Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shraddhatatwa
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
- - -
শ্রাদ্ধতত্ত্ব
শ্ৰীযুক্ত রাজা শশিশেখরেশ্বর রায় বাহাদুর-সঙ্কলিত
[ হিন্দু সমাজ পত্র “ত্রিশূল” হইতে উদ্ধৃত।.]
কাশীধাম
অখিল ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মণ-সমাজ-রক্ষা মহাসভার পক্ষে
তারাচরণ শৰ্মা কর্তৃক প্রকাশিত।
মহামণ্ডল শাস্ত্র প্রকাশক সমিতি লিমিটেড প্রেসে
অক্ষয়কুমার মুখােপাধ্যায় দ্বারা মুদ্রিত।
১৩২৭।
মূলা • তিন আনা মাত্র।
No text on this page.
** পাঁচশত বর্ষ পূৰ্বে বাঙ্গালার স্মার্ত শিরোমণি রঘুনন্দন ভট্টাচাৰ্য শ্রাদ্ধ-স্তত্ত্ব' নামে একখানি স্মৃতি শাস্ত্রের সংগ্রহ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। সে সময়ের হিন্দুসমাজে ঐরূপ একখানি শাস্ত্রীয় গ্রন্থের একান্তই আবশ্যক ছিল। হিন্দু- সমাজের ঘাের বিপ্লবের দিনে এ সময়ে আবার আর এক ছাঁচে ঢালিয়া, আধুনিক পাঠকগণের পাঠোপযােগী করিয়া ঐ সকল শাস্ত্রীয়তত্ত্ব হিন্দু জনসাধারণ মধ্যে পুনঃ প্রচারের প্রয়ােজন উপস্থিত হইয়াছে। কলিকাতার বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ- সভার, ঢাকার পূর্ববঙ্গ ব্রাহ্মণ সভার, এবং কাশীর ব্রাহ্মণ রক্ষা সভার সংবিত শ্রদ্ধাস্পদ শাস্ত্রাধ্যাপক মহােদয়গণের মধ্যে অনেকের দৃষ্টি পুনঃ পুনঃ এ বিষয়ে আকর্ষণ করাগেও এই অতি শ্রমসাধ্য কাৰ্য্যে এ পর্যন্ত কেহই হস্তক্ষেপ করিতে অগ্রসর হইতেছেন না দেখিয়া, হিন্দু-সমাজ-তত্ত্ব অনুশীলনে দত্ত-চিত্ত শ্ৰীযুক্ত রাজা শশিশেখরেশ্বর রায় বাহাদুরকেই স্বয়ং এই কাৰ্যভার লইতে আমরা অনুরােধ করি র। অসুস্থ শরীরে, অর্ধশয্যাগত অবস্থাতে থাকিয়াও তিনি এই গ্রন্থের অনেকাংশ নিজ মুখে বলিয়া দিয়া অন্য দ্বারা লিখাইয়াছিলেন। তাহার সুশিক্ষিত পুত্র শ্রীমান্ কুমার শান্তিশেখরেশ্বর রায় এম, এ, তাহার উপদেশ অনুসারে নানা দেশের ইতিহাস গ্রন্থ অনুসন্ধান করিয়া অনেক জ্ঞাতব্য- তত্ত্ব সংগ্রহ করিয়া তাহার এই কার্যের সহায়তা করিয়াছেন। এতদভিন্ন পণ্ডিত অম্বিকাচরণ কাব্যতীর্থ ও রামদত্ত শাস্ত্রী মহাশয় সংগ্রহ কার্যে যথেষ্ট সহায়তা করিয়াছেন। এই সকল কারণেই হউক, অথবা অন্য যে কারণেই হউক, এই পুস্তিকার টাইটেল পেজ মুদ্রন সময়ে, তাহার নামের নিম্নে “রচিত” শব্দ স্বহস্তে কাটিয়া দিয়া তিনি “সঙ্কলিত” শব্দ সে স্থলে লিখিয়া দিয়াছেন। এই সময়ে তিনি ইহাও বলিয়াছিলেন,—যে রঘুনন্দন ভট্টাচার্যের “শ্রাদ্ধতত্ত্ব” সৰ্ব্বক্ষণ চকু সম্মুখে রাখিয়া উহারই বিস্তৃতি বা এক প্রকা- রের ভাষ্য স্বরূপ এই গ্রন্থের প্রতিপাদ্য বিষয়সকল তিনি সঙ্কলন করিতে সমর্থ হইয়াছেন, সেই গ্রন্থকারের নিকট বিপুল কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চিহ্নস্বরূপ ঐ শ্রাদ্ধতত্ত্বের নামেই ইহার নামকরণ হওয়াই তিনি সুসঙ্গত মনে করেন। মৃত স্মাৰ্ত্ত ভট্টাচর্যের প্রতি অসাধারণ শ্রদ্ধামুলক তাহার এই উপেদেশ বাক্যের অনুবর্তী হইয়া, রঘুনন্দনকৃত সংস্কৃত শ্রদ্ধতত্ত্ব গ্রন্থের ইহা ঠিক টিকা বা অনুবাদ স্থানীয় হইলেও, এই পুস্তিকার নাম “দ্ধতত্ব” রাখা হইল। ইতি তারিখ ১০ই ভাদ্র, ১৩২৭। তারাচরণ শৰ্ম্মা। সম্পাদক, ব্রাহ্মণ-রক্ষা-সভা, কাশ।
{ শ্ৰীযুক্ত রাজা শশিশেখরেশ্বর রায় বাহাদুর লিখিত) শ্রাদ্ধ কি? কিভাবে কোন সময় হইতে এদেশের ব্রাহ্মণ সমাজে শ্রাদ্ধ প্রথার প্রবর্তন ও সম্প্রসারণ হইয়াছে ? অন্যান্য দেশবাসীগণ মধ্যে শ্রাদ্ধের ভাব ও অনুকল্প বিস্তার কি ভাবে কত কাল হইতে সংঘটিত হইয়াছে । ব্রাহ্মণ্য- ধৰ্ম্মের সহিত শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের কতদূর নিগূঢ় ও ঘনিষ্ট সম্বন্ধ রহিয়াছে ? বেদ, পুরাণ এবং ধর্মশাস্ত্রাদিতে কত প্রকার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের কথার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায় ? সকল শ্রাদ্ধানুষ্ঠান দ্বারা অনুষ্ঠাতার এবং যাহাদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করা হয় তাহাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কত প্রকার ফল প্রাপ্তি হইয়া থাকে। এবং তাহা কি তবে সংঘটিত হইয়া থাকে। ইহলোকবাসীদের সহিত পিতৃলােকবাসীদের অধ্যাত্ম সম্বন্ধকে সন্নিকট ও ঘনিষ্ঠত করিবার কাৰ্যে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান, কিরূপে সহায়তা করে। শ্রদ্ধানুষ্ঠান অকরণের প্রত্যয় কি? লৌকিক স্থূলদৃষ্টিতে শ্রদ্ধানুষ্ঠানের প্রয়োজনতা কিরূপে উপলব্ধি করা যাইতে (২) পারে? শ্রাদ্ধ সম্বন্ধীয় এই দশটি অতি প্রয়ােজনীয় ও অবশ্য জ্ঞাতব্য বিষয়ের আলােচনা এই প্রস্তাবে করিতে ইচ্ছা করিয়াছি। আস্তিকতার-সুদৃঢ়-ভিত্তি-ভূমির উপরে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান ব্যবস্থিত। যেখানে আস্তিকতা নাই অর্থাৎ আত্মার অস্তিত্ব জ্ঞান নাই, সেখানে পরলােকের চিন্তা নাই, আর যেখানে পরলােকের চিন্তা নাই, সেখানে শ্রাদ্ধ তর্পণেরও কথা নাই। যেখানে ভবিষ্যৎ নাই সেখানে ভবিষ্যৎ ভাবনারও প্রয়ােজন- ভাব। কাজেই নিঃসংশয়ে একথা বলা যাইতে পারে যে আস্তিক্য জ্ঞানের উপরেই এদেশের ব্রাহ্মণাদি বর্ণচতুষ্টয়ের আচরিত শ্রাদ্ধ প্রথার মূলতত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত। আস্তিক জ্ঞান কি? একথার আলােচনা এখন এখানে করিব না? সংক্ষেপে এস্থলে এই মাত্র বলা যাইতে পারে যে—এই রক্ত মাংসাদিতে সংগঠিত স্থূল দেহের অতিরিক্ত আরও একটা কিছু আমাতে রহিয়াছে সেইটা লইয়াই আমার এই আমিত্ব বােধ আর যাহাকে ধরিয়া আমার এই আমিত্ব বোধ এবং যাহাকে ধরিয়া, আমাকে আমি “আমি” বলিয়া পরিচয় দিয়া থাকি, সেই আমি পূৰ্বে ছিলাম, এখন আছি, ইহার পরেও খাকিব, এবম্বিধ ত্রিকাল ব্যাপক বা সৰ্বকাল ব্যাপক আমার নিজ সত্বজ্ঞানকে আশ্রয় করিয়াই আমাদের শাস্তিক্য জ্ঞান উদ্ভাসিত হয়। এজ পরকাশের ও পরনেকের চিন্তা, ইহার সহিত অতি ঘনিষ্ট বন্ধনে বিজড়িত। শ্রাদ্ধতত্ত্ব
(৩)
বুঝিতে কৌতুহলী হইলে, পরকালতত্ত্বও সঙ্গে সঙ্গে বুঝিতে
একটু চেষ্টা করিতে হইবে।
১। শ্রাদ্ধ কি ?
এই প্রশ্নের উত্তরে ‘অমরসিংহ তাহার কৃত অভিধানে
ব্যাখ্যা করিয়াছেন :-“শাস্ত্রোক্ত বিধানেন পিতৃকৰ্ম্ম।”
পলমুনির বচন উদ্ধৃত করিয়া স্মার্ত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য
তাহার রচিত শ্রদ্ধতত্বগ্রন্থে বলিয়াছেন “সংস্কৃত ব্যঞ্জনচাঞ্চ
পয়ােধিতান্বিতং। শ্ৰদ্ধয়া দীয়তে যাৎ শ্রাদ্ধং তেন
নিগদ্যতে।” বাঙ্গালার
অভিধান সংকলিত। জ্ঞানবাবু
তাহার কৃত বাঙ্গালা ভাষার অভিধানে” বলিয়াছেন মৃতের
প্রতি শ্রদ্ধা প্রযুক্ত যাহা দান করা বা যে অনুষ্ঠান করা
যায় তাহারই নাম শ্রাদ্ধ। এইরূপ বাঙ্গালা এবং সংস্কৃত
ভাষার অভিধানাদি নানা গ্রন্থে শ্রাদ্ধ শব্দের নানাঅর্থ বুঝাইতে
যদিও চেষ্টা করা হইয়াছে, কিন্তু শ্রাদ্ধ শব্দের এইরূপ কোন
আভিধানিক ব্যাখ্যাকেই পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা বলিয়া আমরা
গ্রহণ করিতে পারি না। কারণ পিতৃলােকের উদ্দেশ্যে
* শ্ৰীযুক্ত রাজা শশিশেখরেশ্বর রায় বাহাদুর লিখিত
পরলােক-তত্ত্ব' পুস্তকে পরলােক সম্বন্ধীয় অনেক জ্ঞাতব্য
বিষয় আলােচিত হইয়াছে। এজন্য এ প্রস্তাবে উহার
পুনরালোচনা নাবশ্যক বােধে পরিত্যক্ত হইল।
( প্রকাশ।)
(৪)
কোন বস্তু দেওয়াকেই শ্রাদ্ধ বলা যাইতে পারে না।
পিতৃলােক প্রাপ্তির পূর্বে জীব কিছুকাল প্রেতভাবাপন্ন
হইয়া থাকিতে পারেন।
সে সময়েও তাহার তৃপ্ত্যর্থে
শ্রাদ্ধ করিবার ব্যবস্থা আছে। এই সময়ের শ্রাদ্ধকে 'প্রেত
শ্রাদ্ধ” নামে অভিহিত করা হইয়া থাকে। গয়াতে কেবল
মৃত নর নারীর নয়, মৃত পশু পক্ষীর সদগতি কামনাতেও
বিষ্ণু পাদপদ্মে পিণ্ডদান করিয়া শ্ৰদ্ধ করিবার ব্যবস্থা
আছে।
কেবল এইমাত্র নহে, আমাদের ধর্মশাস্ত্রে জীবিত
মানুষেও তাহার সদগতি উদ্দেশ্যে নিজেই নিজের শ্রাদ্ধক্রিয়া
যে সম্পন্ন করিয়া রাখিতে পারেন এইরূপ
পারেন এইরূপ ব্যবস্থাও
আছে। * এই সকল বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি করিয়া “শ্রাদ্ধ
কি ?” বুঝাইতে চাহিলে বলিতে হইবে—রক্ত-মাংস-অস্থি-
মজ্জা ত্বগাদি সম্বলিত মৰ্ত্তদেহ হইতে নিষ্ক্রান্ত পাঞ্চভৌতিক
একটা সূক্ষ্মতর দেহ-প্রাপ্ত জীবের সদগতি প্রাপ্তির অনুকূল
শাস্ত্রোক্ত-বিধি-বিহিত ক্রিয়ানুষ্ঠানের নাম শ্রাদ্ধ ।
ষ্ঠাতার হৃদয়ের শ্রদ্ধাই হইতেছে এই ক্রিয়ার প্রধান
ঋণত্রয়বিনিৰ্ম্মক্তমত্মশ্ৰাদ্ধং প্রকল্পয়েৎ।
পিতাহাত্মৈব সৰ্ব্বেষাং তৎপিতা প্রপিতামহঃ।
আত্মাত্মার্পণার্থায় কুৰ্য্যাত্মক্রিয়াংসুধী।
উত্তরাভিমুখােভূত্ব পূর্ববৎ কল্পিতাসনে।
আবাহাত্মপিতৃন্ দেবি দ্যাৎ পিণ্ডং সময়।”
(মহানিৰ্বাণ তন্তু।
(৫)
উপাদান, এই জন্যই ইহাকে বলা হয় “শ্রাদ্ধ । যেখানে
দেবভোগ্য মধু, ঘৃত, পরমান্নাদি নানা উপাদেয় উপকরণ
একত্রীভূত করা হইয়াছে, শ্রাদ্ধকৰ্ত্তা পট্টবস্ত্র পরিহিত হইয়া
শ্রাদ্ধ করিতে বসিয়াছেন, অথচ সে সময়ে যদি, আন্তরিক
শ্ৰদ্ধ। বিরহিত হইয়া কেবল লােক প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য
তিনি ঐ কাৰ্যানুষ্ঠান করিতে থাকেন, তাহা হইলে সে ক্ষেত্রে
উহা শ্রাদ্ধ বলিয়া আখ্যাত হইবে না। আবার অন্যস্থলে, সকল
বস্তুই ঐরূপ বিরাজিত আছে এবং কর্মকর্তার হৃদয়েও শ্রদ্ধা
আছে কেবল বিধি বিহিত মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক পিণ্ডদানের
পৰিবৰ্ত্তে, মনে কর ‘রবি বাবুর’ রচিত একটা বাঙ্গালা গান
গাইয়া পিণ্ডদান করা হইতেছে, সেখানে ব্রাহ্মণের দৃষ্টি লইয়া
দেখিতে বসিলে, ঐরূপ ক্রিয়াকেও শ্রাদ্ধ বলিয়া গণ্য করা
যাইতে পারে না। “শ্রাদ্ধ কি?” বুঝিতে ইচ্ছা করিলে
কেবল আস্তিক হইয়াই উহাকে বুঝিতে চেষ্টা করিলে
চলিবে না, অথবা কেবল অভিধানের সহায়তা লইয়া
শব্দার্থ বুঝিতে চেষ্টা কৰিলেও হইবে না, পরন্তু শাস্ত্রীয়
মার্গে অতীব সযত্নে ও সাবধানে পদ বিক্ষেপ করিয়া এরূপ
একটা অতি পবিত্র ও উচ্চস্থানে আমাদিগের
হৃদয়কে
আনিয়া উঠাইতে হইবে যে,—সেখান হইতে শ্রদ্ধকাৰ্য
সম্পাদন সময়ে ইহলোকবাসী শ্রাদ্ধকৰ্তার মস্তক, পরলােক,
বাসী পিতৃপুরুষের হস্ত সম্প্রসারিত সস্নেহ আশীৰ্বাদ ধারণের
সৌভাগ্য উপভােগ করিতেছে, ইহা সম্যক প্রত্যক্ষীভূত
{ ৬) হতে পারে। ইহা কাব্য কথা নহে। ইহা পূর্কেও হইয়াছে এবং যথাবিধি কাৰ্যানুষ্ঠান করিলে এখনও নিঃসন্দেহ হইতে পারে। ২। কিভাবে কোন সময় হইতে এদেশের ব্রাহ্মণ সমাজে শ্রাদ্ধ প্রথার প্রবর্তন ও সম্প্রসারণ হইয়াছে ? এরূপ প্রশ্ন আধুনিক প্রাচ্য-তত্ত্ব-সংগ্রাহকদের মুখেই শােভা পায়। ব্রাহ্মণ্য দৃষ্টি লইয়া প্রশ্নের সমাধান করিতে উপস্থিত হইলে মুক্তকণ্ঠে একথা বলিতে হইবে যে,কোন একট। পরিমিত সময় হইতে ব্রাহ্মণ-সমাজে শ্রাদ্ধ প্রথার প্রবর্তন হয় নাই, কারণ কোন একটা পরিমিত সময় হইতে ব্রাহ্মণের সৃষ্টি হয় নাই এবং ব্রাহ্মণের আচরণীয় কার্যাদিরও সৃষ্টি হয় নাই। বেদ নিত্য, ব্রাহ্মণ নিত্য, ব্রাহ্মণের আচরণীয় সর্ববিধ বৈদিক-কাৰ্যও নিত্য; কাজেই ব্রাহ্মণের শ্রদ্ধাদি অনুষ্ঠান ও নিত্য। সত্য-ত্রেতা-দ্বাপর-কলিযুগ ব্যাপিয়া ব্রাহ্মণগণ শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করিয়া আসিতেছেন। তৎপূর্বেও অর্থাৎ প্রলয়ের পূর্বে আর এক সত্য-ক্রেতা-দ্বাপরকলিযুগেও ব্রাহ্মণগণ শ্রাদ্ধাদি যাবতীয় বৈদিক কাষের অনুষ্ঠান করিয়া ছেন। এরূপ অনন্তকাল ব্যাপিয় অসংখ্য প্রলয়ের পূর্বে ও পরে অসংখ্য চতুযুগ-প্রবাহ ধারায় ব্রাহ্মণগণ শ্রাদ্ধাদি কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া আসিতেছেন। এই জশই বলিতে
(1)
হইল, কোন একটা সময় বিশেষ হইতে ব্রাহ্মণ সমাজে শ্রাদ্ধ
প্রথার প্রবর্তন হয় নাই। তবে বর্তমান কলিযুগে,--এসময়ে
এদেশের ব্রাহ্মণ সমাজে সর্ববিধ বৈদিক কাৰ্যানুষ্ঠানের
যেমন নিৰ্ব্বাণােন্মুখ-দশ। উপস্থিত হইয়াছে সেইরূপ ইতি-
পূৰ্বেও আরও অসংখ্যবার কলিযুগের আবির্ভাবের সঙ্গে
সঙ্গে এইরূপ দশা উপস্থিত হইয়াছিল ; এবং সত্যযুগের
বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণ সমাজে বৈদিক কাৰ্যানুষ্ঠানও
উদ্দীপ্ত হইয়াছিল। সেই সময়ে, বয়া-পুরাণের বর্ণনাতে
আমরা দেখিতে পাই, মনুবংশজাত আত্রেয়ের পুত্র নিমি
নামক এক ঋষি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানকে সযত্নে জাগাইয়া তুলিয়া-
ছিলেন।
•
কোগুণঃ পিতৃযজ্ঞস্য কথমেব প্রপূজ্যতে।
কেন চোৎপাদিতং শ্রাদ্ধং কস্মিন্নৰ্থে কি মাত্মকং ॥
এতদিচ্ছাম্যহং শ্রোতুং বিস্তরেণ বদস্ব মে।
বরাহ উবাচ।
মনােস্তু বংশসস্তৃত আত্রেয় ইতি বিশ্রুত।
আত্রেয়স্যাত্মজে। বিপ্রো নিমিম তপােধন।
নিমি-পুত্ৰস্তু ধর্মাত্মা ত্ৰিষু লােকেষু বিশ্রুত।
বর্ষানাঞ্চ সহস্রানি তপস্তপ্ত। বসুন্ধৱে।
মৃত্যুকালমনুপ্রাপ্তন্ততঃ পঞ্চত্বগতঃ ॥
(৮) আমায়ণে রামচন্দ্র কর্তৃক এবং মহাভারতে যুধিষ্ঠিরাদি কর্তৃক তাহাদের পিত্রাদির সগতি প্রাপ্তি উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধানু- ঠান করিবার বর্ণনা অনেক স্থানে দেখিতে পাওয়া যায়। অন্যান্য পুরাণেও ঋষিগণ এবং রাজগণ কর্তৃক শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের বিশদ বর্ণনা বহুস্থানে দেখিতে পাওয়া যায়। মার্কণ্ডেয় পুরাণে রুচি নামক মুনির উপাখ্যানে কথিত হইয়াছে— পূর্বকালে রুচি নামে এক মুনি, ছিলেন, তিনি মমতা অহঙ্কার, প্রভৃতি শূন্য হইয়া সমস্ত পৃথিবী বিচরণ করিতেন। তাহাকে সাংসারিক ব্যাপারে অনাসক্ত দেখিয়া তাহার পিতৃগণ বলিয়াছিলেন যে, বৎস! কেন তুমি পুণ্যময় দার- পরিগ্রহ করিতেছ না? দারপরিগ্রহই স্বর্গ এবং অপবর্গের নষ্টঞ্চ তং সুতং দূষ্ট। নিমেঃ শােক উপাবিশৎ। পুত্রশােকাভিসংযুক্তো দিবা রাত্রে চ চিন্তয়। নিমিঃকৃত্বা তত শােক বিধিন তত্র মাধবি। তমেব গতসঙ্কলরিত্রে প্রত্যপদ্যত । তস্য প্রতি বিশুদ্ধ মাঘমাসে তু দ্বাদশীং। মনঃ সংস্জ্য বিষং বুদ্ধিবিস্তার গামিনী। স নিমিশ্চিন্তয়ামাস শ্রাদ্ধকল্পং সমাহিত। যানি তস্মৈ ভােজ্যানি মূলানি চ ফলানি চ। যানি কানি চ ভ্যানি নবঞ্চ রসসম্ভব। যানি শৈব চেষ্টানি সর্বমেতদুদহৎ।
(৯) হে, বিবাহ না করিলে সকলই বৃথা। গৃহীগণ স্বাহা শব্দোচ্চারণ পূৰ্ব্বক দেবগণের, ‘স্বধ’ শব্দোচ্চারণ পূর্বক পিতৃগণের, এবং অনুদানে ভূতাদি অতিথিগণের পূজা করিয়া স্বর্গলােকে গমন করিয়া থাকেন। কিন্তু তুমি মােহ বশতঃ দেবগণের, আমাদিগের, এবং ভূতগণের ঋণ হইতে মুক্ত না হইয়াই ( সন্তান উৎপাদন না করিয়া) সুগতি লাভ করিবার অভিলাষ কি উপায়ে পূর্ণ করিবে। পিতৃগণের এই সকল বাক্য শুনিয়া রুচি বলিলেন–দারপরিগ্রহ অত্যন্ত কষ্টকর, পাপের এবং অধােগতির কারণ; গাত্রে পঙ্ক লেপন করিয়া ধৌত করা অপেক্ষা দূর হইতে গমন করিয়া তাহাকে স্পর্শ না করাই ভাল; এই কারণে আমি দার- পরিগ্রহ করি নাই। পিতৃগণ বলিলেন—“জিতেন্দ্রিয় হইয়া আত্মপ্রক্ষালন করা উচিৎ, কিন্তু বৎস! তুমি পঙ্ক লেপনের পথেই গমন করিতেছ। পিতৃবাক্য শ্রবণান্তর তিনি কন্যাভিলাষী হইয়া বিচরণ করিতে লাগিলেন। তারপর অতি কঠোর ভাবে ব্রহ্মার তপস্যা করিতে আরম্ভ করিলেন, ব্ৰহ্মা সন্তুষ্ট হইয়া বর দিলেন যে—“তুমি পিতৃ- গণের অর্চনা কর, তাহারা সন্তুষ্ট হইয়া তোমার অভিলাষ পূর্ণ করবেন, তুমি পুত্র উৎপাদন করিয়া অনুষ্ঠেয় কাৰ্য্য সকল সম্পন্ন করিবে, পরে প্রজাপতি হইয়া প্রজা সৃষ্টি করিয়া সফলকাম হইবে।” তাহার পর রুচি নদীতে গিয়া পিতৃগণের তৰ্পণ করিয়াছিলেন। এবং নমস্তেহহং পিতৃ (১০) ভক্ত্যা ইত্যাদি স্তব করিতে করিতে তাহার সমস্ত শরীরে জগধ্যাপক এক মহান তেজোশি সমুদ্ভূত হইয়াছিল। অনন্তর তিনি “অমূৰ্তানাঞ্চ মূৰ্তানাং পিতৃনাং দীপ্ততেজসাং ইত্যাদি স্তব আরম্ভ কৰিলে এক পরমা সুন্দরী কন্যা আবিভূত। হইয়াছিলেন, তাহাকে তিনি বিবাহ করিয়াছিলেন। পিতৃলােকের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ তৰ্পণ ও পিণ্ড দানের জন্য বিবাহ করিয়া সন্তানেৎপাদনের কতই প্রয়ােজন, এই উপাখ্যানে তাহা অতি বিস্তৃতভাবে আলােচিত হইয়াছে । পুরাণের অনেক স্থানেই এইরূপ শিক্ষাপ্রদ উপাখ্যানের অবতারণা করিয়া ব্রাহ্মণ কুমারগণকে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে অনুরক্ত করিয়া রাখিবার চেষ্টা দেখিতে পাওয়া যায়; কিন্তু ইহা হইতে এরূপ সিদ্ধান্ত করা সঙ্গত হয় না যে-অতি পূৰ্ব্ব- কালে এদেশে পিতৃলােকের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ করিবার প্রথা প্রচলিত ছিল না। পরন্তু এই সকল পুরাণ প্রচারের সময় হইতেই এদেশে শ্রাদ্ধ করিবার প্রথা প্রচলিত হইয়াছে দুঃখের বিষয় ইউরােপের সংস্কৃতজ্ঞ ম্যাক্সমুলার প্রভৃতি প্রবীণ পণ্ডিতগণও এইরূপ ভ্রমাত্মক সিদ্ধান্ত কতকটা সমর্থন করিয়া থাকেন। ইহঁদের কেহ কেহ এরূপ অপরূপ ; । * রুচি মুনির এই উপাখ্যান যিনি বিস্তৃতভাবে জানিতে ইচ্ছা করেন তিনি নবম ভাগ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ সংখ্যক ত্রিশূলের পিতৃলােক শীর্ষক প্রবন্ধ দেখিতে পারেন।
ভিমতও প্রকাশ করিয়াছেন যে,“বৈদিক যুগে এদেশে শ্রদ্ধপ্রথা প্রচলিত ছিল না,” তাহার কারণ তাঁহারা বলেন ‘বেদে শ্রাদ্ধ’ শব্দের উল্লেখ নাই।” এ যুক্তি অনুসারে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে হইলে “বৈদিক যুগে বেদও এদেশে প্রচলিত ছিল না” বলিতে হয়। কারণ এখনকার মুদ্রিত বেদের মধ্যে “বেদ” শব্দও দেখিতে পাওয়া যায় না? ফলতঃ চারি বেদই দেবগণ এবং পিতৃগণের স্তব স্তুতি, পূজা উপাসনার কথাতে পরিপূর্ণ রহিয়াছে। পরিপূর্ণ রহিয়াছে। বেদ হইতে পুঞ্জ পুঞ্জ মন্ত্র উদ্ধৃত করিয়া ইহা সপ্রমাণ করা যাইতে পারে। গর্ব জাতীয় পাঠকের সম্মুখে বেদমন্ত্র উদ্ধৃত করিতে অসমর্থ, এজন্য যে সকল পাঠকের বেদ দেখিবার অধিকার আছে এবং যাহারা বেদে কি ভাবে শ্রাদ্ধ তর্পণাদির উল্লেখ করা হইয়াছে জানিবার বাসনা, হৃদয়ে রাখেন, তাহাদের দৃষ্টি শুক্লযজুৰ্বেদ-সংহিতার ২য় অধ্যায়ের দ্বাত্রিংশৎ সংখ্যক মন্ত্রে আকর্ষণ করিতে ইচ্ছা করি। মহীধর ভাষ্যে এই বৈদিক মন্ত্রের ব্যাখ্যা এই ভাবে করা হইয়াছে- “হে পিতর! ধূয়ং অত্র কালে, স্থানে, কর্মণি বা, দত্তং পিং যথভাগং যে ষষ্ঠ ভাগঃ তং, আবৃষায়ধ্বম্ সমগ- ভিলষৎ তত মাদয়ধ্বং তৃপ্যত। প্রার্থিতা তে পিত যথভাগ ঘােষ ভাগঃ তং, আবৃষায়িষত সমগভিলষিত- বস্ত, ততঃ মীমদত তৃপ্তব।”
৪। (১২) উপরি উদ্ধৃত ভাষ্যের বাঙ্গালা মৰ্ম্মানুবাদ এই- হে পিতৃগণ! আপনারা এই কাৰ্য্যে (সময়ে অথবা স্থানে) দত্ত পিণ্ড নিজ নিজ ভাগানুসারে গ্রহণ করিয়া তৃপ্ত হউন। ( প্রার্থিত সেই পিতৃগণ ) যথাভাগে গ্রহণ করিয়া তৃপ্ত হইয়াছিলেন। ঐ সংহিতার পূর্বোক্ত অধ্যায়েরই চতুস্ত্রিংশৎ মন্ত্রের মহীধর ভাষ্য এইরূপ ব্যাখ্যা করিতেছেন- “হে আপ! যুয়ং ‘স্বধা’ পিতৃনাং তৃপ্তিহেতুভূতা স্থ’ ভবথ। ‘উজ্জং’, ‘ঘৃতং পয়ঃ অমৃতং ইতি প্রসিদ্ধমেতৎ পরিশ্রুত ‘কীলং’ জলং বহী বহন্তো ধারা ঘূয়ং মে মম পিতৃ আহুতা তপত তৃপ্তিং গময়ত।” এই ভাষাংশের বাঙ্গালা শৰ্ম্মানুবাদ এই — “হে জল। আপনারা পিতৃগণের তৃপ্তিহেতু হউন। উর্জ, ঘৃত পয়, অমৃত, (নাম প্রসিদ্ধ ) পরিশ্রুত জল বহন করিয়া পিতৃগণের তৃপ্তি উৎপাদন করুন। শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতার উনবিংশ অধ্যায়ের নষ্ট চত্বারিং শং শ্লোকে মহীধৰ ভাষা- “হে অগ্নে! ত্বা স্বা, নিধীমহি আদধীমহি, আধানং তব কুৰ্মঃ ইতি যাবৎ, বয়মিতব্যাহাৰ্য। কি ভূত! বরং দ্বামুণ ইচ্ছ, কিঞ্চন কেবলমুশশু, বয়ং ত্বং সমিধীমহি প্রজ্জালমা, তঞ্চ অভিহিত সন পিতৃন্ অগ্নিশ্বতাদী (১৩) আবহ আবাহয়। কিন্তু স্বং? উশন্ পিতৃ, ইচ্ছন্ কিংভূত পিতুন ? উশতঃ ইচ্ছতঃ। কিমর্থমবাহনমিত্যহি:- আবাহনীয়ে অস্মত্ত হবিষােত্তবে অনর্থং। ছে আগ্নে!. আধানজ্জ্বলনাভ্যাং আরাধিতঃ পিতৃন্ অস্মাকং শ্রদ্ধদেয় হবিষে ভক্ষণার্থং অনিয় ইত্যর্থ।” এই ভাষ্যের বাঙ্গালা মৰ্ম্মানুবাদ :- “হে অগ্নি! আমরা, আপনি আমাদের পিতৃগণকে আন- মন করিবেন অভিলাষ করিয়া, আপনাকে স্থাপিত এবং প্রজ্জ্বলিত করিতেছি। আপনিও আমাদিগের দ্বারা পূজিত হইয়া, অভিলাষী ( অগ্নিস্বত্তাদি) পিতৃগণকে আমাদিগের প্রদত্ত হবি ভক্ষণ করিবার জন্য আহ্বান করুন।” বেদে যে কেবল পিতৃগণের উদ্দেশ্যেই এইরূপ প্রার্থনাদি করিবার পদ্ধতি দেখিতে পাওয়া যায় তাহাই নহে, পরন্তু যাহারা পিতৃলােক পর্যন্ত যাইয়া পৌছিতে পারেন নাই অর্থাৎ যাহারা প্রেতভাবাপন্ন হইয়া রহিয়াছেন তাহাদের সম্বন্ধেও অনেক স্থানে গানেরূপ কথা আছে। ঋগ্বেদ সংহিতার দশম মণ্ডলের একশত পঞ্চ-পঞ্চাশৎ সূক্তে প্রেত ভাবপন্নের সগতি সম্বন্ধে হৃদয়স্পর্শী প্রার্থনা রহিয়াছে। ঋগ্বেদ সংহিতা হইতে ঐ মন্ত্র উদ্ধৃত না করিয়া রমেশচন্দ্র দত্ত কৃত-বাঙ্গালা-অনুবাদ হইতে কয়েক পংক্তি উদ্ধৃত করিতেছি— *কোন কোন প্রেতের জন্য সোমরস ক্ষরিত হয় ; কেহ কেহ ধৃত সেবন করে; যে সকল প্রেতের এ মধুর (১৪) স্রোত বহিয়া থাকে, হে প্রেত ! তুমি তাহাদিগের নিকট গমন কর।* “যাহারা তপস্যা বলে দুর্ধর্ষ হইয়াছেন; যাহার তপস্যা বলে স্বর্গে গিয়াছেন; যাহারা অতি কঠোর তপস্যা করিয়া- ছেন; হে প্রেত ! তুমি তাহাদের নিকট গমন কর।” “যাহারা যুদ্ধস্থলে যুদ্ধ করেন, যে সকল বীর শরীরের মায়া ত্যাগ করিয়াছেন; কিম্বা যাহারা সহস্র দক্ষিণা দান করেন; হে প্রেত ! তুমি তাহাদিগের নিকট গমন কর।* রমেশচন্দ্র দত্তের ঐ পুস্তিকার আর এক স্থান হইতে আর কয়েকটী পংক্তি নিম্নে উদ্ধৃত করিয়া দেখাইতেছি ইহাকে ঋগ্বেদ সংহিতার দশম মণ্ডলের একশত একত্রিংশৎ সুক্তের বঙ্গানুবাদ বলিয়া তিনি প্রকাশ করিয়াছেন :- পূরকালে যজ্ঞ উৎপন্ন হইলে পর আমাদিগের পূর্ব- পুৰুষ, ঋষি ও মনুষ্যগণ উক্ত নিয়মে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করিলেন। প্রাচীনকালে যাহারা এই যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিলেন আমার বােধ হইতেছে যেন আমি মনের চক্ষে তাহাদিগকে দেখিতে পাইতেছি।" “সাতজন দিব্য ঋষি স্তব সমূহ ও ছন্দ সংগ্রহ করিয়া পুনঃ পুনঃ অনুষ্ঠান করিলেন, যজ্ঞের পরিমাণ স্থির করিলেন, যেরূপ সারথিরা ঘােটকের রশ্মি হস্তে ধারণ করে ত জপ সেই বিদ্বান ঋষিগণ পূর্বপুরুষদিগের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া তদনুযায়ী যজ্ঞানুষ্ঠান সম্পন্ন করিলেন।”
করি। (১৫) পিতৃগণের প্রতি এইরূপ শ্রদ্ধার পরিচয় প্রদায়ক অনেক কথাই আমরা বেদের অনেক স্থানে দেখিতে পাই। এই শ্রদ্ধাকে আবার দেবতা জ্ঞান করিয়া ঋষিগণ শ্রদ্ধাকেই কত স্তব স্তুতি করিয়াছেন। রমেশচন্দ্র দত্তের বাঙ্গালা অনুবাদ হইতে এতৎ সম্বন্ধীয় আরও কয়েকটি পংক্তি নিম্নে উদ্ধৃত করিতেছি। শ্রদ্ধাকে আমরা প্রাতঃকালে আহ্বান করি ; মধ্যাহ্ন- কালে ডাকি; যখন সূর্য অস্ত যান, তখন ও শ্রদ্ধারই নাম এই স্থানে আমাদিগকে শ্রদ্ধাযুক্ত করিয়া দাও।” ইউরােপীয় প্রখ্যাত নামা পণ্ডিত হুইটনীর কত অথৰ্ব্ব- বেদ সংহিতার অনুবাদ হইতে নিয়ে কয়েক পংক্তি উদ্ধৃত করিতেছি- "That they are buried, and they that are scattered away, they that are burned and they that are set up-all those Fathers, O Agni, bring thou to eat the oblation. উদ্ধৃত অংশের মর্মানুবাদ— যাহাদিগের দেহ মৃত্তিকা মধ্যে প্রােথিত করা হইয়াছে, যাহাদিগের দেহ খণ্ড খণ্ড করিয়া ইতঃস্তত নিক্ষেপ করা হইয়াছে, যাহাদের দেহ অগ্নি দ্বারা দগ্ধ করা হইয়াছে সেই সকল পিতৃগণকে, হে অগ্নিদেব, আমাদের প্রদত্ত এই পিও ভক্ষণ করিবার জন্য আপনি আয় করুন।
(১৬) উহারই আর এক স্থান হইতে আরও কয়েক পংক্তি নিম্নে উদ্ধৃত করিতেছি- “Unto the heavenly world shalt thou conduct us ; may we be united with wife, with sols; I grasp her hand ; let her come bere after me." উদ্ধৃত অংশের মানুবাদ- দিব্যলােকে আপনি আমাদিগকে লইয়া চলুন। যেন সেখন আমরা পত্নী ও পুত্রাদির সহিত সম্মিলিত হইতে সেখানে পত্নীর পুনর্বার পানি গ্রহণ করিতে বা ধারণ করতে যেন সমর্থ হই। আবার যেন আমার পশ্চাতে তাহাকে আমি পাইতে পারি। ধংশ যেন আম- দের মধ্যে প্রবিষ্ট হইতে না পারে এবং আমরা যেন নষ্ট শ। প্রাপ্ত না হই। আমেরিকায় এসময়ের প্রেত বাদীদের, কথার সহিত অথৰ্ব্ববেদের এই অংশের উক্তির সৌসাদৃশ্য লক্ষ্য করিবার সামগ্রী। ৩। অন্যান্য দেশবাসীগণ মধ্যে শ্রাদ্ধের ভাব ও অনুকল্প বিস্তার কি ভাবে কতকাল হইতে সংঘটিত হইয়াছে ? ইতিপূর্বে এই প্রস্তাবের একস্থানে উল্লেখ করিয়াছি- শ্ৰদ্ধানুষ্ঠান প্রথা, লােক বিশেষ দ্বারা এদেশে প্রবর্তিত হয় (১৭) * নাই, উহা নিত্য ও সনাতন। এই উক্তিকে সমর্থন করিবার জন্য যদি কোন প্রমাণ উপস্থিত করিবার প্রয়ােজন থাকে, তবে সে বিষয়ের অকাট্য একটা প্রমাণ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানীয় মানব জাতির প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থসমূহই প্রদান করিতেছে বলিতে বাধা নাই। অসভ্য ইয়ােরােপীয়ান ইতিহাসবেত্তাগণের সিদ্ধান্ত অনুসারে আমাদের বাস ভূমি এই পৃথিবীর বয়ক্রম কেবল পাঁচ হাজার বর্ষ মাত্র! কাজেই পাঁচ হাজার বর্ষের অধিক পুরাতন কোন ঐতিহাসিক প্রমাণের অস্তিত্বই আদৌ তঁাহাৱা স্বীকার করিতে প্রস্তুত নহেন। ভারতের এবং চীনাদি দেশের মানবীয় ভাষাতে লিখিত ইতিহাস গ্রন্থ অনেক পরে রচিত হইয়াছে বলিয়া তাহারা সিদ্ধান্ত করেন। তাঁহাদের সিদ্ধান্ত অনুসারে ইজিপ্ট দেশের পিরামিড় মন্দিরে খচিত চিত্র গুলিই সর্ব প্রাচীন ঐতিহাসিক প্রমাণ রূপ গ্রহণ যােগ্য সামগ্রী। কাজেই, ইজিপ্টদেশের অতি প্রাচীন নির্মিত এই সকল বৃহৎ পিরামিড়ের গাত্রে অঙ্কিত চিত্রে শ্রদ্ধতত্ত্বের যতটুকু জ্ঞাতব্য কথা আমরা জানিতে পারি সর্বাগ্রে তাহারই উল্লেখ এখানে করিতেছি। মন্দির গাত্রে অঙ্কিত চিত্রের কথা দূরে থাকুক, ইয়ােরােপীয়ান ঐতিহাসিক গণের দ্বারা স্থিরীকৃত হইয়াছে এই বিরাটাকার পিরামিড় মন্দিরগুলি নিজেই ঐ দেশবাসী পৰ্বতন কালের রাজ- গণের পিতৃপিতামহদের নামে উৎসর্গীকৃত, তাহাদেরই ।
(১৮) মঙ্গলোদেশে বিনির্মিত তাহাদের স্মৃতিচিহ্ন বিশেষ ভিন্ন আর কিছুই নহে।* এই সকল মন্দিরের অভ্যন্তরে কোন দেবদেবীর প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত নাই, পরন্তু ইহার গর্ভে কেবল মৃত দেহই সযত্নে রক্ষিত হইয়া আসিতেছে। মন্দির প্রতিষ্ঠার পরে শত সহস্র বৎসর অতীত হইয়াছে, তথাপি এতদূর সুকৌশলে শিল্পবিদ্যার সাহায্যে এই সকল মৃতদেহ এখানে এমন সযত্নে রক্ষিত হইয়াছিল যে মন্দির খনন করিতে করিতে আজিও যে সকল মৃতদেহ এখানে প্রাপ্ত হওয়া যাইতেছে তাহা প্রায় সদ্য মৃতদেহের ন্যায় পূর্ণাবয়ব বিশিষ্ট শক্ষিত হইয়া থাকে। এই সকল মন্দিরের গানে নানাবিধ পশু পক্ষী ফল মূলাদি খাদ্য সামগ্রীর চিত্র অঙ্কিত রহিয়াছে দেখিতে পাওয়া যায় । ইয়ােরােপের প্রত্নতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতগণ সিদ্ধান্ত করিয়াছেন—এ সমস্তই মন্দির মধ্যে প্রােথিত দেহধারীগণের জীবাত্মার প্রত্যর্থে তাহাদের খাদ্য সামগ্রী বিষয়ক স্মৃতির উন্মেষণ দ্বারা তাহাদের তৃপ্তি সাধন জ তাহাদেরই বংশধরগণের দ্বারা এই ভাবে এখানে অঙ্কিত করিয়া রাখা হইয়াছে। * Pierre Loti's EGYPT দ্রষ্টব্য। + "The inscriptious prove the existence of a time when fuveral sacritices on a large scale were utføred to the waves of the rich, but the lavishni ss of the pictured offerings sug-
(১৯)
শত সহস্র বৎসর অতীত হইল, প্রাচীন ইজিপ্সিয়ান
জাতির অস্তিত্ব পৃথিবী হইতে বিলুপ্ত হইয়াছে। এই বিলুপ্ত
জাতীর অস্তিত্বের একমাত্র পরিচায়ক চিহ্নরূপ পর্বতাকায়
উচ্চ এই পিরামিড় গুলি আজিও ইজিপ্টদেশের সুবিস্তৃত
প্রান্তর ভূমির স্থানে স্থানে ভৗম মূর্তিতে দাঁড়াইয়া থাকিয়া
কেবল একটি ঐতিহাসিক তথ্য জগতে নিঃসঙ্গ মানব-মৰ্ম্ম.
স্পর্শী ভাষায় ঘােষণা করিতেছে। সে কথাটা এই যে,
সে দেশে সেকালের লোকেরা, তাহাদের মৃত পুরুষগণের
পূজা করিতেন। পিতৃ পূজাই তাহাদের ধর্মানুষ্ঠান ছিল।
তাহাদের এই পিতৃপূজা, এদেশের হিন্দুদের অনুষ্ঠিত শ্রাদ্ধ
তর্পণ আকারে সম্পাদিত না হইলেও তাহা যে অসাধারণ
ভক্তিভাবের সহিত মৃত পিতৃপিতামহদের তৃপ্তির উদ্দেশ্যে
অর্পিত পিতৃপূজা বলিয়া আখ্যাত হইবার সম্পূর্ণ যােগ্য
একথা নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে।
ইজিপ্টের পিরামিড় মন্দিরগাত্রে অঙ্কিত চিত্রে আরও
দেখিতে পাওয়া যায়, কোথাও বা শবদেহের অগ্নি সংকার
gests a doubt as to their reality; and on the
whole, the most probable theory is that the
cattle, birds, fruits, bread, wine, and provisions
represented in the pictures were intended to
be a substitute for the real objects."
PRIMITIVE CIVILISATIONS,
VOL, I, CHAPTER VI.
(২)
হইতেছে আর পুরােহিত পার্শ্বে দাড়াইয়া মৃতের পত্নী দ্বারা
তাঁহার পিণ্ডদান করাইতেছেন। ইয়ােরােপে খুষ্টানধৰ্ম্ম
প্রবল হইবার পূর্বে প্রাচীন পদ্ধতিতে যখন ইয়ােরােপে
মৃতের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদিত হইত, তখন সেখানেও হিন্দু
সমাজ প্রচলিত পদ্ধতিতেই অগ্নি দ্বারা শব দাহ কাৰ্য্য
সম্পাদন হইত। এখন ও ইয়ােরােপের বহুস্থানে মাটি
খুঁড়িলে অর্ধভষ্মীভূত নরকঙ্কাল এবং অঙ্গার স্তুপ বাহির হইয়া
এই কথার সত্যতা প্রমাণ করিয়া দিতেছে। এখনও
ইয়ােরােপের নানা স্থানে প্রসিদ্ধ সৈনিক পুরুষদের মৃত দেহ
ভূগর্ভে সমর্পণের সময়ে তাহার সদা ব্যবহার্য তরবারি পানি
তাহার পার্শ্বে রাবিয়া দেওয়া হয়। আজিও এদেশে সধবা
নারীর শবদাহ সময়ে তাহার সাধের সিন্দুর কৌটা ও হাতের
শাখা শবদেহের সহিত চিতানলে সযত্নে সমর্পণ করা হইয়া
থাকে। এই চিরাগত হিন্দু আচারের সহিত, ইয়োরোপের
সৈনিক পুরুষের সঙ্গে তাহার ব্যবহার্য তরবারি খানি
উৎসর্গ করিয়া দেওয়া প্রথার সৌসাদৃশ্য বিশেষরূপে লক্ষ্য
করিবার বিষয়।
বিলুপ্ত ইজিসিয়ান জাতির মৃত পিতৃপিতামাদি
পূর্বপুরুষগণের পূজায় বিচিত্র চিত্র যেমন সে দেশের
পিরামিড় মন্দির গাত্রে আজিও অতি সুস্পষ্টভাবে দেখিতে
পাওয়া যায়, প্রাচীন এছেরিয়া এবং বেবিলােইয়াদের
ভগ্ন মন্দিরে যদিও উহা তাদৃশ পরিস্ফুট না থাকুক, এখানেও
(২১) যে অতি প্রাচীনকালে, ঐদেশবাসীগণের দ্বারা তাহাদের পিতৃপুরুষগণের পূজা অতি সমারোহে সম্পাদিত হইত তাহার পরিচয়ও আমরা যথেষ্টই পাইতে পারি। মৃত পিতৃ- পুরুষগণের বাসস্থান উর। লােকে নির্দিষ্ট রহিয়াছে বলিয়া উরা দেবতা বা মৃত্যুর দেবতার, পিতৃগণকে সষ রক্ষণা বেক্ষণ করিবার জন্য, নানা ভাবে পূজা অর্চনা করিবার প্রথা এদেশে প্রচলিত ছিল। মৃতের দ্বিতীয় শরীরকে * বহন করিয়া উরা লােকে কিম্বা অধিক ভাগ্যবানের দেহচুত জীবাত্মা হইলে, তাহাকে বেল বা সূর্যদেবের নিকট হয়। যাওয়া হইতেছে, এরূপ চিত্র অনেক মন্দির গাত্রে দেখিতে পাওয়া যায়। প্রাচীন ইজিসিয়ানদিগের ন্যায় প্রাচীন ব্যাবিলােনিয়া ও এখন জগতে বিলুপ্ত জাতির তালিকাভূক্ত হইয়া ঐতি- হাসিকদিগের প্রাচীন তত্ত্ব সংগ্রহ ব্যাপারে একটা সুবিস্তৃত কর্মক্ষেত্র হইয়া রহিয়াছে মাত্র। এই সকল বিলুপ্ত জাতির কথা পরিত্যাগ করিয়া সুষুপ্ত, নিদ্রিত এবং অর্ধ নিদ্রিত জাতির কথা লইয়া এখন একটু আলােচনা করিব। এ সময়ের সুষুপ্ত জাতির মধ্যে তিব্বতবাসীগণকে এবং অর্ধ নিদ্রিত মধ্যে চীন দেশবাসীগণকে ধরিতে পার। যায়। চীন দেশে প্রাচীন কালে মৃত-পুরুষগণের পূজা অর্চ- * * BU OLD BABYLONIAN TEMPLE RECORDS স্রষ্টব্য।
(২২) নয় যেরূপ বিরাট আয়ােজন অনুষ্ঠান প্রচলিত ছিল, এক ব্রাহ্মণ জাতি ভিন্ন বােধ হয় জগতে আর কোন জাতির মধ্যেই সেরূপ ছিল না। বৌদ্ধ ধর্ম চীন দেশে যাইয়া প্রবিষ্ট হইবার পরে উহার একটা বিশাল পরিবর্তন সংঘটন হইয়াছিল সত্য, কিন্তু তথাপি আজিও তিব্বত এবং চীন দেশে পিতৃপুরুষের অর্চনার যেমন ঘটা দেখিতে পাওয়া যায় এদেশের সাধারণ হিন্দুগণ মধ্যেও সেরূপ দেখিতে পাওয়া যায় কিনা সন্দেহ। চীনদেশের ন্যায় জাপানেও মৃত পূৰ্বপুরুষগণের উদ্দেশ্যে আহাৰ্য্য নিবেদন করিবার এবং পূজা অর্চনা করিবার প্রথা এখনও পূর্ণমাত্রায় প্রচলিত রহিয়াছে। প্রায় তিন সহস্র বর্ষ- ব্যাপী চেষ্টাতেও বৌদ্ধ ধর্ম, ইহাকে এখনও এক পদপরিমিত স্থানও হটাইয়া দিতে পারে নাই। কেবল ইহাই নহে, হিন্দুস্থানের ন্যায় চীনেও একসময়ে মুসলমানধর্ম বিস্তারের প্রখঃ বা প্রবাহিত হইয়াছিল, সে সময়ে উহাতেও চীনবাসীদের পিতৃপুরুষগণের প্রতি অসাধারণ ভক্তির * "As in China, so in Japan Buddbism found strong rivals already in the field- Shintoism, which is a combination of nature- Worship and ancestor-worship with the strange cult of the MIKADO and Confucianism which is chiefly a moral code." Sunders 3 STORY OF BUDDHISM. CHAPTER VII. ugasi
(২৩)
দৃঢ় লতিকার কেশাগ্র সমান স্থানও ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করিয়া
দিতে পারে নাই। এখন খৃষ্টিয়ান মিশনারিগণ দ্বারা চীনের
বহুস্থানে মহাধুমধামে খৃষ্টধর্ম প্রচারিত হইতেছে ;
ধর্ম বিপ্লবের এত ঘাত প্রতিঘাত নিয়ত সহ্য করিয়াও
এখনও উহা অক্ষুন্নই রহিয়াছে। এখনও চীন, তিব্বত ও
জাপানদেশবাসীদের পরলােকগত পিতৃপুরুষগণের প্রতি
তাহাদের অসাধারণ ভক্তি শ্রদ্ধা ইউরোপীয়ান দর্শকদিগের
চিন্তে একটা উৎকট বিস্ময়ের সামগ্রী স্থানীয় হইয়া
রহিয়াছে। কুষ-জাপান যুদ্ধের ইতিহাসে দেখিতে পাওয়া
যায়, পরাজিত রুষ সৈন্যদের সে সময়ে ইংই একটি
দারুণ আক্ষেপের কারণ হইয়াছিল যে জাপান সৈন্যদের
মৃত ব্যক্তিরাও অনেক সময়ে আসিয়া জীবিত সৈন্যদের
কার্যের সহায়তা করিত, তাহাদের মৃত ব্যক্তিরা জীবিত
রুষ সৈন্যের সেরূপ সহায়তা কখনও করিত না! রুব
সৈন্যেরা আক্ষেপ করিয়া বলিত—এ অবস্থাতে তাহারা
আর জাপানদের সহিত যুদ্ধে জয়লাভ করবে কিরূপে?
বলা বাহুল্য, জাপানী সৈন্যদের মৃত আত্মীয়-জনের
উদ্দেশে যুদ্ধক্ষেত্রেই পিণ্ডদান ও পূজা অর্চনা করিবার
অসাধারণ ব্যাকুলতা দেখিয়াই রুষসৈন্যদের হৃদয়ে ঐরূপ
একটা ধারণা জন্মিয়া থাকিবে। পরন্তু যাহারা আস্তিক,
তাহাদের দৃষ্টিতে, অধৰ্ম্ম যুদ্ধে নিহত জাপানী বীরপুরুষদের
প্রেত ভাবাপন্ন দেহ আত্মীয়স্বজনের শ্রদ্ধাভক্তিতে আকৃষ্ট
(২৪) হইয়া আসিয়া কখনও যুদ্ধক্ষেত্রের মহা শশ্মানভূমিতে অবতীর্ণ হইয়া, রুষ সৈন্যদের চিত্তে ভীতি উৎপাদন করাও আদৌ অসম্ভব ঘটনা বলিয়া গণ্য হইতে পারে না। প্রকৃত ব্যাপার যাহাই হউক, জাপানীদের মৃত আত্মীয় স্বজনের প্রতি অসাধারণ ভক্তিশ্রদ্ধার পরিচয়, বিদেশীয়গণ এই যুদ্ধক্ষেত্রে যেরূপ দেখিতে পাইয়াছেন, তাহাতে তঁাহারা বিপন্ন না হইয়া থাকিতে পারেন নাই। কিন্তু যাহারা চীনাদিজাতির ইতিহাস সযত্নে অনুশীলন করিয়া- (ছন তাহারা ইহাতে বিস্মিত হইবার কিছুই দেখেন না। কারণ ভঁহারা অবগত আছেন—বৌদ্ধধর্ম গ্রন্থে, বৌদ্ধ ধশ্বাবলম্বী চীন, জাপান ও তিব্বতবাসীদের মৃত আত্মীয়- স্বজনের জীবাত্মার প্রতি এরূপ ব্যবহার আদৌ অনুমােদিত নহে, কিন্তু এই সকল দেশের কোটি কোটি অধীবাসী নামে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হইলেও, এ বিষয়ে তাহাদের দেশের অতি প্রাচীন কালের ধর্মগ্রন্থ লিখিত উপদেশ গুলি আজিও দৃঢ়ভাবে হৃদয়ে ধরিয়া রাখিয়াছেন। এই উপদেশমূলেই, চীনাদি দেশে, পিতৃলােকবাসী মৃত পূৰ্বপুরুষগণ, কেবল ঐ সকল দেশবাসীগণের আজি ও পরম পূজ্য নহেন, পরন্তু দেবতাসদৃশ অথবা দেবতা হইতে আরও অধিক উচ্চ আসনে সংস্থিত ও সমাদৃত। ঐ সকল মৃত পূৰ্বপুৰুষ চীন- দেশে, আজিও অনেক চীনবাসীর চকে সর্বপ্রধান আরাধ্য
(২৫)
দেবত। ও সদা ধ্যান ধারণার সামগ্রী স্থানীয় হইয়া
রহিয়াছেন।
চীন জাপান ও তিব্বতের অধিবাসীদের আর আর বিষ
যক আচার ব্যবহার যেরূপই হউক, ঐ সকল দেশে মৃতের
অন্তেষ্টি ক্রিয়া ও তৎপর তাহার জীবাত্মার সদগতি উদ্দেশ্যে
অনুষ্ঠিত কাৰ্যাদির সহিত এদেশের উচ্চশ্রেণীর হিন্দুদের
আচরিত ঐ প্রকারের কার্যের এখনও অত্যাশ্চর্য সৌসাদৃশ্য
পরিলক্ষিত হয়। ঐ সকল দেশের ধর্মোপদেশক গুরু
স্থানীয় ব্যক্তিগণমধ্যে, বিশেষতঃ তিব্বতের লামা সম্প্রদায়
মধ্যে আজিও যে কেবল মৃতদেহের অগ্নিতে সৎকার করিবার
* "In China the most transcendental
religious duty clearly imposed by the sacred
texts is the duty of a pious king to meditate
after his accession upon the virtues of his
father or great ancestor, and to realize as
vividly as possible, the image of his living
being."
PRIMITIVE CIVILISATIONS,
VOL. I, CHAPTER II.
এতদ সম্বন্ধে আরও অধিক জানিতে ইচ্ছা করিলে,
SACRED BOOKS OF THE EAST VOL.
XXVIIII, পৃষ্ঠা ২১১ দেখিতে পারেন।
(২৬) প্রথাই প্রচলিত রহিয়াছে তাহাই নহে পরন্তু আমাদের এদেশে মৃতদেহকে চিতায় আরূঢ় করিবার সময়ে যেমন তাহাতে স্বর্ণাদি সংযােজিত করিবার রীতি আছে তেমনি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ঘটিত সে সকল নিয়মও স্থলবিশেষে চীনদের মধ্যে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত হইতে দেখা যায়। কেবল চীন, জাপান ও তিব্বতের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অবস্থাই এইরূপ নহে, মধ্য এশিয়ার মুসলমান অধিবাসীদের * "Other Lamas and monks distinguished for sanctity are burnt, and their ashes are either distributed as relics or preserved in idols or in small Dagabas. Kings, Kings, princes and great med are also burnt and of course with much ceremony and repetition of prayers. Then for long time afterwards prayers continue to be recited by the priests, the object being to propitiate Yama, God of Death, and to deliver the deceased from the possible purgatorial torments of one of the hells." Sir Mopier Williams FU BUDDHISM. গ্রন্থের ন্যস্থানে লিখিত হইয়াছে- + "A piece of gold or silver is placed between the teeth to serve as ferry-money over the Buddhists Styx--the terrible river of death which all deceased persons are compelled to pass," ঐ
(২৭)
মধ্যেও অনেক স্থানে মৃতের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতে আমাদের
এদেশের হিন্দুর আচরণ অত্যাপি কিঞ্চিৎ পৰিমাণে প্রতি
পালিত হইতে দেখা যায়। কেবল ইহাই নহে, এ হেন
সুসভ্য ইউরোপেরও অনেক স্থানে, এমন কি আধুনিক
দর্শন ও বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রস্থান বলিয়া বর্ণিত জনদেশে,
এমন কি সুদূর উত্তর মহাসাগর তীরে অবস্থিত আয়লণ্ডে
পৰ্যন্ত, এখনও মৃতের অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়াতে এবং তৎপর মৃতের
সৎগতি লাভ উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত কাৰ্যাদিতে আমাদের
এই প্রাচীন হিন্দুস্থানে অদ্যাপি প্রচলিত রীতি নীতির একটু
আধটু ছায়া সময়ে সময়ে অতি সুন্দরভাবে পরিস্ফুট হইয়া
রহিয়াছে দেখিতে পাওয়া যায় ।
* Thus in Berar the aboriginal tribes,
which are as yet little touched by Brahmanic
doctrines, practise most elaborate and singular
obsequies known by a name wbich may be
accurately translated into the Irish term wake,
meaning á vigil. The ceremony includes that
very suggestive practice (known also to
Brahmanic rites) of bringing back to his house
the dead person's soul, supposed to bave lost
its home by the body's deatb. A stone, or
some such object, is picked up at the grave,
and carried reverentially back to the house,
(২৮)
পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই সকল অবস্থার মানব
সমাজেই পরলােকগত প্রিয় ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কোন না কোন
পদ্ধতিতে পূজা অর্চনা এবং আর্য পানীয় দানের প্রথা
প্রচলিত রহিয়াছে আমরা দেখিতে পাইতেছি ; ইহাদ্ধারা,
ইতিপূর্বে যে বলা হইয়াছে বেদের ন্যায় ব্রাহ্মণের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানও
নিত্য ও সনাতন এই কথার সত্যতাই যে কেবল প্রকারান্তরে
সমর্থিত হইতেছে তাহাই নহে, পরন্তু পিতৃলােক সম্বন্ধীয়
নানাদেশে নানা প্রণালীতে প্রচলিত ধ্যান ধারণা,
পূজা অর্চনা আচার অনুষ্ঠান পদ্ধতির মূল উৎস, ব্রাহ্মণ্য
ধৰ্ম্মরূপ গিরিগুহা হইতেই যে অতি পূৰ্ব্বকালে সম্ভবত
where it is worshipped for a few days, and then
decently disposed of.
*Now the direct motive and purpose of these
earliest and most primitive mortuary rites are,
I believe, the laying of the ghost; but from
the wailing adoration of these Non-Aryan
woodlanders, up to the ceremonious annual
oblations and invocations of the high-caste
Hindu, they are throughout more or less a kind
of worship."
SIR, ALFRED C. LYALL 23
ASIATIC STUDIES. CHAP. I দ্রব্য।
(২৯)
নিষ্ক্রান্ত হইয়াছে, এমন একটা সিদ্ধান্ত কেহ করিতে
উপস্থিত হইলে বোধ হয় তাহাও অসঙ্গত হইবে না।
জগতের নানাদেশে নানাভাবে প্রচলিত পিতৃপুরুষগণের
পূজা পদ্ধতির অতি সংক্ষেপে আলােচনা করিতে উপস্থিত
হইলেও কেবল শ্ৰদ্ধতত্ত্বের এই অংশ লইয়াই একখানি
সুবৃহৎ গ্রন্থ হইয়া পড়িবার সম্ভাবনা। লেখক ও পাঠক
উভয় পক্ষেরই এ অসময়ে এ সকল নিরস বিষয়ের বিস্তৃত
আলােচনা প্রীতিকর না হইতে পারে বিবেচনা করিয়া,
আপাতত এ বিষয়ের এই খানেই ইতি করিলাম।
৪। ব্রাহ্মণ্য ধৰ্ম্মের সহিত শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের কতদূর
নিগূঢ় ও ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রহিয়াছে ?
এ প্রশ্নের উত্তরে, আমাদের চাৱিবেদ, মালি মুনি
সঙ্কলিত বিংশতি সংহিতা, অষ্টাদশ মহাপুরাণ, সমস্ত উপপুরাণ
এবং ত্যাদি যাবতীয় শাস্ত্র ও ধৰ্ম্ম নির্দেশক গ্রন্থ এক বাক্যে
ইই ঘােষণা করিতেছেন যে, ব্রাহ্মণ্যধৰ্ম্ম যে বর্ণাশ্ৰধৰ্ম্মকে
ক্রোড়ে ধরিয়া দাড়াইয়া রহিয়াছে, সেই বর্ণাশ্রম ধর্মের
মেরুদণ্ডই হইতেছে ;-পরলোক মঙ্গল বিধায়ক শ্রদ্ধানুষ্ঠান।
এ ভাষায়, এই কথা এভাবে বলা যাইতে পারে যে,
ব্রাহ্মণের নিত্য করণীয় কার্যাবলী হইতে পিতৃলােফের
উদ্দেশ্যে তর্পণের জল-গণ্ডুষ দান এবং শ্রদ্ধানুষ্ঠানটিকে খুলিয়া
(৩) ফেলিয়া দিলে, ব্রাহ্মণের আচরণীয় বর্ণাশ্রম-ধৰ্ম্মও সঙ্গে সঙ্গে খুলিয়া শত খণ্ড হইয়া ভাঙ্গিয়া পড়িয়া যাইবে;—তাহার ব্রাহ্মণ্য ভাবের অস্তিত্ব রক্ষার আর কিছুমাত্র উপায় থাকিবে না। এই জন্যই বােধ হয় দেখিতে পাওয়া যায়, মদি মুনি প্রবর্তিত ধৰ্ম্মশাস্ত্রে, ব্রাহ্মণের নিত্য কর্তব্য ও অবশ্য করণীয় কার্যাবলী মধ্যে একমাত্র শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের কথাকে যত প্রাধান্য দেওয়া হইয়াছে, আর তার বিষয়ে তাহার এক চতুর্থাংশ দেওয়া হয় নাই। মনু বলিতেছেন—পাঁচটি নিত্যকর্ম বা পঞ্চ মহাযজ্ঞ ব্রাহ্মণ মাত্রেরই অবশ্য অনুষ্ঠেয়। ব্রাহ্মণের পাঁচটি নিত্য কাৰ্য এই—(১) ব্ৰহ্মযজ্ঞ, (২) পিতৃযজ্ঞ, (৩) দেবযজ্ঞ, (:) ভূতষজ্ঞ এবং (৫) নৃযজ্ঞ।* দেবতা, অতিথি, ভৃত্য, পিতৃলােক ও আত্মাকে পরিতৃপ্ত- করারূপ এই পাঁচটি নিত্যকাৰ্য যে ব্রাহ্মণ না করিবেন, তিনি নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস-গ্ৰহণকাৰ্যবিশিষ্ট-জীব হইলেও জীবিত বলিয়া গণ্য হইবার আদৌ যোগ্য নহেন। যথা- “দেবতহতিথি ভৃত্যানং পিতৃণমাত্মনশ্চযঃ । ন নিৰ্বপতি পঞ্চানামুচ্ছসন্ন স জীবতি। (মনু সংহিতা ৩য় অধ্যায়।) ক * অধ্যাপনং ব্রহ্মযজ্ঞঃ পিতৃযজ্ঞন্তু তর্পণ। হােম দৈববাবলিভৌতে। নৃষজ্ঞেইতিথিপূজন।” (মনু সংহিতা ৩য় অধ্যায়।)
(৩১) মনুসংহিতার অন্যস্থানে লিখিত হইয়াছে— প্রত্যহই পিতৃলােকের প্রীতির জন্য অন্ন, দুগ্ধ, ফল মূল বা জলদ্বারা শ্রদ্ধ করিতে হইবে। প্রাত্যহিক শ্রাদ্ধ ভিন্ন প্রতিমাসে একবার করিয়া পিতৃলােকের বিশেষ শ্রাদ্ধ করিবার ব্যবস্থা আছে ।। “ কুদই :: শ্রাদ্ধ মন্নানোেদকেন বা। পয়ে মূলফর্ব্যৈাপি পিতৃ ভ্য: প্রতিমাবহ।” উপরি উদ্ধৃত শ্লেকের কুলুক ভট্টকৃত ব্যাখ্যা এইরূপ- অত্র পিতৃসজ্ঞং তাবদাহ কুৰ্য্যাদিত। এত্যহং যথা- সম্ভবং শ্রাদ্ধং কুর্যাৎ। শ্রাদ্ধ শব্দাহয়ং কৰ্ম্ম বিধিবাক্য- বর্তী কৌশুপায়িনাময়নীয়াগ্নিহােত্ৰশব্দ বৎ বক্ষ্যমাণ পাৰ্বণ শ্রদ্ধধৰ্ম্মাতিদেশর্থঃ। অন্নাদ্যেন্যোদ্য শব্দেন তিলৈ ব্রীহি ববৈরিত্যাদেরুপাদানং পয়ঃ ক্ষ রং।” উপরি উদ্ধৃত শ্লোক এবং কুল্লুক ভট্টের তৎসম্বন্ধীয় টীকা হইতে অতি পরিষ্কার ভাবে জানিতে পারা যাইতেছে যে, ব্রাহ্মণকে পিতৃলােকের প্রীতির জন্য-অন্ন দ্বারা, দুগ্ধ দ্বারা, ও ফল মূল দ্বারা—নিতান্ত পক্ষে জল দ্বারা প্রতিদিনই শ্রাদ্ধ করিতে হইবে। । “পিতৃণাং মাসিকং শ্রাদ্ধমাহাৰ্য্য বিদুবু ধাঃ তচ্চামিষেণ কৰ্ত্তব্যং প্রশস্তেন প্রত্নতঃ”। ইহার কুল্লুকভট্ট-কৃত ব্যাখ্যা এইরূপ- (৩২) এতদ্ভিন্ন বিশেষ বিশেষ তিথিতে, বিভিন্ন ঋতুতে নব-শস্য সংগ্রহ সময়ে, জাতকৰ্ম্ম, অন্নপ্রাশন, চূড়াকরণ, উপনয়ন এবং বিবাহাদি সমস্ত প্রকারের সংস্কার কাৰ্য্যেই পিতৃলােকের শ্রাদ্ধ করিতেই হইবে। কেবল ইহাই নহে, নব-গৃহে প্রবেশ, দেব-প্রঠা, বৃক্ষ-প্রতিষ্ঠা, জলাশয়- প্রতিষ্ঠাদি কাৰ্য্য সময়ে ও পিতৃলােকের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ করিতে হইবে। * হিন্দু জন সাধারণের ধৰ্ম্মানুষ্ঠান মধ্যে তীর্থ দর্শন একটি প্রধান। এই বহু পুণ্যফলপ্রদ তীর্থযাত্রার আরম্ভ কালেই “ইদানীং নাম নির্বচনেননাক্তমেব পিতৃযজ্ঞানন্তৰ্য্য দ্রয়তি পিতৃণামিতি। ইদং মাসিকং প্রতিমাসভবং শ্রাদ্ধ স্মাৎ পিতৃযজ্ঞপিণ্ডানামনু পশ্চাদাহ্রিয়তে তেন পিণ্ডম- হাৰ্য্যকমিদং পণ্ডিতা জানন্তি, ততো যুক্তং পিতৃযজ্ঞাহনস্তৰ্যম, তামিষেণ বক্ষ্যমাণ-মাংসেন প্রশস্তেন মনােহয়েণ পুস্তি- গন্ধাদি রহিতেন প্রযত্ন কৰ্ত্তব্যং পিণ্ডানাং মাসিক শ্রাদ্ধ মিতি বা পাঠঃ। পিথানাং পিতৃযজ্ঞ-পিণ্ডনাং শেষ তুল্যং।” * “অন্নপ্রাশে চ সীমন্তে পুত্রোৎপতিনিমিত্তকে। পুংসবনে নিষেকে চ নববেশ প্রবেশনে দেববৃক্ষ জলাদীনাং প্রতিষ্ঠায়াং বিশেষতঃ । তীর্থযাত্র। বৃষােৎসর্গে বৃদ্ধিশ্রাদ্ধং প্রকীর্তিতং ॥” ( মৎস্য পুরাণ।
(৩৩) একবার পিতৃলােকের শ্রাদ্ধ করিতে হয়। তীর্থে যাইয়া পৌছা মাত্র আবার তীর্থপ্রাপ্তি শ্রাদ্ধ করিতে হয়। তীর্থ- কার্য শেষ করিয়া বাড়ীতে প্রত্যাগত হইয়া পুনৰ্ব্বার পিতৃ- লােকের শ্রাদ্ধ করিতে হয়। * হিন্দুর দৃষ্টিতে বিবাহের প্রয়ােজন কেবল পুত্রের জন্য, আর সেই পুত্রের আবশ্যক পিণ্ডদানের জন্য। যথা- “পুত্রার্থে ক্রীয়তে ভাৰ্যা পুত্রঃ পিও প্রয়ােজন।” হিন্দুর দায় ভাগে বলিতেছে—যিনি মৃতব্যক্তির পিও দানের অধিকারী তিনিই মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তির অধিকারী হইবেন। স্মৃতিশাস্ত্র সংগ্রাহক হলায়ুধ বলিতেছেন— “গবৈ তীর্থং কৰ্ত্তব্যং শ্রাদ্ধং তৎপ্রাপ্তি হেতুকং। পূৰ্ব্বাহ্নেপথবা প্রতির্দেশে স্যাৎ পূৰ্ব দক্ষিণে ॥ তৎ প্রাপ্তৈাবমিতি কর্তব্য বচনেন তীর্থপ্রাপ্তি নিমিত্তক শ্রদ্ধাভিধানেননাক্ত: স্যাদবাৎ। অতীর্থ প্রাপ্তি নিমিত্তক শ্রাদ্ধএব তনবৃন্তেরিতি তত্ত্ব।” তীর্থ যাত্রা সমারম্ভে তীর্থাৎ প্রত্যাগমেহপি চ। বৃদ্ধি শ্ৰাদ্ধং প্রকুব্বীত বহুসর্পিসমন্বিতং।” + ব্যবহার ময়ুখে কথিত হইয়াছে— “পিওদোহংশ-হরশ্চৈং পূর্বাভাবে পর পরঃ।” ইহার অর্থ-পূৰ্বাক্ত ব্যক্তিগণের মধ্যে পর পর যে ব্যক্তি পিণ্ডদানের অধিকারী সেই ব্যক্তি মৃতের পরিত্যক্ত ধনের অধিকারী।
(৩৪)
এই সকল উক্তি দ্বারা বুঝিতে পারা যায়-ব্রাহ্মণের
কি নিত্য-নৈমিত্তিক কাৰ্য, কি কাম্য কাৰ্য, কি নিজগৃহে
কি প্রবাসে, কি বিবাহদি আনন্দ-উৎসবকালে, কি মৃতু-
জনিত শােক সন্তাপ সময়ে, পিতৃলােকের শ্রাদ্ধ কতইবার
কতই উপলক্ষে, কতই ভাবে যে করিতে হয় তাহার ইয়ত্বাই
নাই। মাতৃগর্ভ হইতে জীব শরীর ভূমিষ্ট হইবার পূর্ব সময়
হইতে শ্মশানে ঐ দেহ ভষ্মীভূত হইবার পরেও ঐ দেহবাসী
জীবের মঙ্গলার্থে ব্রাহ্মণকে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের সহিত সৰ্বকাল
সম্বন্ধযুক্ত থাকতে হয় । এখানে সংক্ষেপে ইহা বলিলেই
পৰ্যাপ্ত হইবে যে-ব্রাহ্মণের ধৰ্মকৰ্ম্মানুষ্ঠানের অষ্টেপৃষ্ঠে এই
রঘুনন্দন শিরােমণির দায়ভাগ গ্রন্থে নারদ সংহিতা হইতে
নিম্ন লিখিত বচন উদ্ধত হইয়াছে-
“পিতৃদ্বিট পতিত পওে! যশস্যদৌপপাতিক।
ঔরসা অপি নৈহেংশং লভের ক্ষেত্রজাঃ কুতঃ।
ঐ স্থানেই দায়ভাগ’ গ্রন্থে পিতৃদ্বিট’ শব্দের ব্যাখ্যা কর।
হইয়াছে-
“পিতৃদ্বি-পিতরি জীবতি তাড়নাদিকৃৎ, মৃতে ভচ্ছাদ্ধাদি
বিমুখ।
উত্তশ্লোকের বঙ্গানুবাদ—পিতৃদ্বেষী এবং পিতার শ্রাদ্ধাদি
বিমুখ, পতিত, পণ্ড ও উপপাতক—যুক্ত লােক ঔরস পুত্র
হহলেও মৃতপিতৃ-পনের অধিকারী হয় না; ক্ষেব্রজ পুবদিগের
কথা ত দূরে থাকুক।
(৩৫) পিতৃপূজন পদ্ধতি এমনই ঘনিষ্ঠ ভাবে সন্নিবিষ্ট হইয়া রহিয়াছে যে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানকে বিচ্ছিন্ন করিয়া, আনুষ্ঠানিক কোন গৃহী ব্রাহ্মণেরই, এক মূহুৰ্ত্তও তাহার ব্রাহ্মণ্য-ধৰ্ম্ম রক্ষা করিয়া চলিতে পরিবার উপায় নাই। মানবদেহ হইতে অস্থি মজ্জা বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিলে যেমন কোন মনুষ্য এক মূহুর্তও জীবিত থাকিতে পারে না, সেইরূপ'পিতৃপূজন এবং শ্রদ্ধ তর্পণকে পরিহার করিয়া কোন গৃহস্থ ব্রাহ্মণ এক মূহুৰ্ত্তও নিজের ব্রাহ্মণ্যধৰ্ম্ম সজীব রাখিতে সমর্থ নহেন। এই জন্যই একথা নিঃসংশয়ে বলা যাইতে পারে যে ব্রাহ্মণ্য- ধর্মের দেহাভ্যন্তরস্থ ওজঃ ধাতু এবং অস্থি মজ্জাই হই- তেছে-ব্রাহ্মণের অনুষ্ঠিত দেব, ঋষি ও পিতৃ পূজন এবং শ্রাদ্ধ তর্পণ। পুরাণাদি প্রাচীন প্রামাণ্য গ্রন্থের অনেক স্থানে দেব পূন হইতেও পিতৃ পুজনেরই প্রাধান্য অধিক উচ্চনাদে কীৰ্ত্তিত হইয়াছে। * শ্রাদ্ধ কাৰ্য সমাপন করিয়া ব্রাহ্মণ মাত্রেই পিতৃলােক ৰাসী পিতার উদ্দেশে এই মন্ত্র উচ্চারণ পূৰ্ব্বক অঞ্জলি করে পুনঃ পুনঃ প্রণাম করেন- *ভগবান স্বয়ং গরুড়ের প্রশ্নের উত্তরে গরুড়পুরাণে বলিতেছেন- “দেবকাৰ্য্যপি সদা পিতৃ কাৰ্যং বিশিষ্যতে। দেবতভ্যঃ পিতৃনাং হি পূৰ্বমাপ্যয়ন শুভং। (গরুড় পুরাণ, একাদশ অধ্যায় ষ্ট্য।)
(৩৬) *পিতা স্বর্গ পিতা ধর্মঃ পিতা হি পরমস্তপঃ। পিতরি প্রতিমাপন্নে প্ৰীয়ন্তে সৰ্ব্ব দেবতা” ইহার মর্মার্থ এই যে,—পিতা স্বর্গ স্বরূপ, পিতাই সকল ধর্মের মূল, পিতাই পরম তপঃ, পিতা সন্তুষ্ট হইলেই সমস্ত দেবতাগণ সন্তুষ্ট হন। শ্রাদ্ধানুষ্ঠান পরায়ণ ব্রাহ্মণের উচ্চ দৃষ্টিতে পিতৃলােক যে কতই অত্যুচ্চ স্থানে সংস্থিত তাহা এই প্রণাম মন্ত্রেই প্রকাশ করিতেছে। ৫। বেদ পুরাণ এবং ধর্মশাস্ত্রাদিতে কত প্রকার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের কথার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায় ? বেদে যদিও একোৰ্দিষ্ট” ‘পাৰ্বণ’ প্রভৃতি সংজ্ঞামূলক শ্রাদ্ধের বর্ণনা দেখিতে পাওয়া যায় না, তথাপি প্রতিদিন এবং যজ্ঞ-বিশেষের জন্য পিতৃগণের উদ্দেশ্যে অগ্নিতে আহুতি দিবার ব্যবস্থা রহিয়াছে। ইহাকে নিত্য 'শ্রাদ্ধেরই রূপান্তর বলা যাইতে পারে। স্মার্ত শিরােমণি রঘুনন্দন কৃত শ্রাদ্ধতত্বে নয় প্রকার শ্রদ্ধের কথা উক্ত হইয়াছে । ভবিষ্যপুরাণে দ্বাদশ প্রকায় “পার্বণশ্রাদ্ধ, মঘাত্রয়ােদশীশ্রাদ্ধ, অষ্টকাশ্রাদ্ধ, নবান্ন শ্রাদ্ধ, একোদিষ্টশ্রাদ্ধ, আদ্যশ্রাদ্ধ, সপীকরণ, অভদয়িক- শ্রাদ্ধ, এই নয় প্রকার শ্রাদ্ধের কথার আলােচনা রঘুনন্দন কৃষ্ঠ শ্রদ্ধতত্ব গ্রন্থে দেখা যায়।
( ৩৭ )
শ্রদ্ধেয় কথা বর্ণিত হইয়াছে। । ধৰ্ম্মসংহিতাকার
বৃহস্পতি বলেন, শ্রাদ্ধ পঞ্চবিধ ; কুৰ্ম্মপূরাণেও পাঁচ
প্রকার শ্রাদ্ধের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। যমস্মৃতিতেও
পঞ্চবিধ শ্রাদ্ধের বর্ণনা আছে ।* * * মৎস্য পুরাণে ত্রিবিধ
শ্রাদ্ধের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। ৪
এইরূপ বিভিন্ন পুরাণেও স্মৃতিগ্রন্থে শ্রাদ্ধের কথা সম্বন্ধে
কোন স্থানে অপেক্ষাকৃত বিস্তার বা কোন স্থানে অপেক্ষা-
কৃত সংক্ষেপ বর্ণনা থাকিলেও মােটের উপর ব্রাহ্মণের
অনুষ্ঠেয় এই সমস্ত শ্রাদ্ধকে (১) নিত্য ও (২) কাম্য
** নিত্যং নৈমিত্তিকং কাম্য বৃদ্ধি শ্ৰাদ্ধং সাপীনং।
পাৰ্বণঞ্চেতি বিজ্ঞেয়ং গােষ্ট্যাং শুদ্ধর্থমষ্টম।
কৰ্ম্মাঙ্গং নবমং প্রােক্তং দৈবিকং দশমূং স্মৃতং।
যাত্রার্থৈকাদশং প্রােক্তং পুষ্ট্যর্থং দ্বাদশং স্মৃতং ।
( ভবিষ্যপুরাণ।}
এ “নিত্য নৈমিত্তিকং কাম্যং বৃদ্ধিশ্রাদ্ধং তথৈব চ।
পাৰ্বণঞ্চেতি মনুন। শ্রদ্ধং পঞ্চবিধং স্বতং ।”
(বৃহস্পতি সংহিতা।)
*** নিত্য নৈমিত্তিকং কাম্যং বৃদ্ধিশ্রাদ্ধমথাপরং।
পাৰ্বণঞ্চেতি বিজ্ঞেয়ং শ্রাদ্ধং পঞ্চবিধং বুধৈঃ ।
(যম-সংহিতা।)
৫ “নিত্য নৈমিত্তিকং কাম্যৎ ত্রিবিধং শ্রদ্ধমুচ্যতে।
(কুৰ্ম্মপুরাণ)
(৩৮ ) প্রধানতঃ এই দুই ভাগে বিভাগ করা যাইতে পারে। শাস্ত্রকারের নিত্য শ্রাদ্ধের লক্ষণ করিয়াছেন--“অহনহনি যৎ শ্রাদ্ধং' তন্নিত্যমভিধীয়তে । অর্থ-প্রতিদিন যে শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান করা হয়, তাহাকে নিত্য শ্রাদ্ধ বলা হয় । একোদিষ্টাদি শ্রাদ্ধ ও নিত্য শ্রাদ্ধের অন্তর্গত। কাম্য শ্রদ্ধের লক্ষণ শাস্ত্রে এইরূপ দেখা যায়-“কামায় তু হিতং কাম্যমভিপ্রেতার্থ সিদ্ধয়ে। পার্বণেন বিধানে তদপুক্ত ( খগাধিপঃ)।” অর্থ-অভিলষিত সিদ্ধির জন্য যে শ্রাদ্ধ করা হয় তাহাকে “কাম্যশ্রাদ্ধ বলা হয় । (হে গরুড় !) তাহা ও পাৰ্বণশ্রাদ্ধের বিধান অনুসারে অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। যে দ্বাদশ প্রকার শ্রাদ্ধের কথা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে, তাহার প্রত্যেকের শস্ত্রীয় ভাষায় যে লক্ষণ বিবৃত হইয়াছে, তাহাই নিম্নে সংক্ষেপে উদ্ধৃত করিতেছি- (১) নিত্যশ্রাদ্ধ-“অন্যহনি যৎশ্রাদ্ধং তন্নিত্যমভিধীয়তে। অর্থ-প্রত্যহ যে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করা যায়, তাহাকে নিত্য- শ্রাদ্ধ বলা হয় । (২) নৈমিত্তিক শ্রাদ্ধ-“একোলিষ্ট যশ্ৰাদ্ধং তন্নৈমিত্তিক মিহােচ্যতে।” অর্থ—একোব্দিষ্ট (প্রভৃতি) শ্রাদ্ধকে নৈমিত্তিক শ্রাদ্ধ (৩৯) (৩) কাম্যশ্রাদ্ধ-কামায় তু হিতং কামং অভিপ্রেতার্থ- সিদ্ধয়ে। পার্বণেন বিধানেন তদপুঞ্জং খগাধিপ!।” অর্থ—অভিলষিত সিদ্ধির জন্য যে শ্রাদ্ধ, তাহাকে কাম্য- শ্রদ্ধ বলা হয়। হে খগাধিপ! তাহাও পার্বণের বিধানানুসারে অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। (৪; বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ—“বৃদ্ধৌ যৎ ক্রিয়তে শ্রাদ্ধ বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ উচ্যতে।” অর্থ-বৃদ্ধিকালে যে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়, অর্থাৎ উপনয়ন, অন্নপ্রাশন, বিবাহ ইত্যাদি সময়ে যে শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান করা যায়, তাহাকে বৃদ্ধিদ্ধ কহে। (৫) সপিণ্ডন শ্রাদ্ধ—“গন্ধোদক তিলৈযুক্তং কুর্যাৎপাত্র চতুষ্টয়ং। অর্ষার্থং পিতৃপাত্রে প্রেতপাং প্রসেচয়ে! যে সমান। ইতি দ্বাভ্যামেজ্জজ্ঞেয়ং সপিণ্ডনং। অর্থ-চন্দন, জল, ও তিল যুক্ত চারিটি পাত্র স্থাপন করিবে। অর্ঘের জল প্রেতপাত্র হইতে পিতৃপাত্রে প্রসেক করিবে; দুই পক্ষকে (প্রেত ও পিতৃপক্ষকে) সমান জ্ঞান করিবে। ইহাকে সপিণ্ডন শ্রাদ্ধ বলে। মােটের উপর মৃত্যুর এক বৎসর পরে প্রেতের পিতৃলােক প্রাপক যে শ্রাদ্ধ, তাহাকেই সপিণ্ডন শ্রাদ্ধ বলে। (৬) পাৰ্বণশ্রাদ্ধ- “অমাবস্যাং যৎ ক্রিয়তে তৎ পাৰ্বণ মুদাহৃতং। ক্ৰিয়তে বা পৰ্ব্বণি যৎ তৎ পাৰ্বণামিতি স্থিতি।
(৪০ ) অর্থ--অমাবস্যা তিথিতে যে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় অথবা পৰ্ব্বকালে যে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় তাহাকে পাৰ্বণ শুরু বলা হয়। (৭) গােষ্ঠী শ্রাদ্ধ- “গোষ্ঠ্যাং যৎ ক্রিয়তে শ্রাদ্ধং গােষ্ঠী শ্রাদ্ধং তদুচ্যতে।” অর্থ-গােষ্ঠীতে (গােশালায়) যে শ্রাদ্ধ করা যায় তাহাকে গোষ্ঠীশ্রাদ্ধ বলে। (৮) শুদ্ধ্যর্থশ্রাদ্ধ- “ক্রিয়তে শুদ্ধ্যয়ে য, ব্রাহ্মণান্তু ভােজন। শুদ্ধ্যই মিতি তৎ প্রােক্তং বৈনতেয় মনীষিভিঃ * অর্থ-শুদ্ধলাভের জন্য যে শ্রদ্ধানুষ্ঠানে ব্রাহ্মণ ভােজন করান হয়, হে গরুড়! তাহাকে মনীষীগণ শুদ্ধার্থ শ্রাদ্ধবলেন। (৯) কৰ্ম্মাঙ্গশ্রাদ্ধ- ক নিষেক কালে সােমে চ সীমন্তোন্নয়নে তথা । জ্ঞেয়ং পুংসবনে চৈব শ্রাদ্ধং কর্মঙ্গমেব চ। অর্থ—গর্ভাধানে, সােমরস পানে, সীমন্তোন্নয়নে এবং পুংসবনে যে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়, তাহাকে কৰ্ম্মাঙ্গ শ্রাদ্ধ বলা হয়। (১০) দৈবিক শ্রাদ্ধ- “দেবানুদ্দিশ যৎশ্রাদ্ধং তদৈবিকমিহােচ্যতে। হবিষ্যেণ বিশিষ্টেন সপ্তম্যাদিষু যত্নত'।
(৪১) অর্থ- সপ্তম্যাদি তিথিতে হবষাভােজী হইয়া যত্নের সহিত দেবতাদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া যে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করা হয়, তাহা দৈবিক শ্রাদ্ধ বলিয়া কর্থিত হয়। (১১) যাত্রার্গ শ্রাদ্ধ- গচ্ছন দেশান্তর যচ্চ শ্রদ্ধং কুর্যাস পর্ষা। যাত্রার্থমিত তৎ প্রােক্তং প্রবেশে চ ন সংশয়ঃ । ( তীগোদ্দেশ্যে ) দেশান্তর গমন সময়ে এবং (তীর্থ হইতে প্রত্যাগত হইয়া) দেশ প্রবেশ সময়ে ঘৃত দ্বারা যে শ্রাদ্ধ করা হয়, তাহাকে যাত্ৰাৰ্থ শ্রাদ্ধ বলা হয়। (১২) পুষ্ট্যর্থ শ্রাদ্ধ- “শরীরােপচয়ে শ্রদ্ধমর্থোপচয়ে এবচ। পুষ্ট্যর্থমেতৎ বিজ্ঞেয়মেপচয়িকমুচ্যতে”। অর্থ –শারীরিক বা আর্থিক উন্নতিলাভের জন্য যে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করা হয় তাহাকে পুষ্ট্যর্থ শ্রাদ্ধ কিম্বা ঔপচয়িক শ্রদ্ধ নামে অভিহিত করা হয়। যাজ্ঞবল্ক সংহিতাতে উক্ত হইয়াছে— “অমাবস্যাষ্টকাবৃদ্ধি কৃষ্ণপক্ষোহয়নদ্বয়ং। দ্রব্য ব্রাহ্মণ সম্পত্তি বিপৎ সূৰ্য্যসঙ্গমঃ। ব্যতিপতো গজচ্ছায় গ্রহণং চন্দ্রসূর্যয়েঃ । শ্রাদ্ধং প্রতি রুচিশ্চৈব শ্রদ্ধকালা প্রকীর্তিতা”।
(৪২)
অর্থ-“অমাবস্যা, অষ্টক (১) বৃদ্ধি (২) কৃষ্ণপক্ষ,
অনদ্বয়, (দক্ষিণায়ন ও উত্তরায়ন), বিষুব সংক্রান্তি,
ৰাতিপাত যােগ, গজচ্ছায়া (৩), চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, শ্রদ্ধের
প্রতি রুচি হওয়া, দ্রব্য সংগ্রহ হওয়া, এবং ব্রাহ্মণ প্রাপ্ত
হওয়া, এই কয়টি শ্রদ্ধের কাল বলিয়া জানিবে। এই
শ্রাদ্ধকালের নামানুসারে অনেক সময় শ্রদ্ধের নামকরণ
হইয়া থাকে ; যথা,—অষ্টকা-শ্রাদ্ধ, গ্রহণ-শ্রাদ্ধ, ইত্যাদি।
৬-৭। ঐ সকল শ্রাদ্ধানুষ্ঠান দ্বারা অনু-
ষ্ঠাতার এবং যাহাদের উদ্দেশ্য শ্রদ্ধানুষ্ঠান করা
হয় তাহাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কত
প্রকার ফল প্রাপ্তি হইয়া থাকে ? এবং তাহা
কি ভাবে সংঘটিত হইয়া থাকে ?
(১) গৌণ চান্দ্র পৌষ মাঘ এবং ফাল্গুনের কৃষ্ণা অষ্টমী
. তিথিকে অষ্টকা বলে । ঐ সকল দিনে পিষ্টক, মাংস
এবং শাক দ্বার' যে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় তাহাদিগকেই অষ্টকা
এদ্ধ বলে। কেহ কেহ বলেন গৌণ চান্দ্র আশ্বিন মাসের
কৃষ্ণা অষ্টমী ও অষ্টকার অন্তর্ভূক্ত।
(২) বৃদ্ধিকাল-অভুদয়কাল (উৎসৰ সময়)।
(৩) গজচ্ছায়া অর্থ যোগবিশেষ।
“কৃষ্ণপক্ষে ওয়েদাং মঘাষিন্দুঃ করে ববি।
যদা তদা গজচ্ছায়া শ্রাদ্ধে পুণ্যৈরবাপ্যতে।”
(৪৩)
ইহার উত্তর দুইটি পথ ধরিয়া আমরা অনুসন্ধান করিতে
পারি। (১) শাস্ত্রমূলক ও (২) লৌকিক যুক্তিমূলক। প্রথমতঃ
শাস্ত্রীয় পথেরই অনুসরণ করা যাউক। শ্রাদ্ধানুষ্ঠান দ্বারা
অনুষ্ঠাতার ইহলৌকিক যে সকল ফল প্রাপ্তি হইতে পারে
তদ্বিষয়ে মৎস্য পুরাণে এইরূপ ক থ ত হইয়াছে-
বংশ বৃদ্ধি করণ শক্তি, অনুরক্ত। স্ত্র, উপাদেয় খাদ্য দ্রব্য
এবং ভােজন শক্তি, বিভব এবং দান শক্তি, শারীরিক
সৌন্দৰ্য্য, এবং স্বাস্থ্য এই গুলি শ্রাদ্ধকার্যের পুস্পস্বরূপ ; আর
ব্ৰহ্মলােক প্রাপ্তিই হইতেছে পরিণাম পরিপক্ক ফল স্বরূপ।
গরুড় পুরাণে একস্থানে উক্ত হইয়াছে-
পিতৃপূজা হইতে অর্থাৎ—পিতৃশ্রাদ্ধাদি অনুষ্ঠান সম্পন্ন
করিলে পরমায়ু, গুণবান্ পুত্র, যশঃ, স্বর্গলােক, কীর্তি, পুষ্টি,
বল, সৌন্দৰ্য্য, গে! মেষদি পশু-সম্পতি, সুখ, ধন, ধান্ত
প্রাপ্ত হওয়া যায় ।।
অর্থাৎ—সখন কৃষ্ণপক্ষে ত্রয়োদশ তিথিতে মঘা নক্ষত্রে
চন্দ্র এবং হস্তা নক্ষত্রে সূৰ্য্য অবস্থান করেন, তখন গজচ্ছায়া
যােগ হয়।
“বৃতিশক্তিঃ স্ত্রিয়ঃ কান্তা ভােজ্যং ভােজনশক্তিতা।
দানশক্তিঃ সবিভব! রূপমালােগ্যসম্পদ।
শ্রাদ্ধপুষ্পমিদং প্রােক্তং ফলং ব্ৰহ্ম সমাগমঃ।”
( মৎস্যপুরাণ)।
অয়ুঃ পুত্ৰা যশঃ স্বর্গং কীর্তিং পুষ্টিং বলং শ্রিয়।
পুখুন সৌখ্যং ধন ধান্য প্রাপ্তয়াৎ পিতৃপূজনাৎ।
(গরুড় পুরাণ)।
( ৪৪)
জাবালি ঋষি বলেন-যে ব্যক্তি সূর্য সিংহ রাশিতে
উপস্থিত হইলে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পন্ন করেন তিনি পুত্র, দীর্ঘায়ু,
স্বাস্থ্য, অতুল ঐশ্বর্য্য প্রাপ্ত হয়েন এবং তাহার কামনা সকল
সিদ্ধ হয়। *
শ্রদ্ধকৰ্ত্তার পারলৌকিক ফল প্রাপ্তি সম্বন্ধে মহামুনি
অত্রি-পুত্র, ভ্রাতা, পৌত্র বা দৌহিত্র ইহারা পিতৃকাৰ্য
সম্পাদনে রত থাকিলে অর্থাৎ-শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করিলে পরম
গতি লাভ করেন ।।
ষজ্ঞবল্ক সংহিতায় শ্রাদ্ধের ফলশ্রুতিতে কথিত
হইয়াছে-“বিধানানুসারে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করিলে শ্রাদ্ধকৰ্ত্তা
স্বর্গ, সন্তান, শৌর্যবীর্য, ক্ষেত্র, বল, পুত্র প্রাধান্য, সৌভাগ্য,
ঐশ্বৰ্য, স্বপ্রাধান্য, বাণিজ্যসিদ্ধি, অরােগীতা, যশঃ শােক --
রাহিত্য, শ্রেষ্ঠগতি অর্থাৎ ব্রহ্মলােক, ধন, ধৰ্ম্ম, চিকিৎসা-
সিদ্ধি, স্বর্গ, ছাগ সমুহ, অৰ্থ দম্পত্তি প্রভৃতি প্রাপ্ত
হয়েন।” এ
। পুত্ৰানায়ুস্তথঃরোগ মৈশ্বৰ্য্যমতুলন্তথা।
প্রাপ্নোতি পঞ্চ মে দত্বা শ্ৰাদ্ধং কামান্ সুপুষ্কলান্ ।
( জাবালি)।
# পুত্র বা ভ্রাতরং বাপি দৌহিত্র পৌত্রক তথ্য ।
পিতৃকাৰ্য্য এসক্ত। যে তে শান্তি পরমাং গতিং ।
( অত্রিসংহিতা)।
এ স্বর্গং হপতামােজশ্চ শৌর্যং ক্ষেত্ৰং বলং তথা ।
পুত্ৰশ্রৈষ্ঠঞ্চ সৌভাগ্যৎ সমৃদ্ধিং মুখ্যতাং গুতাম্।
(৪৫) ঋগ্বেদের একস্থানে পিতৃপুরুষগণের পূজা অন্তে বৰু প্রাপ্তিসূচক যে একটি প্রার্থনা মন্ত্র দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা পড়িলে ইহকাল এবং পরকালের মঙ্গলবিধানের তাহাদের যে ক্ষমতা আছে তাহা অনায়াসে বুঝিতে পারা যায়। এই সংক্রান্ত মুল সূক্তের ভাষ্যের বঙ্গানুবাদ এই- “সুগতি সম্পন্ন, সােমরস পানে অধিকারী, অঙ্গিরা নামে পরিচিত অথৰ্ব্বা নামধেয় এবং ভৃগুনামে পরিচিত যে সকল পিতৃপুরুষগণ আছেন, সে সমস্ত যজ্ঞাহ পিতৃগণের অনুগ্ৰহযুক্ত বুদ্ধিতে যেন আমরা সর্বদা অবস্থান করি ; এবং তাহাতে যেন আমাদের মঙ্গল হয়।” আমরা শ্রাদ্ধ এবং তৰ্পণ করিবার সময়ে সাধারণত অগ্নিস্বত্তা প্রভৃতি যে সকল পিতৃপুরুষের নাম উচ্চারণ প্রবৃত্তচক্ৰতাং চৈব বাণিজ্য প্রভৃহীনপি। অরােগিত্বং যশো বীতশােক ত্বং পরমাঙ্গতিম্। ধনং বেদান্ ভিষসিদ্ধিং কুপাঙ্গাঅপজাবিকম্ । অশ্বনায়ু বিধিবদঃ শ্ৰদ্ধং সং প্রযচ্ছতি । কামানাপু,সাদ মান্। ( যাজ্ঞবল্ক সংহিতা)। অঙ্গিরসঃ আঙ্গিবােনামকাঃ, অথৰ্ব্বাণঃ অথৰ্ব্বা- নামকাঃ, ভূগব: তৃগুনামকাশ্চ নোহস্মাকং পিতরঃ নবথা অভিনবগমনযুক্তা (তদা নূনবৎপ্রীতিজনকা ইত্যর্থ: ।) * ( ৪৬) করিয়া থাকি ঐ সকল নামের মধ্যে উপরি উদ্ধৃত বেদোক্ত অথৰ্ব্ব! ভূত পিতৃপুরুষের নাম দেখিতে না পাওয়া গেকেও উহা যে একের নামান্তর মাত্র, বরাহ পুরাণে মার্কণ্ডেয় ঋষির উক্তিতে তাহা অতি সুন্দরভাবে পরিস্ফুট হইয়াছে । বরাহ পুরাণের এই অংশ পাঠ করিলে পিতৃলোকের পরিচয় এবং যথাবিধি শ্রাদ্ধক্রিয়া সম্পন্ন হইলে পিতৃলােকের পর- তৃপ্তর কারণাদি কতকটা পরিস্কার রূপে বুঝা যাইতে পারে, বিবেচনা করিয়া, এখানে তাহা একটু বিস্তৃতভাবে উদ্ধত করতেছি—গৌরমুখ মুনি নামক এক ব্যক্তি মার্কণ্ডেয়কে জিজ্ঞাসা করিলেন “পিতৃগণ কোন কালে কোথায় বাস করেন ? তাহাদের সংখ্যাই বা কত? ইত্যাদি বিবরণ সকল আমাকে বলুন ।” মার্কণ্ডেয় মুনি উত্তরে বলিলেন- “মারীচি অত্র প্রভৃতি সপ্ত মহর্ষি পিতৃনামে অভিহিত হইয়া পিতৃলােকে অবস্থিতি করিতেছেন। তাহাদের চারিজন মূৰ্ত্তিমান, এবং তিনজন মূর্তি বিহীন পুরুষ। সন্তানক নামে যে সকল তেজোময় পুরুষ এখানে বাস করেন, তাহারা দেব- গণের পিতৃপুরুষ; দেবগণ ইহাদিগকে পূজা করেন, ইহার। - হে চ সােমাস। সােমমহম্ভীতি সােম্যান। যক্তিয়ানাং যজ্ঞাহাণং তেষাং সুমতে অনুগ্রহ যুক্তায়াৎ বুদ্ধৌ বয়ং স্যাম সর্বদা তিষ্ঠেম। অপি চ সেমিনসে ভদ্রে সেমিনসস্ত কারণে ফলে কল্যাণে স্যামঃ সর্বহা তিমেঃ।” (ঋগ্বেদ সায়ন জাষ্য ।
।
(৪৭)
এক শত যুগের পরে ব্রহ্মবাদী হইয়। পুনরায় জন্ম গ্রহণ করেন।
ইহারা পুনরায় আত্মস্মৃতি অবলম্বন করিয়া সাধযােগে
চিনিবিষ্ট রাখিয়া পুনরাবৃত্তি অহতি বিশুদ্ধ যােগগতি লাভ
করেন। এই সকল পিতৃগণ শ্রাদ্ধে পরিতৃপ্ত হইয়া থােগী-
দিগের ষােগ শক্তি বৃদ্ধি করিয়া দিয়া থাকেন ।
ইহার পরে শ্রাদ্ধের উপযুক্ত কালাদির বিষয় বর্ণনা
করিয়া মার্কণ্ডেয় মুনি বলিতেছেন-মানবদিগের চিত্ত, বিত্ত,
প্রশস্ত কাল, শ্ৰাদ্ধবিধি, পাত্র, এবং পরম ভক্তির বিষয় যেরূপ
গৌরমুখ উবাচ।
* “যে চ তে পিতরো ব্ৰহ্ম যং চ কালং সমাসতে।
কিয়তো বৈ পিতৃগণাস্তনি লােকে ব্যবস্থিত।
মার্কণ্ডেয় উবাচ।
প্রবর্তন্তে বরাঃ কেচি দেবানাং সােমবর্ধনা।
তে মরীচ্যাদয়ঃ সপ্ত স্বর্গে তে পিতরঃ স্বঃ।
চত্বারো মূৰ্ত্তিমন্তে। বৈ অয়ন্যে হমূৰ্ত্তয়ঃ।
তেষাং লােক-নিসর্গঞ্চ কীৰ্ত্তায়িষ্যামি তৎ সৃণ।
লােক। সন্তানকা নাম যত্র তিষ্ঠন্তি ভাস্বরাঃ।
দেবানাং পিতরস্তে হি তান্ যজীহ দেবতা।
এতে ৰৈ লােক-বিভ্রষ্ট। লােকান্ প্রাপ্য সনাতনান।
পুনযুগ শতান্তে জায়ন্তে ব্ৰহ্মবাদিন।
তে প্রাপ্য তাং স্মৃতিং ভূয়ঃ সাধ্যযযাগমনুত্তমম্।
চিন্ত্য যােগগতিং শুদ্ধাং পুনরাবৃত্তি দুর্লাম্ ।
( ৪৮ )
বলিলাম ইহা যথাযথভাবে অনুসৃত হইলে পিতৃগণ সৰ্বাতিষ্ট
দান করিতে পারেন। *
বিষ্ণুপুরণে ঔর্ব মুনির মুখনিঃসৃত উক্তিতে জানিতে
পারা যায় শ্রদ্ধা সমন্বিত শ্ৰদ্ধক্রিয়া সম্পাদন দ্বারা কেবল
পিতৃগণকেই যে পরিতৃপ্ত করা হয় তাহাই নহে, উহার দ্বারা
ব্রহ্মা, ইন্দ্র, রুদ্র, অশ্বিনী কুমারদ্বয়, সূৰ্য, অগ্নি, বসু, মরুৎ,
বিশ্বদেব, ঋষি, মানুষ, পশু, পক্ষী, সরীসৃপ প্রভৃতি অথিল
ত্রিলোেক বাসীর তৃপ্তি সাধিত হয়। ।
এতে স্ম পিতরঃ শ্রাদ্ধে যােগিনাং যােগবর্ধনাঃ।
আপ্যায়িত্ত তে সৰ্ব্বে যােগিযােগ বলেন চ।
এষ বৈ প্রথম সর্গঃ সােমপান মনুত্তমঃ।
এতে ত একতনবাে বৰ্ত্তন্তে দ্বিজসত্তমাঃ ।
( বরাহ পুরাণ।
* চিঞ্চ বিত্তঞ্চ নৃনং বিশুদ্ধ
শান্তশ্চ কালো কথিতো বিধি।
পালং যথােক্তং পরমা চ ভক্তি
নৃনাং প্রযচ্ছত্যভিবাঞ্ছিতানি।
(বরাহ পুরাণ। )
। ব্রহ্মেন্দ্ররুদ্ৰনাসত্য-সূৰ্য্যাগ্নিবসুমারুতা।
যশ্বেদেবানৃষিগণা বয়াংসি মনুজা পশূন
সরীসৃপা পিতৃগণ যচ্চাদ্ভূত সংজ্ঞক।
শ্রাদ্বা শ্রদ্ধান্বিত কুৰ্ব্ব তপত্যখিলং হি ।
(বিষ্ণুপুরাণ)
(৪৯}
't.
পিতৃপুরুষের শ্রাদ্ধ করিলে যে সমগ্র জগৎ, এমন কি
ভগবান বিষ্ণু ও স্বয়ং পরিতৃপ্ত হইয়া থাকেন, এমন কথা
তাহার নিজের উক্তি দ্বারা প্রকাশিত হইয়াছে। যথা
গরুড়পুরাণে বিষ্ণু বলিতেছেন—“যাহারা দেব, ব্রাহ্মণ,
অগ্নি ও পিতৃগণের অর্চনা করে, সৰ্বজন অন্তরাত্মা আমিই
তাহাদিগের দ্বারা পূজিত হইয়া থাকি। মানব বিভবানু-
সারে স্মাৰ্ত্তবিধানানুযায়ী শ্রাদ্ধ কার্য সম্পাদন করিলে ব্রহ্মার
স্থিতিকাল পর্যন্ত সমস্ত জগৎ তদ্বারা প্রীত খাকে। * *
শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠাতার মঙ্গলের বিষয় সমালােচনায় নিরন্ত
হইয়া যাহার উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করা হয় শ্রাদ্ধ দ্বারা তাহার
কি উপকারই হয় এখন সেই বিষয় কিঞ্চিৎ আলোচনা
করা যাউক।
গরুড় পুরাণে বিষ্ণুকর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে—মৃত
ব্যক্তি যে
স্থানে যে অবস্থায় অবস্থান করেন,
অর্থাৎ পুনর্জন্ম লাভ করিয়া মর্ত্যধামে মনুষ্যরূপেই অবতীর্ণ
হন, পূণ্যকর্মের ফলে স্বর্গ সুখ ভােগ করিতেই থাকুন
অথবা স্বকৃত-কর্মের দোষে তিৰ্য্যগ যােনিতে জন্মহণ করুন
কেন; শ্রাদ্ধকালে শ্রদ্ধার সহিত প্রদত্ত পিণ্ডাদি, মৃত
* “যে যজন্তিপিতৃন্ দেবান্ ব্রাহ্মণাংশ্চ হুতাশনম্ ।
সৰ্ব্বভূতান্তরাত্মানং মামেব হি যজন্তে তে।
আৰ্ত্তেন বিধিনা শ্রাদ্ধং কৃত্বা স্ব-বিভবেচিত।
ব্ৰহ্ম-স্থাবর-পৰ্য্যন্তং জগৎপ্রীতি মানৰঃ ॥”
(গরুড় পুরাণ।
(৫০)
ব্যক্তির তৎ
জন্মের (লব্ধজন্মের) ভক্ষরূপে তাহার
নিকটে উপস্থিত হইয়া থাকে, এবং তাহা পাইয়া পিতৃগণ
পরিতৃপ্ত হইয়া থাকেন। *
নিজ বাটীতে বসিয়া পিণ্ড দান করিলে কি উপায়ে
বহু দূর হইতে এই পিণ্ডাদি পিতৃগণ প্রাপ্ত হইয়া পরিতৃপ্তি
লাভ করিতে পারেন
স। এইরূপ আশঙ্কা নিরাকরণ করিবার
জন্য গরুড় পুরাণে কথিত হইয়াছে—পিতৃগণের নাম, গােত্র
এবং ভক্তিসহকারে পঠিত মন্ত্র সকলই হইতেছে হ্য,
কব্যের প্রাপক। অগ্নিাদি পিতৃগণ, পিতৃলােকের উদ্দেশ্যে
প্রদত্ত পিণ্ডাদি তাহাদের নিকট পৌছাইয়া দিবার জন্য
ব্যবস্থিত রহিয়াছেন। যাহার উদ্দেশ্যে যোগ্য কালে নাম,
গােত্র এবং মন্ত্রোচ্চারণ পূৰ্ব্বক ন্যায়ানুমােদিত ভাবে
যথাবিধি যাহা - কিছু প্রদান করা যায়, তাহারা সেই
উদ্দষ্ট প্রাণী যেখানে আছে, তাহা সেই স্থানে প্রেরণ
• দেবো যদ্যপি জাতােহয়ং মনুষ্য: কৰ্ম্মযােগতঃ ।
তস্যান্নমমৃতং ভূত্ব। দেবত্বেপনুযাতি চ।
গান্ধৰ্বে ভোগরূপেন পশুত্বে চ তৃণং ভবেৎ।
শ্রদ্ধং হি বায়ুরূপেন নাগত্বেহপানুগচ্ছতি ।
ফং ভবতি পক্ষিত্বে রাক্ষসেযু তথামিষং।
দানবত্ব তথা মাংসং প্রেতত্বে রুধিরং তথা।
মনুষ্যত্বেহঃপানাদি-বালাভােগরপােভবেৎ।
(গরুড়পুরাণ)
(৫১)
করেন। যদি কোন জীব শতসহস্র যােনিও ভ্রমণ করিয়া
থাকেন, তথাপি সেই শত সহস্র জন্মের পূর্ব-যোনিজ
সন্তানগণ সেই বহু পূৰ্ব্ব জন্মের নাম, গোত্রাদি উল্লেখ
করিয়া শ্রাদ্ধ করিলে, তাহার প্রত্যেক শ্রদ্ধ দ্বারা সেই
জীবের তৃপ্তি হইয়া থাকে।
ঐ পুরাণেরই অন্য স্থানে উক্ত হইয়াছে-বসু, রুদ্র,
দেবগণ শ্রাদ্ধ দেবতা; ইহারা সন্তুষ্ট হইয়া পিতৃগণের
তৃপ্ত উৎপাদন করেন। গর্ভিণী রমণী দোহদ সেবাদ্বারা
যেমন নিজের ও গর্ভের উভয়েরই পুষ্টিসাধন করেন,
সেইরূপ শ্রদ্ধ হইতে দেবগণ নিজেদের এবং মানবদিগের
পিতৃগণের পুষ্টিসাধন করিয়া থাকেন। +
* নামগােত্ৰং পিতৃনাং বৈ প্রাপকং হব্যকব্যয়াের।
শ্রাদ্ধস্ত মাস্তদ্বৎ ভূপালভ্যশ্চ ভক্তিতঃ ।
অগ্নিহৃদয় স্তেষা মাধিপত্যে ব্যবস্থিত।
কালোয় গতং পাত্রে বিধিনা প্রতিপাদিতং।
অনুং নয়ান্ত তত্রৈতে জন্তুর্যাবতিষ্ঠতে।
নাম গােত্র মন্ত্রণ্ট দমন্নং নয়স্তিতে।
অপি যােনিশতং প্রাপ্তাংস্তাং স্তৃপ্তিরুপতিষ্ঠতি।
তেষাং লােকান্তরস্থানাং বিবিধৈর্নাম গােত্রকে।
(গরুড় পুরাণ)
* বরুদ্রাদিতি সুতাঃ পিতরঃ শ্রাদ্ধদেবতা।
প্রণয়ন্তি মনুষ্যানাং পিতৃন্ শ্রদ্ধেযু পিতাঃ ।
{ ৫২) আর এক স্থানে দেথিতে পাওয়া যায়—প্রোণ শ্রদকালে যমরাজের কঠোর শাসন বিধান হইতে মুক্ত হইয়া শ্রাদ্ধ স্থানে উপস্থিত হন এবং শ্রাদ্ধে নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণের সহিত ভােজন করিয়া তৃপ্ত হইয়া থাকেন। । নানা পুরাণ হইতে এইরূপ অসংখ্য বচন উদ্ধৃত করিয়া শ্রাদ্ধানুষ্ঠান দ্বারা অনুষ্ঠাতার এবং যাহার উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ করা হয় তাহার ইহকাল ও পরকালের অসীম মঙ্গল সংঘটিত হয়, ইহা দেখান যাইতে পারে । শাস্ত্রীয় চশমা খুলিয়া রাখিয়া, সাধারণ লোক- বিচার-চশমা চক্ষে ধরিয়া, তাহারই ভিতর দিয়া, শ্রাদ্ধ ব্যাপারটিকে এখন একটু বুঝিতে চেষ্টা করা যাক— যাহারা পরলােকে যাই বসতি করিতেছেন, তাহাদের পবিত্র কণ্ঠস্বর পরপর হইতে এপারে অবস্থিত সাধারণ লােকের কর্ণরন্ধে সকল সময় সমান ভাবে আসিয়া আত্মানং গুণিী গর্ভমপি প্রণাতি বৈ যথা। দোহদেনে তথা দেবা শ্রাদ্ধেঃ স্বাংশ্চ পিতৃবৃনাং। (গরুড়পুরাণ) + শ্রদ্ধকালে যমঃ প্ৰতা পিতৃশ্চাপি যমালয়াৎ। বিসর্জয়তি মানুষ্যে নিরয়াদপি কাশ্যপঃ ॥ নিমন্ত্রি তাস্তু যে বিপাঃ শ্রাদ্ধ পূৰ্বদিনে খগ । প্রবি পিতন্তেষু ভূক্তৃা শান্তি প্ৰমালয়ম। (গরুড় পুরাণ)
পৌছিতে পারে না; এজন্য এখানে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করিলে,
পরলােকস্থিত জীবের কি ফললাভ হয়, তাহা তাহাদের
মুখের কথায় আমাদের জানতে পারিবার সহজ উপায়
নাই; কাজেই শাস্ত্রীয় টেলিফোন কাণে ধরিয়া সে সকল
তত্ত্ব অনেক সময় আমাদের জানিবার প্রয়ােজন হয়।
ইহলােক ৰা এপারে স্থিত শ্রাদ্ধানুষ্টাতাদের অবস্থা অন্যরূপ।
শ্রাদ্ধানুষ্ঠান দ্বারা কি ফললাভ হয় তাহা তাহারা ইচ্ছা করিলে
শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করিয়া কতকটা নিজেই উপলব্ধি করিতে
পারেন। প্রিয়তম পিতা, মাতা, পত্নী, কিম্বা সন্তানের
মৃত্যুর পরে, তাহার জীবাত্মার সদ্গতি কামনা করিয়া যিনি
শ্রদ্ধা সমন্বিত হইয়া যথাসময়ে যথাবিধি শ্রাদ্ধ ক্রিয়া সম্পন্ন
করিয়াছেন, তিনি ক্রিয়া সম্পন্নের সঙ্গে সঙ্গে একটা
অনির্বচনীয় আনন্দ নিজের হৃদয়ে অনুভব করিয়াছেন।
ঐ আনন্দ সুপেয় পানীয় বা সুখাদ্য-দ্রব্য নিজে উদরস্থ
করা হইতে যে উৎপন্ন হয় নাই ইহা তাহাকে স্বীকার
করিতেই হইবে। যাহার উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ করা হয় শ্রদ্ধ
দ্বারায় তাঁহার যে আনন্দ হয় সেই আনন্দই শ্রাদ্ধ কৰ্ত্তার
হৃদয়ে প্রতিবিম্বিত হইয়া শ্রদ্ধকৰ্ত্তার ঐ আনন্দ উৎপন্ন হয়।
ঐ আনন্দ যে “প্রতিফলিত-আনন্দ” বা “প্রতিবিম্বিত
আনন্দ,” ইহা মনে করিতে কোনই বাধা নাই। যাহারা
জীবাত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাসী এবং পরলােকে আস্থাবান
তাহাদিগকে উলখিত লিন্নান্তে
সিদ্ধান্তে উপনীত না হইয়া
উপায়ন্তর নাই।
(০)
হার সহিত ইহলৌকিক সর্ব প্রকার সম্বন্ধ বন্ধন ছিন্ন
হইয়া গিয়াছে, তাহাদের সহিত একটা মধুর পারলৌকিক
সম্বন্ধ বিজড়িত র খিবার পক্ষে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের ন্যায় আর
দ্বিতীয় বস্তু জগৎ সংসারে কিছুই নাই। যাহার সহিত এ
পৃথিবীর আর কিছুই সম্বন্ধ নাই, যাহাকে চক্ষে দেখিতে
পাইবার উপায় নাই, যাহার মুখের কথা কানে শুনিবার
আর কোনই সম্ভাবনা নাই, ইচ্ছা করিলেও আর যাহাকে
কোনরূপ শারীরিক সেবা করিবার সামর্থ্য নাই; এ অবস্থাতে
তাহার সদ্গতি প্রাপ্তির বাসনাই, হৃদয়ে ধরিয়া রাখিবার
একমাত্র সামগ্রী আমাদের সম্মুখে বিদ্যনান, এই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান
সেই বাসনাটীকে নিত্য সজীব ও সতেজ রাখতে পারে।
এই দিক দিয়া বিবেচনা করিলে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের উপকারিতা
অপরিমেয়। এখন একটি ক্ষুদ্র সত্য ঘটনার অবতরণ করিয়া
এই অধ্যায়ের সমাপ্তি করিব। বহুদিন গত হইল এই
প্রবন্ধ লেখকের পিতার একোৰ্দিষ্ট শ্রদ্ধ তিথিতে তঁাহাকে
পরলােকসী পিতার উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধের অন্যান্য কাৰ্য
শেষ করিয়া পিণ্ডপাক এবং পিণ্ডদান করিতে দেখিয়া
তাহার পঞ্চম বর্ষীয় পুত্র কাৰ্য শেষ হইলে তাহার নিকট
আসিয়া আবদার করিয়া বলিয়াছিল—“বাবা, আপনি
যেমন আপনার বাবাকে পরমান্ন পাক করিয়া খাওয়াইলেন
আমারও ভারী ইচ্ছা করে তেমনি করিয়া পরমান্ন পাক
করিয়া আপনাকে খাইতে দেই।' শিশুর ঐ ভাবের
(৫৫) অকপট অনুরাগ দেখিয়া এই প্রবন্ধ লেখককে সে সময়ে হাসিয়া বলিতে হইয়াছিল—“সে জন্য চিন্তা কি, আমি যখন মরিয়া যাইব, তখন তুমিও অমর জন্য এইরূপ শ্রাদ্ধ করিবে আর পিও পাক করয়া আমাকে এই মত খাইতে দিবে।” বালক একটু লজ্জিত হইয়া বলিল-“না না, আমিত হা বলিতেছি না; মরিয়া গেলে নয়, এখনই এইমত করিয়া পরমান্নের পিণ্ড দিয়া আপনাকে খাওয়াইতে আমার ইচ্ছা করিতেছে!” হিন্দু বাড়ীতে, হিন্দু গৃহকর্তা, তঁাহার মৃত পিতা মাতার উদ্দেশে শ্রদ্ধার সহিত শ্রাদ্ধ তৰ্পণ করিয়া তাহার নিজ গৃহের শিশু সন্তান-সন্ততির কোমল হৃদয়ে যেরূপ পিতৃ- মাতৃ ভক্তির সজীব একটী বীজ রােপন করিয়া কিতে পারেন, সঙ্গে সঙ্গে অটল আস্তিকতার ভাব হৃদয়ে জাগাইয়া পর- লােকে তাহাদিগকে দৃঢ় আস্থাবান করিতে পারেন। এরূপ আর কিছুতেই সম্ভব না। ৮। ইহলােক বাসীদের সহিত পিতৃলােক বাসীদের আধ্যাত্ম সম্বন্ধকে সন্নিকট ও ঘনিষ্ঠ- তর করিবার কার্যে কাৰ্য্যে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান, কিরূপে সহায়তা করে ? ইহার উত্তর পরিস্ফুট করিতে, প্রথমত ইহলােক বাসী- দের সহিত পিতৃলােক বাসীদের অধ্যাত্ম সম্বন্ধটাযে কি, তাহাই বুঝিতে চেষ্টা করিতে হইবে। এচেষ্টার গন্তব্য
(৫৬)
থাকি।
পথ-দর্শনশাস্ত্র। দার্শনিক আলােচনা-ইতিহাস, কাব্যের
ন্যায় সহজ বোধ্য নহে; তথাপি যতদূর সাধ্য সরল ভাষায়
ইহার আলােচনা করিতে চেষ্টা করিব।
আমরা অন্নাদি খাদ্যদ্রব্য উদরস্থ করিয়া দেহ রক্ষা করিয়া
আমাদের এই দেহ স্কুল পরমাণুতে সংগঠিত
কাজেই তাহার ক্ষয়-ক্রিয়া হইতে তাহাকে রক্ষা করিতে
হইলে, দেহের উপাদান—সমশ্রেণীর স্কুল পরমাণু, যাহাতে
থাকে, তাহাই কতকগুলি শরীরে যােগ করিয়া লইবার
প্রয়ােজন হয়। দেহের অবস্থা ভেদে, দেহ রক্ষোপযােগী
ঐরূপ ধাদ্যেরও অবস্থা ভেদ হইয়া থাকে। আমরা দেহ
রক্ষার জন্য তৈল ঘৃতাদি স্নেহ দেহে বস্তু সংযােগ করি বা
আহার করি; কিন্তু ঐ শ্ৰেণীয় বস্তু, মাটিতে যে ক্রিমি থাকে,
( যাহাকে এদেশের কোন কোন স্থানে কেঁচো এবং
ইংরাজিতে Earth worm কহে) তাহাকে খাওয়াইলে
সে মরিয়া যায়। ইহার কারণ এই যে, তাহার দেহ রক্ষার
অনুকূল ঐ সকল বস্তু নহে। মাটিই তাহার প্রধান আহাৰ্য্য
বস্তু। বৃক্ষ, লতা, গুল্ম মাটি হইতে রস আহরণ করিয়া,
তাহাদের দেহের পুষ্টি সাধন করে। এমন অনেক জাতীয়
লতা আছে, যাহারা বায়ু হইতে রস আকর্ষণ করিয়া লইয়া
তাহাদের দেহ রক্ষা করে। স্বর্গবাসী দেবতা এৰ পিতৃ-
লােকবাসী পিতৃগণ, তাহাদের অদ্য উপাদানে সংগঠিত
দেহের রক্ষা কাৰ্য্যে, আমাদের এই স্কুল দেহ রক্ষোপযােগী সুল
(৫৭)
আহাৰ্য্য বস্তু অর্থাৎ ডাল, ভাত, মাছ, তরকারীর কিছু মাত্র
মুখাপেক্ষী নহেন। ভাব প্রধান খাদ্যই তাহাদের আহাৰ্য্য।
ভাব প্রধান খাদ্যের মধ্যে শ্রদ্ধা” একটি অতি উপাদেয়
বস্তু। কাজেই দেব এবং পিতৃগণকে শ্রদ্ধা”-রূপ তাহাদের
অতি প্রিয় আহাৰ্য্য দেওয়ার জন্যই আমাদের শাস্ত্ৰকৰ্ত্ত।
মুনিঋষিগণ পুনঃ পুনঃ এত করিয়া বলিয়া গিয়াছেন।
খুলদেহের সহিত বিজড়িত হইয়া থাকিতে বাধ্য হওয়ায়,
স্থূল বস্তুকে অবলম্বন করিয়াই সাধারণতঃ আমাদের চিত্তে
ভাবগুলি এখন পরিপুষ্ট ও পরিস্ফুট হইয়া থাকে। বিশুদ্ধ
শ্রদ্ধা আমরা চক্ষে দেখিতে পাই না, হৃদয়ে ও উপলব্ধি
করিতে পারি না। কাজেই কোন একটা স্কুল বস্তুর সহিত
শ্রদ্ধাকে জড়াইয়া, আমাদিগকে উহার আদান প্রদান কাৰ্য্য
সম্পন্ন করিতে হয়। যেমন কেবল প্রেম” যে কি বস্তু
তাহা আমরা ধরতে পারি না, বুঝিতেও পারি না; স্ত্রী, পুত্র
ৰা কোন এক বন্ধুকে অবলম্বন করিয়া আমাদের প্রেম
আমরা ফুটাইয়া উঠাই। সেইরূপ “শ্রদ্ধাকেও একটা
স্কুল বস্তুর সহিত বিজড়িত করিয়া উহার ব্যবহার করিতে
আমরা বাধ্য হই। এই জন্যই ধৃতকে এবং বেদমন্ত্রকে
অবলম্বন করিয়া অগ্নি মুখে ঘৃতাহুতি দিয়। সেই সঙ্গে
দেবতার প্রতি আমাদের হৃদয়ের শ্রদ্ধা ঢালিয়া দিয়া থাকি।
দেবতা, যজ্ঞস্থলে আবিভূত হইয়া, আমাদের প্রদত্ত
ঘৃতঞ্জলিতে লইয়া মুখে তুলিয়া পান করেন না, পয়ঃ
করেন। (৫৮) ঐ ঘৃতের সহিত আমরা যে “শ্রদ্ধা” দিয়া থাকি তাহাই তঁাহারা পান করেন এবং তাহাতেই তাহারা তৃপ্তিলাত কেবল ঘৃত তঁহাদের পেয় বস্তু হইলে, মাড়ওয়ারী মহাজনদের গুদাম ঘরে হাজার হাজার টিনের কেনেস্তার পূর্ণ ঘূতের মধ্যে তাহার অলক্ষিতে যখন তখন যাইয়া প্রবিষ্ট হইয়া, উদর পূর্ণ করিয়া ঘৃত পান করিয়া, স্বর্গে চলিয়া যাইতে পারিতেন। সে সকল টীনের কেনেস্তারাতে দেবগণের আহাৰ্য্য বস্তু “শ্রদ্ধা” নাই, কাজেই টানের কেনে স্তারার দিকে তাদের দৃষ্টিও নাই। পিতৃগণের অবস্থাও ঐরূপ। তঁাহারাও দেবগণের ন্যায় ভাব-খাদ্যেরই ভােক্তা। তাঁহারাও ভাবখাদ্যের ভিতর “শ্রদ্ধা” বলিয়া যে একটি অতি মধুর সামগ্রী আছে,-তাহাই পরমতৃপ্তি সহিত আহার করিবার জন্য, তাহাদের বংশধর দ্বারা অনুষ্ঠিত আজকৰ্ম্মস্থলে আসিয়া আবির্ভূত হইয়া থাকেন। শ্রদ্ধ- কর্মস্থলে পরমান্ব, মধু, ঘৃত, তিলকে আশ্রয় করিয়া যে শ্রদ্ধা সেখানে রহিয়াছে, তাহারা দেখিতে পাইয়া থাকেন, সেই শ্রদ্ধাটুকু মাত্র উদরস্থ করিয়া, -ঠিক কথাতে বলিতে হইলে, হৃদয় করিয়া,পরিতৃপ্ত হইয়া, নিজ-বাসস্থান-পিতৃলােকে তঁাহারা এস্থান করেন। পিতৃগণের ভোজন পদ্ধতির এইরূপ কথা শুনিয়া কাহারও কাহারও ওঠ প্রান্তে হস্ত রেখা বিকশিত হইলেও হইতে পারে। কিন্তু হাসির বা বিস্মিত হইবায় বিষয়
(৫৯)
এবং
উহাতে কিছুই নাই । পৃথিবীস্থ সকল জীবের ভােজন
ভুক্ত সামগ্রী পরিপাক-করণপদ্ধতি
একরূপ
নহে। ঝিঙ্গা, ইচা ৰা চিংড়িমাছের নিম্নাঙ্গে পাকস্থলী
নহে, মস্তকের নিকটে তাহার ভুক্ত বস্তু জীর্ণ করিবার যন্ত্র
রক্ষিত হইয়াছে। জলোকার সমগ্র দেহটাকেই পাকস্থলী
বিশেষ বলা যাইতে পারে। আমাদের দেহের পাকস্থলী
নাড়িভুড়ির ন্যায়, বৃক্ষের পাকস্থলী বা নাড়িভূড়ি এবং দন্ত
জিহ্বা না থাকিলেও তাহার খাদ্যরস অন্য পদ্ধতিতে পরিপাক
হইয়া, তাহার দেহ পরিপুষ্ট হইবার পক্ষে কোনই বাধা
হয় না। এই পৃথিবীর জীব-জন্তু-বৃক্ষ-লতার মধ্যেই যখন
তাহাদের নিজ নিজ দেহে গৃহীত বিভিন্ন প্রকারের আহার
সামগ্রী ভিন্ন ভিন্ন প্রণালীতে পরিপাক হইতে দেখা যায়,
তখন অন্যলােকস্থিত সম্পূর্ণ অন্য প্রকৃতিতে গঠিত দেবগণের
দেহ এবং পিতৃগণের দেহ অন্য পদ্ধতিতে পুষ্ট হইয়া থাকে
এবং অন্য প্রণালীতে রক্ষিত হইয়া থাকে শুনিলে বিস্মিত,
হইবার কোনই কারণ নাই। “ভাব” যাহাদের খাদ্য,
হৃদয় ভঁহাদের পাকস্থলীর কার্য সম্পাদন করিয়া তাঁহাদের
দেহেয় পুষ্টিসাধন করে-এমন কথা শুনিলেই আমন্ত্রণ
বিস্ময়াবিষ্ট হইব কেন?
“ৰ-খাদ্য কিরূপ ? আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা ও
সভ্যতা ভাবে যাহারা, বিভাের,, তাহাদের কাহারও
মূখে এমন একটা প্রশ্নও উঠিতে পারে। তঁহাদের
(৬) কৌতুহল নিবৃত্তির জন্য ইহা বলিলেই পৰ্যাপ্ত হইবে যে, জীব যে পরিমাণ চৈতন্যমুখী, তাহার জীবন ও দেহ রক্ষার জন্য সেই পরিমাণে, কন্দ ফলমুলাদি জড় খাদ্যদ্রব্যের অতিরিক্ত, আর এক প্রকারের আহার্য-বস্তুর প্রয়ােজন হইবে। এই প্রয়ােজনীয় বস্তুটিকে বুঝিবার জন্য এবং বুঝাইবার জন্য ইহাকেই “ভাব-খাদ্য” নামে অভিহিত করা যাইতে পারে। ইংরাজি অভিজ্ঞেরা হয়ত ইহাকে Spiritual food বলিতে চাহিবেন। কিন্তু ঐ শব্দটি দ্বারা প্রকৃত অর্থ জ্ঞাপন হয় না বলিয়াই ভাবখাদ্য শব্দ এখানে ব্যবহার করিতে হইল। বৃক্ষ লতা গুল্মের দেহ রক্ষার্থে ঐ খাদ্যের প্রয়ােজন হয় না। পশু পক্ষী কীট পতঙ্গের জীবন ধারণ জন্ম তাহাদিগকেও এখাদ্যের অনুসন্ধান করিতে হয় না। মানবের মধ্যে যাহারা পতভাবাপন্ন তাঁহাদিগকেও এ খাদ্য আহরণ জন্য ব্যাকুল হইতে হয় না। মানবজাতীর মধ্যে যে সকল স্ত্রী-পুরুষ কথঞ্চিত দেব- ভাবাপন্নযহাদের প্রকৃতি চৈতন্যমুখী, তঁাহাদিগকেই এ খাদ্যের জন্য কিঞ্চিত ক্ষুধিত হইতে দেখা যায়। শ্ৰীমতী রাধা-কৃষ্ণ-ভাৰ মাত্র বুকের ভিতরে ধরিয়া বহু দিন অন্নজল পরিত্যাগ করিয়াও জীবিত ছিলেন। যােগিপুরুষেরা কেবল ব্ৰহ্ম-ভাব-অমৃ-রসপান করিয়াই বহুকাল জীবিত থাকিতে পারেন। ডাক্তারি চিকিৎসা এন্থে এরূপ বর্ণনাও দেখিতে পাওয়া যায় যে,-উৎকট মসাধ্য পীড়া এ
(৬১)
রােগী, তাহার কোন প্রিয়জনকে দেখিবর প্রতীক্ষাতে,
তাহার চিন্তাই হৃদয়ে লইয়া জীবিত ছিলেন, পরে আকাঙ্খিত
ব্যক্তির দর্শন লাভ মাত্র জীবন ত্যাগ করিলেন। কেবল
কোন না কোন একটা ভাবকে হৃদয়ে ধরিয়াই যে এই
শ্রেণীর মানুষ তাহাদের জীবন রক্ষা করিয়া থাকেন, ইহা
স্বীকার করিতেই হইৰে। এই সকল মানুষকে কথঞ্চিত
ভাবাশ্রিত বলা যাইতে পারে। দেবগণ এবং পিতৃগণই
প্রকৃত-প্রস্তাবে ভাবাহারী, যেহেতু তাহায়। ভাবাত্মক
দেহধারী জীব।
অস্ফুট-চৈতন্য লতা, গুল্ম হইতে পরিস্ফুট-চৈতন্য দেব,
ঋষি ও পিতৃগণ সকলেই নিজ নিজ সত্ব রক্ষার জন্য সর্বদা
সযত্ন। নিজ নিজ অবস্থাতে, আত্মরক্ষার জন্য যাহার
যেরূপ দৈহিক উপাদান আহরণ করা প্রয়ােজন, সে সেইরূপ
উপাদান সংগ্রহের জন্য পরম প্রকৃতি কর্তৃক নিয়ােজিত।
যে কারণে মুগ্ধপােষ্য শিশু মাতৃস্তনে আকৃষ্ট ? ঠিক সেই
কারণে দেবতাগণ এবং পিতৃগণ তাহাদের দেহের পুষ্টি
সাধননাপযােগী শ্রাদ্ধাদি উপাদান দাতাদের প্রতি তুষ্ট। গরু
যেমন তাহার তৃণজলদাতা গােপালকের উপরে অনুরক্ত হইয়া
থাকে, মানুষ যেমন তাহার অন্নদাতার প্রতি সুপ্রসন্ন থাকে,
রােগী যেমন তাহার রােগমুক্তকারী চিকিৎসককে নিকটে
দেখিলে প্রসন্ন-বদন হয়, পথশ্রান্ত, ক্লান্ত, পিপাসিত পথিক
যেমন তাহার শুকণ্ঠে সুশীতল জলদাতাকে প্রাণ খুলিয়া
( ৬২ )
আশীৰ্বাদ করে, জল পিণ্ডদাতা-শ্রাদ্ধকারীর সহিত পিতৃ-
গণের কতকটা সেই ভাবের ব্যবহার বুঝিতে হইবে।
যাহার দ্বারা চিত্তের ও দেহের অনুকূল কার্যের অনুষ্ঠান হয়
তাহার প্রতি জীবমাত্রেরই স্বাভাবিক একটা আকর্ষণ
জন্মিয়া থাকে। এই আকর্ষণ ৰা অনুরাগ হইতে,
প্রত্যুপকার সাধনের সামর্থ্য স্থলে, উপকারীর প্রতি
প্রত্যুপকার করিবারও
প্রবৃত্তি জন্মিয়া থাকে। পিতৃ-
রূষগণের, পিও-জল-দাতা শ্রাদ্ধকৰ্ত্তার প্রতি এইরূপ
একটা সুমধুর ভাবের বিকাশ প্রাপ্ত হওয়া, সম্পূর্ণই
স্বাভাবিক। উপরি কথিত চিন্তাসূত্র ধরিয়া বুঝিতে চেষ্টা
করিলে ইহা অনায়াসে বলা যাইতে পারে যে—যিনি যে
পরিমাণ শ্রদ্ধার সহিত যতদূর নিয়মিতরূপে পিতৃ-অর্চন
কাৰ্য্য যত অধিকার সম্পাদন করিবেন, তিনি সেই
পরিমাণ পিতৃগণের অনুগ্রহ এবং অনুরাগ ভাজন হইতে
পারিবেন, ইহা সুনিশ্চিত। ইহলােকবাসী শ্রাদ্ধকৰ্ত্তার
সহিত পরলােকবাসী শ্রদ্ধে আহুত পিতৃগণের অধ্যাত্ম
সম্বন্ধকে সন্নিকট ও ঘনিষ্ঠতর করিবার জন্য নিত্য-খাদ্ধ ও
তর্পণের ন্যায় সামগ্রী বিশ্বসংসারে আর কিছুই নাই।
৯। শ্রাদ্ধানুষ্ঠান অকরণের প্রত্যয় কি ?
শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে শ্রাদ্ধ অকরণের প্রত্যয় যাহা,
অথে তাহাই বলিতেছি।সাধারণত যে কোন নিত্য
কাৰ্য্য না করিলেই তজ্জন্য পাপ উদ্ভব হয় এবং অবস্থা বিশেষে
(৬৩)
পতিত হইতে হয় । পাতিত্য জন্মিলে শাবিহিত কোন
কাৰ্য্য অনুষ্ঠানেই তাহার আর অধিকার থাকে না । * *
বিশেষ বিশেষ সময়ে করণীয় শ্রদ্ধ সকল না করিলে
যে প্রত্যয় হয়, এখন তাহাই আলােচনা করিব।
বিষ্ণুসংহিতায় কথিত হইয়াছে—“অমাবস্যা, তিনটি অষ্টকা,
তিনটি অষ্টকা, প্রৌপদী, ভাদ্র কৃষ্ণা এয়ােদশী এবং
নবান্ন, এই সমস্ত সময়কে প্রজাপতি নিত্য-শ্রাদ্ধের কাল
বলিয়াছেন। ঐ সময় শ্রাদ্ধ না করিলে নরকে গমন
করিতে হয়।”
* “বিহিতস্যাননুষ্ঠানাৎ নিন্দিতস্য চ ভােজনাৎ।
অনিগ্রহাচ্চেন্দ্রিয়ানাং নরঃ পতনমৃচ্ছতি ॥”
( প্রায়শ্চিত্ত বিবেক দ্রষ্টব্য)
** এই উপরি উক্ত শ্লোকে যে ‘পতন’ শব্দ লিখা আছে,
উক্ত গ্রন্থের সংগ্রহকায় সেই পতন শব্দের এই ভাবে ব্যখ্যা
করিয়াছেন—
“বৈধকৰ্ম্মানধিকারি পাপ জননং পতনং” অর্থাৎ পতিত
হইলে তােক বিধি বিহিত কাৰ্যানুষ্ঠানের অনধিকারী হয়।
- “অমাবস্যা স্তিস্রোহক। স্তিস্রোহন্বষ্টকা।
মাঘী প্রৌপদ্ধকৃষ্ণত্রয়ােদশী ব্রীহিযবপাকৌ চ।
এতাংস্তু শ্রাদ্ধকালাম্বৈ নিত্যানাহ প্রজাপতি।
শ্রদ্ধমেতেকুৰ্ব্বাণো নরকম্প্রতিপদ্যতে।”
(বিষ্ণু সংহিতা দ্রষ্টব্য)
(৬৪)
পরাশরম' নামক গ্রন্থে উক্ত হইয়াছে—অমাবস্যা,
ব্যতিপাত, পূর্ণিমা এবং অষ্টকাতে শ্রাদ্ধ না করিলে
প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয় ।
ভবিষ্যপুরাণে মহাদেবের মুখে এই বাক্য প্রকটিত
হইয়াছে—“পিতা এবং মাতার মৃত্যুতিথিতে বৎসরান্তে যে
শ্রদ্ধার সহিত শ্রদ্ধ না করে,-আমি, মহাদেবী এবং হরি
তাহার পূজা গ্রহণ করি না।
আত্তপ্রবর রঘুনন্দন ভট্টাচাৰ্য তাহার শ্রাদ্ধতত্ত্ব গ্রন্থে
ভবিষ্যপুরাণের বাক্য উদ্ধৃত করিয়া মহালয়া শ্রাদ্ধের
আবশ্যকতা এইভাবে দেখাইয়াছেন—“যে গৃহস্থ সূর্যের
কন্যারাশিতে অবস্থান সময়ে শ্রদ্ধ করে না, পিতৃ-নিশ্বাস
দ্বারা পীড়িত হওয়ায় তাহার ধন ও পুত্র বিনাণপ্রাপ্ত হয়।”
* “অমাবস্যাব্যক্তিপাতপৌর্ণমাস্তষ্টকামু চ।
বিদ্বান্ শ্রাদ্ধমকুৰ্ব্বাণাে প্রায়শ্চিত্তয়ে তু সঃ।”
(পরাশর-মাধব দ্রষ্টব্য।)
- “মৃতাহুনি পিতুর্যস্তু ৰ কুৰ্যাৎ শ্রদ্ধমাদরাৎ।
মাতুশ্চৈব বরাবরাহে বৎসরান্তে মৃতাহুনি।
নাহং তস্য মহাদেবী পূজাং গৃহূতি না হরি।”
(ভবিষ্যপুরাণ দ্রষ্টব্য)
+ “মূৰ্য্যে কন্যাগতে কুৰ্যাৎ জং যাে ন গৃহাশ্রমী।
ধনম্ পুত্রাঃ কুতস্য পিতৃনিঃশ্বাস পীড়নাৎ।”
(ভবিষ্যপুরাণ দ্রষ্টব্য।)
(৫)
ভবিষ্যপুরাণের আর এক স্থানে লিখিত হইয়াছে-“যে
ব্যক্তি আপন পিতা মাতার উদ্দেশ্যে প্রতি বৎসর একোদিষ্ট
শ্রদ্ধের অনুষ্ঠান করে না, সে তমিস্রা’ নামক ঘাের নরকে
গমন করে।
শ্ৰাদ্ধ অকরণের প্রত্যবায় প্রতিপাদক এইরূপ শাস্ত্রীয়
উক্তি সকল পুরাণ এবং স্মৃতিগ্রস্থের অনেক স্থানে প্রচুর
পরিমাণে দেখিতে পাওয়া যায়। সে সকল বচন উদ্ধৃত
কমিয়া এই পুস্তিকা কলেবর বৃদ্ধি করা নিষ্প্রয়ােজন।
লৌকিক দৃষ্টিতে শ্রাদ্ধ না করায় কি ক্ষতির সম্ভাবনা, এখন
তাহারই কিঞ্চিৎ আলােচনা করিব।
যে কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান দ্বারা যে ফল লাভের প্রত্যাশা
করা যায়, সে কাৰ্য্য না করিলে, সেই ফললাভ হইতে যে
বঞ্চিত হইতে হয়, ইহা স্বতঃসিদ্ধ কথা। শ্রাদ্ধানুষ্ঠান দ্বারা
পিতৃলােকের প্রসন্নতা লাভ এবং সেই প্রসূন্নতা হইতে
উৎপন্ন একটা শুভদৃষ্টফলে, শ্রাদ্ধ কৰ্ত্তার শারীরিক পুষ্টি এবং
বৈষয়িক সুখ সম্পদ বৃদ্ধি হইয়া থাকে। আজ না করিলে
এই সকল লাভ হইতে বঞ্চিত হইতে হয়।
(ভােজকো) যন্তুৰৈ শ্ৰদ্ধং ন কররাতি খগাধিপ।
মাতাপিতৃভ্যাং সততং বর্ষে বর্ষে মৃতেহহনি।
স যাতি নরক ঘােয় তমিস্রং নাম নামতঃ।
(ভবিষ্যপুরাণ দ্রষ্টব্য।)
[
যিনি পরলােক মানেন এবং পরলােকবাসী পিতৃ-
গণের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন, তাঁহাকে বাধ্য হইয়া সঙ্গে
সঙ্গে ইহাও স্বীকার করিতে হইবে যে, পিতৃগণ তাহাদের
তৈজসদেহের পুষ্টির জন্য ইহলােকবাসীর প্রদত্ত “শ্রদ্ধার”
কতকটা মুখাপেক্ষী হইয়া রহেন। তঁাহারা, তাহাদের
প্রিয়তম বংশধরগণের নিকট হইতে যথা নির্দিষ্টকালে
শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সময়ে শ্রদ্ধাসমম্বিত পিণ্ড প্রাপ্ত হইয়া পরিতৃপ্ত
হইবার প্রত্যাশা করিয়া থাকেন। শ্রাদ্ধ না করায়, তঁাহাদের
যখন সেই প্রবল প্রত্যাশা বিফল হয়, তখন তঁাহারা হতাশ
হইয়া পড়েন। পিতৃপুরুষগণের সেই হতাশা হইতে সমুৎপন্ন
একটা দুরদৃষ্ট তাহাদের বংশধরগণের বৈষয়িক উন্নতি সাধন
পক্ষেও যে কতকটা বাধা জন্মাইয়া থাকে ইহা আমরা অতি
সহজেই সিদ্ধান্ত করিতে পারি। লৌকিক দৃষ্টিতে, ইহা
শ্রদ্ধ অকরণের একটি প্রধান অনিষ্টকারিতা-রূপ ফল।
শ্রাদ্ধানুষ্ঠান উপলক্ষে প্রতিবাসী, পরিচিত বন্ধু বান্ধব,
কুটুম্ব স্বজন, গুরু পুরােহিত এবং ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণের সহিত
আমাদের সামাজিক আত্মীয়তা বৃদ্ধি করিবারও একটি
সুযােগ আমরা পাইয়া থাকি। শ্রাদ্ধ অকরণে এই সুযোেগটি
আমাদিগকে হারাতে হয়। এই ক্ষতির মূল্যও সামান্য
নহে। শ্রাদ্ধ না করায় আমাদের যে কিঞ্চিৎ অর্থ রক্ষা
হইতে পারে, উপরি উক্ত ক্ষতির তুলনায় তাহা অতি”
অকিঞ্চিং কর।
(৭)
শান্ধ করিবার প্রথা হিন্দু-সমাজ হইতে তুলিয়া দিলে
হিন্দু সমাজের সামাজিক লাভ লােকসানের দৃষ্টিতে আরও
যে সকল ক্ষতির সম্ভাবনা রহিয়াছে, পরের প্রস্তাবে তৎসম্বন্ধে
আরও একটু বিশদভাবে আলােচনা করিবার স্থল পাওয়া
যাইবে।
১০। লৌকিক স্থূল দৃষ্টিতে, শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের
প্রয়ােজন কিরূপে উপলব্ধি করা যাইতে
পারে ?
শাস্ত্রীয় নির্দেশকে আশ্রয় করিয়া, লৌকিক বিচাররূপ
পথ ধরিয়া অতি সাবধানে চলিলে, তবেই উপরিউক্ত
প্রশ্নের সদুত্তর সংগ্রহ করিতে আমরা সমর্থ হইব। শাস্ত্র,
আমাদের দিদর্শন যন্ত্র (Compass) স্বরূপ। বিচার,
আমাদের রাজমার্গ। আর বিবেক,—আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়।
চক্ষু মুদিয়া দির্শন যন্ত্রটি পকেটে লইয়া, প্রশস্ত পথ ত্যাগ
করিয়া, অপথে চলিতে চাহিলে, আমরা প্রতি পাদ-নিঃক্ষেপে
বিড়ম্বিত হইৰ মাত্র। সুপ্রসন্ত সনাতন পথের অগ্রগামী
পথিক হইতে ইচ্ছুক হইলে, এ সকলেরই সহায়তা সময়
বিশেষে আমাদিগকে গ্রহণ করিতেই হইবে। কেবল সূক্ষ্ম
শাস্ত্রীয় নির্দেশকে আশ্রয় করিয়া, শ্রাদ্ধ ব্যাপারটিকে বুঝিতে
প্রয়াস না করিয়া, এজন্য সঙ্গে সঙ্গে স্কুল শৌকিক-বিচার
ধরিয়াও উহা বুঝিতে একটু চেষ্টা করা এসময়ে আমাদের
1. (৬৮) প্রয়ােজন হইয়াছে। এই ভাবে এই বিষয়টি বুঝিতে চাহিলে, সাথে আমাদের—অর্থাৎ মানব জাতির প্রকৃতিগত বিশিষ্টতার দিকে একবার একটু দৃষ্টি কমিতে হইবে। এসংসারে প্রত্যেক শ্রেণীর জীবেরই প্রকৃতিতে এক একটি বিশিষ্টতা বিদ্যমান থাকিয়া, অন্য হইতে তাহার পার্থক্য রক্ষা করিতেছে। যে সকল বিশিষ্টতা দ্বারা পত, পক্ষী, কীট, পতঙ্গ হইতে মানুষ সম্পূর্ণ পৃথক অবস্থাপন্ন জীবে পরিণত হইয়া রহিয়াছে, তাহার মধ্যে দায়িত্ববােধ একটি প্রধান। পশু, পক্ষী, কীট, পতঙ্গের দায়িত্ববােধ- বৃত্তি আদৌ নাই, মানুষের হৃদয়ে দায়িত্ববােধ শক্তি নামক একটি বিশেষ বৃত্তি আছে;—মানুষের ইহাই বিশিষ্টতা ; ইহাতেই মানুষকে, পশু, পক্ষী, কীট, পতঙ্গ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক্ ভাবাপন্ন করিয়া রাখিয়াছে। কেহ কেহ বলিয়া থাকেন—আহার নিদ্রা ভয় ও বংশবৃদ্ধিকরণ স্পৃহা পগুতে এবং মানুষে তুল্য ভাবে রহিয়াছে, কেবল ধর্মই পণ্ড হইতে মনুষ্যকে পৃথক্ করিয়া রাখিয়াছে । এরূপ উক্তি সর্বদী সম্মত নহে। কারণ ‘নাস্তিক” প্রভৃতি মতাবলম্বীরা কোন ধর্মাবলম্বী না হইয়াও মানব আখ্যা হইতে বিচ্যুত নহেন। দায়িত্ববোধ বৃত্তি হিন্দু অহিন্দু আস্তিক নাস্তিক সকলের “আহারনিদ্ৰাতমৈথুনঞ্চ সামান্যমেতৎ পশুভিনং ধৰ্ম্মো হি তেমধিকে বিশেষ ধৰ্ম্মেণহীনঃ পশুভি সমান। (হিতােপদেশ)
(৯)
হৃদয়েই অল্পবিস্তর রহিয়াছে। এই দায়িত্ববােধ বৃত্তি, যে
মানুষে যতখানি পরিপুষ্ট ও পরিস্ফুট হইয়া পড়ে, সে
মানব-সমাজে ততই উন্নত ও উচ্চ বলিয়া পরিগণিত
হইয়া থাকে। প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে, প্রকৃতি কর্তৃক
নিহিত এই দায়িত্ববােধ বৃত্তির বীজ, যাহ অনুগত
অবস্থাতে থাকে তাহার পরিস্ফুটন এবং পরিপুষ্টি-সাধন
করাই হইতেছে—আমাদের শাস্ত্রোক্ত প্রায় সর্বৰি ধৰ্ম্মা-
নুষ্ঠানে অন্তর্নিহিত প্রগাঢ় রহস্য। আমাদের শ্রদ্ধ তর্পণাদি
নিত্য করণীয় অনুষ্ঠান গুলিকেও এই লক্ষ্য অভিমুখী ক্রিয়ার
মধ্যে গণ্য করিয়া লইতে বাধা নাই। এই প্রস্তাবের এক
স্থানে ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে যে-দেবঋণ, ঋষিঋণ
এবং পিতৃঋণ হইতে আংশিক বিমুক্ত হইবার উদ্দেশ্যে
ব্রাহ্মণকে প্রত্যহ দেব্যজ্ঞ, ঋষিজ্ঞ, ও পিতৃযজ্ঞের অনুষ্ঠান
করিতে হয়।
ইহাদের নিকট হইতে আমরা যে সকল
উপকার পাইয়াছি এবং এখনও যে সকল উপকার পাইয়া
থাকি..এবং সে জন্য আমরা তাঁহাদের নিকটে যে অশেষ
প্রকারে ঋণী বা দায়ী হইয়া রহিয়াছি সেই কৃতজ্ঞতা ও
দায়িত্ববােধকে সর্বক্ষণ স্মরণে জাগরিত করিয়া রাখিবার জন্য
ঐ ত্রিবিধ যজ্ঞানুষ্ঠানের অবশ্য কর্তব্য সম্বন্ধে আমাদের
শাস্ত্রগ্রন্থে যে পুনঃ পুনঃ কথিত হইয়াছে, এমনটাই বা
আমরা মনে না করিতে পারি কেন?
।
এখন একটা স্কুল দৃষ্টান্তের সহিত বিজড়িত করিয়া
} (৭০) এই “দায়িত্ববােধ” বিষয়টাকে আমরা বুঝিতে একটু চেষ্টা করিব। ইদানীং অনেক সংবাদপত্রে *Responsible Government” প্রভৃতি কথার আলােচনা আমরা দেখিতে পাইয়া থাকি। যেখানে রাজশক্তি, প্রজাপুঞ্জের নিকটে তাহার কৃত কার্যের জন্য দায়ী রহিয়াছেন মনে করেন এবং সেইভাব হৃদয়ে ধারণ করিয়া রাজ্য-শাসন-সংরক্ষণ কাৰ্য্য পরিচালনা করেন, সেইখানে সেইরূপ রাজশক্তিকে Responsible Government বলিয়া অভিহিত করা হয় । যেখানে সেরূপ অবস্থা নহে, অর্থাৎ দায়িত্ববােধ বিবর্জিত রাজ। যেখানে রাজ্য শাসন করেন, সেখানকার রাজ্যশাসন পদ্ধতিকে Irrisponsible Government বলা হয়। প্রজার নিকট দায়িত্ববােধশূন্য রাজশক্তি, রাজার প্রতি কর্তব্য বােধ-হীন রাজভক্তি-বিবর্জিত প্ৰজাপুঞ্জের জন্মদাত্রী বলিয়া কথিত হয়। যে দেশে এইরূপ যথেচ্ছাচারী রাজা এবং এইরূপ উদ্ধৃঙ্খল প্রজা বাস করেন, সে দেশে রাষ্ট্রবিপ্লব অনিবার্য। ঘােয় অশান্তির রঙ্গমঞ্চে সে দেশ অনতিবিলম্বে পরিণত হয়। সেইরূপ যে গৃহে, পুত্রের প্রতি কর্তব্য-জ্ঞান- রহিত পিতা, এবং পিতার প্রতি কর্তব্য-জ্ঞান পরিশু পুত্র বাস করেন, অথবা যে সংসারে স্বামীর প্রতি দায়িত্ববােধ বিবর্জিত স্ত্রী, এবং স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ববোধ বিহীন স্বামী বাস করেন, সেখানেও পূর্ণ মাত্রায় অশান্তি বিরাজ করিতে দেখা যায়। মানব হৃদয়ের দায়িত্ববোধ বৃত্তি হইতে বৃত্তি হইতে যেমন (১) একদিকে বিশুদ্ধ প্রেম-বিমি কৃতজ্ঞতার সুনির্মল ধারা প্রবাহিত হইয়া চলিতে থাকে, তেমনই অন্যদিকে, আবার কর্তব্য-পালন বুদ্ধি সতেজে পরিস্ফুট হইয়া উঠে। মানবীয় দায়িত্ববােধের পরিস্ফুটন চেষ্টা এই জন্যই আমাদের শাস্ত্রে এত দিক দিয়া এত অধিকপরিমাণে করা হইয়াছে,, দেখিতে পাওয়া যায়। এত দায়িত্ববােধ-হীনতার নিন্দাবাদ আমাদের পুরাণাদি গ্রন্থে এই জন্যই এত অধিক কীৰ্তিত হইয়াছে। পিতা মাতার নিকটে সন্তান, আপনাকে সর্বক্ষণ কতদূর ঋণী জ্ঞান করিবেন, তাহাই দেখাইবার জন্য এবং সন্তানের হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা সংমিশ্র বিশুদ্ধ ভক্তিরস উদ্রেকের জন্য পর- লােকগত মাতার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত পিণ্ড দান সময়ে যে সকল শাস্ত্র নির্দেশিত কথা সন্তানকে স্মরণ ও উচ্চারণ করতে হয়, এখানে তাহার মধ্য হইতে কয়েকটি উদ্ধৃত করিতেছি “দশমাসােদরে গর্ভং তাে মাত্রা সুদুঃখিত। তস্য নিষ্কৃতিকাৰ্য্যায় মাত্রে পিওং দাম্যহং । ১। মহতী বেদনা দুঃখং জননে চাপি পুষ্কল। তস্য নিষ্কৃতিকাৰ্য্যায় মাত্রে পিণ্ডং দদাম্যহং । ২। সম্পূর্ণ দশমে মাসি অতান্তং মাতৃপীড়ন। তস্য নিষ্কৃতি-কাৰ্য্যায় মাত্রে পিং দদাম্যহং । ৩। শিথিলে গাত্রবন্ধেতু মাতুঃ স্যাৎ পরিবেদন। তস্য নিষ্কৃতিকাৰ্য্যায় মাত্রে পিণ্ডং দদামাহ। ৪।
(২)
গাত্রনে বতুত্যুৰ্ভবতি নিশ্চিত।
তঙ্গ নিষ্কৃতিকাৰ্য্যায় মাত্রে পিণ্ড দাহ।।
বনি শােষয়েদ্দেহং ত্রিতােপসনেন চ।
তস্য নিষ্কৃতি-কাৰ্য্যায় মাত্রে পিণ্ড দাম্যহং। ৬।
মাঘে মাসি নিদাঘে চ শিশিয়াতপ দুঃখিত।
ও নিষ্কৃতি-কাৰ্য্যায় মাত্রে পিণ্ড দামইং।।
যৎপিবেৎ কটুবানি কাথানি বিৰিধানি চ।
তস্য নিষ্কৃতিকাৰ্য্যায় মাত্রে পিণ্ডং দদাম্যহং । ৮।
অনেক যাতনা মাতুঃ প্রাণান্ত-দুঃখ-সম্ভবাঃ।
তস্য নিষ্কৃতিকাৰ্য্যায় মাত্রে পিণ্ড দাম্যহং ৯।
জাতস্য নিধনে দুঃখং পােষণাদৌ গত্যেহত।
ভস্য নিষ্কৃতি-কাৰ্য্যায় মাত্রে পিণ্ড দাম্যহং ।১০।
নীচোচ্চক্রমণে দুঃখং গর্ভে দুচ্চ সংস্থিতে।
তস্য নিষ্কৃতিকাৰ্য্যায় মাত্রে পিণ্ডং দদাম্যহং ১১।
তৃষার্তায়ান্তু যখং শুষ্ককণ্ঠে চ তালুনি।
তস্য নিষ্কৃতি-কাৰ্য্যায় মাত্রে পিণ্ড দাম্যহং । ১২।
আত্রে মুত্রপুরীভ্যাং যতুগাত্রপীড়ন।
তথ্য নিষ্কৃতিকাৰ্য্যায় মাত্রে পিণ্ডং দদাম্যহং । ১৩।
দুলানি তু ভক্ষাণি দত্যাভরে সতি।
ও নিষ্কৃতি-কাৰ্য্যায় মাত্রে পিওং দামাইং । ১৪।
•।
. (৩) ক্রোড়স্থ ভােজদৌ যঃখং মাতু ব্যাধিতে। তস্য নিষ্কৃতিকাৰ্য্যায় মাত্রে পিণ্ড দাম্যহং ১৫। এ বহুৰিধৈখৈর্যত দুঃখিতা সদ। তথ্য নিষ্কৃতিকাৰ্য্যায় মাত্রে পিণ্ড দামাহ।* ১৬। উপরি উদ্ধৃত সংস্কৃত বাক্যগুলির মর্মানুবাদ এই- মাতৃদেবী অত্যন্ত দুঃখের সহিত দশমাস উদরে গর্ভধারণ করিয়া ছিলেন, তাহার নিষ্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিও দান করিতেছি। ১। তিনি অত্যন্ত বেদনা দুঃখ সহ ফরিয়া ছিলেন, এবং জনন সময়ে আরও দুঃখ সহ্য করিতে হইয়াছিল, তাহার নিষ্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিণ্ডদান করিতেছি। ২ দশম মাস সম্পূর্ণ হইলে মাতাকে অত্যন্ত পীড়ন সহ করিতে হইয়াছিল, তাহার নিষ্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিণ্ডদান করিতেছি। ৩। গাত্রবন্ধ শিথিল হইলে মাতার অত্যন্ত পরিবেদনা হয়, তাহার নিষ্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিণ্ডদান করিতেছি।৪। গাঙ্গে (শরীর বেদনায়) যে মাতার নিশ্চিত মৃত্যু হইবার সম্ভব ছিল, তাহার নিষ্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিণ্ডদানকরিতেছি। ৫। ত্রিরাত্র উপবাস দ্বারা এবং অগ্নি দ্বারা যে শরীর শােষণ করাইতে হইয়াছিল, তাহার নিষ্কৃতির জয় আমি মাতাকে পিণ্ডদান করিতেছি। ৬।
(৩৪) মাতা আমার জন্য মাঘ মাসে এবং গ্রীষ্মকালে যে শিশির ও আতপ দ্বারা দুঃখিত হইয়াছিলেন, তাহার নিষ্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিণ্ডদান করিতেছি।।। মাতা আমার জন্য যে সমস্ত কটুভ্রব্য এবং বিবিধ কাথ পান করিয়াছিলেন, তাহার নিষ্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিণ্ডদান করিতেছি। ৮। প্রাণান্ত দুঃখে মাতার যে অনেক যাতনা হয়, তাহার নিস্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিণ্ডদান করিতেছি। ৯। জাত পুত্রের নিধন জন্য, পালন জন্য এবং অন্য স্থানে গমন অন্য মাতার যে দুঃখ হয়, তাহার নিষ্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিণ্ডদান করিতেছি। ১০। উচ্চনীচ স্থানে গমনে এবং দুর হইতে গমন জন্য যে দুঃখ হইয়াছিল, তাহার নিষ্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিণ্ডদান । করিতেছি। ১১। পিপাসিত হইয়া কণ্ঠ এবং তালু শুষ্ক হইলে যে কষ্ট হইয়াছিল, তাহার নিষ্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিণ্ডদান করিতেছি। ১২। রাত্রিতে বিষ্ঠামূত্র দ্বারা আমার জন্য যে মাতার গাত্র- পীড়ন হইয়াছিল, তাহার নিষ্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিণ্ডদান করিতেছি। ১৩। সন্তানের ক্রন্দনের জন্য মাতার যে ভক্ষণও দুর্লভ হয়, তাহার নিষ্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিণ্ডদান করিতেছি। ১৪।
---
(৭৫)
সন্তান ক্রোড়ে থাকিলে ভক্ষণের সময় এবং সন্তান
পীড়িত হইলে মাতার যে দুঃখ হয়, তাহার নিষ্কৃতির জন্য
আমি মাতাকে পিণ্ডদান করিতেছি। ১৫।
এইরূপ বহু প্রকার দুঃখ দ্বারা যে মাতা সর্বদা দুঃখিত
হইতেন, তাহার নিষ্কৃতির জন্য আমি মাতাকে পিণ্ডদান
করিতেছি। ১৬।
মনােনিবেশ সহকারে, এই কথাগুলি পুনঃ পুনঃ পাঠ
করিলে, অনায়াসে ইহা উপলব্ধি করা যাইতে পারে যে
একদিকে যেমন সন্তানের চিত্তে পরলােকগত মাতার প্রতি
পবিত্র-কৃতজ্ঞতা ভাবের উদ্রেক করিয়া তাহার চিত্তকে উন্নত
করিবার উদ্দেশ্যে এবম্বিধ মাতৃঅর্চনার অবতরণা করা
হইয়াছে, তেমনই পরলােকবাসিনী মাতৃদেবীকেও সন্তানের
অনুকূলে আকৃষ্ট করিবার অভিপ্রায়ে তাহার অনুষ্ঠিত নানাবিধ
অতীত কার্যের স্মৃতিকে জাগ্রত করিয়া দিবার একটা চেষ্টাও
সুকৌশলে ইহার ভিতর বিন্যস্ত করিয়া রাখা হইয়াছে।
কোন কোন নাস্তিকতাবাপন্ন তার্কিকের চিত্তে এমন
একটা উৎকট চিন্তা উঠিতে পারে যে,-স্ত্রী পুরুষেরা নিজ
সুখ সাধনের জন্য যখন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইয়া থাকেন
এবং তাহারই ফলে যখন সন্তান উৎপন্ন হইতে দেখা যায়,
তখন সন্তানকে তাহার হৃদয়ে আজীবন পিতামাতার প্রতি
কৃতজ্ঞতা পপাষণ করিয়া রাখিবার আদৌ কোন প্রয়ােজন
দেখা যায় না। এ সিদ্ধান্ত ঠিক নহে। এ যুক্তিমূলে, সন্তান
(৭৬) ভূমিষ্ট হইবার পরে, পিতামাতা কর্তৃক তাহার জীবন রক্ষার চেষ্টা অনাবশ্যক। তাহাকে লালন পালন করিয়া এবং লেখা পড়া শিক্ষা দিয়া মানুষ করিবার চেষ্টাও নিষ্প্রয়ােজন। পুত্রের ভবিষ্যৎ সুখের জন্য বিত্ত-সম্পত্তিও রাখিয়া না দিয়া নিজেই উহা ভােগ করিয়া শেষ করিয়া দিলে, ঐ অবস্থাতে কোনই দোষের কথা ছিল না। মানুষে যখন এরূপ আচরণ করে না, পরন্তু নিজেরা নিদারুণ কষ্ট ভােগ করিয়াও যখন অনেক পিতা মাতা পুলের ভবিষ্যৎ মঙ্গলের বিধি ব্যবস্থা করিয়া রাখেন, দেখিতে পাওয়া যায়, এ অবস্থাতে পুত্রকে জীবিত এবং মৃত পিতামাতার প্রতি আজীবন প্রগাঢ় কৃতজ্ঞতা পাশে বন্ধ হইয়া থাকিতেই হইবে। যেখানে সে কৃতজ্ঞতার অভাব দেখিতে পাওয়া যাইবে, সেখানে মানুষ মনুষত্বের উচ্চ আসন হইতে জ্বলিত হইয়া, পশুত্বে যে নামিয়া পড়িয়াছে ইহা বলিতেই হইবে। বেদাদি-শাস্ত্রবিদ্বেষী নাস্তিকেরা, মানুষকে পশুত্বে নামাইতে চাহেন, আর শাস্ত্র- বিশ্বাসী আস্তিকেরা মানুষকে দেবত্বে উঠাইতে চাহেন,এত দুভয়ের পার্থক্য এই স্থানে। শাস্ত্রবিধি অবলম্বন করিয়া, আঁহার মানৰ মণ্ডলীর স্তর হইতে উর্দ্ধে উঠিতে ইচ্ছা করেন, তাঁহাদের উর্কে আরােহণের প্রথম সিঁড়ির ধাপই হইতেছে- মৃত পিতামাতার প্রতি সদা হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা ভাব পোষণ, পিতৃমাতৃ অৰ্চন এবং যথাকালে যথা বিধানে পিতৃমাতৃ শ্রাদ্ধ ও তর্পণ অনুষ্ঠান। এই পথের দ্বিতীয় সােপান হইতেছে,
(৭৭)
-ঋষিগণের প্রতি অন্তরে কৃতজ্ঞতা ভাব পরিপােষণ, ঋষি-
অৰ্চন, ঋষি তর্পণ এবং বিশ্ব-মঙ্গলকামী ঋষিদের উচ্চ-আদর্শ
হৃদয়ে সংস্থাপন। এই মার্গের তৃতীয় সােপান হইতেছে
দেবতাগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা ভাৰ হৃদয়ে ধারণ, দেব-অৰ্চন,
বিশ্বপ্রেমিক দেবদেবীগণের মূর্তি হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা করণ এবং
তাহারই ধ্যান ধারণা ও সদা চিকন। এই ভাবে শাস্ত্রবিধি
অবলম্বন করিয়া ক্রমে অগ্রসর হইতে থাকিলে, মানুষ অনতি-
বিলম্বে সেই মহদুচ্চস্থানে যাইয়া উপনীত হইবে, যেখান
হইতে সমগ্র জগৎসংসারকে আপ্তবৎ. প্রতীয়মান করা
ইহারও উপর স্তরে, আরও উর্কে, যাহা কিছু
রহিয়াছে, মানবীয় জ্ঞানদৃষ্টি আজিও তাহার নিকটে যাইয়া
পৌছিতে সমর্থ হয় নাই। কাজেই এখানে থাকিয়া সে
কথার আলােচনা নিপ্রয়ােজন।
যাইবে।
মানুষের উর্ধগতির পথ উপরে যেভাবে আঁকিয়া দেখা-
ইতে চেষ্টা করা হইল, ইহা এই প্রস্তাব লেখকের কপােল
কল্পিত কাৰ্যকথা নহে, ইহা শাস্ত্র নির্দেশকে অবলম্বন
করিয়াই ৰণিত। আমাদের শাস্ত্রোক্ত শ্রাদ্ধাদি অনুষ্ঠানের
আভ্যন্তরিক তত্ত্ব একটু স্থিরচিত্তে চিন্তা ও অনুশীলন করিয়া ।
দেখিতে উপস্থিত হইলে, এ সকল কথার প্রতিঅক্ষয়ের
সত্যতা অপনা হইতেই আমাদের সম্মুখে খুলিয়া পড়িবে।
যাহারা এই সকল শাস্ত্রীয় তত্ত্ব আরও পরিস্ফুট করিয়া
দেখিতে ও বুঝিতে চাহেন, তাহাদিগকে শ্রদ্ধ ও তর্পন
*
(৭৮) সম্বন্ধীয় সংস্কৃত বচনগুলির ভাবার্থ মনােনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন ও অনুশীলন করিতে অনুরােধ করি। প্রথমত আমরা দেখিতে পাইতেছি,-পিতা বা মাতার মৃত্যু হইবামাত্র তাহার সদগতি লাভের জন্য সন্তানের যাহা কিছু কৰ্তব্য তাহাই করিবার জন্য শাস্ত্রে বিধান করিয়া রাখা হইয়াছে। পিতামাতার সহিত সন্তানের অতিঘনিষ্ঠ রক্ত- সম্বন্ধ থাকাতে এবং পিতারই একাংশ সন্তানরূপে পরিণত হয়, এই হেতুতে পিতার সহিত পুত্রের দৈহিক ও আধ্যাত্মিক সম্বন্ধ যতদূর প্রগাঢ়, এরূপ আর কোন স্থলেই নহে। পিতার মৃত্যু হইবামাত্র, এমনকি পিতার মৃত্যু সময়ের অব্যবহিত পূৰ্ব্ব হইতেই তাহার ভবিষ্যৎ সদগতি লাভের জন্য পুত্রকে নানা রূপ অনুষ্ঠান করিতে হয়। এই রূপ কাৰ্য্যে যে পিতার প্রতি পুত্রের কৃতজ্ঞতার চিহু প্রদর্শন এবং উপকার প্রাপ্তির প্রতিদান চেষ্টা মাত্রই পরিলক্ষিত হয়, তাহাই নহে, পরন্তু সঙ্গে সঙ্গে উদ্বারা নিজের উৰ্দ্ধগতি লাভেরও একটি সদুপায় সৃষ্টি করিয়া রাখা হয়। পিতা, পুত্রের যত্নে উৰ্দ্ধগতি লাভ করিতে সমর্থ হইলে, তথা হইতে পুত্রকে সুখী করিবার জন্য তঁাহার চেষ্টা থাকা সম্পূর্ণই স্বাভাবিক। পুত্রের পৃথিবীতে অবস্থিতি, কাল পর্যন্ত তাহার পার্থিব উন্নতি এবং পুত্রের দেহান্ত হইবার পরে, তাহার পারলৌকিক উর্ধগতি প্রাপ্তির পক্ষে, পিতৃলােকবাসী পিত, এ অবস্থায় তাহার যথাশক্তি চেষ্টা না করিবেন
৭
(৯)
কেন? আমরা প্রতিনিয়ত চক্ষুর উপরে দেখিতে পাইতেছি,
একজন শিক্ষিত যুবক, ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট পদে উন্নীত হইয়া
তাহার পুত্রেরও ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট পদপ্রাপ্তির জন্য উচ্চপদস্থ
রাজপুরুষগণের নিকটে যাইয়া অশেষপ্রকারে কতই যত্ন
উদ্যোগ করিয়া থাকেন। পিতৃলােক-বাসী পিতৃগণ তাহাদের
অধস্তন বংশধরকে যথাকালে পিতৃলােকে লইবার জন্য যে
যত্নশীল থাকেন, ইহা আমরা অনায়াসেই মনে করিতে পারি।
শ্রদ্ধানুষ্ঠান দ্বারা শ্রদ্ধানুষ্ঠাতার এই পরােক্ষ উপকারিতা
সামান্য নহে। এতদ্ভিন্ন সমাজ-হিতকর প্রশস্ত দৃষ্টিতে
আর একটি উপকারিতা এ ক্ষেত্রে আমরা উপলব্ধি করিতে
পারি।
এ বিষয়ও এখানে একটু উল্লেখ করা যাইতে
পারে। শ্রাদ্ধ-তর্পণাদি অনুষ্ঠান দ্বারা হিন্দুর হৃদয়কে যেরূপ
ক্রমে উদার এবং সুপ্রশস্ত করিয়া উঠায়, এরূপ আর কোন
কাৰ্যের অনুষ্ঠানে সম্ভবে কি না সন্দেহ।
কেবল নিজের
পিতামাতা, পিতামহ, মাতামহ প্রভৃতি অতি নিকট আত্মীয়
জনের মঙ্গল বিধানার্থেই, হিন্দুর শ্রাদ্ধতৰ্পণাদির অনুষ্ঠান
ব্যবস্থিত হয় নাই ;-ক্রমে নিকট হইতে দুর, এবং দূর
হইতে আরও দূর, ক্ৰমে পরিচিত হইতে অপরিচিত, ক্রমে
স্বজাতীয় মানব হইতে অপরিচিত মানবমণ্ডলী, ক্রমে ঋষি,
দেবতা, গন্ধৰ্ব্ব, ভুত, প্রেত, পশু, পক্ষী, কীট পতঙ্গ,
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় জীৰ, জন্তু, লতা, গুল্ম, পৰ্বত, নদী
পৰ্যতেরও মঙ্গল কামনাতে অভিষিক্ত করিয়া প্রত্যহ তর্পণের
( ৮০ )
জলদান করিবার বিধাম এক হিন্দু শাস্ত্রগ্রন্থেই দেখিতে
পাওয়া যায়।* এইরূপ বিশ্বজনীন মঙ্গল কামনার দৈনন্দিন
অনুশীলনে অনুষ্ঠাতার হৃদয়, ক্রমে কতদূর প্রসস্ত হইয়া পড়ে
তাহা সহজেই অনুমেয়। শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সময়ে, নিজের পিতা-
মা তার উদ্দেশ্যে পিণ্ডদানের পূৰ্ব্বে, যাহাদের শ্রাদ্ধ করিবার
*নিম্নলিখিত, বচন উচ্চারণ করিয়া তৰ্পণ জল দান
করিবার ব্যবস্থা রহিয়াছে—
“দেবা যক্ষাস্তথা নাগা গন্ধৰ্বারসােহরাঃ।
রাঃ সর্পাঃ সুপর্ণাশ্চ তরব। জম্ভকাঃ খ।
বিদ্যাধরা জলাধারাস্তথৈবাকাশগামিন।
নিরাহারাশ্চ যে জীবাঃ পাপে ধৰ্ম্মে রতাশ্চ যে।
তেষামাপ্যায়নায়ৈতীয়ুতে সলিলং ময়া।”
যজ্ঞবল্ক্য তর্পণ বিষয়ে আরও বিষদরূপে লিখিয়াছেন যথা-
“ব্রহ্মাণং তর্পয়েং পূৰ্ব্বং বিষ্ণু রুদ্রং প্রজাপতিং।,
বেদান্ ছন্দাংসি দেবাংশ্চ ঋষী:শ্চৈব তপােধনা।
আচাৰ্যাংশ্চৈব গন্ধবানাচার্য-তনয়াংস্তথা।
সম্বৎসরং সাবয়বং দেবীররসস্তথা।
তথা দেবান্ নগা নাগান সাগরা পৰ্বতানপি।
সরিতােহথ মনুষ্যাংশ্চ যক্ষান্ রক্ষাংসি চৈব হি ।
পিশাচাংশ্চ সুপর্ণাংশ্চ ভূতান্যথ পশূংস্তথা।
বনস্পতীনােষধীংশ্চ ভূতগ্রামাংশ্চতুৰ্বিধা।
সবং জানুং ততােহন্নাচ্য পাণিভাং দক্ষিণমুখ।
(৮১)
কেহই জগতে নাই, তাহাদের উদ্দেশ্যে একটি পিণ্ডদান করিতে
গয়া বিষ্ণুপদে পিতার উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান-সময়ে
আত্মীয় কুটুম্ব বন্ধু বান্ধব হইতে আরম্ভ করিয়া জগতের চরাচর
সকলকেই উদ্দেশ্য করিয়া পিণ্ডদান করিবার ব্যবস্থা রহিয়াছে
এখন আমাদিগকে গয়ালী ঠাকুর যে সকল মন্ত্র উচ্চারণ
করাইয়া থাকেন, তাহার ভাবার্থ এইরূপ
“আমাদের কূলে যাহারা পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন; ও
আঁহাদের উত্তম গতি প্রাপ্তি হয় নাই, তঁাহাদিগকে
কুশপৃষ্ঠে তিল আর জল দ্বারা আবাহন করিতেছি। এবং
মদীয় মাতামহৰংশে যাহারা মরিয়াছেন ও যাহাদের সম্মতি
হয় নাই তাহাদিগকেও আবাহন করিতেছি। বন্ধুবৰ্গকূলেও
য হারা মরিয়া সগতি লাভ করেন নাই তাহাদিগকেও আবা-
হন করিতেছি। আমাদিগের পিতৃবর্গ, মাতৃবর্গ এবং মাতা-
মহগণ, ব্রহ্মা হইতে বৃক্ষাদি স্তম্ব পর্যন্তরূপে-দেব, ঋবি বা
মনুষ্যরূপে যে প্রকারে আছেন, সেই প্রকারে থাকিয়াই
তঁাহারা এই তিনােদক প্রদান দ্বারা প্রীতিলাভ করুন।
সপ্তদ্বীপবাসী অথবা এককোটি বংশজাত ব্যক্তিরা ব্রহ্মােক
হইতে যে ভূবনে অবস্থিতি করেন, তাহাদিগের উদ্দেশ্যে
তরিঙ্গৈস্তর্পয়েন্মন্ত্রৈঃ সৰ্বান্ পিতৃগণাংস্তথা।
মাতামহাংশ্চ সততং শ্ৰদ্ধয়া তর্পয়েৎ দ্বিজ ।
* যেং ন মাতা ন পিতা ন বন্ধুলৈ বান্নসিদ্ধিতথা-
নোহস্তি তে তৃপ্যন্তু"-ইত্যাদি।
(৮২)
এই সকল তিলেদক প্রদত্ত হইতেছে। আমাদের বংশজাত
যে সমস্ত ব্যক্তি কালকবলে নিপতিত হইয়াছেন এবং
আঁহাদিগের সদগতি হয় নাই তাহাদিগের উদ্ধার্থে এই
সকল পিণ্ড প্রদান করিতেছি। মদীয় মাতামহবংশীয় যাঁহারা
কালকবলে পতিত হইয়াছেন, অথচ সদগতি প্রাপ্ত হন নাই,
তাহাদিগের উদ্ধারের জন্য পিণ্ডদান করিতেছি। মদীয়
বন্ধুগণের বংশে যাহারা অকালে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইয়া
সদগতি লাভ করিতে পারেন নাই, তঁহাদিগের উদ্ধারের
নিমিত্ত এই পিণ্ডদান করিতেছি। আমাদিগের কূলে
জন্মগ্রহণ করিয়া অজাতদন্ত অবস্থায় কিম্বা গর্ভে যাহারা
নষ্ট হইয়াছেন, তাহাদিগের উদ্ধার্থ পিণ্ড দিতেছি।
আমাদিগের কূলে মৃত যাহাদিগের অগ্নিসংস্কার হইয়াছে,
অথবা হয় নাই, তাহাদিগের উদ্ধার্থ পিণ্ডদান করিতেছি।
উক্ত তিন কূলের মধ্যে যাহারা দাবাগ্নিতে বা সিংহ ব্যাঘ,
দংষ্ট্ৰী ও শৃঙ্গী কর্তৃক বিনাশিত হইয়াছেন তাহাদিগের
পরিত্রাণার্থ পিণ্ডদান করিতেছি।
আমাদিগের কূলে
যাহারা উদ্বন্ধনে অথবা বিষ বা শস্ত্র দ্বারা বিনষ্ট হইয়াছেন
কিম্বা, কোন প্রকারে আত্মহত্যা করিয়াছেন তাহাদিগের
পরিত্রাণার্থ পিণ্ড দিতেছি। যাহারা কাল সূত্রে রৌরব
নামক নরকে বা অন্ধতামিত্র নিয়ে গিয়াছেন তাহাদিগের
পরিত্রাণার্থ পিণ্ড দিতেছি। যাহারা নিজ নিজ কর্ম ফলে
নানারূপ দুষ্ট যােনিতে পরিভ্রমণ করিতেছেন এবং
(৩)
যাহাদিগের নরজন্মপ্রাপ্তি হওয়া দুর্লভ তাহাদের পরিত্রাণার্থ
পিণ্ড প্রদান করিতেছি। মদীয় পিতৃগণ যাহারা যেরূপে
আছেন, তাহারা এই পিণ্ড দ্বারা প্রীতিলাভ করুন। যাহারা
বান্ধব-রহিত, ইহলােকে মদীয়, বন্ধু, অথবা জন্মান্তরে
বন্ধু ছিলেন, তাহাদিগের পরিত্রাণাৰ্থ এই শিশু প্রদত্ত
হইতেছে। তাহাদের অক্ষয় সন্তোষলাভ হউক।**
* “অম্মৎকুলে মৃত যে চ গতিৰ্যেং ন বিদ্যতে।
আবাহয়িয্য তা সৰ্বান্ দর্ভপৃষ্ঠে তিলােদকৈ।
মাতামহকূলে যে চ গতিৰ্যেং ন বিদ্যতে।
আবাহয়িয্যে তা সৰ্বান্ দৰ্ভপৃষ্ঠে তিলােদকৈ ।
বন্ধুবৰ্গ কুলে যে চ গতির্যৈং ন বিদ্যতে ।
আবাহয়িয্যে তান্ সৰ্বান্ দৰ্ভপৃষ্ঠে তিলােদকৈঃ ।
আব্ৰহ্মপৰ্য্যন্তং দেবর্ষি পিতৃমানবাঃ ।
তৃপ্যন্তু সৰ্ব্বে পিতরে মাতৃমাতামহােদয়ঃ ॥
অতীত কূল কোটীনাং সপ্তদ্বীপ নিবাসিনা।
আব্রহ্মভুনাল্লাকাদিদমস্তু তিলােকং ।
অম্মৎকূলে মৃত যে চ গতিযেং ন বিদ্যতে।
তেষামুদ্ধরণার্থায় ইমং পিণ্ডং দদাম্যহং ।
মাতামহকূলে যে চ গতিৰ্যেং ন বিদ্যতে ।
তেষামুদ্ধৰণার্থায় ইমং পিওং দদামাহ ।
বন্ধুবর্গ কূলে যে চ গতিৰ্যেং ন বিদ্যতে।
তেষামুরণার্থায় ইমং পিং দদাম্যহং ।
*
(৮৪)
মানব হৃদয়ের উচ্চভাব বিভাসক, বিশ্বপ্রেম প্রবর্ধক,
সৰ্বমঙ্গলবিধায়ক এবম্বিধ শ্রাদ্ধ তৰ্পনাদি কাৰ্যানুষ্ঠানের অবশ্য
কৰ্ত্তব্য। প্রতিপাদন কল্পে এ পর্যন্ত আমরা যে সকল
কথার আলােচনা করিলাম, আস্তিক হিন্দুযুবককে বুঝাইবার
জন্য তাহাই পৰ্যাপ্ত মনে করি। যাহারা শ্রাদ্ধ তর্পণের
অজাতদন্ত যে কেচি যে চ গর্ভে প্রপীড়িত।
তেষামুদ্ধ রণার্থায় ইমং পিণ্ডং দদাম্যহং ।
অগ্নিদগ্ধাশ্চ যে কেচিন্নাগ্নিদগ্ধাস্তথা পরে।
বিদ্যুচ্চোর হতা যে চ তেভ্যঃ পিণ্ডং দদাম্যহং ।
দাবদাহে মৃতা যে চ সিংহব্যাঘ্রইতাশ্চ যে ।
দংঠুিভিঃ শৃঙ্গিভিৰ্বাপি তেভ্যঃ পিণ্ডং দদাম্যহং ।
উদ্বন্ধনমৃত যে চ বিষয-শস্ত্রহতাশ্চ যে ।
আত্মোপঘাতিনো যে ঢ তেভ্যঃ পিওং দদাম্যহং ।
রৌরবে চান্ধতামিত্রে কালসূত্রে চ যে গতাঃ ।
তেযামুদ্ধরণার্থায় ইমং পিং দদাম্যহং ।
জাত্যন্তর সহযুে ভ্রমন্ত স্বেন কৰ্ম্মণ।।
মানুষ্যং দুর্লভং যেষাং তেষাং পিণ্ডং দদাম্যহং ।
যে কেচিৎ প্রেতরূপেন বর্তৃন্তে পিতরে মম।
তে সৰ্বে তৃপ্তিমান্তু পিণ্ডদানেন সৰ্ব্বদা।
যেইবান্ধবা বান্ধব বা যেহন্যজন্মনি বান্ধবাঃ।
তেষাং পিখো ময়া দত্তে ক্ষম্যমুপতিতাং।”
(৮৫) মঙ্গলকারিতা সম্যক উপলব্ধি করিয়াও সময়াভাব বা অর্থাভাব বা সামর্থাভাব মনে চিন্তা করিয়া এই সকল কার্য্যের অনুষ্ঠানে বিরত রহেন, সেরূপ হৃদয়বান পুরুষগণের উদ্দেশে, এই প্রস্তাবের উপসংহার কালে, দুই একটি কথা নিবেদন না করিয়া নিরস্ত থাকিতে পারিতেছি না। রজ- প্রধান ক্ষত্রিয় বা বৈশ ধনীগণের শ্রাদ্ধ-তর্পণ সময়ে সােণা- রূপার টাট কোশাকুণী ঘট কোটরার ছড়াছড়ি বা নিমন্ত্রিত অনিমন্ত্রিত ভাট ব্রাহ্মণ, ভিক্ষুক ভােজনের হুড়াহুড়ি যতই হইতে দেখা যাউক না কেন, সাত্বিক ব্রাহ্মণের শ্রাদ্ধ তর্পণা- নুষ্ঠানে এ সকলের আদৌ কোন প্রয়ােজনই হয় না। শাস্ত্রে আড়ম্বরহীন-কাবে শ্রাদ্ধদিনে অতি অল্প সংখ্যক শুদ্ধা- চারী ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রণ করিয়া খাওয়াইবারই ব্যবস্থা রহিয়াছে। যাহার ধৃত মধু পরমান্নের সংস্থান নাই, বন্য ফলমুল আহরণ করিয়াও তাঁহার পিতামাতার শ্রাদ্ধ সম্পন্ন হইতে পারে। তদভাবে কেবল এক অঞ্জলী জলেও যে শ্রাদ্ধ সুসম্পন্ন হইতে পারে এমন কথাও এই প্রস্তাবের একস্থানে ইতিপূর্বে শাস্ত্রীয় বচন উদ্ধৃত করিয়া দেখাইয়াছি। “সময়াভাবের পক্ষে ইহা স্মরণ রাখিলেই যথেষ্ট হইতে পারে যে, অসমর্থ স্থলে কেবল “আব্রহ্মস্তম্বপৰ্যন্তং যৎ কিঞ্চিৎ সচরাচরং। ময়া দত্তেন তােয়েন তৃপ্তিমায়াত্ত সৰ্ব্বশঃ * উচ্চারণ করিয়া তিলেদকাঞ্জলী দিয়াও নিত্য তর্পণ কাৰ্য্য শেষ করা যাইতে পারে। এতটুকু উচ্চারণ করিতেও ১ () হায় সময়াভাব, তিনি আব্ৰহ্মশুম্বপর্যস্ত জগতৃপ্যতু” বলিয়া এক অঙ্গুলী জল ঢালিয়া দিয়াও তর্পণ সম্পন্ন করিতে পারেন। সময়াভাবে ব্রাহ্মণের ধর্মানুষ্ঠান বন্ধ হইয়া থাকিতে পারে না। যে ভাগ্যবান দরিদ্র মহাপুরুষের হৃদয় তার ঘরে শ্রদ্ধারূপ অমৃতরাশি সঞ্চিত রহিয়াছে, তাহার আবার বিশ্বসংসারে অভাব কি বস্তুর । যাহার বুকের তিৱে কৰ্তববুদ্ধি রহিয়াছে, তাহার আবার সামর্থ্যের অভাব কোথায়? যে ব্রাহ্মণ, প্রকৃত প্রস্তাবে নিষ্ঠাবান-ব্রাহ্মণ কুলােদ্ভব, তাহার আবার কর্তববুদ্ধিরই বা অভাব থাকিবে কি কারণে? ফল কথা, যেখানে কর্তব্য-বুদ্ধি আছে এবং ছা আছে, সেখানে সময়তা, অর্থাভাব বা সামর্থ্যাভাব হয় না। এরূপ কোন বাধা বিয়ের চিন্তাই হিন্দু ধৰ্ম্মানুষ্ঠান পথে এক মুহূর্তের জন্যেও তিষ্ঠিতে পারে না। এ সময়ে আমা- দের ভাব-সময়ের, অর্থের বা সামর্থ্যের নহে, অভাব কেবল ইচ্ছার। ইচ্ছাপ্রসবিনী জগজ্জননী, হিন্দুর নির্বাপিত হৃদরে, হিন্দুর কর্তব্য-পালনের ইচ্ছাকে আবার কবে প্রদীপ্ত করিয়া দিবেন, তাহা কেবল তিনিই জানেন!
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.