Bally Sadharan Granthagar

Bedanta-bibek Ed. 2nd

Saraswati,nigamananda · 2010/02/21

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সারস্বত গ্রন্থাবলী–সংখ্যা ১২
বেদান্ত-বিবেক
বিচারাঙ্খায়তে বােধােহনিচ্ছা যং ন নিবর্তয়েৎ
স্বোপৰি মাত্ৰাৎ সংসারে দহত্যখিল সত। তাম্।
—পঞ্চদশী
a
পরিব্রাজকাচাৰ্য পরমহংস
শ্রীমৎ স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী
প্রণীত

প্রকাশক
শ্রীমৎ স্বামী চিদানন্দ
সারস্বত মঠ
[ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
দ্বিতীয় সংস্করণ—বােধন ষষ্ঠী--১৩৪১
মুদ্রাকর
প্রতুলচন্দ্র মজুমদার
কমলা মেসিন প্রেস, বগুড়া
মূল্য • আনা ]
!

ভূমিকা ওঁ নমঃ গ্রীগুরবে শ্রীগুরুচরণ-কমল-সেবা প্রভাবে শুদ্ধ-চিত্ত জিজ্ঞাসু ভক্তগণের অনায়াসে তত্ত্বজ্ঞান উৎপাদনের জন্য এই “বেদান্ত-বিবেক” পুস্তক প্রকাশিত হইল। মিথ্যা হইতে সত্যকে, অনিত্য হইতে নিত্যকে, অনাত্ম হইতে আত্মাকেদ্বৈত হইতে অদ্বৈতকে বাছিয়া লইবার যে শক্তি, সাধা- রণতঃ তাহাকেই বিবেক বলে। বেদান্তশাস্ত্র প্রতিপাদিত বিচারই বেদান্ত-বিবেক। শাস্তুকারগণ এই বেদান্ত বিবেককে মােক্ষদ্বারের অন্যতম দ্বারপাল স্বরূপে বর্ণনা করিয়াছেন। বস্তুর যিনি প্রকৃত তত্ত্ব অবগত হইবার জন্য যথার্থ যত্নশীল হন এবং শুভ ইচ্ছার সহিত ধীর ভাবে আপনার অন্তরে সর্বদা তদ্বিষয়ক বিচার করিতে থাকেন, তিনি অচিরেই আপনার অভিলষিত পদার্থ লাভ করিয়া কৃতার্থ হন। এই গ্রন্থে বেদান্ত-প্রতিপাদিত নিত্যনিত্য-বিবেক, দ্বৈতাদ্বৈত- বিবেক, পঞ্চকোশ-বিবেক, আত্মনাত্ম-বিবেক এবং মহাবাক্য-বিবেক, এই পঞ্চ-বিবেকের আলােচনা করা হইয়াছে। প্রথমে অনিত্য বস্তু হইতে নিত্য বস্তু নির্ধারণ করিয়া দ্বৈতাদ্বৈত-বিবেকে তাহা যে অদ্বৈত, তাহা প্রতিপাদিত হইয়াছে। সেই নিত্য অদ্বৈত পদার্থ [ ৪ ] পঞ্চকোশের অতিরিক্ত হিরন্ময়কোশে স্ব-মহিমায় বিরাজিত আছেন, পঞ্চকোশ-বিবেকে তাহাই প্রদর্শিত হইয়াছে। তৎপরে সেই বস্তুই আত্মা, তদ্বতিরিক্ত অন্য সমস্ত পদার্থই অনাত্মা-আত্মানাত্ম-বিবেকে তাহা বর্ণিত হইয়াছে। পরে সেই নিত্য অদ্বৈত আত্মাই যে আমি, মহাবাক্য-বিবেকে তাহাই প্রতিপাদিত হইয়াছে। সুতরাং আত্ম- জ্ঞান বা তত্ত্বজ্ঞান লাভ করিতে হইলে এই পঞ্চ-বিবেকের আলােচনা অবশ্য করিতে হইবে। তাই সাধারণের উপকারার্থ বেদান্ত-বিবেক লিখিত হইয়াছে। শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে দীর্ঘকাল বাপিয়া বেদান্ত-বিবেকের পুনঃ পুনঃ বুদ্ধ্যানােহ করিতে পারিলে, ত্বজ্ঞান জন্মিয়া থাকে। বিবেক হইতে যে জ্ঞান উৎপন্ন হয়, তাহ। একবার দৃঢ়তা প্রাপ্ত হইলে, তদ্বিষয়ে ইচ্ছা না থাকিলেও উহা কখনও নিবারিত হইবার নহে। ঐ জ্ঞান উৎপন্ন হইবামাত্র সমস্ত সাংসারিক অনিত্য বস্তু- বিষয়ক সত্য-ভ্রমকে বিনাশ করিয়া থাকে। অতএব যিনি তত্ত্ব- জ্ঞানের দ্বারা মুক্তি লাভের ইচ্ছা করেন, তিনি কোন শাস্ত্রকে, কোন বিশেষ ব্যক্তিকে অথবা কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের মতকে অভ্রান্ত জ্ঞান করিয়া অন্ধবিশ্বাসী হইবেন না। সৎযুক্তির সহিত সকল বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিচার করিলে যাহা সত্য বলিয়া বােধ হইবে, তাহাই যত্নের সহিত গ্রহণ করিবেন। হইয়াছে। এই পুস্তকে সদযুক্তির সহিত সকল বিষয়ের বিচার প্রণালী সন্নিবেশিত পুস্তকের উপযােগিতা পুস্তকের মধ্যেই আছে। পুস্তকখানি মনােযােগের সহিত পাঠ করিলে অনেকেই-- বিশেষতঃ উচ্চাধিকারী জনগণ উপকৃত হইবেন, সন্দেহ নাই। সনাতন

[ ৫ ]
ধর্মের মুখপত্র “আৰ্য-দর্পণে” এই গ্রন্থে প্রবন্ধগুলি প্রকাশিত
হইয়া সুধীগণের সমাদরপ্রাপ্ত হইয়াছিল। তাই পুস্তকাকারে পুনঃ
প্রকাশিত হইল। বর্তমানে এরূপ পুস্তকের বহুল প্রচার বাঞ্ছনীয়।
বাঞ্ছাকল্পতরু শ্রীশ্রীগুরুদেব সকলের বাঞ্ছা পূর্ণ করুন। নিবেদন
গুরুচরণাশ্রিত
১০ই বৈশাখ, শুক্লাপঞ্চমী
শ্রমচ্ছঙ্করাচার্যের জন্মােৎসব
১৩২৭ বঙ্গাব্দ

দ্বিতীয় সংস্করণের বক্তব্য
শ্রীগুরু কৃপায় বেদান্ত-বিবেকের দ্বিতীয় সংস্করণ
সংস্করণ প্রকাশিত
হইল। এই সংস্করণে গ্ৰন্থখানিকে পাঠকবর্গের অধিকতর উপযােগী
করিবার চেষ্টা করা হইয়াছে। কাগজ পূৰ্ব্বাপেক্ষা অনেকাংশে ভাল
দেওয়া হইয়াছে, তদুপর বড় বড় অক্ষরে পরিষ্কার ভাবে সাজাইয়া
মুদ্রিত করায় পূর্বাপেক্ষ। ইহার আকারও বৃদ্ধি পাইয়াছে। সর্বোপরি
পরিশিষ্টে গ্রন্থন্তৰ্গত পারিভাষিক শব্দসমূহের অর্থ এবং একটী বর্ণানু-
ক্রমিক বিষয়-সূচী সন্নিবেশিত হওয়ায় ইহার উপযােগিতা বহু গুণে
বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়াছে, সন্দেহ নাই। এক্ষণে এই গ্রন্থ পাঠে যদি এক
জনেরও চিত্ত অনিত্য বস্তু হইতে নিত্য বস্তুর সন্ধানে উদযুক্ত হয়,
তাহা হইলেই শ্রম সফল জ্ঞান করিব। কিমধিকমিতি
।
সারস্বত মঠ
বােধন ষষ্ঠী-২৭শে আশ্বিন
১৩৪১
বিনীত
স্বামী চিদানন্দ
-প্রকাশক

हौ
বিষয়
পৃষ্ঠা
নিত্যানিত্য-বিবেক
০ ০ ০
০ ০ ০
দ্বৈতাদ্বৈত-বিবেক
•••
১৪
পঞ্চকোশ-বিবেক
২৯
আত্মনাত্ম-বিবেক
০ ০ ০
• ?
৪৩
মহাবাক্য-বিবেক
•••
ఆ

11.1 বেদান্ত-বিবেক নিত্যানিত্য-বিবেক জ্ঞান-গরিষ্ঠ ঋষিশ্রেষ্ঠ বশিষ্ঠদেব ব্রহ্মবিচারকে মােক্ষ- দ্বারের অন্যতম দ্বারপাল স্বরূপে বর্ণনা করিয়াছেন। বস্তুত যিনি প্রকৃত তত্ত্ব অবগত হইবার জন্য যথার্থ যত্নশীল হন এবং শুভ ইচ্ছার সহিত ধীরভাবে আপনার অন্তরে সর্বদা তদ্বিষয়ক বিচার করিতে থাকেন, তিনি অচিরেই আপনার অভিলষিত পদার্থ লাভ করিয়া কৃতার্থ হন। যাহার চিত্ত গমন কালে, স্থিতি কালে, জাগ্রত এবং স্বপ্ন অবস্থাতে সর্বদা ব্রহ্মবিচরাসক্ত হয়, সেই ব্যক্তিকে পণ্ডিতেরা মৃত বলিয়া অভিহিত করেন। যাহাদিগের মন যথার্থ চিন্তাশীল নহে, যাহারা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে সকল বিষয় আপন মনের মধ্যে বিচার করিতে পারে না, তাহাদিগের তাদৃশ দুর্বল হৃদয়ে কোন গভীর বিষয় কখনই দীর্ঘকাল স্থায়ী হইতে পারে না। আপনার অন্তরে গভীর বিষয় সকল বিচার করিতে পারে না

২
বেদান্ত-বিবেক
* এ।
বা করে না, সে রাশি রাশি পুস্তক পাঠ করিলেও প্রকৃত
তত্ত্বজ্ঞান লাভে বঞ্চিত থাকে। যদ্যপি
বস্তুবিচার তদ্বিষয়ক জ্ঞান
বিশেষরূপে নিজ অন্তরে বিচার না
লাভের প্রকৃষ্ট উপায়
করিরা কেবলমাত্র শাস্ত্রীয় উপদেশ বা
বড় বড় লােকের মত জানিয়া কোন সত্যকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত
করা যায়, তাহা হইলে পরীক্ষার সময় ঝড় আসিলে সে সত্য
কখনই আর হৃদয়ে স্থান পায় না। অনেক লঘুচিত্ত ব্যক্তিকে
যে প্রতিদিন নূতন নূতন মতের বশীভূত হইতে দেখা যায়,
তাহার একমাত্র কারণই এই যে, তাহারা নিজ অন্তরে সেই
গভীর বিষয়ের সম্যক্ চিন্তা করিতে অক্ষম। কিন্তু যাহারা
ব্ৰহ্মবিচার করেন, তাঁহাদের অন্তঃকরণে সমুদ্রের ন্যায়
গাম্ভীৰ্য্য, সুমেরুর ন্যায় স্থিরতা ও চন্দ্রের ন্যায় শীতলতা
উদিত হয়। অতএব প্রতিনিয়ত শ্রদ্ধা ও যত্ন সহকারে বিচার
করিবে। ইহা বিষয়-সুখের ন্যায় আশু প্রীতিজনক না হইলেও
দৃঢ়তার সহিত অভ্যাস করা কর্তব্য।
তত্ত্বজ্ঞান লাভ করা সহজ নহে। প্রকৃত অধিকারী
হইলে তত্ত্বজ্ঞান লাভ হয় না। আহারশুদ্ধি, ত্রিবিধ
সংঘাতশুদ্ধি, দেশ-কাল ও সৎপাত্রাদির লাভ, সঙ্কল্প-ত্যাগ,
ইন্দ্রিয়-সংযম, ব্রতচৰ্যা এবং গুরুসেবা প্রভৃতিতে এই অধি-
কার লাভ হয়। ইন্দ্রিয়গণ চপলতাবৃত্তি পরিত্যাগ করিয়া
স্থির ভাব ধারণ না করিলে জ্ঞান কদাচ প্রকাশ পাইতে পারে
। এই সকল বিবেচনা করিয়া শাস্ত্রকারগণ উপদেশ

নিত্যানিত্য-বিবেক - - দিয়াছেন যে, সাধন-চতুষ্টয়-সম্পন্ন ব্যক্তি জ্ঞান লাভার্থ তত্ত্ব- বিচার করিবে। অর্থাৎ—সাধন-চতুষ্টয়সম্পন্ন ব্যক্তিই জ্ঞানাধি- কারী। নিত্যনিত্য-বস্তুবিবেক, ইহামূত্ৰাৰ্থ-ফলভােগ-বিরাগ, শম-দমাদি-ষটক-সম্পত্তি এবং মুমুক্ষুত্ব এই চারিটীই সাধন- চতুষ্টয়—এতদ্বিশিষ্ট ব্যক্তি সাধন-চতুষ্টয়সম্পন্ন। নিত্যা নিত্য- বিবেকই বর্তমান প্রবন্ধে আমাদের আলােচ্য বিষয়। “নিত্যং বকেং ব্ৰহ্ম, তদ্বতিরিক্তং সৰ্বমনিত্য, অয়- মেব নিত্যনিত্য-বস্তু-বিবেকঃ” অর্থাৎ একমাত্র ব্রহ্ম নিত্যবস্তু, তদ্ব্যতিরিক্ত অন্য সমস্তই ক্ষণস্থায়ী ও অনিত্য ; এই প্রকার যে নিশ্চয় জ্ঞান, তাহারই নাম নিত্যনিত্য-বিবেক। মুমুক্ষু : সাধক সমাহিত চিত্তে বিচার দ্বারা নিত্যনিত্য অবধারণ করিবে; ব্ৰহ্ম যে সৎ-স্বরূপ এবং দ্বিতীয় ইহা শ্ৰতি-প্রতি- পাদিত তত্ত্ব। বিচার দ্বারা অনিত্য বস্তুর স্বরূপাবধারণ করিলে, সেই তত্ত্ব অবগত হওয়া যায়। ব্ৰহ্ম নিত্য এবং, ভূতসমূহ অনিত্য ; অতএব পঞ্চভূতের স্বরূপ বিচার করিতে হইবে। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ এই ভূতসমুহের গুণ বিচার কয়টী পঞ্চভূতের গুণ। আকাশে শব্দ; বায়ুতে শব্দ, স্পর্শ ; তেজে শব্দ, স্পর্শ, রূপ ; জলে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস এবং পৃথিবীতে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ পাঁচটা গুণই থাকে। শ্রোত্র, ত্ব, চক্ষু, জিহবা এবং নাসিকা এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়, কর্ণ প্রভৃতি স্থূল দেহাবয়বে অধিষ্ঠিত হইয়া ৪ বেদান্ত-বিবেক --- ; যথাক্রমে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস এবং গন্ধ গ্রহণ করিয়া থাকে। এই সকল ইন্দ্রিয় অতি সূক্ষ্ম, এজন্য প্রত্যক্ষ করা যায় না; সুতরাং কাৰ্য্য দ্বারা অনুমেয়। ইহারা প্রায়ই বাহ বিষয়ে ধাবিত হয়। কর্ম পাঁচটী—কথন, গ্রহণ, গমন, মলােৎসর্গ ও প্রস্রবণ। কৃষি, বাণিজ্য, সেবা ইত্যাদি পঞ্চ কর্মেরই অন্তর্গত। বাক্, হন্ত, পদ, বায়ু এবং উপস্থ—এই পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা উক্ত পঞ্চ কৰ্ম নিৰ্বাহ হয়। স্কুল দেহের মুখ প্রভৃতি অবয়বে পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় বর্তমান। মন উক্ত দশবিধ ইন্দ্রিয়ের অধ্যক্ষ, মনের স্থান হৃৎপদ্মপণ্ডল ; উক্ত দশবিধ ইন্দ্রিয়ের সাহায্য ব্যতীত বাহবস্তু গ্রহণে মনের ক্ষমতা নাই বলিয়া তাহাকে অন্তঃকরণ বলা যায়। ইন্দ্রিয়গণ বিষয়-সম্বন্ধ প্রাপ্ত হইলে অন্তঃকরণ দ্বারাই বিষয়ের গুণ-দোষ বিচার অন্তঃকরণের তিন গুণ—সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ ; এই ত্রিগুণ দ্বারাই অন্তঃকরণ বিবিধ বিকার বা অবস্থা প্রাপ্ত হইয়া থাকে। সাত্ত্বিক বিকার বা অবস্থা হইতে পুণ্য অর্জন হয়, রাজা অবস্থা হইতে পাপ সঞ্চয় হয়, তামস অবস্থা হইতে পাপ বা পুণ্য কিছুই হয় না, বৃথা আয়ুক্ষয় হয়। এই সমন্তের মধ্যে অহং” (আমি) এইরূপ জ্ঞান যাহার প্রতি হয়, তিনিই কর্তা। যে যে পদার্থ লইয়া জগৎ, তন্মধ্যে কৰ্ম্মেন্দ্রিয়ের অধি- কৃত পদার্থ সর্বাপেক্ষা স্পষ্ট হইলেও অল্প ; পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের “অধিকৃত পদার্থ তদপেক্ষা অধিক, মানস-প্রত্যক্ষের অধিকৃত নিত্যানিত্য-বিবেক ৫ পদার্থ আরও অধিক, অনুমানগম্য পদার্থ অধিকতর, অনু- মানের অগম্য পদার্থ শাস্ত্র দ্বারা বুঝিতে হয়। এইরূপ স্কুল, সূক্ষ্ম নানাবিধ পদার্থ সমূহই জগৎ-জগৎই “ইদং” পদের অর্থ। সৃষ্টির পূৰ্বে সমস্ত জগৎ একমাত্র অদ্বিতীয় সৎস্বরূপেই অবস্থিত ছিল, নামরূপ ছিল না ইহাই শ্রুতিবাক্য। মেবাদ্বিতীয় এই শ্রুতিবাক্য ত্রিবিধ ভেদশূন্যত্বের পরি- চায়ক। এক অর্থাৎ স্বগত ভেদশূন্য ; সঘর বিচার ও পরিচয় এব’ অর্থাৎ সজাতীয় ভেদশূন্য এবং ‘অদ্বিতীয় অর্থাৎ বিজাতীয় ভেদশূন্য। স্বগত, সজাতীয় ও বিজাতীয় ভেদশূন্য পরম পদার্থই সদ্বস্তু। সদ্বস্তুতে ত্রিবিধ ভেদ নাই কেন? সদ্বস্তুর অবয়ব নাই, যেহেতু সদ্বস্তুর অংশই নিরূপিত হয় নাই; অর্থাৎ সদ্বস্তু অখণ্ড। নাম বা রূপও সদ্বস্তুর অংশ নহে,—তখন নামরূপ উৎপন্নই হয় নাই; কেননা নামরূপের উৎপত্তিই সৃষ্টি, সৃষ্টির পূর্বে নামরূপের উৎপত্তি অসম্ভব, অতএব আকাশের ন্যায় সদ্বস্তুও নিরবয়ব সুতরাং স্বগত-ভেদশূন্য। যদি অন্য সদস্তু থাকিত, তবেই তাহা সজাতীয় হইতে পারি, কিন্তু তাহা নাই, যেহেতু সদ্বস্তুর বৈলক্ষণ্য নাই; নামরূপ-স্বরূপ কল্পিত-আশ্রয়ের বা উপাধির প্রভেদ ব্যতীত সদ্বস্তুর ভেদ হয় না। যেমন জলাশয় ভেদে সূর্যের প্রতিবিম্ব অনেক হইলেও সূর্যের প্রভেদ হয় না, সূৰ্য্য একই থাকেন; সেইরূপ সদস্তুর কল্পিত আধার ঘট- বেদান্ত-বিবেক পটাদির ভেদে সদ্বস্তুর উপাধিক ভেদ হইলেও বাস্তবিক ভেদ হয় না; সুতরাং সদ্বস্তু সজাতীয় ভেদশূন্য। যাহা সদ্বস্তুর বিজাতীয় অর্থাৎ বিপরীত ভাবাক্রান্ত, তাহা ‘অসৎ-কদাপি ‘অস্তি’ বা আছে, এইরূপ ব্যবহারের যোগ্য নহে; অতএব তাহা প্রতিযােগী হইতে পারে না, সুতরাং সদ্বস্তুর বিজাতীয় ভেদ : একেবারেই অসম্ভব। অতএব সদ্বস্তর একমেবা- দ্বিতীয় ইহা সিদ্ধ হইল। এই সদ্বস্তুর শক্তি মায়া ; মায়ার পৃথক্‌ সত্তা নাই, সৃষ্টি প্রভৃতি দেখিয়া মায়াশক্তির অনুমান করিতে হয়, যেমন অগ্নির দাহিকাশক্তি। কাৰ্য্য জন্মিবার পূর্বে কেহ কখন শক্তিকে জানিতে পারে না। পরমাশক্তি মায়াকে পরব্রহ্মের স্বরূপ বলা যায় না, যেহেতু আপনিই আপনার শক্তি ইহা বলা অসঙ্গত হয়; যেমন অগ্নির দাহিকাশক্তিকে অগ্নির স্বরূপ সন্তুর শক্তি বলা যায় । আর যদি শক্তিকে মায়ার স্বরূপ-বিচার। সদ্বস্তু হইতে অতিরিক্ত বস্তু, বলিয়া স্বীকার করা যায়, তবে তাহার যথার্থ স্বরূপ কি তাহা বলিতে হয়। শূন্য তাহার স্বরূপ, ইহা বলিতে পারা যায় না; যেহেতু শূন্য অর্থাৎ আকাশকে মায়ার, কার্যরূপে স্বীকার করা গিয়াছে। অতএব মায়ার সৎ হইতে অতিরিক্ত ও শূন্য হইতে বিভিন্ন এই অনির্বচনীয় স্বরূপ স্বীকার করিতে হয়! এই জগৎ উৎপত্তির পূর্বে অসৎ ছিল না এবং পৃথক সত্তাবিশিষ্ট ছিল না, কিন্তু তৎকালে তমঃশব্দবাচ্য পরমাত্ম-

নিত্যানিত্য-বিবেক
৭
শক্তি-স্বরূপ মায়ারূপে ছিল। মায়ারও সত্তা পৃথক্‌ নহে,
যেহেতু বেদে দ্বিতীয় বস্তুর সত্তা প্রতিষিদ্ধ হইয়াছে। সদ্বস্তু
পরব্রহ্মের সত্তা সম্বন্ধেই তাহার সত্তা। অতএব শূন্যের ন্যায়
মায়ারও দ্বিতীয়ত্ব নাই। আরও দেখ, বস্তু ও তাহার শক্তি
এতদুভয়ের পৃথক্‌ জীবনগণনা লােক প্রচলিতও নহে। এই
মায়াশক্তি সম্পূর্ণ ব্ৰহ্মব্যাপী নহে, কিন্তু এক দেশব্যাপী ;
-যেমন ঘট-সরাবাদির জননশক্তি পৃথিবীর সর্বাবয়বে নাই,
কেবল আর্ল মৃত্তিকাতেই তৎশক্তি অবস্থিত। এই পরমাত্মার
একপাদ সৰ্ব্বভূতে ব্যাপ্ত এবং তিন পাদ নিত্য শুদ্ধ মুক্ত
স্বয়ম্প্ৰকাশ স্বরূপ। যেমন রং-কাগজ বা কাপড়কে আশ্রয়
করিয়া তাহাতে বিবিধ চিবের সৃষ্টি করিয়া থাকে, তদ্রুপ
মায়াশক্তি সদ্বস্ত ব্ৰহ্মকে আশ্রয় করিয়া তাহাতেই নানাবিধ
বিকার অর্থাৎ কাৰ্য্য-পরম্পরা সৃষ্টি করিয়া থাকেন।
মায়াশক্তি পরব্রহ্মে যে সকল বিকার সৃষ্টি করেন,
তন্মধ্যে প্রথম বিকার আকাশ, আকাশের স্বরূপ অবকাশ
স্থান, আর আকাশের অস্তিত্ব ব্যবহার হইতে
সস্তু পরব্রহ্মের সম্বন্ধও তাহাতে আছে।
সদস্তুকে অবলম্বন করিয়া
সদ্বস্তু একস্বভাব অর্থাৎ সত্তামাত্রই
তাহার স্বরূপ, আকাশের দুই রূপ ;
ব্রহ্মের অবকাশ স্বরূপ নাই, আকাশে অবকাশ ও সত্তা এই
দুই রূপই অবস্থিত। যে মায়াশক্তি আকাশের কল্পনা করিয়া-
ছেন, তিনিই সদ্বস্তু ও আকাশের অভিন্নতা কল্পনা করিয়া
বুঝা যায়।
মায়ার সৃষ্টিক্রম

বেদান্ত-বিবেক তদুভয়ের ধর্মধৰ্ম্মি-ভাব বিপরীত ক্রমে সৃষ্টি করিয়াছেন। যাহা যদপেক্ষা অধি দেশে থাকে, তাহা তাহার ধর্ম হইতে পারে না, কিন্তু ধর্মী—আশ্রয় হইতে পারে। ব্ৰহ্মস্বরূপ সদ্বস্তু অধিক দেশে থাকেন বলিয়া তিনিই ধৰ্মী এবং আকাশ -ধৰ্ম্ম। সুতরাং জাতি ও ব্যক্তি, জীব ও দেহ, গুণ ও দ্রব্য ইহারা যে প্রকার পরস্পর পৃথক্‌, তদ্রুপ আকাশ ও সদ্বস্তুর পরস্পর বিভিন্নতা হইবে। যুক্তি-বিচার দ্বারা সৎ ও আকা- শের প্রভেদ দৃঢ়তর রূপে অবগত হইলে আকাশের সত্যত্ব জ্ঞান বা সদ্বস্তুর আকাশ-ধৰ্ম্মজ্ঞান আর কদাপি হয় না। এই হেতু জ্ঞানী ব্যক্তির নিকটে আকাশ সর্বদা অসত্যরূপে প্রতিভাত হয় এবং সদ্বস্তু তাহার নিকটে সৰ্ব্বদা আকাশ-ধৰ্ম পরিবজ্জিত হইয়া প্রকাশ পাইয়া থাকে। এই প্রকারে শাস্ত্র-যুক্তিদ্বারা আকাশের মিথ্যাত্ব এবং সদস্তুর সত্যত্ব সাধিত হইলে ঐ প্রকার শাস্ত্র-যুক্তি অনুসারেই বায়ু প্রভৃতি হইতে সদ্বস্তুকে পৃথক ভাবে নিশ্চিত করিবে। যদি বল বায়ু প্রভৃতি আকাশের কাৰ্য্য, সদ্বস্তু বায়ু প্রভৃতির কারণ নহে, সুতরাং সদস্তুর সহিত অভেদ-প্রতীতি বায়ু প্রভৃতিতে অসম্ভব। তাহার উত্তর এই যে, মায়া সদ্বস্তুর একদেশে অবস্থিত, আকাশ মায়ার একদেশবর্তী, বায়ু আকা- শের একদেশে অবস্থিত, এইরূপে বায়ুও সদ্বস্তুতে কল্পিত হইয়াছে। অর্থাৎ সদ্বস্তু বায়ুর সাক্ষাৎ কারণ না হইলেও পরম্পরার কারণ, এইজন্যই অভেদ-প্রতীতি হইতে পারে।

নিতানিত্য-বিবেক ৯ শােষণ, স্পর্শ, গতি এবং বেগ, এই কয়টী বায়ুর স্বাভাবিক সম্বস্তু হইতে সৃষ্ট পদার্থেরও ধর্ম ; আর সদ্বস্তু, মায়া এবং আকাশ বিভিন্নতা ও অসত্যতা ইহাদিগের যে তিন গুণ তাহাও বায়ুতে আছে। যথা-বায়ুতে অস্তিত্বরূপে যে সত্তা-তাহা সদস্তুর গুণ ও সৎ হইতে বায়ুকে পৃথক্ করিলে তাহার যে অসত্যতা- রূপ—তাহা মায়ার গুণ এবং বায়ুতে যে শব্দ গুণ উপলব্ধ হয়, তাহা আকাশের গুণ। বায়ুতে সৎস্বরূপ পরব্রহ্মের যে সদংশ, তাহাকে পৃথক্ করিলে যাহা অবশিষ্ট থাকে, তাহা অসরূপ মায়িক অংশ—তাহা মিথ্যা। যেরূপ পূর্বোক্ত যুক্তিদ্বারা আকাশের অসত্যতা স্থিরীকৃত হইয়াছে, তদ্রুপ যুক্তিদ্বারা বায়ুর অসত্যত্ব নির্ণয় করিয়া তাহাতে সত্যত্ব জ্ঞান পরিত্যাগ করিবে। বায়ু হইতে অল্পস্থানব্যাপী অগ্নিরও অসত্যত্ব যুক্তিদ্বারা স্থির করিবে। ব্রহ্মাণ্ডে উপর্যুপরি আবরণরূপে বর্তমান পঞ্চভূতের ন্যূনতা ও আধিক্যের বিচার আছে। অর্থাৎ বায়ুর দশাংশের একাংশ পরিমিত অগ্নি বায়ুতে কল্পিত হয়। এই প্রকার সকল ভূতেরই দশাংশরূপ তারতম্য পুরাণাদি শাস্ত্রে উক্ত হইয়াছে। অগ্নি প্রকাশ-স্বভাব-সম্পন্ন ; বায়ুতে যাহার অনুবৃত্তি-সম্বন্ধ পূৰ্বে উক্ত হইয়াছে, তত্তৎ পদার্থের অনুবৃত্তি অগ্নিতেও আছে। অগ্নি অস্তিত্ব-বিশিষ্ট, ইহা সদ্বস্তুর অনুবৃত্তি; অগ্নি অসত্য অর্থাৎ সদ্বস্তুর সত্তা ব্যতীত ভিন্ন সত্তা অগ্নিতে নাই, ইহা মায়ার অনুবৃত্তি; অগ্নি শব্দ- বেদান্ত-বিবেক বিশিষ্ট, ইহা আকাশের অনুবৃত্তি ; এবং স্বীয় সাক্ষাৎ কারণ বায়ু হইতে স্পর্শগুণ প্রাপ্ত হইয়াছে। এই সদ্বস্তু, মায়া, আকাশ এবং বায়ুর অংশযুক্ত অগ্নির নিজ গুণ রূপ’ মাত্র,- তন্মধ্যে সদ্বস্তুর অতিরিক্ত অর্থাৎ অস্তিত্ব ভিন্ন আর সমগ্র ধৰ্ম্মই মিথ্যা, এইরূপ নিশ্চয় করিবে। অগ্নি সদ্বস্তু হইতে পৃথরূপে নিশ্চিত হইলে এবং অগ্নির অসত্যত্ব হৃদয়ে বদ্ধমূল হইলে জল যে অগ্নি হইতে দশাংশ নূন এবং অগ্নিতে কল্পিত ইহা চিন্তা করিবে। সদ্বস্তু হইতে অগ্নি পৰ্যন্তের অনুবৃত্তি-সম্বন্ধ হেতু জলের অস্তিত্ব, অসত্যত্ব, শব্দ, স্পর্শ এবং রূপ আছে, তাহার নিজগুণ রস- মাত্র, তন্মধ্যে সদ্বস্তুর গুণ অস্তিত্ব ভিন্ন অন্য সমগ্ৰ ধৰ্মই মিথ্যা ইহা নিশ্চয় করিবে। জল সদ্বাস্তু হইতে ভিন্ন বলিয়া ধারণা হইলে এবং জলের মিথ্যাত্ব হৃদয়ে বদ্ধমূল হইলে, জল হইতে দশাংশ নূন পৃথিবী-জলেতেই কল্পিত এইরূপ চিন্তা করিবে। হইতে, জল পৰ্যন্ত পদার্থের সম্পর্কে পৃথিবীর অস্তিত্ব, অসত্যত্ব, শব্দ, স্পর্শ, রূপ ও রস ; পরন্তু গন্ধই তাহার নিজ গুণ ;-তন্মধ্যে সদ্বস্তুর গুণ সত্তাভিন্ন আর সমগ্ৰ ধৰ্ম্মই মিথ্যা। অতএব সত্তা বা সদ্বস্তু যে পৃথিবী হইতে ভিন্ন, ইহা নিশ্চয় করিবে। সত্তা পৃথক্‌ নিশ্চিত হইলে, ভূমি যে মিথ্যা ইহাই পৰ্য্যবসিত হয়। পূর্বোক্ত অসত্য ভূমি হইতে দশাংশ নূন ও তন্মধ্যগত ব্ৰহ্মাণ্ড ভূমিতে কল্পিত হয়। সেই ব্ৰহ্মাণ্ড t নিত্যানিত্য-বিবেক ১১ মধ্যে ভূরাদি চতুর্দশ ভুবন, সেই চতুর্দশ ভুবনেতে যথাযােগ্য প্রাণীদেহ অবস্থিত। ব্রহ্মাণ্ড, চতুর্দশ ভুবন, এবং প্রাণীদেহে সদ্বস্তুকে পৃথক্ করিলে অসৎ স্বরূপে বিবেচিত সেই ব্ৰহ্মাণ্ডাদি প্রতিভাত হইলেও কোন হানি নাই। ত্রিলােকের মধ্যে সর্বত্রই দেখিতে পাওয়া যায় যে, মৃত্তিকা প্রভৃতি কাৰ্য্যের উপাদান বস্তুগুলি—সেই কাৰ্য্য অপেক্ষা নিত্য অর্থাৎ অধিক কাল স্থায়ী। কিন্তু ঘটাদি কাৰ্যদ্রব্যগুলি মৃত্তিকাদি কারণ অপেক্ষা অনিত্য, যেহেতু লােকে ঘটাদি কাৰ্য-দ্রব্যের ধ্বংস দেখিতে পায়। অতএব ব্ৰহ্মাতিরিক্ত বস্তুমাত্রেরই ব্ৰহ্ম হইতে উৎপন্ন হইয়াছে বলিয়া অনিত্যতা নিরূপণ এই সমগ্র বিশ্ব অনিত্য, আর এই জগ- তের কারণ সেই পরব্রহ্ম পরমার্থতঃ নিত্য। “তস্মাদ বা এত” ইত্যাদি শ্রুতিবাক্য স্পষ্টই নির্দেশ করিতেছেন যে, এই প্রপঞ্চ ব্ৰহ্ম হইতে উৎপন্ন হইয়াছে। সেই কারণে জগতের অনিত্যত্ব বিষয়ে সন্দেহ হইতে পারে না। সাবয়ব-নিবন্ধন সকল প্রপঞ্চেরই এইরূপে অনিত্যত্ব প্রতিপন্ন হইলে, বৈকুণ্ঠাদি লােকসমূহে যে নিত্যত্ব-বােধ, তাহা মূঢ়- বুদ্ধি জনগণের ভ্রান্তিমাত্র। অতএব ভূতসকল ও ভৌতিক পদার্থ সকল এবং মায়া, ইহাদিগের অসত্তা বিশেষরূপে হৃদয়ঙ্গম হইলে সদ্বস্তু বিষয়ে অদ্বৈত জ্ঞানের আর কখনও বিপৰ্যয় হয় না। যে তত্ত্বজ্ঞানী পৃথিব্যাদির অসত্তা ও অদ্বিতীয় সদ্বস্তু নিশ্চয় করিয়াছেন, বেদান্ত-বিবেক তাঁহারও ব্যবহার লােপ হয় না, কেননা পৃথিবী অসত্য হইলেও তাহার স্বরূপ বিনষ্ট হয় না। অর্থাৎ এক পুরুষের অজ্ঞান-নিবৃত্তি হইলে ত আর জগৎ- জগতের ব্যবহারিক সত্তা নিবৃত্তি হয় না যে, ব্যবহার বিলুপ্ত হইবে? সুতরাং সাংখ্য, বৈশেষিক প্রভৃতি অন্যান্য বাদীরা অনেক যুক্তির সাহায্যে জগৎসত্তার দ্বৈতভাব যেমন যেমন প্রতিপন্ন করিয়াছেন, ব্যবহারক্ষেত্রে সেই যুক্তিই অনুসরণীয়, তাহার খণ্ডনে যত্ন করিবার প্রয়ােজন নাই। যাহা হউক দ্বৈত- বিষয়ে অবজ্ঞা দৃঢ়তর হইলে অদ্বৈত-জ্ঞান ক্ৰমশঃ বিশেষরূপে স্থিরীকৃত হয়। যে ব্যক্তির অদ্বৈত-জ্ঞান স্থিরতর হইয়াছে, তাহাকেই জীবন্মুক্ত বলা যায়। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মতে ইহাই ব্রাহ্মী স্থিতি; ইহা প্রাপ্ত হইলে আর অদ্বৈতন ও জীবন্মুক্তি মুগ্ধ হইতে হয় না। এতন্নিষ্ঠ পুরুষ দেহান্তে নিৰ্ব্বাণমুক্তিরূপ ব্ৰহ্মানন্দ লাভ করিয়া থাকেন। জীবন্মুক্ত পুরুষ নীরােগাবস্থায় উপবিষ্ট থাকিয়া অথবা রুগ্না- বস্থায় ভূতলে বিলুষ্ঠিত বা মূৰ্জিত হইয়া প্রাণত্যাগ করিলেও তঁাহার ভ্রান্তি কোন ক্রমেই উপস্থিত হয় না। যেমন প্রাত্য- হিক স্বপ্ন বা সুষুপ্তিকালে অধীত বিদ্যা বিস্মৃত হইলেও জাগ্রত কালে তাহা আর বিস্মৃত থাকে না, তদ্রুপ প্রাণান্ত- কালে তত্ত্বজ্ঞানীর অদ্বৈত-জ্ঞানের বিস্মৃতি হয় না। বেদান্ত- সিদ্ধ অদ্বৈত-জ্ঞানের মৃত্যুকালেও বিপৰ্যয় হয় না, সুতরাং নিত্যানিত্য-বিবেক ব্ৰহ্মানন্দ প্রাপ্তির হেতু, ইহা সিদ্ধ হইল।

নিত্যানিত্য-বিবেক এইরূপে নিত্যত্ব ও অনিত্যত্ব সম্বন্ধে বেদ ও তদনুযায়ী তর্কের সাহায্যে যে বিচার, তাহাই নিত্যানিত্য-বিবেক বলিয়া কথিত হইয়া থাকে। একমাত্র ব্রহ্মই নিত্য; সুতরাং ঐহিক এবং পারলৌকিক সকল ভােগ্য বস্তুতেই অনিত্যত্ব নিশ্চয় হওয়া প্রযুক্ত যে নিস্পৃহতা বা তুচ্ছ-বুদ্ধি উদিত হয়, তাহাই বৈরাগ্য বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। নিত্য ও অনিত্য বস্তুর স্বরূপ কি, তদ্বিষয়ে যথার্থ জ্ঞানের উদয় হওয়া নিবন্ধন পুরুষের পুষ্পমাল্য, চন্দন ও বনিতা প্রভৃতি যাবতীয় অনিত্য বস্তুতেই বৈরাগ্য উদিত হইয়া থাকে। আবার নিত্য এবং অনিত্য বস্তুর বিচার হইতে প্রসূত তীব্র বৈরাগ্যকেই সাধুগণ মুক্তির মূল কারণ বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন। সেই জন্য বিবেক-সম্পন্ন মােক্ষার্থী প্রযত্নের সহিত নিত্যনিত্য বিচার দ্বারা প্রথমতঃ সেই বৈরাগ্যকেই সম্পাদিত করিবেন। এই বৈরাগ্যই বন্ধন ভেদ করিবার মহান্ উপায়। একমাত্র নিভ্যানিত্য-বিবেক দ্বারা ব্রহ্মে অনুরাগ এবং ব্ৰহ্মাতিরিক্ত যাবতীয় পদার্থে বিরাগ উৎপন্ন হইয়া থাকে। কারণ নিত্যা- নিত্য বিবেক দ্বারা বুঝিতে পারা যায় যে, ব্ৰহ্মই একমাত্র অবিনাশী-ব্রহ্মব্যতিরিক্ত বলিয়া প্রসিদ্ধ আর সকল বস্তুই বিনাশী। যথা :- ব্ৰহ্মব নিত্যমন্যত্ত, নিত্যমিতি বেদন।

দ্বৈতাদ্বৈত বিবেক অনাদি মায়াদ্বারা সমাচ্ছন্ন জীব তত্ত্বজ্ঞান দ্বারা প্রবুদ্ধ হইলে অজ, অনিদ্র ও অস্বপ্ন অদ্বৈত ব্ৰহ্মকে জানিতে পারে। যে পর্যন্ত প্রপঞ্চের নিবৃত্তি না হয়, তাবৎ সংশয় নিবৃত্তি হয় না এবং সংশয় নিবৃত্তি না হইলেও দ্বৈত ও অদ্বৈত ইহার একতর নিশ্চয় হয় না। এই দ্বৈত-প্রপঞ্চ কেবল মায়া মাত্র আর পরমাত্মাই কেবল মাত্র অদ্বৈত। যাবৎ মায়া বিদ্যমান থাকে, তাবৎ এই প্রপঞ্চ সত্য বলিয়া বােধ হয় এবং যখন সেই মায়া অন্তরিত হয়, তখন এই প্রপঞ্চ অসত্য জ্ঞান হইয়া অদ্বৈত জ্ঞান উপস্থিত হয়। সংসারী ব্যক্তি সাধন-সম্পন্ন ও বিবেকযুক্ত না হইলে অদ্বৈত ব্ৰহ্মজ্ঞানের অধিকারী হইতে পারে না। পরাৎপর পরমাত্মা অবিবেকী ব্যক্তির নিকট দ্বৈত-ভাবেই জ্ঞেয় হইয়া থাকেন। যে জ্ঞান দ্বারা আমি স্বতন্ত্র, জগৎ স্বতন্ত্র, ব্ৰহ্ম স্বতন্ত্র ও জীব স্বতন্ত্র বলিয়া বােধ হয়, সেই দ্বৈত জ্ঞান কিরূপে সহজে নিবারিত হইবে? জন্ম-জন্মান্তর হইতে দ্বৈতজ্ঞান আমাদের অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছে। সুতরাং তাহা কঠোর সাধন ও বিবেক ব্যতীত উল্টাইয়া ফেলিবার উপায় নাই। সাধন দ্বারা দ্বৈতভাব ফিরাইয়া অনেক কষ্টে অদ্বৈত- দ্বৈতাদ্বৈত-বিবেক ভাবে পরিণত করিতে হয়। দ্বৈত-জ্ঞানকে অদ্বৈত-জ্ঞানে আনিবার জন্য সমস্ত পৃথক্ পৃথক্ জ্ঞানকে পৃথক্ পৃথক্‌ ভাবে দ্বৈত ও অদ্বৈতে বুঝিয়া অবশেষে একত্বে নিয়ােজিত উপনীত হইবার ধারা করিতে বেদান্ত প্রথমে সৃষ্টি ও স্রষ্টা বা জগৎ ও ব্ৰহ্ম এই দ্বৈতভাব স্থাপন করিয়া পরিশেষে বলিয়া- ছেন যে, ব্ৰহ্মই জগৎ রূপে প্রতীয়মান হইতেছেন, অর্থাৎ-জগৎ ব্ৰহ্ম হইতে কোন স্বতন্ত্র পদার্থ নহে, জগতের স্বতন্ত্র কোন সত্তা নাই। ব্রহ্মের মায়াশক্তি হইতে জীব- জগতের উৎপত্তি হইয়াছে। ব্ৰহ্ম ও মায়াশক্তিকে পৃথক্‌ পৃথক্ ভাবে বুঝাইয়া প্রথমতঃ দ্বৈতবাদ স্থাপিত হইয়াছে বটে; কিন্তু পরিশেযে শক্তি ও শক্তিমানের একত্র সম্মিলন দেখাইয়া অদ্বৈতবাদই প্রতিপাদিত হইবে। সুতরাং সমাহিত চিত্তে ব্ৰহ্ম ও জীব-জগতের বিচার করিয়া অদ্বৈত জ্ঞান লাভ করিতে হইবে। ব্ৰহ্ম ও জগৎ সম্বন্ধে বিচার করা যাউক। সৃষ্টির পূর্বে এই জগৎ ছিল না, তখন কেবল এক এবং অদ্বিতীয় সৎ মাত্র ছিলেন। সেই সৎ অর্থাৎ ব্রহ্ম আলােচনা করিলেন যে, আমি প্রজারূপে বহু হইব; এবং জীবজগৎ রূপে বহু হইয়াছেন। সেই পরব্রহ্ম হইতে প্রাণ, মন, বাক্, পাণি প্রভৃতি কৰ্ম্মেন্দ্রিয়, চক্ষু-কৰ্ণাদি জ্ঞানে- ব্ৰহ্ম হইতে জীব-জগতের উৎপত্তির কারণ ন্দ্রিয়, আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল ও বিশ্ব- ধাত্রী পৃথিবী উৎপন্ন হইয়াছে। এইরূপ বহু শ্রুতিতে উক্ত হইয়াছে যে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সেই পরমাত্মা হইতে সৃষ্ট ১৬ বেদান্ত-বিবেক হইয়াছে, সুতরাং বিশ্ব যে আদৌ সৃষ্টি হয় নাই এ কথা বলা যায় না। এইজন্য এই বিশ্বকে সৃষ্টি এবং সেই পরমাত্মাকে স্রষ্টা বলিয়া স্বীকার করিতে হয় এবং তাহা হইলেই দ্বৈতবাদ স্থাপন করা হইল। এই স্থাপিত দ্বৈত-জ্ঞানকে অদ্বৈতে পরিণত করা বিচার ও অভ্যাস ব্যতীত সিদ্ধ হয় না। শাস্ত্রা- লােচনা দ্বারা যদিও দ্বৈতবাদ খণ্ডন করা যায়, তথাপি উহা অসিদ্ধ, যেহেতু তাহাতে প্রকৃত ভ্ৰম ভঞ্জন হয় না। কারণ, অদ্বৈত-জ্ঞান জন্মাইলেও সংসার-লিপ্সা থাকে। বিচার ও অভ্যাস ব্যতীত তাহা দূর করা যায় না। বিচার ও অভ্যাস পরিপক্ক হইলে বাহ্যজগৎ অন্তর্জগতে বিলীন হইয়া আপনা আপনিই অদ্বৈত-জ্ঞান উপস্থিত হয়। তখন সেই পরমাত্মা- কেই জগদাকারে দর্শন হইয়া থাকে। বিজ্ঞানরূপিণী মহা- মায়ার নিজ আবরণ ও বিক্ষেপ-শক্তি দ্বারা আবরিত হইয়া ব্ৰহ্মই জগদাকারে দৃষ্ট হন। এক্ষণে বিবেচনা করিতে হইবে যে, প্রকৃত পক্ষে এ জগতের অস্তিত্ব আছে কি না? যদি জগতের প্রকৃত অস্তিত্ব স্বীকার করা যায়, তাহা হইলে বিবেচনা করিতে হইবে যে, একমাত্র চিৎস্বরূপ ব্রহ্ম হইতে এই চরাচর জগৎ উৎপন্ন হই- জগৎপত্তি সম্বন্ধে সাধারণের মতামত য়াছে ; পরন্তু যদি জগতের অস্তিত্ব স্বীকার না করা যায়, তাহা হইলে সেই একমাত্র চিন্ময় ব্ৰহ্মই আছেন, অপর কিছু নাই বলিয়া প্রতিপন্ন হয়। সৃষ্টিবিচার- ১৭ দ্বৈতাদ্বৈত-বিবেক তৎপর পণ্ডিতগণ বলিয়া থাকেন যে, এই বিশ্বসৃষ্টি কেবল সেই পরমাত্মার মাহাত্ম্য বিস্তার মাত্র ; কেহ বলেন- উহা স্বপ্নবৎ মায়া-স্বরূপ। কোন কোন সৃষ্টি-বাদীরা বলিয়া থাকেন যে, এই সৃষ্টি প্রভুর ইচ্ছা মাত্র। জ্যোতি ব্বি পণ্ডিতেরা বলিয়া থাকেন যে, কালক্রমে আপনা আপনি সৃষ্টি হয়। হয়। কেহ বলেন যে, পরমাত্মা আপনার ভােগ-বিলাসের জন্য এই জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন। কেহ বলেন, আপনার ক্রীড়ার্থই তিনি জগৎ নিৰ্মাণ করিয়া- ছেন। অপর বাদীরা বলিয়া থাকেন যে, উৎপাদন করাই পরমাত্মার স্বভাব, তাহাতে কোন বিশেষ কারণ নাই। তিনি পূর্ণকামী, তাহার কোন স্পৃহা নাই, সুতরাং তিনি কোনরূপ ইচ্ছা করিয়া সৃষ্টি করেন নাই, পরন্তু আপন স্বভাব- বশতঃ উৎপাদন করিতেছেন-ইত্যাদি নানাপ্রকার জগদুৎ- পত্তির কারণ ব্যক্ত করিয়াছেন। এক্ষণে উপনিষদ্ বা বেদান্ত শাস্ত্ৰ জগৎ সম্বন্ধে কি বলিতেছেন, বিশেষ ভাবে তাহা আলোচনা করা যাউক। ঈশ্বর-কর্তৃক সৃষ্ট ও জীব-কর্তৃক কল্পিত জগৎ বিভাগ করিয়া প্রদর্শন করা যাইতেছে--কেননা সেই বিভাগ হইলে জীবের পরিত্যাজ্য দ্বৈতভাব স্পষ্টরূপে উপনিষদের মতানুযায়ী জগৎপত্তির বিবরণ প্রকাশিত হয়। শ্বেতাশ্বতরােপনিষদে ব্যক্ত আছে,-মায়া-শক্তিকে প্রকৃতি বলিয়া জানিবে এবং সেই মায়ারূপ উপাধি-বিশিষ্ট চৈতন্য ঈশ্বর বলিয়া কথিত ১৮ বেদান্ত-বিবেক হয়। সেই মায়া-উপাধি-বিশিষ্ট ঈশ্বর এই সমুদয় জগৎ সৃষ্টি করিয়াছেন। অন্যান্য উপনিষদে আছে, এই আত্মা হইতে অভিন্ন সেই ব্ৰহ্ম হইতে আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, পৃথিবী, ওষধি, অন্ন এবং স্থূলদেহ-এই নিখিল পদার্থ যথাক্রমে উৎপন্ন হইয়াছে। যেমন অগ্নি হইতে ফুলিঙ্গ সকল উদ্ভূত হয়, তদ্রুপ অক্ষর-ব্ৰহ্ম হইতে বিবিধ প্রকার চেতন জীব ও নানাবিধ জড় পদার্থ সকল উৎপন্ন হইয়াছে। তিনি জীব- চৈতন্যরূপে সমুদয় প্রাণিদেহে প্রবিষ্ট হইয়াছেন, প্রাণধারণ হেতু তাহার জীবসংজ্ঞা। সৰ্বাধিষ্ঠানভূত সৰ্ব্ব্যাপী ব্ৰহ্ম- চৈতন্য ও পূর্বোক্ত ইন্দ্রিয়-প্রাণ-মন-বুদ্ধিব সমষ্টিরূপ লিঙ্গ- শরীর এবং সেই লিঙ্গদেহে স্থিত চৈতন্য-প্রতিবিম্ব, এই সমুদয়ের সমষ্টি জীব শব্দে কথিত। ঈশ্বরীয় মায়াশক্তিরূপ উপাধির যে প্রকার জগৎ-সৃজন সামর্থ্য আছে, তদ্রুপ তাহার মােহন- শক্তিও আছে; সেই শক্তিদ্বারা জীব মুগ্ধ হইয়া সাংসারিক সুখ-দুঃখ প্রাপ্ত হয় এবং মােহদ্বারা ঈশ্বরত্ব বিস্মৃত হইয়া সংসারে নিমগ্ন ও শােকাকুল হয়। শস্য প্রভৃতি অমসমূহ যদিও শস্যাদিরূপেই ঈশ্বরেরই সৃষ্টি, তথাপি জীব জ্ঞান ও কর্ম দ্বারা তৎসমুদয়ের ভােগ্যত্ব ঈশ্বরষ্ট দ্বৈত প্রপঞ্চ ও জীব- স্থাপন করিয়াছে। তৎসমুদয়ের অন্ন- সৃষ্ট দ্বৈত প্রপঞ্চের বিচার রূপে সৃষ্টি জীব-কৃত। পিতৃজা এবং পতিভােগ্যা, সেইরূপ এই জগৎ ঈশ্বসৃষ্ট এবং জীবভােগ্য, এই দুই ভাবে অম্বিত । আর মায়াবৃত্তিরূপ গ্লেমন রমণী অতএব দ্বৈতাদ্বৈত-বিবেক জগৎ-সৃষ্টি বিষয়ে ঈশ্বরের যে সঙ্কল্প, তাহাই এস্থলে সৃষ্টিহৈতু এবং মনােবৃত্তিরূপ ভােগবিষয়ক জীবের যে সঙ্কল্প, তাহাই ভােগসাধন। যদিও ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট সমুদয় বস্তু স্বরূপতঃ পুনৰ্ব্বার জীব-কর্তৃক সৃষ্ট হইতে পারে না, তথাপি ঈশ্বর-সৃষ্ট মণি প্রভৃতি স্তুসকল রূপান্তর প্রাপ্ত না হইয়াও ডােক্তার নানা প্রকার বুদ্ধি প্রযুক্ত সেই সকল বস্তুর ভােগ নানা প্রকারে হইয়া থাকে। কেহ মণি লাভে হৃষ্ট হয়, কেহ অলাভ বশতঃ ক্ষুন্ন হয়, কিন্তু বৈরাগ্যবান্ ব্যক্তি সেই মণি দর্শন করেন মাত্র, তাহার হর্ষ বা দুঃখ কিছুই হয় না । মণির প্রিয়, অপ্রিয় ও উপেক্ষ্য এই তিন রূপ জীবসৃষ্ট, আর প্রিয়, অপ্রিয় ও উপেক্ষ্য এই ভাবম-সাধারণ মণিরূপ ঈশ্বরসৃষ্ট। এক রমণী—সম্বন্ধযুক্ত নর-নারীর ব্যবহারে ভাৰ্য্যা, পুত্রবধু, ননন্দা, যাতা ও মাতা ইত্যাদি নানা প্রকারে বিভিন্ন আখ্যা প্রাপ্ত হয়, কিন্তু স্ত্রীমূর্তির স্বরূপতঃ ভেদ হয় না। যদি বল, ভাৰ্য্যা, পুত্রবধু ইত্যাদি জ্ঞানসকল ভিন্ন হউক, কিন্তু স্ত্রী- আকারের ত ভেদ হইতেছে না, স্ত্রীমূর্তিতে জীবসৃষ্ট কিঞ্চিৎ বৈলক্ষণ্যও পরিদৃষ্ট হয় না, সুতরাং জীবসৃষ্ট ভােগ্য এ কথা সঙ্গত হয় কিরূপে? -তাহার মীমাংসা এই যে, বাহ বস্তু দুই প্রকার ;-বাহদেশে পঞ্চভূতময় এবং অন্তঃকরণে মনাে- ময়; তাহাতে যদিও বাহ্যদেশে দৃশ্যমান মাংসময়ী স্ত্রীর ভেদ না হউক, কিন্তু অন্তঃকরণবৃত্তিস্থ সেই মনােময়ী স্ত্রী-প্রত্নী, বধূ ২০ বেদান্ত-বিবেক অরূপত্বের প্রমাণ প্রভৃতি নানা প্রকারে কল্পিত হয়। আবার যদি বল, আন্তি, স্বপ্ন, মনােরাজ্য এবং স্মৃতি ইহাতেই বাহ্যবস্তুর মনােময় স্বরূপের সম্ভব হউক, কিন্তু জাগ্ৰৎ অব- বাহবস্তুর মনােময় স্থাতে বাহ্যবস্তুর মনােময়ত্ব কি প্রকারে সম্ভব হয় ? তাহাতে সিদ্ধান্ত এইবাহে দৃশ্যমান বস্তুতে চক্ষু প্রভৃতি সংযােগ দ্বারা অন্তঃকরণ সংযুক্ত হইলে সেই বাহ্যবস্তুর যে প্রকার আকার, অন্তঃকরণও তদ্রুপ হয়, সুতরাং জাগ্রন্থ অবস্থাতেও বাহবস্তুর মনােময় হওয়া সম্ভব হয়। যেমন সাধারণ বস্তুপ্রকাশক সূৰ্যাদির আলােক যখন যে বস্তুকে অধিকার করে, তখন সেই বস্তুর আকার বিশিষ্ট হয়, নতুবা বস্তুর স্বরূপ প্রকাশ হয় না; তদ্রুপ সৰ্ব্ব-বস্তু-প্রকাশক অন্তঃকরণ যখন যে বস্তুকে অধিকার করে, তখন তদাকারে পরিণত হয়, তদ্ভিন্ন তত্তদ্বস্তর জ্ঞান হয় না। বাহ বস্তুসকল চক্ষু প্রভৃতির নিকটস্থ হইলে বুদ্ধিস্থ প্রমাতৃ-চৈতন্য হইতে অন্তঃকরণ-বৃত্তি উৎপন্ন হইয়া সেই বস্তুকে অধিকার করতঃ তদাকারে পরিণত হয়, সুতরাং যে বস্তু যেমন বাহ প্রদেশে পাঞ্চভৌতিক, সেই বস্তু অন্তঃকরণে তদ্রুপ মনােময় হয়। এতাবতা প্রমাণিত হইল যে, বাহ্যবস্তু দুই প্রকার ; ভৌতিক ও মনােময়। যেমন বাহ মৃন্ময়-ঘট ঈশ্বর-সৃষ্ট, জীবঃ দ্বৈত-প্রপঞ্চই তদ্রুপ অন্তঃকরণে মনােময় জীবসৃষ্ট। জীবের বন্ধনের কারণ বাহ্য মৃন্ময় ঘট চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয় দ্বারা জ্ঞেয়, আর অন্তঃকরণে মনােময় বস্তু সাক্ষী-চৈতন্য দ্বারা দ্বৈতাদ্বৈত-বিবেক প্রকাশিত হয়। অন্বয় ও ব্যতিরেক দ্বারা অবগত হওয়া যাইতেছে যে, মনােময় বস্তু সকলই জীবের সংসারে বদ্ধ হইবার হেতু, মনােময় বস্তুর বিদ্যমানতাতে সুখ-দুঃখ উৎপন্ন হয়, আর তাহার অবিদ্যমানে সুখ বা দুঃখ কিছুই হয় না। —স্বপ্নবস্থাতে বাহ্য বস্তুর জ্ঞানাভাব হইলেও মনােময় বস্তু দ্বারা জীব বদ্ধ হয় এবং সমাধি, সুষুপ্তি অথবা মূচ্ছাবস্থাতে বাহ্যবস্তু সত্ত্বেও মনোময়ের অভাব জন্য বন্ধনহীন হয়। পুত্র দূরদেশে অবস্থানকালে কোন মিথ্যাবাদী আসিয়া তাহার পিতাকে বলিল যে, তােমার পুত্রের মৃত্যু হইয়াছে,-শুনিয়া তিনি পুত্রের মৃত্যু নিশ্চয় করিয়া অবশ্য ক্রন্দন করেন । অথবা কোন ব্যক্তি, তাহার দূরদেশস্থিত পুত্রের যথার্থ মৃত্যু হইলেও, তৎসংবাদ না পাওয়ায় জীবিত জ্ঞান করিয়া প্রফুল্ল- চিত্ত থাকেন। অতএব মনােময় জগৎ যে সর্বজীবের সংসার- বন্ধনের কারণ, ইহা সর্ব প্রকারে সিদ্ধ হইল। জীবসৃষ্ট মানস-প্রপঞ্চরূপ দ্বৈতজগৎ অন্তঃকরণ হইতে পরিত্যক্ত হইলে জীবমুক্তি হয়, সেই হেতু উক্ত প্রকার দ্বৈত-প্রপঞ্চ ঈশ্বর নির্মিত দ্বৈত-প্রপঞ্চ হইতে পৃথক্ করিয়া আলােচনা করা হইল। ঈশ্বর-সৃষ্ট দ্বৈত-প্রপঞ্চের অবশ্য প্রয়ােজন আছে, যেহেতু বাহ-জগতের সত্তা ব্যতীত বন্ধনের কারণ অন্তঃকরণে ঈশ্বর-সৃষ্ট বাহজগৎ জীবসৃষ্ট তত্তদ্বস্তুর আকার প্রতিভাস সম্ভাবিত হয় না। যদি বল, বাহ্যজগৎ ব্যতিরেকে পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব সংস্কার দ্বারা অন্তঃকরণে জগৎ প্রতিভাসরূপ মনােময় জগতের কারণ ২২ বেদান্ত-বিবেক দ্বৈত-প্রপঞ্চে মিথ্যাত্ব মনােময় জগৎ সম্ভাবিত,---ইহা স্বীকার করিলে ঐরূপ বাহ- জগতের প্রয়ােজন না হউক, কিন্তু তৎপ্রতিপাদন নিরর্থক বলা যাইতে পারে না। যেহেতু বস্তুর সত্তাসিদ্ধি প্রমাণাধীন, তাহা কোন প্রয়ােজনকে অপেক্ষা করে না। আবার পূর্ব পূৰ্ব্ব জন্মের সংস্কারও বহ-জগতের অস্তিত্বই ঘােষণা করি- তেছে। অতএব ঈশ্বরসৃষ্ট দ্বৈত-প্রপঞ্চই জীবসৃষ্ট দ্বৈত- প্রপঞ্চের অর্থাৎ মনােময় জগতের কারণ সন্দেহ নাই। ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট বাহ দ্বৈত-প্রপঞ্চের নিবৃত্তি না হইলেও তাহাতে মিথ্যা জ্ঞান হইলেই অদ্বিতীয় ব্ৰহ্মজ্ঞান হয়। দ্বৈতজ্ঞান অদ্বৈত-জ্ঞানের বিরােধী জ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞানের হেতু বলিয়া বাহ্য দ্বৈত-জগতের অভাব হই- লেই যে অদ্বিতীয় ব্রহ্মজ্ঞান হইবে, একথা বলা যায় না। কারণ, প্রলয়কালে সমস্ত জগতের নাশ হইলে অদ্বৈত-বিরােধী দ্বৈতবস্তুর অভাবেও গুরু বা শাস্ত্রাদির অভাববশতঃ অদ্বিতীয় ব্ৰহ্মজ্ঞান হইতে পারে না। ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট দ্বৈত বাহ- প্রপঞ্চ অদ্বৈত তত্ত্বজ্ঞানের বিরােধী নহে, বরং তদ্বারাই অদ্বৈত ব্ৰহ্মজ্ঞান হয়,—অর্থাৎ গুরু বা শাস্ত্রোপদেশ ব্যতীত কিম্বা দ্বৈত প্রপঞ্চে মিথ্যা জ্ঞান ব্যতিরেকে অদ্বৈত ব্ৰহ্মজ্ঞান কখনও হয় না। সুতরাং তাহাকে অপ্রয়ােজনীর বলা যায় না। জীবসৃষ্ট মনােময় দ্বৈত-প্রপঞ্চ দুই প্রকারে বিভক্ত ;- যথা শাস্ত্রীয় দ্বৈত এবং অশাস্ত্রীয় দ্বৈত। অশাস্ত্রীয় দ্বৈত আবার তীব্র ও মন্দ, এই দুই প্রকারে বিভক্ত। কাম- দ্বৈতাদ্বৈ-বিবেক ২৩ ক্রোধাদি মনের দ্বৈত ভাবসকলকে তীব্র বলা যায় এবং তদ্ভিন্ন মনােরাজ্যসকলকে মন্দ বলে ; ব্ৰহ্ম-জিজ্ঞাসু পুরুষের এতদুভয় জীবসৃষ্ট মনােময় জগতের নিবারণ করা কর্তব্য। যেহেতু ব্ৰহ্ম- অশাস্ত্রীয় দ্বৈত-প্রপঞ্চের নিবৃত্তি জ্ঞানসাধনে শান্তি এবং সমাধি এই উভয়ের অনুষ্ঠান শ্রুতিতে উক্ত হইয়াছে। কেবল অদ্বৈত- জ্ঞানের পূর্বকালেই যে কাম-ক্রোধাদি পরিত্যাগ করিবে এমত নহে, জীবন্মুক্তরূপে প্রসিদ্ধ হইবার জন্য জ্ঞানের উত্তর কালেও তাহা পরিত্যাগ করা কর্তব্য। কাম্য বস্তুতে অনিত্যাদি দোষের অনুসন্ধান করাই কাম-ক্রোধাদি পরি- ত্যাগের অসাধারণ উপায় বলিয়া বেদান্তাদি শাস্ত্রে ভূয়ােভূয়ঃ প্রতিপাদিত হইয়াছে। অতএব সেই সকল বিষয় অন্বেষণ করিয়া কাম-ক্রোধাদি পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক সুখে কালযাপন কর। সৰ্ব্বদা বিষয়ানুধ্যান করিলে আসক্তি জন্মে, পরে তদ্বিষয়ে কামনা হয়, পরে মােহ, স্মৃতি-বিভ্রম, বুদ্ধিনাশ, অশেষে প্রাণবিয়ােগও হয়, অতএব ইহা অপেক্ষা অনিষ্ট- জনক আর কি হইতে পারে ? নিরােধ ও অভ্যাস দ্বারা জীবসৃষ্ট মনােময় জগতের অশাস্ত্রীয় দ্বৈত-প্রপঞ্চের নিবৃত্তি হইয়া থাকে। এই প্রকারে মনােরাজ্য পরাজিত হইলে মন বৃত্তিশূন্য হইয়া জড়বৎ স্থিরভাবে অবস্থান করে, তখন পরম নিৰ্ব্বাণ-মুক্তির পথ পরিষ্কৃত হইতে থাকে। আত্মর সহিত অভেদরূপ ব্ৰহ্মবিষয়ক বিচারকে শাস্ত্রীয় মানস-প্রপঞ্চ বলিয়া উক্ত হইয়াছে। প্রথমতঃ নিরােধ ও ২৪ বেদান্ত-বিবেক অভ্যাস দ্বারা অশাস্ত্রীয় দ্বৈতসমুদয়ের নিবৃত্তি করিয়া যতদিন জীষ্ট মননাময় জগতের অদ্বৈত ব্ৰহ্মজ্ঞান না হয়, ততদিন শাস্ত্রীয় শাস্ত্রীয় দ্বৈত-প্রপঞ্চের নিবৃত্তি দ্বৈতের অনুশীলন করিবে। তত্ত্বজ্ঞান- সম্পন্ন হইলে তাহাও পরিত্যাগ করিবে। যথানিয়মে গুরু- বাক্যে বিশ্বাস করতঃ বেদান্তশাস্ত্র অধ্যয়ন ও পুনঃ পুনঃ অভ্যাস করতঃ আত্মা ও ব্রহ্মের একত্ব প্রতিপাদন করিতে হইবে। জয়ায়ুজ, অণ্ডজ, শ্বেতজ ও উদ্ভিজ্জ এই চারি প্রকার স্থূল শরীর, তাহার ভােজ্য অন্ন প্রভৃতি, তাহার আশ্রয় এই সমস্ত স্থূল ব্ৰহ্মাণ্ড পঞ্চীকৃত ভূত বলিয়া অবগত হইবে। যেহেতু কাৰ্য্য কখনও নিজ কারণ হইতে ভিন্ন নহে, অতএব পঞ্চভূতের কাৰ্য্য এই সমস্তই সেইরূপ ভূত মাত্ৰ, সুতরাং পঞ্চভূত হইতে ভিন্ন নহে।. আকাশাদি ভূতের নিজ নিজ গুণের সহিত পঞ্চীকৃত আকাশাদি পঞ্চ মহাভূত, সূক্ষ্ম-শরীর এই সমস্তই কেবল অপঞ্চীকৃত ভূত। আবার রজঃ, তমঃ ও সত্ত্বগুণের সহিত অপঞ্চীকৃত ভূতসমূহ বাস্তবিক মায়া মাত্র এবং এই মায়া চিদাভাসযুক্ত। সুতরাং আত্মই একমাত্র সত্য পদার্থ—জীবসৃষ্ট মনােময় জগৎ মিথ্যা। তাহা কেবল অন্তঃকরণে ঈশ্বরসৃষ্ট বাহ্য জগতের আভাস মাত্র। চিত্তবৃত্তি নিরােধ ও বিচার দ্বারা ঈশ্বরসৃষ্ট দ্বৈত-প্রপঞ্চের খণ্ডন করিতে পারিলে জীবসৃষ্ট মনােময় জগতের শাস্ত্রীয় দ্বৈত- প্রপঞ্চেব নিবৃত্তি হইয়া থাকে। তখন শাস্ত্র ও বিচারাদি সকল পরিত্যক্ত হয়।

দ্বৈতাদ্বৈত বিবেক
২৫
পূৰ্বেই বলা হইয়াছে যে, বাহ্য জগতের সত্তা ব্যতীত
বন্ধনের কারণ অন্তঃকরণে তত্তদ্বস্তুর আকার-প্রতিভাস সম্ভা-
ঈশ্বরঃ দ্বৈত-প্রপঞ্চের
বিত হয় না। অতএব নিরােধ দ্বারা
নিবৃত্তি পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব জন্মের সংস্কার এবং বিচার
দ্বারা বাহ্য জগতের নিবৃত্তি করিতে পারিলে মনােময় জগতের
লয়-বিলয় সাধিত হয়। এই হেতু বাহ্য জগতের বিচার
প্রয়ােজন। বেদান্ত-বিবেকশীল ব্যক্তিরা এই জগৎকে স্বপ্নের
ন্যায় অনিত্য, মিথ্যা, ভ্রমাত্মক, বিনশ্বর ও অলীক বলিয়া
জানেন। স্বপ্নবস্থায় যেমন অসত্য বস্তুকে সত্য বলিয়া বােধ
হয় এবং আমি স্বপ্ন দেখিতেছি বলিয়া কখনই বােধ হয় না,
সেইরূপ মায়াবলে এই অসত্য জগৎকে সত্য বলিয়া বােধ,
হইতেছে এবং আমি যে মায়াবিমােহিত হইয়া এরূপ দেখি-
তেছি, তাহা কখনই বােধ হয় না। সুতরাং অজ্ঞানাবস্থায়
এই জগৎ সত্যৎ বােধ হইলেও জ্ঞানােদয় মাত্রেই এই
জগতের অস্তিত্ব বিনাশপ্রাপ্ত হয়। যদি বল, বেদান্তশাস্ত্রেই
উক্ত আছে যে, যেরূপ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সকল অগ্নির স্বরূপ,
সেইরূপ সহস্র সহস্র প্রকার জীবসংযুক্ত এই অপরিসীম
জগৎও তাহার স্বরূপ— তবে এই জগৎকে কি প্রকারে অলীক
ও ভ্রমাত্মক বলিতে পারা যায় ? তদুত্তরে বেদান্তই বলিতে-
ছেন যে, মৃত্তিকা, লৌহ, বিস্ফুলিঙ্গাদি দৃষ্টান্ত দ্বারা যে
সৃষ্টির কথা বলা হইয়াছে, তাহা জগৎ, জীব ও আত্মার
একত্ব প্রতিপাদনাথ-কোন দ্বৈত প্রতিপাদনাৰ্থ নহে।

২৬
বেদান্ত-বিবেক
যেরূপ এক অপরিচ্ছিন্ন আকাশকে ঘটাকাশ, পটাকাশ ও মহা-
কাশ ইত্যাদি নানারূপে দ্বৈত কল্পনা করা হয়, কিন্তু বাস্তবিক
আকাশ একই অদ্বৈত মাত্র ; এই জগৎ, জীব ও পরমাত্মার
ভেদও তদ্রুপ জানিবে। আত্মা আত্মস্বরূপ, নানা প্রকার
নহেন, কিন্তু নানা বস্তুর অন্তর র্তিরূপে বিদ্যমান আছেন।
যেরূপ রঞ্জু স্বীয় আকারে অবস্থিত থাকিয়াও সৰ্ব্বপ্রকারে
সর্পরূপে কল্পিত হয়, আত্মাও তদ্রুপ স্বরূপে অবস্থান পূর্বক
অনন্ত ভাবে কল্পিত হইয়া থাকেন।
এইরূপে আত্মতত্ত্ব
পরিজ্ঞান হইলেই দ্বৈত-প্রপঞ্চের নিবৃত্তি হইয়া সর্বপ্রকার
অনর্থের নিবৃত্তি হয়। অর্থাৎ তখন আর দ্বৈতজ্ঞান থাকে না।
সুতরাং আত্মা অদ্বয়। আত্মাকে অদ্বৈতরূপে জানিতে পারি-
লেই “সােহহং” অর্থাৎ আমিই সেই ব্ৰহ্ম ইত্যাকার জ্ঞান
হয়। অতএব অনন্তচিত্তে তত্ত্ব পৰ্যালােচনা করিলেই সেই
অদ্বৈত আত্মার দর্শন লাভ হইয়া থাকে এবং তখনই অদ্বৈত
জ্ঞান পরিপক্ক হয়।
এই যে পরিদৃশ্যমান জগৎ দেখিতেছ, তাহাই
অখণ্ডিত ব্রহ্মের রূপ। এই বিস্তীর্ণ মায়াময় সংসার
আত্মাতেই লয় ইয়া থাকে। এই
আত্মাকে কেহ সুক্ষ্ম কেহ বা স্কুল
বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু
তাহাতে স্কুল-সূক্ষ্ম ভাব নাই, কারণ সূক্ষ্ম হইলে এই বৃহৎ
জগৎকে সমাবৃত করা অসম্ভব ; আর স্কুল হইলে অণুপ্রমাণ
অাত্মা সম্বন্ধে নানা মতের
খগুন এবং একত্ব ও
অদ্বিতীয়ত্ব নিরূপণ

দ্বৈতাদ্বৈত-বিবেক ২৭ = = = = = = সমীচীন নহে, - বিশিষ্ট জীবদেহে আত্মার অবস্থান অসম্ভব। আগমিকেরা আত্মার মুর্তি কল্পনা করেন অর্থাৎ শিব, বিষ্ণু প্রভৃতিকে পরমাত্মা বলেন, কিন্তু ঐসকল দেবতার মূর্তি বা দেহ অচির- স্থায়ী। যাহার মূর্তি স্বীকার করেন না, তাহারা পরমাত্মাকে শূন্যস্বরূপ নিরাকার বলিয়া বর্ণনা করেন; কিন্তু এ মতও যেহেতু এই বিশ্ব পরমাত্মার বিরাট দেহ বলিয়া উক্ত হইয়াছে। কেহ বা কালকে পরমাত্মা বলিয়া থাকেন, এ মতও অসৎ ; কারণ কালের দণ্ড-পল-মুহূর্তাদি ব্যবহার জন্য অখণ্ড বলা যায় না। কেহ কেহ দিকে পরমাত্মা বলেন, কিন্তু দিক্ সকলও পূর্ব-পশ্চিমাদি ভেদে বহু। মন্ত্র- বাদীরা মন্ত্রকেই ব্ৰহ্ম বলেন, কিন্তু মন্ত্রবলে কালদষ্ট ব্যক্তিকে আরােগ্য করা যায় না। কেহ বলেন, চতুর্দশ ভুবনই পরমাত্মা, কিন্তু চতুর্দশ ভুন বহু জীবের আবাসভূমি। সুতরাং উহা জড়। কোন কোন বাদী মন-বুদ্ধি-চিত্ত অর্থাৎ অন্তঃকরণকে আত্মা বলেন, কিন্তু অন্তঃকরণ সুষুপ্ত্য- বস্থায় থাকে না, সুতরাং তাহা আত্মা নহে। মীমাংসকেরা বিধি-নিষেধজ্য ধর্মাধর্মকেই আত্মা বলেন, কিন্তু দেশকাল- ভেদে ধৰ্মাধর্মের বিপ্রতিপত্তি দেখা যায়, অতএব এ মতও সাঙ্খ্যবাদীরা পঞ্চবিংশতি তত্ত্বকে পরমাত্ম-অরূপ নির্ণয় করিয়া থাকেন, কিন্তু আত্মা তত্ত্বাতীত, তত্ব নহেন। পাতঞ্জল মতে পঞ্চবিংশতি তত্ত্বের অতীত ঈশ্বর কল্পিত হইয়া থাকে, কিন্তু ঈশ্বর ও পুরুষ একই তত্ত্ব, পুরুষাতিরিক্ত ঈশ্বর

২৮
বেদান্ত-বিবেক
স্বীকার করিলে ঘটাদির ন্যায় অনীশ্বরত্ব প্রতিপত্তি হয়,
সুতরাং এ মতও অসৎ। পাশুপত ও অন্যান্য বাদিগণ
পরমাত্মাকে অনন্ত প্রকার পদার্থ -স্বরূপ বলিয়া থাকেন,
কিন্তু পরমাত্মাকে বহুরূপ কল্পনা করা অবিধেয়, যেহেতু
তিনি এক এবং অদ্বিতীয়।
পৃথক পৃথক্‌ ভাবাপন্ন ব্যক্তিগণ সেই পরমাত্মাকে
বহুরূপে কল্পনা করেন, কিন্তু যিনি বুঝিতে পারেন যে, সেই
একমাত্র পরমাত্মাতে ভ্রমবশতঃ নানাবিধ পদার্থ কল্পিত হইয়া
থাকে, তিনিই বেদান্তের মর্ম বুঝিতে পারিয়া নিঃশঙ্কচিত্ত
হইতে পারেন। এই হেতু মুমুক্ষু সাধক সমাহিত ভাবে
দ্বৈতাদ্বৈত-বিবেক দ্বারা অবগত হইবে যে, অদ্বৈতই পরমার্থ
এবং দ্বৈত সেই অদ্বৈতের কাৰ্য। যখন সমাধি উপস্থিত হয়,
তখন দ্বৈতবুদ্ধি থাকে না। শ্রুতিতেও উক্ত আছে যে,
“একমেবাদ্বিতীয়”; সুতরাং অদ্বৈত বৈদান্তিক মত
সৰ্ব্বথা অবিরুদ্ধ। তাই মাক্যোপনিষদ্ বলিয়াছেন,
অদ্বৈত পরমাখো হি দ্বৈতং তভেদ উচ্যতে।
তেষামুভয়থা দ্বৈতং তেনায়ং ন বিরুধ্যতে।

পঞ্চকোশ-বিবেক আত্মা ও তাহার স্বরূপ অগ্নি যেমন সমূহ দৃশ্য পদার্থে প্রচ্ছন্ন ভাবে অবস্থিতি করে এবং আমরা যেমন সেই অবস্থান আমাদের জ্ঞানেন্দ্রিয় সমূহ দ্বারা প্রত্যক্ষ করিতে অসমর্থ হইলেও অনুমান দ্বারা অনুভব করিতে সমর্থ হই, আত্মা তাদৃশ সমূহ পদার্থে প্রচ্ছন্ন ভাবে অবস্থান করেন এবং একমাত্র অনুমান দ্বারা আমরা আত্মার এতাদৃশ অবস্থান অনুভব করিতে সমর্থ হই। আত্মা সর্বব্যাপী এবং প্রশান্ত ভাবে অবস্থান করেন বলিয়া আনন্দময়। আত্মা এক, নিত্য ও সত্য।. সৰ্ব্বব্যাপী সচ্চিদানন্দময় আত্মাই পরমাত্মা নামে অভিহিত হয়েন। আত্মাধিকৃত পদার্থসমূহ প্রকৃতি নামে উক্ত হয়। আত্মা এবং প্রকৃতি কদাচ পরিচ্ছিন্ন ভাবে অবস্থিতি করেন । পরন্তু অগ্নি সৰ্বব্যাপী এবং এক হইলেও তদধিকৃত পদার্থ যেমন অনেক দৃষ্ট হয়, তাদৃশ আত্মা সৰ্ব্বব্যাপী এবং এক হইলেও তদধিকৃত প্রকৃতি অনেক থাকে। এতদ্ব্যতীত প্রকৃতি ও তাহার জল যেমন কখন বাষ্পরূপে, কখন মেঘ- রূপে আবার কখন তুষাররূপে অবস্থান করে, তাদৃশ প্রকৃতি অনেক বলিয়া কোন কোন অংশে স্বরূপ ০ বেদান্ত-বিবেক কতিপয় ভিন্ন ভিন্ন রূপে পরিদৃষ্ট হয়। আবার বহু হইলেও কোন-না-কোন রূপে প্রকৃতি সর্বদা সর্বত্র বিদ্যমান থাকে। সুতরাং আত্মার ন্যায় প্রকৃতিকেও সৰ্বব্যাপিনী বলা যায়। যে প্রকার স্বরূপে অবস্থিত প্রকৃতিতে আনন্দময় আত্মা বিদ্যমান থাকেন, তাহাকে প্রকৃতির আনন্দময় স্বরূপ বলে। প্রকৃতির এই স্বরূপ অপরিবর্তিত থাকিলে কদাচ সংসারের সৃষ্টি সম্ভবপর হইত না। প্রকৃতির স্বরূপান্তর-গ্রহণ সৃষ্টি নামে অভিহিত হয় এবং একমাত্র অনুমান দ্বারা প্রকৃতির স্বরূপান্তর-গ্রহণ উত্তম রূপে অনুভব করা যায়। শীতােষ্ণাদি কারণ বশতঃ জল যেমন বাষ্পাদিতে রূপান্তরিত হয়, প্রমাণ বিপৰ্যয়াদি বৃত্তি কারণ বশতঃ প্রকৃতি তাদৃশ আনন্দময়- স্বরূপ হইতে অন্যান্য স্বরূপে পরিণত হয়। প্রকৃতির অন্যান্য স্বরূপসমূহ যথাক্রমে বিজ্ঞানময়, মনােময়, প্রাণময় এবং অন্নময় বলিয়া প্রসিদ্ধ। এতদ্ব্যতীত আরও অনেক প্রাকৃ- তিক স্বরূপ থাকিতে পারে, কিন্তু তৎসমুদয় আমাদের বুদ্ধিগম্য বলা যায় না। কাষ্ঠাদির পরিবর্তনে যেমন তদধিষ্টিত অগ্নির স্বরূপ পরিবর্তন হয়, প্রকৃতির স্বরূপ পরিবর্তনে তাদৃশ অধি- ষ্ঠিত আত্মার স্বরূপ পরিবর্তন হয়। পরন্তু এই পরিবর্তনে যে এককালে সমগ্রা প্রকৃতি অথবা সৰ্বব্যাপী আত্মা স্বরূপান্তর গ্রহণ করে, এরূপ বলা যায় না। প্রশান্ত ভাবে অবস্থিত আমাদের কোনরূপ ইষ্টানিষ্ট পদার্থের সাক্ষাৎকার হেতু যেমন অশান্তিবাবিকার উপস্থিত হয়, পঞ্চকোশ-বিবেক ৩) W আনন্দময় আত্মার স্বরূপান্তর প্রশান্ত ভাবে অবস্থিত আনন্দময় আত্মারও তাদৃশ প্রাকৃতিক অন্য স্বরূপ সাক্ষাৎকারহেতু অশান্তি বা বিকার উপস্থিত হয়। অথবা বনমধ্যস্থ শুষ্ক কষ্ঠসমূহের পরস্পর সংঘর্ষণে যেমন তন্মধ্যে প্রচ্ছন্ন ভাবে অবস্থিত প্রশান্ত অগ্নি অথবা অগ্নির অংশবিশেষ প্রদীপ্ত বা চৈতন্যযুক্ত হয়, বৃত্তিসম্বন্ধ হেতু তাদৃশ প্রকৃতিমধ্যে প্রচ্ছন্ন- ভাবে অবস্থিত আনন্দময় আত্মা, অথবা আত্মার অংশবিশেষ চৈত্যস্বরূপে আনীত হয়েন। সুতরাং অগ্নি প্রদীপ্ত হইলে যেমন কাষ্ঠসমূহের পূৰ্ব স্বরূপের অসদ্ভাব হয়, চৈতন্যরূপে আর্নীত হইলে আত্মার তাদৃশ আধারস্থানীয় প্রকৃতিরও পূর্ব স্বরূপের অসদ্ভাব হয়। স্বরূপান্তরে আনীত আত্মার এই সময় প্রদীপ্ত অগ্নির ন্যায় সৰ্ব্বব্যাপী এবং আনন্দময় স্বরূপের অপলাপ বিষয়ে বিজ্ঞান হয়। এই কারণ বশতঃ চৈতন্য- স্বরূপে আনীত আত্মার এই প্রথম স্বরূপান্তরকে বিজ্ঞানময় আত্মার বিজ্ঞানময় স্বরূপ বলা যায়। বিজ্ঞানময় আত্ম- দ্বারা অধিকৃতা প্রকৃতি বিজ্ঞানময় আত্মার বিজ্ঞানময় শরীর বলিয়া উক্ত হয়। যে সকল প্রকৃতি এইরূপে বিজ্ঞানময় স্বরূপের অন্তর্গত হয়, তৎসমুদয় প্রাকৃতিক বিজ্ঞানময় ক্ষেত্র বলা যায়। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানময় ক্ষেত্রে নময় শরীরধারী যে সকল আত্মা বিদ্যমান থাকেন, তাহারা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব নামে কীর্তিত হয়েন। আবার কাষ্ঠমধ্যে প্রদীপ্ত অগ্নি যেমন আপন পূৰ্ব্বস্বরূপ প্রাপ্তির স্বরূপ

বেদান্ত-বিবেক
নিমিত্ত আপন অধিকৃত কাষ্ঠকে দাহ করিতে প্রবৃত্ত হয়,
বিজ্ঞানময়-স্বরূপে আনীত আত্মা তাদৃশ আপন অধিকৃত
প্রাকৃতিক স্বরূপকে ভােগ করিয়া আপন পূৰ্ব্ব স্বরূপে পুনরা-
বর্তনের জন্য চেষ্টিত হয়। চৈতন্যস্বরূপে আনীত আত্মার ইহাই
বাসনা বলিয়া অভিহিত হয়। এই বাসনায় প্রণােদিত
হওয়ায় বিজ্ঞানময় আত্মার বিজ্ঞানেরও অভাব উপস্থিত হয়।
সকল বিজ্ঞানময় আত্মা যদ্যপি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানময়ক্ষেত্রস্থ
অন্যান্য বিজ্ঞানময় পদার্থসমূহের ভােগ-বাসনায় প্রবৃত্ত না
হইত, তাহা হইলে আর অন্য কোন প্রকার সৃষ্টির সম্ভাবনা
থাকিত না।
বিজ্ঞানময় আত্মর এবম্বিধ ভােগ-বাসনা বিজ্ঞানময়-
ক্ষেত্রস্থ বিপৰ্যয় বৃত্তির সাক্ষাৎকার হেতু সম্ভবপর হইয়া
বিপৰ্যয়-বৃত্তির সম্বন্ধহেতু
আত্মার মনােময়
বিজ্ঞানময় আত্মার বিজ্ঞানময় স্বরূপের
অপলাপ হয়। যে সকল বিজ্ঞানময় আত্মা বিপৰ্যয়-বৃত্তির
অনুসরণ করেন, তাঁহারা ভস্মাবৃত অগ্নির ন্যায় বিজ্ঞানময়
স্বরূপ হইতে মনোময় স্বরূপে আনীত হন। বিজ্ঞানময়
আত্মা মনােময় স্বরূপে আনীত হইলে, তদধিকৃতা প্রকৃতিরও
স্বরূপ পরিবর্তন হয়। সুতরাং মননাময় আত্মাধিকৃতা প্রকৃতি
মনােময় আত্মার মনােময় শরীর বলিয়া উক্ত হয়। যে সকল
প্রকৃতি এইরূপে মনােময় শরীরের অন্তর্গত হয় তৎসমুদয়
প্রাকৃতিক মনােময় ক্ষেত্র নামে খ্যাত হয়। ইন্দ্রাদি দেবতা-
থাকে।
স্বরূপ।

পঞ্চকোশ-বিবেক
আত্মার প্রাণময়
স্বরূপ
দিগের আত্মা মনােময় শরীরধারী বলিয়া পুরাণশাস্ত্রে উক্ত
হইয়াছে। যে সকল মনােময় শরীরধারী আত্মা প্রাকৃতিক
মনােময় ক্ষেত্রস্থ বিকল্পবৃত্তির অনুসরণ
করেন, তাঁহাদের মনােময় স্বরূপের
অপলাপ হয়। এবম্বিধ মনােময় আত্মা প্রাণময় স্বরূপে
আনীত হন।
প্রাণময় আত্মাধিকৃত প্রকৃতি প্রাণময় আত্মার
প্রাণময় শরীর বলিয়। উক্ত হয়। যে সকল প্রকৃতি এইরূপে
প্রাণময় শরীরের অন্তর্গত হয়, তৎসমুদয় প্রাকৃতিক প্রাণময়
ক্ষেত্র নামে খ্যতি হয়। প্রাণময় শরীরধারী প্রাণময় আত্মা-
গণ যক্ষ, রক্ষঃ, গন্ধৰ্ব্ব, ভূত, প্রেত ও বেতালাদি নানা নামে
পরিচিত হয়।
যে সকল প্রাণময় আত্মা প্রাকৃতিক প্রাণময়
ক্ষেত্ৰস্থ নিদ্ৰাবৃত্তির অনুসরণ কবেন, তাঁহাদের প্রাণময় স্বরূপের
অপলাপ হয়। এবম্বিধ প্রাণময় আত্মা
অন্নময়-স্বরূপে আনীত হন। অন্নময়-
স্বরূপে আনীত আত্মা আমাদের আত্মা বা জীবাত্মা
নামে বিখ্যাত। জীবাত্মাধিকৃত প্রকৃতি জীবাত্মার
অন্নময় শরীর বলিয়া উক্ত হয়। যে সকল প্রকৃতি অন্নময়-
স্বরূপের অন্তর্গত হয়, তৎসমুদয় প্রাকৃতিক অনুময় ক্ষেত্র
বলিয়া খ্যাত হয়।
প্রাকৃতিক অনুময় ক্ষেত্রে স্মৃতিবৃত্তি বিদ্যমান থাকে ;
অধিকন্তু প্রমাণ-বিপৰ্যয়াদি বৃত্তিসমূহ সূক্ষ্মরূপে অন্নময় ক্ষেত্রে
অবস্থিত হয়। স্মৃতিবৃত্তির অনুসরণ করতঃ অন্নময় আত্মা
আত্মার অন্নময়
স্বরূপ

৩৪ বেদান্ত-বিবেক অবস্থা সংসার মধ্যে নিরন্তর অসহনীয় যন্ত্রণা ভােগ করেন। কিন্তু জীবাত্মার পূর্ব স্বরূপ একদিন সৰ্ব্বব্যাপী ও আনন্দময় ছিল; বৃত্তিসম্বন্ধহেতু সেই স্বরূপ অন্তর্হিত হইয়াছে। আনন্দ- ময় আত্ম বিজ্ঞানময়, মননাময় এবং প্রাণময় স্বরূপ হইতেও যথাক্রমে বঞ্চিত হওয়ায় একমাত্র অন্ন- জীবাত্মার বর্তমান ময় স্বরূপ বিদ্যমান থাকে। অধিকন্তু আনন্দময় স্বরূপ হইতে বঞ্চিত হওয়ায় আত্মায় যে চৈতন্য- স্বরূপ প্রাদুভূত হয়, অন্নময় আত্মায়ও সেই চৈতন্য-স্বরূপ বিদ্যমান থাকে। আবার যথাক্রমে আনন্দময় স্বরূপ হইতে বিজ্ঞানময়াদি ক্রমে অন্নময়-স্বরূপে অবনতি হওয়ায়, জীবাত্মায় আনন্দময়াদি ক্রমে প্রাণময় পৰ্যন্ত প্রত্যেক স্বরূপের যথাসম্ভব সূক্ষ্মা স্মৃতি বিদ্যমান থাকে। এতদ্ব্যতীত আত্মার অনুময় শরীরে প্রাণময়াদি অন্যান্য শরীর ক্রমসূক্ষ্ম হইয়া বিদ্যমান রহিয়াছে। এই সকল স্বরূপ আমাদের আত্মার সূক্ষ্মশরীর এবং কারণশরীর নামে অভিহিত হয়। সূক্ষ্মবিচার দ্বারা অবগত হওয়া যায় যে, আমাদের অন্নময় শরীর প্রাণময় শরীর দ্বারা প্রাণময় শরীর মনােময় শরীর দ্বারা, মনােময় শরীর বিজ্ঞানময় শরীর দ্বারা এবং বিজ্ঞানময় শরীর আনন্দময় শরীর দ্বারা আপন আপন আবশ্যকীয় কৰ্ম্মসমূহে নিয়ােজিত হয়। প্রত্যেক শরীরাধিষ্ঠিত আত্মা পূর্বোক্ত বাসনানুসারে তুল্য-স্বরূপ-বিশিষ্ট পদার্থ সমূহের ভােক্তারূপে বৰ্তমান থাকায় আমাদের প্রত্যেক শরীর স্বজাতীয় শরীর দ্বারা আপন পঞ্চকোশ-বিবেক ৩৫ আপন পুষ্টি সাধন করে ; অর্থাৎ আমাদের অন্নময় শরীর যেমন অন্য অন্নময় শরীর দ্বারা আপনার পুষ্টি সাধন করে, তাদৃশ আমাদের প্রাণময়াদি শরীরসমূহ অন্যান্য প্রাণময়াদি শরীর সমূহ দ্বারা আপন আপন পুষ্টি সাধন করে। আবার আমাদের অন্নময়াদি শরীরে যেমন অনেক প্রকার কাৰ্য্য পরিলক্ষিত হয়, আমাদের প্রাণময়াদি সূক্ষ্ম শরীর সমূহে তদনুরূপ অনেক প্রকার কাৰ্য্য বিদ্যমান থাকে। এতদ্ব্যতীত আমাদের আত্মা অন্নময় শরীরে সর্বদা অবস্থান করিলেও স্বপ্ন, সুষুপ্তি এবং মৃত্যু আদি অবস্থায় অল্পাধিক সময়ের জন্য অন্নময় শরীর হইতে প্রাণময়াদি সূক্ষ্ম শরীরে আনীত হয়। আনন্দময়াদি শরীরসমূহে বঞ্চিত হইয়া আমাদের আত্মা অন্নময় শরীরে আনীত হওয়ায়, অন্নময় শরীরস্থ তথা অন্যান্য শরীরস্থ অভাবসমূহ সমবেত হইয়া আমাদের নিকট প্রাদুভূত হয়। এই কারণবশতঃ আমরা প্রতিনিয়ত অন্নময় শরীরের জন্য অন্নাভাব, প্রাণময় শরীরের জন্য প্রাণভাব, মনােময় শরীরের জন্য মনােভাব, বিজ্ঞানময় শরীরের জন্য বিজ্ঞানাভাব এবং সর্বোপরি আনন্দাভাব অনুভব করিয়া থাকি। অভাবসমূহের নিবৃত্তির নিমিত্ত ভােগ- বাসনায় প্রণােদিত হইয়া সংসারে আমরা যে সকল কার্যে প্রবৃত্ত হই, তদ্বারা ক্ষুৎপিপাসার নিবৃ- তাহার নিবৃত্তির উপায় ত্তির ন্যায় কোন প্রকার অভাবের ক্ষণিক নিবৃত্তি সম্পাদিত হইলেও আমাদের অভাব বস্তুতঃ জীবাত্মার অভাব ও বেদান্ত-বিবেক পূৰ্ব্ববৎ বিদ্যমান থাকে। অধিকন্তু স্ত্রী, পুত্র, অর্থ এবং সম্পত্তি আদি যে সকল পদার্থ আমাদের অভাবের নিবৃত্তি- কারক বলিয়া আমরা সংগ্রহ করিবার নিমিত্ত নিয়ত বিব্রত হই, সংগৃহীত হইলেও তদ্বারা আবার অন্যান্য অনেক প্রকার অভাব উপস্থিত হয়। যাহা হউক আমাদের আত্মার বা জীবাত্মার এই সকল অভাব পিঞ্জরাবদ্ধ পক্ষীর অভাবের ন্যায় স্বতঃ উপস্থিত না হইয়া যে পরতঃ উপস্থিত হয়, তাহা অনায়াসে উপলব্ধি করা যায়। পরতঃ উপস্থিত হয় বলিয়া জীবাত্মার অভাবের নিবৃত্তি সম্ভব হয় না। আমরা আমাদের আত্মার অভাব নিবৃত্তির নিমিত্ত সংসার-ক্ষেত্রে অহােরাত্র যে সকল কৰ্ম্ম করি, তৎসমুদয় প্রধানতঃ আমাদের অন্নাভাবের নিবৃত্তিকারক। একমাত্র অন্নাভাব নিবৃত্তি করিতে একটী সমগ্র জীবন-কাল অতিবাহিত করিয়াও বস্তুতঃ কৃত- কাৰ্য্য না হইলে, প্রাণাদি পদার্থের অভাব-নিবৃত্তি যে এক প্রকার অসম্ভব হয়, তদ্বিষয়ে বিচিত্র কি ? আবার ভােগ- সাধন দ্বারা যেমন ভােগাভিলাষের শান্তি হয় না, অথবা স্বেচ্ছামত অধিক ভােজন করিলেও যেমন ক্ষুধার অত্যন্ত নিবৃত্তি সম্ভব হয় না, তাদৃশ অন্নময়াদি পদার্থসমূহ দ্বারাও অন্নময়াদি শরীরে অন্নাদি পদার্থের অভাবের নিবৃত্তি সম্ভব এক একটী বৃত্তির সম্বন্ধহেতু আমাদের এক এক প্রকার অভাবের সম্ভব হওয়ায়, বৃত্তি-সম্বন্ধ সমূহের ব্যতিরেক- মুখী পরিহার উত্তরােত্তর সকল প্রকার অভাবের নিবৃত্তিকারক হয় না।

পঞ্চকোশ-বিবেক ৩৭ হয়, অর্থাৎ স্মৃতিবৃত্তির পরিহার দ্বারা অন্নাভাব, নিদ্ৰাবৃত্তির পরিহার দ্বারা প্রাণাভাব, বিকল্প-বৃত্তির বৃত্তি-সম্বন্ধ পরিহার দ্বারা অভাব নিবৃত্তিকরণ পরিহার দ্বারা মনােইভাব, বিপৰ্যয়- বৃত্তির পরিহার দ্বারা বিজ্ঞানাভাব এবং প্রমাণ-বৃত্তির পরিহার দ্বারা আনন্দাভাব নিবৃত্তি হয়। একমাত্র অভ্যাস, বিচার ও বৈরাগ্য দ্বারা বৃত্তিসমুহের পরিহার সম্ভব হয়। বৃত্তিসমূহের পরিহারের সহিত তন্নময়াদি শরীরসমূহ অতিক্রম করা যায়। সুতরাং তৎকালে জীবাত্মার অন্নময়াদি ইতর স্বরূপসমূহ, জীর্ণবাস সমূহের ন্যায় পরিত্যক্ত হয় ও সর্বব্যাপী আনন্দময় স্বরূপ প্রকাশিত হইয়া থাকে। আনন্দময়া দি শরীর হইতে অনুময় শরীর পর্যন্ত আত্মার এই পঞ্চবিধ শরীর বেদান্তশাস্ত্রে পঞ্চকোশ নামে উক্ত হইয়া থাকে। তরবারি যেমন অন্নময়াদি শরীর কোশমধ্যে আবরিত থাকে, আত্মাও তাদৃশ অন্নময়াদি শরীরে অধিষ্ঠিত আছেন ; সুতরাং অন্ন- ময়াদি শরীর আত্মার কোশ-স্বরূপ। আত্মার প্রকৃত স্বরূপ এই পঞ্চকোশে আবৃত থাকে। এই কোশসম্বন্ধহেতু তাহার স্ব-স্বরূপ অন্তর্হিত হয়। অন্নময় কোশ বা স্থূল শরীরকে আত্মস্বরূপে অনুভব করিয়া আমাদের আত্মা অর্থাৎ জীবাত্মা সংসার মধ্যে নিরন্তর অসহনীয় যন্ত্রণা ভােগ করেন; আপনার স্বরূপ আবৃত থাকে বলিয়া—আপনাকে জানিতে পারেন না বলিয়া প্রকৃতির গুণের ভােক্তা হইয়া পড়েন। পঞ্চকোশ- আত্মার কোশ-স্বরূপ বেদান্ত-বিবেক বিবেক দ্বারা আত্মার স্বরূপ পরিজ্ঞাত হওয়া যায়। পঞ্চকোশ- বিবেক দ্বারা যে ব্যক্তি আত্মাকে জানেন, তিনি ব্রহ্মানন্দ লাভ করেন। আত্মার জন্মরাহিত্যহেতু স্বরূপপ্রাপ্ত পুরুষের আর পুনর্জন্ম হয় না। এজন্য মুমুক্ষু সাধকের পঞ্চকোশ-বিবেক একান্ত কর্তব্য। শ্রুতিতে আত্মা “গুহাহিত” নামে কথিত হইয়াছেন। স্থূলদেহ অন্নময়-কোশ হইতে অভ্যন্তরে প্রাণময়-কোশ, তাহা, হইতে অভ্যন্তরে মনােময়-কোশ, তাহা হইতে অভ্যন্তরে বিজ্ঞানময়-কোশ, তাহা হইতেও অভান্তরে আনন্দময়-কোশ -পরম্পরাক্রমে বর্তমান এই পঞ্চকোশকে গুহা বলা যায়। গুহা-শব্দবাচ্য পঞ্চকোশ-বিবেক দ্বারা আত্মার স্বরূপ জানিতে সমর্থ হওয়া যায়। অতএব এই পঞ্চকোশের বিষয় বিচার করা যাইতেছে। পিতা-মাতা কর্তৃক ভুক্ত অন্নের পরিণামর্ভূত শুক্র ও শােণিত হইতে উৎপন্ন এই স্কুল শরীর অন্নের পরিণাম বলিয়া এবং অন্নদ্বারা প্রবর্ধিত হয় বলিয়া ইহাকে অন্নময়-কোশ বলা হইয়া থাকে। এই অন্নময়-কোশ আত্মার স্কুল বিষয়-ভােগের আশ্রয় বলিয়া, আত্মা এই স্কুল- দেহে বিদ্যমান থাকিয়া শব্দ-স্পশাদি স্থূল বিষয়সমূহ উপভােগ করেন। মহারাজ যেরূপ অনেক দ্বার-বিশিষ্ট অট্টালিকায় বাস করতঃ বিবিধ বিষয় ভােগ করেন, তােপ আত্মা উপাধি- বিশিষ্ট হইয়া নবদ্বারযুক্ত দেহে ইন্দ্রিয়গণ কর্তৃক সেবিত হইয়া অন্নমকোশ আর স্বরূপ নহে পঞ্চকোশ-বিবেক ৩৯ বিবিধ বিষয়ের উপভােগ করেন। এই অনুময়-কোশকে নিত্যসিদ্ধ অবিনাশী আত্মার স্বরূপ বলা যায় না। যেহেতু এই অনুময়-কোশ অনিত্য অর্থাৎ উপত্তির পূর্বে ও মরণের পরে তাহার অভাব হয়। পূর্বজন্মে অসৎ, অনিত্য সেই সুলদেহ কি প্রকারে ইহজম্ম সম্পন্ন করিতে পারে, যেহেতু পূৰ্ব জন্মানুষ্ঠিত কৰ্ম্মানুরােধ-ব্যতিরেকে ইহজন্ম সম্ভব হয় না। আর যে পদার্থ ভাবি-জন্মে অসৎ হইবে, তাহার ইহকাল- সঞ্চিত কৰ্মভােগ করাও অসম্ভব। অতএব অন্নময়-কোশ আত্মা নহে। যে প্রাণাদি পঞ্চবায়ু স্থূলদেহব্যাপী হইয়া ঐ দেহে বলাধান করতঃ ইন্দ্রিয়গণকে স্ব স্ব বিষয়ে প্রবৃত্ত করায়, তাহাকে প্রাণময় কোশ বলে। বাক্-প্রভৃতি কৰ্ম্মেন্দ্রিয় এবং শরীরের দ্বারা যে যে পুণ্য কিম্বা পাপ কৰ্ম্ম অনুষ্ঠিত হয়, প্রাণময়-কোশই তৎসমুদয়ের কর্তা। এই প্রাণময়-কোশকে চৈতন্য-বিশিষ্ট আত্মার স্বরূপ বলা যায় না; যেহেতু বায়ু জড় পদার্থ। বায়ুপূর্ণ প্রাণময়-কোশ চৈতন্যস্বরূপ আত্মা নহে। শ্রোত্র প্রভৃতি পাঁচটী জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সহিত মন ‘মনােময়-কোশ নামে অভিহিত হইয়া থাকে। অন্নময়াদি শরীরে অহং জ্ঞানের এবং গৃহ-ধনাদিতে মদীয়ত্ব-বুদ্ধির কর্তাই মনােময়- কোশ। এই মনােময়-কোশে কাম-ক্রোধাদি বৃত্তিগুলি উৎপন্ন হয় এবং তাহার দ্বারা বাহফল কামনা করে, যত্ন করে, প্রাণময়কোশ আত্মার স্বরূপ নহে অতএব ৪০ বেদান্ত-বিবেক স্বরূপ নহে ; আত্মার স্বরূপ নহে কাৰ্যের অনুষ্ঠান করে ও ভােগ করে। মনের দ্বারাই বন্ধ ও মােক্ষ হইয়া থাকে। এইজন্য মনােময়-কোশ আত্মার মনােময়-কোশও আত্মার স্বরূপ নহে। যেহেতু কাম-ক্রোধাদি বৃত্তি দ্বারা তাহার বিকার জন্মে। অতএব মনােময়-কোশ-অধিকারী আত্মা নহে। শ্রোত্র প্রভৃতি পাঁচটী জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সহিত বুদ্ধি বিজ্ঞানময়-কোশ নামে অভিহিত হয় ; ইহাকে মহান্ বলে ; অভিমানও ইহার একটী বৃত্তি এবং ইহা কর্তৃত্বাদি-লক্ষণবিশিষ্ট, সৰ্ব্ব সংসারের নিৰ্বাহক ও বিজ্ঞানময় শব্দবাচ্য। এই বিজ্ঞানময়-কোশ বিজ্ঞানময়-কোশকে আত্মার স্বরূপ বলা যাইতে পারে না; যেহেতু তাহ। সুষুপ্তিকালে অজ্ঞানে লীন হয়। অতএব বিজ্ঞানময়-কোশ উৎপত্তি-বিনাশ-রহিত আত্মা নহে। বিজ্ঞানময়, মনােময় ও প্রাণময় এই তিনটী কোশ মিলিত হইলে, তাহাকে আত্মার সুক্ষ্মশরীর বলা হয়। কোন অন্তর্মুখী বুদ্ধিবৃত্তি ভােগকালে চিদানন্দ- প্রতিবিম্ব-বিশিষ্ট এবং ভােগ-সমাপ্তিতে নিদ্রারূপে প্রকৃতিতে লীন হয়, তাহাই আনন্দময়-কোশ নামে অভিহিত হয়। অস্থায়িত্ব-হেতু এই আনন্দময়-কোশও আত্মার স্বরূপ নহে। কেন না চিদা- নন্দময় আত্মা সনাতন। এই পঞ্চকোশ পরিত্যাগ করিলে, অবশিষ্ট যে সাক্ষী- স্বরূপ জ্ঞান, তাহাইআত্মার স্বরূপ। এই পঞ্চকোশরূপ উপাধি- আনন্দময়-কোশ আত্মার স্বরূপ নহে

পঞ্চকোশ-বিবেক
আত্মার স্বরূপ
সম্বন্ধ-বলে আত্মাই জীবরূপে পরিচিত হন।
যেমন লৌকিক
সম্বন্ধ-বলে ব্যবহারে এক ব্যক্তি পুত্রকে
অপেক্ষা করিয়া পিতা ও তিনিই
পৌত্রকে অপেক্ষা করিয়া পিতামহ হন এবং পুত্র ও পৌত্রের
অভাবে তিনি পিতা বা পিতামহ কিছুই নহেন, তাদৃশ এক
আত্মা মায়াশক্তি-উপাধি সাহায্যে ঈশ্বর এবং পঞ্চ
কোশ-উপাধি দ্বারা জীব, আর উপাধির অভাবে নিরু-
পাধি কেবল চৈতন্য মাত্র হন। বিচার দ্বারা বৃত্তিসমূহের
পরিহারের সহিত তন্নময়াদি কোশগুলিকেও অতিক্রম করা
যায়। সুতরাং তৎকালে আত্মা স্ব-স্বরূপে প্রকাশিত হন।
পূৰ্বেই বলা হইয়াছে যে বিচার, অভ্যাস ও বৈরাগ্য
দ্বারা কোশসমূহের পরিহার সম্ভব হয়। পঞ্চকোশ-বিচার
দ্বারা আত্মার স্বরূপ অবগত হইয়া
অন্নময়াদি ক্রমে বিজ্ঞানময়াদি পর্যন্ত
এক একটী কোশ অতিক্রম করতঃ আনন্দময় ক্ষেত্রে উপনীত
হইলে, অর্থাৎ অন্নময়াদি কোশের প্রতি প্রাণময়াদি কোশের
যে সকল সম্বন্ধ বিদ্যমান থাকে, অভ্যাস দ্বারা তৎসমুদয়ের
নিরােধ করিতে সমর্থ হইলে, জীবাত্মা স্ব-স্বরূপে পুনরাবর্তন
করিতে সমর্থ হন। আপন পূৰ্ব্ব স্বরূপে পুনরাবর্তন
জীবাত্মার নির্বাণ বলিয়া উক্ত হয়। ভস্মসমূহ
যেমন আপনাদের মধ্যে অগ্নিকে প্রদীপ্ত করিতে সমর্থ
হয় না, বৃত্তিসমূহ তাদৃশ নিৰ্বাণপ্রাপ্ত জীবাত্মাকে স্বরূপান্তরিত
৩খ
জীবাত্মার নির্বাণ বা
আত্মস্বরূপে অবস্থান

৪২
বেদান্ত-বিবেক
করিতে পারে না। সুতরাং প্রদীপ্ত অগ্নির নির্বাণপ্রাপ্তির
স্যায় জীবাত্মার নির্বাণপদ লাভ হয়। অতএব বিচার দ্বারা
পঞ্চকোশ-বিবেক ও অভ্যাস দ্বারা বৃত্তি-সমূহের পরিহার
করিতে পারিলে, যিনি হিরন্ময় হৃদয়-কোশ অবস্থিত,—যিনি
দিব্যজ্যোতি তে নিজগৃহরূপ হৃদয়কে হিরন্ময় করিয়াছেন,
সেই নিষ্কল আত্মার দর্শন-লাভ হয়। তখন জ্ঞান হয়—
হিরন্ময়ে পরে কোশে বিরজং ব্রহ্ম নিষ্কল।

আত্মনাত্ম-বিবেক এক এবং অদ্বিতীয় ব্রহ্মেরই কাৰ্য-কারণ ভাব জন্য জীব ও ঈশ্বর ভেদে দুই প্রকার উপাধি হইয়াছে। কারণ- ভাব জন্য অন্তর্যামী ঈশ্বনােপাধি এবং কাৰ্য্য-ভাব জন্য অহংপদ-বাচ্য জীবােপাধি হইয়াছে। ব্ৰহ্ম অদ্বৈত হইয়াও কাৰ্য-কারণ জন্য দ্বৈতরূপে প্রতীয়মান হইতেছেন। এই দ্বৈতভাব নিরাকরণের উপায় বিবেক। জীবের বিবেক-জ্ঞান উপস্থিত হইলে জীব ও ঈশ্বররূপ উপাধির নাশ হইয়া কেবল শুদ্ধ চৈতন্য মাত্র অবশিষ্ট থাকেন। সেই অবশিষ্ট শুদ্ধ চৈতন্যই অদ্বৈত ব্ৰহ্ম। এইরূপ অদ্বৈত ব্ৰহ্ম-জ্ঞান হইলে সংসার-বন্ধন হইতে পরিমুক্ত হওয়া যায়। জ্ঞানই অবিদ্যা নিবৃত্তর—মুক্তির একমাত্র সাধন। কৰ্ম্মদ্বারা কিম্বা কৰ্ম্মসহকৃত জ্ঞানের দ্বারা মুক্তি লাভের আশা নিতান্ত অসম্ভব। কারণ অজ্ঞানের সহিত কৰ্ম্মের কিছুমাত্র বিবােধ না থাকায়, কৰ্ম্ম অজ্ঞানের নাশক হইতে পারে না। জীব কৰ্ম্মদ্বারা জন্মলাভ করে এবং কর্মদ্বারাই বিনাশ প্রাপ্ত হয়; এই জন্ম-মৃত্যু-প্রবাহ কৰ্ম্মেরই ফল। কৰ্ম্ম অজ্ঞানের কাৰ্য্য এবং অজ্ঞানের দ্বারাই বর্ধিত হয়। যে বস্তু যাহার দ্বারা বর্ধিত হয়, তাহার দ্বারা সে কখনও বিনাশ প্রাপ্ত 58 বেদান্ত-বিবেক হয় না; যাহার সহিত যে একত্র অবস্থান করে, সে তাহার নিবৰ্ত্তক হয় না। অজ্ঞান হইতে কর্মের উৎপত্তি হয়। নিত্য- শুদ্ধ-বৃদ্ধ-স্বরূপ আত্মায় ব্রাহ্মণত্বাদি ধৰ্ম্ম আরােপ করিয়া কর্ম চিত্তশুদ্ধি ব্যতীত পুরুষ ব্রাহ্মণণাচিত কৰ্ম্ম করিতে প্রবৃত্ত কখনই মুক্তির সাধক হয় না হন, সুতরাং অজ্ঞানই কর্মের কারণ। কৰ্ম যখন অজ্ঞান-জন্ম এবং অজ্ঞান হইতে বর্ধিত হয়, তখন কৰ্ম্ম কিরূপে অজ্ঞানের নিবৰ্ত্তক হইবে? লােকে দেখা যায়, যে যাহা হইতে জন্মে কিম্বা বদ্ধিত হয়, সে তাহার নাশক হয় না। জ্ঞান ও কর্মের সমুচ্চয়ও সম্ভব হইতে পারে না। যেমন আলােক ও অন্ধকার। আলােক ও অন্ধকার পরস্পর বিরুদ্ধ পদার্থ ; যৎকালে আলােকের স’যােগ, তৎকালে অন্ধকারের ধ্বস হইয়া থাকে। সুতরাং আলােক অন্ধকারের ধ্বংসের কারণ। তজ্জন্য আলােক ও তান্ধকাবের পরম্পর বিরুদ্ধতা সেই রূপ প্রকৃত স্থলে, যখন জ্ঞানের সম্বন্ধ, তখনই অজ্ঞানের নাশ; সুতরাং জ্ঞান অজ্ঞানের ধ্বংসের হেতু-যুগপৎ উভয়ের একত্র অবস্থিতি সম্ভব নহে। কিন্তু কর্ম ও অজ্ঞান এক অবস্থান করে। যে যাহার সহিত একত্র অবস্থান করে, সে তাহার নাশ বা নাশক হইতে পারে -অতএব কৰ্ম্ম ও অজ্ঞ নের নাশকত্ব বা না ভাব নাই- একমাত্র জ্ঞানই অজ্ঞানের নাশক। তমঃ ও প্রকাশের ন্যায় অজ্ঞান ও জ্ঞান উভয়ের পরস্পর বিরােধ পরিদৃষ্ট হয় ; সুতরাং জ্ঞান ব্যতীত অজ্ঞানের বিদ্যমান আছে।

৪৫ আত্মনাত্ম-বিবেক নাশ অন্য কাহারও দ্বারা হইতে পারে না। অতএব বুদ্ধিমান ব্যক্তি অজ্ঞান নাশের জন্য জ্ঞান সম্পাদন করিবে। সেই জ্ঞান আত্মা ও অনাত্মা-দেহাদির ভেদজ্ঞানের দ্বারা উৎপন্ন হয়, অন্য প্রকারে হয় না। সেই নিমিত্ত জ্ঞানলাভের জন্য যুক্তিদ্বারা আত্মা ও অনাত্মার বিবেক করা বক্তব্য, যাহাদ্বারা অনাত্মাতে আত্মত্ব-বুদ্ধি-রূপ গ্রন্থি বিনাশ প্রাপ্ত হয়। আত্মার স্বরূপ অবগত হইয়া অনাত্মা হইতে তাঁহাকে পৃথক্ ভাবে উপলব্ধি করাই আত্মনাত্ম-বিবেক। আত্মা নিরতিশয় প্রীতির আস্পদ বলিয়া আত্মাকে সুখ-স্বরূপ বলা যায়। আত্মা প্রাণিগণের অত্যন্ত প্রিয়, কারণ স্ত্রী, পুত্র, আত্মীয়, গৃহ, ধন প্রভৃতি পদার্থসমূহ এবং বাণিজ্য, কৃষি, গাে-রক্ষণ, রাজসেবা, চিকিৎসা প্রভৃতি ক্রিয়াসমূহ আত্মারই নিমিত্ত। এই আত্মা পুত্র, ধন এবং যাবতীয় বস্তু হইতে প্রিয়তম, সুতরাং আত্মা সর্বাপেক্ষা অন্তর বস্তু। সুখের কারণীভূত বস্তুসমূহে সকল প্রাণীর সসীম প্রীতি পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু কোন সময়ে কোথায়ও প্রাণিগণের আত্মাতে সসীম প্রীতি দেখা যায় না। যে বস্তু প্রিয় বলিয়া অভিমত, তাহা কখনও মনুষ্যগণের অপ্রিয় হয় না; বিপৎকালে কিম্বা সম্পৎ- সময়ে যেমন আত্মা প্রিয়, সেইরূপ অপর কোন বস্তু প্রিয় নহে। যাহার ইন্দ্রিয়সমূহ ক্ষীণ হইয়াছে, যে ব্যক্তি বৃদ্ধ, অথবা যে মৃত্যুমুখে নিপতিত, সকলেই বাঁচিয়া থাকিবার আত্মার সুখ-স্বরূপত্ব নিরূপণ ৪৬ বেদান্ত-বিবেক ; আশা করে, কারণ আত্মা সর্বাপেক্ষা প্রিয়। প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি এবং যাহা কিছু ও যৎপরিমাণ চেষ্টা, তাহা সমস্ত আত্মারই নিমিত্ত, অন্যের জন্য নহে—এই কারণে আত্মা সকল প্রাণীর নিরতিশয় প্রীতির আস্পদ, যাহার অঙ্গত্ব- হেতু সমস্ত বস্তু উপাদেয়ত্ব প্রাপ্ত হয়। কাহারও প্রীতির জন্য কেহ কাহার প্রিয় হয় না; কেবল আপনার প্রয়ােজন অর্থাৎ আত্মার প্রীতির জন্যই পরস্পর পরস্পরের প্রিয় হইয়া থাকে। এই সকল কারণে আত্মাই কেবল মাত্র সুখ- স্বরূপ। শাস্ত্রে যাহাকে সৰ্ববস্তু অপেক্ষা প্রিয় বলিয়াছেন, যে এই আত্মা অপেক্ষা অন্যকে প্রিয় বলিয়া মনে করে, সে তাহা হইতে দুঃখ অনুভব করিয়া থাকে। এই হেতু আত্মা ও অনাত্মার বিবেকের দ্বারা তাহাদের প্রকৃত স্বরূপ অবগত হওয়া কর্তব্য। অজ্ঞ, বেদান্ত-শ্রবণ-পরায়ুখ, পাণ্ডিত্যাভিমানী, ঈশ্বরের অনুগ্রহ-রহিত, সদ্গুরুর কৃপা হইতে বিমুখ লােকগণ সুখ- স্বরূপ আত্মাকে না জানিয়াই দুঃখপ্রদ বিষয়াত্মবাদ বিষয়সমূহকে সুখস্বরূপ মনে করিয়া বাহ্য সুখের নিমিত্ত যত্ন করিয়া থাকে। মূঢ় ব্যক্তিগণ জানে যে, এই জগতে প্রিয় বস্তুর ধ্যান, দর্শন, উপভােগ প্রভৃতিতে সমস্ত প্রাণীর যে আনন্দ অনুভূত হয়, তাহা বস্তুর ধৰ্ম্ম নহে; কারণ, উহা মনেই উপলব্ধি হয়। বস্তুর ধর্ম কিরূপে মনে উপলব্ধি হইবে ? স্ত্রী, ধন, চন্দন প্রভৃতির খণ্ডন আত্মনাত্ম-বিবেক ৪৭ - - - = n r: A• •--, A দর্শন ও উপভােগে মনে যে আনন্দ উৎপন্ন হয়, তাহা বস্তুর অর্থাৎ স্ত্রী, ধন, চন্দন প্রভৃতির ধর্ম নহে। আনন্দ বস্তুর ধর্ম হইলে শীতকালেও চন্দন সুখকর হইত। বিশেষতঃ বস্তুর ধৰ্ম্ম মনে কেবল উপলব্ধ হয়, অতএব আনন্দ কখনও বস্তুর ধৰ্ম্ম হইতে পারে না। বিষয়জ "মুখ কৰ্ম্মের উৎকর্ষ ও অপকর্ষ বশতঃ নানা প্রকার হইয়া থাকে, সুতরাং বিষয়- সম্পর্কজনিত সুখ বিষমিশ্রিত অন্নের ন্যায় দুঃখদায়ক। অত্মা সুখস্বরূপ, তঁাহার অঙ্গত্ব হেতু বিষয়সমূহ সুখত্ব প্রাপ্ত হয়। বিষয়ের সান্নিধ্য বশতঃ যে সুখ উপলব্ধ হয়, তাহা বিম্বভূত চৈতন্যাংশের স্ফুরণমাত্র, অচেতন বিষয়ের নহে। যেমন চন্দ্রের অনুগ্রহ বশতঃ কুমদিনীর আনন্দ হয়, তদ্রুপ আত্মার স্ফুরণপ্রযুক্ত সমস্ত জড়বস্তুর আনন্দের আবির্ভাব হয়। সুতরাং বিষয় আত্মা নহে, আয়ার অভ্যাস হেতুই বিষয়ে সুখ উপলব্ধি হইয়া থাকে। এইজন্য পণ্ডিত ব্যক্তি সুখ- স্বরূপ আত্মাকে জানিয়া বিষয়ােৎপন্ন বাহ্য সুখের জন্য যত্ন করেন না। কোন কোন মন্দবুদ্ধি ব্যক্তি পুত্রকে আত্মা বলিয়া মনে করে। প্রদীপ হইতে প্রদীপান্তরের ন্যায় পিতা হইতে পুত্ৰাত্মবাদ পুত্র উৎপন্ন হয়, অঙ্কুরে বীজের গুণ- সমূহের ন্যায় পুত্রেও পিতার গুণরাজি দৃষ্ট হয়, এই নিমিত্ত অত্যন্ত ভ্রান্ত ব্যক্তি পুত্রকে আত্মা বলিয়া মনে করে। “আত্মা বৈ পুত্ৰনামাসি” এই শ্রুতিবাক্য এবং

৪
বেদান্ত-বিবেক
••
“আত্মজ” শব্দ পুত্রের আত্মত্ব প্রতিপাদন করে বলিয়া তাহা-
দিগের ধারণা। কিন্তু সামান্য চিন্তা করিলেই বুঝিতে পারা
যায় যে, পুত্র কিরূপে আত্মা হইতে পারে ? পুত্রকে অত্যন্ত
ভালবাসা যায় বলিয়াই পুত্রকে আত্মা বলিতে পার না।
কারণ পুত্র ভিন্ন ভূমি, পাত্র ও ধন প্রভৃতিতেও ত প্রীতি দেখা
যায়। এই দেহে পুত্র অপেক্ষা অধিক পরিমাণে প্রীতি
পরিদৃষ্ট হয়, কারণ গৃহে অগ্নি সংযুক্ত হইলে লােকে পুত্রকে
পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করে। দেহ রক্ষার নিমিত্ত লােক
পুত্রকে রিক্রয় করে ; পুত্র প্রতিকূল হইলে তাহাকে বিনাশ
করে ; অতএব পুত্র কখনও আত্মা হইতে পারে না। একটা
দীপ হইতে অন্য দীপ যেমন পূৰ্ব দীপের সদৃশ রূপ-গুণাদি
যুক্ত হয়,
সেইরূপ
পুত্রে পিতার রূপ-গুণাদির
কারণ অবিকলাঙ্গ পিতা হইতে বিকলাঙ্গ পুত্র এবং গুণবান্
পিতা হইতে নিগুণ
পুত্র
উৎপন্ন হয়। আর পিতার যেমন
গৃহের সমস্ত কাৰ্য্যে এবং সকল বস্তুতে প্রভুত্ব আছে, পুত্রে
সেইরূপ প্রভুত্ব সূচনার নিমিত্ত পুত্রে আত্মশব্দের উপচার
গৌণ প্রয়োগ করা হয়; শ্রুতি কোথায়ও মুখ্যবৃত্তি দ্বারা
পুত্রকে আত্মা বলেন না। অতএব পুত্রে যে আত্মত্ব,
তাহা গৌণ, মুখ্যরূপ নহে। একমাত্র দেহই অহং-জ্ঞানের
বিষয়, পুত্রাদি নহে।
দেহই অহং-পদবাচ্য আমি -এরূপ সমস্ত প্রাণীর
প্রত্যক্ষ নিশ্চয় আছে; “এষ পুরুষােন্নরসময়ঃ” অর্থাৎ এই
সাদৃশ্য নাই।

আত্মনাত্ম-বিবেক ৪৯ দেহাত্মবাদ খণ্ডন পুরুষ (দেহ) অন্নের সারাংশের বিকারভূত, ইহা শ্রুতি বলিয়া থাকেন। তাই চাৰ্বাকমতাবলম্বিগণ কর্তৃক অব- ধারিত হইয়াছে যে, শ্রুতি এই শরীরকে পুরুষ বলিয়া থাকেন, অতএব পুরুষই আত্মা; এই দৃশ্যমান শরীরই আত্মা। কিন্তু বিচার করিয়া দেখিলে সহজেই বুঝিতে পারিবে যে, ইন্দ্রিয়ের অধীন এই জড়দেহ কিরূপে আত্মা হইতে পারে ? এই দেহ ইন্দ্রিয়গণ কর্তৃক পরিচালিত হইয়া ক্রিয়া করে, নিজে কোথায়ও ব্যাপৃত হয় না; গৃহ যেমন গৃহস্থগণের আশ্রয়, তদ্রুপ দেহ ইন্দ্রিয়- গণের আশ্রয়। এই শরীর বাল্য-যৌবনাদি বিবিধ অবস্থাযুক্ত এবং পিতৃ-শুক্র ও মাতৃ-শােণিত হইতে উৎপন্ন ; কখনও দেহ আত্মা হইতে পারে না। তবে কি ইন্দ্রিয়গণ আত্ম ? —আমি বধির, আমি অন্ধ, আমি মূক, এইরূপ অনুভব বশতঃ ইন্দ্রিয়গণ আত্মা ইন্দ্রিয়াত্মবাদ হইতে পারে ; কারণ ইন্দ্রিয়গণের বিষয়- জ্ঞান বিদ্যমান আছে। “দেহে প্রাণাঃ প্রজাপতিমেতমেত্যেত্যুচুঃ” এই শ্রুতি দ্বারাও ইন্দ্রিয়গণের আত্মত্বই যুক্তিযুক্ত। কিন্তু বিচার করিয়া দেখ, ইন্দ্রিয়সমূহ কিরূপে আত্মা হইবে ? করণগুলি কুঠারের ন্যায় জড় হইয়া থাকে ; কুঠার প্রভৃতি করণের চৈতন্য কুত্রাপি পরিলক্ষিত হয় না। শ্রুতিতে যে ইন্দ্রিয়গণের উক্তি-প্রত্যুক্তির বিষয় দেখা যায়, তাহা সাক্ষাৎ ইন্দ্রিয়গণের নহে, কিন্তু সেই সেই খণ্ডন -৪ক

বেদা-বিবেক
খণ্ডন
ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাদের প্রত্যুক্তি ইন্দ্রিয়সমূহে আবােপ
করা হয় মাত্র ; শ্রুতি সাক্ষাৎ ইন্দ্রিয়দিগের চৈতন্য বলেন
নাই। বিষয়-বিজ্ঞান থাকা সত্বেও ইন্দ্রিয় আত্মা হইতে
পারে না। কারণ অচেতন প্রদীপ প্রভৃতি যেমন বিষয়
প্রকাশ করে, তক্রপ জড় চক্ষু প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণেরও বিষয়-
প্রকাশকত্ব সিদ্ধ হইতে পারে। অতএব জড় ইন্দ্রিয়সমূহ
কখনও আত্মা নহে।
প্রাণ, অপান, সমান, উদান ও ব্যান,—এই পাঁচটী
বৃত্তিবিশিষ্ট মুখ্য প্রাণ ইন্দ্রিয়গণের ব্যাপারের হেতু ; বাল্য,
যৌবন প্রভৃতি সমস্ত অবস্থাতে অবস্থা-
প্রাণাত্মবাদ
বিশিষ্ট এই প্রাণ আত্মা হইতে পারে।
আমি ক্ষুধার্ত, আমি পিপাসাতুর,—এইরূপ অনুভব বলেও
প্রাণকে আত্মা বলা যায়। কিন্তু বিচার করিলে প্রাণেরও
আত্মত্ব সিদ্ধ হয় না। কারণ প্রাণ আত্মা হইতে জাত
বায়ু মাত্র। কৰ্ম্মকারের যাঁতার বায়ু যেমন পুনঃ পুনঃ বাহিরে
যায় এবং ভিতরে আসে, সেইরূপ এই বায়ুও একবার দেহের
বাহিরে যায় এবং আবার দেহের অভ্যন্তরে আসিয়া থাকে-
ইহা হিত বা অহিত, আপনাকে বা পরকে কিছুই জানে না।
প্রাণ অচেতন, চঞ্চল এবং সর্বদা ক্রিয়াশীল; অতএব প্রাণ
কখনও আত্মা হইতে পারে না।
সুপ্ত ব্যক্তিতেই মন বৰ্ত্তমান থাকে, প্রাণের জ্ঞানশক্তি
পরিলক্ষিত হয় না; অথবা তাহার তখনও মন বিদ্যমান

আত্মনাত্ম-বিবেক মন-আত্মবাদ খণ্ডন থাকে, কিন্তু প্রাণের অনুভব হয় না। মন সকল বিষয় জানে এবং সমস্ত বিষয়-জ্ঞানের কারণ, অতএব মনই আত্মা ; আমি এইরূপ সঙ্কল্প করিতেছি, আমি বিষয়-চিন্তা করিতেছি—এই- রূপ অনুভব বশতঃ মনকে আত্মা বলা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু বিচার করিলে মনকেও আত্মা বলিতে পার না। কারণ মনও চক্ষু প্রভৃতির ন্যায় ইন্দ্রিয় ; তাহার আত্মত্ব কিরূপে হইবে ? করণ কর্তা কর্তৃক কর্মে নিয়ােজিত হইয়া থাকে, নিজে প্রবৃত্ত হয় না। যে করণের প্রযােজক এবং কৰ্ত্তা, তাহাকে আত্মা বলা উচিত। আত্মা স্বতন্ত্র, তাহাকেও পুরুষ বলা হইয়া থাকে, তিনি কখনও প্রযােজ্য হন না। অতএব মন কখনও আত্মা নহে। আমি কৰ্ত্তা, আমি ভােক্তা, আমি সুখী—এইরূপ অনুভব বশতঃ বুদ্ধিকে আত্মা বলা যাইতে পারে, কারণ বুদ্ধ্যাত্মবাদ অহঙ্কার বুদ্ধিরই ধৰ্ম্ম। “বিজ্ঞানাং যজ্ঞ তনুতে কৰ্ম্মাণি তনুতেইপিচ” এই শ্রুতি অতি স্পষ্টরূপে বুদ্ধির কর্তৃত্ব প্রতিপাদন করিতেছেন, সেই জন্য বুদ্ধির আত্মত্ব যুক্তিসঙ্গত। বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধগণের এই সিদ্ধান্তে প্রভাকর-পক্ষাবলম্বী এবং নৈয়ায়িক এই উভয়ে দোষ অৰ্পণ করিয়া থাকেন। তাহারা বলেন-বুদ্ধি কিরূপে আত্মা হইতে পারে ? কারণ বুদ্ধি অজ্ঞানের কাৰ্য, প্রতিক্ষণে সে বিনাশী ; বুদ্ধি প্রভৃতি সমস্ত বস্তুর অজ্ঞানে লয় দৃষ্ট হয় বলিয়া, “আমি অজ্ঞ”—এইরূপ স্ত্রী হইতে বালক পর্যন্ত খণ্ডন ;

বেদান্ত-বিবেক সকলেরই অনুভব থাকায়, অজ্ঞানই আত্মা হইবে,বুদ্ধি কখনও আত্মা হইতে পাবে না। যদি বল, ‘অজ্ঞান’ শব্দের অর্থ জ্ঞানাভাব, কিন্তু আত্মা আনন্দময়—অজ্ঞান ও আনন্দ- ময়ত্ব কিরূপে এক হইতে পারে ? তাহার উত্তর এই যে, আত্মার যে আনন্দের কথা বলিতেছ, তাহার অর্থ দুঃখাভাব। প্রকৃত পক্ষে মােক্ষ বা সুষুপ্তিতে আনন্দ থাকে না, দুঃখ না থাকায় আনন্দ শব্দের প্রয়ােগ হয়। অতএব আনন্দ শব্দের অর্থ দুঃখ-জ্ঞানের অভাব। সুষুপ্তিকালে বুদ্ধি প্রভৃতি সমস্ত বস্তু অজ্ঞানে লয়প্রাপ্ত হয়। সেই নিমিত্ত সুষুপ্তিকালে দুঃখী লােকেরও আনন্দময়তা থাকে, “আমি কিছুই জানি না”— এইরূপ অনুভবও সুষুপ্তিকালে দেখা যায়। সুতরাং অজ্ঞানের আত্মত্বই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু ভট্টমতাবলম্বীরা এইরূপ সিদ্ধা- ন্তেও দোষ অর্পণ করিয়া থাকেন। তাহারা বলেন,—যখন জ্ঞানও উপলব্ধ হইতেছে, তখন কেবল অজ্ঞানকেই কিরূপে আত্মা বলা যায় ? জ্ঞানাভাব বিষয়ে-“আমি অজ্ঞ’ এইরূপ অজ্ঞতা কিরূপে লােক জানিতে পারে ? “আমি সুখে নিদ্রা গিয়াছিলাম, আমি কিছুই জানিতে পারি নাই”— এইরূপ অজ্ঞান-বিষয়ক জ্ঞান প্রবুদ্ধ ব্যক্তিতেও দৃষ্ট হয়। অতএব আত্মা খদ্যোতের ন্যায় চৈতন্য ও জড়-স্বভাব বলিয়া অভিপ্রেত। সুতরাং তাঁহাদের মতে জ্ঞানাজ্ঞানই আত্মা। কেবল মাত্র অজ্ঞানই আত্মা নহে। অজ্ঞানাত্মবাদ খণ্ডন আত্মনাত্ম-বিবেক খণ্ডন হইবেন ? কিন্তু বস্তু বিচার করিলে বুঝিতে পারিবে যে, আলােক এবং অন্ধকারের ন্যায় জ্ঞান ও অজ্ঞান পরস্পর বিরুদ্ধ পদার্থ ; সুতরাং আত্মা কিরূপে জ্ঞানাজ্ঞানময় জ্ঞানাঞ্জনাত্মবাদ অন্ধকার এবং প্রকাশের ন্যায় জ্ঞান ও অজ্ঞান এক অধিকরণে থাকে না; কিম্বা তাহাদের সংযােগ নাই অথবা তাহাদের অধিকারও তুল্য নহে। ‘আমি জানি না’-এইরূপ অজ্ঞান-বিষয়ক জ্ঞান, ভাব-বিষয়ক জ্ঞান ও তাহাদের ধর্ম সুষুপ্তিকালে উপলব্ধ হয় না; অন্য যাহা কিছু প্রমাতা, প্রমেয় ও প্রমিতি প্রভৃতি, তাহা শূন্য বলিয়াই প্রতীতি হয় ; কারণ সুষুপ্তিকালে অন্য কোন বস্তু নাই, আমিও ছিলাম না- এইরূপ সুষুপ্তি হইতে উত্থিত সকলেই স্মরণ করিয়া থাকে; অতএব শূন্যই আত্মা, জ্ঞানাজ্ঞান আত্মা হইতে পারে না। শূন্যের আত্মত্ব কেবল যে যুক্তি দ্বারা অবধারিত হয়, তাহা নহে,-“অসদেবেদমগ্র আসীৎ” -এইরূপ শ্রুতিবাক্য দ্বারাও শূন্যের আত্মত্ব বিশ- ভাবে নিরূপিত হইতেছে। অতএব শূন্যকেই আত্মা বলা উচিত। পূৰ্বে ঘট ছিল না, কিন্তু উৎপন্ন হইলে লােকের নেত্রগােচর হয় ; উৎপত্তির পূর্বে ঘট মৃত্তিকার অভ্যন্তরে থাকিয়া পরে বাহিরে প্রকাশিত হয়, ইহা হইতে পারে না। যেহেতু ঘট মৃত্তিকার মধ্যে থাকিয়া পরে প্রকাশিত হয় না। অতএব শূন্য হইতে এই সব ঘট-পটাদি পরিদৃশ্যমান সদ্বস্তু উৎপন্ন হইয়াছে, সেই নিমিত্ত সৰ্ব্বতােভাবে শূন্যই আত্মা। • ৫৪ বেদান্ত-বিবেক খগুন কিন্তু বিবেক-বৈরাগ্যযুক্ত ভগবৎ-কৃপা ও সদ্গুরুর আশ্রয়প্রাপ্ত মহাত্মারা এই শূন্যের মধ্যেই ‘পূর্ণের সন্ধান প্রাপ্ত হইয়াছেন। তাহারা শূন্যবাদীদিগের শুষ্কাবাদ সিদ্ধান্তও নিরাস করিয়াছেন। তাঁহার বলেন,-বীজে যেমন বটবৃক্ষ অব্যক্ত ভাবে নিহিত আছে, সেইরূপ সুষুপ্তিকালে বুদ্ধি প্রভৃতি সমস্ত পদার্থ স্বকীয় উপাদান-কারণ মায়ায় লীন হইয়া অবিকৃত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। স্বীয় রূপে বিদ্যমান রহিয়াছে, কখনও ইহা শূন্যরূপে প্রতীয়মান হয় না; যেমন বটবৃক্ষ কোথায়ও অঙ্কুররূপে, কোথায়ও বা বীজরূপে অবস্থান করে, সেইরূপ এই জগৎ কখনও ব্যক্তরূপে (কাৰ্যরূপে ), কখনও বা অব্যক্তরূপে (কারণরূপে ) বিদ্যমান থাকে। আর ‘অসদেবেদমগ্র আসীৎ -এই শ্রুতি অব্যাকৃত ভাবে জগতের অবস্থা এবং সুষুপ্তি প্রভৃতি সময়ে, তাহার ভেদ বলিয়া থাকেন। অনভিজ্ঞগণ এইরূপ অর্থ পরিজ্ঞাত না হইয়া শ্রুতি ও যুক্তি দ্বারা নিরূপিত এই জগতের প্রত্যক্ষকে শূন্য বলিয়া থাকে। অসৎ ( অবস্তু) হইতে সত্যের (বস্তুর) উৎপত্তি শুনিতে বা দেখিতে পাওয়া যায় না। অশ্বডিম্ব, নরশৃঙ্গ ও আকাশ-কুসুম হইতে কি কোন বস্তু জন্মিয়া থাকে আর ঘট যদি মৃত্তিকায় অব্যক্ত- ভাবে না থাকে, তাহা হইলে কখনই তাহা মৃত্তিকা হইতে উৎপন্ন হয় না; যদি না থাকিয়াই উৎপন্ন হয়, তাহা হইলে বালুকা কিম্বা জল হইতে ঘট উৎপন্ন হউক; বালুকা এবং

আত্মনাত্ম-বিবেক
**
জল হইতে ঘটের উৎপত্তি কোথায়ও ত দেখা যায় না।
অতএব যে বস্তু যাহা হইতে উৎপন্ন হয়, তাহাতে তাহার
স্বভাব বিদ্যমান আছে। যাহাতে যে বস্তুর স্বভাব বিদ্যমান
আছে, সে তাহা হইতে উৎপন্ন হয়,—ইহা অস্বীকার করিলে
বিপরীত হইবে অর্থাৎ দুগ্ধ হইতে ঘট এবং মৃত্তিকা হইতে
দধি উৎপন্ন হইবে; সকল সময়ে, সমস্ত শাস্ত্রে এবং সমস্ত
লােকে কাৰ্য্য ও কারণ নিয়ত রহিয়াছে। শ্রুতি এবং
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা অসৎ হইতে সতের উৎপত্তি নিষেধ করিতে-
ছেন, অতএব অসৎ হইতে সদ্বস্তুর উৎপত্তি হয় না। শূন্য
নামক পদার্থ ই মিথ্যা, সুতরাং অসৎ শূন্য কিরূপে সৎ আত্মা
হইবে ?
আত্মার সন্ধান বা
আত্মজ্ঞান
পূর্বোক্ত প্রকারে বিচার করিয়া পণ্ডিতগণ শ্রুতি, যুক্তি
ও অনুভবের দ্বারা ধন-রত্ন-পুত্রাদি হইতে আরম্ভ করিয়া
শূন্য পর্যন্ত পদার্থের অনাত্মত্ব বিশেষ
রূপে সাধিত করিয়াছেন। মহাত্মারা
অন্য প্রমাণের দ্বারা বাধিত বস্তুর সত্যতা স্বীকার করেন না;
অতএব পুত্র হইতে আরম্ভ করিয়া শূন্য পর্যন্ত সমস্তই যে
অনাত্ম পদার্থ, ইহা স্পষ্টরূপে নির্ণীত হইল। এখন কথা
হইতেছে যে—সুষুপ্তি সময়ে সমস্ত পদার্থ, কারণে লয়প্রাপ্ত
হইলে এ জগতে শূন্য ব্যতীত আর কোন বস্তু উপলব্ধ হয় না ;
যদি সেই শূন্যই আত্মা না হইল, তবে আত্মা কে? যদি
আত্মার অস্তিত্ব থাকে, তবে কেন উহা উপলব্ধ হয় না?

বেদান্ত-বিবেক সুষুপ্তিকালেও যে আত্মা থাকে, তাহার প্রমাণ কি? অহঙ্কার প্রভৃতি বাধিত হইলেও আত্মা স্বয়ং কেন বাধিত হন না? এই সকল প্রশ্নের মীমাংসা এই যে,-লােকে স্বয়ং স্বকীয় সুষুপ্তি সময়ে নিজে যাহা অনুভব করে, তাহাকে বিদ্যমান শূন্যভাবই বলিয়া থাকে। তৎকালে অজ্ঞ লােক নিজের অস্তিত্বকে জানিতে না পারিয়া কেবল শূন্যত্বের কথাই বলে। সুষুপ্তি সময়ে অব্যক্তসংজ্ঞক প্রজ্ঞা প্রবুদ্ধ থাকিতে তাহার শূন্যত্ব সাধিত হইতে পারে না। সুষুপ্তিকালে বিদ্যমান শূন্যের জ্ঞাতাকেই আত্মা বলিয়া জানিবে। অর্থাৎ শূন্যাত্ম- বাদী বলিয়া থাকেন—সুষুপ্তি সময়ে কেবল শূন্যই থাকে ; সুতরাং শূন্যই আত্ম। কিন্তু সুষুপ্তিকালে শূন্যই থাকে, অর্থাৎ আর কিছুই থাকে না—ইহা যে অনুভব করিতেছে, তাহা শূন্য হইতে ভিন্ন। তাহা হইলে শূন্যের অনুভবিতাকে আত্মা বলা যায়। মূঢ়ব্যক্তি বুদ্ধি প্রভৃতির অভাবকে জানিয়া ‘কেবল শূন্য থাকে, এই কথা বলে, কিন্তু তাহাদের অনুভবি- তাকে জানিতে পারে না। অতএব এই শূন্যকে যিনি অনুভব করেন, তিনিই আত্মা। অপর লােক তাঁহাকে জানিতে পারে না; কিন্তু তিনি সুষুপ্তিকালীন ধর্মকে প্রত্যক্ষ ভাবে জানিতে পারেন। যিনি সুষুপ্তি সময়ে বুদ্ধি প্রভৃতির অভাব অবগত আছেন, তিনিই বিকারশূন্য আত্মা। যাহার তেজ দ্বারা এই পরিদৃশ্যমান সমস্ত জগৎ প্রকাশিত হইতেছে, সূর্যের ন্যায় স্বয়ং-প্ৰকাশ সেই আত্মার কি অন্য প্রকাশক ;

আত্মনাত্ম-বিবেক ৫৭ থাকিতে পারে ? বুদ্ধি প্রভৃতি সমস্ত বস্তুই জড়, আর তাহাদের প্রকাশক একমাত্র আত্মা। পৃথিবীতে যেমন সূর্যের কোন প্রকাশক দৃষ্ট হয় না, সেইরূপ আত্মার কেহ প্রকা- শক নাই এবং আত্মা ভিন্ন অনুভবিতাও আর কেহ নাই। যিনি জাগ্ৰৎ, স্বপ্ন, সুষুপ্তি সময়ে সমস্ত বস্তু অনুভব করিয়া থাকেন, কে কিরূপে সেই জ্ঞাতাকে জানিতে পারে? যেমন অগ্নি সমস্ত বস্তুকে দগ্ধ করে, কিন্তু অগ্নির দাহক অন্য কেহ নাই, সেইরূপ আত্মা সকলের জ্ঞাতা, আত্মার জ্ঞাতা আর কেহ নাই। কারণ আত্মা স্বয়ং বােদ্ধা, অতএব অন্য উপ- লব্ধার অভাব বশতঃ আত্মা কাহারও জ্ঞানের বিষয় হন না। সুষুপ্তিকালে বুদ্ধি, মন, ইন্দ্রিয়, দেহ প্রভৃতি কারণে বিলীন হওয়ায় একমাত্র আত্মা কিছুই দেখেন না, শ্রবণ করেন না, বা মনন করেন না। এই অবস্থায় আত্মা স্বয়ং সুষুপ্তি- কালীন অজ্ঞানের সাক্ষী থাকিয়া বিকল্পশূন্য হইয়া সুখে অবস্থান করেন। আত্মার এইরূপ প্রত্যভিজ্ঞ* হয় এবং হেতু দ্বারা আত্মার অনুমান হয় ; ‘আমি সুখে নিদ্রা গিয়াছিলাম, —এইরূপ স্মৰ্যমান বস্তুর অস্তিত্ব অবগত হওয়া যায়। পূর্বে যদি আত্মার অনুভব না থাকিত, তাহা হইলে কখনই তদ্বিষয়ে স্মৃতি হইতে পারিত না। শ্রুতিও সুষুপ্তিকালে আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করিয়া থাকেন। সুষুপ্তিকালে যদি আত্মা বিদ্যমান না থাকেন, তবে শ্রুতিতে অকাময়িতৃত্ব এবং স্বপ্নের অদর্শন প্রভৃতি সঙ্গত হইতে পারে না। অবিদ্যমান বস্তুতে ৪খ বেদান্ত-বিবেক vvvvv - এ - === আত্ম-স্বরূপ নিষেধ হইতে পারে না। সুতরাং তখনও আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করিতে হইবে। এই সমস্ত প্রমাণের দ্বারা কেবল শুদ্ধ সচ্চিদানন্দ-স্বরূপ আত্মার অস্তিত্ব জ্ঞাত হইয়া তাহাকে সাক্ষীরূপে অবগত হও। সত্ত্ব, চিত্ত্ব এবং আনন্দ আত্মার স্বরূপ; নিগুণ আত্মার গুণ-সম্বন্ধ থাকিতে পারে না বলিয়া সত্ত্ব, চিত্ত্ব ও আনন্দ আত্মার গুণ নহে। কিন্তু সৎস্বরূপ, নিরূপণ জ্ঞানরূপ ও আনন্দময়তাই আত্মার লক্ষণ ; তিনি সর্বদা স্বরূপে অবস্থিত থাকায়—তিন কালেই তাঁহার স্বরূপের প্রচ্যুতি হয় না--এজন্য তঁাহাকে সত্য বলা যায়, জ্ঞান-রূপে অবস্থিত থাকায় শুদ্ধ-চৈতন্য-লক্ষণ চিৎ- স্বরূপ বলা যায় এবং অখণ্ড সুখরূপে অবস্থিত থাকেন বলিয়া আনন্দরূপতা কথিত হয়। জাগ্রৎ, স্বপ্ন এবং সুষুপ্তি সময়ে “আমি আছি” এই- রূপে আত্মার অস্তিত্ব অনুসৃত রহিয়াছে; অতএব এই নিত্য আত্মার নিত্যস্বরূপ আত্মার কখন বিনাশ নাই, “আমি নিরূপণ ছিলাম”—এই অভিন্ন জ্ঞান সৰ্ব্বদাই পরিলক্ষিত হয় ; “আমি ছিলাম না”--এইরূপ জ্ঞান কখনও দৃষ্ট হয় না; অতএব আত্মার নিত্যত্ব যুক্তিসিদ্ধ। গঙ্গার তরঙ্গপরম্পরায় যেমন জল অনুবৃত্ত আছে, সেইরূপ বাল্য, কৈশাের, যৌবন, প্রৌঢ় ও বার্ধক্য অবস্থায় এবং জাগ্ৰৎ, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি অবস্থায় এবং দুষ্ট ও অদুষ্ট বুদ্ধির বৃত্তিসমূহে আত্মনাত্ম-বিবেক আত্মার অস্তিত্ব অনুগত রহিয়াছে ; “এই আমি”—ইহার অনুষ্ঠান করি, “এই আমি” ইহা দেখি—এইরূপ সাক্ষীর একরূপত্ব সর্বদা অব্যাহত রহিয়াছে। প্রত্যেক বস্তুতে অহঙ্কার প্রভৃতি পৃথক্‌ অর্থাৎ বিষয়ভেদে অহঙ্কার প্রভৃতি ভিন্ন হইয়া থাকে ; তাহারা প্রতিক্ষণে পরিণাম প্রাপ্ত হয় বলিয়া বিকারী। আত্মার কোনরূপ অংশ নাই বলিয়া অপরিণামী; অতএব আত্মা অবিকারী, সুতরাং নিত্য। যে আমি স্বপ্ন দেখিতেছিলাম, যে আমি সুখে নিদ্রিত ছিলাম, পরক্ষণে সেই আমি প্রবুদ্ধ হইয়াছি—এইরূপ অক্ষুন্ন ভাবে আত্মার সত্তা অনুভূত হইতেছে, ইহাতে কোনরূপ সংশয় নাই। শ্রুতিতে যে আত্মার মন প্রভৃতি যােড়শ কলার কথা বলিয়াছেন, তাহা চিদাভাসের অর্থাৎ প্রতিবিম্বিত চৈতন্যের, আত্মার নহে;-আত্মা নিষ্কল অর্থাৎ অংশবিহীন বলিয়া কখনই লয়প্রাপ্ত হন না, অতএব আত্মার নিত্যত্ব সিদ্ধ হইল। আত্মার জ্ঞান-স্বরূপ ঘটাদি জড় বস্তুর প্রকাশক সূৰ্য্য প্রকাশ-স্বরূপ, অচেতন নহে,—অতএব বুদ্ধি প্রভৃতির প্রকাশক চৈতন্য- স্বরূপ আত্মাও জড় নহেন। যেমন নিরূপণ দেওয়াল প্রভৃতি অচেতন পদার্থের স্বভাবতঃ প্রকাশ নাই, সকল সময়ে সূর্যাদির কিরণ ব্যতীত কোথাও প্রত্যক্ষ হয় না, সেইরূপ বুদ্ধি প্রভৃতি আত্মা ভিন্ন স্বভাবতঃ অণুমাত্রও প্রকাশ পায় না; যেমন সূৰ্য্য প্রকাশ- ৬০, বেদান্ত-বিবেক স্বরূপ, সেইরূপ শ্রুতি আত্মাকে কেবল জ্ঞানরূপ বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। সূৰ্য যেরূপ স্বপ্রকাশে বা অপর পদার্থ প্রকাশে অন্য কোন প্রকাশকান্তরের অনুমাত্রও অপেক্ষা করে না, সেইরূপ চৈতন্য-স্বরূপ আত্মা নিজের বােধনে কিম্বা অহঙ্কার প্রভৃতির বােধনে অপর কাহারও অপেক্ষা করেন না। যেহেতু আত্মা অপর কোন প্রকাশকের অপেক্ষা না করিয়া স্ব-স্বরূপে প্রকাশ পান, সেইজন্য স্বয়ং প্রকাশ এই চিদাত্মা নিজের জ্ঞানের নিমিত্ত পর-প্রকাশের অপেক্ষা করেন না। সূর্য, চন্দ্র এবং বিদ্যুৎ যাহাকে প্রকাশ করিতে পারে না, স্বল্পতেজঃসম্পন্ন অগ্নির কথা আর কি বলিব ? সেই প্রকাশ- স্বরূপ আত্মাকে লক্ষ্য করিয়া এই সমস্ত জগৎ প্রকা- শিত রহিয়াছে, সকল অবস্থায় সেই আত্মা বিরাজমান রহিয়াছেন। অতএব আত্মার জ্ঞান-স্বরূপ নিত্য-সিদ্ধ। যাহা নিত্য এবং জ্ঞান-স্বরূপ, তাহা অবশ্য আনন্দময়। সুখের অভাবই দুঃখ। সুখের অনন্তরূপই নিত্যানন্দ। এ জগতে যে সুখের পরিচয় আছে, সেই আত্মার আল-স্বরূপ নিরূপণ সুখই অপরিচ্ছিন্নরূপে অনন্ত হইলেই নিত্যানন্দময় হয়। তাই পরম ঋষি সনৎকুমার আত্মাকে আনন্দ-স্বরূপ বলিয়া স্থির করিয়াছেন। নিরতিশয় প্রীতির আম্পদ বলিয়া আত্মাকে আনন্দ-স্বরূপ বলা যায়। রােগ-শােকগ্রস্ত দীন-দুঃখীও মরিতে চাহে না, কারণ আত্মা সর্বাপেক্ষা প্রিয়। স্ত্রী-পুত্র, ধন-রত্নাদি, তাহাদের জন্য প্রিয় অনাত্ম-বিবেক ৬১ নহে, আত্মার জন্যই প্রিয় হইয়া থাকে। জাগ্রৎকালে এবং স্বপ্নাবস্থায় অন্তঃকরণ, ইন্দ্রিয়সমূহ ও দেহ বিদ্যমান থাকায়, সকলের পূর্বে বর্তমান আত্মা জ্ঞানের বিষয়ীভূত হন না। কিন্তু সুষুপ্তিকালে দুঃখময় ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণাদি কারণে লয় হইলে, আনন্দ-স্বরূপ আত্মা প্রকাশ পান। তাই সুষুপ্তি হইতে উত্থিত সমস্ত লােক আনন্দ-স্বরূপত্ব রূপে আত্মার প্রত্যভিজ্ঞা করিয়া থাকে, অর্থাৎ—“আমি সুখে নিদ্রা গিয়া- ছিলাম”—এইরূপ অনুভাব বশতঃ আত্মার আনন্দ-স্বরূপত্ব সিদ্ধ হয়। ব্ৰহ্ম। হইতে সমস্ত প্রাণী নিজ নিজ উপাধির অনুরূপ এই আত্মার আনন্দের অংশ অবলম্বন করিয়া থাকে। ভক্ষ্যদ্রব্যে যে সুখজনক মধুর রস আস্বাদন করা যায়, তাহা শর্করারই মাধুৰ্য্য, অন্য দ্রব্যের নহে; সেইরূপ বিষয়ের সান্নিধ্যবশতঃ যে আনন্দ অনুভূত হয়, তাহা বিশ্বভুত অাত্মার আনন্দের স্ফুরণ মাত্র, অচেতন বস্তুর নহে। যে কোন স্থানে যে কোন বস্তুর সংযােগে যে আনন্দ হয়, তাহ অাত্মারই স্ফুর্তিরূপ আনন্দ। যাহারা আনন্দ শব্দের অর্থ দুঃখভাব বলিয়া মনে করে, তাহারা ভ্রান্ত ; কারণ লােষ্ট্র প্রভৃতিতে দুঃখের অভাব বিদ্যমান রহিয়াছে, কিন্তু তাহাতে আনন্দ অনুভূত হয় না। কিন্তু কোন সময়ে কাহারও আত্মপ্রীতির অভাব পরিলক্ষিত হয় না। অতএব আত্মা আনন্দ-স্বরূপ বটেন। শ্রুতি তাই আত্মাকে সৎ-স্বরূপ, জ্ঞান-স্বরূপ ও আনন্দ-স্বরূপ বলিয়া থাকেন। পণ্ডিত, বেদান্ত-বিবেক সাধুশ্রেষ্ঠ ব্ৰহ্মজ্ঞ মহাত্মার সমাধিকালে প্রত্যক্ষ ভাবে কেবল মাত্র সচ্চিদানন্দ-স্বরূপ আত্মাকে অনুভব করিয়া থাকেন। সচ্চিদানন্দ আত্মার স্বরূপ, গুণ নহে। যেমন উষ্ণতা ও প্রকাশ অগ্নির স্বরূপ, সেইরূপ সৎ, চিৎ ও আনন্দ আত্মার স্বরূপ--ইহাই নিশ্চিত; অতএব আত্মার সজাতীয়, আত্মার অদ্বিতীয়ত্ব বিজাতীয় প্রভৃতি ভেদ নাই। “এক- নিরূপণ মেবাদ্বিতীয়”—এই শ্রুতিবাক্য ত্রিবিধ ভেদ-শূন্যত্বের পরিচায়ক। আত্মা কিরূপ? না ‘একং’ অর্থাৎ স্বগত ভেদ-শূন্য ; ‘এব’ অর্থাৎ সজাতীয় ভদ-শূন্য ও ‘অদ্বিতীয়ং অথাৎ বিজাতীয় ভেদ-শূন্য। অতএব স্বগত, সজাতীয় ও বিজাতীয় ভেদ-পরিশূন্য পরম পদাথ ই আত্মা। এই আত্মা অনাদি ও অনন্ত। অনন্ত বস্তুর সত্তা স্বীকাৰ্য্য, তদ্ভিন্ন অন্য কোন বস্তুর স্বতন্ত্র সত্তা স্বীকাৰ্য্য হইতে পারে না। যে বস্তু অনন্ত, তাহা সর্বত্র ব্যাপ্ত। যাহা অনন্তরূপে সৰ্ব্ব- ব্যাপী, তদ্ভিন্ন অন্য কোন বস্তুর স্বতন্ত্র সত্তা স্বীকার করিলে আর অনন্ত বস্তুর সৰ্বব্যাপিত্ব থাকে না। যে বস্তু অনন্ত, তাহাতে সমস্ত বস্তুই অবস্থান করিতেছে। একথা যদি প্রামাণ্য ও সত্য হয়, তবে এই পরিদৃশ্য- মান জগতের স্বতন্ত্র সভা অসত্য। জগৎ আবার অনন্ত সত্তা হইতে বিভিন্ন হইবে কিরূপে? যদি বল জগৎ স্বতন্ত্র পদার্থ, তবে বলিতে হইবে আত্মা অনন্ত নহেন। অতএব জগৎ আত্মাতেই অবস্থান করিতেছে। এক এবং অদ্বিতীয়

আত্মনাত্ম-বিবেক
আত্মাই বিশ্বব্যাপী হইয়া সমস্ত পদার্থে ওতঃপ্রােতঃ
হইয়া আছেন। কোন ন্যায়ে এ যুক্তি খণ্ডিত হইতে
পারে না। যাহারা বলে আত্মা সৰ্বব্যাপী, অথচ জগৎ
সেই আত্মা হইতে স্বতন্ত্র ও ভিন্ন পদাথ', তাহারা বস্তুতঃ
আত্মার অনন্ত সত্তার অস্তিত্ব ও সৰ্বব্যাপিত্ব স্বীকার করে
। যখনই বলিলে আত্মা সৰ্ব্বব্যাপী ও অনন্ত, তখনই
জগতের স্বতন্ত্র সত্তা অস্বীকার করিলে। সুতরাং আত্মা যদি
অনন্ত হন, তবে অবশ্য বলিতে হইবে, এই জগৎ ও ব্রহ্মাণ্ড
সেই আত্মারই শরীর ও রূপ। তিনি অনন্ত বিশ্বের বস্তুরূপে
অবস্থিত আছেন এবং সেই অনন্ত বিশ্ব তাহাতেই অবস্থান
করিতেছে। আবার যাহা অনন্ত, তাহা অবশ্য অনাদি।
যাহার আদি আছে, তাহার সীমা ও শেষ আছে; কিন্তু
অনন্তের সীমা ও শেষ সম্ভব না। সুতরাং আত্মা অনাদি।
তিনি অনন্ত দেশে ও অনন্ত কালে সৃষ্টি, স্থিতিও প্রলয়রূপে
ওতঃপ্রােতঃ হইয়া আছেন। যিনি নিজে অনন্ত, তঁাহার
রূপও অনন্ত। তবে কেন আমাদের চক্ষে এ বিশ্ব খণ্ডিত
আকারে পরিচ্ছিন্ন দেখায় ? —বিজ্ঞান-চক্ষুর অভাবে। স্থূল
দৃষ্টিতে অনন্তের প্রতীতি হয় না। বাহ্য-বিজ্ঞান সেই অনন্তের
আভাস দেয় মাত্র। কিন্তু অধ্যাত্ম-বিজ্ঞানে মানবের অন্তর্দষ্টি
প্রস্ফুটিত হয়, সেই অন্তর্দষ্টিতে সম্যক্ দৃষ্টি উৎপাদিত হইলে
অনন্তের পূর্ণ প্রতীতি ও প্রত্যক্ষ হয়। বেদ-বেদান্ত সেই
অধ্যাত্ম-বিজ্ঞান প্রকাশ করিয়া মানবকে এক নূতন চক্ষু
;

৬৪
বেদান্ত-বিবেক
দিয়াছেন। তাহাই জ্ঞানচক্ষু বা দিব্যনেত্র। সদ্গুরুর
কৃপায় এই জ্ঞাননেত্র প্রস্ফুটিত হইলে মানুষ অনন্ত জ্ঞানে ও
অনন্ত সুখে উপনীত হয়েন। সেই সময় স্পষ্ট অনুভব
করিতে পারেন—যে প্রকার আকাশ এই চরাচর বস্তুসমূহের
বাহ্য ও অভ্যন্তরে অবস্থিতি করিয়া সমুদয় পদার্থের আধার
রূপে প্রকাশিত হইতেছে, তদ্রুপ স্বরূপতঃ এই ব্রহ্মাণ্ডের
সাক্ষি-স্বরূপ যে আত্মা, তিনি সত্তা রূপে ইহার অন্তর্বাহে
অবস্থিতি করিয়া সমুদয় ব্রহ্মাণ্ডের আধাররূপে . প্রকাশ
পাইতেছেন। অতএব সচ্চিদানন্দ-স্বরূপ আত্মা অনাদি,
অনন্ত এবং অদ্বিতীয়।
পৃথিবীতে যত প্রকার ধর্মমত প্রচলিত আছে, তন্মধ্যে
অদ্বৈতবাদের স্থান সর্বোচ্চে। সকল মতই অদ্বৈতবাদের
অদ্বৈতদের
সুশীতল ছায়ায় সমাশ্রিত ; সকলই
শ্রেষ্ঠত্ব । অদ্বৈতবাদের সেবায় নিরত।
বেদান্তশাস্ত্র পর্যালােচনা করিলে বেদান্তের তাৎপর্য যে
অদ্বৈত, তাহা অতি সহজেই অবগত হওয়া যায়।
যাহারা দ্বৈতকে সত্য বিবেচনা করিয়া তদনুসারে অন্যকে
উপদেশ দেন, তাহাদিগকে দোষ প্রদান করা যায় না; কারণ
অদ্বৈত অতি গহন, অকস্মাৎ লােকের বুদ্ধিগম্য হয় না; সেই
সমস্ত প্রথম অধিকারীর পক্ষে দ্বৈতমতই শ্রেয়। যেমন
বালক নিৰ্ম্মল নভােমণ্ডলে মলিনতাদির কল্পনা করিয়া থাকে,
তদ্রুপ ভেদবাদিগণ সেই অদ্বৈত পরমাত্মা হইতে জীব ও
;

আত্মনাত্ম-বিবেক •• হইবে। প্রপঞ্চের সত্যভেদ কল্পনা করিয়া থাকে; কিন্তু সেই সমস্ত লােক যদি দ্বৈতপক্ষ গ্রহণ করিয়া কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান করে, তাহা হইলে এক সময়ে অদ্বৈতের মাহাত্ম্য বুঝিতে সক্ষম বহু প্রাচীন কালেও অদ্বৈতবাদ প্রচলিত থাকিলেও বেদবিভাগ এবং বেদান্তসূত্র ও পুরাণাদি শাস্ত্ৰকৰ্তা জগদ্গুরু ব্যাসদেবকেই অদ্বৈতবাদী বলিতে হইবে। ভগবান্ গৌড়পাদ সেই মতের পরিপােষক, ভগবৎ-পাদ শঙ্করাচাৰ্য তাহার বহুল প্রচার করিয়াছেন মাত্র। এই অদ্বৈতজ্ঞানই তত্ত্বজ্ঞান, ইহা মােক্ষলাভের একমাত্র সাধন। “তত্ত্বজ্ঞানান্নিঃশ্রেয়সাধিগমঃ” এই সূত্রে ভগবান্ অক্ষপাদও তত্ত্বজ্ঞানকে মােক্ষসাধন বলিয়া কীৰ্ত্তন করিয়াছেন। জগদ্গুরু শ্ৰীশঙ্করাচাৰ্য এই তত্ত্বজ্ঞানের উপদেশ প্রচার করিয়া মুক্তির পথ প্রশস্ত করিয়া দিয়াছেন। বেদের কর্মকাণ্ডের তাৎপৰ্য কৰ্ম্মে থাকিলেও, জ্ঞান- কাণ্ডের-বেদান্তের তাৎপৰ্য্য অদ্বৈত-ব্ৰহ্মে। সমস্ত বেদান্তবাক্য অদ্বৈতবাদ প্রতিপাদনের বেদান্তের তাৎপর্য জন্য উদ্গ্রীব। বিবেক-বৈরাগ্যসম্পন্ন শ্রীগুরু ও ভগবানের কৃপা প্রাপ্ত না হইলে আত্মা যে এক ও অদ্বিতীয় এবং নিত্য ও সর্বাধার রূপে বর্তমান আছেন, তাহা ধারণা হয় না। প্রকৃতপক্ষে আত্মা এক, বহু নহেন। একই আত্মা মনের বহুত্বে নানারূপে প্রকাশিত। সুতরাং জীব অসংখ্য ; আত্মা অসংখ্য নহেন। একই আত্মা দেহ- পরিচ্ছেদে নানা দেহে ভেদ-প্রাপ্তের ন্যায় বিরাজ বেদান্ত-বিবেক করিতেছেন। একটী দীপ জ্বালিত বা নিৰ্বাপিত করিলে, যেমন অন্য দীপ জ্বলিত বা নিৰ্বাপিত হয় না, সেইরূপ একজনের বন্ধনে বা মােক্ষে অন্য জনের বন্ধন বা মােক্ষ হয় । মন প্রতি শরীরে বিভিন্ন ; সুতরাং সুখ, দুঃখ, শােক, সন্তাপ, জন্ম, মৃত্যু প্রভৃতিও ভিন্ন। তাতএব আত্মা এক এবং অদ্বিতীয় ; এই অদ্বৈত বৈদিক মত সৰ্ব্বথা অবিরুদ্ধ। কাষ্ঠের ভিতর অগ্নি, পুষ্পে গন্ধ, দুগ্ধে ঘৃত যেরূপ ভাবে আছে, সেইরূপ দেহমধ্যে আত্মা আছেন। দুগ্ধ মন্থন করিয়া যেরূপ তাহা হইতে নবনীত উত্তোলিত আত্মজ্ঞানের উপায় ও হয়, সেইরূপ সাধনা দ্বারা আত্ম দর্শন করা যায়। কাষ্ঠ ভেদ করিলে সেই কাষ্ঠগত বহ্নি যেমন পরিদৃশ্যমান হয় না, সেইরূপ শরীর ছেদন করিলে উহাতে আত্মদর্শন লাভ হইবার সম্ভাবনা নাই। কৌশলক্রমে কাষ্ঠ ঘর্ষণ করিলে যেমন তন্মধ্যস্থিত অগ্নি নিষ্কাশিত ও নিরীক্ষিত হয়, সেইরূপ ধ্যান দ্বারা প্রমান বিশুদ্ধচিত্ত যােগিগণই আত্মাকে দেহে নির্লিপ্ত ভাবে অবস্থিত দেখিতে পান। কিন্তু যাহারা অবিশুদ্ধ-চিত্ত সুতরাং মন্দমতি, তাহারা শাস্ত্রাভ্যাসাদি দ্বারা সহস্র চেষ্টা করিলেও আত্মার দর্শন পায় না। অধ্যাত্ম- যােগেই জ্ঞানচক্ষু লাভ হয়। এই জ্ঞানচক্ষু দ্বারা আত্ম- দর্শন ঘটে। সেই জ্ঞানচক্ষু যাহাদের নাই, তাহার কাজে কাজেই জড়বাদী, না হয় দেহাত্মবাদী হইয়া পড়ে। জ্ঞানচক্ষু- তাহার ফল আত্মনাত্ম-বিবেক সম্পন্ন সাধু ব্যক্তিগণের উপদেশ বাক্যে যাহারা আস্থা স্থাপন করিতে পারে, তাহাদেরও কিয়দংশে আত্মজ্ঞান লাভ এবং আত্মায় বিশ্বাস স্থাপন হয়। নতুবা সামান্য ব্যবহারিক বুদ্ধিতে বাদ-বিতণ্ডা করিয়াই ঘুরিয়া বেড়াইতে হয়। অতএব এতাব প্রতিপন্ন হইল যে, ধন-রত্ন বা স্ত্রী- পুত্র এবং দেই, ইন্দ্রিয়, প্রাণ, মন, বুদ্ধি, অজ্ঞান, জ্ঞানাজ্ঞান ও শূন্য—ইহারা আত্মা নহে; ইহাদের অতিরিক্ত সাক্ষি- চৈতন্যই আত্মা। সেই আত্মা সৎ, চিৎ ও আনন্দ-স্বরূপ- এক এবং অদ্বিতীয়। আত্মা ও অনাত্মার অবিবেকবশতঃই জীবের বন্ধন-দশা উপস্থিত হইয়াছে। অতএব সাধু ব্যক্তিগণ আত্মনাত্ম-বিবেক দ্বারা আত্ম-নিরূপণ করিয়া সৰ্ব্বদা আত্ম- নিষ্ঠ হইয়া থাকিবে। এইরূপ নিয়ত অভ্যাস করিলে আত্মার স্বরূপ দর্শন ঘটিয়া থাকে—আত্ম-অনাত্মার ভেদ বুঝিতে পারা যায়। যখন অনাত্মা আর আত্মার সন্নিধানে মহৎ ও অহ- ঙ্কারাদি রূপে পরিণত হয় না,-চিৎস্বরূপ আত্মাকে কোন প্রকার আত্মবিকৃতি দেখাইতে পারে না,-অনাত্মা ও অনা- ত্মার বিকার আত্ম-চৈতন্যে প্রদীপ্ত বা প্রতিবিম্বিত হয় না, আত্মা যখন সাক্ষীরূপে মাত্র চৈতন্য-স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত থাকেন, বিকার দর্শন হয় না, সেই সময়ে জীবের মুক্তিলাভ হইয়া থাকে। যতদিন বিবেক দ্বারা আত্মম নিবৃত্তি না হয়, ততদিন সাবধানে সাধনা করিবে। স্বীয় বুদ্ধি দ্বারা বিচার ও নিদিধ্যাসন করতঃ অপরিচ্ছিন্ন, অদ্বৈত, অক্ষর, পরম, ৬ বেদান্ত-বিবেক ------ = = = নিজানন্দ স্বয়ং সাক্ষাৎ করিয়া জীবন্মুক্ত, বিশ্রান্ত ও শান্তি- প্রাপ্ত হও। তুমি অনাত্মার গুণ দ্বারা সমাবৃত হইয়া আপ- নাকে সকল প্রকার ক্রিয়া ও কর্মের কর্তা বলিয়া অভিমান করিতেছ, কিন্তু তুমি বাস্তিবক নিষ্ক্রিয়, নির্বিকল্প, উদাসীন এবং সৎস্বরূপ আত্মা। যে প্রকার অগ্নি প্রতপ্ত লৌহপিণ্ডের অন্তরে ও বাহে ব্যাপ্ত থাকিয়া তাহাকে প্রকাশ করতঃ আপনিও প্রকাশিত হয়, সেই প্রকার তােমার আত্মা সমস্ত পদার্থের অন্তর্বাহ্যে ব্যাপ্ত থাকিয়া অখিল সংসারকে একাসন করতঃ স্বয়ং প্রকাশিত রহিয়াছেন। যথা- সৰ্ব্বভূতমাত্মানং সৰ্ব্বভূতানি চাত্মনি। ঈক্ষতে যােগযুক্তাত্মা সর্বত্র সমদর্শন। সৰ্ব্বভূতেষু চাত্মানং সৰ্ব্বভূতানি চাত্মনি। সংপন্ ব্ৰহ্ম পরমং যাতি নানে হেতুনা। ভাবার্থ এই যে, যিনি ব্ৰহ্মাদি স্থাবর পর্যন্ত সর্বভূতে আত্মাকে এবং আত্মাতে সৰ্ব্বভূত দর্শন করেন, তিনি ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করিয়া থাকেন। অতএব মুক্তির একমাত্র হেতুভূত জ্ঞান লাভের নিমিত্ত সমাহিত চিত্তে আত্মনাত্ম-বিচার দ্বারা আত্মনিষ্ঠ হইবে। মুমুক্ষুদিগের আত্মনাত্ম-বিবেকই একমাত্র সাধনা। আত্মা বত্বেকং ব্ৰহ্ম, অতিরিক্তং সর্বমনাত্মা ॥

মহাবাক্য-বিবেক বৈরাগ্যাদি-সাধনচতুষ্টয়পূৰ্ব্বক বেদান্তবাক্যের বিচারই মুখ্য অপরােক্ষরূপে ব্ৰহ্মজ্ঞানের কারণ বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছে। বেদান্তশাস্ত্রের তাৎপৰ্য পৰ্যালােচনা করিলে সমীচীন জ্ঞান জন্মে। সেই জ্ঞানদ্বারা আত্যন্তিক সংসার- দুঃখের মােচন হয়। অর্থাৎ শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে গুরু- বাক্যে বিশ্বাস করিয়া ধ্যাননিষ্ঠ চিত্তে বিচার করিলে জ্ঞানােদয় হয় এবং সেই জ্ঞানেই মুক্তি হইয়া থাকে। অতএব ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে প্রতিনিয়ত তত্ত্ব-বিচার তত্ত্ব-বিচার করিবে। এক্ষণে দেখিতে হইবে যে শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে তত্ত্ববিচার করা কিরূপ? আমি কে এবং কি—এই অখিল ব্ৰহ্মাণ্ডই বা কি-বন্ধন কি এবং কি প্রকারে উপস্থিত হয়—আত্মা কি, অনাত্মাই বা কি-জীবাত্মা ও পরমাত্মার ভেদ বিচারই বা কিরূপ?—এই সকল প্রশ্ন স্বতঃই মনে উদয় হইয়া থাকে। বিচার দ্বারা এইরূপ প্রশ্নের মীমাংসা করাকেই তত্ত্ব-বিচার বলে। এইরূপ বিচার দ্বারা সংসাররূপ চিরকালব্যাপী সুদীর্ঘ রােগ সম্পূর্ণরূপে নিবৃত্তি হয়। আমি কে এবং কাহারই বা সংসার ? এইরূপ বিচারে প্রবৃত্ত হইলে অজ্ঞান বিভূম্ভিত এই সংসার এককালে লয়প্রাপ্ত ৭০ বেদান্ত-বিবেক হয়। তত্ত্ব-নিরূপণ কারণ বিচারে প্রবৃত্ত হইলে বুঝিতে পারিবে যে, তুমি ইহা নহ, উহা নহ এবং এই জগৎ প্রপঞ্চ যাহা কিছু দেখিতেছ, ইহার কিছুই তুমি নহ ; তুমি সেই সৎ-স্বরূপ পরমাত্মা। তুমি কেবল মায়াদ্বারা সমাবৃত হইয়া এইরূপ হইয়াছ। তুমি প্রকৃতির গুণদ্বারা সমাচ্ছন্ন হইয়া ‘আমি’ জ্ঞানে আপ- নাকে সকল প্রকার ক্রিয়া ও কৰ্ম্মর কর্তা বলিয়া অভিমান করিতেছ। তুমি প্রকৃত পক্ষে নিষ্ক্রিয়, নিঝিকল্প, নিরঞ্জন এবং সৎ-স্বরূপ “তত্ত্বমসি” অর্থাৎ তুমিই সেই ব্ৰহ্ম । “তত্ত্বমসি” বাক্য দ্বারা অত্মাকে প্রতিপন্ন করা হইয়াছে এবং “নেতি নেতি” অর্থাৎ “ইহা নহে-উহা নহে” বাক্য দ্বারা এই মিথ্যাভূত পাঞ্চভৌতিক জগৎকে নিরাস করিয়া শ্রুতিবাক্য সকল এক পরিশুদ্ধ আত্মাকেই প্রতিপন্ন করিয়া- অতএব আমিই ব্ৰহ্ম এবং সেই ব্ৰহ্মই আমি, ইহাতে কিছুমাত্র সংশয় নাই। এবং অদ্বিতীয় ব্রহ্মের কাৰ্য-কারণভাব জন্য জীব ও ঈশ্বর ভেদে দুই প্রকার উপাধি হইয়াছে। কারণভাব জন্য অন্তর্যামী ঈশ্বনােপাধি এবং কাৰ্যভাব জন্য অহং-পদবাচ্য জীবােপাধি হইয়াছে। ব্ৰহ্ম অদ্বৈত হইয়াও কাৰ্য-কারণভাব জন্য দ্বৈতরূপে প্রতীয়মান হইতেছেন। তত্ত্ব- বিচার দ্বারা জীব ও ঈশ্বররূপ উপাধির নাশ হইয়া কেবল ছেন।

মহাবাক্য-বিবেক ৭১ শুদ্ধ-চৈতন্য মাত্র অবশিষ্ট থাকেন। সেই অবশিষ্ট শুদ্ধ- চৈতই অদ্বৈত ব্ৰহ্ম । এইরূপ অদ্বৈত ব্ৰহ্মজ্ঞান হইলেই সংসার-বন্ধন হইতে পরিমুক্ত হওয়া যায়। এক্ষণে ইহাই বিচাৰ্য যে, যদি আমিই ব্ৰহ্ম হইলাম, তবে আমি সক্রিয় ও জীবভাবে স্থিত, আর ব্রহ্ম নিষ্ক্রিয় ও সৎ-স্বরূপে স্থিত –এরূপ বিরুদ্ধ ভাব পরস্পরের মধ্যে কেন হয় ? ইহার উত্তর এই যে, জীবাত্মা ও পরমাত্মার বিরােধ কেবল উপাধি জন্য হয়, প্রকৃত পক্ষে কোন বিরােধ নাই, পরমাত্মা ও জীবাত্মার এই যে বিরােধ, তাহা শুদ্ধ উপাধি দ্বারা কল্পিত মাত্র। মহৎ আদির কারণ মায়া ঈশ্বরের উপাধি এবং অবিদ্যার কাৰ্য্য পঞ্চকোশ জীবের উপাধি। মায়া এবং পঞ্চকোশ, এতদ্বয় নিরাকৃত হইলে ঈশ্বর ও জীবরূপ যে উপাধিদ্বয়, তাহাও সম্যক্‌রূপে নিরাকৃত হয়। যেরূপ রাজ্য- জন্য রাজা এবং গদাজন্য যােদ্ধা উপাধি ঘটে, কিন্তু রাজ্য ও গদা রহিত হইলে রাজা ও যােদ্ধ। উভয়েই তুল্য হইয়া থাকে, সেইরূপ ঈশ্বর ও জীবরূপ উপাধি রহিত হইলে উভয়ে তুল্য হন, অর্থাৎ ব্রহ্মমাত্র থাকেন। এক্ষণে কথা হইতেছে যে, কি উপায়ে এই উপাধির নিরাকরণ করিয়া সৎ-স্বরূপ ব্রহ্ম প্রতিপাদিত হইবেন। বেদান্তশাস্ত্রে এ সম্বন্ধে উল্লেখ আছে যে, “অধ্যারােপ” ও “অপবাদ” ন্যায় দ্বারা উপাধি সকলের নিরাস এবং সম্বন্ধত্ৰয় দ্বারা “তত্ত্বমসি” বাক্যের ঐক্য করা হইয়াছে। তত্ত্বমসি—অর্থাৎ তুমিই সেই ব্ৰহ্ম-এই শ্রুতি- ৭২ বেদান্ত-বিবেক বাক্য দ্বারা পরমাত্মা ও জীবাত্মার অভিন্নত্ব প্রতিপাদন করিতে গেলে, প্রত্যক্ষ প্রভৃতি প্রমাণের সহিত বিরােধ ঘটে; তজ্জন্য বাচ্যার্থের উপযযাগিতা নাই। সুতরাং তৎ- পদার্থ ও ত্বং-পদার্থের লক্ষ্যার্থ দ্বারা একত্ব স্থাপিত হয়। ক্রমশঃ তাহা প্রদর্শিত হইতেছে কিন্তু তৎপূৰ্বে তত্ত্বমসি বাক্য- বিচারের অধিকারী কে, তাহা দেখা যাউক। তত্ত্ববিচার করা সহজ নহে। প্রকৃত অধিকারী না হইলে তত্ত্বজ্ঞান লাভ হয় না। আহারশুদ্ধি, ত্রিবিধ সংঘাতশুদ্ধি, দেশ-কাল ও সৎপাত্রাদির লাভ, সঙ্কল্প- তত্ত্বমসি বিচারে অধিকার নিরূপণ ত্যাগ, ইন্দ্রিয়-সংযম ও গুরুসেবা প্রভৃ- তিতে এই অধিকার লাভ হয়। ইন্দ্রিয়গণ ও অন্তঃকরণ চপলতা-বৃত্তি পরিত্যাগ করিয়া স্থিরভাব ধারণ না করিলে জ্ঞান কদাচ প্রকাশ পাইতে পারে না। পুষ্করিণী প্রভৃতির জল স্থিরভাবে থাকিলে তবে যেমন তাহাতে প্রতিবিম্বসকল সুস্পষ্ট নয়নগােচর হয়, তদ্রুপ দুৰ্বত্ত ইন্দ্রিয়সকল স্থিরভাব ধারণ করিলে তবে জ্ঞান দ্বারা জ্ঞেয় পদার্থকে স্থায়ী ভাবে দর্শন করিতে পারা যায়। যিনি দুশ্চরিত হইতে বিরত হন নাই, যিনি শান্ত ও সমাহিত হন নাই, যিনি শান্ত-মানস হন নাই, তিনি কেবল প্রজ্ঞা মাত্র দ্বারা ব্ৰহ্মকে প্রাপ্ত হন না। যিনি শ্রদ্ধা-ভক্তিপূর্বক বিহিত কর্মদ্বারা ঈশ্বরকে পরিতুষ্ট করিয়া জন্মান্তরে ঈশ্বরানুগ্রহ দ্বারা মাহাত্ম্য অর্জনপূর্বক নিত্য ও অনিত্য বস্তুর বিবেক, ইহ-পরকালে বৈরাগ্য এবং মহাবাক্য-বিবেক १७ শম-দমাদি গুণসম্পন্ন হন, এই প্রকার সন্ন্যাসীই তত্ত্বমসি মহাবাক্য বিচারের মুখ্যাধিকারী। তিনি সদ্গুরু কর্তৃক তত্ত্বমসি বাক্যের অর্থ জ্ঞাত হইলে, তৎক্ষণাৎ তাহার-সেই ব্ৰহ্মই আমি—এবম্বিধ পরম অখণ্ডাকার চিত্তবৃত্তি সমুদিত হয়। অন্যান্য অধিকারীর যতকাল পর্যন্ত প্রমাণগত সন্দেহের নিবৃত্তি না হয়, ততকাল প্রযত্ন সহকারে সৰ্ব্বদা শ্রবণ করা কৰ্ত্তব্য। যে পৰ্য্যন্ত প্রমেয়গত সন্দেহ বিনিবৃত্ত না হয়, ততকাল শ্রুতি ও তদনুকূল যুক্তিসমূহ দ্বারা আত্মার যথার্থ স্বরূপ নির্ণয়ের নিমিত্ত পুনঃ পুনঃ মনন করা বিধেয়। মন- নের দ্বারা দৃশ্য প্রপঞ্চ দূরীকৃত হইলেও যে পর্যন্ত প্রত্যক্ষ জ্ঞান দ্বারা বিলয় প্রাপ্ত না হয়, তদবধি উত্তমরূপে নিদি- ধ্যান করা কর্ত্তব্য। অতএব প্রকৃত অধিকারী তত্ত্বমসি-বাক্যের অর্থ শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন করিলেই তত্ত্বজ্ঞান উৎপন্ন হইবে। তত্ত্ব- মসি বিচার দ্বারা জীব-ব্রহ্মের ঐক্য সাধনের পূর্বে জীবাত্মা ও পরমাত্মার উপাধির নিরাকরণ করিতে হইবে। অধ্যারােপ ও অপবাদ ন্যায় দ্বারা উপাধি সকলের নিরাকরণ করা হইয়া থাকে। রঞ্জু কখন সর্প নহে, তথাপি সেই রঞ্জুতে যেমন সর্পভ্রম হয়; সেইরূপ বস্তুতে অবস্তুর ভ্রমরূপ যাহা অজ্ঞান, তাহাকেই অধ্যারােপ বলে। অর্থাৎ বস্তুতে যে অবস্তু জ্ঞান-যথা রজুতে যে সর্পজ্ঞান—তাহাই অধ্যারােপ। এস্থলে সদ্বস্তু ব্রহ্মেতে অধ্যারােপ ন্যায় ৫খ ৭৪ * * বেদান্ত-বিবেক যে অসদ্বস্তু জগৎ জ্ঞান, তাহারই নাম অধ্যারােপ। যে বস্তু নাই, তাহাই অবস্তু এবং যাহা আছে, তাহাই বস্তু। এস্থলে যেরূপ সর্প নাই, এজন্য সর্প অবস্তু এবং রঞ্জু আছে বলিয়া রজুই বস্তু; সেইরূপ জগৎ নাই বলিয়া জগৎ অবস্তু এবং ব্ৰহ্ম আছেন বলিয়া ব্ৰহ্মই বস্তু। সুতরাং যে বস্তু বিদ্যমান নাই সেই বস্তুকে, যে বস্তু আছে তদুপরি আবােপ করার নাম অধ্যারােপ। এস্থলে জগৎ নাই এবং ব্রহ্ম আছেন; সুতরাং সদ্বস্তু ব্রহ্মের উপর অসদ্বস্তু জগৎকে আরােপ করা হইয়াছে। রঞ্জুতে সর্পভ্রম হইলে যখন সেই ভ্রমের বিনাশ হয়, তখন যেরূপ সর্পজ্ঞান বিলুপ্ত হইয়া কেবল রঞ্জুমাত্রের জ্ঞান থাকে, সেইরূপ সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মবস্তুতে অবস্তুরূপ অজ্ঞান- বিম্ভিত জড়প্রপঞ্চের যে ভ্ৰম, তাহার নাশ হইলে ব্ৰহ্মমাত্র অবশিষ্ট থাকেন; ইহাকেই অপবাদ কহে। অতএব ব্রহ্মে অধ্যা- রােপিত ব্ৰহ্মাণ্ড বা জীবেশ্বরের উপাধি সকলের অপবাদ স্যায় দ্বারা নিরাস করিয়া সম্বন্ধয় দ্বারা তত্ত্বমসি বাক্যের ঐক্য করিতে হইবে। সম্বন্ধয় এই যে— সমানাধিকরণ-সম্বন্ধ, বিশেষ্য-বিশেষণভাব-সম্বন্ধ এবং লক্ষ্য-লক্ষণ-সম্বন্ধ। এই সম্বন্ধয় দ্বারা তত্ত্বমসি বাক্যের ঐক্য করা হইয়াছে। সমান-বিভক্ত্যন্ত দুই পদের একাধিকরণে অবস্থিতির নাম সমানাধিকরণ; অথাৎ দুই পদের স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র অর্থ হইলেও যে একমাত্র বস্তুকে বুঝায়, তাহার নাম সমানাধি- অপবাদ যায় মহাবাক্য-বিবেক ৭৫ s করণ। যথা—সেই যােগানই এই বা এই-ই সেই যােগা- নন্দ, এই কথা বলিলে কেবল এক সমানাধিকরণ-সম্বন্ধ যােগানন্দই লক্ষ্য হয়। কারণ পূর্ব কালে দৃষ্ট ব্যক্তি যােগানন্দের বােধক “সেই” শব্দ এবং বর্তমান কালের যোগানন্দের বােধক “এই” শব্দ, এই উভয় শব্দাথেরই তাৎপৰ্য এক ব্যক্তিকে বুঝাইতেছে। তত্ত্বমসি বাক্যে সমানাধিকরণ প্রয়ােগ করিলে তৎ ও ত্বং পদের তাৎপৰ্যাথ এক ব্ৰহ্মমাত্রকেই বুঝাইবে। তত্ত্বমসি বাক্যে তৎ++অসি এই তিনটী পদ বর্তমান আছে। অর্থে তিনি। পূৰ্বেই বলা হইয়াছে, তৎ-পদার্থ ও ত্ব- পদাথের উপযােগিতা নাই, লক্ষণাবৃত্তি-লভ্য অর্থ গ্রহণ করিতে হইবে। সুতরাং তৎ-পদের অর্থ জগতের উপাদান কারণ তমােগুণ-প্রধান এবং নিমিত্ত কারণ বিশুদ্ধ সত্ত্ব-প্রধান যে মায়া, তদুপাধি-বিশিষ্ট ঈশ্বর ( সগুণ ব্ৰহ্ম ); আর দেহে- ন্দ্রিয়াদি ও অন্যান্য ধর্ম—গুণ সকল, নিগুণ আত্মাতে আরােপ করতঃ যে কর্তৃত্বাদি অভিমানী হয়, তাহাই ত্বং-পদের অথ। এই বাচ্যার্থ পরিত্যাগ করিয়া লক্ষ্যাথ গ্রহণ করিতে হইবে। বেদান্তবাক্য-বেদ্য, বিশ্বাতীত, অক্ষর, অদ্বয় যে বিশুদ্ধ স্বয়ং বেদ্য, তাহাই তৎ-পদের লক্ষ্যার্থ লক্ষ্যাথ; আর যিনি স্বয়ং বােধ-স্বরূপ দেহেন্দ্রিয়াদির সাক্ষী এবং সকল রূপ-প্রপঞ্চ হইতে ভিন্ন, তিনিই ত্বং-পদের লক্ষ্যার্থ। অর্থাৎ নাম-রূপাদি-বিহীন তৎ ও জং পদের অতএব বেদান্ত-বিবেক একমাত্র অদ্বিতীয় ব্ৰহ্ম-চৈতন্য তৎ-পদের লক্ষ্য ; আর জীবগণের অন্তঃকরণস্থিত সাক্ষি-স্বরূপ কুটস্থ- চৈতন্যই ত্বং-পদের লক্ষ্য। যেখানে বাচ্যার্থ উপপন্ন হয় না, তথায় লক্ষ্যার্থ স্বীকার করিতে হইবে। তৎ-পদের লক্ষ্যাথ অপ্রত্যক্ষ ব্ৰহ্মচৈতন্য এবং ত্বং-পদের লক্ষ্যার্থে প্রত্যক্ষ জীবচৈতন্য বুঝাইতেছে। আর “অসি”র অর্থ হওয়া। সুতরাং তত্ত্বমসি পদের অথ “তিনিই তুমি”; অর্থাৎ অপ্রত্যক্ষ ব্ৰহ্মচৈতন্য-বােধক যে তৎ-শব্দ ও প্রত্যক্ষ জীবচৈতন্য-বােধক যে ত্বং-শব্দ—এই উভয় শব্দের তাৎ- পৰ্য্যাথ বােধক এক চৈতন্য-স্বরূপ ব্রহ্মেতে পর্যবসিত হয় ; এজন্য তৎ ও ত্বং শব্দদ্বয় ব্রহ্মচৈতন্য-স্বরূপ একাধিকরণে অবস্থিত হইল। যেহেতু উভয় শব্দেরই লক্ষ্যার্থ একমাত্র ব্ৰহ্মচৈতন্য। এই—সেই এবং সেই—এই ; এইরূপ সম্বন্ধ উপস্থিত হইলে পরস্পরকে বিশেষ্য-বিশেষণ ভাব বলা যায়। অর্থাৎ একপক্ষে এই সেই-এর বিশেষণ এবং সেই এই-এর বিশেষ। বিশে-বিশেষণ-ভাব কারণ সেই আর এই—এই দুইটা শব্দের তাৎপৰ্যাথ অভিন্নরূপে এক বস্তুকেই বুঝাইতেছে। “সেই এই যােগানন্দ”—এই কথা বলিলে সেই কে ?-না সেই পূৰ্ব্বকালের দৃষ্ট ব্যক্তি যােগা- নন্দ ; এবং এই কে ?—না বর্তমান কালের দৃষ্ট ব্যক্তি সেই যােগানন্দ। সুতরাং “সেই এই”—এই দুই পদের লক্ষ্য বস্তু সম্বন্ধ মহাবাক্য-বিবেক ৭৭ এক অভিন্ন যােগানন্দ মাত্র। যেহেতু যােগানন্দকেই লক্ষ্য করিয়া “এই সেই”--এইরূপ কথা বলা হইয়াছে, সুতরাং সেই এবং এই—এই দুইটী শব্দের পরস্পরের মধ্যে বিশেষ্য- বিশেষণ-ভাব সম্বন্ধ হইতেছে। সেইরূপ তত্ত্বমসি বাক্যে তং-পদের অর্থ অপ্রত্যক্ষ চৈতন্য এবং ত্বং-পদের অর্থ প্রত্যক্ষ চৈতন্য। এজন্য এই উভয় পদের পরস্পর বিশেষ্য-বিশেষণ- রূপে সম্বন্ধ রহিয়াছে ; যেহেতু উভয় পদের তাৎপৰ্য্যার্থে এক অভিন্নরূপ ব্ৰহ্মচৈতন্যই বুঝাইতেছে । প্রত্যক্ত্ব ও সদ্বিতীয়ত্ব এবং পরােক্ষ ও পূর্ণতা পরস্পর-বিরুদ্ধ, অর্থাৎ প্রত্যত্বের সহিক পরােক্ষত্বের বিরােধ এবং সদ্বিতীয়ত্বের সহিত পূর্ণতার বিবােধ। কারণ, প্রত্যক্ত্ব ও সদ্বিতীয়ত্ব এই দুইটী গুণ জীবের প্রতি সম্ভব এবং ব্রহ্মের প্রতি অসম্ভব ; আর পরােক্ষত্ব ও পূর্ণতা এই দুইটী গুণ জীবের প্রতি অসম্ভব; অর্থাৎ প্রত্যত্ব ও সদ্বিতীয়ত্ব-ভাব কেবল জীবেরই হয়, ব্রহ্মের হয় না। কারণ জীব বহু এবং নানা প্রকার, কিন্তু ব্ৰহ্ম বহু এবং নানা নিরূপণ প্রকার নহেন। আর পরােক্ষঙ্গ ও পূর্ণত্ব কেবল ব্রহ্মেরই হয়, জীবের হয় না। পূর্ণ, জীব পূর্ণ নহে, পরন্তু অসম্পূর্ণ। এরূপ বিবােধস্থলে মীমাংসা করিতে হইলে লক্ষ্য-লক্ষণ-সম্বন্ধরূপ লক্ষণা করিতে হয়। অথাৎ শব্দাথের বিরােধ হইলেও কেবল লক্ষ্য বস্তু কি,—তাহাই দেখিতে হইবে; যেহেতু লক্ষ্য বস্তুই প্রয়ােজন। লক্ষ্য-লক্ষণ-সম্বন্ধ কারণ, ব্ৰহ্মই ।

৭৮ বেদান্ত-বিবেক শব্দার্থের পরস্পর বিরােধ হয় হউক, কিন্তু লক্ষ্যাথের কোন রূপ বিরােধ না থাকা জন্য কেবল একমাত্র বস্তুতেই লক্ষ্য রহিতেছে। সুতরাং যে স্থলে লক্ষ্য বস্তু একই এবং শব্দার্থ বিরুদ্ধ, সেই স্থলের সম্বন্ধকে লক্ষ্য-সম্বন্ধ বলে। অথাৎ অবিরুদ্ধ অংশের নাম লক্ষ্য এবং বিরুদ্ধাংশের নাম লক্ষণ। লক্ষ্য-লক্ষণা সম্বন্ধের বিরুদ্ধ অথাংশ ত্যাগ এবং অবিরুদ্ধ অথংশ গ্রহণ করিতে হইবে। তত্ত্বমসি এই বাক্যেতে তৎ-পদের অর্থ অপ্রত্যক্ষ চৈতন্য এবং ত্বং-পদের অর্থ প্রত্যক্ষ চৈতন্য ; এই অপ্রত্যক্ষত্ব ও প্রত্যক্ষত্ব ভাব পরস্পর বিরােধী বলিয়া পরিত্যাজ্য। উহা পরিত্যাগ করিলে কেবল এক অবিরুদ্ধ চৈতন্য মাত্র অবশিষ্ট রহিল এবং সেই অবশিষ্ট চৈতন্যাংশ গ্রহণ করিবার যোগ্য। অতএব অবশিষ্ট চৈতন্য- কেই লক্ষ্য এবং তৎ ও ত্বং পদকে লক্ষণা বলা যায়। প্রমাণান্তরের উপরােধ হেতু মুখ্যার্থ পরিগ্রহ না হইলে মুখ্যার্থ ভিন্ন অপর অর্থ গ্রহণ-প্রবৃত্তিকে লক্ষণা বলা যায়। জতী, অজহতী ও জহত্যজহতী ভেদে লক্ষণা ত্রিবিধ। জহতী শব্দের অর্থ ত্যাগ। শব্দের প্রকৃত অর্থ পরিত্যাগ করিয়া অন্য অর্থ স্বীকার করা অর্থাৎ সমস্ত বা বাচ্যার্থ পরিত্যাগ করিয়া হতী লক্ষণ তদযুক্ত অন্য ক্ষিয়ে যে বৃত্তি অথাৎ লক্ষ্যাথ গ্রহণ, তাহাবই নাম জহতী লক্ষণ। “গঙ্গায় ঘােষ বাস করিতেছে”—এই কথা বলিলে, গঙ্গাজলে মহাবাক্য-বিবেক ৭১ বাস অসম্ভব, সুতরাং তাহা না বুঝাইয়া গঙ্গাতীরে বাস বুঝাইবে; অর্থাৎ ঘােষ গঙ্গাতীরে বাস করিতেছে, এইরূপ লক্ষণা করিতে হইবে। ইহার নাম জহতী লক্ষণ। তত্ত্বমসি এই বাক্যে প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ এই উভয় পদের লক্ষ্য কেবল চৈতন্যাংশ মাত্র। সুতরাং চৈতন্যাংশে কোন বিরােধ নাই, কেবল প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষের প্রতিপাদক অংশে বিরােধ আছে ; সুতরাং স্বার্থ পরিত্যাগ করিয়া অন্যাথে লক্ষণ স্বীকার করিতে হয় না। এজন্য তত্ত্বমসি বাক্যে জহতী লক্ষণা সঙ্গত হইতেছে না। যদি বল, গঙ্গা শব্দের স্বীয় অর্থ পরিত্যাগ করিয়া যেরূপ লক্ষণ। দ্বারা ‘তীর’ অর্থ গ্রহণ করা হইয়াছে, সেইরূপ লক্ষণাদ্বারা তৎপদের স্বীয় অর্থ পরিত্যাগ করিয়া ত্বং-পদাথে কিম্বা ত্বং-পদের স্বীয় অর্থ পরিত্যাগ করিয়া তৎ-পদার্থে লক্ষিত হউক। না—তাহা হইতে পারে না; কারণ, পূর্বোক্ত “গঙ্গায় ঘােষ বাস করিতেছে”—বাক্যে তীর শব্দের উল্লেখ নাই, সেই না থাকা জন্য তদর্থের অপেক্ষা করিয়া জহতী লক্ষণ সঙ্গত হইয়াছে। কিন্তু তত্ত্বমসি এই বাক্যে তৎ ও ত্বং এই উভয় শব্দের উল্লেখ থাকা জন্য উভয় শব্দের অর্থ স্বয়ংই প্রসিদ্ধ আছে। সুতরাং তাহাতে লক্ষণদ্বারা অন্যতর পদের অন্যতর অর্থ-জ্ঞানের অপেক্ষা সম্ভব হই- তেছে না; তজ্জন্য তত্ত্বমসি-বাক্যে জহতী লক্ষণা অসঙ্গত হইল।

০ বেদান্ত-বিবেক আর অজহতী অর্থ অত্যাগ। অর্থাৎ প্রকৃত অর্থ ত্যাগ না করিয়া যে অন্য-বিষয়ক বৃত্তি গ্রহণ করিতে হয়, তাহার নাম অজহতী লক্ষণ। অজহতী লক্ষণ “রক্তবর্ণ ধাবিত হইতেছে”—এই কথা বলিলে, রক্তবর্ণের ধাবন অসম্ভব, এজন্য রক্ত তাশ্ব গ্রহণ করিতে হয়; অর্থাৎ এস্থলে রক্তবর্ণ অশ্ব ধাবিত হইতেছে বুঝিতে হইবে। রক্তবর্ণ ধাবিত হইতেছে—এই বাক্যে রক্তিম গুণের ধাবনকাৰ্য্য বিরােধ হেতু রক্তিম পদের অর্থ পরিত্যাগ করিয়া লক্ষণা দ্বারা রক্তবর্ণ আশ্বাদিরূপ অর্থ স্বীকার করিয়া অর্থগত বিরােধ নিবারণ করা হইয়াছে। অতএব রক্তবর্ণ ধাবিত হইতেছে— এই বাক্য অজহতী লক্ষণসঙ্গত হইয়াছে। তত্ত্বমসি বাক্যে তৎ ও ত্বং পদের অপ্রত্যক্ষ ও প্রত্যক্ষ চৈতন্যের ঐক্যরূপ বাক্যাথে’ অপ্রত্যক্ষ ও প্রত্যক্ষের প্রতিপাদক অংশের বিরােধ হেতু বিরুদ্ধাংশ পরিত্যাগ না করিয়াও লক্ষণদ্বারা তৎসম্বন্ধীয় যে কোন অর্থ লক্ষিত হই- লেও তাহার বিরোধ পরিহার সম্ভব হয় না। সুতরাং তত্ত্বমসি বাক্যে অজহতী লক্ষণা অসম্ভব হইল। যদি বল, তৎ ও ত্বং-পদার্থের স্ব স্ব বিরুদ্ধ অথাংশ পরিত্যাগ করিয়া অবিরুদ্ধ অথাংশের সহিত তৎ ও ত্বং-পদার্থ লক্ষিত হউক। ,~-ভাগ লক্ষণা স্বীকারও নিষ্প্রয়ােজন। যেহেতু একপদ দ্বারা স্বীয় অবিরুদ্ধ অথাংশ ও অন্য পদদ্বারা অবিরুদ্ধ অন্য অথাংশ, এই উভয় অর্থ লক্ষণায় সম্ভব হয় না =

মহাবাক্য-বিবেক
৮১
এবং অন্য পদদ্বারা যে অর্থবোধ হয়, লক্ষণা দ্বারা পুনৰ্ব্বার
তাহার অন্যরূপ পদাথের জ্ঞান সম্ভব হয় না। সুতরাং
জহত্যজহতী লক্ষণ। স্বীকার করিতে হইবে।
জহত্যজতী অর্থে ত্যাগত্যাগ ; অর্থাৎ বাচ্যা-
থের একদেশ ত্যাগ করিয়া যে আর একদেশ বােধ
করায়, তাহার নাম জহত,জহতী লক্ষ। ইহার
তাৎপৰ্য এই যে, বিরুদ্ধাংশ ত্যাগ এবং অবিরুদ্ধাংশ গ্রহণ
“এই সেই যােগানন্দ”-এই পদমধ্যে
জহত্যজহতী লক্ষ
পদের বিরুদ্ধাংশ একদেশ ত্যাজ্য এবং
অবিরুদ্ধাংশ অপর দেশ অত্যাজ্য। এক্ষণে “এই সেই
যােগানন্দ” বলিলে এই পদের মধ্যে ত্যাজ্য বিরুদ্ধাংশই বা
কি—এবং অত্যাজ্য অবিরুদ্ধাংশই বা কি--তাহা দেখিতে
হইবে। এই সেই যােগান---এই পদের মধ্যে এই’ শব্দ
এবং সেই শব্দ ; এই দুইটী শব্দ পরস্পর বিরােধী। কারণ
‘এই’ শব্দ হইল বৰ্ত্তমান-কালীয়তা জ্ঞাপক এবং সেই শব্দ
হইল অতীত-কালীয়তা জ্ঞাপক ; সুতবাং এই আর সেই শব্দ
পরস্পর বিরােধী। এক্ষণে দেখিতে হইবে যে, বাক্যের
দুইটী শব্দ পরস্পর বিরােধী হইলে অবশিষ্ট একটী “যােগা-
নন্দ” শব্দ অবিরােধী থাকিল। কারণ বৰ্ত্তমান কালের
বােধক যে এই’ শব্দ, তাহার সহিত যােগানন্দ শব্দের কোন
বিরােধ নাই এবং অতীত কালের বােধক যে সেই শব্দ,
তাহার সহিতও যােগানন্দ শব্দের কোন বিরােধ নাই;

২ বেদান্ত-বিবেক সুতরাং যােগানন্দ শব্দটী হইল নির্বিরােধী অর্থাৎ পদের অবিরুদ্ধ অংশ। অতএব বিরুদ্ধাংশ পরিত্যাগ করিলে অবশিষ্ট অবিরুদ্ধ অংশ যােগানন্দ শব্দটী মাত্ৰ থাকিল। এই অবি- রুদ্ধাংশটী গ্রহণ করিবার বিধির নাম জহত্যজহতী লক্ষণ। “এই সেই যােগানন্দ”-এই বাক্যে জহত্যজহতী লক্ষণা সম্ভব হইয়াছে। তত্ত্বমসি বাক্যেও এই লক্ষণ সঙ্গত হইবে। যেরূপ “সেই যােগানন্দই এই”—এই বাক্যে পূর্ব- কালের দৃষ্ট ও বর্তমান কালের দৃষ্ট ব্যক্তির স্বরূপ যে বাচ্যার্থ, তাহার একাংশ বিরােধ হেতু বিরুদ্ধাংশ যে অতীত কাল ও বর্তমান কালে দৃষ্টত্ব, তাহা পরিত্যাগ করিয়া ব্যক্তিরূপ অংশ অবিরুদ্ধ বলিয়া লক্ষ্যাথ সিদ্ধ হয়; অথাৎ তৎকালীয়ত্ব ও এতৎকালীয়দি ধৰ্ম পরিত্যাগ কৰিয়া যােগানন্দের দেহ- মাত্র বােধ করায় ; তত্ত্বমসি বাক্যেও সেইরূপ অপ্রত্যক্ষ ও প্রত্যক্ষ চৈতন্যের ঐক্যরূপ যে বাচ্যার্থ, তাহার একাংশে বিরােধ হেতু বিরুদ্ধ অংশ যে অপ্রত্যক্ষ ও প্রত্যক্ষত্ব, তাহা পরিত্যাগ করিয়া অবিরুদ্ধ অখণ্ড চৈতন্যাংশ মাত্র লক্ষ্যার্থ সিদ্ধ হয়। প্রত্যক্ষাদি জীবধৰ্ম্ম সকল ত্বং পদ হইতে পরিত্যাগ করিলে এবং তৎ পদ হইতে সৰ্ব্বজ্ঞত্ব ও পরােক্ষাদি ধৰ্ম্মসকল পরিত্যাগ করিলে কেবল শুদ্ধ কূটস্থ পরম বস্তুমাত্র অবশিষ্ট থাকে। সেই অবশিষ্ট পরম বস্তুর লক্ষ্যাথ ব্ৰহ্ম, সুতরাং তৎ ও ত্বং পদদ্বয়ের অত্যন্ত ঐক্যজন্য তৎ++অসি= মহাবাক্য-বিবেক তত্ত্বমসি পদ সিদ্ধ হয়, অর্থাৎ তৎ-ই তুমি এবং তুমি-ই তৎ অথাৎ তুমিই ব্ৰহ্ম বলিয়া প্রতিপন্ন হইবে । কেহ কেহ তত্ত্বমসি মহাবাক্যটীর কর্মধারয় সমাসের পরিবর্তে ষষ্ঠীতৎপুরুষ সমাস করিয়া বাচ্যার্থ সমর্থন করেন। তাহারা বলেন, তস্য++ অসি=তত্ত্বমসি—ষষ্ঠীতৎ- পুরুষ সমাসে বিভক্তির ললাপ হইয়া তস্য শব্দ তৎ হইয়াছে। একটী শব্দকে ব্যাকরণের কল্যাণে নানাবিধ অর্থে পরিণত করা যাইতে পারে বটে, কিন্তু তাহাই কি প্রকৃত জ্ঞান ? শ্রুতি “একমেবাদ্বিতীয়” অথাৎ ব্ৰহ্ম এক এবং অদ্বিতীয় বলিয়াছেন, সুতরাং বাচ্যাথের উপযােগিতা নাই। বাচ্য অর্থদ্বয়ের অভিন্নত্ব-বিবক্ষা হইলে কিরূপে বিরােধ প্রতীত হয়, দেখা যাউক। তত্ত্বমসি এই বাক্যে তৎ-পদার্থ পরােক্ষত্বাদি-যুক্ত চৈতন্যকে বুঝায়, এবং ত্বং-পদার্থ অপরােক্ষ- ত্বাদি-যুক্ত চৈতন্যকে বুঝায়। তৎ ও ত্বং এই দুইটা পদার্থ যদি পরস্পরের ভেদের ব্যবৰ্ত্তক হইয়া বাচ্যার্থ-বিরােধ খণ্ডন বিশেষ্য-বিশেষণ-ভাব, সম্বন্ধবিশেষ কিম্বা অন্য বাক্যাথ হয়, তাহা হইলে প্রত্যক্ষ প্রভৃতির সহিত বিবােধ ঘটে; সুতরাং বাচ্যার্থ সঙ্গত হয় না। সৰ্বেশ্বরত্ব, স্বতন্ত্রত্ব, সর্বজ্ঞত্ব প্রভৃতি গুণসমূহের দ্বারা সকলের উৎকৃষ্ট সত্যকাম, সত্যসঙ্কল্প পরমেশ্বর তৎ-পদের বাচ্যার্থ ; আর অল্পজ্ঞ, দুঃখে জীবনযাত্রা নিৰ্বাহকারী, সংসারাশ্রয়যুক্ত, প্রকৃতরূপ এই সংসারী জীব তৎ-পদের বাচ্যার্থ। ঈশ্বর এবং ৮৪ বেদান্ত-বিবেক AAM জীব এই দুইটা বিরুদ্ধ পদার্থের একত্ব কিরূপে সম্ভব হয় ? কারণ প্রত্যক্ষ প্রমাণ দ্বারা উভয়ের এই বিবােধ উপলব্ধ হইতেছে। বিরুদ্ধ-ধৰ্ম্ম-সমন্বিত বলিয়া অগ্নি ও হিমের ন্যায় জীব ও ঈশ্বর পরস্পর বিলক্ষণ-স্বভাব-বিশিষ্ট; শব্দার্থ দ্বারাও প্রত্যক্ষাদি প্রমাণের সহিত বিরােধ ঘটে; যদি তাহাদের উভয়ের ঐক্য পরিত্যক্ত হয়, তাহা হইলে তিবচন সমূহের সহিত এবং স্মৃতিবচন সমূহের সহিত অত্যন্ত বিরােধ হয়। আবার তত্ত্বমসি বাক্যার্থ যদি বিশিষ্ট বা সম্বন্ধবিশেষ হয়, তাহা হইলেও যথার্থ বাক্যাথ হয় না, কারণ তাহাও শ্রুতির অভিমত নহে। অখণ্ড একরসত্ব—অখণ্ড একরূপ বস্তুই শ্রুতি-সম্মত বাক্যার্থ। শ্রুতি পুনঃ পুনঃ স্কুল ও সূক্ষ্ম প্রপঞ্চের ব্রহ্মস্বরূপত্ব দেখাইয়া সুষুপ্তিকালে ব্রহ্মের সহিত আত্মার অভিন্নত্ব উৎপাদন করতঃ ব্রহ্মের একত্ব প্রদর্শনের অভিপ্রায়ে এই সমস্ত দৃশ্যমান পদার্থ আত্মাতিরিক্ত নহে— ইহা বলিয়া ব্রহ্মের অদ্বিতীয়ত্ব সিদ্ধির নিমিত্ত ব্ৰহ্ম এবং আত্মার অভিন্নত্ব প্রতিপাদন করিয়াছেন। জগৎ কিম্বা জীব বিদ্যমান থাকিলে ব্রহ্মের অদ্বিতীয়ত্ব কিরূপে সিদ্ধ হইবে ? অতএব জীব ও ব্রহ্মের অখণ্ডত্ব এবং ঐক্য সর্বথা অবিরুদ্ধ। সুতরাং তৎ ও ত্বং-পদের বাচ্যার্থ স্বীকার সঙ্গত নহে। যেখানে বাচ্যার্থ উপপন্ন হয় না, তথায় লক্ষণ। স্বীকার করিতে হইবে। অতএব বাক্যাথ সিদ্ধির নিমিত্ত লক্ষণা স্বীকার করিয়া তত্ত্বমসি স্থলে তৎ পদের অর্থ পরােক্ষ-বিশিষ্ট-চৈতন্য এবং

কারণ
•
মহাবাক্যবিবেক
ত্বং-পদের অর্থ অপরােক্ষত্ব-বিশিষ্ট চৈতন্য ; কিন্তু পরােক্ষ
ও অপরােক্ষত্ব প্রভৃতি বিরুদ্ধ ভাব পরিত্যাগ করিলে প্রত্যক্ষ
প্রভৃতি প্রমাণের বাধ হয় না,-অবিরুদ্ধ চৈতন্যাংশ গ্রহণ
করিলে শ্রুতিবিরােধও ঘটে না।
তবে আপত্তি হইতে পারে যে, সর্বত্র একটী পদে
লক্ষণা হইয়া থাকে । কিন্তু তত্ত্বমসি বাক্যে তৎ ও ত্বং-পদে
অন্যান্য আপত্তির
লক্ষণা করিবার প্রয়ােজন কি ? কেবল
মাত্র ভৎ-পদে লক্ষণ। করিয়া, তৎপদের
প্রতিপাদ্য অথের বিরুদ্ধাংশ পরিত্যাগ করিয়া তাহার অবি-
রুদ্ধ-ভাবযুক্ত তৎ-পদের অর্থকে লক্ষিত করিবে; অথবা ত্বং-
পদে লক্ষণা করিয়া ত্বং-পদ-প্রতিপাদ্য অথের বিরুদ্ধাংশ
পরিত্যাগ করিয়া তাহার অবিরুদ্ধ-ভাগযুক্ত তুং-পদ-প্রতিপাদ্য
অর্থকে লক্ষণা দ্বারা বুঝাইবে। এইরূপ একটি মাত্র পদে
লক্ষণা করিলে যখন চলিতে পারে, তখন দুইটী পদে লক্ষণা
করার প্রয়ােজন কি ? বিশেষতঃ সৰ্ব্বত্র একটী পদে লক্ষণা
পরিদৃষ্ট হয়। তাহার উত্তরে বলা যাইতে পারে—একটী
মাত্র পদ নিজের অংশ এবং অন্য পদার্থের অংশকে কিরূপে
লক্ষিত করিবে ? একটী পদ দ্বারা পদার্থ-জ্ঞান হইলে লক্ষণা
ব্যতীতও অথ-প্রতীতি হইতে পারে ; সুতরাং লক্ষণারও
প্রয়ােজন থাকে না। অতএব দুইটী পদের অংশ ত্যাগ করিয়া
একমাত্র চৈতন্যকে বুঝাইবার জন্য দুইটী পদে লক্ষণ। স্বীকার
করা হইয়াছে। “সেই এই যােগানন্দ”—এই বাক্য কিম্বা

বেদান্ত-বিবেক বাক্যার্থ যােগানন্দের একত্বরূপ স্বকীয় বাক্যার্থের অপ্রকাশক দেশ-কালাদি বৈশিষ্ট্যরূপ বিরুদ্ধাংশ ত্যাগ করিয়া লক্ষণা দ্বারা যেরূপ অবিরােধী যােগানন্দ ব্যক্তিমাত্ৰকে লক্ষিত করে, সেইরূপ তত্ত্বমসি স্থলে বাক্য কিম্বা বাক্যাথ পরােক্ষ-বিশিষ্ট চৈতন্য এবং অপরােক্ষত্ব-বিশিষ্ট চৈতন্য—এই উভয়ের উপ- স্থিত বিরুদ্ধ ভাগ একত্বরূপ বাক্যাথ এবং পরােক্ষত্ব, অপরােক্ষত্ব, সর্বজ্ঞ, অল্পজ্ঞত্ব, বুদ্ধি হইতে স্থূলভূত পৰ্যন্ত অবিদ্যাকল্পিত অনাত্ম বস্তু পরিত্যাগ করিয়া অবিরুদ্ধ শুদ্ধ চৈতন্যরূপ কেবল সৎস্বরূপ, নির্বিকল্প, নিরঞ্জন ব্ৰহ্মকে লক্ষণ দ্বারা সম্যক্‌রূপে লক্ষিত করিয়া থাকে। আবার যেমন “সেই এই যােগানন্দ”—এই বাক্যে ‘সেই’ শব্দের অর্থ পূৰ্ব্বকালে দৃষ্ট যােগানন্দ এবং এই’ শব্দের অর্থ বর্তমান কালে দৃশ্যমান মােগানন্দ। তাহাতে বিরুদ্ধ যে পূৰ্বকাল ও এতৎকাল বিশিষ্ট অংশ, তাহা পরিত্যাগ করিয়া লক্ষণা দ্বারা যেমন কেবল যােগানন্দ মাত্র বুঝায়, সেইরূপ তৎ-শব্দের অর্থ মায়া-উপাধি বিশিষ্ট ঈশ্বর এবং ত্বং-শব্দের অর্থ অবিদ্যা- উপাধি বিশিষ্ট জীব, সেই উভয়ের বিরুদ্ধাংশ যে মায়া ও অবিদ্যা—তাহা পরিত্যাগ করিলে অপরিচ্ছিন্ন, নিত্য, জ্ঞানা- নন্দ-স্বরূপ পরব্রহ্মই লক্ষিত হয়েন। সুতরাং তৎ ও ত্বং—এই পদদ্বয়ের অধ্যারােপিত উপাধি সকলের অপবাদ ন্যায়ে খণ্ডন করিয়া সমানাধিকরণ, বিশেষ্য-বিশেষণ-ভাব ও লক্ষ্য-লক্ষণ, এই সম্বন্ধয় দ্বারা তত্ত্বমসি বাক্যের ঐক প্রদর্শিত হইল।

মহাবাক্য-বিবেক
৮৭
অতএব তৎ-পদের অর্থ পরমাত্মা ও ত্বং-পদের
অথ জীবাত্মা। এই তৎ ও ত্বং পদের যে ঐক্য অর্থাৎ
পরমাত্মার সহিত জীবাত্মার যে ঐক্য, তাহাই অসি-পদের
দ্বারা সাধিত হয়। সর্বজ্ঞ পরমাত্মার সহিত অল্পজ্ঞ জীবাত্মার
ঐক্য কি প্রকারে সম্ভব হয়,—তজ্জন্য বলা হইয়াছে যে, তৎ
ও ত্বং-পদার্থ-স্বরূপ ঈশ্বর ও জীবের
অসি-শব্দের সার্থকতা
পরােক্ষত্ব, সর্বজ্ঞাদি ও অপরােক্ষ
অল্পজ্ঞাদি যে বিরুদ্ধাংশ সকল তাহা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক ত্বং-
পদটী শশাধন করিয়া লক্ষণ দ্বারা লক্ষিত ঈশ্বর ও জীবের
অবিরুদ্ধাংশরূপ চিৎপদার্থ মাত্রকে গ্রহণ করিলে ব্ৰহ্মচৈতন্য
এবং জীবচৈতন্য মধ্যে কেবল এক চৈতন্য মাত্রই অবশিষ্ট
থাকেন; সুতরাং চৈতন্য পক্ষে ঐক্য সম্ভব হয়। কিন্তু
ঐক্য শব্দে ইহা বিবেচনা করা কর্তব্য নয় যে, দুই বস্তুর
পরস্পর সংযােগ দ্বারা ঐক্য করা। তবে কি? না-ঐক্য
অথাৎ একতাভাব,—ইহা একই, এরূপ জ্ঞাত হওয়া। যে
বস্তু পূর্বে ছিল এবং এক্ষণে যে বস্তু রহিয়াছে-এ সেই
বস্তুই। সেই বস্তু এক এবং এই বস্তু দ্বিতীয়—এরূপ ভাব
নহে। কেবল সেই বস্তুই ভ্রমবশতঃ অন্য বস্তু বলিয়া কল্পিত
হইতেছে মাত্র, সুতরাং এরূপ স্থলে দুইটা বস্তু স্বীকাৰ্য নহে।
এই স্থলের ঐক্যজ্ঞান দুই বস্তুর একতা বুঝাইতেছে না,
কেবল স্মরণ করাইয়া দিতেছে যে, পূর্বে তুমি যে ছিলে,
সেই তুমিই এই হইয়াছ। অতএব অসি-শব্দ দ্বারা তৎ ও

অতএব বেদান্ত-বিবেক ত্বং—এই দুইটী পদের একরূপতা সাধিত হইয়াছে, দুইটা বস্তুর মিলন প্রদর্শিত হয় নাই। তত্ত্বমসি বাক্যের বিচার দ্বারা যাহার “সেই ব্ৰহ্মই আমি”—এইরূপ ঐক্যজ্ঞানে প্রতীতি বা দৃঢ় প্রত্যয় জন্মি- য়াছে, তিনি সমস্ত সংসার-দুঃখ হইতে উত্তীর্ণ হন। তাই শ্রুতি বলিয়াছেন যে,-“শােকং তরতি চাত্মবিৎ” অর্থাৎ আত্মজ্ঞানী ব্যক্তির কোনরূপ শােক থাকে না। তত্ত্বমসি বাক্যের প্রত্যক্ষজ্ঞান দ্বারা সাধুগণের সচ্চিদানন্দ অখণ্ড একরস-স্বরূপ মােক্ষ অবস্থা প্রাপ্তি ঘটে। ঘটে। যে পর্যন্ত তৎ-পদ ও হৃং-পদের অর্থ সম্যক্‌রূপে মহাবাক্যের বিচারের ফল নিরূপণ বিচার করা না যায়, ততকাল মানব- গণের মরণ এবং সংসারে আগমনরূপ বন্ধন অব্যাহত থাকিয়া যায়। অতএব মুক্তিকাম পুরুষের সংসার-বন্ধন হইতে মুক্তি লাভের জন্য : তত্ত্বমসি বাক্যের অর্থ বিচার করা একান্ত কর্তব্য। তত্ত্বমসি মহাবাক্যটী দ্বারা এক পরিশুদ্ধ আত্মাকেই প্রতিপন্ন করিয়াছেন। তৎ ও ইং-পদের লক্ষণা দ্বারা লক্ষিত সমস্ত উপাধিরহিত, সচ্চিদানন্দ-স্বরূপ, অদ্বিতীয়, বিশেষশূন্য, আভাস-রহিত, তৎশব্দ বা ইদংশব্দের অবাচ্য, নির্দেশের অযােগ্য, আদি ও বিনাশরহিত, ব্যাপক, শান্ত, কূটস্থ, তর্কের অবিষয়, জ্ঞানের অগােচর নিগুণ ব্রহ্মই অবশিষ্ট থাকেন। সুতরাং জীব ও ঈশ্বরের একতাজ্ঞান দ্বারা উপাধি বিলয়- প্রাপ্ত হইলে, উভয়ের কোনরূপ ভেদ থাকে না। জীব ও মহাবাক্য-বিবেক ঈশ্বরে উপাধি-বৈশিষ্ট্য, সেই সেই ধর্মভাগি, বিলক্ষণত্ব- এই সমস্ত জ্ঞানের দ্বারা কল্পিত, সুতরাং স্বপ্নদৃষ্ট পদার্থের ন্যায় এই সমস্তই বাধিত হয় বলিয়া জাগ্ৰৎ কালে তাহা মিথ্যা। দৃষ্ট-দর্শনপ্রমুখ ভ্রান্তিজনিত বিকল্পসমূহের দ্বারা কোথায়ও স্বপ্ন ও জাগরণের বিশেষ পরিলক্ষিত হয় না। অতএব স্বপ্নের ন্যায় জাগরণও মিথ্যা। স্বপ্ন ও জাগ- রণ—এই উভয় অবস্থাই অবিদ্যার কাৰ্য্য বলিয়া তুল্য। সেইরূপ স্বপ্ন ও জাগরণে দৃষ্ট, দর্শন ও দৃশ্য প্রভৃতি কল্পনাও মিথ্যা। সকল লােক সুষুপ্তিকালে স্বপ্ন ও জাগরণের অভাব অনুভব করিয়া থাকে, উভয়ের কিঞ্চিত্র বিশেষ নাই; অতএব উভয়ই মিথ্যা। অতএব সদা অদ্বিতীয়, বিকল্প- রহিত, উপাধিশূন্য, শুদ্ধ, সৰ্ব্বদা আনন্দমূর্তি, নিশ্চেষ্ট, স্বপ্রতিষ্ঠ এবং কেবলমাত্র একই ব্ৰহ্ম ; তাহাতে কোন রূপ ভেদ নাই, সুখ-দুঃখাদি গুণের প্রতীতি হয় না। বাক্য কিম্বা মনের ব্যাপার যাহাতে নাই, তাহা কেবল, অতীব শান্ত, বিভু এবং সকলের পূৰ্বে বিদ্যমান এবম্বিধ অদ্বিতীয় আনন্দ-রূপতাই অবভাসমান হয়। এই জরা-মরণবিরহিত সৎ, চিৎ ও আনন্দ-স্বরূপ পরম সত্যবস্তুই তত্ত্বমসি বাক্যের যথার্থ লক্ষ্য। সুতরাং ত্বং অর্থাৎ তুমি শরীর, প্রাণ, ইন্দ্রিয়বর্গ, মন, বুদ্ধি কিম্বা অহঙ্কার নহ; অথবা এই দেহ, প্রাণ, ইন্দ্রিয় প্রভৃতির সমষ্টিও তুমি নহ; এই সমস্ত বস্তুর নির্মল প্রকাশ সাক্ষি-স্বরূপ সেই ব্ৰহ্মই তুমি। কর্মসূত্রে এই যে দেহ ;

; •• বেদান্ত-বিবেক উৎপন্ন হইয়াছে, তাহা আবার কৰ্ম্মেই বর্ধিত এবং নাশপ্রাপ্ত হয়; যাহা সুষুপ্তি সময় পর্যন্ত স্বপ্রকাশ সমস্ত পদার্থ-স্বরূপ, ‘আমি—আমি এইরূপ একভাবে নিত্য অবভাসমান থাকে, বুদ্ধি ও সমস্ত বিকার হইতে অবিকারী জ্ঞাতা কেবল জ্ঞান- স্বরূপ সেই ব্ৰহ্মই তুমি। যিনি নিত্যজ্ঞান-স্বরূপ আত্মাতে কল্পিত আকাশ প্রভৃতি সমস্ত জগতের অস্তিত্ব প্রদান করেন এবং যিনি স্বকীয় তেজ দ্বারা প্রকাশ বিস্তার করেন, কেবল জ্ঞানস্বরূপ সেই সাক্ষাৎ ব্রহ্মই তুমি ; ভ্রান্তিবশতঃ তােমাতে এই শরীর, দেহ ও আত্মার সংযােগ, দেহধৰ্ম্মস্থূলত্ব, কৃশত্ব প্রভৃতি আরােপিত হইয়াছে, বস্তুতঃ এ সমস্ত কিছুই নহে; তুমি জন্মরহিত পরিপূর্ণ-স্বভাব সেই ব্ৰহ্ম। স্বকীয় ভান্ত জ্ঞান দ্বারা যে যে বস্তু পরিদৃষ্ট হয়, সেই সমুদয় বস্তুর সম্যক্‌রূপে স্বরূপ অবগত হইলে জানিতে পারিবে, সে সমস্ত তুমি ব্যতীত আর কিছুই নহে। অতএব তুমি অভয়, নিত্য, কেবল সুখস্বরূপ, পূর্ণ, নিৰ্বাপার, শান্ত, সর্বদা দ্বৈতরহিত ব্ৰহ্মরূপেই অবস্থিত। তুমি জ্ঞাতা, জ্ঞান ও জ্ঞেয় হইতে পৃথক্‌, জ্ঞাতার সহিত অভিন্ন অখণ্ড জ্ঞানম্বরূপ, জ্ঞেয়ত্ব ও অজ্ঞেয়ত্ব বিরহিত, শুদ্ধ, বুদ্ধ তুমিই তত্ত্বমসি অর্থাৎ সেই ব্ৰহ্ম । অন্তঃকরণ বিষয়ে জ্ঞানবত্ব প্রভৃতি বিবিধ বিকল্প দ্বারা অস্পৃষ্ট, যাহা কেবল জ্ঞানস্বরূপ, সৎ-স্বভাব, তুল্যরূপ, অদ্বিতীয়, শুদ্ধ, বুদ্ধ তুমিই তত্ত্বমসি অর্থাৎ সেই ব্ৰহ্ম। যিনি সর্বপদার্থে বিদ্যমান, মহাবাক্য-বিবেক সৰ্বাত্মক, সৰ্ব্ব পদার্থ হইতে পৃথক্‌, সমস্ত নিষেধের অবধি- ভূত, সত্যস্বরূপ, ব্যাপক, নিত্য, অদ্বিতীয়, শুদ্ধ, বুদ্ধ তুমিই তত্ত্বমসি অর্থাৎ সেই ব্ৰহ্ম। নিত্য সুখস্বরূপ, অখণ্ড, একরূপ, নিরংশ, নিস্ক্রিয়, বিকারশূন্য, আত্মা হইতে অভিন্ন, অতীব দুরবগাহ, অদ্বিতীয়, শুদ্ধ, বুদ্ধ তুমিই তত্ত্বমসি অথাৎ সেই ব্ৰহ্ম। যাহাতে যাবতীয় বিশেষ অস্তমিত হইয়াছে, যিনি আকাশের ন্যায় ভিতরে ও বাহিরে পরিপূর্ণ, আনন্দ ও জ্ঞান- স্বরূপ, স্বচ্ছ, অদ্বিতীয়, শুদ্ধ, বুদ্ধ তুমিই তত্ত্বমসি অর্থাৎ সেই বহ্ম। আমি ব্ৰহ্মই অর্থাৎ ব্ৰহ্ম ব্যতিরিক্ত অপর কিছুই নাই, আমি সত্ত্বাদি গুণবিহীন নির্বিকল্প কেবল সুখস্বরূপ- এইরূপ অখণ্ড চিত্তবৃত্তি দ্বারা তুমি নিস্ক্রিয় ব্রহ্মে অবস্থান কর এবং আত্মার সহিত অভিন্ন পরব্রহ্মে সতত রত হও। আমিই “তত্ত্বমসি” এই মহাবাক্যের প্রতিপাদ্য ব্ৰহ্ম । অধ্যারােপ ও অপবাদ ন্যায় অবলম্বনকারী সদ্গুরু কর্তৃক তত্ত্বমসি বাক্যের অর্থ জ্ঞাত হইলে, তৎক্ষণাৎ নিৰ্মলান্তঃকরণ সেই পুরুষের নিত্য সুখস্বরূপ, অদ্বিতীয়, উপমারহিত, নিৰ্ম্মল, উৎকৃষ্ট, এক বস্তু—সেই ব্ৰহ্মই আমি এবম্বিধ পরম অখণ্ডা- কার চিত্তবৃত্তি সমুদিত হয় সেই চৈতন্যস্ফুরণযুক্ত অখণ্ডা- কার চিত্তবৃত্তি, আত্মা হইতে অপৃথক্ পরব্রহ্মকে অবলম্বন করিয়া বিদ্যমান থাকে অখণ্ডাকার মহাবাক্যের সাধকের চিত্তবৃত্তি দ্বারা অজ্ঞান বাধিত হইলে অন্তঃকরণস্থ আবরণরূপ যে অজ্ঞান, সে-ও বাধিত হয়। যেমন অবস্থা বেদান্ত-বিবেক A Ans সূত্র দগ্ধ হইলে সূত্রের কাৰ্য্য পটও দগ্ধ হয়, সেইরূপ অজ্ঞান নষ্ট হইলে, তাহার সহিত যাবতীয় অজ্ঞানের কাৰ্য্য নাশপ্রাপ্ত হয়। সুতরাং সে অবস্থায় বেদাদি শাস্ত্রের বিধি-নিষেধ দ্বার। আর বন্ধন সম্ভব হয় না। জীবের যতদিন প্রমাণ দ্বারা দেহের আত্মভ্রম না নিবৃত্তি হয়, ততদিনই বর্ণধৰ্ম্ম, আশ্রম, আচার প্রভৃতি কৰ্মশান্ত্রের প্রামাণ্য প্রতীতি হয়। যাহার “আমি দেহ নহি”—এইরূপ জ্ঞান জন্মিয়াছে, তাহার কোনরূপ কৰ্ম্মেই কর্তৃত্ব নাই। তাহার নিকট সমুদয় শাস্ত্রই স্থির ও নিশ্চেষ্ট হয়। তাঁহার পক্ষে কিছুই ভেদাভেদ নাই। তাহার পাপ-পুণ্য বিশীর্ণ হইয়া যায়, ধর্মাধর্ম ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, সংসার এবং বৃত্তি অর্থাৎ মনঃ-ইন্দ্রিয়াদির ধর্মসমুদয় বিনষ্ট হইয়া যায়, তখন তিনি কেবল শব্দাতীত ও গুণত্রয়শূন্য হইয়া বিচরণ করিতে থাকেন। তখন তিনি সাধারণ মনুষ্যমণ্ডলী হইতে অনেক উচ্চ স্থানে অবস্থিতি করেন। যে স্থানে বাস করেন, তথায় লােগ নাই, শােক নাই, ভয় নাই, জরা মৃত্যু, দুঃখ-দারিদ্র্য এ সকল কিছুই নাই। তিনি পৃথিবীতে থাকি- লেও ব্রহ্মলােকবাসী, রুগ্ন হইলেও বলবান্ ও সুস্থ, দরিদ্র অবস্থাতেও তিনি মহৈশ্বৰ্য্যবান্ এবং ভিখারী অবস্থাতেও রাজচক্রবর্তী। তিনিই সাধু-পুরুষ এবং ধন্যজন্ম। স্বর্গ, মৰ্ত্ত, পাতালে তাহা হইতে পূজনীয় আর কেহ নাই। বস্তুতঃ অজ্ঞান মনুষ্যগণ তখন তাহার মহত্ত্ব অনুভব করিতে পারুক আর নাই পারুক, স্বৰ্গস্থ দেবতাগণের নিকট তিনি সে অবস্থায় মহাবাক্যবিবেক - " সৰ্ব্বদা পূজিত হইয়া থাকেন। তিনি পূজিত হইয়াও প্রীত হন না, নিন্দিত হইয়াও কুপিত হন না, মৃত্যু আসন্ন দেখিয়াও উদ্বিগ্ন হন না এবং দীর্ঘজীবনেও আনন্দ প্রকাশ করেন না। তিনি তিরস্কৃত হইলেও রুক্ষবাক্য প্রয়ােগ করেন না, অতিমাত্র প্রশংসিত হইলেও প্রিয়বাক্য বলেন না। যিনি আহত হই- লেও ধৈৰ্যনিবন্ধন প্রতিঘাত করেন না এবং হন্তার যাহাতে অমঙ্গল হয়,–এরূপ ইচ্ছাও করেন না, এরূপ ব্যক্তির দয়া ব্ৰহ্মাদি দেবতারাও আকাঙক্ষা করিয়া থাকেন । যথা :- , বিচারেণ পরিজ্ঞাতবস্ফোদিতাত্মনঃ। অনুকম্প্যা ভবন্তীহ ব্ৰহ্মা-বিষ্ণি-শঙ্করাঃ। ও হরিঃ ও সমাপ্ত ওঁ ব্রহ্মাপণমস্ত পরিশিষ্ট পারিভাষিক শব্দের অর্থ অন্বয় ও ব্যতিরেক-তৎ সত্ত্ব তৎ সত্তা অর্থাৎ তাহা থাকিলে তাহা থাকা, ইহার নাম অন্বয় এবং তদসত্ত্বে তদসত্তা অর্থাৎ তাহা না থাকিলে তাহা না থাকা, ইহার নাম ব্যতিরেক। চিত্ত থাকিলেই সুখ-দুঃখের অনুভূতি হয়, ইহাই অন্বয়ের উদাহরণ এবং চিত্ত না থাকিলে সুখ-দুঃখের অনুভূতি হয় না, ইহাই ব্যতিরেকের উদাহরণ। আবরণ ও বিক্ষেপ-শক্তি-মায়ার দুই প্রকার শক্তি। যে শক্তিদ্বারা বস্তুর স্বরূপ তিরােহিত হয়, তাহা আবরণ-শক্তি, আর যে শক্তিদ্বারা এক বস্তুতে অন্য বস্তুর প্রতীতি হয়, তাহাই বিক্ষেপ শক্তি। রঞ্জুতে সর্পভ্রম স্থলে আবরণ-শক্তি রঞ্জুর স্বরূপ তিরােহিত করিয়া দেয়, এবং বিক্ষেপশক্তি তাহাতে সর্পভ্রম জন্মায়। ইহামূত্রার্থফলভােগবিরাগ-ঐহিক বিষয়-সুখ বা মৃত্যুর পর স্বৰ্গভােগ, এই উভয় প্রকার সুখ-ভােগেই বিন্দুমাত্র আস্থা বা ইচ্ছা থাকার নাম ইহামূত্ৰাৰ্থলভােগবিরাগ। ত্রিবিধ সংঘাতশুদ্ধি-সংঘাত = শরীর, ত্রিবিধ সংঘাত স্কুল, সূক্ষ্ম ও কারণ এই ত্রিবিধ শরীর। এই শরীরত্রয়ের শুদ্ধি সম্পাদনই বিবিধ সংঘাত শুদ্ধি।

পারিভাষিক শব্দের অর্থ প্রত্যভিজ্ঞ-অতীত কালের অনুভবের সংস্কারসহ বর্তমানের অনুভব। যেমন “কাল যে ঘটটা দেখিয়াছিলাম, এই তাে সেই।” শেষের টুকু প্রত্যভিজ্ঞা-প্রত্যক্ষ, পূর্বের টুকু সংস্কার। প্রমাণ-বিপৰ্যয়াদি বৃত্তি-প্রমাণ, বিপৰ্যয়, বিকল্প, নিদ্রা ও স্মৃতি, চিত্তবৃত্তির এই পাঁচটী বিভাগ। চিত্তের বিষয়সম্পর্কে যে বিষয়াকার প্রাপ্তি, অর্থাৎ বিষয়-সম্বন্ধে চিভের যে অবস্থা বা পরিণাম বা পরিবর্তন, তাহার নাম বৃত্তি। এই পঞ্চবিধ বৃত্তির মধ্যে প্রমিতি বা প্ৰমার করণের নাম প্রমাণ, যে বস্তু যে রূপ, তাহাকে সেইরূপ না জানিয়া অন্যরূপে জানার নাম বিপর্যয়, আকাশ-কুসুম প্রভৃতি যে বস্তু নাই বা অলীক, অথচ আকাশ-কুসুম প্রভৃতি শব্দ শ্রবণে সেই শব্দার্থের যে এক প্রকার জ্ঞান হয়, তাহার নাম বিকল্প, চিত্তের যে অবস্থায় জাগ্রবৃত্তি ও স্বপ্নবৃত্তি থাকে না, তমােবিষয়া বা অজ্ঞানাব- লম্বিনী সেই বৃত্তির নাম নিদ্রা, এবং অনুভূত বা জ্ঞাত বিষয়ের যে অপহরণ অর্থাৎ অলােপ তাহার নাম স্মৃতি। প্রমাতা, প্রমেয়, প্রমিতি-(১) প্রমাতা-প্রমাণকারী বা জ্ঞাতা, (২) প্রমেয় = প্রমাণের বিষয় বা জ্ঞেয়, (৩) প্রমিতি = প্রমা বা যথার্থ জ্ঞান। বাচ্যার্থ—শব্দের শক্তিয়ের মধ্যে (অভিধা, লক্ষণ ও ব্যঞ্জনা) অন্যতম বা প্রথম শক্তি অভিধা। এই অভিধা বৃত্তিদ্বারা যে অর্থ প্রতীতি বিষয় হয়, তাহাকে বাচ্যার্থ বলে। এই শব্দ-শক্তিদ্বারা শব্দের মুখ্যার্থের জ্ঞান হয়। ফলতঃ শব্দ শ্রবণ মাত্রই যে অর্থ প্রতি- ভাত হয়, তাহাই শব্দের বাচ্যার্থ বা মুখ্যার্থ। লক্ষ্যার্থ-লক্ষণা-বৃত্তি দ্বারা যে অর্থ প্রতীতিবিষয় হয়, তাহাকে লক্ষ্যার্থ বলে। মুখ্যার্থের বাধা ঘটিলে যে শব্দ-শক্তিদ্বারা গ, পরিশিষ্ট ; । । তৎসংসৃষ্ট অন্য অর্থের বােধ হয়, তাহার নাম লক্ষণ। লক্ষণার প্রকারভেদ ও দৃষ্টান্ত সহ বিস্তৃত বিবরণ মূল গ্রন্থেই দ্রষ্টব্য। শম-দমাদি ষটক সম্পত্তি-শম, দম, উপরতি, তিতিক্ষা, শ্রদ্ধা ও সমাধান ইহারা ষটসম্পত্তি। তন্মধ্যে অন্তরিন্দ্রিয় মনাে- নিগ্রহের নাম শম, অথবা ঈশ্বরনিষ্ঠ যে বুদ্ধি তাহারও নাম শম; চক্ষু প্রভৃতি বাহ ইন্দ্রিয়গণের দমনের নাম দম; বিহিত কৰ্ম্মসকলের সন্ন্যাসবিধান দ্বারা যে পরিত্যাগ, তাহার নাম উপবৃতি, কিম্বা শব্দাদি বিষয় শ্রবণাদিতে বর্তমান মনের প্রত্যাহার পূর্বক ব্ৰহ্মবিষয় শ্রবণা- দিতে যে বৰ্ত্তন, তাহার নাম উপরতি; যাহাতে শরীর বিচ্ছেদ না ঘটে, অর্থাৎ যাহাতে মৃত্যু না হয়, এভাবে যে শীতােষ্ণ সুখ-দুঃখাদি পরস্পর বিপরীত, বিষয়সকল সহ্য করা, তাহার নাম তিতিক্ষা; গুরু ও বেদান্ত বাক্যে বিশ্বাস করার নাম শ্রদ্ধা; এবং পরমেশ্বরে যে চিত্তৈকাগ্রতা, তাহার নাম সমাধান। শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন—(১) উপক্রমােপসংহার, (২) অভ্যাস, (৩) অপূৰ্ব্বতা, (৪) ফল, (৫) অর্থবাদ ও (৬) উপপত্তি এই ছয় প্রকার লিঙ্গ দ্বারা অদ্বিতীয় ব্ৰহ্মে সমস্ত বেদান্তের তাৎপর্য অবধারণের নাম শ্রবণ, বেদান্তের অবিবােধ যুক্তি দ্বারা সর্বদা ত অদ্বিতীয় ব্ৰহ্মবস্তুর চিন্তনের নাম মনন, এবং তত্ত্বজ্ঞান বিরােধী দেহাদি জড় পদার্থের জ্ঞান পরিহার পূর্বক অদ্বিতীয় ব্ৰহ্মবস্তুর যে অবিরােধী জ্ঞানপ্রবাহ, তাহার নাম নিদিধ্যাসন। * প্রতিপাদ্য বস্তুর আদিতে ও অন্তে সেই বস্তুর প্রতিপাদন করার নাম উপক্রমােপসংহার ; যে প্রকরণে যে বস্তু প্রতিপাদ্য, সেই প্রকরণের মধ্যে সেই বস্তুর পুনঃ পুনঃ প্রতিপাদনের নাম অভ্যাস ; প্রতিপাদ্য বস্তুর প্রমাণাতিরিক্ত প্রমাণের অবিষয় রূপে সেই বস্তুর প্রতিপাদন করার নাম অপূৰ্ব্বতা; প্রতিপাদ্য বস্তুর প্রয়ােজন শ্রবণের নাম ফল ; প্রতিপাদ্য বস্তুর প্রশংসা করার নাম অর্থবাদ এবং প্রতিপাদ্য বিষয়ের প্রতিপাদনের যুক্তির নাম উপপত্তি।

বিষয়-সূচী [ বর্ণানুক্রমিক } বিষয় পৃষ্ঠা i. ••• ৮০ ১০ । ••• অজহতী লক্ষণা অজ্ঞানাত্মবাদ খণ্ডন অদ্বৈত-জ্ঞান ও জীবমুক্তি অদ্বৈতবাদের শ্রেষ্ঠত্ব ••• ৬৪ অধ্যারােপ ন্যায় ••• ••• ০ ০ ০ ০ ০ ০ অনুময়কোশ আত্মার স্বরূপ নহে অন্নময়াদি শরীর আত্মার কোশ-স্বরূপ অন্যান্থ আপত্তির খণ্ডন : ৮৫ ০ ০ ০ ••• ৭৪ . অপবাদ ন্যায় অসি-শব্দের সার্থকতা ৮৭ আ ০ ০ ৫. . ৬২ . . আত্মজ্ঞানের উপায় ও তাহার ফল আত্মা ও তাহার স্বরূপ আত্মার অদ্বিতীয়ত্ব নিরূপণ আত্মার অম্নময় স্বরূপ আত্মার আনন্দ-স্বরূপ নিরূপণ আত্মার জ্ঞান-স্বরূপ নিরূপণ আত্মার নিত্য-স্বরূপ নিরূপণ ১ । । ••• ৬০ ••• ১৮ ৪ পরিশিষ্ট * * * * বিষয় পৃষ্ঠা আত্মার প্রাণময় স্বরূপ ০ আত্মর বিজ্ঞানময় স্বরূপ আত্মার মনােময় স্বরূপ * * * ০ ০ ০ ৩২ ••• আত্মার সন্ধান বা আত্মজ্ঞান •• ••• আত্মার সুখ-স্বরুপত্ব নিরূপণ ০ ০ ০ ৪৫ • ৪১ ০ ০ ৫৮ আত্মার স্বরূপ আত্মার স্বরূপ নিরূপণ আত্মা সম্বন্ধে নানা মতের খণ্ডন এবং একত্ব ও অদ্বিতীয়ত্ব নিরূপণ ২৬ আনন্দময় আত্মার স্বরূপান্তর আনন্দময়-কোশ আত্মর স্বরূপ নহে ৪০ ইন্দ্রিয়াত্মবাদ খণ্ডন ৫ ০ ০ s p ৪১ ১৮ ঈশ্বরসৃষ্ট দ্বৈত-পঞ্চ ও জীবসৃষ্ট দ্বৈত-প্রপঞ্চের বিচার ঈশ্বরসৃষ্ট দ্বৈত প্রপঞ্চের নিবৃত্তি ঈশ্বরসৃষ্ট বাহ্যজগৎ জীবষ্ট মনােময় জগতের কারণ • • ০ ০ উপনিষদের মতানুযায়ী জগদুৎপত্তির বিবরণ ১৭ কর্ম চিত্তশুদ্ধি ব্যতীত কখনই মুক্তির সাধক হয় না •• ৪ ০ ত জগদুৎপত্তি সম্বন্ধে সাধারণের মতামত জগতের ব্যবহারিক সত্তা ••• r, F বিষয়-সূচী F . • Me == ** ৬rs বিষয় পৃষ্ঠা s , ৭৮ ০ ০ ০ ৮) ••• ৭০ ••• २० | জহতী লক্ষণ। হত্যজহতী লক্ষণ। জীব ও ঈশ্বর জীবসৃষ্ট দ্বৈত-প্রপঞ্চই জীবের বন্ধনের কারণ জীবসৃষ্ট মনোময় জগতের অশাস্ত্রীয় দ্বৈত-প্রপঞ্চের নিবৃত্তি জীবষ্ট মনােময় জগতের শাস্ত্রীয় দ্বৈত-প্রপঞ্চের নিবৃত্তি • জীবাত্মার অভাব ও তাহার নিবৃত্তির উপায় জীবাত্মার নির্বাণ বা আত্মম্বরূপে অবস্থান জীবাত্মার বর্তমান অবস্থা জ্ঞানাঞানাত্মবাদ খণ্ডন २8 ৪১ ৩৪ ০ ০ ০ ••• ••• ... ৭৩ ন ••• ••• १२ ৪৯ তৎ ও ত্বং গুদের লক্ষ্যার্থ তত্ত্ব নিরূপণ তত্ত্ব-বিচার তত্ত্বমসি বিচারের অধিকার নিরূপণ দ দেহাত্মবাদ খণ্ডন দ্বৈত-প্রপঞ্চে মিথ্যাত্ব জ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞানের হেতু দ্বৈত হইতে অদ্বৈতে উপনীত হইবার ধার। প পুত্ৰাত্মবাদ খণ্ডন প্রকৃতি ও তাহার স্বরূপ প্রাণময় কোশ আত্মার স্বরূপ নহে প্রাণাত্মবাদ খণ্ডন ২২ ১৫ ••• ৪৭ ০ ০ ০ * * * ২৯ • • ••• ৩৯ • • • ••• ৫ পরিশিষ্ট . বিষয় পৃষ্টা ০০০ ২ . . . ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৪০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৭৬ বস্তু-বিচার তদ্বিষয়ক জ্ঞান লাভের প্রকৃষ্ট উপায় বাচ্যার্থ বিরােধ খণ্ডন বাহ্নবস্তুর মনােময় স্বরূপত্বের প্রমাণ বিজ্ঞানময় কোশ আত্মার স্বরূপ নহে বিশেষ্য-বিশেষণ ভাব সম্বন্ধ বিষয়াত্মবাদ খণ্ডন বুদ্ধ্যাত্মবাদ খণ্ডন বৃত্তি সম্বন্ধ পরিহার দ্বারা অভাব নিবৃত্তিকরণ বেদান্তের তাৎপর্য ব্ৰহ্ম হইতে জীব-জগতের উৎপত্তির কারণ ব্ৰহ্মাতিরিক্ত বস্তু মাত্রেরই অনিত্যতা নিরূপণ ০ ০ ০ # ০ ০ ৪৬ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০০ ০ ০৮ ৩ ৪০ ০ ০ + ৮৮ ভূতসমূহের গুণ বিচার ম মন-আত্মবাদ খণ্ডন মনােময়-কোশ আত্মার স্বরূপ নহে মহাবাক্যের বিচারের ফল নিরূপণ মহাবাক্যের সাধকের অবস্থা ল লক্ষ্য-লক্ষণ সম্বন্ধ নিরূপণ শ শূন্যাত্মবাদ খণ্ডন ৭৭ ৫৪ ৭ সস্তুকে অবলম্বন করিয়া মায়ার সৃষ্টিক্রম সস্তুর বিচার ও পরিচয় সদস্তুর শক্তি মায়ার স্বরূপ বিচার সস্তু হইতে সৃষ্ট পদার্থেরও বিভিন্নতা ও অসত্যত। সমানাধিকরণ সম্বন্ধ ০ ০ ০ ৭৫ ও তৎসং । অসাম-বঙ্গীয় সারস্বত মঠের প্রতিষ্ঠাতা পরিব্রাজকাচাৰ্য পরমহংস শ্রীমৎ স্বামী নিগমানন্দ পরমহংসদেব কৃত সারস্বত-গ্রন্থাবলী ! ১ ব্রহ্মচর্য সাধন এই পুস্তকে ব্রহ্মচর্য সাধনার বা বীৰ্য্য ধারণের যাবতীয় নিয়ম- বলী, যৌগিক সাধন এবং শুক্রবটিত ব্যাধির যৌগিক ও অবধৌতিক প্ৰতীকারের বিষয় বিবৃত হইয়াছে। গ্রন্থকারের চিত্রসহ দশম সংস্করণ, মূল্য। আনা মাত্র। অসমীয়া সংস্করণ ০, ইংরেজী সংস্করণ ০, হিন্দী সংস্করণ ॥ আনা। ২ যােগীগুরু এই পুস্তকখানিতে যােগদর্শন ও তাহার সাধনা সম্বন্ধে সমস্ত কথাই উল্লিখিত হইয়াছে। যােগকরে যােগতত্ত্বের আলােচনা, সাধনকরে সরল ও প্রত্যক্ষ-সিদ্ধ যৌগিক সাধনসমূহের বিবরণ, মন্ত্রকল্পে ও স্বরকল্পে নিত্য প্রয়ােজনীয় ও অব্যর্থ উপকারী সিদ্ধ যৌগিক ক্রিয়াসমূহ বর্ণিত হইয়াছে। ৮ম সংস্করণ, গ্রন্থকারের হাফটোন চিত্রসহ মূল্য ১০। হিন্দী • আনা।

৩ জ্ঞানীগুরু ইহাতে জ্ঞান ও যােগের উচ্চাঙ্গসমূহ বিশদ রূপে আলােচিত হইয়াছে। নানাকাণ্ডে হিন্দু ধৰ্ম্মের প্রমাণ ও ভিত্তি, জ্ঞানকাণ্ডে হিন্দু দর্শনের নিগূঢ় তত্ত্বসমূহ ও সাধনকাণ্ডে জ্ঞান ও যোগের উচ্চাঙ্গ সাধনাদি বর্ণিত হইয়াছে। গ্রন্থকারের চিত্রসহ ৬ষ্ঠ সংস্করণ মূল্য ২ = টাকা মাত্র। ৪ তান্ত্রিকগুরু ইহাতে তন্ত্রশাস্ত্রের মর্মরহস্য ও নিগূঢ় তান্ত্রিক সাধনাসমূহ প্রাঞ্জল ভাষায় বিবৃত হইয়াছে। যুক্তিকল্পে তন্ত্রের যুক্তি ও প্রমাণ, সাধনকল্পে মােক্ষানুকূল তান্ত্রিক সাধনা ও পরিশিষ্টে গৃহস্থের নিত্য প্রয়ােজনীয় কাম্য-কর্মের সাধনা উল্লিপিত হইয়াছে । পঞ্চম সংস্করণ, গ্রন্থকারের প্রতিমূর্তিসহ-মূল্য ১৮০ মাত্র। ৫ প্রেমিকগুরু ইহাতে জীবনের পূর্ণতম সাধনা, প্রেম-ভ ক্ত ও মুক্তির বিষয় বিশদরূপে বর্ণিত হইয়াছে। পুর্বস্কন্ধে ভর্তি শাস্ত্রের সমস্ত শাখার বিশ্লেষণ ও উত্তরস্কন্ধে সন্ন্যাস ও জীবমুক্তি সম্বন্ধে বিশেষ আলােচনা করা হইয়াছে। পঞ্চম সংস্করণ-গ্রন্থকারের প্রতিমূর্তিসহ মূল্য ২, মাত্র। ৬ মায়ের কৃপা এই গ্রন্থে মাকে, এবং কিরূপে মায়ের কৃপা লাভ করা যায়, তাহা অধিকার ভেদে বিবৃত হইয়াছে। উপদেশগুলি মা স্বয়ং খুখে প্রদান করিয়াছেন। পরিবর্ধিত ৫ম সংস্করণ, মূল্য। আন। মাত্র। হিন্দী সংস্করণ। আনা।

৭ কুম্ভযােগ ও সাধুমহাসম্মিলনী
এই গ্রন্থে কুম্ভযোগ, সাধু-সম্মিলনী, কি উদ্দেশ্যে কাহার কর্তৃক
স্থাপিত, সাধকগণের বিবরণ প্রভৃতি বর্ণিত হইয়াছে। ৩য় সংস্করণ
মূল্য | অনা মাত্র।
৮ তত্ত্বমালা-প্রথম খণ্ড
শক্তিসম্প্রদায়ে প্রচলিত যাবতীয় পূজা-পার্বণ ও উৎসবাদির তত্ব
বিবৃত হইয়াছে। দ্বিতীয় সংস্করণ—মূল্য | আন! মাত্র।
৯ তমালা-দ্বিতীয় খণ্ড
বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের উৎসবাদির তত্ত্বসমূহ বিবৃত হইয়াছে। ২য়
সংস্করণ-মূল্য ॥ আনা মাত্র।
১০ তমালা তৃতীয় খণ্ড
এই খণ্ডে আত্মতত্ত্ব ও হিন্দুর সাধনা সম্পর্কিত বহু জ্ঞাতব্য
বিষয়ের বিশ্লেষণ ও আলােচনা করা হইয়াছে। মূল্য ৬০ আনা।
১১ সাধকাষ্টক
এই গ্রন্থে আট জন গৃহস্থ সাধুর পূত জীবন কাহিনী বর্ণিত
২য় সংস্করণ-মূল্য ৩.অানা মাত্র।
১২ বেদান্ত-বিবেক
পরিবর্ধিত ২য় সংস্করণ-মূল্য • আনা মাত্র।
১৩ শিক্ষা
শিক্ষার আদর্শ, সমস্যা, সমাধান, প্রয়োগ –এই পৰ্ব চতুষ্টয়ে
বিভক্ত। শিক্ষাকে অধ্যাত্ম দৃষ্টি দিয়া দেখিবার ইহা অভিনব প্রয়াস।
এই পুস্তকখানি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক, সকলেরই পড়িয়া
দেখা উচিত। মূল্য ১ টাকা মাত্র।
হইয়াছে।

..
১৪ উপদেশরত্নমালা
এই পুস্তকখানিতে ঋষি ও সাধু মহাপুরুষদিগের কর্ম, জ্ঞান ও
ভক্তিমূলক কতকগুলি আধ্যাত্মিক তত্ত্বপূর্ণ উপদেশ নিবদ্ধ হইয়াছে।
পঞ্চম সংস্করণ, মূল্য' • আনা মাত্র। হিন্দী সংস্করণ • আনা।
১৫ স্তোত্রমালা
সারস্বত মঠে পঠিত স্তোত্ৰসমূহের সংগ্রহ। বড় বড় অক্ষরে
রঙীন কালীতে পরিষ্কার ছাপা। ৩য় সংস্করণ, মূল্য • আনা।
শ্ৰীমৎ স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতীদেবের
হাফসেন প্রতিমুক্তি
বড় সাইজ (১৪”x১১*) নূতন ধরণের • ছয় আনা।
মাঝারী সাইজ ৩, ছােট সাইজ নানা রকমের প্রত্যেকটা এক
অনা। নূতন ৩ রঙ্গী বর্ডারযুক্ত • আনা।
পুস্তকাদি পাইবার ঠিকানা
১। সারস্বত মঠ, পােঃ কোকিলামুখ, যােরহাট (আসাম)
২। উত্তর-বাঙ্গালা সারস্বত আশ্রম, পোঃ বগুড়া।
গুরুদাস চট্টোপধ্যায় এণ্ড সন্স-২০৩১১, কর্ণওয়ালিশ
স্ট্রীট, কলিকাতা
আৰ্য-দর্পণ
[ সনাতন ধর্মের মুখপত্র )
ধৰ্ম, নীতি ও শিক্ষা সম্বন্ধীয় মাসিক। গভীর গবেশ।
প্রবন্ধৱজিতে সমলস্কৃত। আসাম বঙ্গীয় সারস্বত মঠের তত্ত্বাবধু,
সপ্তবিংশ বর্ষ (১৩৪১ ) যাবৎ নিয়মিত ভাবে পরিচালিত
আসিতেছে। বার্ষিক মূল্য—সডাক ২০ মাত্র। বৈশাখ হ
বর্ষারম্ভ। যে কোন সময়ে গ্রাহক হইলেও বত্সরের প্রথম
পত্রিকা লইত হয়।
প্রাপ্তিস্থান-আর্য্য-দর্শণ কাৰ্যালয়
উত্তর-বাঙ্গালা সারস্বত আশ্রম, পােঃ বগুড়া (বঙ্গদেশ

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Bedanta-bibek Ed. 2nd

Author
Saraswati,nigamananda
Title
Bedanta-bibek Ed. 2nd
File name
Bedanta-bibek Ed. 2nd
Text
OCR done
Citation
1934
Published
2010/02/21
Publisher
Swami Chidananda
Language
Sanskrit
Pages
122
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Bengali Essay
Keywords
Mahabakya Bibek
DLI number
510897
Barcode
4990010018095.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
C4nUxAL8rQ5
Download PDF

Bedanta-bibek Ed. 2nd