Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kojagari
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কোজাগরী
শ্রীপ্যারীমােহন সেনগুপ্ত
পাঁচ সিকা
প্রকাশক
“অশােক চট্টোপাধ্যায়
প্রবাসী কাৰ্যালয়
১২০২, আপার সাকুলার রােড,
কলিকাতা
প্রবাসী প্রেস
১২০২, আপার সার্কুলার রােড,
কলিকাতা
শ্ৰমাণিকচন্দ্র দাস কর্তৃক মুদ্রিত
উৎসর্গ ঃ
পতৃতুল্য পূজনীয়
নিবারণচন্দ্র মুখােপাধ্যায়
শ্ৰীযুক্ত কুমুদবান্ধব মুখখাপাধ্যায়
শ্রীচরণেষু
মেহে প্রেমে আর করুণা-ধারায় ব্ৰিক্ত চিত্তে মম
করিলে সরস, করিলে সবল ; দেখাইলে অনুপম
মানব-জীবন-লক্ষ্য আমারে,—আজি তােমাদেরি করে
তােমাদেরি গড়া জীবনের ফুল নিবেদি ভকতি-ভয়ে।
অণ
শ্ৰাপ্যারীমােহন সেনগুপ্ত
No text on this page.
নিবেদন কাব্য-রচনা কবির নিকট আনন্দ-বিলাস। কোজাগরী পূর্ণিমার অমল স্নিগ্ধ আলােক যেমন বিশ্বভুবনকে স্বপ্নসুখে বিভাের করিয়া তুলে, কাব্যলােকের বিমল শীতল জ্যোতি তেমনি কবিচিত্তকে আনন্দময় স্বপ্নের নিবিড়তায় আচ্ছন্ন করিয়া রাখে। কাব্যটি কবির নিকট উজ্জল স্বপ্নলােকে বিচরণ। সেইজন্য কাব্যগ্রন্থের নাম রাখিলাম “কোজাগরী” আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “অরুণিমা” ১৩২৯ সালে প্রকাশিত হয়। তাহার পর ১৩৩০ হইতে ১৩৩৮ অবধি নয় বৎসরে রচিত আমার যে-সব কবিতা বিভিন্ন মাসিক পত্রে প্রকাশিত হইয়াছে, সেইগুলিরই অধিকাংশ লইয়া এই গ্রন্থ গ্রথিত করিলাম। নানা সাংসারিক কারণে এই দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশে এত বিলম্ব ঘটিয়া গেল। সেজন্য অনুরাগী পাঠকগণের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। যে-সমস্ত মাসিক পত্রে এই গ্রন্থের কবিতাগুলি প্রকাশিত হইয়াছিল সূচীপত্রে তাহাদের উল্লেখ করিলাম। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী বন্ধু শ্ৰীযুক্ত রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রচ্ছদপটের পরিকল্পনা করিয়াছেন। তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞ রহিলাম। স্নেহভাজন মা জিতেন্দ্রনাথ সেন, মা সন্তোষকুমার সেন, শ্ৰীমান অনিলকুমার সরকার, মা গণেশচন্দ্র দত্ত ও ক্রমান মহিমারঞ্জন রায় প্রেস-কাপি রচনায় আমাকে সহায়তা করিয়া সুখী করিয়াছেন। শ্রীপ্যারীমােহন সেনগুপ্ত গগাপীনাথপুর বারহাট্টা, হুগলী ফান, ১৩৩৯
No text on this page.
} ৬ ৫০০ ১২ ১৪ २० ২১ ৪. ৩১ मृती কোজাগরী (বঙ্গবাণী, কার্তিক ১৩৩৩} পাতার দোলা ( বঙ্গবাণী, বৈশাখ ১৩৩৩ ) বুদ্ধগয়ার পথে (বঙ্গবাণী, অগ্রহায়ণ ১৩৩০ ) আলােক-স্তুতি (শক্তি, শ্রাবণ ১৩৩২) বিদ্রোহী কবি মধুসূদন ( প্রবাসী, ফান ১৩৩৩ ) প্রিয়া-স্মৃতি (ভারতী, ফাল্গুন ১৩৩০ ) শ্রাবণ-মধ্যাহ্ন (মানসী ও মর্মবাণী, আশ্বিন ১৩৩৬) কৈকেয়ী (প্রবাসী, ফাল্গুন ১৩৩) রাতের বাদল ( প্রবাসী, কার্তিক ১৩৩৩) জয় স্বাধীনতা জয় (প্রবাসী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৪ ) বঙ্কিমচন্দ্র (প্রবাসী, বৈশাখ ১৩৩৫ ) অন্ধকারে (মানসী ও মর্মবাণী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৫) বাদল-সকাল (বঙ্গলক্ষ্মী, আষা ১৩৩৫ ) রবীন্দ্রনাথ (পঞ্চপুষ্প, বৈশাখ ১৩৩৭ ) শরৎ-মধ্যাহ্নে ( প্রবাসী,কার্তিক ১৩৩৪ ) রণ-সঙ্গীত (প্রবাসী, ভাদ্র ১৩৩৪ ) দুঃখানন্দ ( উদ্বোধন, ফাল্গুন ১৩৩২) কর্ণ (প্রবাসী, ভাদ্র ১৩৩১) শীতের রৌদ্র (প্ৰবৰ্ত্তক, মাঘ ১৩৩৪ ) বাতায়নে (দীপিকা, শরৎ সংখ্যা , ১৩৩৩:) যৌবন-বন্দনা ভারতচন্দ্র (মানসী ও মর্মবাণী, বৈশাখ ১৩৩৬) গৌতমের গৃহত্যাগ (প্রবাসী, চৈত্র ১৩৩০ ) ভাদরে (বঙ্গলক্ষ্মী, ভাদ্র ১৩৩৫ ) পুরুষ ও নারী (বঙ্গলক্ষ্মী ) . . . ৩৮ . ৩) ৫ ৪১ . ৪৩ ৪৫ ৪৬ ৫৪ ৫০০ ০৫ . ৫০০ ৭৩ ৭৪ ৮৩ ৮৫ ২ * ০ ০ . ১৪ ০ ০ ০ বর্ষ মিলন (মানসী ও মর্মবাণী, ১৩৩৫ ) মৃত্য-অভিযান (প্রবর্তক, বৈশাখ ১৩৩৯) ধরণী (বঙ্গবাণী, ফাল্গুন ১৩৩২) নিদাঘ-মধ্যাহ্ন (প্রবর্তক, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৬) রবীন্দ্র-বন্দনা (প্রবাসী, শ্রাবণ ১৩৩৪) চাঁদের আলােয় (বঙ্গলক্ষ্মী, কার্তিক ১৩:৫) ভাগলপুরের পথে (ভারতবর্ষ, মাঘ ১৩৩৭) দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন (শ্রীদেশবন্ধু, আষাঢ় ১৩৩৮) মরিতে হবে ( উত্তরা, মাঘ ১৩৩২) আমার দেশ ( ভারতবর্ষ, ভাদ্র ১৩৩৬) জন্মভূমি ( ভারতবর্ষ, অগ্রহায়ণ ১৬৩৭) স্বপ্নলা ( বিচিত্রা, মাঘ ১৩৩৫) কাল-বৈশাখী (প্রবাসী, বৈশাখ ১৩৩৩) হও আগুসার (প্রবর্তক ) সপ্তর্ষি (বঙ্গবাণী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৩) জন-পথে (দীপিকা, আষাঢ় ১৩৩৪ ) রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী (মানসা ও মর্মবাণী, ফাল্গুন ১৩৩৫ ) •• সংশয়ী (যুগান্তর, ১৩২৯) মুক্তি দাও ( মাসিক বসুমতী, কার্তিক ১৩৩৭ দেওঘর ( বঙ্গবাণী, চৈত্র ১৩৩৩) বাদল-জল (বঙ্গলক্ষ্মী, শাবণ ১৩৩৫ ) ছত্রপতি শিবাজী (প্রবাসী, চৈত্র ১৩৩৩) দুপুরে (দীপিকা, শ্রাবণ ১৩৩৪ ) সিন্ধু ( প্রবাসী, আশ্বিন ১৩৩১) গান্ধী-বন্দনা (ভারতবর্ষ, বৈশাখ ১৩৩৮) জাগ্রত ভারত (পঞ্চপুষ্প, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৭ ) বিদায় (মানসী ও মর্মবাণী, চৈত্র ১৩৩৪) E এ । ১০৪ ০ ০ ০ ১১১ ১১২ ১১৮ ১১৯ | F ১৩১ ১৩২ ১৪০ ০ ১৪২ ১৪৬
কোজাগরী
কোজাগত্রী
কে জাগর?-কে জাগ রে ?—কে জাগে আজ এই নিশিতে ?
যে জাগে সে সত্য কবি, সে-ই জানে প্রাণ মিশিয়ে দিতে
বিশ্বপ্রাণের লীলার সাথে ; সে-ই জেনেছে পিইতে মধু ।
সে-ই জেনেছে দেখতে কিরূপ রূপ-গর বিশ্ববধূ।
রাত তাে এ নয়,এ যেন রে শুদ্ধ শােভার মুর্তিখানি
আকাশ-রাজার স্বপ্নে-দেখা স্বপ্নময়ী এ এক রাণী।
ফুলের হাসি, নারীর শােভা, প্রভাত-বিভা, সঁঝের মায়া
টুকরাে শােভা ছড়িয়ে যা’ রয় সে এই রাতির ক্ষুদ্র ছায়া।
সব শােভারি পূর্ণমিলনপূর্ণ-বিকাশ কোজাগরী
বিশ্বহিয়ার রূপের তৃষা কি রূপ ধরে মরি মরি!
বর্ষা-শ্যামল বিশ্ব-দেহে লাগল জোয়ার যৌবনের
তাই এল আজ নিশার রূপে প্রিয়া তাহার, ঘেরি’ ঘেরি’
সবটা তারি প্রতি দিয়ে শুভ্র উজল প্রীতির সুধায়,
পিয়ে পিয়ে বিশ্ব বিবশ, সুখ ছাপে তার হিয়ার কানায়।
বর্ষা স্নেহ বিলিয়ে গেল, জাগিয়ে গেল প্রাণের সাড়া,
সে-প্রাণ পেল পরিণতি তৃপ্তি ধৃতি প্রীতির ধারা।
••
কোজাগরী শােভার সেরা শরৎ-শােভা, সেই শরতের হৃদয়-রাণী জুড়িয়ে দিল সকল হৃদয়, মুছিয়ে দিল সকল গ্লানি। এই ধরাতে হিংসা আছে, লােভ আছে দ্বেষ, মারামারি সব ভুলে যাই যতই হেরি কোজাগরীর সাগর-বারি। রৌদ্র আছে, ঝঞা আছে, আছে কাটা, দুঃখ শত- সব ভুলে যাই, সব ভুলে যাই, চিত্ত অগাধ-তৃপ্তি-রত। কোজাগরীর রূপ-সাগরের জোয়ারে আজ ভাছি একা, যাক নিয়ে যাক, যাক রে নিয়ে, ধরার সাথে আর না দেখা ; আর না আসা দুঃখ-শােকের ঘূর্ণিপাকে বিষম খেতে ; আর না আসা কোলাহলের আঘাত নিতে বক্ষ পেতে; আর না আসা চোখের জলে করুতে বরণ ভাগ্য রূঢ় ; আর চাহি না জানতে দুখের অন্তরেরি তত্ত্ব গূঢ়। দে রে ছুটি দে রে ছুটি আজকে রাতের সঙ্গে ছুটি ; দু’পায়ে আজ দুঃখে দলে সুখ লুটি রে সুখ সে লুটি। দীর্ঘা রহ দীর্ঘতমা, হে পূর্ণিমা কোজাগরী, দিবসে আর জাগিও নাকো, ভােমার বুকেই যাই গাে মরি। কিম্বা নিয়ে চলাে আমায় যেথায় তুমি চিরন্তনী, অমর করে রেখে সেথায় পিইয়ে সুধা সঞ্জীবনী । রূপের নেশায় করলে পাগল, এ নেশা মাের ভেঙো নাকো, এই নেশাতেই নিবুক জীবন, এই স্বপনেই রাখাে ঢাকো। ২
কোজাগরী
কোজাগরী ললা শর্বরী, চিত্তক্ষুধার পরম সুধা,
পিয়ে পিয়ে তােমার সুধা কাঙাল হিয়ার জুড়ায় ক্ষুধা।
যাই ভেসে আর পান করে যাই, একলা আমি, নাই রে কেহ ।
কোজাগরী শয়ন আমার বিলাস স্বপন পেয় গেহ।
ভেসে ভেসে চলছি আমি রূপ-সাগরে ভেসে ভেসে,
রূপের সে ঢেউ আছড়ে গায়ে যাচ্ছে ভেঙে শুভ্র হেসে।
চছি ভেসে অবাধ সুখে-ধরার ছেলে নই রে আমি,
রূপ-সাগরের ফেনা আমি, তার গতিরই অনুগামী ;-
কখন্ ভুলে উঠেছিঃ ধরার কূলে-কে তা জানে ?
দূর আবাসের আভাস পেয়ে আজ ছুটেছি তাহার টানে।
দোল দে রে ঢেউ, দে রে দোলা, নয়ন মুদে আজকে বুঝি-
এলাম ভেসে যেখান হতে চছি সেথা সােজাসুজি ।
কোথা সে ঠাই জানি নাকো, জানি আমি হাসির ছেলে,
সুন্দরেরি ছেলে আমি, তার বুকে যাই বক্ষ মেলে।
কে জাগর ? কে জাগে রে ?—কে জাগে আজ এই নিশিতে ?-
কবি জাগে, কবি জাগে, সে জাগে প্রাণ মিশিয়ে দিতে।
৩
কোজাগরী
পাতার দোলা
অদূরে ধীর বায়ে উজল রােদ মেখে
অশথ-পাতাগুলি দুলিছে েেক থেকে।
সবুজ পাতাগুলি
করিছে কোলাকুলি-
চপল ভাইগুলি যেন রে নেচে নেচে
এ ওরে ভালবাসে কত না যেচে যেচে।
পাতার দোলালি
দিল রে প্রাণে তুলি’
গােপন কোন্ বাণী প্রকৃতিপ্রাণ হ’তে,
কি যেন দূর কথা এল রে ভাব-স্রোতে।
এই যে আমি চলি,
হাসি ও খেলি, বলি,
এই যে মাের মাঝে প্রাণের মাতামাতি-
এই এ ছােট প্রাণ
মহতাে মহীয়ান
সবার পিছে রহে তৃণে ও ধূলাসাথী।
৪
পাতার দোলা
ফুল যে হাসে, ফোটে,
তরু যে ঠেলে ওঠে,
তৃণ যে দোলে, নাচে, পাতারা করে খেলা,
এক সে একই প্রাণ
বিকাশে অফুরাণ,
মানুষে জীবে তৃণে তাহারি লীলা মেলা।
অশথ-পাতাগুলি
করিছে কোলাকুলি,
দোলে রে দোলে তারা, পরাণে দেয় দোলা ;
আজিকে প্রাণে মনে
শােণিত-গতি সনে
ও দোলা মিশে দোলে, বুঝি তা ভাব-ভােলা।
কোজাগরী
বুদ্ধগয়ার পথে
আজ চলেছি সকালবেলা বুদ্ধগয়ার শুদ্ধ পথে,
মন রে আমার, শান্ত থেকো, ক্রুদ্ধ নহে কোনাে মতে।
বাম দিকেতে ফন্তু রােগ বইছে ধীরে ঝিরি ঝিরি,
শিয়রে তার বিরাট-বপু পাহারা দেয় বিন্ধ্যগিরি।
কোন্ সে গিরি ফল্গু-জনক ?-কার স্নেহে সে বক্ষ ভরে ?-
নিদয় তাহার এ কি পিতা! নেই কি স্নেহ ফন্তু তরে ?
কাতর চলে করুণ সুরে ফন্তু চলে বিষাদিনী
বালির তটের বুক মেলে সে ভাবছে উদাস—কি না জানি।
বট-অশথে আমের গাছে বুদ্ধগয়ার পথটি ঢাকা-
এ কি মােহন, এ কি শীতল, এ কি আঁচল স্নেহমাখা।
কোন্ বেদনা কাহার প্রভাব আজকে এরা বক্ষে রাখে!
যতই চলি ততই ভুলি কার সে অপার অনুরাগে !
এই এ শীত স্নিগ্ধ ছায়ায় ঢাকা যেন কাহার বাণী--
এ বাণী কি সেই মানুষের, সে নর-দেবের ?—বেদন মানি’
দুঃখ মানি’ দৈন্য মানি’ চিত্ত যাহার জিনল সবে,
আত্মবলের শিখায় যাহার পুড়ল যত শঙ্কা ভবে ?
৬
বুদ্ধগয়ার পথে
ফনদীর এই জলে কি পথশ্রমে কাতর-হিয়া
সে রাজতনয় করূল পরশ, হরূল তৃষা এ জল পিয়া ?
যতই চলি চিত্তে আমার উঠছে জেগে সেই সে কথা
সেই সে শুদ্ধোদনের তনয় ঘর ছেড়ে চায় নিজনতা ;
নিজনতা কোথায় মিলে ?—কোথায় মিলে একটি কোণে
সবার আড়ে একটু সে ঠাই গুহায় কিবা গহন বনে-
যেথায় বসে বুঝতে পারে জগৎ-জোড় দুঃখ-ব্যথা,
জগৎজন-বেদন-পেষণ, দুষ্ট-শােকের কঠোরতা,
মৃত্যু-দানবেরি দলন, অত্যাচারের নির্দয়তা,
ছােটর 'পরে বড়’র পেষণঃ অহঙ্কারের প্রমত্ততা,
মানব-প্রাণ-দলন শত দুঃখ পীড়া দৈন্য কিবা,
যেইখানেতে চিত্ত মাঝে জমবে গভীর রাত্রিদিবা,
জমবে এবং ভাবিয়ে যাবে—কেনই আসে, শেষ কেমনে ?
কেমন করে জিনবে মানুষ এই বেদনে এই পীড়নে ?
কোথায় সে কোণ কোন্ গহনে, কোথায় সে কোন্ গিরিমূলে,
ববে যুবক রাজী তনয় চিত্ত বেঁধে বিলাস ভুলে ?
কোথায় পাব, কোথায় সে ঠাই ?-এই তৃষাতে যাচ্ছে যেন
শুদ্ধোদনের শুদ্ধ তনয়, বৎসহারা হরিণ হেন।
আজকে বুদ্ধগয়ার পথে আড়াই হাজার বর্ষ-কথা
মনের মাঝে উঠছে ভেসে—ভাবছি এই সে নিজন,
৭
কোজাগরী
এইখানে তাে ব্যাকুল বুকে এল ব্যাকুল যুবক ঋষি,
বন খুঁজেছে নদীর তটে পাহাড়-মূলে দিশি দিশি।
এই পথে সে গিছল না কি ?—আছে সে পথ আজও বেঁচে ?
এই বনে কি লুকিয়েছিল দুঃখ-মােহ-মুক্তি যেচে ?
কে আজ মােরে বলতে পারে—পারে কি ওই নিবা গিরি ?
সেই যুবকের বেদন-ব্যথা রাখে কি ঐ ফন্তু ঘিরি’?
আছে কি গাছ পরশ-পাওয়া, ফল দিল যে সেই যুবারে ?
এই মাটি তার চরণ-পরশ লুকায় কি ও ধূলার ভারে ?
চলছি ধরি, মনটা যেন কিসের ভারে পড়ছে নুয়ে,
সেই সে মহান বিরাট প্রাণের আভাস মােরে যাচ্ছে ছুয়ে,
যাচ্ছে ছুয়ে ধূপের মত !—উথলে ওঠে, নুইয়ে পড়ে
পরাণ আমার চিত্ত আমার কোন প্রীতিতে ভক্তিভরে !
আজ জেনেছি, আজ পেয়েছি পথের মাঝে সেই পুরুষে,
আজ বুঝেছি বেদন তাহার কবুতে ছেদন-সব কলুষে ।
গাছের ছাওয়া, নদীর গাওয়া, বিন্ধ্যগিরির যৌন চাওয়া-
সব মিলে আজ চিত্তমাঝে বইয়ে দিল দূরে-হাওয়া
দূরের হাওয়া, দূরের কথা, সুদূর লােকের পরম মাভৈঃ
সেই যুবকের চিত্তে জাগা কোথায় ব্যথা দুঃখ বা কই!
চলছি আমি চলছি আমি বুদ্ধগয়ার শুদ্ধ পথে,
শুদ্ধ পথে শুদ্ধ বনে, বুদ্ধদেবের প্রেমের-রথে
বুদ্ধগয়ার পথে
ডাক এসেছে, ডাক এসেছে, বইবে যেন আমায় তাহা
কোন্ সেলােকে!-কীসে আলাে !—কী সে পরম জ্যোতি আহা!
চিত্ত জাগে, চিত্ত দোলে, চিত্ত ভাসে আলাের স্রোতে
দুঃখ-ব্যথার অতীত আলাে মুক্ত জগৎ-কলুষ হ'তে !
এত্তটুকু নেইক গ্লানি, নেই তাতে আবিলতা,
মন ভরেছে, প্রাণ ধুয়েছে সেই আলােরি অমলতা!
বুদ্ধ পরম! বুদ্ধ গুরু! সকল দুখের কারণ জ্ঞাতা!
দুঃখ সয়ে দুঃখ-জেতা! বেদন-নত জনের ত্রাতা!
আজ পেয়েছি অভয় বাণী, পথ সে কোথায় বল মােরে,
কেমন করে জিব ব্যথা জড়িয়ে থেকে ব্যথার ডােরে ?
শক্তি সে দাও, দাও সে আশা, দাও পরম বুদ্ধি তব
বুদ্ধগয়ার ক্ষুদ্র কোণে জাগল যাহা অভিনব ।
আজ চলেছি ধরি ধরি, ফন্তু বহে, বিন্ধ্য চাহে ;
বুদ্ধগয়ার পথখানিতে লুটিয়ে থাকি শীতল ছায়ে ।
লুটিয়ে থাকি, মিশিয়ে থাকি, যুগ-যুগান্ত আঁকড়ে থাকি,
সেই যুবকের দুঃখ-নাশের ব্যাকুল বেদন বক্ষে রাখি।
ফ চলুক, বিন্ধ্য দেখুক, সেই অতীতের সাক্ষী যারা,
এই পথে মাের ক্ষুদ্র পরাণ সেই পরাণে হউক হারা;
হউক হারা, হউক সারা, পার হয়ে যাক্ সকল ক্লেশে-
এ পথ মােরে যা নিয়ে যা সেই মহানের মানস-দেশে।
৯
কোজাগরী
আলােক-স্তুতি
দৃপ্ত উজল দীপ্তিমান
জাগিল প্রভাত জগৎ-প্রাণ।
নাই নাই নাই নাহি রে ভয় !
প্রণমি আলােক, আলােক জয় ।
রশ্মি-শায়ক তীক্ষ্ণ ধায়,
আঁধার-বক্ষ ভেদিয়া যায়।
লুটায় আঁধার রক্তময়!
বিজয়ী আলােক, আলােক জয় !
বিরাট অটল অন্ধকার
এ শিশু-হস্তে লভে প্রহার।
কৃষ্ণ পুতনা করিছে ক্ষয় ;
হে বীর আলােক, তোমারি জয়।
১০
আলােক-স্তুতি
আঁধার করিল স্তন্যদান,
তাহারি গর্ভে লভিলে প্রাণ,
তাহারি আজিকে করিছ লয়,
হে মহাবিজয়ী, তােমারি জয়।
জীবন জীবন দৃপ্ত-বুক!
মৃত্যু লুটায়, লুকায় মুখ ।
জাগাে জাগাে জাগাে,-নিদ্রা নয় !
জীবন এসেছে, আলােক জয়।
সত্য নিত্য মিথ্যা-ত্রাস,
জীবন-জনক, সুপ্তি-নাশ,
মুক্তি মুক্তি দীপ্ত-হাস,
মূর্ত অন্য ও উল্লাস!
শক্তিধারক, হাস্যময়,
জিনিছে জড়তা, জিনিছে ভয়।
বিশ্বজীবন আলােক জয়!
নবীন আলােক আলােক জয় ।
কোজাগরী
বিদ্রোহী কবি মধুসুদন
হে বিদ্রোহী উদ্ধৃঙ্খল, হে বাংলার দুরন্ত সন্তান!
মাননি শাসন কোনাে, চূর্ণ করি’ নিষেধ-পাষাণ,
সমাজ-বাঁধন ভাঙি, করি’ ভেদ ধৰ্ম্মের নিগড়
উন্মত্ত-চরণ-ভরে চলেছিলে চির-অগ্রসর!
ছুটেছ আশার পিছে,সে আশা কভু বা মরীচিকা-
ক্ষণেকে মােহিয়া আঁখি ক্ষণ পরে যাহা বিভীষিকা!-
তারি পিছে ছুটে গেছ উদ্দাম অবােধ বাধাহীন ;
ভেঙে গেছে মােহ কত, তবু মােহ হয়নিক ক্ষীণ।
যে-আশা ছুটেছ ধরি’ মেটেনিক সে তােমার আশ,
তবু চির-অভিলাষী, তবু ছিল উল্লাস-উচ্ছ্বাস !
শান্ত বঙ্গ-গৃহে স্নিগ্ধ জ্বল নাই প্রদীপের শিখা,
বৈশাখের মেঘে তার দীপ্ত তুমি বিদ্যুতের লিখা!
হে দুরন্ত দৃপ্ত কবি! বিদ্রোহ-পাগল সেই প্রাণ
নৃত্যতালে প্রসারিয়া করি’ দিলে নব-গতি-মান
ক্ষীণা সে কাব্যের নদী-শৈবালে জঞ্জালে হতবল
সনাতন অবসাদে, পুরাতন-উপলে বিহাল ।
বিশ্ব-সাগরের বার্তা তারি গতি করি’ আহরণ
শীর্ণা ভাষা-তটিনীতে জাগাইলে প্রাণের নৰ্ত্তন!
বিদ্রোহী কবি
মধুসূদন
বাল্মীকি ব্যাসের সাথে মিলাইলে ভাজ্জিলে হােমারে,
কৃত্তিবাস কাশীদাস জেগে ওঠে প্রতীচ্য-হুঙ্কারে।
বঙ্গের শঙ্খের সাথে বেজে ওঠে পশ্চিমের ভেরী,
কাব্যের চরণ হ’তে খসে পড়ে জড়তার বেড়ী!
নিত্য নব আশা পানে ছুটেছিলে উন্মাদ সমান ;
এক আশা বঙ্গ-ভাষা তাতে তব একান্ত ধেয়ান!
আজ ভাবি—সেই ভালাে, নৈরাশ্যে নৈরাশ্যে বল লভি’
ব্যগ্র আশে পূরিয়াছ আমাদের আশা তুমি, কবি !
যে-তৃপ্তি খুজেছ নিতি পেলে তাহা হয়ে যেত শেষ,
অতৃপ্ত আবেগে তবে কে দেখাত সুখের উদ্দেশ ?
তুমি রচি’ গেছ পথ বনদল উপাড়িয়া বলে,
আজি সে পথের 'পরে রবির অমল জ্যোতি জ্বলে ।
দেব-ত্রাস মধু দৈত্য নাশে যেই সে মধুসূদন,
বাংলার কাব্যের কক্ষে তুমি কবি জড়তা-দলন !
সমাজে দলেছ পায়ে, স্বধৰ্ম্মে ভেঙেছ দৃঢ় হাতে ;
দরদ দিয়েছ তবু জাতির অভাব-বেদনাতে ;-
মাতৃ-ভাষা-জননীরে, হে দরদী, রাখনিক দূরে
প্রাণরসে পুষ্ট তারে করিয়াছ নিত্য চিত্ত-পুরে।
মুক্তি পেল বদ্ধ যাহা সুপ্তি-মাঝে শুনি’ মেঘনাদ ;
নবচ্ছন্দে নেচে এল নবীনের বিচিত্র সংবাদ ।
আজি তব জন্মদিনে নমস্কার, বিদ্রোহী মহান্ !
নমস্কার সে-বিদ্রোহে যে-বিদ্রোহ আনিল কল্যাণ।
=
কোজাগরী
অফুরন্ত সুগভীর সীমাহীন প্রেম-পারাবার
আজি মাের চিত্তমাঝে এপার ওপার
অবিরাম ফুলে ফুলে দুলে দুলে উঠে পড়ে সহাস্য গর্জনে,
উচ্ছ্বসিত তরঙ্গের আনন্দ-নৰ্ত্তনে।
কমলার মূর্তিখানি গর্ভ হতে তুলিয়া আদরে
আদিম সমুদ্র যথা মুগ্ধ তৃপ্তিভরে
ফুলে ফুলে ঢেউএ ঢেউএ ছুটে এল পদযুগ করিতে লেহন,
তেমনি এ চিত্তমাঝে যেই অগণন
একান্ত আপন মাের প্রেমভােলা প্রেমভরা প্রিয়া
প্রভাত-অরুণ সম উদেছিল জ্যোতি বিচ্ছুরিয়া
তাদেরি চরণ-মূল চুমিতে বেড়িতে, বিথারিয়া
উদ্বেল-প্রণয়-সিন্ধু উল্লাসে মেতেছে আজি হিয়া।
পথে পথে নিশিদিন করি’ আহরণ
নয়ন-হইতে-ঝরা হৃদয়-হইতে-গলা সকরুণ প্রেম-নিবেদন,
জমায়ে জমায়ে চিত্তে যা রেখেছি তুলি।
আজি তারা রচিয়াছে পূর্ণ সিন্ধু—সেই বিন্দুগুলি।
১৪
প্রিয়া-স্মৃতি কবে কারে বেসেছি ভালো গবাক্ষের ক্ষুদ্র পথে আশা-দেওয়া নয়নের মৌনপ্রেম-আলো অন্তরের অন্তস্তলে আঁধারের খুলিল কপাট। কোন্ জনতার হাট অতিক্রমি’ চলে গেছি—তারি মাঝে একখানি মুখ সরমে-হাসিতে-আঁকা মূৰ্তিধর। সুখ- কোমল করুণ আঁখি সাথে জীবনের ইতিহাসে লিখন রাখিল রেখাপাতে। নয়নে নয়নে নাহি কথা - কবে কোন নিরালায় লজ্জায়-আনতা মুখখানি হেরে হেরে’ সাথ গেছে হেরি হেরি আরো। কল্পনারে কহিয়াছি—আঁকো যত পারাে এ মুখের অবি-মােহন লিখন, একে বুকে রেখেছিনু করিয়ে যতন। কারে বা বেসেছি ভালাে, কাছে গেছি বার বার, সাধ গেছে শত শুধু শুধু একবার, শুধু নিমেষের তরে চিরদিন মত বক্ষে তারে চেপে ধরি—ওষ্ঠে ওষ্ঠে ঢেলে দিই প্রাণ একটি চুম্বনে শুধু হয়ে যাক্ আদান-প্রদান ; ব্যগ্ৰ হিয়া তাও লভিয়াছে।
কোজাগরী
আবার কোথায় কোন উৎসবের কোলাহল মাঝে
আমারেই বারবার হেরিয়া সে তরুণী পিয়াসী
ব্যস্ত ত্রস্ত অঞ্চলেতে প্রেম-বাহ চকিতে উচ্ছ্বসি
পরশ দিয়েছে মােরে-
পড়েছিল বাঁধা প্রাণ সেই স্পর্শ-সুখ-প্রেম-ডােরে।
আবার সে একদিন কোন এক সখী
অতিনা অতিধীরা-আড়ে আড়ে আমারে নিরখি’
নয়ন করেছে নীচুমেলেনি নয়ন,
ফিরিয়া চলিয়া গেছি-এহিয়া গােপন
হেরিয়াছি খোঁজে সে-ই মােরে বারবার
কাছে গেছি-আঁখি দুটি নত হ’ল তার,
আঁখিতে ফেলেনি আঁখি-লেখা-
তবু মােরে চেয়েছিল-তারপর গেছি একা একা।
আবার সে কার সাথে ঘন ঘন মৌন পরিচয়
বহুদিন ধরে ধরে নয়নে হৃদয়-বিনিময়
হয়েছিল সুনিবিড়
দেখা শুধু দেখা দেখা কামনা-অধীর।
দেখে পেয়েছি ব্যথা দোহে,
-দেখা হয়েছে শােধ দীর্ঘ-দেখা-তৃপতির অচপল মােহে
প্রিয়া-স্মৃতি
গেল চ'লে একদিনগণ্ডে তার হেরিয়াছি নয়নের জল,
সে-জল হৃদয় মাঝে তুলেছিল নদীস্রোত আবেগ-উচ্ছল ।
আবার পেয়েছি কারে সুচতুরা সুচপলা সুকৌতুকময়ী
আশা দেছে, হাসি দেছে,—সবার গােপনে রহি রহি’
চুমা দেছে, নেছে সেধে সেধে,
অভিমানে আলাপনে রেগে হেসে কেঁদে
আমারে বেসেছে ভালল-প্রসারিয়া বাহু দুইখানি
প্রেমের দুইটি ডাের বুকেতে নিয়েছে মােরে টানি,
কখনাে বা কোনো নিরালাতে
পিছু হ’তে চুপে চুপে এসে মাের আঁখি দু’টি টিপে দুই হাতে
বাম গণ্ডে সুনিবিড় চুমা দেছে আঁকি’
পলায়েছে, সেদিন দেয়নি ধরা,আজো
সেই আধা ধরা, আজ সে যে ফঁাকি।
আজি স্মৃতিভরা বক্ষে সেই যত পুজি
আকুলি বিকুলি’ ঘােরে মােরে খুজি’ খুজি
সেই মােরে-প্রেমাতুর, ভালােবাসা-সুবিলাসী, প্রণয়-প্রবণ।
আমি হাসি ব’সে দুরে, হাসে মাের মন।
হাসিছে গােপনে বসি’ অভিলাষী চপল হৃদয়।
সেই অযাচিত-পাওয়া সেই অযাচিত-দেওয়া প্রেম-অভিনয়
১৭
কোজাগরী চিত্তে মাের ঘুরে ঘুরে ভাসে ভাসে হাসে, পরতে পরতে পরশিয়া তরুণ উল্লাসে। প্রাণ-পথে-আলাে-দেওয়া, হৃদয়ের বন্ধমুক্তকারী, - স্নিগ্ধজ্যোতি সুমধুর অতিমনােহারী, ক্ষণিকের তবু যারা চিরদিনকার, আনন্দের হরষের সােনার জীয়নে জাগা দিল বারম্বার, অভিষেক-বারি-দানে জাগাইল হৃদয়ের প্রণয়-সম্রাট,- নিমেষের দানে, তবু সে দান বিরাট- আজি সেই অগণনা লাজনা স্মিত-স্নিগ্ধ-আঁখি প্রেয়সীর প্রেমাশীষ শিরে মাের রাখি’ চ'লে যাই চলে যাই—যেতে হবে দূর, হে মাের তরুণী তন্বী প্রাণপ্রিয়া প্রিয়াগণ । জেগে রহ অনিবার সেই প্রেমাতুর। তােমাদের স্নিগ্ধ আলো এই পথে পাথেয় আমার ; সৌন্দর্য্যের কণাগুলি! পরিপূর্ণ সে সৌন্দৰ্য্য বল কোথা অতুল অপার ? Sbr
শ্রাবণ-মধ্যাহ্ন
মধ্যাহ্ন কি মধ্যরাত্রি নাহি পাই ঠিক,
সা অন্ধকারে লুপ্ত গুপ্ত সৰ্ব্ব দিক্।
স্তব্ধতা বিরাজে সৌম্য নিবিড় স্তব্ধতা,
নাহি শব্দ শিহরণ চঞ্চলতা কথা।
জনহীন পথ আর বায়স নীরব ।
ব্যোমবুকে গুরু গুরু নীরদ সরব।
সে-রবে জাগিছে বিশ্বে ভীতিশিহরণ ;
জানায়—নহেক লুপ্ত বিশ্বের জীবন।
গৃহে বসি’ হেরি এই জীবন্ত আঁধার,
জীবন ও মরণেব লীলা-পারাবার।
হেরি আর ভাবি আমি এমনি বিলয়,
জীবনে মরণে দ্বন্দ্ব বড় মধুময়।
চঞ্চলতা সাথে সুপ্তি, রৌদ্রে অন্ধকার,
অশান্তিরে ধরে শান্তি, আনন্দ অপার।
১৯
কোজাগরী ফনী তােমার সব বুঝেছি, সব চাতুরী, দশরথ ! কাটা ভেবে সরাও তারে,-কাটায় তােমার ভরুব পথ ! মন্থরা! তুই ঠিক বলেছিস, রামকে দিয়ে রাজ্য-দেশ আমায় এরা করবে নীচু, শাসবে আঁখি রাঙিয়ে বেশ। শশাধ নেবে সব হিংসা যত, করবে আমায় গৰ্বহীন ;- কেমন করে হয় তা দেখি।-কৌশল্যা আর সব সতীন- পায়ের নীচে রাখনু যাদের আমায় তারা দলবে পায় ? কৈকেয়ী এ ভূর নাগিনী, ছোবল দিতে সুখ সে পায়। , না, আমার নেই তাে প্রেম, রামকে ভালােবাসব না পরের ছেলে ভালােবেসে নিজের ছেলে ঠেলব না। পুত্রশােকে মরূবে রাজা, কাতর হবে প্রজার দল রাম গেলে বন-ভরতকে কি আল টেনে বানের জল ? সে যদি হয় রাজা, তাতে দুঃখ বুড়াের হয় কিসে? প্রজাই এত কাতর কিসে? রাজার ছেলে নয় কি সে ভরত আমার ? আছি য’দিন দেখব কেমন কে পারে রুতে তারি রাজা হওয়া !—কবুব আমি ঠিক তারে অযােধ্যা-রাজ-সিংহাসনের একচ্ছত্র রাজার রাজ । কৈকেয়ী নয় কোমল মেয়ে, -ইচ্ছা যা তার হয় তা কাজ । কঁদুক বুড়াে, কাঁদুক সতীন, কঁদিয়ে আমায় করবে সুখ ! আমার মুখে ঢালবে কালি ?- কবুব কালো সবার মুখ!
কৈকেয়ী
( ২ )
[ দশরথের মৃত্যুর পর অযােধ্যায় ফিরিয়া আসিয়া ভরত কৈকেয়ীকে যথেষ্ট ভৎসনা
করেন এবং তাঁহাকে ত্যাগ করিয়া কৌশল্যার নিকট গমন করেন।
;
স্পর্ধা আমার আছেই তাে তা, থাকবে তাে এই অহঙ্কার ।
সাধ করেছি যখন যা তা ঠিক করেছি ; সাহস কার
ধতে মােরে, ঠেলতে মােরে?—মানুষ আমি জন্তু নই।
কিন্তু ভরত ভৎসনা করে!-শুননু তাও ? কারেই কই ?
আমায় বলে রাক্ষসী সে! আমায় বলে স্বার্থপর!
আমায় বলে পিশাচী সে! সাপের সমান বিষধর!
আর যে বলে বলুক এসব ; ভরত! তুইও ববি সেই ?
বুকের রক্তে করুনু মানুষ, তার কি কোনােই মূল্য নেই ?
কবুব আমি তাের অশুভ ? কেমন করে বুঝলি তাই ?
সৎ-মা হ’ল আমার সেরা ? আমার মুখে ঢালি ছাই!
যার জন্যে সব সয়েছি সে আজ মােরে দল পায় !
স্বামীর সােহাগ ত্যাগ করেছি, সতীন-সােহাগাড়মু তায় ;
দাসদাসীদের মৌন ঘৃণা, অযােধ্যারি রােষের বিষ
তাের তরে যে সইনু সবি! তুই আজ মােরে এ কি দি।
সেই অবজ্ঞা ! সেই হলাহল ! সেই অনাদর! অপমান!
সব পীড়া প্রাণ সইতে পারে, তাের অপমান সয় না প্রাণ!
পেটের ছেলে হাতের মানুষ, সেই ভরত আজ এ কি তুই।
শুভই যা তা ভাবছি সদা;—একটি যে তুই, নেইক দুই !
২৩
কোজাগরী
সিংহাসনে তােরে, মাণিক, দেখব সে যে অগাধ সাধ ;
সব আশা মাের নিভিয়ে দিলি ? ঘটিয়ে দিলি কী প্রমাদ !
দুঃখ ঘৃণা সই সবি, ভাবনু পাবি রাজ্যধন,
সেই সুখে মাের রইল পরাণ, হর্ষে-ভরা রইল মন।
সে ভরত আজ ত্যাগ করেছে, সে বলেছে—রাক্ষসী।
রাখনু চেপে যে-সব ব্যথা আজ উঠে সব উচ্ছ্বসি।
যাক অযােধ্য। যাক রসাতল, আয় রে প্রলয় গর্জে’ আয়,
আমার স্বপন ভগ্ন যখন প্রাসাদ কেন, কে আর চায় ?
যাক ভেসে যাক আজকে রাতে অযােধ্যাদেশ লুপ্ত হােক,
লুপ্ত হােক্ ও হাজার লােকের ঘৃণায়-ভরা ক্রুদ্ধ চোখ !
কৈকেয়ীকে কাঁদিয়েছে আজ ভরত তারি পেটের পুত,
যে চোখে কেউ জল দেখেনি সে চোখে জল-শােকের দূত।
কাঁদব আমি, নেই দুখ তায় ;-এ কান্নারি সঙ্গে আজ
যত্নে-রাখা এ রাজ্যপাট যাক রে নেমে পাতাল মাঝ ।
আজকে হ’তে কৈকেয়ী সে ভাববে তাহার ছেলেই নেই।
ভরত—সে তত শত্রু তারি—মরেছে সে নেইক সেই।
নেবে না সে রাজ্য ও ধন, আনুতে রামে ছুটবে বন ;
আপন মাকে এই অপমান করলে ভরত! কী ভীষণ !
দুঃখ সয়ে যার তরে আজ কিনু আমি বিপুল সুখ,
বুক দিয়ে যায় কনু মানুষ, সে এই আমার রাখছে মুখ ?
যে গর্ব মাের দাড়িয়েছিল উচ্চশিরে আকাশ-গায়,
ভরত! তারে নুইয়ে ধূলায় কবুলি গুড়া অবজ্ঞায় !
২৪
কৈকেয়ী ( ৩ ) [ ঘৃণায় ও বিদ্রুপে জর্জরিতা কৈকেয়ী প্রাসাদ-কোণে গােপনে অনুতাপে চতুর্দশ যৎসর কাটাইয়াছিলেন। রামের অযযাধ্যায় ফিরিবার সময় তাহার অনুতাপ প্রবল ও তীব্র হইয়া উঠে। বাল্মীকির রামায়ণে উল্লেখ না থাকিলেও কৃত্তিবাস লিখিয়াছেন- রাম ‘মা’ বলিয়া না ডাকিলে বিষাক্ত লাড় খাইয়া প্রাণত্যাগ করিবেন, কৈকেয়ী এমন প্রতিজ্ঞাও করিয়াছিলেন।] চোদ্দ বছর রাম গেছে বন-আছে নাকি কাল সে ফিরে, বাহন তারি কোন্ হনুমান জানিয়ে গেল। কালকে কিরে এই পােড় মুখ তুলব আমি সেই সে রামের চোখের পরে, হিংসা-বিষে জ্বলিয়ে যারে তাড়িয়ে দিনু সুখের তরে ? তাড়িয়ে দিনু গহন বনে-রাজ্য-সুখ ও স্নেহের সুখ সকল কেড়ে করুনু কাঙ্গাল, শাস্তি দিমু কঠোর দুখ। চোদ্দ বছর প্রতিটি দিন রামের ব্যথা বাজল মাের পাষাণ বুকে; বনচারী তার নয়নের তপ্ত লাের অগ্নিবিন্দু সমান আমার বুকের মাঝে রাত্রিদিন বােধ করেছি, জ্বালিয়ে দেছে, পুড়িয়ে মােরে কবুল ক্ষীণ। সেদিন আমি ভুলিনি যে, আমিই যেদিন পাঠাই বনে সাশ্রু চোখে মােরই কাছে বিদায় নিল মাের চরণে। তখন মনে দিইনি আমল তার সে কাতর করুণ ছবি, ভরত আমায় ছাড়ল যেদিন, সেদিন হ’তে বুঝনু সবি নামের বেদন, তার সে ছবি রইল জেগে ব্যথার সাথে, সে-ব্যথা মাের নিত্য সাথী স্বপ্নে জেগে দিনে রাতে।
কোজাগরী
ছাড়ল সতীন, পৌর-নারী, ছাড়ল দাসী, রাখল দূরে
কুর নাগিনী কৈকেয়ীরে শিউরে ভয়ে বিজন পুরে।
বিরাট পুরীর একটি কোণে বনু কঠোর নিজন,
দিনের পরে দিন চলে যায়, বক্ষে জমে বিরাট ব্যথা।
জুর নাগিনীর বিষের সে দাত ভাঙল ভরত, জানবে কে ?
পুড়ছে গরল দুখের দাহে, বুঝল না কেউ, কেউ না হেথা ।
রাম-বনবাস-ষষ্ঠ-দিনে দশরথ তাে ত্যজল দেহ,
ভরত দিল ভৎর্সনা মােরে, রইল কে আর করতে ঝেই ?
কার কাছে আর দাবী আমার, কার কাছে মাের গৰ্ব্ব রবে,
শাসিয়ে যারে ভুলিয়ে যারে কৈকেয়ী তার কাম্য লবে ?
সেদিন হ'তে নেই কেহ নেই, রইনু কোণে ঘৃণ্য একা ;
লক্ষ লােকের মনে কেবল হিংসা আমার রইল লেখা!
হিংসামূলে ঘুণ ধরেছে, বােঝেনি তা কেউ দরদী ।
কেউ আসেনি জানতে কি তাপ করূছে শােয়ণ নিরবধি।
আপন-গড়া দুঃখ আমার আপন হয়েই রইল নিতি,
জানল না কেউ-পেলাম শুধু নিদয় ঘৃণা, নিদয় ভীতি।
বনে বনে রাম ঐ ঘােরে দুঃখে ক্লেশে,--আমার হিয়ায়
সে ব্যথা যে বাজল কী ঘাের কী পীড়াময় বুঝবে কে তায়।
আমায় সে যে ‘মা’ বলেছে-সে কথা কি ভুলতে পারি?
পাষাণ ছিনু সে এক দিনে,-তাই বলে কি নইক নারী।
কৈকেয়ী
ছয় ছটা দিন পাশের ঘরে দশরথের আর্তরবে
প্রাণ গলেনি,আশায় ছিনু প্রাণের ভরত বসবে যবে
অযােধ্যারি সিংহাসনে, মিটবে আমার সকল গ্লানি ।
তার পরে সব উল্টে গেল,-ভরত দিল বজ্র হানি’!
সেই আঘাতে গর্ব গুড়া, সেই আঘাতে বুঝনু আঘাত
রামের বুকে দিলাম যাহা-ঘটুল যাহে রাজার নিপাত ।
গভীর রাতে রোজ মনে হয়-দাড়িয়ে যেন সেই দশরথ
সামনে আমার ক্রুদ্ধ চোখে কটমটিয়ে,-করবে যে বধ !
চকে শুনি, ঘুম ভেঙে যায়, পাঁজর ভাঙা সেই সে ধ্বনি,
দশরথের সেই সে বিলাপ,-বুক কাপে মাের, প্রহর গণি !
মূর্তিমন্ত এস রাজা জীবন লয়ে দাড়াও ভূয়ে
সব অপরাধ কবুব স্বীকার, চাইব ক্ষমা চরণ ছুয়ে।
বসনহীনা ভিখারিণীর নগ্ন গায়ে বৃষ্টি-ধারা
যেমন বেঁধে, তেমনি যে রে রামের নিশাস তীব্র পারা
আমার বুকের চামড়া ভেদি মৰ্ম্মমাঝে বেদন তােলে !
অনশনে রাম যে বনে,সে কথা কি এ মন ভােলে ?
চোদ্দ বছর ‘মা’ বলেনি ভরত আমায়—পাইনি কোলে ।
সকল মেহ সব অভিমান বক্ষে জমে উতল দোলে।
হিংসা যত উচ্চাভিলাষ বিলুপ্ত মাের, কান্না খালি
রূপ নিয়েছে অগাধ স্নেহের পব কারে এ মাের ডালি ।
কোজাগরী
'?
কী অপমান আমার হবে ভাবল না তা, ছুটল ভরত
রামকে হেথায় ফিরিয়ে নিতে; কিন্তু রামের উদার দরদ
মাের অপমান রক্ষা করে চাইল নাকো রাজ্য পেতে
সে-কথা যে আমার মনে জাগল কত দিনে রেতে।
সেই তাে আমার স্নেহের ভাজন, সেই ক্ষমাবা, দুঃখে সুখী,
কঁদন আমার স্নেহ আমার তারেই দেবাে-দুখের দুখী।
কাল সে ফিরে আসবে ঘরে, কিন্তু যদি মা’ না বলে
আমায় যদি নাই ডাকে সে, ঘৃণায় ছেড়ে যায় সে চলে,
কোন্খানে ঠাই থাকবে আমার ? কোন্ সুখে আর বাঁচতে চাবাে ?
মরুব খেয়ে-এই রেখেছি বিষের লাড়ু খাইব খাবাে।
কৈকেয়ী নাম ঘুচবে তবে, মুছবে সবার পথের কাটা,
তার বেদনা তারই সাথে বিলীন হবে-পাঁজর-ফাটা!
কিন্তু জানি এমন নিদয় নয় তাে সে রাম--নয় তাে কঠোর,
আসবে সে ঠিক আমার পাশে,বারে আশা, রে চিত্ত মাের।
রাতের বাদল
-
গভীর রাতে
বরষা সাথে
কি সুখ মনে জাগে !
ধরণীখানি
হৃদয়ে টানি
গভীর অনুরাগে।
বৃষ্টি পড়ে
তরুর 'পরে
গহন বন মাঝে ;
খােলা সে মাঠে
পুকুরে বাটে
গৃহের ছাদে নাচে।
আঁধার ঢাকে
ধরণীটাকে
ঢাকে সে দিশি দিশি,
তাহারি গায়ে
চপল পায়ে
বাদল নাচে মিশি”।
বাদল-ধারা
দিতেছে সাড়া,
ধরণী চুপে শােনে ;
কোজাগরী
ঝরে গাে ঝরে
বৃষ্টি পড়ে
ধরাতে, মম মনে।
জাহাজধাঁশি
আসিছে ভাসি—
তরাস বহি আনে।
ভীতির সাথে
হৰ মাতে
পরাণ মাঝখানে।
ঝরিছে ঝর
পিয়াস-হর
বাদল-ঘন-ধারা,
ঘুমাতে নারি-
উতল বারি
করিছে সুখে সারা
বাদল-ধারা-
নিদ্রা-হারা
হয়ে যে শুনি সুখে ;
গভীর রাতে
বাদল সাথে
হষ ও ভীতি বুকে
৩০
জয় স্বাধীনতা জয়
[ চীনের জাতীয় গাথা ]
হে মুক্তি, হে স্বাধীনতা, বিধাতার শ্রেষ্ঠ আশীৰ্বাদ,
শান্তি সাথে মৈত্রী করি’ আনাে আনাে বিচিত্র সংবাদ ;
মূৰ্ত্ত কর পৃথ্বীতলে দশেক সহস্র নব রূপ।
দানব সমান দৃপ্ত, প্রেতাত্মা সমান সৌম্য ভূপ
সর্বশীর্ষে উদ্ধাবোমে বিস্তারিয়া মহিমা মহান
এস হে নীরদ-রথেবায়ু তাহে অশ্ব বেগবান।
এস এস হে রাজনু, তেজসূৰ্য্যে বিতাড়াে আঁধার ;
ঘুচাও এ দাসত্বের অন্ধকার নরক-আগার।
শ্বেতচৰ্ম্মা ইউরােপা, বিধাতার হে দুলালী সুতা,
গৃহ তব দৈন্যহীন-সুপ্রচুর-অন্ন-মদ্য-যুতা।
আমি ভালবাসি মুক্তি মুক্তি মাের প্রিয়া মাের বধূ,
দিবসে সে চিন্তা মাের, রজনীতে স্বপ্ন সেই মধু
পিতৃভূমি প্রিয়তম, তােমার বেদনা দেয় ব্যথা !
মুক্তি-আশে ছুটি তাই, ছুটি লভিবারে স্বাধীনতা।
চঞ্চল সে স্বাধীনতা মুষ্টি হ’তে ছুটিয়া পালায়।
দুঃখজ লক্ষ ভ্রাতা দাসত্ব-পেষণে গুমরায়।
কোজাগরী । বায়ু বহে মনােরম, শিশির শােভিছে ঝলমল, স্নিগ্ধ গন্ধে পুষ্পদল সুবাসিত করে ধরাতল। কত নর হেরি ঐ রাজ্য লভি’ ভুঞ্জে শত সুখ, কেমনে ভুলিব তবু স্বদেশের যন্ত্রণা ও দুখ ? পিকিংএ হােথায় হের ব্যাঘ্র সম হিংস্রক সম্রাট প্রণতি মাগিছে দন্তে বিলুণ্ঠিয়া সিংহাসনপাট। অসহ্য বেদনা, হায়, মৃত আজ মৃত স্বাধীনতা ! সমৃদ্ধ এশিয়া আজ মরুভূমি—বিশাল শুষ্কতা! এ বিংশ শতাব্দী মােরা গড়িয়া করিব নব যুগ ; আজি ভরি’ বীৰ্য্যন্ত দৃপ্ত শত মানবের বুক জাগিছে একক আশা, ধ্বনিয়া উঠিছে এক সুর- “গড়িব নূতন পৃথ্বী, নব স্বর্গ, গ্লানি করি’ দূর ।” দাসত্ব-বিনত পিষ্ট লক্ষ চিত্ত স্বদেশের মম জাগুক অত্যুচ্চ গর্বে কোয়াংটাং হিমালয় সম। নাঞ্চলেওঁ, ওয়াশিংটন, বিমুক্তির দুর্জয় সন্তান, এশিয়ার কোটী চিত্তে মূৰ্ত্ত হও, করে শক্তিমান। হে হিন, আদি পিতা, কোথা পথ ? দাও হে অভয়, এস মুক্তি, স্বাধীনতা, করাে ত্রাণ, জয় তব জয়।
বঙ্কিমচন্দ্র
ধূলিধূম-সমাকীর্ণ ক্লিন্ন আজ সাহিত্য-গগন ;
এস দীপ্তকরােজ্জ্বল গ্লানিহৰ্তা মধ্যাহ্ন-তপন!
কুহেলি-কুটিজাল রশিদর্পে কর পরিষ্কার,
সুনীল নিৰ্ম্মল রূপে মুক্ত ব্যোম জাগুক আবার।
প্রােজ্জ্বল প্রাসাদে তব, হে সম্রাট, ঘােরে ফেরুপাল ;
তব শুভ্র রাজধানী ঘেরে আজ তৃণের জঞ্জাল ।
ন্যায়-দণ্ড হস্তে এস, হে বঙ্কিম, শক্তির আধার ;
এস সিংহ, স্তব্ধ কর ফেরুদলে তুলিয়া হুঙ্কার।
হুঙ্কারে গর্জনে তব উন্মথিয়া তােল বঙ্গদেশ,
চঞ্চলিয়া সঞ্জীবিয়া কর তারে দৃপ্ত মুক্তক্লেশ।
ভােমার ভেরীর নাদ প্রান্তরে ভবনে বনে পথে
ধ্বনিয়া রণিয়া বঙ্গে জাগাইয়া দিক সুপ্তি হতে।
এস বীর সত্য ন্যায়াধীশ হে ক্ষুদ্রদলন,
ঘৃণ্য ক্লিন্ন জায় যাহা ধূলিগর্ভে লভুক মরণ।
চরণে দলিয়া দাও উচ্চশির তৃণগুদল,
ভােমার নির্মিত বত্মে করে যাহা কুটিল সমল ।
৩৩
কোজাগরী
তােমার শীতল-স্নিগ্ধ জলাশয়ে করে যে পঙ্কিল
নাশাে সে শৈবালদল, পদ্ম হােক শুভ্র ও সুনীল।
*
ভুলে গেছি মাতৃমন্ত্র, দীনা বঙ্গজননীর মুখ ;
দাহন তােলে না চিত্তে লেলিহান অগ্নি সম দুখ।
মিথ্যা মােহে ভুলে গেছি রিঙ্গ নগ্না জননীর রূপ,
স্বার্থে লােভে দ্বন্দ্বে দ্বেষে রচিয়াছি মরণের কূপ।
এস ঋষি সত্যদ্রষ্টা দেশ-মুক্তি-যজ্ঞের ঋত্বিক,
বিভ্রান্তে দেখাও পথ, মাতৃমন্ত্রে কর হে নির্ভীক।
প্রতাপ, মহেন্দ্রে আনাে জীবানন্দ, দেবী চৌধুরাণী,
তব দৃপ্ত সুত সুতা হরুক এ নির্জীবের গ্লানি ।
বীৰ্যবস্ত কল্পনায় বীৰ্যবান শ্রীকৃষ্ণ বিরাট
বিমুক্ত করিয়া তুমি দেখাইলে স্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র।
সে-পুরুষ মহীয়ান্ নারীচিত্ত বাঙ্গালীর চোখে
আবার উজ্জলি’ তােল শক্তি-শ্যায়-মহিমা-আলােকে
তুমি পূর্ণ শক্তিমান, শক্তিমান মান সন্তান
গড়িলে যা ঘরে ঘরে আজি তাহা হােক মূর্তিমান্ ।
বীৰ্য্য চাই, শক্তি চাই, চাহি বেগ, উন্মত্ত যৌবন,
চাহি দৃপ্ত মেরুদণ্ড, উল্লসিত উদ্দাম জীবন।
মজ কুজ ভীত ত্ৰন্ত দুর্বল ও অলস বাঙ্গালী
তােমার জীবনমন্ত্রে প্রাণ-নৃত্যে উঠুক আস্ফালি।
৩৪
বঙ্কিমচন্দ্র
এস দ্রষ্টা, এস স্রষ্টা, এস ভ্রাতা, মুক্তির সাধক,
তােমারে আনি' আজ আলি মােরা যজ্ঞের পাবক।
নেতৃহীন শক্তিহীন শান্তিহীন এ বঙ্গের ঘরে
সাহিত্যসম্রাট এস বগুরু ন্যায়-দণ্ড-করে ।
কোজাগরী
অন্ধকারে
সন্ধ্যাবেলা আকাশ পানে আজকে আছি চেয়ে,
মন ভেসে যায়, প্রাণ ভেসে যায়, সুপ্তি আসে ধেয়ে ;
জীবন যেন লুপ্ত আমার ; বিপুল স্রোতে ভাসি,
অন্ধকার আর আলাের স্রোতে যাই রে সি’ হাসি।
খণ্ড মেঘের ঢেউএ ভরা আকাশ সিন্ধু হেন
আঁধার-আলাের জোয়ার-ভাটায় নিত্য দোলে যেন।
অনন্ত কাল এ স্রোত বহে অনন্ত প্রাণ বহি
অনন্ত জীব ডুবছে, আবার ভাসছে রহি’ রহি',
আমার মতন-নেইক বিরাম শান্তি কোনাে ক্ষণে,
বৃক্ষ ভাসে, মানুষ ভাসে, পৃথী, জীবগণে।
নেইক সাড়া ধরায় কোনাে, এক নারিকেল গাছ
মৃদুল হাওয়ায় দোলায় পাতা শূন্যতারি মাঝ ?
একটি দু’টি কাকের আওয়াজ, নেইক রে আর কিছু ।
ব্যাধের মত আঁধার এসে শব্দ পিছু পিছু
করলে তারে শায়ক-হত ; স্তব্ধ দিশি দিশি,
কেবল আমি জ্যান্ত যেন, তাও যে রে যাই মিশি’!
কে আনে রে মৃত্যু-পরশ-চিত্তে আমার লাগে ।
স্পন্দিত প্রাণ স্তম্ভিত হয় এ কার অনুরাগে !
৩৬
অন্ধকারে
শান্তি এ কি? এ কি গভীর মৃত্যুরি বন্ধন ?
এ কি বিপুল প্রাণের সাথে প্রাণের আলিঙ্গন ?
অবােধ উদাস বুঝতে নারি এ কারি আহ্বান ;
টানছে আমায় উধাও খালি অন্ধকারের বান।
আকাশ-বুকে আঁধার-স্রোতে আজকে ভেসে যাই,
যাই রে ভেসে গভীর দেশে, বন্ধ বাধা নাই।
হে অন্ধকার, হে পারাবার, জীবন-কাণ্ডারী,
নাও টেনে নাও, নাও গাে বুকে ; সইতে নাহি পারি
এই ধরণীর কঠোর মরুর দুঃখ-পেষণ-কারা ;
ক্ষতের পরে দাও গাে প্রলেপ, শান্তি-সুধার ধারা।
সে শান্তি দাও, মৃত্যু যদি হয় গাে তাহার রূপ,
তবুও তারে কবুব বরণ, সে মােৰ জীবনভূপ।
দিনের আলােয় দুঃখ আনে, দগ্ধ তাহে আঁখি,
এস আঁধার স্নিগ্ধ কোমল, চক্ষে বুকে রাখি।
জুড়াও জীবন, হে অন্ধকার, নিবাও ব্যথার শিখা,
শান্তিরি দাও স্নিগ্ধ চুমা, মৃত্যুরি দাও টীকা।
কোজাগরী
বাদল-সকাল
( গান )
আজিকে হৃদয়-মন খুলিয়া
প্রভাত-বাদলে তারে তুলিয়া
তরল আঁধার পরে রাখ রে।
রাখ রে সজল মেঘ-ছায়াতে,
নীরব নিথর ঘন-মায়াতে,
নীরবে চাহিয়া শুধু থাক রে।
দূর হ’তে শাদা ধোয়া আকাশে
আঁকিয়া বাঁকিয়া চলে বাতাসে,
ভিজা কাকে থেকে থেকে গুমরে।
কোথায় লুকাল রবি সভয়ে ?
আঁধারে বাদলে চলে বিজয়ে,
দিবসে রাতির ভীতি শিহরে।
আঁখি-পথে প্রাণ আসে ছুটিয়া,
শীতল বাদল-স্নেহ লুটিয়া
তৃপতি লভিয়া ফেরে গহ্বরে।
প্রভাতে আজিকে আলাে-আঁধারে
বুকে বাঁধি’ ধরারে ও ধারারে
যাও মরি,' আলােকে না জাগ রে?
৩৮
রবীন্দ্রনাথ
পূৰ্ব্বগগন মন্থন করি’ জাগিল যে-বি জ্যোতির্ময়,
সাগর উতরি’ প্রতীচী-আকাশে স্পর্শিল যার রশ্মিচয়,
যে ভণে চণ্ডীদাসের পীরিতি, উপনিষদের মৈত্রীগান
যার সঙ্গীতে হয়েছে মূৰ্ত্ত, ভারত-সত্য লভেছে প্রাণ ;
যে জানাল কত নিগূঢ় বারতা সহজ ভাষায় প্রকাশ করি,
সত্য যে খোঁজে দেশে দেশে আর কালে কালে যেথা রয়েছে পড়ি;
যে বলিল, প্রেম পরম কাম্য নরে নরে আর দেশে ও দেশে;
তেয়াগিল যেই রাজার উপাধি দেশের দুঃখে দারুণ ক্লেশে ।
প্রাচীন-ভারতমূৰ্ত্তি যে-জন আপন কাব্যে মূৰ্ত্ত করে ।
সাম্য মৈত্রী স্বদেশের-প্রেম যার সঙ্গীতে আপনি ঝরে ;
প্রাচীন-কাব্য-রীতি সনে যেই মিশাল সহজ কাব্য-রীতি ;
বঙ্গপ্রীতির সাথে সাথে যার আপনি আসিল বিশ্বপ্রীতি ;
দেশে যে দেখায় দেশের মূর্তি, বিদেশে দেখায় বিশ্বরূপ ;
অন্যায়ে যে-ই বলে অন্যায়, মেনেছে কেবল বিশ্বভূপ;
কোমল কান্ত গীতাবলি যার চণ্ডীদাসের গীতির পারা;
বঙ্গভূমির সুধা-নিঝর যার গানে পেল লক্ষ ধারা;
শ্রাবণের ধারাসম যার গীত বঙ্গভূমিতে প্লাবন আনে ।
শারদ জ্যোৎস্না সম যার গান তপ্ত হৃদয়ে শৈত্য দানে ;
কোজাগরী
ব্যথাতুরা নারী যার সঙ্গীতে আপনার ব্যথা মুক্ত দ্যাখে ;
শিশুগণ যার কাব্যে আপন খেলা আর হাসি ফুটায়ে রাখে।
বিরহ মিলন দুঃখ যাতনা কাব্যে যাহার পেয়েছে রূপ ;
বর্ষা শরৎ রাত্রি দিবা ও ফাগুনের হাসি-রসের কুপ ;
সকলে যেথায় করিয়াছে ভিড়, ভিজা মাটী যেথা গন্ধ ছাড়ে ।
ঝরা ফুল আর পথহারা নদী জানায় বেদনা দুঃখভারে ;
ক্ষোভে স্নেহে প্রেমে হেরি যেথা মােরা মানবের বহু লক্ষ ছবি ।
তৃণ ও আকাশ অন্ধকারের লীলা ও বেদনা বুঝে যে কবি ;
সেই সে মহান্ সেই সে বিরাট সেই প্রতিভায় নমস্কার ।
বঙ্গপ্রদীপ হইয়া হরিল জগৎজোড়া যে অন্ধকার।
প্রণাম প্রণাম, হে রবি মহান, পূৰ্ব্ব-গগন-উজলকারী,
রশ্মি যাহার পুরব হইতে হ’ল পশ্চিম-আঁধার-হারী ।
৪৩
শরৎ-মধ্যাহ্নে
আজি শরতের শান্ত মধ্যাহ্নবেলায়
বসে আছি কৰ্ম্মহীন, স্তব্ধ নিরালায়
আপনার গৃহ-মাঝে। বিমুক্ত তপন
ধরণীর স্নিগ্ধ অঙ্গে গাঢ় আলিঙ্গন
করিতেছে অনিবার।
এ গৃহ আমার
স্বর্ণ-জ্যোতি তপনের তপ্তপ্রেম-ধার
যতনে ধরিছে দেহে। ঘরে বসি ভাবি
আজি এ সুন্দর রৌদ্র নিখিলেরে ছাপি’
চলেছে কোথায় ? আম্র-তরু-শিরে-শিরে
পত্রে পত্রে, তটিনীর তরঙ্গিত নীরে,
বনে বাটে নদীতীরে শত শূন্য ভরি’
প্রসারিত পৃথিবীর বক্ষ পূর্ণ করি’
দুলিছে মাতিছে আজি রৌদ্র-পারাবার !
হের বসুধার আজি উচ্ছল ভাণ্ডার।
এ মােহন মধ্যাহ্নের সুবর্ণ-বিভায়
বিগতদিবস-স্মৃতি পরশিয়া যায়
৪১
কোজাগরী
আমার এ চিত্তে, চোখে। এই এ আলােকে
শত সুপ্ত আশা মাের জাগিছে পুলকে।
পশ্চাতে চাহিয়া দেখি-বিক্ষুব্ধ জীবন
পড়ে আছে উদাসীনবেদন পেষণ
ক্ষণিক হরষে ভরা লুপ্ত লক্ষ দিন,
কেহ দীপ্ত, কেহ ম্লান, কেহ দৃপ্ত, ক্ষীণ।
সম্মুখে চাহিয়া দেখি—কোন্ এক দ্বারে
বহিয়া এনেছি আজি চপল আমারে
উন্মত্ত আশায়। হানি সেথা করাঘাত,
কোন্ হর্ষ কি রত্নের লভিব সাক্ষাৎ ?
বল বল, স্বর্ণরৌদ্র, এ কোন্ দুয়ার?
জীবনের অমৃত কি এখানে অপার ?
৪২
রণ-সঙ্গীত
[ ইতালীর জাতীয় গাথা]
জাগাে ভাই জাগাে, জাগাে হে বন্ধু হাজার হাজার,
বরিতে নবীন উজ্জ্বল যুগ হও আগুসার
চল দলে দলে, চল দৃঢ় পদে, নাহিক ভয়,
চল চল ত্বরা ন্যায়ের যুদ্ধে লভিতে জয়।
হৃদয়-শােণিতে কিনিব সে-জয় কাম্য অতি ;
এ সাগর হতে অপর সাগর জানাবে নতি।
এ সারা ইতালী জুড়িয়া আমরা সকলে ভাই,
এক ভাষা আর এক সুখ আশা, দ্বিতীয় নাই।
যৌবন, ওহে যৌবন, তুমি মধুর প্রিয়,
হে সুন্দরের পরম বিকাশ, হে লােভনীয়।
তােমারি’লীলার ঘূৰ্ত্তি এই এ ফ্যাসিষ্ট-বল,
এ বল করিবে মুক্ত দেশের দাসের দল।
এই বলে বলী জাগ্ৰত আজি স্বদেশ মাের
লাঞ্ছনা ক্লেশ আর না সহিছে দুঃখ ঘাের।
নবীন জীবনে জেগেছে আজিকে সুপ্ত দেশ,
গরীয়ান আজি মহীয়ান সে যে দৃপ্ত-বেশ!
৪
কোজাগরী
জীবন-মশাল উজ্জ্বল করি’ উচ্চে জল,
ঘুচিবে আঁধার, অভিযান-পথ হইবে আলাে।
চল দৃঢ় ধীর চল সুস্থির শান্ত-গতি,
মুক্তি লভিবে তবে তাে পূর্ণ শুদ্ধ-জ্যোতি।
যৌবন, ওহে যৌবন, তুমি মধুর প্রিয়,
হে সুন্দরের পরম বিকাশ, হে লােভনীয় ।
তােমারি লীলার স্ফুৰ্ত্তি এই এ ফ্যাসিষ্ট-বল,
এ বল করিবে মুক্ত দেশের দাসের দল।
পরিখা-গহবরে রজনী জাগিয়া কাটিয়া পথ
গুলির দাহন দলিয়া চলিব, কে করে রদ ?
বহিয়া বহিয়া পতাকা আমরা চলিব দ্রুত,
সমর-ঘূর্ণী মথিয়া বহিব পতাকা পূত ;
বিজয়-লক্ষ্মী লুবেন পতাকা—দণ্ড তার ;
মানুষ আমরা মানুষের মত দুর্নিবার।
মােদের ইতালী ইতালী বলিছে—কর রে রণ’
ইতালীর নামে লড়িয়া জিনিব দুর্দমন !
যৌবন, ওহে যৌবন, তুমি মধুর প্রিয়,
হে সুন্দরের পরম বিকাশ, হে লােভনীয় ।
তােমারি লীলার স্ফুর্তি এই এ ফ্যাসিষ্ট-বল,
এ বল করিবে মুক্ত দেশের দাসের দল!
৪৪
দুঃখাল
দুঃখের গভীর ব্যথা এ চিত্তে আমার
আজি যেন পরিপুর্ণ হর্ষ-পারাবার !
সমুখে মানুষ যায়—হাসে, গলাগলি ;
বিবাহ-সানাই শুনি, শিশুর কাকলি,
বন্ধুজন-হাসাহাসি, উচ্চ আলাপন।
আমি স্তব্ধ বসে রই, একান্ত আপন
একান্ত নিবদ্ধ হয়ে উঠিছে ঘনায়ে
মাের ব্যথা বক্ষে মাের; আলোকে ও বায়ে
ঘটেনি প্রকাশ তার ; নাহি কোনাে নর
সে-বেদনা যেচে নিয়ে করে লঘুতর।
আমার বেদনা তার গর্ভে মধু দেওয়া ;
গরলে অমৃত রচে,কাটা-ঘেরা কেয়া।
দৈন্তে দুঃখে জাগা মোর যত অশ্রুজল
অন্তরে সঞ্চি ঢালে নিঝ শীতল।
৪৫
কোজাগরী
কর্ণ
[ কর্ণের জীবন আগাগােড়া ব্যর্থতায় ভরা। অর্জুনের শরে যুদ্ধক্ষেত্রে কর্ণ নিপতিত
হইলে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে জানান যে, কর্ণ তাঁহার জোষ্ঠ ভ্রাতা। ইহাতে শােক-বিহ্বল
হইয়া অৰ্জ্জুন তৎক্ষণাৎ কর্ণের মাথা আপনার কোলে তুলিয়া লইয়া তাহার পরিচর্যা
করিতে থাকেন। অর্জুনের কোলে কর্ণ বিলাপ করিতেছেন।
কর্ণ
কে রে ? কার স্পর্শ পাই ?—দুৰ্য্যোধন ? দুৰ্য্যোধন বুঝি ?
এস ভাই, কর্ণ হত প্রাণপণে তব তরে বুঝি’!
এস সখা ! এস মিত্র! লহ শেষ বিদায় আমার !
অর্জুন
দুৰ্য্যোধন নহি ভাই, আমি পার্থ অনুজ তােমার।
কর্ণ
এ ! ! পার্থ! পার্থ হেথা-দেখি দেখি-বটে তাে অর্জুন।
কি সংবাদ চিরদ্বন্দ্বী ? শত্রু তব রিক্ত-ধনু-হ্ণ
মৃতপ্রায় ! আর কেন ?
অর্জুন
ক্ষমা কর মােরে, সহােদর ;
জ্যেষ্ঠ মাের, তা মাের, অপরাধ করেছি বিস্তর।
৪৬
কর্ণ
কর্ণ
সহােদর ? জ্যেষ্ঠ তব ! শত্রু-জনে এ কি সম্ভাষণ !
তুমি অরি,আমি অরি-এই ভাই মােদের বন্ধন।
জ্যেষ্ঠ আমি ? জ্যেষ্ঠ বটে! আজ প্রাতে শুনিনু তাহাই।
তুমি আমি সহােদর-সিংহে ব্যাঘ্ৰেশুনিনু বৃথাই।
আজ প্রাতে, আগে নয়, শুনিয়াছি তােমারই জননী
আমার জননী সেও, জ্যেষ্ঠ আমি ; ধন্য মনে গণি।
চিরদ্বেষী, চিরদ্বন্দ্বী, চিরঅরি সর্প ও নকুল
এক গর্ভ হতে এল, ভুল ভাই, বিধাতার ভুল!
কর্ণ অধিরথ-সুত অবজ্ঞাত,—সেই ছিল বেশ ;
অরি-হাতে হনু হত সেই ভেবে মুছে যেত ক্লেশ।
বড় ব্যথা, বড় ক্লেশ! পদ্মাবতী! বৃষকেতু নাই ?
ভাই, ভাই, কেঁদো নাকো, ধৈৰ্য্য ধর, শান্ত হও ভাই!
কর্ণ
.
শান্ত হব, ভেবাে নাকো; ঐ হােথা ডুবে দিন স্বামী
তপন জনক মাের চিরারাধ্য !-যাই পিতা আমি ।
শান্ত হব, যাব ভাই, মহীতলে তুমি রবে বীর
দ্বন্দ্বীহীন দম্ভী দৃপ্ত!-মৃত্যু মাের নহে যে সুস্থির !
, না, ভাই, ক্রোধ নাই, দ্বেষ নাই, হিংসা নাই আর,
আমি তব জ্যেষ্ঠ ভাই, তব শুভ ইচ্ছি বার বার।
৪৭
কোজাগরী মৃত্যু আসে, শান্তি আসে, জানি ভাই মুদিব নয়ন । দু’টি কথা বলে যাই, দু’টি কথা -হৃদয়-বেদন! অর্জুন ব্যথিও না আপনারে, ছাড় খেদ, ছাড় সহােদর। কর্ণ খেদ, ভাই, খেদ বটে, বড় খেদ, কহি পর-পর- বড় ব্যথা, বড় দুঃখ জমে আছে, ঢেকে আছে বুক ; পার্থ ধীর, ভ্রাতা মাের, তব পাশে নামাই সে দুখ। যে-ব্যথা বলিনি কারে সে ব্যথা আজিকে ব’লে যাই ; ধরণী দিল যে-ব্যথা, ধরণীতে রেখে যেতে চাই। পার্থ ভাই, ভেবে দেখ—অবহেলা, ঘৃণা, অপমান শৈশব হইতে পেনু নিতি আমি মানবের দান, ব্যর্থতা বিপুল শুধু পদে-পদে নিঠুর ব্যর্থতা ; কীর্তি-শৈলে উঠিপড়ি, ঠেলে পদ গুপ্ত পিচ্ছিলতা! শৈশবে ত্যজিলা মাতা লজ্জায় গােপনে অবজ্ঞায়। কৈশােরে যখন প্রাণ মুঞ্জরিল বীরত্ব-ব্যথায় অস্ত্র-গুরু দ্রোণ পাশে মাগিলাম অন্ত্রের শিক্ষণ, দিলা গুরু প্রত্যাখ্যান, রাধা-সুতে ফিরাল বদন। গেনু জামদগ্ন-পাশে—অস্ত্রশিক্ষা লভিনু অপার ; ক্ষত্র নহি জানি’ গুরু দিলা শাপ, দিলা তিরস্কার, ৪
কর্ণ
শাপ দিলা—দ্বন্দ্বী-মুখে ব্যর্থ হবে তাের বাণ-বল ।
দুর্জয় এ চিত্তে তবু কোনাে ব্যথা করেনি দুর্বল।
দুর্বার এ বীৰ্য-তেজ আপনাতে সম্বরিতে নারি’
ছুটে গেছি দম্ভী দৃপ্ত-যে-দিন নিপুণ-অস্ত্রধারী
জিনিলে সবারে তুমি পরীক্ষায় করি’ সবে ম্লান,
আমি প্রতিদ্বন্দ্বী তব গেনু সেথা, বীৰ্য-অভিমান
ফোলে বক্ষে ; অধিরথ-সুত জেনে দিলা সবে গ্লানি,
দুৰ্য্যোধন নিজ গুণে হীন কর্ণে করি’ দিলা মানী।
অগ্রসরি’ গেনু আমি দেখাইতে অস্ত্রের কৌশল,
বার্তা এল-কুন্তী-পীড়া, সঙ্গে ভঙ্গ হ’ল সভাস্থল !
ব্যর্থ শিক্ষা অভিলাষ ব্যর্থ আশা, পেনু বড় ক্ষোভ।
বড় ব্যথা, আজে বাজে সমাজের অবিচার-কোপ।
অর্জুন
থামাে, ভাই, থামাে, থামাে, গত দুঃখ গত হয়ে যাক!
কর্ণ
গত দুঃখ গত হবে! ব্যথা তার থাক, ভাই, থাক,
করুণার তরে নয়,-কেবল কর্ণের পরিচয়
ভাগ্যসনে দ্বন্দ্ব তার, ব্যর্থতারে দিতে পরাজয়।
আরাে আছে—আরে ব্যথা, শােনন, পার্থ, অন্তর-যাতনা,
দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে হাসি পেল হেরি’ বীরপনা
৪৯
কোজাগরী
বীৰ্য্যহীন ক্ষত্রিয়ের, লক্ষ্যভেদে হ’ অগ্রসর,
দ্রৌপদী লাঞ্ছিল মােরে, অধিরথ-সুতে নাহি বর
বরিবে সে কভু-ব্যর্থকাম, ব্যর্থণক্তি, ব্যর্থ-আশ,
অপমানে অবজ্ঞায় পুড়ে ম’ল উচ্চ অভিলাষ!
পিঞ্জরে আবদ্ধ ব্যাঘ্র নিষ্ফল আক্রোশে যথা মরে
সম্মুখে হেরিয়া তার মুক্তিনাশী অতি ক্ষুদ্র নরে !
অর্জুন
সে দুঃখের ভারে, ভাই, বাড়ায়াে না আজিকার ভার ।
মানুষ ভাগ্যের শিশু, ক্রীড়ণক দুঃখ-যাতনার।
কর্ণ
আজি প্ৰাতে শােনন, ভাই, তপনে বন্দিয়া প্রাণ ভরি’
প্রতিজ্ঞা করিনু দৃঢ় - দৃঢ় বলে আজ মারি’ অরি
দর্পী পার্থে, নিষ্কণ্টক করি পথ ; কর্ণ-জয়গান
ধ্বনিয়া রণিয়া আজ দিকে দিকে বাজাই বিষাণ!
সহসা কুন্তীরে হেরি-নতমুখী, মুখে মাখা ব্যথা
স্নেহশীল ধীরে ধীরে জানাইলা সে বর্জ-বারতা
আমি কর্ণ পুত্র তার—নিমেষে টুটিল অন্ধকার!
চিত্তে মাের একসাথে বেজে গেল হর্ষ হাহাকার !
দুজ্জয় জয়ের বহ্নি ম্লান হ’ল, নিবে নিবে যায়,
এ নব বিচিত্র সুখে, জননীর স্নেহের বাত্যায় ।
কর্ণ। দুর্দম বাসনা মাের অরিন্দম প্রতিজ্ঞা দুৰ্ব্বার মন্ত্রবদ্ধ সর্প-সম ব্যর্থ রােষে ফোলে অনিবার। চলে আসি রণাঙ্গণে ;—ভিক্ষা-আশে আসিলা ব্রাহ্মণ, মাগিল কঠোর ভিক্ষা, মাগিল সে জীবনের ধন- শেষের সহায় মাের আত্মরক্ষী কবচকুণ্ডল। দিনু তাহা ; আশা শেষ, দিনু ভাই জীবন-সম্বল। তবু হেরিয়াছ, ভাই, এ কর্ণের অক্লান্ত প্রতাপ, প্রচণ্ড প্রবল শক্তি হায়, হায়, মৃত্তিকার চাপ গ্রাসিল রথের চক্রে, আনায়ে পড়িল সিংহ বাঁধা। সনাতন সেই দুঃখ, সনাতন ব্যর্থতার বাধা পদে পদে এল কাছে, পদে পদে পরা’ল শৃঙ্খল ; আমি বিধাতার শাপ, কীর্তিহীন, জীবন নিষ্ফল! জননৗ ভাসায়ে দিল অবজ্ঞায়,-ভেসে ভেসে আসি অবজ্ঞা-উপলে পিষ্ট, মেহহীন, ব্যর্থ-উচ্চ-আশী। পুত্র হয়ে মাতৃত্যক্ত, বীর হয়ে সুনির্মল খ্যাতি লভিনিক, চিত্ত-আশা চিত্তে লয়, গৰ্ব আত্মঘাতী। আমি এ ধূমকেতু প্রয়ােজন-হীন আলাে লয়ে আকাশের ব্যর্থ সৃষ্টি—তপনে চেেত যবে বহে অজস্র আলাের স্রোত তারায় তারায়। তুমি ভাই, বীর বটে, বংশগব্বী, শুখ্যাতি, কোনাে গ্লানি নাই! জয়ী তুমি, তৃপ্ত তুমি, বীরত্বের দেখালে ব্যঞ্জনা ; আমি পেনু অনাদর, অভিশাপ, ব্যর্থতা, গঞ্জনা ।
কোজাগরী
হীনতা, দীনতা, লজ্জা উচ্চ শির করিয়াছে নত ;
জ্যেষ্ঠ বটে শ্রেষ্ঠ নই, কীৰ্ত্তি নাই বলিবার মত।
কর্ণ নাম মুছে যাক খেদ নাই
-শুধু অনুরােধ
তুমি মনে রেখাে মাের এ লাঞ্ছনা অপমান-বােধ
শত্রু নয়, দ্বন্দ্বী নয়, ভ্রাতা বলে মনে দিও ঠাই ;
ধরণীতে যা হ’ল না স্বর্গে হবে—রব ভাই ভাই।
আর নয়, বড় ব্যথা, যাই ভাই, ভেঙে যায় বুক।
পার্থ, ভাই, আশীর্বাদ করি তুমি লভ চিরমুখ।
শীতের রেন্দ্র স্নিগ্ধ রৌদ্র বিকশিত জ্বলন্ত যৌবনে সুনীল অম্বর ব্যাপি’ অনন্ত ভুবনে মেলিয়াছে দীপ্তি তার। হিম-ক্লিষ্ট গাছে বিথারি’ আপন অঙ্গ নিজ বক্ষ মাঝে টানিছে এ তপ্ত সুখ পত্র-পাত্র ভরি। তৃণ জাগে দীর্ঘ শিরে ; শত সৌধ পরি আলােক সুদৃপ্ত তৃপ্ত সুশুভ্র মােহন বিশ্বের অন্তর হতে ক্ষরিত জীবন- জয়ফুল্ল সম্রাটের সমান বিভায় দাড়ায়ে রয়েছে শান্ত-সৌম্য মহিমায়। এ যে ক্লিষ্টা ধরণীর পীড়িত শিয়রে বিশ্বের অমৃত-প্রাণ অভয় বিতরে! কি উগ্র আগ্রহে হর্ষে, হে বিশ্ব মহান, এ ভুবনে রৌদ্র-স্নেহ করিতেছ দান।
কোজাগরী
বাতায়নে
এক বাতায়নে দেখি শুভ্র-মেঘ-চূড়া-
কেশর বিস্তারি’ যেন এক সিংহ বুড়া
মাথা তােলে ধীরে ধীরে। অন্য বাতায়নে
ছিন্ন মেঘ লঘু অতি, ত্বরিত-গমনে
চলে দিকে দিগন্তরে মাপিয়া দেখিতে
আকাশের নীল ব্যাপ্তি। হােথায় চকিতে
অন্য বাতায়নে হেরি-উগ্নারিছে ধূম
প্রকাণ্ড কলের চিনি-যেন ত্যজি’ ঘুম
যুদ্ধে রত কুম্ভকর্ণ লভিয়া প্রহার
অবিরাম ফেলে শ্বাস কৃষ্ণ-বাষ্পকার।
অন্য বাতায়নে হেরিত্রিতলের ছাদে
এক কাক ঘন ঘন ডাকে, যেন কাঁদে
শব্দে রূপে বিচিত্র এ জীবন্ত ভুবন
চলিয়াছে, কিন্তু কেন, কিবা প্রয়ােজন?
যৌবন-বন্দনা
নম যৌবন, শৌর্য-সূৰ্য্য, নম নম নির্ভয়,
নম হে দৃপ্ত শক্তিক্ষিপ্ত, নম নম দুর্জয়,
নম অন্যায়-পেষণ-দলন, নম হে দুর্ণিবার,
নম বিপত্তি-কলুষ-হন্তা ভীতি-জেতা দুৰ্ব্বার,
নম ভৈরব উন্মাদ শিব সশূল দিগম্বর,
নম নৰ্ত্তন-মত্ত-চরণ রিক্ত-আড়ম্বর,
নম মহাকাল রুদ্র ভয়াল ভীষণ দুর্দমন,
নম জঞ্জাল-জীর্ণতা-হারী সমেঘ প্রভঞ্জন,
নম সমুদ্র চপল রুদ্র উত্তাল বেগবান,
উদ্দাম স্রোতে বিপুল বিঘ্ন ভাঙি পড়ে খান খান,
নম ক্রন্দন-বিজয়ী বেদন-বিমুখ মহােল্লাস,
দৈন্য-দুঃখ-শঙ্কা-হরণ অন্যায়ী-পাপী ত্রাস,
নম যৌবন শৌৰ্য-সূৰ্য্য, নম নম নির্ভয়,
নম দুর্দম-শক্তি-আধার, নম নম দুর্জয়।
কোজাগরী
ভারতচন্দ্র
[ অন্নদামঙ্গলের “শিবনামাবলী’র ছাদের অনুকরণে
জয় কবীশ ভাস্বর,
গুণী অনশ্বর,
চিত্রকরেশ্বর,
শিল্পীবর।
জয় বিচিত্র-ছন্দক,
বিচিত্রবাদক,
সুকীৰ্ত্তি ভালক,
গুণাকর
জয় শিবানুবৰ্ত্তক,
কুলিশ-ভাষক,
প্রফুল্ল-হাসক,
নৃত্যপর।
জয় পীযুষ-ভাষণ,
কাঠি-নাশন,
উজ্জল-ভূষণ,
জয় জড়ত্ব-শায়ক,
ছন্দ-বিধায়ক,
নব্য নিয়ামক,
শক্তিধর।
জয় পিণাক-টক্কত,
মৃদঙ্গ-ঝক্কত,
সঙ্গীতালক্ষ্ণত,
কাব্যকর।
জয় প্রতিভা-আলয়,
দিবাকরােদয়,
শশীসুধাময়,
দৈন্যহর।
জয় গউড়-গৌরব,
অশেষ-সৌরভ,
যুগে যুগে সব
মুগ্ধ কর ।
কোজাগরী
গৌতমের গৃহত্যাগ
স্তব্ধ আষাঢ় পূর্ণিমা রাত নিথর নিঝুমকছে সস!
কোন্ অতলে তলিয়ে গেছে ধরার ধ্বনি, ধরার ভাষা।
শান্তি নিবিড়, শান্তি অটল, শান্তি কঠোর মৃত্যু যেন!
কেবল ঝিঝির ডাক শােনা যায় বিশ্ব-প্রাণের রণন হেন!
কেবল চাদের চোখটা জ্বলে, তাও সে ক্ষণে পড়ছে চুলে।
মত্ত মানুষ ধরায় আছে-একথা মন যায় যে ভুলে।
চাঁদের আলােয় নিদ্রা ঝরে, নিদ্রা-নিবিড় জ্যোৎস্না-রাতি।
শুদ্ধোদনের রাজপ্রাসাদে জ্বলছে নাকো একটি বাতি।
স্তব্ধ পুরী, হাস্যধ্বনি, বন্দনা-গান, নৃত্য, কথা,
মন্ত্রণালাপ, শঙ্খ-আরাব, নর্তকীদের উচ্ছলতা,
আরতি-সাম,--সকল নীরব, সব ডুবেছে কোন্ গভীরে।
ঘরে ঘরে সুপ্ত জনের জাগছে আরাম-নিশাস ধীরে।
ধরার বুকে নেইক ধ্বনি, রাজপ্রাসাদে নেইক সাড়া!
শয্যা’পরে কে ঐ নড়ে, কে ঐ নড়ে নিদ্রাহারা ।
অগাধ ঘুমায় যশােধরা, বক্ষে ঘুমায় ছােট্ট ছেলে,
তারই পাশে গৌতম ও যে নিদ্রাবিহীন চোখটি মেলে।
কি ব্যথা তার বাজছে বুকে? কিসের দুখে রাত্রি জাগে ?
গৌতমের গৃহত্যাগ
কি ভাবনায় ক্ষিপ্ত ও মন? নিদ্রা কেনই তুচ্ছ লাগে ?
দুখের ব্যথা, শশাকের ব্যথা, দৈন্য-ব্যথা, জরার ব্যথা
ঐ
বুকে তার ভিড় করেছে সব বেদন ও কাতরতা।
বক্ষে যেন বাণ লেগেছে ছটফটিয়ে উঠছে পাখী।
নিদ্রা নাহি নিদ্রা নাহি, ব্যাকুল যুবক থাকি থাকি’!
উঠল যুবা, প্রাণ যে জ্বলে, বল উদাস শ্যা’পরে,
গুপ্ত বেদন আজকে ভীষণ ব্যাকুল করে চেতন করে !
জানলা দিয়ে দেখল যুবা আকাশ-গায়ে জ্বলছে তারা,
অসীম দেশের আভাস দিয়ে ভাঙতে কি রে বল্ছে কারা?
ঘুমায় শিশু দেখল যুবা, আঁকড়ে তারে যশােধরা,
একটি শিশু হেথায় সুখে, লক্ষ শিশু হােথায় ধরা
দুঃখে ক্লেশে পিষছে নিতি, তাদের হােথা দেখবে কেবা ?
এই শিশুরি সমান মূঢ় রইল ধরায় অজ্ঞ যেবা,
পথ দেখাবে কে রে তারে, হাতটি ধরে তুলবে তারে,
দুঃখ-ভরা জগৎ হতে লবে তারে দুখের পারে ?
ঝড় উঠেছে, ঝড় উঠেছে, ধরার সাগর দুলছে ঝড়ে,
মানুষ-তরী ডােবে ডােবে,- রাখবে কে তায় হালটি ধ’রে ?
বেদন-নত ভূতলশায়ী লক্ষ জনার ক্ষুব্ধ কানে
মুক্তি-অভয় কে দেবে রে ?উঠবে সবাই সবল প্রাণে !
বাজে বাজে বিষম বাজে-বক্ষে ব্যথায় ডাঙশ হানে ;
পঁড়ায় যুবা শয্যা-পাশে, উদাস হেরে আকাশ পানে।
4
কোজাগরী
পুরীর পাষাণ-প্রাচীর ভেদি ডিঙিয়ে এসে সুখনিগড়ে,
জায়ার প্রীতি ছাপিয়ে ঢেকে, নর্তকী-গান চুর্ণ করে,
কেমন করে সকল ব্যথা ঐ বুকেতে লাগল এসে ?-
গােপন ব্যথা, গােপন কঁাদন এল কি হায় হাওয়ায় ভেসে ?
পায়নি কি ঠাই, পায়নি রে বাস এই এ যুবার বক্ষ বিনে ?
হাজার হাজার বরষ ধরে খুঁজছিল কি রাত্রে দিনে
এই বুকেরি শীতল আবাস ? বুকটি আজি কেন্দ্র সম
সব বেদনা আঁকড়ে ধরে,নমনীয় পরম কম !
চোখ ছেপে তার অশ্রু আসে, বুক ছেপে তার কঁাদন দোলে,
বেদন-উতল দাড়িয়ে যুবা নিথর নিশার শান্ত কোলে !
যৌবন এই, প্রেমের লীলা, যশােধরার মধুর হাসি,
এই যে দোহার অটুট বাঁধন--জরায় সবি ফেলবে গ্রাসি’ ;
যশােধরার দীপ্ত রূপে জরার আঁধার ফেলবে ছায়া,
এই যে সবল শক্ত আমি মুইয়ে যাব কুজ-কায়া !
মৃত্যু শেষে আসবে কঠোর, টানবে ধরে সবার কেশে;
কেউ রবে না, কেউ পারে না জিতে তারে সর্বনেশে ।
হাসে মানুষ হর্ষ করে, জানে না সে হাসির পিছে
লুকিয়ে আছে বিষম কঁাদন, সুখ যা বলে সে যে মিছে!
সেই কঁাদনের বেদন পিয়ে বেদনজয়ী মুক্তি-গাথা
কে দেবে রে ক্লিষ্ট ধরায়, কে হবে রে ক্লেশের ত্রাতা ?
জাগল যুবার ক্লিষ্ট মনে শায়ক-বেঁধা সেই সে পাখী,
জীর্ণ বুড়ার মুইয়ে চলা, বস্ত্রে শবে নে যায় ঢাকি।
গৌতমের গৃহত্যাগ
গিরগিটি খায় পিঁপড়ে ফড়িং, গিরগিটিরে সাপ সে গিলে,
সেই সাপেরে কামড়ে খেল দৌড়ে এসে একটা চিলে ;
মানুষ মারে ছাগ ও মাছে-এই ত ধরা!—হিংসা-নীতি
চলছে কঠোর ; নেইক দয়া, নেই করুণা, নেইক প্রীতি।
এই ত জগৎ মিথ্যা বিপুল-জগৎ বিরাট মিথ্যা ঘেরা,
চাই আলাে চাই, চাই রে আলাে, আঁধার বড়, আঁধার ডেরা!
কে ঘােচাবে এ হিংসা-দ্বেষ, কে তাড়াবে নির্দয়তা ?
ব্যাকুল যুবা কক্ষে ঘরে, বক্ষে জমে ব্যাকুল ব্যথা।
এই তাে রাতি, এই অবসর, তারায় চঁাদে বলছে মােরে--
বেরিয়ে পড়ে বেরিয়ে পড়াে, আর কি সুযােগ পাবি ওরে ?
হয় মিশে থাকু মিথ্যা মায়ায়, প্রিয়ার প্রেমে থাক্ রে মিশি’ ;
নয় চলে আয় জগৎ-বুকে, এই ত সুযােগ-নীরব নিশি !
হেথায় মুকুট, স্বর্ণ-আসনহােথায় ধূলি কঁাকর-ভরা ;
হেথায় বিলাস, নর্তকী-গান-হেথায় রােদে পুড়ছে ধরা ;
হেথায় স্নেহ-শীতল গেহ হােথায় মানুষ আছে তাপে ;
হেথায় সেবা ব্যগ্র অশেষ-হােথায় দুখে দছে দাপে ;-
কোনটা নিবি কোনটা নিবি ? তারায় তারায় যে জিজ্ঞাসে-
হবি রাজা না ভিখারী ?দাড়াব ভাই সবার পাশে!
দুৰ্ব্বলেরি বক্ষ দ’লে ঘুরূবে না মাের রথের চাকা,
শােণিত-আশী রাজতরবার এই পুরেতেই থাকুক ঢাকা।
৬১
কোজাগরী দুর্বলেরে বল দেবাে রে, দুখীর হব সুখের কামী, মুছিয়ে শােণিত দানব অভয় আমি আমি এই এ আমি। রাজ-আভরণ নয়ক আমার, ভেঁড়া কাপড় অঙ্গ-ভূষণ ; শয্যা কোমল বি ধছে গায়ে, ধরার ধুলি আমার শয়ন ; রাজপ্রাসাদের শীতল ছায়ায় আমার নিবাস নয় রে নহে । পথের পাশে, রোদের তাপে, গাছের তলায় নিবাস রহে। রাজার শাসন, বিধির শাসন, পুরােহিতের শাসন যত- মুছব আমি সকল শাসন, মুছব আমি সকল ক্ষত। ঐ আসে রে ঐ আসে রে, ঐ যে শুনি কাতর ধ্বনি, পুত্রহার কাছে শােকে হারিয়ে তাহার বুকের মণি ! নিদ্ৰাবিধুর যশােধরা দীর্ঘশ্বাসে ফিল পাশে, থকে দাড়ায় ব্যাকুল যুবা, বক্ষ তাহার কাপল ত্রাসে! হায় রে নারী, হায় মােহিনী! আমায় তুমি বাঁধলে ডােরে, অঝাের দিলে প্রণয়-প্রীতি, কিন্তু তবু বুক যে পােড়ে। পুত্র দিলে শ্রেষ্ঠ যা সুখ, তবুও ব্যথা ঘুচল না যে ; সব স্নেহ-প্রেম ছাপিয়ে, প্রিয়া, এ কোন্ ব্যথা বক্ষে বাজে! একলা তােমার থাকব শুধু ?-কর কর আমায় ক্ষমা, বিপথ মাঝে কঁদছে যে নর, বুঝবে নাকি, অনুপমা ? সবায় আমি চাইছি প্রিয়া, তােমায় আমি ছাড়ছি নাকো, সবায় পেয়ে তােমায় পাবাে, ঘুমাও প্রিয়া, শান্ত থাকো।
গৌতমের গৃহত্যাগ
জগৎ-জনে করছে যে ভিড়—এই এ বুকে আছে সবে ;
সবায় সেথা দেবদ নিবাস, সবার সাথে তুমিও রবে !
একটি চুমা তােমার মুখে, একটি চুমা শিশুর মুখে,
এই নিয়ে আজ দাও গাে বিদায়, বেরিয়ে পড়ি দুখের বুকে।
দুখের মাঝে দুঃখে বুঝে দুঃখ হ’তে নিঙড়ে সুধা,
হব আমি সবার দুখে, মিটিয়ে দেবাে সবার ক্ষুধা।
মৌন দাড়ায় ক্ষুব্ধ যুবা, জায়ায় হেরে পুত্ৰে হেরে,
যায় বড় সাধ আঁকড়ে ধরে দুইটি জনে বাহুর বেড়ে ।
হাত সে বাড়ায়, আবার গুটায়,—না, না, একি! আবার মায়া ?
হেথায় দুটি, হােথায় কোটি মানব যে রে দগ্ধ-কায়া ;
যাই চলে যাই, যাই চলে যাই, যাচ্ছি আমি, শােনাে শােননা,
দুঃখী ওগাে, ব্যথিত ওগাে, আর ভাবনা নাইক কোনাে ।
পাওনি প্রতি ? পাওনি দয়া ? আমি সবায় প্রেম বিলাব,
প্রেমের আলােয় প্রেমের সুধায় দুখ মুছাব, শােক তাড়াব।
রাজার ছেলে রাজ্য নিয়ে যাব সবায় ঘুরিয়ে আঁখি—
এই কি রে সুখ !-হায় অভাগা ।-প্রেম দিয়ে যে রাখব ঢাকি।
ব্যথায় দেবাে দরদ-মধু, বিপথ হ’তে আনব পথে,
মুক্তিবাণী শুনিয়ে দেবাে, বাঁচবে মানুষ শঙ্কা হতে।
সুপ্ত থাকো, তৃপ্ত থাকো, যশােধরা, আমার প্রিয়া,
কিনলে তুমি এই যে হিয়া, সবার হ’তে দাও এ হিয়া।
কোজাগরী
স্তব্ধ আবার দাড়ায় যুবা,-আকাশ পানে আবার দ্যাখে,
দিক্-ভােলানাে চাদের আলাে ডাকে যেন ঐ যে ডাকে।
অবাধ অঝাের দিকে দিকে চাদের আলো কেবল হাসে,
মুক্তি আছে, মুক্তি পাব, হৃদয় ভরে কী উল্লাসে!
যাই অসীমে, যাই অশেষে, নেইক রে আর বাঁধা-ধরা,
বক্ষে তুফান দু'কূল ছাপে,-এ যে বাঁধন-চূর্ণ-করা!
দ্বার খুলে যায় বেরিয়ে যুবা, বিপুল নিশা হাওয়ার ভরে
ডাল যেন। দাড়ায় যুবা। আবার সে যে ফিল ঘরে।
ঐ না নড়ে যশােধরা!-ঐ যে শিশু, আহা!—আহা !
ছাড়ব এদের ? চির জনম ? কেমন করে সইব তাহা ?
কক্ষে ঘােরে আবার যুবা, লাগল গায়ে নিশার হাওয়া,
ডাল পেচক প্রাসাদ-শিরে, রাত বুঝি নেই ? হয় না যাওয়া।
ছাদের 'পরে বেরিয়ে যুবা হেরূল আকাশ—নেই সীমা ;
মৌনা নিশীথিনীর বুকে শব্দ নাহি—অচল ভীমা !
অসীম আলাের প্লাবন চলে-অশেষ আলাে, উদার আললা !
এত আলােয় দুখ ঘােচে না? কেমন করে মুছব কালাে ?
বিশ্বে অসীম এই বিরাটে কি আমি কি করূতে পারি ?
আমার হিয়ার ক্ষুদ্র বাসে কতই আছে প্রেমের বারি ?
ফিল যুবা, ফিল ঘরে, বল ধীরে শষ্যা-শেষে ;
পারব নাকি ? পাব নাকি ? অশ্রুতে গাল যায় রে ভেসে !
৬৪
গৌতমের গৃহত্যাগ
আবার এল উতল হাওয়া—দু ব্যথার সাগর জোরে ;
কে রাখে রে ? কিসের মায়া ? প্রাণ যে আবার উঠল ভরে।
যুক্ত করে দাড়ায় যুবা যশােধরার চরণ-মূলে,
শেষ দেখা সে দেখল প্রিয়ায়, দেখল ছেলেয় দেখল ভুলে’!
যশােধরার শয্যা ঘিরে’ ঘুরূল সে ধীর তিনটি বারে।
কেঁদো নাকো, ফিব আমি সবায় নিয়ে তােমার দ্বারে।
যাই প্রিয়া যাই, যাই প্রিয়া যাই, বিদায় বিদায়, আসি আসি,
তােমায় আমি ভালােবাসি, জগৎ-জনে ভালােবাসি ।
ঘর হতে সে বেরিয়ে এল, চাইল আবার আকাশ পানে ;
জগৎ তারে ডাক দিয়েছে ব্যথার টানে প্রেমের টানে।
৬৫
৫
কোজাগরী
ভাদরে
গুরু গুরু ডাকে মেঘ, ঝুরু বুরুি জল
এমন বাদল-দিনে হৃদয় বিকল ।
ছুটে ছুটে হাওয়া বয়, কড় কড় বাজ ।
হরষে চমকি’ দেখি ছাড়ি’ সব কাজ ।
কালাে কালো মেঘ-বুকে আলো জ্বলজ্বল
আকাশের সাথে মাের জ্বলে হৃদিতল ।
ঘন ঘন পড়ে বাজ অদূরে দূরে।
আঁখি ঝলসিছে বটে, হৃদয় পূরে
এই এল ঝমাঝম, এই ৰা ধরি।
দোলায়িত দুখ সুখ হৃদয় ঘিরি।
কালাে মেঘ সরে কভু-নীলের আভা
ভালাে নাহি লাগে ধারা চপল-ভাবা ।
ডেকে ঢেকে আসে মেঘ কালােয় কালাে
এই বড় ভালাে ওরে এই ত ভালো ।
ঝমাঝম ঝমাঝম কেবল বারি।
পরাণের এত সুখ রুবিতে নারি।
ভাদরে
ধোয়া-ধোয়া চারিদিক্ মাঠে ও গাহে
ওরে ধোয়া দে রে ছোয়া হৃদয়-মাঝে।
ভরে গেছে ধরা জলে বাজে ও বাতে
এই ভরপূর খেলা হৃদয়ে মাতে।
চেয়ে শুধু থাকি আজ শুধু দেখি জল ।
শুধু শুনি গুরু গুরু মেঘ-কোলাহল।
শুধু আঁখি থুয়ে রই জলের ধূমে।
পাতার নাচন দেখি ধারার চুমে৷
দেখি জলস্রোত ছােটে একে ও বেঁকে ।
যেমনি তা কমে জল আসিছে ঝেকে।
ভাদর-বাদর মেরে আদর করে।
তারি সাথে খেলা করি মনের ঘরে।
কোজাগরী
পুরুষ ও নারী
আমি পুরুষ জাগনু যখন সৃষ্টিযুগের কোন্ সে ক্ষণে-
হিয়ায় যেন গােপন ব্যথা
জাগল নিরাশ আকুলতা,
সৃষ্টিকাজের শূন্য কি এক বুঝনু আমার প্রাণের কোণে ;
বুঝ = যেন কি যেন নেই, কি যেন চাই প্রাণে-মনে।
আকাশ আলাে ধূলায় তৃণে কি যেন নেই, নেই-ক যেন ;
শক্তি আমার দীপ্তি আমার
চাইছে কি এক থাকার আধার,
একলা আমি! -নয়-ক তো ঠিক !-আর কিছু নেই? নেই-ক কে
স্তব্ধ নভে ক্ষুব্ধ চোখে দেখ নু উদাস দীনের হেন।
হৃদয় ভরে কূলে কূলে জল বেদন দিনে দিনে ;
আমায় যেন চিনতে নারি ;
আমি যেন শূন্যে বারি,
কে রাখে, কে ধরে—আমায় ? উতল হনু কাহার বিনে?
আমার কাছে চিনিয়ে আমায়, আমায় লবে কেই গাে চিনে
পুরুষ ও নারী
ধরার বুকে বেদন-বেগে ছুটু উধাও ক্লিষ্ট-কায়া,
মিল নাকো বুকের তৃষা,
খুজ উদাস, হারাই দিশা,
কি চাই আমি ? তাই কি জানি ! সুখ চাহি কি ? কিসের মায়া ?
কি আছে গাে, কে আছ গাে? তাপ যে বড়! দাও গাে ছায়া !
আমার বেদন এমনি সেদিন আঁধার, আলাে, বায়ুর স্রোতে
নিশাস রূপে আগুন রূপে
গুরুল
দিশি
চুপে চুপে ;
মৌন কভু, কঁাদ কভু-নেই পাথেয় প্রাণের পথে ;
পূর্ণ যে নই, নই যে সরস, রস কোথা পাই কোথা হতে?
শক্তি ছিল দীপ্তি ছিল, তবুও যেন শক্তিহারা,
শূন্য ছিল প্রাণের মাঝে,
দুঃখ ছিল সকল কাজে ;
মুক্তি ছিল, তবুও তাতে পাইনিক সুখ—যেনই কারা!
চলন আমার আশা উছাস ছিল বেতাল ছন্নছাড়া।
ক
হঠাৎ কবে দেখনু তােমায়, নারী, আমার কাম্য। নারী!
নয়ন পরে পড়ল নয়ন,
এই কি আমার বাঞ্ছিত ধন?
এই বাহুরি বল্লরী কি পতন-ঝোকা বৃক্ষটারি
হবে শরণ? ঠিক দাড়াবে ? এরেই কি রে ধবৃতে পারি ?
কোজাগরী
ওষ্ঠ তােমার কাপল ক্ষণেক-পড়ল ব্যথায় মধুরত
তােমার ভুরুর মােহন লিখা
নিবায় বুকের আগুন-শিখা,
স্বপন-মাখা ললাট তােমার জুড়ায় সকল আকুলতা,
গণ্ড দুটির নধর সুখে হারিয়ে গেল আমার ব্যথা!
চরণ ফেলে এগিয়ে এলে - সে চলা কী ছন্দভরা ।
ক্ষিপ্ত আমার প্রাণের গতি
তাতেই পেল ছন্দ-যতি,
হাতের তব দোলন আমার দু বুকে সুধায়-ঝরা ;
কিল আমায় তােমার আঁখি তােমার হাসি তিয়াস-হরা ।
জিজ্ঞাসা কি করব তােমায়, জানিই নাকো কেমন ভাষা!
কি বুঝাব বলব কিব?
রইল না মাের রাত্রি দিবা ;
অবাক হ’ পুলক-মূঢ় দেখে তােমায়, তােমার হাসা; ·
বাঞ্ছিতা মাের চিত্ত-স্বপন, পেলাম আশা, মিল আশা।
একলা ছিলাম তাই চাহিলাম, এই কি আমার সেই সে চাওয়া
সেই চাওয়া কি মূর্তি ধরে
আজকে দাড়ায় নয়ন পরে?
বুঝনু মনে সেই বটে সেই,-এবার হবে ছন্দে যাওয়া;
এবার এল, এবার পেলাম সেই পাওয়া সে আশার পাওয়া।
৭০
পুরুষ ও নারী
মুখে মুখে চেয়ে চেয়ে দাড়িয়ে তুমি, দাড়িয়ে আমি,
ভরে ভরে ভকূল হিয়া
ভােমার রূপের রসটি পিয়া,
পিয়া চোখের অঝাের মধু জুড়িয়ে গেনু,-যায় সে নামি,
নেমে বুকের ফাকে ফাকে করূল ভরাট–অতলগামী।
এগিয়ে এলাম,-হাতখানি মাের তুললে তােমার কোমল হাতে ;
বজ্র যেন পড়ল বাঁধা,
থাল যেন গোপন কাদা,
প্রাণ ছিল কি তােমার আশায় ? বুঝনু ছিলই এই আশাতে ;
এরই তরে উঠত ফুলে’ আকুল বেদন বুক-কারাতে !
শিরায় শিরায় খেল তড়িৎ তােমার কোমল সেই পরশে,
ছিল যাহা গুপ্ত বেদন,
জাগল সেথা সুখের কাপন,
আবেশ এল ঘুমের মত, মগ্ন হলাম কোন্ হরষে ;
বৃষ্টিধারা ঝরুল যেন গ্রীষ্মে ধরার বুক নীরসে।
চোখে চোখে দেখছি দোহে, আবার দেখি আবার দেখি,
তুমি পেলে আশার নিধি,
আমি পেলাম চায় যা হৃদি,
তুমি ভাবব-এই কি সে, সেই ? আমি ভাবি—এই কি, সে কি ?
হিয়ায় হিয়ায় জান দেহে ~~এই তাে রে চাই ! আহা! একি!
কোজাগরী
জড়িয়ে দিলে আমার গায়ে তােমার বাহুর দুইটি লতা,
আমিও তােমা দুইটি করে
জড়িয়ে ধরি বক্ষ পরে,
বুকে বুকে বাজল দোহার গুরু গুরু আকুলতা,
আমার বেদন চিনুল তােমার বেদনটিরে, কইল কথা ।
দেহে দেহের পরশ পেয়ে আশায় আশা যুক্ত বহে,
আমার আশা আমার উছাস
তােমার আশায় পেল নিবাস,
দুই আশা দুই ব্যাকুলতা জড়ায় নবীন পরিচয়ে,
দুই বেদনা তৃপ্ত হ’ল সুখের হরষ-বেদন লয়ে।
অধর 'পরে মিল অধর-একটি চুমা আবেগ-ঢালা,
এক চুমুকে অধর দিয়ে
দোহার পরাণ দোহায় পিয়ে
দোহার আশা ঢালুনু দোহায়, সে কী রে “সুখ, জুড়ায় জ্বালা ;
এক চুমােতে দোহায় বাধা ; যুক্ত হ’ল ছিন্ন মালা ।
পূর্ণ হ’ল সেই সে ক্ষণে সৃষ্টিকাজের গােপন কা;
কোমল নীলে ছাইল আকাশ,
ছন্দ পেল সাগর, বাতাস,
রবির জ্যোতি ফুটল দ্বিগুণ, চাঁদের হাসি সুধায় মাখা :
পুরুষপাশে মিল নারী-সৃষ্টিপটে শ্রেষ্ঠ আঁকা।
१२
বর্ষা-মিলন
ভদরের অবিশ্রান্ত অশান্ত বর্ষণ
আজি এ প্রত্যুষে তােলে বিপুল প্লাবন
ধরণীর কক্ষে কক্ষে ; ব্যাপ্ত বক্ষে তার
শরণ লভেছে জল এধার ওধার
শত স্থানে। বসিয়া নির্জন বাতায়নে
জলের উল্লাস হেরি প্রান্তরে প্রাঙ্গণে।
চেয়ে চেয়ে বাদলের ব্যাকুল ধারায়
ভেসে ওঠে এ নয়নে প্রশান্ত বিভায়
প্রিয়ার মূরতি মাের, দেখা নাহি যার,
অন্তরে যে জাগে ক্ষণে, ভুলি বারবার।
মনে হয়, সেও আজ চেয়ে জানালায়
বাদলে উদ্বেল চিত্তে হেরিছে আমায়
আপন অন্তর মাঝে।
মনে মনে দেখা,
দূরে দূরে রহি, তবু নহি একা একা।
কোজাগরী
[ টেরেন্স ম্যানুইনীর মুক্তি-গাথা ]
ভগবা, মাের করি অভিযান, এই অভিযান সৰ্বশেষ ;
তুমি জান ইহা ন্যায় অভিযান, নাহিক ইহাতে মিথ্যালেশ।
তােমার আঁখির নিম্নে চালাও, দেখাও মােদের মুক্তিপথ ;
আনাে আনাে ত্বর বিজয়-রথ ।
করাে নাকো রােষ, এই অভিযান পুণ্যাভিযান, পুণ্যফল ;
বিঘ্ন-বিপদে ডরি নাকো যেন, মতি যেন রহে অচঞ্চল।
মরিতে শিখাও, মরিতে দাও।
কতক মরিবে, ভূমিতে লুটাবে, সে তত ভালে লেখা, জানি তাে তাও ;
মরিয়া বিজয়-ধ্বজা উড়াও।
বহু বরষের যতেক বেদনা, যত বিভীষিকা, পাপের ফল,
মৃত সেবকের শােণিতের ধারা, জীবিত জনের চোখের জল
তােমারি চরণে নিবেদি আজ।
হারায়েছি যেই স্বাধীনতা মােরা তাহারে, লভিতে দিলাম এই
জীবন মােদের, কামনা মােদের, শ্রেষ্ঠ যে দান, আর তাে নেই।
দাও স্বাধীনতা, ঘুচাও লাজ ;
কৃপা করি’, বিধি, মুছাও লাজ।
৭৪
মৃত্যু-অভিযান
দ্যাখাে হে মােদের হৃদয়ে বিরাজে পরের দলনে কত না দুখ ;
দাস যেবা তার কত না গােপন বেদনে নিত্য জ্বলিছে বুক ;
তােমারেই মােরা নিবেদি সব।
কত আশা এল হইল বিলীন, কত শঙ্কায় দুলিছে প্রাণ ;
ব্যথানত তবু হব না বিরত চালাতে নিয়ত এ অভিযান।
আনিব মুক্তি জয়বিভব।
জানি না মােদের ভাগ্যে কি লেখা, তবু চাল মােরা, ডাকে যে দেশ ।
দাও বল দাও, দাও হে সাহস, ঘুচাব দেশের অশেষ ক্লেশ ;
করিব দেশেরে মরণহীন।
মুক্তিযুদ্ধে যারা রবে বেছে তাদেরে দানিও তব আলােক,
বিপদে তুমি যে সহায় মােদের, তুমি যে মােদের পরিচালক।
সদয় নয়নে দেখিও দেশেরে সর্বদিন।
করিও দেশেরে পূর্ণ-বল,
মুক্ত, দৃপ্ত, সুখােজ্জ্বল।
মরিতে শিখাও, মরিতে দাও ।
মরি’ সবে জয়ধ্বজা উড়াও।
৭৫
কোজাগরী
ধরণী
ধরণী, ভরণী মাের জীবন-দায়িনী।
তৃণে পুষ্পে শস্যে অয়ি প্রাণ-প্রবাহিনী ।
ধূলিময়ী মৌন মূক নিস্তব্ধ নিশ্চল,
বিরাট মৃত্তিকা-পিণ্ড বিমূঢ়-বিহ্বলা,
অয়ি ধীরা, অয়ি স্থিরা, প্রশান্ত-অন্তরে
রেখেছ জীবন-বহ্নি ধূলি স্তরে স্তরে ।
কোটি কোটি জীবনের জাগ্রত অঙ্কুর
মুক গর্ভে রহে পরিপূর ;-
ধ্যানময় প্রাণময় গভীর সঞ্চয়
সৃষ্টির সাগ্নিক শক্তি পােষিছ দুর্জয়।
ঐ ক্লিন্ন ধূলিজাল জীবন-চঞ্চল,
ঐ মৌন মাটীশুপ সৃজনে উচ্ছল ।
পুষ্পে হাসিয়াছ তুমি, পৰ্বতে উদ্দাম
প্রাণ-বেগে ঊর্জে উঠে শাসাে অবিরাম ;
বিহঙ্গে মেলিয়া পাখা শূন্যে কর জয় ;
সমুদ্রে তােমারি প্রাণ বিরাট নির্ভয়
উদ্বেল উত্তাল ক্ষিপ্ত ভীম দুর্দমন ;
বৃক্ষে তুমি শ্যামদ্যুতি নয়ন-শােভন ,
ধরণী
মানবে প্ৰমূৰ্ত্ত তুমি জীবন-বিকাশ
বিজয়ী করুণ দৃপ্ত সংযত প্রকাশ ;
শ্বাপদে হিংস্রক তুমি দুরন্ত-ভয়াল!
হে বহু-জীবন-ধাত্রী, করুণ করাল
আজি স্তষ্ক নিশীথের সুপ্ত অন্ধকারে
দাড়ায়ে নিরখি তােমা --এপার ওপারে
পড়ে আছ শব্দহীনা যেন নাহি প্রাণ,
সুপ্তি-স্বপ্নজাল-ঘেরা এক অবসান!
তুমি যে গড়িছ কোটি প্রাণ পলে পলে,
এ কথা যায় না জানা আজি সুপ্তি-তলে ।
দাড়াইয়ে ধ্যানমৌনা শান্তা তব পাশে
হেরি একি-বক্ষ মাের ফুলিছে নিশ্বাসে,
হস্ত দোলে!-এ চেতনা এই প্রাণ-গতি
ছিল কি ধূলির গর্ভে এই পরিণতি ?
বাঁচিবার ধরিবার গ্রাসিবার লােভ,
ইচ্ছা-আশা-বাসনার এই যে বিক্ষো,
ছিল হােথা ? –ছিল ছিল ; মৃত্তিকার রস
এ মাের শােণিত-বিন্দু, মাটির হরষ
আমার এ প্রাণবেগ, ঐ ধূলিরাশি
মাংস মাের, মাের মাঝে উঠেছে উচ্ছ্বাসি’
কোজাগরী
ঐ ধীর স্থির ধরা আপাত-নিপ্রাণ।
তৃণ যথা তােলে মাথা মাটির পাষাণ
করি’ ভেদ, সেইমত জাগিয়াছি আমি,
আমার সর্বস্ব এই ধূলি-অনুগামী।
হে মাত ধরণী ধাত্রী, করি নমস্কার,
আড়ম্বরহীনা অয়ি জননী আমার !
দাড়াইয়ে সুপ্তিময়ী ধরণীর শিরে
ভাবি আজ, কি দিয়েছি কি দিয়েছি ফিরে
ও স্নেহের প্রতিদান ? পেনু প্রাণ, দেহ,
অন্ন পাই, পাই ছায়া-সুশীতল গেহ,
জীবন আনন্দে চলে, মিটে প্রয়ােজন,
সকল অভাব মাের দৈন্য অগণন ।
আমি অকৃতজ্ঞ নর, জননীর ঋণ
শশাধিতে নারিনু কণা, শুধু স্বার্থলীন !
সহসা শুনিনু শান্তি ভেদিয়া ক্রন্দন
ওঠে কার,-আসে কাছে কে নম্র-বদন
শুভ্রবাস সাশ্র-আঁখি, দেহ জরজর
বেদনার নির্দয় প্রহারে, থরথর
হস্তপদ, স্থানে স্থানে শােণিতের লিখ।
শুভ্র অঙ্গে, হােমাগ্নির স্বর্ণময় শিখা
৭৮
রণী
ব্যথিত বিবর্ণ যেন সলিল-সিঞ্চনে।
“কে মা তুমি?”—জিজ্ঞাসিমু.বিনম্র বচনে।
“আমি ধাত্রী, জন্মদাত্রী তােমার ভরণী,
আমিই ধরণী পৃথ্বী, সবার জননী।”
“ধন্য আমি ধন্য আজ-হেরিয়া তােমায়,
ঈপ্সিত-দর্শনা অমি, শােভা-সুষমায়
শ্যামকান্তি তুমি মাতা। একি হেরি আজ
ব্লানজ্যোতি হতরূপ !---কপােলের মাঝ
ও কি দগ্ধ ক্ষত! কি যাতনা ৩ব, মাতা-
কহিনু বিস্ময়ে।
“ব্যথা কও বলি না তা,”
কহে মাতা সবেদন ভাষে---“সহি সব
অত্যাচার তােমাদের সব উপদ্রব ।
আমার অন্তরে শত শ্রেষ্ঠ অভিলাষ
ছিল যত অনুপম আশা ও উল্লাস
সব দিয়ে গড়েছিনু তােমায়-মানবে,
আকাঙ্ক্ষা সার্থক হ’লমাের অনুভবে
দিলে রূপ সকল আশায় তুমি নর।
কিন্তু, বাছা, এ কি আজ প্রহারে জর্জর
কোজাগরী
কর মােরে অবিরাম, অঙ্গ চিরি’ চিরি’
করিছ কর্ষণ, ধর্ষণ-পেষণে ঘিরি’
বক্ষে মাের কাটো ক্ষত নির্দয় আঘাতে;
মাের শ্যাম-সুষমায় অত্যাচারী হাতে
করিছ বিলােপ ; মাের প্রিয় পশু-পাখী
আমারি সন্তানে তব হিংস্রতীক্ষ্ণ আঁখি
সন্ধান করি৮ে. নিত্য ক্ষিপ্ত বুভুক্ষায় ;
দলনে সুদক্ষ তুমি হিংস্রক লীলায়।
তােমারে গড়িনু যবে ছিল মনে আশা
সৃজন সার্থক হবে, সকল পিপাসা
পূর্ণ হবে শান্ত সুতে লয়ে। কিন্তু হায়,
এ কি ব্যথা, এ কি ক্লেশ, এ কি বেদনায়
আমারে পিষিছ নিত্য।”
-মুছিল নয়ন
ব্যথাতুরা ধাত্রী ধরা।
অব্যক্ত নন
বক্ষে ফুলে ওঠে তার।
সুপ্ত অন্ধকারে
বিরাজে নিবিড় শান্তি স্বপ্ন-পারাবারে।
৮ ০
ধরণী স্বপ্ন সম হেরিলাম জননীর মুখ, স্বপ্নে শুনিলাম তার অন্তরের দুখ। স্বপ্ন-পারাবার-তীরে দাড়ানু উদাস- জননীর এ যাতনা হবে নাকি হ্রাস ! বেদনায় নম্র বক্ষে করি অনুভব ধরণীর 'পরে মাের যত উপদ্রব ।
কোজাগরী
নিদাঘ-মধ্যাহ্ন
নিদাঘের মধ্যাহ্নের বিদগ্ধ বাতাস
শীতল আশ্রয় খুঁজি’ ফেলিছে নিশ্বাস
দিকে দিকে। নারিকেল-পত্র-শীৰ্ষগুলি
দারুণ গ্রীষ্মের ক্লেশ বলে কপি’ দুলি।
ডাকে কাক শুষ্ক স্বরে কাতর বিহ্বল ;
ধরণী চিলের কণ্ঠে প্রকাশে উচ্ছল
নিদাঘ-দাহন-ব্যথা।
যায় প্রাণ যায়-
এই আৰ্ত্ত রব আজ নরে মৃত্তিকায়
ভূণে ও শ্বাপদে যেন অগ্নি-রৌদ্র মাঝে
ফুকারিছে অবিরাম, চিত্তে মাের বাজে।
আকাশের মেঘ আজ পুড়িয়া নিঃশেষ
হেথা হােথা পড়ে আছে যেন ভস্মলেশ।
এ কি দাহ! এ কি ব্যথা! এ কি বিশ্বরূপ
বরষা করুণ। যার কোথা সেই ভূপ?
২
রবীন্দ্র-বন্দনা
তিমির-গহন পূর্ব গগন করি’ মন্থন জ্যোতির্ময়
দৃপ্ত দান্ত দীপ্ত কান্ত ঘাের দুরন্ত কে নির্ভয়
রশ্মিশায়কে দীপ্তি-পাবকে বিনাশি’ দৈত্য-অন্ধকার
পূত নিৰ্ম্মল হেম-উজ্জ্বল জাগিল মহান নির্বিকার ?
দশ দিক্ যার মেহসম্ভার লভি’ বন্দনা করিছে গান,
ক্ষুদ্র ক্লিন্ন অধম খিন্ন জ্যোতির পরশে লুপ্ত-প্রাণ,
সুপ্ত গােপন সজাগ চেতন, অন্যায় শিরে হানিছে কর,
অজীবে জীবন, কলুষ-নাশন কে রে এ ভীষণ শক্তিধর ?
জগৎ-জীবন জগৎ-পােষণ রবি রবি এরে জ্যোতির্ময়,
করি’ মন্থন পূর্ব গগন সৰ্ব্ব জগৎ করিল জয়।
মধু-বঙ্কিম দৃঢ়-ভঙ্গিম উষা পুষা দুই অগ্রদূত
বঙ্গ-গগন-তিমির-হরণ দুই দিগজয়ী কী অদ্ভুত
রবি-পন্থার ভাতি-সঞ্চার করিয়া ঘােষিল সুপ্রভাত,
ফুল্ল-নয়ন দৃপ্ত-গমন রবি করে পিছে নয়নপাত।
হাসে দশ দিক, হাঁকে কুহু পিক, হাসিল ভুবন তৃণ ও ফুল,
বঙ্গ-ভারতী কিরণ-আরতি লভিয়া তুলিল মুখ রাতুল।
তাহার গােপন যতেক বেদন করিল হরণ রবির কর,
ভারতী-বক্ষ বঙ্গ-কক্ষ আঁধারবিহীন সুভাস্বর।
কোজাগরী
মানব-চিত্ত-নিহিতবিত্ত জগৎ-নয়নে সমুজ্জ্বল,
ত্রাসিত ক্লিষ্ট অপনাবিষ্ট হইল প্রবল যা দুর্বল।
কাব্যকমল মেলি’ শত দল হৰ্ষমত্ত ফুলমুখ,
নিরাশা-তিক্ত কান্তি-রিক্ত মানব আজিকে পূর্ণসুখ !
জগৎ-জীবন জগৎ-পােষণ উদিয়াছে রবি জ্যোতিৰ্ম্ময়,
করি’ মন্থন পূৰ্ব্ব গগন সৰ্ব্ব জগৎ করিল জয়।
চাঁদের আলােয়
গগনের ঐ দুর কোণেতে চাদের কুম্ভ হতে
আজকে সুধা পড়ছে ঝরি’ ঝরি’ ;
বনের পরে পাতার গায়ে গড়িয়ে তাহা পড়ে,
ঘাসের বুকে জড়িয়ে রহে ধরি।
ঐ সুদূরে মাঠের পারে গাছটা তােলে মাথা
চাদের আলােয় নাইবে বলে সুখে।
গ্রামের কোলে বনের বেড়ায় রূপাের আঁচলখানি,
মৃদুল হাওয়া কাঁপছে তারি বুকে।
ধানের-মলা সবুজ মাঠে জ্যোৎস্নাপারাবার
দুর অসীমে ঝাপসা হয়ে মিশে ;
একটি দুটি টুকরাে মেঘে শাদা স্বপন সম
অসীম নভে হারিয়ে ফেলে দিশে।
গাছের তলায় আঁধারটুকু লুকিয়ে পড়ে রহে,
একটি দুটি জোনাক্ সেথা জলে।
আলাে-ছায়ার বসনখানি জড়িয়ে নিয়ে গায়ে
পথটি ধীয়ে লুকিয়ে কোথা চলে।
৮৫
কোজাগরী
;
ভাগলপুরের পথে
কিবা শান্তি দিলে মােরে, কি তৃপ্তি উদার,
শ্যামলা বিপুল স্নিগ্ধা পৃথিবী আমার !
দক্ষিণে বিততা গঙ্গা দিগন্তশায়িনী
শুভ্র বালু-বেলাময়ী মৃদুল-ভাষিণী
বামে স্তব্ধ গিৰিশ্রেণী উচ্চ-নীচ পথে
দুর হতে দুরান্তরে রহে শতে শতে।
হে ধরা, পৰ্বত যেন তব ওষ্ঠাধর,
কি কথা বলিতে গিয়ে উচ্ছ্বাস-কাতর!
গঙ্গা তব কল্লোলিত চলমান প্রাণ,
পৰ্বত উদ্দাম দৃপ্ত প্রাণ শক্তিমান !
ভােমার প্রাণের আজ এ দুই মূরতি-
তলিত বহমান আর দৃপ্ত অতি
আজি মাের চিত্তে বলে নহে প্রাণহীন,
এ ধরণী চিরন্তন জীবনে নবীন।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন
দেশের বন্ধু, দশের বন্ধু, দীনের বন্ধু, নমস্কার ।
করে রঞ্জন দেশের চিত্তে তােমার চিত্ত চমৎকার।
প্রেমরঞ্জিত কৃপামণ্ডিত প্রীতিনন্দিত নায়কবর,
চিত্ত-সুধায় বিত্ত-ধারায় নিত্য বঙ্গ-দুঃখ-হর।
আর্ত কেঁদেছে, কেঁদেছে ব্যথিত, পিষ্ট কেঁদেছে, কেঁদেছে ক্ষীণ,
সব হাহাকার শােক-ঝঙ্কারে রাজায়েছে তব চিত্ত-বীণ।
ভােগী তুমি অতি নৃপতি সমান, ত্যাগী শিব সম সৌম্যাকার,
প্রাসাদ-গরিমা নিমেষে তেয়াগি’ কুটীর-মহিমা করিলে সার।
কোটী দেশবাসী কটি-বাস পরে, তাইত ছাড়িলে রাজার বাস;
দলন-পীড়িত দেশের প্রভু তাে হলে না, হলে যে দেশের দাস।
নরের মাঝারে রাজে নারায়ণ,-সন্ধান তব অজানা নয় ;
নরের সেবায় নরনাথ সেবা বুঝিলে সত্য, হে জ্ঞানময় !
শত ব্যাধি আজ ঘেরে নিরবধি অভাগা বঙ্গে, নাহিক শেষ ;-
দন্তের ব্যাধি, ব্যাধি দাসত্ব, ব্যাধি জড়ত্ব হিংসা দ্বেষ।
সকল ব্যাধির ধন্য ভিষক, চিত্ত-সুধায় দুঃখ দূর ;
চিত্ত তােমার বিত্ত তােমার নিত্য জুড়াল বঙ্গপুর।
দেশের বন্ধু, দশের বন্ধু, দীনের বন্ধু, নমস্কার।
করে রঞ্জন দেশের চিত্তে তােমার চিত্ত চমৎকার।
bry
কোজাগরী
মরিতে হবে
আমারে মরিতে হবে-অতি সত্য কথা,
অতীব নিশ্চিত এই, নাহিক ব্যর্থতা,
নাহিক ব্যত্যয় এর, নাহি ব্যতিক্রম ;
চূর্ণ হবে এই মাের জীবন-উদ্যম।
এই হাসা, এই ধরা, এই মাের গতি,
এই বলা, এই কর, এই আঁখি-জ্যোতি
থেমে যাবে, নিবে যাবে; এ সুন্দর দেহ
যজে-গড়া, এই প্রীতি-ঘেরা মাের গেহ
সব যাবে, সব শেষ ; অদম্য শকতি
লুপ্ত হবে ধুলিমাঝে, লভিবে বিরতি।
যারে আজ আমি বলি, যে বলে তােমার,
কা’র কাছে থাকিব না, কেহ না আমার।
এই স্নেহময় ধরাশস্যে পুষ্পে যেই
আমারে রেখেছে সুখে কোনাে দুঃখ নেই,
গলাগলি যার সাথে জীবন-সঙ্গিনী,
আনন্দের বােরা এই নন-নন্দিনী
সবারে ছাড়িয়া যাব সব রবে পিছে,
জীবনে যা সত্য আজ, মরণে তা মিছে।
৮৮
মরিতে হবে আমি আছি, এই আমি-বাঁচার গৌরব, আমি শাসি, ভালবাসি, প্রীতি অনুভব- সব যাবে, সব শেষ, সব অবসান, এত মাের গর্ব, সুখ, আনন্দ, সম্মান। আমারে মরিতে হবে!-বড় লাগে ভয়, কেমনে ছাড়িব ধরা আনন্দ-নিলয় ? জীবন, জীবন মাের, হে শ্রেষ্ঠ বান্ধব, তুমি আমি এক আছি—এই এ গৌরব চূর্ণ হবে? তুমি নাই ?কেমনে এ ভাবি ? জগতে, মানুষে মাের লুপ্ত সব দাবী ? ছাড়িব না, ছাড়িব না এ মাের জীবন, এ সুন্দর প্রাণ মাের সযত্ন-গঠন ছাড়িব না, ছাড়িব না এ জীবনে আমি, আমার জীবন এ যে—আমি এর দ্বামী! হে সঙ্গিনী, হে বান্ধব, হে সখী জীবন, তােমাতে আমাতে যে গাে নিগূঢ় বন্ধন ; তােমাতে আমাতে প্রীতি—এ যে দুর্নিবার ; তােমাতে আমাতে যােগ-নদী-পারাবার। হে জীবন, হে পরাণ, আমারি মাঝারে গড়িয়া উঠেছ তুমি শকতিসঞ্চারে,
কোজাগরী
মাের বিন্দু বিন্দু রক্ত সদা করি’ পান,
আমারি শকতিকূৰ্ত্ত তুমি মাের প্রাণ!
তুমি যাবে ? কোথা যাবে ? আমি যাব কোথা
রক্তের বন্ধন এ যে !-এ-কি বাতুলতা?
হে একান্ত প্রিয় মাের জীবন সুন্দর,
তুমি যেই আমি সেইনহি মাের পর।
তুমি যাবে ! অসম্ভব !ছেড় না বান্ধব,
তােমারে দিয়েছি প্রীতি, শকতি-বিভব।
নয়নে আনন্দ দিলে, হৃদয়ে হরষ,
নিও না নিও না কেড়ে, করাে না নীরস।
.
তবু ভাবি আজ এই নিভৃত সন্ধ্যায়-
দিবসের রশ্মি পরে তরল ধারায়
যত নেমে আসে আঁধা’ দিগন্ত চিরিয়া
ব্যাপিয়া ঘিরিয়া সুপ্তিজাল প্রসারিয়া-
আমারে মরিতে হবে, হবে মাের শেষ,
ওই সূৰ্য্যরশ্মি সম রব নাক লেশ।
দিন যায়—আগু যাই জীবন ধরিয়া,-
আগু যাই ?-পিছু পানে যাই যে হটিয়া
দিন যায়-বেড়ে উঠি দিনে পর পর,
বাড়া নয়, মৃত্যুপথে ধীর অগ্রসর।
=
মরিতে হবে
আমারে মরিতে হবে, মরিব নিশ্চয়
এই নিদারুণ সত্য আজিকে হৃদয়
বুঝিতেছে ক্ষিপ্রপদ আঁধারের তালে ;
শান্তিময়ী রাত্রি আজ যেন মাের ভালে
পরায় প্রশান্ত টীকা মরণ-লিখন,
নত নেত্রে নম্র শিরে করি তা গ্রহণ।
এসুন্দর ধরাখানি, এ সুন্দর নর,
প্রফুল্ল এ শিশুদল, পুষ্প মনােহর,-
কেউ নয়, কিছু নয়, কেহ না আপন,
সবারে ছাড়িয়া যাব, সমস্ত বন্ধন
ছিন্ন হবে, চূর্ণ হবে,আমি নাই নাই,
প্রীতি-অনুভূতিহীন হব ধূলি ছাই।
প্রশান্ত আঁধারে আজ প্রশান্ত সন্ধ্যায়
মৃত্যুর বারতা বাজে হৃদি-কিনারায় ।
আমারে মরিতে হবে—এই এক কথা,
বাজে আজ কানে মাের ভেদি’ নীরব
৯১
কোজাগরী
আমার দেশ
[ কাশিয়ার জাতীয় গাথা]
ভালবাসি আমি আমার এ দেশ, ভালবাসি অতিশয়,
যুদ্ধজয়ের যত সুখ তাহা এ সুখের সম নয়।
রক্ত দিয়া ও রক্ত লইয়া স্বদেশের যত মান,
স্বীয় শক্তি ও মহিমায় তার মূর্তি যে গরীয়ান,
তাহার অতীত বল-কীর্তির পূণ্য যে ইতিহাস,
তাহাতে আমার নহে তত সুখ, নহে তত উল্লাস।
আমি ভালবাসি, কেন নাহি জানি, ভালবাসি গিরি তার,
তুষার-আধার বন্ধুর গিরি গম্ভীর অনিবার।
বায়ু-চঞ্চল অরণ্য তার রাশি রাশি, নাহি শেয,
ভালবাসি ভরা উদ্দাম নদী চলে ছাপি’ দেশ দেশ ;
গ্রামে গ্রামে তার আঁকাবাঁকা পথে চলিবারে ভালবাসি,
দৃষ্টির বাণে করিবারে ভেদ অন্ধকারের রাশি ;
যেতে যেতে খুঁজি রাত্রি-আবাস, বৃক্ষের ফাকে ফঁাকে
দূর পল্লীর ক্ষীণ আলােরেখা কঁপিয়া কঁপিয়া ডাকে।
দূরে ও অদুরে চিনির ধোয়া আঁকিয়া বাঁকিয়া উঠে,
শস্য-যােঝাই গাড়ীগুলি যায়, মেঠো পথে গরু ছুটে।
১৬
আমার দেশ
পাহাড়ের গায়ে সােনালি মাঠের মাঝে মাঝে বাহু তুলি
দাড়ায় পাদপ—তাহাদের সাথে প্রাণ করে কোলাকুলি ।
জানে কয় জনা কি সুখ আমার হেরিতে পৌষ মাসে
খামারে খামারে ধানের পাহাড় চাষীর কুঁড়ের পাশে।
খড়ের গাদায় কুঁড়ে পড়ে ঢাকা, পথ নাই ধানে ধানে,
চাষী হাসে আর চাষীর বালক, আকাশ মাতায় গানে।
প্রভাত হইতে রাত্রি গভীর হাসি-হর্ষের বান
পল্লীরে করে মুখর উতল, নাচে যেন তারি প্রাণ।
ভালবাসি আমি এই দেশ মাের ভালবাসি অতিশয় ;
যুদ্ধজয়ের যত সুখ তাহা এ সুখের সম নয় ।
কোজাগরী
জন্মভূমি
[ টমাস ডেভিসের ইংরেজী কবিতা অবলম্বনে ]
অর্থে অতুল, গৌরবে গরীয়া,
নিয়ত নবীন, সতত সে সুন্দর,
ভালবাসি আমি অপরূপ শােভমান
আমার জন্মভূমি এই সুখকর।
সাহসী কোথায় এ দেশের নর সম ?
ধৈৰ্যে অটল এ হেন নারী বা কোথা :
দেশের মুকতি তরে সপি’ প্রাণ মম
হব আমি বহু পুণ্য-কৰ্ম্ম-হােতা।
এ দেশ নহেক অলস, শক্তিহীন,
শক্তিমত্ত সাহসী আমার দেশ,
সত্যসাধক মহিমায় সে প্রবীণ,
জননী জন্মভূমি এ পুণ্য-বেশ।
১৪
জন্মভূমি
সুষমা-শােভায় মণ্ডিত দেশ মাের,
পুণ্য ধৰ্ম্ম তাহার বৰ্ম্ম-ঢাল,
কোন্ অরি পারে ছিড়িতে শক্তি-ডাের ?
দেশের মিত্র সুখে থাকে চিরকাল।
সুচির নবীন, চির সুন্দর দেশ,
সত্যসাধক অপরূপ অতুলন,
নাহি দুখ হেথা, নাহি হেথা কোনাে ক্লেশ,
আমার জন্মভূমি এই সুশােভন।
কোজাগরী
স্বপ্নলা
লাে মাের মানস-লক্ষ্মী সুচির-বাঞ্ছিতা,
রাত্রিশেষে আজি মাের স্বপ্নে তুমি দেখা দিলে সেই রূপান্বিতা,
সেই শ্যামা স্নিগ্ধজ্যোতি স্বর্ণদ্যুতিময়,
সেই দীর্ঘতন্বী ধীরা চাপল্য-নিলয়,
সেই কুশুদস্তা সু-উন্নত-নাসা,
সুউজ্জল সুললাট স্বর্ণশ্বপ্নে-ভাসা,
অস্থল অধর দুটি প্রতি-সম্ভাষণে সদা কূটন-উন্মুখ,
নয়নে করিছে বাস শিশু-হাসি আর গুপ্ত দুখ,
কান্ত গণ্ডে পরিপূর্ণ স্নিগ্ধ কোমলতা,
হেমদণ্ড দুটি হস্ত যেন দুই লতা,
ও গ্রীবায় মরি মরি ধীরে রাখি’ কর
আঁকড়ি মরিতে চাই জন্মজন্মান্তর।
স্বপনে হেরিনু তােমা, পার্শ্বে মাের বসিয়া সুন্দরী
বাম করে দেহ মাের কোমল আঁকড়ি,
মাের মুখ পানে চেয়ে হাসিতেছ মিষ্ট দুষ্ট হাসি,
সৌভাগ্যসন্দিগ্ধ আমি স্পর্শিতে তােমারে ভয় বাসি!
চাপল্য-মূরতি তুমি কভু নভে চাহিছ উদাস,
থেকে থেকে মাের মুখে ছড়াইছ হাসির কুসুম রাশ রাশ।
স্তব্ধ তৃপ্ত ব'সে ব'সে হেরি তব লীলা,
বক্ষে বাঁধিবারে চাই তন্বী তােমা’ শান্ত-দুষ্ট-শীলা।
স্বপ্নলা
তােমারে তুলিতে বক্ষে ব্যগ্র সুখে দাঁড়াইয়া উঠি,
এ কি এ কি লীলাময়ী, আমার চরণ-তলে লুটি,
আঁকড়িয়া দু’চরণ কহ তুমি-“বল বল, প্রিয়,
আমারে রাখিবে কাছে চিরদিন? চির প্রীতি দিও!”
কহি আমি-“মানসী, বাঞ্ছিতা, প্রিয়া, স্বপ্ন-জাগরণ-লব্ধ সখী,
তােমারে তােমারে আমি নিশিদিন চৌদিকে নিরখি,
গৃহে ও কাননে পথে নভস্তলে চিত্ততলে খুঁজি ।
সম্মুখে লভিনু আজি ; নিঃস্ব জীবনে তুমি পুঁজি।
তােমারে রাখিব কাছে।এ কি আজ শুধাইলে, নারী!
তােমারে লভিতে বক্ষে আপনারে নিঙাড়ি নিঙাড়ি',
বেদনায় পরিশ্রমে জেগে কাটে জীবন-প্রহর।
এস মাের স্বপ্ন-সাধ!”বলিয়া প্রসারি’ দুই কর
বক্ষে তুলি তারে আর চক্ষে রাখি সে স্নিগ্ধ বয়ান,
সেই মৃদুহাস্যভরা জ্যোতির্ময় উজ্জ্বল নয়ান।
বাহুর বন্ধনে মােরে বাঁধিয়াছে মাের আকাঙ্ক্ষিতা,
দুর্ভেদ্য বেষ্টনে মাের বক্ষতটে সে রহে বেষ্টিত ;
উর্দ্ধমুখে মাের মুখে অপলক দিঠি দিয়ে চায়,
নত নেত্রে আমি তারে করি পান দৃষ্টির তৃষ্ণায়।
মৃদু হেসে বলে মােরে-“জেনাে তুমি মাের ?”
আমি বলি-“চিরদিন চিরদিন আমি তাের তাের।”
চারি নেত্র দৃঢ় বাঁধা, চারি নেত্রে হতেছে ভাষণ,
বাক্যহারা দু’জনায় নয়নে নয়নে আলাপন।
কোজাগরী
লিতে সে চাহে যাহা নয়নে তা’ কল্লোলিয়া জাগে,
আমি যা বলিতে চাই ঢেলে দিই দৃষ্টি-অনুরাগে।
নাহি বাক্য, নাহি গতি, দু’জনে নিমগ্ন দু’জনায়,
কোথায় জগৎ, দ্বন্দ্ব, কোলাহল ? সূৰ্য্য তারা কোথায় মিলায় ?
আমি বেঁচে আর বেঁচে রহে মাের মানসী সুন্দরী।
এ দুটি জাগ্রত প্রাণে লক্ষ লক্ষ প্রাণ গেছে মরি।
জীবন্ত এ দুটি প্রাণী আর সব মরণ-নিশ্চল ;
আমি হেরি প্রিয়া হেরে—দুই প্রাণে জগৎ চঞ্চল।
দোহে দোহে নির্নিমেষ দেখা দেখা, নাহি তার শেষ।
সহসা টুটিল স্বপ্ন! একি রে কোথা সে কল্পদেশ ?
শূন্য শয্যা 'পরে মাের ব্যথাক্লিষ্ট বিদগ্ধ পরাণ
আছড়িয়া বারম্বার মাগে মৃত্যু, দ্রুত অবসান।
কোথা স্বপ্ন ? কোথা মাের প্রিয়া সে মানসী ?
লভিনু যে পারিজাত, কোথা গেল খসি ?
প্রভাত-আকাশ পানে চাহি’ বারম্বার
বৃথাই খুঁজিয়া মরি স্বল্পলব্ধ মানসী আমার।
দেহে কি কভু সে মােরে এ জগতে দিবে নাকো দ্যাখা ?
স্বপ্নে হেরিব না আর স্নিগ্ধ মুখাকা?
শুধু চিত্তে চিরদিন তারি আশা করিব পােষণ!
অসহ এ আশাক্লেশ !-এ মুহূর্তে ঘটুক মরণ।
কালবৈশাখী
বহু দিন পরে
শূন্য ব্যোম ভরে
ছুটিয়া গর্জিয়া এল পর্জন্ত প্রবল
তৰ্জনে গর্জনে খলখল,
আকাশ বাতাস বিড়ম্বিয়া
নরে তৃণে ধরণীৰে নিৰ্বাক্ সংক্ষুব্ধ করি’ দিয়া।
এ কোন্ ভৈরব, কাল, বিশ্বামিত্র, ক্রোধন দুর্বাসা ?
কিবা এর অন্তর-দুরাশা?
কি চাহে, কি গ্রাসিবারে এ মত্ত নর্তন ?
পিনাকী-প্রলয়ডঙ্কা তুলিছে রণন ?
বজ্র এর ক্রীড়নক ছুড়ে দেয় দিকে দিকে দিগন্ত ভেদিয়া
ছিন্ন এস্ত স্তব্ধ করি’ চলমান এসৃষ্টির হিয়া !
আঁখি তার জ্বলজ্বল-ঝলসিছে আগ্নেয় বিদ্যুৎ
কার তরে এত দম্ভ, এ রােষ অদ্ভুত ।
ঘটেছে কি দক্ষযজ্ঞ সেই পুনর্বার ?-
উমা সতী-সার
লাঞ্ছিত হয়েছে পুন’?—তাই হে মহেশ,
উড়াইয়া আলােড়িয়া বিস্ফারিয়া কেশ
কোজাগরী
মেঘরূপে সৃষ্টিবুকে দলন-চঞ্চল
প্রমত্ত বিহ্বল
এলে কাল-বৈশাখীতে স্বরূপ আস্ফালি,
মুখে অট্টহাস আর হস্তে বলি?
বুঝেছি বুঝেছি রােষ—হে ভৈরব বরষা বৈশাখী
নিদাঘার্তা ক্লিষ্টা পৃথী তীব্র তাপে শ্বসি’ থাকি থাকি
বাতাসে ভেটিল তােমা’ আপনার বেদন-বারতা
ভুমি সিন্ধুপুত্র বীর-ভগ্নী ধরা ক্লিষ্টা তাপন
শুনিয়া আসিলে ছুটি আস্ফালিয়া দুরন্ত আক্রোশ,
বক্ষে মেহজল, মুখে অভয়-নির্ঘোষ
জাহ্নবী-জড়িত-কেশ রুদ্রশান্ত মহেশের মত,
প্রলয়ে দুর্বার আর কল্যাণ-নিরত।
দক্ষনাশে মত্তপদ, হস্তে ডঙ্কা, বয়ানে বিষাণ
নৃত্যমান
যেমন ভৈরব চিরকাল
করুণা বিলাতে ঢালে জাহ্নবীর জলধারা হ’তে জটাজাল,
তেমনি হে দুর্নিবার ভৈরব বরষা,
ধরণী ভগিনী তরে হে শান্ত ভরসা,
প্রলয়ে দুর্বার তুমি, দানব নিদাঘে দলিবারে
বজ্র-হাতে অগ্নি-চোখে দেখা দিলে দিগন্তের পারে।
কালবৈশাখী
ধীরে ধীরে ব্যাপিয়া আবরি’ চতুর্দিক
দুর্দান্ত নির্ভীক
নাশিছ মারিছ ঐ অগ্নিশ্বাস দৈত্য নিদাঘেরে
পলায়ন-পন্থা তার সব ঘেরে ঘেরে।
প্রলয়স্বরূপ শুধু তবু নহ তুমি
শীতলিয়া প্রচুম্বিয়া ধরণীর ভূমি
ছলছল অবিরল রাশি রাশি ঢেলে দাও স্নিগ্ধ জলধারা
ধূর্জটির জটাত জাহ্নবীর পারা।
হে বরষা, হে মহেশ, প্রলয়ে মঙ্গলে অপরূপ,
নিৰ্বাক্ বিশ্বের বুকে দিগ্বিজয়ী ভূপ,
হে কালবৈশাখী, তুমি কাল নও, অনন্ত মঙ্গল
এক হস্ত নাশলিপ্ত, অন্য হস্ত সৃজনে চঞ্চল ;
দেবেশ মহেশ-সম ধ্বংস দাও আবার কল্যাণ,
হে কাল-বৈশাখী রুদ্র, হে বিদ্রোহী,
প্রণমি তােমারে নতপ্রাণ।
কোজাগরী
হও আগুয়ার
[ ইরেজী কবি হইতে ]
হও আগুসার, কাটিছে আঁধার,
রবে না ধরায় তিমির-লেশ।
কোটী কোটী প্রাণ আজি চলমান
সাগরের কুলে, গিরির দেশ।
চলেছে জগৎ ধরি’ রণ-পথ,
ভেরী বাজে আর দোলে নিশান ;
পবনে গগনে ভরি’ গর্জনে
রণ-প্রাণ নৃত্যমান।
চল আগে চল,
ঐ ধরাতল
শুনিছে মােদের গমন-রব ;
শান্ত আকাশ ছড়ায়ে সুহাস
ঢালিছে আশীষ শিরেতে সব।
আশা উদ্দাম ঈগল সমান
অভিযান-পথে অগ্রে যায় ।
ধৈর্য্যের ঢাল বক্ষ বিশাল
করিবে রক্ষা অস্ত্র-ঘায়।
হও আগুসার
চল চল, ভাই, আর দেরী নাই,
এই যে নিকটে শান্তি জয় ;
দেখ হে হরষে, আলােক ঝলসে
সত্যসেবীর বক্ষময়।
অতীতের যত বন্ধন গত,
পৃঙ্খল তার লুপ্ত আজ ;
পিছে যে আঁধার ছিল ভীমাকার
গলিয়া মিলায় আলােকমাঝ।
কোজাগরী
[ রামমােহন রায় ]
সত্যজ্ঞান, আত্মজ্ঞান, এ বিশ্বচৈতন্যজ্ঞান উদ্বোধিত ভারতের বুকে ।
সে জ্ঞান আছিল গুপ্ত শত শত শতাব্দীর অজ্ঞতার লাঞ্ছনার দুখে ।
হে রাম, হে ধনুষ্পণি, প্রজ্ঞা-অন্ত্রে করি’ ভেদ যুগ-যুগ-সঞ্চিত জঞ্জাল,
লক্ষ মুগ্ধ আঁখি পরে উজলিয়া দেখাইলে সে জ্ঞানমাণিক্যরশ্মি-জাল।
মূঢ়তা-নিশ্চল এই পাষাণী অহল্যা সম ভারতবর্ষেরে, তুমি রাম,
সঞ্জীবিলে স্পর্শে তব ; আজো তব প্রাণাবেগ চিত্তে তার স্পন্দে অবিরাম।
[ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ]
আলসে বিলাসে নিরাশে যে-দেশ নতপ্রাণ
সেথায় শুদ্ধ পুণ্য যাগের বহ্নিমান
জ্বলিলে, হে বীর, আলস বিলাস ভস্ম ছাই।
দৃপ্ত কঠোর ভীষ্ম অটল, তুলনা নাই ।
পিতা তুমি নব বঙ্গের অধিনায়ক নেতা,
দুঃখদলন দুঃখহরণ শঙ্কা-জেতা।
কর্কশ বটে গিরি তবু বুকে প্রস্রবণ,
কৰ্ম্মকঠোর তব বুকে দয়া সঞ্জীবন ।
[ মধুসূদন দত্ত ]
বিদ্রোহী তুমি, উদ্দাম তুমি শাসন-জয়ী,
পদ্ম। সমান প্রলয়ঙ্কর পরাণ বহি
১০৪
সপ্তর্ষি
শৈবালদল-রুদ্ধ বঙ্গ-কাব্য-নদী
করিলে সবেগ, উত্তাল ছােটে সে নিরবধি।
গভীর রাত্রে বৈশাখ-মেঘে বজ্রসম
তব মেঘনাদে ছুটালে তন্দ্রা, নাশিলে তম।
বঙ্গের গৃহে নহ তুমি ধীর প্রদীপ-শিখা,
কক্ষে কক্ষে জ্বলিলে তাহার বিজলি-লিখা।
[ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |
গুপ্ত ছিল ভাষা-গঙ্গা বিস্মৃতি-মহেশজটাজালে ;
হে তপস্বী ভগীরথ, সাধনা-উজ্জল টীকা ভালে
নিনাদিয়া শঙ্খ তুমি, সে গঙ্গারে মুক্ত করি’ দিয়া
শুষ্ক-বঙ্গ-চিত্ত-ক্ষেত্র প্রাণাঙ্কুরে দিলে সঞ্জীবিয়া।
দিলে রস, দিলে গতি, দিলে হর্ষ, মন্ত্র ও সাধন
একা পার্থ লক্ষজয়ী করে ধর্মরাজ্যের স্থাপন।
ছিল মুকুট, দণ্ড, সিংহাসন, প্রাসাদ বিরাট!
সকলি রচিলে বলে, ছত্রদণ্ডে শােভিলে সম্রাট।
[ স্বামী বিবেকানন্দ ]
আচার-বন্ধন-পিষ্ট জর্জরিত দেশে
দাঁড়ালে পিনাক-হস্ত ভৈরবের বেশে;
ডঙ্কা ও বিষাণ তব ফুকারি’ ফুকারি
শঙ্কা দিলে ভণ্ডে যত, যত অত্যাচারী।
কোজাগরী
গুহাগুপ্ত জ্ঞানভেরী-তারে তুলি’ নিয়া
মন্ট্রিলে যে বাণী—মুগ্ধ প্রতীচ্যের হিয়া।
বৃদ্ধ ভারতের তুমি দৃপ্ত সিংহশিশু,
ধৰ্ম্মী কৰ্ম্মী অতুলন—শঙ্কর ও যীশু।
[ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ]
স্নেহকোমল ছায়াশীতল শস্যশ্যামল বঙ্গভূমি।
সে বঙ্গেরি চিত্তখানির মূর্তি যেন জাগ লে তুমি।
মেহ আছে, প্রেমও আছে, আছে ছায়া, শ্যামলতা,
কাব্যে তােমার মেঘের মায়া, পদ্মানদীর চপলতা,
ফিঙের ধ্বনি, শিশুর হাসি, প্রিয়-প্রিয়ার গাঢ় চুমা ;
হাসাও তুমি, কাদাও তুমি, নাচাও, বলল-ঘুম, ঘুমা।
দেশে দেশে সকল মানুষ একটি প্রেমের সূত্রে গাঁথা
শিখিয়ে দিলে, ধন্য হল প্রেমগরবী বঙ্গমাতা।
মুগ্ধ জগৎ শুনছে তােমার প্রাণজুড়ানাে মােন বেণু,
সবার ব্যথা বাজছে তাতে--আকাশ এবং ধুলিরেণু।
কবির শিরােমণি তুমি, বঙ্গ-ভালে দীপ্ত টীকা,
বিশ্বগেহের আঁধার হবেঙ্গ-প্রদীপ স্নিগ্ধ-শিখা।
[ জগদীশচন্দ্র বসু ]
যে-প্রাণে বলিষ্ঠ নর, বিহ, তপন, গ্ৰহদ,
সেই প্রাণ, সেই বীৰ্য, সেই বেগ উদ্ভিদে উচ্ছল,
সপ্তর্ষি
এ গুপ্ত প্রগাঢ় সত্য মনীষা-কিরণে তুমি, কবি,
লভিলে আপন চিত্তে, প্রকাশিলে কী বিচিত্র ছবি
শেষহীন জীবনের, এক যাহা ভিন্ন রূপে মিশি।
তৰ পূৰ্ব্ব পিতৃগণ যেই সত্যলােভী প্রধী ঋষি
হেরিল অখণ্ড প্রাণ চরাচরে অদ্বৈত অব্যয়,
তাদের সন্তান তুমি চিনে নিলে সে প্রাণ দুর্জয়।
আত্ম-মদ-গর্ব-ঘােষী পশ্চিমের প্রচণ্ড পিনাক
সত্যসন্ধ ভারতের জ্ঞানমন্ত্রে বিজিত, নিৰ্বা।
কোজাগরী জনপথে এই যে নিশিদিন অশেষ চলাচলি, এই যে ডাকা, হাসা, ইসারা, বলাবলি ; এই যে ব্যথাভারে আনত মুঢ় মুখ ; এই যে ধনমদে মত্ত ফোলা বুক। এই যে যুবকের সতেজ অভিযান ; এই যে জরাতুর যষ্টিগত প্রাণ- জানালা দিয়ে সবি দেখি রে চেয়ে চেয়ে ; অসীম ভাবনায় মন যে পড়ে ছেয়ে ! এই যে সারাক্ষণ অশেষ যাওয়া-আসা ; সুধীর মন্থর, কারাে বা দ্রুত ভাসা; দু’জনে গলাগলি, দু’জনে রাগারাগি ; সুচির পরে দেখে দু’সখা অনুরাগী ; দেখিয়া গুরুজনে কেহ বা প্রণময় ; কেহ বা পিছু হ’তে টানিয়া কড়া কয় - Job
জনপথে
এমনি দেখি দেখি, ভাবিয়া কুল নাই,
দুঃখ সুখ ঋণ প্রীতি সে এক ঠাই।
এই যে চলিয়াছে অবাধ শেষহীন,
চলেছে যুগে যুগে, এখনও প্রতিদিন,
কবে রে এর শেষ কোথায় হবে শেষ?
থামিবে ? থামিবে না এ যাওয়া-আসা-ক্লেশ ?
মানুষ এল কেন? কেন সে পাতে ঘর?
জানে তাে দুখ-শােক প্রচুর ধরা’পর !
কেন সে আপনারে জড়ায় পাকে পাকে ;
উতরি’ এক দুখে দুখেরি আশে থাকে ?
দু’পাশে মরে ঝরে আপন জন তার,
তবু সে প্রাণটারে আঁকড়ে বারে বার।
দুখের শেষ নাই, সুখেরও হবে লােপ ;
পীরিতি রবে সে কি ?—থাকিবে শুধু ক্ষোভ !
হায় রে মুঢ় নর, তবুও যাওয়া-আসা,
তবুও সুষতন, আশা ও ভালােবাসা ;
তবুও প্রীতি-ডাের বাড়ায়ে নিতি নিতি
বাঁধিস্ নব জনে,-কে রবে নিতে প্রতি ?
হায় রে দুখ-ভােলা, হায় রে সুখ-ভােলা,
ও চিতে কোন্ ভুল নিয়ত দেয় দোলা ?
১০৯
কোজাগরী
ও ভুলে থাক্ তুই ভুলিয়া চিরদিন,
আসা ও যাওয়া ক্লেশ পাসরি’ তাহে লীন।
জগৎ ধেয়ে যায়, তাহারি সাথে নর
গােলক সম বেগে চলেছে পরে পর।
উপলে বাধা পায়, কঁাটায় কাটে পদ,
তবুও জীবনেরে ভাবে সে নিরাপদ।
বৃহৎ জনপথে অবাধে লােক যায়,
তা দেখে গৃহকোণে মরি রে ভাবনায়।
১১০
রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী
রচ নাই মহাকাব্য, নাট্য, উপন্যাস ;
সভামঞ্চে বিস্তারিয়া বাক্যের বিন্যাস
মুগ্ধ কর নাই জনে। একান্ত গােপনে
একাগ্র অন্তরে আর অক্লান্ত সাধনে
সেবেছ পরম-সত্য বাণীর চরণ।
পশ্চিম-বিভ্রান্ত বঙ্গে মন্দির ভবন
ছিল না বাণীর কোননা। হে যােগী সন্তান,
উগ্র তপােবলে স্বীয় রক্ত করি’ দান
রচিয়াছ বাণীগেহ সাহিত্য-আলয়।
হে উদ্গাতা, হে পুরােধা, হে কল্যাণময়,
প্রতিষ্ঠিয়া বঙ্গবাণী দিলে তাহে প্রাণ,
ভারতের ভারতীর রাখিলে সম্মান।
মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি তুমি বিভ্রান্ত এ দেশে,
দেখালে ভারতসত্য অভ্রান্ত নির্দেশে।
১১১
কোজাগরী
সংশয়ী
কোথায় গােপন কোণে কোন অন্তরালে
লুকায়ে আছে সে জীব, যারে কালে কালে
বলেছে ঈশ্বর আর বলেছে বিধাতা,
জগৎ-জীবন-সিন্ধু, সৰ্ব্ব-শুভ-দাতা,
করুণার অবতার, সবার আশ্রয়,
সকল-তাপিত-জন-আনন্দ-নিলয়,
জগৎ-জনক ? কোথা এই রহস্যের
আবরণে আবরিত বিপুল বিশ্বের
কোন্ কক্ষে কোন্ গর্ভে কোথায় কেমনে
ই-জাল-মায়াজালে অতীব যতনে
রেখেছে সে আপনায় ঢাকি ? উর্ধে চাই
অপার অনন্ত শূন্য বিরাজে সদাই
প্রচণ্ড দুর্বার বাধাহীন—বক্ষে তার
বিন্দুসম অতিদীন ক্ষুদ্র-দেহভার
ঘুরিছে তপন, চন্দ্র, লক্ষ গ্রহ, তারা,
বিন্দুমাত্র স্থান ব্যাপি যেন সঙ্গীহারা
বিশাল প্রান্তর মাঝে একক পথিক।
তার পর সব শূন্য, নাহিক নিরিখ,
১১২
সংশয়।
নাহি বায়ু, নাহি দেশ, নাহি ছায়া আলো,
নাহি গতি, রাত্রি, দিন,—সব স্তব্ধ কালাে
সকল-বিহীন!-হায়! কোথায় ঈশ্বর ?
ধরণীর পানে চাই-আলােক-ভাস্বর,
শব্দময়ী গীতময়ী মানব-জননী
সহস্র-বিচিত্র-রূপে অদ্ভুত-বরণী ;
লক্ষ লক্ষ বৃক্ষলতা, অসংখ্য মানব,
অসংখ্য পতঙ্গ পক্ষী, পশু ও দানব
উঠে পড়ে ফুটে ঝরে দুলিছে দোদুল
রচিয়া আপন ভাগ্য দুঃখ সুখ ভুল
অদম্য জীবন-স্রোতে। অঙ্কুর রচিছে
বৃক্ষে, বৃক্ষ রচে বীজ, ধরণী ঢালিছে
স্নেহরস, মানব সৃজিছে মানবেরে,
পশুরে জিছে প—এমনি চলে রে
বিচিত্র জগৎখানি।-কোথা পাই তারে
সবার জনকরূপী সৰ্বনিয়ন্তারে ?
আপনার মধ্যে চাইদৃপ্ততেজা আমি
ধরণী লুটিয়া খাই, চলি দিবা-বামি’
গ্রাসি’ বায়ু গ্রাসি’ জল,-দুরন্ত প্রবল
নিজ হাতে ভেঙে চুরে মত্ত উচ্ছঙ্খল
১১৩
৮
কোজাগরী দস্যুর সমান; আপনার ভাগ্য, পথ, সে তত আমি রচি, চলিয়াছে মহারথ মানবের দুঃখ-সুখ হরষে চালিত উদ্দাম কৰ্ম্মের বেগে, মােরে আন্দোলিত হিল্লোলিত নিয়ন্ত্রিত করি’ নিশিদিন,- মাের কৰ্ম্ম মানবের কৰ্ম্ম সাথে লীন হইয়ে রচিছে দুঃখ-সুখ নিজে-গড়া। কোথা তবে কার মাঝে সেই শক্তিভরা পরম পালক ? সে কি শুধু কল্পনায়, কবির ভাবের ঘন মােহের মায়ায় বসে আছে কল্পিত বাস্তবে ? একদিন একান্ত দুর্বল অজ্ঞ অতি দীন হীন ক্ষুদ্র নর চমকিয়া হেরিল নর্তন বৈশাখের, জলধির প্রমত্ত গর্জন,- বিস্ময়ে স্তম্ভিত তারি প্রাণ; হেরে ধারা ঝর ঝর বরষার সর্বগ্নানি-হারা শস্য-সঞ্জীবন, রাত্রি-শেষে ফুল্ল রবি আনন্দ-জীবন-দাতা, আরাে কত ছবি শরতের বসন্তের হিল্লোলিয়া প্রাণ তাহারে আনন্দে ভরে, গাইল সে গান- ১১৪
সংশয়ী
আছে আছে এ বিশ্বের অন্তর-মাঝারে
সবার পশ্চাতে আর আঁকড়ি সবারে
শক্তিময় সঞ্জীবন-প্রাণ। সে বিস্ময়
অদৃষ্ট শকতি পরে সেই সে প্রত্যয়
যুগে যুগে চলে এল মানব-সন্তানে;
রচেছে দেবতা শত, কৌতুকসন্ধানে
নির্দেশ করেছে স্বর্গ ঈশ্বর-আবাস,
পারিজাত-গন্ধময় সৰ্ব্বদুঃখনাশ
শান্তিময় সুখময়।
দুঃখ সে প্রবল
রিক্ত করি’ তারে যবে করিছে দুর্বল
কাতর অক্ষম, নিরাশ্রয় কঁদে হায়,
জগতে শকতি দিতে নাহি কিছু পায়,
খুজে মরে কল্পিত আশ্রয় ভগবান !
এমনি বিস্ময়ে ভয়ে দুঃখে তারি প্রাণ
রচিয়াছে আপন ঈশ্বরে দুঃখাতীত ।--
এ তার কল্পনা শুধু আনন্দ-পূরিত,
নিরালম্ব জীবনের কল্পিত আশ্রয়,
রৌদ্র-তপ্ত পথিকের বাঞ্ছিত নিলয় !
কল্পনায় এঁকে এঁকে আনন্দ ঘনায়ে
আপন মনের রসে রেখেছে জাগায়ে
ঈশ্বর মঙ্গলময় সুখের প্রতি।
কোথ। তার এই বিশ্বে জীবন্ত মূরতি ?
কোজাগরী
দোলায়িত সংশয়িত এ জিজ্ঞাসু মন
নিশিদিন অনুখন করে বিশ্লেষণ
বিশ্বের সকল দৃশ্য, সব কৰ্ম্ম, ভাব,
সকল চিন্তার ধারা; তবু যে অভাব
জেগে রয় মৰ্ম্ম মাঝে, মেটে না বাসনা,
থামে নাকো কৌতুহল ; দুরন্ত কল্পনা
ছােটে আর বলে শুধুআছে? মিথ্যা নয় ?
বাস্তবে পেলে না যারে, কেবল হৃদয়
তাহারে আঁকড়ি’ রবে এই কিবা কথা !
ক্ষুব্ধ মনে মৰ্ম্মে চাপি’ মরমের ব্যথা
বসে থাকি বাক্যহীন। নয়ন ফিরায়ে
চেয়ে দেখি-নিঃস্ব নগ্ন সৰ্বস্ব বিলায়ে
কত সে সন্ন্যাসী ত্যাগী বলিছে সদাই
আছে আছে, অন্তরেতে আমি তারে পাই
জগৎ-বিধান সেই সৰ্ব্ব-শুভ-দাতা।
এমনি এ সংশয়ের চপল বিধাতা
কভু আছে, কভু নাই, শূন্য হেরি সব,
হেরি শুধু আমি আছি যৌবন-বিভব ।
মুক্ত হতে চাই আজ ছেদিয়া সংশয় ;
মিথ্যা যদি সে ঈশ্বর, রহুক হৃদয়
সংশয়ী
এমনি এ দুর্নিবার দুরন্ত প্রবল
নিশিদিন মােহনাশী বিদ্রোহ-চঞ্চল ।
যদি সত্য সে ঈশ্বর, উঠুক ফুটিয়া
জীবন্ত জাগ্রত রূপে আঁধার নাশিয়া
প্রদীপ্ত বিভায়।
মূৰ্ত্ত মুক্ত সত্য চাই;
রহস্যের আবরণ পুড়ে হাে ছাই।
১১৭
কোজাগরী
মুক্তি দাও
[ সার্বিয়ায় দেশপ্রেম-গাথা ]
হে বিধাতা, তুমি কত যুগে যুগে রক্ষা করেছ আমার দেশ ।
হে ন্যায়নিধান, ভূপতি মহান, শােন হে আজিকে মােদের ক্লেশ।
মাগি হে কাতরে স্বদেশের তরে দাও হে মুক্তি, ক্লেশের শেষ।
লয়ে যাও আগে, লয়ে যাও দূরে, মুক্তির পথে লইয়া যাও;
দেশের রাজ্য জাহাজ সমান বন্দর মাঝে বাঁধিয়া দাও;
তব শক্তি ও করুণার গুণে ঘাের তম হ’তে আলােকে নাও।
উজ্জ্বল অতি সে-আলােক মাঝে যতেক শক্র হউক লােপ;
রাখ হে রাজ্য, রাখ এ দেশেরে, দাও হে মুক্তি, ঘুচাও ক্ষোভ।
১১৮
দেওঘর
বাংলা-সীমা ছাড়িয়ে এলাম কাকুরে দেওঘরে ;
হেথায় হােথায় দূর অদূরে পাহাড় থরে থরে।
কূিট-পাহাড় তিনটি মাথা, পূব দিকেতে রাজে ।
তবুও যেন যেদিক্ তাকাই সেই দিকে সে আছে।
কাকর-ভাঙা রাস্তা শাদা, মাঝখানে পাটকিলে,
কোথাও আবার লাল মাটীতে রাস্তা রেঙে দিলে।
মাঠের পাশে চকী পাহাড়, পাথর মাথা তােলে -
মৌন ধরার শক্তি গােপন কঠোর হয়ে ফোলে।
মানব-গৃহে যেমন ছােট শিশুরি হাট লাগে,
ধরার বুকে তেমনি হেথায় ছােট্ট পাহাড় জাগে ।
তুলেছে থ্যাবড়া মাথা, কার মাথা বা সরু,
কেউ বা দাড়ায় পাহারওলা-ঠাসান দিয়ে শুরু।
এই এখানে একটা জাগে, আবার দু’হাত দূরে,
আবার হেথায় দশটা পাথর উঠছে ধরা ফুড়ে।
পাহাড়-শিশুর জন্ম দেখে স্তব্ধ হয়ে রই,
বিপুল বিস্ময় আমার কেমন করে কই ?
রে প্রাণবান পাহাড়-শিশু, মানব-শিশুর মত
সবল উদ্দাম ওরে জীবন-জাগ্রত,
১১৯
কোজাগরী
মােনা মাতা ধরণী তাের আছে খেয়াল-ঘােরে,
আপন দেহ অটুট করে গড়ছে ধীরে তােরে।
দুৰ্ব্বার বাসনা তারি আকাশ ছোঁবার আশা
তাের ঐ রূপে মূৰ্ত্ত যেন তাহার প্রাণ-ভাষা।
কোথাও হরিৎ ক্ষেত্র শােভে পাহাড় কোলে কোলে,
কঠোর গিরির গা বেয়ে বা করুণা-দী ঝােলে।
শস্যমাতা কোমল ধরা পাহাড় গড়ে গড়ে
আপন নিদয়তায় স্মরি’ ঝরণা রূপে ঝরে।
ঝরণা-নদী যায় ছুটে যায় বালিরি পথ কেটে,
পাথর-স্কুপের তলে তলে টুটে কোথাও ফেটে।
মাঠের গায়ে সেই ধারাতে করাত দিয়ে গেছে ।
লাল কাঁকর আর শাদা কাকর জড়িয়ে পেঁাহে আছে ।
তপোবনের বুননা পাহাড় লক্ষ গাছে পােষে,
বহুল পাথর-খণ্ড বিরাটু পাশে পাশে বসে।
গুহায় কোথায় বনের ঝােপে লুকিয়ে আছে বাঘ,
গন্ধ তারি আছে নাকে, আছে কানে ডাক,
শঙ্কিত প্রাণ, হাঁপিয়ে ক্লেশে উঠি পাহাড়-মাথা—
যেথায় পাথর আঁকড়ে দাড়ায় অশথ, নােনা, আতা
সেখান থেকে দেখছি ধরা নিয়ে নীরব শুয়ে,
অসংখ্য গাছ, তৃণ, পুকুর যত্নে বুকে থুয়ে ;
১২০
দেওঘর
ধানের ক্ষেতের সবুজ ছবি বা আলের ফ্রেমে,
লােহিত মাটীর পথখানি যায় উঠে আবার নেমে ।
বিচিত্র এ ধরার মূৰ্ত্তি কোথাও শাদা, লাল,
কোথাও উচু কোথাও নীচু, কোথাও কাটা খাল।
মানুষ চলে, চরছে গরু যেন বকের সারি !
ঐ ধরাতে দুঃখ পীড়ন আছে মহামারী ?
ঐ ধরাতে যুদ্ধ বাধে ?—রাগ ও লাঠালাঠি ?
একটু মাটী, কড়ির তরে মাথার ফাটাফাটি ?
দশটি জনের পােষণ তরে একটি প্রাণী খাটে ?
দুঃসহ-ক্লেশ-আরব সাথে বক্ষ কোমল ফাটে ?
হােথায় মরে একটি কি নর দশটি শিশু রেখে,
তাদের প্রবল আৰ্তনাদ কি বাতাস চলে মেখে ?
ঐ কি ধরা দুঃখভরা, কলকলােচ্ছ্বাস ?
ঐ কি ধরা খেলছে যেথায় হর্ষ, কঁাদন, আশা ?
পাহাড়-চুড়ায় বসে ভাবি কিছুই যেন নাই,
মানুষ যেন শিষ্ট অতি, শান্ত সৰ্ব্বদাই।
আজ মনে হয় পাহাড়-চুড়ার শাস্তি বায়ু ধরে
পাখীর মত যাই উড়ে যাই মানব-ঘরে-ঘরে ;
বলি সবার কানে কানে-ঝগড়া কেন মিছে,
কেন ছুটি পরের কড়ি নেবার আশার পিছে ?
উর্ধে হােথায় শশান্ স্বনিছে শান্তি-উদারতা,
সেই বায়ুরই আভাস নিয়ে কর বেদনা গতা।
কোজাগরী
উচ্চ হ’তে কোন্ বাণী পাই উচ্চ করে হিয়া,
পারব নিতে ঐ বাণী কি দুঃখে প্রলেপ দিয়া ?
নেমে আসি মাটীর বুকে, মা ধরা কল্যাণী,
তােমার বুকে কতই পেষণ করূছে মানব প্রাণী !
কাটছে তােমার বক্ষে ক্ষত, শস্য তবু দাও,
করূছে দাপাদাপি দলন, শান্ত মুখে চাও।
উচ্চ হ’তে হেরে তােমায় বুঝ তােমার আমি,
তােমার মাটী তােমারি জল আমার সর্বস্বামী।
মাগাে আমার পৃথী ধাত্রী, তােমার আমি ছেলে,
লােটাতে চাই তােমার বুকে আপন বক্ষ মেলে।
কাকর, পাথর ধুলি সবি আমারি আত্মীয়,
তৃণ ও গাছ যেমন, আমি তেমনি তােমার প্রিয় ।
পাহাড়-কোলে লুকিয়ে বসি—রাজিছে স্তব্ধতা,
সৰ্ব্ব-জগৎ এমনি যেন শান্তিপ্তি-নতা!
একটি ঘুঘু ডাক্ছে শুধু পাতার ঝােপে বসে ;
চমকে শুনি-বটের পাতা একটি পড়ে খ’সে
শরৎ-মেঘের সিড়ি দিয়ে সূৰ্য্য নেমে চলে,
সােনালি তার উত্তরীয় ছড়িয়ে জ্বলজ্বলে !
অন্ত তাে নয়, অস্তগিরির শিরে রবির বিয়ে
চেলীপরা সন্ধ্যা সাথে, সিদুর ও ফাগ দিয়ে।
১২২
দেওঘর
রবি ও সাঁঝবর ও বন্ধু লুটায় আলিঙ্গনে,
রাত্রি তাদের ঘটায় মিলন কৃষ্ণ আবরণে।
চৌদিকে চাই দেওঘরেরি-বৃক্ষেরি মেখলা,
পাশে পাশে দাড়ায় পাহাড় পাঁচতলা সাততলা।
লম্বা সারি ইউক্যালিপটাস উচিয়ে দাড়ায় মাথা ;
গােলাপ, জবা, চামেলিদের সহাস দোলন মা’তা ;
বাড়ীর দ্বারে ঢুকতে গেলেই গােলাপ হেসে ডাকে,
চামেলি সে অতিথিরে অর্ঘ্য বিলায় নাকে।
এই কাকুরে এই পাথুরে মাটীর একি খেলা,
গড়ছে পাথর, ফোটাচ্ছে ফুল-অবাক্-করা মেলা !
কঁকর পানে তাকিয়ে ভাবি—তুইও মাটীর গড়া,
ফুলের পানে তাকিয়ে ভাবি-চিরেও ফোটায় ধরা !
প্রগাঢ় বিস্ময়ে আমার চিত্ত ভ’রে আসে;
বিচিত্র এ কতই ধরা-দেওঘরে আভাসে।
খণ্ড মেঘে ঘুরে বেড়ায় থমকে দাড়ায় কোথা,
ভােরের বেলা ত্ৰিকুট-শিরে জ্বলছে সােনা হােথা !
ত্রিকুট গিরি তিনটি মাথায় কুয়াস-টুপি আঁটে ;
কুয়াশা কি পায়নি শরণ হারিয়ে আকাশ-বাটে ?
গদের আলাে গিরির গায়ে, তরুর শিরে, পথে
উপচে পড়ে, আকাশ নারে ধরুতে কোনাে মতে!
।
১২৩
কোজাগরী
টুকরাে আঁধার তৃণের 'পরে ঘুমােয় গাছের তলে ।
চঁদের আলােয় লজ্জা পেয়ে জোনাক মৃদু জ্বলে!
:
পাহাড়, কাকর, গােলাপ-ভরা দেওঘরেরি ছবি
চিত্তপটে রাখল একে বাংলা গাঁয়ের কবি।
১২৪
বাদল-জল
তাথিয়া তাথিয়া থিয়া
নাচিয়া নাচিয়া হিয়া
বরিছে—
বরিছে বাদল-জল,
ঝমাঝম ছলছল
ঝরিছে।
ঝরিছে ঝরিছে বারি,
কে ঢালিছে জলঝারি
অঝােরে ?
কে বলিছে—নাও, নাও,
ধরা বলে-দাও, দাও,
কাতরে।
দাও দাও, নাও নাও,
ভেক সবে গান গাও
হরযে ;
লােমকূপ ধরণীর
ভরে যায়, কােলে শির
তৃণ সে ।
কোজাগরী
ছত্রপতি শিবাজী
–
.
ছত্র ধর, ছত্রপতি, বড় তাপ, অসহ্য যন্ত্রণা,
লেলিহান্ জিহ্বা মেলি দুঃখ-অগ্নি করিছে তাড়না ;
ঘাের দুঃখ, ঘাের ব্যথা, দৈব শিরে মৃত্যু হানে ;
দাসত্ব-প্রখরতাপ দহিছে বৈশাখ-রৌদ্র-বাণে ;
ছায়া নাই, গৃহ নাই, পদতলে তপ্ত বালু দহে,
মরুভূমি এ ভারত দীর্ণ, মূঢ় মরীচিকা-মােহ !
ছত্র ধর, ছায়া কর, ছত্রপতি ওহে মহারাজ,
নিবাররা এ রৌদ্র-অগ্নি, দাসত্বের দৈন্য-দুঃখ-বাজ।
ছায়া দাও, স্নেহ দাও, দাও মেঘ, জীবন-সলিল ;
রক্ষা কর, কর ত্রাণ, মুছে দাও মরীচি’ জটিল।
আনাে আনাে মেঘসম বক্ষে জল, বদনে অভয়,
শ্মশানে জাগাও প্রাণ, শুভময় হে শিব দুর্জয় !
ছিন্ন কর এ সংশয়, এ সন্তাপ, বিকট শুষ্কতা,
দাসত্ব-দক্ষেরে দলি’, করি’ নাশ দানব দীনতা।
হস্তে শূল পাপনাশী, শিরে জল জগৎ-জীবন,
এস শিব হে শিবাজী, নিদাঘাৰ্ত্ত ভারত-ভবন!
"
ছত্রপতি শিবাজী এস তব সৌম্য শৌর্য্যে, দীপ্ত বীর্য্যে, উন্মত্ত উল্লাসে, উড়ে যাক্, মুছে যা ত্ৰাস দ্বিধা তােমারি নিশ্বাসে ; তব তীব্র-আঁখিতলে ভস্ম হাে জকুটি-নয়ন, নত হােক অন্যায়ের উত্তোলিত বাহুর পীড়ন ভগ্ন হাে তব বলে পাপ-ভিত্তি দৈত্যের প্রাসাদ ; তুলিয়া বিষাণ তব ফুকারাে বিষম সিংহনাদ, সে নাদে গহ্বর মাঝে লুকা অন্যায়ী পাপকারী ; দক্ষ-সভা হােল্ক নাশ শিবের হুঙ্কারে ভীতিহারী। এস এস হে শিবাজী, দলিত হিন্দুর দীপ্ত আশা, আৰ্যের গৌরবধ্বজাবাহক, শাসক পাপনাশা। স্বপ্ন সম চিত্তে আজ জাগে সেই পঞ্চনদ-তীর, শ্বেতকান্তি দীর্ঘবপু খনাসা সেই আৰ্য বীর- সেই মুষ্টিমেয় বীর শৌর্য-বীৰ্য-মহিমা-আধার ভীম হস্তে ভিন্ন করি’ লক্ষ শত্রু, পাহাড়, কান্তার, গড়িলা ভারতবর্ম—বিশ্বের প্রদেশ-মধমণি— সংযত শক্তির মাতা, তত্ত্বজ্ঞান-প্রজ্ঞানের খনি, উদ্ধত-অন্যায়-নাশী, ধৰ্ম্মবেদী, করুণা-বিকাশ, নিষ্কাম কৰ্ম্মের কত্রী, দৈন্যজয়ী, মুখে নম্র হাস, নিৰ্ম্মল, প্রশান্ত দান্ত, ক্ষমামূর্তি, আনন্দ-নিলয়, অপূৰ্ব্ব ভারত জাগে আত্মজয়ী, করি’ দিগ্বিজয়। ১১৭
কোজাগরী
জিনি’ জন জিনি’ দেশ ধৰ্ম্মবাৰ্তা করিল ঘােষণ
শ্রীরাম, শ্রীকৃষ্ণ দুই ধৰ্মী কৰ্ম্মী কলুষ-নাশন ।
ভীষ্ম সে আহবে ভীষ্ম, অন্যায়ে অধৰ্ম্মে পরায়ুখ ;
অর্জুন অপার-বীৰ্য—সবর্জ প্রশান্ত জলমুক্ ।
এই শৌর্য্যে এই বীৰ্যে সংযমে কল্যাণে মহীয়ান,
প্রতিষ্ঠিত ধৰ্ম্মভিত্তি ভারত-সাম্রাজ্য প্রাণবান,
এক হস্তে বীৰ্য্য-খা, অন্য করে অন্ন জীবপ্রাণ,
নয়নে করুণা-গঙ্গা, ললাটেতে ক্ষমা ও কল্যাণ ;-
এই তত ভারতবর্ষ অতুল জননী মহীয়সী,
রামকৃষ্ণার্জুন-ভীষ্ম-মহাবীর-বলে বলীয়সী ;
দৃপ্ত দাস্ত, ক্ষিপ্ত ক্ষান্ত, মুক্ত শান্ত ভারত স্বদেশ
রামাৰ্জ্জুন-জন্মভূমি নিত্য সহে অপমান-ক্লেশ,
নেহারি, হে আৰ্য বীর, ভারতের সুযােগ্য সন্তান,
রিক্ত তবু পূর্ণ-চিত্ত, সঙ্গীহীন তবু শক্ত-প্রাণ,
জাগিলে অটল শৌর্য্যে, আত্মবলে সেনানী গড়িয়া,
আৰ্য্যের মহিমা-রশ্মি দিগ্বিদিকে দিলে বিস্তারিয়া!
হে শিবাজী, দুৰ্বল অক্ষমভীরু সবাকার সম
স্বপ্নে তুমি তৃপ্ত নও নেহারি বিচিত্র অনুপম
মুক্ত ভারতের ছবি,--সত্য যাহা ছিল একদিন
সত্য তারে করিবারে বিমুক্ত উদ্দাম বাধাহীন,
ছত্রপতি শিবাজী পােষিলে দুর্জয় আশা, করিলে সঙ্কল্প নিদারুণ, ক্ষিপ্ত খঙ্গে রাহুমুক্ত করি’ দিলে ভারত-অরুণ । হিন্দুর ভারতবর্ষে হিন্দু করি’ দিলে পুনৰ্বার, অহিন্দু অন্যায়ী জেতা পদনিম্নে কঁাদিল তােমার। আৰ্য যারে জন্ম দিল, আৰ্য-রক্তে যে-ভূমি উর্বর সে পূত পবিত্র ভূমি অশুচি অন্যায়ে জরজর- এ দারুণ অভিশাপ, এ অসহ্য দুর্ভাগ্যের ক্লেশ তুমি শিব শূলপাণি বজ্রবেগে করিলে নিঃশেষ। খণ্ড ভিন্ন পিষ্ট ছিন্ন পরিক্লান্ত ভারত বিরাট অখণ্ড করিতে এক-ছত্ৰতলে, সাধক সম্রাট, দুর্জয় বাসনা তব আজ যেন স্বপনে মিলায়, বেড়ে গেছে দাস-পাশ, আশা-শিখা নিবেছে বাত্যায় । তবু তবু বড় ব্যথা, তবু এ দারুণ দুঃখ মাঝে শুধু তব পানে চাই, তব মাঝে তবু আশা রাজে। তােমার আরব্ধ কৰ্ম্ম, হে সম্রাট, কে করে সাধন?- ভীত নত শত শত শক্তিহীন করিছে ক্রন্দন ! শূন্য হ’তে স্বর্গ হতে এ ক্রন্দনে পাবে নাকি ব্যথা : আসিবে না পুনৰ্বার লয়ে তেজ, লয়ে উদ্দামতা ? এ প্রিয় ভারত তব, তব প্রিয় এই হিন্দু জাতি, তুমি বিনা কে রক্ষিবে, হে হিন্দুর শেষ শৌভাতি! এস এস মহারাজ, ছত্রপতি এস হে সম্রাট, নাথহীন হিন্দু কাঁদে, কঁদে তার সিংহাসন-পাট।
কোজাগরী
এস তব সৌম্য শৌর্য্যে, দীপ্ত বীর্ষে, উদ্দাম উল্লাসে,
উড়ে যাক মুছে যা ত্রাস ৰিধা তােমারি নিশ্বাসে ;
তব তীব্র আঁখিতলে ভস্ম হাে জকুটি-নয়ন,
নম্র হােক অন্যায়ের উত্তোলিত বাহুর নর্তন।
দুপুরে
স্তব্ধ রৌদ্র, শান্ত দুপুর, নীলাকাশ যেন ধোঁয়া,
ঘন গুরুগুরু কপােতকুজন গভীর-সুপ্তি-ছোওয়া,
কার্নিশ-আড়ে একটি চড়ুই কিচ কিচ করে ধীরে,
সরু চাচা সুরে চিল ডাকে দূরে রৌদ্র মরুভূ-তীরে,
আলিশার নীচে বায়স ঝিমায়, কভু দেখে, নাড়ে মাথা,
নর-কণ্ঠের কাকলি নীরব, শান্তি-আসন পাতা -
যত দেখি আর যত শুনি তত নত হয়ে আসে মন,
শ্রবণ ভরিছে শান্তি-আবেশে, জুড়ায় এ দু'নয়ন।
এই তাে নিত্য, এই তত সত্য, এই ত চিরন্তন,
জাগ্রত দ্রুত জীবনের তলে শান্তি-সঞ্জীবন।
কোজাগরী
সিন্ধু
উত্তাল ভীম দুর্দম !
যুগে যুগে মহাবিক্রম
কত দেশ রাজদপে
গ্রাসিয়াছ তব গর্ভে!-
সেই তেজ রাজতন্ত্র
ফুকারিয়া মহামন্দ্র,
আস্ফালি’ মহা আক্রোশ,
দিশি-দিশি তুলি’ মহারােষ,
উন্মাদ করে গর্জন
টুটিতে সলিল-বন্ধন!
নাচে তাই ঢেউ, দোলে জল
আছাড়ি’ আকুলি অবিরল ;
দুর্বার ভেঙে ভেঙে ধায়
উদ্দাম ঘাের ব্যায়।
উন্মাদ ঢেউ উন্মাদ
দোলে দোলে, এল পরমাদ
ওই ওই বুঝি বিশ্বে !
স্তম্ভিত সব দৃশ্যে।
বাধা-ভাঙা ক্ষ্যাপা সিন্ধু!
বিশ্রাম নাহি বিন্দু-
১২
সিন্ধু
উদ্দাম চল খলখল,
মহারুদ্র ও মহাবল।
(যেন) সক্রোধ ক্ষ্যাপা শঙ্কর
সতী-কাধে ফেরে ধরা-পর,
হাসে খিলখিল অবিরল,
শাদা ফেনা ঝরে কলকল,
ঘটাবে প্রলয় দুর্জয়,
কঁপে সৃষ্টি ও কঁপে ভয়!
সিন্ধু! মাতায়ে পারাপার
এ কি লীলা তব !-সংহার
খেলিছে, মেলিছে আস্য,
এ যে দানবের হাস্য!
জ্ঞানহীন যেন আদি প্রাণ
সৃষ্টির সেই অভিযান
আজো লভেনিকে সংযম,
নাহি ছন্দ ও নাহি ক্রম,
আজো নহে সেই তৃপ্ত।
গছে, ভাঙে, ছােটে ক্ষিপ্ত ।
কুলে দাড়ায়েছি ক্ষুদ্র,
বল বল মােরে, রুদ্র!
১৩
কোজাগরী
কিবা ক্রন্দন, পরিতাপ,
কিবা ব্যথা, শােক, কি প্রলাপ
ঢেউএ ঢেউএ ফোলে অনিবার,
অজ্ঞেয় কোন্ দুখভার ?
ভেদি মাের দেহ-চর্মে
ও উছাস পশে মৰ্ম্মে,-
নহে এন, নহে শােক,
নহে তাহা ব্যথা, দুখভােগ,
দুর্জয় মহা উল্লাস
বিশ্বের প্রাণ-উচ্ছ্বাস ;
মূক ধরণীর প্রাণ মন
মূক বিশ্বের সে গােপন
প্রাণ তব মাকে চঞ্চল
আলােড়িছে বেগে উচ্ছল ।
তুমি বিশ্ব ও ধরণীর
দৃপ্ত পরাণ তেজী বীর!
নমামি নমামি মহাপ্রাণ।
নমামি সিন্ধু মহীয়ান!
ভােরর বেলা, সিমু, তােমার কুলে
দাড়িয়েছি আজ, ঐ ও নভমূলে
সিন্ধু প্রকাণ্ড এক সােনার থালা ওঠে, সূৰ্য না কি?-কী 'অপরূপ ফোটে আধখানা তার রহে জলের তলে, আধার আলােয় জলের সােনা এলে, লাফিয়ে ওঠে দুষ্ট যেন ছেলে- মায়ের কোলে দাড়িয়ে পড়ে ঠেলে । সােনার আভা ভাসে, দোদুল দোলে দীর্ঘ দেহে উতল ঢেউএর কোলে! বসিয়ে দেছে সােনার যেন থাম- ঢেউর 'পরে দুলছে অবিরাম। চোখ মেলে চাই—ওই সুদুরে দূরে পেরিয়ে ফেনা পেরিয়ে সে ঢেউ উধাও হেরি চক্রবালের রেখা, সেইখানেও শেষ তব নেই লেখা ! অসীম সুনীল অগাধ সুনীল বারি- চোখ হেরে যায় ধরতে গিয়ে ভারি দেহের আভাস ; মন মানে যে হার গভীর উদারতার পেতে পার। সােনার রবি একটি পাশে হাসে, উধাও বারি চৌদিকে উচ্ছ্বাসে! শেষ কোথা নেই!-শেষ কোথা রে শেষ? আমায় খালি দেছে সীমার বেশ। ১৩৫
কোজাগরী
ওহে বিরাট! বিরাট আলিঙ্গনে
আমায় চেপে ছড়িয়ে ও শয়নে
সােনার জলে, ঢেউ-দোলাতে, নীলে
দাও হে মেলে তােমার ও নিখিলে
বিরাই, তােমায় করে নমস্কার
সঁপছি আমার ক্ষুদ্র-দেহ-ভার।
গভীর রাতে হঠাৎ এ যে ভাঙল আমার ঘুম,
লােকের কথা সব কোলাহল একান্ত নিঝঝুম।
গর্জে ওঠে সুদূরে ওই কে যেন আস্ফালে,
সিন্ধু ডাকে সিন্ধু মাতে গভীর রাত্রিকালে ।
ঘুমের বুকে সকল মানুষ অগাধ লভে সুখ,
একলা আমি জাগমু কেন ?-কাপছে ত্রাসে বুক!
আছড়ে’ ডাকে, গর্জে’ ডাকে, আসছে যেন ছুটে
পাগলা সাগর ; করূবে কি গ্রাস ?-নেবে কি আজ লুটে
এই সুযােগে ক্ষুদ্র ভবন ?-ক্ষুদ্র আমায় ধরে
টানবে কি ঐ ঢেউর বুকে, আছড়ে গুড় করে
করবে বিলােপ ?-ভয়ে আমার কঁপছে সারা দেহ!
কি অপরাধ সিন্ধু আমার বাঁচাও, কর স্নেহ।
ওই ডাকে ঢেউ, ওই ডাকে জল, ওই সে কলরােল,
ভীম ভীমতর তীব্র নিঠুর যেন মরণ-দোল!
-
সিন্ধু
পাগল ভোলার তাল-বেতালে প্রমথ সব নাচে।
আজকে আমায় কে বাঁচাবে ?—প্রাণ করুণা যাচে।
স্তব্ধ রাতে সিন্ধু তােলে অত্যাচারের ভেরী,-
একক আমার বুকের মাঝে বাজছে ঘুরি’ ঘেরি’
নিশাস্ আসে রুদ্ধ হয়ে বিরাট ভয়ের চাপে,
হাত কাঁপে মাের, কাঁপছে দেহ, প্রাণ হিয়া মন কাঁপে।
রক্ষা কর আমায় আজি, সিন্ধু আমার পিতা।
সন্তানে আজ রােষ করাে না, বিশ্বভূমির মিতা!
প্রাণ খুলে আজ এপ্রাণ ভরে তােমায় নমস্কার ।
রক্ষা কর, আর এস না আছড়ে বারংবার !
গ
নমামি নমামি সিন্ধু!
যুগে যুগে রবি, ইন্দু
ভেদি উঠে তব গর্ভ
অরুণিম শুচি। সৰ্ব্ব
ভূমি তুমি গড়ে নিত্য
দিলে বাস, দাও বিত্ত।
আদিমজীবন-অঙ্কুর
তব মাঝে হ’ল পরিপূর,
ফুকারে তার এ মানব
জন্ম লভিল জীব সব।
বীর তুমি, কভু শান্ত !
কভু উদ্দাম, ক্লান্ত।
১৩৭
কোজাগরী দীপ্ত উজল, ধূমলীন! এই এক রূপ, এই ভিন্। নিশ্চল, পুন’ লীলাময়! নিষ্ঠুর, পুন’ সদাশয় ! শুভ্র আবার কভু নীল। গম্ভীর, হাস খিলখিল ! কভু দেব, কছু দৈত্য- ভাঙো দেশ, ভাঙে চৈত্য। ফেনমালা গলে চিকচিক ধরিয়া রত্ন ও মাণিক সম্রাট তুমি সম্রাট পদতলে কঁপে ধরা-নাট ! শত বাহু তুলে উচ্চ বাজাও শাসন-তূর্য ! শুল্ক অবাক্ শােনে ব্যোম তব গর্জন, মহা ওম্ ! হে মহা! দিই বিস্ময় তব পায়ে প্রেম আর ভয়। তুমি দাও দাও অনুরাগ ঢেউ-ডােরে বাঁধ দেহভাগ ক্ষুদ্র এ দেহ-বন্ধন ভেঙে দাও, যত ক্রন্দন ১৩৮ সিন্ধু ছাড়া পাক, মিশে যাক ওই সীমাহীন জলে থইথই। তব সত্তানে বুকে নাও নুতন জন্মে গড়ে দাও। করে দাও নভযুক্ত ; বিপুল উদার মুক্ত, অসীম নিখিলে দাও বাস, দুখ সুখ কঁাদা হাে নাশ । অতল অগাধে ডুবে যাই, রতনশয়ানে শুতে চাই, দুলে দুলে দুলে ফেনা-সাথ ভেসে ভেসে যাই দিন-রাত। বিরাটবিরাট। নিয়ে যাও- দেহ, মন প্রাণ নাও তাও। এ আমার যত গর্ব ঢেউএ ঢেউএ কর খর্ব মহা প্রাণে দাও মহা দেশ, মহা ওঙ্কার, মহা শেষ! নমামি নমামি মহাপ্রাণ ! হে মহাজনক মহীয়ান্। প্রণাম প্রণাম প্রণিপাত, ওহে আদি প্রাণ, আদি নাথ।
কোজাগরী
গান্ধী-বন্দনা
প্রণাম, প্রণাম তােমারে মহান, ওহে ভারতের দুঃখহারী,
প্রণাম তােমারে, ওহে বলীয়ান, ভারত-মুক্তি-পতাকাধারী ।
তােমারে প্রণাম ওহে অগ্রণী, কোটী কোটী মূক নরের নেতা,
দুঃখে বক্ষে ধরিয়া আদরে ওহে দুখ-ক্লেশ-দৈন্য-জেতা !
শঙ্কাবিহীন ওহে কৃশকায়, কৃশ দেহে পােষ বজ্র নিতি ।
খর্ব তনুতে গৰ্ব বিরাট, দুখের গর্ব, বিরাট প্রতি।
প্রণাম তােমারে ধীর বৈষ্ণব, অতুল-বিনয়ী, মিষ্টভাষী,
প্রণাম তােমারে দৃপ্ত যােদ্ধা, কুলি-মন্দ্রে কলুষনাশী।
তােমারে প্রণাম সাগর-উদার, ধরণী সমান ধৈৰ্যশালী ;
হিমাচল সম অটুট-অটল, সূৰ্য্য প্রখর-অংশুমালী ।
অগ্নি সমান উজল পাবক, জননী সমান মেহানুরাগী ;
শিশুর মতন মুক্ত সরল, শঙ্কর সম সৰ্ব্বত্যাগী ।
তুমি কি প্রতাপ, তুমি পুরুরাজ, তুমি কি শিবাজী ভারত-ভ্রাতা ?
তুমি কি সমর-নিপুণ কৃষ্ণ-গীতার মহান্ গীতােতা?
তুমি কি বুদ্ধ, নানক, নিমাই ? মহম্মদ কি অতুল বলী ?
তুমি কি খৃষ্ট ?—তব মাঝে বীর প্রেমিক সকলে উঠিছে জলি’!
ওহে শিবাজীর শক্তি-বিকাশ, ওহে বুদ্ধের প্রণয়বাহী,
তােমারি মাঝারে শিবাজীরে নমি’ বুদ্ধেরে নমি’ কীর্তি গাহি।
১৪
গান্ধী-বন্দনা
চলেছ খৰ্ব্ব, গৰ্ব্ব-দৃপ্ত চরণে দলিয়া মৃত্যু-ভীতি ;
পশ্চাতে চলে কোটী কোটী নর, কোটী কোটী নারী অসীম-ধৃতি ;
তােমার কণ্ঠে লভিয়াছে ভাষা কোটী মানবের কঠোর ব্যথা ;
মূর্ত তুমি যে মুক্তি-স্বপন-ঘাথে যা ভারত বেদন-নতা।
তােমাতে হয়েছে সংহত যত দাসের দুঃখ যুগে ও যুগে ;
অনশনক্ষীণ লক্ষ লােকের অসহ যাতনা বহিছ বুকে।
কোটী কৃষকের ঋণদায় তুমি নিজ ঋণ সম মানিলে মনে ;
মিলালে চিত্ত গতগৌরব হৃত-বৈভব ভারত সনে।
প্রণাম প্রণাম তােমারে মহান, বুদ্ধ তুমি যে শিবাজী তুমি ;
তােমারে প্রসবি’ ধন্য হয়েছে পেষণ-পীড়িত ভারত-ভূমি।
শত শতাব্দী কাটিয়া গিয়াছে দাস-পাশে আর পেষণ-পাশে!
রত্ন-প্রস্থ ও বীর-প্রসূ এই ভারত এখনও মরেনি ত্রাসে।
আজও আছে তার শৌর্যের বীজ, আজও মহত্ত্ব সজীব রহে।
গান্ধী, তােমারে প্রসবি’ ভারত আপন শকতি সবারে কহে।
প্রণাম তােমারে গান্ধী বিরাট, প্রণাম মুক্তি-পতাকাধারী ;
প্রণাম তােমারে ভারত-সূৰ্য, প্রণাম ভারত-বিপদ-হারী।
১৪:
কোজাগরী
জাগ্রত ভারত
আজি গুজ্জর করে গর্জন-সিংহের হুঙ্কার,
কাপে হিমাদ্রি, কঁপে সমুদ্র কুমারিকা, গান্ধার।
কঁপে মান্দ্রাজ, কঁপিছে সিন্ধু, পঞ্জাব, উৎকল,
কঁপিছে বল, বেহার, অন্ধ , বােম্বাই ও কেরল।
মাতে ভাগীরথী, যমুনা, পদ্ম, রাবী ও ব্ৰহ্মনদ,
মাতে নর্মদা, কৃষ্ণা, কাবেরী-কে করে সে গতি রদ ?
জাগে রাজপুত, জাগিয়াছে শিখ, মরাঠা, মুসলমান।
জেগেছে বাঙালী, ওড়িয়া, বেহারী, অন্ধী, মওপ্রাণ।
জাগে মাজাজী, সিন্ধী ও জাঠা সীমাহীন জাগরণ!
সুপ্ত ভারত-আত্মার এ কি সুপ্তির বিদারণ ?
গরুড় আজি কি অধীর কাতর অমৃতের পিপাসায় ?
মথিয়া আকাশ ছুটিবে সে কি রে পূরিবারে দুরাশায় ?
কে ঘষে পাঞ্চজন্য আজি রে, কে কলির হৃষীকেশ ?
রথ কোথা তার ? কোথা অৰ্জ্জুন, যােদ্ধা শস্ত্র-বেশ ?
গান্ধী গান্ধী হৃষীকেশ দেখ, শঙ্খ অহিংসার,
কোটী অৰ্জ্জুন ভারত জুড়িয়া জেগেছে দুর্নিবার।
১৪২
জাগ্রত ভারত
নাহিক শস্ত্র, অস্ত্র ও তুণ, ধৈৰ্য্য আত্মবল,
দুঃখ-সহন বীৰ্য, দুঃখবিজয়ী চিত্ততল,
অস্ত্র-আঘাত দেহে লতে পারে, ব্যথায় নির্বিকার,
প্রহার সহিয়া করে নিস্ফল প্রহারের অনাচার।
হেন দুর্জয় কোটী অর্জুন অস্ত্রবিহীন যােধ
নেমেছে আহবে, অস্ত্র কেবল নিৰ্বাক্ প্রতিরােধ।
ধূলি-লুষ্ঠিত নত কলেবরে বহে গুরু ক্লেশভার,
নিৰ্বা সহে সত্যাগ্রহী সকল অত্যাচার।
দেশে দেশে আর গ্রামে গ্রামে আজ কোটী
দৃঢ়চেতা নর
মৃত্যুরে চায়, তবু নাহি চাহে ঘাের অন্যায় কর।
ধায় ব্যবসায়ী, ছাত্র, উকিল, বৃদ্ধ, যুবক আজ,
ভারতবনিতা মুক্তি-অধীর, বলে ওই—সাজ সাজ !
এ কি এ প্লাবন, এ কি রে বন্যা, এ কি এ প্রেমােচ্ছ্বাস !
প্রাণ বিলাবার তরে এ কি আজ উদ্দাম উল্লাস।
রােধি’ অন্যায় ন্যায় বিধানিতে এ কি আশা দুর্জয় !
আজি দুর্বল করে নির্ভয়ে প্রবলেরে পরাজয় !
দুঃখ-দহনে দগ্ধ পরাণ ধরে পবিত্র রূপ,
হিংসা-ক্রোধের ছায়া নাহি সেথা, সে যে মৈত্রীর কূপ ;
মৈত্রী-ধারায় নিষ্ণাত মন দুষ্টেরে ভালবাসে,
দুঃখ সহিয়া জিনিছে দুঃখ, নির্ভয়ে জিনে ত্রাসে।
এ কি বুদ্ধের অক্রোধ এল, খৃষ্টের খাটি প্রেম ?
এ কি নিমাইর প্রেমের নৃত্য, জগাই-বিজয়ী ক্ষেম?
১৪৩
কোজাগরী
এসেছে এসেছে মৈত্রীপ্লাবন, আত্মার মহাজয়,
দুরে গেছে আজ মৃত্যুর ভয়, লােভয়, রাজভয়।
গুজ্জর হতে পাঞ্চজন্য তােলে আজি নির্ঘোষ,
সত্যাগ্রহ-বিষাণে বিগত আজি শত আফশােষ।
বিজিত দলিত ক্লিষ্ট দেশের বক্ষে এ কোন্ প্রাণ
জাগিল শঙ্কাবিহীন মূর্ত আত্মার অভিমান!
অভিনব এই কৃষ্ণ মহান্ গীতা রচে রণ-মাঝে,
সমর-চাতুরী নাহি এর, বলে সব কথা অরি কাছে।
পদবিক্ষেপে ভারতের মাটী নড়িয়া কাপিয়া উঠে,
বাক্যকণায় কত শতকের নিদ্রা আপনি টুটে !
কাহার বাণীর অগ্নির শিখা ভারতে আগুন জ্বালে ?
উৎসুক চোখে জগৎ তাকায় কার পবিত্র ভালে?
বাক্য কাহার ধ্বনিছে ছাপিয়া কামানের গর্জন?
হিংসাক্লিষ্ট জগৎ মানসে করে কারে অর্জন ?
কৌপীনধারী কোন্ সে যােগীর পদতলে ধনী ছুটে ?
গৰ্ববিহীন কাহার চরণনিয়ে গৰ্ব্বী লুটে ?
কাহার বিশাল উদার চিত্তে নাহি কোনাে ভেদ নাই,
দ্বিজ-চণ্ডাল, ধনী-নিধন মিলিয়াছে এক ঠাই ?
হিংসা, চাতুরী, মারণ, দম্ভ, অন্ত্রে জর্জরিত
জগতের চিত খুজিত যে-সুধা সুচির-আকাঙ্ক্ষিত,
১৪৪
জাগ্রত ভারত
সেই সুধা আজ ঝরে অবিরাম, সে সুধার নিঝর
গান্ধী দাড়ায়, জগৎ জুড়ায় পিপাসায় জর্জর।
পরপদতলে অপমানে দুখে আঁধারে অবজ্ঞায়
পােষিল সত্যধৰ্ম্ম ভারত যুগ-যুগ-বেদনায় ;
আজি সে সত্য হয়েছে মূৰ্ত্ত, অতীতের তপােবল
গুহা হ’তে আজ জাগিয়াছে যেন উদ্দাম উজ্জ্বল।
বিজিত ভারত, ক্ষুব্ধ ভারত, লাঞ্ছিত, ক্লেশনত
বিজেতারে বলে—তােমার প্রতাপ-গর্ব করিব গত।
মিথ্যা দন্ত, সমর-সজ্জা, অন্ত্রের কৌশল,
আত্মার বলে অস্ত্রে কামানে করি’ দিব নিল।
পেয়েছি সত্য, পেয়েছি ধৰ্ম্ম, প্রেমে মাের অভিযান,
দলনে এ দেহ হউক চূর্ণ, না লব কাহারাে প্রাণ।
আহব এ নয়, প্রেমের যজ্ঞ, আত্মার আরাধন,
নব দীক্ষায় হবে মানবের অভিনব জাগরণ।
১•
কোজাগরী
বিদায়
বিদায় আজি গভীর রাতে বিদায় আজি, ভাই,
জগৎ হ’তে মানব হতে বিদায় আজি চাই।
বিদায়, ওগগা নিথর রাতি,
আর না চাহি জীবন-বাতি
জ্বালাতে আমি তপন সাথে, বাঁচিতে বল নাই,
আঁধার-যবনিকার তলে গলিয়া ঝরে যাই।
স্তব্ধ আজি সকল দিশা,
সকল গতি হয়েছে নিশা,
সকল ধ্বনি মরণ-বুকে লুটায়ে অবসান ;
আমার বুকে দুলিছে মৃদু সভয় মম প্রাণ।
আকাশ চাহে হাজার চোখে,
দানব যেন মরণ-লােকে
ডাকিছে ঘন ডাকিছে মােরে অচল ইসারায়,
কাঁপিছে দেহ, কপিছে প্রাণ, শকতি শিথিলায়।
কহিতে ভাষা শকতি নাহি,
বিমুঢ় চিতে বিদায় চাহি,
বিদায় আজি বিদায়, প্রিয়া, আঁধার-হিয়া-মণি,
বিদায় স্নেহপুতলী শিশু হরষ-সুখ-খনি।
১৪৬
বিদায়
বিদায়, যেবা বেঁধেছে মােরে
ক্ষণিক স্নেহপ্রীতির ডােরে,
হরষ দিয়ে হাস্য দিয়ে জিনিলে যেবা মন,
চলিতে পথে মধুর ভাষে যে দিলে প্রেমধন।
বিদায়, মম কিশাের-প্রিয়া,
নিকটে দূরে নয়ন দিয়া
যে দিলে মােরে পরাণ ঢালি’ পরাণে কতদিন
বিদায়, ওরে পাগল শিশু চপল দুখহীন।
••
বিদায় আজি বকুল চাপা মল্লিকা ও জুই,
ফুটিয়া থাক, আজিকে তব বয়ানে চুমা খুই।
চুমিয়া তব পরাগ-স্নেহে,
অধর ভরি’ মাখায়ে দেহে
সুবাস-ভরা তােমারি তলে বিদায়-নত শুই,
বিদায় লব চাহিয়া শেষ মুদিব আঁখি দুই।
বিদায় দেহ আমারে আজি, হে তৃণ মাথা-তােলা,
কঠোর পায়ে দলেছি কত, ক্ষম গাে ক্ষমা-ভােলা।
ক্ষম গাে মােরে বিদায়-কালে,
তােমার বুকে তপ্ত-ভালে
লুটায়ে পড়ি গভীর দুখে জুড়াতে ক্ষতজালা,
ভালে ও চিতে পরশ দেহ শীতল স্নেহচালা।
১৪৭
কোজাগরী
বিদায় দেহ আমারে, মাগাে ধরণী মেহময়ী,
কত যে ঋণী তােমার কাছে কেমনে তাহা কহি ?
জ্বণের রূপে তােমার বুকে
লুকায়ে ছিনু যুগে ও যুগে,
করিয়া জীব জাগালে মােরে অকূল বেলা পরে ;
কীটের রূপে গড়ায়ে এ শকতিসুখ-ভরে।
সে কীট হতে গড়িলে মােরে
প্রবল দৃঢ় মানব করে
তােমারি বায়ু তােমারি জলে অম্নে পালি’ তব,
করিলে কীটে মহিমাময় মানব অভিনব।
বিদায় নিতে তােমারি পাশে
এ বুক মম ফাটিয়া আসে,
তুমি যে মাের সবার সেরা মায়ের সেরা মাতা,
ভাললা যে বাসি তোমার মাটী, ধূলি ও তৃণ পাতা।
তবুও মাগাে, বিদায় মাগি,
জননী সুখ-দুখের ভাগী,
গভীর রাতে কে মােরে ডাকে, মরণ যেন চিনি,
কত না কণে তাহার সাথে হয়েছে বিকিকিনি।
সে আজি ডাকে তারার চোখে,
সে আজি ডাকে গভীর লােকে,
আঁধার-হাতে পরশ করে আমার দেহখানি ;-
নিবিছে বাতি, থামিছে গতি, তাহারি জয় মানি।
১৮
বিদায়
বিদায় আজি বিদায় মাগি,
মানব ধরা তৃণের লাগি
প্রতির শ্বাস রাখিয়া গেনু লয়াে গাে লয়াে তুলি,
বিদায় নিল পাগল কবি চপল লীলা ভুলি।
শেষ
No text on this page.
এই লেখকের
অন্যান্য বই
মেঘদূত
বাংলা মন্দাক্রান্তা ছন্দে মেঘদূতের এমন অভিনব অনুবাদ এই
প্রথম। মহামহােপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও প্রবােধচন্দ্র সেনের
মেঘদূতের আলােচিত সম্বলিত। বাঁ দিকে মূল সংস্কৃত ও ডান দিকে
অনুবাদ। চমৎকার ছবি ও চমৎকার সাজসজ্জায় উপহারের সম্পূর্ণ
উপযােগী। মূল্য দুই টাকা।
‘প্রবাসী’তে শ্ৰীযুক্ত চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন :
“সবার সেরা মূলানুগ অনুবাদ।
শ্ৰীযুক্ত নলিনীকান্ত গুপ্ত :–“মন্দাক্রান্তার এতখানি রেশ
বাংলায় অন্য কোথাও পেয়েছি বলে ত মনে হয় না।”
শ্ৰীযুক্ত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় :—“মেঘদূতের যতগুলি
বঙ্গানুবাদ আমি দেখিয়াছি, সবগুলির মধ্যে প্যারী-বাবুর এই অনুবাদ
আমার নিকটে শ্রেষ্ঠ বলিয়া বােধ হইয়াছে।
অণিমা
বহু মাসিক পত্রে প্রকাশিত অনেক দেশপ্রেমের কবিতা ও বহু-
প্রশংসিত বিবিধ কবিতা ইহাতে আছে। দাম বারাে আনা।
প্রবাসী-“আজকাল যারা কবিতা লেখেন তাদের মধ্যে এই
কবির স্থান অনেক উচ্চে।”
মানসী ও মর্মবাণী—“ছন্দের লঘু গতিতে, ভাব ও ভাষার
সৌন্দর্য্যে কবিতাগুলি বেশ চিত্তাকর্ষক হইয়াছে।”
যুক্ত কালিদাস রায় :-“তােমার কবিতা আমার খুবই
ভাল লাগে।”
বেদবাণী
ঋগ্বেদের প্রায় একশত সূক্তের পদ্যানুবাদ। শ্রীযুক্ত চারুচন্দ্র
বন্দ্যোপাধ্যায়-লিখিত বৈদিক দেবতাগণের ও ঋগ্বেদের পরিচয়ও
আছে। ঋগ্বেদের সংক্ষিপ্ত সার। দাম তিন টাকা।
দার্শনিক পণ্ডিত মহেশচন্দ্র যােব—“খাহারা বৈদিক ধর্ম
ও সভ্যতার সাধারণ তত্ত্ব অবগত হইতে চাহেন, তাহারা এই পুস্তক
পাঠ করিয়া বিশেষ উপকৃত হইবেন। গ্রন্থ অতি উপাদেয় হইয়াছে।”..
হালুম বুড়াে
ছেলেমেয়েদের মজাদার কবিতা। তাহারা পড়িতে পড়িতে
হাসিবে, নাচিবে ও মাতিয়া যাইবে। দাম আট আনা।
বাঘসিংহের মুখে
আফ্রিকার বনে জঙ্গলে ভীষণ ভীষণ জানােয়ারের সঙ্গে বাঙ্গালী
যুবকদের লড়াই। ভয়ঙ্কর দুঃসাহসের গল্প। দাম আট আনা।
বাংলাদেশের কবি
বাংলাদেশের বড় বড় বারাে জন কবির জীবনের গল্প, আর
তাহাদের সরল সহজ কবিতা ইহাতে আছে। দাম আট আনা।
ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস,
২২১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.