Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Madhumalati Ed. 1st

Chattopadhyay,sabitriprasanna · 2009/11/6

PDF Proofread

Front matter

.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মধুমালতী

প্রাপ্তিস্থান :-
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
২০৩১১১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
অন্যান্য প্রধান পুস্তকালয়।
প্রথম সংস্করণ।
পৌষ ১৩৩১।
[ মূল্য ১১ এক টাকা]

মধুমালতী শ্ৰসাৰিত্ৰীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়

উপাসনা প্রেস
১৪-এ শরৎ ঘােষের স্ট্রীট, ইন্টালী, কলিকাতা
হইতে ঐধীরেন্দ্র নাথ গুপ্ত কর্তৃক
মুদ্রিত ও প্রকাশিত

আমার কবিতা তুমি বড় ভালবাস
তাই
তােমারই হাতে
অসঙ্কোচে
আমার
মধুমাল
তুলে দিলাম

No text on this page.

জাপ বিষয় পৃষ্ঠা বিষয় পৃষ্ঠা মূৰ্ত্তরাগ ৪২ ব্যর্থ সঙ্গীত ত Ear ৪৩ অনও ৪৪ e পূৰ্ব্বাপর শাভন সাঁঝে “বকুল-স্মৃতি প্রেমের চিহ্ন মনের মাণিক চিরঋণী দূরের বধু ০ ০ ০ ৪৬ ০০০ ৪৮ • • ০ ০ ০ ১২ প্রেমের পরশ ১৪ pen অসহ ৪৪ বিনিময়ে অনাগত ৫৭ ৫ ২১ ২৪ প্রেমের পালা মধ্যমণি জবাবদিহি চির-আদরিনী ••• আদালে বিদাষ ক্ষণে দেয়ালী উল্কাপাত আষাঢ়ে দরদী বিদায়-বেল। বর্ষ-স্মৃতি ফিরে চল ভাগ্য-লক্ষী বিড়ম্বনা ••• ব্যথার দান অদৃষ্টের পরিহাস মধুমালতী ••• ৬৮ ৫ ও ০ পরশ-পাগল মায়াবিনী • • ৭ মৌন প্রেম ৪ ০ १२ ০ ০ ০

No text on this page.

মধুমালত
পূৰ্ব্বাপর
শুধু পথপানে চেয়ে
কত নিশিদিন আঁধারে মিশেছে হতাশের গান গেয়ে !
কত আদরের নিজ হাতে গাঁথা। বকুলের মালা হতে
ঝরে গেল ফুল, পরাণ অকুল বেঁচে র’ল কোন মতে।
সাঁঝের আঁধারে চাহি বারে বারে নয়ন পলক-হারা
শুধু নিরাশায় প্রাণ ফেটে যায়, নীলিমায় ফোটে তারা।
পথের কাঙাল দ্বারে দ্বারে ঘুরি’ কি যে চাই নাহি জানি,
মাঝে মাঝে যেন জেগে ওঠে প্রাণে শত জনমের বাণী,
পথের পথিক চলে যায় পথে, আমি পড়ে পথপাশে
ফিরেও চাহে না তবে কেন তারা এই পথে যায় আসে ?
নয়নের আগে কুসুম-কলিকা বুক ভরা তার মধু
স্কুলের নেশায় রঙিন দেখায় ঠিক যেন নব-বধূ।
তারও ফুটে সুখ, ঝরা সে ধরে না, গন্ধ বিলায়ে খুসি
হৃদয়ে বাহিরে এত প্রেম-মধু গােপনে কে রাখে পুষি’ ?,
ভ্রমর আসিয়া কত গান গায় বুঝি না তাহার মানে
আমারি সমুখে নদী বয়ে যায় কি যে বলে সেই জানে।
মলয় বাতাস জাগায়ে হতাশ কাণে কাণে কি যে কয়
অর্থ বুঝার নাহি সামর্থ্য প্রাণে আর কত সয় ?

মধুমালতী
আমার প্রাণের পথ বেয়ে গেছে তাজানা অচেনা কত
ধূলায় আঁকিয়া চরণ-চিহ্ন চির-জীবনের মত।
মনে পড়ে যেন চিনেছি তাদের দেখেছি কোথায় কবে
তারা বুঝি পুন আসিয়া আমায় আপনার করে লবে।
কোন দিন কোন মধুময় প্রাতে কারে দিয়েছিনু মালা
শুধু সে মালার পরশে কেন গাে এত বুকভরা জ্বালা ?
মধুময় প্রাতে যাহাদের সাথে হয়েছিল মাের দেখা
আপনার মানি নিয়েছিনু টানি না জানি ভাগ্যলেখা।
ফুরাল সে খেলা, বেড়ে এল বেলা, পিছনে চাহিনু যবে
দেখি কে কোথায়, ফেলিয়া আমায় চলিয়া গিয়াছে কবে।
মানুষের রীতি জানে না পীরিতি, নিতি সে নূতন চায়
পুরাতনে ক্ষণে পড়ে নাক মনে আনমনে চেয়ে যায়।
তবু মনে পড়ে তারা যেন মাের কোথা আছে এইখানে
শতরূপে যেন রয়েছে প্রকাশ অন্তর মাঝখানে।
নিখিল রূপের মাঝারে রয়েছে অন্ধ দেখিতে নারি,
অবিরাম রসে বয়ে চলে যায় সকল তৃষ্ণাহারী ;
ললিত কণ্ঠে গেয়ে যায় গান আমারই কাণের কাছে,
চারু পরশের মাধুরী লভিয়া পরাণ বাঁচিয়া আছে।
হৃদয়ানন্দ কুসুম-গন্ধে নন্দি’ আমার প্রাণ
মণি-লাবণ্যে উছলিয়া ওঠে আমার সকল গান।
অামারে ঘেরিয়া তোমরা আমার আছ কি গােপন করি'
ঢালিতে শুধু অন্তর-মধু মম প্রাণমন ভরি
?
২

শাঙন সাঁঝে
শাঙন মেঘে মেঘে
বেদনা ওঠে জেগে,
নয়নে নেমে আসে বরষা জল,
তরাসে কেঁপে ওঠে হৃদয় তল ।
মিলন দিনে বুকে সে কি সে গুরু গুরু
ব্যথিয়া গেল সুখ কাপিয়া দুরু দুরু,
কি কথা বলে গেলে টানিয়া জোড়া ভুরু
এখনও মনে পড়ে অবিকল ।
নয়ন কোণে শুধু একটু মৃদু হেসে
মাথাটি নীচু করে দাড়ালে কাছে এসে,
আদরে বুকে নিনু কত না ভালবেসে
আধেক ফোটা যেন শতদল !
বৃন্ত হ’তে উঠি আপনি ফুটিতেছ
শােভার নাহি বুঝি সমতুল,
পরাগ মাঝে তব গন্ধ অভিনব
আপনি হয়ে আছ সমাকুল !
কথা যে জুটিল না
মুখ যে ফুটিল না
দাড়ায়ে র’লে নতমুখে
সে ব্যথা বেজেছিল বুকে ।

মধুমালতী
আজ, মেঘের পরে মেঘ মহলা করে যায়
অশ্রু-ভেজা মন করিছে হায় হায়,
তােমার মালাগাছি বুকে যে রাখা দায়
তুমি যে নাই মাের পাশে;
বরষা নেমে এল সজল কালাে মেঘে
উতলা হয়ে বয় বালা বায়ু বেগে,
বুকের মাঝে আজ যক্ষ ওঠে জেগে
বিরহী প্রিয়তম আশে ।
কোন সে অলকায় অলক আলুথালু
ধূলায় লুটে সারা খালি,
চোখের জলে তার কাজল মুছে গেছে
আঁচলে মাখা শুধু কালি ।
আমার মত সে কি
আকাশে মেঘ দেখি
গুমরি উঠিতেছে দুখে
বিরহ-ভরা-ভরা বুকে ?
জঘন হতে তার বসন পড়ে খুলে
শাঙন-ঘন-ছায়া পড়িছে গ্রীবামূলে,
নদীর ভরা ঢেউ হৃদয় উপকূলে
আঘাত করি যায় অনুখন,
দীরঘশ্বাস বয়, কঁাকন বেজে উঠে
বেশর খসি পড়ে, নূপুর যায় টুটে
বরণ মালাখানি নিমেষে পড়ে লুটে,
শিহরি ওঠে প্রাণ অকারণ।
৪

মধুমালতী
শাঙন মেঘময় তাহারি মায়াখানি
বিছায়ে রাখিয়াছে সে যে
আমার মন বলে বরষা ধারাজলে
তাহারি বীণা ওঠে বেজে ।
গর্ভীর বেদনায়
প্রাণ যে তারে চায়
দু’হাতে আগুলিয়া বুকে
স্পরশে কেঁপে ওঠা সুখে ।
ওই যে মেঘে মেঘে আকাশ গেল ছেয়ে
বরষা জলধারা আকুলি’ এল ধেয়ে,
বিজন বনপথে বাতাস গেল বেয়ে
ছড়ায়ে ভেজা বনফুল ;
আজিকে থির হয়ে আছে যে আনমনা
শাঙন মেঘ সনে তাহারাে আনাগােনা,
বিরহী হৃদয়ের আজি এ আরাধনা
জীবনে হবেনাক’ ভুল ;
উজল কেশভার মেঘেতে একাকার
মাঠের পরে পড়ে লুটি
জীবন ভরি আজ মধুর হয়ে ওঠে
বিরহে ম্লান আঁখি দু’টি ।

“বকুল-স্মৃতি”
;
আমি দিই ভাষা, শুধু ভালবাসা, প্রাণ দিয়ে সাধা সুর
আজি, তব অন্তর-মধু দিয়ে মােরে করিয়াছ ভরপূর !
আমার মরম-কুঞ্জ-কুসুমে ভরেছি পূজার ডালা
কলি ছিড়ি’ আজ কত না যতনে গেঁথেছি বরণমালা
কার তরে ওগাে কার মুখ চাহি জানাে কি গাে মন চোর
কোন তটিনীর ছায়াঘন বুকে বিনত বেতসী মাের ?
ছল-ছল-ছল, জল-কল্লোল উজ্জ্বল নদীতটে
আমাদের কথা যাহা রটে ওগাে সে কথা সত্য বটে।
পরশে তােমার ফুটাইলে কলি গন্ধ দিলে যে ফুলে ;
পাতার আড়ালে তরুরে ঘেরিয়া লতা হিল্লোলে দুলে,
বিন্দুজলের শুষ্কতৃযায় চাতক মরে যে ডাকি
কে তুমি আস গাে ধরার বক্ষে করুণার ধারা মাখি ?
সব কথা জানি, সব কথা মানি, সব করি অনুভব
তুমি ছিলে, আছ, হৃদয়ে বাহিরে করিতেছ উৎসব।
আজি তুমি দিলে পাঠায়ে তােমার মরম-মাধবী-মধু
যৌবন আজ ধরেনাক’ বুকে,লজ্জিতা নব বধূ!
বকুলের ফুলে গাঁথিয়াছি মালা দিয়েছি তােমার গলে
আদরে সােহগে বক্ষে তােমার কভু বা পড়েছি ঢ’লে,
কভু দিছি চুমা, কভু অনাদর, হেলা ফেলা আঁখিজল,
কভু নিঠুরের নির্মম হাসি, কভু দোষী দুরবুল ;
কখনও শুনেছি অভিমান-ভরা না শুনার যেই কথা
‘পরাণ-পোড়ানি’ দিবস যামিনী ‘হিয়া-দগদগি’ ব্যথা

মধুমালতী
মম ভাণ্ডারে দিলে ভারে ভারে দুনিয়ার দৌলৎ
হারাণ-মাণিক, ফিরে-পাওয়া-ধন, কাঙালের সম্পং !
মনে পড়ে সব কত বৈভব আমারে দিয়েছ ঢেলে
আপনা বিলায়ে অধমের ঠাই কিবা তুমি ফিরে পেলে ?
হৃদয়-চেঁায়ান তরল সুধায় বকুল গন্ধ’ বলি’
পিয়াসী জনারে ভুলাইতে চাও, কেন প্রিয়তমে ছলি”
আমার বুকের বকুল বাগানে, ফুল-সস্তার মাঝে
তুমি কি আমার মূৰ্ত্ত মানসী, প্রেম-সুন্দর সাজে ?
তরল হইয়া গলিয়া পড়িছে বকুলের মধু যত
মন-মধুপের নাহি গুঞ্জন শুধু ভুঞ্জনে রত !
গন্ধ যে তার পুলকিয়া দেহ, আকুলিয়া প্রাণ মন
শিহরিয়া তনু, আকুল বাতাসে দেয় তব পরশন।
অন্তরে তব কত মধু আছে, কত প্রেম কত প্রীতি
কত রূপ দেহে, কত রস প্রাণে, কণ্ঠে করুণ গীতি ।
পরশ তােমার এমন মধুর বিরহ-বিধুর পাশে
স্মৃতির সরণী বহি নিশিদিন এখনও ভাসিয়া আসে!
এত সুন্দর, এত সুগন্ধ মদির আবেশে ভরা
এত পবিত্র, এত উজ্জ্বল, এত উন্মনা-করা,
এত যে গভীর, এত গম্ভীর, এমন মৌন মূক
শুচিতায় ভরা স্নিগ্ধ-প্রতিমা--মহিমায় ভরা বুক।
তােমারে আজিকে মনেপ্রাণে ওগাে জেনেছি বুঝেছি ভালাে
ঢালো মধু প্রাণে ওগাে মধুময়ী, ঢাললা তুমি আরও ঢালাে’ ।

প্রেমের চিহ্ন
হৃদয়রক্ত মন্থন করি’ আঁকিয়া দিয়েছি প্রেমের চিহ্ন
অঙ্গে অঙ্গে তব,
লালিমা তাইতাে উঠেছে ফুটিয়া এমন করিয়া
অদ্ভুত অভিনব।
সেতাে শুধু নয় দেহের চিহ্ন ওগাে অভিন্ন
মন তাহা ভাল জানে,
সকল অঙ্গ ছাইয়া এখন লভেছে আসন
অন্তর মাঝখানে।
অস্থির মাঝে পেয়েছে স্বস্তি, মজ্জার মাঝে
সফল সজ্জা তার,
বক্ষরক্ত প্রবাহের মাঝে মৃদু কম্পনে
হয়ে গেছে একাকার।
2
অঙ্গ-চিহ্ন পেয়েছে সঙ্গ, কতনা রঙ্গে
অনু পরমাণুময়,
কেমন করিয়া মুছে ফেলে দেবে ? প্রেমের চিহ্ন
মুছিলে যাবার নয়।
তুমি যত তা’রে মুছিবারে চাও, লজ্জার রাগে
আরও লাল হয়ে ওঠে,
তােমার মনের গােপন কথাটী, অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠার মাঝে
শত গুণ হয়ে ফোটে।

মধুমালতী
যুগল বাহুতে ঢাকিতে চাও যে মুছিবারে চাও
চোখের লজ্জা করি’
চেয়ে দেখ ওই প্রেমের চিহ্ন রাঙিয়া উঠিল করপদ্মের
দুটী পল্লভ ভরি”।
একটী প্রেমের লজ্জা ঢাকিতে শতেক লজ্জা
প্রকাশ হইয়া যায়,
তােমার ত্রস্ত গােপন-বাসনা বিফল হইয়া
করিতেছে হায় হায় !
মনে যাহা চাও জীবনে মরণে, কতনা আদরে
প্রাণে যাহা ভালবাস
তাহারে লইয়া কিসের লজ্জা? সফল হলে যে
তাই ভেবে শুধু হাস।
আমার বুকের রক্তে ফুটেছে প্রেমের চিহ্ন শক্ত তাহারে
মুছে ফেলে দেওয়া হাতে
প্রদীপ লুকায়ে রাখিবারে চাও হে মাের পরাণ প্রিয়
গভীর আঁধার রাতে ?

মনের মাণিক
মনের মাণিক উঠেছে জ্বলিয়া
আঁধার হইল দূর ;
রােশনাই আজ শুধু রােশনায়ে
অন্তর ভরপুর।
ওরে, জীবনের গতি ছিল এত দিন
বাঁধনের মাঝে হারা
আজি ছুটে চলে আবেগ আকুল
ব্যাকুল পাগল পারা !
আর কোনও বাধা নাই,
তিমিরে অধীর লুকোচুরি খেলা
কোথা হবে তার ঠাই ?
পথের কষ্ট নাই ওরে নাই
আলােকে পুলক জাগে
আজি দেখ চেয়ে স্তিমিত নয়নে
নয়নাঞ্জন লাগে,
পঞ্জর মাঝে যে হতাশা ছিল
অন্তরে যত কালি,
সব দূরে গেছে, মাণিক দিয়েছে
হাজার প্রদীপ জ্বালি-
আঁধার কোথায় আর
মাঝি গান গায়, তুফান থেমেছে
সুখে করে পারাপার !
১০

মধুমালতী
।
আজিকে মনের নীপ নিকুঞ্জে
হবে নাকি হাের খেলা,
ফাগের গুড়ায় হবে লালে লাল
এমন সন্ধ্যাবেলা-
ওরে, কুঙ্কুম আন্ চুয়া চন্দন
আন পিচকারী গােটা
আজিকে রঙের বাদল ঝরিয়ে
রঙের ফোয়ারা ছােটা ।
আজি কা'র শুভদিন ?
কে বাজালে বাঁশী এমন করিয়া
কে ছুইল মন-বীন্।
চেয়ে দেখ ওই কদমের গায়
ওকি শিহরণ জাগে,
মনের গােলাপী মন্দির আবেশ
যুগল নয়নে লাগে।
তমালের ডালে ময়না ডাকে যে
শ্যামা শীষ দেয় ধীরে,
দোয়েল কি বলে সে কি বােঝা যায়
শিখী নাচে তরু-শিরে,
যুথীর পরাণময়
এ কি কম্পন এতটুকু প্রাণ
কেমনে এ সুখ সয় ?
ওরে জলে জলে আজ আলাের জোয়ার
হৃদয়-যমুনা কূলে--
কোন্ কিনারার নিশানা করিয়া
ঢেউ চলে হেলে দুলে ?
১১

চিরঋণী
কি লিখিব কাব্যকথা কি গাহিব প্রেমের সঙ্গীত
প্রিয়ে ?—আজিকার দিনে পৃথিবীর সমস্ত ইঙ্গিত
তােমা পানে বাহু তুলি জানায় যে কাতর মিনতি
আমি তার অর্থ ভাল জানি। সেবারতা তুমি সতী
আপনার সাধনা মন্দিরে ; অর্ঘ্য ভরি’ সাজাইয়া ডালা
রাখিতেছ যার তরে,—অন্তরের একান্ত নিরালা
কোণে যে বাসনা পুষ্পসম উঠিল ফুটিয়া,
দলে দলে মধু গন্ধ, হৃদি-বন্ধ আপনি টুটিয়া
কখন লুটায়ে পল দেবতার পায়ে পাওনি সন্ধান,
আত্মভােলা, সর্বস্ব দিয়াছ তুমি দেহ মন প্রাণ,
তবু সদা ভয়াতুর—কি বুঝি পারনি তারে দিতে
তারে বুঝি ফাঁকি দিয়ে লুকাইয়া রাখিলে কি চিতে-
যারে তুমি দিতে চাও আপনারে সর্বস্বান্ত করি’!
আমার এ তৃষিত জীবনে রূপ নিয়ে আসিলে সুন্দরী।
ও তনু তনিমা বেয়ে যে লাবণ্য পড়িছে গড়ায়ে
রুক্ষম মরু-কাঠিন্যের পরে ; যে আলােক পড়িল ছড়ায়ে
আনত আয়ত আঁখি-পল্লব না মেলিতে চমকি
আচম্বিতে হেরি তাই মুগ্ধ হয়ে দাড়ানু থমকি ;
ক্ষণিকের দিব্য জ্যোতি চিত্তাকাশে ধ্রুবতারা সম
চঞ্চল ধরার বুকে স্থির শােভা অতি মনােরম !
;

মধুমালতী
রূপের প্রদীপ জ্বালি কামনার দেয়ালী উৎসবে
আপনারে বিলাইয়া আমারে আপন করি লবে
এই ছিল সাধনা তােমার দেবী,-হয়েছ সফল ?
যা দিয়েছ তার কাছে যা পেয়েছ নিতান্ত নিস্ফল।
ওষ্ঠে তব মিষ্ট হাসি, কণ্ঠে তব মধুর মূচ্ছ না
হৃদিপদ্ম-পাদ্য-অর্ঘ্যে এতদিন করেছ অর্চনা,
কি পেয়েছ প্রতিদানে তুমি তাহা ভাল জান প্রিয়ে
সর্বহারা রিক্ত প্রাণ, তােমার হৃদয়ে ব্যথা দিয়ে
গ্লানি ভরা মিথ্যা বাক্যে বলিয়াছি প্রণয়ের দান
বিষ পাত্র হাতে দিয়ে বলিয়াছি কর সুধা পান।
হাসি মুখে সহিয়াছ, উৎসর্গের গৌরবে উজল
অচঞ্চল মূর্তিখানি, অবিচারে হয়নি বিহবল ।
;
তাই মাের মর্ম মাঝে এই কথা বাজে বারম্বার
সুগভীর বেদনার সুরে, অনাঘ্রাত কুসুম সম্ভার
হেলায় গিয়েছি পায়ে দলে, পাছে পায়ে লাগে মাের ব্যথা,
শঙ্কা তব কস্তু বক্ষে, নয়নের স্নিগ্ধ কাতরতা
অশ্রু হয়ে ঝরিল ধরায়, সে কথা যে ভুলিতে পারিনি
নিজেরে বিলায়ে তুমি করিয়াছ মােরে চিরঋণী।

প্রেমের পরশ
মনের মাঝে কান্না যখন জাগে
শক্ত তারে চুপ করিয়ে রাখা,
চেষ্টা-করা মুখের হাসি তখন
দেখায় যেন মলিন, কালিমাখা
চোখের কঁাদন নীরব থাকে বটে
মনের কঁাদন বড় বেশী রটে।
-
আড়াল দিয়ে মুছতে গেলে চোখ
আকাশ-ভাঙ্গা বৃষ্টি আসে নেমে
প্রাণের কথা প্রাণের মাঝেই রয়
কেন এমন নিথর হয়ে থেমে ?
কঁাদন সে যে হৃদয়-ছেড়া কঁাদন,
একে একে ছিড়ছে বুকের বাঁধন।
হাসি দিয়ে কান্না চাকা শুধু
নূতন করে আগুণ জ্বালা প্রাণে
মনের সাথে যুদ্ধ করা মিছে
কান্না কঁাদে ছন্দে সুরে গানে,
হাজার তারে যখন পড়ে ঘা
মন যে তখনমােটই নড়ে না ।
আসা-যাওয়া সেই ত কালের গতি
তবে কেন কেঁদে ভাসাই ধরা ?,
সেই কথাটা বুঝতে নারি আমি
কেন মিছে মনকে পাগল করা।
১৪

মধুমালতী
সবার চেয়ে এই কথাটা ঠিক
মুখ চেয়ে মাের নয়ন নিৰ্ণিমি !
সন্ধ্যা সকাল কেবল আনাগােনা
শুধু মুখের একটি কথার আশে,
হঠাৎ যদি চোখােচাখিই হয়
সােহাগ ভরে একটু খানি হাসে;
একটু হাসি একটি মধুর কথা
তেই যাবে প্রাণের কাতরতা ।
আদর করা সােহাগ করা শুধু
বুকের পরে আমায় টেনে নিয়ে,
হাতের পরে হাত দুখানি রেখে
কথায় কথায় শতেক চুমা দিয়ে !
ধন্য আমি,আমার প্রাণের কাছে
প্রেমের পরশ নিবিড় হয়ে আছে।
অসহ
বঁধূ দূরে-বঁধূ দূরে
গাও অনাহত মধুসুরে।
অতি দুঃসহ পরশ তােমার
কাছে থেকে তাই সহে না আমার
দূরে সরে যাই, তবু যদি পাই
মনের গোপন পুরে।
দূরে আছ তাই মােরে ভালবাস
চলে যাও তাই ফিরে ফিরে আস ;
আদর করিতে হয় গাে নিঠুর
কাঙাল বেদনাতুরে।

বিনিময়ে
শত সাধনায় যে ধন লভিনু কত কামনার পরে
তাহারে রাখিনু দু’হাতে আগুলি আপনার বুকে করে ;
হৃদয়-রক্তে পুষিনু তাহারে কত না যত্ন করি’
মুখপানে চেয়ে গেল কতদিন, বিনিদ্র-বিভাবরী,
পলকে প্রলয় নয়ন-আড়াল যদি ক্ষণেকের তরে
কত যে শঙ্কা আসিত পরাণে শত অঘটন স্মরে ।
পথ-কণ্ঠক বিঁধিলে চরণে বাজিত আমার বুকে
নয়নের জল পাগল করিত তাহার একটু দুঃখে ;
এক নিমেষের একটু সুখের ক্ষণিক হাসির তরে
সারা জীবনের সঞ্চিত প্রেম দিয়েছি উজাড় করে।
মরম-তন্ত্রে বাঁধিনু তাহার কম-কণ্ঠের সুর
চিত্ত-চকোর প্রেম-সুধা পানে হয়ে র’ল ভরপুর ;
আমারে ঘেরিয়া রাখিনু তাহারে তবু কত ভয় মনে
যাহা ছিল তার সব দিয়ে গেল, কেমনে পরাণ ধরি
শূন্য আমারে করিল পূর্ণ নিজেরে রিক্ত করি’!

অনাগত
কেন তুমি অমন করে’
চেয়ে থাক মুখের পানে
বুঝতে কিগাে পারছ না সই
দুখের কাটা বিঁধছে প্রাণে ?
তুমি কেন শিউরে ওঠো
বুঝতে তুমি পারবে না যে,
ব্যথার ব্যর্থ হও কেন গাে
তাইতাে ব্যথা বক্ষে বাজে ।
বুকের মধ্যে কেমন করে
কিসের ব্যথা নিয়ে আসে
পাঁজরের এই হাড়গুলাে সব
নড়ে ওঠে গভীর শ্বাসে ;
মনের কঁাদ রুখতে গিয়ে
নয়ন ছুটায় হাজার নদী
জানি আমি এ সব কারণ
রাখব জেনেও নিরবধি।
জেনে শুনে করছি কিগাে
তাইতাে বলি--তোমার জেনে
ফল হবে না—আমি দেখ,
ভাগ্যটাকেই নিলাম মেনে !
সারা বুকে তুমি আমার
মিশিয়ে আছ পরশ হয়ে
১৭

মধুমালতী
বুকের মাঝে সে কি কাপন
সত্যি তােমায় ঝক্ষে লয়ে ;
ওষ্ঠ তােমার উঠলে কেঁপে
প্রাণের বাঁধন যায় যে খুলে
এই দেহটার সব খানি যে
বিশ্ব দোলায় ওঠে দুলে ;
গণ্ড তােমার সয় না ছোঁয়া
আপনি রঙীন হয়ে ওঠে
চুমার ভরে এক নিমিষে
হাজার গােলাপ আপনি ফোটে,
কেন এমন হয় তা জানি
জেনেই বা কি করছি বল?
“জেনে শুনে বরা পাগল”
এই কথাটাই সত্যি হল!
এই যে দুটী বাহুলতায়
বাঁধলে আমায় কঠিন ডােরে
আপন হাতেই ছিড়বে বাঁধন
বলতে পার কেমন করে ?
আমার চোখের এক ফোঁটা জল
নয়ন দিয়ে মুছিয়ে নিতে
এলিয়ে পড়া চুলের রাশি
যতন করে গুছিয়ে দিতে
বুক দিয়ে যে বুকের ব্যথা
জুড়িয়ে দিতে আলিঙ্গনে

মধুমালতী
পরশ দিয়ে সকল দেহে
সােহাগ তােমার সঙ্গোপনে।
আদর সােহাগ চুমার মাঝে
লজ্জাবতী কও না কথা
আনমনায় আনাগােনা
এই টুকুতেই দেয় যে ব্যথা।
এই যে গভীর এই যে মধুর
জানি এরও অর্থ জানি
তবু কেন সয় না প্রাণে
মন কি আমার অভিমানী ?
দিন যে আমার যাবে কেটে
রাত্রি এসেও দেবে দেখা,
কেমন করে কাটছে জীবন
এই কথাটাই ভাবব একা;
প্রভাতের এই আলাের প্রদীপ
ভুবন ভরে উঠবে জ্বলে,
কিরণ তাহার হিরণ বরণ
ছড়িয়ে দেবে থলকমলে,
ফুলফোটা বন মধুর করে
গাইবে পাখী তেমনি সুরে,
প্রাণটাকে মাের উদাস করে’
নিয়ে যাবে কোন্ সুদূরে ;
রােদের তেজে আঁউরে যাবে
ঘুঘু-ডাকা দুপুর বেলা,

মধুমালতী
সাঝের বাতাস ঝিরঝিরিয়ে
জল নিয়ে যে করবে খেলা,
রাতের আঁধার আবে সাথে
চাদের আলাে তারার মালা,
আমি জানি বাড়বে তাতে
এই বিরহের দারুণ জ্বালা !
এই যে আমি মিশিয়ে আছি
তােমার মধু স্পর্শমাঝে,
জড়িয়ে আছ এই যে আমায়
হৃদয় ভরা হর্ষ-লাজে--
আমায় ছেড়ে প্রিয়তমে
চাওনা হ’তে স্বর্গসুখী,
আমার ব্যথায় ব্যথিত তুমি
দুঃখে আমার সর্বদুখী ।
আমার নয়ন জলের ধারা
সয়না জানি তােমার প্রাণে
আমার মলিন মুখের ছায়া
তােমার বুকে বেদন হানে।
জানি ইহার মূল্য জানি
ফল কিছু নাই এ সব জানায়
অনাগত এই বিরহ
তবু কেন এমন কাদায় ?
জানি তুমি আসবে ফিরে
আবার আমায় নেবে বুকে
२०

মধুমালতী
সােহাগ ভরে আদর করে
রাখবে আমায় সুখে দুখে ;
জান কি গাে জান তুমি
তােমায় ছাড়ার কত ব্যথা
ওগাে আমার প্রিয়তমা
আমার লজ্জাবতী লতা ?
প্রেমের পাল্লা
ভারি চোটপাট—খুব কড়াকড়া বুলি
-না হয় আজকে দিয়েছ দু’গাছা রুলী।
চুল
ওঠে তাই দিয়েছ যে তেল কিনে
তা’তেত তােমায়রা গরজ কম দেখিনে!
কপালের টিপ ?--দুখানা আলতা পাতা ?
ওঃ! ছাতা দিয়ে তাই কিনে ফেলেছেন মাথা।
হলুদ রঙের সূতাে এক ফেটি কই
এদিকে বলেন,-“তুমি ছাড়া কারাে নই।”
নাকছাৰীটাত ভবড়বে বেমানান
ভালবাস কত তাই বুঝি এ জানান ?
দুল দিতে ভুল একমাস যার হয়
সে কেন দেখায় ‘বেবাগী হ’বার ভয় ?
?

ঘুম ?-আমি
?
মধুমালতী
মিছে কথা গুনাে কেমনে যে মুখে ফোটে
এখনও যে পূবে চন্দ্র সূৰ্য্য ওঠে;
আমার জন্য খেটে খেটে তুমি সারা ?
আগে ভেবে দেখ কথাটা কেমন ধারা।
নাক ডেকে ঘুম ? কখন শুনলে বল ?
দিনে
কথাটা কেমন হ’ল ?
তুমিত জাননা মার কাছে বসে বসে
রামায়ণ পড়ি, খরচ দিই যে কসে’
তােপ ভােরে উঠি, তখনি রাঁধার তাড়া,
বাবুর—ঘুম ভাঙ্গে না চায়ের পেয়ালা ছাড়া!
ঘর ঝাঁট দেওয়া, একগাদা পান সাজা
ওঠা নামা করে পড়ে গেল মাের মাজা,
এর মাঝে কর টেবিল বাজিয়ে গান
সত্যি বছি, -আশ্চান্ করে প্রাণ।
সাবানের কথা? বলােনাক’ মুখ নেড়ে
আতরের শিশি ? কালত নিয়েছ কেড়ে !
সাবান মাখিনে তাতে দেবে বােজ গালি
বাক্স এদিকে প্রভুর দয়ায় খালি।
গন্ধ মাখিনে সন্ধ করেছ মনে,
কত কথা তুমি বলেছ দিদির সনে;
“হেনা”র শিশিটা উপহার দিলে সই
“লক্ষীটি মেখাে” বলে দিলে পই পই,
বেছে বেছে কেনা অমন সাধের “জুই”
তােমারে লুকিয়ে বল দেখি কোথা ধুই?

মধুমালতী
ভাল যে বেসেছ সেটাকি এমন বেশী,
তাই নিয়ে কেন সারাখণ রেষারেষি।
কথা না কইলে কেঁদেছ সত্যি বটে
কার দোষ ? বলি-বুদ্ধি নেই কি ঘটে ?
উপরের কলে’ জল ওঠেনিক কাল
সংসার করা জাননাত নাজেহাল !
ঘুম পেয়েছিল কইতে পারিনি কথা
অমনি বাজিল পরাণে দারুণ ব্যথা?
রেগে শুলে খুঁয়ে বিছানাটা ছেড়ে দিয়ে
অনুতাপ কত-কেন করেছিলে বিয়ে!
কাছ ছাড়া হলে সয়না সেটা জানি ?
তা বলে কেমনে পাল্লায় বড় মানি ?
‘চিঠি চিঠি’ বলে গর্ব করাে না আর
সে গুমাের ওগাে হয়ে গেছে সব বা’র
তিন খানি চিঠি দিয়েছিলে রেখে ঢেকে
দাসী দিয়েছিল পাঁচ খানা একে একে !
যা দিয়েছ তার দ্বিগুণ নিয়েছ ফিরে
মিথ্যা বলােনা রইল মাথার কিরে ।

মধ্য-মণি,
আকাশের ক্ষুধা অসীম হইয়া জেগেছে আমার প্রাণে
শুষ্ক উষর মরুর তৃষ্ণা পরাণের মাঝখানে।
প্রন্তির বায়ু অন্তর মাঝে ফেলিছে দীর্ঘশ্বাস,
নিরবল সঙ্গীবিহীন কাটিল বৰ্ষমাস।
উৰ্ম্মি-মুখর সিন্ধু-বারতা দূর হতে শুনি কাণে
আমার মনের গােপন কথাটি ফোটে নিঝর গানে,
সহকার চায় মাধবী লতায় কলি পাশে অলি ফেরে
অকারণ সেকি কুমুদের হাসি তরুণ-তরুণী হেরে ?
সারা দিনমান করি অভিমান ফোটে না সন্ধ্যামণি
ঊষার আলােকে শেফালি যে ঝরে তারে কি ব্যর্থ গণি ?
কুন্দ কুসুম গন্ধ বিলায়ে ভ্রমরে ডাকিয়া কয়
‘আমার বুকের সবটুকু মধু তুমি ছাড়া কারাে নয়!
বক্ষের সুধা না মিটালে ক্ষুধা গরলের জ্বালা পাবে
অধরের মধু সে কি শুধু শুধু অধরে শুকায়ে যাবে ?
পাহাড়ের বুক শতধা দীর্ণ কি গভীর ব্যথা ভরে
পঞ্জর রাশি বাহির করিয়া তটিনী কাদিয়া মরে ;
পবন পরশে ফুটে ওঠে ফুল ঊষায় গাহে যে পাখী,
এত ভাব এত অভাব ব্যথারে কেমনে গোপন রাখি ?
যজ্ঞ-অনল-হৰি-তৃষ্ণায় বক্ষ ফাটিছে মাের
শ্রান্তিবিহীন বৃষ্টি ধারায় ঝরিছে অশ্রু-লাের।
হৃদয় চাহে যে হৃদয়-পরশ প্রাণ চাহে দেওয়া প্রাণ
বক্ষের ক্ষুধা মিটাতে কে করে অধরের সুধা দান ?
২৪

মধুমালতী
নয়ন চাহিয়া পলক পড়েনা দেহে যে রূপের আলাে
শুধু চেয়ে থাকা তৃষ্ণা বাড়াতে তাও ভালাে তাও ভালাে।
আমারে মাথার মাণিক করিয়া রাখ যদি তুমি মাথে
প্রাণের এ ক্ষুধা বুকের তৃষ্ণা কেমনে মিটিবে তা’তে ?
আমারে পরিতে এত যদি সাধ পরাে সখী তুমি গলে,
জীবনে মরণে সােণার বরণে রহিব নিয়ত জ্বলে ;
তব মণিহার কণ্ঠে তােমার দুলিব ভাগ্য গণি
প্রিয়তমে, তুমি করিও আমারে তাহার মধ্যমণি !
জবাবদিহি
তােমায় আমি ভালবাসি কি না ?
হাজার রকম প্রমাণ আছে তার
বুঝবেনাক’ ‘জবাবদিহি বিনা
ঋণের তাগিদ নাইক মােটে যার ।
শুনবে তবে বলি শােন শােন
বুঝে শুঝে প্রমাণ হাতে গােণ :-
এই দেখনা কারণ অকারণে
তােমায় শুধু বলছি নানা কাজে,
তুমি শুধু ওগাে তুমিই আমার
শাসন চালাও হৃদয়-রাজ্য মাঝে,
কেন সেটা বলি ?—কেন জান ?
অবান্তরে যদিই মনে টান ।
২৫

মধুমালতী
কি জানি গাে কেমন করে তুমি
তাকাও আমার মুখের দিকে, যেন
আমি একটা মস্ত অপরাধী
কেন ? তােমার এত প্রতাপ কেন ?
চেঁচিয়ে তাকাও তুমি এমন জোরে
প্রাণটা আমার ওঠে কেমন করে ।
তুমি যদি চোখের আড়াল হও
নিমেষ যেন অশেষ মনে হয়,
পথের সাড়ায় বুকের সেকি কাপন
হতাশ হয়ে চমকে ওঠে ভয় !
পায়ের শব্দ খুবই চেনা বটে
পদে পদে তবু যে ভুল ঘটে ?
কঠিন তুমি তবু চোখের জল
অনেক সময় রুধতে পার কই,
তােমার চোখের কান্না দেখে আমি
একেবারে এমন পাগল হই—
-ভাবি সবই আমার অপরাধ
মন জুড়ে দেয় করুণ আর্তনাদ।
হয়ত তুমি ঘুমিয়ে আছ রাতে
আমি আছি সমান ভাবে জেগে,
মুখ চেয়ে মাের পলক পড়ে নাক’
হঠাৎ কেন উঠমু বেজায় রেগে ;
কথা তুমি কও না কেন হায়
মন যে আমার প্রমাদ গণে তায় ।
২৬

মধুমালতী
শুধাই তােমায় এমন অনেক কথা
নিজেই আমি জানি না তার মানে,
ঘুমিয়ে আছ দাও না কোন সাড়া
মন মরে তাও বিপুল অভিমানে !
শুধু কথার অনেক মালা গেঁথে
পরাই, খুলি সকল জাগর রেতে ।
চিবুক গণ্ড অধর রঙিন করে’
দিলাম তােমায় কত রকম চুমাে,
মন কেঁদে কয় একটু জায়গা না গাে ?
মুখে বলি,—ঘুমাে ওরে ঘুমাে !
আমার জাগা তোমার ঘুমের মাঝে,
তুমি আমি আছি নানান সাজে !
চেনা পথও এমন ভুলে যাই
তােমার কথায় পাগল যখন হই,
সােজা পথও চলতে দেখি বাঁকা
মাঝখানেতে হঠাৎ থেমে রই ;
তােমায় ছেড়ে হয় না পথে চলা,
তােমার কথায় আমার কথা বলা ।
ভাল মন্দ যা খুসী তাই তােক
তােমার কথা শুনতে ভালবাসি,
চোখের জলে প্রাণ ফেটে যায় তবু
বুকে রাখি তােমার অশ্রুরাশি ।
দেখলে হাসি ধন্য হয়ে যাই,
কান্না দেখে তেমনি দাগা পাই।
২৭.

মধুমালতী
অগােছাল সামাল করে তুমি
সাজিয়ে তােল আমার ভাঙা ঘরে,
হেলা ফেলা গুছিয়ে রাখ তুমি
আপন হাতে কত যতন করে,
কেন কর ? কেন কিসের টানে
একটানা স্রোত বয় যে দুটী প্রাণে।
আমার যে কাজ তােমার পরশ বিনা
ব্যর্থ হয়ে অকাজ হয়ে যায়-
তুমিই তারে পুণ্য করে তােল
পরাণ আমার তাইত তােমায় চায় ।
কি কাজ আমার আছে তােমায় ছাড়া,
ওগাে আমার সকল কাজের বাড়া !
বিপর্যয়ের ধাক্কা খেয়ে খেয়ে
পাঁজর যেন পড়ছে খসে খসে
দীর্ঘশ্বাসের দমকা হাওয়ার মন
শিথিল হয়ে পড়ছে যেন ঢসে।
দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বুকে
শুধু দিলে একটা চুমু মুখে,
কোথায় গেল দুঃখ বিপর্যয়
সরিয়ে দিলে সব হতাশার ভয় !
অভিমানে মনের মাঝে শুধু
ঘনিয়ে ওঠে অন্ধকারের কালাে,
তর্ক কহে মনের কাণে কাণে
এর চেয়ে যে মরণ তােমার ভালাে-

মধুমালতী
ওষ্ঠ কঁপে কণ্ঠে মিলায় কথা
গুমরে মরে শুধু নীরব ব্যথা।
বুকের পরশ ছুইয়ে দিলে তুমি,
মন বলে গাে এতই আপন তুমি ?
তুমি যখন পরশ কর মােরে
সকল দেহ শিউরে ওঠে কেন ?
বুকের মাঝে মেঘের দুরু দুরু
কোথায় আছি ঠিক থাকে না যেন।
সইতে নারি অধর পরশন
এমন সুখের তুমিই আপন জন।
সুখ তুমি দাও এতই হৃদয় ভরে
এই বুকে তা সইবে কেমন করে ?
কি বল আর কি যে কর তুমি
পাই না সঠিক ঠিক ঠিকানা তার
মনটা আমার এমন ছেয়ে আছ
তােমার মনের খবর পাওয়া ভার।
দুষ্ট, তুমি করবে কেবল জয়
আমার ভাগ্যে কেবল পরাজয় ?
তাতেই আমি অসীম সুখের ভাগী
আমি তােমার এমনি অনুরাগী ।
তােমার কথা মনে হ'লে আমার
পথকে আমি পথ বলে কি মানি,
লক্ষ যােজন তফাৎ থেকে কাণে
শুনি তােমার মুখের মধুর বাণী,

মধুমালতী
দূর যে তখন নিকট হয়ে আসে
মুখখানি মাের আঁখির আগে ভাসে !
ভাষা দিয়ে ভালবাসার কথা
বলতে যাওয়া নিতান্ত দুরাশা,
এইটে শুধু জেনে রেখো মনে
অামার পথেই তােমার যাওয়া আসা-
লক্ষ যুগের জীবন মরণ পণে
পথের যাত্রী তুমিই আমার সনে ।
চির-আদরিণী
ওগাে মাের আদরিণী ।
তােমারে যে আদর করিনি
সেকি মাের অবহেলা
অবজ্ঞায় দূরে পায়ে ঠেল— ?
দীর্ঘ রাত্রি দীর্ঘ দিনমান
বিস্তারিয়া আপনার উম্মুখ পরাণ
আমার সম্মুখে,
সুখে দুঃখে
আমারে ঘেরিয়া তুমি আছ নিরন্তর।

মধুমালতী
তােমার অন্তর
নিঙাড়িয়া দিলে ঢালি’ অমৃতের ধারা;
তুমি আত্মহারা
বিলাইলে দেহ মন, সৌন্দর্য্যের অফুরন্ত খনি;
চিয়ােজ্জ্বল মণি,
আপন দীপ্তিতে তুমি হৃদয়ের অন্ধকার হরি
আছ মাের তনু মন ভরি’!
তবু যে পারিনি কেন করিতে আদর,
প্রতিদানে সমাদর
দিইনি যে অজস্র সম্ভারে ;
বসাইয়া দ্বারে
কখন চলিয়া গেছি সংসারের কাজে
সেই ব্যথা নিরন্তর অন্তরে যে বাজে!
জানি, তুমি আমা লাগি’ হায়,
কুসুমিত বাসর সজ্জায়,
স্তব্ধ অর্ধরাতে
বিস্ফারিত আঁখিপাতে
সাজাইয়া বেদনার রক্ত আঁখিজল
একান্ত বিহ্বল,
আমারে পাওনি কাছে লাে মাের সজনি।
কত ব্যর্থ বিনিদ্র রজনী
যাপিয়াছ নিরালায় ; বাহিরের এতটুকু ধ্বনি
কম্প্রবক্ষে উঠি’ রণরণি
আমার পায়ের তালে
তখনি যে তােমারে শুনালে

মধুমালতী রুদ্ধশ্বাসে করিয়া উৎসুক, এই বড় দুখ- তখনি ভাঙ্গিয়া গেছে প্রতীক্ষার কল্পনার ভুল। তােমার মালার ফুল প্রভাতের আলো ও বাতাসে ঝরে গেল নিতান্ত নিরাশে! সে কি শুধু তােমারি বেদনা ? আমার কি নহে আরাধনা দেবতার পায় আমার বুকের মাঝে নিত্যকাল রাখিব তােমায় ? - ওগাে মাের প্রেমভিখারিণী তুমি যে গাে চিরপূজারিণী আমার মন্দির তলে ; নিতান্ত বিরলে সারাক্ষণ বেড়াও সঞ্চরি’ পুষ্পপাত্রে অর্ঘ্য তব বসন্তের আনন্দ মঞ্জরী। তব প্রেমচন্দনের মধুগন্ধে করি’ ভরপূর সৌন্দৰ্য্য মাধুৰ্য দিয়ে ধরণীরে করেছ মধুর আমার আঁখির আগে, এই মনে লাগে ওগাে মাের সেবার প্রফুল্ল প্রতিমা তােমার ত নাহি কোনও সীমা, ছড়ায়ে পড়েছ তুমি অন্তর হইতে দিগন্তরে। থরে থরে সাজাইয়া আপনারে বস্তু-বিশ্বে কল্পনার দেশে,

মধুমালতী
শেষে কি দাড়ালে এসে
মম আঙ্গিনায়
একদিন উৎসব-সন্ধ্যায়
হাতে ল'য়ে বরমাল্যখানি ?
হৃদয়ের রাণী,
তোমারে চেয়েছি আমি জন্মে জন্মে লক্ষ শতবার
তাইত লজ্জার নাহি পার।
প্রাণমন পরিপূর্ণ করি’
অণুপরমাণু ভরি’
ব্যাপ্ত হ'য়ে যে রয়েছে আজ
তাহারে এড়ায়ে আমি সাধিয়াছি কোন শুভ কাজ ?
আমারে যে ভাল বাসিয়াছ,
স্বর্গের আনন্দধ্বনি মাের তরে কণ্ঠে আনিয়াছ,
রচিয়াছ মাের তরে
সুখছায়াসুপ্ত নীড় দরিদ্রের জীর্ণ খেলাঘরে,
আমার সে নন্দন ভবন
ঊষার আলােকে দীপ্ত ; বসন্তের দখিনা বন
বয়ে যায় মাের আঙ্গিনায়,
পাপিয়া দোয়েল শ্যামা আমারে যে ডেকে ডেকে যায় ;
অতি পরিপাটি
গরবী করবী ফোটে রক্তরাঙ্গা, অতসী দোপাটি,
ভুইচাপা ফোটে ভুয়ে,
মাধবী যে নুয়ে শুয়ে
ঢেলে দেয় মধুর অম্রাণ

মধুমালতী
হে কল্যাণী, সে ত সব তােমারি হাতের পুণ্যদান!
তবু আমি হই যে বিমুখ
সে ত মাের নয় সুখ !
আমি ভাল জানি
তােমা হতে এ সংসার আমারে যখন লয় টানি’
বজ্রমুঠি প্রসারিয়া,
পরাণের প্রিয়া
তুমি ত জান না প্রাণ কেঁদে ওঠে কি করুণ সুরে !
তােমা হতে যত দূরে
সরে যাই,
ততই যে আপনার সর্বস্ব হারাই।
তােমাময় হয় যত প্রাণ
সংসারের অক্ষমতা ততই যে করে অপমান!
কোনও দিন হয়ত ডেকেছ মােরে,
নিত্রালস ঘােরে
হয়ত কইনি কথা,
নিদারুণ ব্যথা
লেগেছে তােমার মনে,
কোনও দিন শুধু অকারণে
বাড়ায়েছি তােমার লাঞ্ছনা,
সে যে প্রিয়ে কি নির্মম আমারে বঞ্চনা
আমি তাহা ভাল জানি;
ক্ষণিকের অসম্মান তব, মাের চিরজীবনের গ্লানি !
সফলিয়া জীবন যৌবন
৩৪

মধুমালতী
সেই যে মিলন-রাতে প্রণয়ের প্রথম চুম্বন
আমারে করিল জয়,
সে ত কভু ভুলিবার নয়।
তােমার প্রথম দৃষ্টি গােপন-সুন্দর
দেখে নিল হৃদয়-কন্দর ;
তােমার নয়ন পাতে
দেখিনু তােমারে মুৰ্ত্ত মেঘমুক্ত নিৰ্ম্মল প্রভাতে!
মন্থিয়া হৃদয়-সিন্ধু লভিলে যে কৌস্তুভ রতন
করিয়া যতন
পরাইলে আমার গলায়
সে কি প্রিয়ে কভু ভােলা যায় ?
আজও যে বুকের মাঝে
আমার সকল কাজে
তােমার প্রথম স্পর্শ জেগে আছে করি অনুভব
জীবনের বিপুল বৈভব !
মাঝে মাঝে শােনা যায় কাণে
তােমার প্রথম কথা হৃদয় বাখানে।
ব্যগ্রবাহু আলিঙ্গন পাশে
বক্ষের ত্বরিৎ কম্প এখনও যে ফিরে ফিরে আসে,
সেকি প্রিয়ে অবহেলা করে
অনাদর ভরে ?
সে কি মিথ্যা একান্ত অলীক ?
তােমাপানে চাহি নিৰ্ণিমিখ
তােমা হতে দূরে যাই সরি’
;

মধুমালতী
তােমারি সম্মুখে ধরি
অন্তর-প্রদীপ খানি মাের,
ওগাে মনােচোর
বাহিরে তােমায় যত করেছি বর্জন
অন্তরে তোমারে তত করেছি তজ্জন!
পরশ-পাগল
-বুকের মাঝে কেমন করে তাইতে
একটুখানি পরশ তােমার যখন তখন
হয় যে আমার চাইতে।
না চেয়ে যে থাকা আমার দায়,
তােমার বুকের পরশ যদি না দাও তবে
বুক যে ফেটে যায়।
সকল দেহ শিথিল হয়ে আসে
বুকের বসন নয়ন জলে ভাসে।
দেহের যত কঁপুনি সব থমকে দাড়ায়
মনের কিনারায়,
দীর্ঘশ্বাসও রুদ্ধ হয়ে বুকের মাঝে
হঠাৎ থেমে যায় ।
বলার কথা শিউরে উঠে যেন
কণ্ঠে মিলায় এমন করে কেন ?

মধুমালতী
আপন মনের কল্পনাতে সুখের স্বপন
রঙীন করে’ বুনি।
কখন তুমি উঠবে জেগে তাইতে বসে
রাতের প্রহর গুণি।
ওচোখ দিয়ে চাইলে পাগল হই
ঘুমিয়ে গেলে আবাক হয়ে রই ;
কি যে কথায় জমছে ব্যথা
থেকে থেকে প্রাণ যে ওঠে কেঁপে,
তাইত তােমায় এমন করে
আমার বুকে হঠাৎ ধরি চেপে ;
আশঙ্কা যে তাতেও করে মানা
ঘুম ভেঙ্গেছি এই ব্যথা দেয় হানা।
দুঃখ দিলাম জীবন-ভরা ঘুমের সুখেও
হ’লাম আমি বাদী,
হৃদয়-ক্ষুধা মিটবেনা ত, দোষ নিও না
তা’তেই সাধাসাধি ।
বুঝতে পেরেও বুঝতে নারি হায়
এই কথাটা মনে রাখাও দায় !
ঘুমের ঘােরে অনেক কথাই কইছি আমি হয়ত ব্যথা
দিইছি তােমার বুকে
আমার অবুঝ ব্যথার কালি ঘনিয়ে উঠে ছড়িয়ে প’ল
তােমার উজল মুখে !

মধুমালতী
ভাবতে গেলে পাগল হয়ে যাই
দুটো কথা এক করে যে বুঝব মানে
তারও শক্তি নাই।
সকল কথার খেই হারিয়ে সাদায় কালাে করি’
তােমায় পাওয়া মনের মাঝে তুলছি শুধু আবর্জনায় ভরি’!
জানি সবই মন যে মানে না
কি হবে তা ভাবতে জানে না ;
‘এখন'টারে পায়ের দাপে ধূলায় ভরে’ মনের দর্প
কছি শুধু মাটি,
তবু মনে জেনে রেখাে মনের যা’ তা মনের মাঝেই
রইবে ঠিকই খাঁটি।
জানি,
ক
আমার চাওয়ার অনেক বেশী করে’
দেহ মনের অর্ঘ্যদানে আমায় দেছ ভরে।
দিও তুমি পরাণ-বঁধু পরশ তােমার দিও,
ঘুমের ঘােরে একটী বারও তােমার বুকে নিও।

মায়াবিনী
কঠিন তুমি পাষাণ চেয়েও বেশী
কোমল তুমি নেতিয়ে পড়া লতা
কণ্ঠ কটু নিমের মত ক্ষণে,
ক্ষণে মধু মধু তােমার কথা !
তােমার মুখে রৌদ্র মেঘের রাশি
লীলার ছলে কতই খেলা করে
ফুলের গােয় ফোটে বিমল হাসি
কান্না আবার মুক্তা সম ঝরে।
লতার মত জড়িয়ে কভু ধর
আঁউরে ওঠ তপ্ত পরশ পলে।
কখনও বা কমল কলি সম
রবির তাপে ফুটছ দলে দলে।
ঢেউয়ের মত লুটিয়ে পড় কভু
হৃদয়-তটে, উছলে তুমি সারা
নড়িয়ে তুমি সরাও বাহির থেকে
হাড়ের বাঁধন, ভাঙ্গতে মরমকারা
গুরুর মত কঠোর আদেশ দিয়ে
কখনও বা বুঝছ তুমি মােরে,
লুটাও পায়ে দাসীর মত কভু
আমা হতে অনেক দূরে সরে !

মধুমালতী
এ কি তােমার নিত্য নব লীলা
মায়ার খেলা বুঝতে পারি কই ?
পেয়েও তোমায় পাইনা কেন আমি
তাই ভেবে ত অবাক হয়ে রই।
মৌন প্রেম
কেন মুখ পানে চেয়ে রও
তোমার মনের কি গােপন কথা
চোখে চোখে তুমি কও?
কত সাধ যেন হৃদয়ে তােমার
কত আশা যেন প্রাণে,
শত সাধনার গভীর মন্ত্র
শুনালে নীরব গানে ।
আমারে দেখিয়া কেন
আয়ত আঁখির পাতায় পাতায়
ব্যথার অশ্রু হেন ?
দু’হাতে তােমারে আনি' আশুলিয়া
বক্ষে আমার ধরি’ ।
লাজ গুণ্ঠনে আবরি’ বয়ান
দূরে কেন যাও সরি’ ?

মধুমালতী
কও কও একবার
হে মাের মৌন মানস প্রতিমা
ছলনা করােনা আর!
বিনয় কনে প্রবােধ মান না
অভিমানে পাও ব্যথা,
নয়ন মুছা’তে নয়নের জল
তবু মুখে নাই কথা ।
তােমার দীরঘ শ্বাসে
পরাণ আমার ফেটে যায় ওগাে
অন্তরগ্লানি আসে।
একবার তুমি মুখ ফুটে বল
কি চাই আমার কাছে
তুমি যা’ নিয়েছ তার বাড়া আরাে
কিছু কি আমার আছে।
কোনও দিন অজানিতে
স্বপনের ঘােরে মােহের মায়ায়
ব্যথা কি দিয়েছি চিতে ?
মৌন প্রেমের মধুর মহিমা
কাদায় পাগল মন
অকথিত বাণী আর কত কাল
নীরব র’বে এমন ?
সহিতে পারি না আর
ভিখারী করিয়া কাঙাল জনায়
রুধিলে হৃদয়-দ্বার ?
৪১

মূৰ্ত্ত রাগ
এতকাল ধরে যে গান গেয়েছি
হৃদয়ের তালে তালে,
যে সুর সেধেছি প্রাণপণ করি’
প্রাণের অন্তরালে ;
যে রাগ রাগিণীচয়,
ছিল মাের মন-ময়,
আপনার মাঝে আপনি ফুটিয়া উঠি
চরণে তােমার পড়েছিল কবে লুটি?
সারা জীবনের ভাষাহীন গানে
ছিল কি তােমার ভাষা ?
আমার নিভৃত হৃদয়-কুঞ্জে
ছিল কা’র যাওয়া আসা ?
সুরের নিঝর ধারা,
ভেঙ্গেছে পাষাণকারা,
তবু আমি কিছু জানিতে পারিনি হায়
মধু মুচ্ছ না মুরছি পড়েছে পায়।
মনের আড়ালে ছিল যা মৌন
নিয়ত নীরব তামে,
তুমি আজ তারে করেছ প্রকাশ
আমার মুখর গানে।
8२

মধুমালতী
সুরের গুঞ্জরণ,
পাগল করিল মন,
মম সঙ্গীত তব ইঙ্গিতে ভরা
মূৰ্ত্ত রাগে যে আপনি দিয়েছ ধরা।
ব্যর্থ সঙ্গীত
কত আর গাব গান !
গান গেয়ে মন পাই না তােমার
কেঁদে ওঠে সারা প্রাণ!
ছন্দে গাথায় চাহিয়া তােমায়,
লজ্জায় মরে যাই,
সাধা সুর বৃথা খুজে ফিরে আসে
কোথা গেলে তােমা পাই?
একবার শুধু, শুধু একবার, একবার ফিরে চাও,
আমার গানের মূচ্ছনাটুকু চরণে লুটাতে দাও!
অবশ অঙ্ক ঘেরিয়া আমার
আঁধার নামিল ধীরে,
কণ্ঠ যে মাের রােধ হয়ে আসে
পঞ্জর ভাঙ্গে গভীর হতাশে

মধুমালতী
প্রাণ ফেটে যায় মরণ কাঁদনে
বুক ভাসে আঁখি নীরে।
কতদূর তুমি, কতদূর ওগগা, তুমি আছ কত দূরে
তােমার চরণ পরশ লভিতে গাব আমি কোন্ সুরে ?
তুমি কি গানের পারে ?
কেন বুকফাটা সুরের মিনতি
ফিরে আসে বারে বারে ।
অনন্ত
তােমার মুখে রূপের আলাে
ভুলালাে মাের মন ভুলালাে
ডুবিয়ে দিল রূপ-সাগরের মাঝে ;
অসীম ঘেরা সাগর বেলা
ঝিনুক নিয়ে ঢেউয়ের খেলা
জলের কণায় রূপের কণা রাজে!
পবন এসে তুফান তুলে
গাইল কি গান সাগর কূলে
অথির পাথার পেলাম না ত থৈ,
রত্ন আশে ডুবতে মানা
ভাগ্য আমার নাই অজানা
মনকে তবু রুখতে পারি কৈ ?
৪৪

মধুমালতী
লক্ষ ঢেউয়ে উথলে উঠি
রূপ যে তােমার উঠল ফুটি
কোটি ছেড়ে কোনটি আমি ধরি’?
লক্ষ তুমি অসীম হলে
বক্ষে আমার পড়লে ঢলে
বাহুর সীমায় ধরতে যেয়ে মরি।
আমার প্রাণের সকল চাওয়া
মনের মতন রতন পাওয়া
ডুব দিমু তাই রূপসাগরের মাঝে
প্রাণ বুঝে না প্রাণের টানে
লক্ষ মাণিক ঝিলিক হানে
প্রাণের মাঝে ; তাই মরে যাই লাজে ।
৪৫

দূরের বঁধু
বঁধু, আছ তুমি কত দূর ?
দূরের ব্যর্থ তিয়াসায় বুঝি
হয়েছ এত মধুর !
কাছে থাক তুমি, তােমার প্রভায়
মম চিদাকাশ উজ্জ্বল ভায়
এতটুকু কণা অভার থাকে না
হয়ে থাকি ভরপূর !
তাই, মৰ্ম্ম তােমার মরমে মরমে
তােমার চেতনা সকল করমে
রয়ে যায় তবু থাকে না আবেশ
আমারে ভাব নিঠুর।
দূর হ’তে কাণে পশে অনিবার
কোমল-কষ্ঠী বীণা
ডেকে কয় মােসর অভাগা অবােধ
বুঝি আর ফিরিবি না !
মম,
অন্তরে ওঠে কি যে উতরােল
শিরায় শিরায় সে কি কল্লোল,
নখরে নখরে অধরে অধরে
পরশ-পিয়াস জাগে ;
৪৬

মধুমালতী
চঞ্চল হৃদি-সাগর উপরি
অপরূপ রূপ আহা মরি মরি!
নিরাখিতে চাই পলকে হারাই
প্রাণে বড় ব্যথা লাগে !
t
তমার রূপের সে মধু মাধুরি
কত রসে ওগাে ভরা,
দূর হ'তে তব ওই যে লাবণী
অন্তরে পড়ে ধরা।
তব, অঙ্গের ছায় বহে যে মলয়
এত দূরে তবু হয়নি বিলয়,
নীলাকাশ ভরা চাহনি তােমার
পরাণ পাগলকরা।
যদি তুমি ওগাে ধরা নাহি দাও
দূরই আমার ভালো
মন-মন্দিরে আরতির দীপ
আপনার হাতে জালাে।
৪৭

আড়ালে
চোখের আড়াল রইলে বটে
মনের আড়াল নও,
চোখের পাতা বুজিয়ে জলে
লুকিয়ে মনে রও।
এও কি তােমার খেলা ?
মনের মাঝে লুকিয়ে কাটাও
সন্ধ্যা সকাল বেলা।
ডাকলে সাড়া নাইক তােমার
আঁখির অাগে কৈ ?
এই যে তুমি আমার মনে
কইছ কথা সংগােপনে,
হৃদয় মাঝে শুধুই তুমি
অবাক হয়ে রই।
নয়ন মেলে চাইতে নারি
লজ্জা আসে মনে,
চোখের দেখা দেখতে চাওয়া
হৃদয়-পােরা ধনন ?
ক
ওগাে হৃদয়-রাণী
মধুর তােমার মধুর পরশ
ব্যথার প্রলেপ জানি
৪৮

মধুমালতী
অসীম হয়ে উঠলে ফুটে
ছাপিয়ে সারা প্রাণ ;
চোখে দেখার খেদ মিটেছে
মনে পাওয়ার দিন এসেছে,
হৃদয়ৰীণা তােমার সুরে
উঠল গেয়ে গান।
নয়ন যাহার খোঁজ পেলে না
মন পেলে তার দেখা,
আমার সকল প্রাণের পথে
তােমার চরণ রেখা।
বিদায়ক্ষণে
হঠাৎ কালাে মেঘের ছায়া নামল মুখে
তোমার যেন,
উতাল ঢেউয়ের পাগল মন জাগল বুকে
আমার কেন ?
ও মুখখানি মলিন হলে ঢাইতে নারি
নয়ন ভরে,
তােমার বুকের একটু ব্যথাও সইতে পারি
কেমন করে ?
৪৯

মধুমালতী
তাতেই আমি হাসতে গেনু যাবার বেলা
হৃদয় বেঁধে
মন বলে হায় আমায় নিয়ে আবার খেলা
উঠল কেঁদে ;
বাঁধন হারা কান্না তখন জলের ধারায়
আসছে নেমে
আমার ব্যথায় লজ্জানত চোখের পাতায়
রইল থেমে।
;
সেই যে তােমার বারেক চাওয়া নয়ন তুলে
আমার পানে
আমার সকল দেহখানি উঠল দুলে
তারই টানে ;
বলতে যেয়ে ফুটল না মুখ, কোন্ যে কথা
কুণ্ঠা লাজে
ঠোটের আগায় মিলিয়ে গেল, আজ সে ব্যথা
বক্ষে বাজে ।
তােমার বুকের পরশটুকু মিল নাক
বিদায় বেলা,
সে ত আমার ভাগ্যলেখা নয় ক’
তােমার অবহেলা।
হাজার কথা বেজার হয়ে রইল আমার
হৃদয় ঘেরি’
বিদায় বুঝি এমনি নিদয় সইল না আর
একটু দেরী!
৫০

দেয়ালী
আজি দেয়ালীর সকল প্রদীপে বিশ্বের সারা প্রাণ
জ্বলিয়া উঠিল রভস রঙ্গে, এ কার অগ্নিদান ?
সুনীল চন্দ্র-আতপের তলে অসীম অশেষ হিয়া
বাঁচিয়া উঠিল কাহার যজ্ঞে জীবনী-মন্ত্র নিয়া ?
প্রাসাদ শিখরে কে জ্বালায় দীপ আঁচল আড়ালে ঢাকি
কে দেখে কদলী-তােরণের আলাে বাতায়ন পাশে থাকি ?
কুটীর দেহলি তুলসীমঞ্চ দুয়ারের আলিপনা
উজল করিল দীপের আভায় কোন্ সন্ধানী জনা ?
একি গাে রমণী মনের মাধুরী বিকাশে অগ্নিশিখা
আঁধারের গায় রচিবারে চায় কাহারাে স্মিরিতি লিখা ?
হরষ-আলােকে জাগে কি তরাস বাতাসের যাতায়াতে
কেমনে বাঁচিবে এত ছােট প্রাণ এমন আঁধার রাতে।
একি আলাে নয় ?--মানব-মনের বাসনার দীপমালা
তবে কেন তার এত আয়ােজন, কেন এ আলােক জ্বালা ?
বাসনার শিখা ওই কেঁপে খুন আকাশের মুখ চাহি
মনের আগুনে দহিছে দশায় পলকের থির নাহি।
প্রাণের প্রদীপ আপনার মাঝে আপনি পুড়িয়া সারা
গভীর আঁধার পাথারের তলে হয়ে গেল দিশাহারা।

উল্কাপাত
উদার আকাশ নীল-নিৰ্ম্মল কিরণোজ্জ্বল ধরণী,
শান্তমধুর বিমলকান্তি স্নিগ্ধ হরিৎ-বরণী।
শ্যামল নব পল্লব-দল ছল-ছল-ছল শিশিরে,
ঘন-বনবীথি মুখরিত, গীতি ভেসে যার দশদিশিরে।
শাখায় শাখায় পাতায় পাতায় কচিকিশলয় ধরিয়া,
নবীন জীবন সরসধারায় উঠিয়াছে ওই ভরিয়া !
চুম্বনে জরা যৌবন পায়, মৃত পায় প্রাণ চকিতে
অসাড় জাগিয়া সাড়া দিয়ে ওঠে আগুন শিখায় ভখিতে।
কলি ফুটে ওঠে ফুল হয়ে, ফুল অপনা বিলায় গন্ধে
মধু পিয়ে প্রাণ-বঁধুয়া বিভাের গায় নানা সুরে ছন্দে।
উতলা বাতাস মাতাল হইয়া শুধু করে যাওয়া আসা যে,
চারিদিকে রটে যে নীরব কথা কাহার প্রাণের ভাষা সে?
ইন্দ্রধনুর সাতরঙে রাঙা আজিকে পরাণ লীলাময়
বন্ধুর পথে ঝরঝর ঝরে নিঝর-সরে’ শিলাচয়।
উলসি বিলসি কূলে কূলে ভরা অসীমে চলেছে তটিনী,
যৌবন যেন ধরে না বক্ষে নৃত্যচপলা নটিনী।
তরুণ অরুণ-কিরণ আসিয়া পরশ বুলায় নিখিলে
হৃদয় জাগিয়া কহে চুপিচুপি-গত নিশি তারে কি দিলে ?
সকাল বেলায় বকুল তলায় খেলার মালটী পেয়েছি
শত জনমের অতৃপ্ত প্রাণে তাহারেই বুঝি চেয়েছি।
নিমেষে কাটিল সারা দিনমান তন্দ্রা-বিবশ-নয়ানে
শ্যাম-তরুছায়ে আঁচল বিছায়ে অলস-আবেশ-শয়ানে।
সন্ধ্যায় মেঘ ঢেলে দেয় রঙ, সেকি হােরিখেলা আকাশে
দূর সাগরের অজানা গানের সুর ভেসে আসে বাতাসে ;

মধুমালতী
আমার নিশায় শুধু চঁাদ ওঠে খােলে তারকার বিপণি
শুধু জ্যোৎস্নার গাঢালা আবেশ মুখচেয়ে বুকে কঁপনি।
দূর হতে শুনে বেণু-সঙ্কেত প্রিয়-অভিসারে চলেছি,
স্বপনের ঘোরে না জানি কি বাণী, কার কাণে কাণে বলেছি।
সে যে প্রিয়তম রূপে অনুপম অন্তর ধন জীবনে
প্রো-সম্পদে অচলা লক্ষী আমারি রচিত ভবনে।
আঙিনায় তার পায়ের চিহ্ন তারি করাঘাত দুয়ারে
রূপ নিয়ে ফেরে চারিদিকে মাের তাহারি মধুর মহীরে !
পঞ্জর মাঝে রি নিশ্বাস বক্ষের মাঝে তারি কম্পন উঠেছে,
সারা দেহময় তাহারি আবেশ মনময় সে-ই ভাব হয়ে আজ ফুটেছে।
নয়নে তাহার অপরূপ রূপ, কাণে কাণে তারি মধুময় ভাষা জাগিয়া
নিশিদিনমান অধরে আমার, তারি অধরের পরশন-মধু লাগিয়া ।
হৃদয়ে বাহিরে তারি ফুলদোল, তারি হােরিখেলা উতরােল
হর্ষের একি হিল্লোল ওঠে, সারা প্রাণে আজ দ্যায় দোল।
একি হলাে কোথায় সে মােহিনী প্রকৃতি
অনুপরমাণু তার প্রাণে দেয় জাগাইয়া ভাতি।
প্রতি অঙ্গে ক্ষত মাের, দীর্ণ বুকে একি দীর্ঘশ্বাস
মৃত্যুর কিনারে এসে কঁপে প্রাণ, শঙ্কিত বিশ্বাস ;
ঐ কাপে ধরণীর স্বর্ণাঞ্চল, প্রভঞ্জন আসে
উপাড়িয়া তরুশ্রেণী, মহাবট কঁপিছে তরাসে ।
সাগর হয়েছে ক্ষুব্ধ, তােলে হাত ভাঙ্গিতে আকাশ
তটিনী নাগিনী সম ফেলে যেন বিষের নিশ্বাস !
উত্তাল তরঙ্গ ভরে’ ভেসে যায় ফুল ভারে ভার
অর্ধপ্রস্ফুটিত কলি সৌন্দর্য্যের আনন্দ সম্ভার।

মধুমালতী
ভ্রমর গুঞ্জনহীন খঞ্জন খুঁজিয়া মরে ঠাঁই,
আহত ব্যর্থতা শুধু বুক চিরে বলে নাই নাই।
সূৰ্য্য ঢাকে ক্ষোভে মুখ, চন্দ্র লুকাইল অন্তরালে
ধরার আলাের ধারা বিমলিন দিচক্রবালে।
আমার হৃদয়-মণি নিতে চায় কোন্ সে শয়তান
প্রাণ ছিড়ে প্রিয়তমে নিতে চায় হেন শক্তিমান ?
তিলে তিলে জমাইয়া রাখিয়াছি যেই ধন পুষে’
সেই সে বুকের রক্ত নিশ্বাসে সে নিতে চায় শুযে?
একদণ্ডে পণ্ড করি উৎসবের সব আয়ােজন
কেমনে কাড়িয়া লবে পরাণের প্রিয়তম ধন ?
পর্বত ভাঙ্গিয়া পড়ে সৌন্দৰ্য্য নিমেষে হলাে হত
কোন্ অত্যাচারী দৈত্য নিল আজ সৰ্বধ্বংসী ব্রত ?
ঘনকৃষ্ণ মেঘমালা ঘনাইয়া উঠি’ অকস্মাৎ
বিদ্যুৎস্ফরণ সনে হানিল কি ভীম উল্কাপাত ?
আষাঢ়ে
আকাশ আজি ভরিয়া গেছে শায়ণ-ঘন-জলদে
চকিত চোখে চপলা চলে চমকি;
মেঘের ডাকে ধরণী কঁপে
শরীর উঠে শিহরি,
ঘাটের পথে দাড়ায় বধূ থমকি!
৫৪

মধুমালতী
বিরামহীন বাদল-ধারা, ঝরিছে দিন যামিনী
ডাহুক সাথে ডাহুকি ডাকে সঘনে,
পুলক ভরে নৃত্য করে ময়ুর আজি চাহিয়া
সজল-মেঘ-কাজল-পরা গগনে।
নদীর জল উঠিছে ফুলি দু’কূল গেছে ছাপিয়া
সাগর পানে ধাইছে কত পুলকে
সাগর আজি বিথারি দেছে আগল-হারা হিয়ারে
শতেক প্রাণ আঁধার মাঝে ঝলকে।
আজিকে শুধু ভাবিগাে বসে কুসুম-নিভ-পরাণে
নিঠুর আমি কেমনে দলি চরণে
এসেছি চলে দেখিনি চেয়ে কাজল-আঁখি সজল
নয়ন জলে বাজিছে তাই স্মরণে।
দরদী
বুক ভরে’ দিলে অধর-সুধায়
প্রাণ ভরে দিলে গানে,
ফুটাইলে তুমি দেহ-লাবণ্য
অমিয় পরশ দানে।
নয়নে চাহিয়া খুলিলে নয়ন
অনুরাগ রাগে ভরা ;
৫৫

মধুমালতী
সঙ্গীতে শত ইঙ্গিত দিয়ে
আপনি দিয়েছ ধরা।
অভিমান-রেখা টানিয়া ভূরুতে
নামা’য়ে আয়ত আঁখি,
গণ্ডগেলাসে গোলাপী সরাব
ভরপূর করি’ রাখি
মূক হয়ে শত নীরব ভাষায়
মুখর হইলে তুমি,
প্রাণের তৃষ্ণা বাড়াইয়া দিলে
শুধু একবার চুমি।
কুসুম-কোমল অধর তােমার
পদ্মের দু’টি দল,
প্রেম-মহিমায় মাধুরী-রক্তে
করিতেছে ঢলঢল ;
যুগল বাহুতে বঁধিয়া জানালে
হৃদয়ের ব্যাকুলতা ;
প্রকাশ করিলে কতভাবে তুমি
গোপন মনের কথা।
আকুল আবেগে জড়ায়ে বক্ষে
শিহরিয়া দিলে দেহ,
দরদীর দানে ভরিয়া উঠিল
আমার শূন্য গেহ !

বিদায়-বেলা
আজি বড় দুখ এই ভাঙ্গা বুক
দহিছে,
কাল যে বিদায়, কাণে কাণে তাই
কহিছে।
বীণা ফেলে দাও, পূরবী কি আশা-
রাগিণী
বাজায়াে না আজ, হাতে ধরি অনু-
রাগিণী ।
শুধু, মাথাটি তােমার বুকে মাের দাও
এলায়ে,
দূরে থেকে গাে আজি বিদায়ের
বেলা এ ।
আজিকার রাতে একটা কথাও
কমােনা
কাজল নয়নে যেন জল-ভার
ব’যােনা!
চারিদিকে শুধু মলিন নীরব
মায়াটি,
বিছাইয়া দিক অসীম অটুট
ছায়াটি ।

মধুমালতী
ছেড়ে দিতে আর ছেড়ে যেতে বাজে
হৃদয়ে,
কথা ক’য়ে তার ব্যথা কি বাবে
নিয়ে ?
আজিকার দিনে কালিকার কথা
তুলােনা,
মিলন-লগন পলে চলে যায়
ভুলােনা,
আজি পলকের পুলকের মহা-
রজনী,
শুধু বুকে এসো বাহু-পাশে বাঁধ
সজনী ।
বর্ষ-স্মৃতি
দিনগুলাে সব উড়াে-পাখী
কেমন করে এসেছিল
জোড়া দেয়া আমার বুকের খাঁচাতে,
পালকে তারা আলােক মাখি’
পুচ্ছ তুলে নেচেছিল
বুকের জমা রক্তটুকু নাচাতে।

মধুমালতী
মনের আদার, দিইছি অৱে
যতন করে আপন হাতে
ভুবন-ভােলা কণ্ঠ সুরে ভেসেছি,
মনে পড়ে দিবস রাতে
সেই কথাটি বারে বারে
মিথ্যারে কি শুধুই ভালবেসেছি ?
দিনগুলাে সব ফাগুন দিনে
বকুল হয়ে ফুটেছিল
শুন শাখার সকল পাতা ভরিয়া,
কুড়িয়ে নেবার মানুষ চিনে
আপন মনে হেসেছিল
আঁচলে মাের আপনি প’ল ঝরিয়া।
উতের হাওয়ায় সজাগ হয়ে
পরাণ-বঁধুর পথের পানে
ব্রইল চেয়ে মনটি আমার দুরন্ত,
হারিয়ে যাওয়ার ভয় ভাবনায়
রেখেছিলাম আগলে প্রাণে
আজ দেখি হায় দিনগুলাে মাের ফুম্ভ।
দিনগুলাে যে প্রাণসাগরে
উতাল মাতাল পাহাড় প্রমাণ
ঢেউ তুলিয়া কল্লোলিয়া ছুটেছে,
তপ্ত বালির সেই সায়রে
বিলিয়ে দিয়ে সমস্ত প্রাণ
আহলাদে যে তটের বুকে লুটেছে।

মধুমালতী
তীরের তরী বাঁধন কাটি
ভাসিয়ে দেছে দিল-দরিয়ায়
আজকে তারা তেমনি স্বধা কূলে কি ?
মরীচিকার আবৃছায়াটি
আঁখির আগে, বুক ফেটে যায়
সাগর শুকায় আমারি কোন্ ভুলে কি ?
দিনগুলো মাের জ্যোছনা রাতের
সমস্তটুক আবেশ নিয়ে
ঘুমিয়ে যেত আশায় ভরা বুকেযে,
কণ্ঠে মালা প্রিয়ার হাতের
আকুল অধর-সুধা পিয়ে
রঙীন প্রাতে উঠত জেগে সুখেযে !
সারা দিনের সকল স্মৃতি
ঘনিয়ে উঠে সন্ধ্যা বেলা
বিছিয়ে দিত মিলন-মধুর মায়াটি,
গভীর প্রেমের এই কি রীতি
এইকি প্রিয়ার প্রেমের খেলা
ওই সুদূরে অথির ধূসর ছায়াটি ।
t
৬০

ফিরে চল ওরে, তুই যদি এত দুর্বল, এত অক্ষম, এতই দৈন্য তাের তবে কেন বল্ বাহিরিলি পথে, এতদিন পরে, রাত না হইতে ভাের ? তুই ভেবেছিলি—শেষ-যামিনীর একটু আঁধার এখনি কাটিয়া যাবে চেনা-পথ ছেড়ে যেতে নাহি যেতে, নয়ন আমার উষার আলােক পাবে, পরিচিত স্বর-লহরীর মাঝে প্রভাতের পাখী এখনই ধরিবে তান বন-মল্লিকা সেফালি দু’হাতে গন্ধ বিলা’য়ে বিভাের করিবে প্রাণ, ভােরের বাতাস কাণে কাণে মাের ক’য়ে যাবে ওগগা হয়নি তােমার ভুল তােরই চেনা-লতা কবে কত কথা দু’কাণে পরিয়া নিশির শিশির-দুল। 'ওরে নির্বোধ, ভেবেছিলি তাের এই পথই চেনা, হবে দেখাশুনা চির-পরিচিত সনে, আপন গরবে উপেখি’ আঁধার, তাই বুঝি তুই চলেছিলি আনমনে ? কি হয় ? তাের চেনা-পথ কোথা ?কবে কার দেখা ?- কিসেরই বা পরিচয় ? স্বপনে বা মনে অথবা কি ক্ষণে দেখছিস যারে, সে কিরে আপন হয় ? আপনার মনে তুলিয়া তর্ক, কত দিন রাত করেছিস যদি হেলা আজ কেন তবে নিশার আঁধারে করিবারে সাধ প্রাণ ল’য়ে ছেলা খেলা! তুই ভেবেছিলি প্রভাত বেলায় প্রাণের খেলায় বিজয়-মাল্য প: ফিরে যাবি ঘরে নৰ্ম্মসখার দুটী হাত ধরে’ সবে বিস্মিত স্কুরি শ্যামল অঙ্গ বহিয়া গলিয়া পড়িবে তােদের তরুণ কিরণ রাশি যাত্রা সফল ভাবিয়া কমল কৌতুকভরে আপনি উঠিবে হাসি ।

মধুমালতী পাখী গেয়ে যাবে বন্দনা-গান, জাগাইয়া প্রাণ নবযাত্রার পথে রচিয়া স্বর্গ সুখের স্বপন ইন্দ্রধনুর কল্পনা মনােরথে ! ঘরের দুয়ারে আসিয়া সহসা বাঞ্ছিত-ধনে বক্ষে আগুলি ধরি, মুখপানে চেয়ে কহিবি আদরে, শত চুসনে অধর গণ্ড ভরি, ‘তােমারে খুঁজিতে বাহিরিনু পথে, কখনও ভাবিমি পাব তােমা হেন ধনে, জনমে জনমে ছিলে বুকে মাের, ছিলেগাে আমার সকল পরাণ মনে। এই দেখ বুকে তােমার পরশ, অধরে তােমার মৃদু মধু পরশন, তব পথ চেয়ে অপলক আঁখি—এতদিন পরে এলে কি পরাণ ধন । তােমার মানসী মুর্তিটী আছে কত রূপ নিয়ে, সুন্দর হয়ে অন্তর মাঝখানে, কাণে লেগে আছে স্বর-মুচ্ছনা, মধুর হইয়া উঠিতেছে তব গানে।” কভু নিধি বুকে বুকের পরশ, দু’টি হাত নিয়ে নয়নে বুলাবি কভু, শুধু মুখ চেয়ে কাটাবিরে কাল তৃষিত পরাণ তৃপ্ত হবে না তবু। চুম্বনে ক্ষণে যৌবন-সুধা জীবন-মরণ-সিন্ধু মথন করি’ চিরকাল তরে ওরে ও কাঙাল, রেখে দিবি তাের শূন্য হৃদয় ভরি। তাের সে প্রাণের প্রিয়তমা সখী, নামাইয়া আঁখি কহিবে মধুর ভাষে, --“তােমার ও-বুকে যদি ঠাই পাই,পরাজয়ে বল কি আমার যায় আসে?” এই ভেবেছিলি, একেছিলি ছবি কতনা বর্ণে মনের মতন করি’ তাইরে পাগল ছুটে এলি চলে, চলেছিস তাই আজও এই পথ ধরি। ফিরে চল, ওরে ফিরে চল তুই, ওরে দুর্বল, ওরে ও দৃষ্টিহীন, -শেষ রজনীর ঘাের কেটে যাক ঊষার আলােকে ফুটিয়া উঠুক দিন। হৃদয়ে যাহারে আপনার জানি প্রিয়তম ব’লে অন্তরে দিলে ঠাই আজ তারে শুধু মন দিয়ে চাও স্বরূপ তাহার তােমার বাহিরে নাই।

ভাগ্যলক্ষী
তুমি এলে উৎসবের আনন্দমুখর এক রঙীন সন্ধ্যায়
সন্ধ্যা-মণি রজনীগন্ধায়
আবরিয়া তখনি ; লীলায়িত আনন্দের খনি,
আমার নয়ন-আগে দাঁড়ালে যখনি
ভরিয়া সুবর্ণ ঝাঁপি কল্যাণের পঞ্চশস্য দিয়া,
তখনি কঁপিল মাের হিয়া
অজানিত আশঙ্কায় ;
মৰ্ম্মের সহস্র তন্ত্রী ব্যথিয়া উঠিল বেদনায় ।
তুমি এলে, তারি সাথে এল প্রিয়ে, সংসারের নিষ্ঠুর সংঘাত।
তরুণ অরুণদীপ্ত যৌবনের নির্মল প্রভাত
দীর্ঘশ্বাসে হয়ে এল ম্লান ;
আমার সমস্ত প্রাণ
বক্ষ পঞ্জরের দ্বারে ছিন্নপক্ষ বিহঙ্গম সম
তােমারি সকাশে প্রিয়তম,
ছুটে যেতে লুটে পল বারবার,
দেখা তবু পেল না তােমার।
বসন্তের শুভ আগমনে
যে ফুল ফুটিয়াছিল মৰ্ম্মতলে নিকুঞ্জ কাননে
কুড়ির মাঝারে তার ফুটিবার বেদনা গভীর,
সারাদিন ব’য়ে গেল দখিনা-সমীর
ব্যর্থ হ’ল আসা-যাওয়া তার।

মধুমালতী
হৃদয়ের রুদ্ধ বেদনার
মৰ্ম্মছেঁড়া করুণ-কাহিনী, ব্যক্ত হ’ল ভ্রমর গুঞ্জণে,
ভুঞ্জি’ মধু ক্ষণে ক্ষণে
প্রলুব্ধ করিয়া ফুলে রাড়াইল বিরহের ব্যথা ;
হৃদয়-মাধবীলতা
এতটুকু পেল না আশ্রয় ;
কলি বুঝি ফুটিবার নয় !
বসন্ত বিদায় নিল শুষ্ক কলি দীর্ণ কিশলয়ে
হৃদয়-শােণিতে লেখা স্মৃতি-রেখা রাখি’ দিঘলয়ে ।
তুমি এলে, সঙ্গে করে নিয়ে এলে অফুরন্ত হাসির সম্ভার
নিমেষে উল্লসি ওঠা সমুদ্রের তরঙ্গ অপার ;
দুলিয়া ফুলিয়া উঠি’ ধেয়ে এলে কল কল কল,
রৌদ্রতপ্ত বালু তট তল
ব্যগ্র বাহু আলিঙ্গনে ঘিরি’
ক্লেদসিক্ত ম্লান দেহে মুহূর্তে পাথারে গেলে ফিরি,
বুকে নিয়ে আঘাত নির্মম !
প্রাণের অধিক প্রিয়তম
একান্ত নিকটে এসে হয়ে গেছ নিতান্ত সুদূর,
নিয়ে এলে হাসি রাশি, রেখে গেলে ক্রন্দনের সুর
অনন্ত এ সমুদ্র বেলায়।
শ্রান্ত দীর্ঘ অবেলায়
শুধু শুনি বেদনার বাঁশী
রজনীর অন্ধকার ঢেকে দেয় দিবসের হাসি।
{

-
মধুমালতী
তুমি এলে শিরে বহি পরিপূর্ণ পূজার থালিকা,
যে নব মালিকা-
নিরালায় বসি তুমি সযতনে রচিলে সুন্দরী,
আপনার লাবণ্য মাধুরী
প্রতি পুষ্পে মাখাইয়া তার, দিলে মাের গলে,
তখন কি জানিতে সরলে
কোরকে কোরকে তার কীট জাগে অতি ভয়ঙ্কর ?
বিদীর্ণ করিয়া নিরন্তর
ফুল্ল কুসুমের মালা, মধুগন্ধ নিশ্বাসে নাশিয়া
সন্তপ্ত করিবে শুধু হিয়া ?
এনেছিলে শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য অন্তরের শেষ নিবেদন
সঙ্গে করে ফিরে গেলে মৰ্ম্মছেড়া গভীর বেদন।
,
বিড়ম্বনা
তােমার গলে দিইছি মালা
সেই ত’ আমার লজ্জা,
অগ্নি-মরু-মরীচিকায়
হায়রে বাসর শয্যা!
ফোটা ফুলের দলে দলে
কাটার জ্বালা তীক্ষ্ণ,

মধুমালতী
তােমার সিথেয় দিলাম চিতার
ছাই--সধবার চিহ্ন।
বিয়ের চেলী রঙীন হল
দীর্ণ
বুকের রক্তে,
ধূপের ধোঁয়া করলে আঁধার
দীপান্বিতা
হায়রে যুগল প্রাণের মিলন
হায় বরণের অর্ঘ্য,
মুগ্ধ আঁখির স্নিগ্ধ জ্যোতি
হায় হৃদয়ের স্বর্গ।
হায়রে আমার মনের মাণিক
হায় হৃদয়ের রত্ন,
কলুষহরা জলুষ ভরা
কি জানি তার যত্ন।
ওরে আমার পাথার জলের
জ্যোৎস্না মাখা ঢেউটি,
বিজন আঁধার ঘরের কোনে
যত্নে জ্বালা দেউটি।
ওরে আমার ফুল বাগিচার
ফুলের সেরা পদ্ম, •
ওরে আমার চাদনী রাতের
জ্যোৎস্না অনবদ্য।

মধুমালতী
ওরে আমার মুকুল বনের
বকুল বুকের গন্ধ,
ওরে আমার নিশি ভােরের
উততর হাওয়া মন্দ!
ওরে আমরা সাগরবেলায়
কুড়িয়ে পাওয়া শুক্তি
স্বপন-ছোঁয়ার মােহ মায়া
অরূপ রতন মুক্তি।
তােমার রূপে মুগ্ধ আঁখির
সে কি ব্যাকুল দৃষ্টি,
মন-চাতকের আকুল তৃষায়
বচন-সুধার বৃষ্টি।
নখের ডগায় বহ্নিশিখায়
জ্বলছে রূপের দীপ্তি
বাহুর পাশে বক্ষে বেঁধে
কি সে গভীর তৃপ্তি !
অধর পরে অধর পরশ
ক্ষোেয় শিরা মজ্জা
অথির বুকের থির সাগরে
হায়রে.শেষের শয্যা ।
৬৭

ব্যথার দান
তামার গলে পরিয়ে দিলে বরণমালা,
তার যে জ্বালা
এতখানি
তাকি জানি ?
তােমার বুকের রক্ত দিয়ে ফুলগুলি সব রাঙিয়েছিলে,
গেঁথেছিলে
আপন হাতে
নিজন রাতে;
এই অভাগায় তাই দিয়ে যে করলে বরণ,
ওগাে আমার মনােহরণ,
সে যে মরণ
সেই কথাটা জালে পরে
আমার প্রাণের বরণ ডালা সেই বেদনায় উঠত ভরে।
বাসি পলাশ ফুলের মত
ঠোট দু’খানি ; নয়ন দুটি বারেক তুলে করলে নত,
দেখতে পেলাম মধুর হাসি
সে যে তােমার সর্বনাশী
জীবন ভরা ব্যথায় ঝরা মাণিকের টুকরােখানি
কি জানি

মধুমালতী
•
বিষের সাগর সেঁচে দিলে মানিক হাতে,
জল আমার আঁধার রাতে
এখন দেখি সেই যে আলাে
তাতেই আমার সব হারালাে।
আমার ঘরে,
তােমায় যেমন নিইছি সকল শূন্য করে,
কণ্ঠে আমার তােমার হাতের বরণমালা,
মণির আলা
উজল হয়ে আছে জানি আঁধার মাঝে,
তবু কেন বক্ষে বাজে
মিলনরাতের সেই এতটু হাসির কথা ?
দেয় যে জনা
আনন্দ কি তারই একা,
এমনি লেখা
নেয় যে তাহার ছার কপালে ?
বুকে তাহার আগুন জ্বালে
একটি কথা,-
পেয়েছি সে কি শুধু হৃদয়ভরা নিদয় ব্যথা ?

অদৃষ্টের পরিহাস
ব্যথা কি লাগে না মাের প্রাণে ?
একান্ত নিরালা ঘরে
শ্রান্ত মন ওঠে ভরে
দূর দূরান্তের এক মর্মছেঁড়া গানে।
ধ্বনিতে ব্যথিয়া ওঠে প্রাণ,
স্তব্ধ দ্বিপ্রহর ছেয়ে,
'উম্মাদিনী.আসে ধেয়ে
কি করুণ কাতর আহ্বান।
ওঠে মন,
নিমেষে দুলিয়া
তবু যে পারিনা যেতে
অমৃতে পরাণ পেতে
দগ্ধ বুকে স্নিগ্ধ পরশন
।
সেযে অদৃষ্টের পরিহাস!
মনে হয় সব ফাকি,
মৰ্ম্মের বেদনা ঢাকি
রাত্রি-দিন ফেলি দীর্ঘশ্বাস,
কাটিয়া যাইবে গােণা দিন।
যতদূর দেখা যায়
সুদূর স্বপ্নের প্রায়
সুখস্মৃতি হয়ে আসে ক্ষীণ।
৭ ০

মধুমালতী
কোথা মাের মানসী কল্পনা ?
কে রাক্ষসী মায়াবিনী
শিখাইল বিকি-কিনি
তুচ্ছ সুখ স্বার্থের জল্পনা ।
কোথা মাের হৃদয়ের ধন?
নয়ন আবরি’ মাের
অলক্ষিতে কোন চোর
তিলে তিলে করিছে হরণ?
তােমা পানে চেয়ে হাসি পায়,
লাে মাের হৃদয়-রাণী
মুখে যে সরেনা বাণী
অশ্রুজলে বুক ভেসে যায়!
তবু তুমি চেয়ে মুখপানে,
আশায় বসিয়া রবে,
অশেষ লাঞ্ছনা সবে
গলে যাবে বেদনার গানে।
হায় হায়, এত বিড়ম্বনা!
প্রাণ দিয়ে অপমান
আনন্দের প্রতিদান
পেলে মাত্র মৃত্যু-সম্ভাবনা !

মধুমালতী
মধুমালতীর ফুল্ল কুসুমে গাঁথিয়া মালা
শুধু আরতির অছিলায় দিমু গরল জ্বালা ?
গন্ধ ও মধু দীরঘ নিশাসে উবিয়া যায়,
চরণের তলে দলগুলি বুঝি ঝরিছে হায় !
জীবন ভরিয়া যে ফুল তুলেছি আপন হাতে
কাটার ব্যথায় রচিয়া মালিকা নিজন রাতে
দিয়েছিনু গলে, প্রিয়তমা বলি বরণ করি,
মিলনের আলাে কেমনে ফুরালাে জীবন ভরি’ ?
দেবতা কি আজ বধির হয়েছে মৌন মূক
স্বর্গ-বিলাস ভুলায়ে রেখেছে মর্ত্য দুখ ?
বিশ্বাস আজ মনের কিনারে কঁপিয়া খুন,
পাঁজরের হাড়ে এতদিন পরে লেগেছে ঘূন ;
তৈল-বিহীন প্রদীপের বুক পুড়িয়া ছাই,
উর্ণনাতভর বেড়াজালে ঘেরা মুক্তি নাই।
মনের কোণা যে কালি ঝুলে ভরা অন্ধকার
দেবতা খুঁজিয়া দেখি’ দেউলের বন্ধ দ্বার!
१२

গ্রন্থকার প্রণীত ceপল্লীব্যােঙ্গর পরিচয় পত্র “পজীব্যথা”র পরিচয়পত্র প্রবাসী-শ্রাবণ ১৩২৮ পল্লীব্যথা-কবিতার বই। ডক্টার রাধাকমল মুখােপাধ্যায় ভূমিকায় এই কবিতাগুলির প্রাণের পরিচয় দিয়াছেন। যে-সব মূক-মুখে ভাষা নাই, সেইসব পল্লীবাসী সাধারণ জনের ব্যথাগুলিকেই কবি ভাষা দিয়াছেন; চাষার নিষ্ফল আশা, চাষার উপর জমিদারের জুলুম, সমাজের জুলুম, ভদ্রনামধারীদের জুলুম প্রভৃতির যে-সব ব্যথা তারা নীরবে নিরন্তর সহ্য করে, সেইগুলিকে কবি লােক চক্ষে তুলিয়া ধরিয়া দেখাইয়াছেন—যদি কারাে হৃদয় স্পর্শ করে ও এই ব্যথার সান্ত্বনা দিবার ইচ্ছায় তার সুপ্তশক্তি জাগিয়া ওঠে এই উদ্দেশ্যে। সব কবিতাই প্রাণের দরদ দিয়া লেখা; পল্লীর ছবিগুলি বেশ ফুটিয়াছে ; কবিত্ব সম্পদেরও অভাব নাই। প্রবর্তক-১৩২৭ পল্লীব্যথার বাহিরের বাঁধাই সুন্দর। তার চেয়ে সুন্দর গ্রন্থারম্ভের ভূমিকাখানি। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর, মমতাকরুণ হৃদয়পটে কবি বাংলার আসল ও সাচ্চা হৃদয়খানি তুলিয়া ধরিয়াছেন যে ছন্দোময় বেদনার গানে—সব চেয়ে সুন্দর সেই বেদনা, সেই গান। বলিতে কি, বইখানি আমাদের অত্যন্ত ভাল লাগিয়াছে। সাবিত্রীপ্রসন্ন বাবুর হৃদয়ে খাটি কবিত্ব লুকাইয়া আছে। “কাঙালের নাকি ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নাই, সুখ দুখ হাসি মিছে” কবি সেই কাঙালের হৃদয় লইয়া আপনার নয়নের জলে তাহাদের নয়নের জল মিশাইয়াছেন, “পাঁজর ভাঙ্গিয়া নিশিদিনমান যাদের বহিছে দীর্ঘশ্বাস, তাদের তপ্তশ্বাস আপন শ্বাসে মাখাইয়া ফুটাইয়াছেন, আর অপূর্ব শ্রী ও কারুণ্যে, মমতা ও মাধুর্যে ভরিয়াই ফুটাইতে পারিয়াছেন। ভূমিকালেখকের সহিত আমরাও বলি কবির এই করুণ পল্লীব্যথা আরও জাগুক, দেশময় সে ব্যথা জাগিয়া অসংখ্য দুঃখময় দেহে ব্যাপ্ত হইয়া একটা বিরাটতর জাতির জীবন গড়িয়া তুলুক। এইরূপ ঘননিবিড় ভাবুকতার প্রত্যক্ষ সাহিত্যের ( 3 ) মূল্য ছাড়া একটা জাতিগঠনকারী পরােক্ষ মূল্যও আছে। বাংলায় জাতীয় বিদ্যালয়ে এরূপ বই-ই উৎকৃষ্ট সাহিত্য বলিয়া পাঠ্য হইবার উপযােগী। নারায়ণ-মাঘ ১৩২৭ ‘পল্লীব্যথা পল্লীর অযত্নকণ্টকিত বিজন পথের ঝরা ফুল, এ ভাবের কবিতা নয় প্রাণের কবিতা। সাবিত্রীর কবিতায় ঘরের আলপনা আছে, “বাঁশের খুঁটি তা’তে খানিক কোষ্টা বাধা গ্রাম্য ছবি আছে, “কনে-চন্দনের উৎসব মঙ্গল স্নিগ্ধতা আছে। এই পল্লী-দেবীর দেউল আজ উৎসবহীন, দেশ মরিয়াছে তাই দেশাত্মা আজ রূপহার। সে বেদনাও “পল্লী ব্যথায় করুণ হইয়া বাজিয়াছে- “সন্ধ্যাবেলায় তুলসী তলায় জ্বলে না প্রদীপখানি।” ঢাকা রিভিউ-ফাল্গুন ও চৈত্র ১৩২৭ যাহারা মাসিক-সাহিত্যের খোঁজ-খবর রাখেন, তাহাদের নিকট সাবিত্রীবাবুর নাম অপরিচিত নহে। আর যাহারা কবিতা পাঠ করা নিতান্ত অসম্রতার কাৰ্য্য মনে করেন না, তাহারা নিশ্চয়ই একবাক্যে বলিবেন সাবিত্রীবাবু শুধু কবি নন, সুকবি বটে। কবি : সাবিত্রী প্রসন্নের মমতামণ্ডিত “পল্লীব্যথার সুর আমাদের প্রাণকে মােহিত করিয়াছে। সােণার পল্লী আজ অদৃষ্টের নির্মম পরিহাসে—“প্ৰেতছায়া প্রাণহীন স্তিমিত- নয়ন। “মানুষের দেহে প্রেতের নৃত্য বণতাণ্ডব সম, আপন রক্ত আপনি শুষিছে নিষ্ঠুর নির্মম !” চারিদিকেই অত্যাচার ও অবিচারের অট্টহাস্য। যাহার প্রত্যহ দু’ মুষ্টি অন্ন জোটে না, তাহারও ‘জুলুমদার’এর কবল হইতে মুক্তি নাই। তাই কবি ঘৃণার হলাহল ঢালিয়া দৃঢ়প্রতিজ্ঞ জমিদারের ‘জুলুমদারী’র সজীব চিত্র দেখাইয়াছেন ;- 'ন ( 8 ) যমুনা-চৈত্র ১৩২৭ ‘পল্লীব্যথা কবিতা-পুস্তক। আজকালকার তরুণ কবিদের অনেকের কবি- তার অর্থবােধ করা এক দুরূহ ব্যাপার! তাহারা যেন এই পৃথিবীর সহিত বড় একটা সম্বন্ধ রাখিতে চান না। আশার কথা ; আনন্দের কথা-সাবিত্রী প্রসন্ন ঠিক সেই শ্রেণীর কবি নহেন। আলােচ্য কবিতা গ্রন্থখানির মধ্যে অচিন দেশের অজানা বার্তা নাই ; আধ্যাত্মিক তার ডান নাই—আছে দুঃখ দৈময় দেশের প্রতি সমবেদনাব্যথিত হৃদয়ের আন্তরিক উচ্ছাস। বিশ্বের বাণী নাই—আছে বাঙ্গলার পরপদদলিত উপেক্ষিত দরিদ্রের কাতর হাহাকার। ভুমিকায় শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত রাধাকমল বাবু সত্যই বলিয়াছেন-“আমাদের চির নূতন, চির পুরাতন নিথর-নীর ‘পাগলাদহ’ ও ‘পেত্নী তলার ঘাট’, ‘রামনগরের হাট’ ও ‘দুধপাতিলার মাঠ হইতে যে হাওয়া কবি আনিয়াছেন, তাহা তরুণ-উষার আলােকে সজীব।” সাবিত্রীপ্রসন্ন বাঙ্গলার সাহিত্যরসিকসমাজে অপরিচিত নহেন। শব্দ ঝঙ্কার, ছন্দের লঘু ভঙ্গিমা ইত্যাদি প্রত্যেকটী কবিতার মধ্যে একটা অনাড়ম্বর সহজ প্রবাহের মত বহিয়া গিয়াছে। গাঁয়ের কায়ায় ‘চিত্র ‘তুচ্ছের সম্মান’ ‘চাষার আশা’ কবিতা কয়েকটা পাঠকের মনে পল্লীজীবনের সহজ সরল দৈনন্দিন কর্মের স্বাভাবিক চিত্রের স্মৃতি উদ্বোধিত করিয়া দেয়। সহুরে সভ্যতার লৌহকবলে সৰ্বস্বহারা পল্লীর বিষাদক্লিষ্টরূপ কবি বুক দিয়া অনুভব করিয়াছেন। দরিদ্র কৃষক মজুরের দগ্ধ দুর্ভাগ্যের উপর প্রবলের পৈশাচিক তাণ্ডব ‘অশরীরি প্রেতের নৃত্য অপেক্ষাও ভীতি উৎপাদক। জুলুমদার’ হইতে আরম্ভ করিয়া ‘অকেজোনারী পৰ্য্যন্ত প্রত্যেক কবিতাই অত্যাচার, অবিচার, শােষণ, পীড়নের জীবন্ত আলেখ্য। পঙ্গু স্থবির সমাজের নীরব ঔদাসীন্য, স্বার্থলােলুপ জমিদার ও ধনীর অপ্রতিহত অত্যাচার, পদদলিত দরিদ্রের মর্মান্তিক উক্তি প্রত্যেক কবিতার মধ্য হইতে রুদ্র-করুণ রাগে ঝঙ্কত হইয়া উঠিতেছে। গৌরবময় দেশ-মাতৃপূজার পৌরহিত্যে ব্ৰতী হইয়া আজ যাহারা কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছেন, সাবিত্রীপ্রসন্ন তাহাদেরই অন্যতম। পরাজয় ব্যর্থতার মধ্য দিয়াও বিগ্রহ রক্ষা করিতে হইবে। তাই প্রেতের ছায়া দেখিয়াও কবি ভীত হন নাই, নৈরাশ্যে তাঁহার হৃদয় ভাঙ্গিয়া পড়ে নাই, যতবার ব্যর্থকাম হইয়াছেন, ( ৫ ) ততবারই “ঘরের মায়ায় আবার নূতন উদ্যম নূতন শক্তি লইয়া পল্লীমার বুকে ছুটিয়া গিয়াছেন। উপাসনা-মাঘ ১৩২৭ শ্ৰীযুক্ত সাবিত্রীপ্রসন্নের পল্লীব্যথা” বঙ্গসাহিত্যকে নুতন সম্পদে ঋদ্ধ করিয়াছে। দুঃখ শােক রাগ দৈন্ত প্রপীড়িত বাংলা দেশের পল্লীভূমির যত প্রকারের বেদনা আছে কবি প্রায় সবগুলিই কারুণ্যমধুর অনাড়ম্বর ভাষা ও ভাবে ছন্দিত করিয়া এই পুস্তকখানিতে গ্রথিত করিয়াছেন। বঙ্গে কৃষক ও নিঃস্ব পল্লীবাসীগণের জীবনের সুখ দুঃখ, আশা নৈরাশ্য, শােক সান্ত্বনার বার্তা ও তাহাদের সংসারের গুহ্যতম রন্ধেরও সংবাদ, সাবিত্রীপ্রসন্নের স্যায় বঙ্গের আর কোনও কবি এত পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে ঝঙ্কত করিতে পারিয়াছেন কি না সন্দেহ। দুই একজন ব্যতীত পল্লীবাসীগণের মর্মবাণী এত বেশী দরদের সহিত এত বেশী আন্তরিকতার সহিত আর কোন কবি শুনাইতে পারেন নাই। এই- খানেই শ্ৰীযুক্ত সাবিত্রীপ্রসন্নের বিশিষ্টতা। কবির বর্ণনা কুশলতা অনুপম। শুধু কৃষকের সুখ দুঃখের স্নিগ্ধ সজল আলেখ্য নহে, কৃষকের সংসারের অবিকল চিত্র ও পল্লী প্রকৃতির হুবহু চিত্রের অঙ্কনেও কবি অসাধারণ নৈপুণ্য দেখাইয়াছেন— কবি কৃষকের সুখদুঃখের বার্তা কৃষকেরই ভাষায় জ্ঞাপন করিয়াছেন—সেজ ভাবের সহিত ভাষার অপূৰ্ব্ব সামঞ্জস্য ঘটিয়াছে। কৃষকের ভাষায় এরূপপৰ্যাপ্ত অধিগতি অন্য কোন কবির কাব্যে আমরা পাই না। সমগ্র পুস্তকথানির অঙ্গ প্রত্যঙ্গে শিরা উপশিরা ভরিয়া একটী সহানুভূতিময় স্নিগ্ধ মধুর কারুণ্য রস শােনিত ধারার ন্যায় সঞ্চালিত—সেই হিসাবে ভাইফোঁটা, বধূর ব্যথা, কয়েদী ও শোকাতুরা কারুণ্য রসমাধুর্যে সর্বাপেক্ষা স্নিগ্ধ ও মেদুর। ‘আসামী কবিতার সরল প্রকাশ ভঙ্গিতে মুগ্ধ হইয়াছি। রতন-কুলী’ কবিতায় কুলী জীবনের শােণিত-রাঙা চিত্রটী বঙ্গসাহিত্যের চিত্রশালায় উজ্জ্বল হইয়া রহিবে। ‘গ্রহের ফের’ কবিতাটা একেবারে জাতীয় চিত্র, ভারতবর্ষের প্রাচীন গৌরব এবং তাহার বর্তমান অবস্থাই পাশাপাশি আলিখিত।

( ৬ ) ‘বন্ধুর ব্যথা বঙ্গের সামাজিক জীবনের ও ‘শােকাতুরা পারিবারিক জীবনের নিখুত চিত্র। বিষয়ােপযােগী ছন্দোনিৰ্বাচনে কবিয় কুশলতা অপূৰ্ব্ব । এই কবির রচনায় গভীর আন্তরিকতা আছে, হৃদয়ের সরস মাধুৰ্য্য, বিশ্বমানবের প্রতি নিবিড় সহানুভূতি, দেশপ্রাণতা, সূক্ষ্ম অন্তদৃষ্টি, ভাষাসম্পদ, চিত্রাঙ্কনীপ্রতিভা ছন্দোবৈচিত্র্য এবং ছন্দোরচনায় কুশলতা সমস্তই বিদ্যমান আছে। প্রতিভা-শ্রাবণ ১৩২৮ কবি সাবিত্রীপ্রসন্ন বঙ্গের শক্তিমান নবীন কবিগণের অন্যতম। যে মর্মন্তুদ বেদনায় আজ সারা বিশ্ব চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে, যে নিরুদ্ধ হাহাকার আজ ভাষাহীনকে মুখর ও অন্ধকে চক্ষুষ্মান করিয়া তুলিয়াছে, দরদী কবির অন্তর বীণার তারে তারে বিশ্বের এই মর্ম বেদনা পল্লীর করুণ ছন্দে ঝঙ্কত হইয়াছে। পল্লীব্যথা কল্পনা-জীবির সৌখীন ব্যথা নয়, ইহা দরদীর অশ্রুজল। “গায়ের কায়ায়” কবি পল্লীর সুখদুঃখময় জীবনের চিত্র আঁকিয়াছেন, “প্রেতের ছায়ায় অবিচার, অত্যাচার, নিষ্ঠুরতার বেদনাপ্লত কাহিনী প্রাণ দিয়া লিখিয়াছেন, “ঘরের মায়ায় পল্লীর নিভৃততম মর্মে সমগ্র জাতির যে প্রাণের উৎস অলক্ষিতে ক্ষীণ হইয়া আসিতেছে তাহাই উদঘাটিত করিয়া দেখাইয়াছেন। সওগাত- -আশ্বিন ১৩২৭ আজ বাঙ্গালার পল্লী শ্মশান। তাহার সে সুর আনন্দময় ছবি আর নাই। তাহার শ্যামল সৌন্দর্যের অন্তরাল হইতে আর নন্দনের সুষমা উছলিয়া উঠে না। দুঃখসন্তাপহরা মূৰ্ত্তিতে সে আর ব্যথিত সন্তানকে স্নেহের ক্রোড়ে তুলিয়া লয় না। তাই গভীর দুঃখে করুণ সুরে কবি ‘গাঁয়ের কায়া”র প্রারম্ভেই গাহিয়াছেন। “ঊষার অরুণ রাগে ছিলে তুমি সজীব তরুণ- শামশােভা-মহােৎসব আঁখি যুগ মমতা-করুণ আজি তুমি প্রেতছায়া প্রাণ হীন স্তিমিত নয়ন কমাল। গাথিবারে কর নর-কঙ্কাল চান।”

( ৭ ) তাহার এই মর্মস্পর্শী দুঃখের রাগিণী বড় করুণ সুরে বাজিয়াছে। গ্রন্থের যেখানেই দৃষ্টিপাত করি, সেইখানেই দেখি একটা মদ বেদনার ছবি স্পষ্ট ফুটিয়া উঠিয়াছে। কবি প্রাণ দিয়া পল্লীর বেদনা অনুভব করিয়াছেন, তাই নিজ হৃদয়ের দুঃখ-ক্ষতের শােণিতে তাহার করুণ ছবিখানি আঁকিতে তিনি সক্ষম হইয়াছেন। গ্রন্থের সকল কবিতাই প্রাণময়ী। তিনি যে বেদনার ছৰি বাঙ্গালার পাঠক সমাজের চক্ষে ধরিয়াছেন, বাস্তবিক তাহা দেখিবার ও বুঝিবার জিনিস। উপসংহারে আমরা রাধাকমল বাবুর ভূমিকার কথায় বলি--“যার স্নেহে ‘পল্লীব্যথা জাগিয়াছে তিনি বিরল কুটীরে কঁদিয়া কবির আরও ব্যথা জাগান ; বিশ্বময় সে ব্যথা জাগিয়া অসংখ্য দুঃখময় দেহে পরিব্যাপ্ত হইয়া একটা বিরাটতর জীবন গড়িয়া তুলুক। তাহাতে দেশ ও জাতি, কাব্য ও কবি সবই ধন্য হইবে—আমাদের জননীও দৈন্যের মধ্যে বিজয় লাভ করিবেন।” অর্চনা মাঘ ১৩২৭ এ কবিতার বইখানি সাধারণ কবিতার বই হইতে একটু স্বতন্ত্র। ইহার বিশেষত্ব কবিতাগুলির অর্থ বুঝিতে, কবির ভাবকে ধরিতে ও কবিকে চিনিতে পারা যায়। বইখানি তিনভাগে বিভক্ত। (১) গায়ের কায়া (২) প্রেতের ছায়া (৩) ঘরের মায়া। প্রতি অংশেই কবির —বস্তৃতান্ত্রিকতা, আন্তরিকতা কবিতার ভিতর দিয়া ভাষাৰ নিৰ্বরে ব্যক্ত হইয়াছে। আমাদের এখন এই শ্রেণীর কবিরই দরকার যিনি প্রেম-কবিতার “আহা-উহু” ছাড়িয়া দেশের চিত্র পাঠকের হৃদয়ে আঁকিয়া দিতে পারিবেন-দেশাত্মবোধ প্রাণে জাগাইয়া তুলিতে পারিবেন। আমরা “পল্লীবিদায়” কবিতাটী আগাগােড়া উক্ত করিবার প্রলােভনসম্বরণ করিতে পারিলাম না। এই বইখানির ভূমিকা লিখিয়াছেন শাস্পদ শ্রীযুক্ত রাধাকমল মুখােপাধ্যায় মহাশয়। তিনি ভাল করিয়া বইখানির পরিচয় দিয়াছেন এবং প্রকৃত সমালােচনার • কাৰ্য করিয়াছেন। তিনি ভূমিকার শেষে বলিয়াছেন, “শ্রমজীবীই ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী ; শ্রমের জয়গান করা ভবিষ্যৎ সাহিত্যের নিকট বর্তমান যুগ দায়- স্বরূপ অর্পণ করিয়াছে। মুকুন্দরাম দীর্থ শতাব্দী পূর্বে বাংলার শ্রমের জীবন ও

(৮)
মর্ম উদঘাটন করিয়াছিলেন। বৃহত্তর কল্পনার রা রঞ্জিত করা, গভীরতর
ভাবুকতার দ্বারা মুগ্ধ করা, মহত্তর অধ্যাত্মসের দ্বারা আপ্লুত করা, নিপুণতর
শিল্পের ধারা চমকিত করা সজাগতর স্বাজাত্যবােধের দ্বারা অনুপ্রাণিত করা
বাংলার ভবিষ্যৎ গীতি কবিতার কাজ—এ সাধনায় কবি কতদুর অগ্রসর হইবেন
তাহা বলিতে পারি না, কিন্তু এই যে তাহার পণ এবং তিনি যে তাহা চিনিয়া
পাথেয়ও কেশ সংগ্রহ করিয়াছেন তাহা বুঝিতে পারিয়াছি......।”
উলিখিত মাসিক পত্রিকা ব্যতীত ইংরাজী সাময়িক পত্রে এবং বাঙলার অন্যান্য
মাসিক পত্রেও এই পুস্তকখানির বিশদ আলােচনা হইয়াছে। স্থানাভাবে এবং
সবগুলি পত্রিকা কাছে না থাকায় অন্যান্য সমালােচনাগুলি মুদ্রিত করিতে পারা
গেল না এবং যে আলােচনা কয়টি মুদ্রিত হইল তাহারও অনেকাংশ বাদ দিতে
হইলে।
প্রাপ্তিস্থান :-
রুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
২০৩১১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
ডি, এম, লাইব্রেরী ৬১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
ইণ্ডিয়ান বুক ক্লাব কলেজ স্ট্রীট মারকেট।
ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট।
বরেন্দ্র লাইব্রেরী ২০৪ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট।
ও অন্যান্য পুস্তকালয়ে প্রাপ্তব্য-মূল্য ১২ টাকা।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Madhumalati Ed. 1st

Author
Chattopadhyay,sabitriprasanna
Title
Madhumalati Ed. 1st
File name
Madhumalati Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1924
Published
2009/11/6
Publisher
Dhirendra Nath Gupta,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
98
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Chattopadhyay,Sabitriprasanna
DLI number
512871
Barcode
4990010019903.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
BvGg5i9Vd1y
Download PDF

Madhumalati Ed. 1st