Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Goswami Sri Raghunathdas Ed. 2nd

2010/02/3

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ঐশ্রীগুরুঙ্গেী জয়তঃ
bYyqনী,
মীরঘুনাথস
শ্ৰী শ্ৰীব্ৰহ্মমাধ্বগৌড়ীয়-সম্প্রদায়ৈক-সংরক্ষক ও বিষ্ণুপাদ অষ্টোত্তরশতী
শ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গােস্বামী প্রভুপাদের
কৃপাদেশে ও অনুকম্পায়
তদাশ্রিত গৌড়ীয়-সম্পাদক
শ্রীসুন্দরানন্দ বিদ্যাবিনােদ বিএ
কর্তৃক সঙ্কলিত
গৌরাব্দ-৪৪৩
দ্বিতীয় সংস্করণ ]
[ ভিক্ষা।• আনা মাত্র

১নং উল্টাডিঙ্গি জংসন রােড, কলিকাতা
শ্রীগৌড়ীয়মই হইতে
শ্রীকুঞ্জবিহারী বিদ্যাভূষণ-কর্তৃক
প্রকাশিত।
২৪৩২ আপার সারকুলার রােড, কলিকাতা
গৌড়ীয় প্রিন্টিং ওয়ার্কসে
অনন্তবাসুদেব বিদ্যাভূষণ বি, এ
কর্তৃক মুদ্রিত।

শ্রীশ্রীগুরুগৌরঙ্গি
QYg
সীরনাথ
নমুনাথের আবির্ভাব
হুগলী জেলার অন্তর্গত ই, আই, আর লাইনে
*ত্রিশবিঘা রেলস্টেসনের সন্নিহিত সরস্বতী নদীর
তটে অবস্থিত সপ্তগ্রাম এককালে বাঙ্গালার প্রসিদ্ধ
বন্দর ও সমৃদ্ধিসম্পন্ন বিশিষ্ট নগর ছিল। এই
নগরের অন্তঃপাতী শ্ৰীকৃষ্ণপুর-গ্রাম। এই গ্রামে
হিরণ্য ও গােবর্ধন দাস নামক জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ
সহোদর বিপুল সম্পত্তির অধীশ্বররূপে বাস করিতেন।
বর্তমানকালে এইস্থানে শ্রী শ্রী রাধাগােবিন্দ শ্রীবিগ্রহ
একটী মন্দিরাভ্যন্তরে বিরাজিত। শীগগাবর্ধন দাসের
প্রতিষ্ঠিত (?) শ্ৰীমন্দিরের সম্মুখে একটী বিস্তৃত

গােস্বামী স্ত্রীরঘুনাথদাস প্রাঙ্গণ। কোন নাটমন্দির নাই, কেবল একটী জগমােহন আছে। কলিকাতা সিমলা-নিবাসী শ্ৰীযুক্ত হরিচরণ ঘােয কিছুদিন পূর্বে মন্দিরটীর সংস্কার বিধান করিয়া দিয়াছেন। মন্দির প্রাঙ্গণটী প্রাকার-পরিবেষ্টিত। যে গৃহে শ্রীবিগ্রহ বিরাজিত, তাহারই সংলগ্ন একটি ক্ষুদ্র গৃহে শ্রীল দাস গগাস্বামী প্রভুর ভজনাসন বলিয়া একটা নাতি- উচ্চ প্রস্তর-আসন (১৪০ হাত দীর্ঘ, ১ হাত প্রস্থ ও দ• হাত উচ্চ) নির্দিষ্ট হইয়া থাকে। কিংবদন্তী, এই আসনে উপবিষ্ট হইয়া শ্ৰীল দাস গােস্বামি-প্রভু ভজন করিতেন। শ্ৰীমন্দিরের পাশে স্বল্পতোেয়া স্রোতােহীনা সরস্বতী নদী কৃশা মলিনার ন্যায় বিরাজিতা থাকিয়া আজও যেন কৃষ্ণপুরের অতীত গৌরবের স্মৃতি ও নিদর্শন হৃদয়পটে উদয় করাইয়া দিতেছে। হিরণ্য ও গােবর্ধন দাসের বংশগত উপাধি বিশেষরূপে জানা না গেলেও ইহারা যে কায়স্থ- কুলােদ্ভুত সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য পুরুষ ছিলেন, তাহা জানা যায়। ইহাদের রাজপ্রদত্ত উপাধি ‘মজুমদার। ইহাদের বাৎসরিক খাজনা আদায় তদানীন্তন বারু রঘুনাথের আবির্ভাব লক্ষ মুদ্রা ছিল। শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর প্রকটকালে নবদ্বীপ সমৃদ্ধ নগর থাকিলেও উহা হিরণ্য ও গােবর্ধনের আশ্রিত বিদ্যানুশীলনরত ব্রাহ্মণগণেরই বাসস্থল ছিল মাত্র। সেই শুদ্ধ বিগণ হিরণ্য ও গােবর্ধনের প্রতিপাল্য থাকিয়া তাহাদেরই প্রদত্ত অর্থ, ভূমি ও গ্রামাদি দ্বারা জীবনযাত্রা নির্বাহপূর্বক অধ্যাপনাদি কাৰ্য্য করিতেন। ব্রাহ্মণের প্রতি তাহাদের অসাধারণ মৰ্য্যাদা ছিল এবং দান-বিষয়ে তঁাহারা মুক্তহস্ত ছিলেন। শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর মাতামহ নীলাম্বর চক্রবর্তীর সহিত ইহাদের অনুগত-ভ্রাতৃ-সম্বন্ধ ছিল ; এইজন্য মহাপ্রভু ইহাদিগকে ‘আজা’ বা মাতামহ বলিয়া ডাকিতেন। মিশ্রপুরন্দরকেও ইহার পূর্বে অনেক সেবানুকূল্য করিয়াছিলেন। শ্রীঅদ্বৈতাচাৰ্য প্রভুকেও ইহারা যথেষ্ট সেবা ও শ্রদ্ধাভক্তি করিতেন। যদিও ইহারা ব্রাহ্মণের সহায়ক ছিলেন, তথাপি মহাপ্রভু ইহা- দিগের বিষয়ানুরক্তি দেখিয়া ইহাদিগকে ‘বৈষ্ণবপ্রায়’ বলিয়াছেন অর্থাৎ ইহারা শুদ্ধ বৈষ্ণব নহেন। শ্ৰীমন্মহাপ্রভু জাগতিক জাতিকুলের নিরর্থকতা ও বৈষ্ণবের আবির্ভাবের সহিত শেক্তি বা যৌন- সম্বন্ধের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা জানাইবার জন্য যে ••

৪
গোস্বামী শ্রীরঘুনাথদাল
হিরণ্য-গগাবর্ধন দাসকে “বিষয়-বিষ্ঠাগৰ্ত্তের কীড়া,
“শুদ্ধবৈষ্ণব নহে, বৈষ্ণবের প্রায় প্রভৃতি বলিয়া-
ছেন, তাহাদেরই গৃহে বিষয়-বৈরাগ্যের আদর্শ-প্রতি-
মূর্তি বৈষ্ণবাচাৰ্য-সম্রা শ্ৰীল রঘুনাথ দাস গােস্বামী-
প্রভু আবিভাব-লীলা প্রকাশ করিয়াছেন। স্বতঃ-
প্রকাশ সূৰ্য্য পূর্বদিকে আবির্ভূত হয় বলিয়া
পূর্বদিক যেরূপ সূৰ্য্যের জননী নহে, সেইরূপ
বৈষ্ণব-সূৰ্য্য কোন বিশেষ-কুলে বা বিশেষ-গৃহে
আবিভূত হইলেও সেই কুল বা পুরুষবিশেষ
বৈষ্ণবের কারণ বা জনক নহেন। আনুমানিক
১৪১৬* শকাব্দায় হিরণ্য মজুমদারের কনিষ্ঠ সহােদর
গগাবর্ধন মজুমদারের গৃহে শ্রীল রঘুনাথ দাসের
আবির্ভাব হয়। কায়স্থ ও বিষয়ী গাের্পনের গৃহে
আবিভূত হইয়াছিলেন বলিয়া প্রভুবর দাস-গগাস্বামী-
রঘুনাথকে কায়স্থ বা বিষয়ী কৰ্ম্মনিপুণ ব্রাহ্মণাদি
জাতির অন্তর্গত মনে করিলে স্ব-প্রকাশ-সূর্যকে
* কাহারও কাহারও মতে রঘুনাথের আবির্ভাব-কাল ১৪২৮ শকাব্দা,
প্রকটস্থিতি ৭৬ বৎসর, বৃন্দাবন-বাস ৪৯ বৎসর, গৃহে স্থিতি ১৯ বৎসর,
নীলাচল-বাস ৮ বৎসর এবং অন্তর্ধান ১৫.৪ শকাব্দ (শ্রীসজ্জনতােষণী
২য় খণ্ড ২৬ পৃঃ দ্রষ্টব্য)।

রঘুনাথের আবির্ভাব
।
‘পূর্বদিকের পুত্র', বা নৃসিংহদেবকে ‘স্তম্ভ-পুত্র’, কিম্বা
বরাহদেবকে ‘ব্ৰহ্মনাসারন্ধ-পুত্র’, ‘জলপুত্র’ এবং
‘বিষ্ঠাজি-শূকর-জাতি’ বিচার করিবার ভ্রমে
পতিত হইতে হয়। শাস্ত্র এইরূপ বিবৰ্ত্ত-বিপদ হইতে
রক্ষা করিবার জন্য ঐরূপ মহাভ্রান্ত বিচারকে
“ভীষণদপি ভীষণ অমার্জনীয় অপরাধ” বলিয়া
জানাইয়াছেন। শ্ৰীমন্মহাপ্রভুও সেই আদর্শ প্রচার
করিয়াছেন। যাহার
যাহার “বাপ জেঠা বিষয়-বিষ্ঠা-
গর্তের কীড়া”, তিনিই আবার মহাপ্রভুর বিচারে
আচাৰ্য-শিরোমণি গােস্বামী—নিখিল ব্রাহ্মণের
উপদেষ্টা। ইহা হইতেই জানা যায়, মহাপ্রভু
শৌক্র বা যৌন-বিচার অবলম্বন করেন নাই, তিনি
বৃত্তবিচার অবলম্বন করিয়াছেন—“বিষয়-বিষ্ঠা-গর্তের
কীড়া-প্রসূতকে ‘গােস্বামী বলেন নাই, অথবা
গােস্বামীর শৌক্র (?) পুত্রকে ‘গােস্বামী বলেন
* অর্চে বিষ্ণেী শিলাধীগুরুষু নৱমতিবৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি-
বিষ্ণোর্ব বৈষ্ণবানাং কলিমলমথনে পদতীর্থেহবুদ্ধি।
ঐবিষ্ণোর্নাম মন্ত্রে সকল-কলুষহ শব্দ সামান্তবুদ্ধি-
বিষ্ণৌ সর্বেশ্বরেশে তদিতবসমধী বা নারকী সঃ।
(পদ্মপুরাণ)

গােস্বামী স্ত্রীরঘুনাথদাস নাই। তিনি রঘুনাথে ব্রাহ্মণাধীন কায়স্থবুদ্ধির আদর্শ প্রদর্শন করিলে রঘুনাথকে নিখিল ব্রাহ্মণ- গণের গুরু-আচাৰ্য-উপদেষ্ট-স্বরূপ ‘গােস্বামী’পদে অভিষিক্ত করিতেন না।

বাল্যে নমুনাথের সাধুসঙ্গ হিরণ্য-গগাবর্ধনের পুরােহিত বলরাম আচার্য্য হিরণ্য-গগাবর্ধনের গৃহের অনতিদূরে চাদপুর নামক গ্রামে বাস করিতেন। বলরাম আচাৰ্য্য নামাচাৰ্য্য শ্রীল ঠাকুর হরিদাসের কৃপাপাত্র ছিলেন। ঠাকুর হরিদাস কোনও সময় বলরাম আচার্যের গৃহে ভিক্ষা নির্বাহ পূর্বক নিরন্তর নামকীর্তনুশীলন করিতে- ছিলেন। সেই সময় বালক রঘুনাথ পুরােহিত বলরাম আচার্যের গৃহে অধ্যয়ন করিতেন। অধ্যয়নার্থ আগমন-কালে রঘুনাথ প্রত্যহ হরিদাস ঠাকুরের দর্শন ও সঙ্গ লাভ করিয়া ঠাকুরের কৃপাভাজন হইলেন। বলরাম আচাৰ্য প্রকৃতই পুরের হিতকারী ‘পুরােহিত ছিলেন। তিনি নামাচাৰ্য হরিদাসের প্রতি জাতিবুদ্ধি করিবার পরিবর্তে ‘অপ্রাকৃত গুরু- বুদ্ধি করিতেন, তাই নিজ গৃহে রাখিয়া প্রাণের সাধে ঠাকুরের সঙ্গ ও সেবা করিয়াছিলেন। এক- দিন গােপাল চক্রবর্তী নামক কোন এক কৰ্ম্মজড়- স্মাৰ্তাবলম্বী ব্রাহ্মণ-ত্রুব নামাচাৰ্য্য হরিদাসকে হিরণ্য-

৮
গােস্বামী স্ত্রীরঘুনাথদাস
গগাবর্ধনের সভায় অপমান করিলে বলাই পুরােহিত
সেই “ঘটপটিয়া মূখ” ব্রাহ্মণ-ত্রুবকে যথেষ্ট তিরস্কার
ও ব্রাহ্মণ-সহায় মজুমদারের দ্বারা গােপাল চক্রবর্তীকে
চিরতরে বহিষ্কৃত করাইয়াছিলেন। হিরণ্য- গাবর্ধনের
গুরু-পুরােহিত শ্ৰীযদুনন্দন শ্রীঅদ্বৈতাচার্যের অন্তরঙ্গ
শিষ্য ছিলেন। শ্রীঅদ্বৈতাচাৰ্য-বিরােধী, অদ্বৈত
সন্তানব্রুব, কৰ্ম্মজড়ষ্যার্তগণের পাষণ্ড-বিচারের
প্রতিকূলে শ্ৰীযদুনন্দন আচাৰ্য শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকেই
‘স্বয়ং ভগবান্ এবং বৈষ্ণবে ‘অপ্রাকৃত বুদ্ধি পােষণ
করিতেন। তিনি এল বাসুদেব দত্ত ঠাকুরের
অশেষ কৃপাপাত্র ছিলেন।

নমুনাথ পলায়ন-চেষ্টা • নিত্যসিদ্ধ গৌরজন রঘুনাথ যে মুহূর্তে গৌর-- সুন্দরের নাম শুনিলেন, সেই মুহূর্তেই গৌরাঙ্গ- চরণে আত্মসমর্পণ করিলেন। রঘুনাথের এই আত্ম- সমর্পণ নূতন বা সর্বপ্রথম নহে; তিনি নিত্যকাল গৌরাঙ্গচরণে প্রণত। গৌরাঙ্গের নিত্যভৌম-লীলায় জগজ্জীবকে গৌরাঙ্গচরণে আত্মসমর্পণ শিক্ষা দিবাব জন্য নিত্যকাল তিনি এই প্রকার আত্মসমর্পণের লীলা আবিষ্কার করিয়া থাকেন। যেদিন হইতে রঘুনাথ মহাপ্রভুর কথা শুনিলেন, সেইদিন হইতেই তাহার নিত্যসিদ্ধ অনুরাগনল তীব্র হইতে তীব্রতর হইয়া জ্বলিয়া উঠিল। তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। গৃহ, দ্বার, হস্তী, অগ, রথ, নিখিল ঐশ্বৰ্য্য, অধ্যয়ন -সকলই তাহার নিকট অকিঞ্চিৎকর হইয়া উঠিল ; নীলাচলে কৃষ্ণানুসন্ধান-লীলাকারী বিপ্র- লন্ত-বিগ্রহ মহাপ্রভুর বিরহে উন্মত্ত হইয়া রঘুনাথ নীলাদ্রি যাইবার জন্য গৃহ হইতে পলায়নের চেষ্টা করিলেন। গােবর্ধন মজুমদার কয়েকবার পলায়ন = গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস পর রঘুনাথকে পথ হইতে বাঁধিয়া আনিয়া গৃহে রাখিলেন। রঘুনাথ যাহাতে আর পলাইতে না পারেন, তদভিপ্রায়ে গােবর্ধনদাস সবসময় পুত্রের নিকট পাঁচ জন প্রহরী এবং পুত্রের সান্ত্বনা প্রদান ও সেবাদি করিবার জন্য চারিজন সেবক ও দুইজন ব্রাহ্মণ নিযুক্ত করিলেন । রঘুনাথ নিত্যসিদ্ধ বৈরাগ্য-ধৰ্ম্মে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বাল্যকাল হইতেই পুত্রের বহির্মুখ-সংসারে উদা- সীনতা ও মহাভাগবত-বৈষ্ণব-সঙ্গে হরিকথা শ্রবণ- কীৰ্ত্তনাদিতে অনুরাগ লক্ষ্য করিয়া বিষয়াসক্ত মাতা- পিতা একমাত্র সন্তান ও বিপুল ঐশ্বর্যের ভাবী অধিকারী রঘুনাথকে সংসার-শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত করিবার আশায় একটী পরম রূপলাবণ্যবতী, অপ্সরাতুল্যা সুলক্ষণা কন্যার সহিত রঘুনাথের বিবাহ দিলেন। উত্তম বসন-ভূষণ, স্র-চন্দনাদি যেরূপ ক্ষুধানল- সন্তপ্ত পুরুষের তৃপ্তি-বিধানে সমর্থ হয় না, তদ্রুপ ইন্দ্রসম ঐশ্বৰ্য্য ও অপ্সরাতুল্যা ভাৰ্যা প্রভৃতিও বিপ্রলম্ভ-বৈরাগ্যানলে অনুক্ষণ দগ্ধচিত্ত রঘুনাথের তৃপ্তি আনিতে পারিল না।

শান্তিপুরে মহাপ্রভুর দর্শন
শ্ৰীমন্মহাপ্রভু সন্ন্যাসলীলা প্রকাশপূর্বক শান্তি-
পুর হইয়া নীলাচলে গমন করিলেন। দ্বিতীয়বার
বৃন্দাবন-গমনােদ্যোগের লীলা প্রকাশ করিয়া নীলা-
চল হইতে কানাইর নাটশালা পর্যন্ত বিজয় এবং
বৃন্দাবন-গমনের চেষ্টা পরিত্যাগ পূর্বক পুনরায় শান্তি-
পুরে অদ্বৈত-গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। সন্ন্যাসের
পর মহাপ্রভুর শান্তিপুরে এই দ্বিতীয়বার আগমন।
রঘুনাথ যখন শুনিলেন, তঁাহার প্রাণের আরাধ্যবস্তু
গৌরসুন্দর শান্তিপুরে অদ্বৈতগৃহে আসিয়াছেন, তখন
তিনি পিতার নিকট নিবেদন করিয়া বলিলেন,
“আমাকে প্রভুর চরণ-দর্শনার্থ শান্তিপুর-গমনে আজ্ঞা
প্রদান করুন, অন্যথা আমার প্রাণ থাকিবে না।”
গগাবর্ধনদাস অগত্যা বহু প্রহরী, লােকজন ও
দ্রব্যাদি সহ পুত্রকে শান্তিপুরে পাঠাইলেন এবং
অতি শীঘ্র ফিরিয়া আসিবার জন্য অনুরােধ
করিলেন। রঘুনাথ-বিরহ-ব্যাকুল রঘুনাথ পাগলের
মত হইয়। ছুটিয়া আসিয়া সাগরগামিনী জাহ্নবীর

গােস্বামী স্ত্রীরঘুনাথদাস ন্যায় শ্রীচৈতন্যচরণ-সাগরে সাষ্টাঙ্গে পতিত হইলেন। প্রভু রঘুনাথকে পদরজঃ প্ৰদান করিয়া কৃপা করিলেন অদ্বৈতাচাৰ্য গােবর্ধনদাসের সম্বন্ধে স্নেহময় হইয়া রঘুকে মহাপ্রভুর সঙ্গ-প্ৰসাদ ও উচ্ছিষ্টপাত্র প্রদান পূর্বক রঘুর প্রতি যথেষ্ট কৃপাবৰ্ষণ করিলেন। রঘু শান্তিপুরে মন্মহাপ্রভুর পাদসমীপে সপ্তদিবসকাল অবস্থান করিয়া, অহােরাত্র নিজ মনােব্যথা প্রভুর চরণে জানাইয়া বলিলেন,-“প্রভো, আমি কেমন করিয়া বিষয়ী পিতার নিযুক্ত প্রহরীগণের হস্ত হইতে মুক্তি পাইব ? প্রভে, কেমন করিয়া নীলাচলে আপনার পাদপদ্ম-সন্নিধানে অবস্থান করিতে পারিব ? সন্তর্যামী মহাপ্রভু নিত্যসিদ্ধ প্রভুকুলের প্রভু মহাপ্রভু জানিতেন যে, নিত্যসিদ্ধ প্রভু রঘুনাথ তাঁহার নিত্য-কিঙ্কর রঘুনাথ কৃষ্ণ-বিরহে-বিপ্র- লন্তবারিধিতে নিত্য অভিষিক্ত; তথাপি জগতে অযুক্ত, অস্থির, কৃত্রিম, ফল্প, অস্থায়ী, খণ্ড, ‘লােক- দেখান’, তথাকথিত বৈরাগ্য প্রদর্শনের বিকট ও ব্যর্থ অভিনয় হইতে লােকদিগকে রক্ষা করিবার জন্য নিত্যসিদ্ধ যুক্তবৈরাগ্যবান্, বৈরাগ্যবপু রঘুকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন,- শান্তিপুরে মহাপ্রভুর দর্শন স্থির হঞ। ঘরে যাও, না হও বাতুল। ক্রমে ক্রমে পায় লােক ভবসিন্ধুকূল । মর্কট-বৈরাগ্য না কর লােক দেখাঞ। যথাযােগ্য বিষয় ভুঞ্জ অনাসক্ত ইঞা। অন্তর নিষ্ঠা কর বাহে লােকব্যবহার। অচিরাৎ কৃষ্ণ তােমায় করিবেন উদ্ধার ॥” -মহাপ্রভুর এই উপদেশ-রত্নটী রত্নের মধ্যে কৌস্তুভ-মণি; ইহা সাধন-ধানে যাত্রিগণের ভব- সংসার-সাগরের অন্তঃস্থিত মহা-সতর্কালােক-স্তম্ভ স্বরূপ। ঘঁহারা সত্য সত্য সাধন-রাজ্যে প্রবেশ করিয়াছেন, তঁাহারা, এই উপদেশের প্রতিবর্ণের গুরুত্ব কত অধিক, তাহা অনুভব করিতে পারিবেন। প্রত্যেক সাধক-জীবনের হৃদয়ফলকে মহাপ্রভুর এই কয়েকটী কথা আদর্শ-নীতিবাক্যরূপে হীরক-মণ্ডিত করিয়া রাখা উচিত। এই উপদেশ-বাক্য হইতে একটুকু বিচলিত হইলেই আমাদিগকে হয় ‘ভােগী’, হয় ‘ফ-ত্যাগী’, অথবা ‘প্রাকৃত-সহজিয়া’ হইয়া পড়িতে হইবে। মহাপ্রভু রঘুনাথকে আশ্বাস দিয়া বলিলেন যে, প্রভু যখন বৃন্দাবন দর্শনপূর্বক নীলাচলে আসিয়া

১৪
গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস
অবস্থান করিবেন, সেই সময় রঘু কোন ছলে
নীলাচলে আসিয়া প্রভুর নিকট অবস্থান করিতে
পারিবেন। কৃষ্ণের সেবার জন্য যাহার আর্তি,
তাহাকে কেহ রাখিতে পারে না, তঁাহার জন্য কৃষ্ণই
সকল সুযােগ করিয়া দেন। যাহাদের কৃষ্ণ-ভজনের
প্রকৃত আৰ্ত্তি নাই, লােকদেখান অভিনয় মাত্র
আছে, কৃষ্ণ-মায়া তাহাদিগকে বঞ্চনা করেন। ইহা,
বলিয়া মহাপ্রভু রঘুনাথকে বিদায় দিলেন।

হে প্রত্যাবর্তন রঘুনাথ গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়া বহি-বৈরাগ্যের অভিনয় সকলই পরিত্যাগ করিলেন। বাহে বিষয়াসক্তির অভিনয় দেখাইয়া মাতাপিতাকে বঞ্চনা পূৰ্ব্বক অন্তরে কৃষ্ণ-ভজনের বিপুল বৈরাগ্যে অধিষ্ঠিত থাকিলেন। বাহ্যদৃষ্টিসম্পন্ন বিষয়ী মাতা- পিতা রঘুনাথের বাহ-চেষ্টা দেখিয়া এবং অন্তর- চেষ্টায় প্রবেশ করিতে সম্পূর্ণ অসমর্থ থাকিয়া পুত্র “পুনমূর্ষিকো ভব”-মন্ত্রে দীক্ষিত হইতেছেন, বিচার- পূর্বক আনন্দিত হইলেন। সুতরাং রঘুনাথের প্রতি প্রহরী-বেনাদির শিথিলতা করিলেন। এই প্রকারে কিছুদিন অতিবাহিত হইলে একদা রঘুনাথ শুনিতে পাইলেন যে, মহাপ্রভু বৃন্দাবন হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন। ইহা শুনিয়াই রঘুনাথ মহাপ্রভুর নিকট যাইবার উদ্যোগ করিলেন। কিন্তু বৈষয়িক কোন দুর্ঘটনাবশতঃ তাহাকে আরও একবৎসর গৃহে অবস্থান করিতে হইল। ঘটনাটী এই,-পূর্বে এক মুসলমানসপ্তগ্রামের অধিকারী ছিলেন, পরে হিরণ্যদাস তাঁহাকে অধিকার-চ্যুত গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস করায় সেই মােসলেম চৌধুরী হিরণ্যদাসের প্রতিপক্ষ হইয়া দাড়াইলেন এবং নবাবের উজিরের সাহায্যে সপ্তগ্রাম অধিকার করিয়া হিরণ্য-গগাবর্দ্ধনকে বন্ধন করিবার চেষ্টা করিলেন। হিরণ্য-গগাবর্ধন পলাইয়া গেলেন। মোসলেম চৌধুরী রঘুনাথকে বন্ধন করিলেন এবং বন্দী রঘুনাথকে নানাপ্রকার ভয় প্রদর্শন ও ভৎসনা করিয়া বলিলেন, যদি রঘুনাথ তঁাহার জ্যেষ্ঠ- তাত ও পিতাকে শীঘ্র আনয়ন না করেন, তাহা হইলে তাহাকে যথেষ্ট যাতনা ভােগ করিতে হইবে , কিন্তু মােসলেম চৌধুরী নিৰ্ম্মম-হৃদয় হইলেও রঘু- নাথের মুখ-দর্শনে তাহার উপর আর কঠোর অবিচার করিতে পারিলেন না। কৃষ্ণ-ভ জন-পরায়ণ সুচতুর রঘুনাথ মােসলেম চৌধুরীকে মান দান করিয়া মধুর বাক্যে তাহার কোপ-শান্তি করিলেন। মােসূলেমের হৃদয় এতদূর আদ্র হইল যে, তাহার দুই চক্ষু দিয়া রঘুনাথের প্রতি স্নেহ-কৃতজ্ঞতা-জ্ঞাপক অশ্রু নির্গত হইতে থাকিল। মােসূলেম চৌধুরী উজিরকে জানাইয়া রঘুনাথের বন্ধন মােচন করিয়া দিলেন। রঘুনাথও জ্যেষ্ঠতাত হিরণ্য মজুমদারের সহিত মােসলেম চৌধুরীর মিলন করাইলেন।

গৌর-বিরহােন্মনমুনাথ
রঘুনাথ এইবার মুক্ত হইয়াই নীলাচলে প্রভুর
নিকট পলাইয়া যাইবার ইচ্ছা করিলেন। একদিন
রাত্রিকালে শয্যা হইতে উঠিয়া রঘুনাথ একাকী
নীলাচলের পথে পলাইয়া যাইতেছিলেন, গােবন
দাস তাহাকে বহুদূর হইতে ধরিয়া গৃহে লইয়া
আসিলেন। কিন্তু ধরিয়া আনিলে কি হয়, রঘুনাথ
যে কৃষ্ণ-বিরহ-বাতুল হইয়াছেন।
সুযােগ পাইয়া
রঘুনাথ আবার পলাইলেন—পুনঃ পুনঃ পলাইয়া
যাইতে লাগিলেন। যতবার পলাইয়া যান, ধনাঢ্য
পিতা একমাত্র পুত্রকে যথেষ্ট লােজন দ্বারা
ততবারই ধরিয়া অনান। অবশেষে গােবর্ধন-পত্নী
পুত্রকে বাঁধিয়া রাখিবার জন্য পতির নিকট
জানাইলেন। গােবন দাস পুত্রের প্রেমােন্মাদ
বুঝিতে পারিয়া পত্নীকে বলিলেন,
“ইন্দ্রসম-ঐশ্বৰ্য্য, স্ত্রী-অপরা সম।
এ সব বান্ধিতে নারিলেক যার মন।
দড়ির বন্ধনে তারে রাখিবা কেমতে ?
জন্মদাতা পিতা নারে প্রারব্ধ খাইতে।
চৈতন্যচন্দ্রের কৃপা হাছে ইহারে।
চৈতন্য প্রভুর বাতুল কে রাখিতে পারে ?

পানিহাটিতে
পতিতপাবন নিত্যানন্দ প্রভু যখন পানিহাটিতে
রাঘব পণ্ডিতের গৃহে প্রেমের প্লাবন প্রবাহিত করিয়া
স্ত্রী-বৃদ্ধ-বালক-যুব সকলকে প্রেম-বারিতে অভিষিক্ত
করিতেছিলেন, সেই সময় রঘুনাথ পিতার আজ্ঞা
গ্রহণ পূর্বক পানিহাটি-গ্রামে উপস্থিত হইলেন। ।
রঘুনাথ পানিহাটিতে পৌছিয়া
দেখেন, প্রভু
নিত্যানন্দ সুরধুনীতীরে একটি বৃক্ষমূলে পীঠোপরি
উপবিষ্ট রহিয়াছেন এবং নিম্নে বহু ভক্ত প্রভুকে
বেষ্টন করিয়া কৃষ্ণকীর্তনে প্রমত্ত আছেন। রঘুনাথ
নিত্যানন্দ প্রভুকে কিছু দূর হইতে সাষ্টাঙ্গে দণ্ডবৎ
করিলেন। একজন সেবক নিত্যানন্দ প্রভুকে রঘু-
নাথের কথা জানাইলে নিত্যানন্দ তাহার অন্তরঙ্গ
নিজ জন রঘুনাথকে
স্নেহমাখা-ডাকে ডাকিয়া
,
বলিলেন,
* * চোরা দিলি দরশন।
আয় আয় আজি তােরে করিমু দণ্ডন।”
নিত্যানন্দ রঘুনাথকে নিকটে টানিয়া আনিয়া
রঘুর মস্তকে স্বীয় কোটিচন্দ্র শীতল পদকমল স্থাপন

পানিহাটিতে করিলেন এবং স্ব-গণকে দধি-চিড়া-মহােৎসবে পরি- তৃপ্ত করাইবার জন্য রঘুনাথকে আদেশ করিলেন। নিত্যানন্দ স্বয়ং ধনকুবের বিষয়ী গােবর্ধন দাসের অর্থ স্ব-গণের ভােজনের জন্য রঘুনাথের নিকট যাচা করিয়া পানিহাটিতে চিড়া-দধি-মহামহােৎসবের বিপুল আয়ােজন করিবার আদর্শ অর্থাৎ দণ্ড- মহােৎসব-লীলা দ্বারা জানাইলেন, নিত্যানন-গণ বা শুদ্ধ-ভক্তের সেবা দ্বারাই অর্থশালী ভােগী বিষয়ীর বিত্তশাঠ্যরূপ অনর্থ-নাশ ও নিত্যমঙ্গলােদয় হইয়া থাকে। সেই মহােৎসবে স্ব-গণসহ নিত্যানন্দ প্রভু ধ্যানযােগে মহাপ্রভুকে পানিহাটিতে আনয়ন করিয়া রঘুনাথদাসের চিড়াদধি-মহােৎসব স্বীকার করিলেন। পরদিবস প্রাতঃকালে নিত্যানন্দ গঙ্গাস্নান করিয়া বৃক্ষমূলে উপবিষ্ট আছেন, এমন সময় রঘুনাথ নিতাই- চাদের নিকট আসিয়া চৈতন্যচরণ-প্রাপ্তির জন্য আৰ্ত্তি জানাইয়া বলিলেন,- ‘তােমার কৃপা বিনা কেহ চৈতন্য না পায়। তুমি কৃপা কৈলে তারে অধমেহ পায় ॥” রঘুনাথ জানাইলেন, নিত্যানন্দ-গুরু-প্রসাদ ব্যতীত কেহ শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য লাভ করিতে পারেন না। = গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস নিত্যানন্দ রঘুনাথের চৈতন্যপদ-লাভে ঐকান্তিকী ব্যাকুলতা দেখিয়া রঘুকে কৃপাশীৰ্বাদ করিবার জন্য নিজ ভক্তগণকে অনুরােধ করিলেন এবং স্বয়ং রঘুনাথকে নিকটে ডাকিয়া রঘুর মস্তকে পদ স্থাপন- পূর্বক বলিলেন,-“রঘু, মহাপ্রভু তােমাকে আত্মসাৎ করিবার জন্য লক্ষ্যে চিড়া-দধি- মহােৎসবে আসিয়াছিলেন, সুতরাং তােমার সমস্ত বিঘ্ন বিনষ্ট হইয়াছে। মহাপ্রভু তােমাকে স্বরূপের হস্তে প্রদান করিয়ানিজ অন্তরঙ্গ ভৃত্যরূপে শ্রীচরণে স্থান দিবেন। রঘুনাথ রাঘব পণ্ডিতের সহিত গােপনে পরামর্শ করিয়া নিত্যানন্দ প্রভুর ভাণ্ডারীর হস্তে স্বর্ণল ও শতমুদ্রা প্রণামীস্বরূপ প্রদান করিলেন এবং নিত্যা- নন্দ প্রভুর নিকট ঐ বিষয় আপাততঃ গােপন রাখিতে বলিলেন। রাঘব পণ্ডিত রঘুনাথকে নিজ গৃহে লইয়া গিয়া শ্রীবিগ্রহ প্রদর্শন ও প্রসাদী মাল্য চন্দনাদি দ্বারা রঘুকে অভিষিক্ত করিলেন। পথের জন্য ঘুনাথের সহিত তানেক প্রসাদ দিলেন। রঘুনাথ নিত্যানন্দ প্রভুর মহান্ত-ভৃত্য ও আশ্রিত বর্গকে অভিনন্দনপত্র এবং প্রণামী প্রদান করিতে

পানিহাটিতে
ইচ্ছুক হইয়া সবিনয়ে রাঘব পণ্ডিতের নিকট এক শত
মুদ্রা ও দুই ভােলা সােণা স্থাপন করিলেন। নিত্যা-
নন্দের কৃপাপ্রসাদ প্রাপ্ত হইয়া রঘুনাথ রাঘব
পণ্ডিতকে প্রণামপূর্বক স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন।
গৃহে ফিরিয়া আসিয়া রঘুনাথ আর গৃহের
অন্তঃপুরে যান না, রাত্রিকালে বহিদেশস্থ দুর্গা-
মণ্ডপেই শয়ন করেন। প্রহরিগণ দিবারাত্র সতর্ক
থাকিয়া রঘুনাথের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিয়াছে, যাহাতে
রঘুনাথ আর পলাইয়া যাইতে না পারেন ।
ক্রমে বর্ষাকাল আসিয়া পড়িল, গৌড়দেশের
ভক্তগণ মহাপ্রভুকে দর্শন করিবার জন্য পুরী যাত্রা
করিলেন; কিন্তু রঘুনাথ প্রকাশ্যভাবে গৌড়ীয়-
ভক্তগণের সহিত গমন করিতে পারিলেন না।
প্রহরিগণ কড়া পাহারা দিতেছে, আর কোনপ্রকারে
পলাইয়া গিয়া গৌড়ীয়-ভক্তগণের সহিত মিলিত
হইলেও গােৰ্দ্ধনদাসের ভৃত্যগণ রঘুনাথকে সেখান
হইতে ধরিয়া আনিবে ।

তিনে হাহত্যাগ কিরূপে মহাপ্রভুর পাদপদ্মে উপস্থিত হইতে পারিবেন, রঘুনাথের দিবানিশি এই চিন্তা–আহার- নিদ্রা বা অন্য চিন্তা কিছুই নাই। একদিন রঘুনাথ বাহিরে চণ্ডীমণ্ডপে শয়ন করিয়া আছেন ; শেষরাত্রে গুরুপুরােহিত যদুনন্দনাচাৰ্য মণ্ডপের অঙ্গনে আসিয়া দাঁড়াইলেন, রঘুনাথ আচাৰ্য্যকে দেখিতে পাইয়া দণ্ডবৎ প্রণাম করিলেন। যদুনন্দন আচার্য্যের এরূপ অপ্রত্যাশিত সময়ে আসিবার কারণ এই যে, যদুনন্দনের এক শিষ্য তাহার গৃহদেবতার নিত্য-সেবা করিতেন, সেই শিষ্যটী চাপল্যবশতঃ অৰ্চ্চন ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাওয়ায়, যদুনন্দন সেই শিষ্যকে প্রাতরারাত্ৰিক-সম্পাদনার্থ অনুরােধের জন্য রঘুনাথকে সঙ্গে গ্রহণ করিতে আসিয়াছিলেন। রঘুনাথ গুরুর অনুগমন করিয়া গুরুগৃহাভিমুখে চলিলেন। কতদূর গিয়া গুরুদেবকে কহিলেন,—“প্রভাে, আপনি ঘরে যান, আমি অৰ্চ্চককে পাঠাইয়া দিতেছি।” রঘুনাথ এই ছলে গুরুর নিকট গমনের আজ্ঞা লইয়া প্রথমে সেই জারীকে পঠাইয়া দেিলন এবং তৎপর উপযুক্ত

।
চিরতরে গৃহত্যাগ
সময় বুঝিয়া অতি দ্রুতবেগে পূৰ্বাভিমুখে গমন
করিতে থাকিলেন । শেষরাত্রে প্রহরীরা সকলেই
নিদ্রিত হইয়া পড়িয়াছিল, তাহারা রঘুনাথের
পলায়নের কথা কিছুই জানিতে পারিল না। রঘুনাথ
শ্রীচৈতন্যনিত্যানন্দের চরণ স্মরণ করিতে করিতে
ধৃত হইবার আশঙ্কায় পথ ছাড়িয়া বনে বনে উপপথ
ধরিয়া উদ্ধশ্বাসে চলিতে লাগিলেন। সারাদিনে পনর
ক্রোশ পথ অতিক্রম করিয়া আসিলেন। সন্ধ্যায়
এক গােপ-গৃহে কিছু দুগ্ধ পান করিয়া অত্যন্ত
শ্রান্ত-দেহে গােপের বাথানে পড়িয়া রহিলেন।
এদিকে পরদিন প্রাতে গােবদ্ধ নের গৃহে
রঘুনাথের অদর্শনে মহা-কোলাহল উঠিল। গােবন
দাস মনে করিলেন, রঘুনাথ নিশ্চয়ই পুরী-যাত্রী
গৌড়ভক্তগণের সহিত নীলাচলাভিমুখে যাত্রা
করিয়াছেন। শিবানন্দ সেন গৌড়দেশ হইতে
যাত্রী লইয়া নীলাচলে যাইতেন ; তজ্জন্য তৎসহ
রঘুনাথের অবস্থান অনুমান করিয়া গােবদ্ধ ন দাস
রঘুনাথকে গৃহে পাঠাইয়া দিবার মৰ্ম্মে শ্রীশিবানন্দ
সেনের নিকট এক অনুরােধ-পত্রের সহিত দশজন
লােক পাঠাইলেন। সেই সকল লােক ঝাক ।

২৪ গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস নামক স্থানে পুরী-যাত্ৰী বৈষ্ণবগণের সাক্ষাৎ পাইল। রঘুনাথের সঙ্গে মােটেই দেখা হয় নাই, শিবানন্দ সেন এই কথা জানাইলে গােবদ্ধ ন দাসের প্রেরিত সকল লােকই গৃহে প্রত্যাবর্তন করিল। রঘুনাথের মাতাপিতা বড়ই চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। এদিকে প্রভু-প্রেমে আত্মহারা রঘুনাথ প্রভু-চরণ- লাভের জন্য প্রশস্ত পথ পরিত্যাগ করিয়া উপপথ ও বিভিন্ন কুগ্রামের মধ্য দিয়া চলিতে লাগিলেন। সারাদিন উপবাসী--ক্ষুধা-তৃষ্ণা বােধ নাই, রৌদ্র-বৃষ্টি জ্ঞান নাই, রঘুনাথ নিরন্তর চলিতেছেন—সমস্ত চিত্ত চৈতন্য-চরণ-প্রাপ্তির জন্য তৃষ্ণাতুর। পথে রঘুনাথ কোনদিন কিছু চর্বণ করিয়া থাকেন, কোনদিন বা সারাদিন উপবাসের পর কিছু দুগ্ধ পান করেন, কোনদিন বা কোন অতিথি-বৎসল, করুণ-হৃদয় সুকৃতিশালী মহাত্মার অনুরােধে কিছু রন্ধন করিয়া প্রসাদ গ্রহণ করেন; 'এইরূপভাবে দ্বাদশ দিনে পুরুষােত্তমে উপনীত হইলেন পথে রঘুনাথের তিনদিন মাত্র অন্নভােজন হইয়াছিল।

নীলাচলে রঘুনাথ নীলাচলে উপস্থিত হইয়া দেখেন, তাহার প্রাণপ্রভু শ্রীগৌরসুন্দর শ্ৰীস্বরূপাদি ভক্ত- গণের সহিত উপবিষ্ট আছেন। আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি, তাহা ১৪৩৯ শকাব্দ। রঘুনাথ দূরে থাকিয়া প্রভুকে সাষ্টাঙ্গ-প্রণিপাত করিলেন। মুকুন্দ রঘুনাথের আগমন-বার্তা প্রভুকে নিবেদন করিলে মহাপ্রভু রঘুনাথকে নিকটে ডাকিলেন। রঘু- নাথ তাহার ক্ষুধার অন্ন,—পিপাসার জল-জীবনের জীবাতু-স্বরূপ প্রভুর শ্রীচরণ স্পর্শ করিলেন। প্রভু উঠিয়া রঘুনাথকে দৃঢ় আলিঙ্গনে বদ্ধ করিলেন। রঘুনাথ ক্রমে ক্রমে স্বরূপাদি ভক্ত- গণের চরণ বন্দনা করিলে রঘুনাথের প্রতি প্রভুর কৃপা দর্শন করিয়া সকলেই রঘুনাথকে আলিঙ্গন দান করিলেন। নিত্যসিদ্ধ নিজ জন রঘুনাথের গৃহত্যাগ উপলক্ষ করিয়া মহাপ্রভু অনর্থযুক্ত ভক্তি- সাধক জীবকে শিক্ষা দান করিলেন,

২৬
k
গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস
“প্রভু কহে,—কৃষ্ণকৃপা বলিষ্ঠ সবা হৈতে।
তােমারে কাড়িল বিষয়-বিষ্ঠা গর্ত হৈতে।”
এদিকে ঐকান্তিক গৌর-কৃষ্ণকনিষ্ঠ রঘুনাথ
মনে মনে ভাবিলেন,
* * “কৃষ্ণ নাহি জানি। তব কৃপা কাড়িল
আমা, এই আমি মানি ।”

মহাপ্রভুর শিক্ষা
মহাপ্রভু রঘুনাথকে দেখিয়া ভক্তগণের নিকট
হিরণ্য-গোবনের চরিত্র বর্ণন করিতে থাকিলেন
এবং বলিলেন যে, যদিও হিরণ্যগগাবর্ধন ব্রাহ্মণে
যথেষ্ট শ্রদ্ধাযুক্ত এবং ব্রাহ্মণের প্রতি প্রচুর বদান্য,
তথাপি ঐরূপ দেহাত্ম-বুদ্ধি-প্রসূত অদ্যাভিলাষ,
কৰ্ম্ম ও জ্ঞানমিশ্র অথচ অপ্রতিকূল বিষ্ণু-বৈষ্ণৰ
আনুগত্যাভাস বা লৌকিক-শ্রদ্ধা শুদ্ধভক্তি নহে,
উহা কনিষ্ঠাধিকার মাত্র। হিরণ্য ও গোবর্দ্ধন,
“যদ্যপি ব্ৰহ্মণ্য করে ব্রাহ্মণের সহায়।
শুদ্ধবৈষ্ণব’ নহে, ‘বৈষ্ণবের প্রায়।
তথাপি বিষয়ের স্বভাব হয় মহা-অন্ধ।
সেই কৰ্ম্ম করায়, যাতে হয় ভব-বন্ধ।
হেন বিষয় হৈতে কৃষ্ণ উদ্ধারিলা তােমা।
কহন না যায় কৃষ্ণকৃপার মহিমা ।”
যে মহাপ্রভু একদিন তপনমিশ্র-নন্দন শ্রীল
ঘুনাথ ভট্ট গোস্বামী প্রভুকে “বৃদ্ধ মাতা-পিতার
যাই' করহ সেবন” (চৈঃ চঃ অন্ত্য ১৩১১৩)
এইরূপ আদেশ করিয়াছিলেন, আজ তিনিই আবার
এক

২৮ গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস শ্ৰীল রঘুনাথদাস গােস্বামী প্রভুর প্রতি ব্রাহ্মণ- সহায় পিতা, মাতা ও সুশীল। ভাৰ্য্যা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক কৃষ্ণানুসন্ধানের আদর্শকে কৃষ্ণকৃপার মহিমা বলিয়া স্থাপন করিলেন কেন ? পুত্রের কাছে তাহার সম্মাননীয়, পূজনীয় পিতা ও জ্যেষ্ঠতাতকে ‘বিষয়-বিষ্ঠা-গর্তের কীড়া’ বলা প্রাকৃত নীতিবাদীর চক্ষেও বিগর্হিত ; কিন্তু মহাপ্রভু এ আদর্শ দেখাইলেন কেন? আর পতিপ্রাণ। ভাৰ্যার প্রাণে নিরতিশয় কষ্ট প্রদান করিয়া রঘুনাথের গৃহ- ত্যাগকেই বা মহাপ্রভু অনুমােদন করিলেন কেন? মহাপ্রভু তাহার নিত্যসিদ্ধ পার্ষদভক্ত রঘুনাথের দ্বারা আমাদের ন্যায় অনর্থযুক্ত জীবকে অনেক শিক্ষা দিয়াছেন। যাঁহারা মাতা-পিতার সদাচার, দেব-দ্বিজে ভক্তি, দান-ধ্যান, পুণ্যকৰ্ম্ম প্রভৃতির দোহাই দিয়া বিষয়াসক্ত মাতা-পিতার সেবার ছলে বিষয়ভােগকেই ‘কৃষ্ণসেবা বলিয়া আত্মবঞ্চনা ও লােকবঞ্চনা করিতে চাহেন, অথবা ভাৰ্য্যার কামে মুগ্ধ হইয়া ভাৰ্যার ভক্তির কল্পনা করেন এবং ঐরূপ কল্পিতা ও আত্মেন্দ্রিয়তপণময়ী মিছা ভক্তিতে ভাৰ্যাকে অবস্থিত করিয়া ভাৰ্যার অঞ্চল-ধক হইয়া মহাপ্রভুর শিক্ষা পড়েন, সেই সকল অনর্থযুক্ত কপটভক্তগণকে কৃপা করিবার জন্যই নিত্যসিদ্ধ নিজ-জন রঘুনাথের প্রতি মহাপ্রভুর এই সকল উপদেশ। রঘুনাথ ভট্টকে বৃদ্ধ মাতাপিতার সেবা করিবার নিমিত্ত মহাপ্রভুর উপদেশ-প্রদান—বিষয়াসক্ত, অন্যাভিলাষযুক্ত বা বৈষ্ণব-প্রায় মাতা-পিতার সেবা-শিক্ষা-প্রচার নহে। তপনমিশ্র মহাপ্রভুর একান্ত দাস ছিলেন, তিনি মহাভাগবত, তপনমিশ্রের সহধর্মিণীও মহাপ্রভুতে ঐকান্তিক-ভক্তিবিশিষ্টা; মহাপ্রভুর কাশী-অবস্থান- কালে তাহারা সকলেই সর্বপ্রযত্নে মহাপ্রভুর সেবা করিয়াছিলেন ; তাহার নিত্যকাল মহাপ্রভুর সেবা তাহারা শ্ৰীল রঘুনাথদাস প্রভুবরের মাতাপিতৃনামধারিগণের ন্যায় পুত্রে ভােগবুদ্ধিকারী, বিষয়াসক্ত বা বৈষ্ণবের প্রায় নহেন। তপনমিশ্র সপরিবারে মহাপ্রভুর নিত্যভক্ত—মহাভাগবত। সুতরাং শ্রীরঘুনাথ ভট্টের প্রতি মাতাপিতার সেবার জন্য আদেশ-গৌরভক্ত, মহাভাগবত বৈষ্ণব-সেবার ফলে গৌরচরণ-সেবালাভের আদর্শ জগতে স্থাপন। মহাপ্রভু ফলের দ্বারা কারণ জানাইয়াছেন। বহির্মুখ বা ছলভক্ত জগতে ভক্তাভাস মাতা-পিতার সেবার ; করেন।

গােস্বামী স্ত্রীরঘুনাথদাস নামে বিষয়-ভােগ-প্রবৃত্তির অনুশীলন-ফলে-“জননী- জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী”, “পিতরি প্রীতি- মাপন্নে প্ৰীয়ন্তে সর্বদেবতা” প্রভৃতি লৌকিক-নীতি- বাক্যের আচরণফল স্বর্গাদি পুণ্যময় অনিত্য কুবিষয়- ভােগ লাভ করিতে পারে। কিন্তু মহাপ্রভু রঘুনাথ ভট্টকে সেরূপ শিক্ষা দেন নাই। মহাপ্রভু রঘুনাথ ভট্ট প্রভুর দ্বারা মাতা-পিতার দেবার ফলে অধিকতর বিষয়ভােগে প্রবৃত্ত হইবার আদর্শ প্রদর্শন করেন নাই। মহাপ্রভু রঘুনাথ ভট্টকে বিবাহ করিতে নিষেধ করিয়াছিলেন এবং মাতা-পিতার শ্রীধাম- প্রাপ্তির পর বৃন্দাবন যাইতে আদেশ করিয়াছিলেন। এল রঘুনাথদাস প্রভুর আদর্শ দ্বারা মহাপ্রভুর অভক্তিনীতিবাদিগণকে জানাইলেন, “কাম ত্যজি’ কৃষ্ণ ভজে শাস্ত্র আজ্ঞা মানি। দেব-ঋষি-পিত্রাদিকের কভু নহে ঋণী।” ==

স্বরূপের রানু
শ্ৰীমন্মহাপ্রভু শ্রীল রঘুনাথকে নিজ দ্বিতীয়স্বরূপ
শ্ৰীল স্বরূপের হস্তে সমৰ্পণ করিলেন। সেইদিন
হইতে রঘুনাথ দাস ‘স্বরূপের রঘু’ বলিয়া খ্যাত
হইলেন। অনুপম ভক্তবৎসল মহাপ্রভু নিজ সেবক
গােবিন্দকে ডাকিয়া বলিলেন,-“গােবিন্দ।
রঘুনাথ পথে অনাহারে, অনিদ্রায় কাটাইয়াছে,
সুতরাং তুমি ভাল করিয়া তাহার সন্তর্পণ কর।
মহাপ্রভু রঘুনাথকে সমুদ্র-স্নান করিয়া শ্রীজগন্নাথ
দর্শনান্তে প্রসাদ-সেবনের জন্য বলিলেন। রঘুনাথ
মহাপ্রভুর ভক্তগণের সহিত একে একে মিলিত
হইলেন। রঘুনাথ সমুদ্র-স্নানপূর্বক শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর
আদেশে শ্রীজগন্নাথ দর্শন করিয়া প্রত্যাবৃত্ত হইলে
গগাবিন্দ রঘুনাথকে মহাপ্রভুর ভুক্তাবশেষ প্রদান
করিলেন; রঘুনাথ আনন্দিত হইয়া সেই মহাপ্রসাদ
সম্মান করিলেন।
এইরূপে রঘুনাথ পাঁচদিন শ্ৰল স্বরূপদামােদরের
নিকট অবস্থান মহাপ্রভুর
অবশেষ-পাত্র
পাইলেন। ষষ্ঠ দিবস হইতে রঘুনাথ রাত্রিতে
••

গগাস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস প্ৰসাদার্থিরূপে সিংহদ্বারে প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। পুরুষােত্তমক্ষেত্রে নিষ্কিঞ্চন বিরক্ত- ভক্তগণ এইরূপ সারাদিন নাম-সঙ্কীৰ্ত্তন ও শ্রীজগন্নাথ দর্শন করিয়া সিংহদ্বারে দণ্ডায়মান থাকেন। যদি কেহ কিছু প্রদান করেন, তাহা হইলে তাহারা তাহাতে ভিক্ষা নির্বাহন করেন, নতুবা উপবাসী থাকেন, কাহারও নিকট কিছু চাহেন না।

মহাপ্রভুর উপদেশ গােবিন্দ মহাপ্রভুর নিকট বলিলেন,—“রঘুনাথ - এখানে আর প্রসাদ পান না, রাত্রিকালে সিংহ- দ্বারে অযাচক-বৃত্তি গ্রহণ করিয়াছেন।” মহাপ্রভু নিত্যসিদ্ধ-বৈরাগ্যবপু রঘুনাথকে লক্ষ্য করিয়া জগতের অনর্থযুক্ত সাধকজীবকে শিক্ষাদানকল্পে বলিলেন,-রঘুনাথ উত্তম কাৰ্য্য করিয়াছে, প্রকৃত বৈরাগীর ধৰ্ম্ম আচরণ করিতেছে। বৈরাগী অনুক্ষণ নামসঙ্কীৰ্ত্তন করিবেন, নিজের জীবন-যাত্রার জন্য পরাপেক্ষা করিবেন না। যে পরাপেক্ষা করে, তাহার ভজন-সিদ্ধি হয় না; কৃষ্ণ তাহাকে উপেক্ষা করেন। বৈরাগী ভজন-পরিপক্কতার জন্য দেহ- রক্ষাকল্পে যৎসামান্য ভিক্ষা করিবেন। বৈরাগী হইয়া জিহ্বালম্পট হইলে তাহার পরমার্থ লাভ হয় না, সে চতুর্বিধ প্রাকৃত রসের দাস হইয়া পড়ে; স্থায়ীভাব-রতিতে সামগ্রীর সম্মিলনে যে দাস্য-সখ্যাদি চতুর্বিধ অপ্রাকৃত রস, সেই পরম

৩৪ গােস্বামী স্ত্রীরঘুনাথদাস
প্রয়ােজন অার প্রাপ্ত হইতে পারে না। বৈরাগীর
কৃত্য-নিরন্তর নাম-সঙ্কীৰ্ত্তন। ভজনার্থ জীবনধারণের
জন্য শাক-পত্র-ফল-মূলে উদর-ভরণ ব্যতীত কোন
প্রকার উদর-লাম্পট্যের কিছুমাত্র প্রশ্রয় দেওয়া
বৈরাগীর কর্তব্য নহে। জিহ্বার লালসায় যে ইতস্ততঃ
ধাবিত হয়, সেইরূপ শিশ্নোদরপরায়ণ ব্যক্তি কথনও
কৃষ্ণের সন্ধান পায় না ।
আর একদিন রঘুনাথ তাক্ত গৃহ-সাধকের
মঙ্গলের জন্য আপনাকে
আপনাকে সেইরূপ সাধক-জীব
অভিমান করিয়া শ্ৰীস্বরূপ-দামােদরের নিকট নিজ
কৰ্তব্য জিজ্ঞাসা করিলেন। রঘুনাথ সন্ত্রমবশতঃ
অথবা প্রকৃত ভক্তি-পন্থার অনুসরণ-লীলা-প্রকাশার্থ
স্বয়ং মহাপ্রভুর কাছে কিছু জিজ্ঞাসা করিতেন
, স্বরূপ ও গােবিন্দের দ্বারা অর্থাৎ মহাপ্রভুর
সেবকের আনুগত্যে মহাপ্রভুর নিকট পরিপ্রশ্ন
জানাইতেন। ঐল স্বরূপ-দামােদর মহাপ্রভুর নিকট
রঘুনাথের কথা উল্লেখ করিয়া বলিলেন,-“প্রভাে,
আপনার মুখে রঘুনাথ তঁাহার কর্তব্য শ্রবণ
করিতে চাহিতেছেন।”
স্বরূপের কথা শুনিয়া
মহাপ্রভু ঈষৎ হাসিয়া রঘুনাথকে বলিলেন,-

৩৫ মহাপ্রভুর উপদেশ “আমি ত’ দামােদর-স্বরূপকেই তােমার উপদেষ্টা করিয়া দিয়াছি, তুমি ইহারই নিকট সাধ্য-সাধন- তত্ত্ব শিক্ষা কর। আমিও যে-সকল কথা না জানি, দামােদর-স্বরূপ সে-সকলই জানেন।” এই বাক্য-ভঙ্গী দ্বারা মহাপ্রভু জানাইয়াছিলেন, মাধ্ব- গৌড়ীয়ের নিত্যপ্রভু বা গুরু শ্রীদামােদরস্বরূপই সমগ্র সাধ্যসাধন-তত্ত্বের আচাৰ্য্য। মহাপ্রভু রঘু- নাথকে বলিলেন,-“তথাপি যদি আমার আজ্ঞায় তােমার শ্রদ্ধা হয়, তবে তােমাকে বলিতেছি, শ্রবণ কর।” মহাপ্রভু রাগানুগা-ভক্তিজীর আচার উপদেশমুখে কহিলেন, “গ্রাম্যকথা না শুনিবে, গ্রাম্যবার্তা না বলিবে। ভাল না খাইবে, আর ভাল না পরিবে। অমানি-মানদ হা কৃষ্ণনাম সদা লবে। ব্রজে রাধাকৃষ্ণ-সেবা মানসে করিবে।” “তৃণাদপি সুনীচেন তরােরিব সহিষ্ণুনা । অমানিনা মানদেন কীৰ্ত্তনীয়ঃ সদা হরিঃ।” প্রভুর মুখ হইতে রঘুনাথ এই উপদেশামৃত কর্ণাঞ্জলিপুটে পান করিলেন এবং হৃৎস্বর্ণ-সম্পুটে

গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস
ধারণ পূর্বক মহাপ্রভুর চরণে সাষ্টাঙ্গে পতিত
হইলেন। মহাপ্রভু রঘুনাথকে কৃপালিঙ্গন করিয়া
পুনরায় তাঁহাকে এল স্বরূপের হস্তে সমর্পণ
করিলেন। রঘুনাথ স্বরূপের আনুগত্যে একান্তভাবে
গৌর-কৃষ্ণের অন্তরঙ্গসেবা করিতে লাগিলেন।

নীলাচলে গৌড়ীয়-ভক্তগণ দেখিতে দেখিতে প্রাকৃতিক বর্ষার সমাগমের সঙ্গে সঙ্গে গৌড়াকাশের অপ্রাকৃত ভক্ত-জলদ-শ্রেণী প্রতি বর্ষের ন্যায় এবারও রথযাত্রার পূর্বে নীলাচলে সমাগত হইয়া শ্রীচৈতন্যপাদপদ্মরত্নাকর স্পর্শ করিলেন। ভক্তবাৎসল্য-বারিধি, বিপ্রলম্ভরসসাগর শ্রীচৈতন্যদয়ানিধি ভক্তগণকে লইয়া গুণ্ডিচামাজ্জন, বন্য-ভােজন-মহোৎসব এবং রথাগ্রে অদ্ভুত নৰ্ত্তন- কীৰ্ত্তন-লীলা প্রকাশ করিলেন। রঘুনাথ ভক্ত ও ভগবানের এই সকল অপূর্ব লীলা দেখিয়া চমৎকৃত হইলেন। ভক্তগণের সহিত রঘুনাথের মিলন হইল, অদ্বৈতাচাৰ্য-প্রভু রঘুনাথের উপর উরুকৃপা বর্ষণ করিলেন। শ্রীল শিবানন্দ সেন অনুরােধ-পত্ৰীসহ গগাবর্ধনদাসের রঘুনাথের অন্বেষণার্থ লােক-প্রেরণ এবং রঘুনাথকে না পাইয়া ঝাকরা গ্রাম হইতে প্রত্যাবর্তন প্রভৃতি বিষয় শ্রীরঘুনাথের কর্ণগােচর করিলেন।

শিবানন্দের ব্যুনাথ-প্রশংসা
চাতুৰ্ম্মাস্তের পর গৌড়ীয়-ভক্তগণ যখন পুরী
হইতে গৌড়ে প্রত্যাবর্তন করিলেন, তখন তাহা
জানিতে পারিয়া গােবর্ধন দাস নীলাচল-প্রত্যাবৃত্ত
শিবানন্দ সেনের নিকট রঘুনাথের সংবাদ জিজ্ঞাসা
করিতে লােক পাঠাইলেন। ঐল শিবানন্দ সেন
গগাবর্ধন-দাসের প্রেরিত লােকের নিকট রঘুনাথের
তৎকালিক বৈরাগ্য ও বৈষ্ণবী-প্রতিষ্ঠার প্রশংসা
করিয়া বলিলেন,-
-তেঁহহ হয় প্রভুর স্থানে।
পরম বিখ্যাত হোে কেবা নাহি জানে ।
স্বরূপের স্থানে তারে কৈছেন সমর্পণ।
প্রভুর ভক্তগণের তোহো হয় প্রাণসম।
রাত্রিদিন করে ভেঁহাে নাম-সঙ্কীৰ্ত্তন।
ক্ষণমাত্র নাহি ছাড়ে প্রভুর চরণ।
পরম বৈরাগ্য তার, নাহি ভক্ষ্য পরিধান।
যৈছে তৈছে আহার করি’ রাখয়ে পরাণ ।

শিবানদের রঘুনাথ-প্রশংসা দশদণ্ড রাত্রি গেলে ‘পুস্পাঞ্জলি’ দেখিয়া । সিংহদ্বারে খাড়া হয় আহার লাগিয়া । কেহ যদি দেয়, তবে করয়ে ভক্ষণ। কভু উপবাস, কভু করয়ে চর্বণ ।” প্রেরিত লােক শিবানন্দ সেনের নিকট হইতে রঘুনাথের এই বিবরণ শ্রবণ করিয়া গােবর্ধন দাসের নিকট যথাযথ ঐ সকল কথা বর্ণন করিলেন। কৃষ্ণ- ভােগ্য ভক্তকে নিজভােগ্য-পুত্র-বুদ্ধিকারী সপত্নীক গগাবর্ধন দাস রঘুনাথের কৃষ্ণভজনের জন্য ভোগ- ত্যাগের কথা শুনিয়া অতীব দুঃখিত হইলেন।

নমুনাথের ভিক্ষা কি ? . শ্রীচৈতন্য-লীলার ব্যাস ঠাকুর বৃন্দাবন গাহিয়াছেন, “যত দেখ বৈষ্ণবের ব্যবহার-দুঃখ। নিশ্চয় জানিহ সেই পরানন্দ সুখ। বিষয়-মান্ধ সব কিছুই না জানে। বিদ্যা-ধন-কুলমদে বৈষ্ণব না চিনে।” জগতের বিষয়-সম্প্রদায়--বিদ্যা-ধন-কুল-রূপ- মদমত্ত বহির্মুখ-সম্প্রদায় মনে করেন, বৈষ্ণবগণ তাহাদেরই ন্যায় অভাবগ্রস্ত—তাহাদেরই ন্যায় ভিখারী-উদরভরণের জন্য পরমুখাপেক্ষী—পরের দ্বারে অনুগ্রহপ্রার্থী। বিষয়ী, ভােগী ফল্পবৈরাগ্যের বাহাদুরীটা-মাত্র বোঝে, কিন্তু যুক্তবৈরাগ্যের মহিমা বুঝিতে পারে না। ইহারা জড়সম্ভোগবাদী, তাই বিপ্রলম্ভবৈরাগ্যর কথা বুঝিতে পরে না ; উহারা কামে অতৃপ্ত-জড় অভাবে প্রপ্রীড়িত, তাই কামদেবের কামবর্ধন-কামে অতৃপ্ত---স্বভাবে প্রতিষ্ঠিত হইয়াও অপ্রাকৃত,অভাবে অর্থাৎ বিপ্রলম্ভ- বৈরাগ্যে দগ্ধচিত্ত গৌরভক্তগণের মাহাত্ম্য বুঝিতে রঘুনাথের ভিক্ষা কি ৪১ পারে না। রঘুনাথ অর্থাভাবে কিম্বা অৰ্জন- শক্তির অভাবে অথবা লােক দেখাইবার জন্য চর্বণ-উপবাসের আদর্শ দেখান নাই’–ইতর সাধারণের ন্যায় দগ্ধোদর-ভরণ-চিন্তায় ব্যস্ত হইয়া ভিক্ষার অপেক্ষা করেন নাই, কৃষ্ণানুসন্ধানে প্রমত্ত থাকায় তাহার বাহাপেক্ষা বিন্দুমাত্রও ছিল না ; কিন্তু কৃষ্ণভােগ্য-শুদ্ধসত্বে স্বতভাগ্য-পুত্রবুদ্ধিকারী গােবর্ধনদাস বা তঁাহার পত্নী তাহা বুঝিতে পারেন নাই ; তাহারা মনে করিয়াছিলেন, রঘুনাথ যখন ভিক্ষা করেন, তখন নিশ্চয়ই তঁাহার আর্থাভাব। রঘুনাথের পিতার চিত্তবৃত্তি জগতের নিখিল বহির্মুখ-সম্প্রদায়ে প্রতিফলিত রহিয়াছে। ঐ বহির্মুখ-সম্প্রদায়স্থ ব্যক্তিগণ মনে করেন, বৈষ্ণবগণ অভাবপীড়িত হইয়া তাহাদের দ্বারে অনুগ্রহ-প্রার্থী। এই বুদ্ধিতে কেহ বৈষ্ণবগণের উপকার (?) ও অভাব-নিবারণ (?) করিবার সদাশয়তা দেখাইতে প্রস্তুত, কেহ বা তাহাদিগকে পরমুখাপেক্ষী সার- মেয়ের ন্যায় গৃহ-দ্বার হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দিতে প্রস্তুত ! বহির্মুখ-সম্প্রদায় প্রকৃত বৈরাগী ও বেযােপজীবী বৈরাগীর পার্থক্য ধরিতে পারে না;

৪২ গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস তাই বােঝে না যে, অকিঞ্চনের পরমধন কৃষ্ণের সেবক-বৈষ্ণবগণের ব্যবহার-দুঃখ অন্বয়ভাবে তাহাদের দিক্‌ হইতে কৃষ্ণানুসন্ধানরূপ পরানন্দ-সুখ, আর ব্যতিরেকভাবে জগতের দিকে সকলকে বিষয়ের অনিত্যতা শিক্ষা-প্রদান এবং নিখিল বিষয় দ্বারা অদ্বিতীয় বিষয়-সমুদ্রের পূজায় আকর্ষণ ও আবাহন। গগাবর্ধনদাস বা গােবর্ধনদাসের চিত্তবৃত্তির আদর্শ বিষয়-সম্প্রদায় যদি বৈষ্ণববুদ্ধিতে রঘুনাথ বা কৃষ্ণভােগ্য-ভক্তের সেবানুকূল্য করিতেন, তাহা হইলে উহা দ্বারা শুদ্ধবৈষ্ণব-সেবার ফলস্বরূপ কুবিষয় বিনাশ ও কৃষ্ণবিষয়ানুরক্তি লাভ হইত। কিন্তু কৃষ্ণভােগ্য বস্তুতে স্ব-ভােগ্য-পুত্রবুদ্ধি করিয়া বৈষ্ণবসেবার পরিবর্তে কেবলমাত্র স্বভােগ-পুত্রের সেবা (বা ভােগ ) করিব, কিম্বা বহির্মুখ কপট- সম্প্রদায়ের ন্যায় বৈষ্ণব-সেবার বাহাবরণের ছল লইয়া স্ত্রী-পুত্রাদির সেবা (অর্থাৎ ভােগ) করিব এইরূপ বুদ্ধি থাকিলে মহাপ্রভুর বা কৃষ্ণের তাহাতে প্রীতি হয় না। আমরা ইহার সাক্ষ্য গােবর্ধনদাসের দৃষ্টান্তেই দেখিতে পাই।

শিবানন্দ ও গােবর্ধনের ভুত্যবর্গ গােবর্ধনদাস শিবানন্দসেনের নিকট রঘুনাথের জন্য অর্থসহ যে-সকল লােক পাঠাইয়াছিলেন, শিবানন্দ সেন তাহাদিগকে বলিলেন,—“তােমরা একাকী নীলাচলে যাইতে পারিবে না, এখন ঘরে যাও, যখন আমি গৌড়ীয়-ভক্তগণকে লইয়া নীলা- চলে যাইব, তােমরা সেই পৰ্যন্ত অপেক্ষা কর।” শিবানন্দসেন গােবর্ধনের প্রেরিত লােকগণের নিকট শতমুখে রঘুনাথের গুণকীৰ্ত্তন করিলেন। কাঞ্চনপল্লীনিবাসী বাসুদেব দত্ত ঠাকুরের প্রিয়পাত্র- সুমধুর-মুৰ্ত্তি আচাৰ্য্য যদুনন্দন; তাহারই প্রিয়শিষ্য রঘুনাথ। রঘুনাথ তঁাহার নিজগুণে আমাদের সকলেরই প্রাণাধিক বস্তু। রঘুনাথ শ্রীচৈতন্যের কৃপা-প্রাচুর্যে সতত-স্নাত স্বরূপগােস্বামীর প্রিয় ও বৈরাগ্যরাজ্যের একমাত্র নিধি। নীলাচলে যাহার বাস করেন, তাহাদের মধ্যে এমন লােক নাহ, ৮। একা । এই এক ৪8 গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস যিনি স্বরূপের রঘুকে না জানেন। রঘুনাথ সর্ব- সজ্জনের চিত্ত-তোষণ দ্বারা কোন অনির্বচনীয়া নিত্যসিদ্ধ-সৌভাগ্যভূমি হইয়াছেন—যে ভূমিতে বীজবপনের সঙ্গে সঙ্গেই শ্রীচৈতন্যের অনুপম প্রেমতনু। ফলবান হইয়াছে।

বিষয়ীর অর্থ
শিবানন্দের মুখে রঘুনাথের গুণ শ্রবণ করিয়া
গােবৰ্ধনদাসের প্রেরিত লােকসকল গৃহে ফিরিয়া গেল।
যখন বর্ষান্তরে শিবানন্দের নীলাচলে যাইবার সময়
উপস্থিত হইল, তখন শিবানন্দের নির্দেশানুসারে
তাহার অর্থাদিসহ শিবানন্দের সহিত নীলাচলে
চলিল। নীলাচলে পৌছিয়া গােবর্ধনদাসের প্রেরিত
ভৃত্যদ্বয় ও পাচক ব্রাহ্মণ রঘুনাথের আবশ্যকীয়
ব্যয়-নির্বাহাৰ্থ রঘুনাথের হস্তে চারিশত মুদ্রা
প্রদান করিবার জন্য তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন
এবং অর্থ গ্রহণ করিতে অনুরােধ করিলেন। রঘুনাথ
গগাবর্দ্ধনদাসের প্রেরিত অর্থ অঙ্গীকার করিলেন
। দুইজন সেবক অর্থ লইয়া নীলাচলেই রহিল।
রঘুনাথকে পুনঃ পুনঃ অনুরােধ করায় রঘুনাথ
নিজের জন্য কপর্দকমাত্রও স্বীকার না করিয়া
মহাপ্রভুকে মাসে দুইবার ভিক্ষা করাইবার
আনুকূল্যস্বরূপ অষ্ট পণ কড়ি অর্থাৎ আট আনা

৪৬
গোস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস
মাত্র গ্রহণ করিতে থাকিলেন। এইরূপভাবে
মহাপ্রভুর সেবার জন্য প্রতিমাসে আট আনা মাত্র
গ্রহণ করিয়া দুই বৎসরকাল গােবর্ধনদাস-প্রেরিত
অর্থের কিয়দংশ হইতে মহাপ্রভুর সেবা করিলেন
অর্থাৎ দুইবৎসরে মহাপ্রভুর ভিক্ষার জন্য ১২,
বার টাকা মাত্র খরচ হইল। কিন্তু দুইবৎসর
পরে রঘুনাথ মহাপ্রভুর ঐরূপ নিমন্ত্রণকাৰ্যও
পরিত্যাগ করিলেন।
মাসদ্বয় গত হইল। রঘুনাথ আর মহাপ্রভুকে
নিমন্ত্রণ করেন না দেখিয়া একদিন মহাপ্রভু শ্রীল
স্বরূপদামােদর প্রভুকে জিজ্ঞাসা করিলেন,-“রঘুনাথ
কেন আমার নিমন্ত্রণ ছাড়িয়া দিল ? স্বরূপ
উত্তর করিলেন,“রঘুনাথ বােধ হয় মনে বিচার
করিয়াছেন,
“বিষয়ীর দ্রব্য লঞা করি নিমন্ত্রণ।
প্রসন্ন না হয় ইহায়, জানি প্রভুর মন ।
মাের দ্রব্য লইতে চিত্ত না হয় নিৰ্ম্মল ।
এই নিমন্ত্রণে দেখি, - প্রতিষ্ঠা’-মাত্র ফল।
উপরােধে প্রভু মাের মানেন নিমন্ত্রণ।
মানিলে দুঃখী হইবেক মূখ জন।”

বিষয়ীর অর্থ ৪৭ ভক্ত ও ভগবানের লীলায় কত যে মহতী শিক্ষ। নিহিত আছে, তাহা সেবােম্মুখ পুরুষগণই উপলব্ধি করিতে পারেন। বিষয়ী গােবর্ধনদাসের প্রেরিত অর্থ নিজের জন্য গ্রহণ না করিয়া রঘুনাথের তাহ। মহাপ্রভুর সেবার্থ গ্রহণ সাধারণ বিচারে ত্যাগের আদর্শ বলিয়া বিবেচিত হয়; কিন্তু ভগবদ্ভজন- নিপুণ বৈষ্ণবগণের অসাধারণ বিচারে সেরূপ স্বার্থ- ত্যাগেও কপটতা, অন্যাভিলাষ বা অচিবুদ্ধি লুক্কায়িত আছে জানাইবার জন্যই নিত্যসিদ্ধ প্রভুবর রঘুনাথের কনিষ্ঠাধিকারীর চিত্ত-ভাবের অভিনয়- ছলে দেহসম্বন্ধী পিতামাতার ভােগ্য ধন-দ্বারা মহা- প্রভুর সেবা হইতে পারে, এইরূপ বুদ্ধিবিশিষ্ট কোমলশ্রদ্ধকেও মহতী শিক্ষা দান। এই লীলা- দ্বারা শ্ৰীল রঘুনাথ গােস্বামীপ্রভু আমাদিগকে শিক্ষা দিলেন যে, ভােত্তাভিমানী বিষয়ীর ভােগ- বুদ্ধিস্পৃষ্ট জড়দ্রব্য কখনই চিন্ময় বিষ্ণু-ভােগ্য নহে, তাহা দ্বারা গৌর কৃষ্ণের সেবা হয় না। অহঙ্কার-বিমূঢ় ব্যক্তিগণের ভােগ্য জড়বস্তুর দ্বারা চিন্ময়ী বিষ্ণুসেবার পরিমাণচেষ্টা—অনর্থবৰ্দ্ধিনী ও চিজ্জড়-সমন্বয়মূলা জড়-প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তির আকাঙক্ষ।

৪৮
গগাস্বামী স্ত্রীরঘুনাথদাস
মাত্র। তথাপি বালিশের নিত্যমঙ্গলার্থ ভগবান
কখনও কখনও সেরূপ দ্রব্য গ্রহণের অভিনয় করিয়া
বালিশের ভক্তমুখী সুকৃতি উৎপাদনাৰ্থ অমন্দোদয়-
দয়া করিয়া থাকেন। কিন্তু তিনি অহঙ্কার-বিমূঢ়-
ব্যক্তির দ্রব্য কখনও গ্রহণ করেন না। শ্রীল
সনাতন গোস্বামীপ্রভুর বৃহদ্ভাগবতামৃত গ্রন্থে এই
বিচারটী সুন্দররূপে প্রদর্শন করিয়াছেন—কৃষ্ণ স্বকীয়
স্বাভাবিক ঘনানন্দানুভব দ্বারা সতত সন্তপ্ত এবং
নিজলাভপূর্ণ, কিন্তু সেই ভগবান্ ভক্তবৎসল্যগুণে
নিজ স্বভাবেরও অতিক্রম করিয়া থাকেন। তিনি
সর্বতােভাবে অভাব অপরিগৃহীত হইয়াও নিজ
ভক্তজনপ্রদত্ত প্রেমসম্পত্তি বা পূজা-লাভে পরিপূর্ণ
হইয়া থাকেন। তিনি ভক্তজনপ্রদত্ত ভােগ-সম্পত্তি
দ্বারা পরিপূর্ণ থাকেন বলিয়া অন্যজন অর্থাৎ
অভক্তকৃত পূজার অপেক্ষা করেন না। কিন্তু যদি
প্রশ্ন হয়, ধন-ব্যয়াদিদ্বারা যাহা নিস্পাদিত হইয়া
থাকে, তাহা কিরূপে ব্যর্থ হইতে পারে ? পূজকের
ধন ব্যয়াদি ব্যর্থ হয় না। যেমন, মুখমণ্ডলে যেরূপ
তিলকাদি ধারণ করা যায়, দর্পণে তদনুরূপই প্রতি-
বিম্ব দৃষ্ট হইয়া থাকে ; তদ্রুপ, বিষয়ী ধনব্যয়াদি

বিষয়ীর অর্থ ৪৯ দ্বারা যে ভগবানের পূজা করিতে ধাবিত হন, তাহা অর্ধেক্ষজের ইন্দ্রিয়-তর্পণে অর্পিত না হওয়ায় এবং দেহাত্মবুদ্ধিসম্পন্ন বিষয়ীর কোন ঐহিক-পারত্রিক ফল-কামনায় অর্পিত হওয়ায় ভগবান্ তাহা স্বীকার করেন না, বিষয়ী প্রতিষ্ঠা বা কোন প্রকার ঐহিক- পারত্রিক ফল লাভ করিয়া থাকেন। যদি প্রশ্ন হয়, বিষয়ীর হিতার্থ তৎপ্রদত্ত পূজা করুণাময় ভগবান্ কেন গ্রহণ করেন না ? তদুত্তর এই যে, হিতাহিতবিবেকশূন্য অবিদ্বাবিষয়ী ভগবৎপূজার্থ ধন ব্যয় করিয়া কোন সময় শোকার্ত হইয়া থাকে, তজ্জন্য শ্রীভগবান্ দয়াপরবশ হইয়াই যেন বিষয়ীর পূজার অপেক্ষা করেন না, প্রাকৃত ফলদানে উহা পরিশােধ করিয়া থাকেন। অতএব বিষয়ীর ভােগ্য- দ্রব্য কখনও চিন্ময়-বিষ্ণুভােগ্য নহে। ৪

মহাপ্রভু শিক্ষা
শ্ৰীমন্মহাপ্রভু শ্ৰীল স্বরূপের মুখে রঘুনাথের
সেবােম্মুখচিত্তের বিচার-প্রণালী শুনিয়া বিশেষ
সন্তুষ্ট হইলেন এবং হাসিতে হাসিতে ( সাধক ও
আচাৰ্যগণের সঙ্গ বা ব্যবহারবিধি সম্বন্ধে ) উপদেশ
প্রদান করিয়া বলিলেন,-
বিষয়ীর অন্ন খাইলে মলিন হয় মন।
মলিন মন হৈলে, নহে কৃষ্ণের স্মরণ
বিষয়ীর অন্ন হয় ‘রাজস’ নিমন্ত্রণ।
দাতা, ভােক্তা—দুহার মলিন হয় মন।
মহাপ্রভু জানাইলেন যে, তিনি রঘুনাথের
অপেক্ষায়ই এতদিন বিষয়ী গােবর্ধনদাসের অর্থে
নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিয়াছেন। যাহা হোক, যখন
রঘুনাথ স্বয়ংই ঐরূপ চেষ্টা পরিত্যাগ করিয়াছেন,
তখন ভালই হইয়াছে। মহাপ্রভু রঘুনাথকে লক্ষ্য
করিয়া আমাদের ন্যায় অনর্থযুক্ত জীবকে জানাইলেন

মহাপ্রভুর শিক্ষা
যে, ঈশ্বরের অমন্দোদয়-দয়াফলে অনৰ্থযুক্ত জীবের
যখন সবুদ্ধির উদয় হয়, তখন সাধক কৰ্ম্মমিশ্রা
ভক্তিচেষ্টা ত্যাগ করিয়া সম্বন্ধ-জ্ঞানােদ্ভাসিতা
শুদ্ধ-সেবা-প্রবৃত্তিতে উদ্বুদ্ধ হইয়া থাকেন।

মুনাথের নিরপেক্ষতা + + ১ ভিক্ষার জন্য পরমুখাপেক্ষী হইয়া সিংহদ্বারে পঁড়াইয়া থাকাও রঘুনাথের ভাল লাগিল না, তিনি কয়েকদিন পরে সিংহদ্বার পরিত্যাগ করিয়া ছত্রে গিয়া মধ্যাহ্নে মাত্র ভিক্ষা করিতে লাগিলেন। মহাপ্রভু গােবিন্দের নিকট রঘুনাথের ঐরূপ ব্যব- হারের কথা শুনিয়া স্বরূপকে জিজ্ঞাসা করিলেন,- “স্বরূপ, রঘুনাথ ভিক্ষার জন্য এখন কেনই বা সিংহদ্বারে অপেক্ষা করে না ? তুমি কি ইহার কোন কারণ জান ?” স্বরূপ কহিলেন, “প্রভে, রঘুনাথ পরমুখাপেক্ষী হইয়া ভিক্ষার জন্য সিংহদ্বারে দণ্ডায়মান থাকাকে ভাল মনে করেন না, ইহাতে হৃদয়ে শান্তি পান না; মধ্যাহ্নকালে ছত্রে মাধুকরী ভিক্ষা গ্রহণ করেন।” মহাপ্রভু ইহা শুনিয়া বলিলেন, রঘুনাথ ভালই করিয়াছে ; ‘সিংহদ্বারে। ভিক্ষা-বৃত্তি-বেশ্যার আচার।' পরের ইচ্ছামত তাহার নিকট অলাভ-প্রতীক্ষা-নিরপেক্ষ বৈরাগ্য- ; * Wণ

রঘুনাথের নিরপেক্ষতা
ধর্মের প্রতিকূল। বারবনিতা যেরূপ পরপুরুষের
কৃপাপেক্ষায় গৃহদ্বারে দাড়াইয়া তাহাদের প্রতীক্ষা
করিতে থাকে, তদ্রুপ সিংহদ্বারে দণ্ডায়মান ভিক্ষা-
প্রার্থিগণেরও ‘ইনি আসিতেছেন, ইনি দিবেন;
ইনি দিয়াছেন; ইনি দিলেন না; আর একজন
আসিতেছেন, ইনি দিবেন ; এই যে ব্যক্তি চলিয়া
গেলেন, ইনি দিলেন না ; অন্য আর এক ব্যক্তি
আসিয়া দিবেন’-এইরূপ বিবিধ সঙ্কল্পৰিকল্প করিতে
হয়। মাধুকরী ভিক্ষাই ত্যক্তগৃহ বিরক্তের হরি-
ভজনের অনুকূল। কৃষ্ণভজনেচ্ছ, ব্যক্তি যাবতীয়
সঙ্কল্প-বিকল্প ও পরমুখাপেক্ষা হইতে মুক্ত থাকিয়া
নিরন্তর কৃষ্ণসংকীৰ্ত্তনে কৃষ্ণস্মৃতি-সুখ লাভ
করিবেন।

গিনিনি-বিগ্রহ এল শঙ্করানন্দ সরস্বতী নামক এক বৈষ্ণব- যতি শ্ৰীবৃন্দাবন হইতে গােবর্ধন-শিল ও গুঞ্জামাল। লইয়া আসিয়া নীলাচলে মহাপ্রভুকে প্রদান করেন। মহাপ্রভু এই দুই অপূর্ব বস্তু প্রাপ্ত হইয়া বিশেষ আনন্দিত হইলেন কৃষ্ণস্মরণকালে প্রভু সেই মালা ও শিলাকে সাক্ষাৎ গান্ধর্ব- গিরিধারিজ্ঞানে কখনও হৃদয়ে ধারণ করেন, কখনও নয়ন-প্রান্তে রাখেন, কখনও বা নাসায় তাহাদের অপ্রাকৃত মধুগন্ধ গ্রহণ করেন, কখনও বা শিরে স্থাপন করেন, শিলা প্রভুর নেত্ৰ-জলে নিরন্তর স্নাত হন। মহাপ্রভু তিনবৎসর কাল এ শিলামালারূপিণী গান্ধকিা-গিরিধারীর সেবা-লীলা প্রদর্শন করিয়াছিলেন #গান্ধকিা-গিরিধরমিলিত- তনু মহাভাব গৌরসুন্দর রাধাগােবিন্দ-রতির মূর্ত- বিগ্রহ ও নিজ পমপ্রেষ্ঠ রঘুনাথের নিকট যেন আপনাকে আপনি বিলাইবার জন্য রসরাজ গিরিধারী গিরিধারি-বিগ্রহ শিলা ও গান্ধা-রূপিণী মালারূপে স্বয়ংই নিবেদিত হইলেন। গৌরসুন্দর এই লীলা দ্বারা জানাইলেন যে, যাহারা মহাভাব গৌরাঙ্গের উপাসনা করেন, তাঁহারাই সম্ভোগ-বিগ্রহ রসরাজ কৃষ্ণের সেবা প্রাপ্ত হন; তাহাদেরই নিকট নিত্য-মহাভাব , লীলাময় গৌরসুন্দর তঁাহার নিত্যরসরাজ-লীলাময় রাধাকান্ত কৃষ্ণস্বরূপ প্রকাশ করেন। কৃষ্ণের মহাভাবময়ী গৌরলীলা সম্ভোগময়ী রসরাজলীল নহে। মহাভাৰলীলাময় গৌরসুন্দরের সঙ্কীর্তন- রাসে রসরাজের সম্ভোগময়-লীলা প্রকাশিত হয় “নাই। সঙ্কীৰ্ত্তন-রাস বিপ্রলম্ভরস বা মহাভাবের পরাকাষ্ঠা। সেই সঙ্কীৰ্ত্তন-পিতা মহাভাবময় গৌর- সুন্দর আরাধিত হইলেই তিনি অনর্থমুক্ত জীবের নিকট স্বীয় রসরাজ-লীলাময় রাধাকান্ত-মূর্তি প্রকাশিত করেন। মহাভাবলীলাময় গৌরসুন্দর কখনও গৌররূপে রসরাজ-মূর্তিতে প্রকাশিত হন না। যাঁহারা সিদ্ধান্তবিরােধ ও রসাভাসদোষ করিয়া মহাভাব-গৌরসুন্দরকে ‘রসরাজ’ কল্পনা করেন, নিত্য-লীলা-ধ্বংসপ্রয়াসী সেই অপরাধিগণকে মহাপ্রভু সৰ্বতােভাবে বঞ্চনা করেন, কিন্তু ৮। -- - রুক । এক- - - -

গগাস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস
তাহার মহাভাব-স্বরূপের উপাসকের নিকট তিনি
তাঁহার রসরাজ-লীলাময় রাধাকান্তস্বরূপ প্রকাশিত
করিয়া থাকেন,
যথা যথা গৌরপদারবিন্দে
বিন্দেত ভক্তিং কৃতপুণ্যরাশি।
তথাতথােৎসর্পতি হৃদ্যকস্মাৎ
রাধাপদাস্তোজধাম্বুরাশিঃ ॥
পুঞ্জ পুঞ্জ সুকৃতিসম্পন্ন পুরুষ শ্রীগৌরপদকমলে
যাদৃশী ভক্তিলাভ করেন, অকস্মাৎ তাহার হৃদয়ে
শ্রীশ্রীরাধাপাদপদ্মের প্রেমসুধাসমুদ্রও তাদৃশভাবেই
উদগত হইয়া থাকে।
মহাপ্রভু রঘুনাথকে শিলারূপী গিরিধারী-বিগ্রহ
ও মালারূপিণী গান্ধা প্রদান করিয়া বলিলেন,-
“রঘুনাথ, এই গােবর্ধন-শিলা সাক্ষাৎ কৃষ্ণ-বিগ্রহ,
তুমি পরম আগ্রহের সহিত ইহার সেবা কর”
“প্রভু কহে, এই শিলা কৃষ্ণের বিগ্রহ।
ইহার সেবা কর তুমি করিয়া আগ্রহ।
মহাপ্রভু শ্ৰবিগ্রহের শুদ্ধ সাত্ত্বিক সেবার
প্রণালীও জানাইলেন,
ক

গিরিধারি-বিগ্রহ
“এক কুঁজা জল, আর তুলসী মঞ্জরী ।
সাত্ত্বিক সেবা এই—শুদ্ধভাবে করি।”
দুই দিকে দুই পত্র-মধ্যে কোমল মঞ্জরী।
এইমত অষ্ট মঞ্জরী দিবে শ্রদ্ধা করি।”
মহাপ্রভু স্বয়ং শ্রীহস্তে স্বীয় পরমপ্রেষ্ঠ রঘুকে
গগাবর্ধনশিলা প্রদান করিয়া উপরি-উক্ত সেবা-
প্রণালী বলিলেন। রঘুনাথ সানন্দে গান্ধৰ্বিকা-
গিরিধারীর ভাব-সেবা করিতে লাগিলেন। স্বরূপ
রঘুকে অর্ধহস্ত পরিমিত দুই খণ্ড বস্ত্র, একখানি
গান্ধর্বিকাগিরিধারীর উপবেশন-পীঠ ও জল
আনয়নের জন্য একটী কুঁজা প্রদান করিলেন ।
রঘুনাথ প্রেমানন্দে মগ্ন হইয়া ভাব-সেবা করিতে
লাগিলেন; সেবাকালে তিনি গােৰ্দ্ধন-শিলাকে
সাক্ষাৎ ব্রজেন্দ্রনন্দনরূপে দর্শন করিতে থাকিলেন।
‘প্রভুর স্বহস্ত-দত্ত গােবর্ধনশিলা চিন্তা করিবামাত্রই
রঘুনাথ প্রেমে বিভাের হইয়া পড়েন। জল-তুলসী
দ্বারা শুদ্ধ সাত্ত্বিক বা ভাব-সেবায় রাগাত্মিক
হরিজন রঘুনাথের যত সুখ বা প্রেমােদয় হয়,
অর্চনমাগীয় সমজ্ঞানযুক্ত যােড়শোপচার-পূজা
তাহার সঙ্গে তুলনা দিতে পারে না।

গােম্বামী শ্রীরঘুনাথদাস
মহাপ্রভু ও তঁাহার ভক্তগণের এক একটা
আচরণে যে কত মহাকল্যাণময়ী শিক্ষা নিহিত
রহিয়াছে, তাহা আমরা কৃষ্ণতত্ত্ববিৎ আচার্যের
আনুগত্য ব্যতীত-~প্রকৃত স্বরূপরূপানুগ মহাপ্রভুর
নিজজন গুরুদেবে পর-ভক্ত্যনুশীলন ব্যতীত কখনই
বুঝিতে পারি না। এই জন্যই শ্রুতি # বলিয়াছেন,
“যাহার গুরুদেবে ও কৃষ্ণে পরা ভক্তি আছে, তাহারই
নিকট শাস্ত্রের নিগুঢ় তাৎপৰ্য প্রকাশিত হয়।”
শ্ৰীমন্মহাপ্রভু ও তদীয় নিজ-জন রঘুনাথ উপরি-উক্ত
লীলা দ্বারা আমাদিগকে একাধারে অনেক শিক্ষা
দিয়াছেন।
অদৈব-বর্ণাশ্রমের পালিত, পুষ্ট বা কর্মজড়-
স্মাৰ্ত্তগণের পদলেহী কতিপয় প্রাকৃত-বুদ্ধিযুক্ত,
অক্ষজ-জ্ঞান-মদমত্ত আনখকেশাগ্র-বৈষ্ণব-বিরােধী,
বাহে বৈষ্ণবের বেশভূষায় সজ্জিত, অপম্বার্থান্বেষী
ব্যক্তি প্রাকৃত ঘৃণিত স্ব স্ব প্রচ্ছন্ন স্বার্থ চরিতার্থ
* যস্য দেবে পরা ভক্তিৰ্যথা দেবে তথা গুরো।
তস্যৈতে কথিত হর্থাঃ প্রকাশন্তে মহাত্মনঃ
(শ্বেতাশ্বতর ৬২৩)

গিরিধারি-বিগ্রহ করিবার বাসনায় স্বীয় অক্ষজজ্ঞান বা মনেধৰ্ম্ম সম্বল করিয়া বিষ্ণুর অপ্রাকৃত অৰ্চ্চা-বিগ্রহে ধাতু বা শিলা- বুদ্ধি, কৃষ্ণ প্রকাশ-বিগ্রহ সেবক-ভগবান্ চিবিলাস শ্রীগুরুদেবে মৰ্ত্তবুদ্ধি, বর্ণাশ্রমীর গুরু পরমহংস- বৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি পূর্বক অনন্তরৌরবে ধাবিত হইবার জন্য কল্পনা করিয়া থাকে যে, বৈষ্ণবীদীক্ষায় দীক্ষিত পুরুষের শালগ্রাম-পূজায় অধিকার নাই ; ইহা জানাইবার জন্যই শ্ৰীমন্মহাপ্রভু রঘুনাথকে শালগ্রাম পূজার অধিকার না দিয়া তাহাকে গগাবর্ধন শিলা প্রদান করিয়াছিলেন। এইরূপ দুষ্ট মত বর্তমানেও কৰ্ম্মজড়ম্মত্ত পদাবলেহী, অপস্বার্থান্ধ জাতি-গােস্বামিসম্প্রদাযে দেখিতে পাওয়া যায়। এই সকল অপম্বার্থান্ধ বণি-সম্প্রদায় তাহাদের ঐরূপ উক্তি দ্বারা ষড়গােস্বামীর বিরােধী বলিয়া প্রমাণিত হন, ইহাদের কিছুমাত্র বৈষ্ণবতা নাই, কনিষ্ঠাধিকারে যে বৈষ্ণবাভাসটুকু আছে, তাহাও নাই; তাহারা মাৎসর্য্যপর কৰ্ম্মজড়স্মত্তের চাটুকার, অপরাধী, অপম্বান্ধি, ঘৃণিত প্রাকৃত সহজিয়া। শ্রীল সনাতন গােস্বামী প্রভু ও এল গােপাল ভট্ট গােস্বামীপ্রভু হরিভক্তিবিলালে পাঞ্চাত্রিকী গােগাস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস দীক্ষায় দীক্ষিত পুরুষের পারমার্থিক ব্রাহ্মণতা প্রচার করিয়াছেন। শ্রীল জীবগোস্বামিপাদ ব্ৰহ্ম- সংহিতা-টীকায় * ধ্রুবের উদাহরণে দীক্ষিত-পুরুষের পারমার্থিক ব্রাহ্মণ প্রতিপাদন করিয়াছেন। শ্রীল সনাতন গােস্বামী প্রভু ৫ম বিলাসের টীকায় শালগ্রামপূজা-নিত্যতা-প্রকরণে জানাইয়াছেন যে, যে কোন কুলােদ্ভূত দীক্ষিত ব্যক্তির শালগ্রাম পূজা করা অবশ্য কর্তব্য। ইহার বিরুদ্ধ মত “মাৎসৰ্য- পরৈঃ স্মাত্তৈঃ কৈশ্চিৎ কল্পিত”ইতি মন্তব্য অর্থাৎ মাৎসর্যপর কোন কোন কৰ্ম্মজড়-স্মার্তের কল্পিত মত বলিয়া জানিতে হইবে, কারণ ;-- “শূদ্রেধন্ত্যজেপি যে বৈষ্ণবাস্তে শূদ্রাদয়াে ন কিলােচ্যন্তে। তথা চ নারদীয়ে “শপচোহপি মহীপাল বিষ্ণোর্ভক্তো দ্বিজাধিকঃ।” ইতিহাস-সমুচ্চয়ে “শূদ্রং বা ভগবদ্ভক্তং নিষাদং শপচং তথা। বীক্ষতে জাতিসামান্থাৎ স যাতি নরকং ধ্রুব।” * এবং দীক্ষাতঃ পরষ্টাদেব তস্য (ব্ৰহ্মণঃ) ধ্রুববে দিজত্বসংস্কারস্তদাবাধিতত্বাৎ তন্মন্ত্ৰাধিদেবাজ্জাতঃ।

গিরিধারি-বিগ্রহ ৬১ পাদ্মে চ, “ন শূদ্রা ভগবদ্ভক্তাস্তে তু ভাগবত মতাঃ । সৰ্ববর্ণেষু তে শূদ্রা যে ন ভক্তা জনার্দনে।” চতুর্বর্ণের মধ্যে সর্বনিম্ন-শূদ্রকুলােদ্ভূত, এমন কি, চতুর্বর্ণ-বহিভূত অন্ত্যজকুলাের্ভূত পুরুষগণও যদি বৈষ্ণবী-দীক্ষায় দীক্ষিত হন, তাহা হইলে তাহারা নিশ্চয়ই শূদ্র বা অন্ত্যজ বলিয়া অভিহিত হন না। শ্রীনারদপুরাণ এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করিয়া বলেন, হে ভূপতে, শপচকুলােদ্ভূত পুরুষও যদি বিষ্ণুর ভক্ত হন, তাহা হইলে তিনি ব্রাহ্মণ হইতে শ্রেষ্ঠ। শ্বপচকুলে অবতীর্ণ বিষ্ণুভক্তকে শপজাতি বলা দূরে থাকুক, পুণ্যময় ব্যবহারিক ব্রাহ্মণ বলিলেও তাহার চরণে অপরাধ করা হয়; কারণ তিনি পার- মার্থিক ব্রাহ্মণ বা ভাগবত; নিখিল ব্রাহ্মণ তাহার শিষ্যত্ব লাভ করিতে পারিলে মহাসুকৃতিশালী বলিয়া বিবেচিত হইবে। ইতিহাস-সমুচ্চয়েও উক্ত হইয়াছে, চতুর্বর্ণের মধ্যে শূদ্র অথবা বর্ণবহিভৃত নিষাদ ও শপচকুলে অবতীর্ণ ভগবদ্ভুক্তে যদি কেহ তত্ত্বজ্জাতি- সামান্যে দর্শন করে, তাহা হইলে সে ব্যক্তি নিশ্চয়ই নরকে গমন করিবে। পদ্মপুরাণেও উক্ত হইয়াছে,

•
গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস
ভগবদ্ভক্তগণ কখনই শূদ্র নহেন, তাহারা ভাগবত
অর্থাৎ সর্ববর্ণগুরু ব্রাহ্মণ, গুণাতীত ব্ৰহ্মজ্ঞ
পুরুষ, পরমাত্মােপাসক যােগিকুলেরও গুরুদেব,
অদ্বয়জ্ঞানাবলম্বী একায়নস্কন্ধী ঐকান্তিক বৈষ্ণব
আর ঘঁহারা কৰ্ম্মজড়তায় আচ্ছন্ন, সেই সকল স্মাৰ্ত্ত
বিষ্ণুমায়ার উপাসক, তাহারা জনার্দন বিষ্ণুর ভক্ত
নহেন। তঁাহারা ব্রাহ্মণাদি উচ্চকুলের অভিমান
করিলেও বিষ্ণুমায়ায় অভিভূত শােকমগ্ন বলিয়া
সববর্ণের মধ্যে শূদ্র।
কদৰ্য্যশীল, বিক্ষিপ্তমতি অনর্থযুক্ত জীবগণের
ন্যায় একায়নস্কন্ধী পরমহংসকুলের পাঞ্চত্রিকা
ষ্ঠান-নিষ্ঠা এবং তদুচিত সংস্কারাদি-গ্রহণের বাহা-
পেক্ষা নাই বলিয়া তাহারা শাল গ্ৰামাদি-অৰ্চনের
অধিকারী নহেন বা তঁাহারা শূদ্র—এইরূপ অনুমান
কদৰ্য্যশীল ব্যক্তিগণের মূখা-প্রসূত। পাঠশালার
বালকগণ যদি মনে করে যে, তাহাদের গুরু
মহাশয় যে “তিন তিরিক্ষে নয়’ না পড়ান, তাহা
মহাবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যক্ষ
তাহার ছাত্রগণকে পড়ান না বলিয়া তিনি নামতা
জানেন না, সেইরূপ অনুমান যেমন মূখ-বালকোচিত

গিরিখারি-বিগ্রহ নিরর্থক বাক্যমাত্র, তদ্রুপ যে-সকল ব্যক্তি মনে করেন, একায়নস্কন্ধী পরমহংসবৈষ্ণবগণ যখন কনিষ্ঠাধিকারােচিত অৰ্চন-নিষ্ঠা প্রদর্শন করেন না এবং তদুচিত সংস্কারাদিও সকল সময় বাহ্যে গ্রহণ করিবার আদর্শ দেখান না, তখন তঁাহারা শূদ্র- ভঁহাদের শালগ্রাম পূজায় অধিকার নাই। এই মূখত অপনোদন করিবার জন্যই সাত্বত পঞ্চরাত্র- সমূহ সমস্বরে কীৰ্ত্তন করিয়াছেন ; ‘‘তথা দীক্ষাবিধানেন দ্বিজত্বং জায়তে নৃণা৷” (হঃ ভঃ বিঃ ২৭ ধৃত তত্ত্বসাগর বচন) (বৈষ্ণবী) দীক্ষা-বিধানের দ্বারা নরত্রেরই বিপ্রত সাধিত হয়। “বিনীতানথ পুত্ৰাদী সংস্কৃত্য প্রতিবােধয়েৎ।” (নারদ-পঞ্চরাত্র ভরদ্বাজ-সংহিতা ২৩৪) বিনীত শিষ্য-পুত্রদিগকে বৈদিক দশ সংস্কারে সংস্কৃত করিয়া আচাৰ্য্য তাহাদিগকে ব্রহ্মচারী করাইয়া মন্ত্রের অর্থ শিক্ষা দিবেন, ইহাই দীক্ষাবিধি। “শূদ্রোহপ্যাগমসম্পন্নো দ্বিজো ভবতি সংস্কৃতঃ।” (মঃ ভাঃ অনুঃ শাঃ পঃ ১৪৩৪৬) ৬৪ গােম্বামী স্ত্রীরঘুনাথদাস নিম্নকুলােস্তৃত শূদ্রও এই সকল কৰ্ম্মফল দ্বারা আগমসম্পন্ন অর্থাৎ পঞ্চরাত্রিক বিধান অনুসারে দীক্ষিত হইয়া দ্বিজ-সংস্কার লাভ করেন। “ব্রাহ্মণকুমারাণাং সবনযােগ্যত্বাভাবাবচ্ছেদক- পুণ্যবিশেষময়-সাবিত্র-জন্মাপেক্ষাবদস্য অদীক্ষিতস্য শ্বাস্য সাবিত্ৰজন্মান্তরাপেক্ষা বৰ্তত ইতি ভাব।” ( দুর্গমসঙ্গমনী পূঃ বিঃ ১১৩) ব্রাহ্মণকুলাের্ভূত ব্যক্তির যেমন সবন-যােগ্যতা- নির্ণায়ক বিশেষ পুণ্যময় সাবিত্রজন্মের অপেক্ষা থাকে, সেইরূপ চণ্ডাল-কুলােদ্ভুত অদীক্ষিত ব্যক্তির নামকীৰ্ত্তন-মাত্রে) ব্রাহ্মণত্ব বা সবন-যােগ্যতা লাভ হইলেও সাবিত্রজন্মের অপেক্ষা আছে। শ্রীসনাতন গগাস্বামী প্রভুও তৎকৃত শ্ৰীবৃহদ্ভাগবতামৃত-গ্রন্থের ২য় খণ্ড ৪র্থ অধ্যায়ে ৭ম শ্লোকের “দীক্ষালক্ষণ- ধারিণঃ” পদের স্বলিখিত টীকায় দীক্ষিত ব্যক্তি- মাত্রেরই যজ্ঞােপবীত-ধারণের কর্তব্যতার কথা জানাইয়াছেন; “দীক্ষায়াঃ সাবিত্ৰাদি-বিষয়কায়া ভগবন্মন্ত্র- বিষয়কাঞ্চ যানি লক্ষণানি ক্রমেণ যজ্ঞােপবীত- কমণ্ডলু-ধারণাদীনি ধৰ্ত্ত শীল”মধামিতি তথা তে।”

গিরিধারী-বিগ্রহ গোবিন্দভাষ্যকার ‘প্রমেয়-রত্নাবলী’ গ্রন্থে পাদ্মে- করখ ও-বচন উদ্ধার করিয়া যে পঞ্চ সংস্কারের কথা উল্লেখ করিয়াছেন, তন্মধ্যে ‘যাগ' শব্দের ব্যাখ্যায় তিনি শালগ্রামাদি-পূজাই স্থাপন করিয়াছেন। যাহারা নিখিল ব্ৰহ্মজ্ঞকুলের গুরুদেব শ্রীশ্রীল রঘুনাথদাস প্রভুতে জাতিবুদ্ধি করিয়া তাহাকে শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর দৃষ্টান্ত দ্বারা শালগ্রাম-পূজার অনধি- কারী প্রমাণিত করিতে চাহেন, সেই সকল গুরু- গৌরাঙ্গ-বিদ্বেষী, গােস্বামিবিরােধী অপরাধীকুলের নৃঙ্খতা এক একটী করিয়া অতি সহজেই খণ্ডনবােগ্য। প্রথমতঃ, তাহারা শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর আদেশে বৈষ্ণব-স্মৃতি সঙ্কলনকারী গ্রীল সনাতন ও শ্রীল গােপাল ভট্ট গগাস্বামী প্রভুর অর্থাৎ শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর ব্যবস্থার উপরে গুরুগিরি করিবার দুদ্ধিবিশিষ্ট ; দ্বিতীয়তঃ, তাহারা শ্রীগণ্ডকী-শিলা ও শ্রীগগাবর্ধন-শিলায় ভেদ- বুদ্ধিকারী। কৰ্ম্মজড়-স্মাৰ্তগণের যেরূপ ত্রিধাতুক কুণপে আত্মবুদ্ধি, ভূমিজাত বস্তুতে পূজবুদ্ধি, সলিলে তীর্থবুদ্ধি এবং ভক্তগণে প্রাকৃতবুদ্ধি থাকহেতু পঞ্চরাত্র ভাগবতের বিচারানুসারে তাহারা ‘গরু’ ও ‘গাধা-সংজ্ঞায় সংজ্ঞিত হয়, এবং সেই গগাস্বামী রঘুনাথদাস গােখর-বুদ্ধি লইয়া তাহার। এক্ষেত্রে (?) মহা- প্রসাদের অস্তিত্ব কল্পনা এবং জগতের সর্বত্র শ্রীজগন্নাথদেব ও তদীয় মহাপ্রসাদের অনস্তিত্ব কল্পনাপূর্বক অদ্বয়জ্ঞানে ভেদ-বুদ্ধি ও মহাপ্রসাদে প্রাকৃতবুদ্ধি করিয়া থাকে, সেইরূপ প্রকৃতির কৰ্ম্ম- জড়-গণই গােবর্ধন ও শালগ্রামে ভেদ-বুদ্ধি করিয়া তাহাদের গােখরত্ব প্রমাণ করে। শ্রীগােবর্ধন ও শ্রীশাল গ্রাম অদ্বয়জ্ঞানেরই বিভিন্ন প্রকাশ-শূত্তি, বিষ্ণু-তত্বে ভেদ মানিলে মহা-অপরাধ হয়- ইহা গােখরগণের মস্তিষ্কে প্রবেশ করে না। যাহাদের শ্ৰীশালগ্রামে অন্তনিহিত শিলাবুদ্ধি বিরাজিত .. তাহাদেরই গােবর্ধনে শিলাবৃদ্ধি এবং শালগ্রামের সহিত ভেদবুদ্ধি উদিত হইয়া থাকে। এল রঘুনাথদাস গােস্বামী প্রভুকে মহাপ্রভু অশৌ-ব্রাহ্মণ-কুলােদ্ভূত ব্যক্তিবিশেষ-বিচারে শাল- গ্রাম পূজায় অধিকার না দিয়া গােবর্ধন-শিলা প্রদান করিয়াছিলেন বলিয়া যাহারা পাষণ্ডত। ব্যাসদেবের বিচারানুসারে তাহাদিগকে একসঙ্গে ভীষণ বিষ্ণু ও বৈষ্ণবাপরাধে নিমজ্জিত হইতে হয় ;

গিরিধারী-বিগ্রহ “অ*ৈ বিঞ্চে শিলাধীগুরুষু নরমতি- বৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি বিষ্ণোব। বৈষ্ণবানাং কলিমলমথনে পাদতীর্থেহম্ভবুদ্ধি। শ্রীবিষ্ণোর্নামি মন্ত্রে সকল-কলুষহে শব্দসামান্যবুদ্ধি- বিষ্ণো সর্বেশ্বরেশে তদিতরসমধীর্যস্য বা নারকী সঃ।” যে ব্যক্তি অৰ্চ্চাৰিগ্রহে শিলাবুদ্ধি, বৈষ্ণব-গুরুতে মরণশীল মানব-বুদ্ধি, বৈষ্ণবে জাতিবৃদ্ধি, বিষ্ণু- বৈষ্ণব-পাদোদকে জলবুদ্ধি, সকল-কলুষ-বিনাশী বিষ্ণু-নাম-মন্ত্রে শব্দসামান্যবুদ্ধি এবং সর্বেশ্বর বিষ্ণুকে তাপর দেবতার সহিত সমবুদ্ধি করে, সে নারকী। সুতরাং যাহারা শ্ৰীল দাস গােস্বামী বা বৈষ্ণব- গুরুগণকে গােখরবুদ্ধিজাত বিচারের আসামী মনে করে, ব্যাসদেব উহাদিগকে নরকভাক্ বলিয়া জানাইয়াছেন। অধিক কি, শ্রীল জীবগােস্বামিপদ বেষ্ণব এবং ঐকান্তিক বৈষ্ণবের কিরূপ শ্রেষ্ঠ জানাইয়াছেন, তাহা পাঠ করিয়াও ভীষণ-পরাধ- নিবন্ধন কর্মজড়স্মাৰ্ত্তবুদ্ধিপুষ্ট নারকিগণের সময়- নিবৃত্তি হয় না।

গগাস্বামী রঘুনাথদাস “ব্রাহ্মণানাং সহভ্যেঃ সত্রযাজী বিশিষ্যতে। সত্রযাজিসহভ্যেঃ সৰ্ব্ববেদান্তপারগঃ । সববেদান্তবিৎকোট্যা বিষ্ণুভক্তো বিশিষ্যতে। বৈষ্ণবানাং সহস্রেভ্য একান্ত্যেকো বিশিষ্যতে ॥” (ভক্তিসন্দর্ভ ১৭৭ সংখ্যা ধৃত গরুড়-বাক্য) সহস্র ব্রাহ্মণ অপেক্ষা একজন যাজ্ঞিক শ্রেষ্ঠ, যাজিক-সহস্রের অপেক্ষা একজন সবেদান্ত- শাস্ত্রজ্ঞ শ্রেষ্ঠ, সবেদান্তশাস্ত্রজ্ঞ কোটী ব্যক্তি অপেক্ষা একজন বিষ্ণুভক্ত শ্রেষ্ঠ এবং সহস্র বৈষ্ণব অপেক্ষা একজন একান্তী ভক্ত শ্রেষ্ঠ। শ্ৰীল রঘুনাথদাস গােস্বামী প্রভু একায়নস্কন্ধী একান্তীপরমহংস বৈষ্ণবের লীলা প্রদর্শন করিয়াছেন; কাজেই তাহাকে শ্ৰীমন্মহাপ্রভু কনিষ্ঠাধিকারী পাঞ্চাত্রিকের অধিকারটুকুমাত্র প্রদান নাই। মহাপ্রভু নিখিল ব্ৰহ্মজ্ঞ ব্রাহ্মণ-কুলের গুরু, নিজ-প্রেষ্ঠ, মহাভাগবত রঘুনাথকে কনিষ্ঠাধি- কারােচিত অৰ্চন প্রদান করেন নাই, পরন্তু শ্রীরাধাগােবিন্দের শুদ্ধ-সাত্ত্বিক ভাবসেবা প্রদান করিয়াছিলেন করেন

গিরিধারী-বিগ্রহ
“এই শিলার কর তুমি সাত্ত্বিক পূজন।
অচিরাতে পাবে তুমি কৃষ্ণপ্রেমধন।”
রঘুনাথ গুণার্ণব মিশ্রের মত ভৌম-বস্তুতে
পূজবুদ্ধি এবং অভিজ্ঞ মীনকেতন রামদাসে মৰ্ত্তবুদ্ধি
করিবার আদর্শ প্রদর্শন করেন নাই। গুণার্ণব
মিশ্রের শালগ্রাম-বিচ্চন ও রঘুনাথের পরমশ্রেষ্ঠ
গগাবর্ধন-গিরিধারী এবং গুঞ্জামালারূপিণী স্বীয়
ঈশ্বরী গান্ধৰ্বার ভাব-সেবা এক নহে। গুণর্ণিব-মিশ্র
প্রকৃত বুদ্ধিবিশিষ্ট, শুদ্ধ-বৈষ্ণব নহেন। গুণাব
মিশ্রের শাল গ্রামে শিলাবুদ্ধি অথবা শালগ্রামকে
ভূমিজাত বস্তুজ্ঞানে তাহাতে লৌকিকী পূজ্য-বুদ্ধি-
মাত্র ছিল; কিন্তু মহাভাগবত রঘুনাথ ভাবসেবা
করিতে করিতে--
;
“পূজাকালে দেখে শিলায় ‘ব্রজেন্দ্র-নন্দন।
‘প্রভুর স্বহস্ত-দত্ত গােবৰ্ধন-শিলা।
এই চিন্তি’ রঘুনাথ প্রেমে ভাসি’ গেলা।
জল-তুলসীর সেবায় যত সুখােদয় ।
যােড়শােপচার-পূজায় তত সুখ নয়।”

===== ক + ৫ =
৭০ গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস
রঘুনাথ একায়নস্কন্ধী একান্তী মহাভাগবত ছিলেন
বলিয়াই মহাপ্রভু
মহাপ্রভু রঘুনাথকে
রঘুনাথকে কনিষ্ঠাধিকারী
প্রাকৃত-বৈষ্ণবের অধিকারােচিত শালগ্রাম-বিষ্ণচ্চন
প্রদান না করিয়া গান্ধৰ্ব্বা-গিরিধারী প্রদান পূর্বক
সাক্ষাৎ চিল্লীলা-মিথুনের মহাভাগবতােচিত রাগময়ী-
সেবা প্রদান করিয়াছিলেন। গােখর-বুদ্ধিবিশিষ্ট
কৰ্ম্মজড়স্মাৰ্তগণের গােময়পূর্ণ মন্তকে এত বড় কথা
প্রবেশ করে না বলিয়াই তাহারা গােবর্ধনশিলারূপী
সাক্ষাত্ ব্রজেন্দ্রনন্দন ও গুঞ্জামাল-রূপিণী সাক্ষাদ
গান্ধৰ্ব্বাকে প্রকৃত শিলা ও কুচের মালা অনুমান
পূর্বক অদ্বয়জ্ঞানে ভেদ-বুদ্ধি করিয়া থাকে।
শালগ্রাম-বিষ্ণচ্চন কনিষ্ঠাধিকারােচিত এবং মধ্যম
অধিকারেও গৌরবময়ী সেবার অর্ডা; কিন্তু মহা
প্রভুর সেবিত গােবর্ধন-গুঞ্জামালা-রাগময়ী সেবার
চিল্লীলা-মিথুন-বিগ্রহ। মহাভাগবত রঘুনাথ মহা-
প্রভুর এই অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়াছিলেন,
“রঘুনাথ সেই শিলা-মালা যবে পাইলা।
গােসাঞির অভিপ্রায় এই ভাবনা করি ।
শিলা দিয়া গােসাঞি সমর্পিল ‘গােবর্ধনে।
গুঞ্জামলা দিয়া দিলা রাধিকা চরণে ॥

গিরিধারী-বিগ্রহ
৭১
আনন্দে রঘুনাথের বাহ বিস্মরণ।
কায়মনে সেবিলেন গৌরাঙ্গ-চরণ ॥”
—এইরূপে রঘুনাথ চিল্লীলা-মিথুনের ভাৰ-সেবায়
নিযুক্ত থাকিলেন।
একদিল শ্রীল স্বরূপ গােস্বামী রঘুনাথকে
বলিলেন,-
“অষ্ট কৌড়ির খাজা-সন্দেশ কর সমর্পণ।
শ্রদ্ধা করি’ দিলে সেই অমৃতের সম।”
রঘুনাথ শ্রীস্বরূপ গােস্বামীর
অভিলাষমতে
শ্রীরাধাগােবিন্দকে খাজা সন্দেশ প্রদান করিলেন ।
এল স্বরূপের আজ্ঞায় গােবিন্দ তাহার সমাধান
করিয়াছিলেন।

নমুনাথের ‘বৈরাগ্য কি ? ক নামােচ্চারণমাত্রেই শ্ৰীল দাস-গগাস্বামীপ্রভুর হৃদয়ে দুইটা বিষয়ের স্ফূৰ্ত্তি হয়—বাহ দর্শনে তাহার অতিম বৈরাগ্য-বিবেক, আর অন্তর্দর্শনে তাহার রাধা-দাস্ত। সারগ্রাহিগণ বৈরাগ্য-বিবেক ও রাধা- দাস্তকে দুইটী পৃথগ, বৃত্তি মনে করেন না। দাস্তের অপর নামই ‘বৈরাগ্য; তবে অরূঢ়িতে বৈরাগ্যের যে অপ্রকৃষ্ট ধারণা, সে ধারণার সহিত রূপানুগগণের ‘বৈরাগ্য-শব্দের সুবিদ্বদ্রূঢ়ির বিশেষ পার্থক্য আছে। রূপানুগগণ ভক্তিরসামৃতসিন্ধু- স্নানকালে জানেন, রাধা-দাই-বেরাগ্য-পরাকাষ্ঠা অথবা একমাত্র বেরাগ্য-বিবেক। অবশ্য এ কথাটী সকলে ধারণা করিতে পারিবেন না। কারণ ইহা মুক্তরাজ্যের চরম-কথা। জগতের অন্য কোথায়ও বৈরাগ্য নাই—চির- স্মরণীয়-কীৰ্ত্তি দাতাকর্ণ বা হরিশ্চন্দ্রের ন্যায় কশ্মীর বৈরাগ্য নাই—“কা তব কান্তা কস্তে পুত্রঃ”, “কৌপীনবন্ত খলু ভাগ্যবন্তঃ” মন্ত্রের উপাসক রঘুনাথের বৈরাগ্য কি ? নির্ভেদ-জ্ঞানীর বৈরাগ্য নাই—হিমালয়ের উচ্চশৃঙ্গে ধ্যানস্থ নগ্ন মূৰ্ত্তি, বায়ুভক্ষণকারী যােগীর বৈরাগ্য নাই-হেটমুণ্ড, উৰ্দ্ধবাহু, পঞ্চপা, বিকট তপস্বি- গণের বৈরাগ্য নাই—এমন কি, ভগবান্ শ্রীরামচন্দ্রের ভজনের জন্য কঙ্কাল-মাত্ৰ-সার মহা-তপস্বী, মৌন- ব্রতধারী বাল্মীকি মুনি, দণ্ডকারণ্যবাসী ফলমূলভােজ সংযতাত্মা ঋষিগণ, পরমাত্মা-ভজনশীল বালিখিল্য ঋষিগণ, সনকাদি মুনিগণ, যুগান্তরসাধনকারী ব্ৰহ্মাদি তপস্বিগণেরও বৈরাগ্যের পূর্ণতা নাই। বৈরাগ্য- বিদ্যা একমাত্র কৃষ্ণ বিলাসিনীরাধার অনুচরীগণেই একমাত্র শ্রীরূপানুগ-গণেই বিরাজিত। বৈরাগ্য- বিদ্যা স্বয়ং মহাভাবম্বরূপা শ্ৰীমতী। মহাভাবই বৈরাগ্য, অধিরূঢ়-মহাভাবই-বৈরাগ্যের পরাকাষ্ঠা, প্রেমবিলাসৰবৰ্ত্তই—বৈরাগ্য-চিন্তামণি, বিপ্রলম্ভই -বেরাগ্যের পরিভাষা। অনেকে অজ্ঞাতক্রমে শ্ৰল দাসগােস্বামীপ্রভুরু বৈরাগ্যের সহিত কপিলাবস্তুদ্ধ সিদ্ধার্থের বৈরাগের তুলনা করেন করুন্, কেহ বা দাস-গগাস্বামীর বৈরাগ্যের সহিত শঙ্করাচার্যের বৈরাগ্যের তুলনা করেন করু, কিন্তু বৈরাগ্য’ শব্দের অজ্ঞরূঢ়ি, ‘৭৪ == গােস্বামী রঘুনাথদাস সাধারণরূঢ়ি, এমন কি বিজ্ঞরূঢ়ি পৰ্যন্ত যাহা নির্দেশ করিতে সমর্থ, শ্রীল দাস-গােস্বামীপ্রভু সেইরূপ অকিঞ্চিৎকর, অযুক্ত, খণ্ড বৈরাগ্য-বিভূতির ধি- কারী মাত্র নহেন। তিনি সুবিজ্ঞ শস্বরূপ-রূপের নির্দিষ্ট বৈরাগ্য-বিদ্যার যে রূঢ়ি, তাহারই পূর্ণ অধিকারী মহাভাবময়া বৈরাগ্য-বিদ্যা বার্ষভানবীই শ্ৰীল দাস গােস্বামী প্রভুর আরাধ্যা ঈশ্বরী, তিনি সেই বৈরাগ্য-বিদ্যাময়, তঁাহার অন্তর-বাহির মহাভাৰস্বরূপ- বর্ষভানৰী-ময়। তাই আজ আমরা স্টল দাস- গােস্বামী প্রভুর চরিত্র আলােচনা-দ্বারাই একাধারে এল দাস-গােস্বামীর ও তদীশ্বরী শ্ৰীমতী বার্ষভানবীর যুগপৎ চরিত্র অনুশীলনের ফল পাইতে পারিব । ঐল দাস-গােস্বামী প্রভুর বৈরাগ্য-বিদ্যানুরাগ তাহার “স্বনিয়ম-দশকে”র দুই একটা শ্লোক হইতে অধিকার পাঠকগণ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিবেন, “অজাণ্ডে রাধেতি ক্ষুরদভিধয়াসিক্ত-জনয়া- ইনয়া সাকং কৃষ্ণং ভজতি য ইহ প্ৰেমনমিত। পরং প্রক্ষাল্যৈতচ্চরণকমলে তজ্জলমহাে মুদা পীত্ব শশ্বচ্ছিরসি চ বহামি প্রতিদিন এই ব্রহ্মাণ্ড মধ্যে যিনি প্ৰেমনমিত হইয়া রাধা” ? ৭৫ রঘুনাথের বৈরাগ্য কি ? এই স্ফুর্তিময়ী অভিধাসিক্তজনের সহিত প্রেমরসে শ্রীকৃষ্ণের ভজন ভজন করেন, আমি তাহার চরণদ্বয় প্রক্ষালনপূর্বক সেই পূত-পাদোদক সানন্দে পান করিয়া প্রতিদিন নিয়ত শিরে ধারণ করি । “অনাদৃত্যোগীতামপি মুনিগণৈবৈণিকমুখৈঃ প্রবীণাং গান্ধামপি চ নিগমৈস্তৎপ্রিয়তমা। য একং গােবিন্দং ভজাত কপটী দাম্ভিকতয়া তদভ্যর্ণ শীর্ণে ক্ষণমপি ন যামি ব্রতমিদম্ ।” বাণাবাদক নারদাদি মুনিগণ ও নিগম মাহার গান করেন, সেই গােবিন্দ-প্রিয়তমা প্রবীণা গান্ধব রাধাকে অশ্রদ্ধাপূর্বক দাম্ভিকতাবশতঃ যে- সকল কপটী কেবলমাত্র গােবিন্দের ভজনা করে, তাহাদিগের অপবিত্র সমীপদেশে আমি ক্ষণমাত্রও গমন করি না —ইহাই আমার ব্রত। বৈরাগ্য-বাপু শ্ৰীল দাস-গােস্বামী প্রভু “বিলাপ- কুসুমাঞ্জলি”তে যে বৈরাগ্য-বিচার-পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন, সেই বৈরাগ্য-বিচার-বারিধির গভীরত। রূপানুগগণই তানুভব করিতে পারেন, “অশাভরৈরমৃতসিন্ধুময়ৈঃ কথঞ্চিৎ কালাে মতিগমিতঃ কিল সাম্প্রতং হি।

৭৬ গােস্বামী স্ত্রীরঘুনাথদাস ত্বঞ্চে কৃপাং ময়ি বিধাস্তসি নৈব কিং মে প্রাণৈব্রজে ন চ বরােরু বকারিণাপি।” হে বরােরু, মদীশ্বরি গান্ধবিকে, আমি এতদিন আশাপ্রাচুর্যের অমৃত-সিন্ধুতে অতি কষ্টে কালাতি- পাত করিলাম, ইহা নিশ্চয় জানিও। এখনও তুমি যদি আমাকে কৃপা না কর, তবে এ পােড়া প্রাণ, ব্রজবাস, অধিক কি, বকশত্রু শ্রীকৃষ্ণেও আমার কাজ নাই । এরূপ বৈরাগ্যবিবেক নৃলােকে হয় না। কথা শ্রীরূপানুগ ব্যতীত অন্য কেহ বুঝিবে না- জগতের লােক বুঝিতে পারে না। পূর্বেই বলা হইয়াছে, বৈরাগ্য-বিদ্যাই শ্ৰীমতী রাধিকা। বৈরাগ্য- বিবেকে নিজ ভােগ-সুখ-সম্পর্কলেশও নাই ; কৃষ্ণ- সুখৈকতাৎপর্য্যের নামই বৈরাগ্য, তাহার পরিপূর্ণতা শ্ৰীমতী রাধিকায়-- “কৃষ্ণবাঞ্ছা-পূর্তিরূপ করে আরাধনে। অতএব ‘রাধিকা-নাম পুরাণে বাখানে কৃষ্ণময়ী-কৃষ্ণ যার ভিতরে বাহিরে। আঁহা যাহা নেত্র পড়ে তঁাহা কৃষ্ণ স্ফরে । এল দাস-গােস্বামী-প্রভু অন্তরে বাহিরে এই বৈরাগ্য-বিদ্যেশ্বরীর সেবায় জীবন যাপন করিয়াছেন, তাই তাহার বৈরাগ্যের তুলনা চতুর্দশ-ব্রহ্মাণ্ডে, ৭৭ রঘুনাথের বৈরাগ্য কি ? বৈকুণ্ঠে, এমন কি দ্বারকায় পর্যন্ত মিলোনা। তিনি বৃন্দাবনেশ্বরী বৈরাগ্যবিদ্যার দ্বিতীয় বপু। জগতের লােক যে রঘুনাথদাস গােস্বামী প্রভুর বৈরাগ্যের প্রশংসা করেন--তঁাহাদের ক্ষুদ্র সসীম দৃষ্টিতে দাস-গগাস্বামী প্রভুর যে বৈরাগ্যটুকু দর্শন করেন, সেইরূপ আংশিক, অসম্পূর্ণ একদেশী খণ্ড- বৈরাগ্য-বিভূতি দাস-গগাস্বামী প্রভুর সেবার জন্য মুকুলিতাঞ্জলি হইয়া তৎপশ্চাতে সময়-প্রতীক্ষা করিতে থাকিলেও তঁাহার সেবিকার পায় না। জগতের ভােগী ও ত্যাগী সম্প্রদায় যাহাকে “বৈরাগ্য” বলেন, অসম্পূর্ণ বা ঐশ্বৰ্য-দৃষ্টিতে সেরূপ বৈরাগ্য- বিভূতি শ্ৰীল দাস-গােস্বামীর পাদপদ্মে দেখিতে পাওয়া গেলেও ঐরূপ বৈরাগ্য পর-বৈরাগ্য- বিদ্যারই খণ্ড প্রতিফলন মাত্র। দাস-গােস্বামী প্রভু পর-বৈরাগ্য-বিদ্যা-বারিধি শ্রীরাধাকুণ্ডে নিত্য-স্নাত- দাস-গােস্বামী প্রভু বৈরাগ্যযুগ,ভক্তিরসামৃত-সিন্ধুতে নিত্য-অভিষিক্ত-বৈরাগ্য- বিলম্ভে নিত্য-বিভাবিত। দাস-গােস্বামী প্রভু মহাভাৰস্বরূপ। বৈরাগ্যবিলাস- বিদ্যা বার্ষভানবীর বপুৰূহ। मरदक অনুনাথের বৈরাগ্য অন্যাভিলাষিগণের অনেকেই দুদিনের জন্য বৈরাগ্যের ভান প্রদর্শন করিয়া জড় কনক, কামিনী বা প্রতিষ্ঠাসংগ্রহে সিদ্ধি লাভ করিতে পারে। ঐরূপ বেরাগ্যকে ‘মর্কট’ বা ‘ফ-বৈরাগ্য বলে। মর্কট স্বভাবতঃই অস্থির, গৃহস্থের ঘর হইতে খাদ্য- অপহরণের জন্য কিছুকাল স্থৈর্য্য ও অচঞ্চলতা প্রদর্শন করলেও পরমুহূর্তেই উহার নিজ স্বভাব প্রকাশ করিয়া ফেলে। মর্কট দিগম্বর হইয়া পরিব্রাজক ভিক্ষুর ন্যায় বিচরণ করে, কদলী-ফল-মূল প্রভৃতি সাকি দ্রব্য ভােজন করে, বনে বাস করে, নিজ অপস্বার্থ সিদ্ধির জন্য সাময়িক স্থ্যৈ প্রদর্শন করে। অন্যাভিলাষী, কৰ্ম্মী, জ্ঞানী, জ্ঞানী, যােগী, তপস্বী, মিছাভক্ত, কপট প্রাকৃত সহজিয়াগণের বৈরাগ্যও সেইরূপ—কোন না কোন অপস্বার্থসিদ্ধির জন্য । কপট-সহজিয়াগণধাতুদ্রব্য স্পর্শ না করিয়া জড়া প্রতিষ্ঠা-রূপা শূকরী-বিষ্ঠা ঘাটিয়া থাকে—মাধুকরী রঘুনাথের বৈরাগ্য ৭১ বা মহাপ্রভুর-সেবার্থ ভিক্ষা করিবার ছলনায় ছােট হরিদাসের আদর্শে পরস্ত্রী-সম্ভাষণ কিম্বা অন্য কোন উদ্দেশ্য সিদ্ধি করিয়া থাকে--এল দাস গােস্বামী প্রভুর অনুকরণ তঁাহর প্রতি মর্কট স্বভাবোচিত মুখভঙ্গী প্রদর্শনের জন্য রাধাকুণ্ড বা বৃন্দাবন- নবদ্বীপ-বাসের ছলনা করিয়া কনকাদি সংগ্রহ করিয়া থাকে। অন্তঃসলিলা ফনদীর ন্যায় অন্তর্নিহিত অন্য উদ্দেশ্যবিশিষ্ট ঐ সকল বৈরাগ্যের অভিনয় যুক্তবৈরাগ্য নহে। অনেকেই সাময়িক ভাব- প্রবণতা বা উত্তেজনার বশবর্তী হইয়া দু'দিনের জন্য বৈরাগ্যের ভান দেখাইতে পারে এবং কিছুকাল পরেই “পুন ষিকো ভব” মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া “যে তিমিরে সেই তিমিরে” অথবা অস্থির-বেরাগ্যের প্রবল প্রতিক্রিয়াবশতঃ তাহা হইতেও অন্ধতমে অর্থাৎ দ্বণ্য ভােগ-রাজ্যে পতিত হইয়া থাকে। অযুক্ত-বৈরাগ্যের ইহাই লক্ষণ। যুক্ত-বৈরাগ্য কৃষ্ণ- পাদপদ্মের সহিত সম্বন্ধজ্ঞান বা প্রণয়-রঞ্জু-দ্বারা সংযুক্ত। রঘুনাথদাস গোস্বামী প্রভুর কৃষ্ণেন্দ্রিয়- প্রত্যর্থে অদ্বিতীয়, অদ্ভুত, বৈরাগ্যযুক্ ভজনের আদর্শ সেইরূপ। তাহার বৈরাগ্যের অপর নাম

গগাস্বামী শ্রীরঘুনাথদা
বিপ্রলম্ভ তর্থাৎ সৰ্বেন্দ্রিয়ে কৃষ্ণানুসন্ধানকৃষ্ণকে
পূর্ণভাবে পাইয়াও অতৃপ্তি-অসামান্যা কৃষ্ণসেবা-
'লালসা। একটী প্রাকৃত অসম্পূর্ণ দৃষ্টান্ত উল্লেখ
করিয়া বলা যাইতে পারে,—যেমন, পতিতারা সতী
পাগলিনী হইয়া পতির অনুসন্ধান করেন, তখন
তাহার লজ্জা-জ্ঞান থাকে না, বস্ত্র দ্বারা শরীর
আচ্ছাদিত আছে কি না, সে বিষয়ে অনুভূতি থাকে
না-খাওয়া, পরা, পুত্রপৌত্রাদির পরিচর্যা,
সংসারের কার্য নির্বাহ, গুরুবর্গের সেবা হইয়াছে
কিনা, তদ্বিষয়ে মনােযােগ থাকে না-দেহের
মার্জন-ভূষণ,
কেশ-বিন্যাস, তাম্বুলাদি সেবা
প্রভৃতি সম্ভোগ-চেষ্টার অবসর থাকে না—কেবল
আত্মহারা হইয়া কোথা যাঙ, কোথা পাঙ”
এই ভাবে বিভাের থাকেন, সেইরূপ কৃষ্ণানুসন্ধানের
জন্য যাঁহারা পাগল, তাহারাও সম্ভোগবাদীর ন্যায়
জড়তৃপ্তি, এমন কি আত্মারামত্বে পৰ্যন্ত তৃপ্ত হন
না।\ল রঘুনাথের বৈরাগ্য অপ্রাকৃত বিলম্ভের
পরাকাষ্ঠা, সুতরাং সেই বৈরাগ্য-বারিধির পরিমাণ
কে করিতে পারিবে ? তাই কবিরাজ গােস্বামী
বলিয়াছেন,

রঘুনাথের বৈরাগ্য ৮১ * * * “অনন্ত গুণ রঘুনাথের কে করিবে লেখা। রঘুনাথের নিয়ম,যেন পাষাণের রেখা।” শ্রীল রঘুনাথের বৈরাগ্য-বিধি পাষাণের উপর রেখার ন্যায় সুদৃঢ় ও চিরস্থায়ী। রঘুনাথ মূৰ্ত্তিমা বৈরাগ্য-বিগ্রহ। জড়সম্ভোগবাদী, অনর্থযুক্ত, কৃষ্ণবহির্মুখ জীৰ আমরা আমাদের প্রতি অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ-আনখ-কেশাগ্র যেরূপ কৃষ্ণ-বিমুখতা- নিবন্ধন—শয়নে, স্বপনে, অশনে, ভূষণে অনুক্ষণ ভােগানুসন্ধান করিয়া থাকে, তদ্রুপ সম্ভোগ-বিগ্রহ কৃষ্ণের সেবার নিত্য-পরিপূর্ণ-উন্মুখতা-পরাকাষ্ঠার আদর্শ-প্রদর্শনকারী এল রঘুনাথের সকল অঙ্গপ্রতঙ্গ, অনখ-কেশা গ্র, কায়-মনােবাক্য, শয়নে স্বপনে, অশনে, ভূষণে অবিরাম কৃষ্ণসেবানুসন্ধানের আদর্শই আবিষ্কার করিয়াছে। প্রভুবর এল দাস গােস্বামী তাহার স্বরচিত ‘প্রেমান্তোজমকরন্দ-স্তোত্রে, কৃষ্ণবাঞ্ছাপূৰ্ত্তি-আরাধনার মূর্তবিহ কৃষ্ণের প্রণয়- বিকার মহাভাবচিন্তামণি নিজেশ্বরী শ্রীরাধাঠাকুরাণীর স্বরূপ-বর্ণনে শ্রীরাধার মানসিক ভাব, কায়িক অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ, বেশভূষা সমস্তই যে কৃষ্ণপ্রেমের এক একটা শােভা বা ভূষণ, তাহা বিশ্লেষণ করিয়া ২ গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস দেখাইয়াছেন। রাধা-দাস্তের মূর্ত-বিগ্রহ দাস গােস্বামী প্রভুরও চিত্তবৃত্তি, কায়িক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, শয়ন-স্বপন, অশন-ভূষণ সেই চিল্লীলামিথুনের সেবারই এক একটি শােভা বা ভূষণ-স্বরূপ, সুতরাং তাহার বৈরাগ্যযুক ভজনের আদর্শ নৃলােকে বুঝিতে পারিবেন না। শ্ৰীল কবিরাজ গােস্বামী প্রভু লিখিয়াছেন, “সাড়ে সাত প্রহর যায় কীৰ্ত্তন-স্মরণে। সবে চারিদণ্ড আহার-নিদ্রা কোনদিনে।” শ্রীল দাস গােস্বামী প্রভুর কোন কোন দিন চারিদও আহার-নিদ্রার অভিনয়ও পরিপূর্ণ কৃষ্ণ- মাভাগবতগণ আহার-নিদ্রার অভিনয়েও কৃষ্ণ-ভজন করিয়া থাকেন। সাধারণ জীবের তমােগুলােখ বা আলস্যজনিত নিদ্রা, কিম্বা রজো- গুণােথ বা প্রবৃত্তিজনিত আহার চেষ্টার ন্যায় কৃষ্ণভজনশীল মহাভাগবতগণের আহার-নিদ্রা নহে। তাহাদের আহার-নিদ্রা-শয়ন-স্বপন সকলই পূর্ণ হরভজন। কাজেই কবিরাজ কাজেই কবিরাজ গােস্বামী প্রভুর বর্ণনা পাঠ করিয়া যেন কেহ মনে না করেন যে, দাস: গােস্বামী প্রভুর ২৪ ঘণ্টার ভিতরে ২৪ ঘন্টা ভজন।

রঘুনাথের বৈরাগ্য ; হরিভজন হয় নাই, কিছু কম ছিল ; তাহা নহে। বায়ুভক্ষণকারী, বিজিতনি যােগি-তপস্বিগণ অনাহারে, অনিদ্রায় যুগ-যুগান্তর কাটাইলেও বিপ্রলম্ভবপু রঘুনাথের অনুক্ষণ কৃষ্ণভজন-আদর্শের কোট্যংশের একাংশের সহিতও তুলনা হইতে পারে । তাই বিজিত ষড় বর্গ গােস্বামী রঘুনাথের বৈরাগ্যের কথা কবিরাজ গােস্বামী প্রভু লিখিয়াছেন, “বৈরাগ্যের কথা তার অদ্ভুত কথন। আজন্ম ন দিলা জিহ্বায় রসের স্পর্শন। ছিণ্ডা-কানি কথা বিনা না পরেন বসন। সাবধানে প্রভুর কৈলা আজ্ঞার পালন। প্রাণরক্ষা লাগি’ যেবা করেন ভক্ষণ । তাহা খাঞা আপনার করে নিৰ্বেদন।” বিপ্রলম্ভবপু গৌরভক্তগণের পক্ষে ইহা আর আশ্চৰ্য্য কি? তঁাহারা ত’ আর আমাদের মত আত্মসন্তোগ-চেষ্টারত দেহারামী নহেন, দেহারামত্ব কেন, আত্মারামত্বও যে তাহাদের নিকট ন্যক্কত। কৃষ্ণানুসন্ধানে যাহারা পাগল, তাহারা ছিণ্ডা কানি- কথা অথবা পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির ন্যায় উত্তম বসন- ভূষণই পরিধান করুন, তাঁহাদের তাহা দেখিবার,

৪
গােস্বামী রঘুনাথদাস
ভাবিবার, ভােগ করিবার অবসর কোথায় ? তাহারা
দেহের কাৰ্য্য অভ্যাসে করিয়া থাকেন, তাহাদের
চিত্ত কৃষ্ণসেবানুসন্ধানে রত-কৃষ্ণসেবা-রস-সমুদ্রে
নিমজ্জিত। সম্ভোগবাদি আমরা ভােজন পাইলে
নাচিয়া উঠি; কারণ, কৃষ্ণে ভােগবুদ্ধিই আমাদের
বিরূপের স্বাভাবিক বৃত্তি। ঈশাবাস্য-জগৎকে
ভক্ষণ করিব-লুণ্ঠন করিব—ভােগ করিব-ইহাই
আমাদের বর্তমানের দুর্বুদ্ধি। কিন্তু যাঁহারা
একমাত্র কৃষ্ণসেবার জন্য জীবন ধারণ করেন,
তাহারা আপনাদিগকে ধিক্কার দিতে দিতে বলেন,
অহাে ! আমি এই ক্ষুধাব্যাধির পরিচর্যা
করিতে গিয়া এই ক্ষণকাল কৃষ্ণসেবা হইতে বঞ্চিত
হইলাম ; ধিক্‌ আমাকে, শত ধিক! কোথায়
কৃষ্ণকে ভােগ করাইব-কৃষ্ণ আমাকে ভােগ
করিবেন, কিন্তু আমি এ কি করিতেছি ? তাহারা
কিন্তু ভােগ করেন না, তাহাদের ভােগবুদ্ধি নাই,
তাহাদের সততই কৃষ্ণস্মৃতি, তাহারা কৃষ্ণপ্রেমে
মাতােয়ারা হইয়া কৃষ্ণপ্রসাদ কৃষ্ণকৃপারূপে
আস্বাদন করেন; তাহা দ্বারা তাহারা কৃষ্ণকেই
ভােগ করান-কৃষ্ণেরই সেবা করেন। ভাগবত,

রঘুনাথের বৈরাগ্য গণের নিজ ভােজনেও কৃষ্ণসেবা-কৃষ্ণকে ভােগ করাইবার চেষ্টা। ‘আপনার নিবেদন করিতে করিতে অন্বয়ভাবে তঁাহারা ভােজনের মধ্যেও বিপ্রলম্ভ বা কৃষ্ণানুসন্ধান করিয়া থাকেন, ব্যতিরেক- ভাবে অনর্থযুক্ত জীবকুলকে কৃষ্ণপ্রীতে ভােগ-ত্যাগ শিক্ষা দিয়া থাকেন। তাই বলিতেছিলাম, মহা- ভাগবতগণের আহার-নিদ্রাও কৃষ্ণ-ভজন—তাহাও কৃষ্ণানুসন্ধান—তাহাও বৈরাগ্য—তাহাও বিপ্রলম্ভ আর জড়সম্ভোগবাদী, দেহারামী বা ছল-আত্মা- রামানুসন্ধানকারী, যােগি-তপস্বিগণের আহারনিদ্রা পরিত্যাগও প্রচ্ছন্নভােগ বা সম্ভোগ চেষ্টা। শীল রঘুনাথদাস গােস্বামী প্রভু ভােজনকালেও বিপ্রলম্ভ বা নির্বেদ প্রকাশ করিতে করিতে আপনাকে ধিক্কার দিয়া বলিতেন, “আত্মানং চেদ্বিজানীয়াৎ পরং জ্ঞানধূতাশয়ঃ । কিমর্থং কস্য বা হেতেৰ্দেহঃ পুষ্ণাতি পামরঃ।” যদি পরব্রহ্মকে কেহ জানিতে পারেন, তাহা হইলে সম্বন্ধ-জ্ঞান দ্বারা নিবৃত্তাকাঙক্ষ সেই পুরুষ আবার কি জন্য কি সুখ ইচ্ছা করিয়া, জিহ্বা-লম্পট হইয়া দেহপােষণে যত্ন করিয়া থাকেন ?

গােস্বামী রঘুনাথদাস
কিছুদিন পরে রঘুনাথ মধ্যাহ্নকালে ছত্রে গমন
পূর্বক মাধুকরী গ্রহণের চেষ্টাও পরিত্যাগ
করিলেন। যাহারা প্রকৃত প্রস্তাবে কৃষ্ণভজন
করিতে চাহেন, তাহারা যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষ
হইবার চেষ্টা করিবেন। ইহার পরিপূর্ণ আদর্শ
শ্রীল রঘুনাথদাস গােস্বামী প্রভু তাহার আচরণ
দ্বারা প্রচার করিয়াছেন। রঘুনাথ ছত্রে মাধুকরী
গ্রহণ পরিত্যাগ করিয়া মহাপ্রসাদ বিক্রেতাদের যে
সমস্ত প্রসাদ বিক্রয় না হইত এবং যাহা দুই তিন দিন
হইয়া গেলে পসারিগণ সিংহদ্বারের নিকট কোন
এক স্থানে গাভীদিগকে বিলাইয়া দিত, পচা গন্ধে
গাভীরাও যাহা ভক্ষণ করতে না পারিয়া চলিয়া
যাইত, রঘুনাথ রাত্রিকালে, লােকে না দেখিতে পায়
এইরূপভাবে, ঐ সকল পষুষিত অন্ন ঘরে লইয়া
আসিয়া জলে ধৌত করিতেন এবং ভিতরের দৃঢ় অন্ন
সংগ্রহ করিয়া লবণ-সংযােগে কৃষ্ণোচ্ছিষ্ট চিবস্তু-
জ্ঞানে গ্রহণ করিতেন। একদিন শ্রীল স্বরূপ
গগাস্বামী প্রভু রঘুনাথের এই অদ্ভুত আচরণ দেখিয়া
সাননে রঘুনাথের নিকট হইতে সেই মহাপ্রসাদ
কিছু চাহিয়া লইলেন এবং কৃষ্ণোচ্ছিষ্ট চিবস্তুজ্ঞানে

রঘুনাথের বৈরাগ্য
৮৭
-
তাহা আস্বাদন করিলেন। আস্বাদন করিয়া শ্রীল
রঘুনাথকে বলিলেন,-
* *—“ঐছে অমৃত খাও নিতি নিতি।
আমা সবায় নাহি দেহ’—কি তােমার প্রকৃতি ?”
মহাপ্রভু যখন সেবক-গােবিন্দের মুখে এই সকল
অপূর্ব বার্তা শ্রবণ করিলেন, তখন রঘুনাথের নিকট
"আসিয়া রঘুনাথ ও স্বরূপকে বলিতে লাগিলেন,
“খাসা বস্তু খাও সবে, মােরে না দেহ’ কেনে?”
-এই বলিয়া মহাপ্রভু রঘুনাথের নিকট হইতে এক
গ্রাস অন্ন বলপূর্বক কাড়িয়া লইয়া ভােজন করিলেন।
মহাপ্রভু যেই আর এক গ্রাস উঠাইয়া গ্রহণ করিতে
উদ্যত হইয়াছেন, অমনি স্বরূপ মহাপ্রভুর হাত ধরিয়া
ফেলিলেন এবং বলিলেন,-“প্রভাে, ইহা তােমার
যােগ্য নহে।” স্বরূপ প্রভুর হাত হইতে মুষ্টিবদ্ধ অন্ন
কাড়িয়া লইলেন। মহাপ্রভু স্বরূপকে বলিলেন,-
নিতি নিতি নানা প্রসাদ খাই।
ঐছে স্বাদ আর কোন প্রসাদে না পাই ।
কবিরাজ গােস্বামী প্রভু লিখিয়াছেন,
“এইমত মহাপ্রভু নানা লীলা করে।
রঘুনাথের বৈরাগ্য দেখি’ সন্তোষ অন্তরে।”

سانا
গােস্বামী রঘুনাথদাস
পাঠক, “এক লীলায় করেন প্রভু লীলা পাঁচ
সাত” - এই বাক্যের সার্থকতা ত’ মহাপ্রভু ও
মহাপ্রভুর ভক্তগণের লীলা-তরঙ্গে কতবার দেখিয়া-
ছেন, এই লীলালহরীতেও তাহা দর্শন করুন।
লােক-শিক্ষক-লীলাভিনয়কারী মহাপ্রভু ও মহাপ্রভুর
ভক্তগণ স্বলীলায় কত ভাবেই না জীবগণকে শিক্ষা
দিয়াছেন ।
হায়! আমার ন্যায় পামর তাহা
দেখিয়াও দেখিল না-বুঝিয়াও বুঝিল না-
শুনিয়াও শুনিল না। যে শ্রীস্বরূপ দামােদর
রঘুনাথকে বলিলেন,-“ঐছে অমৃত খাও নিতি
নিতি। আমা সবায় নাহি দেহ’ কি তােমার
প্রকৃতি ?” আবার সেই স্বরূপই মহাপ্রভুর হাত
হইতে সেই “অমৃত” “তব যোগ্য নহে” বলিয়া
কাড়িয়া লইলেন ! এই দুই বাক্য ও আচরণের
মধ্যে যে কত মহতী শিক্ষা নিহিত রহিয়াছে,
গুরু-বৈষ্ণব-সেবামুখগণই তাহা উদঘাটন করিতে
পারেন। অনর্থযুক্ত আমরা—সেবা-বিমুখ আমরা—
আনখ-কেশাগ্র বৈষ্ণব-সেবা-বিমুখ আমরা সাধক ও
সিদ্ধকে, শিষ্য ও গুরুকে, অনর্থযুক্ত ও অনর্থমুক্তকে
সমপর্যায়ে গণনা করি। কৃষ্ণবহির্মুখিনী চিত্তবৃত্তি

রঘুনাথের বৈরাগ্য
আমাদিগকে প্রতি পদে এইরূপ ভ্রান্তির পথে
প্রধাবিত করিয়া থাকে, তাই সাধ্য-সাধন তত্ত্বের
আচাৰ্য, ভক্তিসিদ্ধান্ত-সম্রাট মাধ্বগৌড়ীয়ের ঈশ্বর
শ্রীল স্বরূপ দামােদর প্রভু আমাদিগের নিকট এক
অদ্ভুত লীলা আবিষ্কার করিয়া মহতী শিক্ষা দান
করিলেন।

সাধকওসিদ্ধেশ্নকি
এক অবস্থা ?
স্বরূপ দামােদর প্রভু রঘুনাথ ও মহাপ্রভুর প্রতি
দুইটী পৃথক ব্যবহারের আদর্শ স্থাপন করিয়া সাধক
জীবকুলের জন্য জানাইলেন যে, (জীবশিক্ষার্থ)
সাধক-লীলাভিনয়কারী
(নিত্যসিদ্ধ) প্রভুবর
রঘুনাথের বা সাধকের স্বয়ং কৃষ্ণপ্রীত্যর্থে বৈরাগ্য
আচরণের অভ্যাস থাকিলেও নিখিল ঐশ্বৰ্যশালী
নিত্যসিদ্ধ হরি-গুরু-বৈষ্ণবকে একমাত্র প্রভুজ্ঞানে
বাৎকৃষ্ট চিদুপকরণের দ্বারা সেবা করা কর্তব্য।
সাধকসিদ্ধসমন্বয়বুদ্ধিরূপ পাষণ্ডতা হইতেই মনে হয়
যে, সাধকের ন্যায় সিদ্ধও নানা প্রকার কৃচ্ছসাধ্য
সাধন করিতে বাধ্য। রামচন্দ্রপুরী, অমােঘ প্রভৃতির
আদর্শ লইয়া অনেকে মহাপ্রভুর রাঘবের ঝালির
বিচিত্র ভােজ্যসামগ্রী বা সার্বভৌমের গৃহে বিচিত্র
নৈবেদ্যসম্ভার গ্রহণকে মহাপ্রভুর পক্ষে উদরলাম্পট্য
মনে করে, কেহ বা অবধূত নিত্যানন্দ রামের
সর্বোৎ
৩

সাধক ও সিষের কি এক অবস্থা?
দারপরিগ্রহ-কাৰ্য্যকে বান্তাশীর আচরণ মনে করে,
কেহ বা মহাবিষ্ণবতার অদ্বৈতাচাৰ্য প্রভু, শ্রীনিবাস
আচার্য্য প্রভু প্রভৃতি বিষ্ণুবৈষ্ণবসম্রাজগণের
একাধিক পত্নী গ্রহণ, জাহ্নবা ঠাকুরাণীর উষ্ণজলে
স্নান, পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি, রায় রামানন্দ, বাণীনাথ
পট্টনায়ক প্রভৃতির বিষয়সেবার অভিনয়কে বিলাসিতা
বা প্রাকৃত বিষয়নিষ্ঠা মনে করিয়া অপরাধ-পঙ্কে
নিমজ্জিত হয়। এই সকল পাষণ্ডতার মূল কারণ সিদ্ধ
ও সাধকে সমন্বয়-বুদ্ধি। যেমন হিতাহিত জ্ঞানবিলুপ্ত
রােগিকুল মনে
মনে করিয়া থাকে যে, স্বাস্থ্যবান্
চিকিৎসক-সমাজকেও রােগিকুলের ন্যায় সাগু,
বালি', তিক্ত ঔষধ গ্রহণ ও উপবাসাদি আচরণ
করিতে বাধ্য হওয়া উচিত, তদ্রুপ মৎসর অনর্থযুক্ত
ব্যক্তিগণও বলিয়া থাকে যে, সিদ্ধগণও সাধকের
ন্যায় উপবাস, শুদ্ধরুটি, চানা, পষুষিত কর্দমাক্ত
প্ৰসাদা গ্রহণ, ছেড়া কাথা, শতছিদ্র কানি পরিধান,
এক এক বৃক্ষতলে এক এক দিন বাস, অপরের
দ্বারা লাঞ্ছিত, নির্যাতিত ও তিরস্কৃত হইতে বাধ্য
হইবেন। যেহেতু কোন কোন সিদ্ধ মহাভাগবত যখন
সাধক জীবগণকে বৈরাগ্য শিক্ষা দিবার জন্য এক

১২ গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস এক বৃক্ষের তলে এক এক দিন শয়ন করিয়াছেন, অনিকেত থাকিয়াছেন, শুষ্ক রুটী, চানা, প্যুষিত কর্দমাক্ত অন্ন বা কেবল কর্দম গ্রহণ করিবার অভিনয় দেখাইয়াছেন, উপবাসী থাকিয়াছেন, জগতের লােকের নিষ্ঠীবন, তিরস্কার প্রভৃতি দ্বারা লাঞ্ছিত হইয়াও সহিষ্ণুতার আদর্শ দেখাইয়াছেন, তখন নিশ্চয়ই সর্বতন্ত্রস্বতন্ত্র, নিত্য কৃষ্ণসেবায় দৃঢ়চিত্ত, সিদ্ধ গুরুবৈষ্ণবগণও আমাদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য আমাদের গােলামী করিতে বাধ্য হইবেন ! আমরা আমাদের নিত্যসিদ্ধ গুরুবর্গকে বিধর্মী দ্বারা বাইশবাজারে প্রহৃত করাইব, মদ্যপের দ্বারা গুরু বৈষ্ণব-বর্গের অঙ্গে কলসীর কানা নিক্ষেপ করাইয়া রক্ত বাহির করাইব, আমর বিলাসিনী সহ অট্টালিকায় বাস করিয়া গুরুবৈষ্ণবকে অনিকেত থাকিতে বাধ্য করিব, আমরা বােসরয়েজ, মােটর গাড়ী. স্যালুনকার, এরিয়ােপ্লেন প্রভৃতিতে আরােহণ করিয়া নিরন্তর কৃষ্ণসেবাতৎপর গুরুবৈষ্ণববর্গকে পদব্রজে চলিতে বাধ্য করিব, আমরা নরকপথের সাধনন দেহের বিলাসের জন্য ঢ, চুষ, লেহ, পেয় গ্রহণ করিয়া নিত্যসিদ্ধ, বিজিতষড় বর্গ গুরুবৈষ্ণব-

সাধক ও সিদের কি এক অবস্থা?
বর্গকে পষুষিত কর্দমাক্ত অন্ন, শুষ্ক রুটী, ছােলা,
বায়ু প্রভৃতি ভক্ষণ করিতে বাধ্য করিব। এই
সকল পাষণ্ডবুদ্ধির হস্ত হইতে মুক্ত করিবার জন্যই
ব্ৰহ্মমাধ্বগৌড়েশ্বর শ্রীল স্বরূপদামােদরের ঐরূপ
শিক্ষালীলা প্রচার। শ্রীল স্বরূপদামােদর প্রভু জানাই,
লেন-সাধক জীবের পক্ষে আনুকরণিক নিষ্কপটতা
ও নিরপেক্ষতার সহিত কর্দমাক্ত পষুষিত অন্ন
প্রভৃতি গ্রহণরূপ বৈরাগ্যাচরণ যােগ্য হইলেও
সিদ্ধগুরু-বৈষ্ণবর্গ বা স্বয়ং ভগবানের প্রতি তদধীন
বশ্য বদ্ধ জীব তাহা শাসনবিধিরূপে নিয়ােগ করিতে
সম্পূর্ণ অযােগ্য। সর্বতন্ত্র-স্বতন্ত্র লােকশিক্ষকলীলা-
ভিনয়কারী ভগবান্ বা গুরুবৈষ্ণববর্গ লােক শিক্ষা-
দানার্থ স্বেচ্ছায় বৈরাগ্যের আচরণ প্রদর্শন করিলেও
আমরা স্বতন্ত্র
গুরুবৈষ্ণব-ভগবানকে আমাদের
ইন্দ্রিয়তৃপ্তিবিধানাৰ্থ সাধক জীববাচিত সাধন করা
ইতে বাধ্য করিতে পারি না। তাহা রামচন্দ্রপুরী
বা অমােঘের আদর্শে পাষণ্ড। গুরুবৈষ্ণব দৈন্ত
করিয়া ছেড়া কাঁথা পরিধান, পষুষিত কর্দমাক্ত
অন্ন ভােজন, আপনাকে ‘অধম চণ্ডাল’রূপে বর্ণন
করিতে চাহিলে তাহার গায় হেঁড়া কথা পরাইয়া

৯৪
গােস্বামী স্ত্রীরঘুনাথদাস
দিতে হইবে না বা তাহার ভােজনের জন্য পর্যুষিত
কর্দমাক্ত অন্নের ব্যবস্থা করিতে হইবে না কিম্বা
তাঁহাকে ‘অধম চণ্ডাল’ বলিতে হইবে না, সিদ্ধান্ত
সম্রাট স্বরূপদামােদর প্রভু ইহাই শিক্ষা দিলেন।

হরিগুরুবৈষ্ণবের অমান্নায় দা হিংসা কি নিষ্টতা শ্ৰীল স্বরূপদামােদর ও শ্ৰীমন্মহাপ্রভু সাধক- জীবলীলাভিনয়কারী (নিত্যসিদ্ধ প্রভুবর) শ্রীল রঘুনাথের বৈরাগ্যের উত্তরােত্তর উত্তরােত্তর তীব্রতা ও ঐকান্তিকতা-দর্শনে আনন্দিত হইলেন কেন? “রঘুনাথের বৈরাগ্য দেখি’ সন্তোষ অন্তরে”। যাহা দেখি’ প্রীত হন গৌর ভগবান্ ।” সাধারণ বিচারে ইহা নৃশংসতা, নিষ্ঠুরতা বা মৎসর বলিয়াই মনে হয়। রঘুনাথ বৃদ্ধ মাতা- পিতা, ইন্দ্রসম ঐশ্বর্য, অপরা-সম স্ত্রী পরিত্যাগ করিয়া যখন নীলাচলে আসিলেন, তখন মহাপ্রভুর আনন্দ ধরে না; আবার যখন গােবর্ধনদাসের প্রেরিত সেবক ও অর্থাদি রঘুনাথ নিজের জন্য কিছুই গ্রহণ করিলেন না, তখন মহাপ্রভুর আনন্দ আরও বর্ধিত হইল। পুনরায় রঘুনাথ যখন গােবর্ধনদাসের অর্থে মহাপ্রভুকে নিমন্ত্রণ করিবার চেষ্টাও পরিত্যাগ

গগাস্বামী রঘুনাথদাস
করিলেন, তখন মহাপ্রভু অধিকতর আনন্দিত
হইলেন। রঘুনাথ যখন মহাপ্রভুর সেবক গােবিন্দের
প্রদত্ত ভােজ্য-সামগ্রী গ্রহণ না করিয়া ভিক্ষার জন্য
সিংহদ্বারে গমন করিলেন, তখন মহাপ্রভু পরম
আনন্দিত হইলেন। যখন সিংহদ্বারও পরিত্যাগ
করিয়া রঘুনাথ একবেলামাত্র ছত্রে মাধুকরী করিতে
থাকিলেন, তখন মহাপ্রভু আরও অধিকতর গুণে
আনন্দিত হইলেন; আবার ছাত্র পরিত্যাগ পূর্বক
যখন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হইয়া কর্দমাক্ত, পর্যষিত,
পশুর অখাদ্য সামগ্রী প্রসাদজ্ঞানে গ্রহণ করিতে
থাকিলেন, তখন স্বরূপ দামােদর ও মহাপ্রভু এত
অধিক আনন্দিত হইলেন যে, নিখিল ঐশ্বর্যের সম্রাট
হইয়াও তাহারা রঘুনাথের সেই সম্মানের বস্তু রঘু-
নাথের নিকট হইতে কাড়িয়া খাইতে গেলেন।
কবিরাজ গােস্বামী প্রভু এখানেই লিখিয়াছেন,
মহাপ্রভু ও স্বরূপদমােদর—“রঘুনাথের বৈরাগ্য
দেখি সন্তোষ অন্তরে।” ইহারই নাম কি সন্তোষ ?
ইহারই নাম কি স্নেহ ? দুনিয়ার সব লােক সমস্বরে
বলিবে, ইহার নাম নৃশংসতা।
একজন রাজপুত্র
নবযৌবনকালে রাজৈশ্বৰ্য্য ছাড়িয়া পথের ভিখারী

হরিবৈষ্ণবের দয়া হইলেন, তবুও প্রভুর আশা মিটিল না, তারপর আবার তাহাকে ছেড়া কানি পরাইয়া ও গরুর অখাদ্য পচা খাওয়াইয়া ছাড়িলেন এবং ইহাতেই প্রভুর পরম সন্তোষ হইল। ইহা কি সন্তোষ ? না হিংসা, মৎসরতা বা নিষ্ঠুরতা? স্নেহমাখা হৃদয় কি কখনও এইরূপ নৃশংসতা সহ করিতে পারে? কই, রঘুনাথের স্নেহময়ী মাতা, স্নেহময় পিতা ত’ রঘুনাথের এই বৈরাগ্য সহ করিতে পারেন নাই—তাহাদের ত’ বুক ফাটিয়া গিয়াছিল, তাই তাহারা রঘুনাথের জন্য নীলাচল পৰ্য্যন্ত অর্থ ও সেবক পাঠাইয়াছিলেন, কিন্তু মহাপ্রভু কি নিষ্ঠুর! স্বরূপ-দামােদর কি নৃশংস।ইহাদিগকে আবার লােকে করুণাসিন্ধু’, ‘দয়াবতার প্রভৃতি বলেন! স্নেহময় মাতা-পিতা স্নেহবশীভূত হইয়া যে অর্থ ও সেবক পাঠাইয়াছিলেন, মহাপ্রভু ও স্বরূপদামােদর সেইগুলি পৰ্যন্ত ত্যাগ করাইয়া রাজ- পুত্রকে ছেড়া-কাঁথা-কানি পরাইয়া—পশুর, অখাদ্য পচা ভাত খাওয়াইয়া ছাড়িলেন! আর তঁাহারাই নাকি দয়াময়দের বিচারে রঘুনাথের প্রতি পরম মেহময়। অার স্নেহময় মাতা-পিতা যত ৭

১
গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস
জমাখ্য-দ্য! ভাগবতের লেখককে পাইলে ফে
আমরা আজ কি করিতাম, তাহা বলা যায় না।
লেখক বলিয়াছেন,
কিমাত্মনানেন জহাতি যোহন্ততঃ
কিং রিকৃথহারৈঃ স্বজনাখ্যদভিঃ।
কিং জায়য়া সংস্কৃতি-হেতুভূতয়া
মর্ত্যস্য গেহৈঃ কিমিহায়ুযােহব্যয়ঃ।”
এই দেহের দ্বারা কি হইবে ?—যাহা অন্তঃকালে
ত্যাগ করে। দাদগণকে লইয়াই বা কি হইবে?
যাহারা ‘আত্মীয়’ নামে পরিচিত দ—'আমাদের
আত্মধনের সর্বনাশ করে, আমাদিগকে নিজস্ব-পিতৃ-
সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত করে। স্ত্রী লইয়াই বা কি
হইবে?—যাহা সংসারের একমাত্র হেতু। মানুষের
গৃহেরই বা কি প্রয়ােজন ? এখানে বৃথা আয়ুক্ষয়েরই
বা কি আবশ্যক।
নিরীশ্বর-নেতিক বিশ্বমানব, এইকথাগুলি ভাল
করিয়া চিন্তা করুন, উতলা হইবেন না—অসহিষ্ণু
হইবেন না, বিচার করুন-চৈতন্যচন্দ্রের দয়া
বিচার করুন ; বিচার করিতে করিতে চমৎকৃত
হইবেন;'' তখনই বুঝিতে পারিবেন, মহাপ্রভু
.

হরিগুরুবৈষ্ণবের দয়া
ও মহাপ্রভুর প্রকৃত ভক্তগণের দয়া বিশ্ববিপ্লবময়ী।
বিশ্বমানব বিশ্বের অভিজ্ঞান-দ্বারা অঙ্ক কষিয়া
যাহাকে স্নেহ’, ‘কৃপা’, ‘দয়া’, ‘পরােপকার’ প্রভৃতি
বলিয়া ‘ঠিক’ দিয়া রাখিয়াছে, সেই ঠিকেই ভুল,
তাহ স্নেহ নয়, দয়া নয়, কৃপা নয়, পরােপকার নয়,
তাহা হিংসা, নৃশংসতা, নিষ্ঠুরতা, মৎসরতা। আর
বাহ-দৃষ্টিতে যাহাকে আমরা ‘হিংসা’, ‘নিষ্ঠুরতা,
নৃশংসতা, মনে করিতেছি, তাহাই পরম কৃপা
মহাবদান্যতা—মহা-অনুকম্পা। ইহা বুঝিয়াছিলেন
—নিত্যসিদ্ধ রঘুনাথ ; তাই আমাদের ন্যায় পামর
জীবকে শিক্ষা দিবার জন্য তাঁহার ঐ প্রকার
অভিনয়। যিনি ইহা বুঝিতে পারেন, তিনিই
মুক্তিপদে দায়ভাক হন।
প্রকৃত সদ্গুরু-প্রকৃত গৌরজন তাহার
অকৃত্রিম, অপার্থিব-স্নেহত-তাহার সুশীতল
পদ-ছায়ায় নিত্য-আশ্রিত শিষ্যকে এইরূপ অমায়ায়ই
কৃপা করেন—স্নেহ করেন, দয়া করেন, শিষ্যের
উপকার করেন ; আর স্বজনাখ্য-দস্যবিত্তাপহারী
গুরুত্ৰুব-মহাবদান্য মহাপ্রভুর অমন্দোদয়-দয়া-
বিচারবিমুখ ব্যক্তিগণ আপাত স্নেহ-দয়-উপকারের

গগাস্বামী রঘুনাথদাস নামে ভীষণ হিংসা-নৃশংস করিয়া থাকেন। এতবড় সাধের মানবজীবন মানব-জীবন-এত বড় একটা সুযােগ-যে সুযোগে সকল আশা, সকল পিপাসা মিটিয়া যাইতে পারে, সেই সুযােগ হইতে তাহার আমাদিগকে বঞ্চিত করেন, সুতরাং স্নেহময়ের নামে তাঁহাদের মত হিংসক কে ?-মিত্রের নামে তঁাহাদের মত শত্রু কে ?—উপকারীর নামে তাহাদের মত অপকারী কে ?-স্বজনের নামে তাহাদের মত দুৰ্জ্জন কে ?- শুভানুধ্যায়ীর নামে তাহাদের মত অশুভ- কামী কে? যতদিন আমরা মােহন্ধ থাকি, ততদিন আমাদের কর্ণে এ সকল কথা প্রবেশ করে না। মুিখমস্তিকের গঠন-প্রণালী এ সকল কথা ধারণা করিতে পারে না ; উল্টা বোঝে—হিংসাকে দয়া, স্নেহ বােঝে, আর স্নেহকে হিংসা, নিষ্ঠুরতা বােঝে। রােগী বৈদ্যের ব্যবস্থাকে নিষ্ঠুরতা মনে করিবে, ইহা স্বাভাবিক। গৌরসুন্দরের প্রকৃত ভক্ত ছাড়া কৃষ্ণতত্ত্ববিৎ সদ্গুরু ছাড়া অপরের সমগ্রদর্শন নাই- সুদূরদর্শিতা নাই। অপরের দূরদর্শিতার গতি দেহ ও মনপৰ্য্যন্ত, তাহাদের মুখে আওড়ান আত্মার কথা-কথার কথা মাত্র, মায়াদেবী তাহাদের মাথার হরিগুরুবৈষ্ণবের দয়া প্যাচ এমনি করিয়া প্রস্তুত করিয়াছেন যে, দেহ-মন অতিক্রম করিয়া আত্মার কল্যাণের কথা তাহাদের মস্তিষ্কের নিকট কেহ উপস্থাপিত করিলেই তাহাদের মাথার প্যাচগুলি যেন আপনা আপনি (automatically) আঁটিয়া যায়; তাই তাহারা আত্মার হিংসা করিয়া দেহ-মনের আপাত-তর্পণকেই ‘স্নেহ’, ‘দয়া, ‘উপকার’ প্রভৃতি মনে করেন। এখানে রঘুনাথের স্বজন-নামধারী গােৰ্দ্ধন দাস প্রভৃতির আচরণ এবং প্রকৃত নিত্য স্বজন মহাপ্রভু-স্বরূপ-দামােদরাদির আচরণ রঘুনাথের চরিত্রে প্রকৃত ‘সেহ’, ‘দয়া, ‘কৃপা’, ‘উপকারের চিত্র জগতের নিকট অতি পরিস্ফুটরূপে প্রদর্শন করিয়াছে। প্রকৃত ‘কৃপা, ‘স্নেহ’, ‘মমতা কাহাকে বলে, রঘুনাথ স্বয়ং আমাদিগকে নিজ চরিত্রের উদাহরণস্থলে শিক্ষা দিয়াছেন, মহাসম্পদ্দারাদপি পতিতযুদ্ধত্য কৃপয়া স্বরূপে যঃ স্বীয় কুজনমপি মাং ভস্য মুদিতঃ। উরাে গুঞ্জাহারং প্রিয়মপি চ গােবনশিলাং দদৌ মে গৌরাঙ্গো হৃদয় উদয়ন্মাং মদয়তি।” (স্তবাবলীতে চৈতন্য স্তবকল্পবৃক্ষ-স্তবে ১১শ শ্লোক)

১০২ গােস্বামী রঘুনাথদাস
আমি মহা কুজন হইলেও যিনি আমাকে পতিত
দেখিয়া কৃপা পূৰ্ব্বক সম্পং ও দারা (পাঠান্তরে
বিষয়রূপ-দাবাগ্নি) হইতে উদ্ধার করিয়া শ্রীস্বরূপের
হস্তে অৰ্পণ করিয়াছিলেন এবং তাহাতে প্রচুর
আনন্দ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, যিনি আমাকে স্বীয়
বক্ষের গুঞ্জামাল ও গােবর্ধনশিলা দান করিয়া-
ছিলেন, সেই গৌরাঙ্গ আমার হৃদয়ে উদিত হইয়া
আমাকে মত্ত করুন।
“বৈরাগ্যযুগভক্তিরসং প্রযতুৈ-
রপায়য়মনভীমন্ধ।
কৃপাম্বুধিঃ পরদুঃখদুঃখী
সনাতনং তং প্রভুমায়ামি।”
( বিলাপকুসুমাঞ্জলি ৩য় শ্লোক)
যিনি সর্বদা পরদুঃখে কাতর ও দয়ার সাগর,
অামি অনিচ্ছুক থাকিলেও যিনি যত্নসহকারে
অজ্ঞানান্ধ আমাকে বৈরাগ্যযুক্ত ভক্তিরস পান
করাইয়াছেন, সেই সম্বন্ধজ্ঞানদাতা সনাতন প্রভুতে
আমি প্ৰপন্ন হইতেছি।

ব্লন্দাবনে নমুনাথ পুরুষােত্তমে রঘুনাথ শ্ৰীস্বরূপের আনুগত্যে ব্রাধাভাব-দ্যুতি:সুবলিত বিপ্রলম্ভলীলাময়-বিগ্রহ গৌরসুন্দরের অন্তরঙ্গসেবা করিতে থাকিলেন। দীর্ঘ কৃষ্ণবিরহসন্তপ্ত বার্ষনবী কুরুক্ষেত্রে যে দিবব্যা- দে বিভাবিত হইয়া বৃন্দাবনের মুরলীননিনাদিত তপনতনয়াতীরে নিভৃত নিকুঞ্জে কৃষ্ণকে পাইতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন, পুরুষােত্তমে জগন্নাথ দর্শনেও মহাপ্রভুর সে ভাব উদিত হইত-নীলাচলে রপােপরি জগন্নাথ-দর্শনে কুরুক্ষেত্রের বৃন্দাবনীয় বিপ্রলস্তোদয়, আবার সুন্দরীচলে উপবনমধ্যে জগন্নাথ দর্শনে রাধাকুণ্ডে কৃষ্ণকে পাইবার অভিলাষ বিরহ- বারিধিকে দ্বিগুণতর উদ্বেলিত করিয়া তুলিত । স্বরূপ ও স্বরূপানুগ রঘুনাথ মহাপ্রভুর বিরহ-সমুদ্র উদ্বেলনের অনুকূল অনিলস্বরূপ ছিলেন ; তাহারা ভাবােপযােগী সেবাদ্বারা মহাপ্রভুর বিলম্ভেরই অধিকতর: পরিপুষ্টি করিতেন। রঘুনাথ স্বরূপের আনুগত্যে ঘােড়শ বৎসরকাল শ্রীপুরুষােত্তমে খাকিয়া মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ সেবা করিয়াছিলেন।

১০৪ গােস্বামী রঘুনাথদাস রঘুনাথের জীবাতু-স্বরূপ চৈতন্যচন্দ্র ও তাহারই দ্বিতীয় স্বরূপ শীস্বরূপ দামােদর উভয়েই অপ্রকট লীলা আবিষ্কার করিলেন। ইহাতে রঘুনাথের স্বতঃসিদ্ধ বিহানল আরও বাড়িয়া উঠিল। রঘুনাথ, বিরহব্যথিত হইয়া পুরুষােত্তম হইতে বৃন্দাবনে গমন করিলেন, উদ্দেশ্য—এ দেহ আর রাখিবেন , শ্রীরূপ-সনাতনের চরণ দর্শন পূর্বক ভৃগুপাতে দেহ বিসর্জন করিবেন। রঘুনাথ কর্মিগণের ন্যায় ভৃগুপাত ইচ্ছা করেন নাই ; রঘুনাথ ছিলেন আর এক রাজ্যের লােক। তিনি কৃষ্ণকে পূর্ণতমভাবে সেবা করিয়াও “কৃষ্ণের সেবা হইল না, সুতরাং এ পােড়া প্রাণ-ধারণের আবশ্যকতা কি?”—এইরূপ অত্যন্ত বিরহব্যথিতের বিচারে ভৃগুপাতে দেহ বিসর্জনের সঙ্কল্প করিয়া- ছিলেন। কিন্তু শ্রীরূপ-সনাতন বিরহােন্মত্ত রঘুনাথকে থামাইলেন; স্নেহের “তৃতীয় ভাই” করিয়া নিকটে রাখিলেন, 'আর নিরন্তর তাঁহার মুখে বিপ্রলম্ভ- লীলাময়-বিগ্রহ মহাপ্রভুর লীলা শ্রবণ করিয়া বিলম্নোদ্দীপনের পরিপুষ্টি করিতে থাকিলেন। শ্ৰল কবিরাজ গােস্বামী প্রভু স্বীয় প্রভু রঘুনাথের

১০৫
বৃন্দাবনে রঘুনাথ
বৃন্দাবনীয় দৈনিক কৃত্য সরল মধুর
গাহিয়াছেন (চৈঃ চঃ আঃ ১০৯৮-১০৩),-
“অন্ন-জল ত্যাগ কৈল অন্য-কথন।
পল দুই-তিন-মাঠা করেন ভক্ষণ ।
সহস্র দণ্ডবৎ করে, লয় লক্ষ নাম।
দুই সহস্র বৈষ্ণবের নিত্য পরণাম।
রাত্রিদিনে রাধাকৃষ্ণের মানস সেবন।
প্রহরেক মহাপ্রভুর চরিত্র-কথন।
তিন সন্ধ্যা রাধাকুণ্ডে অপতিত স্নান।
ব্রজবাসী বৈষ্ণবেরে আলিঙ্গন দান।
সার্ধ সপ্তপ্রহর করে ভক্তির সাধনে।
চারি দণ্ড নিদ্রা, সেহ নহে কোন দিনে।
তাহার সাধন-রীতি শুনিতে চমৎকার।
সেই রূপ-রঘুনাথ:প্রভু যে আমার।”

রাধাকুণ্ডবাসী লুনাথ শ্যামকুণ্ড ও রাধাকুও কলিকালে লােকলােচন হইতে বিলুপ্ত হইয়াছিল। কলিযুগপাবনাবতারী শ্রীগৌরসুন্দর বৃন্দাবনে আগমন করিয়া সেই যুগল- কুণ্ড পুনরুদ্ধার করেন; কিন্তু সেই কুণ্ডদ্বয়ে অত্যল্পমাত্র জল:প্রকাশিত ছিল। নিত্য যুগলকুণ্ড নিস্নাত রঘুনাথ জগতে কৃষ্ণার্থে অখিল চেষ্টার আদর্শ প্রচার করিবার জন্য কুণ্ডদ্বয় সংস্কারপূর্বক তাহা জলপূর্ণ করিয়া লােকলােচনের নিকট প্রকাশ করিতে ইচ্ছা করিলেন। ইহাতে অর্থানুকূল্যের আবশ্যকতা জানিয়া রঘুনাথের চিত্তে অর্থলাভের চিন্তা উদিত হইলে রঘুনাথ অথৈষণা-জন্য আপনাকে ধিত করিবার আদর্শ প্রদর্শন করিলেন। কৃষ্ণার্থে-অখিলচেষ্ট শ্ৰীল রঘুনাথের অর্থৈষণা পূর্ণ-কৃষ্ণসেবা-তাৎপৰ্য্যময়ী, তথাপি পাছে রাধাকুণ্ডবাস বেষ-গ্রহণের ছলনা করিয়া মর্কটচরিত্র-ব্যক্তিগণ কনক-কামিনী-প্রতিষ্ঠারূপিণী শুকরী বিষ্ঠার লালসায় ঘুরিয়া বেড়ায়, সেই আদশে যদিও রাধাকুণ্ডবাসী রঘুনাখ ১০৭ বাধা প্রদান করিবার জন্যই রঘুনাথ আপনাকে ধিক্কার প্রদান করিলেন। ভগবান ভক্তের মনাে- ভীষ্ট অপূর্ণ রাখেন না। বৈষ্ণব—সত্য-সঙ্কল্প, তাই রঘুনাথের সেবা-সঙ্কল্প-কল্পলতিকা অচিরেই পুষ্পিতা ইইল। কোন এক ধনাঢ্য ব্যক্তি বদরিকাশ্রমে গমন করিয়া নারায়ণের দর্শনীস্বরূপ প্রচুর অর্থ প্রদান করিলেন । নারায়ণ ঐ শ্ৰেষ্ঠীকে সমস্ত অর্থ ব্ৰজস্থ অরিষ্ট গ্রামে বৈষ্ণবশ্রেষ্ঠ শ্রীরঘুনাথ- দাসের নিকট লইয়া যাইতে স্বপ্নাদেশ প্রদান করিলেন এবং তৎসঙ্গে বলিলেন যে, যদি বিরক্তা- গ্রগণ্য রঘুনাথ অর্থ গ্রহণ করিতে না চাহেন, তাহা হইলে যেন শ্রেষ্ঠী মহােদয় শ্রীল রঘুনাথকে শ্রীকুণ্ডযুগল-সংস্কারের কথা স্মরণ করাইয়া দেন। সেই শ্ৰেষ্ঠী নারায়ণের আজ্ঞা পাইয়া ব্রজে শ্রীরঘুনাথদাস গােস্বামীর নিকট আসিলেন এবং তাহার চরণ বন্দন পূর্বক তৎসমীপে যাবতীয় অর্থ প্রদান করিলেন; তৎসঙ্গে নারায়ণের আজ্ঞাও বিজ্ঞাপিত করিলেন। রঘুনাথ বদান্যবর শ্রেষ্ঠীর সেবা-বৃত্তির পুনঃ পুনঃ প্রশংসা করিয়া তাহাকে কুণ্ড- দ্বয়ের পঙ্কোদ্ধার-সেবা করিতে অজ্ঞা দিলেন। ;

Sobo গােস্বামী রঘুনাথদাস শ্ৰেষ্ঠী মহােদয় আজ্ঞা প্রাপ্ত হইয়া পঙ্কোদ্ধারার্থ বহু লােক নিযুক্ত করিয়া দিলেন। শ্যামকুণ্ডের তীরে একটী সুপ্রাচীন বৃক্ষ বিরাজিত ছিল ; সকলে বলিলেন যে, ঐ কুণ্ডতীরে যে বৃক্ষটী রহিয়াছে, উহা ছেদন পূর্বক শ্যামকুণ্ডের চতুষ্কোণ সমান করিয়া খনন করিতে হইবে। সেই দিন মহারাজ যুধিষ্ঠির স্বপ্নযােগে রঘুনাথের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেন, “আমরা পঞ্চভ্রাতা এই বৃক্ষরূপে শ্যাম- কুণ্ডের তীরে বিরাজিত রহিয়াছি ” রঘুনাথ পরদিন প্রাতঃকালে সকলকে আহ্বান করিয়া ঐ বৃক্ষ ছেদন করিতে নিষেধ করিলেন। এই নিমিত্ত শ্যামকুণ্ড বক্র থাকিয়া গেল। রঘুনাথ কুণ্ডযুগলকে সুনিৰ্ম্মল সলিলপরিপূর্ণ দেখিতে পাইয়া অতিশয় আনন্দিত হইলেন। রঘুনাথ দিবারাত্র যুগল-কুণ্ডে তীরে অনিকেতভাবে:বৃক্ষতলেই অবস্থান করিতেন। একদিন.শ্রীল সনাতন গােস্বামী প্রভু বৃন্দাবন হইতে শ্রীল গােপাল ভট্টের কুটীরে আগমন করিয়াছিলেন। যখন তিনি তথা হইতে মানস পাবন-ঘাটে স্নান করিতে গেলেন, তখন একটী ব্যাকে সেই স্থানে জল পান করিতে দেখিতে পাইলেন । বাহ-স্মৃতি-

রাধাকুণ্ডবাসী রঘুনাথ
বিলুপ্ত রঘুনাথ কৃষ্ণস্মরণ-চিন্তায় বিভাের হইয়া
সেখানে উপবিষ্ট ছিলেন।
ব্যাঘ্র রঘুনাথের নিকট
দিয়াই বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিল। কিছুক্ষণ
পরে বাদশা প্রাপ্ত হইয়া রঘুনাথ সম্মুখে শ্রীসনাতন
প্রভুকে দেখিতে পাইলেন। রঘুনাথ সসম্ভ্রমে
সনাতনকে দণ্ডবৎ প্রণাম করিলেন। সনাতনও
বুঘুনাথকে স্নেহালিঙ্গনে বদ্ধ করিয়া ধীরে ধীরে বলিতে
লাগিলেন,—“রঘুনাথ! আমার একটী অনুরােধ,
তুমি এখন হইতে বৃক্ষতল ছাড়িয়া কুটীরে ভজন
করিবে।” রঘুনাথ সনাতনের অজ্ঞা মান্য করিয়া
কুটীরমধ্যে ভজন করিতে থাকিলেন।
যখন রঘুনাথ রাধাকুঞ্জে বাস করিতেছিলেন,
তখন এক ব্রজবাসী বিরহব্যথিত রঘুনাথের অন্নাদি
ত্যাগ এবং এক দোনা মাত্র ঘােল-পানের নিয়ম
দেখিয়া সখিস্থলী গ্রাম হইতে বৃহৎ পলাসপত্র সংগ্রহ
করিয়া আনিলেন এবং ঐ পলাসপত্রের দোনা
প্রস্তুত করিয়া নিয়মিত পরিমাণ অপেক্ষা কিঞ্চিৎ
অধিক পরিমাণ ঘােল দোনাপূর্ণ করিয়া তাহা দাস
গগাস্বামী প্রভুর সম্মুখে লইয়া গেলেন। রঘুনাথ
নুতন পত্রের বৃহত্তর দোনা দেখিয়া ব্রজবাসীকে

গগাস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস জিজ্ঞাসা করিলেন,—“ইহা কোথায় পাইলে?” ব্রজবাসী বলিলেন,-“আমি গােচারণ করিতে করিতে সখিস্থলী গ্রামে গিয়াছিলাম, সেখানে উত্তম পত্র দেখিতে পাইয়া তাহা আনয়ন করিয়াছি, তাহা দ্বারাই দোনা প্রস্তুত ইয়াছে।” সখিস্থলীর নাম শুনিবামাত্র রাধাপক্ষীয় রঘুনাথ ক্রোধপূর্ণ হইয়া উঠিলেন এবং তক্রসহ দোনা দূরে নিক্ষেপ করিলেন। কতক্ষণ পরে স্থির হইয়া ব্রজবাসীকে বলিলেন,- “সে চন্দ্রাবলীর গ্রাম'না যাইবা তথি।” আঁধাকুণ্ডবাসে রঘুনাথের আর একজন অন্তরঙ্গ স্বজাতীয়াশয় স্নিগ্ধ সঙ্গী ও শষ্য ছিলেন—শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ গােস্বামী। শ্রীল রঘুনাথ স্বীয় মুক্তাচরিত্র- গ্রন্থের উপসংহারে কবিরাজ গােস্বামী প্রভুর কথা এইরূপভাবে গুস্ফিত করিয়াছেন— “যস্ত সঙ্গবলহেঙুতা ময়া মৌক্তিকোত্তমকথা প্রচারিতা। তস্য কৃষ্ণকবিভূপতেব্রজে সঙ্গতির্ভবতু মে ভবে ভবে।” আমি আঁহার সঙ্গ-প্রভাবে এই অদ্ভুত মৌক্তি- কোত্তমকথা প্রচার করিলাম, আমার জন্মে জন্মে ১১১, রাধাকুণ্ডবাসী রঘুনাথ এই ব্রজভূমিতে সেই কৃষ্ণদাস কবিরাজের সঙ্গ লাভ হউক। শ্ৰীল দাসগােস্বামী প্রভুর অন্ত্যলীলার সঙ্গী কবিরাজ গােস্বামী প্রভু রঘুনাথের নিকট শ্রীচৈতন্য- লীলা শ্রবণ করিয়া চরিতামৃত রচনা করিয়াছেন, রঘুনাথ দাসের সদা, প্রভুসঙ্গে স্থিতি। তার মুখে শুনি’ লিখি, করিয়া প্রীতি । চৈতন্যলীলা রত্নসার, স্বরূপের ভাণ্ডার, তি’হে থুইল রঘুনাথের কণ্ঠে। তাহা কিছু যে শুনিল, তাহ। ইহা বিস্তারিল, ভক্তগণে দিল এই ভেটে। শ্রীল রঘুনাথের রূপপাদপদ্মনিষ্ঠাও মুক্তা- চরিত্রের একটী শ্লোকে প্রকাশিত হইয়াছে, ‘আদদানভৃণং দন্তৈরিদং যাচে পুনঃ পুনঃ। মপপদান্তোজধূলিঃ স্যাং জন্মজন্মনি। আমি,দন্তপংক্তিতে তৃণ ধারণ করিয়া পুনঃ পুনঃ প্রার্থনা করিতেছি, জন্মে জন্মে যেন প্রভুপাদ এরূপ গােস্বামী মহাশয়ের শ্রীপাদপদ্মের ধূলি হইতে পারি। রঘুনাথের স্বাভীষ্ট তাহার স্বনিয়মদশকের কয়েকটা পছে এইরূপভাবে গ্রথিত হইয়াছে, =

ঘনিয়ম-দশম
গুরো মন্ত্রে নামি প্রভুর-শচীগর্ভজপদে
রূপে শ্রীরূপে গণযুজি তদীয়-প্ৰথমজে।
গিরীলে গান্ধা-সরসি মধুপুৰ্যা: ব্রজবনে
ব্ৰজে ভক্তে গােষ্ঠালয়িষু পরমাস্তাং মম রতিঃ ॥ ১
শ্রীগুরুদেব, ইষ্টমন্ত্র, মহাপ্রভু শ্রীগৌরাঙ্গদেবের
ঐপাদপদ্ম, শ্রীস্বরূপগােস্বামী প্রভু, ঐরূপ গােস্বামী
প্রভু, গণাগ্রগণ্য ঐরূপাগ্রজ সনাতন গােস্বামী
প্রভু; গিরিবর শ্রীগােবর্ধন, শ্রীরাধাকুণ্ড, শ্রীমথুরাপুরী,
শ্ৰীবৃন্দাবন, শ্ৰীব্রজভূমি, ভক্তজন এবং শ্রীগােষ্ঠবাসি-
গণের আমার নিরতিশয় রতি অবস্থান করুক। ১।
ন চান্য ক্ষেত্রে হরিত সনাথেহপি সুজনা-
রসাস্বাদং প্রেমণ দুধদপি বসামি ক্ষণমপি।
সমং ত্বেদগ্রাম্যাবণিভিরভিতন্বন্নপি কথা
বিধান্তে সংবাসং ব্রজভুবন এব প্রতিভব । ২।
অন্য কোন ক্ষেত্র শ্রীকৃষ্ণবিগ্ৰহযুক্ত হইলেও
আমি শ্রীবৈষ্ণব মহাপুরুষের নিকট হইতে
সপ্রেমে রসাস্বাদন করিয়া ক্ষণকালও তথায় বাস
করিব না, পরন্তু এই ব্রজভূমিতেই ইতরজনগণের
সহিত গ্রাম্যজনােচিত বাক্যালাপ করিয়াও প্রতি
জন্মে বাস করিব ॥ ২৪

স্বনিয়ম-দশম সদা রাধাকৃষ্ণোচ্ছলতুলখেলা-স্থাযুজং ব্ৰং সন্ত্যজৈতদযুগবিরহিতােহপি টীমপি। পুনরাবত্যাং যদুপতিমপি প্রৌঢ়বিহুবৈঃ ফুরন্তং কাচাপি হি নহি চলমীক্ষিতুমপি ॥ ৩॥ এই রাধাকৃষ্ণের যুগলরূপের সাহিত্যে বঞ্চিত হইলেও আমি শ্রীরাধাকৃষ্ণের ধারাবাহিক অতুল লীলাস্থলীযুক্ত এই ব্রজধাম পরিত্যাগ করিয়া স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের আদেশেও ক্ষণকালের জন্য প্রৌঢ়বিভব যুক্ত শ্ৰীযদুপতিকে দর্শন করিবার জন্য পুনরায় দ্বারকাপুরীতে গমন করিব না ৩ গন্মােদৈঃ রাধা রতি হরিণ শ্লিষ্টহৃদয় ফুটং দ্বারাত্যামিতি যদি শৃণােমি তিতটে। তদাহং তত্রৈবােদ্ধতমতি পতামি পুরাৎ সমুড়ীয় স্বান্তাধিকগতি খগেন্দ্রাদপি জবাৎ। ৪। রাধিকা প্রেমােন্মাদবশতঃ দ্বারকায় গমন পূর্বক শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক হৃদয়ে আলিঙ্গি হইয়া সর্বসমক্ষে শােভা পাইতেছেন, এই কথা যদি আমার শ্রুতিগােচর হয়, তাহা হইলেই আমি উদ্ধতচিত্তে মন অপেক্ষাও দ্রুতগামী, গরুড় হইতেও অধিক বেগে উড্ডীয়মান হইয়া এই ব্ৰজপুরী হইতে দ্বারকায় গমন করিব । ৪। A ৮ ১১৪ গােস্বামী রঘুনাথদাস অনাদিঃ সাদিৰ্বা পটুরতিদুর্বা প্রতিপদ- প্রমীলংকারুণ্য প্ৰগুণকরুণাহীন ইতি বা। মহাবৈকুণ্ঠেশাধিক ইহ নরাে বা ব্ৰজপতে- বয়ং সুনুর্গোষ্ঠে প্রতিজনি মমাস্তাং প্রভুবরঃ। ৫। এই ব্ৰজরাজনন্দন শ্রীকৃষ্ণ অনাদি অর্থাৎ কারণরহিত সৰ্বাবতারী স্বয়ং ভগবানই হউন অথবা সাদি অর্থাৎ কারণযুক্ত অবতারই হউন, সর্ববিষয়ে নিপুণই হউন, অথবা অনিপুণই হউন, প্রতিক্ষণ প্রকাশমান কারুণ্যশালীই হউন অথবা প্রকৃষ্ট-- গুণহেতুক করুণারহিতই হউন, পরবব্যামাধিপতি নারায়ণ অপেক্ষা উৎকৃষ্টই হউন কিম্বা নরমাত্রই হউন, আমার এ সমস্ত বিচারে আবশ্যক নাই, পরন্তু, তিনিই প্রতি জন্যে আমার আরাধ্য প্রভুরূপে প্রকাশিত হউন । ৫। অনাদৃত্যোগীতামপি মুনিগণৈবৈণিকমুখে প্রবীণাং গান্ধৰ্বামপি চ নিগমৈস্তৎপ্রিয়তমা। য একং গােবিন্দং ভজতি কপটী দাম্ভিকতয়া তদভ্যর্ণ শীর্ণে ক্ষণমপি ন যামি ব্রতমিদ ॥ ৬। বীণাবাদক শ্রীনারদপ্রমুখ মুনিগণ বেদে যাহাকে গান করিয়াছেন, সেই কৃষ্ণপ্রিয়তমা প্রবীণ

অনিয়ম-দশম
১১৫
গান্ধর্বাকে যে কপটভাবাপন্ন পুরুষ দম্ভবশতঃ
পরিত্যাগ করিয়া কেবল গােবিন্দের ভজন করে,
তাহার সমীপবর্তী অপবিত্র দেশে আমি ক্ষণকালও
গমন করিব না—ইহাই আমার নিশ্চিত ব্ৰত । ৬।
অজাণ্ডে রাধেতি ক্ষুদভিধয়া সিক্তজনয়া-
২নয়া সাকং কৃষ্ণং ভজতি য ইহ প্ৰেমনমিত।
পরং প্রক্ষাল্যচ্চরণকমলে তজ্জলমহাে
মুদা পীত্ব। শচ্ছিরসি চ বমি প্রতিদিন। ৭।
এই ব্রহ্মাণ্ডমধ্যে যাহার “রাধা” এই নাম
সুপ্রসিদ্ধ এবং
এবং যিনি অমৃত দ্বারা সমস্ত জনকে
পরিতৃপ্ত করেন সেই এই শ্রীরাধিকার সহিত
শ্রীকৃষ্ণকে যিনি ইহলােকে প্রেমনমিত হইয়া ভজন
করেন, আমি প্রত্যহ তাহার চরণদ্বয় প্রক্ষালনপূর্বক
সানন্দে উক্ত পাদোদক পান করিয়া নিরন্তর তাহা
মস্তকে ধারণ করি। ৭ ॥
পরিত্যক্ত প্ৰেয়ো-জনসমুদয়ৈবঢ়মসুধী-
দুরন্ধে। নীরন্ধং কদনভরবন্ধেীত নিপতিত।
তৃণং দদৈষ্ট। চটুভিভিযাচেহস্ত কৃপয়া
স্বয়ং গান্ধৰ্বা স্বপদনলিনান্তং নয়তু মাম্॥৮।
আমি নিজ প্রিয়তম বান্ধবগণ কর্তৃক পরিত্যক্ত

গগাস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস এবং হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হইয়া দুঃখসাগরে নিপতিত হইয়াছি; তথাপি আমার প্রাণ-ধারণেই মতি অতএব অদ্য দন্তে তৃণ ধারণ পূর্বক কাকুতির সহিত প্রার্থনা করিতেছি যে, শ্ৰীগান্ধা- দেবী কৃপাসহকারে আমাকে নিজপাদপদ্মসমীপে উপনীত করুন ॥৮। ব্ৰজোৎপন্নক্ষীরাশনবসনপত্রাদিতিরহং পদার্থেনিবাহ ব্ৰবহৃতিমদম্ভং সনিয়মঃ । বসামীশাকুণ্ডে গিরিকুলবরে চৈব সময়ে মরিষে তু প্রেষ্ঠে সরসি খলু জীবাদিপুরতঃ । ৯ আমি দস্তরহিত এবং নিয়মযুক্ত হইয়া ব্রজধাম- জাত ক্ষীররূপ ভােজ্যদ্রব্য, বস্ত্র ও পাত্রাদি পদার্থ দ্বারা দেহযাত্রা নির্বাহ পূর্বক গিরিবর গােবর্ধন- সন্নিহিত রাধাকুগুটে বাস করি এবং যথাসময়ে এজীব গােস্বামী প্রভৃতির সম্মুখে এই প্রিয়তম স্থানেই দেহত্যাগ করিব। ৯। ফুরক্ষ্মালক্ষ্মীব্রজবিজয়িলক্ষ্মীভলস, বপুগান্ধ ঘা-স্মরনিকরদিব্যদগিরিভৃতে। বিধাস্টে কুঞ্জাদৌ বিবিধ-বিস্তাঃ সরসং রজঃ শ্রীরূপাখ্যপ্রিয়তমজনশৈব চরমঃ ১।

অনিয়ম-দশম
১১৭
যাহার সুশােভন অঙ্গের শােভাতিশয়রাশি
দেদীপ্যমান লক্ষ্মীগণকেও তিরস্কৃত করিতেছে, সেই
শ্রীরাধিকা এবং কন্দর্পগণ অপেক্ষাও শােভমান
শ্রীকৃষ্ণকে আমি তৎপ্রিয়তম শ্রীরূপ-গগাস্বামী প্রভুর
অনুগত হইয়া কুঞ্জ প্রভৃতি স্থানে নির্জনে বিবিধ
ক্রমে সেবা করব ॥ ১০
কৃতং কেনাপ্যেতন্নিজনিয়মশংসি স্তমিম
পঠে যে বিশ্রঃ প্রিয়যুগলরূপেহর্পিতমনা।
দৃঢ়ং গােষ্ঠে হৃষ্টা বসতি বসতিং প্রাপ্য সময়ে
মুদা রাধাকৃষ্ণৌ ভজতি সহিতেনৈব সহিতঃ। ১১।
যিনি শ্রীরাধাকৃষ্ণে চিওসমর্পণপূর্বক বিশ্বস্তভাবে
কোন এক ক্ষুদ্রতম ব্যক্তিরচিত নিজ নিয়মসূচক
এই স্তব পাঠ করেন, তিনি নিশ্চিতই হৃষ্ট হইয়া,
ব্রজভবনে নিবাস লাভ করিয়া শ্রীরূপের সহিত
সানন্দে রাধাকৃষ্ণের সেবা করিয়া থাকেন। ১১।
এল দাস গােস্বামী প্রভু দীর্ঘকাল ধরাধামে
প্রক ট-লীল? প্রকাশ করিয়া বিপ্রল-বৈরাগ্যের
পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। পুরুষােত্তমে
শ্ৰীমন্মহাপ্রভু ও স্বরূপদামােদরের অপ্রকটে
অধিকতর বিরহ-ব্যথিত হইয়া শ্রীরূপ-সনাতনের

১৮
গগাস্বামী স্ত্রীরঘুনাথদাস
আশায় রঘুনাথ বৃন্দাবনে আসিয়াছিলেন; সেই
রূপসনাতনও যখন অপ্রকট-লীলা প্রকাশ করিলেন,
তখন রঘুনাথের বিরহ-ব্যথা কোটীগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত
হইল। রঘুনাথ রূপ-সনাতন-হারা হইয়া কিরূপ
ভাবান্বিত হইয়াছিলেন, তাহা তাহার প্রার্থনায়-
চতুর্দশ” নামক নিজ পদ্যেই প্রকাশিত হইয়াছে।
“শূন্যায়তে মহাগগাষ্ঠং গিরিদ্ৰোহজগরায়তে।
ব্যাঘ্রতুণ্ডায়তে কুণ্ডং জীবাতুরহিতস্য মে।
ন পততি যদি দেহস্তেন কিং তস্য দোষ
স কিল কুলিশসারৈর্য দ্বিধাত্রা ব্যধায়ি।
অয়মপি পরহেতুৰ্গাঢ়তর্কেণ দৃষ্টঃ
প্ৰকটকনভারং কোবহত্বন্যথা বা ।
গিরিবরতটকুঞ্জে মঞ্জু বৃন্দাবনেশা-
সরসি রচয়ন্ শ্রীরাধিকাকৃষ্ণকীর্তি।
ধৃতরতি রমণীয়ং সংস্মরন্ তৎ পদাজং
ব্ৰজদধিফলমশ্ন সৰ্বকালং বসামি।
বসতাে গিরিবরকুঞ্জে লপতঃ
এরাধিকেই কৃষ্ণেতি।
ধয়তাে ব্রজদধিতং নাম
সদা মে দিনানি গচ্ছন্তু।”

স্বনিয়ম-দশম
১১৯
আমার জীবনস্বরূপ শ্রীরূপের সহিত বিচ্ছিন্ন
হওয়ায় আমার নিকট মহাগােষ্ঠ শূন্যের ন্যায়,
গিরিরাজ গােবর্ধন অজগরের ন্যায় এবং শ্রীরাধাকুণ্ড
ব্যাকুণ্ডের ন্যায় প্রতীত হইতেছে। যদি আমার
দেহ ভৃগুপাতের দ্বারা পতিত না হয়, তাহাতে
দেহের কোন দোষ নাই; কারণ, আমার এই
দেহকে বিধাতা বজ্রসার দ্বারা নির্মাণ করিয়াছেন,
অথবা আমি গাঢ় তর্কদ্বারা অন্য একটা কারণ
দেখিতে পাইয়াছি যে, আমা ভিন্ন অন্য আর কে
এইরূপ দুঃখভার বহন করিবে ? আমি যেন
রাধা-শ্যামের কীৰ্ত্তি প্রচার করিতে করিতে,
রাধানাথের সানুরাগ ও রমণীয় পাদাজ স্মরণ করিতে
করিতে এবং ব্রজের দধি ও ফল ভােজন করিতে
করিতে গােবর্দ্ধন-তটবর্তী-কুঞ্জে শ্ৰীবৃন্দাবনেশ্বরীর
যে সরােবর, তাহাতেই সৰ্বকাল বাস করিতে
পারি। হে নাথ, হে শ্রীরূপ, গিরিবরকুঞ্জে বাস,
অগ্রে “হে রাধে!” তৎপশ্চাৎ “হে কৃষ্ণ,”—এই
নামদ্বয় উচ্চারণ এবং ব্রজের দধি ও তক্ৰ পান
করিতে করিতে আমার দিনসমূহ অতিবাহিত
হউক।

২০ গগাস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস ঐল রূপ-সনাতনের অপ্রকটের পর শ্রাল রঘুনাথদাস গােস্বামী প্রভুর রাধাকুণ্ডে ভজন- প্রণালী ভক্তিরত্নাকরকার ঐল ঘনশ্যামের ভাষায়, এইরূপ উক্ত হইয়াছে, “শ্রীদাসগােসাঞির কথা কহনে না যায় । নিরন্তর দগ্ধে হিয়া বিরহ-ব্যথায়। কোথা শ্ৰীস্বরূপ, রূপ, সনাতন বলি'। ভাসয়ে নেত্রের জলে বিলুঠয়ে ধূলি । অতি ক্ষীণ শরীর দুর্বল ক্ষণে ক্ষণে। করয়ে ভক্ষণ কিছু দুই চারি দিনে। যদ্যপিই শৃদ্ধ দেহ বাতাসে হালয়। তথাপি নিবন্ধ-ক্রিয়া সব সমাধয় । ভূমে পড়ি প্রণমি’ উঠিতে নাহি পারে। ইথে যে নিষেধে কিছু না কহয়ে তারে । অনুকূল কৈলে প্রশংসয়ে বার বার। দেখি সাধনাগ্রহ দেবেও চমৎকার। প্রভুদত্ত গােবর্ধনশিলা গুঞ্জাহারে। সেবে কি অদ্ভুত সুখে আপনা পারে। দিবানিশি না জানয়ে নাম-গ্রহণে । নেত্রে নিদ্রা নাই, অশ্রুধারা দুনয়নে।

স্বনিয়ম-দশম
দাস গােস্বামীর চেষ্টা বুঝিতে কে পারে।
সদা মগ্ন রাধাকৃষ্ণ-চৈতন্যাবহারে।
নির্জনে বসিয়া করে গ্রন্থনুশীলন।”
নিবাস আচার্য্য প্রভু, শ্রীনরােত্তম ও
শ্ৰীশ্যামানন্দ প্রভু রাধাকুণ্ডে শ্ৰীল দাস গােস্বামী
প্রভুর সাক্ষাৎ ও কৃপা লাভ করিয়াছিলেন বলিয়া
ভক্তিরত্নাকরে উল্লিখিত হইয়াছে। এই ঘটনা
১৫১২ শকাব্দের পর । ভক্তিরত্নাকর নিত্যানন্দেশ্বরী
শ্রীজাহবাদেবীর সহিত'ও রাধাকুণ্ডে
শ্ৰদাস
গােস্বামীর সাক্ষাতের কথা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন,
‘দাস গােস্বামী’ সে নিৰ্জন কুণ্ডতীরে।
করেন শ্রীনাম-গ্ৰহণাদি ধীরে ধীরে।
কৃষ্ণদাস কবিরাজ অগ্রেতে আসিয়া।
দাস গােস্বামীর আগে ছিল দাড়াইয়া।
অবসর পাইয়া করয়ে নিবেদন।
জাহ্নবা ঈশ্বরীর হৈল আগমন।
শীঈশ্বরী দেখে দাস গােস্বামীর গমন।
অতিশয় ক্ষীণতনু, তেজঃ সূৰ্য সম॥
ঈশ্বরী-অন্তর বুঝিতে কেবা পারে।
ঋরে দুই নেত্রে বারি, নিবারিতে নারে ॥

গগাস্বামী রঘুনাথ দাস
শ্রীদাস গােস্বামী, প্রণমিতে ধৈর্য্য ধরি।
কৈলা যে উচিত প্রেমময়ী শ্ৰীঈশ্বরী ॥
শ্ৰঈশ্বরী আগে দাস গােস্বামী যে কয়।
"তাহা শুনি কার বা না বিদরে হৃদয়।”

দাস গােস্বামী প্রভুর
গ্রন্থরাজি
দাস গােস্বামী প্রভুর প্রসিদ্ধ গ্রন্থত্রয়ের কথা
একটী প্রাচীন শ্লোকে দৃষ্ট হয়—
“রঘুনাথাভিধেয়স্য তয়াের্মিত্ৰত্বমীয়ুষঃ।
স্তবমালা-দান-মুক্তাচরিতং কৃতিমূদিতম্ ।
ঐঘনশ্যামদাস অন্য ভাষায় লিখিয়াছেন,
রঘুনাথ দাস-গােস্বামীর গ্রন্থয়।
(১) স্তবমালা নাম “বাবলী” যারে কয়।
(২) শ্ৰদানচরিত, (৩) মুক্তাচরিত মধুর।
যাহার শ্রবণে মহাদুঃখ হয় দূর ।
শ্ৰল রূপগােস্বামী প্রভুকৃত ‘স্তবমালা হইতে
পৃথগরূপে নির্দেশ করিবার জন্য শ্রীল দাসগগাস্বামী
প্রভুর স্তবগ্রন্থকে ‘স্তবাবলী’ নাম দেওয়া হইয়াছে।
এই স্তবাবলীর এক একটী স্তব শােভ-মাধুর্য্যে
মণিগণের মধ্যে কৌস্তুভমণিকেও পরাভূত করে,
উহার এক একটী কৌস্তুভমণির শােভা পরাভবকারী
ব্ৰজব্রততীকুঞ্জের
অমূল্য-কুসুম কৃষ্ণকৰ্ণাবতংস
ও কৃষ্ণকৰ্ণমহামহােৎসব। স্তবাবলীর মধ্যে নিম্ন

১২৯ গােম্বামী শ্রীরঘুনাথদাস লিখিত স্তবরাজি গ্রথিত হইয়াছে,-(১) শ্রীচৈতন্য- অষ্টকম, (২) শ্রীগৌরাঙ্গস্তব-কল্পতরু, (৩) মনঃ- শিক্ষা (4) শ্রীরঘুনাথ দাস গােস্বামিন প্রার্থনা, (৫) শ্রীগােবর্দ্ধনাশ্রয়-দশক, (৬) গােৰ্দ্ধনবাস- প্রার্থনা-দশকম, (৭) শ্রীরাধাকুণ্ডাষ্টকম, (৮) ব্রজবিলাসস্তব, (৯) পিলাপ-কুসুমাঞ্জলিঃ, (১০) প্রেমপূরাভিধস্তোত্র, (১:) গ্রন্থক প্রার্থনা, (১২) স্বনিয়মদশক, (১৩) শ্রীরাধিকাষ্টোত্তরশতনাম- স্তোত্রম, (১৪) শ্রীরাধিকাষ্টকম্, (১৫) প্রেম্ভোজ- মরন্দাখ্য গুবরাজঃ, (১৬) স্বসঙ্কল্পপ্রকাশস্তোত্রম, (১৭) রাধাকৃষ্ণোজ্জ্বলকুসুমকেলিঃ, (১৮) প্রার্থনা মৃত, (১৯) নবাষ্টকম্ (২০) গােপালরাজস্তোত্র, (২১) শ্রী মদনগােপালস্তোত্রম্ (২২) শ্রীবিশাখানদ- দাভিধস্তোত্রম্ (১৩) শ্ৰীমুকুন্দাষ্টকম,(২৪) উৎকণ্ঠা- দশক, (২৫) নবযুবদ্বন্দ্বদিদৃক্ষাষ্টকম , (২৬) অভীষ্টপ্রার্থনাষ্টকম্ (১৭) দান-নিৰ্বৰ্ত্তন-কুণ্ডাষ্টকম, (২৮) প্রার্থনাশ্ৰয়চতুর্দশকম, ও (২৯) অভীষ্টসূচন। শ্রীল দাস গােস্বামী প্রভুর স্তবাবলীর অন্তর্গত মনঃশিক্ষার কয়েকটী শ্লোক অনুবাদের সহিত উদ্ধত করিবার লােভ সম্বরণ করিতে পারিলাম না, অ মনঃশিক্ষা গুরৌ গোষ্ঠে গােষ্ঠালরিষু সুজনে ভূসুবগণে স্বমন্ত্রে শ্রীনমি ব্ৰজনবযুবত্বশরণে। সদা দম্ভং হি কুরু রতিমপূৰ্ব্বামতিতর- ময়ে স্বাতিশ্চটুভিরভিযাচে ধৃতপদঃ ১। হে ভ্রাতঃ মন, তুমি দম্ভ পরিহারপূর্বক ঐগুরু- দেব, শ্ৰীবৃন্দাবনধাম, শ্ৰব্ৰজবাসিগণ, সজ্জনগণ, বিগণ, ইষ্টমন্ত্র, শ্রীকৃষ্ণনাম এবং শ্রীরাধাকৃষ্ণরূপ রক্ষকের প্রতি সর্বদা অপূর্ব ও অতিশয় অনুরাগ ধারণ কর। আমি তােমার চরণ ধারণ পূর্বক চাটুবাক্যসমূহের দ্বারা ইহা প্রার্থনা করিতেছি।১। ন ধর্মং নধৰ্মং শ্ৰতিগণনিরুক্তং কি কুর ব্ৰজে রাধাকৃষ্ণপ্রচুর-পরিচৰ্য্যামিহ তনু। শচীনুং নন্দীশ্বরপতিমুতত্বে গুরুবরং মুকুন্দ-প্রেষ্ঠত্বে আর পরমং ননু মনঃ। ২। হে মন, তুমি বেদবিহিত ধৰ্ম্ম বা বেনিষিদ্ধ অধৰ্ম্মের অনুষ্ঠান করিও না, পরন্তু ইহলােকে ব্রজধামে অবস্থানপূর্বক শ্রীরাধাকৃষ্ণের প্রভূত সেবা বিস্তার ১২৬ গগাস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস কর এবং শ্রীশচীনন্দনকে শ্রীকৃষ্ণজ্ঞানে ও শ্রীগুরু- দেবকে শ্রীকৃষ্ণপ্রেষ্ঠজ্ঞানে নিরন্তর স্মরণ কর। ২ যদীচ্ছেরাবসিং ব্রজ-ভুবি সরাগং প্রতিজ- যুবং তচ্চেৎ পরিচরিতুমারাদভিলযেঃ। স্বরূপং শ্রীরূপং সগণমিহ তস্যাগ্রজমপি ফুটং প্রেমা নিত্যং অর নম তদা ত্বং শৃণু মনঃ | ৩। হে মন, শ্রবণ কর, যদি তুমি প্রতি জন্মে অনুরাগ-- যুক্ত হইয়া ব্রজধামে নিবাস এবং শ্রীরাধাকৃষ্ণের শী সেবাবিষয়ে অভিলাষ কর, তাহা হইলে স্বরূপ গােস্বামী, সগণ ঐরূপ গােস্বামী এবং তদগ্রজ সনাতন গােস্বামী প্রভুকে সর্বদা ভক্তি সহকারে স্মরণ ও নমস্কার কর। ৩। অসদ্বাৰ্তা-বে। বিজ মতিসৰ্বষহরণী: কথা মুক্তি ব্যাঘ্ৰা ন শৃণু কিল সৰ্বাত্মগিলনী। অপি ত্যক্ত। লক্ষ্মীপতিরতিমিতাে ব্যোমনয়নীং ব্ৰজে রাধাকৃষ্ণেী স্বরতিমণিদৌ ত্বং ভজ মনঃ॥ ৪ | হে মন, তুমি দুৰ্জ্জনের সহিত বসতিরূপ বেশ্যাকে পরিত্যাগ কর, যেহেতু, উহা বুদ্ধিরূপ সর্বস্ব অপ- হরণ করিয়া থাকে। এইরূপ মুক্তিস্বরূপা ব্যাঘ্রীর কথাও শ্রবণ করিও না, যেহেতু, উহা সর্বশরীর গ্রাস মনঃশিক্ষা করিয়া থাকে। অপিচ, যে লক্ষীনারায়ণ-ভক্তি এই ব্রজধাম হইতে পরব্যোমে লইয়া যায়, তাহাও পরিত্যাগপূর্বক ব্রজধামে রাধাকৃষ্ণের উপাসনা কর। যেহেতু ঐ রাধাকৃষ্ণ হৃদয়মধ্যে প্রেমমণি প্রদান করেন। ৪। অসচেষ্টা কষ্টপ্রদ-বিকটপশালিভিরিহ প্রকামং কামাদি-প্রকটপথপাতিব্যতিকরৈঃ।. গলে বদ্ধ। হন্যেহহমিতিবকভিত্মপগণে কুরু বং ফুৎকারানবতি স যথা ত্বং মন ইতঃ ॥ ৫॥ হে মন, কাম প্রভৃতি কুপথপ্রাপক বঞ্চকগণ কর্তৃক আমি গলদেশে অসৎ চেষ্টারূপ ক্লেশদায়ক ভীষণ পাশসমূহ দ্বারা আবদ্ধ হইয়া বিনষ্ট অতএব তুমি বকশত্রু বকশত্রু নন্দনন্দনের বত্মরক্ষক শ্রীবৈষ্ণবগণকে এরূপভাবে কাতরম্বরে আহ্বান কর, যাহাতে তাহারা তােমাকে উহ হইতে রক্ষা করেন। ৫। হইতেছি ; অরে চেতঃ প্রােৎকপটকুটীনা ভরখর- ক্ষরসুত্রে ত্ব। দহসি কথমাত্মানমপি মাম্। সদা ত্বং গান্ধৰ্ব্বা-গিরিধরপদপ্রেমবিলসৎ- সুধাভোসে পাত্বা স্বমপি নিতরাং মাঞ্চ সুখ। ৬ - ১২৮ গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস হে মন, তুমি কি জন্য প্রকৃষ্টরূপে উদীয়মান কপটতাজনিত কুটিনাটীরূপ গর্দভের ক্ষরিত মূত্রে সান করিয়া নিজকে এবং আমাকে দগ্ধ করিতেছি। তুমি সর্বদা রাধাকৃষ্ণের পাদদ্বন্দবিষয়ক প্রেম- ভক্তিরূপ বিলসমান সুধাসমুদ্রে স্নান করিয়। নিজকে এবং আমাকে অতিশয় সুখী কর। ৬। প্রতিষ্ঠাশঃ বৃষ্ট। খপচরমণী মে হৃদি নটেৎ কথং সাধু প্রেম। স্মৃতি শুচিরেতনু মনঃ। সদ। ত্ব: সেবম্ব প্রভুদয়িতসামন্তমতুলং যথা তাং নিষ্কাশ্য ত্বরিতমিং তং বেশয়তি সঃ। ৭ হে মন, প্রতিষ্ঠারূপা ধৃষ্ট। শপচরমণী আমার হৃদয়ে নৃত্য করিতেছে, অতএব বিশুদ্ধ সাধুপ্রেম কিরূপে এই হৃদয় স্পর্শ করিবে ? তুমি সর্বদা শ্রীকৃষ্ণের ভক্তরূপ অতুলনীয় সামন্তরাজের সেবা কর, যাহাতে তিনি সেই প্রতিষ্ঠাশারূপা ধৃষ্টা পচ রমণীকে হৃদয় হইতে অপসারিত করিয়া সাধু প্রেমকে তথায় প্রবিষ্ট করাইবেন।৭। যথা দুষ্টং মে বয়তি শঠস্কাপি কৃপয়া যথা মহং প্রেমামৃতমপি দদাতুলমসো । যথা শ্ৰীগান্ধা-ভজন-বিধয়ে প্রেরয়সি মাং তথা গােঠে কাকা গিরিধরমিহ ত্বং ভজ মন। ৮+

মনঃশিক্ষা
হে মন, গিরিধর শ্রীকৃষ্ণ যাহাতে কৃপাপূর্বক
মাদৃশ শঠজনের দুষ্টত্ব দূরীভূত করিয়া উজ্জ্বল প্রেমা
মৃত প্রদান এবং শ্রীরাধিকা-ভজন-বিধিতে প্রেরণ।
উৎপাদন করেন, তুমি এই গােষ্ঠে কাতরােক্তি দ্বারা
তাহাকে সেইরূপে ভজন কর । ৮ ॥
মদীশানাথত্বে ব্রজবিপিনচন্দ্ৰং ব্রজবনে-
শরীং তাং নাথত্বে তদতুলসখীত্বে তু ললিতাম্।
বিশাখাং শিক্ষালীবিতরণ-গুরুত্বে প্রিয়সরাে-
গিরীন্দ্রে তৎপ্রেক্ষা-ললিতরতিদত্বে স্মর মন। ৯।
হে মন, তুমি বৃন্দাবনচন্দ্র শ্রীকৃষ্ণকে মদীয়া ঈশ্বরী
শ্রীরাধিকার নাথরূপে, বৃন্দাবনেশ্বরী শ্রীরাধিকাকে
নিজের নাথরূপে,শ্রীললিতাকে শ্রীরাধিকার অতুলনীয়।
সখীরূপে, ঐবিশাখাকে শিক্ষাসমূহের প্রচারণ-গুরু-
রূপে এবং শ্রীরাধাকুণ্ড ও এগােবৰ্ধনকে শ্রীরাধা-
কৃষ্ণের দর্শন ও ললিত-তিপ্রদরূপে স্মরণ কর। ৯।
রতি গৌরী-লীলে অপি তপতি সৌন্দৰ্য্যকিরণৈঃ
শচী-লক্ষ্মী-সত্যাঃ পরিভবতি সৌভাগ্যবশনৈঃ।
বশীকারৈশ্চন্দ্রাবলিমুখ-নবীনব্রজসতী
ক্ষিপ্যারাৎ যা তাং হরিদয়িতরাং ভজ মনঃ ১০
হে মন, যিনি সৌন্দৰ্য-কিরণসমূহ দ্বারা কপ

গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস প্রিয়া রতিদেবী, শিবপত্নী গৌরীদেবী এবং লীলা- নাম্নী শক্তিকে তাপ প্রদান করেন, সৌভাগ্যসম্বলন দ্বারা শচী, লক্ষী ও সত্যভামাদেবীকে পরিভব করেন এবং স্ব-সুলভ বশীকরণ-ধৰ্ম্মাদি দ্বারা চন্দ্রাবলী প্রভৃতি নবীন ব্রজসতীগণকে দূরে নিক্ষেপ করিতেছেন, সেই শ্রীকৃষ্ণদয়িতা রাধাকে ভজন কর । ১০ ॥ সমং শ্রীরূপেণ স্মর বিবশ-রাধাগিরিভৃতে ব্রজে সাক্ষাৎ সেবালভনবিধয়ে তদ্গুণযুজোঃ। তদিজ্যাখ্যাখ্যানশ্রবণনতি-পঞ্চামৃতমিদং ধয়ন্নীত্যা গােৰ্দ্ধনমনুদিনং ত্বং ভজ মনঃ ১১। হে মন, তুমি নিজ-গুরুদেব শ্রীরূপের সহিত ব্রজধামে গােষ্ঠে ললিত-মুলাদিগণযুক্ত, পরস্পরের প্রতি কন্দর্পভাববিবশ শ্রীরাধাকৃষ্ণের সাক্ষাৎ সেবা- লাভের জন্য প্রত্যহ ভজন-পরিপাটি সহকারে শীগগাবর্ধনের পূজা, নাম, ধ্যান, শ্রবণ এবং প্রণাম- রূপ পঞ্চবিধ অমৃত পান করিয়া সর্বদা সেই গাের্পনের আরাধনা কর। ১১। মনঃশিক্ষাদৈকদশকবরমেতন্মধুরয়া গিরা গায়ত্যুচ্চৈঃ সমধিগত সৰ্বার্থতি যঃ।

মনঃশিক্ষা সষ থঃ রূপানুগ ইহ ভবনূ গােকুলবনে জনে রাধাকৃষ্ণাতুল ভজনরত্নং স লভতে। ১২। যিনি মনঃশিক্ষাপ্রদ এই একাদশ শ্লোকের যাবতীয় অর্থ সম্যক অবগত হইয়া মধুর-বচনে ইহা উচ্চৈঃস্বরে কীৰ্ত্তন করেন, তিনি শ্রীসনাতন-গােস্বামী ও ঐগােপাল-এরঘুনাথ ভট্ট গােস্বামী এবং শ্রীজীব- গােস্বামী প্রমুখ ফুথের সহিত বৰ্ত্তমান শ্রীরূপ গগাস্বামীর অনুগত হইয়া এই শ্রীবৃন্দাবনে শ্রীরাধা- কৃষ্ণের অনুপম ভজনরত্ন লাভ করেন। ১২।

কেহ কেহ রা-নিজ-জন অনুনাথ গৌরগণােদ্দেশদীপিকাকার শ্রীকবিকর্ণপূর শ্রীদাস গােস্বামি-প্রভুকে এইরূপভাবে নির্দেশ করিয়াছেন, ‘দাসঃ শ্রীরঘুনাথস্য পূর্বাখ্যা রসমঞ্জরী। অমুং কেচিৎ প্রভাষন্তে শ্ৰীমতীং রতিমঞ্জরীম্ । ভানুমত্যাখ্যা বা কেচিদাহুস্তং নামভেদতঃ ॥” পূৰ্বে ব্রজলীলায় গৌরজন শ্রীরঘুনাথদাস গােস্বামী প্রভু রসমঞ্জরী’ নামে খ্যাত ছিলেন। তাহাকে শ্ৰীমতী রতিমঞ্জরীও বলিয়া থাকেন। কেহ নামভেদে তাহাকে ভানুমতীও বলেন। শ্রীল সনাতন গােস্বামী প্রভু যেরূপ সম্বন্ধজ্ঞান- তত্ত্বের আচাৰ্য, শ্রীরূপ গােস্বামী প্রভু যেরূপ অভিধেয়াচাৰ্য, শ্রীরঘুনাথদাস গােস্বামীও সেইরূপ প্রয়ােজনতত্ত্বের আচাৰ্য। তিনি কৃষ্ণ-রতির মূর্ত- বিগ্রহ। কৃষ্ণরতিই জীবের পরম প্রয়ােজন। শীল কবিরাজ গােস্বামী প্রভু তাহার মহাগ্রন্থের প্রতি- পরিচ্ছেদের আদিতে ও অন্তে রূপ-রঘুনাথ-প্রভু- দ্বয়কে স্বীয় প্রভু' বলিয়া বন্দনা করিয়াছেন, কেহ

রাধা-নিজ-জন রঘুনাথ
“ঐরূপ-রঘুনাথ-পদে যার আশ।
চৈতন্যচরিতামৃত কহে কৃষ্ণদাস।”
শীল নরােত্তম-ঠাকুর মহাশয়ও গাহিয়াছেন,
“রূপ-রঘুনাথ-পদে হইবে আকুতি।
কবে হাম বুঝব সেই যুগল-পীরিতি।”

পৱিশিই শ্রীগৌরাঙ্গস্তবকল্পতরু গতিং দৃষ্ট। যস্য প্রমদ-গজবৰ্যেহখিল-জন মুখঞ্চ শ্রীচন্দ্রোপরি দধতি থুৎকারনিবহম্ । সুকান্ত। যঃ স্বর্ণাচলমধরচ্ছীধু চ বচ- স্তরঙ্গৈর্গেরাঙ্গো হৃদয় উদয়ং মদতি। ১ মানবগণ যাহার (সবিলাস) গতি-দর্শনে মদমত্ত মাতবরের প্রতি এবং আঁহার মুখমণ্ডল-দর্শনে পূর্ণ- চন্দ্রের প্রতি থুৎকারসমূহ নিক্ষেপ করিয়া থাকে এবং যিনি নিজ-কান্তিদ্বারা স্বর্ণাচল সুমেরু-পর্বতকেও মাধুৰ্য-প্রভাবে যে যে স্থানে উৎপন্ন, তত্তস্থানেই স্থিতিশীল করিয়াছেন, সেই শ্রীগৌরাঙ্গদেব সুধাময় বচনপ্রবাহের সহিত আমার হৃদয়ে উদিত হইয়া আমাকে উন্মত্ত করিতেছেন। ১। অলঙ্কৃত্যাত্মানং নববিবিধ-রঙ্গৈরিব বল- বিবর্ণত্ব-স্তম্ভক্ষুট-বচন-কম্পা-পুলকৈ ।

শ্রীগৌরাঙ্গস্তবকল্পতরু হস স্বিদ্যনৃত্য শিতিগিরিপতের্নির্ভরমুদে পুরঃ শ্রীগৌরাঙ্গো হৃদয় উদয়ন্ম। মদয়তি । ২৪ যিনি বিবিধ নবীন রত্নতুল্য অতি বিবর্ণত্ব, স্তম্ভ, অস্ফুট বচন, কম্প, অশ্রু ও পুলকরাশি দ্বারা নিজ বিগ্রহকে অলঙ্কৃত করিয়া নীলাচলপতি জগন্নাথ- দেবের পুরােভাগে ভঁহার অতিশয় হর্ষোৎপাদনের জন্য হাস্যসহকারে ঘৰ্ম্মাক্ত কলেবরে নৃত্য করিয়া থাকেন, সেই শ্রীগৌরাঙ্গদেব আমার হৃদয়ে উদিত হইয়া আমাকে উন্মত্ত করিতেছেন। ২। রসােল্লাসৈস্তি-গতিভিরভিতে বারিভিরলং দৃশশাঃ সিঞ্চল্লেকানরুণ-জলযন্ত্রত্বমিতয়ে। মুদা দদৈষ্ট। মধুরনধরং কম্পচলিতৈ- নটন্ শ্রীগৌরাঙ্গো হৃদয় উদয়ং মদয়তি। ৩। যিনি ‘সমৃদ্ধিমদ’নামক সম্ভোগরণের অনুভবজনিত আনন্দে ইতস্ততঃ চরণ সঞ্চারণ এবং অরুণ-বর্ণ জল- যন্ত্র-সদৃশ নয়নযুগল হইতে বিগলিত সলিলরাশিতে জগৎ-সেচন-সহকারে কম্পচলিত দন্তসমূহদ্বারা মধুর অধর দংশনপূর্বক নৃত্য করিয়া থাকেন, সেই শ্রীগৌরাঙ্গদে আমার হৃদয়ে উদিত হইয়া আমাকে উন্মত্ত করিতেছেন। ৩।

১৩ ৬ গগাস্বামী রঘুনাথদাস কচিন্মিশ্রাবাসে ব্রজপতিসুতস্তোরুবিরহৎ শ্লথচ্ছীসন্ধিৎধদধিক-দৈর্ঘ্যং ভুজপদোঃ। লুণ্ঠ ভূমৌ কাক্কা বিকলবিকলং গদগদবচ। রুদন গৌরাঙ্গো হৃদয় উদয়ং মদয়তি। ৪। যিনি একদা কাশীমিত্রের ভবনে ব্রজেন্দ্রনন্দন শ্রীকৃষ্ণচন্দ্রের অতিবিরহহেতু ভুজ ও পদযুগলের শােভা ও সন্ধিস্থান শিথিলভাব প্রাপ্ত হইলে তাহা- দের অতিদীর্ঘত্ব ধারণ করিয়া অতি-বিকলভাবে গ- গদ-বচনে অতি-কাতরতার সহিত রােদন করিতে করিতে ভূলুণ্ঠন করিয়াছিলেন, সেই শ্রীগৌরাঙ্গদেব আমার হৃদয়ে উদিত হইয়া আমাকে উন্মুক্ত করিতেছেন। ৪। অনুদঘাট্য দ্বারত্ৰয়মুরু চ ভিত্ৰিয়মহো বিলঘ্যোচ্চৈঃ কালিঙ্গিকসুরভিমধ্যে নিপতিতঃ। তনুষ্যৎ-সঙ্কোচাৎ কমঠ ইব কষ্ণোরুবিরহাদ- বিরাজ গৌরাঙ্গো হৃদয় উদয়ং মদয়তি। ৫। যিনি সঙ্কীৰ্ত্তনানন্তর শ্ৰমাপনােদনের জন্য ভক্ত- গণ কর্তৃক গৃহমধ্যে শায়িত হইয়াও পরম উৎকণ্ঠা- বশতঃ তথায় অবস্থান করিতে অসমর্থ হইয়া, গৃহের দ্বার উদঘাটন না করিয়া অত্যুচ্চ প্রাচীরত্রয় গৌরাঙ্গস্তবকল্পতরু ১৭ উল্লঙ্ঘন পূর্বক কলিঙ্গদেশােদ্ভব গােসমূহের মধ্যে নিপতিত হইয়াছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণচন্দ্রের অতিবিরহ- হেতু শরীরে খর্বতা উদিত হওয়ায় কূৰ্ম্মের ন্যায় বিরাজিত হইয়াছিলেন, সেই শ্রীগৌরাঙ্গদেব আমার হৃদয়ে উদিত হইয়া আমাকে উন্মত্ত করিতেছেন। ৫। স্বকীয়স্য প্রাণাৰ্ব্বদসদৃশগােষ্ঠ বিরহাৎ প্রলাপামুন্মাদাৎ সততমতিকুৰ্বন্ বিকলধীঃ। দধদ্ভিত্তৌ শশ্বদনবিধুঘর্ষেণ রুধির ক্ষতেখং গৌরাঙ্গে। হৃদয় উদয়ন্মাং মদয়তি ৬ | যিনি স্বীয় অগণিত প্রাণােপম শ্ৰীব্রজধামের বিরহজাত উন্মাদ-হেতু নিরন্তর অতিশয় প্রলাপ করিয়া ব্যাকুলচিত্তে গৃহভিত্তিতে বদনমণ্ডল ঘর্ষণ করায় ক্ষতজন্য সর্বাঙ্গে রুধির ধারণ করিয়াছিলেন, সেই শ্রীগৌরাঙ্গদেব আমার হৃদয়ে উদিত হইয়া আমাকে উন্মত্ত করিতেছেন। ৬ || ক মে কান্তঃ কৃষ্ণরিতমিহ ত্বং লােকয় সখে ত্বমেবেতি দ্বারাধিপমভিদধনু, ম্মদ ইব। দ্রুতং গচ্ছ দুষ্টং প্রিয়মিতি তদুনে ধৃত ত- ভুজান্তে গৌরাঙ্গো হৃদয় উদয়ন্সং মদয়তি। ৭ ৩৮ গগামী রঘুনাথদাস যিনি একদা শ্রীজগন্নাথদেবের দ্বারপালকে শ্রীকৃষ্ণ- সঙ্গিনী সখী মনে করিয়া উন্মাদের ন্যায় “হে সখি, আমার কান্ত শ্ৰীকৃষ্ণ কোথায় ? তুমি সত্বর তাহাকে এস্থানে আনয়নপূর্বক আমাকে দর্শন করাও”- এইরূপ বলিলে “তুমি প্রিয়দর্শনের জন্য সত্বর গমন কর”—দ্বারপাল এইরূপ উক্তি করিয়াছিল ; তাহাতে যিনি দ্বারপালের হস্ত ধারণ করিয়াছিলেন, সেই শ্রীগৌরাঙ্গদেব আমার হৃদয়ে উদিত হইয়া আমাকে উন্মত্ত করিতেছেন। ৭। সমীপে নীলাদ্রেশ্চটকগিরিরাজস্য কলনা- দয়ে গােষ্ঠে গােবনগিরিপতিং লােকিতুমিতঃ। ব্ৰজন্নস্মীত্যুক্ত। প্রমদ ইব ধাবল্পবধতে গণৈঃ স্বৈর্গেরাঙ্গো হৃদয় উদয়ং মদয়তি ॥ ৮ | যিনি নীলাচল-সমীপন্থ চটকপর্বতের দর্শনহেতু নিজ-ভক্তগণের প্রতি “আমি বৃন্দাবনে গােবর্ধন- দর্শনার্থ এস্থান হইতে যাত্রা করিতেছি”—এইরূপ বলিয়া উন্মত্তের ন্যায় তদভিমুখে ধাবিত হইলে নিজ ভক্তগণ কর্তৃক পরিবেষ্টিত হইয়াছিলেন, সেই

গৌরাঙ্গস্তবকল্পতরু
শ্রীগৌরাঙ্গদেব আমার হৃদয়ে উদিত হইয়া আমাকে
উন্মত্ত করিতেছেন ॥ ৮ |
অলং-দোলাখেলা-মহসি বর-তন্মণ্ডপতলে
স্বরূপেণ স্বেনাপর-নিজগণেনপি মিলিতঃ ।
স্বয়ং কুৰ্বন্নাম্নমতি-মধুরগানং মুরভি
সরঙ্গো গৌরাঙ্গো হৃদয় উদয়ং মদয়তি । ৯।
যিনি বিভূষিত দোলাখেলার শােভাযুক্ত উত্তম
প্রসিদ্ধ মণ্ডপতলে স্বীয় স্বরূপ এবং অপর নিজ-গণের
সহিত মিলিত হইয়া স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণনামসমূহের অতি-
মধুর গান করিয়া অভিনয়বিশিষ্ট হইয়াছিলেন, সেই
শ্রীগৌরাঙ্গদেব আমার হৃদয়ে উদিত হইয়া আমাকে
উন্মত্ত করিতেছেন। ৯ ।
দয়াং যাে গােবিন্দে গরুড় ইব লক্ষ্মীপতিরলং
পুরীদেবে ভক্তিং য ইব গুরুবৰ্য্যে যদুবরঃ।
স্বরূপে যঃ স্নেহং গিরিধর ইব শ্রীল-সুবলে
বিধত্তে গৌরাঙ্গে। হৃদয় উদয়ং মদয়তি। ১•
যিনি গরুড়ের প্রতি নারায়ণের ন্যায় গােবিন্দ
নামক ভক্তবরের প্রতি পরমদয়া, সান্দীপনির প্রতি
শ্রীকৃষ্ণের ন্যায় ঈশ্বরপুরীপাদের প্রতি গুরুভক্তি এবং
সুবলের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের ন্যায় স্বরূপ-গােস্বামীর

১৪০ গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস প্রতি পরম স্নেহভাব ধারণ করিয়াছিলেন, সেই শ্রীগৌরাঙ্গদেব আমার হৃদয়ে উদিত হইয়া আমাকে উন্মত্ত করিতেছেন। ১০। মহা-সম্পদ্দারাদপি পতিতমুদ্ধত্য কৃপয়া স্বরূপে যঃ স্বীয়ে কুজনমপি মাং ন্যস্য মুদিতঃ । উৱাে-গুঞ্জাহারং প্রিয়মপি চ গােবর্ধনশিলাং দদৌ মে গৌরাঙ্গো হৃদয় উদয়ং মদয়তি । ১১। যিনি মাদৃশ পতিত এবং কুজনকেও কৃপাপূর্বক মহাসম্পৎ ও কলত্র হইতে উদ্ধার করিয়া, স্বীয় শ্ৰীস্বরূপের নিকট স্থাপিত করিয়া আনন্দিত হইয়া- ছিলেন এবং আমাকে প্রিয়রূপে স্বীকার করিয়া আমার বক্ষোদেশে গুঞ্জাহার ও গােবর্ধনশিলা দান করিয়াছিলেন, সেই শ্রীগৌরাঙ্গদেব আমার হৃদয়ে উদিত হইয়া আমাকে উন্মত্ত করিতেছেন ॥১১। ইতি শ্রীগৌরাঙ্গোদগত-বিবিধ-সাব-কুসুম- প্রভাজপদ্যাবলি-ললিতশাখং সুরতরুম্ । মুহুর্যোহতিশ্রদ্ধৌষধিবরবলৎপাঠসলিলৈ- লং সিঞ্চেদবিলেৎ সরসগুরুতল্লোকনফলম্ ॥ ১২। যিনি শ্রীগৌরাঙ্গদেবে বৰ্তমান বিবিধ নির্মল প্রেমরূপ কুসুমের প্রভায় দেদীপ্যমান পদ্যাবলিরূপ শ্রীগৌরাঙ্গস্তবকল্পতরু ১৪১ শাখাযুক্ত এই স্তবকল্পতরুটীকে অতি শ্রদ্ধারূপ ঔষধিসম্বলিত পাঠসলিলে অভিষিক্ত করেন, তিনি রসবিশিষ্ট গুরুদেবের অবলােকনরূপ ফল লাভ করিয়া থাকেন। ১২। ইতি শ্রীদাস গােস্বামিবিরচিতঃ শ্রীগৌরাঙ্গ- স্তবকল্পতরু সমাপ্ত; ।

শ্ৰীশচীশূন্বষ্টকম্ হরিদৃষ্ট। গােষ্ঠে মুকুরগতমাত্মানমতুলং স্বমাধুৰ্যং রাধাপ্রিয়তরসখীপ্ত মভিতঃ। অহো গৌড়ে জাতঃ প্রভুরপরগোরৈকতনুভা শচীনুঃ কিং মে নয়নসরণীং যাতি পুনঃ ? ১। যে শ্রীহরি ব্রজধামে দর্পণমধ্যে প্রতিফলিত স্বীয় অনুপম আঙ্গকান্তি দর্শন করিয়া প্রিয়তমা সখী শ্রীরাধিকার ন্যায় সর্বতােভাবে তাহা অনুভব করিবার জন্য শ্রীরাধিকার গৌরকান্তি দ্বারাস্বীয় বিগ্রহের তাদৃশ রূপ গ্রহণপূর্বক গৌড়দেশে আবির্ভূত হইয়া- ছিলেন, সেই শচীনন্দন শ্রীগৌরাঙ্গদেব কি পুনরায় আমার নয়নগগাচর হইবেন ? ১। পুরীদেবস্যান্ত প্রণয়মধুনা সুনমধুরাে মুহুর্গোবিন্দাছদ্বিশদপরিচাচ্চিতপদ। স্বরূপ প্রাণাবুদ-কমল-নীরাজিত-মুখ শচীনুঃ কি মে নয়নসরণীং যাতি পুনঃ? ২। যিনি শ্রীল ঈশ্বরপুরীপাদের হৃদয়স্থিত প্রেমমধুতে স্নান করিয়া তাহার প্রতি স্নেহযুক্ত, স্বভৃত্য গােবিন্দ-

শ্ৰীশচীসূন্বষ্টকম্
১৪৩
কর্তৃক প্রকাশমান নিৰ্ম্মল পরিচর্যা-দ্বারা যাহার
পদযুগল নিরন্তর সংসেবিত এবং শ্রীস্বরূপ-পাদের
অসংখ্য প্রাণকমল দ্বারা আঁহার বদন নীরাজিত
হইয়াছিল, সেই শচীনন্দন গৌরাঙ্গদেব কি পুনরায়
আমার নয়নগােচর হইবেন ? ২।
দধানঃ কৌপীনং তদুপরি বহিবস্তুমরুণং
প্রকাণ্ডে হেমাদ্রিদ্যুতিভিরভিতঃ সেবিততঃ।
মুদা গায় চ্চৈর্নিজমধুরনামাবলিমসৌ
শচীনুঃ কিং মে নয়নসরণীং যাতি পুনঃ? ৩।
যিনি স্বয়ং পরমেশ্বর হইয়াও লােকশিক্ষার্থ
কৌপীন এবং তদুপরি অরুণ-বর্ণ বহির্বাস পরিধান
করিয়াছিলেন, আঁহার শ্রীবিগ্রহ ন্যগ্রোধপরিমণ্ডল
এবং সুমেরুশােভা-কর্তৃক সর্বতােভাবে সেবিত, যিনি
সানন্দে উচ্চৈঃস্বরে নিজের মধুর নামরাশি কীৰ্ত্তন
করিয়াছেন, সেই শচীনন্দন শ্রীগৌরাঙ্গদেব কি
পুনরায় আমার নয়নগগাচর হইবেন ? ৩ ॥
অনাবেদ্যং পুৰ্বৈরপি মুনিগণৈর্ভক্তিনিপুণৈঃ
তেগূঢ়াং প্ৰেমােজ্জ্বল সফলং ভক্তিলতিকা।
কৃপালুস্তাং গৌড়ে প্রভুরতিকৃপাভিঃ প্রকট
শচীনুঃ কিং মে নয়নসরণীং যাতি পুনঃ ? ৪

১৪৪ গগাস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস যাহা ভক্তিনিপুণ পুরাতন মুনিগণেরও অজ্ঞেয় এবং শ্রুতির পরম গােপনীয় ধন, এরূপ উজ্জ্বল প্রেম- রস যাহার ফলস্বরূপ, সেই ভক্তিলতাকে যিনি অতিশয় কৃপাবশতঃ গৌড়দেশে বিস্তার করিয়াছেন, সেই পরম-কৃপালু শচীনন্দন শ্রীগৌরাঙ্গদেব কি পুনরায় আমার নয়নগােচর হইবেন ? ৪। নিজত্বে গৌড়ীয়া জগতি পরিগৃহ প্রভুরিমান্ হরেকৃষ্ণেতত্যবং গণনবিধিনা কীৰ্ত্তয়ত ভােঙ। ইতি প্রায়াং শিক্ষা জনক ইব তেভ্যঃ পরিদিশ শচীনুঃ কিং মে নয়নসরণীং যাতি পুনঃ? ৫ | যিনি জগতে গৌড়দেশীয় জনগণকে আত্মীয়- রূপে স্বীকার করিয়া-“হে জনগণ, তােমরা সংখ্যামু- সারে হরে কৃষ্ণ এই নাম কীৰ্ত্তন কর”—এইরূপ বাক্যে পিতার ন্যায় উপদেশ প্রদান করিয়াছিলেন, সেই শচীনন্দন শ্রীগৌরাঙ্গদেব কি পুনরায় আমার নয়নশােচর হইবেন ? ৫। পুরঃ পশ্যন্ নীলাচলপতিমুক্তপ্রেমনিবহৈ ক্ষরনেত্রান্তোভিঃ সুপিত-নিজদীঘোজ্জল-তনুঃ । সদা তিন্ দেশে প্রণয়িগরুড়স্তম্ভচরমে শচীঃ কিং মে নয়নসরণীঃ যাতি পুনঃ ? ৬।

শচীসূষ্টকম ১৪৫ যিনি সর্বদা প্রণয়ি-গরুড়স্তম্ভের চরমদেশে অর্থাৎ পশ্চাদ্দেশে অবস্থানপূর্বক সম্মুখে নীলাচল- পতি শ্রীজগন্নাথদেবকে দর্শন করিয়া পরম-প্রেম- নিবন্ধন বিগলিত নয়নজলে স্বীয় উন্নতােজ্জ্বল বিগ্রহকে অভিষিক্ত করিয়াছিলেন, সেই শচীনন্দন শ্রীগৌরাঙ্গদেব কি পুনরায় আমার নয়নগােচর হইবেন ? ৬। মুদা দদৈষ্ট। দ্যুতিবিজিতবন্ধুমধরং করং কৃত্বা বামং কটিনিহিতমন্তং পরিলস। সমুখাপ্য প্রেগণিতপুলকো নৃত্যকুতুকী শচীনুঃ কিং মে নয়নসরণীং যাস্ততি পুনঃ? ৭। যিনি দন্তসমূহ দ্বারা বন্ধুক-কান্তিবিজয়ী স্বীয় অধরকে দংশনপূর্বক বামহন্ত কটিতলে বিন্যস্ত এবং দক্ষিণহস্ত উত্তোলন করিয়া সহর্ষে নৃত্য-কৌতুকযুক্ত এবং কৃষ্ণবিরহিণী শ্রীরাধার ভাবে বিভাবিত হইয়া অগণিত রােমাঞ্চশালী হইয়াছিলেন, সেই শচীনন্দন শ্রীগৌরাঙ্গদেব কি পুনরায় আমার নয়নগােচর হইবেন? ৭। সরিব্রীরামে বিরহবিধুরে গােকুলবিধাে- নদীমন্যাং কুৰ্বন্নয়নজলধারা-বিততিভিঃ।

১৪৬ গগাস্বামী রঘুনাথদাস মুহুমূৰ্ছাং গচ্ছতকমিব বিশ্বং বিরচয় শচীঃ কিং মে নয়নসরণীং যাতি পুনঃ? ৮। যিনি নদীতীরস্থ উপবনে গােকুলচন্দ্র শ্রীকৃষ্ণের বিরহে বিহ্বল হইয়া নয়নজলধারাসমূহ দ্বারা অপর এক নদীর সৃষ্টি করিয়াছিলেন এবং বারম্বার মূচ্ছ- ভাবাপন্ন হইয়া নিখিল বিশ্বকে মৃতের ন্যায় চৈতন্য- রহিত করিয়াছিলেন, সেই শচীনন্দন শ্রীগৌরাঙ্গদেব কি পুনরায় আমার নয়নগােচর হইবেন? ৮ শচীনােরস্যাষ্টকমিমভীষ্টং বিরচয়ৎ সদা দৈত্মোদ্রেকাদতিবিশদ-বুদ্ধিঃ পঠতি যঃ। প্রকামং চৈতন্য প্রভুরতিকৃপাবেশবিবশ: পৃথু প্রেমান্তোধে প্রথিত-রসদে মজ্জয়তি তম্। ৯। যিনি অতি-বিমল বুদ্ধিযুক্ত হইয়া দৈন্যাতিশয় সহকারে স্বীয় অভীষ্ট-সম্পাদক শ্রীশচীনন্দনের এই অষ্টক পাঠ করেন, শ্রীচৈতন্যদেব তাহার প্রতি অতি- শয় কৃপা-পরতন্ত্র হইয়া শ্রীকৃষ্ণবিষয়ক রসদ প্রেম- সিন্ধুতে নিমজ্জিত করিয়া থাকেন । ৯। ইতি শ্রীলদাসগােস্বামিবিরচিতং শ্রীশচীন্বষ্টকং সম্পূর্ণ।

প্রেমান্ডোজমকরন্দস্তবাজঃ মহাভাবােজ্জ্বলচ্চিন্তারঙ্গোদ্ভাবিতবিগ্ৰহাম্। সখীপ্রণসদগন্ধবরােধৰ্ত্তন-সুপ্রভা। ১। মহাভাবে উজ্জ্বলচিন্তামণিভাবিতবিগ্রহ, কৃষ্ণ- প্রতি সখীর যে প্রণয়, তাহাই সদগন্ধ কুঙ্কুমাদি দ্বারা সুন্দর কান্তি প্রাপ্ত। ১। কারুণ্যামৃতবীচিভিস্তারুণ্যামৃতধারয়া। লাবণ্যামৃতবন্যাভিঃ সুপিং গ্লপিতেন্দিরাম্ ॥ ২॥ পূর্ববাহে কারুণ্যামৃতে, মধ্যাহ্নে তারুণ্যামৃতে ও সায়াহ্নে লাবণ্যামৃতে স্নাত সঁহার বিগ্রহ ॥ ২॥ হ্রীপট্টবস্ত্রগুপ্তাঙ্গীং সৌন্দর্য্যঘুণাঞ্চিতা। শ্যামলােজ্জলকন্তু রীবিচিত্রিতকলেবরা। ৩। লজ্জারূপ পট্টবস্ত্র-পরিধান, সৌন্দৰ্য্যরূপ কুঙ্কুম- শােভিত শ্যামবর্ণ, শৃঙ্গার-রসরূপ কস্তুরী দ্বারা চিত্রকলেবর। ৩। কষ্পপুলকস্বেদগদগদরক্ততা। উন্মাদে। জাড্যমিত্যেতৈ রর্নৈভিরুত্তমৈঃ। ৪।

১৪৮ গােস্বামী শ্রীরঘুনাথদাস কম্প, অশ্রু, পুলক, স্তম্ভ, স্বেদ, গদগদ, স্বর, রক্ততা, উন্মাদ ও জড়তারূপ নয়টী উত্তম রত্নে অলঙ্কত । ৪। ক্লিপ্তালতিসংশ্লিষ্টাং গুণালীপুষ্পমালিনীম্। ধীরাধীরাত্ব-সদ্বাস-পট্টবাসৈঃ পরিষ্কতাম্। সৌন্দৰ্য-মাধুৰ্য্যাদি, গুণসকল পুষ্পমালারূপে যাহার শরীরে বিরাজমান, ধীর ও অধীরা-ভাবকে তিনি পট্টবাস অর্থাৎ কপূরাদি দ্বারা পরিষ্কৃত করিয়াছেন। ৫। প্রচ্ছন্নমাধমিল্লা সৌভাগ্যতিলকোজ্জ্বলাম্। কৃষ্ণনামষশ-শ্রাবাবতংসােল্লাসিকর্ণিকাম্॥ ৬। প্রচ্ছন্নরূপে মানই যাহার ধম্মিল্ল অর্থাৎ বদ্ধ- কেশপাশ, (খোপা) সৌভাগ্যরূপ তিলকে যাহার কপাল উজ্জ্বল, কৃষ্ণনাম ও যশঃশ্রবণই আঁহার কর্ণভূষণ ॥ ৬। রাগতা লরকোষ্ঠং প্রেমকৌটিল্যকজ্জ্বলাম্। নভাষিতনিৰ্মিত-কপূরবাসিতাম্ ॥ ৭। অনুরাগরূপ তাম্বুল দ্বারা যাহার ওষ্ঠ রক্তিমায় রঞ্জিত, প্রেম-কৌটিল্যকেই যিনি কজ্জ্বলরূপে ধারণ

প্রেমাভোজমকরদবরাজঃ
১০৯
করিয়াছেন; নৰ্ম্ম অর্থাৎ উপহাস-হেতু মৃদু হাসিরুপ
কপূর দ্বারা যিনি সুবাসিত। ৭।
সৌরভাঃপুরে গৰ্বপৰ্যঙ্কোপরি লীলয়া।
নিবিষ্টাং প্রেম-বৈচিত্তবিচলত্তরলাঞ্চিতা ৮।
সৌরভরূপ অন্তপুরে যিনি গর্বরূপ পৰ্যঙ্কে
শায়িত হইলে বিপ্রলম্ভরূপ হার প্রেমবৈচিত্ত্যরূপ
তরলরূপে দোলায়িত। ৮।
প্রণয়ক্রোধসদ্যোলী বন্ধগুপ্তীকৃতন্তনা।
সপত্নীবক্ত হচ্ছােষিযশ-কচ্ছপী-বাম্। ৯।
প্রণয়-ক্রোধরূপ কাঁচুলী দ্বারা যাহার স্তনযুগল
আবৃত, সপত্নীগণের মুখবক্ষঃশশাষণকারী যশঃই
যাহার কচ্ছপী বীণা। ৯।
মধ্যত্মসখীস্কন্ধলীলান্তকরাজাম্।
শ্যামাং শ্যামরামােদমধূলী-পরিবেশিকা। ১০।
যৌবনরূপ-সখীর স্কন্ধে যিনি স্বীয় লীলারূপ
করকমল রাখিয়াছেন; যিনি বহুগুণযুক্ত হইয়াও
কৃষ্ণকন্দপানন্দি মধু পরিবেশন করিতেছেন। ১০।
দাং নত্ব যাচতে ধৃত্ব তৃণং দরৈয়ং জন।
দাস্যাতসেকেন জীবয়ামুং সুদুঃখিতম্ ॥ ১১।

১৫০ গােস্বামী রঘুনাথদাস এবষ্কৃত শ্রীরাধাকে দন্তে তৃণ ধারণ পূর্বক প্রার্থনা করি,এই সুদুঃখিত জনকে স্বীয় দাস্যরূপ অমৃত দানে জীবিত করুন। ১১। ন মুঞ্চেচ্ছরণায়াতমপি দুষ্টং দয়াময়। অতে। গান্ধৰ্বিকে, হা হা মুঞ্চৈনং নৈব তাদৃশম্। ১২। হে গান্ধবিকে, দয়াময় কৃষ্ণ শরণাগত জনকে যেমন পরিত্যাগ করেন না, তুমিও তপ আশ্রিত জনকে ত্যাগ করিও না ॥১২ । প্রেমাভোজমকরন্দাখ্যং স্তব জমিমং জন। রাধিকা-কৃহেতুং পঠংশুদ্দাস্তমপ্লয়াৎ ॥ ১৩। যিনি শ্রীরাধিকার কৃপা-হেতু এই প্রেম্ভোজ- মকরন্দাশ্য স্তবরাজ পাঠ করেন, তিনি রাধাদাস্য প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। ১৩। সমাপ্ত

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Goswami Sri Raghunathdas Ed. 2nd

Author
Not Available
Title
Goswami Sri Raghunathdas Ed. 2nd
File name
Goswami Sri Raghunathdas Ed. 2nd
Text
OCR done
Citation
1929
Published
2010/02/3
Publisher
Sri Kunjabihari Bidyabhushan, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
158
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Raghunather Sadhusanga
DLI number
512664
Barcode
4990010019717.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
DT4vjzmaFGK
Download PDF

Goswami Sri Raghunathdas Ed. 2nd