Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Rajendra- Jibani Part 1, Ed. 1st

Bandhopadyay,abhayacharan · 2010/02/5

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

IN

PRINTED AND PUBLISHED BY N. MUKHERJEE, B.A,
AT THE ART PRESS
20. BRITISH INDIAN STREET, CALCUTTA

No text on this page.

রাজেন্দ-জীবনী
( প্রথম ভাগ )
শ্ৰীঅভয়াচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
এ. এ., সি-ই,
কর্তৃক সম্পাদিত
প্রথম সংস্করণ
[ মূল্য এক টাকা

No text on this page.

শুদ্ধিপত্র
পৃষ্ঠা
পংক্তি
অশুদ্ধ
৪
৪
২০
এ 2 2
১
তাহারা
স্বরস্বতীর
মাননীয়,
খুটিনাটি
মেঘক্তমূ
নিখুত
( ‘তাহারা লুপ্ত)
সরস্বতীর
মাননীয়া
খুঁটিনাটি
মেঘমুক্ত
নিখুত

No text on this page.

গ্রন্থকারের নিবেদন বঙ্গের বর্তমান অবস্থায়, ব্যবসায়-জগতের উজ্জ্বল তারকা ও আত্মচেষ্টার বিস্ময়কর সফলতার প্রতীকস্বরূপ ভারত- বিশ্রুত কৰ্ম্মবীর স্যর রাজেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়ের গৌরবময় জীবনী বঙ্গভাষায় প্রকাশ করিবার বিশেষ আবশ্যকতা আছে। এইজন্য মিষ্টার কে, সি, মহীন্দ্র প্রণীত ও ইংরাজীভাষায় সুলিখিত সর রাজেন্দ্রের ‘ব্যক্তিগত জীবনালেখ্য’ অবলম্বন করিয়া, রাজেন্দ্র-জীবনী (প্রথম ভাগ) বাঙ্গলা ভাষায় সম্পাদিত হইল। ইংরাজী- ভাষায় অনভিজ্ঞ বঙ্গীয় জননীবর্গের ও তাহাদের আশা-ভরসা-স্বরূপ পাঠনিত উদীয়মান বালকবৃন্দের উদ্দেশে, এই ক্ষুদ্র পুস্তক প্রধানতঃ নিবেদিত হইল। যদি ইহা পাঠ করিয়া কোন মাতার পক্ষে পুত্রের চরিত্রগঠনে ভবিষ্যৎ ভাগ্য-নিয়ন্ত্রণে কিছুমাত্র সহায়তা সাধিত এবং কোন উচ্চাভিলাষী বালক বক্ষ্যমাণ মহাপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া, নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়িয়া তুলিবার জন্য অনুপ্রাণিত ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়, তাহা হইলে আমার সমস্ত শ্রম সার্থক মনে করিব। হয়,

বঙ্গের ও বঙ্গীয় ছাত্রবৃন্দের চিরশুভানুধ্যায়ী শ্ৰদ্ধাস্পদ
মনস্বী স্যর প্রফুল্লচন্দ্ররায় মহাশয় অনুগ্ৰপূৰ্ব্বক তাহার
অননুকরণীয় সারগর্ভ ভাষায় এই পুস্তকের ভূমিকা
লিখিয়া দিয়াছেন, তজ্জন্য আমি তাহার নিকট চিরকৃতজ্ঞ
রহিলাম।
Marsman arajaraju
বালীগঞ্জ,
কলিকাতা।
মে, ১৯৩৪

ভূমিকা
“উদ্যোগিনং পুরুষসিংহমুপৈতিলক্ষ্মী
দৈবেন দেয়মিতি কাপুরুষাঃ বদন্তি।”
রাজেন্দ্রনাথের জীবনী তাহার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। শৈশবে
পিতৃহীন দরিদ্র বালককে দারিদ্র্যের সহিত সংগ্রাম করিয়া
আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করিতে হইয়াছে। গভীর আত্মবিশ্বাস,
অবিচলিত ধৈৰ্য, অদম্য কৰ্ম্মপ্রেরণা, সর্বোপরি আন্তরিক
সততাই তাঁহার সফলতার মূল। ব্যবসার কথায় যে সকল
বাঙ্গালীর ছেলে মূলধনের দোহাই দিয়া নিশ্চেষ্ট হইয়া
বসিয়া থাকে, রাজেন্দ্রনাথের জীবনী তাহাদের আদর্শ হওয়া
উচিত। তরুণ জীবনে মূলধন হাতে দিয়া রাজেন্দ্রনাথকে
কেহ ব্যবসা-ক্ষেত্রে পাঠায় নাই। সহায়মাত্রহীন তরুণ
যুবক বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত উচ্চশিক্ষা লাভ করিতে
পারেন নাই,তবুও যৌবনে ‘প্রাণ দিয়ে দুঃখ স’য়ে
আপনার হাতে যে ক্ষেত্র রচনা করিয়াছিলেন এবং তাহাতে
যে বীজ বপন করিয়াছিলেন, আজ তাঁহার পরিণত
বয়সে তাহাই বিরাট মহীরুহে পরিণত হইয়া সমগ্র জাতির
গৌরবের উপাদান হইয়া দাড়াইয়াছে। রাজেন্দ্রনাথ একজন

০
প্রকৃত কৰ্ম্মবীর, ব্যবসা ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে বাঙ্গালীজাতির
মধ্যে কেহই এ প্রকার সফলতা লাভ করিতে পারেন নাই।
বর্তমান পুস্তকখানি বাঙ্গালীজাতির
একটী প্রকৃত অভাব
মােচন করিয়া আপামর সাধারণকে রাজেন্দ্রনাথের কর্মবহুল
জীবনের অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করিয়া তুলুক ইহাই আমার
কামনা।
শ্রীপ্রফুল্লচন্দ্র রায়
৯২, অপার সারকুলার রােড,
কলিকাতা।
২৬-২-১৯৩৪

রাজেন্দ্র-জীবনী
প্রথম পরিচ্ছেদ
বাল্য জীবন
দিগন্ত বিস্তৃত ধান্যক্ষেত্রের মাঝে সারি সারি কুটীর,
কোন স্থানে দীর্ঘ তাল বৃক্ষের শ্রেণী কিম্বা আম্রকুঞ্জ,
কোথায় বা বাঁশ ঝাড়ের নীচে লতাগুল্মের ঘন সন্নিবেশ,
আবার তাহারই পাশে অনাবৃত স্থানে ছােট বড়
জলাশয়—তাহার তীরে দিবসের ঘটনা
জন্মস্থানের
পল্লী-চিত্র। আলােচনা করিবার জন্য পল্লীবাসী যুবা-
বৃদ্ধের সমাবেশ—ইহাই বাঙ্গলার পল্লীমাত্রের সাধারণ চিত্র।
যে ভ্যা গ্রাম স্যর রাজেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়ের
জন্মস্থান বলিয়া ধন্য হইয়াছে, তাহার প্রাকৃতিক চিত্রও
অবিকল এইরূপ। বাংলার যে হাজার হাজার গ্রামে
কৃষকগণ সমস্ত দিনের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর সন্ধ্যার
আগমনে শুধু একটু বিশ্রাম ও হয়ত বা ক্ষণিক তৃপ্তি
লাভ করে, গত শতাব্দীর মধ্যভাগে সেইরূপ একটি
সাধারণ ছােট পল্লী ভ্যালার অতীত গৌরবের পরিচয়

২ রাজেন্দ্রনাথ দিবার কিছুই ছিল না। কোন লিখিত বিবরণ না থাকিলেও শােনা যায় যে সেই সময়ে ভ্যাল্লায় অনধিক দুইশত কৃষক পরিবার ছিল। গত আশী বৎসরে ম্যালেরিয়ার প্রকোপে ইহাদের সংখ্যা অনেক কমিয়া গিয়াছে। কিন্তু এখনও ভ্যায়, অন্যান্য বঙ্গপল্লীর মত, মৌসুমী মেঘের ছায়া-শীতল সিক্ত চাদোয়ার নীচে পরিপুষ্ট নারিকেল ও তালবৃক্ষের কুঞ্জ, অতীত যুগের মতই, কম্পিত পত্রে মলমধুর বাতাস দিতেছে। আর আজিও সেখানে নানা বর্ণে চিত্রিত আকাশ, খেয়ালীর মত, গ্রাম্য লােকের সরল মনে বিস্ময় উৎপাদন করিতেছে। আশী বৎসর পূর্বে ভ্যাল্লায় দৈনন্দিন গ্রাম্য-জীবন- প্রণালী কি রকম ছিল তাহা বাক্যে চিত্রিত করা কঠিন কাজ নহে। বলিতে কি, অচল প্রাচী যেন ভারতের গ্রামে গ্রামে মূৰ্ত্ত হইয়া দেখা দেয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ কৃষক-জীবন। আমরা মানসনয়নে দেখিতে পাই যে সেই যুগে ভ্যালার কৃষকগণ প্রত্যুষে জাগিয়া উঠিয়া কিরূপভাবে নিজ নিজ মাদুরের বিছানা গুটাইয়া রাখিত। সূর্যোদয়ে পুরুষগণ তাহাদের স্বল্প-পরিসর জমিতে চাষে ব্যাপৃত থাকিত, আর মেয়েরা পুকুরঘাট হইতে জল তুলিতে, রান্নাঘর ঝাড়- পোচ করিতে, উনানে আগুন দিয়া তাহার উপর হড়ী বসাইয়া নিকটস্থ ডােবায় গা ধুইতে বা স্নান করিতে ব্যস্ত থাকিত। পূর্বাহে করণীয় কাৰ্য্যের ভিতর যে একটা রূপ ও আবেষ্টন সূত্রে বাল্যজীবন ছন্দ (rythm) আছে সে বিষয় কিছুমাত্র না বুঝিয়া, শুধু ধৰ্ম্মভাবে নারীজাতি প্রত্যহ সূৰ্য্য উঠিতে না উঠিতে নিত্যকর্ম আরম্ভ করিত। শিশুগণ তাহাদের নিস্পাপ কৌতূহলী চক্ষু খুলিয়া আশ্চৰ্য্য ও মুগ্ধভাবে আর একটি নব দিন আবির্ভা- বের মনােহর দৃশ্য দর্শন করিত—তাহাদের আনন্দ-ধ্বনিতেই বুঝা যাইত যে গ্রাম জাগরিত হইয়াছে। গ্রাম্য বালকগণ এ কালের খেলার আনন্দ উপভােগ করিবার কিম্বা অদ্ভুত ঘটনার ও বীরত্বের কাহিনী শুনিবার সৌভাগ্য লাভে বঞ্চিত ছিল বলিয়া, পুষ্করিণীই তাহাদের ক্ষুদ্র কর্মব্যস্ত জীবনে একমাত্র আনন্দ ও উত্তেজনা প্রদান করিত। সন্তরণ তাহাদের সব চেয়ে বড় খেলা ও সব চেয়ে অবিরাম শ্রমের ব্যাপার ছিল। এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি হইলে তাহারা মায়ের ভৎসনা মাথা পাতিয়া লইত। পাঠশালার গুরু মহাশয় তাহাদের আমােদে কোন বাধা দিতে পারিতেন , কেননা শুধু উচ্চবংশের বালকগণ গুরুমহাশয়ের শাসনাধীন ছিল। অপর দিকে, উৰ্বর উদার প্রকৃতি, অল্প শ্রমে বয়স্ক কৃষকদিগের জীবিকার আয়ােজন করিয়া দিয়া, তাহাদিগকে আলস্য-পরায়ণ, উদাস-দৃষ্টি ও “কূপ- মণ্ডুক” করিয়া তুলিয়াছিল। ভ্যালা গ্রাম, মহকুমার কেন্দ্র বসিরহাট হইতে প্রায় এক মাইল দূরে অবস্থিত। ইতিহাসে বা কিম্বদন্তীতে এই গ্রামের বিষয়ে কোন অতীত গৌরব-কাহিনী খুঁজিয়া ৪ রাজেন্দ্রনাথ ভ্যাবলার পুরুষ নিজ পাওয়া যায় না। এই স্বল্পায়তন গ্রামে প্রধানতঃ নিম্ন- শ্রেণীর কৃষক-পরিবার বাস করিত। মুষ্টিমেয় ভদ্র অধিবাসী এক আদালতের কাজ ছাড়া অন্য পেশা ভদ্ৰপরিবারের গৃহাশক্তি তাহারা জানিত না-কাহারও জানাইবার ও গ্রামানুরাগ। আগ্রহও ছিল না। গ্রামের কোন উদ্যোগী বা ভাগ্যবান্ সামান্য কৃতিত্বের লক্ষণ দেখিবামাত্র বসিরহাটে উঠিয়া যাওয়া লাভজনক মনে করিত—তারপর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হইলে দূরান্তরে চলিয়া যাইত। কিন্তু এইরূপ দেশান্তর যাওয়ার জন্য তাহারা পূর্বপুরুষের মূলধারা বা পৈতৃক ভিটা হইতে বিচ্ছিন্ন হইত না। ভ্যাবলা-পরিবারবর্গের অধিকাংশ হিন্দু। একান্নবর্তী পরিবারের জীবনধারা তাহাদের অস্থিমজ্জায় বসিয়া গিয়াছিল। অর্থ-সন্ধানে ধাবিত কোন ভাগ্যবান্ দূরযাত্রীর মাথায় কখন এ সঙ্কল্প আসিত না যে জন্মস্থান- গ্রামের সঙ্গে যে যােগ আছে তাহা বিচ্ছিন্ন করিতে হইবে। এই সমস্ত কারণে, যদিও ভ্যালার সুসন্তানগণ দেশময় ছড়াইয়া পড়িয়াছিল এবং উন্নত জীবিকা উপার্জনের উদ্যমে অল্পবিস্তর সৌভাগ্য লাভ করিয়াছিল, নিজ ভ্যাবলা, প্রায় বর্তমান সময় পর্যন্ত, সামান্য আবাসপূর্ণ সাধারণ পল্লীমাত্র ছিল। এইরূপ একটি পরিবারে, স্যর রাজেন্দ্রনাথের পিতা ভগবানচন্দ্র মুখােপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। উচ্চ ব্রাহ্মণকুলে ভগবানচন্দ্রের জন্ম হইয়াছিল এবং বাল্যজীবন চরিত্রের বিশেষত্ব। নিজেও তিনি নিষ্ঠাবান্ হিন্দু ও আদর্শ ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাহার বুদ্ধি ও কর্মশক্তি তাহাকে কৃতী পুরুষ করিয়াছিল। পিতা ও উন্নতিশীল মােক্তার বলিয়া বারাসতে তাঁহার জ্যেষ্ঠতাতের বিস্তৃত পসার জমিয়া গিয়াছিল। তিনি পার্থিব ঐশ্বর্য্যে ধনী হইয়াও আপনার মানসিক বা ধৰ্ম্মগত ভাবের কোন ব্যতিক্রম হইতে দেন নাই। প্রচলিত কুলপ্রথা ও সামাজিক পদ অনুসারে তিনি গৃহদেবতার নিত্য পূজা ও সেবা করিতেন। স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ও শিক্ষাবশতঃ তিনি একান্নবর্তী পারিবারিক প্রথার উপর বিশেষ শ্রদ্ধাবান্ ছিলেন। তিনি তাহার উপার্জিত ও সঞ্চিত প্রচুর অর্থের উপর পরিবারবর্গের সাধারণ দাবী স্বীকার করিতেন। স্বাভাবিক উদারতাবশতঃ তিনি স্বােপার্জিত অর্থের অধিকাংশ বাগান ও পুষ্করিণীসমেত বৃহৎ বসতবাটী নির্মাণে ও জমি কিনিতে ব্যয় করিয়া- ছিলেন। হিন্দুকুলাচারের নির্দেশ অনুসারে ভগবানচন্দ্রের চির- পােষিত কামনা ছিল যে তাঁহার বংশের ধারা চিরন্তন হইবে এবং তিনি একটি পুত্র সন্তান রাখিয়া যাইবেন যে তাহার অন্তিমে সমস্ত শাস্ত্রীয় ক্রিয়াকর্ম সম্পাদন করিবে ও বংশের জীবনপ্রণালী অব্যাহত রাখিবে। কিন্তু এ বিষয়ে তাহাকে বহুবৎসর নিঃসন্তান ও হতাশভাবে থাকিতে হইয়াছিল। তিনি পবিত্র ও উচ্চ ব্রাহ্মণকুলে রাজেন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করায়, কেবলমাত্র ধর্মের অনুশাসনের বশবর্তী হইয়া, বারবার চারিবার বিবাহ করেন। এরূপ বহুবিবাহ, আজিকার দিনে অসঙ্গত মনে হইলেও, অতীত কালের সমাজবিধি, ঘটনাসূত্রে ন্যায়সঙ্গত বলিয়া, কর্তব্যের মধ্যেই গন্য করিত। ভগবানচন্দ্রের তিন ভাই ছিলেন। তাহারা সকলেই একান্নবর্তী পরিবারে বাস করিতেন। ভগবানচন্দ্র রামনিধি মুখখাপাধ্যায়ের তৃতীয় পুত্র, এইজন্য পিতার পরলােক- প্রাপ্তির পর জ্যেষ্ঠ পুত্র আনন্দচন্দ্র পরিবারের কর্তার প্রাপ্য সমস্ত স্বত্ব ও শাসনশক্তি উপভােগ করিতেন। আনন্দচন্দ্র ভ্যাল্লায় পৈত্রিক বাটিতে থাকিতেন এবং ভগবানচন্দ্র ২৬ মাইল দূরবর্তী বারাসতে বাস করিতেন। তখনকার দিনের একান্নবর্তী পারিবারিক প্রথার শাসনপ্রণালী কত সুদৃঢ় ছিল, তাহা দেখাইতে হইলে ইহা বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে যদিও ভগবানচন্দ্র সকলের চেয়ে অনেক বেশী আয় সংসার খরচে দিতেন ( তিনিই পরিবারের মধ্যে একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন কিনা ঠিক বলা যায় না), তথাপি পারিবারিক ব্যাপারের নিয়ন্ত্রণ ও সমাধানে কনিষ্ঠ সরিকের মতই তাহার সামান্য মাত্র ক্ষমতা ছিল। তাঁহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আনন্দচন্দ্রের মেজাজ বড় রুক্ষ্ম ছিল—বাটীর কর্তা হইয়াও যে তিনি সংসার খরচের জন্য বিশেষ কিছু দিতে পারিতেন না এ জ্ঞান বােধ হয় তঁাহার মেজাজকে

বাল্যজীবন
৭
আরও কর্কশ করিয়া তুলিয়াছিল। একসময় ভগবানচন্দ্র,
আয়ের অল্পতাবশতঃ, আনন্দচন্দ্রের নিকট পারিবারিক
দুর্গোৎসবের খরচ কমাইয়া দিবার প্রস্তাব করিয়া বিষম
বিপদে পড়িয়াছিলেন, কেননা এরূপ বিষয়ে কনিষ্ঠের
প্রস্তাব জ্যেষ্ঠের নিকট অপমানসূচক উপদেশ বলিয়া গণ্য
হইয়াছিল। মহাপূজার দুই দিন আগে বারাসত হইতে
ভ্যালায় ফিরিয়া, ভগবানচন্দ্র তাহার সম্মুখে পৈতৃক
বাটীর সদর
দরজা বন্ধ দেখিতে পাইলেন। যতক্ষণ
পৰ্যন্ত জ্যেষ্ঠের মৰ্যাদা রাখিয়া ভগবানচন্দ্র বিনীত ভাবে
তাহার ক্ষমা প্রার্থনা না করিলেন, ততক্ষণ তিনি গৃহ
প্রবেশের অনুমতি পান নাই।
নিঃসন্তান অবস্থায় ভগবানচন্দ্রের প্রথম দুই স্ত্রীর
পরলােক গমনের পর তিনি তৃতীয় বার বিবাহ করেন।
কিন্তু তাহাতেও অনেক বৎসর তাহার আশা পূর্ণ হয় নাই।
অবশেষে নৈরাশ্যের তাড়নায় পুনৰ্ব্বার
বিবাহ করিলেন। ১৮৫৩ সালে তাঁহার
চতুর্থ স্ত্রীর একটি কন্যা হইয়াছিল। কিন্তু এক বৎসর
পরে, অর্থাৎ ১৮৫৪ সালে, তঁাহার তৃতীয় স্ত্রীর ৩৩৩৪
বৎসর বয়সে এমন একটি পুত্র জন্ম গ্রহণ করিল যিনি
উত্তরকালে শুধু যে ভগবানচন্দ্রের চিরপােষিত কামনা পূর্ণ
করিলেন তাহা নয়, পরন্তু বংশের নাম উজ্জল করিয়া যে
দেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন তাহাকেও.. গৌরবান্বিত
জন্ম।

৮ রাজেন্দ্রনাথ করিয়া তুলিলেন। ইনিই শিল্প-বাণিজ্যক্ষেত্রে সার্থকনামা রাজেন্দ্রনাথ। ভগবানচন্দ্র অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সে মৃত্যুমুখে পতিত হইলেন। তখন রাজেন্দ্রনাথের বয়স ছয় বৎসর মাত্র। বালক তখন জানিত না যে কী দারিদ্রের উদ্বেগ তাহার স্কন্ধে অর্পিত হইল। বিদ্যাদ্বারা অর্জিত পিতৃহীন বালক। অর্থে মনু-নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত অধিকার থাকা সত্ত্বেও, ভগবানচন্দ্র যা কিছু উপার্জন করিয়াছিলেন সমস্তই একান্নবর্তী পরিবারের ভাণ্ডারে গিয়াছিল। তঁাহার মৃত্যুর সময় রাজেন্দ্রের মাতার হাতে সামান্য কিছু টাকা ও দুই একটি রৌপ্যপাত্র মাত্র ছিল। কিন্তু তিনি ও তাঁহার পুত্র পারিবারিক সম্পত্তির চার আনা অংশীদার বলিয়া, আহার ও আশ্রয়ের জন্য আপাততঃ তাঁহাদের কোন কষ্ট হইল না। এত শৈশব বয়সে রাজেন্দ্র পিতৃহীন হইয়া- ছিলেন যে তখন তঁহার ধন ও দারিদ্র্য সম্বন্ধে কোন ধারণা করিবার ক্ষমতাই ছিল না। তিনি মায়ের একমাত্র সন্তান বলিয়া পিতার মৃত্যুর পর তাহার দৈনিক জীবন- ধারার কোন বাস্তবিক ব্যতিক্রম হইল না। তবুও হয়ত একটী স্নেহ-হস্তের অন্তর্ধানে, এমন এক শূন্যতার সৃষ্টি হইল যাহা একদিকে তঁাহার বালকসুলভ নমনীয় মনকে অজ্ঞাত- সারে কতকটা কঠিন করিয়া তুলিল, অপরদিকে তাঁহার যা কিছু স্নেহ-ভালবাসার কামনা সমস্ত মায়ের উপর নিবদ্ধ বাল্যজীবন হইল। মাতার মধুর ও কোমল প্রভাব পিতার স্নেহযুক্ত শাসনের স্থান অধিকার করিল। ইহার ফলে বােধ হয় রাজেন্দ্রনাথ পরিণত বয়স পর্যন্ত সুগভীর সহৃদয়তার প্রভাবাধীন হইয়া রহিয়াছেন। বালক রাজেন্দ্রনাথ অন্যপ্রকারেও পিতার অভাব অনুভব করিয়াছিলেন। তিনি তখন সেই ভাবনা-বিহীন বয়সে ছিলেন যখন গ্রাম্য-বালকের প্রিয় সবােবর ও সেতু তাহাকে ইচ্ছানুরূপ আমােদ প্রদান করিত। তৃপ্তির স্রোতে গা ভাসাইয়া জীবন যাপন করিতে তাহাকে বাধা দিবার কেহই ছিল না। কিন্তু যে মুহূর্তে পিতার স্নেহপ্রবণ যত্ন অপসৃত হইল, তিনি আমােদ আহলাদের অনুসরণ কমাইয়া দিয়া একটু লেখাপড়ার সময় করিয়া লইতে আদিষ্ট হইলেন। সেইসময় একটি পাঠশালা ভ্যায় একমাত্র শিক্ষাস্থল ছিল। রাজেন্দ্র তাহাতে ভর্তি হইলেন। সেই পাঠশালার অধ্যক্ষ ছিলেন এক গুরুমহাশয়। সেই গুরুমহাশয়ের বিদ্যার ; তদারকে প্রায় ত্রিশটি বালক ছিল। গ্রাম্যপাঠশালার তিনি যে ক্ষুদ্র আটচালায় শিক্ষা দিতেন শিক্ষার পদ্ধতি। তাহার অনেক ত্রুটি, ও তাহা নামেমাত্র পাঠ- শালা ছিল। সেখানে সেখানে প্রত্যহ তাঁহার পড়ুয়ারপাল জড় হইত—শুধু মূল উৎস হইতে বিদ্যাধারা পান করিবার জন্য নয়, বরং তাহা ছাড়া ছােট ছেলেরা অনায়াসে যে সব কাজ করিতে পারে, গুরুমহাশয়ের পরিবারের এ ধরণের গুরুমহাশয় ও ২ রাজেন্দ্রনাথ ছােটখাট ফায়-ফরমাস খাটিবার জন্য। প্রাচীন ভারতের বিদ্যালয়গুলির কার্যপ্রণালী ও নজীর এইরূপই ছিল। ভ্যালা ইহার চেয়ে ভাল কিছু জানি না। এ যুগেও নবদ্বীপ প্রভৃতি সংস্কৃত চর্চার কেন্দ্রে, সেই প্রাচীন সনাতন প্রথায় টোলে শিক্ষা দেওয়া হয়। পুরাতন গ্রাম্য পাঠ- শালায় এমন সব বিষয় শিখান হইত, প্রাত্যহিক জীবনে প্রয়ােজনীয় ব্যাপারের সহিত যাহাদের স্পষ্ট ও নিকট সম্বন্ধ আছে। একটি বিষয়ের উপর বিশেষ করিয়া জোর দেওয়া হইত—যে যাহা কিছু শিখান হইত সমস্তই সম্পূর্ণ- ভাবে আয়ত্ত করিতে হইবে, এবং, বৰ্ত্তমানযুগের শিক্ষা- ব্যবস্থায়, যেমন তাহা বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হইলে স্মরণের বহিভূত হইয়া যায়, সেরূপ ঘটিবে না। শিক্ষার পদ্ধতি প্রধানতঃ তর্কগত ছিল, এবং তাহার প্রসার বিশেষভাবে সীমাবদ্ধ হইলেও, পাঠ্য পুস্তক না থাকায় ও শিক্ষক স্মরণ- শক্তির চর্চার জন্য জেদ করায়, কঠিন মানসিক শিক্ষা ও শাসন স্বতঃই সম্পাদিত হইত। ভ্যাবলার গুরুমহাশয়, অর্থাৎ গ্রামস্থ একমাত্র বিদ্যাভি- মানী, মাতৃভাষা ভাল জানিতেন ও মানসাঙ্কে বিশেষ অভিজ্ঞ ছিলেন, কিন্তু তাহার বেশী আর বড় মানসিক ব্যায়াম ও শৃঙ্খলা; কিছু জানিতেন না। পাঠশালায় যে শিক্ষা গণিতের হেঁয়ালী। দেওয়া হইত তাহা স্বভাবতঃই বাংলাভাষার প্রথমপাঠ ও পাটীগণিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। রাজেন্দ্র- বাল্যজীবন নাথের মনের উচ্চ গ্রহণশক্তি ছিল, এবং এই কয় বৎসরে, গুরুমহাশয় ছাত্রগণের মস্তিষ্ক-চালনার উদ্দেশ্যে যে মানসিক ব্যায়ামের ব্যবস্থা করিতে ভালবাসিতেন, রাজেন্দ্র তাহাতে ব্যুৎপন্ন হইবার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন। দৈনিক অভ্যাস হিসাবে, যে জটিল অঙ্কগুলি কসিবার জন্য গুরু- মহাশয় ছাত্রদিগকে পীড়াপীড়ি করিতেন,—তাহাতে বালক দিগের বুদ্ধিবৃত্তি তীক্ষ হইত, তাহাদিগকে আমােদ দিত এবং সঙ্গে সঙ্গে মানসিক শৃঙ্খলাও শিক্ষা দিত। এই দৈনিক অঙ্কগুলির ভিতর, গুরুমহাশয়ের প্রবীণ মস্তিষ্ক-প্রসূত বুদ্ধি- বিভ্রমকর হেঁয়ালী ও রহস্যময় প্রশ্ন অনেক থাকিত। রাজেন্দ্রনাথ যেন স্বভাব পটুতার প্রেরণায় অসাধারণ স্মরণশক্তির বুদ্ধিবৃত্তির এই অদ্ভুত খেলায় যােগ দিতেন। আজিও তিনি যে অসাধারণ স্মরণশক্তির অধিকারী এবং যে গুণের সাহায্যে ঘটনাচক্রে তাহার কৰ্ম্মজীবনের সূচনা হইয়াছিল, বাল্যের এই বিশেষ শিক্ষা সেই শক্তি অর্জনের মূলে নিহিত আছে। পুরাতন পাঠশালার ঋণ রাজেন্দ্রনাথ জীবনে ভুলেন নাই। যখনই তাহার সাহায্য করিবার যথেষ্ট ক্ষমতা হইল, সেই মুহূর্তে তাহার প্রথম চিন্তা, সেই মা কৃতজ্ঞতা সূত্রে ক্ষুদ্র স্বরস্বতীর পুরাতন পীঠস্থান—যেখানে তাঁহার উচ্চ পরিণতি। বর্ণপরিচয় হইয়াছিল, সেইদিকে ধাবিত হইল। অল্প অনুসন্ধানেই তিনি বুঝিতে পারিলেন যে মূল কারণ। পাঠশালার

১২
রাজেন্দ্রনাথ
পাঠশালার আর্থিক অবস্থা শােচনীয়। তখন হইতে তিনি
নিজের খরচে তাহা চালাইবার সমস্ত ভার বহন করিতে
লাগিলেন। অনেক বৎসর এইরূপ করিবার পর, যখন
ভাগ্যলক্ষ্মী তাহার সাহসিক ব্যবসা ব্যাপারে সুপ্রসন্ন হইলেন
এবং তিনি যথেষ্ট অর্থ দিতে পারিলেন, তখন তিনি সেই
পাঠশালাকে উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পদবীতে উন্নীত
করিলেন। ১৯১১ সালে এই বিদ্যালয়ে মধ্য-ইংরাজী
পরীক্ষা পর্যন্ত শ্রেণীবিভাগ করিয়া পাঠ আরম্ভ হইল।
এই উপলক্ষে প্রকাশ্য উদ্বোধন-উৎসবে, মিষ্টার সােয়ন
(তদানীন্তন জেলার ম্যাজিষ্ট্রেট) ও মিষ্টার হরূনেল (বাংলার
শিক্ষাবিভাগের তদানীন্তন ডিরেক্টর) সমাগত হইয়াছিলেন।
সেই সভায় স্তর রাজেন্দ্র, তিনি যে তাহার পুরানাে গ্রামের
অধিবাসীদিগের শিক্ষাবিধানে সাহায্য করিবার সৌভাগ্য
লাভ করিয়াছিলেন তজ্জন্য নিজের আনন্দ প্রকাশ করেন।
১৯২১ সালে এই বিদ্যালয় আরও উন্নত হইয়া ছাত্রদিগের
জন্য ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিবার অধিকার প্রাপ্ত হইল।
এই উপলক্ষে স্যর রাজেন্দ্র শুধু প্রকাণ্ড বিদ্যালয় বাটী
নির্মাণ ও তাহার সহিত বিস্তৃত খেলিবার মাঠ যােগ করিয়া
ক্ষান্ত হইলেন না, পরন্তু বিদ্যালয়ের সংরক্ষণের জন্য প্রচুর
বৃত্তি দান করিলেন। বিদ্যালয়ের নাম এখন “স্যর রাজেন্দ্র
এ, ই, স্কুল” হইয়াছে। ১৯২৯ সালে যখন বহুমান্যবর
atata 50077 (His Excellency Sir Stanley

'।
ভ্যাবলায় নবনির্মিত পারিবারিক ভবন
(১৯২৯)

No text on this page.

বাল্যজীবন ১৩ Jackson) ও মাননীয়, লেডী জ্যাকসন স্যর রাজেন্দ্রের বিশেষ নিমন্ত্রণে একদিন ভ্যাল্লায় থাকিয়া নানা গ্রাম্য অনুষ্ঠান দর্শন করেন—যে অনুষ্ঠানগুলির সূচনা ও সংরক্ষণ স্যর রাজেন্দ্রর বদান্যতায় সম্পাদিত—তখন ভ্যাল্লা স্কুলও, বঙ্গের লাটসাহেব ও তদীয় পত্নীর পদার্পণে গৌরবান্নিত হইয়াছিল। আনন্দের বিষয় যে, যে দিবা- ভােজে স্থানীয় ভদ্রমহােদয়গণ মান্যবর অতিথিদ্বয়ের সম্মানার্থ সমবেত হইয়াছিলেন, সেইস্থলে কেহ কেহ স্যর ষ্টাক্লীকে নিমন্ত্রণকারীর কর্ণে চুপিচুপি বলিতে শুনিয়াছিলেন যে স্যর রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জির জন্মস্থান ভ্যালায় আসা বস্তুতঃ তাহার ও তাহার স্ত্রীর পক্ষে তীর্থযাত্রার সমান। পূৰ্ব্ববর্ণিত গুরুমহাশয়ের নিকট যখন রাজেন্দ্রনাথ প্রাথমিক শিক্ষালাভ করিতেছিলেন, তখন ভ্যাবলার বালক- গণ ইংরাজী ভাষায় সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ছিল। ইংরাজী শিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা ; কিন্তু সেই সময় হইতেই অভিভাবকবৃন্দ, কালীগঞ্জে গমন। তাহাদের বংশধরগণের পক্ষে ইংরাজী শিক্ষা যে অত্যাবশ্যক তাহা ধারণা করিতে পারিয়াছিলেন। কেননা শাসকজাতির ভাষা ভাল করিয়া না জানিলে তাঁহাদের সংস্পর্শে আসিয়া লাভবা হওয়া ও জীবনে উন্নতি করা অসম্ভব। সুতরাং বালকদিগকে ইংরাজীতে শিক্ষিত করা পিতামাতার গভীর চিন্তা ও উদ্বেগের বিষয় হইয়াছিল।

১৪
রাজেন্দ্রনাথ
আনন্দচন্দ্রের পুত্র ও রাজেন্দ্রর
পুত্র ও রাজেন্দ্রের জাঠতুত ভাই
চন্দ্রকুমার, ভ্যালার মুখার্জি পরিবারের মধ্যে
ইংরাজী লিখিতে ও বলিতে শিখিয়া, প্রায় ত্রিশ মাইল
দূরবর্তী কালীগঞ্জে মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেটের অফিসে একটি
কাজ পাইলেন। বর্তমানে খুলনা জেলার অন্তর্গত এই
কালিগঞ্জের সহিত সে সময় মুখার্জি পরিবারের ঘনিষ্ঠ
সম্পর্ক ছিল, কেননা এই পরিবার কালীগঞ্জে কতকগুলি
ধানের জমীর মালিক ছিলেন-সম্বৎসরের প্রয়ােজনীয় ধান
সেখানে উৎপন্ন হইত। কালীগঞ্জ এলাকায়, তাহাদের
নিকট আত্মীয় নীলকুমার চ্যাটার্জির অনেক ভূ-সম্পত্তি
ছিল, এবং তাহার হাতেই একান্নবর্তী মুখার্জি পরিবারের
বৈষয়িক স্বার্থ ন্যস্ত ছিল। নীলকুমার তাহার বালক
পুত্রদের শিক্ষার জন্য নিজ বাটীতে
স্থাপনা করিয়াছিলেন। তাহার নিযুক্ত একজন ইংরাজী-
অভিজ্ঞ শিক্ষক, বালকদিগকে বিদেশী ভাষার গূঢ় তত্ত্বে
দীক্ষিত করিয়াছিলেন। নীলকুমারের পরিবারের বাহিরের
দু’চারিটি বালকও সেই স্কুলে পড়িবার অনুমতি পাইয়াছিল।
নিকট আত্মীয় বলিয়া চন্দ্রকুমার মুখার্জি নীলকুমারের
বাটীতে আদরণীয় অতিথিস্বরূপ থাকিতেন। তিনি ইংরাজী-
শিক্ষা দিবার জন্য তাহার শিশুপুত্র মতিলালের সঙ্গে
রাজেন্দ্রনাথকেও কালীগঞ্জে লইয়া গেলেন।
রাজেন্দ্র ও মতিলালের মধ্যে খুড়া-ভাইপাে সম্পর্ক
একটি ছােট স্কুল

বাল্যজীবন ছিল, কিন্তু তাহারা প্রায় সমবয়সী ছিলেন। রাজেন্দ্র এক বৎসরের বড় ছিলেন, এবং সেইজন্য ভয়ঙ্কর অভিমানী অভিন্ন-হৃদয় মতিলালের উপর কর্তৃত্ত্ব করিবার অধিকার মতিলাল। পাইয়াছিলেন। আমরা মানস নয়নে ছবি আঁকিয়া দেখিতে পাই যে রাজেন্দ্র ও মতিলাল, এক শুভদিনে ভাল কাপড় পরিয়া, দধি মিষ্টান্ন খাইয়া ও তাহাদের মাতৃদত্ত আশীৰ্বাদ লইয়া, একত্রে সব প্রথম গুরুমহাশয়ের পাঠশালার দিকে যাইতেছেন। তিন বৎসর পরের চিত্রে আমরা পুনৰ্ব্বার দেখি যে যথাক্রমে পাকা নয় ও আট বৎসরের দুই উচ্চাভিলাষী কিশাের বালক, ইংরাজীভাষা শিখিয়া দিগ্বিজয় করিবার জন্য, ভ্যাবলা হইতে কালীগঞ্জের দিকে যাত্রা করিতেছেন। সেই বাল্য- বয়সে এই এই দুইটি বালক যে নিবিড় বন্ধনে মিলিত ছিল তাহা পরিণামে সুন্দর বন্ধুতায় পরিণত হইয়াছিল। নদীর দুই পারে আড়াআড়ি অবস্থিত রুদ্রপুর ও পঁড়া নামক দুইটি গ্রামে, দেশকালসুলভ প্রথানুসারে একই দিনে যখন দুইজনের বিবাহ হইল, তখন তাহারা সেই বন্ধুতার গাঢ় প্রতিষ্ঠা করিলেন। যতদিন মতিলাল বাঁচিয়া ছিলেন ততদিন এই স্নেহ ও সৌহার্দ্য একদিনের জন্যও ক্ষুন্ন হয় নাই। তাহার মৃত্যুর পর, ইহার পরিবর্তে স্যর রাজেন্দ্রের হৃদয়ে মতিলালের পরিবারবর্গের জন্য নিবিড় ও দৃঢ়পােষিত স্নেহ চিরজাগরিত হইয়া রহিয়াছে।

১৬
রাজেন্দ্রনাথ
দুর্ভাগ্যক্রমে কালীগঞ্জে রাজেন্থের ইংরাজী শিক্ষা বেশী
দূর অগ্রসর হইতে পারিল না। তিনি সেখানে কয়েক
মাস থাকার পরই, বসন্তের মহামারী সে
কঠিন পীড়া ও
প্রদেশ একেবারে বিধ্বস্ত করিয়া দিল।
পাঠ বন্ধ।
সেই দূর অতীতে ইংরাজী টীকার বিষয়
কেহই জানিত না। এদিকে বাংলা টীকা রাজেন্দ্রের
ক্ষীণ শরীরের পক্ষে বিষম অনিষ্টকর হইয়া দাড়াইল।
তিনি কতদিন ধরিয়া অজ্ঞান হইয়া
অজ্ঞান হইয়া রহিলেন—এক
দিন এমন হইল যে তাহার জীবনের আশা পৰ্যন্ত
প্রায় বিসর্জন দিতে হইয়াছিল। এই অবস্থায় তাঁহার
বিধবা মাতা গ্রামান্তরে ভয়ানক উদ্বেগে দিনের পর
দিন কাটাইতেন। অবশেষে রাজেন্দ্র একটু সুস্থ হইলে,
তিনি তাহাকে ভ্যাল্লায় ফিরাইয়া আনাইলেন। মায়ের
স্নেহ ও অক্লান্ত সেবা-যত্ন রাজেন্দ্রের জীবন ও স্বাস্থ্য
ফিরাইয়া আনিল। কিন্তু পরবর্তী কয়েক মাস তাহাকে,
পাঠ বন্ধ করিয়া, আলস্যে সময় কাটাইতে হইল।
কিছুদিনের জন্য গ্রাম্যবালকদিগের জীবন-ধারায় ফিরিয়া
আসিয়া, রাজেন্দ্র সন্তরণ-খেলায় বিশেষ মনােযােগ দিলেন।
পূৰ্ব্ব-অভ্যাস বলে ও এখন অবিরাম
মৎস্য শীকারে
চেষ্টায়, তিনি এই খেলায় ক্রমশঃ পরিপক্ক
অদ্ভুত নৈপুণ্য।
হইয়া ‘সর্দার’ হইয়া দাড়াইলেন। এই
সময় তাহার দ্বিতীয় বড় খেলা অর্থাৎ মাছ ধরায়
সন্তরণ ও

বাল্যজীবন ১৭ তাহার অদ্ভুত নৈপুণ্য, তৎপরতা ও সহিষ্ণুতা পরিস্ফুট হইল। বাঙ্গালী গ্রাম্যবালক যেন জলাশয় ও তাহার সহস্র রহস্যের জন্য স্বাভাবিক অনুরাগ লইয়াই জন্মগ্রহণ করে। তরুণ রাজেন্দ্র বাল্যবয়সেই জলাশয় ও তাহার পলায়নপটু আশ্রিত জীবদিগকে জীবদিগকে জয় করিবার জন্য তাহার সমস্ত ক্ষমতা প্রয়ােগ করিতেন। যাহাই ঘটুক কেন, কঠিন বাধা অতিক্রম করিবার জন্য তাঁহার দুর্দমনীয় প্রবৃত্তি হইত। এই প্রবল ইচ্ছাশক্তি, তাহার ভবিষ্যৎ জীবনে মানুষের মধ্যে নেতা হই- অঙ্কুর ও চিরস্থায়ী বার উচ্চাভিলাষরূপে জাগিয়া উঠিয়াছিল। ক্রীড়ানুরাগ। বঙ্গে যুবকবৃন্দের শারীরিক উন্নতি বিধানের সাহায্যের জন্য স্যর রাজেন্দ্র যে অত্যন্ত উদারভাবে অর্থদান করিয়া আসিতেছেন, তাহার জীবনব্যাপী ক্রীড়ানুরাগ তাহার মূল কারণ। ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শিক্ষাবস্থা স্কুল ও কলেজ কালীগঞ্জের গৃহশিক্ষা তরুণ রাজেন্দ্রের মনে ব্যাকুলতা ও চঞ্চলতার বীজ বপন করিয়া দিয়াছিল। যখন তাহার শিক্ষাবিধানে পূৰ্ব্বস্বাস্থ্য প্রায় ফিরিয়া আসিল ও জল- মাতার চেষ্টা। ক্রীড়ায় তঁাহার আগ্রহ একটু পুরাতন হইয়া গেল, তখন তিনি ভাষার রহস্যের বিষয় ভাবিতে লাগিলেন। ক্রমশঃ বিদ্যালাভের জন্য তাহার প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ পাইল। ইংরাজীশিক্ষা সম্বন্ধে তাঁহার আগ্রহ ও উৎসাহ তাঁহার মাতারও মনােযােগ আকর্ষণ করিল। নিঃস্ব বিধবা হইলেও, রাজেন্দ্রের মাতার অসীম সাহস ছিল। তাহার স্মরণ হইল যে তাহার স্বামী দয়াপরবশ হইয়া জয়গােপাল মুখার্জি নামক এক ব্যক্তির শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করিয়াছিলেন, এবং পরে তাহার বারাসতে চাকরী লাভেও সাহায্য করিয়াছিলেন। অবিলম্বে রাজেন্দ্রের মাতা একজন আত্মীয়ের মারফৎ জয়গােপালকে জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইলেন যে ভগবানচন্দ্র তাঁহার জন্য যাহা করিয়াছিলেন তাহা স্মরণ করিয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থ, তিনি পিতৃহীন শিক্ষাবস্থা বারাসতে বালককে নিজের আশ্রয়ে রাখিয়া লেখাপড়া শিখাইতে পারিবেন কি না। জয়গােপাল আনন্দের সহিত এই প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। এইরূপে পরবর্তী চার বৎসর, রাজেন্দ্রনাথ বারাসতে জয়গােপালের বাটীতে থাকিয়া স্থানীয় স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত, অর্থাৎ ম্যাটিকুলেশন শ্রেণীর নিম্নশ্রেণী পৰ্যন্ত, আগ্রহ ও মনোেযােগসহকারে পাঠ অভ্যাস করিতে লাগিলেন। ছাত্রজীবনের এই কয়েক বৎসর, সহজ ও বিশেষ শাসন- বিহীন অবস্থায় রাজেন্দ্রের চরিত্র গঠিত হইতেছিল। (म সময়ের অতি অল্প ঘটনারই উল্লেখ এখন ছাত্রজীবন ; পাওয়া যায়। তখন রাজেন্দ্র ও মতিলাল দুজনেই জগৎ জয় করিবার স্বপ্ন দেখিতেন— অর্থাৎ তাঁহাদের অনভিজ্ঞ মনের ধারণায় হয়ত এক নিশ্বাসে নিকটস্থ নদী পারাপার হওয়া, অথবা একটা পাঁচসের রুইমাছ বঁড়সিতে গাঁথিয়া ভােলা। স্কুলের ছুটির পর তাহারা অবসর সময় চারিদিকে হাঁটিয়া বেড়াইয়া, কিম্বা ক্রীড়ার ক্ষেত্র জলাশয় হইতে রােমাঞ্চকর আমােদ সংগ্রহ করিয়া কাটাইয়া দিতেন। হাডু-ডুডু এবং ঐ ধরণের বালকদিগের প্রিয় অনায়াস-রচিত খেলা ছাড়া তখন কোন নির্ধারিত খেলার বিষয় গ্রামের কেহ জানিত না। দুষ্টামী ও বালসুলভ চপলতা এখনকার মতই চলিত ছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ একটী বর্ণিত ঘটনা এই স্থলে লিপিবদ্ধ করা বােধ হয় অপ্রাসঙ্গিক বালসুলভ চপলতা।

রাজেন্দ্রনাথ কুলের লােভে ছল। হইবে না। রাজেন্দ্রনাথ ও মতিলাল একদিন সান্ধ্য ভ্রমণে বাহির হইয়া দূর হইতে দেখিতে পাইলেন যে এক ফিরিও- আলী তাজা সুমিষ্ট কুল বিক্রয় করিতেছে। দুজনে কিছু কুল লইবার মতলব ঠিক করিয়া, সাহস ভরে বৃদ্ধার নিকট গেলেন ও দু’চার পয়সার কুল চাহিলেন। অতঃপর রাস্তার ধারে বসিয়া তাঁহারা টপাটপ, কুল খাইতে লাগিলেন। যখন ফলের ভূরিভােজনে উদর পূর্ণ হইল, তখন দুজনেই হাতে পয়সা নাই বলিয়া বিস্ময়ের ভাণ করিলেন। অবশেষে স্থির হইল যে কুলের দাম আনিতে রাজেন্দ্র বাটী যাইবেন ও মতিলাল জামীন স্বরূপ কুলওয়ালীর কাছে বসিয়া থাকিবেন। রাজেন্দ্র যতক্ষণে বাটী পেীছিলেন, তাহার মধ্যে তাহার সাহস অন্তর্হিত হইল। অভিভাবকের নিকট হইতে পয়সা আদায় করা তখন বড় সহজ ছিল না। পয়সা চাওয়ার চেয়ে চুপ করিয়া থাকাই, রাজেন্দ্রনাথ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে করিলেন। এদিকে মতিলাল হাটের কাছে বসিয়া বসিয়া অস্থির হইয়া পড়িতেছিলেন। সন্ধ্যা আগত হইল, তবুও বাটীতে মতিলালের দেখা নাই। তাহার অন্বেষণ করিতে করিতে আসল ব্যাপার প্রকাশ হইয়া পড়িল। সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য বেতের শাসনও প্রকাশিত হইল। যদিও “চাচা আপনা বাঁচা” এই নীতি রাজেন্দ্রনাথের পক্ষে কঠিন শাস্তির কারণ, বস্তুত ফলের উপর তাহার লােভই এই দুষ্টামির

শিক্ষাবস্থা
অযথা
জন্য দায়ী। তাহার পরবর্তী জীবনেও, এই অত্যধিক
আসক্তির প্রচুর পরিচয় পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে ইহাও
বলা যায় যে কখনও কোন বৃদ্ধা স্ত্রীলােক তাঁহার দারস্থ
হইয়া শূন্য হস্তে ফিরিয়া যায় নাই, যেহেতু বারাসতের
বুড়ী কুলওয়ালীর নিকট ঋণ কি তাহার মানস-পথে
সৰ্ব্বদাই উদিত হয় না?
সম্ভবতঃ বাংলা টীকা দেওয়ার ফলে এবং বারাসতে
বারবার ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায়, ক্রমশঃ রাজেন্দ্রর
সাধারণ স্বাস্থ্যের অবনতি হইতেছিল। ইহার উপর উচ্চ
অতি প্রয়ােজনীয় আগ্ৰহজাত কঠিন পাঠশ্রমে তাহার জীবনী
বায়ু পরিবর্তন।
শক্তিরও
অপচয় ঘটিয়াছিল।
ভ্যাবলায় পারিবারিক ভবনে এই অবস্থার কোন
প্রতিকারের সম্ভাবনা নাই দেখিয়া, রাজেন্দ্রের মাতা
ভীত হইয়া এক বৃদ্ধ কবিরাজকে ডাকাইলেন। কবিরাজ
পরামর্শ দিলেন যে বালকের জীবন রক্ষা করিতে হইলে
তাহাকে দীর্ঘকাল বায়ু পরিবর্তনের জন্য অবিলম্বে এমন
কোন স্বাস্থ্যকর স্থানে পাঠাইতে হইবে যেখানে বারি-বর্ষণ
বিরল।
তখন নিজ ভ্রাতার বিষয় রাজেন্দ্রের মাতার মনে
পড়িল। এই ভাতা—পণ্ডিত দ্বারকানাথ ভট্টাচাৰ্য, অল্প
বয়সেই, তাজমহলের প্রসিদ্ধ বাসভূমি আগ্রায় প্রবাসী
হইয়াছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণােচিত দীক্ষিত পুরােহিতের
পেশা অবলম্বন করিয়া, আগ্রায় এক বৃহৎ কালীবাড়ী

২২ রাজেন্দ্রনাথ সুদূর আগ্রা যাত্রার সূচনা। নির্মাণ করেন ও কালীমন্দিরে দেবী মূর্তির প্রতিষ্ঠা করেন। পরিণামে এই কালীবাড়ী, চতুস্পার্শ্বস্থ জেলার মাতুল- প্রতিষ্ঠিত আগ্রার মধ্যে বাঙ্গালীদিগের পূজা ও মিলনের প্রসিদ্ধ কালীবাড়ী। কেন্দ্র হইয়া উঠিয়াছিল। এখানে দূরাগত বাঙ্গালী পরিবারের পক্ষে আতিথ্য ও অন্যবিধ সাহায্য অনায়াসলভ্য ছিল। পুত্রের কল্যাণের জন্য রাজেন্দ্রনাথের মাতা, ভ্রাতার স্নেহ উদ্রেক করিতে অবিলম্বে আগ্রায় তাহার নিকট পত্র পাঠাইলেন। কোন হিন্দু যে এরূপ স্নেহের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করিবে, তাহা কল্পনার অতীত। পণ্ডিত দ্বারকানাথ অবশ্য রাজেন্দ্রকে তৎক্ষণাৎ আগ্রায় ভঁহার নিকট পাঠাইয়া দিতে বলিলেন। এ পর্যন্ত রাজেন্দ্রের মাতা এই বিষয়ের কাজের দিকটী ভাবিয়া দেখেন নাই। বার-তের বৎসরের একটি বালক যে কখন কালীগঞ্জ ও বারাসাত ছাড়া নিজ গ্রামের বাহিরে আর কোন সহর বা গ্রাম দেখে নাই, যে আজীবন আত্মীয় স্বজনের আশ্রয়ে বাস করিয়াছে, এরূপ অপরিপক্ক অনভিজ্ঞ ও সুকুমার বয়স্ক বালক কেমন করিয়া সে সময়ের বিপদসঙ্কুল আটশত মাইল পথ একাকী নিঃসঙ্গ অবস্থায় ভ্রমণ করিয়া, এক অজানিত ভবনে উপনীত হইতে পারিবে ? তারপর অর্থসমস্যা—নগদ টাকা পরিবারের মধ্যে দুষ্প্রাপ্য ছিল। কিন্তু একই চিন্তা রাজেন্দ্রের মাতার চিত্ত অধিকার

-
•
১ * *
পুত্ৰপ্রাণ। বীর। জননী
( স্বর্গীয়া ব্ৰহ্মময়ী দেবী)

No text on this page.

শিক্ষাবস্থা
;
করিয়াছিল—অর্থাৎ পুত্রের মঙ্গল ও প্রকৃত শিক্ষা। হিন্দু
মাতাগণ পুত্রদিগের জীবনে নিজ নিজ অস্তিত্ব মিশাইয়া
দেন। তাহাদের জীবনের প্রতি মুহূর্তের প্রায় প্রত্যেকটি
কাৰ্য্য সন্তানগণের কল্যাণ ও উন্নতিকল্পে নিবেদিত
পুত্ৰপ্ৰাণা সাধারণ হইয়া থাকে ; বিশেষ পিতার অবর্তমানে,
হিন্দু মাতা।
মাতৃভাব আরও গভীররূপে পুত্রের জীবনে
একেবারে নিমজ্জিত হইয়া থাকে। মাতৃজাতির মধ্যে
ভ্যালার এই অত্যদ্ভুত মাতা বিশেষ সম্মানের যােগ্যা,
যেহেতু নৈষ্ঠিক হিন্দু বিধবা হইয়া এবং একান্নবর্তী
পরিবারের ভিতর প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় থাকিয়াও,
ব্যক্তিত্বে অসাধারণ
একমাত্র পুত্রকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার জন্য সুদূর
বীর জননী।
প্রবাসে পাঠাইতে মনস্থ করিলেন।
কারণেও তিনি এই মীমাংসা করিতে বাধ্য হইলেন,
কেন না ইতিমধ্যে জয়গােপাল মুখার্জির মৃত্যু হইয়াছিল,
এবং সেইজন্য বারাসতে রাজেন্দ্রের থাকিবার কোন স্থান
ছিল না। সেই দুর্গম পথ ও অশেষ কষ্টকর ভ্রমণের
যুগে, এক অতুল সাহসী মাতা আপনার বার-তের বৎসর
বয়সের একমাত্র নাবালক পুত্রকে দীর্ঘকালের জন্য বিদায়
দিয়া, তাহার শিক্ষার সাধনাব্ৰত সফল হউক বলিয়া
আশীৰ্বাদ করিলেন। এরূপ আশ্চর্য ব্যাপারের মূলে ছিল
এই মহীয়সী মহিলার কোমল অন্তঃকরণের সহিত প্রবল
ইচ্ছাশক্তির সুদুল্লভ যােগ। তিনি নিজ স্বভাবের বিশিষ্ট
অন্য

২৪ রাজেন্দ্রনাথ বালকের পক্ষে ছাপ পুত্রের চরিত্রের উপরও রাখিয়া গিয়াছেন। অর্ধ- শতাব্দী পরে, এই দেশবিখ্যাত পুত্র, নিজ বাল্যজীবনের কতকগুলি ঘটনা স্মরণ উপলক্ষে সংক্ষেপে মাতার প্রাপ্য সম্মান দিয়া বলেন, “তিনি অদ্ভুত প্রকৃতির স্ত্রীলােক ছিলেন।” এক শুভ প্রভাতে, বালক রাজেন্দ্র, একটী ভৃত্য সঙ্গে লইয়া, ভ্যালা হইতে তাহার দুঃসাধ্য দীর্ঘ ভ্রমণের পথে যাত্রা করিলেন। তখন তঁাহার হৃদয় প্রফুল্ল পথের কষ্ট- ও উচ্চাশাপূর্ণ-বিদায়ের বেলা তাহার অশ্রুতপূর্ব। মাতার আত্মসংযম যাত্রাপথে তাঁহার পক্ষে সহায় ও শান্তিদায়ক হইয়াছিল। তিনি ছাব্বিশ মাইল হাঁটিয়া বারাসতে উপস্থিত হইলেন। আরও আট মাইল পথশ্রমের পর, ভৃত্য ও তাহার বালক প্রভু নবাবগঞ্জে (ব্যারাকপুর) উপনীত হইলেন। সেখানে রাজেন্দ্রের মাতুলের, অর্থাৎ তাহার বিমাতার ( ভগবানচন্দ্রের চতুর্থ স্ত্রীর ) ভ্রাতার নিবাস ছিল। এই চৌত্রিশ মাইল পথ হাঁটিতে দুজনের তিন দিন তিন রাত্রি লাগিয়াছিল -তাহার মধ্যে একরাত্রি পথপার্শ্বে মুক্ত প্রান্তরেই অতিবাহিত করিতে হইয়াছিল। কিন্তু মাতুল যােগেশ্বর গাঙ্গুলীর স্নেহ ও আদর অভ্যর্থনায় ক্ষুদ্র বালক পদব্রজে ভ্রমণের সমস্ত কষ্ট শীঘ্রই ভুলিয়া গেলেন। তাহার কোমল মনে একটি সানন্দ ঋণের ছবি চিরমুদ্রিত হইয়া রহিল। স্যর রাজেন্দ্র জীবনে এই সাদর

শিক্ষাবস্থা
২৫
অপার স্নেহ।
অভ্যর্থনার কথা ভুলেন নাই—আজিও যােগেশ্বর গাঙ্গুলীর
পুত্র ও পরিবার তাহার নিকট হইতে প্রত্যুপকার পাইয়া
থাকেন। ভাগিনেয়ের
পথিমধ্যে
উপর স্পষ্টতঃই
অপর মাতুলের
মাতুলের বিলক্ষণ স্নেহের উদ্রেক হইল—
তিনি বালককে কিছুদিন নিজের কাছে
রাখিয়া দিলেন। ভৃত্য যে ছােট থলীতে রাজেন্দ্রের জন্য
সামান্য কয়খানি কাপড় ও বই আনিয়াছিল, তাহা ভাল
করিয়া দেখা হইল ও শীতকালের উপযােগী গরম কাপড়
তাহাতে যােগ করিয়া দেওয়া হইল। রাজেন্দ্র যাহাতে
গঙ্গার খেয়াপার হইয়া বৈদ্যবাটী যাইতে পারেন, তাহার
সমস্ত বন্দোবস্ত যােগেশ্বর করিয়া দিলেন। রাজেন্দ্রের মাতার
হাতে কেবলমাত্র পুত্রের জন্য আগ্রা পৰ্যন্ত একখানি
তৃতীয় শ্রেণীর টিকিট কিনিয়া দিবার ও রাহা খরচের জন্য
বড় পুঁজি তিন টাকা দিবার মত অর্থ ছিল। ভৃত্য নবাবগঞ্জ
হইতে ফিরিয়া আসিয়া, সে এবং তাহার বালক প্রভু কেমন
করিয়া চৌত্রিশ মাইল পথ হাঁটিয়া অতিক্রম করিয়াছিল
তাহা বর্ণনা করিল, এবং যােগেশ্বর গাঙ্গুলী গঙ্গা পার
করিয়া দিবার যে বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন তাহাও বলিল।
পথের কষ্টের কথা শুনিয়া মাতা আর আত্মসংযম রক্ষা
করিতে পারিলেন না—তাহার উপর গাড়ীর কাল্পনিক
কষ্টের কথা মনের মধ্যে ভােলাপাড়া করিয়া, তিনি
আপনাকে সামলাইতে না পারিয়া মূচ্ছিতা হইয়া পড়িলেন।

২৬ রাজেন্দ্রনাথ ; এই অবস্থায় তিনি চব্বিশ ঘণ্টার বেশী রহিলেন, এবং যদিও পরে তাহার স্বাস্থ্য ও সাহস ক্রমশঃ ফিরিয়া আসিল, এই ঘটনা তঁাহার স্নায়ুমণ্ডলের উপর এমন পুত্রের ক্লেশে মাতার ব্যথা ও মূচ্ছাঁয়ােগ; কঠোর আঘাত করিয়াছিল, যে ইহার পর অদ্ভুত আরােগ্য। হইতেই মাঝে মাঝে তাহার ‘ফিট হইত। এই স্থানে, দ্বিতীয় বিচিত্র ঘটনা হিসাবে, বলা যায় যে যদিও অপম্মার রােগ, পরবর্তী উদ্বেগবশতঃ তাহার জীবন বিষময় করিয়া তুলিয়াছিল, তথাপি রাজেন্দ্রনাথ যখন পতা জলকলে ঠিকার কাজ পাইবার পর, তাহার সৌভাগ্য- সােপানের প্রথম ধাপে পঁহুছিয়া, মাতাকে বারাকপুরে নব-প্রস্তুত প্রথম বাসভবনে লইয়া আসিলেন, তখন এই রােগ সহসা অন্তর্হিত হইল। পঞ্চদশ বর্ষ পূর্বে যে স্নায়ুমণ্ডল উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তায় বিষম আন্দোলিত হইয়াছিল, পুত্রের জীবনে সমৃদ্ধির প্রথম সুস্পষ্ট নিদর্শন, যেন তাহার পক্ষে আনন্দের সঞ্জীবনী সুধা হইয়া উঠিল। আগ্রায় রাজেন্দ্রনাথের ছাত্রজীবন সম্বন্ধে বিস্তৃত বিবরণ এখন পাওয়া যায় না। তিনি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই, পূর্ণ স্বাস্থ্য লাভ করিয়া, সেন্টজ কলিজিয়েট স্কুলে ভর্তি হইলেন, এবং অধ্যবসায় ও উৎসাহ সহকারে পাঠাভ্যাস করিতে লাগিলেন। মানব-চরিত্রে অভিজ্ঞ তাহার প্রবীন মাতুল, স্নেহাস্পদ ভাগিনেয়ের মনের ক্রমবিকাশ ও উন্নতিসাধনে এবং তঁাহার চরিত্র-গঠনে সহায়তা করিয়া আনন্দ লাভ

শিক্ষাবস্থা
২৭
আগ্রায়
করিতেন। সেই অল্প বয়সেই, রাজেন্দ্রনাথের চরিত্রে চালনা-
শক্তির ও কাৰ্য্য-সম্পাদনে উপায়-আবিষ্কার-শক্তির সূচনা
দৃষ্ট হইয়াছিল। যদিও পাঠ্যপুস্তক তাহার
ছাত্রজীবন ও প্রায় সারাদিনের সঙ্গী ছিল, তথাপি আগ্রা
চরিত্র-গঠন।
যাহার জন্য জগতে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে,
সৌন্দর্য্যের সেই মহান্ নিত্য তীর্থের দিকে তিনি নিশ্চয়ই
সান্ধ্যভ্ৰমণ করিতে করিতে অগ্রসর হইতেন। তাজমহল
মানুষের ইন্দ্রিয়বর্গের উপর সুষমা ও সৌষ্ঠব-সম্ভুত প্রবল
প্রভাব বিস্তার করে—ইহার অভ্যন্তরে এমন এক মােহিনী-
শক্তি নিহিত আছে যাহা বর্ণনার অতীত, এবং যাহা
প্রত্যেকবার দর্শনে বৃদ্ধিলাভ করে। সেই সুকুমার বয়সে
যখন রাজেন্দ্র, এক সম্রাটের অবিনশ্বর প্রণয়ের স্মৃতিরক্ষক
স্বরূপ, ক্ষীণাঙ্গী পরীর মত সুদীর্ঘ ও সুদর্শন মজিদ চূড়ার
(minarets) দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিতেন, তখন কি
তিনি স্বপ্ন দেখিতেন যে নিজ উচ্চাভিলাষ
ভিক্টোরিয়া স্মৃতিসৌধ
রূপ উপাদান লইয়া একদিন সমতুল্য অমর
প্রতিরূপ গড়িয়া তুলিবেন? তাজ নিশ্চয়ই
অননুকরণীয়, কিন্তু যে মহাপ্ৰতিভা ও অদ্ভুত কলানৈপুণ্য
এই সুষমা ও সৌষ্ঠবের সমুজ্জ্বল মন্দির গঠন করিয়াছিল,
তাহার উদ্দেশে বিনীত সম্মান প্রদর্শন, স্বপ্নের বিষয়
হইতে পারে। আমরা বিস্ময়ভরে কল্পনা করি যে হয়ত
সাজাহানের প্রসিদ্ধ দুর্গের উচ্চ অঙ্গনসমুহৰু পার্শ্বস্থ
সূক্ষ্ম সম্বন্ধ।

২৮ রাজেন্দ্রনাথ ময় প্ৰগ্ৰীব (balcony) হইতে তাহার প্রণয়-পরিমল অনুক্ষণ যমুনার উদ্দাম তরঙ্গ পার হইয়া প্রিয়তমা রাজ্ঞীর শান্তি- অমরধামের দিকে প্রবাহিত হইত—সেই দৃশ্যের অন্তরলগ্ন মাধুরী রাজেন্দ্রের তরুণ ভাবপ্রবণ মনে এমন সজীব বীজ স্থাপনা করিল, যে তাহা পরিণামে অঙ্কুরিত ও ফলিত হইয়া বঙ্গ-গৌরবকর বিখ্যাত ইনজিনিয়ারিং পরাক্রমরূপে প্রতিভাত হইল। কাহার সাধ্য দৈবের নিৰ্বন্ধ খণ্ডন করে—যে দৈব পঞ্চদশবর্ষের এক চিন্তাশীল ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বালকের পদবিক্ষেপ, স্থাপত্য-শিল্পের পরম ঐশ্বৰ্যপূর্ণ সম্রাটবর্গের প্রাচীন রাজধানীর দিকে চালিত করিল এবং তাহার উচ্চাশাপূর্ণ হৃদয়ে অলৌকিক প্রেরণা ঢালিয়া দিল? আমরা বিস্মিত অথচ কৃতজ্ঞতাপূর্ণ হইয়া উঠি যেহেতু রাজেন্দ্রনাথ সেই অনুভবক্ষম কোমল বয়সে ভারতের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য-সৌন্দর্য্যের অনন্তধারা আকণ্ঠ পান করিবার সুযােগ পাইয়াছিলেন এবং এইরূপে, যে মুখ্য প্রতিভা পরিণামে, বিশেষ করিয়া কলিকাতা সহরকে সুন্দররূপে কল্পিত ও সুনির্মিত প্রাসাদসমূহে সজ্জিত করিয়াছে, তাহার প্রথম ছাঁচ আবির্ভূত হইয়াছিল। আগ্রার দিনগুলি রাজেন্দ্রনাথের পক্ষে পরম সুখের স্মৃতি হইয়া রহিয়াছে। তিনি মাতুলের স্নেহময় তত্ত্বাব- ধানে, প্রায় তিন বৎসর কাটাইয়া দিলেন। তিনি ম্যাটি- কুলেশন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতে ছিলেন, এমন সময় শিক্ষাবস্থা অকস্মাৎ হঠাৎ পণ্ডিত দ্বারকানাথ এই মর্মে এক জরুরী তার পাইলেন যে রাজেন্দ্রের মাতার অতি কঠিন পীড়া এবং পুত্রকে যেন তৎক্ষণাৎ পাঠাইয়া দেওয়া হয়। আগ্রাত্যাগ তখন আশু আগ্রা-ত্যাগ অপরিহার্য হইয়া -কৌশল-ফলে। উঠিল। মাতার জন্য দুশ্চিন্তায় ও আসন্ন পরীক্ষা হইতে বঞ্চিত হইয়া হতাশায় অভিভূত অন্তঃ- করণে রাজেন্দ্রনাথ বাটীর দিকে যাত্রা করিলেন। বাটী পৌছিয়া যখন দেখিলেন যে সেই টেলিগ্রামটি ছলমাত্র, তখন তাঁহার যেমন সাতিশয় বিস্ময় হইল তেমনই বিরক্তিরও সীমা রহিল না। তাহার বয়ােঃজ্যেষ্ঠগণ, সেই কিশাের বয়সেই তাহার প্রবল দৃঢ়প্রতিজ্ঞার বিষয় জানিয়া, বিবাহ দিবার উদ্দেশ্যে তাহাকে ভ্যালায় ফিরাইয়া আনিবার জন্য এই কৌশল উদ্ভাবন করিয়াছিলেন। সেই অল্পবয়সেই রাজেন্দ্র তাহার সমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষমতা প্রয়ােগ করিয়া বিবাহের কল্পনায় বাধা দিয়াছিলেন। অনিচ্ছায় বাল্যবিবাহ কিন্তু পরিবারবর্গ একবার তাঁহাকে আয়ত্তের মধ্যে পাইয়া তাহার কথায় কর্ণপাত করিলেন না, এবং এ বিষয়ে তাঁহার কোন স্বাধীন মতও চলিল না। বংশানুগত প্রথা অনুসারে আগে হইতেই পাত্রী ঠিক করা ছিল। রাজেন্দ্রের বয়স আঠার বৎসর হইতে না হইতেই তিনি একদিন দেখিলেন যে বিবাহ- বন্ধনে আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছেন। সম্পাদন।

রাজেন্দ্রনাথ ম্যাটিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবার পূর্বেই রাজেন্দ্রের বিবাহ হইয়াছিল। বিবাহ-উৎসব শেষ হইবার কিছু পরেই, পাঠের জন্য তাঁহাকে কলিকাতায় পাঠান ভবানীপুরে লণ্ডন হইল। সেই সময় ভগবানচন্দ্রের কনিষ্ঠ মিসনারী ইনষ্টিটিউসনে ভ্রাতার পৌত্র, অর্থাৎ রাজেন্দ্রের ভ্রাতুস্পুত্র প্রবেশ ; ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। যােগেন্দ্রনাথ মুখার্জি, কলিকাতা মিউনিসি- পালিটীতে কলেক্টরের কাৰ্য্য করিতেন। তিনি রাজেন্দ্রের চেয়ে দশ বৎসরের বড় ছিলেন, এবং কয়েক বৎসর চাকরী করার ফলস্বরূপ তাহার বেশ আয় দাড়াইয়াছিল। রাজেন্দ্রনাথ কলিকাতায় আসিয়া ভবানীপুরে লণ্ডন মিসনারি সােসাইটির ইনষ্টিটিউসনে ভর্তি হইলেন, এবং যােগেন্দ্র- নাথের বাসায় থাকিয়া ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলেন। মতিলালও কলিকাতায় আসিয়া সেই স্কুলে ভর্তি হইলেন। উভয়েই যথাসময়ে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেন। সেই সময়ে অনেক হিন্দু অভি- ভাবক, সুশিক্ষার জন্য বালকদিগকে খৃষ্টীয় মিসনারী স্কুলে পাঠাইতে চাহিতেন। আগ্রার যে সেন্টজ খৃষ্টীয়ান শিক্ষালয়ের ঋণ কলেজে রাজেন্দ্রনাথ প্রথম নিয়মিত শিক্ষা- স্মরণে কৃতজ্ঞতা। লাভ করিয়াছিলেন তাহাও খৃষ্টীয় অনুষ্ঠান। এইজন্য তিনি খৃষ্টীয়ান শিক্ষাগুরু ও শিক্ষালয়ের নিকট তাঁহার বাল্যবয়সের ঋণ সর্বদা মনে রাখেন, এবং এরূপ বিদ্যালয়ের সাহায্যার্থ কর্তৃপক্ষ কোন প্রার্থনা করিলে, ।

শিক্ষাবস্থা
বদান্যভাবেই তাহা পূরণ করেন। ভবানীপুরস্থ লণ্ডন
মিসনারী সােসাইটীর ইনষ্টিটিউসন, ইহার অন্যতম প্রসিদ্ধ
পুরাতন ছাত্র বলিয়া, স্যর রাজেন্দ্রের নাম আজিও প্রীতিভরে
স্মরণ করে।
ম্যাটিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া, রাজেন্দ্রনাথ
প্রেসিডেন্সী কলেজের ইজিনিয়ারিং বিভাগে ও
মতিলাল মেডিক্যাল কলেজে প্রবেশ করিলেন।
তখনও দুজনে বেলতলায় যােগেন্দ্রনাথের বাসায়
থাকিতেন।
বাংলাদেশে ফিরিয়া রাজেন্দ্রের স্বাস্থ্য আবার বিলক্ষণ
ক্ষুন্ন হইল। স্ফোটক রােগের বিষম আক্রমণে তাঁহার
অশেষ কষ্টে ঘুঘুনে মৃদু জ্বর হইতে লাগিল। রাজেন্দ্র
কলেজে শিক্ষা।
ও মতিলাল দুজনেই প্রত্যহ বেলতলা
হইতে ছয় সাত মাইল দূরে নিজ নিজ কলেজে
যাতায়াত
করিতেন। তঁাহারা পূর্বাহ্ে প্রত্যেকে
এক আনা হইতে দেড় আনা অবধি দিয়া, ধৰ্ম্মতলা
পর্যন্ত সেয়ারে ঠিকা গাড়িতে আসিতেন, এবং সেখান
হইতে পটলডাঙ্গাস্থিত কলেজ পৰ্যন্ত হাঁটিতেন। বৈকালে
দু’টি বালকই কলেজ স্কোয়ার হইতে ভবানীপুর বেলতলা
পৰ্যন্ত সমস্ত পথ হাঁটিয়া
পথ হাঁটিয়া বাটী ফিরিতেন, কেননা
সকালের মত সেয়ারের গাড়ি ভাড়া দিবারও অর্থ থাকিত
। বাটীর বাহিরে আহার বা জলখাবারের জন্যও

রাজেন্দ্রনাথ খরচ কোন সঙ্গতি তাহাদের ছিল না—সকালে নয়টার সময় প্রাতরাশের পর একেবারে রাত্রি আটটার সময় আবার আহার করিতে পাইতেন। যােগেন্দ্রনাথ মুখার্জির বৃহৎ পােয় পরিবার ছিল বলিয়া, অন্য বিষয়ে অনেক থাকা সত্ত্বেও, তিনি দুটী বালকের জন্য যথাসাধ্য অর্থ ব্যয় করিতেন, অর্থাৎ তাহাদের শিক্ষা, পুস্তক ও পরিধান- বস্ত্র ইত্যাদির খরচ দিতেন। তাঁহাদের ছাত্রজীবনের এক সঙ্গীন সময়ে সাহায্যের জন্য, যােগেন বাবুর নিকট যে তাহারা কত ঋণী, তাহা পরবর্তী জীবনে উভয়ে সর্বদা স্নেহভরে স্মরণ করিতেন। ১৮৫৬ সালে প্রেসিডেন্সী কলেজে যে ইনজিনিয়ারিং বিভাগ উন্মােচিত হইয়াছিল, রাজেন্দ্রনাথ তাহাতে ১৮৭২ সাল হইতে প্রায় তিন বৎসর অধ্যয়ন করিয়াছিলেন। সেই সময়ে ইনজিনিয়ারিং শিক্ষার অবস্থা বিশেষ উন্নত ছিলনা। এইরূপ বাধা ও শত অসুবিধা সত্ত্বেও, এই তিন বৎসরে রাজেন্দ্রনাথের মনে যথার্থ ইজিনিয়ারিং বিজ্ঞানের প্রতি প্রকৃত ও প্রগাঢ় অনুরাগ ক্রমশঃ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইতেছিল। এবিষয়ে তিনি ভ্যাবলার গুরুমহাশয়ের নিকট ঋণী, কেননা তিনিই প্রথমে মানসাঙ্ক এবং গণিতের হেঁয়ালী ও কূট প্রশ্নের চর্চাদ্বারা বালক রাজেন্দ্রের উর্বর ও নমনীয় মনে এইরূপ মূলতত্ত্ব বিষয়ক অনুরাগের বীজ বপন করিয়া দিয়াছিলেন। ইন্‌জিনিয়ারিং শিক্ষাবস্থা শূন্য পদ কলেজের তদানীন্তন শিক্ষা-প্রণালী এইরূপ ছিল যে ইহাতে কেবল মাত্র সরকারী পূর্তবিভাগের অধঃস্তন ইনজিনিয়ারিং কর্মচারী ও ওভারশিয়ারের বিজ্ঞানানুরাগ ; পূরণ করিবার জন্য ছাত্রদিগকে শিক্ষিত তদানীন্তন শিক্ষার হীনাবস্থা। করা হইত। ইঞ্জিনিয়ারিং-বিদ্যা, ব্যবসায় হিসাবে শিক্ষা দিবার কোন চেষ্টা করা হইত না— উচ্চ পেশা হিসাবে ত দূরের কথা। সুতরাং এই শিক্ষার সাহায্যে সেই যুগে ইনজিনিয়ারিং বিদ্বৎ-মণ্ডলী ক্রমশঃ গড়িয়া উঠিবার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। সে সময়ের শিক্ষা-গুরুগণ ইনজিনিয়ারিং শিক্ষাকে, নির্ধারিত আয়ের আশায় সরকারী কর্মজীবনে প্রবেশ করিবার ছাড়পত্রস্বরূপ মনে করিতেন—শিক্ষাদ্বারা যে তরুণ মনে প্রজ্ঞাজাত সমবােধ মুদ্রিত করিয়া দিতে পারা যায়, এবং বিশেষ ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা যে প্রাকৃতিক উপাদান সাহায্যে নানাবিধ শিল্প-সৃষ্টির প্রধান উপায়, তাহা বুঝিবার মত কল্পনাশক্তি তাহাদের ছিল না। শেষ পরীক্ষা দিয়া ইনজিনিয়ারিং উপাধিপত্র (degree) লাভ করিবার পূর্বেই, রাজেন্দ্রের স্বাস্থ্যের রােগে, দৈন্যে কলেজে অবনতি ঘটিল। তাহার পুরাতন জ্বর পাঠ অসমাপ্ত ; আশু ফিরিয়া আসিয়া তাহার শরীর অধিকার জীবিকার্জনের করিয়া বসিল। অতএব বাধ্য হইয়া তাহাকে পাঠ বন্ধ করিতে ও কলেজ ছাড়িয়া দিতে গুরুতর ; প্রয়ােজন বােধ

৩৪
রাজেন্দ্রনাথ
হইল। আর্থিক বাধা-বিপত্তি ও ক্রমবর্ধমান অনুগ্রহ-বােধ
তাহার পক্ষে ক্লেশকর হইয়া ছিল। দায়ীত্বপূর্ণ বিবাহিত
অবস্থায়, অবিলম্বে জীবিকা-উপার্জন আরম্ভ তাহার পক্ষে
প্রায় অবশ্য করণীয় হইয়া উঠিল।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ
প্রতিকুল অবস্থায় বিশেষত্ব;
কঠোর জীবন-সংগ্রাম
যােগেন মুখার্জির এক বন্ধু বাংলা সরকারের চীফ
ইজিনিয়ারের অফিসে প্রধান কেরাণীর কাৰ্য্য করিতেন।
তিনি রাজেন্দ্রনাথের জন্য একটী বৃহৎ ‘বিলের প্রস্তাবিত
সরূভেয়ারের পদ সংগ্রহ করিয়া দিতে প্রস্তুত হইলেন।
অস্বাস্থ্যকর জলাভূমির জরীপের কাৰ্যে যে কঠিন জীবন
যাপন করিতে হইবে তাহা রাজেন্দ্রের ভগ্ন স্বাস্থ্যের পক্ষে
সঙ্গত হইবে না, কতকটা এই কারণে, কিন্তু প্রধানতঃ
কোন প্রভুর অধীনে কাৰ্য্য করিবার বিরুদ্ধে
স্বাধীন মনােবৃত্তি ;
লােভনীয় চাকরী তঁাহার অন্তর্নিহিত বিতৃষ্ণাবশতঃ, তিনি এই
চাকরী লইতে পারিলেন না—যদিও লইবার
অনুকূলে গুরুতর প্রলােভন ছিল, কেন না একজন উপাধি-
বিহীন অনভিজ্ঞ ছাত্রের পক্ষে এই পদের বেতন অপেক্ষাকৃত
প্রচুর ছিল, এবং এই পদ গ্রহণ করিলে রাজেন্দ্র ও তাহার
পরিবারবর্গ তৎক্ষণাৎ আর্থিক অসচ্ছলতার ক্লেশ হইতে
নিষ্কৃতি লাভ করিতে পারিতেন। সম্ভবতঃ তাহার অন্তরঙ্গ
প্রধান পরামর্শদাতা এক মতিলাল ভিন্ন তাহার
প্রত্যাখ্যান।

রাজেন্দ্রনাথ পরিবারের আর কেহই মনে করেন নাই যে তিনি এরূপ আশাতীত বেতনের পদ প্রত্যাখ্যান করিবেন, কিন্তু বিশেষ মনােযােগপূৰ্ব্বক সমস্ত বিষয় বিবেচনা করিয়া তিনি স্থির সিদ্ধান্ত করিলেন, এবং সেই প্রস্তাবে অস্বীকৃত হইলেন। একবার নিষ্পত্তি করিয়া তিনি নিজ সঙ্কল্পে অটল রহিয়া গেলেন। ইহা শুনিয়া যােগেন্দ্রনাথ ভয়ানক ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিলেন। যখন তাহার ভয় প্রদর্শন ও অনুরােধে কোন ফল হইল না, তখন তিনি রাজেন্দ্রনাথকে এক প্রকার গৃহ- বহিষ্কৃত করিয়া দিয়া বলিলেন যে অতঃপর তিনি তাঁহার ভরণপােষণের ভার গ্রহণ করিবেন না। এই বিপদে ভীত হইয়া, বরং নিজের স্বাধীন কর্মজীবন গড়িয়া তুলিবার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইয়া, রাজেন্দ্র বেলতলা পরিত্যাগ করিয়া তাহার ভ্রাতুস্পুত্র মতিলালের সহিত ওয়েলিংটন স্কোয়ারের নিকটস্থ একটী মেসে থাকিবার বন্দোবস্ত করিলেন। মতিলাল ও তাহার বন্ধুবর্গের সাহায্যে, রাজেন্দ্রনাথ অবশেষে একটী অনাথ বালিকাশ্রমে গণিতের সাময়িক শিক্ষকরূপে কাৰ্য্য পাইলেন। তিনি প্রত্যহ দুই ঘণ্টার জন্য শিক্ষা দিবার ভার গ্রহণ করিয়া কাৰ্য্য আরম্ভ করিলেন। ইহাতে তঁাহার মাসিক পনর টাকা আয় হইত, এবং এই টাকায় তাহার মেসে জীবন-যাত্রার সামান্য খরচ মাত্র সঙ্কুলান হইয়া যাইত। দেখিতে দেখিতে রাজেন্ত্রের বিবাহিত জীবনের প্রথম

অভিন্নহৃদয় মতিলাল
(স্বর্গীয় ডাক্তার মতিলাল মুখােপাধ্যায় )
{ প্রবীন বয়সে।

No text on this page.

কঠোর জীবন-সংগ্রাম ৩৭ অশুভ ফল। চারিটী বৎসর কাটিয়া গেল। এই অবস্থার দায়ীত্ব যে ক্রমশঃ বাড়িয়া যায়, এবং বিনা আয়ে বা অল্প আয়ে সেই দায়ীত্ব পূরণ করিতে হইলে যে কত অসুবিধা সহ ও ত্যাগ বাল্যবিবাহের স্বীকার করিতে হয় তাহা রাজেন্দ্র মর্মে মর্মে অনুভব করিতে লাগিলেন। তাঁহার মাতা ও স্ত্রী, সুখে স্বচ্ছন্দে না থাকিলেও, একান্নবর্তী পরিবারের আশ্রয়ে ছিলেন, কিন্তু তাঁহার বিবেক তাহাকে, এই অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকিতে না দিয়া, অস্থির করিয়া তুলিল। কোন সমাজের গঠন ও প্রচলিত আচার ব্যবহারের উপর, তাহার শুভাশুভ কি পরিমাণে নির্ভর করে সে বিষয়ে মতভেদ থাকিতে পারে, কিন্তু বৈদিক যুগে প্রচলিত যৌবন- বিবাহের স্থলে ভারতে যে বাল্যবিবাহ ঘটনাচক্রে পরে প্রবর্তিত হইয়াছিল, তাহা বর্তমান সময়ের পক্ষে অনুপ- যােগী ও অনিষ্টকর বলিয়া অনেক চিন্তাশীল ব্যক্তিই স্বীকার করেন, এবং তাহার বিরুদ্ধে আন্দোলন ও প্রচেষ্টাও চারিদিকে হইতেছে। বিশেষ বঙ্গে প্রচলিত বাল্যবিবাহ প্রথার যে কিরূপ অপব্যবহার হইতে পারে ও তাহা যে আধুনিক যুগে ব্যক্তিগত ও জাতিগত উন্নতির পরিপন্থী তাহা শুধু পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ দেখাইয়া দেন নাই, এদেশের মনিষীগণও যুবকবৃন্দকে বুঝাইয়া দিবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিয়াছেন। স্থর রাজেন্দ্র এই মনিষীগণের মধ্যে অন্যতম। তিনি তাহার কর্মজীবনের পরবর্তী সময়ে, স্বভাবসুলভ

রাজেন্দ্রনাথ
ছাত্রজীবনে
বিবাহের
স্পষ্ট ভাষায়, ভুক্তভােগীর শিক্ষা স্বরূপ, যুবক শ্রোতৃবর্গকে
বলিয়াছিলেন —“বিদ্যালয়ের ছাত্রের পক্ষে পাঠ্যাবস্থায়
বিবাহ সম্পাদিত হওয়ার অপেক্ষা অন্য
কোন গুরুতর অনিষ্ট ঘটিতে পারে না।
তীব্র নিন্দা।
আমার বিবাহের সময় আমার বয়স সপ্তদশ
এবং আমার স্ত্রীর বয়স দ্বাদশ বৎসর ছিল ; আমার
শিক্ষা-সমাপনের পূর্বেই তিনি যৌবনবতী নারী হইয়া
উঠিলেন। আমার ছয় বৎসর বয়সে পিতৃবিয়ােগ হইয়াছিল
—আমার বাল্যবিবাহের সম্পূর্ণ কারণ এই যে আমি এক
হিন্দু পরিবারে বিধবা মাতার একমাত্র পুত্র ছিলাম।
আমার অভিভাবক অর্থাৎ পরিবারের কর্তা, আমার স্বর্গীয়
পিতার স্মৃতির প্রতি তাহার ভক্তি দেখাইবার উদ্দেশ্যে,
এত অল্প বয়সে আমার বিবাহ সম্পাদন করিয়াছিলেন।
এক শিশুর সহিত আর এক শিশুর এই বিবাহ, পারিবারিক
রীতি অনুসারে বিশেষ আড়ম্বরে ও সমারােহে সম্পন্ন হইয়া
গেল। আমার স্ত্রী যাহাতে আমাকে চিঠি লিখিতে
পারেন সেইজন্য আমি বাধ্য হইয়া আমার হাত খরচ হইতে
প্রতিমাসে দুই চারি আনা বাচাইতাম ; তিনি একদিন
অন্তর আমাকে চিঠি লিখিতে চাহিতেন, কিন্তু আমার সেরূপ
খরচ করিবার ক্ষমতা ছিল না। আমি মাসে পাঁচ টাকা
করিয়া হাত খরচ পাইতাম—ইহা আমাকে বেলতলা হইতে
প্রত্যহ কলেজে আসিবার জন্য সেয়ারের গাড়ী ভাড়া

কঠোর জীবন-সংগ্রাম
হিসাবে দেওয়া হইত। সুতরাং আমি আমার স্ত্রীর জন্য
একদিন অন্তর চিঠি লিখিবার মত যথেষ্ট পােষ্টকার্ড কিনিতে
পারিতাম না—বিবাহিত যুবতীর অন্য যে সমস্ত ছােটখাট
জিনিষের প্রয়ােজন তাহা ত দূরের কথা। তাহার এই
অভাব আমার পক্ষে এত কষ্টকর হইয়াছিল, এবং আমার
মনের গভীর কোমল ভাব এরূপ ভাবে উত্তপ্ত ও বিকৃত
করিয়া দিয়াছিল যে আমাকে স্পষ্টই স্বীকার করিতে হইবে
যে ইহাতে আমার শিক্ষার বিশেষ হানি হইয়াছিল। সেই
জন্য, পূর্ণ দায়ীত্ব-জ্ঞান অনুসারে ও দৃঢ় বিশ্বাস ভরে, আমি
আমার সমস্ত যুবক বন্ধুগণকে এই নিৰ্বন্ধই করি যে জীবিকা
উপার্জন করিতে পারিবার পূর্বে তাহারা যেন কখনও
বিবাহের বিষয় মনেও না করে-তা তাহাদের পিতামাতা
যাহাই বলুন। আমি স্বীকার করিতেছি যে আমিও এই
বিষয়ে দোষী, কেননা আমার পুত্রের শিক্ষা শেষ হইবার
পূৰ্বেই তাহার বিবাহে আমাকে সম্মতি দিতে হইয়াছিল।
কিন্তু যখন আমার পুত্র শিক্ষার জন্য ভারতের বাহিরে
গিয়াছিল, তখন তাহার স্ত্রীর হাত খরচের জন্য আমি কিছু
দিতে পারিয়াছিলাম। আমি আমার স্ত্রীর ইচ্ছা ও বিশেষ
পীড়াপীড়ির জন্যই, অনিচ্ছার সহিত এই বিবাহে মত
দিয়াছিলাম। পাছে পুত্ৰটী এক ইংরাজ বালিকাকে বিবাহ
করে এই ভয়ের ভাব আমার স্ত্রীর মনে ছিল বলিয়াই
তাহার সানুনয় প্রার্থনা কার্যে পরিণত হইয়াছিল। এরূপ

৪০
রাজেন্দ্রনাথ
বিদেশী বিবাহ যে বাল্যবিবাহ অপেক্ষাও গুরুতর বিপদ
এই ধারণা আমার থাকায়, আমি মত দিতে বাধ্য হইয়া-
ছিলাম। আমার দ্বিতীয় পুত্রের সম্বন্ধে ইহা বলিতে পারি
যে যতদিন সে শিক্ষা সমাপন করিয়া আশাপ্রদ কর্মজীবনে
প্রবেশ করে নাই, ততদিন তাহাকে বিবাহ করিবার জন্য
কোন পীড়াপীড়িই করা হয় নাই।”
স্যর রাজেন্দ্রের জীবনের এক বিশেষ অংশের এই
স্পষ্ট অথচ অর্থপূর্ণ বিবরণীর ভিতর, বাল্যবিবাহের তীব্র
নিন্দা ব্যতীত, সেই অতীত যুগে তাহার মনে যে অশান্তি
ও দুঃখকর দারিদ্র্যের ভাব বর্তমান থাকিত তাহার স্পষ্ট
নিদর্শন পাওয়া যায়। বাল্যবিবাহ তাহার পক্ষে কী গুরুতর
প্রতিবন্ধক হইয়াছিল তাহাই তিনি পরিষ্কার ভাষায়
বুঝাইয়াছেন; আরও ইঙ্গিত করিয়াছেন যে কোন ক্ষুদ্রতর
মানবের পক্ষে ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষের উপর এরূপ
বাধাগ্রস্থ জীবনের এতদূর দারুণ প্রতিক্রিয়া হয় যে তাহাতে
তাহার উদ্দেশ্য-সাধন অসম্ভব হইয়া পড়ে। কিন্তু স্যর
রাজেন্দ্র নিজে প্রতিকূল অবস্থার সহিত
প্রতিকুল অবস্থার সংগ্রাম করিয়া জয়ী হইয়াছেন। কে বলিতে
শুভ পরিণাম।
পারে যে
যে ধাতুকে এরূপ কঠিন
লৌহস্তম্ভের উপর পিটিয়া পিটিয়া উজ্জ্বল পিত্তল রূপে
পরিণত করা হইয়াছে, তাহা এইরূপ আঘাত পাইয়াই
আরও অধিকতর দীপ্তিমান্ হইয়া উঠে নাই ? দুঃখের
অসাধারণ ক্ষেত্রে

৪১
কঠোর জীবন-সংগ্রাম
মধুরতা বিষয়ে নৈতিক ব্যাখ্যার প্রয়ােজন নাই; কিন্তু
মানব সম্বন্ধীয় কার্যাবলীর একটি অল্প বিস্তর নির্দিষ্ট
ধারা এই মনে হয় যে কেবল ক্লেশ ও পরীক্ষার ভিতর
দিয়াই মানুষ নিজের যথার্থ প্রকৃতি প্রকাশ করিতে পারে।
নিজ ভরণ-পােষণ সম্বন্ধে স্বাধীনতা লাভ করিয়াও
রাজেন্দ্র কঠোর জীবন যাপন করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।
অনাথাশ্রমে প্রত্যহ দুইঘণ্টা পরিশ্রম করিয়া তিনি
কেবলমাত্র নিজের গ্রাসাচ্ছাদনের উপযুক্ত অর্থ অর্জন
করিতেন। তাঁহার পাঠ তখনও শেষ হয় নাই। সাধারণ
চাকরীর উপর হার এতই বিতৃষ্ণা ছিল যে তাহার
জীবনের সর্বাপেক্ষা নৈরাশময় মুহূর্তে, শত অভাব সত্ত্বেও,
যে চাকরী তিনি প্রত্যাখ্যান করিয়া ছিলেন, সেরূপ কোন
কাজ লইবার ইচ্ছা অতঃপর ভ্রমেও তাহার মনে উদয়
হয় নাই। অপর দিকে, ইন্‌জিনিয়ারিং সমস্যার প্রতি
তাঁহার স্বাভাবিক অনুরাগ ক্রমশঃ
প্রবল আসক্তিতে
পরিণত হইল। তাহার সমস্ত অবসর সময় ইজিনিয়ারিং
বিজ্ঞান সম্বন্ধে জ্ঞানবৃদ্ধি এবং
নির্মাণকাৰ্য্য
তাহার
দর্শনে ঐকান্তিকত। ক্রিয়াসিদ্ধ (Practical) প্রয়ােগের উদ্দেশ্যে
নিবেদিত হইত। কলিকাতা সহরের রাস্তায় ও সাধারণ
উদ্যানে তিনি প্রায়ই বেড়াইতেন, এবং সেই সময়
প্রাসাদোপম অট্টালিকাবর্গের রচনা-কৌশল (design)
দেখিয়া দেখিয়া, তিনি অতুল আনন্দ উপভােগ করিতেন।
৪

৪২
রাজেন্দ্রনাথ
;
ইন্‌জিনিয়ারিং মতামতে (theory) তিনি বিশেষ মােহিত
হইতেন না; কিন্তু কারিকরগণ যখন তাহাদের ঘােট ঘােট
কাজ তন্ময় হইয়া করিত, তখন তিনি অখণ্ড মনোেযােগ
দিয়া তাহাদের কাৰ্য দেখিতেন এবং সেই কাজগুলি
আরও উত্তমরূপে করা যায় কিনা তাহাই ভাবিতেন।
তিনি সহর্ষ মনোেযােগ দিয়া স্থাপত্য-বিদ্যাবিদের
অভিপ্রায়ের ক্রমবিকাশ একদৃষ্টে চাহিয়া দেখিতেন, এবং
কোথায় ও কি রূপে সেই কল্পনার উন্নতি সাধন করা যায়
তাহাই নিজমনে তােলাপাড়া করিতেন। অন্য কোন সখে
উচ্চ গুণাজ্জনের
তাহার মন নিবিষ্ট ছিল না—অন্য কোন
ভিত্তি।
খেলা তাহার অবসর সময়ের ভিতর আমল
পাইত না। তাহার সময়, তাহার মন, তঁাহার কর্মশক্তি
সমস্তই এক সৰ্ব্ব-প্রধান উদ্দেশ্য-সাধনে নিয়ােজিত থাকিত।
যে প্রখর ও কেন্দ্রীভূত শ্রমশীলতা ও নৈপুণ্য, রাজেন্দ্রনাথ
নিজ কর্মজীবনের প্রথম আরম্ভ হইতেই দেখাইতে পারিয়া-
ছিলেন, আমাদের বিশ্বাস তাহার ভিত্তি এই রূপেই
স্থাপিত হইয়াছিল।
তুচ্ছ ঘটনা হইতে কিরূপে বৃহৎ ব্যাপার উৎপন্ন হয়,
স্যর রাজেন্দ্ৰ ভঁাহার কর্মবহুল জীবনের সময়বিশেষে
আপনাকে, ও যাহারা তাহার কথা শুনিবার সুযােগ পান
তাহাদিগকে স্মরণ করাইয়া দিবার সূত্র পাইয়াছেন।
বৰ্ত্তমান সময়ে তিনি যে প্রসিদ্ধ ও উচ্চ স্থান অধিকার

৪৩
তুচ্ছ ঘটনায়
সফলতা।
কঠোর জীবন-সংগ্রাম
করিয়া আছেন, একটা সামান্য ঘটনা তাহাকে তদুর্দিষ্ট
পথে চালিত করিয়াছিল—উপরােক্ত সত্যের ইহা অপেক্ষ।
উত্তম উদাহরণ তাহার জীবন হইতে
উচ্চাকাঙ্খর পাওয়া যায় না। পূৰ্বেই বলা হইয়াছে
যে তিনি এই সময় তাহার ভ্রাতুস্পুত্র ও
অন্তরঙ্গ বন্ধু মতিলালের সঙ্গে এক মেসে থাকিতেন।
মতিলাল যে ডাক্তারী পেশার জন্য আপনাকে শিক্ষিত
করিতেছিলেন, তাহার আশায় থাকিতেন। কিন্তু স্বাধীন
ব্যবসায়ী-জীবনের এক ছায়ামাত্র ছাড়া, রাজেন্দ্রের সম্মুখে
অন্য কোন বিশেষ লক্ষ্যই ছিল না। এমন কোন বিশদ
ও নির্দিষ্ট প্রণালী জানা ছিল না, যাহা অনুসরণ করিয়া
তিনি জীবনের উচ্চাকাঙ্খর স্রোতস্বতী পৰ্যন্ত পঁহুছিতে
পারেন। বলিতে কি, তিনি যেন এক অজ্ঞাত বাধায়
লাগিয়া ক্রমাগত হোঁচট খাইতে ছিলেন, এবং সেই বাধার
অপর দিকে তঁাহার উচ্চাভিলাষ ও স্বপ্নের আসল আকৃতি
বিরাজিত ছিল।
বাঙ্গালীর মনে, ব্যবসায়’ শব্দটী কোন আকর্ষণী ও
মােহিনী শক্তি সঞ্চার করিতে পারে না। ব্যবসায়-গত
ব্যবসায়ী-জীবনে শিক্ষানবিশী করিতে হইলে, যে কঠিন
বাঙ্গালীর
পরিশ্রম ও শ্রমশীলতার প্রয়ােজন, তাহার
বিরুদ্ধে বাঙ্গালীর ধ্যানপরায়ণ মানসিক
জড়তা, শারীরিক অবসন্নতার সহিত মিলিত হইয়া, বিশেষ
অযােগ্যতা।

৪৪ রাজেন্দ্রনাথ সফলতা। বাধার সৃষ্টি করে। বাঙ্গালী কবিসম্রাট, বিরাট, প্রাকৃতিক দৃশ্য ও সৌন্দৰ্য-বােধের দিক হইতে, এই মনােবৃত্তির কারণ নির্দেশ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন বটে, কিন্তু কঠোর সত্য এই যে কেবলমাত্র মনােবিজ্ঞানবিষয়ক নিলিপ্ততা কখনই মানুষের অন্নসংস্থান করিতে পারে না। সততাযুক্ত কর্মের মূল্য ও সহিষ্ণুতাপূর্ণ পরিশ্রমের মর্যাদা-জ্ঞান রাজেন্দ্রনাথ জীবনের প্রথম হইতেই উপলব্ধি করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা, সহিষ্ণু পরিশ্রম ও সাহসে পারিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়। তাঁহার পরিবারে এমন কোন পূৰ্বরীতি ( tradition) ছিল না, যাহা তঁাহার মনে ব্যবসায়-গত কর্মজীবনের দিকে অনিবার্য প্রেরণা আনিতে পারিত। তাহার চারিপার্শ্বে ও নিকটে এমন কোন জীবন্ত উদাহরণও ছিল যাহা তাঁহাকে, যেন হাতছানি দিয়া, ঝটিকাময় ও বিষম প্রয়াসপূর্ণ জীবনের দিকে আহ্বান করিতে পারিত। কিন্তু তাহার মন ছিল অগ্রণীর মত—তাহা সাহস ও নৈপুণ্য- সহকারে সুগঠিত এবং যুক্তিমূলক সুনিশ্চিত প্রণালী অনুসারে সুরচিত। দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও মনােবল, যৌবনসুলভ আশাবার সহিত মিলিত হইয়া, এমন একটা অভূতপূৰ্ব কর্মজীবন গড়িয়া তুলিল, যাহা তাহার কৃতজ্ঞ দেশবাসীগণের নয়নপথে উজ্জ্বলপদচিহ্নম্বরূপ পড়িয়া রহিয়াছে। একবৎসর রাজেন্দ্রনাথ বালিকা বিদ্যালয়ের সাময়িক শিক্ষকের কাৰ্য করিয়াছিলেন, কিন্তু সাধারণ প্রায় কঠোর জীবন-সংগ্রাম ৪৫ প্রথম সুযােগে সান্যালের সম্বন্ধ। ; ইজিনিয়ারিং সম্বন্ধে জ্ঞানবৃদ্ধিই তাহার প্রধান বৃত্তি ছিল। আমরা পূৰ্বেই বলিয়াছি যে অট্টালিকা প্রভৃতির আসল নির্মাণকাৰ্য্য তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পৰ্য- বেক্ষণ করিতেন। সেই সময়, রামব্রহ্ম সান্যাল নামক একটি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র তাঁহার সঙ্গে এক মেসে থাকিতেন। অবিরত অসুস্থতা, সান্যালের ছাত্রজীবনের সাথী হইয়া ছিল ; তাহার ফল এই হইল যে তিনি ডিগ্রি পাইলেন না, সুতরাং পড়া বন্ধ করিয়া অর্থকর কাৰ্য্যের চেষ্টা করা ভিন্ন সঁহার অন্য উপায় রহিল না। তিনি জীবন- বিজ্ঞানের (biology) ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ করিয়া ছিলেন বলিয়া আলিপুরের চিড়িয়াখানার সুপারিন্টেডেন্টের পদ পাইলেন। তখন সবেমাত্র সেই চিড়িয়াখানা মঞ্জুর হইয়াছিল, এবং তাহার অন্তর্গত বাগান প্রস্তুত হইতেছিল। সান্যাল ও রাজেন্দ্র এক মেসে থাকিয়া দুই নিকট বন্ধু হইয়া গিয়াছিলেন। সান্যাল সুপারিন্টেডেন্টের কার্যে যােগ দিবার পর, রাজেন্দ্রনাথ সময়ে সময়ে আলীপুরে তাঁহাকে দেখিতে যাইতেন এবং তাহার সঙ্গে নব-বিন্যস্ত বাগানে ঘুরিয়া বিবরণ। বেড়াইতেন। তখন সেখানে পশুপক্ষী- দিগের বাসের জন্য পিঞ্জর ও গৃহসমূহ গঠিত হইতেছিল । এক সুন্দর প্রভাতে, রাজেন্দ্রের স্কুলে পড়াইবার কাৰ্য উন্নতি-মুলে তুচ্ছ ঘটনার

৪৬
রাজেন্দ্রনাথ
থাকায়, এইরূপ বন্ধু-দর্শনের জন্য তিনি আলীপুরে
গিয়াছিলেন এবং সান্যাল ও তিনি গল্প করিতে করিতে
বাগানে বেড়াইতেছিলেন। গল্পের বিষয় বােধ হয় তাহাদের
পুরােবৰ্ত্তী নিজ নিজ আদর্শ ও আকাঙ্খ, কিম্বা হয়ত
তাহাদের মেসের জীবনের তুচ্ছ ঘটনা এবং মেসের
বন্ধুগণ। হঠাৎ রাজেন্দ্রনাথের মনোেযােগ
মনোেযােগ কতকগুলি
লােকের দিকে আকৃষ্ট হইল। সেইদলে একজন ইংরাজ
ছিলেন, এবং তিনি পার্শ্ববর্তী কারীকরদিগকে কোন
প্রয়ােজনীয় বিষয় বুঝাইতে গিয়া স্পষ্টতঃই ফাপরে
পড়িয়াছিলেন। সেই স্থানে, বিশেষ নক্সা অনুযায়ী
ও নূতন আকৃতির একটি সেতু নির্মিত হইতেছিল, এবং
সেই ইংরাজ, সম্ভবতঃ ভারপ্রাপ্ত ইন্‌জিনিয়ার, তাঁহার
পক্ষে সর্বাপেক্ষা ভাল হিন্দুস্থানী-মিশ্রিত বাংলায় বুঝাইতে
চেষ্টা করিতেছিলেন যে সেতুর মূল দেওয়াল (abutment)
ঠিক খিলান তুলিবার পুর্বেই কিভাবে নির্মাণ করিতে
হইবে। রাজেন্দ্রনাথ তৎক্ষণাৎ ব্যাপারটী বুঝিতে
পারিলেন। যে মিস্ত্রি, সম্মানভরে কিন্তু স্পষ্টতঃই নিষ্ফল
ভাবে, ইজিনিয়ারের অস্পষ্ট আদেশ শুনিতেছিল,
তাহারই সঙ্গে রাজেন্দ্রনাথের, পূৰ্বে বেড়াইতে বেড়াইতে
কথা কহিবার প্রয়ােজন হইয়াছিল। সুতরাং এই দুই
জনের কথাবার্তার মাঝে পড়িয়া, ইংরাজ কি বলিতে
চাহেন তাহা দেশীয়ভাষায় বুঝাইয়া দিবার একটা ঝোঁক

কঠোর জীবন-সংগ্রাম ৪৭ হঠাৎ তাহার মনে আসিল। মুহুর্তের উত্তেজনাবশে তিনি মিস্ত্রিকে ডাকিয়া, কিরূপে সেই প্রধান দেওয়াল নিৰ্মাণ করিতে হইবে তাহা তাঁহার পরিস্কার ও সুনিশ্চিত ভাষায় বুঝাইয়া দিলেন। মিস্ত্রি অবিলম্বে বিষয়টী বুঝিতে পারিল, এবং পূর্বমুহূর্তের উদ্বেগ হইতে পরিত্রাণ পাইয়া, স্বাভাবিক আনন্দভরে ইজিনিয়ারকে উচ্চৈঃস্বরে বলিল যে আর তাহার কিছু বলিবার প্রয়ােজন নাই, কারণ এখন সে কি করিতে হইবে ও কিরূপে করিতে হইবে তাহা ঠিক বুঝিয়াছে। এই ইংরাজ ব্রাফোর্ড লেলি—তখন তিনি কলিকাতা কর্পোরেশনের চীফ ইনজিনিয়ার ছিলেন। পরে তিনি নাইট উপাধি লাভ করেন, এবং হুগলি-পুলের প্রসিদ্ধ পরিকল্পনাকারীরূপে ইনজিনিয়ারিং পরিচিত হন। ব্রাফোর্ড লেলি, এই কথাবার্তায় বাধাপ্রদানে কিছু মনে করেন নাই। তিনি রাজেন্দ্রনাথকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে তিনি কে ও বাগানে কি করিতেছেন। রাজেন্দ্রনাথ যে কৈফিয়ত দিলেন তাহা তাহার প্রকৃতির পরিচায়ক। ইন্‌জিনিয়ারিং পেশার সুপরিচিত ও সৰ্ব্ব- স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ এই ইংরাজের সঙ্গে তাহার পক্ষে সরলভাবে কথা বলিবার কোন বাধা ছিলনা, বিশেষ প্রায় অজ্ঞাতসারে তাহার মনে হইতেছিল যে ব্রাফোর্ড লেলি কৃতজ্ঞ-হৃদয়ে, ও তাঁহাকে সাহায্য করিতে জগতে

৪৮
রাজেন্দ্রনাথ
অভিলাষী হইয়া, সদয়ভাবে তঁাহার সঙ্গে কথা কহিতেছেন।
রাজেন্দ্র প্রথমে সান্যালের সঙ্গে তাঁহার বন্ধুতার বিষয়
উল্লেখ করিলেন, আর বলিলেন যে দু’জনেই অসুস্থতা
বশতঃ নিজ নিজ পেশার উপযুক্ত হইবার ডিগ্রি না
পাইয়া, দুর্ভাগ্য বরণ করিয়া লইয়াছিলেন, এবং এখন
সান্যাল অর্থকর ও ইচ্ছানুরূপ কর্মজীবন নির্বাচন করিতে
সমর্থ হওয়ায়, তিনি সময়ে সময়ে বন্ধুর নিকটে একটু
গল্প করিতে ও পরামর্শ লইতে আসায় আনন্দ লাভ
করেন। ইহাই তাহার আলিপুরের বাগানে আসিবার
কারণ। আরও জিজ্ঞাসিত হইয়া, তিনি নিজ উচ্চাকাঙ্খর
ইতিহাস বর্ণনা করিলেন—কিরূপে ইন্‌জিনিয়ারিং পেশা
ও স্বাধীন জীবনের জন্য প্রবল আসক্তি ও উৎসাহ
বশতঃ, তিনি একটি মােটা বেতনের পদ গ্রহণ করিতে
অস্বীকৃত হইয়াছিলেন। অতঃপর তিনি, স্থপতি ও কন্ট্রাক্টর
রূপে যে স্বাধীন জীবিকা আবিষ্কার করিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ,
তাহাই জোর করিয়া বলিলেন। তাহার ইনজিনিয়ারিং-
বিষয়ক জ্ঞান যে কোন ক্রমেই সামান্য ছিলনা, তাহা
তিনি যে ভাবে মিস্ত্রির দ্বারা কাজ চালাইয়া লইয়া-
ছিলেন তাহা হইতেই প্রতিপন্ন হইয়াছিল; এবং এই
কৈফিয়ত হইতে ব্রাফোর্ড লেলি, তাহার সম্মুখস্থ
যুবকের ক্ষমতা বিষয়ে যে অনুকূল ধারণা করিয়াছিলেন
তাহাও নিঃসন্দেহ। যদিও এক উচ্চাভিলাষী কিন্তু প্রায়
••

কঠোর জীবন-সংগ্রাম ৪৯ ভাবপ্রবণ কৃতজ্ঞতা। নিঃসম্বল যুবকের বিরাট কল্পনায় ব্রাডফোর্ড লেলির হাস্যের উদ্রেক হইয়াছিল, তথাপি তিনি রাজেন্দ্রকে নিজ কার্ড দিয়া পরদিন প্রাতে পতা জলকলের কারখানায় গিয়া তাহার সঙ্গে দেখা করিতে বলিলেন। যে সামান্য ঘটনাসূত্রে তাহার সৌভাগ্যের দ্বার খুলিয়া গেল, কী আনন্দভরে স্যর রাজেন্দ্র তাহার দিকে পশ্চাৎ অদৃষ্টচক্রের দৃষ্টি করেন, তাহা সম্পূর্ণভাবেই বুঝা যায়। বিবর্তন ও পঞ্চাশাের্ধ বৎসর পরে, যখন বৃদ্ধ শ্রদ্ধাস্পদ স্যর ব্রাফোর্ড, স্যর রাজেন্দ্রের বিলাতে আগমনবার্তা শুনিয়া, হঠাৎ তাহার লণ্ডনস্থ অফিসে প্রবেশ- পূৰ্বক, দুষ্ট বালকের প্রতি শিক্ষকের ব্যবহারের মত, তাহার দিকে চাহিয়া অঙ্গুলি তাড়না করিলেন, তখন কী রহস্যময় স্মৃতির প্রভাবে স্যর রাজেন্দ্রের সমস্ত ভাবপ্রবণ হৃদয় আন্দোলিত হইয়া উঠিল, তাহা অনুমানের যােগ্য। যখন স্তর রাজেন্দ্র এক বিশেষজ্ঞ কমিটির (স্যর আর, এন, মুখার্জির নেতৃত্বে ইন্‌জিনিয়ারিং কমিটি নামে পরিচিত কমিটির) পরামর্শানুসারে কলিকাতার জন্য ক্যাটি- লেভার পুলের পক্ষে মত প্রকাশ করিয়াছিলেন, তাহারই কয়েক মাস পরে এই সাক্ষাৎ ঘটিয়াছিল। ভাগীরথীর যে বৰ্ত্তমান ভাসমান সেতু অর্ধশতাব্দীর উপর জনসাধারণের উপকার করিয়া আসিয়াছে, স্যর ব্রাডফোর্ড তাহার পরি- কল্পনাকারী। তখন তিনি যেমন শ্রমশীল ও পৌরুষের রাজেন্দ্রনাথ আধার ছিলেন, উপরােক্ত ঘটনার সময় প্রায় নবভিীবর্ষ বয়সের বৃদ্ধ হইয়াও তােপ ছিলেন। অদৃষ্টের বিবর্তনে, তিনি, কলিকাতায় ভাগীরথী পার হইবার জন্য ভাসমান ধরণের আর একটি পুলের সমর্থনকারীরূপে, মুখার্জি কমিটির সমীপে উপস্থিত হইয়াছিলেন। এই প্রস্তাব, সেতু-নিৰ্মাণ- স্থাপত্যের বর্তমান অর্থ-বিজ্ঞান অনুসারে স্পষ্টভাবেই পরিত্যক্ত হইয়াছিল। কমিটির পরিকল্পনার পক্ষে যে উৎকৃষ্ট শিল্পবিষয়ক যুক্তি ছিল তাহা স্বীকার করিয়া লইয়াও, স্যর ব্রাডফোর্ড লেলি স্যর রাজেন্দ্রকে বিশেষ অনুরােধ করিলেন যে তিনি যেন তাহার সর্বোৎকৃষ্ট সৃষ্ট পদার্থের অন্তর্নিহিত মত একেবারে বর্জন করিয়া একজন সমকৰ্ম্মী ইজিনিয়ার ও পুরাতন বন্ধুর সুনাম নষ্ট না করেন। ইহা বিশুদ্ধ ভাবপ্রবণতার উদ্দেশে সনির্বন্ধ অনুরােধ। স্যর রাজেন্দ্র বলিয়াছেন যে এই অনুরােধে তঁাহার গভীর মনােভাব সাড়া দিবার মত হইয়া উঠিল। কিন্তু ইতিপূৰ্বেই কমিটি তাহাদের বিবরণী প্রদান করায়, তখন তাহার এ বিষয়ে আর কিছু বলিবার ছিল না। সুতরাং, যুক্তি ও শিল্পসঙ্গত উৎকর্ষ বিসর্জন দিয়া, ভাবপ্রবণতা অনুসারে কাৰ্য করিবার যে প্রথম ঝোঁক তাহার হইয়াছিল, তাহা দমন করা ভিন্ন উপায় ছিল না। এই সাক্ষাতে স্যর রাজেন্দ্রের চরিত্রের এক হৃদয়গ্রাহী বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বলভাবে দৃষ্টিগােচর হইয়াছিল, অর্থাৎ তিনি কখন উপকার বা মহৎ কার্যের কথা ভুলেন না।

কঠোর জীবন-সংগ্রাম
সমূহ
নিজ মতের
পােষকতা।
যখন স্যর ব্রাফোর্ড লেলি আপােষের জন্য দৃঢ়ভাবে যুক্তি
দেখাইতেছিলেন, তখন তাহার নিকট বাধিত থাকার ভাব
স্যর রাজেন্দ্রের মনে জাগরূক ছিল, এবং এই ব্যক্তিগত
কৃতজ্ঞতা স্যর ব্রাডফোর্ডের যুক্তির সম্বন্ধে প্রায় তাহার
মনে বিশ্বাস উৎপন্ন করিয়াছিল। কিন্তু তিনি আরও
একটি শিক্ষালাভ করিয়াছিলেন, অর্থাৎ যখন
আপত্তিসত্ত্বেও
শিল্পসংক্রান্ত কার্যকারিতা বিচারের বিষয়,
তখন কেবলমাত্র বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্ত অনু-
সারে কাৰ্য্য হওয়া উচিত। এই হিসাবে, তিনি কোন
মতের একমাত্র সমর্থনকারী হইলেও, কঠিন প্রস্তরের
মত দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান থাকেন। এই চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের
উদাহরণ, জনসাধারণের জন্য তাহার কৃত বিবিধ কার্যাবলীর
ভিতর বার বার পাওয়া গিয়াছে।
ঘটনার সূত্র ধরিয়া বলা যায় যে আলিপুরে ব্রাফোর্ড
লেলির সহিত প্রথম সাক্ষাতের পর, সমস্ত দিন রাজেন্দ্রনাথ
শত আশা ও উত্তেজনার মধ্যে কাটাইয়া দিলেন। দুইটি
সমস্যা আপাততঃ তাঁহাকে উদ্বিগ্ন করিয়া তুলিল—অর্থাৎ
অর্থ বা মূলধন ও পরিচ্ছদ বিষয়ক সমস্যা। প্রথমটীর
সমাধান অদূর ভবিষ্যতের জন্য রাখিয়া দিয়া, তিনি পরিচ্ছদ
সম্বন্ধে, পরদিন প্রভাতে তাহার জীবনের সর্বপ্রধান সাক্ষাতের
জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলেন। ইহা যে কী গুরুতর সমস্যা
তাহা বুঝাইতে হইলে বলিতে হইবে যে বঙ্গের তদানীন্তন

রাজেন্দ্রনাথ
অবস্থায় ব্যবসায়-ক্ষেত্রে, বিশেষ ইন্‌জিনিয়ারিং ব্যবসায়ে,
বিশুদ্ধ বাঙ্গালী উদ্যম হতাদরে পড়িয়াছিল। সম্ভবতঃ অধীন
জাতির আত্ম-সৃষ্টহীনতা-মনােভাব (inferiority complex)
বর্তমান থাকায়, শাসকজাতির পরিচ্ছদ অনুকরণ সম্মানসূচক
বলিয়া গণ্য হইত। তখন বৃটীশ কর্তৃপক্ষের হস্তে,
সরকারী
পদ ও সরকারী কাৰ্যভার প্রদান করিবার সমস্ত ক্ষমতা ন্যস্ত
ছিল। তাহাদের মধ্যে অধিকাংশের, ভারতবাসী সম্বন্ধে
ঔপনিবেশিক মনােবৃত্তি ও কর্কশ মেজাজ ছিল। এইরূপ
প্রকৃতির লােক কখন ধারণাই করিতে পারিতেন না যে
অধীন জাতির কোন মস্তিষ্ক-শক্তি বা অনুভব-ক্ষমতা থাকিতে
পারে। সুতরাং বিজিত জাতির লােকের পক্ষে ব্যবসায়-
ক্ষেত্রে সামান্য কৃতকাৰ্যতার উপায়, সাধারণতঃ অনুকরণের
পথে পাওয়া যাইত। বাঙ্গালীর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, ইংরাজী শিক্ষায়
সজাগ হইয়া, এই অবস্থার মূলসূত্রগুলি আয়ত্ত করিয়া
লইল, এবং জয়ী হইবার জন্য নত হইল (stooped to
conquer")
রাজেন্দ্রনাথ অনেক ভাবিয়া, কাৰ্য্যক্ষেত্রে উপহাস বা
তাচ্ছিল্য এড়াইবার জন্য, গলাবন্দ কোট ও
পেণ্টলন
পরিধান করাই যুক্তিযুক্ত মনে করিলেন।
ইনজিনিয়ারিং
বর্ধনশীল মানসিক শক্তি থাকায়, তিনি
পরিচ্ছদ-সমস্যা। স্থানকালের উপযােগী অনুষ্ঠান সহজেই
নির্ধারণ করিতে পারিতেন। বৃহত্তর উদ্দেশ্য সাধনের জন্য,
ব্যবসায়ে

* * - .
কঠোর জীবন-সংগ্রাম
স্যর
মত যে
ধুতি-কামিজ ছাড়িয়া ইংরাজী পরিচ্ছদ পরিধানে তাহার
মনে কোন চাঞ্চল্যের উদয় হয় নাই; তথাপি তিনি যে
একটা নূতন কাৰ্য করিতেছেন, এই চিন্তা তাঁহার মনে
দৃঢ়ীভূত হইয়াছিল। রাজেন্দ্রের এই
পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পােষক ব্যবসায়-কাৰ্যে বিশেষ
ফলদায়ক, কেননা ইহাতে স্বচ্ছ মন ও চতুর মস্তিষ্কের
আভাস পাওয়া যায়। সাফল্য লাভ করিতে হইলে
শ্রমশীলতা ও নৈপুণ্যের আভাস, ইহার সহিত যুক্ত
হওয়া উচিত।
উপরােক্ত পরিচ্ছদ পরিধান করিয়া, আলিপুর বাগানের
ঘটনার পরদিন প্রাতে রাজেন্দ্রনাথ যখন পতা জলকলের
কারখানায় গিয়া ব্রাফোর্ড লেলির সহিত সাক্ষাৎ
করিলেন, তখন তাহার বাহিরের আকারে বুদ্ধিমত্তা,
পরিচ্ছন্নতা ও আত্মবিশ্বাসের ভাব বিদ্যমান ছিল। তঁাহার
শুভ্র
নূতন বেশ দেখিয়া, ব্রাফোর্ড লেলির মুখে
বিদ্যুতের মত একটু হাঁসি খেলা করিয়া গেল।
পতা কারখানায় শােধন-ক্ষেত্রের বিস্তৃতি, থিতাইবার
পুষ্করিণী খনন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক যে
সমস্ত কাৰ্য, লেসলির সর্বোচ্চ তত্ত্বাবধানে
প্রথম পরীক্ষা।
সম্পাদিত হইতেছিল, তাহা তিনি ঘুরিয়া
ফিরিয়া তন্ন তন্ন করিয়া রাজেন্দ্রনাথকে দেখাইলেন, ও
তদ্বিষয়ক অনেক কূট প্রশ্নের উত্তরে সন্তুষ্ট হইয়া, হঠাৎ
কার্যে
উপযােগিতার

৫৪
রাজেন্দ্রনাথ
পরবর্তী প্রশ্ন করিলেন, অর্থাৎ তখন যে যে হারে বিভিন্ন
কাৰ্যসমূহ সম্পাদিত হইতেছে, ঠিক সেই সেই হারে
রাজেন্দ্রনাথ কাৰ্য্য গ্রহণ করিতে প্রস্তুত কিনা। ব্রাফোর্ড
লেলি কোন হিসাব, কোন হার বা কোন কার্যের
পরিমাণ দেখাইলেন না—কেবলমাত্র অবিলম্বে “হ” কি
“না” এই উত্তর চাহিলেন। “হ” বলিলে আর্থিক ক্ষতির
আশঙ্কা এবং “না” বলিলে এত বড় সুবিধা-ত্যাগ—এই
দুইটী বিরুদ্ধ চিন্তা মুহূর্তের জন্য যুগপৎ রাজেন্দ্রনাথের মনে
উদিত হইল, কিন্তু স্বাভাবিক প্রত্যুৎপন্নমতি, এবং, যদি আর
কেহ (তাহার পক্ষে অজ্ঞাত) নির্দিষ্ট হারে কাজ চালাইতে
পারে তবে তিনিও পারিবেন--এই আত্মবিশ্বাসবশতঃ তিনি
বিনা করারে নির্দিষ্ট হার স্বীকার করিয়া লইলেন; কিন্তু
ব্রাফোর্ড লেলিকে বলিলেন যে নিয়ম-সাপেক্ষ না হইয়া
তিনি যে এই সম্মতি দান করিলেন তাহার অপরাৰ্থ এই যে
তিনি সমস্ত কাজ পাইবেন। কথায় কথায় একেবারে এই
বিষয়টীতে মনােযােগ আকৃষ্ট হওয়ায়, লেলি বিষম সংশয়ে
পড়িলেন, কিন্তু ইজিনিয়ার হিসাবে তাহার ধারণা হইল
যে আশু উত্তরের দাবী করা তাহার পক্ষেও ঠিক সঙ্গত
হয় নাই। অধিকন্তু রাজেন্দ্রনাথের কথার সুরে তাঁহার
আত্ম-প্রত্যয়ের পরিচয় পাইয়া, তিনি যে অজ্ঞাত ক্ষতিপূরণ
হিসাবে সমস্ত কাজটী চাহিতেছেন, সে প্রার্থনা লেলি ন্যায্য
বলিয়া বিবেচনা করিলেন।
;

কঠোর জীবন-সংগ্রাম ব্যক্তিগত আলিপুর বাগানে সাক্ষাতে নিশ্চয়ই ব্রাফোর্ড লেলির মনে রাজেন্দ্রনাথ সম্বন্ধে অনুকূল ধারণার উৎপত্তি হইয়াছিল, কেননা তিনি তাহার হস্তে সমস্ত কাৰ্য্য আকর্ষণশক্তি। সম্পাদনের ভার ন্যস্ত করিলেন। কিন্তু এই উপলক্ষে ব্যক্তিগত আকর্ষণ শক্তিরও অস্তিত্ব স্বীকার করিতে হইবে। যুবাবয়স হইতেই যে রাজেন্দ্রনাথ এই অনির্ণেয় ক্ষমতার অধিকারী তাহা নিঃসন্দেহ। যাঁহারাই তাহার সহিত ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসিয়াছেন, তাঁহাদের সাধারণ অভিজ্ঞতা এই যে তাহারা এক নেতৃজাতীয় ব্যক্তির সম্মুখে সমাসীন, এবং তদ্বারা তাহাদের নিজ নিজ ইচ্ছাশক্তির উপর একপ্রকার অবর্ণনীয় প্রভাব বিস্তৃত হইতেছে। একবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হইবার পর, যথাসময়ে বিরুদ্ধ ইচ্ছাশক্তি স্যর রাজেন্দ্রের নিজ ইচ্ছার সহিত মিলিত হইয়া গিয়াছে—এরূপ ঘটনা যে কত বার ঘটিয়াছে তাহার ইয়ত্তা করা যায় না। ব্যাখ্যার অতীত এবং অতীব বাঞ্ছনীয় এই আকর্ষণশক্তির সহিত, উচ্চশ্রেণীর যুক্তি-প্রদর্শন-শক্তি, শ্রমশীলতা ও সহিষ্ণুতার উপাদান যােগ করিলে, আমরা ব্যবসায়-কৰ্ম্মী হিসাবে স্তর রাজেন্দ্রের অপূর্ব সফলতার রহস্য ভেদ করিতে সমর্থ হইব। পতা জলকলে নির্মাণকাৰ্য্য আরম্ভ করিয়াই রাজেন্দ্র- নাথ এক কঠিন পরীক্ষায় পড়িলেন। ফেইক নামক যে ইংরাজ এই কার্যের স্থানীয় ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী ছিলেন, ৫৬ রাজেন্দ্রনাথ ভারতীয়-বিদ্বেষী তাহার কাৰ্য্যে অভিজ্ঞতা থাকিলেও, দুর্দান্ত স্বভাব ও উষ্ণ মেজাজ ছিল। ভারতীয় কর্মচারী ও কন্ট্রাক্টরগণের সহিত তিনি সাধারণতঃ সদ্ব্যবহার করিতেন ইংরাজের সংসর্গে না। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্ররূপে এই কার্য্যের কঠোরতা। জলকল পরিদর্শন করিতে আসিয়া, রাজেন্দ্র- নাথ ফেইকের ভারতীয়-বিদ্বেষী মনােবৃত্তির পরিচয় পাইয়াছিলেন। সুতরাং যখন ব্রাফোর্ড লেলি ফেষ্টইকের সহিত তাহার পরিচয় করাইয়া দিয়া বলিলেন যে অতঃপর এই কর্মচারীর অধীনে তাঁহাকে কাৰ্য্য করিতে হইবে, তখন প্রথম ইংরাজের সহিত—এবং এই জাতীয় ইংরাজের সহিত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে কাৰ্য্য করিতে হইবে ভাবিয়া রাজেন্দ্রনাথ চিন্তাকুল ও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সন্দিহান হইলেন। কিন্তু তাহার অদম্য উচ্চাভিলাষ থাকায় ভয়ের ভাব কাটিয়া গেল—তিনি সাহসভরে প্রকৃত বিপদের সম্মুখীন হইলেন। উপস্থিত ঘটনাবলী অবিলম্বে বুঝিয়া, তদুপযােগী আশু আচরণ রাজেন্দ্রের মনােবৃত্তির অঙ্গ বিশেষ। ফেউইকের সহিত সদ্ভাবে চলিতে হইলে যে প্রচুর পরিশ্রম ও কূটবুদ্ধির প্রয়ােজন তাহা উপলদ্ধি করিয়া, রাজেন্দ্রনাথ ব্রাফোর্ড লেলির নিকট কার্যক্ষেত্রে বাসস্থান কার্যক্ষেত্রে বাসস্থানের প্রার্থনা করিলেন, কেননা তাহা পাইলে তিনি দিবারাত্রি কার্যের নিকট শর সংগ্রহ।

কঠোর জীবন-সংগ্রাম ৫৭ থাকিয়া কন্টাক্ট অনুযায়ী সমস্ত কাৰ্য্য নিখুতভাবে সম্পাদন করিতে পারিবেন। লেলি তঁাহার জ্বলন্ত আগ্রহ ও, দৃঢ়বিশ্বাস লক্ষ্য করিয়া সন্তুষ্ট হইলেন, এবং ফেইকের সহিত পরামর্শ করিয়া একটী বাংলাের অর্ধাংশ রাজেন্দ্র- নাথকে দিতে স্বীকৃত হইলেন। অপরার্ধে একজন ইংরাজ কর্মচারী সস্ত্রীক বাস করিতেছিলেন—প্রকাশ্যে এই কারণে, ফেইক নিয়ম করিয়া দিলেন যে রাজেন্দ্রনাথ তাহার অংশটি পরিষ্কার ও উপযুক্ত ভাবে সাজাইয়া পাশ্চাত্যপ্রথায় সে স্থানে বাস করিবেন, কেননা এরূপ না করিলে প্রতিবাসী ইংরাজের সহিত তাহার মনােমালিন্যের সম্ভাবনা। কিন্তু ফেন্ডাইকের গূঢ় উদ্দেশ্য সম্ভবতঃ অন্যরূপ ছিল—অর্থাৎ বড় সাহেবের অনুগ্রহভাজন এই বাঙ্গালী, বিদেশীভাবে বাস করিতে বাধ্য হইলে, ব্যক্তিগত আচার ব্যবহারে শীঘ্রই অপদস্থ হইয়া পড়িবে। রাজেন্দ্রনাথ এতদূর অগ্রসর হইয়া, ফিরিবার চিন্তা মনেও স্থান না দিয়া, সহাস্যমুখে ফেন্ডাইকের নিয়ম স্বীকার করিয়া লইলেন। অতঃপর সর্বপ্রধান সমস্যা অর্থাৎ অর্থ-সমস্যা সমাধানের সময় আসিয়া পড়িল। রাজেন্দ্রনাথ প্রথম কন্ট্রাক্ট পাইলেন —তাহার উচ্চাভিলাষ, আত্মবিশ্বাস ও যৌবনসুলভ আশাবত্তার মণিকাঞ্চন-সংযােগে ; সেই কাৰ্য্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হইয়া সফলতার প্রথম সােপানে আরােহন করিলেন—তাহার চতুর বিষয়-বুদ্ধি প্রভাবে ; এবং কাৰ্যস্থলে বাসস্থান ৫৮ রাজেন্দ্রনাথ সংগ্রহ করিলেন—নিখুতভাবে কাৰ্যসম্পাদনের ঐকান্তিক আগ্রহ প্রদর্শন সূত্রে। কিন্তু এতগুণ সত্ত্বেও, মূলধন না থাকিলে কোন কন্ট্রাক্ট কাৰ্যই আরম্ভ করা যায় না, কেননা সম্পাদিত আংশিক কার্যের জন্য প্রাপ্য টাকা পাইবার বহু পূর্বে শ্রমিকদিগের বেতন নিয়মিত ভাবে সময়ে সময়ে দিতেই হইবে। সুতরাং রাজেন্দ্রনাথ, নিকট বন্ধু ও সঙ্গীগণের সাহায্যে, অর্থের অন্বেষণে চারিদিকে ধাবিত হইলেন। প্রথমে তাহার সমস্ত চেষ্টা বিফল হইল। দিনের পর দিন যখন সন্ধ্যার সময় হতাশ ও অবসন্নভাবে তিনি মেসে ফিরিয়া আসিতেন, তখন মেসের বন্ধুবর্গের উৎসাহসূচক বাক্য ও পরামর্শ তাঁহার একমাত্র সান্ত্বনাস্থল ছিল। কণ্টাক্ট কার্যের জন্য করপােরেশনের অঙ্গীকারপত্র হাতে পাইয়াও, একজন অপরিচিত মুরুব্বীহীন বাঙ্গালী যুবকের পক্ষে অর্থ সংগ্রহ, কাৰ্যতঃ অসম্ভব বলিয়া প্রতীয়মান হইল। অবশেষে দৈব রাজেন্দ্রনাথের প্রতি সুপ্রসন্ন হইল। দেবেন্দ্রনাথ সেন নামক তাহার মেসের এক বন্ধু (তখন সংস্কৃত কলেজের ছাত্র ) কোনক্রমে ১,০০০ টাকা সংগ্রহ করিয়া, আধা-আধি লভ্যাংশে সেই টাকা রাজেন্দ্রনাথকে ধার দিলেন। তাহার নূতন বহুকষ্টে মূলধন সংগ্রহ আবাসস্থান, অর্থাৎ স্নানাগার-সংযুক্ত শয়ন- কক্ষ, বসিবার ঘর ও বারাণ্ডার একাংশ সাজাইতেই এই টাকার অর্ধেক ব্যয় হইয়া গেল। ইহা যে ও বাসস্থান সজ্জিতকরণ।

কঠোর জীবন-সংগ্রাম কত বড় পরিবর্তন তাহা বুঝাইতে হইলে বলিতে হইবে, যে, তখনও পর্যন্ত রাজেন্দ্রনাথ, সাধারণ বাঙ্গালী যুবকশ্রেণীর মধ্যে প্রচলিত প্রথায় বাস করিতেন, অর্থাৎ তাহার আসবাবের মধ্যে কেবল মাত্র একখানি তক্তাপােষ ও তদুপযুক্ত বিছানা এবং দুই সুট পরিধেয় বস্ত্রপূর্ণ একটী টিনের বাক্স ছিল। অতীত যুগের ছাত্রদিগের ব্রহ্মচর্য এবং অনাড়ম্বর জীবন- যাত্রার সহিত উন্নতভাব-ধারার সংযােগের বিষয় স্মরণ করিয়া, অধিকন্তু দারিদ্রের পীড়নে, সে যুগের ভারতীয় ছাত্রবৃন্দ অত্যল্প ব্যয়ে জীবন নির্বাহ করিতে অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছিল। রাজেন্দ্রনাথ যতদিন কলিকাতায় মেসে ছিলেন এই ভাবেই থাকিতেন। এখন তাঁহার প্রথম কর্মদাতা- দিগের নিৰ্বন্ধে জীবনযাত্রায় অকস্মাৎ আড়ম্বর দেখাইতে বাধ্য হইয়াও, তিনি মিতব্যয়িতার আদর্শ হইতে বিচ্যুত হইলেন না। বিলাতী প্রথায় সজ্জিত দুই একটা বাটিতে যাহা লক্ষ্য করিয়াছিলেন তদনুসারে তিনি গৃহসজ্জার অত্যাবশ্যক উপকরণগুলি নির্ণয় করিতে সমর্থ হইলেন— অর্থাৎ মূল্যবান্ কার্পেটের পরিবর্তে সৌখীন মাদুরের আচ্ছাদন, একখানি ক্যাম্পাসের খাট, ছয়খানি চেয়ার, একটী খাইবার টেবিল, একটী আলমারী, বস্ত্রপরিবর্তনের ঘরের জন্য একটী কাপড়ের আলনা, শুভ-সূচনা হিসাবে শেষােক্ত ঘরে এক বৃহৎ দর্পণ। এই সমস্ত সৌভাগ্যসূচক সরঞ্জাম সংগ্রহ করিয়া রাজেন্দ্রনাথ মনে

রাজেন্দ্রনাথ
মনে সন্তুষ্ট হইলেন বটে, কিন্তু তাঁহার মূলধনের অর্ধেক
অন্তর্হিত হইল। তথাপি সেই অবস্থায় ইহা যে অর্থের
সদ্ব্যবহার, এ বিষয়ে তাহার মনে কোনও সন্দেহ ছিল
। গৃহ প্রবেশ করিবার পূর্বে তিনি ফেইককে
জিজ্ঞাসা করিলেন যে তিনি গৃহের সাজসজ্জা প্রভৃতি
দেখিতে অভিলাষী কি না। ফেইক তাহার নির্দেশবাণী
স্মরণ করিয়া, গৃহসজ্জা পরীক্ষা করিতে প্রবৃত্ত হইলেন।
সম্ভবতঃ তাহার মনােগত ভাব এই ছিল যে তাঁহার
রাজ্যে বিসদৃশ প্রজাস্বরূপ এই নূতন কন্ট্রাক্টর প্রথম
পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হইবে। কিন্তু তিনি দেখিলেন যে
গৃহসজ্জা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, এবং তাহা ছাড়া প্রধান
ঘরগুলির বস্ত্রাচ্ছাদন প্রভৃতি এরূপ বিশুদ্ধ ইউরােপীয়
প্রথায় সুবিন্যস্ত, যে কোন বাঙ্গালীর ঘরে সেরূপ দেখা
যায় না। তিনি আশ্চর্য্য ও সন্তুষ্ট হইয়া, রাজেন্দ্রের
নিকট স্বীয় মত ব্যক্ত করিতে দ্বিধা বােধ করেন নাই,
অধিকন্তু বলিলেন যে তঁাহার আশা আছে যে রাজেন্দ্রনাথ
কঠিন পরিশ্রম করিয়াই ক্ষান্ত হইবেন না—ক্রমশঃ ইংরাজ
সহকারীদিগের মত বসবাস করিতে শিক্ষা করিবেন।

সময়
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
কর্মজীবনের প্রাৱম্ভ
কন্টাক্টররূপে নবজীবনে প্রবেশ করিয়াই, রাজেন্দ্রনাথ
অমানুষিক পরিশ্রম করিতে লাগিলেন। পল্তার বাংলােতে
থাকিবার সমস্ত বন্দোবস্ত সম্পূর্ণ হইবার পূর্বে এক সপ্তাহ
কাল, তিনি প্রত্যহ প্রাতে সেয়ালদহ ষ্টেশন হইতে ছয়টার
ট্রেণ ধরিয়া কাৰ্যে যাইতেন, এবং সন্ধ্যা সাতটার সময়
কলিকাতায় মেসে প্রত্যাবর্তন করিতেন—সমস্ত
পৰ্যবেক্ষণ, তদারক ও উপস্থিত কাৰ্যের খুটিনাটি আয়ত্ত
করিতে ব্যস্ত থাকিতেন। একজন বাঙ্গালী যুবক যে সমগ্র
মন প্রাণ দিয়া কাৰ্য্যে এতদূর বিভাের হইয়া থাকিতে
পারে, তাহা ফেউইকের মত ইংরাজদিগের নিকট অভিনব
গণ্য হইত। রাজেন্দ্রনাথ
কার্যে ঐকান্তিকতা
অল্প মূলধনের
অল্পাহারেই তৃপ্ত হইতেন—তাহার বিপুল
সম্ভাবিত শুভফল। শ্রমশীলতা ও উৎসাহ নিজ আশু প্রয়ােজনেরই
অনুরূপ ছিল। ফেউইকের নিকট হইতে গৃহসজ্জার
অনুমােদন লাভে তাঁহার উৎসাহ আরও বৃদ্ধি প্রাপ্ত
হইল; এবং গৃহ প্রবেশের পর তিনি আরও অধিক সময়
ও মনােযােগ হাতের কাজে দিতে লাগিলেন। তাহার
দৃশ্য বলিয়া

রাজেন্দ্রনাথ ঋণ-লব্ধ মূলধনের মধ্যে ৫০০ টাকা মাত্র অবশিষ্ট ছিল, অতএব তাহার পক্ষে পরিদর্শক ইন্‌জিনিয়ারদিগের মনে নিজ কৰ্ম্ম-ক্ষমতা সম্বন্ধে দৃঢ় বিশ্বাস উৎপাদন করা অত্যাবশ্যক হইয়া পড়িল, কেননা একমাত্র এই উপায়েই তিনি তঁাহার বিলের টাকা শীঘ্র পরিশােধ ও স্বল্প মূলধন পূরণ করাইতে পারিতেন। ব্যবসায়-ব্যাপারে অর্থের প্রয়ােজনীয়তা ও শক্তির পরিমান অনেক সময় অতিরঞ্জিত হইয়া থাকে। অর্থ যতক্ষণ অর্থরূপেই থাকে—যতক্ষণ তাহা কাৰ্যে সুপ্রযুক্ত হইয়া উৎপাদন ও অর্থবৃদ্ধির সহায়তা না করে, ততক্ষণ ব্যবসায়-ক্ষেত্রে অর্থের বাস্তব সত্তা পরিলক্ষিত হয় না। কোন উৎসাহী ও উদ্যমশীল যুবক যখন উৎপাদন-কাৰ্য্য সাধনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইয়া উঠে, তখন তাহার পক্ষে অর্থ- শক্তির অভাব বিরক্তি ও বাধার কারণ হয় বটে, তথাপি এই অর্থঘটিত বিপ্নবশতঃই তাহার কৃত কাৰ্য প্রকারান্তরে আপেক্ষিক উৎকর্ষ লাভ করে কিনা, করে কিনা, তাহা গবেষণার বিষয়। এই আলােচনায় দারিদ্রের প্রশংসাসূচক কিছুই নাই--অপর দিকে অর্থের অসচ্ছলতাবশতঃ, ব্যবসায়ে যে সমস্ত অসুবিধা ঘটে বলিয়া জনসাধারণের ধারণা তাহারও যে অঙ্কশাস্ত্রসম্মত সীমা নির্দিষ্ট আছে, এ মতও ভ্রান্ত অধিকন্তু, জ্ঞানীগণ স্বীকার করেন প্ৰাচুৰ্য্যঘটিত সুবিধাও সীমাবিশিষ্ট। সামান্যভাবে জীবন নয়।

কৰ্ম্মজীবনের প্রারম্ভ
যাপনে অভ্যস্ত রাজেন্দ্রনাথ যে পেশা গ্রহণ করিয়াছিলেন,
নগদ টাকার অভাবে তাহার উন্নতি সময়ে সময়ে এরূপভাবে
স্থগিত থাকিত যে তাহাতে তিনি প্রায় উন্মত্ত ও মরিয়া
হইয়া উঠিতেন, কিন্তু তাহার এমনই চরিত্র-বল ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞা
ছিল যে প্রয়ােজনের সময় তিনি অর্থকষ্টের বিষয় ভুলিয়া
গিয়া হাতের কাজে মনপ্রাণ সমৰ্পণ করিতে পারিতেন।
অর্থ-সমস্যা উদ্বেগের কারণ হইলেও, তাহার কাৰ্য্য তাহার
নিকট গুরুতর বিষয় ছিল । কর্মজীবনের প্রথম অবস্থা
হইতেই তিনি অর্থনৈতিক উৎকর্ষ-জ্ঞান লাভ করিতে
লাগিলেন—কেমন করিয়া তাহার সামান্য মুলধন হইতে
সর্বোচ্চ মুনাফা আদায় করা যায় সে কৌশলও শিক্ষা
করিলেন। ঐকান্তিক মনঃসংযােগ ও একলক্ষ্য সাধনার
ফলস্বরূপ, তাহার চরিত্র ক্রমশঃ এরূপ উচ্চগুণসম্পন্ন মহামূল্য
আকার ধারণ করিল যে তাহার স্পর্শে, তাঁহার প্রত্যেকটী
প্রারব্ধ কৰ্ম্ম সফলতার স্বর্ণ-বর্ণে অনুরঞ্জিত হইয়াছে।
ইজিনিয়ারিং কলেজ ছাড়িবার অল্পদিন পরেই নির্মাণ
কার্যে নিযুক্ত হইয়া, রাজেন্দ্রনাথ ‘লেভল’ ও ‘থিওড়ােলাইট’
যন্ত্রদ্বয়ের সম্যক্ ও বিস্তৃত ব্যবহার করিতে লাগিলেন,
কেননা কলেজে থাকিতেই তিনি নিপুণ হস্তে এই দুইটি
যন্ত্রের চালনা করিতে পারিতেন। এখন তিনি এই উপায়ে
তাঁহার পূর্বে নিযুক্ত কন্ট্রাক্টরদিগের কাৰ্যে কতকগুলি
ভ্রম বাহির করিলেন। দুই চারি মাসের মধ্যেই, সমস্ত

৬৪ রাজেন্দ্রনাথ ভ্রমের একটি তালিকা প্রস্তুত করিয়া, পরিদর্শক ইনজিনিয়ার- দিগকে সেগুলি দেখাইয়া, তিনি তাহাদের সংশােধন করিয়া দিলেন। একদিন তিনি ঘটনাক্রমে শুনিতে পাইলেন যে ব্রাডফোর্ড লেলির সাপ্তাহিক পরিদর্শন উপলক্ষে ফেইক তাঁহাকে বলিতেছেন যে নূতন কন্ট্রাক্টরের কাৰ্য্য এত উত্তমরূপে সম্পাদিত হইতেছে ও তাহা এতদূর ভ্রমশূন্য যে তিনি একজন মিউনিসিপাল ইজিনিয়ার কমাইয়া দিয়া কর্মচারী বাবদ কিছু খরচ বাঁচাইতে পারেন। পরবর্তী কথাবার্তায় আরও প্রতীয়মান হইল, যে ফেইকের বিশ্বাস, রাজেন্দ্রনাথ কর্মক্ষমতার যে উচ্চ আদর্শ লইয়া কাৰ্য্য কাৰ্য্য-শক্তির আরম্ভ করিয়াছিলেন তাহা ভবিষ্যতে অক্ষুন্ন উচ্চ আদর্শ। রাখিতে পারিবেন। এই অনুকূল মত, ফেন্- উইকের নিকট হইতে প্রাপ্ত বলিয়াই, রাজেন্দ্রনাথের পক্ষে নিশ্চয়ই উচ্চ প্রশংসা বলিয়া গণ্য হইল। কিন্তু তাহা লাভ করিয়াও রাজেন্দ্রনাথ নিশ্চিন্ত না হইয়া, প্রশংসিত কার্যের অধিকতর উৎকর্ষ সাধন করিতে বদ্ধপরিকর হইলেন। পরিদর্শক মিউনিসিপাল ইজিনিয়ারের অন্তর্ধান যেমন এক দিকে তঁাহার উপর কর্তৃপক্ষের দৃঢ় বিশ্বাস প্রমাণ করিল, সেইরূপ অপরদিকে তঁাহার নিকট নিজ শক্তির পরিমানও প্রকাশিত হইল। সেই সময় হইতেই তিনি বিরক্তিকর পরিদর্শন হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিয়া, পতা কারখানার নিৰ্মাণ-কার্য্যের সম্পূর্ণ ভার প্রাপ্ত হইলেন।

কৰ্ম্মজীবনের প্রারম্ভ রাজেন্দ্রনাথ পল্তায় ছয় মাস কাৰ্য করিবার পর, ব্রাফোর্ড লেসলি কলিকাতা করপােরেশন পরিত্যাগ করিয়। ইষ্ট ইণ্ডিয়ান রেলওয়ের চী ইন্‌জিনিয়ারের পদ গ্রহণ করিলেন, এবং তাহার স্থলে মিষ্টার (পরে স্যর ) হেরি কিম্বার, সরকারী পূর্ব-বিভাগের সুপারিনটেণ্ডিং ইনজিনিয়ারের পদ হইতে মনােনীত হইয়া, কলিকাতা করপােরেসনের চীফ ইনজিনিয়ারের পদে অধিষ্ঠিত হইলেন। ব্রাডফোর্ড লেলির বিশ্বাসভাজন বলিয়া, রাজেন্দ্রনাথ তাঁহার নিয়মমত পরিদর্শন নির্ভয় মনে প্রতীক্ষা করিতেন। কিন্তু নূতন ও অপরিচিত চীফ, ইঞ্জিনিয়ারের পরিদর্শন সম্পূর্ণ বিভিন্ন প্রকৃতির, সুতরাং চিন্তাকূল মনে রাজেন্দ্রনাথ ফেইকের সহিত তাহার প্রথম পরিদর্শন প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে তাহার সহিত প্রথম সাক্ষাৎ রাজেন্দ্রনাথের পক্ষে প্রতিকূল হইয়া দাঁড়াইল। প্রথমেই, বিনা পরিচয়ে কিম্বারের সহিত পরিদর্শনে যােগ দিতে হইল বলিয়া, রাজেন্দ্রনাথ একটু দমিয়া গেলেন। তৎপরে, নির্দিষ্ট হারে যে কঠিন মৃত্তিকা কৰ্ত্তিত হইতেছিল, কিম্বার যখন সেই কার্য্যের দোষ প্রদর্শন করিলেন, তখন এই বিষয়ে উৎকৃষ্ট কার্যের জন্য বর্তমান হার যথেষ্ট নয় বলিয়া রাজেন্দ্র- নাথ কৈফিয়ত দিলেন। কন্টাক্টরের এই অযাচিত কৈফিয়ত এবং হার-বৃদ্ধির প্রস্তাব শুনিয়া, কিম্বার অসন্তুষ্ট হইয়া বক্ৰমুখে তাঁহার প্রতি যে রূঢ় বাক্য প্রয়ােগ করিলেন, ৬৬ রাজেন্দ্রনাথ ব্যবসায়-জগতে মান অভিমানের রহিলেন। স্থানাভাব। মনে তাহাতে রাজেন্দ্রনাথের মর্যাদা-হানি ও কাৰ্য্য ছাড়িয়া দিবার উপক্রম হইল। কিন্তু বর্তমান কাৰ্য্য-সম্পাদনের উপর যে তাহার জীবনের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করিতেছে, তাহা বুঝিতে পারিয়া রাজেন্দ্রনাথ চুপ করিয়া এই মীমাংসা যে জ্ঞানপূর্ণ ও যুক্তিযুক্ত সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। বুদ্ধিমান্ ব্যবসায়ী ও কর্মী, নিজ মনের উপর ভাবপ্রবণতা বা অভি- মানের প্রতিক্রিয়া অগ্রাহ্য করিয়া, কাজে লাগিয়া থাকাই কৰ্ত্তব্য নয়। করেন। এই কারণে, রাজেন্দ্রনাথ কিম্বারের কর্কশ বাক্য মন হইতে একেবারে মুছিয়া ফেলিলেন, এবং তিনি দ্বিতীয়বার পরিদর্শনে আসিলে প্রফুল্ল মুখে তাহার অনুগমন করিলেন। এই পরিদর্শন রাজেন্দ্রনাথের পক্ষে সাফল্যমণ্ডিত হইল—সমস্ত দেখিয়া কিম্বার কার্যের উৎকর্ষ সম্বন্ধে তাহার প্রশংসা করিলেন। স্থর রাজেন্দ্রর স্মরণ হয় যে সেইদিন হইতে কিম্বার আর কখনও তাহার সহিত কর্কশভাবে কথা বলেন নাই—প্রত্যুত শেষ পর্যন্ত সাতিশয় ভদ্ৰব্যবহার করিতেন। এইরূপ অনুন্নত অবস্থায় আলােচ্য কর্মজীবনের সূচনা হইল। পরিণামে ইহা যে কেবল বঙ্গীয় ব্যবসায়ের ইতিহাসে অতুলনীয় হইয়া উঠিল তাহা নহে, পরন্তু তাহার গৌরব- দীপ্তির নিকট, অন্যান্য অনেক কৃতকর্মা ব্যক্তিগণের উপন্যাস- সুলভ অদ্ভুত অভ্যুদয় নিষ্প্রভ বলিয়া প্রতীয়মান হইল।

কর্মজীবনের প্রারম্ভ পতার নির্মাণকাৰ্য কন্টাক্ট অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পাদিত হইল। চী ইন্‌জিনিয়ার সমাপ্ত কাৰ্য দেখিয়া সন্তুষ্ট হইলেন। সেইস্থানে অন্য কোন নূতন কাৰ্য্য পাইবার সম্ভাবনা না থাকায়, রাজেন্দ্রনাথ কাৰ্যান্বেষণে অন্যত্র যাইতে প্রস্তুত হইলেন। এদিকে তাঁহার ভ্রান্তিশূন্য ও সাধুসঙ্গত কাৰ্য্য দেখিয়া ফেইক মিউনিসিপাল ই- জিনিয়ারকে স্থানান্তরিত করিয়াছিলেন, সুতরাং তঁাহার অধীনে তখন কোন সুদক্ষ পরিদর্শক কর্মচারী ছিল না। এই অবস্থায় তিনি কিম্বারের নিকট প্রস্তাব করিলেন যে জল-শােধনের বন্দোবস্ত ও থিতাইবার পুষ্করিণীগুলির সংরক্ষণ (maintenance) তদারক করিবার জন্য রাজেন্দ্র- নাথকে কন্টাক্টররূপে পায় নিযুক্ত করা হউক। এই পতার সংরক্ষণ প্রস্তাবে রাজেন্দ্রনাথ সহজেই সম্মত হইলেন। কাৰ্য্য-গ্রহণ। এবার যে অঙ্গীকার-পত্র প্রস্তুত হইল, তাহাতে প্রত্যেক কার্য্যের বিবরণ, হার ও পরিমাণ স্পষ্টভাবে উল্লিখিত ছিল। রাজেন্দ্রনাথ হিসাব করিয়া দেখিলেন যে এই কাৰ্য্যে তাহার মােটামুটি ১০০০ টাকা মাসিক আয় হইবে। স্বাবলম্বনের এই নিরাপদ স্থলে পঁহুছিয়া, তিনি ভাবিয়া দেখিলেন তাহার যে অভিভাবক ও উপকারী আত্মীয় দুই বৎসর পূৰ্ব্বে, সভেয়ারের পদ গ্রহণ বিষয়ে অবাধ্যতাবশতঃ, তাঁহাকে গৃহ-তাড়িত করিয়া নিজের ভার লইতে বাধ্য করিয়াছিলেন—এখন তাহার সহিত সদ্ভাব রাজেন্দ্রনাথ আপোষ। সংস্থাপনের উপযুক্ত সময়। তিনি অনুতপ্ত না হইলেও, তরুণ কন্ট্রাক্টর হিসাবে তাহার সাফল্য ও নিশ্চিত উচ্চ পারিবারিক শাসন- আয় আত্মীয়-স্বজনকে চমকিত করিয়াছিল। নীতিও সাফল্যের পারিবারিক শাসন-নীতি পূৰ্বে অমান্য করিলেও, তিনি ক্রমশঃ পারিবারিক গণ্ডীর ভিতর পুনগৃহীত হইলেন। কিন্তু পারিবারিক অভিমান- বশতঃ, বাস্তব ব্যবহারে যেন একটু ব্যবধান রহিয়া গেল, বহু বৎসরের পর তিনি সম্পূর্ণ ক্ষমা লাভ করিলেন। সংরক্ষণ-কাৰ্য্য লাভ করিয়া রাজেন্দ্রনাথ প্রয়ােজনীয় মূলধনের অভাবে আকুল ও উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িলেন। এখন আর নির্মাণকার্যের মত তাহার সত্বর বিল পরিশােধের সম্ভাবনা রহিল না। যে মেসের বন্ধু টাকা ধার দিয়াছিলেন, তিনি আর অধিক মূলধন সংগ্রহ করিতে পারিলেন না। এই দুঃসময়ে রাজেন্দ্রনাথ, আগ্রা-যাত্রার পথে পরম উপকারী ও স্নেহশীল মাতুল যােগেশ্বর গাঙ্গুলীর বিষয় শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সহিত স্মরণ করিলেন। যােগেশ পতা হইতে মাত্র দুই মাইল দূরে বাস করিতেন। রাজেন্দ্র- নাথ তাহার নিকট গিয়া আর্থিক আকুলতায় সাহায্য প্রার্থনা করিলেন। যােগেশ দেখিলেন যে তাহার ভাগিনেয় এখন সংসারে প্রতিষ্ঠিত ও সফল কর্মজীবনে অগ্রসর হইয়া, পুরুষের মত পুরুষ হইয়া দাড়াইয়াছেন। দেখিয়া তিনি স্বভাবতই গর্ব অনুভব করিলেন। তাহার কোমল হৃদয়ে ভাগিনেয়ের তাহাকে ১০০০

কৰ্ম্মজীবনের প্রারম্ভ
সংগ্রহ।
শুভকামনা স্বতঃই উদিত হইল। তিনি সন্ধান করিয়া
জানিলেন যে এক ব্যক্তি তাঁহার জামিনে পাঁচ হাজার
প্রয়োজনীয় মূলধন- টাকা তঁাহার ভাগিনেয়কে ধার দিতে প্রস্তুত
আছেন। মাতুল তৎক্ষণাৎ জামিন হইতে
সম্মত হইলেন। কিন্তু ইহা ব্যক্তিগত জামিন মাত্র বলিয়া,
ঋণদাতা এই সৰ্তে টাকা দিলেন যে তিনি শতকরা বার্ষিক
ছয় টাকা সুদ পাইবেন এবং মাসিক ২৫ টাকা বেতনে
তত্ত্বাবধায়ক কেরাণীরূপে কাৰ্য্যস্থলে থাকিতে পাইবেন।
প্রথম ঋণদাতা দেবেন্দ্রনাথ সেনের সহিত এই নূতন
বন্দোবস্ত হইল, যে তিনি অতঃপর লাভের এক-চতুর্থাংশ ও
তাহার ১০০০ টাকার জন্য শতকরা বার্ষিক ছয় টাকা সুদ
পাইবেন।
এইরূপে যথাসম্ভব অল্প মূলধন লইয়া, রাজেন্দ্রনাথ
পায় তাহার সংরক্ষণ-কণ্টাক্টের কাৰ্য্য আরম্ভ করিলেন।
অতঃপর তিনি মূলধনের দুশ্চিন্তা মনে আসিতে না দিয়া,
পরিদর্শক ইনজিনিয়ারগণের নির্দেশানুসারে করণীয় কাৰ্য্য
সুসম্পন্ন করিতে লাগিলেন। সুফলস্বরূপ, ভঁহার বিলের
টাকা পাইতে অধিক বিলম্ব হইত না। অধিকন্তু, সওদাগর
ও ব্যাপারীগণ, ক্রমশঃ তাহার পরিচয় পাইয়া, তাহাকে
বিশ্বাস করিতে এবং নগদ মূল্য না লইয়া অধিক টাকার
দ্রব্য সরবরাহ করিতে লাগিলেন। কণ্টাক্ট-কার্যের
প্রত্যেক অংশ সুসম্পন্ন করিয়া তিনি যেরূপ সুনাম অর্জন

৭০ রাজেন্দ্রনাথ সাফল্যের করিলেন, উপরােক্ত ব্যক্তিবর্গের সহিত সৰ্ব্বদা সাধু ব্যবহারের দ্বারাও তিনি সমান সুফল লাভ করিলেন। স্যর কন্টাক্ট-কার্যে রাজেন্দ্রের বিশ্বাস যে কণ্টাক্ট-কাৰ্যে সাফল্যের নিগুঢ়নীতি। মূল-সূত্র এই যে প্রথমে সামান্যভাবে কাৰ্য্য আরম্ভ করিতে হইবে এবং নিজে ছােট বড় প্রত্যেক বিষয় তন্ন তন্ন করিয়া দেখিতে হইবে, কেন না একমাত্র এই উপায়ে কাৰ্য্যের খরচ কমাইবার কল-কৌশল শিখিতে পার যায়। কার্যক্ষেত্রে প্রায় প্রতিদিনই ছােট বড় নানা সমস্যা আসিয়া পড়ে—অভিজ্ঞতা না থাকিলে দুইটী বিভিন্ন কাৰ্য- প্রণালীর শিল্প ও অর্থগত আপেক্ষিক মূল্য ঠিক বুঝিতে পারা যায় না। যদি কেই সামান্যভাবে কাৰ্য্য আরম্ভ করিয়া কাৰ্য্যদাতা ও সওদাগরগণের সহিত নিয়ত সাধু ব্যবহার করেন, এবং শেষােক্ত লােকের মনে ক্রমশঃ বিশ্বাস উৎপাদন করিয়া ধারে অধিকতর দ্রব্য পাইবার সুবিধা লাভ করেন, তবে তাহার পক্ষে অল্প মূলধন প্রতিবন্ধক হয় না।” যতদিন রাজেন্দ্রনাথ পতায় সংরক্ষণ কন্ট্রাক্টের কাৰ্য্য করিতে ছিলেন, তাহার মধ্যে তিনি কলিকাতায় এবং চুচুড়ায় সরকারী পূর্ত বিভাগের অধীনে ছােট ঘােট নির্মাণ কাৰ্যের কন্ট্রাক্ট একই সময়ে লইতেন। তিনি ধীরে ধীরে স্বাধীন ভাবে বৃহৎ নির্মাণকাৰ্য পাইবার পন্থা আবিষ্কার করিতেছিলেন, কেন না তিনি জানিতেন সে সংরক্ষণ কার্যের কন্ট্রাক্ট যে কোন সময়ে শেষ হইতে পারে, এবং ইহাতে

কৰ্ম্মজীবনের প্রারম্ভ
৭১
আপাততঃ মাঝামাঝি আয় হইলেও, এরূপ কাৰ্য্য দ্বারা
ভবিষ্যৎ উন্নতির পথে অগ্রসর হইবার আশা নাই। তিনি
পতায় তিন চারি বৎসর কন্টাক্ট কাৰ্য্য করিয়া প্রায় ২০,০০০
টাকা সঞ্চয় করিয়াছিলেন। এই টাকা ও ঋণ-লব্ধ ৬,০০০
টাকার মূলধনের সাহায্যে, বৃহত্তর কাৰ্য-সম্পাদনের ক্ষমতা
সম্বন্ধে তাঁহার আত্মবিশ্বাস উৎপন্ন হইল।
যখন রাজেন্দ্রনাথ বৃহৎ কাৰ্য্য পাইবার আশা অন্তরে
পােষণ করিয়া তাহার জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন, তখন এক
দৈব-দুর্বিপাকে তাঁহার উচ্চাভিলাষের স্রোত সহসা
দৈবদুর্ঘটনায় উচ্চা- রুদ্ধ হইয়া গেল। সেই সময়, তাহার নিজ
কাজীর গতিরোধ।
প্রস্তুত নক্সা অনুযায়ী তাহার বাংলাের একটি
ক্ষুদ্র বহিঃশালা (out-house ), পরিদর্শক ইন্‌জিনিয়ারের
মঞ্জুর অনুসারে নির্মিত হইতেছিল। এই সামান্য ইরামত
ছাদ পর্যন্ত উঠিলে, ফেইক বারাণ্ডার ঢালু ছাদে লােহার
কড়ি ব্যবহার করিতে বলিলেন, কিন্তু কত ডিগ্রি কোণে
কড়িগুলি স্থাপিত হইবে, তাহা নক্সা হইতে স্থির করিয়া না
দিয়া কড়িগুলি আনাইতে ও নির্দিষ্ট স্থানে বসাইয়া পরীক্ষা
করিতে চাহিলেন। রাজেন্দ্রনাথ জানিতেন যে প্রথমে এই
কোণ নির্ধারিত না হইলে কড়ির দৈর্ঘ্য অনিশ্চিত থাকিবে।
এরূপ ক্ষেত্রে তিনি স্বভাবতঃই পূৰ্ব্বে কড়ি আনাইতে অনিচ্ছা
প্রকাশ করিলেন। উগ্র-স্বভাব ফেইক রাজেন্দ্রের যুক্তি
অগ্রাহ্য করিয়া, কড়িগুলি আনাইবার জন্য ও যথাস্থানে

৭২ রাজেন্দ্রনাথ স্থাপনা করিবার জন্য জেদ করিতে লাগিলেন। রাজেন্দ্রনাথ পূর্বে একবার কর্তৃপক্ষের রূঢ় আচরণে ব্যথিত হইয়া বিক্ষুব্ধ মনােভাব দমন করিয়াছিলেন, কিন্তু এবার শিল্প-বিদ্যাবিষয়ক নীতি তর্কের বিষয় হওয়ায়, অভিজ্ঞ ও সুদক্ষ ইন্‌জিনিয়ার বলিয়া পরিচিত এক ব্যক্তির অজ্ঞতা দেখিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিয়া থাকিতে পারিলেন না। অতর্কিত ভাবে এই বিস্ময়-প্রকাশের ভাষা ফেউইকের পক্ষে নিন্দাসূচক হইয়া দাড়াইল। সর রাজেন্দ্রের চরিত্রের এক বিশেষত্ব পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে, (৫১ পৃষ্ঠা), অর্থাৎ শিল্প-বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং পেশা সম্পর্কিত কোন বিষয়ে বাদানুবাদ হইবার সময় তিনি, ব্যক্তিত্বের বিষয় একেবারে বিস্মৃত হইয়া, বিষয়টীর পৃথক্‌ সূক্ষ্ম নীতির উপর মন নিবিষ্ট করেন। এইরূপে কতবার তিনি অজ্ঞাতসারে ব্যক্তি বিশেষকে অসন্তুষ্ট এবং লােকের মন অস্থির করিয়া দিয়াছেন। তথাপি তিনি, নিজ ব্যক্তিগত অসুবিধা এড়াইবার জন্য, আপনার বিজ্ঞান-সংক্রান্ত মত কখনও আপােষে শিথিল করিতে সম্মত হন নাই। বৰ্ত্তমান ঘটনায় রাজেন্দ্রনাথের প্রত্যুত্তর উপযুক্ত হইলেও, তাহাতে যে পরিণামদর্শিতা ও শিষ্টতার অভাব ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। ফেইক একজন কন্ট্রাক্টর শ্রেণীর ব্যক্তির দুঃসাহসিক ও দুর্বিনীত আচরণে অধীর ও ক্রুদ্ধ হইয়া তৎক্ষণাৎ রাজেন্দ্রনাথকে এই লিখিত আদেশ প্রদান কর্মজীবনের প্রারম্ভ ৭৩ করিলেন যে তিনি যেন সেই মুহূর্তে জলকলের এলাকার ভিতর সমস্ত নির্মাণকাৰ্য্য বন্ধ করেন, এবং তাহার উপর যে সমস্ত কাৰ্যের ভার ছিল, তাহা পরিষ্কার ভাবে ফেন্- উইকের সহকারীকে বুঝাইয়া দিয়া, তিনি যে বাংলােতে বাস করিতেছেন তাহা তিনদিনের ভিতর খালি করিয়া দেন। ফেইক যে সেস্থানে সর্বেসর্বা তাহারই পূর্ণ পরিচয় প্রকাশের ব্যবস্থা হইল। তাহার আদেশ পালন করা ভিন্ন রাজেন্দ্রনাথের উপায়ান্তর রহিল না। চীফ ইজি- নিয়ারের নিকট আবেদন করিবার পথ উম্মুক্ত ছিল বটে, কিন্তু তাহাতে প্রধান কর্তৃপক্ষের মতে আংশিক দোষী বিবেচিত হইবার এবং তজ্জনিত ক্ষতির আশঙ্কাও রাজেন্দ্রনাথের মনে আসিল। তথাপি তিনি পরদিন পূৰ্ব্বাহ্ েকলিকাতায় চী ইনজিনিয়ারের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া, এই বিষয়ের বিচার প্রার্থনা করিলেন। কিম্বার স্থির হইয়া তাহার সমস্ত কথা শুনিলেন, এবং, সাধ্য হইলে, পরদিন প্রাতে পতায় গিয়া এই বিষয়ের তদন্ত করিবেন বলিলেন। বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনা করিয়া সত্য সত্যই কিম্বার, নিজ কথা অনুসারে, পরদিন প্রাতে জলকলে উপস্থিত হইলেন। ফেউইকের সহিত তাহার কি কথাবার্তা হইল তাহা রাজেন্দ্রনাথ কখনই জানিতে পারেন নাই; কিন্তু কিম্বার নিশ্চয়ই মনে করিয়াছিলেন যে রাজেন্দ্র- নাথের উপর যে অটল আদেশ প্রয়ােগ করা হইয়াছিল,

৭৪
রাজেন্দ্রনাথ
তাহ ঠিক প্রশস্ত ও ন্যায়সঙ্গত হয় নাই ; অধিকন্তু তাহাকে
এইভাবে কাৰ্য্যচ্যুত করায়, জলকলের নিয়মিত কাজ
চালাইবার পক্ষে যে অভাব আবির্ভূত হইল, তাহা পূরণ
করা সহজ হইবে না। অপর দিকে, ফেইক, উৰ্দ্ধতন
কর্মচারীর নিকট রাজেন্দ্রের আবেদনে অধিক মাত্রায়
কোপান্বিত হইয়া, তাহার আদেশ পূনৰ্বার বিবেচনা করিয়া
দেখিতে একেবারে অস্বীকৃত হইলেন। এ বিষয়ে কিম্বার
ও হার মধ্যে তর্ক-বিতর্ক অনেকক্ষণ ধরিয়া চলিয়াছিল,
তাহাতে এক এক সময় উভয়েরই মেজাজ উত্তপ্ত হইয়া
উঠিয়াছিল। কিন্তু ফেইক স্থানীয় ভারপ্রাপ্ত ইন্‌জিনি-
য়ার এবং আলােচিত কার্য্যে অভিজ্ঞতর বলিয়া, কিম্বার
অবশেষে, দুঃখের সহিত রাজেন্দ্রনাথের উপর যে আদেশ
প্রদত্ত হইয়াছিল তাহা বজায় রাখিতে বাধ্য হইলেন।
তিন দিনের মধ্যে রাজেন্দ্রনাথ অধ্যুষিত বাংলাে ছাড়িয়া
দিলেন, এবং এক সপ্তাহের মধ্যে তঁাহার কৃত কার্যের সমস্ত
বিল পেশ করিলেন। এখন ফেইকের প্রকৃতিগত শত্রুতা
বিরুদ্ধ প্রকৃতির বাহিরে প্রকাশিত হওয়ায়, রাজেন্দ্রনাথ, যুব
সঘর্ষের ফল। বয়স ও সমান উগ্র মেজাজ বশতঃ, তৎপ্রদত্ত
অসম নির্বিবাদে সহ্য না করিয়া, প্রতিবিধানে যত্নবান
হইলেন।
অতঃপর ফেউইককে বিপদাপন্ন ও অপদস্থ
করাই তাহার দৃঢ় সঙ্কল্প হইল। এই সঙ্কল্প শীঘ্রই কাৰ্য্যে
পরিণত হইল, কেন না পলতার সংরক্ষণ-কার্যে নিযুক্ত

কর্মজীবনের প্রারম্ভ ৭৫ সমস্ত নিপুণ শ্রমিকদলকে তিনি সঙ্গে লইয়া যাইতে সমর্থ হইলেন। পুরা দুইমাস তিনি তাহাদিগকে বসাইয়া রাখিয়া বেতন দিতে লাগিলেন, তাহাতে ফেইকের বিলক্ষণ বিরক্তি ও অসুবিধা উপস্থিত হইল, কেন না বিশেষ বিশেষ কার্যে শিক্ষিত এই সমস্ত লােকের মত আর একদল নিপুণ শ্রমিক সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন হইয়া পড়িল। এই কারণে কিছু দিনের জন্য কলিকাতার জল-সরবরাহ-কার্যে সমূহ ক্ষতি সঙ্ঘটিত হইল। যে দুইমাস রাজেন্দ্রনাথের বিশ্বস্ত অনুচরবর্গ প কারখানার বাহিরে অবস্থান করি- তেছিল, তাহার মধ্যে তিনি অন্য নির্মাণকাৰ্য্য পাইবার চেষ্টা করিয়া অকৃতকাৰ্য্য হইলেন। বহুদিন এইরূপ নিষ্কর্মা শ্রমিকদলের বেতন যােগান অসম্ভব, সেইজন্য তাহাদের মধ্যে অধিকাংশ অবশেষে নিজ নিজ গ্রামে চলিয়া গেল, অল্প- সংখ্যক লোেক জলকলে ফিরিতে বাধ্য হইল। দুই বিরুদ্ধ প্রকৃতির অবশ্যম্ভাবী সঘর্ষণের উত্তেজক প্রসঙ্গ এইরূপে শেষ হইল। এই প্রকাশ বিরােধের তাৎপৰ্য প্রণিধান যােগ্য, কেন না ইহার ফলে কাৰ্যনিৰ্বাহ সম্বন্ধে নিত্য সংশয়ের ভাব কাটিয়া গেল, এবং বিরােধী ব্যক্তিদ্বয়ের মনে, পরস্পরের চরিত্র-বল সম্বন্ধে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট ধারণা বদ্ধমূল হইয়া রহিল। রাজেন্দ্রনাথ কলিকাতায় ফিরিয়া আসিয়া, তাহার ছাত্র- জীবনের সেই পুরাতন মেসেই পুনঃপ্রবেশ করিলেন। তিনি

৭৬
রাজেন্দ্রনাথ
কলিকাতা করপােরেশনের নিকট হইতে সমস্ত প্রাপ্য টাকা
আদায় করিয়া, তঁাহার বাজার দেনা পরিশােধ করিলেন,
এবং তঁাহার প্রথম মহাজন দেবেন্দ্রনাথ সেনের সমস্ত
মূলধন ফিরাইয়া দিয়া, তাহার সহিত অংশীদার-সম্বন্ধ
যথাবিধি বিচ্ছিন্ন করিলেন। অধিকন্তু তিনি, তাঁহার
মাতুলের বন্ধুর নিকট হইতে ঋণলব্ধ টাকার অর্ধেক,
অর্থাৎ ২৫০০ টাকা প্রত্যর্পণ করিলেন। এই সমস্ত হিসাব
নিকাশ করিয়া তিনি দেখিলেন যে তখনও তঁাহার হাতে,
দ্বিতীয় ঋণের বাকী টাকা সমেত, প্রায় ২০,০০০ টাকা
মজুত আছে। যে কণ্টাক্টর প্রায় নিঃসম্বল অবস্থায় ব্যবসায়
আরম্ভ করিয়াছিলেন, তাঁহার পক্ষে এই টাকা রাজৈশ্বর্যের
সমান! এই আপেক্ষিক বিভব হাতে পাইয়া, রাজেন্দ্রনাথের
আত্মবিশ্বাস ও কাৰ্য্যশক্তি বিলক্ষণ বর্ধিত হইল। তাহার
মূলধন ও কাৰ্যদক্ষতার সাহায্যে অর্থোপার্জনের উদ্দেশ্যে,
অতঃপর তিনি চতুষ্পর্শস্থ জেলায় সরকারী পূৰ্ত্ত-বিভাগে
নির্মাণ কাৰ্য্য পাইবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিতে লাগিলেন।
বিরক্তির আবর্তে পড়িয়া পলতার কণ্টাক্ট
পূর্ত বিভাগের
কন্টাক্ট-সূত্রে অকালে লয়-প্রাপ্ত হওয়ায়, একমাত্র সরকারী
বিদেশ-ভ্রমণ।
পূৰ্ত্ত-বিভাগেই আশাপ্রদ কাৰ্যপ্রাপ্তির
সম্ভাবনা ছিল। এই বিভাগের নির্ধারিত হার হইতে লাভ
করিবার সুবিধা পাওয়া যাইত, এবং বিলের টাকা
সত্বর ও পুরামাত্রায় আদায় হইত। রাজেন্দ্রনাথ কলিকাতা

কৰ্ম্মজীবনের প্রারম্ভ
৭৭
ছাড়িয়া কুষ্টিয়ায় নিজ মােকাম ( head-quarters) স্থাপনা
করিলেন, এবং তথায় ও রাণাঘাট, মাগুরা প্রভৃতি তদানীন্তন
উন্নতিশীল মফঃস্বল-কেন্দ্রে, যে কোন সরকারী নির্মাণকাৰ্য্য
পাওয়া যাইত তাহা সম্পাদন করিতে লাগিলেন। এইরূপে,
অনিশ্চিত আয়ের উপর নির্ভর করিয়া, তিনি প্রায় এক
বৎসর বিদেশ-ভ্রমণে কাটাইয়া দিলেন।
রাজেন্দ্রনাথ যে উপজীবিকা মনােনীত করিয়াছিলেন,
তাহা একদিকে যেমন স্বাধীন ধরণের, অপরদিকে তেমনই
অনিশ্চিত। এ হেন জীবিকার সুবিধা অসুবিধার বিষয়
যে তিনি সেই সময় গভীরভাবে চিন্তা করিতেন, এরূপ
অনুমান করা অসঙ্গত হইবে না। বৃত্তি-নিৰ্বাচনে যে
বিশেষ সাহস বিপদ-বরণেরই নামান্তর, সেই সাহস-বলে
বলীয়ান্ যুবক-সম্বের সৃষ্টি, বঙ্গে প্রচলিত ইংরাজী শিক্ষা-
প্রণালীর সাহায্যে সুসাধ্য হয় নাই। সরকারী চাকরীতে
যেমন তেমন করিয়া ঘি-ভাত’,—ইহাই ছাত্র সাধারণের
মনােবৃত্তি ছিল। পৃথক্‌ পথের পথিক রাজেন্দ্রনাথ, দারুণ
অভাবে পড়িয়াও, অবজ্ঞাভরে চাকরী প্রত্যাখ্যান করিয়া-
ছিলেন। এখন তিনি কন্ট্রাক্টরের স্বাধীন পেশায় কিয়ৎ
পরিমাণে কৃতকাৰ্য্য হইয়াছেন, সুতরাং তিনি এই স্থির
সিদ্ধান্ত করিলেন যে কোন সাময়িক বিফলতা তঁহাকে
চিহুিত পথ হইতে বিচ্যুত করিতে পারিবে না। তাহার
পক্ষে দুঃসাহসিকতার আকর্ষণ পূৰ্বের মতই প্রবল ছিল।

৭৮ রাজেন্দ্রনাথ এই কারণে তিনি পতার কাৰ্য্যচ্যুতি সাধারণ ঘটনা হিসাবেই দেখিতেন। বস্তুতঃ এই ঘটনা উপলক্ষে তিনি বিবিধ কার্য সম্পাদন করিয়া, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সুযােগ পাইয়াছিলেন। কিন্তু অনুরূপ আর্থিক সুবিধা হয় নাই। কুষ্টিয়ায় অবস্থান করিয়া, রাজেন্দ্রনাথ নিজ পেশার স্থায়িত্ব সম্পাদন করিতে পারেন নাই। কিন্তু তঁাহার একরােখা দৃঢ়প্রতিজ্ঞা থাকায়, দুর্ভাগ্য রােধ করিবার জন্য কাৰ্যে অধ্যবসায় বরং বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়াছিল। যখন রাজেন্দ্রনাথের ভাগ্য-গগনে ঘনমেঘ ক্রমশঃ পুঞ্জীভূত হইতেছিল, তখন সহসা অপ্রত্যাশিতভাবে মেঘ কাটিয়া গেল, দিবালােক প্রকাশিত হইল এবং সঙ্গে সঙ্গে “উদ্যোগিং পুরুসিংহমুপৈতি লক্ষ্মী” ( উদ্যোগী পুরুষ- প্রবরেব লক্ষ্মীলাভ হয়) এই মহাসত্য প্রতিপন্ন হইল। একদিন প্রভাতে তাহার নিকট ফেইকের এক পত্র উপস্থিত হইল। স্যর রাজেন্দ্র পরে স্বীকার করিয়াছেন যে তিনি ব্যগ্র ও উৎসুক হইয়া এই পত্ৰ খুলিয়াছিলেন। পত্রে ফেইক তাঁহাকে সুবিধামত পতায় গিয়া সাক্ষাৎ করিতে অনুরােধ করিয়াছিলেন। অদৃষ্টচক্রের এই বিবর্তনে, রাজেন্দ্রনাথ স্বভাবতঃই উল্লসিত হইয়া উঠিলেন। পত্রের ছাত্রের মধ্যে ফেউইকের নম্রতা ও অনুতাপের আভাস পাইয়া, তিনি অসঙ্কুচিত চিত্তে পতায় গিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। ফেইক, স্বকীয় বিশিষ্ট প্রকৃতি কর্মজীবনের প্রারম্ভ ৭৯ অনুসারে, তাহার অতীত অশিষ্টতার জন্য রাজেন্দ্রনাথের ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন, এবং তাহার হস্ত স্পন্দন করিয়া গত বিষয় ভুলিয়া যাইতে বলিলেন। ফেইক সরল ভাবেই স্বীকার করিলেন, যে তাহার কাৰ্য সে সময় বিঘ্নসঙ্কুল, এবং বলিলেন যে যদি রাজেন্দ্রনাথ পুনৰ্ব্বার সংরক্ষণ-কণ্টাক্ট গ্রহণ করেন, তাহা হইলে পূৰ্ব অশুভ ব্যাপারজনিত তাহার সমস্ত ক্ষতি উদারভাবে পূরণ করিয়া দিতে ফেইক অঙ্গীকার করিতেছেন। রাজেন্দ্রনাথ কন্টাক্ট গ্রহণ করিলেন, এবং সমান উদারতা মেঘক্তমু অদৃষ্টগগন ; উন্নত চরিত্রের স্ফুরণ। পরবশ হইয়া ফেইককে আশ্বাস দিলেন যে তিনি সংরক্ষণ-কার্য্যের সমস্ত গােলযােগ যথাশক্তি মিটাইয়া দিবেন। ফেউইকের মুখের কথাই তাহার পক্ষে যথেষ্ট—তিনি ক্ষতিপূরণ বিষয়ে কোন লিখিত অঙ্গীকার- পত্র চাহেন । এক সপ্তাহের মধ্যে রাজেন্দ্রনাথ আবার তাহার পুরাতন বাংলােয় ফিরিয়া আসিলেন, এবং কলিকাতার জল-সরবরাহের কারখানা সম্পূর্ণ কর্মক্ষম রাখিবার দায়িত্ব পুনৰ্ব্বার গ্রহণ করিয়া সংরক্ষণ-কর্তারূপে তথায় অধিষ্ঠিত হইলেন। তিনি ইচ্ছা করিলে ফেইকের নিকট হইতে কন্টাক্ট সম্বন্ধে পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিকতর মূল্য আদায় করিতে পারিতেন, কিন্তু প্রত্যেক কার্যের জন্য যথাযােগ্য পারিশ্রমিক মাত্র গ্রহনীয়—ইহাই তাহার মত। যে সমস্ত শিক্ষিত শ্রমিক তাহার সহিত একযােগে জলকল

bro
রাজেন্দ্রনাথ
ত্যাগ করিয়াছিল, তিনি আবার তাহাদিগকে কাৰ্যে নিযুক্ত
করিয়া, নিজ সত্য পালন করিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই
তিনি কার্যের জটিলতা আয়ত্ত করিয়া লইলেন, এবং পূর্ব
জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বলে সংরক্ষণ-যন্ত্র আবার নিপুণভাবে
চালাইতে লাগিলেন। আবার তথায় মঙ্গল প্রতিষ্ঠিত হইল।
এইরূপে পলতার সংরক্ষণ-কাৰ্য্য কলের মত নিখুতভাবে
চালাইবার সমস্ত বন্দোবস্ত সমাপন করিয়া, রাজেন্দ্রনাথ
দেখিলেন যে তাহার অন্যকাৰ্যে হস্তক্ষেপ করিবার যথেষ্ট
সময় আছে। তখন তিনি বৃহৎ নির্মাণ-কাৰ্য লইবার
উদ্দেশ্যে, যিনি প্রয়ােজনীয় মূলধন যােগাইতে পারেন
এরূপ লােকের অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। এই উপলক্ষে
তাহার এক আত্মীয়, ভূতনাথ মুখার্জি নামক এক ধনী
ব্যক্তির সহিত তাহার পরিচয় করাইয়া দিলেন। যে সমস্ত
ধনী অংশীদার লাভে
ভারতীয় রাজন্যবৃন্দ, কর্মচারী ও অনুচরবর্গের
ব্যবসায়-জীবনের বৃহৎ দলবল লইয়া, প্রতিবৎসর শীতকালে
কলিকাতায় আগমন ও অবস্থান করিতেন,
তাহাদের সকলের জন্য খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করিবার
কন্টাক্ট লইয়া, ভূতনাথ প্রভূত অর্থ সঞ্চয় করিয়াছিলেন।
তাহার সহিত রাজেন্দ্রনাথের কথাবার্তায় ইহা স্থির হইল
যে তিনি একদিকে ইনজিনিয়ারিং ব্যবসায়ের অর্ধেক
অংশীদার হইবেন, অপরদিকে বিনা সুদে এক লক্ষ টাকা
পর্যন্ত মূলধন ব্যবসায়ে খাটাইবেন এবং অংশীদারের
সূত্রপাত।

কর্মজীবনের প্রারম্ভ
৮১
নিয়মিত কর্তব্য হিসাবে অর্থ-সংক্রান্ত সমস্ত কৰ্ম্ম তদারক
করিবেন—তাহাতে রাজেন্দ্রনাথ নিশ্চিন্ত হইয়া শিল্পগত
বা ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাপারে নিজের সমস্ত সময় প্রয়ােগ
করিতে পারিবেন । দ্বিতীয় বার পল্তার কাৰ্য্য এক
বৎসর চলিবার পর, টি, সি, মুখার্জি এণ্ড কোম্পানির
নামে এই অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠিত হইল। সেই সময় হইতেই,
স্যর রাজেন্দ্রের প্রকৃত ব্যবসায়-জীবন আরম্ভ হইয়াছে
বলিতে হইবে।
অতঃপর পলতার সংরক্ষণ-কার্যে অনুক্ষণ রাজেন্দ্রনাথের
ব্যক্তিগত মনােযােগ দিবার প্রয়ােজন না থাকায়, তিনি
পতার বাংলাে ছাড়িয়া নিকটবর্তী মনিরামপুর গ্রামে
বাসস্থান মনােনীত করিলেন। পতায় দ্বিতীয়বার কাৰ্য
লাভে এবং ভূতনাথের সহিত অংশীদারত্ব স্থাপনে, রাজেন্দ্রনাথ
ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে এক প্রকার নিশ্চিন্ত হইয়া, মাতা ও পত্নীকে
স্বচেষ্টা প্রসূত সুসজ্জিত গৃহে সুখস্বচ্ছন্দে রাখিতে ব্যর্থ
হইলেন। তাহাদিগকে অচিরে মনিরামপুরে নবগৃহে আনয়ন
করিলেন। এই আনন্দজনক পরিবর্তনে তঁাহার মাতার
অশেষ উপকার হইল, কেননা রাজেন্দ্রনাথের
মাতা ও পত্নীর
নবগৃহ-প্রবেশ। বাল্যাবস্থা হইতে যে অপম্মার রােগ তঁাহার
মাতার পক্ষে প্রায় চিরন্তন হইয়া গিয়াছিল, তাহা এই
সময়ে সহসা অন্তর্হিত হইল। বাল্যবয়স হইতেই তাহার
পুত্রের উপর তিনি যে উচ্চ আশা ও বিশ্বাস স্থাপন করিয়া

৮২ রাজেন্দ্রনাথ ছিলেন, সে বিষয়ে সিদ্ধিলাভ, তঁাহার পীড়িত স্নায়ু-মণ্ডলের পক্ষে সুস্নিগ্ধ প্রলেপের মত আরামদায়ক হইয়া উঠিল । অপরদিকে, মাতার বিশ্বাসের উপযুক্ত হইবার জন্য স্যর রাজেন্দ্র প্রথম জীবনে যে কঠোর সাধনা করিয়াছিলেন তাহা তাহার পক্ষে অতীব প্রশংসনীয়। মনিরামপুরে থাকিবার সময় রাজেন্দ্রনাথ তাহার কৰ্ম্ম- ক্ষেত্র প্রসারিত করিবার এবং অন্য বিষয়ে মনােযােগ দিবার অবসর ও সুযােগ পাইয়াছিলেন। কিছুদিন পরে তিনি হুগলীতে আদালত বাটী নির্মাণ, ও কতকগুলি মেরামত কাৰ্য্যের অপেক্ষাকৃত বৃহৎ কন্টাক্ট পাইলেন। তদুপলক্ষে প্রাতে পর কাৰ্য্য পরিদর্শন, এবং তাহার পর গঙ্গ। পার, ও উত্তরগামী হইয়া ব্যারাকপুর হইতে হুগলীতে গিয়া নূতন কাৰ্য্য পৰ্যবেক্ষণ, তাহার দৈনিক করণীয় ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইল। তখন মােটর-বােটের প্রচলন হয় নাই। সাধারণ ফেরী ষ্টীমারের সংখ্যা অত্যল্প ও তাহাদের যাতায়াতের সময় অনিশ্চিত ছিল। এদিকে রাজেন্দ্রনাথ সময় সম্বন্ধে আজীবন নিষ্ঠাবান্—জীবনের সেই যুগে পতা-হুগলী পথে অধিক সময় ক্ষেপন করিবার মত অবস্থা তাহার ছিল না। সুতরাং বাধ্য হইয়া তাহাকে যােল দাড়বিশিষ্ট এক অনতিবৃহৎ বজরা ক্রয় করিতে হইল। এইরূপে সময়-সমস্যার কিয়ৎ পরিমানে সমাধান হইল। তথাপি তাঁহাকে বিশেষ বিবেচনা করিয়া এমন একটি কর্মজীবনের প্রারম্ভ ৮৩ কাৰ্যপ্রণালী নির্ধারণ করিতে হইল যাহা দ্বারা, বিভিন্ন স্থানে তাহার কাৰ্য্যের অংশবিশেষ অপ্রধান কন্টাক্টরদিগকে ভাগ করিয়া দিয়া ও প্রধান কর্তৃত্ব নিজের হাতে রাখিয়া, কাৰ্য- সমূহের প্রত্যেক ক্ষুদ্র অংশের কঠোর তত্ত্বাবধান করিতে পারা যায়। এই উদ্দেশ্য-সিদ্ধি বিষয়ে প্রথমে তিনি নিঃসন্দেহ হইতে পারেন নাই, কেননা তাহার আশঙ্কা হইল যে সাময়িক পরিদর্শন যতই সূক্ষ্ম ও কঠোর হউক না কেন, কাৰ্য-ক্ষেত্র হইতে প্রধান তত্ত্বাবধায়কের অনুপস্থিতি উপ- লক্ষে চারিদিকে চেষ্টার শৈথিল্য উৎপন্ন হইবেই হইবে। তথাপি তিনি বুঝিতে পারিলেন যে তাহার নিয়মিত কার্যাবলী বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়ায় ও নানা বিষয়ে মনেযােগ দিবার আবশ্যক হওয়ায়, তাঁহার পক্ষে দায়ীত্ব বিভাগ করা ভিন্ন উপায়ান্তর নাই। সেই জন্য তিনি দৈনিক পরিদর্শন, সূক্ষ্ম ও কূট প্রশ্ন, এবং ব্যক্তিগত আলােচনা দ্বারা প্রত্যেক সম্পাদিত কাৰ্য্যের সহিত ঘনিষ্ঠ সংস্রব রাখিয়া, কাৰ্য-বিভাগ-প্রণালী প্রসারিত ও নির্দোষ করিবার জন্য সচেষ্ট হইলেন। তাঁহার প্রবর্তিত প্রণালীর বিভক্ত দায়িত্ব সত্ত্বেও সাফল্য। পরীক্ষা যথা সময়ে সফল বলিয়া প্রতিপন্ন তঁাহার কাৰ্য-প্রণালীর উৎকর্ষ এবং তাহার পরিদর্শনের কাৰ্য-সাধকত। ও ক্ষিপ্ৰকারিতা বিষয়ে চিফ, ইনজিনিয়ার, হুগলীর কাৰ্য্য সমাপ্তি প্রসঙ্গে তাহার প্রশংসা করিয়াছিলেন। হইল।

৮৪
রাজেন্দ্রনাথ
এই সময়ের একটি ঘটনা স্তর রাজেন্দ্রের মানসপটে
অঙ্কিত হইয়া আছে। তাহাতে আর একটু হইলেই তাহার
কর্মজীবন অকালে লয়-প্রাপ্ত হইত। একদিন তিনি নিয়-
মিত পরিদর্শনকার্যে নৌকাযােগে ব্যারাকপুর হইতে
হুগলীতে যাইতে ছিলেন। নদীর স্রোত প্রতিকূল থাকায়,
দাড়ীগণ পশ্চিমতীর ঘেসিয়া যাইতেছিল, এবং গমনেও
বিলম্ব হইতেছিল। তখন চৈত্রমাস, বেলা প্রায় একটা--
রাজেন্দ্রনাথ
প্রখর রৌদ্রতাপ এড়াইবার জন্য ইতি-
পূৰ্বেই নৌকা-কক্ষে প্রবেশ করিয়াছিলেন।
সহসা নদীতে
কোটালের বাণ আসিল। অমাবস্যা পূর্ণিমার সময় বলিয়া,
তাহার জন্য মাঝির প্রস্তুত থাকা উচিত ছিল, কিন্তু তাহার
অমনােযােগ বশতঃ, এক প্রকাণ্ড ঢেউ আড়াআড়ি ভাবে
নৌকায় বিষম ধাক্কা লাগাইয়া তাহাকে একেবারে উলটাইয়া
দিল। রাজেন্দ্রনাথ কতকটা ভারী পরিচ্ছদ সমেত জলে
পড়িয়া গেলেন। ঢেউ এর পর ঢেউ তাহার উপর দিয়া যাইতে
লাগিল—পরিচ্ছদের ভারে বিপন্ন হইয়া সন্তরণ-শক্তি সত্ত্বেও
তিনি ভাসিয়া থাকিতে পারিলেন না। হুগলীর দুই তিন
মাইল দক্ষিণে কশ্যালী গ্রামের সম্মুখে এই দুর্ঘটনা
ঘটিয়াছিল। নৌকা যেখানে ডুবিয়াছিল, তাহার নিকটেই
বসু নামক রাজেন্দ্রনাথের এক বন্ধু বাস করিতেন।
সৌভাগ্যক্রমে বসু-গৃহিণী সেই সময় বাটীর ছাদ হইতে
নদীর দৃশ্য দেখিতেছিলেন । তিনি নৌকা ডুবিতে

কৰ্ম্মজীবনের প্রারম্ভ ভগবানের করুণ। দেখিয়া তৎক্ষণাৎ উচ্চৈস্বরে স্বামীকে ডাকিলেন—স্বামী দৌড়াইয়া গিয়া দেখিলেন যে তখন প্রবল স্রোত রাজেন্দ্র- মারাত্মক বিপদে নাথকে টানিয়া লইয়া যাইতেছে। মুহূর্ত মধ্যে বসু মহাশয় দুইটি জেলে ডিঙ্গি অধিকার করিয়া বসিলেন—তাহারাও তখন বাণের মধ্যে পড়িয়া হাবুডুবু খাইতেছিল। তাহার হুকুমে একটি ডিঙ্গি রাজেন্দ্র- নাথের দিকে অগ্রসর হইল। একেবারে শেষ মুহূর্তে, যখন তিনি অবসন্ন হইয়া পড়িতেছিলেন, মাঝি তাহাকে টানিয়া তুলিল। সে সময় তিনি মরিয়া হইয়া ভাসিয়া থাকিবার জন্য যে চরম চেষ্টা করিতেছিলেন, তাহা স্যর রাজেন্দ্রের এখনও স্মরণ হয়। অবশেষে যখন তিনি আসন্ন মৃত্যু হইতে রক্ষা পাইলেন, তখন দারুণ স্নায়বিক প্রতি- ক্রিয়া বশতঃ অজ্ঞান হইয়া পড়িলেন। বসু মহাশয় তাহাকে নিজ বাটীতে লইয়া গিয়া প্রাথমিক সাহায্যের ব্যবস্থা করিলেন, এবং অবিলম্বে ডাক্তার ডাকিয়া পাঠাইলেন। পরদিন তাহাকে কলিকাতায় স্থানান্তরিত করিবার প্রয়ােজন হইলে, তিনি আবার পুরাতন মেসে যাওয়াই স্থির করিলেন। 'তথায় তঁাহার আত্মীয় ও বন্ধু মতিলাল, এতদিনে ডাক্তারী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া, মেডিক্যাল কলেজে একটী কাৰ্য- সূত্রে অন্যান্য ডাক্তার বন্ধুগণের সহিত বাস করিতেছিলেন। ভ্রাতুষ্পত্রের চিকিৎসায় ও বন্ধুবর্গের শুশ্রুষায়, রাজেন্দ্রনাথ ক্রমশঃ আরােগ্যলাভ করিলেন, কিন্তু তিনি এমন কঠোর রাজেন্দ্রনাথ স্নায়বিক আঘাত পাইয়াছিলেন যে তাহার স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ফিরিয়া পাইতে অনেক সময় লাগিল। এই আশ্চর্য ঘটনায়, একদিকে যেমন “রাখে কৃষ্ণ মারে কে?” এই প্রবাদ-বাক্য সত্য বলিয়া প্রতিপন্ন হইল, অপরদিকে তেমনই, সর রাজেন্দ্র যে ঈশ্বরানুগৃহিত এবং পূর্ত-কাৰ্য্য ও শ্রমশিল্পজগতে ভগবানের বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে নিয়ােজিত, এরূপ সিদ্ধান্তের কারণও প্রকাশিত হইল। উপরােক্ত দুর্ঘটনাজনিত কঠিন পীড়া হইতে আরােগ্য- লাভ করিবার পর, রাজেন্দ্রনাথের সাংসারিক দুঃসময় উপস্থিত হইল। তাঁহার স্ত্রীর স্বাস্থ্যভঙ্গ ও সন্তান-সম্ভাবনা হওয়ায়, তাহার মাতা পুত্রবধূকে লইয়া ভালায় চলিয়া গেলেন। রাজেন্দ্রনাথ অগত্যা মনিরামপুরের বাস উঠাইয়া কলিকাতায় পুরাতন মেসে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তিনি কলিকাতা হইতে প্রত্যহ ব্যারাকপুর ও অন্যান্য স্থানে কাজ দেখিতে যাইতেন। কার্যের দূরত্ব ও যানবাহনের অসুবিধা বশতঃ, তাহার দৈনিক কৰ্ম্ম কঠিন হইয়া পড়িত, কিন্তু তিনি সর্বদা ব্যস্ত থাকিতেই আনন্দ লাভ করিতেন। মুহূর্তের জন্যও তঁাহার সতর্কতার হ্রাস হইত না—কোনদিন তাহার তালিকানুযায়ী কোন পরিদর্শন করণীয় হইলে তাহা ঠিক সেই দিনে সম্পাদনেও ত্রুটী হইত না। ছয়মাস পরে, তাহার পত্নী একটী পুত্রসন্তান প্রসব করিলেন, কিন্তু কর্মজীবনের প্রারম্ভ ৮৭ বিয়ােগ । ভগ্নস্বাস্থ্যবশতঃ আনুসঙ্গিক জটিল রােগে আক্রান্ত হইয়া কয়েক দিন পরেই পরলােক গমন করিলেন। যদিও আটবৎসর- পত্নী ও পুত্র ব্যাপী বিবাহিত জীবনের মধ্যে অল্প সময়ই রাজেন্দ্রনাথ পত্নীর সহিত একত্র বাস করিতে পারিয়াছিলেন, তথাপি তিনি পত্নীবিয়ােগ দুঃখে অত্যন্ত অভিভূত হইয়া পড়িলেন। শশাকে মুহ্যমান হইয়া, এবং সংসারে নিতান্ত একাকী—এই মনােভাবের বশবর্তী হইয়া, রাজেন্দ্রনাথ কলিকাতায় বাস করিতে লাগিলেন। এদিকে তঁাহার মাতা গ্রামে থাকিয়া, মাতৃহীন শিশুকে পালন করিতে লাগিলেন। দুই বৎসর পরে, সেই শিশুরও মৃত্যু হইল। তখন এক বৃদ্ধ মাতা ভিন্ন নিজ সংসারে একান্ত নিঃসঙ্গ হইয়া, রাজেন্দ্রনাথ ভাবিতে লাগিলেন যে গাহস্থ্য বিপদের বিষম আঘাতে তাহার সৌভাগ্য-তরণী চূর্ণ হইয়া যাইতেছে। কিন্তু পুরুষ বিস্মৃতিশীল জীব-মানসিক চাঞ্চল্য তাহার মূল চরিত্রের এক ক্ষুদ্রাংশমাত্র। সময়ের চিকিৎসা- গুণে, দুঃখ দূরীভূত ও নিঃসঙ্গ-ভাব নিবারিত হইয়া যায়। কয়েক মাস পরেই, রাজেন্দ্রনাথের কাৰ্য্যে আসক্তি পুনর্জীবিত হইল এবং তাঁহার পূর্ব উৎসাহ ও কর্মশক্তি ফিরিয়া আসিল। যখন তাহার বিয়ােগ-দুঃখের তীব্র ব্যথা মন্দীভূত হইল, তখন চারিদিক হইতে তাহার নিকট পুনর্বিবাহের প্রস্তাব ও অনুরােধ আসিতে লাগিল। তন্মধ্যে তাহার মাতার পীড়াপীড়িই তাহার পক্ষে অলঙ্ঘনীয় হইয়া উঠিল।

bb রাজেন্দ্রনাথ পূৰ্বেই কথিত হইয়াছে যে ভারতীয় পিতামাতার নিকট বংশানুক্রম রক্ষার আদর্শ ধর্মের অনুশাসনের মতই পবিত্র ও পালনীয়। যতদিন রাজেন্দ্রনাথের শিশুপুত্র জীবিত ছিল, ততদিন তাঁহার পুনর্বিবাহের জন্য মাতা পীড়াপীড়ি করেন নাই। কিন্তু শিশুর মৃত্যুর পর, রাজেন্দ্রের মাতার এই দৃঢ় মনােভাব হইল যে কোন উপায়ে বংশানুক্রম রক্ষার ব্যবস্থা না করিতে পারিলে, অতঃপর তাহার সংসারে জীবন ধারণই বৃথা। এই মনােভাবের বশবর্তী হইয়া, তিনি বিবাহে পুত্রের সম্মতি লাভ করিবার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। এই সময়ে পুনর্বিবাহের ইতিহাস। রাজেন্দ্রনাথের বয়স ছাব্বিশ বৎসর হইয়া- ছিল। যদিও তিনি নিশ্চয়ই মনে করিয়াছিলেন যে তাঁহার বর্তমান স্বাধীন ও সচ্ছল অবস্থায়, পুরাতন প্রথায় বিবাহ, অর্থাৎ মাতার নির্বাচনমূলক বিবাহ, অসঙ্গত হইবে, তথাপি তিনি অধিকদিন মাতার নির্বন্ধ উপেক্ষা করিতে পারেন নাই। অবশেষে তাহাকে বিবাহে সম্মতি দিতে হইল। একবার সম্মতি দিয়া, তিনি পাত্রীনিৰ্বাচন বিষয়ে কোনরূপ তর্ক তুলিলেন না। তাহার বিশ্বাস ছিল, এবং বােধ হয় এখনও আছে, যে ভারতীয় সংসার ও সমাজ গঠনের বর্তমান অবস্থায়, বিবাহে পিতামাতার মনােনয়নই সর্বোৎ- কৃষ্ট। নারীজাতীর অবরােধ ও বাল্যবিবাহের মত নিষ্ফল ও অনিষ্টকর প্রথার উচ্ছেদ সাধনে তিনি অতিশয় উৎসাহী।

কর্মজীবনের প্রারম্ভ নারীর প্রাপ্য পূর্ণ অধিকার, ও শিক্ষা বিষয়ে পুরুষের সমান সুযােগ প্রদানেরও তিনি একজন বিশিষ্ট সমর্থক। কিন্তু যুবক-যুবতীর অবাধসাক্ষামূলক যে ব্যক্তিগত পতি-পত্নী নিৰ্বাচন, পাশ্চাত্য জগতেও চিন্তাশীল ও কৃষ্টি- প্রাপ্ত (Cultured) মনিষীগণ সন্দেহের চক্ষে দেখিতেছেন, এ দেশের ব্যক্তিবিশেষ যে সেই পাশ্চাত্য প্রথা লইয়া নিরাপদে পরীক্ষা করিতে পারেন, ভারতীয় সমাজের শিক্ষা জ্ঞান ও সংস্কার তাহার সম্পূর্ণ প্রতিকূল-ইহাই স্যর রাজেন্দ্রের মত। কোন কোন স্থানে যে এরূপ অন্ধ অনুকরণের বিষময় ফল হইয়াছে, এবং সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় নারীত্বের উচ্চ আদর্শ ক্ষুন্ন হইয়া গিয়াছে, তাহা অস্বীকার করা যায় না। পাশ্চাত্য সাহিত্য ও সভ্যতায় উচ্চশিক্ষিত পুত্র কন্যাগণেরও স্মরণ রাখা উচিত যে পিতামাতার দীর্ঘতর জীবনের অভিজ্ঞতা এবং সংসারের ও মানব-চরিত্রের বিস্তৃত পরিপক্ক জ্ঞান উপেক্ষনীয় নহে। ব্যক্তিগত মনোনয়ন যদি তাহাদের এই প্রিয় ও বিবাহিত জীবনের পক্ষে আবশ্যকীয় বলিয়া মনে হয়, তবে অন্ততঃ পিতামাতার বিবাহে স্বাধীন নির্বাচন বনাম মনােনীত দুই চারিটী পাত্রপাত্রীর মধ্যেই পিতামাতার উপদেশ। তাহা সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত, নতুবা যুবাবয়সে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের আকর্ষণ ও নিজ নিজ ভাব- প্রবণতার উপর নির্ভর করিলে, বিবাহিত জীবনে দীর্ঘস্থায়ী সুখের আশা করা দুরাশা মাত্র। ৭

রাজেন্দ্রনাথ
মাতার প্রয়াস।
নূতন জীবন-ধারার প্রারম্ভ হিসাবে, রাজেন্দ্রনাথের
দ্বিতীয় পরিণয় সম্বন্ধে কয়েকটা বিষয় বিশেষ উল্লেখযােগ্য।
বলা বাহুল্য যে বিবাহের
সমস্ত বন্দোবস্তের ভার
তাহার মাতার হাতে ছিল। মাতা কোন ধনী পরিবারের
ভিতর পাত্রীর অন্বেষণ করেন নাই। কী
পত্নী-নির্বাচনে
ধরণের বালিকা তঁাহার পুত্রের ঠিক উপযুক্ত
হইবে, সে বিষয়ে তাহার মনে প্রায় নিশ্চিত ধারণা ছিল।
অনেক অনুসন্ধানের ফলে, তিনি একটী বালিকাকে মনােনীত
করিলেন। সেই বালিকাটীর বয়স অল্প হইলেও, তাহার
গুণাবলী ও চলনগৌরব তাহার উচ্চশির পুত্রের উপযুক্ত ছিল।
হরিহরপুর লেডী যাদু মুখার্জির জন্মস্থান। তাঁহার পিতার
আর্থিক অবস্থা বড় ভাল ছিল না, এবং শৈশবেই তিনি
পিতৃহীনা হইয়াছিলেন। তাঁহার পালন কর্তা মাতামহ, চরিত্র
বলে বলীয়ান ও ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ ছিলেন, এবং তিনি পরিবারস্থ
পুত্র কন্যার মনে, সুন্দর কর্তব্য-জ্ঞান শিক্ষাদ্বারা সঞ্চারিত
করিয়া দিয়াছিলেন। রাজেন্দ্রনাথের মাতা,
ধৰ্ম্মনিষ্ঠায় তাহার সমকক্ষ ছিলেন, এবং ঠিক এইরূপ পরিবার
হইতেই নিজ পুত্রবধু পাইবার প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। তিনি
পুত্রের নিকট কন্যাপক্ষের সমস্ত পারিবারিক সদ্গুণ বর্ণনা
করিলেন, কিন্তু মনােনীত পাত্রীর নিজ গুণাবলীর বিষয়
কিছুই বলিলেন না। রাজেন্দ্রনাথ স্বাভাবিক লজ্জাবশতঃ
সে বিষয় জানিবার জন্য পীড়াপীড়ি করিলেন না, কিন্তু
পূজা ও

৩
#
রাজেন্দ্রনাথ-( ৪০ বৎসর বয়সে )

No text on this page.

কর্মজীবনের প্রারম্ভ এই বিবাহের ভাবীফল সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নিঃসংশয় হইতে পারিলেন না। যথাসময়ে শুভলগ্নে মাতার কর্মশক্তি ও পূণ্যবলে বিবাহ অনুষ্ঠান ও উৎসব নির্বিঘ্নে ও সমারােহে সম্পাদিত হইল। এইরূপে একটি পরম সুখসমৃদ্ধিময় যুগল জীবন-যাত্রা আরম্ভ হইল। তাহা শুধু সমস্ত পরিবারের পক্ষে কল্যাণকর মূর্তিমতী ও আনন্দের উৎস হইয়া উঠে নাই, পরন্তু সৌভাগ্য-লক্ষ্মী। যে কেহ, মমতা করুণা ও মাতৃস্নেহের জীবন্ত প্রতিমাস্বরূপ সেই মাধুৰ্য্যময়ী মহিলার ঘনিষ্ঠ সংস্রবে আসিয়াছেন, তিনিই ধন্য হইয়াছেন। রাজেন্দ্রনাথের পূৰ্ব সংশয় সত্ত্বেও, যে দিন যাদুমতী দেবী তাহার জীবনের অংশভাগিনী হইয়া আসিলেন, সেই দিন তাহার পক্ষে অতি শুভ দিন, কেননা সেই দিন হইতে তাহাকে আর পশ্চাদৃষ্টি করিতে বা পশ্চাদগামী হইতে হয় নাই। সেই দিন হইতে তিনি সাফল্যের পর সাফল্য লাভ করিয়া, ইঞ্জিনিয়ারিং ও শ্রমশিল্প জগতে অতুল কীৰ্ত্তি অর্জন করিয়া- ছেন, এবং কয়েক বৎসরের মধ্যে কয়েক যুগের মত সাধিত কাৰ্য পুঞ্জীভূত করিয়া দিয়াছেন। এই অপূৰ্ব কৰ্ম্ম-মন্দির গঠনে তাহার জীবনসঙ্গিনী কতদূর সহায়তা করিয়াছেন তাহার পরিমাপ করা সম্ভব নহে, কিন্তু এ কথা বলিলে অত্যুক্তি হইবে না যে লেডী যাদুমতী দেবী কেবল আদর্শ- পত্নী ও আদর্শমাতার দৃষ্টান্তস্বরূপ নহেন, অধিকন্তু স্যর

রাজেন্দ্রনাথ
রাজেন্দ্রের সংসারে পূণ্য-প্রদীপরূপে বিরাজিত থাকিয়া,
পরম সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বিধান-কত্রী, এবং তাহার কর্মজগতে
নিজ অসামান্য সহজপ্রবৃত্তি বলে (through her
wonderful instinct ) 6713 কৰ্ম্মবীরের অনুপ্রাণনা
(inspiration) ও উৎসাহদাত্রী বলিয়া পরিগণিত
হইয়াছেন।

No text on this page.

।।
৭,
এ ।
২
'ব,
মাননীয়া লেডী মুখার্জি

পরিশিষ্ট । অবশিষ্ট কর্মজীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় ১৮৮৩-১৮৮৫-কলিকাতার জলসরবরাহের জন্য কলি- কাতা হইতে পত পৰ্য্যন্ত ৪০ ইঞ্চ ব্যাসবিশিষ্ট পাইপ স্থাপন উপলক্ষে, তাহার উদ্ভাবিত প্রণালী অনুসারে পাইপ ক্রয় করিয়া তাহার স্থাপনার জন্য পৃথক কণ্টাক্ট দিয়া, কলিকাতা করপােরেশান প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ বাঁচাইলেন । ইহার ফলে তাহার নিজের প্রভূত যশঃ ও একলক্ষ টাকা লাভ হয়। ১৮৮৫-১৮৮৮-তাহার ব্যক্তিগত চেষ্টায় ও পরিশ্রমে, ইউরােপীয় কন্ট্রাক্টরগণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও, টি, সি, মুখার্জি এণ্ড কোম্পানি প্রথম শ্রেণীর কন্ট্রাক্টর বলিয়া পরিগণিত হইল, এবং পস্তার জলকলের বিস্তার- সংক্রান্ত নিৰ্মাণ-কার্যের অধিকাংশ, কন্ট্রাক্টসূত্রে পাইয়া বিলক্ষণ লাভ করিল। ইউরােপীয় কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীগণের সহিত, অবিরত চেষ্টা দ্বারা ক্রমশঃ বন্ধু স্থাপন। ১৮৮৮-১৮৯০-আগ্রার জলকলের কণ্টাক্ট প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে আগ্রা গমন ; চীফ ইঞ্জিনিয়ার হিউজ সাহেব রচিত নক্সার কতকগুলি ভ্রম প্রদর্শন এই জলকলের জন্য •• ৯৪ রাজেন্দ্রনাথ সর্বনিম্ন টেণ্ডার দিয়া এবং আগ্রা মিউনিসিপালিটির সুপারিশ সত্ত্বেও, ভারতীয় ব্যবসায়ী বলিয়া কন্ট্রাক্ট লাভে বঞ্চিত হইলেন। (পরবর্তী ইউরােপীয় ব্যবসায়ী কণ্টাক্ট পাইলেন) এলাহাবাদ জলকলের টেণ্ডার দিবার জন্য হিউজ সাহেবের অনুরােধ, এবং কোন কোন ইউরােপীয় ব্যবসায়ীর সহিত একযােগে টেণ্ডার দিবার জন্য ব্যক্তিগত পরামর্শ। এই সূত্রে চারি পাঁচটি কলিকাতাস্থ ইউরােপীয় ব্যবসায়- কেন্দ্র ( firm) হইতে সহযােগিতার প্রতিদানে অধীনস্থ কৰ্ম্ম ও কমিশন দিবার প্রস্তাব ; প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান। অবশেষে কলিকাতাস্থ ওয়ালস, লভেট কোম্পানির অ্যাকুইন মার্টিন সাহেবের সম্মানসঙ্গত প্রস্তাবে এক-তৃতীয় লভ্যাংশ সৰ্ত্তে তাহার সহিত সহযােগিতায় স্বীকার, এবং একত্রে এলাহাবাদ গমন। শেষ মুহূর্তে উভয়ের বহুযত্ন ও পরিশ্রম- প্রসূত টেণ্ডার চুরি। উভয়ের পাঁচঘণ্টাব্যাপী কঠিন মানসিক পরিশ্রমের পর, রাজেন্দ্রনাথের অসামান্য স্মরণ শক্তির সাহায্যে, টেণ্ডার নির্দিষ্ট সময়ে পুনঃ প্রস্তুত হওয়ায়, এলাহাবাদ জলকলের কণ্টাক্ট লাভ। উভয়ের যুক্ত নিরাশা, আশঙ্কা, কেন্দ্রীভূত পরিশ্রম ও শেষ সাফল্যসূত্রে মার্টিন কোম্পানী নামক বৃহৎ কারবারের অঙ্কুরােদগম। ১৮৯০-১৮৯২-জলকল নিৰ্মাণ উপলক্ষে এলাহাবাদে প্রবাস; চুক্তির সময়ের ভিতর (এবং পূৰ্ব্বার আগ্রার পরিশিষ্ট ; জলকল নির্মাণের অগ্রে ) সমস্ত কার্য সম্পাদন ; এলাহাবাদ জলকলের উনােচন-সভায় বড়লাট লর্ড ল্যান্সডাউনের প্রশাংসালাভ। ইউরােপীয় কন্টাক্টর দ্বারা আগ্রার জলকল নির্মাণে অনতিক্রমনীয় বাধা উপস্থিত হওয়ায়, যুক্তপ্রদেশ সরকার কর্তৃক আহুত হইয়া প্রস্তাবিত উচ্চ পারিশ্রমিক লইতে অস্বীকৃত হইলেন, এবং অবৈতনিক বিশেষজ্ঞরূপে তিন মাসের ভিতর সমস্ত বাধা অতিক্রম করিয়া আগ্রা জলকল উন্মােচনের উপযােগী করিয়া দিলেন। এই কঠিন কাৰ্য- সাধনে, জলকলের কাৰ্য্য সম্বন্ধে প্রধান বিশেষজ্ঞ, সাতিশয় বিশ্বস্ত কন্ট্রাক্টর ও উচ্চ-হৃদয় ভদ্ৰব্যক্তি বলিয়া পরিচিত হইলেন। ১৮৯২-৯৫—এলাহাবাদ জলকলের মত, ওয়ালস লভেট কোম্পানীর নামে ও তদনুরূপ সৰ্ত্তে কানপুর জলকলের কণ্টাক্ট-লাভ ও কাৰ্য-সম্পাদন। এই কোম্পানীর প্রধান অংশীদার, বাঙ্গালী কণ্টাক্টরকে এক-তৃতীয়াংশ লভ্যাংশ দিতে আপত্তি করায়, অ্যাকুইন মার্টিন সেই কোম্পানীর সহিত সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করিয়া, রাজেন্দ্রনাথকে সমান অংশী- দাররূপে লইয়া মার্টিন কোম্পানী নামক নূতন কোম্পানী গঠন করিলেন (১৮৯২ সাল)। কিছুদিন পরে টি, সি, মুখার্জি কোম্পানীর সহিত তাঁহার সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হইল।

রাজেন্দ্রনাথ প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও, নবপ্রতিষ্ঠিত মার্টিন কোম্পানী মীরাট, নাইনিতাল, বেনারস ও লক্ষৌএর জলকলসমূহের এবং লক্ষ্ণৌএর বৃহৎ পয়ঃপ্রণালী সমূহের নিৰ্মাণ কন্টাক্ট পাইলেন। অ্যাকুইন মার্টিনের ‘নাইট’ (knight) পদবী লাভ উপলক্ষে রাজেন্দ্রনাথ অতীব আনন্দিত হইয়া, স্বেচ্ছায় মার্টিন কোম্পানীতে নিজ আট আনা অংশ হইতে আধ আনা অংশ প্রিয়বন্ধু স্যর অ্যাকুইনকে অভিনন্দন হিসাবে চিরকালের জন্য অর্পণ করিলেন, এবং এই অপূৰ্ব্ব উপহার দানের সহিত তাহাকে প্রধান অংশীদার বলিয়া স্বীকার করিলেন। এই মহানুভবতায় স্যর অ্যাকুইন মুগ্ধ হইয়া- ছিলেন, এবং উভয়ের ঘনিষ্ঠ স্নেহের সম্পর্ক দৃঢ়ীভূত হইয়া- ছিল। স্যর অ্যাকুইন মৃত্যুকালে উইল দ্বারা রাজেন্দ্র- নাথকে নিজ সম্পত্তির একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক করিয়া গিয়াছিলেন। ২০ নম্বর বিডন স্ট্রীটে বিস্তৃত উদ্যানসমেত প্রাসাদোপম অট্টালিকা ক্রয় কবিয়া, এবং তাহার আশ্চৰ্য্য উন্নতি ও পরিবর্ধন করিয়া, প্রায় ২০ বৎসর তথায় বসবাস করেন। বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের শীর্ষস্থানীয় মনীষিগণের ও সম্রান্ত- বংশীয় সুরুচি ও শিষ্টাচারে উন্নত ব্যক্তিগণের সমাগমে এবং তাহাদের সরস সদালাপে ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলােচনায় এই প্রসিদ্ধ সামাজিক কেন্দ্র অবিরত মুখরিত থাকিত।

পরিশিষ্ট ১৮৯৫-১৯০০—অতঃপর জলকলসংক্রান্ত বৃহৎ কার্যের প্রয়ােজন শেষ হওয়ায়, ঐকান্তিক গভীর চিন্তার ফলে রাজেন্দ্রনাথ বঙ্গে লাইট রেলওয়ে নির্মাণের পন্থা উদ্ভাবন করিলেন। তদনুসারে মার্টিন কোম্পানি, কাৰ্যনিৰ্বাহক প্রতিনিধি (Managing Agents) রূপে, গভর্ণমেন্টের পৃষ্ঠপােষকতায় ও যৌথ কারবারসূত্রে, ক্রমান্বয় হাওড়া- আতা-সেয়াখালা, রাণাঘাট-কৃষ্ণনগর, বারাসাত-বসিরহাট, ব্যক্তিয়ারপুর-বেহার ও আরা-সাসারাম লাইট রেলওয়ে নিৰ্মাণ করিলেন। এই সমস্ত রেলওয়ে প্রথম হইতেই লাভজনক হইয়া দাঁড়াইল। মূল কল্পনার জন্য সমস্ত সুনাম রাজেন্দ্রনাথের প্রাপ্য। পরিশেষে ঈর্ষান্বিত ইউরােপীয় বণিকবর্গের প্ররােচনায় গভর্ণমেন্ট পৃষ্ঠপােষকতা প্রত্যাহৃত হইলে, মার্টিন কোম্পানীকে লাইট রেলওয়ে নির্মাণ বন্ধ করিতে হইল। ১৯০০-১৯২০-আবার নিবিষ্ট মনে নূতন কল্পনা উদ্ভাবন করিয়া, রাজেন্দ্রনাথ সহকর্মী অংশীদারকে অট্টালিকা-নিৰ্মাণ- স্থাপত্যে অগ্রণী হইবার প্রচেষ্টায় সম্মত করাইলেন। তদুদ্দেশ্যে স্যর অ্যাকুইন মার্টিন, থর্ণ টন্ নামক প্রতিভাবান স্থপতি-শিল্পীকে বিলাত হইতে ভারতে আনয়ন করিলেন। থর্ণ টনের মৌলিক ও মনােরম পরিকল্পনা অনুসারে সুগঠিত প্রাসাদসমূহ দ্বারা, মার্টিন কোম্পানি কলিকাতা ও অন্যান্য সহর সুশােভিত করিয়া দিলেন। এই কোম্পানি কর্তৃক ১৮ রাজেন্দ্রনাথ কলিকাতার ভিক্টোরিয়া স্মৃতি সৌধ নির্মাণে, এই শ্রেণীর উচ্চকার্য্যের, এবং স্যর রাজেন্দ্রের স্থপতি-জীবনের গৌরবময় পরিণতি হইল। বিংশ শতাব্দীর তাজসদৃশ ও “মৰ্ম্মর স্বপন প্রায়” এই অপূৰ্ব স্মৃতি-মন্দির নির্মাণের কণ্টাক্টলাভে স্যর রাজেন্ত্রের ব্যক্তিগত প্রতিভা ও অসামান্য চিন্তাশক্তি প্রধান কারণরূপে বিদ্যমান ছিল। ১৯০৬—স্যর অ্যাকউইন মার্টিনের পরলােক গমনে মার্টিন কোম্পানির প্রধান অংশীদার ও অধ্যক্ষ হইলেন। ১৯২৭-হাওড়ার বর্ণ কোম্পানির সুবৃহৎ ও প্রসিদ্ধ কারবার ক্রয় করিয়া মার্টিন কোম্পানির সহিত যােগ করিয়া দিলেন। গভর্ণমেন্ট কর্তৃক মনােনীত হইয়া উচ্চ অবৈতনিক পদে বা অন্যরূপে, জনসাধারণের কাৰ্যে স্যর রাজেন্দ্রের আত্ম- নিয়ােগের তালিকা :- ১৯১০-এলাহাবাদে শ্রম-শিল্প ও অর্থনৈতিক সমিতির সভাপতি ; তাহার প্রদত্ত ও সুচিন্তিত বক্তৃতাসূত্রে ছয় বৎসর পরে শ্রম-শিল্প কমিটি গঠন। ১৯১১-কলিকাতার সেরিফ। ১৯১৬-১৮—ভারত-সম্রাট, নিযুক্ত শ্রম-শিল্প কমিটির মেম্বর ও কয়েক মাসের জন্য তাহার প্রেসিডেন্ট। ১৯২১-রেলওয়ে কমিটির মেম্বর।

পরিশিষ্ট
১৯২২-ভাগীরথী-সেতু (Hooghly Bridge) কমিটির
প্রেসিডেন্ট।
১৯২৩-বঙ্গীয় ব্যয়সঙ্কোচ কমিটির প্রেসিডেন্ট।
১৯২৪-ভারত-সম্রাট নিযুক্ত ভারতীয় ব্যয়সঙ্কোচ
কমিটির মেম্বর।
১৯২৪-২৫—ভারতীয় কয়লা-কমিটির ( Indian Coal
Committee) মেম্বর।
১৯২৫-২৬ভারত-সম্রাট নিযুক্ত ভারতীয় মুদ্রানীতি
ও আয়ব্যয় (Currency and Finance) সম্বন্ধীয় কমিটির
মেশ্বর।
এতদ্ব্যতীত শিল্প-শিক্ষা বিষয়ে দ্রব্য-বহন
( Transport) কমিটিতেও গভর্ণমেন্টের বিশেষ সাহায্য
করিয়াছেন।
কলিকাতার আতুরাশ্রমের এবং অনুন্নত শ্রেণীর উন্নতি-
বিধায়ক সমিতির প্রধান পৃষ্ঠপােষক।
সাধারণের শিক্ষার—বিশেষ নারী শিক্ষার পৃষ্ঠপােষক
রূপে প্রভূত দান; মিসেস্ পি, কে, রায় প্রবর্তিত গােস্থলে
মেমােরিয়াল বালিকা বিদ্যালয়ের স্থায়িত্ব ও উন্নতিকল্পে
অমূল্য পরামর্শ ও সাহায্যদান।
শরীর-চর্চার বিশেষ উৎসাহদাতারূপে বঙ্গীয় অলিম্পিক
অ্যাসােসিয়েসনের প্রেসিডেন্ট।
বালকদিগের মনে সেবা ও নিয়মানুবর্তিতার ( Service

১০ ০ রাজেন্দ্রনাথ and discipline) আদর্শ বদ্ধমূল করিয়া দিবার জন্য, কলিকাতা বয় স্কাউট অ্যাসােসিয়েসনের প্রেসিডেন্টরূপে দশ বৎসরের উপর কাৰ্য্য করিয়া ভারতে সর্বপ্রথম রজত- বৃক (Silver wolf ) মেডেল পুরস্কার পাইয়াছেন (১৯৩১)। সমানের মত ভারতীয় ও ইউরােপীয়দিগের অবাধ সামাজিক মিলনের জন্য কতিপয় ভারতীয় ও ইউরােপীয় বন্ধুগণের সহিত একযােগে কলিকাতা ক্লাব স্থাপন। দুই বার তাহার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হইয়াছেন। otu karsfaatfai ( Institute of Engineers ) সভার প্রেসিডেন্ট। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের ( Indian Science Congress) প্রেসিডেন্ট। বঙ্গীয় এসিয়াসংক্রান্ত সভার ( Asiatic Society of Bengal) প্রেসিডেন্ট দুই বৎসরে অবনতিশীল সভার বিশেষ উন্নতি সাধন। ভারতের ও বঙ্গের শাসন পরিষদে (Executive Council) বার বার মেম্বর হইবার ইঙ্গিত বা প্রস্তাব পাইয়া ব্যক্তিগত কারণে প্রত্যাখ্যান করিতে বাধ্য হন। বিলাতে গােল-টেবেলেও একাধিক বার ডেলিগেটরূপে নিমন্ত্রিত হইয়া যাইবার অক্ষমতা প্রকাশ করেন।

অশীতিতম জন্মােৎসবে স্যর রাজেন্দ্রনাথ

No text on this page.

পরিশিষ্ট
রাজেন্দ্রনাথের উপাধি-তালিকা
রাজদত্ত-সি, আই, ই (১৯০৯); কে, সি, আই, ই
(১৯১২); কে, সি, ভি, ও (১৯২২)।
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত—ডি, এস, সি, ইন্‌জিনি-
utf (Honoris Causa )
ভারতের ইজিনিয়ারিং সভা প্রদত্ত-এ, আই, ই,
( ইণ্ডিয়া)।
বিলাতের যান্ত্রিক (Mechanical) ইনজিনিয়ারিং
সভা প্রদত্ত—এম, আই, এ, ই, (ভারতে প্রথম ও
একমাত্র Honorary Life Member)।
বঙ্গীয় এসিয়াসংক্রান্ত সভা প্রদত্ত—এফ, এ, এস, বি।
সমস্তগুলি উপাধি লইয়া তাহার নাম এইরূপে লিখিত
হয় ?
Sir Rajendra Nath Mookerjee, K. C. I. E.,
K. c. v. ০., D, sc., M. I, E. ( Ind.), M. I. M. E.,
F. A. S. B,

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Rajendra- Jibani Part 1, Ed. 1st

Author
Bandhopadyay,abhayacharan
Title
Rajendra- Jibani Part 1, Ed. 1st
File name
Rajendra- Jibani Part 1, Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1934
Published
2010/02/5
Publisher
N. Mukherjee, Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
129
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Bandhopadyay,Abhayacharan
DLI number
513134
Barcode
4990010020141.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
CHh43VZ1XpD
Download PDF

Rajendra- Jibani Part 1, Ed. 1st