Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Pather Sheshe Ed.7
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পথেৱ শেষে
সামাজিক নাটক
BANM
2,
2,1:
মনােমােহন থিয়েটারে অভিনীত
প্রথম অভিনয় রজনী-২৯শে অগ্রহায়ণ, ১:৩ সাল
স্বর্গীয় নিশিকান্ত বসু রায় বি-এল,
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস্ট, কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ—পপৗষ, ১৩৩৫ সাল
দ্বিতীয় সংস্করণ—ফা, ১৩৩৫ সাল
তৃতীয় সংস্করণ-ভাদ্র, ১৩৩৬ সাল
চতুর্থ সংস্করণ—আষাঢ়, ১৩৩৭ সাল
পঞ্চম সংস্করণ-কার্তিক, ১৩৩৮ সাল
যষ্ঠ সংস্করণ—ফাল্গুন, ১৩৩৯ সাল
সপ্তম সংস্করণ-বৈশাখ, ১৩৪২ সাল
এক টাকা
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্সের পক্ষে ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্কস হইতে
গােবিপদ ভট্টাচাৰ্য যারা মুষিত ও শিত
২০১১, কর্ণওয়ালিস টু, কলিকাতা
K. }{ , প্রাণাধিক নির্মলকুমার- কত আব্দার তােমার পূরণ ক’তে পারি নি। সে সব এখন মনে হয় আর আমার মৰ্ম্ম পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আজ তুমি কত দূরে-সৰ্ব্বপ্রকারে আমার নাগালের বাহিরে—একেবারে পথের শেষে চলে গিয়েছ। হাতে তুলে তােমাকে কিছু দিতে পারব না। তাই বুকের কয়েক ফোটা তাজা রক্ত যা তপ্ত-অশ্রু হয়ে বেরিয়েছে, তাই তােমার উদ্দেশে পাঠাচ্ছি-তুমি গ্রহণ করােনা তোমাৰ-বাবা, Gন ১২ CALCUTTA.; * .
চরিত্র
ঐ পুত্র
•••
। ।
দুর্গাশঙ্কর রায়
জমিদার
নলিনী
যােগেশ
ঐ ভাগিনেয়
অনাদি
ঐ দেওয়ান
নিবারণ
ঐ কর্মচারী
যশ্বের
ঐ কর্মচারী
শ্যামা
ঐ
ভৃত্য
গগাবিন্দ
নলিনীর ভৃত্য
শশীবাবু, শশীবাবুর বন্ধুগণ, নিধুখুড়ো, খাজাঞ্জি, জগা পাগল,
ডাক্তার, ইনস্পেক্টর ইত্যাদি
পদা
দুশঙ্করের ভগিনী
নলিনীর স্ত্রী
রাধা
ভিখারিণী
ললিতা
নিবারণের তালিকা
s
পথের শেষে প্রথম অঙ্ক প্রথম দৃশ্য জমিদার দুর্গাশঙ্কর রায়ের বাটী— সুসজ্জিত কক্ষ প্রাচীর-গাত্রে দুগশঙ্কর রায়ের মৃত। পর, নিজের ও পুত্রের তৈলচিত্র বিলম্ব দুগশঙ্কর রায় একখানি আরাম কেদারায় বসিয়া গড়গড়ায় তামাক ইতেছেন। তাহার উদাস দৃষ্টি গবাক্ষপথে দূরে প্রান্তরে নিবদ্ধ। পাশ্বে ঢ়াইয়া প্রাণ দেওয়ান অনাদিনাথ কথা বলিতেছেন। নিম্নল হইত নয় মাঝে প্রাণখােলা হাসির ‘হে হো' শব্দ শুনা যাইতেছে। দ্বিপ্রহর তপনও অতীত হয় নাই। অনাদি। ব্যামাে হ’তেই সরােজবাবু বুঝতে পেরেছিলেন যে, এ যাত্রা তাঁর আর রক্ষা নাই। সংসারে আপনার ব’লতে এক বয়স্থা বিবাহ- যােগ্যা ভগ্নী ; তাই রােগের যাতনার চেয়েও ভগ্নীর ভবিষ্যৎ চিন্তা তাকে বেশী কাতর করেছিল। শেষে যখন বুঝতে পারলেন যে আর রক্ষা নেই, তখন অনন্যোপায় হয়ে থােকাবাবুকেই তাঁর ভগ্নীকে বিয়ে ক’তে এমন পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন যে, থােকাবাবুর স্বীকৃত হওয়া ভিন্ন আর গত্যন্তর ছিল না। সে অবস্থায়, প্রিয় বন্ধুর অন্তিম শয্যার সেই কাতর অনুবােধ কেউই উপেক্ষা ক’তে পারে না -দুর্গাশঙ্করের মুখ হইতে গড়গড়ার নল খসিয়া পড়িয়াছে। তিনি অপলক দৃষ্টিতে অনাদিনাথের মুখের দিকে চাহিয়া আছেন।
পথের শেষে প্রথম অঙ্ক তাড়াতাড়ি সব যােগাড় করে গােধুলি লগ্নে যেমন বিয়ে হয়ে গেল অমনি সরােজবাবুর দেহত্যাগ হল- দুগাশঙ্করের মুখ দিয়া অস্ফুট টভাবে “এ” শব্দটা উচ্চারিত হইল। বজ্রাহতের ন্যায় নিজের অজ্ঞাতসারে আরামকেদারা হইতে উঠিয়া অধীরভাবে কয়েকবার কক্ষমধ্যে পদচারণা করিয়া তিনি দরে গবাক্ষ পথে চাহিয়া রহিলেন। নিম্নল হইতে প্রাণখোলা উচ্চহাসির হে।' হাে’ শব্দ শােনা গেল। বুদ্ধ দেওয়ান কয়েক মুহূর্ত নতদৃষ্টিতে স্তব্ধ থাকিয়া পুনরায় বলিতে লাগিলেন বৌমাকে নিয়ে আজ থােকাবাবু কলকাতা রওনা হলেন। বাবার সময় আমায় বললেন, যে বাবাকে আমার প্রণাম জানিয়ে বলবেন যে আমি তার অধম সন্তান। তাঁর চরণে মার্জনা ভিক্ষা করছি! কি ক’য়ূব—আমার উপায় ছিল না। আপাততঃ আমি কলকাতায়ু যাচ্ছি-বাবার কাছে যাবার আমার আর মুখ নেই—তবে যদি তিনি এ অভাগাকে ক্ষমা করেন, তবে আবার তার পদধূলি মাথায় করে ধন্য হব। নিয়তল হইতে পুনরায় উচ্চহাসির ধ্বনি উখি হইল । কয়েক মুহূর্ত কক্ষটী শুব্ধ থাকিল। ধীরে দুগাশঙ্কর দেওয়ানের দিকে ফিরিলেন-দেওয়ান অনাদিনাথ ভীতিবিল দৃষ্টিতে দেখিলেন যে প্রভুর চক্ষুদয় ত মুখমণ্ডল আরক্তিম, নাসার নেবে কম্পিত হইতেছে। দুর্গা। শুছ অনাদি, ঐ যে নীচের তলা থেকে প্রাণ খােলা উচ্চহাসির শব্দ আছে—শুছ ? এ কেন জানও হাসির শব্দ কার জান ? । অনাদি। আমি ত নৌকা থেকে উঠে সােজা আপনার কাছেই এসেছি। দুর্গা। তবে শােন। আমার বাল্যবন্ধু শশীকলকে জান। দু’বছর পূর্বে তার মাতৃদ্ধে শশীদের বাড়ী গিয়েছিলেম মনে আছে? ৩ অনাদি। আরে ।
প্রথম দৃশ্য
পথের শেষে
দুর্গা। সেখানে শশীর মেয়েটা দেখে আমার ভারী পছন্দ হয়েছিল।
যেন পটে আঁকা একখানি দুর্গা-প্রতিমা। এখও তার সেই ঢলঢলে
সুন্দর মুখখানি আমার চোখের সামনে ভাসছে। আর কি তার
গুণ—পাঁচ দিন ছিলেম আমি অনাদি—ক্ষুদ্র বালিকা মায়ের মত
নিপুণহাতে আমার কি সেবাটাই না করল—মার কি মধুর তার
মুখের জ্যেঠামশাই ডাক—আমি মুগ্ধ হ'লেমবুঝলে অনাদি, আমি
একেবারে মুগ্ধ হ'লেম। আসবার পূর্বে মেয়েটিকে পুত্রবধূ, ক’বার
জন্য শশীর নিকট চাইলেম—আমি চাইলেম—বুঝলে? শশী অবশ্য
সানন্দে সম্মত হ’ল। আমার কাছে বেশী কিছু ছিল নাপাচ থান
মােহর, হাতের হীরের আংটা আর ঘড়ির চেন—এই দিয়ে তাকে
আশীৰ্বাদ করে এসেছিলেম—সে আজ নয়, দু’বছর পূৰ্বে। বৈশাখ
মাসে, এই ঠিক দু’বছর।
। অনাদি। আজ্ঞে সে ত শুনেছি।
দুর্গা। হাঁ,
হাঁ, মলিবাড়ী"এসেই তােমাদের সবাইকে সে কথা বলেছি।
খোকাও জানে—শুধু জানা কেন, কতবার এই দু’বছরে শশীর স্ত্রী
ভাবী জামাই জেনে তাকে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়েছে—তার বাড়ীর
মেয়েছেলেরা অবাধে তার সঙ্গে মেলামেশা করেছে। কবে এতদিন
এ বিয়ে হয়ে যেত।শুধু থােকার পড়ার ক্ষতি হবে বলে আমি
বলে কয়ে শশীর স্ত্রীকে নিরস্ত রেখেছি। আর বেচারা শশী, তার
বয়স্থা কাবাগদত্ত-আমার কথার উপর নির্ভর করে নিশ্চিন্ত
হয়ে বসে আছে । :—আজ সে এসেছে আশীৰ্বাদ ক’তে-
আমিই তাকে সংবাদ দিয়ে আনিয়েছি
অনাদি। সে কি!
দুর্গা। এক ঘণ্টা পূৰ্বে ২৯শে তারিখে আমি বিয়ের দিন স্থির করে
দিয়েছি। আমি, বুঝলে অনাদি, আমি নিজে গাজী দেখে দিন
1.
পথের শেষে প্রথম অঙ্ক এসেছ। ঠিক করে দিয়েছি। বে’তে কি খরচ হবে, কত লােক খাবে, কাকে কাকে নিমন্ত্রণ ক’বে,শশীর সংসার-ন ত কোন দিনই বড় একটা নেই--নিজের হাতে তাকে সব লিষ্টি করে দিয়ে বাড়ীর ভেতর খাবার কি ব্যবস্থা হচ্ছে তাই দেখ কে এসেছি, এর মধ্যে তুমি শকাল স্তব্ধ থাকিয়া পায়চারি করিয়া পুনরায় বলিতে লাগিলেন হতভাগার আসতে দেরী দেখে দেরী দেখে তাকে আনতে তােমাকে পাঠিয়েও শাঠিয়েও নিশ্চিন্ত হতে পারিনি—পাছে তােমাদের আসতে দেরি হয়, পাছে ঠিক সময় তােমরা পৌছিতে না পার, তাই যােল দাড়ের বজরাখানা রাধানগরের ঘাটে পাঠিয়ে দিয়েছি পুনরায় ক্ষণেক স্তব্ধ থাকিয়া পদচারণা করিতে লাগিলেন ও ক্ষণেক পরে বলিতে লাগিলেন)+-কন্যাদায় আজকাল কত বড় দায় জানত। আমার কথার উপর নির্ভর করে নিশ্চিন্তমনে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে বেচারা আনন্দ-উৎসবে মেতে আছে—নীচের তলায় বসে মহাশান্তিতে কি প্রাণখােলা হাসিটাই হাসছে—কোন্ প্রাণে তার বুকে এখন আমি বক্স হা। কোন্ মুখে তাকে এখন আমি বলব যে, এ বিয়ে হবে না তুমি ফিরে যাও—কেমন করে এ পােড় মুখ এখন আমি তার সামনে বের ক’ব—কেমন করে--বলবল - নিজের মুখে চপেটাঘাত করিতে লাগিলেন। কুলাঙ্গার সব জেনে শুনে আমায় অপদস্থ ক’রুলে-আমার এই উচু মাথা হেঁট করালে-আমাকে মিথ্যাবাদী, প্রক, জোচ্চোর, প্রতিপন্ন ক’লে নিজের মুষ্টিবদ্ধ হস্ত দংশন করিতে লাগিলেন ও অধীর- ভাবে পদচারণা করিতে করিতে বলিতে লাগিলেন) পিতার সম্মানের চেয়ে বন্ধুর অনুবােধ বড় হ’ল! অধম সন্তান-অধম সন্তান ক্ষমা কক্ষ-কৰ-পদধূলি ! ( সহসা অনাদির দিকে ফিরিয়া) জন অনাদি এর পরিণাম কি? এমন শাস্তি তাকে আমি প্রথম দৃশ্য পথের শেষে দেব—এমন শাস্তি, যা স্মরণ করে কোন দিন কোন পুত্র পিতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাৰ্য্য না করে -পিতার অবাধ্য না হয়— পিক অপরু করতে সাহস না করে এমন শাস্তি অনাদি। থােকাবাবুর উপায় ছিল না—সে অবস্থায় দুর্গা। উপায় ছিল না। কেন? সরােজকে সব খুলে বলে, অন্য কোন সুপাত্রার চেয়েও সুপাত্র দেখে সরাজের অনাথা ভগ্নীর বিবাহ দিলেই হ’ত যত টাকা লাগত আমি হাসতে হাসতে দিতাম। তা হলেই সােজ সন্তুষ্ট হত। না অনাদি, তুমি যা ভাবছ তা নয়-এ জেনে শুনে আমাকে অপদস্থ করা -জেনে শুনে। আচ্ছা, অনাদি, শশীকে ডাক— অনাদি। এখনই— দুর্গা। কঠোরস্বরে যাও- অনাদির প্রস্থান ওঃ-এই ছেলেকে কি ভালটাই না বেসেছি! কেন এতদিন ছাইএর উপর রেখে বলি দিইনি— মৃতপত্নীর তৈলচিত্রের দিকে সহসা দৃষ্টি পড়ায় স্তম্ভিত হইয়া দাড়াইলেন ও পরে বলিয়া উঠিলেন) হবে না— তা কখনই হবে না—হাত জোড় ক’ঝুলেও নাকুলাঙ্গারকে আমি কখনই ক্ষমা করব না। নানা-না- খামার প্রবেশ শ্যামা। বাবু খাবার জায়গা কি পাশের ঘরে ক’ব। দুর্গা। কে ? হ—কি ? তামা। খাবার জায়গা কোন্ ঘরে- দুর্গা। -না-কিছু ক’তে হবে না—সব আগুনে ঢেলে দে, রাস্তায় ছড়িয়ে দে-জলে ভাসিয়ে দে- শ্যামা। বাবু- শ প্রথম অঞ্চ ক দুর্গা। আবার বাবু! আমার কথা শুনতে পাসনি হারামজাদা। আমাকে চপেটাঘাত। প্রহার খাইয়া অপ্রতিভভাবে শ্যামার প্রস্থান। অন্ত দ্বার দিয়া বন্ধুগণসহ শশী ও অনাদি প্রবেশ করিলেন। দুর্গাশঙ্কর তাহাদের দেখিয়া দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া গবাক্ষর দিকে সরিয়া গেলেন শশী। কই দেওয়ানজী, এই বেলা খােকাকে ডাকত আশীৰ্বাদটা সেফেলি-এর পর ত বারবেলা হবে ;—কই দাদা কোথায় ? ( অনাদি। আসুন বাবু, বসুন। দুর্গাশঙ্কর সহসা ছুটিয়া আসিয়া শশীকমলের হাত দুখানি ধরিয়া বালকের স্যায় কাঁদিয়া উঠিলেন ও বলিলেন- শশী, শশী-ভাই আমায় আমায় ক্ষমা কর—আমি জোচ্চোর মিথ্যাবাদী—প্রতারকচণ্ডাল। নিজের চুল ছিড়িতে লাগিলেন এ কি! তুমি করছ কি দাদা-কি বছ—তুমি কি পাগল হলে! দুর্গা। পা পা থেকে জুতাে খােল-আপনারাও খুলুন—তারপর এই মিথ্যাবাদীর পিঠে-এই জোচ্চোরের মাথায় দমাদম্ মারুন-কষে মারুন—রক্ত পড়া চাই—এই রক্তে কুলাঙ্গারের জন্ম হয়েছে কি না! শশী। ব্যাপার কি দেওয়ানজী ! থােকা ভাল আছে ত? দুর্গা। ভাল নেই! খাসা আছে-বাপের মুখে চূণকালী দিয়ে সাধের বৌ নিয়ে কোলকাতায় মধুচন্দ্র করূছে ! শশী। বৌ নিয়ে ! দুর্গা। , বৌ নিয়ে। কুলাঙ্গার আদর্শ বন্ধু-প্রীতি দেখিয়েছেন। পিতাকে অপদস্থ ক'রে–পিতার মুখে ঢুণকালী দিয়ে প্রাণের বন্ধুর অনাথা ভগ্নীকে উদ্ধার করেছেন। শশী। এ! (থপ, করিয়া মাটীতে বসিয়া পড়িলেন) তবে আমার প্রথম পৃষ্ঠ পথের শেষে -উপায় ! আমি যে তােমার কথার উপর নির্ভর করে নিশ্চিন্ত" বসে আছি। আমার বয়স্থা মেয়ে—বাগদত্তা—আমার উপায় ১ম বন্ধু। আর উপায় ! কেমন, পূর্বে বলেছিলাম না। এখন আহাম্মকির ফল ভোগ কর। বলেছিলাম না, যে অতটা বাড়াবাড়ি ভাল নয়। ২য় বন্ধু। এ রকম যে হরৈ এ তােমার আগেই বােঝা উচিত ছিল। মুখের কথার উপর নির্ভর করে এই কলিকালে কেউ এমন নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকে। হাঃ হাঃ হাঃ-এটা যে কলিকাল হে- শশী। দাদা-দাদা—আমার, রেণুর মুখের দিকে চেয়ে আমায় দয়া কর। বাড়ী গিয়ে কি করে আমি এ কথা বলব। তারা যে সবাই জানে, বেরেণু তােমার পুত্রবধূ! দোহাই তােমার-তােমার পায় পড়ি দাদা–আমার উপর দয়া কর— দুর্গা। ওঃ-অনাদি-অনাদি-আমি কি উত্তর দেব-কি বলব-আমি কি ক’ব- শশী। দাদা, দাদা, যদি উপার কর আমি তােমার পায়ের উপর মাথা খুড়ে ম’ব—আজ, দু’বছর আসা যাওয়ার কি রকম জানা- জানি হয়েছে তুমি ত সৰ জন-আমি কি করে বাইরে মুখ দেখাব। দুর্গা। শশী, ওঠ ভাই, তুমি আমার আবাল্য সহচর, প্রাণের বন্ধু ! আমি নরাধম, আমায় ক্ষমা কর—দয়া কর। পিতার মুখ যে পুড়িয়েছে পিতাকে যে অপদস্থ করেছে-এমন অপদার্থ কুলাঙ্গারের হাতে যে তােমার রেণু পড়েনি, সে তােমার পরম সৌভাগ্য। ভেবেছিলেম, ওঃ, কত সাধ আমার মনে ছিল—আমার মাকে বল যে, আমি তার অভাগা ছেলে—আর—আর—আমি বড় অভাগা, আমায় তােমরা ক্ষমা কর।: (কর কাজ হইয়া আসিল) ৩ ৩.
পথের শেষে প্রথম অঙ্ক ১ম বন্ধু। আর এখানে দাড়িয়ে থেকে কি হবে! চল হে—নৌকায় উঠি গে’। অথেষ্ট হয়েছে—আর কেন! দুর্গা। আমার একটা অনুরােধ—আমি আমার যা কিছু আছে— স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি তােমার মেয়ের নামে দানপত্র করে দিচ্ছি। সেখানি আমার মায়ের বে’র সময় আমার হয়ে তাকে তুমি যৌতুক দিও। ১ম বন্ধু হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। এইবারই হাসিয়েছেন মশায়। গাছের গােড়া কেটে আগায় বেশ জল ঢালছেন ত! আপনার বাহাদুরী আছে! ৯। শশী বাবুর মেয়ের বে দেবার টাকা যদি না জোটে, তবে আপনার কাছে ভিক্ষা করতে আসবেন বৈ কি! চল হে। ১ অনাদি। বাবুবাবু—এই অসময়ে, এই অবেলায় যাবেন ! রান্না বান্না |- সব হয়েছে। না ? বাপু, তােমরা দেখছি কাণ কেটেও সুখী নও, আবার মুণের প্রলেপও দিতে চাও! চমৎকার ব্যবস্থা ত তােমাদের। চল- শশীকে টানিয়া লইয়া প্রস্থান করিল দুর্গা। অনাদি-অনাদি-আমি কি করব—বল ! আমি কি কব, দেওয়ালের গায়ে মাথা খুড়বে, না জানালা ভেঙ্গে লাফিয়ে পড়ব। ওঃ, এমন অপমান- দুই হাতে মাথাটা চাপিয়া ধরিলেন * অনাদি। বাবু—বাবু—যা হবার হয়ে গেছে—এখন স্থির হ’ন-স্থির হন- দুর্গা। অনাদি-অনাদি—আমার মাথা ঘুরছে-পা কাপছে- অনাদি দুর্গাশঙ্করকে ধরিয়া বসাইলেন ৯ অনাদি। পাখ-পাখা একখানা-জল-কল-শ্যামা-শ্যামা
প্রথম দৃ
পথের শেষে
শ্যামা পাখা ও জল লইয়া আসিল। অনাদি দুর্গাশঙ্করের মাথায় জল
দিতে লাগিলেন এবং শ্যামা বাতাস করিতে লাগিল
দুর্গা। (কিছুক্ষণ পরে) শ্যামা
শ্যামা। বাবু !
দুর্গা। (পুৰেতৈলচিত্রের দিকে-অঙ্গুলি-নির্দেশ করিয়া) ঐ ছবিখানা
নামিয়ে আন্ত। (মাৰ তথাকরণ) এখনই ওখানা আগুনে দিয়ে
পােড়াবি আর সেই ছাই এনে আমায় দেখাবি।
শ্যামা । যে 'আজ্ঞে ।
সমা অনদির দিকে চাহিল। অনাদি ইঙ্গিত করলেন
ছৰি লইয়া শ্যামা প্রস্থান করিল
দুর্গা। শােন অনাদি আমার আদেশ, আজ থেকে আমার বাড়ীর
ত্রিসীমানার মধ্যে বা আমার জমিদারীর মধ্যে কেউ যেন সে
কুলাঙ্গারের নাম উচ্চারণ না করে। সে এ পরিবারের কেউ নয়-
আমার বংশের কেউ নয়। আমার পুত্র নেই—মরেছে মরেছে-
(টলিতে টলিতে প্রস্থান।
অনাদি। কি সর্বনাশ হ’ল ! ত্রিশ বছর এ সংসারের নিমক খাচ্ছি।
যদি পিতা-পুত্রে আবার মিলন ঘটাতে পারি তবেই সে নিমকের
মর্যাদা রাখলুম, নইলে আমার জীবন ব্যর্থ। দেখি এখন বাবুকে যদি
কিছু খাওয়াতে পারি—এ বয়সে এত বড় আঘাত—সালে উঠতে
পালে হয়।
অতি সন্তর্পণে যােগেশ ও তৎপশ্চাতে তাহার মাতা সুখদা প্রবেশ করিলেন)
যােগেশ। শুনলে সব ?
সুখদা। হ।
যােগেশ। কেমন, এই সুযােগ ?
সুখাদা। সুযােগ তকিন্তু
যােগেশ। কিন্তু!
পথের শেষে
প্রথম অঙ্ক
সুখদা। তার সদ্ব্যবহার করবে কে?
যােগেশ। কেন আমি?
সুখদা। তুমি! এমন একটা জমিদারী তােমার ছিল না! তুচ্ছ একটা
স্ত্রীলােকের জন্য এমন তুমি মেতে উঠলে যে, এক সর্বনেশে মকদ্দমায়
দু’দিনে তােমার সব ফাক—পথের ফকির হয়ে আজ তুমি মাতুলের
অন্নদাস। আর তােমার গর্ভধারিণী আমি—আমি ভাইয়ের
সংসারে বাদীর বাদী।
যােগেশ। জমিদারী গিয়েছে বটে কিন্তু যে অভিজ্ঞতা পেয়েছি তা দিয়ে
এখন এমন বিশটে জমিদারী ক’তে পারব না।
সুখদা। অভিজ্ঞতায় পেট ভরে না—অভিজ্ঞতায় পেট ভরে নি
অভিজ্ঞতায় পেট ভছেও না। পেট ভয়তে চাই টাকা—বেঁচে
থাকতে চাই টাকা—শুধু টাকা।
যােগেশ। আচ্ছা, এবার তুমি দেখে নিও। এবার একটা হিল্লে না
লাগিয়ে আমি ছাড়ছি না
সুখদা। দিনরাত নেশা ভাঙ্গে ডুবে থেকে! ওঃ—যােগেশ, মামার দোরে
দু’মুঠা ভাতের জন্য পড়ে থাকতে তাের লজ্জা হয় না ! তাের মা আজ
দাসী বাদীর অধম হয়ে-তিন বেলা ভাইয়ের সংসারে হেঁসেলের
হাড়ী ঠেছে—তাের শরীরে কি মানুষের রক্ত নেই !
যােগেশ। সে ত যা হবার হয়ে গেছে মা। এখন গাওটা যাতে লেগে
যায় তার ব্যবস্থা কর।
সুখদা। আমি ব্যবস্থা কব !
যােগেশ। হাঁ মা তুমি। তুমি ইচ্ছা করলে দিনকে রাত ক’তে পার।
তােমার পায় পড়ি মা, এ সুযােগ যদি সরে যায়, তবে আমি প্রাণে
বাঁচব না। চমৎকার সুযােগ মা, শুনলে ত মামাবাবু এ জয়ে আর
নলিনীদার মুখ দেখবেন না-
দ্বিতীয় দৃশ্য । দুর্গাশঙ্করের কলিকাতার বাটী। দ্বিতলের একটী কক্ষ উন্মুক্ত-দ্বারপথে ভিতর-বাটীর দিকে রেলিং দেওয়া ঝুল-বারান্দা দেখা যাইতেছে। পার্থের পড়গড়ির জানলা বন্ধ আছে। অপর পার্শ্বের জানলা খোলা আছে-সে জানলা দিয়া নিম্নের রাজপথ দেখা যায়। কক্ষটীতে কয়েকখানা চেয়ার আছে—বেলা নয়টার বেশী হয় নাই পারুল ও তংপশ্চাৎ তাহার অঞ্চল টানিতে টানিতে নলিনীর প্রবেশ পারুল। ছাড়—ছাড়—আ হা হা-কি যে কর- নলিনী। ( সহাস্যে) কি করি ? এই দিনের বেলা- নলিনী। আমি কি বলেছি যে এখন দুপুর রাত্রি পারুল। কেউ দেখবে নলিনী। ওঃ, তাই বল ! এই জন্য আজ দু’দিন পাড়ার যত লােক তােমার জানলার গােড়ায় আড়ি পেতে পড়ে আছে-- পারুল। কেন বিলে ঝি নেই-গগাবিন্দ নেই– নলিনী। থাকে থাক। আমি স্পষ্ট উত্তর চাই। তুমি তােমার ঐ মান্ধাতার আমলের পচা পুরানাে সাড়ে পাঁচ হাত ঘােট্টা সহজে খুলবে, না আমি লােকজন ডেকে জোর করে খােলা ? পারুল। লােকজন ডাকবে কি-ও মা, সে কি! নলিনী। কি করব বল-তােমার ঐ ঘােটা-রাক্ষসীকে দেখে দেখে আমার হৃদরােগ হবার উপক্রম হয়েছে—আজ ওকে গঙ্গাপার করে তবে আমার অন্ত কাজ। পারুল। ওগাে তােমার পায়ে পড়ি-আমার যে ভারী মজা করে- পথের শেষে প্রথম অঙ্ক ঐ বিদেকে নলিনী। বে’র আগে এ লজ্জা কোথায় ছিল—তখন ত পারুল। যাও-আমি কিন্তু চলে যাব নলিনী। যাও দেখি— পারুল। ধরে রেখেছ যে- নলিনী। দেখ, এখনও ঘষ্টা খােল বলছি। তা না হলে পারুল। আমার বড় লজ্জা করে—আমি পারব না। নলিনী। পারবে না? আমি আজ কিছুতেই ছাড়ব না। ডাকব,—গগাবিন্দকে ডাক্ব পারুল। ওমা! সে কি ? নলিনী। খুলে না এখনও ! ডাকি—তবে ডাকি। ডাকি—তবে ডাকি! ও-ও-ও-- পারুল। কর কি! কর কি! তােমার পায়ে পড়ি। নলিনী। পায়ে পড়লে কি হবে। আজ আমি একটা কাণ্ড বাধাবই। ওরেও বিনে-ও- পারুল। নানা—এই যে—এই যে— নলিনী। এই দেখ দেখি। এমন মুখখানি কি ঢেকে রাখবার। পারুল। যাও তুমি বড় দুষ্ট- নলিনী। পারুল। পারুল। কি ? নলিনী। তােমার দাদার জন্য বড় মন কেমন করে না? পারুল। তুমি কাছে না থাকলে আরও বেশী করত। নলিনী। স্বর্গের দেবতা সে, স্বর্গে গিয়েছে। তার কথা ভাবলে তার আত্মা কিন্তু কষ্ট পাবে। মহা-শান্তিতে সে গিয়াছে-দেখেছিলে , ম’রবার সময় কি শান্তির হাসি তার চোখে মুখে ফুটে উঠেছিল পারুল। সে হাসি ত তাঁর মুখে তুমিই ফুটিয়েছিলে।
দ্বিতীয় দৃশ্য পথের শেষে নলিনী। আমি ! পারুল। হাঁতুমি। তুমি যদি এ অভাগিনীকে চরণে স্থান না দিতে তবে মরণের পরপারে গিয়েও কি তার আত্মা শান্তি পেত! ও, কথায় ভুলিয়ে আমায় এতক্ষণ আটকে রেখেছ—কি দুষ্ট, তুমি ! ছাড়-ছাড়— নলিনী। ছাড়তে পারি এক সৰ্ত্তে- পারুল। কি ? নলিনী। আর কখনও আমার কাছে অত বড় ঘােষ্টা দিয়ে আসবে না পারুল। সে কিন্তু যখন আমরা এক লা থাব। নলিনী। হাঁ, যখন আমরা দুজনে একলা থাব। কি রাজী ? পারুল। হু:- নলিনী। ঠিক ত ? পারুল। খুব। নলিনী। আচ্ছা যাও। কি, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলে? ওকি, উহুঃ, না অতখানি নয়, এদিকে এস, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। এইটুকু, এর বেশী নয় কিন্তু পারুল। তাহলে এইবার ছুটী- নলিনী। আচ্ছা, মঞ্জুর। আমিও একবার বেরােব- পারুল। এত বেলায় আবার কোথায় বেরােবে ! রান্না কিন্তু হয়ে গেল -কালকের মত দেরি ক’র না—সকাল সকাল এস। নলিনী। এই ত! লজ্জার বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে ত ভাল করি নি। এই ত শাসন সুরু হল- পারুল। যাও। হাসিতে হাসিতে নলিনী কক্ষের বাহিরে গেল ও বারালায় দাড়াইয়া পার্শ্বের গবাক্ষর খড়খড়ি খুলিয়া পারুল কি করে দেখিতে লাগিল। পারুল নলিনীর গমনপথে ক্ষণকাল চাহিয়া থাকিয়া বলিল—
পথের শেষে
প্রথম অঙ্ক
দেবতা, তুমি যদি দয়া করে চরণে স্থান না দিতে, তবে স্রোতের তৃণের
মত ভাতে ভাসতে কোথায় যেতাম কে জানে!
ও গড় হইয়া নলিনীর উদ্দেশ্যে প্রণাম করিল
নলিনী। ( হাে হাে করিয়া উচ্চ হাসিয়া উঠিয়া বলিল) আমি সব
শুনেছি—সব দেখেছি-
পারুল। (থতমত হইয়া) এা-—এ সব কিন্তু ভারী অধ্যায়-
নলিনী। ( বাহিরে দাড়াইয়া দরজার ভিতরে মুখ বাড়াইয়া) বাঃ-
রাগলে যে আরও চমৎকার দেখায়--
পারুল। যাও, সত্যি বলছি কিন্তু
নলিনী। এবার সত্যি যাচ্ছি কিন্তু
পারুল। কি লজ্জা! সব দেখে ফেলেছেন—আর এত দুষ্ট, আজ
আমি কিছুতেই কথা বলব না—কাছেও যাব না-
নেপথ্যে রাধা গাহিয়া উঠিল—
‘ব্রজরাজ নন্দন
বৃন্দাবন ধন
মণ্ডিত মালতী মালে-
কে গাইছে ?
( নেপথ্যে—নলিনী। ওরে ওহিদ, বষ্টমীকে গুম পাঠিয়ে দেত।
একা আছে।
। এমন অসময়ে বেরুচ্ছ বাবু ?
নলিনী। এখনই ফিরব রে
বিন্দে ওগগা ও বষ্টমী, ই যাও
রাধা। কোন পথে গা ?
বিন্দে। ঐ সােজা চলে যাও
পারুল। এতক্ষণ রাস্তায় বেরিয়েছেন-জানালা দিয়ে ত দেখা যায়।
৫.
লম্বা দেখন্নিয়া দিয়া একপার্শ্বে সরিয়া দাড়াইয়াছে।) পরে যে ( জানালা খুলিয়া দেখিয়া )-ওমা! ছি! ছি! আমি কি জানতুম যে তিনিও পেছন ফিরে তাকাবেন! দুই দুইবার ধরা পড়লেম— দ্বার সম্মুখে আসিয়া রাধা বলিল— গাে গিন্নীমা-গিন্নীমা গেলেন -গিন্নীমা গেলেন কোথায়? কই গাে ঝি, তােমাদের গিন্নীমা কোথায় ? (পারুল রাধার কথা শুনিয়াই (নেপথ্যে- ( ঐত উপরেই আছেন। বৌমা লাভালা বাহু) রাধা। তুমি এই বাড়ীর গিন্নী নাকি? নূতন গিন্নীপনা বুঝি—তা বুঝেছি, তা’ ভাই আমি মেয়ে মানুষ তায় ভিখিরি—আমার কাছে অত লজ্জা কেন? (পারুল ঘােটা খুলিল) বাঃ-বড় সুন্দর ত তােমার মুখখানা- পারুল। নিজের মুখখানা আরশীতে বুঝি কখনও দেখ নি। তুমি দোরগােড়ায় দাড়িয়ে রইলে-ভিতরে এস না ভাই- রাধা। ভাই, এই বেশ আছি ; তুমি গান শুনবে না? পারুল। ste- রাধার গীত ব্ৰজরজি:নন্দন বৃন্দাবন ধন মণ্ডিত মালতী মালে। অগুরু চন্দন তনু ঘন লেপন শিরে শিখণ্ডক দোলে । খঞ্জন গঞ্জন কমল লােচন চাল উজোরি সহ হস। শ্রবণে চঞ্চল, মকর কুল, পিন্ধন পিঙল বাস। বিশ্বধর পর, মুরলী উচর সাধা রাধা বুলি বুলে। রাঙ্গা উৎপল, চরণ যুগল, মল মঞ্জীল খেলে।
পথের শেষে প্রথম অঙ্ক পারুল। বাঃ কি মিষ্টি গলা ! তােমার বৈষ্ণবও এসেছেন না কি ? রাধা। আমি নিজেই যে বৈষ্ণবী নই—বৈষ্ণব পাব কোথায় ? পারুল। আচ্ছা ভিখারিণী, তােমার ভিখারী আছেন ত ? রাধা। আমার স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা ক’ছ—তিনি ভিখারী হবেন কেন? তিনি যে রাজ-রাজেশ্বর। পারুল। তােমার কথা ত আমি বুঝতে পারছি না। এস না ভাই ঘরের ভিতর। রাধা। আমার যে জাত গিয়েছে পারুল। তা যাক, আমার ঘরে এমন কিছু নেই যা তুমি এলে অপবিত্র এস- রাধা। দেখ ভাই গিন্নী, বাড়ী বাড়ী যাই—দোরগােড়ায় দাড়িয়ে গান গাই—কেউ অনুগ্রহ করে একটা আধটা কথা বলে, কেউ মুখ ফিরিয়ে চলে যায়—দয়া করে যে যা দেয়, নিয়ে চলে আসি। তােমার মত এমন জুলুম ক’রুতে ত কাকেও দেখি নি। পারুল। আমি যে ভাই নূতন গিন্নী, এখনও ত গিন্নীপনা শিখতে পারি নি রাধা। যদি না শিখতে পার,—শিখ না ;-প্রাণটা এমনি কঁচা থাক। গরীবের উপর এমনি দরদ চিরকাল রেখ। পারুল। কই তুমি এলে না। রাধা। তবে এ ভিক্ষের ঝােলাটা দোরগােড়ায় রেখে আসি। এটা সঙ্গে থাকলে ত আমি তােমার সঙ্গে মন খুলে আলাপ করতে পারব ও কেবলই খোঁচা দিয়ে আমায় মনে করিয়ে দেবে যে, তােমাতে আমাতে স্বর্গ মর্ত্য পার্থক্য-তুমি স্বামী সােহাগিণী- স্বামীর আদরিণী—গৃহের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, গৃহিণী—আর আমি অভাগিনী, কাঙ্গালিনীপথের ভিখারিণী ;" = ২৪
দ্বিতীয় দৃশ্য
পথের শেষে
রাধা দ্বারের নিকট ঝুলি রাখিয়া ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল আর পারুল একখানি
আসন পাতিয়া তাহাকে বসিতে দিল ও অপরখানায় নিজে বসিল
পারুল। এখানে ব’স
রাধা। তুমি যে আমায় জামাইয়ের আদর আরম্ভ কলে—
পারুল।
মনের কথা বলবার একটা লোেক না পেয়ে এ ক’দিনে প্রাণটা
আমার হাঁপিয়ে উঠেছে-ভগবান আজ তােমায় মিলিয়ে দিয়েছেন
যদি, তােমায় আমি সহজে ছাড়ছি না
রাধা। আমি ভিখারিণী আর তুমি রাজরাণী ; এ তুমি বলছ কি
পারুল। রাজরাণী হয়েছি ত আমি মাত্র আজ ক’দিন—আমিও যে ভাই,
গরীবের মেয়ে—গরীবের বােন।
বােন। দেবতা দয়া করে, পায়ে ঠাই
দিয়েছেন তাইত-নইলে আমারও যে কি অবস্থা হত-কে জানে!
রাধা। অতীত কথা কি কার’ মনে থাকে, না কেউ মনে রাখে । তুমি
ভাই অদ্ভুত ! গরীবের মেয়ে রাজার ঘরে পড়লে আগেকার কথা
সে যে ইচ্ছা করে ভুলে যায়, গরীব দুঃখীদের সে যে ঘৃণা করে।
পারুল। ল কি হয় !
রা। তার মনে সদাই থাকে একটা ভয়, পাছে সে যে গরীবের মেয়ে
এ কথা কেউ জাতে পারে বা বলে ফেলে।
পারুল। তােমার বয়স কি ভাই ?
রাধা। এই ষােল। তােমার ?
পারুল। এই চৌদ্দ। তাহলে ত আমরা প্রায় সমবয়সী। ভাবটা বেশ
জবে। কি বল ? তােমার নামটা কি ভাই! .
রাধা। রাধা। তােমার ?
পারুল। পারুল।-আমি ভাই তােমায় কিন্তু রাধা বলে ডাব,
কি বল ?
রাধা। যা তােমার ইচ্ছ। আমি কিন্তু তােমায় নূতন গিন্নী বলে ডাকব।
প্রথম অঙ্ক
পারুল। আবার ও ‘গিন্নী’ কেন! তুমি আমার নাম ধরেই ডেক—
রাধা। তা কি হয় ভাই—চাকর চাকরাণী সব রয়েছে তারা কি মনে
করবে—আমি যে ভিখারিণী।
পারুল। হাঁ ভাই রাধা, এই কঁচা বয়সে, এত রূপ নিয়ে ভিক্ষা ক’তে
বেরিয়েছে—তােমার ভয় করে না ?
রাধা। ভয়! একদিন সে আমায় বড্ড ভয় দেখিয়েছিল, এখন আমার
সাহস দেখে, সে নিজেই ভয় পেয়ে পালিয়েছে।
গীত
আমার নাই ভয়ের বালাই।
অভয়ার পদ হৃদে ধরি,
ভয়কে কি আর আমি ডরাই।
ঝড় তুফানে বেজায় নাকাল,
মাঝ দরিয়ায় ছেড়েছি হাল,
(তারপর) কালী বলে দিয়ে ঝাঁপ, (আমি) ভয়ের মুখে দিছি ছাই।
এমন গান আমি কখনও শুনিনি—
রাধা। তােমার মত এমন সমজদার শ্রোতাও আমার আর জোটে নি।
-তুমিইত দেখছি গিল্পী, তােমার শ্বশুর শাশুড়ী নেই ?
পারুল। শাশুড়ী নেই-শশুর দেশে আছেন। আমার খবর ত সবই
নিলে, তােমার কথা ত আমায় কিছু বলে না
রাধা। আমার কথা! সে যে এক উপন্যাস—বলতে ত অনেক সময়
লাগবে।
পারুল। তা লাগুক না-আমার ত কোন কাজ নেই। তিনি বাইরে
গেছেন- যতক্ষণ না ফিরছেন—আমার ছুটা।
রাধা। আচ্ছা, তবে শােন। তােমরা কি জাত ?
পারুল।. কাম। তােম?
পথের শেষে
ধা। আমিও কায়স্থের মেয়ে। আমারও শাক বাজিয়ে উলুধ্বনির
মাঝে বিয়ে হয়েছিল—আমিও স্বামীর ঘর করতেম—আমারও
গােলাভরা ধান ছিল-গােয়ালভরা গরু ছিল। শাশুড়ী মেয়ের
অধিক স্নেহ করতেন, ননদেরা বােনের মত ভালবাসত। আর
স্বামী ?—তার সােহাগ পেয়ে, আমার এ নারী-জন্মও সার্থক
হয়েছিল। ভােরে ঘুম থেকে উঠতাম, আমার ছােট উঠানখানি
মেজে ঘষে ঝকঝকে ক’তাম—নিজের হাতে রেধে সকলকে
খাওয়াতাম-শাশুড়ীকে রামায়ণ পড়ে শুনাতে শুনাতে অশােক-বনে
রাক্ষসী বেষ্টিত মা জানকীর দুঃখে অশ্রু বিসর্জন করতাম—বিকেলে
আমার ছােট বাগানখানিতে দোপাটা ফুলের চারায়, গাঁদার চারায়
সয়েহে জল দিতাম, ননদদের চুল বেঁধে আদর করে টিপ পরাম
আর সাঁঝের বেলায় প্রদীপ জ্বেলে তুলসীতলায় স্বামীর মঙ্গলের জন্য
দেবতাকে প্রণাম কম। চোখের পলকে এমনি সুখে জীবনের
দুটী বৎসর আমার কেটে গেল। (রাধা থামিল )
রুল। তারপর? ( রাধা স্তব্ধ হইয়া রহিল—তাহার মন যেন কোন
স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করিতেছে। তারপর কি হল? ( রাধা পূৰ্ব্ববং
নিরুত্তর) রাধা-ও রাধা-
ধা। হ—( দীর্ঘশ্বাস ) এমনি সুখে এ অভাগিনীর দু’টা বছর কেটে
গেল। অত সুখ, অত শান্তি, অত তৃপ্তি, অত আনন্দ স্মরণ
ক’রুতেও আজ আমার দেহ মন পুলকিত হয়—আমার এ অভিশপ্ত
জীবনে সইবে কেন? এইমাত্র তুমি আমার কঁচা বয়সের কথা
বলে না—ঐ বয়সই আমার কাল হ’ল। এই ছার রূপ আর যৌবন
আমাকে বৈকুণ্ঠ ভ্রষ্ট করল-আমার উপর আমাদের দুশ্চরিত্র
মাতাল জমিদার-নন্দনের কৃপাদৃষ্টি পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে
দু’চারখানা উড়াে চিঠি আসতে আরম্ভ হ'ল—পদী নাপ্তেনী টাকার
j
পথের শেষে প্রথম অঙ্ক খতি নিয়ে টাকা বাজিয়ে বাজিয়েও কয়েকদিন চলাফেরা করল ; অবস্থা গুরুতর দেখে আমি আমার স্বামীকে ও শাশুড়ীকে সব বলে দিলাম। তারা পদীকে একদিন খুব শাসিয়ে দিলেন। কয়েক দিন তারা কোন উচ্চবাচ্য করল না—আমরাও মনে ক’রুলাম যে মেঘ বুঝি কেটে গেল। কিন্তু মেঘ ত কাটেনিসে শুধু ভিতরে ভিতরে জমাট বাঁধছিল—পিতার মৃত্যুর পর জমিদারী হাতে পেয়েই একদিন রাত্রে সেই নর-পিশাচ আট দশ জন পাইক নিয়ে বেড়া কেটে আমাদের ঘরে ঢুকে আমার সেই সুখনীড় থেকে আমাকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে গেল—স্বামী বাধা দিতে গেলেন-একজন পাইক তার মাথায় লাঠি মারল—তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। পারুল। সর্বনাশ! শুতেও যে গায়ে কাঁটা দেয়—তারপর-তারপর? রাধা। পাইকেরা ঘাড়ে করে আমায় এক মাঠের মাঝখানে নিয়ে গেল—আমি মূৰ্জিত হয়ে পড়লাম পারুল। আ হা হা ! রাধা। জ্ঞান হলে দেখলাম, আমি আমার বড় সাধের উঠানে শুয়ে আছি-স্বামী দাওয়ার উপর মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন- শাশুড়ী বুক চাপড়ে আর্তনাদ করূছেন-ননদের ফ্যা ফ্যা করে আমার দিকে কাতর-নয়নে তাকাচ্ছে আর চোখের জল ফেলছে, আর গ্রামের মাতব্বর মশাইরা উঠানের চারিপাশে জটলা করছেন ; কিছুক্ষণ পরে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল—মকর্দমা হল। জমিদারের ছেলে প্রথমে জমিদারী বন্ধক দিলেন—পরে বিক্রী কলেন- হাজার হাজার টাকা জলের মত বিতরণ হল—দিন রাত হয়ে গেল- সাক্ষীদের পেট ভ’রল—আর সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণ হয়ে গেল যে আমি জন্ম জন্ম ভ্রষ্টা, দুশ্চরিত্রা, স্বেচ্ছায় পরপুরুষের সঙ্গে গৃহত্যাগ করেছি। পারুল। এ্যা! সে কি! ২৮
দ্বিতীয় দৃশ্য
পথের শেষে
রাধা। বিচারক ঘটনাটা বুঝেছিলেন—তার বিশ্বাসও হয়েছিল—কিন্তু
প্রমাণ কোথায় ? আসামীরা খালাস পেল-আমারও স্বামীর ঘরের
দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ হ’ল।
পারুল। সে কি! কেন—কেন!
রাধা। মকদ্দমার সময় লােজন নিয়ে একটা বাড়ী ভাড়া করে আমার
স্বামী জেলায় থাকতেন। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসে আমিও
কয়েকদিন সেখানে ছিলাম—মকর্দমা শেষ হলে তার বাড়ী যেতে
হ’ল। যাবার সময় আমায় বল্লেন-“সবইত বুঝতে পাছ-বুড়ো
মা গলায়, কতকগুলাে অবিবাহিতা ভগিনী-গাঁয়ের সবাই তােমায়
বাড়ী নিতে অমত করছেন। সংসারে বাস ক’তে হলে সমাজকে
ত আর অমান্য করা যায় না।” কথাটা শুনে আমার মাথা ঘুরে
গেল-বসে পড়লাম-তারপর তার পা দুখানি জড়িয়ে ধরে কেঁদে
বললাম—কি অপরাধে আমায় ত্যাগ করে যাবে—অন্যে না জানুক,
তুমি ত জান, আমার কোন দোষ নেই।
পারুল। তিনি কি বললেন ?
রাধা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ঐ একই কথা। বুড়াে মা গলায়-অবিবাহিত।
ভগ্নী, সমাজকে কি করে অমান্য করি।
পারুল। তারপর
ৰাধা। তারা সব নৌকায় উঠলেন—আমি একবস্ত্রে রাস্তায় দাড়ালুম।
পারুল। বিনা অপরাধে তােমায় ত্যাগ ক’লেন ?
রাধা। বিনা অপরাধে! পরপুরুষে অঙ্গস্পর্শ করেছে—ধনষ্ট হয়েছে
-আর কি অপরাধ চাও!
পারুল। তুমিত স্বেচ্ছায় আত্মদান কর নি
রাধা।
সে কথা কে ভাবে! কে দেখে! সমাজ গম্ভীর হয়ে বললেন
—“ত্যাগ কর’--স্বামী লীছেলের মত ত্যাগ কলেন।ব্যস্।
পথের শেষে
প্রথম অঙ্ক
পারুল। আর একটা জন্ম তােমার ব্যর্থ হল।
রাধা। ব্যর্থ হবে কেন! ইচ্ছা করলেই সার্থক ক’তে পারি
পারুল। কি করে ?
রাধা। কেন? বাজারে রূপের পশরা খুলে যদি বসি, তাতে স্বামীর মুখ
উজ্জল হবে না-সমাজের মেরুদণ্ড সুদৃঢ় হবে না—আমার জীবন সার্থক
হবে না! আত্মহত্যা বা বেশ্যাবৃত্তি এ ভিন্ন আমার যে আর কোন পথ
নেই, এ ত সমাজও জাতেন,স্বামীও জাতেন—তবুও একবস্ত্রে
আমায় রাস্তায় দাড় করিয়ে নিরুবেগে তারা নৌকা ভাসালেন।
পারুল। অথচ স্ত্রীকে রক্ষা করবার শক্তি এদের নেই।
রাধা। স্ত্রীকে ত্যাগ করা যত সহজ, রক্ষা করা ত তত সহজ নয়। তাতে
প্রয়ােজন হয় পুরুষত্ব—দেহের তাজা টকটকে রাঙ্গা রক্ত।
পারুল। তারপর তুমি কি করূলে ?
রাধা। মনের দুঃখে ভাই ম’রতে গিয়েছিলাম—গলায় ইট বেঁধে
গলাজলে নেমেছিলামও-ডুব দেব দেব ভাবছি, এমন সময় পাড়
থেকে কে ডেকে বললে—“মরেছিস্ কি হেরেছি মা, জিততে যদি
চা, যদি কিছু জমা করে যেতে চা—আমার সঙ্গে আয়।” পেছন
ফিরে চেয়ে দেখি জগা-পাগলা-
পারুল। জগা-পাগলা ! কে সে?
রাধা। মাঝে মাঝে সে আমাদের গাঁয়ে আসত ; কোথায় থাকতাে কি
করত—তা কেউ জানে না। সবাই তাকে জগা-পাগলা বলে
ডাকত! ঝি বৌ সবাই তার সঙ্গে আলাপ ক’ত—আর সে
সকলকে মা বলে ডাকত। তার গান শুনতে পেলে লােকে জান্ত
যে, সে গায়ে এসেছে, আর সবাই ঘরে যা কিছু ভাল থাকৃত,
তাই তাকে খাওয়াত।
পারুল। তারপর ?
দ্বিতীয় দৃশ্য পথের শেষে শভি মােড় ; ২. i, এ কি দেবী না মানবী! এমন ত কখনও দেখিনি। এই পতিপ্রাণা সতীকে এর স্বামী ত্যাগ করেছেন। দুর্ভাগ্য কার? এর—না এর স্বামীর! নেপথ্যে—নলিনী। কি রান্না হ’ল রে ? (ণে নেপথ্যেঝ কোছিলে-এ-বাবু ' কোন সময় 44 বেলিছি। " (২) পারুল। ঐ যে এসেছেন। দু দু বার হাতে হাতে ধরা পড়ে যে লজ্জা পেয়েছি—কেমন করে মুখ দেখাব ! কি ভেবেছেন ? নলিনীর প্রবেশ নলিনী। কই—সাড়াশব্দ পাচ্ছি না যে ! (স্বগত) মুখ ফিরিয়ে দাড়িয়ে! হুঃ-বুঝেছি -মান হয়েছে। ( প্রকাশ্যে ) সতীশের বােনের কাছে ও সব বলে আমায় অপদস্থ না করে আমায় বলেই হত! পছন্দ হয় নি—তা কি আমি বুঝতে পারি না। পারুল। (সভয়ে) না—না—আমি ত তার কাছে কিছু বলি নি— এই তােমার পা ছুয়ে বছি-আমায় বিশ্বাস কর। পছন্দ হয় নি। ভিখারিণীকে রাজ-সিংহাসনে বসিয়েছ—( কঁদিয়া ফেলিল) নলিনী। এা --কেঁদে ফেলে যে আমি ও একটা রহস্য করেছি- , তুমি রহস্যও বুঝবে না! দেখলাম মান করে মুখ ফিরিয়ে দাড়িয়ে আছ, তাই- পারুল। অমন সর্বনেশে রহস্য কেউ করে! এখনও আমার গা কাপছে- নলিনী। পাগলি কোথাকার! পারুল। আমার যে আর কেউ নেই- নলিনী। পারুল! পারুল। কি। ও, আবার বুঝি সেই সকালের মত আরম্ভ ক’লে । ছাড় ছাড়-রােদে রােদে ঘুরে তেতে পুড়ে এসেছ—জামা খােল =
পথের শেষে
প্রথম অফ
প্রস্থান
আমি গােবিন্দকে পাঠিয়ে দিচ্ছি-তাড়াতাড়ি চান কর। আমি
খাবার জায়গা কয়ছি-
নলিনী। তার জন্য বল আছে—ঠাকুর আছে-তুমি শুধু আমার
কাছে থাকবে।
পারুল। তা বৈ কি! তার চেয়ে এক কাজ কর-আঙ্গুরের মত বুকে
পিঠে লাে দিয়ে মােড়ক করে আমায় তােমার পকেটে তুলে
রাখ! রাঁধতে ত দেবে না—পরের বাঁধা দুটী গুছিয়ে সাজিয়ে
তােমার সামনে থালা খানা দেব, তাতেও যদি বাদী হও তবে আমি
তােমার পায়ের উপর মাথা খুড়ে ময়ুব ; আমি কিন্তু তা বলে দিচ্ছি।
আমি গরীবের মেয়ে—অত বাবুয়ানা আমার সইবে না।
নলিনী। শােন-শােন। বেজায় রেগেছ! সবােজ আমায় কি অমূল্য
রত্নই দিয়েছে। রেণুকে বিবাহ করিনি বলে বাবা অসন্তুষ্ট হয়েছেন,
কিন্তু পারুলকে একবার দেখলে বাবা নিশ্চয় পারুলকে ভালবাসেন।
স্নানের উপকরণ তেল, সাবান, তােয়ালে প্রভৃতি লইয়া
গোবিন্দের প্রবেশ
নলিনী। কি গােবিল ?
গগাবিন্দ। দিদিমণি বলে দিয়েছে, যে ভাত ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে ; তােমাকে
এখনই তেল মাখতে হবে।
নলিনী। (স্বগত) এ যে বড় কড়া শাসন দেখছি। কি আহাম্মকিই
করেছি লজ্জাটা ভেঙ্গে দিয়ে। ( প্রকাশ্যে ) কি বলে গােবিন্দ,
তােমার দিদিমণি বলে দিয়েছে—তবে ত তেল মাখতেই হবে।
তবে আর দাড়িয়ে কেন, এসলেগে যাও, তেল মাখাও
গগাবিন্দ। গায়ে যে জামা রয়েছে—তেল মাখাব কি করে?
নলিনী। ও-তাই বল। তােমার দিদিমণি বুঝি জামার উপর তেল
মাখাতে বলে দেয় নি।
দ্বিতীয় দৃশ্য
a শেষে
গগাবিন্দ। (অতিবে) না-
নলিনী। তবে জামাটা খুলে ফেলি—কি বল? ( খুশিতে
কাগিনে-বলিলেন) গােবিন্দ ডাক এসেছে?
গােবিন্দ। ডাকওয়ালা এসেছিল—চিঠি নেই।
নলিনী। এ্যা-আজও চিঠি নেই ! তাইত-পারুলকে একবার
দেখেও যদি বাবা রাগ করতেন ? শশিকলবাবুর কন্যাকে বিবাহ
করে আমি অপরাধী সন্দেহ নেই। কিন্তু সবরাজের সেই অন্তিম
প্রার্থনা যদি আমি না রাখতেম, তবে আমার পক্ষে সেটা কত বড়
হৃদয়হীনতার কার্য হত --
গগাবিন্দ। তেল মাখাব ?
নলিনী। এ-ওঃ, হা-
নেপথ্যে—যােগেশ। বাড়ীতে কে আছ ?
নলিনী। কে ডাকলে ? যােগেশ না ? যােগেশ !
নেপথ্যে যােগেশ। হাঁ, আমি। উল্পে আব?
নলিনী। হ—এস— তাই চিঠি আসেনি। চিঠি পেয়েও পাছে
আমি লজ্জায় বাড়ী না যাই, তাই আমাদের নিয়ে যেতে যােগেশকে
পাঠিয়েছেন। আমি হাজার অপরাধ ক’মূলেও বাবা কি আমার
উপর রাগ ক’রুতে পারেন।
যোগেশের প্রবেশ
।
এই যে—এস। কতক্ষণ এসেছ ?
যােগেশ। এই ত আসছি।
নলিনী। এই আছ! তােমার যে একঘণ্টা আগে আসা উচিত ছিল।
Train fronte con late ?
যােগেশ। Train ঠিক সময়ই এসেছে।
নলিনী। তবে ? এতক্ষণ কোথায় ছিলে ?
পথের শেষে
প্রথম অঙ্ক।
যােগেশ। সে গেয়াের কথা আর বল কেন! আসব আমি একা,
দেওয়ানজী বায়না ধ’লেন, তিনিও আবেন।
নলিনী। বেশ ত, কাকাকে সঙ্গে করে এনেছ ত! বুড়াে মানুষ,
গঙ্গায়ন করে যাবেন।
যােগেশ। না এসে কি আর ছেড়েছে—সারাটা পথ বিড়ির বিড়ির
করে আমার হাড় মাংস চুষে খেয়েছে। তারপর এই শিয়ালদহ
ষ্টেশনে নেমে আমাকে বলে যে দাড়াও আমি আছি। আমি
দাড়িয়ে আছি ত দাড়িয়েই আছি—বুড়ােটার আর খোঁজ খবর
নেই। ঘণ্টা খানেক দাড়িয়ে দাড়িয়ে পায়ে যখন খিল ধরে গেল,
তখন আস্তে আস্তে রওনা দিলেম।
নলিনী। তাঁকে কোথায় রেখে এলে?
যােগেশ। কে জানে গিয়েছে কোন চুলােয় ।
নলিনী। তাই ত, এখনও তিনি আসছেন না! হাঁ যােগেশ, বাবা
ভাল আছেন ত?
যােগেশ। হু।
নলিনী। তাঁর পায়ের সে বেদনা সেরেছে ত ?
যােগেশ। -
নলিনী। খাওয়াটা বড় কমে গিয়েছিল—আবার দুটী খেতে পায়ূছেন ত?
যােগেশ। হু।
নলিনী। বিয়ের কথা শুনে প্রথমটা বুঝি বাবা খুব রেগেছিলেন ?
যােগেশ। দেওয়ানজী আসছেন, তার মুখেই সব শুনতে পাবে।
নলিনী। কই, কাকাতাে এখনও এলেন না। ভাবনার কথা হয়ে
দাড়াল-বুড়ােমানুষ! তুমি বস, বিশ্রাম কর, আমি একবার ঘুরে
দেখে আসি ! ( উঠিয়া জামা পরিবার উদ্যোগ করিতেছেন ঠিক সেই
সময় নেপথ্যে অনাদি-খােকাবাবু বাড়ী আছ?)
দ্বিতীয় দৃশ্য পথের শেষে টও। নলিনী। ঐ যে কাকা এসেছেন। আছি-কাকা, আছি-কাকা, র আসুন। গােবিন্দ শীগগির যা, কাকাকে নিয়ে আয়না, আমিই যাচ্ছি। ব্যস্ত ভাবে প্রস্থান যােগেশ। (পকেট হইতে সিগারেট বাহির করিয়া তাহা ধরাইয়া ) এখন শুভস্য শীঘ্রং করে কাজটা সেরে মামাবাবুকে তার ক’রূতে পারুলে বাঁচি। আমার তার না পেলে আবার তিনি জলস্পর্শ কবেন না। অনাদির হাত ধরিয়া নলিনীর প্রবেশ নী।' আমায় একটা সংবাদ দিলেন না কেন, আমি ষ্টেশনে থাকতাম। কত কষ্ট হয়েছে আপনার ! গােবিন্দ, শীগগির পাখা আন্, দে আমার কাছে। (পোৰি নিকট হইতে পাখা লইয়া অন্যদিকে রাষ্ট) অনাদি। দাও বাবা আমায় দাও। নলিনী। কেন কাকা, আপনি শ্রান্ত, আমি না হয় একটু বাতাস করি। তাতে দোষ কি? আপনি বসুন। | অনাদি। (স্বগত) কি মহৎ অন্তঃকরণ! এই সােণার চাদ ছেলে, ওঃ, কোন্ প্রাণে আমি সে সব কথা বলব ! নলিনী। একখানা গাড়ী করে এলেন না কেন! এই রােদে-আপনার মুখখানা একেবারে শুকিয়ে গেছে, বড় কষ্ট হয়েছে। অনাদি। এইটুকু পথ ত, এর জন্য আবার একখানা গাড়ী করে খামকা কেন কতকগুলি পয়সা খরচ করব। নলিনী। জামাটা খুলে ফেলুন.! ( জনান্তিকে) যােগেশ, তুমি কাকার সামনে সিগারেট টান্ছ ? তােমার হ’ল কি! ছিঃ ছিঃ ছিঃ- যােগেশ। ( জনান্তিকে) রেখে দাও তােমার ছিঃ ছিঃ ছিঃ ! ও সব ভক্ত বিটেলি আর ভণ্ডামী আমার ধাতে সয় না।
পথের শেষে
প্রথম অঙ্ক
১। অনাদি ।
নলিনী। (জনান্তিকে) ভণ্ডামী কি বলছ তুমি! তােমার কি মাথা
খারাপ হয়েছে !
যােগেশ। (স্বগত) তােমার মাথা খাব কিনা তাই। (প্রকাশ্যে বেশ
মশাই, খুব ভদ্রতা শিখেছেন যা হক!
নলিনী অবাক হইয়া যােগেশের মুখের দিকে তাকাইয়া রহিল
। কেন বাবাজী ?
যােগেশ। আমায় ষ্টেশনে দাড় করিয়ে রেখে, নিজে গিয়ে ঘণ্টাখানেক
বসে বেশ চা রুটীর শ্রাদ্ধ করে এলেন।
অনাদি। নারায়ণ ! নারায়ণ !
নলিনী। যােগেশ রাত্রে বােধ হয় তােমার ঘুম হয় নি! যাও, চান
করে এস। কাকা কি কোনদিন চা রুটা স্পর্শ করেন। তার
আহ্নিকও ত এখনও হয় নি।
অনাদি। যাক্, আমার মা লক্ষ্মী কই ?
নলিনী। গােবিন্দ বলগে’ যা কাকা এসেছেন, শীগগির তার আহ্নিকের
যায়গা করে দিতে হবে। কাকা, বাসায় একজন ভদ্রঘরের বাঙ্গালী
বামুন আছে, তার হাতে থাকেন ত ?
* অনাদি। যাবার আগে গঙ্গায় একটা ডুব ত দিয়েই যাব! নেহাত
উড়ে টুড়ে না হয়—
নলিনী। গােবিল শীগগির বা।
গােবিন্দের প্রস্থান
রাত্রে ত খাওয়া হয় নি—এত বেলায় কি গঙ্গায় যাবেন ? আজ
বাড়ীতে চান করে কাল গঙ্গায় গেলে চলবে না ?
১১ অনাদি। না: আজ আর গঙ্গায় যেতে পারছি কই!
নলিনী। তবে আর দেরী না করে, চাটা সেরে নিন-যােগেশ, তেল
মাখ ভাই।
দ্বিতীয় দৃশ্য
পথের শেষে
যােগেশ। দেওয়ানজী মশাই, তেল ত খুবই মাখছেন! তারপর?
২১ অনাদি। সময়ে সব হবে।
যােগেশ। সময়ে সব হবে! মুখে ত বেশ ব’ছেন—সময়ে সব হবে। কাজ
যে কিছুই দেখছি না। ঘণ্টা দেড়েক কোথায় ঘুরে যদিই বা দয়া করে
এলেন—তা ও ঘণ্টাখানেক ত বাতাস খেয়ে কাটালেন। ওদিকে একটা
লােক যে না খেয়ে উপবাসে মারা যাচ্ছে, সে খেয়াল আছে কি?
অনাদি। আছে বাবাজী, খুব আছে। একটু থাম না—কেন ব্যস্ত
হ’চ্ছ!
যােগেশ। কেন ব্যস্ত হচ্ছি তা আপনি কি করে বুঝবেন! আপনি
ত মাইনের চাকর বই আর কিছুই নন। উঃ ! অসুস্থ শরীরে কাল
সমস্ত দিনটে উপবাসে কেটেছে আজ এত বেলা হ’ল এখনও তারটা
দেওয়া হল না। এই তার যাবে তবে তিনি জলস্পর্শ করবেন।
ব্যস্ত কি মশাই সাধে হই।
নলিনী। কিসের তার কাকা? ব্যাপার কি, আমি যে কিছু বুঝতে
পায়ুছি না।
২ অনাদি। কিছু না বাবাজী, কেন।
যােগেশ। কিছু না! তবে ব’বেন না আপনি। বেশ তবে আমি
বছি! দেখ দাদা এ বাড়ীতে
& অনাদি। যােগেশবাবু—যােগেশবাবু-ক্ষান্ত হও ক্ষান্ত হও—সর্বনাশ
ক’র না-
যােগেশ। রাখুন মশাই আপনি! আমি সব চাপাচাপির কেউ নই।
এই বাড়ী থেকে তােমাদের এখনই বের হয়ে যেতে হবে।
২ অনাদি। যােগেশ বাবু, দোহাই তােমার—আমি বৃদ্ধ—আমি ব্রাহ্মণ,
তােমার হাত ধ’ছি-এই পৈতে দিয়ে তােমার হাত ধছি-ক্ষান্ত
হও-এখনও ক্ষান্ত হও--
পথের শেষে
প্রথম অঙ্ক
যােগেশ। কেন মশাই বার বার বাধা দিচ্ছেন। মাবাবুকে মেরে
ফেলাই কি আপনার উদ্দেশ্য।
নলিনী। যােগেশ, আমি যে কিছুই বুঝতে পাছি না—
যােগেশ। কেন এ ত পরিষ্কার কথা। এখনই তােমাদের এই বাড়ী ছেড়ে
যেতে হবে। এই মামাবাবুর আদেশ।
নলিনী। এ! বাড়ী ছেড়ে যেতে হবে—এই বাবার আদেশ !
যােগেশ। হাঁ, আর যদি সহজে না যাও, তবে দারােয়ান দিয়ে তােমাদের
বের করে দেবার আদেশ দিয়েছেন।
নলিনী। এ।
পড়িয়া যাইতেছিল—একখানা চেয়ার ধরিয়া সামলাইল
যােগেশ। তােমাদের বের করে দিয়ে তাকে তার ক’তে হবে।
নলিনী। বাবার আদেশ-বােগেশ, আমার বাবার আদেশ ?
যােগেশ। হাঁ, তােমাদের এ বাড়ী থেকে বের করে দিয়ে তাকে তার
ক’তে হবে। সেই তার পেলে তবে তিনি জলস্পর্শ করবেন।
নলিনী।
তবে কি তিনি উপবাসী আছেন?
যােগেশ। হাঁ-কাল থেকে।
নলিনী। এ্যা! বল কি! এতক্ষণ আমায় বল নি কেন? তার
যে মােটেই ক্ষুধা সহ্য হয় না। ও:-কত কষ্ট পাচ্ছেন তিনি
আমার জন্য । কাকা, বাবা অভুক্ত আছেন জেনেও কেন আপনি
এতক্ষণ এ কথা আমায় বলেন নি। যােগেশ, তুমি এখনই তার
কর, আমি বাবার আদেশ মাথায় করে এই মুহূর্তে এ বাড়ী থেকে
বেরিয়ে যাচ্ছি।
এস্থানেতি
যােগেশ। দাড়াও—আরও কিছু বলার আছে-
নলিনী। যা ব’বে সত্বর বল। আমার বাবা আজ দুইদিন উপবাসী।
আমার এখানে নিশ্বাস আটকে আছে।
।
দ্বিতীয় দৃশ্য পথের শেষে যােগেশ। তুমি তার ত্যাজ্যপুত্র নলিনী। ত্যাজ্যপুত্র ! কারণ? যােগেশ। সম্ভবতঃ এই বিয়ে। তার সঙ্গে তােমার কোন সম্বন্ধ নেই। তুমি তার বংশের কেউ নও- নলিনী স্থির হইয়া দাড়াইতে পারিতেছে না, নিকটের একখানা চেয়ার ধরিয়া দাড়াইল নলিনী। বেশ, তার আজ্ঞা আমার শিরােধার্য। যােগেশ । তােমার মায়ের নামে ব্যাঙ্কে যে পাঁচ হাজার টাকা আছে, তা তােমার। তার স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তিতে তােমার কোন অধিকার নেই- A অনাদি। যােগেশবাবু—যােগেশবাবু-আর কেন-এতেও কি তােমার তৃপ্তি হয় নি! দোহাই তােমার—আর বিষ ঢেল না—আর বিষ ঢেল না। যােগেশ। থামুন না মশাই। তার অস্থাবর বা স্থাবর সম্পত্তিতে তােমার কোন অধিকার থাকবে না, তা তুমি পাবে না। তবে তুমি তার বংশে জন্মে কোন নীচ কাজ করলে তাঁরই কলঙ্ক হবে ; এইজন্য তিনি তােমায় এই দশ হাজার টাকার চেক দিয়েছেন। আর তার জমিদারীর আয় থেকে মাসিক একশত টাকা ভাতা পাবে। আমার কোন দোষ নেই, মামাবাবু যা ব’লতে বলে দিয়েছেন আমি তাই বলে খালাস। এই নাও ভাই তােমার দশ হাজার টাকার চেক। ভাল করে দেখে শুনে নিও- নলিনী ক্ষণকাল চেকখানি মাথার উপর ধরিয়া রাখিলেন, পরে বলিলেন বাবার দান আমি মাথায় করে নিলাম। যােগেশ তাকে আমার প্রণাম জানিয়ে ব’ল, আমি তার অধম সন্তান হলেও তারই রক্তে আমার জন্ম হয়েছে। আমি যখন তাঁর মেহ হারিয়েছি, তখন ৪১
পথের শেষে
প্রথম অঙ্ক
তাঁর করুণার দান আমি নিতে চাই না। আমি নেব না। তার
টাকা তাঁকে ফিরিয়ে দিও। গােবিন্দ তাের দিদিমণিকে ডাক্।
গোবিন্দের প্রস্থান
অনাদি। থােকা, বাবা, আমার একটা অনুরােধ, আমি বৃদ্ধ-আমি
ব্রাহ্মণ-আমার মিনতি
নলিনী। আমার বাবা যে আজ দুই দিন উপবাসী কাকা! আর কি
আমি দেরি করতে পারি ?
অনাদি। আমি ষ্টেশনে নেমেই তার করেছি, সেই জন্যই আমার দেরি
হয়েছিল বাবা-
নলিনী। তার করেছেন! যাক, লিখেছেন ত যে আমি বাড়ী ছেড়ে গিয়েছি।
অনাদি। হাঁ-
নলিনী।
কাকা, আজীবন প্রাণপণে সত্যকে আঁকড়ে ধরে পড়ে আছেন,
আর আজ মৃত্যুর তীরে দাড়িয়ে আমার জন্য বাবার কাছে আপনি
মিথ্যাবাদী হবেন—আমার জন্য ! না কাকা, এ দেহে বিন্দুমাত্র রক্ত
থাতে তা হবে না। তবে আমার দুঃখ এই যে, বাবা একবার
পারুলকে দেখলেন না। যাক, এই যে—( পারুল ও গােবিন্দের
প্রবেশ । পারুল, কাকাকে প্রণাম কর। (পারুলের তথাকরণ )
পারুল, এ বাড়ীতে আমরা আর থাকতে পাব না-বাবার আদেশ।
চল। গােবিন! তবে আসি দাদা, কত বকেচি-কত মেরেচি,
আমি যে তাের ছােট ভাই, কিছু মনে করি না দাদা
গােবিন্দ। তুমি পাগল হয়েছ দাদাবাবু! আমি তােমার মামাবাড়ী
থেকে তােমার মায়ের সঙ্গে এসেছিলাম। আমি তােমার মাতুল
সম্পত্তি। তােমার বাবার হুকুম ত আমার উপর চলবে না।
গােবিন্দকে তুমি ফেলে যাবে! হাঃ হাঃ হাঃ! আচ্ছা তােমরা
এগােও, আমি বাক্স বিছানা বেঁধে ছেলে নিয়ে আসছি। এন
৪২
দ্বিতীয় পৃষ্ঠ
পথের শেষে
নলিনী। কাকা, বাবাকে আমার প্রণাম জানিয়ে বলবেন যে, সরুণফ
জীবন-সঙ্গিনী পেয়ে আমি সুখী হয়েছি। তার শাস্তি আমি সানন্দে
মাথা পেতে নিলাম—তবে আসি(অনাদিকে প্রণাম) এস পারুল
প্রস্থানেতি-অনাদি ছুটিয়া গিয়া তাহার হাত ধরিলেন
১১অনাদি। না--না-আমি যেতে দেব না-মুখের ভাত ফেলে কোথায়
যাবি-
নলিনী। অবুঝ হবেন না কাকা-শেষে আমার জন্য আপনি বাবার কাছে
মিথ্যাবাদী হবেন।
» অনাদি। হই হব মিথ্যাবাদী— ইহকাল পরকাল
ব্রাহ্মণত্ব, শুধু তুই থা—তােকে যে আমি কোলে করে মানুষ
করেছি। না, আমি যেতে দেব না—কিছুতেই যেতে দেব না
নলিনীকে জড়াইয়া ধরিলেন
নলিনী।
যােগেশ কাকাকে ধর ভাই।
১১ অনাদি। নানাধর না—ধর না—তােমার পায়ে পড়ি যােগেশবাবু
আমায় ছেড়ে দাও—আমায় ছেড়ে দাও—আমি যেতে দেব না।
থােকা ! ওরে, বানে বাবা-নে- যানে—মুখের ভাত ফেলে
বাসনে-ওরে যানে যােগেশ অনাদিকে টানিয়া রাখিল নলিনী
পারুলের হাত ধরিয়া দিতে দিতে প্রস্থান করিল। এ্যা! চলে
গেল - সত্যি চলে গেল-নারায়ণ ! কি ক'লে—কি কলে—
ও হাে হােঃ-(মুচ্ছিত হইয়া পড়িয়া গেলেন)
যােগেশ। ( ললাটের ঘৰ্ম্ম মুছিয়া ) প্রথম বােড়ের কিস্তি।
পকেট হইতে মদের ফ্লাস্ক বাহির করিয়া ঢক ঢক করিয়া গিলিতে লাগিল
৪৩
দ্বিতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য দ্বিতলে দুর্গাশঙ্কর রায়ের শয়নকক্ষ রজনী দ্বিপ্রহর পালঙ্কের উপর দুর্গাশঙ্কর নিদ্রিত পার্শ্বের কক্ষ হইতে ধীরে ধীরে দরজা খোলা হইল। অতি সম্বর্পণে উম্মুক্ত দ্বার-পথে সুখদা আসিয়া দাঁড়াইল। দুর্গাশঙ্করের কক্ষের স্তিমিতপ্রায় অলােকে একবার কক্ষের চারি পখ দেখিয়া লইয়া পা টিপিয়া টিপিয়া সুখদা দুগাশঙ্করের শয়নকক্ষে প্রবেশ করিল ও পালঙ্কের নিকট গিয়া দাড়াইয়া ভ্ৰাতার নিদ্রিত মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। দ্বারপথে যোগেশকে দেখা গেল। সে যেন নিজের নিশ্বাসে চমকিয়া উঠিতেছে। তাহার চোখে মুখে গভীর উৎকণ্ঠা ফুটিয়া উঠিয়াছে। যােগেশের দিকে তাকাইয়া সুদ। অতি সাবধানতার সহিত দুর্গাশঙ্করের বালিসের নিম্নে হস্ত দিয়া কি খুজিতে লাগিল। দুর্গাশঙ্কর একবার নড়িয়া উঠিলেন, তাহা দেখিয়া নিশ্বাস রুদ্ধ করিয়া সুগদা স্থির-দৃষ্টিতে তাহার দিকে তাকাইয়া সােজা হইয়া দাড়াইল এবং যােগেশ কমধ্যে প্রবেশ করিয়া যেন মরিয়া হইয়া হস্ত উত্তোলন করিল। তাহার হস্তে একখানি তীবার ছোরা দেখা গেল। সুখদা কটু মটু করিয়া যোগেশের দিকে তাকাইল। যোগেশ নতদৃষ্টিতে কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া দ্বারপথে গিয়া দাঁড়াইল। সুখদা পুনরায় বালিশের নিয়ে চাবীর জন্য হাত দিল এবং ক্ষণপরে সিন্ধুকের চাবী বাহির করিয়া আনিল ও পা টিপিয়া টিপিয়া দরজার নিকট আসিল। চাৰী দেপিয়া যােগেশের চক্ষুদ্বয় আনন্দে জ্বলিয়া উঠিল। সুখদা যােগেশের হস্তে চাৰী দিলেন—যােগেশ নিঃশব্দে প্রস্থান করিল। মুখ দরজার চৌকাট ধরিয়া নিদিত দুর্গাশঙ্করের মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। ৪ দ্বিতীয় দৃশ্য দ্বিতলে দুর্গাশঙ্করের শয়নকক্ষ বাঙ্গ দিয়া নদীতীরে পথ ও প্রশস্ত প্রান্তর দেখা যাইতেছে। দুর্গাশঙ্কর পালঙ্কের উপর অর্ধশায়িত--পাশে অনাদিনাথ দণ্ডায়মান। প্রভাত তখনও অতীত হয় নাই অনাদি। কেমন আছেন আজ ? দুর্গা। আজ অনেকটা ভাল। তবে শরীর বড় দুর্বল। কথা বলতেও যেন কষ্ট বােধ হচ্ছে। অনাদি। কোলকাতা থেকে এসে যে অবস্থা দেখেছিলাম। আমার ত ভয়ই হয়েছিল। আবার যে আপনি সেরে উঠবেন এ আশা ছিল । নারায়ণ খুব রক্ষা করেছেন। দুর্গা। এ প্রাণ কি অত সহজে যাবে অনাদি! পূৰ্বজজ্জিত কৰ্ম্মফল- কার ভরা ডুবিয়ে এসেছি—ওঃ--যা, তুমি না কি আজ জেলায় যাচ্ছ ? অনাদি। আজ্ঞে হ। কাল সেই চরের মকদ্দমা-শুনলাম ধনগার তরফ থেকে হাইকোর্টের বড় ব্যারিষ্টার আসছে। দুর্গা। তাই নাকি!. তা হলে—মকর্দমাটা বড় জেদের। শিবনারায়ণ বড় দম্ভ করে বলেছিল যে সে ও চরটা নেবেই, আমিও বলেছিলাম যে একখানা ইট থাকতে নয়। শেষে কি- অনাদি। আপনি ভাববেন না বাবু—বড় ব্যারিষ্টার ত আর দলীলের লেখাগুলাে উল্টিয়ে দিতে পারবে না। দলীলের জোরেই আমরা জিতে যাব। দুর্গা। দেখ গিয়ে কতদুর কি করতে পার। হাঁ, অনাদি, যােগেশ ব’লছিল যে সে একটু জমিদারীর কাজ-কৰ্ম্ম শিখতে চায়—বেকার ৪৫ পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্ক বসে আছে। তােমারও শরীর ভাল নয়—তাতে আমি পড়ে থেকে তােমার খাটুনিও বড় বেড়ে গেছে—এ সময় একজন সহকারী হলে তােমার সুবিধা হবে। আমার ইচ্ছা যে তুমি সঙ্গে রেখে ওকে কিছু কিছু কাজ-কর্ম শেখাও- অনাদি। আপনার ইচ্ছা !বেশ! (স্বগত) তবে আর বেশী দিন এ সংসারে আমার অন্ন নেই। তাতে দুঃখ ছিল না-যদি ছেলেটার একটা উপায় করতে পারতেম ! আহাহা-সােণার চঁাদ ছেলে ! কিন্তু আর বুঝি পারলেম না-কেমন ধাপে ধাপে এগুচ্ছে-ধাপে ধাপে গ্রাস করছে- দুর্গা। আচ্ছা অনাদি, এখন তুমি যেতে পার অনাদি। নে আয়ে- অনাদি দ্বার পর্যন্ত অগ্রসর হইলেন--আবার কয়েক পদ ঘরের দিকে গেলেন- আবার ফিরিয়া দ্বার পর্যন্ত অগ্রসর হইয়া দাড়াইলেন- দুর্গা। কি অনাদি? তুমি কি কিছু আমায় ব’তে চাও অনাদি। বাবু দুর্গা। কি অনাদি? অনাদি। খােকা বালক—তার শাস্তি যথেষ্ট হয়েছে। নর-ছাশঙ্কর মুখ ফিরাইয়া বসিয়া রহিলেন—কোন উত্তর দিলেন না। ললি কিছুক্ষণপাড়াইয়া-আপদগনে বলিলেন—বড় আশা করে আমার তার পেয়ে সে আছে। নারায়ণ ! মুখ রেখ ঠাকুর। ধীরে ধীরে প্রস্থান করিলেন দুর্গাশঙ্কর ক্ষণকাল শুব্ধ হইয়া বসিয়া রহিলেন, তারপর বলিলেন- পুত্রের দিক থেকে পিতার নিষ্ঠুরতা তােমরা সবাই দেখছ। একবার পিতার দিক থেকে পুত্রের পানে তাকাও দেখি—অপরাধী পুত্রের নিকট পিতার কি কিছুই প্রাপ্য নেই—পিতার প্রতি পুত্রের কি কোন কর্তব্যই নেই! শান্তি-শান্তি-শান্তি ॥ কার এ শান্তিকার !
দ্বিতীয় দৃশ্য
পথের শেষে
যােগশ ও সুখদার প্রবেশ
যােগেশ। এই যে আজ উঠে বসতে পেরেছেন। যাক, বাঁচা গেল। কি
দুর্ভাবনায়ই এ ক'টা দিন গিয়েছে।
আজ অনেকটা ভাল বােধ করছি। তােমাদের সেবা-যত্নে এ
যাত্রা দেখছি বেঁচে গেলাম।
সুখদা। সেবা-যত্ন ! ছেলের এ ক’দিন কি চোখে ঘুম ছিল না পেটে অন্ন
ছিল। দিনরাত কেবল—“মামাবাবুমামাবাবু।” কোলে ভাত
দিয়েছি কি—এক গ্রাস মুখে দিতেই অমনি উঠে পড়েছে। ওরে ওরে
উঠিস্ নিউঠিস্ নি-আর দু’টো গ্রাস মুখে দিয়ে যা—কে কার
কথা শােনে! একেবারে সটান এই ঘরে। মুখে সর্বদাই এক বুলি
—আমরা না করলে কে আর করবে। মামাবাবুর আর আছে
রক্তের সম্বন্ধে ত আর কার সঙ্গে নেই—আর যারা, তারা ত
মাইনের চাকর।
দুর্গা। না, যােগেশের মতিগতি পরিবর্তন দেখে আমি বড় খুসী হয়েছি।
সুখদা।
সে তােমার আশীৰ্বাদ দাদা-ঐ যে কথায় বলে, “সৎসঙ্গে
স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সৰ্ব্বনাশ।” আমি ওকে বরাবর বছি যে,
দাদার কাছে গিয়ে কিছুদিন থাক—দাদা আমার সাক্ষাৎ মহাদেব
তার কাছে থাকলে তুই মানুষ হবি। তা মানুষের দুঃসময়ে
ত বিপরীত বুদ্ধি হবেই। ছেলে আমার কথা কানে তুলে
। তারা সব মাতাল, গেঁজেল, নেশাখাের-অমন দুশ্চরিত্রের
সঙ্গে কি ঐ কাচা ছেলে এটে উঠতে পারে। কি চক্রটাই না
করল। বাছাকে আমার নাকানিচোবানি খাইয়ে বিষয়-আশয়টুকু
গ্রাস করে, পথের ফকির করে তবে ছাড়ল। নইলে ওর
অন্ন আজ পায় কে! তখন যদি আমার কথা কাণে তুলতি, তবে
কি আজ তাের এই দশা হয়, না দেওয়ানজীর মত লােকে তােক
৪৭
এ - - - - পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্গ মামাবাড়ীর ভেতুড়ে বলে গালাগাল দিতে পারে। ( সহসা ক্রন্দন ) এত লােকের মরণ হয়—যম কেবল আমাকেই ভুলেছে, আজ এ-ও আমায় শুনতে হল। যােগেশ। এখন সে সব কথা কেন তুছ মা! দেখছ নামাবাবুর এই অসুখ ! শুনলে উনি কষ্ট পাবেন—আবার হয়ত অসুখটা বেড়ে উঠবে। ১ দুর্গা। কি যােগেশ? যােগেশ। আজ্ঞে সে বিশেষ কিছু নয়। আপনি সেরে উঠুন, তারপর সময় মত একদিন বলব। একটু গরম দুধ খাবেন কি এখন ? দুর্গা। একটু আগেই ত খেয়েছি বাবা--আর কত খাব। সুখদা। হাজার হক ছেলে মানুষ ত! ভাবে সে যত বেশী করে আমার মামাবাবুকে খাওয়াতে পাব—তত তাড়াতাড়ি সেরে উঠবেন। যােগেশ। না না, ডাক্তার বলে দিয়েছেন যে দিনে অন্ততঃ ছ'সাতবার পথ্য খাওয়াতে হবে। শক্ত ব্যামাে থেকে উঠেছেন কিনা। সুখদা। শক্ত ব’লে শক্ত! পরশু রাত্রে যে রকম হয়েছিল, বাপরে-- মনে হলেও গা কাঁপে! দুর্গা। আমার কিন্তু কিছু মনে পড়ে না। কথা বলতে বলতে মাথাটা কেমন ঝিম্ ঝিম্ করে উঠল, চোখে যেন অন্ধকার দেখলাম, তারপর আর কিছু মনে নেই। যে সময় দুর্গাশঙ্কর কথা বলিতেছিলেন, সে সময় যােগেশ দুরে গবাক্ষপথে ইসারা করিয়া সুখদাকে কি দেখাইল এবং ইঙ্গিতে বলিলএইবার সব মাটী।” গবাক্ষর দিকে চাহিয়া সুপার মুখ ছাই এর মত শাদা হইয়া গেল—মুহূর্তে তাহার নয়নের নরকাগ্নি ঝক ঝক্ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল-হস্ত মুষ্টিবদ্ধ হইল। দন্তে দন্তে অধর দংশন করিতে লাগিল। পর মুহূর্তে সে ভাব বিদূরিত হইল। সুখদা সহজ দৃষ্টিতে পুত্রের দিকে তাকাইয়া একবার হাসিল। ৮+ -- ৪
দ্বিতীয় দৃশ্য
পথের শেষে
সুখদা। মনে থাকবে কি! তােমার কি তখন হুস ছিল। দিন-রাত
কেবল প্রলাপ—কেবল প্রলাপ—“খােক ফিরে আয়-থােকা ফিরে
আয়।” ভাবতাম সর্বনেশে ছেলেটার জন্যে প্রাণটা বুঝি এবার
গেল। হারে ছেলে! এমন মায়ার সমুদ্র বাপকে চিনলি না !
একবার এসে পা দুখানি জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইলেই ত সব রাগ
জল হয়ে যেত। হাঁ দাদা, একবার যদি ছেলেটা এসে তােমার পা
দু’খানি জড়িয়ে ধরে কেঁদে পড়ত তাকে তুমি তাড়িয়ে দিতে পারতে ?
কখনই পারতে না। তােমার যে দয়ার শরীর। প্রাণ ত নয় যেন
মায়ার সমুদ্র! তা না করে, তুই বাছা উকিল বন্ধুদের পরামর্শ শুনে
বাপ পাগল হয়েছে বলে মকদ্দমা করে জমিদারী নিবি--এত বড়
তাের বুকের পাটা ! একটা চক্ষুলজ্জাও কি নেই! বুড়াে বাপ-একটা
ধৰ্ম্ম ত আছে! বাপ হ’ল তোের পাগল ! বাপের সঙ্গে মকদ্দমা !
দুর্গা। সে কি সুখদা?
সুখদা। কেন—তুমি শােন নি সে সব কথা ? যােগেশ, তাের
মামাবাবুকে বলিস্ নি ?
যােগেশ। মামাবাবুর অসুখ, তাই
সুখদা। অসুখ তাতে হয়েছে কি রে মুখপােড়া হতচ্ছাড়া! তাের এ
ঝুকি ঝক্কড় রাখবার দরকার কি! আদালতের প্যাদা নিয়ে যখন
জমিদারী দখল ক’তে আসবে, তখন কি পাবি তুই সে তাল
সালাতে! আমাদের কি বাপু,দু’মুঠো ভাতের কাঙাল-দশ
জনের দশ কথা শুনেও পেটের দায়ে পড়ে আছি, বলে খালাস
হওয়াই ভাল। তারপর যার ঝুকি সে বুঝুক গে’।
দুর্গা। যােগেশ, ব্যাপার কি ?
যােগেশ। আজ্ঞে—(স্বগত) কি বলি? মা’র মত অত মেধা ত আমার
নেই। শেষটা কি ধরা পড়ে যাব— সুখদার দিকে করুণদৃষ্টি নিক্ষেপ )
৪৯
পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্ক দুর্গা। চুপ করে রইলে যে—বল- সুখদা। (স্বগত) হতভাগা ছেলে এই বুদ্ধি নিয়ে জমিদারী হাত ক’রূবে! (প্রকাশ্যে ) ও মুখচোরা ত তােমায় সবই বলবে। পারে কেবল রান্নাঘরে গিয়ে আমার কাছে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে -“আমার মামাবাবুকে অপমান করেছে। আমি বলছি শােন। ঐ যে ওদের কলকেতায় পাঠিয়েছিলে -তাই যােগেশ খােকাকে বলে- ছিল, যে বাড়ী চল—সবাই মিলে মামাবাবুর হাতে পায়ে ধরে ক্ষমা চাইব-তার রাগ জল ক’তে কতক্ষণ। শুনে তােমার গুণনিধি ছেলে মানওয়ারী গােরার মত গর্জে উঠে বল্লে যে—“পায় ধরে জমিদারী নেব—কেন আইন আদালতের দোর চিনি না-বুড়াে ভেবেছে কি–আদালতে আমি তাকে পাগল সাব্যস্ত করব- পাগলা গারদে পাঠাব— দুর্গা। এা, আমি জেগে আছি ত! দুর্বল শরীরে শুতে ভুল করিনি ত আবার—আবার বন্ত সুখি—কি বছিলি শক্ত হইয়া, বিছানার উপর বসিলেন) সুখদা। কি আর বলব দাদা! বলতে বুক ফেটে যায়। থােকা তােমার সঙ্গে মকদ্দমা করে জমিদারী নেবে—তােমায় পাগল সাব্যস্ত করে পাগলা গারদে পাঠাবে। কলিকলি-সাক্ষাৎ কলি— দুর্গা। এখােকা—খােকা—সেই থােকা—আমার চোখের দিকে চেয়ে যে কোন দিন কথা বলেনি—এ ও সম্ভব—সম্ভব হয়। যােগেশ, অনাদি এ সব জানে ? যােগেশ। আজ্ঞে - সুখদা। জানে না ! মুখপােড়া ত কিছু বলবে না—কাজেই আমায় সব বলতে হচ্ছে। ঐ কথা শুনে যােগেশ নলিনীকে দু'চার কথা বলেছিল। বলবে না। হাজার হক তুমি ত আর পর নও-মায়ের
দ্বিতীয় দৃশ্য
তা মােড়া » তার ধোন শেৰে
সহােদর ভাই—মাম ;-তােমার অপমান ও কি চুপ করে স’য়ে
থাকতে পারে। তাতে দেওয়ানজী রেগে মেগে যােগেশকে
“ছােটলােক—মামাবাড়ীর ভেতুড়ে” আরও কত কি কটু-কাটব্য
বলে গাল মন্দ দিলে। ছেলেটা আমার কাছে এসে ভেউ ভেউ
করে কেঁদেছে—দু’দিনের মধ্যে একটা দানাও দাতে কাটে নি-
বলে, যে মামার অন্ন আমি আর ছোব না-আমার গ্লানি হয়েছে।
তারপর কত বুঝিয়ে সুঝিয়ে তবে শান্ত করেছি।
দুর্গা। অনাদি! চির বিশ্বাসী অনাদি! এ ও কি হয় !
সুখদা। বিশ্বাসী কে কেমন তা ক্ষেত্রে পড়লেই বােঝা যায়। বলে যে
‘যতক্ষণ ধরা না পড়ে ততক্ষণ সাধু। বুঝলে না, থােকার হাতে
জমিদারীটে গেলে সে ত আর কিছু দেখবে শুনবে না-নূতন বয়স
নূতন বৌ—আমােদ আহলাদেই কাটাবে—তাহলে লুটবার সুবিধাটা
ভাল রকম হয়। তুমি থাকতে ততটা সুবিধে হচ্ছে না কি না।
যােগেশ। (স্বগত) মা’র কি সাফ মাথা-বেড়ে লাগিয়েছে ত! ওঃ,
একেবারে ঘােড়র কিস্তি গজের কিস্তি এক সঙ্গে।
দুর্গা। হু-অনাদির কথায়ও আমি বুঝতে পেরেছি, যে সে যােগেশের
উপ সন্তুষ্ট নয়। সে এই জন্য।
সুখদা। ছেলেটা হয়েছে দাদা সবার চক্ষুশূল। তুমি একটু আদর
করে যখন তখন ডাক কি না-
হাঁপাইতে হাঁপাইতে খামার প্রবেশ
শ্যামা। বাবুবাবু-দাদাবাবু এসেছেন।
দুর্গা। দাদাবাবু-
খামা। আজ্ঞে হ—দাদাবাবু-
দুর্গা। ফটক বন্দ করে দে-তার ছায়াও যেন আমার বাড়ীর মধ্যে না
পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্ক - পড়ে ;যদি জবরদস্তি করে, দারােয়ান দিয়ে গলা ধাক্কা দিয়ে রে করে দিবি-- শ্যামা। বাবু বৌদিদিও সঙ্গে আছেন। সুধা। ও বাবা—একেবারে পাকাপাকি বন্দোবস্ত। কি সাহস ! ধন্য ছেলে বা হক। শ্যামা। বাবু, বৌদিদিও এসেছেন দুর্গা। এসেছেন তা তাের কি—তাের বাবার কিরে হারামজাদা ( বালিস ছুড়িয়া মারিলেন) যদি ভাল চা ত যা বল্লাম তাই ক। তাড়িয়ে দে—গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দে শ্যামা। বাবু— নতদৃষ্টিতে দাড়াইয়া রহিল) দুর্গা। হু’:-আচ্ছা। যােগেশ ! পড়েকে ডাক্ত- শ্যামা। নানা–বাবু আমিই যাচ্ছি প্রস্থান ! দুর্গা। নাঃ, আর কাকেও বিশ্বাস নেই --সব নেমকহারাম---সব সয়তান। সুখদা। যা বলেছ দাদা, মানুষ যদি চিন্তে পায়তেম, তবে কি আজ আমাদের এ হাল হয়। যােগেশ। এত শীঘ্র ! বড় বড় লােক পিছনে আছে তার উপর নিজেও কিছু লেখাপড়া জানে—জজ-ম্যাজিষ্ট্রেটের সঙ্গে মামাবাবুর পরিচয় দিয়ে যখন তখন দেখা ক’তে পারে- ৮। ঝটা মারি অমন লেখাপড়ার মুখে—বাপের এই অবস্থা মরার মুখ থেকে ফিরে এসেছে—একটা মানুষের আত্মা-ও কি নেই। দুর্গা। কে উপরে আছে ? যােগেশ। (একটু অগ্রসর হইয়া দেখিয়া) দেওয়ানজী- সুখদা। বােধ হয় একটা আপােষ রফার কথা বলতে দুর্গা। অপােষ রফা! আচ্ছা।
দ্বিতীয় দৃশ্য পথের শেষে সুখদা। তুই এ দিকে আয় বাছা। এ সব কথায় আমাদের থাকবার দরকার নেই। তাের দোষ ত লেগেই আছে। সুখদা ও যােগেশ প্রস্থান করিল যাইতে যাইতে যােগেশ নিম্নস্বরে সুখদকে বলিল— 'ভাগ্যিস জানালা দিয়ে ওদের আসতে দেখেছিলেম।” সুখদা। মা কালী আছেন। যােগেশ। তােমাকে কি বলব মা-তােমার জুড়ি নেই। সুখদা। উ হু’:-এখনও কিছু হয় নি। দেওয়ানটা আছে। এই ফঁাড়া যদি কাটাতে পারি তবেই বিপরীত দ্বার দিয়া অনাদির প্রবেশ দুর্গা। কে? অনাদি ! কি, একটা নিষ্পত্তি, না। অনাদি। আজ্ঞে হ। তা হলে এ বুড়াে ব্রাহ্মণের গয়া কাশীর ফল হয়। আমার তার পেয়েই ছুটে এসেছে! বালক- দুর্গা। হু-তুমিই তার করে আনিয়েছ -না ? অনাদি। আজ্ঞে হ—আপনি একেবারে বেহুস হয়ে ছিলেন- দুর্গা। আমি বেহুস হয়ে ছিলাম, তাই তার ক'রে আনিয়েছ। কেন ? অনাদি। আজ্ঞে হ। দুর্গা। অনাদি, আমায় কি কচি ছেলে পেয়েছ যে চোখ রাঙিয়ে, আইন-আদালতের ভয় দেখিয়ে দু’পাতা ইংরাজী বিদ্যার ধমক দিয়ে—জান অনাদি, এই দুর্গাশঙ্কর রায়ের প্রতাপে সাত সাতটা পরগণার লােক ভয়ে জড়সড়-জান অনাদি, এই দুর্গাশঙ্কর রায় এ জমিদারীর ভার নেবার পর এ দেশ থেকে চোর-ডাকাত, বদমায়েস ভিটে ছেড়ে পালিয়েছে—ভেবেছ কি দুর্গাশঙ্কর রায় মরে গিয়েছে। , সে মরে নি-আজও বেঁচে আছে। হাঁ, বেঁচে আছে, বুড়াে হয়েছে কিন্তু বেঁচে আছে। অনেকে তার পরিচয় নিয়েছে-ইচ্ছ৷ হয়, তুমিও একবার নাও
পথের শেষে
দ্বিতীয় অঙ্ক
অনাদি। নারায়ণ-নারায়ণবাবু আপনি বলছেন কি?
দুর্গা। হাঁ ঠিকই বলছি।
অনাদি। বাবু, আপনি ভুল বুঝেছেন—মিথ্যা কথা শুনেছেন। অনাদি
চক্রবর্তীকে আজ ত্রিশ বছর দেখছেন—সে নিমকহারাম নয়।
নিজের ছেলে-পুলে নেই—আপনার ছেলে ঐ খােকাকে পুত্রের
অধিক করেছি—জানেন ত, আপনি বিরক্ত হয়েছেন-কাজের
ক্ষতি হচ্ছে বলে কত সময় রাগ করেছেন—তবুও আমি তাকে
কোল থেকে নামাইনি-(অনাদির চোখ দিয়া দর-দর-ধারে অশ্রু
পড়িতে লাগিল )-ইচ্ছা ছিল—
সুখদা যােগেশকে এক রকম ঠেলিয়া ঘরের মধ্যে প্রবেশ করাইয়া দিল
যােগেশ। দেওয়ানজী, আপনি সে ছবিখানি পােড়ান নি।
অনাদি। এসেছ বাবাজী! রগত শনি-আমি কি কব ! কোন্
ছবিধান বাবাজী ?
যােগেশ। যে-খানা মামাবাবু শ্যামাকে পােড়াতে
শ্যামাকে পােড়াতে বলেছিলেন।
সেখানা দেখলাম আলমারির পেছনে কাপড়ে মােড়া রয়েছে-
অনাদি। সেখানেও তােমার নজর গিয়েছে?
বেগে সুখদার প্রবেশ
সুখদা। হতভাগা হতচ্ছাড়া, জানিস, সব কথাতেই তাের দোষ, তবু
মুখপােড় অপমানি হ’তে কেন সব কথায় থাকতে যাস! ভগবান
মেরেছেন, ভাতের কাঙ্গাল হ'য়ে এসেছিস-দশজনের ঝাটা লাথি
খেয়ে বাকি গঞ্জনা স’য়ে মুখ বুজে থাকতে পারি থাক, না পারিস
দূর হয়ে যা। পােড়া না পােড়াক সে খোঁজে তাের দরকার
কিরে বাছা। আমার মামাবাবু অসুখে পড়ে আছেন, তাই তাঁর
কথা আর কেউ গ্রাহ করে না। ওরে তত কমবেই না- কেউই
ত করে না—দেখছি, চোখের উপর দিনরাত দেখবুকের মধ্যে
দ্বিতীয় দৃষ্ট পথের শেষে ধূ ধূ করে আগুন জ্বলছে, কিন্তু মুখে রাটি কাড়িনি—তেমন বাপের মেয়ে নই। তুই যে মামাবাবু মামাবাবু’ করে অজ্ঞান—তাের কিছু ক’বার ক্ষমতা আছে! সুখদা ঝড়ের মত এক নিশ্বসে বলিয়া প্রস্থান করিল। ক্ষণকাল কক্ষটী নীরব রহিল। তারপর অনাদি ধীরে ধীরে বলিলেন- “যােগেশবাবু, নলিনীর ছবিখানি পােড়াতে আমিই শ্যামাকে নিষেধ করেছিলেম আমিই যত্ন করে সেখানে কাপড় ঢেকে আলমারির পেছনে রেখেছিলেমকারণ আমি জানি, আবার একদিন ঐ ছবির খোজ হবে। আমার দুর্ভাগ্য যে, সেখানেও তােমার নজর গিয়েছে। যা আমি যতদিন এ সংসারে আছি ততদিন আমার চোখের সামনে ও ছবিতে কেউ আগুন দিতে পারবে না—তােমার মামাবাবুও —এই তাঁর সামনে বলে যাচ্ছি! চরের মামলাটা সেরে জেলা থেকে এসে আমি বিদায় নেব, তখন আর কেউ তােমাদের নিষেধ করবে না—তখন যা ইচ্ছা তােমাদের ক’র-ইচ্ছা হয়, আগুনে দিও-ইচ্ছা হয়, ছুরি দিয়ে ফাল ফাল কর—যা তােমাদের খুসী। ও—হবার নয়—হবার নয়-নারায়ণ-নারায়ণ-মুখ রাখুলে না ঠাকুর ধীরে ধীরে প্রস্থান সুখদার পুনঃ প্রবেশ সুখদা। দেখলে—দেখলে অহঙ্কারটা! যার খাচ্ছে তাকেই আবার চোখ রাজাচ্চে। দাদাকে দয়ার সাগর পেয়ে বড় বাড় বেড়েছে সব! দুর্গা। যােগেশ, নিধু খুড়ােকে একবার আমার এখানে ডেকে দাও ত—এখনই যােগেশের এহান সুখদা। এখন খাবার যােগাড় করব কি দাদা? দুর্গা। আর খেতে ইচ্ছা নেই ভাই-
পথের শেষে
দ্বিতীয় অঙ্ক
যা হ’ক দু’টো পেটে ত দিতে হবে।
পেটে ত দিতে হবে। প্রাণটা ত বাঁচাতে
দুর্গা। হাঁ তা ত হবে। আচ্ছা একটু পরে।
সুখদা।
তবে আমি সব গুছিয়ে গাছিয়ে রাখি গে, যখন তােমার ইচ্ছা
হয়, আমাকে ডেক। ( যাইতে যাইতে) ওহহ হােঃ-দাদার দশা
দেখলে বুক ফেটে যায়—ওহহ হােঃ-
চোখে কাপড় দিয়া প্রস্থান
দুর্গা। সব আবছায়া—সব আবছায়া—যেন একটা ছায়ার মানুষ হয়ে
গেছি-ওঃ-
শ্যামার ধীরে ধীরে প্রবেশ
কে ?
শ্যামা। আমি শ্যামা-
দুর্গা। কি ?
শ্যামা। বাবু আমি দেশে যাচ্ছি-
দুর্গা। দেশে যাচ্ছি! বেশ—যা। একে একে সব যা–পড়ে থাকবে
শুধু একটা কঙ্কাল, আর তাই আঁকড়ে ধরে থাক এই ত্রিকালজ্ঞ
ভুশুণ্ডি কাক—
দুই চক্ষু হইতে দু' ফোঁটা জল গড়াইয়া পড়িল
শ্যামা। আমি ত আজ যাচ্ছি না বাবু—আপনি ভাল করে সেরে উঠলে
বাব।
দুর্গা। প্রভুভক্ত ভৃত্য-আমার সুখ দুঃখের চিরসাথী।
চিরসাথী। শ্যামা ।
আমার কাছে আয়। তারা গিয়েছে রে?
শ্যামা। হ বাবু
দুর্গা। কোন গােলমাল করেছিল?
শ্যামা। কিসের গােলমাল বাবু! পাষাণে বুক বেঁধে যেমন আমি
দ্বিতীয় দৃশ্য পথের শেষে ব’ল্লাম যে বাবু দেখা করবেন না—দাদা বাবুর দু’চোখ বেয়ে ধারায় জল পড়তে লাগল-হাউ হাউ করে তিনি কেঁদে উঠলেন— কঁপতে কাঁপতে বসে পড়লেন—আমি গিয়ে ধরলাম। তারপর অতি কষ্টে বললেন—“শ্যামা-আমি অভাগা। বড় অভাগা । বাবার পাদুখানি বুঝি আর এ জীবনে দেখতে পাব না।” তারপর কঁদতে কাঁদতে বৌমার হাত ধরে চলে গেলেন দুর্গা। ( নিম্নস্বরে—যেন ভয় পাছে কেহ শুনিতে পায়) তাের বৌমাকে দেখেছিস্ রে ? শ্যামা। হাঁ বাবু। কি সে রূপ, যেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মীঠাকরুণ। চোখ ফেরান যায় না—আর কি মিষ্টি কথা ! আমায় বলেন—লক্ষ্মী দাদা, আমায় একবার বাবার কাছে নিয়ে যেতে পার ? দুর্গা। তার পর তুই কি বলি? শ্যামা। কি আর বব বাবু—ব’লাম যে “তােমায় আর একদিন নিয়ে যাব বৌমা।” (দুর্গাশঙ্কর দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিলেন, এক বিন্দু অশ্রু তাহার চক্ষু হইতে তাহার অজ্ঞাতে ঝরিয়া পড়িল) বাবু বাবু—দেখবেন—ঐ যে, ঐ যে তারা নৌকায় উঠে আপনার ঘরের দিকে চেয়ে হাত জোড় করে প্রণাম করছেন— দুর্গা। এ-কৈ—কৈ? (একলম্ফে যুবকের মত ছুটিয়া গবাক্ষর দিকে অগ্রসর হইলেন ও সহসা মধ্যপথে থামিয়া বলিলেন) বন্দ কর -জানালা বন্দ কর- বল করব ? দুর্গা। কর—শিগগির বন কর—আমায় শক্ত করে ধর-(কপিতে লাগিলেন) না—না—আমায় বাঁধ-বিছানার চাদর দেখাটের সঙ্গে আমার হাত-পা বাধ-বাঁধ শ্যামা। বাবু—বাবু শ্যামা।
পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্ক দুর্ণ। বাঁধ-বাধ হারামজাদাশীঘ্র বাঁধ শ্যামা অপ্রতিভের ন্যায় প্রভুর আদেশ পালন করিতে লাগিল আরও আরও জোরে-আরও শক্ত করে- শ্যামা। এখন খুলে দি বাবু—এতক্ষণ তারা নৌকা খুলেছেন- দুর্গা। নৌকা খুলেছে! আচ্ছা দেখুলে দে। বাঁধন খুলিয়া দিয়া কঁদিতে কাদিতে শ্যামার প্রস্থান কিন্তু না—এতগুলি মিথ্যা কথা কি যােগেশ আর সুখী আমাকে ব’তে পারে ! ভগবান! তুমি সব জান—বিচার করােদণ্ড দিয়াে-যে জালায় আমি-ওঃ- নিধু খুড়াের প্রবেশ নিঘু। কি বাবা, এ অসময়ে ডেকেছ কেন? ধান্যেশ্বরীর আরাধনা করে যেমন একটোক গলায় ঢেলেছি, অমনি তােমার ডাক গিয়ে হাজির। কি করি বাবা, তুমি ডেকেছ, আঁধার রেতে এসে হাত পাতলেও দেবীর ভােগের জন্ত, তােমার কাছে টাকাটা-সিকেটা পাই—কাজেই বােতলবাহিনীকে আপাততঃ মাচায় তুলে বিরহ-ব্যথায় জ’তে জ’তে মনের দুঃখ মনে চেপে, চলে এসেছি। দুর্গা। খুড়াে, বড় জ্বালা, একটু মদ দিতে পার—একটু মদ-দশ টাকা নাও-বিশ টাকা নাও-একশ' টাকা নাও আমায় একটু মদ দাও —আমায় বিশ্বতি দাও—বিস্মৃতি দাও--আমায় বাঁচাও-মদ দাও মদ ও নিধু। দুর্গাশঙ্কর! বড় ঘাটা খেয়েছ বাবা—বুঝেছি। ঘাটে ছেলেটা আর বৌটাকে দেখলাম। ব’স বাবা-মার কাছে ব’স বিছানার উপর দুর্গাশঙ্করকে বসাইলেন ও নিজে নিকটে বসিলেন দেখ বাবা, কলেরায় মাতৃহারা ছেলে দুটো যখন একদিন আগ পাছ মারা গেল-বুকের ভিতর রাবণের চিতা লক লক করে জ্বলে ৫৮
পথের শেষে
উঠল—কি তার দাহকি সে জ্বালা! তারপর যাতনা সইতে
পেরে অনেক ভেবে চিন্তে, মদ খাওয়া ধরলুম-ভাবলুম মদে সব
ভুলিয়ে দেবে। তারপর ত জান বাবা, লােক-লজ্জা গ্রাহ করি নি
--যথাসর্বস্ব রাক্ষসীর পায়ে ঢেলেছি—প্রথম প্রথম বিলিতি—তার
পর যখন পয়সাও কমে এলাে, পিপাসাও বেড়ে গেল তখন
একেবারে ধান্তেশ্বরী। কিন্তু বাবা, ভুলতে পারলেম না—যখন
নেশা বাড়ে তখন বুকের হাহাকারও বাড়ে-সে যে কি যাতনা
ও--অতি বড় শত্রুও যেন সে যাতনা না পায়। লাভের মধ্যে
হয়েছে এই, এখন আর মদ না হলে এক দণ্ডও টিকতে পারি না –
এক জ্বালা নেবাতে গিয়ে আর এক জ্বালা বাড়িয়েছি ! কি দুর্গাশঙ্কর
কঁছ? কঁাদ—কাদ—বরং সে ভাল! কাদলে যাতনা অনেক
কমে। এখানে শােও ত বাবা তুমি এখানে শুয়ে শুয়ে কঁাদ,
আর আমি তােমার গায়ে হাত বুলিয়ে দি, আর মায়ের নাম করি-
তারাতারা—পাষাণী-
গীত
এ সব ক্ষেপা মায়ের খেলা।
যার মায়ায় ত্রিভুবন বিভোলা।
সে যে আপনি ক্ষেপা,
কর্তা ক্ষেপাক্ষেপা দুটো চেলা ।
কি রূপ কি গুণ ভঙ্গি কি ভাব কিছুই যায় না বলা,
যার নাম করিলে কপাল পােড়ে
কঠে বিষের জ্বালা।
দুর্গাশঙ্কর ঘুমিয়ে পড়েছে। যাক্, একটু ত ভুলে পাবে।
ব্যস্তভাবে অনাদির প্রবেশ
অনাদি। বাবুবাবু-
নিধু। চুপ-ঘুমিয়েছে-
.0 , ...
পথের শেষে
দ্বিতীয় অঙ্ক
অনাদি। কিন্তু বড় জরুরী খুড়াে-
নিধু। লােকটাকে কি মেরে ফেলতে চাও অনাদি-
অনাদি। এ দিকেও যে সর্বনাশ! ইত—কি করি—কি করি
উদভ্রান্তভাবে প্রস্থান
নিধু। একটু বসতে হ’ল নইলে এরা লােকটাকে ঘুমুতে দেবে না—
মেরেই ফেলবে।
নিধু সস্নেহে দুর্গাশঙ্করের গায়ে হাত বুলাইতে লাগিলেন
CALCUTTA,
৬০
তৃতীয় দৃশ্য = একতলায় রান্নাঘরের সম্মুখের বারান্দা তদুপরি চক্মিলান বাড়ীর ঝুলবারান্দা। রান্নাঘরে সুখদা পাক করিতেছে। বেলা দশটা তখনও বাজে নাই নিবারণসহ যােগেশ রান্নাঘরের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়া ব্যস্তভাবে ডাকিল *মা-মা” সুখদা। ( রান্নাঘরের বাহিরে আসিয়া ) কি! ডাকছিস কেন? ( নিম্ন- স্বরে) হতভাগা ছেলে একশ’দিন বলেছি না, যে আস্তে কথা বলবি— ঐ দাদার শশাবার ঘর থেকে এ যায়গাটা স্পষ্ট দেখা যায়। নিধুঠাকুর ঐ খাটের উপর বসে আছে, বুদ্ধির দোষে তুই সব মাটি ক’বি দেখছি। যােগেশ। দেওয়ান শালা, ভীষণ খোজাখুজি আরম্ভ করে দিয়েছে- সে একেবারে ক্ষেপে গেছে—শীঘ্র দলিলগুলাে নিবারণের হাতে দেও -ও এখনি রওনা হক। সুখদা। তখনি বলেছিলাম না যে এগুলি সরিয়ে ফেল! কেমন খাল ত! ( উচ্চৈঃস্বরে) বােনের অসুখ তা হলে যেতেই হবে। আহা মা’র পেটের বােন। ভাই-বােনের মত আপনার জন কি আর আছে । একেবারে টাকা রক্তের টান। আমার রান্না ত সব হয়নি এখনও -তা ডাল-ভাত খা হয়েছে দু’টা মুখে দিয়ে যাও বাছা ( নিম্নস্বরে) নিবারণ ঘরের ভিতর এস। দলিলগুলাে আমার হলুদের হাড়ীর মধ্যে কাগজে মােড়া আছে—এখানে দাড়িয়ে না—ঐ দেখ নিধু ব্যাটা তাকিয়ে আছে। ( রান্না ঘরের ভিতর গেলেন) নিবারণ। ফিরতে ত দেরি হবে- যােগেশ। হাঁ তা ত হবেই। দলিল দেবে, টাকা আনবে। হাঁ দেখ নিবারণ, টাকা হাতে না পেয়ে কিন্তু দলিল দিও না—হুসিয়ার -খুব হুসিয়ার পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্ক নিবারণ। সে বিষয় নিশ্চিন্ত থাকুন, কিন্তু আমার বাড়ীতে অন্য পুরুষ- লােক নেই, ললিতা একা থাকবে- যােগেশ। সে জন্য তােমার চিন্তা নেই, আমি যখন আছি। একটা ব্যবস্থা করবই। তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে রওনা দাও। নিবারণ। বখরা ? যােগেশ। কেন? দশ আনা ছয় আনা, -সেত আগেই স্থির হয়েছে। নিবারণ। হয়েছে ত, কিন্তু কাজটা যে আমারই সব করতে হচ্ছে। ছয় আনায় আমার বড় ঠকা হয় যােগেশবাবু। ওটা আধাআধি করে দিন-কি বলেন? রাজী ? যােগেশ। (স্বগত) ব্যাটা করে ফেলে, এখন মােচড় দিচ্ছে! দাড়াও সােনারদ-আমিও যােগেশ ঘােষ! ( প্রকাশ্যে ) টাকার মধ্যে কি আছে নিবারণ—ও দু’দশ টাকার কম বেশীতে কি আসে যায়। আমাদের দুজনেরই উদ্দেশ্য হচ্ছে দেওয়ান ব্যাটাকে জব্দ করা সেটা হলেই হ’ল-কি বল ? নিবারণ। আজ্ঞে হাঁ-তা বৈ কি—তা বৈ কি। তবে-তাহলে আপনি রাজী ত ? যােগেশ। হ-হ-রাজী বৈ কিনিও না তুমি আট আনা। টাকা কড়িতে আমার কোন দিনই বড় একটা আশক্তি নেই। হ্যা, আর তুমি দেরি ক’র না-দলিলগুলাে নিয়ে চট্ পটু বেরিয়ে পড় আবার কি ফ্যাসাদ বাধাবে—যে শত্ৰুপুরি! নিবারণ। ললিতার কিন্তু বড় ভয়। যােগেশ। সে জন্য কোন চিন্তা নেই যখন আমি আছি। নিবারণ রান্না ঘরে ঢুকিল আচ্ছা শালা, দেখে নেব তুমি কত বড় চালবাজ। বড় বড় সাগর সাঁতরে পার হয়ে এলাম, আর তুমি ত যাদু পচা ডােবা। ললিতার
তৃতীয় দৃশ্য
পথের শেষে
বড় ভয়! হাঃ হাঃ হাঃ -‘সে জন্য কোন চিন্তা নেই, আমি যখন
আছি! খাঁটি সত্য কথা—একেবারে খাঁটি! এক এক ঢিলে
যদি তিনটে করে পাখী মারতে না পারলেম—তবে আর বাহাদুরী
কিসের। দলিলগুলাের জন্ম দেওয়ান ব্যাটা মামাবাবুর কাছে
অপদস্ত হবে—চাকরী ত যাবেই—পুলিশেও যেতে পারে। এই হ’ল
এক। দলিলের বিনিময়ে শিবনারায়ণ বসুর পাচ হাজার টাকা
যদিও আপাতত: অর্ধেক নিবারণকে দিচ্ছি—কিন্তু সে অর্ধেকও
হাতে আনতে আমার কতক্ষণ! এই দুই। আর তৃতীয় হচ্ছে,
সুন্দরী ললিতা,-নিবারণের বাড়ীতে সে দিন তাকে দেখে আমি
মুগ্ধ হয়েছি—তার গান শুনে আমি আত্মহারা হয়েছি,-ললিতাও
হাবভাবে ইসারায় প্রকাশ করেছে যে, সে আমায় চায় ! মিলনের
অন্তরায় ছিল—এই নিবারণ। যা দিন কয়েক ত নিশ্চিন্ত !
নিবারণ রান্নাঘর হইতে বাহির হইল
এই যে পেয়েছ ? হুসিয়ার—খুব হুসিয়ার! আমার পত্রখানা
শিবনারায়ণ বাবু ব্যতীত আর কারও হাতে দিও না বুঝলে?
নিবারণ। হাঁ, তাহলে আমি বাড়ী থেকে জামা-কাপড় নিয়ে বেরিয়ে পড়ি?
যােগেশ। নিশ্চয়। ( উচ্চৈঃস্বরে) তােমার বােনের অসুখ কি রকম
থাকে আমাদের জানিও নিবারণ—আমরা বিশেষ উৎকণ্ঠিত থাকব
নিবারণ। আধা আধি ত ?
যােগেশ। —জান , আমি এক কথার লােক।
নিবারণ। তবু তবু-আচ্ছা, তাহলে আমি বেরিয়ে পড়ি। প্রস্থান
যােগেশ। শালা কি পাজি। আচ্ছা দেখা যাবে।
এছানােত
সুখদা রান্নাঘর হইতে বাহিরে আসিল
সুখদা। আবার কোথায় বেরুচ্ছ বাছা এই অবেলায়? রান্না-বান্না প্রায়
হয়ে গেছে। (নিম্নষরে ) হারে ডােটা ত তেমন জোরের নয়-
পথের শেষে
দ্বিতীয় অঙ্ক
যােগেশ। বল কি মা, ভাল ডাক্তারখানা থেকে কিনেছি।
সুখদা। না, তেমন ক্রিয়া পাচ্ছি না ।
যােগেশ। তবে মাত্রাটা বাড়াও-কিন্তু একেবারে বেশী বাড়িও না
যেন-আস্তে-আস্তে
সুখদা। নেনে—আমাকে আর তাের বুদ্ধি দিতে হবে না। আমি
তাের মা--তােকে পেটে ধরেছি।ঐ দেওয়ান আছে,—ওদিকে
তাকাস না-খবরদার ( উচ্চৈঃস্বরে) তিখিধম্মে যা করবি তুই, তা
ত বুঝতেই পায়ছি—সকাল সকাল খেয়ে দেয়ে কোলকাতা থেকে
যে বইখানা এনেছিস্ তা আমায় শােনাতে হবে-
যােগেশ। কি—গীতা শুবে ? সে যে সংস্কৃত। তুমি তা বুঝতে পারবে না।
অনাদির উন্মাদের ন্যায় প্রবেশ
অনাদি। যােগেশবাবু, এদিকে নিবারণ এসেছিল ?
যােগেশ। (স্বগত) নিবারণের খোজ! তবে কি সন্ধান পেয়েছে !
( প্রকাশ্যে ) হাঁ দেওয়ানজী, এই যে কিছুক্ষণ পূর্বে তার বােনের
অসুখ দেখতে গেল। এত সকালে বাড়ীতে রান্না হয়নি বলে
এখান থেকে খেয়ে গেল।
অনাদি।
( আপন মনে) তা হলে তােক পাঠাতে হয়--শ্যামা শ্যামা
পাড়ে-
সুখদা ও যােগেশ অর্থপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল
সুখদা। (স্বগত) আর কিছু সময় না পেলে ত যােগেশ ধরা পড়ে যাবে।
( প্রকাশ্যে ) ব্যাপার কি দেওয়ানজী ?
অনাদি। কেন তুমি জান না। শােননি?
সুখদা। কি করে জানব ভাই-তােমরা না বললে কার কাছে শুনব।
কি হয়েছে দেওয়ানজী ?
অনাদি। আর কি হবে—আমার সর্বনাশ হয়েছে! বুকের রক্ত ঢেলে
-
৩ঃ
তৃতীয় দৃশ্য
পথের শেষে
-
এই ত্রিশ বছর ধরে বিশ্বাসী বলে—প্রভুভক্ত ব’লে যে সুনাম, যে
খ্যাতি অর্জন করেছিলাম—গিয়েছে—সে সব গিয়েছে। সিন্দুক
চাবি বন্ধ—অথচ ভিতরে একখানা কাগজও নেই। ও-আমি কি
ক’য়ব-কি ক’ব-কি করে এ পােড়া মুখ মনিবকে দেখাব!
সুখদা। কাগজ ! কি কাগজ দেওয়ানজী ?
অনাদি। চরের মােকর্দমার সমস্ত দলিল—( সহসা)-যােগেশবাবু-
যােগেশবাবু! দয়া কর-এই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের উপর দয়া কর
তােমাদের অন্নে প্রতিপালিত আমি—আমায় মেরে ফেল না--দলিল
পেলে আত্মহত্যা ভিন্ন আমার অন্য উপায় নেই – উপায় নেই—
বাবা, আমি ব্রাহ্মণ, এই পৈতে দিয়ে তােমার হাত দুখানি ধরছি-
আমায় রক্ষা কর- দয়া কর—কাগজগুলাে ফিরিয়ে দাও
যােগেশ। দলিল ফিরিয়ে দেব আমি ! আপনি বলছেন কি দেওয়ানজী !
আপনি কি বলতে চান, যে সিন্দুক থেকে আমি চুরি করেছি।
এত বড় সাহস আপনার!
সুখদা। কি! যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা ! ঘােটলােকের মত স্পর্ধা!
তুমি ভেবেছ কি বল ত অনাদি চক্রবর্তী! জান তুমি আজ কাকে কি
ব’লছ! বরাতের দোষে চারটে ভাতের কাঙ্গাল হয়ে না হয় আজ
মামার দোরে এসে পড়েছে—জান, তােমার মতন দু’দশ জন চাকর
একদিন ওর বাড়ীতেও ছিল ! ( সহসা ক্রন্দন) ও গাে, তুমি কোথায়
আছ গাে—দেখে যাও একবার তােমার যােগেশের দুর্দশা! চাকর আজ
তাকে চোর বলছে -ও হােহাে-আমাদের অদৃষ্টে এত-ও ছিল—
সেই সময় দোলা ঝুল বায়ার উপর “অত গােলমাল কিসের
বলিয়া-বেলি ধরিয়া-দুর্গাশ আলিইলেন। পচাৎ-শা
নিধ খােআহাহা, কেন আবার ওখানে যাচ্ছ।”—বলিয়া তাহার
পার্শ্বে আসিয়া দাড়াইলেন।
পথের শেষে
দ্বিতীয় অঙ্ক
অনাদি। শােন যােগেশবাবু, আমার অবস্থা বুঝতে পারছ ; আমি মরিয়া
-আমার মন ব’ছে দলিলগুলি তুমি নিয়েছ। আমি প্রতিজ্ঞা
ক’ছি, ব্রাহ্মণ আমি, এই পৈতে ছুয়ে প্রতিজ্ঞা ক’ছি—এই মুহূর্তে
আমি চাকরী ছেড়ে যাব—তােমার পথ প্রাণান্তেও আর মাড়াব
না—শুধু কাগজ ক’খানি মনিবকে বুঝিয়ে দিয়ে আমি মানে মানে
বিদায় হব। নীরব রইলে-যােগেশবাবু, নীরব রইলে—দেবে না—
দেবে না,-শােন তবে, আমি ত মরেছি—তােমায়ও আমি সহজে
ছাড়বাে না-না,-কিছুতে ছাড়ব না।
যােগেশ। কি, মারবে নাকি?
সুখদা। ওরে, কে কোথায় আছি, শীগগির আয়-অনাদি চক্রবর্তী
আমার যােগেশকে মেরে খুন কয়লে -কেন আমি ম’তে ভাইয়ের
দোরে এসেছিলাম -এর চেয়ে যে ভিক্ষে করে খাওয়াও আমার
ভাল ছিল।
যােগেশ। কি, এত বড় স্পর্ধা তােমার দেওয়ানজী-তুমি আমায় মাতে
তেড়ে আস। বেশ, আমি যাচ্ছি মামাবাবুর কাছে—প্রস্থানােত
অনাদি। (পথ আগলাইয়া) না-না-কোথায় যাও, কোথায় যাও
আমায় মেরে না ফেলে যেতে পারবে না -আমি পাগল হয়েছি
পাগল হয়েছি-যােগেশবাবু, -দিদিমণি, তােমাদের পায়ে ধরছি-
ব্রাহ্মণ আমি-ততামাদের পায়ের উপর মাথা খুড়ছি-দয়া কর
আমায় বাঁচাও।
শ্যামার প্রবেশ
খামা। এ কি দেওয়ানজী-দেওয়ানজীকরূছেন কি?
দোতলা হইতে সিড়ি' বাহিয়া দুর্গাশঙ্কর ও তৎপশ্চাৎ নিধু নামিয়া
আসিতে লাগিলেন
সুখদা। আর কি করবেন? এমন করেও লােকে শত্রুতা শােধ দেয়
তৃতীয় দৃশ্য পথের শেষে গা! যতদূর পেরেছে অপমান করেছে-গাল দিয়েছে—ধেয়ে ধেয়ে মায়ূতে এসেছে—এখন ব্রাহ্মণ হয়ে পায়ের উপর আছড়ে পড়ে পরকালের পথেও কাটা দিচ্ছে—যাও বাপু, ও সব বুজরুকী— অনাদি। পায়ের উপর মাথা খুডলুম-তবু তােমাদের দয়া হ’ল না— তবে সত্যি সত্যি আমায় মেরে ফেলবে—বেশ তাই হক-তােমাদের সামনে এই দেয়ালে মাথা ঠুকে মরব। মাথা ঠুকিতে লাগিলেন—শ্যামা ধরিয়া ফেলিল সুখদা। শ্যামা-শ্যামা ! ধর-ধনু-কি সর্বনেশে লােক গা—এখন আমাদের মায়ে ছেলের হাতে দড়ি দেবার চেষ্টা-কেন আমি ম’তে এখানে এসেছিলেম। দুর্গাশঙ্কর ও নিধু-ধুড়াে সেই সময়ে সে স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন দুর্গা। অনাদি! ( অনাদি মুখ ঢাকিয়া কঁদিতে লাগিল ) সুখদা। দাদা-দাদা-তােমার সংসারে এসে দুর্গা। (হন্তের ইঙ্গিতে সুখদাকে স্তব্ধ করিয়া) অনাদি! ব্যাপার কি? অনাদি। বাবু—বাবু (হাউ হাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিয়া) সিন্দুক থেকে দলিল চুরি হয়েছে- দুর্গা। সে কি! কি দলিল ? অনাদি। চরের সমস্ত দলিল- দুর্গা। চরের সমস্ত দলিল। অনাদি। আজ জেলায় যাব বলে কাল বেছে গুছে মিল করে তাড়া বেঁধে সিন্দুকে তুলে রেখেছিলাম। আজ সিন্দুক খুলে দেখি- একখানিও নেই-সব চুরি হয়েছে- সুখদা। অথচ সিন্দুক ঠিক তালা-বন্ধই আছে। দুর্গা। অনাদি!
পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্ক 'ওঃ এত অনাদি। আজ্ঞে হযেখানকার যা সব ঠিক আছে, কেবল সেই তাড়াটা নেই- দুর্গা। সিন্দুকের চাবি ত একটা তােমার কাছে আর একটা আমার কাছে থাকে। তৃতীয় চাবি ত নেই। সব বিলিতি কল। বড় জেদের মকদ্দমাটা-পঞ্চাশ হাজার টাকার সম্পত্তি! খুড়াে, সংসারটা বাস্তবিকই উল্টে গেল ! সুখদা। আর বুড়াে মিন্সে আমার যােগেশকে ব’ছে যে, তুমি দলিল চুরি করেছ। দুর্গা। যােগেশ কি করে দলিল পাবে অনাদি? এ তােমার অতি অন্যায় কথা। তুমি ত নিজেই বলছ যে তুমি আজ তালা বন্ধ দেখেছ । সুখ। মিন্সের সে কি ঢং! একবার তেড়ে মায়ূতে আছে—একবার পা ধরছে-একবার মাথা খুড়ছে-একবার দেয়ালে মাথা ভাঙ্গছে । এ যে সর্বনেশে লােক গাে! দুধ-কলা দিয়ে এমন কালসাপও মানুষে পােষে! দুর্গা। অনাদি, আমি কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারছি না; তালা বন্ধ রয়েছে , —হ, সিন্দুকে টাকা কড়ি ছিল ? অনাদি। আজ্ঞে হাঁসাড়ে বার শ’ টাকা ছিল। দুর্গা। সে টাকা আছে ? অনাদি। আজ্ঞে হ্যা। দুর্গা। সব ? অনাদি। আজ্ঞে হ— যােগেশ। চোর বুঝি সে সাড়ে বার শ’ টাকা রেখে যেত! দুর্গা। এ যে আরও সন্দেহের কথা অনাদি- অনাদি। বাবু, আমি এই পৈতে ছুয়ে বলছি, আমি নির্দোষী—আমি কিছুই জানি না , ৬৮
তৃতীয় দৃশ্য
মােছ ও হস্ত
দুর্গা। এ সব অবস্থা শুলে কি তােমার কথা কেউ বিশ্বাস করতে
পারে অনাদি ? অনাদি! সহােদরের অধিক তােমায় মেহ করেছি--
সংসারের কাকেও যে কথা বলতে পারিনি, অকপটে তােমায় তা
বলেছি—আজ কি সেই বিশ্বাসের-সেই স্নেহের-ওঃ- চোখে
একবিন্দু অশ্রু দেখা দিল )
অনাদি। পৃথিবী! তুমি দ্বিধা হও—তােমার গর্ভে মুখ লুকিয়ে এ লজ্জা
থেকে আমি নিষ্কৃতি পাই। বাবুবাবু-আর বলবেন না—তার
চেয়ে আমায় জেলে দিন তাও আমি সইতে পারব ; কিন্তু আপনার
এক একটা কথা আমার মর্ম পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে।
দুর্গা। আর আমার কি হচ্ছে অনাদি। দাড়িয়ে দেখছ একমাত্র
পুত্রকে ত্যাগ করেছি চোখ দিয়ে এক ফোটা জল পড়েনি-আর
আজ তােমায় বিদায় দিতে-(করুদ্ধ হইয়া আসিল, আর কথা
বলিতে পারিলেন না।-ক্ষণকাল পরে) ওঃ --অনাদি ! কি ক'লে
কি ক'লে! তােমায় যে আমি বড় ভালবাসতেন—বড় বিশ্বাস
ক’তেন।
অনাদি। বাবু, অনাদি চক্রবর্তী আপনার সে বিশ্বাসের অমৰ্যাদা
করেনি।
এক আধ দিন নয় —আজ ত্রিশ বৎসর আপনার অয়ে
প্রতিপালিত হয়েছি-আপনারই অনুগ্রহে আজ সাতটা তরপের
লােক এই দরিদ্র ব্রাহ্মণকে দেখলে সসম্রমে মাথা নােয়ায়। অনাদি
পিশাচ নয়—সে মানুষ ; সে সব কথা সে ভােলে নিভুলতে পারে
। কিন্তু কি করব বাবু-দশ-চক্রে আজ ভগবান ভূত হয়ে
দাড়িয়েছেন। বুঝতে পাছি—মনে মনে সব বুঝতে পারছি—কিন্তু
আয়নার ছবি, ধরতে পারছি না। আমি জেলায় যাচ্ছি—আপনার
মকর্দমা ক’তে। ঐ চর যখন দখল হয়, তখন এই অনাদি চক্রবর্তীই
প্রথম মাথা দিতে গিয়েছিল-ঐ
দিতে গিয়েছিল-ঐ চরের জন্য এই অনাদি
পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্ক চক্রবর্তী সাত রাত্রি হাজত বাস করেছিল—যা সে কথা। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, কোন চক্রান্ত টিকবে না, যতক্ষণ এই বৃদ্ধ বেঁচে আছে। মকদ্দমা আমি জিতে দেব, কিন্তু চাকরী আমি আর করব । আপনারও যখন আমার উপর সন্দেহ হয়েছে, তখন আর আমাকে রাখা উচিত নয়। ভেবেছিলাম জেলা থেকে এসে, সুনামের সঙ্গে চলে যাব, কিন্তু তা হ’ল না। তবে আমি বলে যাচ্ছি, বিনা দোষে যারা এই পলিত-কেশ বৃদ্ধকে অপদস্থ করেছে—মেহময় মনিবের নিকট বিনা কারণে অপরাধী প্রতিপন্ন করিয়েছে তারা এর যােগ্য প্রতিফল পাবে—পাবে। নইলে—নইলে আমার নারায়ণ পূজা মিথ্যা—গায়ত্ৰী উচ্চারণ ব্যর্থ—ব্রাহ্মণের পবিত্র শােণিতে আমার জন্ম হয়নি—হয়নি—হয়নি- পৈতেটা দুই তিন খণ্ড করিয়া ছিড়িয়া ফেলিয়া টলিতে টলিতে প্রস্থান সুখদা। চোরের বড় গলা- নিধু। আর কেন মা, গিয়েছে ত। সুখদা। (স্বগত) এ আবার আর এক আপদ উড়ে এসে জুড়ে ব’! একটা না তাড়াতে আর একটা ! এযে মহীরাবণের গুষ্ঠি । প্রস্থান নিধু। । কি ভাবছ দুর্গাশঙ্কর - চল উপরে যাই। দুর্গাশঙ্কর নিঃশব্দে নিধুর অনুৰা হইলেন। কয়েকপদ গিয়াই নিধু, গান ধয়িল- “আমার কি হবে শঙ্করি । তুমি থাকতে ওমা আমার জাগা ঘরে হ’ল চুরি।” গান করিতে করিতে নিধু দুর্গাশঙ্করকে লইয়া দোতলায় উঠিল চতুর্থ দৃশ্য নলিনীর ভাড়াটীয়া বাড়ীর কক্ষ নলিনী ও গােবিন্দ নলিনী। এমন আপিস নেই যে ঘুরি নি। কিন্তু এমন অদৃষ্ট যে পনর টাকা মাইনের একটা চাকরীও জুটল না। কোথাও যদি সামান্য বেতনেরও একটা চাকরী খালি হল—হাজার হাজার এম-এ, বি-এ, সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়বে! আমার না আছে সহি সুপারিশ আছে বড় পাশের সার্টিফিকেট।কে আমায় চাকরী দেবে বল। গগাবিন্দ। তবে কি হবে দাদাবাবু? নলিনী। আবার এমনি গ্রহের ফের যে কাকার তার পেয়ে দু’জন লােকের বাড়ী যাতায়াতে খামকা কতকগুলাে টাকা খরচ হয়ে গেল। গগাবিন্দ। বুড়ােবাবু দেখাটা পর্যন্ত ক’লে না! নলিনী। আবার সে কথা কেন গােবিন্দ—সে সব কথা ভুলে যাও- ভুলে যাও। আর সে অতীত কাহিনী স্বপ্নেও মনে ক’র না—তুলেও মুখে এনাে না। গগাবিন্দ। বাড়ীওয়ালার দাবােয়ান আজ আবার এসেছিল। নলিনী। রাস্তায় তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে—ও-বেলায় আসতে বলে দিয়েছি। ও-বেলায় যদি তাকে টাকা দিতে না পারি, তবে আর ইজ্জত থাকবে না। আজ প্রায় পঁচিশ দিন ওয়াদার পর ওয়াদা করে তাকে ঘুরিয়ে হয়রান করেছি—দারােয়ানটা খুব ভদ্র, তাই রক্ষে। মুদী কাল বলে দিয়েছে পূর্বের টাকা না পেলে আর সে ধারে জিনিষ দেবে না। এখন ভাবছি গােবিন্দ, যে পারুল যদি তখন বুদ্ধি করে বিলে আর ঠাকুরকে বিদায় না ক’ত, তবে আজ কি অবস্থা হত কোথা থেকে গুণতেম তাদের মাইনে-তার পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্ক তুমি একটা উপর এই সাত আট মাসে দু’জন লােকের খাওয়াতেও ত কম ব্যয় হত না। গগাবিন্দ। তুমি অত ভেব না দাদাবাবু—ভেবে ভেবে তােমার সােনার বর্ণ কালী হয়ে গেছে। নলিনী। অদৃষ্টে আরও কি আছে কে জানে। এই হাতে একটি পয়সাও নেই, অথচ আজ সন্ধ্যার মধ্যে বাড়ীওয়ালার ত্রিশ আর মুদির কুড়ি- এই পঞ্চাশ টাকা যােগাড় করতে না পারলে স্ত্রীর হাত ধরে রাস্তায় গিয়ে দাড়াতে হবে, না খেয়ে মরতে হবে। গােবিন্দ ! যে ভাবে হয় পঞ্চাশ টাকা আমি সন্ধ্যার মধ্যে যােগাড় করবই করব। থাকবার যায়গা দেখ। কুড়ি টাকা ভাড়ার বাড়ীতে আর থাকা চলবে না—কুড়ি টাকায় যে এখন আমার সংসার চালাতে হবে। তুমি কোন বস্তি-টস্তিতে তিন চার টাকা ভাড়ায় একখানা খোলার ঘর দেখ—কোন রকমে সেখানে মাথা গুজে পড়ে থাকা যায়। আজ সন্ধ্যাবেলায় সেখানে উঠে যাব। গােবিন্দ। ঈশ্বর ! এও আমায় কাণে শুতে হ’ল ! নলিনী। কি গােবিন্দ, কাঁদছিস! এতেই চোখ দিয়ে টস্ টন্ করে জল পড়ছে। এতে যদি চোখ দিয়ে জল ফেলিস-তবে এর পর যখন তাের সামনে খেতে না পেয়ে শুকিয়ে কুঁকড়ে মরব তখন ত চোখ দিয়ে রক্ত ফেলেও কুল পাবি না। পিতা-জন্মদাতা-দেবতার দেবতা, মনস্তাপের তীব্র যাতনায় তাঁর অন্তর থেকে অজ্ঞাতে যে কঠোর অভিশাপের বাণী ধ্বনিত হয়েছে—সে কি সহজ জিনিষ রে। আমায় চুর্ণ করবে, ধ্বংস করবে-বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে যাবেই দেখি গে’ টাকা কোথায় পাই- ব্যথভাবে এহন গােবিন্দ। না,-কোন মতে এই যম বেটার দেখাটা একবার পেতাম
চতুর্থ দৃশ্য
পথের শেষে
তবে তার হাড় মাংস চুষে চিবিয়ে খেতাম। এত লােক মরছে-
শুধু আমার মরণ নেই। আর ত চোখে দেখতে পারি না—আর ত
সহ্য করতে পারি না। যার বাড়ীর চাকর-বাকরদের পর্যন্ত দালানে
ভিন্ন ঘুম হয় না—আজ সে রাজ্যের রাজা, মাথা গুজবে একখানা
খােলার ঘরে—এই দুপুর বন্দরে পঞ্চাশটী টাকার জন্য আজ সে
দোরে দোরে ঘুরছে। ভগবান! আমায় মরণ দাও-মরণ দাও।
কাঁদিতে লাগিল
পারুলের প্রবেশ
পারুল। তাকে অত নিমন্ত্রণ করে ডেকে আন্তে হবে না গােবিন্দ-দা
—সময় হলে সে আপনিই হাজির হবে। দেখ, তখন যেন পেছিও
! হুঁ গােবিন্দ-দা, বুড়ো হয়েছএখনও কচি থােকার মত
কঁদতে তােমার লজ্জা করে না !
গগাবিন্দ। কি দুঃখে যে কঁাদি দিদিমণি তা যদি জাতে।
পারুল। বল কি! দুঃখে তােমার কান্না আসে! ভারি আশ্চর্য্য ত!
আমার ত হাসি আসে—এই দেখ না হাছি-
গােবিন্দ । এমন হাসি চিরদিন তােমার মুখে যেন লেগে থাকে দিদিমণি!
পারুল। তা যেন থাল—এখন বলত তােমার দাদাবাবুগেলেন কোথায় ?
গােবিন্দ। এই কোথাও হয়ত বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন !
পারুল। দেখলে গােবিন্দ-দা, তােমার দাদাবাবুর আকেলটা! চালে
ডালে আমি তােক রাজভােগ রেধে নিয়ে বসে আছি, আর তিনি
গেলেন এখন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা করতে। আজ মহাপ্রলয়
হবে—আমি কিন্তু আগে থাকতে বলে রাখছি-
গােবিন্দ। নানা-দিদিমণি, দাদাবাবু তেতে পুড়ে আছেন, এর পর
আর তার সঙ্গে ঝগড়াঝাটি কর না - লক্ষ্মী দিদিটা আমার
পারুল। আমি তােমার সব কথা শুতে রাজী আছি গােৰি-দা-শুধু
পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্ক আমায় ঐ অনুরােধটা কর না-দেখছ ত, আমি কি রকম রেগে গিয়েছি গগাবিন্দ। নানা দিদিমণি, রে’গ না রে’গ না, ঘরের লক্ষ্মী তুমি, তুমি রাগ- লেই যে সর্বনাশ, দাদাবাবু আমার তাহলে যে পাগল হয়ে যাবে পারুল। আচ্ছা গােবিন্দ-দা, তােমার অনুরােধে না হয় রাগব না—কিন্তু আমার একটী কাজ তাহলে তােমায় ক’তে হবে- গােবিন্দ। বল দিদিমণি, কি করতে হবে—এক দৌড়ে আমি তােমার কাজ ক’ছি। পারুল। কাছে কোথাও স্যাক্রর দোকান আছে ? গগাবিন্দ। স্যাকরার দোকান। সে ত লক্ষ্য করিনি দিদিমণি -তা একটা স্যাক্রার দোকান খুজে বের করতে আমার দেরি হবে না। স্যাকরার দোকানে গিয়ে কি কব দিদিমণি ? পারুল। এই হারগাছা বিক্রী ক’তে হবে—তৈরী করতে দেড়শ’ টাকা লেগেছিল—এখন যা পাও- গগাবিন্দ। হার বেচব! কার হার? দিদিমণি-দিদিমণি, নানা, আমার দ্বারা কখন তা হবে না, প্রাণান্তেও আমি তা পারব না। ভগবান পারুল। বাঃ রে তুমি যে কেঁদেই আকুল! কাদছ কেন ? গগাবিন্দ। না দিদিমণি প্রান্তেও আমি তােমার হার বেচতে পারব না। পারুল। ও—তাই বল। সেই জন্য কঁাচ্ছ। আমি ত অবাক। গােবিন্দ দাদা, এ হার ত আমার নয়—ঐ যে ও-বাড়ীর বউটা কাল আমাদের এখানে বেড়াতে এসেছিল, সে বেচতে দিয়ে গেছে। তাদের লােজন কেউ নেই কি না। নিজেদেরও-এক সময়ে ওদের খুব ভাল অবস্থা ছিল কি না—তাই আমার কাছে দিয়ে গেছে গগাবিন্দ। দেখ দিদিমণি, বােকা পেয়ে বুড়াে গােবিন্দকে ফাকি দিও যেন ৭৪ চতুর্থ দৃশ্য পথের শেষে পারুল। তুমি কি পাগল হয়েছ গােবিন্দ-দা। বেশী দেরি ক’র না কিন্তু গােবিন্দ যাইতে যাইতে ফিরিয়া বলিল গগাবিন্দ। দিদিমণি, আমি বােকা মুখ লােক—দাদাবাবুকে দিয়ে বিক্রী কলে হ'ত না—দাদাবাবু দোকানে গেলে বেশী টাকায় বিক্রী হত- পারুল। বৌটা যে এখনই আসবে গােবি-দা, তাদের বড় দরকার এসেই যদি টাকা না পায় তবে কেঁদে অনর্থ করবে। আর তােমার দাদাবাবু ক্লান্ত হয়ে আছেন তাকে আর ও ঝাটের ভিতর নিতে চাই না। আমাদের ত নয়—দু’টাকা কম বেশীতে আমাদের আসবে যাবে কি।বেচতে দিয়েছে—বেচে দিলাম ফুরিয়ে গেল। গগাবিন। তা ঠিক বলেছ দিদিমণি, তেতে পুড়ে এসে দাদাবাবু, আবার স্যাকরার দোকানে দৌড়বে—আচ্ছা আমি-ই যাচ্ছি। প্রস্থান পারুল। তিনি এসে যখন জিজ্ঞাসা করবেন-কি বলব কে! সত্য কথাই বলব। রাগ করবেন ? আমি সব বুঝিয়ে বলব। এই কাটফাটা বােদ মাথায় করে যার স্বামী ‘হা টাকা হা টাকা করে দোরে দোরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন—তার কি গহনা পরা শােভা পায়। মা কালী । আশীর্বাদ কর মা যেন আমার সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার আমার শাঁখা সিন্দুর যেন বজায় থাকে। যেন বজায় থাকে। দাদার একটা দাদার একটা ভুলে কি সর্বনাশ হয়েছে ! পিতা-পুত্রের মিলন পথের কাঁটা আমি-ঐশ্বর্যের ক্রোড়ে বদ্ধিত স্বামী আমার, অজি দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত। আর সে আমারই জঙ্গ-আমারই জন্য। একটা কাল ব্যাধির মত আমি তার সৰ্বাঙ্গ ছেয়ে আছি। এ চিন্তার দাহ-তুষানলের ন্যায়—আমার মৰ্ম্ম পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে। স্বপ্নেও যাকে কামনা করতে পারি নি, সেই দেবতা স্বামীর চরণে স্থান পেয়ে আমার এ নারী-জন্ম সার্থক পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্ক হয়েছে, কিন্তু তার জীবন যে আমি বিষময় করে দিয়েছি। প্রাণ দিয়েও যদি পিতা-পুত্রের মিলন ঘটাতে পারতেম । ( নেপথ্যে-রাধা। “কৈ গাে--”) পারুল। কে ? রাধা না? এ দিকে আয় না ভাই- ত্বরিতে চোখের জল মুছিয়া ফেলিল গীত গাইতে গাইতে রাধার প্রবেশ যশােমতী কোলে নাচে ব্রজ গােপাল। মায়ের কোলে হেলে দুলে নাচে মায়ের দুলাল ॥ (তার) রাঙ্গা পায়ে নুপূর বাজে, থিয়া থিয়া গােপাল নাচে- (ও তার কচি হাতে তালি দিয়ে, থিয়া ধিয়া গােপাল নাচে- মায়ের প্রাণ সঙ্গে নাচে, নন্দরাণীর নয়ন নাচে তােরা দেখে যা দেখে যা বৃন্দাবন করি অলো, নাচে যশােমতীর কালো ; হেরে নয়ন জুড়াল । কোটী মদন জিনি, অপরূপ নীলমণি চদিমুখে “মা” “মা” বোল, হৃদি চাদ চাদমুখ, চুম্বই চুম্বই, যশােমতী ভেল পাগল। কি গাে নূতন গিন্নী-কি ভাবছ ? ছেলে হবে—চঁদ মুখে মা বলে ডাকবে-আধ আধ স্বরে পারুল। তােকে ‘পিসীমা' বলে ডাকবে রাধা। তা বৈ কি। তাহলেই আমার রায়বাঘিনী ননদিনী’র দলে নিতে পারি। না ? পানুল। তবে কি হবি–“মাসী ? রাধা। হ—তাতে রাজী আছি। মাসী’ ডাকের সঙ্গে যে মায়ের গন্ধ জড়ান আছে। কচি ছেলের আধ আধ স্বরের ‘আ’ ডাক-সে ৫ D
চতুর্থ দৃশ্য
বড় মিষ্টি-বড় মিষ্টি-বুঝি সুধার সাগর মন্থন করে তার জন্ম
হয়েছে—মুহূর্তে মায়ের সমস্ত যাতনা দূর করে দিয়ে তার প্রাণ
অব্যক্ত পুলকে ভরে দেয়—নারীত্ব মাতৃত্বের ক্ষীর-সাগরে স্নান করে
ধন্য হয়! (দীর্ঘশ্বাস)
পারুল। (স্বগত) কত বড় একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা হতভাগিনীর বুকের
ভিতরে লুকিয়ে আছে। অথচ ইহজীবনে আর তা পূর্ণ হবে না।
( প্রকাশ্যে ) রাধ, আমার যদি ছেলে হয়, তবে সে তােক “মা”
বলে ডাকবে-
রাধা। আরআরআমি তাই শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ব। জীবনটা
আমার সার্থক হয়ে যাবে ! দেখলে ভাই, কি দুর্বলতা! নাঃ, এ
মনটাকে আর কিছুতেই বশে আন্তে পারলেম না। এই দেখ,
আবার চঞ্চল হয়ে উঠেছে - ( সহসা) রাক্ষসী ! করেছি কি-
করেছিস্ কি?
পারুল। কি--কিরাধা?
রাধা। —না—সে ত মরেনি, ঘুমিয়েছিল মাত্র।
যেই নাড়া পেয়েছে,
অমনি জেগে উঠেছে। অভ্যাস, সাধনা, সংযম-সব মুহূর্তে ডুবিয়ে
দিয়েছে—সব মুছে নিয়েছে -- সব ব্যর্থ করেছে! সেই হাহাকার সেই
তীব্র হাহাকার—বুকের মাঝে সেই তীব্র হাহাকার ! বুক যে শূন্য
একেবারে শূন্য ! কই-কই—আমার ঠাকুর কই—আমার ঠাকুর
কই—কোথায় কোথায়! দেখি খুজে দেখি-
পারুল। রাধা-রাধা- চলে গেল ! এমন ত ওকে কখনও দেখিনি
পাগল হ’ল না কি। অত জ্বালা বুকে করে যে বেঁচে আছে এই
আশ্চৰ্য্য!
নেপথ্যে নলিনী। গােবিন্দ গােবিন)
এই যে এসেছেন।
বেগে প্রস্থান
পথের শেষে দ্বিতীয় অ শুল্কমুখে ক্লান্ত নলিনীর উত্তেজিত অবস্থায় প্রবেশ নলিনী। না-মানুষকে আর বিশ্বাস করব না-এত অকৃতজ্ঞ—এমন শয়তান সে! পারুল। কেন? বিড়ালছানাও ত কম অকৃতজ্ঞ নয়! মা-মরা একটা বিড়ালছানাকে কত দুধ খাইয়ে কত মাছ খাইয়ে যেই একটু বড় করে তুলেছি অমনি একদিন সে আমার হাত কামড়ে দিল। এই দেখ না, আজও আমার হাতে সে দাগ রয়েছে। মানুষ ত ঢের ভাল- কামড়ায় না। নলিনী। কামড়ালে আর বেশী কি হয়—শরীরে একটু ব্যথা লাগে, বড় জোর একটু রক্ত পড়ে। কিন্তু মানুষের অকৃতজ্ঞতা মৰ্ম্ম পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। আজ সতীশের কাছে গিয়েছিলেম—পঞ্চাশটা টাকার জন্য—সতীশ-আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধু সতীশ-বুঝলে পারুল ? পারুল। উৰ্দটা ভাল জানি না, কিন্তু বাঙ্গালা ব’ললে পরিষ্কার বুঝতে পারি। নলিনী। ঠাট্টা নয় পারুলশােন-পঞ্চাশটি টাকার জন্য সতীশের কাছে গিয়েছিলে! বাবু শনিবার ক’তে যাবেন বলে ইয়ার বন্ধুদের নিয়ে মােটরে উঠতে যাচ্ছেন—সে সময় আমায় দেখে এক বন্ধুকে কি বলে জান! আমায় শুনিয়ে শুনিয়ে বললে—“নাঃ, এই শালা ভিখিরিদের জ্বালায় অস্থির।” ভিখিরিভিখিরি—আমি ভিখিরি ! আর যখন টাকার অভাবে দেশে ফিরে যাচ্ছিলে, তখন বই, কলেজের মাইনে, মায় জামা কাপড় জুগিয়ে, বাড়ীতে রেখে কে তােকে লেখা- পড়া শিখিয়েছিল—সে এই ভিখিরি! আজ বড় এটর্ণির মেয়ে বিয়ে করে তার ফার্মের অংশীদার হয়ে না ? পারুল। ও—তাই বল। বড় এটর্ণির মেয়ে বিয়ে করেছে। তবে ত সে বলবেই। ৭০ চতুর্থ দৃশ্য পথের শেষে নলিনী। ব’লবেই ! কেন? আমি কি তার কাছে ভিক্ষা করতে গিয়ে- ছিলাম। এখনও আমি তার কাছে পাঁচ:ছশ’ টাকার উপর পাই, যা সে আমার কাছ থেকে হাওলাত নিয়েছে। আজ পঞ্চাশটি টাকা চেয়ে আমি হলেম ভিখিরি! আজ টাকার মুখ দেখেছি, মােটর চড়চিস্-না? পারুল। আচ্ছা, এক কাজ কর- নলিনী। কি ? পারুল। তাকে একদিন নিমন্ত্রণ করে খুব ভাল করে খাইয়ে দাও নলিনী। অপমানের তীব্র বিষে আমার শরীরের প্রত্যেকটা লােমকূপ রি রি করে আছে, আর তুমি তাই নিয়ে রহস্য ক’ছ-তুমি হাসছ ? এ দুর্দিন 'আমার চিরকাল ছিল না -জান, ইচ্ছা কলে এ আমি এড়িয়ে চলতে পায়ূতেম। ক্ষণকালের জণ্ঠ পারুলের মুখখানি কাগজের মত শাদা হইয়া গেল। কিন্তু সে শুধু ক্ষণিকের জন্য। মুহূর্তে নিজেকে সামলাইয়া লইয়া প্রশান্ত-বদনে পারুল বলিল-- “নাথ-ইষ্টদেবতা! সুধা পায় ঠেলে স্বেচ্ছায় আদর করে বিশ্বের অনাদৃত হলাহল পান করেছ, এখন যদি বিষের জ্বালায় ছটফট কর, তবে তােমার হলাহল পানের সার্থকতা থাকবে কোপায়।” ( নেপথ্যে—গগাবিন্দ। দিদিমণি-) যাচ্ছি গােবিন্দ-দা। এইবার চানটা করে চারটা খেয়ে নাও লক্ষ্মীটা, আমি আসছি এখনি। নলিনী। টাকাটার যােগাড় হ’ল না। আবার দাবােয়ান আসবে। একবার বাড়ীওয়ালার বাড়ী থেকে ঘুরে আসি—দেখি যদি বলে করে আর দুটো দিন সময় নিতে পারি।
পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্ক পারুলের পুনঃ প্রবেশ পারুল। হাঃ হাঃ হাঃ- নলিনী। হঠাৎ এত হাসির ফোয়ারা ছুটল যে? পারুল। ছােটাতে জানলেই ছােটে তবে কথা হচ্ছে জানা চাই— হাঃ হাঃ হাঃ- নলিনী। তােমার মাথা খারাপ হ’ল না কি। পারুল। আমার সতীনের হক। বল—বল—তােমার ক’টাকা চাই? বল বল—আজ আমি দাতাকর্ণ-বল না -বল না—ক টাকা চাই ? নলিনী। ক’টাকা চাই। টাকা? পারুল। জরুর। জলদি বােল । নলিনী। কি বলছ পারুল ? পারুল। পারুল ঠিক কথাই বলছে,—বল—বল—ক’ টাকা চাই ? নলিনী। কেন তুমি দেবে নাকি! পারুল। বলেই দেখ না—দিই কি না। নলিনী। আচ্ছা পঞ্চাশ টাকা। পারুল। হাত পাত। নলিনী। কি পাগলাম সুরু ক’মূলে এই আড়াই প্রহরে পারুল। ব’ললে ত আবার পুরুষের রাগ হবে। সৃষ্টির ললাকের কাছে হাত পাততে পার। আর স্ত্রীর কাছে হাত পাততেই বুঝি যত দোষ। ?—আহাহা-পাততই না হাতখানা এক রি - নলিনী। আচ্ছা, দেখি তােমার কি পৰ্যন্ত দৌড়। এই হাত পেতেছি। পারুল। বেশ এখন চোখ বোজ- নলিনী। পাগলামাের আর সময় পেলে না। ও সব রেখে এখন দুটি দেবে ত দাও, খেয়ে দেয়ে আবার বাড়ীওয়ালার কাছে যেতে হবে। পারুল। ঐ ঐ ত তােমার দোষ-অল্পেই অধৈর্য হয়ে পড়লক্ষ্মীটা ৫০
চতুর্থ দৃশ্য
পথের শেষে
পারুল।
আমার মা সোমাণিকআর! পরশ নয়ন দু’টা একবার
নিমীলিত কর দেখি।
নলিনী। ( বিরক্ত ভাবে) আচ্ছা পাগলের হাতে পড়েছি ত— এই নাও,
এই চোখ বুজেছি
লেগে যা ভানুমতির ভেল্কি ! এক-দুই,--তিন
নলিনীর হাতে পঞ্চাশ টাকার নােট দিল
নলিনী। এ কি! নােট -পঞ্চাশ টাকার। এ তুমি কোথায় পেলে?
পারুল। বলছি—বলছি—ক্রমে ক্রমে—সবুরে ঠিক মেওয়া ফলাবাে।
আচ্ছা, পাত দেখি বাঁ হাতখানি
নলিনী। কেন, আরও আছে না কি ?
পারুল। আহাহা—কেন তর্ক করে সময় নষ্ট কর। সময়ের মূল্য বােঝ
আমার হড়ীশালের শূন্য সিংহাসন যে খা খা ক’য়ছে—আমি ত
আর বিলম্ব করতে পারি না—পাত দেখি বা হাতখানি-
নলিনী। আচ্ছা, এই পাতলুম। চোখও বুজতে হবে নাকি?
পারুল। হু:—৭০ টাকার নােট প্রদান) এইবার চোখ খুলে দেখ দেখি।
নলিনী। এ! আরও সত্তর টাকার নােট। পারুল—পাল।
কোথায় পেলে এত টাকা? বল আমায়-
পারুল। আরে সে মজার কথা আর বল কেন! একেবারে দেশ ছাড়া
করেছি-
নলিনী। দেশ ছাড়া করেছ! কাকে?-
পারুল। সতীনকে
নলিনী। সতীনকে!
পারুল। হাঁ গােছ, ঐ যে সেই হতভাগা হারছড়া সাত তােমার
আমার মিলন-পথের বাধা হয়ে যােজ জালাতন এত
मिन-मसिपिपनि
এবারের
১
পরে যে দ্বিতীয় অঙ্ক আজ যৰ বেও হিসাব খোলা ৫ ৰূতখন গোবিন্দ-দার মারফত একদম বিক্রমপুর চালান দিয়েছি। নলিনী। কি! তুমি গলার হার বিক্রী করেছ! পারুল। উপায় কি বল! সত্যকাল হ'লে না হয় একজনকে দানই ক’তাম, কিন্তু এটা যে কলিকাল। এ কালে দান করলে লােকে যে মতলব খোঁজে! তাইত বাধ্য হয়ে বিক্রমপুরে চালান দিলাম । নলিনী। পারুল-পারুল-কি করেছ—কি করেছ তুমি! উঃ, এ-ও আমার অদৃষ্টে ছিল ! স্ত্রীর অলঙ্কার বিক্রয় ! বাবা, বাবা, আর কত শাস্তি দেবেন -এতেও কি আপনার তৃপ্তি হয় নি। পারুল। তুমি পুরুষ,তুমি বীর, -তুমি বিজয়ী,তুমি হবে শত বিপদে পর্বতের মত অচল অটল, এই সব তুচ্ছ ব্যাপারে কি তােমার এত বিচলিত হওয়া সাজে! নলিনী। কিন্তু, এ যে- এ যে—আমি সহ্য করতে পাছি না। দুর্গাশঙ্কর রায়ের পুত্র আমি, আজ সামান্য পঞ্চাশ টাকা--যাতে আমার একদিনের বাজে খরচ কুলােয় নি, আজ সেই সামান্য পঞ্চাশ টাকার জন্য আমার স্ত্রীর গলার হার বেচতে হল। পারুল। আমার দিকে একবার তাকাও দেখি না, আমি কিভাবে সহ্য করছি একবার ভাব দিখি! শত বিলাসিতার মাঝে পালিত তুমি, ঐশ্বর্যের ক্রোড়ে বর্ধিত তুমি-দারিদ্রের কঠিন পীড়নে তােমার বক্ষ- পঞ্জর অপেক্ষা প্রিয় বিলাস-উপকরণগুলি একে একে বিক্রয় করেছ এক একখানি করে আমার চোখের সম্মুখে নিঃশেষ করেছ—আমি কি করে তা দাড়িয়ে দেখেছি? কই, বুকের রক্ত ত চোখ ফেটে কেয়ােয় নি! জুয়েল, ইষ্টদেবতা! রাজরাজেশ্বরের আজ কেন দীন ভিখার বেশকার হয় না। এই কাঠফাটা মােন, রাস্তায় কুকুরটা পর্যন্ত খাতে বেরুতে সাহস করে না, তার ভিতর তুমি এই পঞ্চম দৃশ্য তা মােড়া ও হস্তান্তর নিষেধর শেষে আড়াই প্রহর বেলায়—মাথায় এক বিন্দু জল পড়েনি, পেটে এতটুকু খাবার পড়েনি, “হা টাকা, হা টাকা করে পাগলের মত ছুটে বেড়া আর—আমি কোন প্রাণে স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিত হয়ে ঘরে বসে তাই চেয়ে দেখব। নলিনী। কিন্তু কিন্তু পারুল, তােমার ঐ শূন্য গলা আমায় পাগল করে দিচ্ছে পারুল। স্বামি, ইষ্টদেবতা, আমার ইহকালের সর্ব, পরকালের মােক্ষ! কে চায় ঐ ছার সােণার হার ! এস প্রভু, আমার কত জন্মের তপস্যার ফল—আমার কত জন্মের সাধনার ধন-নলিনীর হাতখানি লইয়া গলার উপর রাখিয়া ) আমার চিরবাতি চিরকাম্য এই হার আমার গলায় পরিয়ে দাও—জীবন আমার ধন্য হক। আর আশীর্বাদ কর যেন জন্ম জন্ম আমার এই বড় সাধের হার থেকে আমি বঞ্চিত না হই। বলিতে বলিতে পারুলের মুখমণ্ডল এক স্বর্গীয় জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল- তাহার মস্তক যেন ঈষৎ উর্ধে উখিত হইল-নলিনী মুখ-বিস্ময়ে তাহার দিকে চাহিয়া রহিল। তাহার নয়নে শ্রদ্ধা ফুটিয়া উঠিল। কটু টু পঞ্চম দৃশ্য নিবারণের বাটী খড়ের ঘরপরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। গৃহমধ্যে শয্যার উপর ললিতা ও যােগেশ উপবিষ্ট। যােগেশের সম্মুখে সুরাপাত্র প্রভৃতি সজ্জিত। ললিতা পাশে বসিয়া হারমনিয়াম সহযােগে গীত গাইতেছে। গীত আজি নূতন সুরে বাঁধ বীণা নুতন গান গাও। নূতন আঘােয় নূতন চোখে নূতন ক'রে চাও। যার লাগি তাের, আঁখি লােরে কেটেছে রাতি,- আজ দুয়ারে সেই নূতন অতিথি, তুলি নুতন কেলা, জুই, চামেলী, মল্লিকা জাতি ঐ নূত মালা গাঁথি তারে আদরে পরাও। ললিতা। কি যােগেশবাবু, কেমন enjoy করলেন? যােগেশ। বেশ! তুমি ইংরিজীও জান। এ তুমি যে একটা রত্ন। ললিতা। আমি যে মেমের স্কুলে পড়েছিলাম। সেখান থেকেই আমার হাতে খড়ি। সেকেণ্ড মাষ্টার আঁক কষাতে Tiffin hour বােজ বাসায় নিয়ে যেত। বছর খানেক বেড়ে কেটেছিল—তার- পরই মেম ধরে ফেলে! যােগেশ। তারপর-তারপর? ললিতা। তারপর যা হয় নাম কেটে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দিলে । বাবা টের পেয়ে একটা অজ-পাড়াগেঁয়ে গাড়ল চাষার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে একেবারে আমার শ্বশুরবাড়ী দীপার দিলেন। আমি উত্তর নীপুমনি গলেম। চাকর জোখুনধুপালিয়ে গেল, ই ৮০ পঞ্চম দৃশ্য পরে শেষে लिमि-बारा ইতিফলকে পালক, আর বিয়ের ছ'মাসের মধ্যে আমার স্বামী-দেবতা পটল উৎপাটন করলেন-আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেম। যােগেশ। বটে! বটে! মধুসূদন ত খুব রক্ষা করেছেন! ললিতা। সে কথা আর বলতে। আমি হলেম ইংরেজিপড়া, মেমের স্কুল ফেরত একপ্লিশড, লেডি গাইতে জানি, বাজাতে জানি-দু’দশ খানা নভেল নাটক পড়েছি-আমায় কি না বলে সাত হাত ঘােমটা টেনে ঘরের কোণে বসে থাকতে ! যােগেশ। আরে রাম! সে কি একটা কথা ! ললিতা। আর সেই অসভ্য গেয়াে চাষাটা-মুখে খোঁচ, খোঁচ, দাড়ী, পায়ে এক হাঁটু ধূলােতাকে আমার কথায় কথায় দেবতা দেবতা করতে হবে—আর সেই এই আচরণের ধুলাে নিয়ে মাথায় মাখতে হবে ! যােগেশ। আরে ছছ ছছ ছছঃ- ললিতা। এই দেখ, তােমার সঙ্গে ভাই কথা বলেও সুখ আছে- যােগেশ। সে ভাই তােমার কৃপাদৃষ্টি ! তা নিবারণের বরাত ফিরল কবে থেকে ? ললিতা। কেন তােমায় বলিনি সে কথা! “মনের কথা” কলকাতায় যেতে চিঠি লিল। আমিও কলকাতায় যাব মনে ক’লাম। সেই সময় নিবারণটা মামাবাড়ী যায়—ওর মামাবাড়ী আবার ঐ গায়ে। নিবারণ আবার আমার দূর সম্পর্কে ভগ্নীপতিও হয়। তাই ভাবলেম যে নিবারণের সঙ্গে এ নরকপুরি থেকে ত বেরুই। তারপর সুযােগ মত কলকাতায় চলে যাব। পথে কদিন একসঙ্গে থেকে নিবারণের সঙ্গে কেমন একটু ভাবও হয়ে গেল। তার উপর—এখানে এসে নিবারণ আমার সঙ্গে খুব ভদ্রতাও করেছে—এসেই তার পরদিনই ধীকে আর ছেলেমেয়েকে এখান থেকে বিদেয় করেছে। কাজেই একটু পরে যে দ্বিতীয় অঙ্ক চক্ষু লজ্জা হল। আবার যেতে চাইলে নিবারণটা পায় ধরে হাউ হাউ করে কাঁদে! তাই ভেবেছিলাম যাক আর কটা দিন-তারপর ত ভাই তােমার সঙ্গে দেখা, এখন যে পায়ে শেকড় গজিয়ে গেছে যােগেশ। কেন আর ভাই ছলনা কর—তেমন অদৃষ্ট আমার হবে ! এ অধমকে তুমি চরণে স্থান দেবে- ললিতা। দেখ ভাই শেষ কালে তুমি অবলা কুলবালাকে মজিয়ে মাঝ দরিয়ায় না ভাসাও- যােগেশ। ললিতা ললিতা-তুমি যদি আমার হও—তােমাকে আমি মাথায় করে রাখব। নিবারণ তার স্ত্রীকে আর ছেলেমেয়েকে তাড়িয়েছে—আমি আমার মাকে পৰ্যন্ত তাড়াব। তুমি আমার হও ললিতা- ললিতা। হব কি হে—বহু দিন ত হয়েছি যােগেশ। সত্যি! মাইরি!—আমার মাথায় হাত দিয়ে বল ললিত ললিতা। তােমার-তােমার-তােমার-কেমন এইবাৰ হ’ল ত! যােগেশ। তাহলে নিবারণের কি ব্যবস্থা কবে? সে যে কালই আসছে- ললিতা। এ-কাল আছে ? যােগেশ। হললিতা। সে এলে আমার কি উপায় হবে—কেমন করে আমি তােমার বিরহ সইব—আমি যে মরে যাব ললিতা। ললিতা। Idiotটা কাল আসছে---আবার সেই ঘ্যান্ ধ্যান্ প্যান্ প্যান্! তাই ত! যােগেশবাবু, তােমার মামার জমিদারীটা তুমি পাবে ত? যােগেশ। নিশ্চয়! নলিনীটাকে তাড়িয়েছি—অনাদি চক্রবর্তীকে দূর করেছি-আর আমার জমিদারী পাওয়া ঠেকায় কে? ললিতা। বেশ, বেশ, এই ত চাই। সাথে কি তােমাকে আমার অত ভাল লাগে। এ যােগেশবাবু, তােমার বিধবা বিবাহে আপত্তি আছে?
পর ৫ যােগেশ। কিছু মাত্র না। তােমার মত বিধৰা পেলে, তিন পুরুষে বিধবাকেও বিয়ে ক’তে রাজী আছি। ললিতা। তুমি তাই বেশ up-to-date। সেইটা আমার আরও ভাল লাগে। যােগেশ। সে ভাই তােমার মহিমে। ললিতা। কিন্তু idiotটা কাল যদি এসে পড়ে—তাহলে-তাইত- যােগেশ। তুমি কোলকাতা যাবে ঠিক করেছিলে না? ললিতা। এই দেখত, তােমায় আমায় কেমন মিশ খায়! আমিও ঠিক ঐ কথাই ভাবছি। যােগেশ। ব্য, তবে আর ভাবনা কি! আজ রাত্রেই তুমি কোল- কাতায় চলে যাও। আমিও হাতের জরুরি কাজ ক’টা সেরে দু’ চার দিনের ভেতর হুজুরে হাজির হ’ব। কি বল ? ললিতা। সেই ভাল। যােগেশ। তুমি দেখ ললিতা, আমি তােমাকে কি যত্নেই রাখি! হাঁ, নিবারণ সে টাকাটা কোথায় রেখেছে? ললিতা। কোন্ টাকা? যােগেশ। ঐ যে, সেই পাঁচ হাজারের অর্ধেক আড়াই হাজার - ললিতা। ও-সেই টাকা! সে ত আমার কাছে। তােমার সঙ্গেও সে রকম আলাপ হ’-তখন দেখ, ও সব টাকা কড়ির হাঙ্গামা তােমায় মােটেই পােয়াতে হবে না। যােগেশ। বেশ-বেশ- তাহলে সে টাকাটা ত অবশ্য নিয়ে যাচ্ছ? ললিতা। নিশ্চয়। আমরা ভাই শিক্ষিত মহিলা, টাকা-কড়ির ব্যাপারে আমাদের ভারি উদারত। “পর’ বলে কোন কথা আমাদের মনেই আসে না। যােগেশ। ব্য, তাহলে সব ঠিক, আজ রাত্রেই। ও: আজ আমার } পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্ক সুপ্রভাত—কি আনন—কি আনন্দ! এখন তাহলে ভাই একটু drink-( মদ্য ঢালিয়া গ্লাস ললিতার মুখের কাছে ধরিল ) ললিতা। ওকি ! জান ত ওটা আমার বড় একটা অভ্যাস নেই— যােগেশ। হয়ে যাক-হয়ে যাক-drink হল আমাদের কারণ, drink নইলে কি আমােদ জমে! চাঁদ-মুখে গেলাসটা তুলে ধরেছি একটু প্রসাদ করে দাও! ললিতা। তােমার অনুরােধে কিন্তু ভাই যােগেশবাবু—ললিতা প্রসাদ করিয়া দিল—যােগেশ মহা আনলে তাহা পান করিল। যােগেশ। ব্যপান হ’ল এইবার একটা নাচ গান- ললিতা। দূর ! তুমি কি যে বল—আমি কি জানি যােগেশ। কেন আর অধীনকে ছলনা কর প্রেমময়ী। ললিতা। একান্তই ছাড়বে না, তােমার অনুবােধৰে গীয় পড়েছি—অক্ষমতলিশ। আই লাগছে যোগেশ কিছু গীত আজি যমুনা কেন উজান বয়। হাসিয়া লুটিয়া মৰ্ম্ম হানিয়া মুখ কি কথা কয়। তার তীরে বাণী কত না বেজেছে, ব্রজবালা জলে কত না খেলেছে, জাগেনি কখন (ও) এ সুখ শিহরণ, যমুনারি দেহময়। ৮৮ পঞ্চম দৃশ্য পথের শেষে নিধু খুড়োর প্রবেশ ক নিধু। কি বাবা চাদবদন! এই দুপুর বেলায়-একেবারে যে আমােদেয় হয়ূরা ছুটিয়ে দিয়েছ! গ্রামে ঘরে অতটা বাড়াবাড়ী কি ভাল । বিশেষ এই ভদ্রপল্লীতে! আরে কেও ? বাবাজীবন যে—আরে তাইত বলি (সুর) ‘কমল ছাড়া হয় কি কভু ভৃঙ্গ’- যােগেশ। ( স্বগত) সর্বনাশ! এখনই মামাবাবুকে সব বলে দেবে। নিধু। । তারপর বাবাজীবন, এখানে কি জন্য শুভাগমন-বাড়ীতে নেই নিবারণ- যােগেশ। সেইটাই ত খুড়াে নিধু। আসবার কারণ -কি বল বাপধন? এখন বল দেখি বিবরণ ললিতা। (স্বগত) বুড়াে বেশ রসিক ত—কথাগুলি ত ভারি মিষ্টি- বেশ লাগছে। একে সঙ্গে নিলে ত হয়। ( প্রকাশ্যে) আসুন-বন- যােগেশ। হাঁ, এস খুড়ােব’স-( স্বগত) আপদটাকে এখন বিদেয় করি কি বলে। ( প্রকাশ্যে ) এই খুড়াে নিবারণ মহালে গিয়াছে- যাবার সময় বার বার করে একে দেখাশুনা করতে অনুরােধ করে গেল—তাই ভাবলুম মানুষটা একা আছে নিধু। আমি গিয়ে দোকা করি। কেমন না? তা বাপধন, তুমি যে মানুষটাকে বড় বেশী দোকা করা আরম্ভ করেছ! এই সকাল নেই, সন্ধ্যা নেই, দুপুর নেই যােগেশ। কি করি খুড়ে। ওর যে ব্যামােনা নিধু। ব্যামাে ! কি ব্যামাে? যােগেশ। এই—এই-পেট বেদনায় আজ কদিন বড় কষ্ট পাচ্ছে- ( স্বাগত টা যেন কাটালের আঁটা নিধু। । তুমি পধন চাঁদবদনের পেট বেদনার দাওয়াই ? কাটা
দ্বিতীয় অঙ্ক
যােগেশ। আমি যে খুড়া ওকে চিকিৎসা করছি-( স্বগত) ক্রমেই
যে জড়িয়ে পড়ছি।
নিধু। চিকিৎসা করছ! কি রকম—কি রকম—
যােগেশ। এই—এই হােমিওপ্যাথি ওষুধ দিচ্ছি
নিধু।
বটে-বটে—কিন্তু বাবা ডােজ চালাচ্ছ যে এলােপ্যাথির।
বাবাজী, তােমাদের হােমিওপ্যাথি মতে নাচ গানটা কি আজ কাল
পেট বেদনার একটা বড় রকম দাওয়াই বলে গণ্য হয়েছে।
যােগেশ। এ!
ললিতা। হােহাের হাে- পা দু'খানি নাচের ভাবে নাড়িয়া, শব্দ করিল )
নিধু। ঐ যে ! এখনও উঁদবদনের শ-অঙ্গে— সুরে) তালে, তালে,
রিনি ঝিনিরিনি ঝিনি নূপুর বােলে।
যােগেশ। ওটা কি জান খুড়াে (মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে) ওটা
নিধু।
ওটা-ওটা-
ললিতা। নিপাতনে সিদ্ধ ।
নিধু। ঠিক-ঠিক-ঠিক বলেছ চাদবদন-ঐ নিপাতনে সিদ্ধ ! কি
বাবাজীবন ?
যােগেশ। বুঝতেই ত পারছ খুড়াে-কেন আর লজ্জা দাও! হা হা হা।
নিধু। হা হা হাখুড় ও এক আঁচড়েই বুঝেছে রে বাবা-তা
বাপধন, এতক্ষণ পায়তারা কষছিলে কেন? খুড় কি চিরকালটা
এই রকম বুড়ো ছিল! খুড়ােব প্রাণেও একদিন মলয়ার ফুরফুরে
হাওয়া বই-খুড়াের চোখেও একদিন ইন্দ্রধনুর রঙ্গিন ছবি জাগত।
এক কালে তােমার পুড়ােকে লােকে “রসের সাগর” বলত! তারপর
তিন রাবণের চুলী বুকের উপর জ্বলে এমন শশা বলে যে,
সাগর গেল-কল কষ ওকাল-আটা পর্যন্ত ফেটে । চৌচির -
পথের শেষে
=
(সুরে) দু’দিনের হাসি দু’দিনে ছুটিল
রহিল না আর কেউ
ভবসিন্ধু পারে একা বসে ক্ষেপা
গুণিছে ভবের ঢেউ
ওঃ -এঞ্জিন একদম খালি—আর দম নেই–
ললিতা। সে কি!
নিধু। বুঝলে না চঁদবদন-মৌতাতের সময় হয়েছে-
ললিতা। ওঃ, এই কথা! এটা চলবে কি?
নিধু। এ! একেবারে শ্বেতাঙ্গিনী! জিতারও বাবা—জন্ম জন্ম
এমনি পেট বেদনায় ছটফট কর আর খুডাের প্রাণ শীতল কর
ললিতা। খুব আশীৰ্বাদ করলেন ত খুড়াে-
নিধু। আ হা হা বুঝলে না, ওটা নিপাতনে সিদ্ধ ! কিন্তু চাঁদবদন, এ যে
হরিষে বিষাদ হ’ল-এ যে একেবারে হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছেছে, এ পা
দু’খানা নিয়ে কি করব? পূর্ণাঙ্গ না পেলে ত ধ্যান চলবে না-
ললিতা। ওঃ, এই কথা ! খান না কত খাবেন—ঐ আলমারি ভরা রয়েছে।
নিধু। আহাহা ! অভয়া, কি অভয় বাণীই শােনালি, আর জন্মে তুই আমার
মাসী ছিলি।-তাহলে উঁদবদন একবার শ্ৰীঅঙ্গখানি নাড়তে হচ্ছে-
ললিতা। আচ্ছ, ওটা থাক, আমি আপনাকে আস্ত একটা বােতল দিচ্ছি।
নিধু। আহাহাতাই দাও—এটা থাক, তােমরা যুগলে হােমিওপ্যাথি
ক’র—অব এলােপ্যাথিক ডােজে
ললিতা। এই নিন—( বােতল দিল)
নিধু। আহাহা-শ্বেতাঙ্গ রূপসি !-কতকাল পরে -- কতকাল পরে-
জুড়িয়ে গেল-বুকখানা জুড়িয়ে গেল
যােগেশ। নাস্তিকে ললিতাকে) কি কলে বলত। ও কি আর
এখন উঠবে !
পথের শেষে
দ্বিতীয় অঙ্ক
ললিতা। ( জনান্তিকে) লােকটাকে আমার বড় ভাল লেগেছে -
যােগেশ। ( জনান্তিকে) এখনই যে সব মামাবাবুকে বলে দিয়ে আমার
আদ্যশ্রদ্ধের ব্যবস্থা কবে।
ললিতা। ( জনান্তিকে) বেশ, এক কাজ কর না—ওকে বলে কয়ে
আমার সঙ্গে কলকাতায় পাঠিয়ে দাও না ! যতদিন তুমি যেতে
পার-ওকে নিয়ে আমার দিনগুলাে যা’হক এক রকম কেটে
যাবে।
বােগেশ। (স্বগত) এ কথা মন্দ নয়। নিধু ব্যাটা আজকাল বড়
মামাবাবুর কাছে যাওয়া আসা ক’রূছে। ওকে সরান দরকার ।
তারপর ললিতার সঙ্গে ওকে পাঠাতে পারলে ললিতা হরণের সম্পূর্ণ
দোষটা ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পাব।
ললিতা। (জনাস্তিকে) কি ভাবছ ! ভয় নেই। বুড়াের প্রেমে মজে
তােমায় বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাব না।
যােগেশ। ( জনান্তিকে) দূর! আমি কি তাই ভাবছি। ও কি যেতে
চাইবে ?
ললিতা । ( জনান্তিকে) দেখি ! (প্রকাশ্যে ) ও কি খুড়াে ! বােতল
কোলে ক'রে কি ভাবছ?
নিধু। তারল্যরূপিণী, মূর্খ-বিদ্বান-ধনী-নিধনী-জ্ঞানী-অজ্ঞানী একাকার
কারিণী, মনুষ্যত্বনাশিনী, লাঞ্ছনাদায়িনী, বােতল বাহিনী শ্বেতাঙ্গিনী!
সর্বস্ব দিইছি, এইবার প্রাণ আহুতি দিচ্ছি—গ্রহণ কর—আমায় মুক্ত
কর-( বােতলের গলাটা এক আঘাতে ভাঙ্গিয়া খানিকটা সুর
উদরস্থ করিল )
ললিতা। খুড়ে খুড়ো-
নিধু। মােস বাবা, পূর্ণাহুতি হয় নি-(পুনরায় পা
ব’লছিলে চাঁদবদন ?
ব্যকি
পঞ্চম দৃশ্য
পথের শেষে
ললিতা।
ললিতা। খুড়ে তুমি যদি আমার একটা কাজ কর, তবে বত মদ খেতে
পার আমি খাওয়াব।
নিধু। মাইরি।
ললিতা। নিশ্চয়।
মিধু। অভয়া! আজ যে অভয়বাণী শােনাচ্ছ তাতে তােমার জন্য নিধু
শৰ্ম্মার জান কবুল।
বল, কি করতে হবে ?
কলকাতায় আমার এক বােনের শক্ত ব্যায়ােম
নিধু। কি, পেট ব্যথা? তিনিও কি তােমারই মত বেওয়ারিশ ! তা
বাবা, আমি ত হােমিওপ্যাথি জানি না।
ললিতা। যাও খুড়ােতােমার কেবল ঠাট্টা।
নিধু। আচ্ছা, তারপর
ললিতা। আমি তাকে দেখতে যাব। নিবারণ এখানে নাই, যােগেশবাবুও
তার মামার অসুখের জন্য যেতে পারছে না, অথচ তার এমন অবস্থা
যে, আছে কি নেই। আজ না গেলে হয়ত ইহজন্মে আর দেখাই
হবে না। কিন্তু কার সঙ্গে যাব খুড়াে--একে মেয়েমানুষ তার উপর
এই কঁচা বয়স - একা ত যেতে পারি না—তুমি যদি খুড়, আমাকে
সঙ্গে করে নিয়ে যেতে।
নিধু। তাইত চাঁদবদন, বড় মুস্কিলে ফেলে যে—
ললিতা। নাঃ, গরীবের দুঃখ কেউ বােঝে না-ওঃ-একটা মাত্র বােন—
একবার শেষ দেখাটাও- ( চক্ষে অঞ্চল প্রদান )
নিধু। একেবারে ব্রহ্মাস্ত্র ছাড়লে চাঁদবদন-নাঃ, এর পর আর কথা চলে
। তবে চল। হাঁ, আমি দুর্গাশঙ্করকে একবার বলে আসি-
যােগেশ। জােগত। অর্থাৎ যােগেশ ঘােষের আদ্যাজের ব্যবস্থাটা
করে বহ। (প্রকাশ্যে ) মামাবাবু জালে কি আর তােমাকে
যেতেড়ো, তিনি কিছুতেই ছাড়বেন না।
পথের শেষে
দ্বিতীয় অঙ্ক
ললিতা।
-
নিধু। কথা নেহাৎ মিছে বলনি বাবাজী। চল চাবন তােমার ঐ
চঁদমুখেরই জয় হক।
ললিতা। সাধে কি তােমায় এত ভালবাসি খুড়াে-
নিধু। একেবারে জল করে দিলে ধনমণি –
না খুড়, ওসব ধনমণি টনমণি না—তােমার মুখের
ঐ
চাঁদবদন ডাক আমার ভাবি মিষ্টি লাগছে-
নিধু। আচ্ছা, তােমার আজ্ঞাই শিরােধার্য। বাবাজী সর্বদা দুর্গাশঙ্করের
কাছে থেক’—তাকে জ্বালাতনটা একটু কম কর। আর এই
অবস্থাটা তাকে বুঝিয়ে বল।
যােগেশ। (স্বগত) সে আমার মনেই আছে। এমন কথা ব’!
( প্রকাশ্যে ) সে জন্য তােমার কোন চিন্তা নেই, যা ব’তে হয়,
আমি ব’—তােমার কিন্তু এখনই যেতে হবে খুড়াে !
নিধু। আমার আর কি! এইত আমি এক পায়ে খাড়া-তবে চাদরখানা,
গামছাখানা, আর কাপড়খানা নিয়ে আসি। ঘঁ, আর কবাট
জোড়ায়-ও একটা তালা লাগাতে হবে, ঘটিটা বাটিটা আছে-
ললিতা। দেখ খুড়াে, আশা দিয়ে সরলা অবলাকে নিরাশ কর না --
গরীব বলে ভুলে যেও না
নিধু। সে পথ কি আর রেখেছ চাঁদবদন –খুড়াে যে মজুগুল
ললিতা। সত্যি না কি।
নিধুর হাসিতে হাসিতে প্রস্থান
যােগেশ। এই দোসরা গজের কিস্তি।
১
ষষ্ঠ দৃশ্য বস্তির মধ্যে ক্ষুদ্র একখানি খােলর ঘরের অভ্যন্তর নােগশয্যায় শায়িত শিশুপুত্রের পার্শ্বে পারুল উপবিষ্টা। নলিনী পার্থে দণ্ডায়মান। তাহাদের বসনে ভূষণে সামান্য আসবাব পত্রে মূর্তিমান দারিদ্র্য প্রকটিত পারুল। নিজের কথা বলি নি আজ দুই দিনের মধ্যে ছেলেটার মুখে ওষুধ দূরে থাক, একটু বার্লির জলও দিতে পালেম না—গায়ে জ্বর খা খা ক’য়ছে - আজ যে একেবারে নেতিয়ে পড়েছে-- নলিনী। কি ক’ব। এই দেখ, আজ ক’দিন ঘুমুতে ঘুরতে কি ভাবে পায়ের তলা খয়ে গেছে! চারটে পয়সা কোথাও জুটল না- শেষে রাস্তায় দাড়িয়ে ভিক্ষা চাইতে লাগলেম, মুখের দিকে চেয়ে কেউ একটু মুচকি হেসে চলে গেল—কেউ বলে টিকটিক পুলিশ -কেউ একটু মুরুব্বিয়ানা করে খেটে খেতে উপদেশ দিয়ে চলে গেল। শূন্য হাতে ফিরে এলাম। শেষে যে আমার এ অবস্থা হবে-ওঃ- পারুল। তবে কি হবে ! কি করে বাছাকে বাচাব! নলিনী। এখনও বাছাকে বাঁচাবে আশা ক’ছ পারুল। হায় অভাগিনী । পারুল। ওগাে, অমন কথা মুখে এনাে না ; দেখ যদি কোন রকমে বাছার জন্য যা হয় কিছু আনতে পার নলিনী। কোথা থেকে আন্তকি দিয়ে আব -কেমন করে আব! চেয়ে দেখ, এমন আমাদের কিছু নেই—যার বিনিময়ে কেউ একটা পয়সা দেয়। ময়লা, দুর্গন্ধ পান কয়েক ঘেঁড়া কড়া—আর গােটা দুই মাটির ভড়। বুঝতে পারছ না পারুল—এ আমার শান্তি, নইলে আমাৰন সর্বনেশে লােগ হবে কেন। সেই রােগের চিকিৎসায় তােয়; গহনাগুলাে, জিনিষপত্র, খাট-বিছানা, বা, মায় পথের শেষে দ্বিতীয় অঙ্ক পিতল কাসাগুলি—আমার বলতে যা কিছু ছিল, সব গেল। একেবারে আমায় রাস্তার ভিখারী করে দিল। পারুল। ও গাে, আর একবার যাও না-দেখ যদি কোথাও কিছু পাও- কেউ কি আমাদের এই দুর্দশার কথা শুনে একটি পয়সাও দেবে না। নলিনী ছায়াচ্ছি। কিন্তু বৃথা পারুল খোজ পেলে ? নলিনী। কোথায় তার খোঁজ পাব! এখানে থেকে কি সে আমাদের সঙ্গে না খেয়ে মরবে—গােবিল বুদ্ধিমানের কাজই করেছ—অবস্থা বুঝে সরে পড়েছে। পারুল। না--গােবিন্দ তেমন নয়। নিশ্চয় তার কোন বিপদ ঘটেছে। যােগে ছয় মাসের উপর তুমি পড়েছিলে, যখন একেবারে অচল হয়ে উঠল—তখন বুড়াে-মানুষ মােট ব’য়ে পয়সা রােজগার করে তােমার ওষুধ পথ্য জুগিয়েছে। সে না থাকলে আমার অদৃষ্টে -- নলিনী। এ্যা—তাই মনে হয় নি। বােস - আচ্ছা, পারুল আমি আর একবার দেখে আসি- পারুল। মা কালি !মাএ কি করলে কি করলে! স্বামী আমার রাজ্যের হয়েও আজ চার দিন অনাহারী, রুগ্ন পুত্রের মুখে এক ফোটা বার্লির জল দেবার জন্য রাস্তায় দাড়িয়ে ভিক্ষা করছেন, -আর এই ছয় মাসের ছেলে—রাজার ছেলে—আজ খেতে না পেয়ে, শুকিয়ে কুঁকড়ে ধীরে ধীরে-ও হাে হােত অভিশপ্ত আমার এ জীবন-এত বিষাক্ত আমার এ নিশ্বাস! কেন জমেছি আমি- এই দেবতার জীবনাকাশে ধূমকেতুর মত কেন আমি উদয় হয়েছি। পারুল কাদিতে লাগিল। সেই সময় উন্মুক্ত দরজা দিয়া দেখা গেল ? অধির ি পরিধান করিয়া অতি সন্তান পারুল দেখিতে - এই ৰে নলিনী উঠান সিল বাহিরে চলিলা ৫৫ ষষ্ঠ দৃশ্য পথের শেরে পারুল পুত্রের নিকটে গিয়া বলিল- খােকন আমার-সােনা আমার-চাদ আমার বক জুড়ান ধন আমার সমস্ত দুঃখের সান্ত্বনা আমার—চোখ মেল বাবা-আধ আধ স্বরে একটি কথা কও বাবা। আহাহা-বাছা আমার নেতিয়ে পড়েছে! যদি তিনি এবারও কিছু আতে না পারেন, তবে কেমন করে আমি বাছাকে বাঁচাব—কেমন করে!-ভগবান! যদি কোলে দিয়েছ প্রভু—তবে কেড়ে নিও না ঠাকুর—এমন করে মায়ের বুকে বজ্ৰ হেনে, মায়ের কোল খালি করে তার বুক জুড়ান ধনকে কেড়ে নিও না—কেড়ে নিও না - গােবিন্দের প্রবেশ গােবিন। দিদিমণি-দিদিমণি- পারুল। এসেছ-এসেছ গােবি-দা! আঃ-বাঁচলেম—তবে আমার কাতর নিবেদন ভগবানের চরণে পৌছেছে—কথা ব’ল নাব’স, আগে একটু সুস্থ হও, এত হাঁপাচ্ছ! মাথায় এ পটী বাঁধা কেন ? গােবিল। গাড়ী চাপা পড়েছিলাম দিদিমণি- পারুল। সে কি! গােবিদ। মােট নিয়ে যাচ্ছি-মােড় ফিরবার সময় একখানা মটরগাড়ী ঘাড়ের উপর এসে পড়ল। পারুল। আ-হা-হা-তারপর-তারপর গােবিন্দ। বুড়ো মানুষ, টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হ'লেম। দিন সাতেক নাকি বেহুস ছিলামন হয়ে দেখি আমি হাসপাতালে। পারুল। এখ। গগাবিন্দ আসতে চাই, তারা আসতে দেবে না। বলে, ষাৰে ? ইনষে তৃতীয় অঙ্ক কি করে-রাস্তার মাঝে পড়ে ম’বে যে। তােমাদের যে অবস্থায় দেখে গিয়েছি, আজ আর কিছুতেই থাকতে পারলেন না—একরকম জোরাজুরি করে আজ সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছি। তােমাদের ছেড়ে যে আমি স্বর্গে গিয়েও স্থির থাকতে পারি না দিদিমণি—এ কদিন যে কি ভাবে কেটেছে-কই, আমার থােকনমণি কই পারুল। আর থােকনমণি! গােবিন্দ-দা—আর বুঝি তাকে বাঁচাতে পারুলেম না- কাদিতে লাগিল। গােবিন্দ। এাসে কি-কি হয়েছে তার ? পারুল। ঐ দেখ, জ্বরে অজ্ঞানবুকে শ্লেষ্ম জমে ঘড় ঘড় শব্দ হচ্ছে। গগাবিন্দ। ওষুধ দিয়েছ দিদিমণি— পারুল। ওষুধ ! গােবি-দা, আজ দু’দিনের মধ্যে বাছার মুখে এক ফোটা বালির জলও দিতে পারিনি কেন-কেন দিদিমণি? (পারুল চোখে অঞ্চল দিয়া কাদিতে লাগিল) হুবুঝেছি। দাদাবাবু কোথায় ? পারুল। ( হাউ হাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিল) ভিক্ষা ক’তে গিয়েছেন গােবিন্দ দা—আজ চার দিন তার পেটে দানা পড়েনি। গােবিন। বেশ বেশ! আর তােমার তার চাইতেও বেশীদিন বােধ হয়, না? বুড়ােবাবু, খুব আরাম করে তােমার জমিদারী, তােমার টাকাকড়ি, তােমার ঘর-বাড়ী ধুয়ে ধুয়ে জল খাও। খুব আরাম করে -খুব আরাম করে ! আমি চললেম দিদি-যেমন করে পারি চুরি করে থােক-ডাকাতি করে হােক-ভিক্ষে করে থােক— এখনই থােকনমণির খাবার আন্- উঠিতে যাইয়া পড়িয়া গেল ; পুনরায় চেষ্টা করিতে লাগিল, পারুল। না-না—পাবে না—উঠতে গিয়ে মাথাঘুমে গিয়েই এ !ি তােমার মাথার পল যে তে ভিজে উ গােবিন্দ। ১৮ পর ৫ গােবিশ। উঠুক—একবার সােজা হয়ে দাড়াতে পারতেন! ধর দেখি দিদিমণি হাতখানা-একবার দাড় করিয়ে দাও দেখি-ধর-ধর- কেন দেরী কয়ছ- পারুল। সােজা হয়ে দাড়াতে পারছ না—উঠতে গিয়ে পড়ে তােমার মাথার ঘা দিয়ে যে রক্ত ছুটছে—তুমি যাবে কি করে ! গােবি। যেমন করে হােক আমায় যেতেই হবে। আমার থােকন- মণি আজ দু’দিন উপবাসী—যেতে হবে—আমায় যেতেই হবে- ধর-হাত ধর পারুল হাত ধরিল ; গােবিন্দ অতি কষ্টে উঠিয়া লাঠিতে ভর দিয়া প্রস্থান করিল পারুল। গােবিন্দ-দা! আর জমে তুমি আমাদের কে ছিলে! এমন মানুষও সংসারে আছে! খােকন—থােকন—আর ত নড়ে না- চোখও মেলছে না ! পাতার ঠোঙ্গা হাতে করিয়া অৰ্দোন্মাদ নলিনীর প্রবেশ মাথা কাটিয়া দর দর ধারে রক্ত ছুটিতেছে নলিনী। পারুল-পারুল ! এনেছি—আর ভয় নেই। তােমার খােকনের জন্য সংসারের সব চেয়ে সেরা জিনিষ, যা কোন বাপ কোন ছেলেকে এ পৰ্যন্ত খাওয়াতে পারে নিতাই এনেছি-নাও, পেট ভরে খাও। পারুল। কই ? দাও-দাও—দেখি, যদি এখনও বাছাকে বাঁচাতে পারি। বাছা আমার কেমন হয়ে—একি! এ যে রক্ত। নলিনী। হ রক্ত—বাপের রক্ত! ঠোঙ্গা ভরে ছেলের জন্য এনেছি। আমার বাবার মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়ে, বুকে শেল হেনে আমি চলে এসেছি—আমার ছেলেকে যদি রক্ত না খাওয়ালেম তবে শাস্তি হল কই! নাওনাও-পেট ভরে খাওয়াও! পারুল। তুমি কি—এ কি! তােমার কপাল কেটে যে দর দর খা -পড়ছে, আমার মাথা খেতে কোথায় গিয়েছিলে। •• দ্বিতীয় অঙ্ক শিনী। রক্তটাই শুধু দেখলে—পদাঘাতটা দেখতে পেলে না। এই দেখ, পিঠে জুতাের লােহাগুলাে কেমন সুন্দর ফুটেছে—কেমন সুন্দর পারুল। ভগবান! ভগবান! আর জন্মে কত পাপ করে এসেছি! ওঃ! রাজ্যেশ্বরের—আমি রাক্ষসী-আমি রাক্ষসী-( কাদিতে লাগিয়ে নলিনী। তুমি কছ পারুল! আমি কিন্তু কাঁদিনি। শােন হবে, মােট বইতে গিয়েছিলেম। বেশী পয়সা পাব বলে বড় মােটটা বেছে নিলাম-একে বােগে দুৰ্বল হয়েছি, তার উপর চার দিন, এই চার দিন কিছু খাইনি কি না—কিছু দূরে গিয়ে কাঁপতে কাঁপতে পড়ে গেলাম। মাথার মােট পড়ে গেল-বাবুর ক’টা জিনিষ ভেঙ্গে গেল-রেগে তিনি পিঠে বিলাতী জুতাে শুদ্ধ লাথি মারলেন—হুড়ি খেয়ে ছটকে পড়লেম-রাস্তায় এক পাগল হাত ধরে টেনে তুলল চেয়ে দেখি,-কপাল কেটে গা বেয়ে রক্ত পড়ছে। পারুল। ভগবান-ভগবান-আর কত নলিনী। তুমি দিবারাত্র ভগবানকে ডাকছ কিনা তাই তিনি আজ আমার ভারি উপকার করেছেন--চেয়ে দেখি সামনেই এই পাতার ঠোঙ্গাটাকে হয় ত খাবার খেয়ে ফেলে গেছে-আমার আর খুজতে হল না-কষ্ট পেতে হ’ল না—সেইটে তুলে নিয়ে রক্ত ভরে ছুটে এসেছি-খাওয়াও পারুল-তােমার ছেলেকে খাওয়াও-দেখ, কেমন টকটকে লাল-দুর্গাশঙ্কর রায়ের রক্ত কি না! কই আন— ছেলে আন—দাও তাকে খাইয়ে দাও-দাড়িয়ে শুধু কাদছ! মরে যাবে যে! তবে থাক তুমি-আমিই খাওয়াচ্ছি—পারুল, এত ঠাণ্ডা কেন! পারুল। এা । নলিনী। আসাড়! হাতের ঠোঙ্গা পড়িয়া গেল वर्छ पेश পথের যে পারুল। ওগাে তবে কি আমার খােকন নেই । নলিনী। না। হারে নিমকহারাম। এত কষ্টের রক্ত একটু খেলি না ! খুব বেঁচে গেছিস। বম্ ভােলা। পারুল। এ! তবে আমার থােকন নেই—থােকন নেই-থােকন আমার-যাদু আমার বাবা- মুচ্ছিতা হইয়া পড়িয়া গেল নলিনী। থােকন—খােকন! কই আমি ত কাদিতে পারছি না ! গলা শুকিয়ে গেছে। একেবারে কাট-বােস, এই যে গায়ে রক্ত আছে- এই দিয়ে ভিজিয়ে নি—তারপর ঠিক সেই সময়ে গােবিল-“দিদিমণি ! ভয় নেই ভিক্ষা করে দুধ পেয়েছি আর ভয় নেই”—বলিতে বলিতে প্রবেশ করিল। নলিনী। এনেছ- এনেছ। কি ? দুধ ? বেশ-বেশ-দাও-দাও- গগাবিন্দ। দিদিমণি দিদিমণি—এই নাও-খােকনমণিকে দুধ খাওয়াও- নলিনী। আর তাকে খাওয়াতে হবে না গােবিল—নিশ্চিন্ত—একেবারে নিশ্চিন্ত—সে মরে গেছে—চারদিন খাইনি—আমায় দাও গগাবিন্দের হাত হইতে দুধের পাত্র কাড়িয়া লইল গােবিন্দ। মরে গেছে! নলিনী। ——নিশ্চিন্ত। গােবিন্দ কাপিতে কাপিতে অট আর্তনাদ করিয়া বসিয়া পড়িল। তাহার কথা বলিবার শক্তি নাই নলিনী। চারদিন খাইনি-আঃ গলাটা ভিজবে—দুধ ভাল—দুধ ভাল। ( খাইতে গেল ও পাত্র কম্পিত হস্ত হইতে পড়িয়া গেল। গােবিন- খােকমার খেতে না পেয়ে শুকিয়ে কুঁকড়ে মরেছেখােন
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম )
দুর্গাশঙ্করের শয়ন-গৃহ
{ সুখদা ও যােগেশ নিয়স্বরে কথা বলিতেছেন
সুখদা। যােগেশ, তুই কি সত্যিই আজ কলকাতায় যাবি?
যােগেশ। বলছি ত, আমার যেতেই হবে।
সুধাদা। না গেলে হয় না?
যােগেল। নানা-না। আর কতবার শুনতে চাও?
সুখ। তাের ভালর জন্যই বলছি বাছা! চার দিকে এই আগুন
আলিয়ে রেখে, এখান থেকে যাবি। কিসে কি সর্বনাশ হবে ।
যােগেশ। (স্বগত) ললিতা বারবার চিঠি লিখছে—তার উপর সেই
মেয়েঙ্কুলের মাষ্টার শালা জানি না কি করে সন্ধান পেয়ে আবার তার
ওখানে আনাগােনা আরম্ভ করেছে। না, আমার যেতেই হবে—
সুখদা। যােগেশ, আমার কথা রাখ বাবা। কলকাতা যাবার সঙ্কর
পরিত্যাগ কর। একটা হেস্তনেস্ত না করে এখান থেকে এক পা-ও
নড়িস না
যােগেশ। বলেছি ত কলকাতায় আমার যেতেই হবে।
সুখ। (হাত ধরিয়া) যােগেশ, আমার কথা রাখবি না! কি, চুপ
কয়ে রইলি ! না মানুষের সাধ্য কি যে অদৃষ্টের গন্নিধ করে।
বৃথা চেষ্টা বৃথা! আমি বুঝতে পেরেছি যােগে
রূপের সেই
প্রথম স্থা পথের ৫ শ্রীলােকর জন্য তুই উন্মাদ হয়েছিস-আবার তাের মতিচ্ছন্ন ঘটেছে। মনে আছে আর একবার আমার অবাধ্য হয়েছিলি আমার নিষেধ না শুনে এক রমণীর জঙ্ক উন্মাদ হয়ে নিজের যথা- সর্বস্ব-বিসর্জন দিয়েছিলি—সে বার প্রাণটা রক্ষা হয়েছিল-কিন্তু এবার—যােগেশ, যােগেশ, এখনও সাবধান হ’-আমার মায়ের প্রাণ জানি না কি এক অজ্ঞাত আশঙ্কায় কেঁপে উঠছে! যােগেশবাবা- যােগেশ। কেন বৃথা বিরক্ত করছ মা। বলেছি ত’ যা হয় হক- আমার যেতেই হবে। সুখদা। যা হয় হক-তােমার যেতেই হবে। তবে ত অনেক দূর এগিয়েছ। কিন্তু আমি এ কি করলাম—কার জন্য ইহকাল পরকাল সৰ নষ্ট করলাম। ওঃ- এখন যােগেশ। ললিতাসলি! কি মিষ্টি নাম-কি মধুর তার কথাগুলি -কি সুন্দর তার মুখখানি! যদি না যাই, তাকে হারাব—নিশ্চিত হারাব। আর কলকাতায় গেলেই যে সব প্রকাশ হয়ে পড়ে আমার সর্বনাশ হবে তারও কিছু নিশ্চয়তা নেই। কিছু নিশ্চয়তা নেই। নাঃ, ও সব মায়ের অমূলক সন্দেহ—ভিত্তিহীন শঙ্কা। বুড়াে ত এখনও বাইরে আসছে না যে তাকে বলে যাব। যাক, ততক্ষণ সেরেস্তার কাজ- গুলাে সেরে আসি। এন খামার অতি সন্তর্পণে প্রবেশ শ্যামা। একি বাবা! এ যে আগা গােড় গিট আর প্যাচ। সােজা নয় জানতেম, কিন্তু এত বড় বাঁকা তা ত মনে করি নি এই শুনলাম নিধু ঠাকুর ললিতা ঠাকরুণকে হরণ করেছে, আবার তুমি বব ‘ললিতা ললিতা করে বুক ফাটাচ্ছ কেন! তার উপর আবার কলকাতায় গেলে সব প্রকাশ হবে—তােমার সর্বনাশ !
পথের শেষে তৃতীয় অঙ্ক হবে! এ যে বিষম সমস্যা! ভিতরে ভিতরে একটা কিছু শয়তানি চক্র তােমাদের চলছে-নিশ্চয় চলছে। কিছুই ত বুঝতে পাছি না যাই হক, আমার আরও সতর্ক থাকতে হবে। দু’পুরুষ এ সংসারের মুণ খাচ্ছি—পারব না—দেখা যাক। দুর্গাশঙ্করের প্রবেশ দুর্গা। ধীরে ধীরে জীবনের আলাে নিষ্প্রভ হয়ে আসছে, আর কে তুমি আমার আবাল্য সংস্কার দূর করে-আমার কঠোরতার দর্প চুর্ণ করে, একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষার মূৰ্ত্তি ধরে আমার বুকের ভিতর জেগে উঠছ—কে তুমি-কে তুমি ? নিবারণের প্রবেশ নিবারণ। ( সভয়ে) আজ্ঞে আমি নিবারণ— দুর্গা। (চমকিত হইয়া) এ্যা! (কিব আর ক্ষণেক চাহিয়া রছি -দি-প্রকৃতির রিলেন বলিলেন) ওহ, তারপর নিবারণ, কোন খোঁজ পেলে? নিবারণ। কোথায় আর খোজ পাব বাবু-নিধুঠাকুর তাকে নিয়ে দেশান্তরি হয়েছেন- দুর্গা। নিধু খুড়াে—নিধু খুড়ো! সেই নিধু খুড়ো-নিবারণ, একি সম্ভব? নিবারণ। আজ্ঞে প্রমাণ যা পাওয়া যাচ্ছে তাতে আর অবিশ্বাস ক’বার কিছু নেই– দুর্গা। প্রমাণ! প্রমাণ পেয়েছ ? নিবারণ। আজ্ঞে হাঁ! যে নৌকায় তারা গিয়েছিল তার মাঝি ফিরে এসেছে—আর যারা তাদের এক সঙ্গে ট্রেনে উঠতে দেখেছে তাদের মুখেও শুনেছি। বাবুবাবু নিধুঠাকুর আমার সর্বনাশ করেছে- দুর্গা। শশাকে জর্জরিত, জরায় জীর্ণ, নালায় বিশ্ববি, তার মুখে ১০০ প্রথম দৃশ্য পথের শেষে মায়ের নাম শুনে যে আমার শরীর রােমাঞ্চিত হত। সেই মিঃ স্থির প্রশান্ত আনন—সেই বিভােরতাময় সারল্য-তবে আর কি- তবে আর কি -নিবারণ-ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দাও গে’ -শেয়াল কুকুরের সঙ্গে বনে জঙ্গলে বাস কর গে’—ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ- গবাক্ষের নিকট গিয়া দূরে আলােকিত প্রান্তরের দিকে চাহিয়া রহিলেন যােগেশের প্রবেশ যােগেশ। নিধুঠাকুরের কথা হচ্ছে বুঝি নিবারণ। না—লােকটা মানুষের উপর অভক্তি জন্মিয়ে দিয়েছে কোন ছেলে ছােরায় কলেও মনকে একটা প্রবােধ দেওয়া যায়। কিন্তু দুর্গা। এ ! কি বলে? যােগেশ। আজ্ঞে বছিলাম যে ছেলে ছােরার পক্ষে রমণীর রূপমােহে আকৃষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু দুর্গা। স্বাভাবিক। যােগেশ। আজ্ঞে হাঁ। অপরিণতি বুদ্ধি-খেয়ালের ঝোকে একটা কাজ করে বসে। (দাশঙ্কর-একদৃষ্টে বােগের মুখের দিকে তাকাইয়া রহিলে কিন্তু নিধুঠাকুর যে খেয়ার নৌকায় পা বাড়িয়েছেন। তার পক্ষে পাকা চুল মাথায় করে পরস্ত্রীহরণ -না, এর কোন কৈফিয়ত নেই। দুর্গাশঙ্কর পদচারণা করিতে লাগিলেন ও ক্ষণপরে আপন মনে বলিতে লাগিলেন- রমণীর রূপবহ্নির নিকট যদি বৃদ্ধের পলিতকেশ, বৃদ্ধের অভ্যস্ত সংযম মুহূর্তে ভস্ম হয়ে যায়-তবে প্রথম যৌবন উন্মেষে উদ্ৰান্তদৃষ্টি বালকের কি অপরাধ! না—কোন অপরাধ নেই-এইই জগতের নিয়ম। সৃষ্টির ব্যতিক্রম আমি—নিজের মাপকাঠিতে জগত মাপতে গিয়ে কি এক মহাত্ৰম করেছি-মহাত্ৰম করেছি—মহাভ্রম করেছি। দ্রুত পদচারণা করিতে লাগিলেন
পথের শেষে
তৃতীয় অঙ্ক
যােগেশ। মামাবাবু! আমি আজ কলকাতায় যাব ইচ্ছা করেছি।
(দুর্গাশঙ্কর তাকাইলেন) বেদনার অসুখটা আবার বেড়ে পড়েছে
তাই মনে করেছি সময় থাকতে একজন ভাল ডাক্তার দেখিয়ে
ওষুধের ব্যবস্থা করে নিয়ে আসি।
দুর্গা। বেশ।
যােগেশ। আমার সব প্রস্তুত। শুধু আপনার অনুমতির অপেক্ষায় আছি-
দুর্গা। কখন যাবে ?
যােগেশ। এখনই। আমার জিনিষ-পত্র সব নৌকায় উঠেছে।
সুখদার প্রবেশ
সুখদা। তুমি ত যাচ্ছ বাছা, দাদার শরীরের এই অবস্থা
যােগেশ। না—এই মা-ই আমাকে পাগল কবে। (প্রকাশ্যে )
ডাক্তারকে ভাল করে বলে যাচ্ছি—আর তুমি ত আছ। (সুখদার
বিরক্তভাবে প্রস্থান) আমার বেশী দেরি হবে না—বড় জোর দুতিন
দিন। আজ্ঞেতা হলে আমি রওনা হই।
দুর্গা। এস বাবা।
যােগেশের স্থান
দুর্গাশঙ্কর পদচারণা করিতে লাগিলেন, পরে সহসা ডাকিলেন
“যােগেশ—যােগেশ - দেখত নিবারণ, ডাকত যােগেশকে”—
নিবারণের প্রস্থান
দুর্গা। তার মায়ের অলঙ্কার স্যায়তঃ ধৰ্ম্মতঃ তারই প্রাপ্য। কি অধিকার
আছে আমার এ থেকে তাকে বঞ্চিত করবার। হয়ত হতভাগ্য
অর্থাভাবে—না-না—আর সে কথা ভাবব না—সেই স্বপ্নের কথা
-ওঃ-পাগল হয়ে যাব!
বাগেশ ও নিৰার ' পুনঃ প্রবেশ
গেল। আমায় ডাকলেন ?
দুর্গা। যােগেশ, খােকাকে মাসে মাসে একশ’ করে টাকা পাঠান হয় ত?
প্রথম দৃ পথের শেষে যােগেশ। এ আবার কি ফ্যাসাদ! ( প্রকাশ্যে ) আজ্ঞে হাঁ। দুর্গা। পাঠান হয় ? যােগশ। আজ্ঞে হ। প্রতি মাসেই খাজাঞ্জি মশায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আমি নিজে পাঠাই। দুর্গা। কোথায় পাঠাও ? যােগেশ। সর্বনাশ! নিবারণটা কিছু বলে দিয়েছে না কি! ( প্রকাশ্যে ) আজ্ঞে তিনি তাঁর এক বন্ধুর নামে পাঠাতে লিখেছিলেন— দুর্গা। লিখেছিল-সে লিখেছিল! কই আমাকে বল নি ত! কোথায় সে পত্র ? যােগেশ। এখন কি উত্তর দি—ফিরেই দেখছি ঝকমারী করেছি। (প্রকাশ্যে ) আজ্ঞে যত দূর মনে পড়ে তাতে দাদা দেওয়ানজীকেই পত্র লিখেছিলেন এবং সে পত্রখানাও দেওয়ানজীর কাছে আছে। দুর্গা। অনাদির কাছে। যােগেশ। আজ্ঞে হাঁ। তিনি তাঁর এক বন্ধুর নামে পাঠাতে লিখেছিলেন, সেই নামেই বরাবর পাঠান হয় - দুর্গা। বন্ধুর নামে কেন ? যােগেশ। বােধ হয় নিজের ঠিকানা আমাদের নিকট গােপন রাখতে চান। আমি সন্ধান নিয়েছি প্রতি মাসেই তিনি তাঁর বন্ধুর বাড়ী থেকে টাকা নিয়ে যান। দুর্গা। তাহলে তার বন্ধুর ঠিকানা যখন তােমার জানা আছে, তখন সেখানে খোঁজ করে তুমি থােকার স রতে পারবে। যােগেশ। আজ্ঞে হাঁ। খুব পারব। টাকা যা পাঠিয়েছি তা ভগবানই জানেন। যদি পি- নিবারণ শালা সব বলে দিলে না কি? দুর্গা। যােগেশ, আমার সঙ্গে এস গাশনের সহিত যােগেশের প্রস্থান লা বছ তে চায়?
পথের ষে
তৃতীয় অঙ্ক
বেগে সুখদার প্রবেশ
সুখদা। নিবারণ তুমি কিছু প্রকাশ করেছ না কি?
নিবারণ। কই? না।
সুখদা। তবে? মধুসূদন –মা কালী—রক্ষা ক’র মা। আমি জোড়া
মহিষ দেব মা। পায়ের শব্দ, আসছে,—হে মা কালী—হে মা
দুর্গা-রক্ষা কর মা-রক্ষা কর
বেগে প্রস্থান
দুর্গাশঙ্কর ও যােগেশের পুনঃ প্রবেশ, যােগেশের হস্তে একটী গহনার বাক্স
দুর্গা। এ বাক্সে তার মায়ের সমস্ত গহনা আছে। প্রায় পনর হাজার
টাকার গহনা! এ তারই প্রাপ্য। বাক্স শিলমােহর করা আছে-
তার মায়ের মৃত্যুর পরদিনই আমি শিলমােহর করেছিলাম। বাক্সের
চাবি তার কাছে আছে। বাক্সটা নিয়ে যাও—যদি তার সন্ধান
পাও—তাকে দেবে—দেখলেই সে চিন্তে পারবে। তার নিজের
হাতে দেবে-খবরদার আর কারও হাতে দিও না। খুব হুসিয়ার
যােগেশ। যে আজ্ঞে
দুর্গা। আর যদি তার সন্ধান না পাও—(গলার স্বর কঁপিয়া উঠিল)
যদি সে না নেয় তবে-তবে-ফিরিয়ে আনবে।
যােগেশ। যে আক্তে। (স্বগত) তা আনব-একবার বেরুতে পারলে হয়—
দুর্গা। আচ্ছা যাও।
যােগেশ। ( যাইতে যাই) খােদা যখন দেন তখন এমনি করেই দেন।
আর সে
এবান
দুর্গা। যােগেশ-কৈ যাব!
(নেপথ্যে—যােগেশ-আনিবার পুনঃ
আর একটা কথা। বেশ) হ, তার নিজের হাতের
রসিদ আনবে। তার •ে সেলেই আমি চিনতে পারব।
প্রথম পৃষ্ঠ পথের শেষে যােগেশ। যে আজ্ঞে। রসিদ আগে নিয়ে তারপর বাক্স দেব। দুর্গা। নানা-না—তা ক’তে যেও না—তাহলে সে মােটেই নেবে না। তাকে আগে সব বুঝিয়ে দিও, তার পর সে যে পেলে তার একটা নিদর্শন তার কাছে চাইবে। যােগেশ। বাক্সটা হাতে পেয়ে যদি নিদর্শন না দেন দুর্গা। নিশ্চয় দেবে—সে আমার ছেলে না। যােগেশ। আমি তবে রওনা হই ? ঝড়ের মত সুখদার প্রবেশ ক সুখদা। রওনা ত হ’চ্ছ। কলকাতা সহর চোর ডাকাতের মুল্লুক- অতগুলাে টাকার গহনা নিয়ে একা যাচ্ছ—হারায় চুরি যায়-এর জন্য দায়ী হবে কে! আমি বাছা ঝঞ্চাটটা পছন্দ করি না দুর্গা। যদি আবশ্যক মনে কর তবে কোন কর্মচারিকে না হয় সঙ্গে নিয়ে যাও। সুখদা। হাঁ, যজ্ঞেশ্বর বিশ্বাসী লােক। তাকে বরং নিয়ে যাও। যােগেশ। (স্বগত) মা’র যে বুদ্ধি! যজ্ঞেশ্বরকে নিয়ে শেষে একটা মুস্কিলে পড়ি আর কি! সাধে কি বলে বাইশ হাত কাপড়ে মেয়েলােকের কাছা আঁটে না। (প্রকাশ্যে) আজ্ঞে না, কিছু দরকার নেই। সুখদা। যা ভাল বােঝ বাছা। মােন্দা আমি ওর মধ্যে নেই। দুর্গা। এখন তুমি যেতে পার। হাঁ, দেখ, আমি ডাকলেও আর ফিরে না - যাও পেছন ফিরিয়া জানালার গরাদে ধরিয়া : শ প্রস্থান করিল নিবারণ। (স্বগত) সার্থক । হাজার টাকার গহনা ! ও জমেছিলুম। যদি বা এক এই যােগেশবাবু। পনের ধর বােঝা বইতে আমরাই হাজার আড়াই টাকা
পথের শেষে
তৃতীয় অঙ্ক
পেয়েছিলাম তাও বরাতে সইল না। শালী আমায় ধনে প্রাণে
মেরেছে।
দুর্গা। যােগেশ গিয়েছে নিবারণ ?
নিবারণ। আজ্ঞে হ্যা।
দুর্গা। যাক্, নিশ্চিন্ত।—বিশ্বাস নেই—অবাল্য সহচর সুযােগ পেলেই
মাথা খাড়া করে উঠবে।
নিবারণ। বাবু আমার কি হবে? আমি যে ধনে প্রাণে মরেছি।
দুর্গা। কি করতে চাও?
নিবারণ। আমি একবার তাদের খুঁজে দেখতে চাই।
দুর্গা। বেশ, ভাল কথা। কে আছিস? খাজাঞ্জিকে একবার এখানে
আসতে বল ত। শােন নিবারণ, এমন দিন ছিল যখন আমার এই
বিস্তীর্ণ জমিদারীতে দ্বিপ্রহর রজনীতে সৰ্বাঙ্গ অলঙ্কারে ভূষিত হয়েও
কোন রমণী রাস্তায় বের হলেও তার দিকে কেউ কুদৃষ্টিতে চাইতে
সাহস ক’ত না—এমন কঠোর শাসন আমার ছিল। কিন্তু কি
ক’রুব-সে দিন আর আজ নেই।
নিবারণ। সে কি বাবু। এখনও যে আমরা আপনার রাম-রাজত্বে
বাস ক’ছি।
ঋজাঙ্গির প্রবেশ
খাজাঞ্জি। আমায় ডেকেছেন ?
দুর্গা। । নিবারণকে দুই শ’ টাকা দাও গে’—আর তার কাগজ
পত্র বুঝে নিয়ে আর ছেড়ে দিও।
খাজাঞ্জি। যে আযাব!
দুর্গা। যাও। (খাজাঞ্জিনির 'নামার পাথেয় ও অন্যান্য খরচের
ক আপাতত আমি দুই শ টাকা দিচ্ছি নিবারণ।
দরকার হয় আমার নি*• সে সাহায্য পাবে। তুমি সর্ব প্রথমে
**
প্রথম দৃ পথের শেষে কাশী যাও। আমার বিশ্বাস-খুব দৃঢ় বিশ্বাস তারা কাশীতেই অজ্ঞাতবাস ক’য়ছে। বারাণসীর পবিত্র ভূমি ব্যতীত এত পাপ ভার বইবার আর কার শক্তি আছে -অন্য দেশ হলে ধ্বসে যাবে যে ! তুমি সর্বাগ্রে কাশী যাও। নিবারণ। যে আজ্ঞে দুর্গা। শােন নিবারণ, যদি তাদের খুঁজে বের করতে পার—নিধুঠাকুরকে যদি বেঁধে আমার সামনে আতে পার আমি তােমায় পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার দেব। আমি একবার তাকে দেখব-হ্যা, একবার তাকে দেখব। ( দ্রুত পদচারণা ) আচ্ছা, তুমি তাহলে এস। কাগজ পত্র বুঝিয়ে দিয়ে সত্বর বেরিয়ে পড় গে। নিবারণ। যে আজ্ঞে । যে আজ্ঞে। (স্বগত) যােগেশবাবুর দলে মিশে দলীল চুরি করে এমন মনিবেরও আমি সর্বনাশ করেছি। আমার শান্তির হয়েছে কি! ঢের বাকী—এখনও ঢের বাকী । প্রস্থান দুর্গাশঙ্কর নতমস্তকে কিছুক্ষণ পদচারণা করিলেন, পরে ধীরে ধীরে বলিলেন- হায় রমণীর রূপ ! জানি না তােমার ভিতর কি মাদকতা আছে। পুত্র পিতার মেহ বিস্মৃত হয়, বন্ধু বন্ধুর বুকে ছুরি বসায়, বৃদ্ধের সংযম স্রোতের তৃণের মত ভেসে যায়। খামার প্রবেশ ঋছ ? দিন দেখেছিলি তুই? কে? ওঃ-শ্যামা ! হরে শ্যামা, খােদ খামা। আজ্ঞে হ। দুর্গা। কেমন দেখতে রে? শ্যামা। খুব সুন্দর বাবু, যেন সার ঠিাকরুণ। দুর্গা। আর শশীয় মেয়েকে দেখে পথের শেষে তৃতীয় অঙ্ক শামা। আজ্ঞে হ্যা। কতবার দাদাবাবুর সঙ্গে তাদের বাড়ী গিয়েছি কতবার দেখেছি। দুর্গা। কে বেশ সুন্দরী ? শ্যামা। বাবু, বৌদিদির তুলনা হয় না। দুর্গা। এত সুন্দরী ? শ্যামা। আমি মুখ লােক—কি করে আপনাকে বােব বাবু ! সে মুখের দিকে একবার তাকালে চোখ ফেরান যায় না আর কি মিষ্টি কথা । দুর্গাশঙ্কর বিহ্বলের স্থায় শ্যামার মুখের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। মা বলিতে লাগিল- আপনি ত একবার দেখলেন না আমার বৌদিদিকে—যদি আপনি একবার দেখতেন—যদি তার মুখের একটা কথা আপনি শুনতেন- আপনি গলে যেতেন- দুর্গাশঙ্কর দ্রুত পদচারণা করিতে লাগিলেন কখনও অমন করে আপনি তাড়িয়ে দিতে পাতেন না। যােগেশবাবু আর পিসীমা কতকগুলাে মিথ্যা কথা লাগিয়ে আপনার মন খারাপ করে দিল—আমার দাদাবাবু কি তেমন ছেলে যে বাপের সঙ্গে মকর্দমা করবেন বাপ বলতে যে তিনি অজ্ঞান’- দুর্গা। এ! তবে কি সব মিথ্যা খামা। মিথ্যা নয়। কুই, এই ত দুটো বছর হয়ে গেল—তিনি ত কোন মকদ্দমা ক—আর ৫ দুর্গা। না, তা করে। শ্যামা। বাবু, আমি চাকনিবার শুনক। আমি আর আপনাকে কি বােঝাব! তবে দু’পু মুণ খাচ্ছি-বােধ হয় আপনার জন্য আগুনে ঝাঁপ দিতে নাসোআমাদের দাদাবাবু যাতে আর এ প্রথম দৃশ্য ¥ পথের শেষে বাড়ীতে ফিরে আসতে না পারে, যােগেশবাবু আর পিসীমা তারই চক্রান্ত করেছে। মিথ্যা কথা লাগিয়ে লাগিয়ে দাদাবাবুকে আপনার দু’চক্ষের বিষ করে তুলেছে- দুর্গাশঙ্কর অপলক দৃষ্টিতে শ্যামার মুখের দিকে তাকাইয়া রহিলেন। শ্যামা বলিয়া যাইতে লাগিল যে অবস্থায়, যে ভাবে যােগেশবাবু আমার দাদাবাবু আর বৌদিদিকে কলকাতার বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দেয়, তা শুনলে বাবু আপনার চোখ দিয়ে টস্ টন্ করে জল গড়িয়ে পড়বে। আড়াই প্রহরের সময় দাদাবাবু তেল মেখে চান করতে যাচ্ছেন—বৌদিদি আমার ভাত বেড়ে নিয়ে বসে আছেন, সেই অবস্থায় সংবাদটা দিয়ে তাদের বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে যােগেশবাবু। দেওয়ানজী মাথা ভাঙ্গতে লাগলেন-কাঁদতে লাগলেন—যােগেশবাবুর পায় পর্যন্ত ধরলেন—তবু কি যােগেশবাবু থামে! তাদের বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়ে তবে দুর্গা। কি ! এত বড় স্পর্ধা যােগেশের ! যােগেশ—যােগেশ— শ্যামা। যােগেশ বাবু কলকাতা গিয়েছেন বাবু সুখদার প্রবেশ সুখদা। যােগেশকে ডাকৃছ দাদা—সে যে একটু আগে কলকাতায় গেল। দুর্গা। হু:-আচ্ছা। সুখদা। ( যাইতে যাইতে) ছেলেও যেমন মামা-অন্ত প্রাণ—দাদারও উঠতে বতে ‘যােগেশ—যােগেশ’। যােণ মুহূর্তও চলে না। এস্থান দুর্গশকর অধীর ভাবে কয়েকবা" লন, শেষে বলিলেন- বড় দেরি—সময় পাব ত—এত আছে ত! দেখি, খামা-আম ধিরাবার মত আয়ু এখনও আমাকে লইয়া এহান পর শেষে তৃতীয় অঙ্ক সুখদা পা টিপিয়া টিপিয়া প্রবেশ করিল ও যে দরজা দিয়া দুর্গাশঙ্কর ও শ্যামা বাহির হইয়া গেল সেই দরজায় কাণ পাতিয়া শুনিতে লাগিল সুখদা। হতচ্ছাড়াকে কলকাতায় যেতে বারবার নিষেধ করলাম—আমার কথা কাণে তুলল না। কত দিক এখন আমি সামলাব! সুযােগ পেয়ে শ্যামাটাও এতক্ষণ কি ফাসুর ফুসুর করে গিয়েছে। কি কাগজ পত্র বের কছে! এদিকে আবার আসছে-তক্কে তক্কে থাকতে হল। এহান দুর্গাশঙ্কর ও শ্যামার পুনঃ প্রবেশ উইলখানি হাতে লইয়া দুর্গাশঙ্কর কয়েক বার পদচারণা করিলেন দুর্গা। নাঃ, এ কলিযুগে রামচন্দ্র বা ভীষ্ম জন্মাতে পারেন না তার জন্য অভিমান করা শােভা পায় না। এ উইল আমি পরিবর্তন ক’ব তার জন্মগত অধিকার থেকে আমি তাকে বঞ্চিত ক’ব না। তবে দাতব্য ঔষধালয়ের সঙ্কল্পটা মনে জেগেছে- উইলপানা খুলিয়া পড়িতে লাগিলেন। জানালার আড়ালে দাঁড়াইয়া সুখদা সমস্তই দেখিতেছে। তাহার মুখ ভয়ে বিবর্ণ হইয়া গেল ও বলিল- সর্বনাশ! উইল পড়ছে-হতভাগা আমাকে জিজ্ঞাসা না করে ওঃ-গেল -সব গেল—সব প্রকাশ হয়ে পড়ল- দন্তে দন্তে অধর দংশন করিতে লাগিল দুর্গা। এ কি! খামা। কি বাবু ?-আর যে দুর্গা। ভুল দেখিনি। চশমা খুলিয়া ছিলেন নির নিবারন ও পুনরায় পড়িতে লাগিলেন সুখদা। (আড়াল হইতে) বিল সব পণ্ড ক’মূল! এবার জেল দুর্গা। না, ভুল নয় -আ: जान T;
প্রথম দৃ পথের শেষে শ্যামা। কি হয়েছে বাবু? দুর্গা। কিছু না-যজ্ঞেশ্বরকে ডাক্। সুখদা। (অন্তরাল হইতে) ব’লাম যজ্ঞেশ্বরকে সঙ্গে করে কলকাতা নিয়ে যা—আমার কথা কাণে তুল না—এখন যে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে—ও—দু’ দু’বার—দু’ দু’বার ছার স্ত্রীলােকের জন্য আখের নষ্ট কল ! দুর্গা। দাতব্য ঔষধালয়ের নামও নেই এ উইলে—সমস্ত সম্পত্তি যােগেশ পাবে! আশ্চর্য ! যজ্ঞেশ্বরের সহিত খামার পুনঃ প্রবেশ এই যে যজ্ঞেশ্বর ! আমি তােমাকে কি মৰ্ম্মে উইল লিখতে বলেছিলেম আর তুমি আমাকে কি পড়ে শুনিয়েছিলে? কি, চুপ করে রইলে যে—উত্তর দাও- শ্যামা। উত্তর দাও বাবু যশ্বের। থাম রে বাপু! বাবু, আমি ছাপােষা মানুষ। পাছে সত্যি কথা বলে চাকরিটী হারাই! দুর্গা। সত্যি কথা বলে চাকরি হারাবে কেন? যজ্ঞেশ্বর। যােগেশবাবুর সঙ্গে বিরােধ করে কতক্ষণ আপনার সংসারে টিকতে পাব। দেওয়ানজী পারেননি আর আমি ত আট টাকার মুহুরি। যাক্, আপনি মনিব-আপনার অন্নে প্রতিপালিত হচ্ছি- সত্যি কথাই বলব—তাতে অদৃষ্টে যা একটা দাতব্য ঔষধালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আপনি আপনার স্থান বছ? সমস্ত সম্পত্তি দান কছেন এই মর্মে আমাকে উই বলেছিলেন- আমি ঠিক তাই লিখেছিলেম এবং আই। "নিয়েছিলেম- দুর্গা। তাই লিখেছিলে! কই ওঁর : ত উইলে দেখছি না- যজ্ঞেশ্বর। কি করে দেখবেন বা ১৯ উইল নয়। ভয় পাই পথের শেষে তৃতীয় অঙ্ক দুর্গা। সে উইল নয় ! যজ্ঞেশ্বর। আজ্ঞে না! ওখানা সেই দিন রাত্রে যে দ্বিতীয় উইল হয়েছে তাই। দুর্গা। দ্বিতীয় উইল কে করলে? যজ্ঞেশ্বর। আপনার নামে যােগেশবাবু—আর লিখেছি আমি। দুর্গা। হু:তুমি লিখলে কেন? যজ্ঞেশ্বর। না লিখলে চাকরি যায়। স্ত্রী-পুত্র নিয়ে না খেয়ে ময়ূতে হয় । খামা। বরাবর জমিদারী হাত করবার চক্র! সেই জন্যই ত দাদাবাবুকে আপনার চক্ষুশূল করে এখান থেকে সরিয়েছে। দুর্গা। এ সব এত দিন আমায় জানাও নি কেন? যজ্ঞেশ্বর। আমাদের ত উপরে আসবার হুকুম নেই। দুর্গা। হুকুম নেই ! কার হুকুম নেই? যজ্ঞেশ্বর। আজ্ঞে যােগেশবাবুর দুর্গা। বেশ, শ্যামাকে দিয়ে জানাওনি কেন, চিঠি লিখে জানাও নি কেন? যজ্ঞেশ্বর। চেষ্টা করলে যে জানাতে না পারতেম তা নয়। দুর্গা। তবে ? তুমিও বুঝি এর ভিতর লিপ্ত আছ ? যজ্ঞেশ্বর। আজ্ঞে আপনি মনিব, প্রতিপালক—পিতৃতুল্য—আপনার নিকট মিথ্যা বলব না। ঐ জাল উইল লিখে দেওয়ায় যতটুকু এর ভিতর লিপ্ত হতে হয় তার চেয়ে একচুলও বেশী নয়! কি করব বাবু, সামান্য লেখা পড়া জানি—পাঁচ ছটা পােয়, ভরসা—আপনার ঐ আটট টাকা, “জীর অবস্থা দেখে যােগেশবাবুর ভয়ে আপনাকে জানার দুর্গা। দেওয়ানজীর অং সঘাতক বলে আমিই তাকে তাড়িয়ে নিবারণ দিয়েছি। যতের। বাবু! আমার ও করবেন। ঘটনাচক্রে তাকে অপরাধী মনে হলেও তিৰি নর্দোষী। 'নি- সব! নি
প্রথম দৃশ্য
পথের শেষে
দুর্গা। নির্দোষী !
যজ্ঞেশ্বর। হাঁ বাবু নির্দোষী। শুধু নির্দোষী নন—বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ আপনার
পরম হিতৈষী। বােধ হয় আপনার মঙ্গলের জন্য হাতে হাসতে
তিনি প্রাণটা ছুড়ে ফেলে দিতে পারেন। আপনার এই অগাধ
সম্পত্তি হস্তগত করতে হলে সর্বাগ্রে দেওয়ানজীকে এখান থেকে
সরান দরকার। কাজেও হয়েছে তাই। বাবু! আপনার ছােট খাট
এক একটা মহলের নায়েবী করে আপনার কত চাকর দালান দিচ্ছে,
পুকুর কাটছে, দোল দুর্গোৎসব করছে—আর এত বড় জমিদারীটার
সৰ্বময় কৰ্ত্তা হয়েও দেওয়ানজীর খড়ের চালের ছাউনি জোটে না
পাঁচ সিকের চাদর আর চোদ্দ আনার কোটকি জুতাের উপরে এ
জীবনে তিনি উঠতে পারলেন না।
দুর্গা। হু:—দলিলগুলাে কি হ’ল তবে?
যজ্ঞেশ্বর। তা আমি জানি না বাবু।
দুর্গা। এ সব আমায় তখন বল নি কেন?
যজ্ঞেশ্বর। আট টাকার মুহুরির কথায় কে কাণ দিত—কে বিশ্বাস করত বাবু।
আজ ব’ছ কেন ?
যজ্ঞেশ্বর। আজ এ সব আপনার বিশ্বাস হবে-আপনার অন্তরে বিধবে।
দুর্গা। কেন ?
যজ্ঞেশ্বর। ঐ জাল উইল আজ আপনার হাতে।
দুর্গা। আচ্ছা যাও কাজ কর গে’
যজ্ঞেশ্বরের প্রধান
সুখদা। অৈন্তরাল হইতে) এক ভু • এক ভুলে সর্বনাশ।
বেড়া আগুন-বেড়া আগুন-কোন ছ? বি ?
দুর্গা। এত বড় পাষণ্ড এই যােগে
কলা দিয়ে এতকাল একটা
কাল সাপ পুষেছি ! আজই। উপর বসে আমারই হৃৎপিণ্ড
টেনে ছিড়ছে।
দুর্গা।
পথের শেষে তৃতীয় অঙ্ক শ্যামা। জমিদারীটে নেবে বলে কি চক্রটাই মায়ে ছেলেয় না করেছে! মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দেওয়ানজীকে অপদস্থ করে তাড়িয়েছে- ভিতরে ভিতরে আরও কি করেছে কে জানে। দিন রাত দুইজনে কেবল পরামর্শ আঁটছে সুখদা। (অন্তরাল হইতে) বল্ হারামজাদা - চাকা ঘুরে গেছে—দিন পেয়েছিস-প্রাণ ভরে বল্। না-মরেছি ত—হাল ছাড়ব না। একবার অন্তিম চিকিৎসা করব- দুর্গা। ওঃ—আমি কি করেছি—কি করেছি। পিশাচের কথায় বিশ্বাস করে-শয়তানের ছলনায় আত্মবিস্মৃত হয়ে আমি নিজের বুকে নিজে কুঠার হেনেছি। ও হােহাের—আমার চির আদরের থােকা আমার মাতৃহারা গােপাল—আমার কত সাধের-কত কামনার পুত্রবধূ-তাদের আমি কুকুরের মত বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছি কুকুরের মত তাড়িয়ে দিয়েছি। শ্যামা। বাবুবাবু! স্থির হন। যা হবার হয়ে গেছে। এখন প্রতিকার করুন। দুর্গা। হাঁ। প্রতিকার করব—প্রতিকার করব। ডাক যােগেশকে- শ্যামা। আজ্ঞে যােগেশবাবু ত কলকাতায় পালিয়েছে- দুর্গা। কোথায় পালাবে! নরকের গর্ভে পালালেও আর তার নিস্তার নেই। ডাক তার মাকে শ্যামা। (দ্বারের দিকে একটু অগ্রসর হইয়া) পিসীমা-পিসীমা ! কর্তাবাবু ডাকছেআর পেসীমা আসছেন— দুর্গা। কই কোথা যাব। নিবার - এই যে- সুখদা। আমায় ডেকেছ দা. বাসে
প্রথম দৃশ্য
পথের শেষে
দুর্গা। চোপ! আমি পিশাচীর দাদা নই।
সুখদা। শ্যামা দাড়িয়ে দেখছিস কি! শীগগির ডাক্তারের কাছে ছুটে
যা। দাদা কেন অমন কছে!
দুর্গা। কি! আমাকে পাগল প্রমাণ ক’য়বে! তা তােমরা পার। তােমাদের
মাতা-পুত্রের অসাধ্য এ জগতে কিছু নেই। কিন্তু আর তা হবে না।
আমি তােমাদের চিনতে পেরেছি—তােমাদের স্বরূপ দেখতে পেয়েছি।
ধৰ্ম্মের ঢাক প্রলয়নাদে বেজে উঠে তােমাদের মুখ থেকে দরদের মুখােস
খুলে দিয়ে তােমাদের নারকীয় মূর্তি প্রকাশ করে দিয়েছে। কি সুখদা!
যােগেশ জমিদার হবে! হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ—খুব মাথা খাটীয়েছিলে
বেড়ে চক্রান্তটা করে ছিলে দু’জনে। কিন্তু এই জাল উইল আজ
তােমাদের বড় আশায় ছাই দিয়ে সব প্রকাশ করে দিয়েছে।
সুখদা। আমাদের ত এখন দোষ হবেই। যা শুনেছি সরলভাবে
তােমার হিতের জন্যে
দুর্গা। চোপরাও জালিয়াত ! সরলভাবে আমার হিতের জন্য ! হাঁ এই জাল
উইলও সরলভাবে আমারই হিতের জন্য তােমরা করেছ—কেমন ?
সুখদা। উইল জাল করেছি।
দুর্গা। হাঁ। তােমার ছেলে যজ্ঞেশ্বরকে দিয়ে এই জাল উইল লিখিয়েছে।
এইমাত্র সে বলে গেল। শুতে চাও?
শুনতে চাও? ডাক ত যজ্ঞেশ্বরকে
সুখদা। কোন দরকার নেই। তােমার কথাই যথেষ্ট।
দুর্গা। বেশ। তারপর?
সুখদা। তারপর কি ?
দুর্গা। কেন তােমরা আমার উইল জাক বছ ?
সুখদা। আমরা।
দুর্গা। হাঁ, তুমিও এতে লিপ্ত ওই ।
সুখদা। কিসে বুঝলে? যজ্ঞেশ্বর শে;
১৯
পথের শেষে তৃতীয় অঙ্ক দুর্গা। । সুখদা। তবে ? দুর্গা। তােমার ইচ্ছা যে যােগেশ আমার এই জমিদারীর মালিক হয়। সুখদা। যােগেশ জমিদারীর মালিক হলে আমার লাভ ? বিধবার প্রয়ােজন এক মুঠো আতপ চাল। আতপ চাল। যােগেশ এই জমিদারীর মালিক হলে কি সে আমাকে সােনার ভাত খাওয়াবে ! যােগেশের একটা পৈত্রিক জমিদারী ছিল না। তখন কি আমি সর্বাঙ্গে হীরা মতি পান্নার গহনা পরতাম। এখন আছি তােমার গল গ্রহ, যদি যােগেশ তােমার জমিদারী পেত তখন হতেম তার মুখাপেক্ষী। বল তবে কোন আশায়, কোন স্বার্থে, যােগেশের সঙ্গে জালিয়াতিতে লিপ্ত হয়ে আমি পরকালটাও নষ্ট ক’ব! সম্পত্তির লােভে যােগেশের পক্ষে উইল জাল করা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু ভাই বলে আমি তার মা এই জন্য তার যত কুকার্যে আমার লিপ্ত থাকতে হবে। আমি তার মা বলে যদি অপরাধী হই, তবে আমার চেয়েও বেশী অপরাধী তুমি! এক মাতাল লম্পটের সঙ্গে যখন ভগ্নীর বিবাহ দিয়েছিলে, তখন কি করে আশা করেছিলে যে, এ ভগ্নীর গর্ভে ধাৰ্মিক সচ্চরিত্র যুধিষ্ঠির জন্মাবে। জাল জোচ্চ রি ত যােগেশের পক্ষে স্বাভাবিক। মনে করে দেখ’ দেখি একবার, কার পুত্র সে! আজ আমায় তিরস্কার ক’তে তােমার লজ্জা হয় না। ভাব দেখি একবার কি ভাবে আমার একটা জন্ম তুমি ব্যর্থ করেছ ! স্বামী হতে কোন দিন সুখী হয়েছি। আমার পিঠের কাপড়খানা তুলে দেখ, আজ চোদ্দ বৎসর বিধবা হয়েছি, এই চোদ্দ বৎসরেও সে মায়ের দাগ মিলাতে পারেনি, মাতাল হয়ে এমন মার আমাকে মেরেছে। ছেলে হতে কোন দিন সুখী হয়েছি। আমার ছেলে মাতাল, আমার ছেলে লম্পট—আমার ছেলে জালিয়াত! ভাব দেখি একবার কি সুখের জীবন আমার ! এখন তােমার আশ্রয়ে l
প্রথম দৃশ্য
পথের শেষে
এসেছি—মার, কাট, জেলে দাও, মাথা মুড়িয়ে ঘােল ঢাল—যা ইচ্ছা
কর—আর আমার সহ্য হয় না ! ( কঁদিতে লাগিল।
দুর্গা। তাইত! ( নত মস্তকে পদচারণা করিতে লাগিলেন।
শ্যামা। (স্বগত) ও বাবা-এ যে উকীলের বাবা ! এক বক্তৃতায়
কৰ্ত্তাবাবুকে ভাবিয়ে দিয়েছে।
সুখদা। শােন দাদা, আমার ছেলে নেই—আমার ছেলে মরেছে ! ঐ
কুলাঙ্গারকে যদি তুমি ক্ষমা কর—ঐ জালিয়াতকে যদি তুমি শাস্তি না
দেও, তবে আমি গলায় দড়ি দেব-রাস্তায় ছুটে বেরুব—জলে ঝাঁপ
দেব। বল, ওকে জেলে দেবে—বল-বল-প্রতিজ্ঞা কর-নইলে
আমি তােমার পায়ের তলায় মাথা খুড়ে ম’
প্রকৃতই ছুটিয়া গিয়া দুর্গাশঙ্করের পায়ের তলে মাথা খুড়িতে লাগিল
দুর্গা। আ হা হা—করি কি করিস্ কি সুখী-তুই কি পাগল হলি
সুখদা। না, আমি শুনব না—কোন কথা শু না-বল, ওকে তুমি
জেলে দেবে।
দুর্গা। হাঁহ-করব—যা হয় একটা ব্যবস্থা করব। এ দেখত কি
করেছিস্-এ যে দর দর ধারে রক্ত ছুটছে—কপালটা যে কেটে গেছে
-শ্যামা শিগগীর জল আন— শ্যামার প্রস্থান) কি ক’লি-দেখত
পাগলী ! এমন ছেলেমানুষী করূতে হয় ! রক্ত পড়ে ভেসে যাচ্ছে !
সুখদা। রক্ত। আমার বুকের ভিতর আজ যা হচ্ছে ! দাদা-
কুলাঙ্গার শেষে তােমার মত মামার
দুর্গা। চুপ কর। ও সব আর এখন মনে করি না। শ্যামা-খামা
শ্যামার জল লইয়া প্রবেশ
একটু জল আতে হারামজাদার একটা দিন গেল !
পুকুর কেটে জল আছিলে! নড়তে চড়তে তােমাদের ছয় মাস
পথের শেষে তৃতীয় অঙ্ক শ্যামা। আজ্ঞে নীচেয় গিয়ে জল আনতে হ’ল । দুর্গা। কেন পাশের ঘরেই ত জল ছিল- খামা। আজ্ঞে সেটা আমার মনেই হয়নি—অত রক্ত দেখে আমার কেমন ভিরমি লেগেছিল- দুর্গাশঙ্কর রক্ত মুছাইয়া পটী বাধিতে লাগিলেন (স্বগত) পড়ুক না একটু রক্ত। সখের ঘা। আরও একটু দেরি করে আস্বার ইচ্ছা ছিল তা কাবাবু যে চীৎকার আরম্ভ কলেন। কর্তাবাবু কিন্তু একেবারে জল হয়ে গেছেন। সুখদা। (স্বগত) বঁটাতে আঙ্গুল কাটলে রক্ত পড়ে না ! দু ফোটা রক্ত পড়লে কি আসে যায়! আর তুমি আমায় অবিশ্বাস করবে -এইবার আমার যােগেশের পথ নিষ্কণ্টক করব। এখন দেখছি যােগেশ কলকাতায় গিয়ে ভালই করেছে। ( নেপথ্যে ডাক্তার। শ্যামা-শ্যামা- দুর্গা। ঐ যে ডাক্তার এসেছে-যা, ভালই হয়েছে। এই যে, উপরে এস বাবা-শ্যামা ! যা ত—শিগগীর- শ্যামা। (স্বগত) নাঃ-কৰ্ত্তাবাবু বেজায় বাড়াবাড়ি ক’গছেন। প্রস্থান সুখদা। ডাক্তারকে কিন্তু আমার সম্বন্ধে কিছু বল না দাদা- দুর্গা। কেন, ও ত আমাদের ঘরের ছেলের মত। ছেলের মত। অনেকটা অনেকটা কেটে গেছে, দেখুক না একবার। সুখদা। না দাদা-তােমার পায়ে পড়ি—এ আমার আপনা হতেই সেরে যাবে। ডাক্তারকে লইয়া খামার প্রবেশ ডাক্তার। একি! আপনার যে এখনও খাওয়া হয় নি দেখছি। শরীরের যে অবস্থা তাতে এরকম অনিয়ম হওয়া ঠিক নয়। (সুখদার দিকে ফিরিয়া) আপনি থাকতে এরকম অনিয়ম-ওকি আপনার কপালে কি হয়েছে? ১২২ প্রথম দৃথ পথের শেষে দুর্গা। দেখত ডাক্তার-- সুখদা। না-না—এ আর দেখতে হবে না। পড়ে গিয়েছিলাম তাই কেটে গেছে। তুমি আমার দাদাকে একটু ভাল করে ওষুধ দাও ডাক্তারবাবু, কাল খুব বেশী রক্ত পড়েছে। দাদার শরীরের দিকে ত আর তাকান যায় না ডাক্তারবাবু! ডাক্তার। চেষ্টা কি আমি কম করছি। কিন্তু কোন ওষুধে যে ফল পাচ্ছি না। আচ্ছা, দেখি আপনার হাতটা একবার, আপনাকে বড় exhausted cat4 2766 pulse feeble- সুখদা। কি বলে--কি বললে ডাক্তারবাবু—দাদা আমার বাঁচবে ত! বাঁচবে ত! আমার দিকপালের মত ভাই! ঐ ভাইয়েরই মুখের দিকে চেয়ে আমি যে পাষাণে বুক বেঁধে বেঁচে আছি- ( ক্রন্দন ) ডাক্তার। এ কি! আপনি যে কেঁদে ফেলেন! কোন ভয় নেই। সকালে আজ বােধ হয় কিছু খান নি, এখন ওঁকে একটু গরম দুধ দিন ত— সুখদা। আমি এখনই নিয়ে আসছি। (স্বগত) এইবার-এইবার- প্রহান্ত শ্যামা। (স্বগত) পিসীমার চোখ দুটো হঠাৎ শিকারী বাঘের মত জ্বলে উঠল কেন ? প্রহান এক বিষয়ে আপনি বড় fortunate, এমন বােন অতি অল্প লােকেরই আছে। দুর্গা। সব দিক একাকার হলে কি মানুষ টিকতে পারে। তাই বােধ হয় ভগবান দয়া করে ঐ টুকু অবশিষ্ট রেখেছেন। ভাই বােনের মেহের বাঁধন মায়ের শােণিতে গড়া কিনা তাই বােধ হয় এত অটুট—এত মধুর। ডাক্তার। এ জীবনে আর তা উপভােগ ক’তেই পালেম না। ভাইও নেই—বােনও নেই। হাঁ কাল রাত্রে ক’বার উঠতে হয়েছে ?
পথের শেষে তৃতীয় অঙ্ক দুর্গা। প্রায় সমস্ত রাত্রি। রক্তের পরিমাণও খুব বেশী। শরীর যেন দিন দিন নিস্তেজ হয়ে আসছে ডাক্তার। একটা injection নেবেন ? কোন কষ্ট হবে না--মাত্র একটা সেকেণ্ড- দুর্গা। আর কেন বাবা এই শেষ সময় ফোড়া-ফুড়ি করে কষ্ট দেবে ডাক্তার। আচ্ছা থাক্। আচ্ছা থাক্। তাহলে ওষুধটা আজ বদলে দেব । দুগ্ধ লইয়া সুখদার প্রবেশ সুখদা। (স্বগত) এইবার শেষ চেষ্টা। ( প্রকাশ্যে ) হ ডাক্তারবাবু, ও ওষুধটা বদলে দিন। দাদা-এই দুধ এনেছি- দুর্গা। এত দুধ! এ কি খাওয়া যায় ভাই- সুখদা। শুন্ছেন ডাক্তারবাবু! এই টুকু দুধ খেতে চান না। একটু না খেলে ডাক্তার। ও-টুকু দুধ আপনার খাওয়া উচিত। দুর্গা। দেখি কত দূর পারি। ( খাইতে উদ্যত ) ( নেপথ্যে) শ্যামা। বাবুবাবু-খাবেন না-খাবেন না- ও কি ? সুখদা। কিছু না-খাও -খাও-খাও-- শ্যামা ছুটিয়া আসিয়া দুধের বাটী দুর্গাশঙ্করের হাত হইতে কাড়িয়া লইল। সুখদা ছুটিয়া গিয়া খামার গলা চাপিয়া ধরিল ও বলিল- “হারামজাদা—দে-দে-দুধ খেতে দে—দুধ খেতে দে--আমার যােগেশ নিষ্কণ্টক হবে—আজ আমার যােগেশ নিষ্কণ্টক হবে— দুর্গা। একি! ডাক্তার। convulsions- শ্যামা। বাবু-বাবু- আমায় মেরে ফেলে—আমায় বাচান-বাঁচান। দুর্গাশঙ্কর ও ডাক্তার অতি কষ্টে শ্যামাকে সুখদার হাত হইতে মুক্ত করিলেন। সুদ। নিজের চুল টানিয়া ছিড়িতে লাগিল ও পিঞ্জরাবদ্ধ শালের ন্যায় গর্জন করিতে লাগিল ১২৪ দ্বিতীয় দৃশ্য পথের শেষে দুর্গা। এ সব কি শ্যামা ? শ্যামা। দম ছেড়ে নি বাবু, আমায় মেরেছিল আর কি ! কর্তাবাবু! এই দুধের বাটীতে আজ শিশি খালি করে বিষ মিশিয়েছ-মা কালী রক্ষা করেছেন-এই দেখুন সে শিশি- ডাক্তার। এ! একি! এযে arsenic! উগ্র বিষ—horriblehorrible! দুর্গা। ডাক্তার আমায় ধর- ডাক্তার। এ কি! আপনি কাপছেন! বসুন-বসুন-স্থির হন স্থির হ’ন-বাতাস কর শ্যাম।। তাই বল, ভিতরে ভিতরে arsenic- এর slow poisoning চলছে। তাই কোন ঔষধে ফল হচ্ছে না। deliberate murder—কি ভয়ঙ্কর! ভগবান আজ আপনাকে খুব রক্ষা করেছেন, কিন্তু আর মুহুৰ্ত্ত বিলম্ব ক’বেন না-এখনই কলকাতা রওনা হন। systemএ কতটা poison ঢুকেছে কে জানে! সুখদা। কে ? যােগেশ! কলকাতা থেকে এসেছ! এস বাবা-এস- তােমার পথ পরিষ্কার করেছি—আমার যােগেশ জমিদারী পেয়েছে -আমার যােগেশ জমিদারী পেয়েছে। হাঃহাঃহাঃহাঃ- ডাক্তার। হু:! হতেই হবে। আশা ভঙ্গ sudden shock! artery ছিড়ে গেছে ; mental dcrangement হবেই। দুর্গা। শ্যামা, আমার কাছে আয়-আমার কোলে আয়। ডাক্তার। এই আমার চাকর-আর ঐ আমার বােন—আমার মায়ের পেটের বােন-যা আছে বলে এক মুহূর্ত পূর্বে তুমি আমায় ভাগ্যবান ব’ছিলে এই দেখ জাল উইল—আর ঐ সেই বিষ মিশান দুধ- ব’লত ডাক্তার, আমি হাসব না কাদব ! ১২৫
দ্বিতীয় দৃশ্য
কলিকাতা-ললিতার ভাড়াটীয়া বাটীর-কক্ষ
ললিতা ও যােগেশ উপবিষ্ট
ললিতা। কি গাে ! একদৃষ্টে হাঁ করে চেয়ে কি দেছ ?
যােগেশ। তােমায় দেখ ছি। এ যে মােহিনী মূর্তি
ললিতা। দেখ’ ভাই-গিলে ফেলাে না যেন
যােগেশ। পারলে ছাড়তুম না..সত্যি ললিতা, কি চমৎকার মানিয়েছে
তােমায়। যেন তােমার জন্যই গহনাগুলি তৈরী হয়েছিল
ললিতা। এখনই ত আমার খুলে দিতে হবে
যােগেশ। কেন?
ললিতা। পরের জিনিষ আমার ত নয় যে প'রে মনের সাধ মিটাব
যােগেশ। না-না -ওসব যে তােমার
ললিতা। আমার! সত্যি বলছ ?
যােগেশ। হা ললিতা
ললিতা। গহনা প’রবার আমার বড় সাধ-গহনা আমি বড় ভালবাসি,
হ যােগেশবাবু, এক্ষুনি আবার কেড়ে নেবে না ত ?
কেড়ে নেব ললিতা, তােমার গা থেকে গহনা! আমায় কি
তুমি এমনি পিশাচ মনে কর
ললিত। দেখ ভাই, আমি কিন্তু অনাদর সইতে পারি না
যােগেশ। তােমায় অনাদর ক’ব ! ললিতা, তােমায় আমি মাথার
মণি করে রাখব।
ললিতা। দেখ ভাই, সরল অবলাকে মজিয়ে শেষে মাঝ দরিয়ায়
ভাসিও না যেন।
দ্বিতীয় দৃশ্য পথের শেষে যােগেশ। তােমার সুখের জন্য আমার সর্বস্ব পণ। তােমার মুখের একটা কথায় আমি বােধ হয় হাসতে হাসতে প্রাণ দিতে পারি। বল—বল ললিতা, তুমি আমায় ভালবাস—তুমি আমার ললিতা। যােগেশবাবু, প্রিয়তম ! আমি তোমার প্রেমে উন্মাদিনী- ইত নিবারণকে ছেড়ে তােদর কাণ্ডারী-করে-যৌবনতরী গলিয়ে দিয়েছি গীত বাজ লো আজ হৃদয়বীণা নূতন তানে। এ পুলক কোথায় ছিল—নুতন আলােক ছুটলো বঁধু নূতন প্রাণে । হৃদয়-কুঞ্জে নূতন সুরে কি গান ধরেছে পাপিয়া, পুঞ্জে পুঞ্জে আছে ফুটে ফুল হৃদয়-মঞ্চ ছাপিয়া নুতন চোখে ফুটেছে আজি নূতন করে দুনিয়া কি জানাে যাদু, পরাণ বঁধু, মজলে নারী অপি-বাণে। ", ছুরিকা হস্তে নিবারণের প্রবেশ নিবারণ। এতদিনে তােমার সন্ধান পেয়েছি যােগেশবাবু ! যােগেশবাবু —যােগেশ- যােগেশ। (চমকিত হইয়া) কৈ কৈ ( সভয়ে) নিবারণ ! নিবারণ। হাঁ, আমি নিবারণ—চিনতে পারছ? কে, ললিতা? বাঃ! —বেশ সেজেছ ত-খাসা আছ! না? শয়তানি! বল, কোথায় আমার টাকা? দেখছি এই ছুরি- ললিতা। আমি কিছু জানি না—আমি কিছু করি নি- নিবারণ। আচ্ছা। যােগেশবাবু, নিধুঠাকুর ললিতাকে চুরি করেছিল -না? খুব মাথা খাটিয়েছিলে! এখন ? যােগেশ। যাও যাও, এখান থেকে বেরিয়ে যাও-দারােয়ান, দারােয়ান ১২।
পথের শেষে তৃতীয় অঙ্ক নিবারণ । দারােয়ান কি কবে বিশ্বাসঘাতক! পাষাও--ততার সঙ্গে আজ আমার হিসাব নিকাশ-শয়তান। আমি তােকে খুন ক’রূব- তােকে টুকরাে টুকরাে করব। ললিতা। ( ছুটিয়া নিবারণের সম্মুখে , গিয়া )- না— নামের না— যােগেশবাবুকে মের না- নিবারণ। ওঃ বড় দরদ! পথ ছাড় শয়তানি ! ছাড়বি না—ছাড়বি না— পদ্মাঘাত করিয়া ললিতাকে মাটীতে ফেলিয়া দিল। ললিতা মূচ্ছিতা হইল। তাহার কপালটিয়া রক্ত পড়িতে লাগিল। সেই অবসরে নিবারণের হাত হইতে ছুরি কাড়িয়া লইয়া যােগেশ তাহাকে পুনঃ পুনঃ আঘাত করিতে লাগিল। নিবারণ মাটীতে পড়িয়া গেল। তাহার সর্বাঙ্গ হইতে দর-দর ধারে শাণিত ছুটিল। ভোগেন তাহা দেখিয়া সভয়ে বলিল ——খুন—খুন করেছি!” ১২৮ তৃতীয় দৃশ্য কলিকাতা দুর্গশঙ্করের বাটা-কক্ষ দুর্গাশঙ্কর ও অনাদি দুর্গা। কোন খোঁজ পেলে না? অনাদি। এখনও ত কিছু পাই নি। আপনার তার পেয়ে কলকাতায় এসেই তিন তিন জন গােয়েন্দা লাগিয়েছি—তাদের পেছনে জলের মত টাকা খরচ করছি-প্রত্যেককে হাজার টাকা করে পুরস্কার দেব প্রতিশ্রুত হয়েছি। দিবারাত্র তারা সহরের অলি-গলিতে ঘুরছে, কিন্তু পাপিষ্ঠ যে কোথায় উধাও হয়েছে কেউ তা খুজে বের ক’তে পারছে না। (দুর্গাশঙ্কর নতমস্তকে পদচারণা করিতে লাগিলেন। আজকার দিনও দেখব মনে করেছি তার পর সহরের বাইরেও লােক লাগাব। আমার মনে হয় কলকাতায় দুর্গাশঙ্কর পদচারণা করিতে করিতে সহসা প্রাচীর বিলম্বিত দর্পণের দিকে তাঁহার দৃষ্টি পড়ায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখিয়া শিহরিয়া উঠিলেন ও বলিলেন- “ও কে ?” অনাদি। কি বাবু? দুর্গাশঙ্কর ধীরে ধীরে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া আয়নার ভিতর নিজের প্রতিবিম্ব দেখাইলেন! অনাদি সেই দিকে চাহিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া নতমস্তকে দাড়াইলেন। দুর্গাশঙ্কর দেখিতে দেখিতে যেন শিহরি উঠিতে লাগিলেন-পরে ভাবিলেন- অনাদি। বাবু! দুর্গা। নেচ্ছ, কত স্পষ্ট ছাপ পড়েছে। (স্নান হালিসিয়া) সান এরী-আয়ত বেশী দেরী নেই অনাদি- ২১ পথের শেষে তৃতীয় অঙ্ক অনাদি। নারায়ণনারায়ণ দুর্গা। একটা আকাঙ্ক্ষা—শুধু একটা আকাঙ্ক্ষা-ছুটীয়া অনাদির হাত দু’টা জড়াইয়া ধরিলেন)—এই শেষ সাধ আমার পুরাও ভাই- অনাদি। বাবু, সাহস করে এ কথা আপনাকে আমি জানাতে পারিনি। আপনার অনুমতি না নিয়েই পাচ হাজার টাকা পুরস্কার ঘােষণা করে সহরের সর্বশ্রেষ্ঠ গােয়েন্দা কৃষ্ণবাবুকে আমি সেই হতভাগ্যের সন্ধানে লাগিয়েছি। দুর্গা। আছে—আজও কি বেঁচে আছে সে-বেঁচে আছে তারা। অনাদি। আছে বই কি বাবু—নিশ্চয় বেঁচে আছে। দুর্গা। তুমি ব’লছ—তুমি বলছ তারা বেঁচে আছে। বল-বল ব্রাহ্মণ —মুক্তকণ্ঠে প্রাণ খুলে বল-তােমার মুখে একদিন বদ ধ্বনিত হয়েছে—তােমার বাণীতে একদিন সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় সংঘটিত হয়েছে —তােমার কথা মিথ্যা হবে না—বল ব্রাহ্মণ-আবার আমি হারানিধি ফিরে পাব নিধুঠাকুর ও তৎপশ্চাৎ মুটিয়া গােবিন্দের মােট মাথায় প্রবেশ গােবিন্দ মােটটী অতিকষ্টে নামাইয়া ক্লান্তির জন্ঠ এক ধারে বসিয়া পড়িল। তাহার সর্বাঙ্গ হইতে দেবারি নির্গত হইতেছিল এবং অতিকষ্টে সে দম লইতেছিল নিধুঠাকুরকে দেখিয়া দুর্গাশঙ্কর বলিলেন- “ কেকে? সাহস বটে!” নিধু। রসদ বাবা, পয়সার অভাবে বুড়ো বামুনকে ইষ্টিশান থেকে হেঁটে আসতে হয়েছে। আগে দমটাই ছাড়তে দাও। ও কে ? অনাদি না? অনাদি। আহে। নিধু। বেশ বেশ। তােমাকে যে এখানে পাব তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনিতা ভালই হয়েছে। এই নাও বাবা-তােনার দলিল .
তৃতীয় দৃশ্য পথের শেষে অনাদি। দলিল! নিধু। বুঝতে পালে না! শােন তবে ; তােমার জন্যই বাবা এতদূর এসেছি—নইলে বাবা, খাসা বিশ্বেশ্বরের শ্রীপাদপদ্মে পড়ে ছিলুম। বুঝলে দুর্গাশঙ্কর, এই যে প্রাণে এত জালা—এত দাহবাবার আরতি দেখতে দেখতে সব যেন জুড়িয়ে যেত। আর কেবল তােমার কথা মনে হত। এবার আমি তােমায় নিয়ে যাব। অনাদি। দলিল কি বলছিলেন ? নিধু। ‘, শােন তারপর—তােমাদের নিবারণ আমায় কাশীতে গিয়ে ধরেছে, আমি না কি তার রুক্মিণী হরণ করেছি। শুনেই ত আমার চক্ষুস্থির! আর ধরতে গেলে দোষটা আমার ঘাড়েই পড়ে। তারপর বাবা তাকে বুঝিয়ে দিলাম যে আমার কোন দোষ নেই। বােনের অসুখ দেখতে কলকাতায় আসবে, লােক অভাবে আসতে পাছে না বলে চুড়ী বড় ধ'রে পড়ল-কাদাকাটা ক’তে লাগল -বাবাজীবন যােগেশচন্দ্রও অনুরােধ ক’তে লাগল—তার উপর জানই ত বাবা, আমি নেশাখাের মানুষ কিছু লােভও দেখাল- তাই তাকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় এসেছি। তখন কি জানিয়ে বাবা, মান যােগেশচন্দ্র আমার মাথায় কাটাল ভেঙ্গে মনের সুখে কোষ থাচ্ছে। এর ভিতরে যে এত প্যাচ তা বােকা-বামুন আমি কি করে জানব বল! অনাদি। তারপর-তারপর? নিধু। কলকাতায় এসে পরদিনই চুড়ী নিজে ইষ্টিশানে গিয়ে আমায় টিকিট কিনে দিয়ে আরও নগদ পঁচিশ টাকা দিয়ে কাশীর গাড়ীতে তুলে দিয়ে গেল। গরীবের ছেলে বা কোনদিন অদৃষ্টে ঘটবে বলে আশা করি নি-আমার ত মহাশূর্তি—আনলে একেবারে ডগমগ হয়ে কাশীতে বাবা বিশ্বেরের পাদপয় দেখতে গেলাম।
পরে ৫ তৃতীয় অঙ্ক আরে তখন কি জানি যে ছোড়া ছুড়ী সম্পূর্ণ দোষটা আমার ঘাড়ে চাপাবার জ কৌশল করে আমায় সরিয়ে দিচ্ছে। দুর্গা। এত বড় পাষণ্ড!-একবার পেতাম তাকে নিধু। আহা, শেষ পর্যন্ত শােনই না দুর্গাশঙ্কর-আরও এহস্য আছে। নিবারণের যখন বেশ বিশ্বাস হ’ল যে আমি নির্দোষ-যােগেশ বাবাজীই তার মাথায় হাত বুলিয়েছেন-তখন সে কি বলে জান? অনাদি। কি? নিধু। নিবারণ বলে যে খুড়াে আমি মহাপাপী। এ আমার উপযুক্ত শান্তি। নিজের ছেলের মত দেওয়ানজী আমায় প্রতিপালন করেছেন, ঐ যােগেশের দলে মিশে আমি তার সর্বনাশ করেছি-সিন্দুকের চাৰী বাবুর বালিশের তলা পেকে যােগেশের মা চুরি করেছিলেন সেই চাবী দিয়ে আমি আর যােগেশ সিন্দুক খুলে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে চরের দলিল শিবনারায়ণবাবুকে দিয়েছিলাম। দুর্গা। এ! অনাদি। নারায়ণ-নারায়ণ- নিধু। কথাটা শুনে, তােমায় বল কি অনাদি, আমার যা অবস্থান আননশ দুঃখ-না রাগ-বুঝলে দুর্গাশঙ্কর, আমার তখনকার অকাটা আমি তােমাদের বঝাতে পাছি না- দুর্গা। তারপর ? নিধু। তারপর নিবারণ বলে যে খুড়াে নিরপরাধ দেওয়ানী যােগেশের চক্রান্তে মনিবের কাছে লাধিত হয়েছেন,—আমায় যােগেণের সন্ধানে যেতে হবে-তার সঙ্গে হিসাব নিকাশ পরিষ্কার করতেই হবে—আমি ত কর্তাবাবুকে গিয়ে সব বলতে পাছি না -আপনি যদি ম করে যান, তবে দেওয়ানজীর মিথ্যা কলঙ্ক দূর হয়। তারপর এই পত্রখানা আমার হাতে দিয়ে বললে যে, এই পত্র
পর এর
লিখে যােগেশ শিবনারায়ণবাবুর কাছে টাকার তাগাদা করেছিল
পত্রখানি তাকে আর দিতে হয়নি—তার লােক টাকা নিয়ে আসছিল
—পথেই আমার সঙ্গে দেখা হয়। পত্রখানি আমি কি জানি কি
ভেবে তুলে রেখেছিলাম। এখন আপনি কর্তাবাবুকে দেখাবেন,
তাহলেই তিনি সব বুঝতে পাবেন। এই নাও বাবা, এই সে পত্র,
রক্ষাকবচের মত অতি যত্নে নামাবলীতে বেঁধে রেখেছি।
অনাদির হতে দিলেন
অনাদি। ধৰ্ম্ম, তুমি তাহলে আছ!
নিধু। নিশ্চয়—নিশ্চয়-ওরে বাবা, পাপের ও লাফালাফি ক’দিন।
হাঃ হাঃ হাঃ-এখনও যে চন্দ্র সূৰ্য্য উঠছে। আমি কিন্তু অনাদি,
মনে তােকে কখনও অপরাধী ভাবিনি—তবে মুখ ফুটে কিছু বলতে
সাহস পাই নি।
দুর্গা। অনাদি,-অনাদি—একবার সে পাপিষ্ঠ যােগেশটাকে আমার
সামনে আনতে পার—একবার—তাতে যত টাকা লাগে
গােবিন। (আপন মনে) হা রে যােগেশবাবু, মুখের ভাত কেড়ে নিয়ে
আমার দাদাবাবুকে এই বাড়ী থেকে তুমি কুকুরের মত তাড়িয়ে
দিয়েছিলে ।
৩ কে?
নিধু। আমার মুটে -মােট নিয়ে এসেছে। তুই ব্যাটা ত আচ্ছা
হতভাগ্য। আমি না হয় কথায় কথায় তাের পয়সা দিতে তুলে
গেছি—তুইও ত বেশ দিব্যি চুপ করে বসে আছি! এতক্ষণ যে
আর দুটো মােট বয়ে আর দু’পয়সা রােজগার করতে পারতিস।
এই নে বাবা তাের বার পয়সা
গােবিল। পয়সা নামাবলীতে বাঁধ ঠাকুর। তােমার মােট বয়ে পয়সা
নিলে গােবিন্দের গর্গের সিড়ি তৈরি হবে কি দিয়ে ! Hও ঠাকুর
অনাদি।
পথের শেষে তৃতীয় অঙ্ক একটু পায়ের ধূলাে, প্রণাম হই কর্তাবাবু, দিন দেওয়ানজী—বুড়ােকে একটু পায়ের ধূলাে দিন- অনাদি। গােবিন্দ না! তাইত! তুমি মুটে। গােবিন্দ। আমি মােট টানছি এই দেখেই চমকে উঠলে দেওয়ানজী- হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ- অনাদি। কেন গােবিল, তুমি কি আজকাল থােকাবাবুর কাছে থাক ! এই বয়সে তুমি মােট টাছ—আহা হা! গােবিন্দ। আহা হা অনাদি। থােকাবাবুর সংবাদ কি গােবিন্দ ? কোথায় আছে সে আজ কাল? মা-লক্ষ্মী আমার ভাল আছেন ত? গােবিন্দ ! আমি যে গােয়েন্দা লাগিয়েও তােমাদের সন্ধান পাইনি গােগাবিন্দ। বড় অসময়ে খোঁজ করছ দেওয়ানজী-আর যদি ছটামাস আগেও খোঁজ নিতে- কেন-কেন গােৰিন্দ ? দুর্গা। আছে ত—খােক বেঁচে আছে ত? গগাবিন্দ। থাকাই সম্ভব-মাস খানেক হল আমি তাদের হারিয়ে ফেলেছি। দাদাবাবু হয়ত বেঁচে আছে, কিন্তু কর্তাবাবু-তােমার সাগর সেচা মাণিক—তােমার সাত রাজার ধন-তােমার বংশের দুলাল-তােমার স্বর্গের সিড়ি—আমার থােকনমণি-ও হাে হাে- দুর্গা। কার কথা বল্ছ ? গােবিন্দ তােমার খােকার ছেলে- দুর্গা। এ্যা! আমার থােকার ছেলে হয়েছে। অনাদি-অনাদি- কই, খমা কই-(খামার প্রবেশ) ওরে আমার থােকার ছেলে হয়েছে। অনাদি, গাড়ী জুততে বল-তুমি কাঁদছ কেন গােবিন্দ, এখনই আমি নিজে গিয়ে আমার দাদাকে নিয়ে আসছি- অনাদি।
তৃতীয় দৃশ্য পরে যে গগাবিন্দ। কাকে আর আনবে কর্তাবাবু-সে পালিয়েছে। বাপমায়ের বুকে শেল হেনে সে ফাকি দিয়ে পালিয়েছে-সে আর নেই দুর্গা। নেই—সে নেই। গগাবিন্দ। -সে নেই। পয়সার অভাবে তার মুখে এক ফোটা বালির জল জোটেনি–পয়সার অভাবে তার মুখে এক ফোটা-ওষুধ পড়েনি-খেতে না পেয়ে রােগে ভুগে শুকিয়ে কুঁকড়ে-ওহহহহ ! আর আমি তাই দাড়িয়ে দেখেছি এই চোখে তাই দাড়িয়ে দেখেছি তবু এ পােড় প্রাণ বের হয় নিতবু বুকখানা ফেটে যায় নি ( বুক চাপড়াইতে লাগিল ) দুর্গা । ও হােহাে-না-না—আর বল না—আর শুনতে পারি না। পালাল-পালাল-মাথাটা ছুটে পালাল-অনাদি ধব, ধর, চেপে ধর অনাদি। শ্যামা-শ্যামা ! বাতাস কর। (খামার তথাকরণ) গােবিন্দ, তুমি আমার সঙ্গে ও-ঘরে এস। দুর্গা। নানা-না-দাড়াও-আমার থােকা? নিধু। এখন থাক। দুর্গাশঙ্কর! একটু সালে নাও বাবা। যাও গােবিন্দ, অনাদির সঙ্গে যাও- বেগে যােগেশের এবেশ যােগেশ। এই যে মামাবাবু এখানে! বাঁচলুম-রক্ষা করুন-রক্ষা করুন মামাবাবু-আমায় পুলিশে তাড়া করছে। দুর্গা। কে ?—হ, এইবার পেয়েছি-এইবার পেয়েছি তােকে, শয়তান ; -রাক্ষস ! তুই আমার, বংশ নাশ করেছি-আমার সর্বনাশ করেছি—আমি তাের বুকের রক্ত- দুর্গাশঙ্কর ছুটিয়া যােগেশকে আক্রমণ করিতে গেলেন ও নিজে ভূপতিত হইয়া মুচ্ছিত হইলেন। গামা অনাদি ও নিধু ধরাধরি করিয়া তাহাকে বিছানার উপর তুলিয়া শােয়াইয়া দিল। গামা মাথায় জল দিয়া বাতাস করিতে লাগিল == পnt তৃতীয় অঙ্ক নিধু। তুমি আবার যােগেশবাবু এ সময় কোথা থেকে উদয় হলে বলত- যােগেশ। আমায় বাঁচাও আমি নিবারণকে খুন করি নি—সত্যি বলছি—খুন করি নি-আমায় পুলিশে তাড়া কয়েছে-পেছন পেছন আসছে—এলাে বলে-চারদিন পেছন মিয়েছে—এক মুহূর্ত বসতে দেয় নি এক মুহূর্ত ঘুমুতে দেয় নি–এক মুঠো ভাত মুখে দিতে দেয় নি-দিন রাত তাড়া করেছে—বাঁচাও আমায় বাঁচাও- শাম। গােবি-দা! শীগগির যাও-পুলিশকে ডেকে ধরিয়ে দাও-- যােগেশ। নানা-ডে’ক না-ডে’ক না—আমায় তারা বেঁধে নিয়ে যাবেহাতকড়ি পরাবে—আমায় ফাঁসিকাঠে ঝােলাবে—আমায় বাঁচাও-গােবিন্দ, তামা, তােদর পায়ে পড়ি আমায় বাচা - নিধু। তবু লােকে মনে করে যে ধর্ম নেই । কি ক'লে যােগেশবাবু নিজে গেলে, আর মামারও সর্বনাশ করলে ! যােগেশ। নানা—আমি কিছু করি নি-আজ চারদিন কিছু খাই নি -এই দেখ, পেট শুকিয়ে গিয়েছে-বুক শুকিয়ে গিয়েছে—আমায় দু’টা খেতে দাও—আমায় বাঁচাও- গগাবিন। কি যােগেশবাবু, তুমি না এই বাড়ী থেকে একদিন আমার দাদাবাবুকে মুখের ভাত কেড়ে নিয়ে কুকুরের মত তাড়িয়ে দিয়েছিলে -আজ ?- শ্যামা। গড়িয়ে ক’ছ কি গােবি-দা-গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দাও-পুলিশ-পুলিশ- অনাদি। চুপ কর শ্যামা- শ্যামা। কি বলছেন দেওয়ানজী! চুপ ক’ব! ও কাকে বাদ দিয়েছে -সােণার সংসারটা মায়ে ছেলের শ্মশান করেছে- যােগেশ। এ, দেওয়ানজী! এতক্ষণ দেখতে পাইনি। যাক, আর তৃতীয় দৃ পরে যে ভয় নেই। দেওয়ানজী-দেওয়ানজী-আমায় আপনার পায়ে পড়ি দেওয়ানজী পায়ের উপর পড়িল) নিধু। তােমার বাহাদুরি আছে যােগেশ। এই লােকটাকে তুমি কি লাঞ্ছিতই না করেছ—আবার এখন—না, তােমার বাহাদুরি আছে! যােগেল। আমায় ক্ষমা করুন দেওয়ানজী—আপনার পায় পড়ি দেওয়ানজী, আমায় বাঁচান। ছেলে বেলায় আপনার কোলে মানুষ হয়েছি—আমায় মেরে ফেলবেন না, দোহাই আপনার অনাদি। যােগেশবাবু-না-আমি তােমায় রক্ষা ক’ব। নিধু। কি বলছ অনাদি ? অনাদি। শরণাগত-পায়ে ধরে কাদছে খুড়াে-- নিধু। দুর্গাশঙ্করের মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছ? অনাদি। বুঝেছি খুড়া। যােগেশবাবুকে নিয়ে এখনই আমি এ বাড়ী ছেড়ে যাচ্ছি! চল যােগেশবাবু-কোন চিন্তা নেই। তােমার জন্য আমার সর্বস্ব পণ। যােগেশ। আপনার এ উপকার দেওয়ানজী- অনাদি। আমি তােমাকে বেশ চিনি-বাড়াবাড়ি করে আমায় যােগেল। আরে মাআতে না- অনাদি। নিঃশব্দে আমার সঙ্গে এস- যোগেশসহ অনাদি এনােয়ত ও ঠিক সেই সময় সমুখ হইতে রাধা বৈষ্ণবীর প্রবেশ রাধা। বাবু কি এখানে আছেন? অনাদি। কে তুমি মা? কি চাও? বাধা। আমি একজন ভিখারিণী-জমিদারবাবুকে চাই ? এখানে কি তিনি-কে-কে ১৩০
পথের শেষে
তৃতীয় অঙ্ক
যােগেশ। কে ?
রাধা। -আমি শৈলবালা—চিনতে পাছ না যােগেশবাবু
যােগেশ। তু-তুমি-এ-এখানে ?
রাধা। তুমি এখানে কেন যােগেশবাবু?
অনাদি। যােগেশবাবু যে আমাদের জমিদারবাবুর ভাগিনেয়।
রাধা। এ! ওঃ—তাই—তাই কিন্তু কিন্তু এ এ বিচার—একের
পাপে অনা—একি অধ্যায় ! একি অন্যায় বিচার।
অনাদি। উন্মাদিনী! একে চেন যােগেশবাবু?
যােগেশ। চিনি। -কইনা!
রাধা। কি বলে যােগেশবাবু? ‘চেন না’! আমায় চেন না! বলতে
লজ্জা ক’ছে? আচ্ছা, আমিই বলছি। এই আমাদের জমিদার
পুত্র-এর পিতা আমাদের বৃদ্ধ জমিদারের মৃত্যুর পর ইনি আমাদের
শুভাশুভ, মান-ইজ্জত, জাতিধর্মের মালিক হলেন। স্বামীর ভিটায়,
স্বামীর গৃহে, স্বামীর শয্যায় সুখসুপ্ত আমি, নিশুতি রাত্রে এক
পাইক নিয়ে ঘরের বেড়া কেটে আমাদের ঘরে ঢুকে আমার স্বামীর
মাথায় লাঠি মেরে কে আমায় স্বামীর বাহুপাশ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে
গিয়েছিল—এই ইনি-আমাদের শুভাশুভ মান-ইজ্জতের মালিক।
সেই রাত্রে দু’ক্রোশ পথ টেনে নিয়ে কে আমার ইহকাল পরকাল
নষ্ট করেছে—এই ইনি—আমাদের জাতি-ধর্মের মালিক।
অনাদি। পাষণ্ড!
যােগেল। না-না-ও কথা শুনবেন না-মিথ্যা—সব মিথ্যা-
বাধা। মিথ্যা—সব মিথ্যা! যােগেশৰাৰু স্থিরভাবে কথাগুলো উচ্চারণ
কমতে পালে-জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে উঠল না-বুকের রক্ত জমাট
বেঁধে গেল না। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল দেখি যে এ
সব মিথ্যা কথা—দেখি একবার শয়তান তুমি কতটা ছাপিয়ে
১৩
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.