Makardah Saraswat Library, Howrah
Palashi
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পলাশী
ষ্টার রঙ্গমঞ্চে অভিনীত
প্রথম অভিনয় রজনী ২৪, আশ্বিন ১৩৫২
শ্রীহীরেন্দ্রনারায়, থাপ
জেনারেল পাবলিশা
কলিকাতা
ই লেখকের অন্যান্য বই- থিবী (উপন্যাস। ৩য় সংস্করণ) ; (সচিত্র কাব্য। ৫ম স (উপন্যাস) ই ফাল্গুন (উপন্যাস) ল (গল্পচয়ন ) পরশ ( নৃত্য ও গীতি নাটক) দ্ম (কবিতাচয়ন) বস্বত্ব গ্রন্থকার কর্তৃক সংরক্ষিত ] দাম-দেড় টাকা। প্রিন্টার- শ্ৰীশশধর চক্রবর্তী কালিকা প্রেস লিঃ ২৫, ডি, এল, রায় স্ত্রীট, কলিকাতা তা
প্রথম অভিনয় রজনীর
অভিনেতৃসদ্য
আলিবর্দী-শ্রীজয়নারায়ণ মুখােপাধ্যায়
সিরাজদ্দৌলা—শ্ৰভূপেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
মীরজাফর-শ্রীশিবকালী চট্টোপাধ্যায়
মােহনলাল-ভূমেন রায় (পরে) সত্য পাঠক
আলিহােসেন ( পুরন্দর)-এবাণীব্রত মুখোপাধ্যায়
মাণিকৰ্চাদ—ঐবিমল চন্দ্র ঘোষ
উমিচাদ দেবেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
অংগা সমসের-এনগেন্দ্রনাথ সমাদ্দার
আমীর খ-শান্তি গুপ্ত
মীরনাজির-শ্রীগােপাল মুখােপাধ্যায়
সোলেমান-ঐসত্যেন্দ্রনাথ দাস (অনু)
মিঃ হলওয়েল-ঐবিজয়নারায়ণ মুখােপাধ্যায়, বি, এ,
স্বামিজী-শ্ৰীতারাপদ ভট্টাচাৰ্য্য
শাশুশীল-ঐবিমল মুখােপাধ্যায়
বালাজী-মি: ম্যালকম
দয়ানন্দ-শ্রীগােপাল ভট্টাচাৰ্য্য
দানশা—শ্রীপঞ্চানন বন্দ্যোপাধ্যায়
আলতাফ-শ্ৰীঅবিনাশ দাস
অন্যান্য ভূমিকায়—শ্রী প্রণব পাঠক, শান্তি চট্টো, চঞ্চল বসাক,
রঞ্জিৎ চট্টোপাধ্যায়, সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত,
তারক ভট্টাচাৰ্য, নগেন্দ্র মজুমদার।
মেহের উন্নিসা-শ্ৰীমতী অপর্ণা দেবী
সেলিনা ( করুণা )-শ্ৰীমতী বীণা দেবী
লুৎফা-শ্ৰীমতী রেখা দত্ত
লক্ষ্মীবাঈ—শ্ৰীমতী দুনিয়াবাল
সৌরভী-শ্ৰীমতী যুথিকা দেবী
প্রাচ্যনুত্যে-শ্ৰীমতী গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়
অন্যান্য ভূমিকায়—শ্ৰীমতী বীণা ২নং বীণা 'স, গীতা (চারিজনা)
উমা (দুইজন।) অঙ্গুর, কনক, মীণা, মালতী,
রেখা ( দুইজনা)
পলাশী সংগঠনকারীগণ মধুসুদন আড়ি স্বত্বাধিকারী—শ্ৰীযুত সলিলকুমার মিত্র, বি, কম পরিচালক মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, এম, এ, সুরশিল্পী- ধীরেন্দ্রনাথ দাস ও তারাপদ ভট্টা; নৃত্যশিল্পী- ললিত মােহন গােস্বামী মঞ্চতত্ত্বাবধায়ক-শ্ৰীযুত যতীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী স্মারক মণিমোহন চট্টোপাধ্যায় আলােকসম্পাৎকারী-শ্ৰীযুত বিভূতি রায় এমপ্লীফায়ার বাদক- যন্ত্ৰী স্য-শ্ৰীধীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যেপাধ্যায় কালী পদ কমল বিদ্যাভূষণ পাল ললিত মােহন বসাক কার্তিক চন্দ্র ঘােষ হারাধন বিশ্বাস পূর্ণচন্দ্র দাস মিহির মিত্র
No text on this page.
ষ্টার রঙ্গমঞ্চের স্বত্বাধিকারী শ্ৰীযুক্ত সলিলকুমার মিত্র, বি, কম, এবং লব্ধ প্রতিষ্ঠ নাট্যকার ও প্রযােজক শ্রীযুক্ত মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, এম, এ, মহাশয়কে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাইতেছি। পলাশী’কে মঞ্চস্থ করিতে শ্ৰীযুক্ত মহেন্দ্র বাবু যে যত্ন ও পরিশ্রম করিয়াছেন, সেজন্য তাহার নিকট কৃতজ্ঞ না হইয়া পারি না। রঙ্গমঞ্চের অন্যান্য কৃতী রূপকার এবং অভিনেতা ও অভিনেত্রীবর্গকে আমার অকৃত্রিম ধন্যবাদ জানাইতেছি। হী, না. মু.
No text on this page.
শ্ৰীমান হােমেন্দ্রনারায়ণ মুখােপাধ্যায়
শ্ৰীমান লােকেন্দ্রনারায়ণ মুখােপাধ্যায়
কল্যাণীয়েষু
No text on this page.
চরিত্র পরিচয় - -পুরুষ- = = ৫ ০ ০ ০ • • আলিবর্দী সুবে বাংলার নবাব। সিরাজদ্দৌলা ঐ দৌহিত্র, পরবর্তী নবাব। মীরজাফর সিপাহসালার (সেনাধ্যক্ষ )। মােহনলাল সেনাপতি। মাণিকাদ কলিকাতার দেওয়ান। উমিচাদ পেশােয়ারী সওদাগর। আগা সমসের প্রাক্তন সেনাপতি। আমীর খাঁ সহকারী সেনাপতি। আলি হােসেন (পুরন্দর) সিরাজের বয়স্য। মীরনাজির মতিঝিলের শেরিফ। মিষ্টার হলওয়েল ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর প্রতিনিধি। শান্তশীল সহঃ সেনাপতি (মােহনলালের সহঃ) স্বামিজী মােহনলালের গুরুদেব। বালাজী দণ্ডপাণি মহারাষ্ট্র সেনানায়ক। দয়ানন্দ দয়ানগরের দেবাংশি সন্ন্যাসী। সােলেমান সেনাপতি মীরমদনের পুত্র। আলতাফ হাবিলদার । * দানশা জনৈক ফকির (ভগবানগােলা নিবাসী) কৃষ্ণদাস ( রাজা রাজবল্লভের পুত্র), মােহনলালের প্রতিবেশিগণ, সৈনিকগণ, কোতয়াল, প্রতিহারীগণ ও প্রহরীগণ। ০ ০ ০ • • • * ইনি প্রসিদ্ধ দোহাকার সিদ্ধপুরুষ দানশা ফকির নহেন। যদিও উভয়েই মুর্শিদাবাদ জেলায় জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।
– স্ত্রী
০ ০ ০
• এ
মেহেরউন্নেসা (ঘসেটি)
লুৎফাউন্নেসা
সেলিনা (করুণা )
লক্ষ্মীবাঈ
সৌরভী
নর্তকীগণ।
নবাব আলিবর্দীর জ্যেষ্ঠা কন্যা।
সিরাজের পত্নী।
মােহনলালের ভগিনী (লুৎফার সঙ্গিনী
ভাস্কর পণ্ডিস্তের পালিতা কন্যা।
দয়ানন্দের ভৈরবী।
• ০ ০
০ ০ ০
পলাশী
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
নন্দীগ্রাম-পল্লীপথ। অদূরে সবুজ ধানক্ষেত ও তাহার পার্শ্বে
প্রবাহিত নদী। পশ্চাতে কুটীর শ্রেণী ও গাছপালা দেখা যাইতেছে,
বটের ছায়ায় বসিয়া স্বামিজী গান গাহিতেছেন।
গান
আমার সােনার বাংলা দেশ
নম নম নম নম।
স্নিগ্ধ উজল পল্লীমায়ায়
ছায়াঘন নিরুপম।
কাজল দীঘির অথৈ জলে
সােনার কমল কুমুদ দলে,
পল্লী বালার চিকুর দোলে
স্বপন পরী সম।
স্তব্ধ দুপুর আম্রবনে রাখাল বাজায় বেণু,
তােমার বুকের পরশ খুজে বেড়ায় নীরব ধেনু;
২। পলাশী ভাটিয়ালির গানের তালে, নূপুর বাজে ডিঙার হালে রম ঝম রম ঝম । নম নম নম নম । ( নেপথ্যে কোলাহল শোনা গেল ) নেপথ্যে—আগুন!—আগুন! স্বামিজী। আগুন! একি! মােহনলালের গৃহে আগুন! সৰ্ব্বনাশ ! এ আগুন নেবাবে কে? পুরন্দরপুরন্দর, শান্তশীল, আগুন! আগুন! [ প্রস্থান আবার কোলাহল উঠিল। মােহনলাল চীৎকার করিতেছে- ভাগে ভাগে। হিয়াসে। নেপথ্যে-আগুন-আগুন-- ( বিভিন্ন কণ্ঠের কলরব) [ মঞ্চ অন্ধকার হইয়া পুনরায় আলােকিত হইল, সহসা মােহন- লালের গৃহে আগুন জ্বলিয়া উঠিল ] নেপথ্যে-জল! জল! জল নিয়ে আয়। [ একটা জ্বলন্ত মশাল হাতে মােহনলাল ধীরে ধীরে রাজপথে আসিয়া দাঁড়াইল। মুখে একটা অস্বাভাবিক ক্রুর হাসি ও দৃঢ়তা।] মােহন। ধিকি ধিকি তুষের আগুনে যার অস্থি মজ্জা মেদ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, সেই দুর্ভাগা দেশকে আজও বলেসােনার বাংলা দেশ ! ভীরু কুকুরগুলাে চীৎকার করছে। কিন্তু মােহনলালের ওই ভাঙ্গা কুঁড়ের মমতায় নয়। পাছে এই আগুনে নিজেদের ঘর পােড়, সেই ভয়ে।
পলাশী
[ কয়েকজন প্রতিবেশী ছুটিয়া মােহনলালের নিকটে আসিল ]
১ম প্ৰ। ঠাকুর! মােহন ঠাকুর !
মােহন। খবরদার। কেউ নেবাতে চেষ্টা করােনা। আমার
ঘর, আমি নিজে হাতে আগুন জ্বালিয়েছি। জ্বলবে, অনন্তকাল ধরে
জ্বলবে ওই আগুন।
প্রতি। এ! কি বলছ মােহন ঠাকুর ?
মোহন। হাঁ, ঠিকই বলছি।
বলছি। আপন আপন ঘর সামলাও গে
যাও। যাও–যাও এখান থেকে।
২য় প্র। বােনটার শােকে মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
৩য় প্র। তা আবার হবে না? সংসারে আর আছেই বা কে ?
১ম প্র। অমন সুন্দর বােন! যেন রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী।
মােহন। যাও–যাও এখান থেকে। তােমরা জানাে শুধু কুকুরের
মত ঘেউ ঘেউ করতে। আর জাননা (হাতের মশালটি পদদলিত
করিয়া নিবাইল) পরের সর্বনাশ করতে।
প্রতি। রণে হেরে ঘরে এসে চোঙ রাঙানি। বর্গীদের সঙ্গে
দিল্লাগি চলবে না বাবা। তারা মারাঠা। যাও না একবার, বুঝবে
ঠেলাটা।
[ বলিতে বলিতে প্রস্থান
মােহন। (প্রজ্জ্বলিত গৃহের দিকে চাহিয়া ) আঃ, বাচা গেল।
মােহনলালের চিহ্ন নন্দীগ্রাম থেকে, সমস্ত বাংলার বুক থেকে এমনি
করে মুছে ফেলব। করুণাও নিশ্চয়ই মরেছে। আমার বােন সে,
সে জানে কেমন করে মরতে হয়। (গৃহখানির উদ্দেশে হাত জোড়
করিয়া নমস্কার করিল) তােমার সম্মান রাখতে পারিনি। তাই
বিদেশী দর হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার আগে, আপন হাতে তােমায়
')
৪ পলাশী দগ্ধ করেছি। জননী জন্মভূমি আমার ! ক্ষমা করাে। (অস্থিরভাবে পায়চারি করিতে লাগিল। পুরন্দর ও শান্তশীলের প্রবেশ পুরন্দর। মােহন! মােহন। কে, পুরন্দর ! শান্তশীল ! এসেছে। তােমরা ? পুর। স্বামিজী আমাদের মুর্শিদাবাদ থেকে খবর দিয়ে আনিয়েছেন। আমরা না এসে পারি ? মােহন। আসৃবি, তা জানি। কিন্তু এসেও কোন লাভ হবে না পুরন্দর! বর্গীরা আমার বােনকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। গ্রামের লােক রক্ষা করতে পারেনি। অথচ সমাজপতিদের বিচারে আমি জাতিচ্যুত, আমার বংশ-গৌরব কলুষিত! অবশ্য এ কথা জানতাম যে তােরা কোনদিন আমায় পরিত্যাগ করবি না। তবুও পুর। তবুও জেনে শুনে এমন করলি কেন মােহন? বাপ- পিতামহের ভিটেয় নিজের হাতে আগুন জ্বালালি ভাই? মােহন। ভুল তো করিনি পুরন্দর। যে মায়ের সম্মান রাখতে পারব না। তাকে পরের হাতে লাঞ্ছিত হতে দেওয়ার চেয়ে, আপন হাতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া ঢের ভাল। এ অাগুন আর নিববে না বন্ধু। নন্দীগ্রামের ঘরে ঘরে, সারা মুর্শিদাবাদে, সমস্ত বাংলায় এমনি করে জ্বলে উঠবে আগুন। যদি বাঙালী কোনদিন পারে এ লাঞ্ছনার প্রায়শ্চিত্ত করতে, তবেই আবার ফুটে উঠবে বাংলার মুখে হাসি। নইলে এই শস্যশ্যামলা জন্মভূমিতে যে চিতা আজ আলিয়ে দিলাম, তা রাবণের চিতার মত চিরকাল ধরে জ্বলবে। পুর। অভিসম্পাৎ করােনা মােহন। আমরা বেঁচে থাকতে যদি ৫ পলাশী বিদেশীর হাতে বাংলা লাঞ্ছিত হয়, সে দুর্ভাগ্য শুধু বাংলার নয়, বাঙালীর, আট কোটী হিন্দু মুসলমানের। মোহন। পুরন্দর পুর। চঞ্চল হয়ােনা ভাই! বৃদ্ধ আলিবর্দী বেঁচে থাকতে থাকতে, বাংলার বুনিয়াদ শক্ত করে না গাঁথতে পারলে, চিতা জেলেও মায়ের সম্মান রাখতে পারবে না। মােহন। কিন্তু তােমার আলিবর্দী তাে সমাজের যত সব ন্যায়- চঞ্চু আর স্মৰ্ত্তশিরােমণির মুখ বন্ধ করতে পারবেন না ভাই ? পুর। আলিবর্দী না পারুন, আমরা পারবাে। দেশ হীনবীৰ্য্য হলে সমাজ এনি পঙ্গু হয়ে পড়ে। সেই পঙ্গু সমাজকে অভিশাপ দিয়ে জাগিয়ে তােলা যায় না, তাকে জাগাতে হয় চাবুক মেরে। মােহন। চাবুক মেরে ? পুর। হাঁ চাবুক মেরে। আর সে চাবুক দেশের তরুণদের হাতে। ন্যায়চক্ষুদের হাতে নয়। শান্ত। সে হয় বুঝলাম। কিন্তু এই যে করুণাকে ধরে নিয়ে গেল মারাঠা দস্যরা, তাই নিয়ে সমাজপতিরা নানা কুৎসিত কথা রটনা করলেন। মােহনকে পতিত রাখবার সিদ্ধান্ত হল। তুমি কি বল, এর প্রতিকার হবে ওই বুড়ো ভেড়াগুলােকে চাবুক মেরে ? পুর। সে চাবুকের কথা আমি বলছি না শান্ত। আমি বলছি- আমরা যদি শক্তিমান হয়ে উঠি, আমাদের শক্তির কশাঘাতে ওদের মুখ আপনিই বন্ধ হবে। যে করুণার সম্পর্কে ওরা আজ নানা কথা বলবার সাহস পায়, তাকে কতটুকু জানে ওরা? মােহন। করুণ।! অভাগিনী করুণা।
পলাশী
[ মােহন একটু দূরে অবনত মস্তকে দাড়াইয়াছিল। তাহার
চোখে জল আসিল। ]
পুর। মােহন! কাদছো? ছিঃ, তােমার চোখে জল ।
মােহন। অত অপমান সয়ে কি করুণা আজও বেঁচে আছে
ভাই ?
পুর। করুণাকে অপমান করার শক্তি মারাঠার নেই মােহন।
তা ছাড়া পণ্ডিতজী বেঁচে থাকতে, মারাঠা শিবিরে মায়ের অপমান
হবে না, এ আমি ঠিক জানি।
মােহন। তিনি বেঁচে থাকতে তার সৈন্যেরা যদি একটা অসহায়
কুমারীকে দেবমন্দির থেকে ধরে নিয়ে যেতে পারে, তা হলে
অপমানের আর কি বাকী থাকে পুরন্দর ?
পুর। কিন্তু সে অনাচার ঘটেছে পণ্ডিতজীর অগােচরে। পণ্ডিতজী
আর যাই হােন, অন্তত হীন চরিত্র নন্ এ বিশ্বাস আমার আছে।
শান্ত। সেই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে তো নিশ্চিন্ত থাকা চলে
ভাই।
স্বামিজীর প্রবেশ
স্বামিজী। নিশ্চয়ই না।
পুর। এই যে স্বামিজী, আপনি? (স্বামিজীর পদধূলি লইল।)
স্বামিজী। মােহন গায়ে ছিল না। তাই অত্যাচারের প্রতিবিধান
করতে আমি তোমাদের সংবাদ পাঠিয়েছিলাম।
মােহন। আমার অবর্তমানে গ্রামশুদ্ধ লোেক যার প্রতিবিধান
করতে পারেনি, একা পুরন্দর আর শান্তশীল তার কতটুকু পারবে
স্বামিজী ?
পলাশী ৭ স্বামিজী। এ গাঁয়ের লােকের প্রতিবিধান করবার শক্তি নেই মােহন। তাই সে ভার দিয়েছি তােমার আর পুরন্দরের হাতে। শান্ত থাকবে তােমাদের পিছু পিছু। এই মুমুষু জাতির কঙ্কালকে ভেঙে, তোমরা গড়ে তুলবে নতুন মানুষের দল; যারা মৃত্যুকে মুষ্টিভিক্ষা দেবে হাসতে হাসতে। মােহন। স্বামিজী। (মস্তক নত করিল ) ( ক্ষণেক সকলে নীরব হইল ) পুর। ভেবােনা ভাই, এ মহাকাৰ্য্যে নবাব আলিবর্দী তােমায় সাহায্য করতে স্বীকৃত হয়েছেন। মােহন। নবাব আলিবর্দী । পুর। বিস্মিত হচ্ছ মােহন ? তােমার বন্ধু এই পুরন্দর এতদিন ধরে আত্মীয়-বান্ধবের সঙ্গ ত্যাগ করে আলিহােসেন নাম নিয়ে নবাবের প্রাসাদে অবস্থান করছিল, সে কি বিনা উদ্দেশ্যে ? আমি নবাবের পরম বিশ্বাসের পাত্র। আমার অনুরােধে তিনি স্বীকৃত হয়েছেন তােমায় সাহায্য করতে। বাংলার বুক থেকে যদি বিদেশী দস্যদের নির্মুল করতে পার, নবাব সরকার চিরদিন তােমার স্বপক্ষে থাকবে? মােহন। পুরন্দর! পুর। হাঁ ভাই। স্বামিজী। শুনলাম নবাব আলিবর্দী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—অন্তত: মারাঠাদের যদি বাংলা থেকে বিতাড়িত করতে পার, তিনি তােমায় পাঁচ-হাজারি মনসবদারের জায়গীর দিয়ে, সেনাপতির পদে বরণ করবেন।
পলাশী
মােহন। আমি পদমর্যাদা চাই না স্বামিজী। আমি চাই
প্রতিশােধ, মারাঠার বিরুদ্ধে প্রতিশােধ।
পুর। বেশ, সেই প্রতিশােধ নিয়েই তুমি তােমার বীরত্বের
পরিচয় দাও মােহন।
মােহন। স্বামিজী ?
স্বামিজী। মারাঠাদের বাংলা থেকে বিতাড়িত করে যদি
নবাবের বিশ্বাসভাজন হতে পারাে, মােহন, যাত্রাপথ আরও সুগম
হবে তােমার। আমি শুনেছি-নবাব আলিবর্দী ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন,
মরবার আগে দেশরক্ষার ভার কোন সুযােগ্য ব্যক্তির হাতে তুলে
দেবার জন্যে। মৃত্যুশয্যায় শুয়েও তিনি খুঁজছেন একজন সত্যিকারের
মানুষ, যাকে বিশ্বাস করা যায়। স্বদেশ-সেবার এ অপূর্ব সুযােগ
তুমি হারিয়ােনা মােহন।
মােহন। আমার মত একজন অসহায় যুবক এই বিস্তীর্ণ বাংলা-
দেশের কতটুকু কাজে লাগতে পারে ? আর আমার দ্বারা কী-ই
বা সম্ভব?
স্বামিজী। সবই সম্ভব মােহন। চাণক্যের মত এক দরিদ্র বৃদ্ধ
ব্রাহ্মণ যদি এই বিশাল ভারত সাম্রাজ্যের শাসনতন্ত্রকে ভেঙে নূতন
সাম্রাজ্য গড়ে যেতে পারেন, তা হলে তােমার মত এক অমিততেজা
যুবক পারে না এই জরাজীর্ণ বাংলাকে ভেঙে নূতন করে গড়ে তুলতে ?
মােহন। পারবে। স্বামিজী ?
স্বামিজী। হাঁ, পারবে মােহন।
মােহন। আশীর্বাদ করে। তবে সন্ন্যাসী।
[ মােহন নতজানু হইয়া স্বামিজীর পদপ্রান্তে বসিল ]
স্বামিজী। আশীৰ্বাদ শুধু আমি করবাে না মােহন, আশীৰ্বাদ
পলশেী
করবে বাংলার শ্যামল শস্যক্ষেত্র। আশীর্বাদ করবে বাংলার নদ নদী
বন উপবন। আশীৰ্বাদ করবেন দেবী ভাগীরথী, আর আশীৰ্বাদ করবে
বাংলার বেদনার্ত নরনারী—আট কোটী হিন্দু মুসলমান।
মােহন। স্বামিজী ! আমি সেই আশীৰ্বাদই মাথা পেতে নেবে।
আজ থেকে শপথ করলেম, আমার দেহে শেষ রক্তবিন্দু থাকতে আমি
বাংলাকে বিদেশীর হাতে লাঞ্ছিত হতে দেব না। এই জরাজীর্ণ
বাংলাকে ভেঙে আবার নতুন করে গড়ে তুলব। জীবন দিয়ে করব
আমার দেশমাতৃকার অভিষেক। সমগ্র বাংলায় জেগে উঠবে
আর এক নতুন জাতি। গ্রামে গ্রামে, পথে পথে ধ্বনিত হবে সেই
গান-“আমার সোনার বাংলা দেশ। আমার সােণর বাংলা দেশ।”
দ্বিতীয় দৃশ্য
মারাঠা শিবির। লক্ষ্মীবাঈ একাকী শিবিরের মধ্যে গ
গাহিতেছে। শিবিরের এক পার্শ্বে লক্ষ্মীবাঈয়ের শয্যা, অপর পার্শ্বে
বিশ্রাম করিবার আসন ও দু একটী প্রয়ােজনীয় আসবাব।
গান
আমি যে বেঁধেছি ঘর
অজানার বালুচরে।
যারে ভুলে যেতে হবে জানি,
তারি লাগি আঁখি ঝরে।
পলাশী
জানি ফাগুন দিনের শেষে,
দখিণা বাতাস এসে
ডাক দিয়ে যাবে দূর মরু পথে,
কাল বৈশাখী ঝড়ে ।
{ গান শেষ হইতে না হইতেই ব্যস্ততার সহিত বালাজীর প্রবেশ )
বালাজী। লক্ষ্মী।
লক্ষ্মী। কাকা !
বালাজী। পণ্ডিতজী তাে এখনাে ফিরলেন না। নবাবের
সৈন্যের ময়ূরাক্ষীর ওপারে ছাউনী ফেলেছে। অামাদের
কোতােয়ালীর তিন দিকে ঘাটি পেতে, ঘিরে ফেলবার উদ্দেশ্যে এবার
নূতন পদ্ধতিতে শিবির সংস্থাপন করেছে।
লক্ষ্মী। কাকা, পিতাজী কি একাই নন্দীগ্রামে গেছেন ? সঙ্গে
কোন গােলন্দাজ, কোন ঘােড়সাের যায়নি?
বালাজী। না, তিনি স্বেচ্ছায় একাকী গেছেন।
লক্ষ্মী। তা হলে?
বালাজী। পণ্ডিতজীর জন্য আমি চিন্তা করি না লক্ষ্মী। মহারাষ্ট্র
নায়ক ভাস্কর পণ্ডিতের পথ রােধ করা সহজ নয়। তা ছাড়া,
তা ছাড়া, নবাবী
সৈন্যের সে সংবাদ পাবারও কোন সম্ভাবনা নেই। কিন্তু আমি
ভাবছি, তিনি শিবিরে ফিরবার আগে যদি ওরা অতর্কিতে আমাদের
আক্রমণ করে!-যাক, সে কথা নিষ্প্রয়ােজন। যতক্ষণ পণ্ডিতজী
ফিরে না আসেন, সাবধানে থেকো। যে কোন সময় হয়তো আমাদের
ছাউনী স্থানান্তরিত করবার দরকার হতে পারে।
পলাশী
১১
[ বালাজী যেমন ব্যস্ততার সঙ্গে আসিয়াছিলেন তেমনি ব্যস্তভাবে
চলিয়া গেলেন ]
লক্ষ্মী। পিতা একা গেছেন নন্দীগ্রামে। নবাব-সৈন্তের। তিন
দিক থেকে মারাঠা শিবির ঘিরে ফেলবার জন্যে এগিয়ে আসছে।
যদি পথে কোন বিপদ হয় ! না—না, কাকা বলেছেন কোন ভয়
নাই। মহারাষ্ট্রনায়ক ভাস্কর পণ্ডিতের পথ রােধ করা সহজ নয়।
বিশ্বনাথ রক্ষা করবেন।
( লক্ষ্মী চঞ্চল পদে ইতস্তত ফিরিতে লাগিল )
এবার হয়তো বাংলা মুলুক ছেড়ে যেতে হবে। বেশ লাগে
আমার এই বাংলাদেশ। এমন নদ নদী বন উপবন! ইচ্ছা করে
পাখীর মত বাংলার বনে বনে ঘুরে বেড়াই। আর কখনাে বাংলায়
ফিরবাে কিনা, ভগবান জানেন। করুণাদির সঙ্গেও হয়তাে জীবনে
আর দেখা হবে না। আশ্চর্য মেয়ে ! মাত্র দুদিনের পরিচয়, অত
স্নেহ !-অত ভালবাসা।
( সহসা নেপথ্যে প্রহরী গর্জন করিয়া উঠিল)
প্রহরী। (নেপথ্যে) কোন স্থায় ? ঠারাে, ঠারো হিয়া।
মােহন। (নেপথ্যে) নেহি উলুক ! হুসিয়ার।
( লক্ষ্মীবাঈ সহসা চমকিয়া উঠিল। ভীত চঞ্চল দৃষ্টিতে চাহিয়া
দ্বারপথে একটু অগ্রসর হইতেই সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল মােহনলাল )
লক্ষ্মী। কে ? কে আপনি?
মােহন। মারাঠার শত্রু।
লক্ষ্মী। মারাঠার শক্ত ?
মােহন। হা।
পলাশী
?
লক্ষ্মী। কিন্তু এখানে কেন ? এখানে জেনানা।
মােহন। ( সহাস্যে) জেনানা ! জেনান। শুধু মারাঠারই আছে ?
বাঙালীর নেই
লক্ষ্মী। কি বলছেন আপনি?
মােহন। ভুল বলিনি।
লক্ষ্মী। আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
মােহন। বুঝবার প্রয়ােজন হবে না। আমি এসেছি শুধু মারাঠা-
নায়ক ভাস্কর পণ্ডিতকে বুঝিয়ে দিতে।
লক্ষ্মী। তিনি তাে এখানে নেই। যখন থাকবেন, আসবেন
আপনি।
মােহন। থাকা না থাকার প্রশ্ন নাই। আমিও সেদিন ছিলাম
গ্রামে।
লক্ষ্মী। (ঈষৎ উত্তেজিত হইয়া) কি বলতে চান আপনি?
স্পষ্ট করে বলুন।
মােহন। স্পষ্ট করে বলবো ? আমি চাই প্রতিশােধ।
লক্ষ্মী। প্রতিশােধ! তাই এই নিভৃত প্রহরে চোরের মত প্রবেশ
করেছেন মারাঠা-নায়ক ভাস্কর পণ্ডিতের শিবিরে ? তারই কন্য।
লক্ষ্মীবাঈয়ের সামনে। জীবনের মায়া নেই আপনার ? দেউড়ি—
দেউড়ি--
মােহন। সে চেষ্টা নিস্ফল হবে। আপনার প্রহরীরা বন্দী।
লক্ষ্মী। বন্দী ?
মোহন। হাঁ।
লক্ষ্মী। প্রহরীর বন্দী হলেও আমি এখনো বন্দী হইনি।
সে
কথা স্মরণ রাখবেন।
পলাশী
১৩
মােহন। স্মরণ আছে বলেই তাে আপনার শিবিরে প্রবেশ
করেছি সবার আগে।
লক্ষ্মী। কিন্তু সে প্রবেশ তস্করের মত করেছেন। মারাঠা
বাহিনীকে পরাজিত করে যদি কোনদিন লক্ষ্মী বাঈ-এর শিবিরে প্রবেশ
করতে পারতেন, লক্ষ্মীবাঈ আপনার পৌরুষকে অভিনন্দিত করত ;
চোখ রাঙিয়ে বিজেতার কন্যাকে বন্দী করা যায় না।
মােহন। যায় কিনা, প্রমাণিত হইতে বিলম্ব হবে না।
লক্ষ্মী।
তা জানি। কিন্তু তাকে বন্দী করা বলে না। সে
অপহরণ, কাপুরুষের বৃত্তি।
মােহন। অপহরণ ?
লক্ষ্মী। নিশ্চয়ই।
মােহন। অপহরণ! হােক অপহরণ ; আমি চাই প্রতিশােধ।
যে গ্লানি আর অপমানে আমি জর্জরিত, সেই গ্লানিতে নত করবাে
ভাস্কর পণ্ডিতের শির। তাকে বুঝিয়ে দেবো, বাঙালী অপমানের
প্রতিশোধ নিতে জানে...
লক্ষ্মী। সে পরিচয় দেবার এই প্রকৃত পথ নয়। বিশেষত
আপনার মত তেজস্বী নিষ্ঠাবান্ যুবককে এই ভাবে আত্মহত্যা করতে
দেখে, আমার সত্যি অনুকম্পা হয় মােহনলালজী।
(মােহনলাল চমকিত দৃষ্টিতে একবার লক্ষ্মীবাঈএর মুখপানে
চাহিল। লক্ষ্মীবাঈএর সহিত দৃষ্টি বিনিময় হইতেই লক্ষ্মীবাঈ ঈষৎ
হাসিয়া দৃষ্টি নত করিল )
মােহন। মােহনলালজী ! আপনি জানেন আমার পরিচয় ?
লক্ষ্মী। জানি। আপনি মােহনলাল ঠাকুর। আপনার কথা
আমি অনেক শুনেছি। মােহনলাল ঠাকুর ব্যতীত এতখানি দুঃসাহস
১৪
পলাশী
?
বাংলায় আর কারো নেই। করুণাদির মুখে সবই শুনেছি। তাই
প্রথম দেখেই বুঝলাম, আপনি করুণাদির দাদা।
মােহন। করুণাদি ?
লক্ষ্মী। হাঁ, করুণাদি।
মােহন। আপনি চেনেন ? চেনেন
করুণাকে ?
আমার
ছােটবােন, যাকে বর্গীরা ধরে এনেছে।
লক্ষ্মী। ভুল করবেন না, মােহনলালজী। আপনার বােনকে
মারাঠারা ধরে আনেনি। তিনি যখন বাণেশ্বরের মন্দিরে পূজো দিতে
যাচ্ছিলেন, ওলন্দাজ বােম্বেটেরা তাকে অপহরণ করে। তারপর
অবশ্য কয়েকজন মারাঠা পদাতিক তাকে ছিনিয়ে আনে। উদ্দেশ্য
মহৎ ছিল কিনা তা জানিনা।
মােহন। করুণা-করুণ। এখনাে বেঁচে আছে লক্ষ্মীবাঈ
লক্ষ্মী। শুধু বেঁচে আছেন তাই নয় । বাবা নিজে তাকে পৌছে
দিতে গেছেন আপনাদের গ্রামে। যারা তাকে মারাঠা শিবিরে ধরে
এনেছিল, তারা অন্য কোন গর্হিত কাজ করেনি। তবুও ভাস্কর
পণ্ডিতের আদেশে একজনের হয়েছে প্রাণদণ্ড, অপর দুজনের গােমুখী
নির্যাতন।
মােহন। লক্ষ্মীবাঈ।
লক্ষ্মী। যে অপরাধে ছত্রপতি শিবাজী তার একমাত্র বংশধর
শম্ভুজীর প্রাণদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন, সে অপরাধ মারাঠারা ক্ষম।
করতে জানে না। তারা লুণ্ঠনকারী দস্যু হলেও, অনাচারী পশু নয়।
মােহন। (নীরব রহিল )
লক্ষ্মী। কি ? হঠাৎ অমন নিৰ্বা হয়ে গেলেন যে?
মােহন। এ কথা কি সত্য?
পলাশী
লক্ষ্মী। ( সহাস্যে) আপনার কাছে বন্দী হবার ভয়ে মিথ্যা বলাও
তো অস্বাভাবিক নয়।
মােহন। না, না, রহস্য করবেন না। আমায় বলুন, করুণ।
আজও বেঁচে আছে কিনা ?
লক্ষ্মী। তিনি বেঁচে আছেন সত্য। আর এখানে থাকতে
আপনার সম্পর্কে যে আশঙ্কা করেছিলেন সেটাও দেখছি মিথ্যে নয়।
মােহন। আশঙ্কা?
লক্ষ্মী। হাঁ। আপনার জন্যেই সে আশঙ্কা। আপনি হয়তো
ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে মরণের মাঝখানে ঝাপিয়ে পড়বেন।
মােহন। মৃত্যুকে আমি ভয় করি না লক্ষ্মীবাঈ।
লক্ষ্মী। যারা পুরুষ তার মৃত্যুকে ভয় করে না। তাই বলে তস্করের
বৃত্তিও তাদের শােভা পায় না। (বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে মােহনলালের পানে
চাহিয়া রহিল )
মােহন। আমায় ক্ষমা করুণ লক্ষ্মীবাঈ
লক্ষ্মী। মেয়েদের কাছে ক্ষমা চাওয়াও আপনার মত পুরুষের
শোভা পায় না।
মােহন। লক্ষ্মীবাঈ, আপনি পরিহাস করবেন না। আমি ক্রোধে
হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়েছিলাম। নন্দীগ্রামে ফিরে যখন সংবাদ পেলাম
করুণাকে মারাঠারা ধরে নিয়ে গেছে, আমার রক্তে আগুন জ্বলে
মনে হ’ল, সারা দুনিয়াটা পুড়িয়ে ছারখার করে দিই—
লক্ষ্মী। আর অমনি অসহায় অবস্থায়, একাকী মারাঠা শিবিরে
ছুটে এলেন !
মােহন। না লক্ষ্মীবাঈ, আমি অসহায় অবস্থায় আসিনি। মারাঠ।
শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবার জন্য প্রস্তুত হয়েই এসেছি।
উঠল।
পলাশী
লক্ষ্মী। বেশ তাে। কিন্তু এখানে আর বিলম্ব করবেন না।
আমায় নিয়ে যাবেন বলে যে শিবিকা সাজিয়ে এনেছিলেন, সেই
শিবিকাতেই নিজে ফিরে যান। পিতাজী আসবার আগে ছাউনীর
সীমানা ছাড়িয়ে না গেলে
মােহন। সে বিপদের জন্য ত আমি প্রস্তুত হয়েই এসেছি
লক্ষ্মীবাঈ । বলেছি তো, আমি একা আসিনি। আমার সঙ্গে আছে
নবাবের ফৌজ। নবাবকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছি যে, মারাঠাদের
বাংলা থেকে বিতাড়িত করবো।
লক্ষ্মী। তা করবেন। কিন্তু এখন আমার অনুরােধ আপনি
রাখুন। আমি করযোড়ে মিনতি করছি, মােহনঠাকুর ! আপনি যান।
শীঘ্র চলে যান।
মােহন। ওঃ! আচ্ছা, আচ্ছা—তাই হবে। আমি যাচ্ছি-
( প্রস্থানে দ্যত )
আচ্ছা,
লক্ষ্মী। করুণাদিকে আমার কথা বলবেন। যদি আবার কখনাে
দেখা হয়, সৌভাগ্য মনে করবো। চিনবার আগে মনের অগােচরে
দেখেছিলাম যার মুত্তি, তাকে চোখের সামনে দেখা কি কম সৌভাগ্য?
মােহন। সে সৌভাগ্যকে আমিও কম মনে করি না লক্ষ্মীবাঈ।
আসি তবে ?
লক্ষ্মী। যদি কিছু মনে না করেন—
মােহন। বলুন।
লক্ষ্মী। তাড়িয়ে দিলাম ব’লে ক্ষমা করবেন। আর—আর ( একটু
ইতস্তত করিয়া) কোন দিন সাক্ষাৎ হবে কিনা ভগবান জানেন।
( হাতের অঙ্গুরীয় খুলিয়া) রঘুজী ভোলার নামাঙ্কিত এই আংটী
-
পলাশী
১৭
শুধু স্মৃতি চিহ্নই নয়, জীবনে অনেক কাজে লাগবে। এই সাঙ্কেতিক
দেখালে, কোন মারাঠা আপনার পথ রােধ করবে না।
( অঙ্গুরীয়টি মােহনলালকে উপহার দিয়া পদধূলি লইল)
মােহন। আপনার ঋণ চিরদিন মনে থাকবে।
লক্ষ্মী। সে আমার সৌভাগ্য হাসিল)
মােহন। সৌভাগ্য আপনার চেয়ে আমার আরও বেশী ।
[ প্রস্থানােত হইলেন। সহসা দ্বারপথে আসিতেই বালাজী
দণ্ডপাণি আসিয়া মােহনলালের পথ রােধ করিলেন ]
বালাজী। (সশব্দে তরবারিখানি কোষ হইতে অর্ধ-মুক্ত করিয়া)
কে তুমি ?
(মােহনলাল কোন উত্তর না দিয়া ক্ষিপ্রতার সহিত অঙ্গুরীয়টি
বালাজীর চোখের সামনে ধরিল। বালাজী সসম্মানে পথ ছাড়িয়া
দিলেন। কিন্তু সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে লক্ষ্মীবাঈএর মুখপানে চাহিয়া অগ্রসর
হইয়া আসিলেন)
বালাজী। লক্ষ্মীবাঈ।
লক্ষ্মী। কাকা! (ক্ষণিকের জন্য মস্তক অবনত করিল)
বালাজী। কে এই যুবক ?
লক্ষ্মী। উনি করুণাদির দাদা মােহনলাল। পিতাজী করুণাদিকে
পৌছে দিতে গেছেন, সে খবর পাননি বলে, ব্যস্ত হয়ে ছুটে
এসেছিলেন।
বালাজী। কিন্তু সুরক্ষিত মারাঠা ছাউনীর ভিতর প্রবেশ করা
কেমন করে সম্ভব হ’ললক্ষ্মী ?
সে কথা আমি তাে বলতে পারি না কাকা!
লক্ষ্মী।
২
১৮
পলাশী
বালাজী। হাতে রঘুজী ভোলার সাঙ্কেতিক।
লক্ষ্মী। আমিই দিয়েছি তাকে।
বালাজী। লক্ষ্মীবাঈ
লক্ষ্মী। পাছে পাছে নির্বিঘ্নে গৃহে ফিরতে না পারেন।
( অবনত মস্তকে পায়ের আঙ্গুল দিয়া মাটিতে দাগ কাটিতে
লাগিল )
বালাজী। এই অনুজ্ঞা পণ্ডিতজীর ছিল ?
লক্ষ্মী। না।
বালাজী। হু, শক্রর হাতে অত বড় অস্ত্র তুলে দেওয়া তােমার
উচিত হয়নি লক্ষ্মীবাঈ।
লক্ষ্মী। শক্ত ?
বালাজী। হা শত্রু। উনি যেই হােন, সশস্ত্র যােদ্ধা। মারাঠার
বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে শিবিরে প্রবেশ করেছিলেন। ওঁকে নির্বিঘ্নে
চলে যাওয়ার সুযােগ না দেওয়াই উচিত ছিল। এবার মারাঠার
পরাজয় বােধ হয় অনিবার্য।
লক্ষ্মী। কাকা !
বালাজী। যাক্, দেউড়ীরা বন্দী অবস্থায় দাঁড়িয়ে। আমি
ততক্ষণ তাদের মুক্ত করে দিইগে।
[ প্রস্থান
তৃতীয় দৃশ্য
[ মুর্শিদাবাদ প্রাসাদের কক্ষ। নবাব আলিবর্দী রােগ শয্যায়,
পার্শ্বে তাহার জ্যেষ্ঠা কন্যা মেহেরউন্নেসা ]
মেহের। (উন্মনাভাবে বাতিদানের ঝালর নাড়িতে নাড়িতে)
মতিঝিল! চুণীপান্না-হীরা-জহরতে-গড়া দুনিয়ার বেহেস্ত মতিঝিল
আজ শ্মশান হয়েছে। আলিমঞ্জিলও থাকবে না-এবার ভাঙ্গবে
এই আলিমঞ্জিল।
আলিবর্দী। মেহেরউন্নেসা।
মেহের। আব্বাজান।
আলি।
এ রােগ আর সারবে না, মা।
মেহের। কেন বাবা! তলিফ কি বেড়েছে ?
আলি। দেহের তলিফ না বাড়লেও, মনের তলিফ দিন
দিন যেন বেড়ে উঠছে মেহের। দীর্ঘ বিরাশী বৎসর ধরে কেবল যুদ্ধ
বিগ্রহ আর ঝড়-ঝাপটাই সয়েছি। দেহ কঙ্কাল সার হলেও, এ
শূলবেদনার সঙ্গে আরও কিছুদিন লড়াই করবার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু
তাতে তো লাভ নেই মা! এখন মৃত্যুই আমার বিশ্রাম। তাই,
মরণকে আর তিলমাত্র ভয় করে না।
এখন শুধু ভয় করে-
মেহের। (সযত্নে পিতার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে )
কিসের ভয় করে বাবা ?
আলি। ভয়! কিসের ভয় জানিস মা। পাছে এই স্থবির
কঙ্কাল কবরের ভিতরে গিয়েও নিশ্চিন্তে ঘুমাতে না পারে।
২০ পলাশী মেহের। আপনি কি পাগল হলেন আব্বাজান ? আলি। পাগল হইনি মা। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আজ যেন জীবনের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আমার চোখের সামনে। শরফরাজ খাঁকে হত্যা করে যে দিন বাংলার সিংহাসন ছিনিয়ে নিয়েছিলাম, সেদিন হয়তাে অন্তরে শুধু রাজ্যলিপ্লাই ছিল। তারপর এই সুদীর্ঘকাল নানা বিপদ আর বিদ্রোহের ভিতর দিয়ে তিল তিল করে বাংলাকে লালনপালন করেছি কন্যার মত। আফগান, মারাঠা, পাের্তুগীজ, ওলন্দাজ—কত দস্যুর উৎপীড়ন বুক পেতে প্রতিরােধ করেছি। কোনদিন বিচলিত হইনি। কিন্তু আজ বিচলিত হচ্ছি শুধু এই ভেবে যে, আমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই হয়তো সাধের এই গুলবাগিচা শুকিয়ে যাবে। (হঠাৎ যন্ত্রণায় কাতর হইয়া পেট চাপিয়া ধরিলেন)। মেহের। অকারণ আশঙ্কায় অমন অস্থির হবেন না, বাবা । আলি। মেহের! শােন মা, এদিকে আয় (মেহের কাছে গেল। ক্ষণেক নীরব হইয়া মেহের-উন্নেসার মুখপানে চাহিয়া, তাহার হাতখানি নিজের বুকে টানিয়া লইলেন) সুবে বাংলার নবাব বৃদ্ধ আলিবর্দীর শেষ ভিক্ষা, সিরাজকে তুই ক্ষমা করিস মা । মেহের। আব্বাজান! আলি। মা, আমি জানি, সিরাজ তাের অপমান করেছে। তবুও সে ছেলে। লােকের চোখে নবাব সিরাজদ্দৌলা হলেও, তাের কাছে সেই দুগ্ধপােষ্য শিশু মীরজা মহম্মদ। হােসেন কুলীকে হত্যা করার অপরাধ শুধু ওর একার নয় ; তাের বৃদ্ধ পিতাও সে পাপে জড়িত। মেহের। (চমকিয়া উঠিয়া) মতিঝিলের ঐশ্বৰ্য্য তাহলে নবাব আলিবর্দীকেও প্রলুব্ধ করেছিল ?
পলাশী
আলি। আমায় ভুল বুঝি না, মেহের।
মেহের। ভুল আমি কাকেও বুঝিনি বাবা। নবাব নওয়াজেস
মহম্মদ যাকে পােষ্যপুত্র গ্রহণ করেছিলেন, সে সিরাজেরই সহােদর
মীরজা ফজলকুলি। ফজলকুলির নাবালক পুত্র মুরাদকে বেওয়ারিস
করার লােভ সিরাজেরও শােভা পায় না আব্বাজান। থাক, সে পুরানাে
কথা এখন আর কেন ? সিরাজের ভবিষ্যৎ যদি কোনদিন অন্ধকার হয়,
সে হবে নবাব আলিবর্দীর ভুলে ; ঘসেটি বেগমের আক্রোশে নয়।
আলি। আমার ভুলে ?
মেহের। হাঁ, আপনারই ভুলে। নবাব সরকারে অনেক
যােগ্যতর ব্যক্তি থাকতে, এক অজ্ঞাতকুলশীল যুবককে সেনাপতির
পদে অভিষিক্ত করে, তার হাতে অতখানি ক্ষমতা ন্যস্ত করা কি
সমীচীন হয়েছে জাহাপনা ?
আলি। কিন্তু মা, ওই মােহনলালের বাহুবলেই তো বাংলা আজ
মারাঠা-উৎপীড়ন থেকে মুক্ত !
মেহের। আজ মুক্ত হলেও, ভবিষ্যতে ওর জন্যেই জ্বলে উঠবে
অশান্তির আগুণ। নবাব আলিবর্দীর স্বপ্ন বাতাসে মিলিয়ে যাবে।
আলি।
একি তােমার অনুমান ঘসেটি ?
মেহের। অনুমান হতে পারে, কিন্তু সেটা একেবারে ভিত্তিহীন
নয়। রাজা রাজবল্লভের ভাবী জামাতা, ভবিষ্যতে শেঠজী আর রাজা
জানকীরামের সহায়তায়, নিজেই বসবেন বাংলার মসনদে।
রাজা রাজবল্লভের ভাবী জামাতা ?
মেহের। সেনাপতি মােহনলাল।
আলি। নবাব নওয়াজেস মহম্মদের বিশ্বস্ত দেওয়ান, তােমার
পরম হিতাকাঙ্খী, রাজা রাজবল্লভকেও তুমি অবিশ্বাস কর, মেহের ?
আলি।
২২ পলাশী মেহের। বিশ্বাস! আমি বিশ্বাস কাকেও করি না, জাহাপনা। তাই সিরাজের হিতাকাঙ্খার জন্যেই অনুরােধ করি,অন্ততঃ যাবার বেলায় সে ভুল সংশােধন করে যাবেন, আব্বাজান! নইলে, ওই মােহনলালকে কেন্দ্র করেই অদূর ভবিষ্যতে অমাত্যদের ভিতর রাজদ্রোহিতাও অসম্ভব নয়। আলি। ( ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন) ঘসেটি, সত্য বল, গােপন করো না, কেন এই আশঙ্কা তােমার ? মেহের। আশঙ্কা যে কেন, তা আমার চেয়ে নবাব আলিবর্দীই ভালাে বুঝবেন। ভেবে দেখবেন, জাহাপনা। সে ভুল সংশােধনের সময় এখনাে আছে। ( প্রস্থানােত ) আলি। (ব্যগ্রতার সহিত ) মেহের—মেহের—মেহের-উন্নেসা ! মেহের। (ফিরিয়া) বিশ্রাম করুণ আপনি। (তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চাহিয়া সদম্ভে নিষ্ক্রমণ ) আলি। মেহের উন্নেসা।ভুল? নবাব আলিবর্দীর ভুল! নানা অসম্ভব। দীর্ঘ বিরাশী বৎসরের অভিজ্ঞতায় আলিবর্দী অন্ততঃ শিখেছে মানুষ চিনতে। মােহনলাল বীর। (উত্তেজনার বশে উঠিয়া বসিলেন) সিরাজ। সিরাজ! ( চীৎকার করিয়া উঠিলেন) যারা বীর, তারা কখনও বিশ্বাসঘাতক হয় না (উত্তেজনার বেগ সহ করিতে না পারিয়া সহসা যন্ত্রণা কাতরভাবে হৃৎপিণ্ড চাপিয়া ধরিলেন) সিরাজ, সিরাজ- ক্ষিপ্রপদে সিরাজের প্রবেশ সিরাজ। দাদু-দাদু-( তাড়াতাড়ি নবাবকে ধরিয়া ফেলিলেন, সিরাজকে অবলম্বন করিয়া নবাৰ উত্তেজনার বেগ কতকটা সামলাইয়া লইলেন)
পলাশী
আলি। আয়, দাদু আয়। (হাঁপাইতে লাগিলেন)
সিরাজ। অমন করছ কেন দাদু ?
আলি। না, আর করবাে না। (ধীরে ধীরে শয্যা গ্রহণ
করিলেন) সারা দুনিয়া যদি বলে—আলিবর্দী ভুল করেছে, তবুও আমি
মানবে না।
সিরাজ। কিসের ভুল দাদু সাহেব ?
আলি। কিছু নয় ভাই। খােদাতালা যে ভার তােমার মাথায়
তুলে দিয়েছেন, সে ভার বহন করতে যেন কোনদিন কুষ্ঠিত হয়াে না।
সিরাজ। কুষ্ঠিত কোনদিনই হব না দাদু। তবে এত দিন যে
সাহস ছিল, আজ যেন সে সাহস আমার ফুরিয়ে যাচ্ছে। (অশুভারাক্রান্ত
হইলেন)
আলি। (সিরাজের মাথায় হাত রাখিলেন) দাদু,-(কুর্ণিশ
করিতে করিতে মীরজাফর, মাণিকচাদ, আলিহােসেন ও উমিচাদ
প্রবেশ করিলেন। নবাব মস্তক সঞ্চালিত করিয়া অভিবাদন করিলেন)
জাফরআলি, মাণিকচাদ, আলিসাহেব, চাদমিঞা, এসাে ভাই।
অমাত্যগণ। বন্দেগী জাহাপনা।
( সসম্মানে একপার্শ্বে দণ্ডায়মান হইলেন):
আলিবর্দী। জাফর আলি।
মীরজাফর। জনাব !
আলি। তুমি শুধু নবাব সরকারের হিতাকাঙ্খী অমাত্যই নও,
আমার পরম আত্মীয়; এই বৃদ্ধের একমাত্র স্নেহের দুলাল সিরাজের
অভিভাবক। তুমিই ওকে উপদেশ দিয়ে পরিচালিত করে। সিরাজ
ছেলেমানুষ। যদি কখনও ভুল করে, কোন অন্যায় করে, তাকে শাসন
কয়রা, তিরস্কার করে, কিন্তু ত্যাগ করােনা ভাই।
২৪
পলাশী
মীরজা।
সে কথা নতুন করে আমায় বলতে হবে না জাঁহাপনা।
আমি ধর্মের নামে শপথ করেছি।
আলি। সবই জানি, জাফর আলি, তবুও মন মানে না। সংসারে
এতকাল শুধু এই বালকের মুখ চেয়েই আমি সব করে এসেছি। এই
বালক—এই আমার সিরাজ যদি কখনাে-( যন্ত্রণায় কাতর হইয়া
পড়িলেন।)
সিরাজ। (অরুদ্ধকণ্ঠে) দাদু সাহেব! দাদু সাহেব
আলি। কাদিসনে দাদু। দীন দুনিয়ার মালেক খােদাতাল রক্ষা
করবেন। নইলে, এত বড় দুঃসময়ে অমন হিতকারী বন্ধু মােহনলালকে
তিনি তােমার পাশে এনে দেবেন কেন ?
মীরজা। (কুর হাসির সঙ্গে) নিশ্চয়ই—নিশ্চয়ই
( সিরাজ সহসা মীরজাফরের মুখপানে চাহিয়া শঙ্কিত হইয়া উঠিলেন)
আলিহােসেন। সিপাহসালার আর যাই হােন, ওঁর উদারতার
তুলনা নাই।
মাণিক। আপনি থামুন, আলি সাহেব।
আলিহােসেন। যে আজ্ঞে মনসবদার! (সেলাম করিয়া একটু
পিছাইয়া দাড়াইল)
আলি। মােহনলাল যে বীরত্বের সঙ্গে বর্গীদের আক্রমণ থেকে
দেশকে রক্ষা করেছে, তেমন বীরত্ব আমি খুব কম বাঙালীরই দেখেছি
জাফরআলি। তাই, তাই আমি তাকে ফতেপুর পরগণা জায়গীর
দিয়ে, পাঁচহাজারী মনসবদারের সম্মান দিয়েছি। আর, আজ হতে
দিলাম রাজা খেতাব।
উমি। খেতাব যােগ্যপাত্রেই অর্পণ করেছেন জাহাপনা।
পলাশী
।
মীরজা। ভালই করেছেন জাহাপনা। কিন্তু একজন দরিদ্র
যুবককে হঠাৎ রাজা খেতাব দিয়ে
আলি। তুমি আশঙ্কা করছো, হয়তো তার মেজাজ বিগড়ে
যাবে। কিন্তু সে মিথ্যা আশঙ্কা সিপাহসালার। অমন নির্লোভ
তেজস্বী যুবকের মেজাজ বিগৃড়ে দেবার মত খেতাব নবাব সরকারের
চলতি সনদে নাই। তার পরিচয় একদিন আপনা থেকেই পাবে।
(একটু উঠিয়া বসিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু পারিলেন না। সহসা
বক্ষ চাপিয়। পুনরায় শয্যা গ্রহণ করিলেন)
সিরাজ।
উমি। উঠবেন না, উঠবেন না শাহানশা।
( ব্যস্ততার সহিত নবাবকে ধরিয়া) উঠবার চেষ্টা
করাে না দাদু।
আলি। না, দাদু ! (হাঁপাতে হাঁপাইতে) আর উঠবার চেষ্টা
করবে না। আঃ! এবার আমি শান্তিতে ঘুমাবো। সিপাহসালার,
সে ঘুম আমার ভাঙবে না তাে ভাই ? (ব্যগ্রভাবে মীরজাফরের দিকে
হাত বাড়াইলেন)
মীরজা। সেলাম ওয়ালেম জাহাপনা। আপনার শান্তির
কোনদিন বিঘ্ন হবে না।
উমি। আলহামদুলিল্লাহ।
'আলি। মাণিকচাদ—
মাণিক। আপনি নিশ্চিন্ত হােন খােদাবন্দ।
( সকলে মস্তক নত করিয়া প্রার্থনা জ্ঞাপন করিলেন)
আলি। আলিহােসেন! তুমি সিরাজের পাশে পাশে থেকে
তাকে অসৎ পথ থেকে রক্ষা করে ভাই। দেখাে, এই অসহায়
পলাশী
বালক যেন খেয়ালখুশীতে কখনাে এই বিরাট সমুদ্রে নৌকাডুবি
করে না বসে।
আলিহােসেন। জীবন থাকতে এ বান্দা কোনদিন নেমকহারামী
করবে না। জাহাপনা।
উমি। আমরা সবাই জান দিয়ে নবাবের তাবেদারি করবে।
জনাব।
আলি। আমার বড় সাধের গুলবাগিচা—আমার বড় সাধের
সােনার বাংলার গুলবাগিচা-
সিরাজ। সিরাজ বেঁচে থাকতে কোনদিন তােমার এ গুলবাগিচা
শুকিয়ে যাবে না দাদু। যে বাংলাকে তুমি জীবনের অধিক
ভালবেসেছ, সেই বাংলার বণিয়াদ জীবন থাকতে ভেঙে পড়তে
দেবাে না। আমিও ভালবাসবো—ঠিক তোমার মতই ভালবাসবো
বাংলাকে।
আলি। তােমরা সবাই আশ্বাস দিচ্ছ, সবাই আমায় সান্ত্বনা দিচ্ছ।
কিন্তু তবু কেন জানি না, আজ জীবনের অস্তাচলে পা বাড়িয়ে পিছনে
দেখছি কেবলি অন্ধকার! কি বিরাট অতলস্পর্শ অন্ধকার ! ভয়ে
আমার বুক কেঁপে ওঠে, সিরাজ, দাদু! এদিকে আয় তত ভাই।
সিপাহসালার, ( মীরজাফরের দিকে হাত বাড়াইয়া) সিপাহসালার
ভাই, বন্ধু, দেখে যেন বৃদ্ধ আলিবর্দীর এই গচ্ছিত ধন সে অন্ধকারে
হারিয়ে না যায়। (কম্পিত হস্তে মীরজাফরের হাতে সিরাজের
হাতখানি তুলিয়া দিলেন।)
মীরজা। উতলা হবেন না জাহাপনা ! আমি আবার শপথ করছি,
জীবন থাকতে সিরাজকে কখনাে বিব্রত হতে দেবো না।
উমি। স্থিরচিত্তে কিছুক্ষণ বিশ্রামের চেষ্টা করুন জাহাপনা,
পলাশী
২৭
অসুস্থতা আপনিই কমে যাবে। চলুন মনসবদার। জাহাপনা যাতে
নির্বিঘ্নে নিদ্রা যেতে পারেন, তার ব্যবস্থা করুন নবাব।
মীরজা। নিশ্চয়ই ! আসি তাহলে জাহাপনা ?
(কুর্ণিশ করিয়া মীরজাফর, উমিচঁাদ ও মাণিকচাদের প্রস্থান।)
আলিহােসেন। সিপাহসালারের করুণার সীমা পরিসীমা নাই।
নবাবের হিতৈষী অমাত্য!
সিরাজ। থামে। আলিহােসেন।
আলি-হাে। শুধু আমি নই, সবাইকেই থামতে হবে জাহাপনা।
কলকাঠি যখন নড়বে, তখন সবই থেমে যাবে। কিন্তু বাবা, সাপেরও
রােজা আছে। আজ না হয়, দুদিন পরেও মাথায় ঈশর মূল ঠেকবে।
আর বাছাধন তখন সুড় সুড় করে গর্তে সেঁদোতে পথ পাবে না।
সিরাজ। কি বলছ তুমি আলিহােসেন।
আলিবর্দী। ঠিকই বলছে দাদু। কিন্তু কি করবাে, উপায় নাই।
তাই বলছি দাদু, বিশ্বাস যখন করতেই হবে, সর্বস্ব দিয়ে বিশ্বাস করে।
সিরাজ। তাই করবাে দাদু, তােমার কথার কখনও অন্যথা
হবে না।
কুর্ণিশ করিয়া মােহনলালের প্রবেশ
আলিবর্দী। কে ?
মােহন। বান্দা মোহনলাল শাহানশা।
আলি। বান্দা নয়, বান্দা নয়, আজ থেকে তুমি রাজা মােহনলাল।
মােহন। লাখাে সেলাম পেীছে জাহাপনা।
আলি। রাজা! লুণ্ঠনকারী বর্গীদের তুমি বাংলার সীমানা থেকে
তাড়িয়েছ। শুধু বাকী আছে আমার শেষ ইচ্ছা পূরণ। আমি প্রতিজ্ঞা
পলাশী
করেছিলাম, ভাস্কর পণ্ডিতকে মহারাষ্ট্রে ফিরে যেতে দেবো না।
ছলে বলে কৌশলে, যেমন করে থােক, তাকে হত্যা করবো। যদি
দরকার হয়, গুপ্তহত্যা করেও
মোহন। গুপ্তহত্যা!
আলি। হা, গুপ্তহত্যা। জানাে রাজা, সালিয়ানা বারাে লক্ষ
টাকা তাদের সেলামি দিতে হয়েছে।
মােহন। গােস্তাকি মাপ করবেন জাহাপনা। ভিখারীকে
রাজার সম্মান দিয়ে জাহাপনা মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন।
কিন্তু এ দীন সাম্রাজ্যের বিনিময়েও অস্ত্র কলঙ্কিত করতে পারবে না
জনাব।
আলি। জানি সেনাপতি। সে অনুরােধ তোমায় করবাে না।
কিন্তু আলিবর্দীর প্রতিজ্ঞা ব্যর্থ হবে না। আমি তার অন্য ব্যবস্থা করে
যাবাে। তােমায় শুধু অনুরােধ, ইংরেজ আর ফরাসী বণিকদের ওপর
তীক্ষ্ণদৃষ্টি রেখাে। ওরা যেন কোনদিন প্রবল হয়ে না ওঠে।
মােহন। কর্তব্যপালনে বান্দা কোন দিনই পশ্চাৎপদ হবে না
জাহাপনা।
আলি। আমার আশঙ্কা, ওরাই হবে সিরাজের সবচেয়ে বড়
ওরা স্বচ্ছন্দে বাণিজ্য করুক, তাতে কোন আপত্তি নাই।
কাশিমবাজারে যখন কুঠী তৈরী করে, তখন আমি বাধা দিইনি। কিন্তু
এবার ইংরেজ কোম্পানী কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ করে, সৈন্য সংগ্রহের
চেষ্টায় রত হয়েছে। ভয় হয়, আমার মৃত্যুর পরেই ওরা বাংলার
সিংহাসন আক্রমণ করে বসবে।
মােহন। বেনিয়া ইংরেজ কোম্পানীর যদি অতখানি দুঃসাহস হয়,
তাহ'লে জাহাপনার আদেশ পেলে, মােহনলাল তার পূর্বেই ঐ
পলশেী
২৯
কোম্পানীর দুর্গের ইমারত ধূলাের সঙ্গে মিশিয়ে দেবে। ইংরেজ
কোম্পানীর কেল্লার ওপর দিয়ে গঙ্গার জোয়ার বয়ে যাবে।
আলি। পারবে? পারবে, রাজা মােহনলাল?
মােহন। মােহনলাল সে পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত জাহাপনা।
ইংরেজ কোম্পানীকে সে জানিয়ে দেবে যে, সাতসাগর পার হয়ে
বেনিয়াগিরি করতে এসে বাংলার নবাবের বিরুদ্ধাচরণ করা চলে না।
বাংলার হাতিয়ারে এখনও প্রচুর ইস্পৎ আছে।
আলি। তাই করাে সেনাপতি। ওদের কেল্লা ভেঙে দিয়ে, কুঠী
দখল করে নিও। (উৎফুল্ল হইয়া) নবাবের বিশ্বস্ত সেনাপতি তুমি।
মরবার বেলায় এ আশ্বাস দিয়ে আমায় নিশ্চিন্ত করেছ রাজা।
(নেপথ্যে সেলিনা বেগমের গান শােনা গেল )
গান।
গহন আঁধার তলে
নিবিল দিনের শিখা।
আলি। (উৎকর্ণ হইয়া) কে কাদে প্রাসাদের দ্বারে ? ( ব্যস্ত
হইয়া উঠিলেন) কে কাদে?
সিরাজ। আলিহােসেন, দেখতে। হয়ত লুৎফার নতুন সঙ্গিনী
সেই সেলিনা বেগম।
আলি-হহ। জো হুকুম জনাব। (দ্বারপথে অগ্রসর হইল)
মােহন। সেলিনা বেগম !
সিরাজ। হাঁ, সেলিনা বেগম। অদ্ভুত মেয়ে ! যেমন বুদ্ধি তেমনি
ওর নির্ভীকতা। বর্গীরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল বলে, সমাজ ওকে স্থান
দেয়নি। ওর দুঃখে দরদী হয়ে, লুৎফা আশ্রয় দিয়েছে নিজের হারেমে।
আলি-হহ। ( ফিরিয়া আসিল) বেগম সাহেবার সঙ্গে সেই নতুন
বেগম সাহেবা এই দিকেই আসছেন জাহাপনা।
।
পলাশী
(মােহনলাল ও আলিহােসেন পশ্চাদপসরণ করিয়া নিষ্ক্রান্ত হইল।
সিরাজ উঠিয়া দাড়াইলেন)
লুৎফাসহ সেলিনার প্রবেশ
লুৎফা। কেমন আছেন ভাই সাহেব ?
আলিবর্দী। আয়-আয় দিদি ! তােরা বোস আমার কাছে।
এইখানে—ঠিক আমার চোখের সামনে। বােস দিদি, বােস। গা তাে
দিদি, যে গান গাইছিলি। অমনি সকরুণ গান শুনতে আজ আমার
বড় সাধ যায়।
সেলিনা
গান
গহন আঁধার তলে
নিবিল দিনের শিখা।
স্বপনের বালুচরে মিলালো যে মরীচিকা।
কাদিছে নিরালা রাতি, চাতক কাদিছে দূরে।
তৃষিতা ধরণী কাদে বেদনা-করুণ সুরে।
ধূসর গগন তলে
সাঝের তারাটি জ্বলে,
অস্তাচলের দেউলে কপিছে মরণ অপলাষিকা।
আলি। (গানের শেষে) অস্তাচলের দেউলে কাঁপিছে মরণ
অপলাষিকা। মৃত্যু! হ্যা, মৃত্যুর ছায়া কেঁপে কেঁপে উঠছে, আমি
আমি দেখতে পাচ্ছি, চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।
(সহসা উঠিবার চেষ্টা করিতেই শ্বাস বৃদ্ধি পাইল। অস্থির হইয়া
শয্যায় লুটাইয়া পড়িলেন)
পলাশী
সিরাজ। ( ব্যস্ততার সঙ্গে) দাদু! (ঝুকিয়া পড়িলেন)
লুৎফা। ভাই সাহেব, জনাব
সেলিনা। আপনারা ব্যস্ত হবেন না। আমি যাই, হেকিম
সাহেবকে খবর দিয়ে আসি।
অলি। না না আর হেকিম সাহেব নয়। আঃ (চোখ
মেলিয়া একবার চারিদিকে চাহিলেন। হাতখানি সিরাজের মাথায়
রাখিবার চেষ্টা করিয়া) ভয় করিসনে দাদু। বাংলার হাতিয়ারে
এখনও ইস্পৎ আছে।
সেলিনা। নবাব সাহেব।
নবাব সাহেব। (নতজানু হইয়া শয্যাপাশ্বে বসিল )
আলি। না-না,-পিছু ডেকো না। লুৎফা, সেলিনা বেগম,
তােমরা রইলে, সিরাজকে দেখে তােমরা। (সহসা অস্থিরভাবে
বুক চাপিয়া ধরিলেন) আর,—ওঃ দুনিয়ার মালেক ! (দেহ স্থির
হইয়া গেল।)
সিরাজ। দাদু, দাদু,তােমার আদরের সিরাজকে ফেলে,
তােমার এত সাধের সােণার বাংলা দেশ ফেলে, তুমি কোথায়
চললে দাদু ?
চতুর্থ দৃশ্য
[ পশ্চাতে ফোর্ট উলিয়ম দুর্গ। দুর্গের এক অংশ কামানের
গােলায় ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে। দুর্গ প্রাচীরের অপরাংশে মােহনলাল
দাড়াইয়া সৈন্যদের আদেশ দিতেছেন। কেল্লার ভিতর হইতে
সৈন্যদের অস্পষ্ট কোলাহল শােনা যাইতেছে। তাহারা কেল্লায়
প্রবেশ করিয়াছে। অন্তরাল হইতে কামানের শব্দ আসিতেছে।
সম্মুখভাগ ধূমাচ্ছন্ন। কামান গর্জনের অব্যবহিত পরেই মােহনলাল
আদেশ দিলেন ]
মােহন। কেল্লা দখল করো। লুট করে।। কামানের গােলায়
ভেঙে চুরমার করাে। যাও, কেল্লার ভেতর প্রবেশ করাে।
( কামান গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে আবার ধূমাচ্ছন্ন হইল)
স্পর্ধার সীমা থাকা উচিত। নবাব সরকার অনুগ্রহ করে আশ্রয়
দিয়েছেন বলে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর এতদুর সাহস!
নেপথ্যে মীরজা। সেনাপতি! রাজা মােহনলাল! সেনাপতি,
রাজা মােহনলাল!
মীরজাফরের প্রবেশ
মােহন। সিপাহসালার!
মীরজা। রাজা মােহনলাল, শীঘ্র যুদ্ধ বন্ধ করুন।
মােহন। জনাব ! ( সানুনয় দৃষ্টিতে চাহিলেন)
মীরজা। না-না, এ লােকক্ষয় এ ধ্বংসলীলা বন্ধ করুন রাজা।
আপনার রণকৌশল প্রশংসনীয় হলেও, এ যুদ্ধ আমি সমর্থন করি না।
পলাশী
মােহন। কোম্পানী নবাবের শাসন মানতে রাজী নয়।
মীরজা। মানতে না চায়, তার অন্য প্রতিবিধান করুন সেনাপতি।
এ ভাবে ধ্বংস করবেন না! রাজা মােহনলাল! নবাব সিরাজদ্দৌলার
জননী আমিনা বেগমের আদেশ, শুধু আদেশ নয়, তার অনুরােধ,
কোম্পানীর সাহেবদের উপর যেন কোন উৎপীড়ন না হয়। তারা
নবাবের আশ্রিত বিদেশী বণিক। আহা-হা ! সুদুর সাগর পার হতে
এসেছে এ দেশে বাণিজ্য করতে।
মােহন। যে আজ্ঞা, জনাব। (শ্বেতপতাকা তুলিলেন )
( মীরজাফর প্রস্থানােদ্যত হইয়া আবার ফিরিয়া আসিলেন)
মীরজা। এ কথা ও স্মরণ রাখবেন সেনাপতি, অপচয় করবার মত
গােলা-বারুদ আর ফৌজের প্রাচুৰ্য্য নবাবের নেই। রাজ্যশাসন
ছেলে খেলা নয়। অপচয়ের খেসারৎ নবাবকেও রেয়াৎ করবে না।
মােহন। (বিস্মিতভাবে) অপচয় ?
মীরজ।। হা-অপচয়। এই তিন দিন আপনারা যে সৈন্তক্ষয়
আর গােলা-বারুদ নষ্ট করেছেন, তা আমি অকারণ মনে করি।
মােহন। সে কথা নবাবকে জানাবেন।
মীরজা। প্রয়ােজন হয় আপনিই জানাবেন, রাজা। সিপাহসালার
জাফর আলি নবাবের মুখাপেক্ষী নয়।
(রাগত ভাবে স্থান ত্যাগ করিলেন)
মােহন। সুবে বাংলার নবাব কে ? সিপাহসালার মীরজাফর—না
নবাব আলিবর্দীর দৌহিত্র সিরাজ ?
উত্তর দিতে দিতে আলিহােসেনের প্রবেশ
আলি-হো। ( দৃঢ় কণ্ঠে) নবাব আলিবর্দীর দৌহিত্র সিরাজ।
৩৪
পলাশী
মােহন। পুরন্দর!
আলি। চুপ, পুরন্দর নয়, আলিহােসেন।
মােহন। আলিহােসেন বলতে পার ভাই, মীরজাফরের এরূপ
মনােভাবের কারণ?
আলি। দেবা ন জানন্তি কুতাে মনুষ্যাঃ।
সহকারী সেনাপতি শান্তশীলের প্রবেশ
শান্ত। সেনাপতি! একশো-ছেচল্লিশ জন ইংরেজ সৈনিক
অবরুদ্ধ। কোম্পানীর প্রতিনিধি মিষ্টার হলওয়েল বন্দী।
মােহন। (উল্লসিত হইয়া উঠিলেন) হলওয়েল বন্দী? হলওয়েল,
হলওয়েল ! হাঁ, মিষ্টার ড্রেক কোথায়? ড্রেক ?
শান্ত। ড্রেক তার অনুচরদের নিয়ে ফতা থেকে মাদ্রাজের পথে
পালিয়েছেন।
মােহন। পালিয়েছে ? হাঃ হাঃ-যে প্রাণভয়ে পালিয়েছে, তাকে
পালিয়ে বাঁচতে দাও। মিষ্টার হলওয়েলকে হাজির কর।
( শান্তশীলের প্রস্থান)
মােহন। ( চিন্তিত ভাবে) আলিহােসেন, সিপাহসালার কি
নবাবকে আমিনা বেগমের ইচ্ছা জ্ঞাপন করেছেন ?
আলি। না। নবাবের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎও করেন নি। যেমন
ঝড়ের মত এসেছিলেন, তেননি ঝড়ের মত ফিরলেন রাজধানীর পথে।
মােহন। হু।-নবাব কোথায় আলি ?
আলি। তিনি বােধ হয় এতক্ষণ সৈন্যদের নিয়ে কোম্পানীর
ধনাগারে প্রবেশ করেছেন।
মােহন। শােন আলিহােসেন, মিঃ হলওয়েলের সঙ্গে বােঝাপড়া
হবার আগে, তুমি নবাবকে এ সংবাদ জানিয়ে এস।
পলাশী
আলি। হাআমি যাচ্ছি। (অর্ধপথে গিয়া )-নবাব না আসা
পর্যন্ত মিঃ হলওয়েলকে মুক্তি দিও না যেন।
[ প্রস্থান ]
মােহন। সিপাহসালার এ যুদ্ধ সমর্থন করেন না। কিন্তু ইংরেজ
কোম্পানী যে ভাবে দুর্গ নির্মাণ করে সৈন্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল,
তাতে বাংলার সিংহাসন কবলিত হ’তে মােটেই বিলম্ব হত না। অথচ
এমনি বিচিত্র যে, সিপাহসালার নবাবের একজন হিতৈষী অভিভাবক।
দেওয়ান মাণিকচঁাদ ও তাহার পশ্চাতে দুইজন সশস্ত্র
প্রহরীর মাঝখানে মিষ্টার হলওয়েলের প্রবেশ
মাণিক। (অভিবাদন করিয়া) সেনাপতি, মিষ্টার হলওয়েল।
pa I Good morning General ! I surrender to the
Nawab.
মােহন। মিষ্টার হলওয়েল, যে কারণে নবাব কাশিমবাজার
কুঠি দখল করেছিলেন, ঠিক সেই কারণেই বাধ্য হয়েছেন আপনাদের
কলকাতার দুর্গ আক্রমণ করতে। বাণিজ্য করবার অবাধ অধিকার
কোম্পানী পেয়েছিল, কিন্তু মিষ্টার ড্রেক সে অধিকারের অপব্যবহার
করেছেন।
হল।
General !
মােহন। পুনঃ পুনঃ নিষেধ সত্ত্বেও আপনারা কলকাতায় দুর্গ
নির্মাণ করে ফৌজ সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন। ইংরেজ সিপাই আর
গােলাবারুদ আমদানি করে নবাবের এলাকায় পল্টন জমায়েৎ
করেছেন। এ সব অপরাধ নয় ?
391 Am I to explain the conduct of Mr. Drake ?
তবে এ কথা হামি বলতে পারে যে, ইংরেজ কোম্পানীর গােলাবারুডে
নবাবের কোন অনিষ্ট করতে না।
পলাশী
মােহন। তা না করতে পারে। কিন্তু যেখানে আপনারা আশ্রিত
ব্যবসায়ী, যেখানে সৈন্য সমাবেশ বা সে দেশের শাসনতন্ত্রে হস্তক্ষেপের
চেষ্টা, নিশ্চয়ই আপনাদের পক্ষে প্রশংসনীয় নয়। নবাব স্বেচ্ছায়
বাণিজ্যের যে অধিকার দিয়াছিলেন, বিরুদ্ধাচরণ না করলে তিনি কোন
দিনই তা প্রত্যাহার করতেন না।
মাণিক। ফলে ইংরেজদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার পরিমাণ ভেবে
দেখবার চেষ্টা করবেন, মিষ্টার হলওয়েল।
হল। হামি জানে, হামাডের বহুট ক্ষটি হইল। Our firms and
godowns are looted by your soldiers; হামাডের সমুড়ায়,
দোকান পাট আপনার সিপাহীরা লুট করিল। Hundred and
forty-six Britishers are arrested. They're all being
damned, imprisoned in a dungeon. সমুডায় ইংরেজ বণ্ডীকে
অন্ধকার কূপের ভিটর আটক ঠাকিটে হইল।
মােহন। দেওয়ান মাণিকচাদ, একি সত্য? (মােহনলাল মাণিক
চাদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাহিল )
মাণিক। না, সংবাদ সত্য নয় রাজা! (হলওয়েলের প্রতি )
আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন মি: হলওয়েল। আমি তাদের থাকবার
সুব্যবস্থা করেছি। ইচ্ছা হয়, আপনি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে
পারেন। আশঙ্কার কোন কারণ নাই। তবে, তারা সকলেই যুদ্ধে
আহত।
হল। Would
his excellency not consider the
circumstances now? একবার হামাডের বিষয় বিবেচনা করা
'
হইবে না?
মােহন। এতে নূতন করে বিবেচনা করবার কিছুই নেই মিঃ
* পলাশী উঠত না। হলওয়েল। আপনারা যদি কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দিয়ে নবাবের শাসন- তন্ত্রের অবমাননা না করতেন, তা হলে অবস্থা এতখানি জটিল হয়ে এমন কি, নবাবের ব্যক্তিগত অনুরােধও আপনারা অগ্রাহ করেছেন। মাণিক। ওঁরা ভাবতেই পারেননি যে, নবাবের শক্তি তিন দিনে ওই উইলিয়ম দুর্গ বিধ্বস্ত করে ইংরেজদের বন্দী করবে। সাত শো গােলন্দাজ সিপাই আর তিনশাে ইংরেজ সৈনিক নিয়ে, ওরা ভেবেছিলেন নবাবকে বিব্রত করে তুলবেন। 599 1 That's not the fact Dewan Bahadur. F#076378 বিপডে হামিলােক বিচলিট হইয়াছিল। টাই- মােহন। নবাব চেয়েছিলেন কৃষ্ণদাসের ঔদ্ধত্যের উপযুক্ত শাস্তি বিধান করতে। কৃষ্ণদাস বিদ্রোহী। যদিও সে বিদ্রোহের মূল কারণ নবাবের পক্ষেও সম্মানজনক নয়। অন্ততঃ আমি তাই মনে করি। হল। টবে আপনি কেন ইংরেজকে এই অপরাটের জন্য ডােষারােপ করেন রাজা বাহাডুর ? নবাব যদি কাশিমবাজার কোঠি ডখল করিয়া নিটেন, মিঃ ড্রেক কখনই অটডুর অগ্রসর হতে না। However, আমরা এখন নবাবের শরণাপন্ন। তিনি সুবিবেচনা যাহা মনে করিবেন, আমরা টাহাই মানিয়া লইবে। We ask for the Nawab's favour again. মােহন। উত্তম। আপনি সহকর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করে, যে সৰ্ত্তে বাণিজ্য করতে প্রস্তুত, তার মুসাবিদা দাখিল করুন। দিল্লীর সনদ অনুসারে বাংলায় বাণিজ্যের অধিকার দিতে নবাবের কোন আপত্তি নাই। তবে শাসনতন্ত্র-বিরােধী কোন অন্যায় আবদার নবাব কিছুতেই সহ করবেন না। ৩
Oba
পলাশী
591 Many thanks, Raja Bahadur ! This favour
will ever be borne in mind.
(কুর্নিশ করিয়া পশ্চাদপসরণ করিলেন ও পুনরায় অগ্রসর
হইয়া মােহনলালকে জিজ্ঞাসা করিলেন)
হল। But, হামিলােক কখন বণ্ডীদের মুক্তি আশা করিটে পারে?
( মােহনলাল মাণিকচাদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাহিলেন)
মাণিক। আপনাদের চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হলেই বন্দীদের মুক্ত
মিষ্টার হলওয়েল।
করা হবে,
(নেপথ্যে প্রহরীগণ)
“নবাব নাজিম মন্সুর-উল-মুলক শাহকুলি খাঁ মিরজা মহম্মদ
সিরাজদ্দৌলা হায়বৎজঙ্গ বাহাদুর” (সিরাজদ্দৌলার প্রবেশের সঙ্গে
সঙ্গে সকলেই সসম্মানে অভিবাদন করিলেন)
সিরাজ। দুর্গের ধনাগারে মাত্র পঞ্চাশ হাজার রৌপ্য মুদ্রা মজুত
আছে। আমার বিশ্বাস, হলওয়েল সাহেবের নিশ্চয়ই অজানা নয়,
কোম্পানীর অন্যান্য অর্থ কোথায়! অথবা দুর্গের ধনরত্ন তুমি নিজেই
অপসারিত করেছ সাহেব! দেওয়ান মাণিকৰ্চাদ, ওকে কারাগারে
নিক্ষেপ করুন।
মাণিক। যা হুকুম জাহাপনা।
মােহন। মাপ করবেন মনসুর-উল-মুলক। আমি মিঃ হলওয়েলকে
মুক্তি দিয়েছি। তিনি নবাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন।
সিরাজ। কিন্তু আমি ওদের বিশ্বাস করি না রাজা। ওরা সব
পারে।
পলাশী
মােহন। বেশ নবাবের অনুজ্ঞা মতেই কাজ থােক। ফলাফলের
জন্য মােহনলাল দায়ী নয়, জাহাপনা।
সিরাজ। ক্ষুব্ধ হবেন না সেনাপতি, নবাব কোনদিনই রাজা
মােহনলালের অবমাননা করবে না। যাও, হলওয়েল সাহেব! সেনা-
পতির আদেশ অনুসারে তােমরা চুক্তিপত্র প্রস্তুত কর।
মােহন। আদেশ সেনাপতির নয়, শাহানশা। দুর্গে প্রবেশ
করবার আগে, জাহাপনা যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, গােলাম তা-ই
জানিয়েছে মাত্র।
সিরাজ। (মােহনলালের প্রতি নবাবের গােলাম নন সেনাপতি,
আপনি তার হিতৈষী বন্ধু, দুর্দিনের সহায়! আজ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি,
কাশিমবাজার কুঠি দখল করবার পর যদি কলকাতা অবরােধ না
করতাম, তা হলে এর মূল উচ্ছেদ আর কোনদিনই সম্ভব হত না।
সিপাহসালার, শেঠজি, রায় দুল ভ—এরা সকলেই নিষেধ করেছিলেন।
কিন্তু আপনি নবাবের সুযােগ্য সেনাপতি ; আপনার চোখে কেউ ধূলাে
দিতে পারেনি।
(মােহনলাল কুর্নিশ করিল)
যাও হলওয়েল, আমার আর কোন বক্তব্য নাই। তােমাদের বাণিজ্যে
আমি বাধা দিতে চাই না। আমি চাই, নবাবের সঙ্গে সম্প্রীতি রেখে
তােমরা কারবার কর ! নবাব সরকার চিরদিন পৃষ্ঠপােষকতাই
করবে।
হল। So kind of your Excellency! আমি এই প্রটিশটি
নবাব বাহাদুরকে ডিচ্ছে যে, The English traders-ইংরেজ
বণিকেরা কোন-ডিন তাহার অবাঢ্যতা করবে না। নবাবের আদেশ
সকল ডিন—সকল সময় মানিয়া চলিবে। (কুনিশ করিলেন)
৪০
পলাশী
সিরাজ। দেওয়ান মাণিকৰ্চাদ, সাহেবকে কুঠিতে পৌছে দেবার
ব্যবস্থা করুন। হ্যা, আপনি কলকাতাবাসীদের জানিয়ে দেবেন যে,
আজ হ’তে কলকাতার নাম হবে আলিনগর। সুতানটী এবং গােবিন্দপুর
ওই আলিনগর নামেই অভিহিত হবে।
মাণিক। যে আজ্ঞা, জাঁহাপনা।
( কুর্নিশ করিয়া পশ্চাদপসরণ করিতে করিতে মােহনলাল ও
নবাব ব্যতীত সকলের প্রস্থান)
সিরাজ। রাজা, আপনি বাংলার সিংহাসন নিরাপদ করেছেন।
ফরাসী আর ওলন্দাজদের আমি ভয় করি না। ওরা কোনদিনই
শক্তিশালী হয়ে উঠবে না। আমার আশঙ্কা শুধু সওকজঙ্গের জন্য ।
ঘসেটি বেগমের সহায়তায়, সে একদিন না একদিন বাংলা আক্রমণ
করবেই। আমাদের দৃষ্টি যখন নিবদ্ধ থাকবে এইদিকে, সেই সুযােগে
সে মুশিদাবাদ আক্রমণ করবে। মুর্শিদাবাদকে পূর্নিয়ার অন্তর্ভুক্ত
করবার সনদ, সে বাদশাহের কাছ থেকে পূর্বেই সংগ্রহ করেছে।
মোহন। সময় থাকতে শত্ৰু নিৰ্ম্মল করাই ভাল, জাহাপনা।
সিরাজ। তা যদি হয়, তা হলে পূর্ণিয়। বিজয়ের ভার দিলাম
আপনার হাতে। বাংলাকে শত্রছীন করতে যা করা উচিত, তা
আপনিই করবেন রাজা।
সহসা প্রহরীর প্রবেশ
প্রহরী।
( কুর্ণিশ করিয়া) জাহাপনা ! কোতোয়াল খবর
পাঠিয়েছেন, কৃষ্ণদাস বন্দী হয়েছে।
সিরাজ। কৃষ্ণদাস ! কৃষ্ণদাস বন্দী হয়েছে ? (কোষ হইতে তরবারি
অদ্ধোন্মুক্ত করিয়া) রাজা রাজবল্লভের প্রিয়তম
পুত্র কৃষ্ণদাস!
( উত্তেজিত হইয়া উঠিলেন) প্রকাশ্য দরবারে আমি তাকে উলঙ্গ করে
পলাশী
৪১
৩
চাবুক মারব। রাজদ্রোহী প্রজা-সে চায় নবাবকে অপদস্ত করতে।
যাও প্রহরী, কোতােয়ালকে আদেশ জানাও—তাকে এইখানে
হাজির করবে।
মােহন। নবাব ! বিস্মৃত হবেন না, আপনি সুবে বাংলার অধিপতি
নবাব মনসুর-উল-মুলক। বয়সে তরুণ হলেও, দায়িত্বের গুরুভার
আপনার মাথায়।
সিরাজ। রাজা !
মােহন। বারাঙ্গনার বিলাস-ঈর্ষায় নিজেকে কলুষিত করবার
প্রবৃত্তি আপনার শােভা পায় না।
সিরাজ। ( লজ্জায় মস্তক নত করিলেন) সেনাপতি! আমায়
ক্ষমা করুন।
শান্তশীলের প্রবেশ
শান্ত। (তরবারি অৰ্ধোন্মুক্ত করিয়া সামরিক প্রথায় নবাবকে
অভিবাদন করিল )
সিরাজ। কি সংবাদ, সহকারী সেনাপতি ?
শান্ত। হুগলি থেকে মহারাজ নন্দকুমার সংবাদ পাঠিয়েছেন,
মারাঠা-নায়ক ভাস্কর পণ্ডিত, মানকর থেকে নাগপুরে ফেরবার পথে,
গুপ্ত আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন।
(নবাবের হাতে মহারাজের পত্র দিলেন। সংবাদ শােনা মাত্র
নবাব অতিশয় উল্লসিত হইয়া উঠিলেন। মােহনলাল
সহসা চমকিয়া উঠিলেন)
সিরাজ। দ-সর্দার নিহত ? ঠিক জাননা, ঠিক জানাে শান্তশীল,
বাংলার চিরশত্রু সেই ভাস্কর পণ্ডিত নিহত? ( উল্লসিত হইয়া উঠিলেন)
৪২
পলাশী
শান্ত। সংবাদ সঠিক, জাহাপনা।
মােহন। নবাব আলিবর্দী ! এমনি করে প্রতিহিংসা সফল করলে
জনাব। মৃত্যুর ওপার হতেও তুমি প্রতিজ্ঞা পালন করতে বিস্মৃত
হলে না! (চিন্তিতভাবে মস্তক নত করিল )
সিরাজ। সিরাজও পালন করবে তার প্রতিজ্ঞা। সিরাজও
বিস্মৃত হবে না যে, কৃষ্ণদাস তার পরম শত্রু। নবাব আলিবর্দীর শিক্ষা,
শত্রুকে করব না ক্ষম। এই মুহূর্তে যদি তাকে একবার সামনে
পাই, তা হলে এমন শাস্তি দেব—( অতিমাত্ৰ উত্তেজিত হইয়া
উঠিলেন)
(কোতােয়াল ও কৃষ্ণদাসের প্রবেশ)
কোতাে। কৃষ্ণদাস হাজির, জাহাপনা।
সিরাজ। কৃষ্ণদাস! রাজা রাজবল্লভের স্নেহের দুলাল ! তােমার
এতখানি স্পর্ধা যে, সুবে বাংলার অধীশ্বর নবাব সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে
প্রতিদ্বন্দ্বিতা! এত স্পর্ধা তােমার! বেইমান নফর, তােমার দেহের
চামড়া উপড়ে ফেলে, তাতে নিমক ঢেলে দেব। তােমার অর্ধদেহ
ভূগর্ভে জীবন্ত প্রােথিত করে, কুকুর দিয়ে খাওয়াব। যাও, নিয়ে
যাও, হতভাগ্যকে নিয়ে যাও আমার সামনে থেকে।
মােহন। দাড়াও। হজরৎ। জনাব
সিরাজ।
কোন কথা নয় রাজা, এ সিরাজের প্রতিজ্ঞা।
মােহন। আশ্রয়প্রার্থীকে ক্ষমা করা রাজধৰ্ম্ম।
সিরাজ। রাজধৰ্ম্ম। দেশের রাজাকে অবমাননা করে, জাতিকে
বে-ইজ্জত করে, যে বিদেশী বেনিয়া কোম্পানীর পাদুকা লেহন করে,
তাকে ক্ষমা করা রাজধৰ্ম্ম ? সিরাজের রাজধৰ্ম্ম তা নয়; সিরাজের
রাজধৰ্ম্ম তাকে অন্য শিক্ষা দিয়েছে রাজা। দুনিয়ায় কারও সাধ্য
পলাশী ৪৩ নাই সিরাজকে তার সঙ্কল্পচ্যুত করে। সরাে রাজা, দেশদ্রোহীর তপ্তরক্ত দিয়ে আমি আমার প্রতিজ্ঞা পালন করব। ( ক্ষিপ্ততার সহিত দেহরক্ষীর তরবারি টানিয়া লইয়া কৃষ্ণদাসের দিকে অগ্রসর হইলেন)। মােহন। (কৃষ্ণদাস ও নবাবের মধ্যবর্তী হইয়া, বাধা দিয়া বলিল) রক্তপাতই যদি নবাবের অটুট সঙ্কল্প হয়, তা হলে শােনো নবাব, মােহনলালের প্রতিজ্ঞা ! প্রয়ােজন হয়, নিজের বুকের রক্ত দেবাে। কিন্তু তার পূর্বে অনুতপ্ত, আশ্রিত, করুণাপ্রার্থী ঐ কৃষ্ণদাসকে হত্যা করতে দেবাে না। কর, কর নবাব, রক্তপাত কর, তােমার প্রতিজ্ঞা পালন কর। (নবাবের সম্মুখে নতজানু হইয়া বক্ষ পাতিয়া দিল।) সিরাজ। না-। (তরবারি ফেলিয়া দিলেন)। ওঠো রাজা মােহনলাল, আজ আমি রক্ত চাই না। মোহন। রক্ত চাওনা, নবাব ? সিরাজ। না। নিশাশেষে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সুবর্ণভূমি এই বাংলার ষড়ৈশ্বৰ্য্যময়ী রাজলক্ষ্মী যেন রিক্তা নিঃস্ব সৰ্বহারা বিধবার বেশে হীরাঝিলের বাতায়নে এসে দাড়িয়েছেন। মায়ের চোখের জলে ভাগীরথীর দুইকূল প্লাবিত হয়ে গেল। পুঞ্জীভূত দীর্ঘশ্বাস বাষ্পের আকারে ভাগীরথীর দুইকূল আবৃত করে দিল। দেখতে দেখতে আকাশে জমে উঠল ঘন কৃষ্ণ মেঘ। সেই মেঘ মুর্শিদাবাদ হতে ধেয়ে চললে পলাশীর প্রান্তরে। পলাশীর আম্রকাননে নেমে এল সূচীভেদ্য অন্ধকার। সেই অন্ধকারের ভিতর থেকে উঠল আমার রিক্তা অসহায় জননীর বুকভাঙা করুণ আর্তনাদ—‘জাগাে সিরাজ জাগো মােহনলাল, জাগগা বাংলার আটকোটী হিন্দুমুসলমান। পলাশীর কালরাত্রি, বাংলার কালরাত্রি, বুকের রক্তে কর চির অবসান।”
৪৪ পলাশী মােহন। নবাব-নবাব- সিরাজ। এসে কৃষ্ণদাস, এসাে মােহনলাল! আজ আর হিংসা নয়, দ্বেষ নয়, আত্মকলহ নয়। আমার রক্ত, তােমাদের রক্ত, আটকোটী হিন্দুমুসলমানের রক্ত সঞ্চিত থাক বাংলার কালরাত্রি প্রভাতের অপেক্ষায় ; মিলিত হিন্দুমুসলমানের জাতীয় জীবনে নবসূর্যোদয়ের পরম প্রতীক্ষায়।
দ্বিতীয় অক
প্রথম দৃশ্য
;
[ মেঘাচ্ছন্ন রাত্রি। বাহিরে ঝড়ো-হাওয়ার শাঁ শাঁ শব্দ।
চারিদিকে নিস্তব্ধতা; রাজধানী নিদ্রাতুর। মতিঝিল প্রাসাদের
একটি সুসজ্জিত কক্ষ। মেহের-উন্নেসা বেগম মসনদে বসিয়া আছেন।
তাহার উভয় পার্শ্বস্থ সােফায় উপবিষ্ট মীর নাজির ও পদচ্যুত সেনাপতি
আগ সমসের। মেহের-উন্নেসার পরিচ্ছদে স্বেচ্ছাকৃত রূপ-সজ্জার
প্ৰাচুৰ্য্য। নৃত্যগীতে কক্ষ মুখর হইয়া উঠিয়াছে ]
নৃত্য ও গীত
ঢালে সাকি সিরাজী
গুলাবি মূলতান।
দিল-পিয়ালায় উজাড় কর
দেহেলি জাফরান।
বাগিচায় বুলবুলি
চাহে চোখ তুলি ;
সরমে ভীরু হিয়া
পিয়া লাগি, মানে কি হয়রা।
মেহের। না—না, নাচ গান থামিয়াে না। তােমরা চলে যেওনা,
গান ধরাে-গান ধরাে-
মীরনাজির। শাহাজাদি! মনে হচ্ছে, আজ যেন নৃত্যগীতের
বিশেষ ব্যবস্থা
৪৬
পলাশী
মেহের। হঁ্যা, বিশেষ ব্যবস্থা। আপনাদের বিদায় অভিনন্দন
বিদায় অভিনন্দন।
উভয়ে। বিদায় অভিনন্দন।
মেহের। বুঝলেন না ! হাঃ হাঃ হাঃ, নাচ দেখুন—আগে নাচ
দেখুন।
( নর্তকীর প্রবেশ ও নৃত্য করিয়া প্রস্থান)
মীরনাজির! শাহাজাদি।
মেহের। ওঃ, কি বছিলাম ? আপনাদের বিদায় অভিনন্দন।
মানে বুঝতে পারেন নি? কেন আপনি
কেন আপনি শােনেন নি-নবাবের
আদেশ, আপনাকে সাতদিনের মধ্যে বাংলা মুলুক পরিত্যাগ করে
যেতে হবে। অন্যথায়, প্রাণদণ্ড দিতে তিনি বাধ্য হবেন।
মীর। তাই নাকি।
মেহের। অবশ্য আমি জানি, এ দণ্ডবিধান মতিঝিলের শেরিফ
মীর নাজিরকে শাস্তি দেবার জন্য নয়। মেহের-উন্নেসাকে লাঞ্ছিত
করবার জন্য। ( আগা সমসেরের প্রতি ) সেনাপতি।
আগা। শাহাজাদি!
মেহের। আপনি নবাব আলিবর্দীর বিশ্বস্ত সেনাপতি।
নবাব
আলিবর্দী নিজেও কোনদিন আগা সমসেরকে অপমানিত করতে
সাহসী হন নি।
আগা। তা জানি, বেগম সাহেব।
মেহের। সেইজন্যেই আমি চাই, এ অপমানের প্রতিশােধ নিতে
আপনারা কোনদিন পশ্চাৎপদ হবেন না।
জান কবুল, নবাবজাদি।
পলাশী
৪৭
আগা। কিন্তু, সিপাহসালার জাফর আলি যদি বিরুদ্ধাচরণ
করেন!
মেহের। ঘসেটি বেগম পশ্চাৎপদ হবে না, আগা সাহেব। সুরাটী
বেগম হাসিনা-বানুর সাহায্যে জনাব জাফর আলির এস্তাকালের ব্যবস্থা
করবাে আগে। প্রয়ােজন হলে, বিষপ্রয়ােগেও কুষ্ঠিত হব না। ঘসেটি
পরাজয় মানে না। উদ্দেশ্য সাধনের পথ নিষ্কণ্টক করবে আগে।
(দ্বারদেশে প্রহরী আসিয়া কুর্ণিশসহ জানাইল)
প্রহরী। সিপাহসালার জনাব জাফর আলি, ওহ উমিদ।
( প্রস্থান)
( সকলেই আসন ত্যাগ করিয়া দাঁড়াইলেন। মেহের-উন্নেসা
ব্যস্ততার সহিত দ্বারপ্রান্ত পৰ্য্যন্ত অগ্রসর হইয়া সসম্ভ্রমে উভয়কে
অভ্যর্থনা করিয়া আনিলেন ও আসন গ্রহণের জন্য অনুরােধ জ্ঞাপন
করিয়া নিজে পুনরায় মসনদে বসিলেন)
মেহের। জনাব জাফর আলি।
মীরজা। আদেশ করুন।
মেহের। ইংরেজ কোম্পানীর কাশিমবাজার কুঠি লুঠ করবার
সময় না-হয় মােহনলাল অতর্কিত আক্রমনের সুযােগ পেয়েছিল,
কিন্তু তাদের উইলিয়ম দুর্গ দখল করার কৃতিত্ব কি অস্বীকার করতে
পারেন?
মীরজা। না। মুষ্টিমেয় অর্ধ-শিক্ষিত ফৌজ নিয়ে উইলিয়ম দুর্গ
জয় করে মােহনলাল বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে, তা জানি। কিন্তু,
তাতে লাভের চেয়ে লােকসানই হয়েছে বেশী।
মেহের। লােকসান ?
মীরজা। হ্যা। এবার ইংরেজ কোম্পানী হ’ল নবাবের স্থায়ী
৪৮
পলাশী
শত্রু। অবশ্য নবাবের কলকাতা আক্রমণের উদ্দেশ্য ইংরেজ-দমন নয়।
রঙ্গিলা বিবিকে নিয়ে রাজা রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাসের সঙ্গে যে
শত্রুতা, এ তারই ফল।
উমি। ফল যারই হােক। আপনাদের মত বিচক্ষণ ব্যক্তির
হাতে শক্তি থাকতে, এর প্রতিবিধান হওয়া কি উচিত ছিল না
সিপাহসালার ?
মীরজা। কিন্তু আমরা নিরুপায়, চঁাদ সাহেব।
সমসের। আপনি নাকি কোরাণ স্পর্শ করে শপথ করেছেন?
মেহের। সুতরাং সিরাজের সব অনাচার নীরবে সইতে হবে।
কেমন, এই না সিপাহসালার? ( ক্রুর হাসির সঙ্গে বিলােল দৃষ্টি
নিক্ষেপ) কিন্তু রাজা রাজবল্লভও কি সহ্য করবেন এই অত্যাচার ?
মীরজা। রাজা রাজবল্লভ বলেন, কৃষ্ণদাস ব্যভিচারী। একমাত্র পুত্র
হলেও, তার জন্যে সেই কলঙ্কের কালি তিনি গায়ে মাখতে পারেন না।
মেহের। রাজা রাজবল্লভ পারেন এ অপরাধ মার্জনা করতে।
সেনাপতি আগা সমসেরকে পদচ্যুত করে তাকে অপমানিত করা
হয়েছে, তিনিও পারেন নবাবকে ক্ষমা করতে।
সমসের। সমসের আফগান,-সে জানে অপমানের প্রতিশােধ
নিতে।
মেহের। ( বক্রদৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া) ওমরাহ উমিচাদ ! ওমরাহ
উমিচাদ আমিনা বেগমের আফিংএর কারবার পয়মাল করেছেন
বলে, নবাব মােহনলালকে দিয়ে তাকে অপমানিত করেছেন।
হুগলী থেকে তার সওদাগরী কারবার গুটিয়ে জলঙ্গীতে ফিরে
আসতে হয়েছে। তিনি পারেন, নবাবের সে অপমান মাথা
পেতে নিতে।
পলাশী ৪৯ উমিচাদ। উমিচাদ বাঙ্গালী নয়, সে পেশােয়ারী সওদাগর। বাংলা মুলুকের জল হাওয়ায় তার পেশােয়ারী রক্ত এখনাে হিম হয়ে যায়নি। মীরনাজির। সাবাস, ওমরাহ ! মেহের। সিপাহসালার জাফর আলি, অমন নিৰ্বা হয়ে কি ভাবছেন? প্রকাশ্য দরবারে আপনাকে পদচ্যুত করে যেদিন মীর খাদেমকে সিপাহসালার পদে অধিষ্ঠিত করা হয়, সেদিনের কথা আপনি বিস্মৃত হয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু আমি বিস্মৃত হইনি। মীরজা। সিরাজ নাবালক। নিজের ত্রুটি বুঝতে পারলে, একদিন সে অনুতপ্ত হবেই। মেহের। চমৎকার ! (হাস্য) ভবিষ্যতের সান্ত্বনায় আপনারা নীরবে সহ্য করতে পারেন নবাবের সব অত্যাচার। কিন্তু ঘসেটি বেগম করবে না। সিরাজের স্মরণ না থাকলেও, আপনারা আশাকরি এ কথা বিস্মৃত হননি যে, বাংলার সিংহাসন নবাব আলিবর্দীর বাহুবলে অজ্জিত নয়। এই ঘসেটির অনুগ্রহেই তিনি হয়েছিলেন সুবে বাংলার অধিপতি। নবাব শরফরাজকে আলিবর্দী হত্যা করেন নি। সে হতভাগ্য পতঙ্গের মত পুড়ে মরেছে এই ঘসেটির রূপের আগুনে। মীরজা। জানি বেগম সাহেব। মেহের। তা হলে আপনাদের নবাব সিরাজদ্দৌলাকে এ কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন যে, সুবে বাংলার সিংহাসনে বসে ঘসেটিকে চোখ রাঙানাে চলে না। মীরজা। সিরাজকে এ কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া মীরজাফরের সাজে না, ছােটি বেগম! নবাব আলিবর্দী মরবার সময় তাকে আপনাদের হাতেই তুলে দিয়ে গেছেন। আপনারা পারেন না তাকে ঠিক পথে চালিয়ে নিতে পারেন না, তাকে ক্ষমা করতে ? ৪
৫০
পলাশী
মীরজা।
মেহের। পারি, যদি সে সওকৎজঙ্গের অধীনে বেতনভােগী
সামন্ত হয়ে থাকতে রাজী হয়।
সওকজঙ্গের অধীনে ?
মেহের। দোষ কি? সেও তো নবাব আলিবর্দীর দৌহিত্র।
মীরজা। আপনি সওকজঙ্গকে বাংলার সিংহাসনে বসাতে চান ?
মেহের। । সে সিরাজের চেয়েও বেশী স্বেচ্ছাচারী। তবে
কাঁটা দিয়ে কাটা তুলতে চাই। বাংলার সিংহাসনে আমি বসাতে
চাই সুযােগ্য ব্যক্তিকে। আপনার-আপনারা করবেন তার
সহায়তা ?
মীরজা। মাপ করবেন, বেগম সাহেবা। আমি নিরুপায়। ধর্মের
নামে শপথ করে-
মেহের। অধৰ্ম্মকে প্রশ্রয় দেবেন, এই তাে?
মীরজা। (উত্তেজিত হইয়া উঠিলেন) অধৰ্ম! সিরাজ এমন কোন
অপরাধ করেনি, যার সমর্থনে মীরজাফর অধৰ্ম্মকে প্রশ্রয় দিয়েছে।
উমি। উত্তেজিত হবেন না জনাব জাফর আলি।
মেহের। (মীর নাজির ও আগা সমসেরকে উদ্দেশ করিয়া )
নাজির সাহেব! আগা সমসের। আপনাদের ওপর আমার অগাধ
বিশ্বাস আছে। আর বিলম্ব না করে, আজ রাত্রেই আপনারা রওনা হন
পূর্ণিয়ার পথে। আমার অনুরােধ, দেখবেন সিরাজের সেনাপতি যেন
পূর্ণিয়া হ'তে বিজয়ােল্লাসের সঙ্গে বাংলায় ফিরে আসতে না পারে।
(মস্তক আন্দোলিত করিয়া বিদায় জ্ঞাপন করিলেন। মীর
নাজির ও আগা সমসের অভিবাদন করিয়া বিদায় লইল। মেহের
উন্নেসা চটুল দৃষ্টি ও বক্র হাসির সঙ্গে একবার মীরজাফরেক
পলাশী
দিকে আর একবার উমিচাদের দিকে চাহিলেন। ক্ষণেকের জন্য
সকলেই নীরব রহিলেন। মীরজাফরের মুখে উদ্বেগ দেখা দিল।)
মীরজা। আপনি কি সত্যই সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করতে চান ?
মেহের। যদি বলি, চাই।
মীরজা। উদ্দেশ্য নিষ্ফল হবে। সেনাপতি মােহনলাল জীবিত
থাকতে, নবাবকে পরাজিত করা সওকৎজঙ্গের পক্ষে অসম্ভব।
উমি। মােহনলাল! মােহনলাল! মােহনলালের মারণাস্ত্র এখন
এই উমিচাদের হাতে।
মীরজা। মােহনলালের মারণাস্ত্র ?
উমি। হ্যা তাই। কয়েক দিন পূর্বে উপানন্দ ঠাকুরের আশ্রমে
এক সুন্দরী তরুণীর আবির্ভাব হয়েছিল। তাকে অজ্ঞান অবস্থায় গঙ্গার
জলে পাওয়া গেছে। উপানন্দের শুশ্রুষায় তার জ্ঞান ফিরেছে। বিশেষ
সন্ধান করে জেনেছি, তরুণীটি মােহনলালের প্রণয়িনী। নিরাশ্রয়
হয়ে রাজা মােহনলালের শরণাপন্ন হবার জন্যই তিনি রাজধানীর পথে
এসেছিলেন। উপানন্দের শিষ্য দয়ানন্দ দরবেশকে মােটা টাকা কবুল
করে, সেই সুন্দরীকে আনবাে হাতের মুঠোয়। তারপর, ওই বখরির
জিয়ানা দিয়েই মােহনলালের গলায় বঁড়শী বেঁধাবাে। দেখবে,
মােহনলাল কত বড় বাঘের বাচ্চা।
মীরজা। কিন্তু তাতে করে নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করা যাবে না,
চাদসাহেব।
মেহের। কেন যাবে না জনাব আলি? আপনি সিপাহসালার।
নবাবের সিপাহীরা আপনার হাতেই তলব পেয়ে থাকে। আপনি
ইঙ্গিত করলে, তারা অনায়াসেই বিপর্যস্ত করতে পারে সেনাপতি
মােহনলালকে। সৈন্যেরা যদি আদেশ অমান্য করে,
পলাশী
মীরজা। তাতে লাভ কি বেগম সাহেবা ?
মেহের। লাভ! সুবে বাংলার সিংহাসনে সুযােগ্য নবাবের
আসন হবে।
মীরজা। সুযােগ্য নবাব সৈয়দ সওকৎজঙ্গ?
মেহের। না। বাংলার সুযােগ্য নবাব, মীর মহম্মদ জাফর আলি
খ। বাহাদুর। ( অস্বাভাবিক গাম্ভীর্যের সহিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন)
মীরজা। ( চমকিয়া উঠিলেন) আমি ?
মেহের। হা আপনি।
মীরজা। বিদ্রুপ করবেন না, বেগমসাহেব।
মেহের। মেহেরউন্নেসা বিদ্রুপ করে না জনাব আলি। এ তার
প্রতিজ্ঞা, তার শপথ।
মীরজা। (স্বগত) বাংলার নবাব মীর মহম্মদ জাফর আলি খা!
না, আমি কোরাণ স্পর্শ করে শপথ করেছি। আমায় মাপ করবেন
বেগম সাহেবা।
মেহের। যদি বিশ্বাস না হয়, সওকৎজঙ্গ নিজেও দেবে সেই
প্রতিশ্রুতি। সুবে বাংলা পূর্ণিয়ার অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, আপনিই হবেন
তার নবাব। চান—চান সওকজঙ্গের মুখ থেকে সে অঙ্গীকার শুনতে?
মীরজা। সওকৎঙ্গ ? পূর্ণিয়ার নবাব সওকৎজঙ্গ পদার্পণ
করেছেন মুর্শিদাবাদে ?
মেহের। হাঁ, আমারই গৃহে, মতিঝিলের হারেমে, আমার ভগিনী
ময়মনা বেগমের পুত্র নবাব সৈয়দ আহম্মদ সওকৎজঙ্গ। (উঠিয়া পথ
দেখাইয়া অন্দরের দিকে আহ্বান করিতে করিতে) আসুন চাদ
সাহেব, আনুন নবাব জাফর আলি। সওকৎজঙ্গ এই মুহূর্তেই দেবে
আপনাদের প্রতিশ্রুতি। সুবে বাংলার সিংহাসনে বসবেন, ধর্মপ্রাণ
পলাশী নবাব মীর মহম্মদ জাফর আলি খা। (মেহেরউয়েসা ভিতরে চলিয়া গেলেন, পশ্চাতে পশ্চাতে উমিচাদও নিষ্ক্রান্ত হইলেন) মীরজা। (কিছুদূর অগ্রসর হইয়া পশ্চাৎপদ হইলেন) ঝড় উঠেছে। প্রাসাদের অগ্নিকোণে জমেছে লাল মেঘ, ঈশানে নেমেছে শিলাবৃষ্টি, ঝড়! ( বাহিরে সহসা ঝড়ের শব্দ) এই ঝড়ে ভেঙে পড়বে ওই জীর্ণ প্রাসাদের বনিয়াদ। নবাব আলিবর্দি ! কাণ পেতে শােন। তােমার স্থবির কঙ্কাল কবরের ভেতর থেকে হাহাকার করে উঠবে। সুবে বাংলার সিংহাসনে বসবে—মীর মহম্মদ জাফর আলি খা। না, না, আমি কোরাণ স্পর্শ করে শপথ করেছি। কোরাণ! কোরান শরীফ! খােদাতালার পবিত্র কালাম। (ক্ষণেক নীরব থাকিয়া) কিন্তু, সুবে বাংলার সিংহাসন! বাংলা- বিহার-উড়িষ্যা ! খােদ মালেক, দেনেওয়ালা। (সহসা বিদ্যুৎ- পাতে চমকিয়া উঠিলেন) ওকি! বিদ্যুৎ ?-না, না। বাজ! বাজ! বজ্রপাত! নবাব আলিবর্দি । সেলাম-সেলাম। ( অন্যপথে নিষ্ক্রমণ) দ্বিতীয় দৃশ্য কাশিমবাজারের সন্নিকটস্থ দয়ানগরনিবাসী দেবাংশি দয়ান দরবেশের গৃহ। লক্ষ্মীবাঈ ও দয়ানন্দ। লক্ষ্মী। কত দিন তাে হয়ে গেল। আজও সাক্ষাৎ করতে পারলেন না বাবা? আপনি নিজেও তাে দরবারে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারতেন।
পলাশী
দয়ানন্দ। রাজধানীতে গিয়ে এখন কোন ফলই হবে না মা।
সেনাপতি মােহনলাল সওকৎজঙ্গের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পূর্ণিয়া গেছেন।
পূর্ণিয়া থেকে না ফিরলে, কোন দিকেই কোন সুবিধা হবার
আশা নাই।
লক্ষ্মী। বাবা, এক একবার ভাবি, মিছেমিছি আমায় বাঁচালেন
কেন? আমি তাে নিরুপায় হয়েই আশ্রয় নিয়েছিলাম গঙ্গার জলে।
যদি দরকার হয়, এখনও
দয়া। ছিঃ, মা। তুমি তো জানেনা, জেনে শুনে আত্মহত্যা করা
মহাপাপ।
লক্ষ্মী। হােক পাপ। পাপ পুণ্যের বিচার করবার আমার অবসর
নেই বাবা। মানকরের পথে পিতাজীকে যে ভাবে হত্যা করা
হয়েছিল, তাতে কি সারা বাংলার মহাপাপ হয়নি?
দয়া। হলেও সে রাজনীতি। রাজনীতির কাছে পাপ পুণ্য সবই
সমান। সে কথা যাক। আমি ভাবছি, মােহনলাল যদি তােমায়
আশ্রয় না দেন।
লক্ষ্মী। কেন দেবেন না? আমি ভিক্ষে করে নেবাে তার আশ্রয়।
দয়া। কিন্তু, সে আশ্রয় কি তােমার পক্ষে গৌরবের হবে না ?
তিনি বিবাহিত।
লক্ষ্মী (বিস্ময়াবিষ্টের ন্যায় শিহরিয়া উঠিল) মােহনলাল বিবাহিত।
আপনি ঠিক জানেন বাবা?
দয়া। জানি। পূর্ণিয়া থেকে ফিরে, তিনি রাজা রাজবল্লভের
কন্যাকে বিবাহ করবেন বলে সম্মতি দিয়েছেন। শােভাময়ী সর্ববিষয়ে
মােহনলালের যােগ্য। আর রাজা রাজবল্লভও প্রতিষ্ঠাসম্পন্ন বাঙ্গালী,
পূর্ব বঙ্গের দেওয়ান। (কুর দৃষ্টিতে চাহিলেন)
পলাশী লক্ষ্মী। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সুযােগ্য সেনাপতি তিনি। সে প্রস্তাবে সম্মত হওয়াই তাে স্বাভাবিক বাবা। দয়া। তাই বলছি, তার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবার আগে, কথাটা একবার ভেবে দেখাে, মা। লক্ষ্মী। যদি তাই হয়, লক্ষ্মী কোনদিনই তাদের শান্তিতে হস্তক্ষেপ করবে না। মা গঙ্গার কোলে আবার ঠাই নেবে। দয়া। (গম্ভীর ভাবে) হু, কিন্তু আমি তা হতে দেবাে না। আমি নিজে সম্প্রদান করবাে তোমায় উপযুক্ত পাত্রে। লক্ষ্মী। ছিঃ, ও কথা মুখে আনবেন না, বাবা। দয়া। আচ্ছা, এখন যাও। স্নান করে দয়াময়ী কালিকার পূজার আয়ােজন করগে । ( কি ভাবিয়া) না-না। তােমায় করতে হবে না। সৌরভী-সৌরভী । ( চীৎকার করিয়া ডাকিলেন) সৌরভী। (নেপথ্যে) কি হলাে? অমন চীৎকার করে বাড়ী মাথায় করছো কেন ? দয়া। (লক্ষ্মীর প্রতি) যাও তাে মা, তাড়াতাড়ি স্নানটা সেরে, আজকের মত তুমিই করগে দয়াময়ীর পূজার আয়ােজন। পাগলি, কোন ভয় নেই তাের। তবে কি, জানিস? আমি ভিখিরী সন্ন্যাসী, চাল- চুলাে নেই, তাই সব সময় ভয় করে তােকে আমার আশ্রয়ে রাখতে। লক্ষ্মী। তা জানি বাবা! ( চিন্তিতভাবে বাহির হইয়া গেল ) সৌরভী। (লক্ষ্মী চলিয়া যাওয়ার পর বিশেষভাবে আশেপাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া) তােমার উজির সাহেব কি বললে? দয়া। উজির সাহেব। সৌরভী। ওগো, ওই যে ওমরা না হােমরা।
পলাশী
দয়া। ( তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আবার চারিদিক দেখিয়া।) ওমরাহি
উমিচাদ !
সৌরভী। হা, হাঁ। উনি যখন অমন করে বলছেন, তখন
সুযােগটা ছাড়ে কখনাে ? আমীর ওমরার নেক নজর থাকলে, শেষ
বয়েসে আর ভাবনা করতে হবে না।
দয়া। এখনই আসবেন তিনি। কিন্তু খুব হুসিয়ার ভৈরবী, লক্ষ্মী
যেন কোন রকমে টের না পায়। ও মেয়ে বড় সােজা নয়, একটু গন্ধ
পেলেই সব কিস্তি বেচাল করে দেবে। শুধু তাই নয়, হয়তাে শেষে
প্রাণ নিয়ে টানাটানি হবে। খুব হুস করে-
সৌরভী। হুস করাে তুমি। সৌরভী অত পকা নয়। অমন
মেয়েকে সে এক হাটে কিনে আর এক হাটে বেচতে পারে।
দয়া। তাতে পারে; কিন্তু আমার যে সাহস হচ্ছে না। কি
জানি, যদি বেচাল হয়ে যায়। শেষে কি একুল-ওকুল দুকুল যাবে ?
সৌরভী।
কেন, শুনি? অত ভয় কিসের?
দয়া। যদি কোন রকমে এ কথা প্রকাশ হয়ে পড়ে? সেনাপতি
মােহনলাল বাঘের বাচ্চা! তা ছাড়া অত বড় একটা পপি
সৌরভী। পাপ! পাপ আবার কিসের ? চাদ সাহেব কত
টাকা দেবে শুনি?
দয়া। তিন শো আশরাফি।
সৌরভী। তিন-শো! তবে আবার পাপ কিসের ? কমসম
হলে, না-হয় পাপের ভয় ছিল।
দয়া। কুছ পরােয়া নেই। দয়াময়ী দয়া করে যখন শিকার
জুটিয়েছেন, তখন পাপ-পুণ্যের ভার তিনিই নেবেন।
(দরজায় লঘু শব্দ)
পলাশী ! নেপথ্যে। স্বামিজী ! স্বামিজী ! দয়া। ওই যে এসেছেন। তুমি ভিতরে যাও সৌরভী। দেখে, খুব সাবধান। সৌরভী। আচ্ছা। ( পিছনদিকে চাহিতে চাহিতে প্রস্থান) দয়া। এই যে আসুন। উমিাদের প্রবেশ উমি। আর কোন গােলমাল নেই তাে? দয়া। গােলমালের কিছুই নেই, ওমরাহ সাহেব। তবে কি জানেন, এত বড় একটা কাজ- উমি। বেশতো, আমি জবান দিচ্ছি। সময় হলে আপনাকে আবার খুশী করবাে। দয়া। আপনার মেহেরবানী। কিন্তু আমার ভয় হয়, যদি কোন রকমে মােহনলালের কাণে এ কথা যায়, তা হলে আর রক্ষা থাকবে না। উমি। নিশ্চিন্ত থাকুন, সন্ন্যাসী। মােহনলালের আয়ু এবার শেষ হয়ে এসেছে। ভিখারীর ছেলে, রাজার সম্মান পেয়ে, আসমান জমিন সমান দেখছে। এবার পূর্ণিয়া যুদ্ধে হবে একেবারে কাবার। দয়া। ধৰ্ম্মের চাকা আপনিই ঘুরবে জনাব । উমি। নিশ্চয়ই। এই নিন আপনার প্রণামী। (টাকার থলি য়ানদের হাতে দিয়া) তাহলে অল্পক্ষণ পরেই আপনি আর ভৈরবী এ বাড়ী ছেড়ে চলে যাবেন। কোন ভয় নেই, চারিদিকে সশস্ত্র প্রহরী নযুক্ত আছে। কিন্তু সাবধান, লক্ষীবাঈ যেন পালাতে না পারে।
পলাশী
দয়া।
যে আজ্ঞা জনাব।
( লােলুপ দৃষ্টিতে থলিটি দেখিতে লাগিল।
উমি। আচ্ছা, আসি তবে।
দয়া। ( অস্বাভাবিক প্রসন্নতার সঙ্গে। আসুন।
( উমিচাদের প্রস্থান)
সৌরভী—সৌরভী!
(সৌরভীর প্রবেশ )
সৌরভী। কি হলাে? ওমরা সাহেব কি বলে ?
দয়া। বলছি।-লক্ষ্মী ফিরেছে ?
সৌরতী।
। এখুনি হয় তাে এসে পড়বে।
দয়া
এই নাও।
( টাকার থলিটি হাতে দিয়া) দেখাে, খুব
সাবধান। যদি কোন রকমে ভেস্তে যায়, গর্দান যাবে।
সৌরভী। নিজে সাবধান থেকে; তাহলেই হলাে।
আছে তো? গুণে দেখেছো ?
দয়া। গুণতে হবে না। তাড়াতাড়ি জিনিষপত্র গুছিয়ে নাও গে।
আজই বিলাসপুরে চলে যাব।
(সৌরভী থলির মুখ খুলিয়া একবার প্রসন্ন দৃষ্টিতে চাহিয়া পরম
উল্লাসের সঙ্গে কক্ষ ত্যাগ করিল )
দয়া। সবই দয়াময়ীর ইচ্ছা! মানুষ নিমিত্ত মাত্র।
সব ঠিক
( আলুথালু অবস্থায় লক্ষ্মীর প্রবেশ )
লক্ষ্মী। বাবা, কে ও! কে ও?
দয়া। (সহসা থতমত খাইয়া গেল। অজ্ঞাত আশঙ্কায় মুখ বিবর্ণ
হইয়া উঠিল) কই ? কেউ না তাে!
পলাশী
লক্ষ্মী। হাঁ, আমি দেখেছি। আমার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল,
দেখে সৰ্বাঙ্গ ভয়ে শিউরে উঠল। চোখে চোখ পড়তেই আড়ালে সরে’
গেল। বলল, বলাে বাবা! তােমার পায়ে ধরি, আমায় গােপন
করাে না।
দয়া। তােমায় গােপন করবো কেন মা? (ইতস্তত করিতে
লাগিল।
লক্ষ্মী। তবে বলছে না যে?
দয়া। ওঃ (নিজেকে সংযত করিয়া) ভেবেছিলাম, সুসংবাদটা পরেই
দেবাে। কিন্তু পাগলির দৃষ্টি এড়িয়ে যাবার কি উপায় আছে ? নবাব
সরকারে খবর পাঠিয়েছিলাম। তাই মােহনলালজীর সহকারী এসে
সংবাদ দিয়ে গেলেন, তােমার আগমন যথা সময়ে তাকে জানানাে হবে।
লক্ষ্মী। উনি তার সহকারী ! কিন্তু এ যে বিশ্বাস করতে পারি
। বলে, বলল বাবা! এ কথা কি সত্যি?
দয়া। সন্ন্যাসী কখনাে মিথ্যা বলে না, মা। এতই যদি তােমার
সন্দেহ, আমার ওপর যদি এতই অবিশ্বাস-( কৃত্ৰিম ক্রোধে আস্ফালন
করিয়া উঠিল।)
লক্ষ্মী। না না, রাগ করােনা দেবাংশি ! তুমি মহাপুরুষ, আমায়
দূরে ঠেলে দিও না বাবা, তােমার পায়ে পড়ি।
(দয়ানদের পদতলে লুটাইয়া পড়িল)
(লক্ষ্মী মাথা তুলিবার আগেই দয়ানন সন্তর্পণে কক্ষ ত্যাগ করিল
এবং একদিকে উমিচাদ ও অন্যদিকে দুইজন সশস্ত্র প্রহরী প্রবেশ করিল)
লক্ষ্মী। একি! কে তুমি?
ভয় পেয়ােনা সুন্দরী, আমি মানুষ। বাঘ নই,—রক্ত
মাংসের মানুষ।
তৃতীয় দৃশ্য
উদ্যান।
মােহনলালের আবাসের পুরােভাগ। পশ্চাতে মন্দির ও তৎসংলগ্ন
প্রাঙ্গনের মাঝখানে স্বামিজী দণ্ডায়মান। তিনি দেবী
চণ্ডিকার বন্দনা গান গাহিতেছিলেন। মােহনলালের পূর্ণিয়াবিজয়
উপলক্ষ্যে উৎসবের আয়ােজন হইয়াছে।
গীত
বলে
বলে রণদেবী চণ্ডিকা রঙ্গিনী
রণমদ মন্থন ছন্দে।
-বন্দে।
প্রতিপদ বিক্ষেপে কঁপিছে ধাত্রী,
শঙ্কা বিনাশি এস, দেবী জয়দাত্রী ।
ঝঞ্চা ঝলক জালি-
লেলিহান মহাকালী,
মাভৈ কৃপাণী উমা !
রণদে-রণদে-রণদে।
স্বামিজী গান গাহিয়া প্রাঙ্গন অতিক্রম করার পর, দেবদাসীর
অসিনৃত্যে রণচণ্ডীর আবাহন। নৃত্যশেষে মােহনলাল মন্দির পার্শ্ব
হইতে ধীরপদে উদ্যান নিরীক্ষণ করিতে করিতে প্রাঙ্গনে আসিয়া
দাড়াইলেন।
মােহনলালের পশ্চাতে শান্তশীল ও পুরন্দরের প্রবেশ। অপর দিক
হইতে স্বামিজী ও করুণার প্রবেশ।
পলাশী
মােহন। স্বামিজী !
(মােহনলাল ও তাহার পশ্চাতে শান্তশীল ও পুরন্দর স্বামিজীকে
প্রণাম করিল )
স্বামিজী।
এস মােহন। পূর্ণিয়ার যুদ্ধে তােমার বিজয়-উল্লাসে
আমরা আজ চণ্ডিকা উৎসবের আয়ােজন করেছি ।
মােহন। করুণা! তুইও এসেছিস বােন। তােকে যদি
নবাবের লােক চিনে ফেলে ?
করুণা। না, সেলিনা বেগম এসেছে বােরখা পরে সবার অলক্ষ্যে।
কেউ জানতে পারবে না যে, তােমার বােন করুণাই নবাবমহিষী
লুৎফাউন্নিসার সঙ্গিনী সেলিনা বেগম।
মােহন। বােন!
করুণা! তুমি নিশ্চিন্ত থাক, দাদা! বর্গীরা হরণ করেছিল বলে
সমাজ আমায় আশ্রয় দেয়নি।
আশ্রয় দেয়নি। আশ্রয় দিয়েছেন নবাবমহিষী
লুৎফাউন্নিসা। নর্তকীর পরিচয় দিয়ে নবাবমহিষীর সঙ্গিনী হলেও,
আমি সেখানে বেগমের মর্যাদা পেয়েছি। নবাবের মনে আমার
সম্পর্কে সন্দেহের ছায়া মাত্র উদিত হতে পারে না।
স্বামিজী। ভেবাে না মােহন, তােমার বন্ধু এই পুরন্দর আলিহােসেন
রূপে যেমন নবাবের বিশ্বস্ত সঙ্গী, তােমার ভগ্নি করুণাও সেলিনা বেগম
রূপে নবাবের ততখানি বিশ্বাসের পাত্রী। তােমার বিজয়-উৎসবে
ও এসেছে আনন্দ করতে।
মােহন। বিজয় উৎসব! কিন্তু নবাবের সিপাহসালার ও অন্যান্য
অমাত্যরা পূর্ণিয়ার যুদ্ধ সমর্থন করেননি।
স্বামিজী। তাতে কিছুই যায়-আসেনা মােহন।
পূর্ণিয়ার যুদ্ধ তাে ওর সমর্থন করবেনই না। এদিকে
৬২ পলাশী জাফর আলি, শেঠজি, রাজবল্লভ, ওয়াটস্ আর রায় দুর্লভ—এরা সবাই মিলে কি সৰ শলা-পরামর্শ করছেন। আড়ালে আড়ালে রাতদিন গুজগুজ ফুসফুস চলছে। আমার মনে হয়, সিপাহসালারের মগজে বাংলার মসনদ যখের মত চেপে বসেছে। শান্ত। ওদের বিশ্বাস, সিরাজ ব্যাভিচারী। তাই তাকে মসনদে রাখা উচিত নয়। মােহন। ওদের চোখে সিরাজ উচ্চ অল ব্যাভিচারী। কিন্তু আমার কাছে সে পরিপূর্ণ মানুষ। মায়ের মত কোমল তার অন্তর- শিশুর মত সরল তার বিশ্বাস। মানুষকে সে বিশ্বাস করে ভগবানে চেয়ে বেশী। তাই ভয় হয়, সেই বিশ্বাসই একদিন ঘটাবে তার সর্বনাশ। স্বামিজী। তােমরা তােমাদের কর্তব্য করে যাও মােহন। আলি হোসেন, তুমি মুর্শিদাবাদে ফিরে যাও। বিলাসপ্রিয় বালক সিরাজকে প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দেবে তার দায়িত্ব। তাকে জানিয়ে দেবে, তার জীবনের মূল্য অনেক। তার অন্যথা কোনদিই হবে না স্বামিজী। স্বামিজী। এসো, মুর্শিদাবাদ যাওয়ার পূর্বে আমি তােমায় মায়ের নিৰ্ম্মাল্য পরিয়ে দিই। (স্বামিজী ও পুরন্দরের প্রস্থান) মােহন। শান্ত, এখানে তােমারও আর বেশীদিন বিলম্ব করা চলবে না। আলি নগরের অবস্থা কতকটা শান্ত হলেও, আমি নিশ্চিত হতে পারিনি। আমার মনে হয়, ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী সহজে ছাড়বে না। শুধু বাণিজ্য করবার ইচ্ছা থাকলে, তারা কলকাতায় দুৰ্গস্থাপনের চেষ্টা করতো না। পুর।
পলাশী
করুণা। তােমাদের এত আশঙ্কা কেন দাদা? তােমরা তো
সময় থাকতেই তার উচ্ছেদ সাধন করেছ।
মােহন। উচ্ছেদ সাধন করেছি, না জল সেচন করেছি, তা
অবিলম্বেই বুঝবে করুণা।
সােলেমান। (নেপথ্যে) রাজা মােহনলাল, রাজা মােহনলাল !
মােহন। কে ?
সােলেমানের প্রবেশ
সােলে। এই যে, আপনিই বােধ হয় রাজা মােহনলাল ?
মােহন। হাঁ, কিন্তু তুমি কে বালক ?
সােলে। গােস্তাকি মাপ করবেন রাজা। আমি সেনাপতি
মীরমদনের পুত্র, সােলেমান।
মােহন। সােলেমান। নবাবের বিশ্বস্ত সেনাপতি মীরমদনের
পুত্র তুমি ?
সােলে। আমার পিতার সঙ্গে আমি আসতে চাইলাম রাজা
মােহনলালকে দেখতে। পিতা আমায় সঙ্গে আনতে রাজী হলেন না।
তাই লুকিয়ে এলাম এখানে আপনাকে দেখবাে বলে।
মােহন। কেন বালক? আমাকে দেখবার জন্যে
সােলে। দেখব না? পূর্ণিয়ার যুদ্ধে যিনি সওকৎজঙ্গকে পরাজিত
করে নবাবের মান রেখেছেন, সেই মহাবীর কেমনধারা মানুষ চোখে
দেখবে না? আমরাও তাে একদিন বড় হব, আমাদেরও তো একদিন
অমনি করে দেশের দুষমনদের সঙ্গে লড়াই করে, দেশের জন্য শহীদ
হতে হবে। আপনি আমাদের শহীদ হ’তে শেখাবেন রাজা!
মােহন। বালক, ওরে কিশাের বালক, তাের মত কিশাের শহীদ
যদি বাংলার ঘরে ঘরে জেগে ওঠে, তাহলে বাংলা মায়ের দুঃখ কোথায়
৬৪
পলাশী
ভাই? আসুক শত
আসুক শত দেশদ্রোহী—আসুক মীরজাফর, রাজবল্লভ,
জগৎশেঠের দল,তবু—তবু মুক্তকণ্ঠে বলি, সেই দেশদ্রোহীদের
শান্ত। মােহন দা, মােহন দা! তুমি কি পাগল হলে?
মােহন। ও, আনন্দের উত্তেজনায় আমি কি ভুল বলে
ফেলেছি শান্তশীল।
শান্ত। চুপ করাে-দেখ কারা আসছে।
সােলে। ঐযে নবাবের লােকেরা আসছে, ওদের সঙ্গে আমার
বাবা। আপনার জন্যে ভেট নিয়ে আসছেন।
মােহন। ভেট !
সােলে। আপনি পূর্ণিয়ার যুদ্ধবিজয়ী। তাই নবাব উপহার
পাঠিয়েছেন।
মােহন। চল শান্তশীল! নবাবের স্নেহ-উপহার আমরা সসম্মানে
গ্রহণ করিগে।
(শান্তশীল সহ প্রস্থান)
করুণা। সােলেমান!
সােলে। বেগম সাহেবা।
করুণ। তুমি যে এত শীঘ্র দেখা করবে ভাই, সত্যিই কল্পনা
করতে পারিনি।
সােলে। আপনার কাছ থেকে যে কাজের ভার নিয়েছি। কথা
দিয়েছি, এখানে এসে আপনাকে সব খবর দেবাে। না এসে পারি
বেগম সাহেবা ?
করুণা। কোন খবর পেয়েছ ভাই?
সােলে। হাঁ, বেগম সাহেবা, তাকে আটক করে রেখেছে।
করুণা। আটকে রেখেছে। কোথায় ?
পলাশী
সােলে। দয়ানন্দ দরবেশের বাড়ীতে।
করুণা। দয়ানন্দ দরবেশ ! দেবতার নাম নিয়ে মানুষের কাছে
পূজা নেয়,অথচ এত বড় পিশাচ সেই দয়ানন্দ ! কিন্তু সে কেন
সােলে। টাকার লােভে বেগম সাহেবা। তাকে টাকা দিয়ে
হাত করেছে-
করুণা।
কে ?
সােলে। ওমরাহ উমিচাদ।
করুণা। উমিচাদ। পেশােয়ারী সওদাগর বাংলায় এসে টাকার
জোরে --আচ্ছা, উমিচাদের মরণ-অস্ত্র এই সেলিনা বেগমের হাতে।
সেলে। বেগম সাহেবা-
করুণা। সােলেমান, তুমি আমায় খবর দিয়ে যে মহা উপকার
করেছ, সে ঋণ আমি কখনাে শুধতে পারব না ভাই।
সােল। ঋণ ! আমি তো শুধু তােমার একার জন্য কাজ করি না,
বেগম সাহেবা। আমি কাজ করি আমার দেশের জন্য, আমার মা
বহিনের ইজ্জৎ রাখবার জন্য।
করুণা। জানি সােলেমান! রাগ করাে না ভাই। তুমি ঐ
গাছতলায় গিয়ে একটু অপেক্ষা কর। আমি তােমার সঙ্গে একটু
বাদেই যাত্রা করবাে।
সেলে। কোথায় ?
করুণ।। দয়ানন্দ দরবেশের বাড়ী। পথ দেখিয়ে নিতে পারবে
ভাই।
সােলে। খুব পারবো। আমি যাই; চট করে তৈরী হয়ে নাও
বেগম সাহেবা।
( প্রস্থান)
;
পলাশী
মােহনলালের প্রবেশ
মােহন।
করুণা !
করুণা। দাদা! দাদা!
মােহন। কি বােন? হঠাৎ এত ব্যস্ত হয়ে উঠলি যে? সেই
বালক কোথায়?
করুণা। তাকে আমি কাৰ্যান্তরে পাঠিয়েছি। তুমি শুনেছ
দাদা?
মােহন। কি ?
করুণা। মানকরে গুপ্তঘাতকের হাতে পণ্ডিতজী নিহত হওয়ার
পর, লক্ষ্মীবাঈ বাংলায় ফিরে এসেছিল। সে আজ বন্দী ।
মােহন। ( চমকিয়া উঠিলেন) বন্দী! লক্ষ্মীবাঈ বন্দী।
করুণ। বল দাদা, আজ নির্বিচারে সয়ে যাবে তুমি তার এই
লাঞ্ছনা?
মােহন' লক্ষ্মীবাঈয়ের, লাঞ্জনা সইব আমি! বল, বল করুণা, কে
তাকে বন্দী করেছে ?
করুণা। লক্ষ্মীবাঈ বন্দী হয়েছে নবাবেরই কোন এক বিশ্বস্ত
অমাত্যের হাতে। এর বেশী কিছু আপাততঃ বলতে পারব না।
মােহন। অমাত্য যে-ই হােক! হােক রাজা রাজবল্লভ, হােক
দেওয়ান মাণিকচঁাদ, সিপাহসালার মীরজাফর, এমন কি নবাব
সিরাজদ্দৌলা হলেও আমি ক্ষমা করবে না। এ অনাচার আমি
কিছুতেই সইব না।
করুণা। দাদা, লক্ষ্মীকে তুমি ভালবাস?
মােহন। সে কথা ভেবে দেখবার অবসর তো কোনদিন পাইনি,
বােন। (একটু থামিয়া) তবে তাকে আমি শ্রদ্ধা করি।
পলাশী করুণা। চুপ (পথের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করিয়া) সিপাহসালার আর খাঁ সাহেব এই দিকেই আসছেন। ( দ্রুত ভিতরে গেল ) মােহন। সিপাহসালার জাফর আলি মােহনলালের গৃহে ! ( চিন্তিত ভাবে) দুর্বোধ্য রাজনীতির আবার কোন নূতন অধ্যায়ের সূচনা হবে, কে জানে! মীরজাফর ও আমির খাঁর প্রবেশ। মােহনলাল পরম সমাদর ও সম্ভ্রমের সহিত অভ্যর্থনার উদ্দেশে অগ্রসর হইলেন দরিদ্র মােহনলালের পরম সৌভাগ্য যে, তার গৃহে আজ সুবে বাংলার সিপাহসালার জনাব মীর মহম্মদ জাফর আলির পদধূলি পড়েছে। মীরজা। সৌভাগ্য কার, সে কথা ভাববার সময় এখন নাই রাজা। কলকাতার ইংরেজরা মাদ্রাজ-কোম্পানীর সঙ্গে যােগ দিয়ে নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করেছে। অবিলম্বে তাদের ফৌজ এসে উপস্থিত হবে। ক্লাইভ আর ওয়াটসন সসৈন্যে রওনা হয়েছে দেবগ্রামের পথে। মােহন। এ সংবাদ অপ্রত্যাশিত নয় জনাব। আমি জানতাম, শক্তি সঞ্চয় করে ওরা একদিন না-একদিন নবাবের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেই। আমির। বিশেষ করে কাশিমবাজার কুঠি ধ্বংস করে, সেখানকার কুঠিয়াল ওয়ার্টসের প্রতি নবাব যে দুর্ব্যবহার করেছেন, তা ইংরেজরা কোনদিনই ক্ষমা করবে না। মীরজা। কিন্তু তার প্রতিবিধান তাে করতে হবে খাঁ সাহেব। মােহন। প্রতিবিধান যুদ্ধ ছাড়া সম্ভব নয়, সিপাহসালার। মীরজা। যুদ্ধ করেও কোন সুফল হবে না, রাজা। ওরা নবাবের চির-শত্রু হয়ে থেকে যাবে। তার চেয়ে, আপােষ সােলেনামা অনেক ভাল।
৬৮
পলাশী
মােহন। নবাবের মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে আপােষ কি সম্ভব
জনাব ?
মীরজা। সম্ভব, রাজা। নবাবের বিরুদ্ধে বারবার ক্ষুব্ধ হয়েই
আজ ওরা মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমার মনে হয়, বাণিজ্য প্রধান
বাংলা থেকে নবাবের মসনদ যদি পূর্ণিয়ায় স্থানান্তরিত করা হয়,
বিদেশী বণিকদের আর কোন অভিযােগ থাকবে না।
মােহন। বাংলার শাসনতন্ত্র ?
মীরজা। পূর্ববঙ্গের স্বাধীন শাসনকর্তারূপে প্রতিষ্ঠিত হবেন
রাজা মােহনলাল। আর বাংলা-
( মােহনলাল চমকিয়া উঠিল )
আমির। বাংলা থাকবে জনাব জাফর আলির শাসনাধীনে।
পূর্ববঙ্গে লক্ষ্মণ সেনের লুপ্ত গৌরব পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে।
মােহন। (উৎক্ষিপ্ততার সহিত) কর মাপ করবেন সিপাহসালার।
ভিক্ষুক মােহনলালকে সিংহাসনের প্রলােভন দেখাবেন না। বেইমানি
করে সে ইন্দ্ৰত্বও চায় না।
মীরজা। স্থির চিত্তে ভেবে দেখবেন রাজা! বিলম্বের সময় নাই।
কালই পলাশীর ময়দানে ছাউনী ফেলতে হবে।
এ ছাড়া, দ্বিতীয়
কোন পথ নাই। ( ব্যস্ততার সহিত প্রস্থানােত) আপনার নবাব
সংশােধনের বাইরে।
( প্রস্থান)
মােহন। বেয়াদবি মাপ করবেন জনাব আলি। (মুহূর্তে কি
ভাবিয়া) জনাব জাফর আলি, সিপাহসালার জনাব মীরজাফর।
( মীরজাফর আবার ফিরিলেন)
মীরজা। বলুন, রাজা।
পলাশী
মােহন। ( অতি ব্যগ্রভাবে ) মানকরের পথে ভাস্কর পণ্ডিতকে
কে হত্যা করেছে, জানেন ?
মীরজা। জানা নাই।
মােহন। তার পালিত কন্যা লক্ষ্মী বাঈ নবাবের কোন্ অমাত্যের
হাতে বন্দী ?
মীরজা। সে কথা নবাব জানেন!
মােহন। নবাব ?
( অস্বাভাবিকরূপে আঁকাইয়া উঠিলেন।
মােহনলালের সৰ্ব্ব সত্তা যেন সহসা প্রচণ্ড ভাবে আহত হইল )
মীরজা। ( দৃঢ়তার সহিত) হাঁ, নবাব। বুঝতে কষ্ট হচ্ছে রাজ
মােহনলাল ? নবাব মুগ্ধ সেই সুন্দরীর রূপে
( প্রস্থান )
চতুর্থ দৃশ্য।
কাশিমবাজারের কোন একটী নির্জন গৃহ। উমিচাদ মদ্যপান
করিতেছে। আৰ্মানী নর্তকী নৃত্য করিতেছে। দয়ানন্দ উমিচাদের
পার্শ্বে বসিয়া পরম-উল্লাসের সহিত উপভােগ করিতেছে এবং মাকে
মাঝে উমিচঁাদকে মদ ঢালিয়া দিতেছে।
উমিচাদ। কিহে দয়ানন্দ ঠাকুর, কেমন দেখছো?
দয়া। হুজুর, চমৎকার ! দিশী বিদেশী বাইজি, এ যে একেবারে
গুলজার করে তুলেছেন।
৭০
পলাশী
উমি। হাঁ। কিন্তু যাকে নিয়ে আমার আসর গুলজার হবে, তাকে
একবার পাঠিয়ে দাও দিকিনি।
দয়। জো হুকুম। এখনি পাঠাচ্ছি। ( প্রস্থাননাদ্যত হইয়া
ক্ষণেক থামিল এবং একপাত্র মদ ঢালিয়া লইয়া উমিচাদের দৃষ্টির
অন্তরালে পান করিল )—কালী, কৈবল্যদায়িনী মা।
(প্রস্থান)
উমি। ইংরেজ কোম্পানী নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করেছে।
কলকাতার পরাজয়ের খেসারৎ এবার সুদে-আসলে আদায় হবে।
ক্লাইভের কামানের মুখে সব উড়ে যাবে।
লক্ষ্মীবাঈ এর প্রবেশ
উমি। এই যে, এসাে এসাে সুন্দরী! আমি যে তােমারি আশা
পথ চেয়ে!
লক্ষ্মী। আমি স্পষ্ট কথায় জানতে চাই, আপনার উদ্দেশ্য কি?
আপনি আমায় মুক্তি দেবেন কি না ?
উমি। এ অধীনের কাছে মুক্তি ভিক্ষা কেন সুন্দরি ! তার চেয়ে
অধীনকে কিঞ্চিৎ প্রেমভিক্ষা দিয়ে কৃতার্থ করুন না। (লক্ষ্মীকে
ধরিবার জন্য হাত বাড়াইল)
লক্ষ্মী। ( অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত ছিটকাইয়া দুরে দাড়াইল) সাবধান,
বেয়াদব।
বেয়াদব! ভুলে যেওনা লক্ষ্মীবাঈ, তােমার মােহনলাল
এতক্ষণে রওনা হয়ে গেছে পলাশীর মাঠে। বর্তমানে এই
বেয়াদবের অনুগ্রহের ওপরই নির্ভর করে তােমার জীবন, তােমার
ইজ্জৎ, তােমার সর্বস্ব।
উমি।
পলাশী
৭১
লক্ষ্মী। কখনই না।
উমি। না !
তবে দেখতে চাও?
লক্ষ্মী। নিশ্চয়ই। প্রয়ােজন হলে, সে নিজেকে রক্ষা করবে ;
এবং সেই সঙ্গে ঘৃণিত নফরকেও দেবে সমুচিত শাস্তি। (বস্ত্রাভ্যন্তর
হইতে একখানি শাণিত অস্ত্র বাহির করিল।)
উমি। হত্যা করবে ? হা-হা-হা, উমিচাদকে হত্যা করবে
একটি কুসুমকোমল। নারী! সেও উমিচঁাদকে শুনতে হ’ল। না,
তােমার অনেক ঔদ্ধত্য সহ্য করেছি। কিন্তু আর নয়—( আস্ফালন
করিয়া উঠিল) এই কোতয়াল, কোতয়াল!
(সেলাম করিয়া কোতয়ালের প্রবেশ )
কোত। হুজুর !
উমি।
একে নিয়ে যাও। ঐ অন্ধকার ঘরটায় কুলুপ দিয়ে সাত
দিন বন্ধ করে রাখবে। দেখাে, যেন এক ফোটা জল পৰ্যন্ত না পায়।
কোত। যে হুকুম, হুজুর।
উমি। কোন অনুরােধ, কোন উপরােধ শুনবে না। দেখি, ওর
মােহনলাল কেমন করে উদ্ধার করে ওই অন্ধকূপ হ'তে।
লক্ষ্মী। অবিশ্বাসী গােলাম ! তুমি জান না, কেমন করে দেবতা
রক্ষা করেন তার আশ্রিত মানুষকে।
এবার আর দেবতার বাবারও সাধ্যি নাই যে, উমিচাদের
কবল থেকে তােমায় রক্ষা করে। (কোতয়ালের প্রতি) যাও, নিয়ে
যাও এখান থেকে।
(কোতয়াল লক্ষ্মীবাঈএর দিকে অগ্রসর হইয়া তাহাকে উদ্দেশ
করিয়া বলিল)
কোত। আইয়ে বিবি,
৭২
পলাশী
(লক্ষ্মীবাঈ যাইবার উদ্যোগ করিতেই উমিচাদ পুনরায় বাধা
দিয়া বলিল)
উমি । না-না, থাক। আরও কিছুক্ষণ ভাববার সময় দাও।
পাশের ঘরে নিয়ে বসাও।
লক্ষ্মী। দরকার হবে না। ভাবতে হয়, সেই অন্ধকূপে গিয়েই
ভাববাে।
(লক্ষ্মীবাঈ বাহির হইয়া গেল। পশ্চাতে পশ্চাতে কোতয়ালও
বাহির হইয়া গেল )
উমি। আচ্ছা, দেখা যাক, কতদিন অমনি তেজ থাকে। কিন্তু আর
যে সময় নাই। পলাশীর যুদ্ধে ভাগ্যে কি ঘটবে, তা ভগবানই জানেন।
অন্ততঃ একটী-বারও যদি মুখ ফুটে বলে-( সহসা পদ শব্দে পশ্চাৎ
ফিরিয়া) কে ? ( চমকাইয়া উঠিল )
কে! (বােরখা-আবৃত সেলিনার প্রবেশ ) তাই হােক। আমি
ভেবেছি, বিলম্ব দেখে নবাবের কোন গুপ্তচর এসে হাজির হল
(বােরখা খুলিয়া সহসা সেলিনা সম্মুখে আসিয়া দাড়াইল)
আপনি ?-তুমি ! না না, হুরপরী সেলিনা বেগম ? এত ভাগ্য
আমার?
সেলিনা। ভাগ্য আপনার নয় জনাব, আমার। আপনার প্রসন্ন
দৃষ্টি লাভের সৌভাগ্য কি একটা নর্তকীর জীবনে কম গৌরবের কথা?
উমি। সে কথা বলে আমায় লজ্জা দিও না, বেগম সাহেবা !
তুমি মর্তের অপ্সরী। স্বয়ং নবাব সিরাজদ্দৌলা, সিপাহসালার
মীরজাফর, ধনকুবের জগৎ শেঠ পৰ্যন্ত যার জন্য পাগল, তার
শুভাগমনে নফর আজ ধন্য। আমি জানি, নবাব সিরাজদ্দৌলাও শত
পলাশী
চেষ্টায় তােমার অনুগ্রহ লাভ করতে পারেন নি। শেঠজী বলেন,
সেলিনা বেগম শুধু মাতােয়ালাই করে, কিন্তু কোনদিন কাউকে ধরা
সেলিনা। ছিঃ, আমায় লজ্জা দেবেন না ওমরাহ।—সিপাহসালার
মীরজাফরের প্রাসাদে আপনার প্রসন্ন দৃষ্টির ইঙ্গিত পাওয়ার পর
থেকে, আমি নিজেকে দমন করবার অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু
পারিনি। তাই নিভৃতে আপনার সাক্ষাৎ লাভের সুযােগ গ্রহণ করে
আজ ধন্য হয়েছি।
উমি। সে আপনার অনুগ্রহ। তশরিফ রাখুন। এই নফর ।
সেলিনা। থাক, কাকেও ডাকতে হবে না। এই নির্জনতা
আমার খুব ভাল লাগে। রাত্রিদিন রাজধানীর কোলাহলে কাণ
ঝালাপালা হয়ে যায়। (একটু ইতস্তত করিয়া) একটু সিরাজী,
কি একটু সরাব দিতে পারেন জনাব ? এতদূর এসে শরীরটা বড়
ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
উমি। সরাব ? সরাব চলবে
অপ্সরী ?
সেলিনা। (নতমুখে একটু হাসিল) অবশ্য একা হলে নয়।
উমি। কুছ পরােয়া নেই। ( তাড়াতাড়ি সরাবের বােতল ও
পানপাত্র আনিয়া উপস্থিত করিল )
সেলিনা। আমার কিন্তু বেহুস হলে চলবে না, চঁাদ সাহেব। আজ
রাত্রেই আমায় আবার মুর্শিদাবাদে ফিরে যেতে হবে।
কাল প্রত্যুষে আমাকেও উপস্থিত হতে হবে পলাশীর
রণক্ষেত্রে। (মদ্যপান)
সেলিনা। তা যাবেন! আচ্ছা ওমরাহ, আপনি কতখানি সরব
খেয়ে ঠিক থাকতে পারেন ?
উমি।
৭৪ পলাশী উমি। উমিচাদ কোনদিনই বেঠিক হয় না হুরপরী। সেলিনা। সেই জন্যই তো, কত বড় বীরপুরুষ আপনি, তাই দেখতে সখ যায়। উমি। হা-হা-হা, সুন্দরী! উমিচাদ বীরপুরুষ। এই দেখ— (বােতল মুখে লাগাইল) সেলিনা। ওকি করছেন! (বােতল কাড়িয়া লইল) বসুন । আমি নিজে হাতে ঢেলে দিচ্ছি, একটার পর একটা পাত্র। উমি। বহুত আচ্ছা ভেইয়া!! আরে চুপ। মেয়েছেলেকে ভেইয়া বলাটা তাে ভুল হয়ে গেল। কি বলব, বেগম সাহেবা ? বােহিনিয়া! আরে তাে—তােবা, তােব- সেলিনা। পিয়ারী, শাহান শা। উমি। তােফা! পিয়ারী, মেরি দিলকে পিয়ারী। ঢালে। সরাব পিয়ারী। সেলিনা। (গুন গুন করিয়া গান গাহিতে লাগিল ও সুরা ঢালিতে লাগিল) দিল মাতােয়ারা করুন, ওমরাহ ! (সুরাপাত্র উমিচাদের হাতে দিয়া চটুল কটাক্ষের সহিত হাসিল) ঢালো, ( গান ও তৎসঙ্গে বিলােল নৃত্যভঙ্গী) চাদ কহে চকোরীরে- আমার এ-প্রেম কাদিয়া মরিছে স্বপন যমুনা তীরে। এপারেতে আমি একা, ওপারে কাদিছ তুমি ;
পলাশী পাপিয়া বধূর বিধুর বিলাপে কাদিতেছে বনভূমি। পিউ কাহা! কঁদে পিউ কাহা! এসাে ফিরে। ( গান গাহিতে গাহিতে উমিচাদের হাতে পাত্র তুলিয়া দিবার সময় কৌশলে সেলিনা মদের মধ্যে একটী চূর্ণ ঔষধ মিশাইয়া দিল এবং আপন হাতে তাহা উমিচাদের মুখে তুলিয়া ধরিল ) উমি। (সুরা পান করিয়া) সেলিনা, অপ্সরী! (টলিতে টলিতে সেলিনার দিকে হাত বাড়াইল) সরে যেয়ােনা, আমায় ঘুম পাড়িয়ে রেখে পালিয়ে যেয়ােনা—( অবসন্ন হইয়া ঢলিয়া পড়িল) সেলিনা। লক্ষ্মী-লক্ষ্মীবাঈ-লক্ষ্মীবাঈ- ( ব্যস্তসমস্ত ভাবে লক্ষ্মীবাঈএর প্রবেশ ) লক্ষ্মী। কে ? করুণাদি? তুমি ? সেলিনা। (ইসারায় নীরব করিয়া বলিল) চুপ। সেলিনা বেগম। লক্ষ্মী। তুমি এখানে? সেলিনা। তােমায় উদ্ধার করতে। আর বিলম্ব না করে এই বােরখায় সৰ্বাঙ্গ ঢেকে বেরিয়ে পড়। বাইরে পালকী দাঁড়িয়ে আছে। ওরা ঠিক জায়গায় নিয়ে যাবে। খুব সাবধানে গা ঢাকা দিয়ে যাবে। প্রহরীরা যেন ঘুনাক্ষরেও টের না পায়। লক্ষ্মী। আর তুমি ? সেলিনা। আমার জন্য ভেবাে না লক্ষ্মী। আমার গতি সর্বত্র অবাধ। প্রহরীরা আমায় চেনে। কেউ বাধা দেবে না।
৭৬
পলাশী
লক্ষ্মী। ব্যাপারটা কেমন স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে করুণাদি। আমি
বুঝে উঠতে পারছি না।
সেলিনা। এখন বুঝবার দরকার নেই লক্ষ্মী। যাও, আর দেরী
করাে না।
লক্ষ্মী। (বােরখা পরিতে পরিতে) আমি তাে জানি না, কোন
পথে বাইরে যেতে হবে।
সেলিনা। চলাে, আমি তােমায় পৌছে দিয়ে আসি। ঘুমাও,
ঘুমাও মুখ উমিচঁাদ, বামন হয়ে চঁাদ ধরবার সাধ মুখেরই সাজে।
(লক্ষ্মী ও সেলিনা প্রস্থানেথত হইল। সহসা দয়ানন্দ আসিয়া
তাহাদের পথরােধ করিয়া দাঁড়াইল।)
দয়া! উমিচাদ ঘুমালেও, দয়ানন্দ জেগে আছে। তার চোখে
ধূলাে দেওয়া সামান্য নারীর কাজ নয়, সুন্দরী। ( অগ্নিময় দৃষ্টি নিক্ষেপ
করিল )
(সেলিনা ও লক্ষ্মীবাঈ চমকিয়া উঠিল)
লক্ষ্মী। (চঞ্চলতার সহিত) দয়ানন্দ ! শয়তান?
সেলিনা। আপনিই দয়ানন্দ দরবেশ ? ফকির-সন্ন্যাসী?
দয়া। হাঁ আমি-আমিই দয়ানন্দ। চঁাদ সাহেব, চঁাদ সাহেব
(উমিচাদের দিকে অগ্রসর হইল।)
সেলিনা। চাদ সাহেবের ঘুম আজ আর ভাঙবে না। বিষের
ক্রিয়া আরম্ভ হয়েছে (বিলােল হাস্য )
দয়া। বিষের ক্রিয়া ! ( সহসা সেলিনার হাত চাপিয়া ধরিল )
সেলিনা। হাঁ বিষ ! ছাড়,ন। আমি বিষকন্যা। সর্বাঙ্গে গােখরে
সাপের তীব্র বিষ মাখানাে।
পলাশী
৭৭
একি!
( দয়ানন হঠাৎ আতঙ্কিত হইয়া হাত ছাড়িয়া দিল। করুণ।
বিদ্যুৎ-বেগে তাহার কণ্ঠস্থিত মালার গােছ চাপিয়া ধরিয়া বুকের
উপর শানিত ছুরিকা ধরিল। দয়ানন্দ ভয়ে নির্বাক হইয়া পিছাইয়া
গেল।)
সেলিনা। আপনার চাদ সাহেবকে বলবেন, সেলিনা নটী হলেও
বারাঙ্গনা নয়। সে রাজা মােহনলালের ভগিনী করুণা দেবী।
( দয়ানন্দ ক্ষণেক হতভম্ব হইয়া চাহিয়া রহিল। লক্ষ্মী ও সেলিনা
পুনরায় প্রস্থানােত হইতে দয়ানন্দ হাত তুলিয়া ইসারা করিল। সঙ্গে
সঙ্গে তিনজন সশস্ত্র প্রহরী আসিয়া পথ রােধ করিল।)
করুণা।
দয়া। হাঃ হাঃ হাঃ, বিষকন্যা! এবার কোথায় পালাবে বিষ
কন্যা ? তােমার উদ্যত ফণা নুইয়ে দিতে জাগ্রত বিষহরীর দল
উপস্থিত। (প্রহরীদের প্রতি) বন্দী কর।
করুণা। দূরে দাড়াও, দূরে দাঁড়াও শয়তান! নইলে
দয়া। রমণীর হাতে ছুরীর ঝকমকানি! তাতে ভয় পাবে
সশস্ত্র যােদ্ধা! অগ্রসর হও, কালনাগিনীদের বন্দী কর ।
লক্ষ্মী। দিদি, দিদি-
(নেপথ্যে গুলির আওয়াজ হইল)
প্রহরী। একি! গুলি চালায় কে ?
দয়া। ভয় পেয়ােনা,-অগ্রসর হও, অগ্রসর হও।
৩
( পর পর তিনটী পিস্তলের গুলির আঘাতে, একে একে
প্রহরীরা সকলে ভূপতিত হইল)
দয়া। সর্বনাশ! কে আক্রমণ করলে! পালাই, পালাই
৭৮ পলাশী সােলেমান ও মােহনলালের প্রবেশ মােহন। কোথায় পালাবে শয়তান ! জীবন্ত মৃত্যু তােমার সম্মুখে ! ( বাম হস্তে দয়ানন্দের গলা টিপিয়া ধরিয়া, দক্ষিণ হস্তে পিস্তল উদ্যত করিলেন।) দয়। একি! রাজা মােহনলাল! দয়া করো, ক্ষমা করাে। মােহন। ক্ষমা ! হাঃ হাঃ হাঃ, দেবতার পূজারী তুমি, আজ মানুষের কাছে চাইছ ক্ষমা? ক্ষমা চাইতে তােমার লজ্জা করে না দয়ানন্দ! না—না, ক্ষমা নাই, তােমার শাস্তি মৃত্যু। সেলিনা। দাদা! সােলেমান। রাজা মােহনলাল,রাজা মোহনলাল ! মােহন। কে ? সােলেমান- সােল। ওকে হত্যা করে কি হবে রাজা। মােহন। ঠিক বলেছ সােলেমান। যাও দয়ানন্দ, তুমি মুক্ত। হ যাবার সময় শুনে যাও : হিন্দু সন্ন্যাসী হয়েও তুমি যে হিন্দু নারীর অবমাননার ষড়যন্ত্র করেছিলে, আমায় সংবাদ দিয়ে সেই হিন্দু নারীর মৰ্য্যাদা রক্ষা করেছে এই মুসলমান তরুণ–সােলেমান। দয়া। রাজা-রাজা! (মােহনলালের পদ প্রান্তে পড়িল।) মােহন। (দয়ানন্দের হাত ধরিয়া তুলিলেন) জাতির আজ পরম দুর্দিন। বাংলার আজ অগ্নিপরীক্ষার দিন। সেই পরীক্ষা দিতে রাত্রি প্রভাতে চলেছি আমরা পলাশীর প্রান্তরে। তার পূর্বে, যাও–যাও হে সন্ন্যাসী, ভগবানের কাছে বঙ্গেশ্বর সিরাজদ্দৌলার কল্যাণ ভিক্ষা কর। হিন্দু যদি মুসলমানের বেদনা বােঝে, মুসলমান যদি হিন্দুর জন্য বুক পেতে দাড়ায়, তাহলে কোন বিদেশী শক্তির সাধ্য নাই—এই পলাশী ৭৯ চিরপবিত্র জন্মভূমিকে পদানত করে। যাও হিন্দু, সিরাজের জন্য প্রার্থনা করাে। (সােলেমানের প্রতি) যাও, মুসলমান শহীদ! তােমার এই হিন্দু ভাই-এর জন্য খােদার কাছে প্রার্থনা করগে, যেন জীবন দিয়েও জন্মভূমির স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারি। বিদেশী বেনিয়া কোম্পানীর গৰ্বোন্নত শির যেন পলাশীর প্রান্তরে অবনমিত করতে পারি।
তৃতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য পলাশীর প্রান্তর। নবাব ফৌজের ছাউনী। পশ্চাতে আম্রবন, তাহার অপর দিকে পলাশীর রণক্ষেত্র দেখা যাইতেছে। ছাউনীর অদূরে নবাবের কামানশ্রেণী সজ্জিত। কামান গর্জন ও তৎসহ দূরে আর্তনাদ ও কোলাহল হইল। কামান গর্জনের অব্যবহিত পরেই মােহনলাল মঞ্চের পূরােভাগে আসিয়া দাড়াইল ও শত্রুপক্ষের গতিবিধি লক্ষ্য করিতে লাগিল। অন্য পার্শ্ব দিয়া হাবিলদার আলতাফ আসিয়া আদেশের অপেক্ষায় দাঁড়াইল। মােহন। ক্লাইভের সৈন্যরা এবার পিছু হেঁটে বাহির নালার কোলে আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে অগ্রসর হবার আর উপায় নাই। ওদিক থেকে যদি আমির খ। আর রায় দুর্লভ তাদের এক সঙ্গে আক্রমণ করে, তাহলে জয় অবশ্যম্ভাবী। ( অতিমাত্র ব্যগ্রতার সহিত চারিদিক লক্ষ্য করিতে লাগিলেন) আলতাফ। কিন্তু, জনাব মােহন। কিন্তু নাই আলতাফ। সূর্যাস্তের পূর্বেই ক্লাইভ সন্ধির প্রস্তাব পাঠাতে বাধ্য হবে। আল। কিন্তু জনাব, সিপাহসালার যে তফাতে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন! আমির খা, দুর্লভ রায়, কেউ ছাউনী ছেড়ে এগিয়ে যাননি। তারা শুধু পিছনে দাড়িয়ে লড়াই দেখছেন।
পলাশী
৮১
মােহন। লড়াই দেখছেন। বল কি আলতাফ ?
আল। মিথ্যা বলিনি, জনাব।
মােহন। মিথ্যা বলনি? ওকি! ওদিকে বাঁ পাশ দিয়ে একটু
একটু করে ইংরেজ গােলন্দাজরা এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে, না?
আল। বাঁ দিকে এসে সুবিধে করতে পারবে না, জনাব। মীর
সাহেব তার ফৌজ নিয়ে রুখে পঁড়িয়েছেন।
মােহন। সাবাস মীর সাহেব! সাবাস মীর মদন !
( ছুটিয়া মঞ্চের শেষ প্রান্তে গিয়া পুনরায় সতর্কতার সহিত
সৈনিকদের গতিবিধি লক্ষ্য করিলেন)
আলতাফ, তুমি পূব সীমানায় গিয়ে আর একবার ভাল করে
দেখে এসো। সিপাহসালার, আমির খা, আর রায় দুর্লভ কতদূর
অগ্রসর হয়েছেন। আর দেখ, সিপাহসালার যদি নবাবের তাবুতে
ফিরে গিয়ে থাকেন, তা হলে খাঁ সাহেব আর রায় দুর্লভকে জানাবে,
এদিক সুরক্ষিত আছে।
আল। যে হুকুম, জনাব।
( সেলাম করিয়া প্রস্থান)
( দুই পার্শ্বে দুইজন সশস্ত্র প্রহরীসহ সিরাজের প্রবেশ )
সিরাজ। সেনাপতি, রাজা মােহনলাল !
মােহন। আদেশ করুন, জাহাপনা।
সিরাজ। কোম্পানীর মুষ্টিমেয় সৈন্য আমাদের তােপের সামনে
বেশীক্ষণ টিকবে না। কলকাতা ও পূর্ণিয়ার যুদ্ধে যে বিজয়লক্ষ্মী
আপনার অঙ্কশায়িনী হয়েছে, আশা করি পলাশীতে তার মর্যাদা চির
উজ্জ্বল হবে।
৮২
পলাশী
মােহন। দোয়া করুন, শাহান শা।
সিরাজ। জনাব জাফর আলি আশ্বাস দিয়েছেন, রাজা মােহন
লাল আর ওমরাহ মীর মদন জীবিত থাকতে, বাংলার ফৌজ কোনদিন
শত্রুর কাছে মাথা নত করবে না। সে আশ্বাস যেন ব্যর্থ না
হয়, রাজা।
মােহন। ব্যর্থ হবে না, জাহাপনা। আপনি নিশ্চিন্তে রাজধানীতে
ফিরে যান। নবাবের জয় অবশ্যম্ভাবী।
সিরাজ। তাই যাবাে। জাফর আলিও আমায় সেই কথা
বলেছেন। তার অনুরােধেই আমি রাজধানীর পথে রওয়ানা হয়েছি।
কিন্তু দেখবেন রাজা, বাংলার মসনদ যেন বিপন্ন না হয়।
মােহন। মােহনলালের দেহে শেষ রক্তবিন্দু থাকতে সে নবাবের
ইজ্জৎ-সুবে বাংলার গৌরব কোনদিন কলঙ্কিত হতে দেবে না জনাব ।
সিরাজ। সে কথা জানি রাজা। তবুও সিপাহসালার আশঙ্কা
করেন, পাছে তার অমর্যাদা হয়। যদি সেনাপতিরা তাঁর আদেশ
পালনে কুণ্ঠিত হন ?
মােহন। ( চমকিয়া) সিপাহসালার ?
সিরাজ। হাসিপাহসালার। (ব্যগ্রতার সহিত মােহনলালের
হাত ধরিলেন। রাজা মােহনলাল! দুর্দিনের বন্ধু আমার, আদেশ
নয়, অনুরােধসিপাহসালারের মর্যাদা রাখবেন। তাকে বিশ্বাস
করা ছাড়া কোন উপায় নাই।
মােহন। (মস্তক নত করিয়া) জো হুকুম, জাহাপনা।
সিরাজ। পলাশ ! রক্তরাঙা পলাশীর দিগন্তে—কে জানে, আজ
নবীন বাংলার সূর্যোদয়ের অরুণভা, কিংবা বাংলার গৌরব রবি
অস্তাচলে বসে
পলাশী ৮৩ মােহন। জাহাপনা, কথা অসমাপ্ত রাখুন জনাব। প্রয়ােজন হলে মােহনলাল বুকের রক্তে বাংলার অস্তরবিকে ফিরিয়ে আনবে, নব গৌরবের উদয়াচলে। সিরাজ। ভাই, বন্ধু-রাজা মােহনলাল ! মােহন। সালাম-সালাম হজরৎ !—সালাম ! সিরাজ। সূর্যোদয় না সূৰ্যাস্ত ! বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ সূর্যোদয় না সূৰ্যাস্ত-( উদ্বিগ্নভাবে রণক্ষেত্র ত্যাগ)। মােহন। পলাশী। বাংলার পলাশী, বাঙ্গালীর পলাশী ! তােমার মুখে আজ ও কিসের হাসি খেলে যায়। (নেপথ্যে কোলাহল) একি! সহসা নবাব সৈন্য ছত্রভঙ্গ হ’ল কেন? সবাই ইতস্তত ছুটেছে! এর অর্থ কি? (একদল সৈনিকের প্রবেশ) কোথায় যাচ্ছ তোমরা? সৈনিকগণ। (কুনিশ করিয়া) হুজুর, যুদ্ধ আজ আর হবে না। মােহন। যুদ্ধ হবে না !-কেন? সৈনিক। সিপাহসালার হুকুম দিয়েছেন। মােহন। সিপাহসালার! সিপাহসালারের হুকুম ? সৈনিক। (ভয়ে) হ, জনাব। মােহন। না, না, তােমরা ফিরে যাও। আর একটা প্রহর। কোন রকমে আর একটা প্রহর যদি এমনি সাহসের সঙ্গে লড়তে পারে, শত্রুরা বিধ্বস্ত হবে। (ব্যগ্রতার সঙ্গে) যাও, যাও তাই, তােমাদের দেশের ইজ্জৎ-সুবে বাংলার স্বাধীনতা হেলায় হারিও না। যাও-যাও-
৮৪
পলাশী
সৈনিকগণ। ( ছুটিয়া পুনরায় অগ্রসর হইল) যে হুকুম, জনাব !
সিপাহসালার! প্রতিশােধ নিও না। সমগ্র হিন্দুমুসলমানের
স্বাধীনতার বিনিময়ে, তুমি প্রতিশােধ নিতে চেয়ােনা জনাব।
(দ্রুতপদে আলতাফের প্রবেশ)
কে, আলতাফ ? এনেছো, এনেছে। সংবাদ ?
আল। সিপাহসালার হুকুম দিয়েছেন, যুদ্ধ আজ আর হবে না।
মােহন। ( চমকিয়া উঠিলেন) সিপাহসালার নিজে দিয়েছেন এ
হুকুম ! সঠিক শুনেছ আলতাফ ?
আল। সঠিক শুনেছি জনাব। তিনি হুকুম দিয়ে ক্লাইভের সঙ্গে
সাক্ষাৎ করতে গেছেন।
মােহন। ক্লাইভের সঙ্গে সাক্ষাত করতে ।
আল। হাঁ। অধিকাংশ সেনাপতি তার আদেশে সৈন্য ছত্রভঙ্গ
করে দিয়েছেন। ইংরেজের গুলিতে মীরসাহেব হত।
সেনাদলও ওদের সঙ্গে যােগ দিয়ে পিছু হটে পালিয়েছে।
মােহন। ( চমকিয়া উঠিল) মীরসাহের হত! নবাবের বিশ্বস্ত
সেনানায়ক মীরমদন। আলতাফ, তুমি যাও বন্ধু, সৈন্যদের ফেরাও,
তাদের উৎসাহিত করাে, তাদের বলে—মােহনলাল যতক্ষণ পলাশীর
প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকবে, ততক্ষণ সিপাহসালারকে বাঙালী জাতির
মুখে কলঙ্কের কালি মাখাতে দেবে না। যাও–যাও- আলতাফের
প্রস্থান) সিপাহসালার মীরজাফর, তুমি একি সর্বনাশ করলে ! তুমি না
কোরাণ স্পর্শ করে শপথ করেছিলে ?
(মীরজাফরের প্রবেশ)
মীরজা। সেনাপতি মােহনলাল! শীঘ্র আপনার সৈন্যদের যুদ্ধে
পলাশী ৮৫ নিবৃত্ত করুন। সিপাহসালারের আদেশ অমান্য করে সৈন্তক্ষয় করবার অধিকার আপনার নেই। মােহন। আমার অধীনস্থ সৈনিকদের পরিচালিত করবার সম্পূর্ণ অধিকার আমার আছে, সিপাহসালার ! মীরজা। ভুলে যাবেন না রাজা বাহাদুর, যে আপনি নবাবের গেলাম। মােহন। সে কথা ভুলে যাইনি বলেই, নেমকহারামি করবার প্রবৃত্তি আমার নেই। মীরজা। স্মরণ রাখবেন, আপনি নবাবের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন-সিপাহসালারের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করবেন। মােহন। কিন্তু, তা বলে এ অন্যায় আদেশ মীরজা। ন্যায় অন্যায় বিচার করবার অধিকার আপনার নাই সেনাপতি। যদি কর্তব্যবােধ এতই প্রখর হয়, এ আদেশ যদি অন্যায় বোধ করেন- মােহন। জনাব মীরজাফর ! আমি ন্যায় অন্যায় বিচার করতে চাইনা। শুধু একটা ভিক্ষা আমায় দিন,-আপনার আদেশ প্রত্যাহার করুন। মীরজা। স্মরণ রাখবেন সেনাপতি, এ নবাবের দরবার নয়, পলাশীর রণক্ষেত্র। মােহন। সে কথা স্মরণ আছে বলেই আজ আপনার কাছে করযােড়ে ভিক্ষা চাইছি। প্রয়ােজন হয়, নবাবের ধনভাণ্ডার, রাজ- ঐশ্বৰ্য্য সর্বস্ব নি, গােলাম নতমস্তকে আপনার আদেশ মেনে নেবে। কিন্তু জনাব, আপনার কাছে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করছি, আমার
৮৬
পলাশী
জন্মভূমিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল পরাবেন না। এই সােনার বাংলাকে
বিদেশী বেনিয়ার পায়ে বিকিয়ে দেবেন না।
( মীরজাফরের পদতলে বসিস)
মীরজা। উঠুন রাজা! (কুর হাসির সঙ্গে আপনার পদমর্যাদা
বিস্মৃত হবেন না।
মােহন। জনাব! জনাব! এ যুদ্ধ বিরতি মানে, নবাবের পরাজয় ;
সমস্ত বাংলার পরাজয়। এ পরাজয় কেমন করে মাথা পেতে নেব
জনাব ?
মীরজা।
রাজা মােহনলাল! আমার আর বাক্যব্যয়ের সময়
নাই। আমার আদেশ, এই মুহূর্ত হতে আপনি পদচ্যুত।
হলে, নবাবের কাছে দরবার জানাতে পারেন।
( মােহনলাল শিহরিয়া উঠিল। ক্ষণেক চিন্তা করিয়া মীরজাফরের
পায়ের কাছে তরবারি ত্যাগ করিল।
মােহন। ভিখারী ব্রাহ্মণ, নিরুপায় তুমি ! কিন্তু স্মরণ রাখবেন
বাংলার ভাবী অধীশ্বর। বাঙালীর শিরে আজ যে ভীষণ বজ্রাঘাত হবে,
সেই বজ্রের নির্মম আঘাত আপনাকেও বুক পেতে সইতে হবে।
চৌচীর হয়ে যাবে ঐ কলিজা। স্বপ্নলােকের তাজমহল লুটিয়ে
পড়বে এই বাংলার মাটীতে। মােহনলাল জীবিত থাকতে, বাংলার
সিংহাসনে বেইমানের স্থান হবে না। (বেগে প্রস্থান)
( মীরজাফর চমকিয়া উঠিল)
দ্বিতীয় দৃশ্য
[ ভগবান গােল।। দানশা ফকিরের আস্তানার সন্নিকটস্থ পথ।
বেদনার্ত হৃদয়ে স্বামিজী গান গাহিয়া পথ অতিবাহন
করিতেছেন।
গান
আমার আঁখির জলে
নামিল শ্রাবণ ধারা।
ডুবিল আকাশে চাঁদ
নয়ন মুদিল তারা।
কালবৈশাখী ঝড়ে
আমার প্রদীপ নিবিল ঘরে,
আমি কাঁদি, আমি কাঁদি
মরুপথে পথহারা।
হায় পলাশী প্রান্তরে তাের
ঘনায় অন্ধকার।
কাদিছে ধাত্রী, যাত্রীরা কাঁদে,
উঠিতেছে হাহাকার।
বিধুরা বিবশ বঙ্গজননী
কাঁদিছে সর্বহারা।
ওরে ও পলাশী, সােনার বাংলা
করিলি অন্ধ কারা।
[ গান গাহিয়া প্রস্থান। অপর দিক হইতে দীনবেশে
৮৮
পলাশী
সিরাজ ও লুৎফার প্রবেশ।]
সিরাজ। হায় পলাশী, সােনার বাংলা করিলি অন্ধ কারা! হায়
পলাশী, সােনার বাংলা করিলি অন্ধকারা ! সারা বাংলার বুক ভেঙে
আজ অমনি কান্না উঠছে লুৎফা। আমার রাজ্য গেছে,
ঐশ্বৰ্য্য
গেছে, পলাশীর বেইমানি আমায় পথের ভিখারী করেছে।
তাতেও আমার দুঃখ নাই। কিন্তু ঐ কান্না—সারা বাংলার ঐ
বুকভাঙ্গা ওই আর্তনাদ! এ আমি কেমন করে সইব লুৎফা ? হায়
পলাশী ! হায় সর্বনাশী পলাশী !তুই এ কি করলি রাক্ষসী। আমার
সােনার বাংলার বুকে এ কি রক্তের বন্যা বইয়ে দিলি !
লুৎফা। হজরৎ, জনাব ! আপনি বারবার এমন অধৈৰ্য্য হলে,
এ বিপদের সময়-নারী আমি, আমি কেমন করে পথ চলার সাহস
পাব প্রভু ?
সিরাজ। না লুৎফা, আর অধৈৰ্য্য হব না। কিন্তু সারা দিন
খেয়ে, আর কেমন করে পথ চলবে তুমি ? তােমার মুখ শুকিয়ে
গেছে, শরীর কাঁপছে। এসাে, দেখি যদি কোথাও কিছু আহাৰ্য্য পাই।
লুৎফা। এখানে কে আমাদের আহাৰ্য্য দেবে ?
সিরাজ। ঐ যে, সামনে মনে হচ্ছে এক ফকিরের দরগাহ! ঐতে
ফকির সাহেব বেরিয়ে যাচ্ছেন। ফকির সাহেব—ফকির সাহেব।
নেপথ্যে দানশা।-কে ?
সিরাজ। আমরা মুসাফির। একবার এই দিকে আসুন হজরৎ।
( দানশার প্রবেশ )
দানশা। মুসাফির! আসুন—আসুন, আমার দরগায় এসে
তশরিফ রাখুন জনাব। মনে হয়, আপনার শরীফজাদা।
পলাশী
৮৯
সিরাজ। (আনত মস্তকে সেলাম জানাইয়া) ফকির সাহেব,
আপনার আতিথেয়তা জীবনে ভুলতে পারব না। যদি কোন দিন
সৌভাগ্য হয়, আবার আপনার দরগায় এসে পীরকে শিন্নি দিয়ে
যাবো। কিন্তু আজ আর বিলম্ব করবেন না। একটুখানি শিন্নি,
একটু খিচুড়ী, না হয়—যা থাকে তাই এনে দিন। (লুৎফাকে
দেখাইয়া) উনি বড় ক্ষুধার্ত।
দানশা। ( স্মিতমুখে) একটু সবুর করুন, মুসাফির। আপনার
বিশ্রাম করুণ। আমি অবিলম্বে খিচুড়ী পাকিয়ে শিন্নি করে দেব।
লুৎফা। (সিরাজকে) না, চলুন। অপেক্ষা করতে হবে না।
আমি খাবাে না কিছু।
সিরাজ। তুমি বুঝবে না।
কাল থেকে খাওয়া হয়নি তােমার।
অতদূর পথ, কেমন করে যাবে বেগম সাহেবা ? (ফকিরের প্রতি)
ফকির সাহেব, খিচুড়ী পাকাবার দরকার হবে না। ঘরে যা আছে,
তাই একটু দিন।
দানশা। আমায় লজ্জা দেবেন না। এ ফকিরখানায় এমন কিছু
নেই, যা দিয়ে আপনাদের ক্ষুধানিবৃত্তি হতে পারে। বিলম্ব হবে না
বেগম সাহেবা, একটু-একটু সবুর করুন ! তশরিফ রাখুন।
( বহুমূল্য পাদুকার দিকে দৃষ্টি পড়িল। ফকির চমকিয়া উঠিল ও
বিস্ফারিত নেত্রে উভয়ের দিকে চাহিয়া রহিল )
আপ-না-রা? (নিজেকে সংযত করিয়া) হয়তাে অনেক দূর পথ
যাবেন! একটু বিশ্রাম করে খেয়ে না গেলে, নিশ্চয়ই আপনাদের
কষ্ট হবে। দেরী করবাে না আমি। (উচ্চকণ্ঠে ডাকিল ) মুস্তাফা।
মুস্তাফা ! ( ডাকিতে ডাকিতে বাহির হইয়া গেল।)
পলাশী লুৎফা। না-না, বিশ্রামের প্রয়ােজন নেই। চলুন বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে যেখানে হয় বিশ্রাম করবেন। সিরাজ। ভয় নেই, লুৎফা। ফকিরের আস্তানায় আশ্রয় নিয়েছি। তার অনুরোধ উপেক্ষা করে গুণাহ সঞ্চয় করতে আর যে আমার সাহস হয় না বেগম সাহেবা। লুফা। তা জানি। কিন্তু তবুও ভয় হয়। জানি না, কেন আমার বুকের ভেতরটা থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। চলুন—চলুন আপনি। সিরাজ। নসীবকে এড়িয়ে কোথায় গিয়ে বাঁচবে বেগম সাহেবা ? লুৎফা। নসীব! সবই আমাদের নসীব ? বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার অধিপতি আজ একমুঠো ভাতের জন্যে ফকিরের দরগায় ধন্না দিয়েছে। কার ভাত! কে ভিক্ষা করে ? এও আপনি নসীব বলে মেনে নেবেন জনাব ? সিরাজ। নসীব ছাড়া আর কি বলতে পারি লুৎফা। লুৎফা। শয়তানের ষড়যন্ত্রে নবাব সিংহাসনচ্যুত হয়, ফকিরের দরগায় কাঙ্গালের মত হাত বাড়িয়ে অন্ন ভিক্ষা করে, এও নসীব জনাব ? কিন্তু বিশ্বাস হয় না। আমি পারি না বিশ্বাস করতে। নসীব যারা সৃষ্টি করেছে, তারা সব পারে। চলুন, চলুন নবাব, অন্ততঃ মুর্শিদাবাদের সীমানা ছাড়িয়ে সিরাজ। মুর্শিদাবাদের সীমানা ছাড়িয়ে! লুৎফা ! মুর্শিদাবাদের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে আজ বুকের ভিতর যে কি আৰ্তনাদ উঠছে, তা তুমি বুঝবে না। এই মাটি, এই মাটি আজ মায়ের মত দুহাত বাড়িয়ে ডাকছে—ওরে সিরাজ, ফিরে আয়—ফিরে আয়। কিন্তু কে শুনবে সে আহবান! ( দুহাতে মাটি আঁকড়াইয়া ধরিলেন) আঃ, আমার
পলাশী
দেশের মাটি! এই মাটিই আমার স্বর্গ! না—না, আমি যাব না-
যাব না! (সহসা উদভ্রান্ত হইয়া পড়িলেন) মুর্শিদাবাদ ছেড়ে আমি
কোথাও যাব না লুৎফা।
লুৎফা। (দুহাতে সিরাজকে ধরিয়া) নবাব ! নবাব !
সিরাজ। (নীরব)
লুফা। ধৈৰ্য্য হারাবেন না প্রভু !
সিরাজ। না, আর আমি ধৈৰ্য্য হারাব না লুৎফা। পলাশীর পরাজয়
মাথা পেতে নিয়ে, আমি আমার সােনার বাংলাকে দুনিয়ার দরবারে
চিরদিন লাঞ্ছিত হতে দেবাে না। আমি পাটনায় যাবাে। সেখানে
রাজা জানকীরাম আছেন। তার সাহায্যে আবার সৈন্য সংগ্রহ
করবে। আবার আমি যুদ্ধ করবে। বিশ্বের দরবারে আমার সােনার
বাংলাকে আবার মাথা উচু করে দাঁড় করাবাে। চলাে, চলাে লুঙ্কা।
ফকিরের কাছে বিদায় নিয়ে চলে যাই (উঠিয়া দাড়াইলেন) ফকির
সাহেব! সুফী দরবেশ।
লুৎফা। আর কালবিলম্ব করবেন না, নবাব। আমার ভয় করছে ।
কি জানি, যদি কোন বিপদ এসে পড়ে!
সিরাজ।
সে আশঙ্কা তো সব সময়ই আছে লুৎফা! ওরা যখনই
শুনবে, আমরা রাজধানী ছেড়ে এসেছি, আমাদের অনুসন্ধান করতে
চেষ্টার ত্রুটি করবে না। চারিদিকে ঘােড়-সােওয়ার পাঠিয়ে খবরদারি
করবে।
( দানশ ফকিরের প্রবেশ)
দানশা। এই যে জনাব ! আর দেরী নাই, একটু-একটু বিশ্রাম
করবেন, আসুন। পীরের দরগায় ধরে দিয়েছি খিচুড়ীর শিন্নি।
সিরাজ। আহারের আর প্রয়ােজন হবে না, ফকির সাহেব।
পলাশী
আমাদের ক্লান্তি দূর হয়েছে। আবার ফিরে আসবাে একদিন
আপনার দরগায়। আজ বিদায় দিন।
দানশা। ( অনুনয়ের সঙ্গে। তা হয় না, অতিথি। আমি নিঃস্ব
ফকির। দয়া করে যখন গরীবখানায় পদধূলি দিয়েছেন, তখন অভূক্ত
যেতে দেবে না জনাব। অন্ন প্রস্তুত।
লুৎফা।
তা হোক।
দানশা। তা হয় না, বেগম সাহেবা ! না না, গােস্তাকি মাপ
করবেন। তৈরী খানা ছেড়ে আমি আপনাদের যেতে দেবাে না।
মুস্তাফা-মুস্তাফা !
(মুস্তাফার প্রবেশ )
এই যে মুস্তাফা–যাও, এদের দরগায় নিয়ে যাও।
মুস্তাফা। আসুন জনাব
সিরাজ। অদৃষ্টে যা আছে, তাই হােক ! চল, লুৎফা।
[ মুস্তাফাসহ সিরাজ ও লুৎফার প্রস্থান।]
দানশা। পায়ে অত দামী জুতাে দেখেই আমি ঠিক চিনতে
পেরেছি--কে-
নেপথ্যে। ফকির সাহেব! ফকির সাহেব !
দামশা। কে-কে ?
( মীরণ ও দুইজন রক্ষীর প্রবেশ
মীরণ। ফকির সাহেব
দানশা। আপনি।
মীরণ। আমি মীরণ—
দানশা। ওঃ, সিপাহসালার জাফর আলির পুত্র ! আসুন জনাব।
পলাশী মীরণ। হাঁ, তােমার প্রেরিত সংবাদ পেয়েই আমি দ্রুত অশ্বারােহণে ছুটে এসেছি। তারা কোথায় ? দানশা। আমার দরগায়। আসুন দেখিয়ে দিচ্ছি। খিচুড়ী খাওয়াব বলে বসিয়ে রেখেছি। নবাবের মুখ শুকিয়ে গেছে ; বেগম ক্ষিদের জ্বালায় চলতে পারছে না। তারা কল্পনাও করতে পারেনি যে, খিচুড়ী খাওয়ার কি চমৎকার ব্যবস্থা করে রেখেছি। আসুন, আমুন- মীরণ। (রক্ষীদের অনুগমনের ইঙ্গিত করিয়া ফকিরের সঙ্গে সঙ্গে চলিল।) তৃতীয় দৃশ্য [ মুর্শিদাবাদ প্রাসাদের কক্ষ। কক্ষমধ্যে একাকী অস্থিরপদে মেহের-উন্নেসা পায়চারি করিতেছেন। প্রতিটি গতিভঙ্গীতে ভয়াবহ হিংস্রতা ; সেই সঙ্গে মাঝে মাঝে উদ্দেশ্য সিদ্ধির বিজয়ােল্লাসে দৃপ্ত হইয়া উঠিতেছেন। কক্ষের পশ্চাৎ-ভাগে অর্ধগােলাকৃতি প্রশস্ত লৌহদ্বার উন্মুক্ত। ] মেহের। মতিঝিল হতে আমন্ত্রণ করে এনে, সিরাজ কৌশলে আমায় বন্দী করেছে তার প্রাসাদে। এই ঘসেটি বেগমের চোখের আগুনে নবাব শরফরাজ পতঙ্গের মত পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কুট রাজনীতিতে পূর্নিয়ার সিংহাসন বিধ্বস্ত হয়েছে। অর্ধবঙ্গের অধিষ্ঠাতা রাজা রাজবল্লভের অন্তর তীব্র বিষে জর্জরিত হয়েছে। এবার সিরাজের পালা—( অন্তরীক্ষে লক্ষ্য করিয়া) আগা সাহেব! আগা সাহেব।
৯৪
পলাশী
(আগা সমসেরের প্রবেশ)
আগা। নবাবজাদি।
মেহের। নবাব রাজধানী ছেড়ে চলে গেছেন?
আগা। হ—তিনি নৌকায় ভগবানগােলার পথে যাত্রা করেছেন।
মেহের। বেগম লুৎফা ?
আগা। তিনিও সঙ্গে গেছেন।
মেহের। বাকী রইলেন কে ? যে-ই থাক্, এইখানেই যবনিকা
পতন হবে না। সিপাহসালার মীরজাফরের চক্রান্তে নবাবের সৈন্তের?
ছত্রভঙ্গ হয়ে পলাশী ত্যাগ করেছে। কেমন ?
আগা। হাঁ, বেগম সাহেবা।
মেহের। সেনাপতি মােহনলাল পদচ্যুত! মীরমদন নিহত !
পেশােয়ারী বেইমান উমিচাদ, রায় দুর্লভ, আমির খা আর জনাব জাফর
আলি কোম্পানীর সাহেবদের সঙ্গে সন্ধি করবার জন্যে দাদপুরের পথে
অগ্রসর হয়েছেন? তাই না?
আগা। হা।
মেহের। এবার—এবার মীরজাফর নবাব হবে। কিন্তু যে স্বজাতির
প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাকে শয়তানেও বিশ্বাস করে না।
আগা। করতে পারে না শাহাজাদি। কিন্তু রবার্ট ক্লাইভ আর
ওয়াটসন সাহেব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—জাফর-আলিকে বাংলার
সিংহাসনে বসাবেন।
মেহের। হাঁ, অন্ততঃ কিছুদিন না বসালে নূতন রাজ্য করতলগত
হবে না।
আগা। তা জানি। কিন্তু বেগম সাহেবা, এ যুদ্ধের পরিণাম
এইখানেই শেষ নয়। সেনাপতি মােহনলাল-হাবিলদার আলতাফ
পলাশী
আর নবাবের অন্যান্য বিশ্বস্ত সেনানায়কেরা শেষ সংগ্রাম করবেই।
মােহনলাল পলাশী থেকে রাজধানীর পথে ফিরেছেন। নুতন সৈন্যদল
নিয়ে তিনি রাজধানীর পথ রােধ করবেন। দাদপুরের সন্ধি তারা
মানবেন না।
মেহের। মােহনলাল মুর্শিদাবাদে ফিরেছে ?
আগা। শুধু ফিরেছেন তাই নয়, রহমৎ খর সাহায্যে গােলা-
বারুদ সংগ্রহ করে, নতুন
সৈন্য সমাবেশও নাকি করেছেন।
মেহের। ( চিন্তিত ভাবে) পদচ্যুত সেনাপতির আদেশে রহমৎ
খ। গোলাবারুদ সরবরাহ করবেন কেন? আর সৈন্যেরাই বা তার
আদেশ মানবে কেন?
আগা। মানবে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে। মােহনলাল
পদচ্যুত সেনাপতি হলেও সে বাঙালী,বাঙলার স্বাধীনতা রক্ষার
অধিকার তার জন্মগত। তা ছাড়া, নবাব সিরাজদ্দৌলা মীরজাফরের
আদেশ এখনও সমর্থন করেন নি।
মেহের। (সহসা উভ্রান্ত হইয়া উঠিলেন, ক্ষণেক্ষ উৎকর্ণ থাকিয়া
যেন কি শুনিবার চেষ্টা করিলেন) আগা সাহেব! আগা সাহেব।
ওই শুনুন—শুনুন নবাব আলিবর্দীর কান্না। প্রাসাদের কক্ষে কক্ষে
প্রতিধ্বনি! ( ব্যস্ততা ও অনুনয়ের সহিত) আর নয়, আগা সাহেব
যেমন করে হােক, আমায় প্রাসাদের বাইরে নিয়ে চলুন। আমি
বন্দী। নবাব আলিবর্দীর কন্যা মেহেরউন্নেসা আজ পিতৃগৃহে বন্দী।
বাইরে সশস্ত্র প্রহরী। আর নয়, আগা সাহেব।
আগা। ব্যস্ত হবেন না শাহাজাদি। আগা সমসের জীবিত
থাকতে ঘসেটি বেগম লাঞ্ছিত হবে না। আপনি প্রস্তুত থাকবেন,
পলাশী যেমন করে হােক, মুক্ত করব। যদি জীবন বিপন্ন হয়, তবুও পশ্চাৎপদ হব না। t [ অভিবাদন করিয়া প্রস্থান ] মেহের। প্রস্তুত প্রস্তুত আমি সৰ্ব্বদাই আগা সাহেব। (ক্ষণেক নীরব থাকিয়া) কার্যসিদ্ধি হয়েছে। তবুও যেন নিশ্চিন্ত হতে পারি । সিরাজ যাবে, জাফর আলি বসবে বাংলার সিংহাসনে। ঘসেটির যে অধিকার এত দিন ছিল, সে অধিকারটুকুও এবার লুপ্ত হবে। না না,তা হতে দেবাে না। বাংলার সিংহাসন যদি রসাতলে যায়, তবুও ঘসেটির সঙ্কল্প ব্যর্থ হবে না। সুলতানা রাজিয়া শাসনদণ্ড হাতে নিয়ে অধিষ্ঠিত হয়েছিল পিতৃসিংহাসনে, আর ঘসেটি খেয়ালখুসীর আতস- বাজী খেলবে তার স্বােপার্জিত সিংহাসন নিয়ে। যদি প্রয়ােজন হয়, সুবে বাংলার সিংহাসন চিরদিনের মত সে ডুবিয়ে দেবে ওই গঙ্গার জলে। (সহস। বাহিরে কোলাহল ) ও কি! ও কি !-কিসের কোলাহল ! নেপথ্যে। নবাব কোথায়! নবাব ? সুবে বাংলার মালেক নবাব সিরাজদ্দৌলা!-কোথায়? মেহের। নবাব! সুবে বাংলার মালেক নবাব সিরাজদ্দৌলা। ( আগ সমসেরের প্রবেশ ) আগা। নবাব সিরাজদ্দৌলা বন্দী। মেহের। বন্দী। আগা। দানশা ফকির ধরিয়ে দিয়েছে। জাফর আলির পুত্র মীরণ আসছে তাকে বন্দী করে নিয়ে মুর্শিদাবাদে। নেপথ্যে। নবাব কোথায়, কোথায় নবাব বাহাদুর ?
পলাশী, মেহের। কিন্তু, ওরা কারা আগা সাহে: আগা। রাজা মােহনলাল এ প্রাসাদ করেছে। এ প্রাসাদ অবরুদ্ধ। মেহের। প্রাসাদ অবরুদ্ধ ? আগা। হাঁ। নবাব সিরাজদ্দৌলা প্রাসাদে আসছে সিরাজের অনুসন্ধানে। মেহের। সিরাজের সন্ধানে মােহনলাল ! সিরাজ বশ, এবার বাকী ওই মােহনলাল! ঘসেটির প্রতিহিংসা—ঘসেটির প্রতিহিংসা- [ প্রস্থান ] ( অপর দিক হইতে মােহনলাল, লক্ষ্মীবাই ও সেলিনার প্রবেশ ) মােহন। নবাব কোথায় ?-নবাব ? ( প্রবেশ করিতেই সহসা আগা সমসেরের সহিত মােহনলালের সাক্ষাৎ হইয়া গেল।) একি! আগা সাহেব। আপনি এসেছেন ফিরে ? আগা। বাংলার স্বাধীনতা বিপন্ন, না এসে তো পারি না রাজা। (মােহনলালের সহিত হাত মিলাইল) মােহন। বাংলা আজ সত্যই বিপন্ন সেনাপতি। সিপাহসালার ধড়যন্ত্র করেছেন। আমরা মানবে না সে সন্ধি। মেহের। (কক্ষের অন্তরাল হইতে) সেনাপতি-রাজা মােহন- লাল! নবাব অধীর প্রতীক্ষায় আপনার পথ চেয়ে আছেন। মােহন। কে-কে আপনি? নবাব কোথায় ? মেহের। নবাব আপনারই প্রতীক্ষায় ঐ সামনের কক্ষে বুয়েছেন!
পলাশ
মাগ।
হম খাকে।
প্রাণ,
::: নাব, আপা
"""'ণ করছেন,
সমত করুন।
মােহন। (উভ্রান্ত ভাবে কক্ষ মনে
কোথায়
স! হজরৎ |
"
মেহের। ( তীব্র শ্লেষের সঙ্গে)
সেই সঙ্গে কক্ষের গরাদযুক্ত
২ল পিঞ্জরাবদ্ধভাবে বন্দী হইলে
মােহন। একি! একি , আমি
ঘসেটির ষড়যন্ত্র !
লক্ষ্মী। বেগম সাহেবা-বেগম ,
সেলিনা। কোথায় বেগম সাহেব
বাংলার শেষ আশার প্রদীপ এমন ক
সাহেবা, বেগম সাহেবা !
হন।
অনুরােধ করছ
শা। এরা কেউ পলাশীর মহা
দেবে না। এৰে বাংলার নবাব ছিল।
হালা তুমি আজ কোথায়, জা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.