Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sabitri

Sen Gupta,satyacharan · 2009/09/11

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

។

সাবিত্রী।
(পৌরাণিক দৃশ্য-কাব্য।)
শ্ৰীসত্যচরণ সেন গুপ্ত
প্রণীত।
“পতি সেবা পরং সত্যং দানং তীর্থতিবেচনং
সর্ব দেবময় স্বামী সৰ্বম্মা পর শুচি।
সৰ্ব্ব পুণ্য স্বরূপশ্চ পূf
কলিকাতা,
১/১ শঙ্করঘােষের লেন, নব্যভারত প্রেসে,
শ্ৰউমেশচন্দ্র নাগ দ্বারা মুদ্রিত।
সন ১৩• ৪ সাল।
All rights reserved ]
মূল্য আট আনা।

No text on this page.

উৎসর্গ।
কাশিমবাজারাধিপতি
শ্রীল শ্ৰীযুক্ত মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী
বাহাদুর।
মহারাজ,
গুণের আদর সর্বত্র, সাবিত্রী আমার হাতে
পড়িয়া সম্পূর্ণ গুণহীনা। সাধারণে ইহা আদৃত
হইবে না জানি। আপনি স্বগুণে নিগুণেরও
আদর করিয়া থাকেন, কৃপাপূর্বক সাবিত্রীকে
স্নেহ-চক্ষে দেখিলে কৃতার্থ হইব।
গ্রন্থকার।

No text on this page.

নাট্রোল্লিখিত ব্যক্তিগণ। পুরুষগণ। ৫ অশ্বপতি মৎসেন, সত্যবান মত্রদেশের রাজা। শাদেশের রাজা। দ্যুমৎসেনের পুত্র। ০ 1 . . t কেশব সত্যবানের সহচর। যম, নারদ, মন্ত্রী, পারিষদবৃন্দ, চিত্রগুপ্ত, যমদূত-বয়, অাজপুরােহিত ৪ ঋষিবালকগণ। ০ মালবী শৈৰা সাবিত্রী । মুলা সুরমা স্ত্রীগণ। অশ্বতির স্ত্রী। দ্যুমৎসেনের স্ত্রী। অশ্বপতির কন্যা। সাবিত্রীর সহচরী। ঋষিপত্নী। এতদ্ব্যতীত বনদেবী।

No text on this page.

সাবিত্রী।
(পৌরাণিক দৃশ্য-কাব্য।
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
(রাজপ্রাসাদ মধ্যস্থ উপবন।)
সাবিত্রী ও মুরলা।
গীত।
সাধের প্রাণ সাধে সাধে পরকে কিলাে দিতে পারি,
মনের কথা, প্রাণের ব্যথা পরের কাছে ফুটতে নারি
নাইক চেনা, নাইক শুনা,
না জানি প্রাণ আপন কি না,
পরের কাছে আপন হয়ে সাধের হাসি হেসে মরি ;
আপনিই আপন-হারা, পরকে আপন মনে করি।
মুরলা। স্নান-কমলিনী মত মলিন-মুখেতে
অশান্তি-প্রতিম কেন তুমি লাে সজনি
নিরবধি ? কেন হাসি নাই,-ফুৰ্ত্তি-হীন
কেন ? কেন বা না কও কথা, মুলারে

সাবিত্রী। [ প্রথম অস্ক । লয়ে,আগেকার মত সাদরে সদেহে সখি ? সােহাগের শতদল, কেন, কোন, দুখে বল হেন অফুটন্ত ভাব হেরি লো সতত? মধুর-বসন্তকাল, মধুর বনেতে মােরা,-মধুর পরাহ্নে হাসিছে বিটপি রাজি। মধুর-কুসুম তুলিছে তিনে,-সরল হৃদয় কত সুন্দরী যুবতী-উপহার দিবে বলে প্রাণেশ- রতনে। তুমি কি না সখি, হেন মধুময় কালে, মধুময় ভাব ত্যজি, দিশেহারা মত, মন-মরা ভাবে বিবশা হইয়া হয়, আছ নিমগন ! কি অভাব তৰ ৰল,-যে অভাবে এত গুরু অন্তর তাপিত ? রাজার নন্দিনী তুমি, চির- অল্প মাত্র অভাবের চিহ্ন নেহারিয়া কত শত দাস দাসী হয় লাে অস্থির—নিবারিতে সে অভাব কার- মন করি। তবে সহচরি! এত সুৰে বিষাদের চিহ্ন কেন বলনা সখীরে সাৰিতী। সথি রে ! কিসেরই কারণ, মন উচাটন কে জানে কেন বা বুঝিতে নারি, কত দুখে যেন এলিতেছে হৃদি, জ্বালা নিবারিতে যেন না পারি।

এখন গর্ভা।]
সাবিত্রী।
৩
কি যেন ছিল না।
পরাণ-ভিতরে
পরাণ-সজনি, কথন হায়,
এখন সজনি, পরাণ আমার
কি যেন খুজিতে সতত চায় ?
কি যেন ভাবনা
বলিছে সঙ্গত,
হৃদয়-মাঝারে বিষের সম,
কি যেন কি পেলে জুড়ায় হৃদয়,
কি যেন অভাব হয়েছে মম।
মুলা। বুঝেছি সজনি ! তুমি যুবতীর বেশ
ধরিতেছ বালিকার ভাব অতিক্রমি
অল্পে অল্পে। অলে অলে সজনি লো এৰে
যুবতীর আভা তব অঙ্গে বিরাজিছে ।
যৌবন-বরষা স্ফীত যথা নদী-নীর
হাত-মুখে সিন্ধু পথ করে অন্বেষণ
মধুর কালেতে সখি,-তুমিও তেমতি
তব মধুময় কালে, মধু-প্রাণ-জন
সাথে মধুর মিলন লাগি হয়েছ আকুল
স্বভাবসুলভ-বশে। প্রথম, প্রণয়-মন্ত্রে
ম’জে লাে সজনি! হারায়েছ চিত তৰ;
মন-মরা হেরি তাই তব মুখ খানি।
সাবিত্রী। সখিলে,-
পরাশমার নিগুঢ়-নিলয়ে
কোথায় যেন ৰা লুকাৰ হিল,

সাবিত্রী।
নীরব-নিশীথে পনে সজনি,
কে যেন আসিয়া হরিয় নিল।
মােহন-মূরতি পুরুষ-রতন
যেন বা এখন সমুখে ওই
আপনা ভুলিয়া পরেরি হয়েছি
যেন আমি এৰে আমার নই!
--
মুরল। সখি,-
একি অসম্ভব কথা শুনি লো শ্রবণে
আজি তব মুখে! সত্য বটে, ভালবাসা
স্বভাবের বশে, উপনীত হয় আসি
যৌবন কালেতে; কিন্তু একি কথা, একি
কথা সজনি লাে? নিদ্রা কালে স্বপ্নবশে
পুরুষ মুরতি নেহারিয়া মন চায়
তারে পূজিবারে ? কোন কালে, কোন দেশে
শুনিনাই এবণেতে এ হেন বারতা।
সাবিত্রী। সজনি লল, দেখ নাই নয়নেতে,
তুমি লো কখন তাহার মুরতি-শােত।
নিদ্রাকালে, যে মূরতি হেরিয়াছি আমি
সে মুরতি সম-নর তাে কি ছার কথা,
অমর আবাসে, বৃন্দারকদল মাঝে
আছে কি না তত শােভা, তাহাতেও সখি,
আমি সংশয় মনেতে গণি। কি যেন লো
কত নব কান্তি তার সঙ্গে প্রকাশিছে

প্রথম গর্ভাঙ্ক।]
সাবিত্রী।
শত ধারে,-সে কান্তি আমার কাছে
অনুপম সখি !
মুলা। সখি, বিস্ময় জন্মিছে মনে, শুনে তৰ
কথায় ক্রমে ক্রমে। অতি পুরাতন
কালে, উষাদেবী হেরেছিল হেন মত
স্বপ্ন নিশাযােগে। তারপর আর কেহ
কভু শুনে নাই শ্রবণেতে এ হেন বারতা।
সাৰিত্ৰী। সখি লো, হেরিনু যে শুভ-স্বপ্ন, শু
নিশাযােগে, কি কব তাহার কথা।
কত যে মধুর ভাব, এখনও মিশান
রয়েছে সজনি, তাতে, অধিক বলিতে
নারি। সুন্দর, সুঠাম সেই মূর্তি
মনােহর,-যখন হেরিনু, তখনি ভুলি,
মজিনু রূপেতে তার। অমনি তাহার লাগি
প্রাণ উচাটন হ’ল লো সজনি, মম।
সত্য কি কহিতে সখি, সকল ভুলিয়ে,
সরম ত্যজিয়ে, সেই মূৰ্ত্তি সেবা ধরম
করিয়ে, তারি করে প্রাণ মন সঁপেছি
লাে সখি, সযতনে। জিজ্ঞাসা করিল
দাসী, নাম তার কিবা, সুন্দর মুরতি
প্রতি, অমনি শুনিল, কে যেন
কহিয়া গেল অতি মৃদু মৃদু -সত্যবান”
নাম এর, এই তর পতি”।
মুলা। চমৎকার স্বপ্ন বটে! না জানি কি হলে

সাবিত্রী।
হলিল লল! কোন দেব এহেন বলা
প্রতি
সাবিত্রী। সখি ! কিসে পাব তারে? হৃদি যে আকুল
হ’ল তাহার লাগিয়ে প্রাণ যে রহে না
প্রাণে—কি করি উপায় বল না সে।
সহচরি!
মুরলা। ধৈৰ্য্য ধর, প্রাণ সখি, ধৈৰ্য্য বিনা কার্য্য
নাশ। বিশেষতঃ, ধৈৰ্য্য:সাথী প্রেম চির।
প্রেমিকা নলিনী যবে হেরে ইন্দু মুথ
ৰ্য্যৈ ধরি রহে তবে। পুনঃ, নিশা গতে
ডুবে যৰে নিশানাথ, রাখিয়া বিরহে
প্রাণপ্রিয় কুমুদীরে, নলিনী আবার
পায় প্রাণেশ রতন, ভাসে মহা সুখে।
তুমিও সজনি, থাক ধৈর্য্য ধরে, পূৰিৰে
কামনা তব, নাহিক সন্দেহ।
সাবিত্রী। সখি, কতবার মনে করি,
যতনে ধৈর্য ধরি,
কেন মিছে ভাবি আর, তারে আর পাবনা।
ভুলে যাব তার মুখ
যতনে বাঁধিব বুক,
অসুখ অশান্তি পথে কভু আর যাবনা।
কিন্তু হায় পােড়া মন বশীভূত নয়,
দেবতা-দুর্লভলাগি ঘটায় প্রায়।

প্রধম গর্ভা।] সাবিত্রী। তুমি মম সহচরী, তব দুটি করে ধরি, কি করিলে ভাল হয়, বলে দাও সজনি, কে যেন নিয়েছে প্রাণ, আর প্রাণে বাঁচিনি। মুলা। সখি, ভেবনা অত, পাবে মনমত ধন, এক ধীর হয়ে। দুখ কি কাহার লাগি থাকে চিরদিন? মেঘেতে গগন, ঢাকে, হয় অন্ধকার, গুরু গুরু রব করি পড়ে বারি ধারা, অশনির ভীম নামে পান্থ এস্ত প্রায়, “রক্ষ রাম, রাবধারে” ডাকে উচ্চৈঃস্বরে। কিন্তু ক্ষণ কাল পরে, দেখ, সেই অন্ধকার বিলীন গগন- ভালে। নাহি কাদম্বিনী ধ্বনি, নাহি আৰু বারি ধারা প্রলয়ের মত। তমস্থলে, সুন্দর আলােক চিহ্নে পান্থ শ্ৰমিতেছে। তবে, কেন সখি, তােমার সে সুখ দিন হবে না উদয় ? স্থির হও, স্থির হয়ে কিছু কাল করিলে যাপন, পাবে বি- জনে সখি, নাহিক সন্দেহ। সাৰিত্ৰী। সখি, যা’আছে কপালে হবে। চল এৰে গৃহে যাই। তিমিরবসনে দেখ, সন্ধ্যা উপজিল, ভাবিত হবেন মাতা বিলম্ব দেখিলে। ( উভয়ের প্রস্থান।) 4

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
(রাজ-কক্ষ।)
মালবী ও অশ্বপতি।
মালী।
কে জানে ক’দিন হ'তে সাবিত্রী আমার
হয়েছে কেমন যেন। কেন নাথ ! নাহি জানি
হেরি দিন দিন, বিলাসে অরুচি তার।
না বিনায় বেণী আর শরীর-শোভন
যতনে হাসি মুখে। মূল্যবান পরিধানে
হেরি বীতরাগ, আভরণে অযতন
সতত নেহারি। ইন্দুনিভ-আননেতে
না হেরি হাসির ছটা। অল্প মাত্র আস্থা
নাই, প্রিয়জন সাথে পরিচয় করিবার
তরে। কেন নাথ ! কেন, বল, কি দুখের
ভরে, সাবিত্রী আমার কেন বা এমন
হ'ল!
এখপতি। কি করে বুঝিব প্রিয়ে ? সুমতী সাবিত্রী
অন্দরের মাঝে সদা করে অবস্থান।
সদা ব্যস্ত রহি আমি, রাজকাৰ্য্য তরে।
আসি যবে পুরি মাঝে, হেরি তার মুখ
দিনান্তে বারেক মাত্র। তুমি পুর-নারী,
তোমারি জানিতে শক্তি কিবা তার দুখ,
কি ভা’র মর্ম কথা।

দ্বিতীয় শর্তা।]
সাবিত্রী।
মালৰী। না, ভাগ্যক্রমে সতী সাবিত্রী মাত্র
আমার সম্বল। লতি নাই পুত্র আর
করমের ফলে। সে সাবিত্রী দুখে মন
বাপিলে জীবন, কিসে আমি সুখে বই ;
কি সুখেতে বল, ভাসি আমি সুখ-নীরে ?
কর মহারাজ, কর প্রতীকার তার
যে দুখে দুখিত মম পরাণ দুহিতা।
শপতি। রাশি, অসম্ভব কথা তব। কি সুখে
ব্যথিত মম পরাণ দুহিতা, জানিনা
বিন্দুমাত্র। তবে কি পেতে বল,
প্রতীকার করিবারে পারি আমি তার।
মানবী। নাথ, রাখিবে কি নিবেদন ? শুন মাের
কথা। সাবিত্রী বয়স্থ। এবে, দাও পরিণয়
তা’র, যে দুথের শেলে তার হৃদি বিড়
হােক্, পরিণয় আনন্দেতে শান্তি পাবে
মনে, হেন আশা করি।
অশ্বপতি। রাশি, অনুমান ঠিক তব। দিবসমিল
ধরা দুহিতার আমি। এতদিন মনােযােগ
হিলনাক ইহাতে আমার, শুনহ কারণ
তা’র-সাধের সাবিত্রী মম, বড় মায়া
তার প্রতি
-যে দিন বিবাহ হবে,
বিধির বিধানে ললনার মম, প্রিয়ে,
সেই দিন হ'তে মম অধিকার আর না থাকিৰে,
তা’র প্রতি। তাই ভেবেছিনু কুমারী কালেতে

সাবিত্রী।
[ প্রথম অঙ্ক
তা’র যত বেশী দিন বিগত হইবে, ততই
মম মম।
মালৰী। মহারাজ, বিবাহ ত হবে একদিন,
চিরদিন নাহি রবে কুমারীর কাশে।
তবে আর কেন, তবে আর কেন মিছে
বয়স-যৌবন দেখিছ কুমারী কালে ?
অশ্বতী। দিব রাণি, দিব পরিণয় ত্বরা সাবিত্রীর।
পরাণের দুহিতারে দিব রাণি, দিব পৰ কৰে
সপে অতি ত্বরা। এখনি করিব গিয়া
সচিবের সনে, সুমন্ত্রণা এর প্রিয়ে। যাই,
বেলা হল, প্রজাবৃন্দ মাের লাগি আছে
প্রতীক্ষায়।
( অশ্বপতির প্রস্থান)
(মুরলার প্রবেশ ।)
মালী। এস, বাছা, মুরলা লাে, বড় ভালবাসি
তােমা, পরাণ দুহিতা সাবিত্রী হইতে
ভিন্ন ভাব নাহি তাবি তোমারে সুমতি।
জিজ্ঞাসিব এক কথা; অপলাপে প্রতারিত
করনাক মােরে।
মুলা। একি কথা, জননি গো ! সন্তানে কি কভু
অনর্থ-অমৃতবাণী কহিবারে পারে
জননী সকাশে? কহ মাতঃ, কিবা কথা ,
ৰাহ জানি, সত্য করি বলিব এখনি।

দ্বিতীয় গাঙ্ক।]
সাবিত্রী।
সালৰী। মুরলে, সাবিত্রী আমার হয়েছে কেমন যেন ।
গগন-মার্গেতে ইন্দু বিরাজ করিলে
কো কনদ শুষ্ক যথা,-সাবিত্রী আমার
শুখাতেছে সেই মত। তুমি সহচরী তার,
থাক তার সনে দিবানিশি ; তাতেই সুধাই,
জান কি কারণ এর, কেন হেন ভাব?
মুলা। জানি। সুধাইলে ভাল হ’ল আপনা হইতে
আমি তােমার সদনে, কহিব সকল কথা
ভেবেছিনু মনে। গত কয় দিন কেব
জানে, মাতঃ, কোন দেব বুঝি ছলিলা
অবলা জনে! ঘাের নিশাযােগে,
স্বপনের বশে দেখেছে সজনী মম
কাহার মুরতি। অনুপম কান্তি তার
মূৰ্তি মনােহর-হৃদয় যেন বা হরিলা গো
আচম্বিতে সজনীর মম। শুনি সহচরী
কাছে, নাম তার সত্যবান। অপূৰ্ব স্বপন
মাতঃ! অপূৰ্ব স্বপনে সরল হৃদয়-মাঝে
ব্যথা উপজিল।
মালবী। মুরলে, অবাক হইনু শুনি স্বপনের কথা।
জানিনাক সত্যবান ধরণী সস্তুত কি না।
যা হােক কহিও সাবিত্রী প্রতি, ধরণীর
'মাঝে, সত্যবান নামে কেহ যদি রয়,
তৰে তারি সনে সাবিত্রীর দিব পরিণয়।

সাবিত্রী।
[ প্রথম অঙ্ক
যাও তুমি সাবিত্রীর পাশে, কহ
গে বারতা মম।
( মালবীর প্রস্থান।).
গীত।)
(মুরলার
পােড়া প্রাণ কেন মিছে পরের পানে চায়,
পরের পানে, কি কারণে বললাে তাকার ?
প্রাণে আমি করবাে মানা,
কা’র পানে আর চাব না,
কতবার মনে করি, কে যেন ভুলায়।
প্রাণে প্রাণে মেশামিশি,
কেন এত ভালবাসি,
কেন প্রাণ পরের কাছে সদা ধেয়ে যায় ?
পরের লাগি মাতােয়ারা,
সদা প্রাণ বিভাের।
৫াণের হাসি প্রাণে হেসে, কে যেন হাসায়।
-
;
( প্রস্থান।)
[ পটক্ষেপন ]

মৎ।
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
বন-কুটীর ।
দ্যুমৎসেন ও শৈব্যা ।
বিধির বিধান কেহ না পারে বুঝিতে।
কালি যা’র কৱতলে সাম্রাজ্য স্থাপিত,
দোর্দণ্ড প্রতাপে যা’র ধর কষ্পবান,
হয় ত আজিকে সেই কালচক্র বশে
ভ্রমিতেছে পথে পথে ভিখারীর বেশে
মুষ্টিমেয় অন্ন লাগি। কালি যা’র
আদেশেতে বাধ্য প্রজাকুল, হয় ত
আজিকে সেই আকুল অন্তরে,
প্রজামত পালিতেছে রাজার আদেশ,
কায়মন-বাক্য করি । কালি যে শিবিকা
ভিন্ন পথ পৰ্যটন করিতে নারিত কভু,
কাল-বিপর্যয়ে হয় ত আজিকে সেই,
শিবিকা বাহকরূপে আছে নিয়ােজিত।
শতেক দৃষ্টান্ত প্রিয়ে, দিতে পারি এর
মহারাজ হরিশ্চন্দ্র, সূর্যকুল-জাত তিনি,
বিদিত জগত মাঝে, শুনেছ কি তার
কথা ?-নিয়তি লাগিয়ে, রাজ্যহারা
হয়ে, করিলা বিক্রয় তিনি ধৰ্ম্ম-পত্নী
কোন ব্রাহ্মণের কাছে—বারাণসী ধামে ;

১৪ সাবিত্রী। [ দ্বিতীয় অঙ্ক - নিজে, ভৃত্যরূপে নিয়ােজিলা নীচাশয় শব-দাহী জন কাছে। কহ প্রিয়ে, কহ, তার চেয়ে কিসে বা অসুখী মােরা ? শৈব্যা । মানি, নাথ, সব কথা কিন্তু তব টুথ দেখে, মম দুখ উপজয়। মৎ। দুঃখ, প্রিয়ে, কৰ্ম্ম-ফলে, কৰ্ম্ম-ফলে ভাগ্য ফল, ভাগ্য-ফলে সুখ দুঃখ ভুঞ্জে জীব- চয়,তা’র লাগি মিছামিছি অনুতাপ কেন? গত জন্মে করেছিনু যা কিছু সুকৰ্ম্ম, তারি ফলে প্রথমতঃ রাজ্য উপভােগ করেছি মনের সুখে শাদেশ-মাঝে। কুকৰ্ম্মও ছিল ভালে, বুঝি পূৰ্বজন্মে, কত শত তাপিত আতুর বৃদ্ধে, দিয়াছি কত মর্মভেদী হৃদয়ের ব্যথা-ভবিষ্যৎ শুভাশুভ জ্ঞান-হারা হয়ে। তারি ফলে, স্থবির বয়সে আজি, হারাই নেত্ররত্ন ; অমনি সুযােগ পেয়ে, বিক্রমে আমি পুরী অপর নৃপতি পশিলা নিঃশঙ্কে মম রাজপুরী মাঝে। পলায়ে আসিনু তাই, এ ঘাের কাননে--বা হেতু প্রাণ শুধু। করমের ফল প্রিয়ে, কৰ্ম্ম-ফলে আজি মম এ হেন দুর্দশা! তার লাগি অনর্থক দুঃখ কেন মনে?

প্রথম গর্ভাৰু।]
সাবিত্রী।
শৈব্যা ভাল, নাথ, মেরি যেন কৰ্ম্ম-ফলে
পেতেছি দারুণ দুঃখ। কিন্তু বল দেখি,
প্রাণাধিক পুত্র মম-শান্ত সত্যবান
করিয়াছে কিবা দোষ বিধাতার পায় ?
সুন্দর সরল মূর্তি--আহা মরে যাই,
তার দুধ মনে হলে—হৃদি ফেটে যায় ;
বাছা মাের অনাদরে, মরি, দিবানিশি
মিতেছে কানন মাঝারে—আমাদের
তরে শুধু। কি খাব কি খেয়ে বাঁচিব
মােরা, তারি তরে বাছা মাের ভ্রমে শুধু
শুধু।
মৎ। প্রিয়ে, সেও কৰ্ম্ম-ফলে জেন। কৰ্ম্মফল
বিনা নাহি হয় কোন কাৰ্য্য অবনী
ভিতরে। কারণ অভাবে নাহি ব্যাধি
উপজয় মানব শরীরে জেন। পূর্ব
জন্মে সত্যবান নিশ্চয় অধর্ম-পথে
ছিল নিয়ােজিত, তারি ফলে এত তাপ
উহার হৃদয়ে।অথবা বিষত
রহে যদি কুসুম কাননে, না বিতরে
ফুল আর অন্যত, তা’র বিষ-গন্ধে।
তেমতি মােদের হেন অদৃষ্টের ফলে
মম পুত্র সত্যবান-সেও পায় দুধ।
শৈব্যা। মাথ, বড় দুখ উপজয় হেরি সত্যবানে।
এ বয়সে তারে হায়, রাখিতে আদুরে

সাবিত্রী।
[ দ্বিতীয় অঞ্চ।
সাধ হয় কত মনে! রাজভােগ উপভােগে,
রাজ-পরিচ্ছদে বাছারে আমার রাখিতে
নিয়ত বাঞ্ছা, এ পােড়া মানসে।
মৎ। রাণি, ভেবনা আর, মিছামিছি
দিবস রজনী কুপ্রসঙ্গ এক মনে।
কে বা কার, কেবা আমি, কার জন্য ভেবে
বল করি দেহ ক্ষয়--অজ্ঞান তন্দ্রার
বশে। এই তুমি, এই আমি, এই দুই
জনে কহিতেছি কত কথা প্রাণের
আবেগে,-তুমি জান তােমারই যেনব।
আমি,-তােমা ছাড়া হ’বনা-হ’বনা কভু।
কিন্তু ভাব দেখি, একবার পৃথিবীর
চিন্তা রাশি বারেক ভুলিয়ে, বিধির
বিধানে যবে, হৃদয় পিজির হতে
পরাণের প্রিয় পাখী ছেড়ে যাবে অন্য
দেশে, অলক্ষে উড়িয়া, তখন ভাবনা
কোথা থাকিবে লো প্রিয়ে ? ফঁাহার কারণে,
আঁহার আদেশে ভুঞ্জিয়াছি সুখরাজি
ব্রাজেশ্বর হয়ে এক দিন, তাহারই
নিয়মে আজি মােরা বনবাসী—সামান্য
জনের মত। তাঁর অভিপ্রেত কার্যে
দিবে বাধা-চিন্তা করি, হেন জন কেহ
নাই জেন লো সংসারে। তবে কেন
মিছামিছি, মানষ-গগনে দুখ-মুন

প্রথম গর্ভা।]
সাবিত্রী।
১৭
পাবে স্থান ? ভুল, ভুল অনর্থক চিন্তা ।
ভাব-ভাব তারে একমনে, তিনি সার
শুধু। থাক, হয়েছে অনেক বেলা,
থা
এবে ও প্রসঙ্গ, চল যাই নদী-তীরে,
স্নান, পূজা কোন কাৰ্য্য হয়নি এখনো।
{ উভয়ের প্রস্থান।
( সুরমার প্রবেশ।)
সুরমা। কই, কেহ ত নাহিক হেথা। কোথায়
গেলেন রাণী, রাজাই বা কোথা ?
সত্যবান গেছে বুঝি কাষ্ঠ আহরণে।
আহা, হৃদয় বিদীর্ণ হয় দেখিলে
এদের দুঃখ। মহারাজ চক্রবর্তী,
রাজা দ্যুমৎসেন বিখ্যাত জগতিতলে ।
কত গুণের অধীশ্বর আছিলা ভূপতি
ইয়ত্বা নাহিক তা’র। হায়! বিধির
বিপাকে, এবে ত’র কিবা দশা!
বিধাতঃ, জানিনাক কি কারণে,
কোন্ কাৰ্য হেতু করেছ এমন দশা
এমন জনের? যাই, বুঝি গিয়াছেন
স্নানহেতু নদী-তীরে, যাই তথা ;
এসেছিনু পুণ্যময় রাজা-রাণী দরশন তরে ।...
( সুরমার প্রস্থান।

সত্য। দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। (বন-বাপীকুল।) সত্যবান। বৃথা এ জীবন মম, বৃথা এজীবনে করিতে নারিনু কাৰ্য অবনী মাঝারে । কেবল ভাবনা-স্রোতে, অকুল পাথারে দিতেছি সাঁতার যেন নিরবধি, সাহি কুল, নাহিক গন্তব্য-পথ, উত্তাল তরঙ্গ- মালা স্বেচ্ছাক্রমে মােরে টানিছে যথায়, তথায় যেতেছি যেন। ভয়ে ত্রস্ত প্রায় হেরি আশাতৃণে মরিচীকামত ধরিতে যেতেছি তারে, অমনি সে তৃণ ডুবিছে অতল জলে ভরেতে আমার । ( কেশবের প্রবেশ।) কেশব। সখে, সত্যবান, এহেন সময়ে, বসি বাপীকুলে ভাবিতেছ কিবা বল। সুন্দর বদন প্রান্তে চিন্তার কালিমা কেন বা উদিত হব! বল বন্ধুবর, অকপটে মন কথা বন্ধুর সদনে। সত্য। সথে, যাতনায় প্রাণ যায় ! অসীম ভাবনা মম-মিছে দেহ, মিছে জন্ম, মিছে অবস্থিতি মম-মিছে আমি লােক

দ্বিতীয় গর্ভা।]
সাবিত্রী।
বলি’, লােকে পরিচিত। নির্জীব পরাণে
কোন কাৰ্য্য নাহি হয় জানি বটে সার,
কিন্তু বল দেখি, জীবন্ত হৃদয়ে, অভাগ।
মতন আর কেবা আছে এই ভূলােকের
মাঝে! ছি! ছি! দিন গেল দিনে দিনে, কত
কাল গেল, এখনও অভীষ্ট সিদ্ধি
নারিনু করিতে।
কেশ। সখে, কেন, ভাব মিছামিছি অতীতের
কথা? যা’হবার হয়ে গেছে, যা’ যাবার
চলে গেছে, তা'বলে দুঃখিত কেন হইব
এখন ? ভাবনা,-ভাবনার মত আর
শত্রু কেহ নাই,—ভাবনা বিষম শত্রু।
অন্য শত্ৰু একা আসে, একা যায়, ভাবনার ফলে,
ভাবনা সহিতে মূর্তিমান ভয়, নিরাশার
ছায়া দহে একেবারে মন প্রাণ ; নিস্তার তখন
থাকেনা,থাকেনা আর।
সত্য। সখে, পুরুষ পরাণে, কেন চিন্তা হেন
বলিবারে যেন পারিনা ;
কত কথা ভাবি, কোথা ভেসে যাই,
মন যেন মনে থাকেনা।
কত আশা করি, কত সুখ চাই,
হথ লেশ যেন দেখিনা,
দুখের সলিলে সতত সাঁতরি,
কুল পেতে যেন পারিনা।

২০
সাবিত্রী।
[ দ্বিতীয় অঞ্চ।
কি পাপেতে হায় হেন তাপ পাই,
কে জানে কেন বা বুঝিনা;
শূন্য-হৃদি মম চৌদিকে নিরাশা,
আশা আর মম পূরিল না।
। মন আশা পুরিলনা বলনা এমন
বাণী প্রিয় সখে, কি আছে কাহার ভালে
নাহিক নির্ণয় তার।
পথের ভিখারী
যেই, বিধিকৃপা-বশে রাজসনে এক
দিন সমারূঢ় সেও হতে পারে। কর
যত্ন, কর চেষ্টা, কর আয়ােজন, দাঢ্য
কর সঙ্কল্পেতে, বিকল্প ভাবনা-
বিসর্জন সলিলেতে করি নিমজ্জিত।
হবে,হবে পুনঃরাজা তুমি শাশ্বদেশ
মাঝে।
ক
(চারিজন ঋষি বালকের প্রবেশ ।)
১ম বালক। (সত্যবানের হাত ধরিয়া) রাজপুত্র, আর লুকালে
চলবে কেন? তুমি যে রাজার ছেলে, তা আজ
আমরা মায়ের কাছে শুনেছি। হ্যা রাজপুত্র, সত্যি
কথা রাজপুত্র, তুমি রাজার ছেলে।
২য় বা। রাজপুত্র, তােমার দিব্য-কান্তি, 'তােমার কপালে
ঐ রাজ টীকা আছে। তুমি আর আমাদের লুকাইওনা,
তুমি রােজ রােজ মিছে ক'রে বল, যে তুমি বাজার
ছেলে নও।
।

पिडीधी।]
সাবিত্রী।
২১
সত্য। (জনান্তিকে)
কি বিপদ! বনেও মনের মাঝে নাহি দেখি
সুখ। জ্বালাতন, জ্বালাতন পূর্ব কথা
অরণে মানসে।
কেশ। সখে,—স্থির হও, হয়ােনা আকুল অত,
মনে বল কর; মনে যার সুখ,
কি অসুখ আছে তার। মনের সুখেতে
সামান্স ভিখারীজনও সম্রাট আসনে
আসীন হইতে পারে। সুখহীন প্রাণে
ভূপতিরও হীন প্রাণ ভিখারীর চেয়ে।
৩য় বা। হঁা, তাই ত রাজপুত্র,তুমি কেন অসুখী হ'তে যাবে ?
তুমি আমাদের রাজা, আর তােমার বন্ধু, আমাদের
কেশব দাদা-ইনি তােমার মন্ত্রী।
কেশ। (হাসিয়া ) আর তােমরা রাজপুত্রের প্রজা, কেমন ?
৪র্থ বা। না, কেশব দাদা ঠাট্টা করনা ; সত্যি কথা, আমরা
আজ সব শুনেছি। আমরা আজ আর ছাড়বনা,
আমরা আজ ওকে রাজা করে, তােমাকে মন্ত্রী
করবো। তােমার মন্ত্রণায় রাজ্য বেশ সুশাসনে
চলবে।
সত্য। (হাসি) পাগল ছেলে, রাজার ছেলের কি এই রকম
বেশ হয়? এম্‌নি কাপড়, এম্‌নি পােষাক, এম্‌নি বনে
বনে কাঠ ভেঙ্গে বেড়ান, রাজার ছেলেরা কি করে।
থাকে।

সাবিত্রী।
[ বিতীয় অঙ্ক।
১ম বা। না, রাজপুত্র, তােমার অদৃষ্ট এখন মন্দ হয়েছে।
তােমাদের রাজ্য এখন আর এক রাজায় দখল
করেছে। তাতেই তুমি এখন এমনি ভাবে থাক।
হা রাজপুত্র, তা হবে না, তুমিই আমাদের রাজা,
আমরা এই বনের মাঝে তােমাকে রাজা করবাে।
সত্য। আচ্ছা, আমি রাজা হলে, তােমাদের কি উপকার
হবে? আমি রাজা হলে আমারই আনন্দ হ'তে
পারে, কিন্তু তােমাদের তা’তে ত কিছু সুখ দেখিনা।
৩য় বা। অমন কথা ব’লনা রাজপুত্র, তুমি রাজা হলে আমা-
দের অনেক সুখ হবে। আমরা বনে বাস করি,
বনে কত ভয়' আছে জান ? সিংহ, ব্যাঘ্র-দুরন্ত
হিংস্রব জন্তু যদিও আমাদের আক্রমণ কতে পারে
, কিন্তু দৈত্য দানবের ভয়ে আমাদিগকে অনেক
সময়েই উৎপীড়িত হইতে হয়, তুমি রাজা হলে আর
আমাদের সে উৎপাৎ থাকবেনা, আমরা তখন মনের
সুথে বাস কতে পারবাে।
কেশ। আর যদি উনি রাজা হয়েও তােমাদের দুঃখ দূর
ফতে যত্ন না করেন, তাহলে তােমাদের কি সুখ
হবে ?
৪র্থ বা। হাঁ তাইত,অমন কথা বল না কেশব দাদা। যে
রাজা প্রজাদিগকে শত্রুর হাত হতে উদ্ধার না করেন,
( তাকে সকলেই ধিক্কার দিয়া থাকে,তার চেয়ে পাপী
আর কেউ হতে প্ররে না।

দ্বিতীয় গর্ভকি।]
সাবিত্রী।
সত্য। (হাসিয়া) আর যদি আমি ও সব জেনেও ধিক্কার
সহ কবার ভয় না করে, পাপের বােঝা ঘাড়ে লই,
তাহলে তােমাদের কি হবে ?
৩য় বা। (হাসিয়া) না, রাজপুত্র, তুমি তা ত করবেনা, তুমি
বড় দয়ালু, তােমার বড় ধৰ্ম্মে মতি—অমরা তােমাকে
বিলক্ষণরূপে জেনেছি।
সত্য। (হাসিয়া) ভাল, তােমরা এত কথা শিখুলে কোথা
থেকে ?
২য় বা। কেন, আমাদের মা আমাদের সব কথা বলেছেন।
আমাদের মা বলেছেন, রাজপুত্রকে পেয়ে আমাদের
বন যেন হাসছে। তুমি আমাদের একটা গান শুনবে?
(অপর বালকদিগের প্রতি চাহিয়া ) এস, ভাই, সবাই
মিলে আমরা সেই গানটা গাই এল।
(গীত)
১ম বা। রাজ আদরে, রাজায় পেয়ে হাসছে বনরাজি।
২য় বা। সােহাগের ফুল হাসছে দেখ সােহাগ ভরে আজি।
৩য় বা পিউ পিউ পাপিয়া হাসে,
৪র্থ বা। কোকিল-কুল কুহু কুহু ভাষে,
সকলে। গুণ গুণ ভ্রমরা হাসে, হাসে ধরা আজি।
১ম বা। চল, রাজপুত্র, আর এখানে থেকে কাষ নাই, অনেক
বেলা হয়েছে, চল এখন কুটীরে যাই।
(সত্যবানের হাত ধরিয়া বালকগণের ঐ গীত পুনরায়
গাইতে গাইতে প্রস্থান ও কেশবের পশ্চাদা-
নুসরণ কর)

সাবি। তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। (বন।) ( সাবিত্রী ও মুরলার প্রবেশ।) এস ভাই, ফুল তুলি, গাঁথি মালা বিনি- তােমার সজনি, চঁচর চিকুর- দাম, সুঠাম-কবরী সুসাজে সাজিবে আজি মালার মিশ্রণে। কি ফুলে গাঁথিব মালা পরাণ সজনি ? গাঁধিবার মত ফুল নাই ত বিপিনে ! আছে বটে, হেথা,নানা ফুলত, যাতি যুঁথি, বেলা, মল্লিকা, মালতী, কিন্তু এক বিনে যেন সখি, বিফল সকলই। বিফলের ফুলমালা গেঁথে কি হবে ? বিফলের ফুল ? সুফলের ফুল, সখি, সবাই ত লয়। মুফলের ফুলে মধু আছে,—সুতায় তাহার, জানে ত সকল লোকে। বিফলের ফুল রূপহীন, মধু হীন, কিন্তু বহুগুণ ধরে দেন, তুলনা তাহার নাহিক ধরার মাঝে। চল, তুলি তবে বিফলের ফুল। আমি তুলি, তুমি লও, তার পর গাঁথ। [ সাবিত্রীর স্কুল চনও সুরক্ষার গান। মুর। সারি।

তৃতী শঙারু {} সাবিত্রী। { কুঠার হস্তে বৃক্ষান্তরালে সত্যবানের প্রবেশ।) সত্য। বঙ্গ বিধাতার ইচ্ছা। কখন্ কাহাকে খেন কিরূপে নির্ণয় নাহিক তার। আমি শাবদেশ অধিপতি-মহাতেজোপুঞ্জ মৎসেন-রাজপুত্র। সুসময়ে মাের, পরিচারকবৃন্দ কত সেবিত আমারে- কুসুম মধুপে যথা তােষে মধুকালে। এৰে মাের অসময়, পিতা মােৰ অন্ধ, সুযােগ-সময়ে অরি করেছে হরণ- বিশাল রাজত্ব মাের। জনক জননী উভয়ে লইয়া আমি এসেছি কাননে ; নিশি দিন পরিশ্রমে করি তনুপাত। আপনার দুখ, জনকের দুখ, জননীর দুখ, হায় ! ফেটে যায় পােড় প্রাণ, কেহ নাহি দেখে। সাবি। সখি, দেখ দেখ, দেখ চেয়ে কে ওই পুরুষ! কুঠার হাতেতে ওই বৃক্ষ-অন্তরালে। (হাসি) এতদিনে স্বপ্ন বুঝি ফলে সহচরি । সাবি। সখি, দেখি কি, কেমন গঠন ওর কিবা , কি লাট, ফি উন্নত মালা ! কিবা চক্ষু-নীলিমার । উঃ কাছে। দেশঝি শ্রী নন্ উনি জব গরি । ।

সাবিত্রী। [ দ্বিতীয় অঙ্গ। বোধ হয় শাপষ্ট দেবতা ধরায়। সাবি। বােধ হয়’ কেন সখি, নিশ্চয় দেবতা উনি। হয়, শাপের লাগি অবতীর্ণ ধরা-মাঝে, নয়,-জেন, বন-মাঝে বন-দেব উদেছেন সখি! সত্য। (সাবিত্রী ও মুরলাকে অন্তরাল হইতে দেখিয়া ) ও কি ও- বনলতিকার কাছে সুবর্ণ লতিকা সদৃশ কে দু'টি রমণী ওই ! নিবিড় কানন ; কানন-নিবাসী তাপসী ব্যতীত কেহ ত রহেনা হেথা। পরিচ্ছদ পারিপাট্য নেহারি এদের সামান্য তাপসবালা জ্ঞান নাহি হয়। কে এরা, এল কোথা হতে ? যামিনী শােভিত যথা সুচাদ উদিলে, এদের উদয়ে তথা শােভে বনবাজি। সাবি। সখি, যাও, যাও, কে উনি কোথায় বাস, কেন এইখানে, লও গিয়া পরিচয়। কি কাষ তােমার সখি, ওঁর পরিচয়ে ? সাবি। যাও, সখি, যাও ত্বরা, বিলম্ব কল্পনা তুমি, আন পরিচয়। মুর। (হাসিয়া) কি সুধাব ওর কাছে ? সাবি। সখি, রাখ এষে পরিহা। পরিচয় জানিবাৱে হয়েছি আকুল। সত্য। কিছু না বুঝিতে পারি--কোথা হতে এ এরা। মােয় ইখ লাখ হেবা ফিন্য খুব +

তৃতীয় খণ্ঠায়।]
সাবিত্রী।
২৭
উয়েছেন মাের দুধ নিবারুণ ভয়ে?
যাই, কাছে গিয়া দেখি, সত্য মিথ্যা
করিগে নির্ণয় ।
(সাবিত্রীর নিকট সত্যবানের আগমন।)
(মুরলার প্রতি)
কে তােমরা দু’টি বালা, এ বিজন বনে
রয়েছ সহায়হীনা? হেন অনুভব,
কোন সম্রান্তের বালা পড়িয়া বিপদে,
কিম্বা পথ ভুলি, অসহায়ে রহিয়াছ
এই বনমাঝে। যদি তাই হয়, কহ মোবে ;
শাদেশ-অধিপতি দুমৎসেন-পুত্র
যুবরাজ সত্যবান এখনি আসিবে
রাখি নিজ নিকেতনে। আশঙ্কা নাহিক
কিছু। কে তােমরা বনমাঝে, যদি
বাধা নাহি থাকে, দা ও পরিচয় মােরে,
সাধ্যমত উপকার করিব নিশ্চয়।
কথায় বাধিত মাের হনু মহাশয় ।
পড়িনি বিপদে, কিম্বা পথহারা হয়ে
নাহি আহি হেথা মােরা। এই যে আমার
সখী—দৈখিছেন এই, এর প্রিয়পাখী
হারায়ে গিয়াছে কোথা লক্ষ্য তাকেতে,
তাই মাের ধূলিতেছি উভয়ে মিলিয়া।
ক দেশ ধুলি, কত দেশ গেনু,

সাবিত্রী। ২৮ (দ্বিতীয় অফ সত্য। মুর। সত্য। নেহারি কত পাখী,-কহিনু সখীরে- *চিনে লও প্রিয় সখি, প্রিয় বিহঙ্গমে।” কিন্তু কোনখানে সখী মাের, না পেল খুজিয়া ; শেষে মহাশয়, এসেছি বনেতে, কত খুঁজে খুঁজে চিনেছে আমার সথী তার প্রিয়ধন। ধরিতে পেরেছ ভারে ? ,তারে ধরি, হেন সাধ্য নাই আমাদের। পাতিলে ছাদের ফাঁদ পড়িবে বিহগ, পড়য়ে চুম্বকে যথা লৌহ আকর্ষিয়া ; পাত না সে ফাদ তবে। মহাশয়, অবলার জন্ম হয় অনেক পাপেতে! মাের সখী নারীজাতি, তাহে, রাজকুল-বালা (পিত মদ্রদেশের ) বামন হইয়া যথা হাতে চাদ চাওয়া- ধরিতে বিহগে ফাদ কেমনে পাতিবে তথা রাজকুল-বালা। নাহি কি উপায় কে? অাছে, কিন্তু বহুল আয়াসসাধ্য। হীন- মতি নারীজাতি-আমাদের সাধ্য নাই, তৰে যদি অবলার উপকার তরে আপনি ধরিয়া দেন সেই বিহামে, তবে মাের সখীবাধিত হইয়া কাছে থাকে চিরকাল। মহাশয় রাজপুত, তা’হে প্রতিশ্রুত-করিবেন সাধ্যমত সত্য।

হীর গর্জা। ]
সাবিত্রী।
২৯
মমাদের সাহায্য। তাই কই, নিজগুণে
আপনি ধরিয়া দেন সেই বিহঙ্গমে
বৈ বিহগ তরে ভ্ৰমণ কৰিছি মোরা
বহুকাল হতে।
শ্য। (হাসিয়া )
তব সখী তরে হেন কিছু নাই, যাহা
নারিব করিতে আমি। বিহগে ধরিব
এত বেশী কথা নয়,যদি মম প্রাণ পেলে
তার কোন হয় উপকার, তাও দিতে কভু
আমি হ’ব না বিরত।
( সাবিত্রীর প্রতি।
কহ বিধুমুখি, কহ অকপটে কোথা
বা বিহগ তব ?—এখনি ধরিয়া প্রদান
করিবে দাস তােমার করেতে।
( সলজ্জভাবে স্বগতঃ )
কেন লাজ ? যার তরে প্রাণ কাঁদে, তাঁর
কাছে কেন লাজ? লজ্জা, দুর হও,-দূর
হও,তােমারে চাহিনা এবে, এস তুমি
সময়ান্তে। যার আমি তার সাথে কথা
ক’ব, তুমি তাহে কেন বাধা দিতেছ এখন।
সত্য। (সাবিত্রীর প্রতি)
বিধুমুখি, কেন মৌনীভব? কোথায়
বিহগ তব ?
সাৰি। ' (নতমুখে) আপনার কাছে প্রতো।

সাবিত্রী।
[হিতীয় মঞ্চ
সত্য। (হাসিয়া) মোর কাছে। মাের কাছে তব পাখী,
লও ধরি তবে।
সাবি। (ফুলের মালা হন্তে লইয়া)
দিন অনুমতি, পরাব পাখীর গলে
কুসুমের মালা।
(হাসিয়া) যাহা বাছা বিধুমুখি, পারলো
করিতে, নাহি প্রয়োজন অনুমতি অপেক্ষায়।
(সাবিত্রী কর্তৃক সত্যবানের গলায় মালা প্রদান
ও সাবিত্রীর হস্ত হইতে অপর একগাছা মালা
লইয়া সত্যবান কর্তৃক সাবিত্রীর গলায় প্রদান।)
(মুরলার গীত।)
প্রেমের জনম কোথা, কে জানে লাে সজনি,
প্রেমিক যে জন প্রেমের হাটে প্ৰেম চেনে সে আপনি।
প্রেমিক প্রেমিকা সনে
প্রেমের আলাপ নিরজনে-
প্রেমের চ'ৰে চ'ৰচশিখমে ভরা হৃদয় খানি।
(পদক্ষেপণ)

তৃতীয় অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। ( রাজ প্রাসাদ।) ( রাজা অশ্বপতি ও নারদ আসীন।) হে দেবর্ষি, ত্রিভুবন সমাচার তােমার বিদিত; জান তুমি, দেব, নর, যক্ষ, রক্ষ গন্ধর্ব, কিন্নর--কে কেমন ভাবে আছে ভুবন মাঝেতে। দোষ, গুণ, খ্যাতি, যশ কেবা কত ধরে, তাও অবগত তুমি, তাই নিবেদন, কহ প্রভা, শবদেশ অধিপতি দ্যুমৎসেনপুত্রসত্যবান- পরিচয় আমার সনে। কেন মহারাজ, ভারপগিচয় জানিবারে হয়েছ ব্যাকুল। সাবিত্রী যুবতী এবে; পরিণ নাহি তা’র হল এতদিনে যিতিগণের মুখে মারধর্মশাস্ত্রে শুনিয়াছি, হে দেবর্ষি-যেই পিতা সময়েতে দুহিতানতলে নাহি করে সম্প্রদান; ঋতুকালে যে পুরুষ অসলেতে রয়, নার। কিন্তু মহাভাগ, ৩২ সাবিত্রী। [ প্রথম গৰ্ভাৰু। কিম্বা, যেই ভর্তৃহীনা-জননীরে না করে পালন, নিন্দার ভাজন সেই। তাই প্রভ, ললনা আমার-সাবিত্রী-রতনে, গুণবান সত্যবান করে দিব করিয়াছি স্থির। নার। মহারাজ, জানি তার পরিচয় ; তেজোপুর যুবা সেই,-যথা দিনমণি দিন আগমনে, প্রখর কিরণ মালা প্রকাশি পৃথিবী করয়ে অস্থির, তেমতি তাহার তেজ অরিলােপরি। বুদ্ধিতে গুরুর তুল্য। মহেন্দ্রের মত শোৰ্য্য ; পৃথিবীর তুল্য ক্ষমা আছয়ে তঁাহার। দানেতে স্বনাম- খ্যাত,-সংস্কৃতি-নক্ষন রন্তিদেব ভিন্ন কেহ নহে তার কাছে দানে উপমেয় । ব্ৰহ্মনিষ্ঠ, সত্যবাদী,-যষতির মত মহান্ অনুভব তার। রূপবান,-অশ্বিনী- কুমার মত দীপ্তবর্ণ-ভাতি। চন্দ্রের মতন প্রিয়-দর্শন সে যুবা। দাস্ত, মৃদু, পুর, সভ্য-বহু গুণ তার। কিন্তু এক দোষ আছে ; সেই দোষে সবগুণ বিফল তাহার। সাবিত্রী অতীব পাপী, নতুবা তার সাথে সম্বন্ধ-বন্ধন কেন করিবেন বিধি । কহিলে, আপনি তারে সর্বগুণান্বিত, তবে তার কি দােষ ? নার। এক দোষ মহানান, এক দোষে বহু দোষ }

তৃতীয় অঙ্ক।]
সাবিত্রী।
৩
*.
নার।
তন,তবে, আজি হতে হবে যবে
বৎসর পূরণ, সেই দিন হবে জেন
তাহার মরণ-ক্ৰমে ক্ষীণ আয়ু হ'য়ে ।
মহারাজ, আর মাের অবকাশ নাই,
গােলকে যাইতে হবে বিষ্ণু দরশনে,
অতএব যাই এবে। সত্যবান সাথে
দিবে কিনা পরিণয় করহ চিন্তন।
দেব, প্রণমি তোমার পায়।
আশীৰ্বাদ করি, তব হউক মঙ্গল । -
(নারদের প্রস্থান।)
কিবা করি এবে। দুহিতারে সত্যবানে
কেমনে প্ৰদানি ? সে যে ক্ষীণ-আয়ু হয়ে
মরিবে বৎসর পরে—কহিলা নারদ।
দেবর্ষি নারদের বাক্য কভু মিথ্যা ত
হবে না; মরিবে--মরিবে, বৎসর পরে,
সত্যবান মরিবে নিশ্চয়, হইবে বিধবা
মম পরাণ-দুহিতা।
এ সব জানিয়া
আমি কেমনে প্ৰদানি দুহিতারে
তা’র করে ? পারিব না, পারিব না-
দুহিতারে সত্যবানে দিতে।
( মালবীর প্রবেশ।)
মহারাজ, কর দিনরি বিবাহের,
জামতারে দেখি মােকা চরিতার্থ হই।

।। ।
৩৪
সার্বির্তী।
[ প্রথম গর্ভা।
অশ্ব। রাণি, দিবনাক সত্যবান সাথে
পরিণয়, শুনিলাম এই মাত্র,
কহিলা নারদ-কুলগুরু, মাের কাছে,
সত্যবান রূপবান গুণবান বটে,
কিন্তু আছে তার এক দোষ, সেই দোষ
তরে সকলই বিফল তঁার শুন রাণি
কহিলা নারদ, আজি হতে হবে যবে
বৎসর পূরণ, সেই কালে সত্যবান
ছাড়িবে ধরণী। তবে বল বাণি,
কেমনে জানিয়া তারে করি সম্প্রদান ।
তার সাথে পরিণয় হবে না জানিও;
যাও তুমি, যাও সাবিত্রীরে কহ এ বারতা।
(এক দিক দিয়া মালবী ও অন্য দিক দিয়া অশ্বপতির প্রস্থান।)
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
রাজকক্ষ।
( সাবিত্রী আসীনা।)
(গীত।)
সাবি। প্রাণে প্রাণ নাইক অামার, প্রাণ বুঝি হারিয়ে গেছে।
মনে মন মন-হাৱা মলিন মত হয়ে আছে।
কোথায় ছি, কোথায় গে,
কোথা যা প্রাণ হারাই
।

তৃতীয় অঙ্ক।]
সাবিত্রী।
যে নিল প্রাণ চুরি করি, সে মাের প্রাণ কই দিয়েছে,
আবেশে অবশ হয়ে প্রাণহারা প্রাণ হয়ে আছে।
(ঐ সুর বজায় রাখিয়া মুরলার গাইতে গাইতে
প্রবেশ।)
মুব। তােমার প্রাণ তােমার কাছে কিসেব তরে
হারিয়ে যাবে ?
সাবি। অযতনে রেখেছিনু, জানিনা কেউ কেড়ে নেবে।
অবলার প্রাণ একটু খানি,
সাবি। বড় জ্বালা গো সজনি !
একটু হাসি একটু চাওয়া প্রাণ বল কিসে রবে ?
সাবি। জানিনা বারেক দেখায় পোড়া প্রাণ এমন হবে ।
(উভয়ের প্রস্থান।)
তৃতীয় গভাঙ্ক।
দরদালান।
( মালবীর প্রবেশ।)
মাল। শুনিবে না মম বাণী অবােধ বালিকা,
বুঝলাম কত তাৰে, মম ভাগ্যদোষে
তুলিল না সেই কথা শ্রবণ-বিবরে।
করিল প্রতিজ্ঞা,-সত্যবান বাচুক
মরুক, সেই পতি সেই গতি, বরিবে
তাহারে। যাই, পুনরায় ফহি গিয়া, দেখি
বুবে কি না।

সাবিত্রী।
[ প্রথম গাঙ্ক।
{ মালবীর গমনােদ্যোগ ও সাবিত্রীর প্রবেশ।)
সাবি।
এস বাছা, যাইতে ছিলাম আমি
তোমারই সন্ধানে।
কেন মাতঃ, কি প্রয়ােজন মাের?
মাল। শুন বাছা, পুনরায় কহি তােমা প্রতি
রাখহ মােদের কথা। সত্যবান গুণবান
হাে’ন, বরণ করিতে তুমি পাবে না তাহারে,
বৎসর পরেতে মরিবে যে জন, জানিয়া
শুনিয়া তরে কোনে বরিবে? অহীয়ে
নেহারি কে বা হাত দেয় বল, তাহার
গহ্বরে ? হও ক্ষান্ত বাছাধন, ভুল
সত্যবানে। দিব অন্য যুবা সাথে
তব পরিণ।
সবি। মাতঃ, অঙ্গার আদেশ কেন তনয়ার
প্রতি ?
এ পন ও বালিকা তুমি। ন্যায়-অন্যায়
কারে বলে, জানি তোমা হয়ে মােরা বেশী।
তোমার জননী আমি, তােমার মঙ্গল
কামনা মম দিবস রানী। সত্যবান-পাথে
তব হলে পরিণয়, মঙ্গল নাহিক জেন।
তাই তােমা কই, ভুল রে, ভুলে
যাও যাদুমণি, সত্যবান মুখ জাহা
ব হৃদয়েতে গাছৰে অঙ্কিত।

তৃতীয় অয়।]
সাবিত্রী।
সাবি। মাতঃ, ক্ষনিবেন মােরে। অবােধ 'বালিকা
আমি, নাহি হিতাহিত বিবেচনা; কিন্তু
শুনেছি শ্রবণে-পতি সেবা তরে শুধু
নারীর জনম। পতি পায় যে নারীর
আছে সদা মতি, সেই সতী ভুবনেতে ।
সতী ভাবে, ধৰ্ম্ম কর্ম সকলি হইবে
করিলে পতির সেবা। পতি বিনা রমণীর
গতি যে গাে নাই, তুমিই বলিতে মােরে ।
তবে কেন, মাতঃ, তনয়ার প্রতি
অসতীর পথে যেতে করিছ আদেশ ?
সত্যবান মাের স্বামী, তার সাথে
লােকাচার-পরিণয় হয়নি যদিও
কিন্তু হৃদয় অন্তরে তারে ভাবিয়াছি
পতি। তবে মাতঃ, কিরূপেতে বল,
করিব বিবাহ আমি অপর জনেরে ?
সত্যবান মম পতি, সত্যবান মম
গতি ; সত্যবান স্থিতি হলে মম স্থিতি
জানিবে ধরায়।
(অশ্বপতির প্রবেশ।)
(সাবিত্রীর প্রতি )
মাতঃ, হউক মঙ্গল তব ; আশীর্বাদ করি,
সত্যবানে লয়ে তুমি আয়ুতী হও।
( মালবীর প্রতি)
রাশি, নাহি কর অনুরোধ,

সাবিত্রী।
( তৃতীয় গণ্ঠা।
শুনেছি সকল কথা দুহিতার আমি
বাহিরে থাকিয়া। দিব পরিণয় সত্যবান
সাথে, করহ উদ্যোগ তা’র । আমিও
বাহিরে যাই--মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান
করিবার তরে।
( এক দিক দিয়া মালধী ও অন্য দিক দিয়া অশ্বপতির প্রস্থান।)
( সাবিত্রীর গীত ।)
সাধের প্রেমে এত জ্বালা কেন বিধি দিয়েছিলে ?
সুখের পথে কণ্টকেরে কেন বল রেখেছিলে?
শশীরে গগন-ভালে
হেরিলে মানস ভােলে
কেন বল তার সনে কলঙ্কেরে মিশাইলে ?
| পটক্ষেণ।

সত্য। চতুর্থ অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। পাৰ্বতীয় বন। (সাবিত্রী ও সত্যবানের প্রবেশ।) সাবিত্রি ! যখনই তােমার দুঃখের কথা আমার মনে হয়, তখনই যেন বুক বিদীর্ণ হয়ে যায়। তুমি অবলা রাজবালা, রাজকুল-সুলভ উপাদেয় সামগ্রী ব্যতীত কখন অন্য কিছু ভােগ করনি, এখন অভাগ। সত্যবানের হাতে পড়ে, দিনান্তে ও দু’চারিটি বন- ফলে উদর পূরণ করতে পাও কিনা সন্দেহ। রাজ অট্টালিকায় সুন্দর সুকোমল শয্যাব্যতীত কখনও শয়ন করনি, আর এখন অম্লানবদনে কতকগুলি তৃণ- পল্লৰে শয্যাসন রচনা করিয়া সুখে শয়ন করূছ। রাজ ভবনে তােমার জন্য কত দাস দাসী নিয়ােজিত ছিল, যখন যাহা অভিলাষ হইত, আদেশমাত্র অবিলম্বে তাহারা পূরণ করিত; কিন্তু এখন এ হতভাগ্যের গলায় মালা দিয়া অবধি তুমি সে সমস্ত সুখেই বঞ্চিত হয়েছ। দাস দাসীতে তােমার আদেশ পালন করূবে, এত দূরের কথা, এখন তুমিই এক রূপ পরিচারিকার কাৰ্যে নিযুক্ত। লােকে কন্যা যাহাতে পরমসুখে থাকে এরূপ পাত্রের হাতেই কন্যাকে সম্প্র- ঘন করে ; জানিনা, মহারাজ অশ্বপতি কা’র ছলনায় ৪২ সাবিত্রী। [ দ্বিতীয় গর্ত। = সত্য । কাটাতে, এখন ভাগ্যরশে সামান্য দরিদ্রের ন্যায় বন- চারী হয়েছ। ভগবানের কৃপায় আবার এই দুঃখের পর সুখ হবে—তুমি নিজ রাজ্য উদ্ধারে সক্ষম হবে তার জন্য ভাবনা কি ? যত্ন কর, যত্নের অসাধ্য কিছুই নাই। লােকে হাতীর মাথা থেকে মুক্তা বার করতে সক্ষম হয়, সাগর থেকে রত্ন সংগ্রহ কতে পারগ হয়, আর তুমি নিজ রাজ্য শত্রুর হাত হতে উদ্ধার করূতে সক্ষম হবে না। প্রিয়তমে, আর আমি অনর্থক ভাবনায় অসুখী হ’ব না। যা’র এমন স্ত্রী, তার কিসের অসুখ ? সাবিত্রি । হৃদয়েশ্বরী। হৃদয়েশ্বরী! আজ হতে আমার আর কোন অসুখ নাই। আমি আজ হতে সুররাজ ইন্দ্র অপেক্ষাও সুখী। চল, দেবরাজ যেমন প্রাণ- ধিকা শচী সঙ্গে নন্দনকাননে পারিজাত আহরণে যান, আমিও তদ্রুপ তােমাকে লইয়া এই বিপিন মাঝে সুফল অন্বেষণে যাই । (উভয়ের প্রস্থান ।) দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। বন-নদী। (নদীতীরে শৈব্যা ও সুরমা।) শৈব্যা । ঠিক কথা সুরমা দিদি, এখন আমি বড়ই সুখী। এখন আমার আর শাৰদেশ মনে নাই, এই বনই এখন আমার দেশ বলে বােধ হয়।

চতুর্থ অঙ্ক।] সাবিত্রী ৪ • রাণি, বনের মত সুখের স্থান আর কোথায় আঙ্কে ? যদি ভালবাবার কোন স্থান থাকে তা হলে সে বন, যদি প্রাণ জুড়াবার স্থান জগতে থাকে, তা হলে সে বন। শৈব্যা। না, সুরমা দিদি, আমরা পুরনারী; পুরী ত্যাগ করে বনের শােভায় প্রথম প্রথম মন ভােলে নাই,-বৃদ্ধ- স্বামী, শিশু পুত্র নিয়ে দরিদ্র দশায় বনে থাকতে প্রাণ যেন কেমন করত। অবস্থা তেম্‌নি মন্দ থাক্‌, সত্যবান এখন আমার বয়স্থ ও বীৰ্য্যবান হয়েছে, সােণার চাদের মত বউ ঘরে এনেছি, তাতেই এখন আমার এই বনই যেন রাজপুরী বলে বােধ হয় । রাণি, তুমিত আনন্দিত হবেই, তােমার পুত্রবধুর গুণে এই বনবাসী সকলেই অনল সলিলে নিমগ্ন । তপস্বিগণ সকলেই একবাক্যে বলে থাকেন তোমার পুত্রবধূর গুণে তোমরা আবার রাজ্যলাভে সমর্থ হবে, তোমাদের এ দুঃখ আবার ঘুচবে। শৈবা। সুরমা দিদি, প্রথম যখন রাজ্য ছেড়ে বনে এলাম, তথন তুমি আমায় কত বুঝিয়েছ, মহারাজ কত সান্ত্বনার কথা বলেছেন, কিন্তু কিছুতেই মনে শান্তি লাভ করতে পারিনি। তখন মনে করেছিলাম, আমাদের সংসারের সুখ বুঝি জন্মের মত অন্তর্হিত হয়েছে। মুর। রাণি, বিপদে অধৈৰ্য্য হতে নেই। বিপদ বিন সম্পদের মর্যাদা কেহ বুঝতে সমর্থ হয় না। আচ্ছ।

৪৪
সাবিত্রী।
[ দ্বিতীয় পর্ভাৰু
রাণি, তােমরা যদি আবার রাজ্যলাভ করতে পার,
তখন কি সুরমাকে মনে থাকবে?
শৈব্যা। সে কি কথা সুরমা দিদি! পৃথিবী ভুলতে পারব,
তবু তােমার গুণের কথা ভুলতে পারবনা। তুমি
আমাদের বিপদের সঙ্গিনী। তােমার যত্ন, তােমার
ভালবাসা কি ভুলে যাবার কথা দিদি ?
চল রাণি, সন্ধ্যা হয়ে এল, জল নিয়ে কুটীরে যাই।
( উভয়ের কলসী কক্ষে জল লইয়া উপরে উত্থিত
হওন।)
শৈব্যা। আচ্ছা দিদি, তুমি কি মনে কর, আমাদের রাজ্য
আবার ফিবে ?
সুর। নিশ্চয় ফিরবে রাণি। তুমি আবার রাণী হবে,
দ্যুমৎসেন আবার রাজা হবেন, আমরা দেখে কৃতার্থ
.
শৈব্যা । সুরমা দিদি, এই বনে এখন আমি যত সুখে আছি,
তা’তে রাজ্য আর ভাল লাগে না। তুমি কি মনে
কর, যদি কথন বিধির ইচ্ছায় আমাদের রাজ্য আবার
ফেরে, আবার দ্যুমৎসেন রাজা হবেন, আবার শৈব্যা
রাণী হবে ? তা মনে করনা। যদি কখন রাজলক্ষী
প্রসন্না হন, আমরা দু’দিনের জন্য রাজা রাণী হ’ব
মাত্র, তারপর সত্যবান সাবিত্রীকে রাজা রাণী করে
আমরা আবার এই বনে এসে বাস করব।
( উভয়ের প্রস্থান)

চতুর্থ।
সাবিত্রী।
(মুরলার প্রবেশ ।
কিশাের কালের সাথী সাবিত্রী আমার,
বহুদিন দেখি নাই তার মুখ খানি।
কত খেলা খেলিয়াছি, কত হাসিয়াছি
হাসি উভয়ে মিলিয়া নিভৃতে মনের
সাধে ; পরাণের কত কথা মন প্রাণ
খুলি কহিয়াছি দু’জনেতে। এবে দু’য়ে
দুই স্থানে; প্রাণ মম কাদে সদা বিরহে
তাহার,তাই আসিনু দেখিতে হেথা
তার মুখ খানি। যাই বুঝি আরও কিছু
দূরে হবে বা কুটীর—দেখিগে কুটীরে
মম পরাণ সজনী ।
(প্রস্থান) ।
;
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
উপবন।
সাবি।
=
( সাবিত্রী ও সত্যবান।)
সুগন্থি মল্লিকা বেলা যাতি যুথি চয়ণে,
গাঁথিলাম মালা নাথ, মনমত যতনে,
কিন্তু নাহি ভাল হ’ল থরে থরে নাহি র’ল ;
যাতি গুলি মাঝে আছে, শুধু তারই কারণে
মধুর রূপের ডালি নাহি যেন মদনে।
প্রিয়ে,
সুন্দর গেঁথেছ মালা হেন লয় মনে।

সাবিত্রী।
[ তৃতীয় গরু।
সাবি। তবে নাথ, আজি ইহা দিই তব গলে ;
অন্য দিন সাজাইব মনমত ফুলে।
(সত্যবানের গলায় সাবিত্রীর মালা প্রদান )
সত্য। মনে পড়ে প্রিয়তমে, ঠিক এই রূপেতে,
এই বনে--এইখানে মালা দিলে গলেতে ?
সাবি।
পড়ে মনে প্রাণ-নাথ, সে সুখ-কাহিনী-
(নেপথ্যে) কিন্তু দুঃখ কি হয় বিনা তব সঙ্গিনী ?
সাবি। ( চমকিত হইয়া)
কে নাথ, সঙ্গিনী মম মুরলার প্রায়
উত্তরিছে মাের প্রতি-ওই শোনা যায় ।
(নেপথ্যে) আছে কি তােমার মনে আর মুরলায় ?
সাবি। ( ব্যস্ত হইয়া) সখি, সখি-
করনা আকুল আর,
মুরলার প্রবেশ।)
সাবি।
মুল। (হাসি) আকুল কেন ৰা হ'বে আমার লাগিয়ে,
আমি কোন্ ছার !
কেন সখি, হেন বাণী ?
পাশে তব গুণ-মণি।
আর প্রাণের সঙ্গিণী তব এবে কাছে এসেছে ।
সঙ্গিণী এল, না এলকিবা এসে গিয়েছে ?
উভয়েতে কাছে কাছে-
সঙ্গিণীরে মনে আছে?
সাবি। আছে মনে প্রাণসপি-

চতুর্থ অঙ্ক।] সাবিত্রী ৪৭ মুর। মুর। সত্য। তােমারি কারণে, কাছে কাছে থেকে মােরা আজি সুখী জীবনে। মনে আছে সেও ভাল, ভাবিলাম ভুলে গেল সঙ্গিনী আমার বুঝি নাথেরে লইয়ে ; তা’তেই আসিনু হেথা দেখিতে উভয়ে। সত্য। রসিকার শিরােমণি তুমিলল মুরলে ! আর বুঝি তুমি চল শঠতার বলে ? সাবি। না সখি, এমন বাণী উহারে বলনা সরল পরাণ উনি তাকি তুমি জাননা ! কেন লাগে তব গায় ? সাবি। উনি যে আমার কায়, মুর। কায়ারে বলিলে কিছু ছায়া কথা কহে না ; সত্য। কায় বিনা ছায়া সখি, থাকিতে যে পারেনা। মুর। মানিলাম হার আমি তােমাদের কাছেতে। সত্য। কেন সখি, হার মান ? নহিলে কি থাকে মান, তােমরা উভয়ে, আমি একাকী-রমণী, হেরে জিতিব এযে অসম্ভব-বাণী। সাবি। না সখি, তােমারি জিত। মুর। না সখি, তােমার উনি অতি ধৰ্ম্ম-বি। সত্য। আমি কি তোমার কেহ নহিলাে সজনি বাঁধিয়াছে তােমারে যে প্রাণের সঙ্গিনী । সাবি। তুমি সখি, ভাগ চাও? মুর।

৪৮ সাবিত্রী। [ তৃতীয় গর্ত। মুর। সত্য। মুর। সত্য। সত্য। কাষ কি আমার সখি, ও পড়া-পাখীতে ; দিতে পারি তােমাধনে-আরও যদি নাও। দাওনা আমারে সখি, হও আগে আমাদের মত তুমি কুলবালা বিধুমুখী নহিলে কি পেতে নাই ? তা না হলে কা’র মাথে পড়িয়াছে ছাই । তবে সখি, তব সখী ল ও ফিরাইয়া--- দিওনা আমারে আর, সজনী যে তােমাধনে রেখেছে কিনিয়া, তুমি তার জীবনের সার। ফিরান কি সােজা কথা- সজনীর প্রাণ যত দিন না হ’তেছে বার ? তবে কেন মােরে কও আপদ-বালাই ? ষাট ষাট, মরি মরি-বালাই বালাই, বলিতে পারি কি তােমা হেন কথা ভাই। তুমি সজনীর প্রাণ-ধন-কত সাধ করি তােমারে রেখেছে সখী হৃদয় উপরি। তবে সখি, আমি বল সাধনার ধন তাতেই দিয়াছে সখী সকল ভুলিয়ে জান নাকি তোমারেই তার প্রাণ-মন ! তুমি সাধনার ধন, সখীর নিকটে তুমি পরশ-রতন। আমার পরশে তবে সােনা হয়ে যাবে তােমার সজনী,-সখি, লােকে কি কবে ? সত্য। মুর। মুর। সত্য। {:

চতুর্থ অঙ্ক।। সাবিত্রী ৪১ মুর। লােকে আর কিবা কবে,-কে না ইহা জানে ? নয়নে নমনে যবে হল শুভ দরশন, তখনি সজনী মাের সােণা হয়ে গেছে- স্বভাবে অভাব হয়ে তােমাতে মিশেছে। সাবি। চির-রসিকতা তুমি জান সহচরি, এত কথা বলিবারে আমি ত না পারি । ভাল, সখি, কুটীরেতে করিয়া গমন করিগে সকলে এস সুখ-আলাপন। ( মুরলার হাত ধরিয়া সাবিত্রীর প্রস্থান এবং সত্যবানের পশ্চাদমুসরণ।) চতুর্থ গর্ভাঙ্ক বন-কুটীর। (শৈব্যা ও দ্যুমৎসেন।) মৎ। রাণি, ভাগ্যবতী তুমি এবে, ভাগ্যবান্ আমি, সৌভাগ্যের কথা কি আৰু বলিব- মদ্রদেশ রাজবালা পুত্রবধূরূপে ॥ শােভিত কুটীরে মম এই বন-মাঝে। দেবতা দুর্দিনে বুঝি হইলা সদয় মােরে-তেঁই, বিনা যত্নে হেন রত্ন পড়িলাম মােয়া।

সাৰিত্রী।
( চতুর্থ গর্ভাঙ্ক
শৈয্যা। সত্য কথা তব, নাথ। বাছার আমার
মরি! কি বা রূপ-রাশি ভুবন ভুলান,
তু লন তাহার দিতে যেন নাহি পারি
পৃথিবী খুঁজিয়া। প্রাণ মন মােহ রূপে,
জগতের চিন্তাশি ওরূপ হেরিলে
যেন সব ভুলে যাই।
ডুমৎ। পুণ্যবান্ সত্যবান তনয় আমার
তা’না হলে এ হেন রমণী লাভ সকলের
ভাগ্যে কিগো ঘটে প্রিয়তমে। রূপে লক্ষী,
গুণে যেন সরস্বতী বধূমা তা মাের।
কি মধু মাখান কথা-সুধা কাণে বাজে
শুনিলে সে মধুস্বর। কিসে অামি দুঃখী
প্রিয়ে, আমি দুঃখী নই,আমার মতন
ভাগ্য আর ফা’র আছে ?
শৈব্যা। নাথ, বাছা যবে ডাকে মােরে জননী
বলিয়া, কত যে, কি সুখ লভি এ পােড়।
মানসে—কি ক’ব তাহার কথা--মনে
ভাবি, স্বর্গ বুঝি এবে করতল মম
বিধির প্রসাদে।
দুমৎ।
হব রাণি, হব পুনঃ সুখী মেরাজেন
এক দিন। এই রত্ন লভিয়াছি যেই
ভাগ্য-ফলে—সেই ভাগ্য ফলে স্বদেশ
আবার মম আয়ত্ব হইবে।
শৈব্যা। নাথ, রাজাহ’তে আর তব আছে কি বাসমা

চতুর্থ অঙ্ক।]
সাবিত্রী।
দ্যুমৎ। বাসনা ?-বাসনার ফলে নর বেঁচে
রয় ভবে-বাসনা আমার নাহিক বলিব, কিসে ?
আছে অভিলাষ, শাল্বদেশ
যবে মাের হইবে আয়ত্ব, সত্যবানে
সেই দিন দিয়া রাজ্যভার বাণ প্রস্থ
ধৰ্ম্ম আমি করিব গ্রহণ।
শৈব্যা। অভিলাষ মােরও তাই ; রাণী হ’তে আর
মম প্রাণ নাহি চায়।
মৎ। রাণি, ভাব দেখি একবার সে দিনের
কথা,-যবে মােরা এসেছিনু প্রথম
এবনে, কত দুখী ছিলে তুমি, ভেঙ্গে ছিল
হৃদি তব যেন একেবারে নিরাশার
আঘাতেতে হয়ে আঘাতিত।
শৈব্যা । নাথ, সে দিন এখন গেছে। এবে আর
দুঃখ লেশ নাহিক পরাণে।
চমৎ। থাক যদি বন-মাঝে আরও কিছু দিন,
পরাণ তখন বনশোভা ভুলিবারে
আর নাহি চাবে।
(চারিজন ঋষিবালকের প্রবেশ।)
১ম বা। ( শৈব্যার প্রতি) হ্যা মা, হ্যা মা! তুমি আমাদের
রাজার মা, তুমি আমাদেরও মা, কেমন মা?
২য় বা মা, তুমি আমাদের ভালবাসবে মা? রাজা সত্যবান
আমাদের কত.ভালবাসে, কত আদর করেন মা,
তুমিও আমাদের তেমনি আদর করবে তা মা?

; ন। । সাবিত্রী। [ চতুর্থ গর্ভা। শৈয্যা। (হাসিয়া) পাগল ছেলে! আমি কি তােদর ভাল- বসিনে বাছা? আমি তােদের নিয়েই এই বনে সুখে আছি; তােদর ভাল না বেসে থাকতে পারি । ৩য় বা। মা, তুমি আমায় কোলে কর না; তােমার কোলে উঠতে আমি বড় ভালবাসি মা। (শৈব্যার তৃতীয় বালককে ক্রোড়ে লওন।) ৪র্থ বা। হা মা, তুমি ওকে কোলে ক’রলে, আমাকে নিলে না,তুমি আমায় ভাল বাসনা মা। মৎ। (হাসিয়া) নাও এখন,-একজনকে কোলে নিলে ত সকলেই ক্ষেপে উঠল ; নাও ওকে ও কোলে নাও। শৈব্য। (চতুর্থ বালকের প্রতি) আয় বাছা, তুই আমার এই কোলে আয়। (চতুর্থ বালককে শৈব্যার অপর ক্রোড়ে লওন।) ১ম বা। হ্যা মা, তবে তুমি আমাদের ভালবাসনা- আমরা দাঁড়িয়ে থাকলাম, আর তুমি ওদের কোলে ২য় বা। তুমি আমাদের একটুও ভালবাস না। তা’নইলে আমাদের কোলে নিলে না-ওদের কোলে নিলে কেন। শৈব্য।। তৃতীয় ও চতুর্থ বালককে) তবে বাবা, তােমরা এক বার নাম, ওদের একবার কোলে নিই- (তৃতীয় ও চতুর্থ বালকের অবতরণ ও ১ম ও ২য় ৩র বা।' নাম ভাই, আর কেন, তােমরা ত অনেকক্ষণ চড়েছ। নিলে ।

চতুর্থ অঙ্ক।]
সাবিত্রী।
১ম বা। তোমরাও ত এতক্ষণ ছিলে ভাই,আমরা উঠ নাম
আর অনেক্ষণ হয়ে গেল ?
৪র্থ বা। না ভাই, নাম, নেমে চল, আমাদের রাজা কোষ
গিয়াছেন দেখিগে।
১ম বা। (শৈব্যর প্রতি) তবে যাই মা, আমরা আমাদের
রাজাকে দেখতে যাই।
(১ম ও ২য় বালকের ক্রোড় হইতে অবতরণ।)
১ষ বা। তবে আমরা যাই মা। অামাদের রাজা কোথায়
গিয়াছেন দেখিগে।
শৈব্যা। এস বাছা।
৪র্থ বা। “এস” বললে কেন মা? অামরা যে এখন আমাদের
রাজা কোথায় দেখতে যাচ্ছি।
দ্যুমৎ। (হ"সিযা শৈব্যার প্রতি) এস’ বলার অর্থ ওরা
বুঝতে পারবে কেমন করে ? তুমি ‘এস’ বললে,
ওরা মনে করূলে,ওদের বুঝি তুমি যেতে বারণ
করূছ।
।
শৈব্যা। (বালকগণের প্রতি) কেহ ‘যাই’ বললে তাকে
‘এস’ই বলতে হয়।
আমরা মেয়েমানুষ—যাই’
বলাটা আমবা দোষ মনে করি।
৩য় বা। (হাসিয়া) তাতেই বুঝি তুমি আমাদের যাও
বললে না মা,-তা বেশ! (অপর বালকগণের
প্রতি) তবে, চল ভাই, অমৰা সত্যবানকে খুজে
নিয়ে আবার এখনি ফিরে আছি।
(বালকগণের প্রস্থান।)

৫৪
সাবিত্রী।
[ চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
দুমৎ। রাণি--
কিবা সুবিমল মরি বালকের মন,
. দুখ নাই, তাপ নাই, দেখে শােভা ভুলে যাই,
মনে হয় ধরি পুনঃ শিশুর জীবন।
कि
মধু মাখান কথা,প্রফুল্ল কেবল,
সংসারের শােক-হার,-কভু না বিকল।
শৈব্যা। মহারাজ,
সাধ যায় এ দাসীর ও পরাণে,
ধরিতে শিশুর শােভা, ওই রূপ মনােলোভা,
মানস মাখান যেন জ্যোছনার কিরণে।
যত কাল শিশু-কাল, তত কাল সুখ,
শিশু কাল গত হলে কেবল অসুখ।
দুমৎ। আবার অসুখ কেন বলিতেছ জীবনে,
এই না বলিলে তুমি বড় সুখী পরাণে ?
সে কথা নহেক নাথ, শিশু মুখ নেহারি,
শিশু হ’তে সাধ যায়--সব যেন পাসরি।
( সত্যবান, সাবিত্রী ও মুরলাকে লইয়া
বালক চতুষ্টয়ের গান গাইতে
গাইতে প্রবেশ ।)
১ম বা। আমরা সবাই এখন রে ভাই রাজা পেয়েছি।
২য় বা"। বনের মাঝে মােহন সাজে রাজা চিনেছি।
তৃৰ বা। তুলে কুসুম গাঁথি মালা,
৪র্থ বা। পরিয়ে দিব বাজার গলা,
সকলে। মা বলেছে আর কিবা ভঙ্গ, সকল ভুলেছি।
[ পটক্ষেপণ। ]
শৈব্যা ।

পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
অরণ্যানী।
( কুঠার হস্তে সত্যবান ও সাবিত্রী।)
সত্য। প্রিয়ে, তুমি আজ তিন দিন হ’তে উপবাস করে
আছ, অনর্থক কেন কষ্ট ভোগ করূতে আমার সঙ্গে
এই মহাবনে এলে ? আসবার সময় তােমাকে কত
বারণ করূলেম, তুমি শুলে না ; দেখ দেখি, সন্ধ্যা
হয়ে গেল, তুমি কখন দুঃখের বার্তা জানি না,
আজ এই মহাবনে—অন্ধকার রাত্রে তােমার কতই
না কষ্ট হবে !
সাৰি। কষ্ট কি নাথ। আমি যেখানেই থাকি, তােমার
সঙ্গে থাকিলে কোন কষ্ট অনুভব করিনা। আমি
তােমার সঙ্গে অছি-এতে কি আমার কিছু মাত্র
কষ্ট হতে পারে ?
সত্য। প্রিয়ে, তুমি কি কখন পথ-শ্রমের কষ্ট জান ? আজ
যে আমরা কুটীর থেকে অন্তত পাঁচ ক্রোশ দূরে
এসেছি ; পাঁচ ক্রোশ পদব্রজে ভ্রমণ করা তােমার
পক্ষে যে অতিশয় কষ্টকর, তাহা তুমি স্বীকার না
কলেও আমি বেশ বুঝতে পাচ্ছি।
সাবি। নাখ, ও কথা বার বার বলে কেন আমায় লজ্জা

সাবিত্রী।
[ প্রথম গর্ভা।
?
দিচ্ছ ? একি আমার কষ্ট ! তােমার সঙ্গে থাকিলে
ইন্দ্রের নন্দনকানন ও এই ভয়ানক বন আমার নিকট
সমান সুখকর স্থান। যে অবস্থাতেই হক, দাসী
তােমার সঙ্গে থাকলেই স্বর্গসুখ মনে করে। তুমি
কি জান না যে, তােমার মুখ দেখলে আমি সমস্ত
কষ্ট ভুলিয়া পবিত্র আনন্দে ভাসি? তুমি যে আমার
জীবনের ধ্রুবতারা, তুমি প্রাণময়, আমি শুধু তােমার
ছায়া, আমার সুখ, দুঃখ, ভয়, ভাবনা কিছুই ত
তোমা ছাড়া নয়।
সত্য। প্রিয়তমে, তুমি যে কথাগুলি বল, তার উত্তর করি
আমার যেন এমন ক্ষমতা থাকে না। স্ত্রীলােকের জন্যই
পুরুষ সুখী। সাবিত্রি, আমি পূর্ব জন্মের বহু পুণ্যফলে
তােমাকে লাভ করেছি। ভগবান আমাকে পরম
সুখী করিবার জন্যই বুঝি দেবদুল্লভ, প্রেমময়ী
সাবিত্রী রত্নকে ধরাধামে প্রেরণ করেছেন। সাবিত্রি,
ক্রমেই রাত্রি বেশী হয়ে এল ; চল, আর কতকগুলি
কাষ্ঠ-সংগ্রহ করে শীঘ্ৰ কুটীরে যাই।
( উভয়ের বনান্তরে গমন।)
( বনদেবীর আবির্ভাব।)
;
( গীত।)
রূপেতে বিভাের, প্রেমে মাতোয়ারা
যুগল যুবক যুবতী,
কত ভালবাসা
মধুর মধুর মুরতি।

পঞ্চম অঞ্চ। ]
সাবিত্রী।
আহা! মরি মরি—এরূপ মাধুরী
সােহাগের ফুল-সাধের পাপড়ি
ঝরিয়া যাইবে, খসিয়া পড়িবে,
এত সুখ সাধ কিছুনাহি রবে,
নাশিবে এখনি
যুবকের প্রাণ
বিধির বিধানে নিয়তি।
কেন ফোটে ফুল—যদি না রহিবে ?
কেন রূপরাশি—দু’দিনে যা’যাবে !
হাসির শহর—কেন বা জানিনা
কেন ভালবাসা-মরম বেদনা ।
কেন মেশামিশি শিরাতে শিরাতে
কেন বা পুলক বসতি।
(বনদেবীর অন্তর্ধান।)
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
বনসুরমার আশ্রম।
( শৈব্যা ও সুরমা)।
শৈব্যা। দিদি,
রজনী গভীর হ’ল বাছা ঘরে নাহি এল,
ভাবিতে ভাবিতে আমি পড়িলাম ঘুমায়ে,
দেখিতাম কুপন,
তাই এ এইক্ষণ
কহিতে সকল কথা তব মুখ চাহিয়ে।
কি আছে কপালে মাের পারিনাক বলিতে

সাবিত্রী । [দ্বিতীয় পর্ভা। - বাছা যেন গেছে দূরে কাষ্ঠ আহরণ তরে- ঘুমন্ত ধরণী যেন যামিনীর কোলেতে। কাল মেঘে ঘেরিয়াছে আকাশের গায়, দিকে দিকে দিক-হার-চেনা নাহি যায় । যেন কে আকাশ থেকে নামিল সহসা দেখাইল সত্যবানে কত ভালবাসা। বলিল বাছারে মোর যেন কত স্নেহ ভাের, বারিদান কর মােরে পাইয়াছে পিপাসা। বাছা ত’র শুনে বাণী অন্ধকার নাহি গণি, যেন গেল নদীতটে জল অনিবারে, হেনকালে নদীজল ভাসা’ল ধরারে,- সে জল প্লাবনে দিদি, বাছা ভেসে গেল, পারিনা বলিতে আর,“প্রাণ শিহরিল। সুর । রাণি, স্বপন অলীক জেন, কেন তাতে দুথ গণ ? শৈব্যা! না, শােন,-- আরও আছে কত কথা বলিতেছি তোমারে সুর । কাষ নাই বলে রাণি শুনিবনা সে কাহিনী ব্যথিত হতেছ তুমি-ভাসি দুখ পাধারে । শৈব্যা। না শোন, তা’র পর, অতি দুরে সেই নদীকুল, জপেতে নিরত ছিল তাপসী সকলে, ভাসিতে ভাসিতে বাছ। সেইখানে গেল, ; --- পঞ্চম অঙ্ক। ] সাবিত্রী সুর। (তখনও পরাণ তার পরাণেতে ছিল ) সুন্দর তাপসী এক-ধার্শ্বিক প্রধান করিল বাছারে নাের জীবন প্রদান। তবে রাণি, কিবা ভয়, কুস্বপন ইহা নয়। শৈব্যা। না, আরও আছে— বাছা মাের প্রাণ পেয়ে মােদের স্মরণে মনে বড় ব্যথা পেয়ে তাপসীরে নিবে দিয়ে আসিতে লাগিল ধীরে পুনঃ 'এই বিজনে। কৌতুহল বড় মণি, বাড়িতেছে শ্রবণে শৈব্যা। হেন কালে যেন এক মাতঙ্গ আসিয়া দাড়াল পথের মাঝে পথ অগুলিয়া ; মাতঙ্গে মাহুত ছাড়া ছিল এক জন, রম্যবেশ–অনুভব মন্ত্রী সেইজন তুলিল বাছারে মোর করীর উপর, বলিল-“কৰিব তোমা এবে রাজ্যেশ্বর। সুর। ; সুর। তার পর শৈব্য।। রম্য এক রাজধানী কিন্তু রাজা তার কত দিন হয়ে গেল ছেড়েছে সংসার। সেই রাজধানী মাঝে রমণীয় পুরে বাইল সত্যবানে। রাজকীয় সিংহাসনে, মহারাজ চক্রবর্তী করিল বাছারে। রাণি, এরে তুমি মিছে কেন বল কুস্বপন। সুখলাভ হবে তৰ--তাহারি লক্ষণ। সুর।

সাবিত্রী।
[ দ্বিতীয় গর্ভা।
শৈব্যা। না দিদি,
সুখী হতে মনে আমি আর নাহি চাই,
ৰাছা এবে ঘরে এলে পরাণ জুড়াই।
কেন বা পাঠানু তায়, ধরা অন্ধকার প্রায় ;
যা দেখি স্বপনেতে বুঝি হবে তাই।
অভাগী কপালে বুঝি কভু সুখ নাই।
কেন রাণি, উচাটন অলীক স্বপনে ?
স্বপনেতে রাজা হয়, স্বপনেতে সব লয়,
স্বপনেতে স্বর্গবাস-শােন নাকি শ্রবণে?
আর—স্বপন যদ্যপি তুমি মানিবারে চাও
তাহলে বা এ স্বপনে কেন দুখী হও।
সত্যবান রাজ্যেশ্বর—কি আছে ইহার পর ?
এত রাণি সু-স্বপন,
এত রাণি সুলক্ষণ,
অমঙ্গল কেন মিছে করিবারে চাও ?
শৈবা। দেখিলে নিজের ভাল, মন্দ তা’র ফল,
সকলেতে কম, তাই হ’তেছি বিকল ।
কোন চিন্তা নাই জেন, স্বপনে অলীক মেন,
স্বপনেতে নাহি হয় সুফল কুফল।
শৈব্যা। ভাল-দ্বিতীয় প্রহর এবে হইয়াছে রজনী
এখনও না এল কেন ?-কভু হেন হয়নি।
হয়েছে অনেক রাতি বুঝি কোন বনেতে
তারি তরে আছে কোথা—পারে নাই আসিতে,
তা’তে তুমি গণনাক অমঙ্গল মনেতে ।
শৈব্যা। যা আছে কপালে হবে, কি অৱ হইবে ভেবে

সাবিত্রী।
এস এবে মাের সাথে-যাই আমি কুটীরে,
একাকী আছেন রাজা-থাকিব না বাহিরে।
( উভয়ের প্রস্থান।)
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
মহারণ্য।
(সত্যবানের মৃতদেহ ক্রোড়ে সাবিত্রী।)
(সাবিত্রীর গীত।)
-
কি হ’ল কি হল দীপ নিভে গেল,
পড়ে র আমি আঁধারে ;
হৃদয়ের ধন
কে নিল হরিয়া,
চাহিল না ফিরে আমারে।
(বৃক্ষান্তরালে দুইজন যমদূতের প্রবেশ।)
১
মত। ( অপরের প্রতি) ও তাই, এ আবার কি! একটা
স্ত্রীলােক যে মরাটাকে কোলে করে কঁদছে !
২৪ দূত। বােধ হচ্ছে মরাটা ওর স্বামী। স্বামীর সঙ্গে এখানে
এসেছিল, তার পর এই অবস্থা,-তাই কঁদছে।
সাবি। পাশ পুতলি পরাণেতে ছিল,
পাষাণ হৃদয়ে কেনা হয়ে নিল;
দি ফেটে গেল হৃদয়-বেদনে,
হৃদি-কথা বলি কাহারে ?
১ম দূত। ঠিক কথা, মরাটা ওর স্বামীই বটে, যাহােক বন্ধু

সাবিত্রী।
[ তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
।
বিপদ দেখছি,-সতীর কোল থেকে পতিকে কেড়ে
নিতে ত পারবনা তাই,আমার বড় কষ্ট হচ্ছে।
২য় দূত। আরে রেখে দাও তােমার কষ্ট। পরের চাকরী
করূতে এসে আর অত কষ্ট বােধ কলে কাষ করা
চলে না।
সাবি। কত সাধ ছিল পরাণেতে মাের,
ভাঙ্গিল স্বপন-কেবা ঘুম-ঘাের ;
নিঠুর বিধাতা, নিঠুর ক রমে
ফেলিলে গো মােরে পাথারে।
১ম দূত। না ভাই আমি ত কিছুতেই ওকে নিয়ে যেতে পারব
না। আহা! অমন সােনার চঁাদের মত মুখ,ওর
অদৃষ্টে এমন ছিল !
২য় দুত। তুমি কেড়ে নিতে না পার আমি নিচ্ছি। তুমি বয়ে
নিয়ে যেতে পাবে ত -না তাও পাবে না ?
১ম দুত। চাকুরী না গুখরি। মরা বহার চাকরী যখন কতে
এসেছি, তখন বয়ে নিয়ে যেতে হবে বইকি ভাই ।
বয়ে নিয়ে যেতে পারব, কিন্তু কেড়ে নিতে
পারব না।
সাবি। কি হল কি হল
দীপ নিভে গেল,
পড়ে র’ আমি আঁধারে,
১ম দূত। ভাই, দেখ দেখি, যে রকম কঁদছে এতে কি তােমার
বুক ফেটে যাচ্ছেনা।
২য় দূত। কিছু মাত্র না -তােমার যদি এত দয়া মায়া হয়, তা
হলে তুমি আজ একে নিয়ে চল, তার পর কামে

পঞ্চম অঞ্চ। ] সাবিত্রী। জবাব দিয়ে আর কাষ ক’রন। অামার ও সব ভাল লাগে না; নিয়ম মত মনিবের কাষ করব,-তাতে কঁদুক আর কাটুক, হাজুক আর মরুক—আমার বয়ে গিয়েছে। সাবি। হৃদয়ের ধন কে নিল হরিয়া চাহিল না ফিরে আমারে, কি হ’ল কি হ’ল দীপ নিভে গেল, পড়ে রনু আমি আঁধারে। ১ম দূত। রাগ করনা ভাই, যদি তােমার স্ত্রীর এই রকম অবস্থা হয়, তা হলে তোমার স্ত্রীর মনের অবস্থা কি হয় একবার ভেবে দেখ দেখি। ২য় দুত। দেখ, তােমার আমাকে অত অধ্যিাত্মিক তা পূর্ণ উপ- দেশ দিতে হবে না। চাকরী করতে এসেছ, মনি- বের কায কর—আর না পার চলে যাও, আমি গিয়ে আর একজনকে সঙ্গে নিয়ে আসছি। সাবি। পরাণ পুতলি পরাণেতে ছিল পাষাণ-হৃদয়ে কেবা হ'রে নিল, হৃদি ফেটে গেল হয় বেদনে, হৃদি কথা বলি কাহারে ? • কি হল কি হল দীপ নিভে গেল পড়ে রনু আমি আঁধারে। ১ম দূত। না ভাই, আর ঝগড়া বিবাদে কায নাই—চল, তুমি আগে কোল থেকে নেবে, তারপর দুজনে বয়ে নিয়ে যাব।

সাবিত্রী।
[ তৃতীয় পর্তায়।
২য় দূত। এখন পথে এস, নিজের কার্যকর ভাই--অত দয়া
মায়ার দরকার কি?
{ উভয়ের সাবিত্রীর নিকট গমন।)
২য় দূত। (সাবিত্রীর প্রতি) হাগা বাছা, তুমি কি পাগল হয়েছ
নাকি! ওটা যে মরে গিয়েছে, মরাটাকে কোলে
নিয়ে বসে আছ! ছি! ছি ! ওটাকে নামিয়ে ফেল।
সাবি। (লক্ষ্য না করিয়া পূৰ্বভাবে )
কত সাধ ছিল পরাণেতে মাের
ভাঙ্গিল স্বপন-কেবা ঘুমঘাের ;
নিঠুর বিধাতা
নিঠুর করমে,
ফেলিলে গাে মােরে পাথারে ;
কি হ’ল কি হ’ল দীপ নিভে গেল
পড়ে রনু আমি আঁধারে।
২য় দূত। তুমি নিতান্ত পাগল হয়ে দেখছি! যে মরে গিয়েছে
তাকে কোলে নিয়ে বসে থেকে লাভ কি ? ওকে
নামিয়ে দাও,আমরা ওকে নিয়ে যাই।
সাবি।
(চমকিত ভাবে তােমরা কে গা ! হাগা আমি এই
ঘুমের মাঝে আমার স্বামীকে হারিয়েছি,-আমি কি
আর আমার স্বামীকে ফিরে পাব না ?
২য় দুত। আমরা কে—তা চিনূতে পারনি। আমরা শমন
রাজার দুত। মানুষ পৃথিবীতে যত দিন থাকে, তত
দিনের পর তার স্ত্রী পুত্র পরিবারের সনে অন্ধ, কিন্তু
মরে গেলেই আয়াদের অধিকার। তােমার স্বামী

এখন অব ইহলােক নাই, তাই পরলােকের বিচা-
শেষ জন্য আমরা ওকে নিতে এসেছি।
সাবি। অ-অ-তোমাই যমদূত। অচ্ছিা, তােমাদেব
কাছে দ্ভিজ্ঞম কবি, আমি স্বামী ছাড়া আর কিছু
জানি ন'—অামার স্বামীকে তোমব নিয়ে গেলে
আমি কেমন কবে থাকব ?
২য দূত। এত মােব পক্ষে আজ নূতন না বাছা, সকলেই
এবকম হ'যে আসছে , দু’দিন দশদিন প্রাণ তােমার
কেমন কববে’ব পব সবই স’ষে যাবে।
সাবি। গো তােমাদের পায়ে পড়ি আমি স্বামী ছাড।
হ’যে এক দিনেব জন্য থাকতে পারব না, আমি
আমার স্বামীকে কিছুতেই ছাড়াই পাবনা, আমাকে
আব কি ব'লন, তােমবী চলে যাও।
২দূত। ( হাসিয়া ) তাই ত,-আমবা মনিবের চাবী ক’বতে
এসেছ আব তেমবি হুকুম শুনে চলে যাব।-কেন
গোলমাল ক’বছ বাছা আমরা এ রকম বিপদে
আর কখন পড়িনি। আস্তে আস্তে মবাটাকে নামিয়ে
দাও-আমরা নিয়ে চলে যাই।
১ম দূত। (দ্বিতীত্বের প্রতি ভাই, স্বামী শোকাতুরাব প্রতি
একটু ধীয় মেজাজে কথা কও। এরূপ বিপদে একটু
নরম হয়ে কথা হাই ভাল।
২য় দূতা (প্রথম প্রতি দেখ,তুমি বেশী বাড়াবাড়ি করনা।
ফন্দি রুক্ষত মই ৰাধ কৰ ঋ, মা গা চলে
ও, আমি একাই এর গঞ্জি ফছি।
,

(খিত্ৰীৰু এভি): আগন্তু গত কয়না,
আমরা দেয় এলেছি, আয়াতে এখনও দু’ট
শয়া বইতে শুরু ভা, নামিয়ে দাও,-নিয়ে
যাই।
লারি। কেন তােমরা আমাকে আর আবাহন করছ?
তােমাদের পায়ে পড়ি, কোমরা চলে যাও,আমাকে
আর কিছু বল না। স্বামীর সুখেই আমার সুখ,
স্বামীর জীবনেই আমার জীবন, সে স্বামী হারিয়ে
আমি কি করে থাকি। আমি কিছুতেই ছাড়তে
পাবনা, তােম চলে যাও।
২ঝ জুত। দেখ, তুমি বড় পাগলের মত । যে মরে গিয়েছে
তাকে কি আর ফিরে পাওয়া যায়। আর গােল
করনা বাছা, নামিয়ে নাও, আমরা নিয়ে চলে যাই।
সাবি।
ওগো নামী ছাড়া হয়ে আমি ভিলেকের জন্যও
থাকতে পারব না। তােমরা যৱি নিতান্তই নিয়ে
যাবে, তা হলে মাহে শুদ্ধ নিয়ে চল, আমি আর
কোন কথা করা।
১ম দূত। (দ্বিতীয়ের প্রতি আগ্ন ঝরনা ভাই, আমি একটা
কথা বলি, এরকম বিপজ আমাদের পক্ষে এই নূতন।
কেউ ম'লে আৰু এন এতে আয়, এত আমরা
আয় কখন দেখিনি। জয়ে হি, আয় ফিরে
যাই চল। ফিরে গিয়ে
মললিগে,
তিনি বা # লি কৰে। ” ' }
২য় দুঃ। (সাবিত্তীয় একি দৃষ্টি স্থি নিয়ে

সবি।
আয় রে তোমার মা ! ফের খিয়েছে,
তা’কে কি সুখ ফিরিয়ে খায়?
না পারি, আমি নিজেও খুব। আমিও আমার
স্বামীর সঙ্গে পরলােকে যাব।
২য় দূত। তবে ধাক। একটু পরে কিন্তু মহারাজ এলে, তখন
কা’য় কত ক্ষমতা দেখতে পাওয়া যাবে।
( যমদূত বয়ের প্রস্থান।)
( দৃশ্য পরিবর্তন।)
যমপুরী।
( যমরাজের প্রবেশ।)
বােধ মানৰক্ষৰ ভেবেও দেখেনা কতু
সংসার ক’দিন তরে! কোথাকার লোক,
কোথা হতে এল-বাবে বা কোথায়
যখন সময় তার হইবে পূরণ।
বৃথা দর্প—বৃথা মানবৃথা অহঙ্কার,
বৃথা অভিমানসকলই ফুয়াৰে হয় ।
আমি কাল, ফৰে লােক ফাল পূর্ণ হয়,
সবাই শালিতে বাখ ম তিনে।
পানী বেই, কাজে সেই শান্তি পায়
ধৰি ৰালি বল নি আমি।
হিজ কিশবিখি ভিখা।

{ । চিত্র। পুণ্যবান জন কাল পূর্ণ হলে- গমন করলে মুখে বিষ্ণুর গােলকে। ( চিত্রগুপ্তের প্রবেশ ।) মহারাজ, আদেশে তোমার নেহারিয়া খাতা পত্ৰ উলটি পালটি’,-পাঠায়েছি আজি আমি দূত দুই জনে—সত্যবান পরমাত্মা আনিতে হেথায়। যম। সত্যবান! শাহুদেশ অধিপতি, চিত্র । দুমৎসেন-পুত্র-যুবরাজ সহবান ! কহ চিত্র গুপ্ত কালপূর্ণ তাহারই কি হয়েছে এক্ষণে ? হা মহারাজ, শাত্বদেশ যুবরাজ সত্যবান-কাল পূর্ণ হয়েছে এক্ষণে। বড়ই সুধীর যুবা,-শান্ত, দাস্ত, মৃদু, পুর-সকল গুণের সেই ছিল অধীশ্বর। নিয়তি লাগিয়ে অন্ধকালে পিতা তা’র হ’ল রাজ্যভ্রষ্ট, কিন্তু কাল- পরিবর্তে পুনরায় রাজ্যেশ্বর হইবে সময়ে সাবান যুবামাত্র, তাই দুখ হয়, অকালেতে কাল পূর্ণ হল হা’য় শুনি। র কি অল্প কাধ করিয়াছি আমি শাঠাইয়া দূত ।

সবিত্রী। ৬৯ যম। চিত্র। * ভাবিতেছি তাই মনে। অতি ধর্ষণ, ধর্ম ব্যতিরেকে নাহি করে কোন ফাৰ ; বিশেষতঃ সেই যুব নববিবাহিত এবে মদ্রদেশ-রাজবালা সাবিত্রীর সনে। প্রভাে, অধীনের অপরাধ করিও মার্জনা, জিজ্ঞাসিব এক কথা, নিয়তির পতি তুমি,-কহ দেখি, কত শত জননীরে—কত শত অভাগীরে- কাদাও কেনবা হায় হরি পুত্রধন । সত্যবান নব-বিবাহিত, নব-বিবাহিত এমন অনেক ছিল ত ধরার মাঝে, তাদের কি দোষ দেখি আনিলে হেথায় ? তবু দয়া উপজয় ইহার মরণে। প্রভো, হাসি পায় কথা শুনি। বলিতেছ দয়া উপজয় তবু ইহার মরণে। প্রতে, কোথা দয়া তব,—দয়া কি আছয়ে তব কঠিন-পরাণে ? এ যদি থাকে, দাও ছাড়ি বন্দীদলে -যাদের এনেছ তুমি অকালে ধরিয়া; ফেল খুলে রাজ- বেশ, রাঙ্গ-চিহ্ন ছাড়। নিয়ম তােমার, নিয়তি গরভে দাও—আর আজি হতে বন্ধ হও প্রতিকার পাশে--না আনিৰে কোন সনে কখন রিয়া। এভাে, দয়া দয়া ছাড়-গোমার হৃদয়ে দয়া মায়া যম। চিত্র।

সাবিত্রী।
[ তৃতীয় গর্ভা ।
চিহ্ন মাত্র নাই। দয়া যদি র’ত-তাহলে
এ ধৰ্ম্ম-ভার নিতেনা কথন।
( যমদূত-দ্বয়ের প্রবেশ )
১ম দূত। মহারাজ, প্রণাম তােমার পদে।
( দূত দ্বয়ের প্রণাম )
যম।
কহ দূত এবে তব আছে কি বারতা।
২য় দূত। মহারাজ, তব নীতি-বহিভূত কাৰ্য্য
হতে পারে—এ ধারণা, এ বিশ্বাস
ছিলনাক আমাদের দিনেকের
ওরে, কিন্তু আজি তাও হ’ল—সত্যবানে
মাের না পারিনু আনিবারে -এ কাল
আগারে ।
একি অসম্ভব কথা কহিতেছ দূত ?
১ম. দূত। মহারাজ,
মৃতজনে ক্রোড়ােপরি আছে সতী লয়ে
পারি না কিছুতেই আনিতে তাহারে।
চিত্র গুপ্ত, সুযথার্থ ক থা তব, আমি
দয়া-হীন,-কঠিন পাষাণে মম অন্তর
নির্মিত। চলি আজিকে হায়
ঘােরতর সর্বনাশ সাধিবার তরে
সাবিত্রীর, চলি,—চলিনু চির তরে
আজবালা সাবিত্রীরে করিতে বিধবা।
যে কায়েতে ব্ৰতী আছি হায়! দয়ামায়।
সে কাষের কাছ দিয়া যায়নি কখন।
-

পঞ্চম সঙ্ক। ]
সাবিত্রী।
চিত্র।
এম.।
মহারাজ, আজি তব মনােভাবে হ'তেছি
বিস্মিত, কত শত যুবা জনে এনেছ
ধরিয়া নাহিক ইয়ত্ব তার, আজি কিন্তু
যুবা মাত্র তরে করিতেছ হায়,
প্রভাে, কত না চিন্তন।
-করিব না আর আমি অনর্থক চিন্তা
(দূতদ্বয়ের প্রতি) বাও দূত, কাৰ্যান্তরে তােমরা এখন ;
আমি যাই, সত্যবানে আনিতে হেথায়।
( এক পা দিয়া যম ও অপর পার্শ্ব দিয়া
চিত্রগুপ্ত ও দূত দুই জনের প্রস্থান।)
( দৃশ্য পরিবর্তন )
মহারণ্য।
( সত্যবানের মৃতদেহ ক্রোড়ে সাবিত্রী।)
কি হ’ল কি হল
দীপ নিভে গেল,
পড়ে রনু আমি আঁধারে,
হৃদয়ের ধন কে নিল হরিয়া
*,
চাহিলনা ফিরে আমারে।
পরাণ-পুতলি পরাণেতে ছিল,
পাষাণ-হৃদয়ে কে বা হ’রে নিল;
হৃদি ফেটে গেল হৃদয় বেদনে,
হৃদি কথা বলি কাহারে ?
কত সাধ ছিল পরাণেতে মাের;
ভাঙ্গিল স্বপন,-কে বা ঘুম-ঘোর,

সাবিত্রী।
[ তৃতীয় গর্ভা।
নিঠুর বিধাতা
নিঠুর কমে
ফেলিলেগে মােরে পাথারে।
(যমের প্রবেশ।)
যম। কে তুমি তাে বন-মাঝে মৃত জনে লয়ে?
অবলা যুবতী-তায় আঁধার ধরণী ;
নাহিক পরাণে দেখি কিছু মাত্র ভয়।
কেবা তুমি,—কিবা প্রয়োজন তব এই
মৃত জনে? পাগলিনীমত কেন তুমি
আছ এরে লয়ে ক্রোড়পরি? ছাড়,-ছেড়ে
যাও গৃহ অভিমুখে। নীরব-রজনী,
নিবিড় কানন -আলােকের চিহ্ন মাত্র
নাহিক এখানে, সিংহ ব্যাঘ্র দুরন্ত
হিংস্র জন্তু কত আছে হেথা, বিধুমুখি,
এনথই নাশিবে তৰ কুসুম শরীর।
কেবা তুমি মহাশয়, দাও পরিচয়
অধিনী অবলা জনে। বড় অসময়
হয়েছে আমার, প্যাণের ধন, স্বামী
ধনে হারায়েছি এই বনমাঝে, তাই
অভাগিনী একাকিনী নীরব নিশীথে
লয়ে ক্রোড়ে মৃত পতি দিতেছি হেথা।
এম। নিতাও অঘে বালা, সংসারের অন
কণামাত্র বিদ্যমান নাহি তব ঠাই।
এ -সংসার পরিহুরি হয় যে
সাবি।

সাবিত্রী।
==
যায় অন্য দেশে, মূঢ়া, সে কি পুনঃ পায়
প্রাণ ? এই যুব ছিল পতি তব, ছিল
তব অধিকার, যবে এর প্রাণ ছিল,
ছাড়েনি ধরণী ; এবে এর কাল
হইয়াছে পূর্ণ,অসার সংসার হতে
ছেড়েছে পরাণ ; এবে তব অধিকার
নাহিক কিছুই এতে। কেন কঁাদ তবে,
কেনবা করিছ শােক ইহার লাগিয়া ?
কেনবা অশুচি হও শব-পরশনে ?
ছাড়,-ছাড় এরে, আমি কাল, এতে
অধিকার এখন আমার জেন,
আগমন করিয়াছি তাই লয়ে যেতে।
সাবি। তুমি কাল ! তুমি লয়ে যাবে মম পতি!
তা’তেই এসেছ হেথা ? ভাল, ভাল, এত
দুখ মাঝে আমি পেনু কিছু সুখ।
যম। মম দরশনে লােক পরমাদ গণে
তবে সতি, কিসে বল সুখ উপজিল।
সাবি। এ ঘাের কাননে অনাথিনী করে
পারিবে না প্রভাে, পতিরে নিতে
তাই মম মনে সুখ
সতি, তুমি রাজ-বালা, চির সুখ তব,--
জাননাক কভু হায়, দুথ কারে বলে ;
জাবিতেছ তাই মনে--তব প্রাণ-পতি
পারিব না আমি নিতে? কিন্তু যদি বা

সাবিত্রী। | তৃতীয় ওভা। ৭৪ ' জানিতে তুমি বিশেষ রূপেতে কালের হৃদয় হায় ! কত যে কঠিন,তাহলে কভু না ক’তে এহেন বারতা। সাবি। কঠিন তােমারে প্রভো, মূঢ়জনে কয় ; তা’না হলে কাঠিন্যের চিহ্নমাত্র প্রভাে, নাহিক তােমার কাছে। শুনিয়াছি ঋষি- দল মুখে তুমি ধৰ্ম্ম-পরায়ণ ; ধৰ্ম্ম- নীতি-বলে পালহ শাসন-নীতি, তবে বা কেমনে তােমা-কহিব কঠিন । সতি, কথা তব ভুল মাত্র ; যেখানে শাসন-নীতি,শত ধৰ্ম্ম রক, কাঠিন্যের চিহ্ন তবু তথা বিরাজিছে। কঠিন আমার দেহ,—মম কাযে দয়া মায়া কিছুমাত্র নাই। ভদ্রে, তােমার কথায় আমি হয়েছি মােহিত, লও কিছু বর মাগি। সাবি। প্রভো, কি কায অপর বরে? পুরাণেতে আছে, কোন লােভ নাহি থাকে পতিব্রতা কাছে। জলহীন নদী যথা নাহি শােভা পায়, ভক্তিহীন মতি হলে সুখ নাহি তা’য়, নরুপতি-হীন ভূমি নহেক শােভিত, রমণীরও সুখ নাই পতিতে বঞ্চিত। সতি, লও অন্য বর, ছাড় মৃত স্থানে মৃত কি পায় কভু পুনঃ প্রাণদান ।

সাবিত্রী।
৭৫
প্রভো!
.
পতি ভর্তা, পতি কৰ্ত্তা, পতি সে বিধাতা
পতির মতন কেহ নহেক দেবতা।
পিতা, মাতা, পুত্র, ভ্রাতা,
পরিমিত ধন
স্নেহ-বশে, ভক্তিভরে করে বিতরণ,
কিন্তু পতি ধন প্রভো, সৰ্বস্ব প্রদানে
তুষেন নারীর মন,-নয় পরিমাণে।
সে পতি হারায়ে আমি কি বর চাহিব ?
আমারে ও লও তুমি—কিছু না বলিব ।
সতি, অকারণে কেন মিছে করিতেছ
শােক ? আমি নিয়মের দাস শুধু,
নিয়ম আদেশে কার্য কবি চরাচরে,-
নিয়ম লাগিয়ে তােমার পতিরে সতি,
লইতে এসেছি হায় ! এ কানন মাঝে।
পাবে না পতিরে পুনঃ-লও অন্য কোন
বর মাগি —যাহা বাঞ্ছা চিতে।
সাৰি। প্রভাে, পতি বিনা রমণীর কিবা গতি
আছে ধরণীর মাঝে বল ? পতি যা’র
আছে, থাক শত কষ্ট, তবুও সংসার
তা’র সতত সুখের। পতি যায় নাই,
ফুল-হীন লতিকার প্রায় অনাদরে
জগতের সব লােক তারে। রমণীর
সার পতি, মমণী জীবনে এক মাত্র
ধ্রুবতারা পতি ধন প্রভা। যে পতি

সাবিত্রী।
(তৃতীয় পর্য
সাবি।
বিহনে কেমনে জীবনে র’ব ? কি সুখের
তরে পতিহারা হয়ে বর মাগি লব
প্রতো, তােমার সদনে। কোন বর
চাহিনাক, দয়া করি প্রাণনাথে দাও বাঁচাইয়া।
সতি, যত তুমি কর শােক—যত মােহে
মজ, বিধির বিধান কভু খণ্ডিবার
নয়। এবে পতিহার। তুমি বিধির
বিধানে,—কিছুতে তােমার পতি বাচিবে না
হায়! ছেড়ে দাও, ছেড়ে সতি, গৃহে যাও,
লও অন্য বর মাগি যাহা বাঞ্ছা মনে।
প্রভো, গুরু, বিপ্র, ইষ্টদেব—এ সকলও
হতে প্রাণ-নাথে জানি সার; পুরুষের
কাছে বিদ্যা-দাতা মত আর গুরু কেহ
নাই, কিন্তু পতি-ধন সকল হইতে
পূজ্য রমণীর কাছেতে। শুনিয়াছি
শাস্ত্রে আছে, গােলকের নাথ ধরেন
পতির রূপ পতিব্রতা-তরে। সে পতি
বিহনে কেমনে জীবনে র’ব। ফোন বন্ধ
চাহিনাক, জয়া করি দাও শুধু
নাথেরে বাঁচায়ে ।
সব জানি সুলােচনে, কিন্তু জেন সায়,
অনিত্য এ ধরাধামলি অসার।
কালের পূরণে কালে সকলে যাইবে,
তব পতি মত গতি সকলের(ই) হবে।

সাবিত্রী।
তবে কেন মিছে শােক, কেন বা রোদন,
বর মাগি কর সতি গৃহেতে গমন।
সাবি।
এই কি কপালে ছিল। আমি পতিধনে,
ভাৱিতাম সব তীর্থ—ইহারি পুজনে,
বার, ব্রত, ইঠা, নিষ্ঠা নাহি করিতাম,
চরণ বন্দনে সব ফল লভিতাম।
প্রভাতে উঠিয়া আগে বাস পরিহরি
যাইতাম গৃহকাৰ্যে নমস্কার করি।
এখন সেরূপ প্রভাে, কাহাবে করিব ?
পারিব না,যাও তুমি, কভু না ছাড়িব ।
সতি-
কেন মিছে কর আর বিফল রােদন ?
লও কোন বর মাগি, পাবে না পতিবে
পুনঃ, জেন তুমি সার।
যম।
সাবি।
পতি সেবা রমণীর জীবনের সার,
পতি বিনা রমণীর কিছু নাহি আর ;
পতির জীবনে প্রভাে, রমণী জীবন,
পতির বিহনে প্রভাে, রমণী মরণ।
পতির মতন আর কার মেহ পাব,
মন-কথা মনখুলি কাহারে কহিব ?
প্রেম-ভয়ে পুলকেতে আমারে যতন
কে অার করিবে বল, পন্ডির মতন।

৭৮
সাবিত্রী।
{ তৃতীয় শক্তি।
সাধ নাই কোন বরে, প্রতো, পতিধনে
নিওনা-নিওনা কাড়ি,-মিনতি চরণে ।
মম। সাধ্বি,
অপর জনমে পাবে পুনঃ এই পতি,
এলেও কোন বর-যাহা তব মতি।
বিধির করম যাহা কে তাহা লঘিবে ?
সিন্ধু-পথে বীচিমালাকে বল রােধিবে ?
যত তুমি কর শােক-কর বা রােদন
পুনঃ পতি-ধনে তুমি পাবে না এখন।
লও কোন বর মাগি,গৃহে যাও সতি,
কেন আর মােহে মজ—তুমিত সুমতি।
সাবি। প্রভো,
যত কাল রবে প্রাণ আমার পরাণে
তত কাল পতি-ধনে রাখিব যতনে,
পারিব না, পারিব না ছাড়িতে এ ধন ;
যদি ল’বে তবে লও আমারও জীবন।
কোন বর চাহিনাক তােমার সদনে,
শুধু মােরে ফিরে দাও আমার রতনে ;
রাজরাণী, ভিখারিণী-- দশা তাহােক
প্রাণপতি কাছে গ্লেন চিরকাল বুক,
প্রাণ-ধনে এ জীবনে যেন না হারাই,
তব পদে এ মিনতি,শুধু এই চাই।
যম। সতি,
বুঝাইব কত আর ; বুঝে দেখ মনে,
তৰ পতি-পরমায়ু নাবিক এক্ষণে।
ম
1.

পঞ্চম আয়। সাবিত্রী। ৭১ তৈল বিনা দীপ কভু জ্বলিতে না পারে, পরমায়ু বিনা প্রাণ থাকে না সংসারে। লও, কোন বর মাগি-যাহা সাধ মনে, থেকনাক আর হেথা, যাও সুলােচনে। সাবি। প্রভে,- নিয়মের পতি তুমি, তােমার নিয়মে কাৰ্য্য হয় চরাচরে। যদি কোন বর দিবে, দাও তবে,শ্বশুর আছেন মম অন্ধেতে আতুর, চক্ষুষ্মান হন তিনি। সতি, করিলাম বরদান—দ্যুমৎসেন চক্ষুলাভ করিবে ত্বরায়, যাও এবে গৃহমুথেছাড় মৃতজনে। সাবি। যম। প্রভো, ক্ষমা কর—ক্ষমা কর মােরে ছাড়িতে নারিব কভু পরাণ পুতলি। সতি, পাগলিনী মত কেন কহিতেছ বাণী ? সত্যবান মৃত এবে, মৃতজনে রেখে কি হবে ফলোদয় ? দাও ছাড়ি, দাও, আমি ত্বরা লয়ে যাই। সাবি। প্রভাে,- কুমারী কালেতে আমি ছিলাম আঁধারে প্রাণনাথ প্রসাদেতে চিনিনু সংসারে, সংসারের উপদেশ, সংসারের জ্ঞান- করিলেন নাথ মােরে কত শিক্ষাদান,

সাবিত্রী।
(তৃতীয় পর্ভা
সংসার-তরণী নাথ, সংসাৰ বন্ধন,
পারিব না ছাড়িবারে মম প্রাণধন।
সতি,
বিফল রােদন তব, বিফল রােদন,
সংসার জানিও শুধু মিছার স্বপন।
সংসাবেতে সুখ কোথা, অনিত্য সকলি।
তবে কেন মিছামিছি মিনতি কেবলি ?
সাবি।
প্রভো,
পতির সদনে মম ছিলনাক মান,
ভাবিতম, হবে বুঝি তঁাব অপমান।
হেবিলে তাহার দুখ হৃদি ফেটে যেত
পরাণে পরাণ যেন নাহিক রহিত।
চিরকাল জানি মনে, থাকিবেও মনে
প্রাণনাথ কল্পতরু রমণী জীবনে।
নিওনা পতিবে মােব; অনাথিনী করনা ;
পতি বিনা কিছু মনে আমি বে জানিনা।
যম। সতি-
আত্মার বিনাশ নাহি হয় কদাচন,
তব নাথ পরমাত্মা (ও) না হবে নিধন।
জীর্ণবাস পরিহরি যথা নরগণ
পরিধান করে দেখ নবীন বসন
তেমতি লাে পরমাত্মা জীর্ণ-দেহ ছাড়ি,
প্রবেশে নবীন দেহে-নববেশ ধরি।
তা’র লাগি মিছামিছি অনুপ কেন,
সকলেরি এই মত হইবেক জেন।

সাবিত্রী।
০
সাবি। অভাগীর(ও) পরমাত্মাল ও তবে প্রভু,
কিছু না বলিব আমি কঁদিব না কভু।
সংসারে থাকিতে হলে কঁদিতে হইবে,
‘সংসারে সংসারী ছাড়া কভু না সাজিবে।
হীন-মতি নারী আমি, জানি শুধু সার,-
পতি বল, পতি বুদ্ধি, পতিই সংসার।
এমন সংসারে আমি ছাড়িতে নারিব,
পতি-হার হলে প্রভো, আমিও মরিব ।
যম। সতি,
কেবা তুমি, কে বা কার, কোথা তুমি ছিলে ?
কোথায় যাইবে তুমি,-কেন বা আসিলে
কে র’বে ধরণীতলে বল চিরদিন ?
ধন, জন, যৌবন-সবই কালে লীন।
কিছু নয়,—কিছু নয়—সংসার স্বপন,
সংসারে জন্মিলে হবে অবশ্য মরণ।
তবে কেন মিছা মিছি আপন আপন,
আপ হইলে পরে হ'ত কি এমন ?
সাবি। প্রভাে-
অবােধ রমণী, তত্ব কথা নাহি জানি,
সংসারের মাঝে শুধু প্রাণনাথে চিনি।
যখন মরিব আমি তখন মরিব,
এবে কেন তাহা ভাবি ইহারে ছাড়ি।
করিতেছি নিবেদন-মিনতি গাে প
নিওন নাখেরে কাচ্চি,ফেনা বিগত

সাবিত্রী।
[ তৃতীয় গা।
সাবি।
ৰ। সতি,-
তােমার মতন নারী আর দেখি নাই ;
ল ও কিছু আরও বর চাহি মম ঠাঁই।
যে গিয়েছে চ'লে পুনঃ তারে না পাইবে
এ ছাড়া তা’ দিব আমি যা তুমি চাহিবে ।
দিবে প্রভা, আর ও বর মোরে দয়া করে?
দাও পুনঃ শাদেশ শ্বশুরের করে।
যম। পাবেন শ্বশুর তব ফিরে শাদেশ
করিলাম বরদান,ছাড় এবে মৃতজনে।
সাবি।
প্রভাে, নিতান্ত দুখিনী আমি, ক্ষমা কর,
ছাড়িতে নারিব কভু প্রাণেশ রতন।
যম। সতি, যাও নিজ নিকেতনে ; এ কানন,
মাঝে করিতেছ কেন বল বিফল রোদন ?
বচিবেনা সত্যবান,—যাব এর লয়ে,
বরঞ্চ অপর বর লও তুমি মাগি।
সাবি। প্রভাে,-
প্রাণনাথে তুমি লইবে কাড়ি য়া
পুত্রবতী নহি আমি, দাও তবে কৃপা
করি এই বর মােরেশত পুত্রবতী
যেন হই গাে ত্বরায়।
সতি, করিতেছি বরদান—একশত
পুত্র করিবে অচিরে লাভ,-ছাড় এবে মৃতজনে।
সাবি। প্রভো! দিলে বর কৃপকরি, শতপুত্র
লতিৰ অচিরে অমি, পুন প্রাণনাথে

পঞ্চম অক।] সাবিত্রী। য। ; সাবি। মম লয়ে যেতে চাও !একি অসম্ভব কথা! প্রাণ-নাথে যদি হরে’ লও প্রভা, কেমনে লভিব তবে সন্তান রতন ? সাবিত্রি,—তুমিই ধন্য ; তােমার বুদ্ধির কাছে কাল পরাজিত হইল কৌশলে আজি! দিলাম পতিরে তব পুনঃ নব- প্রাণ ; পতি-ধনে লয়ে সতি, তুমি সুখী হও। প্রণমামি দয়াময়। তােমার দয়ায় সংসার মাঝারে প্রভো, কিবা নাহি হয়। তুমি ধৰ্ম্ম, তুমি যােগ, তুমি সে সাধনা, ধার্মিক জনের শুধু তুমি আরাধনা। তােমার প্রসাদে পাপী শিখে পুণ্য ফল, অমর আবাসে যায় পুণ্যাত্মা সকল। মুঢ়া নারী কিরূপেতে চিনিব তােমারে ? প্রণাম তােমার পদে, তরাও আমারে। চিরকাল তব সতি, হইবে মঙ্গল, গাহিবে তোমার গীতি রমণী-মণ্ডল। তব ব্ৰত প্ৰচলিত হবে অবনীতে, তুমি না বঞ্চিত হবে কখন পতিতে। আয়ুষ্মতী হ’বে তুমি ল’য়ে পতি-ধনে, চিরকাল রবে তুমি প্রফুল্ল বদনে। দিলাম তােমারে বর-কুশাঙ্কুর(ও) পদে হব বিধিবেনা কভু-রবেন বিপদে। (যমের অন্তর্ধান।) যম।

৪
সাবিত্রী।
[ তৃতী গায়।
( অন্তরীক্ষে বনদেবীর গীত
মধুর খেলিছে ফুল্ল-নলিনী মধুর প্রেমের হিল্লোলে।
মধুর পরাণে বঁধুর পরাণ বেধেছে কাল-হারিণী ।
করুণ কাকুতি-কলাপ মধুর,
বিমল প্রেম-মহিমা 'অপার,-
ভরিল প্রেমে নিখিল ভুবন,
ভাসিল বিশ্ব-ভীষণ শমনু;
আঁধার কাননে বঁধুর পরশে হাসিল (আজি) সৌদামিনী।
ফুটিল যুগলে প্রেম-মিলনে-মগন প্রেম সলিলে।
( অন্তর্ধান )
(সত্যবানের সংজ্ঞালাত।)
সত্য। প্রিয়ে, রাত্রি কত ?
সাবি।
প্রায় ভাের হয়ে এল নাথ, এখনও দু'একটি তারা
মিটি মিটি জ্বলছে।
সত্য। আমরা কোথায় ? আমরা এখানে কেন ?
সাবি।
কাষ্ঠ সংগ্রহ করতে মহাৰনে এসে, নাথ, তােমার ঘুম
এসেছিল, তাই কোলে করে বসে আছি।
আমি ঘুমিয়েছিলাম। না, না, আমি কোথায়
গিয়াছিলাম!
সাবি। কোথায় যাবে নাথ । তুমি ঘুমিয়ে ছিলে।
প্রিয়ে, যেন দিব্যকান্তি বিশিষ্ট এক জ্যোতির্ময়
পুরুষ আমার সম্মুখে এসে বললেন, আজ তাের পাপ
পুণ্যের বিচারের দিন; তুই সংসারে এত দিন কি
কাষ করূলি আমার সম্মুখে আজ তারই পরীক্ষা দিতে

সাবিত্রী। হবে। সুন্দর গঠন, মনােহর কান্তি ; কিন্তু আমার তাকে দেখে বড় ভয় হল, আমি ভয়ে জড়সড় হয়ে যেন বাকশূন্য হয়ে পড়লাম,-কোন কথা কইতে পারলাম না। তার পর দেখতে দেখতে যেন আমরা এক সুন্দর অট্টালিকার মধ্যে প্রবেশ করলাম। সেখানে যেন অসংখ্য নরনারী কত উৎকট উৎকট কাষে লিপ্ত রয়েছে। এক ভয়ঙ্কর-অসৗম রক্তের নদী, সেই নদীতে কত লোক ডুবে যেন সেই রক্ত পান করছে, কিন্তু অসহ দুর্গন্ধে পরক্ষণেই বমন করে ফেলছে, অমনি ভয়ঙ্কর মূৰ্ত্তি, দুই জন দীর্ঘকায় পুরুষ আরক্ত লােচনে পুনরায় সেই রক্ত পান করু- বার জন্য উত্তেজিত ক’ছে ; কেহবা ভয়ে জড়- সড় হয়ে প্রাণে মরে সেই উদগিরিত বমন আবার গলাধঃকরণ করছে ; কেহবা উহাতে অনিচ্ছা প্রকাশ ক’ছে, অমনি সেই পুরুষ যুগলের ভীম প্রহারে ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ছে। বােৰ হয় ঘুমের ঘােরে স্বপন দেখে থাকবে, নাথ। না, স্বপন নয়। একস্থানে কতকগুলি অভাবনীয় যন্ত্র একটা অত্যুচ্চ মঞ্চের উপর স্থাপিত রয়েছে । কয়েক জন লােকে সেই যন্ত্রের মধ্যস্থলে উদ্ধাপদে, হেটমুণ্ডে থাকিয়া নিয়ত ঘুর্ণিত হচ্ছে ; কতক- গুলি ফণাধর গৰ্প মুখব্যাদান পূর্বক অনবরত সেই লােক গুলিকে দংশন করছে ; দংশনে অস্থির হয়ে চীৎকার করলেই একজন ভীমমুর্তি বিরাট সাবি। সত্য।

৮৬ সাবিত্রী। [তৃতীয় গর্ভা। পুরুষের প্রকাণ্ড মুদগর কর্তৃক নিগৃহীত হতে হচ্ছে। সাবি। ও স্বপ্ন ভিন্ন কিছুই নয়, নাথ। তুমি যে বর্ণনা ক’রছ, ও ত নরকের বর্ণনা—জীবন্তে কি কেহ নরক দেখে থাকে ? প্রিয়ে, আরও কত কি দেখলাম, সব আমার মনে নাই। যে ঘটনাস্থলের কথা বলছিলাম, তারই অদূরে মূর্তিমান কাল মেঘের মতন কতকগুলি লােক সম্পূর্ণ উলঙ্গাবস্থায় জীবন্ত কৃমি ভক্ষণ ক’রূছে ; মুখের বিবর্ণতা হ’বার যাে নাই ; বিবৰ্ণভাব দেখলেই আবার একজন ভয়ঙ্কর পুরুষ অশেষ প্রকারে শাস্তি বিধান করছে। আমার সেই সব দেখে বড় ভয় আমি ভয়ে কেঁদে উঠলাম। সেই সময় সেই জ্যোতির্ময় পুরুষ আবার আমাকে বলতে লাগলেন- “তুই আমাকে চিনিস না, আমি ধাৰ্মিকগণের রাজা? আমার কাছে রাজা, প্রজা, মূর্ধ, বিদ্বান, ধনী, নিধ- নের পার্থক্য নাই। পৃথিবীর লােক মাত্রেই যে পাপ করে, আমি তাকে দণ্ড দিই—পুণ্যাত্মাগণকে আমি কিছুই বলিনা। তাের আজ পাপ পুণ্যের বিচার করব ; তুই সংসারে থেকে এতদিন যা করে এলি, আমার সম্মুখে মৃক কথা প্রকাশ করে বল। সাবি। স্বপ্ন বই কি নাথ! স্বপ্ন না হলে এ রকম, দেখবে কেন? সত্য। , তার পর, আমি কি বলতে গেলাম, এমন সময় হ’ল ;

* অঞ্চ।]
সাবিত্রী
-
শঙ্খ-চক্র-গদাপদ্মধারী ভগবান শ্রী হরি যেন আমাদের
সম্মুখে এসে ধৰ্ম্মরাজকে সম্বোধন করে বললেন,
‘ও এ পর্যন্ত কোন পাপ করেনি, ওর প্রতি শাস্তি
বিধান হবে না। তার পর প্রিয়ে, বলতে শরীর
রােমাঞ্চিত হচ্চে, যেন তুমিই মূর্তিময়ী সতীর রূপে
সেইখানে গিয়ে উপস্থিত হলে, ধৰ্ম্মরাজের পায়ে
ধরে কত কঁালে। তােমার ক্রন্দন দেখে ধৰ্ম্মরাজের
বড় দয়া হ’ল ; তিনি দয়া-পরবশ হয়ে আমাকে
তােমার হাতে হাতে সঁপে দিলেন। বললেন,--দেখ
সত্যবান, কখন যেন ধর্মভ্রষ্ট হ’ও না, ধর্মভ্রষ্ট হলেই
নরকে ডুবতে হবে। তার একটু পরেই সে ঘাের
ভেঙ্গে গেল, আর ত কিছুই দেখতে পাচ্ছিনে।
সাবি। স্বপনই দেখেছিলে, নাথ। স্বপনে লোক কত কি
দেখে।
সত্য।
স্বপ্ন নয়, আমি ঠিকই দেখেছি, আমি যেন পৃথি-
বীতে ছিলাম না। যা হােক, এখন ভোর হয়েছে,
চল কুটীরে যাই, না জানি পিতা মাতা আমাদের জন্য
কত ভাবছেন।
[ উভয়ের প্রস্থান।

চতুর্থ গর্ভাঙ্ক। কনসুরমার অাশ্রম। (শৈব্যা ও সুরমা।) শৈবা। না সুরমা দিদি, তুমি আমাকে প্রবােধ দিবার জন্য ও সকল কথা বল্‌ছ। দিদি, আমি নিশ্চয়ই বলতে পারি, বাছার কোন বিপদ ঘটেছে, বিপদে না পড়লে, বাছা আমার কান্ রাত্রেই কুটীরে আসতো। আহা, বাছা বুঝি দুঃখের জ্বালায় কাষ্ঠ সংগ্রহে কোন ঘাের-বনে গিয়ে প্রাণ হারিয়ে থাকবে ! রাণি, অনর্থক কেন অধীরা হ’চ্চ ? দেখ দেখি, রাজা মৎসেন বহু কালের পর আবার, চক্ষু-রত্ন লাভ কলেন। যার এমন ভাগ্য,--বিনা চিকিৎসায় যার অন্ধত্ব ঘুচে গেল তার কি এ সময়ে কোন বিপদ ঘটতে পারে ? আমি নিঃসন্দেহ বলতে পারি, সত্য- বানের কোন বিপদ ঘটেনি, সত্যবান নিশ্চয়ই কুশলে আছে। শৈব্যা। না দিদি, প্রাণ আর আমার মান। আছে না, সেই স্বপ্নের কথা মনে হচ্চে। মনে করি, ছুটে গিয়ে বাছা আমার কোথায় আছে দেখে আসি। (দ্যুমৎসেন ও কেশবের প্রবেশ।) মৎ। না,-কত স্থানে গেলাম, কত ধুকলাম, কিন্তু কোন স্থানেই সন্ধান পেলাম না। এখনও না আবার পঞ্চম । সাবিত্রী। ? কারণ কি ? তপস্বীরা বলেন, বােধ হয় বেশী দূরে গিয়ে পড়েছে, রাত্রি ও অন্ধকার, সেইজন্য আসতে পারেনি,—তাই হবে। তদ্ব্যতীত বিপদ ঘটলে প্রাণ আমার নিশ্চয়ই একেবারে অস্থির হয়ে পড়তে; তা’ যখন হয়নি, তখন যে কোন বিশেষ বিপদ ঘটেনি—এটা ঠি। শৈব্যা। (দ্যুমৎসেনের প্রতি) এনে দাও মহারাজ, আমার সত্যবান কোথায় আছে, খুজে এনে দাও, তা না হলে আমি আর কিছুতেই স্থির হতে পাচ্চিনে। মহারাজ, যাও, আর একবার যাও, আর বিলম্ব সহ হচ্ছে না। কেশ। (শৈব্যার প্রতি) মা, আমরা অনেক স্থানে গিছ- লাম, কিন্তু কোথাও সন্ধান পেলাম না। একটু অপেক্ষা করুন মা, দেখি, যদি আর ও একটু পরে সত্যবান না আসেন, তা হলে যা হয় একটা উপায় স্থির ক’ছি। শৈব্যা , কেশব, যে দিন তােমাকে প্রথম দেখেছি, সেই দিন থেকেই তােমাকে ও সত্যবানকে আমি ভিন্ন ভাবি না; তুমিও আমাকে যথেষ্ট ভক্তি কর। যাও বাছা, আর একবার আমার জন্য একটু কষ্ট করে বাছাকে খুঁজে নিয়ে এস। মা, সত্যবানকে খুঁজতে যাব, এতে আর কষ্ট কি ? সত্যবান এ পর্যন্ত না আসাতে আমিও যথেষ্ট ভাবিত রয়েছি। কোথায় অাছেন ঠিক

সাবিত্রী।
[ চতুর্থ গর্ভা।
শৈব্যা ।
জানি না বলে ভাবছিলাম, আর একটু অপেক্ষা
করে যাব, কিন্তু আপনি যখন এত অস্থির হয়েছেন,
তখন আর অপেক্ষা না করে এখনই চল্লাম। আশা-
ব্বাদ করুন, যেন সত্যবানকে লইয়া এখনই আপনার
কাছে উপস্থিত হতে পারি। (মৎসেনের প্রতি)
মহারাজ আপনি কুটীরে যান, আমি একাকীই
সত্যবানের অন্বেষণে যাচ্ছি।
( কেশবের প্রস্থান।)
হামৎ। ( শৈ ব্যার প্রতি), রাণি, কেশবকে অনর্থক কষ্ট
দিতে পাঠালে, অল্পক্ষণ পরেই সত্যবান আসবে-
তার আর সন্দেহ নাই।
মহারাজ, বিপদে না পড়লে বাছা এতক্ষণ
নিশ্চয়ই আসতাে। আমি দিব্য-চক্ষে দেখতে পাচ্ছি,
বাছা যেন আমার কি বিষম বিপদে অস্থির হয়ে
পড়েছে, তাই আসতে পাচ্ছে না।
দ্যুমৎ। স্ত্রীলােকের মন যেমন কোমল তেমনই পদে পদে
বিপদ গ’তে মজবুত। তুমি স্ত্রীলােক, তােমাকে
বিশেষ চেষ্টা কৰূলেও বুঝতে সক্ষম হ’ব না। ভাব
দেখি, তুমি ত এত অস্থির হ’, কিন্তু কোন বিপদ
ঘটলে, পিতৃপ্রাণ-আমার প্রাণ কি একটুও কাতর
হত না। আমি নিশ্চয়ই বছি, সত্যবান কুশলে
আছে,-তার আর সন্দেহ নাই।
রাশি, অধীর হ’ও না, সত্যবানের কোন বিপদ ঘটেনি,
সত্যবান নিশ্চয়ই কুশলে আছে। তপস্বীরা যা

পঞ্চম অঞ্চ।]
সাবিত্রী।
বলেছেন, সেই কথাই ঠিক। কাঠ সংগ্রহের জন্য বহু-
দূরে গিয়ে পড়েছে, রাত্রি ও অন্ধকার, বিশেষতঃ বধূ
মাতা সঙ্গে আছেন, সেই জন্য রাত্রে কুটীরে আসতে
পারেনি। এখনই এসে আমাদিগকে চরিতার্থ
করবে।
( সত্যবান, সাবিত্রী ও কেশবের প্রবেশ।)
.
শৈব্যা ।
(সত্যবানের প্রতি) বাছা এত করে কি ভাবা’তে
হয় ? আমার মাথা খাও, এক দিনও আর অপরাহু-
কাশে কোথাও যেও না। দেখ দেখি তােমার জন্য
ভেবে ভেবে আমি আহার নিদ্রা ত্যাগ করেছি।
মা, বড় রাত হয়ে গেল, সেই জন্য আসতে পারিনি,
বৃক্ষ তলেই রাত্রি যাপন করেছিলাম ।
শৈব্য।। ( সাবিত্রীর প্রতি) আহা, সমস্ত রাত্রি অনাহারে
বাছার উঁদমুখ খানি শুকিয়ে গিয়েছে। চল মা, এখন
কুটীরে চল, কুটীরে গিয়ে আহারাদি করে গত
রাত্রের গল্প করবে।
[ সকলের প্রস্থান। ]

পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
k
শাদেশ-রাজ প্রাসাদ-মন্ত্রণাগৃহ।
মন্ত্রী, পারিষদবর্গ এবং রাজপুরােহিত
মন্ত্রী। শুন সভাসদগণ, পুণ্যময় স্থান
এই শান্বদেশে, রাজা দ্যুমৎসেন
শাসিত শাসন নীতি ; তার অধিকারে
পুণ্যের সজীব মূর্তি যেন এই স্থানে
করিত বিরাজ সদা; মহা সুখে
মাতােয়ারা ছিল অধিবাসী। কিন্তু কাল
বিপর্যয়ে, হইলেন নরপতি অন্ধেতে
আতুর, অমনি ৰিক্ৰমে গুরী আক্রমিলা।
হায়! আসি অন্য নরপতি। সত্যবান
নামে এক অছিল। কুমার-তঁারে আর
বৃদ্ধ রাণী-উভয়ে লইয়া হইলেন
বনবাসী রাজা দ্যুমৎসেন-মনের
দুঃখেতে।
পুরে।।” কহ মন্ত্রি, এখনও কি বনে তিনি
আছেন জীবিত ?
আছেন জীবিত তিনি, শুন সভাসদ
সবে-গুন মাের কথা, যেই রাজা এই
পুরী শঠতার বলে করেছিল
আক্রমণ, তারে হারায়েছি এবে
মন্ত্রী।

খঞ্চম গর্ভা।]
সাবিত্রী।
রণ জয়ী হয়ে। এবে মম অভিলাষ,
কানন হইতে দুমৎসেন নরপতি
আসিয়া হেথায় লউন আপন, রাজ্য,
রাজাসন তঁারে সবে করি সম্প্রদান।
১ম পারি। অতীব মধুর বাণী তােমার, সচিব,
আনন্দ-সলিলে আজি হনু নিমগন ফs
শুনিয়া তােমার কথা।
২য় পারি। যার রাজ্য তঁার হবে,
দেশ পুণ্যময় হবে,
হেরি পুণ্যবানে ;
মন্ত্রী।
সকলে থাকিবে সুখে,
জয় জল্প গা’বে মুখে
এ সুখের দিনে।
সকলের অভিপ্রায় করহ প্রকাশ।
১ম পারি। মন্ত্রীবর, সকলেরই অভিমত এই,
অবিলম্বে আনি হেথা সেই পুণ্যবানে
প্রদান করহ তঁারে এই শাদেশ।
চল সবে যাই তবে আনিতে তঁাহারে-
বন মাঝে যথা তিনি। গাও, সবে,-জয়
জয় জয় দুমৎসেন নরপতি।
সকলে। জয় দ্যুমৎসেন নরপতি।
( সকলের প্রস্থান)
মন্ত্রী।

* ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক । শাদেশ-রাজ প্রাসাদ-রাজসভা। সত্যবান ও সাবিত্রী রাজসিংহাসনে সমারুঢ় : এক পার্শ্বে রাজা দ্যুমৎসেন ও শৈব্যা এবং অপর পাশ্বেরাজ। অশ্বপতি ও মালবী উপবিষ্ট ; তৎসম্মুখে কেশব ও সুরমা এবং তৎ- পশ্চাতে মন্ত্রী আসীন : সর্বনিম্নে পারিষদবর্গ উপবিষ্ট, রাজ- পুরােহিত এবং দে- বর্ষি নারদ সভার একতম দেশে সমাসীন। (মুরলার গাইতে গাইতে প্রবেশ।) মন মােহিল, আজি প্রাণ মােহিল, দম্পতি সুখের সাজে কত শােভা ধরিল। (ঐ সুর বজায় রাখিয়া ঋষি বালকগণের গাইতে গাইতে প্রবেশ ।.) ঋষি বা। দুখের বরষা গেল-ধীরে ধীরে, সুখের শরৎ এল—হাসির লহরে,- সকলে। কাননে কলিকা দল ফুটিল, কিবা পরিমল ছুটিল। যবনিকা।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sabitri

Author
Sen Gupta,satyacharan
Title
Pouranik Drishya-kabya
File name
Sabitri
Text
OCR done
Citation
1897
Published
2009/09/11
Publisher
N.a.
Language
Sanskrit
Pages
104
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Historical Plays
DLI number
513185
Barcode
4990010020186.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
D8q9lXnSmuW
Download PDF

Sabitri