Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Sobitaradhana
Front matter
No text on this page.
সবিতাৱাধনা।
( ধৰ্মমূলক নাটক)
,
শ্ৰীমুনীন্দ্রপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী।
গ্রন্থামের সময়
সত্ব সংরক্ষিত।
মুল্য ১ টাকা।
Printed by
Priya Nath Das at the
Fine Art rinting Syndicate,
148, Baranashi Ghose Street,
Calcutta.
প্রকাশক--
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়,
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
•২১ নং কর্ণওয়ালিস ধ্রুট,
কলিকাতা।
উপহার ।
আমার পরম
র
কর-কমলে
সহিত
উপহার প্রদান করিলাম
ক. .
* * *
বা মা ।
৮ ০০.০০ ০ ০
সন
স
তারিখ••••
No text on this page.
মুখবন্ধ। বাংলার ইতু পূজার গল্প অবলম্বন করিয়া “সবিতারাধনা”— নাটক—রচনা করিয়াছি। শুনা যায়, ইতু কথা শুনিলে ও প্রচার করিলে পুণ্য আছে। ইহা যদি সত্য হয়, তাহা হইলে ত পাঠক- পাঠিকারও লাভ, আর আমারও লাভ। “ইতু কথার” নাম শুনিয়া অনেকে হয়ত আবার নাসিকাও কুঞ্চিত করিবেন। ইতুঠাকুর তাহার বিচার যে না করিবেন, এরূপ ত মনে হয় না। ইতুঠাকুর সূৰ্য্যদেব ভিন্ন আর কেহই নহেন। জগতের যিনি চক্ষু, তঁাহার চক্ষু কে এড়াইবে ? আমার কয়েকজন সমালােচক-বন্ধু বলিয়াছেন, “এ নাটকে অনেক তত্ত্ব কথা, নিহিত আছে।” তাহা ত থাকিবারই কথা। তাহা না থাকিলে এ প্রতীচ্য সভ্যতার যুগেও বাংলা দেশের ঘরে ঘরে এখনও এ পূজার এত আদর ও প্রচলন কেন ? আমার সামর্থ্যানুসারে নাটকীয় চরিত্রগুলি ফুটাইতে চেষ্টা করিয়াছি। চরিত্র ফুটাইবার চেষ্টায় অনেক তত্ত্ব-কথারও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হইয়াছে বলিয়া আমার মনে হয়। সুতরাং সে সম্বন্ধে “মুখবন্ধে” আর কিছু বলিব না। যাহা বলি নাই বা বলিতে-বুঝাইতে সামর্থ্যে কুলায় নাই, তাহা পাঠক পাঠিকা- গণকে বুঝিয়া লইতে হইবে। ইংরাজীতে যাহাকে Suggestive বলে, এ নাটকের অনেকগুলি চরিত্র সেইরূপ আঁচে ঢালিতে, চেষ্টা করিয়াছি। ঢালাই কাৰ্য্য যদি খারাপ হইয়া থাকে, তবে সে ছাঁচের দোষ নয়, আমার হাতেরই দোষ।
পুস্তকখানি শীঘ্র বাহির করার জন্য মুদ্রাঙ্কণ কার্যে ভ্ৰম প্রমাদ
অনেক রহিয়া গিয়াছে,বাংলাদেশে মুদ্রাকরের ভ্ৰম প্ৰমাদ
প্রায় এক প্রকার অনিবার্য। পাঠক-পাঠিকাগণ নিজ গুণে
সে সকল ক্ৰটী, অপরাধ ক্ষমা করিলে, আমি কৃতকৃতার্থ
ইতি-
কলিকাতা।
৩০এ কার্তিক,
কার্তিক সংক্রান্তি,
সন ১৩২৪ সাল।
শ্ৰীমুনীন্দ্রপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী।
নাট্রোল্লিখিত ব্যক্তিগণ । পুরুষগণ। ০ ০ ০ ০ ০ রাজা। বীরবাহু চিত্রসেন বিজয় ও ও ও অজয় ০ ০ ০ ঐ সখা। রাজকুমার। চিত্রসেনের পুত্র। দরিদ্র ব্রাহ্মণ। ধনরাজের পুত্র। ০ ০ ০ ধনরাজ মিহির . * স্ত্রীগণ। ০ ০ ০ লক্ষ্মীমণি ধনরাজের স্ত্রী। উনাে ঐ কন্যাদ্বয়। ঝুমননা দেববালাগণ, দেবদূত, পুরুষ ও স্ত্রীলােকগণ, বালকবালিকাগণ, নাগরিকাগণ ও কুম্ভকারগণ ইত্যাদি। স্থান-বাংলা দেশ।
No text on this page.
প্রস্তাবনা।
প্রাচ্যাকাশ রক্তবর্ণ। প্রভাত গগনে তরুণ তপন ধীরে ধীরে
উঠিতেছে। শিশির মাখা তরুগুল্মলতা প্রভানিলে কঁপিয়া পিয়া
শিশিরবিন্দু বর্ষণ করিতেছে। বিহগকুলের কলকাকলীতে দিগদিগন্ত
মুখরিত। অদূরে ক্ষেত্র সমূহ ও একটী শীর্ণকায়া নদী দেখা যাইতেছে।
নার্থী ও নার্থিনীগণ নদী-পথে চলিয়া গেল। গ্রাম্য বালিকাগণ
আনন্দোৎফুল্লা হইয়া গীত গায়িতে গায়িতে একটী সুবৃহৎ বটবৃক্ষতলে
সমবেত হইল।
(গীত।)
বিমল শিশির মাখা হেমন্ত চলিয়া যায়,
দেশ তবু ঢাকে নাই শীতের সে কুয়াসায়।
কার্তিকের আজ শেষ, সবিতা মলিন বেশ,
আতপ-আপেতে সংজ্ঞা সঙ্গ ছেড়ে চলে যায় ;
তাই বুঝি বিশ্বকর্মা রবি তাপ হ’রে লয়।
কাতি যায় অঘাণ আসে, ইতু ঠাকুর পাটে বসে,
শস্য পঞ্চে জবাফুলে ইতু ঠাকুর পৃজি আয়
চন্দনে ও জল সেকে অর্ঘ্য দিব রাঙ্গা পায়।
[ গায়িতে গায়িতে সকলের প্রস্থান।
সবিভাধনা।
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
জীর্ণ-কুটীর-সম্মুখ।
ধনরাজ মস্তক কয়ন করিতে করিতে প্রবেশ করিল।
পরিধানে তাহার শত গ্রন্থিবিশিষ্ট বস্ত্র।
ধন।
।
কি বরাৎ নিয়েই সংসারে এসেছি বাবা! বিধাতা-চন্দর কেমন
বােকারাম—লােক বাছাই করে যত দুখু সব আমার
ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে ! দুঃখের বােঝ কি ভারী বাবা।
একবারে চলচ্ছক্তিহীন করে দেয়। আচ্ছা বিধাতাপুরুষ,
একটা কথা তােমায় ঠাকুর জিজ্ঞাসা করি। বলি, দুখুই
যদি ঘাড়ে চাপালে, তবে আবার একটা বানী জুটিয়ে দিলে
কেন? আচ্ছা, তাও না হয় সহি কম। বানীকে ঘাড়ে
করে না হয় দুঃখের ভাত, সুখ করে খেলুম। কিন্তু তার
উপর আবার ষষ্ঠী ঠাকরুণকে টুইয়ে দেওয়া কেন বাপু?
তা যদি না দিতে ঠাকুর—তা হলে ত দুটো পেট রাজার
হালে চালিয়ে দিতুম।
সবিতারাধনা যা হ’ সংকেরান্তির দিন আজ—দে বাবা দে আজ খানকত পিটের যােগাড় লাগিয়ে দে। জিভ,ভা ঠাকুরের খেদটা আর থাকে কেন! দে বাবা দে–অরিষ্টি গরিষ্ট পাপিষ্টি চেংনা দুটোকে দেব না—তা’র ভয় নেই। দুখানা একখানা দে বাবা, তাহলেই মনােবা পূর্ণ হয়। দেখি যদি ব্রাহ্মণী কিছু যােগাড় লাগাতে পারে। বলি—ব্রাহ্মণী, ও ব্রাহ্মণী—ওগাে-ও-ঔ। [ কুটীরাভ্যন্তর হইতে কি—কি-কি-আমি কি কাল ? রামচন্দর হতে যাবে কেন ? তা হলে কথা শুনে কথার পিঠে কথা বলবে কে ? [ লক্ষ্মীমণির প্রবেশ কি বললে—কি বলে ? বলছি কি, তুমি কালা হতে গেলে কেন ? কালা— ধন। লক্ষ্মী। ধন। শহুর হক। লক্ষ্মী। ধন। লক্ষ্মী। তা বেশ বলেছ। বলি সকাল বেলায় অমন করে সুর তুলেছ কেন ? হু-হুতা—তা—নানা—তা না না না ওকি ও আবার সকাল বেলায় কি ন্যাকামী? যাও যাও- বেলা হ’লভিক্ষেয় বেরােও। তা’ বেই। কিন্তু দেথ ব্রাহ্মণীতা'—তা-তা না না না -দেখ ব্রাহ্মণী—এই কিছু বুঝলে কিনা-এই কিছু যােগাড় ধন।
সবিতারাধনা
লক্ষ্মী।
লাগাও। তুমি লক্ষ্মীমণি দেবী-লাগাও, কিছু যােগাড়
লাগাও। তুমি যা বলবে, আমি তাই শুধ।
আমি কিসের যােগাড় কব গাে—আমি কি বলব গাে, তুমি
কি করূবে গাে? দারিদ্দির বামুন তুমি, ক্ষেপলে নাকি গাে !
ওগাে তাহ'লে যে আর রক্ষে থাকবে না গাে।
ধন। আ গেলরে হাউড়ে মাগী,আমি এখনও জলজ্যান্ত বেঁচে
আর এরই মধ্যে মড়া কান্না তুললে !
লক্ষ্মী। বালাই, বালাই—অমন কথা মুখে এন না, অমন কথা মুখে
এন না। আমার সিথের সিদুর অক্ষয় হােক, হাতের নােয়া
বজ্জর হোক্, মাছের আঁস যেন আমি সারাজীবন সঁতে
কাটুতে পারি, রাঙ্গা কস্তা পেড়ে কাপড় কেউ দিলে খুলে
যেন তা কোমরে ছোয়াতে পারি
ধন। খুব কেট, খুব ছুঁইও। এখন একটা যােগাড় লাগাও দেখি।
পেটের—পেটের—জিভ ভার।
লক্ষ্মী। ও তাই বল—আমার ভাবনা ঘুচল। তুমি ক্ষেতে যাবে
কেন—শত্তর ক্ষেপুকু। হা গা, হা গা—এত সকাল সকাল
ভিক্ষে করে ফিলে যে ?
ধন। ভিক্ষেয় গেলুম কখন—এইবার যাব। বলি, ব্রাহ্মণী একটা
কাজ কতে পার ?
লক্ষ্মী। পাব না, খুব পাব। তােমার কাজ আর পাব না
খুব পাব। কি-কি-বল না ।
ধন। এই—এই বলছিলুম কি-কার্তিক যায়, অঘ্রাণ আসে
সংকেরান্তির দিটে আজ, বুঝলে কিনা, সবাই আজ রগড়
।
সবিতারাধনা
করে পিটে পরমান্ন খাচ্ছে, বলি তুমি কিছু যােগাড় লাগাতে
পাবে না কি ? বেজায় সাধ হয়েছে আমার—সাধটা পূরণ
হয় না কি ব্রাহ্মণী ?
?
লক্ষ্মী।
আ আমার কপাল রে-আ পােড়া কপালরে, আ আমার মুখে
নুড়াের আগুনরে ! তােমার পিটে খেতে সাধ হয়েছে।
মাগাে মা-আমি যাই কোথা’; আমি পাই কোথা ? পেটে
নেই অন্ন, আর তােমার পিটে খেতে সাধ হ’ল! নাঃ তুমি
ঠি ক্ষেপেছ, নিশ্চয় ক্ষেপেছ। পিটে খাবে কি গাে, পেট
খালি যে! তুমি দারিদ্দির ব্রাহ্মণ, এক বেলা জোটে ত তিন
বেলা জোটে না—তুমি পিটে খাবে কি গাে! তােমার ভাত,
কাঠের ছাউনি, পদ্ম কাঠের বেড়া,—তােমার পিটে খেতে
সাধ কেন গাে ?
ধন।
;
হাঁ, হাঁ, খাব, খাব। কথাটাই শােন না আগে। এক গাঁয়ে
ভিক্ষে করতে, সাত গায়ে ভিক্ষে করব ; এক দোয়ারে
যেতুম, সাত, দোয়ারে যাব; যা’র দোয়ারে যেতুম, তার
দোয়ারে ত যাবই ; যার দোয়ারে না যে, তার দোয়ারেও
যাব। ভয় কি, ভাবনা কি ? কেউ দেবে চালটা, কেউ
দেবে গুড়টা, আর কলাটা, মূলােটা, দুধটা দোয়ারে দেয়ারে
ভিখ মেগে যােগাড় ক’ব। তুমি কেবল গড়ার ভাটা
ন্যাও—কি বল ব্রাহ্মণী—কি বল ?
লক্ষ্মী। তুমি যদি এনে দিতে পার, তা—তা হলে আমার গড়ে
দেবার বাধাটা কি ? ত’ পারি—খুব পারি। কিন্তু দেব,
c সবিতারাধনা ধন। পিটে পিটে করে যেন তুমি ক্ষেপ না, তা হলে তুমিও গেলে আর আমিও গেলুম্। না, কেউ যাবে না। তা হলে আমি বেরিয়ে পড়লুম- কি বল, এ কি বল ? তা’ পড়–কিন্তু দেখ যেন হাত, পা ভেঙ্গো না। আমরা দারিদ্দির, আমরা পড়লে আর কে দেখে বল ? না—কেউ পড়বে না। ইচ্ছে হলেই ভগবান চন্দর তা পূরণ করেন। পণ্ডিতদের মুখে সে কথা ত শুনেছি গাে- তবে আবার ভাবনা কিসের ? আমি বেরিয়ে পড়লুম্। [ ধনরাজের প্রস্থান । ধন। লক্ষ্মী। "ওরে উনে—ওরে বুনাে-কোথা’ গেলিরে সব। মেয়ে দুটোর ভাবনাতেই গেলুম। তারা দারিদির ব্রাহ্মণের দুচী চক্ষের বালাই। রাত দিন তাদের চ’খে চখে রাখতে হয়। কে জানে, তারা বন বাদাড়ে, পুকুর পাড়ে, নদীর তীরে কোথায় গিয়ে বসে আছে। আহা দারিদ্দিরের মেয়ে রে। [ প্রস্থান।
সবিতারাধনা
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
নদীতীর।
স্ত্রীলােক ও পুরুষগণ নদীতে স্নান করিতেছে। উনাে ও
বুনাে নদীতীরস্থ একটী বৃক্ষতলে বসিয়া আছে।
১ম পু। গা না, গা না; তােদের কড়ি দেব, একটা গা না ।
বুননা। দিদি, গাইবি ? কড়ি দেবে বলছে, গাই আয় না। কড়ি
পেলে মা’র হাতে দোব, মায়ের দুঃখ কষ্ট ঘুচবে।
উনাে। দূর, তা’ কেন, ভিস্থ মাগব কেন ? বাপ ভিক্ষে মাগে, সে
এক রকম—আমরা তা ক’বাে কেন ? বরং গাইতে তাের
মন গিয়েছে-গাই আয় ; কিন্তু কড়ি নােব না।
বুননা। আচ্ছা।
( উমনাে ও ঝুমনাের গীত।)
দয়াময়, কি দোষে হে ত্যজ অভাগায়,
(তারা) চরণে শরণ বল কেন নাহি পায় ?
তুমি হে জগতপতি,
তুমি অনাথের গতি,
তবে কেন মূঢ়মতি পাবে না তােমায় ?
দয়াল ঠাকুর কর দীনের উপায়।
২য় পু। ওকি ? ওটা ত একটা ছােট্ট গান হ’ল। একটা বড় করে
গা না তােরা।
সবিতারাধনা
কুনো। আমরা ত বড় নই, আমরা যে ছােট্ট—দীনের দীন; বড়
করে, বড় গলায় কেমন করে ডাক্ব ঠাকুর।
তৃ পু। আহা-আহা!
উনাে। তুই থাম ঝুমননা, তুই থাম্। তাের এমন কাঙ্গাল কাঙ্গাল
ভাব কেন ? ফের যদি অমন করে কথা ক’স, তাহলে
ততার সঙ্গে আমি আর কথা ক’ব না।
মননা। আমরা বড় গান কি জানি দিদি ?
উন। খুব জানি। আয় সেই লুকোচুরীর গানটা গাই আয়।
(গীত।)
তুমি কখন্ কোথায় কেমনে থাক কেহ ত জানে না বুঝে না
অবােধ মানব, খুঁজিয়া খুঁজিয়া তাই ত তােমারে পায় না।
অনলে অনিলে সলিলেতে তুমি,
ব্যাপিয়া আছ হে ব্যোম্ জল ভূমি,
গন্ধ রূপ রসে, বিষাদে হরষে
বরষে তােমার করুণা।
বারিধি ভূধর কুঞ্জ-কাননে,
তুমি নিত্য রাজ জীবনে মরণে,
তুমি শান্তিময়, তােমারি রাগিণী
শুনেও কেহ ত শুনে না।
লুকোচুরী তব বুঝে না মানব,
চিনেও তােমারে চিনে না।
সবিতারাধনা
0
[স্ত্রীলােক ও পুরুষগণ হরিধ্বনি করিয়া উঠিল। ভাবহারা
বালিকাদ্বয় গায়িতে গায়িতে চলিয়া গেল। সহস্র
আহ্বানেও তাহারা ফিরিল না। একটী অপরিণত বয়স্ক
বালক মাতার অঞ্চল ধরিয়া মাতাকে টানিতে লাগিল ]
বালক। মা, তারা কোথায় গেল ? ডাক্ না মা, তাদের ডাক্ না।
সঙ্গে করে আমি তাদের বাড়ী নে যাব। আমার বন
নেই, তারা আমার ব’ন হবে—কেমন মা, কেমন?
বা মা। আচ্ছা বাবা-খোঁজ করে আমি তাদের আনব অখন,
এখন চল্ বাবা তুই ঘরে চল্।
বালক। না, তাদের না পেলে আমি ঘরে যাব না। তারা বড়
গরীব। হাঁ মা, গরীবকে এরা দয়া করে না কেন ?
[ বালকের মুখচুম্বন করিতে করিতে বালকের মাতা
বালককে সঙ্গে লইয়া চলিয়া গেল। অন্যান্য সকলে স্নান
করিতে লাগিল। ]
তৃতীয় গর্ভা।
কুটীর-সম্মুখ।
(লক্ষ্মীমণির প্রবেশ)
। যােগাড় ত সব এক রকম হ’ল। গুড়, পেয়েছি, চাল
পেয়েছি, দুধও পেয়েছি—আর কলাটা
পেয়েছি—আর কলাটা মুলােটা ত
সবিতারাধনা
পেয়েইছি। সরা, নাড়নীরও যােগাড় হয়েছে। বাঁশের
চোঙ্গায় চাল ধুয়ে, বেছে কুটে সব ঠিকঠাক করে এনেছি।
এইবার ভােলা চাপাই—পিটে কথা ভাজি। আহা,
দারিদ্দির বামুন কত কষ্টেই না এ সব জোগাড় করে
এনেছে। পরিতােষ করে এখন খাওয়াতে পালেই আমার
বেশ সুখ হয়।
[ কুটীরের সম্মুখে উনন পাতিয়া তাহাতে অগ্নি সংযােগ
করিয়া লক্ষ্মীমণি পিটা ভাজিতে লাগিল। ধনরাজ কুটীরের
পশ্চাদ্ভাগে দণ্ডায়মান থাকিয়া লক্ষ্মীমণির কাৰ্যকলাপ
দেখিতে লাগিল। একখানি পিটা ভাজিতে না ভাজিতেই
উনাে কুটীরের বাহিরে আসিল।
উনাে। মা গাে মা, কি ভাজছি মা? বাবার জন্মে দেখি নি,
মা’র জন্মে খাই নি, দে মা দে—একখানা দে।
লক্ষ্মী। চুপ, কবূ অভাগী চুপ, কর্। কত্তা শুনলে এখনি তােকে
কেটে ফেলবে।
উম্নন। কাটলেও শুনব না, কুটলেও শুনব না। বাবা টের পাবে না,
দে মা দে-একখানা দে।
[ লক্ষ্মীমণি চতুর্দিক নিরীক্ষণ করিয়া উনােকে একখানি
পিষ্টক দিল। উনাে তাহা খাইতে লাগিল; ধনরাজ তাহা
দেখিয়া অঙ্গভঙ্গী সহকারে দড়িতে গিরা” দিল। লক্ষীমণি
পিটা ভাজিতে লাগিল। উনাে চলিয়া গেল, পরে বুনো
আসিল।]
১০
সবিতারাধনা
ঝুমনাে। ওগাে মা, মা গাে কি ভাজছিস মা ?
লক্ষ্মী। কিছু না মা কিছু না ; তুই গুগে যা।
ঝুমনাে। ভাজছিস--আবার বছি কিছু না? দে গাে মা,
একখানা দে।
লক্ষ্মী। এই—এই আমায় সারলে রে। কত্তা শুনলে যে থােড়,
কুঁচি কবে রে।
ঝুমনাে। কাটে, কাটুবে মা ; তুই দে একখানা দে।
লক্ষ্মী।
এই নে, এই নে—আহা বাছারে, যা খেয়ে শুয়ে পড়গে যা।
[ ঝুমনাে পিষ্টক খাইতে খাইতে চলিয়া গেল। ধনরাজ
দড়িতে “গিরা” দিল।]
মেয়ে দুটোকে ত দুখানা দিলুম। কে জানে কি বরাতে
আছে। নাঃ—সে কথা কি আর কেউ জানতে পাবে।
বােধ হয় ত না। জানতে পারলেই ত গিয়েছি। শৰ্মার
এমন রাগ নয়! যাক, বাকী কখানা ত ভেজে, ফেলি
তারপর যা থাকে বরাতে।
{ ধনরাজের প্রবেশ
ধন।
কি ব্রাহ্মণী, কতদুর ? ছ্যাক কল কল, ছাত্ কল কল যে,
এখনও চলছে। বলি, চটপট সেরে ন্যাও। নােলা যে
আমার সকৃপকাচ্ছে।
এই হ’ল বলে। ঠাঁই করে দিচ্ছি, তুমি ব’স না। বসতে
বসূতেই সব হয়ে যাবে।
লক্ষ্মী।
১১
সবিতারাধনা [ লক্ষীমণি ধনরাজকে আসন প্রদান করিল। ব্রাহ্মণ তাহাতে উপবিষ্ট হইল।] ধন। লক্ষ্মী। ধন। বলি বিলম্ব কত ? বিলােম আবার কি ? এই যে খাও না। [ পাত্রপূর্ণ পিষ্টক প্রদান ( খাইতে খাইতে) বাঃ বাঃ বড় চমৎকার হয়েছে ত! পিটেয় ব্রাহ্মণীর কি হাত, রে—যেন মূর্তিমান খােন্তা খােলা। কৈ আর দাও, কৈ আর দাও। এই দিই। [ পিষ্টক প্রদান লী। লক্ষ্মী। বাঃবাঃ কি তার রে, কি গন্ধ রে ! আরাে দাও, আরাে দাও। [ লক্ষ্মীমণির পিষ্টক প্রদান মচৎকার, মচৎকারম মক্ করে বেশ খাচ্ছি। আরো আরো—আরাে দাও। কৈ আর কৈ ? আর ত নেই—যা ছিল সব দিয়েছি। আর পাব কোথা ? —নেই—আর নেই! বুঝেছি–অরিষ্টি গরিষ্টি পাপিষ্টি মেয়ে দুটোকে পেটু ঠেসে খাওয়ান হয়েছে। কেমন, না ? সে কি গাে ! বাছারা, বলে, খালি পেটে শুয়ে ঘুমােচ্ছ- তাদের সাড়াশব্দ নেই; তারা কখন খেলে গাে! বটে।—ভাবছিস, আমি বুঝি খবর রাখিনি? লুকিয়ে লুকিয়ে সব দেখেছি। এই দ্যাখ, দড়িতে গাঁট দিয়ে ধন। ধন। ১২
সবিতারাধনা
লক্ষ্মী।
রেখেছি—পাছে ভুলে যাই। আবার নাকি-সুরে বলা
হচ্চেতা’রা কখন খেলে।
ওগাে তারা কিছু জানে না গাে। ওগাে রক্ষা কর গাে।
ওগাে তাদের কিছু বলনা গাে। ওগাে তারা কিছু জানে
গাে।
মিছে কথা ঢাকতে গেলে এমনি মিছেই বলতে হয়। আচ্ছা,
তার ব্যবস্থাও কচ্ছি। পিটে যখন তারা পেটে পুরেছে,
তখন পিঠে তাদের সইতেই হবে। আমি এমন বান্না
নয়!
ওগাে তােমার হাতে ধরি গাে-ওগাে তােমার পায়ে পড়ি
গাে। তাদের মের না গাে, তারা কিছু জানে না গাে
—এবার তাদের হাতে মারূব না—তাদের ভাতে মারুব।
তাদের বনবাসে দেব। এত বড় নােল! আমার খাওয়ার
লক্ষ্মী।
ধন।
আ খায়।
[ প্রস্থান
মী।
সব্বনাশ হ’ল, সব্বনাশ হল । আমি কেন মতে তাদের
দুখানা পিটে দিয়েছিলুম গো! ওরে ও উন্ননা, ওরে ও
ঝুমনাে। আর যে সাড়া নেই। ঐ বুঝি বনবাসে গেলরে।
ওগাে মেয়ে দুটোকে বনবাস থেকে কে বাঁচাবে গো।
[ কুটীরাভ্যন্তরে গমন।
* *
সবিতারাধনা চতুর্থ গর্ভাঙ্ক। পথ। প্রায় শেষরাত্রি। আকাশে শুকৃতার ঝক ঝক করিতেছে। বনমাঝে শিবারব উখিত হইতেছে, গ্রাম্য কুকুরের দলও সেই সঙ্গে চীৎকার করিতেছে। উনাে ও কুম্নাের হস্ত ধরিয়া ধনরাজ পথে উপস্থিত হইল। ধন। চল, চল, পা বাড়িয়ে বাড়িয়ে চল। হাঁটি হাঁটি পা-পা করে চলে আর পৌঁছাতে পাব না। ঝুমনাে। কোথা নিয়ে যাচ্ছ বাবা; এখনও রাত, পােয়ায়নি—কোথায় বিদেয় করে দিচ্ছ বাবা? ধন। বিদেয় আবার করব কোথা ? মেয়ে ঢং আর কি! বললুম- তােদের মাসী পিসির বাড়ী নিয়ে যাচ্ছি—সে কথা বুঝি বিশ্বাস হ’ল না? আর তােদের গর্ভধারিণীর ত বিশ্বাস হয়ইনি। বটে ? উনাে। মাসী পিসির বাড়ী কোথা বাবা? বন। চল না, চল না—দেখবি এখন। ঝুমনাে। হ্যা বাবা, জ্ঞেয়ানে কখন মাসী পিসী দেখিনি, আজ মাসী, পিসী কোথা থেকে এল বাবা ? সুকালে যা’র কেউ থাকে না, অকালে তার কে থাকে বাবা ? আরে চেংন-এ খুব কথা শিখেছে। বেটী যেন টুলাে পণ্ডিত—গল গল গল গল করে বচন আওড়াচ্ছে। চ, বেটী চ-পা বাড়িয়ে বাড়িয়ে চ।.তাের সব কথার জবাব দিতে ১৪
সবিতারাধনা
হলে আমায় আর প্রাণে বাঁচতে হবে না। চল্ চল আগ
বাড়িয়ে চল।
[ উমনাে ও ঝুম্নােকে ধনরাজ ঠেলিতে লাগিল।
ঝুমনো। যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি—অমন ক'রে ঠেলে দিলে আমাদের আর
দা’বার স্থান কোথা’ বাবা ?
উনাে। চল না কুম্নােচ না। মাসী পিসির বাড়ী যাব—সেখানে
কেমন মজা। মাথায় মাখতে তেল পাব, লজ্জা রাখতে
বস্তর পাব, পেট ভরে ভাত খাব; গুয়া পান মুখে দোব,
চল না বহিন্ চল্ না।
ঝুমনাে। বাবা যখন বিদেয় করে দিচ্ছেন, তখন আর থাকব কেমন
করে! কিন্তু মার প্রাণ ত মানা মানবে না, মা’র চক্ষের
জল ত শুকোবে না। হ্যা বাবা, আবার ফিরূবে কবে ?
ধন। আগে পৌছাই ত—তারপর ফেরার কথা।
উনাে। ফিলেই কি, আর না ফিলেই কি ? মাসী পিসী কি
আর পর?
ধন। উনাে বেটী ঠিক্ বােঝে—এই
অবুঝ
বেটা ঝুমনাে।
উনাে। চল ঝুমনন চল—ভয় কিসের, ভাবনা কিসের ?
বুমনাে। চ-বড় অন্ধকার।
[ চলিতে চলিতে উমনাে ও ঝুমনাের গীত।]
আঁধার আঁধার দিগন্তে আঁধার ,
আললা বুঝি হেথা ফুটে না ;
সৰিতারাধনা কারে শুধাইব, উতরিবে কেব- শুধাবারও লােক মিলে না। আপনার মনে যাইগাে চলিয়া, রহিব কেন বা—হেথায় বসিয়া, খুঁজিয়া খুজিয়া লইব চিনিয়া— পথ ছাপা কভু রবে না যে পথে বসিবে, সে পথে মরিবে পূরিবে না তার কামনা। সকলের প্রস্থান। পঞ্চম গর্ভাঙ্ক। গভীর অরণ্য পথ। প্রভাতালােকে সে পথ আলােকিত। বন্য পক্ষীর সুললিত রবে বনভাগের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হইতেছে। উনাে ঝুমনে। গায়িতে গায়িতে পিতার সঙ্গে পথ অতিক্রম করিতে লাগিল। (গীত।) আঁধারে ডুবিয়া আঁধারে ভাসিয়া আলােকের কণা পেয়েছি ;
সবিতারাধনা
চলিতে চলিতে কঁদিতে দিতে
সে আলােকে পথ চিনেছি।
[ দৃশ্যের পরিবর্তন হইতে লাগিল। বনস্থলী তখন
প্রভাতালােকে অপূৰ্বশ্রী ধারণ করিয়াছে।]
খেলিবারে জীব আসে এই পথে,
খেলা শেষে ধায় মরণের রথে,
আসে পুন যায়, ঘুরিয়া বেড়ায়,
এ পথের ধারা বুঝেছি।
[ বন নিবিড় হইতে নিবিড়তর হইতে লাগিল। উনাে ও
ঝুমনাে পিতৃ সঙ্গে অতি কষ্টে দুর্গম পথে চলিতে লাগিল ]
জীবনে মরণে খেলে জীব খেলা,
খেলিতে খেলিতে ফুরায় যে বেলা,
তবু ত বুঝি না, মায়ার ছলনা
ঐ মায়া ঘােরে ডুবেছি।
কাটে যদি ঘাের হবে তবে তাের
নতুবা সে ঘােরে মজেছি।
উমনে। চলতে আর পাচ্ছি না—আর কতদুর যেতে হবে বাবা?
হন। আর বেশী দূর নয়, আর বেশ দুর নয়। চলনাআর একটু
পা বাড়িয়ে চলুন—তা’ হলেহ পৌছে যাব।
সবিতারাধনা
ঝুমনাে। এ কোথায় নিয়ে এলে বাবা? এ অজগর বিজ বন ; জল
পড়ছে ,ঢেকি হচ্ছে, পাত, পড়ছে, কুলাে হচ্ছে-এখানে
কেন নিয়ে এলে বাবা?
ধন। (স্বগতঃ ) এই রে সালেরে। অরিষ্টি গরিষ্টি পাপিষ্ঠি মেয়েটা
বুঝি আমার সব মৎলব ভেস্তে দেয়। নাঃ—বিশেষ সাবধানে
কথা কইতে হল।
ঝুম্নাে। কি ভাবছ বাবা?
ধন। ভাবছি—তােরা দুধের বাছা, এতটা পথ এলি, কত কষ্টই না,
হয়েছে।
উনাে। আর যে পারি না বাবা—আর যে পা চলে না বাবা।
ধন। পারুবি, পার বি—আর বেশী দূর নয়—আয় আয় চলে
আয়-চলে আয়।
[ উনাে ও বুনােকে ঠেলিতে ঠেলিতে ধনরাজ চলিতে লাগিল।
ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক।
বিস্তৃত অরণ্য।
(উনাে, ঝুমনাে ও ধনরাজের প্রবেশ)
উনাে পা সটকে পড়ছে, গলা শুকিয়ে যাচ্ছে—আর যে চলতে
পারিনে বাবা।
সবিতারাধনা
এ কথা ঢের শুনেছি। বেশী শুনে বেশ কিছু লাভ নেই।
যাক, এই বটা পার হলেই যে ঔরি চৌরি দক্ষিণ দুয়ারী ঘর
পাওয়া যাবে, সেই তােদের মাসী পিসির বাড়ী। সেখানে
একখানা ডাঙ্গায় সাতখানা লাঙ্গল পড়ে-বুঝেছি, সে কি
গা রে, সে কি ঘর, রে! চল, চল বেলা পড়তে আরম্ভ
হয়েছে।
বুনাে। এ বন কত বড় বাবা ?
ধন। কত আর হবে—পােয়াখানেক কি পােয়ানয়েক হবে—আর
কত ! তা—তা-ছের হয়ে থাকে, না হয় একটু শয়নে
পদ্মলাভ ক না। তারপর ছের কাটিয়ে আবার না হয়
চলবি।
উনাে। হ্যা বাবা’ই কর বাবা। একটু না হয় শুই–আঃ-
মাগাে।
[ শয়ন
ধন। ঝুমনাে, তুইও একটু শােনা রে-তােরও ত পা কন্নাচ্ছে,
ঘাড়, লটকে পড়ছে রে।
বুননা। শুই—ঘুমিয়ে পড়লে তুলে দিও বাবা।
[শয়ন
--
ধন।
(স্বগতঃ ) ঘুমিয়ে পড়, ঘুমিয়ে পড়,-দেবতার আশীর্বাদে
ঘুমিয়ে পড়। পাপিষ্ঠি মেয়ে দুটো-একি ঘুমিয়ে পড়ল
নাকি? তাইত ঘুমুলেই ত। বেশ হয়েছে, বেশ হয়েছে।
তবে এইবার এদের উরু থেকে নামিয়ে শােয়াই।
সবিতারাধনা
[ ধনরাজ, কন্যাদ্বয়ের মস্তক আপন উরুদেশ হইতে
নামাইয়া দুইখণ্ড অস্থির উপর স্থাপন করিল ]
ঘুমাে, ঘুমাে, খুব ঘুমে।ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই বাঘ ভালুকের পেটে
যা। তােদর জন্যেই ত আমার এত যন্ত্রণা, আমায় দ্বারে
দ্বারে ভিক্ষে করূতে হয়—তাতেও অন্ন জোটে না। তবু
দুঃখের ভাত, সুখ ক'রে খাচ্ছিলুম। তােরা তাও আমায়
খেতে দিবিনি—আমার খাওয়ার আগ খাবি, বটে! আচ্ছা,
এখন তা’র ফল ভােগ কবৃ। থাক এখন বনবাসে-যা’
এখন বাঘ ভালুকের পেটে। ততাদের গর্ভধারিণীকেও
তােদের সঙ্গে দিলে ঠিক্ হত। ওকি উঠল নাকি ?
[ ধনরাজ, বস্ত্রভাগ দিয়া কন্যাদ্বয়কে বাতাস করিতে
লাগিল।]
না ওঠেনি। একটু মায়া হচ্ছে—হাজার হ’ সন্তান ত!
উহুউহু-ও সন্তান নয়—শহুর-শহুর। আমার যে
এত দুখ খু—তা’ত সব ওরা হ’তেই। থাক, ওরা বনের মাঝে
পড়ে থাক, যা’ক ওরা বাঘ ভালুকের পেটে যাক।
আমার বিধাতা পুরুষের উপর রাগ। তুই ভগবান জীব দিবি
আর আহার দিবিনি। না দিলি ত, নে তাের জিনিস ফিরিয়ে
নে। তাের জিনিস তােকে ফিরিয়ে দিয়ে চলু। দারিদ্দিরের
যন্ত্রণা বড় যন্ত্রণা।
[ ভঙ্গছত্র ভাঙ্গিয়া ফেলিয়া দিল, আতা গুলিয়া বালিকা-
২০
সবিতারাধনা
ঘয়ের পার্শ্বে ছিটাইয়া দিল, নখের কুটা ছড়াইয়া দিল,
বস্ত্রভাগ ছিন্ন করিয়া বনের মধ্যে নিক্ষিপ্ত করিল।]
পালাই পালাই-হয়ত মায়া বাড়বে, হয়ত ওরা উঠে
পড়বে। উঠে পড়লে আর যাওয়া হবে না। না—আর
দেরী করা নয়। চলু, চঞ্জুম—উনাে, ঝুমনে চম্বুম্। থাক্
তােরা যা’র জিনিস, তার বুকে। আমি দারিদ্দির বামুন,
তােদের ভার নিতে পান্নুম না। থাক্ তােরা থাক্-উঃ-
উন্মত্ত ভাবে ধনরাজ ছুটিয়া পলায়ন করিল
(নেপথ্যে) ভগবান, ভগবান!
[ সিংহ ব্যাঘ্রাদি গজ্জন করিতে লাগিল। সে গর্জনে
উনাের নিদ্রাভঙ্গ হইল।]
,
উম্নন। ও ঝুমননা, ঝুমননা, ও ঝুমনন, ঝুমনাে ; ও বুনাে-৩
ঝুমূনাে-ওরে ঝুমনাে।
বুনন। এ উঠছি বাবা—যাচ্ছি—যাচ্ছি-ঠেল না, ঠেল না। কত
রাত, বাবা ?
উনাে। ওরে বাবা নেইরে, বাবা নেই—ওঠ ওঠনা—দেখনা,
চারিদিকের সব নিশানা দেখ না। বাবা কোথা’ গেল ভাই ?
[ ঝুনাে তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিল
ঝুমনাে। ঐ এ কি বলছিস দিদি? বাবা-বাবা।
সবিতারাধনা
উনাে। ওরে আর বাবা নেইরে আর বাবা নেই। এই দ্যাখ, রক্ত,
এই দ্যাখ কাপড়, এই দ্যাখ, হাড়, এই দ্যাখ, নখের কুটা
বাবাকে বুঝি বাঘে খেয়েছেরে, বাবাকে বুঝি বাঘে খেয়েছে।
ঝুমনন। আর আমাদের ছেড়ে দিয়ে গেছে, না? বাবাকে বাঘেও
খায়নি, ভানুকেও খায়নি—বাবা বাড়ী চলে গেছেন।
উনাে। এা তুই কি বলিরে? ঐ শােনা বাঘ সিংহির হুড়ােহুড়ি-
আর দ্যাখনা হাড়ের গড়াগড়ি, রক্তের ছড়াছড়ি।
ঝুমনাের দেখেছি। তুই রক্তটা চেকে দ্যাখনা-তেততা হলেই আলতা
আর নাে হলেই বুঝা যাবে রক্ত।
উনো। (চাকিয়া) হ্যা ত রে, এ ত তেতই ত রে।
ঝুমনাে। এখন বােঝ। সেই যে কাল রাত্তিরে মা আমাদের দুখানা
পিটে দিয়েছিলেন, আর আমরা পােড়া পেটে খেয়েছিলুম,
বাবা তাই আমাদের বনবাস দিয়ে গেলেন।
উম্নন। এ বনবাস-দুখানা পিটে খেয়েছিলুম্ বলে বাবা আমাদের
বাঘ ভালুকের মুখে দিয়ে গেলেন! এই কি আমাদের মাসী
পিসির বাড়ী ? বাবা বাবা-ফের, ফের—এমন কর্ম কখনও
করব না। বাবা বাবা-ফের, ফের-বড় ভয় করছে বাবা।
বাবা-বাবা ।
ঝুম্নন। বাবা কোথায় ? চুপ, কর দিদি, চুপ ক; বাবা গেছেন,
মধুসূদন আছেন। আয় তাকে ডাকি আয়।
[ উনাে কথা কহিল না, কাঁদিতে লাগিল, ঝুমনাে তাহাকে
আর কিছু না বলিয়া আপনি গায়িতে লাগিল।]
s
সবিতারাধনা
প্রলয়-ঝটিকা
বিপদ তারণ
শ্রীমধুসূদন,
বিপদ সময় কোথা’ দয়াময় ?
হানে বিভীষিকা
ও রাঙ্গা চরণে দাও হে আশ্রয়।
এ বিশ্ব মাঝারে
তুমি বিশ্বপতি
আঁধারে আলােক দেয় তব জ্যোতি,
অগতির গতি করি পদে নতি
ভয়ে মরি নাথ দাও হে অভয় ;
অনাথে ফেলিয়া
যেও না চলিয়া-
কর কৃপা দীনে ওহে কৃপাময়।
উনাে। ও ঝুমনাে, ঝুমনাে, বাঘ ভালুকের ডাক যে ক্রমে এগিয়ে
আসছে, সন্ধ্যের ঘনছায়া যে ঘনিয়ে আসছে—কি হবে
ঝুমনন, কি হবে ?
ঝুমনাে। মধুসূধন জানেন।
[ বিপুলকায় বটবৃক্ষের প্রতি লক্ষ্য করিয়া ]
হে বৃক্ষ, তুমি যদি সত্যকালের বক্ষ হও, তুমি দু’ক হও
আমরা তােমার মধ্যে প্রবেশ করি। তুমি বিনা এ দুর্গম
অরণ্যে আমাদের আশ্রয় দিতে আর কে আছে বৃক্ষ? হও,
হও, হও—বৃক্ষ দু’ফাক হও। অন্ধকার দেখে আমাদের প্রাণ,
কেঁপে উঠছে ; তুমি যদি সত্যকালের বৃক্ষ হও, তুমি যদি সত্য
সবিতারাধনা
হও, মা যদি সতী হ’ন, আমরা যদি সতী কন্যে হই—তকে
বৃক্ষ, দু’ফাক হও, দু’ফা হও, দু’ফা হও।
[ বিকট শব্দে বটবৃক্ষ দ্বিভাগে বিভক্ত হইয়া গেল।
উনাের হস্ত ধরিয়া ঝুমন তাহাতে প্রবেশ করিল।
বটবৃক্ষ সহজ অবস্থা প্রাপ্ত হইল। বনস্থলী অন্ধকারে ডুবিয়া
গেল। পকুলের গর্জনে বনস্থল প্রকম্পিত হইতে লাগিল।
fil
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
বন-প্রান্তে সরােবর তীর।
দেব-বালাগণ।
(গীত।)
আর গায়িব বল কি গান,
অশান্ত হল যে শান্ত প্রাণ।
প্রভাত-কুসুমে স্মৃতি যে জাগায়,
কোথায় দ্যুলােক, ভুলােক কোথায়,
প্রাণ নাহি চায়, থাকিতে হেথায়,
ভাল ত লাগে না ধরার গান।
রামধনু আঁকা সেই বাঁকা পথে,
রােধিতে না পারি এই মনােরথে,
মেঘেতে চড়িব, তারকা ধরিব,
শশধর-সুধা করিব পান।
ঘন বায়ু ভার, সহিব না আর
তরল সমীরে তুলিব তান।
g
২
সবিতারাধনা -- L প্র দে বা। সত্য সথি! প্রাণ নাহি চায় আর রহিতে ধরায়, হেথা সমীরণ, উষ্ণ অনুক্ষণ, ধুলি ক্লেদ, ভরা শিলাভার মনে হয়, খাস বুঝি যায় বদ্ধ হয়ে। পাপ তাপ ভরা এ সংসার, উঠে নিত্য হেথা হাহাকার ধরার বাতাস আর সহিবারে নারি, চল বন, চল যাই ফিরি। দ্বি দে বা। সুলােচনে, কহেছ উত্তম- ধরা যেন কারাগৃহ, অশান্তি বেষ্টিত। সত্য, ত্রেতা দ্বাপরের সেই পবিত্রতা উদারতা, সে মহাপ্রাণতা যুগধৰ্ম্মে লুপ্ত বুঝি এবে ; হাহাকার ভিন্ন বল কি রহিবে আর ? হু দে বা। রঙ্গিনী সঙ্গিনী তােরা লাে প্রিয়বাদিনি, তর্কেতে তাদের বল কে আঁটিতে পারে ? ৭ - ", তর্ক যুক্তি জাল, চিরকাল ভ্রম ও প্রমাদে পূর্ণ। ছেড়ে দাও বচন বিন্যাস, অলীক তর্কের ছটা, যুক্তিভিত্তি ঘটা;
সবিতারানা
ন
ভেবে দেখ, এসেছি কি কাজে।
পীড়িতে সেৱিতে,
ভয়ার্ডে তারিতে,
ধৰ্ম্মভার, ব্রতকথা ভবে প্রচারিতে,
পুণ্য-মন্ত্র বিলাইতে জগৎ সংসারে
দেবাদেশে এসেছি হেথায় ;
যাতনা বেদনা যদি সহিবারে হয়,
সহিব নিশ্চয়,
তা’হে কেন প্রকাশিব ঘৃণা অসন্তোষ ?
চ দে বা। তাই বলে সব কি গাে অসহ্য যাতনা ?
তৃ দেবা। স’বে—সহিতেই হবে—
মহতের ধর্ম এইধৰ্ম্ম দেবতার ;
নতুবা প্রভেদ কিসে দেবতা ও নরে ?
ওই দেখ, হিমাচল-তুষার ধবল,
বজ্রাঘাত, ঝঞ্চাবাত সহি’ অবিরত
ধ্যানমগ্ন যােগী মত আছে দাঁড়াইয়া
অনাদি অনন্তকাল সৃষ্টির প্রাঙ্গনে।
কেন জান?—সৃষ্টি রক্ষা হেতু।
হিমাদ্রির পাদদেশ তন্তুলতা মত
আকর্ষিত ক'রে আছে সমগ্র বসুধা ;
কৰ্তব্য না সাধে যদি সে হিম-শেখর
লহমায় ধরাতল সিঙ্গুতলে যায়-
সৃষ্টিনাশ—সর্বনাশ তা’য়।
+ ন
সবিতারাধনা থাকবে তত্ত্বকথা দেখ চেয়ে কর হ’তে অর্ঘ্য সুমন অলক্ষ্যে পড়িয়া গেল ভূতলে সহসা। মনে হয়—এ বিজনে, আসিয়াছে কেহ কোন অজ্ঞাত কারণে। তত্ব লহ তা’র নহে ব্ৰত হইবে বিফল। প্র দে বা। আসিবে কে এ বিজন বনে- দেব-বালা সাধে ব্ৰত যেথা ? তুমি সখি, চারু কল্পনায় হের কত স্বপনের ছবি। হিংস্র পশু সমাকুল এ বন বিজন- কে আসিবে কোন কাজে বলত সুন্দরি ? তৃ দে বা। সেও এক তত্ত্বকথা ! যাক, তত্ত্ব লহ তা’র- নতুবা এ ব্ৰত সাঙ্গ কিছুতে না হবে। দেবদূতে পাঠাও সত্বর, অন্বেষণ কর তার বন বনান্তরে। কোথা দেব দূত, [ দেবদূতের প্রবেশ যাও দূত, করহ সন্ধান বিজন বিপিনে কোথা আছে কোন্ জন কেন ব’সে-কোন্ অভিপ্রায়ে ? ২ সবিতারাধনা মিলে যদি কাহার সন্ধান, মিষ্ট বাক্যে তুষ্ট করি’ ল’য়ে এস সাথে। দেব দূ। যথা আজ্ঞা দেবি মুহুর্তেকে করিব সন্ধান। তৃ দে বা। চল সই তুলি পুন ফুল- রাঙ্গা ছবি রবি পদে অর্থ প্রদানিতে। [ সকলের প্রস্থান দ্বিতীয় গর্ভা। বনপথ। ( দূতের প্রবেশ) দে দুত। ভ্যালা কাজেই পড়া গেছে যা হ’। কেবল আদেশ, কেবল আদেশ—তা’র আর কামাই নেই ; আর তাই আমায় পালন করতে হবে। ‘না’ বলবার যােট নেই, ঘাড় টী নাড়বার অধিকার নেই। পাটী থেকে চুণটা খসূলেই প্রভুর অমনি চ’খ রাঙ্গানি, বকবকানি, ঝনঝনানি। আঃ—অমনি অভি- সম্পাত আর অনি দেবলােক হ’তে মর্ত্যলােকে পতন, তারপর হয় ঘাস কাটন, না হয় ধান ভানন, না হয় ঐ রকম গােছের যা হয় একটা কিছু করণ। ওঃ আমি যদি একবার
সবিতারাধনা
ইন্দ্ৰষ্টা অন্ততঃ একদিনের তরেও পেতেমতাহলে
তাহলে—নাঃ, ও সব কথা আর মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে
কাজ নেই, আড়ালে আবডালে যদি কেউ থাকে, আর আমার
বক্তৃতার ঘটা দেখে কিম্বা শশানে, তাহলেই গেছি আর কি ?
ইন্দ্রের চর ত চারিদিকেই ঘুরূছে।
তা’ত হ’লমুখে না হয় চাবি দিলে কিন্তু বনের
মাঝে ঝোপেঝাপে কে কোথায় বসে আছে—কেমন করে
সেটা এখন অন্বেষণ করি বল দেখি ? কেবল দোহাই দেওয়া,
ঐ দিব্য দৃষ্টিটুকুর উপর। আরে মশায়, কথায় কথায় যদি
ঐ দৃষ্টিটুকু খরচই করে ফেললেম, তাহলে ত ক্ৰমে জমার
ঘর খালি হয়ে গেল। তারপর ? অন্ধ হয়ে হাতড়ে
বেড়াই আর কি!
ঐ যে—ঐ যে—কি একটা নড়ছে না—হ্যা তাই ত
বটে! উহু ও ত হল না-ওটা যে দেখছি একটা সেওড়া
গাছ। দাড়াও-দাড়াও একটা উপায় ঠাউরেছি। ঐ
নারকেল গাছটা খুব লম্বা আছে—ও সব খবর রাখতে পারে।
ওর শরণাপন্ন হয়ে দেখি—ও যদি কিছু উপায় করে দেয়।
[ দেবদূত, নারিকেল বৃক্ষের নিকটে গেল। অন্যান্য বৃক্ষ
মস্তক নাড়িয়া বৃক্ষভাষায় আপনাপন মনােভাব প্রকাশ
করিতে লাগিল।]
সবিতারাধন , তৃতীয় গর্ভা। নিবিড় বন। বটবৃক্ষের বুরি ধরিয়া উনাে ও ঝুনাে বৃক্ষতলে বসিয়া আছে, পত্রের ফাক্ দিয়া রৌদ্রকিরণ তাহাদের মুখের উপর বস্ত্রভাগে পড়িয়াছে। উনাে। বন ! বুননা। কেন দিদি ? উননা। আর কতকাল এমন করে গাছের ফলে, নদীর জলে দিন কাটা’ব ? বার বছর ত কেটে গেল, কই বন থেকে বার হবার ত কোন উপায় হল না। ঝুমনাে। উপায় হলেই কি হবে দিদি ? উম্নন। কেন, বাড়ী ফিরে যাব। আর কি বনের মাঝে থাকতে পারি ? দিনের বেলায় দুটী বনে বনে বনে একটু ঘুরে- ঘুরে বেড়াই—রাত্তির বেলা ঐ গাছের কোটর সার। তাতে পারি বসতে, আর না পারি শুতে। তার ওপর আবার বাঘ ভালুকের ডাক—গাছের ওপর আঁচড় কামড়। আঃ- এমন করে থাকি কেমন করে বন ? কুমনন। দিদি, অনেক দিন হাসিনি-হাসি পায়নি বলে। কিন্তু তােমার কথা শুনে আজ হাসতে ইচ্ছে কছে। হ্যা দিদি, বাড়ী ফিরে যাবে কার কাছে ? উমমম। কেন বাপ-
সবিতারাধন
বুননা। আমরা অভাগিনী-নইলে বাবা বনবাসে দেবে কেন?
তা’ হকগে। ভগবান যা করেন, তা ভালরই জন্যে ।
কিন্তু তুই এই কল্পতরুর নিলে কচ্ছিস কেমন করে ? এই
কল্পতরু আমাদের আশ্রয় না দিলে যে এতদিনে আমরা বাঘ
ভালুকের পেটে হজম্ হয়ে যেতুম্। দারুব্রহ্ম আমাদের
রক্ষা করেছেন—সেটা ভুলে যাচ্ছিস কেমন করে দিদি ?
উনাে। ত’ বটে, তা বটে! আচ্ছা বুনাে, তুই এমন সব বড় বড়
পণ্ডিতি পণ্ডিতি কথা শিখুলি কেমন করে বল দেখি?
তুইও যেখানে মানুষ, আমিও সেইখানে মানুষ। কৈ আমি ত
এমন বলতে পারি না—মনেও আনতে পারি না।
ঝুমন। তা জানি না—কোথা থেকে কি কথা আমার মুখ থেকে
বেরিয়ে যায় তা আমি বুঝতে পারি না। তবে অনেক
জিনিস মনে মনে ভাবি-ভাবতে ভাবতে যদি ভাবের ভাষা
বেরিয়ে পড়ে, তার খবর আমি বলতে পারি না।
উনাে। হু, কথাটাই বুঝলুম না। তা’ নাই বুঝলুম।
আস্থা
ঝুমনন, সারা জীবনটা কি আমাদের এই বনে কাটাতে হবে?
বুননা। মধুসূদনের ইচ্ছা। হা দিদি, বনবাসে তেমন কষ্ট কি
আছে বল দেখি ? বনবাসে এক দুঃখ, কিন্তু লােকালয়ে
যে হাজার দুঃখ।
উনাে। ওরেওরে ঝুমনো পালাই আয়, পালাই আয়, গাছের
ভেতর সেধুই আয়। ঐ দ্যাখ, ঐ দ্যা কি একটা জানােয়ার
আসছে। আয়-প, করে গাছের ভেতর সেঁধুই আয়।
t
সবিতারাধনা
[ ঝুমনােকে টানিয়া লইয়া—উনাে বৃক্ষের মধ্যে প্রবেশ
করিল। তৎপরে দেবদূতের প্রবেশ।]
দে দূত। বাঃ—এটা কি রকম হ’ল ! নারিকেল কর্তার কৃপায় মানুষের
সন্ধান পেলে—আর সন্ধান কেন—চলন্ত, জীবন্ত দু’ দুটো
ছুঁড়ীকে পরােক্ষে নয়—প্রত্যক্ষ দর্শন করলেম। তবে ছুঁড়ী
দুটো স’ল কোথা ? এই বৃক্ষমূলে বসেছিল, এক লহমায়
কোথায় হাওয়া হয়ে উড়ে গেল ? এ-এর যে দেখছি
দেব কন্যাদেরও হার মানালে ? এ্যা! আমি যে ধাঁধায়
পড়ে গেলে।
[ বৃক্ষ মধ্য হইতে সঙ্গীত রব আসিতে লাগিল
আজু বুঝি মঝু শুভদিন।
আঁধারে পেখমু আলােক ক্ষীণ।
দে দূত। ওঃ—একেবারে বােকা হয়ে গেলেম্। মানুষ দেখলে
ফুস মন্ত্রে উড়ে গেল। মানুষ উড়ল ত গীত আরম্ভ হল।
আমরা নেহাত, দেবদাস, তাই আঁতকে উঠলে না ;
মানুষ হলে কিন্তু দাঁতে দাঁত লেগে চিৎপটাং হয়ে পড়তে।
তা’র আর বাকীই বা কতটুকু বল ? এ্যা—এ আবার
গীত আরম্ভ হয় যে !
[ গান গায়িতে গায়িতে উনাে ও ঝুমনােবক্ষ মধ্য হইতে
বাহির হইয়া আসিল। দেবদূত সাশ্চর্য্যে তাহাদিগকে
দেখিতে লাগিল।]
সবিতারাধনা গীত। ' আজু বুঝি মঝু শুভদিন। আঁধারে পেখমু আলােক ক্ষীণ। বেকত বেকত তুহু কোন দেব, অগেয়ানী হাম সব নাহু কোন বােধ, যাে তুহু সাে তুহু পাওল সঙ্গ ছােড় না মােয় না কর রঙ্গ। ঝুনাে। আপনি কে মহাশয় ? অভাগিনীদের পরিত্রাণের উপায় করতে এ বিজন বনে আপনি কে এলেন দেব ? দে দূত। (স্বগতঃ ) দেখ-ব্যাপারটা একবার বােঝ! আমি কোথায় হা হো করে জিজ্ঞাসা করব—বল তােরা কে—কেন এখানে বসে আছিস ; না ওরাই আমায় জিজ্ঞাসা করে বসল। যাই হক, কিন্তু হুমকি ছাড় ছিনি—তা হলেই ঠ’কে যেতে হবে! (প্রকাশ্যে ) হু-বটে——তােদের বুঝি প্রাণে একটু ভয় নেই? আমায় জিজ্ঞাসা ক’ছিস- আমি কে? আরে ম’ল, আমার পােষাক দেখে বুঝছিস -আমি-আমি-আমিটা কে? উননা। আমি ত ভেবেছিলুম একটা জানােয়ার—তাই গাছের ভেতর লুকিয়েছিলুম। গলার আওয়াজে বুঝলুম্ জানােয়ার নয় তাই বেরিয়ে এলু। এখন বলুন—আপনি কে ? দে দূত। কি রহস্য-উপহাস-বিদ্রুপ ? তােদের বুঝি তয় টয় তেমন নেই! তােরা বুনাে বটে?
সবিতারাধনা
ঝুমনাে- না দেব, আমরা সতী-কন্যে। দেবতা, মানুষকে আমাদের
ভয় নেই, তবে পশুকে ভয় করি বটে। এ বনে থেকে বুঝি
তাও নেই। অপরাধ নেবেন না প্রভু,বলুন, আপনি কি
আমাদের উদ্ধার কৰ্ত্তা ?
দে দূত। (স্বগতঃ) নাঃ—ঠকে গেলে--এখানে হুমকি খাল না।
এ যাত্রাটাই ঠকার পালা দেখছি। ভারী কু-যাত্রায় এবার
পা বাড়িয়েছি। (প্রকাশ্যে ) হ—দেখ—আমি—আমি
হলে এই—এই-দেবতাদের দূত। সব খবরাখবর করি।
বুঝলে কিনা—তােমাদের সন্ধানেই এখানে এসেছি। ওর
নামটা কি—দেবকন্যাদের কাছে তােমাদের নে যাব
বলেই—আমি এখানে পদধূলি দিয়েছি। বস্তুত কথা-
বুঝলে কিনা—এখন চল।
ঝুনাে। দেবকন্যা!—তারা কোথায় ?
দে দূত। এই বন-প্রান্তে—সবােবর তীরে ইতুপূজা ক’রুতে এসেছেন।
তাদের হাত থেকে অর্ঘ্যের ফুল পড়ে যেতে তারা বুঝলেন,
এখানে কোন আৰ্ত্ত সাহায্য ভিক্ষায় বসে আছে। তােমরাই
সে আৰ্ত্ত। চল এখন দেবকন্যাদের কাছে তােমাদের
মঙ্গল হবে।
ঝুমনন। ঠাকুর তােমার এত দয়া? দিদি দেলি! চলুন দেব।
মধুসূদন, মধুদন, মধুসুদন।
-
[ সকলের প্রস্থান।
সবিতারাধনা
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
আরণ্য কানন।
(দেববালাগণ পুষ্প চয়নে বুতা )
চতু দে বা। সই ;
আমি আর আমি নই
ফুল পরশনে,
আপনারে হারায়েছি।
কুসুম-কাননে।
মনে হয় এ ভুলােক,
হয় বুঝি সে দ্যুলােক,
হেথায় মলয়া বহে উঠে গীত গান,
মানবের প্রেম প্রীতি মুগ্ধ করে প্রাণ।
জানিতাম, দেবতার,
ভালবেসে আত্মহারা,
আর বুঝি ভালবাসা কেহ নাহি জানে ;
সে ভুল ভেঙ্গেছে মাের আসিয়া এখানে।
প্র দে বা। কি লাে কুল খােয়ালি,
লােক হাসা’লি,
ভাসলি প্রেমে কা’র ;
ওলাে-মূল হারাপি,
হার মানালি,
মুখ দেখান ভার।
৩৬
সবিতারাধনা
এখন কেমন ক'রে,
ফিরব ঘরে,
বলব কি সেথায় ;
তুই ধরায় নেমে,
তুচ্ছ প্রেমে,
ভুলি আপনায় ।
ছি ছি লাজের কথা,
পাই যে ব্যথা,
ডুকরে উঠে প্রাণ ;
ও যে মান ভােয়ালি,
সব হারালি,
কাটুলি আপন কাণ।
দ্বি দে বা। সত্য সই, রসমই,
মানবের প্রেমে,
মজিলে কি, ডুবিলে কি
এ ধরায় নেমে ?
মােরা সবে দেববালা,
দেবলােকে থাকি,
তুচ্ছ প্রেমে মজি যদি
লাজের কি বাকী ?
চতু দে বা। মজি নাই, ডুবি নাই
প্রেমেতে কাহার;
মজিয়াছি হেরি’ শুধু
সবিতারাধনা
*
H
প্রকৃতি-ভাণ্ডার।
উজল হেথায় দিক
হেথা গীত গাহে পি,
হেথায় শ্যামল ক্ষেত্রে
তুলে নদী কুলুন
বন-কুসুমের গন্ধে
আকুল ব্যাকুল প্রাণ।
দ্বি দে বা। সই হারায়েছ জ্ঞান !
চ দে বা। হেথায় মলয় বায়
বহিয়া বহিয়া যায়,
সােণার বরণ রবি,
রজত জোছনা ধার,
সসীমে অসীমে হেথা
সব যেন একাকার।
মেঘে গুরু গরজন,
করে নৃত্য শিখীগণ,
বিজলি ছড়ায় হাসি,
উদার সিন্ধুর জল ;
বনস্পতি সুশােভিত
হেথা পুণ্য হিমাচল।
দ্বি দে বা।
আহা-প্রেম করেছে বিকল ।
চ দে বা,। হেথা আছে তপােবন,
আছে শাস্ত্র আলাপন,
t
সবিতারানা কান্ত পদাবলী হেথা ফুটে কবি-কুঞ্জ মাঝ, ধরার অনন্ত শােভা ভুলােকে দ্যুলােক সাজ। যত হেরি চারিধার, মনে হয় ততবার, কি ভুল করেছি সখি নিন্দি এই ধরাতল, যেথা পাপ পুণ্য ভেদে শান্তি-শাস্তি-কৰ্ম্মফল ! 'তৃ দে বা। তােদর অন্ত পাওয়া ভার- বলে পরে আসল কথা, জাত, থাকে না আর। তােরা—জানিস বুঝিস সব, তবু তুলবি একটা রব ; ধরা কা'র ভাগ্যে কারা স্বর্গ কা’ কপালে কেউ পশু বা কেউ দেবতা যে যা’র কর্ম ফলে। স্বর্গ নরক এই খানেতে এ ঠাই সহজ নয় ; মানুষ গুলাে মানুষ হলে দেবতা 'রাই হয়।
সবিতারাধনা
[ দেবদূতের পশ্চাতে উনাে ও ঝুমনাের প্রবেশ
দে দূত। দেবি,
আনিয়াছি সন্ধানের বস্তু সঙ্গে করে।
অনুমতি চাহি এবে
যেতে কাৰ্যান্তরে।
তৃ দে বা। সাধু তুমি—লভহ বিশ্রাম।
দে দূত। (স্বগতঃ ) আঃ বাঁচা গেল—ফুরফুরে হাওয়ায় গাটা একটু
জুড়াই গে।
[ প্রস্থান
তৃ দে বা। তােমরা কে গা বাছা ?
ঝুমননা। আমরা সতি-কন্যে-বড় দারিদ্দির মা বড় দারিদ্দির।
উমনাে। বাবা আমাদের বনবাস দিয়ে গেছেন।
ঝুমনন। ছি দিদি।
প্র দে বা। বাপে বনবাস দিয়ে গেল—সে আমার কেমন ?
দ্বি দে বা। তা’না হলে আর সংসার কি ? সই এখন বুঝছ কি ?
তৃ দে বা। হু! হ্যা গা তােমাদের নাম কি গা?
উনাে। এই আমার নাম উনাে—আর এর নাম ঝুমনো—এ আমার
ছোট ব’ন। আমরা বার বছর এই বনে আছি—গাছের
ফলে, নদীর জলে এই বার বছর কাটিয়েছি। দেবতা
মানুষের মুখ দেখিনি এই ক বছর—আজ তােমাদের চরণ
দেখে উদ্ধার হলুম মা।
প্র দে বা। ওঃ মেয়েটা একটানা কথার স্রোতে কতটা ভেসে গেল,
.
দেখেছ!
সবিতারাধনা তৃ দে । হু-অভাবই উপায়ের প্রসূতী। আচ্ছাউমনাে ঝুমনাে তােরা এক কাজ ক দেখি। পুষ্করণীতে ডুব দিয়ে স্নান ক'রে আয়-আমরা তােদের সূৰ্য পূজার মন্ত্র দেবপূজার পদ্ধতি শিখাব। সে ব্ৰত, সে পূজা করলে তােদের দুঃখ কষ্ট দূর হবে, অনন্ত সুখ, অনন্ত শান্তির অধিকারিণী হবি। যা’ স্নান করে আয়—তােদের দুঃখের দিন চলে গেছে, সুখের দিন এসে পড়েছে। [ উনাে ও ঝুমনাে কৃতজ্ঞতা ব্যঞ্জক ভাব প্রদর্শন করিয়া প্রস্থান করিল প্র দে বা। সই, এরা সবিতারাধনা করবে কি ? এদের মুখে যে মন্ত্রই উচ্চারিত হবে না। দ্বি দে বা। সে কথা বড় মিথ্যা নয় । চ দে বা। তাকি বলা যায়-দৈববলে পঙ্গুও ত গিরিলন করে। তৃ দে বা। নিশ্চয় ! এই উনাে ঝুমনাে যারা এখন জগতের চক্ষে ঘৃণ্য, তারাই হয়ত একদিন জগতে সবিতা পূজার প্রচার- কারিণী হবে। এই ভারাপণ কবার জন্যই হয়ত আমাদের এখানে আসতে হয়েছে। চুপ—ঐ তারা আসছে। [ উনাে ও ঝুমনাের প্রবেশ ঝুমনাে। মা-মামাগাে! তৃ দে বা। কি মা ? ঝুমনাে। আমাদের চান্ করা হ’ল না মা। পুকুরে নামতেই পুকুরের জল শুকিয়ে গেল, মাছ গুলাে সব ধড়ফড় করূতে লাগল, ৪১ সবিতারাধনা জকে দাড়িয়ে যারা জপ, তপ করছিল, তারা সব, কোষা- কুষি নিয়ে দাড়িয়ে রইল। তাই দেখে আমরা পালিয়ে এসেছি। উম্নন। মা গাে আমাদের কি উপায় হবে ? তৃ দে বা। বুঝেছি, তােরা বড় অভাগিনী! প্র দে বা। বিলক্ষণ-নইলে বাপ, মা আবার সখ করে কি কখনও এমন মেয়ে দুটীকে বনবাসে দেয় ? তৃ দে বা। উপহাস, বিদ্রুপ সকল সময়ে শােভনীয় নয় সখি। হ্যা দেখ, উনাে ঝুমনো, তােরা এই আংটীটা নিয়ে শুনাে সবােবরে ফেলে দিগে যা-তা হলেই যেমন জল তেমনি হবে। [ অঙ্গুরী লইয়া উম্ননা ও ঝুমনাের প্রস্থান দ্বি দে বা। হ্যা সখি ? তৃ দে বা। থাম--যা জিজ্ঞাসা করবে, তা বুঝেছি। বিদ্রুপ-স্রোতে এখন ভাটা পড়। কর্তব্য-পালন করতে এসেছি—কৰ্তব্য- পালন করি এস। চ দে বা। কি ক’তে হবে—বল সখি, আমি তাই করতে প্রস্তুত। প্র দে বা। আর আমরাই অপ্রস্তুত নাকি ? তৃ দে বা। ভাল—আমাদের সমবেত চেষ্টায় সুফলই ফল্বে। এস আমাদের চুল কেটে চামর করি, জিহবা কেটে প্রদীপ করি, . শিরা কেটে সতে করি, বুক চিরে ধূপ জ্বালি। ওড় ফুল, কা-সিন্দুর, রক্ত চন্দন, জবা, দূর্বা, কাঁচা দুক্ষ, হিংচা, কলমি,
সবিতারাধনা
শুনি শাক প্রভৃতি ও পঞ্চ শস্যের যােগাড় করে রাখি।
তা’র স্নান করে এলেই তাদের পূজায় বসাব।
[ তথা করণ। উনাে ও বুনাের প্রবেশ
চ দে বা। কিগো স্নান করে ফিতে তােদের এত বিলম্ব হ’ল যে ?
ঝুম্নাে। মা আমরা—আবার এক বিপদে পড়েছি। সে আংটী টা
হারিয়ে ফেলেছি। তাই খুঁজতে খুজতে এত দেরী হ’ল।
কিন্তু এত খুঁজেও আংটী পেলুম না।
তৃ দে বা। আমাদের আংটা আমাদের কাছে এসেছে-ততাদের ভয়
নেই। নে এখন পূজার আসনে ব’স-পূজার মন্ত্র তােদের
কাণে কাণে বলে দি;
[ উনাে ও ঝুমনাে আসনে উপবিষ্টা হইল। দেববালাগণ
তাহাদের ঘেরিয়া কর্ণে মন্ত্র দান করিতে লাগিলেন]
তৃ দে বা। কিরে উনাে, কিরে ঝুমনােতাের এখন কি দেখছিস ?
উম্নন। দেখছি, বেশ দেছি, খুব দেখছি।
চতু দে বা। বল বল্ কি দেখছিস!
ঝুম্নন। দেখছি-সূর্যদেব তাম্র বর্ণে উদয় হয়ে আমার হাত থেকে
হাতে হাতে পূজা নিচ্ছেন। “জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং
মহাদ্যুতিং-ধ্বত্ত্বারিং সর্বপাপঘ্নং”—ঐ যাঃ-ঠাকুর অদৃশ্য
হলেন যে!
তৃ দে বা। ডাক-ডাক আবার ডাক্-ব্যাকুল হয়ে ডাক্।
ঝুম্নাে। হয়েছে—হয়েছে -ঠাকুর আবার এসেছেন।
চতু দে বা। বেশ হয়েছে--এইবার বর প্রার্থনা কর।
সবিতারাধনা
৫।
প্র দে বা। দূর ছুড়ীরা কেবল পূজাই করছি—বর চা।
উমনাে। বর চাইব—আচ্ছা চাইছি। খােস পাঁচড়া দূর হ’
[ দেববালাগণের হাস্য
প্র দে বা। দূর ছুড়ী—ভাল বর চা।
ঝুমনাে। বাপ, মার দুঃখ দূর হ’ক—তাঁদের ঐশ্বৰ্য হ’-
দ্বি দে বা। বাপ, মার জন্যই চাইছি—নিজেদের জন্য কিছু বর চা।
ঝুমনাে। নিজেদের জন্যে ?-আচ্ছা চাইছি। দিদির যেন রাজপুত্তরের
সঙ্গে বিয়ে হয় ; আর আমার বিয়ে পাত্তরের সঙ্গে হলেই
হবে। হে ঠাকুর তাই হক, তাই হক, তাই হ’-
বেশী লােভ ভাল নয়।
তৃ দে বা। বর ত চাইলি-ঠাকুর কি বল্লেন রে ?
উম্ননা, ঝুমনাে। ঠাকুর বল্লেন-“তথাস্তু”।
তৃ দে বা। বেশ হয়েছে-তােদের পূজা সার্থক হয়েছে। আজ
আল আলন খেতে হয়, হবিস্ত করতে হয়—তা করিস। আর
এই ঘট কার্তিকের সংক্রান্তির দিন থেকে আরম্ভ করে
অগ্রহায়ণ মাসটা গােটা প্রতি রবিবারে পূজা করি ।
ততাদের দুঃখ দূর হবে, মনস্কামনা পূর্ণ হবে। এখন তােরা
বিমুখ হ’, আমরা স্বস্থানে ফিরে যাই—আমাদের কাজ শেষ
হয়েছে।
[ উমনাে ও ঝুম্ননা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিল। দেববালাগণ বায়ু-
মণ্ডলে মিশিয়া গেলেন। ব্যোম-পথে অস্পষ্ট মধুর যন্ত্রধ্বনি
হইতে লাগিল। ]
৪৪
সবিতারাধনা
উনাে। ব’ন তারা কোথায় লুকোলেন ?
ঝুমনাে। তারা দেবকন্যা, দেবলোকে চলে গেলেন। চল আমরা
আল আলনর যােগাড় দেখি।
উনাে। আহা কেন মরুতে বিমুখ হলুম ? যদি বিমুখ না হতু, তাহলে
ত বেশ রথের চাকাখানা ধরে স্বর্গে যেতুম! তুই বুদ্ধি
দিলিনে কেন বন ?
ঝুমনাে। কি হয় দিদি ? তাঁরা হলেন দেবতা, আর আমরা হলুম
মানুষ—আমরা তাঁদের সঙ্গে যেতে পাব কেন ? চল, এখন
হবিষির উপায় করি।
[ প্রস্থান
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
কুমারশালার সম্মুখ।
কুম্ভকারগণ স্থানে স্থানে মৃত্তিকা খনন করিতেছে, স্থানে
স্থানে বসিয়া মৃৎপাত্রাদি গড়িতেছে, এক স্থানে স্তুপাকারে
হাঁড়ি প্রভৃতি পােড়াইতেছে।
প্র কু। 'হৈ সনাতন-হাঁড়ির পােড় টা দ্যাত একবার। আল অল্প
হচ্ছে নাকি ?
ও আর দ্যাব কি-ও ঠিক হ’তেছে। ঢিমা আলৈই পােড়,
ঠি হয়। আরে দ্যাখ দ্যাখ, একবার ওই দিকটায় চায়ে
দ্বি কু।
সবিতারাধনা
.
দ্যাখ-কে দুটা
—কে দুটা মেয়া আসতেছে। বলি, কোন্ খরুদের
নাকি ?
[ উম্ননা ও ঝুমনাের প্রবেশ
কে গা-তােমরা কাদের গা ?
বুননা। আমরা বড় দারিদ্দির গাে। তা বাবা আমরা একটা বৰ্ত্ত
করেছি, সেই বর্তের জন্যে আজ আমাদের আলআলন খেতে
হবে। দারিদ্দির আমরা,আর কোথায় কি পাব বাবা? চারটা
কঁাচরা কলমী শাক পেয়েছি—তাই সিদ্ধ করে দু’ বনে
খাব। তাহলেই আমাদের বৰ্ত্তের নিয়ম পালন করা হবে।
প্র কু। তা আমরা কি ক’ব বাছা ?
উনাে। দয়া করে তােমরা যদি একখানা খােলা খাও বাবা ।
প্র কু। পাজি বেটী, নচ্ছার বেটা
দ্বি কু। ছুঁচো বেটি, হেঁচড়ী বেটি—
প্র কু। সব্বনাশী বেটি, সব্বনাশ করতে এসেছে। দূর হ, দুর হ।
আমার এক পুয়া হাঁড়ি, একপঁইশাল হাঁড়ি—এখনও একটা
নামাতে পারিনি—আর তত বেটিরা কিনা ঐ অলুক্ষুণে নাম
করলি ? বের হ বেটীরা দূর হ,—দে সনাতন বেটীদের বের
করে দে, ঢেকা ডােকা দিয়ে বের করে দে। সর্বনাশী বেটি,
হাড় হাবাতে বেটি । দূর-দূর।
ঝুমনাে। যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি—মেরনা বাবা, গাল দিও না বাবা। ক্ষেপ
ব’ন আমার, কি বলতে কি বলে ফেলেছে। যাচ্ছি বাবা
যাচ্ছি—ভগবান তােমাদের মঙ্গল করুন।
[ উনাে ও এনাের প্রস্থান
•
সবিতারাধনা
দ্বি কু।
ও সম্মন্দি, ও সম্মন্দি সব্বনাশ হ’ল, সব্বনাশ হ’ল। ঐ দ্যাখ,
ঐ দ্যাখ, সােণা পােড়া হাঁড়ি সব কঁচা পােড়া হয়ে গেল,
পুঁইশালকে পঁইশাল হাঁড়ি চড়বড়, চড়বড় করতে লেগেছে।
প্র কু। বলিস কিরে, বলিস কিরে? ওরে তাইত রে—তাইত রে।
ফেরা, ফের-তা’দের হাতে পায়ে ধরে ফেরা।
[ দ্বিতীয় কুন্তকারের প্রস্থান
ও বাবা, ওরা কারা গাে? ওরা দ্যাব নাকি—ছলতে এছল
নাকি ? নাকে কাণে খৎ বাবা—কেউ এলে আর কাকেও
কিছু বলব না।
[ উন্ননা, ঝুমনাে ও দ্বিতীয় কুন্তকারের প্রবেশ
এই যে মা সকল—এস মা, এস। আমরা ছেলে মানুষ,
মরুখু মানুষ-কি বল্তে কি বলে ফেলিছি মা, রাগ
কোরােনি। ক্ষেমা দাও মা, ক্ষেমা কর মা। দয়াময়ী
দয়া কর মা।
দি । আপনকার যত ঘড়ির আবিক থাকে, তা বল মাদাতে
কুটা করে তাপনকার বাড়ী পৌছে দে আসি।
ঝুমননা। না বাবা, রাগ কি বাবা! চলে যেতে বলেছিলে, তাই চলে
গিছলুম; ডেকেছ আবার এসেছি।
প্র কু। বেশ কয়েছ মা, বেশ ক'রেছ—এই ত দয়াময়ীর নােক্ষণ।
তা এখন বল মা, ক’টা হাঁড়ি চাই—আমরা তােমাদের বাড়ী
পৌছে দে আসি।
ঝুমনাে। বেশী হাঁড়ি নিয়ে আর কি ক’ব বল ? শাক সিদ্ধ করে খাক
ৰৈ নয়। এই একটা নিলুম।
সবিতারাধনা
[ঝুনো একটা হাঁড়ি তুলিয়া লইল। কুমারশালার
ভাঙ্গা ফাটা হাঁড়িগুলি পূর্বাবস্থা প্রাপ্ত হইল ]
কুম্ভকারগণ। মাগাে দয়াময়ী-
[ ভূমিষ্ঠ হইয়া উম্নাে ও ঝুনােকে প্রণাম করিল। উনাে
ও ঝুমূনাে চলিয়া গেলে তাহাদের উদ্দেশে তাহারা বারবার
প্রণাম করিতে লাগিল ]
«
!
তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
ধনরাজের বাটীর দালান।
( ধনরাজ ও লক্ষ্মীমণির প্রবেশ)
ধন।
নেই।
ব্রাহ্মণী, ব্রাহ্মণী—আচ্ছা, তুমি অমন করে বসে বসে রাত,
দিন কি ভাব বল দেখি? কেন, অত ভাবনা কিসের, চখে
জল কিসের ? আমার দারিদ্র ঘুচেছে, ঔরি চৌরি ঘর দুয়ার
হয়েছে, ক্ষেত খামার হয়েছে আমার এখন কিছুরই অভাব
গােলায় ধান, সিন্দুকে কাপড়, তােমার গায়ে
দু’ পাঁচখানা অলঙ্কার-কিই বা আর হয়নি বল? এখন দাস
দাসীতে তােমার পার্ট করে, চকবাণে রসুই করে,
দশ পাঁচ জনে আমায় মাগিরি করে। তবু তুমি কি ভাব,
তবু তুমি কেন কাদা যে বল না ব্রাহ্মণী।
কি আর ভাব,শরীর তেমন ভাল নয়, তাই
লী।
লাগে না,
ধন।
ওকি! কথা বলতে বলতে আবার চক্ষে জল এল যে।
তােমার কি হয়েছে—ব না, ওগাে বল না ?
কিছু হয়নি। চ’খে একটা পােক। পড়ল বুঝি,
ক কব করে ।
मी
সবিতারাধনা
ধন।
লক্ষ্মী।
উহ—কথাটা মনে লাল্ল না। একটা কিছু তােমার
হয়েছে। যাই হােক, চিকিচ্ছে করাতে হ’ল। নইলে
পাঁচজনে আমায় ভারী দুষবে। দেখি, একবার কণ্ঠাভরণ
কবিরাজ মশায়ের সন্ধান করি। লােগ দেখে তিনি রােগিণীর
যা হয় ব্যবস্থা কবে।
, না,তােমায় কোথাও যেতে হবে না—আমার কোনাে
রােগ হয় নি।
বটে আর কি! তুমি রােগ পুষে রাখ, আর পাঁচজনে আমার
দুষুক আর কি ? বলবে—পয়সা খরচের ভয়ে বামুণ বন্তি ডাকে
। আমি সে পাঠ পড়িনি।
[ ধনরাজের প্রস্থান
ধন।
লক্ষ্মী।
আমার কি হয়েছে কে বুঝবে, ভগবান্ ! তুমি নিষ্ঠুর, না
করুণাময় ? যদি মেয়ে দুটোই গেল, তবে আমায় বাঁচিয়ে
রাখলে কেন ? দারিদ্রের যাতনায় ব্রাহ্মণ তাদের বনবাসে
দিয়েছেন। এখন ত আমার দারিদ্র ঘুচেছে; কিন্তু তারা
কোথায় ? আমার হারানিধিরা কোথায়? আমার সুখে কি
হবে, ঐশ্বর্য্যে কি হ'রে—আমার যে বুক ভেঙ্গে গেছে।
[ কতিপয় বালক বালিকার প্রবেশ
প্র বা। মুড়ী দে খুড়ী মা, মােয়া দে খুড়ী মা। আজ তােকে একটা
ভাল খবর শােনাব। দ্যাখ দ্যাখ, কা’র আসূছে দ্যাখ,
লক্ষ্মী। আয় সব আয়। এতক্ষণ তােরা আসিনি'কেন রে ?
বি বা। আমরা একটা মজা দেখছিলুম।
।
সবিতারাধনা
দ্বি বা।
প্র বা। বলিনি, বলিনি তাহলে মজা হবে না।
দে খুড়ী মা, মুড়ী দে—তবে বলব।
লক্ষ্মী। তােরা বসে খেলা কর—আমি মুড়ী মােয়া আছি।
[ লক্ষ্মীমণির প্রস্থান
[ বালক বালিকাগণ খেলিতে খেলিতে গায়িতে লাগিল ]
(গীত)
আগডুম বাগডুম্ ঘােড়াডুম্ সাজে,
তাল মেঘর ঘাগর বাজে।
বাজতে বাজতে চলল ডুলি,
ভুলি গেল সেই কমলা পুলি।
কলা পুলির টিয়েটা
সূয্যি মামার বিয়েটা।
হাড়, মড় মড় কেলে জিরে,
রুসুম কুসুম পানের বিড়ে।
আয় রঙ্গ হাটে যাই,
এক খিলি পান কিনে খাই।
সেই খিলিটি
ফোপরা,
মায়ে ঝিয়ে ঝগড়া।
হলুদ বনে কলুদ ফুল,
তারার নামে টগর ফুল।
সবিতাধনা
তৃ বা। ইকিড়, মিকি, খেলবি ভাই?
প্র বা। না না-খুড়ীমা মুড়ী মােয়া আছে। এইবার উনাে
ঝুমনাের কথা খুড়ীমাকে বলি ভাই-খুড়ী মা খুসী হবে।
প্র বা। নাম্ ধ’রছি যে—তারা খুড়ীমার মেয়ে, তাদের দিদি
বলতে পারিনি। ব’তে হয় উনাে দিদি আর ঝুমনাে
দিদি।
লক্ষ্মী।
[ লক্ষ্মীমণির বেগে প্রবেশ
তােরা কি বললি—কি বলি—উনাে ঝুমনাে ? তােরা
এ নাম কোথায় গুলি ?
[ লক্ষ্মীমণি কাঁদিতে লাগিল
বল--বল-চুপ করে রইলি কেন ?
লক্ষ্মী।
[ লক্ষ্মীমণির হস্ত হইতে খাদ্য দ্রব্যাদি ভূমিতে পড়িয়া গেল
এ বা। একি হ’ল ভাই-খুড়ী মা যে কাঁদতে লাগল।
হ্যা বাবা কঁছি, ও নাম অনেক দিন পরে শুনলুম বলে
কান্না আপনি আছে। বল্-বাবা বল, তােরা ও নাম
কোথায় গুলি ?
প্র বা। এই—এই -আমরা-
প্র বা। তুই থাম্, তুই থাম—ঢোক গিলে গিলে তােকে আর বলতে
হবে না।
দ্বি বা। আচ্ছা ভাই আমি বলছি।
প্র বা। তুই ছেলে মানুষ, তুই বন্ধুতে পাবিকেন? ঈড়া, আমি
বলছি। জান—খুড়ী মা, আমরা পথের ধারে খেলছিলু,
সবিতারাধনা
দু’জন মেয়ে এসে আমাদের অনেক কথা জিগগেস্ কল্পে।
আমরা উত্তর দিতে না পেরে তাদের পদ্ম পিসির কাছে
নিয়ে গেলুম্ ।
দ্বি বা।
প্র বা। আর পদ্ম পিসি তাদের দেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বললে
ও উন্ননা ও ঝুমননা, তােরা কোথা থেকে রে!
পর পিসিই ত ব’ল্লে“উম্ননা দিদি, ঝুমননা দিদি তােমার
মেয়ে।
প্র বা। তারা তপিস্তে ক’ত্তে গিছল, না খুড়ী মা ?
দ্বি বা। হ্যা খুড়ী মা, তারা তােমার মেয়ে খুড়ী মা ?
হ্যা বাবা, হ্যা বাবা, তারা কি বেঁচে আছে বাবা? আমি
রাক্ষসী মা, তাদের বাঘ ভালুকের মুখে পাঠিয়েছিলুম।
দু’থানা পিটে, একটু পরমান্নের জন্যে বাছারা আমার বনবাসে
গেছে। সেই পিটে পরমান্ন আমার বাড়ীতে এখন গড়াগড়ি
যাচ্ছে, দাস দাসীতে খাচ্ছে। আহা বাছারে-
লক্ষ্মী।
[ লক্ষ্মীমণি কাঁদিতে লাগিল
প্র বা। কেঁদনা খুড়ী মা, কেঁদনা। উমনাে দিদি, ঝুমনন দিদি সত্যি
সত্যি বেচে আছে।
লক্ষ্মী।
তােদের মুখে ফুল চন্দন পড়ক বাবা। তরী-অমর হয়ে
থাক্ বাবা।
প্ৰ বা'। খুড়ী মা, খুড়ী মা—ঐ ঐ
এ বা। ঐ উমনাে দিদি, ঝুনাে দিদি আসছে।
কৈ কৈ ?
লক্ষ্মী।
৩
সবিতারাধনা
[ উমনাে ও ঝুমনাের প্রবেশ
উ ও ঝু। মামা-মা।
[ মাতা ও কন্যাদ্বয় পরস্পরে প্রগাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধা
হইল ; বালকগণ আনন্দে করতালি দিল ]
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
ত্রিপান্তর মাঠ।
( বীরবাহ ও চিত্রসেনের প্রবেশ)
বীরবাহু এম জল মুছিতেছেন, চিত্রসেন তাঁহার পার্শ্বে
দাঁড়াইয়া তাহাকে উষ্ণীষ দ্বারা ব্যজন করিতেছেন।
বীর।
সখা, প্রাণ যায়-তৃষ্ণায় আর প্রাণ বাঁচে না। বুক ফেটে
গেল, গলা শুকিয়ে গেল। মৃগয়া ক’তে এসে প্রাণ
খােয়ালে। উঃ কি করি—কি করি? জল জল—একবিন্দু
জল। বিন্দুমাত্র জলের বিনিময়ে আমি আমার রাজ্য দেব।
জল, জল-~একবিন্দু জল।
স্থির হও সখা, স্থির হও । জন্বেষণে আমি কিঙ্কর পাঠিয়েছি।
একটু স্থির হও, উতলা হলে তৃষ্ণা আরও বাড়বে—তখন
আর উপায় থাকবে না।
চিত্র।
৫৪
সবিতারাধন। বীর। উপায়! উপায় ! নিরুপায়। এই ত্ৰিপান্তর, মাঠেই বুঝি জল বিহনে আমাদের সকলকে প্রাণত্যাগ ক’রুতে হল। হয়, হস্তী, গােকজন সব মারা পড়ল; চারিদিক ধূ ধূ ক’ছে— এখানে জল কোথায় ? সখা, ভগবানুকে স্মরণ কর, আজ আমাদের শেষ দিন। ডাক-ডাক, সকলকে ডাক। সকলে একস্থানে বসে ভগবানকে ডাকি এস-সকলে একস্থানে ব'সে মরি এস। ডাক, ডাক—সকলকে একস্থানে সমবেত চিত্র। বীর। চিত্র। ঐ এসেছে, ঐ এসেছে। স্বর্ণ ও রৌপ্য ভৃঙ্গার পূর্ণ করে ঐ কিঙ্কর জল আছে। স্থির হও সখা, স্থির হও। জল-জল-কৈ—কৈ ? ঐ-ঐ- [ দুইজন কিঙ্কর স্বর্ণ ও রোপ্য ভৃঙ্গার পরিপূর্ণ জল আনয়ন করিল। স্বর্ণ ভৃঙ্গারের জল বীরবাহু পান করিলেন, রৌপ্য ভৃঙ্গারের জল চিত্রসেন পান করিলেন।] বীর। চিত্র। ধন্য ভগবা, ধন্য ভগবান্ ! যাও কিঙ্কর, অবশিষ্ট জল তােমরা পান করগে। [ কিঙ্করদ্বয়ের প্রস্থান সখা, ভগবানের দয়াটা একবার দেখলে ? ব্যাকুল হয়ে তাকে ডাকলে, তাঁর দয়া থেকে বঞ্চিত হতে হয় না। সত্য সখা-ব্যাকুল হয়ে তাকে ডাকলে তিনি কি আর থাকতে পারেন! বীর।
সনিধন
বীর।
[ একজন কিঙ্করের প্রবেশ
কির। মহারাজ একটা কথা বলতে এসেছি—ভয়ে বলব, না নির্ভয়ে,
বলব ?
বীর।
ভয় ছেড়ে নির্ভয়ে বল ।
কির। মহারাজ, মাত্র দুই গাড়, জল এনেছিলুম্। তা মহারাজ
খেয়েছেন, পাত্তর মশায় খেয়েছেন, লােকজন খেয়েছে, হাতী,
ঘােড়া সব সে প্রসাদী জল খেয়েছে ; তবু যেমন গাড়, ভরা
জল তেমনি আছে। এই দেখুন না ?
[ ভৃঙ্গার প্রদর্শন
কি আশ্চৰ্য্য-সত্যই ত! এ ভৃঙ্গারের গুণ, না জলের গুণ?
তােরা এ জল কোথা থেকে আলি ?
কিঙ্কর। এক ব্রাহ্মণের বাড়ী থেকে। একটা গাছে উঠে আমরা
বাড়ীটা ঠিক করে, বাড়ীর রাস্তা ঠিক করে হবে সে বাড়ী
গিছলুম। ব্রাহ্মণের দুটী কন্যা-দুই গাড়, জল দিলেন।
বীর।
ৰাহ্মণ কন্যা'রা কি তাপস কন্যা ?
তারা গৃহস্থ-কন্যা দুটী কুমারী !
আশ্চর্য কন্যা।
কিঙ্কর। মহারাজ দুই গাড়, জলে এই দুই গাছি কেশ ছিল।
দেখি—দেখি। ওঃ কি দীর্ঘ কেশ ! , আচ্ছা যাও কিঙ্কর।
[ কিঙ্করের স্থান
সখা ! এ কন্যাদ্বয়ের সন্ধান করা ত আমাদের উচিত। এর
আমাদের জীবন রক্ষা করেছে।
বীর।
***
সবিতায়াম
চিত্র।
বীর।
তা খুব উচিত।
চল, তবে ছদ্মবেশে তাদের দেখে আসি। তারপর তাদের
পুরস্কারের ব্যবস্থা করা যাবে।
যেমন অভিরুচি তােমার ।
[ উভয়ের প্রস্থান
।
চিত্র।
তৃতীয় গাঙ্ক।
ধনরাজের বাটীর কক্ষ।
ধনরাজ ও লক্ষ্মীমণি।
লক্ষ্মী।
দেখলে ত, দেখলে ত! আর মেয়েদের কিছু বল না।
তুমি ওদের বনবাসে দিলে—ওরা বনে থেকে, দেবতাকে
তুষ্ট করে তােমার দুর্দিন ঘুচিয়ে দিলে। তারপর সােণার
ঘাড়মােড়া নিয়ে যখন ব্লাছারা বাড়ী ফিরে এল, তখনও তুমি
চোর বলে তাদের বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইলে ।
শাকের ক্ষেত্নে বাছারা সােণার তাল কুড়িয়ে পেলে, আর
তুমি কিনা বন-উরা রাজা পাত্তর মেরে সােণার ঘাড় মােড়া
চুরী করে এনেছে ?,
ধন।.it: আরে ছাই তখন আমি কি তা জানি ?
লক্ষ্মী। তখন না জেনে থাক, এখন জান। ঘাড় মােড়া পেয়েও
ৰাছারা নিতে চায়নি। তবে দেবতার দেওয়া জিনিস বলেই
সবিতারাধনা
ধন।
লক্ষ্মী।
ধন।
বাছারা নিয়েছে। আর নিয়েছে যে তােমারই জন্যে।
তারপর, রাজারা মৃগয়া করতে এসে, খেতে জল পায় না,
তেষ্টায় তাদের ছাতি ফেটে যাচ্ছে, তাদের লােক জন
এখানে জল নিতে এল, তখন তুমি একবারে বেঁউরে উঠলে
ব’লে রাজার লােক তােমায় ধরূতে আসছে।
আর ধ’কূলেই বা কি কবুতুম বল ?
কেন ধ’রূবে ? দোষে থাকি, তবে ত ধরূবে—নইলে কে
ধরে-কে এক কথা বলে ? তুমি সতীর পতি, মেয়েরা
আমার সতী-কন্যেদেবতার আশীর্বাদে কে আমাদের এক
কথা বলে ? তবে আপন দোষে আপনি দোষী হও, তার
ওপর আর কথা নেই।
ইস—আজ যে খুব লম্বা লম্বা কথা শুনছি, ব্যাপার কি ?
আজ ববার দিন পেয়েছি-তাই বছি। তুমি মেয়ে দুটোকে
নবাসে দিলে, তাও সয়েছি ; মেয়েরা ঘরে এল-নাপিত,
ডাকিয়ে তাদের নখ কাটালু, কাপুড়ে ডেকে কাপড়
দিলুম, স্যাক্রা ডেকে গয়না দিলুম—তােমায় লুকিয়ে লুকিয়ে
আমায় সব করতে হ’ল, আমি তাও সয়েছি। কিন্তু বাছাদের
চোর অপবাদ আমি সহি করতে পারিনি, পারবও না। যা
থােক, সে অপবাদ তাদের ঘুচেছে। তাই আমার এ
আনন্দ-সেই আনন্দে আমার মুখে এত কথা শুনতে পেলে
বুঝেছ ?
[ প্রস্থান
তাই ত ব্রাহ্মণী হ’ল কি—এ যে একবারে পণ্ডিত হয়ে পড়ল
লক্ষ্মী।
ধন।
৪৮
সবিতারাধনা
দেখছি। তা হবে, তা হবে -সময়ে অমন হয়। সময়ের
গুণে আমিও যেমন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ-ব্রাহ্মণীও তেমনি
সরস্বতী ঠাকুরুণ। তা’ বেশ হয়েছে, তা বেশ হয়েছে।
[ উনাে ও ঝুমনাের প্রবেশ
উনাে। বাবা।
কি মা ?
উনাে। রাজবাড়ী থেকে তােমায় ডাকতে এসেছে। যাও, যাও
চটপট যাও।
ধন।
এভ্যালা রাজার পাল্লায় পড়া গেল ত ? একবার ত জল
নিয়ে গেল, এবার আবার কি?
ঝুমনাে। না বাবা, ইনি মৃগয়া করা রাজা নন-ইনি দেশের রাজা।
ধন। দেশের রাজা-কি সর্বনাশ! রাজ বাড়ীতে আমার ত কখন
ডাক পড়েনি—আজ এ ফাসাদ কেন ? একটা চুরী ফুরির
দাবী নয় ত ? তােদের ঐ সােণার ঘাড় মােড়ার জন্যেই ত
আমার সদাই ভয়।
বুম্নাে। বাবা, এখনও তােমার অবিশ্বাস! দেখ বাবা, দেবতার
দেওয়া জিনিসে অবিশ্বাস করতে নেই—তা’ হলে অমঙ্গল
হয়।
উনাে। হ্যা বাবা, আমরা কি তােমার শর? আমরা বিদেয়
হলে কি তুমি খুসী হও বাবা ?
রাম বল, রাম বল। বলি তা নয়, তা নয়। ভাবছি,
এমন সময়ে রাজবাড়ী থেকে ডাক এল কেন ? সেই
ভাবনাতেই ত এমন কাহিল হয়ে পড়েছি।
བ ། །
,
১
সবিভাধন
কিরে ?
উনাে। ভাবনা কি বাবা? রাজার মাতৃশ্রাদ্ধ, তােমায় গিয়ে শ্রাদ্ধ
কৰ্ম্ম করাতে হবে। তাতে আর ভাবনা কি বাবা ? যাও,
যাও–রাজ বাড়ী যাও বাবা।
ধন । বলিস কিরে—রাজ বাড়ীতে আমি শ্রাদ্ধ করা’ব কিরে ?
আমি না জানি মন্তর, না জানি তন্তর। মুখ ব্রাহ্মণ আমি,
শাস্তর ফাস্তর জানি না, আমি রাজার বাড়ী শ্রাদ্ধ করা’ব
? এই দ্যাখ,—কি একটা বিপদ ঘটল আবার!
বুননা। কোন বিপদের ভয় নেই বাবা। তুমি স্বচ্ছন্দে যাও। দেশে
ব্রাহ্মণ না পেয়ে রাজা তােমায় পুরােহিত পদে বরণ করূবেন ?
তুমি যাও, ফেঁটা কেটে জোড় পরে তুমি স্বচ্ছন্দে যাও, কোন
বিঘ্ন হবে না। আমরা বৰ্ত্ত করতে বসলুম। দেবতার
নামে, দেবতার বরে তুমি এক বাক্য ব’তে দশ বাক্য
ব’বে। সরস্বতী তােমার কণ্ঠে ব’সবেন। রাশি রাশি
শ্লোক তুমি বলতে পাবে। যাও বাবা যাও, রাজার মাতৃ-
শ্রাদ্ধ করিয়ে তুমি ঐশ্বৰ্য্য নিয়ে ঘরে ফিরে এস।
তােরা যখন বলছিস, তখন না হয় যাই। এখন, তােদের
কথা শোনাই মঙ্গল।
বুনননা। হ্যা, যাও বাবা। চল, ঠাকুরের আশীৰ্ব্বাদী ফুল তােমার
উতরীতে বেঁধে দিইগে।
[ সকলের প্রস্থান।
সবিতারানা
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
শিবির।
বীরবাহ ও চিত্রসেন।
বীর।
চিত্র।
বীর।
চিত্র।
সখা, কি বল, কুমারীদ্বয় সুন্দরী বটে।
হবে।
হবে কিহে-তােমার চ’খ ছিল কোথায় ?
কাছেই। তবে লুকিয়ে সুন্দরী দেখায় আমার চ’খ তেমন
অভ্যস্ত নয়। এই জন্যে কয় ত একটু গােলমাল হয়ে গেছে।
তা’ দেখ সখা, তুমি যখন বলছ, তারা সুন্দরী, তখন তারা
নিশ্চয়ই সুন্দরী, কুৎসিতা হলেও সুন্দরী। তৃষ্ণার জল যারা
মুখে তুলে দিয়েছে, তারা কি কখন অসুন্দরী হতে পারে ?
কি বল সখা, কি বল ?
সখা কি রহস্য ক’বৃছ ?
সাধ্য কি ? তবে কি জান সধা, রাজা রাজড়ার ভাব স্বত।
এই তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে—ধাক’রে বৈরাগ্য এসে পড়ল,
তারপর জল মিলে গেল, তৃষ্ণা মিটে গেল, তখন খেজ-কে
সুন্দরী জল দিলে ? সুন্দরীও দেখা, আর প্রেম-সাগরেও
ঝাপিয়ে পড়া। খেয়াল না থাকলে রাজা হওয়া যায় না,
রাজা হওয়া চলে না—কি বল সখা, কি বল ?
ভৎসনা ক’ছ “সখা?
তাই কি বুঝলে? তা বুঝে থাক বুঝেছ—বেশ করেছ।
বীর।
চিত্র।
বীর।
চিত্র।
সবিতারাধনা বীর। চিত্র। কিন্তু সখা হঠাৎ এমন হয়ে পড়লে কেন বল দেখি? বেশ দেখে, না কেশ দেখে ? কেশ ত নয়, যেন আড়াই হেতে কাল চামর ? কিন্তু একটা কথা—তুমি একটীকে আবার আমার স্কন্ধে চাপাবার যােগাড় ক’বৃছ কেন ? দুটীকেই রাজাপুরে স্থান দিলেই ত বেশ শােভন হত! এক যাত্রায় কি পৃথক্ ফল হওয়া উচিত সখা ? হু, সেটা একটা নীতি বটে আচ্ছা সখা, ব্রাহ্মণ এখনও আসছে না কেন? আমার অনুরােধ ঠিক তার কাছে পৌছেছে ত ? উঃ-সখা ভয়ঙ্কর অধীর হয়ে পড়ছ যে! কিন্তু অধীরতায় আপনাকে আপনি ভুলে যেও না। কথাটা ইঙ্গীতে বুঝে বীর। চিত্র। নিও। বীর। চিত্র। হ্যা-হ্যা আমি রাজা, আমার এতটা অধীর হওয়া উচিত নয়-এই কথা ব’ছ ত সথা? তা তা তা’র যে আর উপায় নেই। প্রেম বাধা মানে না—সে যে এক বিপদ সখা। তা’ত বটেই। সে কথা ত আমি বলেইছি। তা অধীর হ’বার আবশ্যক নেই। ব্রাহ্মণ দেশওয়ালী রাজার বাড়ী শ্রাদ্ধ করা’তে গেছেন। কাৰ্য শেষ হলেই তিনি এখানে আসবে। ততক্ষণ না হয় এস সথা, ঐ কেশেরই গুণ বর্ণনা করা যাক। কাদম্বিনী লাজ পায় হেরিয়া সে কেশ- খুব এক হাত নিচ্ছ সখা। ভাল দেখা যাবে—ঘর এলে, সােণার বরণ দেখে কেমন তার চরণের পােকা না হও। বীর।
সবিতারাধন
বীর।
চিত্র।
-
চিত্র। ততটা হ’বার আমার আশঙ্কা নাই। কারণ, আমি পৰ্বতের
আড়ালে আছি। যা’ সখা, তােমার অধীরতার আর কারণ
নাই—ব্রাহ্মণ ঐ এসে পড়েছেন।
[ বনরাজের প্রবেশ
ধন। জয় হক, জয় হক।
আসুন, আনুন।
বসুন, বন।
খণ। (স্বগতঃ) ওঃ এ ক’দিন কা’র মুখ দেখেই সকালে ওটা যাচ্ছে
কেবল রাজা রাজড়া নিয়েই কাণ্ড চলছে ! রাজবাড়ীতে
শ্রাদ্ধ করা’তে গেলুম, তা বেশী যে কিছু পেলুম তা নয়।
মাত্র দু কপটে চাল ডাল। তাত বাড়ীর পিছনে ফেলেই
দিয়েছিলুম!' ব্রাহ্মণী তা কুড়িয়ে এনে দেখে দু কপটে সােণা।
তারপর আবার রাজসভায় গেলুম। রাজা জিজ্ঞাসা ক’বুলে,
কি পেলে ব্রাহ্মণ ? দিলুম এক শােলােক ঝেড়ে। বললুম
রাজশ্রী যা’র তরুচ্ছায়া, তার আবার অভাব কিসের ?
মহারাণীর সঙ্গে কথা ক’য়ে রাজা আমায় হাত দিলেন, ঘােড়া
দিলেন আর ধন রত্ন ত দিলেনই। এক রাজা ছেড়ে আবার
আর এক রাজার ডা; দেখি এখানে আবার কি হয়।
বীর।
আপনাকে একটু অন্যমনস্ক দেখছি—পথশ্রমে কাতর হয়েছেন
কি?
কিছু না, কিছু না। গৃহস্থ মানুষের আবার এমাম কি ?
আপনি বলুন, 'বলুন—কি অভিপ্রায়ে আমাকে আহ্বান
করেছেন? আপনার কাৰ্য আমি প্রাণ দিয়ে ক’ব।
চিত্র।
খুব কথাই ত আপনি বলে! বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের প্রাণ নিয়ে
একটা বিপদে পড়া যা’ আর কি! তার চেয়ে আপনি এক
কাজ করুন। শুনেছি, আপনার অবিবাহিতা কন্যা আছে-
তা’—তা’ আপনি রাজ-শ্বশুর হন না কেন।
[ ধনরাজ বসিয়া পড়িল
বসুন, বসুস্থির হন—স্থির হন।
বীর।
[ বীরবাহু একখানা পাখা আনিয়া ধনরাজকে বাতাস
করিতে লাগিলেন ]
ধন।
চিত্র।
বীর।
ধন।
৩
আপনি ব্যস্ত হবেন না-আমার তেমন কিছুই হয় নি।
তথাপি আপনি অতিথি।
কন্যার বিবাহের কথা যদি আপনার মনকষ্টের কারণ হয়,
তা হলে সে প্রস্তাব আমরা পরিহার কছি। আপনি সুস্থ
হন, সুস্থ হন।
আমি অসুস্থ হয়েছি, মহারাজ, পীড়ায় নয়—আনন্দে। দীন
হীন ব্রাহ্মণ আমি, আমার কন্যা রাজরাণী হবে শুনে আনন্দে
আমি আত্মহারা হয়ে পড়েছি। যা স্বপ্নের অগােচর, যা
কখনও মনেও ভাবতে পারিনি, তাই আজ অযাচিতভাবে
পাবার আশা পেয়ে আর কি স্থির থাকতে পারি মহারাজ ?
তাই আমার মাথা ট’লে গেছে—আমি অস্থির হয়ে পড়েছি,
অশান্ত হয়ে পড়েছি।
* তা হলে আপনি সম্মত?
সম্মত ! অমৃতে অসাধ কার ?
চিত্র।
সবিতারাধনা চিত্র। বীর। চিত্র । ধন। বীর। - ধন। তবে আপনি যা, দিন ক্ষণ স্থির করুন। অথবা দিন ক্ষণেই বা প্রয়ােজন কি ? ভগবানের নাম স্মরণ করে অদ্য রজনীতেই বিবাহ কাৰ্য্য সমাধা হ’ না কেন ? সখা, অধীরতাটা এখন কা’র অধিক ? তােমারই জন্য সখা। আজ রাত্রেই !—ভাল তাই হ’। শেয়াংসি বহু বিষ্মানি। হাঁ-হ—তাই করুন। আপনি যান, উদ্যোগ করুন। আপনার দুই কন্যা। জ্যেষ্ঠা, রাজরাণী হবে, কনিষ্ঠা, আমার অভিন্ন-হৃদয় সখা চিত্রসেনের জীবন-সঙ্গিনী হবে। যান, যান—আপনি বিবাহের ব্যবস্থা করুন গে। বেলাও ত প্রায় পড়ে এল। এই যাই। ধন্য ভগবান, তুমি যা’র প্রতি সদয় হও, তখন তা’র এমনিই হয়। [ প্রস্থান বলি, সখা, মৃগয়াটা হ’ল কেমন ? ভয়ঙ্কর! এখন যাও, কন্যা আবার ব্যবস্থা কর গে। কুলপ্রথা মত বিবাহ ত করা চাই। নিশ্চয়—কিন্তু ঘটক বিদায়ের ব্যবস্থা কি কাণা কড়ি,-তাই তােমার পক্ষে যথেষ্ট। কেন—তােমায় দু’ কথা শুনিয়ে দিয়েছিলুম বলে ? ” সখা তােমার মুখের ভাব দেখে, মন বুঝে ত সব সামলে নিয়ে নিজেকেও তােমার পথের পথিক ক’বৃলুম। কিন্তু জেন সখা, এ পথের পথিক হয়েছিস্বেচ্ছায় নয়-সহানুভূতিতে। চিত্র। বীর। ? চিত্র। বীর। চিত্র।
সবিতারাধনা
বীর।
তুমি খেলােয়াড়-কাণা কড়িতেও খেলতে পার বটে!
তা না হলে রাজরাজেশ্বর আমার সথা হয় ।
চিত্র।
[ উভয়ে হাস্য করিতে করিতে প্রস্থান করিলেন
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
বৃক্ষতল।
বালক বালিকাগণ
ছুটোছুটি
সময়-প্রাতঃকাল।
করিতেছে।
১ম বা। আর ছুটোছুটি খেলব না ভাই। বসে বসে ইকিড়, মিকিড়,
খেলি আয়।
২য় বালক। আচ্ছা ভাই তাই, আচ্ছা ভাই।
[ সকলে উপবেশন করিল ও ইকিড়, মিকিড়, খেলিতে লাগিল।
ইকিড়, মিকিড় চা চিকিড়-
চামের কোটা মজুমদার ;
ধেয়ে এল দামােদর।
সবিতারাধনা
দামুদারের হাঁড়ি কুঁড়ি,
গােয়ালে বসে চা কাড়ি,
চাল কঁাড়তে হ’ল বেলা,
ভাত খাওসে বােনাই শালা।
ভাতে পড়ল মাছি,
কোদাল দিয়ে চাচি।
কোদাল হ’ল ভোঁতা,
খাও কামারের মাথা।
প্র বা। না ভাই এ খেলা ভাল লাগছে না। এ কেমন মেয়েলি
মেয়েলি খেলা। তার চেয়ে “খােন্ত খানা দেনা খেলি
দ্বি বা। তবে “নুন কোট” খ্যা ভাই।
দ্বি বা। না ভাই, মেয়ে ছেলে বুঝি অত দৌড়তে পারে ?
প্র বা। চল ভাই আমরা তবে বাড়ী যাই। না হয় উনাে ঝুমনাে
দিদির বরেদের কাছে যাই চল। সেখানে বেশ দশ পঁচিশ
খেলব। যদি জিতি, তা হলে উনাে দিদির বর মুক্তো দেবে
আর যদি হারি, তা হলে ঝুমনন দিদির বর মাণিক দেবে।
দ্বি বা।
তাই চল, তাই চল। সেখানে জিতলেও—জিত, হা’লেও ,
জিত।
প্র বা। আচ্ছা ভাই, আজ ক’দিনই বা—উম্নাে ঝুমনাে দিদিদের বে’
হয়েছে, আর তাদের কর আমাদের কত কি জিনিস দিলে
বল দেখি নাই ?
৩৭
সবিরাধনা
৩
দ্বি বা। তা দেবে না—তারা যে সব রাজা লােক। রাজারাই ত
ঐ সব দেয়।
প্র বা। হঁা দেয়—সবাই বুঝি দেয়—তাের যেমন বুদ্ধি ! ওরা
আমাদের ভালবাসে, তাই আমাদের দেয়-বুঝলি ?
প্র বা। শুধু দিদিদের বরই বুঝি আমাদের ভালবাসে? আর খুড়ী
মা ভালবাসে না বুঝি ? আচ্ছা, আচ্ছা, খুড়ীমাকে গিয়ে
আমি সব কথা বলে দিচ্ছি।
প্র বা। না ভাই, আমি কি ত’ বছি, আমি কি তা বছি ?
তৃ বা।
আচ্ছা যা ভাই, কা’র কিছু বলাবলিতে আর কাজ নেই।
তা হলে আপনাআপনি ঝগড়া হয়ে যাবে।
চতু বা। তার চেয়ে এক কাজ করি আয়। দিদিদের বরেদের
বলে এই গুরু মশায়ের পাঠশালাটা বন্ধ করে দেবার চেষ্টা
করি আয়। তা হলে বেশ মজা হবে। আর পাঠশালে
যেতে হবে না।
তৃ বা। হারাধনের আচ্ছা বুদ্ধি ত? আচ্ছা ভাই, তাই করি আয়।
প্র বা। হু, ভারী বুদ্ধি কিনা? লেখা পড়া না কবৃলে বুঝি বেটা
ছেলেদের মান্যি গণ্যি হয় ? কথায় বলে-
লেখা পড়া করে যেই,
হাতী ঘােড়া চড়ে সেই।
১৮
। চতু বা। দুরু দুর দূর-তার চেয়ে বল
লেখা পড়া যেই করে,
খেটে খেটে সেই মরে।
৬৮
সবিতারাধনা
প্র বা.। তুই ভারী জানিস কিনা। চল দেখি দিদিদের বরের কাছে
তা’রা যা’ বলবে, তাই হবে।
বা গণ। আচ্ছা তাই চলু, তাই চল্।
[ সকলের প্রস্থান
ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক।
ধনরাজের কক্ষ।
ধনরাজ ও লক্ষ্মীমণি।
লক্ষ্মী।
ধন।
লক্ষ্মী।
কেমন, আমি বলেছিলুম, আমার মেয়েরা বড় সহজ ভাগ্যবতী
নয়! তা এখন মিলিয়ে পেলে ?
কতক কতক বটে।
কতক, কতক! তােমায় কি আর বল্ব! তােমার ঘর
ছিল না, ঘর হ’লদোর ছিল না, দোর হ’ল ; অন্ন, বস্ত্র যা’
কিছু—সবই মেয়ে দুটোর ইতুপূজোর ফলে। এখন রাজার
ঐশ্বয্যি, রাজা জামাই, খ্যাতি, প্রতিপত্তি কি না হয়েছে ?
আবার বল কতক” ! দেখছি তােমার আশা অফুরন্ত।
আরে দাঁড়াও গিন্নি দাড়াও—ধােপে টেকু আগে। মেয়ে
দুটো ভুতুড়ে বিদ্যে শিখে এসে এ সব কীর্তি করছে কি না—
সবিতারাধনা
লক্ষ্মী।
ধন।
তাই বা কে জানে! ভুতুড়ে বিদ্যে হয়, ত দিন কত পরেই
এই ঘর দোর টাকা কড়ি সব কাক-বিষ্ঠে হয়ে যাবে, হাঁ।
পূজো, ফুজো, মশুর টন্তর আমি ও সব মানি না। মেয়েদের
দেখাদেখি তুমিও ঐ সব আরম্ভ করেছ দেখছি। তােমাদের
এখন সময় ভাল, ধূলােমটো ধ’চ্ছ, সােণা মুটো হচ্ছে-তাই
কিছু বছি না। একটু এদিক ওদিক হলেই হেঁতাল ঘুরিয়ে
তােমাদের মাথা ভাংব—তাও যেন মনে থাকে।
তা’ ভাঙ্গ, ভাংবে। কিন্তু ইতুপূজোর কথা তুমি অমন তুচ্ছ
তাচ্ছিল্য কর না। তা হলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে
যাবে।
আচ্ছা, দেখা যাবে। ভাল কথা মনে পড়েছে। হাগা
গিন্নি, তােমার জামাইরা নাকি এখন তােমার মেয়েদের সঙ্গে
কথাবার্তা বন্ধ করেছে। মেয়ে দুটোর সাধ্য সাধনাতেও
নাকি তারা কথা ক’ না, 'খা না দা না-রাত দিন
*গোঁসা ঘরে” পড়ে আছেন ! ব্যাপারখানা কি ?
ব্যাপার যাই হক—তােমার সে কথায় কথা কইবার দরকার
নেই।
মেয়ে জামাই যেমন বুঝবে, তেমনি করবে। তাতে
আমরা কথা কইলে তাদের মনান্তর আরও বাড়বে।
বুঝলে ? তবে তুমি সেখানে গিয়ে একবার তাদের খবরটা
নিয়ে এস।
* আমি আর সেখানে গিয়ে কি ক’ব বল ? তারা হ’ল রাজা
রাজড়া জামাই—আমি ইলুম গরীব শশুর। আমি কি
সেখানে পাত্তা পাই?
ধন।
•
সবিতারাধনা
লক্ষ্মী।
• তা আমি যাব নাকি? জামাই বাড়ীতে যাওয়া, জামায়ের
সঙ্গে কথা কওয়ার পদ্ধতি ত এখনও আমি শিখিনি। তা
হলে না হয় যেতুম।
বলি, জামাই দুটো বিগডল নাকি ?
লক্ষ্মী।
তােমার বুদ্ধি আর কি ? তুমি যাও, যাও।
আচ্ছা যাই।
[ প্রস্থান
তাইত, জামাইদের হ’ল কি ? এতদিন তারা বেশ হাসত,
বেশ কথা কইত। আজ কদিন ধরে তারা এমন কচ্ছে।
কেন? বিবাদ বিসম্বাদ হ’ল নাকি? নাঃ—আমার মেয়েরা
ত ঝগড়াটে আদৌ নয়। ভাবনার কথা বটে। ভগবানের
মনে কি আছে, কে জানে!
[ প্রস্থান
লক্ষ্মী।
সপ্তম গর্ভাঙ্ক।
শিবির মধ্যস্থ কোষাগার।
বীরবাহু পালঙ্কের উপর শয়ন করিয়া আছেন। উনাে
তাঁহার পদতলে বসিয়া পদসেবা করিতেছে।
উনাে। দাসী কি অপরাধ করেছে নাথ, যে তার প্রতি, তুমি এত
নিয়? অপরাধ করে থাকি, দণ্ড দাও, ঘাড় পেতে ল’ব।
সবিতারাধনা
বীর।
*
কিন্তু হৃদয়বল্পত, তােমার বিমর্ষভাব দেখতে পাব না। ওঠ,
ওঠ। কথা কও।
[ বীরবাহু উঠিয়া বসিলেন
বল নাথ, বল, কি অপরাধে অপরাধিনী আমি ? মৌন কেন
জীবিতনাথ ?
অপরাধ তােমার নয়—অপরাধ আমার। তাই আত্মবিহবল
হয়েছি, তাই মৌনাবলম্বন করেছি। দেখলে নদীর এক
পারে গাভী, অন্য পারে বৎসতরী হাদারবে নদীকূল
আলােড়িত করে তুলেছে। মধ্যে নদী। গাভী বৎসেব
কাছে আসতে পারছে না, বৎসও গাভীর নিকটে আসতে
পারছে না। তাদের পরস্পরের কি করুণ আহ্বান!
আমরাও ত আমাদের জননী ছেড়ে, জন্মভূমি ছেড়ে সুদুর
প্রবাসে পড়ে রয়েছি। আমাদের জননী ত এইরূপ ব্যাকুল
হয়ে আমাদের স্মরণ করূছেন।
উনাে। এই কথা ! আঃ বুক থেকে পাষাণ নেমে গেল! প্রবাস
আর ভাল লাগছে না—এখন আবাসে ফিরে যেতে চাও
নাথ ? একথা না বললে আমি কেমন করে বুঝ ব, স্বামিন ?
লজ্জার অনুরােধে সে কথা আর বলতে পারিনি।
উনাে। তাই বলে অধিনীকে পায়ে ঠেলে দেবে!
-না—তা নয়-তা নয়। দেশে ফিরে যাবার প্রবল
ইচ্ছা হয়েছে—তাই মনটা এমন ধারা নীরস হয়ে পড়েছে।
সেই মৃগয়া কবুতে বা’র হয়েছি—তারপর বিবাহ করে
তােমাদের নিয়েই সুখে স্বচ্ছন্দে আছি। কৈ মাৰ কথাত
বীর।
বীর।
৭২
সবিতারাধনা এতদিন মনে পড়েনি। মা যে কি অবস্থায় আছেন, তাত একবার ভাববারও অবসর পাইনি! আমিও কুসন্তান, আমার সখাও কুসন্তান। সুখেন্মত্ত হয়ে যা'রা গর্ভধারিণীকে ভুলে থাকতে পারে-তা’র কুসন্তান নয় ত কি ? এখন দেশে ফিরে যেতে চাই—মার জন্য প্রাণ কেঁদে উঠছে। উনাে। সে ত খুব ভাল কথা। আমরাও আমরাও আমাদের শাশুড়ী ঠাকুরাণীদের দেখিনি, আমাদেরও ত তাদের দেখার সাধ হয়। তাই চল স্বামিন, তাই চল। আমাদের সংসার আমরা ক’ব, আমরাই বা এখানে চিরদিন পড়ে থাকব কেন ? বীর। বেশতােমার কথা শুনে অতিশয় সন্তুষ্ট হলে। স্বামী- গৃহের প্রতি স্ত্রীলােকের এনি মায়া, এমনি টানই ত কুল- বতীর লক্ষণ! উনো। এখন ওঠ, স্নান কর পূজাহিক কর, খাও, দাও, তারপর যাত্রার ব্যবস্থা কর। এর জন্যে আর আহার নিদ্রা ত্যাগ করা কেন ? বীর। ( হাসিতে হাসিতে) রােগে—না হলে স্ত্রীলােক বশ হয় যে। [ প্রস্থান উম্মা। আমি রাজরাণী-স্বামী সােহাগিনী- [ কুম্নাের প্রবেশ সুমনাে।' দিদি ! বাবা এসেছেন ? উম্নন। এসেছেন—বেশ হয়েছে। হারে হাসছিস যে ! }
সবিতারাধনা
-
=
ঝুমনাে। রাজা যে উঠে বড় স্নানে গেলেন? তােমাদের মিটমাট
হয়ে গেছে বুঝি ?
উনো। আর তােদের এখনও ঝগড়া চলছে নাকি? তা আর
হতে হয় না। তা হলে হাসতে হাসতে তােকে আর
এখানে আসতে হয় না। ব্যাপারটা কি বল দেখি?
কুমননা। ব্যাপার আর কি-অতি তুচ্ছ। কর্তার দেশে ফিরে যাবার
ইচ্ছা হয়েছে—তাই অভিমান করে শয্যা নিয়েছিলেন।
উমনাে। বলিস্ কিরে—এরও যে তাই! এরা তবে যা’ করেন—
দু’জনে পরামর্শ করে করেন বটে !
ঝুম্নন। তা’ আর একবার বলতে। তা না হলে আর বন্ধুত্ব কি?
উমননা। আর আমরা মরি ভেবে।
কুমননা। স্ত্রীলােককে ত ভাবতেই হয়—আমরা যে গৃহিণী। আবার
আমরা যে দাসানুদাসী।
উননা। কবে যাবার দিন স্থির হয়েছে, শুনেছিস ?
বুননা। রাজা সেই কথাই ওকে বলছেন—আর আমি তােমার কাছে
এসেছি। এখন চল, বাবা বসে আছেন।
উম্নন। চল—যাবার কথা বাবাকেও একবার বলতে হবে ত?
বুননা। বাবা শুনেছেন।
উনাে। ভালই হয়েছে-কাজ হালকা করে রেখেছি। চল্ তবে।
মা’র কাছে কখন যাবি ?
ঝুমনো। এদের খাওয়া হলে ?
উনাে। সেই বেশ—তবে চল।
[ উভয়ের প্রস্থান
৭
সবিতারাধনা
অষ্টম গর্ভাঙ্ক।
ধনরাজের বাটির প্রাঙ্গণ।
ধনরাজ লক্ষ্মীমণির সহিত কথা কহিতে কহিতে প্রবেশ
করিল।
লী।
ধন।
লক্ষ্মী।
তাইত মেয়ে দুটো শশুর ঘরে চলল। এতদিন কাছে কাছে
ছিল—সে এক রকম থাকা গিছল।
তােমায় আর ন্যাকামীর নাকিসুর তুলতে হবে না। বনবাসে
দিতে পেরেছিলে, আর শশুর ঘরে পাঠাতে পার না!
ওগাে ঠাকৃরুণ সে একদিন, আর এ একদিন।
প্রাণ কাছে আমার, তােমার কি বল ? তবু আমি চখের
জল ফেলিনি-ফেবও না-পাছে বাছাদের অকল্যাণ হয়।
চুপ কর, চুপ কর—ঐ উনাে ঝুমনাে আসছে।
আসছে আসছে—এস মা, এস।
[ উনাে ও ঝুম্নাের প্রবেশ
এস মা, এস।
[ উম্ননা ও বুনন মাতা পিতাকে প্রণাম করিল।
ধনরাজ ও লক্ষ্মীমণি তাহাদের আশীর্বাদ করিল ]
লক্ষ্মী।
ধন।
উননা। মা, আমরা আসি তবে ?
এখনই মা এখনই ? একটু ববিনি মা?
[ ঝুমনাে চক্ষে হত দিল
সবিতারাধনা
ধন।
এই মায়াটে বেটি ঝুমনাে। কঁদিস কেন মা ! জন্ম জন্ম ঐ
শশুর ঘরই ক মা। কঁদূতে আছে কি মা? ভােরা
কালে, আমি কেমন করে চুপ করে থাকূব !
তােরা ত শ্বশুর ঘরে ঘর করূতে চলি। আমাদের মাঝে
মাঝে মনে কবি ত মা ?
উনাে। বাপ মাকে আবার কে কবে ভুলে থাকে বাবা?
আহা!—মাগো! হ্যা মা তাের সঙ্গে কি দিব মা ?
উনাে। ঝুমনাে কি নিবি রে ?
ঝুমনাে। আমি আর কি নেব। ইতু পূজোর ভাড় ক’টা আমায় দিও
বাবা, আমি তাই ককালে করে নিয়ে যাব। তুমিও ত তাই
নেবে দিদি ?
উম্নন। দূরু-আমি কি এখন তা পারি? আমি এখন রাজরাণী—
ইতু পূজোর ভাড় কি আমি কাকালে নিতে পারি ? তা
হলে লােকে বলবে কি ? ইতুপূজোর মন্তর বলতে গেলে
লােকে বল্বে-রাণী বুঝি ডাইনি—তাই বিড়ি বিড়ি করে
কি মন্তর আওড়াচ্ছে।
তবে তুই কি নিবি মা ?
উনাে। ভাল খাবার দাবার পাও ত সঙ্গে দিও-আবার কি দেবে ।
আচ্ছা।
?
ধন।
[ প্রস্থান
ঝুনাে। “দিদি, তুই ইতু পূজোর ভাড় নিবি না ?
উনাে। দূর দূর দূর ! আমি রাজরাণী—পান চিব’ব মচ মচর, ছিপ,
সবিতারাধনা
• ফেলব পচ পচ, দোলায় যা’ব হচ হচ, আমার কি
ভড় কঁাকালে নেওয়া সাজে!
ঝুমননা। তুই বলিস কি দিদি ! ইতুঠাকুর যে আমাদের সর্বস্ব।
উনে। তা'—তুই যেমন বুঝিস তেমনি ক, আমি যেমন বুঝি তেমনি
করি।
[ ধনরাজ আসিয়া ইতুপূজার ভাঁড় বুননার হস্তে দিল।
ঝুমনাে ভক্তিভাবে তাহা গ্রহণ করিল ]
ধন।
তাের খাবার দাবার সব দোলায় তুলে দিয়ে এসেছি উম্নন।
রাজা এসে পড়েছেন—বাইরে অপেক্ষা ক’রূছেন। চল, আর
বিলম্ব করে কাজ নেই। চিত্র ভারী তাড়া দিচ্ছে। হা-
ওগাে ব্রাহ্মণী, জামাইরা তােমায় প্রণাম করেছে।
দীর্ঘায়ু হ’ তারা, মনের সুখে থাকুক তারা।
১
লক্ষ্মী।
[ নেপথ্যে ভেরীধ্বনি হইল
উনো। ঐ যাত্রার সঙ্কেত। তবে আসি মা, আসি।
[ প্রণাম ও আশীর্বাদ গ্রহণ
ঝুমনাে। মা, বাবা আসি তবে।
[ প্রণাম ও আশীৰ্বাদ গ্রহণ
সবিতারানা
লক্ষ্মী।
মাঝে মাঝে সংবাদ দিস, মা, সংবাদ নিস, মা।
[ একখানা দোলা ও একখানি পালকী প্রাঙ্গণে আসিল।
উনাে দোলায় উঠিল, ঝুমনাে পালকীতে বসিল ]
ধন ও লক্ষ্মী। দুর্গা—দুর্গা।
৭৮
চতুর্থ অঙ্ক।
প্রথম গর্ভা।
রাজ প্রাসাদ সংলগ্ন উদ্যান-বাটিকা।
সময় অপরাহুবীরবাহু পরিক্রমণ করিতেছেন। উনাে
আসিয়া পার্শ্বে দাড়াইল।
বীর।
তুমি
উনাে। মনটা এত ভার ভার কেন মহারাজ ?
মনের গতি সকল সময়ে কি এক রকম থাকে ?
এখানে ?
উম্নন। তােমার সন্ধানে নাথ।
তুমি যাও, তুমি যাও—আমি এখনই আসছি।
বীর।
উনাে।
(গীত।)
আসি আসি বলে যেও না।
আস বলে তুমি আস না।
আশা-পথে চেয়ে রই,
মরমে যাতনা সই,
বারেকের তরে তবু তুমি আস না।
অধিনী যে পাগলিনী তাত ভাব না।
সবিতারাধনা
বীর।
থা—সেই চির-পুরাতন কথা, সেই চির-পুরাতন ক্রন্দনের
সুর, সেই চির-পুরাতন কাব্য। ও গান আর ভাল লাগে
। তুমি গীত গান ভুলে গেছ, অথবা গীত গান শােনবার
আমার আর প্রাণ নেই, হৃদয় নেই। আমি বুঝি অবসাদে
অবসন্ন, বুক বুঝি ভেঙ্গে গেছে। যাও, যাও তুমি যাও।
রাজরাণী অন্তঃপুরে যাও।
উমনাে। প্রাণেশ, আজ একি ভাবান্তর ! দাসী কি কোন গুরুতর
অপরাধ করেছে ? তােমার সে স্নেহ, সে প্রেম, সে সােহাগ
এক লহমায় কোন্ অতীতের শূন্য-গর্ভে বিলীন হ’ল জীবিতে-
শ্বর ? আমি এত সাধ, এত আশা ল’য়ে তােমার চরণ সেবা
ক’তে তােমার দ্বারে ভিখারিণীর মত এলে, আর তুমি
প্রভু, আমায় দীনাহীনা দেখে আশা থেকে বঞ্চিতা ক’ছ ?
আমি কি অপরাধ করেছি দেবতা ?
বীর। -না—তুমি আমার কথা ঠিক বুঝতে পারনি। তোমায়
আমি কোন রূঢ় কথা বলিনি—বলতে পারি না। তুমি
আমার আদরিণী-জীবন-সঙ্গিনী। যাও, যাও তুমি অন্তঃপুরে
যাও। আমি এখন চিন্তাভারে প্রপীড়িত-একটু নিরালায়
থাকতে চাই, একটু নির্জনে নীরবে থাকৃতে দাও।
উনাে। যদি যেতে বললে তবে আর থাকব কেমন করে ? কিন্তু
দারুণ ব্যথিত হৃদয়ে চল্লেম্ নাথ !
[ প্রস্থান
নিরাশার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি। কেন এমন হল! কিসে এমন
হ’ল! রাজৈশ্বর্যের মাঝখানে এসে কি দুরিদ্র। সহধর্মিণীকে
বীর।
, সবিতারাধনা ভুলে যাচ্ছি ? না, তা’ত নয় ! আমার সেই প্রেম, সেই স্নেহ, সেই হৃদয় সব আছে; কিন্তু কি যেন কি একটা নাই- সেটা যেন বিস্মৃতি-সাগরে ডুবে গেছে। কে জানে সেটা কি [ চিত্রসেনের প্রবেশ বীর। চিত্র। বীর। চিত্র। বীর। এস সখা, এস-তােমারই প্রতীক্ষায় হেথায় অপেক্ষা ক’ছি। তােমার আহ্বানে আমিও ছুটে আসছি সখা ? এসেছ, ভাল করেছ। আচ্ছা সখা, তুমি আমায় বুঝিয়ে দিতে পার, কেন এমন হয়, কেন এমন হ’ল ? কি সখ কি ? এই-রাজরাণীর চতুর্দোল যে দিক দিয়ে এল, সে দিকে মহামারী, দুর্ভিক্ষ, রক্তবৃষ্টি হ’লগৃহে গৃহে অগ্নিশিখা উঠল, গৃহদাহ হ’লগৃহে গৃহে ক্রন্দনধ্বনি উঠল। আর তােমার পতিব্রতা পত্নী যে দিক দিয়ে এল, সে দিকে গৃহে গৃহে দোল দুর্গোৎসব, বিবাহ, উপবীত, চূড়াকরণ প্রভৃতি হ’লপুষ্পবৃষ্টি হু’তে লাগল, বসুধা শস্যশ্যামলা হ’ল, গৃহে গৃহে আনন্দ ধ্বনি উঠল। একদিকের লােক রাজরাণীকে অলক্ষ্মী বলে অভিশপ্তা করলে, অন্য দিকের লােক তােমার সহধর্মিণীকে রাজরাণীর সখীকে লক্ষ্মী বলে অভিভাষণ ক’রূলে। সখা, ব’তে পার, কেন এমন হয়, কেন এমন হল ? ও সকল কথা মনেই আতে নেই সখা ! ও সব চ’খের ভুল, কাণের ভুল ! চিত্র।
সবিতারনা
বীর।
সান্ত্বনা ক’বৃছ সখা-তা’র আবশ্যকতা নেই। শেন, আরও
শােন। বিবাহিতা পত্নী নিয়ে বাড়ী ফিলেম্ ; রাজ-মাতা,
রাজ-বধুকে বরণ ক’তে এলেন-বধূর দৃষ্টিতে স্বর্ণ রৌপ্য
সব লৌহ হয়ে গেল। আর তােমার জননী যখন তার
গৃহলক্ষ্মীকে বরণ করে ঘরে তুল্লেন, তখন কাংস্য, লৌহ, স্বর্ণ
হয়ে গেল। তুমি আমায় কেমন করে শান্ত কবে সখা,
কি সান্ত্বনা দিতে পার সখ ? আমি রাজরাজেশ্বর হয়েও
ভাগ্যহীন—কেন না অলক্ষ্মী আমার সংসারে প্রবেশ করেছে ;
আর তুমি ভাগ্যবান, কারণ ভাগ্যবতী রমণী তােমার গৃহ
আলােকিত করেছে। সত্য বল সখা, আমার কথা সত্য
কিনা ?
চিত্র। সে কথা পরে বিবেচনা করে না হয় বলা যাবে। এখন,
তুমি স্থির হও। উদ্বিগ্ন হলে, ধৈর্য হারালে কাৰ্য্যহানি
হবে। ভগবান্ তােমায় পরীক্ষা ক’ছেন—সাবধান সখা
বিচলিত হয়াে না। প্রাজ্ঞ তুমি—অবশ্যই পরীক্ষোত্তীর্ণ হবে।
বীর। বন্ধুর সেই প্রিয় স্তোক-বাক্য। ভাল, বন্ধুত্বের অনুরােধে,
ভালবাসার অত্যাচারে সেই স্তোক-বাক্য আপাততঃ গ্রাহ
ক’তে হ’ল। কিন্তু সখা, ধৈর্য্যেরও সীমা আছে। সে সীমা
অতিক্রম ক’বুলে অনুরােধ উপেক্ষিত হবে। রাজশক্তি,
অত্যাচারের প্রতিবিধান ক’রূবে।
[ উভয়ের প্রস্থান
সরিতাৱাধনা
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
কক্ষ।
[ গীত গায়িতে গায়িতে ঝুমনাের প্রবেশ ]
(গীত)
আমি চলি ফিরি ব’লে সে যেমন,
আমার সার যে সেই চরণ।
সে কঁদালে আমি কাঁদি,
হাসা’লে সে আমি হাসি,
আমার কিছু নয়ক আমার,
সব করেছি সমর্পণ।
সেথানা কেন যেথায় থাকে,
আসে ছুটে আমার ডাকে,
দীন দুখিনী আমি বলে
সে করে গাে যতন।
চিত্র।
[ চিত্রসেনের প্রবেশ
(সলাজে) তুমি এর মধ্যে এলে ?
ডাকের চোটে! আঃ—এমন গােলযােগেও মানুষে পড়ে
গা! বাড়ী থেকে বার হতে না হতেই চেঁচেঁচি,
ডাকাডাকি, হাঁকাহাঁকি। চরণ ফরণ যা তা বলে গাল
সবিতারাধনা
মন্দ। আমি এইবার চলে যাব; যে দিকে দু’ চক্ষু নিয়ে
যাবে, সেই দিকে চলে যাব। দেখি তােমার ডাকাডাকিতে
আর কে আসে!
[ লজ্জাবতী ঝুনাে মৃদু হাস্য করিয়া চিত্রসেনের হস্ত ধরিল।
চিত্ৰসেন সস্নেহে তাহাকে বামপার্শে স্থান দিলেন]
বুননা। তুমিই আসবে।
চিত্র। আমিই আসব—আমার হার, তােমার জিত।
ঝুনাে। মহারাজ ডেকেছিলেন কেন?
মণ্ডা খেতে—তুমি খাবে ?
বুননা। বল না, বল না ।
চিত্র। তোমার দিদির কথা বলতে। সে কথা তােমার গুনে কাজ
নেই।
চিত্র।
ঝুমনাে। তুমি না বললেও আমি বুঝেছি। যে দিন দিদি ইতুভাঁড়
ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, সেই দিনই আমি বুঝেছিলেম, দিদির
কপালে দারুণ দুঃখ আছে। আমি ভেবে আকুল হয়েছি
দিদির কি হবে, কি হবে!
চিত্র।
তুমি আবার তাকে ইতুপূজা করাও না কেন ?
ঝুমনাে। সে কি তা শশানে ? বলে হাসে—আর বলে, রাজরাণী
কি ডাইনির মত বিড়ি বিড়ি করে মন্তর পড়ে ?
বটে! তবে ত রােগ বড় কঠিন! সখা, তাই এমন ক্ষেপে
উঠেছে, বটে! আচ্ছা, ঝুম, তুমি একবার ইতুভড় ফেলে
দিয়ে দেখ দেখি, আমি ঐ রকম ক্ষেপে উঠি কি না?
চিত্র।
৮৪
সবিতারাধনা চিত্র। কুম্নােত সূৰ্য্যায় নমঃ। শ্ৰীসূৰ্য্যায় নমঃ। অমন কথা বলি না, অমন কথা মুখে এন না। বাপরে—যেন পণ্ডিতের টো বসে গেল। তােমার সাত, রাজার ধন এক মাণিক যেন কেউ কেড়ে নিলে, যেন হারিয়ে গেল, যেন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। যেন-যেন- [ ঝুম্নাে চিত্ৰসেনের মুখ চাপিয়া ধরিল (অস্পষ্টভাবে) হুম হুম্ আর বলব না, আর বলব না। ছাড় ছাড়, দম বন্ধ হয়ে গেল। [ ঝুমনাে হস্ত সরাইয়া লইল আঃ-আঁচলেম, প্রাণ বেরিয়ে গেছল’ আর কি! বুননা। আবার! এ্যা—তুমি আমায় চ’খ রাঙ্গাচ্ছ ? তবে আমি এই চড়ুম। [ প্রস্থানােত। ঝুমনাে তাহাতে বাধা দিল ঝুমননা। তুমি আমায় কাদাও কেন? তুমি কঁাদ কেন—হাসলেই ত হাসতে পার। ঝুমননা। তুমি না হাসা’লে, তুমি না হাসলে আমি হাসি কেমন করে ? ঐ করুণ কোমল দৃষ্টিতে, ঐ শান্তোজ্জ্বল রূপ মাধুরীতে, ঐ শান্তি-তটিনী বিধৌত বচন-বেলাভূমে আমি আপনাকে হারিয়ে ফেলি। তুমি উষা-দীপ্তা, নবীন রাগে রঞ্জিতা প্রেমােদ্ভাসিতা ফুল্লকমলিনী; আর আমি কোমলতা শূন্য, কাঠিন্যপূর্ণ স্বার্থপর শিলীমুখ। তুমি আমার গৃহে, আমার সংসারে কি শান্তিলাভ ক’রূবে ললনে ? চিত্র। * চিত্র। চিত্র। ৮৫
সবিতারাধনা
ঝুমনাে। অনন্ত শান্তি, অনন্ত সুখ, অনন্ত প্রেম। আর কি চাই
প্রিয়তম ? তােমার চরণে আমি স্থান পেয়েছি, তােমার
চরণ-সেবায় আমি সেবাধিকারিণী হয়েছি, তুমি আমার
ইহলােক ও পরলােকের দেবতা; তুমি স্বামী, তুমি গুরু ।
আমি দাসী, অনুগতা শিয়া ; ইহা অপেক্ষা সুখ, শান্তি, ঐশ্বৰ্য্য
স্ত্রীলােকের আর কি আছে প্রভাে ?
চিত্র। তুমি নারীর।
ঝুম্নাে। আমি তােমার দাসী-চরণ-সেবিকা।
[ প্রস্থান
চিত্র। অদ্ভূত প্রেম, অদ্ভুত ভক্তি, অদ্ভুত সরলতা আর অদ্ভুত চরিত্র।
কিন্তু সখা-পত্নী ত এই নারীরত্নের সহােদরা ! সে এমন নয়
কেন ? সে যেন একটু দান্তিকা। কিন্তু স্বামী ভক্তিতে
তা’র ত কার্পণ্য নাই। তবে সখা তার প্রতি এমন বিরূপ
কেন? অথবা এই অদৃষ্ট ফল। যাই হক, সখা যা’তে সুখী
হয়, রাজরাণী যাতে সখার সুদৃষ্টিতে পড়ে তার চেষ্টা আমায়
ক’তেই হবে। দেখি কতদূর
কি ক’রূতে
পারি।
[ প্রস্থান
সবিতারাধনা
তৃতীয় গর্ভা।
পথ।
( নাগরিকগণ )
প্ৰ না। বলি, হারে জীবনে, তুই হলি কি? রাত দিন তুই যে
বায়ে বায়ে নেশা ভাং খেয়ে বেড়াস, তাের সংসার চালায় কে
বল দেখি ? তাের মা আমার কাছে কত কান্নাই কাছিল।
দ্বি না। দাদা, ও সব কথা ছেড়ে দাও, ও সব কথা ছেড়ে দাও। মেয়ে
মানুষে কি না বলে-তাতে কি আর কাণ দিতে হয় ?
তৃ না। তা না হয় নাই দেওয়া গেল। কিন্তু তাের ঘােট ছেলেটা
সে দিন যে ম’ল, তুই তা’রে একবার দেখলি না পৰ্যন্ত
বাবা বাবা করে তার আত্মাপাখী খাচা ছাড়া হল,
একবার ঘরে উকিটী মালিনি! হারে নচ্ছার, আমরা সে
রাতে যদি বাড়ী না থাকতে, তা হলে কি হত বল্ দেখি ?
ছেলেটা যে বাস মড়া হত! তুই বাপ, না শত্রুর ?
দ্ধি না। যেতে দাও দাদা, যেতে দাও। যা হবার তা হয়ে গেছে।
এবার দেখ’ দাদা-বড় ছেলেটার যদি কিছু ভাল মন্দ হয়,
তা’ হলে ঘরে থাকি কি না। মাইরি বলছি ভাই, আর
বাড়ী থেকে বেরুব না। নেশা ভাংএর দর আগুন হয়ে
গেছে—আর বাড়ী ছাড়া হয়ে লাভ কি বল ?
তৃ না। থাম বেহায়া থাম্। কথার ছিরি দেখ। হা হে, রামলােচন
দেশের দশা হ’ল কি ? ধান চাল ত এবার জন্মালই না,
সবিতারাধনা
তার ওপর ঘরে আগুন, মড়ক। হঁা হে ভায়া, দেশের দশা
হবে কি ?
চ না। শুধু কি তাই। একবার রাজবাড়ীর দিকে চেয়ে দেখ না।
হাতীশালে হাতী ম’রূছে, ঘােড়াশালে ঘােড় ম’ছে, ধন,
দৌলত ডাকাতে লুটে নে যাচ্ছে। রাজা যেন হতভম্ব হয়ে
বসে আছে। রাজা নিজের দিকেও চায় না, প্রজার দিকেও
চেয়ে দেখে না। চল ভাই চল, এ রাজ্য ছেড়ে রাজ্যান্তরে
চলে যাই। এত কষ্ট সহ্য করে, প্রাণটী হাতে করে কেমন
করে আর এখানে বাস করি বল ?
বি না। এই বােঝ বাবা। আমিই না হয় নেশা ভাং করি, ঘর দোর
দেখি না—আমি না হয় লক্ষ্মীছাড়া, কিন্তু রাজা রাজড়ার
বেলা কি বলবে চাঁদ।
চ না। মিছে নয়—রাজাও উচ্ছন্ন গেছে, রাজ্যও উচ্ছন্ন গেছে।
ঐ আলক্ষ্মী রাজরাণী রাজ্যে পা দিতে না দিতেই রাজ্যের
এমন সর্বনাশ হল ।
তৃ না। কিন্তু দেখ দেখি, পাত্তর মশায়ের সংসারের দিকে চেয়ে।
সংসার যেন উথলে উঠছে। মা আমাদের লক্ষ্মী ঠাকরুণ ।
দু’ হাতে ধন বিলুচ্ছেন, ধান বিলুচ্ছেন--সেই জন্যে এখনও
রাজ্যিটা বজায় আছে, প্রজা বেঁচে আছে। নইলে এতদিনে
সব নিঝড় হয়ে যেত।
প্ৰ না। যাক, যা’ ভাই—আমরা গরীব প্রজা-রাজা রাজার
কথায় থেকে আবার কি শূলে যাব ভাই! ও সব কথায়
কাজ নেই। তার চেয়ে আমাদের দুখ খু কষ্ট রাজা মশাইকে
সবিতারাধনা
• জানাইগে চল। আমাদের দুখ খু কষ্ট শুনলে তিনি কি আর
চুপ করে থাকবে ?
তৃ না। সেই ভাল, সেই ভাল, চল।
দ্বি না। যেতে চাচ্ছ চল—মােদ্দাৎ সেখানে কিছু হবে না—তা আমি
গােড়া থেকেই বলে দিচ্ছি। রাজা মশায়ের প্রায় আমারই
দশা। তফাৎ এই--আমি নেশা করে উচ্ছন্নে গেছি, আর
তিনি বিয়ে করে গােল্লায় গেছেন।
সকলে। এই—এই—চুপ,চুপ।
[ সকলের প্রস্থান
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
ধনরাজের জীর্ণ কুটীর ।
লক্ষ্মীমণি শতগ্রান্থ বিশিষ্ট বস্ত্র পরিধান করিয়া শয়িতা।
ধনরাজ রুক্ষকেশে, মলিনবেশে লক্ষ্মীমণির পার্শ্বে দণ্ডায়মান।
ধন।
ওগাে শুনছ গাবলি শুন্ছ। কিছু গু ডােগাড়া থাকে ত
দাওনা। বাজার হাটু করে নে আসি। বাকড়ের জ্বালায়
যে জলে মলু গাে ।
[ লক্ষ্মীমণি উঠিয়া বসিল
শুছ গা শুনছ ? কথা কওনা যে!
সবিতারাধনা সমী। কি আর শুনব, কি আর কথা কইব? তুমি সর্বনাশ করে বসে আছ। ইতুঠাকুরের কোপে পড়ে তুমি গােল্লায় গেলে একেবারে। ব্রতের ফলে পাওয়া ছেলে তােমার বংশ দুলাল- দুলালের মুখও চাইলে না তুমি। নিজ বুদ্ধি দোষে, নিজ কৰ্ম্ম দোষে তুমি দীনের দীন হয়েছে, আর ছেলেটাকেও হীনের হীন করেছ। তােমায় আর কি বলব, তােমায় কিছু বলতে হলে আমার মরা ভিন্ন আর উপায় থাকে না। মরার বিলম্বও আর বড় বেশী নেই। বা—আমার কি অপরাধ ? তােমার ইতুঠাকুরই ত তােমার ধন। সর্বনাশ করূলে। লক্ষ্মী। [ লক্ষ্মীমণি উঠিয়া দাঁড়াইল রাত বিরেতে সেই ত এসে মারধর করে, হাঁড়ী কুঁড়ি ভেঙ্গে দেয়। আমার কি দোষ ? টাকা কড়ি সবই ত তােমার ইতুঠাকুর কেড়ে নিলে। আবার বল, আমার দোষ ? , দোষ তােমার নয়—দোষ আমার অদৃষ্টের। ছেলেটার যে দিন বে, সে দিন তােমরা বর নিয়ে বেরিয়ে গেলে ; আর আমি ইতুপূজা করূতে বসূলুম। গেরাের ফের, ছেলে আমার স্বাতি নে যেতে ভুলে গেছল। তুমি যতি নিতে ঘরে এলে—তখন আমি পূজা কচ্চি, তােমার ডাকাডাকি, হাঁকাহাঁকিতে আমি কথা কইমুম না ! তাই আমি রেগে হাতাল মেরে তােমার ইতুভাড় ভেঙ্গে দিলুম। তাতে কি হ’ল—মানুষের শরীর-কাজের সময় কাজ না পেলে রাগ হবে না। তাতে আর হয়েছে কি ? ৫
সবিতারাধনা
লক্ষ্মী। • বিশেষ আর হবে কি—সেইদিন থেকে। আমরা ঠাকুরের
কোপে পড়েছি ; যে দারিদ্দির, সেই দারিদ্দির হয়েছি। আর
হবে কি ?
ধন। ওঃ—তবে ত তিনি ভারী ঠাকুর। মানুষেরও যেমন রাগ,
ঠাকুরেরও যদি তেমনি রাগ হয়, ঠাকুরও যদি প্রতিহিংসা
নেয়, তবে সে আবার ঠাকুর কিসের ? ঠাকুর-ঠাকুর
চাল কলা খাবার যম্। অমন ঠাকুর আমি ঢের দেখেছি।
চাল কলা খেতে পেলে, মাখম মিছরি, সর মালাই খেতে
পেলে আমিও অমন ঠাকুর হতে পারি। ওঃ-উনি ঠাকুর
দেখাচ্ছেন !
লক্ষ্মী।
এখনও তােমার চেতনা হয় নি ?
চেতব আবার কিসে? ঠাকুর যদি আমাদের দুখ খু কষ্ট
দেখে একটু “আহা উহুও” ক’ত, তবে বুঝ তুম ঠাকুর।
ঠাকুরের দয়া কৈ, ঠাকুরের ক্ষমা কৈ, যে আমি ঠাকুর মানব?
যে খেতে দেবে, যে আদর কবে, যে বিপদ থেকে বাঁচাবে,
সে মানুষ হলেও আমি তাকে বরং ঠাকুর বলব, কিন্তু এমন
চাল কলা খেকো গোয়ার গােবিন্দকে আর ঠাকুর বছি না।
তা’ যত কষ্টই পাই না কেন।
ওগাে দেবলীলা তুমি বােঝ না।
বুঝেও আর কাজ নেই। গল গল করে বকিয়ে ত ক্ষিদে
বাড়িয়ে দিলে। মাটীতে পোঁতা টোতা কোথাও কিছু
থাকে ত ছাড় না এখন-পেটাকে ঠাণ্ডা করি। পেটের
আমার বড় জ্বালা গাে বড় জ্বালা। বলি, হাগা তােমায় কি
লক্ষ্মী।
সবিতারাধনা
।
লক্ষ্মী।
ও সব জ্বালা টাকা নেই ? তুমি চুপ করে আছ কেমন
করে গো ?
থাকলেই আর কি ক’ব বল ? হাতে যখন কড়ি নেই, তখন
দাঁতে দাঁত দিয়ে পড়ে থাকা ভিন্ন আর উপায় কি ? তা
তুমি এক কাজ কর না। মেয়েদের কাছে একবার যাওনা।
আমাদের দুর্দশার কথা শুনলে তারা কি আর চুপ করে
থাকবে ? যাও না, যাও না, সেখানে একবার যাও না।
সংসার যে অচল হয়ে পড়ল।
ধন। তা বটেই ত—অচল হ’লই ত। কিন্তু আমিও যে অচল
হয়ে পড়েছি-ক্ষুধার জ্বালায়। আগে বরং ভিক্ষে শিক্ষে
করে এক রকম চালাতে পাতু। কিন্তু দুদিন সুখের
মুখ দেখে সে পথেও কাটা পড়েছে। তাই ত--এ যে একুল
ওকুল দুকুল গেল !
লক্ষ্মী। তুমি যাও না, যাও না—মেয়েদের কাছে যাও না। তারা
একটা যা হয় উপায় করে দেবে অখন ?
আরে তুমি ত বললে যেতে-আমি যাই কেমন করে
যাই কি খেয়ে। ক্ষিদে নিয়ে কি আর নড়তে পারি ?
লক্ষ্মী।
গাছের ফল মূল খেয়ে যাও। এখানে পড়ে পড়ে শুকিয়ে
শুকিয়ে শুধু শুধু প্রাণটা যাবে কেন ?
ধন। এ্যা—প্রাণটা যাবে—ক্ষিদের জ্বালায় প্রাণটা যাবে!
তবে না হয় বেরিয়ে পড়ি, তবে না হয় বেরিয়ে পড়ি। তুমি
“সাবধানে থেক, তুমি সাবধানে থেক। ছেলেটা কোথায়
গেল আবার। হাঁ, তা’কেও একটু দেখে শুনো। আমি
ধন।
৯২
সবিরাধনা
#
তবে একবার ঘুরে আসি, আমি তবে একবার মেয়ে দুটোর
কাছে থেকে ঘুরে আসি। কি বল-এ ?
লক্ষ্মী। হা-হা-তাই এস।
[ ধনরাজের প্রস্থান
বাঁচলে। মেয়েদের কাছে গেলে তবু ওঁর প্রাণটা ত বাঁচবে।
ছেলেটাকেও সঙ্গে পাঠিয়ে দিলে হত। আমি মরি ক্ষতি
নেই-কিন্তু স্বামী পুত্রের গায়ে আঁচ, না লাগে।
[ ভূ-শয্যায় শয়ন
পঞ্চম গর্ভাঙ্ক।
রাজসভা।
বীরবাহু সিংহাসনােপরি উপবিষ্ট। সভাসদগণ স্থিরভাবে
বসিয়া আছেন।
বীর।
বৈতালিকের স্তুতিগান বন্ধ করে দিয়েছি—ভাল লাগে না
বলে। আর সভাসদগণ তােমাদেরও বিদায় দিচ্ছি
একটু নির্জনে চিন্তা করব বলে। রাজ্যময় অশান্তি তাণ্ডব
নৃত্য কছে—সে নৃত্য প্রতিরােধের আমি কোন উপায় স্থির,
করতে পাছি না, দুর্ভিক্ষের প্রতীকার, ক’বুতে পাছি না,
দ্য তস্করের প্রতি উপযুক্ত দণ্ডবিধানের ব্যবস্থা কতে
সবিতারাধনা পাছি না। রাজ্যে বড় দুঃসময় এসেছে। প্রজারা বলছে রাণীই তার মূল কারণ। প্রজারঞ্জনার্থে সে কারণের মুলােচ্ছেদ ক’রূতে আমি কৃতসঙ্কল্প। আমায় নির্জনে থাকতে দাও, নির্জনে ভাবতে দাও। তােমরা বিদায় গ্রহণ কর। [ রাজাকে অভিবাদন করিতে করিতে সভাসদগণের প্রস্থান এই ত সংসার-এই ত রাজ্য-সুখ ! একজন সামান্য প্রজা যে সুখের, যে শান্তির অধিকারী, আমার তাতেও অধিকার নেই। এমনই ভাগ্যহীন আমিরাজোচিত কর্তব্য পালনের এমনই কঠিন বিধান। এখন ইচ্ছা হয়, একজন দীনহীন প্রজার সুখশান্তির সঙ্গে আমার রাজপদের বিনিময় করি। হায় অদৃষ্ট ! [ চিত্রসেনের গম্ভীরভাবে প্রবেশ চিত্র। বীর। চিত্র। মৌন কেন, বীর। চিত্র। বীর। রাজন! কে—চিত্রসেন—এস। তুমি সমস্তই শুনেছ ? শুনেছি। কোন উপায় স্থির করেছ ? উত্তর দাও। কি উপায় স্থির করতে পারি রাজন? উত্তম।-আমি উপায় স্থির করেছি। না করে আর থাকতে পারা গেল না। তুমি সমস্ত কথা শােননি বােধ হয়। তাই 'এখনও স্থির হয়ে আছ। রাজ্যে অশান্তির কথা ছেড়ে দাও এখন আমি সমস্ত অকণত। . চিত্র।
সবিতারাধনা চিত্র। বীর। • না-না-তুমি সমস্ত অবগত নও। শােম। আমার পরমান্ন খেতে ইচ্ছা হয়েছিল। মাকে প্রস্তুত করূতে ব’ললে। মা বললেন সুসময়ে যা পেটে সয়নি, অসময়ে কি তা সইবে বাছা ? যা’ হ’ তিনি পরমান্ন প্রভৃতি প্রস্তুত করে রেখে তােমার বাড়ী চলে গেলেন—ফুলবড়ি দিতে। আমি ও রাণী পাশা খে’তে বলে। আকাশে এক ঝল্কা রক্ত বৃষ্টি হয়ে গেল, আগুণের হলকা ছুটুল। তথাপি আমি স্থির হয়ে বসে পাশা খেলতে লাগলেম্ । শুনছ, উছ- কাপছ যে! নাকপিনি ত। বীর । আচ্ছা!-তা’রপর রাণী হাই তুল্লেন—আমার গোঁফ, দাড়ি জলে গেল। এই দেখনা—সত্য কি রহস্য-এই দেখনা। দর্পণে মুখ দেখে আমি দুঃখিত হ'লেম-লজ্জিত হলে। খেলা বন্ধ হয়ে গেল। রাণীকে পরমান্ন আনতে বল্লেম্। আবরণ খুলে দেখি-পাত্র রক্ত পূর্ণ-ভস্মাবশেষে কলুষিত। চিত্র। তুমি কি বলছ সখা ? বীর। সত্য বলছি, স্বরূপ বলছি। তারপর মা এলেন। মা এসে পাত্র স্পর্শ করতেই যেমন পরমান্ন, তেমনি হ’ল। এখন বল দেখি, এমন পিশাচিনীর সঙ্গে আর একত্রে বাস করি কেমন করে ? এই হতভাগিনীর জন্য আমার রাজ্য নষ্ট হতে বসেছে—আমি স্বয়ং মৃত্যুমুখে পতিত হবার আশঙ্কা করছি। বল তুমি, এর প্রতিবিধান করা উচিত কি ?? আমি কিছুই স্থির করূতে পাচ্ছি না। চিত্র।
সবিতারাধনা
বীর। তুমি পার নিপারবেও না। কিন্তু আমি স্থির করেছি।
তুমি কেবল আমায় একটু সাহায্য করবল সেটাও পাবে
কি না ?
চিত্র।
চিত্র।
–
আমায় কি ক’তে হবে ?
বছি। কিন্তু তার পূৰ্ব্বে বল দেখি—এ ব্যাপারটা কি ?
তুমিও মৃগয়া কবুতে গিয়ে একটা বনবাসিনীকে বিবাহ করে
আলে আর আমিও সেই বনে সেইরূপ একটা বনবাসিনী
বিবাহ করে আলেম্ । তারা দুইজনেই সহােদরা।
কিন্তু তােমার ভাগ্যে এত সুখ, এত সম্পদ, আর আমার
ভাগ্যে এত দুঃখ, এত যন্ত্রণা, এত অশান্তি কেন ?
শুনেছি সখা-
যা’ আর কোন কথা শুনতে ইচ্ছা নেই, কোন কথা শুতে
চাইও না। এইমাত্র বুঝেছি--রাণী অলক্ষ্মী।
সখা—তা নয়-
কোন অনুরােধ ক’র না—কলে তা উপেক্ষিত হবে।
আমার স্ত্রীপুত্রকে বধ কর, বধ কর—তুমি স্বহস্তে তাদের
বধ কর। তােমার উপর আমার এই আদেশ। যাও,
তাদের তপ্তশােণিত এনে আমাকে দেখাও—তবে আমি
তৃপ্ত হ’ব, স্থির হ’ব।
বীর।
চিত্র।
বীর।
[ চিত্রসেন কম্পিত কলেবরে বসিয়া পড়িল
, যাও, যাও কাপুরুষ হয়াে না, কার্য হন্তা হয়াে না।
চিত্র।
সখা!
সবিতারাধনা
বীর।
*?
কোন কথা শুনতে প্রস্তুত নই। নারীবধে, শিশুবধে পাতক
বিবেচনা ক’বৃছ—কিন্তু এ নারী নয়, পিশাচিনী। আর সে
পিশাচিনী পুত্র। প্রজারঞ্জনাৰ্থে শ্রীরামচন্দ্র, সতীশিরােমণি
নিরপরাধিনী সীতাকে গর্ভাবস্থায় বনবাসে দিতে পেরেছিলেন,
আর আমি পিশাচিনী, পিশাচিনী-পুত্রের রক্ত দর্শন ক’বৃতে
পারি না ? পিশাচিনী জগতে থাকলে জগতের প্রভূত
অনিষ্ট হবে। যাও, যাও, তাদের বধ করে আমার রাজ্য
রক্ষা কর, আমায় রক্ষা কর, জগৎ সংসারের মঙ্গল-বিধান
কবু।
চিত্র।
বীর।
এক অনুরােধ
কোন অনুরােধ রক্ষা ক’রূতে পা'বৃব না। বহু অনুরােধ রক্ষা
করেছি। কিন্তু এখন, ধৈৰ্য্য আমার সীমা অতিক্রম করেছে।
আর কার অনুরােধ রক্ষা ক’তে পারব না। তুমি যাও,
কৰ্ত্তব্য-পালনে বিমুখ হয় না। তা হলে আমায় অন্য
জনের উপর এ কার্যের ভারাপণ ক’তে হবে। কিন্তু
তাতে তােমারও মঙ্গল হবে না। আমি কৰ্ত্তব্য-পালনে
দৃঢ় সঙ্কল্প।
তােমার কথায় আমি কখনও অবজ্ঞা প্রদর্শন করতে পারি
নে--আজও পারুলেম না। কিন্তু সেই কারণে কি আমার
প্রতি এই অত্যাচারটা বন্ধুত্বের নিদর্শন? চলে সখা,
চলে—-ঘাতক হতে চল্লেম্ ।
চিত্র।
[ প্রস্থান
৯৭
সবিতারাধনা
বীর।
উদার-কোমল-হৃদয় সখা আমায় তিরস্কার করে গেল।
যাক। কিন্তু রাজমহিষীর, রাজকুমারের বধভার সখা ভিন্ন
আর কার উপরে ন্যস্ত করা যেতে পারে।
[ প্রস্থান
ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক।
পথ।
দুর্ভিক্ষ পীড়িত প্রজাবৃন্দ আর্তনাদ করিতে করিতে চলিয়া
গেল। কয়েকজন লােক কয়েকটা শবদেহ টানিয়া আনিয়া
একটা গহ্বরের মধ্যে ফেলিয়া দিল। কয়েকজন নাগরিক
আপনাপন দ্রব্যসম্ভার লইয়া ভীত এ্যস্ত ভাবে ছুটিয়া
পলাইল। দস্যু তস্করেরা তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করিল।
( ভিক্ষাজীরিগণের প্রবেশ ও গীত)
;
ইতুপূজায় করে হেলা,
এ দেশ এখন অন্নহীন
অন্ন বিনা ছন্নছাড়া
সবাই এখন দীনের দীন।
পাপের তাপের শুকিয়েছে জল,
৯৮
সবিতারাধনা
গাছে গাছে নাইক সে ফল,
হাটে বাটে উঠে কেবল
দীনের রােদন ক্ষীণ
কে মুছাবে কাহার আঁখি
এখন যে কুদিন।
ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম সকল গেছে,
পুণ্যদেশে আর কি আছে,
কি সুখে আর বাঁচব বল
আমরা যে গাে দীন,
মরণ হ'লে বাঁচব প্রভু
শুধ,ব তােমার ঋণ।
[ গায়িতে গায়িতে প্রস্থান
সপ্তম গর্ভাঙ্ক।
চিত্রসেনের কক্ষ।
চিত্ৰসেন পালঙ্কোপরি শয়িত। ঝুমনাে পার্শ্বে দাড়াইয়া
আছে।
রমনাে। অধীর হয়াে না, শান্ত হও। আমি তার উপায় স্থির করেছি।
তুমি ওঠ, ওঠ।
সবিতারাধনা
।
চিত্র।
চিত্র।
, আর আমি উঠব না। এই শয্যাই যেন আমার মৃত্যু
শয্যা হয়—এ শয্যা থেকে যেন আর আমাকে উঠতে
না হয়।
ঝুমনন। ছি, তুমি কি বলছ?
প্রাণের জ্বালায় বলছি, নারীবধ ক’তে হবে, শিশুবধ করতে
হবে বলে বলছি, তােমার ভগিনীকে ভগিনীপুত্রকে হত্যা
করতে হবে বলে বলছি, বন্ধুপত্নীর বন্ধুপুত্রের ছিন্ন মস্তক
দর্শন ক’তে হবে বলে বলছি, ছিন্ন মস্তকের তপ্ত শােণিত
রাজসমীপে—সখা সমীপে নিয়ে যেতে হবে বলে বলছি।
এখন বুঝেছ, আমার অবস্থা কি? হয় আমাকে ম’তে হবে,
হয় আমায় উন্মাদ হতে হবে। বুঝেছ, আমার অবস্থা
বুঝেছ ?
ঝুমনাে। বুঝেছি-বুঝেছি বলেই তার উপায় স্থির করেছি, তুমি ওঠ,
আমার কথা শােন, স্থির হও, শান্ত হও।.
[ চিত্রসেন উঠিয়া বসিল
চিত্র। স্থির হ’ব, শান্ত হ’ব—আচ্ছা, না হয় হ'লে। কিন্তু তুমি কি
উপায় কবে ? রাজাদেশ, বন্ধুর অনুবােধ। তুমি কি
উপায় কবে, তুমি কি উপায় কবে ?
ঝুমনন। উপায় করেছি। দেচ্ছ না, ভগিনীর, ভগিনী পুত্রের হত্যার
কথা শুনে, আমি একটুও বিচলিত হইনি, স্বামীর কাতরতা
দেখেও স্থির হয়ে আছি। যাঁদের রক্ত চাই—তাদের রক্ত
এনে দিচ্ছি--দাড়াও।
{ বেগে প্রস্থান
* ..
সবিতারাধন
চিত্র।
কুম্-ঝুম্ ! একি-ঝুম্ কি উন্মাদিনী হ’ল । কি হ’ল
কি হ’ল। ঐ যে রক্তাক্ত দেহে ছুটে আসছে। কি ভীষণ
কি বিভীষিকা।
চিত্র।
[ রক্তাক্ত দেহে ও রক্তপূর্ণ পাত্র হস্তে ঝুমনোর প্রবেশ
ঝুমনাে। এই নাও-এই নাও । যাও, রাজসমীপে নিয়ে যাও।
বিলম্ব কোরাে না, যাও, যাও রক্ত শীতল হয়ে যাবে।
ওঃ—আর সহ্য ক’তে পারি না। তুমি হত্যাকারিণী, তুমি
হত্যাকারিণী ! হায়, হায় আমি কেন রাজরাণীকে রাজপুত্রকে
সঙ্গে করে এখানে নিয়ে এসেছিলেম।
ঝুমুননা। যাও, যাও—কথা বলবার অবসর নেই। ফিরে এস, তারপর
সমস্ত কথা শুবে। ভয় নেই, আমি হত্যাকারিণী নই, আমি
উন্মাদিনী নই
চিত্র। তুমি হত্যাকারিণী নও—আঃ শান্তি পেলেম। কিন্তু কি ভীষণ
বেশ তােমার, কি ভীষণ মূর্তি তােমার ?
বুমনাে। কথা বলবার অবকাশ নেই। ফিরে এস, তারপর সব
শুবে। আমায় বিশ্বাস কর—আমি তােমার সেই ঝুম।
নিশ্চিন্ত হলেম-দাও, পাত্র দাও।
[ রক্তপূর্ণ পাত্র সইয়া বেগে প্রস্থান
বুননা। একটা দুঃসাহসিকতার কাজ করে ফেলে। ঘাতককে
দিয়ে কুকুরের প্রাণ বধ করে শােণিত সংগ্রহ করেছি।
রাজা কি তা জানতে পাবেন-বােধ হয় নয়। এখন
দিদিকে লুকিয়ে রাখি কোথায় ? না, এখানে লুকিয়ে রেখে
চিত্র।
*
1
সবিতারাধনা
আর কাজ নেই। দিদিকে আবার বনবাসে পাঠাই। সেখানে
কুটীর বেঁধে থাকুক গিয়ে। বিজয়ও সঙ্গে যাক। প্রাণে
বেঁচে থাকে, সুদিন ফিরে আসে ত আবার তারা রাজ্যে
ফিরে আসবে। নতুবা এই শেষ বিদায়। তিনি রাজবাড়ী
থেকে ফিরে আসুন। তারপর পরামর্শ করে যা হয় করা
যাবে।
হে ভগবান্ মরীচিমালি, ভক্তের—সেবিকার
মনােবাঞ্ছা পূর্ণ কর।
[ প্রস্থান
পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
নগর-প্রান্তে বনপথ।
উনাে, বিজয়ের হস্ত ধরিয়া বৃক্ষতলে দাঁড়াইয়া আছে।
সময়-সন্ধ্যা।
বিজয়। মা, আর দাঁড়াতে পাছি না। মাথা ঘুরূছে, চ'খে আর
দেখতে পাচ্ছি না, হাত, পা থর থর্ করছে। ক্ষিদের জ্বালায়
প্রাণ গেল মা।
উনাে। মাগাে -কপালে এতও ছিল। সম্মুখে ক্ষুধাতুর সন্তান ক্ষুধার
তাড়নায় মৃত প্রায়, আর আমি দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনায়াসে
তাই দেখছি ! রাজমহিষী আমি-অন্নাভাবে প্রাণ যায়-
রাজকুমার ক্ষুধা তৃষ্ণায় মুমুর্ষ ! হায় বিধাতা তুমি কি নিষ্ঠুর,
তােমার জগৎ কি নিষ্ঠুর! এক মুষ্টি গলিত অন্নও কি আমার
ভাগ্যে নেই ? আমি এত কি মহাপাপ করেছি।
বিজয়। কি ভাবছিস মাতাের চ’খ দিয়ে জল পড়ছে কেন মা?
তুই চুপ, কর—আমার আর ক্ষিদে নেই। ক্ষিদে ভাল হয়ে
গেছে। আয় তুই এই গাছতলায় ব’—আমি তাের কে
মাথা দিয়ে শুই। তা হলই আমার সব ভাল হয়ে যাবে।
১৩
সবিতারাধনা
উনাে। দেখি—কত সয়! আয় বাবা আয়-তাই কর । আমার
কোলে মাথা দিয়ে তুই শশা। আমার ব্যাকুলতা তােকে
ঘিরে থাকুক। দুখিনী জননীর এ ভিন্ন আর কি আছে বাবা?
হ্যা বাবা, তুই যে তাের মাসীর কাছে গেলি, সে কি তােকে
ক্ষুধার অন্নও দিলে না ? আমার দুঃসময় দেখে, সে কি এত
নিষ্ঠুর, এমন পাষাণী হ’ল ? আমি কঁছি—সে হাসছে—
হাসু। কিন্তু এই দুগ্ধপােষ্য শিশুর ভাটাও কি সে নিতে
পারুলে না ? এই কি সংসার, এই কি সহােদর উচিত
কাজ ? যা বাবা, তুই নগরে ফিরে যা'-কার বাড়ী দাসত্ব
করে বেঁচে থাকি ; আমি এই গহন বনে প্রবেশ করি-
হিংস্র পশুকুলের আহার হই।
বিজয়।
অমন ক’চ্ছিস কেন মা? মাসীর ত কোন অপরাধ নেই।
মাসী আমাকে কত যত্ন করতেন, কত কি খেতে দিতেন।
নিজের ছেলেকেও মাসী অত যত্ন কতেন না। কিন্তু এক
জনের জ্বালায় আমায় পালিয়ে আসতে হল।
উনাে। সে কে তাের মেসসা বুঝি ?
বিজয়। না-না-তা’ কেন ? মেসে কি জানত, আমি মাসীর কাছে
আছি! তা নয়-তা নয়—সে একটা বুড়াে-বুড়ো বামুণ।
বামুণটা বােজ রাত্তির বেলায় আমায় ডাঙ্গসের বাড়ী মান্বত
আর বলত,
“তুনিন্দিনীর পুত, তুই আমার ঝুমনাের
ঐশ্বয্যিতে ভাগ বসাতে এসেছিস?”
উমুনাে। বলিস কি, তারপর ?
১৪
সবিতারাধন ', বিজয়। তার পর মাসী বল্লে-বুঝেছি বাবা, এ ঠাকুরের কোপ। তুই যা’ বাবা, মা’র ছেলে তুই মার কাছে যা। উমূননা। এ-তােকে বিদেয় করে দিলে ? বিজয়। না মা, আগে শােন্ না, তার পর না হয় রাগ করিস ? বিস্তর ধনদৌলত, লােকজন সঙ্গে দিয়ে মাসী আমার তাের কাছে পাঠিয়ে দিলে। হাঁ মা, বাবা আমাদের ওপর এত রাগ করেছেন কেন মা? উনাে। ব’লব অখন। তুই বল; তার পর কি হল ? তাের ধন- দৌলত কোথা’ গেল ? বিজয়। সে কথা আর বলব কি মা?—বলতে ভয়ও হয়, কষ্টও হয়। উননা। তুই বল—আমার কাছে আবার ভয় কি, কষ্ট কি ? বিজয়। তবে শােন্ মা। লােকজন সঙ্গে নিয়ে সমস্ত রাস্তা বেশ এলুম। কাছাকাছি এসে ভাবলুম-আমার মা গরীব, মাসী বড়লােক। মাসীর লােকগুলােকে মা’র সঙ্গে দেখা ক’বৃতে দিয়ে কাজ নেই। উনাে। কেন ? বিজয়। আমরা গরীব যে মা! তাই মাসীর লােকজনকে বল্লুম, তােমরা এইখান থেকে যাও ভাই। ঐ 'আমাদের বাড়ী দেখা যাচ্ছে। আমাদের লােকজন এসে সব বই করে নিয়ে যাবে। তারা চলে গেল ! আর অমনি বুড়ো বামুণটা এসে জিনিস পত্তর সব আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে, আমায় ডাহস মেরে, কাদায় ফেলে দিয়ে চলে গেল। সেখান থেকে অতি কষ্টে উঠে আমি তােমার কাছে এলুম।
সবিতারাধনা
}
উনাে। কে সে বুড়ােটাতাের মাসীর ভাঁড়ারী বুঝি? আচ্ছা, কখনাে
যদি দিন পাই, তখন বুঝব? তা হলে দেখছি, তাের
মাসীর কোন দোষ নেই ?
বিজয়। একটুও না।
[ কয়েকজন স্ত্রীলােকের প্রবেশ
এ স্ত্রী। ওরে বাছা, ওরে বাছা-আয় তুই ফিরে আয় ; আহা তােরা
গরীব, তােদর তাড়িয়ে দিয়ে ভাল করি নে। গেরস্থ আমরা,
সহজে কি ভিকিরী তাড়াই? তুই বড় বাড়াবাড়ি কলি,
তাই দুটো কথা বলেছিলুম্ বাছা। তা যাক গে বাছা, এখন
তােরা আয়—তােদের খুঁজে খুঁজে—আজ সমস্ত দিনটা
গেছে ।
দ্বি স্ত্রী। ছাত্ দেখি বাছা, তাের কি অন্যায়! বউ ঝি খেতে বসেছে,
আর তুই তাদের খাওয়ায় দিষ্টি দিস!—তাই ত তােকে দুটো
কথা বলতে হল।
উনাে। আমাদেরও সুকাল ছিল না।
[ ক্রন্দন
তু স্ত্রী। আর চখের জল ফেলিসনি বাছা, আর দীর্ঘ নিশ্বেস ফেলিনি,
যা’দের এতদিন খেলি, তাদের কি অকল্যাণ করূতে আছে
গা:তাের ছেলে তার মাসীর ঘর থেকে ফিল কবে?
আহা বাছারে মুখখানি শুকিয়ে গ্যাছে।
"চতু স্ত্রী। আবাগী বড় মানুষ মাসী বুঝি, ছেলেটাকে খেতে দেয় নি ?
কই সঙ্গেও ত’ কিছু দেখছিনি। এমনই সংসার রে!
সবিতারানা
ছেলেটা এতটা পথ গেল, এতদিন সেখানে রইল, আর
আসবার সময় বুঝি হাতে দশগণ্ডা কড়িও দিতে নেই, রেক
পাঁচেক ধানও দিতে নেই, খান দুয়েক পুরােন কাপড়ও দিতে
নেই ? আহা বাছারে !
প্র স্ত্রী। আমি ত’ বলেছিলুম বাছা, ও চ্যাংনাটাকে পাঠিয়ে কাজ নেই,
তা হলে কাজ হবে না। তুই আপনি যা কিছু আলেও
আতে পাবি। তা শুনলি কৈ? তা না দিয়েছে, নেই
দিয়েছে-তােরা আয়—ততাদের অন্নের যােগাড় আমাদের
কাছে হবে অখন।
উনাে। চল।
(বিজয়ের গীত )
যারা দিনে রেতে ভেবে মরে
অন্ন কোথায় পাওয়া যায় ।
কে জানে কে কোথায় বসে
তাদের মুখে অন্ন দেয়।
ভাবব না আর অত শত
ডাকব তারে পাব যত,
কান্না দেখে আসবে ছুটে
যার কাছে গাে অন্ন চাই;
যাবে ক্ষুধা, পাব সুধা
শঙ্কা আমার আর ত নাই।
।
সবিতারাধনা
আহা বাছারে !
[ বালকের হস্ত ধরিয়া প্রথম স্ত্রীলােক চলিয়া গেল
তাহাদের পশ্চাতে সকলের প্রস্থান ]
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
চিত্রসেনের কক্ষ।
চিত্রসেন ও বীরবাহু
?
দেখ সখা, কেবল ভাবি, বসে বসে কেবল ভাবি। রাজ্যে
বিশৃঙ্খল হ’লধন ধান্তে আগুন লাগল ; প্রজার কাতর
ক্রন্দন আমায় ব্যথিত করে তুলে। কোন উপায় স্থির না
ক’তে পেরে, তােমার কথায় কর্ণপাত না করে আমি রাজ
মহিষীকে ও রাজকুমারকে—উহুহু সে কথা মনে ক’বৃলেও
ব্রহ্মাণ্ডের অগ্নি আমার মাথায় জ্বলে উঠে। স্ত্রী হত্যা করেছি,
পুত্র হত্যা করেছি, কার কথা শুনিনি, কার পরামর্শ
গ্রহণ করিনি—আপনার চিতা আপনি সাজিয়েছি--এখন সে
চিতাগ্নি নির্বাপিত করে কে? ও হৃদয় শান্তি হারা।
কি করি, কি করি—সখ কি করি?
এখন ধৈৰ্য্য ধরতে হবে, ধৈর্য হারালে এখন চলবে না।
.
চিত্র।
'সবিতারানা
বার।
ধৈৰ্য্য! ধৈর্যহারা হয়েছিল, তাই বুঝি শান্তি হারিয়েছি।
কি পরিতাপ! রাজরাণী অপরাধ করে থাকে, সে তার
প্রায়শ্চিত্ত করেছে। কিন্তু দুগ্ধপােষ্য শিশুর অপরাধ কি ?
তার প্রতিও কৃপাবিন্দু ত’ দান করলে না। সন্তান
হত্যার পাপে পাপী হয়েছি। ওঃ হো-হাে-হাে।
চিত্র।
হৃদয়স্থিত হৃষীকেশ যা আমাদের করা, তাই আমরা করি।
আমাদের আর পাপ পুণ্য কি? খেলার পুতুল আমরা
আমাদের আর অপরাধ কি ?
'।
যথার্থ বলেছ, যথার্থ বলেছ—আমার অপরাধ কিসের
আমি কে?-আমি কে? হৃষীকেশই সব জানে। শান্তি
পেতে তােমার কাছে এসেছিলে, সে শান্তি পেয়েছি।
ডাক, ডাক, ঝুম’কে ডাক। তাকে আমি ব'লে যাই
আমার কোন অপরাধ নাই। হৃষীকেশ যা করিয়েছেন,
তাই করেছি। আমার কোন অপরাধ নেই। উহু, উহ,
হ’ল না, হ’ল না, শান্তি পেলে না। ভুল, ভুল, মনের ভুল।
তা কি হয়, তা কি কখনও হয় ?
চিত্র।
কি হয় সখা, কি হয় ?
বার।
এই হৃষীকেশের কথা ! যখন পাপ করব, তখন বলব,
হৃষীকেশ তুমি করাচ্ছ,
তাই কছি; আর সময়ান্তরে
হৃষীকেশকে ভুলে যাব, আপনার কৃতিত্ব আপনি বিচার
করব। তা হয় না। হ’ল না—আমার ভাগ্যে শান্তি
লাত করা প্রটে উঠল না। তােমাৰু সাজান সংসার নিয়ে
সবিহারাধনা t পরি। তুমি সুখে থাক ভাই, আমি দুঃখের আবর্তে পড়ে দুঃখ ভােগ করি। যাই দেখি, যদি কিছু উপায় কতে পারি। [বেগে প্রস্থান চিত্র। তাই ত’! রাজার মানসিক অবস্থা ত’ মন্দ হ’তে মন্দতর হচ্ছে। কি উপায় করি? 'ভগা, ভগবান! [ চিত্ৰসেন ধীরে ধীরে চলিয়া গেল। তৎপরে পরিচারিকা . সঙ্গে ঝুমনাের প্রবেশ ] ঝুমননা। তার পর ? তার পর মা ঠাউরােন, রােজই তেনি বলেন, হাগাে, তুমার মা ঠাউরুণকে জিগাস কছিলে—তার বুন, বুনপাে আছে কি না? আমি সে কথাটি মা ঠাউরুণকে জিগাসতে ভুলে গেছি। তার আর উত্তর দেই কি ? বললেম- ভুইলে গেছি। কুমননা। আবাগী এমন ভুলও কতে হয়! তার পর? তা’র পর মা ঠাউরুণ, তেনি একটা আঙ্গুঠী গাগরীতে ফেইলে দেলে। আপনি মা ঠাউরুণ, চ্যান করতে লাগলেন্, আর আংঠাটা গাগরীতে খসে গেল, আর ঠক্ ঠকানিতে আপনকার মাথায় বাজল। ঝুমনাে।"বেশ, তাের খুব বুদ্ধি। এখন যা’, তারা যেখানে বসে আছে, সেইখান থেকে তাদের নিয়ে আয়। খিড়কীর দোর দিয়ে তাদের আবিদেখিস পাক পক্ষীও না ও কথা টের পায়। বুঝলি -হাবি? পরি। পরি। এয়।
সরিভারাধন
''
4
পরি।
ঝুনাে। মরণ আর কি—“আজ্ঞে” কি তােয় মুখ দিয়ে বেরোয় না?
এজ্ঞে।
ঝুমনো। দূর-আবাগী, হাবি, নেকি। এখন যা তাদের নিয়ে আয়।
আর দ্যা, আসবার সময় : স্যাকরাকে ডেকে আসৃবি,
কাপুড়েকে ডেকে আবি, নারায়ণ তেল নিশ্চয় আবি-
বুঝলি ত ?
পরি।
এজ্ঞে। হঁা, মা ঠাউরুণ, স্যাক্রা, কাপুড়িয়া কবুবা কি ?
আমাদের গহনা কাপুড় দেবান্ বুঝি ?
ঝুমনাে। আচ্ছা-তাের কপালেও কিছু হবে–তুই যা এখন।
এজ্ঞে যাই। খুব ঠায় ঠায় যাব, না, ছুট মেরে মেরে, ছুট
মেরে মেরে যাব।
ঝুমনাে। আঃ—হাবি, তুই বড় জ্বালালি। যা তুই যেমন করে পারিস,
তেমনি করে যা।
[ অঙ্গভঙ্গী করতঃ পরিচারিকার প্রস্থান
পরি।
{
আহা দিদি, বড় কষ্টে, নিদারুণ যাতনা, বেদনা দীনতার
কসাঘাতে জর্জরিত হয়ে দিদি আসতে চেয়েছে। এস
দিদি এস—তােমাদের সকলের দুঃখ কষ্ট দূর করবার চেষ্টা
কবুব। সুখ কি একলার, না সুখ পাঁচজনকে নিয়ে।
[ প্রস্থান
সবিতায়ধনু
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
অন্ধকার গৃহ।
(গৃহ কোণে বসিয়া লক্ষ্মীমণি—আপন মনে বকিতেছে)
ই-তাই ত তেমন কাপড় খানা কেড়ে নিয়ে আমায় ন্যাড়া
পরিয়ে দিলে কে র্যা! ঝুমনাে আমায় কত দেয়, কিন্তু
সব যেন কপ পূরের মত উপে যায়। সেই বুড়াে বামুণটা
কেবল বলে, ইতুনিন্দুনী তুই, ঝুমনাের, ঐশ্বয্যি কেন ভােগ
কবি? ভ্যালা জ্বালাতেই পড়া গেছে রে বাপু। আমার
মেয়ের ধন, আমি ভােগ, করব, তাতে তুই কথা কইবার
কে বামুণ ?
যাগে আর ও সব ভাবব না। তাই ত, আমার
বামুণ এখন কোথায় ? খেতে পাচ্ছে কি না কে জানে ?
ছেলেটাই বা কচ্ছে কি? যাকগে, ভেবে আর কবুব
কি? ভাবলে ত আর কিছু উপায় ক’তে পাব না।
তার চেয়ে বসে বসে এই কলার চোবাটা চিবুই। বড়
ক্ষিদে—আমার বড় ক্ষিদে। ঝুমনাের ছেলে কলা খেয়ে
চলে গেল। ভাগ্যে চোবাটা ফেলে দিয়েছিল, তাই পিত্তি
এক্ষে হল।
[ লক্ষ্মীমণি কলার চোবা চিবাইতে লাগিল
পায়ের শব্দ হচ্ছে, কেউ আছে না কি? এা তাই ত
সবিতারাধনা কুম্। লী। ঝুম্। লক্ষ্মী। তাই ত কলার চোবা ফেলে দেব নাকি? উহু গিলে ফেলি, গিলে ফেলি। [ তথাকরণ ও ঝুমনাের প্রবেশ কে গা-ঝুমনাে?' আয় মা, আয় ; বড় ক্ষিদে মা, বড় ক্ষিদে। কেবল ক্ষিদে ক্ষিদে করেই গেলে। আচ্ছা মা, তুমি কি হলে বল দেখি? কি আর হ’ব মা—সর্বশরীরটা রাত দিন কুকুরে চিবুচ্ছে। বড় কষ্ট মা, বড় কষ্ট। কোন কষ্ট থাকবে না। আজ রবিবার—তুমি আমার সঙ্গে ইতুপূজো কর দেখি—সব কষ্ট দুর হয়ে যাবে। আর মা ইতুপূজো। পেটের জ্বালায় এইমাত্র একটা কলার চোবা হজম্ করে ফেললুম। মা ! আর বকিসনি বাছা, বকিনি। দুৰ্ব্বদ্ধিবশে একটা ছেলে মানুষী করে ফেলেছি, তার আর কি হবে বাছা ? , মা—তােমায় বকিনি । তুমি জননী আমার,স্বর্গের চেয়েও বড় জিনিস। কিন্তু আমি ভাবছি, দেবতার কি কোপ, ! দেবতা তােমায়, দেবতার পূজো কিছুতেই ক’রুতে দেবে না, দেখছি। সেদিন ছেলেদের হাত থেকে পড়ে যাওয়া মাের কোণ ভাঙ্গা খেয়ে ব্ৰতটা নষ্ট ক'লে—আজ আবার কলার চোবা, এ দেবতার খেলা বই ত আর কিছুই নয়। ঝুম। লক্ষ্মী। কুম।
সবিতারাধনা লক্ষ্মী। ঝুম। ? লক্ষ্মী। ঝুম্। কে জানে মা কিসে কি হয়। আমি ক্ষিদেতেই মরে আছি- ত আর বুঝব কি বল ? (স্বগতঃ ) ওঃদেবতার কি কোপ-মাকে আমার মায়ায় -ঘেরে রেখেছে। দিদিরও ঐ দশা ! যাক, কাকেও এখন কিছু বলে কাজ নেই। দিদিও খাই, খাই করে গেল, আর মা’রও ঐ বােল। বলুম-দিদি, বৰ্ত্ত কর না। উত্তর দিলে-ঘােড়ার ছােলা চিবিয়েছি, পাতের ক্ষীর খেয়েছি। এই সব ব্যাপার। কি গ্রহ বৈগুণ্য! আচ্ছা ঠাকুর, তুমি থাক, দেখি—ভক্ত বড়, কি ভগবান বড়। ও ঝুনাে, তুই কি ভাবছিস মা ? ভাবছি !-দেখ মা, আর রবিবারে তােমায় বৰ্ত্ত ক’তেই হবে। আমি তােমায় কাছে নিয়ে শােব। দেখি, তােমায় বৰ্ত্ত করাতে পারি কি না ? আর বৰ্ত্ত ফওঁ ক'রে কি হবে বল মা ? সূৰ্য্যায় নমঃ- শ্ৰীসূৰ্য্যায় নমঃ। [ ঝুমনাে আপন কর্ণ ও নাসিকা মর্দন করিল ছি মা-ও কথা মুখে আনতে নেই। (স্বগতঃ) আগে মাকে বৰ্ত্ত করাই, তারপর দিদিকে করাব। দিদিকেও কাছে নিয়ে—আঁচলে আঁচলে চুলে চুলে বেঁধে শুতে হবে। দে’ দেবতা, দে’থ ভগবান্ ভক্তের মনােবাঞ্ছ যেন পূর্ণ হয়। [ প্রস্থান ওরে ঝুমনাে গেলি—আমার ক্ষিদের উপায় কি করলি? লক্ষ্মী। ঝুম্। লক্ষ্মী।
সবিতারাধনা
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
পথ।
ধনরাজ।
ধন।
কোথায় যাই, কোথা গেলে চাটী অন্ন পাই।
ক্ষিদের জ্বালা, তার ওপর সেই বুড়াে বামুণের মার ধাের !
কখনাে কাদায় পড়ছি, কখনাে পাশ গাদায় পড়ছি, কখনাে
ডাঙ্গস খাচ্ছি আর কখনাে অর্ধচন্দ্রের ব্যবস্থা। ব্রাহ্মণী ত মজা
করে, মেয়ের বাড়ী ব’সে ভাতের থালা পা ক’রূছে ; আর
এখানে আমি বেটা খাচ্ছি প্রহার। দেখ একবার সংসারের
গতিক। ভাল, আমার খবর নিলি, না নিলি, ব’য়ে গেল,,
কিন্তু ছেলেটার খবরটাও ত নিতে হয়। আচ্ছা বাণী থাক্
তুই, হাতে পড়লে তাের নাক ছেটে দেব।
[ জনৈক লােকের প্রবেশ
ওগাে ওগাে কত্তা হনহনিয়ে যাচ্ছ কোথা ? বলি একটু
দাঁড়াও না। বলি, একটা কথা ‘শােন না-একটু দুঃখের
কাহিনী আমার শােন না। আমি ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ—আজ
তিন দিন অনাহারে আছি। চাচী ভাতের যােগাড় করে
দিতে পার? ওগাে, ওগে', কথা কচ্ছ না যে। বক্সি, হাঁ,
কি না, যা হয় একটা কিছু বল না ?
লােক। ব্রাহ্মণ, তুমি, তিন দিন অনাহারে ! আর দেশের ধনীগুলাে
সবিতারাধনা
৩
অন্নছত্র খােলার ভান করে দিব্যি নাম বাজিয়ে বেড়াচ্ছে।
ভাল, ব্রাহ্মণ, তুমি কারও স্মরণাপন্ন হয়েছিলে ?
ওগাে টের গাে ঢের। তেতলা চৌতলা বাড়ী—দ্বারে মােটা
দ্বারী। তারা সব খেদিয়ে দিলে গাে সব খেদিয়ে দিলে।
লােক। তারা তাদের স্বাভাবিক ধৰ্মই পালন করেছে। এস ব্রাহ্মণ
এস, আমার দীন কুটীরে এস। আমিও দীন, তুমিও দীন।
তােমার ব্যথা বেদনা আমি বুঝি, আর তুমিও আমার কথা
বুঝ। ধনী, নিধনের মর্ম ব্যাথা বুঝবে কেন, অথবা সে
অভিযােগ শুনবে কেন? বিলাসীর বিলাস-শয্যার পার্শ্বে
আৰ্ত্তের আর্তনাদ ওঠা উচিত নয়। তাতে যে তাদের
বিলাস-সুখে বাধা পড়বে। তুমি এস ব্রাহ্মণ এস-দীনের
কুটারে এস–অনুভবির অনুভূতি, সমবেদনা, সহানুভূতি
তােমার যন্ত্রণার লাঘব করবে।
{ মিহিরের বেগে প্রবেশ
মিহির। বাবা, বাবা, ভারী মজা, ভারী মজা। চট্ ক'রে এস বাবা,
চট করে ঘরে এস। আমাদের ভাঙ্গা চাল আবার কোটা
হয়ে গেছে। আগে সব যেমন ছিল, তেমনি হয়েছে।
সেই বুড়ো বামুণটা সব ফিরে দিয়ে গেল বাবা, সব ফিরে
দিয়ে গেল। ভারী মজা বাবা, ভারী মজা।
ধন।
বলিস, কিরে, বলিস, কিরে—চল—চল—চল বেটা চ।
কিন্তু এ ব্ৰাহ্মণ গেল কোথা! দ্যাখ, দ্যাখ।
[ ধনরাজ ও মিহিরের বেগে প্রস্থান
১১৫
সবিতারাধনা
পঞ্চম গর্ভা।
চিত্রসেনের কক্ষ।
উমনাে ও ঝুমননা।
(ঝুম্নাের গীত )
ঝুমনাে।
ওগাে নয় ত মিছে
সে ডালে কথা কয়।
দেব তা আমার দ্বারে বাঁধা
আর কারে মাের ভয় ?
যদি আমার আঁখি ঝরে,
সে কত গাে আদর করে
হেরি তারে পুলক ভরে
আমি তখন আমার নয়।
হাসি কঁদি তা’র ঈসারায়
আমি যে গাে “তিনি ময়”।
উনন। ঝুনো, এখন তুই হাসতে বলি, গান গাইতে বলি ?
তাে বিপদ শিয়রে, আমাকে আশ্রয় দিয়ে তুই বিপদ ডেকে
এনেছিস—তুই এখনাে হাসছিস ?
বুননা। কেন দিদি হা’সর না, কেন দিদি গাইব না—
হায় দিন
পেয়েছি যে, গাইবার দিন পেয়েছি যে। যতদিন সে দিন
.
.! '
সবিতারাধনা ছিল না, ততদিন হাসিনি, ততদিন কণ্ঠস্বর কেউ শুনতে পায়নি। আজ সে দিন পেয়েছি-মা’র চখের জল মুছাতে পেরেছি, তােমায় বাঁচাতে পেরেছি—বৰ্ত্ত করে সঙ্গে সঙ্গে তা’র ফল পেয়েছ তােমরা-আর আজ হাসব না। আজ আনন্দের দিন—আজ আনন্দ বিলাব, আনন্দ কুড়াব। উনাে। তুই বলিস কিরে—রাজা তােদের সবংশে কাটুতে চেয়েছে ; আর আজ তাে হাসবার দিন হল। মৰ্ম্ম- বেদনায় তুই ক্ষেপে গেলি নাকি? ঝুমনাে। কাটে কে-কাটাইত আছি—অথবা কাটা যেতে পারি না। উনাে। তুই কি বলছিস ? ঝুনাে। আত্মবিহ্বল হয়েছিলে। যাক, আসল কথা বলি শাে, তা হলেই সব বুঝতে পারবে। তুমি ত ইতুপূজা ক’রূলে। আর সঙ্গে সঙ্গে অমনি-হাতে হাতে ফল। রাজা তােমার বুদ্ধিমান ভগিনীপতিকে ডেকে পাঠালেন-বল্লেন কি জান ? উনাে। জানি—আমাদের তােমরা আশ্রয় দিয়েছ বলে তিনি তােমাদের সগােষ্ঠীকে কেটে ফেল্বে বলেছেন। মাগাে কি রাগ ! কুম্নাে। দূর-তা’ কেন। তােমরা যে এখানে আছ, তা তােমার ভগিনীপতিও জানতেন না, আর রাজাও জানতে না। তা’ হলে আর ইতু প্রজার ফল হ’ল কি? ব্লাজা ওঁকে বল্লে, তুমি ত বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে ঘর সংসার ক’ছ- কিন্তু আমার স্ত্রী পুত্র কোথা’? উনি বল্লেন-সে কি! তারা কি আর c ১১৮
সবিতারাধনা
*.
এ সংসারে আছে ? রাজাদেশে তাদের সঙ্গে সংসারের
সম্পর্ক ত বহুকাল উঠে গেছে !
সে কি আমরা ত বেঁচে রয়েছি—বেশ খাচ্ছি, দাচ্ছি—চলে
বলে বেড়াচ্ছি। আমরা-
হাঁ-হাতা’ত রয়েছ ; কিন্তু তার মধ্যে অনেক কথা
A
আছে যে !
ঝু
এর মধ্যে আবার কথা কি ? এা তবে কি আমরা বেঁচে
নেই নাকি!
[ আপনার শরীর নিরীক্ষণ করিতে লাগিল
(হাসিয়} খুব আছ-তার জন্যে চিন্তা নেই। যাক,
রাজা বল্লেন-তা’ আমি শুনতে চাই না, যেখান থেকে পার,
আমার স্ত্রী পুত্র এনে দাও ; না হলে তােমায় সবংশে এক
গাড়ে কাটব। তােমার ভগিনীপতি কথা শুনেই চ’খ কপালে
তুল্লেন। কাঁপতে কাঁপতে বাড়ী এসে শয্যা নিলেন।
আমি যত জিজ্ঞাসা করি ; কি হয়েছে, ততই তিনি ব্যাকুল
হয়ে পড়েন। অনেক সাধ্য সাধনার পর বল্লেন-“তােমায়
বলে আর কি হবে ?”
বুদ্ধি আর কি!
বিপদে পড়লে সকলের বুদ্ধিই ঐ রকম হয় গাে। আমি
বল্লেম-আচ্ছা বলই না, বলতে আর দোষ কি? ক্ষুদ্রের
দ্বারাও ত মহতের কোন না কোন সময়ে একটু উপকার হয়।
অনেক অনুনয় বিনয় করায় তিনি ব্যাপারটা খুলে,বল্লেন।
শুনে আমি খুব হেসে উঠলেন্।
উ।
সবিতারাধনা
উ।
A ও
তাের হাসি দেখে বুদ্ধির টেকি খুব রেগে গেল ?
সে আর বলতে। আমি বল্লেম-রাজা রাজড়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব
ক’রুলে তা’র ফল ঐ রকম একটা বিকুটে রকমেরই হয়ে
থাকে।
মিছে নয়—তারপর ?
তারপর তাকে সব কথা খুলে বশ্লে। সব শুনে তবে উঠে
কৰ্ত্তা স্নানাহার করেন—তারপর এইমাত্র রাজবাড়ী
গেছেন—রাজাকে নিমন্ত্রণ ক’রুতে। রাজার আজ এখানে
নিমন্ত্রণ—খেয়ে দেয়ে স্ত্রী পুত্র নিয়ে ঘরে যাবেন।
তুই আমায় অবাক্ কলি। এত বুদ্ধি তাের পেটে ! ধন্যি
মেয়ে তুই !
তােমাদের মিলনটা হ’ক আগে-তা’রপর ধন্যি ধন্যি কর।
চল এখন, নেমুন্তন্নে এসে পড়ল বলে।
বলে। আমাদেরও
প্রস্তুত হয়ে থাকতে হবে ত ?
তাের ঋণ কখনাে শুধতে পাব না।
যখন অধঃপাতে যেতে বসেছিলে, তখন এত কথা ছিল
কোথা ? মা’র পেটের ব’ন তুমি, তুমি এসেছ আমার কাছে
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ক’তে ? রাজরাণী হয়ে, রাজার বাঁ পাশে
দাড়িয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর—অনেক কাজ হবে। আমি
তােমার সেই বুননা, আর তুমি আমার সেই বন—সেই
দিদি। চল, এখন—আসল কাজ বাকী।
[ উনােকে টানিয়া লইয়া ঝুমনাের প্রস্থান
কু।
১ ও
বু।
সবিতারাধনা
যষ্ঠ গর্ভাঙ্ক।
চিত্রসেনের সজ্জিত গৃহ।
বীরবাহু ও চিত্রসেন।
চিত্র।
বীর।
কি সখা, মৌনী হয়ে বসে রইলে যে! তুমি দেশের রাজা
হলেও আমার সখা, আমার অতিথি। আমার বাড়ীতে
এসে তুমি অমন করে মন ভার করে বসে থাকলে যে
আমার দারুণ কষ্ট হয় সখা !
আমি ভাবছি তুমি কি—আর আমিই বা কি ? তােমাকে
ও তােমার বংশকে বিনষ্ট করবার জন্য আমি উদ্যত ; আর
তুমি বেস হাসতে হাসতে বেস আমােদ করে তুমি আমায়
নিমন্ত্রণ করে এলে,—আর আমিও সে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে
এসেছি।
তা’ত বেসই হয়েছে-কৰ্তব্যই করা হয়েছে।
বীর। তুমি জান, আমার স্ত্রী পুত্র না পেলে আজ তােমায় সবংশে
ঘাতক হস্তে নিহত হতে হবে ?
বটে! তুমি এমন বীরবাহুই বটে! ভাল আজ দেখা
যাবে এ ক্ষেত্রে তুমি বীর কি আমি বীর !
তুমি কি বলছ চিত্রসেন ? তােমার কোন কু-অভিসন্ধি
আছে নাকি? সেইজন্যই কি নিমন্ত্রণ, সেইজন্যই কি এত
আদর অভ্যর্থনা ! উঃ এত ছলনা!
-তা আর হতে পাবে কেন? তুমি অব্যবস্থিত-চিত্ত,
চিত্র।
চিত্র।
বীর।
চিত্র।
সবিতারাধনা বীর। তােমর সহস্র খেয়াল, সহস্র আবদার, তােমার খর করবাল বড় মােলায়েম—তুমি বলতে জান, ছলতে জান, সেটা তােমার খেয়ালের দাবী। আর আমি দরিদ্র, অর্থ সামর্থ্যহীন- কাজেই আমার বুদ্ধি নেই, প্রাণ নেই, মনুষ্যত্ব নেই; কেমন ? আমায় ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও। বীরের মত যুদ্ধ কর, তা’তে আমি প্রস্তুত আছি। কিন্তু কুকুরের মত আমাকে হত্যা ক’র না, এই আমার অনুরােধ। আমার সৈন্য সামন্তকে কৌশলে স্থানান্তরিত করে, আমায় একাকী পেয়ে তুমি আমার উপর পশুর অধম অত্যাচার ক’র না। আমায় বীরের মত মরুতে দাও। আমায় বীরের মত মরুতে দাও। ভয় নেই তােমায় হত্যা ক’ব না—তবে তােমায় শৃঙ্খল পরাব। কালসর্প, তুমি এত দুরাকাঙ্ক। আমায় শৃঙ্খলিত করে তুমি আমার পদে প্রতিষ্ঠিত হতে চাও। ভগবান-ভগবান্ । যখন তুমি আমায় বধ করবার জন্য উদ্যত হয়েছিলে, তখন ঐ নাম কোথায় ছিল। এখন ভগবান্কে স্মরণ করা হচ্ছে, তখন ভগবানকে, ভগবানের জীবকে বিস্মৃত হয়েছিলে কেন? প্রবঞ্চনা, প্রবঞ্চনা। প্রবঞ্চিত হয়েছি। পদলেহী কুকুরের নিকট প্রাণ ভিক্ষা চাই না। এস, এই উন্মুক্ত বক্ষে তুমি ছুরিকাঘাত কর। এস এস, ঘাতক, আমি প্রাণত্যাগে চিত্র। বীর। চিত্র। বীর। প্রস্তুত। চিত্র। বীর। সথা ! কি এখনও সেই মধুর সম্ভাষণ ? তুমি কি মায়াবী ?
সবিতারাধনা চিত্র। বীর। চিত্র। আমি তদপেক্ষাও হীনতর। কিন্তু সখা, ঐ আসনে স্থির হয়ে ব’স। অবাধ্যাচরণ কর না। আমার আদেশ পালন ক’রুলে–অনুবােধ নয়, আদেশ না শুনলে তুমি তােমার স্ত্রী পুত্রের দর্শন পাবে না। কিছু বুঝতে পাছি না। এ কি বৃহস্য-কি সমস্যা। [ বীরবাহু নির্দিষ্ট আসনে উপবিষ্ট হইলেন। বিজয় আসিয়া তাহার পার্শ্বে উপবেশন করিল। অজয় আসিয়া চিত্ৰসেনের পার্শ্বে আসন গ্রহণ করিল। মুখাবৃতা উনাে ও ঝুম্ননা আসিয়া পরিবেশন করিতে লাগিল। খাও, খাও সখা-উন্মাদের মত লক্ষ্যহীন দৃষ্টিতে কি দেখছ। খেয়ে নাও, খেয়ে নাও—তারপর শৃঙ্খল পরাব। কি দেখ ছ, উদাসের মত কি দেখছ ? দেখছি, দেখ ছি। মন্ত্রদুগ্ধবৎ আমি তােমার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। কিন্তু এর পরিণাম কি তাই ভাবছি। সে যা হয়, তাই হবে। কিন্তু তুমি তােমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা কর। আমার পুত্র, আমার স্ত্রী-রাজরাণীকে এনে দেবে বলেছিলে প্রতিজ্ঞা রক্ষা কর। তাদের দেখতে দেখতে আমি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করি। সেটা এখন আমার পক্ষে গৌরবময় মৃত্যু হবে। পূর্বে আহারাদি সমাপন কর, তারপর স্ত্রী পুত্রের মুখ দেখবে। মিষ্টি মুখ না করিয়ে কি মিষ্টি মুখ দেখাতে পারি। এখনও রহস্য-কৃতঘ্ন ! রাজভক্ত চিত্রসেন রহস্য জানে না, রাজদ্রোহী হতে পারে না। বীর। ; চিত্র। বীর। চিত্র।
সবিতারাধনা *। বীর। অ’র প্রকৃতিতে, কৃতঘ্নতার বীজাণুও থাকতে পারে না। চিত্ৰসেন তােমায় সখা পেয়ে, তােমার সখা হ'য়ে ধন্য হয়েছে। চিত্ৰসেন বন্ধুত্বের গৌরর রক্ষা করে—রাজভক্ত প্ৰজা হওয়ার গৌরব করে—তুমি না বােঝ, সখা,—প্রভু, আমি কি করব বল! এ কি—এ ত’ উদার ভৎর্সনা-মহত্ত্বের বিকাশ, মধুরতার প্রতিকৃতি ! একি-একি! আমি কিছুই বুঝতে পাছি না । এইবার বুঝতে পাবে। ঐ তােমার দক্ষিণ পার্শ্বে তােমার বংশ দুলাল, আর তােমায় পরিবেশন কচ্ছেন স্বয়ং রাজরাণী। আমার পার্শ্বে আমার পুত্র, আমায় পরিবেশন কচ্ছে আমার দরিদ্রা, স্নেহময়ী সহধর্মিণী, আমার মাধুৰ্য্যময়ী দেবী, আমার সৰ্বস্ব। এখন বল মহারাজ, বল দণ্ডমুণ্ড বিধাতা, বল সখা, কৃতঘ্নতার বিচিত্র বর্ণে চিত্রিত হ’বার আমি উপযুক্ত পাত্র চিত্র। কি না ? . বীর। সখা, সধা, সখা। [ বীরবাহু সবেগে উঠিয়া চিত্ৰসেনকে দৃঢ় আলিঙ্গনে বদ্ধ করিল।] চিত্র। আমার দেশে রাজা—দেবতা। দেবতার আলিঙ্গনে, ভক্ত আমি, প্ৰজা আমি, সখা আমি ধন্য হলে। আজ আমার নূতন জীবন। কিন্তু একি স্বপ্নরাজ্য না বাস্তব সত্য ? উমুনােমহারাজ, স্বামীন, প্রতে [ উনাে কাঁদিয়া ফেলি বীর। ১২৪
সবিতারাধনা
বিজয়। বাবা—তুমি আমাকে ভুলেছিলে কেমন করে বাবা ?
[ বীরবাহু বিজয়কে ক্রোড়ে ধারণ করিয়া চুম্বন করিলেন।
উনাের মস্তকে হস্তাৰ্পণ করিলেন ]
বাক্যোচ্চারণের শক্তি হারাতে বসেছি সখা। রাজকুমারকে
নিয়ে আমি চ'ল্লেম। কৃতঘ্ন তুমি নয়, কৃতঘ্ন আমি।
চিত্র।
[ বিজয়কে লইয়া বীরবাহুর প্রস্থান
বটে-আর আমি বুঝি এইখানে দাড়িয়ে দাড়িয়ে এদের
গায়ের মশা তাড়া’ব
[ প্রস্থান
ঝুমনাে। দিদি ?
উম্নন। কেন, বল ?
ঝুমননা। আজ কি আনন্দের দিন। তাের হারানিধি
তাের হারানিধি তুই ফিরিয়ে
পেলি, আর তার হারানিধি সে ফিরিয়ে পেলে। কেমন
আনন্দের দিন দিদি ?
উনাে। তুইই ত আনন্দদায়িনী।
ঝুমনাে। মা’র মুখে হাসি দেখেছি, বাবার মুখে হাসি দেখেছি,
ভাইটীকে হাসতে দেখেছি, আর তােদের যুগল মিলন চক্ষে
দেখেছি। আর কি। আমার সকল সাধ পূর্ণ হয়েছে।
উনাে। তবে আর কি—এইবার সন্ন্যাসিনী হ’।
ঝুমনাে। বালাই। আমার এমন রসরাজ দিবানিশি কাছে থাকতে
আমি সন্ন্যাসিনী হ’তে যাব কেন ? সে কথা থাক গে ।
এইবার ত তুই ব’ন ধরে চললি-রাজরাণী ছিলি, রাজরাণী
সবিতারাধনা
হবি। কিন্তু দেখিস দিদি, ঐশ্বর্য্যের, ক্রোড়ে স্থান পেয়ে,
বিলাসের স্রোতে গা ভাসিয়ে আবার যেন ঠাকুরকে ভুলে
যানি। তাের স্বামীর দিব্য, তাের ছেলের দিব্য, তুই যদি
আমার কথা না রাখি।
উনাে। ভুস্ব আবার! নমাে নমঃ শ্ৰীসূৰ্য্যায় নমঃ। এখন আসি
ব’ন। ঐ দোলা এসেছে, লােক জনও সব এসেছে।
ঝুমনাে। এখন ব্যস্ত হবি বৈ কি দিদি। চল তােকে দোলায় তুলে
দিয়ে আসি। নমাে নমঃ শ্রীসূৰ্য্যায় নমঃ।
উনাে। নমাে নমঃ শ্ৰীসূৰ্য্যায় নমঃ।
[ উভয়ের প্রস্থান
সপ্তম গর্ভাঙ্ক।
ধনর'জের বাটীর অলিন্দ।
(ধনরাজের পশ্চাতে লক্ষ্মীমণি ও মিহিরের প্রবেশ ।)
লক্ষ্মী।
ধন। কেমন ব্রাহ্মণী, আবার দিন পেয়েছি ? এইবার যারা
আমার দুঃখে হেসেছিল, আমি তাদের দুঃখে হাসি ?
ছি! দিননাথের কৃপায় দিন পেয়েছ, এখন দীনের দীন
হয়ে থাক। দীননাথ মঙ্গল কবৃবেন।
মিহির বাবা, যারা আমাদের দুঃখে হেসেছিল, তারা অবােধ, তাই
বলে কি আমরাও অবােধ হ'ব।
সবিতারাধনা
লক্ষ্মী।
ধন।
আহা, বাছার আমার কথা শােন গাে একবার।
শুনেছি, শুনেছি। ছেলে-জ্যাঠামী, মেয়ে-জ্যাঠামী বহুকাল
থেকেই শুনে আসা যাচ্ছে।
এখন, আমার উপর
আদেশটা কি ?
লক্ষ্মী। যা’ বাবা মিহির, তুই দ্যাখত ক্ষেতের ধানগুলাে খামারে
উঠল কিনা? আপনাদের জিনিস আপনার না দেখলে
আর কিছুতেই তার সুব্যবস্থা হয় না।
[ মিহিরের প্রস্থান
তুমি কি কর বল দেখি? অতবড় ছেলে, তার সামনে অমন
বেহায়ার মত কথা কইতে তােমার লজ্জা বােধ হয় না ?
ধন। ভুল হয়ে গিছল ব্রাহ্মণী, ভুল হয়ে গিছল। অভ্যাসের
দোষ কি না ? হা, কি বলছিলে তখন ?
লক্ষ্মী। বলছিলেম আর আমরা সংসারের মায়াঘােরে পড়ে কষ্ট পাই
কেন? দুঃখও পেলু, সুখও ভােগ ক’বুলুম-এইবার ভালয়
ভালয় আলােয় আলােয় সংসারের ভার ছেলে বৌএর ওপর
দিয়ে নির্জনে গিয়ে একটু ডাকি চল। সংসারে পড়ে আর
মার খাই কেন ?
ধন। আরে নাও কথা! এত দুখখু পাবার পর এই সবে মাত্র
সুখের উষা ফুটে উঠেছে, এরই মধ্যে সংসার থেকে ছুটী
নেব ? তাও কি কখন হয় ? আর দ্যাখ, ভগবানকে
ডাকতে হয় ত ঘরে বসে ডাকি এস না। বনবাদাড়ে
যাবার দরকার কি? জটা রেখে, বনে বনে ঘুরে চ’থ
বুজিয়ে বসে থাকলেই কি ভগবৎদর্শন ঘটে! ভগবান্ ত
সবিতারাধনা
লক্ষ্মী।
ধন।
;
আমার হৃদয়েই আছেন—ডাকার মত তাকে ডাকলেই তার
দর্শন পাওয়া যায়।
এ তুমি বল কি ? তুমি এ সব কথা শিলে কোথা ?
তােমার মুখে ত এমন কথা কখনও শুনিনি।
শুনে থাক, এখন শােন। ভগবান্ কে—সে ত আমিই।
তিনি আমাতে—আমি হাতে। দুঃখ, কষ্ট, নােগ, শােক,
অভাব, যন্ত্রণা—এ সব আমরা যা ভােগ করি-এ সব হল
লীলা। খেলা না দিলে, খেলায় তাড়া না পেলে, খেলুড়ের
সঙ্গে যুদ্ধ না হলে কি খেলায় সুখ হয় ? এই যে ভােগান্তিটা
ভুলুম,
এতটা
দুখু কষ্ট পেলুম, তারপর গালভরা হাসি
হাসলু—এটা কি বল দেখি? কৰ্ম্মফল, বল—কৰ্ম্মফল; আর
খেলা, বল, খেলা। আত্মদর্শন হলে ঐ গুলাে বুঝে নেওয়া
যায়।
তুমি এমন জ্ঞানময়, তুমি এমন মহৎ, তুমি এমন বিরাট।
তবে তুমি এমন মায়াঘোরে ডুবেছিলে কেন?
আরে ঠাকরুণ, মায়াও ত ভগবানের। মায়াং বিস্তীৰ্য্য
ভগবান নিৰ্ম্মায়েদঃ জগন্মহৎ। সে মায়াটা যায় কোথা’
বল দেখি ?
বুঝেছি তােমায় আর কিছু বলব না।
ধন।
বাঁচা গেল—একটা দায় ঘুচল।
লক্ষ্মী। উমনাে ঝুমনাের সংবাদ পেয়েছ? ঝুমনাে আমার খুব মেয়ে।
ও না হলে আমাদের এ সুখ সম্পত্তি হত না।
লক্ষ্মী।
সবিতারাধনা ধন। •হা-হা-হা- [ প্রস্থান লক্ষ্মী। ও কি রকম উন্মাদের হাসি! অথবা ঐ বুঝি জ্ঞানের দীপ্তি ! [ প্রস্থান অষ্টম গর্ভাঙ্ক। বীরবাহুর কক্ষ। বীরবাহু ও উমাননা। বীর। রাণী—তুমি কি বিদ্যা শিখেছ বল দেখি? এমন অদ্ভুত কাণ্ড ত কখনও দেখিনি। উম্নন। কেন কি দেখলে ? বীর। কি দেখলেম--তা বলবার ভাষা খুজে পাচ্ছি না। প্রাসাদ- প্রাঙ্গণে ভ্রমণ ক’তে করতে কুশান্ধুরে তােমার কোমল চরণ বিদ্ধ হয়ে শোণিতাক্ত হ’ল ; আমি ভাবলেম, রাজরাণী রাজ- গৃহে প্রবেশ করতে না ক’বৃতেই, এ আবার কি উৎপাত। যাই হক তোমার চরণে রক্তধারা দেখে আমি “সাত, হাড়ির” মুণ্ড দ্বিখণ্ডিত ক’তে বলে। কারণ, তাদের অবহেলাতেই ত প্রাঙ্গণে কুশাঙ্কুর ছিল। -~-
সবিতারাধনা
!!
উনাে। তারা ত পুনর্জীবিত হয়েছে।
বীর।
সেই কথাই ত বলছি। তুমি তােমার ব্রত কলে—ব্রত
শেষে অভূক্ত লােক খাওয়াতে চাইলে। তখন মাত্র সাত
হাড়ির” মা পুত্র শােকে অভূক্ত ছিল। অতি কষ্টে, বহু মিষ্ট
বাক্যে তাকে তুষ্ট করে তাকে সাহায্য প্রদান করা হল।
উনাে। আমি ব্ৰত কথা বিস্মৃত হয়েছিলেম্পুনরায় অধঃপাতে যেতে
বসেছিলেম্। অঞ্চলবদ্ধ সােণার “ঝুমঝুমি” মাটীতে পড়ে
যেতে, তবে আমার ইতুপূজোর কথা মনে পড়ল। ব্ৰত
কলেম, কিন্তু অভূক্তকে না খাওয়ালে, আর্তের সাহায্য না
ক’বুলে ত ব্ৰত সাঙ্গ হয় না। হাড়িনী ছিল—তাই আমার
ব্রতের নিয়ম রক্ষা করা হয়েছে। না হলে হয় ত একটা
ব্যাঘাত ঘটত।
বীর। তুমি তাকে কি দিয়েছিলে, যা সাত হাড়িকে স্পর্শ করাতেই
মৃত সঞ্জীবিত হ’ল-আমি দেখে অবাক হলেম্ ?
উনাে। পূজার পুষ্প জল।
বটে—তােমার ঠাকুর এমন ?
মনন। হাঁ, এই আমার ঠাকুর, এই আমার ইতুপূজা, এই আমার
সবিতারাধনা।
বীর। আচ্ছা, তবে এক কাজ কর দেখি। আমার সাত নৌকা ধন
জলমগ্ন হয়েছে, তা’র উদ্ধার করে দাও দেখি; রাজঘণ্টা
দ্বারে আপনি বাজত, এখন আর বাজে না, রাজহস্তী আনন্দে
নৃত্য করত, এখন আর করে না; তার একটা উপায় ক'রে
দাও দেখি? তবে বুঝি তােমার ঠাকুর।
বীর।
"
৩০০
সবিতারাধনা বীর। . বীর। উনাে• (স্বগতঃ) দিননাথ, দীননাথ, তুমি দীনের নাথ!দেখ ঠাকুর, তােমার ভক্ত, তােমার দাসীর যেন মুখ থাকে। (প্রকাশ্যে ) আচ্ছা, ঠাকুরের ইচ্ছা হলেই সব হয়ে যাবে। বেশ—সন্তুষ্ট হলে। এখন এস, একটু পাশা খেলি তােমার নাকের নথ জিতে নি। উনাে। আমিই পরাজিতা-তােমার দাসানুদাসী। নথ ত দুরের কথা। [ দুইজনে হাসিতে হাসিতে পাশা খেলিতে লাগিলেন কেমন, কচে বার মেরেছি ? উনাে। ও বদ রং-কাচা ঘুটি। রং আমার ঠিক আছে। [ নেপথ্যে আনন্দ কোলাহল বীর। ওকি! প্রহরী-প্রহরী। [ প্রহরীর প্রবেশ কি ব্যাপার ? প্রহরী। মহারাজ ভয়ে ব’ব না নির্ভয়ে ব’ব। বীর। ভয়ে ছেড়ে নির্ভয়ে বল। প্রহরী। মহারাজ, ধনদৌলত বােঝাই সাতখানা নৌকা রাজঘাটে এসে লেগেছে। রাজঘণ্টা যেমন আপনি বাজত, তেমনি, বাজছে, রাজহস্তী আবার নৃত্য আরম্ভ করেছে। তাই রাজ- প্রাসাদে আনন্দধ্বনি উঠেছে। আচ্ছা বিদায় হও—এই নাও পুরস্কার। [ কণ্ঠ হইতে মুক্তার মালা খুলিয়া বীরবাহু, প্রহরীকে প্রদান করিলেন। প্রহরী অভিবাদন করিতে করিতে চলিয়া গেল ] বীর। । ১৩ সবিতারাধনা চিত্র। বীর। চিত্র। বীর। চিত্র। ধঙ্গা তুমি, আর ধন্য তােমার ঠাকুর। [ চিত্রসেনের প্রবেশ ও উমনাের প্রস্থান কি সখা, কাকে এত ধন্য ধন্য করছ ? এস সখা, আনন্দের দিনে আনন্দ দান কবে এস, আনন্দ গ্রহণ ক’রূবে এস। তােমার দয়ায় আমি রাজলক্ষ্মী ফিরে পেয়েছি। সেটা অবশ্য কৃতঘ্নতা। ক্ষমা কর সখা। আচ্ছা, না হয় করা গেল। আচ্ছা সখা, সমস্ত ধন্যবাদটা কি রাণীরই প্রাপ্য? রাণীর সহােদর প্রতি একটু ধন্যবাদও ত বিজ্ঞাপিত হচ্ছে না। ভাল, সে কথার বিচার দেখি একজন করে কি না ? কে, সে ঝুম্ ত ? তা বিচারে আর কাজ নেই। আমি তাকে খুব ধন্যবাদ দিচ্ছি, আর অবনত মস্তকে পরাজয় স্বীকার ক’ছি। কি সমবেদনা, সহানুভূতি-স্নেহ-মন্দাকিনীর প্রবল বন্যা। এস সখা, সে বন্যায় ভেসে যাই। অনেক কাল সংসার করা গেল--আর ভাল লাগে না। এখন আপনার পথ চিনে নেওয়া গেছে। চল সখা, সেই পথে ধসাজাসুজি চ'লে যাই। যাদের দেবতা এমন সত্য, সখা, তারা ধরাতলে পড়ে আর এত দুঃখ যন্ত্রণা পায় কেন ? স্বর্গের জিনিস পেয়েছি আমরা, স্বর্গের আলােক দেখেছি আমরা-চল সখা, সেই পথে চলে যাই। বীর। চিত্র। বীর। ১৩
সবিতারাধনা
চিত্র।
মা’ব-দিনকয়েক পরে। রাণী অনেক দুঃখ, অনেক কষ্ট,
অনেক বেদনা পেয়েছেন। দিন কত সুখভােগ, করা যাক,
তারপর তার ব্যবস্থা করা যাবে।
আচ্ছা, তাই হবে। কিন্তু এর মধ্যে আমাদের সন্তান-সন্ততি-
গণের উপর রাজ্যভার অর্পণ করে নিশ্চন্ত হই চল।
বীর।
চিত্র।
সে ভাল কথা।
চল।
[ উভয়ের প্রস্থান
১৩
ক্রোড় অঙ্ক
সুনীল সমুদ্র-তরঙ্গের মধ্য হইতে সূৰ্য্যদেব ধীরে ধীরে
আকাশমার্গে উঠিতেছেন। ব্যোমপথে জ্যোতির্ময় রথ
উঠিতেছে। রথে উম্ননা, বীরবাহু, চিত্রসেন, ঝুমননা,
ধনরাজ ও লক্ষ্মীমণি বসিয়া আছেন। দেবতাগণ পুষ্পবৃষ্টি
করিতেছেন। নরনারীগণ বেলাভূমে দাড়াইয়া যুক্তকরে
বন্দনা-গীত গাহিতেছে ।
(গীত)
'৪
পু। জয় দেব দিবাকর
অব্যয় অক্ষর,
সর্ব শুভঙ্কর কৃপানিধে।
স্ত্রী। জয় নিৰ্ম্মল উজ্জ্বল
সর্ব সুমঙ্গল,
কলুষ-কল্মষ-হর তাপবিধে ॥
স্ত্রী ও পু। জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্।
ধান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতােহস্মি দিবাকরম
কিা পতন।
মুনীন্দ্র বাবু
অভিনব উপন্যাস
জল-প্লাবন, নবীনের সংসার
প্রায় ফুরাইয়া আসিল।
আট আনা সংস্করণের বিংশ পুস্তক
হালদার বাড়ী
প্রকাশিত হইয়াছে।
প্রবাসীর প্রত্যাগমন ।
কাব্য জগতে অদ্ভূত সৃষ্টি।
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের দোকানে পত্র লিখিয়া
উপরােক্ত পুস্তকগুলি শীঘ্র সংগ্রহ করুন।
মুনীন্দ্র বাবুর ছােট গল্পগুলিও শীঘ্রই
প্রকাশিত হইবে।
মুনীন্দ্র বাবু
হিতবাণী, মুজ-মুলী,
শুভকর্মে গদ্য
পদ্য
পড়িয়াছেন কি ?
না পড়িয়া থাকেন ত গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কিম্বা অন্যান্য
পুস্তকালয়ে পত্র লিখিয়া তাহা সংগ্রহ করুন। মুনীন্দ্র
বাবুর অন্যান্য ইংরাজী ও বাংলা উপন্যাস ও
নাটকাদিও শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে।
মুনীন্দ্র বাবুর
“শিক্ষা-বিস্তার” ও “মণিকণা
এস, সি, আচ্যের দোকানে পাওয়া যায়।
4.
No text on this page.