Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Noopur
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
এ কুমুদরঞ্জনমল্লক
No text on this page.
শ্রীকুমুদরঞ্জন মলিক প্রণীত।
I
পীচলি
শিক
চক্রবর্তী চাটার্জী এণ্ড কোং লিমিটেড,
১৫ ন কলেজ মাের,
কলিকাতা।
.
PRE
বিদ্যোদয় প্রেস।
প্রিন্টার-পুর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী।
৮/২ নং কাশীঘােষের লেন, কলিকাতা
উৎসর্গ।
পরম পূজনীয়
বৈষ্ণবকবি লােচনদাস ঠাকুরের
শ্রীচরণে।
আমি আপনার গ্রামবাসী ও প্রতিবেশী, আপনি
ঠাকুরের পদে নুপুর হইতে সাধ করিয়াছিলেন,
আমিও আপনার চরণে এই নুপুর পরাইতে
আকাক্ষা করিয়াছি। আপনার প্রিয় গ্রামের ক্ষুদ্র
কবির ভক্তি অর্থ বলিয়া, আশা করি, এ অকিঞ্চিৎ
কর দানও গ্রহণ করিবেন।
बाम
১ই আষাঢ়
আশ্রিত
শ্রীকুমুদরঞ্জন।
১৭।
No text on this page.
সূচীপত্র।
ব্রজদাস
৭
১২
১৬
খুদরুন
জন্মান্তরে
জুয়ারী
ব্যতিক্রম
সন্ন্যাসিনী
১৯
৩২
চটি জুতা
অগ্রদানীর ছেলে
అని
অচেনা ছেলে
৪৯
চতুর ওঝা
গণৎকার
৫১
শ্ৰধর
৫৪
- -
মারণ
স্বপ্নের মুল
নির্বাসিত
৬৯..
( 0 )
হরিদাস
পূজারি
শরণা
বাণ
ছেলের দায়ে
১২
একটা টাকা
১৭
বন্ধু
অভিম বধ
যাত্রার দলে
: :
-লা-ধু-গ্রহগ
t
এ
s
গেল ঐ,
'৬৬
শুভ ।
সরলা বালিকা
শুভা নাম তার
ভিখারিণী মার সনে,
কাশীর প্রান্তে
পর্ণ কুটীরে
যাপে দিন নিরজনে।
প্রতি দিন প্রাতে
ভিক্ষায় যায়
নয় বছরের মেয়ে
লোকে দান করে
গঙ্গার ঘাটে,
দেখে বাল চেয়ে চেয়ে
5.
* নুপুর *
মনে হয় তারও
করিবারে দান
কি করিবে দান খেপী,
ভাবিয়া না পায়
ভাবে কত দিন
প্রহর রজনী ব্যাপি।
বহুদিন পর
এক শুভ দিনে
দ্বিগুণ চাউল পেয়ে,
মুখ ভরা হাসি
জননীর কাছে
কুটীরে আসিল ধেয়ে।
জননী তাহার
আছিল পীড়িত
দারুণ বেদনা শিরে।
নিজে আজ শুভা
করি’ রন্ধন,
খাওয়াইল জননীরে।
না করি আহার
অবােধ বালিকা
সরা ভরা ভাত লয়ে
মাতারে লুকায়ে
বাহিরিল পথে
পুলকে অধীর হয়ে।
* নূপুর *
আজি কাশীধামে
মহা উৎসব
বরদার মহারাণী,
দিয়াছেন আসি
আমসত্র,
ছুটিছে অযুত প্রাণী
অতিথি ভিখারী
কত সারি সারি
রাজ পথে চলে যায়
শুভার আহা সে
সরা ভরা ভাত
কেহ নাহি ল’তে চায়।
ভ্রমি পথে পথে
ভাত গুলি তার
কেহ লইল না দেখি,
মনটদুখে বালা
ভাবিতে লাগিল
ম্লান অবনতমুখী।
‘ভিখারিণী ব'লে
আমার নিকটে
কেহ পাতিল না হাত,
দিতে এসে কি গাে ফিরে নিয়ে যাব
মাের এক সরা ভাত।
ফিরিল বালিকা
বিষাদিত মনে
আসি কুটীরের কাছে,
দেখিল দুয়ারে
ভিখারী অনেক,
ম্রিয়মাণ বসে আছে।
* নুপুর *
বলিল ভিখারী
‘আছি উপবাসী
দাও দাও কৃপা করে
মাের হাতে তুলি এই ভাত গুলি
অন্নপূর্ণা মােরে।
বালিকার আহা
ধরে না পুলক
হাসি হাসি কহে কথা,
হাগা এত লােক গিয়াছে যেখানে
তুমি যাও নাই সেথা ?
শুনিলাম পথে
কত সন্দেশ
পরমান্ন যে কত,
খেতেছে নিয়ত
অসতে
আজি লোেক শত শত।
বুড়া বলে ওগো
সবে যেথা যায়
আমি ভিড়ে নাহি যাই,
সকলেই পায়
তাহাদের কাছে
আমি কিছু নাহি পাই।
টানিলে কেহ
যাইব কেমন করে,
পথ ভুলে এই পথে বসে আছি
দাও ভাতগুলি মােরে।
হইয়াছি বুড়া
৪
- * নুপুর ৪ । ৪ 47 উল্লাসে বালা কম্পিত করে সরা আনি ধরি ধরি, নামাইয়া দিল বৃদ্ধের হাতে বুড়া বলে হরি হরি । এমন অন্ন পাইনি কখনাে ঘুরিয়া হয়েছি সারা আমারে কে আর দিবে গাে অন্ন অন্নপূর্ণা ছাড়া। চ'লে গেল বুড়া বালিকা দেখিল হইয়াছে দেরী পথে, বকিবে জননী এই ভয়ে ধীরে ফিরে গেল কুটীরেতে। ভাতগুলি খেয়ে যে সুখ লভিল আসি, ইন্দিরা কভু লভেনি সে সুখ ভুঞ্জিয়া সুধা রাশি। দেব মন্দিরে পরদিন প্রাতে দেবতার অতি কাছে, পরিচারকেরা ‘জুঠা সরা এক দেখিল পড়িয়া আছে। আট কড়কড়ে নূপুর প্রধান পাণ্ডা প্রভাত স্বপনে দেখিছেন পাতি’ হাত বিশ্বেশ্বর বালিকার কাছে লইছেন মাগি ভাত। স্নান করি প্রাতে মন্দিরে আসি শুনি এই বিবরণ, দরদর ধারে অশ্রু গড়ায় বিস্মিত হয়ে র’ন। ফোঁটা ফোঁটা জল মুকুতার মত পড়ে দুগগু বাহি’, বলে বম বম্ বিশ্বেশ্বর অন্নপূর্ণা মায়ি। এসেছিল শুভা প্রণমিতে দেবে তারে নিজ কোলে টানি, বলেন পাণ্ডা স্বপনে দেখেছি এই সেই মুখ খানি। হে ভিখারী শিব ভকত বাঞ্ছা মন্দিরে রাখি সরা, এতদিন পরে হাতে হাতে প্রভু আজিকে পড়িলে ধরা। {
জস
কালাপাহ' ‘ব কাল অভিযানে
আজি ব্রজপুর ধ্বস্ত,
দেবতা ফেলিয়া পাণ্ডার দল
ছুটিয়া পলায় ত্রস্ত।
সারা ব্রজধামে দীন ব্রজদাস
মন্দিরে একা করিতেছে বাস,
দেবতা সমুখে বসিয়া রয়েছে
কুসুমাঞ্জলিহস্ত।
নুপুর
২
দেবমন্দির
সুরভিত আজি
ভুরু ভুরু ধূপ গন্ধে।
প্রভাত আরতিকেরি ব্রজদাস
প্রাণ ভরি পদ বন্দে
ভক্ত আজিকে একি রে বিভল
টস্ টন্ করি পড়ে আঁখিজল,
তৃষিত ভ্রমর পান করে যেন
শ্রীমুখের মকরলে।
L
সাজায়ে সাজায়ে খেদ নাহি মিটে
আবার সাজায় ভক্ত
শিশুকাল হতে রাধারমণের
সে যে চির অনুরক্ত
হাতের বাঁশীটী করি দেয় বাঁকা
হেলাইয়া দেয় ময়ুরের পাখা,
বাঞ্ছিত চির চরণে বুলায়"
করবীপরাগাক্ত।
-
r
* নূপুর *
৪
অঙ্গনে ওই ঢুকিল সৈন্য
করেতে করাল দণ্ড
উপাড়ি ফেলিছে তুলসীর মূল
করিছে লণ্ড ভণ্ড।
পূজায় মগন ধীর ব্রজদাস
বুঝিনে বহে না বহে নিশ্বাস,
প্রেম আঁখিনীরে ভাসিয়া যেতেছে
পাণ্ডু যুগল গণ্ড।
মন্দির দ্বারে দাঁড়ায়ে ‘পাহাড়
হাঁকিয়া বলিল ভূর্ণ
বুকেতে তাহার ভীম বিদ্বেষ
নয়ন রােষেতে ঘূর্ণ।
চাহিয়া বারেক ব্রজদাস পানে
বলিল ‘মির্জা রহ এই খানে
পুজাশেষে এই পাষাণ ছবিটা
পদাঘাতে করে চূর্ণ।
থ
নূপুর *
প্রহরের পর প্রহর কাটিল
হয় না যে পূজা ভঙ্গ,
সাধক আজিকে লভিয়াছে বুঝি
চির আরাধ্য সঙ্গ।
চাহিয়া চাহিয়া দেখি সেনাপতি
মনে মনে হায় করিল যে নতি,
পরাণে তাহার কি ব্যথা জাগিল
পুলকিত হ’ল অঙ্গ।
৭
ফিরিয়া আসিল সে কালাপাহাড়
সাথে সেই সেনা বর্গ,
রােষ কষায়িত নয়ন সাবর
করেতে দুলিছে খড়গ।
দেখি পূজারিরে স্থির নিশ্চল
কঠোর নয়ন হ’ল ছল ছল,
বুঝিল ভক্ত জীবন তাহার
দেবেরে দিয়েছে অর্ঘ্য।
১০
* নূপুর ॥
মির্জার পানে চাহিয়া দেখিল
সেও যে সংজ্ঞা শূন্য
কালাপাহাড়ের পাষাণ হৃদয়
বারেক হইল ক্ষুন্ন।
বলে বিচিত্র চিত্র যে হেতা
চিনিতে নারিনু কোটী দেবতা
বুঝিতে পারিনে দেবতা নরের
কাহার অধিক পুণ্য।
৯
আমি ত জানিনে দেবতা কোথাও
রক্ষা : ছে ভক্তে,
ভক্ত দেবেরে অমর করেছে
আপন বক্ষ রক্তে।
এসেছে দেবতা আজি মন্দিরে
যেতেছি ফিরিয়া পদ বন্দিরে
সাধু মির্জারে চল লয়ে চল
শােয়াইয়া হেম তক্তে।
১১
T
খুদরুনদীঘি ।
যদি কভু এই পথে
এসাে তুমি হে পথিক
খুদরুন দীঘি যেন দেখাে,
শ্যামল মণ্ডপ যেন
আছে এক বট গাছ
তলে তার কিছু খণ থেকো।
কি সুন্দর উচ্চ পাড়
স্নিগ্ধ কাক-চক্ষু জল
আছে প্রায় আধক্রোশ জুড়ি',
পদ্মফুলে টাকা বুক,
সুরভিত সমীরণ
কত পাখী ডাকে ঘুরি ফিরি।
কেহ বলে বুড়ী এক
খুদ খেয়ে দিন যাপি
দিল এ বিশাল দীঘি খান,
কেহ বলে এক রাতে
বিশ্বকৰ্মা দিল গড়ি
কেহ বলে নবাবের দান।
।
১২
* নূপুর বলে এই বট তরু কামরূপ হতে চলুন্তি মন্ত্রেতে এল হেথা, সেই সব ডাকিনীরা এখনও বাস করে রজনীতে শুনা যায় কথা। হয়ত একটী রাতে উড়িয়া যাইবে গাছ এই ভয়ে রাখালেরা হায়, শিকড়ের চারিদিকে ছােট ছােট গোঁজ পুতি দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে যায়। মাের পরিচিত এক আছে থুরথুরে বুড়ী দেয়াসিনী রক্ষাকালিকার, বছরে পূজার দিন আজও ঠিক নিয়মিত দুইবার ভর হয় যার। সে বলিল জানাে বাবা এখানে ছিল না দীঘি ছিল নাক গাছ পালা কোননা, ছিল না নিকটে গ্রাম তিয়াসার বিন্দু বারি কেমনে হইল তাহা শোনো। বামুনের মেয়ে এক যেতেছিল স্বামী সনে ছেলে কোলে এই পথ দিয়ে বাসনা তাদের মনে ‘যাজি গ্রামে থাকি কাল গঙ্গা না'বে কাটোয়ায় গিয়ে। 4 - ৭ ", - নূপুর ॥ তখন বােশেখ মাস উঠেছে দারুণ রােদ কঁদে ছেলে জল জল করে, নিকটেতে গ্রাম নাই পিপাসায় ছাতি কাটে কোথায় যাইবে বল দোড়ে। দেখিতে দেখিতে আহা শামূৰ্ত্তি হল ছেলে মুখেতে সরেনা তার কথা, মাতা পিতা আঁখি নীরে ভাসায় তাহার মুখ মাঝ মাঠ জল পাবে কোথা ? জল জল’ করি ছেলে বুঝিরে মিলায়ে যায় কাঠফাটা রােদ আহা মরি, ব্রাহ্মণ ব্রাক্ষণী তবে যােগাসনে বসিলেন বাঁচাবেন তনয়ে কি করি। স্থির পুতলির মত অচল অটল দোহে স্বর্গ পানে বদ্ধ আঁখি তারা, জননীর স্তনে লগ্ন শিশুর পাটল ওষ্ঠ সকলেই যেন সংজ্ঞা হারা। সঞ্চিত ব্ৰহ্মণ্য তেজ মায়ের অগাধ স্নেহ এক সাথে করিলেন দান, পিতা হ’ল ছায়াময় সুশীতল বট তরু জননী হইল দীঘি খান। । ১৪
* নূপুর
পুত্র হ’ল শতদল
শােভে নীরে টলটল
সাধ্য কার মূল দেয় টুটি,
নিতুই পূজার লাগি
রাশি রাশি লয়ে যায়
নিতুই তেমনি উঠে ফুটি।
সে ছেলে কোথায় গেছে
যুগ যুগ
কত ছেলে
সেই স্নেহনীর করে পান,
অক্ষয় বিটপী যেন
ব্রাহ্মণের পদছায়া
তাপিতে আশ্রয় করে দান।
জন্মান্তরে ।
-***--
বড় জমিদার ধনী ব্রাহ্মণ ঘরে
সুরূপ যুবক গালেতে হয়েছে ক্ষত,
যায় না কিছুতে বরষ বরষ ধরে
দেখে ডাক্তার কবিরাজ কত শত।
সবাই বলিছে ‘বড় অদ্ভুত ঘা’
এত তদ্বিরে কিছুতে যেতেছে না;
বাড়ে না কমে না আছে সেই এক মত
বুঝিতে পারিনে একি অদ্ভুত ক্ষত।
}
১৬
.
* নগর
( ২ )
সে যে দেবতার মানত করিল কত
‘মাদুলী ‘তাগায় ভরিয়া উঠিল হাত,
করি উপবাস গ্রহ যাগ আদি যত
পূজিল শিবেরে জাগিয়া সারাটা রাত।
শুকাল না তবু সেই নিদারুণ ঘা,
নিষ্ঠুর বিধি একবার ফিরে চা’,
নিবারাে বেদনা, দয়াল জগন্নাথ
কাঁদিয়া কঁদিয়া ডাকে সে দিবস রাত।
( ৩ )
}
তীর্থে তীর্থে ভ্ৰমিল সে বহুদিন,
বহু চিকিৎসা বহু ঔষধ করে,
অবশেষে স্লান ভাবি ভাবি তনু ক্ষীণ
ধন্না’ দিলেক আসি তারকেশ্বরে।
দুই দিন পর, নিশি শেষে কার মুখ।
দেখি ব্রাহ্মণ কঁদি চাপড়ায় বুক।
সঙ্গীরা তারে রাখিতে পারে না ধরে,
দর দর ধারে, আঁখিজল পড়ে ঝরে।
*
।
1
-
১৭
1
* নূপুর *
( ৪ )
দেবের আদেশ, গত জন্মেতে আমি
জননীর গালে মারিয়াছিলাম চড়,
সে বিষম পাপ ক্ষমেনি জগৎস্বামী
মায়ের কৃপায় পড়েনি খসিয়া কর।
ঠাকুর বলিল “যাবে না যাবে না যা,
পাপের শাস্তি তাের ও গালের ঘা,
এ জনম ধরি ফল ভােগ তার কর”
ভয়ে বিস্ময়ে লুটায়ে করিনু গড়।
( ৫ )
স্বপনে জড়ায়ে ধরিনু মায়ের পা
হৃদয় মাঝারে জাগিল দারুণ শােক,
মা গাে আমার গত জন্মের মা
তবু যে তােমার করুণা বিভল চেক
রহিল মরমে বড়ই বেদনা ওমা
এ জনমে আর চাহিতে দিলে না ক্ষমা,
রহুক এ ক্ষত, দেখুক দেশের লােক,
অকৃতি তনয়, কৃত কর্মের ভােগ ।
জুয়ারী ।
কেশগুলি তার
শুভ্র হয়েছে
নাহি আর দেহে বল,
তারার মতন উজ্জ্বল আঁখি
আজি ম্লান ছল ছল।
বিসূচিকা দিল
উজারি ভবন
যেখানে যে ছিল খুজি,
কন্যার এক
বালিকাকন্যা
এখন তাহার পুজি।
* নূপুর বুকের ফাটাল ভাঙ্গা সে বিজন ভবনের মত হৃদয়খানি ও তার, ধরিয়া উঠিছে মমতাটী বালিকার। অতীতের দেনা উসুল হয়েছে রাঙা দাগ টানা প্রাণে, ভবিষ্যতের জবর দাবী যে দারুণ বেদনা হানে। সব খােয়াইয়া ছিল বুড়া ভাল এক পেয়ে সব গােল, ভাঙ্গা দেউলের দেবতার কানে নব অভিষেক বােল। থাকে বালিকাটী ঠাকুরদাদার সম বয়সীর মত, দুই জনে মিলে ভাগাভাগি করে করে গৃহ কাজ যত । কোলে লয়ে বুড়া আঁখি জলে দেয় চুমা, নিশায় কঁদিলে বলে রাণী হবি ঘুমা দিদি তুই ঘুমা। কভু বালিকারে ২০ নুপুর - মনে মনে তার প্রবল ধারণা প্রচুর অর্থ জিনে যেমনে হউক রাণীর লাগিয়া জমিদারী দিবে কিনে। সূৰ্ত্তি খেলার সংবাদ পেলে পাঠাইয়া দেয় টাকা, জুয়া খেলিবারে দূর গ্রামে যায় গভীর নিশিথে একা। হাসি হাসি মুখে চাহে যবে রাণী বুড়ার মুখের পানে, বিগত তাহার হীরা জহরৎ সব যেন ফিরে আনে। যবে সে বুড়ার চুপি চুপি কথা কহে, মরুভূমি দিয়া যেন রে শীতল মৌসুমি বায়ু বহে। সূৰ্ত্তি খেলার ঋণ দিন দিন সুদে সুদে গেল বাড়ি, শেষ আশ্রয় ভাঙ্গা বাড়ী খান কাল দিতে হবে ছাড়ি। গলাট জড়ায়ে ।
নুপুর তবু বিষাদের রাণীর বুক, হাসি আলােহীন আঁধার ভবন কিছুই ছিল না সুখ, ছােট মেঘ খানি ঢাকিল জানালার পাশে পেয়ারার গাছ মেঠো কুমড়ার লতা, পুকুরে যাবার সরু বাঁকা পথ সবারি মুখেতে কথা। বুড়া উদাসীন কভু আনমনে আকাশের পানে চায়, দেখে মেঘগুলি কোথা থেকে এসে কোন দিকে উড়ে যায়। কভু ধীর মনে দেয়ালের গায়ে দেখে পিপীলিকা সারি, ডিমগুলো লয়ে কোথায় যেতেছে ভাবনাটা যেন তারি । কভু বলে যেথা রাজা মাের অাছে সেই দিকে যেতে হবে, কেন চিরদিন ঘুরিয়া মরিব ভবে। শুধু মিছামিছি ২২
* নূপুর *
দুকুরে বসিল,
ভােরে ভরে উঠি
চলে দুইজনে,
আট বছরের মেয়ে
তলায়
রৌদ্র দারুণ পেয়ে।
ঘামে ভেজা মুখ
আবার চলেছে
পড়েছে তখন বেলা,
দীঘির পাড়েতে
বড় বট গাছে
বসেছে কাকের মেলা।
ডাকি ডাকি বক উড়ে যায় মেঘে
রাণী বলে ক্ষীণ স্বরে,
দাদা ওরা সব
ফিরিয়া যেতেছে
গাছে উহাদের ঘরে ?
চলে খোড়াইয়া
দেখিয়া কৃষক বধূ।
ঘােমটাটী তার আধেক তুলিয়া
আস্তে বলিল শুধু
শােণণা ওগাে খুকু
পায়েতে লেগেছে ভারী,
রহিবে গা চল
দুইজনে আজ
চল আমাদের বাড়ী।
বুড়ারে ধরিয়া
অনেক হেঁটেছ
২৩
সাথে সাথে তার চলে দুইজনে।
কৃষক গৃহিণী আসি,
বলে “ও মা এ যে পদ্ম করবী
একি গাে মিষ্টি হাসি।
গরম জলেতে
পা দুটী ধােয়ায়ে
তেল দিয়া দিল পায়ে,
বতন করিয়া
মিটিছেনা আশা
ধরিয়া রাখিতে চাহে।
বিদায়ের কালে
ক্ষীর দিয়া বন্ধু
বলে চুপে রাণু খেয়াে,
এই পথে বােন এসাে যদি কভু
দেখা দিয়ে যেন যেয়াে।
হাতটা ধরিয়া
বালিকা চলেছে
বুড়া সাথে কথা কয়ে,
সুকৃতি যেনরে
চপল মনেরে
সুপথে যেতেছে লয়ে।
বহু বহু দেশ
ঘুরিয়া ঘুরিয়া
বহু নদ নদী পারে,
আজিকে দুজনে
আসিয়া দাড়াল
রাজার সিংহ দ্বারে।
২৪
* র * দিলেন হুকুম কে তুমি? যখন দ্বারবান বলে বুড়া বলে কথা সাদা, তুমি দ্বারােয়ান চেননা আমারে আমি যে রাণীর দাদা। রাজা ও ছিলেন দূরে দাঁড়াইয়া ভদ্র অতিথি হেরি, প্রবেশ করিতে তিলেক না করি দেরী। শ্রান্ত চরণা বালিকারে দেখি পরম আদর স্নেহে, বলিলেন দেহে থাক দুইদিন আমাদের এই গৃহে। বুড়া বলে শুধু দুই দিন কেন আর কোথা যাব ছাড়ি, বহু খুঁজে খুঁজে এসেছি হেতায় এই ত দিদির বাড়ী। বুঝিলেন রাজা বহুব্যথা পেয়ে হয়েছে খারাপ মন, সান্ত্বনা আর শ্র ভার কিছুদিন প্রয়ােজন।
* নূপুর
গােপনে মহিষী হেরি বালিকারে
অন্দরে ডাকি তার,
মুখ মুছাইয়া
কত কথা কন
কোলে লন বারবার।
নয়নে তাঁহার
রাণীর মূরতি
এতই লেগেছে ভাল,
বলেন এ যার
বধূ হবে তার
রূপে গুণে ঘর আলাে।
রাজার বাড়ীতে
বুড়ার কাহিনী
সদাই সবার মুখে
সমে সবে
উঠিয়া দাঁড়ায়
হাসি চেপে রাখি বুকে।
হাতের হুকাটা
খেতে খেতে সবে
লুকাইয়া রাখে পাছে,
কেমনে এমন
বেয়াদবি করে
রাণীর দাদার কাছে।
রাজা হাসি হাসি
বৃদ্ধেরে ডাকি
পরিচয় তার লন,
বলেন হাসিয়া
স্বজাতি আপনি
কুলেতেও খাটো নন।
* নূপুর *
বৃদ্ধ বলিল
সত্যই যদি
নাতিনীরে তব
করিতে চাহেন রাণী,
কতগুলি টাকা যৌতুক পাবে
বলুন তাহাই শুনি।
বেশী কোথা পাব
সে দিন আমার নাই,
লক্ষ টাকার
যৌতুক দিব
করিয়াছি মনে তাই।
হাসি হাসি রাজা বলিলেন বেশ
তাহাতেই খুব হবে
আজ হতে আমি রাজকুমারের
খোঁজ করে ফিরি তবে।
বালিকার সাথে
মহা সমারােহ করি,
তের বছরের
কুমারের বিয়ে
রাণী ত দিলেন ধরি।
পারিজাত কলি।
মােহিত যে রাজা রাণী
বুড়া আনন্দে
দেখে আর কাদে
মুখেতে সরে না বাণী।
আট বছরের
হেরিয়া যুগল
২৭
* নূপুর ॥
পর দিন প্রাতে গালাশীল করা
নূতন ধরণ খামে
কোথা হতে এক দরকারী চিঠি
আসিল বুড়ার নামে,
বােম্বায়ে সেই
সূৰ্ত্তি খেলায়
পাঠাইয়া ছিল টাকা,
এবার তাহার
সুফল ফলেছে
যায়নি নেহাৎ ফাঁকা।
লক্ষ মুদ্রা
জিনিয়াছে বুড়া
সত্য হয়েছে বাণী,
স্তম্ভিত শুনি
বিস্মিত রাজা রাণী।
হাসি, হাত ধরি
ওরে ভাই বধূবর,
বিধাতার দেওয়া
এই যৌতুক
বৃদ্ধ দিতেছে ধর।
আমি ত জুয়ায়
হারায়েছি সব
ভাঙ্গিয়া গিয়াছে মেলা,
আজি যা পেলাম সে কেবল সেই
বড় জুয়ারীর খেলা।
গৃহ পরিজন
বলিল বৃদ্ধ
২৮
ব্যতিক্রম।
খৃষ্টমাসের বন্ধ, ভরা ম্যালেরিয়ায় দেশ
এক ভাড়াতে যাওয়া আসা সুবিধাও বেশ।
মা বলেছেন গ্রামে যেতে, নাইক তাঁহার জ্ঞান
বৈদ্যবিহীন গ্রামে যাওয়া হস্তে করে প্রাণ।
মাঝে মাঝে কাছে খোকা নভেম্বরটা ভাের
সন্ধ্যাকালে চক্ষু জ্বলে শরীর খারাপ ওর।
এ সময়ে দেশে মােদের হবেই না ত যাওয়া
স্বাস্থ্যকর ও উপকারী শুনছি কাশীর হাওয়া।
N
নূপুর
অধিকন্তু দর্শন পাব অন্নপূর্ণা মার,
তীর্থ করা উচিত, ক্রমে বয়স হল আর।
সুখে পত্নী পুত্র লয়ে এলেন কাশীধাম,
মায়ের দেশে মাকে মনে পড়ছে অবিরাম।
বলেন খরচ অধিক নহে, মস্ত মােদের বাসা
উচিত ছিল বৃদ্ধ মাকে সঙ্গে লয়ে আসা।
পত্নী বলেন বুদ্ধি তােমার দেখছি বটে ভারী
একলা আমি ঝঞ্ঝাট তাঁর সামলাতে কি পারি ?
দুই জনেতে ‘অশ্বমেধের ঘাটেই করে স্নান
বিশ্বেশ্বর ও অন্নপূর্ণা দর্শনেতে যান।
অঞ্জলি দেন প্রণাম করেন, দেখেন চারি ধার,
মনটা বাবুর কেমন কেমন, প্রাণটা যেন ভার।
আনন্দেতে ঠাকুর দেখি, এলেন যবে ফিরে
স্বামীর তখন বদন মলিন, ভাসছে আখি নীরে।
বলেন আমি দেখতে পেলাম মন্দিরেতে হায়,
শুষ্ক ভাত ও খড়ের রাশি দেবীর বেদিকায়।
দেবতা কোথায় দেবতা কোথায় দেখাও আমায় রে
বলতে আমি, কাণে কাণে বললে যেন কে?
মাতারে তুই দিসনে খেতে, গােধন উপবাসী
পাপিষ্ঠ তুই কোন সাহসে এলি আমার কাশী।
* নূপুর ॥
শুনে অবাক পত্নী রও নয়ন ছলছল,
চিন্তিত ও কাতর স্মরি স্বামীর অমঙ্গল।
রাত প্রভাতে ভােরে উঠেই ভক্তি ভরা বুকে,
রওনা হলেন মায়ের লাগি গ্রামের অভিমুখে।
সন্ন্যাসিনী ।
প্রাণেশ বালার দেশান্তরী সয় সে ব্যথা সঙ্গোপনে
নয় ক মৃত, সন্ন্যাসী সে প্রেমামৃতের অন্বেষণে।
নাইক খবর দ্বাদশ বরষ, করছে বরষ বঞ্চনা কি,
দেবতা পতিব্রতার কথা একেবারেই শুনছে নাকি?
( ২ )
উঠলাে কথা আর পাবে না পরতে সিঁদূর শঙ্খ শাড়ী
এয়ােতের এই চিহ্নটুকু প্রাণের অধিক অঙ্গনারি।
ভাঙ্গবে ‘লােহা’ পড়লাে শােণ টিটিকী ওই সুমুখ ছাদে
বল্লে বালা আমার স্বামী অমর দেবের আশীর্বাদে।
৩২
* নুপুর
( ৩ )
ভৈরবীদের বেশটী পরে বেরয় না আর ঘরটী থেকে,
মা যে হেরি মম্মাহত শীর্ণী কনক বল্লরীকে ;
পূজে পতির কাষ্ঠ পাদুক, রাখে সিঁথির সিঁদুর লেপি,
প্রথম প্রেমের পত্র পড়ি হাসে আপন মনেই খেপি।
( ৪
৪ )
পঞ্চ বরষ কাটলাে আরও, আর পেলে না প্রেমাস্পদে,
কাজ কি তাহার বিফল জীবন ভর্তৃ বিহীন এ সম্পদে !
বদ্রী বিশাল, কেদার কঠিন, মূৰ্ত্তি তৃষার অমরনাথে
দেখলে বালা রুক্ষকেশে রুক্ষবেশে মায়ের সাথে।
( ৫ )
গঙ্গোত্রীতে স্নান করিতে সন্ন্যাসী এক জিজ্ঞাসিল
অশাস্ত্রীয় ব্যবস্থা এ, কোন গুরুতে তােমায় দিল ?
হস্তে তােমার শঙ্খ লােহা, সঙ্গে তােমার নেইক স্বামী,
বৃথায় কঠিন তীর্থে এলে হয়ে বিপুল পুণ্যকামী।
( ৬ )
বলেন বালা হে সন্ন্যাসী সত্য কথা কবই কব
যােগের বলে তােমরা জানি করতে পার অসম্ভবও
আমার স্বামী সন্ন্যাসী যে, তাই সেজেছি সন্ন্যাসিনী,
ধ্যানের দেশে আপনি এসে পূর্ণ ফলই দেবেন তিনি।
* নুপুর *
( ৭ )
সন্ন্যাসীর পুণ্য করে করলে পরশ বধূর পাণি,
যুগান্তেরি সাত পাকেরি সেই সে শুভদৃষ্টিখানি।
চিনতে পেরে শিউরে বালা পড়লে তাহার চরণতলে
মিশললা মিলন নেত্র সলিল গঙ্গোওরী তীর্থ জলে।
৩৪
জি জুতা।
বুকের
গাঁয়ের মাঝে মহেশ কোটাল সত্য ছিল বড়ই পাজি,
জমিদারের বেগার দিতে একেবারেই নয় সে রাজি।
অতি দরাজ পাটা, লােহার মত শরীরখানা,
চোখ দুটাতে আগুণ ছােটে, ক্ৰ দুখানা বেজায় টানা।
যমের মতন পাইক দুজন রাজার হুকুম জানায় তারে,
মহেশ ভােরেই হাজির হল প্রণাম করে প্রভুর দ্বারে।
বলেন বাবু-কোটাল বেটার বাড় হয়েছে দেখছি বড়
আমায় তুমি বেগার দিতে নিত্য নূতন ওজর কর।
বেনােও তুমি গা হতে মাের বেটা সবার অধিক পাজি
জমিদারের বেগার দিতে হাস্যমুখে ইস্নে রাজি।
• নুপুর ॥
মহেশ বলে হুজুর তোমার এত চাকর বাকর তবু
হাখানা মাের কামাই করে বেগার কেন চাইছ প্রভু।
কঁন্দতে কেহ নাইক আমার, গাঁটা না হয় ছেড়েই যাব,
অনেক দেশে, অনেক গাঁয়ে, এমন মনিব অনেক পাব।
বচন শুনে অধিক রেগে জুতাটা পা হতেই খুলে,
মেলেন বাবু লাগলে গিয়ে বাবড়ি বাঁধা তাহার চুলে।
মহেশ কেবল বল্লে কাদি-মনিব বলে রক্ষা পেলে,
এর প্রতিকার করব আমি যাবে না এ দুঃখ মলে।
বাবড়ি চুলে জড়িয়ে যাওয়া চটি জুতায় মাথায় করে
মহেশ কোটাল পালিয়ে গেল সেই দিনে সে গ্রামটা ছেড়ে।
কোথায় গেছে বিশটা বরষ বাবু যাবেন বৃন্দাবনে,
পত্নী এবং নাতনী ভঁহার শুনবে নাক যাবেই সনে।
রেল ত তখন হয়নি দেশে, হবেই যেতে নৌকা যােগে,
ভরসা নাইত ফিরবে কি না দস্যু না হয় মারবে রােগে।
কাটোয়াতে শাখাইঘাটে প্রণাম করে গঙ্গামায়ি
হর্ষে সকল যাত্রী লয়ে, চললাে মাঝি নৌকা বাহি।
দশ বার দিন কাটলাে সুখে ঝড়টা বড় উঠলল আজি
ফেলছে নােঙর পুতছে খুটা সামাল সামাল ডাকছে মাঝি
বিপদ আসে বিপদ নিয়ে বােম্বটে ছিপ আসছে ছুটে
যাত্রীদেরে মারবে প্রাণে লবে সকল অর্থ লুটে।
* নূপুর ।
মাঝিরা সব ভাগের ভাগী পলায় ছুটে নৌকা ছেড়ে
বােম্বেটেরা নৌকা লুটে কতক মেরে কতক কেড়ে।
জমিদারের হস্ত বাঁধি, টাকার ছােট বাক্স সনে,
তুললে লয়ে ছিপের পরে হঠাৎ কি হায় ভাবলে মনে।
দদিগের কৰ্ত্তা যিনি কণ্ঠে তাহার অক্ষ মালা,
পরণে তার পট্টবসন, দুই বাহুতে স্বর্ণবালা।
তারার মতন চক্ষু দুটা, অধরে তার মিষ্ট হাসি,
সম্মুখেতে দস্যু সেনা, পার্শ্বে প্রচুর অর্থরাশি।
ইঙ্গিতে তার জমিদারের মুক্ত হল বাঁধন গুলা,
আসন ত্যজি দস্যপতি নিলেন আসি পায়ের ধূলা।
জমিদার ত ভাবছে মনে কখন পড়ে গলায় ফাঁসি
ক্ষণে ক্ষণে দত্যুদলের উঠছে বিকট অট্টহাসি।
হুকুম দিলেন দস্যপতি নৌকা উহার দাওগে ছেড়ে,
এক্ষণি সব দাওগে ফিরে, আনলে যে সব দ্রব্য কেড়ে।
ব্রাহ্মণ উনি গুরুর গুরু সম্মানেতে না হয় ক্ৰটী
আশীষ করুণ হে দ্বিজবর প্রণাম আমি জানাই কোটী।
ভাবেন বাবু পড়নু আজি কোন মায়াবীর ইন্দ্রজালে
দস্যু এমন শিষ্টমতি মিলতে শুনি সত্যকালে।
বলেন কাদি হে মহারাজ নও ত তুমি দস্যপতি
এ মহত্ত্ব সেই দেখাবে সদয় যাঁরে বিশ্বপতি।
৩৭
নূপুর *
কোন জনমের বন্ধু ছিলে আপন ছিলে আপন চেয়ে
বলতে কথা আটকে গেল, অশ্রু এলাে চক্ষু ছেয়ে।
কৃতাঞ্জলি দস্যপতি প্রণমি তাঁর চরণতলে
মাগেন ক্ষমা কাতরভাবে, দেখেই অবাক দস্যুদলে।
ক্ষমা করুন হুজুর মােরে কেৰল চরণ পরশ পেতে
পথের মাঝে এমনি করে হ’ল খানিক কষ্ট দিতে।
খুলে মাথার পাগড়ীখানি ছিন্ন চটি বাহির করে
বল্লে দেখুন আশীষ তব রেখেছি এই মাথায় ধরে।
প্রভুর চরণ পরশপূত এ জুতা মাের মাথার মণি,
প্রজা আমি জমিদারের যা পেয়েছি তাতেই ধনী।
জমিদার ত চিনতে পেরে মূচ্ছ। হয়ে পড়েন লুটি
দেখেন জাগি নৌকা নিজ, নেয়নি কোনই দ্রব্য লুটি।
শুদ্ধ বায়ু, ফরসা আকাশ, নাচছে তরী জলের তালে
ছিপের রেখা যাচ্ছে দেখা চক্ৰবালের অন্তরালে।
ত
অগ্রদানীর ছেলে।
চূণ বালি ছাড়া
কঙ্কাল 'সার
জঞ্জালে ভরা বাড়ী,
ঘন জঙ্গলে
ঘেরা চারিধার
দেখিলে চিনিতে নারি।
সতত তাহার
রুদ্ধ দুয়ার
কেহ নাই মনে হয়,
দিনে ধূম আর রাতে আলাে ক্ষীণ
বসতির পরিচয়।
শিশু ছেলে লয়ে হােতা থাকে এক
কৃপণ অগ্রদানী,
পত্নী তাহার
দুবছর আগে
ধরা ত্যজিয়াছে জানি।
৩৯
নুপুর ॥
ছেলেটী
এমনি পাষাণ
নিজ কাজে যায় চলে,
বিজন পুরীতে একাকী ফেলিয়া
দশ বছরের ছেলে।
ফুটফুটে ছােট
তাহার
মুখেতে মমতা মাখা,
যেন লৌহের
স্তম্ভের গায়ে
কনক কুসুম আঁকা।
তনয় এমনি
পিতার বাধ্য
যাবে না বাহিরে আর,
রহে জীবন্ত
মণি মরকত
রুধি ভাণ্ডার দ্বার।
পিতা চলে গেলে বালক একাকী
দেখে আনমনে বসি,
গাছে থলে থলাে
আমগুলি যেন
পড়িবারে 'চায় খসি।
ফলিয়া রয়েছে
শ্যাম নারিকেল কঁন্ধি,
স্নেহের সলিল
অপরের লাগি
বুকেতে রেখেছে বাঁধি।
৪ ০
* নূপুর
অশথের গাছে
নব কিশলয়
অরুণাভ কচি পাতা,
কবে ছায়া দান করিতে পারিবে
তারি যেন ব্যাকুলতা।
দেখিয়া দেখিয়া ভরে উঠে আহা
ছােট বালকের বুক,
ভাবে মনে মনে
অজ্ঞাতে যেন
র অতুল সুখ।
সন্ধ্যায় পিতা
ডাকে নাম ধরি
যেমন দুয়ারে আসি,
ঝটিতি বালক
খুলে দেয় দ্বার
মুখেতে ধরেন হাসি।
রাখি তনয়েরে
পিতা চলে যায় প্রাতে,
বৎসর যায়
সুখস্মৃতি রাখি
পুরাণে পাঁজির পাতে।
বালক বিকালে
চেয়ে চেয়ে দেখে
উদার আকাশখান,
দেখে সে কেমনে
করে হিরণ্য দান।
পরদিন গৃহে
মুম্ষু ররি
৪১
নুপুর সন্ধ্যায় দেখে ধনী শশধর রজতে ডুবায় ধরা, দেখে নীরদের দান সাগরেতে কতই বিনয় ভরা। দেখিয়া দেখিয়া নবীন ব্যথায় ভরে উঠে তার বুক, ভাবে মনে মনে লওয়া চেয়ে হায় দেওয়ায় অনেক সুখ। বহুদিন পরে কৃপণ জনক মরণ আগত জানি, বলিতে লাগিল তনয়ে ডাকিয়া শিয়রের কাছে আনি। সত্যই বাছা দানে বহু সুখ তব করে আজি তাই, ভাণ্ডার ভরা আজ দেখ দিয়ে যাই। এত কৃপণতা এত যে কষ্ট সকলি সফল লাগে, "তব চাদ মুখ হবে না যে ম্লান কভু দারি দাগে। অতুল অর্থ ৪২ * নুপুর ॥ পিতার বিয়ােগে অমিত অর্থ আসিল যুবার করে, নিরজনে তারে প্রকৃতি গড়েছে ঘন অনুরাগ ভরে। সে বছর হল অন্ন অভাব এ সারা বাঙ্গালা জুড়ি, আহার অভাবে পথে পথে মরে ছেলে মেয়ে বুড়া বুড়ী। অনশন ক্ষীণ তনয়ের মুখ চাহিয়া মরিল মাতা, বড় বড় হায় জমিদার গৃহে দুবেলা পড়ে না পাতা। তখন দয়ালু স্বভাব দুলাল অগ্রদানীর ছেলে, দুহাতে তাহার ভাণ্ডার দিল গরিবের তরে ঢেলে। খুলি দিল শত অমসত্র প্রচুর পান্থশালা, -আপনি খাইত দীনেদের সাথে এক সনে পাতি থালা। ৪৩ * নুপুর * চতুর যাহারা উপাধি ভূষণে বিনয়ে যুবক কষ্টার্জিত অর্থ পিতার দীনহীনে দিল বঁটি, বলিল এ বেটা একেবারে হল মাটী। শুনি সব কথা নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়, চাহিলেন ডাকি ভূষিত করিতে তায়। নিষেধ করিল জুড়িয়া যুগল পাণি, পরের দানেতে আমরা পালিত পতিত অগ্রদানী। আমরা নিলাম দুই কর পাতি সমাজের দান আগে, সার্থক প্রাণ আজ যদি তাহা গরিবের কাজে লাগে। আসন হইতে নামিয়া তখন কোলাকুলি করি রাজা, বলেন জীবন সার্থক মম সার্থক তুমি প্রজা। ৪৪
* নূপুর ॥
চৌদ্দ পুরুষ
আগে দান লয়ে
পতিত যদিই হলে,
ব্রাহ্মণ চেয়ে
ব্রাহ্মণ তুমি
আজি এ দানের বলে।
আজ হতে তুমি
দানীর অগ্র
নহ হে অগ্রদানী,
কপিলের শাপ
ঘুচাইলে তুমি
প্রেমের গঙ্গা আনি।
৪৫
অনাে ছেলে।
-
যাট বছরের বৃদ্ধ জনেক মালদা জেলা হতে
ছিল দিনেক এই গাঁয়েতে আসি,
লােকটা বােধ হয় মাথা খারাপ, গ্রামের পথে পথে
ফিতে মেখে কেবল ধূলারাশি।
গ্রামটী ঘূরে বিকেল বেলা জমিদারের বাড়ী
বললে আমি ভিক্ষা কিছু চাই,
অন্য কারাে হস্তে আমি ভিক্ষা নিতে নারি
দেন যদি নিই সৌদামিনী মাই।
সৌদামিনী জমিদারের কন্যা আদরিণী
সােহাগ করে সবাই ডাকে ‘সদু,
রূপে গুণে সবার সেরা গ্রামের গরবিণী
হয়েছে সে রাজার বাড়ীর বন্ধু।
৪৬
* নূপুর ॥
}
অনেক ওজর আপত্তিতে চাকর বাকর তারে
দুয়ার হতে ফিরিয়ে দিতে চায়,
শুনে ‘সদু’ চাউল লয়ে আপনি আসি’ দ্বারে
নিজের কাছে আনলে ডেকে যায়।
দেখে বুড়া ব্যাকুল হয়ে বসলাে কাছে গিয়ে
মিনতি হায় করলে কত শত,
রুক্ষ সাদা কেশগুলি তার চরণ তলে দিয়ে
উঠলে কেঁদে ছােট ছেলের মত।
বালিকারে বললে মাগাে অনেক খুজে পেতে
সাধুর কৃপায় পেলাম তােমার দেখা,
তােমার লাগি বিশটী বরষ কাঁদছি দিনে রেতে
পালিয়ে এলে আমায় ফেলে একা।
ভুললে তুমি ঘরটী তােমার, হাতের বােপা গাছে
সেই তুলসীতল,
ভাবছি আমি মাগাে আমার কেমন করে আছে
দেখছে নাকি কাতর আঁখিজল।
এই দেখ মা চিনবে না কি তােমার যপের মালা
বক্ষে করি ফিরছি দেশে দেশ,
হেতায় ধনীর গৃহে আসি ভুললে সকল জ্বালা
নেই কি মাগাে, নেই কি মায়া লেশ।
ঘরের পূবে
৪৭
* নুপুর ॥
গিন্নি ডাকি বলেন তবে “আয়ললা সদু আয়”
কাজ কি বাপু ও সব কথা বলে
ছলছলিয়ে চেয়ে বুড়া ছেলের মত হায়
ভিক্ না নিয়ে কোথায় গেল চলে।
‘সদু’ সেদিন অসুখ বলে আর খেলেনা ভাত
অচিন সূতের বাজলাে ব্যথা বুঝি,
চোখের জলে ভিজলাে বালিস কাদলাে সারা রাত
প্রাতে
বুড়ার
খোঁজ পেলেনা খুজি।
কদিন পরেই ‘সদুর আহা হল বিষম জ্বর
চায়না সে যে চায়না আখি মেলে,
বিকারেতে বলছে—আমি যাবই যাব ঘর
আমার লাগি কঁদছে আমার ছেলে।”
৪৮
তুন ওঝা।
বললে ওঝা এ ভুত আমি
পারবনা ক ছাড়াতে
সাধ্যও নাই ইচ্ছাও নাই তাড়াতে।
সে যে দিবস রাত্রি জাগি
ভাবতো কেবল মায়ের লাগি,
পারলেনা ক মরণ কালে
সেই ভাবনা এড়াতে।
অতৃপ্তি তার থাকতে দূরে
বেড়াচ্ছে এই ঘরেই ঘুরে
দেখছি তারে মলিন মুখে
মায়ের কাছে দাড়াতে।
পারব না ভুত ছাড়াতে।
8న
নুপুর
মা যে আছে একলা ঘরে
কে বা তাহার যতন করে,
মুক্ত দেহ পড়লাে আবার
মায়ার মােহ কারাতে
তােমরা যদি আপন জ্ঞানে
চাও দুখিনী মায়ের পানে,
সেই দিনে সে শান্তি পাবে
আসবে না আর ধরাতে।
পারব না ভুত ছাড়াতে।
নইলে যেদিন বাঁচবে বুড়ী
লক্ষীছাড়া আসবে ঘুরি’,
মায়ের লাগি হয় ত তারে
মােক্ষ হবে হারাতে,
মানবে না সে মন্ত্র কোণে
গঙ্গা, গয়া, বলছি শােন
ঘটবে নূতন নূতন বিপদ
এই তােমাদের পাড়াতে
পারব না গাে, পারব না ভুত ছাড়াতে।
;
গণনগর ।
ও গণক, চান্ দিব, দেখে যাও আমাদের হাত,
ডাকিল গােয়ালা বধু, দ্বারে দাঁড়াইয়া, স্বামী সাথ।
চেননা ওদিগে তুমি ? ও পাড়ায় উহাদের ঘর,
ওই দেখ, দেখা যায়, তরুলতা চালের উপর।
উহাদেরি আছে সেই পােষমান কোকিলটী খাসা,
ছােট খাঁচা, খােলা দোর, তবু রয়, একি ভালবাসা !
ওদেরি কুকুর ভরাে’ লােক দেখে কম চায়,
বিড়াল কুকুর কারও সাধ্য নাই ও বাড়ীতে যায় ।
ওই কোকিলারে বন্ধু খেতে দেয় নিজে দুধ ভাত,
কুকুর পাহারা দেয়, কোকিলটা ডাকে দিনরাত।
চল যাই দুইজনে একবার আসি গিয়া শুনে,
গণক কি বলে যায়, উহাদের হাত দেখে গুণে।
* নূপুর *
গণক বধূর হাত এক দৃষ্টে নিরখি আবার
ডাকিল বারেক কাছে কৰ্ম্মরত স্বামীরে তাহার ।
হস্তখানি লয়ে তার, পাখপানে পড়িল নয়ন,
কুকুর ধুকিছে কাছে, খাঁচাতলে করিয়া শয়ন।
গণক বিষন্ন মুখে, কতক্ষণ পর বলে তবে,
মা লক্ষী আজিকে থাক, বলিতে অনেক দের হবে।
বিপদশঙ্কিতা বধূ ম্লানমুখে আগ্রহে সুধান,
হাগা বাপু বল ! বল। হবে না ত ওর অকল্যাণ।
থাকুক হাতের লােহা, হে ঠাকুর কর বর দান,
অসম্মান করিব না, এনে দিই চাল গুয়া পান।
গণক হাসিয়া বলে, নাহি মা, নাহি মা তাের ভয়,
সিন্দুর উজ্জ্বল তাের, শাঁখা তাের হইবে অক্ষয়।
ছাড়িবে না ! তবে শােন, গত জন্ম কথা বলি আজ
তুমি ছিলে রাজরাণী, এই গােপ ছিল মহারাজ।
রূপ বৈভবের গর্বে বুক ভরি ছিল অহঙ্কার,
বােঝনি দীনের ব্যথা, ব্যথিতের বেদনা অপার।
প্রিয় সে গায়িকা তব পিঞ্জরের মাঝে হের ওই
বিমূঢ় প্রণয়ী:তার ও কুকুর, সে বিলাস কই ?
* নুপুর
আমি সে ভিখারী কুজ দাড়ানু পাতিয়া দুটী কর,
হেলায় তাড়ায়ে দিল, তােমাদের দারুণ কিঙ্কর।
গায়িকা ঘৃণার ভরে, হাসিয়া মারিল ফুল ছুড়ি
রােষে অভিমানে আমি অভিশাপ দিমু কর জুড়ি।
কেমনে যে পড়ে গেল ঝুলি হতে ভিক্ষালব্ধ চাল,
কঁদিলাম ধিক্কারিয়া, ধিক্ বিধি, ধিক এ কপাল।
তারপর এই জন্ম, সহিবারে দৈন্তের পীড়ন,
দরিদ্রের
গৃহে
আসি পল্লীগ্রামে জন্মেছ দুজন।
ভুলিতে পারেনি মায়া, গায়িকা এসেছে হয়ে পিক,
কপট প্রণয়ী তার এই সেই সারমেয় ঠিক।
আমি দিয়া অভিশাপ, হারালেম সব পুণ্যফল,
গণক হইয়া ফিরি, ভিক্ষাবৃত্তি করিয়া সম্বল।
হারা চা নিতে হায় কৰ্ম্মফলে ঘুরিতেছি দেশ,
আজ হেতা দেখা হুল, একত্র সবার সমাবেশ।
দাও মা চাউল দাও, হও মুক্ত, কর মা উদ্ধার,
বার বার ধরা গায় আসিতে হয় না যেন আর।
কথা শুনি, চাল দিয়া, ফেলে বালা নয়নের নাের,
আমরা ভাবিনু হাসি, এ গণক পাকা জুয়াচোর।
শ্রীবর ।
সন্ন্যাসী সাজি’ শ্রীধর যেতেছে
বদ্রীনাথের পথে,
আমাদের সেই সঙ্গী শ্রীধর
চিনিবে না কোন মতে।
পাঠশালে তার ছিল হাত টান
দৃষ্টিও ছিল খর,
‘নষ্টচন্দ্রে’ কত ফল মূল
গােপনে করিত জড়।
একদা তাহার মরেছিল যবে
পােষমানা শুক পাখী
দুদিন ঐধর কেঁদে ফিয়েছিল
বনে বনে তারে ডাকি।
নূপুর
পালিত যতনে বিড়াল কুকুর
পশু পাখী নানা জাতি,
জানিনে ত মােরা কবে হতে হ’ল
সাধু ফকিরের সাথী।
ছাড়ি ‘ঘশীমঠ চলেছে শ্ৰধর
প্রাণভরা অনুরাগে,
পরশ পাথরে গঠিত ঠাকুর
বারবার মনে জাগে।
আসিয়া শ্ৰীধামে মন্দিরে যবে
প্রবেশে হৃষ্টমতি
দৃষ্টি পড়িল দেবতা গলার
মুক্তামালার প্রতি।
স্তিমিত আলােকে হেরিয়া সে হার
কুভাব জাগিল মনে,
শমুখ দেখিয়া কি এক বেদনা
বাজিল মরম কোণে।
দুদিনের পর বিদায়ের দিনে
হস্তে ধরিয়া থালা
‘রাওল’ ঠাকুর আসিলেন লয়ে
সেই সে মুক্তামাল।
নুপুর
বলিলেন তিনি জড়ায়ে আদরে
শ্রীধরের দুটী পাণি,
‘বদরীনাথের’ পরম ভক্ত
আপনি তাহা কি জানি
দেবের আদেশে দেবের এ মালা
উপহার দিমু করে,
শুনিয়া শ্ৰীধর কঁপিয়া উঠিল
বিস্ময়ে লাজে ডরে।
কম্পিত করে মুকুতার মালা
গ্রহণ করিল যবে,
পদধূলি নিতে করে কাড়াকাড়ি,
সাধু সন্ন্যাসী সবে।
ছলছল চোখে চলিছে শ্ৰীধর
প্রতি পদে পদ টুটে,
যতনে তাহারে ধরে লয়ে যায়
গাঢ়োয়ালী এক মুটে।
নিজের দীনতা ভাবিয়া শ্ৰীধর
পারে না রােধিতে বারি,
লাগিতেছে আজ মুক্তার মালা
পাষাণের চেয়ে ভারী।
* নূপুর
এমনি হরির অহেতু করুণা
প্রেমের এমনি যাদু,
কয়লা গলিয়া হীরা হয়ে যায়
তস্করও হয় সাধু।
শ্রীধর এখন মুছি আঁখিনীর
বলিল রে মন তবে,
এখন হইতে যার মালা তার
সন্ধান নিতে হবে।
সংসার ছাড়ি এ মণির মালা
কি করিবি তুই নিয়ে,
দেখা হলে পর তাহারে চাহিবি,
তার ধন ফিরে দিয়ে।
বরষের পর, শ্রীধর চলেছে
বন পথ দিয়া ধীরে,
গঙ্গোত্রীর বারি চড়াইতে
রামেশ্বরের শিরে।
দেখিল পথেতে সঙ্গী জনেক
পতিত নকুলে তুলি,
ক্ষত দেহে তার বুলাইছে হাত
যতনে ঝরিছে ধুলি,
নূপুর
তাপিত ওষ্ঠ ভিজায়ে দিতেছে
কমণ্ডলুর নীরে,
রুগ্ন তনয়ে কঁাধে লয়ে যেন
জনক চলেছে ধীরে।
কিছু দূরে গিয়া দেখে পড়ে আছে
ডানাভাঙ্গা এক পাখী,
সন্ন্যাসী তারে কোলে তুলে নিল
নকুলে ঝোলাতে রাখি,
মুখে দেয় জল, বুকে চেপে ধরে
মুখ পানে চেয়ে কঁাদে,
ভাঙ্গাপাখা তার উত্তরী ছিড়ি
সরু সূতা দিয়া বাঁধে।
শ্ৰীধরেরও আহা ছল ছল আঁখি
চাহি পাখিটীর পানে,
জানিনা সে পােয্য শুকের কাহিনী
জেগেছিল কিনা প্রাণে!
পথের পাশেই সাধুর আবাস
ধরে ডাকিল সেবা,
বাজিতে লাগিল ঐধরের প্রাণে
সুদূরের কোন ব্যথা।
দেখিল সেখানে পদ ভাঙ্গা গাভী
যগু মহিষ জরা,
‘পিজরাপােল’ কি আশ্ৰম উহা
যায় না কিছুতে ধরা।
সজল নয়নে শ্রীধর বলিল
ওহে সন্ন্যাসী ভায়া,
সংসার দিয়ে পশুশালা নিলে
এমনি দারুণ মায়া ?
সন্ন্যাসী বলে কি করি ঠাকুর
বাঁধন নাহি যে টুটে,
নীরব বেদনা আমার পরাণে
সাধনা হইয়া ফুটে।
জীবের মাঝারে দেবতা পেয়েছি
বলিতে পারিনে ভয়ে,
আমার চোখে যে এক হয়ে গেছে
শিবালয় সেবালয়ে।
শুনিয়া শ্ৰীধর বলিল তাহারে
হাসি করুণার হাসি,
কাহার লাগিয়া হেত পড়ে রবে
কাহার লাগিয়া আসি।
r
৫৯
* নুপুর *
s
সন্ন্যাসী বলে মায়াজালে আমি
জড়ায়ে পড়েছি অতি,
এক কাজ তুমি করে দেখি সখা
দয়া করে মাের প্রতি।
‘হৃষীকেশ যে’তে কুড়ায়ে পেয়েছি
একটী মুকুতা আমি,
জানিনে কাহার, মরি খুঁজে খুঁজে
' জানে অন্তরযামী।
শুনেছি কাহার মালা হতে তাহা
অজ্ঞাতে গেছে খসি,
রামেশ্বরেতে যাবে সেই সাধু
তারি লাগি আছি বসি।
ধর বলি সেই মুকুতাটা দিল
আনি শ্রীধরের হাতে,
বলিল মালিকে দিও তুমি যদি
দেখা হয় তার সাথে ।
ঐধর আপন মুকুতার মালা
যতনে বাহির করি,
দেখিল তাহার একটী মুকুতা
কেমনে গিয়াছে পড়ি
* নূপুর *
1
পুলকে সাধুর হাত দুটী ধরি
কঁদিয়া বলিল ভাই,
মালিকের তুমি করিয়াছ খোজ
তব অসাধ্য নাই।
এ মুকুতা হার ও পরের জিনিষ,
নাম তার আছে লেখা,
ধর সখা ধর, ফিরে দিও তারে
যদি পাও তাঁর দেখা।
রাখি মালাগাছি হরষে শ্ৰীধর
চলে গেল নিজ কাজে,
সন্ধানী হাতে সঁপিয়াছে মালা
তৃপ্তি যে হিয়া মাঝে।
জানিনা ক আমি কি করিল সাধু
লয়ে মুকুতার মালা,
হয়েছে সেখানে গ্রামজুড়ি এক
পশু চিকিৎসা শালা।
নুপুর
মুক প্রাণীদের যতন করিতে
রােগে ঔষধ দিতে,
ব্রহ্মচারীরা মগ্ন সেথায়
সদা আনন্দ চিতে।
দেব বলে বলী আছে সাধু দুটী
শুনেছি তাদের কথা
পীড়িত পশুরে কোল দেয় যবে
জুড়াইয়া যায় ব্যথা,
সজে দুইজনে বসে যােগাসনে
স্মরিয়া জীবের জ্বালা,
মালিকের পদে ফিরে দেয় আঁখি
দ্রব মুকুতার মালা।
৬২
নহে সে রূপসী মুখ চোক খাসা রঙটী তাহার কালো
কুৎসিত বলি বেহারী তাহার প্রিয়ারে বাসেনা ভাল।
লয়না তাহার যতন আদর, দেখেনা তাহারে চোখে
নিকটে আসিলে নিজে চলে যায়, তাড়াইয়া দেয় বকে
নহে বেহারীর স্বভাব ত ভাল বিষম স্বেচ্ছাচারী
বালিকা পত্নী তাহার উপরি হল আক্রোশ ভারী।
মুখ সে তার খেয়াল উঠিল যতই হউক ক্ষতি,
কুরূপা সতীর হাত হতে ঠিক লভিবে অব্যাহতি।
গােপনে গেল সে অনেক বৃদ্ধা হাড়ির ঝিএর কাছে
শুনেছে তাহার তন্ত্র মন্ত্র টাটকা টোটকা আছে।
জানে সে মারণ উচাটন কত বশীকরণের টিপ
শুনেছে কেবল মৃদু ফুৎকারে জ্বালাইতে পারে দীপ।
নুপুর
পাঁচটী মূদ্রা ফুরান হইল গোপনে তাহার সাথে,
‘মারণ করিয়া মারিবে বধূরে অমাবস্যার রাতে।
দুই দিন ধরি হইবে সাধন গােপনে অগ্নি জ্বালি
বেহারী কেবল নিকটে তাহার বসিয়া রহিবে খালি।
গভীর নিশীথে জুলিল বহ্নি বিজন নদীর তীরে
হাড়িনী তাহার রুক্ষ জটায় তুলিয়া বাঁধিল শিরে ।
নিবিড় সিদূর কপালে লেপিয়া, বিকট মন্ত্র হাঁকি,
সাক্ষী করিল আকাশ পাতাল চন্দ্র সূৰ্যে ডাকি।
নিরীহ অবলা বালিকা বধিব শুন কামাখ্যা মায়ি,
আমি নির্দোষী, রহ মা সাক্ষী, সােয়ামী তাহার দায়ী।
সিঁদূরে রমণী মূর্তি আঁকিয়া ফিরিয়া আসিল ঘরে
বেহারী সেদিন শিহরি’ উঠিল স্বপনে দারুণ ভরে।
পরদিন রাতে আবার বেহারী আসিল নদীর কূলে
আজিকে তাহার কি যেন আঘাত লাগিছে মরমমূলে,
গঙ্গামাটীর মূর্তি গড়িয়া, হাড়িনী বলি আমি,
বধিব ইহারে আমি নির্দোষ ক্ষম অন্তরযামী।
বেহারীর পানে চাহিয়া বলিল এই বিশ্বের কাটা,
পুতুলের গায়ে ফুটালে তােমার ঘুচিবে সকল লেটা
৬৪
নূপুর
বেহারী ব্যাকুল বলে কাজ নাই, টাকা লও দাও ছাড়ি
দুখিনী আমার থাকুক ঘরেতে কাজ কি তাহারে মারি।
হাড়ী ঝি তখন রুষিয়া বলিল উর্দ্ধে তুলিয়া আঁখি,
চামুণ্ডারে কি ফিরাইতে পারি এতদূরে আনি ডাকি ?
ফুটাইব আমি, ফুটাইব কঁাটা, এই পুতুলের গলে,
তখনি বেহারী কঁদিয়া পড়িল তাহার চরণ তলে।
রক্ষা কর মা সে অভাগী মাের পরাণের চেয়ে প্রিয়,
আমার সাথেতে সুখে সংসার করিতে তাহারে দিও।
হাড়ী ঝি বলিল (টাকা কটী তুলি কৌটার মাঝে থুয়ে,
তবে সে শুনিব শপথ করহ তিনবার এই ভুয়ে।
ভালবাসি তারে ভালবাসি আমি, ভালবাসি তারে বড়
এবারের মত ফের চামুণ্ডা একবার দয়া কর ।
কাঁদিল বেহারী হাড়িনী তখন আপন বক্ষ ছিড়ে
সদ্য শশাণিত তিন ফোঁটা দিল অনলকুণ্ডে ধীরে।
চামুণ্ডা যান হইয়া শান্ত, বেহারী ফিরিল ঘরে,
সুখে সংসার করে দুইজন গলাগলি বধূবরে।
বন্ধুরে দেখিলে এখনাে হাড়ী ঝি বলে আমি দোষী মূলে,
বশীকরণের মন্ত্র বলেছি মারণের কথা ভুলে।
৬৫
স্বপ্রের মূল্য।
১
ভাবছি হােতা করবাে দালান বেলগাছটী কাটি,
ঠাকুর দালান গেছে উহার শিকড় লেগে ফাটি।
ইন্দারাটা অচল হল, ঝরা পাতায় তার
আটাভরা ছােট বেলের কিসের উপকার।
ডাল পড়িয়া ভেঙ্গে গেছে ডালিয়াটার লতা,
এবার আমি কাটবদ ও গাছ শুনব না ক কথা।
মাতা আসি বলেন বাবা নাইকি তােমার জানা,
পূর্ব পুরুষ হতে ও গাছ কাটতে আছে মানা।
মাতামহের মাতামহী স্বপ্নে আদেশ পান,
ওই গাছেতে হয়েছে যে শিবের অধিষ্ঠান।
ডালে ডালে আছে উহার শিবের ত্রিশূল গাড়া
আভিশাপে পড়বে দেবের কাটবে ও গাছ যারা।
হলই না ক গাছটী কাটা মায়ের ভয়ে আর
রইল অটুট শিবের বসত কথায় শুধু ভার।
* নূপুর ॥
বিশ সালেতে হ’ল যখন সর্বনেশে বান
ধুয়ে মুছে নিয়ে গেল ঘর বাড়ী ও ধান।
ঝড়ে ভেঙ্গে উড়ে দিলে, করলে সবই চুর
একটা গাছে নাইক পাতা ফলের কথা দূর।
বেলে ভরা ছিল তখন এই গাছটী শুধু,
কাঁচা ফল ও লাগতো যেন মধুর চেয়ে মধু।
সে দুর্দিনে সারা গ্রামের গরীব দুখী দল, .
প্রাণ বাঁচালে সিদ্ধ করে খেয়ে ইহার ফল।
তার পরেতে হ’ল থােকার দারুণ আমাশয়
চিকিৎসকে জবাব দিলে, বঁাচার কথা নয়।
ঐ গাছেরি বেলপপাড়া সে খেয়ে দু’ মাস পর
মুক্ত হ’ল দারুণ রােগে উজল হ’ল ঘর।
মাতামহের মাতামহী সত্য আদেশ পান
ঐ গাছেতে বটেই বটে শিবের অধিষ্ঠান।
বাদলা দিনে দেখছি ভােরে একটী শাখা তার,
হঠাৎ যেন হয়ে গেছে পুড়েই ছারে খার।
ধরলে বুঝি বাজের শিখা বৃক্ষ পাতি’ কর,
নইলে আহা পুড়ে যেত নীচের গােয়াল ঘর।
হয়ত গােধন নষ্ট হ’ত কতই হ’ত পাপ
পেতে হ’ত হয়ত আমায় দারুণ অভিশাপ।
৬৭
* নূপুর
মাতামহের মাতামহী তাই গিয়াছে বলে
শিবের ত্রিশূল আছে গাড়া উহার প্রতি ডালে ?
স্বপ্ন তােমার সত্য হ’ল যুগ যুগান্ত বহি
আমার প্রণাম লওগাে মাতামহের মাতামহী
নির্বাসিত।
হয়েছিল বহুদিন
আমাদের গােয়ালেতে
গােটা দুই কুকুরের ছানা,
কেউ কেউ ভে ভেকে দেক করে তুলেছিল
ঝালা পালা সারা বাড়ী খানা।
রাখাল নিমাইচাদ আলসের শিরােমণি
তাড়াইয়া দিতে বলা হলে,
তাড়নাে দূরের কথা
দুছড়া ঘুঙ্গুর আনি
বেঁধে দিল তাহাদের গলে।
কুকুর বেড়াল দেখে তেড়ে যায় ছানা দুটা
পুলকের সীমা নাহি আর,
নিমাই নিয়ত বলে
এ রকম তেজী ছান
দুনিয়ায় খুজে মেলা ভার।
1
* নুপুর ॥
একদিন ছানাদুটা খােলা পেয়ে গৃহ দ্বার
ঘরে ঢুকে
খাইতেছে মুড়ি,
হতভাগা নিমায়েরে দেওয়া গেল ঘা কতক
ফেলা গেল সব হাঁড়ি কুড়ি।
দিনু মেরে তাড়াইয়া পরদিন: ছানা দুটা
বসে আছে উঠানেতে আসি,
পৌষমাস কোন জীব নাহি বাবু তাড়াইতে
নিমাই বলিল মৃদু হাসি।
আবার মাসেক পরে ঢুকিয়া হেঁসেল ঘরে
আজিকে দিয়াছে ছুয়ে হাঁড়ি,
এইরূপ দিন দিন
উপদ্রব নিরন্তর
কেমনে সহিতে বল পারি ?
ডাকিয়া অপর লােক বলিলাম ছানা দুটা
দিয়ে এসে নদী পার করে।
তিন গাঁয়ে চলে যাক দেখে যেন আসেনা ক
পুনরায় এ বাড়ীতে ফিরে।
তিন দিন পরে দেখি
একটা কুকুর কৃশ
নদী পায়ে দাঁড়াইয়া হায়,
চাহিয়া আমার পানে ডাকিছে কাতর স্বরে
ল্যাজ নাড়ে ফ্যাল ফ্যাল চায়।
৭১
* নূর ,
সে যেন বলিছে আহা
করেছি বড়ই দোষ
দয়া করে দাও মােরে যেতে,
দেখ মাের ভাইটীরে
শেয়ালেতে লয়ে গেছে
তিন দিন পাই নাই খেতে।
তার সেই চাহনীতে কি যে কাতরতা মাখা,
কি যে দীনভাব তার মুখে,
আপনার ব্যবহারে আপনি পাইমু লাজ
বেদনা পাইমু বড় বুকে।
ও পারেতে গিয়া আমি
বুলালাম গায়ে হাত
পুলকেতে ল্যাজ মুখ নাড়ে,
রসনার ভাষা হায় কতটুকু বলে আর
আধা তার প্রকাশিতে নারে।
সােহাগেতে কোলে করি পার করি আনিলাম,
বাঁচিল সে ঘরে ফিরে আসি,
নির্বাসনে দুই দিন সহিয়াছে বহু ক্লেশ
সৰে তাই বড় ভালবাসি।
;
৭১
নুপুর
নিমাই আদর করে
বলে তারে বারবার
কোথা গিয়াছিলি বােকা ছেলে,
তাড়ালে কি যেতে আছে এই দেখ কোনখানে
ঘুঙ্গুর ছড়াটা এলি ফেলে।
করিলাম বহু খোঁজ সে ছানাটী মিলিলনা
শিয়ালে লয়েছে বলে লােকে,
নিরদয় ব্যবহার করেছি তাহার প্রতি
স্মরি আজ জল আসে চোখে।
৭২
সুখী।
ভাগ্যবন্ত মণ্ডলেরা—লক্ষী বাঁধা ঘরটীতে
তাদের কাছে নাইক প্রভেদ আপন এবং পরটীতে।
গােলাতে আর ধান ধরে না, নেয় না ফসল বন্যাতে
ভবন ভরা ফুল্ল কমল পুত্র এবং কন্যাতে।
পুষ্ট তাদের গােধনগুলি, তুষ্ট তাদের দাস দাসী,
বাদেবী নন বিমুখ তবু অধিক প্রিয় চাষ বাসই।
শােকের ছায়া কচিৎ পড়ে, পলায় যে রােগ সত্বরে,
শান্তি এবং সুখটা যেন তাদের নিয়েই ব্যস্ত রে।
গ্রামের গরিব দুঃখীরা সব তাহার পরম আত্মীয়,
কেউ বা খুড়া, কেউ বা দাদা, সবাই সুহৃদ সব প্রিয়।
তীর্থ ভাবেন বাস্তু ভিটায়, বলেন করে জোর ভারি,
লক্ষ দ্বিজের চরণধূলা পড়েছিল মাের বাড়ী।
যখন দেখি এই মাদুলী সেই রজেতে পূর্ণিত
গর্ব এবং গৌরবে হয় সব দীনতা চূর্ণিত।
৭৩
* নূপুর
গ্রামে অনেক আত্মীয় তার কপট এবং হিংসুটে
অন্তরে তার শত্রু চির, পরােক্ষেতে রয় ফুটে।
নিত্য ভাবে রাত্রি ধরে চঞ্চলা কয় লক্ষমীরে,
ওই বাড়ীতে অচল যেন ত্যজে পেচক পক্ষীরে।
সুখের উপর সুখ দিতে যান দুখীর কেহ নন হরি,
পুষ্প ভরা ওদের তরু আমার শুকায় মঞ্জরী।
বিধিরে হায় দেখতে পেলে বারেক ভঁরে জিজ্ঞাসি,
কেমনতর বিধান ভঁহার, বিচার তাহার কোনদেশী
রাতের আঁধার যায় নি তখন—একটী দিবস প্রত্যুষে,
রক্ত বরণ সন্ন্যাসী এক স্বপ্নে তারে কন রুষে।
বুঝবি কি তুই এই ভবনের গৃহস্বামীর পুণ্যরে,
হিংসা করে হায় পাতকী হস্ বা কেন ক্ষুন্ন রে।
শৈশবে সে ক্ষুদ্র কীটও চরণ দিয়ে দলত না,
কাহার প্রতি কঠোর কঠিন ভীতির বাণী বলতাে না।
কর্দমেতে মগ্নপদ ভ্রমরটীরে প্রাণ দিত,
বৎসে এনে গাভীর কাছে করতো তারে নন্দিত।
লতার হােট পত্ৰটীও তুলত না সে হস্তেতে,
শীতার্ত্ত হায় কুকুর বিড়াল আচ্ছাদিত বস্ত্রেতে।
৭৪
৯ নূপুর
কৌতুকেও করত না সে বালককেও শঙ্কিত
চিহ্নটীও তরুর গায়ে করতােনা ক অঙ্কিত।
ক্ষুদ্র তাহার গােপন দানের জানতাে খবর ঈশ্বরই
মত্ত হ’ হরির নামে সকল বেদন বিস্মরি ।
নিজের দুখও ভুলতে সে যে দুখীর দুখ চিন্তাতে
বিমুখ ছিল যাবৎ জীবন হিংসা পরনিন্দাতে।
দুঃখ সে যে দেয়নি কারে, দুঃখ পাবে কার লাগি,
বৃথায় তাহার হিংসা করে হসনি ভীষণ পাপভাগী।
দুৰ্ব্বলেরি বন্ধু যে জন, জীবকে যাহার যত্ন রে
আবে কুবের মাথায় করে তাহার লাগি রত্ন রে
রক্ষী তাহার মধুসূদন, লক্ষনী তাহার ভাণ্ডারী
লগ্ন ঘাটে মুক্তি তরী, স্বয়ং হরি কাণ্ডারী
হরিদাস ।
অকপট শুধু
AY
হৃদিখানি তার
আর কোণে গুণ নাই,
দাড়ালে বসেনা
বসিলে ঝিমােয়
আলসের সেরা ভাই।
নাহি কাজ তার
অবসরও
সদা চিন্তায় রত,
দার্শনিক কি
মহাকবি নয়,
ঠিক পাগলের মত।
বামুনের ছেলে
পূজা করিতেও
ডাকে না তাহারে লােকে,
জানেনা মন্ত্র
আসন শুদ্ধি,
কাঁদে মন্দিরে ঢুকে।
নুপুর উলটি চক্ষু করে হরিনাম দেখে লাগে শুধু হাসি, চোখের জলটী যাতে তাতে আসে বড়ই মিষ্টভাষী। ছুতা না ধরি কহাতাম কথা ডাকিতাম তারে ঠেলি, বলিত ‘পাগল ফুলের মালাটা উল ঢাল করে দিলি। বলিতাম যবে কই মালা কই তুমি ত রয়েছ বসে, ফ্যাল ফ্যাল করি চাহিত সে শুধু আঁখি যেত জলে ভেসে। তারপর হায় দেখেছিনু তারে করছি চাকুরী যবে, এসেছিল হেতা বয়স তখন চল্লিশ পার হবে। তখন তাহার বেড়েছে খেপামি সদাই আঙুল নড়ে, বেড়েছে কান্না আনমনা তাক বাড়িয়াছে হরে হরে।” 1 ৭৭
* নুপুর
একদিন প্রাতে
ঘুমাইছে পড়ি,
আমি উঠালেম তারে,
চমকি উঠিয়া
চাহি মাের পানে
কঁদে দর দর ধারে।
বলে আহা কেন
ভাঙ্গাইলে ঘুম
পূজা শেষ নাহি হলাে,
আরতি যে বাকি নিভাইয়া দিলে
পঞ্চদীপের আলাে।
বলে আর কাঁদে
হেরি কাতরতা
মােরও চোখে এলাে জল,
জড়াইয়া গলা
ফু পায়ে ফু পায়ে
কাদিল সে অবিরল।
বলিল কাতরে
বড় ব্যাথা ভাই
আজিকে পেয়েছি মনে,
দাও তুমি মােরে শুধু রেল ভাড়া
যাইব বৃন্দাবনে।
যাবার খরচ
পাইলেই হল
আসিবার নাহি চাই
হেরি তার ভাব
জোগাড় করিয়া
তখনি দিলাম তাই।
৭৮
* মূপুর # শুনিলাম পরে, দুরু দুরু বুকে ঢুকিতে বৃন্দাবনে ভাবেতে বিতাের মূচ্ছায় লুটি পড়েছিল খণে খণে। মন্দিরে ঢুকি পুলক ব্যাকুল প্রাণ মন চোখে আনি, দেখেছিল তার ধ্যানের মূরতি যুগল প্রতিমাখানি। বিস্ফারি আঁখি মদনমােহনে দেখিতে দেখিতে হায়, ঢালি দিল প্রাণ শ্রীহরির পদে দেবতার আঙিনায়। হে পূজ্য সখা যে আরতি তব হয়নি জীবনে শেষ, প্রাণ দিয়া তাহা সাঙ্গ করিতে ছেড়ে গেলে বুঝি দেশ, চোখােচাখি হলে আসিতে নারিবে হরি রাখিবেন ধরি, তাই বুঝি সাথে লয়ে নাহি গেলে দেশে ফিরিবার কড়ি ? ৭৯
পূজানি ।
7
গ্রাম হতে দূর
পূর্ব পাড়ায়
ছােট ঘরখানি তার,
সংসারে এক
কন্যা কেবল
কোনও কেহ নাহি আর।
ম! মরা বালিকা
বড় আদরের
জননীর স্মৃতিকণা,
গ্রামের সকলে কোলে পিঠে করে
ভালবাসে সব জানা।
ব্রাহ্মণ সদা
থাকে উদাসীন
বলেনা কোনই কথা
মুড়াইয়া খাওয়া
কাঞ্চন তরু”
মেলে নাক কচি পাতা।
আহ্নিক পূজা
কঠিন হৃদয়
তাই লয়ে থাকে,
সদা করে হরিনাম,
সব মেহমায়া
টানিয়া লয়েছে
বিগ্রহ রাধাশ্যাম।
দশ বছরের
রূপসী বালিকা
অকালেতে গেল মরি,
গ্রামের সকলে
কাদিয়া আকুল
ফেরে হায় হায় করি।
ব্রাহ্মণ অতি
নয়নে নাহিক জল,
শুধু জোরে জোরে
দুই তিনবার
বলে বল হরি বল ।
রাধাশ্যাম পানে
চাহি বলে হাসি
হে ঠাকুর এত দিন
ভাবিতাম আমি,
বড়ই গরিব
সত্যই অতি দীন।
আজিকে বুঝি
আমিও নেহাৎ
নহি ত ভাগ্যহত,
আমারও আছিল
একটা জিনিষ
তােমার নেবার মত।
শশষ্যা ।
সে দিন উত্তরায়ণ উজানির মহােৎসব মেলা
স্নানযাত্রী পরিপূর্ণ অজয়ের সান্দ্র শুভ্র বেলা।
কেহ পুণ্যস্নানে রত, কেহ লক্ষ মন্ত্র করে জপ,
অদূরে সজ্জিত বীথি, মধ্যে ওই নীল চন্দ্রাতপ।
অসংখ্য বিপণি শ্রেণী, আমােদের প্রমােদের হাট,
কৰ্ম্ম ও ভক্তির যােগে মৌন ও মুখর নদী ঘাট।
এসেছে সন্ন্যাসী এক, খর শরশয্যা পরে লীন,
ভীতিময় প্রিয় খট্টা তাহাতেই যাপে নিশিদিন
কতবার অতর্কিতে ছিন্ন রুধিরাক্ত হয় তনু,
কি কঠিন উদাসীন, তাতে ও যন্ত্রণা নাহি অণু।
কেহ বলে হে ঠাকুর হয় নাই এখনাে অভ্যাস,
শরীরে যন্ত্রণা দিয়া ভগবানে লভিতে বিশ্বাস ?
সুন্দর মধুর নিশা জ্যোৎস্নায় ধৌত নদীধাক,
মাঘের প্রশান্ত হিমে তীব্র কঠোরতা নাহি আর।
গেলাম উদাস মনে সন্ন্যাসী রসিয়া আছে যথা,
কি প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসিমু তার পূর্ব আশ্রমের কথা।
হাসিয়া বলেন সাধু এই গ্রামে ছিল মাের বাস
পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে লয়েছি প্রথম সন্ন্যাস।
প্রাচীন পতনােম্মুখ ও অশথ সে ভিটার চিনা
ছিলাম দুর্দান্ত বড় শুনিয়া করিবে জানি ঘৃণা।
চপল বাল্যের মােহে করেছি নির্দয় ক্রীড়া কত,
আজি তাহা বিধিতেছে পরাণে তেক শল্য মতু।
বধিয়াছি খরশরে বিহগ বিহুগী নানা জাতি,
অব্যর্থ লক্ষ্যের জন্য ছিল মাের বিপুল সুখ্যাতি।
সন্ন্যাস লইনু যবে তখন হয়েছে সর্বনাশ,
সন্তপ্ত গেলাম এক বৃদ্ধ বৌদ্ধ শ্রমণের পাশ।
পঞ্চদশ বর্য রহি সুশীতল তার ছায়া তুলে
ধৌত করিলাম পদ অনুতাপ বিগলিত জলে।
তবু মিলিল না শান্তি, কি কঠোর মৌন অভিশাপ।
শ্ৰমণ বলেন বৎস করিয়াছ তুমি মহাপাপ।
নিরীহ প্রাণীর প্রাণ হেলায় লয়েছ তুমি হরি’
ভােগ বিনা কৰ্ম্মফল যাবেনা যে মুগ যুগ ধরি।
৩
নুপুর
ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ দান তস্করের মত নিলে কাড়ি
অসীম যন্ত্রণা দিয়া, প্রতিফল পেতে হবে তারি।
শরের ফলক দিয়া রচ তুমি শয্যা সুকঠিন
পাপের স্মারক ব্যথা যন্ত্রণায় যাপ নিশিদিন।
বহি এ কলঙ্কখট্টা প্রদক্ষিণ কর দীর্ঘকাল,
কাটিলে কাটিতে পারে জীব হিংসা কলুষের জাল।
যখন দেখিবে তুমি শঙ্কাহীন বিহঙ্গের দল
আসিবে তােমারে ঘিরি, করিবে মধুর কলকল।
তােমার বুকের পরে, কপােত লুকাবে আসি মুখ,
জীর্ণপক্ষ হরিয়াল জানাইবে মরমের দুখ।
শ্রান্ত সে টুনটুনি আসি, কমণ্ডলু হতে পিবে জল,
বালহংস স্নানকালে তােমারে ঘিরিবে দলে দল।
তখন বুঝিবে তুমি, মহাপাপ হইয়াছে শেষ,
লভিবে বুদ্ধের দয়া, সার্থক জীবন ব্যাপি ক্লেশ।
সে অবধি ঘুরিতেছি এই তীব্র খট্টা মাের সাথী,
অবসন্ন ভিন্ন তনু, পলে পলে ছিন্ন দিবারাতি।
তবু সদা মনে হয়, যে যন্ত্রণা দিয়াছি অপার,
পরিশােধ কণামাত্র এখনও হয় নাই তার।
ছিন্ন দেহ হতে মাের ঝরে যবে রুধিরের ধারা,
ঘৃণা হয়, মনে পড়ে প্রথম সে ‘টিটিভভরে’ মারা।
৪
* নুপুর
বলিতে বলিতে বৃদ্ধ করুণায় ছল ছল আঁখি
যুগল কমল করে আঁখিজল রুধিলেন ঢাকি।
আমি ভাবিলাম একি, মহাপ্রেমে পুর্ণ এ হৃদয়,
উপরে কর্কশ রূঢ়, হেমায়া হীন মনে হয়।
জীবেরে যন্ত্রণা দিয়া বাল্যের সে অজ্ঞানতা ভরে
বৃদ্ধ তার প্রায়শ্চিত্ত করিতেছে শরশয্যা পরে।
প্রাণ লয়ে খেলা করি, হেলায় স্বেচ্ছায় বধি প্রাণী
মোরা ভঁরে নিন্দা করি, ভণ্ড বলি, হীন প্রাজ্ঞানী!
বিনিম্ন।
* * *
কাশী নরেশের ফুমার দৈখিবে আজি বৈশালী বিশাল পুরী,
উল্লাসে সুখে মজ্জিত যেন সজ্জিত শাের্ভা নগর জুড়ি।
পথে পথে শ্যাম নবীন তােরণ, আম্রের শাখা কনক ঘটে
পুর নারীগণ করে বন্দনা, বলে এ মূর্তি দেখার বটে।
(২)
সকল ভবনে বিপুল সজ্জা, একটী ভবনে আঁধার রাশি,
হেতা কি পশেনি আলােক তুফান, জমেছে লজ্জা,বিষাদ রাশি,
এই ভবনেরি গৌরব ওই নব যুবরাজ পরের ছেলে,
ত্রিতল ভবন, ধন আভরণ, বিনিময়ে পিতা অনেক পেলে।
স্বর্ণ না থাক পর্ণকুটীরে ছিল যে শান্তি ইন্দুমুখে,
বক্ষে মুকুতা, দুঃখ কি ছিল ভীম দারিদ্র সিন্ধুবুকে।
আজিকে ফোটেনা সুরভি কুসুম, ললিত লতিকা শুষ্ক জানি
ফুল ফুরায়েছে, কি হবে লইয়া বৃথা কনকের পুষ্পদানি।
* নূর
( ৪ )
এই যুবরাজ থমকি দাড়ায়, ওই যে চাহিল উর্ধপানে,
ওই কে রমণী আশীষ করিল, নয়নের জলে দূৰ্বাধানে।
গেল যুবরাজ, নগর হেরিয়া, ধুলি উড়াইয়া অশ্বখুরে
মূচ্ছিত হয়ে, পড়িল জননী, উচ্চ ত্রিতল হৰ্মচূড়ে।
৮
ছেলের গায়ে ।
বেনামীতে বিষয় ছিল চাইছে ফিরে আজ
ফিরে দিতে নয়কো রাজি মােটেই শচীরাজ
রাজের পিতা তার নামেতেই বেনামী যে খৎ,
চলবেনা ক সে কি মেনে ছেলের মতামত ?
রমাপতি করলে নালিশ, মহল ফিরে চায়,
শচী তারে একেবারেই হাঁকিয়ে দিলে হায়।
জবাব দিলে, আমার মহল আমার বাপের ধন,
নাইক ইহার অধিকারী অপর কোন জন।
উমাপতি অবাক শুনে, কাণ্ড দেখে তার,
ভাবলে দেশে ধৰ্মধৰ্ম্ম রইলাে না ক আর।
পিতা উহার ছাড়বে কি গাে এই মহলের লােভ
যাউক দেওয়া সাক্ষী মেনে, মিটুক মনের ক্ষোভ।
বিচার দিনে পালকীকরে এলেন মধুরাজ,
তনয় বুঝি পরিয়ে দেছে নামাবলীর সাজ।
নুপুর ॥
হরিনামের মাল্য গলায়, তিলক পরিপাটী,
ভে দেখিয়া মনে হলাে, বলবে কথা খাটা।
উমাপতির উকীল তারে বলেন মহাশয়
বৃদ্ধ হলেন করা উচিত ভগবানের ভয় ?
বেনামীতে বিষয় ছিল নয়ক তব কেনা
ফাঁকা দলিল, দেননি টাকা, হয়নি লেনা দেনা।
সাক্ষী বলেন এ কথা ত সবাই জানে আজ,
হলপ করে বলবে কেন বৃদ্ধ মধুরাজ ?
কোথায় শচী দাড়াও কাছে, পুত্র তুমি মাের,
সাজাতে চাও পিতায় তােমার ভদ্রবেশী চোর।
নরক থেকে তুলবে কোথা, ফেলছ তাতে নিয়ে
চাওগে ক্ষমা রমার কাছে বিষয় ফিরে দিয়ে।
পিতার হুকুম, ধরলে শচী রমাপতির কর,
বললে আমি বিষম দোষী ক্ষম অতঃপর ।
তােমার বিষয় লগে তুমি, বিদায় দেহ হেসে,
মাপ কর ভাই, সরল প্রাণে আমায় ভালবেসে।
বলেন রমা আজকে হতে তুমি আমার ভাই,
কে বলিল এই বিষয়ে তােমার দাবী নাই?
আধেক তােমর, আধেক আমার, তােমার ছিল যাই,
আদালতে উঠলাে ধ্বনি, সাবাস! বাহ বাহা ।
কল ৪
এবার অকাল নহে, নহে মলমাস
মর্কয়ে প্ৰয়াগে গিয়া করিছেন যাস
ধনশালী জমিদার বঁায় মহাশয়,
লক্ষ টাকা চেয়ে যার আয় কমি নর।
সম্মান প্রচুর তার সধাকার কাছে
বড় বড় গোটা দুই খেতাবও আছে।
“চিলীয়’ দুর্ভিক্ষে তিনি দেছিলেন চাদা
উরি নামে আদালত নীচে ঘাট বাঁধা।
কার্তিক পূজার ‘থাকা সমাৱেই তাঁর
সহরের লােকেদেরও বটে দেখিবার ।
প্রয়াগে সিনান করি মুড়ালেন মাথা,
মসি খনি শুনিলেন কত ধৰ্ম্মকথা
* নুপুর
প্রণামী প্রচুর দিয়া, নিত্য বারাে জন,
তৃপ্ত করি করালেন ব্রাহ্মণ ভােজন।
পাণ্ডা তার হৃষ্ট মনে অর্থ পেয়ে হায়,
আসিল সুফল দিতে, আজি যে বিদায়।
গলেতে পরায়ে ডুরি, কপালে তিলক,
মন্ত্র পড়ি শিরে দিল পূত গঙ্গোদক।
আশীষ করিয়া বহু হাতে দিল গুয়া,
একি এ সুফল হায়, সুপারি যে ভুয়া।
বিস্মিত শঙ্কিত পাণ্ডা কঁপে তাঁর হাত,
ভাল গুয়া ভুয়া হল কেন অকস্মাৎ।
পা বলে, শক্তি আছে ভক্তি নাহি হায়
পঁহুছেনি পূজা নীলমাধবের পায়।
শুনি কেহ রাগে কেহ করে উপহাস
বাবু ফেলিলেন শুধু ব্যথিত নিশ্বাস।
ব্লম শাপ ।
•
হাজার মুদ্রা ক… করিয়া
দিলেনাক শােধ অর্থ।
আদালতে গেল হারি ব্রাহ্মণ
খরচ হইল ব্যর্থ।
খাতক, সাক্ষী,-উভয় সমান
দেনা লেনা কই হল না প্রমাণ,
বাতিল হইয়া গেল খত খান,
বৰ্ত্ত হল না সৰ্ত্ত।
* নপু !
( ২ )
আপীলে আজিকে লভিয়া ডিক্রি
সুদ ও খরচ শুদ্ধ,
খাতকে তাহার নিকটে ডাকিয়া
বলে ব্রাহ্মণ ক্রুদ্ধ।
সত্যের জয়ে লভিনু হরষ,
তাের পাপটাকা করিনে পরশ,
শুধু আমি তাের স্বরগের পথ
করে দেব অবরুদ্ধ।
( ৩ )
পাপিষ্ঠ তুই মিথ্যা সাক্ষ্যে
জীবন করিলি নষ্ট,
মরণেতে তুই পাবিনে গঙ্গা
বলিয়া দিতেছি পষ্ট।
উকীল আমলা আদালত ভরি
শুনি অভিশাপ হেসে গড়াগড়ি,
বুঝিল, খাতক সহজে সহিবে
শাপের এ লঘু কষ্ট।
( ৪ )
অর্থের দায় রেহাই পাইয়া
অন্তরে পাপী তুষ্ট,
ভালই হ’ল যে নিলেনা অর্থ
হয়ে ব্রাহ্মণ রুষ্ট।
গঙ্গা না মেলে ক্ষতি নাহি তায়
পেলে সে মুক্তি অর্থের দায়,
তবু ভাণ করে টাকা দিতে চায়
কাদে ছল করে দুষ্ট।
( ৫ )
বয়স যখন পড়িতে লাগিল
শিথিল হইল চৰ্ম্ম,
নিশিতে দারুণ পীড়িতে লাগিল
অতীতের দুষ্কৰ্ম্ম।
পাব না গঙ্গা পাব নাক আমি,
শুধু বাববার বলে দিবাযামি,
আজি যেন শত বিষ-বৃশ্চিকে
বিধিছে তাহার মর্ম।
৯৪
( ৬ )
জনে জনে ডাকি বলে শুন ভাই
মাের মরণের অন্তে,
গঙ্গার জলে দিয়ে দেহখান
মাগি তৃণ কাটি দন্তে।
বলে সবে’ ‘ত্যজ বৃথা হা হুতাশ
দিব গঙ্গায় দিনু আশ্বাস
দুই ক্রোশ দূরে বহে জাহ্নবী
কোনাে বাধা নাই পন্থে।
( ৭ )
বৃদ্ধ তাহার পূর্বের ঋণ
শোধ করে দিল তীর্থে,
করিল সে দান সুদের অর্থ
দেবতা পিতৃ কৃত্যে।
তবু সেদিনের ভীম অভিশাপ
হৃদয় মাঝারে দিয়েছে যে ছাপ,
মােছেনা কিছুতে রয়ে রয়ে শুধু
অনিবার জাগে চিত্তে।
৯৫
নূপুর
( ৮ )
যেদিন তাহার মরণ হইল
সচকিত শাসভঙ্গে,
তখন অজয় প্রলয় প্লাবনে
নৃত্য করিছে রঙ্গে।
ব্যস্ত সবাই লয়ে নিজ প্রাণ,
ভাসাইল জলে মৃতদেহখান,
জানিনে তাহার হল কি না দেখা
জাহ্নবী ধারা সঙ্গে।
কত টাকা ।
7
তিন বছরের দামাল বালক
টাকা লাগায়েছে গলে,
-নড়েনা সরেনা কি হল কি হল
কঁদে আর সবে বলে।
কেহ যায় আহা বাহির করিতে
গলায় আঙুল দিয়া,
কেহ তাড়াতাড়ি ছুটিতে ছুটিতে
ডাক্তর ডাকে গিয়া।
হয় শাসরােধ, দারুণ যাতনা
রবে কতখণ ধরি,
দেখিতে দেখিতে ত্যজিল পরা
ছেলে ছটফট করে।
-ডাক্তর দাসি মৃত দেহ হতে
বাহির করিল টাকা,
পিতা চেয়ে দেখে, গায়েতে তাহার
ঈষৎ সিদুর মাখা।
১৭
3
।
=
নুপুর
দেখে উল্টায়ে পিঠেতে তাহার
মােছা ত্রিশূলের দাগ,
শিরে কর হানি, বলে ওরে টাকা
আবার নিয়েছ লাগ।
যেখানে সেখানে আমার লাগিয়া
ঘুমিতেছ দিনরাত,
বুঝিতে পারিনে গ্রহের ডেঙ্গস
কখন ছাড়িবি সাথ।
জনম ভরিয়া যন্ত্রণা দিয়া
মিটিলনা তাের আশ,
যেমনেতে হ’ক করিবি করিবি
পাপীর বংশনাশ।
দারুণ শশাকের প্রলাপ কাহিনী
শুনি ডাক্তর কয়
বুঝিতে পারিনে কি বলিছ তুমি
টাকাটীর পরিচয়।
শােকাতুর পিতা বলিতে লাগিল
অতি নিদারুণ কথা,
মনে হলে মাের শরীর শিহরে
বুকে বাজে বড় ব্যথা।
।
h
কুর
পিতামহ কাছে শুনিয়াছি তাঁর
পিতামহ ছিল ঠগী,
সাজিত সে কভু ধনী জমিদার
কভু সন্ন্যাসী যােগী।
কণ্ঠেতে হায় টিপিয়। এ টাকা
গামছা জড়ায়ে টানি,
পথে প্রান্তরে বধিয়াছে হায়
কত যে নিরীহ প্রাণী।
কত ধনবানে, কত অতিথিরে
কত ভাবে নিরবধি,
দিবসে নিশিতে করিয়াছে ‘ঘাল’
সজোরে করুধি।
ঘসা ঘসা এই ত্রিশূলের দাগ
সিদুর মাখনাে টাকা,
গায়েতে ইহার কত কষ্টের
মরণের স্বর মাখা।
রুদ্ধ প্রাণের কাতরকাহিনী
অপূর্ণ শত আশা,
যুগ যুগ ধরি ইহার বুকেতে
বাঁধিয়াছে হায় বাসা।
-
শ্বাসরুদ্ধের নিশ্বাস ছাড়া
তৃপ্তি উহার নাই,
ক্ষুধিত পরাণ আমার নিকট
আবার এসেছে তাই।
রাঙ্গা গামছার খুটে বাঁধি এরে
তামার ঘটাতে পুরি,
রেখে গিয়াছিল, সে বছর আমি
বাহির করিনু খুড়ি।
ভয়ে এই টাকা চালায়ে দিলাম
আগে মহাজন করে,
দেখছি আজিকে পাপের মুষল
ফিরিয়া এসেছে ঘরে।
কাল গরু বেচি পেয়েছিনু টাকা
রেখেছি ওইখানে,
মৃত্যু সায়ক আসিয়াছে পুন
তখন বল কে জানে?
যুগে যুগে পাপ ফল ভােগ করে
এ কথা বড়ই পাকা,
করিবে ধ্বংস পাপীর বংশ
পুরা পাওয়া টাকা।
.
«
নগু।
দরজার ধারে বসে থাকে রঘু,
সঙ্গে দ্বাদশ সাথী,
মগন’ তাহার প্রিয় অনুচর,
তারি সাথে জাগে রাতি।
কত পাপ সে যে করেছে' জীবনে
কত প্রাণ করি নাশ,
আনিয়াছে ঘরে কতই অর্থ,
মেটেনি অভাব, আশ।
এই বসেছিল, গভীর নিশিতে,
অশখের কালাে ছায়ে,
দূরে একজন আসিছে, কে দেখে,
‘ণপা’ জুড়িল পায়ে,
1
-
f
৫
নপুর ॥
1
মাঠে মাঠে রঘু ছুটিল তখনি,
ঘুরে গেল তার পাছে
মগন দাড়ালাে পান্থ সুমুখে,
মৃত্যু দাড়ালাে কাছে।
এক ঘা লাঠীতে সেইখানে রঘু,
পথিকে করিল বাল,
দেখিল তাহার কিছু নাই কাছে।
শুধু আধঝুলি চাল,
বলিল দস্যু ছাড়ি নিশ্বাস
দূর, ঝকমারি কাম,
একমুঠা চাল করিলাম আজ,
একটা প্রাণের দাম।
বিরস বদনে ফিরে গিয়ে ঘরে,
কাটাইল নিশাভাগ,
জানিনে তাহার পাষাণহৃদয়ে,
পড়েছিল কিনা দাগ !
পরদিন পুন নরজায় আসি,
কাটাইল দিনমান,
একটী পথিক দেখিল না পথে,
নাহি গাড়ী একখান।
।
১০,
এ পৃ. ৮
একে একে হায় দশদিন যায়,
কিছুই মিলে না আর,
সংসার তার হইল অচল,
গৃহে ফেরা হ’ল ভার।
মাসেকের পর সুচতুর রঘু,
পরি কৌপীন ডাের,
কি জানি কি ভাবি ‘নরজায়’ গেল,
নিশি না হইতে পাের।
বিভূতি মাখানাে সুঠাম শরীর,
রক্ত তিলক ভালে,
সুমুখে বহি, করেতে ত্রিশূল,
বসে আছে বাঘছালে।
সচকিতে হায় দেখিল অদূরে,
সজ্জিত বাজি রাজি,
বর্ধমানের রাজ অধিরাজ
আসিছেন পথে আজি।
ধার্মিক রাজা শুনেছেন বুঝি,
হত্যা হয়েছে দ্বিজ,
আসিছেন তাই শাসিতে দুষ্টে,
লয়ে দলবল নিজ
নুপুর
সৈন্যের দল,
নরজায় আসি
খুঁজি নদীতীর বন,
কোনােখানে তারা কিছুতে
পেলেন
দর একজন।
দূত
আসি এক জানালে রাজায়
দেখিলাম মহারাজ
বসে আছে মাঠে যুবা একজন
পরিয়া সাধুর সাজ।
মনে হয় মাের সেই সে দস্য
সন্ন্যাসী কভু নয়।
লয়ে যেতে পারি এখনি তথায়,
প্রভুর হুকুম হয়।
হল আরক্ত নৃপতি নয়ন
শুনে সে দূতের কথা
শাসিতে দুষ্টে ছুটালেন ঘােড়।।
নিমেষে গেলেন তপা।
দেখিলেন সাধু ধেয়ানে মগন,
কোন দিকে নাহি চায়,
সুন্দর তনু কান্তভীষণ
নব জ্যোতি ফুরে গায়।
1
।
L
অপুর
মােহিত নৃপতি, বুঝিলেন হায়
সাধু সাধারণ নয়।
অঙ্গ লাবনী দিতেছে তাহার
বিভূতির পরিচয়।
মৌনী তাপস কহিল না কথা,
নয়ন ভাসিছে নীরে,
চরণে ঢালিয়া মােহর শতেক
রাজা চলিলেন ফিরে।
রাজার সৈন্য একে একে যবে
গেল বহুদূরে চলি,
‘ঘুর’ ধেয়ান ভাঙ্গিল তখন
চাহিল নয়ন মেলি ।
যামিনীতে চুপে গৃহিণীরে রঘু
অর্থ দিলেন আনি,
পত্নী তাহার পুলকে বিভল
মুখেতে সরে না বাণী।
সুধাইল হাসি কেন বল দেখি
হেন বৈরাগী সাজ,
পাশের বুকে প্রেমের তুফান
বয়ে গেল না কি আজ?
-
1 L
নূপু
কঁদিয়া বলিল রঘুবীর তারে
এ কোপীন তবু ভাণ,
এতেই এনেছি বুঝি সােহাগী
মােহর একশাে থান।
বিদায় আজিকে পাষাণ গলেছে
শােন গােয়ালার ঝি,
নকলে এ ভবে এত মিলে যদি
আসলে না জানি কি?
এত বলি রঘু সেই সাধু সাজে
সেই মালা লয়ে গলে
তখনি একাকী ত্যজিল সে গৃহ
ভাসিয়া নয়ন জলে।
কোথা গেল রঘু, জানি না কেহ
কেহই পেলে না দেখা,
একজন শুধু দেখেছিল তারে
যমুনার কুলে একা।
অতিময় বল ।
সহরের শ্রেষ্ঠদল
গাহিতে এসেছে গ্রামে,
শুনিতে সবারি বড় সাধ,
দক্ষিণা হইবে দিতে, দু’শ টাকা প্রতি রেতে,
যাতায়াত খাওয়া দাওয়া বাদ।
পাচ ক্রোশ দূর থেকে, এসেছে দেখিতে লােকে,
ছুটেছে যাত্রার বড় নাম,
দুই গ্রামে আড়াআড়ি, দুই গ্রামে বারােয়ারি,
অবিরত চলে ধূমধাম।
পালা অভিমন্যু বধ
নীরুব নিপল সৰ,
কথা নাই, গােল দূরে থাক,
শুনে মন্ত্রমুগ্ধ প্রাণে, সাজে আর নাচে গানে,
একেবারে লাগায়েছে তাক।
৮
১৭
নুপুর
অপূর্ব অনিন্দ্যকান্তি, সত্য বলে হয় ভ্রান্তি,
অভিম আসরে দাঁড়ায়,
চারি দিকে আহা আহা, চারি দিকে বাহ বাহ
এ উহারে সাবাসি হারায়।
শূরগণ আসে সাজি,
রণবাদ্য উঠে বাজি,
দামামায় উঠে নব বােল,
খাম্ থা, চুপ চুপ,
ওই ওকি শুনা যায়,
কাদের শ্রবণ ভেদি ৰােল।
‘আগুন’ ‘আগুণ বলি, ছুটিয়া চলেছে লােক,
আধা অভিনয় যায় থামি,
মাথা হতে খুলি তাজ, খুলি পেসােজ সাজ
অভিমন্যু সেই পথগামী।
গরিবের ঘর জুড়ি, আগুণ লেগেছে মরি,
হবে বল কে আগুয়ান,
কচি ছেলে আছে ঘরে, কে আনে বাহির করে
রক্ষা তুমি কর ভগবান।
ভীম অগ্নি শিখা হেরি,
সবে যায়
দূরে
সরি,
অভিমন্যু ঢুকে গৃহমাঝ,
বালকেরে বুকে ধরি, আনিল বাহির করি,
গায়েতে দারুণ লাগে ঝাৰ ।
।
।
1
হােটে অগ্রি লেলিহান, ঝলসিয়া দেহ খান,
বদন কমলে তবু হাসি,
ব্যাকুল জননীকোলে,
সঁপিয়া দিলেক ছেলে,
দেবতার মত কাছে আসি।
অবসন্ন তবু হায়,
এলায়ে পড়িয়া যায়,
দরিদ্রের প্রাঙ্গণ মাঝার,
ভাসি সবে আঁখিনীরে, দাঁড়ালাে তাহারে ঘিরে,
পায়না যে সাড়া কোনো আর।
চারিদিকে নিদারুণ, বেদনার তীব্র ব্যথা,
চারিদিকে শুধু হায় হায়,
ধূসর আকাশ মূলে,
ধীরে ধীরে পড়ে দুলে,
সপ্তমীর চঁাদ নিভে যায়।
হল না ক পালা পায়,
অধিকারী মৃতপ্রায়,
দেশময় উঠিল যে শােক,
ওরে অভিমন্যু এলি, একি দাগা দিয়া গেলি,
কাঁদিয়া বলিছে সব লােক।
গহি অধিকারী’ পানে, বলে গ্রামবাসিগণে,
এত ব্যথা পরাণে কি সয়,
দেখলে যা মহাশয়,
কভু ভুলিবার নয়,
বড় দল, বড় অভিনয়।
*
।
মান্নার জলে ।
গভীর রজনী একটা বেজেছে
লােকে ভরা আটচালা,
চমকে আসর, সাজের জমকে,
জমিয়াছে বেশ পালা।
বাছে ও গীতে মিশিয়া গিয়াছে,
পুলকে নীরব লােক,
যাত্রা দলের একটি ছেলের
ঢুলিয়া আসিছে চোখ।
ছােট ছেলে আহা হাঁটিয়া হাঁটিয়া
আসিয়াছে বহু দুর,
শরীর তাহার এলায়ে পড়িছে
জড়ায়ে আসিছে সুর।
ঘুমেতে নয়ন মুদিয়া আসিছে
আলু থালু তার সাজ,
ছােট প্রাণখানি ক্ষণিকের ছুটি
মাগিতেছে যেন আজ।
১১
নুর
কোথায় আসর, সে যেন খু।
জননীর সেই কোল,
দীন কুটীরের কোমল বালিস
ঘুম পাড়ানিয়ে বােল।
তাড়াতাড়ি ওই উঠিয়া আবার
ধরিতে হতেছে গান,
অধিকারী পানে চাহিয়া তাহার
কাঁদিয়া উঠিছে প্রাণ।
আবার জড়ায়ে
আসিছে নয়ন
টলিয়া পড়িছে তাজ,
সারা দেহখান ক্ষণিকের ছুটী
মাগিতেছে শুধু আজ।
হেরি বালকের সে কাতর ভাব,
নয়নে আসিল জল,
কি জানি কি ভাবি পলকে হইল
হৃদিখানা টলমল।
পারি বা না পারি করিতে হইবে
করিতে হইবে কাজ,
আদেশ তােমার কঠিন কঠোর
নির্দয় নটরাজ।
T -
।
শেষ ।
পৌষ যে আমার যায় গাে চলে
‘বাউরি এবং ‘আ’ দিয়ে,
ধানগুলিকে যাও গাে রেখে
বেষ্টনী ও দাগ দিয়ে।
ফিরছি আজি যাত্রা গেয়ে,
নুতন গানের বায়না নিয়ে,
‘বিজয়া’ ওই দাড়িয়ে আছে
‘বােধন’ লাগি ভাগ নিয়ে।
বলতে গিয়ে হয় না বলা
কি কথা কই বিস্মরি।
“ইতি’র পরে নিতিই লিখি
নূতন করে “শ্রীহরি।
সূৰ্য আবার যায় গো সরে,
আসার আশার সাজটা পরে
‘নান্দীমুখে’র মুখ দেখা যায়
হােমের ধূমের ফাক দিয়ে।
সপুর্ণ।
১১২
কুমুদবাবুর অন্যান্য পুস্তক।
শত
ঐ
ঐ
।
(দ্বিতীয় সংস্করণ)
মূল্য চারি আনা।
বনতুলসী ঐ (যন্ত্রন্থ) মূল্য পাঁচ আনা।
একরা
মূল্য আট আনা।
উজানি
মূল্য আট আনা।
বীথি: বাঁধাই এক টাকা, আরাধ বার আনা।
বনমল্লিকা বাঁধাই এক টাকা।
দ্বারাবতী
নাটিকা) মূল্য আট আনা।
=
,
=
কবিসম্রাট রবীন্দ্রনাথ লিখিয়াছেন :-
“মাসিক পত্রে আপনার যে কোনাে কবিতা পড়িয়াছি তাতেই
বিশেষ আনন্দ পাইয়াছি। আপনার কবিতা আমাদের বঙ্গসাহিত্যে
চিরদিন অম্লান শােয় বিরাজ করিবে।
।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.