Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Madhabacharjya

Gangopadhyay,prasad Chandra · 2010/04/21

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মাধবাচাৰ্য্য
ব্রাহ্মণ পরিমাপূর্ণ
( ঐতিহাসিক পঞ্চাঙ্ক নাটক।)
ভক্তকবি তুলসীদাস, বসন্ত প্রসুন, সফল-স্বপন ইত্যাদি গ্রহণ
যুক্ত প্রসাদ চন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় বিদ্যারত্ব
av
.
প্রণীত।
পন ১৩৩ সাল ।
( All rights Reserved. ]
( মূল্য ১ এক টাকা মাত্র।

Publishers- P: GANGULY, COCHRANE Road, SERAMPORE. P: Printed by K. C. Dass. AT THE TOWN PRINTING WORKS, Serampore.

উ,সর্গ।
tur
.
মাতৃপদকমলে।
se

No text on this page.

উপহার।
L)
র
করকমলে এই নাটকখানি
বরূপ
প্রদত্ত হইল।
সন ১৩৩
সাল।

মুখবন্ধ। সংগ্রণীত কয়েকখানি নাটক উচ্চ প্রশংসার সহিত অভিনয় করিবার পর, শ্রীরামপুর এফ, ভি, ক্লাব, আমায়-যুগাবতার কোন ধৰ্ম্মপ্রবর্তক মহাআর জীবনী নাটকাকারে অঙ্কিত করিতে অনুরোধ করেন। তাহাতে আমি জগদ্গুরু মাধবাচার্যের অলৌকিক চরিত্র যথাসম্ভব সংযুক্ত করিয়া-এই দেবনাটকখানি প্রণয়ন করিয়াছি। মাধৰাচাৰ্য্য অবতরবিশেষ। তিনি দাক্ষিণাত্যে তুলুব নামক থামে বৈদিক ব্রাহ্মণের কুলে ১১২১ শকে জন্মগ্রহণ করেন; এবং ভারতের দক্ষিণাপথে মাচাৰ্য্য ও বলমে মাধবাচাৰ্য্য নামে অভিহিত হন। তিনি লুপ্তপ্রায় বাহ্মণ্যধর্মের স্থাপন ও বৌদ্ধ ধর্মের হ হইতে হিন্দুর সনাতন ধর্ম রক্ষা করিয়া, ইতিহাসপ্রসিদ্ধ অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় প্রদান করেন। তাঁহার স্থায় দিগ্বিজয়ী, অদ্বিতীয় দার্শনিক পণ্ডিত, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ভানকারি শক্তিময় মহাপুরুষ, তৎকালে বা তৎপূর্বে কে ছিলেন না। তিনি দ্বৈতবাদী ও শঙ্করাচার্যের পূর্বতন ধর্ম প্রবর্তক মহাযােগী ছিলেন; এবং যে ভাবে হৃদয়গ্ৰাহিনী প্রাঞ্জলভাষায় একশত আটখানি ভাষ্য, মহােপনিষদ, দর্শনাদি প্রণয়ন করিয়া, মানবের মুক্তির পথ সুগম করিয়া গিয়াছে, অদ্বৈতবাদী শঙ্করাচাৰ্য্য ঠিক সেইরূপ সুক্ষ সরল মীমাংসায়, জটীল বেদান্ত দর্শনের ভাষ্য প্রণয়নে যশ অর্জন করিতে পারেন নাই।

(ii) দেশ ও ধর্মরক্ষণে, সেই মহাপ্রাণ ঋষিবর এক হাতে শাস্ত্র অন্ত হাতে শস্ত্র ধরিতেন। তিনি প্রধান বৈষ্ণব ছিলেন; তাঁহার সর্বাঙ্গে হরিনাম অঙ্কিত থাকিত। তিনি বদনে অহরহ হরিনাম কীর্তন করিতেন। শ্রীগৌরাঙ্গের অনেক পূর্বে সর্বপ্রথম তিনিই পাপীর পরিত্রাণের উপায়, সর্বসাধনার শ্রেষ্ঠ সাধনা হরিনাম গাঁখা দিগদিগন্তে প্রচারিত করেন। তাহার প্রতিষ্ঠিত মধ্যসম্প্রদায়ভুক্ত শুদ্ধাচারি একনিষ্ঠ ভ্রাবিড় ব্রাহ্মণগণ ও বহুশত বিষ্ণু মন্দির, মঠাদি, এখনও সমভাবে সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে। তাহার অমানুষিক কার্যাবলী, বিশ্বকোষ, ইম্পিরিয়েল লাইব্রেরীর প্রাচীন গ্রন্থ দ্রষ্টব্য ও দাক্ষিণাত্য পরিভ্রমণে সম্যকরূপে জ্ঞাত হইতে পারা যায়। সর্বশেষে আমার নিবেদন এই যে, এই নাটকে আঙকু * * * সংশােধন করিয়া, সমানে সমান’, ‘মেহার ইত্যাদি নাটক প্রণে পণ্ডিতবর শশিভূষণ কাব্যতীর্থ মহাশয় এবং এই নাটক অভিনয় কল্পে প্রেমের নেশা ও ‘মালবিপ্লব’ রচয়িতা শ্ৰীযুক্ত সত্যনারায়ণ মুখােপাধ্যায়, শ্ৰীযুক্ত বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায় বি, এ, ও শ্ৰীযুক্ত গলিত মােহন মুখােপাধ্যায় মহোদয়গণ বিশেষ সাহায্য করিয়া আমায় চির কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করিছেন। ইতি ভচরণাকাত- রামপুর, করেন রােভ । অক্ষয় তৃতীয়া, ন ১৩৩ সাল। একর।

নাট্রোল্লিখিত ব্যক্তিগণ। পুরুষ। pp } মাধবাচার্য ধৰ্ম্মপ্রবর্তক। সনাতন ঐ অন্তরঙ্গ। মদনমােহন শাস্ত্রী বিশিষ্ট পণ্ডিত। মেঘনাদ ভণ্ডদ্বয়। সাতকড়ি বাণভট্টম বৌদ্ধ গুরু। পুস্পাদিত্য দাক্ষিণাত্যের রাজা। যক্ষশীলা ঐ কবিতাকুমার রাজকবি। ন সম্রাট। পাতঞ্জল বা কপিঞ্জল জনৈক ব্রাহ্মণ। মন্ত্রী, দ্যদ্বয়, দস্যসর্দার, রাজকর্মচারী, দূত, জনৈক বালক, নাগরিকয়, ব্রাহ্মণগণ, ভিক্ষুগণ, যৈন্তদ্বয় ও শৈবগণ। see छौ আনন্দময়ী ০৪০ gp মাধবাচার্য্যের জননী। মদনমােহন শাস্ত্রীর কন্যা। পুস্পাদিত্যের মহিষী। কবিতাকুমারের স্ত্রী। ০ হাসি চিত্রা নীগণ, ভিক্ষুঝগণ ও সখীগণ।

মাদাচাৰ্য্য। প্রথম অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। বকুল তাল তমাল পরিশােভিত, জ্ঞানের কর্মভূমি দক্ষিণপথের অন্তর্গত, তুলুবের পাদদেশ ধৌত করিয়া একটি ক্ষুদ্রকায়। তটিনী, বক্ৰগতিতে সাগরের পথে প্রবাহিতা। উক্ত নদীতট বহিয়া সুদূরগামি পথের চিহ্ন-শ্যামল ছায়া শীতল বনবীথির মধ্য দিয়া লােহিত রেখায় অঙ্কিত রহিয়াছে। দূরে অত্যুচ্চ পৰ্ব্বতের ধুম্রবর্ণ শৃঙ্গমালা দৃষ্ট হইতেছিল। গন্ধমদির মলয়ানীলসিক্ত -মধুর অপরাহ্নকাল। ভ্রমর গুঞ্জন ও গত কাকলীগীতি মুখরা-সরস বসন্তে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভূষিত ধরিত্রীকে আনন্দস্রোতে নিমগ্ন করিয়া -বৈচিত্রময় রঙের পশরা ঢালিয়া, তথন অস্তগামী রবির পীতাভ- নির্বাণােন্মুখ অগ্নির ন্যায় উজ্জ্বলবণে নীলাম্বরের কোলে বিলীন হইতেছে। ( সন্ন্যাসী বেশে বালক মাধব, সনাতন ও বালকদ্বয় সমাসীন।) ১ম বালক। মাধব, মাধব ! আজ তাের একি বেশ ভাই ? মাধব। সন্ন্যাসীর বেশ ; এই দীনসাজে সাজতে আমি বড় লবাসি-আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই । তাই, আমার মনের কথা জানতে পরে আমার সঞ্চিত বাসনা পূর্ণ ক'রে -আল কে একজন সন্ন্যাসী এসে, মায় এই বেশে সাজিয়ে দিয়ে গেল।

নাট্রোল্লিখিত ব্যক্তিগণ। পুরুষ। ০ ০ A মাধবাচার্য্য ধৰ্ম্মপ্রবর্তক। সনাতন ঐ অন্তরঙ্গ। মদনমােহন শাস্ত্রী বিশিষ্ট পণ্ডিত। মেঘনাদ সাতকড়ি বাণভট্টম বৌদ্ধ গুরু। পুস্পাদিত্য দাক্ষিণাত্যের রাজা যক্ষশীলা ঐ কবিতকুমার রাজকবি । হুন সম্রাট। পাতঞ্জল বা কপিঞ্জল জনৈক ব্রাহ্মণ। মন্ত্রী, দদ্বয়, দসর্দার, রাজকর্মচারী, দূত, জনৈক বালক, নাগরিকদ্বয়, ব্রাহ্মণগণ, ভিক্ষুগণ, সৈন্যদ্বয় ও শৈবগণ। স্ত্রী। আনন্দময়ী . মাধবাচার্যের জননী। মদনমােহন শাস্ত্রীর কন্যা। পুপাদিত্যের মহিষী। কবিতাকুমারের স্ত্রী। হাসি চিত্র। . নর্তকীগণ, ভিক্ষুগণ ও সখীগণ।

মালাম্য। প্রথম অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। { বকুল তাল তমাল পরিশােভিত, জ্ঞানের কর্মভূমি দক্ষিণপথেৱ অৰ্গত, তুবের পাদদেশ ধৌত করিয়! একটা ক্ষুদ্রকায় তটিনী, বক্ৰগতিতে সাগরের পথে প্রবাহিত। উক্ত নদীতট বহিয়া সুদূরগামি পথের চিহ্ন—শ্যামল ছায়া শীতল বনবীথির মধ্য দিয়া লােহিত রেখায় অঙ্কিত রহিয়াছে। দূরে অত্যুচ্চ পৰ্ব্বতের ধুম্রবর্ণ শৃঙ্গমালা দৃষ্ট হইতেছিল। গন্ধমদির মলয়ানীলসিক্ত - মধুর অপরাহ্নকাল। ভ্রমর গুঞ্জন ও নড়াগত কাকলীগীতি মুখরা-সরস বসন্তে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভূষিত ধরিত্রীকে আনন্দস্রোতে নিমগ্ন করিয়া -বৈচিত্রময় রঙের পশরা ঢালিয়া, তখন অস্তগামী রবির পীতাভ। নির্বাণােন্মুখ অগ্নির ন্যায় উজ্জ্বলবর্ণে নীলাম্বরের কোলে বিলীন হইতেছে। ( সন্ন্যাসী বেশে বালক মাধব, সনাতন ও বালকদ্বয় সমাসীন। ১ম বালক। মাধব, মাধব ! আজ তাের একি বেশ ভাই ? এ সন্ন্যাসীর বেশ ; এই দীনসাজে সাজতে আমি বড় ভালবাসি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই । তাই, আমার মনের কথা জানতে পেয়ে আমার সঞ্চিত বাসনা পূর্ণ কত্তে ---আজ কে একজন সন্ন্যাসী এসে, . আমায় এই বেশে সাজিয়ে দিয়ে গেল।

মাধবাচার্য্য
| প্রথম প
২ বালক। সন্ন্যাসীর সাজে মাধবকে বড় সুন্দর মানিয়েছে।
সনাতন। কে সে সন্ন্যাসী দাদা?
মাধৰ। তাকে চিনি চিনি ক'রেও চিনতে পারিনি ; সে যেন চেনা
চেনা, অনেক দিনের জানাশুনা-আপনার হ'তে আপনার।
সনাতন। সে সন্ন্যাসী কোথায় গেল?
মাধব। আনিনা সে কোথা হতে এল--কোথা চলে গেল ! এখনও
যেন তার মধুর স্পর্শ অনুভব ক’চ্চি, সেই থেকে প্রাণটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা
বােধ হচ্ছে ! আমার একি হ'ল ভাই ?
১ম বালক। আয় ভাই মাধৰ ! রাজা রাজা, খেলি আয়।
আগে যে ঐ গাছটা ছুতে পারবে, সেই আজ রাজা হবে।
মাধব। আমার যে কিছু ভাল লাগছে না ভাই।
সনাতন। দাদা, তুমি খেলবে না ? তুমি যে আমাদের খেলার প্রধান
সাথী।
মাধৰ। তবে আয় ভাই, এই বকুল ফুল কুড়িয়ে, অঞ্জলি অঞ্জলি
জলে ভাসিয়ে দিই। ওরা তরঙ্গের বুকে নাচতে নাচতে কোন দিগন্তের পথে
ভেসে যাবে, আমরা এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকবো।
( সকলে পতিত বকুল ফুল কুড়াইতে লাগিল।)
মাধৰ। ( কতিপয় পুষ্প হস্তে লইয়া) এ যে পরিচিত গন্ধ, এ গন্ধে মন
মাতাল হয়,-প্রাণ আকুল করে। ভাই, ভাই, এই পবিত্র বকুলের সৃজনকর্তা
যিনি, না জানি তিনি কত সুন্দর, কোমল হতে কোমল, পবিত্র হ'তে পৰিত্ৰ।
১ম বালক। আবােল তাবােল কি বকুচিস ভাই ?

দ্বিতীয় ]
মাধবাচার্য্য
মাধব। ঐ, ঐ, নদীর ওপারে - দূরে অতি দূরে-অনন্তের পথে
কার বাঁশী শুনা যাচ্চে। কি মধুর -কি মৰ্ম্মস্পর্শি স্বর !
(গীত )
ঐ শােনা যায় সুদূর দেশে কাহার বাঁশীটি বাজে।
কোন ধরণের সুধা আনিতেছে বহি তাপিত হিয়ার মাঝে ।
ও পরিচিত স্বর করে আকুল,
বহিছে উজান ভরিয়া দুকুল,
জানিনা বাঁশী কি দিয়ে গড়া
কোন সুরে বাঁধা পরাণ কাড়া,
তার পরতে পরতে মরমের গাঁথা বিশ্বভূবনে মাজে ।
( উন্মনা মাধবকে লইয়া সকলের প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য ।
মদনমােহন শাস্ত্রীর বাটা।
( মদনমােহন শাস্ত্রী উদভ্রান্তভাবে পদচারণা করিতেছিলেন।)
মান। আশ্চর্য মেধাবী বালক !
দশম বর্ষীয় শিশু শিখিল কেমনে,
মুক্ষন এত তত্বজ্ঞান ;
দর্শন পুরাণ বেদ, একে একে মথি
সর্বশাস্ত্রে প্রাধান্য লভিল।
বালকের হেন পাণ্ডিত্য গভীর

মাধবাচার্য।
হেরি নাই কভু !
হৰে কি জন্মিল কোন দৈবশক্তিমান।
-
নহে কল্য প্রফ সস্তা
বেদাস্তের মীমাংসায়,
সমাগও পাওত প্ৰষয়ে যাও,
অমাসম স্মৃতির নির্ঘট-কারি,
ভারতের বিহ্মন জয়ী অনে,
পরাজিত করল কে মনে !
যে অলৌকিক প্রতিকার
লজ্জায় বৃণায়
নির্বাক গুম্ভিত হই;
হারাইসু চির-ল গৌরব আমায়।
ফিরবেন। আর
আজীবন তপস্যায়,
-~ সে সম্মান মােয়।
{ ক্ষণকাল পদচারণ করিয়}}
না, না, চিন্তার কিবা আছে সেতু!
অঙ্কুরে নাশলে গুরু কেমনে বদ্ধিশে ?
ছলে বলে বিনাশি মাখবে,
করি পান বক্ষের শােণিত তার
জুভাইব অন্তর কালা !
রছিলাম সুৰেপে প্রতীক্ষায়।

দ্বিতীয় দৃশ্য।
আধৰাচাৰ্য্য
( কাঞ্চনের প্রবেশ।)
কাঞ্চন। বাবা, পূজায় বসবে চল ! আমি অনেকক্ষণ পূজার আয়ো-
অন ক'রে এসেছি।
মদন। পূজা ! পূনা আমি কোরবাে না। আমি হৃতসর্বস্ব মন্ত্রহীন
পুরােহিত।
এমন কো কেন বাবা ?
মদন। অমন কচি কেন ? কাঞ্চন, কাঞ্চন! আমি কি অমূল্য
সুত্ব করিয়েছি তা তুই জানিস না। আমার বুকের পাঁজরা খসে গেছে
নয়নের আলো নিভে গেছে, বড় জালা-বড় জালা-লাঞ্ছনায় তীব্র কষাঘাতে
জীবন্মত হয়ে আছি।
কাঞ্চন। সব শুনেছি বাবা! সে তােমার লাঞ্ছনা নয়--গৌরব।
তােমার দেশের, স্বজাতির এক ক্ষুদ্র বালক, তোমার মুখ চেয়ে তােমার আসনের
নিকট দাড়িয়েছে। পরের কাছে যায়নি সে। তাকে অভয় দাও বাবা!
প্রত্যাখ্যানই জাতির উচ্ছেদ, জাতির ভিত্তি গঠন করে~-গুণীর সম্মান।
মদন। অল্পমতি তুই। কেমন করে জানবি মা! ও বালক ক্ষুদ্র
হ'লেও দাম্ভিকতায় রুদ্রের তেজ ধারণ ক’তে চায়।
কাঞ্চন। আমাদের
আমাদের যে রত্নপ্রসবিনী ভারত বাবা! তিনি নিত্য
নুতন রত্ন প্রসব ক'চেন। তাঁর অফুরন্ত অনন্ত ভাণ্ডার বিশ্বোজ্জলকারি রঙ্গে
শােভিত না হলে এই পুণ্য তুমি ম্যাদা কি এতদিন থাকতাে ? প্রত্যেক
রত্নই আকাঙ্খার বস্তু-সমান আয়ের-পাঁচ ফুল না হলে কি সাজি সাজানাে
যায় বাবা?
মান। তােৰ সঙ্গে মিছে তর্ক কৰা। এতে বলা ৰা বই

মাধবাচাৰ্য্য
[ প্রথম গৰু
*
কমছে না। হাজার যুক্তির প্রলেপ দিলেও কিছুমাত্র উপশম হবে না। উঃ,
কি অসহনীয় ঔদ্ধত্য, কি ধৃষ্টতা !
কাঞ্চন। যদি ধৃষ্টতাই হয়-সে মহলের তরে। তার জ্ঞান-গ
চুর্ণ করবার জন্য-আবার তুমি নবশক্তিতে মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারবে।
আর তােমাদের প্রতিদ্বন্দিতার ক্ষেত্রে গভীর গবেষণায় – ভারতের যে লুপ্তরঙ্গ
আবিস্কার হবে, তা দিয়ে বিশ্বের শিক্ষা দীক্ষার এক মহা আধার সংগঠন
করবে। চোখে আঙ্গুল না দিলে কি চোখ ফোটে বাবা! তােমার চোখ
ফোটাবার জন্য, ভগবান দেখবার মত, শেখবার মত জগতের যাবতীয়
আদর্শ বালকের মধ্যে নিহিত করে শক্তির উপর মহাশক্তির লীলা দেখাচ্চেন।
জেনে বাবা ! প্রতিহিংসাই-পতন, প্রীতিপূর্ণ অন্তরের আলিঙ্গন--মনিষিশক্তির
বিকাশ।
[ প্রস্থান।
মদন। কন্যা আমায় তর্কে হারালে। এতদিন মাকে আমার যে
শিক্ষা দিয়াছিলাম-আজ সে এম আমার সার্থক হ'ল! কিন্তু, কি করি,
কিছুতেই দুর্দমনীয় প্রতিহিংসানল নিভছেনা, উত্তােরত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই
হােক ! হয় ও অনলে আমি ভস্মীভূত হব, নয়-মাধবের অস্তিত্ব ধরার বক্ষ
হতে মুছে যাবে।
[ বেগে এস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য।
মাধবের বাটী চত্বর।
উপবিষ্ট মাধৰ।
মাধব। কোথা হয়ি ব্যাথাহারি দীন দয়াময়,
দেখা দিয়ে লুকালে কোথায়!

তৃতীয় দৃশ্য।
মাধবাচার্য্য
ক
প্রাণ যায় তব আদলে
অভাজনে কেন হে কাদাও!
প্রাণসখা দাও দেখা বাচাও আমায়।
তােমায় ডাকিতে জানিনা,
তব আরাধনা সফল হ'ল না,
তেঁই কি হে এলে চলে গেলে
ভুলাইলে ছলে।
বল, বল, আঁখি তৃপ্ত কর,
বল, বল, আয়াধ্য আমার!
কেমনে তােমারে পাবাে !
হৃদিমাঝে ধরিয়া রাখিব,
সঙ্গ ছাড়া হইবনা কভু।
( আনন্দময়ীর প্রবেশ।
মানন্দ।
মাধব, মাধব!
শাস্তু আলাপনে--যােগ ধ্যানে
সারাদিন করিলি ক্ষেপণ,
দিন গেল-সায়া আসিল
এখনও কি হয় নাই তাের নিত্যকর্ম সারা ?
পাগলের পারা ক্ষুধা তৃষ্ণা ভুলি
আর কতক্ষণ রহিবি বসিয়া
মাথৰ। দিন গেল সায়া আসিল ;
বল, বল, আবার বলাে গাে জননী।
ও বিবেক বাণী-

নাৰাচাৰ
{ প্রথম স
হৃদয়ের প্রতি শুয়ে স্বরে উঠুক ঝঙ্কারী।
বল মাতঃ! মাথাের কেমনে রাশি,
কেমনে হইৰে দীনের উপায় ?
আমি নিরুপায় -
সহরির পায় কেমনে পাইৰ স্থান
আম। (স্বগত) কহে সবে বালকের উম্মাদ লক্ষণ।
এযে হেরি পূর্ণ ব্রহ্মজ্ঞান।
এহেন উন্মাদ বাঞ্ছিত নয় !
কোটা জন্ম তপস্যায় -- তবে হয়
এ ভাব সমাধী।
( প্রকা)
ধৈর্য্য ধন্স বাপ।
আচরে পভিবি তুই বাছিত রতনে।
তঙ্কের রােদনে
ভগবান, কতদিন বৃবেন নীরবে ?
কৰি আশীর্বাদ
বিশ্বপতি নাথ হয়ি,
বিষাদ ঘুচাক তাের।
শাধন।
{ মাতাকে প্রণাম পর্ব)
দাও মাগা দাও পদধুলি।
জননীর পদ-রজ-সম
কোন্ বন্ধু আছে স্ত্রিভুবনে!
ৰে বজের গুণে সিংহাসনে

তৃতীয় দৃশ্য ।
মাধবাচার্য্য
বসে নর ঈশ্বরত্ব লাভ।
আছে যাহে বিদ্যমান
তীর্থ শত শত-পবিত্র মহান,
ভগবান যারে ধৰিলেন শিরে।
এ সংসারে সারাৎসার-যম ভঞ্জন
একমাত্র মুক্তির সােপান,
অমিয় সমান
ঐ ধুলিকণা পানে,
মানবের অন্তঃদৃষ্টি হয় উন্মীলিত।
চতুর্থ আশ্রমসার-সন্ন্যাস গ্রহণে
কবে মােরে দেবে অনুমতি ?
অনিদ
সন্ন্যাসের কঠোর নিয়ম
অবােধ বালক তুই-কেমনে পালিবি?
নহে তার প্রকৃষ্ট সময় ইহা।
ওরে স্নেহের পুত্তলী মাের!
রহ এবে কিছুদিন-মাতৃ-বক্ষ ভরি,
দেখিতে দেখিতে তােরে-আনন্দের নীরে
করি অভিষিক্ত অওর আমার।
মাধব
মা গো! সন্ন্যাসের পাত্রপাত্র কালাকাল কিবা ?
ক্ষণভঙ্গুর মনুষ্য জীবন,
নাহি বয় -- সময়ের প্রতিক্ষায়।

১.
মাধবাচাধ্য
( প্রথম আৰু
দিন বহে যায় ;
গেই ডােরে আর মেয়ে--
রাখিওনা ধ'রে।
আনন্দ। সংযমের কঠোরতা - আত্মােৎসর্গ ত্যাগ,
সাধক চরমভূমি সংসার শিক্ষাগারে।
যয়ে দেরে
জননীর পাশে-~-পরীক্ষা তাহার,
তৎপরে সপিব তােরে দেশমাতৃকাছে।
মাধৰ। ইচ্ছা তব করিব পূরণ !
ত্যাগের মূরতি তব ধরিয়া সম্মুখে,
হব আমি পরীক্ষায় জয়ী।
আনন্দ। { মাধবকে চুম্বন পূর্বক-হস্ত ধরিয়া)
আয় বাবা!
{ মাধবের হন্ত ধরিয়া এস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য।
উজানের শেষ।
{ কাঞ্চন হস্তচিত ফুলের মালা সনাতনের গলায় পরাইতেছিল।
কাঞ্চন। ধর প্রভু ! পুপগুচ্ছ হার !
সনাতন। কাঞ্চন।
কাঞ্চন ! একি কহ!
পুষ্প নহে ভােগ্য মানবের,
কিংবা ছার বিলাসের হেতু

মাধবাচার্য হয় নাই পুষ্পের সৃজন। দেবাঞ্জন বিনা- অপচয় যে করে উহার- তার সম কেবা জ্ঞানহীন। জানােনা কি নারী! যাবতীয় সৌন্দৰ্য্য মাখায়ে, ত্রিদিবের কোমলতা দিয়ে কোন একাগ্রতা সাধনা, সুনিপুণ শিল্প-সুবিমল তুলিকায় নির্জনে গঠিল ফুল-পাতিত করি। কাঞ্চন। জানি প্রভু। ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ দান পুস্প, চিরনির্বিকার-দ্রব্য মাঝে সার। যাহায় আশ্রয় করি-ক্ষুদ্র পতঙ্গম স্থান পায় দেবতার পায়। পুষ্পের আশ্রয় হেঁই করেছি গ্রহণ, হে দেবতা ! আচরণ কামনা আমার। পান। কান! শ্রম ও ত্র সংশােধন। নারীর জীবন এত হীন এত তুচ্ছ নয়, স্বেচ্ছায় সে লুটাইবে পথের ধুলায়। কুম কলিক। তুমিলা বালিকা,

মাধবাচার্থ।
{ প্রথম অঙ্ক
সরল অন্তর করুণার প্রবণ,
নন্দনের পারিজা দেবতাবাঞ্ছিত তুমি !
কাঞ্চন। দেবতা জানিনা সখা।
নর নহে দেব হ'তে হীন।
ভক্তিযােগ জ্ঞানমার্গে ভ্ৰমি
দয়া ধৰ্ম্মে মহত্বে ও দানে,
আত্মােৎসর্গে--. পুণ্য সাধনায়
নর হতে হয় দেবের সৃজ।
বেত প্রধান তুমি ।
জীবন যৌবন মম আঙ্গি তব করে।
সনাতন। কে বা কার পতি!
একমাত্র সীতাপতি জগতের গতি।
তারে পতি ভাবে করহ জন্য,
মন প্রাণ সমর্পণ হারে করনা,
করুণা তঁাহর পাবে
ধন্য হবে জীবন যৌবন।
কাঞ্চন। অন্য কিছু না চাহি জানিতে
না চাহি বুঝিতে বেদ বিধি ;
গুণনিধি !
মুক্তির আধার কর্ণধার তুমি মাের।
সনাতন। নরনারী বিশে সম অধিকারী।
এক উদ্দেশ্য লয়ে এক উপাদানে

চতুর্থ দৃশ্য ]
মাধবাচার্য
===
গঠেছেন ধাতা উভয়েরে।
জন্মান্তরে-
হয়তো বা তুমি হবে নর—আমি হব নারী।
কেন তবে কেনলো সুন্দরী
তুলিবারে চাহ মাের স্বামীত্তের উচ্চস্তরে ?
কে তুমি-~~ আপনা পাসরি কেন--
মন প্রাণ দিবে ডালি জড়ের সেবায় ?
"কাঞ্চন। বৃপা তব কযুক্তি প্রভু !
পতি হ'তে কেবা শ্রেষ্ঠ গুরু ?
সতানারী নহে প্রেমের ভিখারী-
স্বর্গ নাহি চায় ।
দীনতায় সেবাব্রত সাধনায়,
উদ্দেশ্য তাহার মাত্র -
বিকাশিতে মাতৃশক্তি।
ধরিয়া সম্মুখে তব সুবিমল ছবি
ধ্রুবতারা রূপে তােমারে করিয়া লক্ষ্য,
দিব আমি আত্মদান বিশ্বের সেবা।
সনাতন। কাঞ্চন, ভালবাসি আমিও তােমায়।
এমন ভাল কেহ বাসেনা করে,
হেরেন। কারেও কেহ এমন সুন্দর।
দেব কণ্ঠস্বর তব,
নীলাভ নয়নে ঐ বিদুৎপ্রবাহ,
চাননে ময়ুশি হাসি,

মাধৰাচাৰ্য্য
[ প্রথম এক
কি সৱল -কি উদার পবিত্রতাম।
হয়েছি ওম্মম,
স্নেহময়ী ভগিনীর সম
দেবীমুক্তি হেরি অব।
আজাব প্রণােদিত করি
রক্ষা কর মর্যাদা ইহার।
কাফন। যে ভাবে বিভাের আমি
যে বন্যায় চলেছি তাসিয়া,
নহে তাহা ভিন্ন পথে ফিরিবার।
এই মাত্র কােনো নাথ।
কামনা জামার দেবপূজা কামায নহে।
স্বার্থ বিজড়িত কদৰ্য জীবন,
কাঞ্চন, এপদে তােমায়
করে নাই সমর্পণ।
( প্রাম।
সনাতন। আশ্চৰ্য্য বালিকা!
যেন এক প্রহেলিকা লয়ে
ক্ষণে ক্ষণে করে খেলা,
মর্ম তার বুঝিরে নারি।
h

মাধৰাচার্য পঞ্চম দৃশ্য। রসভা। . (মহারাজ পুলাদিত্য, কবিতাকুমার, সাসগণ উপবিষ্ট- সম্মুখে মৃত্যগীত চলিতেছিল। (গীত। নকগণ। চুরি ক'রে মােদের হাসি গগনে হাসে চাদ। (মােয়া হাসির ধারায় ডুবায়ে দিই ধরণীর অবসাদ হাসির গানে প্রেমিক প্রাণে বাজাইগে। বাণী, হাসির মাঝে রায়ে যাই হাসি ভালবাসি, মােরা হাসিতে গঠিত হাসিতে পূর্ণিত- হাসিতেই শুধু সাধ। [ গীতান্তে নৰ্তকীগণের প্রস্থান। মুম্পা। কেবল স্তব অতি আর বন্দনা। যেন সৰ একটানা স্রোতে ভেসে চলেছে,আর তার মধ্যে নিমজ্জিত ক'ছে আমার বিবেক বুকি-আমার অস্তিত্ব। কবিতা। মহারাজ, এত বড় রাজসভায় নাচওয়ালী না হলে জমকাবে কেন! বিশেষ অঙ্গহানী থেকে যাবে। মহৰি জনকের সভাতেও খেমটার বন্দোবস্ত ছিল ; ঋতিগানে দোষ বিবেচনা করবেন না। পুপা। এই হৃদয় নিয়ে রাজ কর্মচারী আপনার রাজ্যের সহায়ক, রাজ্যের ভিত্তি দৃঢ় করবেন। (বােরিকের প্রতি। দৌবারিক ! যাও সেই পাপিষ্ঠ ব্রাহ্মণকে নিয়ে এল। | যৌবাহিকের প্রস্থান।

মাধবাচার্য্য
[ পঞ্চম দৃশ্য
কবি। হুজুর! যাই বলেন আর যাই ক’ন। এই কলিকালে
অন্নদাতা পিতা দেবতার চেয়েও বড়। বিশেষ আপনার মত গুণীর সম্মান
না করে কে মহাপাপ অর্জন করবে ?
{ দ্বেবারিক পাতঞ্জল নামক ব্রাহ্মণকে লইয়া আসিল।
পুষ্পা। ব্রাহ্মণ ! তােমার অপরাধ জানাে ?
পাতঞ্জল। রাজ ! গায়তঃ আমার কোন অপরাধ নাই।
পুষ্পা। গুরুতর অপরাধ ! “ছারপােকার সমষ্টি হত্যা ক'রে
তুমি অহিংস ধৰ্ম্মের অবমাননা-করেছ। তার উপর বৈদিক যজ্ঞে
পশুবলি দিতেও তুমি কুষ্ঠিত হওনি।
কবি। কি সর্বনাশ, করেছ কি ? হত্যা বলে হত্যা একেবারে
ছারপােকা! যাকে তৈলকারগণ লক্ষ্মীর বাহন ধনপােকা বলে সমাদয়ে
শয্যায় স্থান দিয়েছেন, যার ভিন্ন মূরতি উকুন জ্ঞানে মস্তকে ধারণ ক'রে
বহ হরেচেন - তাদের বংশ লােপ !
এই শাস্ত্রে আছে,
-
ছারপােকে ধনরূপেণ তৈলকার প্রপুজ্যতে।
লক্ষ্মী স্বরূপিনী দেবী কৃপণহৃদয়। সংস্থিতে।
পাত। একটা পতঙ্গের বিনাশে যদি মহাপাপ বিবেচিত হয়,
জানবেন --জগতে এমন পাপ প্রতি মুহুর্তেই সম্পাদিত হচ্ছে। সলীলে,
বালুকণা মধ্যে কত শত সুক্ষতম জীব, দৃষ্টির অগােচরে, জীবের হস্তেই
প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছে। তার কোন প্রতিকার ক'ৰ্তে পেরেছেন কি ?
কবি। দেহের দূষিত রক্ত পান করে নিরাময় করবার জন্যই
মশক আর ছারপােকার সৃজন। ভগবান বুদ্ধ এই যে ঈগলপক্ষীর

পঞ্চম দৃশ্য !
মাধবাচার্য।
আক্রমণে শরীরের সমস্ত মাংস দান করেছিলেন, তিনি কি জীবহিংসা
করেছিলেন। বুদ্ধ হে, আলােক দেখাও -- আলােক দেখাও !
পুষ্পা। স্বেচ্ছাচারী ব্রাহ্মণ, সামান্য পতঙ্গের প্রতিশোধ নিয়েছে।
কিন্তু অনাৰ্যাধৰ্ম্মের রাক্ষসমৃত্তি, হিন্দুর কুসংস্কার—শুধু তােমাদের বুকের
র ফু নয়-পাঁজরা পর্যন্ত চিবিয়ে খাচ্চে - তার বেলায় ত নীরব রয়েছ।
তােমাদের উন্নত শির সেই কঠোর কুলিশ তলে আজ চিরনত—বিলুষ্ঠিত ---
পথের আবর্জনা হ'তে ও হেয়।
কবি ।
মহারাজ ! শক্তের ভক্ত সকলেই। আমি হেন কবিতার
দোকানদার, আমাকে ও “ ফেলার মাঙ্গের ড্যাবরা চোখ দেখে সময়
সময় অসামাণ হয়ে পড়তে হয়।
পাত। রাজ! দুলের উপর অত্যাচারের পরাকাষ্ঠা আপনিই
ভাল দেখাচ্চেন--অন্যের প্রতি দোষারােপ করবেন না। আপনার মত
দস্যু দ্বিতীয় নাই ; পাপহারক, স্বেচ্ছাচারী, পাষণ্ড আপনি, প্রকাশ্যেই
ধ্বংসনীতির অভিনয় কচেন। রক্ষক হয়ে ভক্ষক আপনি, সিংহাসনে
ব'সে নরকের পথে নেমে যাচ্ছেন।
পুষ্পা। স্পর্ধা! আমি তােমার প্রাণদণ্ডাজ্ঞা দিলাম।
পাত। আমি প্রস্তুত আছি।
পুষ্পা। { দৌবারিকের প্রতি। যাও, নিয়ে যাও।
[ বাণভট্টমের প্রবেশ । ]
বাণ। ক্ষান্ত হও রাজা! হত্যার পরিবর্তে হত্যা এই কি ভিক্ষুর

মাধবাচার্য্য
[ প্রথম অঙ্ক
ধৰ্ম্মনীতি? অহিংসাধৰ্ম্মের আদর্শস্থাপন হিংসার জ্বলন্ত নিদর্শন প্রদর্শন,
কন্টকতরু উৎপাটনে, বিশ্বে বিষের ফল ছড়ানাে, এই কি উচিত
বিধান ?
পুষ্পা।
দেব! পাষণ্ডের অপরাধ জানেন কি ?
বাণ। সব জানি। অপরাধ গুরুতর হ'লেও, তােমার কঠোর।
সমস্ত সীমাকে অতিক্রম করে গেছে।
পুষ্প। প্রভাে! চণ্ডনীতির আশ্রয় গ্রহণ না ক'লে, কোমলতায়
হত্যার ক্রীড়া বাড়বে ; অহিংসা ধৰ্ম্মের মর্যাদা নষ্ট হবে।
বাণ। এ নিষ্কলঙ্ক বৌদ্ধধৰ্ম্ম কলুষিত হবার নয়।
হপ্রেমে গঠিত—দীনতার অনন্ত -- মহিমায় মহিমান্বিত। এখন ঐ
ব্রাহ্মণের এক মাত্র শান্তি, ভগবান বৌদ্ধের পবিত্র নামে – এর অন্তরাত্মার
অভিষেক করা।
পুষ্প। আপনার আজ্ঞা শিরােধার্য। ব্রাহ্মণ ! গর্বের নিদর্শন
উপবীত ত্যাগ কর। ভাগ্যবান তুমি, আজ বৌদ্ধ মন্ত্রে দীক্ষিত হবে !
দ্বেবারিক ! এর মস্তক মুণ্ডিত করে, ঐ মাথার উপর স্থাপন করবৌদ্ধ
ভিক্ষুকর্মচারীগণের পবিত্ৰ চৰ্ম্ম পাদুকা।
বাণ। ভক্তপদাঙ্কিত পাদুকার ধুলিকণা স্পর্শে তােমার সমস্ত দ্বিধা
সঙ্কোচ দূরীভূত হােক।
পাত। আমি মৃত্যু চাই - স্বধর্ম পরিত্যাগ কোরবাে না।
পুষ্পা। আজ আমার, কার্যে পরিণত করবল প্রয়ােগে কুষ্টিত

পঞ্চম দৃশ্য । মাধবাচাৰ্য্য (সকলে বলপ্রকাশ পূর্বক রাজাজ্ঞা পালন করিতে লাগিল।) পাত। হে ব্ৰহ্মণ্য দেব ! তুমি কি নেই। তােমার সে অমিততেজ -সেই বিশ্ববিজয়িনী শক্তি আজ কোথায়! যার কটাক্ষে বজ্রের ধ্বংস- লীলা ছুটে বেড়াতো—যার একটী কথায় বিধাতার অখণ্ডনীয় বিধি ওলােট পালােট হয়ে যেতাে-তার কি এই পরিণতি! পুষ্পা। দ্বিগুণ ভাবে আক্রমণ কর - এখনও কাৰ্য্য সমাধা হ’ল না? এখনও সাবধান রাজা! ঐ দেখুন, আপনার অহঙ্কার চূর্ণ- করে ব্রহ্মণ্যধৰ্ম্ম পুনঃ স্থাপনের জন্য, ঈশ্বরের এক অপ্রতিহত শক্তিরূপে বৈদিক ব্রাহ্মণ - মাধব, বিদ্যুদগতিতে অগ্রসর হচ্ছে, যার অমিত তেজোপাশি সব ভস্মীভূত করবে- সব ভস্মীভূত করবে। (রাজা স্বয়ং পাদুকা খুলিয়া পাতঞ্জলের মাথায় স্থাপন করিতে উদ্যত হইল) পুষ্পা। আমি অনেক শক্তি দেখেছি-নরাধম ! পাত। ওহো ব্রাহ্মণের রক্ষার কি কেহই নাই ? { সহসা সশস্ত্র যক্ষশীলার প্রবেশ। আমি আছি ব্রাহ্মণ ! দূরহ' পাষগুগণ ! ( ব্রাহ্মণকে মুক্ত করিল।) এস ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণ পদরজের চিরকাঙ্গাল আমি--ব্রাহ্মণের সেবা বিক্রীত দাসানুদাস আমি,- ব্রাহ্মণের কন্মে নিয়ােজিত আত্মা আমার বন্ধ কর! এস ব্রাহ্মণ ! তােমার যা কিছু মনস্তাপ-মৰ্ম্মবেদনা, আমায় বুকের মধ্যে গেঁথে দাও। জাহ্নবীর ধারার ন্যায় তােমার পূত নয় মাধৰাচাৰ্য { প্রথম অঙ্ক সলিলে- হৃদয়ের তন্ত্রী প্রতিশােধের প্লাবনে জাগ্রত করুক। (নতজানু হইয়া) ক্ষমা করবেন পিতা ! যক্ষশীলা ব্রাহ্মণকে লইয়া প্রস্থান করিল, সকলে স্তম্ভিত হইয়া বসিয়া রহিল।} ষষ্ঠ দৃশ্য। মদনমােহন শাস্ত্রীয় পূজাগৃহ। { গােপীনাথ বিগ্রহের সম্মুখে পূজাসনে মাধব নিবিষ্টচিত্তে বসিয়াছিল সম্মুখে ভােগরাগদি সজ্জিত রহিয়াছে। ; মাধব। তবু জাগ্রত হলে না। এখনও জড় পাষাণ হয়ে দাড়িয়ে রইলে; দয়াময়! তুমিত’ পাষাণে গড়া নয়। হে চিরসুন্দর -করুণার আধার, বিশ্বমনােহর তুমি, গুণের তােমার তুলনা নাই, স্নেহের সীমানা নাই, অপার মহিমার আদি অন্ত নাই। কই প্রভু, তােমার সেই সচেতন মূর্তি কোথায় ? জানিনা কিসের তাড়নায়, কোন দুর্দৈব ঘটনায় লজ্জায় ঘৃণায় তুমি ভারত ছেড়ে চলে গেছে। ভারতের প্রত্যেক মফিরে পুতুলের পূজা হচ্চে। তােমাগত প্রাণ, তােমার পূজারীগণ-আজ অশ্রুজলে বুক ভাসিয়ে~~~ নির্যাতনের কসাঘাতে পিশাচের সেবা কচ্চে। আবার তােমায় জাগতে হবে। তােমার জাগরণে ভারতের প্রাণে সাড়া এনে দিক। জগত পুক-ভারত পুতুলের পূজা করেন। তাদের পূজা সঞ্চল--সাধনা সার্থক আবাহন শক্তিময়ী। এখন এস ঠাকুর - দীনের দেওয়া এই শাকা নিজের হাতে তুলে নাও, না হয় তােমার পূজায় আজ জীবনাহুতি

মাধবাচার্য।
২১
। তন্ময় জ্ঞানশূ» হইয়া গেল - }
গােপীনাথ বিগ্রহ সচেতন হইয়া )
সাধতব করিব পূরণ।
ভক্তাধীন আমি,
ভক্ত দিলে খাই --
নহে রাহ গুনাহারে।
বহুদিন পরে --
ওরে ভক্তাচুড়ামণি !
আজি তৃপ্ত হব, তব মুখে করিয়া আয়।
( মাধবের মুখে আহার করিয়া অন্তর্হিত হইলেন।)
মাধব। ( চকিতে) এই যে, এই যে, তুমি এসেছ! সৌগন্ধে
গৃহ আমােদিত হয়েছে। পরাণ গলানাে নুপুরধ্বনি প্রাণের মধ্যে বেজে
উঠেছে। প্রাণাধার! দাসের প্রতি তোমার এত করুণা ! বল, বল,
তােমার কি দিয়ে পূজিব, কি দিয়ে তুষিব। দীন হীন আমি, কি আছে
( প্রণাম করিলেন )
এস, এস, কে কোথায় আছ শােকতাপে তাপিত অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত
মহাপ্রসাদ ভক্ষণ করবে এস। আজ ভগবান~~-ভক্তের দান
স্বহস্তে গ্রহণ করেচেন।
নঃ !
(কাঞ্চনের প্রবেশ।
কাঞ্চন। মাধবা, মাধবী, ক্ষাগুহও ! ঐ ভােগের সঙ্গে বিষ

२१
মাধবাচার্য্য
[ প্রথম অঙ্ক
মিশ্রিত আছে। ঐ অন্ন ভক্ষণ করে--পিতৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমিই
কোরবো।
মাধব।
সে বিষ - সুধায় পরিণত হয়েছে--এস ভগ্নি! অমৃতের
আস্বাদ গ্রহণ কর।
( উভয়ে মহাপ্রসাদ ভক্ষণ করিল )
কাঞ্চন। আমি আশ্চর্য হচ্ছি-বিষের যে অমৃতের অপেক্ষাও
আস্বাদ!
মাধব। এ বিষ যে ব্রাহ্মণের দেওয়া—তাই আজ ব্ৰহ্মাণ্যদেব
সুধা ব'লে খেয়েছেন। এমন “বিষ" আমার চির-আকাঙ্ক্ষিত। দেবাদি-
দেব নীলকণ্ঠ! সুধা পরিত্যাগ করে-বিষ পানে অমরত্ব পেয়েছেন।
আজ আমিও নব জীবন পেলুম। কাঞ্চন ! তােমার পিতার ঋণ জীবনে
শােধ ক'তে পারবো না।
কাঞ্চন। কে তুমি ভাই, দেবহৃদয় নিয়ে এসেছ! কি প্রগাঢ়
প্রেম তােমার অন্তরে- কি দৃঢ়তা তােমার বাক্যে-কি গভীরতা তােমার
বিশ্বাসে।
চল ভাই! পিতাকে এ আনন্দের অধিকারী করিগে।
। উভয়ের প্রস্থান- অন্য দিক দিয়া মদনমােহনের প্রবেশ।
( অন্নপাত্র অর্থ নিঃশেষ দেখিয়া )
মদন। কি আশ্চৰ্য্য, বিষ খেয়েও মােলনা! কাঞ্চনের সঙ্গে
দিব্যি হাসতে হাসতে চলে গেলাে। তবে কি-বিষ মিশ্রণে আমার ভুল
হয়েছিল বিষের পরিবর্তে অন্য কিছু ক্রয় করেছি ! তাহৰে কেন,

মাধবাচার্য
আমি নিজে উত্তমরূপে বিষের ক্রিয়া পরীক্ষা করে, স্বহস্তে ঐ উৎসগিত
অন্নে মিশিয়ে দিয়েছি - এই কালকুটের স্পর্শনে, আঘ্রাণে, মৃত্যু অনিবাধ্য।
তবে একি হল!
কোন্ যাদুমন্ত্র বলে, সব পণ্ড হয়ে গেল ! বেটাকে
প্রসাদ ভক্ষণের জন্য --নিমন্ত্রণ করে ডেকে এনে যমালয়ে পাঠাতে পাল্লম
না! যাই হােক পুনঃ পরীক্ষা করে দেখি।
( বস্ত্রমধ্য হইতে বিষের শিশি বাহির করিয়া পানান্তে )
উঃ, বুক গেলো, বুক গেলো; সৰ্ব্ব শরীর জ্বলে যাচ্ছে-সব
অন্ধকার, সব অন্ধকার, আমি কি করুম, আমি কি কম?
( বিষ পাত্র নিক্ষেপ ও
মৃত প্রায় হইয়া পতিত )
| কাঞ্চন ও মাধবের পুনঃ প্রবেশ।]
কাঞ্চন। বাবা, বাবা ! ( পিতার সম্মুখে বসিল) মাধব, ভাই!
দেখছো কি ; বাবা আমার বিষ পান করেছেন। এই যে বিষপাত্র পতিত।
মাধব। ভয় নেই দিদি ! পিতা তােমার জীবিত। বিষ্ণু মন্দিরে
মৃত্যুর অধিকার নেই।
ঐ দেখ গােপীনাথজী জাগ্রত ! নয়নে কি প্রসন্ন
—বদনে অভয় হা। নাও, নাও, ঐ মহাপ্রসাদ তােমার পিতার
বদনে দাও।
কাঞ্চন। (মহাপ্রসাদ লইয়া) দেহ হিম অসাড়, খাস প্রশ্বাস বন্ধ
হয়ে গেছে। ভক্ষণ করবার ক্ষমতা নাই
নাম। তবে মণ্ডকে ধারণ করাও।

মাধবাচার্য্য
[ প্রথম অঙ্ক
( কাঞ্চনের তদ্রুপ কর --মদনমােহন পূর্বাবস্থা প্রাপ্ত হইল।
কাঞ্চন। বাবা, বাবা ।
মদন। (স্তম্ভিতভাবে ) এ স্বপ্ন, না সত্য ! কাঞ্চন, কি যেন একটা
ওলােট পালােট হয়ে গেল না!
কাঞ্চন। বাবা, মাধবদাকে সামান্য তেলােনা।
মদন। বাবা, মাধব ! মার্জনা কর বাবা!
আজ জানলু-
ভগবানের চেয়ে উক্ত বড়।
মাধব। শুধু তাই নয়-ভগবানের হ'তেও ব্রাহ্মণ বড় - ব্রাহ্মণ
হ'তেই তার মহিমা বিকাশ।
( মদনমোহনকে প্রণাম )
মদন।
আয় বাবা !
আমার বক্ষে আয়।
মাধবকে বক্ষে জড়াইয়া ধরিল
[ পটক্ষেপণ।]

দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য ।
উদ্যান লতাকুঞ্জস্থ পথ।
5া ও সখীগণ।
কমলিনী কেন বিষাদিনী
এমন উজ্জ্বল প্রভাতে।
বল বল সই কি বেদনা প্রাণে
আছ কি মরম দুঃখেতে
আর সুকালে ঢলে কি হাসিটা-
তব হৃদি নিকুঞ্জ করিছে দীপ্ত
রবির চুম্বন যেখাটি,
ঐ শােন সই অলির গুঞ্জন,
ভাসিছে তাদের আকুল ক্রন্দন
নিশির নীহার প্রপাতে
[ সখীগণের প্রস্থান।
( মহারাজ পুপাদিত্যের প্রবেশ।
এস নাথ !
প্রাণময় মনোমঃ হৃদয় দেবতা,
অধিনায় চিত্ত-বিনােদন ।

মাধবাচাৰ্য
| দ্বিতীয় অঙ্ক
এক
--
পুষ্প। আদরি, সােহাগিনী
জীবনের ধ্রুবতারা মাের,
তুমিই বিষন্ন প্রাণে শাস্তির নিঝর।
হেরি তব সরা বয়ান
হয় অবসান জলন্ত পার্থিব দুঃখ।
চা। সখা, এত ভালবাসি !
দীনা--গুণীনা দাসী,
শুধু স্তব কৃপাবলে
চরণতলে লভিয়াছে স্থান।
( নতজানু হইলেন।
পুষ্প। উঠ, উঠ ! প্রাণেশ্বরি।
বসন্তের কনকলতিকা,
স্থান তব হৃদি-সিংহাসনে।
( হস্ত ধরিয়া তুলিলেন)
বল, বল চাননে।
কেন হেরি বিরস বদন ?
চা। কেমনে জানাৰ নাথ ! কি বেদনা প্রাণে,
অহরহ মর্ম দহে কিসে !
(বস্ত্রাঞ্চলে চক্ষু মুছিলেন)
পুপা। কি অভাব রাণী ।
রমনীর যা কিছু প্রার্থনা,
জীবনের আকিঞ্চন,
সেই অমূল্য রতন অসীম অতল প্রেম ;
৫

প্রথম পৃষ্ণ } মাধবাচার্য। মৰ্ম্মস্পশী ভালবাসা - তব করে অকাতরে করেছি প্রদান; প্রতিদান নাহি চাহি তার। কিঙ্কর যেমতি-- রাজা আমি ভিখারীর সম, তুষিতে পরাণ তব আছি প্রতীক্ষায়। সতার ইহা হ'তে কিবা কাম্য বস্তু আছে ? চক্র। প্রাণেশ্বর! গৃহত্যাগী পুত্র মাের, সন্ধানে তাহার ; এখনও নিশ্চেষ্ট আছ- পিতা তুমি ভুলিয়াছ পুত্রের মমতা। মাতা আমি উৎকণ্ঠায় সদ। রহিয়াছি অশান্ত পাবে। পুষ্পা। পুত্ররূপে শত্ৰু সেই-নহে তব গর্ভজাত। তার লাগি কি হেতু চিস্তিও রাণী ? বাঞ্ছনীয় মৃত্যু তার। চা। স্নেহ পারাবার রমণীর প্রাণ মাতৃত্বে গঠি। নহে গর্ভজাত সে আমার কিন্তু আমি তার মা, পূণিত এ শূন্য প্রাণ মাতৃ-সম্বােধনে। ত্রিভুবনে আছে কোন্ নারী মা বলিলে নাহি গলে অন্তর যাহার সুধার সমুদ্র মথি মাতৃনাম মৃত সঞ্জীবনী, মৃধৰাচার্য [ দ্বিতীয় জয় করুণায় ভরা মধুয়ে পৃণিত- শুদ্ধ মন্ত্র সরল সজীব, তুলিলেন ধাত- অনন্ত এক সাধনার পথে। শােন প্রিরে!' অভিশাপরূপী পুত্র মাের, এসেছিল চলে গেল করিয়া গংপন ; পিতা বলি ফিরে না চাহিল। এবে সেই নরাধম সংক্রামক ব্যাধি যথা, গৃহে গৃহে বিস্তারিছে বিদ্রোহ অনল। চা। আদি যুগ হ'তে মহাপ্রাণ ঋষি প্রতিষ্ঠিত, নিষ্কলঙ্ক নিৰ্ম্মল ধৰ্ম্ম সনাতন, উচ্ছেদ সাধন ৰে কৰিছে তার, সম্রাট হইয়া হীনবীৰ্য, শক্তিহীন অহিংসা প্রচার হলে পরধর্ম গুজি, রাজদণ্ড দিতে চায় তুলি- হণ, শক, বিধর্মী যবনগণে, প্রাঙ্গণে চিরনিৰ্যাতনে- অহরহঃ দলিতেছে যেবা ;- কিম্বা দেশের অক্ষণে স্বধৰ্ম্ম দ্বপনে- যেজন করিয়া জীবন পণ ক্ষের শােণিত ঢালি মুছাইছে অশ্রু পীড়িতে, রাজা হয়ে দীন ব্রঙ করেছে গ্রহণ। .

প্রথম দৃশ্য। মাধবাচার্য। ২৯ হে রাজন! উভয়ের মাঝে কে বিদ্রোহী দেখ বিচারি। অধৰ্ম্ম আচারি নাথ। কতদিন করিবে যাপন ? চেতন যদ্যপি তব না হয় এখনও প্রজার ক্রন্দন যদি না পাও নিতে, তবে শােন প্রভু! রাণী আমি নিশ্চেষ্ট না বুষ আর ; সেই পথে যাব; পুত্র মাের গেছে যেই পথে। মাতা পুত্রে মিলি দেহে ফিরাইব জয় আবার। পুষ্পা। হিতাহিত বিবেচ্য আমার ! নারী তুমি কোমল পরাণ, সতত দুৰ্বলা, কি বুঝিবে কূট রাজনীতি ? চল সৰ্তী, প্রমােদ উদ্যানে। হের ঐ কমনীয় সন্ধ্যা সমাগত, হাসিতেছে পূর্ণচন্দ্র শারদ গগনে, মৃদু মন্দ বহে সমীরণ, পুষ্প গন্ধে দশদিশি হয় আমােদিত। হয় উচিত- বৃথা তর্কে যাপিতে সময়। [ চন্দ্রাকে আকর্ষণপূর্বক প্রস্থান।

মাধবাচার্য
{ দ্বিতীয় জয়
দ্বিতীয় দৃশ্য।
১
রাজপথ।
মেঘনাদ ও সাতকড়ি।
সাত। ওরে মেধা, কি করা যায় বল। উমেদারি ক'রে
আর পেট চলে না। এদিকে চাকরির বাজার কেমন জানিসত'।
মেধা। এখন উপায়?
সাত। নিরুপায়ের উপার ডেক নেওয়া। ফকিরি নয় আমারি ।
চল আমরা বুদ্ধের দলে মিশে যাই।
মেধা। তাহলে পেটের ভাবনা যাবে বটে। ঘর সংসার ছাতে
সাত। মঠে একবার নাম লেখাতে পাল্লেই, আমার নুহন সংসার
পাতিয়ে নেওয়া যাবে। ভিক্ষুণীদের আদর যত্ন, সেবা একবার পেলে-আর
কি ফিরতে পারবি ? একেবারে কামিক্ষের ভেড়া।
মেথা। ভেড়া কি রে ! বল কেষ্ট বিষ্ণু, যা হােক একটা। কিন্তু
মাছ মাংস না হলে আমার ভাত রােচে না, অহিংসধর্ম পালন কোর্ব কি
করে
সাত। আমারও তাই। একবার মেছে। হাটার গন্ধ নাকে
গেলেই বুঝলি-তা যাক্, লুকিয়ে লুকিয়ে “ডিম” এনে রাখা যাবে, তাই
দিয়ে গপাগপ-কেমন ?
মেথা। আহা, ডিমের কথা আর বলিসনে ভাই। গোসাইঙ্গায়
সেই গানটা মনে পড়ে গেল।

দ্বিতীয় দৃষ্ণ]
মাধবাচার্য।
৩১
( কীৰ্ত্তন)
জয় জয় জয় ডিম্ব, জয় জয় জয় ডিম্ব।
তুমি খাদ্যের সেরা অরুচির রুচি বিশ্বের প্রতিবিম্ব ।
তুমি শুভ্র তুষার বরণ,
মাথম নিশ্চিত কেশুভ গন্ধ
ভোজনে কন্টক শূন্য,
অপার মহিমা তােমার গাে
তুমি শক্তিদায়িনী সাকাররূপিণী
অতিথি পালিনী গো ;
তোমার গােসাই গণে ভাল জানে, { ভণ্ড গোঁসাই
( কুড়ালির মাঝে রাখে গাে গােপনে )
( উদর গােৱা নৈবে তুমি নিরামিষ বন্ধনে।
পাছে তুমি হও মহার্ঘ্য সকলেরি ভক্ষ্য অর্ঘ্য,
এই ভয়ে তারা তােমারে বর্জিত বিধান দিল তিনি ।
মেধা। চুপ, চুপ, ঐ বৌদ্ধ গুরু বাণভট্ট আসছে!
( বাণভটুমের প্রবেশ )
উভয়ে। নমস্কার, নমস্কার ! আজ কি শুভদিন, আপনার দর্শনে
আমরা পবিও হলাম।
বাণ। অপরাধী করবেন না। আমি ভগবান বুদ্ধদেবের দাসানুদাস
সেবকাধম। প্রভুই জগতের একমাত্র প্রণম্য, তাঁকে প্রণাম করে ধন্য হন।
মেঘ। আজ্ঞে, ভক্তও যা ভগবান তা। আপনার মধ্যেও
বুদ্ধদেবের অংশ আছে। আমাদের শিষ্যত্ব বরণ করুন।

মাখৰচাৰ্য্য
[ দ্বিতীয় জয়
বাণ। কে আপনারা ? তোষামােদের বাঙ্গ পতনের মুখে
ভাসাচ্চেন। আপনারা কি জানেন না, বৌদ্ধধর্মে গুরু শিষ্যে পার্থক্য
নাই, মহৎ ক্ষুদকের বিচার নাই, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ নাই। আপনাদের
যদি প্রকৃতই নিৰ্বাণত্ব লাভের অভিলাষ থাকে, তবে মঠে চলুন-ক্তিগণের
সহবাসে, কঠোর সংযমের দীক্ষা নেবেন।
সাত।
অধমদের প্রতি আপনার অপার করুণা !
বাণ। ভগবান বােধিসত্ব আপনাদের মঙ্গল করুন।
সাত। আমাদের কিছু নিবেদন করবার আছে। বালক মাধব
যে ভাবে বৈদিক ধর্মের ব্যাখ্যা করছে, তাতে বৌদ্ধধর্ম বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত
সে শিশু নয়-দৈবের বিরাট শক্ত। এ ধৰ্ম্ম টেকবে ?
বাণ। সে বালকের আশ্চৰ্য প্রতিভার পরিচয় পেয়েছি। কিন্তু
চিন্তার কারণ নাই। এই অহিংসা পরম ধর্ম --যাবার নয়।
হলাহলকেও অমুতে পরিণত করে। এ ধৰ্ম্ম নিঃস্বার্থের অনন্ত মহিমায়
বিশ্বজনীন প্রেমে দীপ্ত--পাতকীর পাপভার বহনের জন্ধ অভিষিক্ত।
চলুন, আশ্রমে চলুন।
সাত। চলুন, চলুন।
মেধা। রাজা যখন বৌদ্ধ ! তখন তার সমস্ত প্রজার কর্তব্য
বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করা। আমরা আগে থাকতেই এই মহৎধৰ্ম্মে আকৃষ্ট
হয়েছি। চলুন প্রভু!
{ সকলের প্রস্থান।

মাধবাচাৰ্য্য
তৃতীয় দৃশ্য।
( গভীর জলমধ্যে নিমজ্জমান মদনমােহনকে লইয়া মাধব নয়।
করিতেছিল। তীরে নাগরিকগণ সমালােচনায় নিত।)
১ম নাগ। গেল, গেল ! দুজনেই ডুবলো ।
২য় না। মরুগুগে-তাের আমার কি।
১ম নাগ। আহা-হা, দু দুটো প্ৰাৰ্থ বিদেরে প্রাণ দেবে ।
২য় নাগ। অত দরদ যদি, সাতরে তােলনা !
১ম নাগ। সাহস হচ্ছে না। যে গভীর জল, তার উপর পােকার
অত কুমীর ভাসচে।
২য় নাগ । তবে, কামাে রাখ। দেখছিস না, সবাই হা করে
শুকিয়ে আছে-কেউ উদ্ধারের চেষ্টা করেছে ?
১ম নাগ। ঐ-ঐ ভেসে উঠলাে। আর বােধ করি ভয় নেই।
২য় নাগ । ঐ যে-পণ্ডিতকে উদ্ধার করে মাধৰ তীরের নিকট
এসে পতেছে।
( মনমােহনকে উদ্ধার করিয়া মাধব তীরে উঠিব, সকলে ধন্স এ
করিতে লাগিল।)
মাধব । আনুন ! .আগে পণ্ডিতের জ্ঞান সঞ্চার করি।

মাধবাচার্য্য
[ দ্বিতীয় গরু
{ সকলে নানা প্রক্রিয়ায় পণ্ডিতের জ্ঞান সঞ্চার করিল।
১মশাগ। চল, চল, আর সকলকে এ সংবাদ দিইগে!
( নাগরিকগণের প্রস্থান।)
“গন ( শায়মান হইয়া) মাধব ! বার বার মৃত্যুর পথ হতে
আমায় কিস্মিয়ে আনিস কেন? এ পৃথিবীতে তাের আমার স্থান নেই।
হয় তুই মরনা হয় আমি মরি ।
অব। আমি যদি আপনার অশান্তির কারণ, আমার জন্যই যদি
আপনার জীবন দুৰ্ব্বহ হয়, তবে আপনার ইচ্ছাই পূর্ণ হােক। হে ব্রাহ্মণ !
উত্তপ্ত অশ্রু মুছুন-বক্ষের অনাহুত বেদনা দুর করুন। আজ এই
ছুদের বক্ষে আমার জীবলীলা সাঙ্গ হােক।
মদন। তাের দয়ার প্রত্যাশী আমি নই। তাের করুণায় জীবন
বহন কত্তে ইৰে ! না, না, তা হবে না। আজ স্নানের ছলে, অগাধ
জলে তােকে নিক্ষেপ কত্তে গিয়ে, ঘটনাচক্রে আমি একটা আবর্তের মধ্যে
পড়ে নিমজ্জিত হয়েছিলেম-তাই এ যাত্রা রক্ষা পেলি। কিন্তু জানি,
আমার হস্তে জীবন তাের সঙ্কটাপন্ন।
[ বেগে প্রস্থান।
( আনন্দময়ী, সনাতন, কপিঞ্জল, যক্ষশীলা ও নাগরিকত্বয়ের প্রবেশ।)
{
আনন। কই, কই, আর মাধব কই?
মাধব। মা, মা !

তৃতীয় দৃ} মাধবাচা আনন। মাধব রে ! তুই শত্রুকে ক্ষমা কর্তে শিখেছি, বিপল্পের জন্য জীবন সমর্পণ করেছিস। এতদিনে জানলুম প্রকৃত কৰ্ম্মী তুই-দেশের, দশের কন্মে বদ্ধপরিকর। এখন তুই—আমার একলার পুত্র নয়-দেশ মাতৃকার সন্তান। তোকে বক্ষে ধরে বিশ্বের জননীগণ ধই হােক। মাধৰ। তােমার আশীর্বাদ কি বিফল হয় মা ! সন্ন্যাসের এই এ মুহ উপস্থিত। দাও মা, বিদায়ের অনুমতি দাও। কপি। পুত্রকে তােমার কান কর মা! আনন। আয় বাবা। আজ তােকে সন্ন্যাসীর সাজে সাজাবো । ( নিজের অঙ্গ হইতে কৈশিক উত্তরীয় উন্মােচন পূর্বক।) এই নে বাবা! বিশ্বের বহুমূল্য পৰীচ্ছদ হ'তে মূল্যবান, কুবের ভাণ্ডারের অয়ক্ষান্তমণি হতে উল, ভাগীরথীর পবিত্র ধারা হতেও পবিত্রতম, এই গৈরিক বসন ধারণ কর। ঐ অবসন ত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই তোর নবজীবন আরম্ভ হােক। সনা। কি কোরছে। মা, মা হয়ে ছেলেকে সন্ন্যাসী সাজাচ্চো। আনন্দ। এত নুতন নয় বাবা! পধৰ্ম্ম রক্ষণে ক্ষত্রিয়াণীগণ তাদের সন্তানদের অস্ত্র শস্ত্রে সাজিয়ে-মৃত্যুর কোলে সপে দেয়। বৈশানা গণ, দেশের অন্ন সংস্থাপনের জন্য পুত্রের বুকের রক্ত দান করে। দ্রাণীগণ, আত্মত্যাগের আদর্শে জন্মভূমি গঠিত করবার জন্য কোলে ছেলেকে শিশুকাল হতে উচ্চবর্ণের সেবায় উৎসর্গ করে থাকে। আমরা ভিখারীর জাতি, ব্রহ্মচায়ীর এই দীনবেশে দেশের বুকে-শিশুপুত্রকে অর্পণ আচার্য [ দ্বিতীয় অঙ্ক কল্পি-পূণ্যের দীপ্ত মহিমায়-ত্যাগ সংযমের পক্ষে-বিকন পরিচালিত সনা। পাষাণ গো! তােমায় কি এ কাদেনা? এ নীতি ব শাবিরুদ্ধ বলে বােধ হচ্ছে। * আনল। আমি একলা কালে কি আসে যায় বাবা! দেশের করুশ-আর্তনাদ কি শুনতে পাওনি? অনায্যের পীড়নে-বৌদ্ধ রানা অত্যাচারে ভারতের চিরমহিমাময় ‘সনাতনধর্ম যে যায়। ফপি। এ নীতি শাস্ত্রবিক নয়। বিজনবাসিনী ব্রহ্মচারিণীগণ, যদি তাদের সন্তানদের আজন্ম ব্রহ্মচর্য শিক্ষা না দিতেন--তা হলে কি পরশুরাম, দ্রোণাচাৰ্য, বশিষ্ঠ, মহামতি দধীচির উৎপত্তি হ'ত ? যক্ষ। জননীর আদর্শ না পেলে, ব্রাহ্মণ সন্তানগণ আজ নিস্কাম সর্বতাগী হয়ে পৃথিবীর পূজা পেত না। যে ব্রাহ্মণগণ, যুগে যুগে ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিরূপে যুগধর্ম রক্ষা করে আসছেন, যে ব্রাহ্মণের সর্বংসহা শক্তির বিকাশে পৃথিবীর পাশবিক ক্রীড়ার, অনাচার, প্রতিহিংসার স্রোত প্রশমিত ; যাদেয় বিশ্বজনীন প্রেমের মাধুরীময় চিত্র দেখে, পুলক বিস্ময়ে নিরীশ্বরবাদী স্লেচ্ছগণ, ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তাদের জননীগণ সান্যা নন। { আনন্দময়ীকে প্রণাম করণ। আনন্দ। মনোভীষ্ট পূর্ণ হােক বৎস! রাধি, তুমি এ জগঞ্জ ভায়তের রাজা হয়ে, পরজন্মে তোমা হতে, অমরার সিংহাসন অলঙ্কৃত হবে।

তৃতীয় দৃশ্য ]
মাধবাচার্য্য
সনা। মার্জনা কর ! শক্তিরূপিণী তোমায় চিনতে পারিনি।
আজ তােমার কৃপায় আমায় সমস্ত বন্ধন টুটে গেল; আর গৃহে ফিরবো না।
আজ হ'তে মাধবদার পার্শ্বচর হয়ে রইলুম।
মাধব। আজ মহেন্দ্রক্ষণে, আমরা দরিদ্রের আশা ভরসাস্থল রাজা
মত রাজা পেয়েছি। মহার্ণৰে কর্ণধার না পেলে—গভীর অন্ধকারে উজ্জল
আলােক না দেখলে –অসহায় যাত্রী কতদূর অগ্রসর হতে পারে?
আশীৰ্বাদ কর মা। যেন দক্ষিণহরুপে রাজশক্তিতে ব্রাহ্মণের লুপ্ত
গৌরব আবার ফেরাতে পারি।
আনন্দ। আশীর্বাদ করি- দেশের কক্ষে নায়াণে তুষ্টি সাধন
( মাধবের মস্তকে হস্ত দিয়া আশীৰ্বাদ করিলেন।)
আয় বাবা! একবার তােকে শেষ বক্ষে ধরি আয় ।
(মাধবকে বক্ষে ধরিলেন।)
এই নাও রাজা, এই নাও ব্রাহ্মণ ! আমার বুকের কলঙ্গে-
আমার নয়নের মণি।
(মাধবকে সমর্পণ করিলেন।
যক্ষ। এস ব্রাক্ষণ। দারুণ স্বেচ্ছাচার বিনাশের জন্য উচ্চার
মত ধেয়ে এস। আয়ধৰ্ম্মে-প্রতি নগর, প্রতি গ্রাম-সুমে হ'তে
কুমারিকা পৰ্যন্ত ভূমিকম্পের বেগে আলােড়িত করে দাও। ভগবান তুমি,
-আজ ভক্ত, বি-হৃদয় নিয়ে কঠে--তোমার পশ্চাকে পশ্চাতে থেকে

যাচার।
( বিতীয় অঞ্চ
যাচ্ছে, তার দারুণ পিপাসার অবসান কর।
[ মাধবকে লইয়া যক্ষশীলা ৩ কপিলের প্রস্থান।
সনা। আমাকেও সঙ্গে নাও দাদা!
[ বেগে প্রস্থান।
নাগরিকত্বয়। (রােমানা আনন্দময়ী প্রতি) চল মা, ঘরে
চল। আল হ'তে আমরা তােমার সন্তান।
সকলের প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য।
কবিতাকুমারের গৃহ।
( কবিতাকুমার ও হাসি।)
কৰি। হাসি, হাসি ! তােমার নামটি কি মধুর ?
হাসি। তা হতেও ভরপুর-তােমার বাঁশিটা । সর্বদাই কত
--
f
কবি। তা হলে বাণ ধরা সার্থক।
হালি। ও বাঁশ লিখার জলে ভাসিয়ে দাও।
*
কৰি। কেন, তুমি কি তাকে তুলে তােলনি ?

মাধবাচা
হাসি। বুকে ধরে রেখেছি।
কবি।
বাঃ বাঃ, বেশ ফুলের গোড়ে !
**
হাসি। কার জন্যে বল দেখি?
কৰি। তা কি আর বলতে হবে। বুঝতে পেরেছি ও গলায়
পরি।
হাসি। বাঃ-নিজে পরবে কি! আমি পরিয়ে দিচ্ছি।
(হাসি কবিতাকুমারে গলায় মালা পরাইল)
4
অতি সুন্দর মানিয়েছে।
কবি। এতক্ষণ বুঝি গরমান ছিল?
হাসি। যাও, আমি কি তাই বলছি।
কৰি। এর পরিবর্তে তােমায় কি দিই।
হাসি। যা ইচ্ছা তােমার।
(কবিতাকুমায় চুম্বন দিল।
হাসি। যাও, 'ভারি দুষ্ট, তুমি !
কবি। • এমন চাদনী রাত, চলনা একটু বেড়ান যাক। আজ
পুর্ণিম-তােমার ষােলকলা পূর্ণ দেখে চাদ হাসছে।
বাসি। অত ফুল * কখনও ফোটেনি।

মাধবাচার্থ
| বিতীয় জয়
.
বসন্তকাল যে খাবায়
কোকিল
কবি। ফুটবে
ডাকছে।
y"
-
সি। শুনতে পেয়েছি, ও বরাবরই ডাকে।
কবি। সামনে ঐ লতাকুঞ্জ, চলনা একটু বসিগে।
হাসি। গলা ধরাধরি করে নাকি ?
কবি। এস, আরো সরে এস। (হণ করিয়া)
-
হাসি। তিলমাত্র ব্যবধান নাই।
কবি। হাসি !
হাসি। কি।
কবি। একটা কথা রাখবে।
হাসি। কোন্ দিন না রেখেছি ।
বি। বিশেষ লাভের কথা ।
হালি।
অত শত বুঝি না। যা বলতে শুনাবাে, গুঞ্জন করবে
না। স্বামীবাক্যের পাপপুণ্য বিচার করবো না।
কবি। কারেও যদি বিনাশ ফ’তে বলি।
হাসি। ' ভূমিকায় বুঝেছি।
কবি। শােন তবে বেদারে পণ্ডিত = মাধবের অত্যাচারে

মাখৰচাৰ্য্য
বৌদ্ধধর্ম যায়। রাজাৰ মনৰুষ্টির জন্য-সুযােগ মত তাকে বাটীতে
এনে-
হাসি। গলায় নিভা চুরি--
কবি। তা নয়-তা নয়--তবে, তবে, সময় মত তােমায় প্রস্তুত
হ’তে বােলবো।
মসি।
এখন কি ক’তে হবে ?
কবি। চল, ঐ ছাদের উপর জ্যোছনা কিরণে গা ঢেলে দেবে।
আজ তােমার কিন্তরীকণ্ঠের সেই গানটা না শুনে ছাড়ছি না !
হাসি। চল, আমিও তােমার মাণিকপীরের’ ছড়াটা শুনে তবে
ছাড়বো।
{ হাসির হস্ত ধরিয়া কবিতাকুমারের প্রস্থান।
পঞ্চম দৃশ্য।
মদনমােহন শাস্ত্রীর গৃহ।
( কাঞ্চন ও মদনমােহন।)
কাঞ্চন। আপনি পণ্ডিত হ'য়ে, একি বলচেন বাবা।
মদন। আমি ঠিক ক’লচিতােরই বােঝবার ভুল।

মাধুৰাচাৰ্য
[ দ্বিতীয় অঙ্ক
কাঞ্চন। আমি অনুমতি নারী, ভুল আমার হ'তে পারে বাবা!
কিন্তু হিন্দুরমণ কি দ্বিচারিণী হতে পারে ?
মদন। স্বীকার করি, তা বলে কোন্ হিন্দুবালিকা পিতার
আদেশ উপেক্ষা কোরে হিন্দু সমাজে একটা স্বেচ্ছাচারিতার মহাভুল
কাঞ্চন। আমি যে বাত্তা!
মদন। আমি কথা দিইনি-এর বিন্দুবিসর্গ জানিনা।
কাঞ্চন। কন্যার বিবেকের উপর, মেহময় পিতার কি কৰ্তব্য
বাবা!
মদন। ক্ষুদ্র বালিকার এ বিবেক বুদ্ধি, ধৃষ্টতার পরিচায়ক।
কাঞ্চন। এ যে স্বভাবের গতি-প্রকৃতির নিয়ম। কেমন করে
শমবর্ষীয়া বালিকা, পরের ঘরে গিয়ে পরকে আপন করে। সংযম,
ভাক্ত, দয়া, দাক্ষিণ্য কে তাদের শেখায়! জ্ঞানের তারতম্য ৩নয় হ'তে
নয়ার প্রতি জগদীগরের যে দান-তা'ত আপনার অবিদিত নেই বাবা !
মদন কুট তর্কে ভােলাৰি। জানতে চাই—তাের উপর আমার
কোন অধিকার আছে কি না?
কাঞ্চন। ওকি কথা বাবা! যদি বেদনা পান, না হয় এ বিবাহ
হবে না। আমায় খার্জন করুন।
মৰ। তুই রাজরাণী হবি এই ' আমার ইচ্ছা। গৃহত্যাগ
সঙ্গ দরিদ্র ভিক্ষুক ; তার হাতে তােক সপে দিতে পারবাে না।

পঞ্চম দৃশ্য মাধবাচার্য্য কাঞ্চন। রাজরাণী আর কুটীরবাসিনী-উভয়েই মানসিক সুখ দুঃখের সমধিকারিণী। ফুল, রাজোনে, কাননে এভাবেই গন্ধ বিতরণ করে ; সে রাজার গলায় যেমন, দরিদ্রের গলাতেও তেমন চির- হাস্যোজ্জল- গৌরবময়। মদন। তাের কোন যুক্তি শুনতে চাই না; এত বড় অপরাধের মার্জনা নেই। কাঞ্চন। বাবা! তার পূর্বে একবার শুরণ করুন, আমার বগগতা জননী – এই বিবাহে কি প্রতিশ্রুতি দেন নি ? মদন। হতে পারে ; হয়ত তথন না বুঝে আমিও কতকটা মত দিয়েছিলেম, তবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইনি। দ্বারকার দীঘাপতির সঙ্গে তাের বিবাহ দেব। অন্যথার-তােকে কঠোর শাস্তি নিতে হবে। কাঞ্চন। বাবা, বাক্যই যে প্রতিজা ! আমার জীবন সায়াহ্নের এই শেষ কথা না রাখলে- জানিস, এ গৃহে আর তাের স্থান নেই । জানবে কন্যা আমার মৃত। [ বেগে এস্থান। কাঞ্চন। তাই হবে। আজ আপনার নিকট চিরবিদায় গ্রহণ কোরবো। বাবা, খাবা! এমনি ক'রে দেহের বন্ধন খুলে ফেল্লেন ! ( অঞ্চলে চক্ষু মুছিয়া ) হো। বুক যে ফেটে যায়। পিতা হ'য়ে কন্যার মৃত্যু কামনা করে !

মাধবাচার্য্য দ্বিতীয় শঙ্ক ষষ্ঠ দৃশ্য। . রাজসভা। পুস্পাদিত্য ও পাত্রমিত্রগণ উপবিষ্ট-সম্মুখে যক্ষশীলা ও সনাতন দণ্ডায়মান।) যক্ষ। আপনার স্নেহের আকর্ষণ যে এমন করে টেনে আনবে, আগে জানতাম না বাবা! আপনার পত্র পেয়েই ছুটে এসেছি। পুষ্পা। কিন্তু পুত্র ! আমার সম্মান তুমি রাখ নাই। জানতে চাই -কে তােমার বড়। সাম্প্রদায়িক বিদ্ধেষজর্জরিত তোমার স্বদেশ, কি পিতৃভক্তি! যক্ষ। জনক, জন্মভূমি, কাকে ছােট করবো বাবা! আমি ন্যায়ের মর্যাদা রেখেছি—আপনার অসম্মান করিনি। আমি ভীরুতা বর্জন করেছি – ভক্তি বিসর্জন দিইনি। পুষ্পা। পিতা স্বর্গ হতেও শ্রেষ্ঠ। তার উপর কেহ নাই । যক্ষ। আপনি আমাৰ ধৰ্ম্ম-ইহকাল পরকাল ; আপনার তুষ্টিতে দেবগণ তুষ্ট হবেন। এই দেশমাতৃকা-আমার কর্মভূমি-আমার জন্ম- মরণের মণিকাঞ্চন। এর আসন্তানগণের সেবাতেও আপনার আত্মার তুষ্টি হবে, আর ঐ নরনারায়ণের আশীৰ্বাদ বর্ষিত হ'য়ে-আপনার সিংহাসনের ভিত্তি দৃঢ় হ’তে দৃঢ়তর করবে। ‘সনা। মহারাজ ! কুমারের একধারে স্বর্গ, একধারে কব- যষ্ঠ দৃশ্য }, মাধবাচার্য্য গঠিত মনুষ্যত্বের উচ্চস্তর। প্লাবনে নদীর একদিক ভাঙ্গে-আবার একদিক গঠিত করে। সূক্ষ্মদৃষ্টি দিয়ে দেখুন, উনি যথাসম্ভব আপনার কৰ্ম্ম বরণ করেছেন। পুষ্প। সাবধান চাটুকার । স্পর্ধা পরিত্যাগ কর। কর্তব্য আমার আমি বুঝি –সে কৰ্ত্তব্য কি জানো-রাজদ্রোহি তােমাদের প্রাণদণ্ড। রুষ্ট হবেন না মহারাজ! দেশের দুর্দিনে আপনার সহানুভূতি চাইতে এসেছি। ধর্ম এক-ঈশ্বর এক। পথ মাত্র বিভিন্ন । আত্মায় পরমাত্মায় সম্মিলনলীলা। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে তাকে কোলে নিন, বিদ্বেষ তাগ করুন। জানবেন, বর্জন নয় ধ্বংসের ইঙ্গিত। ঘৃণাই নীচাশয়তার চরম। পুষ্পা। ধৰ্ম্মের জন্য আমি সমস্ত ক’ত্তে প্রস্তুত। সনা। ধৰ্ম্মের একটা তুচ্ছ দোহাই দিয়ে সঙ্কুচিত চিত্তে বর্জন নীতি চালিয়ে আমরা কত অমূলার বিসর্জন দিয়েছি—যার অভাবে অজি আমরা দলভ্রষ্ট দুর্বল জাতি। অন্য দিক দিয়ে দেখুন, আমাদের পরিত্যক্ত বুকের রক্ত নিয়ে, একটা নগণ্য অসভ্য জাতি, বিরাট শক্তিতে আজ পরিপুষ্ট। আমায় হত্যা করে প্রতিশােধ নিন, পুত্রহত্যা করে নিজের শিরে কুঠারাঘাত করবেন না। পুষ্প। রসনা সংযত কর ! এ রাজসভা, বৈদিকমণ্ডলী নয় ! । সনা। এ রাজসভা, না নরকালয়! প্রধান নারকী তুমি পাশবিক দণ্ড নির্ভর করে কৃমিদে সন্তরণ কোচো। তােমাক চতুর্দিকে

मारवाया
[ীয় অঙ্ক
ঐ পিশাচের কঙ্কালগুলাে--প্রতি মুহুর্তে মহাসংঘর্ষণ তােমার গলা টিপে
আরবার জন্য-তাদের অস্থিময় হন্ত বিস্তার করে রয়েছে। সাবধান
পুষ্পা। কে আছ-বন্ধন কর! দেখ পাপিষ্ঠ, তাের সম্মুখে
তাের অন্তরঙ্গের মৃত্যুলীলা। (যক্ষশীলার প্রতি) যক্ষ, প্রস্তুত হও!
(গসি নিষ্কাসন ; সৈয়দ্বয় সনাতনকে বন্ধন করিল।
ক্ষ। দণ্ড দেবে বাবা, দাও! মাথা পেতে দিচ্ছি।
নয়-মেহের নিদর্শন। পিতৃদত্তশাস্তি, দেবতার আশীর্বাদ। যা কঠোর
হলেও মধু-প্রাণাকারী হলেও অনন্ত তৃপ্তি।
*।
( বেগে চার প্রবেশ ।
চন্দ্রা। অলি কোষবদ্ধ কর রাজা!
পল। কে রাণী। প্রকাশ্য সভায় ? কি লজ্জা, কি ঘৃণা
চা। উন্মাদিনী মা আমি! লজ্জা সঙ্কোচের মধ্যপথে দাড়িয়ে-
মৃত্যুর তাণ্ডবলীলা দেখঞ্জে পারব না। তাই ছুটে এসেছি।
পুষ্প। বেশ ক'টে, বেশ কয়েচ ! এ বিষ এইরূপ সংক্রামক তা
আগে থাকতেই জানতাম। ওহো ।
য। সরে যাও মা! পিতার সঝােয়ে বিজয় গর্বে মরতে দাও।
চা। গরতে হয় তা পুত্রে ময়ৰ !
(পত্রকে বেষ্টন করিয়া ফাইল।)

যষ্ঠ দৃশ্য }
মাধবাচাৰ
পুষ্প। আয় গর্বিত। নারী, অর্থে তাের তীব্র আকাঙ্ক্ষার অবসান
সনা। কার সাধ্য নারীহত্যা করে।
( অসির সম্মুখে দাড়াইল)
পুষ্প। (সৈনিকের প্রতি। একে নির্জন-কারাগারে লয়ে যাও।
সনা। রাজা, আমি বন্দী! কিন্তু আমার বিবেক, আমার সত্য
সে বন্দী নয়, যার বিরাটশক্তি, অচিরে এই ধ্বংস-নীতির অবসান করবে।
(সৈনিক রাজইঙ্গিতে সনাতনকে কারাগারে লইয়া গেল।)
পুষ্প।। উভয়ে স্থির হয়ে দাঁড়াও! হত্যা, হত্যা, একধারে মা-
একধারে পুত্র। সংসার-পটে শােণিতে অঙ্কিত—এ দৃষ্ণ কি অতি
রঞ্জিত! হােক। দেখি কে তােদের রক্ষা করে।
( চন্দ্রা ও যক্ষকে হকায় উন্বত -বেগে মাধবের প্রবেশ)
মাধব। নারায়ণ রক্ষা করবেন !
{ রাজার সম্মুখে আসিয়া দাড়াইলেন।
পুষ্প। কে মাধব, আমার চিরশক মাধব ! আমার অনাহুত
প্রতিদ্বন্দী এস, দেখি এ হত্যার যবনিকা আজ কি ভাবে পতিত হয়।
মাধৰ। { হও তুলিয়া মৃত্যুভয় রাখিনা। সংসার অa,
--বন্ধন, পরমায়ু-যন্ত্রনা, মৃত্যুই-শান্তি। কবে মরবার মতই
ম’রবো।
ৰ

মাধবাচার্য। [ দ্বিতীয় অঙ্ক { মাধবকে আক্রমণ করিলেন; সহসা শৈবগণ শুলহন্তে প্রবেশ করিল।) যক্ষ । কে তােমরা ? ১ম শৈব। আমরা শৈব সম্প্রদায়। সূক্ষ্ম মীমাংসায় এই মহাপুরুষ, শৈব ও বৈষ্ণবের পুৰ্ব্বতন বিদ্বেষ নাশ করে—আমাদের চিরঋণে আবদ্ধ করেছেন। এই দেবতার জন্য আমরা প্রাণ দোব। ( ব্রাজ্ঞায় সৈন্যগুণের প্রবেশ-উভয়দলের যুদ্ধ, রাজা ও রাজসৈন্যগণ পরাস্ত হইল।) - মাধব। আর সেদিন নাই রাজা! ঐ দেখ, ভারতের অনন্ত জলধি হতে নবােদিত সূৰ্য্য রুদ্রমূর্তিতে পুর্ধ্বাকাশে দেখা দিয়েছে। তার উজ্জ্বল উত্তেজনাস্পর্শী জ্বলন্ত কিরণে দিক্‌মণ্ডল আবার জেগেচে। ঐ ঐ নবীন কর্মীর দল, তাদের চিরদিনের জড়তা কাটিয়ে ভগ্নহৃদয়ে প্রেমের ঢেউ তুলে, শ্যামলা পৰ্ব্ব মেখলা বসুন্ধরার মুক্ষেত্রে এসে দাড়িয়েছে। ও তাদের বােধনের সঙ্গীতে এক নবশক্তির আবাহন প্রতি মুহুর্তে বেজে উঠছে। তােমার পথ চিনে নাও রাজা, পথ চিনে না ও। ** , [ রাজা, পাত্রমিত্রগণ নিব্বাক স্তম্ভিত হইয়া রহিল- মাধবাচাৰ্য, ঘক্ষণী লা ইত্যাদির প্রস্থান।

তৃতীয় অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। নির্জন পতনিম্নস্থ কুটীর। ( মাধবাচাৰ্য বেদান্তের ভাষচনায় নিযুক্ত। মাধষ। লেখ, লেখ, লেখনী আমার ! ললিত-লাবণ্যময়ী সুমধুর শ্লোকের প্রতি ছলে বিদ্যুৎ-প্রবাহ ঢেলে নরত্রাণকারী নবশক্তিময়ী বেদান্তের শেষ অধ্যায়--ক্ষের শােণিত নিংড়ে শেষ করে দাও। হে মসি, অসি হ’তে খৰধার তুমি তােমার সহায়তায় মহর্ষি বাল্মীকি পঙ্কিল জগতে রামনামের বা ছুটিয়েছিলেন, মনস্বী ভরত ভারতের চিত্রে অমিয় নাটক অঙ্কিত করে মানবজীবনের গতি ফিরিয়েছিলেন। মহামতি মদু, হিন্দু সমাজের রুদ্ধদ্বারা মুক্ত করে-হিমগিরি হ'তে বিন্ধ্যাচল পৰ্যন্ত সুবিস্তৃত করেছিলেন। } (লিথিতে লিখিতে ভাবসমাধিস্থ হইলেন। যক্ষশীলা, পাতাল ও ব্রাহ্মণগণের প্রবেশ ।) যক্ষ। আজ আপনারা তীর্থমন্দিরে সমাগত। ঐ প্রেমের মূরতি -নিস্পৃহ, নির্বিকার, জীবন্ত বিগ্রহ দেখুন। (সম্মুখে অগ্রসর হইয়া) একি ! প্রভু আমার ভাৰরাজ্যে বিচরণ কর্ডেন ; বেদান্তের সূক্ষ্ম মীমাংসায়, ব্ৰহ্মণ্যদেবের স্বরূপমূর্তি দর্শনে ধ্যানস্থ। ঐ প্রেমের উৎস ছুটে—বিগলিও আঁখি ধারায়, যেন এক একটা উঃ মুক্তা-ঐ

মাধবাচার্য
[ তৃতীয় অঙ্ক
শনের বক্ষ গভীর অর্চনায় সাজিয়ে দিয়েচে। ( সম্বােধন পূর্বক)
( ব্রাহ্মণগণ নিবিষ্টচিত্তে বাহ্যজ্ঞানরহিত নির্বিকার মূরতি
দেখিতে লাগিল।)
মাধব। (নয়ন উন্মীলন পূৰ্ব্বক) অভীষ্ট পূর্ণ হােক রাজা!
( ব্রাহ্মণগণকে হেরিয়া, সসমে) আমুন, ব্রাহ্মণগণ! দীনের প্রণাম
গ্রহণ করুন।
১ম ব্রা। বৌদ্ধগণের অত্যাচারে প্রপীড়িত দীন ব্রাহ্মণ আমরা,
বহুদুর হতে আপনার নিকট এসেছি। বিষ্ণু-অবতার, ব্রাহ্মণ-কুলতিলক,
ব্ৰহ্মণ্য ধৰ্ম্মের স্থাপক আপনি, ব্রাহ্মণের সম্মান রক্ষা করুন।
মাধব। ব্রাহ্মণগণ! সে দোষ কার? আপনারাই ত' খাল
কেটে কুমীর এনেছেন। আপনাদের অক্ষমতায়, ধৰ্ম্মের শিথিলতায়
বিধর্মীগণ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আপনারা কি সেই সাবর্ণ, শাশুল্য,
কপ ঋষির বংশধর? আশ্চর্য হচ্ছি !
১ম ব্রা। আশ্চর্য হবার কোন কারণ নাই। রাজাই সকলের
ধৰ্ম্মে হাত দিয়েছেন।
মাধব। কিন্তু আপনারা যে জাতিসৰ্প ! সে আশীবিষ আজ
আপনাদের কোথায় ? আপনারা কি আবার নূতন করে রাজা
গঠন ক’তে পারেন না।
১ম ব্রা। আমরা রাজার মত রাজা পেয়েছি, কিন্তু ইনি যুদ্ধের
গ এত নন।
(ব্রাহ্মণগণ যক্ষশীলাকে দেখাইলেন।
।
•••

প্রথম দৃশ্য ] মাধবাচার্য্য মাধব। যুদ্ধই কি ব্রাহ্মণের ধর্ম? আপনারা যে, যােগবলে বিশ্ব- ৰাজ্য জয় কত্তে পারেন! আপনারা এক একটা ব্রাহ্মণ-ঈশ্বরের এক একটা শক্তি। সে শক্তির অপচয়ে আজ আপনারা ভিখারী। ১ম ব্রা। নক্ষত্র অনেক চন্দ্র এক। নদ নদীর গতি সমুদ্র। দেবতারাও একদিন অস্বরাক্রমণে চণ্ডিকার আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। মাধব। সেই দেবতার তিল তিল শক্তি নিয়েই-চণ্ডিকার সুজন। শক্তি ত দূরের কথা—আপনারা এক তা পর্যন্ত হারিয়েছেন। ১ম ব্রা। যা হবার হয়েছে-এইবার মরণ পণ । মাধব। উত্তম! প্রত্যেকে সাবলম্বন করুন। ''যােগবলে-যােগ মাতার আসন টলান। এই নিন ! বুকের রক্ত দিয়ে লেখা “বেদা- শুের ভাষ্য। এর মধ্যে ডুবে গিয়ে সনাতন ধর্মের দৃঢ়তা-ঘারে দ্বারে প্রচার করুন, আবার সেই শান্তিরাজ্য ফিরে পাবেন। পাতঞ্জল। (মাধবের হস্ত হইতে বেদান্তের ভাষ্য লইয়া, তদৃষ্টে ) ভ্রাতৃগণ ! আজ মহারত্ন লাভ ক'ল্লেন। এই দেখুন, সূক্ষ মীমাংসায় প্রাঞ্জল ভাষায়, প্রভু আমার দূরধিগম্য বেদের জটিল তথ্য, কি সরল সুন্দর ভাবে পরিস্ফট করেছেন। (ব্রাহ্মণগণ আনন্দিতচিত্তে বেদান্তের ভাষ্য দেখিতে লাগিলেন।) ১ম ব্রা। কি অখণ্ডণীয় যুক্তি, কি উত্তেজনাময় বর্ণবিন্যাস। এই অমূল্য রত্ন, ধর্মের সার সংস্কলন। আমাদের যা কিছু আকাঙ্খা. ছিল তা আজ পূর্ণ হল। এতদিন পশুর মত বিচরণ কমেচি-এখন মনুষ্যত্বের পথে অগ্রসর হব। মাধব। ( যক্ষশীলাকে নীরব খিয়া) চিন্তিত কেন আজ?

মাধবাচাৰ্য্য [ তৃতীয় অঙ্ক যক্ষ। প্রভু! ধর্মপ্রাণ সনাতন এ সময়ে নির্জন কারাগারে প্রায়ােপবেশনে দিন কাটাচ্ছে। কি উপায়ে তার উদ্ধার হবে ? মাধব। সে আদর্শপুরুষের জন্য চিন্তা করােনা! দেশে অন্ন নাই বলে সনাতন অন্ন ত্যাগ করেছে। আমাদের শিক্ষা দীক্ষার আধার গঠন ক’তে, আমাদের মােহের নাগপাশ খুলতে, সনাতন লৌহ- শৃঙ্খল পয়েচে। সত্য তার মুক্তি --বিবেক তার স্বাধীন তার আত্মােৎসর্গ নয়—অক্ষয় কীত্তির মাঝে দেশকে বাঁচান। যক্ষ। দেব! এখন বুঝেছি, কারাগারই-তীর্থস্থান। বন্দীই কর্মী, বন্ধনই মুক্তি। আমিও কারাগৃহ বরণ ক’বাে। ব্রাহ্মণগণ। আমরাও সকলে কারাগৃহ বরণ ক’বাে। মাধব। না, না, তা হয়না। আপনার প্রত্যেকেই তার মত হ'। এক সনাতন গেছে -আবার ক্ষ সনাতনের আবির্ভাব হবে। এখন চলুন! বিশ্বপতি হরির নাম স্মরণ করে বৈদিক ধর্ম প্রচারের জন্য, আমরা পৃথিবী পর্যটনে বহির্গত হই। সকলে। জয়- মাধবাচার্যের জয়। ( সকলের প্রদান। দ্বিতীয় দৃশ্য। বনমধ্যহু পথ। (মদনমােহন শাস্ত্রীর প্রবেশ।) . মন % এযে ভীষণ অরণ্যানী! মা কি আমার এই পথে গেছে!

তীয় দৃশ্য ]
মাধবাচাৰ্য্য
, না, তা হতে পারেনা। নিকটস্থ হ্রদ হ'তে পানীয় আনুতে গিয়ে -
যার পদযুগল জড়িয়ে যেত, প্রভাতের সূর্যকিরণে-কণক লতিকার
ন্যায় যে অবশ হয়ে পড়ত, শব্দের দূর প্রতিধ্বনি শুনে—যার বক্ষ
ঘন ঘন কম্পিত হত, সে এই কণ্টকাকীর্ণ শ্বাপদসঙ্কুল পথে বাকে
কেশন করে। তবে কোন পথে যাই ? কোথা গেলে তার দেখা
পাই ? অভিমানিনী তনয়া আমার ফিরে আয় ! তাের বৃদ্ধ পিতাকে
ক্ষমা কর। এবার যা ব বি সব গুলাে আর তােক কিছু বলব না।
ভগবান ! মাতৃহারা কন্যার পিতা করে পাঠিয়েছিলে কেন?
( কিয়দ্র অগ্রসর হইয়া) ঐ কে কেঁদে উঠল না? সেই বটে, ওযে
পরিচিত স্বর; এই যে, এই যে, আমার হৃদয়ের মধ্যে-তার বুকের
স্পন্দন শুনতে পাচ্ছি। না, না, ওযে পবনের দীর্ঘশ্বাস-বৃক্ষের মরে
প্রকাশ কচ্ছে। আবার ঐ ওদিকে, কে যেন করুণক বাবা বলে
ডাকলে না! হাঁ, এবার সে নিশ্চিত। দাড়া মা, এই যে আমি-”
( পার্বত্য দ্যদ্বয়ের প্রবেশ ।)
১ম দস্য। ঠাকুর, ভালয় ভালয় চলে যা। জানি আমরা কে ?
(লগুড় প্রদর্শন।
মদন। তােমরা যেই হও বাবা ! দয়া করে আমায় বলে দাও
তনয়া আমার কোন্ পথে গেছে ?
২য় দ্য। একটা কাণ। কড়িও কাছে নেই দেখছি।
১ম দস্থা। এর সঙ্গে মিছে বাকবিতণ্ডা করা। বদ্ধ পাগল না
হয়ে যায় মা।

মাধবাচার্য।
[ তৃতীয় আয়
*
২য় । তাের কন্যা বন্দী! রাজসভায় সেখানে সন্ধান
মিলবে।
১ম দা। এই পথ দিয়ে সােজা পাড়ী মা, বিলম্বে প্রাণ হারাবি।
মদন। মা, মা, তুই বন্দী !
[বেশে প্রস্থান।
১ম দস্য। দিনটা ফাঁকা না যায়। চল্ ! ওদিককার ঐ
ঝােপটায় ওত পেতে বসে থাকিগে।
( উভয়ের প্রস্থান~অন্যদিক দিয়া হাসি ও পুরুষ বেশে চিত্রার প্রবেশ।)
হাসি । আয় চিত্রা! এই বনটা পার হলেই তাের মামার বাড়ী।
চিত্রা। যার তার গলগ্রহ হ'তে আমরা আর কোথাও যাব না।
হাসি। তারা যে তাের আপনার জন মা!
চিত্রা। পিতা হয়ে--যখন আমাদের পরিত্যাগ করেছেন আর
কি সে আশা রাখ মা।।
( হাসি অঞ্চলে চক্ষু মুছিল।)
চিত্রা। কঁাদচ মা, ভয় কি! তােমার কাছেই শুনেচি
বিপদের বন্ধু শ্রীমধুসুদন।
হাসি। এতখানি ৰেলা হ’ল-তুই যে আমার কিছু খানি মা!
চিত্র। তুমিওত কিছু খাওনি মা! হাঁ মা, ভিক্ষা কেমন
হালি'। চুপ কর, ওকথা তুলিসনি।'

দ্বিতীয় দৃশ্য। মাধ্য চিত্রা। মাধব ঠাকুর কি করে বাঁচলো মা? হাসি। সে অনেক কথা মা! তাের পিতা তাঁকে অতিথি ভাবে গৃহে এনে-হত্যার ভার দিলেন আমাকে। কখনও তাঁর কথায় পাপ পূণ্য বিচার করিনি : আমি প্রস্তুত হ’লুম। কিন্তু পাম না। গভীর নিশীথে সেই নিদ্রিত অতিথিকে হত্যা ক’ত্তে গিয়ে তার মুখে তার প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলুম-হাত থেকে ছুরি খ'সে পড়লো; একটা স্নেহের উন্মাদনায় আমার অস্তিত্ব হারিয়ে গেল। শেষে তাকে জাগিয়ে তার পায়ে ধরে ক্ষমা ভিক্ষা করে আমার কৃতপাপের প্রায়শ্চিত্ত কল্পন। এই অপরাধে, তাের পিতা কর্তৃক আজ আমরা বর্জিত। চিত্রা। বাবা, বাবা! এই সামান্য কারণে নিষ্ঠুর ভাবে আমাদের বিসর্জন দিলে ! ( হঠাৎ ঝােপের দিকে চাহিয়) ও কিসের শব্দ হচ্ছে } (দ্যদ্বয়ের প্রবেশ ।) চিত্রা। মা, মা ! (সভয়ে মায়ের বুকে মুখ লুকাইল। ১ম দক্ষ। দে বেটা দে, কি আছে দে। হাসি।' (সত্রাসে) আমরা বড় দুঃখী বাবা! আমাদের কিছু নেই। ২ গ্য। বটে, হাতে ঐ সােনার নােয় রয়েছে না? ১ম দশ। তাইত রে, দে মাগী দে-নইলে এই- : (লগুড় গ্রন।)

মাধবাচাৰ্য্য
[ তৃতীয় অঙ্ক
হাসি। ওগো, তােমাদের পায়ে ধরি। আমার প্রাণ নাও,
'এই এয়াে তীর লক্ষণ মুছোন।
২য় দস্য। ওরে, ভাল কথায় হবে না। তবে রে মাগী ।
{ মারিতে উদ্যত।)
হাসি। তাই হােক! মাথার সিন্দুর, হাতের দােয়া নিয়ে মরব।
চিত্রা। ওগো, আমার মাকে মের’না~-মাকে মের’না !
(বেগে ছুরিকা হন্তে আলুলায়িতা কেশে কাঞ্চনের প্রবেশ।)
কাঞ্চন। সাবধান, দুৰ্বত্তগণ ! ( উভয়ের মধ্যস্থলে দাড়াইল।).
১ম দস্য। এ আবার কোত্থেকে এলরে ? ধন্য সাহস বটে!
২ দস্য। শুধু তাই নয়- খাপসুরৎও বটে।
১ম দস্য। এক কাজ করা যাক আয় ! তুই ঐ--বাচ্ছাসমেত
খাড়িটাকে, ঐ জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে গিয়ে সাফ করে দে ; আর আমি
এই ফুলমণিকে—সর্দারের ভােগের জন্য -( ইঙ্গিত করিয়া) বুঝলি !
( কাঞ্চনের হস্তধারণে উদ্যত।)
কাঞ্চন। মৃত্যু পণ - আমায় হত্যা কর।
( উভয় দ্য কাঞ্চনকে আক্রমণ করিল, বেগে সর্দারের প্রবেশ }}
সর্দার। ক্ষান্ত হ’ পাষণ্ডগণ! তােরা দ্য বটে কিন্তু মানুষ।
তবে এ রাক্ষসপ্রবৃত্তি কেন? তােরা কি শক্তির উপাসক ? শক্তি-
রূপিণী রমণীর অসম্মান কয়ে-শক্তিময়ীকে তুষ্ট কবি, না তোদের
ব্যবসা চলবে।
{ সকলে স্তম্ভিত হইয়া কাঞ্চনের জ্যোতির্ময়ীমূর্তি দেখিতে লাগিল।

তৃতীয় দৃশ্য।
মাধবাচার্য
সা। দেখ দেখি পাষণ্ডেরা, ভাল করে চেয়ে দেখ ! সেই দিব্য
জ্যোতি, সেই স্নিগ্ধ দৃষ্টি -সেই চরণ চুম্বি কেশদাম ; ওরে!
আর কালীমায়ে কোন পার্থক্য নেই। নে, নে, চরণে লুটিয়ে পড়।
এ মায়ে
( সকলে কাঞ্চনকে প্রণাম করিল
কাঞ্চন। কে বাবা, দর বেশে দেবতা ! ধৰ্ম্মে মতি হোক।
সর্দার। মা! আজ হতে দস্যুবৃত্তি ছাড়লুম। যে কর্মে মায়ের
মৰ্য্যাদা নষ্ট করে-সদা উৎকণ্ঠায় বুকের উপর পাথর চাপিয়ে রাখে, যে
কর্মে তিলমাত্র তৃপ্তি নেই—সেই কর্মের আজ অবসান হলো।
দ্যদ্বয়। আজ হ’তে আমরাও দস্যুবৃত্তি ছাড়লুম।
সর্দার। চল, ভাই ! গতর খাটিয়ে খাব - চাষ করব -বুকের
বােঝা হালকা হয়ে যাবে।
[ দগণের প্রস্থান।
কাঞ্চন। আর ভয় নাই-এস মা! নিকটেই গ্রাম।
[ সকলের প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য।
মন্ত্রণা গৃহ।
(পুষ্পাদিত্য, মদনমােহন সাতকড়ি, মেঘনাদ ও কবিতাকুমার।)
পুষ্পা। চিণ্ডিত হবেন না ! চতুর্দিকে অনুচর পাঠিয়েচি, আপনার
কন্যার সন্ধান অচিরেই পাবেন।

মাধবাচার্য্য
| তৃতীয় অঙ্ক
মদ। মহারাজ! মাকে আমার পেলে, আমি সব ক'ৰ্ত্তে প্রস্তুত।
পুষ্পা। গহিত কিছুই কৰ্ত্তে হবে না। দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত আপনি,
এমন ভাবে মাধবের কৃত বৈদিক ভাষ্য দলিত করে বৌদ্ধদর্শনের
মীমাংসা সূত্র লিখে দিন, যাতে নির্বিচারে সকলেই বৌদ্ধধর্মে আকৃষ্ট
এতে আপনার যশঃকীৰ্ত্তি দিগন্তে ছড়িয়ে পড়বে।
সাত। এবার বামুন বেটাদের ক'কে পােড়র ছাপ নিয়ে,
অৰ্দ্ধচন্দ্র খেয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে।
মেঘ। পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, ভাগ্যে আমাদের সহিত
সাক্ষাৎ হ’লতাই এই সুবর্ণ সুযােগ পেলেন। এখন আপনি এই
অর্ধ পৃথিবীশ্বরের সভাপতি।
কবি। এখন ইচ্ছামত কবিতার ভেষন চড়ান, দেখবেন—দলে
ফলে খরিদ্দার এসে কাড়াকাড়ি করবে।
মদন। মহারাজের অনুগ্রহ ভিক্ষা কত্তে আসিনি। আমি দীন
কবি, সাধ্যমত-রাজসেবা করব।
পুষ্প। জানি আমি আপনি উদার! ভাগ্যবলে আপনাকে পেয়েছি
-আমিও সাধ্যমত আপনার তুষ্টি সাধনে যত্নবান হ’ব।
কবি। আহা হা-এমন রাজা কি আর হবে !
মেঘা। দেবতা, দেবতা, পাতকী তাতে ধরায় নেমেছেন।
ত। বুদ্ধ হে! আলােক দেখাও'আকে দেখাও।

তুতীয় দৃশ্য।
মাধবাচার্য্য
মদন। আবার ক্ষীণ দেহে জীবনীশক্তি ফিরে আসছে। একটা
তীব্র আলো দেখতে পাচ্চি। রাজা, রাজা! এ আমায় কোথায় নিয়ে
এলে। ভীষণ প্রতিদ্বন্দিতার ক্ষেত্রে—আবার আগুণ জ্বলিয়ে দিলে ।
দেখি, কার সাধ্য এ অনল নেভায় !
[ প্রস্থান।
সাত। মহারাজ ! এইবার শত্রুর সহিত প্রতিযােগিতা হবে
ভাল।
পুষ্পা। মার্কণ্ডের পরমায়ুনিয়ে সে জন্মেছে। তার মৃত্যুর জন্য
যখন যে উপায় অবলম্বন করেছি—সব ব্যর্থ হয়ে গেছে। আজ
সে বেদান্ত প্রচারে সম্রাট হ'তেও ক্ষমতাবান~-শঙ্কর হ'তেও মেধাবী
দেবতা হ'তেও সম্মানিত।
কবি। আজ্ঞে, মহারাজ! সে একটা শত্রুর মত শক্ত। বার
জন্য আজ আমি পত্নী থাকতে দারুণ বৈধব্য-যন্ত্রনা ভােগ ক’চ্চি।
পুষ্প। কবিবর! আপনার কবিনাম সার্থক। এতদিনে
বুঝেছি -- আপনি শুধু কথার মালা গাঁথেন না, আপনার মধ্যেও প্রাণ
আছে ; ধন্য আপনার প্রভুভক্তি!
।
সাত। কবি-সম্রাট ! আপনি মঠে নাম লেখান। সেখানে
পরদুঃখকাতর স্বার্থহীন ভিক্ষুণী গণের উদাত্তসঙ্গীত একবার শুনলে,
আপনার আর কোন অভাব থাকবে না।
মেঘ। আহা, বুদ্ধ হে! তুমিই সত্য-~-
তুমিই সত্য---তুমিই সত্য।

মাধবাচাৰ্য্য [ তৃতীয় অঙ্ক ( বাণভট্টমের প্রবেশ। সকলে। আসুন, আসুন । বাণ। বড়ই আনন্দের সংবাদ মহারাজ ! মাধব এখন মালাবার হতে রামেশ্বরের দিকে যাত্রা করেছে। সেখান হতে ফিরে এসেই আগত-দোল পূর্ণিমায় সদল বলে ধর্ম প্রচারের জন্য--সমুদ্রপথে দ্বারকা- ধামে গমন করবে। অষ্টশততরণী সুসজ্জিত করবার জন্য তার প্রধান শিষ্য সামন্তরাজ, ইতিমধ্যেই আদেশ দিয়েছেন। পুষ্পা। এ মহা সুযােগ। বলুন। আমার কি ক'ত্তে হবে ? তাতে আমার সমস্ত শক্তি নিয়ােগ করব। বাণ। প্রস্তুত হও রাজা ! চারি সহ সৈন্যকে বৌদ্ধ ভিক্ষু সাজিয়ে-দুই সহস্র তরণী সংযােগে আমরাও ঐ পথে যাত্রা করব। তারপর সুযােগ মত- সাত। ভগবান বুদ্ধ হে! এতদিনে মুখ তুলে চাইলে প্রভু! পুষ্পা। একের জন্য অনেক গুলির প্রাণ নষ্ট হবে। হােক। রাজার সহিত প্ৰজার প্রতিদ্বন্দীর এইরূপ সমুচিত ফল অবধারিত। তবে- বাণ। ভাববার সময় নাই রাজা ! আমাদের সব যে যায়। সময় থাকতে বৃক্ষের জট না মারতে পাল্লে আবার সে পূর্ণ তেজে বর্ধিত হবে। গােদাবরীতট হতে গঙ্গাতীর, আসমুদ্র হিমাচল, মাধবের আজ্ঞাধীন নয় এমন দেশ কোথায় ? ঐ শােন, ভিক্ষুগণের মর্মান্তিক আৰ্তনাদ--ঐ দেখ গগনভেদী বৌদ্ধমন্দিরের চুড়া, আজ ব্রাহ্মণগণের বিজয়পাকায় পরিশােভিত। দেখতে দেখতে-গগনের কোলে ঘন

চতুর্থ দৃশ্য )
মাধবাচার্য্য
১১
ঘাের ঘটায় অন্ধকার হয়ে এল—আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। মুহুর্মুহু
বজ্ৰ পতনের শব্দ –উল্কার বিচ্ছুরণ – মেদিনীকে আলােড়িত কচ্চে। যদি
রাজ্য বাঁচাতে চাও-বৌদ্ধধৰ্ম্মকে তার শীর্ষে বসাতে চাও- পিশাচের
অট্টহাসি দেখে ভয় পেয়ােনা; এগিয়ে চল’-- এগিয়ে চল! ঐ বিদ্যুৎ
প্রবাহ আমাদের পথ দেখাচ্ছে।
পুষ্প। দাস সর্বদাই প্রস্তুত।
পথ দেখিয়ে চলুন প্রভু ! পথ
দেখিয়ে চলুন।
মেঘা। বুদ্ধ হে! সকলি তােমারি ইচ্ছা।
( সকলের প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য।
নির্জন কারাগার।
সনাতন।
সনা। নির্জন কারাগৃহ ! চতুর্দিকে সূচিভেদ্য অন্ধকার, তার
মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে – ভীষণ দৈত্যের মত প্রস্তরের বিস্তৃত প্রাচীর।
জনমানবের সাড়া নেই। কোলাহলমুখরিত জগতের একটা ক্ষীণ
স্বরও কর্ণে প্রবেশ করে না। পবনের গতি পর্যন্ত রুদ্ধ। কৃত্রিম
উপায়ে শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ে আর কতদিন বাচবাে ! না, না, আমার বাঁচা
হবে না। যে জাতি কষ্টসহিষ্ণু নয়, যাদের একাগ্রতা সাধনা নেই
যারা ম’রতে এত ভয় পায়, তাদের মৃত্যুই মঙ্গল। জগদীশ্বর এই করে
যেন আমার মৃত্যুর পর এই জীর্ণকঙ্কাল দিয়ে-মহামতি দধীচির অস্থি

মাধবাচাৰ্য্য
[ তৃতীয় অঙ্ক
ন্যায় দৈত্যনাশী বজ্রের উৎপত্তি হয় ; আর সেই বজ্ৰ ---পরাধীন জাতির
জীবন্মুক্তির নেতা-জগদ্গুরু মাধবাচার্যের নিকট সাদরে নীত হয়।
( কারাগৃহের একটা ক্ষুদ্র ছিদ্রপথে ভীলরমণীর বেশে
ধনুব্বাণ হস্তে কাঞ্চনের প্রবেশ।)
সনা। ( শুম্ভিতভাবে } এ কি, কে তুমি ! মানবী না দেবী ?
কাঞ্চন। দুদিনের ব্যবধানে এত বিস্মরণ ! দেবী নয় সেবিকা।
সনা। কে, কাঞ্চন ! এখানে
• এ বেশে ?
কাঞ্চন। জগদীশ্বরের অভিপ্রায় ! অজি তােমার মুক্তির দিন।
চল বীর -- প্রস্তুত হও।
ক্ষণিক চাঞ্চল্যে
সনা। প্রগলভতা পরিত্যাগ কর নারী!
সিংহবিবরে প্রবেশ ক'রেছ জান কি ?
কাঞ্চন। সিংহীর সিংহ-বিবরেই বাস।
সনা। বাক্যের অবসর নাই। যাও কাঞ্চন! যে পথে এসেছ
ফিরে যাও।
চল, তােমার সাহায্য করি।
কাঞ্চন। যদি ফিরতে হয়
দুজনে, যদি মরতে হয়--এক
শয্যায়।
সনা। কঠোর রহস্য । করে ধরি, স্থান পরিতাগ কর।
কাঞ্চন। পরিণাম ভেবেচ বীর ! পশুর মত তোমায় হত্যা
না। মৃত্যু ব্ৰহ্ম! জন্মের সহিত মৃত্যুর সন্মিলন।

চতুর্থ দৃশ্য ।
মাধবাচার্য্য
কাঞ্চন। কাজ সমাপ্তি কর বীর। সারা বিশ্বে কীৰ্ত্তিকেতন
তুলে দিয়ে ম’রবার মত মর। সে মৃত্যু দেবতাবাঞ্ছিত - এ মৃত্যু
ভীরুতাজনিত জড়ের পরিণাম। সে মৃত্যু--অমর, এ মৃত্যু নয়নজল
সিক্ত তুচ্ছ বুদ্বুদ মাত্র। এই দুর্দিনে মাঙ্গোলােরের একটা মাত্র সন্তান
জীবিত থাকূলে, জানবে-মাঙ্গোলাের লক্ষ সন্তানের জননী।
সনা। কিন্তু তােমায় রক্ষা করবো কি করে কাঞ্চন ?
কাঞ্চন। বনপথে-ভীল দর নিকট আমি শর যােজন। শিক্ষা
করেচি। এই ধনুর্বাণ আমার সহায়।
সনা। আর নয়, চল কাঞ্চন ! যা হবার হোক।
( পূর্বোক্ত ছিদ্রপথে উভয়ে বাহির হইল-~-
জনৈক কাব্রারক্ষীর প্রবেশ।)
কারা-র। বন্দী পালায়, বন্দী পালায়।
(বংশীতে ফুৎকার করিতে উদ্যত-সনাতন তাহার হস্ত
হইতে কীরিচ কাড়িয়া লইল।)
সনা। মৃত্যুকে ডেকে এন না!
কাঞ্চন। দেখছ এই তীর
কারা-র। কি ভয় দেখাও নারী! এস, তােমার নারীচপাতা
দুর করি।
( অসি নিষ্কাসন।)

মাধবাচার্য্য
[ তৃতীয় আৰু
সন। আত্মরক্ষা কর।
( কীরিচ নিক্ষেপে উদ্যত।)
(বেগে চার প্রবেশ।)
চন্দ্রা। রাজ্ঞীর আজ্ঞা ! বন্দীকে মুক্তি দাও।
কাৱা-র। তা হয় না মা !
চন্দ্রা। দায়ী আমি! আদেশ লঙ্ঘন কোর’না।
কান্না-র।
সম্রাটের আজ্ঞা।
চন্দ্রা। কি, কুকুরের এতদূর স্পর্ধা! কে আছ শী যাও,
কেল্লার পথে আমার সুসজ্জিত সৈন্যদের নিয়ে এস ! কেউ যেন এই
বন্দীকে বাধা দিতে না পারে।
কারা-র।
আমিও সম্রাটকে সংবাদ দিইগে।
চন্দ্রা। যাও বাবা, যাও মা! এই পথে চলে যাও।
সনা। মা ! তুমি সম্রাজ্ঞীর মত সম্রাজ্ঞী। সম্রাট আমাদের
প্রচণ্ড অনল – আর পশ্চাতে তুমি তার অন্তঃশীলা ফন্তু।
কাঞ্চন। হাতের নােয়, সিথীর সিন্দুর তােমার অক্ষয় হােক।
তবে বিদায় হই মা ! আবার সাক্ষাৎ হবে।
( উভয়ে প্রস্থান করিল-চন্দ্রা নির্নিমেষ নয়নে চাহিয়া রহিল।)

পঞ্চম দৃশ্য ।
মাধবাচাৰ্য
পঞ্চম, দৃশ্য।
হিমালয় গিরিসঙ্কটস্থ পথ ।
( অদূরে কখলের সন্নিকটস্থ বদরীনারায়ণের পথ
দৃষ্ট হইতেছিল। পথিপাৰ্থে মৃত্যুশয্যায়
শায়িত আনন্দময়ী।
আনন্দ। বাবা, বদরীনারায়ণ ! একি কল্লে বাবা ? হৃতন্ত্রী
স্নেহের আঘাতে বিহ্বল করে দিয়ে, বহুদূর হতে তােমার পাদমূলে
টেনে এনে-সব আশা নিম্মুল ক'লে ? উঃ, বুক যে ভেঙ্গে যায়
বাবা! এমন কালব্যাধি দিলে, যে তােমার শ্রীমন্দির অবধি পৌছুতে
পারলুম না। নিঃস্ব আমি পরপারের যাত্রী। খেয়ার অপেক্ষায়
বৈতরিণীর তীরে সমাসীনা, আমায় দয়া কর বাবা! ঐ বেলা ডুবে
যাচ্চে এ সময় আমার মাধবকে একবার এনে দাও! (যন্ত্রণার
কাতর হইয়া) বাবা, মাধবরে ! আর বুঝি দেখা হলাে না।
( অদূরে মাধবাচাৰ্য ব্রাহ্মণগণ সমভিব্যাহারে
প্রবেশ করিলেন।)
মাধব। আমার বুকের ভিতর এমন ক'চে কেন ? অখি-
পল্লব বাষ্পে পরিপূর্ণ হয়েছে-প্রাণ কেঁদে কেঁদে উঠছে-কি যেন
হাৱাই হারাই ; এক অনাহুত বেদনার সুর—এই পথে যাবার জন্য আমায়
আকর্ষণ কচ্চে। জগদীশ্বর ! এ আবার কোন পরীক্ষা প্রভু ?
পাত। ঐ কে একজন পতিত রয়েছে নয়—যেন মুম্ষুবলে
বােধ হচ্চে।

মাধবাচাৰ্য্য
[ তৃতীয় অঙ্ক
মাধব। নিশ্চয় কোন বিপন্নযাত্রী। আসুন, আসুন ব্রাহ্মণগণ !
(সকলে ত্বরিত গতিতে অগ্রসর হইয়া আনন্দময়ীর সম্মুখীন
হইল ও তাহার পরিচর্যায় নিযুক্ত হইল।
মাধব। একি, মা!
মা, মা, এখানে কেন মা?
আনন্দ। (চক্ষুরুন্মীলন করিয়া) কে রে, আমার মাধব এলি ?
আয় বাবা! আমার বুকের কলজে, আমার স্বর্গের সােপান, তোকে
দেখতে দেখতে শেষচক্ষু মুদ্রিত করি।
মাধব। ধুলিশয্যায় এ দুরবস্থায় কেন মা? তুমি কি তার্থে
এসেছিলে? সঙ্গে ত’ কাকে দেখছি না?
পাত। ভ্রাতৃগণ। আজ আমরা গুরুর গুরুর দর্শন পেয়েছি।
উনি জীবনে সন্দিহান। এস, আমরা শুষ্ক কাষ্ঠ আহরণ করে এনে,
এই তুষারসম্পাত হতে রােগিণীকে রক্ষা করি।
(সকলে নানা চেষ্টায় রােগিণীর সেবা করিতে লাগিল।)
আনন্দ। স্বামীর ভিটে ছেড়ে তীর্থে আসব’ কেন বাবা ? তার
চেয়ে পবিত্র, পুণ্যময় ভূমি ভূ-ভারতে কোথায় ? এত দূরে আমার
আসা কেন জানিস, সে কেবল তাের চাদমুখখানি দেখতে। সঙ্গে
অনেকে এসেছিল, পথিমধ্যে কালব্যাধিতে আক্রান্ত হলুম ; অসময়
বুঝে আমায় ফেলে তারা তীর্থে চলে গেল।
মাধব। মা, সন্তানকে ত’ স্মরণ ক'ল্লেই পারতে। রুগ্নশরীর
নয়ে এতদূরে এসেচ কেন ?

পঞ্চম ] মাধবাচার্য্য আনন্দ। ব্রহ্মচারীর যে গৃহে ফিরতে নেই বাবা মা কি সে নিয়ম ভঙ্গ করাবে? তাের কীর্তিগাথায় যখন সারা ভারত মুখৰিত, হ’ল, যখন শুনলুম ব্রাহ্মণ্যধৰ্ম্ম উদ্ধার করে সহস্ৰ শিষ্য নিয়ে তুই এই বদরীর পথে এসেচিস,আর আমি রুদ্ধ আবেগ চেপে রাখতে পারলুম না--ঘর হতে বেেিয় পড়লুম। বাবা! তােকে গর্ভে ধ'রে আজ আমি মায়ের মত মা। মাধব। মা, মা! দেবতা হ'তেও শ্রেষ্ঠ তুমি। তােমার দর্শনে ব্ৰত আমাৰ ভঙ্গ হত না, কবিতকাঞ্চনে পরিণত হত। গর্ভধারিণী যেখানে থাকেন-- সেই স্থান মাত্রেই বারাণসা। সে স্থানের আগাছাও তুলসী বৃক্ষ-কুপপাদক হ'লেও গঙ্গাবারি। বড় দুঃখ মা! প্রথম হ'তে তােমার সেবা করতে পেলেন না। আনন্দ। মায়ের শেষ আশীৰ্বাদ ধর বাবা! ধর্মের ভিত্তি প্রেমের অশ্রুতে ভিজিয়ে-জগতের মধ্যে একটা জাতির মত জাতি গঠিত কর। যে জাতি বুকের রক্তে অভিষিক্ত করে বিশ্ববাসীকে নিস্পৃহতার প্লাবনে সুশীতল কবে; লক্ষ আগ্নেয়গিরির অগ্নৎপাতে তারা বুক পেতে দেবে -তবু স্বর্গের গণ্ডি ছাড়বে না। ব্রা-গণ। মা, মা! তােমায় পেয়ে হারালাম। (ক্রন্দন ) অনিন। কেঁদ না বৎসগণ! তােমরা আমাকে হারাবার সঙ্গে সঙ্গে শক্তিরূপিণী দেশ জননীকে চিনে নাও। আশীর্বাদ করি, মায়ের ছেলে হ'য়ে মায়ের মর্যাদা রক্ষা কর। মাধব। দেখতে দেখতে মায়ের আঁখিপদ্ম মুদ্রিত হয়ে আসছে।

মাধবাচাৰ্য্য
{ তৃতীয় অ
মা, মা ! যার নাম করে গৃহ হ'তে বেরিয়েছ, সেই বদরীনারায়ণকে
দেখতে কি ইচ্ছা হয় না ?
আনন্দ। আমার ইষ্টদেব স্বামীনারায়ণ, অনন্তরূপে রূপান্তরিত
হয়ে প্রতি মুহুর্তে সে সাধ আমার পূর্ণ করচেন। সে রূপ-সাগরে
একবার ডুবলে—আর উঠা যায় না। ঐ শােন, অনন্তবারিধির
মহাসঙ্কীৰ্ত্তন রােল, ঐ দেখ উত্তাল তরঙ্গে তাদের আনন্দ নৃত্যন।
আর ঐ নীল জলে নাচতে নাচতে ভেসে আসছে একখানি সােণার
তরুণী। তার নাকি কে চিনতে পেরেচিস? তোর পিতা, আমার
ভবপারের কাণ্ডারী। ( প্রণাম করিল) বাবা! তবে যদি পারিস
পৃথিবীর সপ্ততীর্থ এইস্থানে আহবান কর। পাপীতাপী জরাজীকে
আর তীর্থ ফলের জন্য কোথাও ছুটতে হবে না, মহাতীর্থ এই হিমালয়
পরিণত হাে’ক—আর সেই সপ্ততীর্থের, জলে যেন আমার মৃতদেহ
অভিষিক্ত করে, অনন্তের পথে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
(মাধবাচাৰ্য যােগাসনে বসিয়া সগুনীকে আহ্বান
করিতে লাগিলেন।)
স্বাগতঃ মা সরস্বতী, সিন্ধু, কাবেরী
গয়া, গঙ্গা, গােদাবরী, নর্মদা, যমুনে,
আবিভূত ভবঃ ।
বিশ্বজননী তােমরা গো দেবী
পৰ্বতদুহিতা শক্তিঅংশভূতা !
মানবের পরিত্রাণ আশে-
শ্রোতস্বতী প্রাণময়ী পবিত্ৰসলিলা,

পঞ্চম দৃষ্ণ।
মাধবাচাৰ্য্য
যুগে যুগে নন্দিত করিছ বিশ্ব।
আদি কাল হতে বক্ষে পরি অতীতের স্মৃতি
কীৰ্ত্তি গাথা গাহি কলম্বনে,
প্রচারিছ পুণের মহিমা।
জনমিয়া ও মহান্ তীরে-
থাকিয়া
সুদূরে
কিংবা শ্রবণে কীর্তনে নাম
অকৃতি মানব কত দেবত্ব লভিল।
বিকশিল ঐ কুলে গােলক বিহারি—
ধরাভার নাশিবার হেতু
অপূৰ্ব্ব মানুষী লীলা।
কোটিকল্প তপস্যায় যােগীন্দ্র গিরীশ,
ধরি নতশিরে স্বর্ণমুক্ত ঐ বেগধারা
অমরত্ব করিলেন লাভ ।
হরিপ্ৰেম বিলাসিনী
সুখদা মােক্ষদা অয়ি !
রোগ শােক পাপ তাপ হরা।
ঋদ্ধি, সিদ্ধিদাত্রী,
যাগযজ্ঞ ক্রিয়ামাঝে শুদ্ধা সনাতনী,
শত শত প্রণমি মা তােমাদের পায়।
উপায় বিহীন নিঃস্ব দীন -
কাঙাল সন্তান আমি,
নাহি জানি ভকতি মিনতি।
আকিঞ্চন অতি -

মাধবাচাৰ্য
তৃতীয় অ
তোমাদের একত্র মিলন !
মাতৃ আশা করগো পূরণ,
প্রকাশিয়া স্ব, স্ব রূপে।
(হরিদ্বারের উত্তরে-সূৰ্য্যকুণ্ড সন্নিকটস্থ গিরিক ভেদ করিয়া
অকস্মাৎ সপ্তনদী প্রবাহিত হইল।
আনন। কি শান্তি, কি শান্তি, গঙ্গা-নারায়ণ -ব্রহ্ম। মৃত্যু)
( দেখিতে দেখিতে সপ্ত স্রোত ধারায় আনন্দময়ীর দেহ
ভাসাইয়া লইয়া গেল।)
মাধব। গঙ্গা, নারায়ণ ব্রহ্ম !
ব্রা-গণ। (সুরে)
নবনীরদ বরণ ধ্যেয় পয়ং।
মধুদানবদারণ দেববরং।
কেশীকংসারি কেশব কল্পতরু।
অনাদি অনন্তনাথ আদিগুরুং।
যুগমায়ক নাগর বেশৰুচিং।
রসময় রমাপতি সর্বশুচিং।
বৃন্দাবিপিনচারী সচ্চিদানন্দং।
ভবপারতরণী- পদারবৃন্দং ।
( সকলে প্রণাম করিল।)

চতুর্থ অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
(কাগামী সুসজ্জিত অষ্টশত তরুণী ভাসমান, প্রথম তরণিপরি
মাধবাচাৰ্য্য, সনাতন, যক্ষশীলা, কাঞ্চন ও
ব্রাহ্মণগণ ইত্যাদি উপবিষ্ট।)
(গীত)
ঐ ভেসে আসে করমের বশে গভীর জলধিগান।
কে আছ যাত্রী, কে আছ কৰ্ম্মি, এস এস মাতমন।
নাহি আর বেলা কো’রনাক হেলা বহে যায় পারের ভেলা
করি নয়ন বন্ধ সাজিয়া অন্ধ তবু করিছ অলস খেলা,
বিলাস ব্যসন করিয়া বর্জন হও পরিচিত পথে আগুয়ান ।
এই সাগরে জনাম সােনার ভারত করমের স্তরে হইল উর্বর
হেথা রতন লভিতে ডুবিয়া মরিতে শঙ্কা সরন কিসের আর,
বােধনের শিখা ঐ দুরে যায় দেখা জ্বলিছে উজ্জল করিছে আহ্বান।
(পশ্চাৎ দিক হইতে অসংখ্য রাজতরণী ভাসিয়া আসিল। সম্মুখস্থ তরী
মধ্যে পুষ্পদিত্য, বাণভট্ট, মদনমােহন ইত্যাদি উপবিষ্ট ও
অন্যান্য নৌকায় বৌদ্ধ ভিক্ষুকবেশে সৈন্যগণ প্রচ্ছন্ন
কামান ইত্যাদি অস্ত্র শস্ত্র সজ্জিত করিয়া
সুযােগ অপেক্ষা করিতেছিল।
সকলে। জন্ধ, ভগবান বুদ্ধদেবের জয়।

মাধবাচার্য্য [ চতুর্থ অঙ্ক মন। সবার আগে আমিই কাৰ্য্য সমাধা করূবে। মাধব, আধৰ। এই আগ্নেয় অস্ত্রের মুখে আত্ম রক্ষা কর। (মাধবকে লক্ষ্য করিয়া গুলি করিল তাহা নিস্ফল হইল –পুনঃ গুলি করিতে উত।} সনা। ( সমস্ত ঘটনা লক্ষ করিয়া মুহুর্তে মাধবকে বেষ্টন পূর্বক) দাদা, দাদা! ( তমুহুর্তে একটা গুলি আসিয়। সনাতনের পৃষ্ঠদেশে প্রবেশ করিল।) মাধব। (মাধবাচাৰ্য্য তরঙ্গলীলা দর্শনে তন্ময় ছিলেন --সচকিতে ) ভাই, ভাই! একি হল! নারায়ণ, নারায়ণ ! ভাইকে আমার রক্ষা ( মাধব সনাতনকে বক্ষে জড়াইয়া ধরিল-যক্ষশীল। মুক্তমধ্যে অস্ত্রোপচার পূর্বক গুলি বাহির করিয়া দিল ও অন্যান্য সকলে সনাতনের পরিচর্যা করিতে লাগিল। যক্ষ। ঐ অসংখ্য রাজতরণী --আমরা শত্রু কর্তৃক পরিবেষ্টিত। পুষ্পা। কামান দাগা, কামান দাগগা,-এক মুহুর্তে সৰুশেষ করে দাও। (তদ্দওেই উভয় তরণীর মধ্যস্থলে ভীষণ বাড়বানল প্রজ্জ্বলিত হইল ও প্রবল ঝড়ে সমুদ্রের বক্ষ আলােড়িত হইতে লাগিল।) মাধব। (সম্মুস্থ ব্ৰহ্মাগ্নি দর্শনে) হে ব্ৰহ্ম রােষানল, হে মহারুদ্র। সপ্ত সমুদ্রের বারিতে তােমার নির্ধাণত্ব নেই। তুমি অক্ষয় অনন্ত- শক্তিম। তােমার গগনস্পশি লেলিহানজিহ্বা, বিশ্বের কালিম। মুছিয়ে দেয়। তােমার দাহিকাশক্তি বুকে ধরে সমুদ্র গল্পে স্কীত -

আধাচার্য
প্রলয়ঙ্কৰি শক্তির আধার। হে সৰ্ব্বভুক, হে পবিত্রতম! দাসের
প্রণাম গ্রহণ করুন।
(সকলে প্রণাম করিল।
(দেখিতে দেখিতে অনল সমস্ত রাজতরণী, বেষ্টন করিল। পদগ্ধ
ও তরঙ্গের ঘাত প্রতিঘাতে বিক্ষিপ্ত নিমজ্জমান তরণী
হইতে গভীর আর্তনাদ কত হইতে লাগিল।
.
পু। প্রাণ যায়~~ রক্ষা করুন, রক্ষা করুন।
মাধব। হে অনল! আমি জীবনাহুতি দিচ্ছি, আমাদের রাজাকে
যক্ষা করুন, রাজাকে রক্ষা করুন! সমুদ্র, স্থির ভক। ও শান্তি,
ওঁ শান্তি, ও শান্তি।
(অনল নিৰ্বাপিত হইল -সমুদ্ৰ স্থির নিস্তব্ধ। মাধৰাচাৰ্য ও ব্রাহ্মণগণ
সকলে বিপৰ্যন্ত, মুচ্ছিত রাজা ও তাহার অনুচরবর্গকে উদ্ধার
করিয়া কুলে প্রত্যাগত হইলেন।
পুষ্পা। (চেতনা প্রাপ্তে) মহাত্মন্! আপনাকে চিনয়েও চিনতে
পারিনি, শ্রীচরণে শত অপরাধী আমি! মহাপাপী কৃতঘ্ন চণ্ডালকে
নিজগুণে মার্জনা করুন। (পদে পতিত হইল।
মাধব। নৃপবর! আপনি দোষী নন্। সমস্তই বিধির ইচ্ছা,
আর অভাগিনী ভারতের অদৃষ্টলিপি। আবার আপনি রাজার মত
রাজা হন। রক্ষক হীনা দীনা ভারতমাতাকে বাঁচান।
যক্ষ। আমায় মার্জনা করুন পিতা।
পুষ্প। আজ বাবা, বক্ষে আয়! আজ, কে কার নিকট মার্জন
চাইৰে ~ আমায় বুঝিয়ে দে।

মাথাচাৰ্য্য t চতুর্থ অফ (বক্ষকে বক্ষে ধরিলেন।) কান। বাবা মাখব ! লজ্জায় ঘৃণায় আমার বাকশক্তি লােপ পেয়েছে। আমি আর কোন সাহসে তাের নিকট মার্জনা চাইব। তোর বৃদ্ধ মদন খুড়োকে দে বাবা-কি শান্তি দিবি দে! মাধব। হে ভুদেব ব্রাহ্মণ ! একি বলচেন ? আপনার ক্রোধ নলে শান্তির উৎস ছুটে এসেছে, আপনার বিদ্বেষবিষে স্বর্গের সুধা উঠেছে। আপনি ভুল করেন নাই ! প্রতিযােগিতায় প্রতিদ্বন্দীকে দাড় করাতে, শরীরের সমস্ত শক্তি নিংড়ে এমন ভাবে ঠিক দিয়েছেন- আজ সাধনায় বিশ্ববাসীগণ অধ্যবসায়ের পথে-যার সামান্য একটু সুত্রও সাজাতে পারে না। মহামুনি দুর্বাসা, শ্রীকৃষ্ণের উপর ক্রোধ প্রকাশ করেছিলেন নিজের দৌর্বল্য নীচাশয়তা দেখবার জন্য নয়, শ্রীকৃষ্ণের মহিলা বিকাশের জঙ্ক। আপনার বিদ্বেষ নয়—হােলিঙ্গন। জানি না, কি দিয়ে আপনার নিকট কৃতজ্ঞতা জানাব। ( অদুরে কাঞ্চন আহতগণের শুশ্রুষা করিতেছিলেন, পিতার কণ্ঠস্বর শুনিয়া পিতৃসমীপে অগ্রসর হইলেন।) কাঞ্চন। বাবা, বাবা! মদন। মা আমার! বন্ধ পিতাকে কি এমন করে কাঁদাতে (বক্ষে টানিয়া লইলেন।) মাধব। কাঞ্চন দেশের জন্য কেঁদেছে—আর জীবনপণে মুছিয়ে নিয়েছে ব্যগ্নিতের মম্মবেদনা।

প্রথম দৃঙ্গ। গাধবাচাৰ্য্য } কাঞ্চন। বাবা! যেন জন্ম জন্ম তােমার কথা হয়ে জন্মাই। আর তােমার নিকট দৃঢ়তা, একাগ্রতা, শিক্ষা করে দেশের সেবা ক’ত্তে পারি। মাধব। অভিবাদন করি বৌদ্ধ গুরু! আশা করি, আপনি এখন সুস্থ। ; বাণ। মাধবাচাৰ্য, সাধকশ্রেষ্ঠ তুমি! ধর্ম প্রবর্তনের ঠিক পথ ধরেছ। আমি আমন চলতে চলতে-হিংসার কুম্ফটিকায় পঞ্চ ভুলে-আগ্নেয়গিরির উচ্চ শিরে উঠেছিলেম ; একবারও ভাবি নাই, তার গলিত স্রোতে নিজের অস্তিত্ব হারাতে হবে। স্থায় ধর্মের নিকট সমস্ত শক্তি পরাজিত ; তােমার নিকট এই মহাশিক্ষা পেয়ে, তোমার আদর্শ নিয়ে, আজ আমি ভারতের নিকট চিরবিদায় নিচ্ছি। এ ভারতে একমায় স্থান তোমার। এবার আমার বিদ্রোহী মনকে প্রেমের বায় ডুবিয়ে-চীন, জাপন, ইত্যাদি পাশ্চাত্যদেশে আবার বৌদ্ধধর্ম প্রচার ক’বাে। বিদায় হই রাজা! স্বধর্মে বিনাশ প্রাপ্ত হলেও পরধর্থ গ্রহণ করুন। আর পণ্ডিতজি! যাবার সময় নিয়ে যাচ্চি আপনার কৃত বৌদ্ধধর্মের শ্রেষ্ঠ সঙ্কলন--অখণ্ড যুক্তিযুক্ত এই পুস্তকা বলী। যতদিন বৌদ্ধধৰ্ম্ম থাকবে ততদিন আপনি অমর। শত শত যবাদ আপনাকে। হে সন্ন্যাসী! হিন্দুরা বৌদ্ধদ্বেী নয়। তারা ভগবানের “দশ অবতারের মধ্যে বুদ্ধদেবকে এক অবতার বলে স্থান দিয়েছেন আপনি অভিমান পরিত্যাগ করুন। পাত। ভারত, ব্রাহ্মণ-প্রধান দেশ। যতক্ষণ এই দেশে এক

মাধবাচাৰ্য
(চতুর্থ অঙ্ক
,
জন মাত্র বৈদিক ব্রাহ্মণ জীবিত থাকবেন, ততক্ষণ এর মজ্জায় মজ্জায়
সনাতন ধর্মের উষ্ণ স্রোত বইবে ।
ৰাণ। তাই ভারত-বহির্গত ম্লেচ্ছভূমি পবিত্র করবার জন্য, নব
শক্তি নিয়ে আমি ছুটে যাচ্চি। ভগবান বুদ্ধদেব আমার সহায় হন।
( প্রস্থান।
মাধব। ঐ সূৰ্য্য ডুবে যাচ্চে ; চলুন মহারাজ, চলুন ব্রাহ্মণগণ!
এই আনন্দের দিনে-আমরা রঙ্গনাথৰ্জীর মন্দিরে পবিত্র সন্ধ্যারতি
দর্শনের জন্য সমাগত হই। এস, আমার প্রাণের প্রাণ সনাতন ! বড়
যন্ত্রনা পাচ্চো-এস, তােমায় বুকে করে নিয়ে যাই ; রঙ্গধরের চরণা-
মৃত পানে তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ হবে।
( সকলের প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
কুটার সম্মুখ।
চিত্রা ও হাসি।
হাসি। হুন-সম্রাট কাকুজ আক্রমণ করেছেন। দেশ এখন
অর্থ সমর্থহীন। মহারাজ পুস্পাদিত্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেও, তাঁর
কোষাগার শূন্য। প্রজাগণ বৌদ্ধত্বের পুৰ্ব্ব সংস্কার বশে যুদ্ধ পর্যন্ত
বিস্মরণ হয়েছে। তাই জগদগুরু মাধবাচাৰ্য-এক হাতে শাস্ত্র এক হাতে
শত্র নিয়ে-দেবমন্দির রক্ষার্থে সকলকে নবশক্তিতে আহ্বান কচ্চেন।
এ সময় অর্থ চাই।' অর্থ না হলে যুদ্ধ চলবে না; রসদ যােগান চাই।
;

দ্বিতীয় দৃশ্য। মাধবাচার্য্য প্রভুর আদেশ শুনে নিঃঙ্গ দীন দরিদ্রগণ, তাদের মুখের গ্রাস বিক্রয় করে সেই অর্থ দেশের সেবায় দান কচ্চে। আমার আশ্রয়দাতাও- এই মহতি কর্মে আজ সৰ্বস্বহারা। (বালকবেশে চিত্রার প্রবেশ আমি হতভাগিনী! আমার কি আছে, কি দিয়ে দেশ রক্ষা ক'ব। চিত্রা। কিসের ভাবনা মা। আমাদের ধন রত্ন নাই বটে- কিন্তু প্রাণ আছে। অভাব আমাদের বিদ্রোহী হলেও স্বভাবের গতি নিম্ন হয়নি। তুমি আমায় বিক্রয় কর মা! হাসি। দেশকে বাঁচান চাই, কিন্তু তার পূজায় কি এই জন্ম দুঃখিনীর কলজে ছিড়ে অর্ঘ্য দিতে হবে? না, আমি তা পারবো না। চিত্রা। সন্তানের কাৰ্য্য কত্তে দাও। কে কার সন্তান মা? মেহের গণ্ডি দিয়ে আমায় বেষ্টন করে-মাতৃত্বের পাবার সঙ্কুচিত করে না। তুমি যে কোটী কোটী সন্তানের জননী। হাসি। জগদীশ্বর ! আমায় একি সমস্যায় ফেল্লে ? আমার একধারে পুত্র-একধারে দেশ। একধারে হৃদয়ের শেষ অবলম্বন- একধারে বেদনাতুর অযুত আঁখির তপ্ত অশ্রুজল। গুরুর মর্যাদা কি দিয়ে রক্ষা ক’বাে। চিত্র। একদিন বিদায় দিতেই ত’ হবে মা! নিয়তির শাসন -মৃত্যুর অলক্ষিত গতি কে রােধ ক’ত্তে পারে? তখন তােমার বুকফাটা আর্তনাদ, মমতার আবর্তন, মেহসিক্ত অশ্রুজল, আমায় ফেরাতে পারবে না।

মাধবাচাধ্য
[ চতুর্থ আৰু
'
হাসি। তাই হবে। কর্মময় জগতে কম্মের নদে জীবন ডালি
দিয়ে, মহাব্রত উদযাপন ক'ৰবা। কাঞ্চন আমায় যে পথ দেখিয়েছে,
মমতায় সে পথ পরিত্যাগ ক’বো না। যাও চিত্রা! ক্রেতাকে ডেকে
( চিত্রার প্রস্থান।
হাসি। আবার—আবার চিত্ত-দৌর্বল্যতা আসছে।
পাষানী মা। হৃদয়, কঠিন হও।
( মেঘনাদ সমভিব্যহারে চিত্রার পুনঃ প্রবেশ।
মেধা। এই নাও বাছা! একশত মােহর। বালককে আমি
জয় ক'লাম।
(মােহরের থলিয়া প্রদান ও হাসির গ্রহণ।
হাসি। এই শিশুপুত্র তােমাদের কোন্ কাজে লাগবে বাবা?
মেঘা। এই বালককে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে সন্ন্যাস দেবাে। খুব
সুখে থাকবে। তা ছাড়া স্ত্রীলােক পেলেও আমরা উচ্চমূল্যে ক্রয় কত্তে
হাসি। না, না, হয়ত তােমরা কোন কাপালিককে দ্বিগুণ
মূল্যে বালকে বিক্রয় করবে। ওগাে, আমার সন্তানকে ফিরিয়ে
দাও-এই নাও মােহর।
(মােহর প্রদানে উত)
চিত্রা। মা, মা ! কি কছ মা?
মেঘ। আর মায়া বাড়িয়ে কাজ নেই-এস বালক।

তৃতীয় দৃশ্য।
মাধবাচাৰ্য্য
হাসি। ওগো, পড়াও-দাড়াও। আর একটু দেখতে দাও।
(বালককে লইয়া মেঘনাদের প্রস্থান-হাসি অশ্রু,
ভারাক্রান্ত নয়নে চাহিয়া রহিল।)
হাসি। ভগবান! তনয়াকে আমার নিরাপদে রক্ষা করো।
[ প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য।
মাগোলােরের উপকণ্ঠে হুন সম্রাটের শিবির।
{সিংহাসনে উপবিষ্ট হন সম্রাট, মন্ত্রী ও সভাসদগণ দণ্ডায়মান,
নর্তকীগণের নৃত্য গীত চলিতেছিল।)
(গীত)
হাম হাম সখা তেমনি করে তড়িৎপয়সা।
চাও চাও বঁধু তেমনি ক'রে মদনের ফুলবাণ।
ভ্রমর যেমন ফুলের পাশে ঘুরে ঘুরে কয় কথা,
কমল বুকে ঘুমিয়ে পড়ে দূর করে দেয় প্রাণের ব্যথা,
তুমি পাশে তেমন আনি শিহরণ গাওগো প্রেমের গান।
সম্রাট। (সুরাপানান্তে বাংলার গােলাপী সরাপে কি ভরপুর
নেশা! যেন মনে হয় একটা পরীর রাজত্বে ভেসে বেড়াচ্ছি।
মন্ত্রী। দম্ ভ'রে আকণ্ঠ পানেও -এর আকাঙ্খা মেটেনা।
(জনৈক সামরিক কর্মচারির প্রবেশ।)

মাধবাচাৰ্য্য ( চতুর্থ অঙ্ক সা-কৰ্ম্ম। সম্রাট! বড় দুঃসংবাদ। শ্রীরঙ্গ পত্তনের স্বর্ণমন্দির দখল ক'তে গিয়ে, আমাদের সহস্র সৈন্স আজ প্রাণ দিয়েছে কিন্তু একখানি ইষ্টকও দখল ক’ত্তে পারেনি। সম্রাট। দূর হও গোলাম, এই সংবাদ নিয়ে এসেচ ! লজ্জা করে না? দিগ্বিজয়ী বীর তােমরা আজ অসভ্য ভীরু কাফেরের হতে পরাজিত ! মা-কর্ম। তাদের চিত্তের দৃঢ়তা-অসমসাহসিকতা–একবার দেখলে—আপনার এ ভ্রম দূরীভূত হবে। মন্ত্রী। নদীর বাঁধ একবার ভাঙ্গলে আর সুক্ষা নাই। ভষ্মা- চ্ছাদিত অগ্নি একবার প্রবল হলে সহজ চেষ্টায় নির্বাপিত হয় না। কিন্তু নিরুৎসাহ হয়ো না। আবার দ্বিগুণ উৎসাহে কৰ্ত্তব্যের মাঝে ঝাপিয়ে পড়। সম্রাট। ভারতের মধুচক্রের গন্ধে অন্ধ হয়ে সুদূরপরাহত পাশ্চাত্য হ'তে ছুটে এসেছি। সত্যই ভারত সােনার ভারত। এর মাটিতে সােনা ফলে এর গোলাভরা ধান, অনন্ত দেশের জীবনীশক্তি এনে দেয়। এ নদীতে ক্ষীর ধারা বয়-পবনের স্তরে পুঞ্জিকৃত মণি-মাণিক্যের গঞ্জিত রেণুকা ভেসে বেড়ায়। এ স্বর্গভূমি আমার চাই। মন্ত্রী। ভারতের অফুরন্ত অনন্ত ভাণ্ডার লুণ্ঠন কর। বিশাল বক্ষের হীরে জহরতের গাছ-সমুলে নিৰ্ম্মল কর। আর ফুল- ভােলা করে ভারতের বাছা বাছা নারী, আমাদের শিবিরে সন্নিবেশিত করে-বিজয় পুরস্কার রূপে-তােমাদের ক্ষুধিত, তৃষিত, অবসাদ দুরীভূত কর।

তৃতীয় দৃশ্য ) মাধবাচার্য্য সম্রাট। সত্য মন্ত্রী! ভারতের নারী, ঈশ্বরের অপূর্ব সৃজন- দেখবার মত, দুনিয়ায় অমূল্য বস্তু। ( কাঞ্চনকে লইয়া জনৈক হুণ সৈন্তের প্রবেশ।) হু-সৈন্য। (অভিবাদন পূর্বক সম্রাট ! বিদ্রোহিনী এই নারী! আলুলায়িতকুন্তলা, সমরক্ষেত্রে বিদ্যুতের মত ছুটাছুটি করে এই প্রতিহিংসার বীজ বজ্রশক্তিতে বিকীর্ণ করেছে-আজ আবার গুপ্তভাবে শিবিরে প্রবেশ করেছিল। মন্ত্রী। মহারাজ পুস্পাদিত্য, আর মন্ত্রী তার মাধবাচাৰ্য, এই যুদ্ধের নায়ক। এর মধ্যে আবার প্রচ্ছন্ননারীশক্তি দেখছি। সম্রাট। নারীর অপরাধ মার্জনীয় নয়। সম্রাট। ধন্য নারী ! দুঃসাহস তােমার! কোমল নাৰীবৃত্তি অপচয়ের এই কঠিন শাস্তি -এস, বুক পেতে গ্রহণ কর! ( তরবারি বক্ষের সম্মুথে ধরিলেন।) কাঞ্চন। ধন্ত বীর! এই গুণপনা নিয়ে এই কাপুরুষতার আশ্রয়ে, তুমি ভারতের অধীশ্বর হবে? হাঃ হাঃ হাঃ ফিরে যাও সম্রাট। নারী-শক্তির দলিত মৰ্য্যাদায় যারা সিংহাসন পাততে চায়-নারীর তর্জনী হেলনে যাদের মাথার মুকুট খসে পড়ে-ভারতের পবিত্র মসনদ তাদের জন্য নয়। নশ্বরমুখবর্জিত ভারতবাসী, তুচ্ছ সিংহাসনের মমতা ছেড়ে ধর্মের সুশীতল ছায়ায় নিদ্রিত বলে-ভারত অতর্কিত নয়। তাদের ধৰ্ম্মে হাত দিলেই–আবার তারা জেগে উঠে, নিজেদের অধিকার পূর্ণমাত্রায় বুঝে নেবে। যদি কখনও ধৰ্ম্ম সমন্বয় কত্তে শেখ,

মধৰাচাৰ্য্য
( চতুর্থ অঙ্ক
মায়ের আসনে নারীকে প্রতিষ্ঠা করে-পুত্রবৎ প্রজাপালনে সংযত
হতে পার তবে ভারতের রাজদণ্ড পাবে।
সম্রাট। কে আছ ? বন্দী কর-বন্দী কর।
কাঞ্চন। স্বেচ্ছায় বন্দী হয়ে এসেছি, তোমার সৈন্যদের সাঙ্কেতিক
নিদর্শন শিখতে। আর সংগ্রহ ক’ত্তে এই মহামূল্য “মানচিত্র ”
প্রভুত অর্থব্যয়ে তােমার প্রধান সেনাপতি যা প্রস্তুত করিয়েছিল।
কাৰ্য্য আমার শেষ—আসি সম্রাট, সাধ্য থাকে বাধা দাও (বস্ত্র মধ্য
হইতে পিস্তল বাহির করিয়া মুহূর্তে প্রস্থান করিল।)
সম্রাট। (সিংহাসন হইতে নামিয়া) পশ্চাদ্ধাবন কর, পশ্চাদ্ধাবন
( সকলে শশব্যস্তে কাঞ্চনের পশ্চাদ্ধাবন করিল।
চতুর্থ দৃশ্য।
বৌদ্ধ-সঙ্ঘ।
সাতকড়ি, মেঘনাদ, কবিতাকুমার, ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীগণ।
গীত।
পু। আমরা সবাই বুদ্ধ, আমরা সবাই বুদ্ধ ।
স্ত্রী। আমরা প্রেমের ভিক্ষুণী গাে আমাদের নাই কোন পথ রুদ্ধ।
। আমরা জানিনা কোন ছল,
কাছ খােলা আপন ভোলা নেড়া নেড়ীর দল ;

চতুর্থ দৃশ্য )
মাধবাচাৰ্য্য
স্ত্রী। আমরা মরা গাঙে উজান ছুটাই সকল কাজেই শুদ্ধ।
পু। আমরা ভ্রাতা ভগ্নী সমান জুটী,
স্ত্রী। প্রেমিকের—নাম গুণে যাই, চক্র ঘুরাই রসে ভেজা মনটি
১৯
উভয়ে । দাও তুলে দাও প্রেমের ধ্বজা এস কে দেবে প্রণয়যুদ্ধ।
[ ভিক্ষুণীগণের প্রস্থান।
মেঘা। বৌদ্ধধৰ্ম্ম চালাব আমরা। সম্বে সকলের সমান
অধিকার-এ খােদ বুদ্ধের হুকুম বাবা! রাজা এ ধৰ্ম্ম ছেড়েছে, বাণভট্ট
পঁয়তাড়া দিয়েছে, তাতে হয়েছে কি এখনও সম্রাটের সম্রাট প্রেমের
অবতার, সেতো আর মেঘা মরেনি।
কবিতা। এমন নিৰ্ম্মল ধৰ্ম্ম সবার ধাতে সইবে কেন ? কোন
দ্বিধা নেই— সঙ্কোচ নেই-অগাধ প্রেমের অবিরাম গতির বিরাম নেই,
সব নির্বিকার, সৰ নিৰ্ব্বিকার। এর উপর কেবল একটা নূতন প্রলেপ
দিলেই হবে।
মেঘ। হবে কি হয়েছে। দেখছ না, এই ধর্ম ভেঙে চুরে-
কন্ঠি বদলের সৃষ্টি করেনেড়া নেড়ীদের কেমন বৈষ্ণবের দলে
ভিড়িয়েছি। এখন যত পার নধর নধর ছেলে মেয়ে ধরে এনে দলপুষ্টি
কর-আর দেদার মজা লোট।
সাত। গত সপ্তাহে যে ফুটফুটে ছেলেটা কিনে আনা গেছে-
সে বেটাত’ কিছুতেই বাগ মানতে চায় না।
।
মেথা। মানুৰে, আনবে, ক্রমে ক্রমে মানবে। না হয় তাকে
কাপালিককে বিক্রয় করে দেবপ্রভুত অর্থ পাওয়া পাবে।

.
মাধবাচার্য্য
( চতুর্থ অঙ্ক
এর সুদ আসল আদায় করা চাই। যখন ছেলেটা ফুট
ফুটে, না জানি ছেলের জননী-
সাত। যেমন ফরসা তেমনি বাঁকা চোখ। সেই নিটোল নিখুঁত
ছবি একবার দেখলে
কবি।
;
(সুরে। এখনও তারে চোখে দেখিনি
শুধু বাঁশী শুনেছি। -তাকে আমার চাই!
সাত; বুদ্ধ হে! সকলি তােমার লীলা খেলা।
মেঘ। যত টাকা লাগে লাগুক, তাকে ঘেরাও কর। সে
সুন্দরীকে না পেলে “মঠ” মানাবে কেন ?
কবি। নিশ্চয়ই।
মেধা। ঐ ভজন আরম্ভ হয়েছে। চল, চল ! ভিক্ষুণীগণের
মধুর কীৰ্ত্তনানন্দে যােগদান করিগে।
কবি। ঐ কোকিল গানে টান পড়েছে প্রাণে প্রাণে।
জাতকুল মান ভাসিয়ে দিয়ে চল সখী কুঞ্জবনে।
সাত। বুদ্ধ হে! কি অপার মহিমা তােমার ।
( সকলের প্রস্থান।

পঞ্চম দৃষ্ণ ]
মাধবাচার্য্য
৮
পঞ্চম দৃশ্য।
এরঙ্গ পত্তনের মন্দির সম্মুখ।
কাল প্রভাত।
মাধব, পুস্পাদিত্য ও মদনমােহন শাস্ত্রী।
মাধব । ভীত হবেন না সম্রাট! শ্রীরঙ্গ পত্তনের সুবর্ণচুড়া
ধুলিসাৎ হবার নয়। ভক্ত, এক একখানি পাজরা খসিয়ে, উক্তিত্ব
উপাদান নয়নের জলে গলিয়ে-সাধনার দৃঢ়তায়—এ মন্দির গেঁথেছে।
এর মূল কোথায় জানেন - হৃদয়ের নিভৃতদেশে। একবার বুকে হাত
দিয়ে নিবিষ্টচিত্তে দেখুন
অনুভূতি পাবেন। যতক্ষণ একটা মাত্র হিন্দু
জীবিত থাকূবে ততক্ষণ শত শত প্রলয়ের ঝঞ্চা –এর অঙ্গস্পর্শ কত্তে
পাবে না।
( অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত ব্রাহ্মণগণের প্রবেশ।
১ম ব্রা। আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেচি!
মাধব। ব্রাহ্মণগণ! ভীষণ যুদ্ধ হবে। যবনরাজ তার সমস্ত
শক্তি নিয়ােগ করে আজ আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। তীরে
দাঁড়িয়ে ঢেউ গােণবার অপেক্ষা রেখনা-যাও, সমর-তরঙ্গে ঝাঁপিয়ে
পড়। সকল কর্মের অগ্রণী তােমরা—সমস্ত জাতির মধ্যে একটা
আদৰ্শকীৰ্ত্তি তুলে ধর। জয় পরাজয় তােমাদের একাগ্ৰত্মর উপর
নির্ভর কক্ষে।
মদন। ভারতের ধর্ম রক্ষার ভার-ব্রাহ্মণ আমরা, আমাদের
উপর স্ত'; এ ঈশ্বরের দান। আমরা ক্ষুদ্র-তৃণাদপি তৃণ-বিশ্বের

মাধবাচার্য্য চতুর্থ অঙ্ক হিতে আজন্ম ব্রহ্মচর্য্য নিয়ে জীবন পাত করি ; আবার রুদ্রের প্রচ্ছন্ন শক্তির মাঝে সচেতন হই—যখন অধর্মের গ্লানি-সমাধির স্তরে-সােণার ভারতের অস্তিত্ব লােপ ক’ত্তে চায়। ভীরু, কাপুরুষ নই আমরা। শারক্ষায় আমাদের শস্ত্র সন্মিলন। অস্ত্রের লেখনী দিয়ে আমাদের শায় লেখা। তার প্রয়ােগ কত্তে হবে তখন, যখন ব্রাহ্মণের যজ্ঞোপবীত বিধর্মীর গলায় ঝুলবে। যাগযজ্ঞের প্ররােচনায় আমরা ভিক্ষার পর বাড়াই না-ত্যাগের স্বেচ্ছাবৃত্ত দারিদ্র্য নিয়ে, দীক্ষা দিই--একাগ্রতা সাধনার লব্ধ প্রতিষ্ঠিত ফলের উৎকর্ষণ। ব্রাহ্মণগণ! তার সম্মান পুষ্পা। ধন্য আমি, আপনাদের চরণে স্থান পেয়েছি। কাঙাল দেশের আজ কেহ নাই-আছে মাত্র বিপন্নের সহায় তেজংপুঞ্জকলেবর নির্ভীক ব্রাহ্মণ। আমরা নিঃস্ব হ'লেও পূর্ণের অধিকারী -আছে ব্রাহ্মণের আশীৰ্বাদ। যে দেশের এই দরিদ্র জাতি-মহত্ত্বে বিশ্বকে আলিন দেয়, হৃদয়ের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ করে—শক্রকে অমরার সিংহাসনে প্রতি, ঠিত করে, সে দেশের ভূপাল কেন-রাখাল হয়ে জন্মালেও অনন্ত তৃপ্তি। হে ভূদেবতা! আপনাদের স্নেহের দান—বিশ্ববিজয়িনী শক্তির আধার ঐ অভয় পদরজা-বিজয়-নিৰ্মাল্যরূপে আমার মস্তকে দিন। (মাধবের পদধুলি লইলেন। মাধব। মহেন্দ্রক্ষণ ব'য়ে যায়। চলুন, মন্দিরাভ্যন্তরে চলুন। ( সকলে মন্দিরমধ্যে প্রবিষ্ট হইল-সম্মুখে এরঙ্গধর ও শ্রীরাধামুৰ্ত্তি বিরাজমান। মাখব। ঐ, ঐ, প্রাণসখা আমার হাসছে; প্রসন্ন নয়নে এক করুণার জ্যোতিঃ বিকীর্ণ হচ্চে। আর ঐ শােন, শক্তিরূপিণী রাধানামের পঞ্চম দৃশ্য ] মাধবাচাৰ্য বাঁশী, উত্তেজনাময় অমর সঙ্গীতে --প্রাণে নবশক্তির সঞ্চার কক্ষে। ভগবান, শক্তির উপাসক। ঐ পার্শ্বে সুশােভিত শীলা-সহচরী মহা- শক্তিরূপ শ্রীরাধা। যার নামে উনি তন্মষ ; জ্ঞান, ধ্যান, অস্তিত্ব। প্রকৃতি হতেই পুরুষের বিকাশ; দাহিকাশক্তিই অগ্নির প্রাণ। ঐ চৈতন্যরূপিণী হতেই নিদ্রিত নারায়ণ জাগরিত-যার চিৎশক্তি নিয়ে চিন্ময়। অন্নদা-বিশ্বপালয়িত্রী মা আমার, মুহুর্তে বিশ্বের সৃজন কচ্চেন আবার পরক্ষণেই ভীম, ঘাের--চণ্ডিকা মূর্তিতে সংহার ক’ছেন। শক্তির এই লীলাক্ষেত্রে দাড়িয়ে-অগ্রে বৈষ্ণবীশক্তির অর্চনা কর। কালী, কালা, বিভিন্ন ভেবনা! ঐ দেখ বিশ্বপিতামাতার বল জ্যোতিঃ। (শূন্যে জ্যোতিঃ বিকাশ—সমস্ত মলির স্নিগ্ধালােকে উজ্জল হইল -যুগলমূৰ্ত্তি মৃদু মৃদু কম্পিত হইতে লাগিল।) সকলে। (স্তম্ভিত হইয়া) ধন্য ধন্য আমরা আমাদের জন্ম সফল-কৰ্ম্ম সফল। মদন। মাধব, মাধব! একি মনােহরমূৰ্ত্তি দেখালি। হৃদয়ে ফারুণ দর্শন-পিপাসা জেগে উঠল’--অনাবিল আকাঙ্ক্ষার তাড়নায় আমায় উন্মাদ ক'রে দিলে। এতদিন শাস্ত্রের বােঝ। ব’য়ে-পাণ্ডিত্যের গৰ্ব নিয়ে তাঁর অনুসন্ধানে ফিরেছি, প্রেমের ঠাকুর সে, প্রেম নইলে ধরা দেবে কেন, স্বার্থের গন্ধে দূরে সরে গেছে। আজ তাের করুণায় যদি দর্শন পেলেম তবে কেন পেয়ে হারালাম। বল, বল বাবা! কোন্ সাধনায় ঐ প্রেমের মুক্তি নয়নের সম্মুখে নিশ্চল হয়ে থাকবে ? মাধব। শ্রীকৃষ্ণের লীলাভূমি দ্বারকাধামে গমন করুন। তথায়

মাধবাচাৰ্য্য
[ চতুর্থ অঙ্ক
প্রভু আমার প্রত্যক্ষ মুরতিতে বিরাজমান। তিনি আপনার অভীষ্ট
পূর্ণ করূবেন।
মদন। তাই যাব, তাই যাব, তাঁর ধ্যানে নিমগ্ন রব'—তার সঙ্গ
ছাড়া হব না। এই বল বাবা! যেন শ্রীকৃষ্ণের অদর্শন আর আমার
শহ কত্তে না হয়।
}
( উন্মাদবৎ প্রস্থান।
মাধব। প্রেমময় ! কি ভাবে কখন কার প্রাণে বঁশী বাজাও
তা মানব-শক্তির অগােচর।
( প্রণাম করিলেন, তৎপরে দেবনির্মাল্য লইয়া প্রদানপূর্বক।)
ৰাহ্মণগণ! এই নাও প্রত্যক্ষদেবতার বিজয়নিৰ্ম্মাল্য।
সকতে এই দেবতার সম্মুখে প্রতিজ্ঞা কর, শ্রীরঙ্গধরের রক্ষণার্থে আমরা
প্রাণ দো-তবু পশ্চাৎপদ হব না।
সকলে। শ্রীরঙ্গধৰ্ম্মের রক্ষার্থে আমরা প্রাণ দোব; তবু পশ্চাৎপদ
খ না।
[ সকলের প্রস্থান।
ষষ্ঠ দৃশ্য।
বৌদ্ধসরে এক পার্শ্ব ।
মেঘনাদ ও হাসি।
হাসি। ওগো, তােমার পায়ে পড়ি আমায় ছেড়ে দাও।
মেঘা। ছাড়বাে কি সুন্দরী-বুকে ধরে রাখবে। তােমার
মঃ পালিত, বৌদ্ধ পৌরহিত্যের একমাত্র উপচার।

যষ্ঠ দৃশ্য ]
মাধবাচার্য।
হাসি। সতীর সতীত্বনাশে ধর্মের পুষ্টি সাধন কবে ? খি
এমন ধৰ্ম্মে -- আর শত ধিক্ ঘৃণিত চণ্ডাল তােমাকে~~ এই পাশবিক
যজ্ঞের হােত !
ক
মেঘ। তােমায় ছাড়া কাটুতে আনা হয়নি। বল, মানে মানে
ভিক্ষুণী হয়ে যােবন বিনিময় কবে কি না?
হাসি। পাষণ্ড! রসনা তাের সংযত হ’ল না ?
মেথ। ঢের ঝাঁজ দেখেছি - সতীপনা ফলান হচ্ছে ! অতি-
সারে না এসে, সজে কি বায়ুপৰিবৰ্তনে এসেছ ?
হাসি। আমি স্বেচ্ছায় এসেছি, না মিথ্যা সংবাদ দিয়ে দস্যু তুই
মৃত্যুশয্যায় পুত্র মোর মাকে দেখতে চাচ্চে ব'লে-এই পাপপুরীতে
আমায় নিয়ে এলি ?
মেঘা। তােমার পরিত্রাণের জন্য এনেছি। রমণী ভিক্ষুণী-এ
খােদ বৌদ্ধের বাণী ; এখন অামি সাক্ষাৎ বৌদ্ধের অবতার-চারিশ
সব আমার হাতে। এখন দীক্ষা না ও, -নাচ, গা ও, আর সম্ভোগ কর
-সম্ভোগ কর।
( হস্তধারণে উঞ্চত।)
হাসি। কি দুবৃত্ত, এতদূর স্পন্ধা! এর উপযুক্ত প্রতিদান
এই বামপদাঘাত
( পদপ্রহার)
মেথা। তবে দেখ গর্বিত নারী! তাের সম্মুখে তাের পুৱহত্যা
করে-- এর যথোচিত প্রতিবিধান ক’ব। সাতু ।
( সাতকড়ির প্রবেশ

মাথৰাচাৰ্য্য
( চতুর্থ অঙ্ক
মেধা। এখনি যাও। চিত্রার ছিন্নমুণ্ড আনয়ন কর।
সাত। যাই দাদা! কিন্তু দেখে, পাখী যেন ফাঁদ কেটে উড়ে
না যায়।
[ সাতকড়ির প্রস্থান।
হাসি। পুৱহত্যা করবি নারকী-ঈশ্বর আছেন।
{ নেপথ্যে ।। ওগো, মের’ নামের’ না। মা, মা !
হাসি। জগদীশ্বর ! বজ্র পতনের পূর্বে সহ ক’রবার ক্ষমতা
দাও। মৰ্ম্মাহি মমতায় হৃপিণ্ড ছিড়বার আগে-প্রাণ অবিচলিত
দৃঢ়তায় গঠিত কর।
{ কবিতাকুমারের প্রবেশ।
কবি। আরে, নুতন শীকার কোথেকে জুটল ? এযে একে
কারে মেওয়া” দেখচি। (সুরে
তুমি কোন কাননের ফুল, তুমি কোন আকাশের শশী।
( হাসি মুখস্ত্র উন্মােচন করিল।)
কবি। একি, হাসি ! এযে আমারই সর্বনাশ!
মেঘা। বিচলিত হ'লে বন্ধু ! সুধার ভাগ যদি নিতে পার -
বিষের ভাগও নিতে হবে।
হাসি। প্রভু, আমায় রক্ষা করুন !
কবি। ভগবান, কতপাপের ফল হাতে হাতে দিলে। তােমার
ও~এইরূপ কঠোরভাবেই পাপী মর্মে মর্মে আঘাত দেয়।

. ষষ্ঠ দৃশ্য ] মাধবাচাৰ্য্য , হাসি, এতদিন কথার মালা গেঁথে, গােলামীর ঘরে বিবেক হারিয়ে নরাধম আমি, তােষামােদের নিম্নস্তরে দাড়িয়ে সামান্য স্বার্থের কারণ, ঘরের লক্ষ্মী তুমি তোমায় বিসর্জন দিয়েছিলেম; আমার যথেষ্ট শাস্তি হয়েছে, এখন চল, ঘরে চল। কৈ আমার চিত্রা কোথায় ? ( হাসিকে লইয়া প্রস্থানােত।) । কোথা যাবে বন্ধু ? ভিক্ষুগণের মুখের গ্রালে কারুর অধিকার নেই। যেমন আছ, স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকু-অথায় তােমার শিরচ্ছেদনে কুষ্টিত হব না। ( কবিতাকুমারকে আক্রমণে উদ্যতবেগে যক্ষশীলার প্রবেশ) যক্ষ। বৌদ্ধ গুরু, এই তােমার কীৰ্ত্তি ? এই তােমার ধর্ম- সংস্কার ? পাপপঙ্কে নিমজ্জিত হয়ে, বিশ্বের অভিশপ্ত উষ্ণশােণিত দিয়ে, দেবমন্দির সুদৃঢ় কবে! তুমি না মানুষ ? মানুষের সর্বনাশ ক'রে সিদ্ধযােগী হবে? উপরে লােকচক্ষু ভগবান আছেন, তার জাগ্রত দৃষ্টি কেহই অতিক্রম কত্তে পারে না। এমন দিন আসবে-যেদিন নিজ কৃত নির্যাতনে নিজেই জর্জরিত হয়ে, তােমায় জগতের দ্বারে অনন্ত অনন্তকাল কেঁদে বেড়াতে হবে। বুঝেছি, এ তােমাদের পবিত্র সঙ্ঘ নয় ; পাশবিকতার একট। কেন্দ্র। আজ হ'তে সমস্ত স ধ্বংস করে, তার স্থানে দ্বৈতবাদীগণের সাধনাশ্রম প্রতিষ্ঠিত করব। জেনে, যাবতীয় নারকীয় করে এই অবসান। যাও, দুর হও ! মেঘ।। এতদূর স্পর্ধা! উত্তম, আমিও বিদ্রোহ করুষ। [বেগে প্রস্থান।

মাধবাচার্য।
{ চতুর্থ অঙ্ক
( চিত্রাকে লইয়া সাতকড়ির প্রবেশ।
সাত। আমার কোন অপরাধ নেই বাষা! আমায় ছেড়ে দাও
বাবা! ঐ পাড় বেটাই এ বালককে হত্যা ক’তে বলেছিল-তা
আমি হত্যা করিনি বাবা! হত্যার অভিনয় করেছি মাত্র।
যক্ষ। দুর হ’--পিশাচের দল।
[ সাতকড়ির প্রস্থান।
কবি। কৈ আমাৱ চিত্র। কৈ ?
চিত্রা। এই যে আমি বাবা ?
কবি। কে চিত্রা, এ বেশে কেন মা?
চিত্রা। অতুল সম্পদের অধিকারিণী হয়ে, তােমার কন্যা, তােমার
খ্রী, আজ ভিখারিণী। এ পরিচয় লোকের কাছে দিতে, লজ্জায় যে
মাথা হেঁট হয়ে যায় বাবা! সেই জন্য, মা আমার নিজে সন্ন্যাসিনী
সেলে—আমায় এই বেশে সাজিয়েছেন।
যক্ষ। কিঙ্করের প্রণাম গ্রহণ করুন !
কবি। বাবা! মহাপাতকী আমি।
যক্ষ। যা হবার হয়েছে, সব ভুলে যান! আবার নৃতন ভাবে
নবীন প্রাণে, দ্বৈতবাদ গ্রহণ করে--হিন্দুর মহিমান্বিতকীৰ্ত্তি জাতীয়
ইতিহাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় জলন্ত অক্ষরে বিমণ্ডিত করে দিন। এ দীনের
প্রার্থনা নয়-দীননাথের আহ্বান। আসুন !
আসুন! কর্মক্ষেত্রে অগ্রসর
ক
( সকলের প্রস্থান।

সপ্তম ]
মাধবাচাৰ্য
সপ্তম দৃশ্য।
রণস্থলের প্রান্তভাগ।
সুরক্ষিত প্রস্তরময় দুর্গের সুদৃঢ় দ্বারের সম্মুখ ।
(যুদ্ধোন্মাদ অবস্থায় সনাতন, যক্ষশীলা, ব্রাহ্মণগণ ও সৈন্যগণ।)
সন। এই প্রস্তরময় পাৰ্ব্বত্যদুর্গ আমাদের পূনধিকার ক’ত্তে
যক্ষ। আসুন, আমরা সমবেতশক্তিতে এই লৌহক বাট ভঙ্গ
সনা। সুচি তীক্ষ্ণ – লৌহকণ্টকময় সুদৃঢ় দ্বার। যেন শত শত
আসিফকের লেলিহান জিহা- শত্রুকে প্রথিত করবার জন্য প্রতীক্ষা
কচ্চে।
( সকলে দ্বার পরীক্ষা করিতে লাগিল - ঘন ঘন কামানধ্বনি শ্ৰত
হইল, ও অদূরে একটী রক্তিম গােল। ছুটিয়া আসিল।)
যক্ষ। বিলম্বে বিপদের সম্ভাবনা সমধিক। আমি চ'ল্লেম, ঐ দুর্গ
প্রাচীরস্থ গোলন্দাজসৈন্যদের আক্রমণ ক’ত্তে। আপনি দ্বার ভঙ্গের
উপায় নিদ্ধারণ করুন।
[ দুই সহস্র সৈন্য সমভিব্যাহারে প্রস্থান।
সন। এই দ্বারে, আমি পৃষ্ঠ দিয়ে দাড়াব; আপনারা সঞ্চলে
আমার বক্ষের উপর ঝাপিয়ে পড় ন।
জনৈ-ৰা। কিন্তু জীবন আপনার--

১৪
মাধবাচাৰ্য্য
[ চতুর্থ অঙ্ক
সনা। তার আগে জন্মভূমি ! ভাববার সময় নাই -অগ্রসর
(সনাতন তীক্ষ কন্টকময় দ্বারে পৃষ্ঠ দিয়া দণ্ডায়মান হইল—সকলে
তাহার বক্ষের উপর সবলে ধাক্কা মারিতে লাগিল, দ্বার কম্পিত
হইল -সহসা ঐ দ্বারমধ্যস্থ ছিদ্রবৎ ক্ষুদ্র গুপ্তদ্বার
খুলিয়া কাঞ্চনের প্রবেশ।)
+
কাঞ্চন। আমি ঐ খাদ পার হয়ে গিয়ে, একটা সুড়ঙ্গের পথে -
দুর্গমধ্যে প্রবেশ করেছিলাম। আপনারা দুই দলে বিভক্ত হয়ে, এক
ফল এই পথে, অন্য দল উক্ত গহবরপথে দুর্গ মধ্যে প্রবেশ করে, শত্রু-
সৈন্য বেষ্টন করুন। যান, শীঘ্র যান ।
[ সৈগণের দুই দলে বিভক্ত হইয়া প্রস্থান।
কাঞ্চন। (কটস্থ লৌহশলাকাবিদ্ধ নির্ভীক সনাতনের গৌরবদীপ্ত
মূৰ্জিত দেহ নিরীক্ষণে ) হায়, হায় ! যদি আর এক মুহূর্ত আগে
আসতে পাত্তা’ম।
(কাঞ্চন সৈন্যদ্বয়ের সাহায্যে সনাতনকে মুক্ত করিয়া
শুশ্রষা করিতে লাগিল।)
সনা। (অৰ্দ্ধমূচ্ছিত অবস্থায় ভগ্নস্বরে। আঘাত আমার গুরুতর
হয়নি। আক্রমণ কর, আক্রমণ কর !
কাঞ্চন। এখানে আর বিলম্ব করা হবেনা। আসুন, আমরা
একে কোন নিভৃত স্থানে নিয়ে যাই।
সনা। কে কাঞ্চন, এস! আমার আর দাড়াবার ক্ষমতা নাই,
-রাধ হয়ে আসছে। আমায় এমন একটা নিভৃত স্থানে নিয়ে

সপ্তম দৃ) মাধবাচাৰ্য্য চল, যে স্থান হতে যুদ্ধের গতিবিধি উত্তমরূপ লক্ষ্য করা যায়। [ সনাতনের রুধিরপ্লাবিত ও মৃতপ্রায় দেহ বহন করিয়া সকলের প্রস্থান। ( মুহুর্মুহু কামানগর্জন ও ভীষণ কোলাহল শ্রুত হইল। সহসা দুর্গশীর্ষের এক অংশ ভাঙ্গিয়া পড়িল, সেই ভগ্নাবশেষ স্থলে দণ্ডায়মান প্রভাতপূর্যের ন্যায় ভাস্বর - কৈশিক বসনাবৃত মাধবাচাৰ্য্য-সকলকে উৎসাহান্বিত করতেছিলেন।) " মাধব। অগ্রসর হও, অগ্রসর হও! জীবনপণ যুদ্ধ কর- হয় বঁাচনা হয় মর! জেনে- ভারতের ধর্ম -ভারতের একটা শ্রেয় জাতির অস্তিত্ত্ব-তােমাদের শক্তির উপর নির্ভর কচ্চে। ঐ তােমাদের মুখ চেয়ে বসে আছে জন্ম-দুঃখিনী ভারত-জননী, যার বক্ষের শােণিতে তােমরা পরিপুষ্ট -আজ সে মাকে বাচাও। ( অন্যদিকে যক্ষশীলা ও সৈন্যগণ দুর্গারােহণ করিতেছিল।) লক্ষ সৈন্য গেছে যা’! এখনও আমরা আছি। আনুক, লক্ষ লক্ষ কামানের গােলা, দাও, বুক পেতে দাও-সােজা হয়ে দাড়াও, একপদ ও পশ্চাদী হয়ো না। চল, পুঞ্জীকৃত শবের উপর দিয়ে ধেয়ে চল—আমাদের মধ্যে একটা-একটা মাত্র বীরকে জীবিত অবস্থায় লক্ষ্য স্থলে পৌছুতে হবেই । ( সহসা দুর্গশিরে লােহিতবর্ণ পাতকা উড্ডীয় হইল।) জনৈক সেনাপতি। (তুৰ্য্যধ্বনি করিয়া) হুন সৈন্যগণ পরাজিত। যুদ্ধে আমাদের সম্পূর্ণ জয়লাভ হয়েছে।

মাধবাচাৰ্য্য [ চতুর্থ অঙ্ক সকল। জয়, রঙ্গনাথের জয়। মণস্থলের একপার্শ্ব। {রণােন্মত্ত অবস্থায় পুষ্পদিত্যের প্রবেশ।) পুষ্পা। কি ভীষণ যুদ্ধ বেধেছে । মূহুর্মুহু কামানের গভীর গর্জন -অস্ত্রের ঝনঝনা-রনােন্মত্ত সৈন্যগণের বিরাট হুঙ্কার–ধরার বক্ষে প্রলয়ের চিহ্ন এঁকে দিচ্ছে! অদ্যকার যুদ্ধে না জানি—ভাগ্য- লক্ষ্মী কার প্রতি প্রসন্না হবেন। (মেঘনাদের প্রবেশ।) জয় হোক মহারাজ ! বিরাট সৈন্য থাকতে আপনি সময় ক্ষেত্রে ? রাজার কর্ত্তব্য কি রাজতক্তায় ব'সে হুকুম চালান নয় ? পুষ্পা। রাজা কাপুত্তলিকা সেজে বসে থাকবে, আর রাজ্য রক্ষায় প্রাণ দেবে দেশের যত দরিদ্র প্রজা? মেঘ। রাজা প্রজায় তবে বিশেষত্ব কি ? দরিদ্রের জন্মই ম'রবার পুম্পা। দীন প্রজা নিয়েই রাজার অস্তিত্ব -দরিদ্র প্রজাই রাজায় প্রাণ ! যে দেশ দরিদ্রের রক্তে উৰ্বৰ-যে দরিদ্রের বিগলিত অশ্রু বিশ্বের বেদনা মুছায়, অভাবের নিষ্পেষনে মিথ্যার প্রলােভনে—যে দরিদ্র - দারিয়ে মহত্বে সম্রাটের নিকট শিরনত করেন। সেই সারল্যের সপ্তম দৃষ্ণ। মাধবাচা অবতার, ধৈর্য্যের, শৌর্যের মহাবট-তুচ্ছ ভােগসুখের আশায় জীবনের মমতায়-সমুলে উৎপাটিত ক’ব ! একি বলচেন ব্রাহ্মণ ? অসীম দারিদ্র্যই যে-বিলাস বিভ্রম হ'তে ধ্বংসের মধ্যে বিশ্বকে যুগে যুগে রক্ষা করে আসছে। মেধা। তবে প্রস্তুত হােন মহারাজ! জাবেন—আমি আজ আপনার বিরােধী। আপনার পুত্র কর্তৃক লাঞ্ছিত হয়ে-ইন সম্রাটের দলে যােগদান করেছি। পুষ্প। কি করেছেন ব্রাহ্মণ ! তুচ্ছ অপরাধে একটা জাতিকে ধবংসের মুখে সঁপে দিয়েচেন? রাজ্য কামনা ছিল --ইঙ্গিতে জানালেন কেন, এই সুবর্ণ মুকুট পদে অর্পণ করে ধন্য হতাম। ধর্ম গুরুর একচ্ছত্ৰা হ'তে অভিলাষ ছিল-ধৰ্ম্ম প্রতিষ্ঠা কল্লেন না কেন; রাজ- কোষ নিঃশেষ করে রাজা আমি- ভক্তের সেবায় কিঙ্করের মত, চির আজ্ঞাবাহী হয়ে থাকতাম। মেঘ। (স্বগতঃ ) মনে করেছিলাম, ছলনায় রাজাকে যুদ্ধ হতে বিরত করে-আমরা সহজেই জয় লাভ ক’ব। কিন্তু তা হ’ল না। (প্রকাশ্যে। আর আপনার সম্মান রক্ষা কত্তে পাল্লাম না! আমি চল্লাম, ক্ষণপরেই সাক্ষাৎ পাবেন। তখন কিন্তু আমার পদলেহন কত্তে হবে। পুষ্প। আপনি শত্রু মিত্র যেই হােন-আপনি ব্রাহ্মণ -দেবতা। প্রথম যখন আপনার সাক্ষাৎ পেয়েছি -অন্ত যুদ্ধ জয় অবশ্যম্ভাবী। [ রােষকষায়িত লােচনে মেঘনাদের প্রস্থান। (সশস্ত্রে সজ্জিত বীরাঙ্গনা চন্দ্রার প্রবেশ।) পু। কে, রাণী ! সমরক্ষেত্রে—এ সময়ে ?

মাধবাচাৰ্য্য ( চতুর্থ অঙ্ক চন্দ্রা। ছায়ার মত তােমার সঙ্গেইত আছি প্রভু ! পুষ্প। ফিরে যাও উন্মাদিনী। আগ্নেয়গিরির উপর দাড়িয়ে পুষ্পশষ্যা রচনা করবার অভিলাষ। চন্দ্রা। ক্ষতি কি নাথ! রাজার পাশে দাড়িয়ে দাক্ষিণাত্যের রাণী কি ম’বার মত মত্তে জানেনা? বনানীর ক্ষুদ্র লতিকা, অসহায় বাহু দিয়ে যে ব্রততী অবলম্বনে যার বিস্তৃত বক্ষ -অবাধ স্বেচ্ছাচারে দিন দিন নব কিশলয়দামে ঢেকে ফেলেছিল, সেকি এতই অসার, এতই অপদার্থ, যে আজ সেই মহাসম্মিলনে দাবানলের মাঝে পঁড়িয়ে ভস্মী- ভুত হ'তে ভয় পাবে? পুষ্প। রাণী, রাণী ! কুসুম-স্তবক গঠিত স্বচ্ছ হৃদয় হতে গােমুখীর ধারা নিঃশেষ করে—আবার আমায় কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্চো! কিংবা অভিমানিনী, এ তােমার অভিমানের উচ্ছ্বসিত বিদ্রুপ। চন্দ্রা। জীবনের সন্ধিস্থলে দাঁড়িয়ে-কিসের অভিমান প্রভু ? আমার মান অভিমান দৰ্প সত্য মিথ্যা সেত’তােমাকে নিয়ে। হে দমিত আমার! জীবনে কতবার তােমার অবাধ্য হয়েছি --মার্জন। চাইবার অধিকার রাখিনি-আমায় মার্জনা কর নাথ। (পদ ধারণ) পুষ্পা। ( সস্নেহে তুলিয়া) অবাধ্য হওনি প্রিয়ে ! ভুল ভেঙ্গে দিয়েচ। প্রেম রাজ্যের পূজারিণী তুমি-তােমার হৃদয় গলান পূজা নিস্ফল হয়নি ; যে সঞ্চিত পূণ্যালােকে আমার পশু প্রবৃত্তি ভেঙ্গে চুরে আবার মানুষ করে গড়েছে। শত অপরাধী আমি-আমায় মার্জনা সপ্তম ] মাধবাচার্য্য চন্দ্রা। স্বামিন, দেবতা! তােমরা কর্তব্যে কঠোর-কখনও কোমল। পত্নীর প্রতি পতির এই ভালবাসা বড় মধুর-বড় করুণ বড় মর্মস্পর্শী। দুঃখের কশাঘাতেই সুখের কদর-অন্ধকারের পর জ্যোৎস্নার মধুর বিকাশ। তুমি কখনও দূরে ফেলে দিয়ে, আবার রাজদণ্ড নিয়ে খেলা করেছি, সহাস্য আস্তে, পরাজয় স্বীকার করে বুকের মাঝে টেনে নিয়েছ। তােমার বর্জন নয়-প্রেমের অনুভূতি। পুষ্প। তােমার অসীম অতলস্পর্শী ভালবাসার তুলনা কোথায় ? তুমি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েচ-বিনিময়ে কিছু চাওনি; সেবা করেছ ফলের আকাঙ্ক্ষা রাখনি। ক্ষুদ্র তটিনী তুমি -গলিত আবর্জনাকে বুকে ধরে--সাগরের বক্ষে ডুবিয়ে দিয়েছ, স্ফীত বক্ষে কখনও তাকে সমতল তটে আছড়ে ফেলনি। (হস্তধারণ পূৰ্ব্বক) প্রিয়ে। ; চন্দ্রা। নাথ। পুষ্প।। এস ! তেমনি করে একবার নয়নে নয়ন মিলাও। ঐ নিৰ্বাক চাহনি—দুকুল আন্দোলিত করে-দুটী প্রাণ-এক আত্মায় সংযােগ করুক! ( হস্ত চুম্বন) আর নয়—ঐ জলতরঙ্গের মত হন সৈন্যগণ সমাগত। চন্দ্রা। আমি তোমার পার্শ্ব রক্ষা করব; অগ্রসর হও রাজা! (জনৈক সৈন্যাধ্যক্ষের প্রবেশ। সৈন্যাধ্যক্ষ। রাজা, রাজা! আমি বিংশতি সহ সৈঙ্গ নিয়ে এসেছি-আপনার আদেশের অপেক্ষা মাত্র। পুষ্প। যাও, লয়ে এস! গােলন্দাজ সৈয় প্রঙ্কত ?

মাধৰাচাৰ্য্য চতুর্থ অঞ্চ সৈন্যাধ্যক্ষ। হ্যা, প্রভু! ( সৈন্যাধ্যক্ষ বংশীতে ফুৎকার করিলেন, বিংশতি সহস্র গােলন্দাজ, পদাতিক ও অশ্বারােহী সৈন্তের প্রবেশ। হুন-সৈন্যগণ জলতরঙ্গের, মত আসিয়া, রাজা ও রাজসৈন্যগণকে আক্রমণ করিল। উভয় দলে ভীষণ যুদ্ধ হইতে লাগিল, রাণী রাজার পার্শ্ব রক্ষা করিতেছিলেন। হুন- সৈন্যগণ হতাহত এবং পরাজিত হইয়া পলায়ন করিল ; রাজ- সৈন্যগণ তাদের পশ্চাদ্ধাবন করিয়া ছুটিল। হঠাৎ একটা রক্তিমবর্ণ কামানের গােলা আসিয়া রাজা ও রাণীর বক্ষ পঞ্জর ভেদ করিয়া অদূরে মাংসপিণ্ডের ন্যায় বিক্ষিপ্ত করিয়া দিল। ক্ষণপরে বিজিত-ক্ষত বিক্ষত দেহ হুন-সম্রাটের প্রবেশ) হুস। জল, একটু জল! প্রাণ যায়, আর দাড়াতে পাচ্ছিনা! (বসিয়া পড়িলেন। কে কোথায় আছ-বাঁচাও --একটু জল দাও। বিনিময়ে রাজ্য সম্পদ যা চাইবে দেব-চিরজীবন গােলামী ক’ব ! আমায় রক্ষা কর। কৈ কেউত’ এলনা, শোবার কেহ নাই- চতুর্দিকে স্তুপাকার মৃতদেহ—শ্মশানক্ষেত্রের পরিচয় দিচ্চে। জগদীশ্বর, এই ভাবে কি সব সমাধি হবে! (রিপূর্ণ পাত্রহন্তে কাঞ্চনের প্রবেশ।) কাঞ্চ! কে জল চাইলে না? (সম্মুখে সম্রাটকে দেখিয়া ) আসুন সম্রাট, এই জল পান করুন। (সম্রাটকে জলপাত্র দিল।) হু-স। (পানান্তে। মা, মা! এত দয়া তােমার-আজ এই বিজেতা-বিধর্মীর প্রাণরক্ষা ক'ল্পে ! কাঞ্চ। আমরা বঙ্গনারী, আমাদের সব ছেলেই সমান বাবা!

সপ্তম দৃশ্য। মাধবাচাধ্য ইস। বুঝেছি মা, সৰ্ব্ব নির্বিশেষে তোমাদের করুণার ধারা মুক্ত। পরাজিত আমি তােমায় দেবার মত কিছুই নাই--এই নাও “ রাজ- মুকুট সুদূর পাশ্চাত্যে এর উপযুক্ত সম্মান রক্ষিত হবে। ( মুকুট উন্মােচন। । আপনার উদারতায় ধন্যবাদ ! দেশের জন্য আমরা এক হাতে অস্ত্র ধরি --অন্য হাতে আর্তের সেবায় আত্মসমর্পণ করি- কিছুর প্রত্যাশা রাখিনা - শুধু একটা কথা- হু-স। বল মা ! আমি প্রাণ দিয়ে পালন ক’ । কাঞ্চ। সম্রাট! রাক্ষস প্রবৃত্তি নিয়ে হত্যার অভিনয়ে ভারতের জনপদ ধ্বংস করবার জন্য রক্তপিপাসু আপনি- সুদূর পরাহত হুনদেশ হ’তে ছুটে এসেছেন। লক্ষ্য আপনার -হিংসা আর লুণ্ঠনের মধ্য দিয়ে স্বরাজ্য স্থাপন। তার আগে একবার ভেবে দেখেছেন কি আপনার কলুষিত আত্মার পরিণতি! সব পড়ে থাকবে সাহানশা, একদিন অসহায় ভিক্ষুকের মত চলে যেতে হবে। বিশ্বের হাটে -প্রধান বিপনি সাজিয়ে, বেচা কেনা কত্তে এসে, সর্বস্ক হারিয়ে, নিয়ে যাবেন শেষে-পুত্রহারা জননীর করুন আর্তনাদ-সতীর বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস-আহতের বেদনাভরা উত্তপ্ত অশ্রু। সম্রাট আপনি -ঈশ্বরের প্রতিনিধি ! এমন ভাবে ধর্মের সিংহাসন রচনা করুন- যেখানে দ্বেষ-হিংসা প্রেমের পথে লুপ্ত-দাম্ভিকতা দীনতার মাঝে নির্বাণ। আর ক্ষুদ্রকে ক্ষুদ্র বলে ভাববেন না। মহকে ছোটকে বড় হতে দিন। লােলুপ না হয়ে নিজের সব্বস্ব বিলিয়ে দিন ; হেয়কে দলিত না করে তাদের ভাই বলে আলিঙ্গন করুন! (সহসা অনুস্থিত মাংসপিণ্ডের

মাধবাচার্য।
( চতুর্থ জয়
সমষ্টি রাজা রাণীকে দেখিয়া) ওকি, অদূরে মাংসপিণ্ডের সমষ্টির মত -
মৃত রাজা রাণী নয়? চলুন, চলুন !
( উভয়ে রাজারাণীর নিকটস্থ হইল।)
কাঞ্চ। হায়, হায় ! আমাদের রাজা রাণী নাই -রাজা রাণী
নাই-মা গো!
মা গো! { ক্রন্দন।)
হু স। কেঁদনা মা! রাজা রাণী তােমাদের মরে নাই। সন্মুখ
সমরে অমর লােকে যাত্রা করেচেন। ঐ দেখ মা !
ঐ নভস্থলে
তাদের উজ্জ্বল রথের সুবর্ণ রেখা এখনও মেলায়নি। ঐ দেখ স্বর্গদ্বার
মুক্ত ক'রে–দেববালাগণ। রাজদম্পতীকে
পুষ্পভূষণে সাজিয়ে
সম্মানিত কচেন। ঐ শােন দেবদূতগণ, ঐ অমর সঙ্গীত মেঘমন্দ্রকুবে
সুরভিত পবনে-দিদিগন্তে ঘােষনা কচ্চে।
(কাঞ্চন ও জুন-সম্রাট নিবিষ্টচিত্তে-স্বর্গের দিকে চাহিয়া রহিল।)

পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
হন-সম্রাটের শিবির।
( সিংহাসনে উপবিষ্ট হন-সম্রাট, সম্মুখে কর্মচারিগণ ও বন্দি
অবস্থায় মেঘনাদ দণ্ডায়মান।)
হু-স। কৃতঘ্ন-বিশ্বাসঘাতক কাফের!
মেঘ। আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি-~~থদেশের প্রতি
আপনার প্রতি নয়। আমি স্বজাতির বুকে ছুরি বসিয়েচি --- আপনাকে
আলিঙ্গন করে।
হু-স। কুকুরের ধর্ম পদলেহন-স্বার্থ তােমায় অন্ধ করেছিল।
মেঘ। যথেষ্ট হয়েচে--মার্জনা করুন। আমি নিজের শিরে
তীক্ষ কুঠার হেনেচি। অনুতাপের গভীর ক্ষত-আমায় তিলে তিলে
দগ্ধ কচ্চে, আর অন্য শান্তির প্রয়োজন নাই।
ছল। নিজের হাতে কবর খুঁড়ে -সমাধি যাত্রায় বিচলিত হলে
চলবে না। বিধৰ্ম্মি ! তােমার পরামর্শে-আজ আমার অর্ধেক সৈন্য
নিহত, আমি বিজিত, বিপদগ্রস্থ। তােমায় কুকুরের মত হত্যা করে।
ভারতের পবিত্র ক্ষেত্র হ'তে-আজ শয়তানের অস্তিত্ব লােপ কো।
মেৰ। (নতজানু হইয়া) প্রাণ ভিক্ষা দিন সম্রাট।
(যক্ষশীলার প্রবেশ।)

১০
মাধবাচাৰ্য্য
{ পঞ্চম অঙ্ক
হু-স। ( সসম্মানে অভিবাদন পূর্বক) আসুন, আসুন রাজা !
( নিকটস্থ আসন দেখাইয়া দিলেন) কাফেরের অপরাধ জানেন ?
যক্ষ। ইনি মহাপরাধী ব'লেই নিতান্ত হতভাগ্য, দেশদ্রোহী
বলেই কৃপার ভাজন--অতি বড় নারকী বলেই ক্ষমার পাত্র।
হল। একটা জানােয়ারের মরা বাঁচায় আপনার লাভ?
যক্ষ। উনি জানােয়ার হলেও ভাই -একাই সহস্র অবলম্বন।
ভাই আজন্ম হিংসাপরায়ণ হলেও-ভায়ের মত অমন আপনার জন
জগতে দ্বিতীয় নাই। ভাই ভায়ের বিরুদ্ধে দাড়ায়-একটা প্রচ্ছন্ন
মিলনের পথ বিকাশের জন্য। মায়ের সব ছেলে সমান হয় না।
মনুষ্যত্ব বর্জিত অপদার্থ ভাই -বয় হলেও নিতান্ত শিশু থাকে—যত
দিন না সে মানুষ হয়।
শুল। কিন্তু যদি কোন দিন সেই অবিশ্বাসী ভাই, চণ্ড-নীতির
আশ্রম ত্যাগ না করে ?
যক্ষ। সে ভায়ের শাণিত ছুরিকা বক্ষে নিয়ে, করুণ। শশাণিত
রঞ্জিত করে, মেহের নয়নে চেয়ে থাকব; আবেগের যে বিদ্যুৎফুরণ
-তৃদ্বন্দিতার নিষ্ঠুরতাকে হত্যা করে-দুটী প্রাণ এক লহমায়
সম্মিলনের সঙ্গম মুক্ত করে দেবে।
হু-স। কিন্তু ঈশ্বর মার্জনা করবেন না-পাপের শান্তি আছেই।
যক্ষ। জীবাত্মায়, পরমাত্মায় বিভিন্ন নয়, সম্রাট! আজ আপনার
দরবারে-ঐ কলুষিত আত্মার পরিবর্তে আত্মদানে-প্রায়শ্চিত্ত ক'ব
আমি। দিন, আমায় শাস্তি দিন।

দ্বিতীয় দৃশ্য ]
মাধবাচাৰ্য্য
হু-স। কি সুন্দর বাংলা দেশ-কি মহৎ এ দেশের রাজা-
কি উদার স্বচ্ছ স্বদেশ-প্রীতি। রাজা! বিজিত আমি, সৰ্ব্বস্বহারা
-আছে মাত্র হৃদয়, আপনার মহত্বের তলে তাও আজ হারিয়ে ফেলুন।
এই নিন, বীকে আমি সসম্মানে মুক্তি দিলাম।
যক্ষ। মানীর মান, বীরধৰ্ম্মের মর্যাদা, একমাত্র আপনারাই
জানেন। আপনার নিকট চিরকৃতজ্ঞ রইলাম।
হু-স। এমন সরল প্রাণ এ দেশের মত আর কোথাও নাই।
যদি কোন জাতি ভারতবিজয়ের যোগ্যতা লাভ করে, তবে ভারত
বাসীর সহানুভূতি ভিন্ন নয় । ভারতের শিক্ষা, দীক্ষা, মহত্ত্ব, ধৰ্ম্মনীতি,
চিরদিন পাশ্চাত্যকে পশ্চাতে রেখেই চলবে। রাজা! শিবিরাভ্যন্তরে
চলুন, আপনার যথাযােগ্য সংবদ্ধনায় আনায় আপ্যায়িত করবেন।
{ শিবিরমধ্যে সকলের প্রবেশ।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
লত-কুঞ্জ।
চিত্রা
চিত্রা। (যক্ষশীলাকে উদ্দেশ করিয়া আমার সারা অঙ্গে বিদ্যুৎ
পুঞ্জ ঢেলে দিয়ে-কে তুমি হে অতকিত অতিথিনীলসাগরের ভরা
জলের মত–পূর্ণ যৌবন নিয়ে নয়ন পথে এসে দাড়ালে।
হারিয়ে ফেলুম ! আমার বুকের রক্ত জমাট বেঁধে বরফ-হিম হয়ে গেল
দৃষ্টির বিনিময়ে কখন যে আপনাকে অর্পণ করে—আড়ষ্ট অচল
হয়ে গেলুম-জাতে পারুম না। সেই হ’তে নিৰ্বাকপ্রণয়ের মধুর

মাধবাচাৰ্য্য
[পঞ্চম অঞ্চ
গুঞ্জনে অধীর হৃদয়, পুলকচঞ্চল দেহের ভিতর মুচ্ছনার অব্যক্ত
আবেশে উচ্ছ্বসিত। আমার মূৰ্ত্তিহীন—ক্ষুধিত তৃষিত আসন অধিকার
করে-কে তুমি গো ? আমি তােমায় চিনি। জন্ম জন্ম আমাদের
এই প্রণয়—সবাইকে বঞ্চিত করে, এমনি করে-গােপনে সঞ্চিত করে
রেখেছিল। তা না হলে এ শিহরণ-মলয়মারুতের মত ছুটে এসে -
ভােরের সােনালী কিরণে এমন করে প্রাণের তার স্পর্শ ক'ৰ্বে কেন?
যার অনুভূতিতে চমকে উঠে-পাখীর গুঞ্জন শুরু করে দিলে-কুসুম
কলিকা ঘােমটা খুলে হাসির লহর ছুটালে ! হে দয়িত ! রাজা তুমি
—আমি ভিখারিণী ; কিন্তু নির্বিকার প্রেমই প্রেম-পূজার অধিকার
সকলেরি আছে। আমি জন্মভাের তােমার পূজা ক’র্ব-কিছু চাইব না।
শুধু ভালবাস- প্রাণ ভরে ভালবাসি।
( সঙ্গিণীগণের প্রবেশ।
গীত।
ওলো তাের একি হ’ল-ওলো তাের একি হল।
দমকা বাতাস এসে ছুটে ফুলের কুঁড়ি ফুটিয়ে গেল।
কেন ছিলি তুই আমন
চচনে প্রাণ লুটিয়ে দিলি—সমঝে চললি না,
তাের গজরানি আর ফনানী বলে। সই কোথায় গেল।
এখন হাবি না জিতবি
হাবি না তুই কঁাদবি,
প্রাণ দিবি কি প্রাণ নিবি সই-নেনা বেচে কোনটা ভাল ।
[ সকলের প্রস্থান।
প্রস্থান।

তৃতীয় দৃশ্য ]
মাধবাচার্য্য
।
তৃতীয় দৃশ্য।
কুটীর।
মাধবাচাৰ্য ও ব্রাহ্মণগণ।
গীত।
ফিরিয়াছি মােরা মায়ের কোলে উদিয়াছে গুতদিন।
কে বলে আর কাঙাল মােদের বিশ্ব মাঝারে হীন
মা মুছায়ে দিয়েছে অশ্রু
একটা স্নেহের চুম্বনে,
হৃদয়ের ব্যথা করেছেন দূর
বক্ষে ধরিয়া যতনে,
আরত’ আমরা নহেরে অনাথ-মাতৃগরবে লীন।
মা মােদের রাজরাজেশ্বরী অভয়া করুণ। রূপিনী
মায়ের মহিমা কররে প্রচার জীবন মরণ সমান গনি,
পরের মাকে মা বলিয়ে হয়ে রাজা কেন হ'বিরে দীন।
মাধব। আবার, আবার গাও ব্রাহ্মণগণ! ঐ প্রণবের গান
বিশ্বের প্রাণ মাতিয়ে দিক-মরা বেঁচে উঠুক - মার কোলে শিশু আনন্দে
নৃত্য করুক্ষীণ নদীর কুলে কুলে উন্মাদনার উচ্ছাসিত বিপ্লাবন ছুটে
যাক। সঙ্গীতময় জগৎ! সঙ্গীত শ্রেষ্ঠসাধনা - তন্ময়ত্ত্বের বৈদ্যুতিক
আকর্ষণ। সাগরের গানে নদী উন্মাদিনী -পৰ্বত ভেদ করে ছােটে-
নীড় হতে পক্ষীশাবক জাতীয় সঙ্গীত নির্ভর করে তার অক্ষমতা ভুলে
প্রথমেই অসীমের মধ্যে উড়ে বেড়ায়। ধর্মসঙ্গীতে ভারত চিক
মুখরিত কর। দেখবে লক্ষ লক্ষ কামানের গােল—পুথিবীর আজন্ম

মাধবাচার্য
[ পঞ্চম অঙ্ক
সঞ্চিত শক্তি--এর বুকে সামান্য একটু দাগ বসাতে পাবে না।
(কপিঞ্জলের প্রবেশ
কপি। প্রভু, প্রভু, কি অপূৰ্ব শক্তি আপনার নামে ! সমর
ক্ষেত্রে দুর্গদ্বারে আহত মুমুর্ষ সনাতন-আজ জ্ঞানেদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই
আপনার পবিত্র নাম গ্রহণে পূৰ্ব্বশক্তি ফিরে পেয়েচে ! ঐ দেখুন,
উৎসুক ভরা হৃদয়ে সরল শিশুর মত ছুটে আচে-
মাধব। কই, কই, আমার সনাতন কই ?
( সনাতনের প্রবেশ।
সনা। এই যে আমি এসেছি দাদা!
মাধ। এস, এস কৰ্ম্মবীর-এস একনিষ্ঠ সাধক-আমার বক্ষে
সনা। এই ক্ষতযুক্ত পুষ, রক্তে ভরা- দুর্গন্ধময় দেহের নিকট হতে
সরে যাও দাদা ! স্থান আমার ঐ চরণধুলার তলে।
মাধব। ভাই আমার, একি ব’ছো? তােমার ক্ষতপূর্ণ দুর্গন্ধময়
দেহ নয়, দেশের কৰ্ম্মে-সুবাসিত চন্দনে চর্চিত পারিজাতের সমষ্টি।
দেবতার প্রিয় তুমি তুমি ত্রিদিবের।
( সনাতনকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করিলেন-দেখিতে দেখিতে তাহার
সর্বাঙ্গের ক্ষত মিলাইয়া তপ্ত কাঞ্চনের শরীর হইল)
সকলে। জর, জয় গুরুনারায়ণ।
কপি। (সনাতনের প্রতি) বন্ধু! ধন্য তােমার মানসিক বল।

তৃতীয় দৃশ্য ]
মাধবাচাধ্য
তুমি শুধু কৰ্ম্মেন্দ্রিয়কে জয় করনি--ভক্তিতে বিশ্ব গুরুকেও পরাস্ত
ক'লে!
মাধব। সনাতন, ভাই আমার ! তুমি বিবাহ কর। কাঞ্চন,
তােমাকে চায়-- সে যােগ্যপাত্রেই ভার ন্যস্ত করেছে। তুমি কৰ্ম্ম –
সে সাধনা, তুমি উদ্যমের ভাবােচ্ছাস --সে উৎসাহের পূর্ণ বিকাশ;
তােমাদের মহাসলিন, বিশ্বের এক মঙ্গল আধার গঠন কৰ্বে।
সনা। এতদূর অগ্রসর হয়ে পশ্চাতে অন্ধকারের নিভৃত গুহায়
ফিরে যাব’! শান্তির উৎসে অবগাহন করে অশান্তির হ্রদে মজে
থাকবো - তা কেমন করে হয় দাদা!
মাধব। পবিত্রতাময়ি যে জন্মক্ষেত্র হ'তে ছুটে এসেছ, তার বুকের
মধ্যে মুখ লুকিয়ে, নবসংস্কারের মহামন্ত্ৰে নিৰ্বাণ আন। ভগবান
কৃষ্ণ, এই সংসার বন্ধনে ধরা দিয়ে মুক্তির প্রবাহ “গীতার” সৃজন
করেছিলেন। রাজর্ষি জনক, জন্মমুক্তযোগী--মহাত্মা শুকদেবকেও
পরাস্ত করেছিলেন। তােমাদের পুরুষ প্রকৃতি মিলিত শক্তি-পৃথিবীর
"ক্ষ ক্ষ নরনারীকে বাৎসল্যরসে যেমন অবগাহন করতে পাবে
-এমন অন্য শক্তি বিরল।
কপি। গুরুর আদেশ পালন কর সখা ! নূতন ব্রতে ব্রতী
হও। ঐ কর্মময় জীবন, নবীন উদ্দীপনায় নব আদর্শে রাঙিয়ে তােল।
ভাবসঘের দক্ষিণ বাতাসে অনুরাগের পিক ডেকে
উঠুক্। প্রেমের
অমৃতবারি সিঞ্চনে বসন্তের নববল্লরী মুকুলিত হ'। সেই ভক্তি
রুদ্র ফাগুনের অগ্নিময় চরণে-বিবেক প্রকৃতি তার নগ্নসৌন্দৰ্য্য
ঢেলে দিয়ে-জগতের যাবতীয় উচ্ছল লীলার ধ্বংস করুক।
(নেপথ্যে আর্তনাদ হইল।)

মাধবাচার্য্য [ পঞ্চম অঙ্ক মাধব। (ফাতরভাবে? কে আর্তনাদ কত্তে কত্তে যাচ্ছে । কপি। একজন ব্যাধিগ্রস্ত মহাপাপী। মাধব। আহা, বড়ই অভাগা-যাও সমাৰে ল'য়ে এস! { সনাতনের প্রস্থান ও সাতকড়িকে লইয়া প্রবেশ । সাত। হে সন্ন্যাসী, করুণ হৃদয় ! হতভাগ্যের ক্রন্দনে বেদনা পেয়েছ, কিন্তু পাবে কি! যন্ত্রণাকাতর তপ্ত অশ্রু মুছিয়ে-মলিন মৰ্ম্ম ঘুচিয়ে --ভাঙ্গা বুকখানা জুড়ে দিতে? পারবে না, কেউ পারেনি। দুষ্কর্মের ফল-- বিস্ফোরকময় এই হস্তের প্রদাহ নিয়ে সারাবিশ্ব ছুটে বেড়িয়েচি-কোথাও একটু সহানুভূতি পাইনি; পাপের প্রতিমূর্তি দেখে-বৃণায় তাচ্ছল্যে সবাই নাসিকা কুঞ্চিত করে সরে দাঁড়িয়েছে ! মাধব। ভাই, পাপ স্বীকারই মুক্তি! বল, জীবনে তুমি কি কি পাপ করেছ? সাত। বৌদ্ধ-সজ ডাকাতের কেন্দ্রে পরিণত করে--পাপের প্রধান সহায় আমি–আজীবন লুণ্ঠন করেছি- দীন দুঃখীগণের মুখের পবিত্র কুমারী-ধৰ্ম্ম, সতীর সতীত্ব ; আর দল পুষ্টি করবার জন্য কত শত অভাগা জননীর নয়নের মণি তাদের সুকুমারমতি শিশুপুত্রগণ। ভবিতব্যতার চির কলঙ্কিত অদৃষ্ট পরিহাসের সে মসীবর্ণ-ইতিহাস আর ব’তে পারি না-জন্মভাের ব'লেও ফুরাবে না। এক সময় আমি তােমাদের বিশেষ শত্রুতা করেছি ! হে ব্রাহ্মণগণ! আমি প্রাণভিক্ষা চাইনা-মৃত্যু চাই। প্রতিশােধ নিয়ে, এই প্রদাহপূর্ণ ব্যাধি হ'তে আমায় মুক্ত কর। উঃ! বড় যন্ত্রনা ! আমি তিলে তিলে দগ্ধ হচ্ছি। কপি। ব্রাহ্মণ প্রতিশােধ নিতে জানে না; স্নেহে, শ্রদ্ধায়, তৃতীয় দৃশ্য মাধবাচার্য্য মার্জনায় বিশ্বকে-বুকের মাকে টেনে নিতে জানে। এই গুণেই ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণ, তার পদজ নারায়ণের বক্ষের ভূষণ। মাধব। যতদিন ব্রাহ্মণ, আত্মপর সমজ্ঞানে গরীয়ান্, ততদিন ততদিন তিনি দেবতা হ'তেও শ্রেষ্ঠ আসন তঁার-এক অপার্থিব মহিমাময় অসীম মহালােকের মধ্যে দেদীপ্যমান। ভাই ! তােমার যাবতীয় পাপ আমি গ্রহণ কল্লেম। তুমি ব্যাধিমুক্ত হও। তােমার হস্তের প্রদাহ আমার বামহন্তে আশ্রয় করুক। সাত। না, না, তা হয়না! ভুক্তভােগী আমি-এর বড় যন্ত্রণা অতি বড় শত্রুকেও যেন এ ব্যাধি স্পর্শ না করে। মাধব। মুক্ত তুমি ! চির নিৰ্ম্মল হও। ( সর্বাঙ্গে হাত বুলাইল, সাতকড়ির হস্তের প্রদাহ মাধবের বামহন্ত আশ্রয় করিল ও দেখিতে দেখিতে তাহার হস্ত ভীষণ স্ফীত এবং যন্ত্রণার আধার হইল-সাতকড়ি ব্যাধিমুক্ত হইল।) সনা। আমরা থাকতে ঐ ব্যাধি আপনি গ্রহণ ক'ল্লেন? তা হয় না; দেবতার নির্মাল্যরূপে আমাদের প্রদান করুন। মাধব। দাও, দাও, কে আছ বেদনাতুর-রুগ্ন জরাজীর্ণ হিয়া পাপী তাপী হতভাগ্য নর! তােমাদের যাবতীয় বােঝ আমার মাথায় চাপিয়ে দাও! মুক্ত হও তােমর। বিশ্বের ভাব যুগে যুগে বহন করে আমি ধন্য হই। ( উদভ্রান্তভাবে) যাই-যাই-আর আমি থাকতে পাচ্ছিনা—ঐ ! ঐ, পীড়িতের আর্তনাদ আমায় কাতর ক’চ্ছে, কি, মর্মভেদী স্বৰ-কি করুণ -হৃদয়স্পর্শ আহবান ! [বেগে প্রস্থান।

মাধবাচাৰ্য্য
[ পঞ্চম অঙ্ক
সনা। আক্তের পরিত্রাণের জন্য দাদা আমার উন্মাদ। চলুন,
চলুন, আমরাও পশ্চাদ্বী হই।
( সকলের প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য।
উদ্যানস্থ পথ।
সনাতন ও কাঞ্চন।
কাঞ্চন। অদ্যকার সন্ধ্যা সার্থক! এর স্মৃতির ইতিহাসে এমন
মধুর উজ্জ্বল পাতা একখানিও ছিল না।
সনা। ফাগুনের ফুলের হাটের লাবণ্য তুমি–পূর্ণিমার রজত
রেখায় দশদিশি আলােকিত করেছ।
কাঞ্চন। তােমার সুধাকণ্ঠের স্নিগ্ধবাণী -ঠিক যেন উচ্ছসিত
ঋণার জলে চঁাদের কিরণ ঢেলে দিচ্ছে।
সন। দক্ষিণ বাতাস কুসুমের গন্ধে মেতে উঠে, স্নিগ্ধতায়
বিশ্বকে মাতায়।
কাঞ্চন। আষাঢ়ের মেঘের মত গাঢ় হ'য়ে--অকস্মাৎ এই পুলক
বর্ষণ আরম্ভ হবে-তা জানা ছিল না !
সন। এইরূপ বর্ষণ না হলে-তােনার মত স্বচ্ছ তটিনীর সৃষ্টি
হ’তে কি! যে নদী গানের সুরে ঢেউয়ের মাতামাতি ক'রে দুই তীরে
ফুল ফুটিরে সােণার ফসল ফলিয়েছে ?
কাঞ্চন। আনন্দের সঙ্গে এত অনুরাগ মাখিয়ে-কোন্ ভাবরাজ্যে
নিয়ে যাচ্চো!

পঞ্চম দৃ)
মাধবাচাৰ্য্য
সন। কোকিল যেমন করে বন্দনাগীতি গেয়ে-বসন্তের
রাণকে হিমানীশতল মাঘের শেষে-বিশ্বরাজ্যে ডেকে আনে।
কাঞ্চন। এই মুচ্ছনার চমক চঞ্চল গতির নিবৃত্তি কোথায় ?
সনা। যেথা প্রবৃত্তি ভিখারী হয়ে-তার যথাসর্বস্ব লুটিয়ে দেয়।
কাঞ্চন। দেৰতা তুমি! উপভােগ ত্যাগ করে অনুভবের
মধ্যে নিজেকে হারিয়েছ।
সনা। হাসির মত সুন্দর তুমি—কবিতার ছন্দের মত ললিত
মাধুৰ্য্য তুমি—শিশিরে ভেজা গােলাপের মত শুভ্র নিস্পৃহতায় নিমগ্ন
কাঞ্চন । আমাদের দাম্পত্য জীবনের ব্রত যেন দরিদ্র নারায়ণের
সেবায় উদ্যাপিত হয়।
সনা। দূরে-ঐ শিউলি গাছের আড়াল থেকে একটা দোয়েল
ডেকে উঠল-তােমার কথার প্রতিধ্বনি নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী কচ্চে।
চল কাঞ্চন ! ঐ পুণ্যলােয়র গোদাবরী তটে যাই, যথায় মহত্ত্বের
গভীরতা, উদার অসীম গতি, উচ্ছসিত হয়ে নীল আকাশের গায়
নিজের অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।
[ উভয়ের প্রস্থান।
পঞ্চম দৃশ্য।
উপবন সন্নিকটস্থ পার্বত্য পথ ।
চিত্রা পুষ্পচয়ন করিতেছিল—একটি বন্য বরাহের পশ্চাদ্ধাবন
করিয়া মন্ত্রী, যক্ষশলা ও শরীররক্ষীগণের প্রবেশ।)

মাধবাচার্য [ পঞ্চম অঙ্ক মন্ত্রী। এই দিকে-এই দিকে মহারাজ! ঐ, ঐ, গাছটার আড়াল দিয়ে ছুটে পালাচ্চে । যক্ষ। { বাণ নিক্ষেপ করিয়া) সব ব্যর্থ হ’ল –ভল দিন, ভল্ল দিন, এখনও অধিক দূর যেতে পারেনি! ( বরাহ চিত্রার নিকটস্থ হইল) মন্ত্রী। বালিকা, স্থান পরিত্যাগ করস্থান পরিত্যাগ কর । (তদ্দণ্ডেই বরাহ, দুইটি রাজ-শরীররক্ষীকে ভীষণভাবে আক্রমণ করিল। চিত্র। চকিতে একটি ভগ্ন বৃক্ষদণ্ড লইয়া নির্ভয়ে বরাহের সম্মুখীন হইয়া তাহাকে সংহাৰ পূৰ্ব্বক উভয়ের প্রাণ রক্ষা করিল।) যক্ষ। (বেগে চিত্রার সম্মুখীন হইয়া) ধ বালিকা, ধন্য তুমি ! তােমার অসীম সাহসিকতা, অপূৰ্ব্ব কৌশল, সকলকে স্তম্ভিত করেছে। মন্ত্রী। মহারাজ ! কান্যকুজের রাণী হবার একমাত্র যােগ্য। এই শক্তিময়ী দেবী। যিনি নারী হয়ে পুরুষ-বিক্রমকে লজ্জিত করেছেন —পরের প্রাণরক্ষার্থে নিজের প্রাণ দিতে কুণ্ঠিত নন্-শত্রু সংহারে ও পরিচর্যায় যার কযুগ-কুসুম কোমল নবনীত-আবার বর্জ্য অপেক্ষাও কঠিন-সেই বীরাঙ্গনা মা-আজ আমাদের সম্মুখে। যাই দেখি, এ বিষয় রাজকবির কি অভিমত। [ যক্ষশীলা ও চিত্রা ব্যতীত সকলের প্রস্থান। যক্ষ। তুমি রমণীর মণি ! দেবী হতেও উচ্চে-আরও উচ্চে। যেখানে কল্পনার গতিবিধি নাই—তুমি সেই মহালোকের। চিত্রা, চিত্রা, তুমি কি আমার সাহায্যকারিণী হবে? চিত্রা। হে রাজার রাজা-সম্রাটের সম্রাটদেবলােকের অধ

ষষ্ঠ দৃশ্য ।
মাধবাচাৰ্য্য
.
তুমি তা হ'তেও বড়। অচিন্ত্য অসীমময় ~ ধারণাতীত প্রভু! রে
আমি—ঐ শ্রীপদ ভিন্ন যে আমার অন্য গতিষিধি নাই।
নারীর অন্তর এত অনুরাগে ভরা? জগদীশ্বর!
তােমার স্নেহের দান। চিত্র-চিত্রা-( হস্তধারণ।)
চিত্র।। প্রভু, দেবতা! চলুন, পিতৃচরণ বন্দনা করিগে ।
উভয়ের প্রস্থান।
যষ্ঠ দৃশ্য।
আশ্রম সমুখ।
মাধবাচাৰ্য্য, যক্ষশীলা, সনাতন ও ব্রাহ্মণগণ ।
সনা। দাদা, দাদা! বিশ্বের পাপভার বহন করে কঠোর সাধ
নায় উন্মাদের মত কাটিয়েচ। বহুদিন পরে তােমায় পূর্বাবস্থায়
ফিরে পেয়েছি। তােমার ঐকান্তিক সাধনার ফলে – ধরা আজ শান্তি
নিকেতনে পরিণত। চতুর্দিকে ধৰ্ম্মের স্রোত বইচে--দ্বৈতবাদীগণের
পূর্ণভায় দিকৃমণ্ডল উদ্ভাসিত। এই আনন্দের দিনে-বিশ্বকে
কাদিয়ে আবার কোন্ নব সাধনায় ব্রতী হ’তে খাবে ?
মাধব। ভাইরে ! তপস্যার শেষ নাই। তপস্যায় মানুষকে দেবতা
করে ! বাকপ-সুবর্ণস্তুপে পরিণত হয়। এর অবিরাম গতির
বিরাম নাই - যত অগ্রসর হবে, তত যাবার আকাঙ্ক্ষা বাড়বে। ধর্মের
বিজয় গর্বে ভারত যাতে চিরদিন সোণার ভারত থাকে---ভারতের
কণামাত্র অনুকম্পা নিয়ে যাতে বিশ্বমানবের পরিত্রাণ হয় এই সংকল্প
সিদ্ধির জন্য আমি মহাসাধনায় যাত্রা ক’চ্চি।

মাধবাচা ব্রা-গণ। ঈশ্বরে আপনাতে কোন পার্থক্য নাই—আমরা আপনাকে কোন প্রাণে বিদায় দো'ব ? যক্ষ। দেব! আমি কে ঐ শ্রীচরণ ভিন্ন জানিনা। আমার প্রত্যক্ষ ঈশ্বর আপনি-আর কি আপনাকে ফিরে পাবনা। মাধব। ফিরে পাবে ; মূর্তিমতী সাধনা-আষার এক নব শক্তিতে ফিরে আসবে, যেদিন প্রপীড়িত ব্রাহ্মণগণের করুণ আহ্বান অধৰ্ম্মর গ্লানিতে ব্যোমপথ ভেদ করে কাতরকণ্ঠ বেজে উঠবে। সনা। দাদা, দাদা! বুক যে ফেটে যায়। মাধৰ। হে আমার তরুণ জীবনদল। অশ্রু সংবরণ কয়। মুক্তিপথের নিশানধারী, তোমরাইত বিশ্বকে পথ দেখিয়ে, যুগে যুগে স্বাধীনতার ইতিহাস রচনা করে এসেছ। বর্ষার দুৰ্য্যোগে প্রলয়ের ঝড় মাথায় করে আত্মভােলা তােমরামান, সম্পদ, সমাদরের বুকে ঝাপিয়ে পড়েছ। আজ আমার অভাবে ভগ্নমনােরথ হও না। যক্ষ। জানিনা দেবতা, আবার কোন্ দেবলােক অলঙ্কৃত ক'বেন। . মাধব। ভারতের তীর্থক্ষেত্র ছেড়ে আমি কোথাও যান। এমন পবিত্র আলো-স্নিগ্ধ বাতাস-স্রোতস্বিনীর স্বৰ্মমুক্ত ক্ষীরধারা, এমন কোথায়? এখানকার ধর্মের লীলা খেলায় আনন্দের লুট হয়- ত্যাগের সঙ্গীতে হৃদয় ভাণ্ডার উপচে উঠে। শ্যামায়মান বনশ্রীতে নিবিড়কুন্তলা-নীলাম্বরপরিধানাবরাভয় সংবিধায়িনী “ প্রফুল্লাননী জননীর-অলক্তরাগরঞ্জিত পা দুখানি বুকে ধরে হিমালয়ের নিভৃত গুহায়-কল্প কল্প যুগ বসে থাকবে।

যষ্ঠ দৃশ্য ] মাধবাচার্য্য যক্ষ। আপনার প্রেমের গানে গােঙ্গ বিছানা ছেড়ে উঠছে। অশীতিপর বৃদ্ধ-বহু বর্ষের সঞ্চিত দুঃখের,ভার নামিয়ে-আবাৰ সৰল হয়েছে। ঋণভার জর্জরিত কৃষক-মরুভূমি কর্ষণ করবার জন্য লাঙ্গল কাধে করে সােজা হয়ে দাড়িয়েছে-আমাদের সে শক্তি কোথায় প্রভু। মাধব। আমার বেদান্ত দর্শন-সূক্ষ্ম প্রাঞ্জল ভাষ্য রইল। যার অনন্তশক্তি একদিন সারা বিশ্বকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। • আশীৰ্বাদ করি রাজা! তােমরা পতি পত্নী, রাম সীতার ন্যায় বাঙ্গোলাের সিংহাসন অলঙ্কৃত কর ! আর বংশপরম্পরায় ব্রাহ্মণ্যধর্মের স্থাপক হ'য়ে- ব্রাহ্মণ্য দেবের পূজায় আত্মদান করে-যুগ ধৰ্ম্ম রক্ষার্থে ত্রিভুবনের আদর্শ হও। যক্ষ। আজ হ’তে এ রাজ্য ব্রাহ্মণের ! যতদিন জীবিত থাকব ততদিন ভূদেব ব্রাহ্মণের সেবার কাটিয়ে দোব। গর্বের নিদর্শন, এই রাজমুকুট-নারায়ণের প্রতি কামনায় ব্রাহ্মণের উদ্দেশে সমর্পণ ক'লাম। ধৰ্ম্মরাজ্য রক্ষণে কিঙ্করের কাৰ্যে-এই অসিমা আমার অবলম্বন রইল। (সম্মুখস্ত সুবর্ণমণ্ডিত বৈদিক বেদিকায় মুকুট রক্ষা করিলেন।) সকলে! ধন্য, ধন্য মহারাজ ! মাধব। ভাই সনাতন, আমার শেষকাৰ্য্য সমাপ্তি ক'রে তুমি । ভারতের চতুঃসীমায় যে বিষ্ণুমন্দির প্রতিষ্ঠা ককেছি -বৈদান্তিক ক্রিয়ায় ভগবানের অর্চনায়-নর-নারায়ণের সেবায় পূণ্যপ্রভায়, চিরদিন সেই মন্দির সমুজ্জ্বল করে রেখাে। সনা। পায়ের ধুলা দাও দাদা! যেন তোমার কাৰ্যে এ পর মাআর কম হয়।

১১ মাধবাচার্য্য ( পঞ্চম অঙ্ক মাধব। আমার প্রাণের প্রাণ ব্রাহ্মণগণ ! দেখাে, মুখ রেখো; আমার বড় সাধের, বড় আশার, বহুকষ্টে গড়া নিষ্কাম ব্রাহ্মণ্য ধৰ্ম্ম, যেন অনাচারে ভ্ৰমবশে তার মর্যাদাহানি করনা। জেনো, তােমাদের পতনে ভারতের পতন তােমাদের উত্থানে ভারতের উত্থান। ভারতের প্রাণ --ধৰ্ম্মে অনুরাগ, ভারতের সম্পদ-সৰ্ব্বত্যাগ, ভারতের শক্তি- বিশ্বজনীন প্রেম। ঐ মহৎভাবে হৃদয় চির গঠিত করে---শ্রীহরির শরণাপন্ন হও। অহরহঃ তাঁর নাম কীর্তন কর, তার মধুময় নাম সৰ্ব্বাঙ্গে অঙ্কিত কর। সেই দীনের কাঙা দীননাথের চরণতলে মিশিয়ে যাও। এই শুভযাত্রার সময় বল-হরের্ণামৈব, হরের্নামৈব, হরের্নামৈব কেবলম্। সকলে। হরের্ণামৈব—হরের্নামৈব-হরের্ণামৈব কেবলম্। মাধব। (শূন্যদেশে চাহিয়া) ঐ, ঐ ব্রাহ্মণ্যদেব ! বৈষ্ণবী রূপিণী পরমা প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে-মহাশূন্যে অবিভূত হয়েছেন। মরি, মরি, কি পূর্ণ জ্যোতির্ময়ী মূৰ্ত্তি ! কি স্নিগ্ধ সুশীতল প্রভা! মন প্রাণ বিগলিত হচ্ছে। দয়াময়! বহুদিন তােমার সুধাংশুলাঞ্ছিত মুখখানি দেখিনি-কমল বাঞ্ছিত পদে প্রতি পুস্পাঞ্জলি দিইনি; আমায় সেবার অধিকার দাও,-সেবার অধিকার দাও। (শূন্তে জ্যোতিঃ বিকাশ-প্রেমােন্মত্ত অবস্থায় মাধবাচাৰ্য মহাপ্রস্থান করিলেন।) ব্রাহ্মণগণ। ওঁ ব্রহ্মণ্যদেবায় গােবিন্দায় বেদান্ত রূপিণে। বিশ্বেশ্বরায় বিশ্বায় ঐ গগ গুরবে নমঃ । ( সকলে ভুলুষ্ঠিত হইয়া প্রণাম করিলেন।) যবনিকা পতন।

লব্ধ প্রতিষ্ট কবি উক্ত দেশবিত গ্রন্থকার - শ্ৰীযুক্ত প্রসাদ চন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় বিদ্যারত্ব প্রণীত তুলসী-প্রতিভা ৮ বা ভক্তকবি তুলসীদাস। ( এফ, ডি, ক্লাব কর্তৃক মনােমােহন থিয়েটারে মহাসমারােহে অভিনীত ও হিতবাদী, ডেলিনিউ, সারভেন্ট, ভারতবর্ষ ইত্যাদি সাময়িক পত্রে এবং “জয়দেব" প্রণেতা হরিপদ চট্টোপাধ্যায়, সত্যচরণ শাস্ত্রী, মণিষিগণ কর্তৃক উচ্চ প্রশংসিত ভক্তিমূলক ঐতিহাসিক পঞ্চাঙ্ক নাটক। রামনামের প্রেমিক, হিন্দিরামায়ণ রচয়িতা, দ্বিতীয় বাল্মিকী ভক্তাবতার তুলসীদাসের অলৌকিক জীবনী ও তুলসীপত্নী রত্নাবলীর আত্মত্যাগ, মতিমালার নিঃস্বার্থ প্রেম, কমলার সতীত্ব, সুবেদার নন্দিনীর মনীষা, চরিত্রবলের নিকট নবাব ও দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতগণের পরাভব ইত্যাদি ঘটনা বৈচিত্রে ও ভাবধুৰ্যে অমানুষিক প্রতিভার ঘাতপ্রতিঘাতে, ভাষায় ও সঙ্গীত ঝঙ্কারে ও হারসে এই নাটক শিক্ষাপ্রদ ও আদর্শস্থানীয়। ডবলক্রাউন উত্তম লক্রাউন উত্তম এন্টিক পেপারে ছাপা ও সুন্দর বাঁধাই। মূল্য এক টাকা মাত্র।

উক্ত গ্রন্থকার প্রণীত প্ৰকাশি অন্যান্য গ্রন্থাবলী
২। বসন্ত প্রসূন।
(আবেগময়ী কবিতা-গ্রন্থ)
মূল্য।• চারি আনা মাত্র।
৩।
মাধবাচাৰ্য্য।
( ব্রাহ্মণ্য ধর্মের গরিমায়দীপ্ত, স্বদেশ প্রেমে উচ্ছ্বসিত,
সৰ্বজন প্রশংসিতৃ পঞ্চাঙ্ক নাটক।)
মূলা ১, এক টাকা মাত্র।
৪। সফল-স্বপন
(যন্ত্রস্থ)
হিন্দু মুসলমানের মহাসম্মিলন, আদর্শ জননী এবং বিশ্বপ্রেমের
জলন্ত নিদর্শনপূর্ণ সামাজিক নাটক।
মূল্য ৭ বার আনা মাত্র।
=
প্রাপ্তিস্থান। বরেন্দ্র লাইব্রেরী, বসুমতী কাৰ্যালয়, প্রকাশক
ও একয়ের নিকট।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Madhabacharjya

Author
Gangopadhyay,prasad Chandra
Title
Aitihasik Panchanko Natak
File name
Madhabacharjya
Text
OCR done
Citation
1923
Published
2010/04/21
Publisher
P. Ganguly,serampore
Language
Sanskrit
Pages
139
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Meghnad
DLI number
510381
Barcode
4990010016276.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
CV75ZaSsMfR
Download PDF

Madhabacharjya