Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Charit-katha
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ভৱিতকথা
শ্রীরামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী এ এ
প্রণীত
মূল • দশ আনা মাত্র
কলিকাতা, ৯১১২ মেছুয়াবাজার ষ্ট্রীট, “নববিভাকর যন্ত্রে শ্রীগােপালচন্দ্র নিয়ােগী কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত। ৩১ ০
हौ
প
।'
g,৩১৩)
৪৩
৪৭
বিষয়
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ
হর্মান হেলমূহেলজ
সআচাৰ্য্য মক্ষমূলর ১
উমেশচন্দ্র বটব্যাল
রজনীকান্ত গুপ্ত (১)
রজনীকান্ত গুপ্ত (২)
বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর
( সাহিত্য, ভাদ্র ১৩০৩)
| বঙ্গদর্শন, ১৩১৩)
{ বঙ্গদর্শন, ফাল্গুন, ১৩১১)
( সাহিত্য, চৈত্র, ১৩০১)
(ভারতী, মাঘ, ১৩৩৭ )
( সাহিত্য,
মাঘ, ১৩০৫)
( সাহিত্য, জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৭ )
সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা, সপ্তম ভাগ) ৯০
৭০
৮৪
No text on this page.
নিবেদন এই পুস্তকের অন্তর্গত প্রবন্ধগুলির মধ্যে কয়েকটি প্রকাশ্য সভায় পঠিত হইয়াছিল । বিদ্যাসাগর মহাশয়ের চরিতকথা ১৩০৩ সালের এই শ্রাবণ এমেরাল্ড থিয়েটারে বিদ্যাসাগর ইনষ্টিটুট কর্তৃক আহুত স্মৃতিসভায় পঠিত হয়। মাননীয় শ্ৰীযুক্ত নীলাম্বর মুখােপাধ্যায় মহাশয় ঐ সভায় সভাপতি ছিলেন। ১৩১২ সালের ২৬শে চৈত্র তারিখে ক্লাসিক থিয়েটারে আহুত সভায় বঙ্কিমবাবুর চরিতকৃথা পাঠ করি । শ্ৰীযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ঐ সভায় সভাপতির আসন গ্রহণ করিয়াছিলেন। মহর্ষি দেবেন্দ্র নার্থের তিরােভাবের কিছু দিন পরে বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ জেনেরাল এ্যাসেমসি কলেজের হলে যে শোকসভা আহ্বান করেন, তাহাতে তাহার সম্বন্ধে ক্ষুদ্র প্রবন্ধটি পঠিত হয়। অধ্যাপক মক্ষমূলর ও রজনীকান্ত গুপ্ত সম্বন্ধে প্রথম প্রবন্ধ, এই দুইটিও তাহাদের মৃত্যুর পর সাহিত্য-পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে পড়িয়াছিলাম। অবশিষ্ট প্রবন্ধ কয়টি কোন সভায় পঠিত হয় নাই। বলেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর প্রকাশিত তদীয় গ্রন্থাবলীর ভূমিক: আমাকে লিখিতে হইয়াছিল ; ঐ ভূমিকাটিও এই সংগ্রহগুলির মধ্যে সন্নিবিষ্ট করিলাম। বিদ্যাসাগর মহাশয় ও.বঙ্কিমচন্দ্র সম্বন্ধে প্রবন্ধ দুইটির কিয়দংশ বৰ্জন করিয়াছি। অন্য প্রবন্ধগুলিতে বিশেষ পরিবর্তন করি নাই। কোন্ প্রবন্ধ কোন পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হইয়াছিল, সূচীপত্রে তাহার উল্লেখ থাকিল । • কলিকাতা ৫ই ভাদ্র শ্রীরামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ১৩২০
No text on this page.
শ্ৰীযুক্ত রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী কৃত
Slo
কৰ্ম্মকথা
চরিত-কথা
জিজ্ঞাসা (২য় সংস্করণ, যন্ত্রস্থ )
leys
১ls
f
রামেন্দ্র বাবুর পুস্তকের পরিচয় দেওয়া অনাবশ্যক। বাঙ্গালা গ্রন্থ এরূপ
চিন্তাশীলতার পরিচয় অতি অল্পই দেখা যায়। চরিত-কথায় বিদ্যাসাগর,
বঙ্কিমচন্দ্র, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচাৰ্য মােক্ষমূলর, উমেশচন্দ্র বটব্যাল,
রজনীকান্ত গুপ্ত প্রভৃতি জন মনীষীর সম্বন্ধে অতি সারগর্ভ প্রবন্ধ আছে।
ছাপা, কাগজ ও বান্ধা উৎকৃষ্ট।
সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটারী, এ, সি, দত্ত, চক্রবর্তী চাটার্জি কোম্পানি
প্রভৃতি প্রধান প্রধান পুস্তক বিক্রেতার নিকট প্রাপ্তব্য।
প্রকাশক শ্ৰীঅনুকূলচন্দ্র ঘােষ
১৩ প্রেমাদ বড়াল স্ট্রীট, কলিকাতা।
No text on this page.
চৱিত-কথা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রত্নাকরের রামনাম উচ্চারণে অধিকার ছিল না। অগত্যা মরা মরা বলিয়া তাহাকে উদ্ধার লাভ করিতে হইয়াছিল। এই পুরাতন পৌরাণিক নজীরের দোহাই দিয়া আমাদিগকেও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নামকীর্তনে প্রবৃত্ত হইতে হইবে। নতুবা ঐ নাম গ্রহণ করিতে আমাদের কোনরূপ অধিকার আছে কি না, এ বিষয়ে ঘাের সংশয় আরম্ভেই উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা। বস্তুতই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এত বড় ও আমরা এত ছােট, তিনি এত সােজা ও আমরা এত বাঁকা, যে, তঁাহার নামগ্ৰহণ আমাদের পক্ষে বিষম আস্পর্ধার কথা বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে। বাঙ্গালী জাতির প্রাচীন ইতিহাস কেমন ছিল, ঠিক স্পষ্ট জানিবার উপায় নাই। লক্ষ্মণসেনঘটিত প্রাচীন কিংবদন্তীটা অনৈতিহাসিক বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া যাইতে পারে । কিন্তু পলাশির লড়াইএর কিছু দিন পূৰ্ব্ব হইতে আজ পর্যন্ত বাঙ্গালীর চরিত্র ইতিহাসে যে স্থান লাভ করিয়া আসিয়াছে, বিদ্যাসাগরের চরিত্র তাহ অপেক্ষায় এত উচ্চে অবস্থিত যে, তাঁহাকে বাঙ্গালী বলিয়া পরিচয় দিতেই অনেক সময়ে কুষ্ঠিত হইতে হয়। বাগ্যত কৰ্ম্মনিষ্ঠ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও আমাদের মত বাকসর্বস্ব সাধারণ বাঙ্গালী, উভয়ের মধ্যে এত ব্যবধান যে, স্বজাতীয় পরিচয়ে তাহার গুণকীৰ্ত্তন দ্বারা ২ চরিতকথা প্রকারান্তরে আত্মগৌরব খ্যাপন করিতে গেলে, বােধ হয়, আমাদের পাপের মাত্রা আরও বাড়িয়া যাইতে পারে। আমাদের প্রত্যেক অনুষ্ঠানে সহৃদয়তার এত অভাব ও মৌখিকতার এত প্রভাব যে, অন্য যে আমরা তাহার স্মৃতির উপাসনার জন্য একত্র হইয়াছি, এই উপাসনা বা রটাই একটা ভণ্ডামি নহে, তাহা প্রমাণ করা দুষ্কর। আমরা তাহার তর্পণােদ্দেশে যে বক্ত তাময় বারির অঞ্জলি প্রদান করিতে উপস্থিত হইয়াছি, তাহার প্রেতপুরুষ যদি অবজ্ঞার সহিত তাহা গ্রহণ করিতে পরান্মুখ হয়েন, তাহা হইলে আমাদের পক্ষসমর্থনে বলিবার কথা কি আছে, সহজে খুজিয়া পাই না। বিদ্যাসাগরের উপাসনায় এই অধিকার অনধিকারের কথা আসে বলিয়া প্রথমেই আমাকে রত্নাকরের নজীর আশ্ৰয় করিতে হইয়াছে। বিদ্যাসাগরের উপাসনায় আমাদের অধিকার না থাকিতে পারে ; এবং বিদ্যাসাগরের জীবনের ও বিদ্যাসাগরের চরিত্রের সম্পূর্ণ তাৎপৰ্য্য আমাদের সম্পূর্ণ হৃদয়ঙ্গম হওয়াও হয়ত অসম্ভব। তথাপি এই সাংবৎসরিক উপাসনা বর্ষে বর্ষে অনুষ্ঠিত হইয়া আমাদের জাতীয় চরিত্রের কলঙ্ক ক্রমশ ধৌত করিবে, এই আমাদের একমাত্র ভরসা। পূজিতের প্রীতি-উৎপাদন, বােধ হয়, আমাদের শাস্ত্রবিহিত শ্রাদ্ধতৰ্পণাদি ব্যাপারের উদ্দেশ্য নহে পূজক আত্মােন্নতি বিধানের জন্য ঐ সকল অনুষ্ঠানসাধনে বাধ্য। বিদ্যাসাগরের প্রেতপুরুষের প্রীতিজনন আমাদের অসাধ্য হইলেও, আমরা স্বার্থের অনুরােধে ঐ কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হইতে পারি। কিন্তু প্রথমেই বিদ্যাসাগরকে আমাদের বলিয়া পরিচয় দিব কি না, সেই ঘাের সমস্যা আসিয়া দাঁড়ায়। সেই প্রকাণ্ড মানবতাকে সঙ্কীর্ণ বাঙ্গালীত্বের সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখিতে যাওয়া নিতান্ত ধৃষ্টতা বলিয়া মনে হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবদ্দশাতে তাঁহার স্বজাতি তাহার নিকট আপনার যে মূত্তি দেখাইয়াছিল, তাহা তাহার জীবনকাহিনীপাঠে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কতটা অনুমান করা যাইতে পারে। তঁাহার আত্মীয় বন্ধুগণের সম্পর্কে আসিয়া তাহাকে পদে পদে লজ্জিত ও প্রতারিত হইতে হইয়াছে, ইহার ভূরি উদাহরণ তাহার জীবনের আখ্যায়িকামধ্যে সঙ্কলিত আছে। যদি কোন বৈদেশিক আমাদের জাতীয় চরিত্রের ছবি আঁকিতে প্রয়াসী হয়েন, তাহাকে মসীবর্ণ সংগ্রহ করিবার জন্য অধিক প্রয়াস পাইতে হইবে ; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘চরিতলেখকগণ প্রচুরপরিমাণে ঐ সকল সামগ্রী একাধারে সংগ্রহ করিয়া রাখিয়াছেন। অণুবীক্ষণ নামে এক রকম যন্ত্র আছে, যাহাতে ছােট জিনিষকে বড় করিয়া দেখায় ; বড় জিনিষকে ঘােট দেখাইবার নিমিত্ত উপায় পদার্থ- বিদ্যাশাস্ত্রে নির্দিষ্ট থাকিলেও, ঐ উদ্দেশ্যে নির্মিত কোন যন্ত্র আমাদের মধ্যে সর্বদা ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু বিদ্যাসাগরের জীবনচরিত বড় জিনিষকে ছােট দেখাইবার জন্য নির্মিত যন্ত্রস্বরূপ। আমাদের দেশের মধ্যে যাঁহারা খুব বড় বলিয়া আমাদের নিকট পরিচিত, ঐ গ্রন্থ একখানি সম্মুখে ধরিবামাত্র তাহারা সহসা অতিমাত্র ক্ষুদ্র হইয়া পড়েন; এবং এই যে বাঙ্গালীত্ব লইয়া আমরা অহােরাত্র আস্ফালন করিয়া থাকি, তাহাও অতি ক্ষুদ্র ও শীর্ণ কলেবর ধারণ করে। এই চতুষ্পশ্বস্থ ক্ষুদ্রতার মধ্যস্থলে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ধবল পৰ্ব্বতের ন্যায় শীর্ষ তুলিয়া দণ্ডায়মান থাকে ; কাহারও সাধ্য নাই যে, সেই উচ্চ চূড়া অতিক্রম করে বা স্পর্শ করে। পূৰ্বেই বলিয়াছি, অনর্থক আত্মগ্লানির অবতারণা আমার অভিপ্রেত নহে। কিন্তু বিদ্যাসাগরকে আপনার বলিয়া তাহার সমীপস্থ হইতে তুলনায় আত্মগ্লানি আপনা হইতে আসিয়া পড়ে। বাস্তবিকই বিদ্যাসাগরের উন্নত সুদৃঢ় চরিত্রে যাহা মেরুদণ্ড, সাধারণ বাঙ্গালীর চরিত্রে তাহার একান্তই অসম্ভব। প্রাণিতত্ত্ববিদেরা মেরুদণ্ড দেখিয়া সমগ্র প্রাণিসমষ্টিকে উন্নত ও অনুন্নত দুই প্রধান পৰ্য্যায়ে ভাগ করে। মেরুদণ্ডের অস্তিত্ব প্রাণীর পক্ষে সামর্থ্যের ও আত্মনির্ভরশক্তির প্রধান পরিচয়। বিদ্যাসাগর ০ ৪ চরিত-কথা যে সামর্থ্য ও আত্মনির্ভরশক্তি লইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, সাধারণ বাঙ্গালী-চরিত্রে তাহার তুলনা মিলে না। একটা কথা আজকাল অহরহঃ শুনিতে পাওয়া যায় । বর্তমান রাজকীয় শাসনে চারি দিকে আমাদিগের জাতীয় অভ্যুদয়ের লক্ষণ দেখা দিয়াছে। অতি প্রাচীন কালে যখন হিন্দু রাজা হিন্দুরাজ্যে শাসনদণ্ড পরিচালনা করিতেন, তখন আমাদের জাতীয় অবস্থা সমধিক উন্নত ছিল, অনেকে এ কথা অস্বীকার করেন না; অন্ততঃ হিন্দুজাতির পুরাবৃত্তের অভাবে এ কথা লইয়া তর্ক বিতর্ক যতক্ষণ ইচ্ছা চালান যাইতে পারে। কিন্তু গত কয় শত বৎসরে আমাদের দুর্দশার যে একশেষ ঘটিয়াছিল, এবং বর্তমানকালে আমাদের সামাজিক জীবন সঙ্কটাপন্ন মুমুষু অবস্থা হইতে ফিরিয়া আসিয়াছে, ইহা একরকম সৰ্ববাদিসম্মত সত্য। এই নবজীবনসঞ্চারের কয়েকটা বড় বড় লক্ষণ দেখিতে পাওয়া যায়। একটা প্রধান লক্ষণ, আমাদের জাতীয় রুচির পরিবর্তন ও জাতীয় সাহিত্যের বিকাশ। বেহুলার নাচ দেখিন্না স্বর্গের দেবগণ যতদূর তৃপ্তিলাভ করিতেন, আমরা মর্ত্যদেহ ধরিয়াও কোনরূপেই ততটা পারি না। এখন বঙ্কিমচন্দ্র অথবা রবীন্দ্রনাথের হাতে মানবজীবনের উৎকট সমস্যাগুলার আলােচনা কবিতাকারে দেখিতে চাই। দ্বিতীয় একটা লক্ষণ, আমাদের মধ্যে রাষ্টিক আকাঙ্ক্ষার উদ্দীপন এবং তৎসহকারে স্বায়ত্তশাসন লাভের প্রয়াস। কিন্তু এই সুস্পষ্ট লক্ষণগুলি বর্তমান, থাকিতেও আমরা উন্নতির সােপানে উঠিতেছি, এই বাক্য নির্বিবাদে গ্রহণ করিতে আমি প্রস্তুত নহি। এক শত বা দেড় শত বৎসরের মধ্যে কলির প্রকোপ সহসা এত দূর বৃদ্ধিলাভ করিয়াছে যে, বাঙ্গালীর পরমায়ুঃ একবারে পঁচানব্বই হইতে পঁয়ত্রিশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, এবং ধর্মের চারি পায়ের মধ্যে তিনটি একবারে 'চিরদিনের মত খঞ্জ হইয়া গিয়াছে, অবশ্য এরূপ বিশ্বাস ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর করিতে আমি বাধ্য নহি। কিন্তু আবার আমাদের সামাজিক গগনের পূৰ্বাকাশে তরুণ সূর্যের উদয় হইয়াছে, এবং অরুণ সারথি হস্তম্বত হরিদগণের রশ্মিগুচ্ছ আর যে ঘূরাইয়া দিবেন না, ইহার স্বীকারেও আমার সাহস হয় না। বঙ্গ-সাহিত্যের অভ্যুদয়সম্বন্ধে কোন কথা এখানে বলিতে চাহি না। দূর্ভাগ্যক্রমে আমরা বঙ্কিমের প্রতিভার উজ্জ্বল আলােক হইতে বঞ্চিত হইয়াছি; কিন্তু আশা করি, নবীনচন্দ্রের ও রবীন্দ্রনাথের তুলিকা অক্ষয় হইয়া আমাদের চিত্তবিনােদনে ও সন্তাপহরণে নিযুক্ত থাকিবে। কিন্তু আমাদের রাষ্টিক বস্থা সম্বন্ধে আমার কিছু বলিবার আছে। শ্রোতৃবর্গ অনুগ্ৰহু করিয়া মার্জনা করিবেন। বস্তুতই শতাধিক বর্ষব্যাপী সুশাসনে আমরা নিতান্ত আদুরে ছেলে হইয়া পড়িয়াছি। আমাদের পরিণামও বােধ করি আদুরে ছেলের পরিণামের অপেক্ষা অধিকতর আশাপ্রদ নহে। পালঙ্কের উপর সুখশয্যাশায়ী শিশুকে যখন আরামের সহিত তুলিযােগে চুমুকে চুমুকে দুগ্ধপান করিতে দেখা যায়, তখন বয়স্ক লােকের মুখ হইতে “আহা মরি শিশুকাল* ইতি কবিতাবাণী সনিঃশ্বাসে নির্গত হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মে এই শিশুকেই আবার কিছু দিন মধ্যে সেই বয়স্কের স্থান গ্রহণ করিয়া জীবনদ্বন্দ্বে নিযুক্ত হইতে হয় । আমাদের স্নেহময়ী গবর্মেন্ট- জননীর অনুগ্রহের মাত্রা ও আমাদেরও আবদারের মাত্রা এমন হইয়া দাঁড়াইয়াছে যে, আর আমরা সেই আরামের পালঙ্ক ও তুলির দুধ সহজে ছাড়িতে চাহিতেছি না এবং আমাদের সচ্ছলতার অণুমাত্র ত্রুটি ঘটিলেই, শৈশবসুলভ সানুনাসিক কণ্ঠধ্বনি বাহির করিয়া জননীর মনােযােগ আকর্ষণ করিতে প্রয়াসী হইতেছি। বাস্তবিকই আমাদের মত সর্বতােভাবে পরমুখাপেক্ষী কোন জাতির উন্নতি ঘটিয়াছে, তাহা ইতিহাসে লেখে না। আমাদের মেরুদণ্ডের সনাতন কোমলতা হইতেই এই অবস্থার উৎপত্তি * যখন এই প্রবন্ধ প্রথম পঠিত হয়, তখন নবীনচন্দ্র জীবিত ছিলেন। .
চরিত-কথা হইয়াছে ; আবার সেই অবস্থা হইতেই মেরুদণ্ডের কোমলতা বাড়িয়া যাইতেছে। আমরা কথায় কথায় আমাদের চরিত্রসংশােধনের প্রস্তাব করি ; এবং এই চরিত্রসংশেধন না হইলে জাতীয় উন্নতির সম্ভাবনা নাই, এই মর্মে মহতী ঘটা করিয়া বক্তৃতা করি। চরিত্রসংশােধন না হইলে যে উন্নতি ঘটিব না, ইহা সত্য কথা; কিন্তু চরিত্র-সংশেধন ব্যাপারটাই কি এত সহজ জিনিস ? যেন ইচ্ছা করিলেই চরিত্রটা আপনা-আপনি শােধিত হইয়া যাইবে। কিঞ্চিলিক যেন ইচ্ছামাত্রেই আপনাকে কুম্ভীরে পরিণত করিবে! ডারুইন-বাদীরা বলেন, কুম্ভীরেরও পূর্বপুরুষ এককালে কেঁচোর মত ছিল। কিন্তু সেই কুম্ভীরত্বে পরিণতির পূর্ব পর্যন্ত তাহাকে কত যুগব্যাপী জীবনদ্বন্দ্বে নিযুক্ত থাকিতে হইয়াছে। ইচ্ছামতেই চরিত্ৰশােধন ঘটে না; এবং প্রস্তাব দ্বারাও জাতীয় উন্নতির সম্ভাবনা নাই। বিদ্যাসাগরের মহত্ত্বের সম্মুখীন হইলে, আমাদের ক্ষুদ্ৰত্বের উপলব্ধি জন্মিয়া যে আত্মগ্লানি উপস্থিত হয়, এইরূপে সেই আত্মগ্লানির কতকটা ওজর মিলিতে পারে। আমরা যে বিদ্যাসাগরের সম্মুখে দাড়াইতে সঙ্কুচিত হই, এইরূপে তাহার কতকটা সান্ত্বনা মিলিতে পারে বটে, কিন্তু এই দেশে এই জাতির মধ্যে সহসা বিদ্যাসাগরের মত একটা কঠোর কঙ্কালবিশিষ্ট মনুষ্যের কিরূপে উৎপত্তি হইল, তাহা বিষম সমস্যা হইয়া দাঁড়ায়। সেই দুর্দম প্রকৃতি, যাহা ভাঙ্গিতে পারিত, কখন নােয়াইতে পারে নাই; সেই উগ্র পুরুষকার, যাহা সহস্র বিঘ্ন ঠেলিয়া ফেলিয়াআপনাকে অব্যাহত করিয়াছে ; সেই উন্নত মস্তক, যাহা কখন ক্ষমতার নিকট ও ঐশ্বর্যের নিকট অবনত হয় নাই; সেই উৎকট বেগবতী ইচ্ছা, যাহা সর্ববিধ কপটাচার হইতে আপনাকে মুক্ত রাখিয়াছিল, তাহার বঙ্গদেশে আবির্ভাব একটা অদ্ভুত ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে গণ্য হইবে, সন্দেহ নাই। এই উগ্রতা, এই কঠোরতা, এই দুর্দমতা ও অনম্যতা, এই দুর্ধর্ষ বেগবত্তার উদাহরণ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর •• ; যাহারা কঠোর জীবনদ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকিয়া দুই ঘা দিতে জানে ও দুই ঘা খাইতে জানে, তাহাদের মধ্যেই পাওয়া যায় । আমাদের মত যাহারা ভূলির দুধ চুমুক দিয়া পান করে, ও সেই দুধে মাখন তুলিয়া জল মিশাইয়া লয়, তাহাদের মধ্যে এই উদাহরণ কিরূপে মিলিল, তাহা গভীর আলােচনার বিষয়। সেই জন্যই বিদ্যাসাগরকে আমাদের বলিয়া পরিচয় দিতে দ্বিধা হয়। অনেকে বিদ্যাসাগরের চরিত্রে পাশ্চাত্য জাতিসুলভ বিবিধগুণের বিকাশ দেখেন। ইউরােপীয়দের আমরা যতই নিন্দা করি না, অনেক বিষয়ে তাহারা খাটি মানুষ ; আমাদের মনুষ্যত্ব তাহাদের নিকট নিষ্প্রভ ও মলিন। যে পুরুষকারে পুরুষের পৌরুষ, সাধারণ ইউরােপীয়ের চরিত্রে যাহা বর্তমান, সাধারণ বাঙ্গালীর চরিত্রে যাহার অভাব, বিদ্যাসাগরের চরিত্রে তাহা প্রচুর পরিমাণে বর্তমান ছিল। বিদ্যাসাগরের বাল্যজীবনটা দুঃখের সহিত সংগ্রাম করিতে অতিবাহিত হইয়াছিল। শুধু বাল্যজীবন কেন, তাহার সমগ্র জীবনকেই নিজের জন্য না হউক, পরের জন্য সংগ্রাম বলিয়া নির্দেশ করা যাইতে পারে। এই সংগ্রাম তাঁহার চরিত্র- গঠনে অনেকটা আনুকূল্য করিয়াছিল, সন্দেহ নাই; কিন্তু পিতৃপিতামহ হইতে তাহার ধাতুতে ও মজ্জাতে ও শােণিতে এমন একটা পদার্থ তিনি পাইয়াছিলেন, যাহাতে সমুদয় বিপত্তি ভিন্ন করিয়া তিনি বীরের মত সেই যুণক্ষেত্রে দাড়াইতে সমর্থ হইয়াছিলেন। দুংখ অনেকেরই ভাগ্যে ঘটে; জীবনের বন্ধুর পথ অনেকের পক্ষেই কণ্টকসমাবেশে আরও দুর্গম। কিন্তু এইরূপে সেই কঁাটাগুলাকে ছাঁটিয়া দলিয়া চলিয়া যাইতে অল্প লােককেই দেখা যায়। বাঙ্গালীর মধ্যে এমন দৃষ্টান্ত প্রকৃতই বিরল। অথচ আশ্চর্য এই, এত প্রভেদ সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর খাঁটি বাঙ্গালী ছিলেন। তিনি খাটি বাঙ্গালীর ঘরে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন; তাহার বাল্যজীবনে ইউরােপীয় প্রভাব তিনি কিছুই অনুভব করেন নাই।
চরিতকথা ; তিনি যে স্থানে যাহাদের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন, সে স্থানে তাহাদের মধ্যে পাশ্চাত্য ভাবের প্রভাব তখন পর্যন্ত একবারেই প্রবেশলাভ করে নাই। পরজীবনে তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষা ও পাশ্চাত্য দীক্ষা অনেকটা পাইয়াছিলেন, অনেক পাশ্চাত্যের স্পর্শে আসিয়াছিলেন, পাশ্চাত্য চরিত্রে অনুকরণের যােগ্য অনেক পদার্থের সমাবেশ দেখাইয়াছিলেন, কিন্তু তাহাতে যে তাঁহার চরিত্রকে কোনরূপ পরিবর্তিত করিয়াছিল, তাহা বােধ হয় না। তাহার চরিত্র তাহার পূর্বেই সমভাবে সম্পূর্ণরূপে গঠিত হইয়াছিল ; আর নূতন মশলা-সংগ্রহের প্রয়ােজন হয় নাই। যে বৃদ্ধ বিদ্যাসাগরের চরিত্রের সহিত আমরা এত পরিচিত, যে বালক ঈশ্বরচন্দ্র পরের ক্ষেতে যবের শীষ খাইতে গিয়া গলায় কাঁটা ফুটাইয়া মৃত প্রায় হইয়াছিলেন, অথবা আহারকালে পার্শ্ববর্তীদের ঘৃণার উদ্রেকভয়ে নিজের পাকস্থলীতে আরগুলার ন্যায় বিকট জন্তু প্রেরণ করিয়া ফেলিয়াছিলেন, সেই বালক বিদ্যাসাগরেই সেই চরিত্রের প্রায় সম্পূর্ণ বিকাশ দেখা যায়। বিদ্যাসাগর যদি ইংরেজি একবারে না শিখিতেন, বা ইংরেজের স্পর্শে না আসিতেন; চিরকালই যদি তিনি সেই নিভৃত বীরসিংহ গ্রামের টোলখানিতে ব্যাকরণের তাৎপৰ্য্য আলোচনায় ব্যাপৃত থাকিতেন, তাহা হইলে ১৩০৩ সালের ১৩ই শ্রাবণ তারিখে কলিকাতা সহরের অবস্থাটা ঠিক এমনি না হইতে পারিত; কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র আপন প্রকাণ্ড পুরুষসিংহত্ব লইয়া আপনার পল্লীগ্রামখানিকে বিক্ষোভিত রাখিতেন, সন্দেহ নাই। তিনি ঠিক যেমন বাঙ্গালীটি হইয়া ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন, শেষ দিন পর্যন্ত তেমনি বাঙ্গালীটিই ছিলেন। তাঁহার নিজত্ব এত প্রবল ছিল যে, অনুকরণ দ্বারা পরত্ব গ্রহণের তাহার কখন প্রয়ােজন হয় নাই ; এমন কি, তাহার এই নিজত্ব সময়ে সময়ে এমন উগ্র মূর্তি ধারণ করিত যে, তিনি বলপূর্বক এই পরত্বকে সম্মুখ হইতে, দূরে ফেলিতেন। পাশ্চাত্য চরিত্রের সহিত তাহার চরিত্রের যে কিছু সাদৃশ্য দেখা যায়, সে সমস্তই তাহার নিজস্ব ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নাই। সম্পত্তি, অথবা তাঁহার পুরুষানুক্রমে আগত পৈতৃক সম্পত্তি। ইহার জন্য তাহাকে কখন ঋণস্বীকার করিতে হয় নাই। সম্প্রতি আমাদের পরমশ্রদ্ধাভাজন মাননীয় কোন মহাশয় এইরূপ একটা কথা তুলিয়াছিলেন যে, পাশ্চাত্যগণের সহিত আমাদের সামাজিক কুটুম্বিতস্থাপন না ঘটিলে, আমাদের জাতীয় চরিত্রের উন্নতির সম্ভাবনা কথাটা লইয়া আমাদের সমাজমধ্যে অনেকটা আন্দোলন চলিয়াছিল। আমাদের মধ্যে যাঁহারা পাশ্চাত্য বেশভূষার ও পাশ্চাত্য আচারের পক্ষপাতী, তাহারা এই আন্দোলনে কিছু চঞ্চল হইয়া উঠিয়া- ছিলেন। বৈদেশিকের সহিত কুটুম্বিতাস্থাপন ও বিদেশের আচার-গ্রহণ সম্বন্ধে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মত গ্রহণ করিতে গেলে কি ফল ঘটিত, বােধ হয়, উল্লেখ অনাবশ্যক। তঁাহার খাঁটি দেশীয় পরিচ্ছদ হইতেই তাহার উত্তর মিলিতে পারে। চটিজুতার প্রতি তার একটা আত্যন্তিক আসক্তি ছিল বলিয়াই তিনি যে চটিজুতা ভিন্ন অন্য জুতা পায়ে দিতেন না, এমন নহে। আমরা যে স্বদেশের প্রাচীন চটি ত্যাগ করিয়া বুট ধরিয়াছি, ঠিক তাহা দেখিয়াই যেন বিদ্যাসাগরের চটির প্রতি অনুরাগ বাড়িয়া গিয়াছিল। বাস্তবিকই এই চটিজুতাকে উপলক্ষমাত্র করিয়া একটা অভিমান, একটা দর্প তাহার অভ্যন্তর হইতে প্রকাশ পাইত। যে অভিমান ও দৰ্পের অনুরােধে নিতান্ত অনাবশ্যক হইলেও মুটের মাথা হইতে বােঝা কাড়িয়া নিজের মাথায় তুলিয়া পথ চলিতেন, এই দর্প ঠিক সেই দর্প। আচারবিষয়ে অন্যের অনুকরণ দূরের কথা, বিদ্যাসাগরের চরিত্রে এমন দুই একটা পদার্থ ছিল, যাহাতে পাশ্চাত্য মানব হইতে তাহাকে পৃথক্ করিয়া রাখিয়াছিল। এই প্রকৃতিগত পার্থক্য দেখিয়াই আমরা বিদ্যাসাগরের অসাধারণত্ব অনুভব করি। পাশ্চাত্যদেশে ফিলাপি নামে একটা পদার্থ আছে, তাহার বাঙ্গালা ১০ চরিত-কথা ! নাম মানবপ্রীতি। এই মানবপ্রীতি কোন সঙ্কীর্ণ সমাজের মধ্যে আবদ্ধ নহে; সমস্ত মানবসমাজ এই হিতৈষণার বিষয়ীভূত এবং ইহাও বলা যাইতে পারে যে, এই হিতৈষণা পলিটিকাল ইকনমি শাস্ত্রেরও সম্পূর্ণ বিরােধী নহে। এই লােকহিতৈষণা ইউরােপ হইতে বাহির হইয়া দিগদিগন্তে ঘূরিয়া বেড়াইতেছে, এবং ইহার প্রভাবে যে কত অলৌকিক ঘটনার, কত অসাধারণ স্বার্থত্যাগের উদাহরণ মিলিয়াছে, তাহার সংখ্যা নাই। এই লােক হিতৈষণার প্রকৃতির মধ্যে এমন একটা কিছু আছে, প্রাচ্য দেশে তাহার তুলনা মিলে না। আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার ভিতর এমন একটা স্মৃৰ্ত্তি রহিয়াছে যেন তাহা আপনাকে সামলাইতে না পারিয়া আপনা হইতে উছলিয়া বাহির হয়, এবং অন্য কোন মূর্ভিধারণের সুবিধা না পাইলে এই মানবপ্রীতির ও বিশ্বহিতৈষণার আকৃতি পরিগ্রহ করে। যে স্ফৰ্ত্তির বশে ইংরাজের ছেলে সাঁতার দিয়া নায়াগারা পার হইতে গিয়া জীবনকে অবলীলাক্রমে বিসর্জন দেয়, এই হিতৈষণাও যেন সেই অমানুষিক ৰ্ত্তি হইতেই উদ্ভূত। এই পরার্থপরতার মূলে যেন ব্যক্তিগত ঘূৰ্ত্তি বৰ্ত্তমান রহিয়াছে। আপনার ব্যক্তিত্ব যেন নিজের ভিতর স্থান না পাইয়া অপরের উপর সবেগে বিক্ষিপ্ত হইতেছে। প্রাণের প্রবাহ যেন আপনার বেগ আপনি সহিতে না পারিয়া পরের দিকে ধাবিত হইতেছে। পরের উপকার যেন ইহার মুখ্য উদ্দেশ্য নহে; আপনার নিজত্বের অভিব্যক্তিই যেন তাহার প্রণােদক। বিদ্যাসাগরকে এইরূপ ফিলানথপিষ্ট বলা চলে না। বিদ্যাসাগরের লােকহিতৈষিতা সম্পূর্ণ অন্য ধরণের। বিদ্যাসাগরের লােকুহিতৈষিতা সম্পূর্ণ প্রাচ্য ব্যাপার। ইহা কোনরূপ নীতিশাস্ত্রের, ধর্মশাস্ত্রের, অর্থশাস্ত্রের বা সমাজশাস্ত্রে অপেক্ষা করিত না। এমন কি, তিনি হিতৈষণাবশে যে সকল কাজ করিয়াছেন, তাহার অঁনেকই আধুনিক সমাজতত্ত্ব মঞ্জুর করিবে না। কোন স্থানে দুঃখ দেখিলেই যেমন করিয়াই হউক তাহার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ০ প্রতীকার করিতে হইবে, একালের সমাজতত্ত্ব সর্বদা তাহা স্বীকার করিতে চাহে না। কিন্তু দুঃখের অস্তিত্ব দেখিলেই বিদ্যাসাগর তাহার কারণ- সন্ধানের অবসর পাইতেন না। লােকটা অভাবে পড়িয়াছে জানিবামাত্রই বিদ্যাসাগর সেই অভাবমােচন না করিয়া পারিতেন না। লােকটার কুলশীলের পরিচয় লওয়ার অবসর ঘটিত না। তাহার অভাবের উৎপত্তি কোথায়, তাহার অভাব পূরণ করিলে প্রকৃতপক্ষে তাহার উপকার হইবে, কি অপকার হইবে, ও গৌণ সম্বন্ধে সমাজের ইষ্ট হইবে, কি অনিষ্ট হইবে, নীতিতত্ত্ব ঘটিত ও সমাজতত্ত্ব ঘটিত এই সকল প্রশ্নের মীমাংসা তিনি করিতেন না। অপিচ, দুঃখের সম্মুখে আসিবামাত্র তাহার ব্যক্তিত্ব একবারে অভিভূত হইয়া যাইত। তিনি আপনাকে একেবারে ভুলিয়া যাইতেন; পরের মধ্যে তাহার নিজস্ব একবারে মগ্ন ও লীন হইয়া যাইত। এই লক্ষণের দ্বারা তাহার মানবপ্রীতি অন্য দেশের মানবপ্রীতি হইতে স্বতন্ত্র ছিল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কোন ব্যক্তির কি উপকার করিয়াছেন, তাহার সম্পূর্ণ তালিকা তৈয়ার করা একরকম অসম্ভব। তাঁহার জীবনচরিত- লেখকেরা যেগুলা সংগ্রহ করিয়াছেন, তাহাই পড়িতে পড়িতে শ্বাসরােধের উপক্রম হয়। শ্রোতৃবর্গ ভয় পাইবেন না; আমি সেই ফর্দ এক্ষণে তাহাদের সম্মুখে উপস্থিত করিতে প্রস্তুত নহি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই সুদীর্ঘ ফর্দের মধ্যে প্রায় শতকরা নব্বইটা কাৰ্য অর্থনীতির অনুমােদিত নহে। কিন্তু প্রচলিত অর্থনীতির উপরে আর একটা নীতি আছে, তাহা উচ্চতর মানবনীতির অঙ্গীভূত। ইউটিলিটির হিসাবে ভাল মন্দ নির্ণয় করিতে হইবে, সন্দেহ কিন্তু এই ইউটিলিটির হিসাবটা নিতান্ত সহজ ব্যাপার নহে। সমাজের স্থিতির ও গতির নিয়মগুলা এতই জটিল যে, সেই নিয়মগুলাকে যতই আয়ত্ত করিতে যাওয়া যায়, তাহারা ততই যেন হাত হইতে পিছলিয়া নাই।
চরিত-কথা পড়ে। সমাজতত্ত্ব সম্বন্ধে আজ কাল আলােচনা যতই অধিক হইতেছে, সমাজের আভ্যন্তরিক প্রকৃতি সম্বন্ধে আমাদের অভিজ্ঞতা ততই যেন বৃদ্ধি পাইতেছে! একটা অকর্মণ্য, অলস, কুচরিত্র ব্যক্তির আহার দিয়া প্রাণ বাঁচাইলে আমাদের পরিমিত খাদ্যসমষ্টির পরিমাণ অকারণে হ্রাস করা হয়, এবং মনুষ্যজাতির জীবনসংগ্রামকে কিয়ৎপরিমাণে আরও তীব্র করিয়া তােলা হয়, এই হিসাবে এইরূপ দয়াপ্রকাশ গর্হিত কৰ্ম্ম বলিয়া আজিকাল- কার অনেক সমাজতাত্ত্বিক নির্দেশ করেন। কিন্তু এই ক্ষুদ্র দয়াপ্রকাশ ব্যাপার কত দিকে কত উপায়ে গৌণভাবে ও পরােক্ষভাবে শুভফুলের আনয়ন ও উৎপাদন করে, তাহা আমাদের স্কুল হিসাবে ধরা পড়ে না ; কাজেই ইউটিলিটির জমাখরচের খাতায় জমার অঙ্কে শূন্য পড়িয়া যায়। রাজশাসন ও সমাজশাসন ও ধৰ্ম্মের শাসন, লােকাচার ও দেশাচার, নীতিশাস্ত্র ও অর্থশাস্ত্র, বিদ্যার বিস্তার ও জ্ঞানের বিস্তার, সহস্র উপায় তবলম্বন করিয়া সহস্র গির্জাঘর ও সহস্র কারাগার ও সহস্র বিদ্যালয় ও সহস্র ধর্মাধিকরণ মনুষ্যের জীবনসমরের উৎকটতার লাঘবসাধনে ব্যাপৃত রহিয়াছে।) বর্তমান সমাজতত্ত্ব দুঃখের সহিত বলিতেছে, এই যুগযুগান্তরব্যাপী মনুষ্যের সমবেত চেষ্টার একমাত্র ফল নিষ্ফলতা। মনুষ্য- চরিত্রে স্বার্থপরতার মাত্রা কোনরূপে কমাইতে না পারিলে, বােধ করি, এই দ্বন্দ্বের ভীষণতার কোনরূপ লাঘব হইবে না। সন্তানকে দেখিলে জননীর স্নেহের উৎস আপনা হইতে উথলিয়া উঠে; কোনরূপ ক্ষতিলাভ- গণনার বা কর্তব্য নির্ণয়ে সংশয়ের অবকাশমাত্র উপস্থিত হয় না। মনুষ্যের চরিত্র যদি কখন এইরূপ অবস্থা প্রাপ্ত হয় যে, সেই স্নেহাকৃষ্ট জননীর মত দুঃখক্লেশাতুর মনুষ্যের দুঃখ দূর করিবার জন্য সে আপনা হইতেই বাধ্য হইবে, তাহা হইলেই মনুষ্যজাতির ভবিষ্যতের জন্য আশা করিতে পার। যায়। অনেক হিসাব নিকাশ জমাখরচ বিচারের পর কর্তব্যনির্ণয়, একরূপ ব্যাপার ; আর আপনার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি কর্তৃক প্রণােদিত ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৩ তাড়িত হইয়া কর্তব্যের দিকে ধাবিত হওয়া আর এক রকম ব্যাপার। এই শেষােক্ত স্থলে কর্তব্য কর্মে প্রবৃত্তিটা স্বভাবের সহিত এমন ভাবে মিশিয়া যায় যে, উহাকে স্বভাব হইতে আর পৃথক করিয়া লওয়া চলে না; পৃথক্ করিতে গেলে সমগ্র স্বভাবটাই ভাঙ্গিয়া যায়। সমাজের বর্তমান অবস্থায় সাধারণতঃ মানুষে পরের কাজ করে; কেন , পরের কাজটা ভাল কাজ ও প্রশংসনীয় কাজ ; উহাতে নিজেরও লাভ আছে, সমাজেরও লাভ আছে। ইহলােকে, এবং হয় ত ইহলােকের পর আর একটা যে লােক আছে শুনা যায়, সেইখানে, এই কাজের জন্য বিশেষ প্রতিপত্তিলাভের সম্ভাবনা রহিয়াছে। কিন্তু মানুষ যেমন ক্ষুধার উত্তেজনায় খাইতে চায়, পিপাসার উত্তেজনায় জলার্থী হয় ; শারীর- বিজ্ঞানঘটিত কোন তত্ত্ব তখন তাহার মনে স্থান পায় না; এমন কি, ক্ষুধার ও পিপাসার তাড়নায় এমন খাদ্য ও এমন পানীয় সে উদরস্থ করিয়া ফেলে, শারীর বিজ্ঞান তাহাতে একেবারে স্তম্ভিত হইয়া পড়ে। সেইরূপ পরার্থপরতা তখনই স্বাভাবিক প্রকৃতির মধ্যে স্থান পাইবে, যখন মনুষ্য সেই প্রবৃত্তির তাড়নায় স্বার্থ ছাড়িয়া পরার্থের মুখে আপনা হইতে ধাবিত হইবে। তাহার এই কার্যের দ্বারা সমাজের মঙ্গল হইবে, কি অমঙ্গল হইবে, তাহা চিন্তা করিতে সে সময় পাইবে না। মনুষ্যের ইতিহাসে যদি কখন এইরূপ দিন আইসে, যখন মনুষ্যের প্রবৃত্তি এইরূপে মনুষ্যকে পরের কাজে প্রেরিত করিবে, তখন হয় ত রাজশাসন ও সমাজশাসনের প্রয়ােজন হইবেক না; তখন নীতি প্রচারক ও ধর্ম প্রচারকের পরিশ্রমের প্রয়ােজন হইবে না; (এবং কারাগার ও গির্জাঘরের ভগ্নাবশেষ চিত্র- শালিকায় একত্র রক্ষিত হইয়া মনুষ্যের অতীত ইতিহাসের পরিচ্ছেদ- বিশেষের সাক্ষ্য দিবে) মনুষ্যের ইতিহাসে এমন দিন আসিবে কি না জানি না; কিন্তু মনুষ্যের এই পরম ধর্মের কল্পনা অন্ততঃ একটা দেশের আনবমস্তিষ্কে প্রতিফলিত হইয়াছিল । যে দেশের সর্বপ্রধান মহাকাব্যের ১৪ চরিত-কথা নায়ক ভগবান রামচন্দ্র এই নিষ্কাম ধৰ্মপ্রবৃত্তির প্ররােচনায় আপনার প্রাণসমা ধৰ্ম্মপত্নীকে কর্তব্যবােধে নির্বাসিত করিয়াছিলেন, যে দেশের সৰ্ব্ব প্রধান ধর্মপ্রচারক ভগবান সিদ্ধার্থ সংসারের দুঃখ যাতনা হইতে মানবমণ্ডলীর পরিত্রাণার্থ রাজ্যসম্পত্তি পরিত্যাগ না করিয়া পারেন নাই, যে দেশের উপাস্য মানবদেব শ্রীকৃষ্ণ এই নিষ্কামধর্মের প্রচারকর্তা বলিয়া ইতিহাসে কীৰ্ত্তিত, সেই দেশে এই ফলাকাঙ্ক্ষাবর্জিত প্রবৃত্তির ঐতিহাসিক উদাহরণওনিতান্তু বিরল হইবার সম্ভাবনা নাই। এই স্থলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহিত আমাদিগের সম্বন্ধ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহিত বর্তমান যুগের বঙ্গসন্তানগণের অধিক সাদৃশ্য না থাকিতে পারে; কিন্তু সেই চরিত্র আমরা যে আদৌ দেখিতে পাই, তাহা সম্ভবে। কঠোরতার সহিত কোমলতার সমাবেশ ব্যতীত মনুষ্যচরিত্র সম্পূর্ণতা পায় না। ভারতবর্ষীয় মহাকবির কল্পনায় পূর্ণ মনুষ্যত্ব বজ্রের ন্যায় কঠোর ও কুসুমের ন্যায় কোমল ; (যুগপৎ ভীম ও কান্ত, অধৃষ্য এবং অভিগম্য। রামায়ণ এবং উত্তরচরিত অবলম্বন করিয়া বিদ্যাসাগর সীতার বনবাস রচনা করিয়াছিলেন। রামায়ণ ও উত্তরচরিতের নায়কের একটা অপবাদ জনসমাজে প্রসিদ্ধ আছে। কোন একটা কিছু ছল পাইলেই রামচন্দ্র কঁদিয়া পৃথিবী ভাসাইয়া ফেলেন। বিদ্যাসাগরের জীবনচরিত গ্রন্থের প্রায় প্রতি পাতাতেই দেখিতে পাওয়া যায়, বিদ্যাসাগর কঁদিতে- ছেন। বিদ্যাসাগরের এই রােদনপ্রবণতা তাঁহার চরিত্রের একটা বিশেষ লক্ষণ। কোন দীন দুঃখী আসিয়া দুঃখের কথা আরম্ভ করিতেই বিদ্যা- সাগর কাদিয়া আকুল ; কোন বালিকা বিধবার মলিন মুখ দর্শনমাত্রেই বিদ্যাসাগরের বক্ষস্থলে গঙ্গা প্রবহমাণা ; ভ্রাতার অথবা মাতার মৃত্যুসংবাদ পাইবামাত্র বিদ্যাসাগর বালকের মত উচ্চেঃস্বরে কাদিতে থাকেন। বিদ্যাসাগরের বাহিরটাই বজের মত কঠিন, ভিতরটা পুপের অপেক্ষাও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কোমল। রােদন ব্যাপার বড়ই গর্হিত কৰ্ম্ম, বিজ্ঞের নিকট ও বিরাগীর নিকট অতীব নিন্দিত। কিন্তু এইখানেই বিদ্যাসাগরের অসাধারণত্ব ; এইখানেই তাহার প্রাচ্যত্ব। প্রতীচ্য দেশের কথা বলিতে পারি না ; কিন্তু প্রাচ্যদেশে রােদনপ্রবণতা মনুষ্যচরিত্রের যেন একটা প্রধান অঙ্গ। বিদ্যাসাগরের অসাধারণত্ব এই যে, তিনি আপনার সুখসাচ্ছন্দ্যকে তৃণের অপেক্ষাও তাচ্ছল্য করিতেন, কিন্তু পরের জন্য রােদন না করিয়া তিনি থাকিতে পারিতেন না। দরিদ্রের দুঃখদর্শনে তঁাহার হৃদয় টলিত, বান্ধবের মরণশশাকে তাহার ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটাইত। জ্ঞানের উপদেশ ও বৈরাগ্যের উপদেশ তাহার নিকট এ সময়ে ঘেষিতে পারিত না। (বায়ু- প্রবাহে মনুমানের মধ্যে ঢুমেরই চাঞ্চল্য জন্মে, সানুমান চঞ্চল হয় ন) এ ক্ষেত্রে বােধ করি দ্রুমের সহিতই তাহার সাদৃশ্য। কিন্তু আবার সানুমানেরই শিলাময় হৃদয় বিদীর্ণ করিয়া যে বারিপ্রবাহ নিঃসৃত হয়, তাহাই বসুন্ধরাকে উর্বরা করে ও জীবকুলকে রক্ষা করে। সুতরাং সানুমাই বিদ্যাসাগরের সহিত প্রকৃতপক্ষে তুলনীয়। ভাগীরথী গঙ্গার পুণ্যধারায় যে ভূমি যুগ ব্যাপিয়া সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা হইয়া রহি- আছে, রামায়ণী গঙ্গার পুণ্যতর অমৃতপ্রবাহ সহস্র বৎসর ধরিয়া যে জাতিকে সংসারতাপ হইতে শীতল রাখিয়াছে, সেই ভূমির মধ্যে ও সেই জাতির মধ্যেই বিদ্যাসাগরের আবির্ভাব সঙ্গত ও স্বাভাবিক। ঈশ্বর এবং পরকাল প্রভৃতি সম্বন্ধে বিদ্যাসাগরের কিরূপ বিশ্বাস ছিল, তাহার চরিতলেখকেরা সে সম্বন্ধে কোন স্পষ্ট কথা বলেন না। তবে সংসার হইতে দুঃখের অস্তিত্ব এক নিঃশ্বাসে উড়াইয়া দিয়া সুখের এবং মঙ্গলের রাজ্য কল্পনার বলে প্রতিষ্ঠা করা বােধ করি দয়ার সাগরের পক্ষে অসাধ্য ছিল। সমুদ্রতলে সার জন লরেন্স ডুবাইয়া দিয়া দুনিয়ার * এই নামে একখান জাহাজ ৭০০ যাত্রিসহ কলিকাতা হইতে পুরী যাইবার সময় বাতাবর্ভে পড়িয়া সমুদ্রে মগ্ন হয়।
চরিত-কথা মালিক কিরূপ করুণা প্রকাশ ও মঙ্গল সাধন করিলেন, এক নিঃশ্বাসে তিনি তাহা আবিষ্কার করিতে পারিতেন না। বস্তুতই দুঃখদাবানলের কেন্দ্রস্থলে উপবেশন করিয়া জগতের মঙ্গলময়ত্ব সম্বন্ধে বক্তৃতা করা তাহার প্রকৃতির বিরুদ্ধ ছিল। বােধ করি, সেই জন্যই ঈশ্বর ও পরকাল সম্বন্ধে নিজ মত প্রকাশ করিতে তিনি চাহিতেন না। তাহার প্রবৃত্তি তাহাকে যে কৰ্তব্যপথে চালাইত, তিনি সেই পথে চলিতেন। মনুষের প্রতি কর্তব্যসম্পাদন করিয়াই তিনি সন্তুষ্ট থাকিতেন ; গণ্ডগােলে প্রবৃত্ত হইবার তাহার অবসর ছিল না। এমন দিন কবে আসিবে, যে দিন মনুষ্যসমাজ সাম্প্রদায়িক কোলাহলের হস্ত হইতে নিষ্কৃতি পাইবে ; যে দিন আপামর সাধারণ বিতণ্ডা ত্যাগ করিয়া বিদ্যাসাগরের অনুবর্তী হইয়া মনুষের প্রতি কর্তব্যনির্ণয়ে মন দিতে অবকাশ লাভ করিবে। বিদ্যাসাগর এক জন সমাজসংস্কারক ছিলেন। সমাজসংস্কারের কথাটা উত্থাপন করিয়া অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করিতে যদি নিতান্ত আতঙ্ক জন্মে, তাহাতে শ্রোতৃবর্গের নিকট মার্জনার ভিখারী হইতেছি। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রের উপাসনায় প্রবৃত্ত হইয়া কথাটা একবারে না ভুলিলেও চলে না। তিনি নিজেই বলিয়াছেন, বিধবাবিবাহে পথ-প্রদর্শন তাঁহার জীবনের সর্ব প্রধান সৎকৰ্ম্ম। বস্তুতই এই বিধবাবিবাহ ব্যাপারে আমরা ঈশ্বরচন্দ্রের সমগ্র মূর্তিটা দেখিতে পাই। কোমলতা ও কঠোরতা উভয় গুণের আধাররূপে,তিনি লােকসমক্ষে প্রতীয়মান হয়েন। প্রকৃতির নিষ্ঠুর হস্তে মানবনিৰ্যাতন তাহার কোমল প্রাণকে দিবানিশি ব্যথিত রাখিত ; দুৰ্বল মনুষ্যের প্রতি নিষ্করুণ প্রকৃতির অত্যাচার তাহার হৃদয়ের মৰ্ম্মস্থলে ব্যথা দিত ; তাহার উপর মনুষ্যবিহিত, সমাজবিহিত অত্যাচার, তাঁহার পক্ষে নিতান্তই অসহ্য হইয়াছিল। বিধাতার কৃপায় মানুষের দুঃখের ত আর অভাব নাই, তবে কেন মানুষ আবার সাধ করিয়া আপন দুঃখের বােব্যয় ভার চাপায়। ইহা তিনি বুঝিতেন না, এবং { ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৭ ইহা তিনি সহিতেনও না। বালবিধবার দুঃখদর্শনে তাহার হৃদয় বিগলিত হইল; এবং সেই বিগলিত হৃদয়ের প্রস্রবণ হইতে করুণা- মন্দাকিনীর ধারা বহিল। সুরনদী যখন ভূমিপৃষ্ঠে অবতরণ করে, তখন কার সাধ্য যে, সে প্রবাহ রােধ করে ! বিদ্যাসাগরের করুণার প্রবাহ যখন ছুটিয়াছিল, তখন কাহারও সাধ্য হয় নাই যে, সেই গতির পথে দাড়াইতে পারে। দেশাচারের দারুণ বাঁধ তাহা রােধ করিতে পারে নাই। সমাজের কুটীভঙ্গিতে তাহার স্রোত বিপরীত মুখে ফিরে নাই। এইখানে বিদ্যাসাগরের কঠোরতার পরিচয় । সরল, উন্নত, জীবন্ত মনুষ্যত্ব লইয়া তিনি শেষ পর্যন্ত স্থিরভাবে দণ্ডায়মান ছিলেন ; কাহারও সাধ্য হয় নাই যে, সেই মেরুদণ্ড নমিত করে। কিন্তু এই সমাজসংস্কার ব্যাপারেও বিদ্যাসাগরের একটু অসাধারণত্ব দেখা যায়। প্রথমতঃ, বিধবাবিবাহে হস্তক্ষেপের পূর্বে তিনি পিতা মাতার অনুমতি চাহিয়াছিলেন। দ্বিতীয়তঃ, বিধবাবিবাহের শাস্ত্রীয় প্রতি- পাদনে তিনি প্ৰৱাসী হইয়াছিলেন। এই দুইটাই আমাদের পক্ষে চিন্তনীয় বিষয়। সম্প্রতি আমরা নীতিশাস্ত্র হইতে ‘মরাল কারেজ' নামক একটা সামগ্রী প্রাপ্ত হইয়াছি। কৰ্তব্যবুদ্ধির প্ররােচনায় স্বার্থবিসর্জন ব্যাপারটা যে কোন দেশের একচেটিয়া নহে, তাহা সদা সর্বদা আমরা ভুলিয়া যাই। আমাদের প্রাচীন ভারতভূমিতেও এই কৰ্ত্তব্যের জন্য স্বার্থ-বিসর্জনের উদাহরণ ভূরি-পরিমাণে পাওয়া যাইতে পারে। তবে দুঃখের বিষয় যে, অন্যত্র যে সব ঘটনায় চানিনাদ হইয়া থাকে, এ দেশে তার অধিকাংশই নীরবে সম্পাদিত হয়। কিন্তু এই মরাল কারেজটা এ দেশে নূতন আমদানি এক অপূৰ্ব্ব জিনিষ। আরও দুঃখের বিষয় যে, একালের শিক্ষার সহিত এই মরাল কারেজের কি একটা সম্বন্ধ দাড়াইয়া গিয়াছে। লােকের বয়ােবৃদ্ধি-সহকারে সংসারের হাইড্রলিক প্রেসের চাপ , •* Moral courage.
১৮ চরিতকথা পড়িয়া ইহা অনেকটা সঙ্কুচিত ও শীর্ণ হইয়া পড়ে; কিন্তু শিক্ষানবিশ বালকগণের নৈতিক সাহসের আক্রমণটা নিরীহ পিতামাতার উপর দিয়া, নিরীহতর প্রতিবেশীর উপর দিয়া ও নিরীহতম মাষ্টার মহাশয়ের উপর দিয়াই নিক্ষিপ্ত হয়। বলা বাহুল্য, বিদ্যাসাগর এই মরাল কারেজের প্রতি বিশেষ রাজি ছিলেন না। স্বাধীন আত্মাকেও কোন স্থানে স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া পরাধীনতা স্বীকার করিতে হয়, তাহা তিনি জানিতেন। নিজের বুদ্ধি এবং নিজের প্রবৃত্তির মুখে বল্পা লাগাইয়া কোথায় তাহাদিগকে নিয়মিত রাখিতে হয়, তাহা তিনি বুঝিতেন। স্বর্গের দেবতায় তাহার কিরূপ আস্থা ছিল, জানি না; কিন্তু স্বর্গাদপি গরীয়া জীবন্তদেবের তুষ্টির জন্য সময়বিশেষে আপনার ধর্মবুদ্ধিকে পৰ্যন্ত বলিদান দেওয়ার প্রয়ােজন হইতে পারে, তাহা তিনি স্বীকার করিতেন। তঁাহার ন্যায় স্বতন্ত্র পুরুষ বঙ্গদেশে তখন ছিল না। কিন্তু মানবজীবনে এমন সময় আসিতে পারে, যখন সেই মুক্তবায়ুমার্গে বিহারপ্রয়াসী স্বাতন্ত্রকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া রাখিতে হয় ; ইহা তিনি/মানিতেন। সেই শৃঙ্খলকে কপটাচারের আয়স নিগড় মনে করিবার প্রয়োজন নাই। উহা প্রেমের শৃঙ্খল ও ভক্তির শৃঙ্খল ;- মনুষের প্রতি মনুষ্যের যে প্রেমের বন্ধন প্রকৃতি আপন হাতে নির্মাণ করিয়া রাখিয়াছে, যে ভক্তির বন্ধন ব্যক্তিনিহিত ক্ষুদ্র জীবনকে সমাজরূপী বিরাটপুরুষের ঐতিহাসিক জীবনের অভ্যন্তরে আবদ্ধ রাখিয়াছে। এই প্রেমের শিকল ও ভক্তির শিকল গলায় পৱিয়া মনুষ্যজীবন ধন্য ও কৃতার্থ হয় ; “মণিমুক্তার মােহন মালা” ইহার নিকট স্থান পায় না। ঈশ্বরচন্দ্রের হৃদয় লইয়া আমরা সকলেই কিছু ধরাতলে অবতীর্ণ হই নাই। বালবিধবার অশ্রুজল আমাদের পাষাণহৃদয়ে রেখাঙ্কন করে না ; তাই আমরা ভণ্ড ব্রহ্মচার মলিন পাংশুবিক্ষেপে সেই অশ্রুজল মুছিতে যাই। ঈশ্বরচন্দ্রের বীরত্ব বিধবার দুঃখমােচনে সমর্থ হয় নাই। দেশাচারের - .
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জয়লাভ ঘটিয়াছে সত্য কথা, কিন্তু ইহাই বিধিলিপি, ইহাই প্রকৃতির নিৰ্বন্ধ। স্বাভাবিক, সরল, ছদ্মবেশহীন মনুষ্যত্ব ইহাতে ম্রিয়মাণ হইবে, সন্দেহ নাই, কিন্তু দুঃখপ্রকাশ নিষ্ফল ;-কেন না, ইহা বিধিলিপি। এই দেশাচারগুলির সম্বন্ধে আমার কিছু বক্তব্য আছে। আমাদের মধ্যে যাঁহাদের বিশ্বাস যে, প্রাচীনকালে একদিন জন কয়েক ব্রাহ্মণ পরামর্শ করিয়া লাভের প্রত্যাশায় এই জঘন্য দেশাচার সকলের ব্যবস্থা করিয়াছেন, এবং জনসমাজ ভয়ে হউক বা নির্বুদ্ধিতায় হউক, সেই সকল ব্যবস্থা নির্বিবাদে গ্রহণ করিয়াছে, তাহাদের সহিত আমি একমত নহি। ব্যক্তিবিশেষের বা শ্রেণীবিশেষের চেষ্টায় সমাজের ধারাবাহিক জীবন যে এইরূপে বিপর্যস্ত হইতে পারে, তাহা বিশ্বাস করিতে পারি না। আজ- কাল সমাজ-শরীরের সহিত জীব-শরীরের তুলনা করা এবং সমাজের অন্তর্গত দেশাচারকে জীবশরীরােদগত ব্যাধিজনক বিস্ফোটকের সহিত তুলনা করা একটা প্রথা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। জীববিদ্যার অন্তর্গত আধুনিক নিদানশাস্ত্রে বিস্ফোটকের উৎপত্তির যে কারণ নির্দেশ করে, তাহাতে এই তুলনা সঙ্গত বলিয়া বােধ হয় না। বাহির হইতে রােগের বীজ শরীর মধ্যে লব্ধপ্রবেশ হইয়া বিস্ফোটকের সৃষ্টি করে। কিন্তু সমাজশরীরের অন্তর্ভুক্ত পুরুষপরম্পরাগত প্রথাগুলিকে সকল সময়ে বাহির হইতে আগত বলিতে পারা যায় না। সমাজশরীরের বয়ঃক্রমানুসারে তাহারা জৈবিক নিয়ম মতেই আপনা হইতে উৎপত্তি, বৃদ্ধি ও লয় পায়। সমাজশরীরকেও ঠিক জীব- শরীরের মত দুরন্ত প্রকৃতির মধ্যে অবস্থান করিয়া সহস্র প্রতিকূল শক্তি হইতে আত্মরক্ষা করিয়া চলিতে হয় ; এবং সেই আত্মরক্ষার প্রয়াসফলে তাহাতে বিবিধ অঙ্গ ও বিবিধ অবয়ব ও বিবিধ যন্ত্রের বিকাশ হয়। জীবশরীরের মধ্যে কতকগুলা অবয়বের চিহ্ন দেখা যায়। শরীরবিজ্ঞানে তাহাদিগকে vestigial organ আখ্যা দেয়। এই ক্ষুদ্র অবয়ব গুলায় জীবন ধারণে ও জীবন রক্ষণে কোনরূপ উপকার দেখা যায় না । ) চরিত-কথা বরং সময়ে সময়ে তাহারা জীবনের সংহারক হইয়া উঠে। সাধারণত তাহারা তাহাদের নিরর্থক, অনাবশ্যক অস্তিত্বরক্ষার জন্য সমগ্রদেহের নিকট হইতে পুষ্টির ভাগ ও শক্তির ভাগ গ্রহণ করিয়া জীবনের প্রতিকূলতাই সাধন করে। ইহারা জীবনযাত্রার প্রতিকূল হইলেও আধুনিক জীববিদ্যার মতে বিস্ফোটকের বা ব্যাধির স্থানীয় নহে। জীবের ইতিহাসে এমন সময় ছিল, তখন তাহারা জীবনের পক্ষে আবশ্যক ছিল, তখন তাহারাও জীবনের আনুকূল্যসাধনে নিযুক্ত রহিত। তদানীন্তন বহিঃ- প্রকৃতির সহিত যুদ্ধবাপারে জীবদেহকে সমর্থ করিবার জন্য তাহাদের আপনা হইতে বিকাশ হইয়াছিল। বহিঃপ্রকৃতির পরিবর্তন সহ তাহাদের আবশ্যকতা অন্তর্হিত হইয়াছে, এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনে কাজেই তা- দের অস্তিত্বও বিলােপের অভিমুখে ক্রমশঃ অগ্রসর হইতেছে। সমাজ- শরীরে দেশাচারগুলাও কতকটা যেন সেইরূপ। সমাজের অতীত ইতিহাসে বিশেষ প্রয়ােজনসাধনের উদ্দেশে তাহাদের আবির্ভাব হইয়াছিল ; এখন সেই প্রয়ােজনের অভাব হওয়ায়, তাহারা অনাবশ্যক ও জীবনের যন্ত্রণাদায়ক হইয়া পড়িয়াছে। কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচন বিনা অন্য কোন প্রণালী নাই, যাহাতে তাহাদের উচ্ছেদ সাধন করিতে পারে। প্রাকৃতিক নির্বাচন সময়সাপেক্ষ ; এবং সেই দিনের প্রতীক্ষা করাই সঙ্গত। সমাজ-শরীরের চিকিৎসক তুমি বিস্ফোটকমে যেখানে সেখানে ছুরিকা চালাইলে সর্বত্র সুফল নাও হইতে পারে। আমার যে সকল বন্ধুবর্গের অনুগ্রহবশে আজি আমি বিদ্যাসাগরের চরণােগান্তে ভক্তির পুস্পাঞ্জলি প্রদানের অবকাশ পাইয়াছি, তাহাদের নিকট আন্তরিক কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিয়া, এই প্রবন্ধের উপসংহারে প্রবৃত্ত হইব। আমাদের দেশে জীবনচরিত লেখা প্রচলিত নাই, এবং কোন ব্যক্তির জীবনচরিত লিখিতে প্রবৃত্ত হইলেও তাহার উপকরণ উপযুক্ত পরিমাণে পাওয়া যায় না। বিদ্যাসাগরের জীবনচরিত রচনা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর করিয়া যাহারা জাতীয় সাহিত্যের এই কলঙ্ক অপনােদনের চেষ্টা করিয়াছেন, তাঁহারা বােধ হয় এই অভাবের ও অসুবিধার বিশেষ ভুক্তভােগী। এরূপ স্থলে বিদ্যাসাগরের মত মহাশয়গণের স্পর্শে যিনি কখন আসিবার সুবিধা পাইয়াছেন, যিনি কোন না কোন সূত্রে তাহার চরিত্রের কোন একটা দোষ দেখিতে পাইয়াছেন, তৎসমস্ত সাধারণের নিকট ব্যক্ত করা তাঁহাদের পক্ষে কৰ্ত্তব্য। এই কর্তব্যের অনুরােধে আমার যাহা কিছু বলিবার আছে, ব্যক্তিগত হইলেও তাহা বলিতে সাহসী হইতেছি। বঙ্গদেশের মধ্যে ছােট বড় এমন ব্যক্তি অল্পই আছেন, যিনি কোন না কোন প্রকারে বিদ্যাসাগরের নিকট ঋণগ্রস্ত নহেন। দূর মফঃস্বলের পল্লীগ্রামের মধ্যেও তাহার প্রভাব কতদূর বিস্তার লাভ করিয়া- ছিল, তাহা চিন্তার অগােচর। মহাকবির বাক্যে আছে, যদধ্যাসিত- মহস্তিদ্ধি তীর্থং প্রচক্ষতে। মহতের আসনভূমি তীর্থস্বরূপ। বঙ্গদেশের পল্লীতে পল্লীতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা যে সময়ে বিদ্যাসাগরের কর্মবহুল জীবনের অন্যতম ব্যবসায় ছিল, সেই সময়ে আমার পিতামহের ক্ষুদ্র কুটীর একদিন বিদ্যাসাগরের পাদস্পর্শে তীর্থস্থলে পরিণত হইয়াছিল। শৈশবকালে সেই গৌরবান্বিত দিবসের প্রসঙ্গক্রমে বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে নানা কথা অন্তঃ- পুরবাসিনীগণের মুখেও শুনিতে পাইতাম। পাঠশালায় প্রবেশলাভের পর বর্ণপরিচয় প্রথমভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, কথামালা, আখ্যানমঞ্জরী প্রভৃতি পুস্তক পরম্পরার শুভ্র মলাটের উপর একই নাম অঙ্কিত দেখিয়া ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যা- সাগরের সহিত পাঠশালা, ও, লেখাপড়া ও ছাপার বহি ও পণ্ডিতম- শয়ের বেদণ্ডের কিরূপ একটা অনির্বচনীয় সম্বন্ধ কল্পনায় স্থির করিয়া লইয়াছিলাম। বিদ্যাসাগরের আকৃতি ও পরিচ্ছদ ও কার্যাবলী সম্বন্ধে যে সকল গল্প শুনিতাম, তৎসমুদয় সেই কল্পনার সহিত বিজড়িত করিয়া অন্তঃকরণ একটা বিদ্যাসাগরমূৰ্ত্তি গড়িয়া ফেলিয়াছিল। বটতলার পুস্তকের বােঝা মাথায় করিয়া চটিজুতাধারীরূক্ষবেশ পরুষমূর্তি এক ব্যক্তি আমাদের २२ চরিত-কথা পল্লীগ্রামে মাঝে মাঝে দেখা দিত। শ্রোতৃগণ মার্জনা করিবেন, সেই লােকটাই যে নিশ্চিত বিদ্যাসাগর, এই ধারণা হইতে অব্যাহতি পাইতে আমাকে উত্তরকালে অনেক প্রয়াস পাইতে হইয়াছিল। আমার মনস্তত্ববিৎ বন্ধুগণের উপর এই বিষম সমস্যার মীমাংসার ভার থাকিল। ১২৮৮ সালের ২১ শে মাঘ তারিখে আমি কলিকাতাসহরে আসি; এবং ২৩ শে তারিখে তীর্থযাত্রীর আগ্রহের সহিত পিতৃব্যদেবের সমভিব্যাহারে চিরাকাঙ্ক্ষিত বিদ্যাসাগরদর্শনলালসা তৃপ্ত করিয়া জীবন ধন্য করি। শৈশবকালের কাল্পনিক বিদ্যাসাগরের সহিত প্রকৃত বিদ্যা- সাগরের সাদৃশ্য দেখিয়াছিলাম কি না, সে কথা উত্থাপনের প্রয়ােজন নাই। কিন্তু সেই দিবস তাঁহার মুখ হইতে যে কয়েকটি বাক্য শুনিতে পাইয়াছিলাম, আজি পৰ্য্যন্ত তাহা আমার কর্ণবিবরে ধ্বনিত হইতেছে। আশা করি, সেই উদার প্রশস্ত স্নেহপূর্ণ হৃদয় হইতে নিঃসৃত হইয়া সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর বঙ্গের যে সকল পুত্রকন্যার শ্রবণপথে প্রবেশলাভ করিয়া হৃদয়ের ভিত্তিমূলে আঘাত দিয়াছে, তাহারা চিরদিন সেই কণ্ঠস্বরের স্মৃতিকর্তৃক প্রেরিত হইয়া সংসারের কর্মক্ষেত্রে বিচরণ করিবেন। সেই প্রাচ্য মনুষ্যত্বের আদর্শ তাহাদের জীবনকে যুগপৎ প্রণােদিত ও সংযমিত রাখিবে। আমাদের এই দুর্দিনেও যদি মনুষ্যত্বের সেই আদর্শের আবির্ভাব সম্ভবপর হইয়া থাকে, তাহা হইলে আমাদের প্রাচীন। পূজনীয়া জননীর দেহে নবজীবনসঞ্চারের আশা কি কখনই ফলিবে না! কিন্তু ভবিষ্যতের ঘনান্ধকার ভিন্ন করিয়া দীপবর্তিকা আনয়ন করিবে কে? কে বলিবে, আমাদের পরিণতি কোথায় ? মহাপুরুষের আবির্ভাব ভারতভূমিতে নূতন ঘটনা নহে। আশা যে, মহাপুরুষের আবির্ভাবই ভারতের উদ্ধারসাধনে সমর্থ হইবে। কিন্তু ভবিষ্যতের সেই মহাপুরুষ কোথায়? দগ্ধাস্থিপঞ্জরময় ভারতের এই মহাশ্মশানে এই মৃতজাতির শবদেহে নূতন জীবন সঞ্চার করিবে কে ? - বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বার বৎসর অতীত হইল, বঙ্কিমচন্দ্র তাহার শ্যামাঙ্গিনী জননীর অঙ্কদেশ শূন্য করিয়া চলিয়া গিয়াছেন; কিন্তু এতদিন আমরা তাহার স্মৃতির সম্মানার্থ কোনরূপ আয়ােজন আবশ্যক বােধ করি নাই। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি আমাদের কর্তব্যবুদ্ধি যে এতদিন জাগে নাই, তাহা আমাদের অবস্থার পক্ষে স্বাভাবিক। বার বৎসর পরে যদি সেই কর্তব্যবুদ্ধি জাগিয়া থাকে, সেই প্রবুদ্ধিসাধনে আমাদের কৃতিত্ব বিচার্য বিষয়। বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং কোন তপােলােকে বা সত্যলােকে অবস্থিত হইয়াও মর্ত্যলােকে তাহার দুঃখিনী জননীকে আজও ভুলিতে পারেন নাই সেইখানে বসিয়া “তুমি বিদ্যা, তুমি ধৰ্ম্ম, তুমি হৃদি, তুমি মৰ্ম্ম, ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে” বলিয়া কাতরকণ্ঠ গান গাহিতেছেন ;-আর মানবের অশ্রুতিগােচর সেই সঙ্গীত সপ্তকোটি কণ্ঠে কলকলনিনাদ উত্থাপিত করিয়া বঙ্গভূমিকে জাগ্রত করিয়াছে। আমাদের কর্তব্যবুদ্ধি আজ যদি জাগিয়া থাকে, স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্ৰই আমাদিগকে জাগাইয়াছেন, আমাদের উহাতে কোন কৃতিত্ব নাই। বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতির উপাসনার জন্য আজিকার সভা আহূত হইয়াছে ; এবং যাহারা এই উপাসনার আয়ােজন করিয়াছেন এবং এই উপাসনা- কর্মকে সম্ভবতঃ সাংবৎসরিক অনুষ্ঠানে পরিণত করিতে ইচ্ছা করেন, তাহারা, কি কারণে জানি না, আজিকার অনুষ্ঠানের প্রধান ভার আমার উপর অর্পণ করিয়াছেন। আমার প্রতি তাহাদিগের এই অহৈতুকী শ্ৰদ্ধার পরিচয় পাইয়া ও বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি আমার ভক্তিপ্রকাশের অবসর লাভ ২৪ চরিত-কথা করিয়া আমি যুগপৎ গৰ্ব্ব ও আনন্দ অনুভব করিতেছি, কিন্তু যােগ্যতর পাত্রে এই ভার অর্পিত হইলে উপস্থিত ভদ্রমণ্ডলীকে বঞ্চিত হইতে হইত । কেবল যে সময়ােচিত বিনয়প্রকাশের জন্য আমি এ কথা বলিতেছি, তাহা নহে; বঙ্কিমচন্দ্র যে বিস্তীর্ণ বঙ্গীয়সাহিত্যের ক্ষেত্রে নেতৃত্বগ্রহণ করিয়া তাহার সহবৰ্ত্তী ও পরবর্তী অনুচরগণের পথপ্রদর্শক হইয়া গিয়াছেন, আমি সেই বঙ্গীয়সাহিত্য-ক্ষেত্রের এক প্রান্তে এক সঙ্কীর্ণপথ আশ্রয় করিয়া মন্দগতিতে ধীরে ধীরে পদক্ষেপে সাহসী হইয়াছি; ইহাই আমার জীবনের কাজ ও ইহাই আমার জীবিকা। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র তাহার প্রতিভার অত্যুজ্জ্বল আলােকবর্তিকা হস্তে করিয়া সাহিত্যক্ষেত্রের যে যে অংশ প্রদীপ্ত করিয়াছিলেন, সেই সেই অংশে আমার “প্রবেশ নিষেধ”। আমি দূর হইতে সেই আলােকের উজ্জ্বলদীপ্তিতে মুগ্ধ হইয়াছি মাত্র, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের ভাগ্যবান্ সহচরগণের ও অনুচরগণের পদাঙ্ক অনুসরণ করিতেও আমি অধিকারী নহি। আজিকার আয়ােজনের অনুষ্ঠানাদিগের অনুগ্ৰহজন্য অকপট কৃতজ্ঞতাস্বীকারে আমি বাধ্য আছি; কিন্তু আমি আশা করি যে আপনারা তাহাদের পানিৰ্বাচনে বিষয়বুদ্ধির প্রশংসা করিবেন না। বাঙ্গালীর জীবনের উপর বঙ্কিমচন্দ্র কত দিকে কত উপায়ে প্রভুত্ব- বিস্তার করিয়াছেন, তাহা আমরা জানি; কিন্তু বাঙ্গালার বাহিরে সম্ভবতঃ তিনি বাঙ্গালার সাক্ ওয়াল্টা স্কটু মাত্র। ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের সহিত পরিচয় অতি অল্পবয়সেই ঘটিয়াছিল, সে বয়সে উপন্যাসগ্রন্থের সহিত আমার পরিচয় বড় একটা স্পৃহনীয় বলিয়া বিবেচিত হয় না। আমার যখন আট বৎসর বয়স, তখন বঙ্গদর্শনে বিষবৃক্ষ বাহির হইতেছিল এবং আমি বঙ্গদর্শনের কয়েক সংখ্যা হইতে বিষবৃক্ষের দুইচারিটা পরিচ্ছেদ আত্মসাৎ করিয়াছিলাম। সেই বয়সে বিষবৃক্ষের সাহিত্যরসের কিরূপ আস্বাদ অনুভব করিয়াছিলাম, তাহা ঠিক মনে নাই ; তবে এ কথা বেশ মনে আছে যে, পাঠশালায় গিয়া তারিণীচরণ চট্টোপাধ্যায় প্রণীত ভূগােল- বঙ্কিমচন্দ্র বিবরণের ভারতবর্ষের অধ্যায়ে গঞ্জাম গঞ্জাম চত্বরপুর, মসলিপটম মসলি- পটম, আর্কট আর্কট, মদুরা মদুরা, টিনিভেলি টিনিভেলি প্রভৃতি অপরূপ সুশ্রাব্য নামাবলী আবৃত্তির ক্রটি ঘটিলে পণ্ডিতমহাশয়ের নিকট বেত্রাঘাত উপহার পাইয়া বাঙ্গালাসাহিত্যের প্রতি যে অনুরাগ দাঁড়াইয়াছিল, নগেন্দ্রনাথের নৌকাযাত্রা ও কুন্দনন্দিনীর স্বপ্নদর্শন নিতান্তই তাহার সমর্থন ও পােষণ করে নাই। আমার বেশ মনে আছে যে, ‘পদ্মপলাশলােচনে তুমি কে এই পরিচ্ছেদের সহিতই আমার তৎকালিক বিষবৃক্ষপাঠ সমাপ্ত হয় এবং ঐ পরিচ্ছেদের শীর্ষস্থিত সংক্ষিপ্ত প্রশ্নটি মনের মধ্যে বিস্ময় ও কৌতূহলের উদ্রেক করিয়া কিছুদিনের জন্য একটা অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করে। কিছুদিনের জন্য মাত্র, কেন না পরবৎসর আমি পাঠশালার পরীক্ষায় যে পুরস্কার পাইয়াছিলাম, বাড়ী ফিরিয়া দেখিলাম, তাহার রাঙা- ফিতার বন্ধনের মধ্যে শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রণীত দুর্গেশনন্দিনী ও বিষবৃক্ষ নামক দুইখানি পুস্তক রহিয়াছে। এই সভাস্থলে যাহারা পিতার বা পিতৃস্থানীয় অভিভাবকের গৌরবযুক্ত পদবী গ্রহণ করেন, তাহারা শুনিয়া আতঙ্কিত হইবেন যে, ঐ পুরস্কারবিতরণে গ্রন্থনিৰ্বাচনের ভার আমার পিতৃদেবের উপর অর্পিত ছিল এবং তিনিই আমার গঞ্জাম গঞ্জাম চত্বরপুর প্রভৃতি সূক্ষ্ম ভৌগােলিক তত্ত্বে পারদর্শিতার পুরস্কার স্বরূপ ঐ দুইখানি গ্রন্থ নিৰ্বাচন করিয়া তাহার নবমবষের পুত্রের হস্তে অৰ্পণ করিয়াছিলেন। পুরস্কারহস্তে বাড়ী আসিয়া রাত্রিটা একরকমে কাটাইয়াছিলাম, পরদিনে বিষুব্রক্ষ ও তার পরদিনে দুর্গেশনন্দিনী টাইটে পেজের হেডিং মায় মূল্য পাঁচসিকা হইতে শেষ পর্যন্ত একরকমে উদরস্থ করি। ঐ দুই গ্রন্থের কোন্ অংশ সৰ্বাৎকৃষ্ট বােধ হইয়াছিল, তাহা যদি এখন অকপটে বলিয়া ফেলি, তাহা হইলে নিশ্চয়ই আপনারা আমার কাব্য- রূসগ্রাহিতার প্রশংসা করিবেন না। বিষবৃক্ষের মধ্যে যেখানে ছেলের পাল “হীরার আয়ি বুড়ী হাঁটে গুড়িগুড়ি” বলিয়া সেই বৃদ্ধার পশ্চাদ্ধাবন চরিত-কথা করিয়াছিল ও বৃদ্ধা ইষ্টিরসনামক ব্যাধির প্রতিকারবিষয়ে কেষ্টর নামক ঔষধের উপযােগিতাসম্বন্ধে প্রতিবেশিনীর সহিত আলাপ করিতেছিল, সেই স্থানটাই গ্রন্থের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট বলিয়া সাব্যস্ত করিয়াছিলাম। গজপতি বিদ্যাদিগগজকেই দুর্গেশনন্দিনীর মধ্যে সর্ব প্রধান পাত্র স্থির করিয়াছিলাম, ইহাও নিঃসঙ্কোচে স্বীকার করিতেছি। আশমানির ঘরে বিমলার আকস্মিক প্রবেশের সহিত বিদ্যাদিগগজ ঘরের কোণে লুকাইয়া আত্ম- গােপন করিলেন, এবং তাহার শীর্ষরক্ষিত হাঁড়ি হইতে অড়হরের ডাল বিগলিত হইয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মন্দাকিনীর ধারা বহাইল, সেই বিবরণ যখনই পাঠ করিলাম, তখনই বুঝিলাম, যে, বাঙ্গালাসাহিত্য অতি উপাদেয় পদার্থ ; এই সাহিত্যের সরােবরে বিদ্যাদিগগজের মত শতদলকমল যখন বিদ্যমান আছে, তখন গঞ্জাম গঞ্জাম চত্বরপুরের কাটাবন ঠেলিয়াও সেই কমলচয়নের চেষ্টা অনুচিত নহে। ঔপন্যাসিক-বঙ্কিমচন্দ্র-সম্বন্ধে এত লোকে এত কথা কহিয়াছেন যে, আর সে বিষয়ে কোন কথিতব্য আছে কি না, আমি জানি না। কথিতব্য থাকিলেও আমি কোন কথা বলিতে সাহস করিব না। শ্রোতৃগণের মধ্যে অনেকেই হয় ত দাবি করিবেন যে আমি যখন বঙ্কিমচন্দ্রের সম্বন্ধে প্রবন্ধপাঠে উদ্যত হইয়াছি, তখন আমি সূৰ্য্যমুখীর ও ভ্রমরের চরিত্র আর একবার সূক্ষ্মরূপে বিশ্লেষণ করিয়া উভয় চরিত্রের তুলনামূলক সমালােচনে বাধ্য আছি। যদি কেহ এইরূপ দাবি রাখেন, তাহার নিকট আমি ক্ষমাভিক্ষা করিতেছি। বাঁকনল আর টেষ্টটিউব হাতে দিয়া নানাজাতি কিম্ভুতকিমাকার দ্রব্যের বিশ্লেষণ আমার ব্যবসায় বটে, কিন্তু মানবচরিত্র বা মানবীচরিত্র বিশ্লেষণে আমার কিছুমাত্র শিক্ষা বা দক্ষতা নাই ; কেন না, নভেলবর্ণিত-মানবচরিত্র বিশ্লেষণে সফরেট হইড্রোজেনের কিছুমাত্র উপযযাগিতা নাই ; ঐ মানবচরিত্র নমনীয়ও নহে, দ্রবণীয়ও নহে এবং জলে দ্রব করিয়া উত্তাপপ্রয়ােগে উহার বঙ্কিমচন্দ্র २१ ভারতাপাদনও অসম্ভব। আর আমার কাব্যরসগ্রাহিতার যে নমুনা দিয়াছি, তাহাতে আপনারাও আমার নিকট সে আশা রাখেন না। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস-সম্বন্ধে একটা স্থূল কথা আমার বলিবার আছে, সেই কথাটা সংক্ষেপে বলিয়াই আমি আপনাদিগকে রেহাই দিব। এক শ্রেণীর সমালােচক আছেন, তাহারা বলেন, মানবসমাজের সুখ- দুঃখ, রেষারেষি, দ্বেষাদ্বেষি এবং ভালবাসাবাসী যথাযথরূপে চিত্রিকরাই নবেলের মুখ্য উদ্দেশ্য ; উহাতে কল্পনার খেলার অবসর নাই। ইহারা বঙ্কিমচন্দ্রের উপর সম্পূর্ণ প্রসন্ন নহেন। আর এক শ্রেণীর সমালােচক বলেন, পাপপুণ্যের ফলাফলের তারতম্য দেখাইয়া সমাজের নীতিশিক্ষার ও ধর্মশিক্ষার বিধানই নবেলের মুখ্য উদ্দেশ্য হইবে এবং সেই উদ্দেশ্য- সাধনে সফলতা দেখিয়াই নবেলের উৎকর্ষ বিচার করিতে হইবে। ইহারাও বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি সম্পূর্ণ প্রসন্ন নহেন। ব্যাকরণশাস্ত্রে যেমন ভডিকাব্য, ইহাদের মতে ধৰ্ম্মনীতিশাস্ত্রে তেমনি নবেল , কাব্যের ছলনা করিয়া পাঠকগণকে কঁাদানই নবেলচনার মুখ্য উদ্দেশ্য। মানবসমাজের যথাযথ চিত্র আঁকিতে নৈপুণ্যের প্রয়োজন, আর নীতি- শাস্ত্র অতি সাধুশাস্ত্র, ইহা স্বীকার করিয়াও আমরা মনে করিয়া লইতে পারিনবেল এক কাব্য এবং সৌন্দৰ্য্যসৃষ্টিই কাব্যের প্রাণ। নীতিশাস্ত্র কেন, যদি কেহ দর্শনশাস্ত্র বা রসায়নশাস্ত্রকেই নবেলের বিষয় করিতে চাহেন, তাহাতে আপত্তি করিব না। কিন্তু বিষয়টি যদি সুন্দর হয়, তাহা হইলে তাহা কাব্য হয় না। সৌন্দর্য্যেরও প্রকারভেদ আছে; গাছপালার ছবি সুন্দর হইতে পারে, গুপ্তকথার হরিদাসও সুন্দর হইতে পারেন, কিন্তু মানবজীবনের ও জগৎ- সংসারের গােড়ার কথাগুলি যিনি সুন্দর করিয়া দেখাইতে পারেন, তিনিই প্রথমশ্রেণীর কবি। গােড়ার কথা দেখাইলেই কবি হয় না; সেটা দাশ- নিকের ও বৈজ্ঞানিকের ও ধর্মতত্ত্ববিদের কাজ, কিন্তু তাহা সুন্দর করিয়া ২৮ চরিত-কথা দেখাইতে পারিলেই কবি হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের নবেলের মধ্যে সেই রকম গােড়ার কথা দুই একটা সুন্দর করিয়া দেখান হইয়াছে ; এইজন্য কবির আসনে ভঁহার স্থান অতি উচ্চ । মানবজীবনের একটা গােড়ার কথা এই যে, উহা আগাগােড়া একটা সামঞ্জস্যস্থাপনের চেষ্টামাত্র । শুধু মানবজীবনের কথাই বা বলি কেন, বহিঃপ্রতির সহিত অন্তঃপ্রকৃতির নিরন্তর সামঞ্জস্যস্থাপনের নামই জীবন। যাহারা হার্বার্টস্পেন্সারপ্রদত্ত' জীবনের এই পারিভাষিক সংজ্ঞা জানেন, তাঁহারা আমার কথায় সায় দিবেন। জীবনের উহা অপেক্ষা ব্যাপকতর সংজ্ঞা আমি দেখি নাই। যাহার জীবন আছে, তাহাকে দুই দিকের টানাটানির মধ্যে বাস করিতে হয়। ধবলগিরিপৰ্বত বহুকাল হইতে বরফের বােঝা মাথায় করিয়া ভারতবর্ষের পুরুষপরম্পরা অবলােকন করিতেছেন, কিন্তু বিজ্ঞানশাস্ত্র তাহার সজীবতায় সন্দেহ করেন। ধবল- গিরি এত মহান্ হইয়াও শীতাতপের ও জলবৃষ্টির ও তুষারবৃষ্টির উৎপাত অকাতরে সহিয়া আসিতেছেন, এবং শত স্রোতস্বিনীর সহস্র ধারা তাহার কলেবরকে শীর্ণ ও বিদীর্ণ ও ক্ষীণ করিয়া তাহার অভ্রভেদী মস্তককে সমভূমি করিবার চেষ্টা করিতেছে—সেই আপন্নিবারণের জন্য তাঁহার কোন চেষ্টাই নাই। কিন্তু সামান্য একটি পিপীলিকা ক্রমাগত আহার- সংগ্রহ করিয়া আপনার ক্ষয়শীল দেহের পূরণ করিয়া থাকে এবং যদি কেহ তাহাকে দলিত করে, সে দংশন করিয়া আত্মরক্ষণে সাধ্যমত ত্রুটি করে না। একদিকে বহিঃপ্রকৃতি তাহাকে ক্রমাগত ধ্বংসের মুখে টানিতেছে ; অন্যদিকে সে ধ্বংস হইতে আত্মরক্ষার জন্য কেবলই চেষ্টা করিতেছে। তার কীটজীবন এই চেষ্টার পরম্পরামাত্র। যেদিন সেই চেষ্টার বিরাম, সেইদিন তাহার মৃত্যু। মানুষও ঠিক পিপীড়ার মতই জীবন ব্যাপিয়া আপনাকে মৃত্যুর কবল হইতে রক্ষার জন্য ব্যাপৃত। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু অন্তঃ প্রকৃতিকে বহিঃপ্রকৃতির আক্রমণনিবারণে সমর্থ বঙ্কিমচন্দ্র করিয়া মৃত্যুনিবারণের ধারাবাহিক চেষ্টাই তাহার জীবন। সর্বনাশ সমুৎপন্ন হইলে পণ্ডিতলােকে অন্ধত্যাগে বাধ্য হন; তাই মৃত্যু অনিবার্য জানিয়ে পণ্ডিতজীব আপনার অর্ধেককে অপত্যরূপে রাখিয়া অপরাদ্ধকে ত্যাগ করিয়া থাকেন। সৰ্ব্বনাশ সমুৎপন্ন হইলে জীবনের কিয়দংশরক্ষার জন্য এই অপত্যোৎপাদন। আহার, নিদ্রা, প্রভৃতি প্রবৃত্তির একমাত্র উদ্দেশ্য যেন-তেন প্রকারেণ জীবনরক্ষা। জীবনরক্ষার দুই উপায়, আত্মরক্ষা ও বংশরক্ষা। পশুর সহিত নরের এই স্থলে সামান্য ; কাজেই ঐ প্রবৃত্তিগুলিকে আমরা পাশব প্রবৃত্তি বলিয়া থাকি । কিন্তু মানুষের একটু বৈশিষ্ট্য আছে। মানুষ অতি দুর্বল পশু, সবল শত্রুর নিকট আত্মরক্ষার জন্য সে আর একটা কৌশল আশ্রয় করিয়াছে। মানুষ দল বাঁধিয়া বাস করে ; সেই দলের নাম সমাজ। দল বাঁধিয়া থাকিতে হইলে স্বাধীনতাকে ও স্বাতন্ত্রকে সংযত করিতে হয়—নতুবা দল ভাঙিয়া যায়। যে পাশব প্রবৃত্তি সমাজকে তুচ্ছ করিয়া মানুষকে কেবল আত্মরক্ষার দিকে প্রেরিত করে, দলের কল্যাণার্থ মানুষ সেই পাশব প্রবৃত্তির সংযমে বাধ্য হয়। সহজাত সংস্কারের অভাবে অতীতের অভিজ্ঞতায় ভর দিয়া, ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া, বুদ্ধিপূৰ্ব্বক পাশব-প্রবৃত্তিকে সংযত করিতে হয়। এইজন্য যে বুদ্ধি আবশ্যক, তাহার নাম ধৰ্ম্মবুদ্ধি ; ইহা বিশিষ্টরূপে মানবধর্ম। ইহা সমাজরক্ষার অনুকূল, ই লােকস্থিতির সহায়। মানুষের পশুজীবনই ত দুই টানাটানির ব্যাপার ; উহার উপর এই সামাজিক জীবন আর একটা নূতন টানাটানির সৃষ্টি করে। আত্ম- রক্ষার ও বংশরক্ষার অভিমুখে যে সকল প্রবৃত্তি, তাহা মানুষকে এক পথে প্রেরণ করে, আর মানুষের ধর্মবুদ্ধি, যাহা মুখ্যতঃ সমাজরক্ষার অর্থাৎ লােকস্থিতির অনুকূল, গৌণতঃ আত্মরক্ষার অনুকূলমাত্র, তাহা মানুষকে অন্যদিকে প্রেরণ করে। সামাজিক মানুষকে এই দুই টানা টানির মধ্যে পড়িয়া সামঞ্জস্যবিধানের জন্য কেবলই চেষ্টা করিতে হয়। এই চরিত-কথা সামঞ্জস্যস্থাপনের নিরন্তর চেষ্ঠাই মানুষের নৈতিকজীবন। প্রবৃত্তি তাহাকে উদ্দাম স্বাতন্ত্রের দিকে ঠেলে, আর ধর্মবুদ্ধি তাহার অন্তরের অন্তর হইতে তাহাকে নিবৃত্তিমার্গে চালাইতে চেষ্টা করে। এই দুই টানাটানির মধ্যে পড়িয়া মনুষ্য কৃপার পাত্র । এইখানেই মানুষের গােড়ায় গলদ ; Original sin ; এইখানেই অমঙ্গলের মূল ; সংসার-বিষবৃক্ষের বীজ। Origift of evil ; মানবজীবনের উৎকট রহস্যে ইহাই গােড়ার কথা। খােদার সঙ্গে সয়তানের চিরন্তন বিবাদের মূল এইখানে। মনুষ্যের হৃদয় সেই জীবনব্যাপী মহাহবের কুরুক্ষেত্র ;-ধৰ্ম্মের সহিত অধর্মের মহাযুদ্ধ সেখানে নিরন্তর চলিতেছে। বঙ্কিমচন্দ্র চারিখানি উপন্যাসে এই গােড়ার কথাটার আলােচনা করিয়াছেন। সেই মহাযুদ্ধের ক্ষেত্র হইয়া মানবহৃদয় কিরূপ ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত হইয়া থাকে, তাই তিনি সুন্দর করিয়া দেখাইয়াছেন, তাহাতেই তিনি উচ্চশ্রেণীর কবি। বিষবৃক্ষ, চন্দ্রশেখর, রজনী, আর কৃষ্ণকান্তের উইল, এই চারিখানি উপন্যাসের কথা আমি বলিতেছি। এই চারিখানি গ্রন্থের প্রতিপাদ্য বিষয় এক। প্রতাপ ও নগেন্দ্র, অমরনাথ ও গােবিন্দলাল, সকলেই কুসুমসায়কের লক্ষ্য হইয়াছিলেন ; ধৰ্ম্মবুদ্ধির দৃঢ়তা ও প্রবৃত্তির তীব্রতার তারতম্যানুসারে কেহ বা জয়লাভ করিয়াছিলেন, কেহ বা পারেন নাই। বীর্যবন্ত প্রতাপ সারাজীবন প্রবৃত্তির সহিত যুদ্ধ করিয়া সম্পূর্ণ জয়লাভ করিয়াছিলেন, তাঁহার মৃত্যুর পূর্বে তাহার জীবনব্যাপী কঠোর ও নীরব সাধনার বিষয় জগতের লােকে জানিতে পারিয়াছিল। মােহমুগ্ধ অমর- নাথ আপনার পিঠের উপর আকস্মিক পদস্থলনের স্থায়ী চিহ্ন ধারণ করিয়া তাহার স্বাভাবিক দম্ভের বলে পরবর্তী জীবনে সন্ন্যাসী সাজিয়া বেড়াইয়াছিলেন ; পত্নীবৎসল নগেন্দ্রনাথ আপনার আত্মাকে ছিন্ন-ভিন্ন- বিদীর্ণ করিয়া অনাথা পিতৃহীনা বালিকার প্রতি দয়া প্রকাশের ফলভােগ করিয়াছিলেন ; আর সর্বাপেক্ষা কৃপাপ্তাত্র গােবিন্দলাল সর্বতােভাবে বঙ্কিমচন্দ্র ৩১ আপনার অনধীন ঘটনাচক্রের নিষ্ঠুর পেষণে নিষ্পিষ্ট হইয়া আপনাকে কলঙ্কহ্রদে নিমগ্ন করিয়া অবশেষে অপমৃত্যুদ্বারা শান্তিলাভে বাধ্য হইয়া- ছিলেন। এই চারিটি মনুষ্যের বিভিন্ন দশার চিত্র সম্মুখে রাখিয়া আমরা কখনও মানবচরিত্রের মহিমা দেখিয়া স্পর্কিত ও গর্বিত হইতে পারি, কখনও বা জাগতিক শক্তির সম্মুখে মানবের দৌর্বল্য দেখিয়া ভীত হইতে পারি। বঙ্কিমচন্দ্র মানবজীবনের ও জগদ্বিধানের এই সমস্যা—এই গােড়ার কথা অতি সুন্দর চিত্রে চিত্রিত করিয়াছেন এবং এইজন্য তিনি উচ্চশ্রেণীর কবি আজিকার দিনে বঙ্কিমচন্দ্রের অদৃশ্যহস্ত আমাদের জাতীয়জীবনকে যেরূপে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করিতেছে, তাহাতে ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র যতই উচস্থানে অবস্থান করুন, বঙ্কিমচন্দ্রের অন্য মূর্তির পদপ্রান্তে পুষ্পা- ঞ্জলি প্রদান করিতে আজ ব্যগ্র হইব, ইহা স্বাভাবিক। বঙ্কিমচন্দ্র কত- দিক্ হইতে আমাদের জীবনের উপর প্রভুত্ব করিতেছেন, তাহার গণনা দুষ্কর। ইংরেজিতে একটা বাক্য চলিত হইয়াছে, যাহার মূলে গ্রীক নাই, সে জিনিষ জগতে অচল। বলা বাহুল্য, এখানে জগৎ অর্থে কেবল পাশ্চাত্যদেশ বুঝায়। আমরা যদি ঐ বাক্যকে ঈষৎ পরিবর্তিত করিয়া বলি যে, যাহার মূলে বঙ্কিমচন্দ্র নাই, সে জিনিষ বাঙলাদেশে অচল, তাহা হইলে নিতান্ত অত্যুক্তি হইবে না। ইংরেজি গতিবিজ্ঞানে একটা শব্দ আছে, মােমেন্ট ; বাঙলায় উহাকে ঝোঁক’শব্দে অনুবাদ করিতে পারি। বঙ্কিমচন্দ্র যে কয়েকটা জিনিষকে ঝোঁক দিয়া ঠেলিয়া দিয়া গিয়াছেন, সেই কয়টা জিনিষ বাঙলাদেশে চলিতেছে। সেই জিনিষগুলা গতি উপার্জনের জন্য যেন বঙ্কিমচন্দ্রের হস্তের প্রেরণার অপেক্ষায় ছিল; বঙ্কিমচন্দ্র হাত দিয়া ঠেলিয়া দিলেন, আর উহা চলিতে লাগিল, তাহার পর আর উহা থামে নাই। দৃষ্টান্তস্বরূপ প্রথমে নবেলের কথাটাই ধরা যাক। বঙ্কিমবাবুর ০ ৩২ চরিত-কথা পূৰ্ব্বেও অনেকে বাঙলা নবেল লিখিয়াছিলেন; তাহাতে কিসের যেন অভাব ছিল। ইংরেজিনবিশ অনেক লেখক ইংরেজি নববলের অনুকরণে বাঙলা নবেল লিখিয়াছিলেন; কিন্তু কিএকটা অভাবের জন্য উহা বাঙলা সাহিত্যে লাগে নাই। বঙ্কিমচন্দ্ৰ নবেল লিখিলেন, আর একদিনেই বাঙলায় সাহিত্যের একটা নূতন শাখার সৃষ্টি হইল। স্রোতস্বতীর যে ক্ষীণাধারা প্রবাহিত হইতেছিল, এখন উকা নূতন পথ পাইয়া বিপুলকায় গ্রহণ করিয়া শত উপশাখার সৃষ্টি করিয়া দেশ ভাসাইয়া জলপ্লাবন উপস্থিত করিল। সকলেই জানেন যে, এই জলপ্লাবনে সাহিত্যক্ষেত্ৰ ভাসিয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছে। বলা বাহুল্য, বাঙলার অধিকাংশ নবেলেই অপেয়, অদেয় ও অগ্রাহ্য ; কিন্তু ইহার জন্য বঙ্কিমচন্দ্র দায়ী নহেন। ইহাতে দেশের দারিদ্রের ও দুরবস্থারই পরিচয় দেয়। বঙ্কিমচন্দ্রের কৃতিত্বের ইহাতে অঙ্গহানি হয় না। এখন হয় ত বাঁধ বাঁধিয়া দেশেকে এই প্লাবন হইতে রক্ষা করিবার সময় উপস্থিত হইয়াছে, কিন্তু এই মুদ্রান্ত্রের স্বাধীনতার দিনে সেইরূপ বাঁধ বাঁধিবার কোন উপায় দেখি না। বঙ্কিম- চন্দ্রের পর যাহারা নবেল লিখিয়াছেন, তাহারা যদি প্রকৃতপক্ষে বঙ্কিমচন্দ্রের অনুবর্তী হইয়া সৌন্দৰ্যসৃষ্টিকেই কাব্যরচনার মুখ্য উদ্দেশ্য করিতেন, তাহা হইলে আমাদের এতটা আতঙ্কিত হইবার সম্ভাবনা থাকিত না। বঙ্কিমচন্দ্রকেই আমরা এদেশে মাসিকপত্রের প্রবর্তক বলিয়া নির্দেশ করিতে পারি । বঙ্গদর্শনের পূর্বেও অনেক মাসিকপত্রিকা বাহির হইয়াছিল, কিন্তু তাতেও কি-যেন-কি একটার অভাব ছিল, তাই তাহার সহিত্যসমাজে প্রভূত্ববিস্তার করিতে পারে নাই। বঙ্গদর্শনই প্রথমে ভবিষ্যতের মাসিকপত্রের রচনারীতি ও সঙ্কলনরীতি নির্দিষ্ট করিয়া দিল ; তদবধি সেই রীতি মাসিকপত্রের সম্পাদকগণকর্তৃক অনুসৃত হইয়াছে। ইহার পূর্বে মাসিকপত্র দাঁড়াইয়া ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের হস্তের প্রেরণা পাইয়াই মাসিকপত্র বঙ্গসাহিত্যে, চলিতে লাগিল। ।
বঙ্কিমচন্দ্র নবেলের মত এই মাসিক সাহিত্যও বিদেশ হইতে এদেশে আমদানি। এক দেশের গাছের বীজ আনিয়া অন্য দেশে উহার চাষের চেষ্টা বহুদিন হইতে প্রচলিত আছে। আজ ক্ষুব্ধ ভারতবর্ষ বিদেশের দ্রব্য গ্রহণ করিব না বলিয়া আস্ফালন করিতেছে, কিন্তু বিদেশী জিনিষকে স্বদেশে স্থান দিতে ভারতবর্ষের কোনকালে আপত্তি ছিল না। আলুর বীজ ও পেঁপের বীজ বিদেশ হইতেই এদেশে আসিয়াছিল ; এবং আফিমে জন্য ও তামাকের জন্য ভারতবাসী বিদেশের নিকট চিরঋণে আবদ্ধ আছেন। অজ্ঞাতকুলশীল অতিথিকে আপন ঘরে স্থান দিতে ভারতবাসী কস্মিন্- কালে কুণ্ঠাবােধ করে নাই। বিদেশের সামগ্রী গ্রহণ করিতে আমাদের কোনকালেই ঔদার্যের অভাব ছিল না। বিদেশের সকল বীজ এদেশের ক্ষেতে ধরে না, কিন্তু কোন-কোনটা বেশ ধরিয়া যায়। কোন কোন বীজ ফলাইবার জন্য চাষের প্রণালীকে ক্ষেতের অনুযায়ী করিয়া লইতে হয়। নবেলের বীজ ও মাসিকপত্রিকার বীজ বঙ্কিমচন্দ্রের পূর্বেই আসিয়াছিল ; —যাহারা উহার আমদানি করিয়াছিলেন, তাঁহারা উহা ফাইতে পারেন নাই। বঙ্কিমচন্দ্র যেদিন চাষের ভার গ্রহণ করিলেন, সেইদিন উহা জমিতে লাগিয়া গেল ; এখন উহার শস্যসম্পত্তিতে সুজলা সুফলা বঙ্গধরিত্রী ভারাক্রান্ত হইয়া পড়িয়াছেন বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। আফিম এবং তামাক, এই দুই উপাদেয় ফসল এদেশের জমিতে যেমন লাগিয়া গিয়াছে, নবেলের এবং মাসিকপত্রিকার শস্যসম্পং কিছুতেই তাহার নিকট নুনতা স্বীকার করিবে না। বাঙ্গলায় নবেলসাহিত্যের ও মাসিক সাহিত্যের সৃষ্টি করিয়া বঙ্কিমচন্দ্র যশস্বী হইয়া গিয়াছেন, কিন্তু তিনি তার অপেক্ষাও বড় কাজ করিয়া গিয়াছেন। বাঙ্গলাসাহিত্যে তাহার কোন্ কাজ সৰ্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ, তাহা জিজ্ঞাসা করিলে আমি বলিব, তিনি সাহিত্য উপলক্ষ্য করিয়া আমাদিগকে আপন ঘরে ফিরিতে বলিয়াছেন এরং সে বিষয়ে তিনি যেমন কৃতকাৰ্য্য হইয়া- ৫ ৩৪ চরিত-কথা ছেন, অন্য কেহই সেরূপ হন নাই। বিদেশের ভাষা অবলম্বন করিয়া আমরা যে বড় হইতে পারিব না, বিদেশের ভাষার সাহায্যে সাহিত্যসৃষ্টি করিয়া বড় হইবার চেষ্টা যে অস্বাভাবিক ও উপহাস্য, তাহা বঙ্কিমচন্দ্রই আমাদিগকে বুঝাইয়া গিয়াছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের বহুপূৰ্ব্বে মহাত্মা রামমােহন রায় দেশের লােকের সঙ্গে কথা কহিবার জন্য দেশের ভাষারই আশ্রয় লইয়াছিলেন ; তিনিলাঙ্গলায় সাময়িকপত্র প্রচার করেন, বাঙ্গলায় বেদান্তশাস্ত্র প্রকাশ করেন ; দেশের লােকের মতিগতি ফিরাইবার জন্য দেশের লােকের অবােধ্য ভাষায় দেশের লােককে সম্বােধনের অদ্ভুত প্রণালী তাহার স্থিরবুদ্ধি সঙ্গত বলিয়া গ্রহণ করে নাই। এমন কি, তিনিই বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে বাঙ্গলাভাষায় প্রথম ও শেষ ব্যাকরণ লিখিয়া গিয়াছেন। রামমােহন রায় যাহা বুঝিয়াছিলেন, তাহার পরবর্তী বাঙ্গালীরা তাহা বুঝিতে পারেন নাই। হিন্দুকালেজ-প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপন্ন ইয়া গেল যে, হিন্দুস্থানে হিন্দুসন্তানের আশ্রয় বা আলম্বন, হিন্দুসন্তানের জ্ঞাতব্য বা রক্ষিতব্য কিছুই নাই। বর্বর জাতির প্রাচীন সাহিত্যে ক্ষীর- সমুদ্র ও দধিসমুদ্রের কথা ভিন্ন আর কোন কথা নাই সিদ্ধান্ত করিয়া লর্ড মেকলে এদেশে পাশ্চাত্যশিক্ষা আনয়ন করিলেন। বিদেশের এই নূতন আমদানি শিক্ষাকে এদেশের লােকে সমাদরে গ্রহণ করিল ও তাহার সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত করিয়া বসিল, যে এই বর্বরের ভাষায় সাহিত্যসৃষ্টির চেষ্টা সম্পূর্ণ বৃথা হইবে। ইংরেজিশিক্ষার প্রথম ধাক্কায় আমাদিগকে ঘর হইতে বাহিরে লইয়া পরের দ্বারে ভিক্ষার্থিবেশে স্থাপিত করিয়াছিল, বঙ্কিমচন্দ্র আমাদিগকে আপন ঘরে ডাকিয়া আনেন। বিদ্যাসাগরমহাশয় বাঙ্গলাভাষাকে সংস্কৃত করিয়া উহাকে সাহিত্যসৃষ্টির উপযােগী করিয়াছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র উহাকে পুনঃসংস্কৃত করিয়া বাঙ্গলাসাহিত্যের সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন। ইংরেজি লিখিয়া যশস্বী হইবার অস্বাভাবিক দুরভিলাষের বন্ধন-হইতে বঙ্কিমচন্দ্রই আমাদিগকে মুক্তি দিয়া গিয়াছেন।
বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্কিমচন্দ্র যাহার মূলে নাই, সে জিনিষ বাঙ্গলাদেশে চলে । রামমােহন রায় বাঙ্গলাভাষার সাহায্যে বাঙ্গলাসাহিত্যের সৃষ্টির প্রয়াস পাইয়াছিলেন, কিন্তু তাহার চেষ্টা চলে নাই; তাহার পরবর্তী শিক্ষিত- বাঙ্গালী সেই গতির রােধ করিয়াছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সংস্কৃত ভাষার ও সংস্কৃত সাহিত্যের পুণ্যতােয়ে বাঙ্গলাভাষাকে স্নান করাইয়া তাহার দীপ্তকলেবর শিক্ষিতসমাজের সম্মুখে উপস্থিত করিয়াছিলেন কিন্তু শিক্ষিত সমাজ তাহার প্রতি শ্রদ্ধাপ্রকাশ কৰ্ত্তব্য বােধ করে নাই। রামমােহন রায়ের ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দেব দেহের জ্যোতির্মণ্ডিত শিরােভূষণ হইতে একথানি মাণিক্য অপসারণ না করিয়াও আমরা স্বীকার করিতে পারি যে, তাহারা যে কাৰ্য্যে অসমর্থ হইয়াছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভা অবলীলাক্রমে সেই কাৰ্যসম্পাদনে সমর্থ হইয়াছিল। আমার প্রিয়সুহৃৎ শ্ৰীযুক্ত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত মহােদয় সেদিন রাগের মাথায় তাঁহার বহুপরিশ্রমে উপার্জিত ইংরেজি বিশ্ববিদ্যালয়দত্ত ডিপ্লোমা- খানিকে চোতাকাগজ বলিয়া ফেলিয়াছিলেন। উপস্থিত প্রবন্ধলেখকেরও ঐরূপ একখানি কাগজ আছে; কিন্তু যখন উহার উপর নির্ভর করিয়াই জীবিকা অর্জন করিতেছি এবং উহার বলেই আজি আপনাদের সম্মুখে দাঁড়াইতে সাহস করিতেছি, তখন ঐ কাগজ খানির প্রতি ওরূপ অপভাষা প্রয়ােগ করিতে চাহি না। এ বৎসর অনেকে বিলাতী লবণ খাইব না এই জেদ করিয়াছেন, কিন্তু আমাদের রক্তবিন্দুর রাসায়নিক বিশ্লেষণে এখনও ঐ দ্রব্যের অস্তিত্ব ধরা পড়িবে। এতদিন ধরিয়া বিলাতী লবণ হজম করিয়া তাহার গুণ গাহিব না পণ ধরিয়া বসিলে নিমকহারামি হইবে। পাশ্চাত্যশিক্ষা হইতে আমরা কোন উপকারই পাই নাই, এ কথা পুরাদমে বলিতে পারিব না। পাশ্চাত্যশিক্ষা হইতে কিছু লাভ করিয়াছি সত্য, কিন্তু পাশ্চাত্যশিক্ষা আমাদের সকলকেই অল্পবিস্তর মুগ্ধ ও অভিভূত করিয়াছিল, ইহাও ততােধিক সত্য। বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনেতিহাস D চরিত-কথা যাঁহারা অবগত আছেন, তাহারা জানেন, বঙ্কিমচন্দ্রও এই আক্রমণ হইতে নিস্তার পান নাই। তবে বঙ্কিমের সহিত অন্যের বিষয়ে প্রভেদ আছে। নীর বর্জন করিয়া ক্ষীরগ্রহণের ক্ষমতা একা রাজহাঁসেরই আছে। বঙ্কিমচন্দ্ররূপী রাজহংস পাশ্চাত্যনীর হইতে যে পরিমাণ ক্ষীর সংগ্রহ করিয়া স্বজাতিকে উপহার দিয়াছেন, আমাদের মত দাঁড়কাকের দ্বারা ততটার সম্ভাবনা নাই। বঙ্কিমচন্দ্রের মাহাত্ম্য এই যে, তিনি কেবল ক্ষীরসংগ্রহ করিয়া নিরস্ত হন নাই, তিনি পাশ্চাত্যশিক্ষার আকর্ষণ ও মােহপাশ সবলে ছিন্ন করিয়া ডঙ্কা বাজাইয়া আপন ঘরে ফিরিয়াছিলেন ও মাতৃমন্দিরে আনন্দ- মঠের প্রতিষ্ঠা করিয়া আমাদিগকে তাহার ভিতর আহ্বান করিয়াছিলেন। বঙ্গদর্শনের বঙ্কিমচন্দ্র পাশ্চাত্যশিক্ষার মােহবন্ধন সম্পূর্ণ কাটাইয়াছিলেন কি না, বলিতে পারি না, কিন্তু প্রচারের পশ্চাতে যে বঙ্কিমচন্দ্র দাঁড়াইয়া- হিলেন, তাহাকে রাহুগ্রাসমুক্ত পূর্ণচন্দ্রের মত দীপ্তিমান্ দেখি । তিনি তখন গীতার উক্তির আশ্রয় লইয়া স্বদেশবাসীকে ভয়াবহ পরধর্ম হইতে স্বধৰ্ম্মে প্রত্যাবৃত্ত হইতে আহ্বান করিতেছিলেন। ভয়াবহ অভিধান দিয়া পরধর্মকে নিন্দা করা আমার অভিপ্রেত নহে; ধৰ্ম্মের একটা সার্বভৌমিক এবং সনাতন অংশ আছে, তাহা সকল ধৰ্ম্মেই সমান ; সে অংশটুকুতে কাহারও ভীত হইবার কোন কারণ নাই ; কিন্তু ধৰ্ম্মের আর একটা অংশ আছে, তাহা দেশভেদে ও কালভেদে মূৰ্ত্তন্তর গ্রহণ করে। ধর্ম যখন লােকস্থিতির সহায়, এবং লােকস্থিতির নিয়ম যখন বিভিন্ন দেশে ও বিভিন্ন কালে বিভিন্ন, তখন ধৰ্ম্মের এই অংশ দেশকালের অপেক্ষা না করিয়া থাকিতে পারেন না। কোন দেশেই মানবসমাজের অবস্থা চিরদিন সমান থাকে না। একটা মানবসমাজ পার্শ্ববর্তী মানবসমাজের সংস্পর্শে ৰা সংঘর্ষে আসিয়া তাহার সমাজব্যবস্থা পরিবর্তিত করিতে বাধ্য হয়। কাজেই ধৰ্ম্মের এই অংশ দেশকালানুরূপ না হইলে উহা তদ্দেশে ও তৎকালে .
বঙ্কিমচন্দ্র ৩৭ লােকস্থিতির অনুকূল হয় না। তৎদেশে ধৰ্ম্মের এই অংশের সহিত তত্তৎদেশের প্রাচীন ইতিহাসের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ। প্রাচীনের সহিত সম্পর্ক একেবারে বিচ্ছিন্ন করিলে কোন সামাজিক ব্যবস্থাই কোন দেশে লােক- স্থিতির অনুকূল হয় না। চুল হয় না। যখন বিভিন্ন সমাজের ইতিহাস বিভিন্ন পথে চলিয়াছে, তখন লােকস্থিতির অনুরােধে ধৰ্ম্মকেও আত্মসমাজের অনুকূল- মূর্তি গ্রহণ করিতে হয়। এইখানেই আত্মধৰ্ম্ম ও পরধৰ্ম্মে ভেদ আসিয়া পড়ে। যে ধৰ্ম্ম এক সমাজে লােকস্থিতির অনুকূল, সে ধৰ্ম্ম অন্য সমাজে অনুকূল না হইতে পারে। এইখানে এ কথাটা মনে রাখিতে হইবে যে, ধৰ্ম্মশব্দের লক্ষ্য কেবল রিলিজন, নহে। আমাদের শাস্ত্রে ধর্মশব্দের সংজ্ঞা আরও ব্যাপক ; মানুষের অনুষ্ঠেয় প্রত্যেক কৰ্ম্ম,দাঁতনকাঠির ব্যবহার হইতে ঈশ্বরােপাসনা পৰ্যন্ত সমস্তই ধর্মের অন্তর্ভুক্ত। এই হিসাবে যাহা বিদেশীর ধৰ্ম্ম, তাহা ভারতবাসীর ধৰ্ম্ম হইতেই পারে না। ইয়ুরােপের প্রাচীন ইতিহাস ও ইয়ুরােপের আধুনিক সমাজতন্ত্র যখন ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস ও ভারতর্ষের আধুনিক সমাজতন্ত্রের সহিত এক নহে, তখন ইয়ুরােপীয়দের ধর্ম আমাদের পক্ষে পরধর্ম। উহাদের খ্ৰীষ্টানির কথা বলিতেছি না, উহাদের আইনকানুন, আহারবিহার, চালচলন, আদব-কায়দা সমস্তই আমাদের নিকট পরধৰ্ম্ম ; আমাদের ধৰ্ম্ম ও তেমনি উহাদের নিকট পরধর্ম ; এবং বিনা বিচারে ও বিনা কারণে একের পক্ষে অন্যধৰ্ম্মগ্রহণ প্রকৃতপক্ষেই ভয়াবহ। সৌভাগ্যক্রমে এই পরধৰ্ম্মবাৎসল্যের মােহ শীঘ্রই কাটিয়া গিয়াছিল, এবং বঙ্কিমচন্দ্র যখন তাহার স্বজাতিকে আপন ঘরে ফিরিবার জন্য ডাক দিলেন, তখন আমরা আগ্রহের সহিত সেই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিলাম। আজি আমরা যে আপন ঘরে প্রত্যাবর্তনের জন্য ব্যাকুল হইয়াছি, বিশবৎসর পূর্বেই সেই প্রত্যাবর্তনের ডাক পড়িয়াছিল ; এবং বঙ্কিমচন্দ্রের পথভ্রষ্ট স্বদেশবাসী সেই ডাকে সাড়া দিতে ঔদাসীন্য দেখায় নাই। আজ সেই ডাক আরও উচ্চৈঃস্বরে পড়িয়াছে, এবং তপস্বী বঙ্কিমচন্দ্র ৩৮ চরিত-কথা মর্ত্যলােকের তপস্যার সমাধান করিয়া অদৃশ্য তপােলােক হইতে আমাদিগকে সেই পরিচিতস্বরে আবার ডাকিতেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রকে কেহ কেহ apostle of culture বলিয়া থাকেন। ধৰ্ম্মের সার্বভৌমিক অংশের আলােচনায় প্রবৃত্ত হইয়া বঙ্কিমচন্দ্র সমুদয় বৃত্তির সর্বাঙ্গীণ সামঞ্জস্য বিধানকে ধৰ্ম্ম বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিলেন। আমরা ধৰ্ম্মের এই সংজ্ঞা স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করিতে পারি। পূর্বেই লিয়াছি, বহিঃ প্রকৃতির সহিত অন্তঃপ্রকৃতির অবিরত সামঞ্জস্যসাধনচেষ্টার নাম জীবন, এবং যখন সমুদয় বৃত্তির সর্বাঙ্গীণ সামঞ্জস্যবিধান না ঘটিলে বহিঃপ্রকৃতির সহিত অন্তঃ প্রকৃতির পূর্ণ সামঞ্জস্য ঘটিবার সম্ভাবনা নাই, তখন ধৰ্ম্মই জীবনরক্ষার একমাত্র উপায়—“ধৰ্ম্মে রক্ষতি রক্ষিতঃ”। ধৰ্মই মানবজীবনকে রক্ষা করে, কেবল ব্যক্তির জীবন বা বংশের জীবন কেন, সমাজের জীবনও ধৰ্ম্মই রক্ষা করে; এবং যদি কেহ ঐহিক জীবনের উপর পারত্রিক জীবনের রক্ষাকেও ধর্মের উদ্দেশ্য বলিতে চাহেন, তাঁহারও সহিত আমি অজি বিবাদ করিতে প্রস্তুত নহি। বঙ্কিমচন্দ্রপ্রযুক্ত ধৰ্ম্মের এই বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা গ্রহণ করলে উহা culture অপেক্ষা ব্যাপক হইয়া উঠে। এই ধর্মের অন্বেষণের জন্য বঙ্কিমচন্দ্র আপন ঘরে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া গীতাশাস্ত্রের আশ্রয় লইয়া- ছিলেন। এই ব্যাপক অর্থে ধৰ্ম্মশব্দ প্রয়ােগ করিলে সার্বভৌমিক ও ও প্রাদেশিক উভয় ধৰ্ম্ম উহার অন্তর্নিবিষ্ট হইয়া পড়ে; এবং বঙ্কিমচন্দ্র দেখাইতে চাহিয়াছিলেন, সেই সাৰ্বভৌমিক ধর্মের বা প্রাদেশিক যুগ- ধৰ্ম্মের অন্বেষণের জন্যও আমাদিগকে পরের দ্বারে ভিক্ষার্থী হইয়া দাঁড়াইতে হইবে না। আজ গীতার সুলভ সংস্করণ লােকের পকেটে- পকেটে বিরাজ করিতেছে, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র যে সময়ে গীতার ব্যাখ্যা করিতে প্রবৃত্ত হন, তখন ইংরেজশিক্ষিত লােকের মধ্যে উহা বিরলপ্রচার ছিল। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র যাহার মূলে, বাঙ্গলাদেশে সে জিনিষ অচল থাকে বঙ্কিমচন্দ্র না, তাহা প্রচলিত হয় ; তাই বঙ্কিমচন্দ্র যে দিন “নব জীবন” ও “প্রচার আশ্রয় করিয়া বঙ্গবাসীকে তাহার আপন শাস্ত্রের সহিত পরিচিত করিলেন, সেইদ্রিন হইতে সেই শাস্ত্র কথা বাঙ্গলাদেশের শিক্ষিতসমাজে চলিতে লাগিল। তদবধি উহা আর থামে নাই। বঙ্কিমচন্দ্ৰই প্রথমে শিক্ষিত বাঙ্গালীর সম্মুখে স্বদেশের শাস্ত্র স্থাপন করিয়াছিলেন, এ কথা বলিলে ভুল হইবে। তাহার অনেক পূৰ্বে বঙ্গ- জননীর আর এক সন্তান বিশ্বজগতে পুরাণকবির চতুৰ্ম্ম খনিঃসৃত এবং ভারতের প্রাচীন ঋষিগণের শ্রুতিপ্রবিষ্ট বাণীর মধ্যে সার্বভৌমিক ধৰ্ম্মের সন্ধান পাইয়া পুলকিত হইয়াছিলেন; এবং তাহার পরে বঙ্গ জননীর আর একজন সন্তান ঈশােপনিষদগ্রন্থের পরিত্যক্ত পাতার মধ্যে সেই ধৰ্ম্মের সন্ধান পাইয়া আপনাকে ধন্য মানিয়াছিলেন। মহাত্মা রামমােহন রায় ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রুতিবাক্যের যে অর্থ গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহা আমি গ্রহণ করিতে পারি নাই। কিন্তু তাঁহারা ভারতবর্ষকে স্বকীয় সামর্থ্যের উপর আত্মপ্রতিষ্ঠা করিতে আহ্বান করিয়া ভারতবাসীর যে জ্ঞানান্ধতা অপনােদন করিয়া গিয়াছেন, তজ্জন্য আমি তাঁহাদের স্বদেশে জন্মিয়া ধন্য হইয়াছি। এ কথা গােপন করিবার প্রয়ােজন নাই যে, ঐ দুই মহাপুরুষের অনুবর্তীরা ধৰ্ম্মতত্ত্বের অনুসন্ধানের জন্য বিদেশে যাত্রা আবশ্যক বােধ করিয়াছিলেন এবং অন্য দেশের অন্য জাতির শাস্ত্র হইতে সার্বভৌমিক ধৰ্ম্মের সারসঙ্কলনে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। ধৰ্ম্মপিপাসুর পিপাসা যদি তাঁহাদিগকে পানীয়-অন্বেষণে পৃথিবীভ্রমণে বাধ্য করে, তাহাতে দুঃখিত হইবার কোনই কারণ নাই। এই বিদেশ-যাত্রীদিগের পরিশ্রমের জন্য আমরা তত দুঃখিত নহি, কিন্তু বিদেশের আকর্ষণ তাঁহারা স্বদেশী- সামগ্রীর প্রতি যদি উপেক্ষা বা অবজ্ঞা প্রদর্শন করিরা থাকেন, তাহার জন্য ক্ষোভ করিবার হেতু আছে। যাহাই হউক, ধৰ্ম্মতত্ত্বের অনুসন্ধানে বিদেশপর্যটন অনাবশ্যক হইলেও আমরা ঐ অনাবশ্যক পরিশ্রমে প্রবৃত্ত ৪ ০ চরিত-কথা হইয়াছিলাম। এমন সময়ে বঙ্কিমচন্দ্র আমাদিগকে আপন ঘরে প্রত্যাবর্তনের জন্য ডাক দিলেন। শিক্ষিত বাঙ্গালী সেই আহ্বান শুনিল ও মাতৃমন্দিরে আনন্দমঠে ফিরিয়া আসিতে সঙ্কোচবােধ করিল না। গীতাশাস্ত্র ধৰ্ম্মের কেবল সার্বভৌমিক সনাতন অংশের উপদেশ দিয়া নিরস্ত হন নাই, প্রাদেশিক ধৰ্ম্ম ও যুগধৰ্ম্মের তত্ত্বও ঐ শাস্ত্রের প্রতিপাদ্য। কয়েকসহস্র বৎসর ধরিয়া ভারতবাসী গীতাশাস্ত্রে যে সহস্ৰশীর্ষ পুরুষের মুখনিঃসৃত অভয়বাণী শুনিয়া আসিতেছে, তাহার সহস্র অক্ষি সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ও ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্রতম অংশে নিবদ্ধ আছে। অতএব ঐ শাস্ত্রের উক্তির মধ্যে প্রাদেশিক ধৰ্ম্মের ও যুগধর্মের মাহাত্মকীৰ্ত্তন দেখিয়া বিস্মিত হইতে হইবে না। যুগধৰ্ম্মসংস্থাপনের জন্য যিনি যুগে যুগে সদ্ভূত হন, তিনি ধৰ্ম্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রের মােহবের যুগে কোন্ মূর্তিতে সস্তৃত হইয়াছিলেন, মহাভারতের মহাসাগর মন্থন করিয়া ভারতবাসীর নিকট লুপ্তপ্রায় সেই মূর্তির উদ্ধারের জন্য বঙ্কিমচন্দ্র যত্নপর হইয়াছিলেন। লুপ্তপ্রায় বলিলাম, তাহার একটু তাৎপর্য আছে। ভারতবর্ষের বৈষ্ণবসম্প্রদায় ভগবানের যে মূর্তিকে পূজার জন্য আগ্রহের সহিত গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহা কুরুক্ষেত্রে সংশপ্তক সেনার সম্মুখীন পার্থসারথির মূর্তি নহে, তাহা বৃন্দাবনবিহারী গােপীজনবল্লভ বংশীবদনের মূর্তি; তাহা নবনীতচৌর উদূখলবদ্ধ বাল- গােপালের মূৰ্ত্তি ; তাহা বৎসকুলের সহিত কেলিপর যমুনাপুলিনবিহারী গােপসখার মূর্তি যে মূর্তিতে ভগবান শ্ৰী-করত মােহনমুরলীর প্রত্যেক বন্ধ শ্রীমুখমারুতে পূর্ণ করিয়া তদুদগত স্বরস্রোতে বিশ্বপ্রকৃতির মর্মস্থলে আনন্দের ধারা সঞ্চার করেন, উহা সেই মূর্তি। ঈশ্বরের ঐশ্বৰ্য্যমণ্ডিত মূর্তি ভারত্ববর্ষের উপাসকসম্প্রদায়ের সম্পূর্ণ তৃপ্তি জন্মাইতে পারে নাই; ভারতবাসী ঐশ্বর্যের অপেক্ষা মাধুর্যের উপাসনায় পক্ষ- পাতিতা দেখাইবে, ইহাতেও বিস্মিত হইব না। বঙ্কিমচন্দ্র মহাভারত- বঙ্কিমচন্দ্র ৪১ ; সাগর মন্থন করিয়া যে মূর্তিকে স্বদেশবাসীর সম্মুখে স্থাপন করিয়াছিলেন, তাহা যুগধর্ম প্রবর্তকের মূর্তি ; তাহা ধৰ্ম্মরাজ্যসংস্থাপকের মূৰ্ত্তি—ধৰ্ম্মের সহিত অধৰ্ম্মের সংঘর্ষ উপস্থিত হইলে যে মূর্তি গ্রহণ করিয়া তিনি সম্ভুত হন, উহা সেই মূর্তি ; রাষ্ট্রবিপ্লব উপস্থিত করিয়া যিনি রাষ্ট্ররক্ষা করেন, উহা তাহার মূর্তি ; জীবনসংগ্রামে জীবন ধ্বংস করিয়া যিনি জীবন রক্ষা করেন, উহা তাঁহার মূর্তি; লোকস্থিতির অনুরােধে যিনি নির্বিকার ও নিষ্করুণ হইয়া বসুন্ধরাকে শােণিতক্লিন্ন দেখিয়া থাকেন, উহা তাঁহারই মূর্তি। যিনি বিশ্বজগতের রন্ধে রন্ধে, সঞ্চারিত করূণা প্রবাহের একমাত্র উৎস, তিনি যে কি কারণে ও কি উদ্দেশ্যে এই নিষ্করুণমূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া জীবরক্তে বসুধা সিক্ত দেখিতে বাধ্য হন, তাহা তিনিই জানেন ; মনুষ্যের শাস্ত্র এখানে মূক ; অথবা এই মূর্তিগ্রহণ সেই সনাতনী মায়ার সহিত অভিন্ন,যাহা হইতে এই বিশ্বজগতের জন্মদি, যাহা হইতে জীবের জীবন, যাহা হইতে জীবনে বহিঃপ্রকৃতির সহিত অন্তঃ:প্রকৃতির নিরন্তর সামঞ্জস্যস্থাপনের চেষ্টা ঘটিতেছে, যাহা হইতে মানবের সকল দুঃখের নিদান সেই খৃষ্টানকথিত পাপপ্রবণতার উৎপত্তি হইয়াছে ; অথবা কবির ভাষায় বলিতে পারি,—ইহা সেই আধ-সত্য, জ্ঞানী যখন তাহার আত্মার মধ্যে জগৎকারণের সন্ধান পাইবেন, যখন তিনি আপনাকেই এই জগান্তির কারণ বলিয়া জানিতে পারিবেন, যখন তাহার অপূর্ণ জগৎস্বপ্ন উদ্বোধনে বিলীন হইবে, তখন সেই মহাস্বপ্নভাঙা দিনে যে আধ-সত্য- ০ সত্যের সমুদ্রমাঝে হয়ে যাবে লীন। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে আর বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচয়িত্রে আমরা এই যুগধৰ্ম্ম-প্রতিষ্ঠার বিশিষ্ট চেষ্টা দেখিতে পাই। তাহার জীবনের শেষভাগের প্রত্যেক কাৰ্যই বােধ করি এই উদ্দেশ্যের অভিমুখ। বঙ্কিমচন্দ্ৰই প্রথমে আমাদিগের নিকট যুগধৰ্ম্মের আবশ্যকতা নির্দেশ করিয়াছিলেন এবং ৪২ চরিত-কথা যুগধর্মের সংস্থাপনের জন্য যিনি যুগে যুগে সদ্ভূত হন, তাহার মহৈশ্বৰ্য্যমণ্ডিত মূৰ্ত্তি আমাদের হৃদয় মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। বঙ্গজননীর প্রত্যেক সন্তানের হৃদয়ভূমি মাতৃভক্তির জাহ্নবীজলে মার্জিত করিয়া তাহাকে তাঁহার সিংহাসনস্থাপনের উপযােগী করিতে হইবে। তিনি যে পবিত্র আসনে উপবিষ্ট হইবেন, তাহা পুণ্যতােয়ে অভিষিক্ত করা আবশ্যক।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ আমরা যাহার বরণীয় স্মৃতির উপাসনার জন্য আজ এই সভাস্থলে উপস্থিত হইয়াছি, ব্রাহ্মসমাজের সহিত ও ব্রাহ্মধৰ্ম্মের সহিত সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করিয়া তাহাকে স্মরণ করা একান্ত কঠিন। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক সাহিত্য- পরিষদের সঙ্কীর্ণ প্রাচীরের মধ্যে আবদ্ধ থাকিয়া আমাদিগকে সেই কঠিন কাৰ্যে হস্তক্ষেপ করিতে হইবে। তবে পারিভাষিক হিন্দুধর্ম বা পারি- ভাষিক ব্রাহ্মধৰ্ম্ম অপেক্ষা যে সনাতন ধর্মের ভিত্তি প্রশস্ততর, সেই ভিত্তির আশ্রয়ের উপর দণ্ডায়মান হইয়া আমরা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুণ্যসমুজ্জ্বল মূৰ্ত্তির প্রতি অকুতােভয়ে দৃষ্টিপাত করিতে পারি আরও আহলাদের বিষয় এই যে, সেই সনাতন ধর্মের প্রকোষ্ঠ হইতে সাহিত্যকে নির্বাসিত করিয়া,-সাহিত্যকে ধৰ্ম্ম হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া-দেখিবার কিছুমাত্র প্রয়ােজন নাই। অন্য দেশে ধৰ্ম্মের পারিভাষিক সংজ্ঞা যাহাই হউক, আমাদের এই ভারতবর্ষে ধৰ্ম্মের সংজ্ঞা আয়ত ও প্রশস্ত। যাহা ধরিয়া আছে, তাহাই ধৰ্ম্ম ; যাহা মানবের ব্যক্তিগত জীবনকে ধরিয়া আছে, যাহা মানবের সামাজিক জীবনকে ধরিয়া আছে ও আরও উদ্ধে উঠিয়া যাহা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে ধরিয়া আছে, আমাদের শাস্ত্রের নির্দেশক্রমে তাহারই নাম ধৰ্ম্ম। সাহিত্য তাহার অঙ্গীভূত। ধৰ্ম্মরূপ সনাতন অশ্বথের মূল রহিয়াছে উর্ধে দেবলােকে; ইহার শাখা প্রশাখা অবায়ুখে প্রসারিত হইয়া মানবসমাজে কৰ্ম্মরূ ও ফুল-ফলে ও পত্রপল্লবে স্ফৰ্ত্তি পাইতেছে। মানবজীবনের যাহাতে ক্ষত্তি, ধৰ্ম্মের তথায় অধিকার; সাহিত্যে মানব- জীবনের স্মৃৰ্ত্তি, অতএব সাহিত্য ধর্মের অধিকারবহির্ভূত নহে লােক- * মহর্ধির মৃত্যুর পর সাহিত্যপরিষৎকর্তৃক জেরল এসেমব্লি কলেজে যে শােকসভার অধিবেশন হয়। ------ 6৪ চরিত-কথা স্থিতি ধৰ্ম্মের অভিপ্রায়-সাহিত্য লােকস্থিতির সহায়—অতএব সাহিত্যকে ধৰ্ম্ম হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখিবার প্রয়ােজন নাই) মানুষের সহিত মানুষের অন্তরঙ্গ সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া, অতীতের সহিত ভবিষ্যতের সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া, মানুষকে মানুষের সহিত করিয়া, ভবিষ্যৎকে অতীতের সহিত করিয়া লােকস্থিতির আনুকুল্য করাই সাহিত্যের এক- মাত্র ব্যবসায়। অতএব সাহিত্যকে ধর্মের সহিত বিচ্ছিন্ন করিবার প্রয়ােজন নাই। যে চতুষ্টয়ী বাণী বিশ্ববিধাতার চতুর্থ হইতে সমীরিত হইয়া আমাদের পূর্বপিতামহ মহর্ষিগণের দৃষ্টিপথে প্রত্যক্ষ হইয়াছিল ও তাঁহাদের শ্রুতি প্রবিষ্ট হইয়াছিল, তাহাই ধৰ্ম্মসংস্থাপনের জন্য ভারত- সমাজে আদর্শসাহিত্যরূপে গৃহীত হইয়াছে হইয়াছে ; আমাদের ব্যবহারিক জীবনের ব্যবহারসম্পাদনার্থ যে কিছু লৌকিকসাহিত্য বর্তমান আছে বা ভবিষ্যতে আবির্ভূত হইবে, তাহা সেই অপৌরুষেয় বাণীর স্মৃতি ও অস্মৃতি ও প্রতিধ্বনি বলিয়া আমরা ভারতবাসী যুগ ব্যাপিয়া গ্রহণ করিয়া আসিতেছি ; পুরাতনী বাথাদিনীর বীণার তন্ত্রীতে তাহাই বিবিধ মূচ্ছনায় যুগ ব্যাপিয়া ঝঙ্কৃত হইয়া আসিতেছে ; তঁাহার করধ্বত-পুস্তক-মধ্যে তাহাই মৗলেখে অঙ্কিত ও নিবন্ধ রহিয়াছে। প্রলয়কালে মহাবরাহের দ্রংষ্টার উপর যখন বসুন্ধরা অবস্থান করেন, ধর্ম তখন মূর্তিমান হইয়া সেই সনাতন সাহিত্যকে উদ্ধার করিয়া রক্ষা করেন। এই পুরাতন সমাজ- তরণী যখন স্বদেশের অজ্ঞানে ও বিদেশের অনাচারে বিপ্লত হইবার উপক্রম হইয়াছিল, তখন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর লােকস্থিতির আনু- কূল্যের জন্য সেই প্রাচীন সাহিত্যের আশ্রয় লইয়াছিলেন ; সেই পুরা- তনী বাণীর বৈদেশিক বিকৃত প্রতিধ্বনিতে কর্ণপাত করা আবশ্যক বােধ করেন নাই। হার নাম ধৰ্ম্ম, তাহাই স্বভাব এবং স্বভাবের নামান্তর স্বাস্থ্য। স্বভাবের অতিক্রমের নাম ব্যাধি, এবং আমার বিবেচনায় আমাদের মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বর্তমান অবস্থায় বিদেশের প্রবল আক্রমণে আমাদিগকে যে অস্বাভাবিক তায় উপনীত করিয়াছে, তাহাই আমাদের একমাত্র ব্যাধি। এই অস্বাভাবিকতারূপ মহাব্যাধি আমাদিগের পক্ষে নানা উৎকট লক্ষণে প্রকাশ পাইতেছে। আমরা বৈদেশিকের পরিচ্ছদে অঙ্গ আবরণ করিতে লজ্জাবােধ করি না, আমরা স্বদেশীকে বিদেশী ভাষায় বিকৃত উচ্চারণে আহ্বান করিতে লজ্জিত হই না। এই সকল অস্বাভাবিক আচরণ আমাদিগকে সৰ্ব্বত্র অশােভন ও অসমঞ্জস করিয়া তুলিয়াছে । মহর্ষি নিজজীবনে এই অস্বাভাবিকতাকে কখনই প্রশ্রয় দেন নাই । যাঁহারা তাহার জীবনের আখ্যান জানেন, তাহারাই বলিবেন, এই অস্বাভাবিকতার প্রতিকূলে দাঁড়াইয়া তাহাকে কি উৎকট ত্যাগস্বীকারে প্রস্তুত হইতে হইয়াছিল। সে দিন ‘সঞ্জীবনী’-পত্রিকায় পড়িতেছিলাম মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ধর্মপ্রচারকালে ইংরেজি বাগ্মিতার প্রশ্রয়দাতা ছিলেন না। এই একটী আচরণেই আমরা তাহাকে আমাদের অস্বাভাবিক অবস্থার বিরােধীরূপে দেখিতে পাই; অন্য উদাহরণের সম্প্রতি প্রয়ােজন নাই। সাক্ষাৎসম্বন্ধে মহর্ষিকে বঙ্গসাহিত্যের সেবকরূপে প্রতিপন্ন করিতে গেলে তাহাকে সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ করিতে হইবে। কিন্তু তিনি সমাজমধ্যে যে ভাবের আন্দোলন উপস্থিত করিয়াছিলেন, যে আন্দোলনে আমাদের শিক্ষিতসমাজ এককালে ক্ষুব্ধ ও তরঙ্গিত ও চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল, তাহার প্রভাব বঙ্গসাহিত্যে স্থায়িভাবে বর্তমান থাকিবে। সেই বর্ষাকালের ঝটিকা-দুৰ্যোগ এখন প্রশান্তভাব ধারণ করিয়াছে; কিন্তু তখন যে সকল ভাবের উৎস খুলিয়া গিয়াছিল, তাহার ধারা প্রবাহে যে কলনাদিনী স্রোতস্বতীর উৎপত্তি হইয়াছে, তাহা বঙ্গের সাহিত্যভূমিকে সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যামলা করিয়া তুলিয়াছে। যাহারা ভারতবর্ষের ইতিহাস সম্যক ভাবে অধ্যয়ন করিয়াছেন, তাহারা ৪২ চরিত-কথা জানেন, স্বাতন্ত্রের সহকারে সংযমই ভারতসমাজের প্রধান লক্ষণ। আমরা যাহার তিরােভাবে শােকপ্রকাশের জন্য অন্য এই সভাস্থলে সমবেত হইয়াছি, তিনি সেই ভারতসমাজের নেতা মহর্ষিগণেরই সন্তান ছিলেন, ও স্বাতন্ত্র্যের সহিত সংযমই তাহার মহনীয় চরিত্রের প্রধান লক্ষণ ছিল। ভগীরথের ন্যায় শঙ্খধ্বনিপূৰ্ব্বক তিনি যে অভিনব সাহিত্যের ভাগীরথী বঙ্গভূমিতে প্রবাহিত করিয়া গিয়াছেন, স্বাতন্ত্রের সহিত সংযমকেই তাহার প্রধান লক্ষণস্বরূপে দেখিতে পাই। তাহার অসামান্যক্ষমতাশালী পুত্রগণ বঙ্গসাহিত্যে যে কৃতিত্ব দেখাইয়াছেন, পুত্রগণের সেই কৃতিত্ব পিতা হইতে বিচ্ছিন্ন করিবার কোন উপায় নাই। মাননীয় শ্ৰীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রনাথের ‘স্বপ্নপ্রয়াণে’ যে উদ্দাম স্বাতন্ত্রের পরিচয় পাই, সার সত্যের আলােচনায় তাহা সংযমদ্বারা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রিত করিতেছে; রবীন্দ্রনাথের 'সােনার তরী’ ও ‘মানসী’র স্বাতন্ত্র্য ‘স্বদেশী সমাজ’এর কল্যাণপ্রদ সংযমে পরিণত হইয়াছে। তিনি একাধারে যে স্বাতন্ত্র ও সংযমের আদর্শ দেখাইয়া গিয়াছেন, প্রার্থনা করি, সেই মহাদশ বঙ্গীয় সমাজকে ও বঙ্গীয় সাহিত্যকে কর্তব্যপথ প্রদর্শন করুক। তিনি যে মনস্বী পুত্রগণে তাহার সর্বোৎকৃষ্ট স্মরণচিহ্ন আমাদিগকে অর্পণ করিয়া গিয়াছেন, তাহারা চিরজীবী হইয়া বঙ্গভারতীর ক্রোড়দেশ অলঙ্কৃত করুন।
হৰ্ম্মান হেলমূহােলজ চারিমাসমাত্র হইল, * হেলমহােলৎজের মৃত্যু হইয়াছে। কিন্তু আমাদের মধ্যে কয়জন জানে যে, পৃথিবী হইতে একটা দিকপাল অন্তর্হিত হইয়াছে। হেলম্হােলৎজের জন্য শােক করিবার অবস্থা আমাদের এখনও হয় নাই। কখনও হইবে কি? জায়ন্তে চ ম্রিয়ন্তে চ মদ্বিধাঃ ক্ষুদ্ৰজন্তব; কিন্তু হেলমহােলৎজের মত লােক ধরাধামে কয়টা জন্মিয়াছে ? হেলমূহেলৎজ মরিয়াছেন সত্য, কিন্তু মনুষ্য যতটুকু অমরতার দাওয়া করিতে পারে, তাহা তাহার প্রাপ্য। ছোটখাট পাহাড় পর্বত যথেষ্ট সংখ্যায় বর্তমান থাকিয়া ধরাতলের বন্ধুরতা সম্পাদন করিতেছে। কিন্তু গৌরবে ও মহিমায় ধবলগিরি অধিক স্থানে স্পর্ধিত হয় না। হেলমহােলৎজ নরসমাজে এইরূপ একটা ধবলগিরি ছিলেন। ধৰ্ম্মসংস্থাপনের জন্য যুগে যুগে যদি অবতারের আবশ্যকতা স্বীকার করা যায়, এবং জ্ঞানের বিস্তার যদি ধৰ্ম্মসংস্থাপনের একটা প্রধান অঙ্গ বলিয়া বিবেচিত হয়, তবে হেলমহােলৎজ নরসমাজে ‘অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। হেলহােলৎজ জ্ঞানের পরিধি কতদূর প্রসারিত করিয়া গিয়াছেন, তাহা যথাযথ বিবৃত করিতে পারি, এমন স্পর্ধা করিনা। সৌভাগ্যক্রমে লণ্ডন রয়াল সােসাইটির গত অধিবেশনে স্বয়ং লর্ড কেলবিন এবিষয়ে আপনার অক্ষমতা স্বীকার করিয়া, সম্প্রতি ভূপৃষ্ঠে বর্তমান অন্যান্য প্রাণীকে তজ্জন্য লজ্জার দায়ে অব্যাহতি দিয়াছেন। মহাজনের নামকীর্তনে যদি কিছু পুণ্য থাকে, কিঞ্চিত্মাত্রায় সেই সুলভ পুণ্যসঞ্চয়ের প্রয়াসে এই প্রবন্ধের অবতারণা। * ১৮৯৪ অব্দে পঠিত।
৪৮ চরিত-কথা জনির পতসদাম নগরে ১৮২১ সালে হেলহােলৎজের জন্ম হয়। ১৮৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাহার মৃত্যু হইয়াছে। ভবিষ্যতে যিনি মানবের বিজ্ঞানেতিহাসে লিপিবদ্ধ করিবেন, এই তেয়াত্তর বৎসর বিস্মৃত হইলে তাহার চলিবেন। আমাদের দেশের বালকগণের প্রবল বমনােদ্রেক সত্ত্বেও, ইংরাজি ব্যাকরণ, ইংরাজি ভূগােল, ইংরাজি ইতিহাস, কিছুমাত্র দন্তস্ফুট করিবার সম্ভাবনা ব্যতিরেকেও, গলাধঃকরণ করিবার সনাতন নিয়ম প্রচলিত আছে। আমনু প্রচলিত নিয়মচক্রের নেমি ভারতবর্ষেও ক্ষুন্ন পথ হইতে ভ্রষ্ট হইতে পারে; এমন কি, জগৎচক্রের নিয়মগ্রন্থিও দুই একটা শিথিল হইবার সম্ভব ; কিন্তু আমাদের পাঠশালামধ্যে এই প্রাচীন নিয়ম গুলির রেখামাত্র ব্যভিচারের কোনও সম্ভাবনা নাই। তবে একটা ভরসা, আমাদের ভারতবর্ষে ইংরাজি সম্বন্ধে যে নিয়ম প্রচলিত, ইউরােপেও গ্রীকলাতিনের অধ্যাপনাসম্বন্ধে অদ্যাপি তাহা বৰ্ত্তমান। সুতরাং আমাদের ক্ষোভের কারণ নাই ; যেহেতু, মহাজনে যেন গতঃ ইত্যাদি। যাহা হউক, সনাতন নিয়মানুসারে হেলমহােলৎজকেও ক্লাসে বসিয়া গ্রীকলাতিন গলাধঃকরণ করিতে হইয়াছিল। শুনা যায়, প্রহলাদ ‘ক’ অক্ষরেই কৃষ্ণনামস্মরণে কাঁদিয়া উঠিয়াছিলেন, এবং যণ্ডামাকের প্রচণ্ড শাসনও সরস্বতীর নিকট তাহার মাথা নােয়াইতে সমর্থ হয় নাই। হেলহােলৎজের সম্বন্ধে সেরূপ কোনও নিন্দাবাদ প্রচলিত নাই; তবে তিনি যে ক্লাসে বসিয়া ক্লাসিকের মাষ্টারকে ফাঁকি দিয়া জ্যামিতির আঁক করিতেন, তাহা স্বয়ং স্বীকার করিয়াছেন। এই নীতিবিরুদ্ধ অশিষ্ট ব্যবহারের জন্য কখনও তাহাকে মাষ্টারের বেত্রাঘাত লাভ করিতে হইয়াছিল কি না, জানিনা। জানিলে, অন্ততঃ আমরা কিছু সান্ত্বনা লাভ করিতাম। পাঠাবস্থায় পদার্থবিদ্যার প্রতি তাঁহার একটু অনুরাগ ও ঝোঁক ৪১ ট তুৰ্মান হেলমহােলৎজ ছিল ; এমন কি, জ্যামিতি ও বীজগণিতের অপেক্ষাও তিনি জড় ও জড়ের গুণ লইয়া নাড়াচারা করিতে ভাল বাসিতেন। সাংসারিক অবস্থার অনু- রোধে পিতার আদেশে তঁহাকে ডাক্তারি শিখিতে হয়। “ফ্রেডরিক উইলিয়ম ইনষ্টিটিউটে ডাক্তারি শিখিয়া সৈনিকবিভাগে কৰ্ম্ম লইয়া তিনি সংসারে প্রবেশ করেন। তবে ডাক্তারি ব্যবসায়ে সেই মহার্ঘ জীবনের অপব্যয় হয় নাই। ডাক্তারি হইতে জীববিদ্যা, তাহা হইতে পদার্থবিদ্যা, তাহা হইতে গণিতবিদ্যা, তাহা হইতে মনােবিজ্ঞান ও দর্শন, এইরূপে ক্রমে মনুষ্যজাতির জ্ঞানমহার্ণবের এপার হইতে ওপার পর্যন্ত সাঁতার দিয়া চলিয়া যাইতে তাঁহাকে দেখিতে পাওয়া যায়। কি পরাক্রম। ডাক্তারি ছাড়িয়া তাহাকে নানাস্থানে অধ্যাপকতা করিতে হইয়াছিল। প্রথমে সহকারিত্ব, পরে অধ্যাপকতা। তিনি কনিগর্গ, হিদেলবর্গ, বন, এই তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিদ্যা ও শরীরবিদ্যার অধ্যাপনা করিয়া, পরে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক নিযুক্ত হয়েন। ১৮৭১ সাল হইতে শেষপর্যন্ত তিনি এই কার্যেই নিযুক্ত ছিলেন। আর সম্মানের কথা। রাজগােষ্ঠী, পণ্ডিতসমাজ ও জনসমাজ, দেশ ও বিদেশী, যার যতদূর সাধ্য, তঁাহাকে সম্মান দেখাইয়া, আপনাকে গৌরবান্বিত করিতে টা করে নাই। এরূপ স্থলে সম্মান প্রদর্শনের অর্থ কৃতজ্ঞতাস্বীকার ও ঋণশােধের চেষ্টা; কিন্তু এ ঋণ কি শশাধিবার শরীরবিদ্যাবিষয়ে হেলমহােলৎজ জোহান মূলরের ছাত্র ছিলেন। যেমন গুরু, তেমনি শিষ্য ; কাহাকে দেখিবে বল ? আমাদিগকে দৃষ্টিমাত্রেই তুষ্ট থাকিতে হইবে। আমাদের স্বদেশে গুরুও নাই, শিষ্যও নাই; এখানে কাহাকে দেখিব? হায় আমাদের অদৃষ্ট! চিরদিনই কি আমাদের এমনি ছিল! এমন দিন কি আসিবেনা, যে শিষ্যের মত গুরু ও গুরুর মত শিষ্য এই ভারতবর্ষেও আবার দেখা যাইবে ? ? ৪ চরিত-কথা ৫ গুরুর প্রবর্তনায় হেলহােলৎজ অজ্ঞানের তামস রাজ্যে দিগ্বিজয়ার্থ প্রবেশে সাহসী হয়েন। সে পঞ্চাশ বৎসরের পূর্বের কথা; তার পর সেই তামস রাজ্যের কতটা তাহারই অধ্যবসায়ে আলােকিত ও আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহা কিরূপে জানাইব ? সেই সময়ে হেলমহােলৎজ টাইফস জ্বরে আক্রান্ত হয়েন। জ্বর হইতে মুক্তি লাভ করিয়া কিঞ্চিৎ যাহা সঞ্চয় ছিল, তাহার দ্বারা তিনি একটি অণুবীক্ষণ যন্ত্র ক্রয় করেন। আজ কাল শিক্ষার্থীর ঘরে ঘরে অণুবীক্ষণ রহিয়াছে। পঞ্চাশ বৎসর আগে জৰ্ম্মণিতেও তাহা ছিলনা। অণুবীক্ষণ অনেকের ঘরে দেখা যায় বটে, কিন্তু হেলমহােলৎজ তাহার মধ্যে কয় জন ? যাহা হউক, সেই অণুবীক্ষণ ক্রয়ের পর তাহার হাতে যে দুই একটা প্রকাণ্ড কাজ সম্পন্ন হইয়াছে, তাহার যৎকিঞ্চিৎ বিবরণ দিয়া প্রবন্ধ শেষ করিব। বাটিরিয়ার নাম আজ লােকের মুখে মুখে ;—বিশেষ সম্প্রতি কলিকাতা সহরে ওলাউঠা ও বসন্তের এই প্রকোপকালে। সম্প্রতি কলিকাতার অর্ধেক লােক বসন্তের টীকা লইল ; বাকি অর্ধেক হয়ত দুই দিন পরে ওলাউঠার টীকা লইবে। যেরূপ হাওয়ার গতি দেখিতেছি, তাহাতে কিছুদিন পরে কুকুরদংশনেও টীকা লইতে হইবে, ইহা বােধ করি বিধাতার বিধান,-ভবিতব্য। বস্তুতঃ শ্বাপদসমাকুলা অরণ্যানী আর মানুষের ভয়বিধায়িনী নহে; শয্যাতলে লুক্কায়িতা কালভুজঙ্গিনীও আর যমদূতী নহে; এখন স্কুলদৃষ্টির অগােচর কমা-বাসিলাস অথবা দাড়ি-ভিব্রিও কখন কোন্ অলক্ষিতে দেহমধ্যে প্রবেশ লাভ করিয়া অকস্মাৎ অন্তরাত্মাকে তাহার প্রিয়তম আধার হইতে বিচ্যুত করিয়া ফেলিবে, এই আশঙ্কাতেই অন্তরাত্মা এক রকম পূর্ব হইতেই ওষ্ঠ প্রান্তে অবস্থিত থাকেন। প্রকৃতই আজ কাল শঙ্কাভিঃ সৰ্বমাক্রান্ত।
হৰ্ম্মান হেলমূহেলিৎজ জীবিতব্য কিরূপে, ভাবিবার দরকার নাই; জীবন যে এ পর্যন্ত বহিয়াছে, ইহাই আশ্চৰ্য্য। জীববিদ্যাঘটিত এই নূতন তত্ত্বের সহিত মহাত্মা পাস্তরের নাম চিরকালের জন্য গ্রথিত রহিয়াছে; কিন্তু সকলে হয়ত জানেন না যে এই নূতন মন্ত্রের হেলমহােলৎজই পুরাতন ঋষি । জৈব পদার্থ কিরূপে পচিয়া যায়, ইহা একটা রসায়নশাস্ত্রের সমস্যা। পচিবার সময় জৈব পদার্থের অঙ্গারভাগ বায়ুস্থিত অম্লজানের সহযােগে ধীরে ধীরে পুড়িয়া যায়, ইহা অবশ্য রাসায়নিকগণের পুরাতন আবিষ্কার। কিন্তু কতকগুলি ক্ষুদ্র ও প্রায় অতীন্দ্রিয় জীবাণু যে এই অবকাশে অপ্রতিহতপ্রভাবে আপনাদের শরীরপুষ্টি ও বংশবৃদ্ধি সাধিত করিয়া লয়, এই গুপ্ত বার্তাটুকু কিছুদিন পূর্বে কেহই জানিতেন না। আজকাল অবশ্য টিাল প্রভৃতির প্রসাদে এইরূপ দুই চারিটা কথার সংবাদ রাখা বড়ই সুকর হইয়াছে ; এবং যে জানেনা, সে কতকটা ত্রেতাযুগের জীব বলিয়া গণ্য হইয়া থাকে। কিন্তু ফলে হেলমহােলৎজ পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে তাহার নূতন ক্রীত অণুবীক্ষণ-সাহায্যে পচনশীল দ্রব্যে এই জীবাণুর অস্তিত্ব প্রথম আবিষ্কার করেন। শুধু অস্তিত্বের আবিষ্কার নহে; এই জীবাণুর অবস্থিতিই যে পচনক্রিয়ার একমাত্র কারণ ; যেখানে জীবাণুপ্রবেশের পথ রুদ্ধ, সেখানে জৈব পদার্থ সহস্র বৎসর অম্লজানের স্পর্শে রক্ষিত হইলেও পচিবে না; শর্করায় মাদকত্বের উৎপত্তি ঠিক এই পচনক্রিয়ারই অনুরূপ ; ইহাতেও জীবাণু বিশেষের অবস্থিতি আবশ্যক; এ সমুদয়ই হেলহােলৎজ স প্রমাণ করেন। একটা আপত্তি উঠিবার সম্ভাবনা ছিল—ছয়ত সেই সেই জীবাণুর শরীর হইতে এরূপ কোনও রস বা বিং নিঃসৃত হয়, যাহা শুদ্ধ রাসায়নিক ক্রিয়াবলে জৈব পদার্থকে বিকৃত করে ও শর্করাকে সুরায় পরিণত করিয়া থাকে। হেলহােলৎজ শর্করা ও জীবাণুর মাঝে • চরিতকথা একখানি সূক্ষ্ম পরদা রাখিয়া দেখাইলেন যে, পরদাখানি নিঃসৃত রসের সঞ্চার রােধ করিতে পারে না, জীবাণুগণেরই সঞ্চার রােধ করে মাত্র। কিন্তু এরূপ স্থলে চিনিরও মদ্যে পরিণতি ঘটেনা। সিদ্ধান্ত হইল, এই ব্যাপারটা জৈব প্রক্রিয়া ; রাসায়নিক প্রক্রিয়া নহে। এই সিদ্ধান্তের ফলে মনুষের চিন্তাপ্রণালী কিরূপ বিপর্যস্ত হইয়া গিয়াছে, তাহা সকলে না জানিতে পারেন; এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে তাহার উল্লেখও অসম্ভব। পাস্তরের মহিমান্বিত আবিস্ক্রিয়াপরম্পরার ইতিবৃত্ত লিখিতে বসিয়া হেলমহােলৎজের নাম উল্লেখ না করিলে চলিবে না। জীব হইতেই জীবের উৎপত্তি হয় ; নির্জীব জড় হইতে কখনও জীব জন্মিতে দেখা যায় নাই; এই তথ্যের আবিষ্কার উল্লিখিত সিদ্ধান্ত হইতেই আসিয়াছে। যাহারা বানর হইতে মানুষ উৎপন্ন হইয়াছে মনে আনিতেও একটা নৈতিক মহাপ্রলয়ের আশঙ্কা করিয়া স্তম্ভিত হয়েন, তাদের অনেকে অবলীলাক্রমে নির্জীব জড় পদার্থ হইতে অকস্মাৎ অঙ্গপ্রত্যঙ্গযুক্ত শরীরী জীবের উদ্ভব স্বীকার করিতে কিছুমাত্র কুষ্ঠিত হয়েন না। স্বেদ, মল, আবর্জনা হইতে বিধাতার মরজিতে বড় বড় কীটের বা পতঙ্গের উৎপত্তি আপনা হইতে হয়, ইহাতে আমাদের দেশে অনেক বড় বড় পণ্ডিতেরও ধ্রুব বিশ্বাস। তবে শুধু আমাদের দেশেই শরীরবিদ্যায়, স্নায়ুযন্ত্রের গঠন ও ক্রিয়াসম্বন্ধে হেলহােলৎজ যাহা আবিষ্কার করিয়াছেন, তাহা অতুলনীয়। তাঁহার উজ্জ্বল প্রতিভা ও উদ্ভাবনশক্তি কিরূপে জটিল সমস্যার তথ্যোদ্ভেদে সমর্থ হইত, ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয়। জীবদেহে স্নায়ুসূত্রগুলি টেলিগ্রাফের তারের সহিত তুলনীয় হইয়া থাকে। তাহারা বাহিরের খবর ভিতরে পৌঁছাইয়া দেয় ও ভিতরের আদেশ বাহিরে আনে। সংবাদবহন তাহাদের কাজ। ভিতশক্তি হৰ্মান হেলম্হােলৎজ যেমন কয়েকটি সঙ্কেত আশ্রয় করিয়া এক প্রান্তের বার্তা অন্য প্রান্তে উপস্থিত করে, ইহারাও সেইরূপ সঙ্কেতের আশ্রয় করিয়া বাহিরের বার্তা ভিতরে প্রেরণ করে ও ভিতরের আদেশ বাহিরে আনয়ন করে। মস্তিষ্ক অর্থাৎ হেড আপিস কতকগুলি সঙ্কেত পাইয়া তাহার অর্থ আবিষ্কার করিতে ব্যাপৃত থাকে ও অর্থ আবিষ্কারের পর তদনুযায়ী কার্য সম্পাদনের চেষ্টা করে। স্নায়ুসুত্রের কাৰ্য্য সংবাদপ্রেরণ ; তবে এই সংবাদপ্রেরণে সময় আবশ্যক হয় কি না ? তাড়িত প্রবাহযােগে বার্তাপ্রেরণেও কিছু না কিছু সময় দরকার; আলােকেরও সুদূরস্থ নক্ষত্র হইতে পৃথিবী পৌছিতে সময় দরকার হয়। স্নায়ুসুত্রের ভিতরে এই স্রোত কি বেগ প্রবাহিত হয় ? হেলমহােলৎজ প্রথমে দেখান, এই স্রোতের বেগ সেকণ্ডে ষাটি হাতু মাত্র ; তাড়িত প্রবাহ বা আলােকতরঙ্গের তুলনায় নগণ্য। অর্থাৎ কি না, একটা যাটি হাত লম্বা তিমি মাছের লেজে বল্লমের খোঁচা বিধিলে মস্তিষ্কে তাহার খবর পৌছিতে অন্ততঃ এক সেকেণ্ড সময় লাগিবে ; অথবা এক সেকেণ্ড পরে সে বুঝিবে যে, এত বড় একটা প্রাণঘাতক ব্যাপার উপস্থিত। আবার, আঘাতের পরে মস্তিষ্ক হইতে আদেশ আসিয়া তাহার লেজ সরাইয়া লইতে অন্ততঃ আর এক সেকেন্ড সময় অতিবাহিত হইবে। শুনা যায়, ত্রেতাযুগের কুম্ভকর্ণের মস্তিষ্ক হইতে কণ দুই ক্রোশ তফাতে অবস্থিত ছিল। হে ত্রৈরাশিক মানব, বল দেখি, কপিরাজ সুগ্রীবকৰ্ত্তক উক্ত রক্ষঃপ্রবীরের কর্ণচ্ছেদন ব্যাপার সংঘটনের কতক্ষণ পরে তিনি টের পান? বলিতে গেলে আধুনিক শব্দবিজ্ঞান হেলমূহেলৎজেরই গঠিত ; তাঁহারই “হাতে মানুষকরা” ছেলে। হেলমহােলৎজেৰ পূৰ্বে শব্দবিজ্ঞান ও সঙ্গীতবিজ্ঞান সম্বন্ধে গােটা কতক মােটা কথা আবিস্কৃত হইয়াছিল মাত্র। তিনিই, সঙ্গীতবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা। কিরূপে একটী বিশুদ্ধ স্বরের , ৫৪ চরিত-কথা সহকারে তাহার উর্দ্ধতনগ্রামবৰ্তী স্বরাবলী সমবেত ও জড়িত হইয়া ঐ মূল স্বরটিকে বিবিধ নাদে ধ্বনিত করে; কখন সুরের সহিত সুরের মিল ঘটিয়া প্রীতি জন্মে, কখন মিলের অভাবে প্রীতির ব্যাঘাত হয় ; নরকণ্ঠ- নিঃসৃত বিবিধ স্বরকে বিশ্লিষ্ট করিয়া কি কি মৌলিক সুর বাহির করা যায়, কিরূপে যন্ত্রোগত কতিপয় মৌলিক সুরকে সংশ্লিষ্ট করিয়া বিভিন্ন নরকণ্ঠাগত স্বরে উৎপাদন করিতে পারা যায় ; ইত্যাদি নানা কথা এবং এই সকল শব্দব্যাপারের সময়ে শব্দসঞ্চালক বায়ুমধ্যে ও শব্দোৎপাদক কঠিন দ্রব্যে কিরূপ আণবিক গতি সংঘটিত হয়, হেলমহােলৎজের শব্দবিজ্ঞানসংক্রান্ত মহাগ্রন্থপ্রচারের পূর্বে এ সমুদয়ই আঁধারে ছিল। শ্রবণেন্দ্রিয়ের সংগঠনপ্রণালী, এবং কিরূপে বায়ুসঞ্চারী উৰ্ম্মিগুলি শ্রবণেন্দ্রিয়ের কোন্ অঙ্গে কিরূপে প্রতিহত হইয়া কিরূপ কাণ্ড ঘটাইয়া দেয় ; এ সমুদয় তত্ত্বের সূক্ষ্ম বিচার পূৰ্বে ছিল না। স্বরবিজ্ঞান ও সঙ্গীতবিজ্ঞানের সহকারে যে যে মনােবিজ্ঞানঘটিত গভীর সমস্যা আপনা হইতে উপস্থিত হয়, হেলমহােলৎজের পূর্বে কে তাহার মীমাসায় সাহসী হইত ? শব্দবিজ্ঞানের পর দৃষ্টিবিজ্ঞান। হেলমহােলৎজের আবিষ্কৃত দৃষ্টি- বিজ্ঞানঘটিত তথ্যগুলির মাহাত্মের উপলব্ধি করাই কঠিন। তাহার আবিষ্কৃত চক্ষুরীক্ষণ (ophthalmoscope} যন্ত্রের উল্লেখ বােধ করি অনাবশ্যক। চক্ষুর অভ্যন্তর পরীক্ষার জন্য আজ কাল এই যন্ত্র ডাক্তারদের একমাত্র অবলম্বন। দৃষ্টিসম্বন্ধে অনেক রহস্য, যাহা সর্বদা আমাদের জ্ঞানের ভিতর আইসে না, তাহা হেলমহালৎজ প্রথমে দেখাইয়া দেন। রেটিনা নামক স্নায়বিক পরদার গঠন কিরূপ, চোখের পরকলার কোথায় কতটা বক্রতা, দর্শনেন্দ্রিয়ের গঠনে কি কি নানাবিধ সাধারণ ও অসাধারণ দোষ বর্তমান রহিয়াছে, দূরদৃষ্টির ও নিকটদৃষ্টির সময়ে কিরূপে দর্শনেন্দ্রিয়ের বিভিন্ন অংশ হর্মান হেলম্যােলঞ্জ ঘুরাইতে ফেরাইতে হয়, কিরূপে বিভিন্ন পদার্থের দূরত্বের উপলব্ধি হয়, কিরূপে দ্রব্যমাত্রকে দৈর্ঘ্য, বিস্তার, বেধ, তিনগুণবিশিষ্ট বলিয়া বােধ জন্মে ; বর্ণের উজ্জ্বলতায় কিরূপে ছােট জিনিষকে বড় দেখায় ; কিরূপে তিনটিমাত্র মূল বর্ণের বােধ স্বীকার করিয়া লইলে সেই তিনটি মৌলিক অনুভূতিরই বিবিধবিধানে সংমিশ্রণদ্বারা অসংখ্য বিচিত্র বর্ণজ্ঞানের উৎপত্তি বুঝান যাইতে পারে; কিরূপে ইহারই মধ্যে একটি মৌলিক বােধের অভাব ঘটিলে মানুষে রঙকাণা হইয়া যায় ; দৃষ্টিগােচর দ্রব্যমাত্রেরই কোন্ অংশটা বস্তুতঃ আমাদের ইন্দ্রিয়গােচর, আর কোন অংশটাই বা মানসগােচর মাত্র, অর্থাৎ একটা বস্তুর কতটা আমরা বাস্তবিক দেখিতে পাই, আর কতটাই বা মনে মনে কল্পনা দ্বারা গড়িয়া লই ; ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ে হেলহােৎলজ যে সকল রহস্যের উদঘাটন করিয়াছেন, তাহার নামােল্লেখমাত্র দ্বারা বিবরণ দেওয়াই অসম্ভব। অতি প্রাচীন কাল হইতে শুনিয়া আসিতেছি, ইন্দ্রিয়গণ জ্ঞানের দ্বারস্বরূপ। কিন্তু জ্ঞান কিরূপে বাহির হইতে এই দ্বারপথে প্রবেশ লাভ করে, তাহার সম্বন্ধে আমাদের পরিচয় এ পর্যন্ত নিতান্ত সঙ্কীর্ণ ও পরিমিত ছিল। বাহিরে জড়প্রকৃতিতে নানাবিধ আনাগােনা আন্দোলনের তরঙ্গ উঠিতেছে ; ইন্দ্রিয়গণ সেই সকলের বার্তা কোনও মতে মস্তিষ্কের হেডআপিসে পৌছাইয়া দেয়, এবং আমাদের অন্তঃকরণ সে সঙ্কেতগুলি বাছিয়া গােছাইয়া সাজাইয়া নানাবিধ প্রণালীতে নানাবিধ গঠন প্রস্তুত করে, কতক সুন্দর বােধে ও আবশ্যক বােধে গ্রহণ ও কতক অনাবশ্যক বােধে ত্যাগ করিয়া জীবনের স্থিতি, গতি, পুষ্টি ও সুখ- সাচ্ছন্দ্যের বিধানে নিরত থাকে। বাহিরে কিরূপ আনাগােনা আন্দোলন চলিতেছে, ইহা জড়বিজ্ঞান বা পদার্থবিদ্যার বিষয় ; ইন্দ্রিয়গণ কিরূপে এই সকল আন্দোলনের বার্তা মস্তিষ্কে হাজির করে, ইহা জীববিদ্যা ও শরীরবিদ্যার বিষয় ; এবং অন্তঃকরণ সেই বার্তাগুলি বা সঙ্কেতগুলিকে ;
চরিত-কথা কিরূপে গােছাইয়া ও সাজাইয়া সেই উপাদানসকলে বিশ্বজগৎ নির্মাণ করিতে বসে, তাহা মনােবিজ্ঞানের বিষয়। সুলতঃ, এই তিন ছাড়িয়া আর কোনও বিজ্ঞান নাই। পণ্ডিতগণের মধ্যে এক এক ব্যক্তি ইহার একটিমাত্র অথবা একটিরই কোন সঙ্কীর্ণ অংশমাত্র লইয়া ব্যাপৃত থাকেন। জ্ঞানসাম্রাজ্যের তিন মহাদেশে একই সময়ে দিগ্বিজয়ে বাহির হইতে পারেন, হেলমূহােলৎজ এইরূপ কৃতকর্মা পুরুষ ছিলেন ; বােধ করি এবিষয়ে তিনি তৎকালিক মনুষ্যমধ্যে অদ্বিতীয় ছিলেন। শ্রুতি ও দৃষ্টি ইন্দ্রিয়গণের মধ্যে সর্বপ্রধান ; সূক্ষ্মতায় অথবা প্রভাবে অন্য ইন্দ্রিয় এই উভয়ের সমকক্ষ নহে । প্রেধানতঃ শ্রুতি ও দৃষ্টি অবলম্বন করিয়াই আমরা এই বিচিত্র সুন্দর জগৎ নিৰ্মাণ করিয়া লইয়াছি। অন্যান্য ইন্দ্রিয় ইহাদের সাহায্য করে মাত্র। এই দুই ইন্দ্রিয়, ইহাদের গঠন, ইহাদের বিষয়, ও ইহাদের ক্রিয়া, এ সম্বন্ধে আলােচনায় তিনি যাহা করিয়াছেন, তাহা অপর কেহ করে নাই । জড়জগতের সহিত আমাদের অন্তর্জগতের এমন কি সম্বন্ধ আছে যে, কতকগুলি জিনিষকে আমরা সুন্দর দেখি, কতকগুলিকে কুৎসিত দেখি ? আমাদের এই সৌন্দৰ্যবােধের মূল কি ? এই সৌন্দৰ্য্যবােধ কোথা হইতে আইসে? এই গভীর তত্ত্বের মীমাংসার জন্য মানব বহুদিন হইতে লালায়িত। সৌন্দৰ্য্যতত্ত্বের মীমাংসা একা হেলমহােলৎজ হইতে যতদূর অগ্রসর হইয়াছে, অন্য কোন ব্যক্তি হইতে তাহা হয় নাই। হেলমহােল- জই প্রকৃতপক্ষে আধুনিক মনস্তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা। জড়ের সহিত মনের কি সম্বন্ধ, এই গভীর সমস্যার মীমাংসার জন্য মনােবিজ্ঞানশাস্ত্রের উৎপত্তি ও বিকাশ। যে পথে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাইবে, হেলমহােলৎজই তাহা দেখাইয়াছেন। ১৮৪৭ সালে ভৌতিক শক্তির অনশ্বরতা সম্বন্ধে হেলমহােলৎজের বিখ্যাত প্রবন্ধ প্রকটিত হয়। তাহার পর পদার্থবিদ্যা রূপান্তর পরিগ্রহ হম্মান হেলমহােলৎজ করিয়াছে। একটা সু-কৌশল যন্ত্র বানাইয়া দিলে উহা বিনাশ্রমে বিনা ব্যয়ে চিরদিন ধরিয়া চলিতে পারিবে ও কাজ দিবে, সে কালের লােকের এইরূপ বিশ্বাস ছিল। এখনও যে এই বিশ্বাসের ধারা অন্তঃসলিল প্রবাহের ন্যায় বহিতেছে না, এমন নহে। জড়ের সৃষ্টি নই, বিনাশও নাই, এই তত্ত্ব কিছুদিন পূর্বে রসায়নবিজ্ঞানের জন্মদাতা বােয়াশিয়ে কর্তৃক নির্ণীত হইয়াছিল; কিন্তু শক্তিরও যে সৃষ্টি নাই, বিনাশও নাই, এ তত্ত্ব তখনও আবিষ্কৃত হয় নাই। অভাব হইতে ভাবের উৎপত্তি হয় না, সৎ অসতে পরিণত হয় না, এইরূপ একটা বাক্য দার্শনিকগণের মধ্যে প্রচলিত ছিল বটে; কিন্তু ইহার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনও প্রমাণ ছিল না ; এবং এই স্বতঃসিদ্ধ হইতে কি সিদ্ধান্ত হয় বা না হয়, তাহারও কেহ ধ্রুব নির্দেশে সাহস করিতেননা। শক্তির বহুরূপিতা হেলমহােলৎজের কিছু দিন পূৰ্বেই বৈজ্ঞানিকগণের মধ্যে স্বীকৃত হইতে আরম্ভ হইয়াছিল। কিন্তু শক্তির অনশ্বরতাকে একটি বৈজ্ঞানিক সত্যরূপে প্রতিপাদনের কাৰ্য্য, হেলমহােলৎজেরই প্রতিভার অপেক্ষায় ছিল । এক হিসাবে মনুষ্যশরীরকে যন্ত্রহিসাবে দেখা যায় । তবে সে কালে অন্য যন্ত্রের সহিত দেহযন্ত্রের কোনরূপ তুলনা সম্ভবত না। বাষ্পষন্ত্রে কয়লা পোড়াইতে হয় ; ঘটিকাযন্ত্রে মাঝে মাঝে দম দিতে হয়, কিন্তু দেহযন্ত্রে জীবনরূপ একটা কি-জানি—কি অতিপ্রাকৃত শক্তিবনা ব্যয়ে, বিনা শ্রমে কাৰ্য চালাইতেছে, এইরূপ একটা বিশ্বাস সকলেরই ছিল। হেলমহােলৎজের লিখিত উক্ত প্রবন্ধপ্রকাশের পর হইতে কথা উঠিয়াছে যে, জীবন হয়ত একটা কবিজনােচিত কল্পনামাত্র, একটা আভিধানিক শব্দমাত্র, কতকগুলি ক্রিয়াসমষ্টির অভিধানমাত্র। কয়লা না পােড়াইলে যেমন বাষ্পযন্ত্র চলেনা, কয়লা না পােড়াইলে সেইরূপ দেহযন্ত্রেরও চলিবার সম্ভাবনা নাই, এবং এই উভয় কয়লাই আমাদের সেই চিরপরিচিত কৃষ্ণকায় অঙ্গার।
৫৮ চারত-কথা আমাদের সৌরজগৎ আর একটা প্রকাণ্ডতর যন্ত্র। সূৰ্য্যমণ্ডল হইতে রাশি রাশি শক্তি বাহির হইয়া তাপরূপে ও আলােকরূপে দিগদিগন্তে আকীর্ণ হইতেছে, ও তাহারই কণিকামাত্র পাইয়া গ্রহে উপগ্রহে নানাবিধ ভৌতিক ক্রিয়া চলিতেছে। এই পৃথিবীতে যে বায়ু বহে, জল পড়ে, মেঘ ডাকে, বৃক্ষ লতা কীট পতঙ্গ হইতে মানুষ পৰ্য্যন্ত জন্মে ও মরে, হাসে ও কাঁদে, খেলা করে ও নাচিয়া বেড়ায়, সূৰ্য্যমণ্ডল হইতে সমাগত কণিকাপ্রমাণ শক্তিই এই সমুদয়ের কারণ। কিন্তু এই অপরিমেয় শক্তি আসিল কোথা হইতে ? হেলমহােলৎজ দেখাইয়াছিলেন, যে সূৰ্যমণ্ডলে এই শক্তির ভাণ্ডার, অন্যত্র নহে; ইহারও পরিমাণ আছে ও ক্ষয় আছে। কোথা হইতে এই ভাণ্ডার সংগৃহীত হইল, এবং এই ব্যয়েরই বা পরিমাণ কি, হেলমহােলৎজ তাহারও হিসাব দিলেন। বলা বাহুল্য, সেই হিসাব সর্বত্র গৃহীত হইয়াছে । সৌরজগৎরূপ মহাযন্ত্র কিরূপে কত দিন হইতে চলিতেছে, তাহা গণিবার উপায় হেলমহােলৎজের নিকটেই মানবজাতি শিখিয়াছে । গণিতশাস্ত্রে হেলমহােলৎজ কি করিয়াছেন, কিরূপে বুঝাইব? দীন। বঙ্গভাষা ও দীন বঙ্গসাহিত্য; অন্য দেশে যাহা সম্পাদিত হইয়াছে, এ দেশে তাহার বর্ণনারও উপায় নাই। মহামতি লর্ড কেলবিনের বিখ্যাত vortex theoryর কথা অনেকে শুনিয়া থাকিবেন। জগদ্ব্যাপী আকাশে বা ঈথরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আবর্তের নাম জড়পরমাণু। হেলমহােলৎজের প্রতিভা এই পরমাণুতত্ত্বের বীজ রােপণ করিয়াছিল। ঘর্ষণক্ষমতা-বর্জিত তরলপদার্থে আবর্তোৎপাদন গণির যে প্রণালী তিনি উদ্ভাবন করিয়াছিলেন, বেলাভূমিতে উৰ্ম্মিরেখার ও বায়ুমধ্যে মেঘের উৎপত্তি হইতে আকাশমধ্যে জড়পরমাণুর উৎপত্তি পর্যন্ত বুঝাইতে সেই প্রণালী ব্যবহৃত হইয়াছে। হেলমহােলৎজ অনেক নূতন গড়িয়াছেন, আবার অনেক পুরাতন হৰ্ম্মান হেলম্যােলঞ্জ ভাঙ্গিয়াছেন। ইউক্লিডের সময় হইতে মানবজাতি আজ পর্যন্ত কতক- গুলি স্বতঃসিদ্ধ লইয়া জ্যামিতিবিদ্যা অথবা দেশতত্ত্ব গঠন করিয়া নিশ্চিন্ত ছিল। আজ কাল সেই স্বতঃসিদ্ধ গুলির মূল ভিত্তি লইয়া টানাটানি আরম্ভ হইয়াছে। কে বলিল, আমাদের দেশের (অর্থাৎ আকাশের ) সীমা নাই ? কে বলিল, আমাদের দেশ সর্বত্রই সমাকার? দুইটা দ্রব্য দৈর্ঘ্যে তৃতীয় দ্রব্যের সমান হইলে তাহারাও পরস্পর সমান, কে বলিল, ইহা অখণ্ডনীয় স্বতঃসিদ্ধ ? মনুষ্যজাতি আবহমান কাল হইতে কতকগুলি বাক্যকে অভ্রান্ত সত্য বলিয়া গ্রহণ করিয়া আসিতেছে। মানুষের মতে ইহারা সত্য, ইহারা স্বতঃসিদ্ধ। মানুষের সংস্কার যে, ইহাদিগকে স্বতঃসিদ্ধ বলিয়া না ধরিলে জীবনযাত্রা যেন চলিবেন, যেন জগৎপ্রণালী উল্টাইয়া যাইবে, যেন জগদ্যন্ত্র বিপর্যস্ত হইবে। বিখ্যাত দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট এইরূপ অধিকাংশ সত্যের স্বতঃসিদ্ধতার মূলে কুঠারাঘাত করিয়াছিলেন। তিনি দেখাইয়াছিলেন যে যাহা প্রকৃতিনিৰ্দিষ্ট প্রকৃতিগত সত্য বলিয়া মানিতেছ তাহা প্রকৃতপক্ষে মানুষেরই সুবিধার জন্য মনুষ্যকর্তৃক সৃষ্ট বা কল্পিত ; মানুষেরই হাতগড়া পুত্তলী। কিন্তু জ্যামিতিবিদ্যার মূল সত্যগুলির স্বতঃসিদ্ধতার সন্দেহ করিতে ইমানুয়েল কান্টও সাহসী হয়েন নাই। হেলহেলৎজ জ্যামিতিস্বীকৃত স্বতঃসিদ্ধের স্বরূপ উদঘাটিত করেন। তিনি প্রথমে দেখান, মনুষ্যের মনের বাহিরে সত্যও কিছুই নাই, স্বতঃসিদ্ধও কিছুই নাই । বিষয়টি বড় গুরুতর, এইক্ষু প্রবন্ধে উল্লেখমাত্র করিয়াই নিরস্ত থাকিতে হইল ।
অধ্যাপক মক্ষমূলর ভারতবাসীর নিকট অধ্যাপক মক্ষমূলরের নাম যতটা পরিচিত ছিল, বােধ করি আর কোন বৈদেশিক পণ্ডিতের নাম ততটা পরিচিত ছিল না। তাহার অপেক্ষাও কৃতকর্মা প্রতিভাশালী ব্যক্তি বিদেশে জন্মিয়াছেন এবং এখনও হয় ত বর্তমান আছেন। কিন্তু ভারতবাসীর সহিত তাহাদের তেমন পরিচয় নাই; শিক্ষিতগণের মধ্যে অনেকে তাহাদের নাম শুনিয়াছেন, অনেকে তাহাদের পাণ্ডিত্যে ও প্রতিভায় মুগ্ধ থাকিতে পারেন, কিন্তু আমাদের দেশে অশিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যেও মক্ষমূলরের নাম শুনিয়াছেন, এমন উদাহরণ বিরল নহে। মক্ষমূলরের জীবনচরিত আমাদের সাময়িক পত্রাদিতে পুনঃ পুনঃ কীৰ্ত্তিত হইয়াছে ; সেই জীবনচরিত পুনরায় কীর্তনের সম্প্রতি আবশ্যকতা দেখি না। কিন্তু মক্ষমূলরের পাণ্ডিত্যে এমন কোন বৈশিষ্ট্য ছিল এবং আমাদের সহিত তাহার এমন একটা বিশিষ্ট সম্বন্ধ ছিল, যে সূত্রে তিনি আমাদের মধ্যে এতটা খ্যাতিলাভ করিয়াছিলেন। মক্ষমূলর সংস্কৃত শাস্ত্রে অভিজ্ঞতার জন্যই আমাদের দেশে বিখ্যাত ; প্রকৃতপক্ষে কিন্তু তিনি বিবিধ ভাষায় অভিজ্ঞ ছিলেন। বর্তমানকালের ভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বলিয়া তাঁহাকে গণ্য করিলে ভুল হইবে না। সুবিখ্যাত সার উইলিয়াম জোন্স যেদিন সংস্কৃত সাহিত্য নামে একটা অতি প্রাচীন সাহিত্য আছে, এই তথ্য আবিষ্কার করিয়া ফেলিলেন, সেই দিনই বর্তমান কালে ভাষাবিজ্ঞানের জন্মদিন বলিয়া গণ্য করিতে হয়। তৎপূৰ্ব্বে ইউরােপের পণ্ডিতেরা গ্লেমন অধ্যাপক মক্ষমূলর ১১ ৯ যাবতীয় মানবকে ইহুদী জাতি-বর্ণিত আদি মানব আদমের সন্তান বলিয়া স্থির করিতেন, সেইরূপ সভ্যজাতির কথিত ভাষাসমূহকে ইহুদীজাতির ভাষা হইতে উৎপন্ন বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে প্রয়াস পাইতেন। সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্য পাশ্চাত্যদেশে আবিষ্কৃত হওয়ার পর সহসা প্রতিপন্ন হইয়া গেল, যে ইহুদী ভাষার সহিত বিবিধ ইউরােপীয় ভাষার কোন সম্পর্ক নাই; এবং ইহুদীজাতির সহিত ইউরােপীয় জাতিসমূহের কোনরূপ নিকট শশাণিতসম্পর্কও নাই। বরঞ্চ সংস্কৃত ভাষার সহিত ঐ সকল ভাষার অত্যন্ত সম্পর্ক রহিয়াছে; এবং সংস্কৃতভাষী ভারতবাসীর সহিত পাশ্চাত্য জাতিগণের শােণিতসম্পর্কও রহিয়াছে। মক্ষমূলরের পূর্বেই এই সত্য আবিস্কৃত হইয়াছিল ; সুতরং তাহাকে এই নূতন ভাষাতত্ত্ব ও এই নূতন জাতিতত্ত্বের আবিষ্কর্তা বলিয়া নির্দেশ করিতে পারা যায় না। কিন্তু সংস্কৃত ভাষায় অভিজ্ঞতা লাভ করিবার পর হইতেই তিনি এই নূতন ভাষাতত্ত্ব ও নূতন জাতিতত্ত্বের তথ্যানুসন্ধানে ও সাধারণের সমক্ষে প্রচারে আগ্রহসহকারে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। তাঁহার যত্ন, পরিশ্রম ও অধ্যবসায় আর্যভাষাসমূহের সম্বন্ধ-নিরূপণে ও আর্যজাতিগণের সম্বন্ধ-নির্ণয়ে যথেষ্ট আনুকূল্য করিয়াছে, একথা কেহই অস্বীকার করিবেন না। ভাষাগত সম্পর্কের মুলে জাতিগত সম্পর্ক বর্তমান রহিয়াছে ; ইংরাজের ভাষার সহিত আমাদের ভাষার সম্পর্ক আছে, সুতরাং ইংরাজের সহিত আমাদের শােণিতগত সম্পর্ক আছে, আমরা উভয়েই আৰ্য্যবংশ- ধর, এই মােটা কথাটা আজকাল সকলের মুখেই শুনিতে পাওয়া যায় । আমাদের মধ্যে অনেকে হয়ত আছেন, যাঁহারা ইংরাজদিগকে আনাম প্রদান করিতে কুণ্ঠা বােধ করিবেন, এবং বিশুদ্ধ আৰ্য্যনামটা কেবল আমাদের নিজস্ব মনে করিয়া আনন্দ বােধ করিবেন। তাহাদের সহিত বিচারে প্রবৃত্ত হইতে আমার ইচ্ছা নাই, তবে আমরা যে আৰ্য্যবংশধর, চরিত-কথা সে কথা আমরা বহুশত বৎসর ধরিয়া সম্পূর্ণরূপে ভুলিয়া গিয়াছিলাম ; এবং আমরা যে সেই অতি পুরাতন সত্যটা পুনরায় জানিতে পারিয়াছি, ও আমাদের আৰ্যত্বের জন্য স্থানে অস্থানে আস্ফালন করিয়া বেড়াইতে সমর্থ হইয়াছি, তজ্জন্য আমরা আৰ্য্য মক্ষমূলরের নিকট সম্পূর্ণভাবে ঋণী ; ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। ঋগ্বেদসংহিতার প্রচার মক্ষমূলরের জীবনের সর্বপ্রধান কাৰ্য, এবং ঋগ্বেদসংহিতার মাহাত্ম তিনিই পাশ্চাত্যদেশে প্রচার করেন। ঋগ্বেদসংহিতাকে তিনি আর্যজাতির প্রাচীনতম ও মানবজাতির প্রাচীন তম গ্রন্থ বলিয়া স্বীকার করিতেন, এবং ঋগ্বেদ সংহিতার কালনির্ণয়ে প্রবৃত্ত হইয়া তিনি আৰ্যজাতির ভারতবর্ষপ্রবেশের কালনির্ণয়েরও চেষ্টা করিয়াছিলেন। এই গ্রন্থের সাহায্যেই তিনি ভারতবর্ষে প্রবেশের প্রাক্কালীন পুরাতন আৰ্যসমাজের অবস্থানির্ণয়েও প্রয়াস। হইয়াছিলেন। এইরূপে মানবজাতির অতীত ইতিহাসের একটা বিস্মৃত পরিচ্ছেদ তিনি নূতন করিয়া আবিষ্কারের প্রয়াস পাইয়াছিলেন। তৎকৃত কাল-নির্ণয় এবং তদুদঘাটিত ইতিহাস সকলে হয়ত নির্বিবাদে গ্রহণ করিতে সম্মত হইবেন না; জ্ঞানবৃদ্ধির সহকারে এই ইতিহাস হয়ত সম্পূর্ণ পরিবর্তিত আকার ধারণ করিবে। কিন্তু তাহা হইলেও মক্ষমূলর যে অসাধারণ পরিশ্রম, চিন্তাশীলতা ও অধ্যবসায়ের উদাহরণ দেখাইয়াছেন, তাহা বিজ্ঞানের ইতিবৃত্তে সষত্নে লিপিবদ্ধ হইবে। আমাদের মধ্যে এক অতি বিজ্ঞ সম্প্রদায় আছেন, যাঁহারা বৈজ্ঞানিক গণের পুনঃ পুনঃ মত পরিবর্তন দেখিয়া বিজ্ঞানকে উপহাস করিয়া খাকেন। কিন্তু তাহাদের জানা উচিত যে বিজ্ঞানের সহিত অজ্ঞানের এই খানেই প্রভেদ। বিজ্ঞান দিন দিন আপনাকে সংশােধিত ও উন্নত করিয়া থাকে, কিন্তু অজ্ঞানের মূর্তি চিরকালই একরূপ। তথায় কোনরূপ বিকারের সম্ভাবনা নাই। আলােকেরই নীল ও পীত ও হরিৎ এবং E অধ্যাপক মক্ষমূলর উজ্জ্বল ও তীব্র ইত্যাদি বিবিধ বিশেষণ আছে; কিন্তু অন্ধকার চিরদিনই আঁধার ; তাহার অন্য বিশেষণ নাই। অধ্যাপক মক্ষমূলর কর্তৃক প্রচারিত ঐতিহাসিক তথ্যসকলে ভ্রম বাহির হইতে পারে এবং তৎকৃত বৈদিক শাস্ত্রের ব্যাখ্যায় কালক্রমে ভ্রান্তি আবিষ্কৃত হইতে পারে। কিন্তু এ কথা সকলেরই জানা উচিত, যে ব্যক্তি কাজ করে তাহারই' ভ্রান্তি ঘটে, যে ব্যক্তি নিশ্চেষ্ট ও নিষ্ক্রিয়, তাহার ভ্রান্তির আবিষ্কার বিধাতারও অসাধ্য। মক্ষমূলরের প্রতিভা কেবল ভাষাতত্ত্বেই আবদ্ধ ছিল না; ভাষাতত্ত্বের পরিধি ছাড়াইয়া অন্যান্য শাখাতেও তিনি যে সকল কথা কহিয়া গিয়াছেন, তাহা লইয়া পণ্ডিতসমাজে সময়ে সময়ে তুমুল আন্দোলন ঘটিয়া গিয়াছে। ভাষাগত সম্পর্কের মূলে জাতিগত সম্পর্ক বিদ্যমান, এই হিসাবে ভাষাবিজ্ঞান অর্থাৎ philology মানব-বিজ্ঞানের বা anthropologyর যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছে, পূৰ্ব্বে তা উল্লেখ করা গিয়াছে। কিন্তু মানবের মধ্যে শােণিতসম্পকের নির্ণয় প্রকৃতপক্ষে জীবতত্বের বিষয়। তােমার সহিত আমার শােণিতগত সম্বন্ধ আছে কি না, উভয়ের কথিত ভাষা ধরিয়া বিচার করতে গেলে অনেক সময় এ বিষয়ে ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে হয়। কিন্তু উভয়ের শরীরগত সাদৃশ্য, উভয়ের গায়ের রঙ, মাথার চুল, হাতের গঠন, চোখের চাহনি প্রভৃতি ধরিয়া বিচার করিতে গেলে সিদ্ধান্ত অনেকটা নিভুল হইবার সম্ভাবনা থাকে। কিছুদিন পূর্বে মক্ষমূল-প্রমুখ ভাষাতত্ত্বজ্ঞ পণ্ডিতেরা কেবল ভাষাগত সাদৃশ্য ধরিয়া বিবিধ মানবজাতির শােণিতসম্পর্ক নির্ণয়ে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। কিন্তু আজকাল জীবতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতের তঁাহাদের এই আবদার সহ্য করিতে পারিতেছেন না; এবং তাহাদিগকে স্বকীয় গণ্ডীর মধ্যে অবস্থান করিতে উপদেশ দিয়া শরীরতন্ত্রের সাহায্যে মানবগণের জাঙ্গিনির্ণয়ের চেষ্টা করিতেছেন। তাঁহাদের সমালােচনায় ভাষাতাত্ত্বিকগণের সিদ্ধান্ত বহুস্থলে ৩৪ চরিত-কথা সংশােধন-সাপেক্ষ বলিয়া প্রতিপন্ন হইয়াছে, এবং কালে আরও সংশােধনের প্রয়ােজন হইবে সন্দেহ নাই। কিন্তু তাই বলিয়া ভাষা-বিজ্ঞানের মীমাংসা একবারে উল্টাইয়া যাইবে, এরূপও বােধ হয় না। আমাদের বৈদিক শাস্ত্র ও অন্যান্য শাস্ত্র আলােচনা করিয়া ও তৎসহ গ্রীক প্রভৃতি পাশ্চাত্য জাতির প্রাচীন শাস্ত্রের তুলনা করিয়া অধ্যাপক মক্ষমূলর একটা অভিনব দেবতত্ত্ব ও ধর্মতত্বের স্থাপনায় প্রয়াসী হইয়া- ছিলেন। তিনি দেখাইতে চাহিয়াছিলেন যে, অতি প্রাচীনকালে পুরাতন আৰ্যজাতি যখন মধ্য-এশিয়ায় বাস করিতেন, তখন তাহাদের একটা বিশিষ্ট ধর্ম প্রণালী ও উপাসনা-প্রণালী ছিল। আৰ্য্যগণের বিভিন্ন শাখা বিভিন্ন দেশে উপনিবিষ্ট হইলে সেই প্রাচীন ধর্ম প্রণালীই ক্রমশঃ প্রাদেশিক বিকার ও পরিবর্তন সহকারে বিবিধ আৰ্য্যধৰ্ম্মে রূপান্তরিত হইয়াছিল ; কিন্তু অদ্যাপি হিন্দুজাতির দেবদেবীগণের সহিত প্রাচীন গ্রীক ও জৰ্ম্মণ জাতির দেব দেবীগণের পুরাতন সম্বন্ধ নির্ণয় অসাধ্য নহে; আৰ্য জাতির প্রাচীন দেবতাগণের সম্বন্ধে বিবিধ উপাখ্যান কিরূপে ক্ৰমে বিস্তৃত হইয়া বিবিধ জাতির পৌরাণিক উপন্যাসে পরিণত হইয়াছে, তাহার নির্দেশও সম্পূর্ণ অসাধ্য নহে। আর্যজাতির দেবতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্ব অবলম্বন করিয়া মক্ষমূলর বিস্তীর্ণতর ক্ষেত্রে সমগ্র মানবজাতির ধর্মতত্ত্বের ইতিবৃত্ত নির্ণয়ে প্রয়াস করিয়াছিলেন। তিনি স্বয়ং ভাষাতত্ত্বজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন, এবং বিজ্ঞানের অন্য যে কোন শাখার আলােচনাতেই তিনি হাত দিতেন, তিনি তাহাতে ভাষাতত্ত্বের সম্পূর্ণ সাহায্য লইতে পরাত্মখ হইতেন না। রঙিন চশমা চোখে দিলে যেমন জগৎ শুদ্ধই রঙিন দেখায়, তিনি সেইরূপ ভাষাবিজ্ঞানের রঙিন পর্দার অন্তরাল হইতে জগতের দিকে চাহিতেন। কাজেই অন্যান্য বিজ্ঞানে তাহার সিদ্ধান্ত সৰ্ববাদিসম্মত হয় নাই ; তাহার এণীত ধৰ্ম্মতত্ত্বও পাশ্চাত্য পণ্ডিতসমাজে নির্বিবাদে গৃহীত হয় নাই। ইংরাজগণের মধ্যে হার্বাট স্পেন্সর, এওয়ার্ড, টাইলর, অধ্যাপক মক্ষমূলর এ ল্যাং প্রভৃতি পণ্ডিতগণ অন্যবিধ ধর্মতত্ত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করিয়াছেন। এই সকল পণ্ডিতদিগের বিরােধী মতের সহিত মক্ষমূলরের মতের বিসংবাদ প্রায়ই ঘটিত। ধৰ্ম্মতত্বের ভবিষ্যৎ কি তাহা বলিতে পারি না, কিন্তু মক্ষমূলরের প্রতিভা কিরূপ সৰ্বতােমুখিনী ছিল, তাহা দেখাইবার পক্ষে ইহা একটা দৃষ্টান্ত স্বরূপ গৃহীত হইতে পারে। মনুষ্যের ভাষার সহিত মনুষ্যের চিন্তাপ্রণালীর অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ ; আমাদের চিন্তা ক্রিয়াটাই ভাষাসাপেক্ষ বটে কি না, তাহা লইয়া বিতণ্ডা চলিতে পারে। অন্ততঃ ভাষার সাহায্য না পাইলে মনুষ্যের চিন্তা প্রণালী কিরূপ হইত, তাহা গভীর আলােচনার বিষয় বটে। মক্ষমূল মনাে- বিজ্ঞানের এই দুরূহ সমস্যায় হস্তক্ষেপ করিয়াছিলেন। তাহার সিদ্ধান্ত মনােবিজ্ঞানবিৎ পণ্ডিতগণের নিকট কিরূপ সমাদর লাভ করিয়াছে বা করিবে, তাহা বর্তমান প্রসঙ্গে উপস্থিত করিবার কোন প্রয়ােজন দেখি না। যাহাই হউক, ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিতগণের মধ্যে এবং বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক সমাজে মক্ষমূলরের স্থান অতি উচ্চে ছিল,—কত উচ্চে ছিল, তাহার নির্ধারণে সম্প্রতি প্রয়ােজন নাই, এবং সম্ভবত সম্প্রতি তাহার নির্ধারণের সময় উপস্থিত হয় নাই। সংস্কৃত ভাষার ইতিহাস প্রণয়নে তাহার কৃতিত্বও ভবিষ্যৎ সমালোচনার বিষয়। প্রাচ্যবিদ্যায় মক্ষমূলরের পাণ্ডিত্য অতি উচ্চশ্রেণীর ছিল, সে বিষয়ে কাহারও সংশয় নাই। কিন্তু প্রাচ্যবিদ্যাবিৎ পণ্ডিতগণের মধ্যে তাহার একটু বৈশিষ্ট্য ছিল, যাহা অন্যান্য পণ্ডিতের নাই, এবং যাহার গুণে তিনি ভারতবাসীর আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ভক্তি পাইবার অধিকারী ছিলেন। এই বৈশিষ্ট্য ভারতবর্ষের প্রতি ও ভারতবাসীর প্রতি তাহার একান্ত অনুরাগ। তিনি ভারতবর্ষকে ও ভারতবাসীকে মনের সহিত ভাল বাসিতেন; বলা বাহুল্য যে পণ্ডিত মাত্রেই—প্রাচ্যবিবিৎ পাশ্চাত্য পণ্ডিতমাত্রেই সেরূপ ভাল বাসেন না। ভারতবাসীর প্রতি এই চরিত-কথা আন্তরিক অনুরাগ তাহার নানা কাৰ্যে প্ৰকাশ পাইত। • ভারতবর্ষের সাহিত্য লইয়া, ভারতবর্ষের ইতিহাস লইয়া অনেক বড় বড় পণ্ডিত মাথা ঘামাইয়াছেন ও উৎকট পরিশ্রম করিয়াছেন। কিন্তু What India can teach us, ভারতবর্ষ ইউরােপকে কি শিক্ষা দিতে পারে, এই বিষয়ের আলােচনায় অন্য কাহারও লেখনী এত ব্যাকুল হয় নাই। অধম ভারতবাসীর জীবনচরিত লিথিয়া সময় ব্যয় করা বােধ হয় তৎশ্রেণীস্থ আর কোন পণ্ডিত কর্তব্যকর্মের মধ্যে গণ্য করেন নাই। মক্ষমূলরের সাহত যে সকল আধুনিক কৃতী ভারতসন্তানের পরিচয় ছিল, অথবা পরিচয় না থাকিলেও যাহাদের প্রতি তাহার শ্রদ্ধা ছিল, তিনি তাহাদের জীবনচরিত লিখিয়াছেন। বর্তমানকালে ও আমাদের বর্তমান অবস্থায় ইহা ফেলিবার কথা নহে। ভারতবর্ষের হিতচিন্তায় তঁাহার জীবৎকালের অনেকটা অংশের ব্যয় হইয়াছে। ছােট ছােট কাজেও তাহার এই আন্তরিকতার পরিচয় পাওয়া যাইত। শ্ৰীযুক্ত দ্বালগঙ্গাধর তিলকের কারাবাসকালে স্বপ্রকাশিত ঋগ্বেদসংহিতা তাহাকে উপহারস্বরূপ পাঠাইয়া তিনি এই সহৃদয়তার পরিচয় দিয়াছিলেন। কাজট। ঘােট ; কিন্তু এইরূপ ছােট কাজেই আত্মীয় চেনা যায়; বিশেষতঃ বন্ধুবর্গের আত্মীয়তার সারতা আপন্নিকষপাষাণেই ধরা পড়ে। গল্প শােনা যায় যে মক্ষমূলর ভারতবর্ষে প্রতি এত অনুরক্ত হইয়াও ভারতভূমিতে পদার্পণে সাহসী হন নাই ; তাহার আশঙ্কা ছিল, মনঃকল্পিত ভারতবর্ষের যে আদর্শ বহুদিন হইতে তাহার মনের মধ্যে বর্তমান ছিল, ভারতবর্ষ চোখের সম্মুখে আসিলে কোথায় তাহা ভাঙ্গিয়া যাইবে। এত মিষ্ট কথা আমরা বড় শুনিতে পাই না। ভারতবর্ষের লোকেও তঁাহার অনুরাগ অনুভব না করিত এমন নহে। বিলাত প্রবাসী ভারতবাসীর অনেকেই মক্ষমূলরের সহিত আলাপকরিয়া আসা একটা কৰ্ত্তব্যমধ্যে বিবেচনা করিতেন; এই আলাপসূত্রে অনেকের সহিত তাঁহার বন্ধুত্ব স্থাপিত হইয়াছিল। অনেক অধ্যাপক মক্ষমূলর তরুণবয়স্ক ছাত্র তাহার আশ্রয় গ্রহণ করিয়া শরণাপন্ন হইত। একবার শুনিয়াছিলাম, কলিকাতায় কোন ধনিসন্তান পিতৃশ্রাদ্ধ উপলক্ষে অধ্যাপক বিদায় স্বরূপে মক্ষমূলরকে এক জোড়া শাল উপহার পাঠাইয়াছিলেন। এদেশের অনেক পণ্ডিতলােকে তাহাদের গ্রন্থের জন্য মক্ষমূলরের প্রশংসাপত্র না পাইলে যেন তৃপ্তিবােধ করিতেন না। এদেশের অনেকের সহিতই তাহার চিঠিপত্র চলিত। ফল কথা, মক্ষমূলত আমাদের প্রকৃত বন্ধু ছিলেন ; আমরা সেই বন্ধু হারাইয়াছি। পণ্ডিতপ্রসূ পাশ্চাত্যভূমিতে আরও কত বড় বড় পণ্ডিত জন্মিবেন। কিন্তু আর একজন মক্ষমূলরকে আমরা কবে পাইব, কে বলিতে পারে ? শরীরতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতেরা তীক্ষ ছুরিকার সাহায্যে মনুষ্যের শবদেহ ব্যবচ্ছেদ করিয়া তাহার কোথায় কি আছে সন্ধান করিয়া দেখেন ; এবং সেই অনুসন্ধানে কত নুতন তথ্য আবিষ্কার করিয়া পরমানন্দ লাভ করেন। কিন্তু সেই শবদেহের প্রতি তাঁহাদের যে বিশেষ একটা অনুরাগ জন্মে তাহা বলা যায় না। আপনার কাজটা সারিয়া ফেলিয়াই তাঁহার বিবিধ ‘ডিসইনফেক্টান্ট' প্রয়ােগে আপনার শরীরের অশুদ্ধি ও ছুরিকার অশুদ্ধি ও টেবিলের অশুদ্ধি তাড়াতাড়ি শশাধনের জন্য ব্যস্ত হয়েন। দুঃখের বিষয় পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণের মধ্যে যাঁহারা হিন্দু- জাতির প্রাচীন সাহিত্য ও প্রাচীন ইতিহাস লইয়া আলােচনা করেন, তাহাদের অনেকের কাৰ্য্যকে কতকটা এইরূপ শবব্যবচ্ছেদের সহিত তুলনা করা যাইতে পারে। তাহার এই মূতজাতির শবদেহ ব্যবচ্ছেদ করিয়া তাহা হইতে নানা তত্ত্বের আবিষ্কার করিয়া যথেষ্ট আনন্দ বা কৌতুক বােধ করিয়া থাকেন; কিন্তু এই শবদেহের স্পর্শ তাহাদের পক্ষে কতটা প্রীতিকর হয়, তাহা বলিতে পারি না। আচাৰ্য মক্ষমূলর কিন্তু ইহাকে ঠিক শবদেহ বলিয়া ভাবিতেন না। বতেন না। অন্ততঃ এই দেহের ধমনীগুলার মধ্যে এককালে রক্তপ্রবাহ সঞ্চালিত হইত, এবং ইহার ৮ চরিত-কথা হৃৎপিণ্ড এক কালে প্রাণের শক্তিযােগে স্পন্দিত হইত, ইহা তিনি বুঝিতেন; এবং বাক্যের দ্বারা এবং কার্যের দ্বারা তাঁহার সেই মনােভাবের পরিচয় দিতেন। সুতরাং আমরা সেই স্বর্গগত আচার্যের নিকট চিরঋণী ও চিরকৃতজ্ঞতাসূত্রে আবদ্ধ। বঙ্গীয় সাহিত্যপরিষদের জন্মাবধি যাঁহারা ইহার সহিত সংস্পৃষ্ট আছেন, তাহাদের স্মরণ থাকিতে পারে, সাহিত্যপরিষৎ স্থাপনের সময় উপদেশ যাজ্ঞা করিয়া মক্ষমূলরকে পত্র লেখা হইয়াছিল। মক্ষমূলর সেই পত্রের উত্তরে নবীন পরিষৎকে কয়েকটা ছােটখাট উপদেশ দিয়াছিলেন। একটা উপদেশ এইরূপ। বাঙ্গালাদেশের প্রত্যেক গ্রামের ও প্রত্যেক নদ নদী বিল খাল প্রভৃতির নাম সংগ্রহ করিয়া সেই সেই নামের উৎপত্তি নির্ণয়ের চেষ্টা পরিষদের একটা কর্তব্য হওয়া উচিত। বলা বাহুল্য যে কাজটা অতি ছােট; এবং আমাদের পরিষৎ এ পর্যন্ত এত ছােট কাজে হস্তাৰ্পণ করিয়া আপনার মহত্ত্বকে সঙ্কুচিত করিতে সাহস করেন নাই। কিন্তু পরিষদের জানা উচিত ছিল, যে ছােট বীজ হইতে বড় গাছ হয়; এবং ছােট কাজের মাহাত্ম্য যাঁহারা উপলব্ধি করিতে পারিয়াছেন, তাহারাই বড় কাজের সম্পাদনে সমর্থ হয়েন। রােম সাম্রাজ্যের ইতিহাস- লেখক যদি কেহ না থাকিত, তাহা হইলেও বৰ্ত্তমান ইংলণ্ডের গ্রামগুলির ও নগরগুলির নামতত্বের আলােচনা করিয়া সেই দেশে রােমের প্রভুত্বের কথা আবিষ্কৃত হইতে পারিত। সেইরূপ এই ছােট কাজে বাঙ্গলাদেশের বিস্মৃত অতীত ইতিহাসের কোন্ অংশ উদ্ঘাটিত হইতে পারে না পারে, তাহা আমরা কিরূপে বলিব? মক্ষমূলর স্বয়ং ছােট কাজকে অবজ্ঞা, করিতেন না। কোথায় দেখিয়াছিলাম মনে হইতেছে না, মক্ষমূলর বিভিন্ন ভাষায় বিড়ালের নামের ইতিবৃত্ত অতি গম্ভীরভাবে আলােচনা করিতেছেন। প্রাচীন গ্রীসের ও প্রাচীন ইউরােপের প্রাচীনতম সাহিত্যে নাকি বিড়ালের কোন উল্লেখ নাই। আমাদের সংস্কৃত প্রাচীনতম সাহিত্যেও অনেক । ;
অধ্যাপক মক্ষমূলর জন্তুর নাম আছে, বিড়ালের না কি নাম নাই। বৈদূৰ্য্যনামক রত্ন, ইংরাজিতে যাহাকে cat's eye বলে, উহাকে বিড়ালশব্দ হইতে ব্যুৎপন্ন করা যাইতে পারে; কিন্তু এই বৈদুৰ্য্য রত্নেরও নাকি অতি প্রাচীন সাহিত্যে নাম নাই। কাজেই অনুমান হইতে পারে যে প্রাচীন আর্যজাতির মধ্যে এবং আর্যজাতির বিভিন্ন শাখা যে সকল দেশে উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছিল সেই সকল দেশে, বিড়াল ছিল না। তার বহুদিন পরে কোন সময়ে আলুর মত ও তামাকের মত কোন্ অনাৰ্য বিদেশ হইতে বিড়াল আসিয়া আর্যদেশমধ্যে ও আৰ্য্যগৃহমধ্যে ও আৰ্যসাহিত্যমধ্যে চিরস্থায়ী স্থান লাভ করিয়াছে। সেই বিদেশী বিড়ালজাতির স্বাদপি গরীয়সী আদি মাতৃভূমি কোন দেশ? সম্ভবতঃ উহা মিশরদেশ ; মিশরদেশে অতি প্রাচীনকালে বিড়াল-দেবতা পূজা পাইতেন; এবং সম্ভবতঃ প্রাচীন মিশরদেশে, ব্যাজাতীয় কোন আরণ্যজন্তু গ্রাম্যত-পাদিত হইয়া বিড়ালরূপ ধারণ করিয়াছিলেন। পরে কালক্রমে মিশর হইতে বিড়ালের আধিপত্য অন্যান্যস্থলে বিস্তৃত হয়। এই অনুমান যদি সত্য হয়, তাহা হইলে জীবতত্ত্ববিদেরা ভাষাতত্ত্বের নিকট আর একটা ঋণগ্রহণ করিবেন। মক্ষমূলরের অনুমান সঙ্গত কি অসঙ্গত, তাহা বিচার করিবার এই স্থান নহে; আমি কেবল একটা দৃষ্টান্ত দ্বারা দেখাইতে চাহি যে বড় লােকে ছােট কাজকে অবজ্ঞা করেন না; তাঁহাদের যত্নে ছােট বীজ হইতে বড় গাছ উৎপাদিত হয়। বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের জন্মকালে ভারতবাসীর হিতৈষী জৰ্ম্মণদেশােদ্ভব আচাৰ্য্য মক্ষমুলর নবীন পরিষৎকে ক্ষুদ্রকাৰ্য্যে অবজ্ঞা না করিতে উপদেশ করিয়া গিয়াছেন। আমরা যদি সেই পরলােকগত মহাত্মার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া ক্ষুদ্র কাৰ্য্যের মাহাত্ম্য বুঝিয়া চলিতে প্ররি, তাহা হইলে সেই মহাত্মার উপদেশ ও তঁাহার প্রতি ভক্তি প্রকাশার্থ আহূত অদ্যকার এই সভা নিতান্ত নিস্ফল হইবে না।
উমেশচন্দ্র বটব্যাল আমার যখন পঠদ্দশা, তখন প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ-বৃত্তিধারী উমেশচন্দ্র বটব্যালের নাম ছাত্রসমাজে অপরিচিত ছিল না; কিন্তু তিনি তখন বঙ্গীয় সাহিত্য সমাজে বােধ হয় অপরিচিত ছিলেন। “সাহিত্য” পত্রে “বৈদিক কালে গােহত্যা বিষয়ক যে কয়েকটি প্রবন্ধ বাহির হয়, বােধ হয়, তাহাই তাহার প্রথম বাঙ্গালা রচনা। বাঙ্গালা সাময়িক পত্রিকায় প্রাচীন ইতি- হাস-ঘটিত গবেষণাপূর্ণ যে সকল প্রবন্ধ সৰ্ব্বদা বাহির হয়, সাধারণ পাঠকের অন্তঃকরণে তাহা কি রকম একটা ভীতির সঞ্চার করে ; বােধ করি, সেই ভীতির বশবর্তী হইয়াই আমি তখন সেই বৈদিক প্রবন্ধগুলি পাঠ করিতে সাহস পাই নাই। “সাধনা” পত্রিকায় সাংখ্যদর্শনের ব্যাখা তাঁহার লেখনী হইতে প্রকাশিত হইতে আরম্ভ হইলে আমি তাহার রচনায় আকৃষ্ট হই, এবং তখনই বুঝিতে পারি, বঙ্গের সাহিত্যক্ষেত্রে একজন মহারথের আবির্ভাব হইয়াছে। তদবধি বাঙ্গালা সাময়িক পত্রে তাঁহার যত প্রবন্ধ বাহির হইয়াছে, প্রায় সকলই আগ্রহের সহিত পড়িয়াছি, এবং পড়িয়া প্রচুর আনন্দ উপভােগ করিয়াছি। অথচ, এই সকল প্রবন্ধের অধিকাংশই ঐতিহাসিক গবেষণায় পরিপূর্ণ। ইহাও স্বীকার করিতে দোষ দেখি না যে, “সাহিত্যপত্রের মলাটের উপর উমেশচন্দ্র বটব্যালের নাম মুদ্রিত দেখিলেই মনে একটা হর্ষ উপস্থিত হইত। আশা হইত যে, এমন একটা কিছু তাহার রচনা মধ্যে দেখিতে পাইব, যাহা অন্যত্র দুর্লভ। কখনই সে আশা হইতে বঞ্চিত হইতে হয় নাই। কিন্তু তখন জানিতাম না যে, এত শীঘ্র এই আনন্দের কনয়িত।
উমেশচন্দ্র বটব্যাল ৭১ . বঙ্গের সাহিত্যক্ষেত্র হইতে অন্তহিত হইবেন, এবং যে আকাঙ্ক্ষার সহিত মাসের পর মাস উমেশচন্দ্রের নাম মাসিক পত্রের মলাটে অঙ্কিত দেখিবার জন্য প্রতীক্ষা করিয়া থাকিতাম, তাহা এত শীঘ্র চিরদিনের জন্য নির্বাণ প্রাপ্ত হইবে। তাহার স্মৃতির প্রতি বঙ্গীয় সাহিত্য-সমাজের কৃতজ্ঞতার ভার আমাকেই গ্রহণ করিতে হইবে, তাহাও. কখন মনে করি নাই। বটব্যাল মহাশয়ের সহিত আমার কখনও সাক্ষাৎ সম্বন্ধে পরিচয়ের সৌভাগ্য ঘটে নাই; এবং তিনি সাহিত্যের যে অংশের প্রধানতঃ আলােচনা করিতেন, তাহাও সৰ্ব্বতােভাবে আমার অধিকার-বহিভূত। এই অবস্থায় তাহার জীবন বা কৰ্ম্ম সম্বন্ধে সমালােচনায় আমি কোনক্রমেই যােগ্য নহি। তথাপি যখন “সাহিত্যপত্রের সম্পাদক মহাশয় অনুগ্রহ পূৰ্ব্বক আমার প্রতি এই ভার অর্পণ করিলেন, এবং তজ্জন্য আমাকে সাহায্য করিতে প্রস্তুত হইলেন, তখন এই অনধিকার চর্চায় প্রবৃত্ত হইতে আমি দ্বিধাবােধ করি নাই। দূর হইতে তাহার রচনা পাঠ করিয়া তাহার প্রতি যে অত্যধিক অনুরাগ ও ভক্তি জন্মিয়াছিল, তাহা প্রকাশের অবসর লাভ করিয়া সেই লােভের সংবরণ আমার পক্ষে দুঃসাধ্য হইয়াছিল। উমেশচন্দ্রের জীবনচবিত লিপিবদ্ধ করা বর্তমান প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নহে। আশা করি, যােগ্যতর ব্যক্তি এই কার্যের ভার গ্রহণ করিবেন। উমেশচন্দ্র স্বয়ং তাহার জীবন চরিত 'লিখিবার ইচ্ছা করিয়া তাহার ভূমিকা মাত্র লিখিয়া গিয়াছেন। সেই অসম্পূর্ণ ভূমিকা হইতে ও তাহার পুত্রগণের নিকট হইতে সংগৃহীত বিবরণ হইতে সংগ্রহ করিয়া তাহার জীবনের স্মৃ ঘটনা কয়টির উল্লেখ করিতেছি। হুগলী জেলার অন্তঃপাতী খানাকুলের অন্তর্গত বামনগর গ্রাম উমেশ- চন্দ্র বটব্যালের জন্মস্থান । ১২৫৯ সালের ভাদ্রমাসে তার জন্ম হয়। ১০০৫ সালের ১লা শ্রাবণ তাহার লােকান্তর প্রাপ্তি ঘটে। ছচল্লিশ বৎসর ০ ৭২ চরিত-কথা পূর্ণ না হইতেই এই কৃতী বঙ্গসন্তানের অকালমরণ কেশবচন্দ্র সেন ও কৃষ্ণদাস পাল ও অন্যান্য বঙ্গসন্তানের স্মৃতি জাগাইয়া দিবে। খানাকুল কৃষ্ণনগর গ্রামও অন্যান্য কৃতী বঙ্গসন্তানের জীবনের সহিত সম্পকসূত্রে সাহিত্যসমাজে অপরিচিত নহে। এই গ্রামের অন্তর্গত অন্যতর পল্লী, রাধানগর রামমােহন রায়ের জন্মভূমি। রামমােহন রায়ের ও উমেশচন্দ্র বটব্যালের পূর্বপুরুষেরা স্থানীয় সমাজের উভয় প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নেতা ছিলেন, ও এই সম্পর্কে রামমােহন রায়ের সময়েও উভয় দলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। রামমােহন রায়ের সমকালবৰ্ত্তী রামকানাই বটব্যাল উমেশচন্দ্রের বৃদ্ধপিতামহ। রামকানাইএর পিতৃ-পিতামহ বৈষ্ণব ছিলেন ; রামকানাই আপন পরিবার মধ্যে স্বকল্পিত-যন্ত্র-সহকারে অভিনব পদ্ধতিতে শক্তি- পূজা প্রচলন করিয়া যান। তাহা এখনও তাঁহার বংশধরগণের মধ্যে চলিয়া আসিতেছে। উমেশচন্দ্র সেই শক্তি উপাসনার তাৎপৰ্য বর্ণনা করিতে প্রচুর আনন্দ অনুভব করিতেন। উমেশচন্দ্রের পিতার নাম দুর্গাচরণ বটব্যাল, মাতার নাম প্রসন্নকুমারী দেবী। প্রসন্নকুমার সৰ্বাধিকারি-প্রতিষ্ঠিত রাধানগর ইংরেজি স্কুলে ১৮৬৮ অব্দে উমেশচন্দ্র প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া কলিকাতা আসেন ; ১৮৭২ অব্দে সংস্কৃত কলেজ হইতে বি,এ উপাধি লাভ করেন ; ১৮৭৪ অব্দে সংস্কৃত শাস্ত্রে এম এ, এবং পর বৎসর বি এ, উপাধি লাভ করিয়া শিক্ষকতা বৃত্তি গ্রহণ করেন। অনন্তর ১৮৭৬ অব্দে তিনি প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করিয়া মৌয়ট পদক পুরস্কার পান। পঠন্দশার অন্য পরিচয় অনাবশ্যক। উমেশচন্দ্র ১৮৭৭ অকে ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট রূপে গবর্ণমেন্টের কাজে নিযুক্ত হয়েন; কয়েক স্থানে ঐ কাৰ্য্যের পর দশ বৎসর পরে ষ্ট্যাটুটারী সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া সিভিলিয়ানি লাভ করেন ;
উমেশচন্দ্র বটব্যাল ৭৩ f ০ শেষে বিভিন্ন জেলায় প্রশংসার সহিত ম্যাজিষ্ট্রেটি কার্য সম্পাদন করেন। গত বৎসর ফেব্রুয়ারি মাসে বগুড়ায় অবস্থান কালে তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হইয়া কলিকাতায় আসেন। চিকিৎসায় বা স্থান পরিবর্তনে কোন উপকার হইল না । ১লা শ্রবণ তারিখে কলিকাতার বাটীতে তাঁহার মৃত্যু ঘটে। রাজকীয় কার্যে তিনি প্রতিষ্ঠা ও প্রশংসা লাভ করিয়াছিলেন ; নম্রতা, রসজ্ঞতা, গৰ্বাভাব ইত্যাদি গুণে সকলের প্রিয় ছিলেন ; সৰ্ব্ব- বিধ কৰ্ত্তব্যসাধনে সর্বদা উদ্যোগী ছিলেন। তাঁহার ব্যক্তিগত চরিত্র বর্তমান লেখক কর্তৃক যথােচিত বর্ণিত হইবার কোন সম্ভাবনা নাই। গার্হস্থ্যজীবনে বা রাজকীয় কৰ্ম্ম সম্পর্কে তিনি বৃহৎ সমাজের সহিত সম্বন্ধে আবদ্ধ ছিলেন ; সাহিত্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়া। তিনি বৃত্তর সমাজের সহিত সম্পক পাতাইয়াছিলেন। এই সমাজেই তাহার সহিত আমাদের সম্বন্ধ। আর কিছু দিন জীবিত থাকিলে তিনি এই বৃহত্তর সমাজকে গৌরবান্বিত করিয়া যাইতে পারিতেন, সন্দেহ নাই। বাস্তবিকই বাঙ্গালা সাহিত্যে তাহার রচনা অপূৰ্ব সামগ্রী ছিল : এই দুর্ভাগ্য দেশের সাহিত্যক্ষেত্রে প্রায় সমগ্র প্রদেশটা যে সেনা-কর্তৃক অধিকৃত, সেই সেনাভুক্ত বীরপুরুষগণের বীরত্বের আস্ফালন যথেষ্ট আছে। কিন্তু তাহাদের শরীরে মেরুদণ্ডের ও অস্থিকঙ্কালের অস্তিত্ব সম্বন্ধে প্রমাণাভাব। রামায়ণের আমলে হােমারের আমলে বীর পুরুষের বাহুযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবার পূর্বে বাগ,- যুদ্ধটাকে একেবারে অনাবশ্যক বলিয়া জানিতেন না; তবে বাহুযুদ্ধটা একবার আরম্ভ হইলে তাহার ফল শত্রুর পক্ষে বড় বিষম হইত। কিন্তু বঙ্গসাহিত্য-ক্ষেত্রের বীরেরা যে বাক্যবাণ প্রয়ােগ করেন, তাহার তীক্ষ্ণতা কখন অনুভবের বিষয় হয় না; এবং তাহারা যে অস্ত্রের আ করেন, তাহা, কাহারও পৃষ্ঠে কখন কাটিয়া বসে না। এক শ্রেণির লেখকের } ৭৪ চরিত-কথা অত্যাচারে মনে হয়, কি অশুভক্ষণেই এদেশে কমলাকান্তের দপ্তর ও উদভ্রান্ত প্রেমের প্রকাশ হইয়াছিল। আর এক শ্রেণির লেখক নিতান্ত পুরাতন জীর্ণ সত্যকে জীর্ণতর বেশভূষায় কথঞ্চিৎ সজ্জিত ও আবৃত করিয়া সাধারণের সমক্ষে উপস্থিত করেন, তাহার প্রতিও কোনরূপ অনুরাগ জন্মিবার সম্ভাবনা নাই। বঙ্গভূমি স্বয়ং যে ব্রীহিশস্য বর্ষে বর্ষে উৎপাদন করেন, তাহা, শুনিতে পাই, একাঙ্ক নাইট্রোজেনবর্জিত ; আর বঙ্গের বাগদেবতা যে সাহিতের সৃষ্টি করেন, তাহা “ধূম-জ্যোতিঃসলিল- মরুতাং সন্নিপাতঃ”; বঙ্গদেশে কাঠিন্যধৰ্ম্মবিশিষ্ট সামগ্রীর এত অভাব কেন, তাহা সুধীগণের আলােচ্য। উমেশচন্দ্র বটব্যালে বঙ্গদেশের প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়া- ছিল। উচ্ছাসের হাওয়া ও বাক্যের কুয়াশা কাটাইয়া উন্মুক্ত আলােকে ও কঠিন মৃত্তিকায় দুই দণ্ড দাঁড়াইবার অবসর দিয়া তিনি আমাদিগকে কৃতার্থ করিতেন। তাহার উদ্যত অস্ত্রে কেবল ঔজ্জ্বল্য ও ক্ষমতা ছিল না ; তাহাতে ধার ছিল ; যে বাহুতে তিনি সেই অস্ত্র ধারণ করিতেন, তাহাতে অস্থি ও পেশী বৰ্ত্তমান ছিল। কেবল পুরাতন কথার পুনরাবৃত্তি করিয়া তিনি শ্রবণেন্দ্রিয়ের বিরক্তি জন্মাইতেন না। তিনি প্রায়ই নূতন কথা বলিতেন, ও পুরাতন কথাকেও নুতন ভাষায় বলিতেন। নূতন সামগ্রীর আস্বাদনে আমাদের রসনা নিত্য নিত্য পরিতৃপ্ত হইত ; নূতন নূতন তথ্যের আভাস পাইয়া আমাদের অন্তরিন্দ্রিয় বহির্মুখে আসিত ও তন্দ্রাত্যাগ করিয়া জাগিয়া উঠিত। এদেশে লেখকের পক্ষে ইহা সামান্য প্রশংসা নহে; এবং এদেশে পাঠকের পক্ষে ইহা সামান্য সৌভাগ্য নহে। উমেশচন্দ্র প্রধানতঃ স্বদেশের পুরাতন ইতিহাস উদ্ধারে ব্যাপৃত দিলেন। সম্প্রতি স্বদেশের ইতিহাস উদ্ধারের চেষ্টা যেন একটু জাগিয়া উঠিয়াছে বােধ হইতেছে। এটা অত্যন্ত শুভ লক্ষণ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এতদিন ধরিয়া আমাদিগকে যে বিদ্যা বিতরণ করিয়া আসিতেছেন, উমেশচন্দ্র বটব্যাল তাহার ফলে দেশে ইতিহাস জানিবার আকাঙ্ক্ষা বিশেষ উদ্দীপিত হইয়াছে, এ পর্যন্ত এরূপ কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। প্রাচীন ভারতবর্ষীয়েরা ইতিহাসের গৌরব বুঝিতেন না, এইরূপ একটা বিলাপ- ধ্বনি সচরাচর শুনা যায় । কিন্তু আমাদের নব্য সম্প্রদায়ের কৃতবিদ্যেরাও যে ইতিহাসের গৌরব বুঝিয়াছেন, তাহাও প্রমাণ-সাপেক্ষ। পরন্তু নব্য- সম্প্রদায়ের এ বিষয়ে আচরণ অনেক সময় স্নায়ুমণ্ডলীর উত্তেজনা জনক। পাশ্চাত্য হিসাবে স্বদেশানুরাগ যাহাকে বলে, তাহা বােধ হয় প্রাচীন কালেও আমাদের ছিল না, এবং একালের শিক্ষাও তাহা হয় ত জন্মাইতে পারে নাই। মূলে স্বদেশানুরাগের ভিত্তি না থাকিলে স্বদেশের উন্নতিচেষ্টা কেবল পশুশ্রম; এবং যে জাতির আপনার পুরাতন কাহিনী জানিবার প্রবৃত্তি নাই, তাহার স্বদেশানুরাগের আস্ফালন সর্বতােভাবে উপহাস্য। স্বদেশের উন্নতির জন্য এদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন, শিল্প-শিক্ষার প্রচার, বিজ্ঞান-শিক্ষার প্রচার, শিল্প-সমিতি স্থাপন প্রভৃতি নানাবিধ উদ্যম দেখা যাইতেছে ; কিন্তু সকল উদ্যমই ব্যর্থ ও বন্ধ্য হয়। তাহার মূর্ণ কারণ এক। আর জাতির অতীত ইতিহাসে যাহার শ্রদ্ধা নাই, সে যেন স্বদেশ-প্রিয়তার স্পর্ধা না করে ; আপনার জাতিকে যে চেনে না, সে যেন কৃত্রিম স্বদেশানুরাগের আস্ফালন না করে। আধুনিক কৃতবিদ্যগণের মধ্যে যে দুই চারিজন সুধী পুরুষ আপনার জাতিকে চিনিতে চেষ্টা করিয়াছেন, উমেশচন্দ্র বটব্যাল তাহাদের অন্যতম। আমাদের শিক্ষিত সমাজে তাহাদের স্থান অতি উচ্চে। সত্য কথা, উমেশচন্দ্র তাহার ইচ্ছানুরূপ ও ক্ষমতানুরূপ কাজ করিয়া যাইতে পারেন নাই। পারেন নাই, সে আমাদের দুর্ভাগ্য।. এক এক বার মনে হয় যদি তিনি রাজকাৰ্য্য জীবিকার উপায় স্বরূপ গ্রহণ না করিতেন, তাহা হইলে বােধ হয় আরও অধিক কাজ করিয়া যাইতে পারিতেন। কিন্তু সেও বুঝি মনের ভ্রম। | ০ চরিতকথা। . কৃতবিদ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে যাহাদিগকে পরাধীন বৃত্তি গ্রহণ করিতে হয় নাই, যাহাদের শক্তির বা অর্থ-সামর্থ্যের বা অবকাশেরও অভাব নাই, তাহাদের মধ্যেই বা কয়জন উমেশচন্দ্রের মত দেশের প্রাচীন ইতিবৃত্তের জন্য অনুরাগ দেখাইতেছেন ? আমাদের শিক্ষিতগণের মধ্যে যাঁহারা ভাবেন, এদেশের প্রাচীন ইতিহাসের শিক্ষায় বা আলােচনায় কোন লাভ নাই, তাঁহাদের কথা ধরিলাম না। যাহারা প্রাচীন কালের জন্য কেবল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেন, তাহাদের পরিতাপও স্বদেশানুরাগের দৃঢ়তার অভাব প্রকাশ করে মাত্র। এই অবস্থায় যিনি অন্য কার্যে লিপ্ত হইয়াও দেশের অতীত স্মৃতি জাগরিত করিবার জন্য কিঞ্চিত্র উদ্যম দেখাইয়াছেন, তিনি সার্থকজন্ম। উমেশচন্দ্র এই চেষ্টা করিয়াছিলেন। তাহার বৈদিক প্রবন্ধাবলীর সমালােচনা আমার সাধ্য নহে। তিনি কালস্রোতে নীয়মান যে দুই একটি চিহ্ন মাত্র অবলম্বন করিয়া অতিদূরস্থ বিস্মৃতপ্রায় অতীত দেশের চিত্রাঙ্কণে প্রয়াস পাইয়াছিলেন ;-তাহাতে কতদুর কৃতকাৰ্য্য হইয়াছেন, তাহার নির্ণয়ে আমি সমর্থ নহি। তঁাহার বৈদিক প্রবন্ধাবলী জনসমাজে তেমন সমাদর লাভ করিয়াছে, তাহাও বােধ হয় । তঁাহার আবিষ্কৃত তথ্যে সকলেই আস্থা স্থাপন করিবেন, তাহাও মনে করি না। অল্প প্রমাণ আশ্রয়ে, অধিকাংশ স্থলে কল্পনার সাহায্যে, যে ইতিহাস আবিষ্কৃত হয়, তাহার যাথার্থে সন্দেহ চিরকালই থাকিবে। অন্যের পক্ষে যাহাই হউক, উমেশচন্দ্রের বৈদিক প্রবন্ধসমূহ আমার নিকট অস্কান্তের কাজ করিত। একটা অনিবাৰ্য মােহের আবেগে আমি সেই রচনাবলীর প্রতি আকৃষ্ট হইতাম। তিনি পাশ্চাত্য পদ্ধতি অবলম্বন করিয়া দেশের প্রাচীন অবস্থার আলােচনা করিতেন; কিন্তু কেবল বৈদেশিক মতের অনুসরণ করিয়া যাইতেন না, স্বাধীন ভাবে নূতন পথে চলিতে চাহিতেন। স্বাধীন চিন্তা তাহাকে যে-পথে উমেশচন্দ্র বটব্যাল ৭৭ ০ চালাইত, তিনি সেই পথে চলিতেন। তাহার এক একটি প্রবন্ধ বৈদিক কালের আৰ্য সমাজের এক একটি পট মানস-চক্ষুর নিকট উজ্জ্বল আলােকে ধরিয়া দিত। সেই পট যে সর্বত্র প্রকৃত তথ্যের অঙ্কনে সমর্থ হইয়াছে, তাহা আমিও বিশ্বাস করিতাম না; কিন্তু সেই পটের অভিনবত্ব, তাহার স্পষ্টতা, তাহার ঔজ্জ্বল্য, দেখিয়া চমৎকৃত হইতাম। কল্পনার তুলিকা যে স্থানে অস্থানে বিবিধ বর্ণের বিন্যাস করিয়া তাহাকে মূর্তি প্রদান করিত, তাহা বুঝিতাম। অতিরঞ্জনই হয়ত তেমন ঔজ্জ্বলের হেতু, ইহাও সম্ভবপর হইতে পারে। তথাপি সেই পট এক এক খানা যখন দৃষ্টি-পথ হইতে সরিয়া যাইত, তখন সুখস্বপ্নের স্মৃতির মত মনের মধ্যে স্থায়ী রেখা অঙ্কিত করিয়া যাইত। ইহা ভারতবর্ষের অতীত সমাজের অন্যান্য ইউরােপীয় চিত্রকরগণের অঙ্কিত চিত্র হইতে কত বিভিন্ন! হয়ত ইহা কল্পনাকৃত অতিরঞ্জনে বিকৃত ও অসত্য, হয়ত আত্যন্তিক স্বজাতি- প্রিয়তা হইতে উদ্ভূত হওয়ায় ও আত্যন্তিক স্বজাতিপ্রিয়তার উৎপাদক বলিয়া বৈজ্ঞানিকের নিকট সম্পূর্ণ শ্রদ্ধার অধিকারী। কিন্তু ইহার মূল্য নির্ধারণ অন্যরূপে করিতে হইবে। ইহা যে অস্পষ্ট স্মৃতি জাগাইয়া দিত, যে আকাঙ্ক্ষার, যে অতৃপ্তির, উদ্দীপনা করিত, তদ্বারা ইহার মূল্যের পরিমাণ করিতে হইবে। এই আকাঙ্ক্ষার ও অতৃপ্তির উদ্বোধনই এখন আমাদের প্রয়ােজন। আমাদের অলস, জড় ও সুপ্ত চিত্তবৃত্তি-সমূহকে প্রবােধিত করিতে এই আকাঙ্ক্ষার ও অতৃপ্তিরই এখন প্রয়ােজন। কর্মসম্পাদনে আমাদের এখন শক্তি নাই, সত্যাবিষ্কারে আমাদের ক্ষমতা নাই। এখন কর্মের প্রতি ও সত্যের প্রতি আমাদের আকাঙ্ক্ষার উদ্বোধন আবশ্যক। এই আকাঙ্ক্ষা হইতে উদ্যম জন্মিবে, এই উদ্যম কালে ফলপ্রসবে সমর্থ হইবে। এই আকাঙ্ক্ষার ভাব ও অতৃপ্তির ভাব উমেশচন্দ্রের রচনার প্রত্যেক .
৭৮ চরিত-কথা ও ছত্রে প্রকাশ পাইত। তিনি একটা পিপাসার উত্তেজনায় পানীয় আহরণে উদ্যত হইয়াছেন, এইরূপ বুঝিতে পারিতাম । মরুভূমির মধ্যে দণ্ডায়মান হইয়া তিনি প্রাণের চেষ্টায় যেন জলের অন্বেষণ করিতেন ; এবং সময়ে সময়ে মরীচিকাদর্শনেও, যেন তৎ প্রতি ধাবিত হইতেন। অন্ধকূপস্থিত জীব নূতন জ্যোতির দেখা পাইয়া যেন তাহার অভিমুখে ধাবিত হইতেছে, এইরূপ বােধ হইত। এই জন্য উমেশ চন্দ্রের বৈদিক রচনা আমার নিকট এত ভাল লাগিত। বাঙ্গালায় আরও কতিপয় মনস্বী ব্যক্তি ইতিহাসের আলােচনা করিয়াছেন, অনেকেই বৈদেশিকের পদাঙ্ক অনুসরণ বৈদেশিকেরই অনুবৃত্তিতে নিরস্ত হইয়াছেন। কেহ কেহ বৈদেশিক বৈদেশিক প্রণালী মে নূতন সত্যাবিষ্কারেও সমর্থ হইয়াছেন। উমেশচন্দ্রের সম্পাদিত কৰ্ম্মের অপেক্ষা তাহাদের সম্পাদিত কৰ্ম্ম এক হিসাবে অধিক মূল্যবান। কিন্তু উমেশচন্দ্রে যে চিত্ত-প্রবৃত্তির স্ফুর্তি দেখিয়াছি, যে অনুরাগের, পিপাসার উত্তেজনা দেখিয়াছি, তাহা অন্যত্র দেখিয়াছি, বােধ হয় না। কোথাও দেখি নাই বলিলে হয়ত ভুল হয় । অক্ষয়চন্দ্র দত্তে এই অনুরাগ ও পিপাসা পূর্ণ মাত্রায় বর্তমান ছিল। বিধাতার নিগ্রহ তাঁহার সেই পিপাসা তৃপ্ত করিতে দেয় নাই। বিধাতার নিগ্রহে উমেশচন্দ্রেও সেই পিপাসার কিঞ্চিৎ নিবৃত্তির অবসর ঘটিল না। বঙ্কিমচন্দ্র এক কালে বাঙ্গালার একখানি ইতিহাস রচনার ইচ্ছা করিয়াছিলেন; কিন্তু ইতিহাসের তথনও সংগৃহীত হয় নাই ; এখনও সংগৃহীত হইতে অনেক বিলম্ব। তিনি বঙ্গের ঐতিহাসিকদিগকে পথ প্রদর্শনের জন্য যথাসাধ্য যত্ন করিয়াছিলেন ; সে চেষ্টা তাঁহার আন্তরিক স্বদেশানুরাগ হইতে প্রসূত। উমেশচন্দ্রেরও এক খানি বাঙ্গালার ইতিহাস লিখিতে ইচ্ছা ছিল। কোন বন্ধুকে তিনি পত্র দ্বারায় ইহা জানাইয়াছিলেন। বঙ্গের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করিয়া উমেশচন্দ্র বটব্যাল ৭৯ তিনি উপাদানেরও সংগ্রহ করিতেছিলেন। উপাদানসংগ্রহ অনেকেরই সাধ্য ; কিন্তু এদেশে সেই সাধ্যসাধনেও সকলে পরাজুখ। উপাদান একত্র করিয়া তাহাকে যথাবিধানে সজ্জিত ও যথাস্থানে বিন্যস্ত করা সকলের সাধ্য নহে। সংগৃহীত উপাদানের মূল্য নির্ধারণ, তাহার অর্থ আবিষ্কার, পুরাতন জিনিষকে নুতন চোখে দেখা, এ সকলই দুরূহ ব্যাপার। উমেশচন্দ্রে এ শক্তি প্রচুর পরিমাণে বর্তমান ছিল। কিন্তু এই অনন্যসাধারণ শক্তির কাৰ্যে বিনিয়োগ ঘটিল না। দরিদ্রের মনােরথ হৃদয়ে থাকিয়াই লয় পায়। আমাদের জাতীয় দারিদ্র্য কি চির দিনই এইরূপ ফলােৎপাদনের প্রতিহত্তা থাকিবে ? উমেশচন্দ্রের দার্শনিক মত তাহার সাংখ্য-দর্শনের ব্যাখ্যায় প্রকাশিত হইয়াছিল। অন্যত্রও তাহার আভাস পাওয়া যায়। তাহার অপ্রকাশিত রচনা মধ্যে তাহার দার্শনিক মতের বিশদ উল্লেখ আছে। তিনি সাংখ্য- মতানুবর্তী দ্বৈতবাদী ছিলেন ; প্রকৃতি ও পুরুষ, বাহজগৎ ও অন্তর্জগতের অন্তস্তলে এই দুই স্বতন্ত্র অনির্বচনীয় পদার্থের অস্তিত্ব স্বীকার করিতেন। ইংরেজি দর্শনে যাহাকে noumcnon বলে বা যাহাকে substance বলে, প্রকৃতি ও পুরুষ, সাংখ্য মতে সেইরূপ noumenon, এবং বহির্জগতের ও অন্তর্জগতের অস্তস্তলে অবস্থিত substance; কোন অজ্ঞেয় কারণে প্রকৃতি ও পুরুষের সম্মিলনে বা সম্বন্ধুস্থাপনে এই প্রতীয়মান বিশ্বজগতের অর্থাৎ phenomenon-সমষ্টির উৎপত্তি। এই সম্বন্ধ স্থাপনেই বিশ্বজগতের উৎপত্তি, সৃষ্টি ও অভিব্যক্তি। এই সৃষ্টি- ব্যাপারকে তিনি “দার্শনিক সৃষ্টি” আখ্যা দিয়াছিলেন। পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা সাংখ্যদর্শনকে এভলুশনিষ্ট বা অভিব্যক্তিবাদী বলিয়া থাকেন। কিন্তু তাহারা এই অভিব্যক্তির তাৎপর্য ঠিক বুঝিয়াছেন কিনা, বলিতে পারি না। ইংরেজি দর্শনে যে এভলুশন' শব্দের প্রয়ােগ আছে, তাহাতে জড়জগতের অভিব্যক্তি বুঝায়, তাহাতে ব্যবহারিক প্রতীয়মান চরিত-কথা জগতের বা ফোনােমেনাল জগতের ব্যবহারিক অভিব্যক্তি বুঝায়। সাংখ্যদর্শনের অভিব্যক্তি বা দার্শনিক পারমার্থিক অভিব্যক্তি ঐ ব্যবহারিক বা বৈজ্ঞানিক অভিব্যক্তি হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রকৃতিক এই কথাটা বটব্যাল মহাশয়ের সাংখ্যদর্শনের ব্যাখ্যায় যেমন স্পষ্টভাবে প্রদর্শিত হইয়াছে, তেমন অন্য কোথাও হইয়াছে কি না, জানি না ; অন্ততঃ, আমার জ্ঞানের সঙ্কীর্ণ পরিধির মধ্যে কোথায়ও দেখি নাই। ভবিষ্যতের দর্শন-ব্যাখ্যাতৃগণ যদি এই পার্থক্যটা সম্পূর্ণ হৃদয়ঙ্গম করিয়া দর্শন শাস্ত্রের ব্যাখ্যা করেন, তাহা হইলে, হিন্দুজাতির দর্শন শাস্ত্র অনেক অপব্যাখ্যা হইতে নিষ্কৃতি পায়। উমেশচন্দ্রের সাংখ্য দর্শনের ব্যাখ্যাপাঠে যথেষ্ট উপকার পাইয়াছি কিন্তু তাহার দার্শনিক দ্বৈতবাদ গ্রহণ করিতে পারি নাই। পুরুষের বাহিরে বহির্জগতের অন্তস্তলে প্রকৃতির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অস্তিত্ব একটা অনুমান বা হাইপথেসিস্ বলিয়া ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে। কিন্তু এই অনুমানের পক্ষে স্বতন্ত্র প্রমাণ পাওয়া যায় না, এবং প্রকৃতির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অস্বীকার করিয়াও জাগতিক রহস্য ও দার্শনিক সৃষ্টি বুঝা যাইতে পারে । সে বিষয়ের আলােচনা বর্তমান প্রবন্ধে নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক। পুরুষ অর্থে স্থূলতঃ যদি আত্মা ধরা যায়, তাহা হইলে, আমার মত অন্যান্য মানবেরও আত্মা আছে, ইহা স্বতঃসিদ্ধরূপে উমেশচন্দ্র গণ্য করিতেন। এ কথাটাও ঠি বৈজ্ঞানিক যুক্তিসঙ্গত বলিয়া বােধ হয় না। আমার আত্মা আমার নিকট স্বতঃসিদ্ধ পদার্থ হইলেও অপরের আত্মা আমার নিকট অনুমান-গম্য ও কল্পিত পদার্থ। জড়জগৎ যেরূপ আমার অনুমান-লব্ধ কল্পিত পদার্থ, জড়জগতে বিচরণশীল জড়শরীরধারী জীবগণের অজড় আত্মাও আমার নিকট সেইরূপ অনুমান-লব্ধ কল্পিত পদার্থ ; ইহুৰ অধিক বৈজ্ঞানিক যুক্তিবলে আসে না। বৈদান্তিক সমগ্র বিশ্বকে একমাত্র “অহ পদার্থে পরিণত করিয়াছিলেন; এবং সেই “অহ”কেই ব্রহ্ম উমেশচন্দ্র বটব্যাল উপাধি দিয়া বিশ্বের হর্তা কর্তা বিধাতার স্থানে স্থাপিত করিয়াছিলেন। সাংখ্য মতে যেমন অনিৰ্দেশ্য কারণে প্রকৃতি ও পুরুষের, জ্ঞ ও জ্ঞেয়ের, সম্মিলনে জ্ঞানের উৎপত্তি, অর্থাৎ বিশ্বের দার্শনিক দৃষ্টি ; বেদান্তমতে সেইরূপ “অহম বা ব্রহ্ম নামধেয় পদার্থ হইতে কোনও অনিৰ্দেশ্য কারণে বা অবিদ্যাযােগে বিশ্বের উৎপত্তি। উভয়ই একটা অনিৰ্দেশ্য কারণ বর্তমান আছে। জ্ঞ ও জ্ঞেয়ের সম্মিলন কিরূপে ঘটিল, অথবা “অহম”- এর কিরূপে বিকার ঘটিয়া বিশ্বজগতে পরিণতি হইল, তাহার প্রণালী নির্দেশ করিতে গেলেই এই অনিৰ্দেশ্য হেতু অবতারণা আসিয়া পড়ে। প্রচলিত ঈশ্বরবাদ সগুণ অথচ বচনাতীত, অনুভবগম্য অথচ অনিৰ্দেশ্য, ঈশ্বর নামক সৃষ্টিকর্তার কল্পনা করিয়া সেই অনির্বচনীয় হেতুর স্থান পূরণ করে। উমেশচন্দ্র অন্ততঃ শেষবয়সে সাংখ্য মত হইতে কিঞ্চিৎ দূরে গিয়া এই শেষােক্ত ঈশ্বরবাদের অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। বৈদান্তিক “সােহহং” বাদটিই কিন্তু বিজ্ঞানদৃষ্টিতে সমীচীন বলিয়া বােধ হয়। পঠদ্দশায় ইংরেজি শিক্ষার হাওয়ায় উমেশচন্দ্র পৌত্তলিকতার প্রতি ও হিন্দুর প্রচলিত উপাসনাপদ্ধতির প্রতি আস্থা হারাইয়াছিলেন। কিন্তু এই অনাস্থা কথন তাঁহাকে শাস্ত্রবিরােধী আচারে প্রবর্তিত করিয়াছিল, বােধ হয় না। তাঁহার কোন বন্ধুর মুখে শুনিয়াছি এককালে ঈশ্বর ও পরকালে বিশ্বাসও তিনি ত্যাগ করিয়াছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাহার মত অনেকটা পরিবর্তিত হইয়াছিল, সন্দেহ নাই। উপরেই বলিয়াছি, সাংখ্য- দর্শনােক্ত প্রকৃতিপুরুষের সম্মিলনের অনিৰ্দেশ্য কারণের স্থলে তিনি ঈশ্বর স্থাপন করিয়াছিলেন। ঈশ্বর অর্থে তাহার নিজ ভাষায় “An intelligent being to whose intelligent action the present form and arrangement of the world of matter, and the connection between human souls and that world are ৮২ চরিত-কথা owing.” এই ঈশ্বর কিন্তু অমঙ্গলের সৃষ্টিকর্তা নহেন, তিনি অমঙ্গল হইতে মনুষ্যকে উদ্ধার করেন। এই অমঙ্গল আবার জগৎ-প্রকৃতির অংশমাত্র। তাহার স্বভাষায় “Evil is a part of nature and the energy of God is directed to the ſurging of our nature from evil and to the raising of us to a higher state.” এই মতের সহিত তাঁহার সাংখ্যমতের সামঞ্জস্য ঠিক বুঝা গেল । অন্যান্য পণ্ডিতের ন্যায় তিনি বেদের বহুদেব-বাদের মধ্যে একেশ্বর- বাদের আবিষ্কারের চেষ্টা করিয়াছিলেন। তাহার বৈদিক প্রবন্ধাবলীর মধ্যে ইহার প্রমাণ আছে। বৈদিক কালের উপাস্য দেবতার তত্ত্ব নির্ণয়ে নানা মতভেদ প্রচলিত আছে। কোন্ মত সমীচীন, তাহা জানি না। অন্ততঃ, জৈমিনিপ্রমুখ যে মীমাংসক সম্প্রদায় বেদের অপৌরুষেয়তা স্বীকার করিয়া বেদের প্রভুত্ব হিন্দুজাতির সমাজতন্ত্রের মূলে স্থাপন করিয়াছিলেন, এবং শ্রৌত ও স্মাৰ্ত্ত আচারের ব্যবস্থাপনে যাহাদের নির্দেশ সমস্ত হিন্দুসমাজ শিরােধার্য্য করিয়া আসিতেছে, তাহারা প্রচলিত অর্থে ঈশ্বরের অস্তিত্বই স্বীকার করিতেন না, এরূপও শুনিতে পাওয়া যায়। দুরূহ দার্শনিক তত্ত্বের মীমাংসায় বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন সিদ্ধান্তে উপস্থিত হইবেন, স্পষ্টই বুঝিতে পারা যায়। কিন্তু সামাজিক ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে আধুনিক হিন্দুর কোন পন্থা অবলম্বনীয়, এ সম্বন্ধে উমেশচন্দ্র বটব্যালের মতে কোনরূপ অস্পষ্টতা ছিল না। প্রথম বয়সে পৌত্তলিকতা সম্বন্ধে তাহার মত যাহাই থাকু, জীবনের শেষ ভাগে তিনি যন্ত্রযােগে উপাসনার সমর্থন করিতেন, এবং যন্ত্রযােগে উপাসনা ও স্তুতিমাত্ৰ বা ধ্যানমাত্র অবলম্বনে উপাসনার মধ্যে কোন প্রকৃতিগত পার্থক্য স্বীকার করিতেন না। তাঁহার অপ্রকাশিত রচনা মধ্যে ইহার স্পষ্ট উল্লেখ দেখিলাম। সমাজধৰ্ম্ম পালনে তিনি চাতুর্বর্ণের উপর প্রতিষ্ঠিত বেদমূলক ধর্মশাস্ত্রানুমােদিত সামাজিক ব্যবহারের অনুরাগী ছিলেন। কালভেদের সহকারে ব্যবস্থাভেদের প্রয়ােজনীয়তা তিনি উমেশচন্দ্র বটব্যাল অস্বীকার করিতেন না; এবং শত বৎসর পূর্বে আচার বিষয়ে যে সকল শাস্ত্রীয় বিধিনিষেধ বৰ্তমান ছিল, বর্তমান কালে তাহার সকলগুলির উপযােগিতা না থাকিতে পারে, ইহা স্বীকার করিতেও সম্ভবতঃ কুষ্ঠিত ইতেন না। ধৰ্ম্মশাস্ত্রনির্দিষ্ট পথই যে সমাজভুক্ত ব্যক্তির অবলম্বনীয় পথ, এই স্থূল সিদ্ধান্তের সহিত ঐরূপ পরিবর্তন-প্রিয়তার বস্তুতঃ কোন অসামঞ্জস্য নাই। ভগবান্ শাক্যমুনির সময় হইতে আজ পর্যন্ত যে সকল নূতন নূতন বেদবিরােধী সম্প্রদায় সৃষ্ট হইয়াছে, তৎপ্রতি কটাক্ষপাত করিতে বােধ করি এই জন্যই উমেশচন্দ্র দ্বিধা বােধ করেন নাই। প্রেমাবতার চৈতন্যদেবের চরিত সমালােচন কালে উমেশচন্দ্র যে ভাষার ব্যবহার করিয়াছিলেন, তাহার আমি অনুমােদন করিতে পারিব না। কিন্তু যে ভাবপ্রবণ সমাজদ্রোহ ও কৰ্ম্মদ্রোহ শাস্ত্রসম্মত নিষ্কাম কৰ্ম্মপরতা হইতে আমাদের সমাজকে ভ্রষ্ট করিবার জন্য পুনঃ পুনঃ চেষ্টা করিয়া আসিতেছে, উমেশচন্দ্র তৎপ্রতিকূলে দাঁড়াইতে সাহসী হইয়াছিলেন।
রজনীকান্ত গুপ্ত (১) বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ সপ্তম বর্ষে পদার্পণ করিয়াছে। অদ্যকার সভাস্থলে উপস্থিত সভ্যগণের মধ্যে যাহারা এই সাত বৎসরের বৃত্তান্ত অবগত আছেন, তাঁহাদের অনেকেই জানেন, আমি পরিষদের অধি- বেশনে আহুত হইয়া যদি কোনদিন একাকী সভাগৃহে প্রবেশ করিতাম, তাহা হইলে চারিদিক হইতে আমার প্রতি প্রশ্ন হইত, “রজনীবাবু কোথায়, রজনীবাবু কোথায় ?” আজিকার অধিবেশনেও আমি আহূত হইয়া একাকী এই সভাগৃহে প্রবেশ করিয়াছি; কিন্তু আজি কেহই জিজ্ঞাসা করেন নাই, রজনীবাবু কোথায় ? ছয় বৎসর পূর্বে আমি তাহার সহিত বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদে প্রথম প্রবেশ করিয়াছিলাম। তদবধি পরিষদের সম্পর্কীয় সকল কাৰ্যসম্পাদনেই আমি তাঁহার সহচর ছিলাম ; যে দিন কোন কারণে তাহার সঙ্গ না পাইয়া আমাকে একা আসিতে হইত, সে দিন কোথায় যেন কিছু ফাঁক পড়িয়াছে বলিয়া বােধ হইত। ছয় বৎসর মাত্র অতীত না হইতে বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ সহসা তাহার জন্য শােকপ্রকাশার্থ আমাকে আহ্বান করিবেন, তাহা কখনও স্বপ্নেও ভাবি নাই। Bengal Academy of Literature যখন বিজাতীয় নাম ও বিজাতীয় বেশ ত্যাগ করিয়া আমাদের বঙ্গীয়- সাহিত্য-পরিষৎ-রূপে প্রথম আবির্ভূত হয়, সেই দিন হইতেই রজনী- বাবুর সহিত পরিষদের নিতান্ত নিকট সম্বন্ধ স্থাপিত হইয়াছিল। রজনী- বাবুর সহিত পরিষদের কত নিকট সম্পর্ক ছিল, তাহা পরিষদের প্রাচীন সদস্তমাত্রই অবগত আছেন; পরিষদের অকৃত্রিম বন্ধু স্বরূপে তিনি সদস্যমণ্ডলীর শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন ; বঙ্গ-সাহিত্যের অনুরক্ত ভূস্বরূপে রজনীকান্ত গুপ্ত ৮৫ তিনি বঙ্গের সাহিত্যিক সমাজের শ্রদ্ধা পাইয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার সহিত আমার অন্যরূপ ব্যক্তিগত সম্বন্ধ ছিল ; কলিকাতার মধ্যে তাঁহার ন্যায় আত্মীয় আমার দ্বিতীয় ছিল না; এবং এই স্থানে আমি পরিষদের সদস্য ও পরিষদের প্রতিনিধি স্বরূপে দণ্ডায়মান হইলেও আমার পক্ষে সেই ব্যক্তিগত সম্পর্ক পরিহারপূর্বক কোন কথা বলা নিতান্ত কঠিন। আমার উক্তির অধিকাংশই আমার ব্যক্তিগত কথা; আশা করি, পরি- যদের সভ্যগণ তজ্জন্য অনুগ্রহপূর্বক ক্ষমা করিবেন। আমার বয়স যখন ৮৯ বৎসর, গ্রামের ছাত্রবৃত্তি পাঠশালার নিম্ন শ্রেণীতে যখন আমি অধ্যয়ন করিতাম, তখন একদিন আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা উপলক্ষে একখানি ক্ষুদ্র পুস্তিকা হইতে dictation দেওয়া হইতে ছিল। কয়েকদিন পরে দেখিলাম, সেই ক্ষুদ্র পুস্তিকাখানি আমাদের বাড়ীতে তক্তপােষের উপর পড়িয়া আছে। পুস্তিকাখানির নাম “জয়দেব চরিত”; গ্রন্থকারের নাম দেখিলাম, শ্রী রজনীকান্ত গুপ্ত। বই খানি পড়িবার চেষ্টা করিয়া ভাল বুঝিতে পারিলাম না; কিন্তু উহার বিজ্ঞাপনটা পড়িয়া মনের মধ্যে কিরূপ একটা গােলযােগ উপস্থিত হইল, তাহা আজ প্রায় ২৭২৮ বৎসর পরে মনে ঠিক আসিতেছে না। এই ঘটনার ৫/৬ বৎসর পরে যখন আমি ইংরেজি স্কুলের নিম্ন শ্রেণীতে পড়িতাম, তখন বাঙ্গলা বহি, বাঙ্গণ কাগজ পড়া আমার রােগের মধ্যে ছিল। সেই সময়কার একখানা বান্ধব পত্রিকায় একটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ পাঠ করি। সেই প্রবন্ধের শেষ ভাগে দেখিলাম যে, শ্ৰীযুক্ত রজনীকান্ত গুপ্ত,—যাহার নামের সহিত পূর্বেই আমার পরিচয় ঘটিয়াছিল, সেই রজনীকান্ত গুপ্ত—সিপাহী যুদ্ধের বৃহৎ ইতিহাস লিখিবার সঙ্কল্প করিয়াছেন। বাঙ্গলা ভাষায় একখানি সুবৃহৎ ইতিহাস গ্রন্থ রচিত হইবে, এই চিন্তায় আমার বালকহৃদয় আনন্দে উন্মত্ত হইয়াছিল। একদিন সহসা দেখিলাম, সিপাহী যুদ্ধের চরিত-কথা পাইলাম ; ইতিহাসের খণ্ডশঃ প্রকাশিত প্রথম ভাগ রজনীবাবুর অন্যতম বন্ধু বাঁকিপুরের বর্তমান গবর্ণমেন্ট উকিল শ্ৰীযুক্ত পূর্ণেন্দুনারায়ণ সিংহ কর্তৃক পিতাঠাকুর মহাশয়ের নামে প্রেরিত হইয়াছে। আগ্রহ সহকারে গ্রন্থের আদ্যোপান্ত পাঠ করিলাম'; একবার পড়িয়া তৃপ্তি হইল না, পুনঃ পুনঃ পাঠ করিলাম। গ্রন্থের ওজস্বিনী ভাষা ও বিষয় বর্ণনায় গ্রন্থকারের এরূপ অনুরাগ ও উৎসাহ কোন বাঙ্গালা গ্রন্থে ইহার পূৰ্বে দেখি নাই । সত্যের প্রতি অনুরাগ, স্বজাতির প্রতি অনুরাগ, স্বদেশের প্রতি অনুরাগ, গ্রন্থের প্রত্যেক পৃষ্ঠে ব্যক্ত দেখিয়া আমাৰ বালক- হৃদয় পুলকিত হইল । গ্রন্থপাঠ করিয়া যেন গ্রন্থকারের চরিত্র চোখের উপরে দেখিতে গ্রন্থপাঠে যে গ্রন্থকারের পরিচয় পাওয়া যায়, ইহার পূর্বে আমার ধারণা ছিল না। কতবার আমার বাল্যবন্ধুগণকে জোর করিয়া ধরিয়া রাখিয়া সিপাহীযুদ্ধের ইতিহাস পড়িয়া শুনাইতাম; আমি স্বয়ং যে আনন্দ পাইয়াছিলাম, সেই আনন্দভােগে অপরকে অধিকারী করিয়া আরও আনন্দ পাইতাম । তাহার পর তিন চারি বৎসর অতীত হইল। আমি যেবার এন্টান্স পরীক্ষা দিই, রজনীবাবু সেবার এণ্টন্সি পরীক্ষায় অন্যতম পরীক্ষক নিযুক্ত ছিলেন। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া কলিকাতায় আসিয়া আমি সিপাহীযুদ্ধের ইতিহাস দ্বিতীয় খণ্ড বাহির হইয়াছে কি না, অনুসন্ধানে বাহির হই। আর কোন বাঙ্গালা পুস্তকের আমি তাহার পূর্বে অনুসন্ধান লই নাই। সে দিনের কথা আমার আজও মনে আছে। কলেজ স্ট্রীট ৯৭নং বাড়ী দোকানের বাহিরে ফুটপাথের উপর সন্ধ্যার পর গুরুদাস বাবু মােড়র উপর বসিয়াছিলেন। নিকটে আর কেহ ছিল না। আমি আগ্রহের সহিঙ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া কোন আশাপ্রদ উত্তর পাইলাম । তথন নিতান্ত নিরুৎসাহ ও ক্ষুন্ন হইয়া বাসায় ফিরিলাম। এই ।
রজনীকান্ত গুপ্ত ৮৭ সময়ে চাপাতলা ফাষ্ট লেনের উপরে, বঙ্গবাসীর কাৰ্যালয় ছিল। রজনী বাবু তঁাহার চাপাতলার বাসা হইতে মাঝে মাঝে চাপাতলা সেকেণ্ড লেন দিয়া বঙ্গবাসী কার্যালয়ে যাইতেন। ঐ লেনে আমার বাসা হইতে আমি রজনীবাবুকে মাঝে মাঝে দেখিতে পাইতাম। বঙ্গবাসী কাগজে তাঁহার ঐতিহাসিক প্রবন্ধ যাহা কিছু বাহির হইত, যত্নের সহিত তাহা পাঠ করিতাম। এই সকল প্রবন্ধ সংগৃহীত হইয়া ‘আৰ্যকীৰ্ত্তি' প্রথম খণ্ড বাহির হইয়াছে শুনিবামাত্র একখানা কিনিয়া আনিয়া পাঠ করি। রাজপুত ও শিখ ও মারাঠার কাহিনী রজনীবাবুর স্বাভাবিক ভাষায় বর্ণিত হইয়া মনের মধ্যে নানা ভাবের উদ্দীপনা করিত। প্রেসিডেন্সি কলেজে আমার পঠদ্দশার শেষ সময়ে রজনীবাবুর সহিত আমার সাক্ষাৎ সম্বন্ধে পরিচয় ঘটে। অখিল মিস্ত্রির লেনে পরলােকগত গিরিজাপ্রসন্ন রায় চৌধুরীর বাসায় তাহার সহিত আমার প্রথম পরিচয় হয়। তাঁহার রচনা পাঠ করিয়া বাল্যাবধি আমি তাহার নামে আকৃষ্ট হইয়াছিলাম। পরিচয়ের পর তাহার চরিত্র-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইয়া আমি ততােধিক আকৃষ্ট হইয়া পড়িয়াছিলাম। সেই চরিত্রের সৌন্দর্য্যে, মাধুর্য্যে ও ঔদার্যে এই সভাস্থলের অনেকেই মুগ্ধ ছিলেন। তাহার সম্বন্ধে আমার বাগবাহুল্যের কোন প্রয়ােজন নাই। রিপন কলেজে কৰ্ম্মগ্রহণ করিয়া অবধি আমি রজনীবাবুর প্রতিবেশী ছিলাম। পরিচয় ক্রমশঃ বন্ধুতায় এবং বন্ধুতা ক্রমশঃ আত্মীয়তায় ঘনীভূত হইয়াছিল। তাহার মধুর প্রকৃতির কোন অংশ আমার অজ্ঞাত ছিল না ; তাহার সহিত অবস্থান আমার বিদেশ-প্রবাসের সর্বপ্রধান আনন্দ ছিল। প্রায় দুই বৎসর হইল, তাহার অন্তিম রােগের সঞ্চার হয়, অন্ততঃ তঁাহার মনের ভিতর ঐরূপ আশঙ্কা জন্মিয়াছিল। কিন্তু ঐ রােগের বাহ্য লক্ষণ কিছুই প্রকাশ পায় নাই; স্বাস্থ্যভঙ্গের কোন চিহ্নই লক্ষিত হয় নাই। তাঁহার আশঙ্কা সম্পূর্ণ অমূলক বলিয়াই উড়াইয়া দিতাম। তিনিও দুই এক জন নিতান্ত অন্তরঙ্গ বন্ধু ব্যতীত অন্যের নিকট তাহা প্রকাশ করেন ৮৮ চরিতকথা নাই। এমন কি তাঁহার নিজ পরিবারস্থ কোন ব্যক্তিই এই আশঙ্কার কথা জানিতেন না। কিন্তু তদবধি তিনি স্বাস্থ্যের জন্য কিছু চিন্তিত হইয়া- ছিলেন। প্রত্যহ প্রাতঃকালে বেড়াইতে আরম্ভ করিয়াছিলেন ; মাঝে মাঝে গঙ্গাস্নান করিতেন। গত শীতকালের অবসানে বাইসাইকেল অভ্যাসের চেষ্টা করিতেন। কচিৎ বা শিয়ালদহ ষ্টেসনে যাইয়া ওজন লইয়া আসিতেন। এই সময়ে রজনীবাবু তাহার জীবনের কর্তব্যসকল সম্পূর্ণ করিবার জন্য কিছু ব্যগ্র হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাঁহার গৃহের লাইব্রেরিটির পূর্ণতা সাধনের জন্য তিনি অকাতরে পুস্তকসংগ্রহে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন ; গত বৎসর পূজার পর গয়াধামে গিয়া পিতৃকৃত্য সমাধান করিয়া আসিয়াছিলেন ; তাহার জীবনের সর্ব প্রধান কাৰ্য্য সিপাহীযুদ্ধের ইতিহাসখানি শেষ করিবার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করিতেছিলেন। তিনি কথায় কথায় হাসিতে হাসিতে প্রায়ই বলিতেন, পরিবারবর্গের জন্য একটা ব্যবস্থা করিয়া শীঘ্রই কাশীবাসী হইবেন। বিগত ২রা বৈশাখ তারিখে তিনি পরিষদের অপর চারিজন সদস্যের সহিত পরিষদের গৃহ নির্মাণাৰ্থ ভূমি প্রার্থনায় কাশীমবাজারে মহারাজ মণীন্দ্রচন্দ্র বাহাদুরের সমীপে যাত্রা করেন। তৎপূর্বে তাহার হাতে সামান্য একটি ব্রণ হইয়াছিল । আমার সহিত, প্রায় প্রত্যহই তঁাহার দেখা হইত। কিন্তু সেই ব্রণের বিষয় আমিও জানিতাম না। কাশীমবাজার হইতে ফিরিয়া আসিলে আরও কয়েকটা ব্রণ হয় ; তৎপরে পৃষ্ঠে একটা ব্রণ দেখা দেয়। ২১শে বৈশাখ ও ৩১শে বৈশাখ তিনি সেই পৃষ্ঠ ব্রণের সংবাদ দিয়া আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতাদিগকে পত্র লেখেন। ৩১শে বৈশাখের পর আর তঁাহার পত্র পাই নাই। ঐ পত্রের দুই চারি ছত্র উদ্ধৃত করিতেছি,-“উহা সাধারণ ফোড়া বলিয়া বােধ হয় না; ডাক্তার বলেন, carbuncular boil; কার্বলের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়াতে আমার বড় চিন্তার কারণ রজনীকান্ত গুপ্ত ৩০ শে জ্যৈষ্ঠ হইয়াছে। ঘা ভাল হইলে একবার বাড়ী যাইব, কারণ সর্বাগ্রজ মহাশয় বাড়ীতে বড় পীড়িত অবস্থায় আছেন। ১০/১২ দিনের পর বাড়ী হইতে ফিরিব। তখন তােমাকে চিঠি লিখিব। শরীর ভাল থাকিলে তোমাদের ওখানে যাইবার বন্দোবস্ত করিব।” ইহার পর সিপাহী যুদ্ধের শেষ ভাগের শেষ ফৰ্ম্মা ছাপা খানায় দিয়া তিনি বাটী গমন করেন এবং কালের পরিণত অবস্থা লইয়া ২৫ শে জ্যৈষ্ঠ বৃহস্পতিবার কলিকাতা ফিরিয়া আসেন । তখন তাহার জীবনের আশা ছিল না। রজনী বাবু ফিরিয়া আসিয়া আমাদের বাড়ী আসিবেন, আমি ও আমার বন্ধুগণ যে সময়ে ব্যগ্র ভাবে এই প্রতীক্ষায় ছিলাম, সেই সময়ে সংবাদ আসিল, আমাদের সেই আশা আর পূর্ণ হইবার নহে। মঙ্গলবার রাত্রি দেড়টার সময় রজনী বাবু ইহজগৎ হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়াছেন। তাহার জীবনের কাৰ্য্য সম্পূর্ণ হইয়াছে, কিন্তু আমাদের আশা অপূর্ণ রহিয়া গেল । সাহিত্যসমাজে রজনী বাবুর স্থান কোথায় তাহা নির্ণয়ের এ সময় নহে। বাঙ্গালা সাহিত্যে তাহার সম্পাদিত কার্যের সমালােচনা আমার সাধ্য নহে। অন্যে সেই ভার গ্রহণ করিবেন। বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ তাহার একান্ত অনুগত সুহৃদকে হারাইয়াছে। পরিষদের জন্য তিনি যেরূপ পরিশ্রম করিয়াছেন সেরূপ বােধ হয় সে সময়ে অপর কেহ করেন নাই। তিনি যে কাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ করিতেন, শ্রদ্ধার সহিত ও অনুরাগের সহিত তাহাতে প্রবৃত্ত হইতেন। সেই আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অকৃত্ৰিম অনুরাগ পৃথিবীতে অতি বিরল সামগ্রী। পরিষদের সদস্যগণের মধ্যে অনেকেই সেই শ্রদ্ধার ও অনুরাগের পরিচয় পাইয়াছেন। আমি অনর্থক বাগবাহুল্য দ্বারা পরিচয় দিবার চেষ্টা করিব না ।
৯০ চরিত-কথা ৪ ১২৫৬ সালে ভাদ্রমাসে মাণিকগঞ্জ মহকুমার অধীন মতুগ্রামে মাতু লালয়ে রজনীকান্তের জন্ম হয়। তাঁহার পিতা কমলাকান্ত দাসগুপ্ত তেওতা গ্রামে বাস করিতেন। তাঁহার পাঁচ পুত্রের মধ্যে রজনীকান্ত সর্বকনিষ্ঠ। রজনীকান্তের তিন ভ্রাতা অধ্যাপি বর্তমান আছেন ; তন্মধ্যে শ্রীযুক্ত উমাকান্ত দাস মহাশয় ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেটের কাৰ্য্য সুখ্যাতির সাহত সম্পাদন করিয়া সম্প্রতি পেশন ভােগ করিতেছেন। সাত আট বৎসর বয়সে রজনীকান্তের কঠিন পীড়া হয় ও তাহার ফলে তাঁহার শ্রবণশক্তি চির দিনের জন্য দুৰ্বল হইয়া যায়। এই দৌর্বল্যের জন্য তাহার বিদ্যালয়ে অধিকদূর পর্যন্ত অধ্যয়ন ও উপাধিলাভাদি ঘটিয়া উঠে নাই। বাল্যকালে তিনি কলিকাতায় আসিয়া সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হয়েন। কিছু সংস্কৃত শিক্ষার পর আয়ুর্বেদ অধ্যয়ন করিয়া ব্যবসায় চালাইবেন এইরূপ উদ্দেশ্য ছিল। সংস্কৃত কলেজে তিনি এন্টাল ক্লাস পর্যন্ত অধ্যয়ন করিয়াছিলেন মাত্র। বিদ্যালয়-ত্যাগের পরবর্তী কালে তিনি কিছু দিন পরলােকগত কবিরাজ ব্রজেন্দ্রনাথ কণ্ঠাভরণের নিকট আয়ুর্বেদ শিক্ষার্থ যাতাযাত করিয়াছিলেন। তাঁহার ভ্রাতা গবর্ণমেন্টের অধীন চাকরি গ্রহণের জন্য তাহাকে অনুরােধ করিয়াছিলেন। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবসায় বা চাকরি কিছুই তাহার অভিপ্রায়ানুযায়ী না হওয়ায় তিনি ঐ পথে যান নাই। এই সময় হইতেই তাহার বাঙ্গলা রচনার প্রতি অত্যন্ত ঝোঁক ছিল ও বাঙ্গলা সাহিতের আলােচনা দ্বারা যশােলাভের বাঞ্ছা ছিল। তাঁহার রচিত প্রথম পুস্তক জয়দেবচরিত বাঙ্গালা ১২৮০ সালে প্রকাশিত হয়। কিছু দিন পূর্কে ঐ পুস্তক লিখিয়া তিনি রাজা সার শৌরীন্দ্রমােহন ঠাকুরের প্রদত্ত পুরস্কার পাইয়াছিলেন। তৎপরে ১২৮২ সালে প্রধানতঃ রজনীকান্ত গুপ্ত গােল্ডষ্ট কারের পাণিনি অবলম্বন করিয়া ‘পাণিনি' পুস্তক প্রকাশ করেন। সাহিত্যচর্চায় জীবন অতিবাহিত করিবেন, রজনীকান্তের এইরূপ সঙ্কল্প ছিল। কিন্তু বঙ্গদেশে সাহিত্যচর্চায় জীবিকা চলিতে পারে কি তাহা তখনও প্রমাণসাপেক্ষ ছিল। সে সময়ে রজনীকান্তের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না ; কলিকাতার খরচ অতি কষ্টে চালাইতেন। তাঁহার সমকালে যাঁহারা তাঁহার সহিত হিন্দু-হােষ্টেলে বাস করিতেন, তাহাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি গ্রহণ করিয়া পরবর্তী কালে সমাজে মান্যগণ্য হইয়াছেন। রজনীকান্তের কোন উপাধি লাভ ঘটিয়া উঠে নাই। শ্রবণশক্তির দৌর্বল্য তাহার জীবিকার্জন বিষয়ে দারুণ অন্তরায় হইয়াছিল। এরূপ অবস্থায় ও এরূপ সময়ে সাহিত্যচর্চা দ্বারা জীবন অতিবাহনের সংকল্প অসাধারণ সাহসের বা দুঃসাহসের পরিচায়ক। (রজনীকান্ত সেই সাহস বা দুঃসাহস লইয়া সাহিত্যচর্চা জীবনের ব্রতস্বরূপ অবলম্বন করিলেন। সাহিত্যের প্রতি আন্তরিক অনুরাগ না থাকিলে এরূপ ঘটিতে পারে না) মৌখিক অনুরাগ এইরূপ দুঃসাহস জন্মাইতে পারে না। বর্তমান যুগে আমাদের মধ্যে এইরূপ উদাহরণ বিরল। এই সময়ে তিনি স্বর্গীয় ভূদেব মুখােপাধ্যায়, ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রভৃতির নিকট পরিচিত হন। ভূদেব বাবুর অনুরােধে, তিনি সামান্য পারিশ্রমিক লইয়া এডুকেশন গেজেটে প্রবন্ধ লিখিতে আরম্ভ করেন। রজনীকান্তের এই সময়ে প্রায় নিঃস্ব অবস্থা। তথাপি তাহার প্রবল সাহিত্যানুরাগ দমিত হয় নাই। এই অবস্থাতেও তিনি পাঠের জন্য ঐতিহাসিক গ্রন্থ প্রচুর পরিমাণে ক্রয়, করিতেন। এই অবস্থাতেই তিনি সিপাহীযুদ্ধের ইতিহাস লিখিবার সঙ্কল্প করেন। ১২৮৮ সালে বঙ্গবাসী সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠা হইলে ঐ সংবাদপত্রের নিয়মিত লেখকশ্রেণীর মধ্যে রজনীকান্তের নাম বাহির ঐবৎসর ৯২ চরিত-কথা রেবরেও পরলােকগত কৃষ্ণমােহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের যত্নে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক এন্ট্রান্স পরীক্ষার অন্যতম পরীক্ষক নিযুক্ত হয়েন ও তৎপর বৎসর তাঁহার সঙ্কলিত সংস্কৃতগ্ৰন্থ এন্টাল পাঠ্যপুস্তকরূপে নির্ধারিত হয়। এই ঘটনার পর হইতে আর তাহাকে জীবিকার জন্য ক্লেশ পাইতে হয় নাই। বঙ্গবাসীতে প্রকাশিত ঐতিহাসিক প্রবন্ধ গুলি নিবদ্ধ হইয়া আৰ্য্য- কীৰ্ত্তি প্রকাশিত হয়। উহাই তঁাহার বালকপাঠ্য প্রথম রচনা। তৎপরে তিনি বিদ্যালয়ে ব্যবহারের জন্য অনেকগুলি পুস্তক রচনা করিয়াছিলেন। তন্মধ্যে অনেকগুলি গ্রন্থ টেকৃষ্টবুক কমিটির অনুমােদিত হইয়াছিল কোন কোন খানি ছাত্রবৃত্তি প্রভৃতি পরীক্ষায় পাঠারূপেও নির্দিষ্ট হইত। এইরূপে স্কুলপাঠ্য পুস্তক প্রচারে তাহার যে আয় দাঁড়াইয়াছিল, তাহার সাহায্য শেষ পর্যন্ত তাহাকে আর সংসার চালাইবার জন্য কষ্ট করিতে হয় নাই। তাহার অমায়িক ভদ্র স্বভাবে ও উদার সরল ব্যবহারে তাঁহার বন্ধুগণ মুগ্ধ ছিলেন। এমন শান্ত স্বভাবের ও সরল ব্যবহারের দৃষ্টান্ত নিতান্ত বিরল। যিনি একবার অল্পসময়ের জন্য তার স্পর্শে আসিতেন, তিনি তাঁহার অত্রিম সারল্যে মুগ্ধ হইয়া যাইতেন। তাহার অকালমৃত্যুতে তাহার বন্ধুগণ আত্মীয়বিয়ােগের ব্যথা পাইয়াছেন। তাহার চিত্ত সর্বদা প্রফুল্ল থাকিত; যেখানে তিনি উপস্থিত থাকিতেন, সে স্থানকে আনন্দময় করিয়া তুলিতেন। তিনি প্রায় সকল সময় সাহিত্যের আলােচনায় ও সদা- লাপে অতিবাহিত করিতেন। বঙ্গসাহিত্যে রজনীকান্তের অভাব তদপেক্ষা ক্ষমতাশালী পণ্ডিত জনকর্তৃক পূর্ণ হইবে; কিন্তু সেই অকপট, শ্রদ্ধাশীল, অমায়িক, অনুরক্ত, সদানন্দ বন্ধুর অকাল মরণে তাহার বন্ধুসমাজ যে অভাব বােধ করিবেন, তাহা আর পূর্ণ হইবার নহে। বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ স্থাপিত হওয়া অবধি রজনীকান্ত গুপ্ত উহার অনুগত সেবক ছিলেন। শ্রীযুক্ত রাজা বিনয়কৃষ্ণ দেবের আশ্রয়ে যখন পঅতিবাহিত রজনীকান্ত গুপ্ত Bengal Academy of Literature বিজাতীয় বেশ ত্যাগ করিয়া বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদে রূপান্তরিত হয়, রজনীবাবু তদবধি উহার সেবায় হইয়াছিলেন। সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকার তিনিই প্রথম সম্পাদক। প্রথম দুই বৎসর তিনি দক্ষতার সহিত পত্রিকা সম্পাদন করিয়াছিলেন। পত্রিকার জন্য প্রবন্ধ রচনা ও প্রবন্ধসংগ্রহ হইতে মুদ্রণ কার্যের তত্ত্বাবধান ও প্রাফ দেখা পৰ্যন্ত সমস্ত কাৰ্য্যই তাহাকে একাকী সম্পন্ন করিতে হইত। এইজন্য তাহাকে প্রভূত পরিশ্রম করিতে হইত। পরিষদের প্রতিষ্ঠার ও উন্নতির জন্যও তিনি প্রচুর পরিশ্রম করিয়াছিলেন। রাজা বিনয়কৃষ্ণ বাহাদুর ও তদানীন্তন সভাপতি শ্ৰীযুক্ত রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয় রজনীবাবুর পরামর্শ না লইয়া পরিষদের জন্য কোন কাজই করিতেন না। পরিষদের কার্যপ্রণালীর আলােচনায় তিনি প্রচুর সময়ক্ষেপ করিতেন। পরিষদের উদ্দেশ্য কিরূপ হওয়া উচিত, পরিষৎ-পত্রিকার আলােচনার বিষয় কিরূপ হওয়া উচিত, এই সকল বিষয় লইয়া তিনি সর্বদাই আলােচনা করিতেন। সাহিত্যপরিষৎ যে যে প্রধান কার্য্যে এপৰ্য্যন্ত হস্তক্ষেপ করিয়াছেন, রজনীকান্ত সেই সকল কাৰ্য্যেই প্রধান উদযােগী ছিলেন। তাঁহারই প্রস্তাবে পরিষদের পরিভাষাসমিতি ও ব্যাকরণসমিতি প্রতিষ্ঠিত তিনিই উৎকৃষ্ট গ্রন্থ প্রকাশ দ্বারা বঙ্গসাহিত্যকে পরিপূর্ণ করিবার উদ্দেশ্যে পরিষদে গ্রন্থরচনাসমিতি স্থাপনার প্রস্তাব করেন। তাঁহারই প্রস্তাবে সাহিত্যপরিষৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙ্গলাভাষার ও বাঙ্গালা- সাহিত্যের আলােচনা প্রবেশ করাইবার জন্য চেষ্টা করেন। পরিষদের প্রস্তাব তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সর্বাংশে গৃহীত হয় নাই; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাষ্ট আর্টস ও বি, এ, পরীক্ষায় বাঙ্গালা রচনার পরীক্ষা প্রচলিত হইয়াছিল। ইহার পর হইতেই রজনীকাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বাঙ্গালারচনা বিষয়ে অন্যতম পরীক্ষক নিযুক্ত হইয়া আসিতে- ০ ১৪ চরিত-কথা ছিলেন। কবিবর হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে অর্থ সাহায্য করিবার জন্য পরিষৎ-কর্তৃক ও পরিষদের বাহিরে যে চেষ্টা হয়, রজনীবাবু তাহাতে আন্তরিক উৎসাহের সহিত যোগ দিয়াছিলেন। এই চেষ্টার আংশিক সফলতা তাহার নিরতিশয় আনন্দের কারণ হইয়াছিল 1, রজনীকান্ত কোনরূপ সঙ্কীর্ণভাব বা গোঁড়ামির প্রশ্রয় দিতেন না। তিনি ভিন্নমতাবলম্বীদিগকেও শ্রদ্ধা করিতে পারিতেন। রাজনীতি বিষয়ে তিনি উদারমতাবলম্বী ছিলেন। কটন সাহেবের নিউইণ্ডিয়া প্রচারিত হইবামাত্র তিনি ঐ গ্রন্থের অনুবাদ বঙ্গসমাজে প্রচার করেন। বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাসে রজনীকান্তের স্থান কোথায়, তাহ নির্ণয়ের এ সময় নহে। স্বাধীনভাবে ভারতবর্ষের আধুনিক ইতিহাস আলােচনায় তিনিই পথপ্রদর্শক। তৎপূৰ্বে ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ডাক্তার কৃষ্ণমােহন বন্দ্যোপাধ্যায়, বাবু রামদাস সেন প্রভৃতি ভারতবর্ষের পুরাতত্বের স্বাধীন আলােচনা আরম্ভ করিয়াছিলেন। রজনীকান্তের প্রথম গ্রন্থ জয়দেবরচিত ও পাণিনি দেখিলে মনে হয়, তাহারও বােধ করি সেই পুরাতত্ত্ব আলােচনার দিকেই প্রথমতঃ প্রবৃত্তি ছিল। কিন্তু শীঘ্রই তিনি উহ ত্যাগ করিয়া ভারতবর্ষের আধুনিক ইতিহাসের আলােচনায় প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। - বাঙ্গালা সাহিত্যের জন্য রজনীকান্ত যে কাৰ্য্য করিয়াছেন, তাহার মূলে একটা কথা পাওয়া যায় ;-স্বজাতির প্রতি তাহার আন্তরিক অনুরাগ। এই অনুরাগই প্রথমতঃ তাহাকে পুরাতত্ত্ব আলােচনায় প্রবৃত্ত করিয়াছিল ; এই অনুরাগই তাহাকে পরে ভারতবর্ষের আধুনিক ইতিহাসের স্বাধীন সমালােচনায় প্রবৃত্ত করে। বাঙ্গাণীর পক্ষে স্বাধীন ভাবে ইতিহাস আলােচনার পথ নিতান্ত সরল নহে। প্রথমতঃ ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহের জন্য বৈদেশিক লেখকের আশ্রয় গ্রহণ করিতে হয়। আপন দেশের ঐতিহাসিক ঘটনা- ৫ রজনীকান্ত গুপ্ত বলী লিপিবদ্ধ করিয়া রাখা বা স্মরণে রাখা আমাদের স্বভাব নহে। সিপাহীযুদ্ধের মত নিতান্ত আধুনিক ঘটনা সম্বন্ধেও এদেশের লােক কোন কথা লিপিবদ্ধ করিয়া রাখা কর্তব্য বােধ করে নাই। তৎকালবৰ্ত্তী প্রাচীন লােক যাহারা বর্তমান আছেন, তাঁহাদেরও স্মৃতিশক্তির উপর কোন ঐতিহাসিক সম্পূর্ণ নির্ভর করিতে পারেন না। ইংরাজিতে এই একটা ঘটনা লইয়া এত গ্রন্থ রচিত হইয়াছে, যে তাহাতে একটা লাইব্রেরী হয়। রজনীকান্ত তাহার উৎকৃষ্ট লাইব্রেরিতে বৈদেশিকের লিখিত এই সমস্ত গ্রন্থই প্রায় সংগ্রহ করিয়াছিলেন; কিন্তু স্বদেশীয়ের নিকট তিনি কোন সাহায্যই পান নাই। রজনীকান্ত যাঁহাদের রচিত ইতি- হাসের সমালােচনায় প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, তাহাদের কথার উপরেই তাহাকে নির্ভর করিতে হইয়াছিল। রজনীকান্তের প্রদর্শিত পথে আজ কাল অনেকেই চলিতে আরম্ভ করিয়াছেন; কতিপয় কৃতবিদ্য লােকে স্বদেশের ইতিহাসের স্বাধীন সমালােচনা আরম্ভ করিয়াছেন। রজনীকান্তের অনুবর্তীর আজ কাল অভাব নাই; কিন্তু ঐতিহাসিক প্রবন্ধে তিনি যে ওজস্বিনী ভাষার অবতারণা করিয়াছিলেন, তেমন ভাষায় কথা কহিতে সকলে সমর্থ হন নাই। তাঁহার ভাষা তঁাহার রচিত গ্রন্থ গুলির প্রতিপত্তির অন্যতম কারণ। উপরে যে আন্তরিকতা ও সহৃদয়তাকে তাঁহার বিশিষ্ট গুণ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছি, সেই আন্তরিকতা ও সহৃদয়তা হইতে এই ভাষা উৎপন্ন। তাহার মনের আবেগ, বর্ণিত বিষয়ের প্রতি তাহার শ্রদ্ধা ও অনুরাগ, সেই ভাষায় স্বভাবতঃ প্রকাশ পাইত ; তাহার মর্ম হইতে সেই ভাষা বহির্গত হইয়া পাঠকের মৰ্ম্মে গিয়া প্রতিহত হইত। ভাষার বিশুদ্ধির দিকে তাঁহার তীক্ষ দৃষ্টি ছিল। বাঙ্গালা রচনায় সংস্কৃত ব্যাকরণের কঠোর নিয়ম পালন করা উচিত কি না, এ বিষয়ে তাহার মত সম্পূর্ণ উদার ও অসংকীর্ণ ছিল ; ০ চরিতকথা তিনি সংস্কৃত ব্যাকরণের সর্বতােভাবে অনুসরণের পক্ষপাতী ছিলেন না; অথচ তিনি স্বয়ং যেরূপ মার্জিত ও বিশুদ্ধ ভাষার ব্যবহার করিতেন, তাহা বাঙ্গালা লেখকগণের মধ্যে দুই এক জন ব্যতীত আর কেহ করি- য়াছেন কি না জানিনা। কিন্তু বিশুদ্ধিরক্ষার জন্য এই প্রয়াস তাহার রচনাকে কখনও কৃত্রিমতাদুষ্ট করে নাই। তাহার আন্তরিকতা ও সহৃদয়তা তাহাকে এই দোষ হইতে রক্ষা করিয়াছিল। ভাষাকে তিনি কেবল ভাব প্রকাশের উপায়স্বরূপ মনে করিতেন না। এই কারণে তাহার রচিত ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও ঐতিহাসিক প্রবন্ধগুলি সাহিত্যের শরীর পােষণ করিবে; সাহিত্য মধ্যে তাহারা আসন লাভ করিবে। সে স্থান কত উচ্চে তাহার নির্ণয়ের কাল এখনও উপস্থিত হয় নাই। বঙ্গসাহিত্যের বর্তমান দরিদ্র অবস্থায় বাঙ্গালায় লিখিত অন্য কোন ঐতিহাসিক গ্রন্থের বা ঐতিহাসিক প্রবন্ধের সম্বন্ধে এতটুকু বলা যাইতে পারে কি না সন্দেহ স্থল। বঙ্গসাহিত্যের সেবা রজনীকান্তের জীবনের মুখ্যতম ব্ৰত ছিল ; তিনি আপন ক্ষমতানুসারে সেই ব্রত যথাসাধ্য পালন করিয়াছেন, এবং সেই ব্রতের পালনেই আপনার সমগ্র শক্তি অর্পণ করিয়া গিয়াছেন। জীবনে তিনি আর কোন কাজই করেন নাই। তাহার অপেক্ষা প্রতিভা- শালী লেখক বঙ্গদেশে অনেক জন্মিয়াছেন; বঙ্গসাহিত্যে তাহাদের স্থান অনেক উচ্চে অবস্থিত ; তাহাদের কার্যের সহিত তৎকৃত কার্যের তুলনার কোন প্রয়ােজন নাই। কিন্তু একমাত্র বঙ্গসাহিত্যের, অতএব বঙ্গমাতার, সেবাব্রতে সমগ্র জীবন উদযাপনের উদাহরণ অধিক আছে কি না জানি না। এই অনুরক্ত সন্তানের অকাল মরণে দরিদ্রা বঙ্গমাতা সন্তাপিত হইবেন সংশয় নাই।
বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর বালক বলেন্দ্রনাথ যখন ‘বালক’ ও ‘ভারতী ও বালক’ অবলম্বন করিয়া বাঙ্গালার সাহিত্য-ক্ষেত্রে অবতরণ করেন, তখন তাঁহার সহিত বা তঁাহার রচনার সহিত আমার পরিচয় ছিল না। সাধনা বাহির হইলে তাহার রচনা আমাকে আকৃষ্ট করে ; তার পর হইতে তিনি যখন যাহা লিখিয়াছেন, প্রচুর আনন্দ প্রাপ্তির আশা লইয়া তাহাই আগ্রহের সহিত পাঠ করিয়াছি, এবং কোনবারেই যে সেই আনন্দলাভে বঞ্চিত হইয়াছি, তাহা মনে হয় না। সেই আনন্দের উৎস এত শীঘ্র অন্তর্হিত হইবে এবং বলেন্দ্রনাথের রচনাসংগ্রহকে পাঠকসমাজে উপস্থিত করিবার ভার আমাকেই গ্রহণ করিতে হইবে, তাহা কখনও ভাবি নাই । এই কাৰ্য্যে কিন্তু আমার অধিকারও নাই, যােগ্যতাও নাই, তৎসত্ত্বেও যখন তাহার স্বজনগণ আমাকে এই ভার দিলেন, তখন অধিক বাক্যব্যয় করিয়াই ভার লইলাম। কেন লইলাম ঠিক বলা কঠিন। বােধ করি বলেন্দ্রনাথের রচনার প্রতি আমার অনুরাগপ্রকাশের এই অবসর আমি ত্যাগ করিতে চাহি নাই। বলেন্দ্রনাথের রচনাভঙ্গীই আমাকে এ বিষয়ে আকর্ষণ করিয়াছিল এমন সঙ্গে গাঁথা শব্দের মালা তার পূর্বে আমি দেখি নাই। শুনিয়াছি বলেরে ভাষা তাহার সাধনার ফল। শিক্ষানবিশি অবস্থায় কাটিয়া ছাটিয়া পালিশ করিয়া তিনি ভাবের উপযাের্থী ভাষা গড়িয়া লইয়াছিলেন। তিনি অলঙ্কারের বােঝা চাপাইয়া ভাষাকে অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতা দিবার চেষ্টা করিতেন না; কিন্তু শব্দগুলিকে বিশেষ বিবেচনার সহিত বাছিয়া লইয়া কোথায় কোটি বসিলে ভাল মানাইবে, তাহা স্থির করিয়া ও ৭ ১৮ চরিত-কথা গাঁথনির দৃঢ়তার দিকে নজর রাখিয়া তিনি যত্নের সহিত শব্দের মালা গাঁথিতেন। কাজেই তঁাহার ভাষা কারিকরের হাতের অপূর্ব কারুকার্য : হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। তিনি ঐশ্বর্যের দীপ্তি অপেক্ষা সৌষ্ঠবের শ্রছাঁদ দিবার চেষ্টা করিতেন; তাহার জন্য যে সুরুচির, যে সামঞ্জসাবুদ্ধির, যে সংযমের প্রয়ােজন ছিল, তাহা প্রচুর পরিমাণে আয়ত্ত করিয়াছিলেন। আধুনিক বাঙ্গালা সাহিত্যে ভাষার প্রতি এইরূপ যত্ন অতি দুর্লভ। অধিকাংশ লেখক ভাষাকে কেবল ভাব প্রকাশের যন্ত্রমাত্র দেখেন, উহাকে কারুশিল্পের হিসাবে দেখেন না। কবিতারচনায় ছন্দের আবশ্যকতা আছে ; বলেজের গদ্যরচনাতেও সেই ছন্দের ঝঙ্কার শুনিতে পাওয়া যায়; এই ছন্দ ভাবের সহিত মিলিয়া মিশিয়া অপরূপ কলাকৌশলের উৎপত্তি করিয়াছে। বলেজ্জের ভাষায় যে স্নিগ্ধ-কোমল-প্রশান্ত উজ্জ্বলতা আছে, তাহা চোখ ঝলসাইয়া দেয় না, কেবলই তৃপ্তি উৎপাদন করে। সেই তৃপ্তি কিন্তু কখনও মাত্রা ছাড়াইয়া পরিতৃপ্তিতে দাড়ায় না। স্রোতস্বতীর মত ইহা স্থির গতিতে আপন নির্দিষ্ট পথে চলে ; ইহার পূর্ণতা কখনও উচ্ছাসে পরিণত হইয়া কূল ভাসাইয়া জলপ্লাবন ঘটায় না। ইহার মধ্যে কোথাও ফেনিল আবৰ্ত্ত নাই ; কোথাও ইহা জলপ্রপাতের কোলাহল উপস্থিত করে নাই। বঙ্কিমচন্দ্র বা রবীন্দ্রনাথের ভাষা তাহাদের বশংবদ ভৃত্য ; তাহারা উহাক যখন যে কাজে বিনিয়োগ করিয়াছেন, তাঁহাদের আদেশে বা ইঙ্গিতমাত্রে ভাষা তদনুযায়ী পরিচ্ছদ বা অস্ত্রশস্ত্র বা ঐশ্বৰ্য্য লইয়া তখনই সেই কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইয়াছে। তাঁহাদের ভাষায় যে বল আছে, যে বেগ আছে, যে তীব্রতা আছে, যে বৈচিত্র্য ও বিভিন্ন-মুখতা আছে, এবং প্রয়ােজনমত ঐশ্বৰ্য্য আছে, বলেরে ভাষায় সে সকল না থাকিতে পারে, কিন্তু ইহার স্থিরতা ও দৃঢ়তা ও স্বচ্ছ-প্রাঞ্জলতা ও সরস-কোমলতা তাঁহার রচনাধে কাব্যর সীমামধ্যে রাখিয়া দিয়াছে। লেখকের ভাবুকতা ও লিপিকৌশল উভয়ের মূলস্থ শক্তি সামঞ্জস্য- বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর বােধ ও সংষম। এই দুইটি না থাকিলে সুরুচি থাকে না। বলেরে আলােচ্য বিষয় অনেক ছিল ; কাব্য ও কলাবিদ্যা, মানবসমাজ মানবজীবন, এইরূপ নানাবিধ বিষয়ের তিনি আলােচনা করিয়াছেন। এই বিচিত্র বিষয়ের মধ্যে কোথায় কি দেখিবার, বুঝিবার, আস্বাদনের ও উপভােগের আছে, তাহা তাহাকে দেখিতে হইয়াছে ও দেখাইতে হইয়াছে। তিনি অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া বিশ্লেষণ করিয়া- ছেন ও বাহিরে দাড়াইয়া সমস্তটা দেখিয়াছেন;-ফুলের ভিতর হইতে মধু আহরণ করিতে গিয়া বাহির হইতে ফুলের শােটা দেখিয়া লইতে ভুলেন নাই ; কোন একটা অবয়বের অস্বাভাবিক স্ফীতি বা হীনতা বা অথ। সন্নিবেশ যেখানে তাহার সামঞ্জস্য-বুদ্ধিকে আহত করিয়াছে, সেখানে মৃদু হাস্য ও শ্লেষের দ্বারা সেই ত্রুটি দেখাইতে পরাজুখ হন নাই। তৎকর্তৃক প্রাচীন বাঙ্গালা সাহিত্যের সমালােচনায় ইহার ভূরি প্রমাণ আছে। কিন্তু কেবল বিশ্লেষণের দ্বারা দোষ দর্শন ও হীনতার আবিষ্কার তাহার উদ্দেশ্য ছিল না; সৌন্দর্য্যের আবিষ্কারই তাহার প্রধান কাৰ্য্য ছিল। যে সৌন্দৰ্য অন্যের চোখে প্রকাশ পাইত না, তিনি তাহা বাহির করিয়া আনিয়া দেখাইয়া দিতেন। তাঁহার গ্রন্থাবলীর অধিকাংশ প্রসঙ্গ হইতে ইহাই প্রতিপন্ন হইবে। বৈজ্ঞানিকের সহিত সাহিত্যিকের একটি স্থানে মিল আছে। ইতর সাধারণ সকলেই সম্মুখে যাহা পড়ে, তাহাই কুড়াইয়া লইয়া সেই কয়টা জিনিষকে জীবনের কাজে লাগাইয়া যেন তেন প্রকারেণ তাড়াতাড়ি জীবনযাত্রায় দৌড়িয়া চলিতেছে; আশে পাশে যাহা আছে, তাহার প্রতি মনঃসংযােগের অবকাশ পাইতেছে না। কিন্তু কয়েকজন লােক এই আশে পাশে চাহিয়া অন্যে যাহা দেখে না, তাহাই দেখেন এবং ইতর সাধারণকে যখন দেখান, তখন তাহারা নূতন কি দেখিলাম’ বলিয়া চমকিয়া উঠে। বৈজ্ঞানিক বলেন, 'দেখ, এত বাস্তবিক ট চরিত-কথা সত্যটা তুমি এতদিন দেখ নাই ; ইহা হইতে জীবনের কত প্রয়ােজন- সিদ্ধি, জীবনযুদ্ধে কত সাহায্য ঘটিতে পারে। সাহিত্যিক বলেন, দেখ, এত সুন্দর দৃশ্যের প্রতি, তুমি এতকাল তাকাও নাই ; ইহা হইতে কত আনন্দ মিলিতে পারে, জীবনযুদ্ধের আনুষঙ্গিক দুঃখ কত কমইতে পারা যায়। একজন যেখানে সত্যের, অন্যজন সেখানে সুন্দরের আবিষ্কার করেন। বিজ্ঞানের ও সাহিত্যের দৃষ্টি একই দিকে ; আবার উভয়েই যখন সেই সত্যকে ও সুন্দরকে শিবরূপে প্রতিপন্ন করেন, তখন বিজ্ঞান ও সাহিত্য উভয়েই তত্ত্ববিদ্যার পরম প্রকোষ্ঠে উপনীত হয় । এই আবিষ্কারের জন্য যে যােগ চাই, তাহা সকলের নাই ; কিন্তু একদেশদর্শিতা, দৃষ্টিবিভ্রম ও দৃষ্টিবিকার এখানেও সাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিক উভয়ের কর্ত্তব্যসাধনের প্রধান অন্তরায়। এই অন্তরায় দূর করিতে সাধনা আবশ্যক ও সংযম আবশ্যক ; নহিলে উভয়েরই কর্মে প্রমাদ ঘটে। সমালােচকের পথ যে বৈজ্ঞানিকের পথ হইতে বহুদূরে বা ভিন্ন মুখে, তাহা মনে করিবার কারণ নাই। বলেন্দ্রনাথের এই সংযম যে প্রচুর পরিমাণে ছিল, তাহা তাঁহার ভাষাতেও যেমন বুঝা যায়, তঁাহার ভাবগ্রাহিতাতেও তেমনই বুঝা যায়। তিনি ভাবের রাজ্যে বিচরণ করিতেন ও ভাবের বায়ুভরে উড়িয়া বেড়াই- তেন; অথচ আপনাকে একান্ত পরবশ করিয়া, মেরুদণ্ডহীনের মত ভাবের স্রোতে আপনাকে ভাসাইয়া দিয়া, আপনাকে শশাচনীয় ও কৃপাপাত্র করিয়া তুলেন নাই। এ বিষয়ে তিনি আধুনিক বাঙ্গালায় বহু সাহিত্যসেবীর ও বহুতর সাহিত্য-জীবীর অনুকরণীয় আদর্শস্থল বা শিক্ষাস্থল। বাঙ্গালা দেশের আধুনিক সাহিত্যের দুষিত হওয়ায় থাকিয়াও তিনি অস্বাভাবিক ভাবপ্রবণতার সংক্রামক ব্যাধি হইতে আপনাকে মুক্ত রাখিয়াছিলেন ; ইহাতে তাহার সংযম ও নিষ্ঠা হইতে উৎপন্ন স্বাস্থ্যের ও বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর বলবত্তার প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। আপনার উপর তাহার প্রভুত্ব ছিল ; ভাবের বিকারে তিনি আত্মহারা হইয়া যান নাই। বয়সের সহিত তাহার রচনা যেমন গাঢ়তা পাইতেছিল, তেমনি তার অন্তদৃষ্টির ক্ষমতা বিকাশ পাইতেছিল। বয়সে বালকত্ব অতিক্রম করিবার পূৰ্বেই তিনি প্রৌঢ়ের দুর্লভ অন্তদৃষ্টি লাভ করিয়াছিলেন, তাহার শেষদিকের রচনা হইতে তাহার পরিচয় পাওয়া যায়। বালকের চাঞ্চল্য বালকের রচনাতেও অধিক ছিল না; কিন্তু বিদেশী শিক্ষার মােহ হইতেও এই অল্পশিক্ষিত বালক অনেক অতিশিক্ষিত বুদ্ধ অপেক্ষা মুক্ত ছিলেন। ‘সাধনা পত্রে প্রকাশিত বারাণসী’, ‘কণারক’, ‘খণ্ডগিরি’ ও ‘প্রাচীন উড়িষ্যা প্রভৃতি প্রবন্ধে স্বদেশী সৈৗন্দর্যে অনুরাগ ও প্রীতি আমাকে বলেন্দ্রনাথের যে পরিণতি দেখিবার জন্য প্রস্তুত করিয়াছিল, অনতি- বিলম্বে প্রকাশিত প্রাচ্য প্রসাধন-কলা’ ও ‘নিমন্ত্রণ সভা সেই পরিণতির দ্রুতত্বে যে আমাকে চমকাইয়া দেয় নাই, তাহা বলিতে পারি না। এই শেষােক্ত প্রবন্ধটির মধ্যে আমাদের বাঙ্গালী হিন্দু গৃহস্থের অন্তঃপুরের 'শ্রীহস্ত’ ও ‘শুভদৃষ্টি', গৃহিণীৰ ‘লক্ষ্মীশ্ৰী’ ও ‘কল্যাণীমূর্তি’, আমাদের সামাজিক অনুষ্ঠানের মূলে ‘শুভ সঙ্কল্প' প্রভৃতি কয়েকটি নুতন কথা পাইলাম, যাহা ইতঃপূৰ্বে আর কোন শিক্ষিত স্বদেশীর মুখে এমন ভাবে শুনি নাই। জোড়াসাঁকোর যে বৃহৎ অট্টালিকার দিকে নব্যতন্ত্রের বাঙ্গালী সমাজ এতুদিন ধরিয়া সমমােচিত নূতন ভাবের ও নূতন তন্ত্রের, এমন কি নূতন ফ্যাশনের জন্য উন্মুখ হইয়া চাহিয়াছিল,মনের কথা গােপন নাই বা করিলাম—সেখান হইতে যে এমন কথাগুলি বাহির হইবে, তাহার জন্য ঠিক প্রস্তুত ছিলাম না। বৃদ্ধ ভূদেব মুখােপাধ্যায়ের গুরুগম্ভীর উপদেশে নব্যবঙ্গ কর্ণপাত করা উচিত মনে করে নাই ; মনীষী রবীন্দ্রনাথ যে মঙ্গলশঙ্খমুহুর্মুহঃ ধ্বনিত করিয়া পথভ্রান্ত সকলকে আপন ঘরের লক্ষ্মী- মন্দিরের কল্যাণপীঠের অভিমুখে প্রত্যাবর্তনের জন্য আহ্বান করিতেছেন, ১০২ চরিত কথা অধিক দিনের কথা নহে, সে শঙ্খঘােষও তখন শুনা যায় নাই। কাজেই বাঙ্গালীর অন্তঃপুরে, বাঙ্গালীর গৃহস্থালীতে, সামাজিক প্রথায় ও দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্মে যাহা সত্য আছে, যাহা সুন্দর আছে, যাহা শিব আছে, তাহা সহসা সম্মুখে আনিয়া বলেন্দ্রনাথ অন্ধকে দৃষ্টিদানের ব্যবস্থা করিয় গিয়াছেন। বলেরে সাহিত্যিক জীবনে যে বিশিষ্টতা ছিল, সেই বিশিষ্টতার গঠন- কৰ্ম্মে, তাঁহার পিতৃব্যের কতটুকু কৃতিত্ব ছিল, আমরা বাহির হইতে ঠিক তাহা বলিতে পারি না। তবে রবিরশ্মির পভাব হইতে আপনাকে আচ্ছন্ন রাখা তাহার পক্ষে অসাধ্য ছিল। অথবা বাঙ্গালা সাহিত্য-জগতের বহু গ্রহ, উপগ্রহ ও বহুতর উল্কাপিণ্ড যাহার নিকট হইতে স্থায়ী বা ক্ষণিক প্রভা সংগ্রহ করিয়া দীপ্তি লাভ করিতেছে, বলেন্দ্রের মত অনুগামী ও অনুচরে তাহার জ্যোতির আংশিক প্রতিফলনে ক্ষুন্ন হইবার হেতু নাই। বরং এত সন্নিধানে অবস্থান করিয়াও তিনি যে তাহার নিজস্ব প্রতিভা প্রচুর পরিমাণে দেখাইতে পারিয়াছিলেন, ইহাতেই তঁাহার সামর্থ্যের বিশিষ্ট। গদ্য অপেক্ষা পদ্য রচনায় তাহার এই নিজস্ব শক্তির স্পষ্টতর পরিচয় মিলে। তাহার রচিত কবিতাগুলির মূল্য তাহার গদ্য রচনার সমান না হইতে পারে, কিন্তু ইহাতে তাহার নৈসর্গিক শক্তির ও স্বাতন্ত্রের অধিক ঘূৰ্ত্তি আছে। অন্ততঃ আধুনিক বঙ্গের অধিকাংশ কবির মত তিনি রবি-প্রতিভায় অভিভূত হন নাই। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের প্রতি তাঁহার যে অনুরাগ ছিল, সেই সাহিত্যের প্রভাবে তিনি আসিয়াছিলেন। কিন্তু তাহাকে আত্মসাৎ করিয়া তিনি আপনার স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখিয়াছিলেন । বলেন্দ্রনাথের জীবনের স্বল্প কাহিনী লিপিবদ্ধ করা আমার কাজ নহে। তাহাকে অন্তরঙ্গ ভাবে চিনিবার সুবিধা বা অবকাশ আমার ঘটে নাই। কয়টা দিনের জন্য আমি তাহার সম্পকে আসিয়াছিলাম। তাহাকে মিতভাষী ও মিষ্টভাষী দেখিতাম। তাহার রচনায় যে কোনল, স্নিগ্ধ বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১০৩ প্রশান্ত শ্ৰী ছিল, তাঁহার মুখে চোখে ও কথাবার্তায় তাহা আরও স্পষ্ট দেখা যাইত। এখানে যেন তাহা সমস্ত তারল্য ও চাঞ্চল্য ত্যাগ করিয়া আরও ঘনাইয়া আসিয়াছিল। বালকের মূর্তির ভিতর প্রৌঢ়ের গাম্ভীর্য দেখিতে পাইতাম ; তাঁহার পরিমিত স্বল্পাক্ষরবদ্ধ উক্তিপ্রত্যুক্তির ভিতর যেন একটা নির্লিপ্ততার ভাব দেখিতাম। তিনি যেন পৰ্যবেক্ষকমাত্র ; সংসারের চক্রে তাঁহাকে যেন কেহ বাধিয়া দিয়াছে; কিন্তু তিনি তাহার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করিতেছেন মাত্র ; উহাতে আগ্রহের সহিত যােগ দিতেছেন না। উহার উন্মত্ত কোলাহলে যােগ দিতে তিনি যেন অক্ষম। সংসারের বিচিত্র সৌন্দৰ্যকলার উপভােগের জন্য হয়ত তিনি উপস্থিত আছেন, কিন্তু সেই সৌন্দৰ্য্যকে দৃঢ় স্পর্শে আঁকড়াইয়া ধরিবার তাঁহার ইচ্ছা নাই। তাহার গদ্য রচনায় তিনি নিজের উপর যতটা কর্তৃত্ব রাখিয়াছিলেন, কবিতাগুলিতে তাহার কিছু অভাব দেখা যায়। ইহাতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিকে, বিশেষতঃ মানসিক সৌন্দর্যের দিকে একটা ভাবপ্রবণ আকাঙ্খা দেখা যায়। সৌন্দর্য্য উপভােগের আকাঙ্খা মাত্র বলিব, তৃষ্ণা বা লালসা বলিব না। কিন্তু তাহার যেন তৃপ্তিতে পৰ্যবসান হইতেছে না। সেই অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষাই যেন থাকিয়া গেল, যেন মধ্যপথ হইতে সহসা কোন অদৃশ্য হস্ত আসিয়া তাহাকে নিঃশব্দে সরাইয়া লইয়া গেল।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.