Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Mohon-madhuri

Bandhopadhyay, Avayacharan · 2009/09/15

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মােহন-মালী)
( নাটিকা )
শ্ৰীঅভয়াচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, এম, এ,
প্রণীত।
মূল্য ॥০ আনা।

Printed by N. Mukherjee
AT GUITA, MUKHERJEE & Co.'s PRESS
1, Wellington Square, Calcutta.

উৎসর্গ-পত্র।
মা !
বড় আদরের
মােহন-মাধুরী
সপিলাম চরণে।
তোমার কৃপায়
হ’ল অভিনীত
লভি সফলতা ধনে।
প্ৰণত--
অভয়।
দাজ্জিলিং,
১লা মে ১৯১৭।

No text on this page.

নাট্ট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ।
পুরুষগণ।
মন্ত্রী।
মহাদেব
বীরকেশর
ব্যাধরাজ।
সত্যশীল
ধনপতি
সভাসদগণ।
রঙ্গরাজ
নীলাম্বর
জনৈক কুলীন কিন্তু দরিদ্র ব্যাধ ।
নীলাম্বর পুত্র।
নন্দী, ভৃঙ্গী, রামদীন, দ্বারবান, তৃতীয় সভাসদ, কাপালিক,
ইত্যাদি, ইত্যাদি।
স্ত্রীগণ।
গৌরী
লীলাবতী
ব্যাধরাজ মহিষী।
মাধুরী
কন্য।
এলােকেশী
নীলাম্বরের পত্নী।
মল্লিকা
মাধুরীর সখিদ্বয়।
তরলিকা
জয়া, বিজয়া, বৃদ্ধা পুরবাসিনী, জনৈক প্রতিবাসিনী, বনদেবী
ও সখীগণ, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

No text on this page.

মােহন-নারী ।
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক
রাজসভা।
( রাজা বীরকেশর সিংহাসনে সমাসীন, উভয় পার্শ্বে মন্ত্রী ও অন্যান্য
সভাসদবর্গ নিজ নিজ আসনে উপবিষ্ট ।)
রাজা। মন্ত্রিবর!
ছদ্মবেশে মম রাজ্যে দেখিনু সকলি
তন্ন তন্ন করি ; মাঠ, কানন, প্রান্তর,
উপত্যকা, নদীতট, গিরি-নিঝরিণী
ভ্রমেছি সকলি আমি ; কিন্তু নাহি দেখি
কোন স্থানে দরিদ্রের বাস। গৃহে গৃহে
নিরন্তর কলরব, নাহিক ক্রন্দন।

মােহন-মাধুরী।
মন্ত্রী।
ভাসিতেছে মম প্রজা আনন্দের নীরে,
হাসিতেছে শস্যক্ষেত্রে শস্য-শ্যাম-ধরা।
স্থানে স্থানে ব্যাধগণ দলবদ্ধ হয়ে
কহিছে সুখের কথা। আমার শাসনে
সকলেই সুখী, দুখী কেবল তস্কর
পরদ্রব্য হরণের সুবিধা অভাবে।
প্রজাই রাজার পুত্র। প্রজাদের সুখে
কি যে সুখ উপজিল মনে, সচিবেশ ।
পারি বর্ণিতে। আহা ! ঈশ্বর-কৃপায় ।
চিরদিন এই সুখ যেন প্রজা পায়।
মহারাজ!
আপনার সুশাসনে প্রজা সব সুখী,
আপনার সুশাসনে দ-দল দুঃখী,
আপনার পুণ্যবলে নাহি রােগ শােক,
আপনার সুবিচারে তুষ্ট সৰ্ব্বলােক।
যে দিকে ফিরাই আঁখি, সব সুখময় দেখি,
নাহি হেরি কোন স্থানে বিষাদের লেশ,
কিবা সুমধুর শান্তি-হর্ষ-সমাবেশ।
ধনপতি। আঃ তার আর কথা কি। মহারাজের রাজ্যে যে
সকলেই সুখী, এ কথা কোন্ নিমহারা অস্বী-
কার করবে। এই আমাদের দিয়েই দেখনা কেন।
আমরা যে পায়ের উপর পা দিয়ে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে

প্রথম গর্ভাঙ্ক। সুখস্বচ্ছন্দে দিন গুজরাণ কচ্চি এ কেবল মহা- রাজেরই অনুগ্রহে। রঙ্গরাজ। আহা, তা ত বটেই। তবে কিনা সকল বিষয়েই শ্রেষ্ঠ কোন জিনিষ সচরাচর নাকি দেখতে পাওয়া যায় না, তাই আমাদের এই রাজ্যটী সৰ্বাঙ্গসুন্দর হতে হ’তেও একটুখানি খুত রয়ে গেছে। সৰ্বাঙ্গসুন্দরই বলতে হবে ; তবে ঐ খুতটুকু পূরণ হলেই সৰ্বাঙ্গসুন্দরের উপর আরও এক- কাঠি সরেশ হয়ে দাড়াবে। রাজা। কি কি রঙ্গরাজ, আমার রাজ্যে তুমি কি খুঁত দেখেছ ? রঙ্গ। ( করঘােড়ে ) আজ্ঞা খুত এমন কিছু নয়। তবে মহারাজ ! সাহস না দিলে বলতে পারি না। রাজা। বল তােমার কোন ভয় নাই। রঙ্গ। বলছিলুম কি এই যে মহারাজের রাজ্যে সবই ভাল, কেবল একটী বিষয়ে একটুখানি অপ্রতুল আছে। সেটী আর কিছু নয়——আপনার রাজ্যে একটী দান- ছত্ৰ থাকিলেই সােনায় সােহাগা হয় । রাজা। কি ? কি ? রঙ্গ। ( করঘােড়ে ) আজ্ঞা একটী দান-ছত্র, যেখানে ভিক্ষুক- দিগের অবারিত দ্বার, যে খেতে না পায় সে যেখানে উদর পূরিয়া ভােজন করিতে পারে। তা হলে সময় বিশেষে এ গরীব ব্রাহ্মণেরও অনেক উপকার হতে পারে।

৪ মােহন-মাধুরী। ধনপতি। কাজেই। ব্রাহ্মণীর ঝাঁটা খেয়ে তখন ত আর পেট ভবে না । রাজা। ও এই কথা; তা সেটা না হয় তােমার পুত্রের বিবাহের সময়ই করা যাবে, কি বল ? সে সময় দান- ছত্র খুলিলে, তােমার ব্রাহ্মণভােজন, শূদ্রভােজন ও ইতরভেজন ও চাই কি রাজ্যশুদ্ধ সকলের ভােজনের বিলক্ষণ সুবিধা হতে পারবে । মহারাজ! অমন আজ্ঞা করবেন না ; ব্রাহ্মণভােজনের উপর আমার ব্রাহ্মণী বিলক্ষণ চটা রাজা। কেন, কেন ? রঙ্গ। আজ্ঞা ব্রাহ্মণী বলেন যে শাস্ত্রে আছে গােব্রাহ্মণ হিতায় চ, তা আমি যখন গোপাৰ্বন করি তখন আমার আবার ব্রাহ্মণভােজন করাবার দরকার কি ? রাজা। আচ্ছা সে কথা থাক্। বলি তােমার অর্ধাঙ্গিনীর কি অন্য কোন সাধ যায় না ? মহারাজ! সে আমার অর্ধাঙ্গিনী কি বল্‌চেন, সাত জন্ম তপস্যা করলে আমি তার অর্ধাঙ্গ হতে পারি কি না সন্দেহ। (জনৈক দ্বারবানের প্রবেশ ) দ্বারবান। ( অভিবাদন করিয়া) মহারাজ! দ্বারদেশে এক জন ব্যাধ আপনার সহিত সাক্ষাৎকামনায় দণ্ডায়মান। অনুমতি হয় ত রাজ সভায় আসিতে বলি । রাজা। আচ্ছা, তাহাকে আসিতে দাও।

প্রথম গর্ভাঙ্ক। দ্বারবান। ( অভিবাদন করিয়া) যে অজ্ঞা মহারাজ। [ প্রস্থান ] (ভেট হস্তে নীলাম্বরের প্রবেশ) নীলাম্বর ( সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত পূৰ্ব্বক) মহারাজ ! প্রণাম হই। আপনার সুশাসনে এ দীনের ঐহিক পার- ত্রিক সমস্তই মঙ্গল। আজ আমার বড় শুভদিন। কিছু দিন হ'ল, আপনার একটী প্রজাবৃদ্ধি হই- য়াছে। আর সেই শুভদৃষ্ট বশতঃই আজ সাক্ষাৎ ধৰ্ম্মস্বরূপ আপনার দর্শন পাইয়াছি। মহারাজ। আপনি গরীবের মা বাপ, আপনার এই গরীব প্রজার ভক্তি-নিদর্শন-স্বরূপ এই যৎসামান্য উপ- ঢৌকন গ্রহণ করিয়া আমায় কৃতার্থ করুন। ( ভেট দৃষ্টে) কোই হায়রে ? ( নেপথ্যে ) যাতা হে ধর্মাবতার। ( এক জন দ্বারবানের প্রবেশ।) রাজা। রামদীন, তুমি একে চিত্ৰগৃহে নজরবন্দী করিয়া রাখ, ( নীলাম্বরের প্রতি ) তুমি এখন এর সঙ্গে যাও। [ নীলাম্বর ও রামদানের প্রস্থান। রাজা। মন্ত্রিবর ! বৃথা মম রাজ নাম, বৃথা এই রাজ্য, বৃথা মম অহঙ্কার। এতক্ষণ আমি মায়াঘােরে আচ্ছাদিত হইয়া কেবল

৬
মােহন-মাধুরী।
মনে করেছিনু, রাজ্যে সকলেই সুখী।
মরুভূমে পিপাসায় কাতর পথিক
মৃগতৃষ্ণিকায় দেখি যথা মনে করে,
অই জল দেখা যায়। কি ভ্রম! কি.ম !
এই নীলাম্বর, দেখ, এ রাজ্যের প্রজা,
দরিদ্রের একশেষ কিন্তু এই ব্যাধ ।
যেই উপহার আজি দিয়েছে আমায়,
দীন হীন ভিখারীও নাহি দেয় তাহা
রাজার সমীপে ধরি। মম রাজ্যে হায়!
কেন এত অকিঞ্চন নির্ধনের বাস?
এত যে যতন মম প্রজার কারণ,
তাদের সুখের তরে এত পরিশ্রম,
সকলি কি বৃথা হল ? নিদারুণ বিধি,
এই কি হে ছিল ভালে ? অহ পরিতাপ ।
( ক্ষণেক চিন্তিয়া )
আচ্ছা এর প্রতীকার অবশ্য করিব ;
মম রাজ্যে নাহি হবে ভিক্ষুকের স্থান।
হয় এরে রাজ্য হতে করি বহিষ্কৃত
ঘুচাব সকল পাপ।
কারাগারে সাতদিন বন্দী করি রাখি’
দিব সমুচিত শাস্তি, যা থাকে কপালে ।
[ সকলের প্রস্থান ]
নতুবা ইহারে

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক,
উদ্যান ।
(লতাকুঞ্জ মধ্যে মল্লিকা ও তরলিকা আসীনা।)
(গীত )
ফুল তুলি আয়লাে সজনি।
( মালা গাঁথিব, মালা গাঁথিব মনের সাধে )
জাতি, ঘূতি, শেফালিকা, মালতী আর মল্লিকা,
মতিয়া, বেল আর চামেলী টগাের—
খুঁজি খুঁজি নারি, যে পায় তারি,
মিনি সুতার হার যে গাঁথে তারে বলি গাঁথনী।
ভালবাসে রাজবালা, মালা লয়ে করে খেলা,
গাঁথিয়া চিকণমালা পরাব খোপায়—
ফুলের মুকুট শিরে, কত শােভা করে,
ফুলের অঙ্গে ফুলের ভূষণ, ফুলে ফুলে গাঁথনী।
মল্লিকা। আচ্ছা ভাই তরলিকা, তুই বল্‌তে পারি, কেন
আমাদের রাজকন্যা আজকাল সৰ্ব্বদাই অন্যমনস্ক।
বসে বসে কি যে মাথা মুণ্ড ভাবেন, তার কিছুই কুল
কিনারা পাওয়া যায় না।

৮
মােহন-মাধুরী।
তরলিকা। তুই ভাই হাঁসালি। ওলাে, রাজকুমারী যে কি
জন্য এত ভাবে এর কারণ, যে নেহাত বােকা সেও
বলে দিতে পারে।
মল্লিকা। তবে আমি বুঝি তারও চেয়ে বােকা ? আচ্ছা
তুই বল দেখি, তা হলে আমি তােকে খুব বুদ্ধিমতী
বল্ব।
তরলিকা। তবেই ত আমার চারটা হাত পা বেরুবে।
হচ্চে না, আগে বল্ কি দিবি। তারপর না হয়
তােমায় রাজকুমারীর চিন্তার কারণ বলা যাবে।
মল্লিকা। তুই যা চাবি তাই পাবি।
হরলিকা। সত্যি নাকি।
সত্যি নাকি। ওমা কি হবে, তবে নাকি মল্লিকা
আমার কিছুই জানেনা। আমি ভাবি, মল্লিকা
আমার বনের মল্লিকা, ওমা তা নয়। মল্লিকা
আমার চতুরের শিরােমনি !
মল্লিকা। আচ্ছা ভাই আমি তােকে কি বলুম যে তুই আমায়
এত কথা শুনিয়ে দিলি ?
তরলিকা। ওই যে বল্লি তুই যা চাবি তাই পাবি, আমি হাবী
বলি—আর আমায় এক ‘ই’ দিয়ে ঠকিয়ে দাও।
আবার ন্যাকামি হচ্ছে দেখ, যেন কিছুই
জানেন না।
মল্লিকা। সত্যি ভাই তরলিকা, আমি যখন ওকথা বলেছিলুম
তখন ও মনে করে বলিনি ; তুই ভাই রাতকে দিন

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। ৯ কর্তে পারি। তা যাক্ ভাই ও সব কথা, এখন কাজের কথা বল্। তরলিকা। কাজের কথার মধ্যে প্রথম কথা এই যে নদী এখন পাহাড়ের আশ্রয় ছাড়িয়া সমুদ্রের দিকে যাইতে বসিয়াছে, বুঝলি ? মল্লিকা। কতক কতক। আচ্ছা ভাই কার এমন কপালের যাকে রাজনন্দিনী ভালবাসার চক্ষে দেখেছেন। তরলিকা। অন্দাজ করনা। মল্লিকা। তুই হাসবি না ত ? তরলিকা। হাঁসবার কথা না হলে হাঁসব কেন ? মল্লিকা। দেখ, ভাই যদি কুলে শীলে রাজকন্যার সমান পাত্র তার মনােনীত হয়ে থাকে, তা হলে অরিন্দমের রাজ- পুত্রই ভাবী রাজ-জামাত। তরলিকা। দূর সে ছেলে মােটেই ভাল নয়, তার হাতে রাজ- কন্যাকে সঁপে দেওয়া আর বাঁদরের গলায় মুক্তার মালা দেওয়া একই কথা। মল্লিকা। তা যেন হ’ল। আচ্ছা মন্ত্রীপুত্র অঙ্গনাথ ? তরলিকা। দু পাগলি, সে যে রােগা, কালো, আবার বাঁকা, যেন ত্রিভঙ্গমুরারী। মল্লিকা। না ভাই তাের সঙ্গে আমি পারব না। আমি যার নাম করূব তুই একটা না একটা খুত বার কবি।

১০
তরলিকা।
মােহন-মাধুরী ।
তাের আর নাম কতে হবে না, চ, রাজকুমারী
কি কচ্চে দেখিগে।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
(মাধুরীর প্রবেশ।)
মাধুরী।
গীত।
কেন প্রাণ কাঁদে কে জানে।
কেন বা বহেগাে নীর দুটি নয়নে।
কেন ভাল বিকাল বেলা, নাহি লাগে ছেলে খেলা,
কেন বা ফুল্ল কুসুম নাহি ধরে মনে
বল মন তোমার কথা,
কেন শুধু পাওলাে ব্যথা,
হতেছে যা দাওলল বলে, কাজ কি গােপনে।
প্রিয়সখীরা ত অনেকক্ষণ ফুল
তুলতে গেছে।
এখনও
ফিরে আচে না কেন?
(সহসা মােহনের বেগে প্রবেশ )
ওকি মােহন, কি হয়েছে, অমন কচ্চ কেন ?
মােহন। মাধুরী! সর্বনাশ হয়েছে ; বাবাকে, তােমার বাপ, কি
কারণে বলতে পারি না, নজরবন্দী করে রেখেছেন।
মাধুরী। আঁা সে কি, আমি এখনই চলুম।
মােহন। না মাধুরী! দাড়াও, তুমি ছেলে মানুষ ; তুমি কি করবে।
মাধুরী। আমি বাবার পায়ে ধরে মিনতি করে তােমার বাপকে
ছেড়ে দিতে বলব।
••

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
১১
।
মােহন। না মাধুরী! তােমার বাপকে কিছু বলােনা। আমাদের
যে রূপ দুরদৃষ্ট, তাহাতে কি জানি পাছে হিতে
বিপরীত হয়।
তিনি তােমার কথায় রাগ করে
আরও কঠিন দণ্ড দিতে পারেন।
মাধুরী। না মােহন ! তােমার কোন ভয় নাই। বাবা সে
রকম নন। তুমি যদি বল আমি এখনি যাই।
মােহন। হঁা যাও।
( মাধুরীর প্রস্থানােদ্যোগ।)
মাধুরী-মাধুরী! একটু দাড়াও, মাধুরীর প্রত্যা-
বৰ্ত্তনােদ্যোগ ) না না তুমি যাও, উঃ—না জানি বাবা
এতক্ষণ কত কষ্টই পাচ্ছেন ।
মাধুরী। মােহন, মােহন! তুমি অমন কচ্চ কেন ? তবে
কি আমার যাওয়া তােমার মত নয় ?
মােহন। সম্পূর্ণ মত। ( স্বগত) হায়, এই সরলা বালিকাকে
কি বলে বুঝাই। (প্রকাশ্যে ) মাধুরী! তুমি যাও,
আর আমি তােমায় ডাব না।
মাধুরী। তবে এখন আমি মার কাছে চলুম ।
পায়ে ধরে বাবার যাতে মত ফিরে তার চেষ্টা
দেখিগে। ( কিয়দ্র গমন)
মােহন। মাধুরী! মাধুরী! না, না, ( মৃদুস্বরে ) উঃ আমি
কি স্বার্থপর নরাধম। মাধুরী !–না–যাও।
( একদিক দিয়া মাধুরীর ও অপরদিক দিয়া মােহনের প্রস্থান।)

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক
রাজবাটীর অন্তঃপুর।
রাজ্ঞী লীলাবতীর কক্ষ।
(লীলাবতী ও এক জন বৃদ্ধা পুরবাসিনী আসীন।)
আহা মা আমার যেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মী ! মার আমার
লাবণ্য ছটায় প্রদীপের আলাে মিটিমিটি করতে
থাকে, মধুমাখা কথায়
কথায় কোকিলও লজ্জা পায়।
আমি পূৰ্ব্বজন্মে কত কঠোর তপস্যা করেছিলাম, সেই
তপস্যার ফলে এমন সুশীল কন্যা পেয়েছি।. বল্‌তে
কি যখন আমি মার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকি, আমার
বােধ হয় যেন কোন দেবী শাপ-ভ্ৰষ্টা হয়ে আমার
কন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করে এই অধিনীকে কৃতার্থ
করেছেন।
বৃদ্ধা। আহা, রাণীমার এক কথা। বালাই, ও কথা কি,
বতে আছে ? ওতে যে তােমার মেয়ের অকল্যাণ হবে।
লীলা।
তা জানি বাছা, কিন্তু তবু না বলেও থাকতে পারি
। মার আমার গুণে বল্‌তে হয়। আহা ভগবান্
কি এমন মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখবেন? আমার কি

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
এমন কপাল হবে যে মেয়ের মুখ দেখতে দেখতে
যেতে পারব।
বৃদ্ধা। হ্যা মা, তা মেয়েটীও ত দেখতে দেখতে বড় হয়ে
উঠল। শত্রুমুখে ছাই দিয়ে তােমার মেয়েটীত
আর নেহাত রােগা নয়। দিবিব দোহারা দাহারা,
এরি মধ্যে যেন বড় সড় বলে মনে হয়। তা হাগা
মা, মেয়ের বিয়ের কি কচ্চ ?
লীলা। কি জানি বাছা! মহারাজই জানেন। তাকে এত
করে বলি যে মেয়ে বিয়ের যােগ্য হয়েছে ; সুপাত্র
দেখে শীঘ্র ওর বিয়ে দাও। মহারাজ শুনেও শুনেন
বলেন “আমার সন্তানের মধ্যে এই একটী
মেয়ে, ওকে নয়নের অন্তরালে রেখে আমি থাক্‌তে
পাবনা।”
বৃদ্ধা। ওমা ওকি কথা গাে ! তবে কি মেয়ে চিরকাল
আই-বড় থাকবে?
লীলা। না তা কেন থাক্‌বে ? সকলি ভগবানের হাতে।
মাতেও তিনি, রাখতেও তিনি।
মাধুর আমার
বিয়ের ফুল ফুটলে তিনিই যেখান থেকে হক্ বর
যুটিয়ে দিবেন, আর মহারাজেরও মতি ফিরিয়ে
দিবেন।
তবে দুদিন অগু আর দুদিন পেছু। :( দূরে
দৃষ্টি পূৰ্ব্বক) ওমা ওই না মাধু আছে ? আহা মার
আমার মলিন মুখ দেখে আমার বুক ফেটে যাচ্চে।
না,

১৪: লীলা। লীলা। মােহন-মাধুরী। (মাধুরীর প্রবেশ।) হামা মাধু! তাের মুখ শুক্নাে শুনাে কেন ? মহারাজ কি বকেছেন ? মাধুরী। না মা ! বাবা কি কখন আমায় বকেন? তবে কি সখীরা কেউ কিছু বলেছে ? মাধুরী। তারা আমার প্রাণের তুল্য ভালবাসে, তারা আবার কিছু বল্‌বে তবে কি হয়েছে মা প্রকাশ করে বল, তাের বিষাদ- মাখা মুখ দেখে আমার প্রাণ বড় ব্যাকুল হয়েছে। মাধুরী। দেখ মা ! বাবা মোহনের বাপকে বিনা দোষে কয়েদ করেছেন। আমি আতে আসতে মন্ত্রী মহাশয়ের কাছে শুনলুম যে তিনি অত্যন্ত গরীব, শুদ্ধ এই তঁার অপরাধ। বৃদ্ধা। ওমা সেই জন্য বুঝি মনের দুঃখে চাদমুখখানি মলিন হয়ে গেছে! লীলা। তুই কি চিরকালই পরের জন্য প্রাণ কঁাদাবি ? এখন ত আর ছেলেমানুষটী নও-জ্ঞান হয়েছে। রাজা যদি কাহাকে শাসন করেন, দোষেই হ আর বিনা দোষেই হতাহাতে আমাদের দুঃখ করে লাভ কি ও রাজা ত আর আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করে রাজ্য শাসন করেন না। মাধুরী। মা রাগ করােনা! তােমার পায়ে পড়ি, বাবাকে

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
বলে কয়ে যাতে তার মত ফিরে তাই কর। আমি
পুরাণে শুনেছি যে নির্দোষীর দণ্ড দেওয়া মহাপাপ।
হা মা সেই মহাপাপ থেকে বাবাকে মুক্ত করা
কি তােমার উচিত নয় ?
লীলা। দেখ, খেপা মেয়ের রকম দেখ ? . আমি মহারাজকে
এ কথা কেমন করে বলি ; আর আমি বল্লেই বা
তিনি শুনবেন কেন? আমি যখন যখন রাজ্য
সম্বন্ধে কোন কথা তাহাকে বলেছি, তিনি অমনি,
সে কথা হেঁসে উড়িয়ে দিয়ে পরিহাস করে আমায়
বলেছেন, “দেখ আমার মন্ত্রীটী বুড় হয়ে পড়েছে,
রাজকাৰ্য থেকে অবসর পেলেই বাঁচে ; তা এইবার
তাকে জবাব দিয়ে সেই পদে তােমায় নিযুক্ত করা
যাবে, কেমন ?” আমি ত লজ্জায় মরে যাই। না মা,
একথা আমা হতে বলা হবে না।
মাধুরী। তবে আমি নাবও না, খাবও না আর শােবও না।
কারও সঙ্গে কথাও কবনা।
চুপটীকরে এল।
বসে থাকব।
লীলা। এমনি করে কি মাকে জ্বালাতে হয় ? এতে বুঝি
পাপ হয় না। লক্ষ্মী মা আমার, ছিঃ কেন আপনার
মনে দুঃখ করে তাের এই দুঃখিনী মাকে কাদাস্?
হ্যা ভাল কথা মনে পড়ল—মুখে আগুন পােড়া
মনের—তােকে এতক্ষণ বলতে ভুলে গেলুম,

মােহন-মাধুরী। তাের কাকা অঙ্গদেশের রাজা যে তাের জন্য কেমন ভাল ভাল খেলানা, ভাল ভাল পুতুল আর খাস কাপড় পাঠিয়ে দিয়েছে। ( বৃদ্ধার প্রতি) কেমন গগা বাছা! তেমন সুন্দর জিনিস কি আর কখনও দেখেছ ? বৃদ্ধা। বাপের জন্মেও না। লীলা। ওই শুনলি ত, আমার কথায় যদি বিশ্বাস না হয়। চ দেখিন্ জিনিস গুলো সব গুচিয়ে রাখিগে। কাপড় খানি পবি চ, তােকে কেমন মানায় দেখতে হবে ? আর পুতুল ও খেলানা গুলি তাের পুতুল ও খেলানার বাক্সে তুলে রাবি চ। ওমা এই যে মুখে হাসি বেরিয়েছে। মাধুরী। তােমার কাণ্ড দেখে হতে হল। মা! তুমি হাজারই লােভ দেখাও, আমায় ভুলাতে পাচ্চ না। বল, বাবাকে যা বলতে বল্লম ববে, নইলে এই আমি চলুম, আমার মনে যা আছে তাই করব। লীলা। ( বৃদ্ধার প্রতি) দেখলেত বাছা, ভবী ভােলবার নয়। মেয়ের সব গুণ কেবল এক দোষ, বড় এক- গুয়ে। যা ধরবে কিছুতেই ছাড়বে না। এখন আমি কি করি, কাজেই মহারাজকে বলতে হ’ল। যাও তাঁকে ডেকে নিয়ে এস, তারপর যা হয় তাই হবে। ( বৃদ্ধার প্রস্থান।)

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
১৭
লীলা।
মাধুরী। মা, আমি তবে এখন আমার ঘরে যাই।
কেন একটু দাড়ানা; রাজা কি বলেন শুনে যাবি।
মাধুরী। না মা! তুমি যদি বল যে মাধুরী এই কথা বলেছে
তা হলে আর আমি লজ্জায় তাঁর কাছে মুখ দেখাতে
পারব না। ওই
ওই বুঝি বাবা আছেন। দুঃখিনী
মেয়ের ভিক্ষা যেন মনে থাকে। আমি এখন যাই।
( এক দিক্ দিয়া মাধুরীর প্রস্থান ও অপর দিক্‌ দিয়া
মহারাজ বীরকেশরের প্রবেশ।)
রাজা। মহিষি ! তুমি আমায় ডেকেছ ?
লীলা। হা মহারাজ! আপনার নিকট অধিনীর এক
নিবেদন আছে।
রাজা। কি নিবেদন শীঘ্র বল। আমার এখন বিলম্ব করুবার
সময় নয়।
লীলা। আপনি কি আজ কোন নির্দোষীর কারাদণ্ড-বিধান
করেছেন ?
রাজা। কই আমার ত মনে হয় না, একথা কেন ?
লীলা। নীলাম্বর বলে যে ব্যাধ, তাকে কি দোষে নজরবন্দী
করে রেখেছেন ?
রাজা। মহিযি : তুমি কি তাকে নির্দোষী বলতে চাও?
আমি যথেষ্ট অপরাধ না পেলে কাহাকেই কারাবদ্ধ
করি না। কি আশ্চর্য ! সে যে নির্দোষী একথা
তােমায় কে বলে ? আর তােমাদেরই বা এ সকল

১৮
মােহন-মাধুরী।
কথা লইয়া বাদানুবাদ করিবার আবশ্যকতা কি ?
তােমরা স্ত্রীলােক, স্ত্রীলােকের মতন
থাক্‌বে।
রাজকার্য সম্বন্ধে প্রশ্ন করা কি তােমাদের অনধিকার
চর্চা নয় ?
লীলা। নাথ! তােমার পায়ে পড়ি, রাগ করােনা। নীলাম্বরের
অপরাধ যাহাই হনা কেন, তাহার লঘু পাপে
গুরুদণ্ড হইয়াছে। নাথ ! আমি তােমার কাছে
কখনও কিছু ভিক্ষা করি নাই। এই আমার প্রথম
ভিক্ষা এবং এই ভিক্ষাই আমার শেষ। তুমি
নীলাম্বরকে মুক্ত করে দাও।
রাজা। মহিষি ! “হাকিম নড়ে ত হুকুম নড়ে না” আমার
হুকুম রদ হবার নয়, তুমি এ বিষয়ে আর আমায়
অনুরােধ করিও না।
আচ্ছা মহারাজ, আমার কথা রাখলেন না—নাই
রাখলেন, তাহাতে আমার বিশেষ কোন দুঃখ নাই
দাসীর এমন কি গুণ আছে যাতে আপনার মনােরঞ্জন
করিতে পারি। কিন্তু মহারাজ! স্নেহময়ী সরলা মা
আমার, যার মুখ দেখে আমরা উভয়েই জীবন ধারণ
করিয়া আছি, যাকে নয়নের অন্তরালে রাখতে হবে
বলে আপনি তার বিবাহ দিতে নারাজ, যার চাঁদমুখ
দর্শনে জগতের জ্বালা যন্ত্রণা সব ভুলে যাই—সেই
স্নেহের প্রতিমা তনয়ারও যদি নীলাম্বরের কারা-
লীলা।

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
মােচনের ইচ্ছা হয়ে থাকে, তা হলে মহারাজ!
তা হলেও কি আপনার হুকুম রদ হবে না?
রাজা। রাজ্ঞি ! তুমি আমায় ভাবালে।
তুমি আমায় ভাবালে। সত্য সত্যই কি
নীলাম্বরের কারাবাস জন্য মাধুরী মনে কষ্ট পেয়েছে ?
লীলা। মহারাজ! আমি কি আপনার নিকট মিথ্যা বলতে
পারি ? আহা! মা আমার এই কথা শুনা অবধি
নাওয়া খাওয়া ত্যাগ করেছে।
রাজা। বটে? আচ্ছা তাকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে এস।
( লীলার প্রস্থান ও ক্ষনেক পরে মাধুরীকে লইয়া প্রবেশ।)
একি হেরি মাধুরিমা ! তব আচরণ,
রাজদণ্ডে দণ্ডিত যে তাহারি কারণ
ভেবে ভেবে শুখায়েছে চঁাদ মুখ খানি
এই কি উচিত, হয়ে রাজার নন্দিনী ?
মাধুরী। কি বলিব পিতঃ ?—অমি বলিতে ডরাই,
মুখরা বলিয়ে পাছে মহানিন্দা পাই।
কিন্তু সর্ব ঘটে থাকি, সেই সময়
যা বলান, তাই বলি ত্যজি লাজ ভয়।
সেই জগদীশ যারে যখন যেরূপে
রাখেন, সে জন থাকে তখন সেরূপে।
অতএব নীলাম্বর নহে অপরাধী,
কেমনে পাইবে ধন বিধি প্রতিবাদী ?
ক্ষমার সমান ধৰ্ম্ম নাহি এ ধরায়,
?
।

২০
মােহন-মাধুরী।
ক্ষমাগুণে হয় নর ঈশ্বরের ন্যায় ।
ক্ষমা গুণ দুই জনে পরিত্রাণ করে,
যেই পায় ক্ষমা আর যে জন বিতরে।
“হে ঈশ্বর । ক্ষমা কর” যেই জন বলে,
পর দোষে ক্ষমা তার উচিত ভূতলে।
ক্ষম নীলাম্বরে পিতঃ মজিও না মােহে,
দুঃখিনী দুহিতা তব এই ভিক্ষা চাহে।
[ প্রস্থান ]
রাজা। মহিষি ! ঘুচিল মম মােহ এতদিনে
বাণীসমা বুদ্ধিমতী কন্যার বচনে।
তুষ গিয়া তনয়ারে মধুর বাক্যেতে,
চলিলাম নীলাম্বরে মুক্ত করে দিতে।
[ সকলের প্রস্থান ]

চতুর্থ গর্ভাঙ্ক
নীলাম্বরের কুটীর।
( চরকা হস্তে এলােকেশী আসীনা।)
৫৫
এলাে। মিসেকে এত করে বারণ কলুম যে রাজবাড়ী গিয়ে
কাজ নাই, তা পােড়ার মুখাে কি আমার কথা কানে
তুল্লে ? এখন কেমন তার ফল হাতে হাতে পেতে
হল ? রাজা কয়েদ করেছেন, বেশ হয়েচে, খুব
হয়েছে, যেমন কর্ম তেমনি ফল । কথায় বলে—
গুরুর কথা না শুনলে কানে
প্রাণ যাবে তােমার হেঁচকা টানে।”
তা একথা কি মুখ পােড়ার কপালে একেবারে ঠিক
খেটে গেল গা? আ, রাগে আমার গা এখনও যেন
নিসৃপিস্ কচ্চে। হতভাগার ঘটে যদি এক কড়ার
বুদ্ধি থাত তা হলে কি আর এমন হয় ? ঠিক
হয়েছে, অতি বাড় ভাল নয়।
( জনৈক প্রতিবাসিনীর প্রবেশ।)
প্রতি। কি গা বউ, সকাল বেলা উঠে কার শ্রাদ্ধ কচ্চ?
কি হয়েছে?

२२
মােহন-মাধুরী।
ক
এলাে। হবে আবার কি, আমার মাথা আর মুণ্ডু হয়েছে।
পাড়ার যারা পরের ভাল দুচক্ষে দেখতে পারে না,
পরের সর্বনাশ যাদের জপমালা, তাদেরি শপ এত
দিনে ফলেচে। কিন্তু এও বলি, আমি যদি সতী হই
তা হলে তাদের ও এমনি করে জ্বালাতন পােড়াতন
হতে হবে। আর তাদেরি বা দোষ কি, মিসেরি কি
ছাই আক্কেল ভাল? তা হলে ভাবনা কি। তুই
বাবু যেমন মানুষ তেমনি থাক, তা নয় ; তুই
তাড়াতাড়ি রাজার কাছে না গেলে ত আর রাজা
তােকে ফৌজ পাঠিয়ে এখান থেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে
গিয়ে জেলে পুতনা ।
আবার ভেট নিয়ে রাজভক্তি
দেখাতে গেছেন। ওর সাত পুরুষের শ্রাদ্ধ কৰ্ত্তে
গেছেন !
প্রতি। ছি বউ, ও কথা কি বল্‌তে আছে ?
এলাে। সাধে বলি, গায়ের জ্বালায় বলি, আমার যে আর
বরদাস্ত হয় না। রক্তমাংসের শরীরে আর কত সহ
হবে ? দেখ দেখি দিদি! ( ক্রন্দনের সুরে) সেই
যে বিয়ের বেলা মা বাপ এক খাড়, আর এক নােয়
দিয়ে বিদেয় করে দিয়েছিল, সেই অবধি আর অন্য
আভরণ অঙ্গে উঠলনা। দুঃখের কথা বলব কি
দিদি ! আমি মেয়ে মানুষ, আমার কিছু আর সংসার
চালাবার কথা নয়। তবু আমি এর বাড়ী ওর বাড়ী

চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
।
মেগে পেতে ভিক্ষে সিক্ষে করে, ধান ভেনে পাট
কেটে এক রকম করে ত দিন গুজরাণ কচ্ছিলেম।
বলব কি দিদি, মিনসের এমনি কঠিণ প্রাণ যে খেটে
খেটে আমার জান হায়রাণ হয়ে গেল, তবু একটি দিন
তার মুখ দিয়ে একবার “আহ” শব্দটী বেরিয়েছে?
চুলােয় যাগগে, ও কথাও ধরি না। আমি গতর
খাটিয়ে যা আনি তাই না হয় দুঃখের ভাত সুখ করে
খা; তা নয়, যত দুৰ্ব্বদ্ধি এর কাছে এসে যােটে।
প্রতি। আহা বউ, হাজার হেক্‌ তিনি তােমার স্বামী, তাকে
কি এমন করে বলতে আছে ?
এলাে। মুখে আগুণ অমন স্বামীর। কালামুখাে যদি এক
দিনের তরে ও আমায় সুখে রাখত, তা হলে কি
অমন কথা আমার মুখ দিয়ে বেরুত ; তা কত
রেখেছে তােমারা ত তা দেখতে পাচ্চ। এর এক
পয়সা রােজগারের ক্ষমতা নাই; কিন্তু কথায় কথায়
তম্বি করা আছে, ‘কাজে কুড়ে ভােজনে দেড়ে, বচনে
মারেন পুড়িয়ে পুড়িয়ে।
প্রতি। আহা! তাহা হলেত তােমার বড় কষ্ট ? তা হাঁ
বউ, তুমি এত কষ্ট সহ্য কচ্চ কেন? তােমার স্বামী
এত কুড়ে, কিন্তু এক কাজ কত্তে পাল্লেই ত ঠিক
সােজা হয়ে যায়। আমরা ত অমন লক্ষ্মীছাড়ার হাতে
পড়লে তাকে কখনই খেতে দিতুম না, তাতে মরুক
•

২৪
মােহন-মাধুরী।
আর বাঁচুক। পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। জঠরানল
একবার জ্বলে যে কোন উপায়ে হ’–পয়সা
রােজগারের চেষ্টা দেখতই দেখত। যখন তােমার
স্বামীর রােগের উপযুক্ত ওষুধ তােমার হাতেই রয়েছে,
তখন তােমার ভাই খেদ করা অন্যায়।
এলাে। (ক্ৰদ্ধভাবে ) দেখ বাছা ? আমার ধন আমি যাই
বলি তা বলে তােমার মুখে যে আমার স্বামীর নিন্দা
সহ্য করব, তা মনে করাে না। সকাল বেলা যদি
বাড়ী বয়ে কেঁাদল কর্তে এসে থাক তবে মানে মানে
আপনার পথ দেখ।
প্রতি। আ মরণ ! যেন খেতে এলাে। পথ দেখ না ত
তােমার বাড়ীতে থাকতে এসেছি না কি ? আচ্ছা
এর শােধ আমিও নিতে জানি।
[ প্রস্থান ]
এলো। এখন আর আমার “তার উপর রাগ নাই। আহা,
মনে করি মিসের উপর রাগ কৰ্বো, কিন্তু যখনই
রাগ হয় ছেলের মুখ দেখে সব ভুলে যাই। হে বাবা
সত্যনারায়ণ ! আমার স্বামী যেন এখনই মুক্ত হয়ে
আসে, আমি তােমায় সওয়া পাঁচ পয়সার সিন্নি দেব।
( দূরে দৃষ্টি পূৰ্ব্বক) ওমা ওই না সে মােহনের সঙ্গে
আচে। তবেত বাবা সত্যনারায়ণ
সত্যনারায়ণ এ দাসীর
কথা শুনেছেন। যাই আগে তাঁর পূজার স পাঁচ
।

২৫
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
পয়সা তাঁর নাম করে বাক্সে তুলে রেখে আসি,
তারপর অন্য কাজ।
[ গৃহাভ্যন্তরে গমন ]
নীলাম্বর ও মােহনের প্রবেশ।
মােহন। মা, মা, একরার বেরিয়ে এস, কে এসেছে দেখ।
এলাে। ( বাহিরে আসিয়া হস্তদ্বারা পুত্রের মুখ স্পর্শকরত ;
সেই হস্ত চুম্বন পূৰ্ব্বক) আমি অনেকক্ষণ দেখেছি
বাবা। তুমি যে ওঁকে আনতে পেরেছ এতে আমি যার
পর নাই সুখী হয়েছি, আশীৰ্বাদ করি তুমি চিরজীবী
তােমাদের বিলম্ব দেখে আমার প্রাণ যে কি
কচ্ছিল তা আর কেমন করে বল্ব। একলা বসে
কেবল আকাশ পাতাল ভাবছিলুম আর ঠাকুরের
কাছে মান্ ছিলুম- যেন নিরাপদে তুমি ওঁকে নিয়ে
ফিরে আসতে পার। মাতে মাতে দূর থেকে
দেখতে পেলুম যে তােমরা আচ্ছ, অমনি ছুটে গিয়ে
ঠাকুরের পূজোর পয়সা আগে তুলে রেখে এসে, তার
পর তােমাদের দেখতে এলুম।
নীলাম্বর। তুমি আমার জন্য ঠাকুরের কাছে মানছিলে ?
আহা তােমার গুণের শেষ নাই, তুমি আমাকে জন্মের
মতন কিনে রাখলে। তােমার মত গুণবতী
স্ত্রীর পতি
হয়ে আমি
আপনাকে ভাগ্যবান্
মনে কচ্চি।
আমি
কেবল
তােমার ন্যায়
*

মােহন-মাধুরী।
সতী সাধ্বীর প্রার্থনাবলেই এ যাত্রা কারাগার হতে
নিষ্কৃতি লাভ করেছি।
এলাে। নাও, তােমার আর সােহাগ কৰ্ত্তে হবে না। আমাকে
যদি তােমার এত উপকারী বলেই বােধ হয়ে
থাকে-তা হলে আমি যা বলি তা শােন।
নীলাম্বর। তুমি যা বলবে আমি তাই শুনব।
এলাে। শুধু মুখে বল্লে হবেনা, শপথ কর ।
নীলাম্বর।
শপথ কত্তে হবেনা, তুমি বল ; আমি এখন আর
তােমার সে নীলাম্বর নই। অল্পক্ষণমাত্র কারাবাসে
আমার চরিত্রের সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেছে। মােহ
বশতঃ তােমাকে আমি পূৰ্ব্বে কত যাতনা দিয়াছি,
তাও এখন বেশ বুঝতে পাচ্চি। আমি তােমার
নিকট যে কত গুণে ঋণী, তা এক মুখে প্রকাশ করা
যায় না। সেই ঋণ কথঞ্চিৎ পরিশােধের নিমিত্ত
আমার প্রাণ বড় ব্যাকুল হয়েছে।
বল বল প্রিয়-
তমে! কি কল্লে তােমার ঋণ পরিশােধ হয় ?
এলাে। নাথ ! যদি অধিনীর প্রতি এত অনুগ্রহ হয়ে থাকে
তাহলে আমার এই কথাটী রাখ। নিশ্চেষ্ট হয়ে ঘরে
ব’সে থাকার চেয়ে মৃগয়া দ্বারা জীবিকা অর্জন করা
সহস্র গুণে ভাল। মৃগয়া তােমার জাত ব্যবসা। তুমি
সেই ব্যবসা পরিত্যাগ করাতে লক্ষনী ক্রমে ক্রমে তােমায়
ছেড়ে যাচ্চেন। সেই লক্ষমীকে ফিরাইবার মৃগয়া ভিন্ন

२१
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
অন্য উপায় নাই। তুমি আজই সিদ্ধিদাতা গণেশকে স্মরণ
করে মৃগয়ায় বেরিয়ে পড়। ওকি মােহন কোথা যাস্ ।
মােহন। আছি।
প্রস্থান। ]
নীলাম্বর। তুমি যা বল্লে তাতে আমার সম্পূর্ণ মত।
আজই—আজই কেন এখনি যাত্রা করব। কিন্তু
আমি কখন বাড়ীছাড়া হইনি, তােমাদের ছেড়ে
কেমন করে থাকব তাই ভেবে আমার প্রাণ যেন
কেঁদে কেঁদে উঠছে। আর তুমিই বা কেমন করে
প্রাণ ধ’রে আমায় বিদায় দেবে ? তুমি এমনি
হতভাগ্যের হাতে পড়ে ছিলে যে, সুখী করা দূরে
থাকুক, আজ সে তােমায় দুঃসহ দুঃখানলে নিক্ষেপ
করতে উদ্যত।
তা ছাড়া অরণ্য ভয়ঙ্কর স্থান।
সেখানে যে কত রকম হিংস্র জন্তু আছে তার কিছুই
স্থিরতা নাই। কখন যে কি ওৎকরে বসে থেকে
কি ভয়ানক সৰ্ব্বনাশ সাধন করবে--তা কিছুই বলা
যায় না। আমি ভাবছি কি, যদি এইরূপ হিংস্র
জন্তু হস্তে অসাবধানতাবশতঃ আমার কোন বিপদ
ঘটে, তা হলে তা হলে প্রিয়ে তােমার যে আর
দাঁড়াবার স্থান থাকবে না। ছেলে পুলে গুলি যে, না
খেতে পেয়ে অন্নের জন্য পথে পথে কেঁদে বেড়াবে।
এলাে। ভয় কি নাথ ? ভগবান্ সৰ্ব্বস্থানেই সহায় আছেন।

২৮
মােহন-মাধুরী।
জলে, অনলে, পৰ্বতশৃঙ্গে, বিজন বিপিনে, সকল
স্থানেই যে তিনি জীবের রক্ষাকর্তা। সেই বিপদভঞ্জন
মধুসূদনের নাম কল্লে কি আর বিপদ কাছে আসতে
পারে ? যে জীব তার নাম নিতে ভুলে যায়, সেই
বিপদে পড়ে বিঘােরে প্রাণ হারায়।
নীলাম্বর। তুমি আজ আমায় অতি চমৎকার উপদেশ দিলে ।
তােমার মত কামিনী যার ভাৰ্য্যা তার কি আর কোন
বিপদ ঘটে ? আমি তবে এখন যাবার জন্য প্রস্তুত হইগে।
(গৃহাভ্যন্তরে গমন ও পরক্ষণে ধনুর্বাণ হস্তে বাহিরে আগমন,
সহসা সুসজ্জিত ভাবে মােহনের প্রবেশ।)
এলাে। ও মােহন তুই অমন সাজ গােজ করে এলি যে?
মােহন। মা, আমি বাবার সঙ্গে মৃগয়ায় যাব। এই দেখ
তামার বন্ধুর কাছে থেকে কেমন ধনুক-বান আর
সাজ জোগাড় করে নিয়ে এলুম।
এলাে। আরে বাপরে। তুই কোথায় যাবি ? সে যে অরণ্য
বিজবন, সেখানে গেলে কি আর রক্ষা আছে ? হয়ত
একটা বাগ এসে হালুম করে তােকে খেয়ে ফেলবে,
না হয় ত একটা অজাগর ফোঁস করে এসে তােকে
গপ করে গিলে ফেলবে। বাবা, ও দুর্বদ্ধি
ছেড়ে দে, তাের যাওয়া হবে না।
মােহন!
তবে বাবারও যাওয়া হবেনা।
নীলাম্বর। ছি বাবা, তুমি ত অবুঝ নও, তােমার ত জ্ঞান হয়েছে।

চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
২৯
বুঝতে ত পাচ্চ যে, আমি মৃগয়ায় না গেলে আর সংসার .
চলে না। আমাকে দায়ে পড়ে বিজন অরণ্যে যেতে
হচ্ছে। এত আর বেড়াতে যাওয়া নয় যে তােমাকে
সঙ্গে নিয়ে যাব। আমার বিহনে তােমার জননীর যে
কষ্ট হবে, তুমি কাছে থাকলে সে কষ্টের লাঘব হবার
সম্ভাবনা। তুমি কখনও তােমার জননীর কাছছাড়া
হবে না। যখন তাকে চিন্তাকুল বা তার মুখ মলিন
দেখবে তখনই সান্ত্বনা দানে তার মন প্রফুল্ল কত্তে
চেষ্টা করবে। তুমি বুদ্ধিমান, তােমাকে আর অধিক
কি বলব। তবে প্রিয়ে। এখন আমায় প্রসন্ন মনে
বিদায় দাও, আমি আসি।
এলাে। ( মলিন বদনে) এস। আমি যদি কায়মনােবাক্যে
তােমার সেবা করে থাকি তা হলে তােমার পদে যেন
কুশাঙ্কুর ও বিদ্ধ না হয়
নীলাম্বর। (যাইতে যাইতে স্বগত) হায় আমায় একান্ত একাকী
যেতে হল। এ সময়ে যদি আমার জ্যেষ্ট পুত্র মহেশ
বেঁচে থাক্ত, তা হলে সে আমার সঙ্গে গেলে কোন
ক্ষতি ছিল না। কিন্তু মােহন বড় ছেলে মানুষ, তাকে
নিয়ে যাওয়া কোন মতে উচিত নয়। হা মহেশ !
( দীর্ঘনিশ্বাস ) মহেশ !
[ নীলাম্বরের প্রস্থান ]
যবনিকা পতন।

দ্বিতীয় অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। কৈলাস পুরী। (জয়া বিজয়া একরাশি ফুল কোলে করিয়া উপবিষ্টা।) জয়া। আয় ভাই, দুজনে হাতাহাতি করে মালাগুণে সব গেঁথে ফেলি আয়, একটু চ প করে কাজ সেরে নিতে হবে, মা আবার এখনই শিব পূজা করূতে আসবেন। বিজয়া। (মালা গাঁথিতে গাঁথিতে) হ্যা ভাই! মা এখনও আবার শিব পূজা করেন কেন ? লােকেত শিবের মত বর পাবার জন্যই তার পূজা করে থাকে, কিন্তু আমাদের মার যখন তিনিই বর তখন তার পূজা করা কেবল বাড়ার ভাগ মাত্র। জয়া। কি জানি বােন মার মনের কথা আমি কেমন করে বল্ব, তবে আমার বুদ্ধিতে যতটুকু আসে তাতে এই- মাত্র বলতে পারি, যে দেবতাদেরও মানুষের ন্যায় পরজন্মের ভয় আছে। পরজন্মেও যাতে বাবা মার প্রথম গর্ভাঙ্ক। : স্বামী হন, সেই জন্যই হয়ত মা এজন্মে বরাবর শিব- পূজা করে আছেন। বিজয়া। দেখ দেখি দিদি, কেমন মালা ছড়াটি গাঁথা হল ? জয়া। বেশ হয়েছে। (বিশেষরূপে নিরীক্ষণ পূৰ্ব্বক) ও বােন্ এখানটা যে মজিয়েচ। লালের পর জরদা ত ভাল মানায় না। এক কাজ কর। ঐ জরদা ফুল গুলি খুলে ফেলে ওখানে গােটা কত সবুজ ফুল বসিয়ে দাও। ও দশা! . তােকে দেখিয়ে তােকে দেখিয়ে দিতে দিতে, আমার আপনার ছড়াটীর এই খানটা খারাপ করে ফেলেছি। দাড়াও মানিয়ে নিচ্ছি। বিজয়া। হা দিদি মাকে এ কথা জিজ্ঞাসা কল্লে হয় না? জয়া। কোন্ কথা ? বিজয়া। এই মা কি জন্য এখনও বাবার পূজা করেন। জয়া। না, না, তাকে ও কথা জিজ্ঞাসা করে কাজ নাই। জানিকি মা যদি রাগ করে বসেন। তা হলেই ত প্রতুল। বিজয়া। দিদি ! মাকে তবে তুমি ভাল চিন্তে পারনি। তিনি কি কখন আমাদের উপর রাগ করেছেন দেখেছ ? তিনি যে আমাদিগকে পেটের সন্তানের মত স্নেহ করেন। কতবার বলেছেন “আমার লক্ষ্মী স্বরস্বতী যেমন জয়া বিজয়াও তেমন, ওদের আমি ভিন্ন ভাবিনা” তুমি কি তা শুননি?

৩২
মােহন-মাধুরী।
জয়া। বিজয়া-তুইই মার মহিমা যথার্থ বুঝেছি। আমি
অজ্ঞান, তাই বলছিলেম যে মা রাগ করূবেন।
এখন,
আমি বেশ বুঝেছি যে, মা আমাদের উপর রাগ কতে
পারেন না। মাতা যদি সন্তানের উপর প্রতি
অপরাধে রাগ করেন, তা হলে কি আর রক্ষা থাকে ?
কথায় বলে-
“কু পুত্র যদ্যপি হয়
কু মাতা কখনও নয়।”
তা এ কথা কি বিশ্বজননী হয়ে ব্যর্থ করবেন, কখনই
। হা দ্যাখ বিজয়া ! তাের মালা ছড়াটী গাঁথা
হয়েছে, আমারও হয়েছে, এই সময় মা যদি এসে
পড়েন তাহলেই সেই কথা জিজ্ঞাসা করা হবে।
নইলে মার আস্তৈ দেরী হলে তাড়াতাড়ি পূজায়
ববেন আর সে কথা বলবার অবকাশ হবে না।
আহা অন্তর্যামী মা আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে
ওই দেখ রুণু রুণু করে এই দিকেই আসছেন ; আহা
মার যদি সন্তানের প্রতি এমনি স্নেহই না থাকবে, তা
হলে সকলে তাকে দয়াময়ী বলে ডাকবে কেন ?
(গৌরীর প্রবেশ।)
ওমা জয়া, ওমা বিজয়া, তােরা দুটীতে একলা বসে
এখানে মালা গাঁথচিস্ ?
জয়া। হাঁ মা, তােমার পূজার যে সময় বয়ে যায়।
;
গৌরী।

প্রথম গর্ভাঙ্ক।
গৌরী। বিজয়া! তুই যেন কিছু ববি ববি বলে বােধ হচ্চে।
বিজয়া। হঁ্যা মা, তুমি ঠিক মনে করেছ, জয়া দিদি আর আমি
তুমি আবার একটু আগে পরামর্শ কচ্ছিলেম যে
তােমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে হবে।
গৌরী। কি কথা মা?
জয়া।
তুমি সত্য কর যে আমরা যা জিজ্ঞাসা করব তার যথার্থ
উত্তর দিবে; সে কথা হেঁসে উড়িয়ে দিবে না।
গৌরী। তােমাদের কাছে আবার সত্য করতে হবে ? আচ্ছা,
সত্য কলেম।
বিজয়া। দেখ মা আমি জয়া দিদিকে জিজ্ঞাসা কছিলে যে
মা এখনও শিবপূজা করেন কেন? তার ত
কোন বাসনাই অপূর্ণ নাই।
গৌরী। তাতে জয়া কি উত্তর কল্লে ?
বিজয়া। দিদি বল্লে যে দেবতাদেরও পুনর্জন্মের ভয় আছে।
মা পরজন্মেও এজন্মের মত ভাগ্যবতী হবেন বলেই
শিবপূজা করেন।
জয়া ঠিক বলেছে। দেবতারা অমর বটেন কিন্তু সময়
সময় তাহাদিগকে দেহ পরিবর্তন করিতে হয়,
ইহার ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত পুরাণে দেখিতে পাওয়া
যায়। এই আমাকে দিয়েই দেখনা কেন? আমি
প্রথমে শক্তিরূপে বৰ্তমান ছিলেম। তৎপরে
পঞ্চাননকে প্রতিরূপে পাবার জন্য দক্ষগৃহে সতীরূপে
গৌরী।
৩

৩৪ মােহন-মাধুরী। জন্মগ্রহণ করি। তারপর গিরিরাজ ভবনে মেনকার গর্ভে উমারূপে জন্মগ্রহণ কল্লেম। ভাগ্যে পূৰ্ব্ব- জন্মে কায়মনােবাক্যে শিবপূজা করেছিলেম, তাইত এজন্মেও তিনিই আমার স্বামী হলেন। তবেই দেখ আমি যে এখনও শিবপূজা করি তাহা নিতান্ত নিরর্থক নহে। জয়া। মা, তুমি এ কথাটী অতি সুন্দর বুঝিয়ে দিলে—আমি অতদূর বুঝতে পারিনি। গৌরী। ওমা জয়া বিজয়া, তােরা ফুলটুল গুলা এগিয়ে দে, আমি এক্ষণে পূজায় বস্। (জয়া বিজয়ার তথাকরণ ও গৌরীর পূজায় উপবেশন।) গৌরী। জয় ত্রিলােকরঞ্জন, ত্রিতাপহরণ, ত্রিগুণধারণ, মহেশ হে। ত্রিভুবনকারণ, ত্রিনেত্রধারণ, ত্রিপুরনাশন ভবেশ হে। জয় সৰ্ব্বশুভঙ্কর, সৰ্বগুণাকর সৰ্বোতমােহর সৰ্ব্বেশ হে। সৰ্বভয়ঙ্কর, সৰ্বমহত্তর, সৰ্ব্বধ্বংসকর, পরেশ হে। জয় সত্যসনাতন বিশ্বগতি। জয় নিত্যনিরঞ্জন লােকপতি। করুণানিধান স্নেহময় অতি। রজতশ্বেত অঙ্গে কিবা বিভূতি। কিবা পঞ্চমুখে হরিনাম করে।

প্রথম গর্ভাঙ্ক।
কিবা ডম্বুর মধুর বাজে করে।
কিবা ফণিগণ গভীর গরজে।
কিবা সুরধনী শিরােপরি রাজে।
এস সবে মিলি তার পদ তলে।
ডাকি শিবকর শিবশঙ্কু বলে ।
( সাষ্টাঙ্গে সকলের প্রণাম।)
বিজয়া। তাইতাে বেলাও অনেক হয়ে গেল। বাবা এখনও
আচেন্ না কেন?
গৌরী। তার কি আর আমাদের মনে আছে, হয়ত কোন
ভক্তের পাল্লায় পড়েছেন।
জয়া। হা মার যেমন কথা-বাবা কি কখন আমাদের ভুলে
থাকতে পারেন, ওই দেখ তঁার নাম কৰ্ত্তে কর্তেই
তিনি এসে পড়েছেন।
( মহাদেবের প্রবেশ।)
মহা। কি আশ্চর্য্য! বসি সবে নিশ্চেষ্টের প্রায় !
নাহি কি গৃহের কাৰ্য, হয়েছে সকলি ?
কি সুখের গৃহস্থলী, নাহি এর তুল;
যেমন গৃহিনী তার তেমন সঙ্গিনী!
গল্প পেলে আর কিছু না চাহে ধরায়।
যাহা মনে এল তাই বলিলে শঙ্কর।
কি ভিক্ষা এনেছ এবে দেখাও সত্বর।
গৌরী।

মােহন-মাধুরী।
গৃহে না থাকিলে কিছু, আমরা কেমনে
পুরাব উদর তব পরম যতনে ?
নারী মােরা, নারি হ'তে ভিক্ষায় বাহির;
কি রূপে হে বিরূপাক্ষ ! হইলে অস্থির।
যা এনছ দাও ত্বরা, করিগে রন্ধন ;
উদর পুরিয়ে তােমা করাব ভােজন।
( ভিক্ষা ঝুলি প্রতি দৃষ্টি পূৰ্ব্বক )
=
( অহ! )
যা ভেবেছি তাই হ’লশূন্য ভিক্ষা ঝুলি ;
নতুবা বেরুবে কেন এত মিষ্ট বুলি ?
অলস হইলে নর নানা দোষ জুটে,
দিনে দিনে বল, বুদ্ধি, জ্ঞান সব টুটে।
ছি ছি, কি লজ্জার কথা, বিদ’রয় হিয়া-
কেমনে আইলে ফিরে ভিক্ষা না করিয়া ?
কোন মুখে, নীলকণ্ঠ ! নিন্দ আমা সবে ?
জানি আনিলে ভিক্ষা, আরাে কত হবে !
ক্ষুধানলে একে জ্বলে, মম কলেবর,
তদুপরি বাক্য আলা, নাহি সহ হয়।
যাহা কিছু থাকে ঘরে, দাও গৌরী আনি—
উচিত না হয় সতি! পতির যন্ত্রনা
!
মহা ।

প্রথম গর্ভাঙ্ক।
৩৭
গৌরী।
উপেক্ষা করিতে তব। শুনিলে না বাণী ?
শুনিবে বা কেন তুমি ! তােমার স্বভাব
পতিবাক্য উল্লঙ্ঘন। দক্ষ যজ্ঞ কালে
কত মতে পিতৃ গৃহে যাইতে বারণ
করিনু তােমায় আমি-শুনিলে কি কথা ?
তার ফল হাতে হাতে পাইলে শঙ্করি ।
পিতৃ-মুখে পতি-নিন্দা পশিল শ্রবণে।
ভালবাসে যেই নারী নিজ পতি ধনে,
পারে কি করিতে তার বচন লঙ্ঘন ?
শােন্ মা বিজয়, জয়া শঙ্কর বচন।
ভালবাসি কি না বাসি, জানে সৰ্ব্বজন।
যার লাগি বার বার দেহ পরিহরি—
লভেছি জনম আমি আপনা পাসরি,
একদণ্ড নাহি আমি ছাড়ি যার পাশ,
জন্মে জন্মে পতি পেতে যারে অভিলাষ,
সেই বলে আমি তারে নাহি ভালবাসি,
এখন রয়েছে প্রাণ কি আশে পিপাসী ?
বুদ্ধির বিকৃতি তব হয়েছে নিশ্চয়,
কোন্ কাজে ব্যস্ত ছিলে এতেক সময়?
সেই কথা আগে তব পাষাণনন্দিনী।
জিজ্ঞাসা উচিত ছিল। তা না করি তুমি
ভৎসনা করিলে কত, বাড়াইলে ক্রোধ।
মহা।

৩৮
-
গৌরী।
মহা।
মােহন-মাধুরী।
তব সম সতী নারী নাহি মনে করে
পতি-কোপ বৃদ্ধি করা পৌরূষের কাজ।
কোপেতে অধীর হয়ে যদি বলে থাকি
কিছু দেবি ! ক্ষম তুমি নিজ দয়া গুণে।
সাধে কি গাে শুধু হাতে ফিরে এনু গৃহে,
যাইতে যাইতে পথে,
( বাধা দিয়া) বুঝেছি সে সব,
ভক্তের কারণে তবে এত দেরি ভব?
তােমার প্রকৃত ভক্ত নাহি ভূমণ্ডলে ;
কেবল ভক্তের ভান করয়ে সকলে।
কি শঙ্করি ! ভক্ত নাই ? ছি ছি হেন কথা
বলিও না আর বার। অন্য জন হলে
সমুচিত শাস্তি তারে দিতাম এখনি।
শিব ভক্ত নিন্দা শিব নিন্দার সমান
নিশ্চয় জানিও তুমি, কি বলিব আর ।
আছে কিনা আছে ভক্ত, জানিব নিশ্চয়—
যদি আজ কোন ভক্ত তব নাম লয়।
হলেম সম্মত আমি এই অঙ্গীকারে ।
মৰ্ত্তপ্রতি একবার কর দৃষ্টিপাত
নীলাম্বর নামে এক ব্যাধের ভবনে।
ওই শুন ওই শুন নীলাম্বর ব্যাধ
‘মহেশ’ ‘মহেশ’ বলি ডাকে বার বার।
গৌরী।
মহা।

প্রথম গর্ভাঙ্ক।
৩৯
গৌরী।
নন্দী।
কৌশলে হারালে হর, অবলা নারীরে,
মানিলাম পরাজয়—কিন্তু এইবারে
কেমনে হারাও তুমি দেখিব শঙ্কর !
কেহ আজ তব পূজা না করিবে হর!
চল তবে দুই জনে যাই মর্ত্যভূমে,
এখানে আসিয়া কেহ না পারে করিতে
পূজা মম। চল দেবি ! বলিলাম আমি
অন্ততঃ জনৈক ভক্ত পূজিবে আমায়,
দেখা যাবে আজি কার কথা সত্য হয়।
( জয়া বিজয়ার প্রস্থান ও নন্দী ভৃঙ্গীর প্রবেশ।)
যথা যাবে বাবা তুমি, আমিও যাব সঙ্গে,
মনােহর মর্ত্যভূমি বেড়াইব রঙ্গে।
তাক্ তাক্‌ তাক্‌ বগল বাজা, লেগেছে বিষম মজা,
বহুদিন পরে আজ যেতে হবে শুনে,
ফেলিয়া শতেক কাজ, এনু ছুটে যেন বাজ,
সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে এই দীন জনে।
আমিও যাব, আমিও যাব নন্দী দাদার সাথে,
চৌদিকে বেড়ায়ে,ঘুরিয়ে ফিরিয়ে,আসিবকুবের রথে।
বল, ল’য়ে যাবে, দাসে সেই ভবে
লাগে বা না লাগে কাজে,
( নইলে ) শাপুড়ে বলিয়ে, কুনাম রটায়ে
দিব এই ধরা মাঝে।
ভৃঙ্গী।

৪০
মহা।
মােহন-মাধুরী।
শুন বৎস নন্দী ভূঙ্গি, তােমাদের আমি
কেমনে লইয়া যা’ব ? ভ্রমণ কারণ
নাহি হই এবে মােরা ঘরের বাহির।
যেই কাৰ্যে যাইতেছি, লুক্কায়িত ভাবে
থাকিতে হইবে তাহে ; তােমরা যাইলে
গমন প্রয়াস মম হইবে বিফল।
চল গৌরী! ত্বরা করি মর্তে যেতে হবে ;
আছে কিনা আছে ভক্ত আজ দেখা যাবে।
[ সকলের প্রস্থান।]

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
অরণ্যমধ্যস্থ শিবমন্দির।
( গীত গাহিতে গাহিতে মল্লিকা ও তরলিকার মাধূরীর সহিত প্রবেশ।)
মল্লিকা ও তরলিকা।
(গীত।)
কুসুম-কাননে কুসুম-চয়নে,
পূজার বাসনা জাগে।
কেমন কোমল কামিনী-পরাণ
শিবপূজা অনুরাগে |
এস পূজি তারে হয়ে শুদ্ধমতি,
যেন পায় সখি মনােমত পতি।
দিলে বিশ্বদল, বাসনা সফল,
হইবে এ শুভ যােগে ।
মাধুরী। সখিগণ ! তােমরা আমায় কোথায় নিয়ে এলে ?
এযে দেখছি নিবিড় অরণ্য, এখানে জনমনুষ্যের
সমাগম পৰ্যন্ত নাই; বৃক্ষলতাদি এমন ঘন সন্নিবিষ্ট
যে দিবাভাগেও যেন অন্ধকার বলে বােধ হচ্চে।
ভয় কি সখি ! ওই যে সম্মুখে শিবের মন্দির দেখা
যাচ্চে। দেবাদিদেব মহাদেবের প্রভাবে এখানে
কোনরূপ বিপদের আশঙ্কা নাই।

82
মােহন-মাধুরী।
মাধুরী। হতেই বা কতক্ষণ? তােমরা না বল্লে “এই নদীর
ধারের বাগান থেকে ফুল তুলে নিয়ে আসি চল”।
এই বুঝি তােমাদের ফুল তুলতে আসা ?
মল্লিকা। রাজকুমারি ! রাগ করাে না, তােমায় এখানে ভুলিয়ে
এনেছি বটে—কিন্তু তাহাতে আমাদের কোন দোষ
নাই। রাণী মা এই মন্দিরের নাম করে মাথার দিব্য
দিয়ে বল্লেন, তােমরা যেমন করে পার, মাধুকে
শিবপূজা করিয়ে নিয়ে এস ; স্পষ্ট বল্লে তুমি ত
আর আসতে চাইতে না, কাজেই আমাদের এই
ফিকির খাটাতে হল।
মাধুরী। বটে, মাও বুঝি এর ভিতরে আছেন! তা থাকলেই
বা, আমি কিন্তু মন্দিরের ভিতরে যেতে পাব না।
আমার মন যেন ভাবী বিপদাশঙ্কায় যারপর নাই
কাতর হয়েছে—আমার দক্ষিণ অঙ্গ অবশ ও
স্পন্দিত হচ্চে—-উঃ তাইত সহসা আমার প্রাণ এত
ব্যাকুল হয়ে উঠল কেন?
তর। সখি ! অত উতলা হচ্চ কেন? তুমি এত উৎকণ্ঠিত
হ’তে পার, এমন কারণ ত আমি কিছুই দেখতে
পাচ্ছি না।
মল্লিকা। রাজনন্দিনী! তুমি ত কোন কালেই ভীরু-স্বভাবা
ছিলে না, তবে আজ এত ভয় পাচ্চ কেন ? কই
আমাদের ত কোন ভয় হচ্ছে না। তুমি মহারাজা-

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
৪৩
ধিরাজ বীরকেশরের কন্যা হ'য়ে সামান্য কারণে
এতদুর ভীত হয়েচ—এ কথা শুনলে যে লােকে
হাঁসবে।
মাধুরী। সখি! তােমরা যাই বল যাই কও, আমার মন কিন্তু
কিছুতেই প্রবােধ মাচেনা। (সহসা বিদ্যুৎ প্রকাশ)।
ওই দেখ গগনমণ্ডলে ঘােরতর ঘন ঘটায় একেবারে
আচ্ছন্ন হয়ে গেছে ; মধ্যে মধ্যে চপলাদেবীও
দেখা দিচ্ছেন, তােমরা এ দেখেও কোন্ সাহসে
এখনও এখানে দাড়িয়া আছ ?
তর। সখি আমরা ত তােমায় দাড়িয়ে থাকতে বলুচিনা, চলনা
মন্দিরের ভিতরে যাই; শীঘ্র শীঘ্ৰ পূজা সাঙ্গ করে
আমরা বৃষ্টির পূর্বেই বাড়ী পঁহুছিতে পাব।
মাধুরী। সখি ! আমি প্রাণান্তেও মন্দিরের ভিতরে যেতে
পাব না, আমি এই রােয়াকে বসে রইলুম, তােমরা
গিয়ে পূজা করে এস। (মল্লিকা ও তরলিকার হাস্য)।
সখি ! তােমর হাঁসলে কেন? আমিত হাঁসির
কোন কথাই বলিনি।
তর। রাজকুমারি ! আজ থেকে তুমি আর কিছু খেওনা?
মাধুরী। কেন ?
এর আবার কেন কি, তুমি খেলেও যা আমি খেলেও তা ;
তােমার হয়ে আমি না হয় একবার বেশী করে
খাবাে, তা হলেই হবে।

৪৪
মােহন-মাধুরী।
মাধুরী। হ্যা তা বুঝি কখন হ'য়ে থাকে ? আমি এত বােকা
নই যে এ কথা বিশ্বাস কব। তুমি খেলে তােমারই
পেট ভবে। আমার ত তাতে ক্ষুন্নিবৃত্তি হবেনা।
তবে আমি শিবপূজা ককূলে আমারি ভাল বর হবে,
তােমার ত হবে না।
মাধুরী। সখি! তােমাদের বাচাতুরী আমার আর ভাল লাগে
, আমার প্রাণ যেন কেমন কেমন কচ্চে। তােমা-
দের পূজা করূতে হয় কর, নইলে অবিলম্বে বাড়ী
ফিরে যাই চল। বলিতে কি আমার এখানে
আর তিলার্ধ মাত্ৰ থাকিতে ইচ্ছা নাই ।
তর। রাজকুমারি ! ক্ষমা কর, আমাদেরই অপরাধ হয়েছে।
আচ্ছা ভাই মল্লিকা! এখন এক কাজ কর, গােটা
কতক ফুল বিল্বপত্র মন্দিরের দ্বারে রেখে আয়,
রাজকন্যা ওইখান থেকেই পূজা কবেন। (মাধুরীর
প্রতি) কেমন সখি ! এতে কি তােমার কোন
অমত আছে ?
মাধুরী। ন', মার যখন একান্ত ইচ্ছা যে আমি শিবপূজা করি,
তখন তাঁর ইচ্ছা যতদূর সাধ্য পূর্ণ করা আমার
উচিত।
( মল্লিকা ও তরলিকার মন্দিরের ভিতর প্রবেশ, সহসা অভ্যন্তর হইতে
যমদুতের ন্যায় একজন ভীষণাকার কাপালিকের বহির্গমন ও
বাহিরে আসিয়াই শিকল দেওন, ভিতরে অস্ফুট চীৎকার ধ্বনি।)

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক
৪৫
মাধুরী। (কপিতে কাপিতে) ও বাবা, এ আবার কে, হে
অনাথনাথ বিপদভঞ্জন মহাদেব ! রক্ষা কর।
( মূৰ্ছা।)
কাপালিক। এতদিনে আমার মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হ’ল ; কতদিন
ধরে মনে মনে সাধ ছিল যে একটী সুরূপা
কুমারীকে সম্মুখে রেখে শব-সাধনা কব। আজ
ভগবান আমার প্রতি মুখ তুলে চাইলেন। যাই
আগে আমার অমূল্য রত্নকে গুপ্ত স্থানে লুকিয়ে
রেখে আসি। তারা ! এইবার দেখব মা দেখা দিস্
কি না।
( মূচ্ছিতা মাধুরীকে স্কন্ধে লইয়া প্রস্থান।)

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
অরণ্যের অপর পার্শ্ব ।
( একটী বৃক্ষে ঠেস দিয়া মােহন দণ্ডায়মান।)
মােহন।
(গীত )
কেন কেন মন উদাসী ।
কিছুই লাগেনা ভাল শূন্য প্রায় দশ দিশি ।
যে দিকে নয়ন পড়ে, শােভা রাশি থরে থরে,
হেরিতে তবুও কারে নিরন্তর অভিলাষী।
সুন্দর হেরিলে পরে ,
তার মুখ মনে পড়ে
পরাণ সপেছি যারে পাব কিরে সে রূপসী ।
( মূচ্ছি তা মাধুরী স্কন্ধে চতুর্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে করিতে
বৃক্ষান্তরালে কাপালিকের প্রবেশ।)
মোহন। ( চকিত ভাবে ) কে ও যায়, চোরের ন্যায় সন্দিগ্ধ
হৃদয়ে, ধীর-পাদ-বিক্ষেপে কে ও যাচ্চে। অবার
স্কন্ধে ওটা কি ? বালিকা বলে বােধ হচ্চে যে।
, লক্ষণ ভাল নয়। (উচ্চৈস্বরে ) ওরে পাপিষ্ঠ।
তিষ্ঠ, আর এক পদও অগ্রসর হইও না, শুলে
আবার পলায়নের চেষ্টা, আচ্ছা যাও কত দূর
যাবে।
[ শরক্ষেপ ]

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। ৪৭ কাপা। (মাধুরীকে ফেলিয়া ভুতলে উপবেশন) উঃ কে আমার এ ভীষণ শত্রুতা কল্লে, উঃ-উঃ-যাতনায় প্রাণ যায়—বড় তৃষ্ণা—একটু জল, জল। ভাই হে! তুমি যেই হওনা কেন, একটু জল দিয়ে আমায় বাঁচাও। [ বারিপূর্ণ চৰ্ম্মপাত্র হস্তে মােহনের কাপালিক- সমীপে আগমন] জল এনেছ? আঃ বাঁচালে [ মুখ ব্যাদান ও মােহনের অল্প অল্প করিয়া জল দেওন।] মােহন। এ কি এ, কাপালিক দেখছি যে! তবে কি আমি এক জন কাপালিককে বাণবিদ্ধ করেছি। ভাল কাপা- লিক ! তুমি কি জন্য এই অসহায় অবলা রমণীকে লইয়া পলায়ন করিতেছিলে ? কাপ। উঃ-উঃ-প্রাণ যায়—বড় জ্বালা, আমার সর্বশরীরে কে যেন বিষ ঢেলে দিচ্চে। মােহন। কেন কেন কাপালিক, তুমি অমন কচ্ছ কেন? আমার আঘাত ত সাংঘাতিক নয়, তুমি যাতে কেবল এই বালিকাকে ছাড়িয়া পলায়ন কর সেই জন্য দূর হইতে বাণ-বিদ্ধ করেছি। কাপা। হা নির্বোধ ! তুমি কি করেছ, এখনাে কি বুঝতে পাচ্ছ না। তােমার বাণ নিশ্চয়ই বিষ মাখান ছিল, উঃ-সহস্র সর্পাঘাতেও এত যন্ত্রনা হয় না, জ্বলে মলুম।

মােহন-মাধুরী। ৪৮ মােহন। ( ম্লান বদনে) কি সর্বনাশ! আমি কি তবে ভ্রম- বশতঃ এক জনের জীবন নষ্ট করিলাম। আমার যে তা হলে, নরকেও গতি হবে না। ভাই কাপালিক ! [ পদতলে উপবেশন ] আমি তােমার চরণ ধরে বিনয় করে বছি, তুমি আমায় ক্ষমা কর। পরমেশ্বরের দিব্য, বাণ যে বিষ মাখান, তা আমি ঘুর্ণাক্ষরেও জানিতাম না। তা জালে কি আর এই বিষম সৰ্ব্বনাশ সঘটিত হয়। কাপা । (মৃত্যু যাতনায় অধীর হইয়া) ভাই, তুমি যদিও আমার পরম শত্রুর কাৰ্য করেছ, তথাপি আমি অন্তরের সহিত তােমায় ক্ষমা কমে। সকলই বিধাতার খেলা। তােমার দোষ কি? আমার আর বড় দেরী নাই, আর একটু জল [ মােহনের অল্প অল্প মুখে জল দেওন]। যাইবার আগে তােমা- কে একটা কথা বলে যেতে ইচ্ছা হচ্চে। স্থির হয়ে শ্রবণ কর। উঃ, আঃ, বড় জ্বালা–আমি বেশ দেখচি, তোমার অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন। তুমি আমাকে বধ করে, আমার সঞ্চিত তপােরাশির ফলভাগী হয়েচ। উঃ-প্রাণ যায়—বড় কষ্ট হচ্ছে—ভাই তুমি যেই হওনা কেন, আমার গতি - করাে, মা- জাদু-বী! ক্রোড়ে স্থান দি—ও মা। [ মৃত্যু ] তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। ৪৯ মােহন। (জানু পাতিয়া করযােড়ে) হে চন্দ্র-সূৰ্য্য! তােমরা সাক্ষী, হে পাৰ্বতীপতি! তুমিও সাক্ষী রইলে, আমি অজ্ঞানে এ ব্যক্তির বধের কারণ হয়েছি, তজ্জন্য আমায় যেন কোন পাপ না অর্শে। এখন দেখি এই অসহায় বালিকা কে? [ গাত্রোত্থান ও ভূপতিতা মাধুরীর নিকট গমন করিয়া তাহার মুখ নিরীক্ষণ ]. অহাে! একি দেখি জগদীশ্বর ! এই কি তােমার মনে ছিল, এ যে মাধুরী-মাধুরী এখানে কেন ? মাধুরী মৃত না জীবিতা? মাধুরী! মাধুরী! উত্তর নাই, একেবারে নীরব নিশ্চয়ই প্রাণ পাখী দেহ- পিঞ্জর থেকে উড়ে গেছে। অহ, কি হ’ললারে, বুক ফেটে যায় ; নয়ন আর কি দেখচ, মাধুরী নাই, তুমি অন্ধ হয়ে যাও। আঁ, মাধুরী নাই! সত্যই কি মাধুরী নাই? ( ক্রুদ্ধ ভাবে ) না, তা কখনই হতে পারে না, মাধুরী আমারি আছে, আমার মাধুরীকে কার সাধ্য আমার কাছ ছাড়া করে ? [ উর্ধে দৃষ্টিপূৰ্ব্বক ] যমদূতগণ, সাবধান, এখনাে বলচি মাধুরীকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করােনা, তা হলে বিলক্ষণ প্রতিফল পাবে। আঁ ও কে ও, ওত যমদূত নয়, ও যে মাধুরী—আমার নয়নমণি প্রাণের প্রাণ মাধুরী ; মাধুরী ডাচ-আমায় হাত নেড়ে ডাচ ; এতক্ষণের পর কি দয়া হল। ;

মােহন-মাধুরী। এই যে আমি যাচ্ছি। কই, কেউত নাই। দেখেছি দেখেচি—এইবার দেখেচি। হা হা হা আর কোথা পালাবে? দাড়াও, ঠিক ওইখানে দাঁড়াও—এক পাও নড়ােনা। আমি তােমার কাছে [ দ্রুতবেগে গমন ও মাধুরীর অঙ্গস্পর্শে ভূতলে পতন ও পর- ক্ষণেই উত্থান।] একি এ [ নিম্নে দৃষ্টি নিক্ষেপ পূৰ্ব্বক ] এইত আমার মাধুরী—আমি কি তবে এতক্ষণ প্রলাপ বছিলেম। মাধুরী না নড়চে? দেখি প্রাণ আছে কি না [ নিশ্বাস পরীক্ষা ]। আছে আছে—এখনাে প্রাণ আছে; এখনাে চেষ্টা কল্লে বাঁচতে পারে। [ ক্রোড়ে মস্তক লইয়া উপবেশন ও ধীরে ধীরে মুখে জলসিঞ্চন ও বস্ত্রাঞ্চল দিয়া ব্যজন ] ধন্য পরমেশ্বর ! তােমার মহিমাই ধন্য, মাধুরী এইবার চোক চাইবে বােলে বােধ হচ্চে। মাধুরী। [ অল্পে অল্পে নয়ন উন্মীলন করিয়া ] একি—আমি কি স্বপ্ন দেখচি না সত্যই মােহনের ক্রোড়ে শায়িতা আছি। এ নিশ্চয়ই স্বপ্ন। না, আর চক্ষু উন্মীলন করূনা, তাহলে আমার এ সুখস্বপ্ন ভেঙ্গে যাবে [ নেত্র নিমীলন ] মােহন। মাধুরী ! মাধুরী! এ স্বপ্ন নয়, চেয়ে দেখ, যথার্থই তুমি আমার কোলে শয়ানা আছ। তুমি কি আমার

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
?
স্বর শুনেও বুঝতে পাচ্চ না যে আমি তােমার সেই
বাল্য সখ মােহন।
মাধুরী। [ চক্ষু উন্মীলন ও ধীরে ধীরে উপবেশন ] মােহন ?
হা সত্যই মােহন আমার সম্মুখে রয়েছে।
মােহন! আমি কোথা ? তুমি এখানে কেমন করে
এলে ? সখীরা গেল কোথা ?
মােহন। মাধুরী, স্থির হও, একেবারে অত কথা জিজ্ঞাসা করাে
। তুমি একটু সুস্থির হলে ওসব কথা আপনিই
মনে পড়বে।
মাধুরী। [ ক্ষণেক ভাবিয়া ] হ্যা মনে পড়েছে। আমরা তিন
সখীতে শিবপূজা করতে এসেছিলেম। হঠাৎ একজন
ভীষণাকার সন্ন্যাসী আমাকে ধরবার জন্য দৌড়ে
আসে। আমি তাকে দেখেই মূচ্ছা যাই ; সেই হয়ত
আমায় এখানে এনেছে, [ ইতস্ততঃ দৃষ্টিপূৰ্ব্বক ]
ওই না সেই সন্ন্যাসী পড়ে রয়েছে? ওর কি মৃত্যু
হয়েছে ? মােহন, কে ওর প্রাণ বধ করে আমায়
রক্ষা কলে।
মােহন। যে করেছে তাকে কি পুরস্কার দেবে আগে বল তার
পর তার নাম কব।
মাধুরী। তবে এ তােমারি কাজ। মােহন! তুমি কেন এ
দুঃসাহসের কাৰ্য করূলে। উঃ কি ভয়ঙ্কর
চেহারা; যদিও দেহে প্রাণ নাই তথাপি দেখে

,
মােহন-মাধুরী।
এখনও আমার হৃৎকম্প হচ্ছে। মােহন! তুমি
কেমন করে এ ভীষণ কাপালিকের প্রাণবধ কল্লে ?
তােমার শরীরে কোথাও আঘাত লাগে নাই তাে?
মােহন। না, আচ্ছা মাধুরী! যদি কাপালিকের হস্তে আমার
মৃত্যু হত, তা হলে তুমি কি করূতে ?
মাধুরী। তাহলে ? তাহলে কি আর আমি এ প্রাণ রাখতেম ?
হয়ত ঐ পাহাড় থেকে পড়ে নয়ত, ঐ নদীতে
ঝাঁপ দিয়ে প্রাণত্যাগ করূতেম।
মােহন। তুমি আমার জন্য আত্মহত্যা করতে কেন ?
মাধুরী। কেন ? তা আমি জানি না।
মােহন। মাধুরী! তুমি কি আমায় ভাল বাস ?
মাধুরী। তা শুনে আর তােমার কি হবে ? তুমি ত আর
আমায় ভাল বাস না।
মােহন। মাধুরী, মাধুরী, এ বিশ্বাস তােমার সম্পূর্ণ ভ্ৰম, আমি
তােমাকে অন্তরের সহিত, প্রাণের সহিত ভাল
বাসি। মাধুরী! আমি পিতামাতার ভালবাসা ভিন্ন
আর কারাে ভালবাসা আগে জানিতাম না। কিন্তু
যেদিন থেকে তুমি আমার নয়ন পথের পথিক
হয়েচ, সেইদিন থেকে আমার নবজীবন সঞ্চার
হয়েচে। তােমায় নিরীক্ষণ করিলে আমার হৃদয়ে
কি যে এক অভিনব ভাবের উদয় হয় তাহা কেমন
করিয়া বলিব। মাধুরী! স্বৰ্গ: কেমন আমি তাহা
।

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। কখন দেখি নাই; কিন্তু যদি কখন স্বর্গসুখ ভােগ করে থাকি ত সে তােমার কাছে। মাধুরী! অমৃত কেমন মধুর তাহাও জানি না, কিন্তু যদি কখন অমৃত আস্বাদন করে থাকি ত সেও তােমারই কাছে। তােমার মধুমাখা কথা আমার কর্ণ- কুহরে যেন অমৃতবর্ষণ করে। মাধুরী ! আমি জানি তােমায় আমায় স্বর্গ মর্ত্য প্রভেদ। তােমার পানিগ্রহণেচ্ছা আমার নিতান্ত দুরাশা, বাতুলতা মাত্র। কিন্তু কি করি, অবােধ মন কিছুতেই প্রবােধ মানে না। আমি কতদিন তােমায় একথা বলতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু লজ্জাবশতঃ পারি নাই। মুখ ফুটব ফুব করেও ফুটে নাই । আজ আমি সকল লজ্জা বিসৰ্জন দিলাম। আজ আমি তােমার কাছে মুক্তকণ্ঠে অঙ্গীকার কচ্চি যে এজীবনে তােমা ভিন্ন অন্য রমণীকে প্রণয় দৃষ্টিতে দেখব না। মাধুরী! আমি তােমার নিকট এই প্রার্থনা কচ্চি যে তুমিও আমার মত লজ্জা ত্যাগ করে বল, আমায় ভাল- বাস কি না ? আমার অদৃষ্ট জানবার জন্য প্রাণ বড় ব্যকুল হয়েছে। তোমার কথায় হয় আমি সৌভাগ্য স্বর্গের সর্বোচ্চ সােপানে আরােহন কব, নয়ত নিরাশার গভীরতম নরকে পতিত বল বল প্রিয়তমে ! স্বর্গ ও নরক এ হইব।

৫৪ মােহন-মাধুরী। উভয়ের মধ্যে আমায় কোন স্থানে রাখা ভােমার অভিপ্রেত ? মাধুরী। মােহন! আমার সখিরা মন্দিরের ভিতর বন্দী রয়েছে, তাদের কি হ’ল চল দেখিগে। মােহন। হঁ্যা ও কথা বলে আমায় ফাকি দিতে চেষ্টা কল্লে চলবে না, আমার কথার উত্তর দাও। তােমার সখীদের জন্য ভাবনা কি? তারা মন্দিরের ভিতর থেকে আর কোথাও যেতে পারবে না । মাধুরী। তুমি যদি আমার সখীদের এখনি মুক্ত করে না দাও তা হলে কিন্তু আমি তােমায় ভালবাসি না । মােহন। হ্যা তুমি ভালবাস। তােমার মুখ বলচে ভালবাস, তােমার চোক্‌ বলচে ভালবাস, তােমার ‘ভাল- বাসি না’ বলচে ভালবাস। মাধুরী। [ সলজ্জ বদনে ] তবে ভালবাসি, হ’লত, এখন আমার সখীগণকে উদ্ধার কবে চল । মােহন। এখন শুধু সখীদের কেন, ত্রৈলােক্যের বন্দীগণকে উদ্ধার করতে বললেও আমি তাতে পরাজুখ হব । মাধুরী! তুমি আজ আমায় যে সুখী কল্লে, তাহা বর্ণনাতীত। এইরূপ অনুগ্রহ যেন আমার প্রতি চিরদিন থাকে ; হঁ্যা তােমার সখীরা মন্দিরের ভিতর বন্দী আছে বল্লে নয় ? আচ্ছা কোথায় সে মন্দির চল দেখিগে। (উভয়ের প্রস্থান ) চতুর্থ গর্ভাঙ্ক। গায় মধুকর (বনদেবী সিংহাসনে আসীনা। উভয় পার্শ্বে সখীগণ দণ্ডায়মানা।) প্রথম সখী। মধুর পবন মধুর গগন, মধুর মাসেতে মধুর সবে। দ্বিতীয় সখী। গায় পিকবর, গায়িছে পাপিয়া মধুর রবে । তৃতীয় সখী। ফুটিল চামেলী, গােলাপ, মালতী, কমল কলিকা কুসুমাবলী। চতুর্থ সখী। ললিত ললিত, সুলয় মিলায়ি পরিমল লােভে, ছুটিল অলি । পঞ্চম সখী। দিবাকর করে শােভিছে কেমন বিটপী রাজি। বনফুল সাজে সাজি বনদেবী হেরগাে কেমন শােভিছে আজি । সকলে। এস সবে মিলি নবফুল মালে, দিই ভক্তি ভরে দেবীর গলে । (মােহন ও মাধুরীর প্রবেশ।) মােহন। কই কই প্রিয়তমে! কোথা তরলিকা, নূতন পাতায় ৬ষ্ঠ সখী।

মােহন-মাধুরী।
মল্লিকা কোথায় গেল, কোথা সে মন্দির ?
ত করে খুজি মােরা তবু নাহি পাই
যদি—একি ! একি হেরি! কোথায় আইনু
বসন্তের ক্রীড়া ভূমি ! অপূৰ্ব্ব শােভায়
সুশােভিত দশদিশি। হেরলাে নয়নে,
নব পত্রে সুরঞ্জিত বন তরু বরে
জড়ায়েছে প্রেমভরে সুদৃঢ় বন্ধনে
কুসুমিতা লতা! আহা! কত পায় ব্যথা
সুকুমার দেহে সেই তরু সঘর্ষণে ;
তবু নাহি মানে, যেন লাগে তার প্রাণে
ফুলের আঘাত সম।
রমণীর প্রেম
পুরুষ প্রেমের চেয়ে বেশী শতগুণে।
ফুল আভরণে শােভে প্রকৃতিসুন্দরী
কি সুন্দর মনােরম ! কিবা অনুপম
সঙ্গীত-লহরী প্রিয়ে পশিতেছে কানে,
ভ্রমর গুঞ্জনে, মরি পিককুল গানে !
ইচ্ছা হয় দোহে পিক পিক-বধু বেশে
থাকি চিরতরে এই কানন ভিতরে।
( অপর দিকে দৃষ্টিপূৰ্ব্বক )
আহা মরি ! একি হেরি এ বিজন বনে ?
লয়ে সখিগণে, সাজি কুসুম ভূষণে,
বনদেবী করিছেন লীলা! বনমালা

চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
দোলে গলে অবিরাম। রূপের ছটায়
জ্যোতিহীন দিবাকর। সুখের আকর
এই বনভূমি আজি দেবী-পদার্পণে
অতি মনােরম !
মাধুরী।
চল চল প্রিয়তম !
নমি মােরা দুইজনে দেবীর চরণে।
বিপদ সাগরে সেতু ও পদ দুখানি ।
উভয়ে। [ নিকটে গিয়া ]
প্রণমে সন্তান মাতঃ ! হের কৃপা নয়নে,
নাশিয়া বিপদ রাশি রাখ রাঙ্গা চরণে।
বনদেবী। এস এস প্রাণাধিক তনয় তনয়া,
আশীর্বাদ করি দোহে, হও চিরজীবী
চিরসুখী; অচিরেতে পুরিবে কামনা
দোহাকার। ম্লানমনা হওনাকো আর।
শিশুকাল হতে আমি বড় ভালবাসি
তােমাদের, শান্ত কর চিন্তাকুল চিত।
মায়ায় মােহিত হয়ে ছায়ার আকারে
ভ্রমি আমি নিরন্তর তােমাদের সনে।
বড় ভয় মনে, পাছে আমার বিহনে
বিপদে উদ্ধার নাহি পাও। জানি আমি
কি হেতু ভ্ৰমিছ আজি এ ঘাের বিপিনে ;
তাই লয়ে সখিগণে আইনু এখানে,

৫৮
মােহন-মাধুরী।
স্নেহের-বন্ধনে বাঁধি রেখেছ যে দেহে।
কি উপায়ে পুনরায় পাবে সখীগণে
বলিব মাধুরী! বাছা, শুন মন দিয়া।
মােহন তুমিও শুন; রাখিয়া মায়েরে
মাের কাছে, যাও তুমি উত্তর দিকেতে
বরাবর, সে মন্দির পাবে পথ মাঝে ।
বিনা ব্যাজে মুক্ত করি বন্দিনী দুজনে
কাতরা মাধুরী সনে মিলাবে ত্বরায়।
মােহন। আসি কি দেখিতে পাব জননী, তােমায় ?
বনদেবী। পাবেনা পাবেনা বাছা মাগিরে বিদায়।
মােহন। বুঝি পুণ্যবতী তত সখীগণ নয়।
বনদেবী। তা বলে মায়ের স্নেহ কম নাহি হয়।
মােহন। বিপদে পড়িয়া যবে কঁপিব মা ভয়ে ?
বনদেবী। অলক্ষ্যে থাকিয়া আমি রক্ষিব উভয়ে।
মােহন। আসি মা, বিদায় মাগে অবােধ সন্তান,
রাঙ্গা পদে সদা যেন থাকে মন প্রাণ ।
( প্রণাম ও প্রস্থান)
বন। (মাধুরীর প্রতি আয় মা মায়ের কোলে জুড়া জীবন,
কেন ভীত চিন্তাকুল সলাজ বদন ?
( মাধুরীকে ক্রোড়ে লইয়া উপবেশন )
কি ভয় কি চিন্তা তাের ? দিলাম অভয়,
বলিলাম মনস্কাম পূরিবে সত্বর ;

চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
;
তথাপি আনত মুখী ! লাজ ভরে বুঝি!
মার কাছে লাজ যে মা সাজেনা মেয়ের।
নাহি হেন কথা কিম্বা নিভৃত বাসনা,
মার কাছে মেয়ে যাহা পারে লুকাইতে।
হাসি মুখে মার পানে চাও একবার
চাও মুখ তুলে ; যাই এ জগৎ ভুলে ;
বাড়িল বনের শােভা তােরে লয়ে কোলে !
মাধুরী। (প্রফুল্ল বদনে) মা, মা, এত স্নেহ তাের এ দাসীর প্রতি।
হাসি কি থাকিতে পারে না আসি মা আর ?
শ্ৰীঅঙ্গ পরশে, মাগাে, গেছে সব জ্বলা,
পড়িয়াছে বহুদূরে অসার-সংসার,
কি এক স্বর্গীয় ভাবে চিত্ত প্রমােদিত।
কি কুহকে গেলা লাজ, নারীর
ভূষণ,
কিছুই বুঝিতে নারি। ক্রমেই সাহস
বাড়িছে জননী! মাের, বসি কোলে তাের ;
জিজ্ঞাসা করিতে কিছু সাধ এবে মনে।
বনদেবী। কি জানিতে চাস বাছা বল ত্বরা করি,
কিছুই অদেয় নাই তােরে।
মাধুরী।
দয়াকরি—
দিলি যদি দরশন, মিনতি চরণে-
নারীধৰ্ম্ম-কথা কিছু শুনা মা আমায়।
বনদেবী। নারীধৰ্ম্ম । মরি মরি কি সুন্দর কথা
-

মােহন-মাধুরী।
জিজ্ঞাসা করিলি বাছা! সতী রমণীর
জানিবার ইহা ছাড়া নাহি কিছু আর ।
পূৰ্ব্বে ব্যোমকেশ যাহা বসি বিতলে
উন্মুখী উমারে কহি, হতেন বিভাের,
জানি আমি, বলিতেছি ; শুন মন দিয়া ।
পতি গতি রমণীর, পতিই দেবতা,
পতির বচন কভু করােনা অন্যথা।
তপ জপ ব্ৰত দান সকলি অসার,
পতিসেবা বিনা কোন ব্রত নাহি আর।
ইষ্ট-দেব দরশন অন্যে নাহি পান ;
নারীর দেবতা কিন্তু সদা মূর্তিমান।
কোমল নারীর প্রাণ, ধ্যান ধারনায়
নাহি পটু, দেহ ধারী দেব তাই পায়।
কায়মনােবাক্যে যেবা সেবে পতি দেবে,
চরমে পরম গতি লভয়ে ত্রিদিবে।
পতিনিন্দা বিষ তুল্য জানিবে রমণী ;
সাক্ষী তার আছে সতী সতী-শিরােমণি।
প্রাণপণে কবরী পতি-সন্তোষ বিধান ;
নিজ প্রাণ দিলে তবে পাবে পতি-প্রাণ।
বিনা কিছু নয়,
পতি-শত্ৰু নিজ শত্রু জেনাে সুনিশ্চয় ।
পতি-চক্ষে এ সংসার দেখিতে হইবে,
;
পতি-বন্ধু নিজ-বন্ধু

চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
মহামূল্য পতি-প্রীতি তবে ত পাইবে।
এইরূপে পাতি-ব্ৰত্য করিয়া পালন,
পতি স্থানে বিশ্বপতি করিবে স্থাপন।
অন্তিমের কথা ইহা, আদিমের নয়,
রমণীর মুক্তি ভবে এইরূপ হয়।
( মাধুরীকে ক্রোড় হইতে নামাইয়া দণ্ডায়মান।)
লয়ে সখীগণে দুরে আসিছে মােহন,
দাও গাে বিদায় মােরে, আসি মা এখন।
মাধুরী। অসার সংসারে মাতঃ ! আবার ফেলিলে ।
বনদেবী। অসার নয় মা কভু
নির্লিপ্ত থাকিলে ।
মাধুরী। প্রণমি চরণে ওই চতুৰ্বৰ্গময়। ( প্রণাম)
বনদেবী। সিথীর সিন্দুর তব হইবে অক্ষয়।
( প্রস্থান)
( গীত)
সখীগণ।
ওই আসে আসে লাে তাের মন মােহন মনােচোরা।
বঁধু এসে, কাছে ঘেসে, কবে কত কথা রসে ভরা ।
সুবাসিত ফুটছে ফুল,
ছুটছে লােভে অলিকুল,
মলয় পবন বহি ধীরে করে প্রাণ মাতােয়ারা।
গােলাপের পাপড়ি প্রায়
ঠোঁট দুখানি কঁপছে তায়,
ধর ধর পর গলায় মালা নাম মনােহরা।
(মাল্য প্রদান ও গীত গাহিতে গাহিতে প্রস্থান)

মােহন-মাধুরী।
(মােহন, মল্লিকা ও তরলিকার প্রবেশ)
মল্লিকা ও তর। রাজকুমারী—রাজকুমারী—রাজকুমারী কোথা?
মাধুরী। ভয় কি সখি! এই যে আমি আছি।
তর। সখি ! তােমায় যে আবার দেখতে পাব এ আশা
ছিল না।
মল্লিকা। সখি! আমরা এতক্ষণ অবল-বান্ধব ভবানীপতির
নিকট কেবল তােমার মঙ্গল কামনা কচ্ছিলাম।
হ্যা ভাই, তুমি কেমন করে সেই যমদূতের হাত
থেকে নিস্তার পেলে ?
মাধুরী। (মােহনকে দেখাইয়া) -এই বীর পুরুষ আমায় উদ্ধার
করে চিরকৃতজ্ঞতা-পাশে বদ্ধ করেছেন।
তর। ( জনান্তিকে মাধুরীর প্রতি) আর কোন পাশে বদ্ধ
করেন নাই তাে ?
মাধুরী। ( জনান্তিকে) যাও।
তর। ( জনান্তিকে) তা এখন ত তাড়িয়েই দেবে।
মল্লিকা। ধন্য বীরত্ব ! যার এমন সুপুত্র সে জননীও ধন্য।
আর যে এমন বীরের অঙ্কলক্ষ্মী হবে তার অদৃষ্টও ধন্য।
মােহন। ( সলজ্জ ভাবে ) আমি কোন ক্রমে তােমাদের
প্রশংসার যােগ্য নই। কাপালিকের সাধ্য কি যে
তােমাদের সখির কোন অনিষ্ট করে !
মাধুরী। তােমরা ওঁর কথা বিশ্বাস করাে না। উনি না থাকলে
নিশ্চয়ই আমায় জীবনের আশা ত্যাগ করতে হত।

চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
মল্লিকা। ( জনান্তিকে মাধুরীর প্রতি ) তাইত সখী তুমি যে
শিব পূজা না করেই মনােমত বর পেলে দেখচি।
এখন থেকেই ‘উনি’ ‘তিনি’?
মাধুরী। (কৃত্রিম ক্রোধ প্রকাশ পূৰ্ব্বক) আবার তুমিও
লাগলে ?
মােহন। আর আমাদের এখানে দেরী করা উচিত হচ্ছে না।
রাজপুরীতে সকলে কত ভাবছে। শীঘ্র তথা যাই
চল, সেখান থেকে জন কতক রাজভৃত্য পাঠিয়ে
দিয়ে কাপালিকের সৎকার করাতে হবে।
[ সকলের প্রস্থান ]।
যবনিকা পতন।

তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
রাজ্ঞী লীলাবতীর কক্ষ।
{ লীলাবতী ও মাধুরী আসীনা।)
লীলা।
আয় বাছা কাছে আয়, কি মনােবেদনা
বল, খুলি মার কাছে ; ভুলেছিস্ খেলা,
পূর্ণ শশধর সম ওই চারু মুখ
বিষাদ মেঘেতে ঢাকা, কি ভাবনা তাের ?
সুললিত দেহলতা, কোমল নধর,
শুকাইছে অযতনে কিসের লাগিয়া ?
বাঁধা ছিল অধরেতে হাসি, রবিকর
খেলে অনিবার যথা গােলাপের দলে ;
গেছে হাসি, ছায়া তার শুধু থাকি থাকি
চমকে নীলিমাময় ওষ্ঠাধর মাঝে,
ক্ষীণ ক্ষণপ্রভা যথা নীল মেঘ কোলে।
দিনে বেদনা আর মায়ের পরাণে,
বল, কেন হলি হেন—কি ভাবনা তাের ?

প্রথম গর্ভাঙ্ক।
লীলা।
মাধুরী। কিসের ভাবনা মাগাে, কি অভাব মাের?
এক মেয়ে রাজকুলে—সবার আদর
বরষে বৃষ্টির মত আমার উপরে ।
না চাহিতে পাই সব, একা করি ভােগ
মা বাপের সবটুকু স্নেহ।
ছেলেবেলা
দূর উপবনে যবে খেলিতে খেলিতে
পড়িয়াছে কোন কথা মনে, ছুটে এসে
বলেছিস্ মার কাছে। মাতা ও মেয়ের
ছিল এক মন। আজি হয়েছিস্ বড়,
শিখেছিস্ লুকাইতে হৃদয়ের ভাব।
মাধুরী। কেন এ নিঠুর বাণী মাতঃ ! ক্ষম দোষ
করিওনা রােষ। বুঝি ছিনু আনমনে
কি বলিতে কি বলেছি ; বল আর বার,
দিব সদুত্তর আমি, পারি যতদুর।
লীলা।
কাজ নাই তাহে বাছা, কোমল পরাণে
ব্যথা দিতে নাহি সাধ ; দেখি দশা তাের
আসি তরলিকা মােরে কহিল বারতা
মােহন-মাধুরী কথা আগাগােড়া সব।
তােল মাথা, কেন লাজ মায়ের সমীপে।
শােন স্থির হয়ে যাহা বলি এবে আমি।
কেন এ প্রণয়ে বাছা দিলি হৃদে স্থান ?

মাধুরী।
মােহন-মাধুরী।
বিফল, কেবল নিজ অমঙ্গল হেতু।
সত্য বটে রূপে গুণে নীলাম্বর সুত
যােগ্য তাের, কিন্তু সে যে দরিদ্রের ছেলে !
মৰ্যাদা লাঘব হবে নিশ্চয় রাজার
এ বিবাহ দিলে, তঁার হবেন সম্মতি।
তবে আর কেন বৃথা এই কাল সাপে,
বিফল প্রণয়ে এই পুষিবি হৃদয়ে ?
শােন্ মা মায়ের কথা, কখনত তুই
হস্নে অবাধ্য মাের, ভুলে যা মােহনে।
ভুলে যাব—ভুলে ? মাগাে বড়ই কঠোর
আদেশ করিলে আজি। মানস-আসনে
বসাইয়া এতদিন পূজিনু যাহারে
রমণী হৃদয় বৃত্তি দিয়া উপহার
ভুলে যাব তারে ? যার মোহনপ্রকৃতি
ধ্যান জ্ঞান সব মাের, ভুলিব তাহারে ?
ভুলে যাব ইষ্টদেবে ?
কেমনে ভুলিব ?
শিরায় শিরায় মাতঃ ! যার চিন্তাস্রোত
বহে দিবানিশি, তারে কেমনে ভুলিব ?
কেমনে ভুলিব তারে, মিশায়েছি যাহে
চিরজীবনের তরে অস্তিত্ব আমার।
কাড়ি লও প্রাণ, মাগো, তাও সহ্য হবে—
প্রাণের অধিক ধনে নিওনা কাড়িয়া।

প্রথম গর্ভাঙ্ক।
ধিক স্বার্থপর মােরে, কি বলিনু এবে !
ক্ষম দোষ, উন্মাদিণী আজি আমি মাতঃ !
থাকুক তােমার কথা, পিতার মর্যাদা,
কন্যার উচিত যাহা করিব পালন।
ভুলে যাব মােহনেরে, কিন্তু তার সাথে
জনক জননী স্নেহ ভুলে যদি যাই,
জগতেরে চিরতরে ভুলে যাই যদি,
চিরবিস্মৃতির জলে সব নিমগণ
হয় যদি ভাগ্যদোষে অভাগী কন্যার –
নিওনা মা তাপরাধ।
বালাই, বালাই,
জীবন থাকিতে তাহা নারিব সহিতে।
মােছ অশ্রু ; মনস্কাম পুরাইতে তাের
আজি হতে প্রাণপনে করিব প্রয়াস।
আয় ততরে রেখে যাই সখীদের কাছে।
কায়মনে পূজে থাকি যদি ইষ্টদেবে,
নিশ্চয় করিব তবে অসাধ্য সাধন।
[ মাধুরীকে লইয়া প্রস্থান। }
লীলা।

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
মহারাজ বীরকেশরের নিজকক্ষ
( চিন্তামগ্নভাবে মহারাজ বীরকেশরের পরিক্রমণ, সহসা
রাজ্ঞী লীলাবতীর প্রবেশ।)
লীলা।
রাজা।
লীলা।
মহারাজ। একি অবিচার !
কেন কি হয়েছে রাণী ।
কি হয়েছে জিজ্ঞাসিছ, নাহি লাজ মনে ?
পিতা হয়ে তনয়ারে তিল তিল করি
বধিছ জীবনে, বল এ কোন্ বিচার ?
কেন উদাসীন সদা তাহার বিবাহে ?
কার ঘরে এত বড় কুমারী তনয়া
রয়েছে দেখাও মােরে । আপন মর্যাদা
ভাব সদা, নাহি ভাব তনয়ার দশা।
এর নাম পিতৃস্নেহ ? ধিক্ হেন স্নেহে।
রটাইছে কত লােকে কত মত কথা,
শুনে লাজে মরে যাই রমণী আমরা ।
রাজা তুমি, নাহি কর লােকলাজ ভয়,
তাই বলি ধৰ্ম্মভয় নাহি হয় মনে ?
অতি দীন দুঃখী যারা, তারাও সময়ে

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
৬৯
লীলা।
সাধ্য মত পাত্রে করে কন্যা সম্প্রদান।
আর তুমি, রাজা এই বিপুল রাজ্যের,
নারিলে বিবাহ দিতে সময়ে কন্যার ।
ধিক্ রাজ নামে।
রাণী ! মিথ্যা দোষ মােরে ;
সন্ধানের নাহি ত্রুটী, দেশ দেশান্তরে,
গ্রামে গ্রামে পাঠায়েছি কত শত দূত
জোগ্য জামাতার তরে, কেহ না পাইল ।
বিধি বাম, তুমি আমি কি করিতে পারি ।
রেখে দাও বিধি তব, কেবা সেই বিধি ?
অদৃষ্ট বাদের কভু নহে এ সময়।
উদ্যমের মূলমন্ত্রে বাঁধি মন প্রাণ
সাধহ আপন কাৰ্য, হবে না নিষ্ফল।
নাহি যদি পেয়ে থাক পাত্র মনােমত,
দেখায়ে দিতেছি আমি, দাও অভিমত।
দেখাও মহিষি! আমি করিনু স্বীকার
যােগ্য হলে কন্যা তারে করিব প্রদান।
যােগাযােগ্য নাহি বুঝি, কিসে তনয়ার
ভাল হবে, তাই আজি বলিব তােমায়।
রমণী প্রবীণ বেশী পুরুষের চেয়ে
এ সব বিষয়ে ; তাই বলিতে বাসনা।
যার কথা বলিতেছি তাহার মতন
রাজা।
লীলা।

মোহন-মাধুরী।
মনােমত পাত্র নাহি মিলিৰে কন্যার ।
সুন্দর বরণ তার, সুন্দর গঠন,
সুন্দর নয়ন তার, সুন্দর বদন,
সুন্দর চলন তার, সুন্দর বচন,
সব চেয়ে ভাল তার স্বভাব সুন্দর।
তাই যাহা করে তাই পরম সুন্দর ।
কোন বংশে জন্ম ?
রাজা।
লীলা।
রাজা।
লীলা।
তাও পরমসুন্দর
অতি উচ্চকুল তাহে নাহি কোন ভুল ।
কোথাকার রাজপুত্র ?
নিজে রাজা বাছা।
এত টুকু রাজ্য ; কিন্তু তাহার তুলনে
তুচ্ছদপি তুচ্ছ তব শাসিত ভূভাগ।
নাহি কঠিনতা তথা, সকলি কোমল,
নাহি দ্বেষ, নাহি হিংসা, নাহি রােগ জরা,
স্নেহ, দয়া, মমতার লীলাভূমি সেই।
কত সৈন্য তার ?
সৈন্য। নাহি একজন।
কি কাজ বা সৈন্যে তার ? অতুল বিক্রমে
শাসে অধিকৃত দেশ একা বীরবর।
কার সাধ্য রাজ্য হতে তাড়ায়ে তাহারে
সিংহাসনে তার স্থান করে অধিকার।
রাজা।
লীলা।

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
৭১
রাজা। বিস্ময় বাড়ালে রাণী, কে এমন জন?
শুনিনু এত দিন এ অপূৰ্ব্ব কথা ?
সকলি
অতুল
তার ! উর্ধে সুরলােকে
দেবে অসম্ভব যাহা, নরে কি সম্ভব ?
নাহি দাও পরিচয়, শুধুই বর্ণনা।
প্রহেলিকা প্রায় সব হয় অনুভব।
কিসে, বা বিশ্বাস হবে ? সাবধান রাণি !
যে অনল জ্বালিয়াছ হৃদয় মাঝারে
নিভাও সত্বর, দাও সত্য পরিচয়।
লীলা। নীলাম্বর ব্যাধ সূত।
রাজা।
কি বলিলে রাণী ।
নীলাম্বর ব্যাধ সূত! ভিখারীর ছেলে !
পরিহাস মম সনে ? না, না, ভ্রান্তি ভুল।
বল, বল একবার হইয়াছে ভুল ।
সত্য নীলাম্বর সূত। ভুল কেন হবে।
মােহন তাহার নাম, রূপেও মােহন।
যে যে গুণে হয় রাজা প্রজার পালক
সকলি তাহার আছে। আরাে বলি শুন,
প্রাণের মাধুরী
রাজা।
অহ বুঝেছি সকলি,
বলিতে হবেনা আর। শতধি মােরে,
এতক্ষণ হীণবুদ্ধি নারীর চাতুরী
লীলা।

१२
মোহন-মাধুরী ।
;
বুঝিতে নারিনু আমি ; ভিখারীর ছেলে,
কোথা পাবে রাজ্য সেটা ? তবে তবে অ—হ
মাথা কাটা গেছে মাের। এও কি সম্ভব ?
কন্যার হৃদয়রাজ্য তার অধিকৃত ।
মিথ্যা কথা, মিথ্যা—কিন্তু তাই বা কেমন ?
ওই স্থির মূর্তিখানি নীরব নিশ্চল
বলিতেছে বাক্যহীন জ্বলন্ত ভাষায়,
সব সত্য সব সত্য। সত্য যদি সব,
তাহলে মা বসুমতি ! যাও দ্বিধা হয়ে
অভাগা সন্তান তাহে করুক প্রবেশ ।
কিন্তু তা হবার নয়। মর্মে মর্মে ব্যথা
সহিতে হইবে কত। রাজকুলগ্লানি
কন্যা-না না কন্যা আর নহে সে আমার
হীন জনে মন প্রাণ করিল অর্পণ।
এই কিহে ছিল লিখা নিঠুর বিধাতঃ !
এ পােড়া কপালে ? রাণী পার কি বলিতে,
কেমনে এমন হল সে দিনের মেয়ে ?
যারে তারে অন্তঃপুরে প্রবেশিতে মানা
নাহি ছিল, তারি ফল পেনু এত দিনে ?
রাজকার্যে ব্যস্ত আমি ; তুমিত জানিতে।
কেন তবে এত দিন বলনি আমায় ?
লীলা। অভিমানে জ্ঞান হীন হইয়া রাজন।

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
বলাে না অন্যায় মােরে। কি জানিব আমি ?
ছেলে বেলা খেলা ধুলা করিত দুজনে
অন্তঃপুর উদ্যানেতে; এই মাত্র জানি।
তারপর বড় হলে মাধুরী আমার,
মােহন প্রাসাদে বড় আসিত না আর ।
ইতিমধ্যে ঘন বনে কেমনে মােহন
উদ্ধারিল মাধুরীরে করি বীরপণ,
শুনিল যেমন সবে, আমিও তেমন।
আজি শুনি মােহনের মােহন মূরতি
হয়েছে অঙ্কিত তার কোমল হৃদয়ে,
ভাস্কর-খােদিত যথা অক্ষয় অক্ষর
মৰ্ম্মর প্রস্তর অঙ্গে বিরাজে নিয়ত।
কি দোষ করেছে বাছা, কেন তারে বাম,
কেন কন্যা নহে তব ? অকলঙ্ক শশী
মূর্তিমতী পবিত্রতা মাধুরী আমার ।
কে বলিল নয় তাহা, বলেছি কি আমি ?
অকলঙ্ক সত্য, কিন্তু এও জেনাে স্থির,
ভিখারী তনয়ে নাহি করিব জামাতা।
আবার পাঠাব দূত নগরে নগরে ;
প্রথমে যাহারে পায়, রাজপুত্র হলে
তাহারেই কন্যা তব করিব প্রদান।
ভুলেছে আমার নাম, তােমার তনয়া
রাজা।

৭৪।
লীলা।
মােহন-মাধুরী ।
ভুলেছে গৌরব আর কুলের মর্যাদা
ভুলিয়াছে উচ্চপদ, তাই নীচ জনে
পূজিছে যতনে হৃদে ; যাও বলাে তারে,
উপাড়িয়া ফেলে যেন মূলের সহিত
হৃদয়মন্দিরে রাখি পূজে যে প্রতিমা,
বিষবৃক্ষ উপাড়িয়া ফেলে যথা লােকে
চিহ্নমাত্র নাহি রাখি। পারে যদি তাহা
তবেই তনয়া বলি করিব স্বীকার,
যাও রাণি !
হৃৎপিণ্ড ছিড়ে যদি যায়,
স্বভাব বিরুদ্ধ এই বিষম চেষ্টায় ?
তাও শ্রেয় তাও শ্রেয় ; তবু যেন কেহ
নাহি বলে নীচ জন হ’ল বৈবাহিক
বীরকেশরের ।
এত—এতই নির্মম ।
দিলে বলি পিতৃস্নেহ মৰ্যাদার কাছে !
এক মাত্র স্নেহধার তনয়ার মুখ
চাহিলে একবার !
পুরুষের মন
কি দিয়া গঠিল বিধি ! কর অনায়াসে
স্নেহমায়া বিসর্জন। আর আমি--আমি
পারিব না, পারিব না থাকিতে জীবন।
ফেটে যায় বুক, যবে নিরখি তাহার
রাজা।
লীলা।

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
মলিন বদন, আহা সংশয়ে চিন্তায়
এতটুকু হয়ে গেছে! বাছারে আমার
কেন অভাগীর গর্ভে লভিলি জনম ?
( আত্মসম্বরণ করিয়া)
পাষাণে বাঁধিলে
বুক
যদি হে রাজন!
আপন মৰ্যাদা লয়ে থাক রাজপুরে,
যাই আমি পিতৃগৃহে, দাও অনুমতি।
মাধুরীর মনােদুঃখ সহিতে নারিব--
যাই আমি পিতৃগৃহে, বাছারে লইয়া ।
আছে পিতা, আছে ভ্রাতা, শুনিবেনা কথা ?
সকলে কি অভাগীরে ঠেলিবে চরণে ?
কেন নিরুত্তর তুমি না কহিছ কথা ?
দাও বা না দাও আজ্ঞা, করিব নিশ্চয়
আছে মনে যাহা মাের ; নয়ন পুতলি
মনােসাধ পুরাইতে পারি যদি তার
তবেই জানিব মম সার্থক জীবন।
দেখ কতদুর হয় নারীর চেষ্টায়,
এই চলিলাম আমিকে পারে ফিরাতে ?
[ বেগে প্রস্থান)
যেওনা যেওনা রাণী । শুন মাের কথা ।
[ পশ্চাতে প্রস্থান ]
রাজা।

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
বিজন বন।
( হতপশু স্কন্ধে ধনুর্বাণ হস্তে নীলাম্বরের প্রবেশ।
'নীলাম্বর।
তিমিরে ঘেরিল পৃথি, ডুবিল তপন।
শিবাকুল সমস্বরে ফেউ ফেউ করি
ঘােষিছে তমােময়ী নিশি আগমন,
অল্পে অল্পে অগ্রসর হন বিভাবরী।
চলিছে বিহগকুল কুলায় উদ্দেশে,
আহার সন্ধানে ফিরে যত রাত্রিচর।
বনবাসী মুনি ঋষি যােগাসনে বসে
ধ্যায়েন কমলাকান্ত পুরুষপ্রবর ।
নিস্তব্ধ রজনী, ঘাের অন্ধকারময়,
তাহাতে আবার মেঘে ছাইল গগন ;
কিরাত—আমারাে প্রাণে হেরি ভয় হয়,
বিপাকে পড়িয়া পাছে হারাই জীবন।
কত দিন অসিয়াছি ছাড়ি পরিজন,
বাঁধিয়া কুটীর এই বিজন বিপিনে
মৃগয়া করিয়া করি অর্থ উপার্জন
অবিলম্বে চলি যাব আপন ভবনে।

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
৭৭
নিরজন এই বন, নাহিক মানব---
দুদণ্ড কহিয়ে কথা যাহাদের সনে
প্রাণ খুলি, দুরে যায় মনােব্যাথা সব,
কেমনে অধিক দিন থাকিব এখানে ?
( সহসা গম্ভীর নাদে বজ্রপতন ও বিদ্যুৎপ্রকাশ)
বধির হইল কর্ণ গভীর নিস্বনে,
চপলার তেজে চক্ষু ঝলসিয়া যায়-
যেরূপ চলিছে মেঘ অধীর গগনে
এখনি আসিবে বৃষ্টি শ্রাবণ ধারায়।
আসিবে কি, এল এই ঝম্ ঝম্ করি,
কেমনে যাইব ফিরে কুটীরে আমার,
উপায় না দেখি কিছু—ওটা কিও হেরি,
সারবান বিল্ব বৃক্ষ প্রকান্ত আকার ?
নিদারুণ এ দুর্যোগে কোথায় বা যাই
উহার উপরি চড়ি রজনী কাটাই।
( বিল্ববৃক্ষে আরােহণ )
( মহাদেব ও গৌরীর প্রবেশ। )
গৌরী। কই হর! কেহইত পুজেনি তােমায় ।
দিবাকর অস্ত গেল, নিশি আগমন ;
তাহাতে আঁধারে কিছু নাহি দেখা যায়
এ দুর্যোগে আসিবেক কোন্ ভক্তজন ?

মোহন-মাধুরী।
মহাদেব। এখনাে রজনী আছে নাহিক সন্দেহ--
কেমনে জানিলে তুমি আসিবে না কেহ ?
গৌরী।
একে লােকালয় নহে, গহন কানন,
তাহে কৃষ্ণপক্ষ নিশি ঘাের অন্ধকার ;
তাহাতে মূষল ধারে সলিল বর্ষণ,
ঝটিকা, বিদ্যুৎ, বজ তাহাতে আবার ।
কে আছে সাহসী হেন আসে এ বিপদে,
প্রাণের আশঙ্কা যাতে হয় পদে পদে ?
যা বলেছি তাই হ’ল, তব ভক্ত নাই
মিছা কেন ঘুরি, চল গৃহে ফিরি যাই ।
মহাদেব । বৃষ্টি জলে আর্দ্রীকৃত হইল বসন,
পথশ্রান্ত হইয়াছি চলি বহুদুর।
সুবৃহৎ বিল্ববৃক্ষ কর দরশন,
চল ওর তলে গিয়ে করি শান্তিদুর।
( মহাদেবের বামপার্শ্বে উপবেশন পূৰ্ব্বক )
গৌরী। কি আশ্চর্য ? একদিন পৃথিবী ভ্রমণে
দেবত হইয়া তুমি হইলে কাতর !
দেবতা সমাজ হায় কি বলিবে শুনে,
ত্রিভুবন ভ্রমে যারা দণ্ডের ভিতর ?
মহাদেব। কি বলিবে দেবগণ ? বলিবে না হয়,
“অতি বৃদ্ধ অকর্মণ্য হয়েছে শঙ্কর,
বৃদ্ধ হয়ে বল তার পাইয়াছে লয়,

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
৭৯
বাহন ব্যতীত হয় চলিতে কাতর।
প্রশংসায় তােষ নাহি, নিন্দায় বা ক্রোধ,
উভয় সমান মম চিরকাল বােধ ।
গৌরী। বিপরীতে সম প্রীত যদি তব মন,
তাহলে বিশ্রাম শ্রম সমান তােমার ;
অতএব বিশ্রামের নাহি প্রয়ােজন,
চল ফিরি যাই ত্বরা কৈলাশ আগার ।
জয় পরাজয় যদি হয় হে সমান,
তাহলে জয়ের তরে কেন সহ ক্লেশ ?
কেন বা বধিছ নাথ ! অবলার প্রাণ,
হয় মানিনু হার, চল ব্যোমকেশ ।
মহাদেব। চাতুরী বা মিষ্টবাক্যে শুন মহেশ্বরি।
নারিবে জিনিতে তুমি । আমার বচন
অন্যথা হবার নয়; দেখ শিরােপরি
সচন্দন বিল্বদল হইল পতন।
( রক্তাক্ত বিল্বপত্ৰ মহাদেবের মস্তকে পতন )।
গৌরী। দেখি দেখি, সত্যই ত ; কোন্ ভক্তজন
সরক্ত চন্দন বিহু দিল শিরােপরি ?
( উর্ধে দৃষ্টিপূৰ্ব্বক)
বৃক্ষেও ত কারে নাহি করি দরশন।
একি মায়া, মায়াময়! বুঝিতে না পারি ।
ধ্যানস্থ হইয়া দেখি । [ ধ্যান ] পেরেছি বুঝিতে,

মোহন-মাধুরী। সেই নীলাম্বরে পুনঃ আমারে ছলিতে আনিয়াছ এইস্থানে; সেই ব্যাধবর মাংসভার সহ আছে বৃক্ষের উপর । পশুরক্ত সিক্ত যত বিল্বপত্র দল ঝড়ে তব উড়ে শিরে পড়িছে কেবল । পশুরক্ত তব কাছে চন্দন বিশেষ, ঝড়ে যে পড়িল তাহা না গণ মহেশ। মহাদেব । জ্ঞানে বা অজ্ঞানে করে যে মাের পূজন, তার মনােবাঞ্ছা করি তখনি পূরণ। এই নীলাম্বর আজি উপবাস করি অজ্ঞানে আমার পূজা করেছে শঙ্করি। আজ হতে নীলাম্বর মম ভক্তবর, তার নমস্কাম পূর্ণ করিব সত্বর। মম বরে মান্যগণ্য হয়ে সবাকার- ধরাধামে মম পূজা করিবে প্রচার। ভক্তি পথে মানবের মঙ্গল কারণ করিলাম আমি দেবি! এত আয়ােজন। গৌরী। লীলাময়! তব লীলা কে বুঝিতে পারে ? শত শত যােগী ঋষি বসি যােগাসনে যার তত্ব নাহি পায় শতেক বৎসরে, তারে আমি নারী হয়ে চিনিব কেমনে। মম পরাজয়ে দুঃখ করি না শঙ্কর

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
মহাদেব ।
তব পূজা প্রতিষ্ঠায় কৃতাৰ্থ অন্তর।
কি
হেতু
আমায় আজি, বাড়াও শঙ্করি।
অনুক্ষণ আমি তব কৃপার ভিখারী।
তুমি দেবী আদ্যাশক্তি, তব শক্তি কণা
পাইয়া অসীম শক্তি লভে ভক্ত জনা।
তােমার শকতি লয়ে আমার শকতি,
তব সহায়তা বিনা নাহি মাের গতি।
মনে কি করেছ তব হইয়াছে হার ?
হার নয় ইহা দেবী! বিজয় তােমার।
ছলেতে জিনেছি আমি, বাস্তবিক নয়,
যে শুনিবে সে বলিবে তােমারি বিজয় ।
যেই তুমি সেই আমি নাহি ভেদাভেদ,
তব ভক্তে মম ভক্তে নাহিক প্রভেদ।
আশীৰ্বাদ করি এবে ভক্ত নীলাম্বরে
অবিলম্বে যাৰ চলি কৈলাস শিখরে ।
( উচ্চৈঃস্বরে )
কেরে ভক্ত আছ মাের বৃক্ষের উপরে
নেমে এস আশীর্বাদ করিব তােমারে।
( নীলাম্বরের বৃক্ষ হইতে অবরােহন)
নীলাম্বর। ( ভূতলে জানু পাতিয়া উপবেশন পূর্বক করযােড়ে)
অপরাধ করিয়াছি ক্ষম দ্বিজবর ।
নীচে তুমি, ছিনু আমি বৃক্ষের উপর ।

৮২. মােহ-মাধুরী। অজ্ঞান, অধম, দীন, বুদ্ধি শুদ্ধি হীন- ক্ষম রােষ আমি তব কৃপার অধীন। মহাদেব। তুষ্ট বই রুষ্ট নই তােমার উপর, যাহা বলি অবহিতে শুন ব্যাধবর। কৈলাস ঈশ্বর আমি; আজি হে আমারে অজ্ঞানে পূজেছ থাকি বৃক্ষের উপরে। আজ হতে তুমি মম প্রিয় ভক্ত বর, মনােনীত বর মাগী লহরে সত্বর। ( সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাৎ পূৰ্ব্বক করযােড়ে ) নীলাম্বর। এদীনের প্রতি যদি তুষ্ট মতি, পদধুলি দাও মাথে । ওরাঙ্গা চরণে রেখ এ অধীনে পুত্র পৌত্রে দুধে ভাতে । ওমা মহামায়া, দিও পদ ছায়া শমন নিকটে এলে। যেন মহেশ্বরি। দুর্গানাম করি শিব লােকে যাই চলে । মহাদেব। তথাস্তু- গৌরী। আমিও বর দিলাম তোমায়- রম্য অট্টালিকা তব হইবে ত্বরায় ; তব পুত্র হইবেক রাজার জামাতা, দীর্ঘজীবী করিবেন তােমারে বিধাতা।

৮৩
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
মহাদেব । প্রতি বর্ষে এইদিন অমারজনীতে
করিবে আমার পূজা ভক্তিপূত চিতে।
ঘরে ঘরে শিবপূজা করিবে প্রচার ;
এস দেবি! যাই এবে কৈলাস আগার ।
( প্রস্থান)

- "
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
নীলাম্বর ব্যাধের প্রাসাদ সম্মুখ।
( চারিজন ব্যাধের প্রবেশ ও গান।)
সারি সারি আয় নাকারী
আগে চল ভাই রে--
হাতে মারি
পেটে পূরি
এমন পেশা নাই রে।
চাহা হাঁস
বাঘ বরা
ছাড়িনে কিছুই মােরা
হরিনেরই গন্ধে যেন
হাতে স্বর্গ পাইরে।
১ম ব্যাধ। ওরে ভাই, আমরা পথ ভুলে এ কোথায় এসে
পড়লুম ?
২য় ব্যাধ। দুর বেটা দিন কানা, পথ ভুলবে কেন? ওই যে
সেই সিমুল গাছটা দেখতে পাচ্ছি না।
১ম ব্যাধ । আরে তাইত, আমার চকে ধাঁধা লেগেছিল নাকি ?
৩য় ব্যাধ। আচ্ছা ভাই আমরা যদি পথ ভুলিনি, তবে এখানে
রাজবাড়ী এল কেমন করে ?
৪র্থ ব্যাধ। তুইও যে দেখচি চোকের মাথা খেয়েচিস্। ওটা
বুঝি রাজবাড়ী?
১ম ব্যাধ। রাজবাড়ী নাহ একটা কোটাবাড়ীত বটে। তায়

চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
আবার যে সে কোটা নয়, এর কাছে রাজবাড়ীও
হার মেনে যায়।
৩য় ব্যাধ । আমার বােধ হয় এ একটা রাজবাড়ী।
রাক্ষস রাজকন্যা শুদ্ধ এবাড়ী এনে রেখেছে।
হয়ত জোর করে তাকে বিয়ে করূবে ।
২য় ব্যাধ। হ্যা তা বরং হতে পারে, এ রকম ঢের শুনা গেছে।
১ম ব্যাধ। দাড়াও, এখানে কার বাড়ী ছিল আগে ঠিক করি।
আচ্ছ। এখানে আমাদের সর্দার নীলাম্বরের বাড়ী
ছিল না?
২য় ব্যাধ। আরে তাই ত তবে সে বাড়ী গেল কোথা ?
৪র্থ ব্যাধ ।
হয়ত রাক্ষস টান মেরে আর এক দেশে ফেলে
দিয়েছে।
২য় ব্যাধ। আহা সর্দার বাড়ীতে নেই, অনেক দিন হল
মৃগয়ায় বেরিয়েছে; ফিরে এসে বাড়ী ঘর না
দেখতে পেয়ে কেঁদেই মরবে । বেচারার কপাল
নেহাত মন্দ, তা নাহলে আর এমন হয়।
৩য় ব্যাধ । যা যা হবার তাত হয়েছে, তার জন্য আর দুঃখ
কল্লে কি হবে। এখন একবার বাড়ীটার ভিতর
ঢুকে দেখতে পাল্লে হয়।
১ম ব্যাধ। হা হঁা বেশ বলেছি। দিনের বেলা কিছু আর
রাক্ষস বাড়ীতে থাকে না। কেমন রাজকন্যা
এনেছে দেখে চক্ষু সার্থক কৰ্ত্তে হবে।

মােহন-মাধুরী
২য় ব্যাধ। হয়ত তাকে মেরে রেখে গেছে।
৪র্থ ব্যাধ।
ভয় কি, সোনার কাটি রূপার কাটী আছে তা
৩য় ব্যাধ। পরামর্শ ত হচ্চে খুৰ; এখন বেরালের গলায় ঘন্টা
বাঁধতে কে যাবে বল দেখি বাবা?
১ম ব্যাধ। আঃ কি বলব কবচ খানা আনতে ভুলে গেচি ।
নইলে সাহসটা একবার দেখিয়ে দিতুম।
২য় ব্যাধ। থতি নেপাল দাদা আজ আমায় পায়কে। দুজনে
মিলে বিশ্বজয় কৰ্ত্তে পারতুম, একটা রাক্ষসের
বাড়ীর ভিতর ঢােকা ত সামান্য কথা।
৪র্থ ব্যাধ। (তৃতীয় ব্যাধের প্রতি। দাদা আমাকেও মাপ
কৰ্তে হবে।
একটা দুঃস্বপ্ন দেখা অবধি প্রাণটা
বড় খারাপ হয়ে রয়েছে।
৩য় ব্যাধ । হা হা ভায়া, শুধু সােনার কাটী রূপাের কাটী
ছোঁয়াতে জানলেই হয় না, ( সদম্ভে ) তােদের
কারুই গিয়ে কাজ নাই। আমি একলাই যাব ।
এই দেখ সব কাপুরুষের দল। (অগ্রসর ও অন্য
সকলের উকি মারিয়া দর্শন, তৃতীয় ব্যাধ দ্বারের
নিকট প্রস্তর নির্মিত বাঘ দেখিয়া ) ওরে বাবা
বাঘ যেরে! (পলায়ন ও ভয়ে এক জনের স্কন্ধদেশে
উত্থান) দেখ দেখ আমার পা কেটে নেয়নিত
( কম্পন )।
৪র্থ ব্যাধ। (স্কন্ধ হইতে তৃতীয় ব্যাধকে ফেলিয়া) ব্যাটারত

চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
৮৭
মুরদ ভারী। কি বাবা কম্প দিয়ে জ্বর এল নাকি,
উনি আবার আমাদের কাপুরুষ বলেন।
২য় ব্যাধ। থাম্ থাম্ তােদের আর ঝগড়া কত্তে হবে না।
এখন চল মহারাজের কাছে খবর দিইগে। তিনি
এসে যা কৰ্ত্তে হয় করবেন ।
( গানের প্রথম লাইন গাইতে গাইতে সকলের প্রস্থান।)

পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
*
t
;
মাধুরীর কক্ষ।
মল্লিকা। ও ভাই তরলিক রাজকুমারী যে দিন দিন ভেবে
ভেবে ক্ষীণ হয়ে যাচ্চে এর উপায় কি বল্ দেখি ।
কত কবিরাজ বদ্যি দেখান হল, কিছুতেই ত কিছু
হল না।
তর। সব রােগ কি আর কবিরাজী চিকিৎসায় সারে ?
মল্লিকা। তা হঁা ভাই, মােহনের সঙ্গে রাজকন্যার বিয়ে
দিলেই ত আপদ চুকে যায়।
আপদ ত চুকে যায় কিন্তু এদিকে রাজা যে কোট করে
বসেছেন যে, যার চাল চুলো নাই তাকে কন্যা
সম্প্রদান করবেন না, তার কি বল্ দেখি ?
মল্লিকা। হক্ কথা বব ভাই তাতে আর ভয় কি, রাজার
কিন্তু এ কোট করা ভারী অন্যায়।
তর। সে কথা রাণীমা ঢের বুঝিয়েছিলেন; কিন্তু রাজা কি
মেয়েমানুষের কথায় কান দেন। তবে মন্দের
ভাল এই, যে রাণী মার অনেক পীড়াপীড়ি ও ভয়
দেখানতে রাজা বলেছেন “যদি কোন দৈব ঘটনায়
নীলাম্বরের অবস্থা ফিরে যায় তাহলে তার
ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিবাহ দিতে কোন আপত্তি
নাই।”
;

পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
মল্লিকা। যাহকু ভাই, এখন ভালয় ভালয় রাজকুমারীর ভাল
হলেই বাঁচি। ঐ বুঝি সখি আছে।
( মাধুরীর প্রবেশ ।)
তর।
তর।
এস এস সখী রাজনন্দিনী এস।
আহা! কমলিনীর এমন বিরস বদন কেন?
মাধুরী। আবার তােমারও কাটাঘায়ে নুনেরছিটা
আরম্ভ কল্লে ?
সে কি সখী! আমরা কি তােমার প্রাণে কষ্ট দিতে
পারি। আমরা যে তােমার সুখের সুখী, দুঃখের
দুঃখী।
মল্লিকা। সখি । আমার যেন মনে নিচ্চে যে এতদিন পরে
তােমার বিয়ের ফুল ফুটেছে।
মাধুরী। সে কার সঙ্গে? বােধ হয় যমের সঙ্গে।
তর। বালাই, বালাই, ওকথা কি বলতে আছে । সখী তুমি
হলে কি ?
মাধুরী। সখি ! কাল রাত্রে এক স্বপ্ন দেখে অবধি আমার প্রাণ
আরও ব্যাকুল হয়েছে।
স্বপ্নের যে কি ফল হবে
কিছুই ভেবে ঠিক কর্তে পাচ্ছি না।
মল্লিকা। সখি ! কি স্বপ্ন দেখেছ, আমরা কি শুনতে পাইনে ?
মাধুরী। তােমাদের কাছে আমার কোন্ কথাই বা গুপ্ত আছে ?
স্বপ্নবৃত্তান্ত বচি শােন---

মােহন-মাধুরী ।
শঠ মধুকর
নিশীথে নিদ্রিত আছি, অকস্মাৎ মনে
হইল, কানন মাঝে আমি একাকিনী--
বৃক্ষে বৃক্ষে কত ফুল ফুটেছে সজনি
নির্ণয় নাহিক তার ;
গুন্ গুন্ রবে বন আমােদিত করি
পুষ্প হতে পুষ্পস্তরে করিছে গমন।
সযতনে তুলি ফুল গাঁথিলাম মালা;
সাজিলাম ফুল সাজে ; বনদেবী যথা
সাজান আপন অঙ্গ ফুল আভরণে।
সহসা পশিল কর্ণে ভীষণ গৰ্জ্জুন,
চমকি চহি ফিরি—দেখিলাম হায়
ভয়ঙ্কর পশুরাজ আসিছে পশ্চাতে।
মৃগরাজে হেরি, মৃগী যথা দ্রুত ধায়
দিগ্বিদিক নাহি গণি, হয়ে বুদ্ধি হার।
ছুটিনু তেমতি আমি; সম্মুখে পৰ্বত,
বিনা ব্যাজে তদুপরি উঠি ত্বরিতে।
ছুটিতে ছুটিতে হল চরণ স্বলন;
শৈল শৃঙ্গ হতে সখি ভয়ঙ্কর বেগে
পড়িতে লাগিনু আমি ; অৰ্দ্ধ পথে যেন
একবীর মম দেহ লইল লুফিয়া।
হারানু চেতন আমি ; চেতন পাইয়া
দেখিনু মােহন ক্রোড়ে রয়েছি শায়িতা।
;
;

পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
কুসুমের মালা মম অঙ্গচ্যুত হয়ে
পড়েছে তাহার গলে, কতই সুন্দর,
কতই উজ্জ্বল সেই সুচারু বদন।
হাসি হাসি মম গলে দিয়া পুষ্প মালা
কহিলা, মাধুরী! প্রিয়ে ! দেখ একবার
তৰ সনে হল আজি মাল্য বিনিময় ।
অমনি ভাঙ্গিল সখি! সুখের স্বপন,
‘কোথায় মােহন’ বলি করিনু রােদন।
হায় স্বপ্নদেবী কেন করিলে বঞ্চনা,
বধিবারে বুঝি এই অবলা ললনা।
মল্লিকা। সখি ! এ স্বপ্ন নিশ্চয়ই শুভসূচক, তা নাহলে
তর। চুপ কর ভাই, কে আছে। আমি পায়ের শব্দ শুনতে
পাচ্চি।
মল্লিকা। বােধ করি রাজা আর রাণীমা এদিকেই আছেন।
চল আমরা লুকিয়ে ওদের কথা শুনব এখন।
মাধুরী। শুনতে হয় তােমরা শােন—আমি এখন একট,
বাগানে বেড়াইগে।
(মাধুরীর প্রস্থান ও মল্লিকা ও তরলিকার
লুক্কায়িত হউন।)
( রাজা বীরকেশর ও রাজ্ঞী লীলাবতীর প্রবেশ )
লীলা। হর্ষবিকশিত নাথ তােমার বদন;
দাসীকে বলহে কেন আনন্দ সঞ্চার।

৯
মােহন-মাধুরী।
সুখে সুখী দুঃখে দুঃখী আমি যে তােমার,
দাও আননের ভাগ বল বিবরণ।
রাজা। এতদিন পরে প্রিয়ে! দারুন ভবনা
ঘুচিল, নিস্তার পেনু কন্যাদায় হতে।
গত নিশি শেষ ভাগে, শুভদৃষ্ট বশে
স্বপ্নবেশে প্রত্যাদেশ হইল আমায়--
কি কর কি কর বীরকেশর সুমতি,
কেমনে নিশ্চিন্ত হয়ে রয়েছে বসিয়া ?
বড় আইবড় কন্যা রয়েছে মাধুরী,
কেমনে তাহারে হেরে রুচে অন্ন জল ?
নীলাম্বর সূতে সতী অনুরাগবতী,
অবিলম্বে তারে কর কন্যা সম্প্রদান।
কুষ্ঠিত হওনা তাহে; মহেশের বরে
হইয়াছে নীলাম্বর মহা ধনবান্।
অমনি ভাঙ্গিল ঘুম ; বালার্ককিরণ
দেখিলাম তরুরাজি করেছে রঞ্জিত।
পাছে মিথ্যা হয় বলি, সুস্বপ্ন বারতা
বলি নাই কারাে কাছে। আনন্দে সভায়
উপনীত ধীরে ধীরে ; শুনিলাম তথা
কতিপয় ব্যাধমুখে অপূৰ্ব্ব কাহিনী।
নিশিযােগে নীলাম্বর-নিষাদ-নিবাস
পর্ণশালা হইয়াছে রম্যসৌধকর।

পঞ্চম গর্ভাঙ্ক ।
ঘুচিল সংশয় মাের ;
করিলাম পণ,
মহেশের প্রিয়ভক্তে বৈবাহিক করি
সফল করিব মম বিফল জীবন ।
লীলা। বহুদিন বারি বিনা তৃষার্ত্ত চাতক
নবঘনােদয় দেখি যথা সুখী হয়,
অথবা তিমিরাবৃত অমারজনীতে
চকোর দেখিলে শশী হয় হে যেমন
তত সুখ উপজিল মনে প্রাণেশ্বর !
এ শুভসংবাদ শুনি; স্নেহের প্রতিমা
তনয়ার মনােমত মিলিল হে বর,
ভাবি হর্ষে নাচিতেছে আমার অন্তর।
বলিব সুখের কথা তারে নিজ মুখে,
ঝাপিয়া আসিবে কোলে শুনে মা আমার,
প্রেমানন্দে পুলকিত হইবে শরীর।
কোথা গেল স্নেহলতা? মাধুরী--মাধুরী
বােধ হয় উপবনে; চল তথা যাই।
উভয়ের প্রস্থান ও মল্লিকা ও তরলিকার বাহিরে গনন)
মল্লিকা। আজ ভাই আমাদের কি আনন্দের দিন ।
তরলিকা। আঃ তা আর বলতে—চল সখির বাসর সাজাবার
যােপাড় দেখিগে ।

4,
শেহন-মাধুরী।
(গীত )
( আজিলাে) ভাসিল সুখ সাগরে ।
মােহন-মাধুরী দেহে এত দুঃখ ভােগ করে।
মিলে নয়নে নয়নে,
নীরবেতে আলাপনে,
মিটাবে প্রণয় ক্ষুধা বিষাদ পালাবে দুরে।
প্রেমিক প্রেমিকা দেহে
মিলিত হবে বিবাহে,
আমরা উভয় সখি হরষিত হব হেরে
( প্রস্থান)

যষ্ঠ গর্ভাঙ্ক ।
রাজ-অন্তপুর (বাসরঘর )
মােহন, মাধুরী ও সখীগণ উপবিষ্ট
ধানদূৰ্বাহস্তে 'বৃদ্ধাপুরবাসিনী ও প্রতিবাসিনীর সহিত রাণীর প্রবেশ।
রাণী।
রাণী।
এস মা সকলে এস, আমার মােহন মাধুরীকে সকলে
আশীৰ্বাদ করবে এস! আহা কি সুন্দর মানিয়েছে
দেখেছ ?
বৃদ্ধাপুরবাসিনী। তা আর বলতে, ঠিক যেন কৃষ্ণ রাধার মিলন
হয়েছে। আহা মরি মরি ।
মােহন! আজ আমার সর্বস্বধন নয়নের মণি মাধুরীকে
তােমায় সমৰ্পণ করিলাম, তাকে যতনে রেখাে।
আর মাধুরী! তুমি যাকে আজ পতিরূপে পেলে
তাহাকে মহাগুরু মনে করে এ সংসারে হাসি
মুখে সুখে কাল কাটাও-এই আশীৰ্বাদ করি ।
প্রতিবাসিনী। রাণীমার যেমন ভাবনা ছিল মেয়ের বিয়ের,
তেমনই চঁাদের মতই জামাই হয়েছে।
রাণী। চল আমরা সব এখন যাই, এরা সব আমােদ আহলাদ
করুক। মল্লিকা তরলিকা : তােরা সব গান টান
কর এদের নিয়ে, আমরা চলুম তবে এখন।

মোহন-মাধুরী।
তরলিকা। (জনান্তিকে) সে আর বলতে রাণীমা—এই দেখ
সব কি করি তােমার জামাইকে নিয়ে।
( রাণী ও বৃদ্ধাদের প্রস্থান)
মল্লিকা।
ওহে বর চুপ করে থাকলে চলবে না, গান টান
গাও।
মােহন। গান।
মল্লিকা। হা-আকাশ থেকে পড়লে নাকি ?
মােহন। আমি তােমাকে গান গাইতে বল্লেম আর তুমিও ত
রাজি হলে। কিন্তু এমন চমৎকার গান ত কখন
শুনি নি। ঐ গানটা শিখতে হবে।
তরলিকা। তাইত রে তােকে ঠকিয়ে দিলে যে, দাঁড়াও আমি
বরের কানটা কেটে নিচ্ছি।
বলি ও বর বর ?
মোহন। আজ্ঞে আমি ত কালা নই অত চেঁচিয়ে ডাক্বার
দরকার কি ?
মল্লিকা। উত্তর দিলে ? ওযে তােমায় বৰ্ব্বর বল্লে !
মােহন। উপায় কি ? তােমরা আজ যা বলবে তাই-ই সহ্য
করতে হবে দেখছি।
তৃতীয় সখী। ও সব বাজে কথা যাক্, আমি যা বলি তাই
শােন। বরকে সকলে একটা গান করতে বল।
চতুর্থ সখী। এই বেশ কথা, এখন ভাই বর একটা গান গাও—
আমরাও যে যার ঘরে যাই।
পঞ্চম সখী।
আর তুমি বুঝি শুধু ফঁকি দেবে ? তা হচ্ছে না।

ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক।
৯৭
ষষ্ঠ সখী।
তরলিকা। তুই আবার ফোড়ন দিচ্ছ কেন বক্ত?
মােহন। গরীবের দিক্ হয়ে একটী কথা বলছে বলে যত দোষ
ওর হল বুঝি ? বেশ ! বেশ !
কথা কাটাকাটিই তাে চললে দেখছি--বলি আসলে
কিছু হবে টবে?
সপ্তম সখী। তবে ভাই তুই নাচ, আর আমি গাই তাইলেও ত
তবু কিছু একটা হবে।
অষ্টম সখী। আমার ইচ্ছা রাণীমা যা বলে গেলেন এস তাই
করি।
মল্লিকা। হ্যা সে তো আছেই। সত্য ভাই বর এখন একটা
গান গেয়ে ফেল দেখি লক্ষ্মী ছেলের মত।
মােহন। একান্তই গাইতে হবে ?
তরলিকা। তা না ত কি শুধু তোমার মুখ দেখব বলে সকলে
এতক্ষণ বসে আছি বুঝি ?
মােহন।
( গান )
সেনা মল্লিক। পারুল নাহি চাই আর তােদের হাসি।
চামেলী জুই বকুল চাপা তােদের আর না ভালবাসি ।
গােলাপ লাে তাের তরে যেদিন
হতাম পাগল গেছে সেদিন,
পড়েছে নয়নে যেদিন মনােলােভা মুখশশী।
জীবন-কানন মাঝে
পাই যে ফুল্ল-কুসুম
তাহারি সুবাসে বিভাের তারই তরে প্রাণ উদাসী ।

:
৮
মােহন-মাধুরী।
মল্লিকা। ওকি ভাই তুমি আমার হাঁসি চাও না তবে আর
আমি হাসব না ।
নােহন।
তােমাকে কি বলেছি ?
মল্লকা। তবে কাকে ?
মােহন। (কা ফুলকে।
মল্লিকা তাই ভালো।
মােহন। এইবার তােমাদের পালা।
তরলিকা। আচ্ছা ! আয় ভাই সকলে মােহন মাধুরীকে
সিংহাসনে বসিয়ে ভাল করে মিলন করিয়ে দিই।
সকলে।
এস ভাই দুজনে।
( মােহনের বামপার্শ্বে মাধুরীকে কুসুম-শােভিত সিংহাসনে
বসাইয়া সকলের গীত।)
( গান )
আকাশের চাঁদ ধরাতে উদয় দেখবি যদি আয়।
সুরস সুবাস ফুল কুসুম কুমুদী মিলেছে তায়।
দেখ কত কথা দুটীতে
নীরবে নয়নে নয়নেতে,
দেখিতে দেখিতে উথলয় সখি সমুদয় দোহার প্রণয়সাগর লাে—
সােহাগ ভরেতে কুমুদিনী ধনী পড়েলাে চাদের গায়।
যবনিকা পতন।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Mohon-madhuri

Author
Bandhopadhyay, Avayacharan
Title
Natika
File name
Mohon-madhuri
Text
OCR done
Citation
1917
Published
2009/09/15
Publisher
Gupta,mukherjee And Co.,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
114
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Lilabati
DLI number
512942
Barcode
4990010019967.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
D31NVpePwmI
Download PDF

Mohon-madhuri