Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Kalkut
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কালকূট ।
(কাব্য।)
“সুধা ঝুজেলনিকিবতৈ মন্থন,
উঠিল কপালক্রমে কালকূট বিষ ॥”
কলিকাতা, ৬৭ নং দুর্গাচরণ মিত্রের স্ট্রীট হইতে
শ্ৰীঅবিনাশচন্দ্র ঘােষ কর্তৃক
বিরচিত ও প্রকাশিত।
কলিকাতা
৬ নং ভীম ঘােষের লেন,
গ্রেট ইডিম্ প্রেসে,
মেঃ ইউ, সি, বসু এণ্ড কোম্পানি দ্বারা মুদ্রিত
ন ১২৯৫ সাল।
No text on this page.
কালকূট।
প্রথম সর্গ
প্রস্তাবনা।
স্বপনের ন্যায় হ'তেছে স্মরণ ;
লেখনী বারেক করেছি ধারণ,
জানি না কল্পনা, জানি না কবিতা,
বিদ্যা তালপাতে অভ্যাস দাগা।
ভূতলে কায়স্থকুলে জনমিয়া,
সংসার শমন কবলে সপিয়া,
কাদিতে জগতে অভাগা রয়েছে,
শ্লোকগুলি আছে হৃদয়ে দাগা ।
२
জগত নিরখি শশান যেমন,
কোথা আমি কোথা বিদ্যা উপার্জন,
সময়েতে মােটে আহার যােটে না,
কে ধাৱে স্বভাৰ প্রকৃতি ধার ।
কালকূট ।
ভাষা ভাষা কথা লােকের বদনে,
ভাষা ভাল কথা বুঝিব কেমনে
“তালপাতসুধু স্মরণ রয়েছে,
তাও ক, খ, দাগা অভ্যাস যার ॥
বিদ্যা কিছু নাই ধন কিছু নাই,
থাকিবেই কিসে এ অভাগার'।
জনমি কেঁদেছি সদাই কাদিব,
কাদিতে জনম ভবে আমার ।
৪
কুটীরে বসিয়া তরুতলে বলি,
নিশীথ সময়ে নদিতীরে বসি,
নিবিড় বিপিনে করিয়া গমন,
অবিরত কাদি কাটাব কাল ।
যখন মানসে উদয় হবে,
জগদীশ বলি ডাকিব তবে,
ফল মূল খেয়ে জীবন ধরিব,
নময় হইলে লইবে কাল ?
কালকূট
আশা-গতি কোন পথেতে পায়,
মানবের তাহা বােঝাই দায়,
কুহুকিনী একি ঘটাৱে দায়,
দুখের উপর উপজে হাসি।
লিখিতে কবিতা লেখনী ধরালে,
ব্রাহ্মণ চরিত্র লেখাতে বসালে,
কি লিখি এখন হ’তেছে ভাবনা,
বিপদ জলধি-মাঝেতে ভাসি ॥
সুমেল বেমেল ছন্দাদি নিয়ম,
কিছুই জানিনা কি করে লিখি।
দারুণ করমে হইলাম ব্ৰতী,
বয়সী কখন হয় কি শিখী।
৭
অথবা
আশার কুহকে হইয়া পতন,
বাসনা উচ্চেতে উঠিল যখন,
কাষ কি নিবারি মান বেগ,
চেগেছে চাক্ কবিতা বাই।
কালকূট ।
পেয়েছি যাতনা পেয়েছি শােক,
না দেখি ধরায় আপন লােক,
সকল যাতনা সহিয়াছে প্রাণ,
সয়নি এখনো কভু তাপমান,
সেটা কেন বাকি রাখিয়া যাই?
জগতের লােক ভালইসে না,
জগতের ধার কিছুই ধারি না,
লােকনা ভয় কেন বা তবে?
নিন্দুক সকলে ব্রাহ্মণে হাসুক,
কবিকুল হলে ভাল তা হাসুক,
হামুক ভারত জগত হামুক,
তাতেই আমার ক্ষতি কি হবে ?
দুরাশা বলে-
ভয় কি তােমার নির্ভয়ে লেখো,
যা ইচ্ছা যায় তাই তুমি লেখো,
কেই বা তােমার তুমিই বা কার,
রেখাে না রেখাে না মনের খেদ
কালকুট।
হ’ক ভস্ম কীট তােমাতেই রবে,
এতে উপকার কারাে নাহি হবে,
কলেই ডুবুক আগুনে পুড়ক,
পরে কি এ লেখা হবে “বেদ
১
১০
আদরে মানবে তাতেও বেস,
না আদরে যদি তাতেও বেস,
ধন « নও কিসে তবে ভয়,
দুরাশা বচনে ঘুচিল ভ্রম।
থৰ্ব থর থর কর কাপাইয়া,
তাক্ষরগুলির অঙ্গ বাঁকাইয়া;
কবিতা কোমল হৃদয় ভেদিয়া
সজোরে চলিল মূঢ় কলম !
কল্ কল কল্ ভাগীরথী জল,
সাগর মিলনে বহিয়া চলে
টিপ টিপ, চিপ, জীবন প্রদীপ,
স্বভাবে হৃদয় গেহেতে জ্বলে।
১২
ভীরুত আঁধারে ঘেরা দশদিশ,
দাসত্ব কৌলীন্য তনয়া পণ।
হিংসা ব্যভিচার শ্বাপদনিকর,
সঘনে গরজি কাপায় বন ।
কালকূট।
উন্নতির কর পদ জোরে বধি,
পােড়ায় অনলে ভয়-দানব।
সেই চিতা ঘেরি দীনতা হীনতা,
হাসে হি হি হি হি করিয়া রব।
১৪
পরশ্রীকাতর নাচে নিশাচর,
ধরিয়া ধরিয়া মানুষ খায়।
পিশিতবিহীন নীরস কঙ্কাল,
বিষাদ ধুলায় লুটায়ে যায় ।
৫
এ ভীষণ দেশে সভয়ে গােপনে
গুটিকত নর করিছে বাস।
পবিত্র প্রণয় এক আনন্দ
পারে লভিতে সমাজ দাস।
যদিও হৃদয়ে একতা প্রণয়,
উদয় হয় তত মিলায়ে যায় ।
ছুতে নাহি ছু'তে পেতে নাহি পেতে,
দেশাচারদৈত্য বিনাশে তায়।
কালকুট।
১৭
কিব। শিল্পকর কিবা চিত্রকর,
কিবা কবি গুণী যে জন হোক।
যশ কি উন্নতি আশ সে দুরূহ,
হৃদয়ের আশা হৃদয়ে রােক।
১৮
কোন দেশ সেট ? সেই বঙ্গ এই
বঙ্গবাসী এরা সমাজ দাস।
এ ভীষণ স্থানে সহিয়া যাতনা,
এই নরগুলি করিছে বাস,। •
এই বঙ্গে-
প্রণয় প্রণয় হয় মধুময়,
সকলেই কয় আমি বলি নয়,
আমি বলি নয় এই বঙ্গে নয়,
বল্লালী নিয়ম অবধি সে নয়,
ছিল কি না ছিল পূরব কালো-
বলিতে পারি না, এখন তো আর,
দেখি না প্রণয় প্রণয়বিকার,
ভেদিছে আকাশ করুণ চীৎকার
থাকি সবে বাধা সমাজ জালে ।
কালকুট।
সহরে সহরে প্রতি ঘরে ঘরে,
গ্রামেতে পল্লিতে ভুধরে প্রান্তরে,
হৃদি পটগুলি খুলি যত্ন করে,
দেখ দেখি মেলি কল্পনা আঁখি।
হৃদয় বদন তন্ন তন্ন করে,
খুজ প্রেম বাহিরে অন্তরে,
বালক অন্তরে যুবক অন্তরে,
দেখ নারী বুকে আছয়ে নাকি ।
কিন্তু কই তাতে প্রকৃত প্রণয়,
স্বাধীনতা জ্যোতি কই তাতে রয়,
জীবন নাশক উগ্র বিষময়,
বঙ্গ দম্পতীর প্রণয় সুখ।
যেদিকে নিরখি সকলি আঁধার,
সকলি অসার সব ধোয়াকার,
ভিতরে যাতনা জ্বলন্ত অঙ্গার,
গুমিয়া গুমিয়া পােড়ায় বুক্ ।
এই যে মিত্ৰতা এই ভালবাসা,
খুজে দেখ এতে ছলনার বাসা,
মুখেতে প্রণয় ভিতরের আশা,
কপট জড়িত গরল মাখা।
কালকুট।
তুমি আমি এক মুখেতেই কয়,
জিলিপির পাক প্রত্যেক হৃদয়,
স্বার্থপর নিজ স্বার্থ সাধি লয়,
চাটুতা শবদে বদন ঢাকা।
০
,
কবি নই তবু লিখিব যতনে
সমাচরিত্র, যাহার পীড়নে
দিবানিশি বারি ঝরিছে নয়
বতেক রমণী মানস-পটে ।
চিত্রকর নই তুলি রং নাই,
তথাপিও ছবি লিখিয়া দেখাই,
না কঁদাতে পারি নিজে কেঁদে যাই,
মানসিক ভাব স্বভাবে উঠে ।
२8
লেখনি প্রসূতা কবিতা আমার,
হয়তো জগতে হউক প্রচার,
না হলেও ক্ষতি নাহিক আমার
যশ ধন লিপ লা কিছুই নাই।
( ইতি প্রস্তাবনা নামক প্রথম সর্গ।)
কালকূট ।
দ্বিতীয় সর্গ
কল্পনা।
দারুণ বল্লালী কল, জ্বলিয়াছে যে অনল,
এখনো জ্বলিছে তাহা নিবিরু নয়।
হৃদি বিদারক রঙ্গ, সর্বদা সহিছে বঙ্গ,
ভীরুজাতি বিপ্রণে কত আর সয় ?
বল্লাল কোথায় আর, কালগ্রাসে ছার খার,
আছে মাত্র বঙ্গমাঝে নামের নিশান।
তার পরে ভয়ঙ্কর, বঙ্গে উদে দেবিবর,
স্মরিলে যাহার কাৰ্য কেঁপে উঠে প্রাণ ।
ঘাের লােভী স্বার্থপর, নামে গায়ে আসে জ্বর,
বংশজে শ্রেত্রিয় করে গেল মহাপাপ।
অপবাদ রাখে না, কেহ নাহি দিল বাধা,
ভাল দেখাইয়া গেল আপন প্রতাপ
। কালকূট ।
৪
সুরূপা সুগুণযুতা, নাথাই চট্টের সুতা
হলাই যবন তারে করিল হরণ।
তাতে ধাদা দোষ হয়, তথাপিও জাত রয়,
ফুলে মেল কুলীনের আদিম কারণ।
সবার মুদিত আঁখি, ভাল দিয়া গেছে ফাকি,
কুলীন ছত্রিম ভাগে বিভক্ত করিয়া ।
উলটি পালটি করি, বাঙ্গালার সুখ হরি,
গিয়াছে বিষাদ রূপ অনলে জ্বালিয়া।
সে অবধি একতার, দেখা নাহি পাই আর
সে অবধি উঠিয়াছে দলাদলি বাই।
শ্ৰোত্ৰিয় বংশজ যারা, সে অবধি কাদে তারা,
সে অবধি দ্রুণহত্যা দেখিবারে পাই ॥
৭
কুলীনের মেয়েদের, অদৃষ্টে ঘটেছে ফের,
সে অবধি মনােমত পতি নাই পায় ।
মনোমত দূরে থাক্, কারাে বা মূলেই ফাঁকি,
পালটি মিলন বিয়ে বিয়ে হ’য়া দায়।
১২
কালকূট।
৮
আইবুড়ী চিরকাল, হায় রে কৌলীন্য কাল,
আসিয়া বঙ্গের সুখ করেছিস্ গ্রাস ?
কোথা সৰ্ব্বদারী বিয়া, কোথা স্বয়ম্বর ক্রিয়া,
সবাই বিষাদেশীর্ণ সমাজের দাস ॥
***
বঞ্চনার ক্র রতার, বৃদ্ধি দেখি অনিবার
প্রতি ঘরে হাহাকার সন্তোষ বিরাম।
নব গুণ কিছু নাই, পুড়িয়া হয়েছে ছাই,
হায় রে বল্লালী কলে এই পরিণাম ॥
ভাবিয়া বঙ্গের দুখ, মলিন-লেখনি-মুখ,
কাদিয়া লিখিতে যায় বৃঙ্গের দুর্দশা।
কুলীনে কৌলীন্য-মদে, টলিতেছে পদে পদে,
কি জানি করে ক্রোধ হয়না ভরা।
কিন্তু ঘাের অত্যাচার, প্রাণে নাহি লহে আর,
সশােকে বিষাদে বলে কবি মলি মুখ ।
আজি হাে কালি হােক, শত বর্ষ পরে হােক,
উপকার এতে হতে পারে একটু।
কালকুট।
১২
হলেও ক্ষতি নাই, সুখ্যাতির আশা নাই,
সমাজের ছবি আঁকি যা হয় তা হবে ।
যার দেহ শিরাময়, সচল শোণিত বয়,
বিপ্রের হীনতা দেখিকে কি নীরবে ?
গ্রামে গ্রামে যথা যাবে, তথায় দেখিতে পাবে,
দলকুল জণহত্যা খল দলপতি।
গরিমা সবার ভরা, সরা জ্ঞান করে ধর।
জানে নাহি ক্রমেতে হতেছে অধােগতি ॥
১৪
“দেখ দেখি ব্রীটনিয়া, কি সিয়া কি রুষিয়া,
আপন উন্নতি তরে করি প্রাণপণ ।
সাহসে করিয়া সঙ্গী, নদনদী গিরি লঙ্,ি
চুৰ্ণি বিজাতির শির পরশে গগণ ॥
ভীরু বঙ্গবাসী হই,
ততদূর ‘আশা কই,
তথাপি বিপ্র জাতির মিলন থাকুক।
পিতা পুত্রে বেঁজী সাপ, পদে পদে মনস্তাপ,
দেখাবার হলে দেখাতাম বাঁধি বুক্ ॥
১
কালকুট।
কেবল হুজুগ তুলে, দোষ দেখাইয়া কুলে,
ছিদ্র পেয়ে পরস্পর মারিতেছে জাহ্।
আপনার দলে বসি, ধরে আনে রবি শশী,
বােষ বশে কেহ কারাে নাহি খায় ভা।
দ্বেষানলে জ্বলে দেশ, যাতনার ক শেষ,
কবৈ বা নিৰ্বাণ বল হবে এ অনল ।
কবে সব বন্ধুবাসী, সমাজ কুপ্রথা ৰাশি,
শীতল করিবে হৃদি বরষিয়া জল ।
t.
১৮
বিমল বিকাশে মুখ, কবে পরিণয় সুখ,
মলিন বঙ্গের ভালে শােভিবে আবার।
কবে হৃদিভভদ কর, করুণ দারুণ স্বর,
শ্রবণ বিবরে কভু পশিবে না আর ?
কবে বা বাঙ্গালী জাতি, আঁধারে স্থালিয়া বাতি,
নিরখিবে বরায়ােহা একতা বদন।
হবে না হবার নয়, অসার কল্পনা হয়,
দীন লাভ করে যথা স্বপনে রতন।
কালকুট।
মনেতে বাসনা করে, গিরিচূড়া ধরি করে,
আকিঞ্চন করা মাত্র কাযেতে ঘটে না।
মিলায়ে বঙ্গের সনে, আঁকি চিত্র এক মনে,
পাকা রং করি যেন কখন চটে না।
উচ্চ আশাকরি বটে, দেখি শেষে কিবা ঘটে,
লেখনী ধরিয়া করে অপার ভাবনা।
কিসে বঙ্গবাণী চিত, করিবারে বিমােহিত,
ভাবিয়া লিখিনু এই দ্বিতীয় কল্পনা।
( ইতি কল্পনা নামক দ্বিতীয় সর্গ।).
তৃতীয় সর্গ।
শিশির সময় প্রায় প্রহরেক নিশা।
কুয়াশায় পথিকেরা হারায়েছে দিশা
নড়ে না তরুর পাতা চলে না পবন।
দেখিছে সহ আঁখি মেলিয়া গগণ ।
কালকুট।
বিহগ সরসি জল নীরব নিথর।
নদনদীতে মাত্র বহে তর তর |
ওই যে মলিন ভাবে রাজ নগর।
কীৰ্ত্তি নাশা কীৰ্তি ঘার করেছে অন্তর
কোথা বা সে নবরত্ন কোথা রাজধাল।
কালের মহিমা মাত্ৰ হ’তেছে প্রকাশ ।
মানব কল্পিত কীৰ্তি কল্পিত নিয়ম।
হবেই সময় বলে তার ব্যতিক্রম।
৪
কারে। দীর্ঘকাল থাকে কারাে অল্পে যায়।
যই করনা শেষে ধ্বংশতাকে পায় ।
যশস্বীর যশ মাত্র কবি-মুখে রয়।
কপ্রথা কুকীর্তি কভু চিরস্থায়ী নয়।
সমাজের নৃপতির কুপ্রথা যা রহে।
সে সমাজ বদ্ধ যারা দীর্ঘকাল দহে।
কিন্তু তাহা চিরস্থায়ী কখন হবে না।
প্রবাহিলে, জ্ঞান স্রোত কদাচ রবে না ।
কালকূট ।
কোথায় সিরাজ তার নিষ্ঠুর আচার ।
আছে মাত্র ইতিহাসে কলঙ্ক তাহার ।
কোথায় বল্লাল সেন কোথা দেবিবর ?
যাদের নিয়মে আজো দহিছে অন্তর ।
৭
যদিও এখন কিছু পরিবর্ত তার ।
প্রায় ধমনীতে আছে বিষের সঞ্চার ।
পদে পদে সমাজের ঘাের অত্যাচার ।
বঙ্গবাসী ভীরু প্রাণে কত সয় আর ?
ওই যে দেখিছ ওই কীর্তিনাশা কুলে।
বলিয়া নবীনা এক বটবৃক্ষ মূলে।
যদিও রজনী বটে নিবিড় আঁধার ।
যাও কাছে দেখ সমাজের অত্যাচার ও
কমল কলিক। আহা তরল বয়সে।
নদীতীরে নিরজনে বলি কি সাহসে?
ভয়েতে না হয় যারা গৃহের বাহির।
আজি কি তাহার স্থান হলাে নদীতীর ?
কালকূট।
১০.
নিঃসরে নিশ্বাস সহ বিষাদ বচন ।
ওহহ এই বঙ্গদেশ সমাজ বন্ধন ?
এতই কি বঙ্গবালা এত পাপাধীনা ?
কাটিতে সমাজ বেড়ী কভু কি পারি না
১১
বিধি এই নিবেদন চরণে তােমার।
বঙ্গের অবলা যেন করো নাকো আর ?
হইব বনের পাখী বনের হরিণী ।
তৰু নয় কভু
নয় বন্দী পরাধিনী ।
১২
দেহ যত শত শত সহিব যন্ত্রণা।
তথাপি করােনা মােরে বঙ্গকুলাঙ্গনা।
পড়িল সজোরে শ্বাস হৃদয় ভেদিয়া।
করিল দু বিন্দুনীর আঁখি উছলিয়া।
চকিত হরিণী যথা নিষাদ শঙ্কায় ।
ভয়ে ভয়ে বিধুমুখী চারিদিকে চায় ।
আবার নিশ্বাস পড়ে আবার আবার ।
“সুরেণ” মধুর-ধ্বনি “সুরেণ” আমার ।
কালকূট.।
.' : ১৪
“দামিনী জনম মত মাগিছে বিদায়।
ভুলনা আমায় প্রিয় ভুলনা আমায় ।
পিঞ্জরের বিহঙ্গিনী কুলীন নন্দিনী।
নতুবা জীবন কেন ত্যজিবে দামিনী ।
“সুরেণ বংশজ হায় “সুরেণ” আমার ।
ধিরে কুলীম্ ধিক্ ধিক্ দেশাচার ।
প্রণয় কি বাঁধা থাকে সমাজ বন্ধনে ?
আবার দু বিন্দুনীর ঝরিল নয়নে।
১৬
নিবিড় আঁধার ভেদি এমন সময় ।
টিপি টিপি আলো জলে অনুভব হয়।
যতই নিকটে আসে ততই উজল ।
আলােকিত নদীতীর বটবৃক্ষতল ॥
১৭
“কি হলো কোথায় গেলো ?” কোলাহল হয়
চমকে কুমারী আহা চমকে হৃদয় !!
নিকটে স্থবির এক বাতি হাতে করে ।
“এই এই ধর ধরু” প্রায় ধরে ধরে ।
২০
কালকূট।
দামিনী দামিনী সমা হইয়া চঞ্চলা।
কুলে ছােটে পাগলিনী হইয়া উতলা।
“কে ধরে ধরিবি যদি আয় তােরা আয় ।
এইবার কুলক্রিয়া দামিনী বিদায়।
“সুরেণ! সুরেণ! “তুমি ভুলনা আমায় ?
জন্মশােধ অভাগিনী দামিনী বিদায় ॥
কীর্তিনাশা উপকুলে হ’তে দিয়া ঝাঁপ ।
দামিনী জনম মত এড়ায় সন্তা!!
“দামিনী ? দামিনী কই ? দামিনী আমার ?”
ছুটিয়া আসিল একে সুষমা-আধার ?
“দামিনী দামিনী কই ?” ভেদি শ্রোত-জল
ফুল তুলি “প্রাণেশ্বর” বলে ধরাতল ।
পাগল তরুণ বলে পলাবে কোথায় ?
পড়িল ঝাঁপিয়া বেগে সুন্দরী যথায়-
উঠেছিল মুখ তুলি সেই স্রোতে হয়।
পড়িতেই নদীগর্ভে অমনি-তলায় ।
কালকুট। ২২ “তরি আন্ জাল আ” কুলে কলরব। ছুটিতেছে চারি দিকে ঘাের ব্যস্ত সব । লেখনী দারুণ শােক লিখিয়া কাদায়। ওই দেখ দেশাচার জলে ডুবে যায় ? (ইতি সূচনা নামক তৃতীয় সর্গ।) চতুর্থ সর্গ- পাগলিনী। আলু থালু কেশ, আলু খালু বেশ, মলিন বসনা কে পাগলিনী ? রূপের প্রভায়, উজল কানন, কে এই বয়সে বনচারিণী ? উদাস উদাস, প্রাণের ভিতর হায় রে মলিন কুসুম কলি। কমল কোরকে, পশিয়াছে কীট, সময়ের দোষে ঘটে সকলি।
२२
কালকুট।
ধুলি মাখা গায়,
কেঁদে কেদে যায়,
মুরেণ! সুরেণ! করুণ রব।
এই ভালবাসা,
এই পরিণাম,
ফুরাল আমার ফুরাল সব।
৪
পাতা মরু মরে, সুন্দরী -শহরে,
ফিরে দেখে বুঝি সুরেণ আসে।
আবার বিষাদ, আবার হতাশ,
নয়ন কমল সলিলে ভাসে।
স্বপনের ন্যায়,
হতেছে স্মরণ,
তুলিলাম মুখ প্রাণেশ বলে।
দামিনী বলিয়া,
* প্রাণেশ আমার ঝাঁপিল জলে
মধুর কাকলী,
করে কর মাত্র,
হইল পরশ,
পড়ে নাকো মনে পড়ে না আর।
অতল গভীর, জলে ডুবিলাম,
কোথায় জগৎ সব আঁধার.!!
কালকূট।
২৩
ভাবিলাম দূর,
হইল যন্ত্রণা,
এ জনম-ক্লেশ ঘুচিল মাের ?
ডুবিয়াও আমি,
পুনঃ বাঁচিলম,
ভবেতে ভুগিতে যাতনা ঘাের !!
হৃদয় ভেদিয়া, পড়িল নিশ্বাস,
কমল উছলি বারি উঠিল।
রূপে করি আলা, পাগলিনী বালা
পুনঃ পিছু পানে বেগে ছুটিল ।
যত ছুটি যায়;
ততই কানন,
ততই নিবিড় ঘন পাদপ।
দিবসে আঁধার, ভয়ঙ্কর স্থান,
ধরাতল নাহি স্পর্শে আতপ •
কোথ। নদীতীর,
কোথায় সুরে,
ক্ষুধায় ভূষায় বিকল মন।
যে দিকে নিরখে, সব অন্ধকার,
শ্বাপদ সঙ্কল নিবিড় বন।
२४
কালকুট।
১১
কভু পায় পায়,
চলিতে জড়ায়,
লুটায় ধুলায় রূপের ডাল।
কে আর তথায়, ধরে তােলে ভয়,
নিকটেতে নাহি চিকণ কাল।
উঠিয়া,
আবার
চলিল -ছুটিয়া,
হায় রে সুন্দরী পাগলী পারা।
কি করে ক্ষুধায়,
কি করে তৃষায়,
যার ভালবাসা হয়েছে হারা ।
সকলি আকাশ, সকলি হতাশ,
ছিন্ন বৃন্ত হায় কুসুম যথা।
হারায়ে দুকুল,
ভাবিয়া আকুল,
( অযতনে পড়ি কনক লতা 1
১৪
কই প্রাণধার, সুরেণ আমার,
ঘন ডাকে বালা সুরেণ বলে।
যত ভালবাসা, যত সুখ আশা,
জনমের মত ডুবিল জলে। ..
কালকূট ।
আহা মরি মরি, হায় লাে সুন্দরি,
সাবাশী তােমার প্রেমানুরাগ।
যা ভাল বেসেছ, দুঃখেতে ভেসেছ,
মরণে মিশাবে সমাজ দাগ ।
রূপে আলাে করি বালা কেঁদে কেঁদে যায় রে,
অভাগিনী বিষাদিনী কে নিবারে তায় রে ?
লায় যায় ফিরে চায় ভয়ে কঁাপে কায় রে ।
চলিতে চলিতে জড়াইছে পায় পায় রে ॥
ক্রমে ক্রমে দিনকর তস্তাচলে যায় রে ।
নিবিড় আঁধার আসি গ্রাসিল ধরায় রে।
কমলকলিক। আহা আতঙ্কে শুকায় রে।
কোথায় আশ্রয় পায় নাহিক উপায় রে ॥
দিকা দিক নাহি জ্ঞান বেগে বলা ধায় রে ।
তরুতে আঘাত লাগি ভূমেতে লুটায় রে ।
আ মরি কদন ভাসে শােণিত ধরায় রে।
আঘাতে কুসুমলতা চেইন হারায় রে ।
ধিক্ ধিক্ দেশাচার ধিক্ বিধাতায় রে ।
কেন নিরামলে বিধি এ বঙ্গবালায় রে।
কালকূট। মরি মরি সুকুমারী ভালবাসা দায় রে জনমের মত ওই লইছে বিদায় রে। নিশীথ সময় ঘাের জগৎ নীরব। মাঝে মাঝে ফুকারিছে কেবল ফেরব । ঝিল্লির ঝঙ্কার সদা শার্দূল হুঙ্কার। শাখা আবরিত শূন্য নিবিড় আঁধার। মাঝে মাঝে বিহঙ্গের পক্ষে ব্যপট- হস্তি কর্ণ সঞ্চালন শব্দ পটাপট । পলায় হরিণকুল আমিছে হরি। আর্নরবে ডাকে ভেক গ্রাস করে হরি। শয়নের বাস সম কানন বিপুল। তরুতে তরুতে জ্বলে খদ্যোতিকাকুল বুভুক্ষিত ব্যাঘ্র এক জিহ্বা নিকলিয়া। দামিনী শিয়র দেশে রয়েছে বলিয়া লােভে লালা ঝরি পড়ে কুমারী বদনে হায়রে কুসুমলতা আছে অচেতনে। আবার ঝরিয়া পড়ে টটসি লাল । ভিজিল কমলমুখ নিটোল কপাল ॥ শীতল পাইতে বােধ চেতন পাইয়া। ধরা ত্যজি পাগলিনী বসেন উঠিয়া ।
কালকূট ।
দেখেন সম্মুখে বমি লাক্ষাৎ শমন।
ভয়েতে বিনােদবালা মুদিল নয়ন |
জীব শিকার দেখি সালাদে শাৰ্দল ।
বসিল করিয়া লক্ষ আস্কালি লাঙ্গুল।
ভীষণ গর্জনে ব্যাঘ্ৰ কঁপাইল বন।
হায়রে কুমারী পুনঃ হ’ল অচেতন।
লম্ফ দিয়া যেই ব্যাঘ্র করিবে শিকার।
বেগে তীক্ষ্মতীর আসি চক্ষে পশে,তার ।
ধরায় লুটিল ব্যাঘ্র করি ভীমনাদ ।
ছুটিয়া আনিল দুই কালান্ত নিষাদ ।
সঙ্গিতে ব্ৰহ্মরন্ধে পুনঃ দুই শর।
হানিল পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয় ব্যান্ড্রবর ।
দেখিল কুমারী আছে হইয়া অজ্ঞান।
কোলে করি ব্যাধদ্বয় হয় অন্তর্ধান ।
ভীষণ নিবিড় বন অন্ধকারময় ।
নীরব গম্ভীর ভাবে মৌনী হয়ে রয়
সুখশয্যা ত্যাগ করি স্নান বেশ ভূষা।
তামস কপাট খুলি পঁাড়াইল উষা ।
কি ফল থাকিয়া আর ভয়ঙ্কর বনে।
বিদায় হইল কবি লেখনীর মনে ।
( ইতি পাগলিনী বর্ণনা নামক চতুর্থ সর্গ।)
কালকূট ।
পঞ্চম সর্গ
কবি-প্ৰবােধ।
লইয়া কনকলতা, চলিল কুটীর, যথা,
বিকট নিষাদ দুইজন।
• পার হয়ে বনস্থলি,
অদূরে পচ পল্লি,
বিশৃঙ্খল কদৰ্য্য গঠন ।
পত্রে ছায়া কুড়ে ঘর, পত্ৰবেড়া জীর্ণতর,
জীর্ণ শীর্ণ পত্রের আগড়।
পশুহাড় ছড়াছড়ি, মুণ্ডু যায় গড়াগড়ি,
কোনটা করিছে ধড়ফড় ।
।
হরিণ বরাহ ভেড়া,
শূকর মহিষ মেড়া,
বাঁধা রহিয়াছে স্থানে স্থানে।
অঙ্গময় মাখা মাটি, গলায় লােহার কঁটি ;
ব্যাধ শিশু পশু ধরে টানে ।
কালকুট।
৪
করিতেছে ছুটাছুটি, লাফা লাফি হুটাপুটি,
পাখী ধরে পাখা ছিড়ে ফেলে ।
পতঙ্গ ধরিয়া নিয়া, পাখা ছিড়ি ফেলি দিয়া,
কদৰ্য্য নিঠুর খেলা খেলে ৪
যতেক বালক মিলি, গােধিকা আগুণে ফেলি,
নৃত্য করে করতালি দিয়া ।
দগ্ধ হলে তুলি তায়, মুন মাখাইয়া খায়,
ব্যাধুবালা খেলে পাখী নিয়া।
ছেড়া চেটা ছেড়া কাঁথা, কুটীরেতে শয্যাপাতা,
দারুণ দুর্গন্ধে উঠে নাড়ী ।
হরিষে নিষাদ দারা, পশুমাস কাটি সারা,
সিদ্ধ করে চড়াইয়া হাঁড়ি ।
ব্যাধের নিবাস স্থান, শ্মশান সমান জ্ঞান,
কুকুর চিবায় পশু.হাড়।
কোনটা ভীষণ, ডাকে, শকুনি ছোয়ান কাকে,
উড়ে দেখে বাঁকাইয়া ঘড়. +
কালকুট।
সুবিধা যখন পায়, ছে। মারিয়া লয়ে যায়,
নাড়ি ভুড়ি অস্থি যাহা হয় ।
দেখিলে শুকায় মুখ, গুরু গুরু করে বুক,
লােকালয় নহে যমালয় ।
=
দিবা প্রহরেক গত,
অংশুপুঞ্জ শত শত,
দেছে উষ্ণ রৌদ্র ছড়াইয়া ।
তীর কঁাড় হাত করি, দুইটা বরাহ ধরি,
এক অমে আগু বাড়াইয়া
৫
পশ্চাৎ নিষাদ কোলে, হেরি মুনি মন ভােলে,
স্বর্ণলতা আছে মৃত প্রায়।
পল্লিতে পশিল যবে, যুবা শিশু বৃদ্ধ সবে,
কুমারিরে দেখিবারে পায় ।
রূপ দেখি চমৎকার, পলক না পড়ে তার,
দেবী ভাবি নমস্কার করে।
দামিনীকে ক্রোড়ে নিয়া, নিষাদ কুটীরে গিয়া,
সমর্পিল বণিতার করে ।
কালকূট।
অবাক্ নিষাদ জায়া,
জন্মিল সন্ততি মায়া,
বারি আনি সিঞ্চে বিধুমুখে ।
কুমারী রে ক্রোড়ে করে, তালবৃন্ত লয়ে করে,
যতনে বীজন করে মুখে ।
কিছুক্ষণ শুশ্রুষায়, • দামিনী চেতন পায়,
বিকাশিল কমল নয়ন।
নিরখিয়া সবিস্ময়, এত যে কানন নয়,
কোথা সেই শাৰ্দল ভীষণ ॥
১৪
কোথায় জীবন যায়, কোথা ক্রোড়ে শুশ্রুষায়,
পুনৰ্ব্বার হইল চেতন।
কদৰ্য্য পাতার কুঁড়ে, ভন্ ভন্ মাছি উড়ে ;
ঘর ভরা পশু পক্ষীগণ ।
খুঙ্গিতে শসায় সাপ, পিঞ্জরে ব্যাঘ্রের দাপ,
খাচায় পাখীর কলরব ।
পশু চৰ্ম্ম শৃঙ্গ হাড়, বর্ষা টাঙ্গী তীর কঁাড়,
চারিদিকে ঝুলিতেছে সব
৩২
কালকূট।
দুর্গন্ধেতে উঠে নাড়ী, ঠিক এ যমের বাড়ী,
যমদারা আছে কোলে করে।
কুপ চক্ষু বক্র না, রূপে লজ্জা পায় কাক,
বক্ৰ নাশা স্পর্শিয়া অধরে ॥
১৭
ভীম আস্য মাঝা ভাঙা, তাম্ব লেতে দন্তরাঙা,
মােটা শাড়ী পশু চৰ্ম্ম প্রায়।
মলিন যেমন “ছালা”, গলায় পলার মালা,
কাসার গহনা হাতে পায় ॥
কাণেতে শক্তির চাকি, স্তনেতে উদর ঢাকি,
তলপেট করেছে পরশ।
ঝাকড় মাকড় চুল, তাতে গোঁজা ঘেঁটু ফুল,
তৈল বিনা করে খস্ খস্ ।
t
উকুননিকির ঝাঁক, বালা করি লাখে লাখ,
মাথা নাড়ে ঝ ঝর ঝরে।
শিকড় মাদুলী যত, চুলে বাঁধা ঝুলে কত,
দেখি বালা পরাণ শিহরে ।
কালকূট।
ভয়েতে মুদিল আঁখি, ব্যাধ জায়া কহে ডাকি,
ভয় কি মা দেখ চক্ষু চেয়ে।
বাঁচায়ে বাঘের করে, কর্তা আনিয়াছে ঘরে,
তুই মাের প্রাণাধিকা মেয়ে।
যদি মা ব্যাধের ঘরে, এসেছি দয়া করে,
একবার কোলে উঠে যােচ্ছ।
আমার কি পুণ্য আছে, দয়া করে মাের কাছে,
যদি তুই দুটো কথা কাস !
২২
রূপে বল কিবা করে, আহা রে দয়ার স্বরে,
কানা হৃদয় ঐব হয় ?
উঠিয়া বসিল বালা, রূপে কুঁড়ে করি আলা,
সজল নয়নে কথা কয়।
কেমা তুমি কার নারী, ছলনা বুঝিতে নারি,
বাঁচাইলে দয়া প্রকাশিয়া।
মায়া পূর্ণ নারীকায়, কোকিলা ঝঙ্কারে হায়,
সাদাদেতে ফেলিল কাঁদিয়া ।
কালকূট।
২৪
আবার কোলেতে করে, কহে গদ গদ স্বরে,
কি সাধ্য বাঁচাই তােরে আমি।
তীর কড় লয়ে করে, পণ্ড বধিবার তরে,
রেতে বনে গিয়াছিল স্বামী।
সঙ্গেতে দেবর যায়, সহসা দেখিতে পায়,
'বাঘে তােমা করিছে শিকার।
তাই তারে বধ করে, তােমায় এনেছে ঘরে,
ত্রাণকর্তা ঈশ্বর তােমার।
মাথা খাস সত্য কবি, মা তুই কি দেবী হবি,
মানবী হইলে কেন বনে ?
পাপিনীরে কৃপা করে, এসে দেখা দিলি ঘরে,
বল মাগাে সন্দ বড় মনে ॥
দিতে বালা পরিচয়,
নয়ন কমলদ্বয়,
অপূর্ণ করে টন্ টন্ ।
মনে জাগে সমুদয়, পিতা মাতা স্ব-আলয়,
প্রতিবাসী বান্ধব সকল ॥
কালকুট।
২৮
আর জাগে উহু মরি, বারিবিন্দু আর ধরি,
নয়ন রাখিতে নাহি পারে।
কমগও ভিজাইয়া, পদ্মকলি ভাসাইয়া,
ধরা শিক্ত করে শতধারে।
মনে পড়ে ছেলেবেলা, ফুল তােলা বাল্যখেলা,
মনে পড়ে পাঠ এক সঙ্গে।
মনে পড়ে ভালবাসা, আর কি ?'ওহহা দুরাশা,
শিহরিল কুমারী আতঙ্গে?
নিজ জীবনের তরে, দামিনী শিহরে ডরে ?
তা নয় সে সুরেণ কারণ।
কোথা সে মােহন কায়, আর কি পাবনা ভয়,
নদি গর্ভে হয়েছে মগন ।
জনমের মত তঁারে, আর আমি পাবনারে,
গুমে গুমে উঠিল কাদিয়া ।
ছেড়ে দেমা ব্যাধ জায়া, কেন মা বাড়ায় মায়া,
কণ্ঠয়ােধ পড়িল ঢলিয়া ।
৩৬
কালকূট।
সকাতরে বাধদারা, মুছাইয়া অশ্রুধারা,
বলে ওমা কেঁদ না কেঁদ না।
পরিচয় পেলে পরে,
পাঠাইয়া দিব ঘরে,
চিন্তা কিগাে ভেবনা ভেবনা ।
বড় মানুষের মেয়ে, ব্ৰহ্মপুত্র যােগ পেয়ে,
বুঝি স্নানে যেতে ছিলে সবে ।
ঝড় বৃষ্টি হয়ে খুবি, হয়ে গেছে নৌকা ডুবি,
বেঁচে এসেছিস তাই হবে।
বিধাতা বাঁচাবে সবে, কেঁদে আর কিবা হবে,
বাড়ী যাবে তার কি ভাবনা।
দামিনী করুণ স্বরে, বলে মা জনম তরে,
আর আমি বাড়ীতে যাব না।
এবে সন্ন্যাসিনীবেশে, বেড়াইব দেশে দেশে,
দেব দেবী করি আরাধনা।
ব্রাহ্মণের মেয়ে হই, পরিচয় ইহা বই,
আর আমি কিছুই দেব না।
কালকূট।
পদধূলি নিয়ে শিরে, ব্যাধ জায়া ধীরে ধীরে,
বলে ধন্য মাের কুঁড়েখানি।
পদধূলি পাব তাের, কিবা পুণ্য ছিল মাের,
পূৰ্ব্বকৃত কিছু না জানি ॥
কথোপকথন ক'রে,
ব্যাধদ্বয় আসি ঘরে,
ভক্তিভাবে করে নমস্কার ।
ধীরে ধীরে মৃদুস্বরে, জায়ারে জিজ্ঞাসা করে,
পরিচয় পেয়েছ কি মার ?
৩৮
শুনে নিষাদিনী কয়, সামান্য এ কন্যা নয়,
দেবী ইনি ব্রাহ্মণের মেয়ে।
করযুড়ি পুনৰ্ব্বার, করে দোহে নমস্কার,
চরিতার্থ পদধূলি পেয়ে।
জিজ্ঞাসে যুড়িয়া কর, বল মা কোথায় ঘর,
রেখে আসি চল সঙ্গে করে ।
ব্যাধ জাতি অনাচারী, খাই সদা পশু মারি,
অপরাধ নিয়ােনা মা ধরে।
কালকূট ।
করুণ কোমল স্বরে, কোকিলা ঝঙ্কার করে,
কসনা যাইব চন্দ্রনাথ।
বাধদ্বয় হর্ষভরে, পদধূলি শিরে ধরে,
যে আজ্ঞে বলিয়া যুড়ে হাত।
!
তখনি দুঃখিনী বালা, খুলি হার বাজু বালা,
অঙ্গে যত ছিল অলঙ্কার।
ব্যাধ করে সমর্পিয়া, বলে দুষ্ট হও গিয়া,
আর কিছু নাহিক আমার ।
82
ব্যাধ বলে ওমা ছিমা, ছি ছি তুমি কর কি মা,
স্বর্ণ অঙ্গ শূন্যে পড়ে রবে।
দীনে আশীৰ্বাদ কর, এই অলঙ্কার পর,
তােমার আশীষে সব হবে।
কাদিয়া ফেলিল বালা, নিষাদ দিওনা জ্বালা,
আর রেখে কাজ কি অলস্কার।
ঘুচেছে সে সব সাধ, বিধি সেধেছেন বাদ,
চুনাথে নে চুল আমারে।
কালকুট।
৪৪
ব্যাধ বলে কেঁদনা মা, তীর কাড় নেরে শ্যামা,
এসগাে মা যাই চন্দ্রনাথে ।
আসিয়া ব্যাধের ঘরে, দিলি দুঃখ দূর করে,
অলঙ্কার দেয় জয়া হাতে
উঠিল কর্ণকলত,
গৌরীর গমনে যথা,
মেনকা সেরূপ ব্যাধ জায়া ।
কেঁদে উঠে কলম্বরে, বলে মা আসিয়া ঘরে,
কেন তুই বাড়াইলি মায়া ॥
দুঃখে ফেটে যায় বুক, আহা মরি বিধুমুখ,
ম্লান তাের ইয়েছে ক্ষুধায় ।
জন্মেছি এমন জেতে,
ক্ষুধার সময় খেতে,
নাহি দিতে পারি তােমায় ।
অনাহারে মরে যাবি, ফলটল কিছু খাবি,
ফলেতে কি দোষ আছে বল ?
এত বলি শীঘ্র উঠে, খুজিয়া আনিল ছুটে,
গুটি দুই সুপক শ্রীফল ।
কালকূট।
৪৮
এই ধর পথে খেও, কিছু দূর গিয়ে নেও,
কৰ্ভা সাবধানে যেও নিয়া।
মাের দফা শেষ করে, মা তুই চলিলি ঘরে,
এত বলি ফেলিল কাদিয়া।
৪৯
০
দামিনী কঁাদিয়া বলে,
ওমা কাজ নাই ফলে,
এ জনমে হবে না আহার।
প্রাণ দেছি যার করে, সে গেছে জনম তরে,
এখন মা মলেই নিস্তার ।
কেঁদে কয় নিষাদিনী, ছি ছি গাে মা পাগলিনী,
কেন অকল্যাণ কথা কোস্।
মা আমার মাথা খা
এই ধর ফল খা,
আর গোটা দুই দিই নাের
ব্যাধ নারী স্নেহ ভরে,
ফল লইয়া করে,
বলে ওমা কাজ নাই আর।
রামা শ্যামা ব্যাধদয়, তীরকাড় করে লয়,
নিদিনী করে হাহাকার।
কালকুট।
હર
বুড়ােবুড়ী মেয়েছেলে, আসে সবে ঘর ফেলে,
ব্যাধ পল্লি ভাঙ্গিয়া পড়িল ।
কুমারী কুটীর হতে, বাহির হইল পথে,
রাহুমুক্ত শশী প্রকাশিল ।
D
.
স্ত্রীপুরুষ সৰ্বজন, রূপে মুগ্ধ হয়ে মন,
স্নেহেব চক্ষে নীর ঝরে।
করি সবে নমস্কার, বলে কিবা কৰ আর,
কাদালি মা ক্ষণেকের তরে ।
৫৪
সবারে সম্ভাষ করি, @ফল করেতে ধরি,
বিধুমুখী হলেন বিদায় ।
ব্যাপদ্বয় আগে আগে, দামিনী পশ্চাৎ ভাগে,
কেঁদে কেঁদে সবে ফিরে যায় ॥ -
ব্যাধ পত্নী ভূমে পড়ি, কেদে যায় গড়াগড়ি,
বলে ওমা কেন এসেছিলি।
দারুণ মায়ায় তাের, বুকফেটে যায় মাের,
অভাগীরে প্রাণেতে মারিলি ।
কালকুট।
জন্মালে ব্রাহ্মণকুলে,
রাখিতাম বুকে তুলে,
তাহলে কি যেতে দিই আর।
ভিক্ষা করে খা’য়াম, কোলে কোলে রাখিতাম,
ঘরে ফিরে আয় মা আমার ।
কবি বলে ধন্যাগাে মা, কে বলে কুৎসিতা তােমা,
অন্তরেতে পরমা সুন্দরী।
ধন্যগো তোমার পতি, পবিত্র চরিত্র অতি,
কি ভক্তি দেখালে আহা মরি ।
৫৮
যাও মা নিষাদ জায়া, পবিত্র তােমার কায়া,
তুমি গাে মা পরমা সুন্দরী।
স্বামিসােহাগিনী হবে, পরম সুখেতে রবে,
কবি আমি আশীৰ্ব্বাদ করি ।
দয়া ধৰ্ম্ম আছে যার, সমাজের অত্যাচার,
যে হৃদয়ে পায় নাই স্থান।
ব্যাধ তারে কেবা কয়, নিষাদ কখন নয়,
সেত হয় কুলীন প্রধান ॥
কালকূট ।
নিষাদিনী যাও ঘরে, কেঁদনা অমন করে,
বৃথায় কাঁদিয়া কি হবে।
গৃহকাৰ্য কর গিয়া, সুখে থাক স্বামী নিয়া,
কবি মা বিদায় হলো তবে !
( ইতি কবি প্রবােধ নামক পঞ্চম সর্গ।)
ষষ্ঠ সর্গ।
আলাপ।
দুঃখিনী দামিনী মরি ব্যাধদ্বয় সনে।
চন্দ্রনাথ লক্ষ কমে যান বনে বনে ।
কখন তরণীযােগে পদব্রজে কভু।
যদিও ক্লেশেতে ক্লান্ত শান্তি নাহি তবু |
ব্যাধের আগ্রহে আর জীবন কারণ।
খেতে হয় তাই কিছু করেন ভক্ষণ ।
বাঁচিতে বাসনা নাই মূল কথা এই।
কোনক্রমে দৈবযােগে যদি বাঁচে সেই ॥
তা হলে আবার দেখা হইতেও পারে।
ধন্য আশা পরাজয় কে করে তােমারে ?
৪৪
কালকূট ।
।
এইরূপে পাঁচ দিন করিয়া ভ্রমণ।
পদ্মা নদীতীরে উপস্থিত তিন জন।
তট ভাঙ্গি স্রোত চলে করি কুলকুল।.
যত দেখ নাহি দেখা যায় পরকুল ।
আবর্জনা ফেণরাশি সৰলে লইয়া।
অসংখ্য আবৰ্ত্ত ছুটে ঘূরিয়া ঘূরিয়া ।
নিৰ্ব্বাতেও ঠলে পদ্ম সৰ্ব্বদা চঞ্চল ।
তালত্রু সমভাসে কুম্ভীর সকল ॥
তরি’পরে জাল ফেলে জালজীবিগণ।
অসংখ্য আরােহী তরি করিছে গমন।
পদ্মা দেখি বিধুমুখী আঁখি ছল ছল ।
আর মনেতে হায় পড়িল সকল ।
সেই মত উচ্চ পাড় সেই নদীকুল।
আর নাহি থাকে স্থির পরাণ অকুল ॥
ধীরে ধীরে তীরে গিয়া নিরখেন জল ।
মৃদুল সমীরে করিতেছে টন্ টন্ ।
জলরাশি ধায় সব কুলকুল স্বরে।
দেখিতে দেখিতে বালা সহসা শিহরে ।
জলেতে সুচারু ছায়া একি চমৎকার।
সুরেণের মূর্তি সেই সুরেণ আমার ।
সেই ভালবাসা মুখে মধুর কথায়-
কেঁদে বলে আছ মাের দামিনী কোথায়
কালকূট ।
ডুবিয়াও দেখা নাহি পেলেম তােমার।
দামিনী আমার কই দামিনী আমার ?
কাদিয়া বলিল বালা বড় ভালবাসি।
সুরেণ এই যে তব চরণের দাসী ।
যেমন জলেতে বালা পড়িবে ঝাপিয়া ।
ব্যাধদ্বয় কর ধরি রাখে বাধা দিয়া।
কেঁদে বালা বলে ছেড়ে দেনারে আমায় ।
জনমের মত ওই সুরেণ সে যায়।
পায়ে পড়ি ছেড়ে দেরে প্রাণে কাজ নাই।
ছেড়ে দে নাথের আমি সঙ্গে সঙ্গে যাই।
ব্যাধদ্বয় বলে মা কি পাগলিনী হ'লে ।
ক্ষেপা মেয়ে মহাপাপ জলে ডুবে মলৈ ।
আবার দেখেন জলে ছায়া বা কোথায় ?
(কঁদে পাগলিনী মুখ জলে ভেসে যায় ।
ধীরে ধীরে সকাতরে পুনঃ উঠি তীরে।
ধরায় বসিয়া বালা ভাসে আঁখিনীরে।
শিবিকা লইয়া স্কন্ধে এমন সময় ।
নদিতীরে আসিল বাহক চতুষ্টয় ।
শিবিকা রাখিয়া তারা দূরেতে বসিল।
দ্বার খুলি নারী দুটী বাহির হইল ।
সম্মুখে দাড়ায়ে যেটি ষােড়শী যুবতী।
অনুভবে বােধ হয় মদনের রতী।
।
কালকূট।
পশ্চাতে দাঁড়ায়ে এক দয়ার প্রতিমা।
করুণ সুন্দরী প্রজ্ঞা রূপের গরিমা।
সহসা দামিনী দিকে ফিরাতে নয়ন।
দেখেন কনকলতা করিছে রােদন ॥
ভুলিল নয়ন হলো মেহের সঞ্চার।
কমল চরণ স্থির নাহি থাকে আর ।
চলিলেন ধীরে ধীরে কুমারীর কাছে।
যুবতীও তাহার চলিল পাছে পাছে ।
দামিনী সম্মুখে গিয়া সুমধুর স্বরে।
জিজ্ঞাসেন দয়াবতী করুণ অন্তরে।
কেমা তুমি কার কন্যা বল কি কারণ।
ধরা বসি কেন মাগো করিছ রোদন ?
প্রশ্ন শুনি সুন্দরীর শােক পরাপর ।
শত গুণ হইয়া উথলে আর বার ।
ঝর ঝর অঝরে ভাসায়ে বদন।
দয়াৰতী বলে মাগাে করােনা নােদন ।
বালা বলে পরিচয় কি কব মা আর।
জগতের হেয় কন্যা আমি বিধাতার ।
গিয়াছে মা আশা মম ওকায়ে মুকুলে।
নিরাশ্রয়া বিপ্রসুতা ভাসি মা অকুলে ।
বাসনা করেছি এই মানসে জননী।
চন্দ্রনাথে গিয়া আমি হইব যােগিনী।
৪৭
কালকূট।
দয়াবতী হৃদি পূর্ণ হইল দয়ায় ।
অমনিই করে ধরি উঠান বালায় ।
কেন মা কনকলতা হইবে যােগিনী।
তুমি মম কন্যা আমি তােমার জননী।
অগ্ৰজা তনয়া “চারুভুমি মা দ্বিতীয়া।
দুটিী ভগ্নি সুখে রবে একত্রে থাকিয়া।
ফোড়শী রূপমী যেটি নাম চারুশীলা।
কোকিল কাকলী স্বরে বিনােদে কহিলা।
এস দিদি দুট বনে একত্রে থাকিব।
প্রাণের অধিক ভাল তােমারে বাসি ।
কাদিয়া দামিনী বলে যাবনা ভগিনী ।
ভেবেছি জনম মত হব গো যােগিনী ।
চারু মাতা চারুশীলা আগ্রহ করিয়া।
হাত ধরি তুলে নিল অশ্রু মুছাইয়া।
রমণী কোমল প্রাণ রমণীর স্নেহে।
আবার বাসনা হ’ল পশিবারে গেহে ॥
বিশেষতঃ দামিনীর মনে আশা এই।
কোন মতে আমার অদৃষ্টে বীচে সেই ॥
তাহলে তো পুনঃ দেখা কখনাে হইবে।
ভবিষ্যতে মনন আশা অবশ্য পূরিবে ।
দামিনী ফিরায়ে মুখ যাবার সময় ।
সবিনয় বচনুেতে ব্যাধদ্বয়ে কয়।
৪৮
কালকূট।
।
তােমরা দুজনে ওগাে যাও গৃহে ফিরে।
গৃহে গিয়৷ কবে নিষাদিনী জননীরে।
প্রাণে প্রাণে বেঁচে আছে ব্রাহ্মণ তনয়া।
অদৃষ্ট ক্রমেতে তার হ’ল না বিজয়া ।
ব্যধদ্বয় কথা শুনি কঁাদিয়া ফেলিল।
বাষ্প গদগদস্বরে কহিতে লাগিল।
পাপিষ্ঠ এ ব্যাধদ্বয় বিদায় এবার।
জনমেতে আর দেখা পাবনা তােমার
পলকের তরে গিয়া দীনের কুটীরে।
জনমের তরে ভাসাইলে অশ্রুনীরে।
চারুশীলা মাতা বলে কেবা দুইজন।
কি কারণে ও'র শশাকে করিছ রােদন।
দামিনী বলেন মাগাে নিষাদের কুলে।
বােধ করি ধর্ম নিজে জন্মিয়াছে ভুলে
মৃতকল্প ছিনু যবে কাননে নিশায়।
ব্যাঘ্র গ্রাসে রক্ষা দুটি করেছে আমায়।
এতদূর ভক্তি স্নেহে দেখিনা নিষাদে।
তাই মা বিদায় দিতে দুঃখে প্রাণ কাঁদে।
শুনি চারুশীলা বালা খুলি অলঙ্কার।
ব্যাধদ্বয়ে তখনি দিলেন 'পুরস্কার ।
অস্বীকার করিবারে যায় ব্যাধদ্বয়।
মুখচুম্বি চারু মাতা কন্যারে কয়।
=
কালকূট ।
স্কন মম গর্ভে ধন্য জনম তােমার।
বদান্যতা দেখি হৃদি প্রফুল্ল আমার।
প্রণমিয়া ব্যাধদ্বয় বিদায় হইল ।
মাতা সুতা দামিনীরে লইয়া চলিল ।
স্নান করি শিবিকায় করি আরোহণ ।
বাহকের স্কন্ধে চড়ি যান তিনজন ॥
দিবা প্রহরেক গত ঈষদুষ্ণ রবি।
তেজস্বিনী মন্দাকিনী প্রকৃতির ছবি ।
শ্রমজীবি শ্রমকরে গরু মাঠে চরে ।
টোলে পাঠশালে ছাত্র বিদ্যা শিক্ষা করে।
নানা স্থানে পাখীকুল চরা করি ফিরে।
পথেতে ধূলিকা পুঞ্জ উড়িছে সমীরে।
কৃষক মাঠেতে ঘাটে সারিতেছে কাম।
এতদূরে লেখনীর কিঞ্চিৎ বিশ্রাম।
( ইতি আলাপ নামক ষষ্ঠ সর্গ।}
কালকুট।
সপ্তম সর্গ
সহােদর
১
{
অদূরে অপূৰ্ব্ব গ্রাম,
বিখ্যাত শ্ৰীখণ্ড নাম,
ক্ষ্মী সহ বিরাজেন রাণী ।
সুন্দর সুন্দর হাট, সুন্দর দোকান পাট,
স্বাস্থ্যকর জলবায়ু জানি।
কৰ্ম্মকার স্বর্ণকার, তন্তুবায় মালাকার,
তৈলকার নাপিত রজক।
উত্তম উত্তম বৈদ্য, ব্যাধি শান্তি করে সদ্য,
বাস করে চণ্ডাল বাদক।
পূবে নদী মধুমতি, ছুটিতেছে দ্রুতগতি,
কোলে লয়ে কুম্ভীরের পাল।
উত্তরেতে ধানক্ষেত্র,
দেখিলে যুড়ায় নেত্র,
ক্ষেত্র মধ্য দিয়া ঘােট খাল ।
কালকূট।
৪
পশ্চিমে গ্রামের শেষে, জীর্ণ গৃহে শ্লানবেশে,
বাস করে যতেক যবন।
দক্ষিণে প্রকাণ্ড বিল, পাখী করে কিল কিল,
খেলিছে বিবিধ মৎস্যগণ।
নীচ জাতি পরস্পরে, গ্রাম প্রান্তে বাস করে,
মধ্যে থাকে ভদ্র জাতিগণ।
কায়স্থ বণিক গোপ, দ্বিজ বৈদ্য সদেগাপ,
সর্বাপেক্ষা অধিক 'ব্রাহ্মণ
সকলেরই আছে জমী, অন্নের নাহিক কমি,
ব্রাহ্মণ গ্রামের জমীদার।
অতিথি কুটুম্ব বাসে, বাজার যখন আসে,
পায় নেই সন্তোষ আহার ।
০
আছে সবে স্ব স্ব ধৰ্ম্মে, দ্বিজ থাকে দশকৰ্ম্মে,
কায়স্থ কলম পিশে খায় ।
লৌহ পিটে কৰ্ম্মকার, তৈল বেচে তৈলকার,
কাটে কাল স্ব স্ব ব্যবসায়।
কালকূট।
পল্লীগ্রাম খ্যাত নাম, শ্রীকান্ত গাঙ্গুলি নাম,
গ্রাম জমীদার মহাশয়।
ভারি নারী কন্যা সনে,
পদ্মাস্নানে হর্ষ মনে,
গিয়াছেন প্রত্যুষ সময় ।
প্রহরেক গত প্রায়, আরােহিয়া শিবিকায়,
নামিলেন আমি অন্তঃপুরে।
চারু দামিনীরে লয়ে, হর্ষ বিকশিত হয়ে,
পশিলেন অন্দর মাঝারে ।
বাহকে.শিবিকা নিয়া, যথাস্থানে রাখে গিয়া,
অন্তঃপুর নারী সমুদায়।
দামিনীর রূপ হেরি, সবে দাড়াইল ঘেরি,
পরস্পর সকলে বিস্ময় ।
১১
চারু মাতা সকলেরে পরিচয় দিয়া।
পশিলেন নিজ গৃহে দামিনীরে নিয়া ।
আর্জ বস্ত্রে খুলি শুল্ক বস্ত্র পরাইয়া।
আপনার কন্যা হাতে দিলেন পিয়া।
( ইতি সহদরা নামক সপ্তম সর্গ ।)
কালকূট ।
অষ্টম সর্গ।
সান্ত্বনা ।
১
এক দিন সঙ্গোপনে, দামিনী চারুর সনে,
উদ্যানেতে করিছে ভ্রমণ।
বহে মন্দ সমীরণ, বিহঙ্গ করিছে গান,
তস্তাচলে ডুবিছে কুপন।
প্রফুল্ল মুকুলকুলে,
অলি গুঞ্জ দলে দলে,
কমলিনী ভাসে আঁখিনীরে ।
হেরিয়া দামিনী মুখ, চারুশীলা পেয়ে দুখ,
কহিতে লাগিলা ধরি করে ॥ •
দামিনী ভগিনী মাের, করে আমি ধরি তাের,
বল সখি বল সত্য কথা।
নিশি দিন বিমলিন, মুখশশী জ্যোতিহীন,
কিবা তাের মরমের ব্যথার
কালকুট।
৪
বড় ভালবাসি তোরে, বঞ্চনা না কর মােরে,
প্রকাশিয়ে বল সত্য বাণী
হেরিয়ে তােমার মুখ,
বিরিয়ে যায় বুক,
কেন তুমি এতেক দুঃখিনী ।
স্বজনী স্বজন কাছে, কিব। গােপনীয়' আছে,
প্রকাশিলে কমে দুঃখ ভার।
মাথা খাও কথা রাখ, বল কেন মৌনী থাক,
একি ভাব অতি চমৎকার।
শুনি চারুশীল কথা, দামিনী তুলিয়া মাথা,
দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া কহিল ।
কি বলিব চারু তােরে, বিধাতা বিমুখ মােরে,
চিরদিন দুঃখেতে দহিল ।
৭
বল্লাল খাইয়া মাথা, সৃজিল কৌলীন্য প্রথা,
স্বর্ণ বাটী করিল শ্মশান ।
জন্মিয়া কুলীন ঘরে, হৃদয় পাষাণ করে,
সুখ আশা ভম্মেতে প্রদান।
কালকূট
আবাল্য যাহার সনে, সােদর সমান জ্ঞানে,
ক্রীড়া রসে বেঁটেছি সময়।
এবে সে সুরেণ মাের, বাঁচিয়া সংশয় ডোর,
বিভূ পদে লয়েছে আশ্রয় ।
৯
প্রাণপণে যত্ন করে, হায়রে লভিতে মোরে,
লাভ মাত্র হলাে অপমান
বিচ্ছেদ সহিতে নারি, প্রাণনাথ বনটারি,
এতদিনে ত্যজেছেন প্রাণ।
১০
হায় লখি কষ্টে প্রাণ, আত্মাতে বিরহ বান,
লজ্জা ভয় দিনু বিসর্জন ।
সুরেণ সুরেণ বলি, লজ্জা ভয় জলাঞ্জলি,
তনুত্যাগ করেছি মনন |
১১
নদী জলে দিনু ঝাপ,
তথাপিও প্রাণ পাপ,
দেহ ছাড়ি গেল না তখন।
ভুজাতে দারুণ জ্বালা,
দয়াবতী ব্যাধ বালা,
শুশ্রুষায় বাঁচালে জীবন।
কালকূট।
১২
ব্যাধের আলয় ছাড়ি, এসেছি তােদের বাড়ী,
মাতা তব জননী সমান।
কত স্নেহ দয়া করে, পালন করিছে মােরে,
তবু কি শীতল হয় প্রাণ,
কি করি কোথায় যাব, কোথায় সুরেণে পাব,
হেরিব সে মুখ শশধর ।
মধুমাখা কথা শুনে, শীতল করিব প্রাণে,
প্রফুল্লিত হইবে অন্তর ।
অভাগিনী ভাগ্য গুণে, যদি নাথ ত্যজি প্রাণে,
স্বর্গধামে করেন বসতি।
রাখিব প্রাণ আর, অনুগামী হব তার,
* স্থির সখি করিয়াছি মতি।
হারায়ে সুরেশ ধনে, কিছু সাধ নাহি মনে,
জ্বলে প্রাণ ভীষণ জ্বলনে।
কেমনে মরণ হবে, কিসে এই প্রাণ যাবে,
এই চিন্তা শয়নে স্বপনে।
কালকূট।
দামিনী বচন শুনি, : চারুশীলা হয়ে মৌনী,
নীরবেতে করিল রােদন।
বলে সখি কি বলিব, কি দিয়া প্রবােধ দিব,
কেবা দুঃখী তোমার মতন।
১৭
নারীর স্বৰ্বস্ব ধন, স্বামী অতি প্রিয়জন,
সে ধনেতে বঞ্চিত হইলে ।
হায় রে দারুণ বিধি, কি লয়ে ধরিবে হৃদি,
শান্তি সুধু শমন লইলে ॥
১৮
রবি অস্ত বেলা নাই, চল বন্ ঘরে যাই,
হেথা কাঁদি কিফল হইবে ।
যা আছে বিধির মনে, অবশ্য ঘটিবে দিনে,
জ্বালা মাত্র অবল। সহিবে ।
১৯
বিষম কৌলীন্য ছলে, বঙ্গদেশ গেল জ্বলে,
কে ঘুচাবে নারীর যাতনা ।
দয়াময় কৃপা করি, রক্ষ কুলীনের নারী,
সহ আর না হয় বেদনা।
কালকূট ।
দামিনী বচন ধর, স্মর সেই মুর-হর,
হৃদে পাবে হৃদয়ের ধন।
সব জ্বালা ফুরাইবে, সুরেণ-রমণী হবে,
কবি কয় এই ত সাধন।
( ইতি সান্ত্বনা নামক অষ্টম সর্গ।)
নবম সর্গ ।
শ্রীক্ষেত্র যাত্রা।
৪
সুখের ফাল্গুন মাস বসন্ত সময়।
মলয় মারুত মরি মন্দে মন্দে বয়।
মধুকর মত্ত সদা মকরন্দ পানে।
শরীর প্রফুল্ল হয় কোকিলের গানে
সহকার মুকুলের মধুর সৌরভে।
মাতিয়া উঠিল দিক অলিকার লােভে ॥
তরু পরে শাখে শাখে বিহঙ্গের আনা।
কোথায় কে গায় গীত নাহি যায় জানা
বিরহিণীগণ যত ব্যাকুল হৃদয়।
উন্মাদিনী প্রায় সদা নাথে মনে হয় ।
কালকূট ।
শ্রীখণ্ড গ্রামের শোভা কে করে বর্ণন।
পল্লিটী শােভিছে যেন নন্দন কানন ॥
নবজাত বৎস সহ গাভী যায় মাঠে।
পরম সুখেতে পল্লিবামী কাল কাটে
‘যুবক-যুবতী” অতি হৰ্যকুল মনে।
হাসিছে খেলিছে কত লয়ে প্রাণ-ধনে ॥
দামিনীর দুঃখ বল কে করে বর্ণন।
শরীর দহিছে তার মলয় পবন ,
কোকিলের কুহুম্বরে হৃদে বাজে শর।
উন্মাদিনী প্রায় বালা হইল কাতর ।
শয়নে ভােজনে মনে কিছু সুখ নাই।
সুরেণ সুরেণ বলি কাঁদেন সদাই।
কোথা গেলে প্রাণনাথ ত্যজি অভাগীরে ।
আর কিসে হারানিধি পাইব না ফিরে ।।
আর কি ধরিয়া করে প্রবােধ বচনে।
তুষিবে না অভাগীরে অতীব বচনে।
আর কি আদর করি নিকটে বসিয়া।
তােমারি সুরেণ আমি কবে না হাঁসিয়া।
আর ত সহে না জ্বালা বুক ফেটে যায়।
ত্যজিব এ পাপ প্রাণ কে রােধে আমায় ।।
এ প্রকারে দহে বালা দিবস যামিনী।
কোন সুখ নাহি মনে যেন পাগলিনী।
কালকূট।
অকস্মাৎ দেখ এক দৈবের ঘটন।
ঐক্ষেত্রের পাণ্ডা আসি দিল দরশন।
দোলায় দোল গােবিন্দ করিতে দর্শন।
শ্রীখণ্ড হইতে যাত্রী করিল গমন।
দামিনী তাদের সনে মিলিত হইয়া।
শ্রীক্ষেত্র করিল যাত্ৰা শ্ৰদুর্গা স্মরিয়া ।
চারুশীলা মাতা পদে নমস্কার করি।
চারুরে চুম্বিয়া ধনি স্মরিল। শ্রীহরি ।
( ইতি শ্রীক্ষেত্র যাত্রা নামক নবম সর্গ।)
দশম সর্গ
কৌলীন্য প্রথার শ্রদ্ধ
মেদিনী পূরের পথে, এক প্রান্থ নিবাসেতে
বহু যাত্রী মিলিত তথায়।
কেহ রাধে কেহ খায়, কেহ শুয়ে নিদ্রা যায়,
কেহ ময় আপন চিন্তায় ॥
কালকুট।
দিবা অবসান প্রায়, দিবাকর অস্ত যায়,
শশধর শােভিছে গগণে।
মন্দ মন্দ গন্ধ বই, বহিতেছে অহঃ রহঃ,
শঙ্খরােল উঠছে সঘনে ।
করেতে কপােল রাখি, দামিনী মলিন মুখি,
অশ্রুবিন্দু ঝরিছে নয়নে।
ঘন ঘন বহে শ্বাস, আলুলিত কেশ পাশ,
ভাবিছেন আপনার মনে ॥
৪
শূন্য মনে ধরা সনে,
বলি বালা এক মনে,
ভাবিছেন সুরেণ কোথায়।
হেনকালে অকস্মাৎ, চকিত হরিণ মত,
উঠি বালা চারি দিকে চায় ॥
পান্থশালা এক ধারে, একটি পর্ণকুটীরে,
তীরবেগে দামিনী ছুটিল ।
হায় হায় হরি হরি, কি অদ্ভুত মরি মরি,
হরিষে বিষাদ ঘটিল ।
কালকূট।
গৈরিক বসন ধারি,
যুবা এক বনচারি,
মৃত্যু মুখে পতিত শয্যায়।
শ্বাস বহে নাভি হতে, জীব সূর্য অস্ত যেতে,
বাকি নাই মরি মরি হায়।
নাহি মুখে অন্য বাণী, কোথা আছরে দামিনী,
আমি দেখ সুরেশের দশা।
তাের লাগি এ জীবন, করিলাম বিসর্জন,
ফুরাইল সব ভালবাসা।
শােকে দুঃখে জনহারা, দামিনী পাগল পারা,
পড়িলেন স্বামী পদতলে ।
বলে নাথ দাসী এথা, ঘুচাও মনের ব্যথা,
মাথাটী লইলা কোলে তুলে ।
বিষাদে হরিষ হয়ে, আঁখী দুটি নিমীলিয়ে,
প্রিয়া মুখ সুরেণ হেরিল।
নয়নে বহিল জল, হৃদি হইল বিকল,
জীব-দীপ অমনি নিভিল
কালকুট।
নাথ মুখে মুখ দিয়া, কত রূপ বিনাইয়া,
কত বার দামিনী ডাকিল।
কে দিবে উত্তর হায়, সুরেণ নাহি ধরায়,
অবশেষে অভাগী বুঝিল ।
স্বামী বুকে বুক
দিয়া, বাম পাশেতে পড়িয়া,
দামিনী রহিল। কিছুক্ষণ।
হায় হায় ওরে বিধি, এই কি তােমার বিধি,
স্বর্ণলতা হইল নিধন |
সুখেতে মরিল বালা, যুড়াল সকল জ্বালা,
স্বর্গ-ধামে যায় জায়া পতি।
সমাজের ত্যাচারে, দামিনী সুরেণ মরে,
এই ছবি কৌলীণ্যের গতি ॥
হা বঙ্গ অতলে যাও, আর কেনরে পােড়াও,
বিপ্ৰকুলে কৌলীণ্য বিষেতে ।
ওহে বঙ্গ নারী নর, স্বদেশ উদ্ধার কর,
দেখ দেশ ডুবিল পাপেতে ॥
কালকূট।
১৪
মরি হৃদি ফেটে যায়, হায়রে বলিব কায়,
এইরূপে কত শত মরে।
তথাপি কুহকে মজি, কেনরে কুলীন সাজি,
(কালকুট) খাও নিজ করে ।
( ইতি কৌলীন্য প্রথার শ্রদ্ধ।)
সমাপ্ত
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.