Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Kalpana-kallol
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কল্পনা-কল্লোল উপন্যাস “কল্পনা-কল্লোল”সম্পাদকের অন্যান্য গ্রন্থাবলী সচিত্র উপন্যাসাবলী সচিত্র নাটকাবলী मामाणिक রাজসং, সুল, $ : ২ কাকী- Gে রী:দান •, ১১ পিসী-মা আৰ্য-কাহিনী , । বিষ-বিবাহ সতী কি কলঙ্কিনী ।/• পৌখিক উর্বশী-উদ্ধার ববাহন মৈথিলী ( রাবণ-কন্যা সীতা)। আকবরের স্বপ্ন ( প্রকাশিত) কোহিনুর থিয়েটারে অভিনীত) /. অঞ্জলি ০ জীবন-চিত্র কনে-মা) (যন্ত্র ) সকল পুস্তকের ছাপা, কাগজ, চিত্রাবলী অত্যুৎকৃষ্ট, কি রচনানৈপুণ্যে, কি চরিত্রচিত্রে, কি ভাবমাধুর্যে বন্ধু বাবুর পুস্তকাবলী সম্পূর্ণ নূতন ও ধর্মভাবে পূর্ণ। তাহার উপন্যাসাবলী হিন্দী ভাষায় অনুবাদিত হইয়াছে। গ্রন্থকার-২২ নং ফকিরা চক্রবর্তীর লেন, অথব আমার নিকটে প্রাপ্তব্য এগুরুদাস চট্টোপাধ্যায় ২১নং ওয়ালিস &ট, কলিকাতা।
কল্পনা-কল্লোল
উপন্যাস
কলির কন্দর্প
সুখের বাসর
শ্রীবন্ধুবিহারী ধর-সম্পাদিত
CALCUTTA
The Bengal Medical Library
201, CORNWALLIS STRBET.
1914
All rights reserved.)
[ মূল্য।• আনা।
Calcutta
PUBLISHED BY BUNKU BEHARY DHUR
FROM THE "BOSUDHA AGENCY”
22, Fakir Chand Chackraburtty's Lane.
Printed by Abdul Goffur
"AT THE NEW BRITANNIA PRESS."
78, Amherst Street.
ILLUSTRATED BY SRIJUT PRIO GOPAL DASS.
1914,
No text on this page.
অমৃতময়ীর কলির কন্দর্প পূজা কল্পনা-কল্লোল কলির কন্দর্প ( বিচিত্র গুপ্তকথা ) প্রথম রঙ্গ এ কে ? প্রতাপাদী হুজুগের ৭। ৮ বৎসর পূর্বে কাটোয়ার গঙ্গাতীরে একজন সন্ন্যাসী থাকিত। তাহার বয়ঃক্রম কত, লােকে তাহা অনুমান করিতে পারিত না। মাথায় জটা ছিল না, স্ত্রীলােকের মত দীর্ঘ কেশ পৃষ্ঠদেশে বিলম্বিত ; ওষ্ঠে অল্প অল্প গোঁপের রেখা, চিবুক লােমাবলী শূন্য। সন্ন্যাসীর বর্ণ কিরূপ, তাহা জানা যাইত না ; সর্বক্ষণ হরিদ্রাবর্ণ ভস্মে দেহ আবৃত থাকিত। চেহারা সুন্দর ;-হস্তপদ সুডৌল, বক্ষদেশ পূরন্ত, কটিদেশ কৃশ, চক্ষু বড় বড়, নাসিকা সরল, ললাট প্রশস্ত ; ললাটে ভস্মলেপের উপরিভাগে রক্তবর্ণ দীর্ঘ ফোঁটা, দুটী নয়নের কোলে কোলেও ধনুকাকার রক্তবর্ণ রেখা। কণ্ঠে রুদ্রাক্ষ ছিল না, অন্য কোন প্রকার মাল্যও ছিল , ভক্তেরা এক এক দিন পুষ্পমাল্য উপহার দিত, তাহাতেই দিব্য শোভা হইত। দেহ সৰ্ব্বা ভস্মাবৃত থাকিলেও, শরীরের লাবণ্য দর্শনে Fরা স্থির করিয়াছিল, নবীন সন্ন্যাসী, বয়সে ২৪। ২৫ বৎসরের অধিক ২ কল্পনা-কল্লোল। বলিয়া বােধ হইত না। কেহ কেহ বলিত, অনেক বেশী; যােগবলে মুবা দেখায়। সন্ন্যাসীরা সচরাচর সম্মুখে ধুনী জ্বালাইয়া, অর্ধ নিমীলিত নেত্রে বসিয়া বসিয়া গাঁজা খায় ; এ সন্ন্যাসী গাঁজা খাইত না, কিন্তু অষ্টপ্রহর ধুনী জ্বলিত। আংটা, চিমটা, শৃঙ্খল, কমণ্ডলু এই সকল আসবাব সঙ্গে ছিল, বহার কেহ দেখিতে পাইত না। দিনমানে সন্ন্যাসীর স্নান ছিল না, আহার ছিল না, শয়ন ছিল না, স্থান ত্যাগ করিয়া অন্যত্রে উঠিয়া যাওয়াও ছিল না, যােগাসনে বসিয়া, অঞ্জলিবদ্ধ করদ্বয় বক্ষস্থলে রাথিয়া, সন্ন্যাসী ধ্যান করিতেছে, ইহাই সকলে দেখিত। সন্ন্যাসীর পরিধান কখনো গৈরিক বসন, কখনাে মৃগচর্ম, কখনন ও বস্ত্র। এখনকার সাধুসন্ন্যাসীতে যাহাদের বিশ্বাস নাই, সেই সন্ন্যাসীর ভাব দেখিয়া, তাহারা পরস্পর বলাবলি করিত, এ কে ? দিবাভাগে সন্ন্যাসীর আশ্রয়স্থান কোথায় ছিল ? একটী প্রাচীন পাকুড় বৃক্ষ; সেই বৃক্ষের তলদেশে একখানি চতুষ্কোণ ব্যাঘ্রচর্ম, তাহার উপরেই সন্ন্যাসীর অধিষ্ঠান। নয়নদ্বয় এক এক সময়ে নিমীলিত, এক এক সময়ে উন্মীলিত, "এক এক সময়ে অর্ধ নিমীলিত ; যেন ঠিক মহাদেবের ত্রিনয়নের ন্যায় ঢুলু ঢুলু। রাত্রিকালে সন্ন্যাসীর বাসস্থান কোথায় ছিল? বৃক্ষতলেই কি নিশা যাপন হইত ?-না,-সেই পাকুড় বৃক্ষের প্রায় শতহস্ত দূরে মেলাস্থলের মৃন্ময় পুত্তলিকাগণের অবস্থান যােগ্য দীর্ঘ দীর্ঘ ঢালা ঘরের আকারে একখানা চাল ছিল, ভিতরে ভিতরে বেড়া দেওয়া খুব,রী খুব রী ঘর ; সেই সকল ঘরের একটা ঘরে সন্ন্যাসী গিয়া বসিত। রাত্রি এক প্রহরের পর সন্ন্যাসীর গঙ্গাস্নান হইত, তাহার পর এক প্রহরান্তে দুই সের আড়াই সের দুগ্ধ পান। সন্ন্যাসীর দুইজন চেলা হিল ; স্নানের সময় এবং দুখপানের সময় সেই চেলারা ভিন্ন আর কেহ নিকটে থাকিত না।
কলির কল। এমবাসী ২। ১ জন ডাংপিটে ছােরা রহ জানিবার ও নিকটবর্তী বৃক্ষে আরােহণপূৰ্ব্বক অনেক রাত্রি পর্যন্ত লুকাইয়া থাকিত, জ্যোৎস্না রজনীতে সন্ন্যাসীর স্নানের সময় তাহারা দেখিয়াছিল, কার্তিকের মত রূপ, দিব্য গৌরবর্ণ, যেন একটী রাজপুত্র। ঐরূপ দেখিয়া লােকের কাছে তাহারা বলিত, এ তো সন্ন্যাসী নয়, এ কে ? গ্রাম্যলােকের মুখে শুনা যাইত, ঐ সন্ন্যাসী প্রায় দুই ইভাবে এখানে আছে। নিত্য প্রাতঃকালে যাহারা গঙ্গাস্নান করিতে যাইতেন, আনান্তে সকলেই তাহারা সন্ন্যাসীকে দর্শন করিতেন, প্রণাম করিতেন, মিষ্টান্ন ভােগ দিতেন ; ভােগের বস্তু সন্ন্যাসী গ্রহণ করিতেন, কিন্তু দাতারা চলিয়া যাইবার পর সেই বস্তু গুলি তিনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালক বালিকা- গণকে বিতরণ করিয়া মনের আনন্দে হাস্য করিতেন। কেহ তাহাকে নগদ পয়সা প্রণামী দিতে আসলে তিনি তাহা গ্রহণ করিতেন না। যাহারা তাহার প্রতি ভক্তি দেখাইতেন, তাহাদের মধ্যে স্ত্রীলােক অধিক, ইহা জানিয়া রাখা আবশ্যক। আরো প্রকাশ পাইয়াছিল, দুই বৎসরের মধ্যে সন্ন্যাসী একদিনও কাহারো সহিত একটাও কথা কহেন নাই। ঠারেঠোরে ইসারায় যাহারা তাহার মনের ভাব বুঝিতে পারিতেন, তাহারাই তাহার ইচ্ছাপূরণ করিতে যত্নবান্ হইতেন। রাত্রিকালে চেলাদের সহিত কথা হইত কিনা, চেলারাই তাহা জানিত ; তাহারাও কাহারাে কাছে কিছু বলিত না। সন্ন্যাসীর আর একটী আশ্চৰ্য্য কাৰ্য্যের কিম্বদন্তী আছে। দিবাভাগে তিনি বৃক্ষতলে থাকিতেন, নিশাকালে কুটির বাস করিতেন ; দুই এক মাস অন্তর কোথায় অদৃশ্য হইয়া যাইতেন, কেহই জানিত না ; এক সপ্তাহ পরে, কখনো বা দুই সপ্তাহ পরে ফিরিয়া আসিয়া সন্ন্যাসী আবার পূৰ্ব্ববৎ যােগাসনে বসিতেন। লোকে জানিত, .. সন্ন্যাসী নিঃসম্বল, বাস্তবিক তাহাই সাধারণ সিদ্ধান্ত'; কিন্তু এই সন্ন্যাসী প্রতি মাসের ।
কল্পনা-কল্লোল। পূর্ণিমা তিথিতে প্রচুর খাদ্য সামগ্রী আয়ােজন করিয়া গ্রামের ব্রাহ্মণ - গণকে সধবাগণকে এবং কুমারীগণকে পরিতােষরূপে ভােজন করাই- তেন। সন্ন্যাসীর দান গ্রহণ করিতে নাই, সন্ন্যাসী ঐরূপে মাসে মাসে ডােজ্য দান করিতেন। অস্বীকার করিলে সন্ন্যাসী পাছে কোপাবিষ্ট হন, সেই ভয়ে কেহই তাহার নিমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করিতে পারিতেন না ; অথচ রূপ কিছু কিছু অর্থ দান করিবার ইচ্ছা করিলে সন্ন্যাসী তাহা গ্রহণ করিতেন না। আর একটা নিগূঢ় রহস্য। মাসের মধ্যে দু’এক দিন মালকোছা করা কাপড় পরা এক একজন লােক সেই পাকুড় বৃক্ষতলে আসিয়া সন্ন্যাসীর সম্মুখে দাড়াইত, অচঞ্চল দৃষ্টিতে সন্ন্যাসীর মূর্তি নিরীক্ষণ করিয়া চলিয়া যাইত, একটীও কথা কহিত না। সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে যিনি সেইরূপ আগন্তুক লােকের পায়ের জুতার দিকে চাহিয়া দেখিতেন, তিনি বুঝিয়া লইতেন, পুলিশের লােক। জুতা ভিন্ন অন্য কোন লক্ষণে পুলিশের লােক বলিয়া চেনা যাইত না। জুতা দেখিয়া যিনি চিনিতেন, তিনি মনে মনে ভাবিতেন, এ কে ?
দ্বিতীয় রঙ্গ তােমরা কি চাও ? সন্ন্যাসী কাহায়ে। সহিত কথা কহিতেন না, একথা পূর্বে বলা হই। আছে। গঙ্গাস্নানের সময় যে সকল স্ত্রীলােক তাহাকে দর্শন করিতে আসিতেন, তাহাদের মধ্যে যেগুলি দিব্য সুন্দরী, যেগুলি পূর্ণ যুবতী, যেগুলির অঙ্গে দিব্য দিব্য বস্ত্রালঙ্কার, আড়ে আড়ে তিনি তাহাদের মুখের দিকে বক্র নয়নে কটাক্ষপাত করিতেন ; দুই তিনটা সুন্দরীর উপরেই তাঁহার কিছু অধিক লক্ষ্য। সুন্দরীরা সন্ন্যাসীর অনুগ্রহ মনে করিয়া কৃতার্থ কইতেন, শুভদৃষ্টি লাভে তাহাদের ভাগ্যে শুভফল ফলিবে, ইহাই স্থির করিয়া, তাহারা আরো অধিক ভক্তিভাবে গলবস্ত্র হইয়া সন্ন্যাসীর চরণে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিতেন। এটী হইল এক বৎসর পরের কথা। সন্ন্যাসী দুই বৎসর আছেন, প্রথম বৎসরে তাহার ঐরূপ দৃষ্টিচাঞ্চল্য ছিল , দ্বিতীয় বৎসরের প্রারম্ভেই সর্বপ্রথম ঐরূপ সূচনা। এইভাবে কিছুদিন গত হইলে পর, একদিন একটা সুন্দরী সৰ্বশেষে গঙ্গাস্নান করিয়া, সন্ন্যাসীকে প্রণাম করিয়া, একাকিনী গৃহে যাইতেছিলেন, সন্ন্যাসীর নিশাবাসের সন্নিকটে এক জন চেলাকে তিনি দেখিতে পান ; নির্জন স্থান, কথা কহিবার দিব্য সুযােগ, তথাপি সেই কামিনী একটু সন্ত্রস্তনেত্রে এদিক ওদিক চাহিয়া, আরো একটু নির্জনে সন্ন্যাসীর সেই চেলাটাকে ডাকিয়া লইয়া কি গুটিকতক কথা বলিলেন ; চেলা কিঞ্চিৎ ইতস্ততঃ করিয়া উত্তর করিল, “আজ আপনি সে তত্ত্ব জানিতে পারিবেন না, কল্য আপনাকে বলিব।
কল্পনা-কল্লোল। কামিনী বলিলেন, “কল্য আমি তােমাকে কোথায় দেখিতে পাইব?” চেলা উত্তর করিল, “আপনি কখন আসিবেন, তাহা যদি আমি জানিতে পারি, তবে ঠিক এইখানেই আমাকে দেখিতে পাইবেন।” আশাকে বুকে রাখিয়া কামিনী সেদিন হৃষ্টান্তঃকরণে গৃহে গমন করিলেন। কোন প্রকার আতঙ্কে লােকের যেমন হৃৎকম্প হয়, আকস্মিক সেইরূপ হইয়া থাকে ; আনন্দে আনন্দে কামিনীয় কোমল হৃদয় ঘন ঘন স্পন্দিত হইতে লাগিল ; গৃহকর্মে মন গেল না, কাহারো কথায় কাণ গেল না, অভ্যাসমত প্রতিবেশিনীদের সহিত গল্প করাও ভাল লাগিল না, মন সর্বক্ষণ চঞ্চল ;-দুর্ভাবনায় চঞ্চল নহে, আশার আশ্বাসে সুখের অভিলাষে চঞ্চল। সূৰ্য্যদেব কাহারো অপেক্ষায় একস্থানে দাঁড়াইয়া থাকেন না, কে হাসিতেছে, কে কঁদিতেছে, কে কি ভাবিতেছে, কে কোথায় কাহার জন্য হাঁ করিয়া পথ চাহিয়া আছে, তাহাও দেখিবার জন্য অপেক্ষা করেন না, নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে প্রস্থান করেন। দেখিতে দেখিতে দিনমণি অস্তাচলচূড়াবলম্বী হইলেন আকাশে নক্ষত্রপুঞ্জ উদয় হইল, অন্ধকার গাঢ় হইয়া আসিল, আশাবতী যুবতী শীঘ্র শীঘ্র গৃহকাৰ্য্য সমাপন করিয়া শীঘ্র শীঘ্র শয়ন করিলেন। কিসের জন্য শয়ন ?-নিদ্রাসুখ সম্ভোগের জন্য ?-না,-নিদ্রাদেবীর 'আরাধনার জন্য নহে, আশা-কুহকিনীর ছলনায় চিন্তাদেবীর উপাসনা করিবার জন্য। কিসের চিন্তা ?-কতক্ষণে রজনী প্রভাত হইবে, কতক্ষণে যােগীবরের অনুচরের সহিত সাক্ষাৎ হইবে, যােগীবরের সেই অনুচর কি কথা বলিবে, মনের অভিলাষ কি প্রকারে সুসিদ্ধ হইবে, শয্যায় শয়ন করিয়া অনুক্ষণ কেবল তাহাই চিন্তা। চিন্তায় চিন্তায় যামিনীর অবসান ; চিন্তাশীলা একটা বারও চক্ষের পাতা বুজিতে পারিলেন না। এই স্থানে সেই কুল কামিনীর কিঞ্চিৎ পরিচয় দান করা আবশ্যক বােধ হইল। কামিনীটী পিত্রালয়ে বাস করেন, পিতা ধনবান্ ছিলেন, কলির কপ। সংসারে সুখের অভাব ছিল না। পরিবারের মধ্যে বিবাদ ফলহ ছিল না, নিত্য নব নব সুখ, নব নব আনন্দ। মাতাপিতা উভয়েই ইইসংসার ত্যাগ করিয়া গিয়াছেন, সহােদর নাই, কেবল ঘােট ঘােট দুটী ভগ্নী। বাড়ীতে অপর পরিবার যাহারা আছেন, তাহারা এই কামিনীটীর প্রিয় কার্য সাধনে নিরন্তর যত্ন করেন। কামিনীর নাম অমৃতময়ী। কুলিন ব্রাহ্মণের কন্যা, নবম বর্ষ বয়ক্রমে বিবাহ হইয়াছে, স্বামী দু: সলিনপুত্র বলিয়া তাহার শ্বশুর তাহাকে নিজ বাড়ীতেই স্থান দিয়াছিলেন ; তদবধি সেই • জামাইটী ঘরজামাই। অমৃতময়ীর বয়ঃক্রম অষ্টাদশ বর্ষ ; স্বামী ঘরজামাই, বিবাহের পর হইতেই শ্বশুর বাড়ীতে আছেন, কাজ কৰ্ম্ম কিছুই করেন না, কাজ কৰ্ম্ম করিবার যােগ্য লেখাপড়াও শিক্ষা হয় নাই, সুতরাং তাশ-পাশা খেলিয়াই দিন কাটান ; অমৃতময়ী কিন্তু তাহাকে কিছু মাত্র অযত্ন করেন না; তাহার পতিভক্তি বিলক্ষণ। অমৃতময়ী সকল সুখের অধিকারিণী, পতিটা মূখ, নিষ্কৰ্ম্ম। কেবল এই মাত্র দুঃখ। আর একটা প্রবল দুঃখ-অমৃতময়ীর সন্তান হয় নাই। সন্তানকামনায় তিনি বহু দেবদেবীর পূজা করেন, পুত্রলাভের ব্রত করেন, মানসিক করিয়া পীঠ স্থানে পূজা মানেন, মহাপুরুষ দেখিলে ভক্তি পূর্বক সেবা করেন, ইহাই তাহার নিত্যকর্ম। বাড়ীর নিকটস্থ গঙ্গাতীরে মহাপুরুষ রহিয়াছেন, তিনি যদি কৃপা করিয়া অভিষ্ট সিদ্ধ করিয়া দেন, সেই বাসনায় অমৃতময়ী সেই সন্ন্যাসীর চেলার সহিত দেখা করিয়া আসিয়াছেন, রজনী প্রভাত হইলেই বাসনার ফলাফল জানিতে পারিবেন, সেই আশাতেই সমস্ত রজনী জাগরণ করিলেন, সেই চিন্তাতেই নিদ্রা হইল না। রজনী প্রভাত হইল। শয্যা হইতে গাত্রোখান করিয়া অমৃতময়ী গঙ্গাস্নানে যাইবার আয়ােজন করিলেন। মনে আবার কি ভাবের উদয় হইল, শয়ন কক্ষের গবাক্ষে বসিয়া সূৰ্য্যপানে চাহিয়া রহিলেন। নিত্য নিত্য প্রাতঃস্নান করা তাঁহার অভ্যাস; সে দিন তবে সে অভ্যাসের করুনা-কল্লোল। অন্যথা হইল কেন? অমৃতময়ী ভাবিলেন, পাঁচ জনের সহিত মান করিতে গেলে, পাঁচ জনের সহিত ফিরিয়া আসিতে হইবে, চেলার সঙ্গে দেখা করিবার সুযােগ ঘটিবে না; বিশেষতঃ যে সময়ে দেখা হইবার কথা, ঠিক সেই সময়ে দেখা করা চাই ; প্রাতঃস্নান করিলে সে কথা রক্ষা হইবে না। গতকল্য যেমন সৰ্বশেষে গিয়াছিলেন, আজিও একটু বেলা করিয়া সেইরূপে শেষে একাকিনী যাইবেন, সেই সঙ্কল্পই স্থির। বেলা এক প্রহর। এক প্রহর। অমৃতময়ী গঙ্গাস্নানে চলিলেন, সঙ্গে কেহই রহিল না ;একাকিনী। পূৰ্ব দিবসের ন্যায় বুক ধড়ফড় করিতে লাগিল, বুকের ভিতর বেগবতী আশা। গঙ্গাস্নান করিয়া, সন্ন্যাসীকে প্রণাম করিয়া, আশাবতী ধীরে ধীরে পূৰ্ব্বকথিত নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হইলেন। সন্ন্যাসীর সেই চেলাটীর নাম শ্যামলাল। পূৰ্ব্বদিবসের অঙ্গীকার স্মরণ করিয়া শ্যামলাল ঠিক সেই স্থানে দাঁড়াইয়াছিল। সমীপবর্তিনী হইয়া অমৃতময়ী সংশয়-কম্পিত কণ্ঠে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমার প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারিবে কি?” শ্যামলাল বলিল, “পারিব।” দুই জনেরই চুপি চুপি কথা, ইহা আর বলিয়া দিবার আবশ্যক নাই। অমৃতময়ী আরো চুপি চুপি একটা কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। শ্যামল বলিল, “ইনি কোন প্রকার রােগের ঔষধ দেন না; বােগ ভাল করিতে পারি বলিয়া, লােকের কাছে আত্মশ্লাঘাও করেন না। যে সকল সন্ন্যাসী পথে পথে ভিক্ষা করিয়া বেড়ায়, লােক ঠকাইয়া পয়সা উপার্জনের আশা কয়ে, তাহারাই ঝুলির ভিতর হইভে একটা শিকড় কিম্বা পাঁচ রকম গুড়া বাহির করিয়া দেয় ; তাহাতে লােকের কোন উপকার হয় না, সন্ন্যাসীদের তবে হ, এক এক জন মহাপুরুষ আছেন, তাহারা ঔষধ দেন না, রোগীর গায়ে হাত বুলাইয়া বােগ আরাম করেন; কখনো বা কলি কৰ্প'। শান্তনয়নে রােগীর নয়ন নিরীক্ষণ করিয়া, রোগীকে উঠিয়া বসিতে বলেন, রােগী তৎক্ষণাৎ নিরাময় হইয়া স্বাভাবিক ভাব ধারণ করে। মহাপুরুষ আছেন, কিন্তু সচরাচর তাহাদিগকে লােকালয়ে দেখিতে পাওয়া যায় না।” একটু যেন অধিরা হইয়া অমৃতময়ী বলিলেন, “তুমি বাছা অনেক কথা বলিলে, অত কথা শুনিতে আমি আসি নাই। মহাপুরুদে টগবলে বহুলােকের উপকার করেন, ভাল ভাল লােকের মুখে এই রকম কথা আমি শুনি; যিনি আমাদের গঙ্গাতীরে রহিয়াছেন, তিনি সেইরূপে আমার কোন উপকার করবেন কি না, তাহাই আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি।” শ্যামলাল বলিল, “উপকারের প্রকার কিরূপ, তাহা না শুনিলে আমি কি উত্তর দিব ?” অমৃতময়ী বলিলেন, “নারীলােকের সৌভাগ্য দুর্ভগ্য তিনি' বলিয়া দিতে পারেন, এমন যদি জানিতে পারি, তবে আমি তাহার চরণে শরণাপন্ন হই। বিধিলিপি কি, তাহা আমি জানিনা, কিন্তু আমার পুত্র সন্তান জন্মে নাই ; এটা আমি দুর্ভাগ্য মনে করি।” শ্যামলাল জিজ্ঞাসা করিল, “কন্যাসন্তান জন্মিয়াছে ?” অমৃতময়ী বলিলেন, “কিছুই না।” ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া শ্যামলাল বলিল, আমাদের প্রভু কৃপা করিয়া কোন কোন গৃহস্থকন্যার ভাগ্যের শুভাশুভ অবধারণ করিয়াছেন, তাঁহার কৃপায় দু’পাচটী অভাগ্যবতীর সৌভাগ্যের উদয় হইয়াছে, তাহা আমি জানি।” অমৃতময়ী বলিলেন, “একটী পুত্ররত্ন কোলে পাইলেই আমি চরিতা হই; বড়ই সৌভাগ্য মনে করি। প্রভু যদি আদেশ করেন, তবে আমি তাহার চরণ সমীপে উপস্থিত হইতে পারি। কোন সময় কোথায় দর্শন করিব, তাহাই তুমি আমাকে বলিয়া দাও।”
কল্পনা-কল্লোল। উৎকট দৃষ্টিতে চাহিয়া শ্যামলাল বলিয়া উঠিল, “বলিয়া দিয়, আমি কে? আপনি আমাকে কেমন কথা বলেন? আপনি আসিয়াছেন, যাহা বলিতেছেন, প্রভুকে আমি জানাইব ; তিনি যেরূপ আদেশ করেন, তাহাই অপনাকে বলিব। আপনি আর একদিন আসিবেন, প্রভুর যেরূপ অভি, প্রায়, তাহা জানিয়া লইয়া আপনাকে আমি যথাকৰ্তব্য বিজ্ঞাপন করিব।” | বলিল, তাহা যুক্তিযুক্ত কথা, ইহা বুঝিতে পারিয়া অমৃতময়ী বলিলেন, “সেই কথাই ভাল। আর একদিন কেন, কল্যই আমি আসিব। অবসর ক্রমে আজ তুমি প্রভুকে জিজ্ঞাসা করিয়া, অভিপ্রায় ‘জানিয়া রাখিও, কল্য আমি শুনিব; যদি আমার পক্ষে অনুকুল হয়, আদেশ মত কাৰ্য্য করিব।” শ্যামলাল বলিল, “তবে তাহাই হউক। আজ আপনি যে সময়ে আসিয়াছেন, কল্য ঠিক এই সময়ে আসিবেন, এই খানেই আমি থাকিব।” মন্থর গতিতে অমৃতময়ী গৃহের দিকে চলিলেন ; দু’পাঁচ পা গমন করিয়াই আবার ফিরিলেন। সন্ন্যাসীর চেলাই হউক, অথবা অন্য লােকের ভৃত্যই হউক, কাৰ্য বিশেষে সকলেই কিছু কিছু অর্থ প্রত্যাশা করে, অমৃতময়ী তাহা জানিতেন; স্নান করিতে আসিবার সময় তিনি পাঁচটী টাকা অঞ্চলে বাধিয়া আনিয়াছিলেন; ফিরিয়া আসিয়া শ্যামলালের হস্তে তাহাই অৰ্পণ করিলেন। যথেষ্ট সন্তুষ্ট হইয়া শ্যামলাল নত মস্তকে মৃদু মৃদু হাসিল। তখন আর কোন নূতন কথা হইল না, অমৃতময়ী গৃহে চলিলেন। অমৃতময়ী পরমাসুন্দরী; গঙ্গাস্নান করিয়া তিনি সিক্তবস্ত্রে শ্যামলালের সহিত দেখা করেন নাই, গঙ্গার ঘাটে বস্ত্র পরিবর্তন করিয়া একখানি ময়ুরকটি চেলী পরিধান করিয়াছিলেন, গাত্রে অধিক অলঙ্কার ছিল না, দুই হন্তে দুইগাছি স্বর্ণ-কঙ্কণ, কণ্ঠে স্বর্ণহার, কর্ণে দুটী নীলমণি দুল, নাসাগ্রে মুক্তার নােক, এই মাত্র অভয়ণ ; তাহাতে সুন্দরী সুন্দর ;
কলির কন্দর্প । ১১ রূপখানি আরও অধিক উজ্জল হইয়া ফুটিয়াছিল ; মুস্তক বস্ত্রাবলশ ছিল না ; এলোকেশী সুন্দরী। কথা কহিবার সমম সেই র মুখখানি এক একবার কুটিল নয়নে দর্শন করিয়াছিল ; মনে ক উদয় হইয়াছিল, কে জানে? সুন্দরী যখন তাহার হস্তে পথঃ ১;" *.ন করিয়া, তাহার দিকে পশ্চাৎ ফিরিয়া, গজেন্দ্র গমনে চলিয়া যান... :'লাল তখন সতৃষ্ট নয়নে সেই রূপের দিকে অনেক্ষণ চাহিয়াছিল ; #অহা হইলেন, শ্যামলাল একটী নিশ্বাস ফেলিয়া কুটির মধ্যে প্রবেশ করিল। স্ত্রী জাতির স্বভাব এই যে, কোন একটী নূতন ঘটনা হইলে িয় সঙ্গিণীগণের নিকটে অনেক শাখা পল্লব দিয়া সেই ঘটনার কথা ব্যক্ত করেন। বাচালতা না থাকিলেও অমৃতময়ী সে প্রকৃতি পরিহার করিতে পারিলেন না। সেই দিন বৈকালে দুটা প্রতিবেশিনী যুবতী তাহার সহিত দেখা করিতে আসিল। এক জনের নাম চারুলতা, দ্বিতীয়ার নাম লক্ষ্মীমণী, দুটীতেই অমৃতময়ীর প্রাণের সহচরী ; বাল্যাবধি পরস্পর সমান ভালবাসা। চারুলতাটী অমৃতময়ীর বেগুন ফুল, লক্ষ্মীমণীটা অমৃতময়ীর দেখাসি। গল্প করিতে করিতে অমৃতময়ী তাহাদের কাছে সন্ন্যাসীর বিদ্যার কথা তুলিলেন, চেলার সহিত দেখা করিয়া যাহা যাহা শুনিয়া আসিয়াছেন, তাহাও বলিলেন। বেগুনফুল আর দেখহাসি মনে মনে আপনাদের ভাগ্য স্মরণ করিল, কথাগুলি শুনিয়া তাদের আল দ হইল, কিন্তু মুখ ফুটিয়া কিছু বলিল না। আরও পাচ প্রকালে ২ পর তারা উভয়ে স্বস্ব গৃহে গমন করিল। সে রাত্রের নূতন কথা আর কিছুই নাই। পরদিন যথ। সময় গঙ্গাস্নানান্তে অমৃতময়ী পূৰ্ব্ববৎ সকলের অগোচরে শ্যামলালের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন, নূতন প্রশ্নের প্রয়োজন হইল না। প্রথমেই তালাল বলিল, “ঠিক হইয়াছে, আপনি আজ রাত্রে এই কুটীরে আসিয়া প্রভুর সহিত যে করিতে পারিবেন। প্রভুর অনুমতি হইয়াছে।. কি উদ্দেশে কল্পনা-কল্লোল। ০ আপনি দেখা করিতে চান, সে কথা আমি তাঁহাকে বলি নাই। আপনি আসিবেন ;-মনে রাখিবেন রাত্রি দেড় প্রহরের পূর্বে দেখা হইবে না।” অবনত বদনে কিয়ৎক্ষণ কি ভাবিয়া অমৃতময়ী জিজ্ঞাসা করিলেন, “তততে, একাকিনী আসিব, ভয় করিবে ; আর দু’একটা সঙ্গিনীকে সঙ্গে জানতে পারিব কি?” শ্যামলাল উত্তর করিল, “সে পক্ষে অনুমতি লওয়া হয় নাই, কিন্তু প্রভুর স্বভাব আমি জানি, স্ত্রীলােকের সঙ্গে স্ত্রীলােক থাকিলে তিনি দর্শন দিতে আপত্তি করেন না।” আবার কি একটু চিন্তা করিয়া, অমৃতময়ী পুনঃরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “সন্ন্যাসীঠাকুর মৌনব্রতী, তিনি কাহারে সহিত কথা কহেন না কিরূপে তবে আমি তাহার অনুজ্ঞা অবগত হইতে পারিব ? শ্রামলাল বলিল, “রাত্রিকালে তঁাহার মৌনব্রত থাকে না ; আমাদের সহিত কথা হয়। আপনি তাহাকে যাহা যাহা জিজ্ঞাসা করিবেন, নিশ্চয়ই সে সকল কথার উত্তর পাইবেন। অমৃতময়ীর সন্দেহ ঘুচিল; আর অধিকক্ষণ সেখানে বিলম্ব না করিয়া পুলকিত অন্তরে তিনি গৃহে চলিয়া আসিলেন। সেদিন বৈকালেও সেইদুটী সখী অমৃতময়ীর বাড়ীতে বেড়াইতে আসিল। অন্য কথা আরম্ভ করিবার পূর্বেই অমৃতময়ী বলিলেন, “আজ রাত্রে আমি সন্ন্যাসী দর্শনে যাইব। অনেক রাত্রে যাইতে হইবে; দেড় প্রহরের কম নয় ; ততরাত্রে একাকিনী কেমন করিয়া যাইব, তাহা ভাবিতেছি।” চারুলতা বলিল, “আমাকে সঙ্গে লইতে যদি তুমি ইচ্ছা কর, তাহা হইলে আমি তােমার প্রহরী হইয়া যাইতে পারি।” অমৃতময়ী বলিলেন, “তােমাদের বাড়ীর লােকেরা বারণ করিবে না ? ;
কলির কর্প। ১৩ • চারু বলিলেন, “বারণ করিবে কে? তুমি বলিতেছ, রাত্রি দেড় প্রহর ; তুতরাত্রি পর্যন্ত আমাদের বাড়ীর কেহই জাগিয়া থাকে না। কতদিন আমি লুকাইয়া লুকাইয়া লােকের বাড়ী যাত্রা শুনিতে গিয়াছি, কেহই কিছু জানিতে পারে নাই।” হাস্য করিয়া অমৃতময়ী বলিলেন, “তােমার খুব সাহস! আচ্ছা, তবে তুমি রাত্রি এক প্রহরের সময় আমার কাছে আসিও, এ-না জে যাইব। দেউড়ির দরােয়ানকে আমি বলিয়া রাখিব, সে আমার কথার খুব বাধ্য, সদর দরজা খােলা থাকিবে।” দেখনহাসির গায়ের কাছে ঘেসিয়া বসিয়া, সাগ্রহে মুখখানি উচু করিয়া লক্ষ্মীমণী বলিল, “আমিও যাইব। আমাদের বাড়ীর সকলেও সন্ধ্যাকালে ঘুমায়।” অমৃতময়ী বলিলেন, “তবে আর আমার ভয় কি? মনের মতন দুটা প্রহরী পাইলে আমি স্বচ্ছন্দে এক ক্রোশ পথ চলিয়া যাইতে পারি ; ভুত বেম্মদত্তিও আমার কাছে ঘেঁসিতে পারে না।” পরামর্শ স্থির হইয়া রহিল ; খানিকক্ষণ গল্প করিয়া সখী ভুটা উঠিয়া গেল। সখীরা ত গেল, পরামর্শ ত হইল, এখন অমৃতময়ীর নূতন চিন্তা আসিল। রাত্রিযােগে গৃহ হইতে বাহির হইয়া যাইবেন কিরূপে? স্বামী ঘর জামাই, সর্বক্ষণ গৃহবাসী, তাহাকে কি বলিয়া প্রবোধ দিবেন? চিন্তা আসিল, তখনি আবার সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত আসিয়া জুটিল। সিদ্ধান্তটা কি, তাহা আমরা আমাদের নিজের কথায় বুঝাইয়া দিব। আমাদের কুলকন্যারা পিঞ্জরাবদ্ধ বিহঙ্গিনীর ন্যায় অন্তঃপুরবরােধে আটক, থাকিলেও, ঠাকুরদর্শনে, গঙ্গাদর্শনে ও তীর্থদর্শনে এবং আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে নিমন্ত্রণে যাইবার সময় স্বাধীনতা পাইয়া থাকেন; পুরুষ অভিভাবক সঙ্গে না থাকিলেও স্ত্রীলােকের স্ত্রীলােকের সঙ্গে যাইবার বাধা প্রাপ্ত হন না। রাত্রিকালে ঠাকুর দর্শনে যাইতেছি, স্বামীকে এই কথা বলিয়া বুঝাইয়া ;
১৪ কল্পনা-কল্লোল ; দিতে পারিবেন, অমৃতময়ীর মনে সেই ভরসা আসিল; তাহাই হইল সিদ্ধান্ত। সন্ধ্যা হইয়া গেল, গৃহে গৃহে প্রদীপ জ্বলিল, খানিকক্ষণ গৃহে গৃহে গােলমাল চলিল, তার পর নিস্তব্ধ। পল্লিগ্রামের গৃহস্থেরা সকাল সকাল গৃহকাৰ্য্য সমাপ্ত করিয়া, গৃহের ঘরগবাক্ষ বন্ধ করিয়া শয়ন করেন। অমৃতময়ী করিলেন না, পৰ্যঙ্কের উপর পা ঝুলাইয়া বসিয়া রহিলেন। রাত্রি চারি দণ্ডের সময় আহারাদি করিয়া তাহার স্বামী শয়ন কক্ষে প্রবেশ করিলেন। অমৃতময়ী আহার করিলেন না। অমৃতময়ীর স্বামীর নাম মুৱলীমােহন বন্দোপাধ্যায়। অর্থাভাবে বিদ্যাশিক্ষা হয় নাই, জ্ঞানীলােকের উপদেশও লাভ হয় নাই, সুতরাং বুদ্ধিও মার্জিত হয় নাই, জামাইটা যেন জবুথবু ; বিশেষতঃ ঘরজামাই। এদেশের ঘরজামাই গুলি শ্বশুর বাড়ীর লােকদিগের একান্ত বশীভূত হইয়া থাকে। কেবল তাহাই নহে, নারীর অধীন হইয়া থাকিতে হয়। নারী- গণ চিরদিন পুরুষের অধীনে থাকিয়া জীবন যাত্রা নির্বাহ করেন, ইহাই এ দেশের ব্যবহার ; পুরুষেরা নারীর অধীন হইয়া থাকিলে লােক তাহাদিগকে কাপুরুষ বলে। আজকাল ইংরাজি সভ্যতার মহিমায় এদেশে, বিশেষতঃ বঙ্গদেশে ঐ রকম কাপুরুষ অনেক। স্ত্রীবাধ্য পুরুষগুলিকে স্ত্রৈণ বলা হয় ; স্ত্রী যাহা বলেন, সেই অজ্ঞা মাথা পাতিয়া লইয়া, বিনা বাক্যবয়ে পালন না করিলে তেমন তেমন স্বামীর নিস্তার থাকে না। সকল কাৰ্যে স্ত্রীর মতানুসারে না চলিলে তাদৃশ পুরুষের সংসার-ধর্ম চলে না। শাস্ত্রে আছে, যাহার সমস্ত কাৰ্য্য স্ত্রীর গােচর করা হয়, তাহার সমস্ত কাৰ্যই বিফল হইয়া যায়। স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী, এটাও মহাজন বাক্য। আজকাল কিন্তু এ সকল উপদেশ প্রায়ই গ্রাঙ্ক হয় না। যাহারা ঘরজামাই, তাহাদিগকে নিয়ন্তর স্ত্রীর পদানত হইয়া থাকিতে হয়; যাহারা বড় মানুষের কন্যা, ঘরজামাইগুলি তাহাদের কাছে গুন্টার গরু। খ্রীর D কলিয় কর। ১৫ অনুমতি ব্যতিরেকে ঘরজামাইদিগের শয়নগৃহে প্রবেশ করিবার সাধ্য হয় না। অমৃতময়ী যদিও ততদূর আধিপত্য চালা না, যদিও তাহার যথেষ্ট পতিভক্তি আছে, তথাপি পতিকে তিনি যাহা বলিয়া বুঝান, পতি তাহাই বুঝিয়া লন্। মুরলীমােহন শয়ন করিলেন, অমৃতময়ী বসিয়া রহিলেন। রাত্রি প্রায় এক প্রহর। স্বামী জাগিয়া আছেন, বুঝিতে পারিয়া অমৃত-না বলিলেন, “আজ আমি একটী মহাপুরুষ দেখিতে যাইব, আমার একটা কামনা আছে, সেটা পূর্ণ হইবে কি না, জানিয়া আসব। ফিরিয়া আসিতে রাত্রি কিছু বেশী হইবে তুমি নিদ্রা যাও। আজ আমি উপবাস করিয়া আছি, নিদ্রা যাইতে নাই।. একাকিনী যাইব না ; আমার বেগুনফুল আর দেখহাসি দু’জনে আমার সঙ্গে যাইবে। এই খানেই তাহারা আসিবে, আমাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া যাইবে, এইরূপ কথা আছে। তুমি যদি অমৃতময়ীর কথা শেষ হইতে না হইতেই চারুলতা ও লক্ষ্মীমণী সেই গৃহে আসিয়া দর্শন দিল। মুরলীমােহন উঠিয়া বসিলেন। সময় সঙ্গিনীগণের অভ্যাস এইরূপ যে, স্ত্রীর সহিত যাহার যেরূপ সম্পর্ক পাতানাে থাকে, স্বামীকেও সেই সম্পর্কে সম্বােধন করেন। মুরলীমােহনকে সৰােধন করিয়া, হাসিতে হাসিতে চারুলতা বলিল, “কি গো বেগুনফুল! আজ যে এখনো তুমি জেগে আছ ? আজ তােমার কিসের আমােদর সেইরূপে হাসিয়া লক্ষ্মীমণী বলিল, “তাই ত দেখহাসি ! বােজ বােজ তুমি ত সন্ধ্যাবেলাই ঘুম যাও; সাজঘুমুনী আমার বিকেলতুজুনি? আজ তােমার কি ব্রতের জাগরণ? আজ আমরা একটা ঠাকুরদর্শনে যাব, সদ হয়ে অনুমতি দেও। দেখহাসিকে আমরা নিতে এসেছি মুরলীমােহন দ্বিরুক্তি করলেন না। একটু পূর্বেই অমৃতমন্ত্রীর কথা শুনিয়া সম্মতি দিতে প্রসুত হইয়াছিলেন, মৌন হইয়া থাকাতেই সেই সমতি সূচিত হইল।
কল্পনা-কল্লোল। t চারুলতা ও লক্ষ্মীমণী যথাসম্ভব সাজিয়া গুজিয়া আসিয়াছিল, অমৃতময়ী বালার পরিধান করিলেন। নিমন্ত্রণে যাইবার সময় ধনবতী কামিনী- দেয় যেরূপ সজ্জা হয় সেরূপ সজ্জা হইল না ; দুইচারি থানি গহনা আর একখানি স্কুল রেশমের শাড়ীতেই অমৃতময়ীর বেশভূষার সমাধান। তিনটা যুবতী তিনবার দুর্গানাম স্মরণ করিয়া গৃহ হইতে বহির্গত হইলেন, মােহন পুনর্বার শয়ন করিলেন। কৃষ্ণ পক্ষের পঞ্চমী, রাত্রি দশ দণ্ডের পর চন্দ্রোদয় হইল, পথে যাইতে কামিনীত্রয়ের কোন কষ্ট হইল না ; পল্লিগ্রামের রাস্তা-ঠাই ঠাই বৃক্ষচ্ছায়া, ঠাই ঠাই চাদের আলাে ; রাস্তায় তখন জনমানবের সঞ্চার ছিল না, তিনটা কুলকন্যা সচ্ছলে ধীর পদক্ষেপে সন্ন্যাসীর কুটীর সমীপে উপস্থিত হইলেন। রাত্রি দেড় প্রহর হইবার অতি অল্প মাত্র বিলম্ব। কুটীর দ্বারে শ্যামলাল দাড়াইয়া ছিল, সে তিনটা কামিনীকে আদর করিয়া একটী কক্ষ মধ্যে যে কক্ষে সন্ন্যাসী ছিলেন, সেই কক্ষের পার্শ্ব কক্ষে কানিনী তিনটীকে ক্ষণকাল বসাইয়া রাখিল। রাত্রি এক প্রহরের পর সন্ন্যাসী যে যে কাৰ্য্য করেন, তাহা সমাধা হইলে শ্যামলাল সেই তিনটা কামিনীকে সঙ্গে করিয়া, সন্ন্যাসীর কক্ষে লইয়া গিয়া, সন্ন্যাসীর সম্মুখে দাঁড় করাইল। কামিনীরা ভক্তিভাবে সন্ন্যাসীর চরণে প্রণিপাত করিয়া, গলবস্ত্রে করপুটে পঁাড়াইয়া রহিলেন। রাত্রি এক প্রহরের পর সন্ন্যাসী স্নান করেন, অঙ্গে তখন বিভূতি থাকে না; এ রায়ে বিভূতি মাখা ছিল। স্নানের পর নিত্য রাত্রে অঙ্গে ভয় লেপন করা হয় কি না, চেলারা জানে, অপরে জানে না; সে রাত্রে কিন্তু সন্ন্যাসীজীর মণিপ্ত কলেবর। সন্ন্যাসীর মুক্তি গম্ভির ; বদন গম্ভীর ; মুখে বাক্য নাই; নেত্রপুট অর্থ উন্মুক্ত। কামিনীরা দাড়াইয়া আছেন, তাঁহাদের মুখেও বাক্য নাই। এম একাণ্ড পরে পূর্ণ বিকসিত নেত্রে একবার কাশিনী তিনটীর মূর্তি লইয়া গেল।
কলির কন্দর্প। ; অবলােকন করিয়া, সন্ন্যাসী ঠাকুর গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমরা কি চাও? অগ্রে অমৃতময়ী কথা কহিলেন, কণ্ঠস্বরে যেন কোকিলা ঝঙ্কারিল, অমৃতময়ী বলিলেন, “প্রভু! আপনি দেবতা, আপনার নিকটে আমি একটা বর প্রার্থনা করিতে আসিয়াছি। সংসারে আমার সর্বপ্রকার সুখের সামগ্রী আছে, একটা অভাব আমার পুত্র হয় নাই। পুত্ৰমুখ না দেখিলে নরক দর্শন ঘুচে না, ধৰ্ম্ম শাস্ত্রের এই বাণী ; এই হেতু আমি একটা পুত্রকামনা করি।” সন্ন্যাসী অতঃপর দ্বিতীয়া যুবতীর মুখ পানে চাহিলেন। দ্বিতীয়া যুবতী চারুলতা। সন্নাসীর দৃষ্টিপাতমাত্র চারুলতা বলিল, “প্রভু! আমার স্বামী বহুদিন প্রবাসী, সমাচার আসে না; তিনি কুশলে আছেন কি না, কতদিনে গৃহে আসিবেন, তাহাই আমি জানিতে ইচ্ছা করি।” শেষবার তৃতীয় কামিনীর প্রতি সন্ন্যাসীর শুভদৃষ্টি। তৃতীয়া কামিনী লক্ষ্মীমণী । লজ্জাকুন্ঠিত বদনে লক্ষ্মীমণী বলিল, ঠাকুর। “আমরা লজ্জাশীলা কুলবালা, ঠাকুরের নিকটে লজ্জা করিতে নাই ; লজ্জা ত্যাগ করিয়া আমি আমার মনের কথা নিবেদন করিব। আমার স্বামী আছেন, তিনি আমাকে সুনয়নে দেখেন না, এক সঙ্গে পাঁচটা দিন গৃহবাসী হন না, কুসঙ্গে রত হইয়া বাহিরে বাহিরে রাত্রি যাপন করেন, ইহাই আমি শুনিতে পাই। কতদিনে তাহার সুমতি হইবে, কতদিনে আমি স্বামী লইয়া সুখী হইব, আপনি কৃপা করিয়া সেই কথাটী আমাকে বলুন। পতিই সতীর একমাত্র ধন, পতি বিনা সতীর গতি নাই, সেই কারণে পতির সুমতি আমি কামনা তিন জনের তিন প্রকার কামনা সন্ন্যাসী ঠাকুর শ্রবণ করিলেন, ক্ষণকাল নয়ন মুদিয়া কি, চিন্তা, করিলেন, তাহার পর অমৃতময়ীকে বলিলেন, “তােমার কামনাটী শীঘ্র সুসিদ্ধ হইবে। মুখের কথায় সিদ্ধ ১৮ কল্পনা-কম্নোল। ; •• হইবে না, যজ্ঞ করিতে হইবে। যজ্ঞ করিয়া রাজা দশরথ পুত্র লাভ করিয়াছিলেন; এখন আর ঋষ্যশৃঙ্গমুনি পাওয়া যাইবে না, তােমার ইষ্ট সিদ্ধির নিমিত্ত আমিইযজ্ঞানুষ্ঠান করিব। এখন কৃষ্ণপক্ষ, এ পক্ষে যাগ যজ্ঞ আরম্ভ করা হয় না; আগামী শুক্ল পক্ষের অষ্টমীতে সঙ্কল্প করিয়া আমি যজ্ঞ করিতে বসিব, সেই রাত্রে তুমি আসিও।” অমৃতময়ীকে এইরূপ আশ্বাস দিয়া তাহার দুটী সঙ্গিনীকে সন্ন্যাসী বলিলেন, “তােমাদের কামনা সিদ্ধির জন্য জ্যোতিষশাস্ত্রের সাহায্য চাই ; আমি জ্যোতিষগণনা জানিনা ; যখন তােমরা আসিয়াছ, তখন একটী উপায় আমি করিতে পারি, তােমরা আগামী অমাবস্যা রজনীতে আমার সহিত সাক্ষাৎ করিও। দুই জনে যদি এক সঙ্গে আসিতে না পার, একে একে আসিও। একজন আসিও অমাবস্যারজনীতে, একজন আসিও প্রতিপদে।” সন্ন্যাসীর কথা সমাপ্ত হইল। কিঞ্চিত ইতঃস্তত করিয়া অমৃতময়ী জিজ্ঞাসা করিলেন, “ঠাকুর! যজ্ঞারম্ভে কি কি দ্রব্য আয়ােজন করা প্রয়ােজন, তাহা জানিতে পারিলে পূর্বাহ্নে আমি তাহা সংগ্রহ করিবার চেষ্টা করিতে পারি।” সন্ন্যাসী বলিলেন, “ইতি মধ্যে আর একরাত্রে তুমি আসিও; অগ্রে সংবাদ না দিয়াও, এই রূপ সময়ে তুমি আসিতে পারিবে ; সেই সময় প্রয়ােজনীয় দ্রব্যের কথা আমি বলিয়া দিব।” কামিনীর সন্ন্যাসীকে প্রণাম করিয়া বিদায় হইলেন। তখন রাত্রি দুই প্রহর। = তৃতীয় রঙ্গ আর একদিন আসিও, সন্ন্যাসীঠাকুর অমৃতময়ীকে এই কথা বলিয়া দিয়াছিলেন ; কবে সেই আর একদিন, সে কথাটী বলিয়া দেন নাই। সংবাদ না দিয়াও আসিতে পারিবে, এইরূপ অনুমতি আছে। সেই অনুমতির উপর নির্ভর করিয়া, দুই দিন পরে গঙ্গাস্নানের পথে অমৃতময়ী সঙ্গোপনে শ্যামলালের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন ; সংবাদ দিতে হইবে না, তথাপি সংবাদ দিয়া রাখিলেন, অমাবস্যার পূর্বে একাদশীর দিন তিনি সন্ন্যাসী দর্শনে আসিবেন। পুত্রকামনায় কিম্বা কি কামনায় মহাপুরুষের সহিত সাক্ষাৎ করিতে হইবে, অমৃতময়ী তাঁহার স্বামীকে সে কথা কিছু স্পষ্ট করিয়া বলেন নাই। ফল কি হইল, সন্ন্যাসী দর্শনের পর গৃহে আসিয়াও স্বামীকে তাহা বলেন নাই, স্বামীও তাহা জানিতে চাহেন নাই। দিন গত হইতে লাগিল, একাদশী আসিল; সেই রাত্রে অমৃতময়ী একাকিনী সন্ন্যাসীর কুটীরে উপস্থিত হইয়া সন্ন্যাসীর সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। যজ্ঞের জন্য কি কি দ্রব্য আবশ্যক সন্ন্যাসী তাহা বলিয়া দিলেন। পরদিন হইতে অমৃতময়ী নিজের ভৃত্যগণের দ্বারা সেই সকল দ্রব্য সংগ্রহ করাইবার চেষ্টায় রহি- লেন। অমাবস্যা আসিল, চারুলতা সেই রাত্রে সন্ন্যাসী দর্শন করিল,- সন্ন্যাসী তাকে কি উপদেশ দিলেন, তাহা অপরে জানিল না, চালতাই জানিল আর চুপি চুপি প্রাণের বেগুণফুল অমৃতময়ীকে বলিল ; অমৃত- ময়ীও সে কথা গােপনে রাখিলেন। প্রতিপদে লক্ষীমণির পালা। . নিশাযােগে লক্ষীমণি নির্ভয়ে সন্ন্যাসীর কনকলে। সহিত সাক্ষাৎ করিয়া যে উপদেশ পাইয়া আসিল, তাহাও চাপা রহিল। দেখহাঁসির মুখে শুনিয়া রাখিলেন কেবল দেখহাসির অমৃতময়ী। অমাবশ্যার পর শুক্লাষ্টমীর তিন দিন পূর্বে অমৃতময়ীর ভৃত্যের তারে ভরে দ্রব্যসম্ভার বহন করিয়া সন্ন্যাসীর কুটীরে রাখিয়া আসিল। সন্ন্যাসী একদিন ঠাকুয়পূজা করিবেন, অমৃতময়ী সেই পূজার সামগ্রীগুলি পাঠাইলেন, বাড়ীর লােকেরা এই পর্যন্ত জানিয়া, রাখিল ; মুরলীমােহনও তাহার অধিক অন্য তত্ত্ব জানিতে পারিলেন না। শুক্লাষ্টমী সমাগত। সেই রাত্রে যজ্ঞারম্ভ হইবে। স্বামীকে পূৰ্ব্ববৎ প্রবােধবাক্যে বুঝাইয়া, অমৃতময়ী যথাসময়ে গহনা বস্ত্র পরিয়া যজ্ঞস্থলে গমন করিলেন। যে ঘরে সন্ন্যাসী থাকেন, সে ঘরে সে রাত্রে কেহই ছিল না ; ঘরের বাহিরে শ্যামলাল ছিল, অমৃতময়ীকে সঙ্গে লইয়া শ্যামলাল আর একটী ঘর দেখাইয়া দিল। অন্যান্য ঘর অপেক্ষা সেই ঘরটা আয়তমে প্রশস্ত, দিব্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ঘরে প্রবেশ করিয়া অমৃতময়ী দেখিলেন, সামান্য আয়ােজন। গৃহস্থ গৃহের শালগ্রামশিলার নিতপূজার যেরূপ নৈবেদ্য ও পুষ্পচন্দনাদি সজ্জিত থাকে, সন্ন্যাসীর গৃহেও সেইরূপ আয়ােজন। ক্ষুদ্র একটী ত্রিপদীর উপর পাঁচটা জবাফুল ; একটা ফুলের মাথার উপর একটী অর্ঘ্য সাজানাে। সেই ত্রিপদীটী সম্মুখে রাখিয়া, ভস্মাবৃত নবীন সন্ন্যাসী যােগাসনে বসিয়া ঘন ঘন দুলি- তেছেন, অর্থ মুদ্রিত নয়নে ঘন ঘন ঢুলিতেছেন। অমৃতময়ী নিকটে গিয়া প্রণাম করিলেন, সন্ন্যাসী যেন তাহাকে দেখিতেই পাইলেন না, এইরূপ অমৃতময়ী ভাবিতে লাগিলেন, “একি ভাব? এই কি যজ্ঞের আয়ােজন ? সন্ন্যাসী কি এইরূপ যজ্ঞ করেন ? ভাব দেখিয়া আমার মনে ছেলেখেলা বােধ হইতেছে। এটা কি তবে প্রতারণা? না-না,—তাহা হইতে পারে না; সাধু পুরুষের কি প্রতারণা জানেন? প্রতারণা নয় ; ইহা কবির কল। ২১ বুঝি যজ্ঞের অধিবাস। এ কি! অকস্মাৎ আমার অঙ্গ শিহরিল কেন? এমন পবিত্র স্থানে আমার ভাগ্যে কি কোন প্রকার অমঙ্গল ঘটনা হইবে ? না-না,-বৃথা আশঙ্কা ; অমঙ্গল আসিবে না। 'ওটা হয় ত আমার মনের ভ্রান্তি! ওমা! তাই তাে! অকস্মাৎ আমার দক্ষিণ চক্ষু নাচিয়া উঠিল যে! সর্বনাশ একি অলক্ষণ ?” ভাবিতে ভাবিতে ভয়াতুরার কণ্ঠস্বর ফুটিয়া উঠিল। উচ্চকণ্ঠে চীৎকার করিয়া তিনি বলিয়া উঠিলেন,—“বাবা! দোহাই বাবা! অমঙ্গল দূর কর !” সত্যই যেন সন্ন্যাসী ঠাকুর ঘুমের ঘরে ঢুলিতেছিলেন, গৃহ- মধ্যে রমণীকণ্ঠের চীৎকারধ্বনি শ্রবণ করিয়া সত্যই যেন নিত্ৰাবেশ ছুটিয়া গেল, সত্যই যেন চমকিত হইয়া জাগিয়া উঠিলেন, ঠিক সেই ভাব দেখাইয়া, সম্মুখদিকে চাহিয়া সুস্থিরকণ্ঠে বলিলেন, “তুমি ?-তুমি- আসিয়াছ?—উপবেশন কর–উপবেশন কর। তােমার অপেক্ষায় সঙ্কল্প করা বাকি রহিয়াছে।” মনে মনে অমঙ্গল আশঙ্কা আসিলেও অমৃতময়ী একখানি ক্ষুদ্র আসনে উপবেশন করিলেন। সন্ন্যাসী বলিলেন, “ওখানে বসিতে হইবে না, আমার নিকটে আসিয়া বসিলে হইবে ; সঙ্কল্পের সময় আমাকে স্পর্শ করা চাই।” অমৃতময়ীর অঙ্গ কম্পিত হইল। সন্ন্যাসী হইলেও সতীস্ত্রীর পক্ষে পরপুরুষের অঙ্গস্পর্শ করা বিধিবিরুদ্ধ ; কিরূপে সন্ন্যাসীর আদেশ পালন করা হয়, এই চিন্তা তাহার মনে আসিল। কৃষ্ণা পঞ্চমীর রাত্রিতে সন্নাসীকে দেখিয়া তাহার ভয় হয় নাই, অকস্মাৎ দক্ষিণাঙ্গ স্পন্দনে আজ রাত্রে একটু একটু ভয়ের সঞ্চার হইল। ভয়কে মুখ্যস্থানে প্রধান করিলে ব্ৰতাচরণ হয় না, ই ভাবিয়া ধীরে ধীরে উঠিয়া, ব্রততী অতি সঙ্কোচে সন্ন্যাসীয় দক্ষিণ পার্কে গিয়া বসিলেন।
কল্পনা-কল্লোল। একবার দক্ষিণদিকে মুখ ফিরাইয়া সন্ন্যাসী তাহাকে বলিলেন, “নাম- গােত্র বল।” অমৃতময়ী মৃদুস্বরে উচ্চারণ করিলেন, “শ্রীমতী অমৃতময়ী দেবী, শাণ্ডিল্য গােত্র।” পঞ্চপাত্রের জলে আচমন করিয়া, সন্ন্যাসীঠাকুর গুটীকতক মন্ত্র পাঠ করিলেন। ত্রিপদীর পার্শ্বে একটী চতুষ্কোণ কুণ্ড খনন করা হইয়াছিল ; সেটা হােমকুণ্ড। তন্মধ্যে বালুকা বিকীর্ণ করিয়া যজ্ঞকাষ্ঠ স্থাপন করা হইয়াছিল, তাহাতে অগ্নি সংযােগ করিয়া, মন্ত্রপাঠ করিতে করিতে সন্ন্যাসী একে একে এক একটী ঘতলিপ্ত বিল্বপত্র আহুতি দিতে লাগি- লেন। আটাশ টা বিপত্রে হােম করা হইল। অমৃতময়ী ঐসকল অনুষ্ঠান দর্শন করিয়া হােমকুণ্ডের দিকে প্রসন্ন- নয়নে এক বার চাহিলেন। সেই নয়নে সন্ন্যাসীর নয়ন নিক্ষিপ্ত হইল। সন্ন্যাসী বলিতে লাগিলেন, “তােমার নয়নের দীপ্তি সৰ্বসুলক্ষণ প্রকাশ করিয়া দিতেছে ; নিশ্চয় তােমার মনস্কামনা সিদ্ধ হইবে। তােমার কণ্ঠস্বর অতি মধুর; বসন্তের কোকিলের স্বরকেও লজ্জা দেয়। হাঁ, একটা কথা আমার মনে হইল। পঞ্চমীর রাত্রে যখন তুমি প্রথমে কথা কহিলে, সুমধুর কণ্ঠস্বর শ্রবণ করিয়া তখনি আমি মনে করিয়াছিলাম, সেই কথাটা তােমাকে বলিব। বলিবার অবসর হয় নাই, আজ বলিতেছি, শ্রবণ কর। আমার একটা শিষ্য প্রয়ােজন, তাহাকে আমি ধর্মশাস্ত্র শিক্ষা দিব ; উচ্চারণ পরিস্কার হইলে ধর্মশাস্ত্রের মহিমা রক্ষা হয়। আমার আশাম, যােগ্যছাত্র আমি প্রাপ্ত হই নাই। তুমি যদি আমার নিকটে শাস্ত্র-শিক্ষা করিতে অভিলাষিনী হও, তাহা হইলে আমি পৰিতুষ্ট হই। তােমার কথাগুলি শুনিয়া, বুদ্ধির প্রখরতা দেখিয়া, আমি বুঝিতে পারিতেছি, তােমাকে আমি যাহা শিখাইব, তাহাই তুমি শিখিতে পারিবে। এদেশে গৃহস্থেরা যত্ন করিয়া পাখী পুষিয়া থাকেন; গুৰুসায়ী কলিয় কাপ। কাকাতুয়া, হীরামােন, ময়না ও শালিক প্রভৃতি পক্ষীকে রাধাকৃষ্ণ বলিতে শিক্ষা দেওয়া হয়, সেই সকল পক্ষী অতি সুমিষ্ট উচ্চারণে কৃষ্ণ- কথা বলে, স্পষ্ট মনুষ্যকণ্ঠের অনুকরণ করে, সংসারের পরাপর বুলীও শীঘ্র শীঘ্র শিখিয়া লয়। কোকিলের স্বর সব্বাপেক্ষা মিষ্ট, সকলেই এই কথা বলেন ; গৃহস্থেরা কিন্তু পােষ। কোকিলকে রাধাকৃষ্ণ বলি-৩ শিক্ষা দেন না ; কোকিল কেবল স্বভাবসিদ্ধ কুহু কুহু রব করিয়া নিজ গুণের পরিচয় দেয়। কোকিলকে যদি রামনাম, কৃষ্ণনাম, দুর্গানাম, এবং অপরাপর পবিত্র পবিত্র নাম গুলি শিখাইয়া দেওয়া হইত তাহা হইলে পােষ। কোকিলের কতদূর মনরঞ্জন করিতে পারিত, লােকে তাহা বিবেচনা করেন না। আমি দেখিতেছি, নারীসংসারে তুমি একটা কোকিল, তােমাকে আমি শাস্ত্রকথা শিখাইয়া দিব ; তুমি পুত্রবতী হও, শাস্ত্রালাপ করিয়া পুত্র টীকেও তুমি ধৰ্ম্মজ্ঞানী করিয়া সুশিক্ষিত করিতে পারিবে।” সন্ন্যাসী এতগুলি কথা বলিলেন, মাথা হেঁট করিয়া অমৃতময়ী সব কথাগুলি শুনিলেন, ভাল মন কিছুই বলিলেন না, সন্ন্যাসীর মুখে দিকেও চাহিলেন না, নিম্নদৃষ্টিতে মাটির দিকে চাহিয়া চুপ করিয়া রহিলেন। প্রসঙ্গ ত্যাগ করিয়া সন্ন্যাসী আবার বলিতে লাগিলেন, “আজ আমার যজ্ঞারম্ভ হইল; অদ্যাবধি পূর্ণিমা পর্যন্ত এইরূপে পূজা করিয়া, প্রতি রজনীতে এইরূপে হােম করিব, পূর্ণিমা রজনীতে পূর্ণাহুতি দিব, সেই রজনীতে আমার যজ্ঞপূর্ণ হইবে। প্রতি রজনীতেই তােমার উপস্থিত থাকা প্রয়ােজন। আজ হইল অষ্টমী, আজিকার কাৰ্য্য সমাপ্ত হইল, নবী হইতে পূর্ণিমা পৰ্যন্ত সপ্তাহ ; এই সপ্তরজনীতে তুমি নিয়মিত রূপে এখানে আসিও। অধিক রাত্রে আসিতে যদি ভয় পাও, সন্ধ্যা- কালেই আসিতে পার; তােমায় বিশ্রামের জন্য আমি স্বতন্ত্র গৃহ নির্দিষ্ট ;
কননা-কজোল। করিয়া দিব, সেই গৃহে তুমি স্বচ্ছন্দে আমার যজ্ঞ কালের অপেক্ষায় বিশ্রাম করিতে পারিবে।” অমৃতময়ী বলিলেন, “আমাদের বাড়ী এখান হইতে অধিক দূর নয়, রাত্রি এক প্রহরের সময় অনায়াসে আমি আসিতে পারিব । শুক্লপক্ষ, —নির্মল চন্দ্রকিরণে আমাদের গতিপথ আলােকিত হইয়া থাকিবে, পথে আসিতে আমি ভয় পাইব না।” সতৃষ্টনয়নে সন্ন্যাসীঠাকুর অমৃতময়ীর চন্দ্রবদন ক্ষণকাল অনীমেষে নিরীক্ষণ করিলেন, মনে মনে কি ভাবিলেন, অমৃতময়ী তাহা বুঝিতে পারিলেন না; হােমকুণ্ডে, ত্রিপদীতলে ও সন্ন্যাসীর পদতলে প্রণাম করিয়া শীঘ্র শীঘ্র বিদায় হইয়া আসিলেন। সন্ন্যাসী তাহার অঙ্গ স্পর্শ করিয়াছিলেন, তাহাতে অন্তরে কেমন এক প্রকার অশুভ চিন্তার উদয় হইছিল, পথে আসিতে আসিতে মনােমধ্যেই সে চিন্তা বিলীন হইয়া গেল। নবমী হইতে চতুর্দশী পৰ্য্যন্ত ছয় রাত্রি ; অমৃতময়ী সেই ছয় রাত্রি যথানিয়মে সন্ন্যাসীর যজ্ঞস্থলে গতায়াত করিলেন; সপ্তম রজনী পূর্ণিমা রজনীতে অমৃতময়ী অভীষ্টসিদ্ধির অভিলাষে অধিক উৎসাহিনী হইয়া সন্ন্যাসীর কুটীরে আগমন করিলেন। তখন ঠিক এক প্রহর। সন্ন্যাসী তখন পূজায় বসিয়াছিলেন। অন্যান্য দিন দেড় প্রহরের পর পূজারম্ভ হয়। সেদিন অর্ধপ্ৰহয় পৃর্বে পূজা হইতেছিল। পূজা করিতে করিতে অন্য কথা কহিতে নাই, সুতরাং অমৃতময়ীকে সমাগতা দেখিয়া সন্ন্যাসী একবার মন্তক সঞ্চালন পূর্বক ইঙ্গিতে তাহাকে অভ্যর্থনা করিলেন। সন্ন্যাসীর আসন হইতে কিঞ্চিত দূরে অমৃতময়ী বসিলেন। পূজা সমাপ্ত হইল; হােম করিবার সময় উপস্থিত। আনন্দপূর্ণনেত্রে মৃতময়ীর মুখপানে চাহিয়া আনন্দপূর্ণকণ্ঠে সংসী বলিলেন, “নিকটে শরিয়া আইস; তােমার আশা পূর্ণ হইয়াছে।”
কলির কর্প। সরিয়া যাইতে অমৃতময়ীর ইচ্ছাছিল না, আশাপূর্ণ হইয়াছে, সন্ন্যাসীর মুখে এই কথা শুনিয়া, মনােতাবের পরিবর্তন হইল; সন্ন্যাসীর দিকে তিনি একটু সরিয়া বসিলেন। হস্তে হস্তে স্পর্শ করিয়া সন্ন্যাসী বলিলেন, “আজ আর আমি রং হােম করিব না; যে দেবতার পূজা আমি করিতেছি, সেই দেবতা মূৰ্ত্তিমান হইয়া আসিয়া পূর্ণাহতি প্রদান করিবেন। দেবতা প্রসন্ন হইয়াছেন, আর তােমার ভাবনা নাই। নির্ভয়ে তুমি এইখানে বসিয়া থাক, আমি এখন গৃহান্তরে চলিলাম। অমৃতময়ীর দিকে বনয়নে চাহিতে চাহিতে সন্ন্যাসীঠাকুর আসন হইতে উঠিয়া, গৃহ হইতে বাহির হইয়া গেলেন, অমৃতময়ী একাকিনী বসিয়া রহিলেন। একাগ্রচিত্ত হইবার বাসনা থাকিলেও নারীজাতির চিত্ত ক্ষণে ক্ষণে চঞ্চল হয় ; অমৃতমঙ্গীর চিত্তের তখন সেই অবস্থা। আশা, আশঙ্কা, সংশয়, এই তিন একত্র হইয়া তাঁহার হৃদয় সাগরে পুনঃপুনঃ ভীষণ তরঙ্গ উৎপাদন করিতে লাগিল। প্রায় চারিদও অতিক্রান্ত। হােমকুণ্ডের দুই দিকে দুটা বড় বড় দ্বত প্রদীপ জ্বলিতে ছিল, সহসা সেই অলােকপ্রদিপ্ত গৃহমধ্যে একটা মনুষ্য মুক্তির ছায়া পড়িল। চমকিত হইয়া অমৃতময়ী সেই দিকে চল দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। দেখিতে দেখিতে সম্মুখ ভাগে এক দিব্যমুক্তির আবির্ভাব। রূপলাবণ্য অতি চমৎকার। মস্তকে বনপুষ্পের মুকুট, যুগল কর্ণে পুষ্প আছে, কণ্ঠদেশে বক্ষবিলম্বিত স্তবকে অবফে সজ্জিত বনফ্লুলের , ৰাম হন্তে পুণনির্মিত দেণ্ড, কি হন্তে কুমশ, পরিধান রক্তবর্ণ পটু, কটিদেশে পুষ্পমাল্য ; নেপুট সমুজ্জল, আখৰে মূই হাত। সয়ালী বলিয়া গিয়াছেন, মসুলে কেবল পূজা হয়, সেই দেবতা মুক্তিমান হইয়া আসিয়া পূহতি প্রদান করিবেন; সেই কানা-কল্লোল। ; বাক্য স্মরণ করিয়া, অমৃতময়ী ভক্তি বিগলিত হৃদয়ে সেই জিব্যমূর্তির চরণে প্রণিপাত করিলেন। সুধীর পদ বিক্ষেপে মূৰ্ত্তি ক্রমে ক্রমে অগ্রসর হইয়া, সন্ন্যাসীর পরিত্যক্ত যজ্ঞাসনে উপবেশন করিলেন; হস্তনে সঙ্কেতে অমৃতময়ীকে নিকটে আহ্বান করিলেন; ভীতি সঙ্কুচিতা, লজ্জাভয় বিজড়িত, আশা প্রমােদিতা অমৃতময়ী কম্পিত চরণে সেই দিব্য মূর্তির নিকটে গিয়া দাঁড়াইলেন ; উৰ্দ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়া মূৰ্ত্তি তাহাকে উপবেশনের সঙ্কেত জানাইলেন ; কম্পিতগাত্রে অমৃতময়ী সেই আদেশ পালন করিলেন। আসনেপবিষ্ট পুষ্পদামসজ্জিত দিব্যমূৰ্ত্তির দক্ষিণ পার্শ্বে অমৃতময়ী আসীন। কুসুমশরাসন পরিত্যাগ করিয়া মূৰ্ত্তি তখন মানসিক মন্ত্র উচ্চারণে হােমকুণ্ডে তিনবার পূর্ণাহুতি দিলেন ; হােমকুণ্ড হইতে একখণ্ড দগ্ধকাষ্ঠ তুলিয়া লইয়া ঘৃতপাত্রে ঘর্ষণ পূর্বক অমৃতময়ীর ললাটে একটা ফোঁটা দিলেন ; অমৃতময়ী পুনরায় তাহাকে প্রণাম কুরিলেন। পলকশুন্য নয়নে ক্ষণকাল অমৃতময়ীর লজ্জাবনত সুন্দর মুখমণ্ডল অবলােকন করিয়া, সেই মূৰ্ত্তি আপন গলদেশ হইতে উন্মোচন পূর্বক একছড়া ফুলের মালা অমৃতময়ীর গলদেশে অৰ্পণ করিলেন। পুনৰ্ব্বার অমৃতময়ীর অঙ্গ রোমাঞ্চিত হইল। মূর্তি এতক্ষণ একটাও কথা কহেন নাই, এই সময় এক প্রকার ভঙ্গস্বরে ধীরে ধীরে বলিলেন, “ব্ৰতবতি । তােমার ব্রত পূর্ণ হইল; আমি তােমার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছি, অচিরাৎ তুমি পুত্রবতী হইবে। আমি কে, তাহা তুমি বুঝিতে পারিতেছ? আমার রূপ দেখিয়া আমাকে কি চিনিতে পারিতেছ? লােকে যাহাকে প্রেম দেবতা বলে, আমিই সেই দেবতা ; আমার নাম কাপ। এই সকল কথা বলিয়া মুর্তিমান কন্দর্প যুগল বাহ প্রসারণপূর্বক অমৃতময়ীকে জোড়ে তুলিয়া লইবার জন্য নৰলে আকর্ষণ করিলেন। সট চীৎকার করিয়া অমৃতময়ী বহুকষ্টে পাষণ্ডের বাহবন্ধন ছিন্ন কলির কর্ণ। করিয়া, কপিতে কঁপিতে উঠিয়া দাড়াইয়া, এক লম্ফে সেই পাপ গৃহের চৌকাট পার হইলেন; সম্মুখে দেখিলেন শ্যামলাল। কম্পিতকণ্ঠে ছাপাইয়া হাপাইয়া শ্যামলালকে তিনি বলিলেন, “এগৃহে কে আসিয়াছে ? তােমাদের সন্ন্যাসীঠাকুর কোথায়? আমি তাহাকে চিনিতে পারিয়াছি তিলাৰ্ধকালও আমি আর এখানে থাকিব না।” প্রজ্বলিত অগ্নিময়ী মূর্তি দর্শন করিয়া শ্যামলাল স্তম্ভিত হইয়া রহিল, তাহার মুখে ক্ষণকাল বাক্যস্ফুৰ্ত্তি হইল না। কপট কন্দর্প গৃহমধ্যে নিস্পন্দ বিস্তম্ভিত। নিশ্বাস রােধ করিয়া অমৃতময়ী যেন বাতাসের ন্যায় ছুটিয়া সে স্থান হইতে পলায়ন করিলেন; কেহই তাহার অনুসরণ করিতে পারিল না। সতীর তেজের নিকটে পাপাচারী পাষণ্ড লােকের কপটতার এইরূপ পরিণাম। কথাগুলি বলিতে যতক্ষণ গেল, সতীর পলায়নের কৃতকাৰ্য্যতার তাহার দংশের একাংশ সময়ও লাগিল না। অমৃতময়ী উদ্ধশ্বাসে দৌড়িয় স্বগৃহে গিয়া উপস্থিত হইলেন, সদর বাড়ীর প্রঙ্গণে পৌছিয়াই মূৰ্জিত হইয়া পড়িলেন। পূর্বের উপদেশ মত দেউড়ীর দরােয়ান জাগিয়া বসিয়া ছিল, একটী নারীমুক্তি ছুটিয়া আসিয়া প্রাঙ্গণে অজ্ঞান হইয়া পড়িল, দয়ােয়ান ছুটিয়া আসিয়া চন্দ্রালােকে দেখিয়াই চিনিতে পারিল, ডাকাডাকি করিয়া বাড়ীর লােকগুলিকে। জাগাইল, দুটী তিনটা স্ত্রীলােক ও মুরালীমােহন তাড়াতাড়ি নামিয়া আসিয়া, চৈতন্যশূন্য অমৃতময়ীকে দেখিলেন, কোলে করিয়া তুলিয়া সত্বে উপরের ঘরে লইয়া গেলেন ; জল সিঞ্চনাদি নানাপ্রকার শুশ্রুষায় অনেকক্ষণের পর অমৃতময়ীর চৈতন্য হইল। স্ত্রীলােকেরা অনুমান করিলেন, মাত্রিকালে ঠাকুর দেখিতে বাহির হইয়াছিল, বাতাস লাগিয়াছে } কল্পনা-কল্লোল। ; । উপর দেবতার দৃষ্টি পড়িয়াছে ! মুরলীমােহনও নারীগুলির ন্যায় সেই সিদ্ধান্তে উপনিত হইলেন। রাত্রিকালে আমৃতময়ীর মুখে কেহ কোন কথা শুনিতে পাইল । অপদেবতার দৃষ্টিই সাব্যস্ত হইয়া রহিল। পরদিন প্রভাতে নারায়ণের মন জলে অমৃতময়ীর অভিষেক করিয়া, শিবস্বস্ত্যয়ন করাইয়া, গ্রহশান্তি করা হইল; অমৃতময়ী নিরাময় হইলেন। প্রকৃত ঘটনা কি, কেহই কিছু জানিতে পারিল না ; কেবল অমৃতময়ীই জানিয়া রাখিলেন; তাহার মনে মনেই সেই নিগুঢ় কথা চাপা রহিয়া গেল। কপট কন্দর্প গলা কঁপাইয়া, ভঙ্গস্বরে কথা কহিলেও, অমৃতময়ী বুঝিতে পারিয়াছিলেন, সেই বৃক্ষতলবাসী সন্ন্যাসীর কণ্ঠস্বর, সন্ন্যাসী ভণ্ড, এতদিনে তাহা। তিনি জানিতে পারিলেন। সেই পাষণ্ডই ফুলসাজে সজ্জিত হইয়া কন্দর্প সাজিয়া, যজ্ঞকুণ্ডে আহতি দিতে আসিয়াছিল। কি প্রকারে তাহার পাপের প্রায়শ্চিত্ত হইতে পারে, সাধ্বীসতী অহরহ তাহার উপায় চিন্তা করিতে লাগিলেন। এক একবার জয় ভয়ে তাঁহার মনে হয়, পাষণ্ডের পরাক্রমে তাহার সতীত্বরত্ব অপহৃত হইতে পাতি, জগতে বিনি সতীর সতীত্ব রক্ষায় পরম সহায়, তাহারই কৃপায় ধর্মে ধর্মে ধর্ম রক্ষা হইয়াছে। সেই দিন অবধি অমৃতময়ীর গঙ্গাস্নান বন্ধ হইল। কিজন্য অমৃতময়ী গঙ্গাস্নান করেন না, কেহ সে কথা জিজ্ঞাসা করিলে অমৃতময়ী বলেন, নিত্য নিত্য অতখানিপথ চলিতে আমার বড় কষ্ট হয়; গঙ্গা যদি আমার প্রতি কৃপা রাখেন, ঘরে বসিয়াই আমি গান কবি, ঘরে বসিলাই গালে গান করি, পিপাসার সময় গঙ্গাজল পান করিব। কাছে ঐকথা তিনি বলেন, কিন্তু মিৰ্জন হইলে আপন মনে তিনি ভাবেন, এখনকার স্যালীদে অসাধ্য কাৰ্য ছুিই নাই। আমাদের পা তলায় সন্ন্যাসী ঘােরর ভবিটল, বিনমানে আহার কমে না, খাত কলির কন্দর্প। সামগ্রী পাইলে ছেলেমেয়েদের বাটিয়া দেয়, পূর্ণিমায় পূর্ণিমায় ব্রাহ্মণ ভােজন করায়, সধবা ভােজন করায়, কুমারী ভােজন করায় ;'কেহ প্রণামি দিতে চাহিলে গ্রহণ করে না। পরম ধাৰ্মিক–বকাধাৰ্ম্মিক। —অত টাকা পায় কোথা ? নিশ্চয়ই চুরি করে! ওদিকে আবার সতীর সতীত্ব নাশের মতলবে গােপনে গােপনে কনৰ্প সাজে। কন্দর্প সাজিয়া কোথায় কত সতীর সর্বনাশ করিয়াছে, তাহাই বা কে জানে? কত দিনের সন্ন্যাসী, তাহাই বা কে জানে ?উঃ! ভারী বুজরুক!—আমি বেশ বুঝিয়াছি, ঐ দলের কর্পেরাই কলির কক্ষপ।
চতুর্থ রঙ্গ কর্পের দর্পচুর্ণ সন্ন্যাসীটার খুৰ বুকের পাটা, পূর্ণিমার রাত্রে একটি কুলকন্যাকে লইয়া যে ভয়ানক কাণ্ড করিল, সাধারণ মনুষ্য সে রূপ বীভৎস কাণ্ড করিতে পারে না। ভণ্ড সন্ন্যাসীটা তাহাতেও ভয় পাইল না, লােকালয় ছাড়িয়া পালাইয়া গেল না, সেই পাকুড়তলায় ধূনী জালাইয়া গঁট হইয়া বসিয়া রহিল। অমৃতময়ী ধনবান লােকের কন্যা, তাঁহার পিতা সেই গ্রামের দলপতি ছিলেন, অমৃতময়ী যদি ঘুনাক্ষরে সেই রাত্রের ব্যাপারটা প্রকাশ করিয়া দিতেন, তাহা হইলে গ্রামের ভদ্র লােকেরা সেই কপট সন্ন্যাসীকে একেবারে গুড়া করিয়া ফেলিতেন। দুঃসাহসী সন্ন্যাসী সেটা একবার মনেও ভাবি না। তারকেশ্বরের ফাগিরির বাবুগিরিতে নবীনের বঁটীতে এলােকেশী খুন, জেলখানায় দুষ্টমহন্তের ঘানিটানা, সে ঘটনাটা ঐ কপট সন্ন্যাসীর কন্দর্পগিরীর অনেক পরের কথা ; কাণ্ডটা প্রকাশ পাইলে তাহার পাপের কিরূপ গুরুতর প্রায়শ্চিত্ত হইত, সকলেই তাহা বুঝিতে পারিতেছেন। কুমার সম্ভবের সূচনায় ত্রিলােচনের লােচনানলে কামদেব ভগ্ন হইয়া ছিল, কার্তিকের জন্মের পর কামদেব পুনায় অন্য স্থানে জন্মগ্রহণ করিয়াছিল, তথাপি আজি পৰ্য্যন্ত কামদেবের নাম অনঙ্গ। কাটোয়ার গঙ্গাতীরের কপট কন্দর্প অনঙ্গ নহে, পূর্ণাঙ্গবিশিষ্ট ; কেহ তাহাকে ভন্ন করেন নাই, তাহার পরিণাম কিরূপ হইল, জানিয়া রাখা আবশ্যক। সতীর সতীনাশের চেষ্টা করা সাধারণ পাপ নহে, পূর্ব পূর্ব যুগে পতিপরায়ণা সতীর কোপদৃষ্টিতে পাপীয়া জন্ম হইয়া যাইত, পুরাণে এরূপ কলির কলপ। দৃষ্টান্ত অনেক দেখিতে পাওয়া যায়। অমৃতময়ীর কোপানলে, কপট কর্পের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয় নাই। প্রায়শ্চিত্তের নিমিত্ত অমৃতময়ীকেও চেষ্টা করিতে হয় নাই, ধর্মের মহিমায় অন্য প্রকারে সেই পাপিষ্ঠের উচিত মত প্রায়শ্চিত্ত হইয়া গেল। যে রাত্রে কনৰ্পবেশ ধারণ, তাহার একমাস পরে সেই ভণ্ডসন্ন্যাসী একদিন হঠাৎ অদৃশ্য হইয়া গেল। লােকটা মধ্যে মধ্যে ঐরূপে অদৃশ্য হইয়া যাইত, কিছুদিন পরে আবার ফিরিয়া আসিত। লােকেরা মনে করিলেন, এবারেও হয়তাে সেইরূপে কোথায় চলিয়া গিয়াছে, আবার আসিবে। সন্ন্যাসী আসিয়াছিল ; কিন্তু পুৰ্ব্বে পূর্বে যেরূপে আসিত, সেরূপে আসিতে হয় নাই। যে দিন সে পাকুড়তলা ত্যাগ করিয়াছিল, তাহার প্রায় দেড় মাস পরে পুলিশের লােকেরা তাহাকে বন্ধন করিয়া আনিয়াছিল। হাতে হাতকড়ী, পায়ে বেড়ী, বাহুযুগল রজ্জবদ্ধ। তখন আর সন্ন্যাসীবেপ ছিল না, দিব্য রূপবান্ যুবাপুরুষ। তাহাকে দেখিবার নিমিত্ত সেই পাকুড়তলায় অনেক লােক জমা হইল, মুখ দেখিয়া সকলেই চিনিল। সকলেরই আশ্চর্য্য বােধ হইল। পূর্বে প্রকাশ আছে, জ্যেৎস্নারাত্রে সন্ন্যাসী যখন গঙ্গাস্নান করিত, প্ৰামের ডাংপিটে ছোড়ার তখন লুকাইয়া সুকাইয়া গাছে উঠিয়া দেখিত, কার্তিকের মত রূপ। বন্দীকে দেখিবার জন্য বৃক্ষতলে যে জনতা হইয়াছিল, সেই জনতামধ্যে সেই প্রকারের ছােরারাও উপস্থিত ছিল ; অন্য লােকেরা সন্ন্যাসীটাকে যেমন চিনিয়াছিলেন, সেই বালকেরা তদপেক্ষায় আরাে ভালরূপে চিনিয়াছিল; দুর্দশা দর্শন করিয়া তাহারা সকৌতুকে করতালী দিয়া হাস্যকরিয়াছিল। কেহ কোন কথা জিজ্ঞাসা না করিলেও একজন বালক অগ্রবর্তী হইয়া সকলের সাক্ষাতে বলিল, “এই বটে সেই ;—এই শােকটা কাজে যখন গঙ্গান করিত, চাদের আলােতে তখন আমরা দেখি এইরূপ চমৎকার মূর্তি।” বালকের কথা শুনিয়া সমাগত কলনা- কল। লােকেরা বিদ্যাপন্ন হইলেন, কিন্তু পুলিশের লােকেরা বিস্ময় প্রকাশ করি না। পুলিশ কি কারণে সন্ন্যাসীকে বাঁধিয়া আনিয়াছে, সেই তত্ব জানি জন্য কৌতুহলী হইয়া একটা ভদ্রলােক সেই প্রশ্ন উত্থাপন করিলেন। পুলিশ প্রহরীগণের অধিনায়ক ছিলেন একজন দারােগা, ভদ্রলােকের প্রশ্ন এষণ করিয়া তিনি বলিলেন, “ভয়ঙ্কর অভিযােগ, ভয়ঙ্কর রহস্য। সন্ন্যাসীবেশে এই লােকটা এখানকার যে আশ্রমে রাত্রিকালে বাস করিত সেই আশ্রমে চলুন, সেইখানে বসিয়াই সকল কথা বলিব। যতলোক এখানে জড় হইয়াছে ইহাদের সকলকে সেখানে যাইতে দেওয়া হইবে , মাতব্বর মাতব্বর পাঁচজন ভদ্রলােক আমার সঙ্গে আসিতে পারিবেন।” তাহাই হইল। পাঁচজন ভদ্রলােক সঙ্গে লইয়া দাবােগা মহাশয় সেই পূৰ্ব্ব কথিত কুটীরাভিমুখে চলিলেন, বন্দীকে লইয়া প্রহরীগণ পশ্চাৎ পশ্চাং চলিল। কুটীরে উপস্থিত হইয়া দারােগা মহাশয় একখানা কল আসনে উপবেশন করিলেন, আর একখানা খজুর পত্রের চেটাই শাতিয়া ভদ্রলােকেরা বসিলেন; প্রহরীরা বন্দীকে বেষ্টন করিয়া সম্মুখভাগে দাড়াইয়া রহিল। দাবােগ মহাশয় খান কতক লা লা কাগজ বাহির করিয়া, তাহাতে যাহা যাহা লেখাছিল, তম্মধ্যে বিশেষ বিশেষ স্থগুলি পাঠ করিলেন। তাহার মন্ত্র এই যে, বন্দীর নাম মাধবকৃষ্ণ সমান্দা, পাচ বৎসর পূর্বে এই লােকটা নদীয়া জেলার এক গ্রামে একদল ডাকাতের সহিত ডাকাতি করিয়া পলাইয়া গিয়াছিল, সেই বলে ২২ জন ডাকাত ছিল, তন্মধ্যে ৭ জন খ. পছে, তাহারা সব ভাকাতের নাম হলে আই, দুই জনের নাম বলিয়াছিল, সেই দুই নে খে এই একন। ইহার বাড়ী কোথায়, এরী আসাশী অহও এ করিয়াছিল, বাড়ীতেও অনুসন্ধান করা হইয়াছিল, ইহাকে পাওয়া কলির কপ। যায় নাই। ইহার মা আছে, স্ত্রী আছে, এক পুত্ৰ আছে, হােট একটা কন্যাও আছে। লােকটা সেই ডাকাতির পর তিন বৎসর কোথায় কোথায় ছিল তাহা স্পষ্ট প্রকাশ নাই, এক স্থলে পুলিশের দুইজন গােয়েন্দা ইহাকে দেখিয়াছিল, তখন সন্ন্যাসীবেশ ছিল না; গােয়েন্দারা। ছদ্মবেশে প্রায় একমাস কাল ইহাকে দেখিয়াছিল, ইহার চাল চলনের উপর নজর রাখিয়াছিল ; একজন মধ্যে মধ্যে ইহার নিকটে গিয়া দুই একটা কথা কহিয়াছিল, সত্যকথা জানিতে পারে নাই; দূরে দূরে থাকিয়া, অপরের মুখে নামধাম জানিয়া লইয়াছিল, বিশেষ প্রমানাভাবে গ্রেপ্তার করিতে পারে নাই। লােকটা কি সূত্রে কাহার মুখে পুলিশ গােয়েন্দার গুসন্ধানের আভাস পাইয়া তথা হইতে পলায়ন করে, তাহার পরেই এইখানে আসিয়া সন্ন্যাসী সাজিয়া বসিয়াছিল। এখানেও মধ্যে মধ্যে পুলিশের লােক ছদ্মবেশে আসিয়া ইহাকে দেখিয়া যাইত। এই পৰ্য্যন্ত শুনিয়া একট ভদ্রলােক একটু চমকিয়া উঠিলেন। কি একটা পূর্বকথা তাহার মনে পড়িল। দুই একবার তিনি এক একজন হিন্দুস্থানী লােককে পাকুড়তলায় দেখিয়াছিলেন, একদিন সেই রকমের একজন লোকের পায়ে পুলিশের ধরণের জুতা দেখিয়া পুলিশের সােক বলিয়া স্থির করিয়াছিলেন, ভাব কিছুই বুঝিতে পারেন নাই। সেই কথা তাহার মনে হইল, কিন্তু দারােগাকে কিছু বলিলেন না। দারােগা বলিতে লাগিলেন, লােকটা এইখানে সন্ন্যাসী হইয়া বসিয়া ছিল, মধ্যে মধ্যে বাড়ীতে যাইত, কোথা হইতে যােগাড় করিয়া টাকা আনিত, দশ পনের দিন বাড়ীতে থাকিত ; বাড়ীতে ইহার যে কন্যা আছে, তাহার বয়স এক বৎসর। লােকটা এখানে আছে দুই বৎসর, ইহার মধ্যে এক বৎসর পূর্বে সেই কন্যার জন্ম। বাড়ীতে যাইবার সময় ইহার সন্ন্যাসী বেশ থাকিত না, নিজবেশেই সংসারের কাজ করিত। অনেক থানার পুলিশ গােপনে গােপনে তকে ওকে ফিরিত, 6 কানা-কলেন। সমত খবর রাখিত ; প্রমাণ চুড়ান্ত হওয়াতে এইবার গ্রেপ্তার করা হইয়াছে। এইবার নিজ বাড়ীতেই ধরা পড়িয়াছে। একজন ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করিলেন, “বন্দী এখন বলে কি?” দারেগা বুলিলেন,-“অপরাধ কবুল করিয়াছে। যখন বন্ধন করা হয় নাই, হাড়িয়া দিবার আশ্বাস দিয়া সেই সময় আমরা ইহার সমস্ত গুপ্ত কথা বাহির করিয়া লইয়াছি। লােকটা বােকা ; লেখাপড়া জানে না, ১০/১২ বৎসর বয়স হইতেই পেস ছিল চুরিকরা। প্রথমে ছিল ছিচকে চোর, ক্রমে ক্রমে হইয়া দাঁড়াইয়াছিল পাকা চোর। নদীয়া জেলার ডাকাতি ভিন্ন তৎপূর্বে আরো দুই তিন যায়গায় ডাকাতি করিয়াছিল, ধরা পড়ে নাই। এইবার ধরা পড়িয়া একে একে কবুল হিয়াছে, বাড়ীর গােলাঘরের নীচে গর্ত খুঁড়িয়া চোড়ামাল ও নগত টাকা পুতিয়া রাখিয়াছিল, সেই গুপ্তস্থান হইতেই দফা দফা টাকা তুলিয়া আনিয়া এখানে ব্রাহ্মণভােজন করাইত। ইহার কথা প্রমাণে সেই গােলার নীচে হইতে আমরা নগতে ও ব্যাঙ্ক নােটে ১৫০ দেড় হাজার টাকা এবং সােনারূপার অনেক অলঙ্কার বাহির করিয়াছি। আর কোন এলাশের অপেক্ষা না রাখিয়া, আমরা ইহাকে বন্ধন করিয়া এখানে আনিয়াছি। বনের অগ্রে ইহার বাড়ীর নিকটবর্তী জনকতক প্রতি বাসীকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানা হইয়াছে, যৌবনের প্রথম অঙ্কুর হইতেই লােকটা বদমাস; ইতর জাতীয় ৫৭টা স্ত্রীলোকের সতীত্ব নাশ করিয়া ছিল, গ্রামের মধ্যেও এক একজনের বাড়ীতে চুরি করিতে গিয়া, তাড়া খাইয়া পলায়ন করিয়াছিল।” বাহার দারােগার মুখে ঐ সকল কথা শুনিলেন, ক্রোধে, স্বণায় তাহ- দে সর্বাঙ্গ ফুলিতে লাগিল। তাহারা মনে মনে ভাবিলেন, কি পাপ ! কাময় এই বাস ডাকাতের পদধূলি লইয়াছি, সন্ন্যাসী বলিয়া প্রণাম বসিয়াছি, প্রায়শ্চিত্ত করিয়া শুদ্ধ হইতে হইবে। ধর্মের মহিমা ধর্মই কলির কন্দর্প। দেখাইয়া দে ; ধর্মের বিচারেই এই পাপিষ্ঠ পাষণ্ড কারাগারে প্রান্তি করিবে। দারােগা মহাশয় অতঃপর সেই ভদ্রলােকগুলিকে প্রহরী বেষ্টিত পৃঙ্খলাবদ্ধ ভণ্ড সন্ন্যাসীটাকে সঙ্গে লইয়া সেই গ্রামের বাড়ী বাড়ী দেখাইয়া আনিলেন, সকলেই তাহাদের পূজ্য সন্ন্যাসীর ইতিহাস শ্রবণ করিয়া ধর্মের জয়কীৰ্ত্তন করিতে লাগিলেন। বন্দীকে যখন অমৃতময়ী দেবীর সদরবাড়ীর উঠানে লইয়া যাওয়া হইল, উপরের গবাক্ষপথ হইতে অমৃতময়ী যখন সেই বন্দীর মূর্তি দর্শন করিলেন, পূর্বাপর জীবন- কাহিনীর সংক্ষিপ্ত বিবরণ শ্রবণ করিলেন, ধৰ্ম্মের উদ্দেশে গতবস্ত্রে প্রণাম করিয়া তখন তিনি মনে মনে ভাবিলেন, “এই সেই কলির কন্দর্প ! এই পাষণ্ডের করাল-কবল হইতে ধৰ্ম্মই আমাকে রক্ষা করিয়াছেন; ইহাকে দণ্ড দিবার নিমিত্ত আমাকে কোন চেষ্টা করিতে হইল না, সংসারে যিনি পাপী লােকের দণ্ডবিধানে সর্বময় কর্তা, তিনিই সমুচিত দণ্ডবিধান করিলেন। চিরদিন ধৰ্ম্মের জয়, অধৰ্ম্মের পরাজয়।” যাদবকৃষ্ণ সমাদ্দার ফৌজদারীতে চালান হইয়া গেল, দায়রা জজ সাহেবের বিচারে তাহার দশ বৎসর দ্বীপান্তরবাসের দণ্ডাজ্ঞা হইল। সন্ন্যাসীর চেলাদের কোন অনুসন্ধান হইল না।
No text on this page.
সুখের বাসর
ঐতিহাসিক উপন্যাস
হল”, “শিশমহল, নূরমহল প্রভৃতি গ্রন্থ প্রণেতা
শ্রীহরিসাধন মুখােপাধ্যায়-লিখত
সুখের মাসয় ইতিপূর্থে নং গতি * না মাফিক
পত্রিকায় ধারাবাহিক বানিয়েছি, এই ছবি প্রকাশিত
ফা, ১৩২০ সাল
ফতিষ্ঠা করলে
।
of this book
of the
সুখের বাসর ( ঐতিহাসিক উপন্যাস) প্রথম পরিচ্ছেদ সুনীল গগনের নীলিমার কোলে কেবল কতকগুলি উজ্জ্বল তারা জ্বল জ্বল করিয়া জ্বলিতেছে। গগনে তখনও চন্দ্রোদয় হয় নাই এবং হইবার বিলম্ব নাই, তাই আবার অত আধিপত্য। সমুজ্জ্বল হীরকখণ্ডের মত কোনটা বা খুব জ্বলিয়া উঠিতেছে, আবার কোনটা খুব ক্ষীণপ্রভ হইয়া বিশাল গগনের কলঙ্ক রূপে বিরাজ করিতেছে। আবার কোথাও বা কতকগুলি তারকা ঘােট বাঁধিয়া প্রাণে প্রাণে মিশিয়া নিভৃতালাপ করি- তেছে। আকাশ সম্পূর্ণরূপে মেঘশূন্য। সেদিন যেন মেঘলা মতলব অটিয়াই আকাশে দেখা দেয় নাই, চাতক যেমন মেঘবারি না হইলে পান করে, না—তেমনি মেধগুলা পূর্ণচন্দ্রের সমুজ্জ্বল জ্যোতি ভিন্ন আর কিছুই অঙ্গে মাখিতে চায় না। সেদিন চাঁদ ছিল না—তাই তাহারা এখনও আসে নাই, বােধ হয় চাদ উঠিলে তাহারা নিশ্চয়ই গগনগাত্রে ছড়াইয়া পড়িবে। প্রকৃতি সমীরণ কম্পন বিহীন। শ্যামল বিটপীর একটী পত্রও বিকম্পিত করিয়া তিসুখময় মৰ্ম্মরধ্বনি উঠিতেছিল না। সম্মুখের সমুন্নত ভূধর শীর্বাশ্রিত তরুগুল্মগুলি একটুও সঞ্চালিত হইতে ছিল না। সৰ যেন-নিথর-নিশ-শক্তিহীন। মূল ধারে পর্বতচূড়া শ্যামল বিটপীল দরী, উপত্যক কনা- কল। বেরিয়াছে। সমীরণ প্রবাহবিহীন—সেই ভীষণ অন্ধকারে যেন আরও ভীম মুর্তি ধরিয়া সিংহগড় দুর্গের আদ্যোপান্ত গ্রাস করিয়াছিল। রজনীর দ্বিযাম উত্তীর্ণ প্রায়। সুপ্ত প্রকৃতির বুকে কেহই জাগিয়া নাই। আছে পেচকাদি নিশাচর। তাহাদেরই মৃদু বা দ্রুতগতি গমন সঞ্জাত শুষ্ক পত্র সমন্বিত ভূপৃষ্ঠের উপয় কখন কখন মৃদু শব্দ সমুখিত হইতেছিল। আর সেই শব্দে দুর্গ প্রকারের সর্বোচ্চ চূড়ায় সমধিষ্ঠিত এক যৌবননামুখী বালিকা বিরাট নিস্তব্ধতার মধ্যে একটু যেন কম্পন অনুভব করিতেছিল। সেই বালিকা গৌরাক্তি। সে কান্তির তুলনা নাই - প্রতিদ্বন্দ্বী নাই। সেই কৃতজ্ঞতাময় বিশালায়ত লােচন পলকবিহীন। অবেণী সখদ্ধ মৰ কৃষ্ণ কেশরাশি—পৃষ্ঠাবরণকারী কারুকার্যময় ওড়নার উপর অসংযতভাবে বিক্ষিপ্ত। তাহার মুখে—প্রতিভা--তেজ—উদ্যমও উদ্দী: পনা। রমণীসুলভ চপলতা সে মুখে নাই। সে মুখ যেন মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মত অতি গভীর, বালিকা তাহার উৎসুক দৃষ্টি দূরে-অতিদুরে প্রসারিত করিয়া উৎকণ্ঠার সহিত এক চঞ্চল আলােক শিখার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া মনে মনে বলিতেছিল,—ইত মুসলমান শিবিরের । ঐখানেই ত রাজপুতের শক্ত-শিবিন্ন সংস্থাপন করিয়া আছে। কাশ হয়। এই দুর্গে উপস্থিত হইয়া আমাদের সর্বনাশ করিতে পারে। আমাদেও পথের দিশ কতে পারে। পিতা মহাচিয়- শয্যায় শুইয়া ছটফট করিতেছেন-আর আমি এনে এখানে আসিয়াহি। এ রাজ্যে এমন ৰীর কেহ কি নাই--যে এক্ষণে ঐ মুসল- মান শিবিরের বিনাশসাধন করিতে পারে? এই চিন্তার সহিত বালিকার মুখ হইতে অনুৰে তাহা লেজাৰ বাহির হইয়া পড়িল। বায়ুস্তরে কে যেন প্রতিধ্বনি করিল-“কে কি আইনে এখানে ঐ যুবমান শিবিরের কাগ সাধন করিতে পারে।” {
No text on this page.
=
অপ্সরী পান্নাদেবী
BIRMAN PRESS CALCUTTA
[ সুখের বাসর—৩৯ পৃঃ । ]
সেই গভীর অন্ধকার মথিত করিয়া এক গভীর এর নীচে হইতে বলিল-“পারে। অনেকেরও এয়ােজন হয় না-ইচ্ছা করিলে একজনেই করিতে পারে।” এ কণ্ঠস্বর বালিকার পূর্বপরিচিত। সে যেন এই কণ্ঠস্বরে ব্যাধভ ভীতা হরিণীর ন্যায় চমকিয়া উঠিল। তাহার মুখের ভাব পরিবর্তন হইল। যদি অন্ধকার না হইয়া দিবালােকে এই ব্যাপার ঘটিত, তাহা হইলে যে কেহ সেখানে উপস্থিত থাকিত,সেই দেখিত—ঘৃণায় লজ্জায় সেই কিশােরীর রক্তরাগ রঞ্জিত গণ্ডদেশ আরও আরক্তিম হইয়াছে। বালিকা সেই সমুন্নত দুর্গ প্রকার হইতে-ঘৃণামিতি-স্বরে বলিল,- “পারে। কিন্তু তােমার মত লােকের নিকট এরূপ প্রত্যাশা করা বিড়ম্বনা মাত্র। সেই দুর্গ নিম্ন হইতে যে ব্যক্তি কথা কহিয়াছিল—সে বলিল,- “প্রাণ অতি তুচ্ছ! এ রাজ্য যার বাহুবলে রক্ষিত—সে ইচ্ছা করিলেই সেই বাহুর শক্তিতেই সম্রাটের এ বিশাল বাহিনী নৰ্মা পারে পৌছাইয়া দিতে পারে। কিন্তু কিন্তু পান্না দুর্গ প্রাকার হইতে সেই রমণী বলিল,-“দুর্জয়সিংহ! তোমার স্বর রুদ্ধ হইল কেন ? এক কিস্তুতেই সব শেষ করিলে কেন ? পান্নাকে তুমি চাও! অনেক দিন হইতে তা জানি। কিন্তু মনে ভাবিয়া দে দেখি—তুমি কি পান্নার উপযুক্ত।” দুর্জয়সিংহ বলিল,-“না-স্বীকার করিতেছি—কিছুতেই নয়। পান্না -অপ্সরী-পান্নাদেবী। পান্নার রূপ দেখিয়া-ভুবন মােহিত হয়। আমি জানি-আমি পান্নার উপযুক্ত নই। কিন্তু কিসে তার উপযুক্ত হইব—পান্না যদি একথা খুলিয়া বলে—আমি তাহাই করিব। সহ প্রাণ বলি দিলে—যদি পান্না মতো হয়—আমি তাহাই করি।” গর্বিত। মরালীয় ন্যায় গ্ৰীৰ উন্নত করিয়া সেই দুর্গ প্রাকার হইতে - সুখের বাস। গম্ভীর স্বরে পান্না বলিল—“যদি তাহাই হয় দুর্জয়সিংহ! তাহা হইলে তুমি এখনই—সেনা লইয়া ভীমবেগে ঐ মুসলমান শিবিরের ধ্বংশ সাধন কর। মালবাজের শত্রু ভয় নিবারণ কর। এ কাৰ্যে যদি তােমার জীবন যায়—যুদ্ধে যদি তুমি বীরের গৌরব অর্জন করিয়া মরিতে পার— যদি তােমার মৃত দেহের শােণিতে ধরা রঞ্জিত হয়—জানিও-এই পান্না তােমার মৃতদেহ আলিঙ্গন করিয়া-চিতাবােহন করিবে! পরলােকে তােমার সহিত মিলিত হইয়া-অনন্ত সুখ সম্ভোগ করিবে।” “যদি তাহাই হয়—তাহা হইলে জানিও—পান্না—এ অধম দুর্জয়সিংহ। এক্ষণেই আকবর সাহের স্কাবার ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করিয়া দিয়া আসিবে। বল-পান্না-তুমি যাহা বলিতেছ তাহা তােমার মনের কথা কি না?” পান্না বলিল,-“রাজপুত কন্যারা-কখনও মিথ্যা বলিতে জানে না। যােধসিংহের কন্যা কখনও মিথ্যা বলিতে শিক্ষিত হয় নাই। জানিও দুর্জয়! যখন দেখিব—তুমি বাহুবলে, অসিবলে, মুসলমানের শিবির ধ্বং করিয়া-এ স্বাধীন মানবের ভয় নষ্ট করিয়াছ—যােধসিংহের দুশ্চিন্তা অবসান করিয়াছতথন-তােমার চরণের দাসী হইয়া আত্মবিক্র করিব। নচেৎ-তােমার সঙ্গে এই শেষ সাক্ষাৎ।” দুর্জয়সিংহ কোষ হইতে সুতীক্ষ তরবারি বাহির করিয়া বলিল,- “পান্না—তােমার পিতা আমাকে এই গভীর নিশীথে দুর্গ পরিদর্শনকরিতে নিযুক্ত করিয়াছেন। দাড়াও—পান্না অই খানে। সমস্ত রাত্রি বিনিষ হইয়া-অইখানে বঁড়াইয়া আমার হইয়া এই দুর্গ পৰ্যবেক্ষণ কর। যদি কল্য প্রভাতে মুসলমান শিবির ধ্বংশ করিয়া এই দুর্গে প্রবেশ করিতে পারি, তাহা হইলে তুমি আমার মুখৰ্শন করিও না। পান্না বলিল,-“তাহাই হউক দুর্জয়! আমি ঘৃণা ভুলিব, বিয়া ভুলিব—চিরানুরাগিনী হইয়া তােমার চরণের দাসী হই। কিন্তু যাহা বলিতেছ—তাহা পারিবে কি?
কলির কপ
ভযােগীর গুপ্ত কথা
এমিবা গুপ্ত কথা”, হরিদাসের গুপ্ত কথা প্রভৃতি প্রণেত
শ্ৰীভূবচন্দ্র মুখােপাধ্যায়-লিখিত
विद्या... बागवारिक वासि
बाविसमा
१२, शिव का
कनिरागा
'মুখের বাস। “দোহাই একলিঙ্গের। দোহাই ভগবানের ! আমি বিজ্ৰপ করি নাই, বৃথাগৰ্ব্ব করি নাই। চলিলাম-পান্না ! হাসি মুখে বিদায় দাও।” এই কথা বলিয়া দুর্জয়সিংহ দুর্গ ত্যাগ করিয়া অন্ধকারে মিশাইয়া গেল। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ দুর্জয় সিংহ সেই ভীমাকার মধ্যে মিশাইয়া গেলে, পান্না বহুক্ষণ ধরিয়া এক দৃষ্টে তাহার গন্তব্য পথের দিকে চাহিয়া রহিল বটে- কিন্তু সে ভীষণ অন্ধকারে সে কিছুই দেখিতে পাইল না। সে এক একবার মনে মনে ভাবিল হয় ত দুর্জয় সিংহ তাহাকে স্তোকবাক্যে ভুলাইয়াছে, -আবার ভাবিল, না—তাহা সম্ভব নয়। সে বা আকৃতিতে কুৎসিৎ হইলেও—তাহার হৃদয়ে যথেষ্ট সাহস—বাহুতে যথেষ্ট শক্তি, আর অসির লক্ষ্যও অব্যর্থ। কিন্তু এই স্বল্পপরিমাণ রাজপুত সৈন্য লইয়া সে যে কি করিয়া আকবর সাহের বিশাল বাহিনীর ধবংশ সাধন করিবে—তাহা সে বুঝিয়া উঠিতে পারিল না। পান্না দুর্গ প্রাকারে দাঁড়াইয়া অনেকক্ষণ পর্যন্ত নানা কথা ভাবিল। আবার আশাপূর্ণ নেত্রে, সেই অন্ধকারের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া অক্ষুট- স্বরে বলিল, “যাও দুর্জয়-তােমার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করিয়া আইস। এই সিংহগড়ের সেনাপতি বলিয়া তাের যে দর্প অভিমান, তেজ আছে- তাঁহাতে যৈন তিলমাত্র কলঙ্ক স্পর্শ না করে। ভগবান একলিঙ্গ তােমার প্রাণের আশা পূর্ণ করুন।” পান্না একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া দুর্গ প্রকার হইতে ধীরে ধীরে নীচে নামিয়া আসিল। তাহার সহসা মনে পড়িল,-“দুর্জয় সিংহ বলিয়া ৪২ f; ছিল—যে সেখানে হপবিত্র ভাল পাইয়াছে। সে যদি চলিয়া গেল—তাহা হইলে দুর্গ রক্ষা করিবে কে? তবে কি সে তাহার অধীনস্থ কোন সেনানায়ককে দুর্গ রক্ষার ভার দিয়া গিয়াছে ? যদি তাহা করিয়া থাকে—যদি হৃদয়ের উত্তেজনা বশে সে সহসা চলিয়া গিয়া থাকে তাহা হইলে কি হইবে। নিকটবর্তী প্রান্তরেই যে শত্রু শিবির। এই রাত্রে শত্রু যদি উপযুক্ত অবসর বুঝিয়া দুর্গাক্রমণ করে—তাহা হইলে দুর্জয় সিংহ ভিন্ন তাহা রক্ষা করিবে কে ? তাহার পিতা যখন শুনিবেন, একমাত্র কন্যার নির্বুদ্ধিতার দোষে এই মহাসৰ্ব্বনাশ ঘটিয়াছে—তখন তিনিই বা বলিবেন কি? পান্না এই সব ভাবিয়া উন্মাদিনীর মত হইল—তাহার মাথা ঘুরিতে লাগিল। সেই অন্ধকার বেষ্টিত নিস্তব্ধ মৈশ জগত তাহার চক্ষের সম্মুখে যেন ভাটার মত ঘুরিতেছে। দারুণ মর্ম জালায় কাতর হইয়া, উন্মাদি পান্না দুর্গ প্রকার হইতে নামিয়া পিতাঁর কক্ষে উপস্থিত হইল। পান্না দেখিল তাহার বৃদ্ধ পিতা যৌধসিংহ এক মনে উন্মুক্ত বাতায়ন পথ দিয়া সুনীল আকাশের দিকে চাহিয়া কি দেখিতেছেন! কক্ষ দীপােজ্জলিত। সে উজ্জ্বল আলােকে পান্না দেখিল তাহার বৃদ্ধ পির মুখ বিরস মলিন চিন্তা কাতর—বিষন্ন ভাব সমাচ্ছন্ন। পান্না স্নেহ মধুর-স্বরে হারের নিকট হইতে ডাকিল—“বাবা—কি ভাবিতেছ। এক দৃষ্টে আকাশের দিকে চাহিয়া কি জাবিতেছ”। কু কর কর নি গ6া ফিরি 4:মি অঞ্চন বিএর ই হই.গিয়া: জন নাই। .বৃদ্ধ যােথসিংহ-তিকারমূর্ণরুব্বিশ-পালা । তুমি এখনও কি যাও নাই কেন?”
মুখের বাসর।
৪৩
পান্না কিয়ৎক্ষণ নিরুত্তয় থাকিয়া বলিল, “নিস্ত্রা! কই-সে ত বহুদিন
আমার সঙ্গ ত্যাগ করিয়াছে।হায়! হায়! কেন পিতা আমি তাের
করা হইয়া জন্মিয়াছিলাম।”
বুদ্ধ বোধসিংহ দেখিলেন—পারার কম গম্ভীর। তাহার মুখের
দিকে চাহিয়া দেখিল-তাম.নয়মে কৰা খেলিংহ কন্যায়
চক্ষে অশ্রুধাজ দেখিয়া চমকি উঠিলেন। তাই সব চিতা, সফল
দুর্ভাবনা যেন সেই অশি কোজা ভাই হইয়া গেল। হিমি
কন্যাকে নিজের কাছে বসাইয়া উত্তরীয় অল্প তাকায় গত প্রাহী
অশ্রুধারা মুছাইয়া দিলেন। তার পর সস্নেহ, স্বয়ে বলিলেন, “কে
পাঞ্জা! কাদিতেই কেন?”
পান্না বলি, “নে সন্তান পিতার ই মােচন করিতে পারে না,
যে সন্তান দুর্ভাবনা কাতর বিপাপ শিঙ্গর মনের শচিন তার
লইতে পারে না -তাহার সানই বৃথা! এই বৃদ্ধ বলে কোথায়
আপনি শান্তি সুৰ সজোজে দিন কাটাইকোেহা না হইয়া
আপনার এ দুর্দশা। এই রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর আগৰু সামা কি,
প্রজাকুল সুখে ঘুমাইতেছে-আম আপমি আাশের দিকে চাহিয়া বিনি
নেত্রে রাত্রি যাপন করিতেছেন।
শােধসিংহ বলিলেন, “ম! এজন্য ত তুমি দায়ী নও। আমি আর
নিজক ফল ভোগ কল্পিতেহি। সেই ক্ষতি কুলায়ম। মনসিংহ
তােমার রূপ দেখিয়া মিহি চিত্তে, তেময় পঞ্জ বরণজিবা
জন দূত ইয়াছিল--তখৰ খছি আমি সে দুতকে অবমাননা না করি,
কঠোর হয়ে কাজের কেবি ফরিহ. হইলে
আমার আজ এ বিপজ উপস্থিত হয় না। কিন্তুাযহা ইৰায় ভাঙ্গ
হইয়া গিয়াছে। এ জগতে বা ইয়াছে তাহাতে:কিন্নাইতে
কেহই সক্ষম নয়। আমার ক ল আমি" মােগ করিতেছি--তাহত
৪৪ বনা-কল্লোল। তােমার অপরাধ কি মা? যাও, রাত্রি অধিক হইয়াছে-শয়নকক্ষে যাও।” পান্না কিয়ৎক্ষণ ধরিয়া কি ভাবিয়া বলিল, “পিত-মানসিংহের সহিত সন্ধি করিলেও সব হাজাম মিটিয়া যায়। আর আমি আপনার কষ্ট দেখিতে পারি না। আমার অনুরােধ -আমার কাতর প্রার্থনা সেই অম্বররাজকে এক্ষণে বলিয়া পাঠান যে—আপনি আমাকে তাঁহার কাছে সমর্পণ করিতে প্রস্তুত। তাহাতে আপনার রাজ্য—প্রাণ-সম্পদ —শান্তি সবই রক্ষা পাইবে। নিজের কর্ম ফলই যদি তাহার জন্য নিয়ন্ত। হয়—আপনি এই মাত্র যাহা বলিলেন-তাহা যদি সত্য হয়- পিতা- পিতা-আমায় মানসিংহের হাতে তুলিয়া দিন। না-দেন, আমি স্বেচ্ছায় তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া আত্ম সমর্পণ করিব। ধিক! এ সন্তান জীবন ধিক এ নারী জীবন! যদি পিতার কষ্ট মােচন করিতে না পারিলাম।” যােধসিংহ এই কথায় বিস্ময় বিস্ফারিত লােচনে পান্নার মুখের দিকে চাহিয়া দেখিলেন। তৎপরে ভীষণ স্বরে বলিলেন-“না-না-তা হইতে পারে না। হইতে দিব না। যতক্ষণ এ দেহে এক বিন্দু শিশলাদিয়া শােণিত কণা থাকিবে—ততক্ষণ হইতে দিব না--যতক্ষণ এ প্রাণের স্পন জন্মের মত না থামিবে, ততক্ষণ হইতে দিব না। পান্না। হতভাগিনী, তুই কি ভুলিয়া গিয়াছিস-যে রক্তে মহারাণা প্রতাপের জন্ম, তাের পিতার দেহে মজ্জার অস্থিতে ধমনীতে সেই শােণিত স্রোত প্রবহমান। যদি তুই এ ঘৃণিত কাৰ্যে অগ্রসর হােস, বুঝিব তুই আমার ঔরসজাত কন্যা নস্। যে মুহুর্তে দেখিব—তুই নীচ কার্যে অগ্রসর হইয়াছিল, সেই মুহুর্তে এই তীক্ষ্ণ চুরিকা তাের বুকে আর আমার বুকে বসাইয়া দিয়া সকল যাতনা, সকল কলঙ্কের অবসান করিব। তােকে মানসিংহের হন্তে তুলিয়া দেওয়া অপেক্ষা ব্যহত তাের মৃত্যু ঘটান আমি শেরঃ বলিয়া বিবেচনা করি।
সুখের বাসর,। ৪৫ পান্না পিতার এ ভীষণ প্রতিজ্ঞাবাণী শুনিয়া মনে মনে শিহরিয়া ধীরে ধীরে বলিল,-“পিতঃ! আমার নিজের কোন স্বার্থ লইয়াই আমি এ প্রস্তাব করি নাই। যাহাতে আপনার রাজ্য রক্ষা হয়, এ বৃদ্ধ বয়সে আপনার রাজ-সম্মান বজায় থাকে—যাহাতে শক্ত হস্তে আপনার শােচনীয় মৃত্যু না ঘটে, তাহার জন্যই আমি এ কথা বলিয়াছি।” যােধসিংহ তখনও আহত সর্পের ন্যায় ক্রোধে ফুলিতেছিলেন । কন্যার এই কথা শুনিয়া দৃঢ় প্রতিজ্ঞাব্যঞ্জক স্বরে বলিলেন,-“পান্না! রাজ্যসুখ অনেক ভােগ করিয়াছি। ক্ষত্রিয় রাজগণ আমার বয়সে বান- প্রস্থ অবলম্বন করেন। ক্ষত্রিয়, শত্রু হস্তে প্রাণ দিতে কখনই ভীত হয় না। মৃত্যু ? কি মৃত্যুভয় দেখাইতেছ পান্না। জীবনের সুখময় যৌবন সময়ে যে যােধসিংহ অসিহস্তে রণক্ষেত্রে প্রতাপের পাশে পাশে থাকিয়া, রাজপুত-গৌরব রক্ষা করিয়া আসিয়াছে, সে কখনও মৃত্যুকে ভয় করে না। রাজ-সম্মান, রাজ্য, ঐশ্বৰ্য্য, সব নর্মদা সলিলে নিমগ্ন হউক, তাহাতে এ বৃদ্ধ যােধসিংহ কিছুতেই কাতর হইবে না। সংসারে আলাে আঁধার ছাড়া যেমন আর কিছুই নাই, সেইরূপ মানব ভাগ্যে সুখ ও দুঃখ ছাড়া আর কিছুই নাই। সমগ্ৰ মেবারের মহারাণা প্রতাপ সিংহ যখন রাজকক্ষের বিলাস, স্বর্ণময় পাত্ৰে আহাৰ্য্য ত্যাগ করিয়া, পর্ণশয্যায় শুইয়া, মৃত্তিকার উপর বজরার রুটি খাইতে পারিয়াছিলেন—তখন সেই বংশে জন্মিয়া, আমি যে রাজ্যচ্যুতির সামান্য কষ্ট সহ্য করিতে পারিব না, তাহা মনে করিও না; মা। তুমি বালিকা,এ সব বিষয়ে যােধসিংহ বালিকার পরামর্শ প্রার্থী নন। আমার দক্ষিণ বাহু ধরূপ দুর্জয় সিংহ বৰ্ত্তমান থাকিতে আমার কোন ভয়ই নাই।" পান্না বলিল, সত্যই তাই পিতা ! আপনাকে দুর্জয়ের শক্তি সাহসের কথা বলিতেই আসিয়াছিলাম।” এই বলিয়া পান্না সেই রাত্রের সমস্ত ঘটনা পিতার নিকট অকপটে ' ব্যক্ত করিল।
কল্পনা-কল্লোল। *পান্না। যােধসিংহ সমস্ত কথা শুনিয়া মাথায় হাত দিয়া রুষ্ট স্বরে বলিলেন সর্বনাশ! কেন তুই আমার কন্যা হইয়া জন্মিয়াছিলি! কেন কন্যা হইয়া তুই পিতার এ সর্বনাশ করিলি! কেন তুই আমার দক্ষিণ বাই ভাঙ্গিয়া দিলি ! দুর্জয় ! দুর্জয় ! করিলে কি! এক সংসায় জ্ঞান হীনা রাজপুত তেজ দর্পিতা বালিকার কথা শুনিয়া তুমি ভীষণ বিপদের মুখে আত্মসমর্পণ করিলে ! পান্না ! পান্না ! তুই আমার সম্মুখ হইতে দুরুহ।” এই বলিয়া বােধসিংহ উন্মাদের ন্যায় সেই কক্ষ ত্যাগ করিলেন। পান্না পিতার এ অবস্থা দেখিয়া ভীত ও স্তম্ভিত ! সে নির্বাক নিশ্চল এতিমার ন্যায় সেই কক্ষ মধ্যে দাঁড়াইয়া কত কি ভাবিল। কিন্তু সে ভাবনার কুল কিনারা নাই। তাহার কষ্ণায়ত শােচন যুগল অশ্রু ভারাক্রান্ত হইল। সে আশু সেই উদ্বেগ উত্তেজিত, আরক্ত গণ্ডের উপর দিয়া ধীরে বহিয়া হৰ্মতল আদ্র করিল। রূপসম্পদমঙ্গী-মহিমা- অরী, রাজপুতকুল-গৌরব-প্রদীপ্ত-চিত্ত পান্না, সেই হৰ্ম্মতলে বসিয়া উর্ধনেত্রে, যুক্তকরে—বলিল-“হে বিকালেশ্বর ! হে শিশােদিয়ের কুল দৈবতা-ভগবান একলিঙ্গ—দেখিও যেন দাসীয় দর্প চূর্ণ না হয়। দুর্জয় সিংহের বীর দর্প অসার বাণীতে পরিণত না হয়, তাহার পিতা যেন এ খাকে কোন কষ্ট না পান ” আমাসেই হলে বসিয়া খুব কদিল। তাহাতে তাহার হৃদয়ের ভার লাঘব হইল। কিন্তু কেহ তাহাকে সান্তনা করতে আসিল না, কারণ সে মাতৃহীনা এই ভাবে নিশ্চল প্রতিমার ন্যায় পান্না সেই দীপােজ্জলিত কক্ষতলে বসিয়া মৰ্ম্ম জ্বালায় জ্বলিতেছে -এমন সময়ে তাহার বৃদ্ধা ধাত্রী আসিয়া হয়ে তাহার অঙ্গ স্পর্শ করিয়া বলিল, “পান্না মা! কাদিতে কেন ? রাত্রি যে দুই প্রহর হইয়া গিয়াছে। শয়ন করিবে এস।”
সুখের বাসর । ৪৭ পান্না উঠিয়া দাঁড়াইল। তাহার চক্ষের অশ্রুধারা ওড়না দ্বারা মুছিয়া ফেলিয়া বলিল,-“দাই ! আমার একটা উপকার করিতে পারিবি? • “কি উপকার মা ?” আমায় এই রাত্রে একবার দুর্গের বাহিরে লইয়া যাইতে পারি? “কেন?” “আমি পাহাড়ের ওপারে মহাদেবের মন্দিরে পূজা দিয়া আসিব।” “কি সর্বনাশ ! পান্না তুমি কি পাগল হইলে মা! পাহাড়ের ওপারেই ত দুষমন্ ছাউনি করিয়াছে।” আমি ত দুষ,মনের কাছে যাইতেছি না।” “তা না হইলে ত্রিকালেশ্বরের মন্দিরের এক রশি দূরে তারা ছাউয়ি করিয়াছে, আর এরল্পে ত তুমি দুর্গের বাহিরে যাইতে পারিবে না।” “কেন আমার পিতার দুর্গ, তাহার কন্যার স্বাধীন গতিতে বাধা দিয়ে কে? “তুমি শােন নাই”—রায় রাণার হুকুম, সেনাপতি দুর্জয় সিংহের হুকুম, রাত্রে কোন লােক দুর্গ হইতে বাহির হইতে পারিবে না। স্বয়ং রাণা যুদি বাহিরে যান, তাহা হইলে তাহাকেও প্রহরীঙ্গা আটক করিবে। পান্না বুঝিল, দুর্জয় সিংহ চলিয়া গেলেও সে দুর্গ রক্ষার সুবন্দোবস্তু করিয়াই গিয়াছে। ইহাতে তাহার বড়ই আনন্দ হইত, প্রাণের চিন্তা অনেকটা কমিয়া আসিল। পান্না বলিল-“চল দাই। তবে আমরা শুইগে যাই।” উভয়ে শয়ন কক্ষে গেল।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ ভীষণ অন্ধকার রাশি মথিত করিয়া দুর্জয় সিংহ মনের দারুণ উত্তেজনায় উন্মাদের মত অগ্রসর হইয়াছে। তাহার দিকবিদিক জ্ঞান নাই। অপরিমেয় মােগল সৈন্য সেই পৰ্বতের অপর পার্শ্বে ছাউনি করিয়াছে। আর দুর্জয় সিংহ এক। সেই মােগল স্কন্ধাবারের দিকে ধাবমান। সঙ্গে একটা মাত্র সেনা নাই, খালি কটিদেশে আবদ্ধ শাণিত তরবারি তাহার সহায়। তবে কি দুর্জয় সিংহ উন্মাদ ! তবে কি তাহার মনে কোন গূঢ় উদ্দেশ্য প্রচ্ছন্ন ভাবে নিহিত! কি করিয়া জানিব ! আমরা ত কিছুই বলিতে পারি না। দুর্জয় সিংহ মনে মনে ভাবিতেছে, “পান্না! যা প্রতিজ্ঞা করিয়া আসিয়াছি, তাহা সম্পূর্ণ না করিয়া আর তােমার মুখ দেখাইব না। তােমার মত সুন্দরী শ্রেষ্ঠার জন্য আমি সব করিতে পারি। জাননা পান্না ! আমার হৃদয়ের মধ্যে তােমার ও মনােমােহিনী বিশ্ববিমুগ্ধকারিণী সৌন্দর্য্যের ছবি আমি কত গভীর ভাবে আঁকিয়াছি! আমি জানি কুরূপ কুৎসিৎ বলিয়া তুমি আমায় ঘৃণাকর। কিন্তু আমি তােমায় চাই ! যে উপায়ে পারি তােমায় লাভ করিব। তােমায় না পাইলে এ তুচ্ছ জীবনে আমার কোন প্রয়োজনই নাই । সমস্ত জগৎ সংসার একদিকে—আর তুমি একদিকে!” দুর্গ হইতে দুই রশি আসিয়া দুর্জয় সিংহ একবার মুক্ত গগনের দিকে করিল। সে দেখিল যে অনন্ত সীমাহীন নীল গগন ছাইয়া, নিত্য যেমন তারা রাশি ফুটিয়া থাকে, সেদিনও তাই! নৈশ সমীরণ, নির্জনে ২২ মুখের বাসর । ৪১ } প্রস্ফুটিত কুসুম স্তবকের সুগন্ধ অপহরণ করিয়া যেরূপ ধীর ভাবে নিত্য বহিয়া থাকে, সেদিনও তাই! জগতের একটা সামান্য ঘটনারও ব্যতিক্রম হয় নাই। জগত নিত্য যেমন চলে সেই রূপই চলিতেছে! কিন্তু তাহার প্রাণে মহাবিল্পব । সুনীল আকাশের জ্বলন্ত তারাগুলি বিদ্রুপের হাসি হাসিয়া বলিতেছে, ‘উন্মাদের মত কোথায় যাইতেছ দুর্জয়সিংহ! অসংখ্য সৈন্য পরিবেষ্টিত শত্রু শিবিরে তুমি একা গিয়া কি করিবে! তােমাকে দেখিতে পাইলেই তাহারা বন্দী করিবে, হত্যা করিবে। তােমার শীতল শােণিতে মালবের উপত্যকা রঞ্জিত হইবে। এ আত্মবলি ত 'প্রশংসার নয়। তার চেয়ে কেন প্রকাশ্য যুদ্ধে সমরাঙ্গণে দেহ ত্যাগ করিয়া বীরের গৌরব লাভে যশস্বী হও না!” নৈশ সমীরণ যেন-বিদ্রুপ করিয়া বলিতেছে, পান্না না হয়— পরমাসুন্দরী, কিন্তু তুমি এত স্বার্থ লােলুপ যে, সামান্য রূপ-তৃষ্ণায় কাতর হইয়া পান্নার জন্য নিজের সর্বনাশ—প্রভুর সর্বনাশ-পান্নার সর্বনাশ করিতেছ ! আকবর সাহের সেনাপতি এত নির্বোধ নহেন-যে তােমার কথায় ভুলিবেন। তােমার মনের সংকল্প ত্যাগ কর-এখন-পান্নাকে ভুলিয়া যাও। কর্তব্যের জন্য কর্তব্য কর। প্রভুর কাৰ্যে জীবন উৎসর্গ করিয়া শত্রুকে পরাস্ত কর। জয়লক্ষ্মী যখন তােমার গলদেশে স্বহস্তে গৌরব-মাল্য পরাইয়া দিবেন--তখন দেখিবে—পান্না ত কোন্ ছার-- তার চেয়েও শত শত সুন্দরী তােমার পদ প্রান্তে লুণ্ঠিত হইবে।” কল্পনার খেয়ালে—দুর্জয় সিংহ এইরূপ ভাবিতে ভাবিতেই যাইতেছিল, সম্মুখের দিকেই তাহার দৃষ্টি আবদ্ধ। কিন্তু সে বড়ই অন্যমনস্ক। চিন্তা- পীড়িত হৃদয়ে অন্ধকারে অগ্রসর হইতে হইতে সহসা সে উপত্যকার এমন এক স্থানে আসিয়া পৌছিয়াছে যেখান হইতে ভীষণ জলকল্লোল শ্রত হইতেছে।
কানা-কল্লোল। এ গভীর গর্জন কার! এত নর্মদার হৃদয় ভেদী সলিল ধারার প্রবল শব্দ। আর একটু অগ্রসর হইলেই যে পাহাড় হইতে তাহাকে নীচে নদীগর্ভে পড়িতে হইত। কি সর্বনাশ! সে মনের আবেগে, উত্তেজনায় পথ ভুলিয়া ভিন্ন পথে আসিয়া পড়িয়াছে। সেই নৈশান্ধকার প্লাবিত নির্জন উপত্যকার মধ্যে দাঁড়াইয়া দুর্জয় সিংহ ভাবিতেছে,—“হায় করিলাম কি ? পথ নির্ণয় করতে না পারিয়া কোথায় আসিয়া পড়িলাম। মনের আবেগে-উত্তেজনায়—আমি যে ঠিক বিপরীত পথেই আসিয়াছি। নৈশান্ধকার দুর্জয় সিংহের এ মতিভ্রম দেখিয়া যেন আরও বিকট মূর্তি ধারণ করিল। সেই ভীমান্ধকারের মধ্য হইতে প্রেতগণ ভীষণ অট্টহাস্য করিয়া যেন তাহাকে বিদ্রুপ করিতে লাগিল। দুর্জয় সিংহের বীর-হৃদয়—যেন সে কঠোর হাতে কঁপিয়া উঠিল। কল্পনার খেয়ালে দুর্জয় সিংহ শুনিতে পাইল যেন-কে তাহার পশ্চাতে পশ্চাতে আসিতেছে। সে অসি কোষ মুক্ত করিয়া—সেই খানে স্থির হইয়া দাঁড়াইল! হায় । হায়! সবই-উন্মাদের বিকৃত খেয়াল ! সহসা সেই ভীমান্ধকারে এক-পুষ্প কোমল হস্ত পশ্চাদিক হইতে তাহার পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করিল। দুর্জয়সিংহ—সে স্পর্শে বিস্মিত—চমকিত হইয়া উঠিল। সে ভাবিল—হয়ত পান্না প্রচ্ছন্ন ভাবে কাহার কাৰ্য্য- কলাপ দেখিবার জন্য-অনুসরণ করিয়াছে। দুর্জয়সিংহ—উত্তেজনাপূর্ণ কণ্ঠে বলিল, “কে তুমি! স্পর্শে বুঝিতেছি কোন স্ত্রীলােক। হা- আপনার অনুমান সত্য।” “এ অন্ধকারে তুমি এখানে দাঁড়াইয়া কি করিতেছিলে ? “তোমার গতিবিধি লক্ষ্য করিতেছিলাম।” “তুমি—তুমি পান্না ! না-না—আমি ত পান্না, কঠর চিনি।
মুখে বাসর।. তুমি বল দেখি—আমি কে?” “ঠিক বলিতে পারিলাম না।” “আমি বলিব -তুমি কে?” *কখনই পারিবেনা।” “যদি—পারি !” “তােমার সহিত তর্ক করিবার আমার সময় নাই।” “তুমি দুর্জয়সিংহ! তুমি পথভ্রান্ত—দুরাশা তাড়িত-সেনাপতি দুর্জয়সিংহ।” দুর্জয়সিংহ—এক অপরিচিতার মুখে তাহার নাম শুনিয়া অতিশয় চমকিত হইলেন! এ কি বিষম সমস্যা ! কে এ? দুর্জয়সিংহ-উৎকণ্ঠার সহিত শুকণ্ঠে বলিল, “কে তুমি! তুমি দেবী না মানবী।” “আম িসামান্য মানবী।” “কণ্ঠস্বরে বুঝিতেছিলুম যুবতী! তুমি এত রাত্রে—এই নির্জন উপ- ত্যকায় আসিয়াছ কেন ? “তােমার সাহায্য করিতে। “আমার সাহায্য করিতে ?” “—তুমি মােগল-শিবির ধ্বংস করিবার প্রতিজ্ঞা করিয়াছ।” “তাহাতে তুমি আমার কি সহায়তা করিবে ?” “তুমি যােদ্ধা ও বীর হইলে কি হয়—একটী নিরেট মূখ—জান না- রমণী না হইলে পুরুষের কোন কাজই হয় না।” স্বীকার করিতেছি। কিন্তু এ কাৰ্যে তােমার স্বার্থ কি ? “তােমার মত আমি স্বার্থের অত উপাসনা করি না। আমি এখন নাম্বার্থে তােমার উপকার করিব।” কেন? - না-কােল। “আমি রাজপুত-কন্যা। তুমি মােগল স্কবার ধ্বংস করিবে প্রতিজ্ঞা করিয়া আসিয়াছকিন্তু সঙ্গে তােমার একটা লােক নাই। আর মােগলের অক্ষৌহিণী সেনা, তােমার উদ্দেশ্যের স্থিরতা নাই—মতিগতির ঠিক নাই। তুমি লক্ষ্যহীন। “তুমি—দেবী! জানি না তুমি কে ? কিন্তু যেই হও—তােমার শক্তি অসামান্য। বল-বল-তুমি কে?” “আমি যেই হই—সে পরিচয়ে তােমার প্রয়ােজন নাই। পরে পরিচয় লইও। তােমার বাহুতে শক্তি আছে-প্রাণে সাহস আছে- প্রতিজ্ঞা করিয়া সত্য রক্ষা করিবার নিবন্ধ আছে। কত সেনা হইলে- তুমি মােগল স্কন্ধাবার বিধ্বস্ত করিতে পার।” মাত্ৰ-পাঁচ শত।” যদি—তাই তােমায় দিই। তােমার কাছে আজীবন ক্রীতদাস হইয়া থাকিব। “তাহা হইলে পান্নার দশা কি হইবে।” এ তীব্র বিজপে-দুর্জয়সিংহের মৰ্ম্মে আঘাত লাগিল। সে আরও বিস্মিত হইল! ভাবিল, “কে এ অদ্ভুত রমণী ! যে তাহার সকল গুহ কথা জানে—অথচ সে তাহাকে চেনে না। একি তবে মন্ত্রসিদ্ধ পিশাচী। এই অন্ধকারমণ্ডিত নির্জন উপত্যকায় প্রেতযােনির আগমনও অসম্ভব = সেই রমণী বীণা বিনিন্দিত স্বরে বলিল, “দুর্জয়সিংহ! রাজপুত হইয়া রাজপুতকে সন্দেহ করিও না!—আমি প্ৰেত নই—পিশাচ নই- সামান্য মানবী! তুমি বিনা সন্দেহে আমার পশ্চাৎবর্তী হও।” দুজয় সিংহ-বীরত্বাভিমানী। কাজে কাজেই সেই অপরিচিত রমণীর এ প্রস্তাবে অমত করিতে পারূিল না। সে মন্ত্রমুগ্নভাবে বলিল, “চল, তোমার সঙ্গেই যাইতেছি।”
সুখের বাসর । সেই রমণী অগ্রে অগ্রে চলিল, দুর্জয় সিংহ তাহার পশ্চাতে। পথ ক্রমশঃ সংকীর্ণ ও জটিল-রমণী বুঝিল—দুর্জয়সিংহের মুক্তভাবে চলিবার বাধা উপস্থিত হইয়াছে। আর দুর্জয় সিংহ মনে মনে ভাবিল, এ প্রতিনী না হইয়া যায় না—নতুবা এই ভীষণ অন্ধকারে বিড়ালীর মত পথ চিনিয়া যাইতেছে কিরূপে।” দুর্জয় সিংহের মনােভাব বুঝিয়া সেই অপূৰ্ব্বদৃষ্টা রমণী বলিল, ‘দুর্জয়সিংহ! তুমিও যেমন তরবারি লইয়া আসিয়াছ—আমিও তেমনি—বর্ষা আনিয়াছি। তুমি আমার বর্ষার এক প্রান্ত ধর। তাহা হইলে তােমার পথ চলিবার কোন কষ্ট হইবে না।” দুর্জয় সিংহ স্পর্শ শক্তি দ্বারা সেই রমণীর হস্তস্থিত বর্ষার একদিক ধরিল। রমণী আবার পথ চলিতে লাগিল। পথের আর শেষ হয় না। পার্বত্য পথে চলিতে বড় বেশী সময় লাগে—বড় বেশী কষ্ট! দুর্জয় সিংহ বিনা বাক্যব্যয়ে অনেক দুর আসিয়া বলিল, “আর কতদুর সুন্দরী।” কেন ভয় হইতেছে নাকি। “ভয়-কাহাকে বলে—বাল্যকাল হইতেই জানি না—কিন্তু আমি বড়ই ক্লান্ত হইয়া পড়িতেছি। “আর বেশী দূর নাই। আমি আমার আশ্রয় স্থানের নিকটে আসিয়াছি। দুর্জয় সিংহ! প্রতিজ্ঞা কর-আজ পান্নার নিকট যে প্রতিজ্ঞা করিয়া আসিয়াছ তাহা সাধ্যমতে পূরণ করিবে।” দুর্জয় সিংহ বলিল—“আমি অন্য উপায়ে আমার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করিতে যাইতেছিলাম। কিন্তু তুমি আমায় অন্যপথে আমিয়াছ। পানি —তােমার উদ্দেশ্য কি?, আর তােমার সহায়তায় আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধি কতদুর হইবে।”
কানা-কল্লোল।
রমণী এ কথায় কোন উত্তর না দিয়া স্থির হইয়া এক গুহার সম্মুখে
বংশীবাদ করিল।
সেই বংশীনাদ শুনিয়া সেই জঙ্গল হইতে পঞ্চাশ জন লোেক
বাহির হইয়া—বলিল, “মা ! তােমার জন্য আমরা ভাবিতেছিলাম। এত
বিল হইল কেন?”
রমণী প্রভুত্ববঞ্জক স্বরে বলিলেন, “পরে সব কথাই জানিতে পারিবে।
তােমরা স্বস্থানে যাও। প্রস্তুত হইয়া থাক। আমার সঙ্কেত শব্দ
শুনিলেই বাহিরে আসিবে।
প্রেতের মত সেই পঞ্চাশ জন লােক-সেই পৰ্ব্বতের গভীর অন্ধকারে
অদৃশ্য হইয়া পড়িল।
রমণী বলিল, “দুর্জয় সিংহ! এখন তােমার
বিশ্বাস হইয়াছে।”
দুর্জয় সিংহ বলিল, “জানি না—আপনি কে? কিন্তু এ পর্যন্ত
যাহা কিছু দেখিলাম—সবই অদ্ভুত। এখন আমায় কি করিতে হইবে।
আমার সঙ্গে-নিঃশঙ্ক চিত্তে এ গুহায় প্রবেশ কর।*
দুর্জয় সিংহকে সঙ্গে লইয়া সেই অদ্ভুত রমণী গুহামধ্যে প্রবেশ
করিল।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ সেটি সত্য সত্যই ক্ষুদ্র গুহা নয়। তাহার প্রবেশ পথট ফু ক্ষুদ্র গুহাদ্বারের মত বটে! কিন্তু কিছুদূর অগ্রসর হইয়াই-দুর্জয় সিংহ দেখিল—একটা সুন্দর ক্ষুদ্র রাস্তা—সেই গুহামুখ হইতে বরাবর চলিয়া গিয়াছে। আর তাহার আশে পাশে কয়েকটা ক্ষুদ্র প্রস্তরময় গৃহ মধ্যে একটা ক্ষুদ্ৰ চত্বর। সেই ক্ষুদ্র গুহার অভ্যন্তর ভাগ—আলােকিত । সে আলোক তত উজ্জ্বল ও প্রখর নহে। তবু তাহাতে আশ পাশের যাহা দেখা যাইতেছে, তাহা হইতে বােধ হয়—তাহা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সেই অপরিচিতা রমণী আলােকিত স্থানে পৌঁছিয়াই অবগুণ্ঠন টানিয়া দিয়াছে। তাহার বেশ ভূষার বিশেষ কিছু পারিপাট্য নাই। সুনীল বসনে তাহার সেই সুন্দর দেহষ্টি সমাবৃত। কিন্তু হইলে কি হয়-বহ্নি যেমন বস্ত্রাবৃত হইলেও প্রচ্ছন্ন থাকে না।—সেই দেহের রূপরাশিও সেইরূপ সেই নীল বসন ভেদ করিয়া বাহির হইতেছিল রমণী চত্বর সমীপবর্তী এক গৃহে আসিয়া বলিল, “আপনি এইখানে বিশ্রাম করুন—অতিথি পরিচর্যার কোন ক্রটিই হইবে না।” দুর্জয় সিংহ একদৃষ্টে সেই রমণীর কাৰ্যকলাপ দেখিতেছিল। তাহাকে চিনিবার অনেক চেষ্টা করিতেছিল--স্মৃতিসমুদ্র মথিত করিয়া অতীতের অনেক কথাই স্মরণ করিতেছিল-কিন্তু কোন কিছুই স্থির করিতে পারিল না। সেই রমণীর ইঙ্গিতে-এক পাৰ্বতীয়া রমণী-কিছু সুমিষ্ট ফল, মিষ্টান্ন, দুগ্ন আর জল সেইখানে রাখিয়া গেল। রমণী বলিল, “মহাশয়। আপনি পথভ্রান্ত-কিছু আহার করুন।
কল্পনা-কল্লোল। দুর্জয় সিংহ বলিলেন, “মুরি! এ আতিথেয়তার সময় নয়। রজনী শেষ হইয়া আসিতেছে। আমি পান্নার নিকট যে প্রতিজ্ঞা করিয়া আসিয়াছি—তাহ পূর্ণ করিতে হইবে। রমণী একটু বিদ্রুপের সহিত বলিলেন-“আপনি জানেন, যে আমিও প্রতিজ্ঞা করিয়াছি যে আপনাকে সাহায্য করিব।” দুর্জয় সিংহ বলিল,-“সত্য। কিন্তু কি উপায়ে যে আপনি আমায় সহায়তা করিবেন তাহা বুঝিতে পারিতেছি না। আপনার সকল কাৰ্যই রহস্যময়-প্রহেলিকাময় বলিয়া বােধ হইতেছে। রমণী বলিল, “বড় দুঃখের বিষয় যে আপনার সহিত এত কথা কহিতে হইতেছে ! আপনি কিছু আহার করুন—ঠিক সময়েই আমি আপনাকে এ গুহার বাহিরে লইয়া যাইব।” দুর্জয় সিংহের হৃদয়ের তখন দারুণ উত্তেজনা। সে উত্তেজনায়, চিন্তায় তাহার কণ্ঠ শুষ্ক। প্রাণ তৃষ্ণায় জ্বলিয়া যাইতেছে। কে যেন গলিত ধাতুস্রাব তাহার কণ্ঠে ঢালিয়া দিতেছে। দুর্জয় সিংহ দারুণ তৃষ্ণার, সদাচারের মর্যাদা রক্ষার জন্য সেই ফল- গুলি আহার করিল। তারপর সুশীতল বারি পান করিয়া আত্মার তৃপ্তিসাধন করিল। দুর্জয় সিংহ একদৃষ্টে সেই রমণীর দিকে চাহিল। কিন্তু অবগুণ্ঠন ভেদ করিয়া তাহার ভিতরে যে কি আছে তাহা দেখিতে পাইল না। সেই অপরিচিতা রমণী দুর্জয় সিংহকে পার্শ্বের একটা গৃহ দেখাইয়া দিয়া বলিল- ঐ গৃহে একটা বিছানা আছে, একটু বিশ্রাম করুন আমি আসিতেছি।” দুর্জয় সিংহ বলিল, “আমি আপনার কাৰ্য প্ৰণালী ত কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। এখন ত আমার বিশ্রামের সময় নয়। আমি ঠিক বুঝিতে পারিতেছি না— মমণী দর্পিত ভাবে গ্রীবা উন্নত করিয়া বলিল, “মহাশয়! আপনি রাজপুত সুখের বাসর। হইয়াও যে রাজপুতকে অবিশ্বাস করিতেছেন ইহাই রহস্যের কথা। আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করুন। যদি মনে করেন আমি আপনার শত্রু, তাহাহইলে বুঝিয়া রাখুন যে স্থানে আপনি আসিয়াছেন, সেস্থান হইতে আপনার উদ্ধারের কোন উপায়ই নাই।” রমণী আর কিছু না বলিয়া দ্রুতপদে সেস্থান হইতে চলিয়া গেল। দুর্জয় সিংহ মনে মনে ভাবিল, ব্যাপার কি কিছুতেই বুঝিতে পারিতেছি না। বনের মধ্যে দুইশত রাজপুত সেনা প্রচ্ছন্ন ভাবে থাকিতে আদেশ দিয়া আসিয়াছি, তাহারা হয়ত এতক্ষণ আমার অপেক্ষায় থাকিয়া আশাহীন ও নিরুৎসাহ হইয়াছে। হয় ত ভীম প্রতাপ মােগলগণ তাহাদের সন্ধান পাইয়া তাহাদের শােণিতে এই নির্জন উপত্যকা রঞ্জিত করিয়াছে। যতই সময় যাইতেছে দুর্জয়সিংহ ততই অধীর হইতেছে। এমন সময়ে সেই রাজপুত রমণী তথায় আসিয়া দেখা দিল, বলিল, “মহাশয়। আমার সঙ্গে আনুন। আর আপনার বিশ্রামের প্রয়ােজন নাই। দুর্জয় সিংহ আবার মন্ত্রমুগ্ধবৎ তাহার পশ্চাৎবর্তী হইল। আবার সেই প্রাঙ্গণ পার হইয়া সেই গুহার বাহিরে আসিল। বাহিরে আসিয়া সে যে দৃশ্য দেখিল, তাহাতে বিস্মিত, মােহিত ও চমকিত হইল। দুর্জয়সিংহ দেখিল সেই ক্ষুদ্র উপত্যকার আশেপাশে মশাল আলােক উজ্জ্বলিত। | অধিত্যকা ভূমিতে পৰ্ব্বতের পার্শ্বে গাত্রে উর্কে অধে সহস্র সহস্র ভীলসৈন্য সজ্জিত হইয়া আছে। উপত্যকার স্থানে স্থানে মশালের আলো জ্বলিতেছে, সেই ক্ষীণ আলােকচ্ছটা সেই সব সেনার মুখে প্রতি ফলিত। তাহাদের দক্ষিণ হন্তে বর্ষা, বাম হস্তে তীর ধনুক। রমণী বাহিরে আসিয়া বলিল, “দুর্জয়সিংহ! এ ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ বার্থহীন নই। তবে তােমার আর আমার স্বার্থ এক নয়। তুমি পান্নায় জন্য এ বিপদে অগ্রসর হইচ্ছে, আর আমি প্রতিহিংসার জন্য এ বিরাট আয়ােজন করিয়াছি। এ আয়ােন এক দিনের নয়। পলে পলে দিনে দিনে, ৮ মাসে মাসে সৎসরে বৎসরে এ বিরাট আয়ােজনের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হইয়াছে। আজ পাঁচ বৎসর ধরিয়া এ আয়ােজন করিয়াছি। কিন্তু আমি রমণী শক্তিহীনা। এ সেনা পরিচালন করিবার উপযুক্ত লােক এতদিন পাই নাই। আজ ভবানী তােমায় জুটাইয়া দিয়াছেন। দুর্জয় সিংহ !-তােমার রাজপুত সৈন্য ও আমার এই ভীল বাহিনী লইয়া তুমি মােগল শিবির আক্রমণ কর। এ গভীর রাত্রে মােগলগণ ঘাের সুষুপ্তিতে সমাচ্ছন্ন। দুর্জয়সিংহ স্থির ভাবে সমস্ত কথা শুনিয়া এই রাজপুত রমণীর শৌৰ্য্য বীর্যে মােহিত হইল। বিনম্র ভাবে বলিল, “দেবি! জানিনা আপনি কে ? কিন্তু বুঝিতেছি আপনি মহাশক্তিময়ী। আপনি কিরূপে জানিলেন যে, এই পৰ্বতের মধ্যে আমার রাজপুত সৈন্ত আসিয়া পৌঁছিয়াছে!” সেই রমণী বলিল, “এই পৰ্বতের এমন কোন স্থান নাই, যাহা আমার অপরিজ্ঞাত। চারিদিকেই আমার গুপ্তচর ঘুরিতেছে। তাহাদেরই একজন এই মাত্র আমার এ সংবাদ দিয়া গেল।” দুর্জয়সিংহ অবনত ভাবে ভূমিতে বসিয়া সেই রাজপুত রমণীর বস্ত্রাঞ্চল চুম্বন করিয়া বলিল, “আদেশ করুন—আমায় কি করিতে হইবে।” রমণী দুর্জয় সিংহকে হাত ধরিয়া উঠাইল। তাহার বস্ত্র মধ্য হইতে একখানি সুতীক্ষ তরবারি বাহির করিয়া তাহার হাতে দিয়া বলিল, “দুর্জয়সিংহ! ভবানীয় মন্ত্রপুতঃ এই খৰধার তরবারি আমার স্বামীর ছিল। যখন আমি তােমায় আমার পরিচয় দিব, তখন বুঝিবে এই তরবারি এক স্বনামখ্যাত বীরের দক্ষিণ হস্তের শশাভাবর্ধন করিত। সাবধানে ইহা ব্যবহার করি ও। দেখিও যেন তােমার হন্তে ইহার অপমান না হয়।” দুর্জয়সিংহ সেই তরবারি লইয়া চুম্বন করিয়া বলিল, “দেবি? নিশ্চয়ই জানিবেন এ তরবারির অমৰ্যাদা আমার দ্বারা হইবে না। এখন আমাদের বিদায় দিন।
সুখের বাসর! যেই অবগুণ্ঠনাবৃত রাজপুতবালা তখনই, তাহার দলের একজন লােককে লক্ষ্য করিয়া ডাকিল, “ভামসা!” এই ডাকের সঙ্গে সঙ্গে এক বীরপুরুষ শাণিত বল্লম হস্তে তাহার নিকটে গিয়া বল্লম অবনত করিয়া বলিল, “কি আদেশ মা!” সেই রমণী বলিল—“বৎস! তুমি আমার দক্ষিণ হস্ত। তুমি আমার সুহৃঃ, মন্ত্রী, বুদ্ধিদাতা বন্ধুপুত্র। আজ যে এতগুলি বীর সন্তানের মা আমি সে তােমারই জন্য । এত দিন ধরিয়া যে মহাব্রতের অনুষ্ঠানে জীবন লাভ করিয়াছ, আজ তাহার উদ্যাপনের দিন। এই মহাবীর দুর্জয়সিংহ তােমাদের সেনাপতি। ভবানীর আদেশে তাহারই প্রেরণায় ইনি আজ আমাদের এ পাহাড়ে আসিয়া পৌছিয়াছেন। তােমরা আমায় যেমন মান্যকর, ভক্তি কর-স্নেহ কর, ইহাকেও সেইরূপ করিবে। ভবানী তােমাদের মঙ্গল করুন।* একটাও সেনা একথা শুনিয়া জয়ােচ্চারণ করিল না। সেই নিশীথাকার মণ্ডিত উপত্যকার বক্ষে কোনরূপ জয় নামই প্রতিধ্বনিত হইল না। কিন্তু সকলেই মনে মনে বলিল, “জয় মা ভবানীর জয়। সকলই মনে মনে বলিল,-“জয় রাণীমায়িকী জয়।” ভামলা দুর্জয় সিংহের চরণ বন্দনা করিয়া বলিল, “এ সংর্ণ উপত্যকায় অশ্বের গমনাগমন বড়ই অসুবিধাকর। এজন্য আমরা সকলেই অশ্বহীন। অনুমতি করিলে আমরা পদব্রজেই যাত্রা করি।” দুর্জয়সিংহ ভাসাকে বলিল, “আমার নিকট ত পথঘাট সম্পূর্ণ অপরিচিত, আমাকে পথ দেখাইবে কে? তামসা বলিল—“আমিই মার নিকট এই ভার পাইয়াছি। আমিই পথ দেখাইয়া লইয়া যাইব।” “কিন্তু হেমকুটের উপত্যকায় যে আমার রাজপুত সৈন্তের অপেক্ষা করিতেছে তাহার ব্যবস্থা কি কল্পনা-কল্লোল। ভাস বলিল,-“সে ব্যবস্থা আমরাই করিয়া আসিয়াছি। মার আদেশে আমি আপনার প্রধান সেনানায়ক অঙ্গধর সিংহকে সমস্ত কথাই বুঝাইয়া বলিয়া আসিয়াছি।' আমাদের একজন প্রতিনিধিও সেখানে অপেক্ষা করিতেছে। চলুন আগে আমরা সেই খানেই যাই।” ভামসা অগ্রে । দুর্জয়সিংহ তাহার পশ্চাতে। ভামসার হস্তে একটা ক্ষুদ্র মশাল। তাহাতে পথ চলিবার কোন কষ্টই হইতেছে না। আর তাহার পৃষ্ঠরক্ষক রূপে পরিণত ভীল সৈন্য পিপীলিকার মত সারি দিয়া সেই অন্ধকারে চলিয়াছে। তাহাদের নিকট একটীও আলো নাই ভামসার হাতের জ্বলন্ত মশালটা যে দিকে যাইতেছে, ঘুরিতেছে, ফিরিতেছে তাহারাও সেইরূপ করিতেছে। কিয়দ্দর পথ চলিয়া দুর্জয় সিংহ একটী বিস্তৃত উপত্যকা পাইল, পাইয়া আনন্দের সহিত ভামসাকে আলিঙ্গন করিয়া বলিল, “এইবার আমি পথ চিনিয়াছি। ইহাই হেমকূটের উপত্যকা ! আমাদের দুর্গ এখান হইতে বড় বেশীদুর নয়। ভামসা! একটা কথা তােমায় জিজ্ঞাসা করিব ভাবিতেছি। তাহার প্রকৃত উত্তর পাইব কি?” ভামসা বলিল -“বলুন।” দুর্জয় সিংহ বলিল-এই শৌর্যবীৰ্য্যময়ী রাজপুত রমণী যাহাকে : তুমি মাতৃসম্বােধন করিলে, যাহার পরিচয় আমি কোন রূপেই পাইলাম নাইনি কে ? ভামসা করজোড়ে বলিল, “বীরবর! আমায় মার্জনা করিবেন। আমা: দের রাণীমার আদেশ যে, তাহার সম্বন্ধে আমরা কোন কথাই বলিব না।” রজনী তখন দ্বিযাম উত্তীর্ণ হইয়া তৃতীয় বামে পড়িতেছে। আকাশে তারারাজি তখন সেই ভাবে জ্বলিতেছে। শ্যামাঙ্গিনী রজনীর বক্ষ্য ব্যাপী তামস রাশি তখনও বিরল হয় নাই। সেই উপত্যকা আরও গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবিয়াছে।
সুখের বাসর। দুর্জয়সিংহের মন চিন্তামগ্ন । সে কত কি ভাবিতেছে তাহার ঠিক নাই। সমুদ্র বক্ষ প্রবাহিত অসংখ্য তুরঙ্গ রাজির মত শত সহস্র চন্তাতরঙ্গ তাহার প্রাণকে ব্যাকুল করিতেছে। বারিধি ৰক্ষস্থিত তরঙ্গ রাজি যেমন দ্রুত ভাবে বেলা ভূমিকে প্রস্তুত করে, সেইরূপ কতশত চিন্তা- তরঙ্গ তাহার বীর হৃদয়কে ব্যাকুল ও বিস্ত করিতেছে। ভামসা বলিল, “সেনাপতি। আর আমাদের ভাবিবার সময় নাই রজনী দ্বিযামে আসিয়া পৌছিয়াছে, এইবার কাৰ্য্য আরম্ভের সময় । আমার সঙ্গে একবার এদিকে আসুন।” ভামসা তাহার হস্তস্থিত মশালটা নিভাইয়া দিয়া অগ্রসর হইল, দুর্জয় সিংহ তাহার পশ্চাতে। দুই দশ মিনিট পরে তাহারা এক উন্নত উপত্যকা ভূমিতে উপস্থিত হইল। ভামসা দুর্জয়সিংহকে সম্বােধন করিয়া বলিল, “সম্মুখের দিকে চাহিয়া দেখুন। ঐ যে সবুজ আলােটী জ্বলিতেছে, উহাই মােগল সেনা- পতির শিবির। আমাদের সবেগে ঐ শিবিরই আক্রমণ করিতে হইবে।” দুর্জয় সিংহ বলিল, “ভামসা, যখন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হইয়া আসিয়াছি, তখন যাহা করিলে সম্মান রক্ষা হয় তাহাই করিব। আমি আমার রাজপুত সৈন্য লইয়া এক পার্শ্ব আক্রমণ করিব, তুমি তােমার ভীল সৈন্য লইয়া তাহার বিপরীত দিক আক্রমণ করিবে।” উভয় সেনাপতি সেইখানে অনেকক্ষণ স্থির ভাবে দাঁড়াইয়া নানা কথা কহিলেন। ইহার পরই তাহারা দুইটা ভিন্ন দিক দিয়া প্রান্তর মধ্যে উপস্থিত হইল। পাহাড় হইতে বন্যা প্রবাহের মত যে কত সৈন্য নামিয়া আসিল, তাহা সুষুপ্তি ক্লান্ত মােগল সেনারা কিছুই জানিতে পারিল না।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ দুর্জয়সিং যাহা ভাবিয়াছিলেন—তাহাই হইল। সহসা সেনাপতির শিবিরের দিকে উপস্থিত হইয়া তিনি—“হর হর মহাদে ও! জয় ভগবান একলিঙ্গকি জয়”, বলিয়া সেনাপতি আসফ খ মহব্বত জঙ্গ বাহাদুরের শিবির পার্শ্বস্থ স্কন্ধাবার আক্রমণ করলেন। চীৎকার শব্দে মােগলদের নিদ্রা ভাঙ্গল বটে, কিন্তু তাহারা যেন কিংকর্তব্য বিমূঢ় হইয়া পড়িল। কোথায় বা সেনাপতি-কেই বা আদেশ দেয়—কিছুরই স্থিরতা নাই। এসব দুসমন গুলি পাহাড়ের কোথা হইতে নামিয়া আসিল, তাহাও তারা স্থির করিতে পারিল না। তবুও অনেকে তাড়াতাড়ি বেশভূষা করিয়া, হাতিয়ার হাতে লইয়া মার মার শব্দে চারিদিকে ধাবিত হইল। কিন্তু শত্রুসৈন্য দলে বেশী। রাজপুতগণ শিবিয়ের একাংশ ঘিরিয়া ফেলিয়াছে-দুই একস্থানে হস্তস্থিত মশাল দিয়া শিবিরে আগুন ধরাইয়া দিয়াছে। দেখিতে দেখিতে চারিদিকে ভীষণ অগ্নি- কাণ্ডের সূচনা হইল। প্রায় পাঁচ হাজার মােগল-সৈন্য সেই প্রান্তরে শিবির সন্নিবেশ করিয়াছে। সহসা সমুদ্রের তরঙ্গ ফুলিয়া উঠিয়া যেমন সমগ্র বেলা ভূমিকে . স্রোতােচ্ছাসিত করিয়া দেয়, সেইরূপ ভীষণ রণ-কোলাহল দিক-দিগন্তরে ব্যাপ্ত হইয়া সমগ্ৰ মােগল-বাহিনীকে জাগাইয়া তুলিল। যে অংশে রাজপুতেরা আক্রমণ করিয়াছিল, সেই অংশের সেনারাই বেশী বিপদগ্রস্ত। ভামসা, তাহার ভীল-সৈন্য লইয়া ভীষণ ব্যুহ রচনা করিয়াছে। অপর দিক হইতে মোগল সেনা আসিয়া পোঁছিবামাত্রই ভীলগণ তীর ছুড়িতে লাগিল। সেই বিষাক্ত, তরে শত শত মােগল- সেনা মরিতে লাগিল।
সুখের বাসর নাই। সেনাপতি আসফ খ, সুখ-সুষুপ্তি-মগ্ন হইয়া হুরীর স্বপ্ন দেখিতে ছিলেন। এই ভীষণ রণ-কোলাহলে তিনি চমকিত হইয়া উঠিয়া পড়িলেন। ব্যাপারটা যে কি, তাহাও তিনি বুঝিতে পারিলেন না। তাহা হইলে তিনি অস্ত্রাদিতে ভূষিত হইয়া অশ্বের সন্ধানে ছুটিতেন। কিন্তু দেখিলেন,--শিবিরে এক টী ও অশ্ব নাই। কে সর্বাগ্রে অশ্ব শিবিরেই আগুন লাগাইয়া দিয়াছে। দুই চারিটী ঘোড়া পুড়িয়া মরিয়া গিয়াছে, বাকি গুলা দড়ি ছিড়িয়া পলাইয়া গিয়াছে । আসফ খা দেখিলেন, বিপদ বড় ভয়ানক! তিনি সম্পূর্ণরূপে পশ্চাৎবল বিহীন। এ সময়ে বিজয়শঙ্কা কিছুমাত্র এ পরাজয়ে মােগলের নামে ভীষণ কলঙ্ক স্পর্শিনে। আসফ খ। মনে মনে ভাবি, লেন,-“ছার এ জীবন ! হায়! স্বজাতির গৌরব রক্ষা করিতে পারিলাম না! দিল্লীতে ফিরিয়া গিয়া বাদসাহকে কি করিয়া মুখ দেখাইব। আমার এতদিনের যশ মান, সম মর্যাদা সবই যে নষ্ট হইল। ইয়ে মোর খােদা! কি করিলে প্রভু!” বীর প্রবর আসফ খ উন্মুক্ত করবাল হস্তে, “ক্রহের দিকে ধাবিত হইতে সঙ্কল্প করিলেন। তিনি উন্মাদের মত কুটি-ভঙ্গীতে ধীরবেগে অগ্রসর 'ইতে লাগিলেন। এমন সময়ে রাজপুত সেনাপতি দুর্জয়সিংহ, তাহার সম্মুখে আসিয়া কঠোর স্বরে বলিল,-“সাহেব! আমরা সহসা আসিয়া আপনার বিশ্রাম-সুখে বাধা দিলাম, এজন্য বড় দুঃখিত! আপনি আত্মসমর্পণ করুন—আমাদের সকল বিবাদ মিটিয়া যাইবে। এ রাজপুত, দুর্জয়- সিংহ প্রতিশ্রুতি প্রদান করিতেছে-সে আপনার কেশাগ্রও স্পর্শ করিবে না।” “রাজপুতের উপযুক্ত কুথাই, বটে! মােগল সেনাপতি বিদ্রুপের সহিত এই কয়েকটা কথা বলিয়া, মুহুৰ্তমধ্যে নিজের তরবারি যেখানে কল্পনা-কল্লোল। ছিল, সেইদিকে অগ্রসর হইলেন। দুর্জয়সিংহ মধ্যপথে আসিয়া তাহার অগ্রসর হওয়ার মুখে বাধা দিয়া বলিলেন,-“সহসা সহস্রাধিক রাজপুত আপনার শিবির আক্রমণ করিয়াছে—এখন আপনার পরিত্রাণের আশা বড় কম! বৃথা অস্ত্র লইয়া কি হইবে? যুদ্ধে কোন ফল হইবে না। ভাবিবেন না সেনাপতি। এই জয়ােন্মত্ত দুর্জয়সিংহের ক্ষুরধার তরবারির আঘাত হইতে আপনি আজ আত্মরক্ষা করিতে সমর্থ হইবেন। সেনাপতি আসফ খ ৩ কুটী ভঙ্গি করিয়া বলিলেন,-“রাজপুত- কলঙ্ক ! তোমার মনের উদ্দেশ্য বুঝিয়াছি। আমি অস্ত্রহীন, আমাকে নিঃসহায় অবস্থায় তুমি বন্দী করিতে চাও-ছি! ছি! এই মুখে তুমি রাজপুত বলিয়া পরিচয় দিতেছ। দুর্জয়সিংহ এই তিরস্কারে ক্ষুধিত-ব্যাবৎ সেস্থান হইতে সরিষা দাড়াইলেন। ঘৃণাপূর্ণ স্বরে বলিলেন-“যাও–যাও, জন্মের মত একবার তরবারি ধারণ কর। বিনাযুদ্ধে তোমার যদিও বা প্রাণে বাঁচিবার আশা ছিল, তাহাও গেল।” মােগল সেনাপতি আর উত্তরের অপেক্ষা না করিয়া, নিজের তরবারি তুলিয়া লইলেন। সুশাণিত অসি কোষমুক্ত করিলেন। শিবির-মধাস্থ তীব্রালোকে সে অসি ঝকমক করিয়া উঠিল। সেনাপতি আসফ খ। ভীমবেগে দুর্জয় সিংহকে আক্রমণ করিলেন। দুর্জয়সিংহের মস্তক লক্ষ্য, করিয়াই সে ভীষণ অসি পরিচালিত হইয়াছিল। কিন্তু দুর্জয়সিংহ রণ- কৌশলবিহীন নহেন। তিনি মুহূৰ্তমধ্যে সরিয়া দাঁড়াইয়া আসন্নমৃত্যুর হস্ত হইতে আত্মরক্ষা করিলেন। কিয়ৎক্ষণ ধরিয়া উভয়ে ভীষণ যুদ্ধ চলিতে লাগিল অস্ত্রের ঝন্ঝনায় সেই ক্ষুদ্র শিবির-কক্ষ বিকম্পিত হইতে লাগিল। উভয়েই স্বেজলে আ রণশ্রমক্লান্ত। আসফ খ। ভীষণবেগে পুনরায় দুর্জয়সিংহের মস্ত লক্ষ্য করিলেন। দুর্জয় সিংহ মস্তক বচাইলেন বটে, কিন্তু সেই অসির M মুখের বাসর। তীক্ষণ গ্রভাগ তাহার স্কন্ধদেশে বিদ্ধ হইল। তিনি যন্ত্রণাসূচক চীৎকার করিয়া ভূমিতে পড়িলেন। মােগল সেনাপতি আসফ খ। ক্ষুধিত ব্যাবৎ ভীমবেগে লক্ষপ্রদান করিয়া যেমন দুর্জয়সিংহের বক্ষের উপর বসিতে যাইতেছেন, এমন সময় কে পশ্চাৎদিক হইতে আসিয়া তাঁহার স্কন্ধদেশে ভীষণ বর্ষাঘাত করিল। সে আঘাত অতি প্রচণ্ড—অতি শক্তিময়। বিশালকায়। মােগল সেনাপতি আর্তনাদ করিয়া ভূপতিত হইলেন। এই আঘাতকারী আর কেহই নহেন-ভীলসর্দার ভামসা। আসফ খাঁ মুচ্ছিত, ভূপতিত। রক্তস্রাবে তাহার শরীর অবসন্ন। চেতনা বিলুপ্ত। দেইযষ্টি স্পন্দহীন ! ভীমকায় ভীলসর্দারের ভীষণ অঘাত অব্যর্থ হয় নাই। শত সহস্র রাজপুত, দশ দিন ধরিয়া যুদ্ধ করিলে যাহা না হইত, ভামসা এক মুহূর্তে তাহা করিল। ভানস মনে মনে ভাবিল-দুর্জয় সিংহের জীবনরক্ষায় সে একটা মহা পুণ্যময় কাৰ্যের অনুষ্ঠান করিয়াছে। নিশ্চয়ই দুর্জয় সিংহ এজন্য তাহার নিকট কৃতজ্ঞ হইবেন। কিন্তু দুর্জয় সিংহের মনের ভাব অন্যরূপ। সে ভামসার এ কার্যে আদৌকৃতজ্ঞ নহে। তাহার দেহ যুদ্ধশ্রমে স্বেদ-প্লাবিত, তাহার ধমনী দারুণ পরিশ্রমে ঘন ঘন স্পন্দিত। কিন্তু তাহার চক্ষু, আহত ব্যাঘ্রের স্যায় জ্বলিতেছে। ভামস। ইতিপূর্বে মােগল স্কন্ধাবারের নানা স্থানে আগুন লাগাইয়া কোন কোন স্থানে থও যুদ্ধ করিয়া, সমস্ত মােগল সৈন্যকে শিবির ত্যাগ করাইয়া ছিল। অতর্কিত আক্রমণে মােগলেরা যে যে দিকে পরিল, জ্ঞানশূন্য হইয়া দিকবিদিকে পলাইয়া গেল। ভামসার আদেশে তাহার ভীলসৈন্যগণ বহুদূর পর্যন্ত তাহাদের অনুসরণ করিল। মধ্যপথে অনেক ভীলসৈন্য কল্পনা-কল্লোল। প্রহরীর কাৰ্য্য করিতে লাগিল—ইহাতে পরাজিত মােগল-সৈন্য আর সে রাত্রে শিবিরে ফিরিতে পারিল না। এদিকে কাজ শেষ করিয়া, অপেক্ষাকৃত নিরাপদ হইয়া ভামসা দুর্জয় সিংহের সন্ধানে সেনাপতি আসফখার শিবিরে প্রবেশ করিল। সেখানে গিয়া দেখিল—দুই যােদ্ধা ভীষণ যুদ্ধে ব্যাপৃত। আসফ খাঁর প্রতিহিংসা- পরায়ণ, ভীষণ খঙ্গ সবেগে দুর্জয় সিংহের মস্তকের উপর নিপতিত হইতে উদ্যত। ভামসা উপস্থিত বুদ্ধিবশে, ন্যায়ান্যায় বিচার না করিয়া মােগল সেনাপতির স্কন্ধদেশে শাণিত বর্ষার আ ঘাত করিয়া তাহাকে ভূপতিত করিল। ভামসা যখন দেখিল, এই অদ্ভুত উপায়ে জীবনরক্ষা করায় দুর্জয়সিংহ তাহার প্রতি একটু ও কৃতজ্ঞতা দেখাইল না—অথচ গম্ভীরমুখে কুটিপূর্ণ চক্ষে, তাহার দিকে চাহিয়া রহিল—তখন সে একটু বিস্মিত হইল। কিয়ৎক্ষণ পরে দুর্জয় সিংহ মৌন ভঙ্গ করিয়া বিষাদ, মলিন, ক্ষীণ- স্বরে নিরাশার সহিত বলিলেন-“ভামসা! ভামসা! কেন আমার এ সৰ্ব্বনাশ করিলে ?” “কি সর্বনাশ সেনাপতি।” *এ যুদ্ধে আমি যদি মরিতাম তাহাও আমার শ্রেয় ছিল। ক্ষত্রিয় সামান্য ভীলের বাহুর শক্তিতে তাহার জীবন ফিরিয়া চায় না।” “এই ভীলইত বহুবার, অনেক প্রথিতযশা রাজপুত সামন্তের নয়- পতির, রাজ্যেশ্বরের, জীবনরক্ষা করিয়াছে। রাণা প্রতাপের প্রাণ এক সময়ে এক ভীলসর্দারের উপস্থিত বুদ্ধিতেই বাঁচিয়া যায়। কিন্তু রাজপুত- শ্রেষ্ঠ, রাণা প্রতাপসিংহ আজীবন তাহাকে, প্রাণের কৃতজ্ঞতা দেখাইতে কুণ্ঠিত হন নাই।” তামসার এ তিরস্কার বড়ই মর্মভেদী! দুর্জয় সিংহ তাহা মর্মে মর্মে অনুভব করিলেন। একটু অপ্রতিভ হইয়া বলিলেন-“তা নয় ভীল !
সখের বাসর। সেনাপতি! মনে ভাবিও না যে, আমি এ উপকারের জন্য তােমার নিকট কৃতজ্ঞ নই ! কিন্তু তুমি আজ আমার উপকার করিতে গিয়া ও মহাক্ষতি করিলে।” *কেন—* আসফখাকে নিহত করিতে পারিলে, আজ আমি বড়ই গৌরব লাভ করিতাম। যদি ঘটনাস্রোত ফিরিয়া দাঁড়াইত, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিতাম, তাহা হইলেও আশা অপূর্ণ থাকিত না। যাহাকে বীরত্ব গৌরব দেখাইবার জন্য আমি এত আনন্দিত, সেও যে বিষাদ-নীরে মগ্ন হইত।” যাহার কথা বলিতেছ। সে পান্না! সে দুর্গাধিপের কন্যা সুন্দরী শ্রেষ্ঠ পান্না।” “সাবধান, পান্নার নাম দ্বিতীয়বার উচ্চারণে তােমার অনিষ্ট ঘটিবে। সামান্য এক ভীল সেনাপতির মুখে পান্নার প্রসঙ্গ আমার আদৌ প্রীতিকর নহে।” “আপনার না হইতে পারে, কিন্তু জানিবেন—পান্নায় আমার বিশেষ স্বার্থ আছে। পান্নার জন্যই আমার এ ছদ্মবেশ--আমার এ ছদ্মনাম, আমার ভীলত্ব, আর তোমার দাসত্ব! জানিও দুর্জয় সিংহ—পান্নারূপ শ্রেষ্ঠ রত্নলাভে তােমার প্রতিদ্বন্দ্বী এখনও বৰ্ত্তমান।” “তবে কি তুমি দুৰ্বিজয় সিংহ! অজয় গড়ের নির্বাসিত সেনা- পতি।” “হুঁ তাই! আমি ভামসা নই, ভীল নই, আমি সেই দুৰ্বিজয় সিংহ। আর এ পর্যন্ত যাহা কিছু করিয়াছি, সবই সেই পান্নার জন্য। তাহার মুখ চাহিয়া আমি যতটা আত্মত্যাগ করিয়াছি, তাহার একাংশও তুমি করিতে পার নাই। “যদি তাই হয়, আমায় কাজ চাইলে কেন?” তোমার একদিন স্বহস্তে আয়ত্ব করিব বলিয়া।”
কনা-কঙ্গোল। কক “তাহার পরীক্ষা না হয় এখনই হইয়া যাক— “না”যতক্ষণ না স্থির বুঝিব, যে পান্না তােমায় বেশী ভালবাসে, ততক্ষণ তুমি আমার মিত্র। এখন রাত্রি কত ?” “শেষযাম।” “চল আমরা শিবিয়ে ফিরিয়া যাই। রিক্তহস্তে যাইবে? “চল—তবে শিবির লুঠ করি।” “না-রাজপুত সামান্য দ্রব্যের লােভ রাখে না। যাহা আজ আমা- দের পক্ষে মহালুণ্ঠন আজ তাহাই করি এস।” “কি ?” “চল-সেনাপতির মুচ্ছিত দেহ মাতাজীর গুহায় লইয়া যাই।” “মাতাজি তিনি। তিনি এ দেহ লইয়া কি করিবেন ?” এই আসফখ। বাদসাহের একজন প্রধান সেনানী। ইহাকে জীবন দান করিবেন। তারপর ইহাকে প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ করাইবেন।” -কি প্রতিজ্ঞা -* “যাহাতে এই শান্তিময় মালবে আর কোন উৎপাত না ঘটে। মাতাজী কি এইরূপ আদেশ দিয়াছেন ? হা- “তার আদেশ পালন করিতে আমি বাধ্য। তথন দুই বীরে সেই দেহ উঠাইয়া লইয়া, শিবির হইতে বাহিরে আসিল। চারিদিকে ভীষণ অন্ধকার। স্কন্ধার সম্পূর্ণরূপে মােগল- সৈন্যশু। যে দুই একশত এদিক ওদিকে লকাইয়া আছে, তাহারা অস্ত্র- হীন, একতাহীন, আত্মরক্ষা মাত্র।
সুখের বাসর।
ভীল-সৈন্যরা, ভামসার দীর্ঘদেহ দূর হইতেই চিনিল। তাহারা
দেখিল—ভামসা স্কন্ধে করিয়া কি একটা বহিয়া আনিতেছেন। তখনই
দশজন ভীল মশাল লইয়া দ্রুতবেগে সেই দিকে অগ্রসর হইল।
ভামসা তাহাদের মধ্যে, একজনকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন-“এই
মুচ্ছিত দেহ, সযত্নে মাতাজীর কাছে পৌছিয়া দাও। তোমরা বনের পথে
যাইও। শীঘ্র যাইতে পারিবে। আমরা সমস্ত সেনাসমেত সূর্যোদয়ের
পূৰ্বেই পৌছিব।”
তখন সে ভীমান্ধকারে দাড়াইয়া ভামসা ও দুর্জয়সিংহ।
ভামসা, দুর্জয়ের স্কন্ধে হাত দিয়া বলিল— এইবার চল—আমরা
স্বস্থানে ফিরিয়া যাই।”
দুর্জয় সিংহ বলিল-“কোথায় যাইব ভামসা?”
“মাতাজীর আশ্রয়ে !”
‘মা’কে এ কলঙ্কিত মুখ দেখাইতে পারিব না”
মুখ কিসে কলঙ্কিত হইল—
এ ছার জীবন অপরের সহায়তায় বঁচিয়াছে। আমি নিজে আত্ম,
রক্ষা করিতে পারি নাই।”
এ কথা তুমি আমি ভিন্ন আর কেউ জানে না।”
“সত্য—কিন্তু আসফ খ তােমায় দেখিয়াছে।”
“দেখিলেও চিনিতে পারে নাই। আমি পশ্চাৎদিক হইতে তাহাকে
বর্ষার দ্বারা আঘাত করিয়াছিলাম। এস দুর্জয় ! প্রভাত হইয়া আসি
তেছে। জানি না—প্রভাত সমস্ত মােগলসৈন্য একত্রিত হইয়া আবার
কি বিভ্রাট উপস্থিত করিবে।”
কল্পনা-কল্লোল। দুর্জয়সিংহ-দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিল—“চল। এখন বুঝিয়াছি মানুষ কৰ্ম্মফলের প্রবল শক্তির অধীন। পুরুষ কার কেবলমাত্র আত্ম- । প্রবঞ্চন।।* ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ নির্জন বনভূমি অতিক্রম সময়ে ভামসা ও দুর্জয় সিংহ একাবারে কথােপকথন বন্ধ করিয়াছিল। ভামসা অগ্রে অগ্র। আর নির্বাক দুর্জয় সিংহ তাহার পশ্চাতে। ভীষণ ঝটিকা সঞ্চারের পূর্বে সমগ্র জড় প্রকৃতি যেমন স্থির ও নিস্তব্ধ ভাব ধারণ করে, এই দুইজন বীরের অবস্থাও তাই। জানিনা—তাহাদের মনে কিসের ঝড় বহিতেছিল ! কিন্তু এটুকু বলিতে পারি, যে ঝড় উঠিয়াছিল—তাহাতে উভয়েরই হৃদয় চূর্ণ-বিচুর্ণ হইতেছিল। প্রভাতের বালার্ক-কিরণে সেই সুন্দর শ্যামল উপত্যকা পথ, স্বর্ণ রঞ্জিত হইয়াছে। পৰ্বত স্থাণুদেশবাহী ক্ষুদ্র গিরি-তরঙ্গিনীর বুকে সেই বালার্ককিরণ রেখা পড়িয়া, গলিত স্বর্ণের মত চিক্ চিক্ করিতেছিল। বিহঙ্গমকুল সমস্ত রাত্রি শকশূন্য অবস্থায় ছিল। প্রভাতালােক পরি- স্নাত হইয়া, তাহারা যেন নবজীবন লাভ করিল। কুলায় ত্যাগ করিয়া শান্ত সুনীল বালার্ককিরণ-প্লাবিত, সমুজ্জ্বল উষার আকাশে স্বর্ণকর- রঞ্জিত মেঘরাশির অন্তরালে থাকিয়া, মধুর, কুজনে নবসঞ্জীবিত প্রকৃতিকে সঙ্গীতােচ্ছাসে মুগ্ধ করিতে লাগিল।
মুখের বাসর। ৭১ '? সে সঙ্গীতে কত সুধা উছলিয়া পড়িতেছে। সে ভৈরবী-আলেয়া- কানাড়ার মিশ্রিত ধ্বনিতে, নীলাকাশের শীতল বায়ুপ্রবাহে কতই সঙ্গীত- স্রোত উথলিয়া পড়িতেছে। প্রস্ফুটিত কুসুমস্তবক, প্রভাত-সৌন্দর্য্য মুখরিত হইয়া, সুপবিত্রতা অঙ্গে মাখিয়া নবােদিত রবির স্বর্ণময় কিরণ- রেখা পাতে ঝলমল করিতেছে। সেই কুসুমবক্ষ-নিঃসারিত মনােহর সুগন্ধ, চুরি করিয়া চতুর প্রভাত সমীর বড়ই বিচিত্র থেলা করিতেছে। সােণার প্রকৃতি, সােণার রঙ্গে রঞ্জিত। পাহাড়ের উপত্যকা ও অধিত্যকা ভুমি স্বর্ণধারা প্লাবিত। পৰ্বতবক্ষবাহিনী নির্জনে স্বননময়ী গিরিনদীর, বনস্পতি-ছায়াময় সুকৃষ্ণ বক্ষেও সে স্বর্ণকিরণ প্রভা প্রতিফলিত হইয়াছে। কিন্তু হায়! এই লোকবিমােহন সৌন্দয্য দেখে কে? সেই প্রভাত সমীর চর্চিত, প্রভাত-রবিকিরণ-প্লাবিত, উপত্যকা-পথে আর কোন মনুষ্যই নাই ! খালি আছে—এই ভামসা আর দুর্জয়সিংহ ! জানি না--তাহারা প্রাণের গভীরতর স্তরে এ প্রভাত সৌন্দর্য্যের শক্তি অনুভব করিতেছিল কি না? তা যাই হউক, সৌন্দর্য্য মানবের দাসী নহে। তুমি আমি বা আর কেহ তাহা উপভােগ করিল না—দেখিল না-বুঝিল না, দেখিয়া মজিল —মরিল না, তা বলিয়া যে সৌন্দৰ্য্য অভিমানিনী হইয়া লজ্জায় মুখ লুকাইবে, এরূপ কোনও কথা সৌন্দর্যের অভিধানে বা প্রকৃতির পক্ষপাতশূন্ত নিয়মের মধ্যে নাই। দুর্জয়সিংহ, প্রথমে মৌনভঙ্গ করল। কারণ সম্মুখেই নাতি প্রশস্ত সুপবিত্র সলিলপূর্ণ গিরিনদী। উপত্যকা সমতল ভূমি হইলেও, সুবিমল সলিল-সম্পদপূর্ণ পার্বত্য নদী দশহাত নিয়ে ! দুর্জয়সিংহ বলিল,-“ভামসা! আর কতদুর যাইতে হইবে! এ নদীর উপর ত কোন সেতু নাই। তবে কি আমাদের হটিয়া নদী পার হইতে হইবে?”
কল্পনা-কল্লোল। ভামসা মৌনভঙ্গ করিয়া বলিল,-“ই। অবশ্য তাই বই কি!? দুর্জয় ! এ স্থান কেমন নির্জন! দুর্জয়সিংহ একথায় চমকিয়া উঠিল । ভামসার স্বর কঠোর বিপ- পূর্ণ। তাহার প্রত্যেক শব্দে দারুণ শ্লেষ ক্ষরিত হইতেছে। দুজ্জয়সিংহ: চমকিতভাবে প্রশ্ন করিল—“কেন ভামসা! একথা বলিতেছ কেন?” “তুমি মনে মনে কি ভাবিতেছিলে—দুর্জয়সিংহ !” “আমার চিন্তা অতি পবিত্র ! সে কথা নাই বা শুনিলে ?” “কিন্তু যদি তোমার আর আমার চিন্তা এক বিষয়েরই হয়।” “হইলেই বা! তাহাতে ক্ষতি কি?” “অত উদার মত আমার নয় । আমি বলি, তাহাতে সমূহ ক্ষতি আছে।” * বৃথা তর্কে প্রয়ােজন কি ? আগে বল দেখি, আমি:কি ভাবিতে ছিলাম ?” পান্নার কথা !” “কেমনে জানিলে ! আমি যদি বলি না— “তাহা হইলে তুমি মিথ্যাকথা বলিতেছ।” “সাবধান! দুর্জয়সিংহ কখনও মিথ্যা কথা বলে না।” “ভামসা—ভীল। অন্ততঃ এখনও সে তাই বলিয়া পরিচিত ! ভাম- সাও মিথ্যা কথা বলিতে শেখে নাই।” “যদি তাই হয়” “তাহা হইলে আমি তাহা হইতে দিব না।” “সাধ্য কি তােমার ভামসা ! যে পান্নার রূপ আমার অস্থিমজ্জা- শােণিতকণার মধ্যে-যে পান্না আমার কয়ে রাজরাজেশ্বরী মূর্তিতে বিরাজিতা—যার জন্য আজ আমার এ লাঞ্ছনা, এ কষ্ট, এ অপমান, তার সুখের বাসর। চিন্তা ত্যাগ করা আমার পক্ষে অসম্ভব । আমার হৃৎপিণ্ড বিদীর্ণ করিয়া শোণিতধারা ঢালিয়া দিয়াও আমি জীবিত থাকিতে পারি, কিন্তু পান্না চিন্তা হইতে একদণ্ড বিরত হইলে আমার জীবনান্ত ঘটিবে।” “পান্না তােমার চক্ষে এত উচ্চ !” –তাই।” “তবে পান্নার জন্য হৃদয়ের শােণিত ধরা ঢালিয়া দাও।” “দিতে পারি, য দ পান্না নিজে এস্থানে উপস্থিত হইয়া, আমার আত্ম- দান যজ্ঞে পূর্ণাহুতি গ্রহণ করে।” এমন সময় সেই নির্জন বনস্থলী বিকম্পিত করিয়া কে যেন গম্ভীর কণ্ঠে বলিল -“হা হতভাগ্য! তােমাদের দেশ বিপন্ন ! আক্রমণকারী শত্রুর করতলগত! এই কি তােমাদের আত্মবিগ্রোহের সময়! হায় রাজপুত ! তােমার প্রকৃতি এত নীচ হইয়াছে।” সেই তীব্র রবিকরােজ্জলিত শম্প-বীথি-পূর্ণ, প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্যময়ী উপত্যকায় সেই গিরিনদীকূলে দাড়াইয়া ধীরগম্ভীর স্বরে, আবার সেই মূর্তি বলিল,-“হায় মূখ ! এখনও তােমাদের চেতনা হইল না!” উভয়ে সবিস্ময়ে দেখিল-গৌরিক-মণ্ডিতা, ত্রিশূল-ধৃত-করা, বিভূতি- ভূষণ-চর্চিতা, রুদ্রাক্ষমালা-বিভূষিতা এক সৌম্যমূৰ্ত্তি রমণী তাহাদের সম্মুখে দাড়াইয়া । সেই রমণীর বিশালায়ত লােচনদ্বয় হইতে যেন অগ্নিশিখা বাহির হইতেছে ! ভামসা ও দুর্জয়সিংহ সে রমণীকে চিনিল। উভয়েই বিস্ময়-বিমুগ্ধ হইয়া এতক্ষণ নির্বাক অবস্থায় ছিল। কিন্তু রমণী কণ্ঠোচ্চারিত সেই বজনাবৎ তীব্র কঠোর তিরস্কার স্বরে, যেন তাহাদের মােহ ছুটিয়া গেল। দুর্জয়সিংহ উত্তরবিহীন ভা সেই শক্তিশালিনী রমণীর পাদমূলে বসিয়া বলিল-“মা ! আমায় মার্জনা কর।”
৭৪ কল্পনা-কল্লোল। । যেন প্রকৃতির বুক হইতে ভীষণ ঝড় কোথায় চলিয়া গেল। সেই তীব্র রাষ-কষায়িত, আয়ত-লােচনদ্বয় হইতে অমৃতময় স্নেহধারা ক্ষরিত হইল। সেই ক্রোধ বিকশিত রক্তোৎফুল্ল ওষ্ঠাধর হইতে সরস হাস্য নিঃসৃত হইল। রমণী কঠোর বিদ্রুপময় স্বর পরিবর্তন করিয়া স্নেহময় স্বরে বলিলেন- “ভাসা! আমি তােমায় আমার সন্তানের অপেক্ষাও বেশী স্নেহ করি, তুমি আমার প্রিয়শিষ্য। কিন্তু বৎস! এই কি তােমাদের তুচ্ছ রমণী লইয়া বিবাদ করিবার সময় ! তােমরা, আমার স্বার্থ, আমার দেশের স্বার্থ, তােমাদের জন্মভূমির স্বার্থ ভুলিয়া যে আত্ম দ্রোহে প্রবৃত্ত হইয়াছি, ইহা যে রাজ- পুতের নামে কলঙ্ক প্রক্ষেপ করিবে। আমি তােমাদের যে কাৰ্যে পাঠাইয়া- ছিলাম, তাহার কি হইল ! মােগল সেনাপতি আসফ খাঁ কোথায়?” ভামসা এই কথায় চমকিত হইয়া বলিল—“কি বলিতেছেন জননি। আসফ খাঁকে যে আমি স্বহস্তে বন্দী করিয়া, ভীলসৈন্ত পাহারা দিয়া, বহুক্ষণ পূর্বে আপনার কাছে পাঠাইয়াছি। সেই সন্ন্যাসিনী বিস্ময় বিমুগ্ধ চিত্তে বলিলেন-“কি বলিতেছ ভাসা ! কোনও ভীল সৈন্য এ পর্যন্ত আমার গুহায় উপস্থিত হয় নাই মােগল সেনাপতি আসফ খ ত দূরের কথা !” ভাস। একথায় যেন বড়ই চিন্তিত হইল! সমস্ত ঘটনা বুঝিতে তাহার বাকী রহিল না। সে যে রজনীর শেষামে তাহার অধীনস্থ কয়েকজন বিশ্বাসী ভীলের তত্ত্বাবধারণে আসফ খাঁকে মাতাজীর নিকট পাঠাইয়াছে। ধরিতে গেলে, প্রভাতের পূর্বেই তাহাদের আশ্রমে পৌছান উচিত ছিল। তাহাদের সকলেই ত এই পৰ্বতময় উপত্যকার সহজ পথ জানে। তাহাদের সকলেই ত শক্তিশালী যােদ্ধা। আসফ খাঁর সাধ্য কি, যে তাহাদের কবল হইতে সহজে পলাইতে পারে। দুর্জয়সিংহ—এতক্ষণ নানাকথা ভাবিতেছিল! সে উপযুক্ত অবসর বুঝিয়া বলিল,-“মা ! আসফ খাঁকে আমি খুব ভাল চিনি! আর
বৎস্য ।
এই কি রে তুচ্ছ রমণীর জন্য বিবাদ করিবার সময় ?
[ সুখের বাসর-৭৪ পৃঃ।
No text on this page.
সুখের বাসর। জানি। আকবর সাহের স্বহস্তে শিক্ষিত মােগল সৈন্যের ও প্রভাব আমি স্পষ্ট বুঝিতেছি-আপনার একজনও ভীল সেন। জীবিত নই। যে সমস্ত মােগল সৈন্য আমাদের অতর্কিত আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হইয়া চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল, তাহারাই শিবিরে ফিরিয়াছে ! আসফ খাকে দেখিতে না পাইয়া দলবদ্ধ হইয়া তাহাকে খুঁজিবার জন্য এই পাহাড়ে উঠিয়াছে অসংখ্য মােগল সেনার সঙ্গে আপনার কুড়িজন ভীলসৈন্য কেমন করিয়া যুঝিবে মা!” সেই গোরিক ধারিণী রমণী, এই সব কথা মনে মনে আলােচনা করিয়া তীব্র বিদ্রুপের সহিত বলিলেন,-“এত বুদ্ধি তােমাদের যে এই ভীষণ বিপদের সময় তােমরা আত্মনাশে প্রবৃত্ত হইয়াছিলে ! আমার আদেশ যেখান হইতে পার আসখাকে বন্দী করিয়া আনিতেই চাও।” ভামসা বলিল, “মা ! আপনার কাজে ত আমি জীবননাৎসর্গ করি- আছি। আমাদের আরও কিছু সেনা দিন।” সেই সন্ন্যাসিনী গম্ভীর স্বরে বলিলেন, “বাবা বল্লভের মন্দিরের সানে তুমি দুই শত ভীলের সন্ধান পাইবে। ভাসা! দুর্জয় ! তােমরা পার ত সৈন্য সহায়তায় আসফ খাকে বন্দী কর।” সপ্তম পরিচ্ছেদ পাঠক। বহুদিন আমরা পানার কোন খবর লই নাই। যে পান্নাকে লইয়া এতকাণ্ড, যে পর জন্য দুর্জুয়সিংহ ও ছদ্মবেশী ভামসার মধ্যে এত বিবাদ, যে পান্না দুর্জয়সিংহকে একাকী মহাহব মুখে পাঠাইয়া শঙ্কিত। অনুতপ্ত, যাহার জন্য পান্না পিতার বিরাগভাজন হইয়াছে, সে পান্নার একবার সংবাদ লওয়া প্রয়োজন।
কল্পনা-কল্লোল। প্রভাত হইয়াছে। সেই কালনিশীথে, দারুণ উত্তেজনার মর্ম যাতনায় পীড়িতা পান্না, দুর্জয়সিংহকে তিরস্কার করিয়া, তাহাকে মহাবিপদের মুখে পাঠাইয়াছেন। যে পান্না এজন্য পিতার নিকট লাঞ্ছিতা ও তিরস্কৃতা পৰ্যন্ত হইয়াছে, পিতার চির আদরিণী কন্যা অনুরাগের বিনিময়ে বিরাগ লাভ করিয়াছে, সেই পান্নার সংবাদ লওয়া একবার প্রয়ােজন। সে রাত্রি কাটিয়াছে ! দিনরাত ত কাহারও জন্য অপেক্ষা করে না। তুমি চোখের জল ফেলিয়া রাত কাটাইতেছ, আমি বিলাস বিভ্রমে উন্মত্ত হইয়া হাসিয়া দিন কাটাইতেছি--তােমারও দিন যাইবে, আমারও যাইবে। তােমারও রাত্রি প্রভাত হইবে, আমারও হইবে। এই সনাতন নিয়মের অধীন হইয়া পান্নার রাত্রি কাটিয়াছে। কিন্তু কোথায় দিয়া কাটিয়াছে সে তাহা জানিতে পারে নাই। সমস্ত রাত্রিই সে নিদ্রাহীন নেত্রে একবার অলিঙ্গ্যে, একবার দুর্গ প্রাকারে, এক বার গৃহ একবার সু-উচ্চ পৰ্বত শিখরে উঠিয়া, বারি প্রত্যাশিত চাতকীর মত, দুর্জয়সিংহের প্রত্যাগমন প্রত্যাশায় সেই অন্ধকার মণ্ডিত প্রকৃতির চারিদিকেই আকুল দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়াছে ! নিশাচরগণ এদিকে ওদিকে ছুটিতেছে, পান্না ভাবে অই দুর্জয়সিংহ আসিতেছে। শুষ্ক পত্রের উপর দিয়া শৃগাল কুকুর চলিয়া যায় সে ভাবে অই বুঝি দুর্জয়সিংহের প্রত্যাগমন-পদ শব্দ। দুর্জয়সিংহকে সে চির দিনের জন্য বিরাগ নেত্রেই দেখিয়াছে। তাহার কারণ আর কিছুই নহে—দুর্জয়সিংহ স্বভাবতঃই দাম্ভিক। তাহার মনে মনে অহঙ্কার যে, সে পান্নার পিতার—দক্ষিণ সুস্থ স্বরূপ—কাজেই পান্না তাহার। কিন্তু ইহা না করিয়া দুর্জয়সিংহ যদি পান্না, 'ছে আসিত, তাহার একটু তােষামােদ করিত, তাহার রূপের প্রশংসা করিত, তাহার মত মালবে আর কোন সুন্দরী নাই, একথাটু সুরক্ত ভক্তের মত বুঝাইতে পারিত, তাহা হইলে হয়ত অভিমানিনী পান্না অভাগা দুর্জয়সিংহের উপর মুখের বাসর। কতকটা বিরক্ত হইত না। দুর্জয়সিংহ সত্য সত্যই ‘ভাবিত, সে পান্নার পিতার দক্ষিণ বাহু স্বরূপ থাকিয়া পান্নাকে লাভ করিবে। দুর্গাঁধিপের পুত্র নাই, সিংহাসনের অধিকারী নাই, পান্নাকে বিবাহ করিতে পারিলে এ সিংহাসন তাহার ! আর দুর্জয়সিংহের এ কল্পনাটা যে অলীক ছিল তাহা নহে। সে যে নিতান্তই আকাশের উপর বাড়ী বানাইতেছিল, স্বপ্নের খেয়ালে মাতোয়ারা ছিল তাহাও নহে। এক দিনের ঘটনায় সে বুঝিতে পারিল তাহার অদৃষ্ট প্রসন্ন হইয়াছে। মালবের সীমান্তে ভীল প্রজারা বিদ্রোহী হইয়াছিল। তাহাদের কেহই দমন করিতে ছিল না। তাহারা দু’দশ দিন অতর্কিত ভাবে প্রজাদের , আক্রমণ করিয়া তাহাদের সব লুঠিয়া লয় । দুর্গাধিপতি পান্নার পিতা, তাহার পার্শ্বচর দুই এক জন সেনাপতিকে এ বিদ্রোহ দমন করিতে পাঠাইয়াছিলেন। কেহই সেই দুর্দান্তলুণ্ঠনশীল ভীলদের আয়ত্ব করিতে পারে নাই। শেষ দুর্গাধিপ দুর্জয়সিংহের উপর এই দুরূহ কাৰ্য্যের ভার দিলেন। বলা বাহুল্য স্বভাব সিদ্ধ কৌশলী বলিয়া, দুর্জয়সিংহ সেই বিদ্রোহী ভীদিগকে দমন করিয়া আসিল। কেবল যে দমন আর আনুগত্য স্বীকার করান তাহা নয়, দুর্জয়সিংহের কূটনীতিতে অনেক ভীল দুর্গাধিপের সেনাদল ভুক্ত হইল। ভীলেদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ আর নাই। অতি হইতে জঙ্গলের অন্তরালে পাহাড়ের উপরে থাকিয়া শত্রুর মস্তিষ্ক ভেদ করিতে তাহারা সিদ্ধ হস্ত! তাহাদের দর নিক্ষিপ্ত দৃঢ়লক্ষ্য বিষবাণে একবার বিদ্ধ হইলেই নিশ্চিত মত এই সময়ে মুসলমানের সহিত যুদ্ধ বাধিবার উপক্রম হইয়াছিল। আকবর সাহের সেনাপতি মালবের অনেক দুর্গাধি পতিকে আয়ত্বে আনিয়াছিলেন। কেবল জনকতককে পারেন নাই। এজন্য সম্রাটের নিকট তাহাকে যথেষ্ট অপমানিত হইতে হইয়াছিল।
৭৮ কল্পনা-কল্লোল । কুদৃষ্টি আসফ খাঁ দুই তিনবার, গােপনে বন পথশিয়ে পান্নার পিতার সুদৃঢ় দুর্গ আয়ত্ব করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু দুর্জয়সিংহের এই সমস্ত দিবারাত্র সজাগ বিশ্বাসী ভীলসেনার জন্য তাহা করিতে পারেন নাই। কেন পারেন নাই তাহা একটু বুঝাইয়া বলিতে হইবে। দুৰ্জ্জয়সিংহ তখন দুর্গাধিপতির একজন বিশ্বাসী সেনাপতি। দুর্জয় বীর, যৌবনমদোত্ৰান্ত রণকুশলী, সাহসী ও প্রকৃত পক্ষে সমরে দুর্জয়। একদিন দুর্গাধিপতি তাহাকে নির্জনে ডাকিয়া বলিলেন, “দুর্জয় ! শুনিয়াছ কি, প্রবল প্রতাপশালী দিল্লীশ্বর আকবর সাহ এই ক্ষুদ্র রাজ্যের উপর করিতেছেন। তাঁহার সেনাপতি আসফ খা আমাকে পত্র লিখিয়াছেন—“যদি এই পত্র প্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে আমি দুর্গ সমর্পণ না করি, বাদসাহের অধীনস্থ সামন্ত নরপতি বলিয়া তাহার তরকারি চুম্বন করি, তাহা হইলে তিনি আমার দুগাক্ৰমণ করিয়া বন্দী করিবেন। আমার কন্যাকে বাদীরূপে সম্রাটের অন্তঃপুরে পাঠাইবেন।” পান্না! তাহার জীবনের জীবন, প্রাণের প্রাণ, দেহের শােণিত, ধমণীর স্পন্দন, নেত্রের জ্যোতি, পান্না মােগল বাদসাহের ক্রীতদাসী হইবে ? —না--না একথা কল্পনার চক্ষেও অতি ভীষণ। শত দুর্গাধিপতি জাহান্নামে যাক, মালবের স্বাধীনতা মােগল করতলস্থ হউক, মালব ক্ষেত্ৰ–হিন্দুর শােণিতে পূর্ণ হউক, তাহাতে তাহার কোন ক্ষতিই নাই। কিন্তু পান্নার একটা মাত্র কেশ ও যেন কেহ স্পর্শ করিতে না পারে। দুর্জয়সিংহ মনে মনে ভাবিল, তাহার প্রাণের প্রাণ পাকে বাঁচাইতে হইলে মােগলকে বাধা দিতে হইবে। আসফ খাঁকে দলবল সমেত বিনাশ করিতে হইবে ! কিন্তু শেষের কাজটা তত সহজ ন.১ অগণ্য বাহিনীর অধীশ্বর মােগলসেনা নায়ককে সাক্ষাৎ যুদ্ধে হটাইয়া দেওয়া, তাহার ত সাধ্যাত্ব নয়। কূটবুদ্ধি দুর্জয়সিংহ মনে মনে কি ভাবল । দুর্গাধিপতিও চিন্তায় y মুখের বাসর। ৭১ বিষন্ন। কাজেই তিনি দুর্জয়ের অবাধ চিন্তা স্রোতে কোন বাধা দিলেন না। দুর্জয় অনেকক্ষণ ভাবিয়া স্থির করিল সম্মুখ যুদ্ধে অসংখ্য মোগল সৈন্তের প্রতিযােগীতা করা, তাহার ন্যায় ক্ষুদ্র ব্যক্তির পক্ষে সম্ভবপর নহে। যে মােগল বাহিনী হীঘাটের মৃত্যুচ্ছায়ামণ্ডিত উপত্যকায় প্রবেশ করিয়া রাজপুতের স্বাধীনতা নষ্ট করিয়াছে—বীর কেশরী রাজপুত কুল গৌরব রাণা প্রতাপের সর্বনাশ করিয়াছে, তাহাকে পথের ভিখারী করিয়া, তঁাহার জীবনাহুতি লইয়া ক্ষান্ত হইয়াছে-সে মােগণকে প্রকাশ্য যুদ্ধে বাধা দেওয়া অতি ধৃষ্টতার কাজ। দুর্জয়সিংহ মনে মনে সংকল্প আঁটিল যে, বিশ্বাসী ভীল সৈন্য চারিদিকে বেড়াইয়া বেড়াইয়া আসফখার গতি বিধর সন্ধান রাখিতে হইবে, সৰ্ব্বদা রাজধানী হইতে তাহাকে দূরে দূরে রাখিতে হইবে, যাতে সে দুর্গের সীমানায় আদতে না আসিতে পারে, দুর্গাধিপতির রাজ্যের সীমানায় না আসিতে পারে, তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে। অতি দরিদ্র ব্যক্তি সহসা সম্মুখে অসংখ্য প্রবিণ রাশি দেখিতে পাইলে যেমন প্রফুল্লচিত্ত হয়, দুর্জয়- সিংহ মস্তিষ্ক আলােড়নকারী ভীষণ চিন্তার ফলে এই পথ দেখিতে পাইয়া সেই রূপ আশান্বিত হইল। দুর্জয় আশা বিক্ষুব্ধ কণ্ঠে, উৎসাহপূর্ণ স্বরে বলিল—“রাজ! যদি আমি আপনার রাজ্য রক্ষা করিতে সমর্থ হই— আসফখাকে, এ রাজ্যের ত্রিসীমানায় না আসিতে দিই, তাহা হইলে আমার জীবনব্যাপী পরিশ্রমের কি পুরষ্কার দিবেন ?” ' দুর্গাধিপতি দুর্জয়ের এই কথা শুনিয়া মনে মনে শিহরিয়া উঠিলেন। কেন তাহার কারণ তিনি ভালরূপ জানেন। তিনি বুঝিলেন দুর্জয়সিংহ অতি স্বার্থপর ! কবহার জীবনেরমূলমন্ত্র হইলেও সে নিঃস্বার্থ ভাবে কৰ্ত্তব্য করিতে চাহে না। কিন্তু এ স্বার্থ কি ? ধনবড় ? না—তাহা হইলে সে ত তাহা খুলিয়াই বলিতে পারিত। তবে কি ? পান্না – পান্না ! যদি তাই ই হয় । তাহাতেই ?
৮০ কল্পনা-কল্লোল। ? বা ক্ষতি কি? আমি রাজ্য চাই, স্বাধীনতা চাই, পূর্বপুরুষের শৌৰ্য্য অক্ষুন্ন রাখতে চাই। এরূপে যে আমার সহায়তা করিবে, তাহাকে অদেয় ত কিছুই নাই। দুর্গাধিপতি সব বুঝিলেন! মানব চরিত্রের বৈচিত্রতা দেখিয়া তিনি চুল পাকাইয়াছেন! দুর্জয়সিংহ তাহার চক্ষে শিশুমাত্র। দুর্জয়সিংহের প্রকৃত মনােভাব জানিবার জন্য দুর্গাধিপতি প্রসন্ন মুখে বলিলেন, “কি চাও দুর্জয়সিংহ! অথ-প্রচুর অর্থ তােমায় দিতে পারি। যেরূপে তুমি আমার মান ইজ্জত সম্ভ্রম রক্ষা করিবে, তাহার পুরস্কার ত অর্থ নয় দুর্জয়- সিংহ।” দুর্জয়সিংহ একথায় একথায় উৎসাহিত হইল। তাহার চিন্তা ক্লিষ্ট মুখমণ্ডল হর্ষ প্রভামণ্ডিত হইয়া উঠিল। দুর্জয় বুঝিল—তাহার অদৃষ্ট অতি সুপ্রসন্ন। সুন্দরী লালমভূতা পান্না তাহার। পান্নার পিতার সুদূর বিস্তৃত রাজ্য তাহার ! দুজ্জয়সিংহ ধীরভাবে নম্বরে বলিল, “আপনার কাজে আমি এ জীবন সমৰ্পণ করিতে পারি। যে আপনার শত্রু, সে আমার এ স্বাধীনরাজ্যের শক্ত, আমার স্বার্থের শত্রু, তাহার উচ্ছেদের জন্য আমি এ হৃদয়ের উষ্ণ শােণিত-ধারা ঢালিয়া দিতে পারি। কিন্তু - কিন্তু—আমি অর্থ চাই —সম্পদ চাই না, চাই আপনার বিমল স্নেহ, চাই আপনার পুত্রত্ব ! দিতে পারিবেন কি ?” দুর্গাধিপতি সব বুঝিলেন, কিন্তু তিনি দুর্জয়ের নিজের মুখ হইতে কথাটা শুনিতে চান্। কাজেই পুন” বুলিলেন—“আমি ত তােমায় সন্তান অপেক্ষাও স্নেহ করি। আমার ত সন্তান ই একমাত্র কন্যা ঐ পান্না ! তাহার জন্যই আমার এত ভাবনা, এত চিন্তা! বলবল দুর্জয় ! কি পুরস্কারের বিনিময়ে তুমি আমার স্ত্রম রক্ষা করিতে পার।” দুর্জয়সিংহ আর মনােভাব চাপিয়া রাখিতে পারিল না! সে দুর্গাধি- সুখের বাসর। ৮১ পতির কথার ভাবে যথেষ্ট প্রশ্রয় পাইয়াছে, যথেষ্ট সাহসী হইয়াছে। কাজেই সে বলিল, “আমি অর্থ চাই না, কিছুই চাই না। এ বিশ্বের একমাত্র অমূল্য সম্পদ পান্নাকে আমায় দিন।” দুর্গাধিপতি সবিস্ময়ে একবার দুর্জয়ের মুখের দিকে চাহিলেন। তাহার চোখের সম্মুখে যেন সমস্ত বিশ্ব ঘুরিতে লাগিল। দুর্জয়সিংহ তাহার অপেক্ষা কুলেশীলে অনেক নীচে। পবিত্ৰ সূৰ্য্যবংশের শােণিত কখনও চন্দায়তের সহিত মিশিতে পারে না। কিন্তু শত্রু নগর দ্বারে, যে পান্নার বংশ গৌরবে তিনি এত গৰ্বিত, সেই পান্নারই সমূহ বিপদ। চায়ৎ কে তিনি অযােগ্য পাত্র ভাবিতেছেন, কিন্তু মুসলমান বাদসাহের অনুগ্রহের দাসী হওয়া অপেক্ষা কি চায় ভাল নয়। তিনি নিজে সাহসী, রণকুশল। কিন্তু জরা বার্ধক্য পীড়িত। দুৰ্বল হস্তে অসি চালনা করা, নিজের রাজ্য নিজ বাহুবলে রক্ষা করা, পান্নাকে রক্ষা করা, তাহার ত সাধ্যায়ত্ব নহে। দুর্গাধিপতি দেখিলেন একদিকে পান্না আর দুর্জয়সিংহ, অপর দিকে মােগল বাদসাহ ও পান্না। পান্না সুন্দরী ; সমগ্র ভারতের মধ্যে পান্নার রূপের গৰ্ব্ব-কথা ছড়াইয়া পড়িয়াছে। দুর্গ রাখিতে হইলে, পান্নাকে রাখিতে হইলে, দুর্জয়সিংহকে বিশেষ প্রয়ােজন। দুর্গাধিপ কি ভীষণ চিন্তায় পীড়িত, তাহা দুর্জয়সিংহ তখনই বুঝিতে পারিল। পারিয়া একটু বিদ্রুপ পূর্ণ স্বরে বলিল, -- “রাজন্ ! কি ভাবিতে ছেন? একটা সামান্য প্রশ্নের উত্তর দিতে এত কিসের ভাবনা।” দুর্গাধিপ। তুমি যেটা সহজ বলিয়া ভাবিতেছ, আমি তাহাকে বড়ই দুরূহ ভাবিতেছি। দুর্জয়। আর পান্নার ভবিষ্যৎ অদৃষ্ট কি আর ও দুরূহ সমস্যাময় নয়। দুর্গাধিপ। ৰটে ! কিন্তু সে সমস্যার নিরাকরণ রাজপুত অতি সহজেই করিতে পারে। রাজপুতনার ইতিহাসে এরূপ উদাহরণের অভাবও নাই।
१ কল্পনা-কল্লোল। দুর্জয়। বটে। তাহা হইলে আপনি পান্নাকে হত্যা করিতে চান ? মােগলের কাছে বলি দিবার পূর্বে কালের নিকট বলি দিতে চান। দুর্গা। তা ভিন্ন আর উপায় কি দুর্জয় ! দুর্জয়। তবু আমায় দিবেন না। দুর্গা। বৎস! তুমি যে চায়! দুর্জয়। চায়ৎ কি এত নীচ! কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞাসা করি- যদি আপনার সংকল্প সিদ্ধির অবসর না পান ? পান্নার সুকোমল বক্ষের শােণিত আকর্ষণে আমার এই দুর্বল হস্ত রক্ষাৰ্থ না হয়, তাহা ইইলে। দুর্গাধিপ সকল দিক দিয়া কথাগুলি ভাবেন নাই। দুর্জয় সিংহ যে ভাবে ঘটনাটাকে বুঝিতেছে তিনি সে ভাবে বুঝিতে চেষ্টা করেন নাই । পিতার স্নেহময় প্রাণে ভীষণ ঝঞ্চা উঠিল। তিনি মনে মনে ভাবিলেন- দুর্জয়সিংহ যাহা বলিয়াছে সত্যই তাই ঠিক। পান্নার জন্যই আসফখর এ দুর্গাক্রমণ। পান্নাকে লুঠ করিয়া সে হয় নিজের অঙ্কলক্ষ্মী করিবে, না হয় মােগল বাদশাহকে উপহার দিবে। আর মুখে যাহা বলিতেছি তাহা কাজে করিতে পারিব কি ? তখন এই ক্ষীণ কম্পিতহস্তে, চিন্তাজর্জ- রিত প্রাণে সাহস আসিবে কি ? তীক্ষ্ণধার উজ্জ্বল ছুরিকা যখন আলােক রশ্মিতে চক চক্ করিয়া উঠিবে, তখন আমার শক্তি ও সাহস সবই। পলাইবে। অকারণ কন্যাঘাতীর দুরপণেয় কলঙ্ক পসরা মাথায় লইয়া ফিরিতে হইবে। দুজ্জ্বয়ের কথায় দুর্গাধিপতির চক্ষু ফুটিল। তিনি এক সামান্য কথাতে বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল ঘটনাই , মনশ্চক্ষে দেখিলেন। তিনি উপায়ান্তর না দেখিয়া ক্ষুব্ধ স্বরে কম্পিতকণ্ঠে বান—তাহা হইলে কি চাও দুর্জয় !” “যাচাই, তাহা ত বলিয়াছি। “পান্না—আমার স্নেহময়ী পান্নাকে চাও”
সুখের বাসর।
“যাহা একবার বলিয়াছি, তাহার পুনরাবৃত্তি করিয়া কোন ধৃষ্টতা
করিতে চাই না।”
“পান্নার হৃদয় বুঝিয়াছ কি? পিতা হইয়া একথা জিজ্ঞাসা করা ভাল
দেখায় না। কিন্তু-পান্ন। রাজপুত কন্যা।”
আমিও রাজপুত। অসি আমার ব্যবসা! পান্নার হৃদয় আমি জানি।
সে বীর পূজায় বড় আনন্দ অনুভব করে।”
“কিন্তু আমি শুনিয়াছি—
“কি শুনিয়াছেন—
পান্না আর এক জনকে ভালবাসে !
“যার প্রাণ উদার, সে জগতের সবাইকে ভালবাসে। পান্না স্বর্গের
দেবী। আপনি পিতা হইয়াও তাহাকে চিনিতে পারেন নাই।”
*ধর—যদি পান্না তােমায় প্রত্যাখ্যান করে।”
*পান্না নারী। মহত্বে তাহার হৃদয় পূর্ণ। আত্মত্যাগে প্রেমের পুষ্টি।
আমি যদি প্রচুর আত্মত্যাগ করিতে পারি—আর পান্না যদি তাহা বুঝিতে
পারে, তাহা হইলে নিশ্চয়ই সে আমার হইবে।*
দুর্গাধিপ আর কিছু না বলিয়া–দুর্জয়ের পৃষ্ঠদেশে মেহময় হাত
‘বুলাইয়া বলিলেন,-“বৎস! তাহাই হউক। পান্না তােমারই হউক।
ভগবান একলিঙ্গ তােমার মনস্কামনা পূর্ণ করুন।”
ইহা হইতেছে কিছুদিন পূর্বের কথা। এই ব্যাপারের প্রায় একমাস
পরে—দুজ্জসিংহ পান্নার নিকট হইতে উন্মাদের মত বিদায় লইয়া সে রাত্রে
আসফখার শিবিরে যাইতেছিল। তাহার পর কি ঘটনা ঘটিয়াছে-পূর্বের
কয়েকটী পরিচ্ছেদে পাহাঁ বুঝিতে পারিয়াছেন।
অষ্টম পরিচ্ছেদ দুর্জয়সিংহকে পান্না যে রাত্রে বিদায় দেয়, তাহাকে আশান্বিত ও উৎসাহিত করিয়া বিপদের মুখে প্রেরণ করে, তাহার পর হইতে চল্লিশ ঘণ্টা, সে দুর্জয় সিংহের কোন সংবাদই পায় নাই। পান্না এজন্য বড়ই ভাবিতেছিল! সে দুর্জয়কে মনে মনে ঘৃণাই করুক, বা ভাল না বাসুক, তাহার বীরত্ব শৌর্যবীর্যের পূজা সে মনে মনে করিত। আর পান্না জানিত এই দুর্জয়সিংহ তাহার পিতার দক্ষিণ হস্ত। দুর্জয় থাকিলে, তাহাদের সর্বস্ব যাইবে। পিতা যাইবেন, দুর্গ মুসলমানের দখলে আসিবে, শেষ তাহার সর্বনাশ হইবে। পান্না প্রভাতে উঠিয়া দুর্গ প্রান্তবর্তী স্বচ্ছ সলিলা নর্মদা জলে স্নান করিয়া আসিয়াছে। সেই সুবিমল প্রভাতে উষা কিরণ রাগরঞ্জিত, স্বর্ণচুড়াময় ত্রিকালেশ্বর দেবের মন্দিরে গিয়া তাহার পূজা করিয়া আসিয়াছে। পূজায় তত একাগ্রতা, তত তন্ময়তা সে জীবনে কখনও দেখায় নাই। পূজা করিতে করিতে কখনও তাহার চোখ দিয়া জল বাহির হয় নাই। আজীবন পূজাকালে সে পিতারই মঙ্গল কামনা করিয়া আসিয়াছে, আর কাহারও করে নাই। সে দিন সে একজনের জন্য কেবল সেই নিশ্চল, ভাষাহীন শিবলিঙ্গকে সম্বােধন করিয়া বলিয়াছে,-“হে ঠাকুর! হে রাজপুতের ইষ্ট দেবতা হে, ক্ষত্রিয়ের কুল নায়ক! তুমি যদি সত্যের হও, তাহা হইলে দুর্জয় সিংহকে বিপ মাপদে রক্ষা করিও। আমি না বুঝিতে পারিয়া হৃদয়ের আবেগ ভরে তাহাকে উত্তেজিত করিয়াছি। তাহাকে বাঁচাও। তাহাকে বড় মুখ করিয়া পাঠাইয়াছি, দেখিও ঠাকুর! যেন মুখ রক্ষা হয়। আজীবন তাহাকে ঘৃণা করিয়া সুখের বাসর। ৮৫ ; আসিয়াছি, তাহার হঠকারিতার জন্য, দাম্ভিকতার জন্য তাহাকে বিরাগ ভরে দেখিয়াছি ; হে ঠাকুর ! সে যেন আমার পিতার শত্রু, মালবে রাজ- পুত স্বাধীনতার শত্রু, আমার শত্রু মােগল সেনাপতি আসফখাকে বিধ্বস্ত করিয়া আসিতে পারে।” সেই পাষাণ দেহ, পাষাণ মন, ঠাকুর, পান্নার সেই নেত্ৰনিঃসৃত অশ্রু ধারার সহিত, তাহার প্রাণের কাতর প্রার্থনা শুনিলেন কি না, শুনিয়া তাহা পূর্ণ করিলেন কিনা, তাহা ত কেহ বলিতে পারে না। পাঠক পূৰ্ব্ববর্তী ঘটনার বিকাশে দেখিয়াছেন ঠাকুর পান্নার কাতর প্রার্থনা শুনিয়াও শুনেন নাই। পান্না অঞ্জলি ভরিয়া বিশ্বদল সইয়া তাহা চন্দন পরিসিক্ত করিয়া ভগবান একলিঙ্গের মাথায় চড়াইল। তারপর গললগ্নীকৃত বাসে প্রণাম করিয়া সেখান হইতে ধীরে ধীরে নিজ কক্ষে প্রত্যাবর্তন করিল। তবে নবম পরিচ্ছেদ পাঠক! এইবারবার আমাদের আসফ খাঁর অনুসরণ করিতে হইবে। কি করিয়া আসফ খাঁ, ভীল সৈন্যের ভীষণ কবল হইতে মুক্তি লাভ করিয়া স্বাধীনতা লাভ করিল, তাহা একবার বলিতে হইবে ভামস, দুৰ্ম্মদ সিং নামক একজন অধীনস্থ অথবা উচ্চপদস্থ সৈনিককে, নাতীর নিকট আসফখাকে হাজির করিবার ভার দিয়া- ছিল। এই দুর্মদ রণেয়ে হইলেও বুদ্ধিতে একটু নির্বোধ ছিল। সে মনে মনে ভাবিল,আসফ খাঁ একা—তাহার সঙ্গে কেহ নাই। মােগলের যেরূপ ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িয়াছে, তাহাতে তাহাদের প্রত্যাগমনেরও কোন সম্ভাবনা নাই। কাজেই সে জনকয়েক বিশ্বস্ত ভীল-সেনার জিম্মায়
কল্পনা-কল্লোল।
আসফ-খাকে দিয়া সৈন্যদলকে দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া তাহার অগ্র ও
পশ্চাতে রাখিয়াছিল—আর নিজে সকলের অগ্রে অগ্রে যাইতেছিল।
সিকি পথ যাইবার পর আসফ-খা মনে মনে বলিলেন-“কি কলঙ্ক।
কি লজ্জা! এই হতভাগ্য নির্বোধ ভীলগণ শেষ কিনা আমাকেই
বন্দী করিল? হায় ! কেন আমি সম্পূর্ণরূপে সজ্জিত ছিলাম না।
কেন নিদ্রাসুখে বিভাের হইয়া, নিজের সর্বনাশ করিলাম। বাদসাহের
সেনাক্ষয় করিলাম! আকবর সাহ কর্তব্যজ্ঞানহীন সেনানীকে কখনই
মার্জনা করেন না। যদি কখনও এই হতভাগ্য ভীদিগের হাত হইতে
মুক্তি পাই, তাহা হইলে আগরায়ও আর ফিরিতে পারি না। প্রচুর
অর্থদান করিলেও কি আমি মুক্তি পাইব না!”
এই সমস্ত কথা ভাবিতে ভাবিতে আসফ খাঁর উর্বর মস্তিষ্কে একটা
মতলব আসিল! তিনি উন্মুক্ত-কৃপাণ-ধৃতকর এক ভীলকে বলিলেন—
*তােমাদের সেনাপতির নাম কি ভাই ?
ভীল বলিল—“তঁাহার নাম ভামস।”
আসফ। তিনি কোথায়। একবার তাহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে চাই।
ভীল। তিনি অনেক পশ্চাতে আছেন। মাতাজীর আশ্রমে তঁার ।
দেখা পাইবেন।
আসফ। মাতাজী কে?
ভীল। কে তা জানিনা, তবে তিনি আমাদের সকলের মা।
আসফ। তিনি সকলের মা কিরূপ?
ভীল। সকলকে তিনি সমানভাবে
আতুর তার চিরপ্রিয়।
আসফ। যদি তাঁর এত দয়া, তিনি
ज
মাটির মানুষ-তাহ।
হইলে আমাকে তার কাছে লইয়া যাইতেছ কেন?
। দরিদ্র, অন্ধ,
সুখের বাসর।
৮৭
ভীল। তা জানি না। ভীলদের স্বভাবই এই, তার আদেশ পাইলে
তাহা পালনই করিয়া থাকে- তাহার কারণানুসন্ধান করে না।
আসফ। এই মাত্র বলিলে ভামসা চলিয়া গিয়াছেন। এখন
তােমাদের দলপতি কে?
ভীল। দুৰ্ম্মদ সিংহ।
আসফ। তিনি কোথায় ? তার কাছে আমায় লইয়া চল।
ভীল। আপনি অপেক্ষা করুন, আমি এখনি তাহার মত জিজ্ঞাস
করিয়া আসি।
এই বলিয়া সেই ভীল যুবক পাশ কাটাইয়া, একদিকে দ্রুত চলিয়া
গেল। আসফখর হস্তপদ আবদ্ধ নহে। কিন্তু প্রহরীগণ তাহাকে
এরূপভাবে ঘেরিয়া চলিয়াছে, যে তাহার পক্ষে কোনরূপে ছুটিয়া পলায়ন
অসম্ভব ব্যাপার।
তখনও উষার আলােক দেখা দেয় নাই। তখনও আকাশের কোলে
অন্ধকারের রাজত্ব। তখনও গগনপ্রান্ত বালার্ক-কিরণ-রাগে রঞ্জিত
হয় নাই। তখনও পক্ষী সকল কোটর হইতে বাহির হইয়া প্রভাত
গগনে উড্ডীয়মান হয় নাই।
আসফ খ। মনে মনে ভাবিলেন—এই অপরিচিত পৰ্বতময় প্রদেশে
পলাইয়াই বা বাচিব কোথায়। এই ভীলগণ এখনি আমায় ধরিয়া
ফেলিবে। তারপর, তারপর, এ পলায়নের অখ্যাতির কলঙ্ক জীবনেও
মুছিবে না।”
আসফ খা আরও ভাবিতেন—“আমি মােগলের নাম কলঙ্কিত
করিয়াছি, সম্রাটের ৰােন্বিত নামের উজ্জ্বল প্রভা মলিন করিয়াছি-
হায় খােদা ! আমার কি সর্বনাশ করিলে ?”
এমন সময়ে সমস্ত ভীহিনী এক তুৰ্য-নিনাদ শুনিয়া স্থির হইয়া
দাড়াইল ! আসফ খাঁ এ তুৰ্য্য মিনাদের কারণ কি বুঝিতে পারিলেন না।
৮৮ কল্পনা-কল্লোল। সেই যুবক ভীল ঠিক এই সময়ে ত্বরিত পদে অগ্রসর হইয়া বলিল- “আপনি এখনি আমার সঙ্গে আসুন। সেনাপতি আপনাকে ডাকিতে- ছেন। দশম পরিচ্ছেদ আসফ খ। সেই ভীলের সহিত দুৰ্ম্মদসিংহের নিকট উপস্থিত হইলেন। তিনি সেখানে যে দৃশ্য দেখিলেন, তাহাতে তাহার কেশ কণ্টকিত হইল। দুদসিংহ প্রস্তরাসনে এক গ্রাধ-বৃক্ষতলে বসিয়া আছেন। আর তাহার সম্মুখে আর একটী গাছের গায়ে বন্য লতা-গুল্মাদির দ্বারা আবদ্ধ এক মােগল সৈনিক। দুৰ্ম্মদ সিংহ আর একটী অনতিবৃহৎ শিলাখণ্ডের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া ধীরস্বরে বলিলেন—খা সাহেব! এই বৃক্ষে আবদ্ধ ব্যক্তিকে চেনেন ?” আসফ খ। সে মূর্তি দেখিয়া চিনিলেন, সে ব্যক্তি তাহার সহকারী সেনাপতি হিম্মত খা। দুৰ্ম্মদ সিংহ-বগম্ভীর কণ্ঠে বলিল—“মােগল সেনাপতি। আবদ্ধ মােগল সৈনিক একজন ভীলকে হত্যা ও আর একজনকে অাহত করিয়াছে। আমি এখনই ইহার প্রাণদণ্ড করিতাম, কিন্তু তাহার পূৰ্ব্বে আপনাকেই অনুরােধ করিতেছি, ইহাকে জিজ্ঞাসা করুন, কেন এই ব্যক্তি এই কাৰ্য করিল ।” আসফ-খ। হিম্মত সিংহকে ভালরূপই চিনিতেন। দুইজন ভীলকে হত্যা করিলেই যে তাহার উদ্ধার সাধন হইতোহা নহে। তবে কেন সে এরূপ গর্হিত কাজ করিল ? এই সুখের বাসর। দুদ সিংহ যে শিলাতলে বসিয়াছিল, সে স্থান হইতে, সেই মােগল সৈনিক প্রায় দশ হাত দূরে একটা মধ্যমাকৃতি বৃক্ষকাণ্ডে আবদ্ধ। আসফ খ। ধীরপদে সেইদিকে অগ্রসর হইয়া বলিলেন,-“হিম্মত খা। কেন এ কাজ করিলে ?” হিম্মত খা আসফের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিক্ষেপ করিয়া বলিল,-“কেন করিয়াছি তাহা বলিব না।” এই কথাগুলি একটু উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া সে অস্ফুট স্বরে বলিল— “ইহাদের গত সংযত করিবার জন্যই এই কাজ করিয়াছি। আপনার উদ্ধারের জন্যই এ সব করিয়াছি। আমার একটু সময়ের প্রয়ােজন। তাই এইভাবে সময় করিয়া লইতেছি। মােগলসেনা সমূহ একত্রিত ও শ্ৰেণীবন্ধ হইয়া আপনার উদ্ধারের জন্য পাহাড়ে উঠিতেছে। আসফ খ। -এতক্ষণে সবকথা বুঝিলেন। হিম্মত খাকে মনে মনে ধন্যবাদ দিয়া উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন—“সত্য কথা প্রকাশ করিয়া বল, আমিও এই হত্যাকাণ্ড জন্য তােমার উপর অসন্তুষ্ট। দুৰ্ম্মদ সিংহ এ কথা গুলি শুনিতে পাইল। সে বলিল—যদি না বল জানিও মৃত্যু তােমার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। হিমুত খ! বলিল—“একটী পিপীলিকা বধ করিতে যেমন কষ্টবােধ হয় না, বিশেষ পাপ হয় না, একটা ভীলকে বধ করা আমি তাহাই মনে করি এ কথায় দুৰ্ম্মসিংহ অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া নিজের বর্ষা উর্দ্ধে তুলিল। কিন্তু আবার কি ভাবিৰাট ধীরে ধীরে পার্শ্বে রাখিয়া বলল, “আমি তাের মত পশুকে অতি সহজেই বুঝাইতে পারিতাম যে একজন সাহসী ভীলের জীবনের মূ্য, আর একজন মােগল সৈনিকের জীবনের মূল্য ইহার পার্থক্য কতদূর। বড় দুঃখ রহিল, যে তাহা এ যাত্রা পারিলাম । আমরা যুদ্ধ ব্যতীত মনুষ্য হনন করিব না এ প্রতিজ্ঞায় যদি 2 ৯০ কল্পনা-কল্লোল। মাতাজীর নিকট আবদ্ধ না হইতাম, তাহা হইলে এতক্ষণ তাের ছিন্নমুণ্ড এই উপত্যকাবাসী শৃগাল কুকুরের ভক্ষ্য হইত।” দুৰ্ম্মদসিংহ আর কিছু বলিয়া একজন ভীলকে বলিল—“তােমার পাগাড়ীর কাপড় দিয়া এই পাপিষ্ঠকে উত্তমরূপে বাধিয়া লও। সেনাপতি ভামশা ও মাতাজী স্বয়ং ইহার বিচার করিলেন।” এই বলিয়া সে তুৰ্য্যধ্বনি করিবামাত্র, বন্দী দয়কে মধ্যে করিয়া, অজাগর-গতিতে এই ভীলসৈন্য আবার পৰ্বত-পথ অতিক্রম করিতে লাগিল। আসফ খা ও হিম্মত খ। পাশাপাশি যাইতেছেন আসফ খাঁ বলিলেন,-“হিম্মত! উপায় কি ? হয়তঃ দুইজনকেই ইহাদের হাতে মরিতে হইবে। হিম্মত মৃদুস্বরে বলিল—“আমি সমস্ত বন্দোবস্ত না করিয়া কিছু এই ভীলদের সহিত বিবাদ করি নাই।” অগ্রগামী ভীলগণ এই সময়ে সহসা চীৎকার করিয়া উঠিল। তাহারা আর অগ্রসর হইতে চাহে না। দুৰ্ম্মদ সিংহ বজ্রনির্ঘোষস্বরে বলিলেন-“ব্যাপার কি?” একজন বলিল—“মােগলসৈন্য পাহাড়ের মুখে কামান বসাইয়াছে।” কথা শেষ না হইতে হইতে “আল্লা হো আকবর” শব্দে দিগদিগন্ত, কম্পিত হইয়া উঠিল। মােগল সৈন্যগণ সত্য সত্যই পাহাড়ের উপর উঠিয়া পড়িয়াছিল। দুৰ্ম্মদ সিংহ বলিলেন-“ভীলগণ! যুদ্ধে কাজ নাই। যে যেখানে পার পলায়ন কর। বিপৰ্য্যন্ত ভীলগণ দুসিংহের আদেশ পালনে কাল বিলম্ব করিল না। যে যে দিকে পারিল, পাহাড়ে জঙ্গলে প্রবেশ ক্ষরিয়া আত্মরক্ষা করিল। মােগল সৈন্যেরা বিনাযুদ্ধে জয়লাত হইল।
মুখের বার। আর আসফ খ।! তিনি সহাস্যমুখে মােগল সেনাদলে প্রবেশ করিলেন। মােগল সেনাগণ তাহাকে অক্ষত শরীরে ফিরিতে দেখিয়া-“আল্লা হো আকবর” শব্দে সেই উপত্যকা ভূমি কোলাহলময় করিয়া তুলিল। আসফ খা—হিম্মত খাকে আলিঙ্গন করিয়া বলিলেন-“আজ হইতে তুমি আমার দোস্ত ! তােমার জন্যই আমি এ প্রাণ ও স্বাধীনতাফ রয় পাইয়াছি।” হিম্মত খা—নতজানু হইয়া ভূমিতে বসিয়া বলিল,-"এ অধীন যখন, দিল্লী সহরে না খাইতে পাইয়া মরিতে বসিয়াছিল, তখন আপনি আশ্রয় দিয়া আমার প্রাণ বাঁচাইয়াছেন। ইহা কিছু নয় জনাব!” আসফ-খা, মােগলসেনাসমেত, নিম্নের উপত্যকায় নামিলেন। উঠি- বার সময়ে যত সময় লাগে নামিবার সময়ে তাহার অপেক্ষা অনেক কম সময়ে কাজ হয়। একাদশ পরিচ্ছেদ মোগল-সৈন্য নিরাপদে, পৰ্বত নিম্নস্থ প্রান্তরে উপস্থিত হইল। সেই ক্ষুদ্র উপত্যকা—যেস্থান চিরদিনই পক্ষীকুজনের প্রতিধ্বনি বুকে বহিয়া আসিয়াছে—মােগল ও রাজপুতের সংঘর্ষে অতি অল্প সময়ের মধ্যে শােণিত রঞ্জিত : উঠিল। তবে শােণিতপাতের পরিমাণ খুব কম। সেই পার্বত্যভূমি সম্পূর্ণরূপে শােণিত রঞ্জিত হইবার পূর্বে রাজপুত ভীলগণ পরাজিত হইল।মাগল সেনাপতি পুনরায় স্বাধীনতা লাভ করিয়া ফিরিয়া আসিলেন।
কল্পনা-কল্লোল। আসফ খাঁর সকল ক্রোধ, দুর্গাধিপতি যোধসিংহের উপর পড়ল। যে সমস্ত রাজপুতের সহিত তিনি সেই উপকার খণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত ইয়াছিলেন, তাহার বিশ্বাস তাহার দুর্গাধিপ িযাপ সিংহের লোক শিবিরে ফিরিয়া আসিয়া অপরাহ্নে তিন তাহার দলের প্রধান বর্গকে একত্রিত করিয়া বলিলেন,-“আমি রাজপুত হস্তে বন্দী হওয়ায় মােগল গৌরবের যথেষ্ট অবনতি হইয়াছে। এ গৌরব পুনরুদ্ধারের একমাত্র উ য় দুর্গ' ধিপত যােধ সিংহকে বন্দী করা। এই নির্বোধকে যখন বনরূপে শৃঙ্খলত করিয়া আগরায় আকবর সংহের নিকট পাঠাইব, তখন সে বুঝিবে মোগলকে অন্যায় স্কন্ধে বন্দী করার কি ফল, প্রায়শ্চিত্ত কি ভীষণ।” প্রধান প্রধান মােগল সেনানীগণ,আসফ খাঁর চারি পার্শ্বে দণ্ডায়মান। তাহার এই কথায় সকলেই অসি কোষমুক্ত করিয়া তাহা উদিকে তুলিয়া বলিল,-“জনাবের হুকুম এখনি পালিত হইবে। পালিত হইবে। আমরা অদ্যই দুর্গক্রমণ করিতে প্রস্তুত।” তাহাদের মধ্যে তুণ খা নামক একজন সেনাপতি বলল “রাজ- পুতেরা বড় সুচতুর। যদ তাহারা পূর্বাহ্নে জানিতে পারে, যে আমরা তাহাদের আক্রমণ করিতে যাইতেছি, তাহা হইলে আমরা যথেষ্ট : বাধা পাইব। হয়ত দুর্গক্রমণ ব্যাপার একটা উপাসের ব্যাপারে পরিণত হইবে। আর এক কথা শুনিয়াছি, 'যাধসিংহের এক পরমাসুন্দরী কন্যা আছে। তাহাকে রঙ্গমহলের বাদী করিতে না পারিলে আমাদের এ অপমানের প্রতিশােধ অসম্পূর্ণ থাকিবে। সকলেই এই কথায় হো হাে করিয়া হাস,উঠিল আসফ খ মুখ গম্ভীব করিয়া বলিলেন-“তুৱাণ খা! যােধ সিংহের দুর্গ দখল করা ৰদূর সহজ, তার কন্যা সেই রাজপুতবা আয়ত্ত করা তদপেক্ষা বিপদজনক। রাজপুতেরা কথায় কথায় জহর খায় ,কথার কথায় আগুনে সুখের বাসর। । ঝাঁপ দেয়, ও সংকল্প ছাড়িয়া দাও। এই স্বয়ং সম্রাট চিতাের বিজয় করিলেন—কয়জন রাজপুতনীকে তিনি জীবন্ত ধরিতে পারিয়াছিলেন। সৈ ক্ষেত্রে আমিও সম্রাটের প্রধান সেনাপতির পার্শ্বরক্ষক ছিলাম— সবই ত স্বচক্ষে দেখিয়াছি।” তুরাণ খ। এই কথায় একটু অপ্রস্তুত হইয়া বলিল—সে পরের কথা, সে ভারটা আমারই রহিল।” তারপর সেই সান্ধ্য সমরসভায় আর এক প্রশ্ন উঠিল—“দুর্গের পশ্চাৎ- ভাগ হইতে সহসা আক্রমণ করাই ঠিক। কিন্তু পথঘাট আমাদের অপরিচিত। সহজ পথ দেখায় কে ? এমন সময়ে সেই শিবির-কক্ষের এক প্রান্ত হইতে প্রতিধ্বনি হইল, “আমি দেখাইব। যে দিক হইতে সেই প্রতিধ্বনি আসিয়াছিল, সকলের দৃষ্টি সেই দিকে পড়িল। শিবির উজ্জ্বল আলােক-পূর্ণ। সকলেই সেই উজ্জ্বলালােকে দেখিল-এক সুদীর্ঘকায় ভীল দাড়াইয়া রহিয়াছে। আসফ খা উত্তেজিত স্বরে বলিলেন—“এখানে এ ভীল আসিল কি করিয়া? নিশ্চয়ই এ শত্রুর গুপ্তচর। ইহাকে বন্দী কর।” সেই দীর্ঘকায় ভীল সেই স্থান হইতে অতি তীব্ৰস্বরে বলিল- “আপনাদের অতকষ্ট স্বীকার করিতে হইবে না। বৃথা রক্তপাতে কোন ফল নাই। আমি স্বেচ্ছায় আপনাদের নিকট যাইতেছি। বন্দী হইবার ভয় থাকিলে এখানে আসিতাম না । ভীল ধীর পদবিক্ষো-সিফ খাঁর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। সেই সমুন্নত দেহ-সেই অগ্নিময় তেজপূর্ণ চক্ষু—সেই প্রশস্ত ললাট-সেই আজানুলখিত বাহু দেখিয়া আসফ খাঁ বুঝিলেন-লােকটা বাজে লােক নয়। সে একজন বীর পুরুষ।
কল্পনা-কল্লোল।
সেই ব্যক্তি নিকটে আসিয়া আসফ খাকে একটা লম্বা সেলাম করিয়া
বলিল—“মােগল সেনাপতি ! আপনি আমার সহায়তা চান কি ?”
আসফ খা—তাহাকে বসিতে আসন গ্রহণ করিতে ইঙ্গিত করিলেন।
সে নিকটস্থ এক শূন্য আসন অধিকার করিয়া বসিল। কোন দিকেই
তাহার দৃষ্টি নাই।
নাই। কোন ব্যাপারেই তাহার ভ্রুক্ষেপ নাই।
আসফ খ। ধীর গম্ভীর স্বরে বলিলেন—“তুমি এখানে আসিলে
কিরূপে? এ শিবির প্রহরী রক্ষিত।
সেই ব্যক্তি ঈষৎ হাস্য করিয়া বিপপূর্ণ স্বরে বলিল,-“আজ ত আমি
একা আসিয়াছি, কিন্তু সেইদিন তিন শত রাজপুত ও ভীল আপনার
'প্রহরীদের সতর্ক দৃষ্টি এড়াইয়া শিবিরে আসিয়াছিল কিরূপে সাহেব !”
আসফ খাঁ এ কথার কোন উত্তর দিতে পারিলেন না। তিনি এই
বিপপূর্ণ কথায় একটুও বিচলিত না হইয়া বলিলেন-“তুমি কে?”
“আমার পরিচয়ে আপনার লাভ কি ? আপনার সহায়তা করিতে
আসিয়াছি-পরিচয়ের প্রয়ােজন কি ?
“পরিচয় না পাইলে আমি তােমায় বিশ্বাস করিব কিরূপে?
“আমার পরিচয় এই—আমি দুর্গাধিপতি যােধ সিংহের শত্রু। তাহার
সর্বনাশ আমার জীবনের ব্রত।
*এ শত্রুতার কারণ কি?”
তঁাহার সুন্দরী কন্যা-পান্না।”
“পান্না-পান্না, যােধ সিংহের সুন্দরী কন্যার নাম পান্না ?”
সেই
যুবক যেন, মুসলমান সেনাপতির মুখে পান্নার নামােচ্চারণেও
মৰ্ম্মব্যথা পাইল। তাহার মুখমণ্ডল লােহিত
তাহার মুখমণ্ডল লােহিত কনসারণ করিল। কিন্তু
তখনই সে মনােভাব প্রচ্ছন্ন করিয়া বলিল-“ই। পান্না।
“কন্যার জন্য তাঁহার পিতা তােমার শত্রু ব্যাপার ত কিছু বুঝিতে
পারিতেছি না—”
সুখের বাসর আপনি অত বড় সেনাপতি—আর এই সহজ কথাটা বুঝিতে পারেন না? আমি ভীল নই-একজন রাজপুত।” আমি পান্নার হস্তপ্রার্থী হই—আর দাম্ভিক দুর্গাধিপতি আমায় অপ- মান করিয়া তাড়াইয়া দেয়। সেই অবধি আমি বনে জঙ্গলে ঘুরিয়া বেড়াইতেছি।” আসফ খা—যেন সমস্ত ঘটনাটা বুঝিয়াছেন, এরূপভাবে উহার শির সঞ্চালন করিয়া বলিলেন—“ওঃ! এখন সব কথা বুঝিয়াছি। কিন্তু পান্নার অপেক্ষাও ত তুমি আরও সুন্দরী পাইতে পার।” “আমি পান্নাকে চাই। তাহাকে পাইলে নরকে যাইতেও প্রস্তুত। “কি স্বত্বে আপনি আমাদের সহায়তা করিতে চান ? আর এ ক্ষেত্রে কি সহায়তা করিবেন ? “বােধসিংহের দুর্গ, পৰ্বতের উপত্যকায়। এ পর্যন্ত কেহ তাহা জয় করিতে পারে নাই। আপনারাও পারিবেন না। কিন্তু এক টী গুপ্তপথ আছে—যাহার সন্ধান পাইলে আপনারা এক মুহূর্তে এই অজেয় দুর্গ জয় করিতে পারেন।” “সে পথের সন্ধান আপনি বলিয়া দিতে পারিবেন না ?* পারিব—তাহা না হইলে আসিয়াছি কেন ? “আপনি কি যােধসিংহের আবাসপুরীর সকল তথ্যই জানেন?” বহুদিন সেখানে বাস করিয়াছি—জানি বই কি। “আপনি আমাদের দুর্গের গুপ্তপথ দেখাইয়া দিবেন?” “দিব— “কি পুরস্কার ? “পান্নার মর্যাদা।” “এ কথার অর্থ কি?
কল্পনা-কল্লোল।
“যিনি দুর্গ জয় করিবেন, পান্নার উপর তাহার কোন অধিকার
থাকিবে না।
পান্নাকে, আমি লইয়া আসিব।”
যদি পান্না আপনার সঙ্গে না আসে ?”
সে কথা আমি বুঝিব।”
“পান্না এখনও অবিবাহিতা?”
म
“আপনি তাহাকে কুপথে লইয়া যাইতে চান?”
“দ্বিতীয় বার ওকথা বলিবেন না ! সে আমার ভাবী ধর্মপত্নী
রাজপুতকন্যা। আমিও রাজপুত। তাহার মর্যাদা রক্ষা, আমার প্রধান
উদ্দেশ্য।
“আচ্ছা ইহাতে স্বীকৃত হইলাম। অর্থ চান ?”
“না—অর্থে আমার প্রয়ােজন নাই।”
আপনার আর কোন প্রার্থনা নাই ?”
“আছে-
*যোধসিংহের স্বাধীনতা-
তাহা হইবে না-
“তাহা হইলে আমিও আপনাদের সহায়তা করিব না।-আমি
উঠিলাম।”
“যখন আমাদের ভিতরের কথা জানিয়াছেন—তখন ' আপনাকে
ছাড়িয়া দেওয়ায় আমাদের সম্পূর্ণ বি
না দিলেও বিপদ
*কেন?”
“এক সহস্র ভীল আপনাদের ধ্বং=ে জন্য ওই বনমধ্যে তাহাদের
বা শানাইতেছে! তাহাদের তুণীরে বিষপূর্ণ তীর।”
সুখের বাসর।
“তুমি প্রাণভয়ে একথা বলিতেছ।”
“রাজপুত মৃত্যুর ভয় করে না। আর সে ভয় থাকিলে, এখানে
আসিতাম না।
“সে ভীল সৈন্যের নায়ক কে? যােধসিংহ ?
“না—মাতাজী।”
“মাতাজী! সে ত স্ত্রীলোক ! তাহার কথা আমি পূর্বে
শুনিয়াছি।”
“সে স্ত্রীলােক হইলেও সিংহী—আপনার সেনা-তাহার সেনার
সহিত সম্মুখ যুদ্ধে এক দণ্ডও আঁড়াইতে সক্ষম হইবে না।”
“মাতাজীর ত কোন শত্রুতাই আমি করি নাই।”
কিন্তু আপনি যােধসিংহের শত্রুতা করিতেছেন?”
যােধসিংহের সহিত মাতাজীর সম্বন্ধ কি ?”
“প্রত্যেক রাজপুত-কন্যা দেশাধিপতিকে পিতা বা ভ্রাতারূপে গণ্য
করে।*
*এ সৈন্য-পালনে মাতাজীর স্বার্থ কি ?
“যাহাতে মুসলমান মালবের স্বাধীনতা নষ্ট না করিতে পারে, তজ্জন্যই
এই বিশাল সৈন্যের সৃষ্টি।
“তাহা হইলে আমি অগ্রে মাতাজীকে বন্দিনী করিব।
“সাহেব! আপনার দুনিয়ার দিন শেষ হইয়া আসিয়াছে
দেখিতেছি।”
“কেন?”
স্বেচ্ছায় আপনি কালসর্পের বিবরে হস্ত প্রবেশ করাইতে উদ্যত
এই মাতজীকে ধরিবার সুস্থ আপনার প্রভু আকবর-সহ অনেক চেষ্টা
করিয়াছিলেন—কিন্তু পারিয়াছিলেন কি?”
1
!
৯৮
কল্পনা-কল্লোল।
তিনি পারেন নাই বলিয়া, যে আমি পারিব না--তাহার কারণ কি?
বিশেষতঃ যে সময়ে তিনি চেষ্টা করেন সে সময়ে রাজপুতানার যুদ্ধ লইয়া
তিনি মহাব্যস্ত।
তবে আপনার ইচ্ছানুযায়ী কাৰ্য্য করুন।
সেই সভায় উপস্থিত মােগল সেনানীগণ—স্থিরচিত্তে এই সমস্ত কথা
শুনিতেছিল। এই সময়ে তাহাদের মধ্য হইতে তুরাণ খ একটু অগ্রসর
হইয়া আসফ খাঁর কাণে কাণে কি বলিল।
আসফ খ্ৰী। সেই ভীলবেশী রাজপুতকে বলিলেন,-মাতাজীর কথা
পরে হইবে। উপস্থিত যােধসিংহের দুর্গ ধ্বংস করাই, আমার অভিলাষ।
অঙ্গ নিশীথে আমরা আপনার প্রদর্শিত পথে—গুপ্তভাবে দুর্গাভিমুখে যাত্রা
করিব। কিন্তু যদি আপনার সহায়তায় দুর্গ জয় না হয়।
“তাহার জন্য কি আমি দায়ী সাহেব! মােগলের বাহুবল—দুর্গ জয়
করিবে। মােগল সেনার সমর-কুশলতায় দুর্গ আপনার অধীনে আসিবে।
আমি পথ-প্রদর্শক মাত্র। দুর্গ জয়ের জন্য নিযুক্ত সেনাপতিও নই।”
যদি আপনার কোন বিশ্বাসঘাতকতা প্রমাণ হয়--
“তাহা হইলে আমি উপযুক্ত দণ্ডের অধীন হইব। আমি ত
আপনাদের সঙ্গেই থাকিব।
“কিন্তু যতক্ষণ না দুর্গ জয় হয়, ততক্ষণ আপনার কোন স্বাধীনতাই
থাকিবে না।”
তাহাও স্বীকার করিতেছি।”
“আপনি এখন আমাদের বন্দী।
“তাহাতেও কোন বাধা দিব না।”
পাঠক! এ রাজপুতকে চিনিয়াছেন কি! ইনি স্বয়ং দুর্জয়সিংহ।
আসফখ এতক্ষণের পর দুর্জয়সিংহকে বর্সিতে আসন দিবার আদেশ
করিলেন।
সুখের বাসর দুর্জয়সিংহ বিদ্রুপ পূর্ণ স্বরে বলিলেন-“মােগল সেনাপতির সৌজন্যে আমি বিশেষ আহলাদিত হইলাম।” দুর্জয় এই কথা বলিয়া নিকটস্থ এক আসনে উপবিষ্ট হইলেন। হইলে সে পাইত। যদি কেহ এই সময়ে দুর্জয়ের হৃদয়ের ভিতর অনুসন্ধান করিত- তাহ। তাহার মধ্যে নিম্নলিখিত কথাগুলির প্রতিধ্বনি • আর ঠিক এই সময়ে দুর্জয় সিংহ তখন মনে মনে বলিতেছিলেন- পান্না ! পান্না! এতদিনের পর আমার আশা সফল হইল। আমি প্রভু দ্রোহী নহি। দুর্গাধিপতি বাল্যকাল হইতে আমার পুত্রনির্বিশেষে পালন করিয়া আসিতেছেন। তার অন্নে এ প্রাণ পুষ্ট-দেহ পুষ্ট। তাহার অনিষ্ট করিবার জন্য, আজ এ মহাযজ্ঞের আয়োজন করি নাই। তোমাকে ও তাঁহাকে রক্ষা করিবার জন্যই এ কৌশল করিয়াছি। মােগল-সৈন্যের উত্তপ্ত রুধিরে, আজ তােমাদের দুর্গপ্রাঙ্গণ রঞ্জিত হইবে। সেই রক্ত, ধারাময় পথে, আমি তােমায় লইয়া আসিব। আজ তােমায় ঘৃণা ভুলিতে হইবে-বিরাগ ভুলিতে হইবে। কৃতজ্ঞতায় আমার কণ্ঠলগ্ন হইতে হইবে। ভগবান একলিঙ্গ জানেন-পান্না, আমি তোমার জন্য কি ভয়ানক কাৰ্য্য লিপ্ত হইয়াছি।” দুর্জয় সিংহের সহিত আসফখর কথােপকথন ভঙ্গীতে, পাঠক বােধ হয়, তাহার উপর বিরক্ত হইয়াছেন। মনে মনে তাহাকে নরাধম, বিশ্বাসঘাতক প্রভৃতি আখ্যা দিতেছেন! তা দিন-তাহাতে আমার কোন ক্ষতিই নাই। আমরা অনেক কার্যের উদ্দেশ্যের গভীরতার মধ্যে প্রবেশ না করিয়া, আগে হইতেই তৎসম্বন্ধে মতামত করিয়া বসি। দোষীকে নির্দোষী কবি নির্দোষীকে দোষী করিয়া ফেলি। ইহাই হইতেছে- এই একদেশ-দশী স্বার্থপর জগতের নিয়ম।
কল্পনা-কল্লোল। ৫ দুর্জয় সিংহ ‘যখন সহসা আসফ খাঁর শিবির মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া তাহাদের কথোপকথনের শেষাংশের প্রতিধ্বনি করেন—তখনও তাহার সঙ্গে একজন ভীল অনুচর ছিল। সেই সভামধ্যস্থ সকলেরই দৃষ্টি—বিশালাকার, ভীমদর্শন দুর্জয়ের উপরই পড়িল। আর একজন লােক যে তাহার সঙ্গে আছে—তাহা কেহ বড় একটা লক্ষ্য করিল না। সেই লােক দুর্জয়ের সান্নিধ্য ত্যাগ করিয়া, সেই ক্ষুদ্র সংগ্রাম শিবিরে এমন একস্থানে দাঁড়াইয়াছিল, যে কেহই তাহাকে দেখিতে পায় নাই আসফ খাঁ দুর্জয়ের সহিত কথােপকথনেই উদ্ভান্ত চিত্ত-কাজেই তিনিও কিছু জানিতে পারেন নাই। দুর্জয়ের সঙ্গী-আসফ খাঁর সহিত দুর্জয়ের যাহা কিছু কথােপকথন হইয়াছিল—সে তাহার সব শুনিল। দুর্জয়ের ইঙ্গিতে মুহূর্ত মধ্যে সে যে কোথায় অদৃশ্য হইল—তাহা কেহ জানিল না। সন্ধ্যার প্রাকাল। সূৰ্য্যদেব অস্তাচল চূড়াবলম্বী হইয়াছেন। নীলীমা- ময়, পশ্চিম গগন অস্তগামী সুলােহিত সূৰ্যকিরণে আরক্তরাগ ধারণ করিয়াছে। তাহা দেখিয়া বােধ হইতেছে যেন প্রকৃতি সুন্দরী, তাহাকে বিদায় দিবার জন্য লােহিতবস্ত্রে দেহাচ্ছাদন করিয়া, ভগবান লােকলােচনকে বিদায়ী অর্ঘ্য প্রদান করিতেছেন। সন্ধ্যা সমাগম দেখিয়া পাখীগণ কোলাহল করিয়া তাহাদের নীড়াভি- মুখে ধাবিত। তাহাদের কলকণ্ঠই সান্ধ্য প্রকৃতির মধুর আহ্বান গীতি- রূপে দিক দিগন্তে ধ্বনিত হইতেছিল।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ পৰ্ব্বতের উপর মাতাজীর আশ্রম। এ আশ্রম অপরিচিতের পক্ষে দুরগম্য। সেই পৰ্ব্বতের উপত্যকার সমস্ত পথঘাটগুলি যদি দুইমাস ধরিয়া খুঁজিয়া তাহার আবাস স্থানের কেহ অনুসন্ধান করে, তাহা হইলেও তাহা খুজিয়া পাইবে না। মাতাজীর অধীনস্থ অনেক সৈন্যও এ গুপ্ত আশ্ৰম নিবাসের সন্ধান জানে না। জানে কেবল মাতাজীর জনকয়েক বিশ্বস্ত সহচর। তাহাদের মধ্যে আমাদের পূর্ব পরিচিত মশা ও দুর্জয় সিংহই বিশেষরূপে উল্লেখযােগ্য। দুর্জয় সিংহ যে একজন শক্তিশালী বীর, তাহা মাতাজী পূৰ্ব্ব হইতেই জানিতেন। ভবানীর দ্বারা প্রেরিত হইয়া দুর্জয় তাহার আশ্রমে উপস্থিত হইয়াছেন। ভবানীর আদেশেই তিনি তাহাকে সন্তান বলিয়া গ্রহণ করিয়াছেন। দুর্জয় সিংহ ও ভামশার মধ্যে যে মনের মিল নাই, মাতাজী তাহাও জানিতেন। কি কারণে যে এ মনােমালিন্য তাহাও তাহার অবিদিত ছিল না। আসফ খাঁ যে শীঘ্রই রায়গড় দুর্গ আক্রমণ করিয়া তাহার পূর্ব পরাভবের প্রতিশােধ লইবার চেষ্টা করিতেছেন—তাহাও তিনি জানিতেন। মাতাজী সুদূরদর্শিনী। বুদ্ধি আর প্রজ্ঞার সহায়তায় তিনি ভূত ভবিষ্যৎ ভালরূপই বিচার করিতে জানিতেন। এইজন্য হার অনেক অনুরক্ত ভক্ত, দেবীজ্ঞানে তাহাকে মনে মনে পূজা কৱিত। দুর্জয় সিংহ যে আসফ খান শিবিরে কোন বিশেষ উদ্দে জানিবার জন্য গিয়াছেন—তাহাওআতাজীর অপরিজ্ঞাত ছিল না। তিনি জাতি চিত্তে , দুর্জয়ের প্রত্যাগমন প্রতীক্ষা করিতেছিলেন।
কল্পনা-কল্লোল। কিন্তু দুর্জয় ফিরিয়া আসিল না। আসিল তাহার সঙ্গী। দুর্জয়কে থে মাৈগল সেনাপতি কৌশল করিয়া আটক করিয়া রাখিয়াছে, এবং, প্রতিশ্রুত কার্য্যের অসাফল্যে যে তাহার জীবন যাইবার সম্ভাবনা, তাহাও তিনি বুঝিলেন। যে লােক মাতাজীকে আসফখার শিবিরের সমস্ত ঘটনার সংবাদ দিল, সে দুর্জয় সিংহের এক জন বিশ্বস্ত অনুচর। এই লােক দুর্জয়ের নিষেধ সত্ত্বেও, পাছে তাহার কোন অমঙ্গল ঘটে, এই আশঙ্কায় তাহার পশ্চাৎবৰ্ত্তী হইয়াছিল। অর্ধপথে আসিয়া দুর্জয় দেখিতে পাইল যে, একজন লােক তাহার অনুসরণ করিতেছে। সেই লােক সম্মুখে আসিয়া যখন তাহাকে প্রণাম করিল-দুর্জয় তখন বুঝিলেন—সে তাহার বিশ্বস্ত অনুচর। দুর্জয় সিংহ অনেক চেষ্টা করিয়া তাহাকে নিবৃত্ত করিতে পারিলেন না। আর সেও কিরূপ কৌশলের সহিত স্বকাৰ্য্য সাধন করিয়াছিল, তাহাও পাঠক দেখিয়াছেন। তারপর সে মাতাজীকে সমস্ত ঘটনা অবগত করাইবার জন্য কি প্রকারে মােগল শিবির হইতে সরিয়া পলাইয়াছিল— তাহাও পাঠক জানেন। মাতাজী দুর্জয় সিংহের জন্য বড়ই ভাবিত হইয়া, ভাষার কক্ষের দিকে চলিলেন। একটী পার্বত্যগুহার মধ্যে মশার গৃহ। গৃহটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ভামশা সেই অপরাহ্নে—উপত্যকায় পাষাণময় বুকের উপর একখানি কৃষ্ণসার চর্ম বিছাইয়া অতি মনোযােগের সহিত, একখণ্ড ক্ষুদ্র শাণ প্রস্তরের সহায়তায় একথানি তরবারি শানাইতেছিল। আর নিকটে একটা পার্বত্য মার্জারী, একদৃষ্টে তাহার হন্তের ক্ষিপ্রগতি লক্ষ্য করিতেছিল। ভাশা বড়ই অন্যমনস্ক। মাতালী মশার নিকটে গিয়া ডাকিলেন, “ভামশা-* ।
মুখের বাসর। মশা তখনই তাহার কাৰ্য্য ত্যাগ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। মাতাজীর পদবন্দনা করিয়া, তাহার গুহার মধ্য হইতে আর একখানি কৃষ্ণাজিন আনিয়া এক প্রশস্ত শিলাখণ্ডের উপর বিছাইয়া দিল। মাতাজী সেই শিলতিলে বসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—“তরবারীতে শান দিতেছ কেন ভাশা?” ভাশ। বলিল,-মা-আজ রাত্রে যে মােগল নিপাত করিতে হইবে।” এয়ােদশ পরিচ্ছেদ ৪ মাতাজী সেই প্রস্তাসন হইতে উঠিয়া দাড়াইলেন। নেত্ৰয় জ্বলিতে লাগিল। সে নেত্র হইতে যেন বিদ্যুত-আল বাহির হইতেছে। তাহার মর্মভেদী তীক্ষ্ণদৃষ্টি, মশার মর্মস্থল স্পর্শ করিল। ভামশা সে দৃষ্টির প্রখরতা সহ্য করিতে না পারিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল- “মা! মা! আজ এ রণরঙ্গিণী মূৰ্ত্তি ধরিলি কেন মা ! ঐ চির প্রস, চির স্নেহময় নেত্র হইতে সহসা এ অনল বৃষ্টি কেন মা? মশার কত শক্তি আছে, যে সে তাের নেত্ৰ-নিঃসৃত প্রচণ্ড দাহনের দারুণ জ্বালা সহ করিবে। সমগ্ৰ সংসার যে ঐ দৃষ্টিতে প্ৰলিয়া যাইবে না। ভামশা আর বলিতে পারিল না। তাহার সর্বাঙ্গ থরথর করিয়া কপিতে লাগিল। তাহার বীর হৃদয়ের অন্তরতম প্রদেশে একটা মহা বিপ্লব উপস্থিত হইল। সেই সংসার-বাসনা-পরিশু। ভৈরবীয় ভীষণ দৃষ্টিতে সে যেন সাহস শক্তি, সামর্থ্য মনুষ্যত্ব সব হারাইল।
কনকল্লোল। নতজানু হইয়া সেই শক্তিশালিনী ভৈরবীর পাদমূলে বসিয়া তাহার চরণ রণ করিয়া বলিল-“মা! না! তাের ঐ রােষ কটাক্ষ, মেহময়-দৃষ্টিতে পরিণত কয় মা।” ভৈরবী ভামশার চঙ্গে জল দেখিয়া নিজে কাঁদিয়া ফেলিলেন। সেই অশ্রুধারা তাহার গণ্ডদ্বয় বহিয়া সেই পাষাণের বুকে পড়িল! প্রাণের উন্ম। যেন অনেকটা কমিয়া গেল। করালবদনী, ভীম-ভৈরবী মূৰ্ত্তিধারিণী কপালিনী যেন দশভূজ প্রসারিণী স্নেহময়ী মাতৃরূপে মশার চিত্ত মােহিত করিলেন। ভৈরবী শিলাসনে বসিয়া, এক দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন, বৎস! তােমরা আমার সন্তান। আমি তােমাদের মা। তুমি বড় দুর্জয় ঘােট! সত্য বল ভামশা—তুমি দুর্জয়ের বুকে এই তরবারি সাইবার জন্য শাণিত করিতে ছিলে কি না ?* ভামসা একবার সেই ভৈরবীর মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিল। দেখিল, মেঘ আকাশের মত সেই মাতৃ মূর্তি সমুজ্জ্বল দীপ্তিতে পরিপূর্ণ। ভামশা মনে মনে ভাবিল-“কে এ? এ কি মন্ত্রসিদ্ধ পিশাচী বা সর্বান্তামী দেবী ? কেমন করিয়া এ আমার মনের কথা জানিল? ভাম নির্বাক! এ প্রশ্নের উত্তর দিতে তাহার প্রাণে একটা মহা সংকোচ উপস্থিত হইল। সে কিছুই বলিল না। নতমুখে সেই স্থানে দাড়াইয়া রহিল। মাতাজী পুনরায় প্রশ্ন করিলেন-“তােমার মত বীর সন্তান, মায়ের নিকট কখনও মিথ্যাবাদী হইতে পারেন। সন্তানের অপরাধ মার্জনা করিতে জননী যেন সর্বদাই প্রস্তুত এমন আর কেহই নয়। ভাম! আমার অনুমান সত্য কিনা?” মশা বলিল—“ম! জানিনা তুমি কি অদ্ভুত শক্তি লইয়া এ ধরাতলে আসিয়াছ। তােমার অনুমান সম্পূর্ণ সত্য।
সুখের বাসয় । এই কথায় সেই রৈবীর ইন্দীবর নেত্রে আবার অশ্রু দৈখা দিল। তিনি অশ্রু মােচন করিয়া বলিলেন-“হায় ! কি দুর্দৈব বশে আজ তােমার এ কুমতি হইল? আর এমন হতভাগিনী জননী আমি তােমাদের, যে আমার এ ভীষণ বিপদের সময় তুমি আমার বামবাহ ছেদন করিতে যাইতেছ!” মাতাজীর বিপদের কথা শুনিয়া ভামশা চমকিত স্বরে বলিল- “তােমার বিপদ ! কিসের বিপদ মা!” মাতাজী। কি বিপদ তাকি তুমি জাননা? ভামশা। না-জানিলে কখনই নিশ্চিন্ত থাকিতাম না। মাতাজী। জানিনা কি তুমি ভাশা—আজ গভীর রাত্রে মােগল সেনাপতি আসফ খ দুর্গাধিপতির দুর্গ আক্রমণ করিবে! ভামশা। এই বিপদ! তার প্রতিকারার্থে প্রস্তুত হইতেছিলাম মা। মাতাজী। আমি প্রথমে তাহা বুঝিতে পারি নাই, তাই তােমায় তরবারি শানাইতে দেখিয়া তিরস্কার করিয়াছিলাম। যদি তাই তােমার মনের উদ্দেশ্য হয়—ভামশা--তাহা হইলে আমি তােমায় প্রাণভরিয়া আশীৰ্বাদ করিতেছি। কিন্তু প্রকৃতই কি উদ্দেশ্য তাই। ভামশা। মা ! তােমার সম্মুখে কখনও মিথ্যা বলি নাই -বলিবও না। আমি দুইট উদ্দেশ্য হৃদয়ে পােষণ করিয়া এই অব্যর্থ অসিতে শাণ দিতেছিলাম । মাতাজী। তোমার অপর উদ্দেশ্য কি? ভামসা। বিশ্বাসঘাতক—দুজ্জসিংহের প্রাণসংহার । মাতাজী। কি সর্বনাশ! তাহা হইলে যাহা ভাবিয়াছিলাম তাই । কে বলিল—দুর্জয়সিংহ বিশ্বাসঘাতক! যে তাহার নামে এ অপরাধ দিতে সাহস করে, তাহাজি শতধা বিভক্ত হউক। ভামশা। মা? আমি কি না জানিয়াই এ কথা বলিতেছি। ১৪ কনা-কল্লোল। মতাজী। কি জান তুমি ভামশা ! দুর্জয়সিংহের হৃদয় উজ্জ্বল আলােকে আলােকিত। সেই আলােক সহায়তায় আমি সৰ্ব্বদাই দেখিতে পাই। সে প্রাণ পার্বত্য নদীর স্রোত প্রবাহের ন্যায় সুনিনি। ভামশা। হইতে পারে, কিন্তু আপনি স্নেগ্ধ হইয়া পক্ষপাতিত। করিবেন না। দুর্জয়সিংহ যে মোগল-শিবিরে গিয়াছে, মোগল সেনাপতি সহায়তা করিতে প্রতিশ্রুতি দান করিয়াছে, তাহাও আমি জানি, সে যে মােগল সেনাপতির হস্তে বন্দী-তাহাও জানি। কিন্তু তাহার এ সামান্য স্বার্থের অন্তরালে এক মহাস্বার্থ যে লুক্কায়িত আছে—তাহা ত জাননা মা ! মাতাজী। সে মহাস্বার্থ কি? ভামশা। পান্না। মাতাজী। পান্নার সহিত মােগল সেনাপতির সম্বন্ধ কি ? ভামশ। পান্নার মত শ্রেষ্ঠ। সুন্দরীকে কি মােগল সেনাপতি ছাড়িয়া দিবে। দুর্জয়সিংহ মােগল সেনাপতির সহিত এই পণে আবদ্ধ যে, সে দুর্গ জয় করাইয়া দিলে পান্নাকে সে তখনই লইয়া চলিয়া যাইবে। মাতাজী। হােক—তাহাতে ক্ষতি কি? যদি শক্তিরূপিণী নিঃসহায়, অনাশ্রিতা রাজপুত ললনার সতীত্ব এ কৌশলে রক্ষা হয়—তাহা হইলে : দুর্জয়কে আমি নিলা করিতে পারিব না। ভামশা। কিন্তু মা—আমি মােগলকে খুব ভালরূপ চিনি। দুর্জয় সিংহ নিজের স্বার্থে অন্ধ হইয়া আসফ খুঁকে চিনিতে পারে নাই। কিছুতেই সে পান্নাকে রক্ষা করিতে পারিবে না। দিল্লীর বাসার রঙ্গমহলের গৃহকক্ষ নিবদ্ধ—সুদীর্ঘ দর্পণে পান্নার রূপের ছায়া পড়িবে । মাতাজী। তুমি পাকে বাঁচাইতে পার ? তামশ। পারি। মাতাসী। তােমার স্বার্থ কি?
মুখের বাসর। ভামশা। পান্নার সতীত্ব রক্ষা। পান্না রাজপুত কন্যা। পান্না আমার হৃদয়ের আরাধ্যা দেবী! পান্নাকে কেহই পাইবে না—আমি না, দুর্জয় না—আর সেই মােগল সেনাপতিও নয়! মা—আমি এজন্য যে প্রস্তুত নহি তা ভাবিবেন না। দুর্গাধিপকে আমিই আপনার আশীর্বাদে রক্ষা করিব—কিন্তু মা-দুর্গ রাখিতে পারিব না। স্বাধীনতাও স্বাতন্ত্র রাখিতে পারিব না। দুর্জয়সিংহ হিত করিতে গিয়া বিপরীত ঘটাইবে * মাতাজী। কি করিয়া একা তুমি এ কাজ করিবে। ভামশা। কে বলিল—আমি একা। ঐ নীলাকাশ গাত্রালী মেঘান্তরালবর্তী বিষ্ণু আমার সহায়। আপনার চরণধূলি আমার সহায় ? এই সুশাণিত অসিই আমার সহয়। মা-আমায় আশীর্বাদ করুন- যেন আমি আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করিতে পারি। মাতাজী নিৰ্বাকভাবে সেই স্থানে দাঁড়াইয়া শূন্যদৃষ্টিতে আকাশের দিকে চাহিয়া একটী মর্মভেদী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন। সে নিশ্বাসবায়ু বায়ুস্তরে গিয়া মিশাইল, কিন্তু তাহার মর্মব্যথা বুঝিল কিনা—তাহ জানি না । চতুর্দশ পরিচ্ছেদ পাঠক। যে পান্নাকে লইয়া এত হুলস্থুল-এত ব্যাপার, সে পান্নার সংবাদ একবার আমাদের লইতে হইবে। পান্না দুর্জয়সিংহকে ঘৃণা করিত সত্য বটে, কিন্তু এই দীর্ঘ বিরহের পর তাহার সে ঘৃণা প্রেমে ও আনুষক্তিতে পৰ্য্যবশিত হইয়াছে। পায় ১৮ কল্পনা-কল্লোল। মনে মনে ভাবে, “আমাকে দুর্জয় প্রাণভরিয়া ভালবাসিত। সে আমার জন্য উন্মাদ, কিন্তু আমি হতভাগিনী, তাহাকে চিরদিনই বিরাগের চক্ষে দেখিয়াছি। আদরের পরিবর্তে উপেক্ষা, অনুরাগের পরিবর্তে বিরাগ দিয়াই আসিয়াছি। সে আমায় তাহার সব দিয়াছে, আমি তাহাকে কিছুই দিই নাই। সে আমায় সিন্ধু দান করিয়াছে, আমি তাহাকে বিন্দু দানেও কৃপণতা করিয়াছি। এস-দুর্জয় সিংহ! আবার ফিরিয়া এস। এবার দেখিবে, প্রাণভরা অনুরাগ লইয়া পান্না তােমার জন্য হৃদয়ের মধ্যে আসন পাতিয়া রাখিয়াছে। দেখিবে হৃদয়কন্দরে তোমার সম্বর্ধনায় প্রেম, প্রীতি, আসঙ্গলিপ্সা পাশাপাশি দাঁড়াইয়া আছে। এই পান্নার জন্য তুমি সৰ্ব্বত্যাগী হইয়াছ। রাজপ উচ্চ সম্মানসুখ, সবই ত্যাগ করিয়া, সুখময় শয্যা, সুখপূর্ণ গৃহকে ছাড়িয়া বনে বনে স্বাপদের সঙ্গে কাল কাটাইতেছ। তােমার সে তােমার সে প খানি দেবতার অর্থের মত তুলিয়া রাখিয়াছি। নিত্য তাহা একবার পাঠ করি। আর মনে ভাবি—কি মহত্ব লইয়াই তুমি ধরণীতে আসিয়াছিলে। তোমার মনের মহত্বকে কেমন কৌশলে প্রচ্ছন্ন রাখিয়া আমার হৃদয়কে পরীক্ষা করিতেছিলে ? আমি তােমার সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে পারি নাই। যদি পারিতাম, তাহা হইলে আজ আমাকে এই দুঃসহ মর্মবেদনায় অধীর হইতে, হইত না। কি সুখ লইয়া আমি এ জগতে আছি দুর্জয়! ভগবান আমাকে না দিয়াছিলেন কি? জগতের যা কিছু স্পৃহনীয় সবই ত আমার ছিল। সুখ ঐশ্বৰ্য্য কিছুই ত আমার অভাব নাই। অশন বসনের ত কোন ক্লেশই নাই। সত্য বটে-জননী কোমল কিশােরে আমায় ছাড়িয়া গিয়াছেন। কিন্তু মৃত্যুর উপর ত কাহারও হাত নাই। রাজকন্যা আমি, জগতের যা শ্রেষ্ঠ আশীৰ্বাদ তাহাই ত পাইয়াছি। তবে সুখের বাসর,। ১০৯ আমি এত অসুখী কেন? কারণ অনুসন্ধান করিয়াও কিছু দেখিতে পাই না, বুঝিতে পারি না। সত্য বটে মােগল-সৈন্য পিতার দুর্গ দখলের জঞ্জ প্রস্তুত। কিন্তু তাহাতে পিতা ত কোনরূপ চিন্তিত নহেন। তাহার অধীনস্থ রাজপুত-সৈন্য অসিস্পর্শ করিয়া শপথ করিয়াছে—তাহার জন্য জীবন উৎসর্গ করিবে। পিতাও দুর্জয় সিংহকে হারাইয়া দিন রাত বিমর্ষ। আমিই ত তার এ বিমর্ষতার কারণ! দুর্জয়কে না পাইয়া তিনি এ বৃদ্ধ বয়সে মত্ত সিংহের শক্তি পাইয়াছেন। নিজে রণক্ষেত্রে যাইতে প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন।” পান্নার ভাবনার আর কুল কিনারা নাই। প্রবল বায়ুতাড়িত সমুদ্রে যেমন একের পর আর একটা তরঙ্গ উঠে, একটী মিশাইয়া যায়, বুদবুদে পরিণত হয়, কিন্তু আর একটা পৰ্ব্বতপ্রমাণ তরঙ্গ তাহার পার্শ্বে দেখা দেয়—পান্নার মনে চিন্তাতরঙ্গ সেইভাবেই প্রবাহিত হইতেছে। কিছুই ভাল লাগিতেছে না! কেন—তাহা সে বলিতে পারে না। তবে—এ বিপদের সময় দুর্জয় সিংহকে ফিরিয়া পাইলে যেন তাহার শক্তি ও সাহস বাড়ে। কিন্তু—কোথায় দুর্জয়। পান্না তাহার পত্র পাইয়াছে—কিন্তু তাহাতে ত কোন ঠিকানা নাই, সে উত্তর দিতে না পারিয়া বড়ই মনক্ষুন্ন। চিত্তের বিষন্নভাব কোন ক্রমেই অপসারিত হইতেছে না দেখিয়া, পাশ্ন। তাহার সাধের সখের এজাজটা তুলিয়া লইল। তাহাতে ঝঙ্কার তুলিল। সুখের তরঙ্গে সেই গৃহকক্ষ বসন্তের সৌন্দৰ্য্য মুখরিত হইয়া উঠিল! পান্না হৰ্ম্মতলে বসিয়া এসরাজ, বাজাইতে লাগিল। পান্না ভৈরবীর ঝঙ্কার তুলিয়াছে। সে করুণ-নাদে, সেই গৃহকক্ষ যেন শোকোচ্ছাসে পূর্ণ হইয়াছে। তাহার অন্তর্জগতের শােকের বরহের ক্রন্দন যেন বহির্জগতের সঙ্গে আসিয়া মিশিয়ছে। পান্না । কল্পনা-কল্লোল। তাহার চিয়প্রিয় গানটা গাহিতে লাগিল। সে গানের সুর কত মধুর, 'ভাব কত সরসভাষা কত সুন্দর। পান্না গাহিছেছিল— কেন—কেন সখি, বাজে বাঁশী যমুনার তীরে, চঞ্চল, আকুল হিয়া, বাঁশী যবে, রাধা বলে ফুকারে। তার ত অনেক আছে- আমার ত কেউ নাই, তবে কেন, মন দিয়ে ও সখি! এত লালা পাই, লােকলজ, গঞ্জনা, কলঙ্ক পরিবেদনা, আর ত সহে না প্রাণে আমি থাকিতে পারি না ধরে। স্বাস্ ননদিনী, ঘাের পরিবাদিনী, বলে কালা-ফলঙ্কিনী রাই, আমি মনে ভাবি তাই- কপােল বহিয়ে, বহে আঁথিধারা, তবুত ভুলিতে পারি না তারে। এই ভৈরবীর করুণ সুর আকাশপ্রান্তে বিলীন না হইতে হইতে, কক্ষ মধ্য হইতে সুরের মােহিনী শক্তি প্রস্ত না হইতে হইতে, দুর্গপ্রাচীর নিম হইতে সহসা, শতকণ্ঠে চীৎকার ধ্বনি উঠিল,-“আল্লী হো আকবর। সেই ভীষণ শখে পাষাণব দুর্গপ্রাচীর কাপিয়া উঠিল। পান্নার প্রাণ চমকিয়া উঠিল। সে গরু-পথে মুখ বাড়াইয়া দেখিল—অসংখ্য সুখের বাসর ১১১ মুসলমান সৈন্য—দুর্গ প্রাচীর নিম্নে অসংখ্য : পিপীলিকা' শ্রেণীর ন্যায় সমবেত হইয়াছে। ব্যাধের ভীষণ তৃৰ্য্য নিনাদ শুনিলে, হরিণী যেরূপ' ভয়চঞ্চিত হয়, বৃক্ষতলস্থ পান্থ তাহার আশ্রয়স্থান বৃক্ষের উপর সহসা বজ্রপাত হইলে যেমন ভীত ও চকিত হয়, প্রান্তর পথগামী পান্থ যেমন সম্মুখে ভীষণ কৃষ্ণকায় সর্প দেখিলে স্তম্ভিত হয়, সঙ্গীতোচ্ছাসে নিমগ্নচিত্তা, ভবিষ্যৎ- ভয়বিহিত। বিরহ-কারা পান্না সহসা মোগল-সেনগণের আল্লা হো আকবর” শব্দে তেমনি ভয়চকিত হইয়া উঠিল তাহার হাত হইতে তাহার সুখভরা সাধের বীণা পড়িয়া গেল, তাহার প্রাণ হইতে সুখের ঝঙ্কার কৰ্পরের মত কোথায় উড়িয়া গেল। ভবিষ্যৎ সুখের মিলন-বাসনা সহসা তাহার চিত্তক্ষেত্র হইতে অপসারিত হইল। সে ভয়-চকিত হরিণীর মত, সেই কক্ষের চারিদিকে উদাস দৃষ্টিতে চাহিতে লাগিল। আবার সেই ভীষণ ধ্বনি—আল হো আকবর। এই যেন অক্ষর বিন্যাস। এই তাণ্ডব-সঙ্গীত-ধ্বনিতে রাজ- পুতের স্বাধীনতা গিয়াছে—প্রতাপের অমূল্য জীবন কালগর্ভে রক্ষিত হইয়াছে—মেবার মরুক্ষেত্রে পরিণত হইয়াছে, আর অমরসিংহ সন্ন্যাসী- বেশে দেশে দেশে ভ্রমণ করিতেছে। পান্না অপূর্ণ নেত্রে সেই হৰ্ম্মতলে বসিয়া যুক্তকরে, প্রাণ ভরিয়া কাতরতা লইয়া ডাকিল-“কোথায় তুমি বিপন্নের দুর্গতি নিবারণ নারায়ণ—কোথায় তুমি বৈকুণ্ঠেশ্বরএকবার দাসীর মুখের দিকে ফিরিয়া চাও-একবার আমার দুর্জয়কে আনিয়া দাও।” এ করুণ প্রার্থনা প্রতিধ্বনি করিয়া গবাক্ষপথে শূন্য বায়ুমার্গে বিলীন হইয়া গেল। তখন পান্না আবার আবেগভরে, অনুতাপবিদগ্ধস্বরে- “কোথা কোথা তুমি দুর্জয়। একবার এ বিপদে দেখা দাও ! আমি মৃত্যু-সঙ্গীতের কল্পনাকল্লোল। হতভাগিনী, স্বেচ্ছায় আমার পিতার দক্ষিণ বাহু ভাঙ্গিয়া দিয়াছি। হায় দুর্জয় ! কোথায় তুমি এ বিপদ সময়ে !” কে যেন পান্নার কক্ষের দ্বারের নিকট হইতে প্রতিধ্বনি করিল- “হায় ! দুর্জয় কোথায় তুমি?” পান্না, এ প্রতিধ্বনিতে চমকিয়া উঠিল। সে সবিস্ময়ে দেখিল তাহার কক্ষদ্বারের কক্ষদ্বারের পার্শ্বে এক দীর্ঘাকার ছায়ামূৰ্ত্তি। সে ছায়ামূৰ্ত্তি দেখিয়া পান্না ভয়ে শিহরিয়া উঠিল। সে ছায়ামূৰ্ত্তি ধীরে ধীরে কমধ্যে প্রবেশ করিল। বিকট হাস্য করিয়া বলিল,-“হতভাগিনী ভয় পাইয়াছি!” পান্না সবিস্ময়ে দেখিল-তাহার ধ্বনির এ প্রতিধ্বনিকারী আর কেহই নহেনস্বয়ং দুর্গাধিপতি। দুর্গাধিপতির তৎকালীন আকার- প্রকার দেখিয়া পান্না ভয়ে শিহরিয়া উঠিল। দুর্গাধিপতির মস্তক উষ্ণীসশূন্য, চক্ষুদ্বয় আরক্ত—কপালের শিরা স্ফীত--সেই আরক্ত মুখমণ্ডল উত্তেজিত ভাবপূর্ণ। দুর্গাধিপতি অনেকটা প্রশান্তচিত্ত হইয়া বলিলেন—“ভয় পাইয়াছি পান্না?” পান্না-একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিল—ভয়-ভয় ! প্রাণের ভয়ের কথা বলিতেছ পিতা! আমি রাজপুত-কন্যা। প্রাণের ভয় আমার নাই। ভয়-ইজ্জতের। তা—সেজন্যও আমি ভীত নহি। রাজপুতকন্যার প্রত্যেক শােণিত-বিন্দুতে, প্রত্যেক মজ্জায়, প্রত্যেক শিরায় যে শিক্ষাশক্তি নিহিত, আজ আমি সেই শিক্ষার ফল দেখাইব।” দুর্গাধিপতি বলিলেন,-“হায় পান্না! কোথায় আমার দুর্জয় ? আজ যদি দুর্জয় সিংহ থাকিত, আজ যদি আমার দক্ষিণ বাহু তুই ইচ্ছা করিয়া ভাঙ্গিয়া না দিতি—তাহা হইলে কি মােগল আজ এ দুর্গ আক্রমণ করিতে পারিত? যদি তুই আমার কথা শুনিয়া দুর্জয়কে পতিত্বে বরণ .
১১ ফতি—তাহা হইলে আজ আমায় উন্মাদের মত এ কক্ষে ছুটিয়া আসিতে হইত? পান্না-পান্না-কি সর্বনাশ করিলি পান্না! হায়! কোথায় গেলে, কি করিলে আবার সেই দুর্জয় সিংহকে ফিরিয়া পাইব।” এমন সময়ে এক রমণী দ্রুতবেগে গৃহে প্রবেশ করিয়া বলিল,- “সে পাপিষ্ঠের আর নাম করিবেন না—সে নরকুলের মহাকলঙ্ক বিশ্বাসঘাতক-দুর্জয়ের নাম পুনরায় উচ্চারণ করিলে এ কক্ষ কলঙ্কিত হইবে।” দুর্গাধিপতি—এই রমণীকে দেখিয়া বিস্মিত হইলেন না, তাহার কথার মর্ম বুঝিতে না পারিয়া বলিলেন,-“সাবধান মলিনা! আবার ওকথা বলিলে আমি তোকে হত্যা করিব।” “নারীহত্যা যে মহাপুণ্য রাজা! কিন্তু মরিতে আমি কাতর নই। আমি আপনার কন্যার ন্যায় পালিতা। আমি আপনার দাসী বাদী, কিন্তু পিতা! আমি যে স্বচক্ষে দেখিয়া আসিলাম–দুর্জয়সিংহ বিশ্বাস ঘাতক।” দুর্গাধিপতি এভাবে বলিলেন-“কিসে বুঝিলে মলিনা-আমার চিরবিশ্বাসী দুর্জয়, এ মহাকলঙ্কে কলুষিত।” “কিসে বুঝিলাম ? এইমাত্র যাহা দেখিয়া আসিয়াছি, তাহা হইতে বুঝিয়াছি— “কি দেখিলে-- “দুর্জয় সিংহ দুর্গের গুপ্ত দ্বারের চাবি খুলিয়া দিয়াছে।” “সর্বনাশতার পর- মােগলদৈ দুর্গদ্বার দিয়া পশ্চাতের প্রাঙ্গণে আসিতেছে। “কত মােগল-সেন। আমার পুরীর মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে ? “পঞ্চশত জনের অধিক ন”ে *অামার সেনারা কোথায়?”
১১৪ কল্পনা-কল্লোল। “আহায়াই মহাশক্তিতে সেই গুপ্তধারমুখে দণ্ডায়মান—তাই মোগল- সেনা আর প্রবেশ করিতে পারিতেছে না।” “যাহারা ভিতরে আসিয়াছে, তাহারা কি করিতেছে ?” “তাহারা ঝটিকার পূর্ব-প্রকৃতির মত স্থির।” *এখনও তাহা হইলে যুদ্ধ বাধে নাই ?” *না— কারণ কি?” “কিছুই বুঝিলাম না— “দুর্জয় সিংহ কোথায় ? “মােগল সেনার অগ্রে— “আমার সেনারা বিনযুদ্ধে অপেক্ষা করিতেছে কেন?” “জানি না—ঠিক বলতে পারি না। তবে আমি ইহা লক্ষ্য করিয়াছি যে, দুর্জয় আপনার সেনাপতিকে কাণে কাণে কি বলিল, তাহারা অস্ত্র খুলিয়া অগ্রসর হইতেছিল; কিন্তু দুর্জয়ের এ নিষেধ। বাণীতে স্থির হইয়া দাড়াইল।” “বুঝিয়াছি মলিনা! আমার কপাল ভাঙ্গিয়াছে। চারিদিকে বিশ্বাস- ঘাতক! আমার অন্নপুষ্ট দুর্জয়—আমার অন্নপুষ্ট রাজপুত-সেনা-সব বিশ্বাসঘাতক । পান্না-পান্না- সহসা এই সময়ে আবার ভীষণ শব্দে আল্লাহহা আকবর ধ্বনি”. গগণমণ্ডল বিদীর্ণ করিল। হিন্দুগণও “হর হর মহাদেও” শব্দে হার প্রত্যুত্তর দিল ! অস্ত্রের ঝনঝনায়, সৈন্যগণের কোলাহলে কার সাধ্য সেখানে তিষ্ঠিতে পারে। পান্না-হতভাগিনী পান্না--তখনও সেই স্থানে, নির্বাক অবস্থায় দণ্ডায়মান। ভীষণ দাবানল-চারিদিকে সহসা প্রজ্বলিত হইলে, ভয়- সুখের বার। ৩ ঐ মোড়কে + চকিত হরিণী যেমন সেই অনলরাশির মধ্যে স্থির হইয়া নির্বাক অবস্থায় দণ্ডায়মান থাকে, পান্নার অবস্থাও সেইরূপ। দুর্গাধিপতি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। এই বৃদ্ধ বয়সেও তাহার প্রাণে মত্ত অসুরের শক্তি জাগিয়া উঠিল। বুদ্ধ দুর্গাধিপতি তখন অসি কোষ বিমুক্ত করিয়া সেই কক্ষ হইতে ভীমবেগে নিষ্ক্রান্ত ইইলেন; যাইবার সময় পান্নার দিকে একটা কাগজের মোড়ক ফেলিয়া দিয়া বলিয়া গেলেন,-“পান্না পান্না, রাজপুত রমণীর সতীত্ব গৌরব চিরদিনই এ জগতে ঘােষিত। সে ঘােষণার যেন অবমাননা না হয়। বিষ আছে । আমি পিতা হইয়া তাের মৃত্যুর জন্য স্বহস্তে বিষ দিয়া গেলাম। যদি দেখি যে রাজপুত-কন্যার যাহা মহাবিপদ, তাহা তাের উপস্থিত হয়, তাহা হইলে ঐ ভীষণ কালকূট পান করি। মৃত্যু ভিন্ন আর কেহই যেন তাের ঐ পবিত্র দেহ স্পর্শ করিতে না পারে।” দুর্গাধিপতি চলিয়া গেলেন। পান্না অনেক চেষ্টা করিয়াও তাহাকে ফিরাইতে পারিল না। পান্নার চক্ষে অশ্রুধারা, প্রাণে আতঙ্ক-মনে ভবিষ্যৎ বিপদাশঙ্কা। আর মলিনাও মন্ত্রমুগ্ধবৎ সেইখানে দাড়াইয়া ভাবিতেছিল—হায়! হায়! পান্না ! তাের উপায় কি হইবে।” মলিনা পান্নার বাল্যসঙ্গিনী। উভয়েই সমবয়স্ক । পান্নার মা মলিনাকে বাল্যজীবন হইতে মানুষ করিয়াছিলেন। মলিনা এক সম্ভ্রান্ত বংশীয় ক্ষত্রিয়া কন্যা। তাহার পিতা রাণ। প্রতাপের সেনাদলভুক্ত ছিল। সেই যুদ্ধে তাহার প্রাণত্যাগ হয়। রাণা প্রতাপসিংহ বংশ সম্বন্ধ ক্রমে আমাদের দুর্গাধিপতির অতি নিকট আত্মীয়। তিনি পান্নার পিতা, এই দুর্গাধিপতিকে অনুরােধ করিয়া পাঠান, “আপনার প্রজা যােধমলের কন্যা মলিনা আমার পালনীয়া। তাহার পিতা হলদীঘাটের সময় ক্ষেত্রে আমার জন্যই জীবন বিসর্জন দিয়াছে।
ফান কল্লোল। আমি এখন রাজ্য ছাড়িয়া চিতাের উদ্ধার রূপ মহাব্রত পালনার্থে সন্ন্যাসীয় কায় বনে বনে ফিরিতেছি। কাজেই আপনি আমার বিশ্বস্ত পার্শ্ব রক্ষক যােধমলের স্ত্রীও একমাত্র কন্যার ভার গ্রহণ করুন। যদি ভগবান এক লিঙ্গের প্রসাদে আমি কখনও চিতাের পুনরুদ্ধার করিতে পারি, তাহা হইলে ইহাদের লইয়া আসিব। নচেৎ ইহাদের পালন-ভার আপনার উপর দিয়া নিশ্চিন্ত হইলাম।” মহারাণার এই অনুরােধ দুর্গাধিপতি লঙ্ঘন করিতে পারিলেন না। তখন রাণা প্রতাপ সিংহ ভারতের চক্ষে দেবতার সম্মান লাভ করিয়াছেন। এ দেবতার অনুরােধ উপেক্ষা করা তাহার সাধ্যায়ত্ব নহে। কাজেই তিনি মৃত মােধমলের পত্নী রুবাই ও তাহার একমাত্র কন্যা মলিনাকে নিজের অন্তপুর মধ্যে আশ্রয় দিলেন। কালবশে মলিনার মাতার মৃত্যু হইল। পতি বিরহিতা অভাগিনী কক্সবাই তাহার দ্বাদশ বর্ষীয়া রূপবতী কন্যা মলিনাকে পান্নার মাতার হন্তে সমর্পণ করিয়া যান। পান্না ও মলিনা উভয়ের এক বয়স। পান্নার মাতা, মলিনাকে পান্নার সঙ্গিনী করিয়া দিয়া বলিয়া দেন,-“এই মলিনাকে আমি কন্যাবৎ পালন করিয়াছি। তুমি ভগ্নীবৎ স্নেহ করিও।” মলিনার ইহ জগতে এখন আর কেহ নাই। তাহার আপ , নার বলিবার কেহ নাই বলিয়া সে পান্নাকে আপনার করিয়া লইয়াছিল। মলিনা সুখে দুঃখে, বিপদে আপদে পান্নার চিরসঙ্গিনী। কাজেই সে এখন পান্নার মহাবিপদ দেখিয়া নিজেকে বিপন্ন জ্ঞান করিতেছে। কাজেই মলিনা বলিল,-“পান্না। বােন! এ বিপদে রক্ষার উপায় কি ? পান্না অপূর্ণ নেত্রে বলিল, “উপায়ের কথা আমরা কি জানি বােন্!” উপায় সে ভগবান।* “সত্য, কিন্তু মানুষের চেষ্টা ভগবানের ইচ্ছার পােক।
মুখের বাসর।
১১
কি চেষ্টা করিব বােন? যাহা শেষ চেষ্টা, তাহার উপায় ত আমার
পিতাই করিয়া দিয়াছেন।
“তাহা হইলে বিষ খাইবে ?”
তা ভিন্ন আর উপায় কি ?”
“উপায় আছে, ভগবান আমার উপায় দেখাইয়া দিয়াছেন।”
“কি সে উপায় ?”
“তুমি আমার এই পােষাক পরিয়া মলিনা হও।”
আর আমার এই পােষাক পরিয়া তুমি যদি বিপদের মুখে পড়।
“তুমি রক্ষা পাইলে অনেক লাভ।”
পান্না এত নীচ নয় যে, সে এই পণে মুক্তি লাভ করিতে চায়।”
“তােমায় আমার অনুরোধ রাখিতেই হইবে।”
“কখনই রাখিব না।”
“ঐ শােন মােগল সৈন্যের বিজয় কোলাহল।”
শুনিতেছি-*
"তােমার শােচনীয় পরিণাম ভাব।
এই বিষ ভক্ষণে তাহার প্রতিকার হইবে।”
অলিনা আর থাকিতে পারিল না। অপূর্ণ নেত্রে, পান্নার হাত
দুখানি ধরিয়া তৎপরক্ষণেই তাহার পাদমূলে বসিয়া বলিল-ভগ্নি পান্না!
ভগবান একলিঙ্গের দোহাই ! এখনি আমার সহিত বেশ পরিবর্তন কর,
আর সময় নাই।”
এমন সময়ে সহসা সেই বাতায়ন পথ দিয়া *আল্লা হাে আকবর,” এই
ভীষণ ধ্বনি উভয়ের কর্ণে প্রবেশ
করিল।
মলিনা বলিল, “আর কেন—এখনও প্রস্তুত হও, আমার কথা শােন।”
পান্না এ কথায় কোন উত্তর না দিয়া স্থির ভাবে তথায় দাড়াইয়া
.মহিল।
কল্পনা-কল্লাল। মলিনা বিষন্ন মুখে বলিল, “বুঝিয়াছি, তােমার মনের কথা বুঝিল্লাছি। কিন্তু পান্না ! তােমার হৃদয়ের এ মহত্মের প্রতিদান না করিয়া আমি ছাড়িতেছি না।” • এই বলিয়া মলিনা পান্নার কক্ষ দ্বারে শিকালি টানিয়া দিয়া অন্য কক্ষে প্রস্থান করিল। পঞ্চম পরিচ্ছেদ মােগলসেনা দুর্গের গুপ্তঘার ভাঙ্গিয়া দলে দলে দুর্গ মধ্যে প্রবেশ করিল। আসফখ তাহাদের অগ্রবর্তী হইয়া উপরে উঠিলেন। আসফখ। দুর্জয় সিংহকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন,“মহাশয়! আমি বড় সুখী হইলাম যে, আপনি আমাদের সহায়তা করিয়াছেন। বাদসাহের নিকট এত্তেল। করিয়া আমি এই ক্ষুদ্র রাজ্য আপনাকেই দিব। দুইটী কারণে আমরা দুর্গ আক্রমণ কয়িয়াছিলাম। একটী পূর্ব অপমানের প্রতিশােধ। দ্বিতীয়-পান্না। যখন দুর্গ মধ্যে আমরা প্রবেশ করিয়াছি—তখন এ দুর্গ.. আমাদের হস্তগত হইয়াছে। কিন্তু পান্না কোথায়?” দুর্জয়সিংহ ক্রুদ্ধস্বরে বলিলেন-“আমি আমার প্রতিজ্ঞা করিয়াছি। পান্নার সহিত আপনাদের কোন সম্পর্কই নাই। আপনারা ত পান্নাকে আমায় দিতে স্বীকৃত। এরূপ স্থলে পান্নার কথা না তুলিলেই ভাল হয়। আসফখ বলিলেন-“রাজপুত যুবক ! রুষ্ট হইও না। আসফখা যাহা বলিয়াছে, যদি কোন বিশেষ প্রতিবন্ধক না ঘটে, তাহা হইলে পান্নাকে আপনিই পাইবেন।” L মুখের বাসর। দুর্জয় সিংহ। বিশেষ প্রতিবন্ধক কি মােগল সেনাপতি ! তখন, কোন প্রতিবন্ধকের সম্বন্ধে কোন কথাই বলেন নাই। আসফখ । অবশ্য তথন প্রয়ােজন হয় নাই, কাজেই কিছু বলি নাই। তবে আপনার মত বুদ্ধিমান লােকের এটা বুঝিয়া রাখা উচিত—যে এতবড় একটা কাজ ইহার মধ্যে অনেক আপত্তি উঠিতে পারে । দুর্জয় সিংহ-মৰ্ম্মদাহে জ্বলিতে লাগিলেন। তঁাহার প্রাণের ভিতর সহস্র বৃশ্চিক দংশনের যাতনা উপস্থিত হইল। তাহার হৃদয় করে চিতার আগুণ জ্বলিতে লাগিল। দুর্জয় মনে মনে অনুশোচনার জ্বালায় বলিলেন- “হায়! হায়! কেন এ নরাধমকে সহায়তা করিতে প্রতিশ্রুত হইয়া ছিলাম, কেন এ বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া জন্মের মত কলঙ্ক কিনিলাম ! যাহা করিয়াছি তাহা ফিরে কি? এ গভীর কলঙ্ক রেখা --আমার ললাটদেশ হইতে মুছিবে কি? যে পান্নার জন্য এত কাণ্ড করিলাম, শেষে সেই পান্নাই আমার হস্ত বহির্ভূত হইল।' মােগল সেনাপতি আসফখ দুর্জয়কে এইরূপ চিন্তা বিমগ্ন দেখিয়া বলিলেন,-“যুবক ! আর আমরা বিলম্ব করিতে পারি না। আমরা এ অন্তঃপুরের মর্যাদা নষ্ট করিতে কোন ক্রমেই ইচ্ছুক নহি। যদি সহজে আপনি আমাদের কাছে পান্নাকে উপস্থিত করেন—তাহা হইলে আমরা কোন গােলযােগই করিব না।” ‘দুর্জয় সিংহ এই কথায় সন্তোষ লাভ করিয়া বলিল, “পান্নাকে লইয়া আপনাদের কি প্রয়ােজন ?” আসফ খাঁ। তাহাকে একবার আমরা স্বচক্ষে দেখিতে চাই। যদি পান্না, দিল্লীশ্বরের রঙ্গমহালের উপযুক্ত উপহার হয়—তাহা হইলে তাহার উপর আপনার কোন দাবী থাকিবে না। যদি তা না হয়, তাহা হইলে পান্না আপনার।
কল্পনা-কল্লোল। দুর্জয় সিংহ প্রাণের অব্যক্ত যাতনা চাপিয়া রাখিতে না পারি ক্রুদ্ধ স্বরে বলিলেন--আপনার? শয়তান! আপনাদের কথার উপর কোন রাজপুত আর কখনই বিশ্বাস স্থাপন করিবে না। আমার জীবন পণ পান্নাকে আপনি কখনই দেখিতে পাইবেন না। যদি আপনারা জীবিত অবস্থায় তাকে পান, তাহা হইলে আমিই তাহার বক্ষে এই শাণিত ছুরিকা বিদ্ধ করিব।” আসফখ তখনই তাঁহার পার্শ্ববর্তী সেনাদের কাণে কাণে কি বলি- লেন। শতাধিকজন মােগল সৈনিক দুর্জয়কে ঘিরিয়া দাড়াইল। দুর্জয় তথনই তাহার অবস্থা বুঝিয়া লইলেন। মুহুর্ত মধ্যে কটিদেশ হইতে তর- বারি নিষ্কাশিত করিয়া সম্মুখবৰ্ত্তী মােগলসেনাকে আঘাত করিলেন। সেই আঘাতে সেই মােগল সৈনিক তথনই ভূপতিত হইল। অন্যান্য মােগলের। ভীম পরাক্রমে দুর্জয়কে আক্রমণ করিল। দুর্জয় প্রাণপণে যুঝিতে লাগিলেন। তাহার অঙ্গম্বেদ প্লাবিত দেহে আহত স্থান হইতে শােণিতধারা প্রবাহিত। মােগল সেনাগণের সহিত বহুক্ষণ একাকী যুঝিয়া দুর্জয় শ্রান্তক্লান্তদেহে মুচ্ছিত হইলেন। মােগলসেনাগণ তাহাকে বন্দী হায়! দুর্জয়! এই কি তােমার পরিণাম। মােগল সেনাপতি আসফখ কঠোর স্বরে বলিলেন—“ঘর দ্বার ভাঙ্গিয়া সব লুঠ কর। দুষমনের উপর কৃপা করিতে নাই। যেখান হইতে পার, তােমরাপান্নার সন্ধান কর। পান্না আর সেই দুর্গাধিপতি বৃদ্ধ শয়তানকে আমি চাই, সেই সুন্দরী শ্রেষ্ঠা পান্নাকে না পাইলে এ দুর্গ জয় বৃথা হইবে।” করিল!
যােড়শ পরিচ্ছেদ সহসা এই সময়ে এক পরমাসুন্দরী রমণী চারিদিকে রূপের জ্যোতি ছড়াইয়া সেইস্থানে উপস্থিত হইয়া পঞ্চম নিন্দিতস্বরে বলিল—“মােগল সেনাপতি আপনি পান্নাকে চান ? আসফখার সমভিব্যাহারী মশালধারীগণের প্রজ্বলিত মশালের বীপ্ত জ্যোতি সেই রমণীর মুখের উপর পড়িয়াছে! কি সুন্দর সেই মুখ। আসফ খ মনে মনে সেই রূপের প্রশংসা করিয়া বলিলেন-“আসফ খ— মােগল সেনাপতি! আপনি পান্নাকে চান ?” আসফ খাঁ সবিস্ময়ে সেই অলােকসামান্য সুন্দরীর আলােকচ্ছলিত সুন্দর বদন মণ্ডলের দিকে চাহিয়া বলিলেন—“বিবি ! তুমি কে?” সেই সুন্দরী অপাঙ্গে বিদ্যুত রেখার বিকাশ করিয়া সহ মুখে বলিল—“যে পান্নার জন্য আপনারা এত কাণ্ড করিলেন—এই নিশীথে এক বিশ্বাসঘাতকের সহায়তায় এক শান্তিময় অন্তঃপুরের পবিত্রতা নষ্ট করিলেন-যে পান্নার জন্য আপনারা লুঠ পৰ্য্যন্ত করিতে অগ্রসর আমি সেই অভাগিনী পান্না! আসফ খা—আবার সেই প্রজ্বলিত মশালের আলােকে পান্নার সেই সুন্দর মুখমণ্ডলের দিকে কিয়ৎ চাহিয়া চাহিয়া বলিলেন-বিবি তােমার কি একটুও ভয় নাই! আমাদের দেখা না দিয়া তুমি ত সহজে পলাইতে পারিতে।” সেই মমণী সদর্পে গ্রীবা উন্নত করিয়া বলিল-রাজপুতরমণ ভয় কাহাকে বলে জানে না। তাহার প্রমাণ মােগল অনেক পাইয়াছে— কল্পনা-কল্লোল। আপনিও আজ পাইলেন! আর এটাও মনে রাখিবেন সাহেব। ধরা না দিলে, সিংহকে আত্নত্ত করা বড়ই শক্ত কাজ। আসফ খাঁ-বলিলেন-“আমরা এখনই তােমায় বন্দী করিতে পারি। তােমার মৃত্যুর স্বাধীনতা লােপ করিতে পারি।” সেই রমণী ঈপের সহিত বলিল,-“না-না—তাহ পারিবেন না। অপমায়া এক পদ অগ্রসর হইবার পূর্বে আমার অঙ্গুলীস্থিত এই গরলগর্ভ হীরকারী আমার সকল যন্ত্রণার শেষ করিয়া দিবে ! জীবিতের পরিবর্তে মৃতকে আপনারা পাইবেন।” আসফ খ। বলিলেন-“সুন্দরী! তােমায় দিল্লীতে বাদসাহের রঙ্গ- মহাশে পাঠাইতে আমি অঙ্গিকৃত। এ রূপ রঙ্গমহালেই যােগ্য! বাহিরে তােমার জন্য শিবিকা আছে। সেই শিবিকায় চড়িয়া নিরাপদে আমার শিবিরে চলিয়া যাও। আমার সেনাগণ তােমার এ পবিত্র অন্তঃপুরে আর কোন উপদ্রব করিবে না।” সংসা এই সময়ে—“জয় মা ভবানীর জয়”-এই শব্দে-সেই দুর্গ- প্রাঙ্গণ কম্পিত হইয়া উঠিল! আসফ খ তখনই ত্বরিতপদে অলিন্দে আসিয়া দেখিলেন—দলে দলে ভীলসেনা সেই দুর্গমধ্যে প্রবেশ করিয়া প্রচণ্ডবিক্রমে মােগলসেনাগণকে ধ্বংস করিতেছে। মুসলমানের সমরনাদ-আল্লা হো আকবর—আর হিন্দুর “জয় মা ভবানী”—এই দুইটা মিশিয়া গিয়া সেই গভীর নিশীথে-সেই দুর্গমধ্যে ভয়ানক বিপ্লব উপস্থিত করিল। সেই ভীলসৈন্তের অধিনায়করূপে ভামশা করাল কৃপাণহন্তে মােগল-সৈর মুণ্ডচ্ছেদ করিতেছে। আর একদিকে বৃদ্ধ দুর্গাধিপতি-যৌবনের শক্তি সাহস ও উদ্যম ফিরিয়া পাইয়া, প্রবল পরাক্রমে মােগলসৈন্যকে আক্রমণ করিয়াছেন। এই সময়ে আর একজন কোখা হইতে আসিয়া মহাপরাক্রয় মােগলদৈ নিপাত করিতে লাগিল। এই তিনজন বীরের করাল পারে প্রচণ্ড আঘাতে অধিকাংশ মুখে । মােগলসৈন্ত ধাশায়ী হইল। চীনসৈন্য বিকল্প গাভ কমিক হাজী ন্যায় হেলিতে দুলিতে উপরের প্রকোষ্টে আসিল। স্বাসরু খাল পচাতে পৃষ্ঠরক্ষক রূপে যে কুড়িজন মোগল সেনা ছিল, তাহারা তখনই নিহত হইল। আসক খ্ৰী বন্দী হইলেন। বৃদ্ধ দুর্গাধিপতি, সমর-শ্রমক্লান্ত রুধির চৰ্বিত দেহ ভামশাকে আলি- জন করিয়া বলিলেন-“বৎস! আমায় মার্জনা কর। আমিই তােমার নির্বাসনের কারণ। আমি তােমার নিকটে ঘাের অপরাধী। সে অপরাধের মহাপ্রায়শ্চিত্ত আজ আমি করিব। এ দুর্গ তোমার, এ ক্ষুদ্র রাজ্য তােমার। আর যে পান্নার অমূল্য সতীত্ব—তােমার বাহুবলে রক্ষিত হইল—সে পান্নাও তােমার। সহসা সেই সময়ে কে এক গম্ভীর কণ্ঠে পশ্চাৎ হইতে বলিল-“দুর্গা- ধিপতি! আপনি ঠিক বিচারই করিয়াছেন। কিন্তু আমি আপনার গোলাম—নিমক ভােব্দী হইয়াও যে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছি- তাহার প্রায়শ্চিত্ত প্রয়ােজন। আপনি না পারেন-ভামশাকে আদেশ করুন যেন সে এখনি তাহার ক্ষুরধার তরবারির সহায়তায় আমার এ ঘৃণিত মস্তক দেহচ্যুত করিয়া দেয়।” ভামশা ও দুর্গাধিপতি উভয়েই ফিরিয়া দেখিলেন-বক্তা আর কেহই নহে। স্বয়ং দুর্জয় সিংহ। ভামশা সেই রুধিরত দেহ দুর্জয় সিংহকে আলিঙ্গন করিয়া বলিলেন-“দুর্জয়। তােমায় আমি মার্জনা করিলাম-আমাদের মধ্যে আর কোন বিবাদ নাই। চিত্ত জয়ে কি সুখ-নিঃস্বার্থ কর্তব্য কত্তব পালনে কি আনন্দ—কি পুণ্য তাহা আজ বুঝিয়াছি। দুর্গাধিপতি রমণী-রত্ন পান্নাকে আমায় সমৰ্পণ করিয়াছেন—এ দুর্গ, রাজ্য আধিপত্য সবই আমায় দিয়াছেন আমি তােমায় দিলাম। পান্না আমায় কল্পনা-কল্লোল। কোন প্রয়ােজন নাই। যে প্রবৃত্তি একদিন আমার সর্বনাশ করিয়াছিল, আজ আমি সেই প্রবৃত্তিকে জয় করিয়াছি। দুর্জয়সিংহ যদি মশার হস্তে নিহত হইত, তাহা হইলে বােধ হয় তাহার পক্ষে শ্রেয় ছিল। আমার হৃদয়ের মহত্ব, মার্জনা আত্মত্যাগ প্রভৃতি সে বঞ্জাম্নিরূপে তাহার প্রাণের চারিদিক দগ্ধ করিতে লাগিল। যে মশার হৃদয় এত মহত্বে পূর্ণ, দুর্জয় সিংহ তাহার সহিত কি না দুর্ব্যবহার করিয়াছে। দুর্জয়সিংহ সেই দিন মর্মে মর্মে বুঝিল-জগতে চিরদিনই ক্ষমা মহত্ব ও উদারতার জয়।
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
*
“কেন এ সৰ্ব্বনাশ করিতে সখী?”
“কেন—তা আবার জিজ্ঞাসা করিতেছিস মলিনা ?*,
আমাদের ত যুদ্ধে জয় হইয়াছে। আবার আমাদের সুখের দিন
ফিরিয়া আসিয়াছে।
অন্য সকলের সুখ হইতে পারে, আমার সুখ আর হইবে না।
জীবনে আজন্ম জ্বলিয়াছি। এত সুখে থাকিয়া ত আমার সুখ হইল না।
এখন বুঝিতেছি মৃত্যুতেই সুখ ! মৃত্যুতেই শান্তি।
বিষ কোথায় পাইলে?”
“আমার পিতা স্বহস্তে আমায় বিষ দিয়া গিয়াছেন।”
হকিম-হকিম!
এ রাত্রে, এ ভীষণ যুদ্ধ কোলাহলময়ী ভীষণ
যামিনীতে কোথায় যাইব পান্না ! কাহাকে ডাকিবপান্না ।”
“তােমায় আর যাইতেও হইবে না। আমার সব শেষ হইয়া আসি-
তেছে। এ জ্বালাময় প্রাণে যেন কত শাস্তি ভােগ করিতেছি! আকাশে
কত তারকা জ্বলিতেছে! সে তারা কত উজ্জ্বল। ঐ দেখ কালমেঘের
রাশি সই! অই তার কোলে, মেঘের বুকে আমি এখনি চলিয়া যাই।
দেদে সই আমার এ হতভাগ্য জীবনের শেষ আশা পূর্ণ কর।
যেখান হইতে পারিস, মল্লিকা, মালতির রাশি আনিয়া ফুলশয্যা
কন-কল্লোল। করিয়া দে। আমার এ সুখের বাসর যেন একটাও আকাঙ্ক্ষার নিশ্বাসে কলুষিত না হয়। ঐ-দেখ! রত্নালঙ্কার শােভিতা, পট্টবস্ত্র বিভূষিতা সীমন্তে উজ্জ্বল সিয় বিন্দু শােভিতা-সুস্মিত বদনা, স্নেহময়ী জননী- 'আমায় ডাকিতেছেন—আয় পান্না আয়-আমার কাছে আয়! আমি তােকে বুকে করিয়া রাখিব।” আর বলা হইল না। এই পান্নার শেষ কথা। জন্মের মত তাহার মলিননেত্ৰ দুটী নিমীলিত করিল। মলিনা দারুণ শােকে চীৎকার করিয়া উঠিল মলিনা-যে সময়ে পান্নাকে গৃহমধ্যে অবরুদ্ধ করিয়া পান্নার পােষাক পরিয়া আসফ খাঁকে প্রতারিত করিতে গিয়াছিল—সেই সময়েই পান্না নারী সশ্রম রক্ষার জন্য-পিতৃ প্রদত্ত বিষ পান করিয়াছে। মলিন। ফিরিয়া আসিয়া সমস্ত ঘটনা বুঝিতে পারিল। তার পর উভয়ের মধ্যে যে কথােপকথন হইয়াছিল, তাহা আমরা উপরে বলিয়াছি। দুর্জয়, ভামশা ও দুর্গাধিপতি পান্নার সন্ধানেই আসিতেছিলেন। পান্নার ক্ষ মধ্য হইতে রমণী কণ্ঠ নিঃসৃত চীৎকার শুনিয়া তাহারা দ্রুতপদে সেই কক্ষে প্রবেশ করিলেন। হুগাধিপতি-মেহময় কঠে ডাকিলেন—“গন্না। আমার। কে উত্তর দিয়ে। পান্না ত নাই। শুন্য পিঞ্জ পড়িয়া আছে- পক্ষ বহুক্ষণ পূর্বে উড়িয়া গিয়াছে। পান্না নিশ্চল স্পনহীন দেহে মর্মর শয্যায় শায়িত। যে রূপ- গত আলাে করিয়াছিল-মৃত্যুর কঠোর হন্ত স্পর্শেও তাহা কােন একটু অলিম হয় নাই। মৃত্যুর কলঙ্ক-রেখা স্পর্শে তাহার নেত্র- আলুখী প ক নাই। পান্না! • মা- অy মরণেও এতরূপ। সেই চোখ সেই মুখ—সেই কৃষ্ণ কেশ রাশি, সেই মৃত্যুছায়াময় মুখে মধুর হাসি,কিন্তু সেদেহে স্পন্দন নাই,প্রাণ নাই, সে নেতে দৃষ্টি নাই, সে ওষ্ঠাধরে ভাষা নাই--সে মনে চিন্তা । নাই। সুর গিয়াছে প্রতিধ্বনি আছে, আলো গিয়াছে নেত্রের আলা আছে, ফুল ঝরিয়া পড়িয়াছে, মায়ের বুকে তাহার গন্ধ আছে। দুর্জয় সিংহ ধীরে ধীরে সেই মৃত দেহের পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইল। বহুক্ষণ ধরিয়া অনিমেষ নয়নে সে অতুল্য মাধুরীভরা রূপরাশি দেখিল। তৎপরে দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল—“পান্না। পান্না! একবার আমার সঙ্গে কথা কও। মিষ্টকথা শুনিতে চাহি না, আদর সােহাগ চাহি না-এখন তােমার বিষাদপূর্ণ দৃষ্টিতেও আমি মহাসুখী হইব। আমি নরাধম-রাজপুত-কুলকল! তােমায় যে এতদিন চিনিতে প্ররি নাই পান্না! তাই তােমার সর্বনাশ করিয়াছি, যাহার অল্প খাইয়া এ দেহ পুষ্ট, তাহার সর্বনাশ করিয়াছি, নিজের সর্বনাশ করিয়াছি।” দুর্জয়সিংহ উন্মাদবতথনই কটিদেয় হইতে শাণিত ছুরিক বাহির করিয়া নিজের হৃদয় বিদ্ধ করিল। তাহার আলম হৃদয়োৎসারিত শােণিতধারায় ভূমিতল লুষ্ঠিতা, পান্নার খেতবস্ত্র রক্তবর্ণ ধারণ করিল। ঝটিকা উৎপাটিত মহামের ন্যায়, মহাশব্দে দুর্জয়ের দেহ পান্নার পার্থে পতিত হইল। সহ করিতে পারি না। আত্মহত্যায় সব আলা জুড়াইল। শত
•মুখে বার।
কোথায় যাইবে পা—মা। অা-মা-ই সঙ্গে নাও
দুর্জয়ের সুখের শে”কথা-“পান্না—আজ আমাদের
সুখের বাসর”
সমাপ্ত।
s
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.