Belgaria Sudha Smriti Pathagar

Andhar Pather Jatri Ed. 2

Gupta,niharranjan · 2010/03/17

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

আঁধার পথের যাত্রী
-রহস্য উপন্যাস
?
নীহাররঞ্জন গুপ্ত
বেঙ্গল পাবলিশার্স
১৪, বংকিম চ্যাটার্জীট,

শ্ৰীযুক্ত সতপ্ত কর্তৃক
সবুজ সাহিত্য আয়তনের
পক্ষ হইতে প্রকাশিত,
১৪, বংকিম চ্যাটার্জী স্ট্রীট, কলিকাতা।
প্রথম সংস্করণ-মহালয়া ১৩৫০
দ্বিতীয় সংস্করণ-১৩৫১
দেড় টাকা
জিতেন্দ্র নাথ দত্ত দ্বারা মুক্তি
জীবি খেল লিঃ
অগাষ লেন, কলিকাত

বন্ধুর
শ্রীযুক্ত শচীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়
করকমলেষু

—একটা কথা দীর্ঘ চার বছর ধরে যুদ্ধের ফলে সমগ্র দেশবাসী আজ বিপর্যস্ত ও নানাভাবে বিব্রত। অন্ন বস্ত্রের অভাবে সর্বত্র হাহাকার। এই দুর্দিনেও পেটের খােরাকের মত মনের খােরাকও আজ একান্ত প্রয়ােজন। কিন্তু কাগজের যেরূপ অভাব তা’তে নূতন পুস্তক প্রকাশ একরূপ অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে। এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে যারা নানাভাবে সাহায্য করেছেন তঁাদের মধ্যে । কাগজ দিয়ে বিখ্যাত কাগজ ব্যবসায়ী ভােলানাথ দত্ত এণ্ড সন্সের অন্যতম সত্বাধিকারী শ্ৰীবিভূতি ভূষণ দত্ত। চিত্রশিল্পী : শ্রীপূর্ণ চক্রবর্তী। ব্লক মেকার : মেসার্স ভারত ফটোটাইপ ষ্টুডিও। মুদ্রণ : শ্ৰপতি প্রেসের ম্যানেজার শ্রীধীরেন্দ্র নাথ মিত্র। এদের কাছে আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। লেখক। এই লেখকের লেখা অন্যান্য বই সাত সমুদ্র তের নদীর পারে কিরীটি রায়ের বাহাদুরী (২য় সংস্করণ) রাত্রি যখন গভীর হয় (২য় সংস্করণ) নিশীথ রাতের তীরন্দাজ রঙীন ধরণী রাখী বন্ধন স্নাথী শী। কালাে ভ্রমর ১ম ভাগ( ২য় সংস্করণ ) কালো অমর এর রক্তলােভ নিশাচন (স্থ সংস্করণ) রাজকুমার অদৃশ্য শত্রু লাল চিঠি = | ভাইলীয় বা อีกนาน পর ১০ they 42 -ভাতার সেন- রাত্রি বারটা বাজল। উঃ কী অন্ধকার! চারিদিক নিস্তব্ধ। শুধু একা আমি জেগে। সবাইত’ ঘুমিয়েছে; তবে আমার চোখে ঘুম নেই কেন? উত্তর পশ্চিম সীমান্তে ভারতের এক ছােট্ট সহর। পৌষের শেষাশেষি। শীতও যেন রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। হাড় পর্যন্ত যেন দুর্দান্ত শীতের তীব্রতায় কনকনাকি জাগাচ্ছে। ঘরের এক কোনে চুল্লী অলছে। আগুণের নীলাভ শিখাগুলি যেন মন ছুয়ে যাচ্ছে। মানুষ কেউ দেখে শেখে আবার কেউ ঠেকে শেখে।

আঁধার পথে যং
ছােট বেলায় মা বাবার মুখে মাষ্টারদের মুখে শুনতাম ?
আমার বুদ্ধিটা নাকি সাধারণের চাইতে একটু বেশী।
কিন্তু আজ জীবনের ৩০টা বছর পিছনে ফেলে এসে পিছন
পানে তাকাচ্ছি, দু’চোখের কোণে অশ্রু জমে ওঠে কেন ?
আমি একজন শিক্ষিত ডাক্তার । সংসারে বর্তমানে আমি
ও আমার এক ছােট ভাই, রজত ।
ও আমার নামটা বুঝি বলা হয়নি।
আমার নাম শিশির সেন ।
ডাক্তারীতে পসার আমার ভালই, কেননা সহরটা ঘােট,
এবং বাঙালী ডাক্তার বলতে গেলে আমিই ‘এক মেবাদ্বিতীয়।
আর চার পাঁচজন পাঞ্জাবী ডাক্তার আছে বটে তবে
বিলাতী ডিগ্রী ল্যাজে দু’চারটে আছে বলেই হয় ত আমার
পশারঠা একটু বেশী ।
বাঙালী হয়েও বাংলা দেশ ছেড়ে দেড় হাজার মাইল দূরে
কেন ডাক্তারী করছি সে কথা বলতে হলে অতীতের একটু
ইতিহাস বলা প্রয়ােজন।
বাবা ছিলেন বহুকাল বিলাত প্রবাসী এবং দুর্দান্ত রকমের
সাহেব।
জীবনের প্রায় বেশীর ভাগ সময়ই তিনি বিলাতের এক
কলেজে অধ্যাপনায় কাটিয়ে যখন বৃদ্ধ বয়সে ভারতবর্ষে ফিরে
এলেন তখন ভারতের বহু স্থান ঘুরে ঘুরে অবশেষে কাশ্মীর
থেকে ফিরার পথে ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্তে এই পাহাড়

এবং সংগে সংগে
আর পথের যাত্রী
াে সহরটিতে
মুত্যন্ত মন বসে যায় ।
এখানে জায়গা কিনে বসবাসের জন্য চমৎকার একটি বাংলাে
প্যাটার্ণের বাড়ী তৈরী করান।
বাবা বলতেন : মানুষ কেন বিলাত যায় জানিনা।
সমস্ত পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্য, জল বায়ু যেন আমাদের
ভারতভূমিতে ইতঃস্তত ছড়িয়ে আছে। এখানে
আছে, নদী আছে, গভীর বনানী, আকাশচুম্বী পাহাড় ;
মরুভূমি কী নেই! হীরা, মণি, মাণিক্য, সব আমাদের ভারতের
মাটীতে খুজলে পাওয়া যায়—সমগ্র পৃথিবীর যেন একটি
ছােটখাটো সম্পূর্ণ সংস্করণ।
শীতের দেশে প্রায় সারাটা জীবন কাটিয়ে এসে এদেশের
গ্রীষ্মটা যেন শরীরে তার মােটেই সইত না।
সেদিক দিয়ে ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্তের পাহাড় ঘেরা
সহরটি ছিল অপূর্ব! শীতকালের ত’ কথাই নেই, গ্রীষ্মকালেও
এখানে রাত্রে রীতিমত ঠাণ্ডা ! গায়ে কিছু না দিয়ে শােয়া
যায় না। শীতকালে রীতিমত তুষার পড়ে।
৪৫ ইঞ্চিরও বেশী বরফে সমস্ত সহরটি ঢেকে যায়।
তুষার ঢাকা চারিপাশের পাহাড়গুলি ও বরফের টোপর
মাথায় পাইন গাছগুলি শীত ঋতুতে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য ধারণ
? আমি পাশ করে আসবার বছর খানেকের মধ্যেই বাবার
মৃত্যু হয়। মা অনেক আগেই স্বর্গে গেছেন।

আঁধার পথের ৮ি
লিংক রােডের 'পরে আমাদের লতিকা লজ’! গ্রেনাইট
পাথরের তৈরী বাড়ীটা। সামনে ছােট খাটো একটা বাগান।
বাড়ীটায় সর্ব সমেত ছয়খানি ঘর। শশাবার ঘর দুটি,
একটিতে আমি, অন্যটায় আমার ভাই রজত থাকে।
একটা পারলার, একটি ষ্টোর ও খাবার ঘর ও একটি
রান্নাঘর।
পারলারের সংলগ্ন মাঝারি গােছের একটি ঘরে পার্টিশন
দিয়ে দু’ভাগ করে, এক অংশে আমার ‘ক্লিনিকস্ অন্য অংশে
আমার প্রাইভেট রুম ! প্রাইভেট রুমের সংগে আমার শয়,
কক্ষে যাবার একটি দরজা আছে।
প্রত্যেক মানুষেরই সখ থাকে। আমারও আছে।
আমার দুটি। এক : ডিটেকটিভ বই পড়বার উগ্র নেশা। দুই ও
নিজের হাতে তৈরী একটি ‘অল-ওয়েভ রেডিও সেট আছে।
সারাদিনের কাজকর্মের পর ঐ দুটি নেশাই আমার সম্বল।
রাত্তে আমি বড় একটা রােগী দেখি না।
ছােট ভাই রজত লেখা পড়া বেশীদূর পর্যন্ত করেনি, সহৰে
ছােট খাটো একটি কাপড়ের দোকান রয়েছে তাই নিয়েই
থাকে। এক খাবার সময় ছাড়া দুই ভায়ে বড় একটা দেখা
হয় না। আমি বেশী কথা বলি না। কিন্তু ছােট ভাই রজত
ঠিক ভিন্ন প্রকৃতির। দিবারাত্র সমান ভাবে তার মুখ চলছে।
রজতের আরাে একটা দোষ আছে ; সর্ব বিষয়ে বিএ
অহেতুক কৌতুহল। কিন্তু মনটা তার অত্যন্ত সরল।
ক

আধার পথের
“দুই ভায়ের মধ্যে আমাদের ভালবাসা কিন্তু প্রগাঢ় !
বাড়ীতে একটা কম্বাই হাণ্ড আছে, নাম তার নারাণ !
ছােট রে থেকেই সে আমাদের কাছে আছে। রান্না থেকে
সুরু করে বাড়ীর সব কিছুই সে দেখা শােনা করে। আমরা
ছাড়াও এ সহরে আরাে দু’ চার ঘর বাঙালী আছেন।
এই সহরটা সম্পর্কে আগেই দু চারটে কথা বলেছি।
সহরের মধ্যে দুটো পরিবার আছে, যাদের প্রতি সহজেই
সকলের দৃষ্টি পড়ে । এক হচ্ছে স্যার সূৰ্যপ্রসাদ সেন।
ভদ্রলােক বিপত্নীক ! একমাত্র মাহারা পুত্র তার সমর।
তা ছাড়াও তার সংসারে আরাে দুটি পােয্য আছে, তাঁর
ছােট ভাই রাধিকাপ্রসাদ ও তার দুই ছেলে বিমল ও সুবল।
স্যার সূৰ্যপ্রসাদ কোথাকার এক ষ্টেটে দীর্ঘ ঊনিশ বৎসর
চাকুরী করে যখন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন, লােকে বলাবলি
করত তার ব্যাংকে নাকি তখন দশলাখ মত টাকা ছিল।
ভদ্রলােক অত্যন্ত বিনয়ী ও নির্বিরােধি।
একমাত্র ছেলে সমর যাতে লেখাপড়া শিখে মানুষের মত
মানুষ হয় তার জন্য স্যার সূৰ্যপ্রসাদের চেষ্টা ও যত্নের ত্রুটি ছিল
; কিন্তু অল্প বয়েসেই কুসংগে মিশে সমর শাসনের বাইরে
চলে যায়। বাপের বাক্স ভেংগে টাকা নিয়ে জুয়াে ও রেস
খেলায় সে অল্প বয়েসেই বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে মত্ত হয়ে ওঠে
একমাত্র ছেলের এই পরিণতি সূৰ্যপ্রসাদের মস্তবড় দুঃরে
কারণই হয়ে উঠেছিল।
••
৫

আঁধার পথের যাত্রী।
মাসখানেক আগে হঠাৎ একদিন রাত্রে সমর সূৰ্যপ্রসাদের
বাক্স ভেংগে হাজার পাঁচেক টাকা নিয়ে সেই যে উধাও হয়ে
গেছে আজ পর্যন্ত তার আর কোন হদিশ মেলেনি।
সেদিনও রাস্তায় রােগী দেখে ফিরছি স্যার সূৰ্যপ্রসাদের
সংগে দেখা ; কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলাম : ছেলের কোন
সংবাদ পেলেন, স্যার সূর্যপ্রিসাদ বললেন : তার কথা আর
বলােনা ডাক্তার। সমর যে আমাকে এমনি ভাবে দাগা দেবে,
স্বপ্নেও তা কোন দিন ভাবিনি।
রাধিকাপ্রসাদ আজ মাত্র বছর দুই হয় দাদার সংসারে এঙ্গে
কায়েমী আসন নিয়েছেন। খুলনায় ওকালতি করতেন ; তার
এক পয়সাও ছিল না। বরাবরই স্যার সূৰ্যপ্রসাদ ভাইকে অর্থ
সাহায্য করতেন।
রাধিকাপ্রসাদের বড় ছেলে বিমলও বি. এ. পাশ করে
চারীর চেষ্টায় ঘুরছে! ছােট ছেলে সুবল ডন, বৈঠক, কুস্তি
প্রভৃতি শরীর চর্চা নিয়েই থাকে। জুয়া না খেললেও বিমল
অত্যন্ত বিলাসী ও চঞ্চল মতি!
মুখে সর্বদাই বড় বড় কথা লেগে আছে !...
এখানকার দ্বিতীয় অধিবাসী জগঞ্জীবন ও পুলকজীবন বাবু।
জগৎজীবন বাবু মাসখানেক আগে হঠাৎ টি, বিতে মারা যান।
জগৎজীবন বাবুর এককালে পাটের দালালী করে প্রভূত
অর্থ ব্যাংকে জমেছিল—তিনি বিবাহ করেন নি! বৃদ্ধবয়সে
জালালী ছেড়ে দিয়ে ছােট ভাই পুলকজীবনকে নিয়ে শান্তি

বল্প পথের যাত্রী ও নিরিবিলিতে জীবনের বাকী কটা দিন কাটাবার জন্য এখানে এসে চমৎকার একখানা বাড়ী তৈরী করেন। ছােট ভাই পুলক জীবন এম, এ পাশ করে বম্বেতে প্রফেসারী কর- ছিলেন, মাঝে মাঝে ছুটি ছাটায় এখানে দাদার কাছে আসতেন। দাদার মৃত্যুর পর তিনি এখন চাকরী ছেড়ে দিয়ে এখানেই এসে বসবাস করছেন। স্যার সূৰ্যপ্রসাদের পরম বন্ধু ছিলেন এই জগৎজীবন চৌধুরী ! শৈশব থেকেই তাদের বন্ধুত্ব ! এ ছাড়া এ সহরে আরাে অনেক বাসিন্দাই আছেন, তাদের কথা না বললেও চলতে পারে কেন না তারা বাঙালী নয়। দিন কয়েক থেকে লক্ষ্য করছি । আমার পাশের একতলা ছােট্ট বাগান বাড়ীটায় আধা বয়সী একটি ভদ্রলােক এসে ভাতা নিয়েছেন। বাড়ীটার নাম : 'Sunny Lodge'। শােনা যায় ভদ্রলােক নাকি বাংলােটা ক্রয় করেছেন। ভদ্রলােকের বােধ হয় বাগান ও গাছপালার খুব সখ ; প্রায় সব সময়ই দেখি বাড়ীর সামনের বাগানের গাছপালা নিয়ে ব্যস্ত আছেন। লম্বায় ভদ্রলােক প্রায় ছয়ফুট হবেন। পেশল উন্নত চেহারা। মাথায় ঘন কালাে চুল, ব্যাক ব্ৰাস্ করা ! চোখে কালাে সেলুলয়েডের চশমা। পরিধানে গেরুয়া রংয়ের খদ্দরে পায়জামা ও পাঞ্জাবী ! ৭ দুই -রজতের কৌতুহল কাল রাত্রে জগৎজীবন চৌধুরীর ছােট ভাই পুলক জীবন থাইসিসে মারা গেছেন ! ভদ্রলােক কিছুদিন ধরে আমারই চিকিৎসাধীনে ছিলেন। মনটা সেই জন্য ভাল নেই। নিজের ক্লিনিক্সএ বসে বসে সেই কথাই ভাবছি এমন সময় ছােট ভাই রজত এসে ঘরে ঢুকল। ও তােমাদের ডাক্তারী শাস্ত্র একদম hopeless দার্দা। good for nothing ! : কেন ? : নয় কেন ? তােমার মুখেই ত’ শােনা ; পুলকবাবু নাকি একদম সেরে উঠেছিলেন। আজ দীর্ঘ ১১ বছর পরে আবার কেমন করে সে রােগ flane up করল !... : ওইত’ বােগটার উৎকট খেয়াল, নেইত নেই, হুস করে আবার এক সময় বলা নেই কওয়া নেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। : যা বল বাপু, তমাদের ডাক্তারী শাস্ত্রটাই একেবারে total failure ! আমি হাসতে হাসতে বললাম : দেখবি দেখবি! now-adays it is budding science! gafwat chefs anyagi ডাক্তাররাই বিশ্বজয় করবাে।

আঁধ'র পথের যাত্রী
: Let us hope !.... যা বলো, সত্যি বেচারা
পুলক বাবুকে যেন কোন মতেই ভুলতে পারছি না !
ভদ্র!....
ইদানিং পুলকের সংগে রজতের আলাপটা যেন একটু
বেশী হয়েছিল ।
তাই হয়ত পুলকের মৃত্যুতে ওর মনে এত ব্যথা লেগেছে।
কিন্তু মৃত্যু বড় নির্মম ।
শাসন তার অমােঘ ....
পরের দিন সকালের দিকে রােগী দেখে ফিরছি বড় রাস্তার
মােড়ে হঠাৎ স্যার সূৰ্যপ্রসাদের সংগে দেখা !
লম্বা কালাে লং কোটটা গায়ে ; পকেটে হাত ঢুকিয়ে মাথা
নীচু করে অন্যমনস্ক ভাবে পথ চলছিলেন! মুখে পাইপ !
: স্যার সূৰ্যপ্রসাদ ! Good morning।
ও ও ডাক্তার !...তােমার কাছেই আমি চলছিলাম ডাক্তার।
ও আমার কাছে!
কোন দরকার ?
: দরকার ! হাঁ একটু বিশেষ কথা ছিল !.... mean,
কথাটা !....all right, এক কাজ করনা কেন ডাক্তার, আজ
রাত্রে আমার ওখানে এসাে না খাবে !....আপত্তি আছে নাকি?
: আপত্তি !....না না!....সমরের কোন সংবাদ পেলেন স্যার
সূৰ্যপ্রসাদ ?
ও সর! না। হতভাগা দেখছি শেষ জীবনটা আমার

আঁধার পথের যাত্রী
?
দুর্বিসহ করে তুলল। কু-পুত্রের পিতা হওয়ার চেয়ে বােধ হয়
জন্ম জন্ম অ-পুত্ৰক থাকাও ঢের বাঞ্ছনীয়।
ও সত্যি, সমর আপনার মত লােকের ছেলে হয়েও কেন যে
কু-পথে গেল।
: বরাত ! ডাক্তার বরাত !....আচ্ছা চলি ডাক্তার ! সন্ধ্যায়
আসছ ত’
: নিশ্চয়ই!....
ধীর, শ্লথ গতিতে স্যার সূৰ্যপ্রসাদ চলে গেলেন!
ভদ্রলােকের মুখের দিকে চাইলেই মনে হয় কী যেন দুঃসহ
চিন্তা ওঁকে নিরন্তর উন্মনা ও ব্যাকুল করে রেখেছে !
সারাটা জীবন খাটুনীর পর কোথায় শেষ বয়েসে শান্তিতে
থাকবেন—হতভাগা পুত্রের জন্য এতটুকুও শান্তি নেই !
সত্যি একেই বলে দুর্ভাগ্য!....
বাড়ীতে ফিরে আসতেই রজতের সংগে দেখা।
: এই যে দাদা! কোথায় ছিলে?
: কেন ?
: A good news!
আনন্দে রজতের দু চোখের তারা চক্ চক্ করতে থাকে।
: কী আবার good news !
Just guess ! বল দেখি ।
ও আমার পেশা গনকারী করা নয়, ডাক্তারী।
ও দাদা তুমি একটি hopeless ! absolutely hopeless !

আঁধার পথের যাত্রী
:
তবু আমি নিরুত্তর।
ও সমর, বুঝলে সমর ফিরে এসেছে।
ও আজকাল কি নেশা টেশা করছিস নাকি রজত ?
ও বিশ্বাস করলে নাত ? আমি জানি বিশ্বাস করবে না।
but believe me! সত্যি সমর ফিরে এসেছে। আমি নিজে
তাকে মাঠের ধারে যে শিশুগাছেয় বন আছে সেখানে
একজন ভদ্রলােকের সংগে কিছুক্ষণ আগে কথা বলতে দেখে
এসেছি।
ও তাের সংগে দেখা হলাে !
ও না! তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে গেলাম ; কিন্তু ধরতে
পারলাম না ।
: তাের দেখতে ভুলও হতে পারে!....
ও ভুল!
তুমি বল কি দাদা ? সমরকে আমি
ভুল করব।
চিন্তে পারব না, যার সংগে দীর্ঘ চার মাস ঘনিষ্ঠ ভাবে মিশেছি।
ও তুই ডাকলি না কেন?
ও ডেকেছিলাম, সে হয়ত শুনতে পায়নি! বেচারী হঠাৎ
ঝোঁকের বশে একটা অন্যায় কাজ করে ফেলে এখন হয়ত
অনুতপ্ত ! কে জানে হয় ত হাতে টাকা পয়সা কিছু নেই—টে।
টো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে! বড় লােকের ছেলে কষ্ট ত’ কোন দিন
জীবনে পায় নি।
ও তুই থামবি রজত ....যা নিজের কাজ করগে যা! আমায়
এখুনি একটা Blood examination করতে হবে।
১১

আঁধার পথের যাত্রী
রজত ক্ষুন্ন মনে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল
*
আশ্চর্য্য!
সত্যিই কি সময় ফিরে এসেছে নাকি।
ফিরে এলেও নিশ্চয়ই এখনও বাপের সংগে দেখা করতে
সাহস পায়নি।
তা না হলে একটু আগেইত সূৰ্য্যপ্রসাদের সংগে দেখা
হলাে; তিনি নিশ্চয়ই ব্যাপারটা জানলে বলতেন।
কবে সে ফিরল ?
কাল! আজ!....না অনেক দিন আগেই ফিরে এসেছে।
গা ঢাকা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বেচারী সমর।•••
রজতও ত’ ভুল দেখতে পারে।
রজত বললে সে নাকি সমরকে ডেকেছিল
সত্যিই যদি সমরই হবে তবে তার পুরাণ বন্ধুর ডাকে সাড়া
দেবেনা কেন ?
১২.

-তিন- –অপ্রত্যাশিত পত্র- গায়ে লং কোটটা চাপিয়ে স্যার সূৰ্যপ্রসাদের বাটীতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে বের হলাম ! শীতের রাত্রি !••• বিকালের দিকে এক পশলা বৃষ্টি হওয়ায় শীতটা যেন একটু চেপেই এসেছে ! মেঘমুক্ত আকাশে দু চারটে তারকা দেখা দিয়েছে। আমার বাড়ী থেকে স্যার সূৰ্য্যপ্রসাদের বাড়ী পােয়া ক্রোশ পথ হবে! পাহাড়ী রাস্তা, উচু নীচু!.... স্যার সূৰ্যপ্রসাদের বাড়ীটা দোতালা; গ্ৰেনাইট পাথরে তৈরী!••• সামনে একটা ছােট খাটো ফুলের বাগান। গেট খােলাই ছিল। লাল সুরকী ঢালা পথ ; বরাবর গিয়ে বৈঠকখানার সংলগ্ন টানা ফুলের টব দিয়ে সাজান বারান্দার সিড়ির নীচে শেষ হয়েছে। এক পাশে ‘গ্যারেজ। বাইরের বারান্দাটা অন্ধকার।••• বৈঠকখানার পাশেই আর একখানি মাঝারী ঘর। আমি বৈঠকখানাতে না ঢুকে পাশের ঘরের দরজার কাছেই

দক - '' ।
ধার পথের যাত্রী
এগিয়ে গেলাম! কেন না, দরজার কাচের সার্সীর ফঁাক দিয়ে
মৃদু আলাের আভাস আসছিল।
ল্যাচকি ঘােরাতেই দরজাটা খুলে গেল।
এ বাড়ীর প্রত্যেকটি গলি ঘুজি আমার পরিচিত ।
ঘরে ঢুকলাম !
ঘরের মেঝেতে পুরু কার্পেট বিছান!
ঐ ঘরের সংলগ্ন আর একটি ছােট ঘর আছে পিছন
দিকে।
দুই ঘরের মধ্যবর্তী দরজায় কবাট নেই শুধু দামী একখানা
পর্দা টাংগানাে।
আমি ঘরে ঢােকার সংগে সংগেই পর্দা ঠেলে সুবল এসে
ঘরে ঢুকল পাশের ঘর থেকে ; এবং সহসা এই ঘরে আমাকে
দেখে যেন অত্যন্ত চমকে উঠে থত মত খেয়ে দাড়িয়ে গেল।
ও ডাক্তার বাবু !....আপনি এ সময়ে।....
ঃ সুবল বাবু!•••আজ রাত্রে এ বাড়ীতে আমার নিমন্ত্রণ !
ঃ ওঃ তাই নাকি!•••হা জেঠামনি আরাে দু’চার জনকে
আজ রাত্রে এখানে খেতে বলেছেন !
: তাই নাকি! কই কাউকেত দেখছি না ।
: মেজর কৃষ্ণস্বামী ও বলদেব বাবু এসে গেছেন, তাঁরা বােধ
হয় উপরে জেঠামনির সংগে গল্প করছেন।
আমি লক্ষ্য করছিলাম কথা বলতে বলতে সুবল বেশ
রীতিমত যেন হাঁপাচ্ছে।
১৪

আঁধার পথের যাত্রী
মনে হয় এই মাত্র বুঝি ছুটতে ছুটতে কোথা থেকে
আসছে! তা ছাড়া তার দৃষ্টি রীতিমত চঞ্চল !
: আচ্ছা আমি আসি। একটু ব্যস্ত আছি !...খাবার সময়
টেবিলে আবার দেখা হবে।
চঞ্চল পদেই সুবল ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।
আশ্চর্য! একটা শব্দ আমি শুনেছিলাম, যখন সুবল
পর্দা ঠেলে ঘরে এসে প্রবেশ করে ঠিক তার আগের মুহূতে!
শব্দটা যেন অনেকটা কোন বাক্সের ডালা বন্ধ করা বা জানালার
কবাট বন্ধ করার মত।
আমি পর্দা তুলে পাশের ঘরে ঢুকলাম !
এ ঘরে এ বাড়ীর কেউ বড় একটা আসে না।
ঘরটা যেন ছােট খাটো একটা মিউজিয়াম।
স্যার সূৰ্য্যপ্রসাদের একটা hobby ছিল, পুরাণণা দিনের
সব স্মৃতি রাখা। যেমন অতীতের পয়সা, মূর্তি, পাথর, পুথী
ইত্যাদি।
এবং হরেক রকম বস্তু দিয়েই স্যার সূৰ্যপ্রসাদ এই ঘরটি
সাজিয়ে রেখেছিলেন।
স্যার সূৰ্যপ্রসাদের পড়াশুনাও যথেষ্ট ছিল।
অনেক দিন সূৰ্যপ্রসাদের সংগে এই ঘরে আমি এসেছি।
কত দিন নানা বিষয় নিয়ে আলােচনাও হয়েছে।
আশ্চৰ্য্য! নির্জনে একাকী এই ঘরে সুবল কি করতে
এসেছিল।
১৫

আঁধার পথের যাত্রী এই ঘরে কী এমন তার প্রয়ােজন ছিল ? সহসা নজরে পড়ল ঘরের একটিমাত্র বাগানের দিকের জানালাটার কাচের সাসী দুটো খােলা! তবে কী সুবল ঐ জানালা দিয়েই ঘরে প্রবেশ করেছিল, এবং আমি তারই শব্দ শুনেছি একটু আগে! কিন্তু কেন ? জানালা দিয়েই বা সে ঘরে ঢুকবে কেন? শব্দটা কিসের পেলাম তবে ? এমন সময় ঘরের এক পাশে দাড় করান একটা শ্বেত- পাথরের টেবিলের পরে রক্ষিত চন্দন কাঠের বাক্সটার দিকে নজর পড়ল। বাক্সর ডালাটা ভাল করে বন্ধ হয় নি। বাক্সটার মধ্যে একটা হাতীর দাতের বাঁট ওয়ালা ম্যাক্সিকান ছোরা ছিল এগিয়ে গিয়ে বাক্সের ভলাটা খুললাম। আশ্চর্য! ছােরাটা বাক্সের মধ্যে নেই। বাক্সটা খালি ছােরাটা •মেজর কৃষ্ণস্বামী স্যার সূৰ্যপ্রসাদকে উপহার দেন। গত মহাযুদ্ধের সময় মেজর কৃষ্ণস্বামী যখন যুদ্ধের ডাক্তার হয়ে ম্যাসিকোতে যান, ঐ ছােরাটা এনেছিলেন। ছােরাটার গঠন সৌন্দৰ্য্য চমৎকার ! কিন্তু ছােরাটা গেল কোথায় ? বাক্সর ডালাটা আবার বন্ধ করলাম ! খট্‌ করে একটা মৃদু - শদ জাগল।

আঁধার পথের যাত্রী
তবে কি একটু আগে এ ঘর থেকে যে শব্দ শােনা গিয়েছিল,
সেটা এই বাক্সের ডালা বন্ধ করবারই শব্দ!
দু’ তিনবার বাক্সর ডালাটা খুলে বন্ধ করে শব্দটা পরীক্ষা
করলাম!
হ শব্দটা অনেকটা সেই রকমই!•••
আনমনে চিন্তা করতে করতে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে
উপরের সিড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম।
সিড়ির নীচে স্যার সূৰ্যপ্রসাদের খাস ভৃত্য আব্দলের সংগে
দেখা!
ও ডাক্তার সাব !''সেলাম আলেকুম্ !
ও সাব উপর মে হায় ?
ও জি সাব !•••
ও সিড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলাম ।
স
খাওয়া দাওয়ার পর মেজর কৃষ্ণস্বামী,
পর মেজর কৃষ্ণস্বামী, বলদেববাবু ও
রাধিকাপ্রসাদ বিলিয়ার্ড রুমে বিলিয়ার্ড’ খেলতে গেলেন।
আমি স্যার সূৰ্যপ্রসাদের পিছু পিছু তার শয়ন ঘরের সংলগ্ন
ছােট্ট প্রাইভেট রুমে গিয়ে প্রবেশ করলাম।
ও বােস ডাক্তার, তােমার সংগে কয়েকটা বিশেষ জরুরী কথা
আছে।
স্যার সূৰ্যপ্রসাদের এই প্রাইভেট রুমটিতে সকলের প্রবেশ
অধিকার ছিল না।
১৭

আঁধার পথের যাত্রী
এই ঘরটি শয়ন ঘরের সংলগ্ন আগেই বলেছি।
আসবাব পত্রের মধ্যে একটি বড় ও দুটি ছােট সােফা ।
একটি রাইটিং টেবিল, টেবিলের কাছে রক্ষিত একটি বিভলভিং
চেয়ার ও একটি ছােট টেবিল।
ঘরের দরজা দুটি !
একটি শয়ন কক্ষে যাতায়াতের জন্য, অন্যটি বাইরে।
ছােট্ট একটি টি’পয়ের সামনে দু’জনে দুটো সােফা অধিকার
করে বসলাম।
পারিনি।
স্যার সূৰ্যপ্রসাদ হস্তধৃত পাইপে টোবাকো ভরতে ভরতে
আমার দিকে চেয়ে বললেন : ডাক্তার, কথাটা আমি বিশ্বাস করতে
এবং বিশ্বাসের যােগ্যও নয়!•••কিন্তু কথাটা যখন
জেনেছি open discussion করে সন্দেহ মিটিয়ে নেওয়াই ভাল।
ও নিশ্চয়ই সন্দেহের শেষ রাখতে নেই।
ও কাল বিকালের ডাকে একটা চিঠি পেয়েছি। চিঠিটা কে
লিখেছে জান ?
: কেমন করে জানব বলুন?
ও চিঠিটা লিখছে মৃত জগৎজীবনের ভাই—মৃত পুলকজীবন!
ঃ কে ?
: জগতের ভাই পুলক! It's a tremendous shock
to me!
ঃ দেখুন চিঠিটা যদি আপনাদের family matter সম্পর্কীয়
54, 06 I think I shouldn't interfere !

আঁধার পথের যাত্রী
: হাঁ ! জগজীবন আমার ছােট বেলাকার বন্ধু ! চিঠিটার
মধ্যে family সংক্রান্ত অনেক কথাই আছে বটে তবে জগৎ
ও পুলকের মৃত্যু সম্পর্কেও ••••••চিঠিটা তােমাকে আমি পড়ে
শােনাতে চাই।
: কিন্তু আমার মনে হয় স্যার সূৰ্যপ্রসাদ, ওসব চিঠি
আমার না শােনাই ভাল, আমি একজন Third person
মানে তৃতীয় ব্যক্তি।
: না না ডাক্তার, চিঠিটা আমি পড়ি তুমি শােন ! বলতে
বলতে স্যার সূৰ্যপ্রসাদ লংকোটের পকেট থেকে কয়েকটা
চিঠির সঙ্গে একটা মুখ ছেড়া রু’রংয়ের ভারী এনভেলাপ হাত
ঢুকিয়ে বের করলেন !••••••
: দেখত ডাক্তার, আশে পাশে কেউ আছে কিনা ?••
বাগানের দিককার জানালাটা বন্ধ করে এসাে! অমনি চট করে
দরজাটা খুলে দেখে এসে বারান্দায় কেউ আছে কিনা।•••
দরজাটাও বন্ধ করে দিও!•••
আমি উঠে জানালাটা বন্ধ করে দিলাম ও দরজাটা খুলে
চারিপাশ ভাল করে দেখে দরজাটাও ভিতর থেকে বন্ধ করে
দিলাম !•••
স্যার সূৰ্যপ্রসাদের হাবভাব কেমন কেমন সন্দেহজনক
লাগছিল। তার চোখ মুখ দেখে স্পষ্টই মনে হচ্ছিল, ভিতরে
ভিতরে তিনি অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে উঠেছেন।
কিন্তু কেন ?
১

আঁধার পথের যাত্রী
!
ঘরের কোণের প্রজ্জ্বলিত চুল্লীর আগুনের রক্তাভা স্যার
সূৰ্যপ্রসাদের মুখের পরে কেমন যেন বিভীষিকার মত
দেখাচ্ছিল।
সূৰ্যপ্রসাদ চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন।
প্রিয় সূৰ্য্যদা !
আজ মৃত্যুর মুখােমুখি দাঁড়িয়ে আপনাকে একটা সত্য
কথা বলে যাবাে ; কেননা আর হয়ত সময় পাবাে না।
আমার দাদার মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। লােকে জানে
অবিশ্যি টি, বিতেই তাঁর মৃত্যু ঘটেছে কিন্তু আসলে
আমিই তার হত্যাকারী !
অর্থের লােভেই তাকে আমি খুনই করেছি।
হায় অর্থ ! সংসারে নিত্য সে কত অনর্থ ই না ঘটায়।
কিন্তু সে বিষ আমায় জুগিয়েছিল কে ?
আপনার ছেলে সমর।•••
আমি বাধা দিলাম স্যার সূৰ্যপ্রসাদ excuse me, ও
চিঠি আমি শুনতে চাই না। ..
না ডাক্তার, তােমাকে শুনতেই হবে ! শােন !
: না ক্ষমা করুন। ও চিঠি আমি শুনতে পারব না।
ও ডাক্তার অবুঝ হয়াে না, শেষ পর্য্যন্ত শােন!•••
ঃ আজ রাত হয়ে গেছে।•••অন্য সময়ে শুনব।
ঃ স্যার সূৰ্যপ্ৰসাদ আবার শুরু করলেন।
বিষ দিয়েছিল বলে এবং আমাকে সাহায্য করেছিল বলে

আঁধার পথের যাত্রী
অজস্র টাকা আজ পর্যন্ত আমি সেই দুষমনকে দিয়েছি।•••
কিন্তু ক্রমে দেখতে পাচ্ছি টাকার খাকতি তার বেড়েই
চলেছে।
আজ তাই বুঝতে পারছি পাপার্জিত অর্থ স্থায়ী হতে
পারে না। এমনি করেই তা ব্যয় হয়।
: স্যার সূৰ্যপ্রসাদ ! আমি আর শুনতে চাই না। ক্ষমা
করবেন—ও সব ব্যাপারে আমি নেই।
বেশ একটু রাগত ভাবেই সােফা থেকে আমি উঠে পড়লাম।
: Good night !•••চললাম। বলে আর দ্বিতীয় কথা
মাত্র না বলে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লাম।
কিন্তু দরজা খুলতেই দেখি•••সামনে দাড়িয়ে গরম চকোলেট
ট্রেতে করে নিয়ে স্যার সূৰ্যপ্রসাদের খাস ভৃত্য আব্দুল
আব্দল আমাকে দেখে যেন বেশ একটু থতমত খেয়ে
গেল।
ঃ আব্দুল !•••তুই আড়ি পেতে শুনছিলি ?
: আজ্ঞে না ডাক্তার বাবু !•••সাহেবের জন্য চকোলেট নিয়ে
যাচ্ছিলাম।
তােমার সাহেব আজ আর রাত্রে চকোলেট খাবেন না
এবং আমাকে বলে দিলেন শরীর আজ তঁার মােটেই ভাল না ।
কেউ যেন আজ রাত্রে আর তাকে বিরক্ত না করে।
আব্দল সেলাম জানিয়ে চকোলেটের ট্রে নিয়ে চলে গেল।
সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে হাত ঘড়ির দিকে চেয়ে

আঁধার পথের যাত্রী দেখলাম রাত্রি তখন সাড়ে দশটা। মনটা বড় খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বরাবর স্যার সূৰ্যপ্রসাদের বাড়ী থেকে বের হয়ে....রাস্তায় এসে নামলাম । রাস্তায় নামতেই সহসা অন্ধকারে কার সংগে যেন ধাক্কা লাগল আমার। আমি বিরক্ত-চিত্তে বল্লাম : কী মশাই দেখতে পান না ? ও ক্ষমা করবেন, অন্ধকারে দেখতে অন্ধকারে দেখতে পাই নি ! স্যার সূৰ্যপ্রসাদের বাড়ীটা কোন্ দিকে বলতে পারেন ? ও জানিনা। খুঁজে নিন। বলে রাগতভাবে অগ্রসর হলাম। বাড়ীতে যখন এসে পৌঁছলাম রাত্রি তখন এগারটা। বাড়ীতে ঢুকে দেখি রজত তখনও ঘুমাতে যায়নি আমার জন্য বসে আছে। -এই যে দাদা! Dinner খেয়ে এলে ? : হাঁ ! তুই এখনও ঘুমাসনি! : এই বার শুতে যাবাে। : দু’জনে বসে গল্প করছি....সহসা পাশের ঘরে ফোন বেজে উঠল। ক্রিং...ক্রিং•••ক্রিং•••! তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে ফোন ধরলাম : হ্যালাে !•••হা! Dr. Sen speaking. কী ?•• কী বললে...স্যার সূৰ্য- প্রসাদ খুন হয়েছেন ?.••• ২২ । চার- -খুন- সর্বনাশ! নিশ্চয়ই ! এখুনি যাচ্ছি।••• রজত ততক্ষণে সামনে এসে দাড়িয়েছে : কী ব্যাপার দাদা ? ও বুঝতে পারলাম না। স্যার সূৰ্যপ্রসাদের চাকর রিং করল, স্যার সূৰ্য্যপ্রসাদ নাকি খুন হয়েছেন।•••আমি তার ওখানে চললাম। তাড়াতাড়ি রােগী দেখবার ব্যাগটা নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। স্যার সূৰ্য্যপ্রসাদের বাড়ীর গেটের সামনে গিয়ে যখন পোঁছলাম রাত্রি তখন বারটা। সমস্ত বাড়ীটা নিঃস্তব্ধ নিঝুম । দোতলায় একটা ঘরের কাচের সার্সীর ভিতর দিয়ে মৃদু আলাের রেখা দেখা যাচ্ছে। কলিং বেল টিপতেই দরজা খুলে গেল। আব্দল দরজা খুলে দিয়েছিল এই যে আব্দুল ! সত্যি তােমার সাহেব খুন হয়েছেন? ও সে কি ! কে বললে ?....সাহেবত’ ঘুমাচ্ছেন। : তবে তুমি একটু আগে আমাকে ফোন করলে কেন ? : কী বলছেন আপনি! আমি আপনাকে ফোন করেছি ? আমিত’ ঘুমাচ্ছিলাম। ও আশ্চর্য! নাম বললে পৰ্যন্ত আব্দল। সত্যি বলছিস্ তুই আমাকে ফোন করিসনি ?

আঁধার পথের যাত্রী
: আল্লার কশম হুজুর ফোন আমি করিনি।
: তাইত! ভারী আশ্চর্য্য!....কিন্তু তাের সাহেব কী
ঘুমিয়েছেন নাকি ?
: তাও ত’ বলতে পারি না হুজুর।
: এতদূর যখন এত রাত্রে এসেই পড়েছি, চল একবার
সংবাদটা নিয়ে যাই।
: কিন্তু সাহেব যদি ঘুমিয়ে থাকেন?
: ঘুমিয়ে থাকেনত’ ভালই। তবুত’ সুস্থ আছেন।
চল।
চল!
আব্দলকে সংগে নিয়ে সিড়ি বেয়ে দোতলায় স্যার
সূৰ্যপ্রসাদের শয়ন কক্ষের সামনে এসে দাড়ালাম।
নিঃস্তব্ধ নিঝুম রাত্রি।
এবাড়ীর সকলেই যে যার ঘাের ঘুমে আচ্ছন্ন।
বদ্ধ দরজার গায়ে ‘ন করলাম!
কোন সাড়া শব্দই নেই।
এবারে মৃদু স্বরে ‘ন করবার সংগে সংগে ডাকলাম ।
স্যার সূৰ্যপ্রসাদ !•••
। কোন সাড়া শব্দই নেই।
আব্দল বললে হুজুর সাহেব নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছেন।
বেশ জোরেই আবার ডাকলাম : স্যার সূৰ্যপ্রসাদ! সংগে
সংগে দরজাতেও জোরে ধাক্কা দিলাম।
তবু কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না!
২৪

আঁধার পথের যাত্রা
এবারে ‘কি হােল দিয়ে ভিতরে দৃষ্টিপাত করলাম;
টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে !....
: আব্দল ! ঘরে আলাে জ্বলছে !....আমার তেমন সুবিধা
মনে হচ্ছে না। এস দরজা ভেঙ্গে ফেলা যাক্ !''
তখন আমি আর আব্দল স্যার সূৰ্যপ্রসাদের শয়ন কক্ষের
দরজা ভেঙ্গে খুলে ফেললাম।
শয়ন কক্ষ্য খালি !
কেউ সে ঘরে নেই।
পাশের প্রাইভেট রুমে গিয়ে তখন সকলে প্রবেশ করলাম।
আজ রাত্রে এই ঘরে স্যার সূৰ্যপ্রসাদের নিকট থেকে
যখন বিদায় নিই, সেই সময় স্যার সূৰ্যপ্রসাদ যে ভাবে
চেয়ারের পরে বসেছিলেন, এখনও ঠিক সেই ভাবেই একই
চেয়ারে বসে আছেন।
কিন্তু ওকি !
স্যার সূৰ্যপ্রসাদের গলায় বাঁধা আছে ওটা কি!
এগিয়ে গেলাম! এবং সংগে সংগে আমার অজান্তেই
আমার গলা দিয়ে একটা অর্ধস্ফুট চীৎকার ধ্বনি বের
হয়ে এল !
স্যার সূৰ্য্যপ্রসাদের ঘাড়ে একটা ছােরা বেঁধান! ছােরার
বটটি ছাড়া সমস্ত ছােরাটাই ঘাড়ের মধ্যে ঢুকে আছে।
ইতিমধ্যে গােলমাল শুনে মেজর কৃষ্ণস্বামী, বলদেব বাবু,
রাধিকা প্রসাদ ও বিমলবাবু, সব সেই ঘরে এসে হাজির

আঁধার পথের যাত্রী
হলেন !•••সূৰ্যপ্রসাদকে নিহত দেখে সকলেই হতচকিত হয়ে
গেলেন। কিন্তু আশ্চৰ্য্য ! কে এভাবে স্যার সূৰ্যপ্রসাদকে
খুন করলে !
ঘরের সব কয়টি প্রাণীই বিহবল, হতচকিত !
কারও কণ্ঠে টু শব্দটি পর্যন্ত নেই !
কী ভয়ংকর! কী বীভৎস দৃশ্য !
ছােরাটা ভাল করে পরীক্ষা করতে গিয়ে আরো, চম্‌কে
উঠলাম ।
এ যে মেজর কৃষ্ণস্বামীর ম্যাকসিকো থেকে আনা
স্যার সূৰ্যপ্রসাদকে উপহার দত্ত ছােরা !
স্যার সূৰ্যপ্রসাদের নীচের ঘরে চন্দন কাঠের বাক্সে ছিল।
: কতক্ষণ আগে খুন হয়েছে বলে তােমার মনে হয় ডাক্তার?
মেজর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন।
ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখলাম, রাত্রি বারটা পনের মিনিট।
: আধ ঘণ্টা কি তার কিছু বেশী হবে!....বললাম । আমি
এই ঘর থেকে বের হয়ে গেছি রাত্রি তখন সাড়ে দশটা হবে।
আমি যখন ঘর থেকে বের হয়ে যাই, দরজার সামনে আব্দলের
সংগে আমার দেখা। আব্দল স্যার সূৰ্যপ্রসাদের জন্য hot
chocolet নিয়ে আসছিল। স্যার সূৰ্যপ্রসাদ আমায় বলে
দিয়েছিলেন রাত্রে যেন তাকে আর কেউ বিরক্ত না করে,
আব্দলকে আমি সে কথা বললাম!•••
: আপনার কথা শুনেই আমি ফিরে গেছি হুজুর, আর
দি আসিনি।
२७

আঁধার পথের যাত্রী ? : কিন্তু কথা হচ্ছে সেই সময়ের পরে আর কেউ এ ঘরে এসেছিল কিনা ?.... বিমল বললে : ! আমি এসেছিলাম, জেঠামণির সংগে আমার একটা জরুরী কথা ছিল। : রাত্রি তখন কটা ও রাত্রি সােয়া এগারটা হবে। তিনি আমাকেও বললেন ; “রাত্রে যেন আর কেউ তাকে বিরক্ত না করে। : তাহলে দেখা যাচ্ছে রাত্রি সােয়া এগারটা পর্যন্তও তিনি জীবিত ছিলেন। ও রাত্রি তখন সাড়ে এগারটা আন্দাজ হবে। আমি ওদিককার ব্যালকনিতে পায়চারী করছিলাম, হঠাৎ স্যার সূৰ্য- প্রসাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম...কাকে যেন তিনি জোরে জোরে কি বলছেন।•••এবং শুধু তাই নয় যেন মনে হলাে কে একজন পিছনের বাগান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দ্রুতপদে মালীর ঘরের দিকে চৰুে গেল !•••মেজর বললেন ! : আমি চলে যাবার পর কেউ স্যার সূৰ্যপ্রসাদের সংগে দেখা করতে এসেছিল আব্দল ? মাঝে কারও সংগে কি আজ রাত্রে তার কোন appointment ছিল ? আব্দলকে প্রশ্ন করলাম। : আজ্ঞে না ! : কেউ আসেনি, তুমি ঠিক জান ? : ঠিক বলছি হুজুর! আর এলেও আমার অজান্তে কেমন

আঁধার পথের যাত্রী
.
করে অন্য কে এবাড়ীতে ঢুকবে ? সদর দরজার পাশেইত আমার
ঘর। আপনি চলে যাবার পর থেকেই আমি আমার ঘরে আছি।
: তাইত।•••
সকলের মুখেই বিস্ময়ের চিহ্ন।
যেন নীরব ‘জিজ্ঞাসা’ সকলের মুখের রেখায় ফুটে উঠেছে।
মেজর কৃষ্ণস্বামী বললেন । কিন্তু এ যে একেবারে অসম্ভব
হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পুলিশে একটা সংবাদ দেওয়া দরকার মেজর ।
আমি মেজরের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম।
নিশ্চয়ই।
: তবে যান মেজর, পুলিশে একটা ফোন করে দিন এখনি,
এখান থেকে সকলে চলে যাও। ব্যাগটা হাতে করে আমি ঘরের
চারিপাশ একবার ভাল করে দেখে সকলের পরে এ ঘরে তালা
দিয়ে আমার ডাক্তারী ব্যাগটা হাতে করে স্যার সূৰ্য প্রসাদের
শয়ন কক্ষে গিয়ে প্রবেশ করলাম।
সকলেই ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছেন !
নিভাজ নিখুত শয্যার পাশেই শ্বেত পাথরের টি পয়ের
পরে ফোন ছিল, পুলিশে ফোন করে দিলাম।
অল্পক্ষণের মধ্যেই পুলিশ ইনেসপেকটার উজাগর সিং তাঁর
মােটর বাইকে করে এসে হাজির হলেন।
উজাগর সিং জাতিতে পাঞ্জাবী ; লম্বা চওড়া চেহারা,
অত্যন্ত সুপুরুষ।
২৮

আঁধার পথের যাত্রী
দীর্ঘ আঠার বৎসর পুলিশ ডিপার্টমেন্টে চাকরী করে যথেষ্ট
সুনাম অর্জন করেছেন।
আমার মুখে আনুপূর্বিক সমস্ত ঘটনা শুনে বললেন :
তাজ্জবকা বাৎ সাব,।
পুলিশ একোয়ারী সুরু হল !
সকলেই প্রায় সেখানে উপস্থিত।
স্যার সূৰ্যপ্রসাদের ভাই রাধিকাপ্রসাদ, তার বড় ছেলে
বিমল, মেজর কৃষ্ণস্বামী, বলদেব বাবু ; খাস ভৃত্য আবদুল,
একমাত্র ভ্রাতুস্পুত্র সুবল ও সূৰ্যপ্রসাদের প্রাইভেট সেক্রেটারী
অমলেন্দু। উজাগর সিং সুবলকে ও অমলেন্দুকে ডাকতে
বললেন।
সুবল নিজের ঘরে ঘুমাচ্ছিল, চোখ মুছতে মুছতে উঠে এল।
সকলে এলে আবার স্যার সূৰ্যপ্রসাদের প্রাইভেট রুমে
প্রবেশ করলাম। মৃতদেহকে পরীক্ষা করে উজাগর সিং
বললেন ? উঃ কী ভয়ানক! যতদূর মনে হচ্ছে কোন চোর
বা ডাকাত এই ঘরে ঢুকে এই পৈশাচিক হত্যা করে গেছে।
কিন্তু কথা হচ্ছে লােকটা কী ভাবে ঘরে ঢুকল! জানালা
দিয়ে ?....কিছু খােয় গেছে—চুরি গেছে কিছু ঘর থেকে ?
পাশেই স্যার সূৰ্য্যপ্রসাদের লিখবার ডেস্ক। উজাগর সিং
ডেস্কের সামনে গিয়ে দাড়ালেন।
ও উজাগর সিং, আপনি কি মনে করেন ব্যাপারটা চুরি
ডাকাতি ?
২৯

রার পথের যাত্রী
?
নিমস্বরে আমি প্রশ্ন করলাম।
: তা ছাড়া আর কী হতে পারে ডাক্তার সাব।
ব্যাপারটাকে আত্মহত্যা কোনমতেই বলা চলে না। কী বলেন?
অবিশ্যি এটা ঠিকই, কোন লােকই এভাবে নিজেকে নিজে
হত্যা করতে পারেনা নিজের গলার পিছন দিকে ছুরি বসিয়ে ।
এটা যে খুন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই। It's murder
right enough.
: কিন্তু কথা হচ্ছে এ খুনের উদ্দেশ্য কী ? What's
the motive ?
: কিন্তু দাদার ত’ কোন শত্ৰুই ছিল না এ জগতে।
অধিকাপ্রসাদ বলতে লাগলেন, নিশ্চয়ই কোন দস্যু তস্করের
কাজ! কিন্তু তস্কর কি নিতে এ ঘরে এসেছিল ? ঘরের
অবস্থা দেখে ত মনে হয় কিছুই খােয়া যায়নি, যেখানকার যেটি
তেমনিই সাজান গােছান আছে। উজাগর সিং ডেস্কের ড্রয়ার
গুলি একটা একটা করে খুলে, তার ভিতরকার কাগজ-পত্রগুলি
নেড়ে চেড়ে যেমন তেমনিই দেখতে লাগলেন। এমন সময়
স্যার সূৰ্যপ্রসাদের প্রাইভেট সেক্রেটারী অমলেন্দু এসে ঘরে
প্রবেশ করল।
: কে ?
উজাগর সিং মুখ ফিরালেন।
: আমি অমলেন্দু!
: স্যর সূৰ্যপ্রসাদের প্রাইভেট সেক্রেটারী! অামি
লাম।
1

—পাঁচ- -অনুসন্ধান ও অমলেন্দু ! : হাঁ! অমলেন্দু চক্রবর্তী। ও কতদিন স্যার সূৰ্যপ্রসাদের এখানে কাজ করছ, উজাগর সিং প্রশ্ন করলেন। ও প্রায় নয় মাস। : দেখ ত’ এই ড্রয়ার থেকে কোন কাগজ পত্র চুরি গেছে বলে মনে হয় কিনা ? অমলেন্দু উজাগর সিংয়ের নির্দেশে ডেস্কের দিকে এগিয়ে গিয়ে কাগজ পত্র দেখতে লাগল। অমলেন্দুর বয়স ২৫ কি ২৬ বছর হবে। স্যার সূৰ্যপ্রসাদের গ্রামেই বাড়ী। গরীব বিধবার ছেলে। এম, এ পাশ করবার পর চাকরীর চেষ্টায় এদিক ওদিকে যখন প্রায় ক্লান্ত হয়ে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে এসেছে এমন সময় মার অনুরােধে সে স্যার সূৰ্যপ্রসাদকে একটা চিঠি লেখে যদি তিনি কোন সুবিধা করে দিতে পারেন। সূৰ্য্যপ্রসাদ প্রথমে তাকে তাঁর কাছে চলে আসতে পত্র দেন। দু’মাস স্যার সূৰ্যপ্রসাদ অমলেন্দুকে একটা কিছু সুবিধা করে দেবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেও যখন কৃতকার্য হতে

আঁধার পথের যাত্রী
ই
পারলেন না তখন ১০০ টাকা মাইনা দিয়ে নিজের প্রাইভেট
সেক্রেটারী নিযুক্ত করলেন, সেও আজ দীর্ঘ নয় মাসের কথা।
অমলেন্দু ছেলেটি শিক্ষিত, বিনয়ী, পরিশ্রমী ও সত্যনিষ্ঠ
এবং স্যার সূৰ্যপ্রসাদের অত্যন্ত প্রিয় ও বিশ্বাসের পাত্র ছিল।
: না, এ ড্রয়ার থেকে কিছুই হারায় নি বলে মনে হচ্ছে।
বলতে বলতে সহসা মেঝের দিকে তাকিয়ে বললে ?
ওখানে মেঝের কার্পেটের পরে কতকগুলাে চিঠি পড়ে আছে।
এগিয়ে গিয়ে নীচু হয়ে মেঝে থেকে কতকগুলি চিঠি তুলে নিল।
উজাগর সিং অমলেন্দুর হাত থেকে চিঠিগুলি নিলেন।
চিঠিগুলাের দিকে নজর পড়তেই আমি দেখলাম আজ
রাত্রে কিছুক্ষণ আগে স্যার সূৰ্যপ্রসাদকে লিখিত ব্লু এভেলাপের
পুলক জীবন বাবুর চিঠিটাও এই চিঠিগুলির মধ্যে নেই।
মুখ দিয়ে কথাটা আমার বের হয়ে যাচ্ছিল কিন্তু চুপ করে
গেলাম আচমকা উজাগর সিংয়ের প্রশ্নে ।
ও ডাক্তার! তুমিই প্রথমে তাহলে স্যার সূৰ্যপ্রসাদকে মৃত
অবস্থায় এই ঘরে দেখতে পাও, কেমন ?
ও ।
: তুমি বলছাে আব্দলই টেলিফোনে এই সংবাদ তােমাকে
দেয়, না?
: আজ্ঞে না সাহেব। আমি ফোন করিনি তা ছা
আজ সারা দিন বা রাত্রের মধ্যে একটিবারের জন্যও ফোনের
ঘরে পর্যন্ত যায় নি।

আঁধার পথের যাত্রী
আশ্চৰ্য্য ! আচ্ছা ডাক্তার তুমি ঠিক বলছো আঙ্গুলের
গলার স্বরই তুমি ফোনে শুনেছিলে ?
: এ বিষয়ে তােমাকে আমি গ্যারান্টি দিতে পারি না ;
তবে এটা ঠিক, আব্দুলের গলার স্বরের মতই আমার মনে
হয়েছিল।
: আচ্ছা কতক্ষণ স্যার সূৰ্য প্ৰসাদ মারা গেছেন বলে
তােমার মনে হয় ডাক্তার ?
: তা আধ ঘণ্টা ত’ হবেই, বেশী হতে পারে।
: তুমি বলছো এ ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল ;
কিন্তু ঐ জানালাটা ?
: আমি নিজেই আজ ওটা রাত্রে স্যার সূৰ্য্যপ্রসাদের সংগে
কথাবার্তা বলবার আগে তার অনুরােধে বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
উজাগর সিং জানালাটার কাছে এগিয়ে গিয়ে পর্দাটা
সরিয়ে বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠলেন । কিন্তু ডাক্তার এ জানালাটা
যে এখন ভােলা আছে দেখছি। বলতে বলতে পকেট থেকে
টর্চ বের করে খােলা জানালা পথে নীচেকার বাগানের দিকে
আলাে ফেলে দেখতে লাগলেন। তারপর মৃদুস্বরে বললেনঃ
ডাক্তার! খুনী এই জানালা পথেই এসেছিল, এবং এই পথেই
কাজ সেরে চলে গেছে। এই দেখ জানালার গায়ে তার
সুস্পষ্ট চিহ্ন এখনও বর্তমান।
আমি এগিয়ে গিয়ে লক্ষ্য করে দেখলাম সত্যিই জানালাটার
পরে সুস্পষ্ট কতকগুলাে জুতাের ছাপ। জুতাের রবার; সােল
ঃ

আঁধার পথের যাত্রী
থাকলে যেমন ছাপ পড়ে এ ছাপগুলিও অবিকল তেমনি।
জুতাের ছাপগুলি দেখে স্পষ্টই মনে হয় আগন্তুক নরম ভিজে
মাটির উপর দিয়ে রবারের সােলওয়ালা জুতাে পায়ে হেঁটে
এসে এই জানালা পথে ঘরে ঢােকায়, জানালার গায়ে কাদা
মাখা রবার সােলের ছাপ পড়েছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে কেউ এঘরে অন্যের অজান্তে আমার
ঘর ত্যাগ করবার পর নিশ্চয়ই এসেছিল।
উজাগর সিং বললেন : ডাক্তার It's a clear case.
জানালা খােলা পেয়ে কেউ এই পথে ঘরে এসে নিশ্চয়ই প্রবেশ
করেছিল এবং এদিকে পিছন করে স্যার সূৰ্যপ্রসাদ চেয়ারের
পরে বসে বসেই হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, সেই সুযােগে স্যার
সূৰ্যপ্রসাদকে পিছন থেকে ছােরা মেরে বেমালুম সরে পড়েছে।
খুনীকে ধরতে আমাদের এতটুকুও বেগ পেতে হবে না সে তুমি
দেখে নিও। আচ্ছা সন্দেহজনক কাউকে কি আজ সন্ধ্যার
দিকে এই বাড়ীর আশে পাশে আপনাদের মধ্যে কেউ ঘুরতে বা
যেতে আসতে দেখেছেন ?
: হুঁ! আমি দেখেছি ইনেসপেকটার, আমি বললাম।
: তুমি দেখেছাে কখন ?
: আজ রাত্রে যখন স্যার সূৰ্যপ্রসাদের সংগে কথাবার্তা বলে
এই বাড়ী থেকে বেরুতে যাবাে এমন সময় গেটের কাছে লােকটা
আমাকে দেখে প্রশ্ন করে স্যার সূৰ্যপ্রসাদের বাড়ীটা কোথায় ?
ও রাত্রি তখন কটা, মনে আছে তােমার ডাক্তার।
৩৪

আঁধার পথের যাত্রী
: হ মনে আছে, কেননা ঠিক সেই সময় গির্জার ঘড়িতে
রাত্রি এগারটা ঢং ঢং করে বাজল!
ও লােকটার বর্ণনা দিতে পার ?
হাঁ একটু ঢ্যাংগা ধরণের, পরিধানে সুট। মাথায় নাইট
ক্যাপ চোখ পৰ্যন্ত নামান। গায়ে কালাে রংয়ের লং কোট।
তার মুখ আমি কিছুই দেখতে পাইনি তবে মনে হলাে যেন
যুবক, বয়েস বেশী নয়। গলার স্বর বেশ কর্কশ ও রুক্ষ্ম ।
: কি হে আব্দল ! এমন ধরণের কোন লােক আজ সন্ধ্যার
পর থেকে কোন সময় এ বাড়ীতে এসেছে কী ?
: আজ্ঞে কেউত আজ সন্ধ্যার পরে সাহেবের সংগে দেখা
করতে আসেন নি।
ও সামনের দরজা দিয়ে হয়ত তােমার সাহেবের সংগে দেখা
করতে আসেনি; কিন্তু পিছনের দরজা দিয়েও ত’ কেউ দেখা
করতে আসতে পারে। তুমি কি করে জানলে আব্দল যে,
তােমার সাহেবের সঙ্গে কেউই দেখা করেনি ?
উজাগর সিংয়ের কথার ধরণে আব্দল যেন বেশ একটু
চকেই উঠল।
: কিন্তু কথা হচ্চে এ বাড়ীর মধ্যে সর্বশেষ আজরাত্রে কে
স্যার সূৰ্যপ্রসাদকে জীবিত অবস্থায় দেখেছেন? উজাগর সিং
প্রশ্ন করলেন।
ও বােধ হয়ত আমিই স্যার সূৰ্যপ্রসাদকে শেষ জীবিত
দেখি, আমি উত্তর দিলাম।

আঁধার পথের যাত্রী
: কটা রাত্রি তখন হবে ?
: রাত্রি তখন সাড়ে দশটা।
: কিন্তু স্যার সূৰ্য্যপ্রসাদকে রাত্রি এগারটার পরও তার ঘর
থেকে কথা বলতে আমি শুনেছি, অমলেন্দু বললে।
: কথা বলছিলেন কার সংগে ? উজাগর সিং প্রশ্ন করলেন।
: তা আমি বলতে পারব না। তবে আমার মনে হয়েছিল
বুঝি স্যার সূৰ্যপ্রসাদ ডাঃ সেনের সংগেই কথা বলছেন ;
কেননা ডিনারের পর উনি স্যার সূৰ্যপ্রসাদের সংগে তার
প্রাইভেট রুমে গিয়ে ঢুকেছিলেন। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি
তার আগেই তিনি সেখান থেকে চলে গিয়েছিলেন। এগারটার
সময় সাহেবের ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম ডাঃ সেনকে কয়েকটা
কথা জিজ্ঞাসা ফর’তে কিন্তু আব্দল বললে ডাঃ সেন অনেকক্ষণ
চলে গেছেন। আমি সন্মতিসূচক ভাবে ঘাড় নেড়ে তার
উক্তি সমর্থন করলাম। এবং বললাম : এগারটা বাজবার পর
আমি আমার বাড়ীতেই ছিলাম। এবং ফোনে সংবাদ পাওয়া
পৰ্যন্ত বাড়ীতেই ছিলাম।
ও কিন্তু কে তবে রাত্রি এগারটার সময় স্যার সূৰ্যপ্রসাদের
সংগে কথা বলছিলেন ? কথা বলতে যখন তাকে শােনা গেছে
তখন নিশ্চয়ই সে সময় তার ঘরে কেউ না কেউ উপস্থিত ছিল
এবং তিনিও বেঁচেই ছিলেন। কিন্তু কে ছিল সে সময় তাঁর
ঘরে মেজর•••
: মেজর কৃষ্ণস্বামী—কথাটা আমি সম্পূর্ণ করলাম।

আঁধার পথের যাত্রী
মেজর কৃষ্ণস্বামী ঘাড় নেড়ে বললেন ; জানেন না।
: আচ্ছা মেজর! তাহলে আপনি রাত্রি এগারটার সময়
স্যার সূৰ্যপ্রসাদের ঘরে ছিলেন না কি বলেন ?
ও তাঁর ঘরে থাকাত দূরের কথা রাত্রি সাড়ে দশটায় ডিনার
শেষ করবার পর তার সংগে আর আমার আজ রাত্রে দেখাই
হয়নি।
মেজর জবাব দিলেন।
ও অমলেন্দু বাবু! আপনি স্যার সূৰ্যপ্রসাদকে ঐ সময়
কোন কথাবার্তা বলতে শুনেছিলেন ?
: হাঁ সামান্য দু একটা কথা আমার কাণে এসেছিল। তাঁর
সূৰ্যপ্রসাদ যেন বলছিলেন, আজ তাই বুঝতে পারছি
পাপার্জিত অর্থ স্থায়ী হতে পারে না এমনি করেই তা ব্যয় হয়।
এবং তার পরেই যেন অবিকল ডাঃ সেনের গলার স্বরের মত
আওয়াজে কে যেন জবাব দিলেন : স্যার সূৰ্যপ্রসাদ ! আমি
আর শুনতে চাই না। ক্ষমা করবেন। অথচ ডাঃ সেনের
কথায় এখন বুঝতে পারছি, আমারই শােনবার ভুল। কেননা
ডাঃ সেন আগেই সেখান থেকে চলে গিয়েছিলেন ।
: তাহলে এইটুকু বেশ বােঝা যাচ্ছে ঐ সময় নিশ্চয়ই
কেউ স্যার সূৰ্যপ্রসাদের সংগে ছিল। এবং রাত্রি এগারটা
পৰ্যন্ত স্যার সূৰ্যপ্রসাদ বেঁচেই ছিলেন।
: কিন্তু রাত্রি সােয়া এগারটার সময় সাহেব বেঁচে ছিলেন
ইজুর; আব্দল বললে।
: কেমন করে ?

আঁধার পথের যাত্রী
ঃ বিমলবাবু তাকে জীবিত দেখেছেন।
কেননা সেই
সময় বিমলবাবুকে আমি সাহেবের প্রাইভেট ঘরের দরজা
দিয়ে বের হতে দেখি এবং তিনি বললেন : সাহেবকে যেন
আজ রাত্রে আর কেউ বিরক্ত না করে ; কেননা এখন তিনি
ঘুমাবেন। আমি ঐ সময় সাহেবের রাত্রের খাবার জল
রাখবার জন্য ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম। আমি জল না রেখেই
ফিরে এলাম।
একটু আগেই তুমি বলছিলে ডাঃ সেন একবার তােমাকে
বলেছিলেন সাহেবের ঘরে যেন আর কেউ গিয়ে তাকে না
বিরক্ত করে ; তা সত্ত্বেও আবার তুমি সে ঘরের দিকে যাচ্ছিলে
কেন ?
উজাগর সিং প্রশ্ন করলেন।
: আজ্ঞে ভুলে গিয়েছিলাম কথাটা, অনেক দিনের অভ্যাস
কিনা মনে ছিল না।
: ফু—উজাগর সিং গম্ভীর ভাবে শব্দ করলেন। তারপর
বিমলবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে সহসা প্রশ্ন করলেন : বিমল
বাবু, এ যা বলছে তা কি সত্যি?
ও সত্যি।
ও রাত্রি তখন সােয়া এগারটাই ?
: আপনার জেঠামশায়ের সংগে আপনার দেখা হয়েছিল ?
হয়েছিল।

আঁধার পথের যাত্রী
: আপনার জেঠামশাই তখন ঘরে একলাই ছিলেন, না আর
কেউ সে ঘরে ছিল ?
ও তিনি একাই ঘরে ছিলেন, আর কেউই ছিল না।
ও তার অবস্থা স্বাভাবিকই ছিল ?
: হঁ ।
কিন্তু কেন আপনি ঐ সময় ওঁর সংগে দেখা করতে
গিয়েছিলেন ?
ও মাপ করবেন, তা আমি বলতে পারব না।
ও কেন ?
: কেন না সেটা আমাদের সাংসারিক ব্যাপার—আর
কারও কাছে বিশেষ করে বাইরের লােকের কাছে বলা চলে না।
ও ফু•••উজাগর সিংয়ের গলা দিয়ে শব্দটা বের হয়ে এল।
আমরা সব পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে তাকালাম।

—সানিলজের বাসিন্দা।
সকাল বেলা রজতের ডাকে ঘুম ভেংগে গেল।
: কী ব্যাপার অত উঁাচাচ্ছিস কেন ?
বিমলবাবু কতক্ষণ থেকে তােমার জন্য এসে বসে আছেন।
তিনি একবার তােমার সংগে দেখা করতে চান, কী জরুরী কথা
আছে। তাড়াতাড়ি উঠে হাত মুখ ধুয়ে বৈঠকখানায় গেলাম ।
ঘরের মধ্যে একটা সােফার পরে বিমলবাবু বসে আছেন,
তার দৃষ্টি ভােলা জানালা পথে সুদূর নিবদ্ধ।
আমি গলা খাঁকরি দিলাম।
বিমলবাবু চমকে আমার দিকে ফিরে তাকালেন।
: এই যে ডাক্তার সেন। আমি আপনার কাছে একটা
সাহায্যের জন্য এসেছি।
: নিশ্চয়ই। বলুন, কী ভাবে আপনাকে আমি সাহায্য
করতে পারি ?
: আপনি আমার সংগে একবার পাশের বাড়ীতে চলুন,
সেখানে একজন ভদ্রলােক আছেন—তার সামনেই কথাবার্তা
: পাশের বাড়ীতে মানে Sunny Lodge-এ ?
জানেন আপনি ঐ খদ্দরের পায়জামা ও পাঞ্জাবী
পরা নিরীহ গােছের ভদ্রলােকটি কে?
৪০

আঁধার পথের যাত্রী
: কোন সৌখীন বড় লােকের ছেলে হবে আর কি।
: না। উনি হচ্ছেন স্বনাম ধন্য সারা ভারতের মধ্যে
সর্বশ্রেষ্ঠ গােয়েন্দা কিরীটি রায় ।
কে ?•••কী নাম বললেন ?
: কিরীটি রায়।
: আপনি তার সংগে দেখা করতে চান ? আমি ধীরে
ধীরে বললাম । কিন্তু কেন ?
: আমার ইচ্ছা কিরীটি বাবু এই case টা হাতে নিন।
তিনি যদি এ হত্যার অনুসন্ধানের ভার নেন তবে নিশ্চয়ই
জানা যাবে আমার জেঠামণির হত্যাকারী কে ?...
: কিন্তু কেমন করে আপনি জানলেন বিমলবাবু, যে
কিরীটিবাবু এই caseটা অনুসন্ধান করতে রাজী হবেন ?
ও আমি তাকে অনুরােধ করব, তার হাতে পায়ে ধরব।
আপনি চলুল ডাক্তার সেন। আপনি ঘটনার সব কিছু জানেন,
আমি তাকে সব কথা গুছিয়ে বলতে পারব না; আপনি
বলবেন।
: বেশ চলুন। কিন্তু একটা কথা বিমলবাবু।
: কী ডাক্তার সেন ?
: আমার কথা যদি শশানেন তবে এই ব্যাপারে কিরীটি
বাবুকে না আনাই বােধ হয় সমীচীন হবে।
ঃ কেন ? কেন ?
ও সে কথা আপনিই ভেবে দেখুন!
৪১

আঁধার পথের যাত্রী
: আমি বুঝতে পেরেছি ডাক্তার সেন, কেন আপনি এ কথা
বলছেন, কিন্তু আপনি যে কারণে আমাকে কিরীটি বাবুকে
এ ব্যাপারে টেনে আনতে নিষেধ করছেন ; ঠিক সেই কারণেই
আমি আরো স্থির নিশ্চিত হয়েছি কিরীটিবাবুকে এ ঘটনার
মীমাংসা করবার জন্য অনুরােধ করতে, কেননা সমরকে আপনার
থেকে আমি'ঢের বেশী ভাল করে চিনি ও জানি।
ও সমর! এ হত্যার সংগে সমরের কী সম্পর্ক থাকতে
পারে বিমলবাবু? এক প্রকার বিস্মিত ও দ্রুত কণ্ঠেই রজত
কথাটা বললে।
কিন্তু আমি বা বিমলবাবু দু’জনের কেউই রজতের কথায়
কান দিলাম না। বিমলবাবু বলতে লাগলেন : সমর জুয়া
খেলতে পারে, চুরি করতে পারে, খারাপ পথে যেতে পারে-
কিন্তু সে কাউকেই খুন করতে পারে না ডাক্তার সেন।
: না না বিমলবাবু! সে কথা মুহূর্তের জন্যও আমার
মনে উদয় হয়নি।
: তাই যদি না হবে—তবে কেন আপনি গতকাল অত
রাত্রে আমাদের বাড়ী থেকে ফিরবার পথে ‘তাজ হােটেলে
গিয়েছিলেন?
মুহূর্তের জন্য আমি চুপ করে রইলাম; কেননা গতরাত্রে
স্যার সূৰ্যপ্রসাদের হত্যার কথা জানবার পর তার বাড়ী থেকে
ফিরবার পথে যে আমি ‘তাজ হােটেলে গিয়েছিলাম তা কেউই
দেখেনি আমার স্থির বিশ্বাস ছিল।
৪২

আঁধার পথের যাত্র।
ও কিন্তু সে কথা আপনি কী করে জানলেন বিমলবাবু ?
: আজ সকালে আমি সেখানে গিয়েছিলাম—আমি ‘তাজ
হােটেলের চাকরদের মুখেই শুনলাম সমর আজ দু’দিন থেকে
সেখানে একটা ঘর ভাড়া করে ছিল।
: আপনি কি একথা আগে জানতেন না ?
ও না। স্বপ্নেও একথা আমি ভাবিনি। হােটেলের খাতায়
তার হাতের নাম সই আছে দেখলাম এবং সেখানকার
চাকরদের মুখেই শুনলাম, গতকাল রাত্রি নয়টায় সে হােটেল
থেকে কোথায় চলে যায়, সারা রাত বা আজ সকাল পর্যন্তও
সে হােটেলে ফেরেনি। কিন্তু ডাক্তার এমনও ত হতে পারে
সে অন্য কোথাও চলে গেছে। এদেশ ছেড়ে, বাংলা দেশেও
ত’ চলে যেতে পারে, বাংলা দেশের পরে তার বরাবরই একটা
আন্তরিক টান ছিল।
: কিন্তু তার সব জিনিষপত্র জামা কাপড় বিছানা ফেলেই
চলে গেল?
: ওসব কিছু বুঝি না আমি ডাঃ সেন ; তার এই ভাবে
চলে যাওয়ার সহজ মীমাংসাও থাকতে পারে।—সে দোষী নয়,
নির্দোষ।
: এবং সেই জন্যই আপনি কিরীটিবাবুর সাহায্য চান
বিমলবাবু ? শুনুন বিমলবাবু, পুকুরের তলা ঘাটতে গেলেই
জল ঘােলাটে হয়ে যাবে। . ঘটনা, এখন পর্যন্ত যেমন আছে
তেমনিই থাক; কেননা, পুলিশে এখন পর্যন্ত সমরকে সন্দেহ
•

আঁধার পথের যাত্রী
করবার অবকাশ পর্যন্ত পায়নি তারা একেবারে সম্পূর্ণ অন্য পথে
অনুসন্ধান চালাচ্ছে। কিন্তু কিরীটিবাবু এর মধ্যে এলে এটা
তার চোখ থেকে চেপে রাখা যাবে না। তিনি বড় ভয়ংকর লােক,
শকুনের মত তার দৃষ্টি, শিকারী কুকুরের মত তার ঘ্রাণ শক্তি।
ও ডাক্তার। সমরের জন্যই আরাে আমি কিরীটিবাবুর
সাহায্যের জন্য ব্যস্ত হয়েছি। আগেই বলেছি সমরকে আপনারা
কেউই তেমন জানেন না, যতটা আমি তার সম্পর্কে জানি।
সমর আমার জ্যাঠতুত ভাই হলেও আমার খেলার সাথী,
সহপাঠী ও বন্ধু! তাছাড়া উজাগর সিংও সমরকে সন্দেহ
করেছেন। তিনিও আজ সকালে তাজ হােটেলে সমরের
খোজে গিয়েছিলেন।
: তাহলে পুলিশ আব্দলকে আর সন্দেহ করছে না?
আমি মৃদুস্বরে বললাম।
: হতে পারে।
: কিন্তু কিরীটিবাবুর পরিচয় আপনি কেমন করে সংগ্রহ
করলেন বিমলবাবু?
: রজতের কাছে পেয়েছি।
ও রজতের কাছে?
হাঁ দাদা, কিরীটিবাবুর একটা চিঠি একদিন ভুল করে
আমাদের বাড়ীতে এসেছিল, চিঠির উপর কিরীটি রায় নাম
দেখেই আমার কেমন সন্দেহ হয় ; আমি চিঠিটা নিয়েই গিয়ে
তার সংগে আলাপ করি। রজত বললে।
;
:

আঁধার পথের যাত্রী
ঃ
যাহােক আমরা স্যানি-লজে গিয়ে হাজির হলাম।
কিরীটি তখন বাইরের বাগানে সূর্যের আলােয় একটা
ইউক্যালিপটাস গাছের নীচে বেতের চেয়ারে বসে চা পান
করতে করতে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন।
৫ নমস্কার ডাঃ সেন। আসুন রজতবাবু।
রজতই সকলের পরিচয় দিল।
আমি তখন বললাম ঃ মিঃ রায়, বিমলবাবুর জেঠামশাই
স্যার সূৰ্যপ্রসাদ সেন গত রাত্রে অত্যন্ত রহস্যজনক ভাবে তার
বসবার ঘরে খুন হয়েছেন এবং সেই রহস্যর মীমাংসা করবার
জন্য উনি আপনার সাহায্যের জন্য এখানে এসেছেন।
কিন্তু ডাঃ সেন! গােয়েন্দাগিরী থেকে আমি সম্পূর্ণ অবসর
ণ করেছি—এবং পাছে কলকাতায় থাকলে অনুরােধ উপবােধ
এড়াতে পারি, তাই—এই দেড় হাজার মাইল দূরে সুদূর
ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্তে নিরিবিলিতে অজ্ঞাত বাসে কাল
কাটাচ্ছি। আমাকে আপনারা ক্ষমা করলেই বিশেষ সুখী হবে।
: কিন্তু মিঃ রায় আমি চাই—বিমলবাবুর অসমাপ্ত কথার
মধ্যেই কিরীটি বাধা দিয়ে বলে উঠল । বুঝেছি বিমলবাবু
আপনি কী চান। খুনীকে বের করে দিতে এইত।•••
: মিঃ রায় আমার এই অনুরােধটুকু আপনাকে রাখতেই
হবে! দয়া করুন !•••
১৪

* ..
—উজাগর সিং-এর যুক্তি
ও ক্ষমা করুন বিমলবাবু-ওসব টানা পােড়েন আর সত্যিই
আমার ভাল লাগে না। কিরীটি বললে।
: এই উপকারটুকু আপনাকে করতেই হবে কিরীটিবাবু।
বিমলবাবু কাতর স্বরে আবার অনুরােধ জানালেন : যত
টাকা চান আপনি আমি দেবাে।
ও টাকা! কিরীটি একটুখানি হাসল : টাকার নেশায়
আমি কোনদিনই গােয়েন্দাগিরী করিনি বিমলবাবু। গােয়েন্দা-
গিরীটা আমার জীবনের পেশা ছিল না; ছিল নেশা। কিন্তু
আপনি ব্যস্ত হচ্ছেন কেন ? পুলিশে যখন কেসটা হাতে
নিয়েছে, খুনীকে তারা নিশ্চয়ই খুঁজে বের করবে। নিশ্চিন্ত
থাকুন।
: তারাত ভুলও করতে পারে মিঃ রায়—অধীরভাবে বিমল
বাবু বলতে লাগলেন ; তাছাড়া এ ব্যাপারে যেন তারা একটু
ভুল পথেই চলছে। অনুগ্রহ করে আমাদের এব্যাপারে একটু
সাহায্য করুন মিঃ রায়।
: তবে শুনুন বিমলবাবু! আমি যদি একবার এব্যাপারে
হাত দিই তবে আমি এর শেষ মীমাংসা না করা পর্যন্ত নিরন্ত
হবাে না। মনে রাখবেন, প্রকৃত শিকারী
কুকুর একবার
শিকারের গন্ধ পেলে তাকে নিরস্ত করা ভয়ংকর কঠিন। হয়
৪৬

আঁধার পথের যাত্রী
তখন আপনার মনে হবে কিরীটি রায়কে এব্যাপারে না জড়ালেই
ভাল ছিল।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিরীটির মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে
বিমলবাবু শুধু বললেন, শুনুন মিঃ রায়। আমি এব্যাপারের
সত্যটুকু জানতে চাই।
: এই ব্যাপারে খাঁটি সমস্ত সত্যটুকুই তবে জানতে চান ?
: হাঁ, আমি এই ব্যাপারের খাঁটি সত্যটুকুই জানতে চাই।
ও বেশ তবে আমি আপনার অনুরােধ রাখবাে। এবং আশা
করি আপনি পরে অনুতপ্ত হবেন না সত্য জেনে।...এখন বলুন .
তবে সমস্ত ঘটনা, একটি কথাও লুকাবেন না। প্রয়ােজনীয়
অপ্রয়ােজনীয় সব কিছুই বলবেন।
: ডাঃ সেনই সব কথা আপনাকে খুলে বলবেন। বিমলবাবু
জবাব দিলেন।
: বেশ ডাঃ সেনই বলুন।....
আমি তখন আগাগােড়া সকল ব্যাপারই খুলে বললাম।
: বেশ, এবার ডাঃ সেন সমর সম্পর্কেও কিরীটিবাবুকে খুলে
বলুন। বিমলবাবু বললেন।
আমি তখন সমরের সংগে যে গত রাত্রে দেখা করতে
গিয়েছিলাম তাও বললাম।
: কিন্তু হঠাৎ সমরের সংগে আপনি ‘তাজ’ হােটেলে দেখা
করতে গিয়েছিলেন কেন বলুন, ডাঃ সেন ?
প্রথমটা আমি একটু চুপ করে রইলাম তারপরে বললামঃ
০৭

আঁধার পথের যাত্রী
৩
আমি ভেবেছিলাম সমরকে তার বাপের নিহত হওয়ার সংবাদটা
দেওয়া উচিত তাই গিয়েছিলাম। অন্য কোন কারণ ছিল না।
তাছাড়া আমার কেমন যেন ধারণা হয়েছিল স্যার সূৰ্যপ্রসাদ
তার ছেলের এখানে উপস্থিতির সংবাদটা জানতেন।
: হু। মাত্র এই কারণেই আপনি ‘তাজ হােটেলে
গিয়েছিলেন ?
: হু ঠিক তাই। আমি বললাম।
কিরীটি এবারে খিল খিল করে সুমিষ্ট মেয়েলী হাসি হেসে
উঠল : ডাক্তার ! don't forget please, I am Kiriti
Roy. সাধারণের চাইতে একটু বিশেষ বােধশক্তি দিয়েই
ভগবান এ ধরায় আমায় পাঠিয়েছেন। শুনুন ডাঃ সেন?
আপনি অত রাত্রে কেন ‘তাজ হােটেলে গিয়েছিলেন তা ।
বলছি। আপনি মনে মনে চাইছিলেন সমর যেন কাল সারা
রাত ‘তাজ হােটেলেই থেকে থাকে।
: কখনই না—আমি তীব্রভাবে প্রতিবাদ জানালাম।
ও শুনুন ডাক্তার! আপনি বিমলবাবুর মত সম্পূর্ণরূপে আমায়
বিশ্বাস করতে পারছেন না। কিন্তু সে কথা যা !....এখন
দেখা যাচ্ছে গত কাল সমর এই সহরেই উপস্থিত ছিল ‘তাজ
হােটেলে। তারপর রাত্রি সাড়ে নয়টায় সে ‘তাজ হােটেল থেকে
বের হয়ে যায় এবং বর্তমানে সে নিরুদ্দেশ। তার পাতা
পাওয়া যাচ্ছে না। এবং তার এভাবে নিখোঁজ হওয়ায়
তাকিই লােকের তার উপরে সন্দেহ জাগবে। একথাও
be
-

থর যাত্রী
***
.
আমি চোর! আমি জেঠার ডুয়ার থেকে ৫০ টাকা চরিখেছি
ইনেসপেক্টর।
ana

No text on this page.

আঁধার পথের যাত্রী আমি বলছি যুক্তির দিক দিয়ে দেখতে গেলে এই ব্যাপারে সমরবাবুর position অত্যন্ত সন্দেহজনক। যাকগে, এখন একবার চলুন বিমলবাবু, আপনাদের ওখান থেকে ঘুরে আসা এবং ইনেপেকট্রারাউফ্লার সিংয়ের আগেও কথাবার্তা বলে আসা যাবে । *** A যাক। আমরা সকলে গিয়ে স্যার সূর্যপ্রসাদের বাটীতে হাজির হলাম। ইনেপেকটার উজাগর সিং তখন সেইখানেই উপস্থিত ছিলেন। আমি কিরীটির সংগে উজাগর সিংয়ের পরিচয় করিয়ে দিলাম। উজাগর সিং যেন কিরীটিকে দেখে বেশ একটু বিরক্তই হলেন কিন্তু মুখে সে ভাব কিছুই প্রকাশ না করে মৃদু সাদর আহ্বান জানিয়ে বললেন- : Glad to meet you Mr. Roy. 1 too! কিরীটি জবাব দিলেন। : Caseটা জলের মত সােজা! বিশেষ করে এ্যামেচার 1 mean সখের গােয়েন্দাদের মাথা ঘামাবার মত কিছুই নেই। : দেখুন ইনেসপেকটার, ঘটনাটা আমাদের বাড়ীর, এবং আমরা ইচ্ছা করেই মিঃ রায়কে এই ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে দেবার জন্য বিশেষ অনুরােধ জানিয়েছি ! বিমলবাবু বললেন। ফুঃ! উজাগর সিং একটা শব্দ করলেন।

বাধার পথের যাত্রী,
। তাছাড়া কিরীটিবাবুর অসাধারণ শক্তির পরে আমাদের
যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে।
ঃ ফুঃ ! বেচারী পুলিশ আমরা—আমাদের শক্তির ঢাক
পিটাবার উপায় ত আর আমাদের নেই।
এতক্ষণে কিরীটি কথা বলল : দেখুন ইনেপেকটার আমি
আমার গােয়ন্দাগিরীর নেশা থেকে সম্পূর্ণরূপেই বিশ্রাম
নিয়েছি—তাছাড়া এ caseটা হাতে নেওয়ার আমার এতটুকু
ইচ্ছাও ছিল না। কেননা ঢাক পিটানটা আমি একটু বেশী
অপছন্দ করি। আমি আপনার কাছে প্রতিজ্ঞা করছি
যদি এই রহস্য উদঘাটনের ব্যাপারে এতটুকু সাহায্যও আমি
করি আমার নাম কেউই শুনতে পাবে না ; আমি আপনার
আড়ালে অজ্ঞাতেই থাকব। তাছাড়া পুলিশ যদি এই সব
ব্যাপারে আমাদের সাহায্য না করত আমাদের ক্ষমতাই বা
কতটুক—তারা দয়া করে আমাদের সাহায্য করেন বলেই না
আমরা কাজ করতে পারি।
কিরীটির কথায় চট্ করে উজাগর সিংয়ের মুখখানি উজ্জল
হয়ে উঠল।
: আপনার সাহায্য ত’ আমার এ রহস্যের মীমাংসা করতে
হলে পদে পদে প্রয়ােজন ইনেসপেকটার সাব ।
বহু বহুৎ সুক্রিয়া।
উজাগর সিং এবার সত্যি সত্যি আনন্দে হেসে ফেললেন।
ও ডাঃ. সেন বলছিলেন, আব্দুলের movemente টা

আঁধার পথের যাত্রী নাকি গত রাত্রে বেশ একটু সন্দেহজনক ছিল ইনেসপেকটার? কিরীটি প্রশ্ন করল। ও ফু...বড় লােকের চাকরগুলােই ওই রকম! বিলকুল কুছ নেই হায়। : সমর সম্পর্কে আপনার কী মতামত ইনেপেকটার? ও মায় দেখতাহু আপ সাচ্চা জহুরী হায়! মুঝে বহুং খুসী হােগি কি আপকো মাফিক হােসিয়ার ব্যক্তিকে সাথ, মুকে কাম করনাকা মৌকা মিলেগি। সবসে পাইলে সমকাহি খােজ করনা জরুরী হায়। : কিন্তু ইনেসপেকটার সাব । আপনার একটু ভুল হচ্ছে। সমরকে আমি অনেকদিন থেকেই বেশ ভাল করে চিনি; সমৰু খুন করতে পারে না, বিমলবাবু বলে উঠলেন। : না পারতে পারে, ইনেসপেকটার মৃদুস্বরে জবাব দিলেন। : সমরের বিরুদ্ধে আপনার কী যুক্তি, শুনতে পারি কি ইনেসপেকটার? আমিই এবারে প্রশ্ন করলাম। : যুক্তি। যুক্তি অনেক আছে ডাক্তার বাবু! প্রথমত ধরুন সমরের স্বভাব চরিত্র মােটেই ভাল ছিল না। জুয়াে, রেস খেলায় অভ্যস্ত, কিছুদিন আগে বাপের বাক্স থেকে টাকা চুরি করে উধাও হয়েছিল; দ্বিতীয়তঃ বর্তমানে তার অত্যন্ত অর্থাভাব চলেছে। তৃতীয়তঃ সে এখানে নিজের বাড়ীতে না থেকে ‘তাজ হােটেলে ছিল, চতুর্থ যতদিন তার বাপ সূর্য- প্রসাদ বেঁচে ছিলেন, এ বাড়ীতে তার প্রবেশ করবার কোন ;

শাখার পথের যাত্রী
পথই ছিল না। কেননা সূৰ্যপ্রসাদ তার আর মুখদর্শনও
করবেন না বলেছিলেন : পঞ্চম গত রাত্রে সাড়ে নয়টার পরে
সেই যে সে ‘তাজ’ হােটেল থেকে বের হয়ে যায়, আর সেখানে
সারা রাতের মধ্যে ফেরেনি। যষ্ঠ আমাদেরই একজন কনেষ্টবল
তাকে গত রাত্রে ১০০ থেকে ১১ টার মধ্যে লিংকরােডে ঘুরতে
দেখেছে। সপ্তম আমি তার পায়ের ব্যবহার করবার রবার
সােল দেওয়া জুতো পেয়েছি—এবং সেই জুততার সােলে
এখনও টাটকা কাদা লেগে আছে; তার ঘরে দু’ জোড়া ঠিক
একই রকমের রবার সােল দেওয়া জুতাে পেয়েছি! স্যার
সূর্যপ্রসাদের ঘরের জানালার গায়ে জুতাের দাগের সংগে ঐ
জুততার সােলের ছাপ হুবুহু মিলে গেছে। এর পরও কী আর
অন্য কোন যুক্তির প্রয়ােজন আছে বিমলবাবু ?....বলুন। চুপ
করে আছেন কেন বলুন ....

০০
-আই
-তদর জের
বিমলবাবু বিহবল দৃষ্টিতে উজাগর সিংয়ের মুখের দিকে
তাকিয়ে রইলেন। উজাগর সিং একটুখানি হেসে আবার
বললেন : শুধু তাই নয়; স্যার সূর্যপ্রসাদের বসবার ঘরের সেই .
খােলা জানালার ঠিক নীচেই বাগানের ভিজা মাটীতে অবিকল
ঐ একই প্রকারের জুতাের ছাপ পাওয়া গেছে; আচ্ছা আমি
থানায় যাচ্ছি জরুরী কাজ আছে। উজাগর সিং ঘর থেকে
বেরিয়ে গেলেন। তখন কিরীটি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে
বললে ? ডাক্তার! গত রাত্রে এই ঘরে বসেই আপনার সংগে
স্যার সূর্যপ্রসাদের আলাপ আলােচনা হয়েছিল ?
ও !
০ ০
ও অপনি যখন এঘর ছেড়ে চলে যান, সেই নীল রংয়ের
চিঠির খামটা কোথায় ছিল?
ও সামনের ওই ছােট টেবিলের পরে স্যার সূর্যপ্রসাদকে
হাত বাড়িয়ে রাখতে দেখেছিলাম।
একমাত্র সেই নীল রংয়ের চিঠির খামটি ছাড়া ঘরের আর
সব কিছুই ঠিক তেমনিই আছে, না?...কিরীটি প্রশ্ন করল।
ও আমার ত তাই মনে হচ্ছে।
: আচ্ছা বিমলবাবু! একটিবার স্যার সূর্যপ্রসাদ গত রাত্রে
এই ঘরের যে চেয়ারটিতে বসে ছিলেন সেটায় বসুন ।
কিরীটির নির্দেশ মত বিমলবাবু চেয়ারটার পরে গিয়ে
বসলেন

আবার পথের যাত্রী
ও হাঁ! এখন বলুনত’ ডাক্তার ঠিক কী ভাবে স্যার
সূর্যপ্রসাদের ঘাড়ে ছােরাটা বেঁধান ছিল? আমি দেখাতে
লাগলাম, কিরীটি দরজার কাছে গিয়ে দাড়িয়ে রইল।
ঃ তাহলে দরজার গােড়া থেকেই ছােরার বঁটটা স্পষ্ট
দেখা যাচ্ছিল বলুন! আব্দল আর আপনি, দুজনে ঠিক এক
সংগেই ছােরার বাঁটটা দেখেছিলেন কী ডাঃ সেন?
: হাঁ। আমি বললাম।
কিরীটি মৃদু ভাবে ঘাড়টা একটু দুলিয়ে জানালার কাছে
গিয়ে দাগগুলাে পরীক্ষা করতে লাগল। সহসা এক সময়
আবার প্রশ্ন করল ? ঘরের ইলেকটিক বাতি তখন জ্বলছিল না
ডাক্তার, যখন আপনারা মৃত দেহ এই ঘরে দেখতে পান?
হ
: আচ্ছা ডাঃ সেন । Fire place টা তখন বেশ ভাল
ভাবে জ্বলছিল, না নিবু নিবু হয়ে এসেছিল ?
ও তাত ঠিক মনে নেই মিঃ রায়, আমি জবাব দিলাম।
: ভাল কথা আব্দুল কোথায় গেল? কিরীটি প্রশ্ন করল।
আল ঘর ছেড়ে কিছুক্ষণ আগে চলে গিয়েছিল, আবার
তাকে ডাকিয়ে আনা হলাে।
: এই যে আব্দল, দেখত ঘরের সব কিছু ভাল করে চেয়ে,
গত রাত্রে ঠিক এমনিই ছিল কিনা? মানে যখন তােমরা
আর সূর্যপ্রসাদকে সর্বপ্রথম এই ঘরে নিহত অবস্থায় দেখতে

আঁধার পথের
: আজ্ঞে, আব্দল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঘরের সমস্ত কিছু নজর
দিয়ে দেখতে লাগল, অবশেষে এক সময় কি একটু ভেবে
বললে, : আজ্ঞে ঐ বড় চেয়ারটা ঠিক এখন যে জায়গায় আছে
ওখানে ছিল না, দেওয়ালের দিকে আরাে অনেকটা সরান
ছিল।
ও আমাকে একবার দেখাও ত, চেয়ারটা সেই জায়গায়
সরিয়ে।
আব্দল তখন চেয়ারটাকে দেওয়ালের দিকে প্রায় আরাে
দু ফুট টেনে নিয়ে গিয়ে এমন ভাবে রাখলে যাতে করে চেয়ারটা
দরজার ঠিক মুখােমুখি হয়ে গেল।
ও কিন্তু চেয়ারটা তুবে এভাবে সরিয়ে রাখলে কে ? কেননা
চেয়ারটা এ জায়গায় রেখে দরজার মুখখামুখি কেউ বসবে না
ঘরের দিকে পিছন রেখে। আশ্চর্য! কে আবার চেয়ারটাকে
যথাস্থানে সরিয়ে রাখল ? অল তুমিই সরিয়ে রেখেছিলে
को
: আজ্ঞে না।
কিরীটি আমার মুখের দিকে ফিরে তাকাল : আপনি?
: না; আমি ঘাড় নেড়ে জানালাম।
: আজ্ঞে, পুলিশের সংগে গত রাত্রে দ্বিতীয়বার এই ঘরে
যখন ঢুকি তখনই চেয়ারটাকে এই অবস্থায় দেখতে পাই।
আমি তখন ভাবলাম, কেউ হয়ত চেয়ারটাকে আবার ঠিকভাবে
সরিয়ে রেখেছেন ; আকল বিনীত ভাবে বললে।
?
৫৫

আধার পথের যাত্র
আশ্চর্য !....কিরীটি মৃদুস্বরে শুধু বললে ।
: অমলেন্দু বা বিমলবাবুও ত’ চেয়ারটাকে ওখানে সরিয়ে
রাখতে পারেন; কিন্তু এই সামান্যতম ঘটনাটার কী এমন
বিশেষত্ব আছে কিরীটিবাবু।
ও সামান্যতম বলেই এর বিশেষত্ব আছে ডাঃ সেন ।
ও কিন্তু এমনও ত’ হতে পারে মিঃ রায় যে, আব্দল মিথ্যা
কথা বলেছে, অথবা ভুল দেখেছে।
: না সে ঠিকই দেখেছে ! আব্দল মিথ্যা কথা বলেনি
ডাঃ সেন, বেশ যেন একটু দৃঢ়ভাবেই কিরীটি কথাগুলাে উচ্চারণ
করলে। তারপর সহসা স্বল্প হাসিতে মুখখানি তার উদ্ভাসিত
হয়ে উঠল। ডাক্তারবাবু যদি এই ধরণের case নিয়ে বেশী
দেখা শুনা বা পড়াশুনা করে থাকতেন তাহলে দেখতেন
এই ধরণের ঘটনায় যারা উপস্থিত থাকেন ইচ্ছায় বা
অনিচ্ছায় তাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু গােপনীয় থাকে।
: আমি প্রশ্ন করলাম, আমারও আছে তাহলে কিছু
গােপনীয় বলুন! আমিও ত’ এই ঘটনার সংগে সংশ্লিষ্ট ?
কিরীটি হাসতে হাসতে বললে ? তা আছে বই কি।
: তাই নাকি! কী বলুন ত’?
ও আমার মনে হয় আপনি স্যার সূর্যপ্রসাদের ছেলে সমর
সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন অথচ আমার কাছে এখনও
গােপন করে রেখেছেন ডাক্তার।
কিরীটির কথা শুনে সহসা আমার মুখটা লাল হয়ে উঠল।

আঁধার পথের যাত্রী
কিরীটি বােধ হয় আমার মুখের সে ভাব লক্ষ্য করে থাকবে।
তাড়াতাড়ি বলে উঠল : না না ডাক্তার, আপনার এতে লজ্জিত
হবার কিছু নেই; যতটুকু আপনি আমাকে বলেছেন তার চাইতে
আমি একটি কথাও বেশী জানতে চাই না; কেননা আমি
জানি গােপনীয় আমার কাছে কিছুই থাকবে না।
ঃ মিঃ রায়। আপনার অদ্ভুত ক্ষমতার কথা ইতিপূর্বে অনেক
কাগজে পড়েছি ও শুনেছি, আপনি যদি একটু আপনার বিশ্লেষণের
ধারা সম্পর্কে কিছু কিছু আমায় বলেন তবে বড় খুসী হবে।
: বেশ ত’ এই ধরুন না এই ঘরের Fire place টার
কথা ! আমি Fire place সম্পর্কে একটু আগে আপনাকে
ও আব্দলকে প্রশ্ন করছিলাম না? আপনি বাত্রি সাড়ে দশটার
সময় এ ঘর থেকে চলে যান, কেমন ত ?
ও নিশ্চয়ই।
আপনি যখন এঘর ছেড়ে চলে যান এ ঘরের জানালা
বন্ধ ছিল, এবং ঘরের দরজাটা ছিল খােলা। তারপর রাত্রি
বারটার সময় এই ঘরের মধ্যে স্যার সূর্যপ্রসাদের মৃতদেহ যখন
আবিষ্কার করলেন, দরজাটা তখন ছিল বন্ধ আর জানালাটা
ছিল খােলা। ঠিক উল্টো! কিন্তু জানালাটা খুললে কে?
ঘরের মধ্যে স্যার সূর্যপ্রসাদই একা ছিলেন এবং সে ক্ষেত্রে
একমাত্র তার পক্ষেই জানালাটা খােলা সম্ভব এবং দুটো কারণে
জানালাটা তিনি খুলতে পারেন। প্রথমতঃ চুল্লীর আগুনে
ঘরটা হয়ত খুব গরম হয়ে গিয়েছিল তাই হয়ত জানালাটা তাকে

ধার পথের যাত্রী
খুলতে হয়েছিল ( কিন্তু সে সম্ভাবনা এ ক্ষেত্রে থাকতে পারে না,
কেননা গত রাত্রে সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টি হওয়ায় ঠাণ্ডাটা একটু
বেশীই পড়েছিল)। দ্বিতীয়তঃ জানালা খুলে কাউকে হয়ত এঘরে
তিনি ঢুকিয়েছিলেন, এবং এমন কাউকে হয়ত এঘরে তিনি
ঢুকিয়েছিলেন, যে তার খুবই পরিচিত ছিল।
: সত্যি! এ দিকটা আমার মনে উদয়ই হয়নি। অথচ কত
সহজ জিনিষটা ভাবতে গেলে।
: ঠিকমত যদি ঘটনাকে পর পর বিশ্লেষণ করে সাজাতে
পারেন তবে সব কিছুই সােজা হয়ে যায় ডাঃ সেন। কিন্তু এখন
দেখা যাক্ রাত্রি এগারটার সময় কে তার ঘরে ছিল! সৰ
কিছু থেকে বােঝা যায় যে রাত্রি এগারটার সময় কাল যে এঘরে
ছিল সে জানালা পথেই এঘরে ঢুকেছিল।
রাত্রি এগারটার পরও বিমলবাবু স্যার সূর্যপ্রসাদকে জীবিত
দেখেছিলেন তাহলেও যতক্ষণ আমরা গত রাত্রের আগন্তুক
সম্পর্কে সব কিছু না জানতে পারছি ততক্ষণ এ রহস্যের মীমাংসা
করা যাচ্ছে না। কেননা এমনও ত’ হতে পারে গত রাত্রে
আগন্তুক জানালা পথে এসে স্যার সূর্বপ্রসাদের সংগে কথাবার্তা
বলে চলে যাবার পর খুনী ঐ খােলা জানালা পথে এ ঘরে এসে
চুকে খুন করে গেছে। কিংবা সেই একই লােক দ্বিতীয়বার
যখন স্যার সূর্যপ্রসাদ চেয়ারের উপরে বসে বসেই তন্দ্রাভূত হয়ে
পড়েছিলেন সেই সময় ঘরে ঢুকে খুন করে গেছে।
এমন সময় অমলেন্দু ঘরে এসে ঢুকল।
এবং যদিও

আঁধার পথের যাত্রী
রায়।
: কী সংবাদ অমলেন্দুবাবু?
: গত রাত্রের টেলিফোনের ব্যাপারটা জানা গেছে মিঃ
রাস্তায় একটা Public telephone থেকে রাত্রি
এগারটা পনের মিনিটের সময় ডাঃ সেনকে কেউ ফোন করে
ছিল। রাত্রি সাড়ে বারটায় Havalion ষ্টেশন থেকে শেষ
ট্রেণ Taxilaর দিকে ছেড়ে গেছে, এবং ঐ ট্রেণটার সংগেই
Corresponding train 365 Bombay Express.com
ছয়টায় Bombay Express রাওল পিণ্ডিতে পৌঁছায়।
: বেশ! বেশ। এখন একবার খবর নিন’ Havalion
Station-এ কারা কারা গেছে তাদের একটা Report পাওয়া
যায় কিনা!
: বেশ!
? চলুন ডাঃ সেন এ বাড়ীটা একবার ভাল করে ঘুরে
দেখা যাক।
ও চলুন।

-পুলিশ জীবনের অভিজ্ঞতা
আমরা ঘর থেকে বের হয়ে সি ড়ির কাছে আসতেই অমলেন্দু
বললে : কিন্তু কে যে ডাঃ সেনকে ফোন করল, আর ।
টেলিফোন করারই বা কী দরকার ছিল এটাও কিছুতেই বােক
যাচ্ছে না মিঃ রায়।
: সত্যি, টেলিফোনের ব্যাপারটার কোন মাথা মুণ্ড আমিও
বুঝতে পারছি না, আমি বললাম !
একটা উদ্দেশ্য আছে বৈকি! কিরীটি মৃদুস্বরে জবাব
দিল।
: কিন্তু কি এমন উদ্দেশ্য থাকতে পারে মিঃ রায়। আমি
প্রশ্ন করলাম।
কিরীটি হাসতে হাসতে জবাব দিল । সেটা যখন জানতে
পারব, তখন ত সব কিছুই জানতে পারব ডাঃ সেন! তারপর
হঠাৎ একসময় আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল আপনি
বলছিলেন রাত্রি তখন এগারটা ঠিক, যখন আপনি গত রাত্রে
একটি লােককে গেটের সামনে দেখেন, না।
তখন গির্জার ঘড়িতে ঢং ঢং করে রাত্রি এগারটা
বাল।
: আচ্ছা পায়ে হেঁটে স্যার সূর্যপ্রসাদের প্রাইভেট রুম
থেকে গেটের কাছে আসতে কতক্ষণ সময় লাগতে পারে বলে
আপনার মনে হয় ডাঃ সেন ।

আঁধার পথের যাত্রী
।
ও সােজা দরজা দিয়ে আসলে ২৩ মিনিটের বেশী লাগে না ;
খুব আস্তে আস্তে হলে ৪৫ মিঃ বড় জোর লাগতে পারে।
ও আচ্ছা স্যার সূর্য প্রসাদের সংগে গত সপ্তাহে কোন সময়ে
কোন অপরিচিত লােক কি কখনাে দেখা করতে এসেছে
অমলেন্দুবাবু?
অমলেন্দু একটু চিন্তা করে বলল : হাঁ, দিন কয়েক আগে
হাজার ট্রেডিং
কোম্পানী থেকে
একজন ভদ্রলােক স্থাৰ
সূর্যপ্রসাদের সংগে দেখা করতে এসেছিল বটে, তবে তাকে
stranger বলা চলে না। কেননা আজ কয়েক মাস থেকে
স্যার সূর্যপ্রসাদ একটা ডিকটাফোন (dictaphone) *
কিনবেন বলে মতলব করছিলেন। ঐ লােকটি dictaphone-এর
ডিকটাফোন ( Dictaphone) : এক প্রকার ফনােগ্রাফ
মেসিন। সাধারণত এই মেসিনগুলো অফিসের কাজের সুবিধার জন্য
ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই মেসিন অফিসে থাকলে ষ্টেনােগ্রাফারে
কোন প্রয়ােজন হয় না; কেননা যা টাইপ করবার প্রয়ােজন হয়
বক্তা ডিকটাফোনের মাউথ পিসটা মুখে লাগিয়ে যা বলবার বলে যান,
কথাগুলাে যন্ত্রের মধ্যে অবস্থিত মােমের একটি সিলিণ্ডারে রেকর্ডে
পরে প্রয়ােজন মত মেসিনটা চালালেই মেসিনটা থেকে
কথাগুলাে গ্রামােফোন রেকর্ড বাজাবার মত শােনা যায়। টাইপিষ্ট
তখন সেইকথাগুলো শুনে শুনে টাইপ করে নেয়। আবার পরে
প্রয়ােজন মত সেই মােমের সিলিণ্ডারটাকে চেঁচে নিয়ে নূতন করে
অনেকবার কাজে লাগান যায়। এক কথায় এ যন্ত্রকে reproducing
মেসিন বলা যায়। অনেকটা গ্রামােফান রেকর্ডের মত কাজ নয়।

আঁধার পথের যাত্রী
?
এজেন্ট। কিন্তু স্যার সূর্যপ্রসাদ শেষ পর্যন্ত
dictaphone কেনেন নি।
ও লােকটি, 1 mean agent-এর চেহারা আপনার মনে
আছে?
: আছে! বেঁটে, বেশ সুশ্রী চেহারা।
আচ্ছা ডাঃ সেন! আপনি গেটের সামনে গত রাত্রে যে
লােকটিকে দেখেছিলেন, তার চেহারার সংগে ঐ agent-এর
চেহারার কোন মিল আছে কি
ও না, সে লােকটি প্রায় লম্বায় ছয় ফুট হবে।
এমন সময় একজন ভৃত্য এসে বিমলবাবুকে বললে ?
এ্যাটর্নি মিঃ করমজি এসেছেন।
বিমলবাবু বাইরের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমি কিরীটিকে প্রশ্ন
করলামঃ মিঃ রায়। স্যার সূর্যপ্রসাদের প্রাইভেট রুম ও শয়ন
কর যা দেখবার দেখা হয়ে গেছে নিশ্চয়ই?
হয়েছে।
ঃ আঃ! যদি ঘরের দেওয়ালগুলাে মানুষের মত কথা
বলতে পারত, তবে আজ আমরা অনায়াসেই জানতে পারতাম
খুনীকে! মৃদুস্বরে আমি বললাম।
: কথা বলার ব্যাপারে জিভ থাকাই সব চাইতে বড় কথা
নঃ গঃ সেন।
ভাষাহীন কাদা ইট দিয়ে গড়া ঘরের দেওয়ালগুলাের ভাষা

আঁধার পথের যাত্রী প্রকাশের জন্য জিহ্বা না থাকলেও দেখবার চোখ ও শুনবার কাণ আছে। আমার সংগে ঘরের নির্জীব দেওয়ালগুলাে, টেবিল চেয়ার সবাই কথা বলে। আমি সব কিছুর কথাই শুনতে পাই। ওগুলিও আমায় অনেক সংবাদ দেয়। : কি খবর পেলেন তবে আজ মিঃ রায় স্যার সূর্যপ্রসাদের প্রাইভেট রুম ও তার শয়ন ঘরের দেওয়ালগুলাে ও আসবাব- পত্রের কাছ থেকে? উদগ্রীব হয়ে আমি প্রশ্ন করলাম। : একটি খােলা জানালা, মিঃ রায় বলতে লাগল । একটি বন্ধ দরজা ও একটি চেয়ার যা আপনা আপনি সরে গেছে। ঘরের এই তিনটি নির্জীব বস্তুর নীরব ভাষা শুনে কেবলই আমার মনে হচ্ছে কেন? কেন ? এমনটা হলাে! কিন্তু কোন জবাবই পাচ্ছি না! অথচ এই তিনটির জবাব আমার চাই-ই! লােকটা কি পাগল ! না নীরেট! এত নাম লােকটার! শুনেছি চুলচেরা বিচারশক্তি, অদ্ভুত দৃষ্টি !•••সবই কি তবে বাজে ।.... : চলুন ডাক্তার, স্যার সূর্যপ্রসাদের মিউজিয়াম ঘরে একটিবার যাওয়া যাক আগে। সেই চন্দনকাঠের বাক্স, যার মধ্যে সেই ম্যাকসিকান ছােরাটা ছিল সেটা একবার দেখলে মন্দ হতাে না। আমরা এসে নীচের মিউজিয়াম ঘরে প্রবেশ করলাম। এমন সময় উজাগর সিংও এসে সেই ঘরে প্রবেশ করলেন। ৬ আঁধার পথের যাত্রী চাপ দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন ? এই যে মিঃ রায় আপনি এখনও যাননি দেখছি। : না, কোথায় আর গেলাম। বাড়ীটা বেশ চমৎকার, ঘুরে ফিরে তাই দেখে বেড়াচ্ছি। কিরীটি মৃদুস্বরে জবাব দিল। : খুনের একপ্রকার কিনারা করে এসেছি মিঃ রায়! : বটে!.... : । আপনাদের ত আগেই বলিছি; আরে বাবা Eighteen years experience in the police department. ফুঃ!.••• ও ধরেছেন নাকি খুনীকে ? ও না ধরিনি এখনও তবে ধরলেই হয়! বড়লােকের একমাত্র ছেলে গােল্লায় গেলে যা হয়। : আপনার চমৎকার প্রত্যুৎপন্নমতি কিন্তু ইনেসপেকটার! ও Eighteen years experience ফু!••• • নিশ্চয়ই! নিশ্চয়ই! কিন্তু কেমন করে বুঝলেন বলুন ত’ যে সমরই তার বাপের হত্যাকারী? Method, iccia Method ! Method! স্যার সূর্যপ্রসাদকে কালরাত্রে শেষ জীবিত অবস্থায় দেখা যায় রাত্রি সােয়া এগারটার সময়; কেননা বিমলবাবু, তাঁর ভাইপাে সেই সময় তার সংগে কথা বলে এসেছেন। প্রথম কারণ এই! দ্বিতীয় রাত্রি বারটার সময় ডাঃ সেন এ বাড়ীতে এসে ঘর জেগে মৃতদেহ আবিষ্কার করেন এবং ডাক্তারের মতে তার সূর্যপ্রসাদ *।

থেকে পৌণে বারটা এই সময়ের মধ্যে নিশ্চয়ই।
আঁধার পথের যাত্রী
আধঘন্টা আগে মারা গেছেন। কী ডাক্তার, আপনি তাই
বলছিলেন না ?
হাঁ, আধঘণ্টা কি আধঘণ্টার কিছু বেশী আগে মারা গেছেন
বলেই মনে হয়েছিল, আমি জবাব দিলাম।
ও বেশ তাই যদি হয়ে থাকে তবে রাত্রি সাড়ে এগারটা
৭
স্যার সূর্যপ্রসাদকে কেউ খুন করেছে এটা আমরা অনায়াসেই
ধরে নিতে পারি,, কেমন ত ?
বলুন!..কিরীটি মৃদুস্বরে বললে শুধু !
: আমি গত রাত্রে এবাড়ীতে যিনি যিনি ছিলেন ঐ সময়ের
প্রত্যেকেরই গতিবিধির একটা রেকর্ড তৈরী করেছি। এই দেখুন।
উজাগর সিং একটি শাদা টাইপ করা কাগজ কিরীটির দিকে
এগিয়ে দিল।
১। মেজর কৃষ্ণস্বামী : বিলিয়ার্ড রুমে বলদেববাবু ও
অমলেন্দুবাবুর সংগে ঐ সময় বিলিয়ার্ড খেলছিলেন।
অমলেন্দুবাবু ও ওঁরা দু’জনেই সেকথার সমর্থন করেছেন।
২। বলদেববাবু : বিলিয়ার্ড ঘরে ছিলেন প্রমাণিত হয়েছে।
৩। রাধিকাপ্রসাদবাবু : পৌণে এগারটা পর্যন্ত বিলিয়ার্ড
ঘরে ছিলেন, পরে নিজের শয়নকক্ষে গিয়ে শয়ন করেন।
আব্দল ও অন্য একজন ভৃত্য বলেছে।
৪। সুবলবাবু : রাত্রি সাড়ে দশটায় শরীর খারাপ
বলে ঘুমুতে যান নিজের ঘরে সকলেই দেখেছে।

আঁধার পথের যাত্রী
৫। আব্দল । রাত্রি সােয়া এগারটায় নীচের ঘরে শুতে
যায় অন্যান্য চাকররা সাক্ষ্য দিয়েছে।
৬। অমলেন্দুবাবু : রাত্রি
সাড়ে এগারটার পর বিলিয়ার্ড
রুম থেকে সকলের সংগে বের হয়ে নিজের ঘরে শুতে
যায় সকলেই দেখেছেন।
চাকরদের মধ্যে আব্দুল আজীবন এখানে আছে, উত্তমসিং
চার বছর আছে, বাবুর্চি ও দারােয়ান সাত বছর এখানে কাজ
করছে, অমলেন্দু অত্যন্ত বিশ্বাসী! একমাত্র আব্দুল সম্পর্কে
সামান্য একটু সন্দেহ জাগে তাছাড়া সকলেই সন্দেহের বাইরে।
ও লিষ্টটা ভালই হয়েছে, কিরীটি কাগজটা আবার উজাগর
সিং-এর হাতে ফিরিয়ে দিল। তবে আব্দল যে খুন করেনি সে
বিষয়ে আমি স্থির নিশ্চিত মৃদুস্বরে কথাটা কিরীটি বললে।
এই লিষ্ট দেখে এটা স্পষ্টই বােঝা যায় এবাড়ীর কেউই
স্যার সূর্যপ্রসাদকে খুন করেনি। এখন দেখা যাক অন্য দিকে
নজর দিয়ে। স্যার সূর্যপ্রসাদের পলাতক ছেলে সমরকে গতরাত্রে
এবাড়ীর আশে পাশে সাড়ে দশটা থেকে এগারটার মধ্যে
একজন আমাদের পুলিশ লিংক রােডে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে।
আপনি ঠিক জানেন পুলিশ ভুল করেনি, আমি প্রশ্ন
।
করলাম।
: না। সে সমরকে অনেকবার দেখেছে। সেইজন্য
তাকে চিনতে তার ভুল হতেই পারে না। এ থেকেই স্পষ্ট
বােঝা যায় এবং রাত্রি এগারটার সময় অমলেন্দুবাবু স্বার

আঁধার পথের যাত্র। সূর্যপ্রসাদের ঘর থেকে কথাবার্তার যে আওয়াজ পেয়েছেন এ থেকেই কি স্পষ্ট বােঝা যায় না এ দুষ্কর্মের হােত কে? কে এ রহস্যের মেঘনাদ ? তাছাড়া জুতাে। জুতাের ছাপ এবং তাজ হােটেল থেকে সময়ের অন্তর্ধান! বাপকে খুন করেছে হয়ত সে রাগের বসে ঝোঁকের মাথায়, তারপরই হয়ত রক্ত দেখে বিহ্বল হয়ে পড়ে এবং ফোনে সংবাদটা দিয়ে ট্রেণে পালায় ! ও কিন্তু ফোনে সংবাদ দিতে গেল কেন? সহসা কিরীটি কথার মাঝে প্রশ্ন করে বসল। : অবিশ্যি এর উত্তর দেওয়া একটু কঠিন!....কেন সে হঠাৎ ফোন করতে গেল ! তবে খুনীরা অনেক সময় এমন অনেক কিছু করে বসে যার কোন সদ-উত্তরই পাওয়া যায় না। পুলিশ লাইনে যদি দীর্ঘ আঠার বছর আমার মত থাকতেন তাহলে দেখতে পেতেন খুনীরা কত অদ্ভুত প্রকারেরই না হয়। ফুঃ .... : কিন্তু একই রকম জুতােত’ অনেক লােকই পায়ে দিতে পারে ইনেসপেকটার সাহেব ? কিরীটি আবার প্রশ্ন করল ও পায়ে দিতে পারে কিন্তু-সমর পালাল কেন ? ও হাঁ পালানটা সত্যিই অন্যায় হয়েছে। কিরীটি মৃদুস্বরে আবার জবাব দিল : পালান সত্যিই তার উচিত হয় নি।•••বেচারী সমর!••• ও এখন তাহলে বুঝুন !•••Eighteen years sperience in police line : 1....

-~
-সমর দোষী নয়-
সমরের এখনও কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি। পুলিশ
তন্ন তন্ন করে সর্বত্র খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে গেছে।
সেদিন আর আমাদের স্যার সূর্যপ্রসাদের বাড়ী ভাল
করে দেখা হয়নি।
সকাল বেলা কিরীটি আমার ক্লিনিক্‌সে এসে হাজির হল।
ঃ ডাঃ সেন! চলুন একবার স্যার সূর্যপ্রসাদের বাড়ী থেকে
ঘুরে আসি। হাতে বিশেষ কোন কাজ নেই ?
ও না। চলুন।
পথ চলতে চলতে আমি এক সময় বললান ঃ মিঃ রায়,
আপনার সংগে কাজ করতে আমি কী যে আনন্দ পাচ্ছি!....
সুব্রত বাবু আপনার সহকারী রূপে অনেক সময় কাজ
করেছেন না ?...
: হুঁ, সুব্রত শুধু আমার সহকারীই নয় পরম বন্ধু !....
জীবনে অমন বন্ধু আমার খুবই কম মিলেছে। আজ এত
দূরে এসে প্রতি মুহূতেই তার কথা আমার মনে পড়ে।
স্যার সূর্যপ্রসাদের বাড়ী।
বাড়ীর পিছন দিককার বাগানে কিরীটি আমাকে নিয়ে
ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। বাগানটিতে নানা প্রকারের গাছ
পালা আছে।

আঁধার পথের যাত্রী
বাগানের এক কোণে ছােট ঘােট পাশা পাশি দুটো ঘর।
একটিতে মালী থাকে, আজ দিন দশেক হলাে সে ছুটা
নিয়ে তার বাড়ী গেছে।
অন্যটা খালিই পড়ে থাকে।
মালীর ঘরটি তালা বন্ধ। অন্যটির দরজা বন্ধ !
দরজা ঠেলে খুলে দ্বিতীয় ঘরটির মধ্যে গিয়ে কিরীটি ও
আমি প্রবেশ করলাম।
ঘরটি বহুদিনের অব্যবহারে ধূলি সমাকীর্ণ !
এক পাশে কতকগুলাে ভাংগা টেবিল ও চেয়ার ভূপ
করা আছে।
মেঝের ধূলায় অনেকগুলাে এলাে মেলাে পায়ের দাগ ও
গােল গােল ঘােট ঘােট দাগ।
কিরীটি ধূলার পরে পায়ের দাগগুলাে দেখে বললে ?
এক দিনের মধ্যে কেউ নিশ্চয়ই এঘরে এসেছিল।
নিশ্চয়ই এঘরে এসেছিল।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে সহসা
কিরীটি নীচু হয়ে মেঝে থেকে কী একটা বস্তু তুলে নিল।
: কী মিঃ রায় ?
: এটা কালাে নস্যির কৌটা !...তারপর সিগ্রেটটা হাতের
পাতার পরে ধরে দেখতে দেখতে বললে ....আচ্ছা ডাঃ
সেন! এই ঘর থেকে স্যার সূর্যপ্রসাদের দোতালার প্রাইভেট
রুমের জানালার নীচে যেতে কতক্ষণ সময় লাগতে পারে ?

ধার পথের যাত্রা
৫ মিনিট দুই তিন, আমি জবাব দিলাম।
হু', দুই তিন মিনিট।...কিরীটি মৃদুস্বরে বললে।
: আচ্ছা মিঃ রায়? এ কেষ্টা সম্পর্কে কিছু বুঝতে
পারছেন ?
: না !যা বুঝেছি তাও গােলমাল হয়ে যাচ্ছে—মনে
হচ্ছে ঘটনাটা যেন বেশ একটু জটিল।
বাগান থেকে আমরা স্যার সূর্যপ্রসাদের বাটির বাইরের
ঘরে প্রবেশ করলাম।
বাইরের ঘরে রাধিকাপ্রসাদ, বিমলবাবু ও এটর্নি মিঃ
করমজি কথাবাত। বলছিলেন, আমাদের সাদর আহ্বান
জানালেন।
মিঃ করমজির হাতে একটা মােটা বােল করা পার্চমেন্টের
রু রংয়ের কাগজ।
: স্যার সূর্যপ্রসাদের উইল বুঝি ?
কিরীটি প্রশ্ন করল।
: হাঁ, রাধিকা প্রসাদ জবাব দিলেন।
ও আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে, উইলটা একটিবার
শুনতে চাই।
ও বিলক্ষণ। মিঃ করমজি, শােনান মিঃ রায়কে একবার
দাদার উইলটা ।
রাধিকা প্রসাদ বাবু বললেন।

আঁধার পথের যাত্রী
মিঃ করমজি তখন উইলটা পড়তে লাগলেন।
আমি শ্রীযুক্ত সূর্যপ্রসাদ সেন জেলা ২৪ পরগণা স্থিত
বরানগর নিবাসী বর্তমানে এবটাবাদ নিবাসী বলিতেছি ইহাই
আমার শেষ উইল ? ইত্যাদি ইত্যাদি। উইলের সারমর্ম এই
এক হাজার টাকা করে প্রত্যেক চাকর পাবে। পাঁচ হাজার
টাকা সেক্রেটারি অমলেন্দু চক্রবর্তী পাবে ।
সাড়ে বার হাজার টাকা পাবে বিমল, এবং সাড়ে বার
হাজার পাবে সুবল, দশ হাজার পাবে ছােট ভাই রাধিকা
প্রসাদ ; এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা পাবে পুত্র সমর
এবং বাদ বাকী দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা কলিকাতার
নানা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে ব্যয় হবে।
ঃ উঃ তিন লক্ষ টাকার সম্পত্তি, আমি বললাম ।
: হু, স্যার সূর্যপ্রসাদ দেখা যাচ্ছে সত্যিকারের ধনী
ব্যক্তি ছিলেন।
সেদিনকার মত বিদায় নিয়ে আমরা চলে এলাম।
গত রাত্রি থেকেই তুষার পড়া শুরু হয়েছে।
ক্লিনিক্‌সে একাকী চুপটি করে fire placeয়ের ধারে
একটি চেয়ারের পরে বসে আছি।
ঘরের কাচের সাসী দিয়ে দেখা যাচ্ছে ঝুর ঝুর করে
পঁজা তুলাের মত হালকা ও নরম শুভ্র তুষার বারে বারে
৭১

লাধার পথের যাত্রী
?
পড়ছে অবিশ্রাম। পথ, ঘাট, দূরের পাহাড়গুলি শাদা
হয়ে গেছে।
সমগ্র বিশ্বচরাচর যেন সর্বাংগে জড়িয়ে নিয়েছে শ্বেত
শুভ্র মখমলের মত পুরু নরম ও কোমল একখানি গাত্রাবাস।
কিরীটির ভৃত্য জংলী এসে দরজার গােড়ায় দাড়াল।
ও কি সংবাদ জংলী
বাবু' একটা চিঠি দিয়েছেন। এখুনি জবাব চাই।
চিঠিটা খুললাম। কিরীটি লিখছে ।
প্রিয় ডাঃ সেন :
আজ রাত্রে স্যার সূর্যপ্রসাদের বাড়ীতে একবার যেতে
হবে বিশেষ প্রয়ােজন। স্যার সূর্যপ্রসাদের খুন হওয়া
সম্পর্কে কয়েকটা আলােচনা করা যাবে; এবং সূর্যপ্রসাদের
খুন হওয়ার রাত্রে সেখানে যিনি যিনি উপস্থিত ছিলেন তারা
প্রত্যেকেই যাতে আজও রাত্রে ওখানে উপস্থিত হন তার
সকল ব্যবস্থা আপনাকেই করতে হবে। ভবদীয় : কিরীটি রায়।
জংলীর হাতেই ছােট একটুকরাে কাগজে জবাব লিখে
দিলাম ঃ মিঃ রায়, আপনার কথামতই ব্যবস্থা হবে-ইতি
শিশির সেন।
জংলী চলে গেল, আমি ভাবতে লাগলাম।
কিরীটির উদ্দেশ্য কী ?
কেন হঠাৎ সকলকে সে এ ভাবে আহ্বান জানাল ।
রহস্যময় কিরীটির ব্যবহার।
৭২

আঁধার পথের যাত্রী
শক্তিশালী গােয়েন্দা সে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই
কিন্তু অহংকারও তার তীব্র।
নিজের শক্তিতে আত্মসমাহিত হলেও সম্পূর্ণ সজাগ !
মনের মধ্যে তীব্র একটা কৌতূহল বারংবার উকি ঝুকি
দিয়ে যেতে লাগল।
কী তার প্রয়ােজন ? উদ্দেশ্যহীন কাজ সে করে না ;
কিন্তু সে উদ্দেশ্যটা কী ?
ধীরে ধীরে এক সময় সন্ধ্যার অন্ধকার চারিপাশের তুষার
ঢাকা পাহাড়গুলির বুক ছুয়ে ধরার বুকে পায়ে পায়ে নেমে
এলাে।
ঘরের মধ্যে গগনে Fire placeয়ের পাশে বসে আছি,
একটা বর্ষাতি গায়ে কিরীটি এসে ঘরে প্রবেশ করল।
রুমাল দিয়ে বর্ষাতির উপরের তুষার কণাগুলি ঝেড়ে ফেলতে
ফেলতে কিরীটি বললে : Good evening ডাঃ সেন।
নারায়ণকে ডেকে গরম কফি দিতে বললাম।
একটা সােফা Fire placeয়ের সামনে টেনে নিয়ে বসতে
বসতে কিরীটি বললে : সমস্ত বন্দোবস্ত ready ডাক্তার ?
হাঁ। মৃদুস্বরে আমি জবাব দিলাম।
: চেয়ারটার সম্পর্কে কোন জবাবই কারও কাছে পাওয়া
গেল না ডাক্তার! মেজর, বলদেববাবু, বিমলবাবু, সুবলবাবু,
রাধিকাপ্রসাদ, আব্দল, অমলেন্দু ও আপনি—সকলের কাছেই
এক জবাব পেলাম, চেয়ারটা কেউই সরান নি।

আঁধার, পথের যাত্রী
: সামান্য একটা চেয়ার নিয়ে অতই বা মাথা ঘামাচ্ছেন
কেন মিঃ রায়? আমি হাসতে হাসতে বললাম।
ও সামান্যই বটে!....সে যাক!....এই যে গরম গরম কফি
এসে গেছে, অপাততঃ এরই সদ্ব্যবহার করা যাক।
ঃ মিঃ রায়। আমি একটা কাগজে আমার চিন্তা ও বিচার
শক্তি অনুযায়ী এই কেস সম্পর্কে কতকগুলো পয়েন্ট টুকেছি-
শুনবেন ?
গরম গরম কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে কিরীটি বললে ?
বলুন শােনা যাক! এ কেসে আপনি আমার বন্ধু সুব্রতর
কাজ করছেন, ভুলে যাবেন না।
১নং : স্যার সূর্যপ্রসাদকে রাত্রি এগারটার সময় তার ঘরে
কারও সংগে কথা বলতে শােনা গিয়েছিল।
২নং : রাত্রি সাড়ে দশটা থেকে এগারটার মধ্যে ঐ রাত্রে
সমর নিশ্চয়ই কোন সময় জানালা পথে স্যার সূর্যপ্রসাদের
সংগে দেখা করতে এসেছিল। জানালায় ও বাগানের জমিতে
তার পায়ের জুতাের ছাপই সেটা প্রমাণিত করেছে এবং কাদা
মাখা জুততা তার হােটেলের ঘরে পাওয়া গেছে।
৩নংঃ রাত্রি সাড়ে দশটা থেকে এগারটার মধ্যে সমরকে
লিংক রােডে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। তাছাড়া ইদানিং
তার অত্যন্ত অর্থ কষ্ট চলছিল, সে সম্পর্কে সে দু একবার
তার বাপকে জানিয়েছিল; তিনি কোন জবাবই তার দেননি।
এই ঘটনাগুলাে থেকে স্পষ্টই বােঝা যায় রাত্রি সাড়ে
৭১

আঁধার পথের যাত্রী দশটার পর ও এগারটার মধ্যে স্থার সূর্যপ্রসাদের সংগে যার কথাবার্তা শােনা গেছে সে সমর ছাড়া আর কেউ হতে পারে না; নিশ্চয়ই সে গােপনে অর্থের জন্য বাপের কাছে এসেছিল এবং হয়ত স্যার সূর্যপ্রসাদ ছেলেকে কোন সাহায্য করতে রাজী না হওয়ায় ক্ষুন্ন মনে ফিরে গেছে—এর থেকে বােঝা যাচ্ছে সমর তার বাপকে খুন করেনি, কেননা রাত্রি সােয়া এগারটায় যাবার সময় মেজর কৃষ্ণস্বামী স্যার সূর্য- প্রসাদের ঘরে তার গলা শুনেছেন। সমর যাবার সময় জানালা খুলে রেখে যায়। পরে সেই জানালা পথে খুনী ঘরে প্রবেশ করে সূর্যপ্রসাদকে খুন করে যায়। সহসা কিরীটি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু চাপা স্বরে প্রশ্ন করল। : তাহলে আপনার মতে খুনী কে ডাঃ সেন ? ও মনে হয় সেই রাতের অচেনা আগন্তুক যার সংগে আমার সেই রাত্রে ফিরবার পথে সূর্যপ্রসাদের বাড়ীর গেটের সামনে দেখা হয়। সে আগন্তুক হয়ত আব্দলের সংগে ষড়যন্ত্র করে আব্দুলের সাহায্যে ছােরাটা চুরি করে অনায়াসেই কাজ সাফাই করে গেছে। : অনুমানটা আপনার মন্দ নয় ডাঃ সেন; কিন্তু টেলিফোন ও ঘরের সেই সরান চেয়ারটা ! ও সত্যি চেয়ারটার জন্য আপনি যেন পাগল হয়ে উঠেছেন মিঃ রায়!..

আঁধার পথের যাত্রী হঠাৎ কথার মাঝেই কিরীটি হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে অসহিষ্ণু ভাবে বলে উঠল : ডাঃ সেন! রাত্রি আটটা দশ মিনিট, চলুন সকলে হয়ত আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন ! আমরা উঠে পড়লাম। - এগার- রহস্যময় কিরীটি- বিচিত্র কিরীটির হাব ভাব !... ওকে যেন কিছুতেই ধরা ছোঁওয়া যায় না। সকলে এসে আমরা স্যার সূর্যপ্রসাদের বৈঠকখানার বড় একটা গেলি টেবিলের চার পাশে চেয়ার টেনে বসেছি। বাইরে অবিশ্রাম পেঁজা তুলাের মত তুষার ঝরছে ঝুর ঝুর....ঝুর••• ! যেন নীরব নিশিথিনী বেদনায় অশ্রু বর্ষণ করছে। টেবিলের ঠিক উপরেই একটা ব্লু রংয়ের ডােম ওয়ালা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে; অন্যান্য আলাে গুলাে আল' হয়নি। Fire placeয়ে গনগনে আগুন। আগুনের লাল রঙের মত শিখাগুলি মাঝে মাঝে লকলকিয়ে উঠছে। ঘরের মধ্যে আমরা সাতজন উপস্থিত, মেজর, বলদেববাবু, রাধিকাপ্রসাদ, বিমলবাবু, সুবলবাবু, আমি ও কিরীটি। মৃত্যুর মত শান্ত কঠিন মীরবতা সমগ্র ঘরখানি জুড়ে বিরাজ করছে। ৭৬ আঁধার পথের যাত্রী সহসা কিরীটি তার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াল। পরিধানে তার কালাে রংয়ের সার্জের গরম সুট। হাতে একটা জ্বলন্ত সিগার। আমাদের সকলের দৃষ্টি এক সংগে কিরীটির প্রতি নিক্ষিপ্ত হলো। • তীক্ষ অথচ চাপা গলায় কিরীটি কথা বলে উঠল : Gentlemen! আমি একটা বিশেষ কারণে এই ভাবে আপনাদের সকলকে এখানে একত্রিত করেছি। কিন্তু আমার কারণ ব্যক্ত করবার আগে একটা বিশেষ অনুরোেধ আছে আমার বিমলবাবুর প্রতি ! বিমলবাবু শুষ্ক চকিত কণ্ঠে বলে উঠলেন । আমাকে !• • • কিরীঠি গম্ভীর চাপা কণ্ঠে বলতে লাগল : বিমলবাবু! আপনি সমরের শুধু সম্পর্কে ভাই-ই নন; সমবয়সী, খেলার সাথী, সহপাঠী ও বন্ধু !....তাছাড়া সমরকে আপনি অত্যন্ত ভাল- বাসেন, এবং শুনেছি সেও আপনাকে তেমনিই ভালবাসে। আমি করজোড়ে আপনার কাছে মিনতি জানাচ্ছি আপত্তি যদি সমর সম্পর্কে কোন খোঁজ জানেন, কোথায় সে আছে, কোথায় যেতে পারে—তাকে এখুনি এখানে ফিরে আসতে কেননা একটিবার চিন্তা করে দেখুন তার এভাবে পালিয়ে আত্মগােপন করে থাকবার জন্য যত দিন যাচ্ছে তার positionও ততই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। একটিবার যদি তিনি এখন ফিরে আসেন,-র যতই দোষ থাক না কেন নিজেকে বাঁচাবার হয়ত বা একটা উপায় তিনি পেতেন, কিন্তু এর পরে আর কোন উপায়ই থাকবে না। বিমলবাবু! সত্যিই বলুন।

আঁধার পথের যাত্রী
প্রচুর।
আপনার স্থির ধারণা হয়ে থাকে সমর এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ
নির্দোষ, তবে এখুনি তাকে আসতে বলুন। এখনাে বাঁচাবার
সময় আছে।
চেয়ে দেখলাম বিমলবাবুর মুখ রক্তশূন্য একেবারে কাগজের
মত শাদা হয়ে গেছে,....শুষ্ক কণ্ঠে শুধু তিনি উচ্চারণ করলেন ?
এখনও সময় আছে ?
ও বিমলবাবু! মনে রাখবেন, আপনাকে অনুরােধ করছে স্বয়ং
কিরীটি রায় ।
যার অনেক বিবেচনা আছে, যার অভিজ্ঞতাও
আপনাকে আমি কথা দিচ্ছি আপনার কোন অনিষ্টই
হবে না। এখনও বলুন সমর কোথায় ?
এতক্ষণে অধীর আবেগে কাঁপতে কাপতে বিমলবাবু উঠে
দাঁড়ালাে । আমি ভগবানের নামে দিব্যি করে বলছি মিঃ রায়,
আমার কথা বিশ্বাস করুন। সত্যি, সমর সম্পর্কে আমি এত
টুকুও সংবাদ জানিনা। সে কোথায় সত্যি আমি জানিনা।
অমার সংগে জেঠামণির খুনের দিন বা তারপর কোন সময়
একটি মিনিটের জন্যও তার দেখা হয়নি।
: বেশ!...এবারে আপনারা যারা এখানে উপস্থিত আছেন
বলুন
যদি কেউ আপনারা সেই পলাতক সমরের কোন
সংবাদ জানেন।
সকলেই নিশ্চপ।
মৃত্যুর মত কঠিন স্তব্ধতা।
৭৮

আঁধার পথের যাত্রী
: বলুন,
করে বলুন। আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।
করজোড়ে। তথাপি সবাই চুপ।
এতটুকু শব্দ পর্যন্ত কারও গলা দিয়ে বের হলাে না।
সহসা রাধিকাপ্রসাদ কথা বললেন : বিমল কেন অবুঝ
হচ্ছে, সত্যি যদি তুমি জেনে থাকো সমর কোথায় তবে বলে
দাও না। কেন বােকামি করছাে?
ও বাবা! বাবা! কী আপনি বলছেন, বিমল চীৎকার
করে আর্তস্বরে বলে উঠল আপনি কী মনে করেন সমর তার
বাপকে খুন করেছে ? সমরকে কি আপনি চেনেন না ?•••
তীক্ষ্ণস্বরে রাধিকাপ্রসাদ বললেন : এ সংসারে আশ্চর্য
বলে কিছুই নেই বিমল। যে মানুষ ঘটনা বিশেষে দেবতা
হয়, সেই মানুষকেই আমরা আবার ঘটনা বিশেষে পশুর
অধম, নেকড়ের মত খল, সাপের মত ঐর, হায়নার মত রক্ত
পিপাসু হতে দেখি। সমর ইদানিং গােল্লায় গিয়েছিল। নেশা
ভাং জুয়াে খেলায় সে মত্ত হয়ে উঠেছিল, হাতে একটি
পয়সাও ছিল না। চিরদিন বিলাসে লালিত পালিত, অর্থাভাব
তার কাছে বড় কষ্টকর ও নিদারুণ, তাছাড়া আমি জানি
দাদাকে সে দু'একবার অর্থের জন্য কাতর অনুরােধও
জানিয়েছিল।
এবারে বিমলবাবু সত্য সত্যই কেঁদে ফেললেন : কিরীটি
বাবু! আপনি কি একটি কথাও বলতে পারছেন না; কেন
চুপ করে আছেন ?....
এক
৭.

আঁধার পথের যাত্রী
--
: কী উনি বলতে পারেন বিমল বাবু•••মেজর তীরে
জবাব দিলেন
: বিমল বাবু শান্ত হােন !•••এতক্ষণে কিরীটি কথা বললে ?
আমি কিরীটি রায়, আপনাকে আশ্বাস দিচ্চি !•••আপনি স্থির
হােন। হাঁ এবারে আমি আমার বক্তব্য শেষ করি। আমি
সমগ্র ঘটনার আসল সত্যটুকু বের করবার চেষ্টা করছি।
এবং সে সত্য অন্যের কাছে যত ভয়ংকর ও নিদারুণ হােক
না কেন-যে সত্যকে চায় বা খোঁজে তার কাছে পরম রমণীয়।
এবং সম্ভবত কিরীটি রায়ের জীবনে এই শেষ গােয়েন্দাগিরীর
কাজ। এরপর জন্মের মত এ পথ থেকে বিদায় নেবাে।
জীবনে আর এ ধরণের কাজে হাত দেবাে না। কিন্তু নিরাশ
হয়ে এই কাজ থেকে আমি শেষ বিদায় নেব না ! কেননা
নিষ্ফলতা কাকে বলে কিরীটি আজ পর্যন্ত জানেনি ও
নেনা!....ভদ্র মহােদয়গণ—সুস্পষ্ট ভাবেই এখানে উপস্থিত
সকলকেই আমি বলছি—আমি এই স্যার সূর্যপ্রসাদের হত্যা
রহস্য জানবার চেষ্টা করছি এবং আমি তা জানবই—আপনারা
কেউ আমার সাহায্য করুন চাই না করুন
সহসা মেজর বলে উঠলেন : আপনার এধরণের কথার উদ্দেশ্য
কী মিঃ রায়, আমাদের সাহায্য বলতে কী বােঝাতে চান আপনি?
শুনুন তবে। কিরীটি তীক্ষস্বরে এবারে বলে উঠল।
এখানে আপনারা যিনি যিনি উপস্থিত আছেন—প্রত্যেকেই
আমার কাছে কিছু না কিছু গােপন করছেন।

স্মিতভাবে সাহস নেই লতে ঘৃণাভরে ঘর থেকে - পালাবার চেষ্টা করবেন না...••• উজাগর সিং ঘুমিয়ে নেই- -এম ২৮,

দূধা সৃতি লাইব্রেরী
স্কৃতি - ১৩৫৭ সাল।
কেলগড়িয়া - বসিরহাট।

আঁধার পথের যাত্রী
••
মেজর বাধা দিতে গেলেন ; কিরীটি তাকে থামিয়ে দিয়ে
বললে : আমি জেনে শুনেই বলছি মেজর! আপনাদের
প্রত্যেকের কাছে কিছু গােপন এখনও আছে! আপনাদের
মধ্যে প্রত্যেকেই যিনি যতটুকু জানেন, কেউ সে কথা আমাকে
খুলে বলেন নি। বলুন••সবাই শপথ করে বলুন আমার কথা
মিথ্যে। বলুন। কী সব চুপ করে রইলেন কেন ? বলুন
আমি মিথ্যে কথা বলছি? বলুন ? উত্তেজনায় কিরীটির
স্বর কাপতে লাগল। সকলেই নিশ্চল, যেন সব মন্ত্রবলে
বােবা বনে গেছে।
এবারে কিরীটি সহসা হেসে ফেললে, তারপর স্মিতভাবে
বললে : আর বলতে হবে না....কিন্তু ছিঃ এতটুকু সাহস নেই
আপনাদের? ভীরু! কাপুরুষ....বলতে বলতে ঘৃণাভরে
সকলের প্রতি দৃষ্টিপাত করে দ্রুতপদে কিরীটি ঘর থেকে
নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।

উজাগৰ সিংয়ের কেরামতি-
পরের দিন।
প্রত্যুষে ।
আকাশ পরিষ্কার।
তুষার ঢাকা পাহাড় শ্রেণীর মসৃণ ধবল গায়ে প্রথম রবির
আলাে যেন রং দিয়ে ফাগুয়া খেলতে শুরু করেছে।
কখন ঘাের রক্তবর্ণ,কখনও হরিদ্রাভ, কখন গৃলিত
সােনার মত বর্ণ বৈচিত্র্যপূর্ব ।
পাহাড়ের নীচ দিয়ে পাইন গাছগুলির পাতায় তুষারের
শাদা কণাগুলি সূর্য কিরণে ঝিমিস্ করছে!
ফোনে ইনেপেক্টার উজাগর সিং-এর গলা শােনা গেল ।
ডাঃ সেন! কিরীটি বাবুকে সংগে করে একটি বার লিংক রােডে
সূর্যপ্রসাদের বাড়ীতে আসুন! দেরী করবেন না।
আমি আর কিরীটি স্যার সূর্যপ্রসাদের বৈঠকখানায়
প্রবেশ করতেই ইনেসপেক্টার উজাগর সিং সাদর আহ্বান
জানাল আইয়ে আইয়ে বাহাদুর সা!•••
: সুপ্রভাত ! কিরীটি শুধু মৃদুস্বরে জবাব দিল।
: আপনি গত রাত্রে আমাকে ফোন করেছিলেন, স্যার
সূর্যপ্রসাদের শয়ন কক্ষে বাক্স আলমারী ডেক্স ইত্যাদি
একবার ভাল করে সার্চ করে দেখতে !....কিন্তু গতকাল ও

আঁধার পথের যাত্রী পরশু একটা জরুরী এনকোয়ারী নিয়ে এত বেশী ব্যস্ত ছিলাম যে, একটুও সময় করে এদিকে আসতে পারিনি ; চলুন ঘর দুটো ত’ সেই দিন থেকেই পুলিশের তালা দিয়ে সিল করা আছে। সকলের সামনেই একোয়ারী করা যাবে। অমলেন্দু বাবুকে ডেকে আনা হল। রাধিকাপ্রসাদ ও বিমলবাবু সংগে সংগেই চললেন ! ইনেসপেক্টার সিল ভেংগে পকেট থেকে চাবী বের করে তালা খুললেন। ঘরের মধ্যে ঢুকতেই মনটা কেমন ছ ছম্ করে উঠল। • মনে হলাে ঘরের অন্ধকার থেকে কে যেন একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল !.... মৃত্যু ক্ষুধায় যেন একটা তীক্ষ্ণ বাঁকান ছােরা লকলকিয়ে ঘরের আসবাব পত্রের মধ্যে একটা রিভলভিং বুক সেলফ !•••একটা সিংগল বেড় ! একটা লােহার সিন্দুক। একটা সেক্রেটেরিয়েট টেবিল ও তার পাশে গােটা দুই চেয়ার! সিন্দুকের মধ্যে কিছু নগদ টাকা ও দরকারী কাগজ পত্র পাওয়া গেল। সেক্রেটেরিয়েট টেবিলের একটা খােলা টানা থেকে অন্যান্য কাগজ পত্রের সংগে দশ টাকার নােটের একটা লাল সুতাে দিয়ে বাঁধা তাড়া পাওয়া গেল। উজাগর সিং বিস্মিত কণ্ঠে বললেন : আশ্চর্য, স্যার সূর্য- প্রসাদ খােলা ড্রয়ারে এমন অসাবধানের মত টাকা রাখতেন!••• জবাব দিল অমলেন্দু: স্যার সূর্যপ্রসাদ তার বাড়ীর উঠল।

আঁধার পথের যাত্রী চাকর বাকর বা কর্মচারীদের মধ্যে কাউকেই এতটুকুও অবিশ্বাস করতেন না। : তাই নাকি! ব্যাংগােক্তি করলেন উজাগর সিং। : । আমার মনে আছে যে রাত্রে তিনি নিহত হন সেই দিনই দুপুরে ব্যাংক থেকে আমি তাঁর আদেশ মত হাজার টাকার দশ টাকার নােট তুলে এনে দিয়েছিলাম ! উজাগর সিং নােটের তাড়াটা গুণতে লাগলেন। গােণা শেষ হলে বললেন : কী বললেন অমলেন্দু বাবু, হাজার টাকার দশ- টাকার নােট? কিন্তু এতে পঞ্চাশ খানা দশ টাকায় নােট কম। ও অসম্ভব। হতেই পারে না! আপনি আবার গুণে দেখুন। তীব্র প্রতিবাদের সুরে অমলেন্দু বলল ! তখন আবার গােণা হলাে এবং দেখা গেল উজাগর সিং- এর গণনা নিভুল। সত্যই পঞ্চাশ খানা নােট কম। : কিন্তু এ যে অসম্ভব!•••আমি নিজের হাতে রাত্রে ডিনার খাবার অল্প আগে তাঁকে নােটগুলি দিয়েছি এবং তিনি গুণে আমার সামনেই ড্রয়ারে রেখে দিলেন ; বলেছিলেন। তারপরদিন সকালে টাকার দরকার আছে। : তারপর তিনি হয়ত কাউকে টাকা দিতেও পারেন । কিরীটি বললে। : না, আমি নিশ্চয় করে বলতে পারি সে রাত্রে কাউকে তিনি টাকা দেননি। কেননা সকালে তার টাকার দরকার ছিল।. তাহলে স্পষ্টই এ থেকে বােঝা যাচ্ছে, হয় কাউকে তিনি নি

আঁধার পথের যাত্রী
সে রাত্রে পরে টাকা দিয়েছিলেন, না হয় সে রাত্রে তাঁর
অজান্তে ঘরে ঢুকে কেউ চুরি করেছে। সে রাত্রে এ ঘরে কে
কে ঢুকেছিল ?
কিরীটি প্রশ্ন করল!
: ডিনার শেষ হবার পর রাত্রে আব্দল একবার সাহেবের
বিছানা ঠিক করতে এসেছিল রােজকার মত!
অমলেন্দু জবাব দিল ।
আব্দলকে তখন সেখানে ডাকান হলাে !
উজাগর সিং আব্দলকে প্রশ্ন করলেন : আব্দুল ! সে
রাত্রে তুমি তােমার সাহেবের বিছানা ঠিক করতে তাঁর ঘরে
ঢুকেছিলে ?
টুকেছিলাম!
: তােমার সাহেবের ড্রয়ারে এক হাজার টাকা ছিল। তার
থেকে পাঁচশ টাকা পাওয়া যাচ্ছে না।
: আল্লার কসম হুজুর—টাকা সম্পর্কে আমি কিছুই
জানি না !
ও চোপরাও উল্লুক, বদমাসচোর! উজাগর সিং
চীৎকার করে উঠলেন।
নিরুপায়ের মতই আব্দল উজাগর সিং-এর পায়ের উপরে
উপুড় হয়ে পড়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল ।
শেষ পর্যন্ত আব্দুলের হাতে হাত কড়া দিয়ে চুরির চার্জে
উজাগৰ সিং তাকে চালান করে দিলেন।
৮৫

আঁধার পথের যাত্রী
আব্দল কঁদতে কাঁদতে চলে গেল।
উজাগর সিং আমাদের বিশেষ করে কিরীটির মুখের দিকে
তাকিয়ে গর্বভরে বললেন : The lofers ! এদের আমি
খুব ভাল করেই চিনি মিঃ রায়! Long eighteen years
experience in police line Fr!
পথ চলতে চলতে উজাগর সিং বললেন : এখন আমার কি
মনে হচ্ছে জানেন মিঃ রায় ?
: কী ? কিরীটি রৌদ্র-ঝলকিত তুষার-মণ্ডিত দূরের পাহাড়
শ্রেণীর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অন্যমনা ভাবে প্রশ্ন করল।
: এই আব্দলও খুন করতে পারে .....রাত্রি সােয়া
এগারটায় সে সেরাত্রে নীচের ঘরে শুতে যায় ; তার আগে
তার movements সম্পর্কে আমরা নির্দিষ্ট কিছুই জানি না।
তাছাড়া দু দুবার তাকে তার মনিবের ঘরের দিকে যেতে দেখা
গেছে।••• আপনার কী মনে হয় মিঃ রায় ?
: ইনেসপেক্টার সাহেব! আমার অনেক কিছুই মনে
হচ্ছে আবার অনেক কিছুই মনে হচ্ছে না। আব্দুল তার
মনিবকে সে রাত্রে খুন করতে হয়ত পারে; কিন্তু really
speaking এক্ষেত্রে খুন করবার মত তার কোন উদ্দেশ্যই খুঁজে
পাচ্ছি না। কী ডাক্তার আপনার কী মনে হয় ? সহসা কিরীটি
আমার দিকে ফিরে তাকাল।
: সত্যি!•••কোন উদ্দেশ্যই খুন করার মত পাওয়া যাচ্ছে
! কিন্তু উদ্দেশ্য ত’ অনেক সময়ে অনেক ব্যাপারেই খুঁজে

আঁধার পথের যাত্রী পাওয়া যায় না মিঃ রায়। এই ভেবে দেখুন না কেন ; সমরের, এমনি করে পালিয়ে বেড়ানটা !....কী উদ্দেশ্য তার এভাবে আত্মগােপন করার মধ্যে থাকতে পারে ? বলুন! ও কেন নেই। আছে বৈকি। এই ধরুন নাবাপের মৃত্যু হলে সে এতগুলাে টাকা পাবে। জবাব দিলেন উজাগর সিং। : হু, এও একটা উদ্দেশ্য বৈকি!•••কিরীটি মৃদুস্বরে বললে ? কিন্তু সেই ব্লু রংয়ের চিঠি সমেত খামটা চুরি করেছে। চিঠির মধ্যে সমরের নাম আপনি শুনেছেন ডাক্তার, এমন হতে পারে সমরই জগৎ জীবনের মৃত্যু ঘটিয়ে পুলকজীবনের কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছিল; যাকে ইংরাজীতে Black ‘mailing বলা চলতে পারে। ৩নং–পিতার মৃত্যুর পর সম্পত্তি লাভ !.... ও আশ্চর্য!••বেচারী সমর ; ক্রমেই তার বিরুদ্ধে প্রমাণ- গুলাে ঘােরাল হয়ে উঠছে!•••আমি বললাম। ও উঠছে নাকি! কিরীটি মৃদুস্বরে বললে ? কিন্তু ঐখানেই ডাক্তার আপনার আর আমার মতভেদ ঘটছে। যদিও তার বিরুদ্ধে তিন তিনটি ভয়ংকর উদ্দেশ্য দেখা যাচ্ছে তথাপি আমি কোনমতেই বিশ্বাস করতে পারছি না শেষ পর্যন্ত যে, সমরই তার পিতার হত্যকারী।••• ; কিরীটির পিছু পিছু তার ঘরে ঢুকতেই দেখি কিরীটি বাইরের ঘরের একখানি সােফায় দু’হাতের মধ্যে মাথা গুজে ৭ আঁধার পথের যাত্রী নিঝুমভাবে বসে আছেন বিমলবাবু! আমাদের পদশব্দে বিমলবাবু চম্‌কে মাথা তুললেন ! : একি বিমলবাবু!•••এই আসছেন বােধ হয়! কিরীটি প্রশ্ন করলে। : হাঁ, মিনিট দশেক হবে মিঃ রায়! আপনারা আমাদের বাড়ী থেকে বের হবার সংগে সংগেই সাইকেলে চেপে এখানে চলে এসেছি মিঃ রায়। কিন্তু আপনি যা বলতে চান—গত রাত্রেই ত’ বলা উচিত ছিল। At least এতটুকু মনের সাহস আপনাদের প্রত্যেকের কাছেই আমি Expect করেছিলাম ! কিন্তু কিরীটির কথা শেষ হতে না হতেই ঝড়ের মত উজাগর সিং এসে ঘরে প্রবেশ করলেন। ঃ মিঃ রায় । : বসুন! বসুন। ইনেসপেকটার সাহেব ; বডড হাঁপিয়ে গেছেন আপনি ; একটু জিরিয়ে নি! : লেকেন বাৎ এহি হায় !•• : যা বলবার আপনার সবই শুনব।.... ঃ মিঃ রায়। সে রাতের সেই অচেনা লােকটীর খোঁজ পাওয়া গেছে! আরে বাবা আমার চোখে ধূলাে দেবে। বাছাধন ঘুঘু দেখেছে ফাদ দেখনি! Eighteeen years experience in the police line. উজাগর সিং গোঁফে তা দিতে লাগলেন। .

-সে রাতের অচেনা আগন্তুক- কিরীটি ধীর মন্থরগতিতে সােফা থেকে উঠে অদূরে রক্ষিত চুরেটের বাক্স থেকে একটা চুরােট নিয়ে অগ্নি সংযােগ করে আবার সােফা অধিকার করল। ব্যাপারটা যেন বিশেষ কিছুই নয়। নিতান্ত স্বাভাবিক দৈনন্দিন ঘটনা মাত্র।••• ও কিন্তু জিজ্ঞাসা করলেন না ত’ ব্যাটাকে কেমন করে পাকড়ালাম ? উজাগর সিং সপ্রশ্নদৃষ্টিতে কিরীটির মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন। এতক্ষণে কিরীটি কথা বললে লােকটিকে কি গ্রেপ্তার করা হয়েছে ? : না, সন্দেহে শুধু আটক করে রাখা হয়েছে। ও লােকটা নিজের সম্পর্কে কী জবানবন্দী দিচ্ছে ? ও কিছুই না! • লােকটা পাক্কা এক নম্বরের ঝানু । ও লােকটা কোথায় আছে ?.... : তক্ষশীলা পুলিশ আউট পােষ্টে!••• চলুন তাহলে একবার মহাপ্রভুর সঙ্গে দেখা করে আসি। চলুন ডাক্তার সেন। বর্তমান ক্ষেত্রে আপনার সাহায্যের বিশেষ দরকার হবে কেননা লােকটাকে অকুস্থানের কাছে একমাত্র আপনিই দেখেছিলেন।

আঁধার পথের যাত্রী
ঃ চলুন! আমি জবাব দিলাম।
তখুনি আমরা পুলিশের গাড়ীতে রওনা হলাম।
বেলা প্রায় সাড়ে তিনটার সময় আমরা তক্ষশীল আউট
পােষ্টের সামনে গিয়ে গাড়ী থেকে নামলাম !
কাটাতার ও রাংচিতার বেড়া দিয়ে ঘেরা ছােট একটা
কমপাউণ্ডের একপ্রান্তে রাণীগঞ্জের টালির কয়েকখানি ঘর।
ঘরে ঢুকতেই থানা ইনচার্জ কৃপাল সিং উঠে দাড়িয়ে
আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন ঃ আইয়ে আইয়ে সাব।
কিরীটির পরিচয় পেয়ে কৃপাল সিং আনন্দে গদ গদ হয়ে
উঠলেন : আপনার মত একজন সুপ্রসিদ্ধ গােয়েন্দার দর্শন
পেয়ে নিজেকে সত্যি ধন্য মনে করছি।
ইনেসপেকটার উজাগর সিং প্রবল বাধা দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে
বলে উঠলেন ঃ কৃপাল সিং! ও সব আলাপ আলােচনা পরে
হবে, আপাততঃ দেখিয়ে দাও লােকটাকে কোথায় আটকে
রেখেছে!•••
: হাঁ! হাঁ! চলুন.চলুন সাহেব।
গারদ ঘরেই লােকটাকে আটকে রাখা হয়েছিল।
গিয়ে গারদ ঘরে প্রবেশ করলাম!
লােকটির বয়স ২২১২৩য়ের বেশী হবে না!
বরং মনে হয় বাইশই হবে।
লম্বা; পাতলা রােগাটে চেহারা।
সকলে
;

আঁধার পথের যাত্রী
•
এক মাথা ভর্তি
চুল তৈলহীন রুক্ষ এলােমেলাে।
মুখের রং তামাটে ; এককালে গায়ের রং বিশেষ পরিষ্কার
ছিল বলেই মনে হয়।
মুখ মলিন ; পাশের খােলা জানালা পথে দৃষ্টি নিবদ্ধ
করে নীরবে বসে আছে।
পরিধানে একটা কালাে রংয়ের সাধারণ গরম সুট!
ও অমিয় বাবু! আপকে সাথ কই সাহেবান থােড়া
বাৎচিত, করনে কে লিয়ে আয়ে হেঁ ! আইয়ে।
চকিতে রুক্ষ্ম দৃষ্টি ফিরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে অমিয় আমাদের
দিকে তাকাল।
: কী ডাঃ সেন! লােকটাকে চেনা চেনা বলে মনে হচ্ছে ?
ইনেসপেকটার আমার মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করে
প্রশ্ন করল।
মৃদুকণ্ঠে
: হু, লম্বা সেই রকমই, আমি বললাম ঃ এবং
দেখতে যতদূর আমার মনে পড়ে সেই রকমইত’ বলে মনে
হচ্ছে। এর চাইতে বিশেষ কিছু বলতে পারছি না।
এতক্ষণে অমিয় সশব্দে যেন বােমার মত ফেটে পড়ল
বলি শুনতে পারি কি মশাই এ সবের অর্থ কী ? কী এমন
আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ পেয়েছেন যে একজন ভদ্রসন্তানকে
এভাবে কুৎসিত উপায়ে আটক করে রেখেছেন, বলুন?
চুপ করে রইলেন কেন ? বলুন ? আপনাদের মতে কী
আমি করেছি বলুন!

আঁধার পথের যাত্রী
গলার স্বর অত্যন্ত রুক্ষ্ম ও কর্কশ।
আমি চমকে উঠলাম : হাঁ! এইত সেই কণ্ঠস্বর ! মিঃ
রায়, এই সেই লোেক! এর সংগেই আমার সে রাত্রে স্যার
সূর্যপ্রসাদের লিংক রােডের বাড়ীর গেটের কাছে দেখা হয়ে
ছিল! হ! এই সেই লােক! ওর কণ্ঠস্বর আমি চিনতে
পেরেছি!
ও গিয়েছিলাম সেখানে তাতে এমন কি অপরাধ হয়েছে ?
তীক্ষ রুক্ষ্ম স্বরে অমিয় জবাব দিল ।
: তাহলে আপনি স্বীকার করছেন যে, আপনি সে রাত্রে
এবটাবাদ লিংক রােডের উপর স্যার সূর্যপ্রসাদের বাড়ীর
কাছে গিয়েছিলেন? এতক্ষণে কিরীটি সর্বপ্রথম কথা
বললে।
: কিছুই আমি স্বীকার করছি না, যতক্ষণ না জানতে
পারছি, কেন আপনারা এ সব অবান্তর প্রশ্ন জিজ্ঞাসা
করছেন!
: আপনি কি গত সপ্তাহের সংবাদ পত্র পড়েন নি অমিয়
বাবু?
: ও বাবাঃ! চমৎকার বুদ্ধিত’ আপনাদের ! উঃ সত্যি
বলতে কী আপনাদের সকলের বুদ্ধির বালাই নিয়ে জলে ডুবে
মরতে ইচ্ছা করছে! এ্যা! শেষ পর্যন্ত আমাকেই তবে
স্থার সূর্যপ্রসাদের খুনী ঠাওরান হয়েছে ! ••
: কিন্তু গত শুক্রবার রাত্রে আপনি স্যার সূর্যপ্রসাদের
২

আঁধার পথের যাত্রী
বাড়ীর গেটের কাছে রাত্রি এগারটার সময় উপস্থিত ছিলেন
এটাত ঠিকই ?
কিরীটি মৃদু দৃঢ়স্বরে বললে !
: চমৎকার! কিন্তু কেমন করে বুঝলেন স্যার?
: এই দেখ, বলতে বলতে চকিতে কিরীটি তার প্যান্টের
পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা জিনিষ বের করে করতল প্রসারিত
করে অমিয়র সামনে ধরল। আমি সবিস্ময়ে দেখলাম ;
জিনিষটা আর কিছুই নয়, স্যার সূর্যপ্রসাদের বাগান ঘরে
পাওয়া কালাে রংয়ের নস্যির কৌটাটা। কিন্তু কৌটাটা
দেখবার সংগে সংগেই অমিয়র মুখের ভাব আশ্চর্য রকম
বদলে গেল ! কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য, চকিতে সে অদ্ভুত এক
ক্রুর হাসিতে মুখখানি কুঁচকিয়ে বললে : চমৎকার! একটা
অতি সাধারণ কালাে রংয়ের নস্যির কোটা প্রমাণ করল যে,
সে রাত্রে সেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম। কিরীটি এবার
অদ্ভুত এক প্রকার হাসিতে মুখখানি সংকুচিত করে বললে ?
অমিয় বাবু! কিরীটি রায়ের নাম বােধ হয় আপনি শােনেন
নি! নচেৎ বুঝতে পারতেন আপনার চাইতে সে বােকা ত,
নয়ই সহস্র গুণে বেশী চালাক !•••কিন্তু এই সামান্য বয়েস,
'কোকেন অভ্যাস কতদিন থেকে করেছেন?
ও কৈাকেন !....বিস্ময় ও আতংক ফুটে উঠল অমিয়র
সমগ্র মুখে।
ছ, কোকেন!...কিরীটির কণ্ঠস্বর গম্ভীর হয়ে এল।

আঁধার পথের যাত্রী
আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে কোকেনের নাম যেন জীবনেও
শােনেন নি।
শুনুন অমিয় বাবু! কোকেন অভ্যস্ত যারা,
তাদের লক্ষণগুলাে আমার অজানা নেই। আপনার দাঁত,
ঠোঁট ও চোখের তারাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ, তাছাড়া নস্যির
সংগে কোকেন মিশান থাকলেও কেমিকেল এ্যানালিসিসে
সেটা আমার কাছে ধরা পড়েছে!
ও স্বীকার করছি আমি সে রাত্রে সেখানে গিয়েছিলাম,
কিন্তু সােয়া এগারটার সময়ই সেখান থেকে আমি চলে আসি।
সেখানকার লােকেরাই সাক্ষী দেবে।
: বেশ! একোয়ারী করে যদি দেখা যায় আপনার কথাই
সত্য, তবে আপনি নির্দোষ তা প্রমাণিত হবে ; ততক্ষণ
পর্যন্ত আপনাকে আটকা থাকতে হবে।
?
কিরীটি
: বেশ!•••
ও কিন্তু সে রাত্রে ওখানে কেন গিয়েছিলেন
আবার প্রশ্ন করল।
ও দরকার ছিল আমার।
: কী দরকার?
ঃ একজনের সংগে দেখা করতে গিয়েছিলাম।
কার সংগে ?
ও তার জবাব দিতে আমি মােটেই বাধ্য নই, আমার
ব্যক্তিগত ব্যাপার! রাত্রি, সােয়া এগারটায় যদি আমি
১৪

আঁধার পথের যাত্রী
সেখান থেকে চলে এসে থাকি তবেই ত’ আমার নির্দোষিত
প্রমাণ হয়ে যায়, তবে এ সব প্রশ্ন আসে কোথা থেকে ?
ফিরতি পথে ইনেপেকটার প্রশ্ন করলেন ? লােকটার
কথা বিশ্বাস করেন মিঃ রায় ?
মৃদু স্বরে কিরীটি জবাব দিল : হু, করি।•••
আমি নির্বাক বিস্ময়ে মুখের দিকে শুধু তাকিয়ে রইলাম ।
সমগ্র পথ আর কেউই একটি কথাও বললে না। সকলেই
যেন আপন আপন চিন্তায় মগ্ন !•••
কাশ্মীর রােড ধরে আমাদের মােটর ছুটে চলেছে।
পাহাড়ের গা কেটে সর্পিল পথ কখনো একে বেঁকে
কখনাে পাহাড়ের শীর্ষ দেশে কখনাে পাহাড়ের পাদদেশে
নেমে গেছে।
নাতি প্রশস্ত কংক্রিটের পথ।
এক পাশে তার খাড়া উচু পাহাড় উর্ধে বহু উর্দ্ধে যেন
অসীম শূন্যতায় হাত বাড়িয়েছে, আর এক পাশে হাজার
হাজার ফিট নিম্নে অসমতল খাদ!
একবার যদি কোন ক্রমে অসাবধানতা বশতঃ গাড়ী
নীচে গিয়ে পড়ে তবে মুহুতে গুড়াে গুড়াে হয়ে যাবে।
মাঝে মাঝে পাহাড়ী গুল্ম লতা ও নানা ধরণের পাহাড়ী
ফুলের বর্ণ বৈচিত্র্য।

আঁধার পথের যাত্রী
শ্বেত, রক্তলাল, আকাশ নীল নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক
সৌন্দর্য !
নয়নে নেশা জাগায়, মনে মাদকতা আনে।
কোথাও পাহাড়ী ঝরণা বার বার করে ঝরছে।
কোথাও শীর্ণ। ঝর্ণাধারা উপলখণ্ডের উপর দিয়ে অবাধ
স্বচ্ছন্দ গতিতে দুষ্ট মেয়ের মত নেচে নেচে চলেছে আপন
খেয়াল খুসিতে ।
দূরে তুষার ঢাকা ধবল মৌলী গিরিশিখরের পরে অন্তগামী
সূর্যের রক্তাভা জ্বল জ্বল করছে। চোখে যেন মায়া অঞ্জন
বুলিয়ে দেয়।
মাঝে মাঝে মালবাহী লরী ছুটে চলেছে।
সহসা নীরবতা ভংগ করল ইনেসপেকটার উজাগর
সিংয়ের কণ্ঠস্বর : আশ্চর্য ! লােকটা কিছুতেই স্বীকার
করলে না কি জন্য এ্যাবােটাবাদ গিয়েছিল।
কিরীটি দুচোখ বুজে গাড়ীর ব্যাক সীটে হেলান দিয়ে
নিঝুম নির্লিপ্ত ভাবে বসেছিল, সহসা মৃদু স্বরে বললে ? আমি
জানি কেন সে শুক্রবার রাত্রে সেখানে গিয়েছিল।
আমি সবিস্ময়ে কিরীটির মুখের দিকে তাকালাম । আপনি
জানেন ?
ও হ জানি!....
: কিন্তু....
লােকটা গিয়েছিল কেন জানেন?

-চৌদ্দ- -টাকা চুরি করেছিল কে পরদিন সকালে । কিরীটির বাড়ীর সামনের বাগানে বসে চা পান করছি এমন সময় মােটর বাইকের ফট ফট শব্দ করতে করতে উজাগর সিং এসে হাজির হলেন । নমস্তে ! নমস্তে, বৈঠে!.... কিরীটি একটা পার্শ্বে রক্ষিত বেতের চেয়ার উজাগর সিংকে দেখিয়ে দিল। : তারপর ইনেসপেকটার সাহেব, কী সংবাদ ?..এত 'সকালে ! : না! বাবু সাহেব, অমিয় গুপ্ত লােকটা সম্পূর্ণ নির্দোষ । তাই নাকি! কিরীটি হাসতে হাসতে বললে। : হাঁ, তাছাড়া আর কী বলি বলুন ? খোঁজ নিয়ে জানা গেল শুক্রবার রাত্রে সত্যি সত্যিই ভদ্রলােক এ্যাবট্রক্লাবে রাত্রি সােয়া এগারটা থেকে রাত্রি বারটা পর্যন্ত ছিল। এ্যাবট্‌ক্লাবে একটা জুয়াের আচ্ছা আছে, জুয়াে খেলছিল। অতএব খুনের ব্যাপারে কোন মতেই লােকটাকে জড়ান বায়া। কী বলেন ?••• উজাগর সিং সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে কিরীটির মুখের দিকে তাকাল। ও লােকটাকে তাহলে মুক্তি দিচ্ছেন বলুন? অগত্যা!....এর পরও কাউকে ধরে রাখা কি উচিত? ১৭

আঁধার পথের যাত্রী
: কিন্তু আমি যদি আপনি হতাম ইনেসপেকটার সাহেব
তবে লােকটাকে কিন্তু এখুনি ছেড়ে দিতাম না।
কিরীটি মৃদুস্বরে বলতে বলতে একটা সিগারে অগ্নি সংযোেগ
: কী বলতে চান আপনি মিঃ রায় ?
ও বলতে চাই আমি হলে অমিয় গুপ্তকে মুক্তি দিতাম
ও খুনের ব্যাপারে নিশ্চয়ই লােকটা জড়িত নয়, এটাত
আপনি বিশ্বাস করেন মিঃ রায় ?
: বােধ হয় ত’ লােকটা খুনের ব্যাপারে জড়িত নয়, তাই
বলে স্থির নিশ্চিত করেও বলা যায় না যে সে খুন করেনি।
: কিন্তু যতদূর জানা গেছে স্যার সূর্যপ্রসাদ রাত্রি সােয়া
এগারটা থেকে সাড়ে এগারটার মধ্যে খুন হয়েছেন, কিন্তু ঐ
সময় লােকটা এ্যাবটক্লাবে ছিল, লােকটাত আর উড়ে এসে
সকলের অলক্ষ্যে খুন করে যেতে পারে না!
ইনেসপেকটার সাহেব! আমি কালাও নই, গর্দভও
নই। আপনার যুক্তি আমি শুনেছি।
আমি শুনেছি। কিন্তু ব্যাপারটা
আগাগােড়াই আপনি ভুল পথে বা ভুল দৃষ্টিতে বিচার করছেন।
ইনেসপেকটার বােকার মতই ফ্যাল ফ্যাল করে কিরীটির ভাব
লেশহীন মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর আবার ধীরে
ধীরে বললেন : কুন মিঃ রায়। আমরা জানি স্যার সূর্যপ্রসাদ
যে রাত্রে সােয়া এগারটা পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। এ বিশ্বাস

* আঁধার পথের যাত্রী
করেন, না করেন না ?•••বলুন! কিরীটি এক গাল ধোয়া ছেড়ে
মৃদু হেসে মাথাটা একটু দোলাল তারপর মৃদু কঠিন স্বরে
বললে : ইনেপেকটার! যে ঘটনা প্রমাণিত হয়নি, এমন কোন
ঘটনাই আমি বিশ্বাস করি না!
ও ফু! একথা ত’ বিমলবাবুর কথা থেকেই সম্পূর্ণভাবে
প্রমাণিত হয়েছে; তিনি নিজেই ত’ রাত্রি সােয়া এগারটার
সময় তার জেঠার সংগে দেখা করে এসেছেন।
ও কিন্তু কথাটা কী জানেন ইনেসপেকটার, অল্প বয়েসের
একজন যুবকের সব কথা আমি বিশ্বাস করিনা! বিশেষ করে
বিমলবাবুর মত লােকের কথা!•••
৫ ফুঃ ! কিন্তু আব্দলও সাক্ষ্য দিয়েছে ঐ সময় সে
বিমলবাবুকে তার জেঠার প্রাইভেট, ঘর থেকে বের হতে
দেখেছে!•••
বজ্র গম্ভীর স্বরে কিরীটি বললে : না! সে দেখেনি!•••
আমরা দু'জনই ভয়ংকর রকম চমকে কিরীটির দিকে
তাকালাম।
আমি মৃদুস্বরে প্রশ্ন করলামদেখেনি?
: না।....শুনুন ডাঃ সেন! আসলে আব্দল বিমলবাবুকে
স্যার সুর্যপ্রসাদের প্রাইভেট, ঘর থেকে বের হতে দেখেনি।
: তবে ?
ও দেখেছে দরজার সামনে। ঘর থেকে ঠিক বের হতে
দেখেনি।

আঁধার পথের যাত্রী
ও কিন্তু ঘর থেকে না বেরুলে দরজার সামনে দাড়িয়ে
থাকতেই বা দেখা যাবে কেন ? প্রশ্ন করলাম আমি। তবে
সে কোথায় ছিল?
ও হয়ত নীচে নামবার সিড়ির উপরে ।
ও সিড়ির উপরে।
: হাঁ ! আমার ধারণা তাই!...
ও কিন্তু সে সিড়ির সামনেই ত’ স্যার সূর্যপ্রসাদের শয়ন
কক্ষের দরজা।
ও তাই বটে।
: কিন্তু মিথ্যা কথা বলবারই বা তার এ ক্ষেত্রে কী প্রয়াে-
জন থাকতে পারে মিঃ রায় ?
ও সেটাই ত’ ‘প্রশ্ন’ এখানে আমাদের ইনেসপেকটার
সাহেব।
: তার মানে আপনি বলতে চান, বিমলবাবুই তার জেঠার
শয়ন ঘরের ড্রয়ার থেকে ৫০০ টাকা চুরি করেছেন।
: আমি কিছুই বলতে চাই না তবে বিমলবাবু সম্পর্কে
গােপনে খোঁজ নিয়ে জেনেছি। ইদানিং ভদ্রলােকের আর্থিক
অসচ্ছলতা ভয়ংকর বিশ্র ভাবে তাকে চার পাশ থেকে ঘিরে
ধরে ছিল।
জেঠার কাছ থেকে হাত খরচ বাবদ প্রতি মাসে যা সে পেত
তাতে তার মােটেই কুলাত না ; অত্যন্ত বিলাসী ও দু’চার জন
বন্ধু বান্ধবের কাছে তার ইদানিং বহুৎ ধার হয়ে গিয়েছিল।

আঁধার পথের যাত্রী
তাগাদার পর তাগাদায় বেচারী এক প্রকার অস্থির হয়েই
উঠেছিল ! তার উপর এক বেণের কাছে হ্যাণ্ডনােটে কয়েক
সপ্তাহ আগে সে দুইশত টাকা ধার করে সাত দিনের মেয়াদি....
এখন ভেবে দেখুন, টাকার তাগাদায় অস্থির হয়েই বিমলবাবু
অন্যের অজান্তে জেঠার ড্রয়ার থেকে ৫০০ টাকা চুরি করে ;
টাকা চুরি করে ঘর থেকে বের হয়ে যেমন সে সিড়ির কাছে
এসেছে অমনি সিড়ির নীচে আব্দলের পায়ের শব্দ শুনে চমকে
ওঠে এবং মনে ভাবে যদি আব্দল তাকে শয়ন ঘরের দরজার
কাছে দেখে তবে তাকে সন্দেহ করতে পারে তাই সে তাড়াতাড়ি
সূর্যপ্রসাদের প্রাইভেট রুমের দরজার হাতলটা ধরে গিয়ে
দাড়ায় যাতে আব্দ,ল সে অবস্থায় তাকে দেখলেও মনে করতে
পারে সে যেন এইমাত্র তার জেঠার সংগে প্রাইভেট, রুমে ঢুকে
দেখা করে বাইরে এসেছে।...এখন আব্দলের সংগে দেখা
হতেই সে তাড়াতাড়ি নিজের Position বাঁচাবার জন্য ঐ কথা
বানিয়ে বলে বরাবর নিজের ঘরে চলে যায়।
: বেশ, তারপর ?
ও তারপর সে যখন বুঝতে পারলে যে তার কথার সত্যতার
পরে এই কেসের অনেকখানি নির্ভর করছে তখন আর
উপায় নেই। নিজেকে বাঁচাবার জন্য একবার যে মিথ্যা
কথা বলেছে সেটাই পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য হয় কেননা
তখন সে জানতে পেরেছে পুলিশের লােক টাকা চুরির কথা
জেনেছে।
১০১

আঁধার পথের যাত্রী : আপনার একথা আমি বিশ্বাস করি না মিঃ রায়। একেবারে Simply অসম্ভব !....ইনেসপেকটার বললেন। ও একথা কী আগে থেকেই আপনি ভেবেছিলেন মিঃ রায় ? আমি প্রশ্ন করলাম। : এই সম্ভাবনা প্রথম থেকেই আমার মনে উদয় হয়েছিল ডাঃ সেন। আমি বরাবরই জানতাম বিমলবাবু আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছেন! সেইজন্য পরশু বিকালের দিকে আচমকা বিমলবাবুকে নিয়ে ছােট একটা Experiment করি। : Experiment করেন? আমি জিজ্ঞাসা করলাম। : তবে শুনুন, কী করে বিমলবাবুর প্রতি সন্দেহ আমার বদ্ধমূল হয়। পনের- -বিমলবাবুর গােপন কথা আমরা দুজনে কিরীটির কথা শুনতে লাগলাম। ও শুনুন ইনেসপেকটার! আমি পরশু দুপুরে বিমলবাবুর সংগে দেখা করি এবং তাকে ও আব্দুলকে অনুরােধ করি গত শুক্রবার রাত্রে ঠিক যে ভাবে দুজনার সংগে কথাবার্তা হয়েছিল সেই ব্যাপারটা আগাগােড়া হুবুহু repeat করতে। Repeat করবার সময় বিমলবাবু একটা কথা বলেন, আব্দল! জেঠা বােধ

আঁধার পথের যাত্রী
হয় এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি তার সংগে কথা বলে
আসছি, তিনি বলে দিয়েছেন ‘আজ রাত্রে যেন আর তাকে বিরক্ত
করা হয়। আব্দল জিজ্ঞাসা করে, আপনি এতক্ষণ সাহেবের
ঘরে ছিলেন নাকি? তাতে বিমলবাবু জবাব দিলেন : হ
প্রায় মিনিট পনের। অথচ বিমলবাবুর movement সম্পর্কে
ভাল করে অনুসন্ধান নিতে গিয়ে অমলেন্দুবাবুর মুখে শুনেছিলাম
এগারটা বেজে পনের মিনিটের সময় বিমলবাবু বাগান থেকে
বাড়ীতে ঢুকছিলেন, অমলেন্দুবাবু তখন সিড়ির কাছেই ছিলেন।
চাকরদের ঘরে নীচের সিড়ির কাছে দু’জনার দেখা! সিড়ির
সামনেই বড় একটা ওয়ালক্লক টাংগানাে আছে তাতে অমলেন্দু
বাবু তখন স্পষ্ট দেখেছিলেন এগারটা বেজে পাঁচ মিনিট ঠিক।
Unguarded momentয়ে বিমলবাবুর মুখ দিয়ে সত্য কথা
বের হয়ে গেছে। অথচ তিনি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেন নি
যে, আমার কাছে সব দিনের আলাের মতই পরিষ্কার হয়ে গেছে
সেই মুহূর্তে তার মুখের সামান্য কয়েকটা কথায়।
ও কিন্তু এই কি সব প্রমাণ ? ইনেপেকটার প্রশ্ন
করলেন!
: চলুন বিমলবাবুর ওখানে যাওয়া যাক! তার জবানীতেই
সব কিছু শােনা যাবে ।
: বেশ চলুন
: চলুন ডাঃ সেন!

আঁধার পথের যাত্রী
বিমলবাবুর ওখানে গিয়ে যখন আমরা হাজির হলাম
বিমলবাবু তখন বাইরের ঘরে একটা সােফায় বসে সেদিনকার
দৈনিক কাগজটা পড়ছেন। আমাদের ঘরে ঢুকতে দেখে সাদর
অভ্যর্থনা জানালেন।
: আসুন! আনুন !
: নমস্কার বিমলবাবু! ইনেসপেকটার উজাগর সিং
আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চান।
প্রশ্ন? বেশত ।....বলুন, কী শুনতে চান ?
ঃ দেখুন আপনি আপনার জবানবন্দীতে বলেছিলেন যে,
রাত্রি এগারটা বেজে পনের মিনিটের সময় আপনি আপনার
জেঠার সংগে তার প্রাইভেট রুমে কথাবার্তা বলে বেরুচ্ছিলেন,
ঠিক সেই সময় আব্দলের সংগে আপনার দেখা।....
ও বলেছিলাম...কেন ? ..স্পষ্টই লক্ষ্য করলাম বিমল
বাবুর কণ্ঠস্বর বেশ একটু বিচলিত।
ঃ মিঃ রায় আপনার সে কথা বিশ্বাস করতে চাইছেন না।
তিনি বলছেন সে রাত্রে আপনি আদপেই স্যার সূর্যপ্রসাদের
প্রাইভেট রুমে ঢুকে তাঁর সংগে কথা বলেন নি।
: তবে? আমি কোথায় গিয়েছিলাম ?
: আপনি গিয়েছিলেন তাঁর শয়ন কক্ষে ! শয়ন কক্ষ ও
প্রাইভেট রুমের মধ্যবর্তী দুয়ার বন্ধই ছিল!....বলুন একথা ঠিক
কিনা?...কিরীটি বজ্র কঠিন স্বরে প্রশ্ন করল।
এবারে বিমলবাবু সত্য সত্যই যেন একেবারে ভেংগে
১০৪

আঁধার পথের যাত্রী
পড়লেন!....এবং বিষন্ন স্বরে বলে উঠলেন ঃ হাঁ। কিরীটি
বাবুর কথাই ঠি!....
আমি চোর! আমি জেঠার ড্রয়ার থেকে ৫০০ টাকা
চুরি করেছি ইনেসপেকটার! উঃ আজ আমি নিশ্চিন্ত !....
শয়নে স্বপনে নিদ্রায় জাগরণে আমার অপরাধের চিন্তা যেন
আমায় পাগলা কুকুরের মতই তাড়া করে ফিরছিল। বিমল
বাবু দু’হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন, তার দশ আংগুলের ফাঁক দিয়ে
ব্যথার অনুতাপ ঝরে পড়তে লাগল। বিমলবাবু অক্লিষ্ট
কণ্ঠে বলতে লাগলেন। দিনের পর দিন পাওনাদারের তাগাদায়
আমি অস্থির হয়ে উঠেছিলাম।
ইতিমধ্যে গােলমাল শুনে রাধিকাপ্রসাদও এক সময়
সেখানে এসে দাড়িয়ে নিজ পুত্রের কথা শুনছিলেন । সহসা
বিমলবাবু পিতার মুখের দিকে তাকিয়ে কান্নাঝরা সুরে বলে
উঠলেন : অমন করে আর মুখের দিকে চেয়ে দেখছেন কী
বাবা ? বিশ্বাস করতে পারছেন না বুঝি !•••আমি চোর হতে
পারি ? কিন্তু এখন আমি মুক্ত! এখন আমি নিশ্চিন্ত ! এখন
আমি আর মিথ্যাবাদী নই!...আর হয়ত আপনি আমার মুখ
দেখতে চাইবেন না; আমিই নিজে এখন নিজেকে ঘৃণা করি ।
শত ধিক্কার দিই!....সে রাত্রে ডিনার টেবিল থেকে বিদায়
নেওয়ার পর একবারও আমার জেঠামণির সংগে দেখা হয়নি।
এখন ডাঃ সেন! ইনেসপেকটার মিঃ রায়....আমার জেলে
দিতে পারেন, যা খুসী তাই করতে পারেন!....
১০৫

আঁধার পথের যাত্রী
: বিমল, বাবা !...অরুদ্ধ স্বরে রাধিকাপ্রসাদ বাবু
ডাকলেন।
ও বাবা ! অভাগা বাবা আমার ! প্রাণভরা ভালবাসাই
দিয়েছিলে, ছেলেকে তােমার কিন্তু উপযুক্ত শিক্ষা দাও নি !....
যাতে করে দিনের পর দিন কেবল বিলাসী অসংযমীই হয়ে
উঠেছি!..ইউনিভারসিটির ডিগ্রীটাই এজীবনের সব চাইতে বড়
কথা নয় !....তার সংগে সংগে চাই মানুষের মত মানুষ হবার
আসল শিক্ষা ও প্রেরণা !...রাধিকাপ্রসাদের দু' চোখের কোল
বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।
ও কঁাদ বাবা কঁদ....আমিও সারা জীবন ধরে কঁাদব।
আমি ভুলতে পারব না যে আমি চোর!...পরস্পাপহারী!....
ঘৃণিত মনুষ্য নামের অযােগ্য!....
ঝড়ের মতই বিমলবাবু ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলেন।
মুহমান রাধিকাপ্রসাদ সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন শুধু !....
সহসা উজাগর সিং বললেন : সব গােলমাল হয়ে যাচ্ছে
মিঃ রায়! সব গােলমাল হয়ে যাচ্ছে।
মিঃ রায় মৃদু হেসে বললেন : ভুল পথে চললে গােলমালই
হয় ইনেসপেকটার।
এখন বুঝতে পারছেন বােধ হয় স্যার সূর্যপ্রসাদ সােয়া
এগারটার পর নিহত হন নি, হয়েছেন ডাঃ সেন তাঁর ঘর
থেকে চলে আসবার পর রাত্রি সাড়ে দশটা থেকে রাত্রি পৌনে
এগারটার মধ্যে ?....

আঁধার পথের যাত্রী
: তাহলে ?....
ঃ তাহলে এখন ভেবে দেখুন, আর একবার ভাল করে
অমিয় গুপ্তর কথা।....
সে যে কেন সূর্যপ্রসাদের বাড়ীতে এসেছিল তার কোন
জবাবই দেয়নি। কী করতে সে এসেছিল সেখানে ?....কেন
এসেছিল ?....আমি বললাম।
ও কিন্তু আমি বলতে পারি ইনেসপেকটার কেন সে রাত্রে
অমিয় গুপ্ত এখানে এসেছিল। সে স্যার সূর্যপ্রসাদের
মাথার একটি চুলও স্পর্শ করেনি ; সে স্যার সূর্যপ্রসাদের
প্রাইভেট রুমের ধারে কাছেও যায় নি।....সে খুন করেনি!....
আমি কিরীটি রায় এই কথা বলছি।....তারপর সহসা
বিদ্যুৎ গতিতে রাধিকাপ্রসাদের মুখের দিকে চেয়ে বললে ?
রাধিকা বাবু! আপনার পুত্র সুবল বাবু কোথায় ?
রাধিকাপ্রসাদ চমকে মুখ তুললেন ঃ সুবল !....
: হাঁ, সুবল !....বলুন বিমল, সুবল ও অমিয় এক মার
পেটের ছেলে কিনা? বলুন! আমার কাছে আর গােপন
করে কোন লাভ নেই!....
: কিরীটিবাবু! কিরীটিবাবু! থর থর করে রাধিকাপ্রসাদের
সারা দেহ কঁপতে লাগল। আমাকে বিশ্বাস করুন মিঃ রায়।
কিরীটি ধীর পদে এগিয়ে এসে উপবিষ্ট রাধিকাপ্রসাদের
পিঠে একখানি হাত রেখে সস্নেহে বললে : হাঁ বলুন!....
নিশ্চয়ই আপনার কথা আমি বিশ্বাস করব!....

আঁধার পথের যাত্রী : কিন্তু আগে আপনি বলুন অমিয় সত্যই নির্দোষী আপনি বিশ্বাস করেন কিনা? রাধিকাপ্রসাদ জিজ্ঞাসা করলেন। : হাঁ করি! সে কথাত’ আগেই বলেছি।•••কিন্তু তাহলেও যতক্ষণ না জানা যাচ্ছে সে রাত্রে কেন সে লিংক- রােডের বাড়ীতে এসেছিল ততক্ষণ তাকে বাঁচান অসম্ভব!••• কিরীটি জবাব দিল । ও সে এসেছিল আমার সংগেই সে রাত্রে দেখা করতে।••• এবং আমি ও সুবল বাগানের ঘরে তার সংগে সে রাত্রে দেখা করি।••• : হু! তা আমি জানি।••• : আপনি কেমন করে তা জানলেন মিঃ রায় ?....রাধিকা বাবু অধীর স্বরে প্রশ্ন করলেন। রাধিকাবাবু !•••সমগ্র রহস্যকে জানা কিরীটি রায়ের কাজ।•••আপনি লাঠি ব্যবহার করেন চলবার সময়....ঘরের মেঝেতে ধূলােয় লাঠির গােল দাগ দেখেছি। : অমিয়র যখন মাত্র বার বছর বয়স তখন খুলনায় একদল বিদেশী সার্কাস পার্টি আসে—অমিয় ঐ বয়সেই খেলা ধূলা দৌড় ঝাঁপে ওস্তাদ হয়ে উঠেছিল....সার্কাস পার্টির লােকেরা ওকে ভুলিয়ে সংগে নিয়ে পালায়। সার্কাস পার্টির কুসংগে মিশে মিশে সে ক্রমে একেবারে গােল্পায় যায়। অবশেষে একদিন সার্কাস পার্টির ম্যানেজার-এর ক্যাস ভেংগে Jobov

আঁধার পথের যাত্রী
কুড়ি হাজার টাকা নিয়ে উধাও হয়!...তার নামে পুলিশে
ওয়ারেন্ট বের করে...অমিয় পালিয়ে পালিয়ে গা ঢাকা
দিয়ে বেড়াতে থাকে। অমিয়র আসল নাম অমিয় নয়
কমল’!....ওটা ওর নকল নাম। দীর্ঘ পাঁচ বছর ও এমনি
করে ছদ্ম নামে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
দাদা খুন
হবার দিন দশেক আগে ঝেলাম্ থেকে
এক চিঠি
পাই—ওর টাকার অত্যন্ত অভাব !....ও কিছু টাকা চায়
আমার কাছে। আমি দাদার কাছ থেকে কিছু টাকা
চেয়ে নিয়ে ওকে আসতে বলি এবং সেই টাকা ও আমার
সােনার বােম ও ঘড়ির চেন সব একত্রে দাদার মিউজিয়াম
ঘরে চন্দন কাঠের বাক্সর মধ্যে রেখে দিই।....ও দেখা করতে
আসে এবং আমার ও কমলের সংগে বাগান ঘুরে দেখা হয়।....
: হু, তখন কটা রাত্রি ? ঘরে ফিরে ছিলেন
আপনি কোন্ পথে ?
ও রাত্রি সাড়ে আটটা।....ঘরে ফিরি আমি মিউজিয়াম
ঘরের জানালা দিয়ে, সুবল ওই জানালা দিয়েই আমার আগে
ফিরে এসেছিল পাছে অন্য পথ দিয়ে এলে আমাদের কেউ
দেখে এই জন্য ।
: তাহলে আপনিই চন্দন কাঠের বাক্সটা খুলে
খুলে রেখে
এবং
ছিলেন !"
আচ্ছা যখন ফিরে আসেন ছােরাটা কী তখন তার মধ্যে
ছিল রাধিকাপ্রসাদবাবু ?....

আঁধার পথের যাত্রী
: না ছিল না।....কিন্তু আমার ছেলে !....বিমল ও কমল
এদের কী হবে মিঃ রায় ?....
: সে কথার উত্তর ঠিক ইনেপেকটার সাহেবই দিতে
পারবেন রাধিকাবাবু!....
ঃ মিঃ রায় বললেন।
০ ০
০০
০০
তত
০ ০
-কে খুনী ??
রাস্তায় নেমে আমি কিরীটিকে বললাম ঃ মিঃ রায়। এই
কেসের যাবতীয় ঘটনা ও অনুসন্ধানে যতটা আমরা এ পর্যন্ত ।
জানতে পেরেছি সব কিছুই আমার বিচার ও যুক্তির সংগে
বিশ্লেষণ করে একটা ডাইরী মত লিখেছি, চলুন আপনাকে
দেবাে আজ। পড়ে দেখবেন।•••
: নিশ্চয়ই !...দেখা যাক কী যুক্তিতে আপনি বিচার
করেছেন।
কিরীটি হাসতে হাসতে বললে !
সেই রাত্রে আবার কিরীটির আহ্বানে আমরা স্বার
সূর্যপ্রসাদের বাড়ীতে একত্রিত হলাম।
১১০

আঁধার পথের যাত্রী
আমি, রাধিকাপ্রসাদ, বিমল, সুবল, মেজর কৃষ্ণস্বামী,
অমলেন্দু, বলদেব বাবু সকলেই আমরা উপস্থিত।
একমাত্র কিরীটি এখনও এসে পৌছায় নি। সহসা দরজা
খােলার শব্দ হােললা, নিঃশব্দে ঘরের পর্দা সরিয়ে কিরীটি
এসে ঘরে প্রবেশ করল : Good Evening Gentlemen,
আজ এখানে যাঁরা
উপস্থিত আছেন প্রত্যেকেই
স্যার সূর্যপ্রসাদের হত্যাকারী রূপে সন্দেহের পাত্র! কেননা
সে রাত্রে প্রত্যেকেই আপনারা খুনের সময় এ বাড়ীতে উপস্থিত
ছিলেন! আপনাদের মধ্যে থেকেই আজ আমি খুনীকে
বের করে দেবাে।•••
ঘরের মধ্যে মৃত্যুর
মতই শীলতা নীরবতা!•••
কারও মুখে টু শব্দটি পর্যন্ত নেই ! বােবা ভাষাহীন।
ও কিন্তু মিঃ রায়! সত্যই কী আপনার বিশ্বাস আমরা
যারা আজ এখন এখানে এই ঘরে উপস্থিত আছি তাদের
মধ্যেই একজন স্যার সূর্যপ্রসাদের হত্যাকারী ?...আমিই
সর্বপ্রথম প্রশ্ন করলাম।
: কিরীটি রায়ের কথায় এখনও আপনি সম্পূর্ণ বিশ্বাস
স্থাপন করতে পারেন না ডাঃ সেন!
: কিন্তু একজন সন্দেহজনক এখনও এখানে অনুপস্থিত
মিঃ রায়। আমি বললাম।
ঃ কে, ডাঃ সেন ?
ও স্যার সূর্যপ্রসাদের পুত্র সমর প্রসাদ সেন।
১১

আঁধার পথের যাত্রী
ও আমি জানি সে কোথায়। কিরীটি গম্ভীর স্বরে বললে।
সকলেই আমরা কিরীটির কণ্ঠস্বরে চমকে তার মুখের
দিকে তাকালাম।
ও সত্যি আপনি জানেন নাকি মিঃ য়ায়! কোথায় সমর
আছে ?
আমি বােকার মত মৃদুস্বরে প্রশ্ন করলাম।
ও জানি!....
ও কোথায় ?
: ঐ যে আপনাদের সকলেরই সামনে, ঐ দেখুন দরজার
গােড়ায় দাঁড়িয়ে আছে•••
আমরা সবিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলাম দরজার গােড়ায়
সঁড়িয়ে সমপ্রসাদ !
ও এখন তাহলে সকলেই উপস্থিত, কেমন ডাঃ সেন ?....
এস সমর ঐ সােফাটায় বােস।•••
ধীর কুষ্ঠিত পদে এগিয়ে সমর কিরীটির নির্দিষ্ট চেয়ারখানি
অধিকার করে বসল।
: এবারে আপনারা সবাই শুনুন !....কিরীটি বতে
লাগল। গােড়া থেকেই সব খুলে বলি।•••গত শনিবার সকালে
বিমলবাবুর আহ্বানে যখন স্যার সূর্যপ্রসাদের হত্যার তদন্তের
ভার নিয়ে সর্বপ্রথম এবাড়ীতে এসে প্রবেশ করি—বাগানের
হােট ঘর দুটো আমার দৃষ্টি বিশেষ ভাবে আকর্ষণ করে !....
এবং আমি সেই দুটো ঘরের অব্যবহার্য ঘরটা বেশ ভাল করেই
'

আঁধার পথের যাত্রী;
পরীক্ষা করি। ঘরটা পরীক্ষা করতে গিয়ে দুটো জিনিষ
আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে—১নং একটা ছােট কালাে রংয়ের
নস্তির ডিবা, অন্য হচ্ছে ঘরের ধূলায় গােল গােল লাঠির
ছাপ ও জুতাের ছাপ !•••এ থেকেই আমি অনুমান করি
নিশ্চয়ই খুব recently সেই ঘরের মধ্যে কেউ গিয়েছিল।
কিন্তু কবে কারা গিয়েছিল, বুঝলাম তারপর। ইনেসপেকটার
উজাগর সিং যখন আমাকে এ বাড়ীর প্রত্যেকটি লােকের সে
রাত্রের গতিবিধি সম্পর্কে একটা ফিরিস্তি দিলেন তখন বুঝলাম
ঐ সময়ের মধ্যে বিমল বাবু ও সুবল বাবু বাগান ঘরে ।
যেতে পারেন। পরে তদন্তে প্রকাশ পায় সুবল বাবু ও
রাধিকাপ্রসাদ বাবু কোন বিশেষ কারণে ঐ রাত্রে বাগান ঘরে
গিয়েছিলেন; কিন্তু রাত্রি এগারটার সময় মেজর কৃষ্ণস্বামী
একজনকে বাগান ঘরের দিক থেকে আসতে দেখেন....সেই
একজন কে ?•••
অমলেন্দু বাবুর সাক্ষীতে জানতে পারলাম সে আর কেউ নয়
আমাদের বিমল বাবু এবং বিমল বাবু গিয়েছিলেন বাগান
ঘরে সমর বাবুর সংগে দেখা করতে।...সমর বাবু ও বিমলবাবু
আশা করি সে কথা অস্বীকার করবেন না।
হাঁ, আমাদের দেখা হয়েছিল রাত্রি তখন এগারটা বাজতে
কয়েক মিনিট মাত্র। দু’জনে এক সংগেই বললে। কিরীটির
গলা আবার শােনা গেল : তাহলে বােঝা যাচ্ছে সমর বা বিমল
বাবুর মধ্যে কেউই সূর্যপ্রসাদের হত্যাকারী নয়। কিন্তু কথা
;
১১৩

আঁধার পথের যাত্রী
*
হচ্ছে কে তবে রাত্রি সােয়া এগারটার সময় সূর্যপ্রসাদের ঘরে
ছিল। এইবারে আসল পয়েন্টে আসব। একটা জিনিষ
আপনাদের কারও মনে উদয় হয়নি।•••স্যার সূর্য প্রসাদের
মৃত্যুর কয়েকদিন মাত্র আগে একজন লােক তাঁর সংগে দেখা
করতে এসেছিল।
: কিন্তু সেত হাজার ট্রেডিং কোম্পানীর একজন এজেন্ট,
ডিকটাফোন বেচবার জন্য এসেছিল ? অমলেন্দু বলল।
ঃ অমলেন্দু বাবু! আপনি জানেন স্যর সূর্যপ্রসাদ ডিকটা-
ফোন কেনেননি, কিন্তু সেটা ভুল !•••আমি নিজে হাজার ট্রেডিং
কোম্পানীতে খোঁজ নিয়ে দেখিছি মৃত্যুর ঠিক দুই দিন আগে
তিনি একটি ডিকটাফোন মেসিন ক্রয় করেন, তাঁর সেই ক্রয়
করার মেমম এখনাে দোকানে আছে।•••কোন খেয়ালের
বশবর্তী হয়ে হয়ত তিনি একথা কাউকে জানাননি, এমনকি
প্রাইভেট সেক্রেটারী অমলেন্দুকেও না! •••এইবার সমরবাবুর
নিরুদ্দেশের ব্যাপারে আসা যাক। সমরবাবু পালান নি, তিনি
লুকিয়ে ছিলেন ডাঃ সেনের পরামর্শ মত।•••ডাঃ সেন সমর
বাবুকে বন্ধুর মতই পরামর্শ দিয়েছিলেন।•••পাছে পুলিশে নিয়ে
তাকে টানাটানি করে। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম
কাকুল টি, বি, স্যানিটোরিয়ামে ডাঃ সেন প্রায়ই যান, কেননা
তিনি সেখানকার ভিজিটিং ফিজিসিয়ান। ডাঃ সেনের সে
রাত্রের ও পরের দিন সকালের movement দেখে কেমন
আমার সন্দেহ হয় নিশ্চয়ই ডাঃ সেন সমর সম্পর্কে কিছু জানেন,

আঁধার পথের যাত্রী
আমার কাছে গােপন করছেন। ডাঃ সেনের গতিবিধি যে যে
জায়গায় আছে, সব জায়গায় গােপনে যাতায়াত সুরু করি এবং
নীলরতন পাণ্ডে নাম দিয়ে একজন নতুন রােগীর সন্ধান পাই
কাকুল টি, বি, স্যানিটোরিয়ামে এবং খোঁজ নিয়ে জানি যেদিন
স্যার সূর্যপ্রসাদ নিহত হন, তারপর দিনই সকালে নীলরতন
সেখানে ভর্তি হয়। নীলরতনকে জেরা করতেই সব কথা
প্রকাশিত হয়ে যায় !
: আশ্চর্য
আপনি মিঃ রায়! • আমি
বললাম।
ঃ এখন ত’ বুঝতে পারছেন ডাঃ সেন কিরীটির কাছে
অজ্ঞাত কিছুই থাকে না।•••
হাঁ, শুনুন আপনারা। আমি কিরীটি রায় এখানে দাড়িয়ে
বলছি। আমি জানি কে আপনাদের মধ্যে খুনী !•••এখনও
স্বীকার করুন ! আমি খুনীকেই সম্বােধন করে বলছি । কাল
সকালেই সমস্ত তথ্য ইনেসপেকটার উজাগর সিংকে আমি
জানাব।
গভীর নিস্তব্ধতা!
জমাট মৃত্যু শীতলতা !•••
এমন সময় একটা লােক একটা খামে বন্ধ চিঠি এনে
কিরীটির হাতে দিল।
চিঠিটা পড়তে পড়তে সহসা কিরীটির দু’চোখ আনন্দে
উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

আঁধার পথের যাত্রী
চিঠিটা পড়া হলে সেটা দলা পাকিয়ে অদূরে ঘরের কোণে
প্রজ্জ্বলিত fire placeয়ে নিক্ষেপ করল।
বলদেব বাবুর কণ্ঠস্বর শােনা গেল : আপনি বলছেন মিঃ
রায়, খুনী আমাদের মধ্যেই একজন! আপনি জানেন—কে ?
: হ! আমি জানি।....
তথাপি সকলে নির্বাক যেন ভূতগ্রস্থ !....
: বেশ! তাহলে বলতে চান না।....কিন্তু মনে রাখবেন
কাল সকালেই উজাগর সিং সব কিছু জানতে পারবেন।
Good night everybody.
আসুন ডাক্তার ! Good
night !...
-কিরীটির বিশ্লেষণ
-সতের
খুনী কে ?....
রাত্রি তখনও বেশী হয়নি, ফিরতি পথে কিরীটিকে সংগে
নিয়ে আমার বাসায় এসে ঢুকলাম : চলুন মিঃ রায় গরম কফি
এক কাপ খেয়ে যাবেন !
কিরীটি মুহূর্ত কী একটু চিন্তা করল তারপর পকেটে হাত
দিয়ে কী যেন অনুভব করে মৃদু স্বরে বললে চলুন।

আঁধার পথের যাত্রী
দুজনে দুখানি সােফা অধিকার করে fire placeয়ের ধারে
বসেছি।
সামনেই একটা টি’পয়ের পরে অর্ধসমাপ্ত কফির পাত্র !•••
কিরীটির হাতে একটা জলন্ত সিগার !•••
মুখের দিকে চাইলেই মনে হয় সে গভীর চিন্তায় মগ্ন !....
fire plcceয়ের আগুনের মৃদু রক্তাভা তার চিন্তাচ্ছন্ন মুখের
রেখায় রেখায় প্রতিফলিত হয়ে কী এক প্রকার দৃঢ় সংকল্পতার
ছাপ যেন ফুটিয়ে তুলেছে!...
সহসা কিরীটিই নিঃস্তদ্ধতা ভংগ করলে : আজকার সান্ধ্য
বৈঠকটা কেমন উপভােগ করলেন ডাক্তার ?
: সত্যি কথা বলতে কি মিঃ রায়, আমি একেবারে অবাক
হয়ে গেছি !...কিছুই যেন আমার বােধগম্য হচ্ছে না! ....সব
যেন প্রহেলিকার মত মনে হচ্ছে। এখনও বুঝতে পারছি না
সত্যই যদি আপনি জানেন খুনী কে তবে তাকে আজই ইনে-
পেকটার উজাগর সিংএর হাতে ধরিয়ে দিলেন না কেন ?•••
এভাবে তাকে পালাবার সুযােগ দেবার কী মানে থাকতে
পারে ! আপনি কী মনে করেন আজ রাত্রের পর কাল সকালে
আর তার পাত্তা পাবেন ?
ও একটা উদ্দেশ্য আছে বৈকি, বিনা উদ্দেশ্যে কিরীটি কোন
কাজই করে না !
: আপনার আশা ছিল অপরাধী আজ রাত্রে নিজের মুখেই
সবার সামনে তার অপরাধ স্বীকার করবে, না ?

আঁধার পথের যাত্রী
কতকটা তাই বটে।
কিন্তু যখন দেখলেন তা হলাে না তখন তাকে এ ভাবে
পালাবার সুযােগ দেওয়ার কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে মিঃ রায় ?
ও সে পালাতে পারবে না ডাঃ সেন! ধরা তাকে দিতেই
হবে।
: আপনার নিশ্চিত ধারণা আজকে যারা ওখানে উপস্থিত
ছিল তাদের মধ্যেই একজন হত্যাকারী—কিন্তু কে ?
কিরীটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল পরে ধীর স্বরে বললে ?
হলে সবই আপনাকে খুলে বলি, শুনুন ডাঃ সেন! আমার
আলােচনায় প্রমাণিত হয়েছে সমর বা বিমল হত্যাকারী নয়
বাকী থাকে যারা তাদের নিয়েই আলােচনা করব। প্রথমেই
ধরুন টেলিফোনে আপনার সংবাদ পাওয়া। ও বাড়ী থেকে
কেউ ফোন করেনি!....এবং খোঁজ নিয়ে জানা গেছে Public
telephone office (2167 phone F31 20375*
ফোন করা হলো? একমাত্র কারণ হতে পারে খুনের
ব্যাপারটা গােচর করা, কেমন ত ?
: বলুন।
: কিন্তু খুনের ব্যাপারটা ত লােকে জানতে পারত।
রাত্রে না হলেও পরের দিন সকালেই সবাই জানতে পারত।
এর থেকেই বােঝা যায় খুনীর ইচ্ছা ছিল যাতে সবাই সেই
রাত্রে খুনের ব্যাপারটা জানতে পারে। কিন্তু কেন?• ভেবে
খেছি এর একটি মাত্র কারণ থাকতে পারে।
কিন্তু কেন

আঁধার পথের যাত্রী
: কী ?
: খুনীর ইচ্ছা ছিল খুনীর কথাটা এমন একটা নির্দিষ্ট সময়ে
প্রকাশিত হােক যে সময়ে যাতে করে সে খুনের সময়ে বা তার
পরে দরজা ভেংগে ঘরে ঢােকবার সময় পায়! এইবার সেই
বড় চেয়ারটার রহস্যে আসা যাক্ ! আপনি যে এ তদন্তের
ডাইরী লিখেছেন তাতে সেই ঘরের ও সেখানকার যাবতীয়
আসবাব পত্রের একটা সুন্দর স্কেচ্ দিয়েছেন। সেটা একটু
ভাল করে দেখলেই বােঝা যায় আব্দলের কথামত যদি
চেয়ারটা সরান হয়ে থাকে তাহলে চেয়ারটা এমনভাবে এমন
জায়গায় টেনে নেওয়া হয়েছিল যাতে করে চেয়ারটা ঠিক ঘরের
বাইরে যাবার দরজা ও ঘরের একটি মাত্র জানালার মাঝামাঝি
থাকে।
ও জানালার ! আমি বিস্মিত ভাবে প্রশ্ন করলাম।
: হাঁ জানালার ও দরজার সংগে ঠিক একই লাইনে।
আব্দলের সওয়ালে আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল নিশ্চয়ই
চেয়ারটাকে পরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। এইজন্য যে কেউ যেন
ঘরে ঢুকে একথা না মনে করে যে চেয়ারটার ওখানে সরাবার
কারণই হচ্ছে চেয়ারটা ও ভাবে ওখানে থাকলে জানালাটা
কেউ যেন দেখতে না পায় দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করবার
সময়। কেননা জানালা ও দরজার মাঝামাঝি অতবড় চেয়ারটা
থাকলে কেউই জানালাটা দেখতে পেতে পারে না দর
দিয়ে ঘরে প্রবেশ করলে! লক্ষ্য করে থাকবেন সেই চেয়

গাধার পথের যাত্রী
হেলান দেবার ব্যাকটা বেশ উচু। কিন্তু ভাল করে বিবেচনা
করতে গিয়ে মনে এলাে চেয়ারের backটা এত বেশী উচু নয়
যে, জানালাটাকে সম্পূর্ণভাবে ঢাকতে পারে দৃষ্টিপথ থেকে ।
তখনই আবার লক্ষ্য করে দেখলাম, জানালার ঠিক পাশেই
একটা ছােট টেবিল আছে। জানালাটা না ঢাকা গেলেও,
চেয়ারের আবডালে টেবিলটা মােটেই দরজা থেকে চোখে পড়ে
না এবং সেই মুহূর্তেই আমার মনে একটা সত্যের ছায়াপাত
হলাে। সেই সত্যকে ঘিরে নানা রকমের সম্ভাবনা মনের মধ্যে
পাক খেয়ে ফিরতে লাগল।
এমনও হতে পারে খুনী সামনের ওই ছােট টেবিলটার
উপর এমন কিছু রেখেছিল যেটা দরজা দিয়ে যারা ঢুকবে
তাদের দৃষ্টি থেকে চাপা দিয়ে রাখতে চায় ? এতক্ষণ পর্যন্তও
আমার মনে কোন ধারণা হয়নি সেটা কী হতে পারে এবং
আদপেই সে রকম কিছু হবে কিনা।....কিন্তু কতকগুলি
ব্যাপার ইদানিং আমার নজরে পড়েছে।
খুনী এমন কোন জিনিষ সেই টেবিলটার উপরে রেখে
ছিল, যেটা হয়ত খুন করে ঘর ছেড়ে চলে যাবার সময় সংগে
করে নিয়ে যাবার সুযােগ বা সুবিধা পায়নি।....অথচ জিনিষটা
হয়ত এমন কিছু ছিল যেটা অন্যের নজরে পড়লে খুনীর পক্ষে
অত্যন্ত বিপদের কারণ হবে। সেইজন্যই সেখান থেকে যত
তাড়াতাড়ি সেটা সরান যায় ততই মংগল তার পক্ষে। এবং
ইজন্য phone করবার প্রয়ােজন হয়েছিল খুনীর। এবং
মনে করুন

আঁধার পথের যাত্রী
সেই অবকাশে গােলমালের মধ্যে সকলের সংগে অকুস্থানে
উপস্থিত হয়ে সেই মারাত্মক জিনিষটা সরিয়ে ফেলবার সুযােগ
হয়েছিল।
এখন পুলিশ সেখানে পৌঁছাবার আগে কারা সে
ঘরে গিয়েছিল, আপনি, আব্দল, মেজর, বলদেববাবু, রাধিকা
প্রসাদ ও বিমলবাবু!....প্রথম ধরা যাক আব্দলকে ! সেই
যদি হবে তবে চেয়ারের কথা সে কোন মতেই বলত না।
মাত্র এই কারণেই আমি আব্দল যে নির্দোষ যে সম্বন্ধে স্থির
নিশ্চিত। তারপর মেজর, বিমলবাবু ও রাধিকাপ্রসাদবাবু।
তাদের প্রতি একটু সন্দেহ হয় বটে!•••কিন্তু কথা হচ্ছে সে
জিনিষটা কী ?...আমি অমলেন্দুবাবুর কাছে খোঁজ নিয়ে
শুনেছি কথাবার্তা যা সে রাত্রে তিনি শুনতে পেয়েছিলেন,
সেটা বেশ একটু অস্বাভাবিক রকম জোরে জোরে। কোন
মানুষই বিশেষ করে প্রাইভেট কথাবার্তা অত জোরে বলতে
পারে না !•••
কিরীটি বলতে লাগল ।
যে মুহূর্তেই আমি হাজার কোম্পানী থেকে জানতে পারি
স্যার সূর্যপ্রসাদ মৃত্যুর দু’দিন আগে মাত্র একটা ডিকটাফোন
ক্রয় করেছেন, তখনই ডিকটাফোনের ব্যাপারটা আমার মনে
গেঁথে যায়।•••আমি চিন্তা করতে
সুরু করি!...হঠাৎ
একসময় মনে হলাে, স্যার সূর্যপ্রসাদ যে ডিটাফোনটা ক্রয়
করেছেন সেটা কোথায়! বহু পরিশ্রম করে খোঁজাখুঁজি
করেও আমি বা ও বাড়ীর কেউ সেটা পান নি।
১২১

আঁধার পথের যাত্রী : আমি কিন্তু একথাটা একবারও ভাবিনি মিঃ রায়। ও স্বাভাবিক! তখন আমার মনে হলাে, এমনও ত’ হতে শারে ডিকটাফোনটাই টেবিলের পরে ছিল এবং সেটা সরিয়ে ফেলা হয়েছে।•••কিন্তু খুনী যদি সেটা সরিয়ে ফেলেই থাকে তবে সকলের সামনে অজ্ঞাতে কী ভাবে সেটা সরিয়ে ফেললে। নিশ্চয়ই এমন কোন কিছু খুনী সংগে এনেছিল যাতে সেটা অনায়াসেই অলক্ষ্যে সরিয়ে ফেলেছে। বুঝতে পারছেন এখন ডাঃ সেন, খুনী আমাদের চোখের সামনে অল্পে অল্পে আকার নিচ্ছে।•••এখন বােধ হয় বুঝতে পারছেন কেন খুনী কৌশলে ফোন করে সেই রাত্রেই খুনের কথা সকলকে জানিয়ে ডিকটা- ফোনটা নিয়ে সরে পড়েছিল, যাতে করে পরের দিন সকালে তার কোন কাজ কমের বা সূত্রের চিহ্ন পর্যন্ত না থাকে।••• কিন্তু সকালে হলেই বা ক্ষতি ছিল কী? ডিকটাফোন নিয়ে যাবার সময় সকলের চোখে ধরা পড়ত।••• আমি বাধা দিলাম । কিন্তু ডিকটাফোনটা সরানর কী এমন প্রয়ােজন ছিল : আপনি জানেন স্যার সূর্যপ্রসাদের কণ্ঠস্বর রাত্রি এগারটার সময়ও তার ঘর থেকে শােনা গিয়েছিল ।•••কিন্তু ভেবে দেখুন—আপনি ডিকটাফোনের মাউথপিসে এখন কিছু বললে—এবং কিছু সময় পরে মেসিন চালালেই আবার সে গােনা যেতে পারে! অর্থাৎ- ?

আঁধার পথের যাত্রী
: হাঁ অর্থাৎ আমি বলতে চাই রাত্রি এগারটার ঢের আগেই
স্যার সূর্যপ্রসাদকে খুন করা হয়েছিল !"রাত্রি এগারটার সময়
তঁার গলা ডিকটাফোনে শােনা গিয়েছিল। খুনী মেসিনটা খুন
করে চলে যাবার আগে চালিয়ে দিয়ে গিয়েছিল অন্যকে ধোঁকা
দিতে। এই সব থেকেই বােঝা যায় খুনী সূর্য প্রসাদের যথেষ্ট
পরিচিত ও জানত সূর্যপ্রসাদ
জানত সূর্যপ্রসাদ ডিকটাফোন কিনেছেন।
তারপরে আসা যাক্ জানালার গায়ে পায়ের ছাপ!....
পায়ের ছাপ দেখে এবং তাজ হােটেলে সমরের কাদা মাখা
জুতাে দেখে মনে হয়—জানালার পায়ের ছাপ সমরের হতে
পারে; কিন্তু খোঁজ নিয়ে জেনেছি সেরাত্রে সমরের পায়ে যে
জুততা ছিল সেটা তাজ হােটেলে পাওয়া জুতাের মতই একই
প্যাটার্ণের রবার সেল দেওয়া জুতাে। কিন্তু হাসপাতালে
সমরের পায়ের সেই জুতো ভাল করে পরীক্ষা করে দেখেছি সে
জুতােয় এতটুকুও কাদার দাগ ছিল না! অথচ সমরের ঘরে
কাদা মাখা জুতাে পাওয়া গেল। কোন লােকই একই
প্যাটার্ণের তিন জোড়া জুতো কিনতে পারে না! তাছাড়া
প্রমাণিত হয়েছে সমর। সময় হােটেলের জুয়াঘরে
জুয়া খেলায় মত্ত ছিল। এবং সমরকেই আপনি বলে
দিয়েছিলেন সে যে কাকুল যাচ্ছে সে কথা যেন সেই রাত্রেই
ফোনে আপনাকে জানায়। এতে মনে হয় নিশ্চয়ই কে
সমরের জুতো পায়ে দিয়ে খুনীকে খুন করে জুতাে আবার তার
ঘরে অন্যের অলক্ষ্যে রেখে এসেছে তার ঘাড়ে খুনের দোৰ

আঁধার পথের যাত্রী চাপানর জন্য !....এ থেকে এও প্রমাণিত হয় খুনী সমরকেও বেশ ভালরূপেই চিনত।•••ও তার সংগে পরিচিত ছিল। এই সব কারণ থেকেই বােঝা যায় খুনী এমন একজন লােক যে জানত, ম্যাকসিকান ছােরাটা কোথায় আছে, যে স্যার সূর্যপ্রসাদের পরিচিত ও বিশ্বাসের পাত্র ছিল। যে সূর্যপ্রসাদের সংসারের অনেক সংবাদই জানত, যে ডিকটাফোনের সংবাদও জানত এবং যার সংগে ডিকটাফোনটাকে লুকিয়ে নিয়ে যাবার মত বাক্স বা তেমন কিছু ছিল—তাহলেই বুঝুন খুনী কে?শুনুন ডাঃ সেন! গােখরা সাপ নিয়ে খেলা করার চাইতে ভয়ংকর কিরীটি রায়কে নিয়ে খেলা করা !....এখন বুঝে দেখুন এই সব কিছুর সংগে মিলে যাচ্ছে কে ?•••আপনি! হাঁ আপনি ডাঃ সেনই....সূর্যপ্রসাদের হত্যাকারী .... আঠার- -আঁধার পথের যাত্রী আমি হােত হাের করে হেসে উঠলাম : কী বলছেন পাগলের মিঃ রায়? শেষ পর্যন্ত এই ধারণা হলো আপনার যে খুনী হাঃ হাঃ হাঃ!•• মুন ডাঃ সেন! পাগল আমি নই।•••আপনার জবান- র মধ্যে সামান্য একটা সময়ের হের ফেরই সমস্ত রহস্ক

আঁধার পথের যায়
আমার কাছে দিনের আলাের মত পরিষ্কার করে দিয়েছে।•••
আমি অনেক দিনই আপনাকে ধরিয়ে দিতে পারতাম শুধু
আপনার বাচালতার দৌড়টা পরখ করছিলাম! ••
ও সময়ের হের ফের !•••
ও হ! আপনি আপনার জবানবন্দীতে unguarded
momentয়ে বলেছেন : রাত্রি সাড়ে দশটায় স্যার সূর্যপ্রসাদের
ঘর থেকে আপনি বিদায় নেন অথচ গেটের কাছে অমিয়র সংগে
যখন আপনার দেখা হয় তখন রাত্রি এগারটা বাজল গির্জার
ঘড়িতে! ঘর থেকে বের হয়ে সিড়ি দিয়ে নেমে গেটের কাছে
আসতে ৫৬ মিনিটের বেশী কারও লাগতেই পারে না অথচ
আপনার আধঘণ্টা লাগল কেন? কী করছিলেন এই আধঘণ্টা।
কোথায় ছিলেন ? তাছাড়া সূর্যপ্রসাদের নিহত হবার সংবাদ
ফোনে পেয়ে কালাে রংয়ের ডাক্তারী ব্যাগটা নিয়ে গিয়েছিলেন
কেন ?..মৃত ব্যক্তিকে ইনজেকসন দিতে বুঝি? ডাক্তার।
নিজের জালে নিজে জড়িয়েছেন।•••ব্যাগটা না নিয়ে গেলে
ডিকটাফোনটা আনতে পারতেন না।•••
এবং ঘরে ঢুকেই চেয়ারটা সরিয়ে রেখেছিলেন পাছে কারও
নজরে পড়ে।
একটা কথা ভুলে যাচ্ছেন, ঘরের কথাবার্তার মধ্যে অমলেন্দু
বাবু আপনার কণ্ঠস্বরই শুনেছিলেন, তাতেই বােঝা যায় আপনি
ছাড়া অন্য কোন তৃতীয় ব্যক্তি ঐ ঘরে ঢােকে নি।
সূর্যপ্রসাদকে খুন করে জানালা টপকিয়ে নীচে নেমে,
২৫

অাবার পথের যাত্রী
তাড়াতাড়ি তাজ হােটেলে গিয়ে সমরের জুতােটা সেখানে রেখে
ফিরে আসতে ২০ মিনিটের বেশী সময় লাগে না।•••তারপর
সেই রাত্রে তাজ হােটেলে গিয়ে সমরকে ভয় দেখিয়ে সরিয়ে
ফেলাও চমৎকার বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন, কিন্তু হায় এত
করেও সব দিক বাঁচাতে পারলেন না। নিজের জবানীতেই ধরা
দিলেন। দোষীর বিচার ভগবান এমন করে তাকে দিয়েই
করান। আচ্ছা আসি Good Night. পালাবার চেষ্টা
করবেন না, কেলেংকারীই বাড়বে শুধু •••কেননা উজাগর সিং
ঘুমিয়ে নেই সজাগ হয়েই আছে।•••
কিরীটি ধীর মন্থর পদে ঘর ছেড়ে চলে গেল।
অন্ধকার, শুধুই অন্ধকার !•••
•••এ জীবনের আর প্রয়ােজনই বা কী ?•••
লােভে জগৎজীবনকে ‘টিউবারকুলিন ইনজেকসন দিয়ে
তার রােগ বাড়াতে সাহায্য করে হত্যা করেছি পুলকজীবনের
প্ররােচনায়।
সমরই পুলকজীবনকে আমার কাছে এনে দিয়েছিল।
একবার খুন করে খুনের নেশা চেপে গিয়েছিল তাই পুলক
জীবনকেও slow poison করতে সুরু করলাম। ধর্মের কল।
বাতাসে নড়ল, মরবার আগে চিঠিতে সে সব কথা সূর্যপ্রসাদকে
নিয়ে গেল।
সুপ্রসাদ যখন রাত্রে আমাকে নিমন্ত্রণ করেন, তখুনি

কেমন একটা সন্দেহ হয়—তাই উপরে যাবার আগে মি।
ঘর থেকে ছােরাটা নিয়ে গিয়েছিলাম প্রস্তুত হয়েই
সূর্যপ্রসাদের হাতে চিঠি দেখে যখন বুঝতে পার,
আমি ধরা পড়েছি তখন অন্যনােপায় হয়েই তাঁকে শেষ
করি !•••
বিচার !
কিন্তু সত্যি বুদ্ধি আছে কিরীটির ! এত সুক্ষ্ম চুলচেরা
মা! বাবা! আজ তােমরা কোথায় কতদূরে
জানি না। জানি না, পৃথিবীর লােকের ডাক তােমাদের কাণে
পৌছাচ্ছে কি না?
এখন নয়। যখন মরে যাবাে,"তখন স্বর্গ থেকে দু’ফোটা
অশ্রুমােচন করে হতভাগ্য বিপথগামী পুত্রের অশরিরী আত্মাকে
স্মরণ করে ।
= = ল ++++
• • •
০ ০ ০
এই যে সামনেই সাজান সারি সারি ‘বিষ’ লেখা ঔষধের
শিসি ।•••বেলেডােনা, হাইড্রোসায়ানিক এ্যাসিড। টিনচার
হায়ােসায়ামাস।•••‘ভােরানল’•••
* ঠিক, ভােরানলই সব চাইতে ভাল হবে।•••ধীরে ধীরে
ঘুমিয়ে পড়ব। সে ঘুম আর ভাংবে না।•••আমার ডাইরীট
কিরীটির নামে লিখে রেখে যাই যেন সে আমার মৃত্যুর পর
পায়।....
কিন্তু কিরীটি যেন তার গােয়ন্দাগিরী না ছাড়ে। এমনি
করেই সে যতদিন বেঁচে আছে দুষ্টের দমন করে যাক।
১৪৭

আঁধার পষ্ট্রে যাত্রী
তাড়াতান তাকে দীর্ঘজীবন দান করুন।•••
ফিরে ?
আঃ! ঘুম।•••
বড় ক্লান্ত আমি !•••
পাশের ঘরে ঘড়িতে রাত্রি বারটা বাজল না?
উঃ এত অন্ধকার কেন ?
আলাে। একটু অলোে।
পাসটির চলাকাল : চাকরী ব্যপদেশে ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমাতে
ছোট খান কাবুলে অবস্থান কালে ১২৪২ হইতে ২০২৪৩

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Andhar Pather Jatri Ed. 2

Author
Gupta,niharranjan
Title
Rahasya Upanyas
File name
Andhar Pather Jatri Ed. 2
Text
OCR done
Citation
1944
Published
2010/03/17
Publisher
Bengal Publishers, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
142
Library
Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Classification
Bengali Novel
Keywords
Gupta,Niharranjan
DLI number
510849
Barcode
4990010018051.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Bt8dN73QZ9y
Download PDF

Andhar Pather Jatri Ed. 2