্ছে, তােমার গর্ভধারিণী--তার আদেশ তােমাকে শুনতেই
অনুকুল
উত্তেজিত কণ্ঠে বলিল, এত বড় একটা অত্যাচার চোখের
উপর দেখে নীরবে সহ্য কতে হবে?
নফরচন্দ্র বলিল, “আলবােথ কতে হবে। তােমার বাবা যখন
জেনে শুনে সব সহ্য কছে, তখন তুমি করবে না কেন? শােন

পূজার তৃত্ব
অনুকুল! একদিন তােমার পিতা নফরচন্দ্র দাতা, ধাৰ্মিক, ন্যায়বান
বলে খ্যাতি লাভ করেছিল। সে দিন তােমার পিতা আশী
বছরের বুড়াে হয়নি, বল-বুদ্ধি হারায়নি, তৃতীয়-পক্ষকে গলার হার
করেনি কিন্তু আজ তােমার সেই পিতা পরমুখপ্রত্যাশী জরাজীর্ণ
স্থবির-সাইফার-সাইফার। তুমি নতমস্তকে তােমার গর্ভধারিণীর
আদেশ পালন করতার কাছে ক্ষমা চাও।
মাথা নীচু করিয়া অনুকুল বলিল, পাবদা না বাবা!
অমনি হরসুন্দরী বাঘিনীর ন্যায় ছুটিয়া আসিয়া বলিল, ও
হতভাগাকে আজই ত্যজ্যপুত্র করতে হবে। ও আমার মেয়েকে
মারতে আসে—আমাকে বাপ মা তুলে গাল দেয়—ওর মুখদর্শন
কার করবাে না।
গর্বভরে অনুকল বলিল, বেশ তাই হক, আমি আজই তােমাদের
পাপ সংসার ছেড়ে যাচ্ছি। যেখানে এত অত্যাচার অবাধে চলে
যাচ্ছে—যেখানে আমার পিতা সাইফার, সে স্থান নরক। বলিয়াই
অনুকুল প্রাননাঙ্কত হইল।
অমনি বৃদ্ধ নফরচন্দ্র বাধা দিয়া বিচলিত ভাবে বলিল, কর কি-
অনুকল! তুমি আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র।
অনুকুল বলিল, আমি মূর্থ পুত্র–পিতৃ-মাতৃদ্রোহী কুসন্তান।
আপনার কনিষ্ঠ পুত্র প্রকাশচন্দ্র বিদ্বান বুদ্ধিমান বাধ্য সন্তান। আমি
আশীর্বাদ করে যাচ্ছি, সে আপনার বংশের মুখােজ্জল কবে।
বলিয়াই অনুকুল দ্রুতপদে প্রস্থান করিল।
বৃদ্ধ নফরচন্দ্র বলিল, গৃহিণি! একটু ঠাণ্ডা হও-ছেলেদের
সঙ্গে নিয়ে চল।

O, CHITRASS TUR. HOY,
পূজার তত্ত্ব
হরসুন্দরী ধমক দিয়া বলিল, নেহাত আহখের মত কথা বলছ।
আমি মা হয়ে ছেলের পায়ে ধরূতে যাব নাকি? দু হয়ে যাক,
ওটা আমার দু’চক্ষের বিষ।
নফরচন্দ্র মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে বলিল, তুমি যা ভাল বােঝ
তাই কর। আমি শুদ্ধ সাইফার–সাইফার।
বলিয়াই বুদ্ধ মন্থরগমনে প্রস্থান করিল।
.
LIBRAZY
{ ;. 1939
.
১

( ১৬ )
শৈবলিনীকে শ্বশুরালয়ে পাঠাইয়া দিয়া শঙ্কর চাকর ও পুত্র
কন্যাগণকে লইয়া হেমবাবু তাহার কর্মস্থল সিমলা পাহাড়ে প্রস্থান
করিলেন। তাঁহার চিন্তার অবধি ছিল না, কি প্রকারে সেখানে
সংসার-যাত্রা নির্বাহ করিবেন। পত্নী নাই-বয়স্থা কন্যা শ্বশুরালয়ে।
একমাত্র বিশ্বস্ত শঙ্কর চাকরের উপর নির্ভর করিয়া কিছুতেই সংসার
চলিতে পারে না। এখন উপায় কি ?
হেমবাবু শঙ্করকে ভাকিয়া বলিলেন, শঙ্কর! কি করে আমার
সংসার চলবে?
শঙ্কর ভরসা দিয়া বলিল, ভয় কি বাবু। যে প্রকারেই হউক
আপনার সংসার চালিয়ে দেব।
হেমবাবু বলিলেন, তুমি একা কি করে’ চালাবে শঙ্কর? আমাকে
আফিসে যেতে হবে। কে রাঁধবে-বাড়বে—কে ছেলেমেয়েদের
দেখবে? তা ছাড়া আরও অনেক গৃহস্থালী কাজ-কর্ম আছে।
শঙ্কর মাথা নীচু করিয়া বলিল, সব আমি করবাে।
হেমবাবু শঙ্করের মুখের দিকে তাকাইয়া বলিলেন, অসম্ভব।
৬০

শঙ্কর বলিল, এই অসম্ভবই আমাকে সম্ভব করে তুলতে হবে। রাঁধবার বাড়বার জন্য একটা ঠিকে বামুন রেখে দিলে হবে, আর ৰত কাজ-কর্ম আছে, সব আমি করব। হেমবাবু বলিলেন, কি বলছ শঙ্কর! তুমি একা মানুষ—এত কাজ কি করে করবে ? শঙ্কর বলিল, আমাকে করতেই হবে একা আমাকে দশটা হতে হবে। হেমবাবু দেখিলেন, শঙ্করের মুখ গভীর—দৃঢ়তাব্যঞ্জক। বিস্মিতভাৰে হেমবাবু বলিলেন, কেন বল দেখি, তােমার এত জেদ? শঙ্কর ধীরভাবে উত্তর করিল, জেদ নয়—আমার উপর হকুম। অত্যন্ত বিস্মিত হইয়া হেমবাবু বলিলেন, কার হুকুম। শঙ্কর বলিল, আমার দিদিমণির হুকুম। বাবু! আমি জানি, চারিদিক থেকে আপনি ঋণজালে জড়ীভূত হয়েছেন। চাকরী করে আপনার যে আয় হয়, দাস দাসী পাচক ৰাহ্মণ রেখে বড়মানুষী চালে চলে জীবনে আপনি ঋণ শােধ করতে পারবেন না। কাজেই আজ থেকে আমাকে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে আপনাকে ঋণদায় থেকে মুক্ত করতে হবে। হেমবাবু অবাক হইয়া সেই প্রভুভক্ত বিশ্ব পরম হিতৈষী ভূতােৰ মুখের দিকে তাকাইয়া রহিলেন—তাহার দুই চক্ষু হইতে অপাৱা ঝরিয়া পড়িল। আত্মসংবরণ করিয়া হেমবাবু বলিলেন, শঙ্কর! তুমি আমার অনেক উপকার করেছ, সে ঋণ ত জীবনে শশাধ করতে পারবাে । তুমি আমার ভৃত্য নও- শঙ্কর বাধা দিয়া বলিল, না বাবু! আমি আপনার ভৃত্য নই- পূজার তত্ত্ব আপনার পুত্র। পুত্রের কি কৰ্তব্য নয়, অসময়ে বিপন্ন পিতাকে সাহায্য করে ? হেমবাবু বলিলেন, পিতারও কি কর্তব্য নয়, পুত্রের সুখ-স্বাচ্ছন্দতার দিকে লক্ষ্য করে ? একটা গৃহস্থের সংসারে কত কাজ। সব কাজের দায়ীত্ব যদি একা তােমার ঘাড়ে পড়ে, তােমার হাফ ছাড়বার অবসর থাকবে না। তােমার ন্যায় পরমাত্মীয়ের উপর আমি এত অত্যাচার কি করে করবাে ? শঙ্কর বলিল, দায়ীদের ভারে যদি আমার ঘাড় ভেঙ্গে যাবার উপক্রম করে, সে দিন আমি আপনাকে জানাবাে, আপনি অধীর হবেন না। শঙ্কর জোর করিয়াই সব দায়ীত্ব ঘাড়ে পাতিয়া লইল। একজন ‘ঠিকে ব্রাহ্মণ ডাকিয়া রন্ধনের ভার তাহার হস্তে দিল, আর সব কাজ- কর্ম সে নিজের হাতেই করিতে লাগিল। সে নিজে বাসন মাজে, জল তােলে, ঘর দ্বার পরিষ্কার করে, ছেলে মেয়ে রাখে, হাট বাজার করে। কোন কাজেই তার ত্রুটি নাই—কিছুতেই তাহার বিরক্তি নাই। দু’দিন পরে হেমবাবু দেখিলেন, একমাত্র শঙ্করের গুণে ভঁহার সংসারে কোন অভাব নাই কোন বিশৃঙ্খলা নাই। যথার্থ ই আজ যেন এক শঙ্কর দশটা হইয়া কাজ করিতেছে। পত্নী ও কন্যা বর্তমানে তাঁহার সংসাবে যে প্রকার সুব্যবস্থা ও শৃঙ্খলা ছিল, আজ তাহার কোন অভাব হয় নাই। প্রভুভক্ত শঙ্করের কাৰ্যে হেমবাবু মুখ হইলেন—তিনি ভাবিলেন, শঙ্কর যথার্থই আজ পুত্রের কাৰ্য্য করিতেছে। শঙ্কর কেন এত করিতেছে? সেই যে শৈবলিনী তাহাকে বলিয়া দিয়াছে, আমার বাবাকে যত্ন করাে, ভাই বােদের ভালবেসে, শঙ্কর পূজার তত্ত্ব সে কথাত ভুলিতে পারে নাই ? সে শৈবলিনীকে প্রাণের চেয়ে অধিক ভালবাসে, তাহাই ত আজ প্রাণপাতেও তাহার আদেশ পালন করিতে প্রস্তুত হইয়াছে। যদি ত্রুটি হয়-শৈবলিনী যদি কৈফিয়ৎ চায়? তার চেয়ে মরণ মঙ্গল।

( ১৭ ) শর অতি দরিদ্রের সন্তান। কোন্ পাহাড়ে মুলুকে কুঁড়ে ঘরে তাহার জন্ম হইয়াছিল—জন্মগ্রহণের পরেই অল্পদিনের মধ্যে একে একে জনক-জননী হারাইয়া বসিয়াছিল, তখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বৎসর। তাহার অন্য কোন ভাই ভগিনী ছিল না। পিতৃমাতৃহীন হইয়া শঙ্কর এক দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়ের ঘরে আশ্রয় পাইয়াছিল সত্য কিন্তু সেখানে স্নেহ-মমতার মুখ কখনও দেখিতে পায় নাই। অবিরত প্রহার ও তিরস্কার অম্লানবদনে সহ করিতে করিতে তাহার জীবনযাত্রার সূত্রপাত হইয়াছিল। সেই আত্মীয়ের দ্বারে দুই চারি বৎসর অতি কষ্টে কাল কাটাইয়া একদিন সে তাহার খােট্টা আত্মীয়ের প্রচণ্ড চপেটাঘাত গণ্ডদেশে গ্রহণ করিয়া গৃহত্যাগ করিয়াছিল। তখন তার বয়স নয় দশ বৎসর মাত্র। বালক শঙ্কর দেশ ছাড়িয়া পলায়ন করিয়া দেশান্তরে উপস্থিত হইল। সে এক কৃষকের বাড়ীতে আয় পাইল। সেখানে জীবিকা অর্জনের জন্য একপাল গৰু, ভেড়া ও ছাগল চরাইবার ভার প্রাপ্ত হইল। বালক পূজার সেখানে পেট ভরিয়া খাইতে না পাইলেও তাহার পত সঙ্গীগণের সহিত দুই এক বৎসর বেশ মনের আনন্দে কাল যাপন করিল। সহসা একদিন নেকড়ে বামে একটা ছাগল-ছানার ঘাড় ভাঙ্গিবার অপরাধে সে কৃষকের হতে উত্তম মধ্যম প্রহারের আস্বাদ গ্রহণ করিয়া সে স্থান তাগ করিয়া পলায়ন করিতে বাধ্য হইল। এইরূপে শঙ্কর একবার হইতে অপর দ্বারে এক স্থান হইতে অন্য স্থানে ফুটবলের মত পদাঘাত সহ্ন করিয়া ভ্রমণ করিতে লাগিল। সে জীবনে কোন স্থানেই ভালবাসা বলিয়া পদার্থ টীর সন্ধান প্রাপ্ত হয় নাই-কঠোর এম ও অত্যন্ত নির্মমতার মধ্যেই সে চির পরিচিত হইয়াছিল—সেই কারণেই তাহার হৃদয় সাহারা মরুভূমির ন্যায় একেবারে নীরস হইয়া গিয়াছিল। পরিণত বয়সে সহসা একদিন সে হেমবাবুর আশ্রয় পাইল—তাহার , পত্নী সুরবালা দেবীর ভালবাসা ও মায়া-মমতা পাইয়া তাহার হৃদয় গলিয়া গেল। এমন জিনিসের আস্বাদ সে জীবনে কখনও পায় নাই-মরুভূমির মাঝখানেও যে মনে থাকিতে পারে, সে কল্পনাও করে নাই—পাষাণের বুক চিরিয়াও যে অমৃত নিঝরিণী প্রবাহিত হইতে পারে, সে পূর্বে কখনও অনুমান করে নাই। শঙ্করের হৃদয় যথার্থই গলিয়া গেলে বালাকে মা বলিয়া ডাকিতে পাইয়া চির জীবনের অভাব সুদে আসলে পােবাইয়া লইল। সুরবালার প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করিল, শৈবলিনী। মত সেই শিশুটাকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া শঙ্করের বুক জুড়াইয়া গেল। সে জীবনে কাহারও ভালবাসা পায় নাই, কাহাকেও ভালবাসিতে শেখে নাই। সিমলার পাহাড়ে আসিয়া সে যথার্থই যেন ভালবাসার স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করিয়া বসিল। স্থান সুন্দর—আয় সুন্দর—অধিবাসীরা সুন্দর শঙ্কর যে দিকে তাকায় সেইদিকেই সৌন্দর্যের একাধিপত্য। সেই সৌন্দর্যের সাগরে ডুবিয়া সুন্দরী শৈবলিনীকে বুকে ধরিয়া অসুন্দর শঙ্করের মনে-প্রাণেও যেন সৌন্দর্য ফুটিয়া উঠিয়াছিল—শঙ্কর মুখ হইয়াছিল। শঙ্কর হেমবাবুর সদয় ব্যবহারে সন্তুষ্ট হইয়াছিল—সুরবালার স্নেহে মুগ্ধ হইয়াছিল কিন্তু সে সর্বাপেক্ষা ভালবাসিয়াছিল, শৈবলিনীকে সে যেন ছিল তাহার বুকের রক্ত। আজ শৈবলিনী শশুরালয়েশঙ্করের হৃদয় শৈবলিনীর বিরহে বড় কাতর হইয়াছিল। সুরবালা পরলােকে গমন করিলেও বােধ হয় সে এত কাতর হয় নাই। কিন্তু উপায় নাই, শঙ্কর বুঝিয়াছিল, শৈবলিনীর বিরহ-বেদনা তাহাকে অম্লানবদনে সহ করিতেই হইবে। কাজেই শঙ্কর বুক বাঁধিয়াছিল, শৈবলিনীর আদেশ পালনের জন্য প্রাণপণে পরিশ্রম করিতেছিল। হেমবাবুর জ্যেষ্ঠ পুত্র বালক সন্তোষকুমার বড় দুরন্ত ছিল—তাহাকে আঁটিয়া ওঠা শঙ্করের দায় হইয়াছিল। মাঝে মাঝে সে শঙ্করকে এত বিরক্ত করিয়া তুলিত যে তাহার ইচ্ছা হইত, বিরাশি সিকার চপেটাঘাত চালাইয়া তাহাকে ঠাণ্ডা করিয়া দেয়। অমনি শৈবলিনীর অনুরােধ মনে পড়িত, শঙ্কর নিজেই ঠাণ্ডা হইয়া যাইত, নখের আঁচড়টা পর্যন্ত তাহার অঙ্গে পড়িত না। হেমবাবু নিজেও বালক-বালিকাগণকে শাসনে রাখিবার অবসর পাইতেন নাপাইলেও সেই মাতৃহীনা শিশুগণের মুখের দিকে তাকাইয়া তাহার হৃদয় করুণায় গলিয়া যাইত কাজেই তাহাদের শত অপরাধ বরদাস্ত হইয়া যাইত দিন দিন তাহারাও অত্যন্ত উচ্ছল হইয়া উঠিতেছিল। * সহসা একদিন হেমবাবু শঙ্করকে বলিলেন, শঙ্কর! ছেলে মেয়েগুলােকে একটু শাসনে রেখাে-ওরা যে অধঃপাতে যেতে বসেছে ? শঙ্কর হেমবাবুর মুখের দিকে কাতর দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বলিল, কি করবাে বাবু! ওরা যে মা-হারা ? হেমবাবু বলিলেন, মা-হারা বলে ওদের মাথা খাওয়ার ব্যবস্থা করা ত ভাল নয় ? শঙ্কর বিরক্ত হইয়া উঠিয়া বলিল, ওরা ত আপনার কাছে কখনও দুরন্তপনা করে না—ওদের যা কিছু উপদ্রব আমার কাছে। আমি ত নীরবে সব সহ্ করি। হেমবাবু বলিলেন, তুমি সহ কর বটে কিন্তু অত্যন্ত প্ৰয়ে ওদের যে ইহকাল পরকাল ঝঝরে হয়ে উঠছে। শঙ্কর রাগিয়া বলিল, ওরা দুষ্ট বলে আপনি কি বলেন, ওদের পিছনে গুণ্ডা লাগিয়ে দেব? আমি ওদের গায়ে একটা নখের আঁচড়ও দিতে পারব না, অন্য কেউ যদি ওদের গায়ে হাত দেয়, তাও সহ্য করতে পারবে না, তাতে ওদের পরিণাম যা হয়—তাই হবে। হেমবাবু বলিলেন, বেশ! তাই হক, কিন্তু মনে রেখাে, দুদিন পরে তােমাকেই আগে এর ফল ভােগ করতে হবে। “হয়-হবে।” বলিয়াই শঙ্কর রাগে গৰু গৰু করিয়া চলিয়া গেল।

( ১ ) দু’দিন যাইতে না যাইতেই শঙ্কর হাতে হাতে ফল পাইল। বালক সন্তোষ অবাধ্যতার চরম সীমায় উপস্থিত হইল। তাহার অশিষ্ট ব্যবহারে পথের লােক পর্যন্ত বিরক্ত হইয়া উঠিল। অনেকের অভিযােগ হেমবাবুর কর্ণগােচর হইতে লাগিল, তিনিও মনে মনে বিরক্ত হইতে লাগিলেন, কিন্তু শঙ্করকে মুখ ফুটিয়া আর কোন কথা বলিলেন না। বালক পাখী মারিবার উদ্দেশ্যে একখানি বড় পাথরের চিল । নিক্ষেপ করিতেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া নিক্ষিপ্ত শিলাখণ্ড অদূরে কর্মনিরত শঙ্করের কপালে সবলে পতিত হইল-শঙ্করের কপাল কাটিয়া দর দর ধারার শােণিতপাত হইতে লাগিল-সে অব্যক্ত চিৎকার করিয়া মাটিতে বসিয়া পড়িল। বালক নিজের অপরাধ বুঝিতে পারিল—তাহার মুখ কাইয়া গেল—নিতান্ত অপরাধীর মত সে ধীরপদে শঙ্করের সন্নিকটে উপস্থিত হইয়া বিষয়বদনে তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া রহিল। শঙ্কর অত্যন্ত আঘাত পাইয়াছিল-বেদনায় তাহার কপাল ফাটি যাইতেছিল কিন্তু বালকের বিষয় মুখ দেখিয়া অন্তরের ভাব গােপন করি পূজার ৩ মুখে হাসি ফুটাইবার চেষ্টা করিল। অদূরে বসিয়া হেমবাবু নিজের চকে সে দৃশ্য দেখিতে পাইলেন—ক্রোধে তাঁহার সর্বশরীর আলিয়া উঠিল। তিনি ধৈৰ্যহারা হইয়া একখানি বেত হাতে করিয়া তীরবেগে বাহিরে ছুটিয়া আসিলেন এবং বালকের পশ্চাতে আসিয়া তাহার পৃষ্ঠোপরি সবলে বেও চালনা করিলেন। কটাক্ষ-মধ্যে শঙ্কর বালকের বিপদ বুঝিতে পারিল সে নিজের ব্যথা ভুলিয়া গিয়া বিদ্যুতের ন্যায় ক্ষিপ্রগতিতে বালকের হাত ধরিয়া টানিয়া নিজের বুকের মধ্যে টানিয়া লইল। হেমবাবুর বেত্রাঘাত ব্যর্থ হইল না—সবলে ব্যথিত শঙ্করের পৃষ্ঠদেশে পতিত হইল। “উ গেলাম গাে! বলিয়াই শঙ্কর পিঠ বাঁকাইয়া মুখ বিকৃত করিয়া মাথা নীচু করিয়া বসিয়া পড়িল। হেমবাবু স্তম্ভিত হইলেন—কি করিতে গিয়া কি করিয়া বসিলেন— পুত্রকে শাসন করিতে গিয়া নির্দোষ নিরপরাধ প্রভুভক্ত ভৃত্যকে অকারণে প্রহার করিয়া বসিলেন। প্রহার সামান্য হয় নাই। অত্যন্ত ক্রোধের বশে যে বেত্রাঘাত তিনি করিয়াছিলেন, বালক সন্তোষের কোমল পৃষ্ঠে সে আঘাত পতিত হইলে অস্ত্রাঘাতের ন্যায় ক্রিয়া প্রকাশ করিতে কটি করিত না কিন্তু শঙ্করের কঠিন গাত্রচর্ম ভেদ করিয়া রক্তস্রাব না করিলেও অবিলম্বে তাহার পিঠ ফুলিয়া উঠিল। একে কপালের আঘাতে সে যাতনা পাইতেছিল, সে জালা জুড়াইতে না জুড়াইতেই পৃষ্ঠোপরি দারুণ আঘাত পড়িল। যন্ত্রণায় শঙ্করের চোখ ফাটিয়া অঞ নির্গত হইবার উপক্ৰম করিল-শঙ্কর কষ্টে আত্মসংবরণ করিয়া হেমবাবুর মুখের দিকে তাকাইয়া জলভরা মেঘে দামিনী বিকাশের মত মুখে হাসি বাহির করিয়া বলিল, বড় বাচায়েছি ভাইকে আমার। বাবু! আপনার বড় অন্যায়- কেন আমার ভাইকে মারতে ছুটে এলেন? ৭৩ পূজার তত্ত্ব হেমবাবু ক্রোধে লজ্জায় ক্ষোভে অভিভূত হইয়া এতক্ষণ স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া ছিলেন—তাঁহার হাতের বেত খসিয়া ভূতলে পড়িয়াছিল। কিছুক্ষণ পরে তিনি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন, শঙ্কর। শঙ্কর ব্যথার জ্বালা চাপিয়া রাখিয়া বলিল, কি বাবু। হেমবাবু বলিলেন, আজ থেকে তােমাকে আমার বাড়ীর চাকরী হ’তে জবাব দিলাম। তােমার পাওনা টাকা কড়ি বুঝে নিয়ে আমার বাড়ী ত্যাগ করে চলে যাও। শঙ্কর অবাক হইয়া হেমবাবুর মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। হেমবাবুর কথার অর্থ সে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিল না। বিষন্ন বিশুষ্ক মুখে শঙ্কর বলিল, আমার অপরাধ কি বাবু? হেমবাবু বলিলেন, অপরাধ যথেষ্ট। তুমি আমাদের অনেক করেছ, তার কৃতজ্ঞতার চিহ্র পুত্র একে দিয়েছে, তােমার কপালে—আর তার নরাধম পিতা আমি এঁকে দিলাম, তােমার পৃষ্ঠে। এখন যাও শঙ্কর। এই পুরস্কার বহন করে জগতের সম্মুখে গিয়ে দাড়াও—আমি যে কত বড় ভদ্র আর তুমি কেমন অভদ্র আজ বিচার হয়ে যাক। শঙ্কর উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, অনিচ্ছায় অজ্ঞাতে যে কাজটা হয়ে গেল, আপনি তার জন্য এত অধীর হচ্ছেন কেন? হেমবাবু বলিলেন, না শঙ্কর! আর তােমাকে আমি রাখব না- পদে পদে আর তােমাকে এমনভাবে নির্যাতন করবাে না। পরের ছেলে তুমি কিন্তু আমার বিশ্বাস, আমার নিজের ছেলেও বােধ হয় এতটা অত্যাচার নীরবে সহ্ন করুততা না। শঙ্কর! বিদায় নাও। “কোথায় যাব ?” “যেখানে ইচ্ছা।” ৭।

পূজার ভ “ত্রিসংসারে যে আমার স্থান নাই বাবু।” হেমবাবু বলিলেন, ভগবানের রাজ্যে যদি পুণ্যের পুরষ্কার থাকে, তােমার স্থানের অভাব হবে না শঙ্কর। অমনি শঙ্কর ঘাড় বাঁকাইয়া গৰ্জন করিয়া বলিল, বাবু! আমি কি পুণ্যের পুরষ্কারের লােভে আপনাদের এতকাল সেবা করেছি ? মুর্থ আমি-ইতর আমি—পাপ-পুণ্যের ধার ধারি না। এককালে আপনার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক ছিল না কিন্তু কেন যে এতকাল আমি আপনাদের প্রাণভরে সেবা করেছি, জানেন? অমনি শঙ্কর সজলনয়নে উর্ধদিকে তাকাইয়া কাতরকণ্ঠে বলিল, মা আমার ! কোথায় আছ তুমি ? শৈবলিনি! দিদি আমার—একবার এসে আমাকে দেখে যাও। শঙ্কর বালকের ন্যায় নােদন করিতে লাগিল। তখন হেমবাবু স্নৈহভরে শঙ্করের চোখের জল মুছাইয়া দিয়া তাহার হাত ধরিয়া কক্ষ-মধ্যে টানিয়া লইয়া গেলেন। প্রভুভক্ত ভৃত্য শয্যায় মুখ খুঁজিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিতে লাগিল। হেমবাবু তাহার গায়ে হাত বুলাইয়া দিয়া নিজেও চোখের জলে বুক ভাসাইতে লাগিলেন।

( ১৯ )
তার পর কিছুদিন গত হইল। একদিন হেমবাবু শয্যায় শয়ন করিয়া
আছেন। হাতের কাজ সারিয়া হেমবাবুর পায়ের কাছে বসিয়া শঙ্কর কাতর
কণ্ঠে বলিল, বাবু! দিদিমণির কোন চিঠি-পত্র পেয়েছেন?
হেমবাবু বলিলেন, না শঙ্কর। এত দিন হয়ে গেল সে ত একখানাও
পত্র লেখে না।
শঙ্কর যেন ক্রন্দনের পরেই বলিল, কেন লেখে না? দিদিমণির জন্য
আমার প্রাণ যেন থেকে থেকে কেঁদে ওঠে। কেন এমন হয় বাবু?
হেমবাবু শঙ্করকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, তুমি তাকে বড় ভালবাস,
তাই তার অদর্শনে কাতর হয়ে পড়েছ।
“চিঠি লেখে না কেন?”
“কুলবধু সেহয়ত সেখানে চিঠি লেখবার সুযােগ পায় না।”
শঙ্কর বলিল, যদি অনুমতি দেন, আমি ছুটে গিয়ে একবার আমার
দিদিমণিকে চোখে দেখে আসি।
হেমবাৰু বলিলেন, পাগল! সে কি এখানে।
এখানে। যেতে আতে কত
টাকা ব্যয় হয়ে যাবে।

পূজার তত্ত্ব
শঙ্কর বলিল, যায় যাবে টাকার ভাবনা কি। এখনও আমার
তহবিলে অনেক টাকা আছে।
হেমবাবু বলিলেন, মিছামিছি এতদূর ছুটোছুট করে’ কাজ কি পাগল।
আমি আজই বেহাইকে পত্র দিচ্ছি।
শঙ্কর বলিল, এত দিন কি তাদের কোন পত্র দেন নি ?
মাথা নীচু করিয়া হেমবাবু বলিলেন, না।
“কেন?”
“তারা আমার সঙ্গে যে কি ব্যবহার করেছে, তা কি তােমার মনে
নাই শঙ্কর ?
শঙ্কর বলিল, তারা যেরূপ ব্যবহার করুক না কেন, সেখানে যে আমার
দিদিমণি আছে। মান অভিমান করলে আমার দিদিমণির উপায় কি
হবে?
হেমবাবু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন, বেশ! আর আমি
কোন অভিমান করব না—তারা যদি আমাকে পায়ের তলায় মাড়িয়ে
ৰায়, তবুও কোন কথা বলবাে না। আমি আজই পত্র লিখছি,
অধীর হয়াে না শঙ্কর !
সেইদিবসই হেমবাবু বেহাই নফচকে পত্র লিখিলেন।
হভরে নিজেই ডাকঘরে পত্র দিয়া আসিল। পরদিবসই শঙ্কর হেমবাবুকে
জিজ্ঞাসা করিল, বাবু! পত্রের উত্তর এসেছে?
হেমবাবু হাসিয়া বলিলেন, তুমি পাগল হলে নাকি! কাল পত্র
দিয়েছি, আজ সে পত্র এখনও তাদের হস্তগত হয়নি, উত্তর দেবে কি করে?
“কবে উত্তর আসবে?”
“পত্র পেয়েই যদি উত্তর দেয়, দুই তিন দিন দেরী হবে।”
তুমি

সে দুই তিন পূর্ণ হইতে না হইতেই শঙ্কর হেমবাবুকে দশ বার তাগিদ করিয়া বসিল। পত্র যথাসময়ে পটলডাঙ্গায় পৌছিয়াছিল এবং তাহা হরসুন্দরীর হস্তগত হইলেই সে ঘৃণাভরে খণ্ড বিখণ্ড করিয়া দূরে নিক্ষেপ করিয়াছিল। হেমবাবু মনে মনে বড় দুঃখ অনুভব করিলেন, কিন্তু শঙ্করের অধীরতা দেখিয়া তিনি মনের ভাব গােপন করিয়া শঙ্করের অত্যন্ত তাগাদায় বিরক্ত হইয়া তাহাকে জানাইলেন, পত্রের উত্তর আসিয়াছে, শৈবলিনী ভাল আছে। হেমবাবু মিথ্যা কথা বলিলেন। কিন্তু শঙ্কর সে কথায় সন্তুষ্ট হইল না। সে বলিল, পত্র দেখি ? হেমবাবু বলিলেন, পত্র দেখে তুমি কি করবে? তুমি ত লেখাপড়া জান না? শঙ্কর বলিল, না জানি, তবুও আমি চিঠিখানা দেখবাে। বিরক্ত ভাবে হেমবাবু বলিলেন, আফিসের ঠিকানায় পত্র এসেছিল- আমি আফিসে ফেলে এসেছি। . শঙ্কর বলিল, কাল পত্ৰখানা আবেনভুলবেন না ত? হেমবাবুরুলিলেন, না ভুলবাে না। তিনি মনে মনে ভাবিলেন, এ পাগলকে বুঝাই কি করে ? পরদিন তিনি আকিল হইতে বাসায় আসিতেই শর প্রথমেই জিজ্ঞাসা করিল, বাবু! চিঠি কই ? শঙ্কর তৃষিত চাতকের মত সেই চিঠির আশায় পথ তাকাইয়া বসিয়াছিল। উপায়ন্তর রহিত হইয়া হেমবাবু শঙ্করকে প্রতারণা করিলেন। তাঁহার জামার পকেটে কোন বন্ধু প্রদত্ত ইংরাজিতে লেখা একখানা পত্র ছিল। হেমবার সেই পত্র বাহির করিয়া শরের হাতে দিলেন। ৭.

GAR BH'WA.'ll
CHITRASENPUR. HOWP.PL
পূজার তত্ত্ব
শঙ্কর যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাইল—তাহার দুই চক্ষু হইতে অশ্রু
ঝরিয়া পড়িল। সে পত্ৰখানা বুকে ধরিয়া পাগলের মত নৃত্য করিতে
লাগিল। সেই দৃশ্য দেখিয়া হেমবাবু অশ্রু সংবরণ করিতে পারিলেন না।
তিনি দ্রুতপদে কক্ষ-মধ্যে চলিয়া গেলেন।
হেমবাবু কোন দিনই
পটলডাঙ্গার কোন চিঠি-পত্র পাইলেন না কিন্তু মাঝে মাঝে শঙ্করকে
যাহা হয় একখানা পত্র দেখাইয়া শান্ত করিয়া রাখিলেন। এইভাবে
সিমলার পাহাড়ে তাহাদের দিন কাটিতে লাগিল।
{{ " C. 6 LIBRARY
[:. 1999
P, ০,

বাড়ীশুদ্ধ লােক শৈবলিনীর সহিত বাক্যালাপ বন্ধ করিয়াছে- হরসুন্দরী দিন রাত্রি তাহাকে গালি-গালাজ করিতেছে কিন্তু এ শাস্তিতেও ঘােষ-গৃহিণীর মনস্কামনা পূর্ণ হইল না। হরসুন্দরী ভাবিল, এ অতি সামান্য শাস্তিঘরের ভিতর দিন রাত্রি বসে থাকবে, রাণীর হালে খাবে পরবে, তাতে ও অভাগার বেটার কি এত ক্ষতি বৃদ্ধি হবে? কাজেই আবার মূতন শাস্তির বিধি-ব্যবস্থা হইল। হরসুন্দরী শৈবলিনীকে শুনাইয়া ক্ষ্যান্ত দাসীকে ডাকিয়া বলিল, ও ক্ষ্যান্ত! ঘােটলােকের মেয়ে দিন রাত্রি ঘরের কোণে বসে থাকবে, কোন কাজ-কর্ম করবে না, এ ত আমার বরদাস্ত হবে না। ওকে তাের কাজ দে না ? ক্ষ্যান্ত বলিল, আপনাদের রাজার সংসারে কাজ করবার লােকের ত অভাব নেই। বউমাকে আমরা কি কাজ দেব? হরসুন্দরী বলিল, ও হ’ল ঘােটলােকের মেয়ে-ঘােটলােকের মত কাজ ওকে দেবসে বসে কেন খাবে সে? ০ পূজার ক্ষ্যান্ত বলিল, আপনি বলে দিন বউমাকে কি কাজ কতে দেব । হরীর হুকুম হইল, আজ হ’তে বাসন মাজা, জল ভােলা, ঘর দোর পরিষ্কার করার কাজ ও ঘােটললাকের মেয়েকে করতে হবে। ক্ষ্যান্ত চমকিত হইয়া বলিল, বলেন কি। বড় ঘরের বউ হয়ে আপনার সংসারে নুতন বউমা দাসী-গিরি করবেন ? হরসুন্দরী বিদ্রুপের হাত করিয়া বলিল, ও অভাগী দাসীর যােগ্য নয়। তােদর তবু একটা জাত-জন্ম আছে, হাতের ছোয়া জল লােকে খায় কিন্তু অই মুফরাসের মেয়ের হাতের জল কে খাবে বলত? কাজেই ওকে বাইরের কাজ-কর্ম করতে হবে- দরকার হলে ধাঙ্গড় মেথরের কাজও ওর ঘাড়ে পড়বে। ক্ষ্যান্ত দাসী অবাক হইয়া রহিল। এতটুকু বালিকার উপর এত অত্যাচার সে যে দাসী হইয়াও কল্পনা করিতে পারে না। রুষ্টভাবে ক্ষ্যান্ত বলিল, এ আপনার অত্যন্ত বাড়াবাড়ি দেখছি না। দাসীর মুখে জবাব শুনিয়া হরসুন্দরী ক্রোধভরে বলিল, বাড়াবাড়ি কমামি বুঝিনে ক্ষ্যান্তি! আমি বা হুকুম করবো, নতমস্তকে সকলকে পালন কতে হবে। যার না পােষাবে, সে পথ দেখতে পারে। বলিয়াই হরসুন্দরী অন্যত্র প্রস্থান করিল। ক্ষ্যান্ত দাসীর হৃদয়েও আজ বিদ্রোহের আগুন জ্বলিয়া উঠিয়াছিল— সে মনে করিল, যখন গতর খাটাইয়া খাইতে হইবে, তখন পথ দেখার ভয় কি আছে। কিন্তু সে তখনই পথ দেখিয়া লইতে পারিল না, কেন না, নুতন বউএর উপর অত্যাচারটা কতদূর গিয়া দাঁড়ায়, তাহাই সে দেখিবার জন্য ঘােফগিন্নীর তেজ দন্ত সহ করিয়াই সেখানে পড়িয়া রহিল।

রসুরীর আদেশ শৈবলিনীর কর্ণগােচর হইয়াছিল—সে আদেশ শুনিয়া সে মর্মাহত হইয়া চোখের জলে বুক ভাসাইতেছিল। বাবুর আদরের কন্যা সে-যথাসর্বস্ব খােয়াইয়া তাহার পিতা বড় ঘরে তাহার বিবাহ দিয়াছেন। তাহার পরিনাম এই ঘটিল। আজ তাহাকে বড় ঘরের দোরে দাসী-গিরি করিতে হইবে। কিন্তু উপায় কি আছে? ঘাে-গিন্নীর আদেশ তাহাকে মাথায় পাতিয়া লইতে হইবে। শৈবলিনী উঠিল—একখানি মলিন বসন পরিধান করিয়া নিয়তলে নামিয়া গেল। রান্নাঘরের বারাণ্ডার উপর বাসনের বােন্ধ ছিল। বালিকা দুই হন্তে আঁকড়াইয়া ধরিয়া কলতলায় গিয়া নামাইল। দাসীরা চাইয়া উঠিল—পরস্পরে মুখের দিকে চাহিতে লাগিল। রাজরাণী হইয়া আজ চাকরাণীর দলে মিশিয়া কাজ-কর্ম করিবে, এ বড় অত্যাচারের কথা। কিন্তু কে তাহার প্রতিবাদ করিবে ? দুঃখে ক্ষোভে দাসীদের বুক ফাটিয়া যাইবার উপক্রম করিল—তাহাদের চক্ষু হইতে অশ্রু ঝরিয়া পড়িল। সকল দাসী মাথা নীচু করিয়া দাড়াইয়া রহিল, কেহই শৈবলিনীকে বাধা দিতে পারিল না—তাহার হাতের কাজ কাড়িয়া লইতে সাহস করিল না। কিন্তু ক্ষ্যান্ত দাসী স্থির থাকিতে পারিল না। ভাবিল, যদি চাকরী ছাড়িতে হয়, সেও স্বীকার কিন্তু চোখের উপর শৈবলিনীকে কিছুতেই এ ঘৃণিত কাজ করিতে দিবে না। ক্ষ্যান্ত ছুটিয়া কলতলায় গেল—বাসনের বােৰা তুলিয়া লইয়া দূরে সরিয়া গিয়া নিজেই বাসন মালিতে লাগিল। দাসী হইলেও ক্যান্ত কায়রে কন্যা-জল ভােলা, বাসন মাজা প্রভৃতি ছােট কাজ সে সে কখনও করিত না। আজ যদি শৈবলিনীকেই সে কাজ করিতে হয়, তবে তাহার করিতেই বা আপত্তি কি? ক্ষ্যন্ত মাথা নীচু করিয়া বাসন আগলাইয়া বসিয়া কাজ করিতে লাগিল। শৈবলিনী নীরবে গড়াইয়া রহিল। দূরে বিতলের রেলিং ধরিয়া দাড়াইয়া ছিল—যুবক প্রকাশচন্দ্র। সে স্বচক্ষে তাহার পত্নীর দুরবস্থা দেখিল—যুবকের বুক ফাটিয়া গেল- তাহার চক্ষে জল আসিল। কিন্তু যুবক কোন কথা বলিল না শুদ্ধ একটা দীর্ঘ নিঃশাস ত্যাগ করিয়া ধীরপদে অন্যত্র প্রদান করিল।

( ২১)
দ্বিতলের বারাণ্ডায় দাড়াইয়া কলতলার দিকে তাকাইয়া হরসুন্দরী
গর্জন করিয়া বলিল, ক্যাপ্তি। বড় দরদী হয়েছিস, দেখছি।
ক্ষ্যান্ত মাথা তুলিয়া বলিল, দরদের কথা কিছু নয় মা। যার কাজ
তারই সাজে। আমরা থাকতে বউমা এ কাজ করবেন, চোখে
দেখতে পারবাে না।
হরসুন্দরী ক্রোধভরে বলিল, বটে। দিন দিন তাের স্পর্ধা বড়
বেড়ে গেছে দেখছি। তুই আমার হুকুম অমান্য করতে সাহস
করিস?
ক্ষ্যান্ত বলিল, হুকুম অমান্য কছি না মা। তবে আমরা থাকতে
যদি বউমা এই সব নােক কাজে হাত দেন, লজায় আমাদের
মাথা কাটা যায়। আপনি বউমার উপর হকুম করেছিলেন, তিনি
আপনার হুকুম আয় করেছেন। তবে আপনি রাগ কছেন
০

পূজার ক্যান্ত দাসীর উপর অন্তরে অন্তরে কষ্ট হইলেও হরসুন্দরী আর কোন উত্তর না দিয়া অন্যত্র চলিয়া গেল। দাসী হইলেও হরসুন্দরী তাহাকে একটু ভয় করিয়া চলিত—তাহার একটু দোষ ত্রুটি হইলেও মার্জনা করিয়া লইত। তাহার কারণ, প্রথমত সে জাতির কন্যা- দ্বিতীয়তঃ সে বিশ্বস্ত ও কনিষ্ঠা—তৃতীয়তঃ সে এককালে তাহার পর শক্ত বােস-গিল্পীর খাস চাকরাণী ছিল, অনেক চেষ্টায় তাহাকে ফুলসাইয়া আনিয়াছিল। যদি আজ সে রাগের বশে চাকরী ছাড়িয়া চলিয়া যায়, তাহা হইলে আবার সে বােসেদের বাড়ী চুকিয়া বসিবে তাহার ঘরের অনেক গলদ বােস-গিমীকে জানাইয়া দিবে। কাজেই মানের দায়ে হরসুন্দরী ক্ষ্যান্ত দাসরীর অবাধ্যতাও সহ করিয়া যাইত। শৈবলিনী এতক্ষণ কলতলায় চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। হরসুন্দরী চলিয়া গেলে, শৈবলিনী দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া মৃদুস্বরে বলিল, ক্যান্ত! কেন আমার মান রক্ষার জন্য চেষ্টা কছ ? আমি বুঝতে পারছি, আমার পিতার কটিতেই আজ আমার উপর এ কঠোর শান্তির ব্যবস্থা হয়েছে। তুমি সরে যাও ক্ষ্যান্ত! আমাকে অই হীন কাজ কতে দাও—আমার বাবার পাপের শান্তি আমাকেই গ্রহণ করতে দাও। ক্ষ্যান্ত কোন উত্তর দিল না—সে মাথা নীচু করিয়াই কাজ করিতে লাগিল। একবার সে মাথা তুলিয়া করুণ দৃষ্টিতে শৈবলিনীর মুখের দিকে তাকাইল। শৈবলিনী দেখিল, কান্ত দাসীর দুই চক্ষু হইতে টপ, টপ, করিয়া অশ্রু ঝরিয়া পড়িতেছে। হায় রে! দাসীর বুকেও দয়া আছে, মায়া-মমতা আছে কি ঘােষগিল্পীর বুকখানা কি পাষাণের চেয়েও শক্ত? শৈবলিনীর উপর ৫ এ অত্যাচার শুদ্ধ তাহার পিতাকেই অপমান করিবার জন্য, শৈবলিনী আহা বেশ বুঝিতে পারিয়াছিল। সে বালিকা-বাঙ্গালীর ঘরের কুলবধূ-প্রতিবাদ করিবার শক্তি তাহার ছিল না—তাহার আত্ম- সম্মানে এত বড় আঘাত লাগিল, তবু সে খাশুড়ীর আদেশ অমান্য করিতে সাহস করিল না। শৈবলিনী জানিত, যদি সে ঘাড় বাঁকাইয়া জোর করিয়া দাঁড়ায়, তাহা হইলে তাহার শ্বাশুড়ীর এমন সাধ্য হইবে , যে তাহার দ্বারা এমন হীন কাজ করাইয়া লয়। কিন্তু সে তাহা করিল না—শাশুড়ীর অবাধ্য সে হইল না। তার কারণ, সে ভাবিয়াছিল, নিজে অপমানের বােঝা মাথায় পাতিয়া লইয়া তাহার পিতার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবে। দীন বেশে শৈবলিনী দাসী-মহলে দাঁড়াইয়া আছে, উপর হইতে সুরমা লক্ষ্য করিল। সুরমার ইচ্ছা হইল, নিম্নতলে ছুটিয়া গিয়া শৈবলিনীর হাত ধরিয়া উপরে টানিয়া আনে কিন্তু ক্ষ্যান্ত দাসীর মত প্রকাশ্যভাবে শ্বাশুড়ীর বিরুদ্ধাচরণ করিতে তাহার সাহস হইল না। যেইমাত্র শৈবলিনী মুখ তুলিয়া তাহার দিকে লক্ষ্য করিল, অমনি সুরমা তাহাকে উপরে উঠিয়া আসিবার ইঙ্গিত করিল। শৈবলিনী ধীর পদবিকেপে উপরে উঠিবার সিড়ির দিকে অগ্রসর হইল। হরসুন্দরী উপর হইতে তাহা লক্ষ্য করিয়া গৰ্জন করিয়া বলিল, নবাবীয়ানায় চলবে না-আমার হুকুম শুনতেই হবে। ছােট লােকের মেয়ে ছােটলােকের মতই থাকবে। জল তুলে এনে ওর নিজের ঘর দোর ওকে নিজেই পরিষ্কার কতে হবে। শৈবলিনীর কান জলিয়া গেল—স আর স্থির থাকিতে পারিল না। কাহারও বাধা-বিপত্তি নিল না—সে ছুটিয়া গিয়া এক বালতি জল পূজার তত্ত্ব লইয়া সিড়ি বহিয়া উপরে উঠিতে গেল। অপমানে অভিমানে তাহার হৃদয় ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। কয়দিন হইতে তাহার অল্প অল্প আর হইতেছিল—শরীর দুর্বল হইয়াছিল—তাহার মাথা ঘুরিতেছিল। জল পড়িয়া সিড়ির পথ ভিজিয়া গিয়াছিল-জলের ভার লইয়া উপরে উঠিতে গিয়াই তাহার পা পিছলাইয়া গেল, অমনি সে সিঁড়ির উপর পড়িয়া গিয়াই অজ্ঞান হইয়া পড়িল। দাসীরা হায় হায় করিয়া উঠিল—সুরমা পৰ্যন্ত ছুটিয়া আসিল- হরসুন্দরীর কন্যা উষারাণীও নিকটে আসিয়া দাঁড়াইল। ঠিক সেই সময়ে ক্ষ্যান্ত দাসী ছুটিয়া আসিয়া শৈবলিনীকে কোলে তুলিয়া লইয়া উপরে উঠিয়া গেল। শৈবলিনীকে তাহার করু-মধ্যে লইয়া গিয়া শ্যার উপর শয়ন করাইয়া তাহার পাৰে বসিয়া সেবা করিতে লাগিল। হরসুন্দরী কক্ষ-দ্বারে গড়াইয়া বাঘিনীর মত তাহার দিকে চাহিয়া চোখ ‘পাকাইতে লাগিল।

( ২২ )
বউএর ভারি জ্বর হয়েছে—বিছানায় পড়ে ছটফট করছে।”
বেলা সাড়ে চারিটার সময় ক্ষ্যান্ত দাসী এই অভূতপৰ্ব সংবাদটী
কর্তা-গৃহিণীর কর্ণগােচর করিল। সংবাদ শুনিয়া বৃদ্ধ নফচত্রের
হস্তস্থিত আলবােলার নল ভূতলে পড়িয়া গেল। কর্তা অত্যন্ত
ব্যস্তভাবে বলিল, যা! বলি কিরে! নূতন বউমার জ্বর হয়েছে।
কৰে হ’ল ?
ক্যাস্ত বলিল, আজ জানতে পেরেছি বাবু! তিন চার দিন আগে
থেকেই বােধ হয় একটু একটু এর হত—আজ জল তুলতে পড়ে
গিয়ে অজ্ঞান হয়েছিল, তারপরই জরটা বড় বেশি হয়েছে।
নফরচন্দ্র বিস্ময়ভরে বলিল, আমার বউমা জল তুলতে গিয়েছিল
কেন?
দাসী মাথা নীচু করিয়া বলিল, গিমী মার হুকুম হয়েছিল।
নফরচন্দ্র বলিল, তিন চারি দিন আগে থেকেই যদি অসুখ হয়ে
থাকে, তােরা ভাল করে সন্ধান নিসনি কেন? তাকে জল তুলতেই
বা দিলি কেন?
দাসী বৰিল, জর হয়েছিল, কার কাছে সন্ধান নেব? নূতন
-

পূজার ৩
বউএর সঙ্গে কথা বলা, তার কাছে যাওয়া পর্যন্ত যে বন্ধ। বলিয়াই
ক্ষ্যান্ত দাসী চলিয়া গেল।
নফচত্র অত্যন্ত ভীতভাবে বলিল, কি সর্বনাশ। একটা কচি
মেয়ে -তিন চারি দিন জ্বর হয়েছে। তার উপর জল তুলবার হুকুম
হয়েছে-পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়েছে-এখন জ্বরে ছট ফট করছে।
তার সঙ্গে কথা বলা—কাছে যাওয়া পর্যন্ত বন্ধ। গিন্নি! ব্যাপারখানা
কি বলত।
বিরক্তভাবে হরসুন্দরী বলিল, ব্যাপার আবার কি হবে—তুমি
চুপ করে থাক না। বউটা ভারি ‘এড়াটে। এই ঠাণ্ডার দিনেও
দু তিনবার স্নান করে। বােধ হয়, একটু সর্দি জ্বর হয়েছে।
কর্তা বলিল, ক্ষেরই হ’ক, পড়ে গিয়েছিল-ব্যথা পেয়েছে-
একটা ডাক্তার ডেকে দেখানাে ভাল।
গৃহিণী মুখ ঘুরাইয়া নথ নাড়া দিয়া বলিল, সর্দি জ্বরে ডাক্তার
দেখাতে হবে, তােমার এত টাকা কোথায় আছে? ও চামারের
মেয়েটা বাপের বাড়ী থেকে কি দু' পাঁচ হাজার এনেছে?
কর্তা বলিল, তা বলে কি ঘরের বউ বে-তদবিরে মারা যাবে?
অমনি হরসুন্দরী মুখ চাইয়া বলিল, সে ভাগ্যি আমার হ'ল
কই? ম'লে ত বঁাচতাম-ছেলের আবার বিয়ে দিতাম।
কর্তা বিরক্তভাবে বলিল, কি অলক্ষুণে কথা বলছ গিন্নি। পরের
মেয়ের উপর একটু মায়া-দয়া করতে নেই ?
ব্যঙ্গরে গৃহিণী বলিল, বড় দয়া মায়ার শরীর দেখছি, যেন
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির! চুপ করে থাক না! দু’দিন উপােস দিলেই
হর ছেড়ে যাবে।

এমন সময় ক্ষ্যান্ত দাসী আবার ছুটিয়া আসিয়া ভীতভাবে বলিল,
ও মা।
কি হবে গাে। বউমা যে আবােল তাবােল বকছে।
বলিয়াই দাসী ছুটিয়া চলিয়া গেল।
ভয়ে কৰ্ত্তার প্রাণ উড়িয়া গেল—ভীতভাবে বলিল, কি সর্বনাশ।
কর্তা উঠিয়া দাঁড়াইল।
হরসুন্দরী বলিল, বক্‌ছে তাতে হয়েছে কি? একটু বাতিক চড়ে
উঠেছে।
কর্তা হতভম্বার মত বলিল, অতটুকু মেয়ের বাতিক চড়ে গেল?
সােজা কথা নয় গিন্নি! চল—চলএকবার দেখে আসি। বলিয়াই
কর্তা গমনােস্থত হইল।
অমনি হরসুন্দরী কাকে টানিয়া ধরিয়া বলিল, পাগল হয়েছ ?
কোথায় যাবে-চুপ করে বসে থাক।
বিচলিতভাবে কৰ্ত্তা বলিল, চুপ করে থাকি কি করে গিন্নি।
ছেড়ে দাও, একবার আমার বউমাকে দেখে আসি।
ক্রুদ্ধভাবে হরসুন্দরী বলিল, তুমি আমার কথা শুনবে না?
গৃহিণীর চোখরাঙ্গানি দেখিয়া কৰ্ত্তা ঠাণ্ডা হইয়া গেল। অমনি
নরম সুরে বলিল, শুনবাে বই কি। তবে কিনা
হরসুন্দরী বাধা দিয়া বলিল, কিছু না কিছু না—তুমি ভেবােনা-
ও পােড়াকপালীর কোন অমঙ্গল হবে না। বলিয়া গৃহিণী কর্তাকে
জোর করিয়া আবার বসাইয়া দিল।
কর্তা আলবােলার নল হাতে লইয়া দুই একবার তামাক টানিয়া
বলিল, যাও না—তুমি নিজে গিয়েই না হয়, খবরটা নাও না।
গৃহিণী বলিল, কার কাছে যাব-কার খবর নেব? সর্বনাম

CHITRASTEFUE, HOV,
পূজার তত্ত্ব
আমার ঘরে এসে আমার জাত গেল, মান গেল, পরম শত্রুর কাছে
মাথা নীচু হয়ে গেল। আমি ওর মুখদর্শন করবে না।
“তাহলে উপায় কি হবে?
“কোন ভাবনা নেই-ও আপনিই সেরে উঠবে। ক্ষ্যান্তকে
বলে দিচ্ছি, যদি তেষ্টা পেয়ে হা করে, সে ওর গালে জল ঢেলে দেবে।
যদি ক্ষিধের কথা বলে, একটু বার্লি বেঁধে দেবে।”
কর্তা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল, গিন্নি! তুমি যা ভাল
বােঝ, তাই কর। তুমিই সব—আমি একটা সাইফার মাত্র।
কর্তা আফিঙের মৌতাতে ঝিমাইতে লাগিল—গৃহিণী কর্নার
কথা শুনিয়া তাহার পার্কে বসিল—যেন ভৈরবের পার্কে চামুণ্ডার
অধিষ্ঠান হইল।
LIBRAZY
its4
শ

( ২৩ ) প্রকাশচন্দ্র উচ্চশিক্ষিত যুবক। বি, এ, পাস করিয়া মেডিকেল কলেজে চতুর্থ বার্ষিক শ্রেণীতে পড়ে। সে দেখিতে সুন্দর পুরুষ সচ্চরিত্র সদালাপী—শান্ত শিষ্ট তার প্রকৃতি। মাতার নিষেধ সত্বেও বিবাহিত পত্নী শৈলিনীর সহিত গােপনে সাক্ষাৎ করিতে গিয়া সে দিন সে লাঞ্ছিত হইয়া যেমন দুঃখিত হইয়াছে, মনে মনে যথেষ্ট লজ্জাও অনুভব করিয়াছে। শৈবলিনীর উপর হরসুন্দরীর দুর্ব্যবহারে অনুকুলচন্দ্র ও তাহার পত্নী সুরমা অত্যন্ত ব্যথিত হইয়াছিল। অনুকুল- চন্দ্রই পত্নীর সহিত পরামর্শ করিয়া সঙ্গোপনে স্বামী-শ্রীর সম্মিলন ঘটাইয়াছিল। যি দ্বিপ্রহরে হরসুন্দরী যখন নিদ্রা যাইতেছিল, তখন সুরমাই কৌশল করিয়া দেবর প্রকাশচন্দ্রকে শৈবলিনীর কক্ষে গােপনে প্রবেশ করিবার সুযােগ করিয়া দিয়াছিল। কিন্তু যখন গগায়েন্দার তীক্ষ দৃষ্টি এড়াইতে না পারিয়া প্রকাশচন্দ্র ধরা পড়িয়া লাবিত হইল, তখন উদ্দেশ্য ব্যর্থ হইল দেখিয়া অনুকুল বিদ্রোহী হইয়া মাতার সহিত বচসা করিয়া নিজেও লাহিত হইল। ১২

( ২৪ )
অপরাহে কলেজ হইতে
ফিরিয়া আসিয়া প্রকাশচন্দ্র জলযােগের
র অন্তঃপুরে সুরমার কক্ষে প্রবেশ করিল। সুরমা খাদ্য দ্রব্য প্রদান
কারলে প্রকাশ বলিল, বউদি ! বড় লজ্জা হচ্ছে, সে দিন নূতন
বউএর ব্যাপার নিয়ে বাড়ীতে এমন একটা কাণ্ড ঘটে গেল। দাদা
কেন মার সঙ্গে ঝগড়া কতে গেলেন?
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া সুরমা বলিল, তার শাস্তির ব্যবস্থাও হয়ে
গেছে—রাম-বনবাসের আদেশ হয়েছে।
প্রকাশচন্দ্র হাস্য করিয়া বলিল, রামচন্দ্র বনবাসের পরিবর্তে পশুর
বাড়ী গিয়ে উঠে বসেছেন, বুঝতে পারছি। সীতাদেবীরও ত সজে
যাওয়া উচিত ছিল ? জুটি হ’ল কেন ?
সুরমা বলিল, শুদ্ধ একা সীতাদেবীর হয়নি—ভাই লক্ষণেরও ক্রটি
যথেষ্ট।
প্রকাশ বলিল, আমিও কি দাদার সঙ্গে সঙ্গে দাদার শ্বশুরবাড়ী
গিয়ে হাজির হব।
সুরমা বলিল, তাতে দোষ কি?
রামের অনুগত ভাই লক্ষণ
তুমি—অন্ততঃ তাঁর তল্লীদার হয়ে ত যেতে পারতে?

পূজার তত্ব
প্রকাশ বলিল, রামচন্দ্র যে তল্পী-তল্পা ফেলেই পালিয়ে গেছেন।
বলত, তােমাকে কাঁধে করে নিয়ে রামচন্দ্রের কাছে
আসি।
সুরমা হাসিয়া বলিল, না ভাই। আমি তােমার সঙ্গে যেতে
পাবো না।
প্রকাশ বলিল, কেন?
সুরমা বলিল, তুমি আমাকে রামচন্দ্রের কাছে নিয়ে যাবে কি
বালিকীর তপােবনে রেখে আসবে, কি করে বুঝবাে?
অমনি প্রকাশ ভঙ্গি করিয়া বলিল, কি আমাকে অবিশ্বাস ?
সুরমা বলিল, দেবর লক্ষণকে বিশ্বাস করেই ত সীতাদেবীর
সর্বনাশ ঘটেছিল। সেইজন্য দেবজাতির উপর স্ত্রীলােকের ঘােতর
অবিশ্বাস।
প্রকাশ বলিল, তুমি ক্ষেপে গেছ বউদি।
সুরমা বলিল, তোমার দাদা যখন ক্ষেপেছেন, তখন আমার
ক্ষেপতে দোষ কি?
প্রকাশ বলিল, আমার দাদা ক্ষেপেছেন কে বলে?
সুরমা বলিল, না পেলে কি কেউ বাপ মার সঙ্গে বিবাদ করে
বাড়ী ছেড়ে চলে যায় ? তােমার দাদার সব কাজেই বাড়াবাড়ি।
এখন আমাকে দিন রাত্রি তােমার মার কাছে মূখনাড়া সহ কতে
হবে- হয়ত ছােট বউএর মত দুর্দশাই আমার কপালে আছে।
ছোট বউএর নাম শুনিয়া প্রকাশচন্দ্র মাথা নীচু করিল—যুবকের
হৃদয়ে যেন একটা প্রবল বেদনা উপস্থিত হইল। কিছুক্ষণ পরে প্রকাশ
মাথা তুলিয়া বলিল, বউদি ! শৈবলিনী নেহাত ছেলেমানুষ—সামান্য
১:

পূজার একটা তত্ত্বের ব্যাপার নিয়ে মা তার উপর বড় অত্যাচার কছেন। তাকে দিয়ে দাসীর কাজও করানো হচ্ছে ? সুরমা দুঃখভরে বলিল, শ্রীলােকের উপর শত অত্যাচার হ'লেও তাদের মুখের দিকে তাকাতে সংসারে কেউ নাই ভাই! তােমার মত এমন বিদ্বান গুণবান স্বামী যার, তার যদি আজ এমনিভাবে অত্যাচার সহ্য করতে হয়, তবে ধিক্‌ আমাদের নারীজন্মে। কাতর দৃষ্টিতে সুরমার মুখের দিকে তাকাইয়া প্রকাশ বলিল, কিন্তু কি করবাে বউদি ? আমি যদি স্ত্রীর পক্ষপাতি হয়ে দাড়াই কথা সমাপ্ত হইতে না দিয়া সুরমা বলিল, তাহলে লােকে তােমাকে স্ত্রৈণ বলে গাল দেবে-লজ্জায় তােমার মাথা নীচু হবে, এই ভয় ত? কিন্তু মনে রেখাে, শ্বশুর-ঘরে স্ত্রীজাতির একমাত্র বল- ভরসা স্বামী। সামান্য একটা অপবাদের ভয়ে তুমি যদি তােমার চক্ষের সম্মুখে বিবাহিতা ধর্মপত্নীর উপর অত্যাচার হ’তে দাও, মাথার উপর ভগবান তােমাকে কি বলে আশীর্বাদ করবেন ? প্রকাশ আবার চিন্তিত হইল—আবার সে মাথা তুলিয়া বলিল, উপায় কি বউদি ? সুরমা বলিল, উপায় তুমি জান, আমি কি পরামর্শ দেব ভাই? প্রকাশ বলিল, আমি মনস্থ করেছি, শৈবলিনীকে সিমলার পাহাড়ে তার পিতার কাছে পাঠিয়ে দেব। সুরমা বলিল, যার সঙ্গে কথা বন্ধ করেছ-যাকে চোখে দেখলেও তােমার অপরাধ হয়, কি করে তাকে তার পিতার কাছে পাঠাবে ? মাতৃভক্ত শান্ত শিষ্ট সন্তান তুমি, কি করে মার সঙ্গে বিবাদ করবে ঠিক সেই সময়ে ক্ষ্যান্ত দাসী ছুটিয়া আসিয়া ব্যস্তভাবে বলিল, বড় বউমা! নূতন বউএর ভারি কর হয়েছেট ফট কছে—উপায় কি। বিস্মিতভাবে সুরমা বলিল, বল কি ক্ষ্যান্ত। ক্ষ্যান্ত বলিল, পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়েছিল, তার পরেই কম্প দিয়ে জ্বর এসেছে। এখন দাহ হচ্ছে—ভুল বকছে। বউমা! কেউ তার সঙ্গে কথা কথা কয় না—কেউ তার দিকে ফিরেও তাকায় না। এক ফোটা জলও কেউ তার মুখে দেয় না। উত্তেজিত কণ্ঠে সুরমা বলিল, কি আশ্চৰ্য। সেই দুগ্ধপােষ্যা বালিকার উপর এত নিৰ্যাতন। এ সংসারে কি তার কেউ নাই ? অমনি প্রকাশ চন্দ্র উঠিয়া দাড়াইয়া গভীরভাবে স্থিরকণ্ঠে বলিল, আছে বউদিদি। দু’দিন আগেই থাকা উচিত ছিল, শুদ্ধ লােক-লজ্জার ভয়ে—মায়ের অভিশম্পাতের আশঙ্কায়—এতদিন নীরব থাকতে হয়ে- ছিল। বউদিদি। বাম-বনবাসের আদেশ হয়ে গেছে—এইবার লণ-বর্জনের পালা উপস্থিত। বলিয়াই প্রকাশচন্দ্র দ্রুতপদে কক্ষ ত্যাগ করিল।

( ২৫) যুবক প্রকাশচন্দ্র কোন বাধা গ্ৰাহ করিল না। বাঘিনী মুর্তিতে জননী বারাণ্ডার উপর কুটী করিয়া দাড়াইয়া ছিল, যুবক তাহার দিকে কটাক্ষ পাতও করিল না। দ্রুতপদে সে শৈবলিনীর কক্ষে প্রবেশ করিয়া কক্ষ-দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিল। শৈবলিনী সংজ্ঞাহীন অবস্থায় শরবিদ্ধা কুঙ্গিনীর ন্যায় শয্যার উপর ছট ফট করিতেছিল, প্রকাশ শয্যার উপর উঠিয়া ধীরে ধীরে অতি যত্নের সহিত বনিতার মস্তক আপনার অঙ্কের উপর তুলিয়া লইল। শঙ্কা-কম্পিত হস্তে যুবক তাহার অঙ্গে হস্তাৰ্পণ করিল। উঃ ! গাত্রে কি প্রচণ্ড উত্তাপ ! প্রকাশ ডাক্তারী পড়ে। পকেটে থার্মোমিটার ছিল—গায়ের উত্তাপ পরীক্ষা করিয়া দেখিল, ১০৫ ডিগ্রী—প্রবল জ্বর। তাহার উপর কাশি দেখা দিয়াছে। প্রকাশ যন্ত্র দ্বারা রােগিনীর বুক পরীক্ষা করিতে লাগিল। এ পিঠ ও পিঠ ভাল করিয়া দেখিল। তাহার পর যন্ত্রটা দূরে নিক্ষেপ করিয়া কপালে হাত দিয়া ভীতভাবে যুবক বলিল, কি সর্বনাশ। নিউমােনিয়া! প্রকাশের চক্ষে জল আসিল—দুই ফোঁটা অশ্রু শৈবলিনীর সুন্দর মুখের উপর ঝরিয়া পড়িল। অমনি যুবক বনাঞ্চলে অশ্রু ফোঁটা মুছিয়া ১৭ পুজার তত্ত্ব লইল। এই সময় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় শৈবলিনী প্রলাপ বকিতে লাগিল, মাগাে ! একটু দাড়াও—আমিও তােমার সঙ্গে যাব। যুবক কাদিতে দিতে বলিল, হায় ! আর একটু আগে কেন শৈবলিনীকে যত্ন করলাম না—এমনিভাবে কেন একে বুকে তুলে নিলাম ? অভাগিনী শৈবলিনী শ্বাশুড়ীর গঞ্জনায় কলের অনাদরে হতাশ হইয়া পড়িয়াছিল—দুঃখে ক্ষোভে বালিকা মরণ-পণ করিয়া বসিয়াছিল। সে শরীরের উপর যথেষ্ট অত্যাচার করিতে লাগিল। কখন অল্প আহার করিত—কখন অনাহারে কাটাইয়া দিত। ক্রমশঃ শরীর ভগ্ন হইতে লাগিল—অল্প অল্প জ্বর দেখা দিল—সেই জরের উপরও সে অত্যাচার করিতে ক্ৰটী করিল না। দুই বেলা স্নান করিত–আহার করিত-সম্মুখে যাহা কুপথ্য দুটিত, তাহাই খাইয়া বসিত। তাহার পর শ্বাশুড়ীর হুকুমে জল তুলিতে পড়িয়া গিয়া অত্যন্ত আঘাত পাইল। বালিকার শরীরে এত অত্যাচার সহ্য হইল না--সে প্রবল রােগে আক্রান্ত হইল—তাহাই আজ তাহার জীবন-শঙ্কট অবস্থা উপস্থিত হইল। প্রকাশচন্দ্র বুঝিতে পারিল, যােলআনা অত্যাচার করিয়া স্ব-ইচ্ছায় শৈবলিনী এ কাল ব্যাধি ডাকিয়া আনিয়াছে—সে মরণের পথে দ্রুত অগ্রসর হইয়াছে। যুবক ভাবিয়া পাইল না, কি প্রকারে তাহার জীবন রক্ষা করিবে। শৈবলিনী আবার প্রলাপ বলিল, মা ! কে আমাকে জোর করে ধরে রেখেছে—ছেড়ে দিচ্ছে না। ওগাে তুমি কে গাে ! তােমার পায়ে পড়ি, আমাকে ছেড়ে দাও—মার মেয়ে মার কাছে চলে যাই। আবেগভরে প্রকাশচন্দ্র শৈবলিনীর সংজ্ঞাহীন দেহ বুকের মধ্যে টানিয়া লইয়া স্নেহভরে তাহার মুখচুম্বন করিল। সে চুম্বনে বােধ হয় সঞ্জীবনী ছিল— শৈবলিনীর সর্বাঙ্গ শিহরিয়া উঠিল—তাহার চৈতন্য ফিরিয়া আসিল। চক্ষু উন্মীলিত করিয়া সম্মুখে কি দেখিল ? দুই দণ্ড পূর্বে যে দেবতার দর্শন লাভ করিবার জন্য সে আকুল হইয়া উঠিয়াছিল—যাহার সাক্ষাৎ পাইলে সে এ অনন্ত নরকেও স্বর্গসুখ উপভােগ করিতে পারিত—যাহার মুখের একটা মিষ্ট কথা শুনিতে পাইলে সে বজ্রের আঘাতও অম্লানবদনে বুকে পাতিয়া লইতে পারিত, এ সেই পরমারাধ্য পতি-দেবতা। শৈবলিনী স্বামীকে বিন্দুমাত্র লজ্জা করিল না-সে বােধ হয় ভাবিয়াছিল, তাহার জীবনে এমন দিন আর ঘটিবে না। তাহাই সে মুখ ফুটিয়া বলিল, এসেছ আবার দেখা দিয়েছ ? দু’দিন আগে যখন এসেছিলে, তখন যদি এমনি ভাবে বুকে তুলে নিতে, তাহলে আমি মরতাম না। প্রকাশের চক্ষে জল আসিল -সে মাথা নীচু করিয়া অত্যাগ করিতে লাগিল। শৈবলিনী আবার বলিল, তুমি কেঁদোনা-চোখের জল ফেলে না—শ্রাবণের বারিধারা ঢেলে দিলেও আর আমাকে বাঁচাতে পারবে না। আমি মছি—ইচ্ছা করেই মরছি—বড়ঘরের মানের দাবীতে আমার জীবন বলিদান করছি। কত দিন এসেছি, একটা মুখের কথাও কেউ আমার সঙ্গে বলে নিপেট পুরে এক দিনও খেতে পাইনি। কত দুবাক্য কানে শুনেছি, তাই মরবার জন্য আকুল হয়ে শরীরের উপর শত অত্যাচার করেছি। আজ আমাকে যমে ধরেছে—মা ডাকছে—আমি যাই। দুৰ্বল শরীরে আবেগভরে এতগুলি কথা বলিয়া শৈবলিনী আবার সংজ্ঞা হারাইল। প্রকাশ উঠিয়া শৈবলিনীর মাথায় জল দিয়া পাখার বাতাস করিতে লাগিল। ক্ষণকাল পরে আবার শৈবলিনীর চৈতন্য হইল—সে দেখিল, প্রকাশ তখনও তাহার পার্শ্বে বসিয়া তাঁহাকে সেবা পূজার করিতেছে। শৈবলিনী বলিল, তুমি এখনও এখানে বসে আছ ? চলে যাও। মা দেখলে গাল-মন্দ দেবেন। প্রকাশচন্দ্র কি বলিতে যাইতেছিল, অমনি শৈবলিনী তাহার জন্ম কম্পিত হস্ত উত্তোলন করিয়া প্রকাশের মুখ চাপিয়া ধরিয়া বলিল, আমার সঙ্গে কথা কমাে নামার আদেশ লঘন করাে না-তােমার পাপ হবে। প্রকাশ কোন কথা না বলিয়া কাতর দৃষ্ঠিতে শৈবলিনীর মুখের দিকে তাকাইয়া রহিল—তাহার চক্ষু জলে ভরিয়া আসিল। অমনি শৈবলিনী প্রকাশের হাতখানি ধরিয়া নিজের কপালের উপর রাখিয়া বলিল, কেঁদোনা তুমি আমার সঙ্গে দুদিনের দেখা—দু’দিনে সাঙ্গ হয়ে গেল। আমার বাবা যখন ছুটে এসে তােমাকে জিজ্ঞাসা করবেন, আমার শৈবলিনী কই ? তখন তুমি তাকে বলল, মার মেয়ে মার কাছে চলে গেছে। আমার ভাই বোনগুলাে যখন কেঁদে বুক ভাসাবে, তখন তাদের বলল, তােদের দিদি জন্মের মত বিদায় হয়েছে। কিন্তু আমার শঙ্কর দাদা যদি আসে, সে যে পাগল হয়ে যাবে—তুমি ত কিছুতেই তাকে শান্ত করতে পারবে না? শৈবলিনীর কাতর খেদোক্তি শ্রবণ করিয়া প্রকাশচন্দ্রের বুক ফাটিয়া গেল—সে শৈবলিনীকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া আকুলভাবে ক্রন্দন করিতে লাগিল।

( ২৬ ) শৈবলিনী আবার অচৈতন্য হইল। প্রকাশচন্দ্র শৈবলিনীর সংজ্ঞাহীন দেহ শয্যার উপর রাখিয়া উখিত হইল। শৈবলিনীর কক্ষ ত্যাগ করিয়া প্রকাশচন্দ্র দ্রুতপদে বহিৰ্বাটীতে নিজের কক্ষে প্রবেশ করিল। কয়েকটা বাক্স ছিল। যুবক একটা বাক্স খুলিয়া নিজের সােনার ঘড়ি, চেইন, বােম, হীরাঙ্গুরীয় বাহির করিল। সে গুলি বস্ত্র-মধ্যে লুকাইত করিয়া প্রকাশচন্দ্র দ্রুতপদে কক্ষ হইতে বাহির হইয়া গেল। হরসুন্দরী দূরে দাঁড়াইয়া এতক্ষণ সমস্ত ব্যাপার দেখিতেছিল। জ্যেষ্ঠ পুত্র অনুকুলচন্দ্র অবাধ্য ছিল বলিয়া ঘােষ-গিল্পী তাহার উপর অসন্তুষ্ট ছিল, কিন্তু কনিষ্ঠ পুত্র প্রকাশচন্দ্র বিদ্বান, বিনয়ী ও মাতার প্রতি একান্ত অনুরক্ত সন্তান—সে কখনও তাহার অবাধ্য হয় নাইমুখ তুলিয়া কখনও উচ্চ কথাটা বলে নাই। আজ সেই প্রিয় পুত্র যখন বাধ্যতার গণ্ডী পার হইয়া মাতার বিরুদ্ধাচরণ করিল, তাহাকে অবজ্ঞা করিয়া নিষেধ অমান্য করিয়া বীয় পত্নীর সেবার ভার বহন্তে গ্রহণ করিল, তখন হরষন্দরীর হৃদয় ক্রোধে অভিমানে ও অপমানে ভরিয়া গেল। মুখ পুত্র অনুকুলচন্দ্রের অবাধ্যতা তাহাকে তত ব্যথা প্রদান করিতে পারে নাই, কৃতবিদ্য সন্তান প্রকাশচন্দ্রের এ প্রকার অবজ্ঞা ও ঔদাসীন্য তাহার হৃদয়ে যে প্রকার যন্ত্রণা উপস্থিত করিয়াছিল। রােষভরে গভীরভাবে হরসুন্দরী কন্যা উষারাণীকে জিজ্ঞাসা করিল, পুটু! প্রকাশ চলে গেছে ? কন্যা বলিল, গেছে মা! “কোথায় গেছে, জানিস?” “বােধ হয়, ডাক্তার ডাকতে গেছে।” রােষভরে হরসুন্দরী বলিল, ডাক্তার ডাকতে গেছে! টাকা খরচ করতে হবে, অই পােড়াকপালীর জন্যে! এত বাড়াবাড়ি আমার বরদাস্ত হবে না পুটু! আদরের মেয়ে পুটু—এতকাল সে মার মন যােগাইয়া আসিয়াছে- মূতন বউএর বিরুদ্ধে গােয়েন্দাগিরি করিয়াছে কিন্তু আজ যেন তাহারও প্রাণ কাদিয়া উঠিয়াছে। তাহাই সে বিরক্ত হইয়া বলিল, তােমারও ত বাড়াবাড়ি নেহাত কম নয় বাপু! বিস্মিতভাবে আদরের কন্যার মুখের দিকে তাকাইয়া হরসুন্দরী বলিল, বলি কি পুটি! আমার বাড়াবাড়ি কিসে দেখলি? আদর পাইয়া পুটু বুকে স্পর্ধা জন্মিয়াছিল। বিন্দুমাত্র ভীত না হইয়া সে বলিল, বাড়াবাড়ি নয়? একটা তত্ত্বের ব্যাপার নিয়ে তুমি ঘরের বউএর উপর কত অত্যাচার কছ, বল দেখি? আজ সে মরুতে বসেছে, তবুও তােমার আশা মেটে না। তােমার বুকে কি বিন্দুমাত্র মায়া-মমতা নাইমা।

এত বড় কথা আজ আদরের মেয়ের মুখে শুনিতে হইল! আঘাত পাইয়া কালপিনী যেমন গর্জন করিয়া ওঠে, তেমনিভাবে হরসুন্দরী চোখ রাঙ্গাইয়া আদরের মেয়ের মুখের দিকে তাকাইয়া বলিল, পুটি! তুইও ওদের দলে মিশে গেছি বুঝি ? পুটু বলিল, অত শত দলাদলি আমি বুঝিনে। তােমার কথা শুনে এ যাবৎ আমি কত অন্যায় কাজ করেছি—ঘরের বউএর বিরুদ্ধে আড়ি পেতেছি—বড় ভাইএর অসম্মান করে’ মহাপাপ করেছি। আর তােমার কথা শুনবাে না। এখনই আমি মূতন বউএর কাছে যাব—তাকে সেবা করবাে। ক্রোধভরে হরসুন্দরী বলিল, তুই তার সেবা করবি? পুটু বলিল, করবাে। শােন মা! সে দিনের কথা মনে হলে এখনও দুঃখে আমার বুক ফেটে যায়। সূতন বউদিদি একটা মুখের কথা শােনবার জন্য আমার হাত ধরে কেঁদেছিল কত দুঃখের কথা আমাকে শােনায়েছিল কিন্তু পাষাণীর মেয়ে আমি তার কথায় কান দেইনি—তার চোখের জল মুছিয়ে দেইনি। ছােট দাদার যখন বিয়ে হয়েছিল, মূতন বউ ঘরে এলে আমি তাকে নিজের বােনের মত ভালবেসেছিলাম। যখন পিত্রালয়ে চলে গিয়েছিল, আমি চোখের জলে বুক ভাসায়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি তােমার পরামর্শ শুনে সেই বউএর উপর কি অত্যাচার করেছি। সে যদি আজ মরে, নরকেও আমার স্থান হবে না মা। বলিয়াই চোখে বনাঞ্চল দিয়া উষারাণী কাদিয়া আকুল হইল। কন্যার কথা শুনিয়া হরসুন্দরী চমকিত হইল—সে দেখিল, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আজ তাহার বিরােধী হইল—বড় আদরের কন্যাও আজ তাহার কার্বে তীব্র প্রতিবাদ করিতে সাহস করিল। কিন্তু শার্দুল যতই খোঁচা খায়, সে ততই গর্জন করিয়া ওঠেকালসপিনী আঘাত পাইয়া মরণাপন্ন হইলেও ফেঁাস করিতে ছাড়ে না। হরসুন্দরী রােষভরে বলিল, তুই যদি আমার অবাধ্য হ’স, তােকে এখনই শশুরবাড়ী পাঠিয়ে দেব। কন্যা বিন্দুমাত্র ভীত না হইয়া বলিল, সে ভয় দেখাচ্ছ কেন? তাই আমাকে পাঠিয়ে দাও, যেন মুতন বউদিদির মরণ চোখের উপর না দেখতে হয় তােমাদের এ বড় ঘরের ভিটেয় আর যেন আমাকে না আসতে হয়। বলিয়াই উষারাণী দ্রুতপদে প্রস্থান করিল।

( ২৭ ) অনতিকাল পরে একজন খ্যাতনামা ডাক্তার সঙ্গে লইয়া প্রকাশ গৃহে ফিরিয়া আসিল। ডাক্তারকে সঙ্গে লইয়া যুবক অন্তঃপুরে শৈবলিনীর কক্ষে প্রবেশ করিল। হরসুন্দরী দুরে দাঁড়াইয়া রােষভরে কম্পিত হইতে লাগিল। ডাক্তার প্রায় অর্ধঘণ্টাকাল বােগিনীকে ভাল করিয়া পরীক্ষা করিল। তাহার পর, মুখ গভীর করিয়া বলিল, রােগ সাংঘাতিকডবল নিউমােনিয়া। পেট ফাঁপ দিয়েছে—-শী টাইফয়েড অবস্থা দেখা দেবে। তবে হতাশ হবেন না—সুচিকীৎসায় আরােগ্য হতেও পারে। চিকীৎসার ব্যবস্থা করিয়া যােল টাকা দর্শনী লইয়া ডাক্তার চলিয়া গেল। প্রকাশচন্দ্র মাথায় হাত দিয়া আকাশ পাতাল ভাবিতে লাগিল। দীর্ঘ নিখাস ত্যাগ করিয়া প্রকাশচন্দ্ৰ উঠিল-রােগিনীর পার্শ্বে গিয়া বসিল- তাহার পরম সুন্দর মুখখানার দিকে অনিযেষ নয়নে অনেকক্ষণ তাকাইয়া রহিল। শৈবলিনী সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়িয়া ছিল—ক্রমশঃ সে দুর্বল হইয়া আসিতেছিল। প্রকাশ মনে মনে বুঝিল, তাহাকে রক্ষা করিবার আর উপায় নাই। তবুও যুবক হতাশ হইল না—বুক বাঁধিল—প্রাণপণে রােগিনীর সেবা করিতে লাগিল। ১৩৫ পূজার তত্ত্ব গৃহিণী হরসুন্দরী কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করিয়া বিরক্তভাবে বলিল, কি এত কঠিন রােগ হয়েছে, যে বড় ডাক্তার ডেকে এনেছিস? প্রকাশ কোন উত্তর না দিয়া জননীর মুখের দিকে তাকাইয়া একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিল। হরসুন্দরী রুক্ষ মেজাজে কঠোর বাক্যে আবার বলিল, এত বাড়াবাড়ি ভাল লাগেনা। তুই কার হুকুমে এত টাকা খরচ করলি? প্রকাশ উদাস নয়নে একবার জননীর মুখের দিকে তাকাইয়া রােগিনীর মুখে ঔষধ ঢালিয়া দিল—সে কতক গলাধঃকরণ করিল—কতক পড়িয়া গেল। হরসুন্দরী আবার গর্জন করিয়া বলিল, যদি তুই আমার অবাধ্য হ’, স্পষ্ট কথা বলছি, তাের স্ত্রীকে নিয়ে এখনই আমার বাড়ী থেকে দূর হয়ে যা। অত্যন্ত কাতরভাবে প্রকাশচন্দ্র জননীর মুখের দিকে তাকাইয়া বুকভরা বেদমায় শুদ্ধ একটা কথা উচ্চারণ করিল--মা ! সে মা সম্বোধন শ্রবণ করিলে বােধ হয়, পাষাণ হিমাচলও গলিয়া যাইত-সুমেরু শিখর ভাঙ্গিয়া পড়িত-বজ্রের আগুণ নিৰ্বাপিত হইত, কিন্তু ঘােষ-গৃহিণীর অতি কঠিন প্রাণে এতটুকুও ব্যথা লাগিল না। হরসুন্দরী বলিল, কোন কথা শুনতে চাই না-তুই ওঠ। প্রকাশ আবেগভরা কণ্ঠে উচ্ছ্বসিত বাক্যে আবার বলিল, মা ! প্রকাশের পাষাণী মা সে কাতর বাক্যে কর্ণপাত করিল না বটে কিন্তু সহসা কোথা হইতে আর একখানি মাতৃমূর্তি ছুটিয়া আসিয়া স্নেহ-কোমল অতি সুমধুর কণ্ঠে বলিল, ভয় নাই বাবা! যদি তােমার গর্ভধারিণীর কাছে আশ্রয় না পাও, বিশ্বসংসারে তােমাব মায়ের অভাব হবে ।

রমণীর মুখের দিকে তাকাইয়া বিস্মিত স্তম্ভিত ও অত্যন্ত বিরক্ত ভাবে হরসুন্দরী বলিল, বােস-গিন্নি! তুমি এখানে? বােস-গিন্নী মহামায়া বলিল, হ্যা ! আমিই এখানে। সন্তানের মুখে মাতৃ-সম্ভাষণ শুনেও তােমার পাষাণ বুকে যখন দয়ার সঞ্চার হ’ল না, তখন মাতৃজাতির অপমানের ভয়ে তােমার পরম শত্রু হয়েও আজ আমাকে এখানে ছুটে আসতে হয়েছে। ঘােষ-গিন্নি ! চোখ রাঙ্গাচ্ছ কেন? হরসুন্দরী বলিল, তােমার স্পর্ধা বড় বেড়েছে দেখছি। তুমি আমার ঘরে এসে আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে চাও ? মহামায়া ঘৃণাভরে বলিল, তােমাকে ভয় করে চলবার মত দীনতা আমার নাই। ঝগড়া করাই যখন আমার স্বভাব, তখন আজ তােমার ঘরে বসে তােমার সঙ্গে ঝগড়া করে জয়ী হয়ে চলে যাব। হরসুন্দরী বলিল, বটে! এখনই পুলিশ ডাকবাে। মহামায়া হাসিয়া বলিল, পুলিস ডেকে আমাকে গেরেফতার করবার আগে তােমার হাতে হাতকড়ি পড়বে। ঘােষ-গিন্নি! একটা নিরাশ্রয় পরের মেয়েকে তুমি কি করে গুম খুন কছ, এখনই প্রকাশ হয়ে যাবে। সর্বনাশ! বড় ঘরের গিন্নী হ'তে হ'লে যে বড় বুক নিয়ে সংসারে আসতে হয়, সে শিক্ষা তুমি পাওনি। আজ তােমার পরম শত্রু হয়েও সেই শিক্ষা তােমাকে দিয়ে যাব। বলিয়াই মহামায়া শৈবলিনীর শয্যার পার্শ্বে ধীরপদে অগ্রসর হইয়া প্রকাশকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, প্রকাশ! ওঠ বাবা! আমি তােমার মা। তুমি বেটা ছেলে বােগিনীর সেবা করতে পারবে না মেয়ের সেবার ভার মায়ের হাতে দাও—তুমি নিশ্চিন্ত হও। প্রকাশের দুই চক্ষু হইতে তখন দর দর ধারায় অস্ত্র নির্গত হইতেছিল। সে দশ মমতা স্বীয় গর্ভধারিণীর পার্শ্বে এমন করুণাময়ী মাতৃমূর্তি ! ১০৭ পূজার দর্শন করিয়া বােধ হয় মনে মনে তুলনা করিতেছিল, ভীমবেশা চামুণ্ডার পার্শ্বে শান্তিময়ী জগজ্জননী দেবী দশভুজা-তুফানভরা খরস্রোতা পদ্মা নদীর পার্শ্বে শান্তসলিলা সুরতরঙ্গিনী গঙ্গা। একই মায়ের দুই মূর্তি-তবে কেন কেহ ভীষণা, কেহ মঙ্গলময়ী অভয়া? বােস-গিল্পী প্রকাশের হাত ধরিয়া উঠাইয়া তাহার স্থান নিজে অধিকার করিয়া বসিল। অমনি প্রকাশচন্দ্র বালকের মত মহামায়ার পদতলে আছাড় খাইয়া পড়িয়া কঁদিতে লাগিল। তখন দূরে দাঁড়াইয়া গৰ্জন করিয়া হরসুন্দরী বলিল, বােস-গিন্নি! তুমি মমতা দেখায়ে আমার সর্বনাশ করতে এসেছ? অপেক্ষা কর, তােমার স্পর্ধা ভেঙ্গে দিচ্ছি—দ্বারবান ডেকে ঘাড় ধরে তােমাকে বিদায় করছি। সে তপদে প্রস্থান করিল।

( ২৮ ) বৃদ্ধ নফরচন্দ্র আফিং খাইয়া আলবােলার নল হাতে লইয়া তখন ঝিমাইতে ঝিমাইতে ভাবিতেছিল, দুনিয়ার মধ্যে কে বেশী মমতার পাত্র ? বৃদ্ধ ভাবিয়া স্থির করিল, তৃতীয় পক্ষের বনিতার মত আদরিণী ত্রিসংসারে কেউ নাই। আহা! গৃহিণী যখন গজেন্দ্রগমনে ধরিত্রীর বুক কাপায়ে সম্মুখে এসে দণ্ডায়মান হয়, কণ্ঠবীণার ঝঙ্কার তুলে হৃদকম্প উপস্থিত করে, তখন ইচ্ছা হয়, ভগবান ভবানীপতির মত ভৈরবীর চরণতলে লুটিয়ে পড়ে মানব-জন্ম সার্থক করি। ঠাকুর দেবতার মধ্যে মহাদেব ঠাকুরটী যেসৰ্ব্বাপেক্ষা সুরসিক ও প্রেমিক সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। কেষ্ট ঠাকুরটাও প্রেমিক মন্দ নয়, তবে তার লুকোচুরী ব্যবসা। মহাদেব ঠাকুরটা কিন্তু একেবারে বম্ ভােলানাথ। তার কারণ, মহাদেবের নেশা করা অভ্যাস আছে, কেষ্ট ঠাকুর সে রসে বঞ্চিত। ঠিক সেই সময়ে হরসুন্দরী তপদে কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করিয়া উচ্চকঠে বলিল, বলি হা গা! তুমি বেঁচে আছ, না মরেছ ? ১০ পূজার তত্ত্ব আবার বৃদ্ধের ভাবনা উপস্থিত হইল, আমি মৃত কি জীবিত। পূরে- দস্তুর যে জীবিত নই, সে আমি বেশ বুঝতে পারছি। কেননা, যে বেঁচে থাকে, সে ত আমার মত দিন রাত্রি ঝিমিয়ে কাল কাটায় না। নেশা- খােরের পক্ষে মরা বাঁচা সমান দশা। আবার ঝঙ্কার উঠিল, বলি আমার কথা কানে ঢুকলাে না বুঝি ? বৃদ্ধ অমনি হাতের নল মাটীতে ফেলিয়া দিয়া হাসিয়া বলিল, ঢুকেছে— ঢুকেছে। কানের ভিতর ঢুকে মাথার ভিতর গুলজার করছে, কিন্তু তার মানে বুঝতে পারছিনে গিন্নি । বিরক্তভাবে হরসুন্দরী বলিল, বলি, তুমি মরেছ ? নফরচন্দ্র বলিল, তা যদি মতাম, তাহলে গা-ভরা গহনা পরে কাল। পেড়ে সাড়ীর বাহার দিয়ে কি হাত নেড়ে কথা বলতে, না একাদশীর দিনে আকণ্ঠ ভােজন করুবার অধিকার পেতে ? আমি আধমরা হয়ে বেঁচে আছি। গৃহিণী বলিল, যদি বেঁচে থাক, তােমার সংসারে এত অত্যাচার কেন বলত ? নফরচন্দ্র বলিল, কি আশ্চর্য! তােমার মত গৃহিণী বেঁচে থাকতে আমার সংসারে অত্যাচার? হরসুন্দরী বলিল, আমার গৃহিণীপনা আর কেউ মানে না গাে ! তােমার বড় ছেলে অবাধ্য হয়ে বাড়ী ছেড়েছে—ছােট ছেলেটাও মাথা তুলে দাড়িয়েছে—পােড়ারমুখী পুটি মেয়েটাও আজকাল কথার কামড় দিতে শিখেছে। নফরচন্দ্র বলিল, ব্যাপার এতদুর পর্যন্ত গড়ায়েছে ? আমি আফিংখাের মানুষ—কোন খবর রাথিনে। কিন্তু গিন্নি! তােমার ছােট ছেলে প্রকাশ চন্দ্রটা ত বেশ শান্ত শিষ্ট ? ১১০

পূজার
গৃহিণী বলিল, শান্ত শিষ্ট হলে কি হয়, সে কার পরামর্শ পেয়েছে,
আমার আদেশ অমান্য করতে শিখেছে। এইমাত্র সে হতভাগা কতকটা
টাকা ব্যয় করে একটা বড় ডাক্তার ডেকে এনেছে।
বিস্মিতভাবে ফরচন্দ্র বলিল, ডাক্তার ডেকে এনেছে কেন?
বিরক্তভাবে গৃহিণী বলিল, জান নামূতন বউটার ‘ব্যাদি’ হয়েছে,
সে নাকি মরতে বসেছে।
বৃদ্ধ নফরচন্দ্র লাফাইয়া উঠিয়া বলিল, বল কি গিন্নি! মরতে বসেছে ?
গৃহিণী বলিল, ভয় নেই-মরবে না—মরবে না। সে যদি মরবে ত
আমাকে হাড়ে মাসে জালাবে কে? তারপর, শােন।
“কি ?”
“পরম শত্রু বােস-গিন্নীর কি এত মাথা ব্যথা পড়েছে যে আমাদের
অন্দরে ঢুকে কোমর বেঁধে ঝগড়া করতে এসেছে ?
চমকিতভাবে হরসুন্দরীর মুখের দিকে তাকাইয়া নফরচন্দ্র বলিল, বল
কি গিন্নি! বােস-গিরী আমাদের বাড়ীতে এসেছেন? কোথায় তিনি ?
হরসুন্দরী বলিল, তােমার মুতন বউমাকে কোলে করে’ সেবা করতে
বসেছে। যাদের ছায়া মাড়াইনে, তাদের স্পর্ধা দেখবাড়ীর উপর
চড়ােয়া হ'য়ে শত্রুতা করছে—কলিকাতা সহরের বুকের উপর দিনে ডাকাতি
হচ্ছে। তুমি এখনও চুপ করে আছ ?
নফরচন্দ্র উঠিয়া দাড়াইয়া বলিল, কি করবাে বল ?
হরসুন্দরী বলিল, দ্বারবান ডাকো-গলাধাক্কা দিয়ে তাকে বাড়ীর বার
করে দাও।
গভীরভাবে নফরচন্দ্র বলিল, গিন্নি! চুপ কর।
রােষরে হরসুন্দরী বলিল, চুপ, করব কেন?
১১১

পূজার তত্ত্ব নফরচন্দ্র বলিল, আমার পরম সৌভাগ্য যে বােস-গিন্নী আজ আমার ভিটায় পদার্পণ করেছেন। ঘাড় বাঁকাইয়া হরসুন্দরী বলিল, বল কি তুমি ? নফরচন্দ্র বলিল, সত্য কথাই বলছি-বােস-গিন্নীর মর্যাদা তুমি কি বুঝবে? কায়স্থ কুলের শিরােমণি সুবিখ্যাত রাজার ঘরে তার জন্ম পটলডাঙ্গার প্রসিদ্ধ বােস-জমিদারের কুলবধূ তিনি। গিন্নি! এত নিকটে বাস করছি, কিন্তু এ যাবৎ সাধ্য হয়নি, বােস-গিন্নীকে বাড়ীতে নিমন্ত্রণ করে এনে পৈত্রিক ভিটা ধন্য করি। আজ তিনি উপযাচক হয়ে আমার বাড়ীতে এসেছেন, এখনও তুমি তার পায়ের তলায় মাথা নীচু করনি? গর্বভরে মাথা উচু করিয়া কর্কশ-কণ্ঠে হরসুন্দরী বলিল, কি—এত বড় কথা! আমি বােস-গিন্নীর পায়ের তলায় মাথা নীচু কবুবাে? মনে রেখাে, আমিও জমিদারের মেয়ে—আমিও পটলডাঙ্গার ঘোষ-জমিদারের কুলবধূ। নফরচন্দ্র বলিল, তােমার বুকে যত অভিমান থাক না কেন, লােস-গিন্নী মান-মৰ্যাদায় তােমার চেয়ে ঢের বড়। হরসুন্দরী বলিল, সে বড় হয়, তুমি তার পা-পূজো করগে—কিন্তু আমার এ উচু মাথা কখনাে নীচু হবে না-শ্মশানে গিয়ে যখন পুড় বাে, .তখনও আমার মাথা এমনিভাবে উচু থাকবে। বলিয়াই হরসুন্দরী স্বামীর দিকে রোষভরে তাকাইয়া মাথা উচু করিয়া গর্বভরে চলিয়া গেল।

( ২৯ ) যখন বড় ডাক্তার আসিয়া শৈবলিনীকে পরীক্ষা করিয়া বলিয়া গেল, রােগিনীর জীবনের আশা অল্প, তবে ভালরূপ সেবা- করিলে জীবন রক্ষা হইতেও পারে, তখন ক্ষ্যান্ত চাকরাণীর বুকে বড় ব্যথা উপস্থিত হইল। সে শৈবলিনীকে বড় ভালবাসার চক্ষে দেখিয়া- ছিল। তাহার জীবন রক্ষার জন্য সে আকুল হইয়া পড়িল। ভালরূপ সেবা করা চাই কিন্তু উপায় কই? কে অভাগিনী বালিকাকে সেবা করিতে সাহস করিবে? প্রকাশচন্দ্র প্রাণপণে পত্নীর সেবা করিবে বটে কিন্তু সে যুবাপুরুষ—রােগিনীর সেবা তাহার দ্বারা নিতান্ত অসম্ভব। ক্ষ্যান্ত ছুটিয়া বড় বধু সুরমার কাছে গেল কিন্তু সুরমা জানাইল, শ্বাশুড়ীর অবাধ্য হইয়া শৈবলিনীকে সেবা করিতে গেলে তাহার নিস্তার থাকিবে না। তখন নিরুপায় হইয়া ক্ষ্যান্ত দাসী গুপ্তভাবে অন্তঃপুরের পথে বােসবাবুদের অন্দরে প্রবেশ করিল। ক্ষ্যান্ত দাসী বােস-গিন্নীকে ভালরূপ চিনিত—তাহার অন্তর জানিত। সে যখন মহামায়ার সম্মুখে গিয়া দাঁড়াই, তখন বােস-গিন্নী বিস্মিতভাবে তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া বলিল, ক্ষ্যান্ত যে পথ ভুলে আমাদের অন্দরে ঢুকে বসেছি নাকি?

পূজার তত্ত্ব অমনি ক্ষ্যান্ত ছুটিয়া গিয়া বােস-গিন্নীর পা জড়াইয়া ধরিয়া সজল- নয়নে বলিল, মা। রক্ষা করুন। অত্যন্ত বিয়েভরে মহামায়া বলিল, সে কি! কি হয়েছে তাের? মহামায়া বুঝিল, হয়ত কোন অপরাধে ঘােষ-গিল্পী তাহার উপর অত্যাচার আরম্ভ করিয়াছে, তাহাই সে তাহার আশ্রয় লইতে আসিয়াছে। ক্ষ্যান্ত দিতে দিতে বলিল, আমার কিছু হয়নি মা! “তবে কার কি হয়েছে, বল না ? ক্ষ্যান্ত চোখে বনাঞ্চল দিয়া বলিল, মা! ঘােযেদের নূতন বউমা সে মারা যায় ? চমকিতভাবে মহামায়া বলিল, বলিস কি? কি হয়েছে বউমার? শৈবলিনীর উপর হরসুন্দরীর অত্যাচারের কথা মহামায়া পূর্বে নিয়াছিল। আজ ক্ষ্যান্ত দাসী আদ্যোপান্তু তাহার নিকট বর্ণনা করিল। শুনিয়া, মহামায়া শিহরিয়া উঠিল। কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া মহামায়া বলিল, ক্ষ্যান্ত। ঘােষেদের সঙ্গে আমাদের বনিবনাও নাই- বিশেষত ঘােষ-গিন্নী ভীষণ রমণী। আমি কি করে বউমাকে রক্ষা কবে? ক্ষ্যান্তু বলিল, মা! আপনি ভিন্ন কারাে সাধ্য নাই, অভাগিনী নুতন বউমাকে রক্ষা করে। তাই অন্য উপায় না দেখে আমি আপনার কাছে ছুটে এসেছি। মহামায়া বলিল, ক্ষ্যান্ত! ঘােষদের সংসারে এত লােক থাকতে নূতন বউএর জন্য তাের কেন মাথা ব্যথা পড়ে গেল বল দেখি? ক্ষ্যান্ত বলিল, বলতে বুক ফেটে যায়। যখন আমি নুতন বউমাকে ১১০ পূজার তা আনতে ভবানীপুর তার বাপের বাড়ী গিয়েছিলাম, আমি সামান্য দাসী হলেও বউমার বাপ আমার দুখানি হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ক্ষ্যান্ত! মায়ের শােকে আমার শৈবলিনী পাগলিনী হয়েছে-সে বুকে বড় ব্যথা পেয়েছে। তোমরা আমার মাকে বঙ্গ করাে-সে যদি কাঁদে, চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে তাকে শান্ত করে। বউমার বাপের যে করুণ কান্নার কথাগুলাে এখনও আমার কানে বাজছে—তার প্রত্যেক কথাটা আজ আমার বুকে শেলাঘাত করছে। মাগাে! ঘােফগিল্পীর ভয়ে আমি ভদ্রলােকের সে অনুরােধ রক্ষা কতে পারিনি-দুঃখে ক্ষোভে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে মা! ক্ষ্যান্ত দাসীর কথা শুনিয়া মহামায় কোমল হৃদয়ে দারুণ ব্যথা লাগিল—তাহার চোখের কোনে অঞ দেখা দিল। মহামায়া উঠিল- অবিলম্বে বােস-কৰ্ত্তা প্ৰসৱৰাবুর সহিত সাক্ষাৎ করিয়া সমস্ত ব্যাপার নিবেদন করিল। প্রসন্নবাবু বলিলেন, তুমি কি করতে চাও? মহামায়া বলিল, আমি এখনই ঘােষেদের বাড়ী যাব-বউমাকে সেবা-শুশ্রুষা করে দেখবাে, যদি তার জীবন রক্ষা করতে পারি। প্রসন্নবাবু বলিলেন, তােমার উদ্দেশ্য মহৎ সত্য কিন্তু আদান করে’ যারা তােমাকে পায় না, তুমি অনাহুত ভাবে তাদের বাড়ীতে যেতে চাও মহামায়া বলিল, কর্তব্য পালনের গুরুত্ব যেখানে বেশী, সেখানে মান-মৰ্যাদার দাবী চলে না। তুমি আমাকে অনুমতি দাও। প্রসন্নবাবু বলিলেন, এ যাবৎ তাদের সঙ্গে রেষারেষি চলে আসছে। যদি তারা তােমাকে অপমান করে।

পূজার তত্ত্ব মহামায়া বলিল, একটা অত্যাচারের আগুন যেখানে জলে উঠেছে, সেটা নিভাতে গেলে সেখানে আগুনের সেক গায়ে লাগবে বই কি। তাতে ভয় কলে ত চলবে না। প্রসন্নবাবু মহামায়ার মুখের দিকে তাকাইয়া বলিলেন, তােমার অদ্ভুত প্রকৃতি। যে ঘােষেদের নাম শুলে তুমি রাগে জ্বলে ওঠ, যাদের ছায়া মাড়াতে তুমি ঘৃণা কর, তাদের বিপদে আজ তুমি মান- অভিমান জলাঞ্জলি দিয়ে তাদের বাড়ী ছুটে চলেছ ? মহামায়া বলিল, যদি ঘােয-গিস্ত্রীর কোন বিপদ উপস্থিত হত, এতটা উদারতা দেখাবার শক্তি আমার হত কি না বলতে পারি না। কিন্তু একটা পরের মেয়ে–নিরীহ বালিকা অত্যাচারের আগুনে পুড়ে মছে-তাকে রক্ষা কতে গিয়ে আমি আগুনে ঝাপ দিতেও প্রস্তুত আছি। শােন, যদি আমার সংকল্প সাধু হয়, ঘােষ-গিণীর সাধ্য কি আমাকে অপমান করে ? আমি চললাম। প্রসন্নবাবু বলিলেন, একা যাবে? মহামায়া বলিল, নির্মলকে সঙ্গে নিয়ে যাব। নির্মলচন্দ্র প্রসন্নবাবুর কনিষ্ঠ পুত্র-প্রকাশের সহপাঠী বন্ধু। দুই পরিবারে বিবাদ বিসম্বাদ থাকিলেও তাহারা পরস্পরে ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। ক্ষ্যান্ত দাসী পূর্বে প্রস্থান করিয়াছিল। পুত্রকে সঙ্গে লইয়া মহামায়া পশ্চাতে যােষেদের অন্তঃপুরে প্রবেশ করিল।

( ৩০ ) বােস গিন্নী মহামায়া শৈবলিনীর সেবার ভার গ্রহণ করিল। প্রকাশ মহামায়ার পদতলে লুটাইয়া পড়িয়া বালকের মত কাদিতে লাগিল। ঠিক সেই সময়ে তাহার সহপাঠী নির্মলচন্দ্র তাহার হাত ধরিয়া তুলিয়া বলিল, প্রকাশ! অধীর হয়ে নামার হাতে সেবার ভার দিয়ে তুমি নিশ্চিন্ত হও। প্রকাশকে লইয়া নির্মলচন্দ্র কক্ষান্তরে প্রস্থান করিল। মহামায়া শৈবলিনীর রােগ-শীর্ণ অবসন্ন তনু একেবারে বুকের মধ্যে টানিয়া লইলেন, তাহার পর, তাহার মুখের কাছে মুখ রাখিয়া দেহকোমল কণ্ঠে ডাকিলেন, বউমা। মা আমার—একবার কথা কও। সে কি সুমিষ্ট বর! সে কি করুণ কায়ায় ভরা বেহাগের বাঁশী। সেই স্বর্গীয় স্বর শৈবলিনীর মৃতপ্রায় দেহে প্রাণ সঞ্চার করিল। শৈবলিনীর সর্বাঙ্গ স্বর্গীয় পুলকে শিহরিয়া উঠিল। সে যে অনেক কাল হইতে সােহাগে বঞ্চিত হইয়া আছে—এতকাল যে বিশ্বসংসার তাহার ১১৭

পূজার তত্ত্ব
কর্ণে নীরব হইয়া আছে। সহসা সুমধুর সম্বােধনে সে চমকিত হইয়া
উঠিল- সে চক্ষু উন্মীলিত করিয়া দেখিল, এক দেবীমুর্তি তাহাকে,
মেহের অঙ্কে ধারণ করিয়া বসিয়া আছে। বিষয়বিস্ফারিত নয়নে
মহামায়ার মুখের দিকে তাকাইয়া শৈবলিনী ক্ষীণকণ্ঠে বলিল, কে
তুমি মা?
শৈবলিনীর বিগুফ গণ্ডে মেহভরে চুম্বন প্রদান করিয়া মহামায়া
বলিল, আমি তােমার মা।
শৈবলিনীর গণ্ডস্থল প্লাবিত করিয়া অশ্রুধারা ঝরিয়া পড়িল।
মহামায়া বনাঞ্চলে শৈবলিনীর চোখের জল মুছাইয়া দিয়া স্নেহভরে
বলিল, কেঁদোনা মা! রােগ ভাল হয়ে যাবে।
শৈবলিনী ক্ষীণকণ্ঠে বলিল, যথার্থই তুমি আমার মা। ঠিক আমার
মায়ের মত মুখখানা। মাগো! ছেড়ে আমাকে কোলে তুলে
নিতে এসেছ? এতদিন কেন ভুলে ছিলে? আর যে আমি সহ
কতে পারি নে মা?
গণ্ডে চুম্বন করিয়া মুখের কাছে মুখ রাখিয়া মহামায়া বলিল, চুপ,
কর মা! তুমি ভাল হবে।
শৈবলিনী বলিল, বল তুমি আমাকে আর ছেড়ে যাবে না-কোলে ,
করে কার্গে নিয়ে যাবে?
মহামান্য অসংবরণ করিতে পারিল না। চোখের জল মুছিয়া
শৈবলিনীকে বুকের মধ্যে টানিয়া লইয়া মহামায়া বলিল, বউমা। ভুল
কছ কেন? আমি পাশের বাড়ীর বােস-গিন্নী-চিতে পারছ না মা?
শৈবলিনী বলিল, মিথ্যা কথা। তুমি আমার মা। আমার মামা
সংসারে আর ত কেউ আমার সঙ্গে কথা কইতে সাহস করবে না?

“কেন।
“আমার খাড়ীর হকুম।
“বিশ্বসংসারে সকলেই তােমার শাশুড়ীর হুকুম পালন কৰে
মা
গ্লাসে পথ্য লইয়া মহামায়া শৈবলিনীর মূখে চলিয়া দিতে গেল।
শৈবলিনী মুখ ফিরাইয়া বলিল, ও কি?
“পথ্য—বেদানার রস।”
মাথা নাড়িয়া শৈবলিনী বলিল, খাবাে না মা।
“কেন খাবে না?”
“আমি মরুবােমরুতে সাধ হয়েছে। আমি মার মেয়ে মার
কাছে যাব।”
শৈবলিনীকে বুকে চাপিয়া রাখিয়া বােস-গিন্নী বলিল, আমি
তােমার মা-তুমি আমার কাছে থাকো।
শৈবলিনীর ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তেজনা আসিল।
মহামায়ার মুখে
দিকে তাকাইয়া শৈবলিনী বলিল, তুমি যদি আমার মা, তবে এতকাল
কোথায় ছিলে? একটা মুখের কথা শােনবার জন্য আমি এতকাল
কাণ খাড়া করে ছিলাম একটা মিষ্টি কথা শুনলে আমি আনন্দে
গলে যেতাম। কিন্তু পােড়াকপাল আমার! কেউ আমার মুখের
দিকে তাকালে না—চাকর চাকরাণীরাও আমার সঙ্গে একটা কথাও
বললে না। যদি দু'দিন আগে আসতে, এমনি করে আমাকে বুকে
তুলে নিতে, তাহলে আমি মতাম না।
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া মহামায়া বলিল, আমি তােমাকে মরতে

শৈবলিনী বলিল, বাচাতে পাবে না মা। বাঙ্গালার কত ঘরে
এমনিভাবে শ্বাশুড়ীর অত্যাচারে কত বউ মরছে, তুমি কজনকে রক্ষা
কবে মা? তার চেয়ে আমাকে মরতে দাও, আর আশীর্বাদ কর,
বড় ঘরের বউ হয়ে আর যেন আমাকে সংসারে না আসতে হয়।
অত্যন্ত উত্তেজনায় শৈবলিনী আবার সংজ্ঞা হারাইল-মহামায়ার
দুই চক্ষু হইতে দর দর ধারায় অঝরিতে লাগিল।

( ৩১ ) কণ্ঠের সাড়া দিয়া চটীজুতার শ করিয়া বৃদ্ধ নফরচন্দ্র নিতান্ত পাগলের মত টলিতে টলিতে টলিতে শৈবলিনীর কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করিল। নফরচন্দ্রকে দেখিয়াই বােস-গিন্নী লজ্জিত সঙ্কুচিতভাবে মাথার উপর অবগুণ্ঠন টানিয়া দিল। বৃদ্ধ নফরচন্দ্র বিলভাবে কক্ষের মধ্যস্থলে দণ্ডায়মান হইয়া করযােড়ে বিজড়িত কণ্ঠে বলিল, বােস-গিন্নি। পরম সৌভাগ্য আমার যে আমার বাড়ীতে আপনার পদধূলি পড়েছে। বােস-গিন্নি! যথার্থই আমি গাধা—যথার্থই আমি ম্য নামের অযােগ্য। তা যদি না হবে, তাহলে আজ আমার কুললক্ষ্মীর উপর এত অত্যাচার ঘটতে পারে—আমার সােণার প্রতিমা আজ ধুলায় গড়াগড়ি খায়? আমি নরাধম। অমনি বােস-গৃহিণী শৈবলিনীর শয্যাত্যাগ করিয়া ভূতলে নামিয়া ভূমিষ্ঠ হইয়া বৃদ্ধ নফরচন্দ্রকে প্রণাম করিল, তাহার পর, নতমস্তকে বলিল, আপনি আমার পিতৃতুল্য-আপনার ন্যায় মহাপুরুষকে আমি ঘােট মূখে বড় কথা বলেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।

নফরচন্দ্র আবেগভরে বলিল, সত্য কথাই বলেছ মা। তাতে কোন অপরাধ হয়নি। আমি পুরুষ-সুবিখ্যাত ঘােষবংশের কর্তা হয়ে একটা হীন বংশের স্ত্রীলােকের মােহে এত মুগ্ধ হয়ে এতকাল পড়ে ছিলাম যে পিতৃকুলের মান-মৰ্য্যাদা হারাতে বসেছি—বড় ঘরের বড় মুখে চুণকালি দিয়েছি—অভিমানের খঙ্গে কুললক্ষ্মীকে বলিদান দিতে বসেছি। আমার মত এত বড় মহাপাপী এ সংসারে কে আছে? আগুনের হলকার মত হরসুন্দরী কক্ষ-মধ্যে ছুটিয়া গিয়া বৃদ্ধ নফরচন্দ্রের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বলিল, আমি হীনবংশের শীলােক। আজ বৃদ্ধের মােহ ঘুচিয়া গিয়াছে--বড় ঘরের পৌরুষ বুকের মধ্যে জাগিয়া উঠিয়াছে। অমনি নফরচন্দ্র কুদ্ধভাবে হরসুন্দরীর মুখের দিকে তাকাইয়া বলিল, চোখ রাঙ্গায়োনা ঘােষ-গিন্নি! বড় ঘরের বড় মৰ্যাদার দায়ীত্ব একদিন তােমার হন্তে সমর্পণ কবে আফিংএর নেশায় ঝিম্ হয়ে আমি নিশ্চিন্ত হয়ে বসেছিলাম। তুমি যদি বড় বংশের মেয়ে হ’তে, তাহলে আজ কি আমার মাথাটা এমন করে নীচু করে দিতে পারুতে? তুচ্ছ একটা পূজার তত্ত্ব-দু' পাঁচশ টাকা যার মূল্য, তারই জন্য আমার কি অমূল্য সম্পত্তি নষ্ট করেছ, তুমি কি বুঝবে ঘােটলােকের মেয়ে। রাগে বৃদ্ধের সর্বাঙ্গ কম্পিত হইতে লাগিল। লড়াঘাতে কালসপিনীর কোটী ভঙ্গ হইলে সে যেমন উদ্ধণা হইয়া গৰ্জন করিতে থাকে, বিষ উদগীরণ করিবার জন্য যেমন অবিরাম মাথা দোলাইতে থাকে, হরসুন্দরী তেমনিভাবে বৃদ্ধের মুখের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিতে লাগিল, অত্যন্ত জোধে তাহার মূখ হইতে একবর্ণও উচ্চারিত হইল না। ২২ হরসুন্দরীর আজ কি অপমান-কি লানা! পরম শক্ত বােস- গিন্নীর সম্মুখেই তাহাকে তাহার বৃদ্ধ স্বামী এমনভাবে অপমানিত করিল। ঘৃণা –অভিমান-ক্রোধ তাহার উচ্চ বক্ষস্থল আজ কেন লৌহের মুদগরের আঘাতে গুড়াইয়া চূর্ণ করিয়া দিল। কিছুক্ষণ পরে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিয়া হরসুন্দরী বলিল, আমি যদি ছােটলােকের মেয়ে হই, তােমার সংসারে আগুন জেলে দিয়ে যাব। নফরচন্দ্র বলিল, আগুন ত তুমি অনেককাল জেলে দিয়েছ? ঘরে এসেই পরম মিত্র বােসেদের সঙ্গে বিবাদ করে’ শক্র করে তুলেছ—বড় ছেলেটাকে গৃহত্যাগী করেছ-ছােট ছেলেটাকে সন্ন্যাসী করে’ ছাড়ছাে-আদরের একটা মেয়ে তার সঙ্গেও বিবাদ বাধায়েছ। সৰ্ব্বনাশি! আর কি কতে চাও? হরসুন্দরী জ্ঞান হারাইল-উন্মাদিনীর ন্যায় সে বৃদ্ধের আগে হত্যাৰ্পণ করিতে উদ্যত হইল। ব্যাপার দেখিয়া বােস-গিন্নী আর নীরবে থাকিতে পারিল না—ছুটিয়া গিয়া উভয়ের মধ্যস্থ হইয়া হরসুন্দরীর হাত ধরিয়া ফেলিয়া বলিল, ঘােষ-গিন্নি! কর কি? স্বামীর গায়ে হাত তুলছে? পাপের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। ছিঃ! ছিঃ। বলিয়াই বােস-গিয়ী তাহার হাত ধরিয়া জোর করিয়া গৃহের বাহির করিয়া দিল। ঠিক সেই সময়ে শৈবলিনী চৈতন্য লাভ করিয়া ক্ষীণকয়ে ডাকিল, মা। বােস-গিল্পী ছুটিয়া গিয়া শয্যার উপর উঠিয়া শৈবলিনীকে বুকে টানিয়া ধরিল, তাহার মুখের উপর মুখ রাখিয়া বলিল, কি না। শৈবলিনী বলিল, আর কেউ আমার সঙ্গে কথা বলবে না মা? মা। ১২৩ পূজার তত্ত্ব অমনি নফরচন্দ্র ছুটিয়া গিয়া শৈবলিনীর বুকের উপর মুখ রাখিয়া বলিল, বলবাে মা! আমি বলবাে। মা আমার? শৈবলিনী ক্ষীণকণ্ঠে বলিল, বাবা। মুখের উপর মুখ রাখিয়া নফরচন্দ্র বলিল, কি মা? বৃদ্ধ বালকের তার নােদন করিতে লাগিল। উষারাণী ছুটিয়া আসিয়া পিতার পাশে বসিয়া শৈবলিনীর হাত ধরিয়া বলিল, বউদিদি! আইন অমান্ত হয়ে গেছে-কথা বলতে ছুটে এসেছি। আমাকে ক্ষমা কর বউদিদি। বলিয়াই সে শৈবলিনীর বুকের উপর মুখ লুকাইয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতে লাগিল। তাহার পর, একে একে সকলেই আসিয়া শৈবলিনীকে ঘিরিয়া দাড়াইল- সকলেই কাঁদিয়া আকুল হইল—আসিল না কেবল বড় ঘরের বড় গিন্নী হরসুন্দরী। সকলেই বুঝিয়াছিল, আর কেন, দুদও পরে শৈবলিনীর জীবন-লীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে।

( ৩২ ) আজ হরসুন্দরীর মর্মান্তিক যন্ত্রণা উপস্থিত হইল। তাহার এত অহঙ্কার -এত আধিপত্য সব নষ্ট হইয়া গেল-তাহার আত্মাভিমানে প্রবল আঘাত পড়িল। ঘােষ পরিবারে এতকাল সকলে নতমস্তকে তাহার আদেশ পালন করিয়াছে—এত বড সংসারটা তাহার ঈঙ্গিতে চালিত হইয়াছে—পুরবাসী পরিজনেরা তাহার কথায় উঠিয়াছে বসিয়াছে কিন্তু আজ তাহার সব প্রভুত্ব চূর্ণ হইয়া গিয়াছে। যাহার বলে বল-যাহার আদরে এ আধিপত্য-যাহার প্রয়ে সে এ যাবৎ সকলকেই পদানত রাখিতে সক্ষম হইয়াছিল, তাহার সেই স্বামী আজ তাহাকে কটুক্তি করিয়াছে—দশ জনের সম্মুখে হতমান করিয়াছে। হরসুন্দরীর বুক ফাটিয়া গেল—চোখে জল আসিলসে ছুটিয়া নিজের কক্ষে প্রবেশ করিয়া শষ্যার উপর আছাড় খাইয়া পড়িল। সমস্ত দিন হরসুন্দরী উঠিল না—জান আহার করিল না কিন্তু কেহই আজ তাহার কাছে আসিল নাসাধ্য সাধনা করিল না—মুখের কথাটা পর্যন্ত কেহ তাহার সঙ্গে কহিল না। সংসারের সমস্ত লােকের ক্রোধ তাহার উপরে। স্বামী বিরক্ত হইয়াছে-সন্তানেরা একা হারাইয়াছে-আত্মীয় স্বজনেরা শতমুখে তাহার নিন্দা করিতেছে- দাস দাসীরা পর্যন্ত যেন ঘৃণাভরে তাহার দিকে কটাক্ষপাত করি- তেছে। লজ্জায় ঘৃণায় হরসুন্দরীর মরিতে ইচ্ছা হইল। দুনিয়ার সমস্ত লােক যখন তাহার বিপক্ষে দাড়াইয়াছে—বে স্বামী এতশল তাহার কথায় উঠিত বসিত—তাহার উপরই সর্বপ্রকারে আত্মসমর্পণ করিয়া বসিয়াছিল, সেই স্বামী যখন তাহার উপর কষ্ট হইয়াছে—পেটের সন্তানেরাও যখন তাহার বিরােধী হইয়া দাঁড়াইয়াছে, তখন হরসুন্দরী বিলক্ষণ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিল, যথার্থই তাহার অপরাধ ঘটিয়াছে—একটা নিরপরাধ বালিকার উপর অযথা অত্যাচার করিয়া তাহাকে মরণের পথে টানিয়া ফেলিয়া দিয়াছে—তাহাই বিশ্ব- ব্ৰহ্মাণ্ড একজোটে তাহার বিরুদ্ধে দাড়াইয়াছে। এতদিনের পর তাহার হৃদয়ে আত্মগ্লানি উপস্থিত হইল। কিন্তু আর যে প্রতিকারের উপায় নাই! তাহার মুখ দেখাইবার পথ নাই। হবসুন্দরী হৃদয়ে নরক-যন্ত্রণা ভােগ করিতে লাগিল। সে নিজের কক্ষে শষ্যার উপর পড়িয়া রহিল-অনাহারে অনিদ্রায় দিন কাটাইতে লাগিল। রান আহারের জন্য দাস দাসীরা এক আধবার অনুরােধ করিয়াছিল কিন্তু হরসুন্দরী তাহাদের ধমক দিয়া তাড়াইয়া দিল—তাহারা মুখ বিকৃত করিয়া প্রস্থান করিল। কয়দিন কাটিয়া গেল-বৃদ্ধ নফরচন্দ্র আর তাহার কাছে আসিল না—একটা সান্ত্বনার কথাও বলিল না-বধূমাতার চিকীৎসার জন্য তাহার কক্ষেই দিন কাটাইতে লাগিল। কার এ প্রকার অবজ্ঞা হররীর অন্তরে অধিকতর যন্ত্রণা প্রদান করিল। তখন সে মনে মনে সঙ্কল্প করিল, নুতন বউএর মরণের সঙ্গে সঙ্গে তাহাকেও এ পৃথিবী ত্যাগ করিতে হইবে। একটা পরের মেয়েকে যে বালা দিয়া মারিয়াছে, নরকে গিয়া তাহার শত গুণ শাস্তি গ্রহণ করিয়া পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতেই হইবে। নূতন বউএর চিকীৎসার জন্য সকলে ব্যস্ত-হরসুন্দরীর দিকে লক্ষ্য করিবার মত মন তখন কাহারও ছিল না। অবসর মত কন্যা উষারাণী বড় বধূ সুরমা তাহার কাছে গিয়াছে কিন্তু হরসুন্দরী কাহারও দিকে ফিরিয়া চাহে নাই, শুদ্ধ শয্যায় শয়ন করিয়া জানাইয়াছে, আমার শরীর ভাল নয়, তােমরা চলিয়া যাও। সৰ্বাঙ্গ বস্ত্রাবৃত করিয়া হরসুন্দরী শয়ন করিয়াছিল। পুত্র প্রকাশ চন্দ্র ধীরপদে কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করিয়া জননীর পদতলে বসিয়া তাহার পায়ে হাত দিয়া কাতর কণ্ঠে ডাকিল, মা। চমকিত হইয়া মুখ তুলিয়া হরসুন্দরী দেখিল, প্রকাশচন্দ্র তাহাব পদতলে বসিয়া চোখের জলে বুক ভাসাইতেছে। হরসুন্দরী বলিল, পা ছাড়া প্রকাশ! আমি তােদেব মা নই-আমি রাক্ষসী। একটা কচি বউএর মাথা চিবিয়ে খেয়েছি—তােরা সরে যা-হয়ত ক্ষিধের লায় আমি টপ টপ করে সব গিলে ফেলবাে। প্রকাশ কঁদিতে কাদিতে বলিল, কেন এমন অধীর হচ্ছ মা! পরের মেয়েটার কাছে এক এস-তার পাশে বস—চিরদিনের মত তাকে বিদায় দাও। হরসুন্দরী মাথা তুলিয়া বলিল, সেই দেবকন্যার পাশে গিয়ে বসবার অধিকার আমার আছে প্রকাশ। প্রকাশ বলিল, তােমার কি অপরাধ মা? সে যে নিজের দোষে নিমেছে। ১২৭ পূজার হরসুন্দরী বলিল, নিজের দোৰে মৰছে? মিথ্যে কথা বলিসনে প্রকাশ! আমিই তাকে হত্যা করেছি বড় ঘরের মানের দাবীতে আমি একটা পরের মেয়ে বলিদান করেছি। এ পাপের শান্তি আমি নিজে গ্রহণ করবাে। চমকিত হইয়া প্রকাশ বলিল, কি কবে তুমি মা? হসুন্দরী বলিল, তাকে যন্ত্রণা দিয়েছি—সেই অভিমানে সে অনাহারে অনিদ্রায় মরণের পথে ছুটে চলেছে। আমিও তার প্রায়শ্চিত্ত কবে, অনাহারে অনিদ্রায় আমিও এ পাপদেহ ত্যাগ করবে। অমনি প্রকাশ জননীর পা জড়াইয়া ধরিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতে লাগিল, অনেক অনুনয় বিনয় করিয়া শত চেষ্টা করিয়া তাহাকে উঠাইতে পারিল না—তাহার সঙ্কল্প ত্যাগ করাইতে পারিল না। যুবক বুঝিল, ঘােষ পরিবারের ধ্বংসই ইহার অনিবাৰ্য পরিনাম। সে ধীরপদে জননীর কক্ষত্যাগ করিল।

( ৩ ) হরসুন্দরীর কঠোর আদেশ অগ্রাহ হইয়া গেল-বাড়ীশুদ্ধ সকলেই আজ প্রাণপণে শৈবলিনীর সেবা করিতে লাগিল। বােস-গিল্পী শৈবলিনীর শিয়রে বসিয়া অনাহারে অনিদ্ৰায় তাহার সেবা করিতে লাগিল। বৃদ্ধ নফরচন্দ্র তাহার ধনের সিন্ধুক উন্মুক্ত করিয়া মুক্ত হন্তে অজস্র অর্থবৃষ্টি করিতে লাগিল। বড় বড় ডাক্তার কবিরাজ আসিতে লাগিল-মূল্যবান ঔষধ পথ্যে ঘর ভরিয়া গেল। চেষ্টার বিন্দুমাত্র ক্রটি রহিল না কিন্তু সৰ বিফল হইয়া গেল—দিন দিন শৈবলিনীর অবস্থা শােচনীয় হইয়া দাঁড়াইতে লাগিল। আগুন যখন মটুকায় জ্বলিয়া উঠিয়াছে, তখন আর জল ঢালিয়া ফল কি হইবে? ডাক্তারেরা প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াও যখন রােগের বিন্দুমাত্র উপশম করিতে পারিল না, তখন তাহারা হতাশ হইয়া জবাব দিয়া এক একে প্রস্থান করিতে লাগিল। বৃদ্ধ নফচত্র তখন পাগলের মত হইল—যাহার তাহার হাত ধরিয়া কাঁদিয়া বলিতে লাগিল, আমার ধন- ১২৯ পূজার তত্ত্ব সম্পত্তি যথাসর্বষের বিনিময়ে তােমরা আমার বউমার জীবন রক্ষা কর। হায় অভাগা ! যদি দুদিন আগে চৈতন্য হইত, তাহা হইলে আজ এত অর্থ অপব্যয় হইত না—তােমার কুললক্ষ্মী এমনিভাবে অত্যাচারের আগুনে পুড়িয়া ছাই হইয়া যাইত না। শৈবলিনী অতি ক্ষীণকণ্ঠে ডাকিল, মা ! আগ্রহভরে মাথা নীচু করিয়া মহামায়া বলিল, কি মা! শৈবলিনী কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল,বাঁচতে বড় সাধ হচ্ছে মা! বুকভরা দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া চোখের জলে বুক ভাসাইয়া মহামায়া বলিল, এত চেষ্টা করেও ত তােমাকে রক্ষা করতে পারলাম না মা? আবার কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া শৈবলিনী বলিল, তিনি কোথায় ? শৈবলিনী প্রকাশচন্দ্রকে লক্ষ্য করিয়াছিল, সকলেই বুঝিতে পারিল। প্রকাশ তখন শৈবলিনীর পার্শ্বে বসিয়া মাথা নীচু করয়া কাদিতেছিল। শৈবলিনার উদ্দেশ্য বুঝিয়া তাহার মুখের কাছে মুখ রাখিয়া প্রকাশ বলিল, এই যে আমি ! শৈবলিনী বলিল, কথা বলতে হুকুম পেয়েছ ? ও কি ! তুমি কাছে ? কেঁদোনা। তুমি একটুখানি হাস-তােমার মুখের হাসি দেখে আমি সুখে মরতে পারবাে। প্রকাশ মাথা নীচু করিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিতে লাগিল। শৈবলিনী দার্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া মহামায়ার মুখের দিকে তাকাইয়া বলিল, বাবাকে, ভাই বােনদের দেখতে সাধ হয়েছে মা! বলিয়াই শৈবলিনী অচৈতন্য হইল। ঠিক সেই সময়ে নফরচন্দ্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র অনুকুলচন্দ্রের সহিত হেমবাবু পুত্র-কন্যাদের হাত ধরিয়া উন্মাদের মত কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করিলেন।

তাহাদের দেখিয়া সকলেই শৈবলিনীর শয্যা ত্যাগ করিয়া দূরে সরিয়া গড়াইল। হেমবার গভীর শােকভরে বাষ্পরুদ্ধকঠে বলিলেন, বেই। বেহাই! আমার মা কই? হেমবাবু শয্যার উপর উঠিয়া শৈবলিনীর লুষ্ঠিত মস্তক অঙ্কে তুলিয়া লইলেন—ভাই ভগিনীগুলি শৈবলিনীর বুকের উপর মুখ রাখিয়া দিদি? দিদি ! বলিয়া উচ্চকণ্ঠে কাঁদিয়া উঠিল। অমনি শৈবলিনীর তন্দ্রা ভাঙ্গিয়া গেল-পিতাকে দেখিরা ভাই ভগিনী- দের দেখিয়া তাহার মলিন মুখখানি যেন পরমাননে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল— মূখে হাস্যের রেখা ফুটিয়া উঠিল। ক্ষীণ হস্ত অতি কষ্টে উত্তোলন করিয়া শৈবলিনী ভাই ভগিনীদের বাহুবেষ্টনে জড়াইয়া ধরিল—তাহার দুই চক্ষু হইতে দর দর ধারায় আনন্দাশ্রু ঝরিয়া পড়িল। হেমবাবু শৈবলিনীর মুখের উপর মুখ রাখিয়া কাতরকণ্ঠে বলিলেন, মা! মা! অনুকুলের টেলিগ্রাম পেয়েই চাকরীর আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে তােমাকে দেখতে ছুটে এসেছি। কথা কও মা! অতি ক্ষীণ কণ্ঠে শৈবলিনী বলিল, বাবা! এসেছ-পূজার তত্ত্ব এনেছ ? বড় ঘরের মান রক্ষা করেছ ? ঠিক সেই সময়ে প্রকাণ্ড একটা ভার কাঁধের উপর করিয়া শঙ্কর চাকর তপদে কক্ষ-মধ্যে প্রবেশ করিয়া বলিল, এনেছি-এনেছি দিদি। শঙ্কর চাকরের যথাসর্বস্ব ব্যয় করে সহর উজাড় করে বাছা বাছা জিনিস এনেছি চোখের উপর দেখ, বড় ঘরের মান রক্ষা কেমন করে করেছি। শঙ্কর মস্তকের ভার কক্ষতলে নামাইল—আরও কয়েক জন ভারীর রুদ্ধে প্রচুর ভ্রব্য উপস্থিত লইল—ঘর ভরিয়া গেল। সকলে অবাক হইয়া শঙ্করের মুখের দিকে তাকাইয়া রহিল।

শঙ্করের উন্মাদের মত মূর্তি। সে মূর্তি দেখিয়া সকলের অন্তরে আতঙ্ক উপস্থিত হইল। হেমবাবু পৰ্যন্ত ভীতভাবে তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। অমনি বােস-গিল্পী উচ্চকন্তে চীৎকার করিয়া বলিল, ওগাে বড় ঘরের বড় গিন্নি! ওগাে বাঙ্গালীর ঘরের শাশুড়ী! একবার ছুটে এস চোখে দেখে যাও। একটা চাকরের বুকে কি মায়া-মমতা-কি কৃতজ্ঞতা—কি উদারতা! বধু-নিৰ্যাতনের মহাপাপে বাঙ্গালা দেশ আজ অশান হয়েছেসৰ ধ্বংসের পথে চলেছে। আর সহ্ন করতে পারিনে। বলিয়াই মহামায়া কাঁদিতে কাদিতে কক্ষত্যাগ করিল।

( ৩০) চোখের উপর এত অত্যাচার সহ্য করিতে পারিবে না বলিয়াই অনুকুল- চন্দ্ৰ গৃহত্যাগ করিয়া শ্যামবাজারে তাহার শশুরালয়ে গিয়া আশ্রয় লইয়া- ছিল। জননীর সহিত যখনই তাহার বিবাদ উপস্থিত হইত, তখনই সে রাগ করিয়া শশুরালয়ে চলিয়া যাইত। সেইজন্য হরসুন্দরী মন্তব্য প্রকাশ করিত, তাহার শ্বশুর শাশুড়ীই তাহার মাথা খাইতেছে। অকুলের শশুর শাশুড়ী সে মন্তব্যে কর্ণপাত করিত না, কেননা, তাহারাও বড়লােক জমিদার। অনুকুল শ্বশুরালয়ে থাকিয়া সঙ্গোপনে বাড়ীর সংবাদ লইত। শৈবলিনীয় কঠিন রােগের কথা শুনিয়া তাহার প্রাণ আতঙ্কে কাপিয়া উঠিলজনক জননীর উপর তাহার বিজাতীয় ঘণা উপস্থিত হইল। সে কালবিল করিয়া সিমলার পাহাড়ে হেমবাবুকে টেলিগ্রাম করিয়া বিপদের কথা জানাইল। শৈবলিনীর জীবনসঙ্কট অবস্থা শ্রবণ করিয়া হেমবাবুর শাখায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল। পূজার তত্ত্ব হয় নাই বলিয়া মার উপর অত্যাচার হইয়াছে, মা আমার মরিতে বসিয়াছে, হেমবাবু যখন শঙ্কর চাকরকে এ সবাদ জানাইলেন, তখন শঙ্কর উন্মাদের ন্যায় লাফাইয়া উঠিয়া বলিল, কি! পূজার তত্ত্ব হয়নি বলে তারা আমার দিদিমণিকে মেরে ফেলছে ? বাবু! বাবু! আমি এখনই কলিকাতায় যাব—পূজার তত্ত্ব তাদের কড়ায় গণ্ডায় বুঝে দেবস সয়তানদের হাত থেকে আমার দিদিমণিকে রক্ষা করবাে। হেমবাবু চাকরীর মমতা রাখিলেন না—আফিসে একটা দরখাস্ত পর্যন্তও করিলেন না—তখনই শঙ্কর চাকর ও পুত্র কন্যাদের লইয়া কলিকাতা অভিমুখে ধাবিত হইলেন। যথাসময়ে কলিকাতায় আসিয়া তিনি প্রথমেই শ্যামবাজারে অনুকুলচন্দ্রের শ্বশুরালয়ে উপস্থিত হইলেন। হাবডার ষ্টেশন হইতেই শঙ্কর চাকর সহসা কোথায় অদৃশ্য হইয়া গেল। হেমবাবু শঙ্করকে চিনিতেন। সে যে শৈবলিনীকে কত ভালবাসে ভালরূপ জানিতেন। তিনি ভাবিলেন, হতভাগা শঙ্কর হয়ত পাগল হইয়া গিয়াছে। শঙ্করের নিকট এখনও সাত আটশত মুদ্রা সঞ্চিত ছিল। সে ভবানী- পুরে একজন পরিচিত ভদ্রলােককে সঙ্গে করিয়া মিউনিসিপ্যাল মার্কেটে পূজার অব্দের বাজার করিল, তাহার পর, নিজে মােট মাথায় করিয়া ভারীর বয়ে ভার তুলিয়া দিয়া পটলডাঙ্গার দিকে উদ্ধশ্বাসে ছুটিয়া চলিল। । শৰ উন্মাদের ন্যায় উচচত করিয়া হরীতে সম্বােধন করিয়া উচ্চকণ্ঠে বলিল, কোথায় গেলে গাে ঘােষ-গিন্নি! ছুটে এস-পূজার তত্ব বুঝে নাও-বড় ঘরের মান রক্ষা হ'ল কি না একবার চোখে দেখে যাও। যথার্থই তখন হরী নিজের কক্ষ ত্যাগ করিয়া কহিরে আন্নিা গড়াইয়াছিল—উকি দিয়া ঘরের দিকে চাহিতেছিল-পূজার তত্ত্ব চোখে দেখিয়া অবাক হইয়া গিয়াছিল। ঠিক সেই সময়ে ক্ষীণকণ্ঠে শৈবলিনী বলিল, শঙ্কর । বাষ্পরুদ্ধকণ্ঠে শঙ্কর উত্তর প্রদান করিল, কেন দিদি। শৈবলিনী বলিল, যাই আমি। শঙ্কর বলল, কেন যাবে ? মনে পড়ে দিদি ! সেদিনকার কথা? তুমি বলেছিলে, আমার বাবাকে যত্ন করাে। বসে আছেন তােমার পিতা, জিজ্ঞাসা কর তাকে, যার কোন ত্রুটি হয়েছিল কি? বলেছিলে দিদি। আমার ভাই বােদের মেরাে না, জিজ্ঞাসা কর তাদের—শঙ্করের একটা নখের আঁচড়ও কি তাদের গায়ে লেগেছিল ? তাদের ভালবাসতে বলেছিলে। আমি ঘােটলােকের ছেলে বড় ঘরের লােকে কি বরে’ ভালবাসে, আমি জানিনে দিদি ! তবে আমি ছােটলােক, তােমার ভাই বোনগুলিকে দিনরাত্রি বুকের মধ্যে জড়িয়ে রেখেছিলাম—তাদের শত অত্যাচার নারবে সহ্য করে ছিলাম। এর চেয়ে ত বেশী ভালবাসতে আমি ছােটলােক শিক্ষা করিনি দিদি। তারপর, পূজার তত্ব? শঙ্করের ভাণ্ডার উজাড় করে’ তত্ব এনেছে- চোখে দেখ দিদি। তবে কেন আজ আমাদের ত্যাগ করে চলে যাবে ? শােকের ঝড়ের দমকা বাতাসে সমগ্র সংসার যেন ভাঙ্গিয়া পড়িল। হরসুন্দরী দুরে দাঁড়াইয়া ছিল—অনাহারে অনিদ্রায় আজ তাহার মূর্তি ভয়ঙ্কর-সে কথা শুনিয়া স্তম্ভিত হইয়া তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া ছিল। আজ পাষাণ হিমাচল গলিয়া গেল-হরসুন্দরীর চক্ষেও অধারা ঝরি পড়িল। অমনি ঘােস-গিন্নী উন্মাদিনীর ন্যায় কমধ্যে ছুটিয়া গিয়া উচ্চকণ্ঠে চিৎকায় ধ্বনি খলিল, বড় ঘরের মান রক্ষা হয়েছে—আমার অহঙ্কার চূর্ণ হয়েছে। কোথায় গেলে বােস-গিন্নি!' আমি আজ নিজের মুখেই স্বীকার করছি, যথার্থই আমি ছােট-অকি ছােট—তােমার পায়ের ধূলাের ও মােগ্য নই। উমা। বইনা : ক্ষমা করছেড়ে যেয়াে না—এত বড় ঘােষশ ছারখার করে দিয়ো না। তার চেয়ে, অভিসম্পাত কব আমার মাথায় বজ্রাঘাত হক। বলিয়াই হরসুন্দরী শৈবলিনার বুকের উপর আছাড় খাইয়া পড়িল। অমনি শৈবলিনীর মুখে শেষ বাণী উচ্চারিত হল মা । সম্পূর্ণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Pujar Tattya Ed.1

Author
Das, Shashibhushan
Title
Pujar Tattya Ed.1
File name
Pujar Tattya Ed.1
Text
OCR done
Citation
1928
Published
2010/05/3
Publisher
Sad-sahitya-mandir, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
158
Library
Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Classification
Bengali Novel
Keywords
Das, Shashibhushan
DLI number
515178
Barcode
4990010016811.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
BrWctsiNpLd
Download PDF

Pujar Tattya Ed.1