Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kahalar
Front matter
No text on this page.
কলার
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
মূল্য বার আনা
কলিকাতা
১৩১নং শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, ভট্টাচাৰ্য এণ্ড সনএর পুস্তকালয় হইতে
শ্রীদেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক প্রকাশিত
এবং
১০৮ নং নারিকেলডাঙ্গা মেন রােড, স্বর্ণপ্রেসে
শিবেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক মুদ্রিত
একটীমার কথা
শিক্ষার দোষেই হউক বা কবিতা-রস-মাধুৰ্য অনুভব করি
সামর্থ্যের অভাবেই হউক, আজকালকার অনেক নবীন লেখা
কবিতা আমি ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারি না; ইহার জন্য অ
অনুযােগও আমাকে সর্বদা সহ্য করিতে হয়। কিন্তু, আনা
কথা এই যে, আমি এই কলারে’র কবিতাগুলি বুি
পারিয়াছি এবং এই কবি-হৃদয়ের নিভৃতে যে ভাবের ।
প্রবাহিত হইতেছে, তাহার সন্ধান পাইয়াছি। ইহাই অ
বিনীত মন্তব্য।
কলিকাতা
৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩০
জলধর সে
এই গ্রন্থের অধিকাংশ কবিতা বিবিধ মাসিকপত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল। বিক্ষিপ্ত রচনাগুলি এবার একত্রে সন্নিবেশিত হইল। কবিতাগুলি আমার প্রথম যৌবনের লেখা। প্রচ্ছদপটের পরিকল্পনাটি সুযােগ্য চিত্রশিল্পী ও সাহিত্যিক শ্ৰীযুক্ত বিশ্বপতি চৌধুরী এম-এ মহাশয়ের নিপুণ তুলিকার চপল- লীলা। তিনি তাঁহার শত কাযের মধ্যেও বন্ধুর অনুরােধ রক্ষা করিয়াছেন,—ইহা তাহার বন্ধুপ্রীতি তথা সাহিত্যানুরাগের পরিচায়ক। বিনীত উকীলপাড়া, বহরমপুর, । শ্ৰীশ্ৰীপুনর্যাত্রা, আষাঢ়, ১৩৩৪ গ্রন্থকার
শ্রদ্ধাস্পদ কবিবর
শ্ৰীযুক্ত করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়
মহাশয়ের করকমলে-
গ্রন্থকার প্রণীত
শিশুদের প্রাণ-মন ভুলান দুইখানি বই
ক্ষীরের নাড়,
ক্ষীর-সমুদ্র
সূচিপত্র छ। বিষয় ধােয়ী জ্যোৎস্নাসুন্দরী বধূর অবগুণ্ঠন বর্ষ-শেষে কবি ১৭ (প্রবাসী-অগ্রহায়ণ, ১৩২৬) (উপাসনা—অগ্রহায়ণ, ১৩২৩) (উপাসনা—আশ্বিন, ১৩২৩) ( মানসী ও মর্মবাণী -বৈশাখ, ১৩২৭) (উপাসনা-চৈত্র, ১৩২৫) (প্রবাসী—ফান, ১৩২৬) (উপাসনা—আশ্বিন, ১৩২৬) ( ভারতী-কার্তিক, ১৩২৭) (ভারতী- পৌষ, ১৩২৭) (ভারতী—অগ্রহায়ণ, ১৩২৭) (উপাসনা-মাঘ, ১৩২৪) २० চাষার বিরহ পথের গান পৌষের অবেলায় সর-জোর মেহের আকর্ষণ। প্রিয়ার প্রথম # ০ ০ ৪ সন্ধ্যার আশা ৪ ৪ নন্দোৎসব কর্পের প্রসার (উপাসনা-জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৪) (নারায়ণ-ভাদ্র, ১৩২৭) ( ভারতী—ফাল্গুন, ১৩২৭) (উপাসনা-মাঘ, ১৩২৯) জ্যোৎস্নালােকে
বিষয়
পৃঃ
৫ ।
| |
পুণ্যশ্লোক
তাজমহল
শ্রাবণের বদলে
নােলক
আগমনী
৭
(ভারতী—জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৮)
( নারায়ণ—কার্তিক, ১৩২৭)
(উপাসনা-কার্তিক, ১৩২৭)
( উপাসনা-চৈত্র, ১৩২৭ )
৭।
বালা দেশের চাষা
মনের রীতি
৭।
আশা
ঘােয়ী
‘কোথা গেলে বাণি? কোথা বীণাপাণি !
কোথা গেলে অয়ি, অয়ি।
এই ক’টি কথা
বলে, আর চলে
পল্লীর পথে ঘােয়ী।
সিক্ত তাহার
দেহের বসন,
ভিজে তার চুলগুলি,
আকুলি-বিকুলি
আঁখি-তারা দুটি
যায় পথ ভুলি’ ভুলি’!
দেবীর আদেশে
ডুব দিতে সে যে
নেমেছিল নদী-নীরে,
দু বাহু মেলিয়া
তুলে নিতে তার
করুণার দান শিরে!
সেই ফাকে তারে
ফাকি দিয়ে কোথা
চলে গেছে তার দেবী,
ভাবিছে সে—শেষে
এই হ’ল তার
রাতুল চরণ সেবি’!
কহলার কোথা যাবে দেবী ! মেঘের আড়ালে এখনাে যে যায় চিনা আকাশে বাতাসে অনিলে সলিলে ওই বাজে তার বীণা । ;- স্তনের উপরে মুকুতার মালা নাচারে ভারতী যায়, ছড়ায়ে আশিস- দুটি রাঙা পায়-পায়। পীযূষ-কণিকা জুড়ি’ যুগ পাণি নমে ধােয়ী তায় নােয়ায়ে লুটায়ে শির, মুখে চোখে তার কথা কাড়াকাড়ি, ভাষার নাহিক থির ! সেই মনখানি সেই চোখ দুটি থুয়ে সে এসেছে জলে, নূতন চিত্ত মধুর বিত্ত পেয়েছে দেবীর ছলে । আঁকা-বাঁকা পথে চলে যায় ঘােয়ী গুন্ গুন্ গান গাহি, অফুরান কথা পেয়েছে সে তার ফুরাবার নাম নাহি। ২ কার আপনার মুখে কহিছে সে কথা, শুনিছে আপন কাণে, কি বলে আপনি ভাবিছে আপনি, কি বলে সে নাহি জানে! নিয়ত মধুর, মধুর মধুর, মধুর যতই দেখে, সকলি তাহার সকলি মধুর ঠেকে লাগিছে মধুর, পড়িতেছে ঝরে টুপ টুপ করে বসনের জল-ফোঁটা, সে ভাবিছে, খাসা উজল মুকুতা ওটা। শাদা নিরমল সেই মুকুতার রাশি থুয়ে যায় নধর দূৰ্ব্বাদলে, যেন সেইগুলি রূপালি আখরে পিছে তার ঝলমলে! যত দূরে যায় সে আখর গুলি তত হয়ে আসে ফিকে, তরল তাদের । ছাঁদের হালী বেড়ে সারা মনটিকে T কলার পড়িয়া রয়েছে চরণের তলে ধূলা-মাটি ইহা নয়, সে দেখিছে, তাহা কমলের রেণুচয়। জলে ভাসা ধরা- হইতে কবে এ সাগর-সলিল ধরণী উঠেছে ফুটি, কোন্ দিন থেকে প্রাণীরা নিতেছে লুটি! পরিমল এর ভাবে তন্ময় সেই ধূলি-কণা লইতেছে ধােয়ী মাথে ;- কে বলিতে পারে, ছিল কি না ছিল তীর্থ সেখানটাতে কা’র পদরজ জড় ছিল সেথা এত দিন তার তরে, কে আশিসটুকু সেথা গেছে রেখে তার লাগি’ সমাদরে ! বন-কুসুমের আকুল গন্ধ ভেসে আসে সমীরণে, কানপ্রকার বেণীর সুরভি- এই অন থােয়ী মনে। ৪ কহার বিনানী করিয়া প্রভাতে ফুলের বেঁধেছিল রাণী চুল, দুপরে বেণীটি খসিয়া ঢাসিয়া শিথিল হইল ফুল। সমীরণ যেন মদন-দোসর, জ্বালা দেয় শত পাকে, চূত-সৌরভে আকুল করিছে বনানীর প্রাণটাকে, দুইটি হিয়ায় পিপাসা বাড়ায়, লতাটি লতায় ঠেলে, কুসুম দুলায়ে পাগল ভ্রমরে পীরিতির ফাঁদে ফেলে! ঝলিতেছে ওই বলাকার শ্রেণী শ্যাম জলদের কাছে, ভাবিতেছে থাের্মী- মােতিম মুকুট প্রকৃতি সে পরিয়াছে। কোন্ দেশ হতে আসে বকগুলি, কোন্ দেশে তারা যায়। ঘুরে ঘূরে আর উড়ে উড়ে তারা কি খবর জানি পায়।
কহলার মনটি তাহারা কোথায় দূরান্তরে, বেঁধে নিয়ে যায় ধবল পাখার ও স্বপনে নয়ন দুইটি ভরে। মেঘ করে আসে আকাশ জুড়িয়া, ঘােয়ী ভাবিতেছে মনে, কে যেন আসিছে বাঁধিতে আলিঙ্গনে। ভুজযুগ মেলি রৌদ্রের হাসি মুখে লেগে তার, চোখে কয় ফোঁটা জল, কোন্ দেবতার এতখানি মায়া, এমনি মধুর ছল! ধরণীর বুকে মিশেছে আকাশ, আর নাহি দিঠি চলে, ডুবে গেছে কোথা দেখা ও অদেখা ঝাপসা আঁখির তলে! . চোখের সামনে যে টুকু রয়েছে এ জনম সেই টু, বিগত জনম রহিল পিছনে ধোঁয়ায় লুকারে মুখ।
সম্মুখ হতে
জনমান্তর
ডাকিছে পথিকে, ‘আয়’!
ভাবিতেছে ধােয়ী,
কে লইয়া যাবে
রহস্য-সীমানায় !
এমনি করিয়া
পথ চলে যােয়
এক দিন এক রাতি ;
একা নয় আর,
পেয়েছে সে তার সাথী।
নিখিল ভুবন
আসিল যখন
কুটীরে আপন
তখন প্রভাত বেলা ;
ছেলে মেয়ে তার
ধূলা-মাটি মেখে
করে আঙিনায় খেলা।
চুমা খেয়ে থােয়ী,
কোলে নিল মেয়ে
কাঁদিয়া উঠিল মেয়ে,
শিশির-সিক্ত
কমল যেন সে
দেখে ঘােয় চেয়ে চেয়ে।
ছেলেটি তাহার
বায়না ধরিল
‘দাও, দাও, দাও’ বলে,
‘আদর করিয়া
থাের্মী নিল তায়
তুলিয়া অপর কোলে।
কহলার দরিদ্রতার বােঝ দু’টি তার আজিকে মাথার মণি, সব খানে আজ দেখিতেছে ধােয়ী হীরা মাণিকের খনি! গৃহিণীর মৃদু ভৎসনা তার বড়ই মধুর লাগে, নথের নাচনি বড় সুন্দর অধরের পুরােভাগে ! রূঢ় ঝঙ্কার প্রিয়-কণ্ঠের গৃঢ় কথা পরকাশে ! কটু কথা শুনে প্রিয়াসনে থাের্মী সুললিত সন্তাষে। ছেলে-মেয়েদের ক্রন্দনরােল এ কি বােল আজ বলে। কিসের যেন গাে ছলছলে কলকলে। মধুর নিঝর দৈন্যের কথা আজিকে তাহার শুনাইছে বড় মিঠা, ছিটায়ে কে দিল এমন মদির-ছিটা । নয়ন দু’টিতে
কলার
সুন্দর ধরা
ঢাকা ছিল কোন
কুহেলির আবরণে-
দেখিতেছে ঘােয়ী
এক ধ্যানে এক মনে।
অবাক হইয়া
জ্যোৎস্না-সুন্দরী
আজকে রাতে আঙ্গিনাতে লুটিয়ে বুঝি ওই প’ল
সাঁচ্চা জরীর কাজটি করা শাড়ীর তব অঞ্চল।
বৃক্ষ শির-বদ্ধ বেণী জোনা-হীরা ফুল-ঘেরা,
নীল ললাটে মুক্তা চুণী-তারার মালা সব-সেরা,
তপ্ত সােণা বর্ণ তব, দীপ্ত চাদের মুখখানি,
কোকিল-মধু-কণ্ঠ হ’তে গােপন থাকি কও বাণী।
কুমুদ ফুটে’ লুটিয়ে পড়ে পরশ-লােভে পা’র পরে,
গাছের ছায়ায় আসন রচি’ দাড়িয়ে থাক কার তরে!
‘সাতটি ভ্রাতা’—সাত নহরে ঝাঁটা তব মস্তকে,
সীথেয় জ্বলে চাদের দেওয়া ফাগের গুড়া ঝক্ঝকে।
ঝিঝির সুরে ঝাঁঝর বাজে তােমার পায়ে ঝিঝিনা,
বাতাস-পা পাতার তালে বাজাও বুঝি ওই বীণা।
নৃত্যবতী চপল নদী পড়ছ ফাটি’ যৌবনে,
হাসির ঝরা ঝছে তােমার পাগল-করা ফুলবনে।
মুগ্ধ কর লুব্ধ মন মদির-আঁখি-দৃপাতে,
সুখের কারা বাঁধন-হারা রূপের ভারা আজ রাতে।
পালক হতে আলােক ঢেলে ধরায় এলে কোন্ পরী ?-
মিটাও তৃষা রূপের নেশা লাে জ্যোৎসনা-সুন্দরি।
শরৎ-ক্ষেত্রে শরতের ক্ষেত ভাঙিয়া এল গাে সােণার বরণ ধান, দিকে দিকে শুধু মধু কলরব, শুধু হাসি, শুধু গান। সারা মাঠে ছুটোছুটি- ছােট বীজগুলি— ছােট আশাটুকু ফলেতে উঠেছে ফুটি। তারি লােভে কত ছােট বড় পাখী উড়ে আসে সার দিয়া, বায়ু-হিল্লোলে ধানের শীর্ষ দোলে কত প্রীতি নিয়া । কে রে তােরা আজ পরবাসী হয়ে ফিরিস্ পরের দ্বারে ! বঙ্গমাতার ক্ষেত-ভরা ধান একবার দেখে যা রে! শরৎ-লক্ষ্মীরাণী সাধনায় ধরা দিয়াছে চাষার আলাে করে মাঠখানি। শাদা শরতের জল-ভরা মেঘ কুটি নাহিক জানে, প্রজার মাথায় রাজ-শাসনের বজ্ৰ নাহি ত হানে। ১১ কহলার সে যে আসে নামি’ নব কল্যাণে সজল নয়নে চেয়ে, তপন-তপ্ত ক্ষেতগুলি তার করুণায় উঠে নেয়ে । কৃষকের কাণে কাণে মিগ্ধ পবন কি কয় বার ? কি জানি কি কথা জানে! সে ত নহে কোন ধনীর পেয়াদা, হুঙ্কার নাহি ছাড়ে, রাঙা চোখ দুটি রাঙায়ে আসে না গরীব প্রজার দ্বারে, ধানের গাছের নত শীগুলি পরশ করিয়া ধীরে অধরে অধরে চুম্বন মাগি নৃত্য করিয়া ফিরে। রােদটুকু মৃদু হাসে; রুদ্র সে নয়- বশীর বাহু কি মিছে তেজ পরকাশে? পাতায় পাতায় স্বর্ণ ছড়ায়ে শরতের সারা বেলা, গভীর সােহাগ দাগিয়া আঁকিয়া মাতিয়া করে সে খেলা। ১২
কহলার
রােদ, জল আর
শীতল পবন
দেখায় ধানের মুখ,
ভরা ক্ষেত দেখে
গরীব চাষার
ভরে উঠে গােটা বুক।
কে রে তােরা আজ
পরবাসী হয়ে
ফিরিস্ পরের দ্বারে
বঙ্গমাতার
মায়ার পরশ
একবার নিয়ে যা রে ।
১৩
বধুর অবগুণ্ঠন
বধুর মুখের অবগুণ্ঠন,
কুণ্ঠার শিরােমণি,
রে অফুটন্ত লজ্জার কুঁড়ি,
সুন্দর তােরে গণি।
গােপন কথাটি কার যেন তুই,
জড়সড় হয়ে আছিস্ নিতুই ;
জরীর সীমায় রেখেছি ঢাকি
কোন্ রহস্য-খনি ।
বধূর মুখের গুণ্ঠন ওগাে,
কুণ্ঠার শিরোমণি !
;
অন্তরে তাের রূপের কৌটা
কুহকের জাল বােনা
চোখের পাতার কল-মাখা
লজ্জার আনাগােনা।
যুক্ত ঠোঁটের দু’টি কিনারায়
মনের ঢেউটি চকিতে মিলায়,
গণ্ড দু’টিতে উকি যেন দেয়
উষার ভানুর কোণা।
অন্তরে তাের রূপের কৌটা—
কুহকের জাল বােনা।
১৪
নূতন বন্ধুর পরাণের সখী,
তুই তার সহচরী ;
আঁখি-জলটুকু আবরণে তাের
রাখি আড়াল করি’
মায়ের মতন ছােট ত্রুটিগুলি
বুক দিয়ে তুই থাকি আগুণি
আঁধার নিঙাড়ি পলে পলে দি
সান্ত্বনাটুকু গড়ি।
নূতন বধূর পরাণের সখী
তুই তার সহচরী।
কৌতূহলের ভরাভরী তুই,
গােধূলির ঝিলিমিলি,
চাউনিতে কিছু হিয়াখানি তাের
ধরা নাহি তুই দিলি ।
তাের আড়ে ওই বধূটির মুখ
ঢাকা র’ল যেন চির কৌতুক ;
গােপনে গােপনে শত গুণে তার
সৌরভ বাড়াইলি।
কৌতুহলের ভরাভরী তুই,
গগাধূলির ঝিলিমিলি।
১৫
কলার
রে অফুটন্ত লজ্জার কুঁড়ি,
সুন্দর তুই-তুই!
সরমের হেন মাধুৰ্যটুকু
এক ছাড়া নেই দুই
সতী-হৃদয়ের কম উচ্ছ্বাস,
কোথা যাবি তুই ? কোথা তাের বাস?
বধুর মধুর আঁখি দু’টি পরে
আয়-আয়, তােরে থুই।
রে অফুটন্ত লজ্জার কুঁড়ি,
সুন্দর বড় তুই।
১৬
বর্ষ-শেষে
--
নিদাঘে কাতর আবাহনে, ওগাে, পাই নি তােমার সাড়া,
নূপুর তােমার গাছের পাতায় আছিল রণন-হারা।
তপ্ত নিশাসে ভেঙে গেছ চলে’ ধরণীর পঞ্জর,
বিরহে তােমার ভূষাহীন কত নদী, ক্ষেত, প্রান্তর।
ফিরিনু শুধুই নিস্ফলতার ঘৰ্ম্ম-বিন্দু লয়ে,
কোথায় আপনা গােপন করিলে, গেলে না কথাটি কয়ে।
ডেকেছি তােমারে কাতর হৃদয়ে বরষার দু’টি মাস,
কহ নাই কথা, ঝাটা বাতাসে ফেলেছ দীর্ঘশ্বাস ।
প্রাণের বেদন ঢেলেছ তােমার বাদলের ঝঝরে,
দেয়া-ডাকে বুঝি জানায়েছ মােরে কত ব্যথা অন্তরে।
আমার কথার উত্তরে তুমি তিমিরে ঢেকেছ মুখ ;
দহিয়াছি একা নিয়ে শুধু মাের জীবনের ভুল-চু!
১৭
২
কলার
শরতে না-কি সে সরিতে হরিতে ছিলে ধরাতল ব্যাপি’,
পাই নাই তােমা ক্ষুদ্র আঁখির খণ্ড মাপেতে মাপি’!
বিশ্বের প্রতি অণুতে হাস্য ফুটেছিল বটে ঠিক,
তােমারি রূপের মাধুরী সে বুঝি ভরে’ ছিল দশ দিক্ !
কণ্ঠ তবুও পাই নি শুনিতে, ডাকিয়া হয়েছি সারা,
ভাঙি শত খানে আপনারে মিছা করেছি ছন্নছাড়া !
হেমন্তে কোথা ছিলে লুকাইয়া, পথপানে ছিনু চাহি,
ক্ষিপ্ৰ সঁঝারে ডুবে গেছে পাখী, শিঞ্জিনী শুনি নাহি ।
কুয়াসার ছলে জমে ছিল গাছে সে কি তব দুখরাশি ?
গণ্ড কি তব করেছিল ম্লান মেঘের খণ্ড আসি’ ?
হেরেছি শিশিরে অশ্রুবিন্দু নিশায় পড়েছে ঝরে,
বিন্দু শুকায়ে প্রভাত-তপনে আশায় ফিরাল মােরে !
বিরহ তােমার সহেছি শিশিরে, পাই নাই কিছু ছোঁয়া,
চেতনে তােমার ঢেকে কি রাখিল তুষার, তুহিন, ধোঁয়া !
তরু-শির হ’তে ঝরে গেল পাতা তােমায় শ্রীহীনা করি,
বায়ুসনে তার মরণের ব্যথা মিলাইল মর্মরি ;
কি যেন কুহকে সকল ভুবন করে গেল একাকার,-
স্তব্ধ দাঁড়ায়ে ঢেলেছি শুধুই আঁখির বেদনা-ভার।
১৮
কলার
বসন্তে, অয়ি, বনের আড়ালে কি কথা কুড়ায়ে পেলে ?
দখিণ বাতাসে সােহাগ জানায়ে এত দিন পরে এলে ?
বিশ্বের বুঝি পাণ্ডু অধরে হাস্য দিয়াছ বাঁটি,
কোমল করের আঙুল বুলায়ে পরশ’ আকাশ, মাটি।
নূতন মুকুলে ঢাকিবে কি প্রিয়ে, পুরাণ ক্ষতের দাগ ?
নিখিল, মধুর—নিয়ে এলে যাহা বিরহের অনুরাগ !
১৯
কবি
আকাশ তারে ডাক দিয়েছে,
বাতাস কথা কহে,
কুসুমগুলি কবির পানে
নয়ন মেলি রহে !
গড়ায় ভানুর ললাট হতে
রূপের বসুধারা,
চলছে ছুটে’ কোথায় কবি
বন্ধ-বাধা-হারা ।
মনটি তাহার উড়াে-উড়াে,
বীণাটি তার হাতে ;
রূপের নেশায় কবির সারা
পরাণ যেন মাতে।
পিটুলি ফুল–সবুজ ফোঁটা
নিটোল বারি-ধার
ঝুরঝুরিয়ে পড়ছে ঝরে
যাওয়ার পথে তার।
২৫
মখমলেরই গালচেখানা
কে রেখেছে পেতে,
দীর্ঘশ্বাসে দুলিয়ে অলক
বনের পথে যেতে।
কোথেকে সে কে এল গো,
কোথায় গেল চলে ?
ভাবছে কবি, এই কথাটি
কে দেবে তায় বলে’!
পায়ের তলে তুতে রঙের
হাজার ছােট ফুল
ঘাসের বনে চটক লাগায়,
তাদের নাহি তুল!
বুঝি বা কোন বনের দেবী
ফোঁড়টি গুণে গুণে
নিপুণ-করে মায়াজালের
ফাঁস রেখেছে বুনে’!
বুননী ত’র বনের ভিতর
কোথায় বল নেই ?
খুজুছে কবি—পায় সে যদি
একটা কিছু খেই।
২১
কহলার
ছাতারেরা পুকুরপাড়ে
পাকুড়-তরু-তলে
সুখের জুটি অনেক ক’টি
নাচছে দলে দলে ;
পায়ে তাদের গুনাে পাতা
উঠছে নেচে নেচে’,
জীয়ন-কাঠির পরশ পেয়ে
মন্ত্রে যেন বেঁচে।
নখের আঁচড় কেটে তারা
সেই কাহিনী লেখে,
কবির প্রাণে চমক দিয়ে
পলায় একে একে।
আতার গাছে ফুল ফুটেছে,
করূছে আলাে বন,
সােণার মত ফুলগুলি যে-
সােণার আভরণ।
ফুলের মুখে মুখটি দিয়ে
বুলবুলিটি বসে
রাঙা কোষের মর্মকথা
শুনছে যেন ও সে!
২২
কহলার
সেই কথাটি শুনে’ তাহার
মুখটি হ’ল লাল,
ভালে কবি কি-যেন-কি
দাঁড়িয়ে ক্ষণকাল!
একটি হােথা পােড় ভিটে,
জমেছে তায় জল,
বেদন-ভরা করুণ আঁখি
করূছে ছলছল !
গল্ল তাহার নয়ন-নীরে
আ-গাছাদের প্রাণ ;
বাড়িয়ে তারা নধর বাহু
জড়ায় ভিটে-খান !
অকেজো নয় আগাছারা,
তাদের আছে মায়া ;
কবির মুখে পড়ল এসে
দুখের কাল ছায়া।
তিন বছরের নগ্ন শিশু
নদীর বালুচরে
কঁদছে বসে ; জননী তার
কলস জলে ভরে।
২৩
কলার
যেনি পেল মায়ের আঁচল
উঠল হেসে ছেলে ;
কান্নাটুকু হাসি হয়ে
শিশুর চোখে খেলে।
কান্না-হাসি কথার কথা,
কিছুই তারা নয়—
চপল মনের খেয়াল দুটি
বাড়িয়ে কথা কয়।
=
আকাশ তারে ডাক দিয়েছে,
বাতাস কথা কহে,
কুসুমগুলি কবির পানে
নয়ন মেলি’ রহে !
কোন্ মােহিনী ভুলিয়ে নিল
তাহার উড়াে মন,
গভীর প্রেমে জড়িয়ে আসে
কবির দু নয়ন!
উঠল বেজে বীণার তারে
মন-ভুলান সুর,
সিক্ত কবির চোখের পাতা,
চিত্ত পরিপূর!
২৪.
চাষার বিরহ
আজিকে প্রথম ফুটেছে ঝিঙের ফুল,
বৃষ্টির জলে বেঁধেছে ডাটার ঝাড়,
আঁব গাছে বাসা বাঁধিয়াছে বুলবুল,
বেগুন গাছের হয়েছে কেমন বাড়,
তাের তরে আজ প্রাণ করে হাহাকার !
বেড়ার গায়ে যে ধরেছে উচ্ছে-জালি,
মাচার উপরে ঝাঁপিয়ে উঠিছে পুই,
শসা গাছগুলাে লতিয়ে উঠিছে খালি,
সবুজ বরণে হাসিছে এবার ভূই,-
আমি হেথা, আর কোথা তুই—কোথা তুই।
২৫
কলার
মমানের পড়েছে মস্ত কাদি,
কাণায় কাণায় ছাপিয়ে উঠিছে কূয়াে,
ডােবায় এবার লেগেছে মাছের গাঁদি,
গাছে এ বছর ফলেছে অনেক গুয়াে,-
তুই বিনে মাের সকলি লাগিছে ভূয়াে !
নূতন খড়ে যে ছেয়েছি ঘরের চাল,
গরুর গাড়ীর বেঁধেছি নূতন ছই,
নূতন বছরে কিনেছি নূতন হাল,
আলের জলেতে পেয়েছি পাঁচটা কই,
তাের তরে আজ কেঁদে কেঁদে সারা হই।
লেবুর ফুলের গন্ধ করিছে মম’,
উঠানে ফুটেছে দোপাটী, কৃষ্ণকলি ;
কলাবতী ফুল টুকটুকে তাের সম
আলাে করে আছে ডােবার ধারের গলি,-
আমি খুন হই, কোথা আজ তুই রইলি ?
কহলার
ধবলি গাইএর হয়েছে বাছুর খাসা,
মঙ্গলা আজো দুধ দেয় কেঁড়ে কেঁড়ে,
করি পেয়ারা হইয়াছে ডাঁশা ডাঁশা,
সারাদিন পুষি তাের পথ চেয়ে ফেরে,-
সব আছে তবু বাঁচি না ক তােমা ছেড়ে।
-
২৭
পথের গান
কাজল আঁখির রূপালি-সূতায়
বুনে’ বুনে’ পথখানি,
নীলাম্বরীর আঁচল ভিজায়ে
ফিরে গেছে অভিমানী ।
বিজুরির জরী-ফিততটি সে তার
ফেলে গেছে চুল খুলে,
শরৎ-মেঘের শাদা কক্কায়
কে তায় বুনিয়া থুলে !
আর টোপ-ঘাস-ফুলে ছােপ
পড়েছে চরণ থেকে,
এইখান দিয়ে চলে সে গিয়েছে
এইখান দিয়ে বেঁকে’!
দুলায়ে দিলে কে হাসির দোলায়
কাশের ও দুধে হাসি!
কনক ধান্তে সােণার শােলােক
রচনা করিছে চাষী।
ঝুমকা জবার বেলােয়ারি ঝাড়-
স্নিগ্ধ আলোর ঝারা
গন্ধ তৈলে বনের মিছিলে
ঝুলায়ে রেখেছে কারা ?
আলােক-লতার দেখন-হাসি সে
বুক জুড়ে আছে বসি’,-
দুই চোখ ঢেকে আঁচলে--এদিকে
গিয়েছে কি ক্রন্দসী !
সাথীহারা কোন্ পাখীর করুণ
ক্রন্দনে বন-থল
সমবেদনায় সাড়া দিয়ে দিয়ে
কেঁদে মরে অবিরল।
নিথর পাতার শিয়রে ঘুমায়
নিশ্চল ছায়াখানি
ঘুমের স্বপনে বন-কৌতুক
সকলি ফেলিছে জানি’!
ললাট ঘামিয়া চন্দন চুয়া
পড়েছে কচুর পাতে,
এই পথ ঘূরে চলে সৈ গিয়েছে
দারুণ রােদের তাতে।
২১
কহলার
শ্যাম সরােবরে সন্ধ্যা-মেঘের
রাঙা ছায়াটুকু পড়ে,
নিবিড় সােহাগ ক্ষণ যৌবন
আঁকড়ি’ আঁকড়ি ধরে!
=
তরু-বীথিকার ফাকে দেখা যায়
টুকরাে আকাশখানি,
জীবনের ছােট প্রহরের শুধু
এইটুকু জানাজানি !
অংশুমালীর মুকুটের সােণা
ঠিকরি’ পড়িছে হােথা ;-
জানি সে কোন্ রহস্য-দ্বার
খুলিতে গিয়েছে কোথা ?
ঝিল্পীর গানে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে
ঘুমিয়ে পড়েছে পাখী,
নীলিমার মায়া-মন্তর তার
জড়িয়ে ধরেছে আঁখি !
বনের মাথায় পাতায় পাতায়
ঝলসি উঠিছে কি রে ?-
ছড়িয়ে গেছে কি গরি কণ্ঠের
সােণার কী ছিড়ে।
কহলার
ফালি চন্দ্রের খালি বুকখানি,
তিমিরে হারায় দিক।
এরি মাঝ দিয়ে চুপে চুপে সে গাে
চলে গেছে ঠিক-ঠিক্ !
সােসর হারায়ে দোসর করেছি।
আজিকে পথেৰে তাই,
এত কি পথের রহস্য ওগাে,-
অন্ত কি এর নাই।
নিঝুম রাতির উদাসী আঁখির
সীমাহীন দিঠি পরে
অধরের হাসি অশ্রু মিশিয়া
এ কি কৌতুক করে।
কই আমি। কই ঘন-কুন্তলা!-
পথ কই-পথ কই।
চিত্তমরমে নিত্য ছড়ায়
গানের সুরটি ওই।
৩১
পৌষের অবেলায় পৌষের হাওয়া দেয়, গা’ করে শি শি! কোন্ তৃণ খালি করে কোন্ জন ছুড়ে তীর ! দেখা যায় ফাঁকে ওই নারিকেল পত্রের রূপসীর লাজভরা চাউনিটি নেত্রের। নীলিমার নীল চোখে গাঢ় হয় নীল রঙ, অন্তরে বুলে’ যায় আকাশের--রঙ, চ,। পৌষের হাওয়া দেয়, পড়ে যায় বন্দুর, বাঁধা হ’ল চুল তাের কর কর ? নলি বেয়ে খেজুরের রস পড়ে টুপ টুপ- অধরের সীধুটু ঝরে যায় চুপ চুপ ! কাঁঠালের কচি মুচি কাচা সােণা চু চুক- আধ রােধ, আধ ছায় দেয়ার দুখ-সুখ! ৩২ কলার চরা সায় চড়ায়ের, ঘর কোণে উড়ে যায়, চোখ-চোখ চায়, আর প্রেম-শ্লোক আওড়ায় ! পৌষের হাওয়া দেয়, পড়ে যায় বন্দুর, বাঁধা হ’ল চুল তাের কর-কদর ? খিলি খেয়ে হাসে যেন খিল্ খিল্ বক ফুল- তরুণীর রক্তিম কর্ণের ওই তুল ! বােঝা ভার কঁাচা কি বা পাকা ওই কৎবেল- লাজশীলা বধূটির যেন রীত-আক্কেল । সজনের ফুল-থােক—বুকভরা মৌ ওর, শেষ করে মৌমাছি মন-পাওয়া মন্তর। পৌষের হাওয়া দেয়, পড়ে যায় রদ্র, ধাঁধা হ’ল চুল তাের কর কর ? নকনা চকনা ভেঙে দেয় দু চোখের পিয়ে যায় প্রেয়সীর রূপ-রস ওষ্টের। সাত গুছি রুচি তাের,—খুঁটিনাটি ক সায়, বেঁধেছি মন মাের বিউনীর ফাস্টায়।
কলার
উড়ে যায় পাখী ওই এক সার—দুই সার,
থা-ভাঙা বক যায়, সাধ নেই গুণবার!
পৌষের হাওয়া দেয়, পড়ে যায় বন্দুর,
বাধা হ’ল চুল তাের কর-কর?
৩৪
সরযুজোর
নির্বাসনে কাছে কে গাে ?
যক্ষের কোন্ কন্যা এ গাে !
জলের ধারা কোন্ রূপসীর চোখে ?
শুকায় না ক আঁখির পাতা,
তরুণ প্রাণে এমন ব্যথা
কোন প্রাণে রে কে দিলে গাে ওকে।
বালির পাঁজর ঠুনকো হিয়া
কে ভাঙিল আঘাত দিয়া ?-
কে দেখালি হৃদয় খুলে’ ওরি।
বেদনা অশ্রুময়ি,
কা’র বিরহে কাতর অয়ি,,
নয়ন-জলের কে তুই ভরাভরী!
!
কহলার
বুকের নীচে পাথর ঠেকে,
তবু আশার স্বপন দেখে,
পাথর ঠেলে উধাও চলে মেয়ে ;
উপল-ঘায়ে রোদনভরে
বিরহেরি টনক নড়ে,
জাগায় ব্যথা স্মৃতির অলপ্পেয়ে
মনের কথা যাচ্ছে শােনা,
বুকের
উপল যাচ্ছে গােনা,
মুখের ছায়া আঁখির দরপণে ;
এমন সরল কমলটিরে
কে ভাসালে নয়ন-নীরে ?
হায়, প্রণয়ীর দরদ নাহি মনে !
শব্দ নাহি, নাইক সাড়া,
একটি
শুধু চোখের ধারা
দিন যামিনী এমনি করে ঝরে ;
একটি শুধু গানের লীলা-
একটি ব্যথা অন্তঃশিলা
আবেগভরে উছলে খালি পড়ে ।
কলার
মৌনতারই নিঝুম সুরে
একটি কথা বেড়ায় ঘুরে,
উপত্যকায় তাকায় মিছে আশা ;
দিন দুপুরের জলুস আলাে
অন্ধকারে মুখ ফিরাল,
গুমরে মরে অবুঝ ভালবাসা !
টুনটুনিরা ঘুটি পরে
রাখতে বৃথা চেষ্টা করে
ক্ষুদ্র নখের ক্ষুদ্র স্নেহ-কণা !
জলকে এসে ফিল নারী,
চকে উঠে কাঁখের ঝারি,
মিলায় পায়ে শায়ার আলিপনা।
ন
ছড়ের জলে এলায় আসি
রবির আলাে চাঁদের হাসি,
সজল করে শুধুই আঁখি-পাতা
সুখের কথা-কান্নাভরা,
সান্ত্বনা তার—অশ্রু-ছড়া,
পরাণি যার ব্যথার রেশে গাথা।
৩৭
কহলার
একটুকু ও কলকলানি,
একটুখানি ধড়ফড়ানি,
শিলায় শিলায় একটু লুটোপুটি ;
সুখ-পেয়ালার শেষ তলানি,
তােরেই আমি মিষ্টি মানি,
তােরই তরে এ মাের
গড়িয়ে গেছে কোথায় জানি
এই পরাণের আধেকখানি-
ওই নয়নের আগ ফোটাতে তাের।
পিছ ফোটাতে পিছিয়ে পড়ে
কোথায় যেন কাদছে ওরে,
আধেক হিয়া-লাে সরযূজোর!
স্নেহের আকর্ষণ
তপােবন ছাড়ি যাইতে আমার চরণ উঠিছে কই ?
সকল স্নেহের মােহটি ভাঙিয়া কেমনে সুদূরে রই।
উতলা পরাণ যদিও আমার আর্যপুত্র লাগি,
তপােবনে আজি এ দশা নিরখি’ কেমনে বিদায় মাগি ?-
ভাবী বিরহের শায়ক-বিদ্ধ ক্ষুঃ বন্য পাখী,
বন-জ্যোৎসনা কোথা সে-সােহাগ মুকুলে রেখেছে ঢাকি’!
অথির হরিণ থির ম্রিয়মাণ, স্তব্ধমত্ত খেলা,
মুখ হ’তে পড়ে, আহারে এতেক হেলা!
মুকুলের স্বাদ বুঝি বিস্বাদ লেগেছে পিকের কাছে,
ময়ুর ময়ূরী নাচ গান ছাড়ি’ অভিমানে নাহি বাঁচে।
মধুপের দলে কোথা সে তিয়াস, কোথা সে আকুল গান।
তপােবন-তরু-বিষাদ হেরিয়া কাঁদিয়া উঠে যে প্রাণ।
কুটীরপ্রান্তে সাধের হরিণী আকুল চাহনে চাহি’
নিরখে বদন, পূর্ণ-গর্ভা,পলকে নিমেষ নাহি।
মুখের নীবার
কহলার
কত দিন তা'রে করেছি যতন কিসে অবসাদ ঘুচে,
তুষেছি কত না শম্প পাতায় যখন যা মুখে রুচে।
নাহি দেরী আর প্রসবের তা’র, নধর শাবক হবে,
হেরি’ তাহারে কি জানি প্রবাসে কেমন পরাণ র’বে ।
অঞ্চল টানি’ গমনের পথে কাঁটা দেয় মরি এ কে ?
কোথা যাই বল, চোখের আড়ালে বুকের দুলালে রেখে
আমারি বাছনি এ মৃগশাবক, নহে এ মাতৃহীন,
সেটুকু অভাব জানিতে ইহারে দিই নি ত কোন দিন।
স্নেহের ছায়ায় জুড়ায়েছি এর সরল কোমল হিয়া,
মুখের ক্ষতটি আরাম করেছি ইঙ্গুলী তেল দিয়া।
পূজার কুসুম, যজ্ঞের ফল, শ্যামল শ্যামাক কত
আপনার করে খাওয়ায়েছি এরে ক্ষুধায় নিয়ম মত।
‘মালিনী’র নীরে দুগ্ধে ও সরে নিদাঘের তৃষা হরি’
ভাদর মাসের প্রখর আতপে রেখেছি বক্ষে ধরি।
কেমনে সকলে রাখি’ অসহায় সুদূর প্রবাসে রই ?
তপোবন ছাড়ি যাইতে আমার চরণ উঠিছে কই
৪০
প্রিয়ার প্রথম মধুর পেলব তার সকল প্রথম, মধু তার রহে চিরদিন। পরাণের তৃষা হরি’ স্মৃতির মাঝার বেজে উঠে অতীতের বীণ। নয়নের বিনিময় চাহনি প্রথম বিজলীর সে কি আলােড়ন ! করে কর-প্রদানের প্রথম পরশ- বরষার নব বরিষণ ! কুসুম-শমনে তার প্রথম কথন- সে যে মাের বারি তিয়াসার ; শরৎ-প্রভাত সম মিগধ মধুর প্রথম সে হাসিটুকু তার ! ৪১
কহলার
পেলব-প্রসূন চেয়ে দু’পর নিশার
তাহার প্রথম অভিমান,
দ্রাক্ষার মধু রস—প্রথম তাহার
অধরে অধর-প্রতিদান।
ফুলের শিশির প্রায় করুণ মধুর
তাহার প্রথম আঁখিজল,
প্রথম প্রকাশটুকু করিতে গােপন
বচনের কি সরস ছল !
মােহের মদির-ভরা প্রথম তাহার
কমনীয় ‘প্রিয়তম’ ডাক,
তাহার প্রথম চিঠি বিরহে ক্ষণিক
আঁকি দেয় মিলনের আঁক
কালিকার ফোটা ফুল আজিকে শিথিল,
পরিমল-হারা, মধুহীন !
মধুর, পেলব তার সকল প্রথম,
মধু তার রহে চিরদিন।
8२
সন্ধ্যার আশা
নিত্যি বিয়ানে কাজ পড়ে মাের সােণালি ডাঙার মাঠে,
হাল ব’তে আর ভূইটি নিড়াতে সারাটি সকাল কাটে।
সার দিয়ে মাটি করি পরিপাটি—তাইতে সুফলা জমি,
মই দিয়ে ভুই পাট করি মুই, চেষ্টার নেই কমি।
ক্ষেতের আগাছা উপাড়িয়া ফেলি, গাছের যে তেজ হবে,
দুনি ক'রে জল ছেচে’ দেই মাঠে-মেঘে জল নাহি রবে।
দুইটি বলদ এমনি আমার আ-দুপুর তারা খাটে,
মাথার উপর সূয্যি উঠিয়া মাথার দিটি ফাটে।
সকল অঙ্গ কর্মে ঘৰ্ম্মে রদ্দরে উঠে নেয়ে—
সকল কষ্ট কষ্ট না মানি সন্ধ্যার পথ চেয়ে !
বলদে নাওয়াই, আপনিও ‘নাই’ কাছের পুকুরটিতে,
ভিজে চাল দু’টি শুধু মাের পুজি পিত্তির মুখে দিতে।
মেয়ে আনে ভাত গাছের তলায় তা’তেই মিটাই ক্ষুধা,
মা’র কোলে বসে মা’র মােটা ভাত মনে হয় যেন সুধা
৪৩
কহলার
মুখে গুজে’ ভাত চাষ-কাজে পুনঃ নিবেশ করি গাে মন,
রােদে জলে মাের ও সুধার লাগি’ এতখানি আয়ােজন।
বেলা চাই আর কাজ করে যাই, ’তেই জীবন বাঁচে
প্রিয়ার আদর, শিশু-হাসি যেন লাল মেঘে-ভরা আছে।
পাখী দলে চলে মৃদু কলকলে কি আশার গান গেয়ে !
সকল কষ্ট কষ্ট না মানি সন্ধ্যার পথ চেয়ে ।
৪৪
নন্দোৎসব
সারা ভারতের সুখ-উৎসব
আজি গােয়ালার গৃহে রে !
ধেয়ে চলে তারা মহা আনন্দে
বাঁকে ক্ষীর ছানা নিয়ে রে।
কা’র মুখে দিবি ননী ছানা তােরা।
কোথা সে গােপাল, কোথা ননীচোরা ।
আজিকার দিনে এমন করিয়া
র’ কার পথ চেয়ে রে।
আসে কি গােপাল ? বাঁধা যে দুলাল
গােয়াল, তােদের মেহে রে।
৪৫
কলার
কটিতে তােদের হলুদ বসন,
বাকে পীত ধড়া ঝুলায়ে
মত্ত হরষে বেড়া মাতিয়া
কা’র মনটু ভুলায়ে !
তালের বড়া ও পরম অন্ন
সাজাস্ ও তােরা কাহার জন্য ?
রাখালের এঁটো ফলটি গােপাল
নিত যে দু হাত আগায়ে,
গােপের হৃদয়—ব্রজের মাটিতে
আছে সে পা দুটি বাড়ায়ে ।
কালাে ছেলে নয়, কেলে সােণা,—তা’র
বিরহে আঁধার মথুরা ;
যমুনার কূলে তিতে আঁখিজলে
ব্রজের ঝিয়ারি বধুরা !
বদ্ধ কারায় নিপীড়িত মন—
মুক্তির লাগি’ সদা উচাটন,
হৃদয়ে হৃদয়ে ফণা বিথারিয়া
গরজে পাপের গােখুরা !
কালিদহ আজ পৃথিবী অখিল
বিষে জরজর আতুরা !
৪৬
কহলার
কচি দুই হাতে কে তুমি ভাঙিলে
কারার লােহার শিকলি !
হাসির ধারাটি কে তুমি পড়িলে
গােকুলের কুলে
উছলি’
সরলতা আর বিশ্বাসখানি
গােপের হৃদয়ে কে দিলে গাে আনি’,
প্রেমের ফন্তু কে তুমি বহালে
গােপিনীর হিয়া উথলি’!
ব্রজের গােপাল, নন্দ দুলাল,
যশােদার প্রাণ-পুতলি !
দুধের কেঁড়েটি, দ’য়ের হাঁড়িটি,
ননীর পাথর বাটি রে,
কচি আঙুলের দাগমাখা যেন
তােদের সকল গা’টি রে!
আজো যেন কোন গােপের বহুড়ী
দেখে যদি কেউ করে ননী চুরি,
উদুখলে আর বাঁধিবে না তায়,
করিবে গলার কাঁটি রে!
যেখানে গোয়াল সেখানে গােপাল,
সেই সে ব্ৰজের মাটি রে!
৪৭
কলার
সারা ভারতের সুখ-উৎসব
আজিকে গােপের ভবনে!
মধুর মুখর করিতেছে তারা
আজিকার মধু লগনে।
লাখো গোয়ালার বাৎসল্যে রে
লাখােটি গােপাল হামা দেয় যে রে,
আজিকে গােকুল দেখি সব ঠাই,
গােকুল-সারাটি ভুবনে
যশােদা, তােমার এসেছে গােপাল,
নবনীত দাও বদনে।
৪৮
কর্পের প্রসার প্রথম বসন্ত-দিনে বন-পথে চলে মনমথ। মলয়ে মদির-নেশা,ফুলকুল চরণে প্রণত। কুহক-কাজল-টানা—আকর্ণ সে দু’টি আঁখি-পাতে ফুলের ধনুকখানি, খর প্রেম- পুষ্প-শর হাতে ! পিক-কণ্ঠে বল্টে নিতি সুললিত প্রেমের প্রলাপ, রক্তাধরে চুম্বিয়া সে প্রতিরাগে রঞ্জিছে গােলাপ ! যৌবনেরি মধুরিমা ফুলে ফুলে বনে বনে ঢালা, মনমথ চলে পথ,কামনার উভ তীর আল! ৪৯
কহলার
অনুরাগে ধােওয়া ফুল-পথ পাশে
ফুটে কত ঘূথি,
নিরজন বন-পথ—সুনীরব
একান্ত নিশুতি।
সেদিন গাছের ডালে সেই সবে
পিক ডাকে কুহু’
বিরহীর ব্যথা যেন গুমরিয়া
উঠে ‘উহু-উহু’!
যুথিকার যত কথা গুন্গুনি’
বােরার কাণে
সেদিন শুনাল অলি,—কামদেব
শরের সন্ধানে
তুলিল ধনুকখানি—বায়ু গেল
মমম্ করি,
বাখানিল কত কথা মুকুলের
চাপা মন হরি’!
=
মুকুল তুলিল মুখ,-খুলে গেল
গুণ্ঠনখানি,
বনস্থলে কত ভাষা—কত কথা
হয় কাণাকাণি ।
মধু চেয়ে মিষ্ট আছে প্রজাপতি সেই দিন বুঝে, সেই দিন পােড়া মন অপরের মন মরে খুজে’! আপনার ছায়া দেখি সেই দিন ভেবে মরে মন, দোসর করিব এরে ইথে মাের করেছি মনন ! কারাে মুখে হাসিবারে, কারাে দুখে লুটাইতে হায়, কি জানি কি কথা মন বারে বারে জানাইতে চায় । গােলাপ-বনের কাছে মনমথ দাড়াল কৌতুকে, তুলে নিল ধনুখানি, খোঁজে ফুল- শর হাসি মুখে ! সেই পথে চলে বামা-মধুময়ী, মদালস আঁখি, গােলাপী অধরে তার সােহাগের ঢেউ মাখামাখি --- গােধূলি আঁচলে বাধা, রূপসীর আলােকরা রূপ- মদনের আঁখি-পাতে যেন সেই করিছে বিদ্রুপ। চকিতে বকুলমালা খোপা হতে খসে গেল পড়ি, স্তনের উশী-লেপ কোথা দিয়ে কোথা গেল ঝরি’! নােয়ায়ে গােলাপ-শাখা চারু হাতে হৃদয়ের পর দেখে বামাসবে না সে তরুণীর প্রণয়ের ভর! মদনের শর চেয়ে খর শর রমণীর চোখে, শাণিত সে আঁখি-বাণ গেল ছুটি বিজলী-ঝলকে! মনমথ-হিয়া ক্ষত করিল সে- আঁখি পালটিতে, বিস্ময়ে মদনদেব চেয়ে র’ল কুণ্ঠাভরা চিতে। ৫২
কইলার
লয়ে ফুল-ধনু শর, অর্ঘ্য দিয়া
পদে তরুণীর,
চোরা ধন ফিরে চায় কামদেব
পায়ে কামিনীর।
কর্প, আমার নাম রতিদেবী-
হেসে কয় বামা।
মনমথ কহে, ‘প্রিয়ে, চমকিত
করিয়াছ আমা!
-ধনু কি মনােরম ! পুষ্প-ধনু
ছার মনে হয়!
খর আঁখি-শর কাছে ফুল-শর
কিছু নয়-নয় !
ত্যক্ত ফুল-ধনু শর লুকাইছে
লাজে মরি মরি,
সু9, তব টানা ভুরু, মােহনীয়
দিঠিতে, সুন্দরি !
মদনের এই জ্বালা, এ বিরহ,
এই ব্যথা সখি,
যেন আমি ত্রিভুবনে-জনে জনে
নিখিলে নিরখি।
বসন্তের কোন্ পাখী অবিশ্রান্ত
ওই মরে কেঁদে!
রতি কহে, ‘আপনারি তীর সখা,
আপনারে বেঁধে।
শিশিরে-স্খলিত পাতা গােলাপের
ছড়ান চৌদিকে,
বিরহের ব্যথাটিরে দিকে দিকে
কে রেখেছে লিখে।
স্নিগ্ধগন্ধ শৈবালের মখমলে
বসিল সুন্দরী ;-
ফাগুনে আগুন-জ্বালা কে ছড়াল
মুঠা মুঠা ভরি’!
মনমথ অনুরাগে চুমিল সে
বুতির অধরে,
শত চুমা হাহাকার করে উঠে
নিখিল-অন্তরে।
৫৪
জ্যোৎস্নালােকে
আজি
বুঝি
জ্যোছনা মধুর-হাসিটি বিধুর
উছলিছে গগনে।
দুলােক ছাপিয়ে পুলক আজিকে
নেমে এল ভুবনে।
খুলে ফেল প্রিয়ে, অবগুণ্ঠন,
পড়ুক নয়নে চন্দ্র-কিরণ,
ঘুচে যাক্ আজ লাজ-আবরণ
দু’টি তব নয়নে।
জ্যোছনা মধুর হাসিটি বিধুর
উছলিছে গগনে।
হের,
কলার
কোথা
বুঝি
ডাকিছে বিহগ কানন-চূড়ায়
ওই শােন ভামিনি,
পরাণ-ছাপান উচ্ছাসে তার
আকুলিছে যামিনী।
রজনীগন্ধা মাধুরী-নেশায়
রূপের অধরে অধর মেশায়,
আঁখির কথার অাক পড়ে তার
দুরন্ত পবনে।
জ্যোছনা মধুর হাসিটি বিধুর
উছলিছে গগনে !
আজি
যদি
=
রজত-ধারায় ধুয়ে গেল ওগাে,
সুনিবিড় তমসা,
যামিনীর বুকে জ্যোৎস্না-আলােকে
উপচিল ভরসা,
কেন পুষে থােও অভিমান আর,-
গােলাপ-পাতায় নাহি আঁধিয়ার,
চোখে নাহি লাগে ব্যথাটি কাটার
পুলকের প্লাবনে!
জ্যোছনা মধুর হাসিটি বিধুর
উছলিছে গগনে।
আজি
কার বুঝি শিশির ফোঁটাটি উজ্জ্বল বড়, ঢল ঢল রভসে, চক্ষের জল উথলি উঠিছে। সুবিপুল হরষে ! ক্ষমা কর মাের যত অপরাধ, ভুলে যাও প্রিয়ে, বাদ প্রতিবাদ, মেঘ ঠেলি’ ওই হেসে উঠে চাদ উজ্জল বরণে ! কিবা জ্যোছনা মধুর হাসিটি বিধুর উছলিছে গগনে ! গোটা কর্ণের মূলে ঝুমকা জবার দুল দু’টি দুলায়ে, মধু পূরণিমা রক্ত অধর- প্রান্তরে লুটায়ে ! নিখিল ভুবন সরসীর জলে একটি ফোটায় আজি ঝলঝলে, সব ধরা ছোঁয়া সব বুকে নেওয়া একখানি স্বপনে! ছালােক ছাপিয়ে পুলক বুঝি রে নেমে এল ভুবনে! আহা, ৫৭
পুণ্যশ্লোক
নিভে গেছে হােমের আগুন, হােমের ফোঁটা রইল স্মৃতি।
থেমে গেছে মন্ত্র-ধ্বনি, রইল প্রাণে ছন্দ-প্রীতি।
চলে গেছে সেই অমানুষ ছড়িয়ে তাহার কীর্তি-মালা,
বুকের কোণে আঁধার থুয়ে নিভে গেছে হঠাৎ আলা !
ছিড়ে গেছে তুলােট পুথি, ভাগবতের একটি পাতা,
ভেঙে গেছে কেমন করে নারায়ণের রূপার ছাতা।
কৰ্ম্মযােগের ভাষটুকু লােপ পেয়েছে জগৎ থেকে ।
অনুষ্ঠানের উদাহরণ গিয়াছে সে ধরায় রেখে।
জ্ঞান তাহাকে ভক্তি দেছে, ভক্তি দেছে জ্ঞানের আলো,
কৰ্ম্ম তাহার স্পৃহাবিহীন—তিনটি তারে পথ দেখালাে ।
কৰ্ম্ম, জ্ঞান আর ভক্তি—এ তিন পথ মিশেছে যেখানটিতে
সেইখানে সে গেছে চলে মােক্ষ-ফলের প্রসাদ নিতে।
* ভাগলপুর টি, এন, জুবিলী কলেজের ভূতপূর্ব প্রিন্সিপাল স্বর্গীয় হরিপ্রসন্ন
মুখখাপাধ্যায় এম-এ, বি-এল মাতুল মহাশয়ের স্মৃতির উদ্দেশে।
কলার
জলের কলস ভেঙে গিয়ে গঙ্গাজলে জল মিশেছে।
ঢেউয়ের মায়া গুড়িয়ে গিয়ে সিন্ধু-বুকে থির হয়েছে !
কে দিয়েছে বোধন-ঘটে ভাসিয়ে আজি অতল জলে ?
মিটমিটিয়ে স্মৃতির প্রদীপ জ্বলছে মােদের চিত্ত-তলে!
ছিড়ে গেছে তুলােট পুথি, ভাগবতের একটি পাতা,
ভেঙে গেছে কেমন করে নারায়ণের সেবার ছাতা!
৫৯
তাজমহল
অশ্রুভরা কানায় কাণায়
শিল্প-সেরা তাজ,
দুখের উপর দুখের বােঝ,
শােকের শত ভাজ।
সাজাহানের জমাট ব্যথা,
চোখের গাঢ় জল,
ভালবাসার শেয়া কাটা,
প্রেমের পরিমল !
নিবিড় মায়া পরাণ-ছাওয়া,
আপন ভােলা রূপ,
দুখ-মহলের এ তাজমহল
বুকের পাষাণ,প!
কলার
মৰ্ম্ম-ছেড়া রক্ত-সাগর,
ডাগর করুণ আঁখি,
মন-চোয়ান হাহাকার এ,---
আলিঙ্গনের রাখী ।
জাগরণে—সুখের স্বপন,
আঁটালাে সৌরভ,
বুকের কাছে সহজ দাবী,
গচ্ছিত বৈভব।
জ্যোমা-মাখা মিনারগুলি-
ছছলে ওই চোখ,
তিনটি ভুবন ছাড়া ওগাে,
এ কোন্ কল্প-লােক !
সাজাহানের পাঁজর হাড়ে
এই সমাধি গাঁথা,
গম্বুজটি--প্রণয়-হিয়া-
ফেনান শ্বেত ছাতা !
প্রণয়ীর এ কোমল বুকে
কমল-আনন ঢাকা,
সৰ্বশেষের চুমাটি এই
করুণ-সােহাগ মাখা !
কা’র গড়া এ সােণার শিকল অঢেল টাকার মূল- বাঁধূতে ফিরে আস্ চিড়িয়া, সােহাগী বুবুল ! ব্যথার উপর জমিয়ে ব্যথা গেঁথে গেঁথে তােলা বক্ষ-ভাঙা ধড়ফড়ানির অশ্রুর হিন্দোলা । গুলাব বনের গন্ধে বিভােল— উদাস এ যে শুধু ! সব হারানাের মধ্যখানে বিশ্বজোড়া ধূধূ! নিবিড় মায়া পরাণ-ছাওয়া, আপন-ভােলা রূপ, দুখ-মহলের এ তাজমহল বুকের পাষাণ-তূপ!
শ্রাবণের বাদলে
শাঙনের পশলায় পশলায় বর্ষণ,
ঝিঝিদের নহবৎ, ভেকেদের পাৰ্বণ !
সারাদিন ধরে জল–ফিফিস্ ফিফি,
হয় লাজ ছয়লাপ বর্ষায় চৌদিশ।
সব ঠাই আজ ওই এক সুর, এক তান,
ধনুকের ছিলাতেই তাই এই জোর টা।
বিদ্যুৎ ঝঙ্কায়, রূপ তাের চায়,
সুরা করে দে উজাড় অধরের পেয়ালায়।
কচুপাতে জলটুকু—দুখ-সুখ টষ্ট!
দু’দিনের সুখ-দুখ, দু'দিনের সম্বল।
ভেজে ফুল বিকুল,—ওর নেই গন্ধের,
যৌবন চঞ্চল—শুধু দুই দণ্ডের।
৬৩
কলার
কাড়াকাড়ি করে প্রাণ কদমের খােসবাই,
বুক পরে সুখ পেয়ে ফিরে তারি মুখ চাই।
বিদ্যুৎ ঝকায়, রূপ তাের চায়,
সুরা করে দে উজাড় অধরের পেয়ালায়।
বাদলের জল-ছাট, ভিজে মাটি-সৌরভ,
স্মিরিতির দ্বারে আনে পীরিতির গৌরব।
চারিধার আঁধিয়ার-অরূপের রূপ এই,
বাহিরের জানালােনা সারা এক নিমিষেই।
বাসি ফুলে গাঁথ মালা, শােনা কথা বল্ ফের,
অতীতের মধু ঢালা-সখি, তার দাম ঢের।
বিদ্যুৎ ঝকায়, রূপ তাের চায়,
সুরা করে দে উজাড় অধরের পেয়ালায়।
কেঁকে এল জল খুব, ঢাকা পল ঝাউবন,
লাখ কথা কয় আজ এক রতি চুম্বন!
ঘ্রাণে তাের খোঁজ পাই, রস তাের প্রেম দেয়,
পরশন মনটু বার বার দেয় নেয় ;
৬৪
কহলার
দিক্ নেই, কুল নেই,-ঘন মেঘ ঘােতর,
মনে হয়, ধরা আজ কাছ টিতে—বুক পর ;
বিদ্যুৎ ঝায়, রূপ তাের চায়,
সুরা করে দে উজাড় অধরের পেয়ালায়।
নােলক
কে তুমি আমারে কহ,
রে ক্ষুদ্র মােলক,
কে তুমি মানস-চোরা,
ঝলকিছ নয়ন-পলক ?
নহ এক রতি
রহস্য প্রচুর তব
রে উজল মােতি ।
কে তুমি ?—তুমি কি কোন
বালিকা-বধুর
ফুল-শয্যার সেই
প্রণয়ের পরশে মধুর
ঠোট দুইখানি
বেষ্টিত-জড়িত সুপ্ত
মৌন মধু বাণী !
কে তুমি ?
তুমি কি কোন
রাজ-প্রেয়সীর
ক্রনে মুকুতা-ঝরা
নির্বাসিতা সতীনের ঝির
অশ্রু এক ফোঁটা,
উছসিত উথলিত
ব্যথাখানি গােটা !
অশ্রু নহ, অশ্রু নহ,
তুমি যে পুলক,
সুরসিকা অঙ্গরার
অন্তরের সুখের দোলক,
তরঙ্গ নাচের
কোন্ পারিজাত-বনে
মধু উৎসবের!
অথবা প্রেমের জ্যোতি
রতির চোখের,
মূরছিয়া আছ তুমি
যখন সে ভােলা মহেশের
৬৭
কহলার
কোপে বর-তনু
ছাই হ’ল-ভস্ম-শেষ
হ’ল ফুল-ধনু!
কিম্বা বঙ্গ-বধূটির
শুভ্র লাজখানি,
রাঙা হয়ে উঠিতেছ
ওষ্ঠ-পুটে বুঝি অনুমানি’
দয়িতের পাণি
সহসা ঘেরিছে সেই
বক্ষে নিতে টানি।
আঁখি-সিন্ধু-বিমর্থিত
লল ধবল মােতি,
ছেলে-খেলা-খেলে গেছে
কিছুক্ষণ বুঝি লক্ষ্মী-সতী
নধর অধরে
প্রবালের দ্বীপে বসি’
প্রফুল্ল অন্তরে।
কলার
সাতটি কড়ায়ে তব
পূরিত অমৃত ;
দৃষ্টি-ভােগে মিষ্টি তুমি,
আজ আমি বড় যে তৃষিত ;
আঁখির পলক
ফিরাতে-ফিরাতে নারি
আমি রে মােলক।
আগমনী
ওই দেখ নাথ, শরৎ এসেছে
দুগ্ধের ঢেউ মাখি,
কাশের গুচ্ছ—শাদা মেঘগুলি
ফেলে নদী কূল ঢাকি।
কেটে গেল গােটা একটি বছর,
তিনটি দিনের দাও অবসর,
মাতার আনন, পিতার চরণ
কেমনে না দেখে থাকি
স্বর্ণের রথে শরৎ এসেছে
দুগ্ধের ঢেউ মাখি।
।
৭০
কলার
পথ চেয়ে চেয়ে বসে বসে মাল
ফেলিছে আঁখির লাের।
বৈরাগী তুমি, কেমনে বুঝিবে
মরমের ক্ষত মাের?
পাষাণ বাপেরও গও বহিয়া
অশ্রু-নিঝর পড়িছে ঝরিয়া,
প্রাণ-মন সারা বেঁধেছে যে তারা
দিয়ে শােণিতের ডাের।
পথ চেয়ে মাতা দিন গণে আর
ফেলে নয়নের লাের।
চাল-কড়ি দিয়া শােধ কি গিয়াছে
জনকের সেই ঋণ !
মায়ের মুখটি মেয়ের মনে যে
পড়িতেছে নিশিদিন।
হিমালয়-পথে, ঘাটে, বনে, গাছে
শত পাকে মন জড়াইয়া আছে ।
এখনাে বাহুতে রাঙা শাখা দু’টি
আছে সেথাকার চিন্!
চাল-কড়ি দিয়া শােধ কি গাে হয়
জনকের সেই ঋণ।
৭১
কলার
অভিমানী ফুল শেফালী ফু
লুটিয়া পড়িছে ধূলে,
আশা-অপেখায় ভারতবাসীরা
রয়েছে নয়ন তুলে।
শরতের হাওয়া শরতের গান
সাড়া দিয়ে যেন চেতাইছে প্রাণ,
মন্ত্র পড়িয়া হিন্দুরা করে
বােধন বি-মূলে।
অভিমানী ওই দুলালী শেফালী
লুটিয়া পড়িছে ধূলে !
বঙ্গদেশের কৃষককুলের
হরষের সীমা নাহি,
স্বর্ণ ক্ষেতের আল-পথে তারা
ফেরে আগমনী গাহি'।
মাের অন্নের থালা নিয়ে তারা
বণ্টন করে ঘরে পাড়া পাড়া,
খালি হাতে শেষে কাঙালের বেশে
থাকে মাের পথ চাহি।
মাটির মানুষ কৃষককুলের
হরষের সীমা নাহি।
१२
কহ্নর
বুড়াে বরে পড়ে তাই হ’ল মােরে
এত দূর হতাদর,
মনে পড়ে সেই মায়ের কান্না,
আঁখি দু’টি ঝরঝ!
খাও গিয়ে ভা, মাখ ছাই গায়,
যাও যথা তথা যেথা মন ধায়,
তিন দিন তবু মায়ে ঝিয়ে দু’য়ে
জুড়াইব অন্তর।
বুড়াে বরে পড়ে’ জানি নে যে হবে
এতখানি হতাদর !
বাঙলা দেশের চাষা
মেঘ জানে গাে মােদের ব্যথা,
বৃষ্টি জানে মন,--
লক্ষ্মী-মায়ের পায়ে পায়ে
কাতর নিবেদন।
দেয়ার বুকে গুর গুরিয়ে
উঠে মােদের দুখ,
মেঘের মাথায় ঝলক দিয়ে
উথুলে উঠে সুখ !
চিত্ত ভরে মত্ত 'পরে
মেঘেরি ডাক শুনি,
আকাশ চেয়ে নূতন সনের
পঞ্জিকাটি গুণি !
৭৪
কলার
বাঙলা দেশের চাষা মােরা,
মেঘ তাকিয়ে রই,
মাঠের আলে ঠেকিয়ে মাথা
মনের ব্যথা কই।
লক্ষ্মী-মায়ের চরণ-তলে
আমরা বসত করি,
কনক ধানে-লেপ-পোছা
ধানের গােল ভরি।
পােষ-পার্বণ কোজাগরে
মােদের আঙিনায়
আপনাতে চরণ ফেলে
লক্ষ্মী দেখা দেয় !
পউষ মাসে লক্ষ্মী বঁধি
নতুন সােণা খড়ে,
সিদূর-কোটো কড়ি দিয়ে
লক্ষ্মী পাতি ঘরে।
বাঙলা দেশের চাষা মােরা,
মেঘ তাকিয়ে রই ;
মাঠের আলে ঠেকিয়ে মাথা
মনের ব্যথা কই।
৭৫
কলার
আর জানি নে দেবতা কোন,
শাস্তু জানি না ক’ ;
তােমার দু’টি রাঙা পায়ে
রাখ মােদের রাখ।
ক্ষুধায় যে-জন যােগায় মুখে
অন্ন দুই মুঠি,
তা’রেই মােরা দেবতা বলি,
তারই পায়ে লুটি।
বুকে তােমার মৈঘের স্নেহ,
কঁখে সােণার ঝাপি,
দাড়াও এসে মধুর হেসে
আলেরি কোল ছাপি’!
বাংলা দেশের চাষা মােরা,
মেঘ তাকিয়ে রই,
মাঠের আলে ঠেকিয়ে মাথা
মনের ব্যথা কই!
দেবতা নিয়ে সারা বছর
আমরা করি ঘর,
তারি পায়ে মােদের যে গাে
সকলি নির্ভর।
কলার
বারি মােদের সুখের ঝারি,
মেঘটুকু সম্বল,
বলদ-গরু-মােদের বাছা,
ধন-কড়ি-ফসল ।
বুকজোড়া এই মাঠ আমাদের,
মন-ভরা মাগ-ছেলে,
জীবনখানি মিষ্টি মানি
দেবীর কৃপা পেলে !
বাংলা দেশের চাষা মােরা,
মেঘ তাকিয়ে রই,
মাঠের আলে ঠেকিয়ে মাথা
মনের কথা কই।
৭৭
মনের রীতি
মন, তুমি যে কেমন মানুষ
চেনা তােমায় যায় না ছাই।
আক্কেলে যে অবাক কর,
ধরা দেবার নামটি নাই ।
পাঁচ বছরের মেয়ের মতন
কোমর বাঁধ সকলটায়,
ক’ণে বৌএর মতন কেন
ঘােটা টান শেষ বেলায়!
আকাক্ষা সে বড়ই বেশী।
পার হতে পা’য় সমুদ্র,
সঙ্কোচ ও যে চরণ-তলে
ফুটায় শত কুশাঙ্কুর।
৭৮
কহলার
যৌবনের এ আগল হিয়া
পাগল রে তাের পাগলামােয়।
কোন্ কুহকী মন্ত্র পড়ে
চোখ দুটোতে হাত বুলােয় !
পড়েছিল কুঞ্জে সেদিন
পুষ্প-রথের চাকার দাগ,
বন-তােষিণীর অন্তরে গাে
নতুন
ফোটা
ফুলের যাগ ।
কোন্ পথে যে প্রণয় এল
নাইক তাহার কিছুই ঠিক
চারটি চোখের মিলন নিয়ে
কোন্ বিজুলীর কোন্ ঝিলিক!
মাের হৃদয়ের কোন্ দেবতা ?
কে কবে তা’র গােত্র নাম!
পুছিলা তা অনসূয়া
এই অভাগীর মনস্কাম।
মনস্কামে কামনা নাই,
লজ্জাহীনা, থাম্ রে আজ।
মন, তােমারে চিনতে নারি
পড়ল মাথায় অনি বাজ !
৭৯
কলার
বকুল ফুলের গন্ধে ছােটে
পুষ্প-ধনুর তীক্ষ্ণ শর,
এলিয়ে পড়ে চুলের বেণী
শিথিল হয়ে পিঠের পর।
মন বলে, আয়, ফুলের কুঁড়ি
ফু দিয়ে ভাই, আয় ফোটাই,
কারাে চোখের আড়-কিনারে
দৃষ্টিটুকুন আয় লােটাই
কয় যদি সে একটি কথা,
চোখ মেলে চায় চোখ দুটোয়-
ছড়িয়ে দেব প্রাণখানিকে
ফাগের মত এক মুঠোয় !
কোন্ অতিথি এল গৃহে ?
‘চোখ গেল’ ওই উঠছে সুর
কুঞ্জ-ভূমির দিগ্বিদিকে
কাছ-কানাচে-অনেক দূর !
সেদিন ছিল কুঞ্জ-বনে
দখিণ হাওয়ার আকুল গান,
ভেঙেছিল বন-তােষিণীর
অভিমানীর গুমরখান।
রাজার ছিল হাতে ধনুক,
চক্ষে ছিল দীপ্ত শর,
বক্ষে আমার একটি কথা
জাগতেছিল নিরন্তর ।
মন কহিল, রাজায় যদি
একলাটি পাই একটি বার,
কল্পনারি মাল্যটিরে
দিই যে পায়ে অর্ঘ্য তার।
হরিণশিশু নিয়ে সখী
দিতে গেল মায়ের কাছ,
‘তাইত সখি, চলে বলে
কলি রে তুই কতই কাচ!
পূবে হাওয়ায় মেঘলা খেলা-
হেলা-ফেলার নয় সে দিন,
অথির মলের মুখর কথা
কেবল করে ঝিনিক্ ঝিম্ ।
মাধবী সেই আঁড়ে ছিল
ছায়া-নিবিড় শাল, পিয়াল,
পরশটুকু সরস বড়
খামখেয়ালির খােস্ খেয়াল।
৮১
ভূতল হ’তে কুড়িয়ে নিয়ে
দুষ্মন্তু ফুল-বলয়
পরিয়ে দিতে কর দু’টিতে
রক্ত হ’ল গণ্ডদ্বয়।
ছিছিতে মন পূর্ণ হল, : .
অন্ধ হ’ল চক্ষু দুই !
কোন্ হেঁয়ালির মানসী-মন,
কোন্ খেয়ালীর কন্যা তুই।
তুই বুঝি কোন্ রাজার মেয়ে,
খেয়াল ভরে পা ফেলি,
তর্জনীটি হেলিয়ে শুধু
হৃদয় নিয়ে তুই খেলি।
ইশারা তাের বেরা নয়,
সব দিকেতে তাল বাজায়,
চোখ-টিপুনির শাসনটুকু
তাের চোখেতেই বেশ মানায়।
কুরুবকে আঁচল বাধে,
চক্ষে পড়ে ছাই পরাগ,
আঁচল ছাড়ে, পরাগ উড়ে,
গও যে হয় অরুণ-রাগ।
২
কলার
যৌবনের এ আগল হিয়া
পাগল রে তাের পাগলামােয়,
কোন্ কুটোটি পড়ল উড়ে
আমার পােড় চোখ দুটোয়।
আশা
ওরে আশা, তুই
কুহকিনী !
ছলনার মেয়ে তুই,
রহস্যের চির প্রিয়া,
কপট লােভের তুই স্নেহের নন্দিনী ;
প্রতারণা কাজ তাের,
ধৰ্ম্ম তাের মিথ্যাচার,
বিলােল কটাক্ষপাত, ধিক মায়াবিনী
হেন জন কে আছে ধরায়
তাের মায়া-ফাঁদে তার বাড়ায় নি পা দুখানি?
ভাসায় নি গণ্ড দু’টি নয়ন-ধারায় ?
শুরু কণ্ঠ ভগ্ন বুকে,
সন্তাপিত ম্লান মুখে
মরে নাই কেঁদে কেঁদে তপ্ত সাহারায় ।
3
হৃদিহীনা বিশ্ববিজয়িনি, নিখিল জগৎজীব- ক্ষুদ্র ক্রীড়নক তাের, খেলাস তাদের ল’য়ে দিবস যামিনী। মুচকি হাসির নীচে গালে দু’টি কূপ আছে- পড়ে নি ত কারাে চোখে, বিশ্বাসঘাতিনি। বুক ফাটে, মেটে না তিয়াসা । আজীবন কেঁদেছে সে, আমরণ জ্বলেছে সে- মুগ্ধ অন্ধ করেছে যে তাের সে প্রত্যাশা। লােভানি দেখায়ে শুধু আলাইলি অগ্নি ধূ-ধূ— অভাগার চিতা-বহ্নি, রে নিষ্ঠুরা আশা। তাের খেলা সবই সর্বনেশে । কুহকের ইন্দ্রধনু কোথা যায় মিলাইয়া । তাসের ঘরটি ভাঙে চক্ষের নিমেষে। স্বপ্নের চমক ভাঙে, আশার পাশায় ও কি চাল পড়ে শেষে ! ৫
আশা কা’র মিটিছে কবে ?
বেঁধে চীর দুই চোখে গান্ধারী কেঁদেছে শােকে
কুরুক্ষেত্ররণাঙ্গনে রুধির-উৎসবে।
কম্বের পালিতা মেয়ে
মিছা আশা-পথ চেয়ে
ভাসায়েছে আঁখি দু’টি নিস্ফলনীরবে।
কবে কার আশা মিটিয়াছে ?
বহু পণ্যে ভরা তরী
পাঠাইয়া দেশান্তরে
বণিক সুখের কত স্বপ্ন দেখিয়াছে,
সেই তরী বহুক্ষণ
সিন্ধু-তলে নিমগন,
জানে না বণিক, স্বপ্নে আজো মুগ্ধ আছে।
করে কা’র মিটিয়াছে আশা ?
যু শয্যায় শুয়ে
আছে বুকে আশা থুয়ে,
ভাবে, সুস্থ হবে দেহ, কণ্ঠে পাবে ভাষা !
জানে না সে মৃত্যু-মায়া
বিছায়ে করাল ছায়া
একটি নিশ্বাসে তার বঁধিয়াছে বাসা !
১৬
কলার
মিটিয়াছে কবে আশা কার?
কঁদে নাই ভালবেসে জানি না এমন কে সে!
ভরে নাই আঁখি-কুন্ত সলিলে তাহার !
রূপসী ফিরায়ে মুখ
বিচূর্ণ করেছে বুক!
মিলে নাই প্রতিদান সে ভালবাসার।
তাই বলি তুই কুহকিনী !
অনন্ত লাভের ফেরে
ফিরালি সবারে তুই
অনর্থক,ক্রীড়াশীলা রস-রঙ্গিনী।
নির্দয়া নিষ্ঠুরা আশা,
বুক-ফাটা এ তিয়াসা
শুধুই বাড়াস তুই কপটচারিণি !
৭
No text on this page.
No text on this page.