Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Man-milan Ed.1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মান-মিলন
(ব্রজলীলা)
শ্রীরাধিকামােহন আঢ্য
প্রণীত
কবি-শ্রীযুক্ত কিরণচঁাদবেশ
লিখিত ভূমিকা
১ম সংস্করণ
সুধেন্দ্রমােহন আঢ্য এণ্ড ব্রাদাস
কাহেতটুলী, ঢাকা।
ন ১৩৩।
( All rights reserved ]
[মূল্য ছয়বানা আর।
ঢাকা-নবাবপুর, নারায়ণ-মেশিন-প্রেসে রাধাবল্লভ বসাকদ্বারা মুদ্রিত।
উৎসর্গ
আমার অনুপযুক্তহস্তের এই ক্ষুদ্রতম অর্ঘ্য
আমার পরমারাধ্যপদ শ্রীশ্রীগুরুদেবের
শ্রীচরণকমলে
ভক্তিসহকারে
সমর্পিত
হইল
No text on this page.
আদহার ক্ষিতি মাঝে ব্ৰজপুর, বঃ বায়ু মধু যমুনা বহিছে মনােখে ; ভীরেতে কদম্বশাখা, তার তলে গম বাঁকা, দাড়াইয়া আছে হাসি মুখে। নব নব রস আদি, ভুজিবারে বাঁশী সাধি, করে শ্যাম রাধা নাম গান; তােষামুদে কোকিলেরা, চারিদিকে হয়ে ঘেরা, কুহু রবে ধরে ধুয়া টান। মান দায় দিতে শােধ, নাহি করে লজ্জা বোধ, “বউ কথা কও সাধে পাখী। কে-করে পতির আশা, কৃষ্ণে যার ভালবাসা, গােপী ধায় গৃহকৰ্ম্ম রাখি। আবেশে সকলে চলে, আকর্ষণী মন্ত্র কল, বংশীরবে হয়ে জ্ঞানহারা; মিশাইয়া অনুরাগ, ত্বরিতে পাইতে লা-প, ছুটে যেন পাগলের পারা। দিগ্বিদিক জ্ঞান আর, শ্রীরাধা- সখীগণ সহ উদ্ধশ্বাসে ; সুকাইয়া চুপচাপ, ছুটিছে জুড়াতে তা-প, কুমের চেয়ে চেয়ে হাসে। এত বিচ্ছেদের পর, পেয়ে সেই বংশীধ, ভাসে সবে সুখের সাগরে ; ইচ্ছামত যার যেবা, করে সবে গম সেবা, হা-সিয়া রহস্য ৪ এ-বে করে। নাহি রহে শ্রীরাধিকামােহন আ্য
No text on this page.
গুরবে নমঃ। নিবেদন বহু বৎসর হইল একদিন রাত্রে বাটীতে বাইবার সময় হঠাৎ মনে কয়েকটি কবিতার উদয় হইল। ৰাটীতে যাইয়াই উহা এক টুকরা কাগজে লিখিয়া রাখিলাম। সে অবধি ঐ কবিতাটির কলেবর বৃদ্ধি করিবার ইচ্ছা বলবতী হওয়ায় কয়েক বৎসরের চেষ্টায় উহা একটি পুস্তকাকারে লিখিয়া রাখিলাম। আমি সেকেলে লোক কাজেই আমার কবিতাগুলি ও কোনাে কোনাে স্থানে সেকেলে ছলে লিখিত হইয়াছিল। সেজন্য উহা বর্তমান বঙ্গ-কাব্যকুঞ্জ স্থান পাইবার কখনও যােগ্য হইবে না বিবেচনায় আমি গ্ৰন্থখানি গােপনেই রাখিয়াছিলাম। আমি যখন কাৰ্যোপলক্ষে নারায়ণগঞ্জে বাস করিতাম তখন আমার সতীর্থ মুকৰি শ্ৰীযুক্ত কিরণ চাই দরবেশ মহাশয় তথায় আসিয়াছিলেন। তিনি আমার এই কবিতাগুলি পাঠ করিয়া উহা ছাপাইতে বলেন এবং আধুনিক কবিতা লিখিবার ধরণ বলিয়া দেন। তঁাহার উপদেশানুসারে উহা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন পূর্বক তাহাকে দেখাইয়াছিলাম। তিনি স্থানে স্থানে জহুরীর মতই উহা পালিস করিয়া ও ভূমিকা লিখিয়া দিয়া আমাকে কৃতজ্ঞতা পাশে বন্ধ করিয়াছেন। তঁাহার উৎসাহে উৎসাহিত হইয়াই আমি সর্বসাধারণের সমক্ষে উপস্থিত হইতে সাহস করিয়াছি। এই ক্ষুদ্র পুস্তক পাঠ যদি কেহ সন্তুষ্ট হন তবেই সমস্ত শ্রম সার্থক জ্ঞান করিব; অন্যথায় তাহারা দরবেশ মহাশয়ের সহিত বুঝা পড়া করিয়া লইবেন। আর এক কথা, আমার কনিষ্ঠ পুত্র ক্ষিতীন্দ্রমােহন আঢ্য আমার রচিত অাদর্শ হার ছড়াটি বড় ভালবাসিত কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য বশতঃ তাহার জীবদ্দশায় উহা রীতিমত আকারে তাহাকে দেখাইতে পারি নাই। অল্পদিন হইল সে এই অসার জালাময় সংসার ত্যাগ করিয়া শান্তিধামে, ঐসদাপ্রভুর চরণে শরণ লইয়াছে। আমিও তাহার প্রত্যর্থে তাহার প্রিয় বস্তু ঐ হয় ছড়াটি তাহার নামে পরিবর্তন পূর্বক শ্রীসদাপ্রভু শ্রীচরণে অৰ্পণ করিলাম। ইতি- ঢাকা কাহেতটুলী শ্রীজীঝুলন পূর্ণিমা নিবেদক ওই ভাদ্র ১৩৩৩ সন শ্রীরাধিকামােহন আচ্য ইং ২৩শে আগষ্ট, ১৯২৬। j ভূমিকা আমায় সতীর্থ শ্ৰীযুক্ত রাধিকামােহন আচ্য মহাশয় লিখিত এই ব্ৰস- পূর্ণ সুরসাল কাব্যখানি পাণ্ডুলিপি অবস্থায় হঠাৎ আমার দৃষ্টিগােচর হয়। কবিতাগুলি পাঠ করিয়া আমার ভাল লাগিয়াছিল, অনুরুদ্ধ হইয়া আমি কাব্যখানি আগাগােড়া দেখিয়া স্থানে স্থানে সংশােধন করিয়া দিতে বাধ্য হই; এবং বোধ হয় সেই কর্মেরই ফল স্বরূপ আজ এই কাব্যের “নান্দীমুখ পাঠ করিবার জন্য আমাকে আসরে নামিতে হইল। কবি ঈশ্বর গুপ্তের তিরােভাবের পরে খাটি বাঙ্গালা ভাষায় লিখিত বাঙ্গালীর নিজস্ব ভাবের কবিতা বঙ্গ-সাহিত্যে একান্তই দুল্লভ হইয়া উঠিয়াছে। বঙ্গীয় কাব্যকলা বর্তমানে উন্নতির চরম সীমায় পেীছিয়াছে; এখন পৃথিবীর যে কোনো দেশে যে কোনো কাব্যের পার্শ্বে বর্তমান বাঙ্গালা ভাষার কাব্যের স্থান হইতে পারে একথা বলিলে বােধ হয় অত্যুক্তি হইবে না। কিন্তু তথাপি মনে হয় আমরা আমাদের কাব্যে বাঙ্গালীর -ভাৰ হারাইয়া ফেলিতেছি। অধিকাংশ উৎকৃষ্ট বাঙ্গালা কবিতার মধ্যেই কেমন যেন একটা বিদেশী ভাবের গন্ধ পাই; প্রাণে যেন কেমন একটা অব্যক্ত অভাব থাকিয়া যায়। বর্তমান কাব্যখানির কাব্য হিসাবে মূল্য খুব বেশী না থাকিলেও বাঙ্গালীত্ব হিসাবে ইহার মূল্য আমার নিকট যথেষ্ট মনে হইয়াছে। এ যেন যথার্থই মনে হয় বাঙ্গালীর ছেলে বাঙ্গালার শস্য শ্যমল শীতল কোলে বসিয়া বাঙ্গালী জীবনেরই একটী অধ্যায় অধ্যয়ন করিতেছি। এ হিসাবে এই কাব্যখনি আমার নিকট মহাৰ্থ বলিয়া মনে হইয়াছে। পাঠ করিয়া একটা আরামের নিশ্বাস ফেলিতে পারিয়াছি। পাঠক পাঠিকাগণ আমার সহিত এক মত হইবেন কিনা জানি না, কিন্তু যদি আমার ন্যায় কেহ বাঙ্গালীর ঘরের কবিতার জন্য ব্যগ্র হইয় থাকেন এই কাব্যখানি তাহার নিকটও ভাল লাগিবে আশা করা যায়। বারাণসী রাস পূর্ণিমা। ১৩৩২ } শ্রীকিরণ চাঁদ দরবেশ
মান-মন।
( ১ )
একদিন রজনীতে,
শ্রীরাধার কুতিতে,
যাইতেছিলেন শ্যামরায় ;
শিখি-পুচ্ছ-চূড়া মাখে, মােহন মুরলী হাতে,
মধুর নূপুর বাজে পায়।
আকাশে হাসিছে চাঁদ,
ভূতলেতে কালাচাদ,
শােভার যে নাহিক তুলনা ;
রাধার নিকুঞ্জ মুখে,
যায় শ্যাম মনােখে,
পথেতে ঘটিল বিড়ম্বনা।
চন্দ্রাবলী কুঞ্জ হতে,
দেখিয়া শ্যামেরে পথে,
হরষিত হ'লো মনে মনে ;
ডাকিয়া পদ্মাবতীরে,
কহিলেক ধীরে ধীরে,
সবিনয় মধুর বচনে।
ওগাে সখী পদ্মাবতি,
দেখ এসে শীঘ্রগতি,
বিধি বুঝি সদয় হইল ;
মােরা এতদিন ধরে, খুঁজিতেছি যেই চোরে,
আজ রে মিলাইয়া দিল।
মান মিলন।
যাও তাড়াতাড়ি করে, আন সেই চোরে ধরে,
বিলম্বােতে যাবে পলাইয়া ;
তবে অনুতাপানলে,
মরিতে হইবে জ্বলে,
ছুটে গেলে আয়ত্তে আসিয়া।
শঠ চূড়ামণি বটে,
কথাতে তো নাহি হটে,
নানাভাবে ভুলাইতে চাবে;
বধিরের প্রায় থেকো, কোন কথা নাহি রেখাে,
তা নহিলে ঠকাইয়া যাবে।
এত শুনি পদ্মাবতী,
মনের হরিষে অতি,
কুঞ্জ হতে বাহির হইল
শ্যামের সম্মুখে গিয়া,
দুই হাত পসারিয়া,
যাইবার পথ আগুলিল।
।
( ২ )
হাসি হাসি কহিছে বচন,
বহুদিন খুজি ঘরে,
পাইয়াছি আজি তঁারে,
আর কোথা যাবে হে এখন ?
খাড় পােেয়ানা জারি,
তব পরে, বংশীধারি,
যাইতে হইবে মােঝ সাথে ;
সহজে না গেলে পরে, লয়ে যাৰ জোর ক'রে,
বাঁধিয়া তােমার দুটি হাতে।
মান-মিলন : ; এত বলি সহচরী, কটির বসন ধরি, করিল শ্যামের গতি থােধ ; ছাড়াইতে নাহি পারি, বাক্যের চাতুরী পাড়ি, কামু দিতে লাগিল প্রবােধ। শোন সখী পদ্মাবতি, দয়া করে মাের প্রতি, রাধার নিকুঞ্জে দাও যেতে ; আজি নাহি গেলে তথা, রাই বড় পাবে ব্যথা, আমাকেও হবে বেগ পেতে। সখী সহ হ মনে, এসে রাই কুঞ্জ বনে, আমার অপেক্ষা করিতেছে নিশি বাড়িতেছে যত, অস্থির হ’তেছে তত, সখীরাও কিবা ভাবিতেছে। নিজ গুণে দয়া ক'রে, আজ ছেড়ে দাও মােরে, নিশ্চয় আসিব আমি কাল ; তােমার সখীর সনে, ভেটিব আনন্দ মনে, থাকিবে না কোনই জঞ্জাল। সখী মাঝে তুমি সতি, অতিশয় বুদ্ধিমতী, সকলেই বাখানে তােমারে সদয় হইয়া আজ, কর সে বুদ্ধির কাজ, আর ধরে রেখাে না আমারে। তুমি তো অবলা বালা, বুঝ অবলার জ্বালা, অধিক কি বুঝাব তােমায়; নারীর হৃদয় তব, বেশী আর কিবা কব, দায় ভেবে ছাড় গাে আমায়।
০
মান-মিলন।
আশপথ চেয়ে আছে,
নাহি গেলে তার কাছে,
নিরাশায় পরাণে মরিবে;
আমার কাধ হবে,
চির অপবাদ রবে,
সখীগণ খ্রীঘাতী বলিবে।
( ৩ )
এত শুনি কহে পদ্মা হাসিয়া হাসিয়া,
অস্থির হতেছ কেন রাধার লাগিয়া ?
তব কথা শুনে বড় হাসি পায় মনে,
লাজ কি হলাে না কিছু, বলিলে কেমনে?
নাগরী করিবে রাগ এই মনে করে,
নাগর অস্থির হয়ে কঁাপে সেই ডরে।
তাই বুঝি বাঁধা আছ শ্রীরাধার পায় ?
হেন নাগরালি বল শিখেছ কোথায় ?
তুমি যত ভালবাস, সে কি তত বাসে?
খােসামােদী করে তুমি থাকো তার পাশে।
ইচ্ছামত কাজ করা ভাগ্যে নাহি ঘটে,
যােড় হতে থাকে সদা রাধার নিকটে।
তােমাদের প্রেম বুঝিলাম এতক্ষণে,
একজন প্রভু আর দাস একজনে।
দাসত্ব শৃঙ্খলে তুমি বন্ধু তার পায়,
নয়নের ঠারে রাধা তােমারে নাচায়।
মান-মিন।
০
রাজার দুহিতা রাই বড়ুয়ার ঝি,
পিরীতি কাহাকে বলে সে বুঝিবে কি ?
মাের সনে এসে দেখ প্রেম কাকে বলে,
হার করে তােমারে রাখিবে চা গলে।
আমাদের সখী কিসে কম রাই হ'তে,
তাহার রূপের তুল নাই এ জগতে।
রসিক। নাগরী সখী রসের সাগর,
উচিত ডুরী তুমি রসিক নাগর।
আমার সখীর নব যৌবন তরঙ্গে,
তুমিই কেবল পার তারিতে রঙ্গে।
বিলম্ব করে না বধু চল ত্বরায়,
দুয়ারে দাঁড়ায়ে সখী তােমার আশায়।
এতেক বলিয়া ধরি’ শ্যামের বসনে,
লইয়া চলিল চন্দ্রাবলী নিকেতনে।
( ৪ )
পদ্মারে পাঠায়ে দিয়ে, চন্দ্রাবলী দ্বারে গিয়ে,
শ্যাম আশে দাড়াইয়াছিল ;
মনের মানুষে পেয়ে,
হরষে আসিয়া ধেয়ে,
করে.ধরি লইয়া চলিল।
ইহা দেখি পদ্মাবতী,
হইয়া:প্ৰফুল্ল অতি,
সখী প্রতি বলিছে বচন ;
অনেক যতন করি,
আনিয়াছি চোরে ধরি,
পুরস্কার দাও গাে এখন।
মানমিলন কত মতে ফাকি দিয়া, যেতেছিল পলাইয়া, আমি তাই, রাখিয়াছি তারে; তােমার আসামী ভাই, দিলেম তােমার ঠাই, সাজা দাও যা হয় বিচারে। কিন্তু তােমা আগে থাকি, এক কথা বলে রাখি, বুঝে সুঝে ক'রাে যেন কাজ ; রাধিকার কেনা দাসে, সাজা দিয়ে তার পাশে, নিজে যেন নাহি পাও লাজ। রাধার দোহাই দিয়া, যেতেছিল ছড়াইয়া, আমি তাতে দেই নাই কাণ; একথা শুনিবে যবে, ক্রোধে রাই অগ্নি হবে, মােরে পাছে করে অপমান। একে তো রাজার মেয়ে, তাতে শ্যাম সঙ্গ পেয়ে, হইয়াছে বড় শহষ্কার ; কাহাকেও নাহি গণে, তুই করে সব জনে, তুমি আর আমি কোন্ ছার। এ বড় আশ্চর্য কথা, শুনে মনে লাগে ব্যথা, যারে ভালবাসে-সে না বাসে; ক্রীত কিঙ্করের মতাে, সদা থাকে অনুগত, তবু মনে লাজ নাহি বাসে। রাই বুঝি মন্ত্র জানে, ধাঁধিয়াছে সে সন্ধানে তাই তার এত কুরালী ; নৈলে কি চোখের ঠারে, নাগরে ঘুরতে পারে, সখীগণ দেয় করুগলি।
মানলিল।
থাক সে সকল কথা, মাের কিবা মাথা ব্যথা,
শুধু এক কথা ভাবি মনে ;
এতদিন যায় আসে,
মনে করে কি বিশ্বাসে,
মরিবে সে ইহার বিহনে
ধার্মিকের চূড়ামণি,
রাধার মরণ গণি,
হয়েছে অস্থির অতিশয় ;
ছেড়ে দাও আজি তারে,
যাইতে রাধার দ্বারে,
কাল হেথা আসিবে নিশ্চয়।
খাইয়াছে যার মুন,
গায়িবে তত তারি গুণ,
তুমি কর যতই যতন;
পাইবে না মন তার,
ভয়ে ধৃত ঢালা সার,
হবে না সে মনের মতন।
( ৫ )
শুনিয়া সখীর কথা,
চন্দ্রাবলী স্বর্ণলতা,
হাসি হাসি শ্যামপানে চায় ;
লজ্জিত হইয়া হরি, বাক্যের কৌশল করি’,
কথা দিয়ে কথারে কাটায়।
কেন এত ব্যঙ্গ কর,
শােন সখি অতঃপর,
মনােগভ ভাব যা আমার ;
মন পরীক্ষার তরে,
এতক্ষণ হল ক'রে,
করিতেছিলেম ব্যবহার।
মান-মিলন। আমার স্বভাব এই, মােরে ভালবাসে যেই, আমি তার কেনা হয়ে রই ; দাস সম অবিরত, থাকি তার অনুগত, এক তিল তারে ছাড়া নই। যেই জন প্রেম-ভােরে, বন্ধন করিবে মােরে, তার মন আগে বুঝা চাই; মনে প্রাণে চায় মােরে, অথবা দুদিন পরে, বলিবে তােমারে কাজ নাই। যদি পরে নাহি চায়, তবে হবে কি উপায়, মরিতে হইবে জ্বলে পুড়ে ; পিরীতি করিয়া শেষ, ভুগিব কি মনােক্লেশ, সুখ শান্তি সব যাবে দুরে। তােমার সখীর লাগি, বহুদিন অনুরাগী, যাই আসি এই পথ দিয়া মম দুরদৃষ্ট তরে, দেখিয়া না দেখ মােরে, ফিরে যাই হতাশ হইয়া। আজি পথে অকস্মাৎ, ধরিয়া আমার হাত, টানিতে লাগিলে জোর করে আতঙ্ক হইল প্রাণে, ভাবিলাম' কেন টানে, আছে বুঝি রহস্য ভিতরে। নিতি নিতি আসি যাই, দেখিতে পাইয়া তাই, কৌতুক করিতে অভিপ্রায় ; সকলে মন্ত্রণা করে, লােকের নিকটে মােরে, হাস্পদ করিবারে চায়। ;
मान-भिनन ।
এসে যা দেখিনু চোখে, অবাক করেছে মােকে,
এই বা কেমন ব্যবহার
ডাকিয়া এনেছে যারে,
বসিতে না বলে তারে,
এ বাড়ীর এই কি বিচার ?
তােমরা যে সখীগণ,
করেছ বিষম পণ,
যে চলিবে এই পথ দিয়া
চেনা পরিচয় নাই,
তবু তারে আনা চাই,
যদি যায় মনেতে ধরিয়া।
••
( ৬ )
ফণিনী আহত হ'লে,
ক্রোধে যেন যায় জ্বলে,
চন্দ্রাবলী হইল তেমন ;
নাগরের বাক্য বাণে,
ব্যথিত হইয়া প্রাণে,
অভিমানে বলিছে তখন।
আমরা তাে কুলবতী, নাহি চাই কারাে প্রতি,
স্বপনেও নাহি ভাবি মনে ;
নিজ সহচরী লয়ে,
রঙ্গ করি নিজালয়ে,
ডাকিতে না যাই কোন জনে।
তবে কেন মাের আশে,
আমার বাড়ীর পাশে,
সদা তুমি ঘুরিয়া বেড়াও ;
নিজে সাধু ভাবো মনে, অন্যে দোষাে অকারণে,
মান অপমান না ভরাও।
মান-মিলন। আসিতে যাইতে পথে, দেখে নারী শতে শতে, লােত সংবরিতে নাহি পার ; তাহারা যেখানে যায়, যুবতীর লালসায়, তাহাদের পেছন না ছাড়। সহজে যে নারীগণ, কুলে দেয় বিসর্জন, হেন বুদ্ধি কে দিল তােমারে ? পাতিয়া বাক্যের ফাদ, বামন হইয়া সদ, কি সাহসে যাও ধরিবারে ? এ ব্যাভার দরশনে, হাসে তারা মনে মনে, তা তাে তুমি নাহি পাও টের ; জন্মেছে অনেক কথা, শুনিলে পাইবে ব্যথা, এখন হতেছে আরো টের। আত্ম ছিদ্র না দেখিয়া, অন্তে ফির দোষ দিয়া.. এ তব কেমন বিচার ; মােরে পাইবার তরে, নিতি যাতায়াত করে, পায়ে ব্যথা হয়েছে তােমার। পুন হেসে হেসে কয়, ওহে সাধু মহাশয়, কোথা হেন ডাকাতি শিখেছ ? না মানাে দিবা কি রাতি, পাইয়া রমণী জাতি, অত্যাচার আরম্ভ করেছ। বারেক নেহর বারে, মজাইয়া ছাড়া তারে, লুটে নিয়ে সর্বস্ব রতন; শেষে তারে ফাকি দিয়া, যাও তুমি পলাইয়া, ধন লাগি করে সে রােদন।
মান-মিলন। কেমন পাষাণ দিয়া, গড়া যে তোমার হিয়া, ফিরিয়া না চাহ তার পানে; মণি হারা ফণী মত, খােজে তােমা অবিরত, দেখা নাহি পায় কোন খানে। ব্ৰজের যুবতীগণ, হয়ে সবে জ্বালাতন, নালিশ করেছে মাের কাছে; শুনিয়া তাদের বাণী, মনে বড় ভয় মানি, মাের ধন চুরি কর পাছে। দেখিনু বিচার করে, ধরিতে হবে এ চোরে তা নহিলে আর রক্ষা নাই ; যেন কভু আর কারে, মজাইতে নাহি পারে। চিরকাল বেঁধে রাখা চাই। পাঠায়েছি অনুচরে, কত দেশ দেশান্তরে, সেই চোর ধরিবার তরে; খোঁজ না মিলিল যবে, ফিরিয়া আসিল সবে, কত দিন ঘােরাঘুরি করে। নয়ন প্রহরী মাের, অকস্মাৎ সেই চোর, একদিন দেখাইয়া দিল ; তারে ধরিবার আশে, বসে আছি নিজ বাসে, ক্ষুধা তৃষ্ণা সকলি ঘুচিল। পদ্মাবতী সখী সনে, শ্রদ্ধা ভক্তি দুই জনে, অবশেষে দিমু পাঠাইয়া ; যদিও তাহারা নারী, করি’ পরােয়ানা জারি, এনেছে সে চোরেরে ধনিয়া, * মান-মিন। পড়েছ অামার করে, ছাবে কেমন করে, খাটিবেনা চাতুরী তােমার; দোষ অনুযায়ী সাজা, পাবে হে চোরের রাজা, বল হে কি আছে বলিবার। মদন কামার আছে, আমার বাড়ীর কাছে, তাহারে আনিব ডাকাইয়া ; মনের মতন করি, মইব শীকল গড়ি', দিব দুটি পদে পরাইয়া। হাতের বাঁশরী তব, 'এখনি কাড়িয়া লব, রাধা নাম না দিব ঝলতে ; হৃদি কারাগার মাঝে, রাখিব বন্দীর সাজে, কারাে মুখ না পাবে দেখিতে। সারাদিন অনাহারে, হৰে তােম থাকিবারে, ক্ষুধানলে জ্বলিবে যখন ; প্রেম মৃধা ভাণ্ডে ভরি, নিজ হাতে ল’য়ে হরি, মােসাধে খাওয়াব তখন। কহিয়া এতেক বাণী, কৃষ্ণে হাতে ধরে আনি, আদরে বসা’ শয্যা পরে ; হেরি সহচরীগণ, হ'য়ে হরষিত মন, নানাবিধ আয়ােজন করে। কপুর তাম্বুল ভরি, রাণে থালা সহচরী, কেহ আনে সুবাসিত বারি ; কেহ কেহ হেসে হেসে, চন্দন বসিতে এসে, রসালসে করে ঠাপাঠারি ।
মান-মিন। * 2 কেহ আনে পিক দান, কেহ বা আতর দান, কেহ ব গােলাপ পাশ আনে; কেহ লয়ে ফুল ভালা, বসিল গাথিতে মালা, যেবা যত কারিগরি জানে। কেহ বেণী বেঁধে দিল, নানা ফুল বাইল, বেণী দেখে ফণিনী পলায় ; আপন আপন মনে, ফুল সাজে দুই জনে, সখীগণ আনন্দে সাজায়। অতি পরিপাটী করি, ফুলের বিছানা গড়ি, ফুলের মরি টাঙ্গাইল ; বসাইয়া দুই জনে, নেচে গেয়ে সখীগণে, আনন্দের তরঙ্গে মাতিল। পেয়ে শ্যাম সময়, চন্দ্রাবলী প্রতি কয়, এ কাজ করছ কেন তবে? কুলের কামিনী হ'য়ে, পর পুরুষেরে লয়ে, কি কারণে কেলি কর সবে? তখন এ কথা শুনে, জ্বলেছিলে রােষাগুনে, মােরে কত ভৎসনা করিলে ; বলিয়াছিলাম যাহা, কাজে একে দেখি তাহ, মিছে কথা কেমনে কহিলে? চন্দ্রাবলী তদুত্তরে, বলিল সােহগ ভরে, নারী ধৰ্ম্ম তুমি কি বুঝিবে ; যদিও অধীন মােরা, হৃদে স্বাধীনতা ভরা, সেই স্ব কেবা ছেড়ে দিবে।
১৪
মান-মিলন।
মােরা কুলবতী নারী, কুল ছেড়ে যেতে নারি,
ডুবিতে অকূল সাগরেতে ;
অকূল কাণ্ডারী পেলে, ধৰ্ম্মাধর্ম ঠেলে ফেলে,
চলে যাই তাহার সঙ্গেতে।
( ৭ )
এত শুনি শ্যাম চঁাদ মৃদু মৃদু হেসে,
নাগরীরে আলিঙ্গিল প্রণয় আবেশে।
সখীগণ মহানন্দে দেয় হুলুধ্বনি,
নাগর নাগরী সুখে বঞ্চয়ে রজনী।
এদিকেতে শ্ৰীমতীর শােন বিবরণ,
শ্যামের ইঙ্গিতে এসেছেন কুঞ্জ বন,
তাঁহার মিলন সুখে বঞ্চিবে যামিনী,
সেই আশে আছে বসে শ্যাম সােহাগিনী।
সখীগণ কেহ কেহ বসিয়াছে ঘিরে,
কেহ নানা আয়োজন করে ধীরে ধীরে।
ক্রমে ক্রমে নিশি যত বাড়িতে লাগিল,
নিরাশা সাগরে রাই ততই ডুবিল।
এক দুই ক'রে তিন প্রহর চলিল,
তবু শ্যাম চাদ নাহি উদয় হইল।
শ্যামের বিহনে রাই হইল অস্থির,
সখীগণ বুঝাইছে, তবু নহে স্থির।
বিরহ অনল যবে জ্বলিয়া উঠিল,
সখীপ্রতি কেদে কেঁদে কহিতে লাগিল।
মান-মিলন। তবুও না এলো, ( ৮ ) সখিরে, কার লাগিয়া, কাননে আসিয়া, বাড়িল বিরহ জ্বালা; নিশি বেড়ে গেলো, কি:করিছে বলো কাল? আসিব বলিয়া, গেলো আশা দিয়া, এখনও হলােনা আসা ; বিরহ অনলে, মন প্রাণ জ্বলে, এই না কি ভালবাসা ? অঙ্গের চন্দন, বিষের মতন, অলঙ্কার যেন ফণী বেড়ি সারা গায়, দংশিছে আমায়, প্রাণ যায় হেন গণি। চঁাদের কিরণ, যেন হুতাশন, হিছে আমার কায় । পবন মলয়, হয়ে নিরদয়, বিধিছে কণ্টক প্রায়। সুখের সাগরে, ভাসিব শ্যামের সনে; এই আশা ক'রে, সারাদিন ভরে, ছিলেম প্রফুল্ল মনে। বহুদিন পরে, মান-মিলন। 1. •• • শাশুড়ী নদী, সদাই বিরােধী, মুকা’য়ে গেঁথেছি মাল। দিৰ খাম গলে, মন কুতূহল, হায়, কোথা মাের কালা । করি তাড়াতাড়ি, গৃহ কাজ সারি, কুসুমে ভরেছি ডাল। বসেছি চন্দন, করিয়া যতন, ঘরেতে লাগায়ে তালা। ক্ষণে কাজ করি, ক্ষণে ছল ধরি, দেখেছি আকাশ বাটে কখন্ তপন, ছাড়িয়া গগন, বসিবে পশ্চিম পাটে। বিলম্বে তাহার, শত শত বার, কত শাপিয়াছি তারে রাহুরে ডাকিয়া, বলেছি কাঁদিয়া, দিবাকরে গ্রাসিবারে। গগনেতে পশি, হেসে যবে দেখা দিল ; সুখ পারাবার, হয়ে শত ধার, হৃদি মাঝে উথলিল। কত আশা করে, পূর্ণ প্রেম ভরে, এলেম নিকুঞ্জে অজ; মরমে আমূল, বসাল নিঠুর রাজ। পূর্ণিমার শশী, নিরাশার শূল, আনমিলন। যদি জানে মনে, আসিবে না বনে, কেবল পরখ করা ; পরীক্ষার বাকী, আছে আর না কি, আগেই পড়েছি ধরা। যাহার কারণ, কলঙ্ক ভূষণ, আদরে পড়েছি গায় নিঠুর এমন, সে কি না এখন, মন বুঝিবারে চায়! শঠ শিরােমণি, আপনি যেমনি, পরেরে তেমনি জানে; কারে কব দুখ, ফাটে মাের বুক, মন না প্রধােধ মানে। কালার লাগিয়া, স’তেছি গঞ্জনা কত ; যদ্যপি সে জন, বুঝিত বেদন, তবে কি এমন হতাে। প্রণয়ীর দুখে, প্রণয়ীর সুখে, প্রণয়ী যে কাদে হাসে ; কালার এ রীত, দেখি বিপরীত, দুখ দিতে ভালবাসে। করিতে যতন, পরেরে আপন, যতই করুক নারী ; পর পরই রয়, আপন না হয়; কুল তেয়াগিয়া, মুখে মধু জাকারী।
মান-মিলন। রমণী হইত, তবে তো বুঝি, রমণী জাতির ব্যথা; নাগরের তরে, কত সহ করে, ভুলিয়া নিজের কথা। প্রাণেশ চরণে, সপি’ প্ৰাণ মনে, সদা জপে তার নাম ; ক্ষুধা তৃষ্ণা তার, নাহি থাকে আর, নাহি থাকে অন্য কাম। প্রাতে ও সন্ধ্যায়, যেয়ে যমুনায়, আনিতাম জল ভরি; কদবের তলে, রাধা রাধা বলে, বাঁশরী বাজা’ত হরি। আমি পর নারী, পরের ঝিয়ারী, যাইতাম লাজে মরে পথে ঘাটে মােরে, সবার গােচরে, এমনি বা কেন করে। শাশুড়ী ননদী, কভু শশানে যদি, রাখিবে মোরে প্রাণে ; ভরিয়া গাগরি, বদন আবরি’, ফিরিতাম মানে মানে। লােকে কিবা কবে, মনে হতো যবে, ভয়েতে কাপিত গা ; আবিতাম সই, আর কখন ই, যমুনায় যাব না। •• बान-भिनन। ১৯ কি যে মন্ত্র দিয়া, বাঁশীরে সাধিয়া, রেখেছিল শ্যাম রায় ; সে স্বর আসিয়া, মরমে পশিয়া, করিল পাগল প্রায়। কোনােখানে যেয়ে, সােয়াস্তি না পেয়ে, প্রাণ হ’তো আকুলিত ; যমুনা যাইতে, ভিতর হইতে, কে যেন ঠেলিয়া দিত। দিবস রজনী, শুনে সেই ধ্বনি, কর্ণ চাপিতাম কর ; অন্তরে থাকিয়া, উঠিত বাজিয়া, জাতি-কুল-নাশা স্বর। করিতাম মনে, ভুলিৰ সে জনে, ভােলা তাে হইত জ্বালা ; হাসি মুখ করে, হিয়ার ভিতরে, সম্মুখে দাড়া’ত কালা । মনের বাঁধন, ছিড়িত তখন, হেরিয়া তাহার মুখ ; কলঙ্কের ভয়, হইত বিলয়, আনন্দে ভরিত বুক। ঘুমের আলসে, শ্যামের পরশে, উঠিয়াম চমকিয়া ; যেন গ্রাম এসে, মৃদু মৃদু হেসে, মােরে আছে জড়াইয়া।
মান-মিলন। যমুনা যাইতে, চো মেলে চেয়ে, দেখিতে না পেয়ে, মরিতাম ধড়, ফড়ি; মুখটি গুজিয়া, কঁদিয়া কাদিয়া, পােহাতেম বিভাবরী। সরমের ভরে, মুখ ফুটে পরে, বলা নাহি যেত, হায় ; অন্তরে কেবল, জ্বলিত অনল, রাবণের চিতা প্রায় ! সেরূপ হেরিতে, একদিন হলো সাধ; আড় নয়নেতে, দেখি মাত্রেতে, ঘটে গেল পরমাদ। নয়ন ধনুতে, দৃষ্টি-বাণ যুতে, ছাড়িল আমার পানে অাখি দ্বার দিয়া, তখনি পশিয়া, বিধিল মরম স্থানে। অচেতন করে, কি করিল মােরে, শােন সে দুঃখের কথা জীবন যৌবন, করিয়া হরণ, প্রাণে দিল বড় ব্যথা। মাের দুই দ্বারী, লজা ভয়ে মারি, দূরে তাড়াইয়া দিল ; ধৈৰ্য সেনাপতি, এসে শী গতি, যাের রণ আরভিল। ;
মান-মিলন। ; হয়ে পরায়, সেই মহাশয়, ভঙ্গ দিল ক্ষণ পরে ; চোর চুরি আশে, মনের উল্লাসে, পশিল নির্জন ঘরে। বিবেক আসিয়া, ধরম কহিয়া, কত যে বুঝাল তায়। অবলার , করিয়া হরণ, নাহি যেন ল’য়ে যায়। চোর শুনিল না, মান মানিল না, উলটি বাঁধিতে এলো ; কি করে বেচারা, হ'য়ে চারা হারা, ভয়ে পলাইয়া গেলাে। পেয়ে সুসময়, চোর মহাশয়, বসি হৃাসন' পরে ; হাসিয়া হাসিয়া, মিঠা কথা দিয়া, ভুলাতে লাগিল মেয়ে। আমি তো সরল, নে বাক্য চুল, হলেম পাগল প্রায় ; শেষ না ভাবিয়া, প্রেমেতে মজিয়া, বিকা’মু কালার পায়। পিরীতির গাছে, বিষ ফল আছে, তাহ। আগে জানি নাই ; জানিলে এমন, নিজে কি কখন, গরল পাড়িয়া খাই ? ত মান-মিলন। ; পিরীতি করিয়া, জ্বলিয়া পুড়িয়া, ক্ষতি নাই যদি মরি ; এ দশা নেহারি, যেন কোনাে নারী, মরে না পিরীতি করি। পুরুষের প্রীতি, হয় প্রতীতি, বলে এক করে আর মুখে স্বর্গে তােলে, মনে রসাতলে, ফেলাইতে চেষ্টা তার। শঠ শিরােমণি, পুরুষ যেমনি, আর কি এমন আছে ? আগে না বুঝিয়া, ঠেকিয়া শিখিয়া, চেতন হইল পাছে। কাণে কাণে আশা, মিটা’তে পিয়াস, বলে-“এলো ওই এলাে” ব্যস্ত হয়ে চাই, দেখিতে না পাই, এই ক'রে নিশি গেলাে। যাহার কারণ, পাইমু বেদন, যে বােঝেনা মাের দুখ ; প্রতিজ্ঞা আমার, আজ হতে আর, হেরিব না তার মুখ। কেশ মুড়াইব, কাজল ত্যজিব, পরিব না নীল সাড়ী ; যমুনার ধার, এ জনমে আর, যাব না ভরিতে বারি।
মান-মিলন। ; আকাশে না চাব, তমালে না যায়, করিব না কালাে সঙ্গ; পাছে কালােরূপ, হয়ে কালরূপ, মম পণ করে । শােন্ সখিগণ, আমার বচন, সে যদি নিকুঞ্জে আসে তােরা করি না, না, প্রবেশিতে মানা, ফিরে যাও নিজ বাসে।” হইয়া বিমুখ, করিবি বিমুখ, রাখিবি তার মান ; মিনতি করিলে, পায়েতে ধরিলে, নাহি দিবি তাতে কাণ। তাহার কথায়, সাধিতে আমায়, হইও না সযতন ; হৃদে বিষ ঢাকা, নাই হেন দুষ্ট জন। পরের বেদন, বােঝে না কখন, খলের স্বভাব তাই ; স্বার্থের কারণ, ধরিতে চরণ, তাহাদের লজ্জা নাই। মান অপমান, করে তুচ্ছ জ্ঞান, স্বার্থ ই তাদের প্রাণ ; লম্পটের শেষ, ভালবাসা বেশ, নাহি পায় হৃদে স্থান। মুখে মধু মাখা, ২৪ মান-মিলন। ললিতা তখন, • (৯ ): প্রবােধ বচন, বলিছে রাইয়ের তরে এত ব্যস্ত হ'লে, কাজ নাহি চলে, থাকে কিছু ধৈৰ্য্য ধরে। ওগাে অভিমানি, শােন মম বাণী, বলি যে তােমার কাছে ; নাগর উপরে, খুটি নাটি ধ'রে, মান কি করিতে আছে ? নাগর সমান, দরদী প্রধান, কেবা বল আছে আর ; দেহে এক প্রাণ, নাই ভিন্ন জ্ঞান, দেহ সুধু ভিন্নাকার। যদি রাগ ক'রে, এহেন নাগরে, উপেক্ষা করগাে আজ ; পেয়ে এই ছল, সাধিবে আপন কাজ। জেনে কারণ, কেন অকারণ, অবিশ্বাস কর তারে; দেখে তােমাকে, সে যে সুখে থাকে, কেউ কি বলিতে পারে? বিপক্ষের দল, মান-মিলন। ; দৈব দুর্বিপাকে, বােধ হয় তাকে, রেখেছে আটক করে ; তোমারি মতন, অধীর সেজন, হয়ে আছে তার ঘরে। পাইলে সময়, আসিবে নিশ্চয়, ইথে কি সংশয় আছে। তুই বিনে তার, গতি নাই আর, সে যে বাঁধা তাের কাছে। ; ( ১০ ) কহিছে শ্ৰীমতী, ললিতার প্রতি, প্রম কূপে পড়ে আছি ; পুরুষ প্রকৃতি, সদা বক্রাকৃতি, সোজা কোথা দেখিয়াছ? ভ্রমর যখন, মধু অন্বেষণ, করে গিয়া কোনাে ফুলে ; সরলা ললনা, বুঝে ছলনা, তারে পেয়ে যায় ভুলে। রস আলাপনে, মধুপের সনে, আনন্দে মাতিয়া রয় ; মনে হয় তার, এ জনমে আর, তালিবে না এ প্রণয়।
মান মিলন। এই অবসরে, হৃদয় মাঝারে, লুকায়ে তাহারে, কত মতে পূজা করে ; পরাগ চন্দন, করয়ে লেপন, নাথের সর্বাঙ্গ পরে। খুলে দেয় তার, মধুর ভাণ্ডার, পতির সন্তোষ তরে ; ধূৰ্ত্ত মধুকরে, মধু খায় প্রাণ ভরে। মন প্রাণ ভরি, মধু পান করি, অন্য ফুলে উড়ে যায় ; সরলা অবলা, বুঝে সে দুলা, ধরিয়া রাখিতে চায়। শত চেষ্টা করে, তবু তারে ধরে, রাখিতে পারেনা, হায় ; হতাশ হইয়া, কাঁদিয়া কাঁদিয়া, অবশেষে মরে যায়। পুরুষ পাষাণ, ভ্রমর সমান, এ কথা তো মিছে নয় ; ফেলিতে নারীরে, দুঃখ-সিন্ধুনীরে, কোন কষ্ট নাহি হয়। পুরুষের মাঝে, যত গুণ রাজ, সকলি তাে আমি জানি; ধরি নানা বেশ, কপটের শেষ, বধে অবলার প্রাণী।
মান-মিলন। ; প্রেমের বাজারে, প্রেম কিনিবারে, সদাগর সেজে যায় ; বেচিবার আশে, যে রমণী আসে, তারে দেখে প্রাণ পায়। পাইয়া এমন, ধনী ক্রেতাজন, লাভের আশায় থাকে ; দিয়ে প্রেম-মণি, সাজা’য়ে বিপণি, পরিপাটী করে রাখে। সদাগর এসে, দোকানে প্রবেশে, জিনিস দেখা’তে কয় দোকানী রমণী, হরিষে অমনি, আবরণ তুলে লয়। দেখি দেখি ক'রে, রত্ন লয়ে করে; উলট পালট করে লােভ দেখাইয়া, মুল্য নাহি দিয়া, নিজের থলিতে ভরে। দোকানী দেখিয়া, অবাক হইয়া, ভয়ে ভয়ে মূল্য চায়, শুনে ও না শােনে, সে আপন মনে, আরেক দোকানে যায়। এহেন প্রকারে, ঠকা’য়ে সবারে, প্রেম ধন চুরি করে ; লাভের বদলে, 'য়ে গলে, দুখিনী মণী মরে। •• মান-মিলন। ; গৃহস্থের ধন, করিয়া হরণ, চোর হয় বটে ধনী ; তাদের বেদন, বােঝেনা কখন, হৃদি পাষাণের খনি । সেই চোরা ধন, করি৷ এমন, লয় যদি বাটপাড়ে ; তা হ'লে বেদন, লাগে যে কেমন, তখন বুঝিতে পারে। কখনাে আবার, মাছ ধরিবার, মনে হয় তার সাধ ভবনদী তীরে, ফদ ল’য়ে ফিরে, নাহি হয় অবশদ। নারী রূপ মীনে, আনিতে অধীনে, কত কারিগরি করে ; দৃষ্টি বরদীতে, হাসির ভুরিতে, কপটতা কাটা জোড়ে। ফাকা প্রেম দিয়া, আধার গড়িয়া, কৌশলে কাটারে ঢাকে; মধুর বচন, সিসার ওজন, কাটারে ডুবায়ে রাখে। মীন তো সয়লা, বুঝে এ ফুল, আধার খাইতে যায় ; গিলিবার কালে; গাধা পড়ে জানে, ছাড়াইতে নাহি পায়।
মান-মিলন। ; আছড়ে পাছাড়ে, তবুও ন ছাড়ে, এমনি পুরুষ জাতি ; গাঁথিয়া তাহারে, তুলে লয় পারে, মনের আনন্দে মাতি'। ধড়ফড়, ক'রে, মীন যায় মরে, দৃকপাত নাহি তাতে তাকে ফেলে রেখে, ধরিতে অন্যেকে, ছিপ লয় পুন হাতে। এই মত করি’ কত মীন ধরি, প্রতিদিন বধ করে; এমন জাতিরে, বল কি খাতিরে, বিশ্ব করিতে মােরে? আর হেন কথা, বলেন অযথা, আমার মাথার কিরে ; শঠের সহিত, করিয়া পিরীত, বুক গেছে চিরে চিরে। আজ হতে আর, তাহার আমার, কোনই সম্পর্ক নাই ; কপালে যা ছিল, তাহা তাে ঘটিল, আর তারে নাহি চাই। এতেক কহিয়া, মানিনী সাজিয়া, বসনে বদন টেকে ; গালে হাত দিয়া, রহিল বসিয়া, ভূমিপানে চো রেখে।
মান-মিলন।
( ১১ )
এদিকে রজনী প্রায় শেষ হয়ে এলো,
নাগরের শ্রীমতীরে মনে পড়ে গেলাে।
পালঙ্ক ছাড়িয়া শ্যাম উঠিয়া ত্বরায়,
চন্দ্রাবলী নিকটেতে চাহিল বিদায়।
ইহা শুনি চন্দ্রাবলী ব্যাকুল হইয়া,
বসাইল পুন
তারে দুহাত ধরিয়া।
গদ গদ ভাষে ভেসে নয়নের নীরে,
বলিতে লাগিল শ্যামে অতি ধীরে ধীরে।
কি ভাবিয়া চাও তুমি হইতে বিদায় ?
ছাড়িয়া দিতে কি বন্ধু এনেছি তােমায়।
যে ধন পাইতে আশা করে কাঙ্গালিনী,
সে ধন পাইয়া কি হে ছাড়ে সে কামিনী ?
বহু যত্নে পাইয়াছি তােমা হেন ধন,
মনে হয় গলে গাথি রাখি অনুক্ষণ।
নয়ন অঞ্জন করে নয়ন রঞ্জনে,
রাখিতে পারিলে তবু তৃপ্তি নহে মনে।
নয়ন পলকহীন যদ্যপি হইত,
তবে মনােসাধ মম কতকমিটি।
বিধির চরণে কত করেছিনু পাপ,
চক্ষেতে পলক দিয়ে দিল মনস্তাপ।
মান-মিলন।
৩১
পাইয়াছি যদি আর কভু না ছাড়িব,
বিচ্ছেদ অনল জ্বালা কেমনে সহিব?
“যাই” কথা বলে মেরে অবাক করিলে,
দেখাতে মৌখিক প্রেম বুঝি এসেছিলে ?
পুরুষ নিঠুর জাতি সব লােকে কয়,
তােমাদের কাছে কিছু অসাধ্য তাে নয়।
পুরুষের হৃদয়েতে নাই ভালবাসা,
পুরাতন ফেলে সদা নূতনেতে আশা।
তােমাকে বলিব বা কি জাতেরই ধারা,
কুলবতী কামিনীকে করে কুল ছাড়।
অকূল পাথারে যবে যায় সে ভাসিয়া,
কূলে দাড়াইয়া হাসে হাতে তালি দিয়া।
দয়ামায়া হৃদে কভু স্থান নাহি পায়,
সুধু স্ব স্ব স্বার্থ সবে সাধিয়া বেড়ায়।
তােমারে পাবার আশা হইয়া অনল,
পোড়ায়ে মারিত যদি সে ছিল মঙ্গল।
বিচ্ছেদের তুষানল হতে বাঁচা যেত,
দগধে দগধে মােরে পােড়াতে না পেত।
এত বলি চন্দ্রাবলী কঁদিতে লাগিল,
বদন চুমিয়া শ্যাম সান্ত্বনা করিল।
অবুঝের মতাে কেন করিছ নােদন,
সাধে কি ছাড়িতে চাই তােমা হেন ধন ?
মান-মিলন
আমারে দেখিলে হেথা লােকে কি বলিবে?
তব অকলঙ্ক নামে কলঙ্ক হইবে।
কাহারাে নিকটে মুখ দেখাতে নারিবে,
ক্ষণ সুখ তরে কেন তােক হাসাইবে ?
চুপে চুপে নিতি নিতি আসি যাই,
গােপনে গােপনে মোরা সাক্ষাৎ করিব।
ছেড়ে দাও করাে না গো আর টানাটানি,
জাগিলে পাড়ার লােক হবে জানাজানি।
আসিতে পাব না আর আলয়ে তােমার,
এই বুঝি শেষ দেখা তােমার আমার।
পেট ভরে খেয়ে উপবাস ভাল নয়,
নিতি নিতি খাওয়া ভাল পেটে,যাহা সয়।
বুঝে সুঝে করে কাজ যা হয় বিচারে,
শেষে যেন অনুযোগ দিওনা আমারে
শান্ত হয়ে চন্দ্রাবলী মুছিল নয়ন,
কহিতে লাগিল শ্যামে মধুর বচন।
তােমার অধিক মাের আছে সে ভাবনা,
সেজন্য তােমার নাই ভয় সম্ভাবনা।
আগে লুকাবার স্থান করিয়া রেখেছি,
তবে তো তােমায় বঁধু ডাকা’য়ে এনেছি।
হৃদয়ের মাঝে বেছে গােপনীয় শান,
সষতনে গড়িয়াছি ঘর একখান।
মান-মিলন।
বিশ্বাসের
আশাবতী সহচরী যতন করিয়া,
আমার লাগিয়া ঘর দিয়াছে বাঁধিয়া।
খুঁটা তাহে লাগা’য়ে রেখেছি,
আশক্তির ঠাট পরে জুড়িয়া দিয়েছি।
শ্রদ্ধার ছাউনি দিয়ে ছাইয়াছি ঘরে,
অনুরাগ দ্বার লাগায়েছি ভাল করে।
ভাব দিয়ে বেড়া তার চারিদিকে আঁটি,
ভকতিতে লেপিয়া করেছি পরিপাটী ।
প্রেম সিংহাসন তাতে রাখিয়াছি পেতে,
তােমারে বসা’ব বঁধু তাহে যতনেতে।
তবে কেন প্রাণনাথ কর এত ভয় ?
সহস্র খুঁজিলে কেহ পাবে না নিশ্চয়।
বড়ই সাধের ঘর বিচ্ছেদ আগুনে,
পােড়াওনা প্রাণকান্ত, রাখ দয়াগুণে।
যেওনা যেওনা বঁধু মাের মাথা খাও,
স্ত্রীবধের ভাগী হবে যদি ছেড়ে যাও।
বিষ খাব কিংবা গলে মারিব কাটারী,
যদি নাথ চলে যাও অধিনীরে ছাড়ি।
মনের যতেক কথা বলিনু ভাঙ্গিয়া,
যাহা ইচ্ছা হয় কর ধরম ভাবিয়া।
ছেড়ে যাবে ব'লে যদি করেছিলে মনে,
তবে কেন অবলা মজা’লে অকারণে?
৩
3
মান-মিলন।
কুলনারী ছিনু আমি দাড়াইয়া কুলে,
সুখ বিনে দুখ বার্তা জানি নাই ভুলে।
অকস্মাৎ কোথা হতে এসে দেখা দিলে,
নয়ন বাণেতে বিঁধে জর্জর করিলে।
ব্যথায় অস্থির হয়ে ঘুরিতে ঘুরিতে,
পড়িয়া গেলাম তব রূপ জলধিতে।
আমি সাগরেতে, তুমি রয়েছ তাে কূলে,
এ অভাগিনীরে বঁধু লহ লহ তুলে।
এতবলি চন্দ্রাবলী নীরব হইল,
চতুরের চূড়ামণি কহিতে লাগিল।
তুমি তাে রাখিবে মােরে গােপন করিয়া,
পিতা মাতা কি ভাবিবে মােরে না দেখিয়া ?
পলকের তরে মাের না হেরি’ বদন,
ব্যাকুল বেদনে তারা করয়ে রােন
চারিদিকে লােকজন দিবে পাঠাইয়া,
নানাস্থানে বেড়াইবে আমারে খুজিয়া।
ব্ৰজের কোনই কুঞ্জ বাকী না রাখিবে,
সব অন্তঃপুর মাঝে দাসী পাঠাইবে।
খুঁজিবে সকল স্থান তন্ন তন্ন করি',
জিজ্ঞাসিলে তােমারে কি বলিবে সুন্দরি ?
লজ্জা পেয়ে অবশেষে যাইতে হইবে,
উভয়ের নামে কত কলঙ্ক রটিবে
মানমিলন।
জেনে শুনে হেন কাজ বল কেবা করে,
দুইদিক রক্ষা হবে ছেড়ে দাও মােরে।
চন্দ্রাবলী বলে যদি একান্ত যাইবে,
আর কিছুক্ষণ হেথা থাকিতে হইবে।
রজনা প্রভাত হতে বিলম্ব তাে আছে,
সেই লাভ যতক্ষণ থাকো মাের কাছে।
দেখ যেন ভুলিও না তব এ দাসীরে,
নিতি নিতি এসে দেখা দিও অভাগীরে।
কিন্তু এক ভয় সদা অন্তরে আমার,
পাছে ভুলে যাও হ'লে নয়নের আড়।
শ্ৰীমতীর প্রেম ভােরে পড়িয়াছে টান,
এ সকল বাক্য শ্যাম শুনিতে না চান।
নাগরীরে বলে হাসিয়া হাসিয়া,
লাভ কি হইবে বল বিলম্ব করিয়া ?
এখন গেলেও যাব, তখনও তাই,
দণ্ডেক অধিক থেকে কোনাে ফল নাই
বরঞ্চ এখন যেতে শঙ্কা নাহি মানি,
দণ্ডেকের পরে ভয় লােক জানাজানি।
হেন বাক্য জালে নাগরীরে বুঝাইয়া,
গেল শ্যাম রাধাকুঞ্জে বিদায় হইয়া।
ললিতা প্রহরী ছিল নিকুঞ্জের দ্বারে,
হেনকালে শ্যামৰ্চাদ দেখা দিল তারে।
হেরিয়া নাগরে হলো পুলকিত মন,
প্রণয় কোপেতে কহে কপট বচন ।
মান-মিলন।
(১২)
কে হে তুমি বটে, কহ অকপটে, কেন হেথা আগমন ?
কিবা তব নাম, কোন্ দেশে ধাম, কি তােমার প্রয়ােজন?
ঢুলু ঢুলু আঁখি, নেশা খাও নাকি? চোখ যে মেলিতে না ;
টলমল অঙ্গ, এ কেমন রঙ্গ, সোজা না চলিতে পার।
আলু থালু বেশ, এলো মেলাে কেশ, দংশনের চিহ্ন গায় ;
সিন্দুরের দাগ, তাম্বুলের রাগ, বদনেতে শােভা পায় ।
বসনের ভার, সহে না তােমার, তাই বুঝি খসে পড়ে;
করে কত টঙ্গ, মেখে কালো রঙ্গ, এসেছ চাতুরী করে।
গােকুল মাঝারে, আমরা তােমারে, কখনই দেখি নাই ;
এত রাত ক'রে, বনের ভিতরে, দেখে মাের ভয় পাই।
মােরা সবে নারী, বুঝিতে না পারি, কেন এলে হেন বেশে;
তােমার বদন, করি’ নিরীক্ষণ, মনেতে সন্দেহ এসে।
লম্পটের বেশ, কপটের শেষ, সহজ মানুষ নও
এখনি এমন, পেলে রাজ্য ধন, না জানি যে কিবা হও।
হেন মনে লয়, ধূর্ত নিরদয়, তােমার সমান নাই ;
তুমি চেনা যায়, সে অভাগিয়ার, ত্রিভুবনে নাহি ঠাঁই।
শুনি পরে পরে, শ্ৰীনদের ঘরে, জন্মেছে অদ্ভুত ছেলে ;
বরণ তাহার, জিনিয়া অঙ্গার, তুলনা নাহিক মেলে।
একে তো প্রাচীন, তাহে পুত্রহীন, ছিল রাজা মনটদুখে ;
এমন সময়, পাইয়া তনয়, ভাসিতে লাগিল সুখে।
দরিদ্র যেমন, পাইলে রতন, চলেতে বেঁধে রাখে ;
হেন শােনা যায়, রাজা রাণী তায়, রাখে সদা কাখে কঁাখে
মানমিলন।
আদর পাইয়া, মাথায় চড়িয়া, বেড়েছে বুকের পাটা;
কত অত্যাচার, করে অনিবার, ব্ৰজে থাকা হলো ল্যাঠা।
গােপিনীরঘরে, ননী চুরি করে, দধি ভাণ্ড ভেঙ্গে ফেলে;
যদি তাড়া খায়, দু চক্ষু রাঙ্গায়, এমনি বিষম ছেলে।
শুনিনু শ্রবণে, ব্রজনারীগণে, যমুনায় গিয়েছিল ;
রাখিয়া দুকূলে, কালিন্দীর কূলে, সবে জলে ঝাঁপ দিল।
রাজপুত্র নাকি, দেখে দূরে থাকি, বসন লইল হরি;
কেমন নিলাজ, করিল এ মজ, লাজ ভয় পরিহরি।
গগাপিনী
সকল, আনিবারে জল, যমুনায় যায় যবে ;
আঁচলেতে ধরে টানাটানি করে, অপমান করে সবে।
আহিরিণী নারী, সহিতে না পারি, তার অত্যাচার যত
হয়ে অগ্নি প্রায়, আসি যশােদায়, শুনাইল কথা কত।
লাজ পেয়ে রাণী, হয়ে অভিমানী, রাখিল ছেলেকে বেঁধে
খুলিতে বলিল, তবু না খুলিল, সারা হলো কেঁদে কেঁদে।
আমাদের রাণী, কেন যে কি জানি, বেড়াতে বেড়াতে শেষে ;
নন্দের বাড়ীতে, মােদের সহিতে, উপনীত হ'লো এসে।
ধরে হাতে পায়, ছেলেটি তঁাহায়, বলিল মােচন তরে ;
দয়াময়ী রাই, শুনিয়া তাহাই, খুলে দিল ত্বরা করে।
দেখিয়া তোমাকে, মনে পড়ে তাকে, তুমি-ই বা হবে সেই ;
হেন কালো আর, গােকুল মাঝর, আর কারো ঘরে নেই।
ভাল মুখে বলি, শীঘ্র যাও চলি, করিও না আর দেরী ;
না গেলে চলিয়া, কোটালে বলিয়া, হাতে পাইব বেড়ী।
•
;
মান-মিলন।
AAAAA
রাইয়ের দুয়ারে, অসি ল'য়ে ঘাড়ে, কোটাল হাজির রয়,
যাহার যেমন, দোষের গণন, শাসন তেমনি হয়।
ন্যায়ের বিচার, এক চুল তার, এদিক ওদিক নয়;
দেশে আর দশে, ঘেষে রাই যশে, প্রজা সব গায় জয়।
রাজপুত্র বলে, তােমারে সকলে, মানিবে ভেবেছ মনে ;
শ্ৰীমতী আজ্ঞায়, বাঁধিয়া তােমায়, নিবে নদ নিকেতনে।
করি হে বারণ, কেন, অকারণ, এত অপমান হবে ;
লয়ে নিজ মান, করহ পয়ান, কেহ না জানিবে তবে।
(১৩)
ললিতার প্রতিকহিলা শ্রীপতি, বাঁশরী বাজিল যেন ;
আসিলে নিশিতে, পারিতে চিনিতে, এখন চিনিবে কেন?
রাত্রে চেনে যারে, দিনে ভােললা তারে,এই তোমাদের রীতি;
এদিকে সরল, জান বেশ ছলা, শিখেছ উত্তম নীতি।
করেছিনু মনে, আসিব কাননে, যত তাড়াতাড়ি পারি;
কৈফতের দায়ে, যেতেম এড়ায়ে, এবে দেখি ল্যাঠা ভারি।
আসিবার তরে, সাজ গােছ করে, বাহির বাড়ীতে গেনু ;.
কেমন করিয়া, বন্ধন ছিড়িয়া, পলাইল এক ধেনু।
পিতা মহাশয়, মােরে ডেকে কয়, ঝটিতি বাঁধিতে তায় ;
বাঁধিতে যাইয়া, আছাড় খাইয়া, আঁচর লাগিল গায়।
সেই সে কারণ, নীলিমা বরণ হ'য়েছে শরীর’ পরে ;
তাই দেখে আজ, বৃথা দাও লাজ, দংশনের সন্দ করে।
পরেতে জননী, আসিয়া অমনি, যতনে মুছায়ে দিল ;
ঘরেতে লইয়া, কোলে বসাইয়া, ক্ষীর ননী খাওয়াইল।
মান-মিলন।
কিছুকাল বাদে, বিধাতার বাদে, খুড়া মহাশয় এলাে ;
দুই ভাই মিলে, গল্প ফেঁদে দিলে, নিশি ক্রমে বেড়ে গেলো।
হেয়ে উপায়, গিয়ে বিছানায়, পড়িলাম মাথা ঘুরে ;
বিরহ আগুন, জ্বলিল দ্বিগুণ, নিদ্ৰা পলাইল দূরে।
কথায় কথায়, র’লো দুনায়, দ্বিপ্রহর হয়ে গেলাে ;
ক্ষণেক এ পাশ, ক্ষণেক ও পাশ, করে করে ঘুম এলাে।
শুইবার কালে, পাণ ছিল গালে, মুখ হ’তে গেছে পড়ে ;
সেই সে কারণে, বদনে বসনে,'তার দাগ গেছে ধরে।
নিদ্রার আলসে, বস্ত্র গেছে খসে, কেশ পাশ এলােমেলো
জাগিয়া উঠিয়া, আসিনু ধাইয়া, সাজ করা নাহি গেলাে।
আজ বৈকালেতে, মােদের গৃহেতে, সুবচনী বাটা ছিল ;
আদর করিয়া, সিন্দুর লইয়া, মা আমারে ফোঁটা দিল।
হেরে সেই দাগ, করিতেছ রাগ, শুনাতেছ কথা কত ;
বিধাতা সদয়, পেয়েছ সময়, বল বল ইচ্ছা যত।
কিন্তু জেনো সার, এই কালীয়ার সুশীলা রাধিকা প্রাণ ;
রাধিকা বিহনে, অন্য কোন জনে, হৃদে নাহি পায় স্থান।
অঙ্গার মতন, আমার বরণ, মােরে ব্যঙ্গ কর তেঁই ;
অঙ্গার মহিমা, নাহি জান সীমা, শশানাে পরিচয় দেই।
নিজে বটে কালো, গুণ আছে ভাল, লাগে পর উপকারে
মাজিয়া অঙ্গারে, ধুলে জল ধারে, জিনিসের মলা ছাড়ে।
বেশ ভূষা কালে, গৌরাঙ্গীর ভালে,কালো ফোটা দিলে পরে ;
তখন তাহার, বাড়ে যে বাহার, মুনি জন মন হরে।
মান-মিলন।
•
নয়ন অঞ্জন, কালীয় বরণ, কালো পক্ষম কালাে মণি ;
যেন মধুকরে, বক্ষ পরে ধরে, হাসে সরােজিনী ধনী।
তব সহচরী, জাগিয়া শর্বরী, হয়েছে মলিন বলে ;
ল’য়ে মম কায়, ঘ’সে তার গায়, ধুয়ে দাও প্রেমজলে।
দেখিবে তখন, উজল কেমন, হইবে বরণ খানি;
কঁচা স্বর্ণ প্রায়, হবে আভা তায়, ভাল মতে ইহা জানি।
যদি এ কথায়, সন্দেহ না যায়, ল’য়ে চল তার কাছে
সম্মুখে থাকিয়া, লও পরখিয়া, তাতে কি আপত্তি আছে ?
(১৪)
এতক্ষণ ধরে, বৃন্দা চুপ করে, সেখানে দাঁড়ায়ে ছিল
সহিতে না পারি, এত বাড়াবাড়ি, তখন উত্তর দিল।
আই আই আই, লাজে মরে যাই, শুনে রাখালের বাণী ;
মুখে আসে যাহা, বলে যায় তাহ, গুরু লঘু নাহি মানি’!
রাখালের সনে, সদা ফিরে বনে, রাখালিয়া বুদ্ধি ধরে ;
ভদ্র আচরণ, শেখেনি কখন; জন্মিয়া রাজার ঘরে।
ধিক্ ধিক্ তারে, ধিক্ শতবারে, সেদিকেতে দৃষ্টি নাই;
ধনী লােক তায়, দেখিতে না পায়, দূরে দূরে থাকে তাই।
চোরের সর্দার, তাই অহঙ্কার, হােট মুখে বড় কথা;
কোন্ সাহসেতে, এসে এখানেতে, করিতেছে রসিকতা?
ও রাখাল, আকাশ পাতাল, ব্যবধান কম নয় ;
রাধা পূর্ণ শশী, শ্যাম অমামসী, কিসে সমতুল হয়।
হইয়া নিগুণ, গায় নিজ গুণ, কথা শুনে হাসি পায়,
বমিন হইয়া, হাত বাড়াইয়া, চঁাদ ধরিবারে যায়।
;
মান-মিলন।
১
•
রস বাতে ভার, করিয়াছে যার, সে যেন দৌড়িতে চায় ;
ইহার ও তেমন, শ্ৰীমতী-মিলন, মনে মনে সাধ যায়।
রাইকে দেখিয়া, চোক ঝলসিয়া, ঘুরে গেছে ওর মাথা ;
হয়ে জ্ঞান হত, পাগলের মতো, গাইছে প্রলাপ গাথা।
ডেকে যশােদারে, এই বেলা তারে, দিয়ে এস তার কাছে ;
নন্দেরে কহিয়, বৈদ্য আনাইয়া, দেখুক কি হইয়াছে।
বৃন্দার বচনে, ব্যথা পেয়ে মনে, হতাশ হইল কালা ;
কহে সবিনয়ে, ব্যাকুলিত হয়ে, অন্তরে পাইয়া জ্বালা।
কৌতুক রাখিয়া, দেহ দেখাইয়া, কোথায় হৃদয়েশ্বরী ;
সারানিশি আজি, না হেরে প্রিয়াজী, আমি যে পরাণে মরি।
কোথা মোর হয়ে, দুটো কথা কয়ে, মানাইবে মানিনীরে,
সে কাজ না করে, তাড়াইছ মােরে, অশনি হানিয়া শিরে।
বিপদ সময়, যে দেয় আশ্রয়, তারি যশ লােকে ঘষে ;
অনাথ দেখিয়া, না চাহে ফিরিয়া, তারে চরাচরে দোষে।
দুখ জলধিতে, ভাসিতে ভাসিতে, এসেছি তােমার কাছে ;
যদি দয়া করে, তুলে লও মােরে, তবে তাে পরাণ বাঁচে।
ব্যাকুল হইয়া, হাত বাড়াইয়া,
দিনু ধরিবার তরে;
বদন ফিরায়ে, রয়েছ দাড়ায়ে, বল গো কেমন করে।
যদি চেষ্টা করে, উঠিগে উপরে, তাহাতেও সেধে বাদ
নিঠুর হইয়া, পথ অগুলিয়া, ঘটাতেছ পরমদ।
বিরহ অনলে, একে মরি জ্বলে, তাতে হান বাক্যবাণ ;
বাহিরে ভিতরে, দগ্ধ হ'লে পরে, কেমনে বাঁচিবে প্রাণ ।
??
১২
মান-মিলন।
;
করি গাে মিনতি, তােমাদের প্রতি, কুঞ্জ মাঝে চল নিয়া
প্রিয়ার বদন, কর’য়ে দর্শন, জুড়াও তাপিত হিয়া।
( ১৬ )
করুণ বচন, করিয়া শ্রবণ, মলিন বদন হেরে ;
সখীদের মন, গলিল তখন, রাগ দ্বেষ গেল ছেড়ে।
বৃন্দাদূতী তবে, বলিছে মাধবে, শোনহে রসিক রাজ;
মানিনীর মান, বজ্রের সমান, ভাঙ্গা নহে তব কাজ।
আগে আমি গিয়া, আসি টের নিয়া, মানের অখুটি কত ;
ভাব অনুসারে, হয় বিচারে, করা যাবে সেই মতাে। -
আগে তুমি যাবে, ফল নাহি পাবে, ভাঙ্গিতে নারিবে মান ;
মাঝে থেকে ওঁর, বাড়িবে কদর, তুমি হবে অপমান।
একথা বলিয়া, শ্যামে প্রবােধিয়া, চলিল নিকুঞ্জ মাঝে ;
যথা বিনােদিনী, বসে একাকিনী, সাজিয়া মানের সাজে।
নিকটে যাইয়া, নীরবে চাহিয়া, রহিলে কতক্ষণ ;
পরে হেসে হেসে, কহে রসে ভেসে, শােননা সখি দিয়ে মন।
যাঁহার কারণ, হেথা আগমন, রহিলাম নিশি জাগি
মানিনী সাজিয়া, রয়েছ বসিয়া, এতক্ষণ যার লাগি ।
বিহনে যাহার, নিকুঞ্জ আঁধার, চারিদিক তমােময়;
সে জন আসিয়া দ্বারে দাঁড়াইয়া, আনিতে কি আজ্ঞা হয় ?
বিরহ অনল, হইয়া প্রবল, দহিতেছে তার হিয়া ;
উষ্ণ অশ্রুজল, ঝরিছে কেবল, তাহার নয়ন দিয়া।
বদন তাহার, পাণ্ডুবর্ণ সার, হয়েছে লাবণ্যহীন;
এক নিশি তরে, না হেরিয়া তােরে, হইয়াছে অতি ক্ষীণ।
।
মান-মিলন।
৪
চেয়ে পথ পানে, কণ্ঠাগত প্রাণে, রয়েছে তৃষিত প্রায় ;
শুভ বার্তাবারি, যদি দিতে পারি, তবে সে পরাণ পায় !
বিধির বিপাকে পড়েছিল পাকে, আসিতে নারিল তাই ;
এই বুঝে মনে, ক্ষম গাে এখনে, তাতে কোনাে লজ্জা নাই।
( ১৭ )
বৃন্দার বচনে, ক্রোধ করে মনে, ফিরিয়া বসিল রাই ;
বলিছে তখন, করিয়া গর্জন, দয়া মায়া লেশ নাই।
তােমার মতন, নিলাজ এমন, দেখি নাই আমি আর ;
কেন গো সেকথা, বলিছ অযথা, মাের কাছে বার বার ।
শক্রর মতন, কর আচরণ, কেন গো আমার সাথে?
সে নাম কি বলে, শােনাও কৌশলে, অঙ্গ জ্বলে যায় যাতে।
নিভানো অনল, জ্বালা’য়ে কি ফল, হইবে তােমার সই ?
তাের আচরণে, বুঝিলাম মনে, আমি তাের কেহ নই।
যাহারে দেখিতে, নাহি লয় চিতে, কেন বল তার কথা?
আনিতে তাহারে, নিকুঞ্জ মাঝারে, তাের কেন মাথা ব্যথা ?
যাহার কথায়, নিকুঞ্জে আসায়, জ্বলাই হইল সার ;
সে কি না এখন, ল’য়ে অন্য জন, সুখ করে আপনার।
মান অপমান, ধর্মাধর্ম জ্ঞান, যাহার নাহিক বােধ ;
তাহার সহিতে, আবার মিলিতে, কেন কর অনুরোধ ?
রতন ভাবিয়া, যতন করিয়া, করেছিনু যারে মালা
কেমনে সে জন, করিল দংশন, সহিতে নারি যে জ্বালা।
বিষের জ্বালায়, জ্বালা’ল আমায়, ভিতর হইল কালো ;
এ বর্ণ আমার, নহে ঘুচিবার, পরাণে পশিল ভালো।
১০
মান মিলন।
•
চুণ খেয়ে যার, মুখ একবার, পুড়িয়া গিয়াছে সই ;
হয় মনে তার, ভয়ের সঞ্চার, যদিও সে দেখে দই।
যার কথা এনে, বল এত টেনে, সে তাে বিষধর ফণী
জেনে শুনে তারে, বল কি প্রকারে, করিব কণ্ঠের মণি ?
বদন মলিন, তনু তার ক্ষীণ, হইয়াছে নিশি জাগি;
চাতুরী বচন, করেছে রচন, সবে ভুলাবার লাগি।
তুমি তাে সরল, নাহি বুঝ ছলা, না বুঝ কপট বাণী ;
এত কাল ধরে, সদা সঙ্গ করে, তার তত্ত্ব নাহি জানি।
উপরে উপরে, ভদ্র বেশ ধরে, যেন কোনাে দোষ নাই ;
ভিতর তাহার, সদা চক্রাকার, চক্রধর নাম তাই।
ভালবেসে নাকি, পড়েছি একাকী, চোরের দায়েতে ঠেকা,
নিয়ে অন্য ধনী, বঞ্চিবে রজনী, আমারে ফেলায়ে একা?
তােমরা আমার প্রাণের আধার, প্রাণের অধিক মানি
জেনে শুনে মেরে, কোন্ প্রাণ ধরে, দিতেছ গরল আনি’?
আমার সহিতে, থাকিতে থাকিতে, ভালাে নাহি লাগে আর ;
মারিয়া আমারে, দায় এড়াবারে, অভিপ্রায় সবাকার।
ধরি তব পায়, ব’লােনা আমায়, সে বিষধরের কথা;
আসিতে না দিয়া, দেহ তাড়াইয়া, চলে যাক যথা তথা।
( ১৮ )
রাই কথা শুনি, হইয়া আগুনি, দূতী কহে ক্রোধে অতি ;
মঙ্গল বচন, না কর শ্রবণ, হইয়াছে ছন্ন মতি।
যে রােগীর’ পরে, মৃত্যু চেপে পড়ে, ঔষধ না খেতে চায় ;
করমের ফেরে, রােগ যায় বেড়ে, শেষে করে হায় হায়!
;
মান-মিলন।
৪৫
তােমারে ও তাই, দেখিতেছি রাই, সময় হারাও হেলে ;
হেন ভক্ষণ, পাবেনা কখন, বঁধুয়া চলিয়া গেলে।
দুই দিন পরে, রাগ যাবে প'ড়ে, একথা ভুলিয়া যাবে ।
তখন হাজার, মাথা কুটে আর, দরশন নাহি পাবে।
মন প্রাণ দিয়া, তােমারে কালীয়া, সততই ভাল বাসে ;
কোন্ প্রাণে তারে, রাখিয়া দুয়ারে, আসিতে না দাও পাশে?
তোমার মতন,
কঠিন এমন, কেহ নাই এ ধরায় ;
মনের মানুষে, অল্প দোষে দূষে, কেবা কবে ঠেলে পায় ?
এই ধরাতলে, জানে তো সকলে, পুরুষ পরশ মণি ;
তাহার সহিতে, তুলনা করিতে, রমণী কি ছার গণি।
নারী জন্ম ধরে, কি সাহস করে, এত তেজ কর তবে ?
আমার বচন, করিবে স্মরণ, কাদিতে হইবে যবে।
মানা করি তাই, ফিরাও না, রাই, তােমার নাগর চাদে
এই কালীয়ায়, পাবার আশায়, কত গােপিনীরা কাঁদে।
হাত ছাড়াইয়া, ঘুরিয়া ফিরিয়া, পড়িবে কাহারো করে ;
ধরিয়া সে ধনী, রাখিবে তখনি, বাঁধিয়া প্রেমের ডােরে।
কহি গাে বিশেষ, মম উপদেশ, শোেননা যদি দিয়ে কাণ;
সাপ ও মরিবে, লাঠী না ভাঙ্গিবে, অটুট রহিবে মান।
আজ্ঞা দাও মােরে, ধরিয়া নগরে, নিয়ে আসি তব কাছে ;
দোষের মতন, করিও ভৎসন, মনে তব যত আছে।
চরণ ধরিয়া, কঁদিয়া কাঁদিয়া, আকুল হইবে যবে ;
পরিহরি' রােষ, ক্ষমা করো দোষ, দুই দিক রক্ষা হবে।
:
মান-মিলন।
••
তাহা না করিয়া, যদি মান নিয়া, অহঙ্কারে থাকো বসি
অনুতাপানলে, মরিবে যে জ্বলে, ফিরে গেলে কালো শশী।
উলটি তখন, ধরিয়া চরণ, নিজেই সাধিতে যাবে
তবু ও তাহারে, ফিরে আনিবারে, কখনই নাহি পাবে।
এত মান তবে, হত মান হবে, থাকিলে মানিনী বেশে;
এখন যে জন, ধরিবে চরণ, ধরাবে চরণ শেষে।
আমি বলি তাই, শোনাে ওগগা রাই, তোমারি হিতের তরে ;
আমরা যাইয়া, আসি তারে নিয়া, তুমি থাকো মান ভরে।
( ১৯ )
কত মতে বৃন্দা সখী বুঝাতে লাগিল,
শ্ৰীমতী তাহার কথা কাণে না তুলিল।
উলটি তাহারে আরো করিল ভৎসনা,
হেথা কেন এলে করিবারে দূতীপনা ?
তব প্রভূ নিশি পােহায়েছে যার সনে,
পুরস্কার পাবে যাও তাহার সদনে।
তােমার রকম দেখে অঙ্গ যায় জ্বলে,
আমার দুঃখেতে তুমি হাস কিবা বলে ?
বাঁশীতে তােরেও বুঝি বশ করিয়াছে,
ভাল মন্দ বিচারের শকতি গিয়াছে।
অবাক হয়েছি আমি তব ব্যবহারে,
আর কোন্ মুখে বলে ডাকিতে তাহারে ?
শুনিতে না চাই আমি কারাে কোনাে কথা,
তবে কেন হেথা এসে বকিছ অযথা
মান-মিলন।
৪৭
যথা ইচ্ছা তথা তারে বল তুমি যেতে,
আর যেন নাহি এসে আমার কুঞ্জেতে।
আমা হতে প্রিয় তব হইল যে জন,
ইচ্ছা হয় তার সনে করহ গমন।
তােমারি কথায় গলে দিমু এই ফাঁস,
দড়ি ধরে টেনে এবে কর উপহাস।
ছলনার কথা এত শিখেছ যেথায়,
শত শত নমস্কার সে গুরুর পায়।
তােমার চাতুরী জালে ভুলে একবার,
যে শিক্ষা পেয়েছি, পুন নাহি ভুলি আর ।
মিছেমিছি আর তুমি বকাওনা মােরে,
চ'লে যাও হেথা হতে যথা মন সরে ।
এত বলি বিনােদিনী মুখ ফিরাইল,
বৃন্দ। সহচরী তবে বলিতে লাগিল।
আপনার দোষ তুমি না দেখ নয়নে,
বিনা দোষে দোষী কেন কর অন্য জনে?
এক দিন শ্যাম চাদে দেখাইব বলে,
তােমারে লইয়াছিনু যমুনার জলে।
সেই দেখা দেখে বাঁধা পড়লে আপনি,
এখন আমারে দোযযা,—বিচার এমনি।
ক্ষুদ্র রত্ন নহে সে যে সিন্ধুকে থাকিবে,
সর্বত্র ভূমিবে সদা-সবাই দেখিবে।
১৮
মান-মিলন।
আরাে তাে রমণী আছে গােকুল মাঝারে,
পাগল হয়েছে কেবা দেখিয়া তাহারে ?
আপনার দুর্বলতা নাহি দেখ চোখে,
বৃথা দোষে দোষী এবে কর অন্য লােকে।
হিত উপদেশ আমি আসিলাম দিতে
কপালের দোষে হলো দোষ ভাগ নিতে।
যাহা ইচ্ছা কর আর কিছু বলিব না,
শেষে আর কোনাে অনুরােধ শুনিবনা।
লােকে বলে যার বিয়ে তার নাই মনে,
প্রতিবেশী ঘুম ত্যজি খাটে সর্বক্ষণে।
তুমি যদি নাহি চাও আনিবারে তায়,
আমাদের এত কিবা পড়ে গেছে দায়!
এখনি নিকুঞ্জ হতে বের করে দিব,
কার তরে আশা দিয়ে তাহারে রাখিব ?
এত বলি বকিতে বকিতে ক্রোধ ভরে,
আসিলেন বৃন্দা দূতী শ্যামের গােচরে।
মনােভাব গােপন করিয়া শ্যামে কয়,
যে মান হয়েছে বড় সহজ তাে নয়।
তােমার হইয়া কত বুঝালেম তারে,
কিছুতে না পারিলাম মান ভাঙ্গিবারে।
কাঞ্চণ ত্যজিয়া কেন কঁাচে দিলে মন ?
নিজ দোষে হারাইলে এ অমূল্য ধন
মান-মিলন।
০৯
কোনাে মতে নারি তারে করিবারে দোষী,
তব লাগি কাদিয়াছে সারা নিশি বসি।
নিজ পায়ে নিজ হাতে মেরেছ কুঠার,
চলে যাও হেথা হ'তে লাভ নাহি আর।
( ২০ )
আশায় বাঁধিয়া বুক ছিল শ্যাম রায়,
মাথায় পড়িল বাজ বৃন্দার কথায়।
কাতর হইয়া তবে বলিতে লাগিল,
এত দিনে বিধি বুঝি নিদয় হইল ।
দয়া করে তার কাছে ল'য়ে চল মােরে,
একবার সেধে দেখি হাতে পায়ে ধরে।
কি উত্তর দেয় মােরে বিনােদিনী রাই,
তাহার মুখের কথা শুনে আমি যাই।
একান্তই যদি মােরে যেতে হয় ফিরে,
ত্যজিব এ ছার প্রাণ যমুনার নীরে।
সহিতে নারি তার বিরহ অনল,
রাই যারে বাম তার জীবনে কি ফল?
মরিবার পূর্বে আমি দুনয়ন ভরে,
প্রাণ প্রেয়সীরে দেখে যাই ভাল করে।
শ্যামের কথায় সবে হইল কাতর,
বৃন্দা ঊীরে লয়ে গেল নিকুঞ্জ ভিতর।
শ্যামেরে আসিতে দেখে মানিনী কিশােরী,
ফিরিয়া বসিল অঙ্গ বসনে আবরি'।
৪
মান-মিলন।
;
নিকটে দাড়ায়ে শ্যাম চোরের মতন,
বলিতে লাগিল তারে করুণ বচন।
( ২১ }
একি অপরূপ, দেখি তব রূপ, এরূপ বিরূপ কেন ?
আমারে দেখিয়া, কথা না কহিয়া, রয়েছ অচেনা যেন।
আরো চমৎকার, দেখি যে তােমার, ব্যবহার মাের প্রতি ;
যাহা অসম্ভব, করিতে সম্ভব, হইয়াছ যত্নবতী।
মেঘ কি কখন, হয় সমর্থন, লুকা'তে দামিনী ছটা ?
নীলাম্বরী দিয়া, রূপটি ঢাকিয়া, বাড়ালে রূপের ঘটা।
কিবা অপরাধে, দোষী ও ঐপাদে, বলে দাও মানময়ী
তব তােষ তরে, প্রায়শ্চিত্ত করে, পাপ হতে মুক্ত হই।
বিচ্ছেদ অনলে, সারা নিশি জ্বলে, একেতে হয়েছি সারা;
তাহার উপরে, মান দায়ে পড়ে, আমি তো যাইব মারা।
তাড়াতাড়ি করে, সুধার সাগরে, আসিনু জুড়াতে কায়;
দুরাদুষ্ট ফলে, সুধার বদলে, গরল উঠিল তায়।
শােননা প্রাণেশ্বরি, অনুনয় করি, বারেক ফিরিয়া চাও;
অমৃত বচন, করিয়া সেচন, শীতল করিয়া দাও।
আসিবার তরে, সব ঠিক করে, খু জিতে ছিলাম ফাঁক ;
বিধির বিপাকে, নিজে পড়ে ফাঁকে, ঘুচেগেল সব আঁকি।
সে দুখের বাণী, জানে বৃন্দারাণী, ললিতাও সবিশেষ
তা’হতে শুনিয়া, বধ কি লাগিয়া, নাহি কি দয়ার লেশ?
তিলেক লাগিয়া, যারে না হেরিয়া, বাহিরায় মম প্রাণ ;
কোন প্রাণ ধরে, হানিছে সে মােরে, মান রূপ বিষণ?
মান-মিলন।
;
তুমি মম জপ, তুমি মম তপ, তুমি নয়নের মণি ;
তুমি মম ধ্যান, তুমি মম জ্ঞান, তােমা ধনে আমি ধনী।
আমি দেহ ছার, তুমি প্রাণ সার, আমি মীন তুমি বারি;
বল গো কেমনে, তােমার বিহনে, বাঁচিয়া থাকিতে পারি।
তুমি মম আশা, তুমি মম বাসা, তুমি মম কৰ্ম্ম কাজ ;
অশনে বসনে, শয়নে স্বপনে, বিরাজিছ হৃদি মাঝ।
প্রাণ বের হলে, দেহকার বলে, টিকিয়া থাকিতে পারে ?
তুমি যদি মােরে, যাও ত্যাগ করে, মরে যাব একেবারে।
তুমি তাে আদরে, দিয়েছ গাে মােরে, রাধিকা বল্লভ নাম ;
আমিও তােমারে, রেখে বাম ধারে, মিশে হই এক ঠাম।
সে যুগ বন্ধন, যদি গো এখন, কেটে ফেলে। জোর করি
কেমন করিয়া, অর্ধ দেহ নিয়া, বাঁচিব গাে প্রাণেশ্বরি?
অলপ বয়সে, পড়ে প্রেম রসে, অকালে মরিতে হলে
মনের বাসনা, কিছু মিটিলনা, এই দুঃখ মনে র’লো।
তােমার চরণে, ঢেলে প্রাণ মনে, নিশ্চিন্ত হইয়া আছি ;
তুমি যদি মার, মারিতেও পার, বাঁচালে পরাণে বাঁচি।
শােনাে প্রাণেশ্বরি, মােরে কৃপা করি, রক্ষা কর দাস ভেবে ;
এ আশ্রিত জনে, বধিলে এখনে, সাধিয়া কলঙ্ক নেবে।
বরঞ্চ বাঁচিলে, কাজেতে লাগিলে, লাগিতেও পারি কত ;
যদি প্রাণে মরি, যাব পরিহরি, চির জনমের মত।
এত অল্প দোষে, অসীম আক্রোশে, বধিয়া কি ফল পাবে;
প্রণয়ী জনারে, প্রণয়িনী মারে, এই কথা রয়ে যাবে।
মান-মিলন।
;
সখীর সমাজে, সদা রবে লাজে, দেখাতে নারিবে মুখ ;
আমার কারণ, পাইবে লাঞ্ছন, এই ভেবে ফাটে বুক।
নিজে যে মরিব, তাতে না ডরিব, তােমারি কারণে ভয় ;
ভালবাসি যারে, দোষ দেবে তারে, একি কভু প্রাণে সয় ?
ধরি ঐচরণে, এ অধীন জনে, ক্ষমা কর এইবার ;
করিলাম পণ, থাকিতে জীবন, এমন হবে না আর।
আর কেন দাসে, দহিছ হুতাশে, ক্ষমা দাও তব মানে;
দিয়ে প্রেম সুধা, নিবার এ ক্ষুধা, আর তো বাঁচিনে প্রাণে
এত বলি কানু, হ'য়ে নত জানু, রাইয়ের চরণ ধরি’;
নয়নের জলে, কত মতে বলে, সাধিল যতন করি।
তবু রাধারাণী, কহিল না বাণী, তুলিল না নত মুখ ;
হেরি রসময়, সকাতরে কয়, শুনিতে বিদরে বুক।
এত যে প্রকারে, সাধিনু তােমারে, তবু না ঘুচিল মান ;
মানের অনল, হইয়া প্রবল, পােড়াতেছে মম প্রাণ।
প্রাণ ছাড়া হয়ে, দেহভার ব’য়ে, বল কি বা প্রয়োজন;
যমুনার নীরে, ত্যজিয়া শরীরে, এড়াইব জ্বালাতন।
এই নেও ধড়া, নেও গুঞ্জ ছড়া, এই নেও চূড়া বাঁশী ;
তব পদতলে, রাখি সকলে, প্রাণে যারে ভালবাসি।
যাহার কারণ, এ সব ধারণ, সে যদি বিমুখ হ'লে।
কার তরে আর, এ সব আমার, প্রয়ােজন হবে বলে।
বিরহেতে জ্ব'লে, রাধা রাধা বলে, বাজাতেম বাঁশী যবে ;
হিয়ার অনল, হইত শীতল, ভাসিতেম সুখর্ণিবে।
৩.
*মিলন
মান-মিল....
যার নাম ধরি, সাধিনু বাঁশরী, সে যদি ত্যজিল মােরে ;
তার বাঁশী তায়, দিয়ে পুনরায়, চ'লে যাই চির তরে।
এবে তব পায়, মাগি গাে বিদায়, ক্ষমা কর যত দোষ ;
প্রসন্ন অন্তরে, যেতে দাও মােরে, মনেতে রেখাে না রােখ।
শোনাে সখীগণ, করাে না গ্রহণ, মম অপরাধ যত ;
বিদায় হইয়া, যাই গাে চলিয়া, চির জনমের মতো।
এই নিবেদন, করি গে৷ এখন, তােমা সকলের ঠাই ;
মম প্রাণ ধনে, রাখিও যতনে, সপে দিয়ে চলে যাই।
পূর্বের ঘটন, করিয়া স্মরণ. যদি সন্তাপিত হয় ;
প্রবােধ বচনে, তুষি ও যতনে, দুঃখ যেন নাহি রয়।
( ২২ )
কেঁদে কেঁদে শামাদ বাহির হইল ;
যেতে যেতে ফিরে ফিরে চাহিতে লাগিল।
ক্ষণেক বঁাড়া’য়ে থাকে ক্ষণে চলে যায় ;
নিকুঞ্জ ছাড়িয়া পদ উঠিতে না চায়।
এইরূপ করে শ্যাম বাহির হইল ;
সখীগণ শ্রীরাধারে বলিতে লাগিল।
কি করিলি, অভাগিনি, কি করিলি আজ ;
কোন্ প্রাণ ধরিয়া করিলি হেন কাজ।
মানের আবর্তে হেন প্রেম ডুবাইলি ;
অল্প দোষে নাগরেরে কেন তাড়াইলি ?
বাঁচে কি না বাঁচে বঁধু নিশ্চয় তো নাই
হায়, হায়, কি করিলি ও পাষাণী রাই।
৫৪
খানমিলন।
৫
.
কত করে পায় ধরে সাধিল তােমারে ;
তবুও রহিলে তুমি মত্ত অহঙ্কারে।
যাইবার কালে কত কাঁদিয়া কাঁদিয়া ;
আমাদের করে দিল তােমারে সঁপিয়া।
তুমি তারে কষ্ট দিলে তাহা না গণিল ;
তব কষ্ট হবে ভেবে চিন্তিত হইল।
হেন দরদীরে বল কোন্ প্রাণ ধরে ;
হাতে পেয়ে অবহেলে দিলে বের করে।
আমাদের কোনো কথা না শুনিলে কাণে
মাতিয়া রহিলে নিদারুণ অভিমানে।
প্রেমের দুয়ারে কি লল। খাটে এত মান ;
হেন প্রেম শিখেছিলে কার সন্নিধান ?
কেঁদে কেদে শ্যামাদ গেল যমুনায় ,
কপালে কি আছে তাহা বল নাহি যায়।
তার দশা দেখে প্রাণ ছটফট্ করে,
সহিতে না পারি’ দুঃখ, ডুবে বুঝি মরে।
বসে বসে খাও জল ধুয়ে ধুয়ে মান ;
এ জন্মে সাধিতে আর আসিবে না কান।
তব সঙ্গে প্রেম করে এই তাে হইল ;
প্রেমের দায়েতে পড়ে প্রাণ হারাইল।
রমণী নামের কীৰ্ত্তি ভালই রাখিলে ;
প্রেমের দোহাই দিয়ে নাগরে বধিলে।
মান-মিলন । নারী কুলে তব নাম ধন্য করিবারে ; বিধাতা পাষাণ দিয়ে গড়িল তােমারে। এতেক ভৎসনা শুনি চমক হইল ; দুঃখিত হইয়া রাই বলিতে লাগিল। ( ২৩ ) কি বলিলি সহচরি, সত্য না কি প্রাণ হরি, কুঞ্জবন ছেড়ে চলে গেছে ? অথবা ছলনা করে মন বুঝিবার তরে, কোনোখানে মুকায়ে রয়েছে ? আমার মাথার কিরে, আসিতে বলগে ফিরে, মম অপরাধ ক্ষমা করি' ; এবার আসিলে পরে, রাখিব মাথায় করে চরণ সেবিব প্রাণ ভরি। সহজে যদি না আসে, আমি যাব তার পাশে, সাধিব ধরণী লুটাইয়া ; দেখিব কেমন ক'রে, ছাড়াইয়া যায় মােরে, প্রাণ দিব চরণে বাটিয়া। হায়, হায়, কি করিনু, অবহেলে হারাইনু, হাতে পেয়ে স্বরগের চাঁদে যে চাদ পাবার তরে, কত নারী ধ্যান করে, না পাইয়া দিবা নিশি কঁাদে। অভাগীর শুভক্ষণে, পাইয়া এমন ধনে, পারিশ্ন করিতে যতন ; হেন যতনের বনে, থাকে কি গাে অযতনে, তাই বুঝি কৈল পলায়ন? ;
মান-মিলন তার নাই কোনাে দোষ, আমিই তাে করে রোষ, বাহির করিয়া দিমু তারে ; হ'য়ে এত মান ইত, তবু কেঁদে কেঁদে কত, সবিনয়ে সাধিল আমারে। তােমরা ও সবে মিলে, কত মতে বুঝাইলে, সকলি তাে হইল বিফল ; শ্রবণেতে সিসে ঢেলে, তােমাদের কথা ঠেলে, এবে ভুগিতেছি তার ফল। এতক্ষণ দাড়াইয়া বাক্য সুধা বরষিয়া শীতল করিতেছিল প্রাণ ; আমি তার বিনিময়ে, কাল ভুজঙ্গিনী হয়ে, দংশিয়া দিলেম প্রতিদান। আমি তো পাষাণী বটে, নহিলে হেন কি ঘটে, মাের মতাে দেখেছ কি আন্ ? সত্যই আমার হিয়া, কঠিন পাষাণ দিয়া, পােড়। বিধি করেছে নির্মাণ। নতুবা কে প্রাণ ধরে, আপন নাগর’ পরে, করে হেন মন্দ ব্যবহার ; নাগরী নাগরে পেলে, ‘সুখে দেয় প্রাণ টেলে, আমি কৈমু অন্যথা তাহার।. আমি তাে গাে চাতকিনী, দেখে কালো কাদম্বিনী, মনে হয় কতই উল্লাস। সে মেঘের সুধা যদি, পান করি নিরবধি, মেটে না তো মনের পিয়াস।
মান-মিলন। ; • যদিও সৌভাগ্যগুণে, আমার মিনতি শুনে, কালো মেঘ উদয় হইল গুড় গুড়, গরজন, শুনিয়া তৃষিত মন, আনন্দেতে নাচিতে লাগিল। বারেক ফিরিয়া তারে, সাধ হ’লাে দেখিবারে, লজ্জা আসি শিরেতে ধরিল নিজের আঁচল খুলি, চ'খে মাের দিল ঠুলি, পিয়া পানে চাহিতে না দিল। তবে কতক্ষণ গতে, সেই কালো মেঘ হতে, বাক্য সুধা ঝরিতে লাগিল পাগল করিল মােরে, সেই সুধা পান তরে, মন প্রাণ ব্যাকুল হইল। যখন চরণ ধরে কঁদিয়া কঁদিয়া মােরে, সাধিতে লাগিল শ্যামরায় ; বারেক অপাঙ্গ ঠারে, হেরিয়া ছিলেম তারে, মনে হ'লে বুক ফেটে যায়। হেরে সুধাধার পানে, প্রাণ কি ধৈর্য মানে, অস্থির হইনু পিপাসায় ; করিতে সে সুধাপান, মাতিয়া উঠিল প্রাণ, বিধাতা সাধিল বাদ তায়। মান ঝড় বহাইয়া, মেঘে দিল উড়াইয়া, মিটিল না অভাগীর আশ ; পিপাসায় প্রাণে মরি, সখি, কি উপায় করি, হায়, হায়, হলাে সর্বনাশ। ;
মান-মিলন। পূর্ব কথা হৃদি পরে, গাঁথা আছে থরে থরে, যবে হয় সে সব স্মরণ ; আমাতে আমি না রই, পাগলিনী প্রায় হই, কানু লাগি হয়ে জীবন। মােরে দেখিবার ছলে, ছেড়ে দিত গাভী দলে, আমাদের বাড়ীর ভিতরে ; ধেনু হারায়েছে বলে তার অন্বেষণ ছলে, প্রবেশ করিত তার পরে। রন্ধন শালায় থাকি, দেখিতাম ঝাকি ঝাকি, তাহার যতেক চতুরালী ; এদিক ওদিক করে, ধেনু খুজিবার তরে, আমারে খুজিত বনমালী। আমার গৃহের পাশে, আসিত দেখার আশে, ইসারা করিত পিছ দিয়া ; নবনী থাকিত সাথে, তার কিছু দিত হাতে, জানালায় হাত বাড়াইয়া। একদিন চাহি’ জল, পিপাসা করিয়া ছল, এসেছিল আমাদের বাড়ী ; শাশুড়ীর কাছে যেয়ে, সবিনয়ে জল চেয়ে, দাঁড়ায়ে রহিল বংশীধারী। শাশুড়ী রন্ধনাগারে, পাঠাইয়া দিল তঁারে, জল পান করিবার তরে ; আমার নিকটে এসে, জল চেয়ে হেসে হেসে, হাত বাড়াইয়া দিল পরে। ", মান-মিলন। আপনার ঘর থেকে, শাশুড়ী বলিল ডেকে, শুধু জল দিও না কো হাতে; বলাই বসাইয়া, ক্ষীর সর নুনী দিয়া, খেলাও পেট ভরে যাতে। মনের আতঙ্ক গেছে, দেহে যেন প্রাণ এলো, আহলাদে হ'লেম আটখানা; আসন পাতিয়া ঘরে, ডাকিনু ইশারা করে, কেবা আর শােনে কার মানা। গৃহ মাঝে প্রবেশিয়া, বসিল আড়ালে গিয়া, কেহ যেন না পায় দেখিতে ; আসন উঠা'য়ে নিয়া, সেইখানে বিছাইয়া, পুনরায় দিলেম' বসিতে। ক্ষীর সর ননী দিয়া, দিনু থালা সাজাইয়া, জল ভ'রে দিলেম গেলাসে ; সেই সব রেখে পাতে, ধরিয়া আমার হাতে, বসাইল তার বাম পাশে। উলটি আমারে হরি, দৃঢ় আলিঙ্গন করি, প্রেম সুধা করিলেন দান ; সে সুধা রাশির আগে, ক্ষীর সর কোথা লাগে, মনােসধে করিলেম পান। যত খাই সেই সুধা, তত যেন বাড়ে ক্ষুধা, তৃপ্তি নাহি হয় হৃদয়েতে ; মনে হ'লাে সব ছেড়ে, তাহার বদন হেরে, ডুবে থাকি সুধা সাগরেতে।
মান-মিলন। কানু যবে চলে গেলাে, কুটিলা বাহিরে এলো, মায়ে বলে কি কাজ করিলি ? হ্যালো ও পােড়ার মুখি, এ ক'রে কি হ'লি হই, বধূরে নাগর ডেকে দিলি? দেখে এ কুটনী কাজ, অন্তরেতে হয় লাজ, মনে হয় গলে দেই দড়ি; কিংবা খেয়ে হলাহলে, অথবা যমুনা জলে, ডুব দিয়া এখনই মরি। শুনিয়া কুটিল বাণী, বলে শ্বশ্রু ঠাকুরাণী, কি জানি বুঝিতে কিছু নারি ; কালারে দেখিলে পরে, ইচ্ছা হয় করে ধরে, বুকে টানি দুবাহু পসারি। সে যখন যাহা চায়, দিয়ে থাকা না যায়, দিলে বড় তুষ্ট হয় মন ; ইচ্ছা হয় কোলে করে, খাওয়াই উদর ভ'রে, ক্ষীর সর দধি ও মাখন। তুই তত বাড়ীতে ছিলি, তাই কোন্ বাধা দিলি, আমার তো ভুল হয়ে যায়। কন্যাকহে ক্রোধে অতি, যেচে দিলি উপপতি, বাধা দিতে আমার কি দায়। এ প্রকারে মায়ে ঝিয়ে, কলহ বাধা’য়ে দিয়ে, চুপ হ’লল কতক্ষণ পরে ; আমি মনে মনে হাসি, ননদিনী সর্বনাশী, জব্দ হয়ে গেল খুব করে। { •• মান-মিলন। ; লুকোচুরি খেলিবারে, মােদের বাড়ীর ধারে, সাঙ্গ পাঙ্গ লইয়া যাইত বলাই থাকিত সাথে, এড়াইতে তার হাতে, কালা কত চাতুরী খেলিত। বুড়ী সাজাইয়া তারে, বসায়ে রাখিত দ্বারে, যেন কোনােখানে যেতে নারে তা হলে আমার সঙ্গে, নিরাপদে মনোরঙ্গে, প্রেম খেলা খেলিবারে পারে। কানু চোর হতো সেধে, বুড়ী দিত চোক বেঁধে, আর সবে যেত লুকাইতে ; লুকানো হইলে পরে, বুড়ী ছেড়ে দিত চোরে, চোর যেত সকলে খুঁজিতে। এ বাড়ী ও বাড়ী করে, পশিয়া মােদের ঘরে, আমারই সন্ধানে ফিরিত ; যেখানে দেখিত মােরে, খুঁজিবার ছল ক'রে, সেইখানে বিলম্ব করিত। নিতি নিতি হেন মতে, ছল ক'রে শতে শতে, দেখা দিতে করিত যতন ; হায়, হায়, এবে তারে, না হেরিয়া কি প্রকারে, করিব এ জীবন ধারণ! এক মুখে কব কত, যদি হতাে শত শত, তবু করা যেত না বর্ণন কহিতে পিয়ার গুণ, বেড়ে যায় শত গুণ, দুগ্ধ আবৰ্ত্তনের মতন। }
মান-মিলন।
বঁধুয়ার নাহি পেলে,
যমুনায় দেহ ঢেলে,
কিংবা বিষ খাইয়া মরিব
ধরে যে পাষাণ প্রাণ,
কৈ তার অপমান,
হেন প্রাণ কভু না রাখিব।
যাও সখি শীঘ্র গতি,
নিয়ে এস প্রাণ পতি,
আর তাে বাঁচিনে আমি প্রাণে ;
যতক্ষণ নাহি পাব,
অন্ন জল নাহি খাব,
বসিয়া রহিব তাঁর ধ্যানে।
( ২৪ )
কাদিতে কাদিতে রাই অজ্ঞান হইল,
ইহা দেখি সখীগণ প্রমাদ গণিল।
কেহ কেহ ঢালে শিরে সুবাসিত বারি,
কেহ বা বাতাস করে এসে তাড়াতাড়ি।
কিছুক্ষণ পরে যবে হইল চেতন,
উঠায়ে বসা’ল তারে করিয়া যতন।
এত যে রাধার প্রতি ক্রোধ করেছিল,
সে ভাব ভুলিয়া এবে বলিতে লাগিল।
বিধির নিবন্ধ কভু না যায় খণ্ডন,
তােমার কপালে ছিল এ দুঃখ লিখন।
নতুবা আপন কাছে পাইয়া নাগরে,
নাগরী কি পারে তারে দিতে বের করে ?
যা হবার হয়ে গেছে শােক পরিহরি,
চল এবে গৃহে যাই, পােহা’ল শর্বরী।
।
মান-মিলন।
৩৩
প্রভাত হইলে তারে খুঁজিয়া দেখিব,
সাক্ষাৎ পাইলে মােরা খরিয়া আনিব।
একান্তই যদি নাহি পাই দরশন,
যমুনা জীবনে সবে ত্যজিব জীবন।
এতবলি সখীগণ কুঞ্জ তেয়াগিয়া,
রাধার আলয়ে গেল সকলে মিলিয়া।
পরদিন শ্রীকৃষ্ণেরে লাগিল খুঁজিতে,
তবু কেহ না পাইল তাহারে দেখিতে।
শ্ৰীমতী বিরহানলে জ্বলিতে লাগিল,
হা নাথ, হা নাথ, বলি’ আহার ত্যজিল।
রাত্রিতে না হয় নিদ্রা, মাথা সদা ঘুরে,
তৈল বিনা জটা হ’লাে চঁচির চিকুরে।
পালঙ্ক ছাড়িয়া কৈল শয্যা মৃত্তিকায়,
লােক লাজে করে কাজ মন নাহি চায়।
শুকাইল চন্দ্র মুখ বর্ণ হলাে কালি,
তেয়াগিল বেশ ভূষা বিনে বনমালী।
হা কৃষ্ণ, হা কৃষ্ণ, বলি’ দিবস রজনী,
কঁদিয়া কাঁদিয়া সারা হলাে রাই ধনী।
মনের অনল চেপে, সখীগণ শেষে,
লাগিল প্রবােধ দিতে অশেষ বিশেষে।
(২৫)
কত দিন পরে,
শ্রীরাধার ঘরে,
এলাে এক নাপিতিনী ;
কালীয় বরণী,
মনােরম সুহাসিনী।
মধুর চাহনি,
মান-মিলন। ০ v ৩. নাকের বাহারে, তিল ফুল হারে, কমল নয়নী ধনী ; চিকন তাহার, কাকাল বাহার, আহা কি রূপের খনি । ধীরে ধীরে এসে, মৃদু হেসে হেসে, বসিল রাইয়ের ঠাঁই কহে, বিনােদিনি, আমি নাপিতিনী, তােমারে কামা’তে চাই। দাও শ্রীচরণ, করি প্রক্ষালন, নখগুলি সব কাটি চন্দন ঘসিয়া, অলক্তক দিয়া, করে দেই পরিপাটী। জটিল। কুটিল', আসি দাড়াইলা, হেরিয়া রূপের ঠাম বলে, ওগাে ধনি, কাহার ঘরণী, কোথায় তােমার ধাম ? মুচকি হাসিয়া, মুখ নামাইয়া, রমণী কহিছে ভাষ ;. গােকুল ভিতরে, অল্প দিন ধরে, এসেছি করিতে বাস। শাস্ত্রের বচন, স্বামী নাম নাহি লয়; আমি যাঁর পায়ে, রয়েছি বিকায়ে, “রা” আদিতে নাম হয়। . রমণী কখন, মান-মিলন। মধুময় দৃষ্টি, মুখ বাঁকাইয়া, • একথা শুনিয়া, দুজনে মিলিয়া, চলে গেলাে আন্ মনে ; মা বলে ও কুটি, হেন আর দুটি, আছে না কি বৃন্দাবনে ? দেখিলে তাহায়, মন ভুলে যায়, চক্ষু যেন পদ্ম ফুল ; কথা বড় মিষ্টি, রূপের নাহিক ভুল। ঝাপটা মারিয়া, কুটিলা বলিছে বেঁকে মাের মনে লয়, সতী কভু নয়, ভাল নাহি চ'খে ঠেকে। সহিতে না পারি, এত বাড়াবাড়ি, কুটিলার অহঙ্কার ; জটিল। তখন, করিয়া গর্জন, বলিল কন্যাকে তার। সবাই অসতী, তুই বড় সতী, আহা লো সতীর চূড়া; কৃষ্ণের ব্যারামে, গ্রীনন্দের ধামে, সতীগিরি হলো গুড়া। ঘরের বন্ধুরে, হিংসানলে পুড়ে, .দিলি কত অপবাদ; কলঙ্ক তাহার, ঘুচিল সেবার, তাের হলপরমাদ।
মান-মিলন। ; করিয়া শ্রবণ, ভাইকে ডাকিয়া, বনে গেলি নিয়া, দেখাতে বৌয়ের দোষ তার ধৰ্ম্মে টান, দেখিয়া আয়ান, তােরেই করিল রােষ। এতেক ভৎসন, কুটিলা গর্জিয়া কয় ; তুই কি প্রকারে, বলিস আমারে, মনে নাহি লাজ হয় ? বড় স্পর্ধা করি, লইয়া গাগরি, গেছিলি তো তাড়াতাড়ি ; ওললা চোখাকি, পেরেছিলি না কি, আনিতে যমুনা বারি ? ছিদ্র আছে যার, সে কি না আবার, খােটা দিতে পারে পরে ; বুড়ী হয়ে গেলি, বুঝিতে না পেলি, আর কি বুঝব তােরে। গােকুলের নারী, সব গেলো হারি’, কালের কুটিল গতি ; সতী যারা ছিল, অসতী হইল, অসতী হইল সতী। ব ঠিক করে, গােকুল ভিতরে, এ বৈদ্য কে দেখেছিল ? জানা শােন নাই, ত্বরা আসিয়াই, কোথা হতে দেখা দিল।
মান-মিলন। ৬। বৈদ্য কিছু নয়, কুহক করিয়া, মাের মনে হয়, ছদ্মবেশী যাদুকর ; যাদু বিদ্যা জানে, এসেছে এখানে, নাহি তার আত্মপর। কি জানি কেমনে, বৌ ছুড়ীর সনে, করিয়াছে পরিচয় ; লােক পাঠাইয়া, অনা’ল ডাকিয়া, পেয়ে সেই সময়। দরদী তাহার, ভুল নাই তার, সুযােগ খুজিতেছিল ; সময় পাইয়া, এক চাল চেলে দিল। নৈলে বল মােরে, ছিদ্র কুম্ভ করে, বারি কে আনিতে পারে ? হয়ে বুড়ো পেঁকি, সেই ভেল্কী দেখি, ভুলে গেলি একেবারে। কুটনী হইয়া, বঁধু আনি দিয়া, থাক সতী বধূ নিয়ে ; হেথা না থাকিব, অন্যত্র যাই, তাের মুখে ঝাঁটা দিয়ে। এতেক কহিয়া, হাত পা নাড়িয়া, কুটিলা বাহিরে এলো; পারি সহিতে, বকিতে বকিতে, মা ও পিছে পিছে গেলাে। ;
, মান-মিলন। ও পােড়াকপালি, মুখে চুন কালি, কেমনে দিলি এ ব্যথা ; উদরেতে ধরে, এত বড় ক'রে, এখন শুনিব কথা। জানিলে এমন, খাওয়া’য়ে লবণ, মারিতাম শিশু যবে ; তাের কুবচন, বজের মতন, বাজিত না বুকে তবে। যা লাে দূর হয়ে, আমার আলয়ে, থাকিতে দিব না আর ; আয়নে কহিয়া, মুখ পােড়াইয়া, করিব যমুনা পার। অন্তরালে থাকি, মুখে বস্ত্র ঢাকি, সখীর হাসিতেছিল; যাইতে দেখিয়া, প্রফুল্ল হইয়া, দুয়ারে কপাট দিল। ( ২৬ ) নাপিতিনী কয়, পেয়ে সুসময়, শােন বিধুমুখী রাই ; চরণ দুখানি, দাও ওগাে রাণি, কামাইয়া চ'লে যাই।
মান মিলন। হেরে রমণীরে, রাধা ফিরে ফিরে, দেখিতে ছিলেক তারে; দেখে মুখ তার, মনটদুখ ভার, কমে গেল একেবারে। আলাপ করিতে, তাহার সহিতে, রাধার হইল মন ; নিকটে ডাকিয়া, বসিতে বলিয়া, ধীরে ধীরে তারে কন। ওগাে সুলােচনে, আসিয়া এক্ষণে, যেতে কেন ব্যস্ত হলে ? আসিতে আসিতে, চাইছ যাইতে, দুটো কথা নাহি বলে। রমণীর প্রথা, আছে যে সবখা, আসিলে নারীর কাছে ; নানা কথা কয়, হয় পরিচয়, কাজের কথাটি পাছে। বলিছে রমণী, ওগো সুনি, আমি কাঙ্গালিনী ছার আমার মতন, অধম এমন, ধরাতলে নাই আর। তােমার সহিতে, আলাপ করিতে, আমি কি সাহস পাই? তব পদতলে, কিছু স্থান হলে, সৌভাগ্যের সীমা নাই।
মান-মিলন ; রমণী চরণ, ; আমি নীচ অতি, নাই অন্য গতি, করি যে নাপিতগিরি করিয়া সেন, এ বাড়ী সে বাড়ী ফিরি। শুনিনু তােমার, মহিমা অপার, দয়ার নাহিক শেষ দীন দরিদ্ররে, তােষহ আদরে, ঘৃণার নাহিক লেশ। হয়ে তুমি রাণী, নহ অভিমানী, অমানীরে দেহ মান ; সুবিনয়ী হয়ে, থাক সব স'য়ে, হরিগত তব প্রাণ। তাই ভেবে মনে, এসে বৃন্দাবনে, তব কৃপা লাভ আশে ; এতদিন পরে, আজ সেবা তরে, আসিয়াছি তব পাশে। (২৭) শ্ৰীমতী তখনে, ভাবে মনে মনে, সাজ বেশে কিবা কাজ ; যার তরে সাজ, সে রাখালরাজ, দেখিবে না এই সাজ।
মান-মিলন। তবু ও লুকা'য়ে, লােক লাজ দায়ে, মনােভাব আপনার ; ঈয়ৎ হাসিয়া, দিল বাড়াইয়া, চরণ দুখানি তার। পাইয়া কোমল, চরণ যুগল, রমণী সাপটি ধরি ; হাসি হাসি মুখে, ভেসে মনােমুখে তুলে নিল ক্রোড়পরি। পেয়ে পরশন, শ্রীরাধার মন, কেমন কেমন হলাে ; বুঝিতে না পারি, নিজ ভাব প্যারী, ‘চুপ করে বসে র’লাে। রমণী তখন, চরণ সেবন, আনু মনে করে যায় ক্ষণে কাজ করে, রাই মুখ’পরে, ক্ষণেক ফিরিয়া চায় । খুটিয়া খাটিয়া, হাত পা ধুইয়া দিল ; কোমল বসনে, অতি সন্তর্পণে, ভাল করে মুছাইল। অলক্তক দিয়া, চরণ রঙ্গিয়া, দিল মনােমত করে ; অবনত মুখে, আপনার মুখে, টিপি তে লাগিল পরে। নখর কাটিয়া, ;
মান-মিলন। ছাড়িতে না চায়, ধরে রহে তায়, ঢেলে দিয়ে প্রাণ মন ; দরিদ্র যেমন, পেয়ে হারাধ, বুকে রাখে অনুক্ষণ। কতক্ষণ পরে, ফোটা ফোটা করে, ভাসে বক্ষ অশ্রুধারে ; শ্রীরাধা হেরিয়া, আশ্চর্য্য হইয়া, জিজ্ঞাসা করিল তারে। ওগাে সুলোচনে, অকস্মাৎ মনে, কি দুঃখ উদয় হলো? কঁদিয়া অধীর, চক্ষে বহে নীর, ইহার কারণ বলে। নাপিতিনী ধীরে, কয় কিশােরীরে শােন বিনােদিনী রাই ; আমার বেদন, বােঝে হেন জন, ত্রিভুবনে কেহ নাই। হৃদয় নাগরে, অভিমান ভরে, অপমান কৈনু কত ; চরণ ধরিয়া সাধিয়া কাঁদিয়া, গেলে স দীনের মতাে। আমার মতন, নিঠুর। এমন, ত্রিজগতে দুটি নাই ; সদা জ্বলে হিয়া, তঁারে না দেখিয়া, বাঁচিতে নাহিক চাই।
মান-মিলন। ৭৩ সে জ্বালা চাপিয়া, বেড়াই ঘুরিয়া, আর কি উপায় করি ; হৃদয় আমার, জ্বলন্ত অঙ্গার, দিবা নিশি জ্বলে মরি। ( ২৮ ) শুনিয়া এ কথা, শ্রীরাধার ব্যথা, বেড়ে গেল। শত গুণ ; রহিয়া রহিয়া, দিল জ্বালাইয়া, হৃদয়ের তুষাগুন। কপােল বহিয়া, অশ্রু গড়াইয়া, ভাসাইয়া দিল বুক ; হিতাহিত জ্ঞান, হলো অন্তর্ধান, শুকাইয়া গেল মুখ। নাপিতিনী হাত, ধরিয়া হঠাৎ, বলিতে লাগিল তারে শুনিলে একথা, পাই বড় ব্যথা, বলি ও না বারে বারে। হিয়ার ভিতরে, অগ্নি গিরি ধরে, আমিও তো আছি বসি ; আর তো না সহে, মন প্রাণ নহে, হেরিয়া প্রাণ শশী। ;
মান-মিলন। তােমার মতন, আমারো সে ধন, চলে গেছে সেধে কত ; বজ্বের সমান, কঠিন সে মান, তবুও হ'লো না নত। হারাইয়া তায়, করি হায়, হায়, মন না সান্ত্বনা মানে ; তাহারি ধেয়ানে, নিয়ােজিয়া প্রাণে, চেয়ে আছি পথ পানে। যদি ভুলিয়া সে, এই পথে আসে, সেই আশে বসে থাকি ; সাধ মিটাইয়া, পিয়ারে দেখিয়া, জুড়াব তৃষিত আঁখি। কোন্ লাজে আর, এ মুখ আমার, দেখাব তাহার কাছে ; থাকি লুকাইয়া, আমারে দেখিয়া, এ দিকে না আসে পাছে। কিন্তু না হেরিয়া, কঁদিয়া কাদিয়া, চক্ষু হ'লো অন্ধ প্রায় ; মৃত্যু কবে আসে, আমি সেই আশে, বসে আছি নিরুপায়। আরাে কত দিন, হয়ে আশাধীন, রব তার পথ চেয়ে ; না পাইলে তায়, ত্যজিব এ কায়, যমুনার জলে যেয়ে।
মান-মিলন। কহিয়া তখন, এতেক বচন, রাই ভাবে কি করি । পরের নিকটে, কেন অকপটে, নিজ দোষ ঘেঁটে দিমু। পুন ভাবে মনে, দোষ বা কেমনে, ভয় করি আর কারে ; কলঙ্কের ঝুলি, লইয়াছি তুলি, সাধ করে নিজ ঘড়ে। যেবা মন্দ কবে, তার মুখে রবে, আমার কি হবে তায় ; কানু প্রেম দিয়া, বেঁধেছি এ হিয়া, এড়েছি লাজের দায়। ( ২৯ ) শুনি নাপিতিনী, রাধার কাহিনী, হয়ে দুখী অতিশয় ; শ্ৰীমতীর করে, রেখে নিজ করে, গদ গদ ভাষে কয়। তুমি ও যেমন, একই জ্বালায় জ্বলি মনে এই আসে, থেকে তব পাশে, দুখের কাহিনী বলি । আমিও তেমন, ;
মান-মিলন। গৃহেতে যাইব, কিন্তু কি করিব, পােড়া উদরের তরে ; অভয় পাইলে, এদিকে আসিলে, যাব পুন দেখা করে। বিদায় লইয়া, যাইতে দেখিয়া, শ্ৰীমতী ধরিল হাতে; কাঁদিতে কাদিতে, আলিঙ্গন দিতে, চমকি উঠিল তাতে। সুখ পরশন, কানুর যেমন, এ ও দেখে সেই মতাে ; চাহি মুখ পানে, রহে এক ধ্যানে, হয়ে যেন বুদ্ধি হত। শরীর অবশ, নয়নে আলস, পুলকে রােমাঞ্চ গায় লাগিল ঘমিতে, পড়িতে পড়িতে, রমণী ধরিল তায়। কহে, প্রাণ সখি, চিনিতে নার কি, তােমার আশ্রিত দাসে; সহিতে না পারি, বিরহ তােমারি, আসিয়াছি তব বাসে। নিবেদন করি, হে প্রাণ কিশােরি, বিমুখ করাে না আর, রাখ রাঙ্গা পায়, তােমার কালায়, ভুলে সব দোষ তার।
মান-মিলন।
( ৩০ )
যুগলে ধরিয়া,
বহু দিন পরে,
পাইয়া নাগরে,
সবে হলো আত্মহারা ;
মনের উল্লাসে, সুখ নীরে ভাসে,
নয়নে বহিছে ধারা।
কোনাে সহচরী, তাড়াতাড়ি করি,
ফুল আনে ডালা ভরে ;
দিল সাজাইয়া,
মনের মতন করে।
কুটিলার ডরে, শঙ্খ না ফু করে,
নাই উলুউলু ধ্বনি ;
পাছে দূর হতে, শুনে কোনাে মতে,
ফিরে এসে পােড়াননী।
সােহাগে গলিয়া, নিকটে আসিয়া,
দাড়াইয়া মনােসুখে ;
বৃন্দা সখী তবে,
কহিছে মাধবে,
হাসি তাে ধরে না মুখে।
বড় ভাগ্য আজ,
ওহে রসরাজ,
তবু যে পড়েছে মনে ;
হারায়ে নাগরে,
ছিনু মােরা আয়ােজনে।
মরিবার তরে,
মান-মিলন।
তুমি গেলে পরে, রাগ গেল পড়ে,
কাঁদিয়া আকুল রাই ;
অজ্ঞান হইয়া,
রহিল পড়িয়া,
মােরা ধরে নিয়ে যাই।
কত যে খুজিনু, দেখা না পাই,
কোথা ছিলে ব্রজ ছাড়ি?
এলে আরাে পরে, দেখিতে কি করে,
মরিলে বিরহী নারী
রাধ বিনােদিনী, শ্যাম প্ৰেমাধিনী,
কে না জানে এই কথা;
ছেড়ে সহকারে,
বাঁচিতে কি পারে,
তাহার আশ্রিত লতা?
?
( ৩১ )
হাসিয়া হাসিয়া, কহে বিনােদিয়া,
বিনােদিনী কর ধরি;
হারা’য়ে তােমায়,
পাগলের প্রায়,
ছিনু আমি প্রাণেশ্বরি।
তােমার মতন,
নিঠুর কজন,
আছে বলে ধরাতলে;
কোন প্রাণ ধরে,
জ্বালায়েছ মোরে,
তােমার বিরহানলে?
মান-মিলন। বিহনে তােমার, সব অন্ধকার, দেখিতাম নিশি দিন; নয়নের তারা, হয়ে জ্যোতিঃ হার, করেছিল দৃষ্টি হীন। ত্যজিয়াছি ধড়া, গুঞ্জ মালা ছড়া, ত্যজিয়াছি চূড়া বাঁশী ; শুধু তব নাম, জপি অবিরাম, হয়েছিনু বনবাসী। তুমি প্ৰাণাধার, সংসারের সার, প্রেম সাগরের তরী ; তরঙ্গে তরঙ্গে, খেলাইব রঙ্গে, তােমারে আশ্রয় করি। তুমি তাে ভকতি, তুমি তাে মুকতি, তুমি তাে আমার সব ; হেরে তোমায়, এত দিন হায়, হয়ে ছিনু আমি শব। কভু বিদেশিনী, কভু নিকিনী, কভু বা সন্ন্যাসী বেশে; বিরহ অনল, করিতে শীতল, দেখিয়া যেতাম এসে। পরিচয় দিতে, ভয় হ'তে চিতে, পাছে দাও তাড়াইয়া ; তা হলে কেমনে, হেরি প্রাণ ধনে, জুড়াতাম তপ্ত হিয়া।
মান মিলন। বিধাতার বরে, তব সুনজরে, পড়িয়া গেলন আজ বহু যুগ পরে, পুন দিলে মােরে চরণ সেবার কাজ। কানু গলে ধরি, কহিছে কিশােরী, অশ্রু ঝরে দুনয়নে; মোর মাথা খাও, সব ভুলে যাও, রাখিও না কিছু মনে। দুষ্ট মান দায়, উপেক্ষি তোমায়, অন্যায় করেছি কত ; আপনার দোষে, শেষে আসােষে, মরিতেছি অবিরত। তুমি যে আমার, তাই অধিকার, তােমার উপরে চলে ; কত অত্যাচার, করি বার বার আমার আপন বলে। কিন্তু আমি ছার, হইয়া তােমার, করিতে নারিনু সেবা ; ভাবি মনে মনে, এ তিন ভুবনে, হেন অভাগিনী কে! অল্প বুদ্ধি নারী, আমি হে মুরারি, পদে পদে দোষ হবে ; পেয়ে সেই দোষ, . যদি কর রােষ, কেমনে বাঁচিব তবে?
মান-মিলন। ধৈৰ্য নাহি রহে, পলক বিরহে, কত যুগ মনে হয় ; হৃদয় মাঝারে, হেরি যে তােমারে, তাই তাে পরাণ রয়। একে পরাধিনী, তাহে কাঙ্গালিনী, আমার কিছুই নাই; বহু পুণ্য ফলে, তব পদতলে, পাইয়াছি চির ঠাই। নয়ন চকোর, হইয়া বিভাের, করে তব রূপ পান ; পেলে তােমারে, বল কি প্রকারে, বাঁচিবে তাহার প্রাণ? তুমি মম এক, তােমার অনেক, আছয়ে তােমার হাতে ; তােমা ছাড়া হলে, আমি-ই যাব জ্বলে, তােমার কি হবে তাতে। ওহে প্রাণপতি, করি হে মিনতি, ক্ষম এ আশ্রিত জনে ; তব রাধিকায়, রেখাে সদা পায়, দাসী আমি শ্রীচরণে। এতেক কহিয়া, কঁদিয়া কঁদিয়া, রহিল চরণে পড়ি রাধিকা মােহন, উঠাইল ত্বরা করি। • ধরিয়া তখন, মান মিলন। রহিল দুজনে, সুখ আলিঙ্গনে, কতক্ষণ আন মনে ; শ্রীকৃষ্ণ তখন, করিল চুম্বন, শ্রীরাধার প্রেমাননে। শ্যাম মায়া করি, সৃজিল বাঁশরী, ধড়া চূড়া সাজ যত ; সখীর। মিলিয়া, দিল সাজাইয়া, তাদের মনের মতাে। পাশা পাশি করে, দাড়াইল যােড়ে, শােভার তুলনা নাই ; দক্ষিণে নাগর, রসের আকর, বামে প্রেমময়ী রাই চরণ উপরি, চরণ শ্রীহরি, রাখিল ভাঙ্গিমা করে শ্রীরাধা চরণ, করিতে বন্দন, চূড়া বামে হেলে পড়ে। রূপের তুলনা, নাই অন্য জনা, তারাই তঁাদের তুল, জলদের পাশে, চপল যে হাসে, সে ও নহে সমতুল। অধরে মুরলী, রাধে রাধে বলি, ঘঘাষিছেরাধার জয় ; প্রেয়সীর মান, বাড়াইতে কান, নিজে মানে পরাজয়।
মান-মিলন। উভয়ের মনে, ভাঙ্গিয়া বাধনে, প্রেমের তরঙ্গ বহে; গলাগলি করি’, নাগর নাগরী, সুখেতে ভাসিয়া রহে। নয়নে দোহার, নয়ন আসার, বহিল কপোল বেয়ে ; দোহার বদন, এক দিঠে র’লো চেয়ে। মধুর প্রকাশ, বহিছে মধুর মধুর কুসুম, মধুর কুঙ্কুম, পড়িছে মধুর গায়। নেহারি দুজন, মধুর আকাশ, বায় ; মধুর শাখীতে, মধুর পাখীতে, করিছে মধুর রব ; মধুর বসন, মধুর ভূষণ, মধুর মধুর সব। মধুর কান্তার, মধুর পাথার, মধুর যমুনা বারি ; মধুর ভূধর, মধুর নগর, মধুময় দিক চারি। মধুরে মধুর, মধুর মিলন হ'লাে ; মধুর অঙ্গেতে, মধুর রঙ্গেতে, দুহু অঙ্গ মিশে র’লল। অতি সুমধুর,
মান-মিলন।
যত সব আলি,
দিয়ে করতালি,
নেচে নেচে গান গায় ;
রঙ্গ রসে ভেসে,
মৃদু মৃদু হেসে,
মধুর চাহনি চায়।
প্রেমে মাতােয়ারা,
হইল তাহারা,
হেরিয়া যুগল ঠাম ;
পেয়ে প্রাণ ধনে,
পূর্ণ এতক্ষণে,
রাধিকার মনস্কাম।
রাধিকা মােহন,
রাধিকা জীবন,
রাধিকা রমণ কান
রাধিকার সনে,
নিখিলের মনে,
পরাশান্তি কর দান।
;
ইতি।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.