Bally Sadharan Granthagar
Chine Mati
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
চী নে মা টি
সন্তোষকুমার ঘােষ
১০ মারণ টে:: কলিকাতা-১২
-জি ট
এই লেখকের ।
কিন্তু গোয়ার-গলি (২য়সংস্করণ)
নানা রঙের দিন
রেষ্ঠ গল্প
শুকসারী (যন্ত্রস্থ )
মিত্রাশয় ১০ খামায়ণ সেট হইতে গৌরীশঙ্কর ভট্টাচাৰ্য ।
একাত ও
লি:, খ ম হইতে
মি মূতি
No text on this page.
No text on this page.
শশ বলল, মেমসাহেব খুব ভাল। দয়ার শরীর। চ', তােকে এখুনি
আলাপ করিয়ে দিচ্ছি।
কু বলল, এখন থাক শশীদা। পরে। বরং মাটি কুপিয়ে নিই
আরেকটু।
শশী বলল, না রে। বাইরের লােক বাগানের কাজে হাত দিলে
সাহেব বড় গােসা হন। আগে ঘরের লােক হয়ে যা। তখন সব
তােকে শিখিয়ে দেব। কেয়ারি করা, জল ঢাল, ইস্তক সব ফুলের
নাম।
সব ফুলের নাম শশী’?
-সব। চ’ এবার,-শশী বলল, ভয় কিসের। মেমসাহেব সাহেব
হলেও মেম তো। মেম মানে হল গিয়ে মেয়েমানুষ।
উলের কাটা থামিয়ে চোখ তুললেন মেমসাহেব।—কী শী।
দণ্ডবৎ বিনয়ে শশী বলল, একে নিয়ে এলাম। আমার দেশের
ছেলে। এখানে এক দিদির বাড়ি থাকত, জামাইবাবু তাড়িয়ে দিয়েছে।
যদি কাজে ভর্তি করে নেন। সাহেবের খাস খানসামার কাজ একে
দিয়ে বেশ হবে।
মেমসাহেব বললেন, আচ্ছা তুমি একে রেখে যাও। আমি দু'চারটে
কথা জিজ্ঞাসা করে দেখি।
সেলাম করে শশী বেরিয়ে যেতেই কুর বুক ঢিপঢিপ শুরু হল।
সামনের একটা দেয়ালের আয়নায় ছায়া পড়েছে দু’জনের,
সিক-ঢাকা মােমের একটি মূর্তির পাশে ধূলােকালাে ঝাকাচুল এক
ছােকরার। কুর দাঁড়িয়ে থাকতে লজ্জা করছিল, সে ধপ করে বসে
পড়ল মেমসাহেবের পা যেযে।
२
শাদা ধবধবে দু’টি ননীনরম পা, আলগা ছুঁয়ে একটি হরিণালিন
চটি। কুঞ্জ তখনও কাপতে থাক।
মেমসাহেব বললেন, আহা, কাজল কেন।
তা হােক, মাটিতেও কু ঝিম সুখে নেই। মাটি কই, কার্পেট;
মেজের লজ্জা ঢাকে, মানুষের পায়ের শব্দ ঢাকে। আর এখান থেকেও
তাে উড়ে উড়ে পড়া সিদ্ধের গন্ধ পাচ্ছে কুঞ্জ; মৃদু ঝিমঝিমে, কে
জানে কী এসেন্স। দীর্ঘ দুটি ভুরুর নিচে দুটি চোখ, গলার একটা ভাজে
ঈষৎ স্পষ্ট পাউডারের দাগ। মেমসাহেব বললেন, এখানে কোথায়
থাকতে তুমি ?
-পটলডাঙ্গায় ।
—দিদির কাছে? কেমন দিদি? জামাইবাবু তাড়িয়ে দিল ?
কী কাজ করে তােমার জামাইবাবু?
কুঞ্জ একটা ছাপাখানার নাম করলে।
আরাে দু'একটা টুকটাক কথা
জিজ্ঞাসা করলেন মেমসাহেব।
বােধহয় খুশি হলেন। উলটা সরিয়ে রেখে উঠে দাড়ালেন, দীর্ঘশিখা
দেহ, আঁচল কুড়িয়ে নিলেন।
বেশ আজ থেকেই কাজ করবে তুমি।
শর্ষরক্তাভ শুৰ আঙুলগুলাের দিকে চেয়ে পলক পড়ল না কুঞ্জর।
এত সুষমা থাকতে পারে শরীরের গঠনে ? চকিতে বকুলদির কথা মনে
পড়ল। ধোয়াজালা রান্নাঘরে বাটনা বেটে-বেটে ক্ষয়ে যাওয়া কটি
আঙুল, লােনাে, ভোতা। এই সতেরাে বছর পর্যন্ত যত মেয়েমানুষ
দেখেছে কুঞ্জ, তাদের কারুর সঙ্গে এই মেমসাহেবের তুলনা নেই—এই
সুষমা, এই মহিমা কোথায় পাবে তার চোখ-বসেখাওয়া, কা-উচু,
হাড়কালি, স্বামীর ভয়ে জুজুবুড়ি বকুলদি।
কু বলল, আমাকে রাখলেন মেমসা’ব? কিন্তু কিন্তু সাহেব
মেমসাহেব হাসবেন,সাহেবের ভাবনা তােমাকে ভাবতে হবে না।
আমার কথাই শেষ কথা। সাহেব কিছু বলবেন না।
ঠিক তখুনি বাইরে জুতাের শব্দ শােনা গেল। তালিম দেওয়াই ছিল। মশমশ আওয়াজ হতেই সােজা হয়ে উঠে দাড়াল, কাঠপুতুল, জোড়াগােড়ালি এ্যাটেন। -কে?—চৌধুরী জিজ্ঞাসা করলেন, অধমনস্ক পাখাটাকে পুরােদম করে দিয়ে। ইন্দ্রাণী বললেন, নতুন লােক। বাহাল করলুম আজ থেকে। উড়েটাকে দিয়ে কোন কাজ পাওয়া যেত না। চৌধুরী বললেন ‘ও’, শুনলেন কিনা সন্দেহ, টুটিটেপা টাইটাকে টিলে করতে গলায় হাত দিলেন। কুঞ্জর হাত ততক্ষণ সাহেবের জুতাের ফিতেয় পৌছে গেছে। চৌধুরী সাহেব বাধা দিলেন না, কোচে গা ঢেলে দিয়ে বললেন, বেশ চটপটে। খাওয়া-শেষে চৌধুরী বিলিতি ম্যাগাজিনের পাতা ওলটান, ঠিক ওলটান না, পাখাতেই ওলটায়, সাহেব ধরে থাকেন মা, কয়েক মুহূর্তের ঝিমুনি, ঘোড়াঘুম। মেমসাহেব সেই অবসরে পশমের কাঁটা নিয়ে বসেন, পায়ের কাছে কুকুরটা মন্ত্রশান্ত ভুজঙ্গকুণ্ডলী। কুঞ্জ বারান্দায় এল। বিকেলবেলার একটুখানি বােদ, বাগানের ঝাউগাছের পাতার পাহারা এড়িয়ে যতটুকু পড়তে পারে। দেয়াল ঘেষে একটা লতা, টকটকে ফুল। তারপর যতদূর চাও, শুধু ফুল, যত্ন করে লাগানাে, কুঞ্জ নাম জানে না। এখানে ওখানে ছােট ছােট গাছ, বেশি বাড়েনি, কিন্তু স্তবকের মত, সমান করে ছাটা। আজ আট মাসের ওপর কুঞ্জর চুলে কঁচি পড়েনি, কিন্তু এ-গাছগুলাের দশমানা চারআনা ছাট নিয়মিত। আস্তে আস্তে কুঞ্জ নেমে এল নিচে, সাবধানে, ঘাস বাচিয়ে সুরকিপ ঘেষে। এ-বাগানে ঘাসেরও চাষ হয়। শশীর ঘরে তখন টোয়েন্টি নাইনের ধূম। এ-পাশের বাংলাে থেকে এসেছে সতীশ, ও-পাশ থেকে মধু, সামনের বাড়ির ড্রাইভার নিত্যানন্দও।
কুকে দেখে শশী উঠে এল। –কিরে, ঠিক হল কিছু ? কু হাসি-হাসি মুখে সব বললে। কেমন-বলেছিলাম-কিনা ঢঙের মাতব্বরী গলায় শশী বলল, তা তুইও তত কম হাঁদা না। মেমসাহেব তোকে রাখলেন, তুই আবার সাহেবের কথা তুলতে গেলি কেন। আরে হাঁদারাম, একি তােদের-আমাদের ঘরের বৌঝি পেয়েছিস যে সােয়ামীর মত না নিয়ে এক পা চলা নেই ? আমাদের মেম সাহেব হলেন স্বাধীন, নামে মাত্তর ইস্ত্রী। উনি কটা সমিতির পিসিডেন, জানিস? কু জানত না, বড়বড় চোখে চেয়ে রইল। শশী বলে গেল, এখানে বরাত জোরে টিকে যাস যদি, সব জানবি। শুধু আমাদের মেমসাব কেন, লেভী অপর্ণা, মিসেস চাকলাদার—এদের সব্বাই। এরা সব অন্য জাতের জেনানা রে ! তুই এখন ফিরে যা। সাহেবের বেরােবার সময় হয়েছে। সাহেব বেরােলেন না, বেরোলেন ইন্দ্রাণী । বারান্দায় এসে পড়ালেন, হাই তুললেন ছােট্ট করে, পেশীর কুঞ্চন ঢাকতে একটা হাত মুখের সমুখে ধরলেন। তারপর যে-হাতে মুখের কুঞ্চন ঢেকেছিলেন সেই হাতের ইশারায় ডাকলেন কুকে। কু ছুটে এল। কুঞ্জর গন্ধ পেয়ে ঘর থেকে ছুটে এল সুপি। যে হাতের ইশারা করে ইন্দ্রাণী ডেকেছিলেন কুঞ্জকে, সেই হাতের ইসারাতেই চুপ করতে বললেন কুকুরকে। কুঞ্জকে বললেন, এত শব্দ করে ছােটে? পুপি ভয় পেয়েছিল। সাহেবের যদি ঘুম ভেঙে যেত। লজা-ভয়ে কু বলল, ও। ওকে দিয়ে দু'একটা টুকরাে কাজ করিয়ে নিলেন মেমসাহেব। তারপর কক্ষান্তরে গিয়ে নতুন বেশে পরিবর্তিত হয়ে এলেন। বললেন, আর্মি একটু বেরুচ্ছি কুঞ্জ। তুমি একটু ব’স। ঘুম ভাঙলে সাহেবের যদি কিছু দরকার হয়। মেমসাহেব বেরিয়ে যাবার পরও ঘরে এসেন্সের গন্ধ রইল। উনি গিয়ে গাড়িতে পা দিলেন, অমনি ইঞ্জিন প্রাণবন্ত হল ; সিটে মাথা এলিয়ে দিলেন, অমনি চাকা গড়াতে শুরু করল। পেট্রোলের গন্ধে .চাপা পড়ল এসেন্সের, তারপর দুটোই মিলিয়ে গেল, কুঞ্জর চমক ভাঙল তখন। একটু পরেই ঘুম ভাঙল সাহেবের। চোখের কোণ অল্প অল্প লালচে। আস্তে আস্তে বার দুই ডাকলেন, “ইন্দু, ইন্দু। সাড়া না পেয়ে বড় করে চোখ মেললেন। দেখলেন বুকে। —মেমসাব কই রে। -এক্ষুনি তাে বেরুলেন। মেমসাহেবের ভয় করেনি, করছে কুঞ্জর। সাহেবের হুকুম না নিয়ে বেরিয়েছেন, যদি সাহেব ক্ষেপে যান। সাহেবে কিছুই করলেন না, শুধু বললেন, এক্ষুণি ? কটা বেজেছে। সাড়ে চার-তাইতাে। নিজেই ঢুকলেন গোসল ঘরে। এই গল্পটাই কুঞ্জ ক’দিন পরে বসিয়ে-বসিয়ে করেছিল বকুলদিয় কাছে। কপাল খুলে গেছে কুর। সাহেবের কখন কী দরকার হয়, সেই জলে খাসদালানের বারান্দার কোণে একটা কুঠুরিতে ওকে আস্তানা দেওয়া হয়েছে। শুধু দুটো কামিজ কিনতে ওকে পুরােপুরি দশ- টাকার নােট দিয়েছেন মেমসাহেব। তার থেকে তিনটি টাকা বাঁচিয়ে কুঞ্জ বকুলদিকে দিতে গিয়েছিল। বকুল মহা খুশি।—চাকরি পেয়েছিস, সত্যি কু? সাহেব-বাড়ি। সত্যিকারের নয়, কিন্তু অত কথা বকুলদিকে ভেঙে বলবে কেন। মেমসাহেব কথাটাই হাজার ব্যাখ্যান করে শােনল কুর। কেমন তাই নয়।
.
সােজা, কেমন স্বাধীন। এক-একলা বেরিয়ে যান গাড়ি করে, কাক
পরােয়া।
গালে হাত দিয়ে শুনছিল বকুল। সব শেষে বলল, অথচ তাের
জামাইবাবুকে না বলে সিনেমায় গেছলাম বলে সেবার আমাকে কী
মারটাই না মেরেছিল, তাের মনে নেই কু?
মনে আবার নেই।
ঘোড়া-গাড়ি করে ব্যাও বাজিয়ে একদল লােক সকালের দিকে
সিনেমার শুবিল বিলি করে গিয়েছিল। তারই একটা কুড়িয়ে
রেখেছিল বকুলদি। বেলা পডতেই দেখিয়েছিল কুঞ্জকে।চট করে
দুটো টিকিট নিয়ে আয় তাে ভাই।
টাকা।
সে বন্দোবস্তও বকুলদি করেছে বইকি। পুরনাে কাপড় আর ফুটো
বাসন বেচে আজই পেয়েছে টাকা-নগদ দুটাকা দশ আনা। এ-টাকার
খবর প্রাণকৃষ্ণ রাখেনা।
কুর তবু হাত সরেনা, পা পড়ে না। বলল, জামাইবাবু জানলে
বকবেন।
–টের পেলে তো।–বকুল ভরামুখ হেসে বলল,-কদিন থেকে
ওভারটাইম খাটছে, রাত দশটার আগে বাবু ফেরেনই না। আমরা
তার আগেই ফিরে আসব, দেখিস। বিকেলের রান্না সেরে রেখে দিইচি,
ফিরে এসে দু'খানা রুটি সেঁকে নােবােখন।
সেদিনই প্রাণকৃষ্ণ ফিরেছিল তাড়াতাড়ি। পুরােঘণ্টা কাজ শেয়
হতে ছুটল ওভারটাইমের লিস্টি দেখতে। নাম নেই। মেজাজ গেল
বিগড়ে। শালা, দুটো পয়সা উপরি আয়ের যদি জো থাকে। মুখ
দেখে দেখে খাতিরের লােক বেছে বেছে লিস্ট তৈরি হয়। ফিরে এসে
বাড়িতে দেখে বৌ নেই। সিড়ির ধাপে বসে একটার পর একটা বিড়ি
টেনেছে প্রাণ।
সেই বিভিন্ন আন কু দেখতে পেলে গলির মুখ থেকেই। বুঝলে
বেগতিক। বুকের ভেতরটা হিমহিম লাগল। একটু খােল বা পুরে নিতে পিছিয়ে রইল। গ্যাসের আলাে গলির ইদিকে নেই। একটা কেয়ােসিনের ডিফে আছে, সেটা আবার বােজ জ্বলেনা। তবু দেখতে পেলে প্রাণকৃষ্ণ শক্ত করে ধরেছে বকুলদির চুলের মুঠি, রাবণ যেমন করে সীতার ধরেছিল। হিড়হিড় করে প্রাণকৃষ্ণ ঘরের মধ্যে টেনে নিয়ে গেল বকুলদিকে। অনেকক্ষণ পরে পা টিপে টিপে ফিরে এসেছিল কুঞ্জ। সারাটা রাত রকে শুয়েই কাটল। আকাশের গায়ে কাঁটা দেওয়া অজস্র তারা। কিন্তু সেদিকে তো চোখ নেই কুর। ওর নিজের গায়েও কাটা দিয়েছে। হয়ত কার্তিকের হিমে; হয়ত অনেকক্ষণ ধরে বকুলদির কান্না শুনে শুনে। পরের দিন, প্রাণকৃষ্ণ কাজে বেরিয়ে গেলে বকুলদি ওকে কালো কালো দাগ দেখিয়েছিল। শুধু তাই না। নাকে, গালে, কানের লতিতে অনেকগুলাে ছড়ে-যাওয়া দাগ। -জামাইবাবু বুঝি দেয়ালে তােমার মুখ ঘষে দিয়েছিল বকুলদি? গলাটাকে করুণ করে কু জিজ্ঞাসা করেছিল। ফিক করে হাসল বকুল,দুর বােকা, এসব দাগ অন্য জিনিষের। তুই বুঝবিনা। একটু থেমে বলল, এ হ’ল ভালবাসা। ভালবাসারও আঁচড় পড়ে, জানিস ? কুঞ্জ তথনে অবােধ চোখে চেয়ে আছে দেখে বকুল বলল, সত্যি কাল আমাদেরই দোষ হয়েছিল ভাই। মেয়েমানুষ, সােয়ামীর অধীন। কত্তার হুকুম না নিয়ে আমাদের বেয়ােনাে উচিত হয়নি। দিদি মানে হল বকুলদিপাড়া সম্পর্কে। বয়সে বছর দুই-এর বেশি বড় না। আগে বুঝি কুঞ্জ নাম ধরেই ডাকত, সেই পুকুরে চান করা, ফুল ভােলা, ফল চুরি করার আমলে। তারপর বকুলের বিয়ে হয়ে গেল। পাত্র প্রাণকৃষ্ণ কলকাতায় চাকরি করে।
বিয়ের পর একবার বাপের বাড়ি ফিরে গেল বকুল, চওড়াপাড় শাড়ি, মােটা টানা সিদুর। দু’বছরের বড় তত ছিই, আরাে যেন বছর দুই বয়স বাড়িয়ে এল। ভাইবােনের খাতার পাতা ছিড়ে বকুল বরকে ভারি ভারি চিঠি লিখত, সেই চিঠি ডাকে দিতে হত কুঞ্জকেই। খামের ওপরে যত্নকরে- লেখা ঠিকানটা দেখে দেখে ওর মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। এবারে কলকাতা পাড়ি জমাবার আগে সেই ঠিকানাটুকু কাগজে লিখে এনেছিল কুঞ্জ। রাস্তাঘাট ঠাহর হতে হতে লাগল দিন চারেক। এ ক’দিন ফুটপাতে শুয়েছে, খেয়েছে মুড়ি, কলের জলে ভিজিয়ে। তারপর অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে ঠিকানায় গিয়ে পৌঁছেছিল ঠিক। খােলার দোচালা, টিনের বেড়া, দৰ্মার ঝাপ, চটের পর্দা। বুকটা কমে গিয়েছিল, তবু ফুটপাতের চাইতে ভাল । ভরসা করে দরজায় টোকা দিলে। বকুল ছিল রাস্তাতেই, একটা বে-আক্র কলে চান করছিল। অচেনা লােক দেখে শপশপে কাপড়ে ফিরে এল তাড়াতাড়ি, ঘড়াটা মাটিতে রেখে, ঘােমটাটা টেনে দিল। কুঞ্জ দেখল, শুকনাে লিকলিকে হাত, চোখে কালি, আরাে বছর চারেক বয়স বেড়েছে বকুলের। আর নাম ধরে ডাকা চলল না। বলল, বকুলদি? বকুল বলল, কু! আমি বলি কে না কে। আয় ঘরে ব’স। কবে এলি। সব শুনে গম্ভীর হয়ে গেল বকুল। মাসিমা নেই? কবে গেলেন। মেসােমশাই নিরুদ্দেশ? আহা। এখানে থাকবি বলে এসেছিস, ভাল কথা। কিন্তু বড় যে মুশকিলে ফেললি ভাই। এই তো দেখছিস ঘরদোরের অবস্থা, শুতে দিই কোথায় ? তাের জামাইবাবুর তাে ছাপাখানায় সামান্য কাজ, আমাদেরই চলেনা। তা হােক, তবু ওরই মধ্যে বলােব হয়ে গেল। কে শােবে বু, ; বা হােক দু মুঠো পাবে। চেনা আরেকটা ছাপাখানায় কুরুকে ফতােলার কাজ জুটিয়ে দেবার ভরসা দিল প্রাণকৃষ্ণ। বদল কি প্রাণকৃষ্ণরই কম হয়েছে। বিয়ের সময় ছিল বাগানে টেরী তেল-চপচপে চুল, ছােকরা ছােকরা দেখাতে। এবার কু দেখল, প্রাণকৃষ্ণর মাথার সমুখের দিকটা অনেকটাই ফসা হয়ে এসেছে, পেছনের দিকে যা কয়েক গােছ চুল আছে তার অনেকটাই শাদা। সামান্য দু’চার বছরে এতটা বয়স বেড়ে যায় মানুষের। সেবারে শ্বশুর বাড়ী গিয়ে ঘন ঘন কঁচি সিগারেট ফুকত ; এবারে বিলকুল খাকি তাও হিসেব করে প’হরে প’হরে ফেঁাকে, খুক খুক কাশে। তা কাশুক, প্রাণকৃষ্ণর মুখের বড়াই আছে তেমনি। প্রথম আলাপেই কুঞ্জ বলেছিল, আপনি একটা কাজ জুটিয়ে দিন জামাইবাবু। ছাপাখানার আপনিই তাে ম্যানেজার। ম্যানেজার? প্রাণকৃষ্ণ বলল, না ঠিক ম্যানেজার আমি নই। তবে বলতে পার বটে। ম্যানেজার নামে যেটা আছে সেটা ছাপাখানার কাজের বােঝে কী। আমাকেই সব চালাতে হয়। বিশ বচ্ছর কম্পােজ করছি, ক’ সিলিপে ক’ ইষ্টিক, চোখ বুলিয়ে বলে দেব। পারবে তুমি বলতে? পারবে আমাদের গ্র্যাজুয়েট মুখুজ্যে? ম্যানেজার হতে কত প্রেস থেকেই তো কত সাধাসাধি করে। বাইনে। বােয়েচ ভায়া, পুরনো চাকরি। তাছাড়া ও-সবে অনেক ঝকি-তা দেবব তােমাকে একটা কাজ জুটিয়ে। দিলও শেষ পর্যন্ত। প্রুফটানার কাজ। এ-কাজটা সহজ, শিক্ষা- নবিশি নেই, সাকরেদি নেই, দিনকতক গেলি টানাটানি করলেই ওস্তাদ। মাইনেপর ঠিক হল কিনা, কত ঠিক হল কে জানে, প্রাণকৃষ্ণ জানতে দিল না কুঞ্জকে। বলল, এখন শুধু খেটে যা। মইয়ের নিচের ধাপে আছিস, নজর রাখবি ওপরে, ওই ম্যানেজার মুখুজ্যে যেখানে বসে আছে, তােকে গিয়ে পৌছতে হবে ওখানে, বুইচিস।
; ছিল বেশ। দুটো খেত, পরত, শুত—কোনদিন রকে, জোর বিষ্টির দিনে সিড়ির নিচে চাদর বিছিয়ে। ভাের সাড়ে আটটায় বেরিয়ে যেত প্রাণকৃষ্ণ, কু তারে কিছু পরে। আগে কম্পোজ হবে তবে তাে পুরুফ। বাজার করে নিয়ে এসে কু দেখতে পেত কালে করে রাস্তা থেকে জল তুলে আনছে বকুলদি, পারছে না। কোমর বেঁকে গেছে, ঠোট দুটো আলগা। আসতে আসতে পাচ্ছে। ছুটে যেত কুঞ্জ। সরাে বকুলদি, আমি ধরে দিচ্ছি জল। এই ক’ বছর শশুরঘর করে, জল টেনে, বাসন মেজে আর উনুন ধরিয়ে ধরিয়ে শরীরে আর কিছু নেই বকুলদির; শুকিয়ে কাঠিসার তো হয়েছেই, সবটুকু লাবণ্য ঝরে গেছে। সবটুকু বুঝি নয়। এখনও যখন কাপড় কেচে, গা ধুয়ে ঘরে এসে ঢেকে বকুলদি, অনেক কষ্টে দরজার কবটের আড়াল করে ওর দিকে পেছন ফিরে কাপড় ছাড়ে, হাত-আয়না সমুখে রেখে টেনে টেনে চিরুণী চালায়, কুর চোখে ধাঁধ। লাগে। অনেক দিন আগে দেখা ওদের গ্রামের স্নিগ্ন শ্যামল কিশােরীকে মনে পড়ে। এখনাে। তবে একেবারে মরে যায়নি বকুলদি, ফুরিয়ে যায়নি। এখনও যদি একটু জিরিয়ে নিতে পারত, খেতে পারত পেট ভরে, তবে বকুল আবার তাজা হয়ে উঠতে পারত, বাতাস লাগত হাড়ে, গালে মাংস, রক্ত আসত শরীরে। কিন্তু শুধু খেতে পেলেই কি সুখী হত বকুল। প্রাণকৃষ্ণ খেয়ে উঠে গেছে, পাতের কাছে বসে বকুলদিকে শুকনো মাছের কাটা চুষতে দেখে কুর তাই মনে হয়েছে বটে, কিন্তু ভাল করে নজর করে মাঝে সন্দেহ হয়েছে, শুধু খাওয়াপরা আর বিশ্রামের অভাবই বকুলদির আসল অসুখ নয়, আরাে কিছু আছে। প্রাণকৃষ্ণর এটো তুলে নিতে এসে থালার চারপাশে লেগে থাকা দু চারটে ভাত কুড়িয়ে কুড়িয়ে খেত বকুলদি। কোন কোন দিন কুরু চোখে ধরা পড়ে গেছে।
-তােমার বুঝি আজ খাওয়া হয়নি, বকুলদি ? এ রকম হাসি ফুটত বকুলদির মুখে। লজ্জা ঢাকে হাসি, কিন্তু হাসির দৈষ্ট ঢাকে কিসে। হবে না কেন, তাই বলে জিনিষ নষ্ট করব কেন। তোের একদম বুদ্ধি নেই কুর। বুদ্ধি আছে প্রমাণ করবার জন্যেই কুঞ্জ হয়ত মাঝে মাঝে পাতে আদ্ধেকটা ভাত ফেলে রেখে উঠতে গেছে। বকুল তা হতে দেয়নি। -ভাত নষ্ট করছিস যে? খিদে নেই। তাছাড়া নষ্ট হবে কেন। -কে খাবে তাের পাতেরটা। ভয়ে ভয়ে, কতকটা চোখ বুজে কুঞ্জ বলেছে, কেন তুমি। বকুল চটে উঠেছে, কিম্বা ভাণ করেছে। এই বুদ্ধি হয়েছে তােমার এত বয়সে। সােয়মীর প্রসাদ খেলে পুণ্যি হয়, তোর পাতেরটা খেলে আমার কি। কুঞ্জ বলতে চেয়েছে, আমার পুণ্য হবে, কিন্তু কথা সরেনি। কিন্তু আসলে তাে খেতে পাওয়ার দুঃখই শুধু নয় বকুলের, আয়না একটা আছে। এই ভয় স্পষ্ট নয়, প্রত্যক্ষ নয়, তবু আছে। বাতাসের মত, নিঃশ্বাসের মত, অজানিতে চোখের পলক পড়ার মত। বিকেলে গা ধুয়ে এসে ভাল একখানা কাপড় পরে কৈকি বকুল, প্রাণকৃষ্ণর জন্যেই পরে ; তবু, কুঞ্জর দেখতে ভুল হয়নি, সদর দরজায় প্রাণকৃষ্ণর গলার আওয়াজ শুনলেই মুখে কেমন একটা ছায়া নামে। সে-ছায়া অবশ্য মিলিয়ে যায় মুহূর্তেই। একটু পরে হাসে বকুলদি, বকুলদিকে হাসতে হয়।আজ এত দেরি ? সারাদিন পরিশ্রমের পর মেজাজ তিরিক্ষি প্রাণকৃষ্ণর। ঘর্ঘর গলায় কী বলে বােঝা যায় না। তারপর হাত মুখ ধুয়ে ঠাণ্ডা হয়ে দু'একটা ইয়াকিও দেয় বৌয়ের সঙ্গে। বকুলদিও হাসে, হাসতে হল। তবুকে •• হাসি, কুঞ্জ ঠিক ধরতে পারে, পেতলের কলসির কানার মত; অন্তরের ছায় লুকিয়ে যায়, ঘােচে না। শুধু বকুলদি কেন স্বামীস্ত্রী সম্পর্কে কুঞ্জর অভিজ্ঞতাই এমনি। এই বস্তিতে আরাে তাে ক'ঘর পরিবার আছে। ও-পাশে ললিতাদি এ-পাশে নীলুদিরা। এমনিতে বেশ আছে। স্বামীর জন্যে রান্না করে, জামা রিপু করে, একসঙ্গে শােয়, বছর বছর বিয়ােয়, কিন্তু তবু কোথায় যেন একটা অস্বাচ্ছন্দ্যের পর্দা দুলতে থাকে। একই সুখ, একই দুঃখের শরিক দু’জনে, তবু দু’জন যেন সমান নয়। একে প্রভু, অপরে দাসী। নইলে সামান্য একটু অন্যমনস্কতার জন্যে ভাতটা একটু ধরে যায় যেদিন, সেদিন বকুলদির মুখ অমন শুকিয়ে যায় কেন, চোখে মুখে ফুটে ওঠে কেন আতঙ্ক। বলে, আজ তাের জামাইবাবু আমাকে আস্ত রাখবে না কুঞ্জ। কী করে ধরে গেল বল দেখি। অবশ্য প্রাণকৃষ্ণও বলে। হাসতে হাসতে। একবারে পাচসিকে পয়সা বাজী ধরেছিল রেসে। কিছু ফিরে আসেনি। ছাপাখানার কালি ধুয়ে মুছে বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রাণকৃষ্ণ বলেছিল, তাের দিদি একেবারে ক্ষেপে যাবে কুঞ্জ। কাপড়কাচা সাবান, সুতাে আর মশলা কেনার পয়সা হিসেব করে দিয়েছিল। ওকে আমি কৈফিয়ৎ দেব কী। বলতে বলতে গলাটাকে ভারী করে আনে প্রাণকৃষ্ণ, চোখমুখও গভীর, তবু কুঞ্জ জানে সব কৃত্রিম। বকুলদির বিন্দুমাত্র তােয়াক্কা রাখে না প্রাণকৃষ্ণ। যেমন রাখেন পাশের ঘরের ললিতাদির স্বামী পশুপতি। এক একদিন বাসায় ফিরতে পশুপতির খুব রাত হয়ে যায়। দরজার ওপর দুমদাম আওয়াজ করে। ললিতা যদি বলে, আজ আবার ওসব খেয়েছ,-মুহূর্তে বিনয়ে কাদা হয়ে যায় পশুপতি। ধরাধরা গলায় বলে, মাইরি না। আর কোনও দিন ওসব ছোঁব না। এই তােমার পা-দুয়ে বলছি- পা দুতে যায় বটে, তখন শখের জোয়ারের পর অনুতাপের টা চলছে, কিন্তু সত্যি কি আর ছোয়, না ললিতাদি তে দেয়।
এর পরও যদি বুঝেসুঝে চুপ করে না যায় ললিতাদি, অমনি বিনয়ের খােলস ছেড়ে ফুসে উঠবে পশুপতি, দু’চার ঘা বসিয়ে দেবে। এসব দেখে দেখে অভ্যাস হয়ে গেছে কুর। তবু দিন মন্দ কাটছিল , কেটে যেত-ও, যদি না প্রাণকৃষ্ণর চাকরিটা অমন হঠাৎ চলে যেত। গেল, কাজে ঢিলেমির জন্যে নয়, গরহাজিরার জন্যে নয়, সীসে চুরির দায়ে। কিছুদিন থেকেই টাইপ কমতে শুরু করেছিল, কেস-কে-কেস দুদিনে খালি। নজর রাখা শুরু হল। সাতদিনের মাথায় ধরা পড়ল প্রাণকৃষ্ণ, হাতেনাতে। সঙ্গে সঙ্গে সাফ জবাব হয়ে গেল। থানা পুলিশ হলনা, বিশ বছরের চাকরি। বাবুরা মাফ করলেন। কিন্তু চাকরিটি কেটে দিলেন। সেই সঙ্গে কুঞ্জরও। চোরে চোরে মাসতুতাে ভাই নয়, শালাভগ্নীপতিও হয়। কে না জানে কুঞ্জ প্রাণকৃষ্ণেরই লােক। সব গুনে গুম হয়ে বসে রইল বকুল। --এবারে কী উপায় হবে। প্রাণকৃষ্ণ ভরসা দিল, কিছু ভেব না, একটা জুটবেই। এত বছর ধরে অাছি এ-লাইনে। জুটল না তত সহজে। কেলেঙ্কারির খবর দ্রুত ছড়ায়। সবাই কী করে টের পেয়ে গেছে চুরির দায়ে বরখাস্ত হয়েছে প্রাণকৃষ্ণ। আরাে মাসখানেক কাটল। এই এক মাস প্রাণকৃষ্ণ বসে থাকেনি। চায়ের দোকানের রকে বসে বসে অব্যর্থ ঘোড়ার কুষ্টিকুলুজী বিচার করেছে। পাঁচ ধরে দশ আনা ফেরৎ এসেছে এইমাত্র, তাতে সংসার চলেনা। বকুলের সঞ্চয়ের শেষ কড়ি পর্যন্ত ক্ষয়ে ক্ষয়ে এল, কিন্তু প্রাণকৃষ্ণর আশা নয়। বােগা জিরজিরে বুকে চাপড় মেরে বলল, সবুর, আর কটা দিন। একটা হদিশ পেয়েছি। ঠিক মত গেঁথে তুলতে পারলেই, ব্যস, পায়ের ওপর পা ধুয়ে--বুঝলে বকুল। বকুল ভাষাহীন, ফ্যাকাশে মুখে তাকিয়ে থাকে। বােঝে কিনা বােঝা যায় না।
১৪ একদিন বিকেলে এসে তাড়া দিলে প্রাণকৃষ্ণ। চটপট তৈরি হয়ে নাও তাে বকুল, সিনেমায় যাব।—সিনেমা! সকালে শুধু মুড়ি খেয়ে কেটেছে, ও বেলার জন্যে তাও নেই। বকুল বলল,-সিনেমা। ধমক দিল প্রাণকৃষ্ণ। হাঁ করে তাকিয়ে থেকোনা, যাও সাবান দিয়ে মুখ ধুয়ে এস, চটপট । সাবান কোথায় ? কেন ললিতার কাছে ধার করে চালিয়ে নাও না। দেবে না। আলবৎ দেবে। যতক্ষণ শাড়ি বদলাল বকুল, ততক্ষণ প্রাণকৃষ্ণ ওর প্ল্যান উন্মােচন করল। আরে, জোর একটা টিপস পেয়ে গেছি। নিরুপমা পার- ফিউমারির নাম শুনেছ। পারফিউমারি কি বস্তু বকুলের জানা ছিল না। সাবান, তেলের কোম্পানী আর কী। আজ ললিতা তােমাকে সাবান মাখতে দিতে খুৎ খুৎ করছিল, দু’দিন বাদে তুমি ওকে বাক্সবাক্স সাবান দিতে পারবে। তবে আমরা এখানে আর থাকব না এই যা। আঁচলটা বেড় দিয়ে সবে মাথার ওপর তুলছিল বকুল, হঠাৎ ওর হাত আলগা হয়ে গেল।-এখানে আর থাকব না। বাহাদুর গলায় প্রাণকৃষ্ণ বলল, তবে আর বলছি কেন। নিরুপমা পারফিউমারির অর্গানাইজার সুবােধ চক্রবর্তীর সঙ্গে আলাপ হয়েছে। আমাকে ওরা বাইরে পাঠাতে চায়—বিহার উড়িষ্যার সােল এজেন্ট করে। মালটা চালাতে হবে আর কী। ট্রেনে ট্রেনে ঘোরাঘুরি করে এতক্ষণে বকুল বুঝতে পেরেছে।–ফিরিওয়ালা হবে তুমি? কম্পােজিটারের বৌ বকুল। সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে বড় হুশিয়ার। ফিরিওয়ালা তত আরাে এক ধাপ নিচে। -আরে দূর দূর। ফিরিওয়ালা হতে যাব কেন। আমার অধীনেই কত ফিরিওয়ালা থাকবে দেখ। এই কু ছোঁড়াটাকেও আমি একটা কা দিয়ে দেব। এসব কাজে বহু দায়িত্ব বকুল, বিস্তর টাকা জন * দিলে তবে জোটে। নেহাৎ সুবােধ চক্রবর্তীর আমাকে খুব মনে ধরেছে তাই- তাই সুবােধ চক্রবর্তীর পয়সায় সিনেমা যেতে হল। । সিনেমায় কী হয়েছিল, সেদিন বােঝেনি কুঞ্জ। ফিরে এসে বকুল ভালমন্দ কিছুই বললে না। কেমন গল্প, ক’টা গান, কিছু না। জিজ্ঞাসা করতে সাহস পেলে না। দিন তিনেক বাদে প্রাণকৃষ্ণ বলল, চটপট তৈরি হয়ে নাও। বিকেলে বেড়াতে যাব। সুবােধ চক্কোত্তি আসবে গাড়ি নিয়ে। বকুলের মুখ মড়াফ্যাকাশে হয়ে গেল, প্রাণকৃষ্ণ সেটা নজর করল কিনা বােঝা গেল না, কিন্তু কুঞ্জ দেখে নিয়েছে ঠিক। -আজকে ? আবার! বিবর্ণ মুখ প্রাণকৃষ্ণ দেখতে পায়নি কিন্তু বিরস গলা শুনল ঠিক। চটে গিয়ে বলল, কী রাজকার্য করছ এখানে বল দেখি। সুবােধ চক্কোত্তির মেলা পয়সা বকুল, খাবার লােক নেই, লােকটা তাই মনমরা হয়ে থাকে। নইলে টাকাকে টাকা জ্ঞান করে না। আজ ধরেছে ডায়মণ্ডহারবার যাবে। —যাক না। বকুল বলল, যত খুশি বেড়িয়ে বেড়াক। আমাদের নিয়ে টানাটানি কেন। কথার ছিরিতে প্রাণকৃষ্ণ ক্ষেপে গেল ;-টানাটানি আবার কিসের। যেতে ইচ্ছে হয় যাবে, না হয় যাবে না। স্থির চোখে একবার স্বামীর চোখের দিকে তাকাল বকুল, বলল, বেশ, চল। ফিরে এসে সটান শুয়ে পড়ল। কুঞ্জ আগেই মুড়ি-বাতাসা খেয়ে নিয়েছিল। সেদিন আর উনুন বলল না। নাটকীয় সেই ঘটনাটা ঘটল আবাে দিন চারেক পরে। একটা টাকা দিয়ে লােকটা ওকে ফরমাস কয়ল, বাওতে খােকা, এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে এস, আর দু’খিলি পান।
ঝাঁঝ। দুপুর-দোকানের বাপ বন্ধ, ফিরে আসতে কুর মিনিট পনেরাে লাগল। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতে যাবে, পারল না। রুদ্ধশ্বাস বকুলদি, আরক্তমুখী বলছে, যান, এখুনি বেরিয়ে যান আপনি। নইলে মিটি মিটি হাসছে সুবােধ।নইলে কী। নইলে উনি এসে আপনাকে ঘাড় ধরে বার করে দেবেন। —প্রাণকেষ্টের কথা বলছ ?—তেমনি হাসছে সুবােধ-আরে না, সে আসছেনা বকুল, তােমার ভয় নেই। প্রাণকেষ্টকে মােড়ের দোকানে বসিয়ে এসেছি, সে এখন চিংড়ির কাটলেটের কাটা চুষছে। সেই মুহূর্তে কী হল কুর, ঘরে ঢুকল ঝড়বেগে, অন্ধের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল সুবােধের গায়ে, হাতের কাছে কিছু না পেয়ে শুধু নখে রক্তক্ষত করে দিতে থাকল। ছিটকে পড়ল অবশ্য মুহূর্তেই। সুবােধ চক্রবর্তী লিকলিকে হলেও কুঞ্চর মত পুচকেকে কায়দা করার জোর রাখে। মেজেয় ঠোকর খেয়ে কেটে গেল কপালের খানিকটা, আর, তখন আর, জ্ঞান রইল না কুঞ্জর। হাতের মুঠোয় ছিল খুচরাে ক’আনা পয়সা, দেশলাই, সিগারেটের প্যাকেট। সব আবীরছোড়ার মত ছুড়ে দিল সুবােধের চোখ লক্ষ্য করে। চশমাটা চুরমার হয়ে পড়ল মাটিতে, তারই দু একটা টুকরো বিধে থাকবে অবােধের চোখে। দু’হাতে মুখ ঢেকে অবােধ মাথাহেঁট অপমানে ঘর থেকে সুড়সুড় বেরিয়ে গেল। কিন্তু সে তো শুধু প্রথমাঙ্কের যবনিকা। প্রাণকৃষ্ণের প্রবেশ হল বেলা গড়িয়ে যেতে। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, সুবােধ আসেনি হাঁটুতে মুখ গুজে বসেছিল বকুল, এতক্ষণে ভেঙে পড়ল কায়ায়। গােঙানির সঙ্গে ইনিয়ে বিনিয়ে কী বললে, বাইরে দাড়িয়ে শুনতে পেল । প্রাণকৃষ্ণ ততক্ষণে কঠিন হাতে ঠেলছে বকুলকে।-যাওনি, যাওনি তবে সুবােধ চিেত্তর সঙ্গে? 5 মিনমিনে স্বরে বকুল একবার বলতে চেষ্টা করল, তুমি ছিলে না- -সতীনােকখি! কই পাতানাে ভাইয়ের সঙ্গে গলাগলি করে যাওয়া সময় এই হিসেব তাে ছিলনা। ওর সঙ্গে কিসের এত গুজগুজ ফুসফুস। ও শালাকে আজই মেরে তাড়াব। দম নিল প্রাণকৃষ্ণ, ফের হতাশার ভঙ্গিতে হাত ঘুরিয়ে শুরু করল। আর কী, যা কিছু আশা-ভরসা ছিল, সব ফর্সা হয়ে গেল। কী খােয়া যেত তােমার সুবােধের কথাটা রাখলে। আর মাস খানেকের মধ্যেও একটা কাজ যদি না জোটাতে পারি, তখন কোথায় থাকবে তােৰ এজ তে বেশ্যাবিত্তি করেও কুল পাবিনি। মেরে তাড়াতে হল না, কুঞ্জ সেদিন নিজে থেকেই সরে পড়ল। তারপরেও কিন্তু একদিন লুকিয়ে দেখা করতে এসেছিল বকুলের সঙ্গে। দেখল তালা বন্ধ। মমাড়ের কাছে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছে, দেখল গাড়ি থেকে নামল বকুল। ভাঙ্গা চশমা জোড়া লাগেনি, নতুন চশমা সুবােধের চোখে। দুরুর ওপরে ছােট একটু ব্যাণ্ডেজ। উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে হনহন রাগে কুঞ্জ চলতে শুরু করল। সব শুনে শশী বলল, রাগের কী আছে। বকুল ঠিকই করেছে । শশীর সব ঠাণ্ডামাথা বিবেচনা । বলল, স্বামীর ইচ্ছেই তাে ইন্ত্রীর ইচ্ছে। স্বামীর ভালই তাে ইস্ত্রীর ভালাে। তার আবার আলাদা সুখ কী, আলাদা ইজ জৎ কী। কুঞ্জ তবু বলল, তাই বলে পরপুরুষের শশী বলল, পরপুরুষ আবার কী। স্বামী যার হাতে সঁপে দেন তার মধ্যেই তাে স্বামীকে ধ্যান করতে হয়। গােপিনীরা যেমন করেছেন। নিজেদের শ্রীকৃষ্ণের কাছে সপে দিতেন, পড়িসনি। এর মধ্যে কোন পাপ নেই কুখ। বকুলের কোন দোষ নেই।
: দোষ তাে নেই, কিন্তু মন বােঝে কই। মাঝে মাঝে বকুলের কাছে যায় বটে, কিন্তু গলির কাছাকাছি এসে নাকে হাত দেয়। এখানে কি সে কখনও ছিল। এখন মনে হয় দুখের মত। আটাকা নর্দমার গন্ধ, ফুটো চালে উকি দেওয়া শতনে ইন্দ্র আকাশ, আর শত ছিদ্র কাপড়ে থােগারােগা কতগুলাে মেয়েমানুষের ঘােরাঘুরি। ওখানে শুধু ফুলে ফুলে রামধনু, সবুজ ঘাসগালিচা, ঝাউউদাস হাওয়া, আর, আর মেমসাহেব। একটি স্বপ্নসুড়ঙ্গের মত সমােহিত দিন-রাত্রি। কোথায় কোন্ স্পাের্টসে বখশিস বিতরণ করে এসেছেন মেমসাহেব। এসেই শুয়ে পড়েছেন বিছানায়। মাথা ধরেছে। একটু ওডিকোলন ছিটিয়ে দিলেন কপালে, তাতেও ব্যাথা কমল না, অস্ফুট গােঙানি শুনতে থাকল কুঞ্জ, দূরে বসে। একটু পরে মেমসাহেব ওকে ইসারায় ডাকলেন, ছােট রুমালটা শুকিয়ে গিয়েছিল, আবার ভিজিয়ে আনতে বললেন। শয়নকক্ষলগ্ন স্নানঘর। এটুকু পথ যেতে আসতে কুর তিন মিনিট কেটে গেল। এতক্ষণ ধরে নিবিড় স্পর্শে ইন্দ্রাণীর কপালের সবটুকু তাপ আহরণ করেছে রুমালটা, সেই তাপটুকু কু শুষে নিতে চাইছে করপৃষ্ঠের বােমকূপ দিয়ে। বেসিনে জল ঝরছে, ঝরছে ত ঝরছেই; ইত্ৰাণী কাতর গলায় ডাকলেন, কু! কী করছিস এতক্ষণ ধরে। চকিতে সম্বিত ফিরে এল। থরথর হাতে ভিজে রুমালটা মেম- সাহেবের হাতে কুঞ্জ তুলে দিল। একটু পরেই ঘরে ঢুকেছেন চৌধুরী সাহেব। সুইচবাের্ডে হাত দিতেই ইত্যাণী বলেছেন, প্লীজ, ডােন্ট। মাথা ধরেছে পাশ ফিরে শুয়ে ইত্যাণী বলেছেন, ইয়েস, বীষ্টলি। তখনকার মত কেটে গেছে বটে, কিন্তু সেই স্বপ্নমােহ বারবার ফিরে এসে।
আর্ট একজিবিশনে যাবেন, বিছানা থেকে উঠে মেমসাহেব চোখে জল দিতে গেছেন, বিছানাটা ফের ঠিক করতে গিয়েও কার হাত সরেনি। চাদরে বালিশে একটি দিব্যদেহের ছাঁচ, একটি অস্পষ্ট মধুর সুরভি। জুতো পালিশ করতে গিয়েও দেরি হয়েছে, ধমক খেয়েছে, তবে কুর হুশ হয়েছে। আরেক দিন। দামী শাড়িখানা কুঞ্জই ধুতে দিয়েছিল। ভাজ খুলেই মেমসাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন, একী, এমন করে আঁচলটা কাটলে কে। তলৰ পড়ল কুর। —এটা কে ধুতে দিয়েছিল, তুমি ? কুম্ভ স্বীকার করল। তৎক্ষণাৎ ওকে শাড়িটা দিয়ে ইন্দ্রাণী বললেন, যাও, এক্ষুনি এটা ওদের দোকানে দেখিয়ে নিয়ে এস। বল পুরাে দাম কাটব আমি। কুৰ তবু নড়ে না। মেমসাহেব ধমক দিলেন আবার—যা—আও! দাড়িয়ে আছ যে। পলক পড়ছে না কুর চোখের। ওর পেছনের দেয়ালে বিশী আলাে, সামনে মেমসাহেব। হঠাৎ কুঞ্জর নজরে পড়েছে, মেম সাহেবের গায়ে ওর সম্পূর্ণ দেহের ছায়া। কুঞ্জর চিনতে ভুল হয় নি, সে-ছায়া ওর নিজেই। নিনখ শুভ্র পায়ের আঙর আঙুল ছুঁয়ে সাপের মত বেয়ে বেয়ে উঠেছে সে ছায়া, শাড়ির ভাজে ভাজে বাধা পেয়ে পেয়ে, বাধা না মেনে, ছায়া করাঙ্গুলি থরথর করে কাঁপছে ইস্রাণীর দুঃশাসন উচ্চচূড় শুনে, কুঞ্জর রুগ্ন, ধুক ধুক ধুক ছায়া হয়ে মিশে আছে ইস্রাণী অবারিত গ্রীবামূলে, আর ইণীর ঈষভিন্ন অধরােষ্ঠ কুঞ্জর ছায়া-কঠে আসক্ত। মাথায় কু ইন্দ্রাণীর চেয়ে ছােট, কিন্তু ছায়া হয়ে ছাড়িয়ে গেছে। ইস্রাণী ফের অসহিষ্ণু ধমক দিলেন, কই গেলে না? যাও। যাবে, কু এবার যাবে। কায়া দিয়ে যার পায়ের পাতাটুকু ছোঁবারও অধিকার কোন দিন পাবে না, ছায়া হয়ে তার সব দেহে নিবিড় স্পর্শ পেয়েছে। কুঞ্জর আর আফশােস নেই। কিন্তু কোথায় যেন সুর কেটে গেছে। ক’দিন ধরে স্পষ্ট টের পেয়েছে কুঞ্জ। বাগানে জল দেওয়া বন্ধ। ঘাস বিবর্ণ, হলিহক, ভায়ােলেট, পপি আর প্রিমরােজ নির্জীব। গাছগুলাে ঝকরাচুল হল, তবু ছট নেই। শশী বলল, এ বছর আর ফুল হবে না, বাড়তি খরচ সাহেব সব বন্ধ করে দিয়েছেন। একটু থেমে ক্ষুন্নকণ্ঠে আবার বলল, আমারও জবাব হয়ে যাবে কুঞ্জ। জবাব হয়ে যাবে শশীদা। কুঞ্জর শহর বাস বেশ কিছুদিন হয়ে গেল, গলায় আর তেমন আন্ত- রিকত ফোটে না। এমন কি শশীর সুপারিশেই যে এখানে ঢুকেছিল সেটাও যেন ভাল মনে নেই কুঞ্জব।-জবাব হয়ে যাবে শশীদা! কারুর পুত্ৰ বিয়ােগের খবর পেয়ে মেমসাহেব ফোন তুলে যে সুরে শােকাতুরাকে সান্ত্বনা দেন, কুঞ্জর গলাতেও সেই নিরুত্তাপ নাগরিকতা। আসল খবর জানা গেল ক্রমে ক্রমে। শেয়ারের খেলায় ফকির হয়েছেন চৌধুরী সাহেব। কঁচা টাকা প্রায় সবই খাঁচাছাড়া চিড়িয়ার মত উধাও, স্থায়ী জিনিসের মধ্যে এই বাড়ি, এই গাড়ি আর কিছু জমি —সেখানেও স্পেকুলেশন-সেও বঁড়শে-বেহালার দক্ষিণে, নীচুডাঙ্গায়, ভূমণ্ডলের মত তারও তিনভাগ জল একভাগ স্থল। ভেজান দরজার বাইরে কুকুরটা টা টা করে, কেউ ফিরেও চায়না, দরজার আড়ালে সাহেব-মেমের কলহ চলে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে ঝিমের কু, কী কথা হয় যােঝে না, শুধু চাপা গলার কুদ্ধ অর্জন কানে আসে। মাঝে মাঝে কু চমকে ওঠে, এই এক্ষুণি পর্দা ঠেলে মেমসাহেব বেরিয়ে আসবেন, একটি মাত্র আঙ্গুলের ইশারায় ওর জবাব হয়ে যাবে। যে পথে গেছে বাগানের ফুল, লনের মাস, দেয়ালের কলি, সেই পথেই যেতে হবে।
শক্ত করে টুলটা চেপে ধরে কু, চোখের পাতা ভিজে ওঠে। যাৰে , যেতে পারবে না। কাপা কাপা আঙ্গুল দিয়ে কুর্তার পকেটটা হাতড়ায়, মুঠি করে ধরে। কে জানে কুঞ্জ ওখানে কী রেখেছে। পা টিপে টিপে দরজায় চোখ রাখে। সাহেব দাড়িয়ে আছেন টুলের ওপর পা রেখে, একটা হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে, স্পষ্টই উত্তেজিত। -দেখাবে না, দেখাবে না তুমি আমাকে তােমার হিসাব ? সংসার খরচের টাকায় তােমাকে হাত দিতে দেব না । এটা আমার। -তোমার! এমন স্বরে সাহেব হেসে উঠলেন যে কুঞ্জর মনে হল জানালার সার্দি ঝন ঝন করে উঠল।-তােমার! তােমাকে কে চেনে ইন্দু, সবাই চেনে মিসেস চৌধুরীকে। এর কোন জিনিসটা তােমার। সংসার খরচের টাকার কথা ছেড়ে দাও, এই মুহূর্তে তােমার বাক্সের চাবি ছিনিয়ে নিতে পারি, দেখতে পারি কত আছে তােমার পাশ বইয়ে, এমন কি, এক টানে ছিড়ে নিতে পারি তােমার কানের ওই বালিংটনের বাড়ির জড়ােয়া দুল কুঃ শিউরে উঠল, দেয়ালটা ধরে সামলে নিল, সরল না তবু। সভ্য মানুষটির মুখােশ বুঝি একেবারে খসেখসে। কিন্তু না। সােজা হয়ে দাড়িয়েছেন ইস্রাণী, দেবী প্রতিমার মত, সাহেবের মাথাও যেন ছাড়িয়ে গেছেন। দেবীর মত শ নেই হাতে, কিন্তু ভঙ্গিটা এক। তা ছাড়া ওই দ্রুত ওঠাপড় বুকে সাহস, প্রােজল চোখের ঘৃণা, ওই তাে তার আয়ুধ। একটি কঠিন আঙ্গুল তুললেন ইন্দ্রাণী, একটি নিশিত ছুরিকার মত, রঞ্জিত নখাগ্রে বিজলী ঝলসে গেল-যাও, এক্ষুণি চলে যাও তুমি। যাও। সেই মুহূর্তে ইন্দ্রাণীর পায়ের কাছে কুঞ্জ মুছিত হয়ে পড়তে পারত। পেয়েছেন, ইন্দ্রাণী পেয়েছেন। তার কুড়িবুড়ি বকুলদি যা পারেনি, একটি মাত্র নির্ভীক আঙ্গুল তুলেই মেমসাহেব সেই অসাধ্য সাধন করেছেন। হৰ বেরিয়ে যেতেই মেমসাহেব শুয়ে পড়লেন, আগে নিৰিলে।
পা টিপে টিপে সেই ঘরে ঢুকল কু। কী ঠেকল পায়ে। একটা কাটা। বােধহয় মোহেবের চুলে। সেই যে বেরিয়ে গেলেন সাহেব, আর সাত দিনের মধ্যে ঘরমুখাে হলেন না। বাগান তাে কবেই ওকিয়েছিল, এখন ধূলাের সয় পড়েছে বারানায়, পায়, আসবাৰে। মেমসাহেবের ভ্রুক্ষেপ নেই। ঠোটের কোণের হাসিটুকু মিলিয়ে গেছে, এসেছে একটু কঠিন দৃঢ়ত। পােষাকের সেই ৰিমঝিম এসেগটুকু নেই, এ ক’দিন মেমসাহেব মােটে প্রসাধনই করেন নি। কাছেও ডাকেন নি কুঞ্জকে। তবু, দূর থেকে দেখেই, কুর বুক ভরে গেছে। ইন্দ্রাণী বিদ্রোহী,বন্দিনী, তবু বিজয়িনী। সাতদিন পরে ফের ঘরের মধ্যে ৪ গুন আলাপ শুনে কুঞ্জর অবাক লাগল। শণ বলল, সাহেব কাল ফিরেছেন যে। অনেক রাত্তিরে গাড়ি এল, শুনিসনি? সাহেব গিয়েছিলেন বােম্বাইয়ে। -কেন?-অর্থ নেই, তবু কুঞ্জ জিজ্ঞাসা করল। পুরানাে চাকর, কী করে সব খবরই যেন চটপট জানা হয়ে যায় শশর। একটা ফিলিম কোম্পানী খােনার ইচ্ছে সাহেবের অনেক দিনের। এবার শেয়ার বাজারে মার খেয়ে সেই ইচ্ছেটা আরও প্রবল হয়েছে। যা কিছুঝরতি-পড়তি পুজিপাটা আছে, সব একত্র করেছেন। বােম্বাই থেকে পাকড়ে এনেছেন জন কয়েক হাইকে। বেশির ভাগ টাকা তারাই দেবে, বাংলা বই কলকাতাতে ভােলা হবে। -তারা সব থােয়? কুঞ্জ জিজ্ঞাসা করল। তারা উঠেছে একটা বড় হােটেলে, আজ বিকেলে জোর একটা পার্টি। সাহেব বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। শিস দিলেন খানিকক্ষণ, নীল আকাশটার দিকে চেয়ে। সুপিকে কোলে তুলে আদর করলেন। মেমসাহেবও এসেছেন পিছনে পিছনে। চৌধুরী বললেন, আমি তা হলে এখন চললুম। দু’টার আগেই ওদের নিয়ে আসবে। তুমি সৰ ব্যৰ এদিকে ঠিক করে রে, হােটেনে ফোন করলেই ওরা সব ঠিক টি পেয়ে নিয়ে যাবে।
-পারব না। সাহেব চটলেন না, হাসলেন,নটি গ্যল; সেম এর এর। -বিকেলে আমায় কাজ আছে; আর্টগ্যালারিতে সিম্পােনি। —টু হেল উইথ ইয়াের সিম্পােসিয়ম। সাহেব বললেন,-না না, এ কাজটা তােমাকে করতেই হবে ইন্দু; এটা হাসিল হলে আমার ভাল, তােমার ভাল। ইউ ক্যান ডু ইট, এ্যাণ্ড আই নাে ইউ উইল। মেমসাহেব জবাব দিলেন না, ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন। উকি দিয়ে কু দেখেছে, সােফায় ইন্দ্রাণী আধশােয়া হয়ে। কপাবে দু'চোখ মা- দিত। অনেক পরে মেমসাহেব উঠলেন, চাবি দিয়ে খুললেন আননি। বু তখনাে দেখছে। থরে থরে সাজানাে শাড়ি, মা, পেটিকোট। ভাজ খুলে খুলে মেমসাহেব দেখছেন। নিঃশাস পড়ে না কুঞ্জর! সাহেব নেই, এই অবসরে তবে পালিয়ে যাবেন মেম সাহেব ! বেছে নিচ্ছেন শুধু নিজের পছমত দু’চারখানা জামা কাপড়। কিন্তু না। মেমসাহেব সবই ফের একে একে গুছিয়ে রাখলেন আল- মারিতে। শুধু চোখ ঝলসানাে এক প্রস্থ পােষাক নিয়ে গােল কামনায় ঢুকলেন। একটু পরে বেরিয়ে এলেন নব রূপে; আয়নার সম্মুখে দাড়িয়ে দাড়িয়ে পরশেন কর্ণাভরণ, যাতে তাকে সব চেয়ে মানায়। কুর তলব পড়ল খানিকক্ষণ বাদে। আজ ক'জন লােক আসবে, মেমসাহেব বললেন, তুমি দরজা জানালাগুলাে একটু ঝেড়ে মুছে রাখ। বেলা পড়তে না পড়তেই হােটেলের গাড়িতে খাবার এল। নাসারির নােক পৌছে দিয়ে গেল ৩ গুচ্ছ শেত পদ্ম। ধবধবে ঢাকনা পাল ঘােট ছােট টেবিলে; ঝকঝকে চিনেমাটির বাসন যেন অনেকনি পরে। তারপর, বেলা গড়িয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে প্রানে স ল শ শােনা গেল কয়েকটা গাড়ির; সিড়িতে এক সঙ্গে অনেক লােঠকিতে। ফু চেয়ে দেখল, সব সিৰু পালুন আর হাওয়াই কুর্তা ।
; সবার সঙ্গে আলাপকরছেন মেমসাহেব, হেসে হেসে করমর্দন করছেন। ওদের জন্যেই মেমসাহেব পিয়ানােতে একটা গৎ বাজালেন; তারপর, চৌধুরী সাহেবের ইশারায় বেছে বেছে খেতে বসলেন এমন একটা লােকের পাশে, যার ভুড়ি ঠেকেছে প্লেটের কিনারে, বােমশ একটি হাতের চার আঙ্গুলে চারটি আংটির ঝিকিমিকি। কয়েকটা খাবার নিজের পাতে নিল লােকটা; কটা দিল মেমসাহেবের ডিশে। হাতে হাতে ছোয়াছুয়ি হয়ে গেল, মেমসাহেব হাত সরালেন না, সয়েও বসলেন না পর্যন্ত। কুঞ্চর তখন চোখ দুটি জলছে। তারপর কী একটা রসিকতা করল লােকটা, সবাই হেসে উঠল, চৌধুরী সাহেবও বােগ দিলেন। মেমসাহেব লাল হলেন, কিন্তু মুহূর্তমাত্র, যেন রাগ করলেন, তারপর নিজেও সেই হাসিতে যােগ দিলেন। চৌধুরী বললেন, এসব বলে ইন্দুকে তুমি লজ্জা দিতে পারবে না হবিল। ও ‘ফ’ হয়ে গেছে কবে। স্টেজ-শাই নয়। এম্পায়ারে নেছেও তাে কয়েকবার। রিয়েলি! ছবিলাল বলল,-আসুন নামিসেস চৌধুরী, এই ছবিতেই নেমে পড়ুন তবে। মেমসাহেব বললেন, আই ওন্ট মাইও ইফ আই ডু-হেসে উঠলেন খিল খিল করে। কুঞ্জ কথাটা বুঝল না—হাসিটা বুঝল। তারপর কুঞ্জ সরে এসেছে বাগানের এক কোণে। শরীরের সব কটা মগ যেন গলতে হয়ে বলছে। ওর কুর্তার পকেটে হাত দিতেই সযত্নে রাখা ক’টা জিনিস বেরুল, ফু একটার পর একটাড়ে ফেলে দিল-যত দূরে পায়ে। শাড়ির আঁচলের কটা টুকরো, চুলের কাটা, চিরুণী থেকে ফেলে দেওয়া কয়েক গাছি দীর্থ চুল, কয়েকটি রঞ্জিত নােগ্র। সাত দিয়ে ঠোট চেপে ধরেছে । ওর এতদিনের গােপন সংগ্রহ, এতদিনের চুরি, পায়ের গােড়ালি দিয়ে মাড়িয়ে দিতে দিতে অস্ফুট * খরে বলল, বদিশৰ বাদি।
যাদুঘর ছয় ঋতুর মধ্যে টুরিস্ট হামলা শুরু হয় ঠিক এই সময়ে, পড়-পড় শীতে। ইস্টিশনটা এমনিতে হট্টমন্দির, যেমন খুশি, যখন খুশি আসা-যাওয়া, কিন্তু এখন বড় কড়াকড়ি! দরােজাদারবাবু সিগন্যাল হেঁট হতে না হতেই এসে হাজির : চিচিং বাঁধ। বিটিকিট মাছিটাকেও গলতে দেবেন না। সাইকেল-রিক্সালার দল ঘন ঘন টিং-টিং টিপ মারছে। একজোড়া মােটে তেরপল-ঘােমটা ট্যাক্সি, পাম্প থেকে ফাকে ফাকে চো-চুমুক পেট্রল টেনেই স্টেশনে ছুট। হােটলে হােটেলে জোড়াকবাট মানা। রিসেপশনিস্ট প্লাকার্ড উন্টে ব’সে আছে : সিঙগল সীটেড ? ও ক্রাইস্ট, নন। ডবল? ই-ইয়েস, অন গ্রাউণ্ড ফ্লোর। এগুলো কুলীন, কলকাতা থেকে বন্দোবস্ত করে তবে আসতে হয়। তবে খানা-জান্তানা মেলে এমন জায়গা আছে আরও দু'একটা, এখনও সীট মিলতে পারে। টিপটা দিলে ব্রাইটন হােটলের পােটার। অন্নপূর্ণা আমে যান বাঙালীর হােটেল। আপনার সুবিধে হবে। খবর মিলল তাে ঠিকানা মেলে না। গলদঘর্ম হ'তে হ'তে, বিকে উপরি বখশিশ কবুল করে, অনন্ত যখন অন্নপূর্ণা আলমের দরজায় টোকা দিলে, তখন ছােট্ট হেমন্তদিন প্রায় শেষ। পাকা বাড়ি, কিন্তু পুরনাে, মুখের চুন ধুয়ে এখন কালি পড়েছে। ফ্রেমে আঁটা টিনের চাকতিটার লেখা অস্পষ্ট, লুপ্তাবশেষ কতকগুলাে অক্ষয় দেখেই ঠাহর করতে হল, এই হবে। দরজায় টোকা দেবার পর দু-মিনিটও বােধ হয় বাড়াতে হয়নি . বাবু;
কি অনন্তয় মনে হয়েছিল ঢের বেশি। কবাট আলগা হল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অভ্যর্থনা শােনা গেল, ‘আসুন। স্বীক। পায়ে পায়ে অনুসরণ করে একটা উঠোন পার হয়ে অনন্ত যে ঘরে পৌছল, সেটা পরিসরে বেশি না। বিল্লালাকে ভাড়া চুকিয়ে, মােট রেখে, তবে স্ত্রীলােকটির দিকে ভাল করে তাকাবার ফুরসৎ হ'ল। -আমি এখানে কিছুদিন থাকব বলে এসেছি। -বেশ । অন্ধকারে গলা শুনে যা মনে হয়েছিল, অনন্ত দেখল, স্ত্রীলােকটির বয়স তার চেয়ে কিছু বেশি। ঠিক কত, অনুমান করতে পারল না ফোতে বাবুদের ব্যাঙ্ক ব্যালান্সের মত ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে মেয়েদের বয়সটা অনিশ্চিত, আন্দাজ করা মুশকিল। রূপ তখন আর উচ্ছল, তটিনী-নটিনী নয়, টলটল দীঘি। রূপ হয়ত এ মেয়েটির ছিল, এখনও একটু আছে। রাত পুইয়ে যাবার পরও পাতায় পাতায় কুয়াশা লেগে থাকার মত। এখন যুগে একটু ভঙ্গিমার অবশেষ, চিবুকের গঠনে ব্যঞ্জনার লেশ। চোখ নামিয়ে নিলে অনন্ত, ব্যাগ বার করে বললে—কত দিতে •• হঠাৎ যেন লাল হল মেয়েটি। এক নিঃশ্বাসে বললে,আমাকে না, আমাকে না।-অনন্তকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করবার সুযােগ না দিয়েই বন্ত পায়ে অহিত হল। বিছানা খুলতে খুলতে অনন্ত ঘরটার চারধারে নজর বুলিয়ে নিলে। আসা বলতে কিছু নেই; একটা ঢিলেড়ি চাপাই, ছােট একটা টুল, দেয়ালে একটা তাক। ওখানে দাড়িকামানর সরঞ্জাম আর খান দুই বই যা সঙ্গে এনেছে, ঠাসাঠাসি রাখা যাবে। আপনি? চমকে অনও পিছনে তাকাল। মােগা, মাঝবয়সী একটা নােক, ময়ের ঠিক মাঝখানটাতে এসে বাড়িয়েছে।-ও, গেস্ট? বসুন, বসুন।
; বিকেলের গাড়িতে এলেন বুৰি। দুপুরের? তবে এতক্ষণ-ও, বুঝেছি মশাই, অন্য কোথাও ঠাই মেলেনি, তাই জগদিন্দ গাঙলীয় হােটেলেই যত প্রশ্ন করেন ভদ্রলােক, তত জবাৰ চান না; কতকটা সোলেয় রথীদের মত, নিজের বাণ নিজেই সম্বরণ করেন।-কতদিন থাকা হবে, মাস তিনেক ? রেট ? আমাদের রেট মশাই দিন তিন টাকা আট আনা, এখনাে সেই সত্যযুগেই আছি। তা আপনি তো পারমানেন্ট মেম্বরের রিবেট পাবেন, নীট পঁচানব্বই, পনেরাে দিনেরটা এ্যাল, হল গিয়ে সাড়ে সাত চল্লিশ, তা মেথরথর্চা, কেরােসিন তেল বাবা শুয়ে পঞ্চাশ টাকাই দেবেন। পাঁচখানা নােট ট্যাকে গুজলেন, কষির দাগ দেখা গেল, শাদা লাল শাদা লাল ঘায়ের মত।তা মহাশয়ের এখানে আসার উদ্দেশ্য। অনন্ত সংক্ষেপে বললে,চেঞ্জ। পুজোর আগে নিউমােনিয়ায় ভুগেছিলুম। -বেশ, বেশ। গলা নামিয়ে জগদিন্দু বললেন,-অবিহি বলে লােক হলেও আমার আপত্তি নেই। আমার এখানে, মশাই, নাম ভাড়িয়ে সেদিনও এক ফেরারী আসামী কাটিয়ে গেল। ধরিয়ে দিইচি। কাকপক্ষীতেও টের পায়নি। সদর রাস্তার ওপরে হােটে না হওয়ার ওই সুবিধে, একেবারে পাওবের অজ্ঞাতবাস। সেদিনও বাণ মার মত নিয়ে বিয়ে করার মতলবে একজোড়া এসেছিল। চোখ মিট মিট করে গাঙলী মশাই বললেন,—এসব ব্যাপার বেশি প্রশ্রয় দিইনে মশাই, তবু-বয়সধর্ম জানি যে সাতদিন ওরা ছিল, এক ঘরে শুতে দিইচি। ওরা ধরা পড়ল, তাও এখানে নয়, ইস্টিশানে গিয়ে। নন বলনে,--ও। -ছেলেটাকে পুলিশ কী মাটাই মারলে, মশাই। মেয়েটাকে অবিশ্যি কিছু বলে না। ওয় বাপটাও পুলিশের সঙ্গে এসেছিল কিনা। একে বােধ হয় মালে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে।
অনন্তর বিন্দুমাত্র ঔৎসুক্য নেই দেখে গাঙ্গুলী প্রসঙ্গ বদল করলেন। -তা বেশ, এসেছেন, থাকুন। এখানে খাবেন ভাল, থাকবেন ভাল। ভীড়ের ঝামেলা নেই। সন্ধ্যে হয়ে গেছে তাই টের পাচ্ছেন না, নইলে আলােও যথেষ্ট আছে। জানালার বাইরেই নিমগাছ। হাওয়াও একটু পাবেন। বেশি হওয়ায় কাজ কী মশাই, আপনি এই নিমুনিয়া থেকে উঠেছেন, বুকে ঠাণ্ডা লাগবে। তা লাগুক, অনন্তর এখন একটু আলো চাই। অন্ধকার ঘন হয়ে নেমেছে ঘরের ভেতর,-দু’ একটা মশাও বুঝি পায়ে কামড়ালে, দরজার ওপরে ঝটপট করছে, কে জানে, বােধ হয় কানা চামচিকে। ইঙ্গিত বুঝে গাঙলী হাঁক দিলেন, কই হে, একটা আলো দিয়ে যাও। একটু পরেই লণ্ঠন নিয়ে এসে দাড়াল, সেই মেয়েটি। ফিতেদপদপ চিমনিটা ভাঙা, মাথায় কালি। তবু, অন্ধকার তাতেই কেটে গেল। এরই মধ্যে মেয়েটি বুঝি সামান্য সাজবদল করে এসেছে, চুলটাও বেঁধে থাকবে। তাতে রূপ বাড়েনি, বয়স একটু বা কমেছে। লণ্ঠনটা নামিয়ে মেয়েটি আর দাড়াল না। সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল। অন লক্ষ্য করলে, সেই কেমন বিব্রত, কুন্তিত ভাব। জগদিন্দু গাঙলীর নামটা অমুখেই জেনেছিল, অনন্ত এবার জিজ্ঞাসা করলে,-এর নামেই হােটেল বুঝি। -অন্নপূর্ণ। আশ্রমের কথা বলছেন? ওর নামে হতে যাবে কেন। মায়ের নামে। আপনার মা? দেরের কাছে যতটা যায়, ততটাই বিরক্তি প্রকাশ করে জগদিন্দু বললে,-আপনি নাস্তিক নাকি মশাই। আমার মা হবে কেন। বিশ- জননী, যিনি সকলকে অন্ন যােগাচ্ছেন। বারানসীর অন্নপূর্ণা, শােনেননি। ইনি সেই।দু হাত এক করে মাথায় ঠেকালে জগদিন্দু, গলা ঈষৎ নামিয়ে বললে,-তা ছাড়া, আপনি যা মনে করেছেন, ও তা নয়। ব, এই, ইয়ে, মানে কি ক্লাশের।
•• সারা রাত নিমগাছের ডালে সৰু সৰু ডানা ঝাপটানি ; জানালার আগ্রা পাল্লায় ঠক ঠক শব্দ। শ্রান্ত শরীর, তবু ভাল ঘুম হল না। এক বার মনে হল, কোথায় যেন ফিস ফিস শুনছে। উঠে গেল, দরজায় রাখল কান। কিচ্ছু না। ফিরে এল বিছানায়। চোখ বুজে তবু দেখা বন্ধ করা যায়; কানের যদি একটা পাতা থাকত। শ্রান্ত স্নায়ুর সুতাে ক’টিকে একাগ্র করে যতবার ঘুমের সুচে পরাতে গেল, ততবার পিছলে গেল । জানালা খুলে দিল শাহ করে। হু হু হিম হাওয়ায় ঘর ভরে গেল, যাক, বদম অস্বস্তির চেয়ে বরং ভাল। এতক্ষণ অনন্ত টের পায়নি চাদ উঠেছে, আকাশের রঙ দুধকুয়াশা। আবার শুয়ে পড়ল যখন, বালিশের নীচে রাখা হাতঘড়িতে সময় দেড়টা। একটু তন্দ্রার মত এসেছিল, হঠাৎ ভেঙে গেল। কে কাদছে। মেয়েলি গলা, ফোপানি-গােঙানি মিশিয়ে কেমন একটু বিকৃত। কিন্তু খুব কাছেই ; হয়ত দরজা খুলেই অনন্ত দেখতে পাবে একটি বিকীর্ণকবরী, অবিন্যস্তবেশ নারীদেহ চৌকাঠের ওপর উপুড় হয়ে আছে। লােভ গেল, তবু অনন্ত দরজা খুলল না ; খুললেই ভেঙে যাবে এই স্বপ্নময়ামতি ; হয়ত অরক্ত দুটি চোখ তুলে যে তাকাবে, সে যৌবনােত্তীর্ণ। জগদিন্দু গালীর ভাষায় ঝি-ক্লাশের। একেবারে শেষ রাতের ঘুম, ভাঙল দেরিতে। দরজা খুলে মন যখন বারান্দায় এল, তখন রকে রােদ এসে গেছে। একটা চটের বস্তা হাতে জগদিন্দু কোথায় বেরুচ্ছিলেন।-এই উঠলেন ? হলে গাঢ় ঘুম হয়েছিল বলুন। বলেছি না, অন্নপূর্ণা আমে কোন অসুবিধে নেই, খালি খাবেন, ঘুমােবেন। চটের থলেটার দিকে আঙুল দেখিয়ে অনন্ত বললে,-এটা? -বেড়াল। পার করতে যাচ্ছি। কাল সারারাত বাইরে কেঁছে। বেড়ালের কান্না বড় অমঙ্গল। গাঙ্গুলী বেরিয়ে যেতেই কী মনে হল অনন্তর, হাঁটু ভেঙে বা ;
- মাটিতে। সন্দেহ নেই, ওর চোখে ধূলাে দিতে সাজানাে একটা কথা বলে গেছে গাঙলী। এই চালাকিটা ধরে ফেলতে হবে। ভিজে শানে দু এক গাছি দীর্ঘ চুল এখনও চৌকাটের কাছে লেগে আছে, অনর বিস। কিছু পাওয়া গেল না। আজ খুব ভােরেই কে যেন সন্তর্পণ হাতে কালকের অপাতের চিহ্নটুকু মুছে নিয়ে গেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনন্ত উঠে দাড়াল। -চা আনব ?-প্রশ্নটা এল দরজার বাইরে থেকে, ভঙ্গি তেমনি কুষ্টিত। -আন।-কালকে আপনি বলেছে, আজকের হঠাৎ ‘তুমি'টা নিজের কানেই একটু তিকটু শােনল। শােক। ইচ্ছে করেই একটু রূঢ় হল অনন্ত। অকুলজা, হয়ত কাটা, একটি অন্তরূপা রমণীকে সম্মান দেখিয়ে যে ভুল করেছে, তার প্রায়শ্চিত্ত না করা পর্যন্ত ওর ভদ্র মনের শান্তি নেই। তাই একটু পরেই চায়ের কাপটাও ঠেলে দিল অনন্ত। প্রায় চেঁচিয়ে বললে,—এত কম চিনি দিয়েছ কেন, এটা কি চা হয়েছে ? বলেই বুঝল, বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। কমচিনি চায়ে কি জিভ এতটা তেতাে হয়, হতে পারে? নাকি, কাল ঘুম হয়নি, সেই অবসাদটুকু বিষ হয়ে জড়াে হয়েছে চিত্তে—অনন্ত আর মাত্রা ঠিক রেখে মানুষের সঙ্গে ব্যবহার করতে পারছে না। মাথা নিচু করে মেয়েটি চায়ে চিনি মেশাচ্ছে; সেই অবসরে অনন্ত ওকে খুটিয়ে দেখল। ঝি ক্লাশের বলে জগদিন্দু কী বােঝাতে চেয়েছে সে-ই জানে, অনন্তর মন কিন্তু এই বর্ণনায় সায় দিলে না। একটু আগেই আঘাত করেছিল; আবার এখন, এই পরমুহূর্তেই, শান্ত, হন্ত, বিব্রত এই মেয়েটির প্রতি করুণাপ্লুত হয়ে গেল। চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে অনন্ত আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করলে,- মােৰ নাম কী।
পপতি মজুমদার নিজেই আলাপ করে গেলেন।
ফিতে ব্যখা জুতত, ধুতির ওপর গলাবন্ধ কোট, চেনঘড়ি। ব্যাকরণ
মিলিয়ে বাবু।—চোর? কাল এসেছেন? নমস্কার মশাই। আমি
এখানকার একজন বাের্ডার। বেশ, ভাল, এখন আফিসে যাচ্ছি, বিকেলে
আলাপ হবে। বেড়িয়ে আসা যাবে পাহাড় পর্যন্ত।
একটু পরেই এসে তাড়া দিলেন জগদিন্দু।-স্নান সেরে নিন।
অনন্ত সবে একটা চিঠি লিখতে শুরু করেছিল, বলল,—এখন না।
একটু পরে।
—দেরিতে খাওয়া অভ্যেস ? তা বেশ। আমি তা হলে খেয়ে নিই
মশাই? দোষ নেবেন না। আমার আবার অফিসের বেলা হল।
আস্তে আস্তে কেমন নিঝুম হয়ে গেল বাড়িটা। একটি মানুষের
পায়ে চলার শব্দটুকু নেই। দরজা ভেজান, জানালা বন্ধ, ঘর কেমন
ছায়াছায়া স্তিমিত। গােটা কয়েক চড়ুই পাখী এতক্ষণ মেজেতে চাল
খুটছিল, তারাও কখন দেয়ালের ফোকরে আশ্রয় নিয়েছে।
ভেজান দরজা একটু আগা হল, কবাটে কবজায় আওয়াজ হল,
অনন্ত মাথা না ফিরিয়েই বুঝতে পেয়েছিল।
—নান করুন।
মুখ ফেরাতেই চোখে চোখ পড়ে গেল। অনন্ত বললে,—এস
সুরমা।
সঙ্গে সঙ্গে সুষমা দু পা পিছিয়ে গেল। সেই সঙ্কোচ, নিভদ্যুতি
চোখে আতঙ্ক। তীব্র তরে বলে উঠল,-না, না, না। ভেতরে
—আর, অনন্তকে কিছু বলবার অবসর না দিয়েই অস্তহিত হল।
স্নান সেরে ঘরে ফিরে অনন্ত দেখল, টুলের ওপর আবার ঢাকা
আছে। খেতে শুরু করেও বারবার দরজার দিকে তাকাল, হয়ত সুরমা
এসে জিজ্ঞাসা করবে আর কিছু চাই কিনা! কিন্তু কেউ এল না। আর
কিছু বাতে না লাগে, সুরমা পরিমাণটা সেই সকম হিসাব করেই
দিয়েছে। খালাতেই হাত ধুয়ে অনন্ত শুয়ে পড়ল।
ঘুম হল না। নিম গাছের ডালে ক’টা কাক চীৎকার করছে
ক্রমাগত, সমুখের রাস্তাটা দিয়ে সময় বুঝে ঠিক এখুনি কতকগুলাে বয়েল
গাড়ি হাঁকাচ্ছে গাড়ােয়ান; অনন্ত চোখ বুজে পড়ে রইল।
কতক্ষণ ছিল হিসাব নেই, হঠাৎ ঠুন ঠুন শব্দ হতেই চোখ মেলল।
চুপি চুপি এসে সুরমা এটো বাসন নিয়ে যাচ্ছে।
-এই, শােন।
সুরমার পা দুটি থর থর কাপল, কিন্তু পালাল না। ফিরে দাড়িয়ে
শান্ত স্বরে বললে,-বলুন।
আদেশ, শাসন, ব্যাকুলতা সব মিশিয়ে অনন্ত ঝোঁকের মাথায় ডেকে
বসেছিল। কী বলবে, ঠিক ছিল না। কোন কথা ভেবে রাখেনি।
কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে চেয়ে রইল।
সুরমা একটু অপেক্ষা করে আবার বললে,—কী বলবেন, বলুন।
এতক্ষণে অনন্তর বুঝি খেয়াল হয়েছে, কিছুই বলবার নেই; তাই
অনেক ভেবেচিন্তে একটা নিরর্থক, ছেলেমানুষি প্রশ্ন করে বসল, এ
হােটেলে আর কোন কাজ করবার লােক নেই, না।
ঘাড় নেড়ে সুরমা জানালে, না।
‘হােটল কত দিনের?
‘বিশ বছরের।
কী মতিভ্রম হল অনন্তর, একটা কাণ্ড করে বসল।
খপ করে সুরমার দুটি হাত ধরে বলল, এই বিশ বছর ধরেই তুমি
এখানে ঝিগিরি করছ সুরমা ?
ছিটকে সরে গেল সুরমা। না, না, না। ঝন্ ঝন শব্দ। একটা
কাচের ডিশ চুরমার হয়ে গেছে মাটিতে পড়ে, সুরমা তীরের মত ধর
থেকে বেরিয়ে গেল।
না, না, না। কী বলতে চাইল সুরমা ? ও ঝি না, না ওকে দুতে
মানা
. আশ্চর্য, এর পরেও সুরমা ফিরে এল কিত।
অন কলমুড়ি দিয়ে
'
পড়েছিল, কিন্তু টের পেল। খুঁটিয়ে খুটিয়ে মেরে থেকে কাচের
টুকরােগুলাে সুষমা কুড়িয়ে নিচ্ছে।
আয়ুর সব প্রান্তি ফোটা ফোটা ঘাম হয়ে ফুটল অনন্তর কপালে। এ
কী খেলা, কিছু বােঝা যায় না। কেন পালায় বারবার। পালায় যদি
ফিরে ফিরে আসে কেন।
ধড়মড় করে অনন্ত উঠে বসল, দরজা আগলে দাঁড়াল। সুমার
বিবর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল—তােমাকে একটা
শুধু কথা বলব সুরমা। আমার কোন মন্দ অভিপ্রায় নেই, বিশ্বাস কয়ে।
তােমাকে দেখে একটা খটকা লেগেছে, তুমি সেটা শুধু মিটিয়ে দাও।
-বলুন।
অনন্ত বলল,—কিসের এত ভয় তােমার। কাকে। কেন ?সুখ
তুলে তাকাল সুরমা। বােধ হয় বিশাস করা যায় কিনা ভাবল। শর
চোখ নামিয়ে বলল, বলব। আপনাকে সব কথাই বলব। পরে। এখন
পথ ছাড়ুন।
এগুলাে ফেলে দিয়ে আসি।
• :
পশুপতি মজুমদার বললেন,-বড় সাংঘাতিক মেয়ে এই সুরমা।
শতহস্ত দূরে রাখবেন।
চড়াইয়ের পর চড়াই, দু’পাশে গভীর খাদ, পাহাড়ের গা পেঁচিয়ে
পেচিয়ে উঠেছে উপবীত পথ। অনন্তর অভ্যাস নেই, দেহ দুর্বল, গীতিমত
কষ্ট হচ্ছিল। পশুপতি গলা ঢেকেছেন কক্ষটারে, কান টুপিতে, কিন্তু
পাথরের ধাপগুলাে টপকে যাচ্ছেন অনায়াসে।
-আনুন এখানটাতে বসা যাক। এটার নাম প্লেনভিউ পয়েন্ট।
মার কথা বলছিলেন। অন্য মনে করিয়ে দিলে।
একটা পাথরের নুড়ি গড়িয়ে দিলেন পশুপতি। হ্যা, বড় সাংঘাতিক
মে।ে আনেন ও একবার জগদিন্দুকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করেছিল?
‘মেয়ে ফেলতে ?
‘া, খাবারে বিষ মিশিয়ে।
.
অনন্তর পা থেকে মাথা পর্যন্ত একটা শিহরণ বয়ে গেল। একটি নয়,
শু, ভীরু মেয়েকে প্রাণহীরূপে কিছুতেই কল্পনা করতে পারলে না।
পপতি ওর মনের কথা আন্দাজ করে নিলেন। ভাবছেন, সে কী
করে হয়, না? কিন্তু মনে রাখবেন, সুষমার এমন দিন বরাবর ছিল না।
ওর রুপ ছিল, তেজ ছিল। মনের জোর ছিল। সেই জোরে একদিন
ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
—কায় সবে?
—জগদিন্দুর।
—আবার তাকেই বিষ খাওয়াতে গিয়েছিল?
বিজ্ঞের মত হাসলেন পশুপতি। সিগারেটে কড়া টান দিলেন। স্ত্রী
চরি, মশায়, এমনি। ভালবাসার লােকের জন্যে প্রাণ দিতে পারে ।
আবার সে ভালবাসা দুটলে প্রাণ নিতেও পারে।
-ওদের ভালবাসা চুটল কেন।
পশুপতি একটু যেন বিরক্ত হলেন। এত কথা জানতে হলে তাে
মশাই অন্তর্যামী হতে হয়। তবে অনুমান করতে পারি। বার জন্যে সব
কিছু পরিত্যাগ করে এল, ভাল ঘর, বর, দু'দিন বাদেই হয়ত দেখল, সে
মানুষ নয়।
মানুষ নয় ?
‘মানুষ বই কি, পুরুষ মানুষ, অত্যন্ত সু, দৈহিক অর্থে। নইলে
এগদিন্দুর আছে কী। না শিক্ষা, না রুচি, না চরিত্র।
তবে কী দেখে সুরমা ভুলেছিল।
পশুপতি বললেন, কী দেখে মেয়ে মানুষ ভােলে, তারা নিজেরাও
জানে না। হিংস্র হয়ে ওঠে সেই ভুল ভাঙলে। সুরমার তখনকার মনের
অবস্থা ভাবুন। নৌকো ডুবিয়ে দিয়ে পাড়ে উঠেছে, অথচ সামনের পশে
কাটা। কলসি বারা হয়ে সব সুধা ঝরে গেছে, যেটুকু লেগে আছে,
সেটুকু বাসি, বিষ। সেই বিষই সুরমা গদিন্দুকে খাওয়াতে গেল। নিজে
খেলেই ভাল করত। কিন্তু তাতে আরও মনের জাের দরকার।
অল্প অল্প হিম পড়ছে, কনকনে হাওয়া। অনেক নীচে, মাসল
পথে সার বিজলী আলাে জ্বলে উঠেছে, অসংখ্য ছােট ছােট জোনাকি
ফোটা; আকাশের নীল আয়নায় তার ছায়া।
পপতি বললেন কী ভাবছেন।
অনন্ত উঠে দাড়াল। বলল, ‘বিশেষ কিছু না। ভাবছি এর পরেও
এরা এক সঙ্গে থাকল কী করে। জগদিন্দু কি জানত, কে বিষ
মিশিয়েছিল ওর থালায়।
‘জানত না? যন্ত্রণায় গোঁ গোঁ করেছে, ছটফট করেছে মেয়ে পড়ে
মা তখনও সামনে দাড়িয়ে; এক গ্লাস জল পর্যন্ত দেয়নি।
পাড়াপড়শী এল, ডাক্তার এল, জগদিন্দুর শরীর ততক্ষণ নিথর হয়ে
এসেছে, কিন্তু চোখ দুটো তখনও খােলা। যমে মানুষে টানাটানি চলল।
‘মা ?”
‘তখনাে পাথরের পুতুলের মত সামনে দাড়িয়ে। কী শ
নিশ্চশমণি চোখে যে ওর দিকে তাকিয়েছিল, যদি দেখতেন। যার
কোন বস্তুরূপ থাকলে দু’জনেই সেদিন অন্ধ হয়ে যেত।
মাঝে মাঝে পথ ভাঙা; সাবধানে নামতে নামতে অনন্ত বলল, এসব
কতদিন আগেকার কথা?
পপতি মনে মনে হিসেব করে বললেন, ‘তা প্রায় বছর কুড়ি হবে
বইকি। একটু থেমে বললেন ‘অবাক লাগছে?
অনন্ত বলল, একটু। সব জেনে শুনেও জগদিন্দু সুরমাকে তাড়িয়ে
দিল না? অনায়াসে বিশ বছর ঘর করল?
পশুপতি হাসলেন। জগদিন্দুর চরিত্র তবে আপনি কিছু বলেননি।
বাকিটা পশুপতি ধীরে ধীরে ব্যক্ত করলেন।
বিষটা বােধ হয় তেমন মারাত্মক ছিল না, জগদি সে বেঁচে
গেল। সেয়ে উঠেই ডেকে পাঠাল সুমাকে। চোয়াল বলে গেছে
একদিনের ধকলে, কিন্তু চোখ দুটো ধক ধক জলছে। বলল, ‘তৈরির
নাও মা, তােমাকে যেতে হবে।
• যেতে হবে জানে, কিন্তু কোথায়? কলায় তােক স্বামীর কাছে। সঙ্গে একজন বিশ্বসী শােক দেবে জগদিন্দু, সে সুরৰুে আৰু বামীর হাতে তুলে দিয়ে আসবে। আমার মুখ পলকে বিবর্ণ হয়ে গেল। এ দু’দিন চোখে জল ছিল না, শুকিয়ে গান হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে কোথা থেকে মেঘ ছেয়ে এল। সুরমা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে, জগদিন্দুর পা দু’টির ওপর মুখ রেখে আকুল কামায় ভেঙে পড়ে বলল, আমাকে পুলিশে দাও, আর যা খুব শান্তি দাও, শুধু কলকাতা পাঠিও না। জগদিন্দু টেনে নিল না পা দু'খানা। কিছুক্ষণ ত হয়ে থাকল। তারপর কঠিন সুরে বলল, ‘বেশ, তােমাকে অন্য শাস্তিই দেব আমি। না, পুলিশে নয়। তােমাকে ক্ষমা করলাম। সেই ক্ষমা যে শান্তিয়ই রকমফের, সুরমা তখন যদি জানত। দিন দুই পরে, একটু সুস্থ হয়েই, জগদিন্দু বাড়ি থেকে বেরুল। ফিরে এল, কোলে একটা মিউমিউ বেড়ালের বাচ্ছা। সুরমা ভেবেছিল মেঘ কেটে গেছে ; ঠাট্টার সুরে জিজ্ঞাসা করল, এ আবার কী। গদি এনাে গভীর। বললে, মনি। রাত্রে খেতে বসে গদিন্দু ভালে, পুসি, পুসি, আয়। খাটের নীচে না কোথায় ছিল বেড়ালটা, লাফিয়ে এল পাতের কাছে, সুব্ধ কটা চোখে চেয়ে রইল। জগদিন্দ করল কি, এক গ্রাস ভাত মেখে ছড়িয়ে দিল, ওর সামনে। ৰেড়ালটা চুক চুক চাটতে শুরু কয়েছে, জগদিন্দু মিটমিট হেসে বললে, যাও, মাছ তরকারী আর কী ী কাছে নিয়ে এস। মা মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল। চা গলায় বললে, এ আবার কী। দিলে, এমনি। পরীক্ষাটা ওর ওপর দিয়েই হয়ে যাক। এমনি ধারা প্রতিদিন। খেতে বসে জগদিন্দু, ভাকে পুসি, পুলি, - আয়। ভাত মাখে, যায়। বড় বড় চোখে লক্ষ্য করে, কোনটা অভিছে কিনা। তারপর নেই দেখে, মুখে নিশ্চিত গ্রাস তােলে। আজ বিশ বছর ধরে এই চলছে। একদিনও জগদিন্দু নিয়ম ভ করেনি। অনন্ত নির্বাক হয়ে শুনছিল। বলল, ‘অদ্ভুত প্ৰতিশােধ তাে। পশুপতি বললেন, ‘অদ্ভুত বৈকি। ভেবে দেখুন, আজ বিশ ধরে দুটো মানুষ এক ছাতের নীচে বাস করছে, অথচ একফোটা জল বাসা নেই, বিশ্বাস নেই। শুধু একে অপরের ওপর অপরিসীম ঘৃণা। অনন্ত বললে ‘কিন্তু সুরমা তো আত্মহত্যা করতে পারত। পশুপতি হাসলেন। তাতে আরও বেশি সাহসের দরকার। মজার কতখানি জোর একটা মেয়েমানুষের থাকতে পারে, অনন্তবাবু? ঘর থেকে ঝোঁকের মাথায় বেরিয়ে আসতেই অনেকটা ফুরিয়ে গিয়েছিল। যে বাকি ছিল, সেটুকুও সুরমার খরচ হয়ে গিয়েছিল জগদিন্দুকে বিষ দিতে গিয়ে। তারপর থেকেই ওর ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নেই। সব সময় এটা অপরাধবােধ, হাত কাঁপে, পা কাপে, চোখের পাতা কাপে। কোন কমে আজকের অস্থিহীন অস্তিত্বকে টেনে নিয়ে কালকের খাতায় জমা দিচ্ছে। ডাক্তারী ভাষায় একেই বােধ হয় স্নায়ু বলে। সেই সুযোগে ‘সেই সুযােগে কী। পশুপতি বললেন, ‘সেটা জগদিন্দুর প্রতিহিংসার সুলতর দিক। এই যে হােটেল দেখছেন, এর সবই সুরমার টাকায়। ওর মানসিক অবস্থায় সুযােগ নিয়ে জগদিন্দু ধীরে ধীরে ওর গহনার বাল গ্রাস করেছিল। আর কী? পশুপতি বিচিত্র হাসলেন। জগদিন্দুর ক্ষমা করার আরও একটা গণ্ড ছিল। সেটা আরও সুল। কিন্তু সেটা আমার মুখে নাই বা কেন। একদিন মাত্র এসেছেন, নিজেই টের পাবেন।
। হােটলে নিজের ঘরে ফিরে গিন্ধ অনন্ত আলাে মলল। সঙ্গে সঙ্গে একটা ৰেড়াল ওর বিছানা থেকে এ উঠে গিয়ে বসল জানালায়। আশ্চর্য কিন্তু নয়, তবু সারা গায়ে চা দিল না। চিনতে পেয়েছে। এটাই জগদিন্দু রােত ডেকে ডেকে অত খাওয়ায়, কে মানে, এটাই হয়ত কাল সারারাত ওর দরজার বাইরে কেঁদেছে। ঘৃণায় আক্রোশে আতঙ্কে মুহূর্তের জন্যে যেন বুদ্ধিভ্রংশ ঘটল অনন্তর। হাতে কিছু নেই। কিন্তু পায়ে জুতো আছে। সেটাই খুলে নিয়ে অনন্ত প্রাণপণ শক্তিতে ছুড়ে মারল। পারলেন না, ফসকে গেল। চমকে ফিরে তাকাল অনন্ত। জগদিন্দু গাঙ্গুলী। মৃদু মৃদু হাসছে। ফসকে গেল তাে। ওটাকে মারা অত সােজা নয়, ওটা আসল শয়তানী। আজ সকালে পার করে দিয়ে এসেছিলুম। আবার এসেছে। অন তখনাে হাঁপাচ্ছে। চোখের পাতা দুটোৰ দপদপ উত্তেজনা কমেনি। কোনমতে চারপাইটার দিকে আঙুল দেখিয়ে জগদিন্দুকে বলল, কন। গদিন্দু বললেন, “আজ এই হােটলের এমন হাল দেখছেন, বরাবর এমন ছিল না। অপূর্ণা হােটেল এক সময় লােকে গিসগিস করেছে। দু তিনজন ঠাকুর বাবাজী রেধে কুলিয়ে উঠতে পারেনি। সাত আটটা গৰ অহােত ফরমাল খেটেছে। তখন থাকবার আস্তানা বলতে ছিল ওই বলদেওদাস ধরমশালা, তার চামচিকে আর ইদুরের ভয়ে ওখানে বেশি লােক যেত না। আর হােটেল বলতে এই অপূর্ণা আৰম। ভিড় হত শিবরাত্রির সময়ে সবচেয়ে বেশি, লােকে মঙ্গলায় গান সেরে মহাকালেশ্বরের মন্দিরে গিয়ে বিগ্রহ দর্শন কত। মালা কি আর নদী, পাহাড়ের ঘাম, ভুবগােড়ালি জল। তাতেই লাশে ভক্তি কত। সাংসাসীরা বেশিরভাগই এত ধরমশালায়, অনেকে আবার নিয়ে বাইরের শ গাছটার নীই খুনি জেলে শীতের রাত ফল করে তি। অন্যান্য যারা, ধরুন পুত্র কামনায় এসেছে, কি কোন মানত রক্ষা করতে, তারা মার যাবে কোথায়, উঠত এখানে এই অপূর্ণ আশ্রমে। ‘ভনভন মাছির মত ট্যুরিস্টের ঝাঁক পড়তে শুরু হয়েছে মাত্র এই বছর দশেক এদের ধর্ম নেই, ভক্তি নেই, ক্যামেরার চামড়ার ফিতে- টাকেই পৈতে করে নিয়েছে। বছর পনের আগে এসেছিল সরকারী পেত্নীতত্ব বিভাগের লোেক; তারা কবর খুঁড়ে খুঁড়ে বার করতে লাগল ক’ হাজার বছর আগেকার মানুষের কঙ্কাল, ঘরদোর। খবরের কাগজে সে কী লেখালিখি। বাস, আর যাবে কোথায়। গল্পে গন্ধে এল কলকাতা বােহায়ের এক সাহেব হােটেল, ব্রাঞ্চ খুললে। তাদের দেখাদেখি আরও দুটো। ‘তাদের সঙ্গে পারবে কেন অন্নপূর্ণা আলম। এখানে কি লাগল খাওয়ানাের বন্দোবস্ত আছে, না এখানে নাচের সঙ্গে বাদ্যি বাজে। খদের গেল, ঠাকুর গেল,চকর শৈল, পাহাড় বেয়ে মুড়ি গড়ানাের মত পড়তে থাকল জগদিন্দু গাঙুৰল। অনন্ত চুপ করে বঁ, ‘ক’জন বাের্ডার আছে এখন। জগদিন্দু বললেন, আপনাকে নিয়ে তিনজন। মজুমদার মশায়ের সঙ্গে আগ আলাপ হয়েছে। উনি আছেন গােড়া থেকেই। সরকারী অফিসে কাজ করেন, হাড়কেন মশাই, বিশ বছর হােটেলে কাটালেন, তবু বাসা করলেন না, ন'মাস ছ' মাসে দেশে গিয়ে পরিবার পরিজন দেখেন আসেন। আরেকজনকে আপনি দেখেননি, তিনি ছ’ মাস হল এসেছেন। কী এক কোম্পানীর এজেন্ট, ঘােরাঘুরির কা, এই হােটলে, বুড়িয়ে থাকার মত, বিছানাটা শুধু পাতা থাকে, নইলে মাসের পঁচিশদিনই উনি কাটান ট্রেনে ট্রেনে। ‘এই দু’জন মাত্র তােক নিয়ে আপনার চলে? চলে আর কই। আরে ঠেকে জগদিন্দুকে চাকরি নিতে হয়েছে। ঠিক চাকরি নয়, নিম-বাধীন, পােষ্ট অফিসে ষ্ট্যাম্প ভোর। সামান্য কমিশন, মনি অর্ডার আর লেপাষা পাত্ত লিখে লিখে আয় কটা পসা হয়। উঠে যেতে-যেতে জগদিন্দু বললেন, 'আমি তা হলে চলি এবার। আপনি বিশ্রাম করুন। যদি—যদি রাত্রে কোন অবিধে হয় তবে একটা খবর দেবেন। নিজে যদি না যেতে পারেন, সুরমাকে দিয়ে ছেকে পাঠাবেন। এই দু'খানা ঘর পরেই থাকে। কথায় কথায় মনটা হাকা হয়ে এসেছিল, জগদিন্দুর শেষ কথাটার অনন্ত আবার চমকে উঠল। যত ভয় সব যেন এক সঙ্গে গ্রাস করছে ওকে। নিম গাছের ডালে সর সর শব্দ, চৌকাটের বাইরে সারারাত কারা। আর নিঃশব্দ চপল পায়ে একটা বেড়ালের ঘরময় ঘােরাঘুরি। দরজা বন্ধ করে শুতে সাহস নেই, আবার খুলতেও ভয়। বেড়ালটাকে তাড়াতে চায়, হাত ওঠে না। বিছানায় পড়ে রইল ঝিম ধরে, আমল, আর মনে হল ওর নাক, চোখ, গলার ভেতরটা পর্যন্ত শাদা শাদা রোঁয়ায় ঢেকে গেছে। সেই রাত্রে অনন্তর প্রবল জর এল। এত চোখ দুটি মেলল, কত পরে, কতদিন পরে, তার হিসেব নেই, তখনাে চেতনা আবিল, স্বপ্নাচ্ছন্ন। দেখল শিয়রে সুরমা দাড়িয়ে। অনন্ত বলল, এ কী। ওষুধ। উঠে বসতে পারবেন? ‘পারব, অনন্ত বলল, তুমি শুধু আমার হাত দুটো ধরাে। উঠ বসেও অন অঙ্ক দুটি হাত ছাড়ল না। চোখে রাখল, কপালে, বলল, আঃ কী ঠাণ্ডা। আমার কত আয় হয়েছিল সুরমা ? ততক্ষণ আবার সেই বিহবল ভয়-ভয় দৃষ্টি ফিরে এসেছে সুরমার চোখে। বলল, একশাে চাৰ, শাচ। আমি এবারে যাই। হাত ছাড়িয়ে সুরমা দরজার দিকে দু'চার পা এগিয়ে গেল। নঃ সনে সরে ঠেলে দিল ওষুধের *স। খাব না, খাব না আমি। সুখ গড়িয়ে পড়ল বিছানায়, চাদর দিয়ে উঠল।
সুরমা ফিরে এল, আঁচল দিয়ে মুছে নিল ওযুখটুকু। কল, আপনি ভাৱিছেলেমানুষ তো। কী করতে হবে বলুন। ঘােলাটে চোখের চাউনি ততক্ষণ অনেকটা স্বচ্ছ হয়ে এসেছে অনন্তর। ভাল ছেলের মত শুয়ে পড়ল, চোখ বুজে আবদায়ের পর বলল; কিছু না, শুধু এখানে বসে থাক তুমি। নিঝুম ঘুমঘুম কয়েক মিনিট কাটল। আবার শিরশিরে ভয় নামল অনন্তর দুর্বল মগ্নচৈতন্তে। একবার মনে হল সে একা শুয়ে আছে, কখন উঠে গেছে পা টিপে টিপে। ভয়ে ভয়ে চোখ মেলল। না বলি তো। যেমন ছিল, তেমনি বসে আছে শিয়রে, সন্ত, আড়ষ্ট। এবার অনন্ত একখানা শৰ্ণ রুগ্ন হাত টেনে নিল মুঠিতে। ধীরে ধীরে , —আমি এখান থেকে চলে যাব সুরমা। সুরমা সাড়া দিল না। অনন্ত আবার বলল, কাল সকালেই। কলকাতা না গেলে এ আর অামার ছাড়বে না। ‘ক ল কা তা’ সুরমা উচ্চারণ করল ধীরে ধীরে, প্রতিটি বর্ণ অত 'অনন্ত বলল, 'কলকাতা তােমার মনে আছে মা? ‘আছে, সুরমা বলল, প্রথমে, তারপরই তাড়াতাড়ি জুড়ে দিল,কি জানি, হয়ত নেই। অস্থিরভাবে অনন্ত বলে উঠল, 'আমি তােমার কথা সব নেছি। সুরমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কেঁপে উঠল, ওর মুঠিতে কী হাত খানা ছুঁয়ে থেকেই অনন্ত সেটা অনুভব করল। সেই হাতখানা একবার রাখল কপালে, একবার চোখের পাতায়, টেনে আনল নারে তার তারপর ঠোটে ছোয়াতে গিয়েইন বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মমেয়েলাে এই হাতেই কি সুরমা বিষ তুলে দিয়েছিল জগদিকে। পক উঠলে কপালের শিরা, গলা শুকিয়ে গেল, এবল বিতৃষ্ণায় হাতটা সরিয়ে দিয়ে অন অধু বলতে পারত, একটু ।
২ । আগ্রহে ছিনিয়ে নিয়ে ঘাসের উপর ঝুকে পড়ল , সঙ্গে সঙ্গে হাত থর থর কেঁপে উঠলাে। দেখতে পেয়েছে। অসহায় শিশুর মতাে এন আর্তনাদ করে উঠল, 'ফেলে দাও, ফেলে দাও, বেড়ালের রোয়া মাসে কিলবিল করছে, এ অল আমি খাবকী করে। দু’হাতে মুখ ঢেকে অনন্ত শুয়ে পড়ল, গােঙাতে থাকল, জল গড়িয়ে মেয়ে ভেসে যাচ্ছে, যাক! ক্ষিপ্র হাতে সুরমা সেই জলে ভিজিয়ে নিল আঁচল, অনন্তর তপ্ত কপাল, নিমীলিত চোখের পাতা কুটি, মুছে দিতে ঠিক তখনই বাইরে কী একটা শব্দ হল। চকিতে মুখ ফিরাল সুরমা। কেউ না। একবার মাত্র গলা খাকাড়ি দিয়েই পশুপতি মজুমদার অদৃশ্য হয়ে গেছেন। পশুপতি মজুমদার বিকেলের দিকে সরকারীভাবে দেখতে এলেন। অনন্ত ততক্ষণ অনেকটা সামলে উঠেছে। পশুপতি বললেন, খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন মশাই। মাঝে মাঝে এমন অসুখ হয় নাকি আপনার। অনন্ত একটু লজ্জিত হাসল। সেবার অসুখের পর থেকেই মাঝে মাঝে-মানে একটু অনিয়ম হয়েছিল কিনা। বালিশগুলাে জড়াে করে আনল পিঠের কাছে, ঠেস দিয়ে বসে ফের বলল, আমি কালই চলে যেতে চাই পশুপতিবাবু। আপনি একটু বন্দোবস্ত করে দেবেন, এই টিকিট কাটা, গাড়িতে তুলে দেওয়া-টেও আর কী। পপতি বললেন, এ আর বেশ কথা কী। কিন্তু হঠাৎ কী হল বললেন না তাে। অনন্ত মান হেসে বলল, কিছু না। আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করব গতিবাবু, অবাৰ দেবেন? এ না শুনে বলতে পারছিনে। ‘সেদিন আপনি জগদিন্দু বেবে সর্তে মাকে ক্ষমা করেছিল, তার ৪৩ কি আভাস দিয়েছিলেন। বলেছিলেন আরও একটা সর্ত ছিল, কিন্তু সেট কী, পশুপতিবাবু? পপতিবাবু বিচিত্র হাসলেন।•••আজও জানেন না? আপনি অবাক করলেন মশাই। এ হােটলে তেত্তির না পেরােতেই সব বাের্ডার কথাটা টের পেয়ে যায় যে। আপনিও পেয়ে গেছেন ভেবেছিলুম। বিশেষ -পশুপতি এখানে একটু অর্থপূর্ণ কাশলেন, আজ তাড়াতাড়ি ফিলুম। তখনই আপনাকে দেখে যাব ভাবলুম, কিন্তু ঘরে ঢুকতে পারলুম না। পশুপতি আবার একটু হাসলেন। দেখলুম, আপনার মাথাটা কোলের মধ্যে নিয়ে একজন আঁচল নিংড়ে নিংড়ে••• অসহিষ্ণু কণ্ঠে বাধা দিলে অনন্ত•••“হ্যা, সুরমা। কিন্তু তার সনে সর্তের সম্পর্ক কী, পশুপতিবাবু। আপনি আসল কথাটা কেবলই এড়িয়ে যাচ্ছেন। একটু কুটি করলেন পশুপতিবাবু, একটু বা রুষ্ট হলেন,“ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলা আমার স্বভাব নয়, অনন্তবাবু। শুধু একটা কদৰ কথা, আভাসে বলতে চেয়েছিলুম। শুনুন তবে। মুখের পেশ কঠিন হয়ে এল পশুপতির, খাগলায় ধীরে ধীরে বললেন, ‘গত বিশ বছর ধরে যত জন এই হােটেলে বাস করে গেছে অনন্তবাবু, তাদের প্রায় কাউকেই একলা রাত কাটাতে হয়নি। অনন্তর পাণ্ডুর মুখ ভরে গেছে বজোচ্ছাসে। দীর্ঘ, চ, অবিন্ত চুলগুলাে ধরেছে মুঠি করে। একটি ভ্রমর যেন এতক্ষণ মগজের মধ্যে চক্রাকারে গুণ গুণ করছিল, এবারে হঠাৎ দংশন করেছে কোরকের মর্য- মূলে। যন্ত্রণায় মুখপেস্ট বিকৃত হয়ে গেছে, প্রাণপণে বাত দিয়ে ঠোট চেপে ধরেছে অনন্ত। কখন উঠে ঘরময় পায়চারী করতে শুরু করেছিল, একবার খেয়ে বিজ্ঞাসা করল, এই সর্ত ? পপতি বলেন, 'এই।
: এতে জগদিন্দুর লাভ। ভয়ঙ্কর একটা কথা বলে পশুপতি ভারমুক্ত হয়ে গেছে, এখন আর সঙ্কোচ নেই। অনায়াসে বলেন, 'বিবিধ। এক, সুরমাকে শাস্তি দেওয়া। দুই.. অনন্ত বললে, বুঝেছি, হােটেলের স্বার্থ। কিন্তু এতে কি সত্যিই কোন লাভ হয় ? ‘আগে হত। এখন আর হয় না। সুরমার বয়স হয়েছে। তা ছাড়া এখনকার লােকের রুচি বদলেছে। অন্যান্য হােটেলেও, এখানকার মত এতটা খােলাখুলি, স্কুল, না হলেও এন্টারটেনমেন্টের আয়ােজন আছে। সেখানে গান আছে, বাজনা আছে, নাচ আছে। সুরমার কতটুকু পুলি বলুন। কিছুক্ষণ পরে অনন্ত বললে, ‘আমার আর একটা সংশয় আছে। আপনি যা বলছেন তা যদি ঠিক হয়, তবে, তবে, প্রথম দিকে সুমা কেন আমার ঘরে আসতে চায়নি। সব সময় কী একটা সঙ্কোচ, ভয় দেখেছি * ওর চোখে। সর্বজ্ঞের মত হাসলেন পাপতি।-তারও ব্যাখ্যা আছে। যত লােক আসে, তাদের সবাই তাে সমান হয় না অনন্তবাবু। তাদের একজন সুরমাকে একবার সন্তান দিয়েছিল, আরেকজন ৰােগ। সেই থেকে আগন্তুক এলেই সুরমার আতঙ্ক। রুদ্ধ, দ্রুত, চাপা স্বরে অনন্ত বলে উঠল, “কী হল সেই ছেলে? ‘জগদিন্দু জাতমাত্র নষ্ট করেছে। ‘আর বােগ ? সেয়েছে কিনা বলতে পারি না।” পশুপতি উঠবেন উঠবেন করছিলেন, অনন্ত শিশুর মততাকে আঁকড়ে ধরল।•• আরেকটা কথার জবাব দিয়ে যান পশুপতিবাবু। গলাটা এক- বার পরিষ্কার করে নিল অনন্ত, যেন কথাটা কী ভাবে বলৰে স্থির করতে পারছে না।•••আজ বিশ বছর ধরে যতন এই হােটলে এসেছে, 3 তাদের সবাইকে সুরমা কি শুধু ঘৃণাই করে গেছে, একজনের ওপরও মায়া পড়েনি ? পড়েছিল বৈকি। পশুপতি আবার পুরনাে দিনের পাতা ওল্টালেন। ‘তখন সবে এখানে এক্সকাভেশান শুরু হয়েছে। সামান্য কিছু কিছু পাওয়া গেছে, তার ঐতিহাসিক মূল্য অনিশ্চিত। সরকারী গ্রান্ট নিয়ে এখানে রিসার্চ করতে এল নীলাম্বুজ মৈত্র। বয়স বেশি না, তেইশ কি চব্বিশ । ভাসা ভাসা বড় বড় দুটি স্বপ্নদেখা চোখ ; শুধু অতীতের প্রস্তরমূর্তিতেই দিব্যরূপ দেখে না, রক্তমাংসের নারীদেহেও দেখে। সুরমা যথারীতি ওকে আত্মদনি করল, কঁাচামন নীলাম্বুজ ভাবল প্রেম। রিসার্চ মাথায় থাকল, দিনরাত রুদ্ধদ্বার ঘরে দুজনের গল্প। প্রথমে নীলাম্বুজ লাজুক ছিল, ভাল করে গুছিয়ে কথা বলতে জানত না, সুরমা ওকে সাহস দিয়েছে। মনের মত শ্রোতা পেয়ে নীলাম্বুজ মহাখুশী। আলাপের পাল তুলে ওরা ইতিহাসের উজানে চলে যায় : আসিরিয়া, বাবিলন, মেক্ষি, মহেঞ্জোদছো। সুমা শশানে, বােঝে, বােঝে না, বােঝার ভাণ করে। ‘ওরা বুঝি এখান থেকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার সংকল্পও করেছিল। কিন্তু কোথায় একটা অঘটন ঘটল, দু মাসের মাথায় নীলাম্বুজের নামে সরকারী চিঠি এল : তােমার রিসার্চের কোন প্রােগ্রেস দেখা যাচ্ছে না, পত্রপাঠ চলে এস। ‘এর আগে বুঝি ঠিক ছিল, এখানকার কাজ শেষ হলেই নীলাম্বুজের পাকা চাকরি হবে, নালন্দা মিউজিয়মে। স্বপ্নসৌধ ধ্বসে পড়ল নিমেষে। বিয়স মুখে নীলাম্বুজ যখন ঘােড়াগাড়িতে গিয়ে উঠল, তখন ওর মুখের চেহারা যদি দেখতেন। ‘এখানেই শেষ ? অনন্ত জিজ্ঞাসা করল। ‘এখানেই। পশুপতি বললেন, নীলাম্বুজ সুরমাকে কী ভসা দিয়ে গিয়েছিল জানি না। তারপর মাসখানেক ধরে প্রতিদিন পিওন আসবায় সময় রমা দরজার কাছে এসে দাড়িয়েছে। নীলাম্বুজের একটা ফোটো বুঝি ওর কাছে ছিল, লুকিয়ে লুকিয়ে সেটা দেখেছে।
‘চিঠি আর আসেনি ? ‘মনে তাে হয় না। তা ছাড়া নীলাম্বুজের সরকারী কুৰিও আর হয়নি। যতদূর শুনেছি ও আজকাল একটা বেসরকারী কলেজে মাষ্টারী করছে, আর এনসেন্ট ইণ্ডিয়ান হিষ্ট্রীয় কোচিং ক্লাস খুলেছে ছাত্রদের নিয়ে। আর কেউ ? আরাে একজন এসেছিল, প্রায় বছর পাঁচেক পরে। ফেরারী পলিটিক্যাল আসামী, গা-ঢাকা দিয়ে ছিল। তার আসল নাম জানা যায়নি, এখানে যে নাম লিখিয়েছিল, সেটা পশুপতির ঠিক মনে নেই, সুধন্ত কিম্বা ওই রকম কিছু হবে। সেই সুধন্য সান্যালকেও ভালবেসেছিল সুরমা। আকৃতিতে সুধ নীলাম্বুজের ঠিক বিপরীত ; ঘােট ঘােট করে ছাটা চুল, এক জোড়া কর্কশ গোঁফ, নিরঙ্কুর দাড়ি কামানাে, অমিশুক। মােটা মােটা বইয়ের মধ্যে ডুব দিয়ে থাকত। কিন্তু সেই আপাত-উদাসীনতার পর্দাও সুরমা সরিয়েছিল। পুথিপত্র থেকে পড়ে পড়ে সুধন্ত নানা রাজনৈতিক মতবাদ ব্যাখ্যা করে শােনাত, সুরমা শুনত। সুধন্যও ওকে কলকাতা নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কিনা জানা যায়নি। বাড়াবাড়ি শুরু হতেই জগদিন্দু রাশ টানলে। এতটা সে চায়না, খদের লক্ষ্মী, তাদের খুশি রাখতে হবে বইকি। একটু মাখামাখি, একটু শরীরের প্রয়ােজন মেটান, কিন্তু তার সঙ্গে আবার মনের আপদ জােটে সুতরাং দিনকত পরেই হােটেলের আশে-পাশে পুলিশের চর ঘােরা বুরি শুরু করল। বেগতিক দেখে সুধন্য একদিন সরে পড়ল শেষ রাতে। জগদিন্দুই পুলিশকে খবর দিয়েছিল ? ‘দিতে পারে’ পশুপতি হাই তুলে বললেন, ‘আবার নাও পারে। হয়ত পুলিশ এমনিই গজে-গন্ধে এসেছিল। ধন্য আর কোন খবর নেয়নি ?
সম্ভব না। ওর খান দুই বই ফেলে গিয়েছিল, তাতে ঠিকানা লেখ। ছিল। সেই বই থেকে সুরমাকে দু'বেলা ধুলাে ঝাড়তে দেখেছি, শুকিয়ে সুরমা দু-একটা চিঠিও লিখে থাকবে। জবাব আসেনি। আর সুরমা ? ‘সুধন্যর সন্তান তখন ওর গর্ভে। পশুপতি উঠে দাড়ালেন, সেই সন্তানটির কী হল, আপনাকে আগেই বলেছি। অনন্তও সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাড়াল—আর একটা শুধু প্রশ্ন পশুপতিবার। আপনি এত খবর রাখতেন কী করে। এ গল্পে আপনার তাে কোন ভূমিকা নেই। মৃদু হলেন পশুপতি।•••‘নেই বলেই ত রাখা সহজ হয়েছে অন বাবু। একটা জিনিস ভুলবেন না, আমি আপনাদের চেয়ে ঢের বড়। ৩ অনুভব দিয়েই অনেক কিছু বুঝতে পারি। বয়সই মানুষের তৃতীয়, দিব্য নয়ন। ব্যাখ্যাটা অনন্তর ঠিক মনঃপুত হল না, কিন্তু আর প্রশ্ন করার সময় ছিল না। পশুপতি অকস্মাৎ অস্তহিত হয়ে গেছেন। বাক্স বলতে একটা সুটকেশ, বিছানাও সামান্যই। গুছিয়ে নিতে বেশি সময় লাগল না। জগদিন্দুর সঙ্গে অনন্ত ইতিমধ্যে দেখা করে এসেছে। হিসাবপত্র নিয়ে বােঝাপড়াও সারা। যতক্ষণ মন স্থির হয়নি অনন্তর ততক্ষণ, এই ঘর, এই শাসরােধকারী পরিবেশ যেন পাষাণ হয়েছিল বুকের ওপরে। তবু আশ্চর্য, এই যাবার প্ৰাকমুহূর্তটিতে একটা অদ্ভুত বেদনাক্ত শূন্যতা বােধ হচ্ছে। ফেলে আগে কিছু—চশমা, রুমাল, চাবি, হাতঘড়ি সব ঠিক ঠিক জায়গাতেই আছে, এমন কি পুরনাে চপ্পল জোড়াও কাগজে মুড়ে নিতে ভােলেনি। তবু। কী যেন নিতে চেয়েছিল, কিন্তু ধুয়ে যেতে হল, মনের কৌটোয় ধরা না দেওয়া একটা ছটফট মৌমাছি। ‘ঘােড়াগাড়ি এসে গেছে।
অনন্ত জানালার শিক ধরে বাইরে নিম গাছটার দিকে চেয়ে ছিল, পিছন ফিরতেই দেখল সুরমাকে। বিব্রত, কুষ্ঠিত, নতনে। সঙ্গে সঙ্গে সনাক্ত হয়ে গেল অস্তিটুকু। ‘গাড়ি এসে গেছে। সুরমা আবার বলল। ‘এই যে যাই। সুটকেশ হাতে নিয়ে অনন্ত উঠে দাড়াল। ঠিক সেই মুহূর্তে নিমগাছের ডালে সরসর ডানাঝাপটানি শােনা গেল, জ্যোৎস্না- অন্ধ দুটো পেচা বুঝি আশ্রয় খুঁজছে পাতার অন্ধকারে, অনেক দূরে কেঁদে উঠল শীতার্ত একটা কুকুর, এক দমক হিম হাওয়ায় দরজাটা দড়াম করে বন্ধ হয়ে হা হল ফের, মেজেয় চুণবালি খসে পড়ল, আর, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চার পায়ের তলা থেকে লাফ দিয়ে একটা বেড়াল গিয়ে জানলার ওপর বসলরি, হিংস্র পিলাক্ষী। আর কিছু ভাবনার প্রয়ােজন হল না, নেশালস সমােহিত কণ্ঠে অনন্ত বলে উঠল, 'তােমাকেও আমি নিয়ে যাব সুরমা। কশকশ একখানা হাত থর-থর কাপছে অনন্তর মুঠিতে, কিন্তু সুরমার মুখভঙ্গির লেশ মাত্র পরিবর্তন হয়নি। বলল, ‘কোথায়। কলকাতা’। সব ব্যবস্থা ঠিক করে সাতদিনের মধ্যেই ফিরে আসব। তুমি এর মধ্যে তৈরি হয়ে নিও। তােমাকে এখানে ফেলে রাখতে পারব না। ‘কেন। নির্বিকার, নিরুৎসাহ প্রশ্ন। অনন্তর একবার মনে হল কঠিন কিছু দিয়ে আঘাত করে করে এই অবােধ হিমৱক্ত মেয়েটির দেহে প্রাণ এনে মেয়। পরমুহূর্তেই আবার স্নিগ্ধ ঘন আবেগের মেঘে ওর মন ছায়াচ্ছন্ন হয়ে এল। সুরমার কানের কাছে মুখ নামিয়ে অনুনয়গাঢ় সুরে অনন্ত বলল, তুমি বুঝতে পারছ না, এখানে থাকলে তুমি মরে যাবে? সুষমা স্পষ্ট, অবিচল স্বরে বলল ‘মরে তো আমি কবেই গেছি, নবাবু। এ ধ ধরে প্রবল, অসহিষ্ণু ঝাঁকুনি দিয়ে অনন্ত বলল, না, না মবােনি। চলাে একবার সেখানে, দেখবে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার কত পথ আছে মেয়েদের। একটি কি দুটি ভুল করলেই সে পথ একেবারে বন্ধ হয়ে যায় না। শুধু সাতটি দিন ধৈর্য ধর সুরমা। তােমার জীবনের এখনও অনেকখানি বাকি আছে। ‘আছে? এতক্ষণে বুঝি একটু দীপ্তি দেখা গেল সুরমার মুখে, কণ্ঠস্বর একটু বুঝি ব্যগ্র শােনাল। অনন্ত বলল, ‘আছে। ঘােড়ার খুরের শব্দ টিকটিকির ডাকের মত ক্ষীণ হয়ে একেবারে মিলিয়ে গেছে। দরজা বন্ধ করে সুরমা ফিরে এসেছে ঘরে। পুরনাে কাপড়ের পুটলির মধ্যে বেতের একটা ঝাপি, তার ভেতরে আবার ওর নিজস্ব কয়েকটা টুকিটাকি। অনন্তর নাম ঠিকানা লেখা একটা কার্ড তখনাে আছে মুঠিতে। এই সাতদিনের মধ্যে হঠাৎ কিছুর দরকার হলে অনন্ত বলে গেছে, চিঠি লিখতে। সাবধানে রাখতে হবে এটা। ঝাপির ওপরের দিকে কতদিনের পুরনাে রেশমী রুমাল, পাথরের মালা একছড়া•••আজও যা হাতছাড়া হয়নি সেকালের ঝালরহাত কয়েকটা জামা, ছােট হয়ে গেছে, কিন্তু বিশ বছর আগেকার গলেগে আছে। দরকারী-অদরকারী জিনিষের স্তুপ সরিয়ে কার্ডটাকে নিরাপদ নিচে রাখতে যাবে, চোখে পড়ল আরও দুটো কাগজ ; বিবর্ণ, হলদে, তবু চেনা যায়। একজন ওকে দিয়ে গিয়েছিল সই-করা ফটো, আয়েক- জন নিজে হাতে লিখে দিয়েছিল নাম-ঠিকানা। ফটো আর চিরকূট, ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। দশ পনেরো বছর ধরে এখানে একভাবে চাপা পড়ে আছে। পাশা- পাশি দুটি কবর। অনন্তর কার্ডখানা ওদের পাশে শুইয়ে দিল সুরমা। আরও একটি। একটু পরেই সরে কড়কড় কড়া নড়ে উঠল, প্রায় সঙ্গে সনে ॥
হা পড়ল ঘরে। চমকে ফিরে তাকাল মা। জগদিন্দু। দোরগােড়ায়
এসে দাড়িয়েছে। নতুন কোন গেষ্ট এসেছে হয়ত। কি জাদি
কঠিন তর্জনীর ইশারায় ওকে বলছে দরজা খুলে দিতে।
ঝাপি বন্ধ করে উঠে দাড়াল সুরমা। ভীত দুটি চোখ নামিয়ে
যয়ে বলল, “ই।
বিষ কালীকৃষ্ণ ভাক্তারকে একখানি একশাে টাকার নােট দিন অনমােহন; তারপর আরেকখানা, গােবিন্দ দারােগাকে। দুজনকে বিদায় করে স্ত্রীর ঘরের সমুখে পা টিপে টিপে এসে দাড়াল। ইতস্তত করল এক মুহূর্ত, পর্দা সরিয়ে উকি দিল। জেগে আছ। জিজ্ঞাসা করবার প্রয়ােজন ছিল না। মৈত্রেয়ীর শীতল শান্ত দুটি চোখ খােলা। চটি খুলে অনঙ্গ ঘরে পা দিল। পাথরের বাঁধানাে যেতে শাদাকালাে দাবার ছকের ডিজাইন, ঠাণ্ডা। আরও কতবার তাে এ যয়ে এসেছে অনঙ্গ, কিন্তু পায়ের পাতা দুটি এমন হিম হয়ে যায়নি। শিয়রে বসে সন্তর্পণে স্ত্রীর কপালে হাত রেখে অন জিজ্ঞাসা করল, ‘কেমন আছ? চােখ দুটি ধীরে ধীরে বুজে এল মৈত্রেয়ীর, অন একটি ক্ষীণক ৰাৰ পেন, বিড়ােত। আস্তে আস্তে ওর চুলে হাত বুলিয়ে অন জিজ্ঞাসা করল, কেন এ কাজ করলে মৈত্রেয়ী; কেন বিষ খেলে ? চকিত হয়ে মৈত্রেয়ী আবার খুলল চোখ দুটি—'ডাক্তার চলে গেছে?” গেছে। পুলিশ। ‘পুলিশও। সেজন্তে তােমাকে ভাবতে হবে না। এটা যে আত্মহত্যার চেষ্টা, সেটা তে যথাসম্ভব গােপন থাকে, সে ব্যবস্থা করে এসেছি। অন হয়ত ভেবেছিল মৈত্রেয়ী আশ্বস্ত হবে; কৃতজ্ঞ একটু হাসি ফুটৰে ওর মুখে; নিরাশ হতে হল। একটু পরে বলল, ‘কি, কেন ভূমি একাকতে গিয়েছিলে মৈত্রেয়ী? কেন বিষ খেয়েছিলে?
হঠাৎ যেন মৈত্রেয়ীর উত্তেজনা দেখা দিল, কপাশে ফোটা ফোটা ধাম। সােজা হয়ে উঠে বসতে গেল, ক্ষীণ অথচ শাণিত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘কে বলেছে আত্মহত্যা? বিমুঢ় গলায় অন বলল, তবে কী? মৈত্রেয়ীর চোখ থেকে ঘােলাটে, অস্থির চাউনি তখনও মুছে যায়নি, বলল, ‘হত্যা।-হত্যার চেষ্টা। অনঙ্গর আঙ্গুল অসাড় হয়ে গেল, ঝুকে পড়ে বলল, এ কথার অর্থ কী মৈত্রেয়ী। বলে কী ব্যাপার; কাকে তােমার সন্দেহ। ততক্ষণ মৈত্রেয়ীর চোখ দুটি ফের বন্ধ হয়ে গেছে। এত বুকের ওঠাপড়া ছাড়া জীবনের কোন স্পন্দন নেই। অতি ক্লান্ত, নিমগ্ন কঠে মৈত্রেয়ীকে বলতে শােনা গেল, ‘বড় ঘুম পেয়েছে, একটু ঘুমােতে দাও। বলব, পরে তােমাকে সব বলব আমি।' আবার পা টিপে টিপে শিয়র থেকে অনঙ্গ উঠে এল। পাথরের মেজে ঠাণ্ডা। বাইরেও কনকনে হাওয়া। আজ সারাদিন বাগানের দেবদা গাছ থেকে একননা পাতা ঝরে পড়েছে, পড়ছে। অন কিছুক্ষণ চেয়ে তারপর আস্তে আস্তে চুল পড়ার ঘরে। জানালা থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। মনে হল, এখনাে কারা যেন ফিসফাস । করছে রাস্তার মােড়ে ; যে চাকরটা আলাে জ্বালিয়ে দিয়ে গেল, তার চোখেও যেন কৌতুক, কৌতুহল। সারা বছর কোন কিছু ঘটে না যে-গ্রামে, একটা গাছ কাটা হলে লােকে সারবন্দী দাড়িয়ে যায়, সেখানকার পক্ষে একটু কড়াকমের চাঞ্চল্য বই কি। বিশেষ, কাণ্ডটা যদি জমিদারবাড়ীর হয়। অনঙ্গমােহনের মা মৃণালিনী মারা গেছেন এই সেদিন, আশ্বিনের শেষে। অনঙ্গর স্বী মৈত্রেয়ী আ বিষ খেয়েছেন। অনশ চাপা দিতে চেষ্টার কসুর করেনি। কিন্তু লােকে সদরের বড় ভাক্তার কালী সরকারকে আসতে দেখেছে: ফটফট টায়ারের খুলাের সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়েছে খৰয়। ঘণ্টা তিনেক পা যুৰে ভাজার আধু, নিবিড় বিদায় নিয়েছেন, অবস্থা একটু ভাল দেখে। এখন ঘুম চাই পরিপূর্ণ ঘুম। ঠিক তখুনি এসেছে গােবিন্দ দারােগা। এদিক ওদিকে মিটিমিটি চেয়ে বলেছে, খবর সব ভাল? এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবনাম জমিদারবাবুকে সেলামটা সেরে আসি। তা, বাড়ির হাতাতে ঢুকতেই শুনলাম বৌরাণীর খুব ব্যামাে! জবাব দিতে গিয়ে তােতলামি এসে গেল জবরদস্ত জমিদার অন- মােহনেরও।‘ব্যামাে? কই, না তাে! একটু বদহজম হয়েছিল, সেরে গেছে। সেরে গেছে ? গেলেই ভাল। সদরের কালীকেই ডাক্তারের গাড়িটা দেখলাম কি না। টাকা বেশী নিলে কি হয়, লােট। ধন্বন্তরি।” দাবােগা তবু উঠল না। সন্দিগ্ধ গোঁফজোড়া ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এ বাড়ির থমথমে আবহাওয়ায় কী একটা গন্ধ খুঁজল। ওর রােমাকীর্ণ নগ্ন দুটি জানুর দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় কাটা দিয়েছিল অনঙ্গমােহনের শরীরে। পারলে বুঝি লাথি মেরে দূর করে দিতে এই খাকিশার্ট গােলামটাকে। কিন্তু মনের ভাব মনে রেখে ফরমাস করতে হল পানের ; জিজ্ঞাসা করতে হল, জর্দা, কিমাম, সুতি ? সেই সঙ্গে একশো টাকার নােটের মশলা দিতে ভুল হল না। অনক কাছারি-ঘরে ঢুকেছিল কিছু কাজ সারবে বলে, মন বলল না। শশাবার ঘরে ফিরে একটা পত্রিকা তুলে নিল, মনে হল, সব সাজানাে কথার ছেলেমানুষি। পাশের স্তিমিত-দীপ ঘরে মৈত্রেয়ীর তখন আবার ঘুম ভেঙ্গেছে, দেহ এখনও বিশ, চেতনা আচ্ছ। মৈত্রেয়ী দুহাতে চোখ ঢাকল উটপাখি আশায়-যদি ঘুমােন যায়, যদি রেহাই মেলে দুর্ভাবনার শিকারী কুকু সােয় হাত থেকে।
; মিলল না। আজ থেকে বছর দশেক আগে এমনি এক হে গােধূলিতে যে নববধূ এ-বাড়িতে এসে দাড়িয়েছিল, কিন্তু ফিরে তারে মনে পড়তে লাগল। রজার, এনায়ত নয়ন, ৩৪না, পনা। দুধ-আলতা-ঢালা পাথর-থানায় দাড়াতে হয়েছিল তাকে, মূহ উলু আর শখের ধ্বনির মধ্যে বরণ করা হয়েছি। কিন্তু সেই কি তার আসল রূপ। না। আসল মানুষটা জলছে ভেতরে, পােশাকে এত যে কি- মক, এতে শুধু বেলােয়ানি কাচ। যােটকটা একটু বিষম বৈ কি ; কোথায় মফঃস্বলের ঢলঢলকচারে লাবণি ধনী-তন, আর কোথায় ক, খামাঙ্গী একটি মেয়ে, দূসম্পর্কিত আত্মীয়ের আশ্রিতা, গােপন সমিতির সভা, আটপৌরে শাড়ি আর হেড়া স্যাঙাল পরে যে সারা শহর চষে বেড়ায়। এই সেদিনও বেআইনী একটা সভায় পুলিশের লাঠি পড়েছে যায় পিঠে। শাশুড়ী জিভে মধু দিলেন, কানে ছোঁয়ালেন, মৈত্রেয়ী আভূমি নৃত হয়ে প্রণাম করল। শাশুড়ী বললেন, 'বৌমা চোখ খােল। বৌ মুখই তুলতে পারে না। অথচ মনের ভেতরটা তখন বুটিপাটি হচ্ছে। নীলা আসুক, দেখে বাক নিপুণ অভিনয় করছে কিনা মৈত্রেয়ী। সমস্ত ব্যাপারটা নাটকীয়, সন্দেহ নেই। জটিল মামলা নিয়ে অন গিয়েছিল কলকাতায় ; উঠেছিল সলিসিটর মনােমােহন মিত্তিয়ের ওখানে। ফিনফিনে ধুতি-পাঞ্জাবী, পম্প-৩, পরিপাটি টেড়ি। নধৰ গৌৰ কাতি দেখে মনােমােহশে বাড়ি হাসির ধূম পড়ে গেল। এ বাড়ির সবাই যাের স্বদেশ সহযােগের ঝোঁকে মনােমােন নিজেই একবার থাকা ছেড়েছিলেন। ছেলেমেয়ে সবাই, খদ্দর না হােক, মােটা যিলের ধুতি ছাড়া পরে না। বড় ছেলে নীরদের রাজনীতি আরাে বা- নব। আন কোন উপায়ে ইংরেৎ ড়ানাের এ দেখে। সেই ফলে বােগ দিয়েছিল মৈত্রেয়ীও। ;
আর একদিন মৈত্রেীকে তিয়ার করল।
-ওকে নিয়ে তােমরা দিনরাত কীএত হাসি-মস্করা কর লােগ।
মৈত্রেয়ী বললে, “হাসব না? লােটা কী সঙ, দেখনি? আজ
সন্ধ্যায় গায়ে কতটা আতর ঢেলে বেড়াতে যায়, জানাে?
‘ঢালবেই তাে, নীরদ বললে, মফসলী বড়ােলােক, ও কলকা
আসেই রেস খেলতে, বাইজীর বাড়ি যেতে, নয়ত কোন অসুখ সারাতে।
মামলাটা তো দুতে।
হাসি-ঠাট্টা নয় মৈত্রেয়ী, এই লােকটার কাছ
থেকে কিছু টাকা দি বাগিয়ে নিতে পার, তবে পার্টির একটা বড়
লত হয়।
মৈত্রেয়ী বললে, এ আর শক্ত কী।
টাকার কথা শুনে অনঙ্গ সঙ্গে সঙ্গে রাজি। কিসে টা, লিসা
ফলা, বলল, ‘কত ?
মত্রেয়ী একটা অয় বলল।
অন—'বেশ ত এখন কোর্টে বেরুচ্ছি। সন্ধ্যাবেলা ফিরে এসে
সেই সন্ধ্যার কথা মনে হলে মৈত্রেয়ীর এখনও গায়ে কাঁটা দেয়।
লােক এখন এমন ভিজেবেড়াল হয়ে গেছে তখন কিন্তু অন্য প্রকৃতির
হিল। গায়ে ছিল অসম শক্তি, গ্রামের জমিদার, যেমন স তেমনি
সাহস। লুটপাটে তেমনি দুরন্ত, লাঠির জোরে বরাষর দখল করেছে
মাটি, টাকার জোরে মেয়েমানুষ।
নইলে ভূমিকা করল না, টাকাটা দেবার সঙ্গে সঙ্গে এক হাতে দয়া
ভেজিয়ে দিল, জোর করে চেপে ধরল হাত ? কী কঠিন, কনুস্পর্শ।
মৈত্রেয়ী নিজেকে ছাড়াতে গিয়েছিল, পারেনি; বরং সামলাতে গিয়ে
ছিটকে পড়েছিল লােকটার বুকে। মনে হল, সমস্ত জামাকাপক্ষে আন
ধরে গে, সে জিজ্ঞাসা করল, এ কী?
‘
কিনা।
খানিক পরে নিজে থেকেই অনঙ্গ আবার খুলে দিল ।
কানের কাছে মুখ নামিয়ে নীচু স্বরে বলল, আমরা ভদ্রলোক। ঝোকে ওপর এক একটা কাজ যেমন করে ফেলি, তার প্রায়শ্চিত্ত করি। আমি তােমাকে বিয়ে করব, মৈত্রেয়ী। আর কাউকে একথা বলতে পারেনি, মৈত্রেয়ী নালিশ করেছিল নীরদের কাছে। সব শুনে নীরদ গম্ভীর হয়ে গেল। অনেক পরে বলল, নরপটার ইহলীলা ইচ্ছে করলে তাে এখুনি সা করে দিতে পারি। কিন্তু তাতে তত আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না। তুমি ওকে বিয়েই কর মৈত্রেয়ী। ‘বিয়ে? তখন চেঁচাতে পারেনি, এখন আর্তকণ্ঠে মৈত্রেয়ী বলে উঠল, ‘তুমি কী বলছ নীরদদা? ‘ঠিকই বলছি', নিষ্ঠুর, নিশ্চল স্বরে নীরদ বলল, এ ছাড়া উপায় নেই। এ বরং গরলে অমৃত হল। মৈত্রেয়ীর মাথায় একখানা হাত আলগােছে রেখে নীরদ আবার বলল, 'আমাদের কাজে যে অনেক টাকা লাগবে মৈত্রেয়ী। তােমার আত্মবিসর্জনের কথা দেশের মুক্তি- ইতিহাসে লেখা থাকবে। নিষ্প্রদীপ ঘরে খস খস শব্দ। আপাদমস্তক মুড়ি দেওয়া, তবু মৈত্রেয়ী কেঁপে উঠল। কে ? কেউ না। কী ? কিছু না। দেয়ালপঞ্জীর পাতাগুলাে ওলটাচ্ছে হাওয়ায়, অনঙ্গমােহনের পূর্বপুরুষের তৈল- প্রতিকৃতি ঠক ঠক কাপছে। মৈত্রেয়ীর বিষক্রিয়াবিবশ চেতনা আবার তলিয়ে গেল, সীসে-বাঁধা শােলার মত, ধীরে ধীরে, কিন্তু নিশ্চিত, দশ বছর অতীতের গহ্বরে। বিয়ের পর প্রথম দিনেই মৈত্রেয়ী হাঁপিয়ে উঠেছিল। এত লােক এ বাড়িতে, এত কিচিরমিচির, মানুষ বাঁচে কি করে। এই মাসিপিসি, দেওর ননদদের সবাইকে সে চেনে না, কে কত আপন, কে গুরুজন, লবু, জানা নেই, সবার সমুখেই আধ হাত ঘােমটা টেনে বেড়াতে হত, সে বড় অতি। এত যে ধর এ বাড়িতে, দোতলা-একতলা মিলে গুণে ফুরোয় না, তবু যেন মনে হত কুলােচ্ছে না, কিছু লােক উপছে পড়ছে বারানায়, কিছু ছাতে। তারপর আলাে নিবতে লাগল এক একটি করে। সবাই বিদায় নিতে রু করল। শেষে একদিন মনে হল, সমস্ত বাড়িটা খালি। এই যে বড় বড় থামের যতিচিহ্নিত দীর্ঘ বারান্দা, এর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত নির্মক্ষিক। কথা বললে ফিরে আসে প্রতিধ্বনি হয়ে, পা ফেললে গম গম করে। মৈত্রেয়ীর কেমন গা ছমছম করত। একতলার এক কোণে পড়ে আছে দাস-দাসীরা; দোতলায় শুধু সে, স্বামী আর শাশুড়ি। শাশুড়ি। এতদিন লােকের ভিড়ে বোঝা যায়নি, এবার তাকে অলাদা করে চোখে পড়ল! রূপ ? সে বয়সে রূপের কথা অবান্তর। রঙ। পরিবারের সবার রঙই ফস। কিন্তু প্রখর দুটি চোখের ছটা, এর তুলনা মৈত্রেয়ী আজও দেখেনি। প্রথম দিন চোখ তুলে তাকাতে পারেনি লজ্জায়; পরেও পারল না, ভয়ে। মৈত্রেয়ীর ভিতর থেকে কে যেন বলে দিল, এই মহিলাটি তার চেয়ে সব বিষয়ে বড়-বয়সে, সম্পর্কে, ব্যক্তিত্বে। ঘৃণার বিষ সেই দিন থেকে ফোটা ফোটা জমেছে মনে। অবচেতনার গহনে পরাজয় মানাটা ওপরে ভেসে উঠেছে প্রবল বিতৃষ্ণা হয়ে। অনঙ্গকে মৈত্রেয়ী চেনে, বােঝে। সুখলি, লম্পট, ধনী। এই আলস্যলালিত সারমেয়ের শিকল তার কাছেই আছে। কি যাকে বােঝা যায় না, যার সাপের মণির মত প্রােজল চোখে চোখ পড়লে বুকের ভেতরটা পর্যন্ত হিম হয়ে আসে, তার সঙ্গে সারাজীবন একসঙ্গে কাটবে কী করে। এই ভয় মৈত্রেয়ী দেখেছে ঝি-চাকরদের মধ্যেও। নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি গল্প-গুজব করে, কিন্তু যে মুহূর্তে মৃণালিনী সমুখে এসে দাঁড়ান, অমনি সব কলরব ত হয়ে যায়, এ ওর মুখের দিকে তাকাতে থাকে। বাটনা যে বাটছিল, তার হাত যায় থেতলে; যে তরকারি কুটছিল, তার আঙ্গুল দিয়ে ঝর রক্ত পড়ে।
কাছারি-ঘরে নায়েবমশাই বসে কাজকর্ম দেখেন, তাদের কাছে
তিনি সিংহ, কিন্তু গিন্নীমা ডেকে পাঠালে তিনিও যে জুতী হয়ে
যান। মণ, সংকুচিত একটুখানি দেহ, পাকাচুলে আঙুল সয়ে তােত
মুখে কথা সরে না।
সিক থেকে ভাড়ার -য়ের চাবি, সব একটা আঁচলে। একটিমাত্র
প্রবল বিপুল ইচ্ছার ডানা মেলে মৃণালিনী এ বাড়ির সব কিছু ঢেকে
রেখেছেন।
এর পরে ইতিহাসটা বিয়ােধ-সংঘর্ষের ঘােট ঘােট ঘড়িতে আকীর্ণ।
প্রতিবারই মৈত্রেয়ী পিছিয়ে এসেছে, প্রতিবারই অক্ষম ক্ষোভে, তীব্র
ঘেযে চিত্ত তিক্ত হয়ে গেছে।
কী কাপড় পরবে, তাও মৃণালিনী ঠিক করে দিতেন। রঙে আর
মেশমে সঙ সেজে বসে থেকে থেকে হাঁপ ধরে গিয়েছিল; একদিন বুঝি
মৈত্রেয়ী বাক্সর তলা থেকে আটপৌরে একটা শাড়ি বার করে পরেছিল।
মৃণালিনী চুপ করে চেয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ।
সেদিন মৈত্রেয়ী কঠিন পণ করেছিল। একটা কিছু বলুন না মৃণালিনী,
সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেবে। কিন্তু মৃণালিনী কিছু বললেন না, আস্তে আস্তে
;
উঠে গেলেন।
পরদিনই কর্মচারী শহর থেকে ডজন খানেক বর্ণাঢ্য, সুতি,
শাড়ি নিয়ে এল। মৈত্রেয়ী বলল, এ কি।
মৃণালিনী বললেন, ‘ভেবেছিলাম সেমার সব ভাল জামাকাপড়
ছিড়ে গেছে।
প্রথমে প্রতিভ, পলে অপমানিত বােধ করেছিল মৈত্রেয়ী। কি
দ্বিতীয়দিন আর সেই আইনে শাড়ি অঙ্গে তােলার সাহস হয়নি।
পরে অন বলেছি, এ-বা ওসয় কাপড় শুধু ঝি-চাকরে পৰে।
ৰাৱা মনি, তারা একটু আলকম থাকবে বৈ কি, যাতে আলাদা
একথাতেও এচ্ছ। কোন শেষ ছিল কিনা কে জানে। রুলে না ;
তো মৈত্রেয়ীকে আলাদা করে চেনা যাবে না, বরঙ পােলাকে
যৰাি যায়।
আস্তে আস্তে অন জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘মাকে তুমি পছন্দ কর না?
মৈত্রেয়ী বলেছিল, 'আমার করা-না-করাতে কী এসে যায়। তােমার
মা করেন কিনা সেই আমার ভাবনা।
মৃণালিনীর মুখের দিকে সাহস করে তাকিয়ে কোন কোন দিন
মৈত্রেয়ী এই প্রশ্নের জবাব খুঁজেছে, পায়নি। আরও অস্বস্তি বেড়েছে
তাতে। তুষ্ট থাকলে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়, কষ্ট হলে সাবধান থাকা চলে,
কিন্তু যার মুখে মনােভাবের একটি রেখাও ফুটে ওঠে না, তার মন
মৈত্রেয়ী যুগিয়ে চলে কি করে!
কিছুদিন পরেই নীরদের কাছ থেকে টাকার তাগাদ এল।
মৈত্রেয়ীর কোন সাড়াশব্দ নেই কেন? নাকি স্কুল সুখের স্বাদ পেয়েই সে
ভুলে গেছে পার্টির কথা, তাদের সংকল্পের কথা। তৃপ্তির তাকিয়ায়
মুখ ডুবিয়ে তুমি যখন শুয়ে আছ মৈত্রেয়ী, আমরা তখন ফিরছি পথে
পথে। গান নেই, খাওয়া নেই, পেছনে পুলিশ, সামনে কাটাপ
অন্ধকার। ঠিকানা জানি, নিশানা নেই।
টাকার কথা শুনে অনঙ্গর মূখে হাসি খেলে গেল।
-আবার? কিন্তু এখানে টাকা কোথায় পাব মৈত্রেয়ী? সব টাকা
মার হাতে। তার কাছে চাও।
কালাে হয়ে গেল মৈত্রেয়
মূখ।
-কেন হাত পাতৰ ওঁর কাছে টাকা তাে তােমার।
কিছুক্ষণ তক থেকে অন গম্ভীর স্বরে বলল, “ভুল ধারণা তােমার।
সব মাম। বাবা যখন মারা যান, আমি তখন কোলের শিত। মা সেই
থেকে আমার সঙ্গে সনে এই সম্পত্তিও লালন করছেন। সব যদি গুন
নিজহাতে মা তুলে না নিতেন, তবে এই যে এত দেখলাম,
আয়াস, বিলাস-সৰ কোথায় থাকত।
টে/খয়ে মৈত্রেয়ী বলতে চেয়েছিল, তা হলে তােমাকে কষ্ট- বাচতে হত। মানুষ হতে। কঠিন কথাটা জিহ্বা, বেরুদ্ধ মা। কেন না, লাভ নেই। এ, অনঙ্গ সে নয় যে বেপরােয়া, তরুণী একটি মেয়েকে নিয়ে বিনাভূমিকায় দরজা ভেজিয়ে দিতে পারে। এ সম্পূর্ণ- ভাবে মায়ের কাছে আত্মবিক্রীত। অনঙ্গ বলল, ‘মার কাছে কৃতজ্ঞ হতে শেখাে। দেখছ না, কী অমানুষিক পরিশ্রম না করছেন আমাদের সংসারের জন্যে, আমাদের শাস্তি, আমাদের ভালর জন্যে ? মৈত্রেয়ী দেখেছে বৈ কি। অনঙ্গ যখন পায়রা পােষে, ঘুড়ি ওড়ায়, বাইচ খেলে, জুড়ি হাঁকায়, তাস খেলে, পয়সা ওড়ায়, মৃণালিনী তখন চশমাটি নাকের ডগায় এটে হিসাবের খাতা দেখেন। সকালে নমােনমাে করে কখন পূজো সারেন, মৈত্রেয়ী টেরও পায় না। জেগে উঠে বােজই দেখে, মৃণালিনী ঘেরা বারান্দার কোণে নির্দিষ্ট একটু জায়গায় কাঠের ডেস্কোর সমুখে বসে তন্ময় হয়ে খাতাপত্র পড়ছেন। আদায় উশুলের কথা ওর জানা কোন খাজনা যদি মকুব হয়, তাও। এর উপর মামলা আছে, মােকর্দমা আছে। নিজে উকিল ডাকিয়ে পরামর্শ করেন, কী ভাবে কী করতে হবে, উপদেশ দেন। মৃণালিনী বললেন, ‘টাকা? তুমি এত টাকা দিয়ে কী করবে যে? মৈত্রেয়ী বলল, “দরকার আছে। তার মানে, বলতে চাও না? কিন্তু এত টাকা একসঙ্গে পাওয়া যাবে না বৌমা। এবার আদায় ভাল হয়নি, তার ওপর সামনে বাসন্তী পূজো। অনেক খরচের ধাক্কা। বলি পড়বে, বাজি পুড়বে, যাত্রা- গান হবে, এমন কি’একটু থেমে বললে, ‘অনঙ্গ বাইজীও আনাতে পারে। শেষ কথাটায় মৈত্রেয়ী পাংত হলে গেল। ওর এই সব খেয়ালের গাপনি এয় দেন মা?
মৃণালিনী সর্দেশ উত্তর দিলেন না। উত্তর দিলেন না। পরে ধীরে ধীরে বললেন, খেয়াল তো ওর একার নয়, বৌমা। তােমার শ্বশুরের পিতামহ আমল থেকে এ চলে আসছে। তুমি বুঝবে না। তা ছাড়া জেনে রাখ, এ-সব ছোটখাটো জিনিস নিয়ে খুতখুঁত করে সাধারণ ঘরে। এ-সবে দোষ ধরে না। জবাব দিতেও মৈত্রেয়ীর প্রবৃত্তি হয়নি। ঘৃণার সাপটা আরেকবার সমস্ত সত্তাকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বিষাক্ত করে দিয়েছে। সেদিন বিকেলেই একটা অসমসাহসিক কাজ করল মৈত্রেয়ী। খাল ঝিকে দিয়ে ডেকে পাঠাল নায়েবকে। কয়েকটা গহনা খুলে দিয়ে বলল, ‘এগুলাে পাঠিয়ে দিন। এই ঠিকানা। নায়েব করজােড়ে বললেন ‘আর যা ইচ্ছে আদেশ করুন, কি এ কাজটি পারব না। মা শুনলে বড় রাগ করবেন। মা, মু, মা। নিজেকে মৈত্রেয়ী আর ধরে রাখতে পারেনি, প্রাক, চেঁচিয়ে বলেছে, আমি বুঝি কেউ নই ? ছি, বৌমা, তুমিই তো সব। সব তােমারই। মৈত্রেয়ীর মুখ শাদা হয়ে গেছে। পেছন ফিরে তাকাতেও সাহস হয়নি। মৃণালিনী আবার বললেন, তবে কি জ্ঞান, যে কটা দিন আমি আছি; সে কটা দিন তুমি আর নিচে না নামলে, কাছারি-ঘরে না-ই বা এলে। সব ঝুকি আমাকে পােহাতে দাও। আমি দু’চোখ বুজলে, সব তােমারই হবে। দু’চোখ বুজলে? কবে, কবে, কবে ? সেদিন থেকে প্রতিদিন বুঝি শাশুড়ির মৃত্যুকামনা করেছে মৈত্রেয়ী, ওঁর মুক্তি তিথিটির অপেক্ষা ‘কেউ নও? আরেকবার শুধু মৈত্মেয়ী মৃণালিনীর কথা অমান্য করেছিল। সেবার অজন্মা, ঘরে ঘরে কান্না, প্রতি সকালে কাছারি-ঘরে প্রজাদের ভিড় খাজনা মকুবের আরজি। কিন্তু এদিকে হাতের টাকায় টান পড়েছে মৃণালিনীর কড়া হুকুম-এক পয়সাও রেহাই পাবে না কেউ। ধনু দিয়ে লােকগুলাে বসে থাকে বেলা দুটো তিনটে অবধি, পট অনে পুড়ে একদিন মৈত্রেয়ী খাস ঝি তরঙ্গকে বলল, একটা কাজ কর না। ওদের দুটো করে বাতাস আর এক ঘটি জল দিয়ে আয়। কখন থেকে সব বসে আছে। তরঙ্গ বলল, “এমন কথা মুখেও এনাে না বৌরাণী। মার হুকুম জাননা ? আজ একটা লােককে ওরা খুটির সঙ্গে বেঁধে কী বারটাই মারলে। এখনও গােঙাচ্ছে। শােননি? আর স্থির থাকতে পারল না মৈত্রেয়ী—মৃণালিনীর পায়ের উপর উপুড় হয়ে পড়ে বলল, একটা লােককে আজ বেঁধে রেখে মেরেছেন আপনারা? মৃণালিনী মামলার নথি পড়ছিলেন। চশমা খুলে নিয়ে বললেন, ‘কেন ? –কেন, তাই তাে আপনাকে জিজ্ঞাস্ত করছি মা। একাজ কেন করছেন আপনারা? অত্যাচার এমনিতেই তাে যথেষ্ট হচ্ছে। আবার বেঁধে মারা কেন! আশ্চর্য, মৃণালিনী রাগ করলেন না। নথিটা একপাশে সরিয়ে রেখে হাসলেন। -বুঝতে তােমার একটু সময় লাগবে বৈ কি, বৌমা। আর, এ কীই-বা অত্যাচার দেখছ। যেখানে বসে আছ, সেখানে এর চেয়ে ভয়ঙ্কর অনেক ঘটনা ঘটেছে। বাগানের জবা গাছটা দেখতে পাচ্ছ, যেটা থেকে নােজ পূজোর ফুল তুলি? ওর নিচে একবার একটা আধমরা লােককে টেনে নিয়ে কবর দিয়েছিলেন তােমার শশুর। মৈত্রেয়ী আপাদমস্তক শিউরে উঠল, মৃণালিনী লক্ষ্য করলেন। বলেন, ‘গর্তে ফেলে দেওয়া হল লােকাকে, মাটি চাপা দিয়ে ফুলগাছ লাগানাে হল। কী টকটকে লাল জবা ফুটছে দেখতে পাওনা। মনে মনে সেদিন কঠিন প্রতিজ্ঞা করেছিল মৈত্রেয়ী। আর না।
আর কোন কথা বলতে আসবে না। শুধু অপেক্ষা করে থাকে। তারপর, দিন এলে টুকরাে টুকরো প্রতিটি ইট খসিয়ে দেবে এই পাপ পুরীর। ঘুচিয়ে দেবে এই বাইজী নাচাননা আর পায়রা গুঁড়াননা। বলিদান আর বাজি পােড়ানো বন্ধ করে সেই টাকায় খুলবে ইস্কুল, কাটাবে পুকুর, রাস্তা তৈরী করিয়ে দেবে। ছেড়া তির কথা বিপু করতে গিয়ে বারবার ছুচ ফুটছে, মৈত্রেয়ী ছাড়ছে না। এও একটা নেশার মত।. বিষপানের ক্রিয়া কি এতক্ষণ থাকে। এর পরের ক’বছর শুধু বারকয়েক আঁতুড়ঘয়ে যাওয়া-আসার ইতিহাস। এল, কিন্তু থাকল না কেউ। প্রথমটা গেল আঁতুড়েই, পরেরটা বুঝি মাস কয়েক বেঁচেছিল। তার পরেরটা হয়ে মােটে দু’ ঘণ্টা ছিল। একেবারে শেষেরটা নষ্ট হয়ে গেল পেটেই। সমস্ত শরীর রক্তশূন্য, দাড়াতে গেলে পা কাপে। মাথা আঁচড়াতে গেলে চিরুণির আগে চুল উঠে আসে। অনঙ্গর পায়ে হাত দিয়ে মৈত্রেয়ী বলল, “এবার রেহাই দাও, আর না। অনঙ্গ বলল, তা কি হয়! মা যে আজও বেঁচে আছেন, সে শুধু নাতির মুখ দেখবেন বলে। আমাদের শুধু কর্তব্য করে যাওয়া। মা! এখানেও মা! মৈত্রেয়ীর শরীরের সব কটা পেশী সঙ্কুচিত হয়ে গেল, শুকননা গলায় স্বর ফুটল না। এর কিছুদিন পরে মৈত্রেয়ী যা ভয় করেছিল তাই ঘটল। চিঠি লিখে লিখে নীরদ জবাব পায়নি, এবার নিজেই এল। এদিক ওদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘পুলিশ পিছনে আছে, এক্ষুণি পালাতে হবে। তার আগে তুমি কিছু টাকা দাও তাে মৈত্রেয়ী। ‘টাকা তাে আমার কাছে নেই। তবে তােমাদের সিন্ধুকের চাবিটা দাও। ‘তাও নেই। সব শাড়ির কাছে • বলল, বলতে বলতে ঝর-ঝর কেঁদে ফেলল মৈত্রেয়ী। আরেকদিন নীর কাছে যেমন কেঁদেছিল। সব খুলে বলল, একে একে। নীরদ মৈত্রেয়ীর একখানি হাত ধরল। তবে তুমি এনে পড়ে আছ কেন? যে জন্যে আসা, তাই যখন হল না, চলে এস আর সঙ্গে। মৈত্রেয়ী হাত ছাড়িয়ে নিল। -এখন হয় না নীরদদা। ভ কুঞ্চিত করে নীদ বললে, “কেন?” মৈত্রেয়ী মাথা নিচু করল, বলল, ‘বাধা আছে। আমাকে দেখে বুঝতে পারছ না ? নীরদ কী বুঝল সেই জানে। কুড়িয়ে নিল হাতের লাঠিটা, শুকঠে ‘চলি। ‘লােকটা কে বৌমা ?” নীরদ নেই, সেখানে দাড়িয়ে আছেন মৃণালিনী। ‘আমার দাদা। -সে তাে বুঝলাম। কিন্তু জিজ্ঞাসা করছি, কেমন দায় একটু খটকা লাগল কিনা। ঘরের বৌকে বের হয়ে যাবার ফুসমন্স দেয়, এ- ততা যেমন তেমন দাদা নয়! মাথা নীচু করে মৈত্রেয়ী দাড়িয়ে রইল। একটা কথাও মুখে সরল না। মৃণালিনী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, যেন জবাবের অপেক্ষা করলেন। তারপর বললেন, 'কিন্তু তুমি কেন এমন কাজ করলে বৌমা ? নিজেও সুখী হলে না, আমার ছেলেটাকেও হতে দিলে না? সেই একবার মৈত্রেয়ীর কপালের শিরা ফুলে উঠেছিল, কঠিন হয়েছিল হাতের আঙুল। লােভ হয়েছিল চিরদিনের মত মৃণালিনীর কণ্ঠ বন্ধ করে দেয়। পারেনি। অলগুলাে আবার শিথিল হয়ে গেছে, ইচ্ছা আর সাহসের মাঝখানে ফাকটুকু ভরেনি। মৃণালিনীর স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙে পড়ল সেবার তীর্থ থেকে ফিরে এৰে। ৰােখই , অল্প অল্প সর্দিকাশি। এক রাতে এমন টানাটানি গেছে যে, মৈত্রেয়ীর মনে হয়েছে কাল সকাল হয়ত আর মৃণালিনী উঠতে পারবেন না। কিন্তু আশ্চর্য মনের জোর মানুষটার। রােজ সকালে সূর্য-প্রণাম কয়েই মৈত্রেয়ীর চোখে পড়েছে বারান্দায় অভ্যস্ত স্থানটিতে শাশুড়ি, সেই পরিচিত ভদী। তবু মৃত্যু হল। মৃণালিনী মরতে চাননি, শেষ পর্যন্ত শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন সংসারের চাবি, তবু শেষ দিনটিকে ঠেকিয়ে রাখতে পারলেন না। এই তাে সেদিনের কথা, মৈত্রেয়ীর স্পষ্ট মনে আছে। সেদিনও জবাকুসুমসঙ্কাশ সূর্যকে দেখবার পরই দেখেছিল শাশুড়িকে। নিবিষ্ট উদগত মূর্তি। কি একটা দরকার ছিল। ডাকল, ‘ম। জবাব না পেয়ে কাছে গেল। এবারও সাড়া নেই। মনে হল মাথাটা যেন দেয়ালে এলিয়ে পড়েছে। ঠেলতেই নথিপত্র খসে পড়ল। মৈত্রেয়ী আর্ত একটা চীৎকার করেছিল, মনে আছে । সবাই ছুটে এসেছিল, সবার আগে অনঙ্গ। অনঙ্গ কেঁদেছিল। রীতি-রক্ষাৰ্থ রুমালে অল্প অল্প চোখ-মােছ নয়, শিশুর মত, আষাঢ়-আকাশের মত। কোনক্রমে সেখান থেকে দু’হাতে মুখ ঢেকে মৈত্রেয়ী শুয়ে পড়েছিল বিছানায়। বড় লজ্জা। এক ফোটাও চোখের জল ফেলতে না পারার আর বিস্ময়। প্রতীক্ষিত মুক্তির দিনটি এসে গেছে, এই উপলব্ধির টলমল বিস্ময়। কিন্তু তখন ভাবনার সময় ছিল না। অনঙ্গ অপ্রকৃতিম্বের মত পড়ে আছে। সৎকারের বন্দোবস্ত মৈত্রেয়ীকেই করতে হবে। শােকাচ্ছন্ন আরও কটা দিন কাটল। নায়েব মশায় একদিন সামনে এসে দাড়ালেন। “কী চান?’ মৈত্রেয়ী জিজ্ঞাসা করল।
‘খাতাটা দেখাতে এনেছি।
-দেখাতে এনেছেন। কিন্তু এখানে কেন? ওঁর কাছে নিয়ে যান।
নায়েব হাসলেন। বাবু আবার কবে এসব দেখেন? উনিই আপনার
কাছে পাঠিয়ে দিলেন। ওঁর মন ভাল নেই। তার ওপর অশৌচের
ক্লেশ আছে।”
নায়েব বললেন, আমি বুঝিয়ে দেব। তা ছাড়া আপনি শিক্ষিতা,
বুদ্ধিমতী। এ ঔপ্ত হতে আপনার কতদিন লাগবে।
ডালা ধরে খুলতে দু’জন লােক লাগে যে সিন্দুক, তার চাবি
পেয়েছে মৈত্রেয়ী; আর একশােটা সারি সারি ঘরের, যার দরজা খােলা
হয় না কখনও, কটের কবজা জং ধরে চৌকাটে সেটে গেছে।
দিন এসেছে। এবার আস্তাবলের টাটু ঘােড়াগুলাে ছেড়ে দেবে
মৈত্রেয়ী, শখের কবুতরগুলােকে একে একে আকাশে উড়িয়ে দেবে।
দীর্ঘ, সামন্ত-রাত্রি-প্রভাত হয়েছে।
নায়েবমশায় রােজ আসছেন। বিষয়-রহস্ত মৈত্রেয়ী বুঝতে পারছে
জমে জমে। কত টাকা আদায় হয় কখন, কত যায় সরকারে, কোন
ফসল কি মাসের।
খাতা থেকে মুখ তুলে মৈত্রেয়ী একবার বলে উঠল, এবারে আদায়
ভাল হয়নি, না নায়েবমশায় ?
নায়েব বললেন, না।
-কেন ?
‘দিনকাল বদলে গেছে বৌরাণী। প্রজাদের জোর বেড়েছে।
নজরাণা উঠে যাবার দাখিল। খাজনা দেয় সেও যেন ওদের দয়া। অথচ
সামনে মস্ত বড় খরচের ধাৰা আছে।
-“কিসের?
‘কেন, মার প্রক্রিয়া। মহা পুণ্যবতী মহিলা ছিলেন, তার শেষ
কাজে খরচ তাে একটু ঢালা হাতেই করতে হবে, বৌরাণী। নানাস্থান
থেকে পণ্ডিতেরা আসবেন। বিশ গ্রামের লোেক খাবে।
--কত টাকা খরচ হবে মনে করেন? নখুয়েব বললেন, ‘অন্ততঃ হাজার দশেক। মৈত্রেয়ী তখন কিছু বললনা। রেল স্টেশন থেকে গ্রাম অবধি একটা পাকা রাস্তা তৈরী করার পরামর্শ কিছুদিন থেকে করছিল নায়েবের সঙ্গে! সন্ধ্যার পর নায়েবকে ডাকিয়ে বলল, রাস্তার কাজ আপাতত বন্ধ থাকুক। আপনি ভিক্ট্রিক্টবােৰ্ডকে সেইমত একটা চিঠি লিখে দিন। শ্রদ্ধশান্তি চুকে যাবার পর আবার ডাক পড়ল নায়েবের। ‘আমি একটা স্কুল খুলতে চাই, নায়েবমশায়। -“কি ইস্কুল ? -মেয়েদের, আপাতত মাইনর, তাতে স্বাবলম্বী হবার বৃত্তিগুলােও শেখান হকে। নায়েব মাথা চুলকে বললেন, ‘সংকল্প তাে ভালই। কিন্তু বৌরাণী- -কী ? ‘খরচের কথা ভেবেছেন ? -আন্দাজে কতকটা ঠিক করেছি। কেন, বাধা কিছু আছে? ‘আছে বই কি’ নায়েব বুঝিয়ে বললেন, ‘তহবিল প্রায় খালি, নগদ টাকা শ্রাদ্ধ-শান্তিতেই ফুরিয়ে এসেছে। খুব শীগগির বিশেষ কিছু আদায় হবার সম্ভাবনাও কম। ‘তা হলে ? নায়েব কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, ‘সাহস দেন তাে আপনাকে একটা গা বলি, বৌরাণী। এসব কাজ ভাল, কিন্তু শুভ কাজের জন্যে সময় লাল। ভাল ভাল, সংকল্প আপাতত কিছুকাল স্থগিত রাখুন। বড় খারাপ দিনকাল, আরও খারাপ দিন আসছে। জমিদারী-প্রথারই আয়ু আর কতদিন, বলা যায় না। ইংরেজ শুনছি চন্তে ঘাৰে। স্বদেশদের হাতে ক্ষমতা এলে ওরা কী করে, ঠিক নেই। মৈত্রেয়ীর কাছ থেকে বাধা না পেয়ে নায়েবের আরকটু সাহস বাড়ল, “দিনকাল মার আমলেও খারাপ ছিল, জ্ঞাতিশত্রু, পূজাশত্রু।
কিন্তু তিনি ছিলেন বিচক্ষণ মানুষ, হিসেব করে চলে চলে এই সম্পত্তি ক্ষয়ে যেতে তো দেননি, বরং তিলে তিলে বাড়িয়ে গেছেন। কার জন্যে বৌরাণী ?-দাদাবাবুর জন্যে, আপনার জন্যে। আপনিও তেমনি পাশে দোলনায় মৈত্রেয়ীর তিনমাসের শিশুটির দিকে আঙুল দেখিয়ে নায়েব বললেন, আপনিও তেমনি ওর কথা ভেবে সব কাজ করুন, বৌরাণী। ঈশ্বর না করুন, যদি একটা বড় গােছের ওলট-পালট কিছু হয়, তখন এই শিশুটির ভবিষ্যৎ কী, ভেবে দেখেছেন? দেখেনি, দেখার কথা ভাবেইনি। ভাবনা করার মত মনের অবস্থাও তখন নয় মৈত্রেয়ীর। মাথা ঘুরছিল। নায়েবকে শুধু বলল, ‘আপনি এবার যান। পরদিনই নীরদের চিঠি এল। মৃণালিনীর মৃত্যুর কথা জেনেছে কি- এবারে তাে কোন বাধা নেই। সুতরাং মৈত্রেয়ী জানে। টাকা। টাকা চাই। ইংরেজরাজ টলমল। কংগ্রেসী আপােষ-আলােচনার নীতিতে নীরদদের দলের বিশ্বাস নেই। সংগ্রামের প্রস্তুতি চলছে তলে তলে। এবার চরম আঘাত। কিন্তু তার বাকিটুকু না পড়েই মৈত্রেয়ী বলে দিতে পারে, টাকা চাই। কিন্তু কোথায় টাকা? তহবিল খালি, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। যা কিছু আছে, সেইটুকুই ধরে রাখতে হবে সষত্নে, আর কিছু না হােক, কোলের শিশুটির মুখ চেয়ে। মৈত্রেয়ী লিখল নীরদকে। প্রথমে ক্ষমা চেয়ে, অক্ষমতা জানিয়ে। একটু উপদেশও জুড়ে দিল শেষে। ইংরেজবিতাড়নের জন্যে আর বড় রকমের আয়ােজনের দরকার নেই, ইংরেজ আপনা থেকেই যাবে। তার চেয়ে, এখনও সময় আছে, তুমি সুস্থ হও, সংসারী হও, নীরদদা। চিঠিটা দ্বিতীয়বার পড়ে মৈত্রেয়ী মনে মনে খুশী হয়ে উঠল। ভাল জবাব হয়েছে। সেই হাসি বেশীক্ষণ রইল না কিন্তু। লিখে, ভাজ করে মৈত্রেয়ী উঠে এসেছিল টেবিলের কাছে, খাম বের করতে হবে। আবক্ষ প্রতিবিম্ব পড়েছে আয়নায়। সােজাসুজি তাকাতেই চোখে পড়ল। এত ভয় মানুষ বুঝি মৃত্যুর মুখােমুখি পড়ে গিয়েও পায়না। পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত শিউরে উঠেছিল, নিমেষে নীরক্ত হয়েছিল মুখ। তবু বিশ্বাস হয়নি। মিলিয়ে দেখতেই বুঝি তাকিয়েছে দেয়ালের দিকে, যেখানে ফুলের মালার ফাস-পরানাে, ফ্রেমে-বাঁধানাে ছবি ঝুলছে। মৃণালিনী। দশবারাে বছর আগে ভােলা ছবি, কিন্তু ব্যঙ্গবিচিত্র হাসিটুকু এখনও অবিকৃত। মৈত্রেয়ী একবার তাকালে সেই ছবির দিকে, একবার আয়নায়। তারপর আর তাকাতে পারল না। , আর ভুল নেই। আয়নায় তাে সে নয়, আরেকজন। চিনতে পেরে মৈত্রেয়ীর বুকের ভেতরটা যেন বরফ জমে স্তব্ধ হয়ে গেল। এতকাল ধরে সঞ্চিত ঘৃণা কি শেষে এই রূপ নিল। তারপর কী করেছে মনে নেই। খুট করে শব্দ হল। মৈত্রেয়ী চোখ মেলল। সকালের প্রথম আলো পড়েছে ঘরে। অনঙ্গমােহন শিয়রের কাছে দাড়িয়ে। -এখন কেমন আছ? -একটু ভাল। মৈত্রেয়ী ক্ষীণ কণ্ঠে জবাব দিল। একবাটি গরম দুধ নিজ হাতে এনেছে অনঙ্গমােহন। ক’ ফোটা ব্রাণ্ডি মিশিয়ে দিয়ে বলল, 'খেয়ে ফেল। একটু পরে জিজ্ঞাসা করল, এখন কেমন বােধ করছ? মৈত্রেয়ী বালিশে ফের মাথা রেখেছিল, ইশারায় বলল, ভাল। অনঙ্গমােহন বসল শিয়রের কাছে, মৈত্রেয়ীর একখানা শিথিল হাত তুলে নিল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নীচু গলায় বলল, “তােমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করব। কাল বাত্তিরে এঘর থেকে যখন চলে যাই, একটা কথা বলেছিলে, আত্মহত্যা নয়, হত্যার চেষ্টা। একথার অর্থ কী, মৈত্রেয়ী ? কে তােমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল?
অনেকক্ষণ চোখে চেয়ে থেকে মৈত্রেয়ী বলল, ‘কোন অর্থ নেই। ভুল বকেছিলুম।” ‘ভুল? মৈত্রেয়ী আস্তে আস্তে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। ভুল বইকি। কিন্তু অন ভুল নিয়েই থাকুক। ঠিক কথাটা বােঝাবার সাধ্য মৈত্রেয়ীর নেই। আর, বললেও অনঙ্গ কি বিশ্বাস করবে, মৈত্রেয়ী আত্মহত্যা করতে চায়নি, বিষ খেয়ে শেষ করতে চেয়েছিল তাকে, নিজের মধ্যে আজ যাকে দেখতে পেয়েছে।
সহমৱণ কার্ডটা বারকয়েক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলাম। আর যাই হােক, নিবেদিতা দেবীর রুচি নেই একথা লােকে বলবে না। মসৃণ, ধবধবে কার্ড, আইভরি ফিনিশ। নয়নারাম কয়েকটা বাহুল্যবজিত অক্ষরে ছাপা নিমন্ত্রণলিপি। শুধু ছাপার অক্ষরকে নিবেদিতা দেবীর আবার বিশ্বাস হয়নি, কার্ডের বর্ডার দিয়ে গােটা গােটা হরফে লিখে দিয়েছেন ‘অবিশ্যি আসবেন কিন্তু। আগের বার ফাকি দিয়েছিলেন, ভুলিনি। এবারে কোন এনগেজমেন্টের ওর শুনব না। অনুপস্থিতির ত্রুটি আপীলেও মার্জনা হবে না। এই তো সেদিন চায়ের পার্টি দিয়েছিলেন নিবেদিতা দেবী, এরই মধ্যে আবার ? আর এস ভি পি নামক একটা ব্যাপার আছে, অপ্রীতিকর কিন্তু অবশ্যকৃত্য। সেটা ফোনেই সারবে স্থির করলুম। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হ’ল না। একটু পরেই ও-প্রান্ত থেকে সাড়া এলাে : কালাে। নিবেদিতা দেবীর গলা। সবিনয়ে নিজের নাম ঘােষণা করে বললুম, ‘কার্ড পেয়েছি। কিন্তু হঠাৎ ভােজ কেন, কী ব্যাপার বলুন তাে? কাচের শার্সির ওপর হালকা হাওয়া হাত বুলিয়ে গেল, নিবেদিতা দেবী এমন গলায় হাসলেন। আবার ফাকি দেবার মতলব খুজছেন তত? বললাম, শনিবার একটা কাজ ছিল বটে। তবে আপনারটা যদি জরিতর হয়, সেটা খারিজ করতে পারি। ‘তাই করুন তবে। নিবেদিতা আবদায়ের গলায় বললেন, 'প্রায়রিটি আমার।
এর পরেও ‘না’ বলতে পারি, এমন বর্বরতা বা মনের জোর কোনটাই আমার নেই। কথা দিলুম, বাবাে। কথা দিলুম বটে, কিন্তু অস্বস্তি গেল না। এ অস্বতি নেহাৎ স্নায়বিক নয়, এর কিছুটা অনভ্যাসের। মেয়েদের মনের কথা জানি না, তবু এর সঙ্গে তুলনা হয় বাসরে যেতে নব-বধূর সংকোচের। সে ভীরুতা তবু মধু, তাতে থরে থরাে প্রত্যাশা মেশানাে আছে। কিন্তু আমার সঙ্কোচ নিখাদ। ডিনার-লাঞ্চ ইত্যাদি যাদের কাছে লাঞ্ছনার নামান্তরমা তার নিশ্চয় ঈর্ষার সঙ্গে এ সব ব্যাপারে অপরের নৈপুণ্য লক্ষ্য করেছেন। অনেকেই ভােলা গলায় গল্প করে, হাসি ঠাট্টাও চলে, আসর জমে। আর এদিকে অনভ্যাসের এটো ঠোট চড় চড় করছে, কতক্ষণে তােয়ালেয় মুখ মুছে পালানাে যাবে, সেই অপেক্ষা। যাই হােক, কথা যখন দিয়েছি তখন বৃথা এ ক্রন্দন। নিমন্ত্রণ, দেখলুম, আরাে অনেকেই পেয়েছেন। নিবেদিতা দেবী কাউকেই বড়াে বাদ দেননি। শিল্পী প্রভাকর দেবের সংস্পর্শে একবারাে যারা এসেছে, খুঁজে খুঁজে তাদের বার করেছেন ঠিক। আর্ট ক্রিটিক সমাদ্দার দেখা হতেই বললে, ওহে কার্ড পেয়েছ তাে।” বললুম, পেয়েছি। কিন্তু কারণ কী বুঝিনি। সমাদ্দার বললে, ‘বােঝবার বিন্দুমাত্র প্রয়ােজনও নেই। নিবেদিত। দেবী তাে অকারণ পুলকেও অহ্বান করতে পারেন। রসিকতাটা ঈষৎ স্থল। ভালো লাগল না। প্রভাকর দেব আমাদের শ্রদ্ধেয় বন্ধু ছিলেন। তারই স্ত্রী নিবেদিতা দেবী। তাকেও সমীহ করি। বললাম, হয়ত প্রভাকর দেবের অপ্রকাশিত কিছু ছবির সন্ধান পাওয়া গেছে। ‘অপ্রকাশিত ছবি ? সমাদ্দার হাসল। ওই টিকটার বয়স কিছু বেশি হয়ে গেছে, ওতে আর চলে না। লােকে অবিশ্বাস করে। জীবদ্দশায় যে সব প্রতিষ্ঠাবান লেখক কিম্বা শিল্পী একে কুল পাননি, বিস্তর প্রার্থীকে নিরাশ করে ফিরিয়ে দিয়েছেন, তাদের মৃত্যুর ঠিক পরেই এত অপ্রকাশিত রচনা আর ছবি আসে কোথা থেকে বলতে পারে? সমাদ্দার কিছু উত্তেজিত। ওকে আর বেশি ঘাটানাে ঠিক না। বললাম, চলি। রবিবার দুপুরে সাইপ্রেস রাে-তে দেখা হচ্ছে। সমাদ্দার বললে, নিশ্চয়। আর্ট সমালােচনা করি বটে, কিন্তু অকৃত্রিম ভালােবাসি ভােজ্য বস্তু। চৰ্য্যচোষলেহপেয়, নিবেদিতা দেবী কোনটাই বাদ দেবেন না, জানি। যে দেশে খ্যাতির চূড়ায় উঠেও একজন প্রধান কবিকে দাতব্য চিকিৎসালয়ে জীবনের শেষ কটা দিন কাটাতে হয়েছিল, সেই দেশে শিল্পী প্রভাকর দেবের সমাদর কিছু বিস্ময়কর বৈকি। আর এ হেমগন্ধহীন প্রেম নয়, জীবনের শেষ ক'টা বছর প্রভাকর অর্থোপার্জনও মন্দ করেনি। কৃতী কবি বা কথাসাহিত্যিকের তুলনায় চিত্রশিল্পীরা এক হিসেবে সৌভাগ্যবান। দেশান্তরে স্বীকৃতি পেতে হলে শ্রেষ্ঠ কবিকেও ভাষান্তর করণের অপেক্ষায় থাকতে হয়। কিন্তু ছবির ভাষা সর্বত্র এক-প্রদেশ, দেশের বেড়া অনায়াসে ডিঙিয়ে যেতে পারে। প্রতি বছরই শীতকালে প্রভাকরের ছবির একটা প্রদর্শনী হত। হিসাব নিকাশের সময় দেখা যেতো, সে ছবির একটা মােটা অংশ কিনেছে বিদেশীরা। তাদের মধ্যে অনেকেই স্থায়ী বাসিন্দা, কিন্তু টুরিস্টদের সংখ্যাও কম নয়। মার্কিন আছে, সুইস আছে, ফরাসী আছে। অনেক সময় অবাক হয়ে ভেবেছি কী পেয়েছে ওরা প্রভাকরের ছবিতে। ছ’ উইকে গােটা ইণ্ডিয়ায় ফ্লাইং টর দেবে, ওদের কি এখন আছে ছবি বােঝার মন, ভগবান জানেন আছে কিনা, প্রভাকরের ছবি- তাে কাটে হ-হু করে। বুঝুক না-ই বুঝুক, ভালাে লাগুক না-ই লাগুক, তাই বলে ছবি কিনবে না? ইণ্ডিয়া দেখতে এসেছে, গেল আর ইয়ােগ ছাড়াও যে অনেক কিছু পাওয়া যায়, প্রিয়তমার কাছে তার নিদর্শন নিয়ে যেতে হবে না?
৪ যখনকার কথা বলছি তখন প্রভাকরের খ্যাতির প্রিহর। এই প্রভাকরকেই সর্বসাধারণ চিনেছিল। আর অসাধারণ যারা, অর্থাৎ দেশ রাজা-মহারাজা, নাইট, জমিদার, তাঁরাও এই প্রভাকরের পৃষ্ঠ- পােষণ করেছেন। শেষের দিকে এমন হয়েছে, পট হােক, ঘট হােক, প্রভাকর তুলি ছোঁয়ালেই সােনা। তার মূল্য একশাে থেকে হাজার, যা-খুশি। এই প্রভাকরের সাধনার প্রথম পর্ব কেটেছে আহিরিটোলার অখ্যাত অন্ধ গলিতে, লােক-লােচনের আড়ালে। তার কিছু কিছু বর্ণনা প্রভাকরের মুখেই শুনেছি, অনেক পরে। থিয়েটারের সিন আঁকতাে প্রভাকর। লােকে নটশেখরের বক্তৃতায় হাততালি দিয়েছে, কিন্তু পেছনের পটের দিকে চেয়ে দেখছে ক’জন গভীর অরণ্যে দুর্যোগের দৃশ্যে, যেখানে প্রধান অভিনেত্রী পথ হারিয়ে করুণ গান ধরেছেন,—সে সুর শুনে পাষাণও গলে, দর্শকদের তাে কথাই নেই—ঘন ঘন হাততালি পড়েছে; কিন্তু কেউ কি একবার ভেবেছে বনের দৃশ্যপট যদি এমন নিপুণ হাতে আঁকা না হত, এমন ছমছমে অন্ধকার যদি তুলির আঁচড়ে না ফুটতাে তবে গান কি জমতাে, না চোখে আসত জল ? ভগীরথের গঙ্গা আনয়নের দৃশ্য তারিফ করেছে সবাই, কিন্তু কারুর , একবার মনে হয়নি এর মধ্যে সীন-আঁকার ভেলকিও অনেকখানি। প্রভাকরের মন উঠল না। থিয়েটারের কাজ ছেড়ে দিলে। হ’ল আরেক যুগ। ইতিমধ্যে থিয়েটারের রঙ আর পট থেকে কিছু কিছু বাঁচিয়ে আপন খেয়ালে প্রভাকর কিছু কিছু ছবি একেছিল। কিন্তু তখন শক্তি কম, কল্পনার দৌড়-ও বেশি না। নামজাদা শিল্পীদের ছবি সামনে রেখে আঁকা; সে সব ছবিতে মৌলিকতা ছিল না। মূলের বিকৃত প্রতিরূপায়ণের কেউ আদর করলে না। সম্পাদক একবার দেখেই পত্রপাঠ ফেরৎ দিয়েছেন, না মশাই, এ, চলবে না। এ কি ছবি না কাগজের ওপর রঙ নিয়ে ছেলেখেলা। ;
যারা ভদ্রত, ভাষা সহানুভূতির সুরে বলেছেন, “কী করি মশাই, কাগজ চলে না। দপ্তরীর পাওনা মেটাতে পারি না, লেখকদের পারত- পক্ষে দিই না এক পয়সা, এর ওপরে আবার ছবি ছাপাবার টাকা কোথায় পাই বলুন। আপনার আবার তিনরঙা ছবি, মেলা টাকার ধাক্কা। আমাদের প্রধান কাজ এখন জনশিক্ষা। দেশের লােককে শিল্প- সচেতন করে তুলতে হবে,—তার ছবি দেখবে, কাব্য পড়বে, নৃত্যে রস পাবে, সেই দিনের অপেক্ষায় আছি। এভাকর অবশ্য অততদিন অপেক্ষা করতে পারেনি। ভাগ্য প্রস, শস্তা দামে কিছু কিছু ছবি সেই সময়েই ক্যালেণ্ডার-ওয়ালাদের বিক্রী করতে পেরেছিল। শতেক গােপিনী পরিবৃত কামু,, আর ‘রামের রাজ্যাভিষেকের’ চটকদার রঙ-বেরঙের ছবি। সেই বর্ণাঢ্যতার মধ্যে যখন কোন নামকরা শিল্পরসিক রসের সন্ধান পেলেন, প্রভাকরের সেদিন থেকে সুদিন শুরু। চোখ-বাঁধা ভবের খেলায় ঘােরাঘুরি সারা হ’ল। ফুটপাথে ছড়ানাে বইয়ের ছাই উড়িয়ে অমূল্যরতন খুজতে খুজতে আর্ট ক্রিটিক হঠাৎ একসময়ে সামনের দিকে তাকালেন। আদি আর ক্যালিকোর ছিটের পাশেই অনেকগুলাে ক্যালেণ্ডার। পার্কের রেলিংয়ে ঝুলছে। একটা ছবির দিকে তাকিয়ে আর চোখ ফেরাতে পারেন না। নামহীন শিল্পী, ছবির নাম 'কুরুক্ষেত্রের পরে। খো, খোজ, কে এঁকেছে। যে কোম্পানীর ক্যালেণ্ডার, তাদের কাছ থেকে অনেক কষ্টে শিল্পীর নাম ধাম উদ্ধার করা গেল। পরের মাসে বিখ্যাত কোনাে মাসিকে প্রভাকরের আঁকা খান দুই ছবি আর ছােট একটা প্রবন্ধ বেরুলাে। শিল্পরসিক লিখলেন, বিষয়বস্তু পুরাণের, কিন্তু শিল্পীর চোখের আলো পুরানাে নয়। আর পৃথিবীর স্মরণীয় সব শিল্প- সৃষ্টির অভিনবত্ব তাে শুধু এই আলো ফেলারই কারিকুরি। নইলে রামায়ণ-মহাভারতের পর কেউ কি দুতাে রঘুবংশ-শকুন্তলা? কি একালের মেঘনাদ বধ? বিদায় অভিশাপ ? প্রভাকর দেবের সঙ্গে আমার এই সময়েই পরিচয়। আমার প্রথম কবিতার বই বেরুবে। কাকে দিয়ে প্রচ্ছদপট আঁকাই। কোন বন্ধু প্রভাকর দেবের নাম করলেন। বললেন, সবে নাম করেছে, এখনাে পায় ভারি হয়নি, ওকে দিয়ে সস্তায় কাজ সারতে পারবে। কথাটা মন্দ লাগল না। প্রভাকর দেবের ঠিকানা যােগাড় করে সেদিনই সন্ধ্যাবেলা তার বাসায় যাওয়া গেল। আজকে যারা প্রভাকর দেবের সাইপ্রেসবাে’র নয়নাভিরাম কটেজ দেখছেন তারা কল্পনাও করতে পারবেন না আহিরিটোলার সেই স্মৃতি- সেতে একতলা বাড়ির রূপ । বাড়িটা শুধুই যদি একতলা হত তবে ক্ষতি ছিল না। কিন্তু চার পাশে দোতলা-তিনতলার চক্রান্তে পড়ে মাঝখানের এই রুদ্ধশ্বাস বাড়িটাতে আছে বাতাস, না আলাে। জীর্ণবাসের মতো চূণের অস্তর অনেকদিনই খসেছে। কিন্তু নতুন জোটেনি। বাইরের দেয়ালের লজ্জা নিবারণ করছে ঘুটে, কিন্তু ভেতরে গিয়ে দেখলুম, নােনাধরা ইটের খাঁজে খাঁজে ছারপােকার নিঃশক পরিখা। একটা লণ্ঠন জালিয়ে প্রভাকর আমাদের বসালেন। ঘরের কোণে একটা তক্তপোেষ, তক্তপােষের নিচে তােরং বুঝি ওটা; মেজেয় শততালি একটা শতরঞ্জি। শতরঞ্জি নাম সার্থক , এত রঙ পড়েছে যে আসল রঙ কী ছিল বােঝবার উপায় নেই। প্রভাকর বললেন, এই আমার স্ট,ডিও। এই স্টুডিও? সরঞ্জাম কই ছবি আঁকার ? প্রভাকর জানালেন, সরঞ্জাম লাগে না। লাগে না? না। তক্তপােষে ঠেসান দিয়ে পট রাখি, ওই আমার ইজেল। কিন্তু আলে? আলাে লাগে না। আলাের সাত রঙ তো আমার বাক্সে। সবচেয়ে বিস্মিত হলাম প্রভাকর যখন বললেন, প্রচ্ছদপট আঁকার জন্যে তিনি কিছু নেবেন না। কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদপট, তার আবার টাকা। বই তো আর বিকোবে না, বন্ধুদের বিলােবেন। না হয় ওই সঙ্গে আমার ছবিও বিলিয়ে গেল।
উঠি উঠি করছিলুম, বুঝতে পেরে প্রভাকর বললেন, ‘বাঃ রে চা খেয়ে যান। আতিথ্যের অপমান করা হবে এবং কথাটা রুচি এবং ভদ্রতা- বিৰােধীও বটে, তবুও এ-কথা না লিখে পারছি না যে, সেই চা মুখে তুলতে পারিনি। কলাইচটা স্টীলের পেয়ালা, জলটা গরম বটে, কিন্তু দুধ-চিনি মাত্রই নেই। চায়ের পাতাও সম্ভবত, এবং সহজবােধ্য কারণে, শস্তা, কেমন একটা পচাতুলসী গন্ধ। পেয়ালাটা তবু ঠোটের কাছে তুলছিলাম আর মাঝে মাঝে নামিয়ে রাখছিলাম, অন্ধকারে প্রভাকর বুঝতে পারেননি,—আর অপলক চোখে দেখছিলাম যিনি চা নিয়ে এলেন, তাকে। নিবেদিতা দেবীকেও সেই প্রথম দেখলুম। দেখার মত কিছু নয়, পরনে লালপেড়ে একখানা মিলের শাড়ি ছিল, কৃশ দু’পানা হাতে সঙ্গীহীন নােয় দু’গাছি নিঃশব্দ। তখনাে কাচের চুড়ির এমন চলন হয়নি। চা দিয়ে দরজার পাশে চুপ করে দাড়িয়েছিলেন। কপাল অবধি ঘােমটাটানা। সে-মুখ সুন্দর না কুৎসিত অন্ধকারে বােঝবার উপায় ছিল না। এমন কি বয়সটাও আন্দাজ করতে পারিনি। ভাঙা ভাঙা চোয়ালের ওপরে ভ্রান্ত দুটি চোখ ; সে চোখের বয়স, কে জানে, যােল, , ছাব্বিশ না ছত্রিশ। এর পরে নিবেদিতা দেবীকে যারা দেখেছেন, তারা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করেছেন নিবেদিতার বয়স কমছে। এক একটি জন্মদিন হ'ত নিবেদিতার, মনে হত একটি বছর বয়স কমল। শীর্ণ কপােল দুটি ভরল প্রথম, তারপর তাতে অল্প অল্প রঙের ছোপও লাগল, স্তিমিত চোখ দুটির তারা সরসীর মতাে টলটল করে উঠল। এ নিবেদিত প্রায়ান্ধকার ঘরে অচেনা অতিথিকে চিনিহীন চা দেবার কুণ্ঠায় দরজার কোণে দাঁড়িয়ে থাকতেন , হাজার অতিথির ভিড়েও নিজেকে না হারিয়ে দৃঢ় পায়ে দাড়িয়ে, অমায়িক হেসে গৃহস্থামিনীর কর্তব্য পালন করেছেন। কিন্তু সে-কথা পারে।
; এর পর প্রভাকরের ছবির কিছু কিছু আদর হতে লাগল। প্রথম দু’চারখানা মাসিক সাময়িক পত্রাদিতে ছাপা হত ; তাতে নাম হত, টাকা আসত না। কিন্তু ধীরে ধীরে ওঁর ছবি বিক্ৰীও হতে লাগল। যারা ছবি কেনেন তারা আর পাঁচজনের সঙ্গে প্রভাকরের ছবিও নিতে লাগলেন একখানা দু’থান করে। উল্লেখযােগ্য শিল্পীদের মধ্যে প্রভার অনন্য না হােক, অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন। অবশ্য আমার সঙ্গে প্রভাকরের সম্পর্ক বরাবরই অক্ষুন্ন ছিল। প্রচ্ছদ- পট আনতে একদিন গেলাম, বই ছাপা হলে এক খণ্ড উপহার দিতে আরেক দিন। প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে প্রভাকর দেবের কাছে ভূমিকায় ঋণ স্বীকার করেছিলাম, পড়ে তিনি ছেলেমানুষের মতাে খুশী হয়ে উঠলেন। বললেন, আমাকে আর বাড়িয়ে তুলছেন কেন ; আমার তত জীবনের অর্ধেকটাই কেটে গেছে- অধেকটাই ? বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেছি ‘বয়স কত আপনার? ‘তা চল্লিশ হবে বৈকি। ভুলে যাবেন না, আমার জীবনের পেনেরাে বছরই কেটেছে থিয়েটারের সীন একে। আজ আপনারা আসছেন, এ আমার বড় সুখের। কিন্তু এ-বয়সে প্রতিষ্ঠা দিয়ে করব কী। আপনাদের অল্প বয়স, সমস্ত জীবনটাই সমুখে পড়ে আছে। আপনাদের সামান্য কাজ করে দিতে পেরেছি এতেই আমি কৃতার্থ। সেদিন প্রভাকর অনুমান করতে পারেন নি দশ বছর পরে আমারই কৃতাৰ্থ বােধ করার পালা আসবে। আমার কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ পরিকল্পনা প্রভাকর দেবে, এতেই লােকের চোখে আমার মূল্য বেড়ে যাবে। সেদিন সবিনয়ে বলেছিলাম, বইখানা পড়ে দেখবেন। পড়ব বৈকি’ প্রভাকর লজ্জিত হেসেছিলেন, তবে বুঝব কি না জানি না। বিশেষ অভ্যেস নেইতাে। তবে ও বুঝবে ঠিক। সহান্তে দরজার দিকে তাকিয়েছিলেন। ও গল্প-কবিতার বই পড়তে খুব ভালােবাসে। লজ্জায় অরুণ হয়ে নিবেদিতা দেবী মুখ ফিরিয়েছিলেন, মনে আছে।
সেদিন দিনের আলােতে দেখলাম বলেই ঠিক মনে হ’ল কি না জানি না, নিবেদিতা দেবীর শাড়িখানা আগের দিনের চেয়ে ঢের ফস।। হাতে দু’গাছি রুলিও দেখলাম। আগের দিন দেখেছি বলে মনে পড়ল না। পরের রবিবার জনকয়েক বন্ধু নিয়ে গেলাম। আজ বাড়ির চেহারা আলাদা। বাইরে তখনাে জনকয়েক রাজমিস্ত্রী খাটছে, ভেতরের দেয়াল ঝকঝক করছে। নিবেদিতা দেবী যুক্তকরে অভ্যর্থনা করলেন, ‘আসুন। বললাম, চেনবার যাে রাখেননি একেবারে। একটু যেন অপ্রতিভ হলেন নিবেদিতা দেবী, একটু চমকে উঠলেন। ক্ষীণ গলায় প্রতিবাদের সুরে বললেন,-“না, না, এ আর কি। আখ পােবাবাড়ির ভাজ ভেঙে পরেছি, তাই। শুধু খােবাবাড়ির ভাজ-ভাঙা কাপড়েই কি চেহারার এমন জৌলুষ বাড়ে। তা নয়। সিদুরের টিপটাও আজ বড়াে করে পরেছেন নিবেদিতা দেবী, পানখাওয়া ঠোটদুটিও টুকটুকে। বললাম, আমি আপনার কথা বলিনি। বাসাটার কথাই বলছিলাম। নিবেদিতা দেবী আরেকবার অপ্রতিভ হলেন। তবু হেসে বললেন, ‘তাই বলুন। হ্যা, বাসাটার কলি ফেরাতে হ’ল। আগে দু’জনে চুপ চাপ ছিলাম, কেউ কোন খোঁজখবর রাখতাে না। এখন আপনার পাঁচজন আসছেন প্রভাকর নিজেই পরে ব্যাপারটাকে বিশদ করে বুঝিয়েছিলেন, ‘দু’খানা ছবি খুব চড়া দামে বিকিয়ে গেল, বুঝলেন। জামঝুরি স্টেটের দেওয়ান নিজে এসেছিলেন, পছন্দ করে নিয়ে গেলেন। এই সুযােগে বাড়িটারও একটু সংস্কার করিয়ে নিচ্ছি। বন্ধুদের সবার সঙ্গে নিবেদিতা দেবী হেসে কথা বলেছিলেন, মনে আছে। খুব সপ্রতিভ, হাসিখুশি। বার কয়েক চা দিয়ে গেলেন। আগের বারের চায়ের সঙ্গে এবারকার চায়ের তারতম্যটা একা আমিই শুধু উপভােগ করলাম।
এর পরে আর কোন দিন এসে আমি প্রভাকর দেবকে একা পাইনি। শুরু হ’ল ভক্ত, গুণমুগ্ধের ভিড়। স্তুতির আরতি। যখনই গেছি কেউ কেউ আছেনই। আর আছেন নিবেদিতা দেবী। অতিথির অক্লান্ত আপ্যায়নে, অকুণ্ঠ ধারায় চায়ের পরিবেশনে। লােকের ভিড় প্রভাকর বেশি সহ করতে পারতেন না, দু’চার মিনিট গেলেই অসহিষ্ণু, ব্যস্ত হয়ে পড়তেন, একটা পটিশনের আড়ালে স্ট ভিও বানিয়েছিলেন, তার আড়ালে পালাতে চাইতেন। আর, সবাইকে সামলাতেন নিবেদিতা দেবী। সাধারণ একটি মেয়ে, এই সেদিনও একে দারিদ্র্যের ভারে কুণ্ঠিত, জড়োসড়াে দেখেছি ; অকস্মাৎ যেন সব সংকোচের ওড়না খসিয়ে সহজ হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। অবাক বৈকি। খুব বেশি লেখাপড়া শিখেছেন বলে মনে হয় না, অথচ অতিথিদের সঙ্গে কেমন সহজভাবে বিবিধ বিষয়ে আলাপ চালিয়ে যান, যে অতিথিদের মধ্যে আছেন দু’জন অধ্যাপক, অন্তত তিনজন আট ক্রিটিক, ভারতীয় শিল্প সম্পর্কে রিসার্চ করছে এমন জন চারেক ছাত্র, এ ছাড়া কোথাও পাত্তা-না-পাওয়া আমাদের মতো আধডজন কবি- ঔপন্যাসিক-গল্পলেখক তাে আছেই। প্রভাকরের একটা শখ ছিল, মাঝে মাঝে আমাদের সবাইকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতেন। আমরা কুণ্ঠা প্রকাশ করলে বলেছেন, আপনারা আমাকে ভালবাসেন, দয়া করে আসছেন এতেই আমি ধন্য। কিন্তু শুধু, আর্টে কি পেট ভরে। আর সে-কথাটা আমার মতো মর্মে মর্মে ক’জন জানে, বলুন। তাই মাঝে মাঝে স্কুল আহার্যেরও আয়ােজন করি। প্রভাকর ইতিমধ্যে দোতলায় একখানা ঘর তুলে নিয়েছিলেন। সেই ঘরে সারি সারি আসন পড়ত। নিজেরাই কলা-পাতা ধুয়ে নিয়ে বসে গেছি; নেবু কেটে নেবারও অপেক্ষা রাখিনি। কখনাে কখনাে হাতে হাতে ঠেকাঠেকিতে মাটির গ্লাস গড়িয়ে সারা ঘরে গদাষমুন বয়ে গেছে, ক্ষেপ করিনি। আমাদের পরিবেশন করতেন নিবেদিতা দেবী। একা হাতে, সৰ।
কি করে কোমরে আঁচল জড়ানাে, কপাল ঘিরে টায়রার মতাে ঘামে ফোটার মালা; কিন্তু ঠোটের হাসিটি অম্লান। কখনাে কখনো পেরে উঠতেন না, ডাল আনতে আনতে ভাজা ফুরিয়ে যেতাে, ভাজা আনতে আনতে ভাত। তাতে আরাে ছুটোছুটি করতে হয়েছে, কপালের ঘাম গড়িয়ে দু ফোটা চিবুকে, এক ফোটা নাকের ডগায়, কর্ণমূল থেকে কয়েক ফোটা গ্রীবায় নেমেছে, কিন্তু হার মানেন নি। সবার সঙ্গে হেসেছেন, কোমরে আরাে শক্ত করে আঁচল বেঁধেছেন। সে-বছর শীতকালে আমরা প্রভাকরের ছবির প্রদর্শনী খুললাম। সেই প্রথমবার। কাগজে কাগজে সচিত্র সমালােচনা ছাপা হ'ল। অনেকের প্রভাকর সেই প্রথম সকলের হলেন। ঘর ভাড়া এবং আরাে সব খরচ বাদ দিয়েই সেবারে কয়েক হাজার টাকা লাভ হল। বােজ সন্ধ্যাবেলা আমাদের আড্ডা বসত। সেই আহিরিটোলার বাসার দোতলার ঘরে। প্রভাকর বােজ একজিবিশনে যেতেন না, আমাদের কাছ থেকে খবর শুনতেন। কত লােক হয়েছিল, কোন্ কোন্ ছবি যিজী হ’ল খুটিয়ে খুটিয়ে জিজ্ঞাসা করতেন। আর শিশুর মতো হেসে উঠতেন বলেন কী। আজ দু'শো লােক হয়েছিল? প্রিন্সিপাল সর্বানন্দবাবু নিজে ছাত্রদের নিয়ে এসেছিলেন ? বলেন কী। কাগজে প্রদর্শনীর রিভিযু দেখে হেসে কুটিকুটি হতেন। এরা কী লিখেছে দেখুন : প্রভাকর দেবের ছবি দেখলে বােঝা যায়, ভারতীয় শিল্প উজীবনের ঠিকানা অজন্তা-গুহার পলাতক পথে নয় ; কিউৰীয় তামিতির ক্লান্তিকর জটিলতায় নয়; পৃথ, জীবনের পৃথতর রূপায়ণে নয়, সপ্ততিপর মনীষীর অরুচি বদলের চাটনি নয়, এমন কি লােকায়ত পটশিল্পের পালিশ করা পরিবেশনেও—কী খটমটে বাঙলা লিখেছে দেখুন। হাসতে হাসতেই হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যেতেন প্রভাকর। কতকটা আপন মনে ধীরে ধীরে বলতেন, এরা ভালােবাসে, তাই লেখে। কিন্তু আমি তাে জানি, আমি এখনাে ভাষাই খুঁজে পাইনি। দেয়ালে দেয়ালে এখনাে অন্ধের মতাে মাথা ঠুকছি, আলাের রেখ এখনাে চোর পড়ল না। আমরা জানতাম এ ধু বিনয়ের বােরখা পরানাে দ নয়, এক আন্তরিকভাবেই বিশাস করতেন তিনি বার্ধকতার কাছাকাছিও পৌছতে পারেননি। তার মতাে আর কে অসহিষ্ণুর মতাে সারা জীবন পদ্ধতির পর পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা করেছে। আর কে চির অতৃপ্তিতে নতুন নতুন বিষয়বস্তুর সন্ধান করে ফিরেছে ? ঐ আহিরিটোলার বাড়িতেই প্রভাকর বরাবর ছিলেন। শুধু জীবনের শেষ ক'টা দিন কাটিয়েছিলেন সাইপ্রেস নাে'য়ে নিজের তৈরী বাড়িতে। বাড়িখানি নিবেদিতা দেবী নিজের পছন্দ মত তৈরী করিয়েছিলেন, হট্টগােল থেকে অনেক দূরে; ঝাউয়ের ছায়ায় ঝিমাননা পথের শেষে নিভৃত শিল্পকু। গৃহপ্রবেশের দিন ঘটা করে চায়ের পার্টি দিলেন সবাইকে। এশ লন, সারি সারি টেবিল, জোড়া জোড়া চেয়ার। দীর্ঘ ইউক্যালিপটাসের ছায়ায় ঘাসের ওপর ভাের কাটা। উদি পরা ভৃত্যেরা নিপুণ হাতে পরিবেশন করছে সব। নিবেদিতা দেবী উল আর কাটা হাতে দাড়িয়ে থেকে সব তবি করছেন, কোথাও কোন জটি না ঘটে। শা ক্রেপ পরা মহীয়সী মূর্তি, আধখানা কপালে ঘােমটা, বাকি আধখানায় বিকেলের মরে আসা আলাের আভা। এতলােককে নিজের হাতে পরিবেশন করা সম্ভব নয়, জানি, তবু আহিরিটোলার বাসার কর্মচঞ্চল দুটি হাত আর ফোটা ফোটা ঘাম ঝরা এত মুখ মনে পড়ে গেল। তাকিয়ে দেখলাম নিবেদিতা দেবী আমার প্লেটে আরাে দুটো পেসটি দেবার জন্যে বয়কে নির্দেশ দিচ্ছেন। সবাই চলে যাবার পর আমরা কয়েকজন আরও কিছুক্ষণ থেকে গিয়েছিলাম। নিবেদিতা বললেন, 'আপনাদের শিল্পীকে এতদিনে তার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে পেরেছি এই সানাটুকুই আমার পাওনা। সত্যি কী বি যে ছিল ওই আহিরিটোলার বাসাটা, যিনি গরম আর নােরা। ওখানে উনি কী করে যে এতদিন শিল্পীমন বাটি রেখেছিলেন, ভাবতেই অবাক লাগে। প্রভাকর হাসলেন। আস্তে আস্তে বললেন, তুমি তাে ছিলে। ওই একটি মাত্র কথা। কিন্তু প্রভাকর সম্পর্কে ওই একটি কথাই সব কথা। নিবেদিতা তাে ছিলেন। প্রভাকরের যে মূর্তি জনসাধারণের সম্মুখে গড়ে উঠেছে, এর অর্থে আর ভালবাসার অঞ্জলিতে, তার কতখানি নিবেদিতা দেবীর তৈরী সেততা আমরা জানি। প্রতিমাকে যে সুন্দর দেখায়, তার কৃতিত্ব কি শুধু মৃৎশিল্পীর, না যে আরতি করে, পঞ্চপ্রদীপ সাজায়, তারাে। এই শেষের কাজটা করেছিলেন নিবেদিতা দেবী। মাথা নিচু করেছিলেন নিবেদিতা দেবী। কী-বে বলে। আমি আর কী করেছি। ‘কী করােনি। শুধু আমার রঙের বাক্স-তুলি আর পট শুছিয়ে দাও নি, আমমর জীবনটাকেও গুছিয়ে তুলেছ। তুমি না থাকলে প্রভাকর ধীরে ধীরে কিন্তু দৃঢ়স্বরে বললেন, “আমি কবে হাউইয়ের মতো উড়ে-পুড়ে-ফুরিয়ে যেতাম। নিবেদিতা দেবী মাথা নীচু করেই রইলেন, কিন্তু আর প্রতিবার করলেন না। মনে হ’ল•এ প্রশস্তিটুকু তিনি মাথা পেতেই নিন। বিনয়ের বাড়াবাড়ি যে করলেন না, এটুকুও ভালই লাগলাে। আর নিবেদিতা দেবী কী আর নিজের মূল্য জানেন না। তিনি কি আর বোঝেন না এই যে আজ যারা প্রভাকরকে ঘিরে ভীড় করেছে তার সবাই প্রভাকরের গুণমুগ্ধ নয়, সবাই কিন্তু এভাকরের টানে এখানে ছুটে আসে না, নিবেদিতা দেবীর হাতে এক পেয়ালা চা খাবার লােতও আসে। নিবেদিতা দেবী শুধু তার দেবের স্ত্রীই নন, নামও। আট-ক্রিটিক পার্ট-সিক আর ছাত্রদের কাছে তাৰ কৰণও কম নয়। নিবেদিতা দেবীর নিজের বয়স যদি চল্লিশের ওপর না হত, তাও কথাটার একটা কম হতে পারতাে। কিন্তু দু একটা চুল তার রূপালি পাক ধরেছে, এখন নিবেদিতা দেবীর নামােচ্চারণে যে ছবি চোখের সমুখে ভাসে, সেটা প্রসঙ্গ-সুন্দর-উদার আতিথ্যের। তার পরের বছরই বুঝি প্রভাকরের পঞ্চাশােতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আমরা ঘটা করে জয়ন্তী করলাম। অনেক ঘটা, অনেক বাণী, ধূপ, মালা চন্দনের সমারােহ। আতিশয্যে মাঝে মাঝে প্রভাকর ক্লান্তি বােধ করেছেন, কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ করেন নি। অনেক লােকের অবিরাম আনাগােনার মধ্যে যে প্রীতির স্নিগ্ধ প্রবাহ, তিনি সেটা অনুভব করেছিলেন, অভিভূত হয়েছিলেন। সব হাঙ্গামা যখন চুকল, তখন আস্তে আস্তে আমাকে বললেন, কী, শখ মিটলাে তাে। বললাম, শখ কী বলছেন, এ-তাে কর্তব্য। দেশ আপনার কাছে এত পেয়েছে, বিনিময়ে সামান্য একটু এদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছে, এ আর এমন কী আর। না, না, না,। আপন মনেই প্রভাকর অস্ফুট উক্তি করলেন, এ কদিন আমার কী মনে হয়েছে জানেন? মনে হয়েছে এই জয়ধ্বনি আৰু হৰি-বনির মধ্যে কোন তফাৎ নেই। যাক আমার অদৃষ্ট ভালাে, নিজের বল হরি হরি বােল’ নিজেই শুনে গেলাম। স্তম্ভিত হয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলুম। পরে আহত গলায় বললাম, এ কথা ন কেন। আপনার কী আর এমন বয়স। এখনও অনেক কিছু তা করবেন আপনি। প্রভাকর গান হাসলেন। চোখ দুটিতে একবার শুধু বিদ্যুৎ খেলে লে-মিছিমিছি আমাকে আর সান্ত্বনা দেবেন না। আমার আর কিছু দেবার নেই। সব ফুরিয়ে গেছে। স-ব-ফুরিয়ে গেছে। ধীক ক কথাটার পুনরাবৃত্তি করলেন,-অকস্মাৎ উত্তেজিত হয়ে বললেন, নইলে বাসায় এসেছি আজ এক বছরের ওপর,এখানে এসে একটা ছবিও কেন সারা করতে পারলুম না? চেষ্টা করিনি তা তো নয়।
অনেকবার করেছি। একেছিও ঢের। কিন্তু একটা ছবিও প্রাণ পায় নি। ভগ্ন গলায় প্রভাকর বললেন, আমার রঙ আর তুলি সেই আহিরিটোলার বাসাতেই রয়ে গেছে। ঠিক সেই বছরই শীতকালে প্রভাকর মারা গেলেন। আমরা তখন ওর ছবির প্রদর্শনী খােলর উদ্যোগ করছিলাম। আজ এতদিন পরে মাঝে মাঝে পেছনে তাকিয়ে ভাবি প্রকল্পের প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তিটা কোথায়। তাকে নিয়ে সাধারণের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস, তার তুলনা তো খুজে পাইনে। স্তব-স্তুতি-নিত রাজপ দিয়ে প্রভাকর উদ্ধত শিরে হেঁটে গেছেন, বিজয়ীর মত দৃপ্ত, কিন্তু নিলিপ্ত, নিরহঙ্কার। শক্তি তার ছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু শক্তি তো আরও অনেকেরই থাকে। তাদের ক’জন পায় সর্বজনের এমন অ অভ্যর্থনা, প্রাণের উত্তাপ ? সত্যিই কি জাতীয় শিল্পের মর্মবাণী উদ্ধার করতে পেরেছিলেন, রঙে-রেখায় তাকে দিতে পেরেছিলেন রূপ? অনেক সময়ে ভাবি, হয়ত পেরেছিলেন। কখনও সংশয় হয়। সাধারণ তঁাকে যে নিয়েছিল তার কারণ হয়ত এই আর সবাই যখন দুর্বোধ্য আপন আপন পদ্ধতির দুর্গে বন্দী, প্রভাকর তখন সকলের হয়ে সহজ করে এঁকেছেন : বলিষ্ঠ, স্কুল রেখায়,প্রতীক ব্যবহারের পলায়ন- বিলাসে নয়। প্রভাকরের শিল্প সম্পর্কে এক কথায় যুলা যায় যে, তা অতিমাত্রায় বাস্তব, অতিবাস্তববাদের রুগ্নতা নয়। আর এর রঙের অকৃপণ ব্যবহার আনতেন। পাং৩, অস্পষ্ট পটভূমিতে আঁকা ছবি তার পছন্দ ছিলনা; তাঁর ছবি অলন্ত, চোখে বিধত, তবু কে চোখ ফেরানাে যেতাে না। বহুকাল শিল্পী রঙে, তুলিতে আকাশের নীল ফুটিয়ে নিতে চেয়েছেন প্রভাকর প্রায়ই বলতেন, আমি চাই কঠিন, পাথুরে মাটিতে ;
১. কতে। সবাই প্রদোষের স্বপ্ন আর গােধূলির বা আঁকার জন্যে পাগল-মার ছবি দ মধ্যাহ্নের। জনতার কণ্ঠের প্রশস্তি জয়ােল্লাসে পরিণত হল, প্রভাকর যখন তাঁর বিষয়বস্তুও বদলালেন। পুরাণ নয়, নিসর্গ নয়, ইতিহাস নয়, শেষ জীবনে প্রভাকরের ছবিতে সম-সময়ের যে প্রাধান্য দেখেছি, তাঁর জন- প্রিয়তার আসল কারণও বুঝি সেইটেই। খবরের কাগজের রিপাের্টের দৈনন্দিনতার মধ্যে প্রভাকর তার শিল্পের উপাদান খুঁজতেন। হাট, সভা, বন্দর, ধর্মতলায় গুলী চালানাে, ফুটপাতের ফিরিওলা, অকসন যাট, এমন কি, রেসকোর্সের ভীড়। কোন কিছুই বাদ দেন নি, কিঞ্চিৎকর মান করেন নি। সে চোখ আবার কাটুন আঁকিয়ের নয়, ফোটোগ্রাফারেরও নয়,—চিত্র শিল্পীর। আমরা মাঝে মাঝে বলেছি, এ কী করছেন। এ যে নেহাৎই একালের। গভীর প্রত্যয়ে প্রভাকরের কপাল প্রশস্ততর হয়েছে,আমার কালকেই যদি আমি নিষ্ঠার সঙ্গে ফোটাতে পারি, তবেই কি আমার ছৰি সকালের হবে না! যা আজকের, তাই তাে রােজকার। একটু হেসে ফের বলেছেন, লাখ-লাখ-যুগ মােনালিসা-হাসি দেখেই বললেন, নান-তিরপিত-ভেল। কিন্তু একটাকার ইলিশ চায় টাকায় বেচতে পেরে মেছুনীর মুখে যে সংজ্ঞাহীন হাসি ফুটে ওঠে, তা কি কখনও খেন নি। সেই হাসিটুকুই প্রভাকর তার ছবিতে ফোটাতে চেয়েছিলেন। কিছুটা কৃতকার্য হয়েছিলেন, সন্দেহ নেই। কেননা, অন্যান্য খ্যাত- নামা শিল্পীর ছবি যখন কেবল ড্রইং রুমের শােভা বাড়িয়েছে, প্রভাকরের ছৰিয় সস্তা যিলােকসন দেখা গেছে খােলর ঘরে, ন’ সিকে সিট সেট মেসের দেওয়ালে। এক ক্যালেণ্ডারের শিল্পী শাবার ঘরে ঘরে ফিরে গেছেন। এভাবের যত্যুর পর দলে দলে লােক যে সাইপ্রেস নাে’য়ের কুটিরে গেছে, নিতানৰী র হার হার চিঠি পেয়েছেন, তিনি গড়ে উঠতে পারেন নি, আলাদা আলাদা জবাব দেওয়া দূরে খাতাতেই শেষবারের মতাে নিঃসংশয়ে স্থির হয়ে গেছে লােকচিতে এগরের আসন কোথায়। প্রভাকরের মৃত্যুর পরদিন নিবেদিতা দেবীর যে রূপ দেখেছিলাম। তা ভুলব না। ক্ষান্তবৰণ আকাশ, যুদ্ধ বিরতির পর রণক্ষেত্র—এই জাতীয় কয়েকটা তুলনা মনে এসেছিল, কিন্তু এর একটাতেও কি সেই ছবির ব্যঞ্জনা আসে। কেপ নয়, সিক্ত নয়, আগাগােড়া শাদা খন্দরের শাড়ি, শাদা ব্লাউজ। মাথা নীচু করে বসেছিলেন, ঈষৎ রক্তিম চোখ দুটি তুলে তাকালেন। নিবেদিতা দেবী একটু হেসেও ছিলেন হয়ত, কিন্তু সে হাসি কান্নার চেয়ে মর্মান্তিক। সারা রাত শিশিরে ভেজা পদ্যের সনে একটা ক্ল্যাসিক্যাল সাদৃশ্য সে-মুখের আসে; উপমায় আসলে ফোটে কতখানি। আরও অনেককে দেখলাম। আর্ট ক্রিটিক, আর সম্পাদক ; কৰি যশপ্রার্থী আর রিসার্চ-স্কলার। সৌরমণ্ডলীর সেই পুরণাে গ্রহ-উপগ্রহ। সেদিন চা খাওয়ার কথা উঠে না, তবু নিবেদিতা দেবী সবাইকে আখ্যায়িত করলেন। অতিথিবাৎসল্য, আঁতুরের মতােই, নিয়ম মানে না। সকলের মাঝখানে সর্বা নিবেদিতা দেবী। তেমনি মহীয়সী। আচ্ছন্ন কণ্ঠে বললাম, “মনে কোন ক্ষোভ রাখবেন না। খ্যাতি পূর্ণ লয়ে তিনি মারা গেছেন। কিন্তু কীতি আছে। ওঁর আঁকা ছবির রঙ হয়ত কোন দিন মিলিয়ে যাবে, কিন্তু মানুষের মনের প্রীতি রঙ মেলাবে না। নিবেদিতা দেবী চেয়ে চেয়ে শুনলেন, তারপর ধীরে ধীরে বললেন, সেই সাধনা। এ শােক আমার একার নয়। আর শােকই বা কেন। প্রভাকরের মৃত্যুর পর ছ'মাস ধরে এমন পত্রিকা ছিল না যাতে একরের অপ্রকাশিত কিছু-না- িছবি বেরােয়নি। পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রবন্ধে আর শােকাবুলের উচ্ছ্বাসে প্রভাকরের শিল্পসৃষ্টির মূল্য আরেক বার নিরুপিত হল। অব নিবেদিতা দেবী ছিলেন বলেই সব সম্ভব হয়েছে। প্রভাকরের জীবনের খুঁটিনাটি যে যখন বা জানতে চেয়েছে, নিবেদিতা দেবী সানকে জানিয়েছেন। প্রায় প্রতিটি উল্লেখযোগ্য শােকসভায় তিনি নিজে উপস্থিত থেকেছেন, প্রভাকরের আৰক্ষ প্রতিকৃতির পাশে শুরুব- মণ্ডিত গভীর-করুণ মূর্তি। জয়ন্তীর পরের বছরের জন্মদিন যথােচিতভাবে উদযাপিত হল। সভাশেষে নিবেদিতা দরজা অবধি এসে আমাদের বললেন, আসবেন মাঝে মাঝে। একা পড়ে থাকি। একেবারে ভুলবেন না।' সকলে সমস্বরে বললাম, ভুলব কী। এ-যে আমাদের তীর্থ। পথে কে-একজন বললেন, ‘ভদ্রমহিলার জষ্টে সত্যি দুঃখ হয়। নিজে আটিস্ট নন কিন্তু আটিস্ট স্বামীর মধ্য দিয়ে আর্টকেও ভালােবেসেছিলেন। আর ভুলব কী। নিবেদিতা দেবী তুলতে দিলেন কই। সাইপ্রে* যাে’র মধুচক্রটি ভাঙতে দিলেন না। সেখানে প্রায়ই চায়ের আসর। কোনদিন সকালে ফোন করে তলব করেছেন; হাজির হয়ে দেখেছি সেখানে আরাে অনেকে উপস্থিত। নিবেদিতা দেবী বলেছেন, 'ওর পতিরক্ষার জন্যে কী করা যায় বলুন তাে।” তৈরি হল কমিটি। চাঁদা উঠল মন্দ না। সরকারও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু প্রভাকরের উপযুক্ত স্মৃতিরক্ষা হয় কিসে। মর্মর মূর্তি ? রাস্তার নামকরণ? না। তবে কি আর্ট স্কুল। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প শিক্ষাদানের জন্যে একটা চেয়ার? প্রভাকরের নামে একটা জাতীয় চিত্রশালা খুললে কেমন হয়? শেষের প্রস্তাবটাই মনঃপুত হ’ল। প্রভাকরের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীতেই চিত্রশালার ভিপ্রস্তর স্থাপিত হ’ল। হাসিতে ভরে
গেল নিবেদিতা দেবীর মুখ। ভারতবর্ষ তবে শিল্পীর সম্মান দিতে
গানে।
জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি এবারে কিছুদিন বাইরে কারে
আসবেন? ঘুরে আসবেন, আষন না। এতে শরীর-মন দুই-ই আলো
হবে, দেখবেন।
ব্যথিত দৃষ্টিতে তাকালেন নিবেদিতা। ‘চলে বাবাে? চলে যেতে
বলছেন? পালিয়ে গিয়ে ভুলে থাকবে সে-ও কি হয়। তার চেয়ে এ
ঢের ভালাে আছি। ওঁর স্মৃতি, ওঁর অসমাপ্ত কাজ নিয়ে। আপনার
পাঁচজন আসেন
বললাম, ‘তবু চিত্তশাস্তির জন্যে মানুষ মাঝে মাঝে নিন
খোঁজে।
নিবেদিতা বললেন, 'খুজুক। সে মুক্তি আমার নয়। এখনাে
কতাে কাজ বাকি। ভালো কথা, প্যারিস থেকে একটা চিঠি পেয়েছি।
ওখানে ওঁর ছবির একটা একজিবিশন খুলতে চান। পরামর্শ দিন তাে,
কী ভাবে কী করা যায়। অতােদর পাঠালে ছবিগুলাে নষ্ট হবে
না তাে।
আলাপে-পরামর্শে সেদিন কাটলাে। কিন্তু কোন সিধান্ত হল না।
নিবেদিতা দেবী ফের পরের দিন যেতে সকলকে নিমন্ত্রণ করবেন,
-কালকে ফের আলােচনা করা যাবে। সকলেই আন না: আরেক
বার। এখানেই চা খাবেন।
প্রদর্শনী সম্পর্কিত পরামর্শ চলল আরাে তিনটে বৈঠকে। পোলা
চা ফুয়ােয়, আবার চা আসে। নিবেদিতা হাসেন। আরেকটু চিনি।
কেক একটা ?
বােঝা যায়, চা-টাই লক্ষ্য, আলােচনাটা উপলক্ষ্য।
প্রদর্শনীর একটা মীমাংসা হল তাে নিবেদিতা দেবীর জারে খেয়াল
হ’ল। শিল্পী আর শিল্পরসিকদের নিয়ে একটা সংঘ গড়বার কথা
মনে এসেছে। কেমন হয়? ধরুন, প্রভাকর আর্ট সােলাইটি।
সকল সময়ে সায় দিলেন। নিবেদিতা দেবীর চোখ দুটি ছল ছল হ’ল। শিরীদের সঙ্গে সাধারণের ওইখানেই তাে তফাৎ। তারা বেঁচে থাকেন সকলের গতিতে, বন্ধুজনের এতিতে। গান ফুরােলেও তার রেশ থাকে ; শিল্পীদের জীবন ফুয়ােয়, কিন্তু থাকে ‘জীবনবাণী। কি নিবেদিতার হিসাবে ভুল হয়েছিল। জীবন নয়, এটা তিনি বই জানতেন, জানতেন না কীর্তিও শাশত নয়। অন্তত সক কীর্তি নয়। কালের ধূলাের আস্তর পড়েছে প্রভাকরের নামের ওপরেও। কিছু দিন থেকেই লক্ষ্য করেছি, প্রভাকরের নামের সেই যাদু আর নেই। তার উল্লেখমাত্রে গুণীজনেরা গদগদ হয়ে পড়ছেন না। যে বিষয়বস্তু নিয়ে একর শেষের দিকের ছবি একেছিলেন, তাতে একসময় সাড়া তেছিল বটে, কিন্তু সমসময়ের মুখচেয়ে আঁকা সেই ছবিগুলাের এখন র গতিরিক্ত কোন আবেদন নেই। তাদের মধ্যে শিল্প সমালােচকেরা গভীর কোন ব্যঞ্জনা খুঁজে পান না। অঞ্চনপদ্ধতি নিয়েও নতুনতর পরীক্ষা চলেছে। শিল্পজগতে আয়েক যুগের পদধ্বনি অস্পষ্ট শােনা যায়, সে একরােত্তর। কে জানে নিবেদিতা এটা লক্ষ্য করেছিলেন কিনা। কিন্তু সাইপ্রেস বে’-এর বাড়িতে লােকজনের আনাগোনা যে কমে এসেছে এ-তে। ও চোখে পড়বে। ডাকেও আর তেমন গাদা গাদা চিঠি আসে না। মিলার্চের কালাররা এখনাে আসেন বটে, আট ক্রিটিকে কদাচিৎ। আর অধ্যাপকেরা কালে-ভদ্রে, অর্থাৎ জন্মদিনে আর মৃত্যুদিনে। এটি দিন নিবেদিতা দেবী এখনাে এটা করে উদযাপন করেন। স হয়, পী ব্যক্তিরা আগের মত বক্তৃতা দেন, কিন্তু করতালিতে নেন বামে সময় শশাচনীয় ঘটনা ঘটেছিল সতি। বিদেশ থেকে এভাবের দুজন অনুৰাগ এসেছিলেন। তাঁদের সম্মানে নিবেদিতা একটা চায়ের পা দিলেন। প্রায় দু’শাে লােককে বেছে বেছে নিমন্ত্রণ চিঠি দেওয়া হল। নতুন করে সাজানাে হ’ল লন। সময় ছিল চারটে। কেউ এলাে না। অসহিষ্ণু নিবেদিতা দেবী একবার ঘড়ি একবার পথের দিকে তাকাচ্ছেন। বিরক্ত অধরে গত সে যাচ্ছে। সাড়ে চারটে থেকে দু'চারজন করে আসতে লাগলেন, কিৎসৰ ৩ দশ বায়ােজনের বেশি হ’ল না। আসর জমল না। শেষ পর্যন্ত আমাদেরই মধ্যে একজন উঠে দাড়িয়ে ৰিলে দুজনকে স্বাগত জানালেন। বিদেশ দু’জমও মিন মিন করে সেসম্মত একটা প্রত্যুত্তর দিলেন।সভা ভঙ্গ হ’ল। আমরা কে কজন গিয়েছিলাম, একে একে চলে এলাম। নিবেদিতা দেবী হাত দুলে নমস্কার করলেন মাত্র। কোন কথা বললেন না, গেট পর্যন্তও ন না। কেয়বার পথে পার্শ্ববর্তী বন্ধুকে বললাম, “নিবেদিতা সেবী আজ একেবারে ভেঙে পড়েছেন। বন্ধু বললেন, 'ভাঙবারই কথা। কিন্তু নিবেদিতা দেয় কী করে আনবেন বলে যে আজ জগদীশ পালের বাগানবাড়িতে সব আর্টিস্ট আর আর্ট ক্রিটিকেরা ভীড় জমিয়েছে। গীশ পালের ওখানে? বন্ধু বললেন, ‘ভাস্কর জগদীশ পালের নাম জানাে না? আজকাল তো ওরই নাম শােনা যাচ্ছে। নতুন ধরণের কী একটা ক্লে দিয়ে একটা মূর্তি তৈরি করেছে, আজ তার অবগুণ্ঠন উন্মোচনের দিন। টাকা আছে বিস্তর, কিছু কিছু প্রতিভাও আছে। জগদীশ পাল না ': আর কিছু বললাম না। এ পর্বেও নিবেদিতা দেবী কী একটা উপলক্ষে একটা ট-পা দিয়েছিলেন। সেটাতে আমি যাইনি। তারপর আজ আবার কার্ড পেলাম। লাঞ্চের নিমণ। আমােবনের জটি নেই। টেবিলের ওপর ধবধবে সাচ্ছাদনী। মাসের মধ্যে অধমুদিত শ্বেতপদ্মের মতাে ভােয়ালে। কাটা, চামচ, প্লেট, চুরি। নিবেদিতা আজ গলায় একছড়া শাদা শখের মালা পরছেন, শা পরিচ্ছদের সঙ্গে মিলিয়ে। মুখে সেই এসম,পরিচ্ছন্ন হাসি। আজ প্রায় পুরনাে, পরিচিত সবাইকেই দেখলাম। সেই অধ্যাপক আর সমালােচক, ছাত্র আর কবি। খাবার পরিবেশনের সরে সঙ্গে যে যার পার্শ্ববর্তীর সঙ্গে মৃদু গুঞ্জনে আলাপ শুরু করলেন : অধ্যাপকে ক্লাশের গল্প, ছাত্রেরা ক্লাশ পালানাের। রিসার্চ স্কলারেরা আপন আপন থিসিস লেখার জন্যে সবিনয়ে মশলা চাইলেন ; আর্ট ক্রিটিক মাখা নাড়লেন। না, নতুন কোন মালমশলা তার কাছে নেই। বরং অমুকের খোঁজ করুন। অবশ্য দেবে, ভরসা নেই, লােকটা আবার কিছু হাত- ছাড়া করতে চায় না, যখের মতো আগলে রাখে। যাক, ভাবনা করবেন না, যত্ন করে লিখে যান, সিদ্ধি অবধারিত; মনে রাখবেন যত শক্ত করে লিখবেন, তত নাম হবে। ‘শিপ্রা দত্তর নাম শুনেছেন ? আর্ট ক্রিটিক গদগদ হয়ে পড়লেন, 'আঃ, চমৎকার গায় মশাই। ‘গায় না তো! আঁকে। ‘আঁকে নাকি? আর্ট কিটিক অপ্রতিভ মুখে একটা ফ্রাই পুরে দিয়ে বললেন, কী জানি, দেখিনি। মেয়েটিকে কিছু ছবি আমার কাছে পাঠিয়ে দিতে বলবেন তাে। প্রমিসিং হলে কালচারাল রিবিয়তে একটা write-up দিয়ে বোে। সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলুম, এরা কেউ প্রভাকর দেবের নামও করলেন না। নিবেদিতা সে নিজে দু’একবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রকার দেবের শিয় এস তুলেছিলেন, কিন্তু দু’এক কথার পরই মােড় ফিরে গেল। শি বাদে আবিষ্কার করলাম আমরা সবাই তরুণতম ভাৰু জগদীশ পালের প্রতিভা নিয়েই আলােচনায় মত্ত। মনে হল, নিবেদিতা দেবী একবার করুণ চোখে আমার দিকে তাকালেন। পরমুহূর্তেই তাকে ঘাড় ফিরিয়ে তালিকার পরবর্তী ভােজ্য আনতে আদেশ দিতে শােনা গেল। সেই মুহূর্তে কী জানি কেন, আহিরিটোলার বাসার কথা মনে এসে গেল। সেখানেও এমনি ভীড় হত, অধ্যাপক, সমালােচক আৰু অনুরাগীর ভীড়। প্রভাকর সবাইকে ভালবাসতেন; প্রভাকরকে ঘিরে কত সবাই। আর নিবেদিতা দেবী ছিলেন। সেটা উপরি। তিনি খাবারে থালা নিয়ে ছুটোছুটি করতেন, তার কপাল এমনিই ঘামে ধুয়ে যেতে। ভাতের মধ্যে এই, সেদিন এরা যেচে এসেছে, আর আজ এদের ডেকে আনতে পেরেই নিবেদিতা কৃতার্থ। খাওয়া দাওয়ার পর পান ছিল, সিগারেট ছিল। ত্রুটি নেই। কেই বেশিক্ষণ বসলেন না। কাজের অজুহাত দিয়ে সরে পড়তে লাগলেন। বিদায় দিতে সদর রাস্তা অবধি এলেন নিবেদিতা দেবী। নমস্কাৰ করলেন। কণকণ্ঠে একবার শুধু বললেন,-আসবেন মাঝে মাঝে। আসছে রবিবার আমাদের এই বাসায় গৃহপ্রবেশ বার্ষিকী। সেদিন শুনলুম ভাঙাভাঙা গলা। দেখলুম কপালে ফোটাফোটা ঘাম। এতদিনে বুৰি টের পেলেন শিল্পীর সঙ্গে এর শিল্পীর স্ত্রীকেও সহমরণে পায়ে বসে আছে।
বসুষষৈ নিজের বাড়ী হলেও বাইরে থেকে সুরপতি একবার কা নাড়তে। কেননা, সদর দরজার ঠিক পরেই কলতলা, এবং কলতলাটা বে-আক। বাথরুম অবশ্য আছে, কিন্তু বাড়ীতে লােকও অনেক। বাথরুমে ভরসায় থাকলে সকলের গা ধুতে ধুতে রাত দশটা বাজবে। বাড়ীতে যখন বেটাছেলে কেউ থাকেনা, মেয়েরা সেই সময়ে, অর্থাৎ দুপুরে, একটু ঢিলেঢালা, অসতর্ক ভাবে থাকে, সুয়পতি জানে। দু'একদিন সাড়া না দিয়ে ঢুকে পড়তে দু'একটি অপ্ৰতত মেয়ে এদিক ওদিক ছুটে পালিয়েছে, দেখে সুরপতি নিজেই অপ্রস্তুত হয়েছে। এরা সবাই এক অল্পবয়সী, প্রায় তার মেয়ের মতন; কিছু না কিছু সম্পর্কও আছে সবার সঙ্গেই। কারুর মামা, কারুর মেশো, কারুর কাকা, কার পিসে। তবু বয়ঃপ্রাপ্ত মেয়েদের সান্নিধ্যে সুরপতি প্রথম যৌন-কাল থেকেই কেমন একটা অস্বাচ্ছন্দ্য বােধ করে এসেছে, আও কাটাতে পারেনি। কলতলা পেরিয়ে সিড়ি, সিড়ির শেষে দোতলার কবিতা, যার দু'ধারে ছােট বড় মিশিয়ে খান ছয়েক ঘর। সুরপতি সেখানে বাড়ালাে না। ছাতা এবং জুতাে দিয়ে ঠক ঠক শব্দ করতে করতে চলে এলাে তিনতলায়, যাকে ছাতও বলা যায়। তিনতলায় এর মােটে একখানি, সামনে খােলা একটু ছাত। সুরপতির এইটুকু মাত্র বা পরতার পরিচয় আছে, এ বাড়ীর সেরা স্বরখানা তার নিজের কাছে। আসলে কিন্তু সেরা বলে রাখেনি, রেখেছে নিরিবিলি বলে। এই ঘর- খানায় পড়াশুনা করবার সুবিধে। মাঝে মাঝে খােলা ছাতটায় বই হতে পায়চারি করা যায়। এই একখানা ঘর বাদ দিলে এবাড়ীয় একতলা নােতলা মিলিয়ে
আর যে খান দশেক ঘর, সব সুরপতি ছেড়ে দিয়েছে আত্মীয়।
তাই সবখানি জায়গা জুড়ে আছে, চেঁচামেচি করছে, ঝগড়া ।
মাঝে মাঝে ঝন ঝন আওয়াজ ওঠে, বাসন পড়ে, কাচ ভা। এই
পড়তে পড়তে তিনতলায় সুরপতির দু'টো শুধু একবার বুঝিয়ে
ওঠে। তার বেশি না।
ঘরে ফিরে সুরপতি বইগুলাে রাখলাে শেলফে। গলার চারা
আলনায়, ছাতাটা দরজার কোণে। তারপর হেঁট হয়ে জুতাের দিতে
খুলতে লাগলো। ওপরের ধােপদুরন্ত মিহি লথের পাবির নিচে
বগলের কাছে বিসদৃশ ছেড়া গেঞ্জি ঘামে চপচপে। সুরপতি একর
অসহায় ভাবে সিলিংয়ের দিকে তাকালাে, যেখানে হকটা শ। এটা
পাখা থাকলে বেশ হত। সুরপতি তাকালে একবার,
কিনা
পরেই নিজেকে তিরস্কার করতে হ’ল। সেটা কি চরম পরত হয়
। তবু তাে সে তিনতলার ঘরে আছে, বেশ আছে। এখন এই
বিকেলটাতে গরম লাগছে, একটু পরেই ফুরফুরে হাওয়া বইতে ।
করবে। কিন্তু যারা নিচে আছে, দোতলায় কি একতলায়, তা
তাে গরম আরাে অসহ।
উঠে বাইরের ছাতে গিয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে ঘরে ফিরে এসে
দেখলে অনুপমা চা জলখাবার নিয়ে এসেছে।
তৃপ্ত, কৃতার্থ একটু হাসি ফুটলাে সুয়পতির মুখে।
-আমি এসেছি তুমি তবে টের পেয়েছ।
-আহ, অনুপমা বললে, তােমার ওই ছাতার ঠুকঠুক না কেন
নিতে বাকি থাকে।
একটু খানি পরােটা ছিড়ে মুখে দিতে দিতে সুরপতি বললে, আর
সবাইকে দিয়েছ।
অনুপমার মুখে সামান্য একটু ছায়া পড়ল যেন। দিয়েছি সে
দিয়েছি। সবাই সবাই করেই তাে তুমি গেলে।
এ তুমি বাড়াবাড়ি কয়ছ অনু, সুরণতি আহত করে বলতে কী
নার করতে পারছি ওদের জন্যে। শুধু খেতে পরতে দিই, এই যা। ও না করলে মানুষ বলে পরিচয় দেবাে কী করে। গামছায় মুখ মুছতে মুছতে সুরপতি আড়খে করলে, অনুপমার শাড়িটা এখানে ওখানে ছেড়া। কি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতে ভরসা পেলে না। যা নরম মন অনুপমার, হয়ত কেঁদে কেটে সায়া হবে। কতকটা খাপছাড়া ভাবে, কতকটা সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে সুপতি বললে, ভেবােনা অনু, এবারকার পরীক্ষার খাতালেখার টাকাটা পেলেই -অক্ষয় স্বর্গ হবে? অনুপমা কঠিন কঠে বললে। সুরপতির আর কিছু বলা হ’লনা। একখানা বই খুলে মুখ আড়াল করলে। আজ পনেরাে বছর যাবৎ এই একই উপায়ে আত্মরক্ষা করে সছে। বেকায়দায় পড়লেই বইয়ে মুখটাকা দেওয়া, তারপর যে যা- খুশি বলে যাক, কান না দিলেই হ'ল। বই পড়তে পড়তেই স্থির করলে, মা স্যার পর বেরিয়ে পছন্দমত এক জোড়া শাড়ি কিনে আনকে অনুপমার জন্যে। মা আমাে কতক্ষণ দাড়িয়ে থেকে দু'চার কথা কী বলেছিল, পতির কানে যায়নি। কিন্তু মেজেয় থপ থপ করে চলে যাবার জানাটা কানে এলাে ঠিক। সেদিকে তাকিয়ে থেকে সুরপতি আপন মনেই একটু হাসলাে। পনেরাে বছর বিয়ে হয়েছে, অনুপমাকে বােৰা গেলনা আজও। বাড়িতে এই যে এত লােক থাকে, অধাভিত, আত্মীয়-এদের অনুপমা যে খুব প্রসন্ন মনে গ্রহণ করেনি সেটা স্পষ্ট ৰােৰা যায়। কিন্তু জোর গলায় প্রতিবাদও করেনি। যদি অনুপমা কোনদিন বলত, থাকো তুমি এদের নিয়ে আমি চঞ্জুম, তবে সুপতির হে অন্তত তার অঙ্করের অন্তস্তল বিধি স্পষ্ট হয়ে যেত। ভাবতাে, হােট মন হপমার, যে উদারতা মানুষকে মহত্ব দেয়, তা থেকে অনুপমা তি। এর দৈন্যের জন্যে একটুখানি অনুকম্পা বােধ করা ৮। কোন দিন অনুপমা এতটুকু কথা বলেনি।সােৎসাহে যুপরি সমস্ত প্রদাৰে সায় দিয়েছে। কিন্তু মাঝে মাঝে মুখে রে ছায়া ঘনাতো, তা মুছে ফেলতে পেরেছে কি। বােধ হয় না। স্পাই বােঝা যেতাে, অনুপম হাঁপিয়ে উঠছে। সঙ্গীতের শান্তি নেই, কিন্তু সভ করতে করতে তবীর আঙ্গুলগুলাে যেন আড়ষ্ট হয়ে এসেছে। কোথায় যেন ক্লান্তি পুঞ্জীভূত। প্রথম যখন অনুপমা এ বাড়িতে আসে কতই বা বয়স তখন ওর। সেবারেই বােধ হয় বি, এ, পাশ করলাে। সুরপতিও এম, এ তে প্রথা হলাে সেবারেই। রেকর্ড নম্বর ছিল, অন্ততঃ অনুপমার পরিবারে সবার আশা ছিল সুরপতি এবারে উচু গােছর সরকারি কাজের জয়ে প্রতিযােগিতামূলক পরীক্ষা দেবে। অন-অনুপমার দাদা এবং সুরপতির সহপাঠী-সেবারেই বুঝি আধুনিক ব্যবসায় বিজ্ঞান শিখতে রওনা হয়ে গেল মাসাচুসেটস্ না কনেকটিকাটে। অনঙ্গ নিচের দিকে একটা সেকেণ্ড ক্লাশ পেয়েছিল। অনুপমার বাবার তখন কলকাতার বারে প্রবল প্রতিপত্তি। স্বাদেশিক ঝোক ছিল না, কেবল টাকার কথা বিবেচনা করেই ভবতােষবাবু তিন তিন বার অজিয়তির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। সুরপতিকে তিনি বিলেত গিয়ে আইন পড়তে ছিলেন। বিলেত যাবার লােভ সুপতিরও ছিল, কিন্তু আইন পার নয় সু দেশ দেখতে এতগুলো টাকা অপচয় করা উচিত হবে কিনা স্থির করতেই কয়েক মাস কাটলাে। ইতিমধ্যে যখন মধ্য কলতায় খ্যাতনামা বেসরকারী একটা কলেজে ইংরিজি অধ্যাপকের পদটা এক রকম চিতই ওর হাতে এসে গেল, তখন একটু কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয় নরপতি। অপমাকে আড়ালে থেকে নিয়ােগপত্রটা খেয়ে জিজ্ঞাসা করলে, এবারে আমি কী করব। -কী আবার করবে। জয়েন করাে। -কি তােমার বাবা যে বলছেন বিলেত ফেস-
"
.
যেখােন। সংক্ষেপে বললে অনুপমা। বলে অল্প একটু হাসল।
সেই হাসিতে যেন অনেকটা ভরসা পেল সুরপতি। অনুপমা ওর
পাশে আছে ঠিক। ভবতােষবাবুকে গিয়ে জানালে, সে বিলেতে যাবে
। প্রােফেসর করব ঠিক করেছি।
প্রােফেসর? এক মুহূর্ত – কুঁচকে নীরব হয়ে চেয়ে রইলেন
ভবতােষ। মাইনে কত পাবে ভেবে দেখেছ ?
-দেখেছি, বললে সুরপতি।
-তা হলে আমার আর বলবার কিছু নেই। যদি পারাে তবে
অন্ততঃ ঘরে বসে এখানকার ল-কোসটাই না হয় পড়ে ফেলল।
তাও পড়ল না সুরপতি। ঘরে বসে সে রিসার্চের পেপার তৈরী
করতে লাগল। শুধু এম, এ, টা চোখে কেমন ন্যাড়া লাগে।
আর সেই সময়ই সুরপতি অনুপমাকে এ বাসায় নিয়ে এসেছিল,
দুঃসাহসই বলতে হবে, কেননা তখন ওর মাইনে ছিল মােটে দেড়শাে।
সেদিনকার দারিদ্র্যের দিনে এই একটি মেয়ে উজ্জ্বল মুখে এসে পাশে
দাড়িয়েছিল, একথা ভাবতেও ভালাে লাগে। বড়ো ঘরের মেয়ে, কে
জানে, কত স্বপ্নই নাজানি ছিল অনুপমার। সবে গড়ে-ওঠা দক্ষিণ
শহরতলীতে আরামে গড়িয়ে যাওয়া জীবন ? আলমারি বােঝাই শাড়ির
রঙে রঙে রামধনু। অনুপমা কোন দিন বলেনি।
নন্দলাল মল্লিকের গলির এ বাসায় পা দিতে দিতে যারা এগিয়ে
এসেছিল ওকে বরণ করতে, তাদের দিকে অনুপম। বিস্মিত দৃষ্টিতে
তাকিয়ে ছিল, একথা স্পষ্ট মনে আছে।
সবার সঙ্গেই হাসিমুখে কথা বললে অনুপমা, সব প্রশ্নের যথাযথ জবাব
দিয়ে গেল; কেবল রাত্রে শুতে এসে জিজ্ঞাসা করল সুরপতিকে, এরা কারা
বলল তাে। আলাপ করলাম, কিন্তু সবাইকে তত চিনতে পারলাম না।
সুরপতি যথাসাধ্য পরিচয় দিতে বসল। ওই যে মাঝবয়সী ফল
মতন বিধবা যাকে দেখলে তিনি হলেন আমার নিদি।
-তোমার দিদি ?
অপ্রতিভ ভাবে ঢােক গিলে সুরপতি বললে, আমার দিদি, মানে, ঠিক আপন দিদি নয়, তবে কিনা, আপন দিদিরও বেশ। অর্থাৎ আমার বাবা যখন পােস্ট মাস্টার ছিলেন নন্দীগ্রামে, তখন —বলতে হবেনা, বুঝেছি। আর মাথায় টাক-পড়া বুড়ো মতন ওই যে —আমার বসন্তকাকা। অর্থাৎ আমার বাবার —আর অর্থ করতে হবেনা। অনুপম হেসে বলল,-এর বিয়েতে এসেছেন ? -বিয়েয়? হ্যা তা এসেছেন বৈকি। বিয়ের তাে এসেছেনই। কী জাননা, ওরা সব আমারই আপনার লােক কিনা, এখানেই থাকেন। -এই বাসাতেই ? সুরপতি ঘাড় কাৎ করলে। -ও। স্পষ্ট বােঝা গেলনা অনুপমা খুশি হয়েছে কিনা। দু’জনকে নিয়ে নীড় রচনার যে স্বপ্ন ছিল, তা বুঝি এত লােকের কিচিরমিচিরে ভেঙে গেছে। বিলিতি ধরণের পরিবার ওদের, সংসার বলতে স্বামী-স্ত্রী আর দু’একটি ছেলে মেয়ে বােঝে। গলাটা পরিষ্কার করে সুরপতি ওকে বােঝতে চেষ্টা করল,- আমাদের বাঙালী সমাজ ব্যবস্থা, বুঝলে, অনেককে নিয়ে। অসংখ্য ডালপালা লতা নিয়ে যেমন বনস্পতি- সব শুনল অনুপমা। সবশেষে সংক্ষেপে শুধু মন্তব্য করল,-ও। কিন্তু শুধু নিরুদি আর বসন্তকাকাই তাে নয়। এ বাড়িতে থাকে নিরুদির ছেলে প্রমথ, ইস্কুলে পড়ে। আরেক পিসতুতাে বােন, যার স্বামী স্বদেশী করে জেলে গেছে, সমা; তার কোলের মেয়ে। খুড়তুতাে ভাই নীলু, যে ক্রমান্বয়ে একটার পর একটা ব্যবসার ফেলিওরের শুতের ওপর সাকসেসের সৌধ নির্মাণ করছে। এরা সবাইত সুরপতির আপন, কাউকেই তাে ফেলা যায় না। সবাই এসেছে একে একে, আস্তে আস্তে
ওর হােট বাসাটি কখন কলরবে মুখর হয়ে উঠেছে, সুরপতি নিজেও
লক্ষ্য করেনি। করলেও ভালােই লেগেছে। নিকট-দূর আত্মীয় স্বজনের
মধ্যে সে-ই একমাত্র কৃতী পুরুষ, তাকে কেন্দ্র করে এমনি একটা
সম্পর্কের সৌরমণ্ডল গড়ে উঠেছে, একথা ভাবতেও ভাল।
তখন ছিল সস্তার দিন, তবু মাসের প্রথমে অনুপমার হাতে মােটে
একশটি টাকা তুলে দিতে কী সংকোচই না হত। বাকি পঞ্চাশটাকার
গােটা কুড়ি-টাকায় সুরপতির চলত জলখাবার আর হাত খরচ; আর
ত্রিশটাকার কিছু যেতে বইয়ের দোকানের পুরানাে দেনা শােধ করতে,
কিছু কিছু নতুন বই কিনতে। আশ্চর্য, সেই সামান্য টাকায় অনুপমা
চালিয়ে নিতােও ঠিক। অনেক লােক বােঝাই সংসারের নৌকোখানা
এক একবার টলােমলাে করত, পাকা মাঝি আছে হাল ধরে। মাঝে
মাঝে তবু সুরপতির কী অপরাধী মনে হত নিজেকে। বিলেত না
গিয়ে ভালাে করেনি।
ধীসিস সাবমিট করবার পর নিজের চেষ্টাতেই একটা টুইশান
শুটিয়ে নিয়েছিল, যাট টাকা, সপ্তাহে দুদিন। বাড়তি রূপাের ঠিকরে-
পড়া আলােয় উদ্ভাসিত হল অনুপমার মুখ। সেবার পূজোয় ঠিক হল,
ওয়া যাবে বেশিদূর কোথাও না, মধুপুরে।
খানিকটা ইতস্তত করে সুরপতি বলেছিল, কিন্তু সেটা কি ঠিক
-কোটা? বাক্স সাজাতে সাজাতে অনুপমা জিজ্ঞাসা করেছিল।
-এই-এই আমাদের দুজনের এভাবে যাওয়া। মানে নিরুদি
এরাও তাে রয়েছেন, ওদের এ ভাবে ফেলে যাওয়া-
—সবাই মিলে যাওয়া কি খরচে কুলুবে ?
-তবে?
তবে যেওনা। সশব্দে বাক্সের ডালা বন্ধ করলে অনুপমা।
শেষ পর্যন্ত স্থির হ’ল দেওঘর যাওয়া হবে। নিরুদিও সঙ্গে
থাকে। এর তীর্থ দর্শন হবে।
১ কিন্তু পূজোর ঠিক প্রাক্কালেই যে গৌরী বিধবা হয়ে আসবে, এখা তখন কে জাত। বসন্তকাকার একমাত্র মেয়ে গৌরী, বেশ ভালাে ঘরেই পড়েছিল। ঠিক মহালয়ার দিন চোখ মুছতে মুছতে এসে দাড়ালে আছাড় খেয়ে পড়ল বসন্তকাকার পায়ের ওপর।-আমার কী হবে বাবা, কোথায় যাবে এবার। বসন্তকাকা ঘরের প্রায়ান্ধকার একটা কোণে বসে ফরসিতে টান দিচ্ছিলেন, দিতেও থাকলেন, কোনাে কথা বললেন না। ইণিতে রপতিকে দেখিয়ে দিলেন। অর্থাৎ সুরপতি থাকতে কারুর কোন ভাবনা নেই। উপরে আছেন জগদীশ্বর, নিচে এই সুরপতি। পূজোয় আর কোথাও যাওয়া হ’লনা। ডক্টরেট পেতে কী রকম খুশি হয়েছিল অনুপমা এখনাে মনে আছে। •এতদিন শুধু ছিল এম, এ’-এবারে যুক্ত হ’ল আরাে তিনটি অক্ষর পি, এইচ, ডি। অনুপমা নিজেই এবারে সুরপতির নামে কার্ড ছাপিয়ে নিয়ে এলো। ভবতােষবাবুও খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু তবু জনান্তিকে মন্তব্য করেছিলেন মেয়ের কাছে যদি এর সিকি পরিশ্রম করেও আইনের পরীক্ষাটা দিতাে। আইন? শুনে সুরপতি হাসলাে শুধু। কেন, এই বে-আইনি ডিগ্রী গুলাের মর্যাদাই বা কম কী। নামডাকওয়ালা একটা মিশনী কলেজ থেকে ইতিমধ্যেই একটা লােভনীয় আমন্ত্রণ এসেছে, ইংরিজি সাহিত্যের প্রধান অধ্যাপকের পদটা সেখানে সম্প্রতি খালি। শুরু আড়াইশােয়। স্বাচ্ছল্যের মুখ দেখা যাবে এবার। অবশ্য প্রয়ােজনের তুলনায় আড়াইশাে টাকা কিছু না। অনুপমারই দাদা অন মার্কিনমুলুক থেকে ফিরে এসেইতিমধ্যেই দু'টো যৌথ কোম্পানী আর একটা ইনসিওরেন্সের কর্ণধার হয়ে ওর দুনাে মাইনের কত চাকর রেখেছে। তবু মাথাটা উচু রেখেছে সুরপতি। কেননা, পথটা তার সৎ, বৃত্তিটা মহৎ। সেই বছরই অনুপমার কোলে এলাে সোম। আরাে দু’বছর পরে প্রথম প্রথম একটু রােমাঞ্চ হত বটে, অনুপমার কোলে নবজাতককে দেখে সহ বিস্ময়ে সুরপতি ভাবতে এ কি তারই আত্মজ। কিন্তু ধীরে ধীরে এ অনুভূতিও রইল না। সংসারে ইতিমধ্যে শুধু এই দুটি লােকই বাড়েনি, নিরুদির এক জা এসেছেন ছেলেপুলে নিয়ে। বসন্তকাকা আরাে অথর্ব হয়ে পড়েছেন, তার অসুখ-বিসুখে খরচ লেগে আছেই। আফিমের মাত্রাও বাড়িয়েছেন তিনি, সেজন্যে উপরি কিছু দুধের খরচ আছে। এই পরিবেশে সােম আর কণাকে আলাদা করে নিজের কিছুতেই ভাবতে পারতাে না সুরপতি। আরাে পাঁচজন যেমন আছে, ওরাও তাদের সঙ্গে মিলে মিশেই মানুষ হােক। ওরা সুরপতির আলাদা করে কেউ নয়, এই পরিবারের সন্তান ; একটি অখণ্ড সত্তার ভগ্নাংশ। অনুপমাএকদিন বললে, দাদাকে আমি কাল থেতে নেমন্তন্ন করেছি। করেছ ? খুশি হয়ে সুরপতি বললে,—বেশ তাে খুব ভাল কথা। নজ আসবে কখন ? সন্ধ্যার পর। দেখ, দাদা বলছিল, তােমাকে ইসিওর করতে। কৌতুহলী হয়ে বসল সুরপতি।—কী ব্যাপার বলো তাে। -বেশি কি আয়,তােমাকে দু'টো পলিসি করতে হবে, পাঁচ হাজার পাঁচ হাজার, খোকা আর পুকুর নামে। -খােকা আর খুকুর নামে? সুরপতির জ সামান্য কুঞ্চিত হল। হঠাৎ। হঠাৎ নয়। এ সংসারের এই তাে হাল দেখছি, একটা পয়সাও মে না। ওদের দুজনের ভবিষ্যৎ তত ভাবতে হবে। শেষ পর্যন্ত ওরা ভেসে যায় যদি ওদের ভবিষৎ, সুরপতি ধীরকণ্ঠে বললে,-ওদের নিজের হাতে, আমাদের নয়। আর দশটা ছেলেমেয়েও এ বাড়িতে যেমন সুখে দুঃখে মানুষ হচ্ছে, ওরা তেমনি হােক না। কেবলমাত্র একটা জন্মের এসিডেন্টের জোরে পাঁচজনের চেয়ে ওর প্রেফারেসিয়েল ট্রিটমেন্ট পাবে, এটাকে আমি ঘােতর ইমরাল মনে করি অনু।
সুতরাং পরের দিন অনঙ্গ এ বাড়ী এসে ঘণ্টা দুই গল্প করে গেল ; আজব দেশ আমেরিকার আজগুবি কেচ্ছা বলে তাজ্জব করে দিলে সবাইকে, সর্বশেষে আসনপিড়ি হয়ে খাবার বিবিধ অসুবিধের উল্লেখ করলে, কিন্তু সুরপতি পলিসি করলে না। সেই ঘটনার পর যদি বেঁকে বসত অনুপমা, তা হলে সুরপতি হয়ত কিছুটা শুধরে যেতে। কিন্তু নিজেকে যেন আরো গুটিয়ে নিলে অনুপমা। স্পষ্টই বােঝা যায় সে পছন্দ করছেন সুরপতির এই উদারতার ঢাক- পেটানাে বাড়াবাড়ি। একটুখানি মুখলিপ্সা, হাত-পা-ছড়ানাে আয়েসের লােভ আছে অনুপমার, তাকে স্বার্থপরতা বলা অবিচার। অনুপমা হয়ত বলতে চাইতো, যারা আছে তারা থাকুক না, কিন্তু তাকে সুরপতিকে খােকাকে আর খুকিকে নিয়ে স্বতন্ত্র একটা কোণ তৈরি হােক না কেন, ঈষৎ উচু একটা বেদী। আর সবাই আশ্রিত আর সে আশ্রয়দাত্রী, একথা অনুপমা কিছুতে ভুলতে পারতাে না। সুরপতি কি আর বােঝেনি। বুঝেছে সব। কিন্তু যে ব্যবস্থা বহাল আছে তার নড়চড় হতে দিতে তার মন সায় দিতাে না। রােজগার আরাে কিছু বেড়েছিল। মাইনে হয়েছিল তিনশাে। পরীক্ষার খাতা দেখে মিটতাে সারা বছরের ঘাটতি। এ ছাড়া বেনামিতে বাজার-চলতি নােট লেখার দায়িত্বও গ্রহণ করেছিল। জুটেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারারসিপ। কিন্তু সেই সঙ্গে বেড়েছে প্রয়ােজন, চড়েছে জিনিষ শবের বাজার। ছােট খাটো কত শখ ছিল অনুপমার। শশাবার-বসবার-খাবার ঘর থাকবে আলাদা আলাদা; পছন্দসই আসবাবে সাজানাে। সপ্তাহে একটি দিন অন্তত সিনেমায় যাওয়া। তখন আর কী-ই বা বয়স অনুপমার। সুরপতি বলেছে,-সে কি হয়। তুমি বরং গৌরীকে নিয়ে যাও। আহা যেচারী, বিধবা হয়ে এসেছে, ওর একটু মন ভালাে থাকা দরকার। -গৌরীকে নিয়ে ? চোখের মণি দু’টো চকিতে জ্বলে উঠেছে অপমার-থাক তবে।
৪৩৪ অর্থাৎ খাওয়া-পরার দায়িত্ব তো নিতে হয়েছেই এর ওপর আবার মন ভালাে করার দায়িত্বও নিতে হবে ? অমন সিনেমায় গিয়ে কাজ নেই। -কী হল? বই থেকে মুখ না তুলেই সুরপতি জিলসা করেছে। -কিছু না। জবাব এসেছে কানে। গৌরীকে নিয়ে কিছু কি সন্দেহ করতে অনুপমা ? কে জানে। সাবধানী মেয়ে অনুপমার মনের নিচের মহলে কী ঘটছে ওপর থেকে বােৰা যেতাে না। তবু সুরপতির কেমন যেন মনে হত, অনুপমা ওকে লক্ষ্য করছে, বসন্ত কাকার ঘরের দরজায় দাড়িয়ে গৌরীর সঙ্গে দু'একটা হাসি ঠাট্টা করেছে যদি, অনুপমা এসে দাড়িয়েছে সিড়ির মুখে। সুরপতির অস্বস্তি লাগত, গ্লানি বােধ হত। কিন্তু ছােট মন বলে অনুপমাকে তিরস্কার করতেও বাধতাে। অস্বীকার করে লাভ নেই, সেই সময়ে, অল্প ক'দিনের জন্যে, একটা দুর্বলতা এসেছিল মনে। অশ্রয় দানের বিনিময়ে একটা বিধবা মেয়ের কাছ থেকে সুবিধে আদায় করে নেবে, তেমন কাপুরুষ সুরপতি নয়, কিন্তু তবু গৌরীর সান্নিধ্য ভালাে লাগত। আর সেই সান্নিধ্যের সুযােগ করে দিতেন বসন্তকাকাই। আশ্চর্য এই লােকটি। ক্ষীণ একটু সম্পর্কের সুতাে ধরে এ বাড়িতে এসে উঠেছেন। একটা ধূম্রলােক রচনা করে রেখেছেন নিজের চারপাশে। কথা বলতেন অল্প। আর বলতে হ’তও না, কেননা প্রয়ােজন মত সৰ উপকরণ হাতের কাছেই পেতেন তিনি। হয়ত এই বন্দোবস্তটা কায়েমি করবার জন্যেই মাঝে মাঝে মেয়েকে ওপরে পাঠাতেন নানা ছুতােয়- সকাল বেলা আদ্যোপান্ত পড়া খবরের কাগজটাই হয়ত সন্ধ্যাবেলা খাবার চেয়ে পাঠাতেন। আরেকটি লােকের সঙ্গে গৌরীর অলক্ষ্য একটা প্রতিদ্বন্দিতা চলত,—নিরুদির। দু’জনেই আশ্রিত। কিন্তু একে অপরকে সহ করতে পারত না। অনুপমা আসবার আগে এ সংসারে নিরুদিমই ছিল একাধিপত্য ; অনুপমার কাছে হার মানতে হয়েছে তাকে, কিন্তু তার আলা যেন মেটাতে চাইছেন গৌরীর ওপর দিয়ে।
গৌরীকে নিয়ে বিশ্রী সব ইঙ্গিত করতেন নিরুদি। কলতলায় কাপড় কাচতে কাচতে শুনিয়ে শুনিয়ে যে সব কথা বলতেন তার দু’একটা ছিটকে এসেছে সুরপতির কানেও। এমন কি নিজের ছেলে প্রমথকেও বাদ দিতেন না। কতই বা বয়স তখন প্রমথর। সবে ম্যাটিক দিয়েছে, গোঁফের ক্ষীণ রেখা উঠেছে। লুকিয়ে ম্যাটিনীতে দেখে আসা বিলিতি ছবির গল্প শােনাতে বিমুখ গৌরীকে। দু’জনে লুডাে খেলত। একদিন প্রমথকে কী মারটাই মারলেন নিরুদি। একটা চাল ফিরি নেবার জন্যে প্রমথ বুঝি হাত চেপে ধরে সাধ্যসাধনা করছিল গৌরীর, সেই অবস্থাতেই তাকে নিরুদি দেখে ফেলেছিলেন। মার ধাের করে ছেলেকে সদর দরজা দিয়ে বার করে দিয়ে সেদিন নিজেও কিছু খেলেন , কিন্তু কলতলায় বসে শব্দভেদী শর যােজনা করতে থাকলেন - রীতি। সােয়ামী খেয়েও সাধ মেটেনি গৌরী, তার দুধের ছেলের মাথা থেতে বসেছে, ইত্যাদি। গৌরীও কিছু আরেক গাল পেতে দেবার পাত্রী নয়। তার জবাবও এসেছে ঘরের ভেতর থেকে, ভেজানো দরজার ফাক দিয়ে। নিরুদির অতো সতীপনা ফলাতে হবেনা। দোষে স্বামী পরিত্যাগ করেছিলেন নিরুদিকে সে কথা আর কেউ না জানুক গৌরীর জানতে বাকি নেই। মাথা হেঁট করে নিজের ঘরে বসে সুরপতি শুনছিল সব। অপমা বসে ছিল পাশে। ওর চোখ মুখ কান লাল হয়ে উঠেছে, স্পষ্টই বােঝা যায়। —কী ইতর এরা। বলােতে এখুনি ঘাড় ধরে বার করে দিই দু’জনকে। থাকনা, অনেকক্ষণ পরে সুরপতি জবাব দিয়েছিল,খানা। কোথায় যাবে? আমরা কান না দিলেই হল। বিচিত্র হাসি ফুটে উঠেছে অনুপমার মুখে।-আমি জানতু। ভূমি পারবে না। প্রাণ গেলেও তাড়াতে পারবে না। কিন্তু খুড়তুতাে ভাই নীপুর কাছে গৌরীর লেখা চিঠি ৰেদিন পর।
পড়ে গেল—নিরুদিই চিঠিটা সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন অনুপমাকে
সেদিন সুরপতিও ভেবেছিল, কাজ নেই আপদ রেখে। মনস্থির করে
বসন্তকাকার ঘরের দরজার কাছে এসে দাড়িয়েছিল, তিক্ত কয়েকটা কথা
শানিয়ে রেখেছিল বসনাগ্ৰে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলা হয়নি। সেইদিনই
বুঝি বসন্তকাকার হার্টের ট্রাবটা বেড়ে গেল। দিন তিনেক যাকে বলে
যমে মানুষে টানাটানি চলল। এক টানা বাপের শিয়রে বসে ক্লান্তিহীন
৩ষা করে গেল গৌরী। বসন্তকাকা যখন সেরে উঠলেন তখন মন
থেকে সব তিক্ততা সুরপতির মুছে গেছে। গৌরীর সেবাত হাত
দু’পানির দিকে চেয়ে থেকে থেকে বিস্ময়ে মন ভরে উঠেছে, কিছু
বলা হয়নি।
জীবনে আর দু’টো অনুরােধ করেছিল অনুপমা। খােক। সেবারে
মাটিক ক্লাসে উঠেছে। অনুপমা ওর জন্যে আলাদা একটা মাষ্টার ঠিক
করতে বলেছিল।
-তুমি তো ওকে মােটই দেখনা, পড়াশুনাও ভালাে হয়নি ওর।
এটা পরীক্ষার বছর, একজন টিউটর রেখে দিলে
-সে হয়না। এ বাড়ি থেকে এর আগে নীপু পরীক্ষা দিয়েছে,
কার বেলা টিউটরের প্রয়ােজন হয়নি, খােকার বেলা রাখলে লােকে
বলবে কী।
-আর থােকা ফেল করলেই বুঝি লােকে তােমাকে খুব ভালো
বে?
-ফেল করলেই বা কী। আমি তো পুত্ৰনামধন্য নই অনু।
বনামধয়।
মেয়ের জন্যে গানের মাষ্টার রাখার প্রস্তাবও এই ভাবেই সুপতি
উড়িয়ে দিয়েছে।
-তুমি শেখালেই পারে।
-আমি? বিয়ের পর ওসবের চর্চা করবার অবসর পেলাম কই।
সংসারের খাটুনি খেটেই ফুৎ পাইনে-
-সত্যি অনু, সহানুভূতির কণ্ঠে সুরপতি বলেছে, আমার হাতে পড়েই তােমার জীবন ব্যর্থ হয়ে গেল। অন্য কেউ হলে- -ও কথা বােললা না। অনুপমা বাধা দিয়ে বলেছে, আমার মতাে ভাগ্য হয়না শুধু-শুধু তুমি যদি একটু স্বাভাবিক হতে । খােকা তৃতীয় বিভাগে পাশ করেছিল। পরীক্ষার ফল ছাপানো গেজেটটা সুরপতির হাতে দিয়ে শুধু চুপ করে দাড়িয়েছিল অনুপমা। একটি কথাও বলেনি। কিন্তু তার চোখের ভাষা পড়ে নিতে ভুল হয়নি সুরপতির। সব কিছুর জন্যে সে সুরপতিকেই দায়ী করছে সন্দেহ নেই। একবার সুরপতি একবার সুরপতি শুধু শিউরে উঠেছিল : সব অবিচার যেন মনে মনে তুলে রাখছে অনুপমা, একদিন সুযােগ পেলে সুদে আসলে সব কিছুর শােধ নেবে। কিন্তু অনুপমা সহিষ্ণুতার চরম পরীক্ষা দিয়েছে এই সেদিন, নীপুর বিয়ের ব্যাপারে। অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজে বড় রকমের একটা লােকসান দিয়ে নীপু দিন কতক গা-ঢাকা দিয়েছিল। সুরপতি বিশেষ বিচলিতও হয়নি। জানতে, নীপু ফিরে আসবে। এলােও ঠিক। রাত দশটার সময় সুরপতি নােটের পাব্লিশারের বাড়ি থেকে ফিরছিলাে, বাসার সম্মুখে এসে দেখে দরজার সামনে দাড়িয়ে -আরে এ যে নীপু। নীপু উঠে দাড়ালাে। মাথা তার তখনাে নীচু। -কোথায় গিছলি, কবে এলি, বাইরে দাঁড়িয়ে কেন-একসঙ্গে অনেক কথাই জিজ্ঞাসা করলে সুরপতি। -বলছি দাদা, তুমি একটু এদিকে এসাে। বিস্মিত সুরপতিকে টেনে নীপু গলির মুখে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর সব কথা বলেছিল ল্যাম্প পােষ্টর নীচে দাড়িয়ে। সবশেষে নীপু বললে, বিশ্বাস করে দাদা, এ বিয়ে না করে আমার উপায় ছিলােনা। আইন যাই বলুক, মায়ের চোখে আমি বাধ্য ছিলাম-
হেঁয়ালির মত লাগছিল নীপুর কথা। বােকার মতাে সুরপতি প্রয়
করেছিলাে, অর্থাৎ?
অনেক ইতস্ততঃ করে নীপু বলেছিল, মেয়েটি আমাকে চুড়াভাবে
বিশ্বাস করেছিল-মানে আর মাস তিনেকের মধ্যে
—থাক আর বলতে হবেনা, সুরপতি বললে-বুঝেছি। মেয়েটি
এখন কোথায়।
সসঙ্কোচে নীপু বলেছে, আছে সামনের এই পার্কটায়। ওকে আমি
বসিয়ে রেখে এসেছি দাদা।
—তাের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে নীপু,ধমকের সুরে সুরপতি
বলেছে,-এই হিমের রাতে ওকে খােলা পার্কে ফেলে এসেছিস? সঙ্গে
করে নিয়ে আসতে পারিসনি হতভাগা ?
-আজকে? নীপ্ত ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করেছে।
ততক্ষণ নিজেই সুরপতি এগিয়ে গেছে।
—বৌদি কী ভাববেন ?
-সে ভাবনা আমার।
ওদের তিনজনকে দরজা খুলে দিতে এসে অনুপমা এক মূৰ্ত থমকে
দাড়িয়েছিল। ওর থথমে মুখের দিকে তাকিয়ে সুরপতিও একটু
বিচলিত হয়েছে বৈকি।
কিন্তু সীমা আনত হয়ে প্রণাম করতেই অনুপমা তাকে চিবুক স্পর্শ
করে তুলে ধরেছে,-থাক থাক ভাই। এসাে। বাড়ি শুদ্ধ লােককে
লাগিয়ে নিজেই শাঁখ বাজায়।
সুরপতি মনে মনে অবাক মেনেছে।
নীপু আড়ালে ডেকে নিয়ে বলেছে, আমার যেন কেমন কেমন
লাগছে দাদা। বৌদি ঠিক রাগ করেছে।
সুরপতি বলেছে-বটে, তাের বৌদিকে এখনাে চিনিস নি। কিন্তু
নীপুর আশংকাটা তার কাছেও অমূলক মনে হয়নি। এতটা বাড়াবাড়ি
যেন ঘাড় ধরে বার করে দেবারই অন্যরূপ।
পাঞ্জাবিটা গায়ে চড়িয়ে সিড়ি দিয়ে নেমে এলাে সুরপতি। সােম তখন ঢুকছে। উসকো খুসকো চুল, আধময়লা পাঞ্জাবি, সুরপতিকে দেখে সােম একপাশে সরে দাড়ালাে। সুরপতি জিজ্ঞাসা করলে, এই ফিরছিস ? সােম জানালে হাঁ। আর কোন কথা হ’লনা। থার্ড ডিভিসনে ম্যাটিক পাশ করে সােম আর পড়েনি, কিম্বা অনুপমাই তাকে পড়তে দেয়নি। আজকাল অনঙ্গর একটা ফার্মে কেরানীগিরি করছে সােম, চল্লিশ- পয়তাল্লিশ টাকা মাইনে। এত লােকের ভিড়ে ছেলের সান্নিধ্য কোন দিনই ভালো করে পায়নি সুরপতি, আজকাল তাে দেখাশােনাই কালে- ভদ্রে। এই যে ওকে দেখে সােম সরে দাড়ালাে, এর ভেতর, সুরপতির মনে হয়ত পিতার প্রতি চিরাচরিত সমীহই শুধু নেই একটা নালিশও আছে যেন। যদি ছেলের একটু যত্ন নিতে সুরপতি, অনুপমার কথামত অতঃ টিউটর রাখতে একটা, তা হলে হয়ত আজ সােম কৃতী ছাত্র হত একজন, অপরিণত বয়সে কেরানীগিরির যাতাকলে পড়তে হত না। সুরপতির প্রতি চিরস্থায়ী ক্ষতের অভিযোেগ আছে সােমের, আর সেই অভিযােগে বুঝি ওর মায়েরও সমর্থন আছে। আর কণা। যাকে মাষ্টার রেখে অনুপমা গান শেখাতে চেয়েছে। আজকাল ওর মুখে অনুপমার অল্প বয়সের হুবহু ছাদ আসে। কিন্তু অনুপমা থাকতাে ফিটফাট, কলেজে যেতে বেনী দুলিয়ে, খুট খুট গােড়ালির শব্দে দুলিয়ে দিত বুক। আর কণা? মেয়েটা ভালাে করে সাজতেও শেখেনি। সাজগোছ করার উপকরণও জোটেনি এই শেয়ারের বাড়িতে। ওর স্বাভাবিক ফস। রঙও যেন নিষ্প্রভ হয়ে এসেছে। বাপের প্রতি মেয়েদের সহজাত একটা আকর্ষণ থাকে, সেই টানে মাঝে মাঝে মেয়েটা অকারণে এসে দাড়াতে সুরপতির পড়ার টেবিলের কাছে ; উপযুক্ত সাড়া না পেয়ে কতদিন ফিরে গেছে ঠোট ফুলিয়ে। রাস্তায় নেমে সুরপতি স্থির করলে, মেয়েটার জন্যেও যাহােক একটা কিছু নিয়ে যেতে হবে,মো, পাউডার কিম্বা এসেন্স।
সারাটা সন্ধ্যাই সুরপতি অন্যমনে রাস্তায় বেরিয়েছে কিনা বলা যায়না। অনুপমার জন্যে শাড়ি কিনেছে ঠিক, তারপর নিজের সমশিতা বজায় রাখবার জন্যে নীপুর স্ত্রীর জন্যে রাউজ-পীস । মেয়ের জন্যেও টুকি টাকি কিনেই বিপত্তি ঘটল। এতগুলাে মােড়ক দু’হাতে সামলানাে ভার। হয়ত পা পিছলে গিয়েছিলো, হয়ত মােড়ক ক’টা সামলাতে পারেনি, কিম্বা অল্প আলােয় বাসের হাতলটা ঠিক ঠাহর হয়নি। কিসের পর কী ঘটেছিল মনে নেই, একটা তীব্র চীৎকার শুধু গলা চিরে বেরিয়ে এসেছিল। জ্ঞান হতে দেখলে নিজের ঘরেই শুয়ে আছে। চিবুকে হাত বুলিয়ে বুঝলে শ্মশ্রুসমাচ্ছন্ন। কতদিন কেটে গেছে কে জানে। আরাে কিছুক্ষণ কাটতে টের পেল, এতক্ষণ সে শুধু একটা চোখেই দেখছে। আরেকটা চোখ মেলতেই পারছেনা কিছুতে। ভয়ে ভয়ে সুরপতি দু চোখই বুজে ফেললে। দ্বিতীয়বার চোখ খুলে অনুপমাকে সামনে দেখতে পেলাে। ক্লান্ত কণ্ঠে ডাকলে নাম ধরে। অনুপমা বললে, এখন কিছু জিজ্ঞাসা কোনা, অনেক তপস্যায় তােমাকে ফিরে পেয়েছি। কিন্তু একে একে সব জানা গেল। সেই দুর্ঘটনার পর কেটেছে তিন দিন। জীবন বেঁচেছে, কিন্তু রয়ে গেছে অপূরণীয় ক্ষতি। শুধু একটা চোখই যায়নি। বুকের পাঁজর ভেঙেছে, গেছে একখানা পা, সেই সঙ্গে চিরকালের মতাে খেটে খাবার ক্ষমতা। তার জীবন নিয়ে একী পরিহাস বিধাতা করলেন! ছ'মাস বিছানায় একই ভাবে পড়ে থাকতে হবে। তার পরে কাঠের পায়ে ভর করে একটু আধটু এদিক ওদিক চলে বেড়াবার অনুমতি মিলবে বটে, কিন্তু গুরুতর, বিশেষ করে, মানসিক পরিশ্রমের-কখনাে নয়।
-আমি তবে আয় খেটে খেতে পারবােনা? আর্ত চীৎকার করে সুরপতি জিজ্ঞাসা করেছিল। বিষন্ন ভঙ্গিতে ডাক্তার ঘাড় নাড়লেন। আশা কম। তা ছাড়া উপযুক্ত তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে বরাবর। সে চিকিৎসাতেও ঢের খরচ। -কত, আন্দাজ । মাসে অন্তত তিন শশা। ফিরিস্তি দেখে হিসাব করে ডাক্তার জানালেন। যদি এই ওষুধ, এই পথ্য আর এই বিশ্রাম চালিয়ে যেতে পারেন, ডাক্তার বললেন, তবে হয়ত, হয়ত কোন দিন, বছর দুয়েক বাদে কোন ক্রমে কর্মক্ষম হতে পারবেন। কিন্তু সেই পথ্য-ওষুধের মাশুল যােগানাে কি সােজা। দুষ্প্রাপ্য ওষুধ, চড়াদামে সংগ্রহ করতে হয়। যে চোখটাতে ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি এখনাে আছে, তার জন্যে নিয়মিত খাদ্যের এক রাজসিক বরাদ্দ। ছানা, মাখন, ডিম, আঙ্গুর, মাছ, দুধ, ফল, মাংস। কোথা থেকে এত চলবে? প্রথম দু’মাস কলেজ থেকে পুরাে বেতনে ছুটি পাওয়া গেল। তার পরে আধামাইনের পালা চলল কিছুকাল। সবশেষে সুরপতিকে বিনে মাইনেয় দীর্ঘ ছুটি নিতে হ’ল। প্রভিডেন্ড ফাণ্ডে সামান্যই জমেছিল। আর এত বড় সংসারের কল্যাণে হাতে প্রায় কিছুই বঁচেনি। তবু সেদিন দুপুরে অনুপমাকে ডেকে সুরপতি হিসাব করতে বসল। মনে বুঝি ক্ষীণ আশা ছিল, কে জানে অনুপমার হয়ত গােপন তহবিল আছে একটা, লক্ষ্মীর ঝাঁপি উপুড় করলে কোন না হাজার কয়েক টাকা বেরুবে। অনুপমা যখন জানালে কিছুই নেই, তখন সুরপতিরও মুখ কালাে হয়ে এলাে। -কিছুই নেই ? -কিছুই নেই। —উপায় ? তাও নেই নাকি। তাকি আর নেই। সুরপতির লেখা নােট থেকে এখনাে মাসে শ'খানেক টাকা আসতে পারে, অবশ্য ঠিক মত তত্ত্বাবধান যদি হয়। আর বই বিক্রিরও একটা মরশুম আছে, সেটা এন নয়। তবে ? তার পরেও একট। তবে আসে বৈ কি। অনুপম। বি-এ পাশ করেনি। অবশ্য সব ভুলেছে, কিন্তু ডিগ্রীটা তো মুছে যায়নি। অনুপম চাকরি নেবে একটা। আর কিছু না জুটুক, মাস্টারি তাে সহজলভ্য। তুমি চাকরি করবে অনু? সুরপতি প্রতিবাদ করছিল প্রথমে, কিন্তু সে প্রতিবাদ তার স্বরের মতােই ক্ষীণ। আর কীই বা উপায় আছে। অনুপমার মতাে অহংকারী মেয়ে দাদাদের কাছে হাত পাতবেনা, এটা ঠিক। এতদিনে সংসারের পূর্ণ কতৃত্ব পেয়েছে অনুপমা। সে সুরপতির স্ত্রী মাত্র নয়। প্রমাদ গণলেন নিরুদি-বসন্তকাকা-গৌরী-নীপুর দল। এতদিন অনুপমা শুধু প্রতীক্ষা করেছে, আঘাত করার সুযােগ এসেছে আজ। সমস্ত বাড়তি জঞ্জাল এবার দূর করবে। সুরপতিও তাই ভেবেছিল। নােট লেখার টাকা ঠিক মত আসছে , কোন মাসে ষাট, কোন মাসে চল্লিশ, কোন মাসে বা পঁচিশ। সােমের মাইনে বেড়েছে, সে আনছে পঞ্চাশ টাকা। আর অনুপমার একশাে পঁচিশ। কত হ’ল? দুশো-কি-সামান্য বেশি। সুরপতির চিকিৎসার খরচই ৰে তিনশো। তবে ? মেজাজ খিটখিটে হয়েছে সুরপতির। সকাল থেকেই চেঁচামেচি শুরু করে। মুকোজ কই আমার? নীপু-ঠাকুরপাের ছেলের অসুখ। তাকে দিয়েছি। অনুপমা বলে। নার দুধ? এত কম কেন? বসন্তকাকাকে দিতে হয়েছে যে। কাকার শরীরটা আজকাল ভেঙে পড়েছে দেখতে পাওনা ? জব নেই। জবাবে শুধু চেঁচাতে ইচ্ছে করে, গালাগালি করতে ইচ্ছে করে।
১০ কাকা! কাকা। গজরায় সুরপতি আপন মনে, রাবণের গুষ্ঠ এসে ঘাড়ে চেপে বসেছে। এরা তাকে সেরে উঠতেও দেবেনা নাকি। অনেক কাল তাে এদের ভার বহন করেছে সুরপতি, আর কেন। উট হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে পড়েছে, তবু কি এদের মায়া হয়না। ওষুধ আছে তত পথ্য নেই। ছানা আছে, কমলা লেবু কই। মাছ তাে এলাে, কিন্তু কোথায় সকাল বেলাকার অধিসেদ্ধ ডিম, ডাক্তার বাবু যা খেতে বলেছিলেন ? আর কোথায়। আনা হয়নি। টাকা নেই। অনুপমা বললে, মােটে দু’শােটি টাকা। দেখতে পাওনা এতগুলাে প্রাণী- চীৎকার করে উঠল সুরপতি, এদের খাওয়াতেই কি তুমি উদয়াস্ত খাটছ, দুপুরে বেরিয়ে টাকা রােজগার করে আনছ ? ওদের তুমি তাড়িয়ে দিচ্ছনা কেন অনু? সুরপতি যত চেঁচায়, তত ওর মুখ দু'হাতে চাপা দেয় অনুপমা, ত্রস্ত, চাপা কণ্ঠে বলে, চুপ করাে, চুপ করাে। ওঁরা শুনতে পাবেন যে! কোথায় যেতে বলব ওঁদের। নীপু ঠাকুরপাের কাজ নেই, বৌয়ের আবার ছেলেপুলে হবে। বসন্তকাকা লাঠিতে ভর না করে এক পা নড়তে পারেন না আজকাল, কোথায় যাবেন গৌরীকে নিয়ে। আর নিরুদি•••এতকাল আমাদের সংসারের জন্য এত করেছেন••• বলতে বলতে গলা ধরে এলাে অনুপমার। আর সুরপতি এক চোখে আহত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। কী উদার, তবু কী হিংস্র অনুপমা, নিষ্ঠুর নিয়তির মত। এতদিনে বুঝি দিন পেয়েছে। সুরপতির খেলায় সুরপতিকে মাৎ করে প্রতিশােধ নেবে। দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল সুরপতির। -আমার ওষুধ-পথ্য জুটবেনা, তবু ওরা এখানে থাকবে? আমি কোন দিন তা হলে সেরে উঠবনা? অন্ধ হয়ে যাবে ? —কী করব বলাে। ঠাণ্ডা গলায় ধীরে ধীরে বললে অনুপমা। তারপর দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নির্বিকারভাবে কারের চার্টটা দেখতে লাগল। ৮ সমান্তর প্রথমেই বলে রাখা ভাল আমার শিক্ষা-দীক্ষা সব বিলিতি রীতিতেই হয়েছিল। বাবা ছিলেন ব্যারিষ্টার। অবশ্য ব্যারিষ্টার কথাটা এখন আর ইবঙ্গের সমার্থসূচক নয়। কিন্তু আমার বাবা এই ঘােতর খাদেশিক বিংশ শতকেও উনিশ শতকের ট্রাডিশন বজায় রেখেছিলেন। ইংরিজি ছাড়া বলতেন না, ইংরিজি খানা ছাড়া খেতেন না। চলনে বলনে পােষাকে পিকডিলি সার্কাসের অনুকৃতির আন্তরিক প্রয়াস করে চলতেন। নিজেকে, নিজের পরিবারকে এবং নিজের মতাবলম্বীদের নিয়ে একটা ছােটখাটো উটপাখী-গােষ্ঠী রচনা করেছিলেন তিনি। আমরা মেমেদের কাছে ফিরিঙ্গি ইস্কুলে বিদ্যাভ্যাস করেছি। খাটো এক পরে অনুচিত বয়স পর্যন্ত নবােদ্ভিন্ন যৌবনের অবহেলা করেছি। যে বয়সে বাবার বন্ধুদের সামনে অনর্গল ইংরিজি কবিতা আবৃত্তি করে তাদের চমৎকৃত করেছি তখন পর্যন্ত বাংলায় ভালাে করে নাম-সই করতে শিখিনি। বাংলা একেবারেই শিখবাে না বাবার প্রথমতঃ এই সংকল্প ছিল পরে কী কারণে জানি না তিনি তার কড়া বিজাতীয় ঘােড়ার রাশ ঈষৎ শিথিল করেছিলেন। মেমেদের ইস্কুলে লেখাপড়া শিখলেও বাড়ীতে আমার বাংলা বর্ণপরিচয় হয়েছিল। কিন্তু ঐ পরিচয় পর্যন্তই। বাংলা হরফের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আমার কখনই হয়নি। বাবার সামনে বাংলা বই খুলে বসবার অনুমতি ছিল না। তার ধারণা ছিল, এ ভাষায় কেবল কুরুচিপূর্ণ অশ্লীল গ্রন্থাদি লিখিত হয়ে থাকে; যা পড়ে সরলমতি বালক- বালিকাদের কিছু শেখার চেয়ে বয়ে যাবার সম্ভাবনা বেশি। মােটের ওপর বিশ শতকের তৃতীয় দশকেও বাবা ঊনিশ শতকের ইবঙ্গী ফিরিজিয়ানায় ঐতিহ্নের উত্তরসাধক ছিলেন।
১১৫ । ধর্ম ? ধর্ম বলে যে কোন পদার্থ আছে একথা আমি জেনেছি অনেক পরে। আদমসুমারীর কালে হয়ত হিন্দু বলেই আমাদের উল্লেখ থাকত কিন্তু ঐ উল্লেখ পর্যন্তই। বাবা কোন ধর্ম মানতেন না। যেতেন গর্জেয়, আর ব্রহ্মোপাসকদের তো রীতিমত বুজরুক বলেই মনে করতেন। বাড়ীতে বাবার সঙ্গে কথাবার্তা বলতাম ইংরিজিতে, ভাই-বােনদের সঙ্গেও তাই। মা ইংরিজি বুঝতেন কিন্তু সাবলীল ভাবে বলতে পারতেন । তার সঙ্গে ষাট : চল্লিশ অনুপাতে ইংরিজি-বাংলার খিচুড়ি পাকিয়ে কথা বলতাম। চাপরাশি বাবুর্চি খানসামাদের সঙ্গে হিন্দুস্থানীতে। বাংলা? বংলাতেও কথা বলতাম বৈ কি। সে শুধু একজনের সঙ্গে। তিনি ঠাকুমা। এই অত্যন্ত বিজাতীয় বাড়ীর আবহাওয়ার মধ্যে তিনি কী করে তার সাবেকি নিষ্ঠার প্রতীক ঠাকুর-ঘর নিয়ে ছিলেন আজ তা ভাবতেও অবাক লাগে। সব বদলেছিল, পুরনাে বাড়ি ভেঙে হাল-ফ্যাসানের করা হয়েছিল, কেবল ঠাকুমা বদলাননি। ঠাকুমা আমাদের চুতেন না, বাবারও কড়া নিষেধ ছিল ওদিকে যেও না। বোধ হয় তার আশঙ্কা ছিল পূজোর ঘরে গিয়ে ফিরিঙ্গি শিক্ষার বাচ্চা হাঁস আমরা, আমাদের গায়েও হিন্দুয়ানার পাক না লেগে আসে। তবু আমরা ঠাকুর-ঘরে মাঝে মাঝে গেছি। বাইরে থেকে উকি দিয়ে দেখেছি ঠাকুমা ঘণ্টা নাড়ছেন। মজা দেখতেই যেতাম বটে, কিন্তু ধূপ-ধুমাচ্ছন, পঞ্চপ্রদীপের অস্পষ্ট আলােয় আলােকিত সেই নির্জন কক্ষে শিলামূতির সমুখে ধ্যানরত ঠাকুমার শুভ্র বৈধব্যের মূর্তিখানি বড় রহস্যময় মনে হত। এত উগ্র বিজাতীয় মােহ থাকা সত্ত্বেও বাবা কেন যে আমাদের ক” ভাই-বােনকে নিয়ে বিলেত যাননি এ প্রশ্ন উঠতে পারে আশঙ্কা করে আগেই একটা কৈফিয়ৎ দিয়ে রাখি। নিয়ে যেতেন হয়ত। কিন্তু ইতিমধ্যে বাবার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছিল। তাছাড়া যুবােপে তখন দ্বিতীয় মহাসমরের উদ্যোগপর্ব চলেছে। তাই শেষ পর্যন্ত বিলেতে গিয়ে ১১৬ আমরা যে সংস্কৃতির কার্বন-কপি করছিলুম তার মূল দলিলটা আর দেখে আসা হয়নি। গল্পের ভূমিকা এই পর্যন্ত। ; নিজে অমন উগ্র বিলিতিয়ানার সমর্থক হয়েও বাবা শেষ পর্যন্ত কেমন করে যে ওর সঙ্গে আমার বিয়েতে মত দিলেন সেটা আমার জীবনে একটা রহস্য হয়ে আছে। হয়ত শেষের দিকে তার রক্তের তেজ একটু শান্ত হয়ে এসেছিল, তিনি হিন্দু সংস্কৃতির দিকে ঝুকেছিলেন। তাছাড়া আরাে একটা কারণ বুঝি ছিল ; সেটা আমার ব্যারিষ্টার বাবার বৈষয়িক বুদ্ধির ওপর কম প্রভাব বিস্তার করেনি। আমার স্বামীর অর্থ ছিলাে। শুনেছিলেম আমার স্বামী ফিলজফিতে শেষ পরীক্ষা সম্মানের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ছেলেবেলা থেকে ফিলজফি বলে শাস্ত্রের নামটুকুই মাত্র জানা ছিল, ও নিয়ে কখনাে নাড়া-চাড়া করিনি। অন্যমনস্ক হয়ে দু’মিনিট বসে থাকলে এক মেসোমশাই যখন বলতেন, খুকু এক-মনে কী ভাবছে দেখ, ও ফিলজফার হবে,তখন ফিলজফার আখ্যাধারী এক ধরণের অসামাজিক কিম্ভুতকিমাকার জীবের কল্পনা করে হাসি পেত। আমরা পড়াশুনা করেছিলুম বটে কিন্তু সীরিয়াস কিছু না। আমাদের ইংরিজিতে বুৎপত্তি ছ’পেনি দামের থিলর পড়তে, এবং নিখুৎ ঢঙয়ে মার্কিণ চিত্রতারকাদের অনুকরণ করতে করতেই ফুরিয়ে যেতাে। দাদার একটু কল-কারখানার দিকে ঝোঁক ছিল। সে পরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেল। বিয়ের আসরে যাকে স্বামী বলে সমুথে এনে হাজির করা হ’ল তার চেহারা দেখেই মনে-প্রাণে জ্বলে উঠলুম। চেহারাটা এমনি তার মন্দ নয়। রঙটা বিলিতি চশমাপরা চোখে হয়ত তেমন ফস ঠেকল , কিন্তু তাতে উজ্জ্বল আভা আছে। কিন্তু গায়ের রঙ যা স্বাভাবিক সেইটেই মানুষের কাছে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জাহির করতে হবে কেন, একটু প্রসাধনে তাকে উজ্জ্বলতর করে তুলতে আপত্তি কী, অন্ততঃ ১১৭ বিয়ের রাতে? সব চেয়ে আশ্চর্য তার পােক। খদ্দরের পাঞ্জাবি, মায় উড়নীটা পর্যন্ত খদ্দরের। তাছাড়া চুলেরই বা কী ছিরি! আগা- গােড়া সমান করে ছটা, মাঝখানে ছােট একটা সীথি। পুরুষ-মানুষের ব্যাকব্রাশ ছাড়া অন্য কোন রকম করে আঁচড়ানাে চুল আমার পছন্দ হত না । শুভদৃষ্টির সময় ওর চোখে কী ছিল জানি না, কিন্তু আমি পলকেই বুঝে নিয়েছিলাম ঠিক রাজঘােটক আমাদের হ’ল না, দুটো জীবনকে মিল খাওয়াতে অনেক সংঘর্ষ, অনেক বিরােধের সম্মুখীন হতে হবে। বাসর-ঘরে সামান্য পরিচয় হ’ল। সারা দিনের পর শরীর ক্লান্তিতে জড়িয়ে আসছিল। তবু ছিল অদম্য কৌতূহল, প্রাণপণ চেষ্টায় জেগে ছিলাম। হঠাৎ আমার হাতে কার যেন করস্পর্শ অনুভব করলাম। পাশে শায়িত ব্যক্তিটির ওপর একে তাে বিরাগের অবধি ছিল না, তাতে তাঁর এই অনধিকার-চর্চায় জ্বলে উঠলাম। উনি আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করলেন, তােমার নাম কী। ন্যাকামিটা আরাে যেন অসহ্য ঠেকল। বললুম, জানেন না না কি! এরকম জবাব হয়ত প্রত্যাশা করেননি। এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে একটু হাসলেন। বললেন, জানি। বললেন, জানি। তবু জিজ্ঞাসা করতে হয়। আর কী ভাবেই বা আলাপ শুরু করতে পারতাম ? বললাম, আমার নাম উমিলা। ওঃ! উনি বললেন। একটু থেমে ফের বললেন, ও-ভাবে নাম বলতে নেই, নামের আগে একটা শ্ৰী পরে একটা দেবী বলাই নিয়ম। নিয়ম নিয়ম। লােকটার এই গায়ে-পড়া গুরুমশাইগিরিতে চটে গেলুম। এই লােকটা নিয়মের বাইরে কিছু জানে না, না কি। প্রাত্যহিক বিবরণ আর দেব না, এটুকু উল্লেখ করলেই বােধ করি যথেষ্ট হবে যে স্বামীর সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে যে সম্পর্কের সুত্রপাত হয়েছিল, পরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
১১৮ দু’-একটা দৃষ্টান্ত দিই। আমার শ্বশুরবাড়ীতে কোন বিলিতি খানার রেওয়াজ ছিল না। আমার আবার ভােরে বিছানায় শুয়ে চা খাবার অভ্যাস। কদিন অপেক্ষা করলুম। শেষে নিজে একদিন ঝিকে দিয়ে বাজার থেকে কিছু ভালাে চা, চিনি আর জমানাে দুধ নিয়ে এলুম। স্বামী খুব ভােরে উঠে ব্যায়াম করতেন। তার পর পাশে পড়বার ঘরে গিয়ে বই, কাগজ ইত্যাদি পড়তেন। ইচ্ছে ছিল, ওঁকে অবাক করে দেবাে। উনি উঠে যেতেই সে দিন নিজে উঠে ভালাে করে দু’পেয়ালা চা করলুম। সেই সঙ্গে বাপের বাড়ী থেকে আনা বিলিতি বিস্কুটের টিন থেকে খান-কয়েক বিস্কুট বেরুল। পা টিপে টিপে ওঁর পড়বার ঘরের দরােজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেছি। উনি পড়ায় অন্যমনস্ক ছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, ওঃ, বােসাে। তারপর আমার হাতে চা আর বিস্কুটগুলাের দিকে তাকিয়ে বললেন, ওগুলাে কী। বললাম, চা। আমি নিজে করে এনেছি। আমরা দুজনে এখানে বসে খাবো। উনি এক মিনিট স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তার পর ঠাণ্ডা নিরুত্তপ্ত কণ্ঠে বললেন, তুমি তাে জানাে আমি সকালে মাত্র আদা-ছােলা আর গরম দুধ খাই। চা আমি কখনােই পাইনে। গভীর লজ্জায়, ক্ষোভে, অপমানে আমার হাতে চায়ের পেয়ালা দু’টো থরথর করে কাপছিল। একটু পরে উনি আবার বললেন, তবে তুমি খেতে পারে। তােমার রুচির ওপর জুলুম করব, বিয়ের মন্ত্রে এমন কোন কথা ছিল না। সেই অপমানের পর তিন দিন ওঁর সঙ্গে কোন কথা বলিনি। স্বহস্তরচিত চায়ের পেয়ালা অসীম ঘৃণায় দূরে সরিয়ে রেখেছিলুম। কিন্তু অপমানের তখনাে কিছু বাকি ছিল। বাকি ছিল। কিছু দিন লক্ষ্য করেছিলুম, ওর কোন রুমাল নেই। অভ্যানুযায়ী নিজে দোকানে •
গিয়ে ভালাে বিলিতি সিল্ক কিছু সংগ্রহ করে নিয়ে এলুম। দিন-কতক
গােপনে পরিশ্রম করে তাতে এমব্রয়ডারি করা গােটাকতক ফুলও
একে দিয়েছিলুম।
আগেই বলে রাখি, এ উপহারও প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। উনি
কোন বিলিতি জিনিষ ব্যবহার করেন না, সেটা আমার আদৌ খেয়াল
ছিল না। সিল্কের রুমালগুলো দিতেই কিছু বললেন না।
আলমারি খুলে এক ডজন খদ্দরের রুমাল বার করলেন। ওঁর এক
পিসতুতাে বােনকে দিয়ে তৈরি করে নিয়েছিলেন।
প্রচণ্ড ক্ষোভে সমস্ত অন্তরটা বিষিয়ে উঠেছিল। অস্থির একটা
জলায় উন্মত্ত হয়ে কখনো ওঁকে জয় করতে বিবিধ পাশ্চাত্য ছলা-কলার
আশ্রয় নিতে গিয়েছি। কিন্তু প্রাচ্যদেশীয় এই মানুষটির নিষ্ঠার বর্ষে
প্রতিহত হয়ে আমার তুণীরের সব ক’টি শর ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে।
বুঝে নিয়েছিলেম সমান্তর দু’টি রেলপথে বিপরীতগামী দু’টি গাড়ীর
মতাে আমরা এক জায়গায় এসে মিলেছি মাত্র। পথ আমাদের
এক নয়।
ইতিমধ্যে বাবা মারা গিয়েছিলেন। দাদা একদিন এলেন। চিরকাল
আদুরে ছেলে হলে কী হয়, দাদার দৃষ্টি খুব প্রখর ছিল। দু’মিনিট
আমার সঙ্গে, দু’মিনিট আমার স্বামীর সঙ্গে কথা বলে, একবার দু'জনের
বিভিন্ন পদ্ধতির বেশভূষার দিকে চোখ বুলিয়ে সমন্ত অবস্থাটা বুঝে
নিলেন।
আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন, তুই আমার সঙ্গে চল।
মনের অবস্থা তখন কী ছিল বলতে পারিনে, বললাম, তাই চলে
দাদা।
দাদা বললেন, যাই ওকে একবার বলে আসি। আমি বললাম,
পাড়াও দাদা। যা বলবার আমিই বলব।
উনি চুপ করে ঘরের মধ্যে বসেছিলেন। গিয়ে আমি বললাম, আমি
চলে যাচ্ছি।
উনি বুঝলেন কি না জানি না, কথাটা শুনে চমকে উঠলেন। বললেন, চলে যাচ্ছে, সে কি, কোথায় ? কঠোর একটা জবাব দেবে ইচ্ছে করেছিলাম, কিন্তু সেই মুহূর্তে কেমন একটা মায়া হল। খানিক পরে উনিই শান্ত কণ্ঠে বললেন, আচ্ছ। যাও। আমার শিক্ষা এবং রুচি দিয়ে তােমাকে জয় করতে পারিনি, সে আমি জানতাম। বাপের বাড়ী এলাম। সেই পুরনো আসবাব, চেনা আবহাওয়া, মাছ যেন আবার জলে পড়ল। দিনকতক খুব মনের সুখে বেড়িয়ে, সিনেমা দেখে, পিকনিক করে কাটলাে। অতিরিক্ত উত্তেজনার পর অবসাদ আসতেই এক দিন আবিষ্কার করলুম, এ বাড়ীর আবহাওয়ায় কোথায় যেন পরিবর্তন ঘটেছে। বাবা অবশ্য নেই, কিন্তু এইটেই একমাত্র কারণ নয়। সকলের অগােচরে কোথায় যেন দুনিরীক্ষ্য পরিবর্তনের ধূলাে জমছিল। ক্রমশঃই বুঝতে পারছিলুম, যত হৈ-চৈ করি না কেন, পুরনাে কুমারী-জীবনে আমি আর কোন দিন ফিরে যেতে পারবাে না। ছােট বােন আর দাদার মেয়েরা মিলে এম্পায়ারে রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যের রূপ দেবে ঠিক করেছিল, কিন্তু সেখানে আমার ডাক পড়েনি। না পরিকল্পনায়, না আয়ােজনে, না মহলায়। জানতে পারলাম, ওদের আয়ােজন যখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ছােট বােনকে ডেকে বললাম, আমাকে কেন বললি না, আমিও তােদর সাহায্য করতে পারতাম। ছােট বােন অনায়াসে বগলে, বাঃ রে, এ তাে ঘােটরা অর্থাৎ কুমারী মিলে করছি। তুমি এর মধ্যে কেন আসবে দিদি। আঘাত পেলাম। আমার বিবাহিত জীবনকে আমি অস্বীকার করলে কী হয়, এরা ভুলতে পারে না। সীমন্তের সিন্দুরের রেখা আমার অতীত আর বর্তমানের মধ্যে একটা দুর্ল অন্তরাল রচনা করে রেখেছে।
বাড়ীতে আরাে অনেক ছেলেরা আসত। বােনেদের, ভাইঝিদের তার বেড়াতে নিয়ে যেতো, গান শুনতো, শপিংয়ে সাহায্য করত, ড্রয়িংরুমে বসে হাসি গল্প ভােসামােদের ফোয়ার খুলে দিত। কিন্তু লক্ষ্য করেছি, আমাকে দেখলেই সবাই কেমন স্তব্ধ হয়ে যায়। আমাকে লক্ষ্যই করে না, আমার সঙ্গে কথা বলতে গেলে উঠে দাড়ায়, সম্রমের সঙ্গে দু'-একটা কথা বলে, তারপর ছটফট করে সরে যাবার জন্যে, পাশের ঘরে যেখানে ছােট বােন পিয়ানােয় সঙ্গীতের আতিথ্য খুলে দিয়েছে। শুধু ছােটরাই নয়। বৌদি সারা দিন সংসারের তদারক করতেন। কিন্তু আমাকে কিছু ছুতে দিতেন না। বলতেন কাজ নেই ভাই তােমার কাজ করে। দু’দিনের জন্যে এসেছ হেসে-খেলে জুড়িয়ে যাও। ইচ্ছে হত চীৎকার করে বৌদিকে বলি, দু’দিনের জন্যে আসিনি। আমি অতীতকে মুছে দিয়ে বর্তমানের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক রচনা করতে চাই। তােমরা ভুলে যাও যে আমি বিবাহিত। বাপের বাড়ীর এই অলক্ষ্য অথচ অনুভবনীয় অবহেলা আমাকে আরেক জনের দিকে ধীরে ধীরে ঠেলে দিচ্ছিল। তিনি ঠাকুমা। তিনি তখনাে জীবিত ছিলেন, কিন্তু অস্তিত্ব আমরা প্রায় ভুলেই ছিলাম। অনেক দিন অন্য সব ঘাট থেকে ধাক্কা খেয়ে এসে দেখেছি ঠাকুমা পূজোর থালায় নৈবেদ্য সাজাচ্ছেন। ধূপে ধূনােয় সুরভিত, মৃদু ঘৃতদীপে অালােকিত সেই কক্ষের সামনে এসে ভেতরে ঢুকতে আর পা সরত না। কেমন একটা রহস্যময় রাজ্যের সীমান্তে এসে চেতনা যেন অবসন্ন হয়ে পড়ত। ঠাকুমা এসে আমাকে ডেকে নিতেন। বলতেন, চান করে এসেছিস তাে। কাপড় ছেড়েছিস ? ঠাকুমার কাছেই আমার নতুন জীবনের দীক্ষা হল। ঠাকুর-দেবতায় কখনােই ভালাে করে বিশ্বাস করিনি, এখনাে করি না। কিন্তু মৃন্ময় মূর্তির অর্চনার মধ্য দিয়ে আমার ব্যর্থ জীবনের গ্লানি যে অন্ততঃ মােজ ১২. কয়েক ঘণ্টার জন্যেও ভুলে থাকতে পারতাম, সে-কথা আজ কতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করি। তাছাড়া ঠাকুমার কাছে বই ছিল। সে-সব বইয়ের নাম ইতিপূর্বে কখনাে শুনিনি, চোখে দেখা দূরে থাক। মাঝে-মাঝে খেয়ালের বশে সে-সব বইয়ের পাতা ওল্টাতে আরম্ভ করলাম। শেষে সে-সব বই রীতিমত পড়তেও শুরু করলাম। দুরূহ শাস্ত্রের যে সব জায়গা দুর্বোধ্য মনে হত, ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করতাম, তিনি বুঝিয়ে দিতেন। ঠাকুমা কৌশলে আমাকে কয়েক বার স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করেছেন, আমি সুকৌশলে সােজাসুজি উত্তর এড়িয়ে গিয়েছি। শেষে একদিন চেপে ধরাতে সব খুলে বলতে হল। আমার বিবাহিত জীবনের ব্যর্থতার সমস্ত ইতিহাস ঠাকুমাকে বললাম। বললাম, রুচিবিরােধের কাহিনী, ওঁর প্রাচীন-পন্থী নিষ্ঠা, স্বাদেশিক বেশভূষা, আমাকে নিঃশব্দ অবহেলা। শুনে ঠাকুমা বললেন, ভুল করেছিস। খাটী জিনিষ ছেড়ে তুই মিথ্যের পেছনে ছুটেছিস। আমিও তাই ভাবছিলাম। তবু একবার অভিমানভরে বললাম, কিন্তু তিনিও তাে আমার খোঁজ করেননি ঠাকুমা। ঠাকুমা বললেন, সেটা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তার একটা স্বতন্ত্র শিক্ষা, রুচির বৈশিষ্ট্য, উচু আদর্শ আছে। তুই তো তার আদর্শের চেয়ে বড়ো না। এর পরের কাহিনী সংক্ষিপ্ত। দাদাকে বললাম, আমি ফিরে যাবাে। দাদা বিস্মিত হলেন, কিন্তু আমার পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন, বাধা দিলেন না। মনে আছে, সেদিন শাদা খদ্দরের লাল-পেড়ে শাড়ি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছি ; কপালে বড়ো করে সিদূরের ফোটা একে ভেবেছি, এই দিনে বিলিতির খােলস বসে আমার জন্মান্তর ঘটলাে। উমেশে •• স্বামীকে নমস্কার জানিয়ে মনে মনে বলেছি, এত দিনে তােমার কাছে গিয়ে দাড়াবার যােগ্যতা অর্জন করলুম। সেটা আগষ্ট-আন্দোলনের সময়। মহাত্মা গান্ধী ও নেতৃবৃন্দের গ্রেপ্তারের প্রতিক্রিয়ায় দেশ অসহিষ্ণু, চঞ্চল। আমি জানতুম, আমার স্বামী কংগ্রেসসেবী, আমি জানতুম, এ আন্দোলনে তিনি স্থির থাকতে পারবেন না, তাকেও ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। স্থির করেছিলুম, আমিও দূরে থাকবে না। স্বদেশসেবায় স্বামীর পাশে গিয়ে দাড়াবে। বিকেল বেলা শ্বশুর-বাড়ী ফিরলুম। উনি কাজে বেরিয়েছেন, তখনো ফেরেননি। চুপ করে তার ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। ঘরখানা দেখে এবারে অবাক লাগলাে, পুরনাে আসবাব কিছু নেই। হালকা, শস্তা হালফ্যাসানের খানকয়েক চেয়ার-টেবিলে ঘরটা বিলিতি- রীতিতে সাজানাে। দেয়ালের ছবি থেকে টেবিলের সস্তা ইংরিজি পত্রিকাগুলােয় একটা বিজাতীয় রুচি। একটু পরে জুতাের মস্ শব্দ করে নিখুৎ টাই-কলা-ট্রাউজার পরা ভদ্রলােক শিষ দিতে দিতে ঘরে ঢুকলেন, তিনি কে? বলতে সঙ্কেচ বােধ করছি, তিনিই আমার স্বামী। আমাকে দেখে ভদ্রলােক মুহূর্তকাল স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন, তার পর বললেন, তুমি ? একদম চেনাই যাচ্ছিল না যে। ভারি বদলে গেছ। জামা-কাপড় ছেড়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে প্রচুর ধূম উদগীরণ করে বললেন,—তার পর, খবর কী? চলে যাবে, না থাকতে এসেছ। প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বললাম,আমার ভয় ছিল, তােমাকে দেখতে পাবাে না। হয়ত বা জেলে গেছ। কংগ্রেস আন্দোলনে সিগারেটে পরিপূর্ণ একটা টান দিয়ে স্বামী বললেন, টু হেল উইথ কংগ্রেস। ও-সব অনেক কাল ছেড়ে দিয়েছি। একটু পরে আস্তে আস্তে বললেন,-তুমি বােধ হয় একটু অবাক হচ্ছ। স্বাভাবিক, খুব স্বাভাবিক। কিন্তু দেখাে, সময়ের সঙ্গে চলতে হয়। পুরােনাে বামুনে চাল-চলনে দেখলাম, নিজের স্ত্রীকেই খুসি রাখা যায় না, অন্তে পরে কা ১২ কথা। তুমি যে-দিন ছেড়ে গেলে, সে-দিনই কথাটা মর্মে মর্মে বুঝেছি। নিজের ওপর ধিক্কার এসেছে। সেই থেকে প্রাণপণ সাধনায় নিজেকে নতুন করে গড়তে চেষ্টা করেছি, যাতে তােমাদের জগতের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারি। কত দূর কৃতকার্য হয়েছি, সেটা তুমি বিচার করাে। বলতে বলতে স্বামী হাঁটু ভেঙে বসবার ভঙ্গিতে আমার সমুখে আনত হয়ে একখানি হাত স্পর্শ করলেন। আস্তে আস্তে হাতখানা ছাড়িয়ে নিলাম। খদ্দরের শাড়িটা সর্বাঙ্গে যেন একটা পরিহাসের মত জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছিল। এই দ্বিতীয় বার আমি আর আমার স্বামী দু’পানি রেলগাড়ীর মত একই জায়গায় এসে পৌচেছি। এবারেও কিন্তু বিপরীতমুখী, সমান্তর পথে।
ছাপ টেলিফোনের রিসিভারটা সশব্দে রেখে দিয়ে ডাক্তার বললেন, আমাকে এখুনি বেরুতে হবে। বিস্মিত হয়ে সবাই বললাম, সে কি ! বিস্মিত হবারই কথা। যুদ্ধশেষে ছােটনাগপুরের ছােট এই শহরটিতে জীবনযাত্রার কোন বৈচিত্র্য ছিল না। সৈন্যরা একে একে ছাউনি তুলছে। কনট্রাক্ট বন্ধ। কাজের মধ্যে সন্ধ্যার পর ক্লাবে এসে জোটা, সিগারেটের ধোঁয়ায় কুণ্ডলী পাকানাে। নতুন নতুন ফরমূলার ককটেল তৈরী, উচু ষ্টেকে ব্রিজ খেলা। ডাক্তার ছিলেন আমার পার্টনার। বললাম, অন্ততঃ ‘রাবারটা ক্লোজ করি, আসুন। -মাথা খারাপ হয়েছে আপনার। এখুনি যেতে হবে। মার্ডার কেস। -মার্ডার! শীতের দিনে ক্লাবের নিরাপদ আরামে বসে থেকেও উত্তেজনা বােধ করলাম। কোথায় ? ককটেলের অবশেষটুকু নিঃশেষ করতে করতে ডাক্তার যে পাড়ার নাম করলেন, সেটা শহরের উপকণ্ঠে কুখ্যাত ফিরিঙ্গি মহল। ব্যাগটা গুছিয়ে নিতে নিতে ডাক্তার বললেন, চলুন না আপনিও। বেশ ইন্টারেষ্টিং হবে। আপত্তি ছিল না; ক্লাবে বসে কুঁড়েমির চেয়ে এ এ্যাডভেঞ্চার অনেক ভাল। বললুম, চলুন। নির্দিষ্ট বাড়ী খুজতে বিশেষ অসুবিধে হ’ল না। ইতিমধ্যেই বাইরে ছােটখাটো ভীড় জমে গিয়েছিল। পুলিশও এসেছে দেখলাম। ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র তচনচ। ঘরের কোনে ভালাভাঙ্গা একটা বাক্স। আর মাঝখানে একটি ফিরিঙ্গি মেয়ে রক্তস্রোতের মধ্যে শায়িত।
তবু প্রাথমিক হির নৈশবাস আততায়ীর সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তির সাক্ষী। প্রায় নগ্ন দেহের নানা স্থানে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন। ডাক্তারের করবার কিছুই ছিল না। ইতিপূর্বেই হয়ে গিয়েছিল। খানিকটা পরীক্ষা করতে হ’ল। দু’মিনিট নাড়াচাড়া করে ডাক্তার উঠে দাঁড়ালেন। পুলিশ ইন্সপেক্টরকে একান্তে ডেকে নিয়ে কি একটু আলাপ করলেন ; বােধ হয় মৃতদেহ মর্গে নিয়ে যাওয়া সম্পর্কে। সমস্ত ঘরে বিশৃঙ্খল অবস্থা, বােঝা যায়, অর্থলােভই এই হত্যাকাণ্ডের মূলে। ডাক্তারের সঙ্গে বেরিয়ে এসে যখন গাড়িতে উঠে বসলাম তখন প্রায় বারোটা। শীতের রাত্রি ; ঝাউগাছের মাথায় কুয়াশা নেমে এসেছে। ফিরিঙ্গি পাড়ায় কলরব তখনাে থামেনি। এখনাে বাতায়নপথে তীব্র আলােকচ্ছটার সঙ্গে প্রমত্ত সুরলহরী ভেসে আসছে ; দুমদাম দুপদাপ শ, যৌথ নৃত্যের ইঙ্গিত। মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে-যাওয়া কুকুরের বিরক্ত চীৎকার। ডাক্তার একমনে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। একাগ্র দৃষ্টি সম্মুখের দিকে নিবন্ধ। পীচের পথে অস্পষ্ট আলাে। ডাক্তারকে একটু অন্যমনস্ক মনে হল। ভেবেছিলাম, আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে ডাক্তার চলে যাবেন। কিন্তু ক্লাবের রাস্তায় ফের গাড়ি ঘুরতেই বিস্মিত হয়ে জিজাসা করলাম, এবার ক্লাবে ? -ক্ষতি কী? ডাক্তার বললেন, চলুন না। কাজ তাে নেই। আমার মনটা একটু চঞ্চল হয়েছে। একটু অবাক লাগল। ডাক্তার মানুষ, এ রকম ঘটনা তাে কতই দেখছেন। ওদের মনও ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায়, আমার এই রকম ধারণা ছিল। তাছাড়া এই হত্যাকাণ্ডেও বিস্ময়কর কিছু নেই। এই ধরণের স্ত্রীলােকদের জীবনের এমনতরাে বীভৎস উপসংহারের অসংখ্য ঘটনা জানি।
ক্লাবে বসে ডাক্তার নিপুণহাতে আবার কয়েকটি উত্তেজক পানীয়ের উপাদেয় সংমিশ্রণ ঘটালেন। তারপর সিগারেটের কুণ্ডলীগুলােকে খােলা জানালা দিয়ে একটার পর একটা পাঠাতে লাগলেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না সেগুলি হাওয়ায় বিপর্যস্ত হ’ল, সেদিকে নিমেষহীন চেয়ে বইলেন। হাতের সিগারেটটার যদিও আধখানা বাকি ছিল, সেটা ফেলে দিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবেই আরেকটা ধরালেন। তারপর নিরাসক্তভাবে পানপাত্রে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, মার্থা জনষ্টোনকে আমি চিনতাম। কী করে চিনলেন, সে প্রশ্ন আর করলাম না। চিকিৎসাসুত্রে আক্তারদের এমন অসংখ্য মানুষকে চেনবার সুযােগ হয়। -মার্থা জষ্টোন কে? -আজ যে মেয়েটি খুন হ’ল। ডাক্তার বললেন, আজ নয়, এখানেও নয়। আমি ওকে ছােটবেলা থেকেই চিনি। ওর বয়স তখন পােনেরাে যােল হবে, আমার তেরচৌদ্দ। এইটুকু বলে ডাক্তার আবার পানপাত্র তুলে নিয়ে আমার দিকে চেয়ে একটু হাসলেন। -ভয় নেই। শীতের রাত্রে আপনাকে একলা পেয়ে পুরনাে একটা প্রেমের গল্প নিজের বলে চালিয়ে দেবাে, আমি সে রকম লােক নই। অস্বীকার করে লাভ নেই, আমার অস্বস্তি লাগছিল। সমস্ত ক্লাবটাতে আমরা দু’জন ছাড়া কেউ নেই। দরজার পাশে ক্লাবের চাকর লছমন ঝিমুচ্ছে ; আমরা উঠলেই আলো নিবিয়ে দরজা বন্ধ করে ভে যাবে। ডাক্তার বললেন, আমি ছােটবেলা যেখানে মানুষ, তার পাশেই একটা মিশনারি কম্পাউণ্ড ছিল। আপনাদের একথা অনেকবার অনেক প্রসঙ্গে বলেছি। এখনো মনে আছে, রবিবার হলেই আমাদের দল বেঁধে সাণ্ডে স্কুলে যাওয়া। খৃষ্ট মাহাত্ম শুনতে ততটা নয়, স্কুলের শেষে লন্সে বিস্কুট প্রসাদ বিতরণের মাহাত্মে যতটা। মেম সাহেব নিজ হাতে সেগুলাে বিতরণ করতেন। ;
১২৮ একবার এক নতুন পাত্রী সেখানে বদলি হয়ে এলেন। নাম উইলিয়ম জনষ্টোন। এক ছেলে দুই মেয়ে-পীটর, মেরি, মার্থা। আজ এই শহরের বিশ্রী একটা পাড়ায় যে গণিকার জীবনের যবনিকা পড়ল, সে যে এক ধর্মভীরু খৃষ্টীয় ধর্মযাজকের মেয়ে একথা শুনে চমকে যাবেন না। মার্থা যখন এল, তখন ও সবে ফুটছে। নারীর রূপে আকৃষ্ট হবার বয়স সেটা আমার নয়। তবু অবচেতন আকর্ষণ যে একটা অনুভব করতাম, সেটা অস্বীকার করে লাভ নেই। মনে আছে, সাণ্ডে ইস্কুলের পর যখন প্রার্থনা হত, তখন মাঝে মাঝে সবার অলক্ষিতে চোখ মেলে মার্থার দিকে চুরি করে চেয়েছি। নীল একটা ফিতে দিয়ে বাঁধা ওর ঢেউভােলা সােনালী চুল, রেশমি ফ্রকের নীচে পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যের আভাস, এমন কি জানু অবধি নাতিস্তুল, নাতিশ পা দুটির দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে আমার সারা শরীরে একটা শিহরণ বয়ে গেছে । —তখন আপনার বয়স তত মােটে তের-চৌদ্দ ? আমি জিজ্ঞাসা করলাম। আর একটা সিগারেট ধরিয়ে ডাক্তার বললেন, বয়সের তুলনায় আমি কিছু বেশিই পাকা ছিলাম। বাইরে তখন দস্তুর মত হিম পড়ছিল। ডাক্তার উঠে গিয়ে কবাট- গুলাে টেনে দিয়ে এলেন। তারপর ফের বলতে শুরু করলেন-হ্যা, মিছিমিছি ভূমিকা বাড়াব না। ডাক্তারের মুখে কবিত্ব মানায়ও না। আমি মার্থার প্রেমে পড়লাম। কিন্তু মুসকিল হ’ল এই, একে বয়স অত্যন্ত অল্প, তাতে আবার ইংরেজী ভাষাটা মুখে ততটা সহজে জোগাত না। মার্থার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে আস্তে আস্তে চলে এসেছি, এমন ব্যাপার অনেকবারই ঘটেছে। হয়তাে মুখের ভাষা লাগত না, চোখের ভাষাতে এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় কাজ হয়। কিন্তু মার্থা আরেক জনের প্রেমে পড়ে গেল। সেবার গরমের ছুটিতে আমার পিসতুতো ভাই কলকাতা থেকে ওখানে বেড়াতে গেলেন। তিনি তখন কলেজে কোন্ ইয়ারে পড়তেন , হ্যা।
ঠিক মনে নেই। কেন না, একই ইয়ারে কয়েক বছর ধরে নখ নতন্থো হয়ে থাকার অভ্যাস তার ছিল। তা হ'লেও ভদ্রলােকের কতকগুলো গুণ ছিল; তিনি ভালাে গান গাইতে এবং বাঁশী বাজাতে পারতেন; দেখতে সুপুরুষ ছিলেন; ইংরিজী ভাষাটার কথারূপ সম্পর্কে তার বিলক্ষণ ধারণা ছিল। এক কথায় তিনি স্মার্ট তত ছিলেনই, উপরন্তু মেয়েরা যা চায়, তাও ছিলেন। একদিন আমাদের সঙ্গে পাত্রী সাহেবের বাড়ী বেড়াতে গিয়ে মার্থাকে দেখে এলেন। দ্বিতীয় দিন একাই গেলেন। আগেই বলেছি, জনপ্রিয় হবার আশ্চর্য ক্ষমতা তার ছিল। তৃতীয় দিন বাসায় এসে বললেন, সদলে পিকনিক করবার একটা আয়ােজন তিনি করে এসেছেন। মাঝখানে রবিবার ছিল। তিনি প্রার্থনা সভাতেও গেলেন। প্রার্থনা চলেছে, আমিও যথারীতি চোখ মেলে মার্থার দিকে মাঝে মাঝে চেয়ে দেখছি ; একবার দেখি মার্থা ঠিক আমার পাশে উপবিষ্ট শ্যামলদার দিকে তাকিয়ে আছে। আর শ্যামলাও যে ঠিক তন্ময় হয়ে প্রার্থনা করছেন না, সেটুকু বােঝবার মত বুদ্ধি আমার হয়েছে। কেমন বি লাগল। একে ‘জেলসি’ বলতে চান, বলুন। পিকনিকের দিন শ্যামল বাশী বাজালেন। হয়ত খুব চমংকারই হয়েছিল। কিন্তু আমি তাে বাঁশী শুনছিলুম না। আমি দেখছিলুম, মার্থা তখন থেকে অপলক চোখে শ্যামলদার দিকে চেয়ে রয়েছে। * চোখে মুগ্ধ সর্পিনীয় দৃষ্টি। এর পরের ঘটনাগুলাে অত্যন্ত দ্রুত ঘটে গেল। শ্যামলা আর মার্থাকে প্রায়ই এক সঙ্গে দেখা যেতে লাগল। দু’একজনের কাছে ধরাও পড়ে গেল ওরা। কানাকানি হতে লাগল-পাত্রী সাহেবের মেয়ে অমুক একটা বাঙালী ছেলের সঙ্গে প্রেমে পড়েছে। পাত্রী সাহেব প্রথমটা খেয়াল করেন নি; খেয়াল হ’তে শ্যামলদাকে ডেকে পাঠালেন। ডেকে রুদ্ধকক্ষে তিনি যে হিতউপদেশমূলক বক্তৃতা ১০ দিলেন, তার সারমর্ম এই : ‘যুবক, আমার কোন বর্ণবিচার নেই। কেবল তুমি খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত হও। কেননা, যীশুকে যে ত্রাণকর্তা বলে মেনেছে, একমাত্র তার হাতেই আমার কন্যা মার্থাকে সম্প্রদান করতে পারি।” শ্যামলদা জনষ্টোনকে কি প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলেন জানি না। পরদিন সকালে উঠে তাকে আর আমাদের বাসায় দেখা গেল না। মার্থাকেও না। এর অর্থ সুস্পষ্ট। পুলিশে খবর দিলে হয়ত একটা কিনারা হত; কিন্তু কেলেঙ্কারির ভয় সাহেবদেরও থাকে। পাদ্রী সাহেব এ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাইলেন না। হয়ত নিয়ত নিয়মিত তিনি ক্রুশবিদ্ধ যীশুখৃষ্টের ছবির দিকে চেয়ে প্রার্থনা করেছেন, তার বিপথ- গামিনী মেয়ে যদি কখনও ফিরে আসে, যীশু যেন তার পাপের ভার গ্রহণ করেন। কিন্তু মার্থা আর ফিরে আসেনি। কিছুদিন বাদে জনষ্টোন সাহেবও বদলি হয়ে চলে গেলেন। আস্তে আস্তে এ ঘটনার স্মৃতিও আমার মনে ক্ষীণ হতে হতে প্রায় মুছে গেল। প্রায় তিন বছর পরে—আমি তখন ম্যাট্রিক পাশ করেছি—খড়গপুর ষ্টেশনে মার্থাকে দেখলাম। মার্থাই তাে। প্রথমটা সংশয় ছিল, বিস্ময় ছিল,অকস্মাৎ প্রিয়জনকে দেখার আনন্দ ছিল। মার্থা ছাড়া আর কার অমন সােনালী চুল, নীল চোখে সুদুর, স্নিগ্ধ দৃষ্টি, কবিতার ষতির মত নিয়মিত চরণপাত ? আমাকে দেখে মার্থা লজ্জিত হ’ল কিনা জানি না, মুখে খুব আদর দেখাল। নিভৃতে আলাপ করবার জন্য চায়ের দোকানে গিয়ে বসলুম। হ্যা, মার্থা শ্যামলের সঙ্গেই আছে। এখানকার রেলওয়ে ওয়ার্কশপে কাজ করে শ্যামল। সুখী হয়েছে কিনা, সে কথা মার্থাকে আর জিজ্ঞাসা করলুম না। ওর উচ্ছসিত হাসি, প্রাণময় কথা থেকেই বােব গেল। ঠিকানা মার্থার কাছ থেকে জেনে নিয়েছিলাম। খুঁজে খুঁজে ওদের ১১ কোয়ার্টারে যখন হাজির হলাম তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। মার্থাই দরজা খুলে দিল। শুনলাম, শ্যামলা তখনাে ওয়ার্কশপ থেকে ফেরেনি। অথচ পাঁচটায় সিফট ছুটী। বােধ হয় ওভারটাইম খাটুছে, মার্থ বলল। চায়ের সরঞ্জাম ঠিক করতে করতে মার্থা বলল, তােমার দাদার জন্যেও জল নিই, কি বলাে। উনি এর ভেতর ঠিক পৌছে যাবেন। চা ঢালছে আর উৎসুক কানে রাস্তার প্রতিটি পদশব্দ শুনছে, মার্থার সেই চেহারা আমার স্পষ্ট মনে আছে। শ্যামলদা কিন্তু এল না। আমাদের দুজনকে তিন পেয়াল করে চা খেতে হল। জানালার পাশে বসে মার্থা উলের কি একটা কাজ নিয়ে বসল; আমিও কাছাকাছি বসে গল্প চালাতে লাগলুম। না, ছেলেপুলে ওদের হয়নি, মার্থা আরক্ত হয়ে বললে,তোমার শ্যামলদা ওসব ভালাে- বাসেন না। মিনিটের পর মিনিট বসে মাথার কাছে ওর যৌথ জীবনযাত্রার বিবরণ শুনলুম। মার্থা কখনো উচ্ছসিত, কখনাে ব্ৰীড়াময়ী, কখনো কুষ্টিত। পলকে পলকে মুখের রঙ বদলাচ্চে, মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলুম। এ নারীর সেই কল্যাণময়ী রূপ যা নিমেষহীন চোখে অনন্তকাল ধরে দেখেও বলা যায়, নন না তিরপিত তেল। মােটর ওপর বাপ মা আয় ছেড়ে যে মােহে মার্থা একদিন অনিশ্চিত পথে পা বাড়িয়েছিল, আজ অবধি তা এতটুকু মান হয়নি। নতুন নীড়টুকু ঘিরে ওর অনেক স্বপ্ন, অনেক কামনা, অনেক ভরসা। বক্ষণ কেটে যেতেও শ্যামলা যখন এলেন না, মার্থা চঞ্চল হয়ে উঠল। হাতের উলের কাজটাকে ফেলে একবার বলল, চলাে তােমাকে খেতে দিই। একবার বলল, আরেকটু না-হয় বােসাে, বেশ ভাে গল্প করছি। তােমার মা এখুনি আসবেন। মা এখুনি’ কেন, কখনােই এলেন না। আমাদের খাওয়া শে? হল, আরেক প্রস্থ গল্প শুরু এবং শেষ হ’ল; রাস্তার শেষ পদশব্দটিও না মিলিয়ে গেল, নির্দিষ্ট বিছানায় শুয়ে শুয়ে তখনাে নখ, মাখ জানালার পাশে বাড়ির পথের নি আলােলির কে তাকিয়ে শেষ রাতে মার্থার ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। জেগে উঠে তাকাতেই বলল, তােমার দাদা এসেছেন। কোথায় ? মাথা লেন জবাব দিল না। নিঃশব্দে ওকে অনুসরণ করে দরজার বাহিরে এসে দেখি, শরীরের অর্ধেক নর্দমায় কর্দমাক্ত, অর্ধেক চৌকাঠের ওপর, কে একজন বেহুস হয়ে পড়ে আছে। মার্থা ফিস ফিস করে বলল, তােমার দাদা। আমি একলা তুলে আনতে পারিনি। তাই তােমাকে ভেকেছি। হজনে ধরাধরি করে শ্যামলদাকে এনে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। মার্থা কাদামাখা পােষাক বদলে, মাথা ধুইয়ে বাতাস করতে লাগল। শ্যামল তখন বিজড়িত স্বরে প্রলাপ বকছেন। পরদিন কলকাতায় চলে এলাম। শুনলাম, শ্যামলার এমন প্রায়ই হয়। মার্থা মাঝে মাঝে খবর নিতে বলল। ওর জন্য মাঝে মাঝে কষ্ট হয়। আমার অন্ত কী-না করেছেন। আত্মীয়-স্বজন সব ফেলে এযে এই এখানে কারখানায় চাকরি মাদার জন্য মার্থাও যে আত্মীয়-স্বজন সবাইকে ফেলে এসেছে ওর সামনে, সেই কথাটার উল্লেখ করলাম না। কলকাতায় এসে মাঝে মাঝে মার্থার চিঠি পেতাম। “ওঁকে বড় বিষন্ন মনে হয় ; এক এক সময় উদাস হয়ে কী যেন ভাবেন।” কিম্বা, “আমি বােধ হয় ওকে সুখী করতে পারিনি। আমি যদি বাঙালী ঘরের শা শ্যামল কোন মেয়ে হতুম!” শেষে একখানা চিঠি পেলাম শ্যামলদা কী একটা ট্রেণিং কীমে শিক্ষানবিশ হয়ে বিলেত গেছেন। ফিরতে বছর খানেক লাগবে। মার্থা আনলেই সম্মতি দিয়েছিল; “আমি তার পথে বাধা হতে চাই •• । আমি জানি তিনি ফিরে আসবেনই। আমি তার প্রতীক্ষায় থাকব।” আরেক পাত্র পানীয় ঢেলে নিয়ে ডাক্তার তার দ্বিতীয় প্যাকেটের চতুর্থ সিগারেট ধরিয়ে ইসারায় আমাকেও আমন্ত্রণ করলেন। আমি বললাম, খাবনা। তারপর কী হ’ল বসুন। ডাক্তার সুরু করলেন, কিন্তু প্রতীক্ষায় থাকা যে কত শক্ত সেটা মার্থ। দ্বিতীয় মাসের প্রথম সপ্তাহেই অনুভব করল, যখন সরকারী কোয়ার্টার ছেড়ে ওকে রাস্তায় দাড়াতে হ’ল। পুজিও বড় বেশী ছিল । স্থানীয় খৃষ্টানেরা কানাঘুষায় ওর ইতিহাস কতকটা জানত। তার ওকে স্থান দিলে না। কলকাতায় এসে মার্থা একটা ছােট বাসা করল। আমিও কলেজ, হােষ্টেলের খরচ বাঁচিয়ে ওকে সাধ্যমত সাহায্য করতুম। কিন্তু ভদ্রভাবে বাঁচতে হলে একটি মেয়ের যা লাগে তার তুলনায় সে আর কতটুকু? চাকরির চেষ্টা করেও সুবিধে হলনা। শেষে যখন তিন মাসের ঘরভাড়া বাকি, চারধারে দেন, তখন একদিন মাথার ঘরের সুমুখে গিয়ে দেখি, তালা ঝুলছে। শেষ চুমুক খেয়ে ডাক্তার রুমালে মুখ মুছলেন,-না আত্মহত্যা সে করেনি। করলে একটা উৎকৃষ্ট মরালযুক্ত কাহিনী হত, কিন্তু আজকের ঘটনা ঘটত না। এ অবস্থায় অভিভাবকহীন মেয়েদের জীবনে নানারকম প্রলােভন এসে থাকে। মাথায়ও এসেছিল। প্রথমটা হৃক্ষেপ করে কিন্তু শেষে প্রলােভনই জয়ী হ’ল। মার্থা দেহের চেয়ে প্রাণকে বেশী মূল্য দিলে। অর্থাৎ দেহ দান করলে। এ-রকম ঘটনায় বিস্ময়ের কিছু নেই। মার্থাকে আমি ভালবাসতাম, শ্রদ্ধা করতাম। তবু ওর এই আচরণ আমি স্বাভাবিক বলেই মেনে নিলুম। কিন্তু যেটা সেদিন বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছিল, সেটা আজ আপনাকে বলি। অসংখ্য ফিরিঙ্গি অনুরাগী খাতেও মাথা বার সঙ্গে নতুন করে ঘর বাধল, সে ওর বাসায়ই বাড়িওয়ালা, এবং সে বাঙালি। নি।
১৩ বইরে ঝাউগাছে শোঁ-শোঁ হাওয়া বইছে, শুনছি। ক্লাবের বেয়ারাটা ক্লান্ত হয়ে কখন দরজার পাশেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ডাক্তারবাবু থেমে যেতেই সমস্ত ক্লাবঘরটিতে দেয়াল ঘড়িটার টিক টিক ছাড়া কোন শব্দ নেই। -আপনার শ্যামলদা ফিরে এসেছিলেন। জিজ্ঞাসা করলুম। ডাক্তার হাতখানা ঘুরিয়ে একটা অনির্বচনীয় ভঙ্গি করলেন । এসেছিলেন হয়ত ; হয়ত আসেন নি। মূল কাহিনীতে শ্যামলদার আর কোন ভূমিকা নেই। আমি যতদূর জানি, মার্থার সঙ্গে তার আর দেখা হয়নি। প্রায় দু’বছর বাদে, আমি তখন ডাক্তারির নীচের ক্লাসে পড়ছি, একদিন সকালে মে থেকে বেরুতে গিয়ে দেখি মা।। আগের চেয়ে কিছু কশ হয়েছে। রূপের সে স্নিগ্ধ দ্যুতি নেই। মুহুর্তে ওর সমস্ত অতীত ইতিহাসটি আমার কাছে অত্যন্ত ঘৃণাই বলে এতীয়মান হল, বেশ একটু রুক্ষ ভাবেই বললাম, কী চাই? আমার সুরের রূঢ়তা ও লক্ষ্য করল; কিছু বলল না, কিন্তু মাথাটা ঈষৎ আনত হয়ে পড়ল। খানিকটা ইতস্ততঃ করে বলল, তােমার দাদার কোন খবর জানাে ? -না। কিন্তু তােমারই বা এখন সে খোঁজে দরকার কী! সে কথার জবাব না দিয়ে উৎসুকণ্ঠে মার্থা বলল,কিন্তু এই সপ্তাহেই ওর ফেরবার কথা ছিল যে। আঘাত করবার নেশা তখন আমাকে পেয়ে বসেছে। নীরস গলায় বললাম, হিসেব রাখতে ভােলনি দেখছি। কিন্তু তােমার কীর্তিকাহিনী শােনবার পর দাদা আর তােমার দিকে ফিরে চাইবেন ভেবেই? ওর সমস্ত মুখ নিমেষে বক্তহীন, বিবর্ণ হয়ে গেল। অনেকক্ষণ কোন কথা বললে না। বুঝলুম মাত্রাটা কিন্তু বেশি হয়ে গেছে। তাই খানিকটা সময় সুরে বললাম, খলপুরে খোজ নিয়েছিলে?
১ মার্থা অক্ষুটস্বরে একবার বললে, ‘না’, তারপর চলতে শুরু করে দিলে। আমি ওকে ডেকে ফেরাতে পারতুম। কিন্তু তাতে কোন লাভ হত না। মলদার ঠিকানা সত্যিই আমার জানা ছিল না। তাছাড়া মার্থা ‘না’ বললেও আমি হলপ করে বলতে পারি, ও প্রথমেই আমার এখানে আসেনি। ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই খঙ্গপুর গিয়ে খােজ করে এসেছে। সেখানে কোন খবর না পেয়ে শেষ চেষ্টা হিসেবে আমার কাছে এসেছে। ঢং ঢং করে ঘড়িতে তিনটে বাজল। ক্লান্তিতে সমস্ত শরীর জড়িয়ে আসছে। আলস্যে হাই তুললুম, ডাক্তার সেটা লক্ষ্য করলেন। বললাম, রাত ফুরিয়ে এসেছে। -আমার গল্পও ফুরিয়ে এসেছে, ডাক্তার বললেন, একটা সিগারেট দিন। সিগারেট ধরিয়ে ফের শুরু হল,-মার্থার কথা হয়ত আমি ভুলেই যেতাম। গিয়েছিলামও। কিন্তু ইতিমধ্যে যুদ্ধ বাধল, আমি পাশ করলুম, এবং সৈন্যদলে চাকরী নিলুম। রাঁচির কাছাকছি কোন একটা জায়গায় আমাদের ছাউনি পড়েছিল, একথা আজকে প্রকাশ করলে ভারত-রক্ষা বিধান অমান্য করা হবেনা। আমাদের দলে ইংরেজ ছিল, শিখ ছিল, পাঠান ছিল, এমন কি কিছু বাঙালীও ছিল। আমি ছিলুম দলের ডাক্তার। কাজ বেশ নেই। অনেক দূরে ফ্রন্টে লড়াই হচ্ছে, তার তাপ এতদুর পৌছায় না। শিস দিয়ে, ড্রিল করে, তাস খেলে সময় কাটাতে হত। সৈন্থদের অবশ্য আরেকটা বিলাস ছিল, নারী শিকার। সন্ধ্যা হতেই দলে দলে ভাগ হয়ে ওরা শহরে যেতাে। জীপে, ট্রাকে, বাইকে, পদব্রজে। শহরের নিষিদ্ধ পল্লীর প্রান্তে সারে সারে গাড়ী পাড় করানাে আছে, এ দৃশ্য আপনারাও অনেকবার দেখেছেন। একদিন একটা ইংরেজ সৈঙ্গ মাতাল হয়ে মাথায় ব্যাণ্ডেজ বাঁধা অবস্থায় ফিরে এল। শুনলুম গণিকা পল্লীতে বিজ্ঞ একটা ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিল। আমাকে ওর চিকিৎসা করতে হল। আবাতটা বেশ গুরুতর হয়নি, একটু পরেই তান ফিরে এল। ওর মুখেই ঘটনাটা শুনলুম। একটি ফিরিঙ্গি মেয়ের কাছে গিয়েছিল মেয়েটি রাজী হয়নি। অনেক টাকা, চকোলেট, বিস্কুট, কিতেই না। ফ্রডারিক যত সাধে, মেয়েটি তত বলে, না। কেন ? শরীর ভাল না। কুৎসিত একটা শপথ উচ্চারণ করে ফ্রেডারিক বললে, অথচ আমি নিশ্চয়ই জানি, ডাক্তার, ওর শরীর নূতন একটা ইঞ্জিনের মতই মজবুত ছিল। কিন্তু এই প্রত্যাখ্যানেও কিছু আসত যেত না, যদি না সেই মেয়েটি ওই চোখের সমুখে দ্বিতীয় একজনের কথায় রাজি হয়ে তার সঙ্গে ঘষে ধুকে দরজায় খিল দিত। আর দ্বিতীয় সেই লােকটি শ্বেতাঙ্গ নয়, ফিরিঙ্গি নয়, বাঙালী। ড্যাম, ডার্টি নেটিভ, হী ওয়াজ এ বেশী। আমিও বাঙ্গালী, কিন্তু মাতালের প্রলাপে রাগ করা চলে না। তারপর ফ্রেডরিক উন্মত্তের মত সেই দরজার ওপর ক্রমাগত ঘুষি লাথি চালিয়ে গেছে। বিকট, প্রমত্তরে অশ্লীল চীৎকার করেছে, যতক্ষণ না অন্য লােকজন জড়াে হয়েছে এবং একটা হাতাহাতির পর ওকে অজ্ঞান অবস্থায় ক্যাম্পে ফিরে আসতে হয়েছে। এই ব্যাপারটা সামরিক আদালত অবধি গড়িয়েছিল। কর্তৃপক্ষ সেই মেয়েটিকে ডেকে পাঠালেন ; আমি সেখানে উপস্থিত ছিলুম। মেয়েটি এলে দেখলুম, সে মার্থ। ইতিমধ্যে মার্থা আরো কয়েক ধাপ নেমে এসেছে। অর্থাৎ পুৰােপুরি রপােপজীবিনী হয়েছে। ওর কোটরগত চোখ, বিশু কপােল, শীর্ণ, শিয়াওঠা হাত পা থেকে ওর এই ক’বছরের ইতিহাস যেন পড়ে নিলাম।
আমার সঙ্গে একবার মার্থার চোখাচোখি হল। কিন্তু আমি যে চিনতে পেরেছি, এমন কোন আভাস দিলুম না। মার্থাকে যে সব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হ’ল তার নমূনা দিই- তােমার নাম মার্থা জনষ্টোন। পেশা মাথার উকিল আপত্তি জানাতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মার্থা নিঃসঙ্কোচে জবাব দিলে। ( ফ্রেডারিককে দেখিয়ে) একে চেন? -না। ঘটনার দিন সন্ধ্যাবেলা এ তােমার কাছে গিয়েছিল ? হতে পারে। -তুমি রাজী হওনি? -না। •কেন ? উত্তর নেই। আবার প্রশ্ন হল, একথা কি সত্য যে তার কিছুক্ষণ পরেই তুমি অন্য একটি লােকের সঙ্গে ঘরে ঢুকেছিলে ? মার্থা স্বীকার করলে। এমনি ধারা জেরা আরাে কিছুক্ষণ চলেছিল। সামরিক আদালতের সিদ্ধান্ত ভালাে মনে নেই, সৈটির বিভাগীয় কোন শাস্তি হয়েছিল বােধ হয়। এর কিছুদিন পরে আমরা অন্য এক ছাউনিতে বদলি হয়ে গেলুম। তারপর তিন বছর শরীরের ওপর দিয়ে কী ঝড়ই গেল ; বর্মার পাহাড়ে, মালয়ের জঙ্গলে, গুয়াদালকানালের খালে বিলে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করেছি, স্বস্তি নেই, বিরাম নেই। সর্বক্ষণ বিমানের গর্জন, কামানের ক্রুদ্ধকণ্ঠে কান দুটো বধির হয়ে গেছে। প্রতি মুহুর্তে অসংখ্য মানুষ মারা পড়েছে। তার চেয়ে বেশী আহত হয়ে আর্তনাদে বাতাস কাঁপিয়ে তুলেছে। আমরা তাদের সেবা করে ১৩ সারিয়ে তুলে ফের রণক্ষেত্রে পাঠিয়ে দিয়েছি। মৃত্যুর ঘূর্ণীঝড়ে বেতস পত্রের মত কম্পমান আমরা ক'জন জীবনের সব মূল্যবােধ খুইয়েছি। -আর মার্থা? সকাল হয়ে এসেছিল। নিজেরটা দেখতে পাচ্ছিলাম না, ডাক্তারের চোখে মুখে রাত্রি জাগরণের সুস্পষ্ট চিহ্ন পড়েছে। উঠে দাড়িয়ে টুপিটা তুলে নিয়ে ডাক্তার একটু হাসলেন, বললেন, সে জীবনে মার্থার স্থান ছিল না ওকে একেবারে ভুলে থাকাই স্বাভাবিক হত। কিন্তু অস্বীকার করে লাভ নেই, মার্থার কথা আমার প্রায়ই মনে পড়ত। ভালােবেসে পাইনি সেই হতাশা নয়, ওর বিচিত্র পতনের জন্যে দীর্ঘনিশ্বাসও নয়। ফ্রেডরিক ঘটিত ব্যাপারের একটা ঘটনা আমাকে চকিত করেছিল, কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না। সেটা কি ? ফ্রেডরিককে প্রত্যাখ্যান করে যে লােকটাকে নিয়ে মার্থা দরজায় খিল দিয়েছিল, সে বাঙালী। এই ব্যাপারটাকেই এত বড় করে দেখছেন কেন? -দেখছি এই জন্যে, যে মাথাকে আমাদের সেনাদলের অনেকেই চিত। ফ্রেডরিকের মত কেলেঙ্কারি তারা কেউ করেনি, কিন্তু অনেকেই মার্থার দরজা থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে। তাদের মুখেই শুনেছি মার্থা বাঙালী ছাড়া আর কাউকে ওর ঘরে ঢুকতে দিত না। অসম্মানের নিম্নতম ধাপে দাড়িয়েও এই বিচিত্র আভিজাত্যটুকু সে বজায় রেখেছিল। শ্যামলদাকে ছাড়বার পর আমাে দু’জনের কাছে মার্থা রক্ষিতা হয়ে ছিল। তারা দু'জনেই বাঙালী। এমন কি,-ডাক্তারবাবু বললেন, আপনি শুনে অবাক হয়ে যাবেন, কাল যে লােকটি সন্ধ্যায় মাথার ঘরে ঢুকেছিল, এমনকি টাকার লােভে শেষ পর্যন্ত মেয়েটাকে খুন করে পালিয়ে গিয়েছে, পুলিশ ইন্সপেক্টার তার সম্বন্ধে আশেপাশের মেয়েদের জেরা করেছে। ঠিক জানা যায়নি, তবু বর্ণনা থেকে পুলিশের সন্দেহ, সেও বাঙালী।
১৯ অদ্ভুত! আমি বললাম। আমরা দু'জন তখন রাস্তায় এসে দাড়িয়েছি। সকাল বেলাকার হিম হাওয়া রাত্রিজাগরণের পর স্নিগ্ধ প্রলেপের কাজ করছিল। ডাক্তার আমার মন্তব্য শুনতে পাননি। অন্যমনস্কভাবে কতকটা আপন মনেই বললেন, -আমার মনে হয়, জীবনে মার্থা একবারই ভালবেসেছিল, শ্যামলদাকে। তারপর সারা জীবন ধরে অসংখ্যের ভেতর দিয়ে সে যে অনন্য পুরুষের খোঁজ করেছে, সে শ্যামলদা। বিচিত্র প্রাদেশিকতাটুকুর নইলে আর কোন অর্থ হয়না।
কাটা সৈনিক ইনি আমার বন্ধু অনুপম রায়। লেখক। আর ইনি ইলতা চতুর্বেদী। এর পরিচয় দেবার নিশ্চয় প্রয়ােজন নেই। প্রয়ােজন বিলক্ষণ ছিল। কিন্তু মুখ ফুটে সেকথা বলব এমন বর্বর নই। বিশেষ সম্বপরিচিতা যখন ভদ্রমহিলা। চিনি বইকি—ভঙ্গিতে মৃদু হেসে নমস্কার করলুম। ভবেশ আমার বিব্রত ভাব লক্ষ্য করে থাকবে। সুযােগ পেতেই গলা নামিয়ে বললে, অভিনেত্রী। বিশেষ সুরাহা হল না। অভিনেত্রী তাে এক হিসেবে রমণীমাত্রেই। ভবেশ অবশ্য সহজ অর্থেই শব্দটা প্রয়ােগ করেছে। ইনি কোন মঞ্চ কিম্বা পটপটিয়সী হবেন। কিন্তু আমি থিয়েটার দেখিইনে। সিনেমা কালেভদ্রে। অন্যান্য অতিথিরা আসতে শুরু করেছিলেন। ভবেশকে সেদিকে ছুটতে হল। আমি করি কী। গােটাই খালি চেয়ার ছিল। ইলতাকে তার একটা গ্রহণ করতে অনুরােধ করলুম। আসন নিয়েই ইলতা তঁার ঝাপি খুললেন, বেরল ছােট্ট হাত- আয়না। আমি দেখেও না দেখার ভাণ করে বসে রইলুম এবং মনে মনে আমার পর্যবেক্ষণ শক্তিকে ধিক্কার দিলুম। সাজ-পােশাকের রুচিহীন বাড়াবাড়িটুকু আগে কেন চোখে পড়েনি। আর কিছু না হােক, ইনি মুখে, সম্ভবত গায়েও, পাউডার যা ঢেলেছেন, তার গন্ধ থেকে জন্মান্ধও বলে দিতে পারত ইনি অভিনেত্রী। মেরামত যেখানে যেটুকু প্রয়ােজন ছিল, সারা হতে মিনিটখানেক লাগল। ইমুলত হাত-আয়নাটা ফের ঝাপিজাত করলেন। এতক্ষণ আমাকে জ্বপেও কয়েন নি, এবার জা নিক্ষেপ করলেন।
সত্যি করে বলুন ও পরিনবাবু, আমাকে আপনি কী কী বইয়ে দেখেছেন। বললুম, পরিমল নয়, অনুপম। এই হল। ইন্দু বিন্দু মাত্র অপ্রতিভ না হয়ে বললেন, আমার কোন্ পার্টটা আপনার সবচেয়ে ভাল লেগেছে তাই বলুন না। পালাবার পথ নেই। অগত্যা গিরিশ ঘােষ, ডি এল রায় ইত্যাদির বিখ্যাত কয়েকটি নাটকের নায়িকাদের নাম করলুম। ইলুলতার হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকল। অনেক পরে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আপনি যে কটা বইয়ের নাম করলেন নিরুপমবাবু, তার একটাতেও আমি নামিনি। প্রমাদ গণলাম। হাতেনাতে ধরা-পড়া পকেটমারের গলায় কিছুক্ষণ এলােমেলাে কৈফিয়ৎ দেবার চেষ্টা করলুম।-মাপ করবেন, ভুল করেছিলুম, তা ছাড়া শিল্পজগতের সঙ্গে বিশেষ পরিচয় তো নেই, ইত্যাদি। ইন্দুলতা কুটি করলেন। কিন্তু ভবেশবাবু যে বললেন আপনি লেখক। ‘যেতে দিন। ওটা কথার কথা। যে লেখে সেই তাে লেখক। কেরাণীও। রাইটাস বিলডিঙ নামেই তাে তার প্রমাণ। কোন ফল হল না। ইলতার মুখ যে হাঁড়ি, সেই হাঁড়ি। কিছুক্ষণ পরে সেই হাঁড়ির ভেতর থেকে স্বর বেরুল, “উহু। ভবেশবাবু কখনই সে অর্থে বলেননি। আপনি নিশ্চয় গল্পট লেখেন। কিন্তু আমি আমার উপর স্থির, নির্মম দৃষ্টি স্থাপন করে ইহুলতা কথাটা শেষ করলেন, কিন্তু সত্যি কথাই বলব। আপনার কোন লেখা পড়িনি। বিনয়াবনত কণ্ঠে বললুম, 'ওগুলো পড়বার যােগ্যও নয়। এর পরে আলাপ জমবে আশা করাও দুরাশা। অথচ খাবার এসে গিয়েছিল, টেবিল থেকে ওঠাও যায় না। সুতরাং প্লেট থেকে একে অপরকে আহার্য তুলে দেওয়া ইত্যাদি কেতামতই চালাতে হল, সেই
১ঃ২
ফাকে কাটা-কাটা কথাও সব ইস্টিশানে থাম। লােকান গাড়ির মত
ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ঢিকুর-ঢিকুর চলতে লাগল।
ইলতা, লক্ষ্য করলুম, মেয়েরা প্রকাশ্যে যতটা খায় তার চেয়ে
বেশিই খেলেন এবং চর্বণ, চোষণ, লেহন ইত্যাদির ফাকে ফাকে উনি
নিতান্ত যে সামান্য। নন, আমাকে সেটা ভাল করে বুঝিয়ে দিতে
থাকলেন।
কিঞ্চিৎ অনুতপ্ত ছিলুম, সুতরাং বাধা দিলুম না।
ইলতা বললেন ওঁর প্রথম অভিনয় দেখে টেকা কলমলিখিয়েরা
খবরের কাগজে কী লিখেছিল। কাটিঙ আছে, একদিন আমাকে
দেখাবেন। স্বয়ং নটাচার্য কি আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন। একবার নাকি
অভিনয়ের শেষে ফুলের মালা এত বেশি হয়েছিল যে আলাদা ঘােড়া-
পাড়ি ডেকে সেগুলাে বাড়ি নিয়ে যান।
মরমে মরে যেতে থাকলুম।
ইন্দুলতা হঠাৎ একবার বললেন, আপনি একটা নাটক লিখুন,
অরূপবাবু।
ততক্ষণে বুঝেছিলুম, ভ্রান্তিটা ওর বিলাস। সংশােধন করবার
পণ্ডশ্রম না করে নিজেকে পরনামধন্য মনে করাই শ্রেয় বােধ কাসুম।
ই-লতা বললেন, ‘গল্প লিখে কিছু হয় না। নাটক লিখুন, যশ, অর্থ
এক সঙ্গে হবে। আমার কুষ্ঠিত মুখভঙ্গি লক্ষ্য করে বললেন, 'আমি
চালিয়ে দেব। 'রঙ্গপীঠের মালিক প্রসল্প চৌধুরী আমাকে না দেখিয়ে
কোন নাটক ধরান না তাে।
ওঁর সুপারিশ নিয়ে খ্যাতিমান হয়েছেন এমন দু’চারজব তরুণ
নাট্যকারের নাম করলেন।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে ভবেশ অন্যান্য অতিথিদের আপ্যায়ন করছিল।
ইলুলতা সেদিকে চেয়ে হঠাৎ বললেন, ‘আচ্ছা, ভবেশ মল্লিকের সঙ্গে
আপনার কতদিনের আলাপ।
‘অনেক দিনের। আমরা কলেজে এক সঙ্গে পড়লুম।
১৩
‘ও। আচ্ছা লােকটার বিস্তর টাকা, না।
‘পৈতৃক সম্পত্তি মদ পায়নি শুনেছি।
ইনুলতা খিলখিল করে হেসে উঠলেন, ‘টাকা আছে সেটা ওর
চেহারা দেখলেই বােঝা যায়। কি গােল ভুড়ি আর কি ফস। রং
দেখেছেন।
উত্তর দিলুম না।
ই-লতা বললেন, 'এত টাকা নিয়ে লােকটা কী করবে ভেবে পায়
। আজ পার্টি দেয়, কাল রেসের ঘােড়া কেনে। শুনেছি, কয়েকটা
ছবিতে টাকা ঢেলেছিল, কয়েক লাখ লােকসান দিয়েছে। আরাে ছবি
তুলবে নাকি।
‘ঠিক জানিনে। তুলতে পারে।
পেয়ালা-প্লেট-পট বাঁচিয়ে ইলুলতা আমার দিকে ঝুঁকে পড়লেন।
-আপনার তাে অনেক দিনের বন্ধু। এক কাজ করুন না। ওকে
থিয়েটারের ব্যবসায় নামান। নাট্যলােকে’র প্রােপ্রাইটর শুনছি খদ্দের
খুঁজছে। বলেন তাে কথাবার্তা চালাই।
বললুম, আপনিই ভবেশকে বলুন না।
ইলুলতা যেন ক্ষুন্ন হলেন—বলতে তত পারি। কিন্তু আমি বললে
কি হবে, আপনি হলেন গিয়ে ওর বন্ধু।
অসহ্য হয়ে উঠছিল। ততক্ষণ আহার পর্ব সারা হয়েছে। কিছুক্ষণ
উসখুস করলুম। তারপর এক সময় চেনা লোেক দেখতে পেয়েছি ভাণ
করে সরে পড়লুম!
পরদিন ভবেশকে ফোনে বললুম, ‘কাল আচ্ছ। মুশকিলে ফেলেছিলে,
যা হােক।
'কী হল।
‘তােমার এই ইন্দুল চতুর্বেদী।
ভবেশ একমাত্রিক যে ইংরিজি শব্দটা উচ্চারণ করলে তার বাংলা
অর্থ কুকুরী। নেহাৎ ইংরিজি বলে তেমন শ্রুতিকটু শােনল না।
১৪৪
ঠাট্টা করে বললুম, 'কি নেমন্তন্ন তত করেছিলে।
ভবেশ বললে, আমার কি মাথা খারাপ যে ওকে খেতে বলব।
ও গ কে কে এসেছিল।
জিজ্ঞাসা করলুম, চতুর্বেদীটা কি ব্যাপার, বল তাে।
‘অনুমান করতে পারছ না ?
‘বােধ হয় পারছি। এসব মেয়ে কারুর না কারুর রক্ষণাবেক্ষণে
থাকে। ওর এখন যে রক্ষক, তার পদবী কি চতুর্বেদী ?
যে উত্তর এল, সেটা বিস্ময়কর।‘ভুল বললে। চতুর্বেদী ওর
স্বামীর নাম।
ইলতার সঙ্গে সেই আমার প্রথম আলাপ। বলা বাহুল্য, সেদিন
ওকে ভাল লাগেনি। কিন্তু সেই ভাল-না-লাগাটুকু, প্রথম আলাপের
বিবরণীতে এত দিন পরেও ফুটে উঠবে ভাবিনি। যেটুকু লিখেছি, ফিরে
পড়তে গিয়ে নিজেই অনুশােচনা হচ্ছে। এ তাে আমি লিখতে চাইনি,
আমি তাে ভুলতেই চেয়েছিলুম একটি বিকেল-বয়সী মেয়ের চিবিকারের
কথা। চেয়েছিলুম একটি করুণ কাহিনী রচনা করতে ; যার ছত্রে ছত্রে
গ্রীস্মার্ত মানুষের দেহের ঘামের মত দরদর দরদ। কিন্তু আমার
ভেতরকার অ-খেলােয়াড় মানুষটি এসব কি লিখিয়েছে। এ ক’পৃষ্ঠা
ছিড়ে নতুন করে লিখব, এমন ধৈর্য নেই। অতএব যেমন চলছে
চলুক।
ইন্দুলতার পরামর্শে নয়, শখে পড়েই একখানা নাটক লিখেছিলাম।
আরও চার পাঁচ বছর পরের কথা বলছি। ততদিনে লেখক হিসেবে
আমার প্রতিষ্ঠা কিছুটা শিকড় পেয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি একটি
নামী ইংরিজি কাগজের সঙ্গে যুক্ত। সেজন্যে ও প্রাপ্যের চেয়ে কিছু
বেশী খাতির পেতুম।
নাটকখানা প্রসিদ্ধ কোন নট এবং পরিচালক পড়তে নিয়ে
গিয়েছিলেন। তিনি একদিন ডেকে পাঠালেন।
কার্ড পাঠালুম, ডাক এল। মাঝখানে মিনিট পাঁচেক সময়
১৪ কেটেছিল। এই সময়টা ভিজিটস রুমের দ্বিতীয় চেয়ারের অধিকারিণীর দিকে বারবার দৃকপাত করেছি। চিনতে আমার বিন্দুমাত্র দেরি হয়নি, কিন্তু ইলত যে চিনতে পেরেছেন, এমন আভাসও দিলেন না। বহুমাস-বাসি একটা মঞ্চপর্দা সংক্রান্ত সচিত্র সাপ্তাহিকে মুখ ঢাকা দিলেন। প্রসিদ্ধ সেই নট-পরিচালক কাজের লােক। বেশি কথা বাড়ালেন । বললেন, আমার নাটকটা পছন্দ হয়েছে। পূজোর আগেই মঞ্চস্থ করতে চান। শুধু দু’একটা সংলাপে আপত্তি আছে। আর, দু'একটা জায়গায় যে টেকনিক ব্যবহার করেছি, সেটা ঠিক সেভাবে ফুটিয়ে ভােলার মত স্টেজ ইকুইপমেন্ট ওঁদের নেই। ওঁদের কেন, এদেশে কারই নেই। আমার অনুমতি নিয়ে সেগুলাে ঈষৎ বদলাতে চান। কি ভাবে, তাও বললেন। সানন্দে সম্মতি দিলুম। পরিচালক বললেন, ‘আর একটু অসুবিধে আছে। উপযুক্ত অভিনেতা অভিনেত্রীর অভাব। আগেকার দিনে, মশাই, এসব হাঙ্গামা ছিল না। পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক নাটক, জমকালাে পােশাকেই লােকে প্রথম ঘায়েল হত। তারপর লম্বা লম্বা বক্তৃতা, একটু চেঁচাতে পারলেই, ব্যস। আর আজকাল আপনারা শুধু কাটা-কাটা কথা বসিয়ে নাটক লেখেন ; সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার ব্যাপার,—যাদের শুদ্ধ করে বাংলা উচ্চারণ শেখাতে ছ' মাস কেটে যায়, তাদের দিয়ে এসব কি করে ফোটাই বলুন । পাছে এই ছুতােয় গােটা নাটকটাই না-মঞ্জুর হয়ে যায়, তাই ভয়ে ভয়ে প্রসঙ্গ বদল করলুম। ‘আচ্ছ। ইন্দুল চতুর্বেদী কি এখন আপনাদের স্টেজে আছেন? ‘কে ইলতা চতুর্বেদী ? অভিনেত্রী। আসবার সময় তাকে যেন দেখলুম। পরিচালকের ততক্ষণ মনে পড়েছে। ভবেশ মল্পিক ইংরিজিতে
১৪৩
যা বলেছিল, ইনি বাংলায় ততােধিক অভদ্র একটা, শব্দ উচ্চারণ
করলেন।
‘আশিয়ে খেলে মশাই। আমরা দুস্কুল থেকে স্ত্রীর সঙ্গে আহরণ
করি বটে, কিন্তু রূপ দেখে, নয়ত গলা শুনে। এর কোটা ওর আছে।
নইলে শুনেছেন কোথাও একটা মেয়ে দশ-বার বছর ধরে শুধু মাইনর
রােলেই প্লে করে গেল?
সবিনয়ে বললুম-এ বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা সামান্য।
পরিচালক বললেন, এখন শখ হয়েছে উনি হীরােইন হবেন। ছু।
সিড়ি দিয়ে নেমে আসছি, পেছন থেকে ডাক এল, শুনুন।
দাড়াতেই ইলুলতা তরতর করে নেমে পাশাপাশি এলেন। বললেন
‘চিনতে পারছেন ?
একটা গর্হিত কর্ম করলুম। বললুম, “না তাে। কোথায়, কোথায়
যেন। শিমুলতলায়? বুঝেছি, নিশ্চয় কোন ওয়েটিং রুমে—
রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে গিয়ে পাউডারও মুছে গেল, ইলতার
খেয়াল নেই, বললেন, ‘সেই যে ভবেশ মল্লিকের বাগান পার্টিতে আলাপ
হয়েছিল।
‘হয়েছিল নাকি। তা আপনি এখানে-
‘ওর ডেকেছিল। নতুন নাটক খুলবে, আমাকে পার্ট দিতে চায়।
কিন্তু যে পার্ট দিতে চাইছে সেটা নিতে আমার মােটেই ইচ্ছে নেই।
যদি অমিতার পার্টটা দিত, তবে বিবেচনা করতুম।
নিরাসক্ত কণ্ঠে বললুম, বেশ, তবে নেবেন না।
এতক্ষণে ইন্দুলতার মুখােশ খসে পড়ল ।
ততক্ষণ প্রায় রাজপথে এসে পড়েছি। ইলতা সেখানে, প্রায় সব
সমক্ষে, আমার সম্মুখে জোড়হস্তে বললেন, 'আপনি একটু ওদের বলে
দিন না।
আমি? আমার কি হত আছে।
ইনুলতা কাঁদো-কঁদো গলায় বললেন, আপনি মিছিমিছি লুকোচুরি
১০। করছেন। আমি সব খবর নিয়েছি। এ নাটকটা তাে আপনার লেখা, না ? অস্বীকার করে লাভ ছিল না। সােজাসুজি বললুম, কিন্তু আপনার অভিনয়কুশলতা কেমন সে বিষয়ে আমি কিছুই জানিনে। এসব ব্যাপার থিয়েটারের মালিকদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া ভাল, না?' ইন্দুলতা তবু নাছোড়। আপনি আমার বাসায় একদিন চলুন আপনার পাণ্ডুলিপি নিয়ে। আমি পড়ে আপনাকে শুনিয়ে দেব অমিতার চরিত্রটি ঠিক ধরতে পেরেছি কিনা। নিষ্কৃতি পাবার জন্যে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই প্রতিশ্রুতি দিলুম। ইনুলতা একটি ঘোড়াগাড়িকে হাতছানি দিলেন, আমি সেই অবসরে ট্রামে উঠলুম। ইন্দুল চতুর্বেদীর জীবনকথা লিখতে গিয়ে মুশকিলে পড়েছি। জীবনী হয় প্রাতঃস্মরণীয়দের নিয়ে। ইসতা তা নন। সায়ংস্মরণয়াও নন। ওঁকে দেখার জন্যে বেলা পড়তে না পড়তে থিয়েটারের বুকিং ঘরের সম্মুখে গিলেকেঁাচা বাবুদের হাতাহাতি হয় না। জমজমাট কোন কোন দৃশ্যে জুৎসই দু’চার কথা বলবার সুযােগ যদিবা পান, হাততালি মােটে পান না। তবু সুরেশ্বরী কিম্বা অপরা কোন নাট্যসম্রাণীকে নিয়ে না লিখে ইনুলতাকেই কেন বেছে নিলুম, তার কারণ ছিল। সে কারণ, আর কিছু নয়, ই-লতারই অনুরােধ। সে কথায় পরে আসছি। আমার নাটকে ইলতা অভিনয় করেছিলেন। নায়িকার ভূমিকায় নয় ; তবে তার অংশও উল্লেখযোগ্য। আমারই অনুরোধে পরিচালক ইন্দুলতাকে এই ভূমিকার জন্যে নির্বাচন করেছিলেন। হেসে বলে- ছিলেন, ‘আচ্ছা। কিন্তু দেখবেন, নাটক ঝুলে গেলে আমাদের দোষ দেবেন না। ঝুলে যায়নি, বরং ভালই উতরেছিল। ইনুগতা প্রাণ দিয়ে অভিনয় করেছিলেন। সেই সূত্রে ওঁর বাসায় আমাকে কয়েকবার যাওয়া-আসা
১
করতে হয়। তখন হঠাৎ একদিন ইলতা বলে বসলেন, কতই তাে
নাটক লিখলেন, এবার আমাকে নিয়ে একটা গল্প লিখুন।
বললুম, ‘আপত্তি নেই। কিন্তু কিছু যে প্রায় জানি না।
জানেন না? ইলত একটু চুপ করে থেকে কি ভাবলেন।
“আচ্ছা, এ বাড়িখরচ কে যােগায়, জানেন ?
জানতুম না। তবে লােকমুখে বড়বাজারের বিশিষ্ট কোন ব্যবসায়ীর
নাম শুনেছিলুম। সেটা উল্লেখ করতে রুচিতে ঠেকল। বললুম, ‘কে
আবার যােগাবে, সব নিশ্চয় আপনার উপার্জনেই চলছে। আপনি
নিপুণ অভিনেত্রী।
ইনুলতা হেসে উঠলেন, আপনি কিন্তু মোটেই নিপুণ অভিনেতা
নন অনুপবাবু, কপটতা আপনার চোখে, মুখে, কণ্ঠস্বরে। আপনি
জানেন থিয়েটার করে আমি সামান্যই পাই, আপনার নাটকটার আগে
দুটো সীনে নামবার মত পার্টও আমার জোটেনি। তাতে আসে
এত আলমারি, কোচ, আসবাব ? তােরংভতি জামাকাপড়? বলুন,
আসে?
আসে না সে-কথা বলবার প্রয়ােজন ছিল না। ইলতা বললেন,
এসব যে জোগায়, তার নাম আপনি সামান্য সন্ধান নিলেই জানতে
পারবেন। কিন্তু একটু থেমে ইন্দুল বলেন, তিনি চতুর্বেদী
নন। অবাক হচ্ছেন না ?
হয়েছিলম প্রকাশ করিনি। সভ্য শহুরে মানুষ, আমাদের সমাজে
বেমাত্র কৌতুহল বে-আইনি। ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বন্ধুজনের বেতন কত
জিজ্ঞাসা করতে পর্যন্ত ভরসা পাইনে, সামান্য-চেনা স্ত্রীলােকের অতীতের
কেঁচো খুঁড়ে সাপ বার করতে যাব কোন ভরসায়।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ইমুলত বলেছিলেন, “বলব, আমার
বিনকথা আপনাকে বলব। আজ নয়, আরেকদিন। স্বরে বুঝি
গভীরতার ছাপ পড়েছিল, সচেতন হতেই ইলতা লজ্জায় হাসলেন,
তাৰপর সেই লজ্জাটুকু চাপা দিতেই বুঝি হঠাৎজোরে—বলব, তকে
সর্ত আছে। একটা নাটক লিখতে হবে আপনাকে। অভিনয় করে অমর হতে তাে পারলুম না, আমার জীবন নিয়ে লেখা নাটকের ভেতর দিয়ে যদি পারি। পেশাদার নাটক লিখিয়ে নই, অন্য কাজের চাপও প্রচু, থিয়েটারের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এল। ইলতার অতীতের কথা সব কি, তার সঙ্গে দেখা সাক্ষাতই বিশেষ হত না। নতুন নাটক লেখা হয়ে ওঠেনি, পুৰণােটারই অভিনয় কদাচিৎ হয়, দেখতে যাওয়ার উৎসাহ পাইনে। হঠাৎ প্রায় আট ন'মাস বাদে ই-লতার কাছ থেকে ডাক এল। ছােট্ট চিঠি, ‘আজ অবশ্য একবার আসবেন। পত্রবাহককে বলে দিলুম যাব। সেদিন রবিবার, যথাপ্রতিশ্রুতি যখন গিয়ে পৌছলুম তখন বৃ- টিপটিপ দুপুর। তবলা মেরামতের দোকানের পাশ কাটিয়ে, পানের দোকানের জল-চেয়ানাে ঝাপ বাঁচিয়ে কোনমতে কাছা কেঁচা এবং ভদ্রতা সমেত নির্দিষ্ট দরজায় টোকা দিলুম। পম্প-ও চৌকাটের বাইরে রাখতে হল। ইহুলতা ফস। তােয়ালে ধুতি ইত্যাদি এনেছিলেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে অতলবিত্ত, অমিতাচারী, মধ্যদেশের গুরুতাহেতু স্তোকন একটি প্রৌঢ়ের ছবি চোখের সমুখে ভেসে উঠল, তার খােলস অঙ্গে তুলতে প্রবৃত্তি হল না। নীচু একটা তক্তপােষে ফরাসমত একটা চাদর পাতা, ঘরে দ্বিতীয় আর আসন নেই। সেদিকেই আঙুল দেখিয়ে ইন্দুল বললেন, ‘বষন পরিমলবাবু। বলতে যাচ্ছিলুম ‘অতিশয় অসময়ে অভাজন পরে অযাচিত অনুগ্রহ। কিন্তু ফোলা ফোলা দুটি পাতার নিচে আরক্তিম দুটি চোখের দিকে তাকাতে পরিহাসটা রসনাগ্ৰেই ঠেকে রইল। ফলে একটি মাত্র তাকিয়া, সেটা তুলে নিতেই দেখি ভাজে ভাজে দু’একটি ভিজে চুল অস্পষ্ট সিদুরের দাগ। ইলতা এতক্ষণ কঁদছিলেন নাকি।
উঠে গিয়ে ইমুলত দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন, রাস্তার দিকের জানালাটা তবু খােলা রইল। ভারী ভারী গলায় ইনুলতা বললেন, আজ আমার জীবনের কাহিনী আপনাকে শােনাব। সেই জন্যেই ডেকেছি। বাইরে তাকিয়ে দেখলুম তখনও ঝিরঝিরে বৃষ্টি, ময়লা মেঘের চাদর মুড়ি দেওয়া আকাশ, কচিৎ রাস্তায় নতুন একটা রিক্সা, বয়সখােয়ানো একটি স্ত্রীলােকের আত্মকাহিনী শােনবার পক্ষে পরিবেশ মন্দ না। তাকিয়াটা আরও কাছে টেনে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসলুম। বললুল, এবার শুরু হােক। ইলত। দু'চোখে তিরস্কার ভরে তাকালেন। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ধিক্কার দিলুম। একি বাইজির কাছে এসেছি যে ফরমাস দিলেই গান অস্বস্তিকর নীরবতার মধ্যে কিছুক্ষণ কাটল। বৃষ্টির টুপটাপ, রিক্সার ঘষ্টি, তবলা মেরামতের দোকান থেকে ভেসে আসা কাটাকাটা বােল চেতনার সঙ্গে একাকার, কতক্ষণ কেটে গেছে খেয়াল করিনি। আমার সমুখেই দু’হাতে মুখ ঢেকে ইলতা বসে, অযত্নবিন্যস্ত একটি খোপার সানুদেশে কমনীয় একটি গ্রীবা, সেখানে বয়সের গণিত নেই, আমার অধচেতন,উপলব্ধিতে এসব কিছুই ছিল না। সময়হীন জ্যোতিহীন প্রদোষে নিরবয়ব দুটি সত্তা যেন মুখােমুখি, মাঝখানে কারণহীন মোন। জানুমগ্ন মুখখানি তুলে ইন্দুলতা অকস্মাৎ কুষ্ঠিত হাসলেন। কিভাবে শুরু করব বুঝতে পারছিনে। জানেন ত’, আমরা অভিনেত্রী, কথা মুখস্ত করে বলা অভ্যাস, তৈরী করে বলতে শিখিনি। বলতে বলতে ই-লতা উঠে পাশের ঘরে গেলেন, সেদিনকার কতকগুলাে খবরের কাগজ এনে বললেন, পড়েছেন ? ওপর ওপর চোখ বুলিয়ে বললুম, 'স্পৃহা নেই। সিমল কনফারেন্স, ফাটকা বাজার, উইম্বলডন টেনিস, এসব আজকের জন্যে নয়। ইমুলতা বললেন, 'আরও খবর আছে। প্রথম এবং দ্বিতীয় পাতা উন্টে গেলেন। পঞ্চম পৃষ্ঠার ওপরের দিকে একটি সংবাদ, ‘পরলােকে ডাঃ চতুর্বেদী। সবটুকু পড়বার আগেই বিমূঢ় কণ্ঠে বলে উঠলুম, ‘ইলতা দেবী, এই ডাঃ চতুর্বেদীই কি আপনার নতমুখে ইন্দুলতা বললেন, স্বামী। আবার সেই মূক অস্বস্তি। আলাপের সূত্র জোড়া লাগাতে কিছুক্ষণ পরে বললুম, আমার বােঝা উচিত ছিল। আপনার নামের পদবীই ত’ ‘সবটা বুঝতেন না’ ইলতা স্থির দৃষ্টি আমার চোখে রেখে বললেন, ‘যে মেয়ে অনায়াসে স্বামীর ঘর ছেড়ে আসে, সে সারাজীবন তার পদবীটুকু আঁকড়ে থাকে কেন ভেবেও কিনারা পেতেন না। উত্তর না দিয়ে সায় দিলুম। ইন্দুলতা বললেন, বিয়ের পর প্রথম রাত্রি থেকেই শুরু করি, আপনার নাটকে যেমন ইচ্ছে সাভিয়ে নেবেন। অল্পবয়স, পাশে না-চেনা একজন লােক, চেহারাটা পর্যন্ত ভাল করে দেখিনি, ভয় ছিল প্রথম আলাপ -জানি কেমন হবে। সেই সঙ্গে কৌতূহল। হয়ত কথাই হবে না, অতর্কিত একটু স্পর্শেই সব বলাবলি হয়ে যাবে। রাঙা চেলী জড়ান পুটুলীটি হয়ে শুয়ে আছি, ঘামে সারা শরীর নেয়ে যাচ্ছে, দাতে ঠোট চেপে প্রতিজ্ঞা করছি চেঁচিয়ে উঠব না, কেননা আশেপাশেই অনেকগুলো কান আড়ি পেতে আছে, হাসাহাসি পড়ে যাবে। কিছুক্ষণ পরে ওদিক থেকে সাড়া এল। কড়িকাঠের দিকে তাকাবেন না পরিমলবাবু, সঙ্কোচের দরকার নেই। কাছে টেনে নেওয়া নয়, মুখখানি তুলে ধরে জানা-নাম আরেকবার জানবার আবদার নয়, মনে আছে, প্রথমেই উনি বলেছিলেন, ‘কতদুর পড়েছ। পড়েছিলুম, থার্ড ক্লাশ অবধি, তাও শেষ দু’বছর বাড়িতে। কোলের ভাইটিকে ধরা, মার চড়ান ভাতের হাঁড়ি নামানর রান্নার শিক্ষানবিশি ফাকে ফাকে যতটুকু সময় পেতুম, বইটই নাড়াচাড়া করে দেখতুম।
টের পেলুম। সেকথা স্বীকার না করে বাড়ির লােকের পরামর্শ স্মরণ করলুম। বললুম, ‘ম্যাটিক অবধি। উনি বললেন, ‘মােটে। কণ্ঠস্বরে যে তাচ্ছিল্য ছিল, আমি যে এখন অভিনেত্রী, আমিও ফোটাতে পারব না। কিছুক্ষণ পর উনি ফের বললেন, আমি তােমাকে পড়াব। হতাশ অনেক গুলাে চোখ দরজা জানালার ফোকর থেকে সরে গেল, সে রাত্রে আর কোন কথা হল না। কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে ইন্দুল বােধ হয় পরবর্তী ঘটনাগুলাে গুছিয়ে নিলেন। বই এল। আপনাকে ছুয়ে বলছি ভাই, সেসব বই পড়তে ভাল লাগত না। বিয়েতে অনেকগুলাে নভেল পেয়েছিলুম, দু'একখানা কবিতার বইও বােধহয় ছিল। সেগুলােই পড়তুম। একদিন ধরা পড়লুম হাতে-হাতে। লুকোতে গিয়েও পারিনি। কলেজ থেকে হঠাৎ ওরকম সময় ফিরবেন তা কি জানতুম। কি বই দেখি, বলে ছিনিয়ে নিলেন। মলাট আর প্রথম পৃষ্ঠা দেখেই ছুড়ে ফেলে দিলেন। বললেন, 'ট্র্যাশ। তােমার টেষ্ট এত নীচু, ছি-ছি। বেড়াতে যাবার কথা ছিল, হল না। পড়াতে বসবেন ঠিক ছিল, কিন্তু বাইরের পােষাক না ছেড়েই ফের কোথায় বেরিয়ে গেলেন। মনে মনে হেসেছিলুম। ভয়ও পেয়েছি। এত তুচ্ছ কারণে এত রাগ কেউ করে। তবু সেদিন ভরসা ছিল, কথা খােলাখুলি বললে খুবই খারাপ শােনবে পরিমলবাবু, হয়ত কানে আঙ্গুল দেবেন, কিন্তু থিয়েটারের এ্যাকট্রেসের আবার রুচি—আমার বয়স, আমার যৌবন। গুণে যদি নাও পারি, রূপ দিয়ে একটা পুরুষকে ঠিক ভােলাতে পারব। সে ভুল ভাঙল কিঙ্কিণী সিকদারকে দেখে। তার চেহারা কেমন ছিল বর্ণনা করবার চেষ্টা করব না, তবু আপনাকে আইডিয়া দিচ্ছি, নাটকে ও চরিত্রটি আনবেন না। ও ভূমিকায় অভিনয় করবার মত মেয়েমানুষ গােটা কলকাতার থিয়েটারপাড়ায় নেই। কিঙ্কিণী কালে ছিল। অমাবস্যার মত নয়, কবিত্বটুকু ক্ষমা করবেন, কৃষ্ণা চতুর্দশ সঙ্গে বােধহয় একটা তুলনা হতে পারে। কিন্তু রঙ ধুয়ে কি জল খাবে। অমন কমনীয় অথচ বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ অমি দুটি দেখিনি। আর শরীরের গড়ন। থাক এসব কথা শুনতে বােধহয় আপনার অস্বস্তি হচ্ছে। দুপুর বেলা খেয়ে উঠে পান চিবুচ্ছিলুম বড় একটা আয়নার সামনে। দেখছিলুম ঠোট টুকটুকে হলে আমায় কেমন দেখায়। কার যেন ছায়া চমকে ফিরে চাইতেই দেখলুম কিঙ্কিণীকে। তখনও অবিশি নাম জানতুম না। বললে, নির্মল নেই ? দাদা বলে না, বাবু বলে না, সরাসরি আমার স্বামীর নাম ধরে ভাকে, এ-মেয়ে তো সােজা নয়। জবাব দিতে বােধহয় দু’পলক দেরি হয়ে গিয়েছিল, মেয়েটি হেসে উঠল। তখনও ঘরে ঢোকেনি, চৌকাটে দাড়িয়ে। বললে, “তুমি নিশ্চয় নির্মলের বৌ। নির্মটা বেছে বেছে শেষ পর্যন্ত কচি মেয়ে বিয়ে করে আনল। তা নির্মল বেরিয়ে গেছে, তাকেও শাড়ি গয়নার মত তােমার তােরংয়ে পুরে রেখেছ ? বললুম, আপনি বললে, আমাকে চিনবে না ভাই, আমার নাম কিঙ্কিণী। নির্মগের সঙ্গে এক সঙ্গে কলেজে পড়তুম। বললুম ‘বন। বসল না, দাড়িয়ে থেকেই আমাকে যেন খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। চোখ নয়, যেন দুঃশাসনের দুটি হাত। আমি ওকে দেখছিলুম। বুঝতে দেরি হয়নি মেয়েটা বড় অহঙ্কারী। পাউডারের একটু গুড়াে পর্যন্ত নেই, ওর নিকষ কালাে রঙটাও বড় করে দেখাচ্ছে। গােয়ালারা দুধে জল মিশিয়ে ফিকে করে, দাম বাড়ায়। মেয়েরাও কালাে রঙ ফিকে করতে পাউডার মেশায়, উদ্দেশ্য এক- পুরুষের চোখে দাম বাড়ান। এ মেয়ের সে চেষ্টাটু পর্যন্ত নেই।
১
কিঙ্কিণী বললে, হা করে কী দেখছ ভাই, আমি কি খাচায় পােরা
জানােয়ার।
বললুম, 'দেখছিলেন তাে আপনিও। খাঁচার কথা যখন তুললেন
তখন বলি। ঘরের বৌ, খাঁচায় বন্ধ হয়েছি তাে আমি।
‘তুমি তাে বড় কুঁদুলে ভাই।
রাগে হুশ ছিল না, বললুম, তবেই দেখছেন আমাকে যত কচি
মেয়ে মনে করেছেন, আমি তত কচি নই।
কিঙ্কিণী রাগ করল না, মুচকি হাসল। পরে বুঝেছিলুম, আমাকে
ক্ষেপাতেই ও এসেছিল। ওর নিকষে ঘষে পরখ করতে চেয়েছিল, আমি
কতটা মেকি।
ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ল, ইলেকট্রিক পাখা ছিল, তবু
একটা খবরের কাগজ ঘুরিয়ে হাওয়া খেতে লাগল। বলল, একটু
বসি। নির্মল এখুনি ফিরে আসবে, কী বল।
ঘরে নতুন
বৌ।
গলায় বিষ ঢেলে দিয়ে বললুম, ‘ঠিক কি। আপনার মত সহপাঠিনী
আর ক’জন আছে জানি না থাকলে হয়ত সারারাত
হঠাৎ হাওয়া খাওয়া বন্ধ রেখে কিঙ্কিণী ফিরে তাকালে ; স্থির চোখে
আমার দিকে চেয়ে বললে, তুমি জান নির্মলের সঙ্গে আমার বিয়ে হবার
কথা ছিল।
এবার মনে মনে আমার হাসবার পালা। এই তাে, নখের সামান্য
আঁচড়েই আসল কুঁদুলে মেয়েমানুষটি তাে তােমার ভেতর থেকে
বেরিয়ে পড়েছে। কি জবাব দেব ঠিক করার আগেই উনি ঘরে এসে
পড়লেন। মাথায় ঘােমটা টেনে আমি ঘর থেকে বাইরে এলুম।
বারান্দাটা পার হতে হতে কানে এল, তােমার বৌ কিন্তু ভারি
ঝগড়াটে নির্মল। ঠিক পাড়াগেঁয়ে খুড়িঠানদিদের মত।
ওঁর জবাবটুকু শােনবার জন্যে কান পাতলুম। সিগারেট ধরিয়ে
কাঠিটা ছুড়ে দেবার মত তাচ্ছিল্যের সুরে উনি বললেন, হবেই তাে।
লেখাপড়া তত শেখেনি।
সেদিন কিঙ্কিণী যতক্ষণ ছিল, ও-ঘর মুখাে হইনি। চাকর ওদের গিয়ে চা দিয়ে এসেছিল। বৃষ্টি ধরে এসেছিল। আমাকে উসখুস করতে দেখে ইন্দুল কটাক্ষ হানলেন ‘এত ব্যস্ত কেন। বললুম, এভাবে চললে, আপনার কথাটা যে সারা রাতেও ফুরবে না।' কেন, ‘সেই জন্যে ? বাঁচলুম। ই-লতা হাসলেন, কিন্তু সে-হাসির সুতােয় অবিশ্বাসের ছুচ পরান। ‘সারা রাতে গল্প ফুরবে না। সেই সঙ্গে সারা রাত একটা এ্যাকট্রেসের ঘরে রাত কাটাতে হবে, এই তো আপনার ভয় অনুপমবাবু? কিন্তু পঞ্চাঙ্ক নাটকের প্রস্তাবনাটুকু মাত্র আপনাকে বলেছি। সেদিন রাত্রে ওঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলুম, কিঙ্কিণীর সঙ্গে তােমার কতদিনের আলাপ। উনি অন্যমনস্কভাবে কী ভাবছিলেন। বললেল, ‘দিন? দিন না, বছর। প্রায় দশ বছর। ওর সঙ্গে আমি পড়তাম। কিঙ্কিণী তোমাকে বলেনি ? কঠিন সুরে বললুম, 'বলেছে। তবু তােমার মুখে শুনতে চাই। কিঙ্কিণীকে তুমি বিয়ে করলে না কেন। নিষ্প্রভ আলাে, উনি কনুই দিয়ে চোখ ঢেকে শুয়েছিলেন, তবু টের পেলুম, চমকে উঠলেন। চট করে জবাব দিতে পারলেন না। অনেক পরে আস্তে আস্তে বললেন, অনেকের জীবনে বড় আদর্শ থাকে। সব মেয়ের জন্ম শুধু রাঙা চেলি আর শাঁখা সিঁদুর পরার জন্যে নয়। রােষে বিদ্বেষে রুদ্ধ প্রায় কণ্ঠে বললুম, ‘রাঙা চেলি পরার দুর্ভাগ্য যাদের হয়েছে, তাদের বুঝি শুধু টিটকিরিই প্রাপ্য। উনি বললেন, “তুমি যে-সব বই পড়, সেই নাটক-নভেল থেকে যে এসব কথা মুখস্থ বলছ। তােমার এ প্রশ্নের জবাব দেব না। পরে জেনেছিলুম, উনি ওষুধপত্র নিয়ে গবেষণা করবার জন্যে একটা ল্যাবরেটরি খুলেছেন। সেখানে কিঙ্কিণী ওঁর সহকারী। সে-ল্যাবরেটরি এখন ওষুধপত্র তৈরির বড় একটা কারখানা হয়েছে। নাম বললেই বুঝতে পারবেন। ইন্দুলত বললেন, এর পরের গােটা কয়েক দৃশ্য বাদ দিয়ে বলি। আমার প্রশ্নের জবাব উনি দেননি, কিঙ্কিণী দিয়েছিল। আমাদের বাসায় প্রায়ই আসত। বেশির ভাগ সময়ই ওঁর সঙ্গে থাকত। কী কথা হত, তার এক বর্ণ বুঝতুম না। আড়ি অনেক পেতেছি। মাঝে মাঝে কিঙ্কিণী বলত, যাই তােমার বৌয়ের সনে আলাপ করে আসি নির্মল। না-জানি বেচারী একটি রান্নাঘরে কী করছে। তাড়াতাড়ি চলে আসতুম রান্নাঘরে। তরকারী চাপিয়ে গিয়েছিলুম। ধরে গিয়ে ধোঁয়া উঠছে। কিঙ্কিণী একটু পরেই হয়ত এল। পিড়ি পেতে বসল কাছে। গল্প করতে এলুম কনে-বৌ। ওমা, তরকারী পুড়িয়ে ফেলেছ ? অকারণেই খুন্তিটা কড়ার পিঠে জোরে জোরে ঠুকতুম। মনে মনে বলতুম, আমার কপালের চেয়ে বেশি না। একদিন কিঙ্কিণীকে সােজাসুজি জিজ্ঞাসাই করে বসলুম, উনি আপনাকে বিয়ে করলেন না কেন। ওর চোখের টলটলে মণি দুটো যেন কৌতুকে নেচে উঠল। বিয়ে? নির্মল আমাকে বিয়ে করেনি কেন ? তাই বুঝি বুঝিয়েছে তােমায় ? আসলে ওকে বিয়ে করিনি আমি। ‘কেন ? কিছুক্ষণ ইন্দুলতা আমার দিকে চেয়ে রইল। বলল, বললে বুঝতে পারবে? বিয়ে করবার জন্যে যে দৈহিক যোগ্যতা চাই, আমার সেট। নেই। বােকার মত বললুম, কেন রূপ ত আপনার যথেষ্টই বাধা দিয়ে বললে, ‘রূপের কথা বলিনি, স্বাস্থ্যের কথা। মা আমি কোনদিন হতে পারব না। কী করে জানলেন।
তল, স্থির চোখে আমার দিকে চেয়ে কিঙ্কিণী বললে, “আমি ডাক্তার। জানি। এও জানি, সন্তান না পেলে নির্মলকে বেশি দিন ধরে রাখা যেত না। ও দু’দিনে ক্লান্ত হয়ে উঠত। এর মাসখানেক পরে কাগজে খবর ছাপা হল, ওদের কারখানার প্রথম পেটেন্ট ওষুধ বেরিয়েছে। দুরারােগ্য কী একটা ব্যাধির ধন্বন্তরি। ওঁর নামের ঠিক নীচেই কিঙ্কিণীর উল্লেখ। ডাঃ চতুর্বেদীর গবেষণায় সহায়তা করিয়াছেন তাহার সহকর্মিনী ডাঃ কিঙ্কিণী সিকদার। এই অভিনব আবিষ্কারের কৃতিত্বের অধাংশ ইহারই প্রাপ্য। কাটিংটা রেখে দিয়েছিলুম, এখনও আছে। আপনাকে দেখাই। বাধা দিয়ে বললুম, থাক। আপনি বরং আলােটা জ্বেলে দিন। ইনত উঠে গিয়ে সুইচ টিপে দিলেন। বললেন, ‘সেই দীর্ঘ বিবরণীর কোথাও আমার নাম নেই। থাকবার কথাও না। স্বামীর বিছানার অধেক আমি পেয়েছি, কিন্তু গৌরবের অর্ধেক পেয়েছে কিঙ্কিণী সিকদার। সেদিন খবরের কাগজটার পাতায় দীর্ঘ নখের আঁচড় টেনেছি, আর ভেবেছি, এটা শুকনাে কাগজ না হয়ে যদি কিঙ্কিণীর মুখ হত। ক্ষত বিক্ষত করে দিয়ে ওর শরীরটাকে দুমড়ে মুচড়ে গায়ের জালা জুড়ােতে পারতুম। কাগজটাকে কুটিকুটি করে ছিড়লুম, পরে আবার আরেকটা আনিয়ে যত্ন করে কেটে কাটিং রেখে দিলুম। বললুম, শােধ নেবার অন্য উপায়ও ত ছিল। কিঙ্কিণীই আপনাকে তার ইঙ্গিত দিয়েছিল। ইলতা বললেন, ‘মা হয়ে ? লজ্জার কথা আপনাকে বলব কি, সে- চেষ্টাও বাকি রাখিনি। কিন্তু কিঙ্কিণীই আমাকে মা হতে দেয়নি। বন্ধুর কক্ষের কড়িকাঠগুলো ই-লতার গম্ভীর স্বরে কেঁপে উঠল। বিমূঢ় চোখে চেয়ে রইলুম, প্রশ্ন করলুম না। অনেকদূরের কোন বাড়ি থেকে সন্ধ্যারতির কঁাসরঘণ্টা বাজছে। ইনুল কিছুক্ষণ কান পেতে শুনলেন। -বধূরূপে যাকে পাইনি, জননী হয়ে তার মনােহরণ করব এ দুরাশা
১৫৮
যেদিন সত্য হবার সম্ভাবনা হল, সেদিন বিস্ময়ে পুলকে আত্মহারা হয়ে
গিয়েছিলুম। তখনও সন্দেহ ছিল, ওর কাছে তাই ভাঙিনি। কিন্তু
ধরা পড়ে গেলুম কিঙ্কিণীর কাছে। একে মেয়েমানুষ, তার ডাক্তার,
ওর চোখ এড়াব সাধ্য কী। প্রশ্ন করলে খুটিয়ে খুঁটিয়ে, তারপর চোখ
টিপে বললে, ‘বুঝেছি।
বাধা মানল না, গায়ে হাত দিয়ে পরীক্ষা করল। পায়ের পাতা
টিপল, চোখের পাতা টেনে দেখল। বলল, এক ফোটা রক্ত নেই যে।
তােমাকে একটা ওষুধ দেব ভাই, টনিক। খেলে বল পাবে। ভয় পেও
, সব ভালভাবে হয়ে যাবে।
ভয় পাইনি, কিন্তু ওর মনের কথা জানা থাকলে পেতুম।
আমাকে ওষুধ দেয়নি পরিমলবাবু, দিয়েছিল বিষ। আমাকে মারতে
নয়-তাহলে ত সব জ্বালাই জুড়ত--আমাকে নিষ্ফলা করতে।
স্তম্ভিত কণ্ঠে বললুম, কী করে জানলেন। আপনার ভুলও ত
হতে পারে।”
পারে। কিন্তু হয়নি। একবারই হয়েছিল যখন ওর দেওয়া ওষুধ
ভােজর পর ভােজ ঢক ঢক করে গিলেছি। খেলেই কেমন মাথা ঘুরত,
তবু খেতুম, বল হবে।
সপ্তাহ-ও ঘুরল না, একদিন কলতলায় পড়ে গেলুম।
অজ্ঞান হয়ে কদিন হাসপাতালে ছিলুম জানি না, যখন চোখ
মেললুম, দেখি উনি পাশে দাড়িয়ে। চেঁচিয়ে বললুম, আমার ছেলে?
উনি কপালে হাত রাখলেন। শান্ত হও।
সে-স্পর্শ যেন তপ্ত অঙ্গারের মত মনে হল। হাতখানা ছুড়ে দিয়ে
বললুম, ‘আগে বল, কোথায় রেখেছ তাকে।
উনি অবিচলিত স্বরে বললেন, ‘সে ত আসেইনি। তােমাকে যে
ফেরাতে পেরেছি, এই ঢের।
কিঙ্কিণী পাশে দাড়িয়েছিল। বললে, ‘কলতলাতেই শেষ হয়ে
গিয়েছিল। তােমারও আশা ছিল না বৌ। হাসপাতালের সার্জন
সমাজের সঙ্গে তখনও নােঙর বাঁধা ছিল। সেটুকুও ছিড়লুম, বিয়ে পাওয়া গহনার পুটুলী নিয়ে ভবানীর সঙ্গে দর্জিপাড়ায় বাসা নিলুম। গল্পে বাধা দিয়ে বললুম, ইলতা দেবী, আপনার বাবা-মা খোজ- খবর নিলেন না? থানা-পুলিশ ? না। কোথায় আর। শয়বাড়ী ফিরে গেছি•••ওঁরা নিজেদের মান বাঁচাতে এই কথাটা রাষ্ট্র করে দিয়েছিলেন। মা যে-কদিন বেঁচেছিলেন, আমার মুখদর্শন করেননি। ‘আপনার স্বামী ? প্রথম যেদিন ছােট্ট একটু পার্টে নামলুম, সেদিনই খবরের কাগজে পড়লুম, উচ্চতর গবেষণার জন্যে উনি বিলেত যাবেন। সদে যাই কিরিণী। আস্তে আস্তে হাই তুললেন ইন্দুস, মুখগহ্বরের সমুখে হাতের পাতা এনে সেটুকু ঢাকলেন। হঠাৎ উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, 'আমার অভিনীত নাটকের সমালােচনা কাগজে-কাগজে ছাপা হয়েছিল সেই সঙ্গে ছবি। আমার পরিচয় দিতে গিয়ে সবাই লিখেছিল, ইনি বিশিষ্ট ভদ্র কুলবধু, বিজ্ঞানব্রতী ডাঃ চতুর্বেদীর সহধর্মিণী। সেদিন কী উল্লাসে আত্মহারা হয়েছিলুম, আপনাকে আজ বােঝাতে পারব না অনুপমবাবু। পেয়েছি, যা চেয়েছিলুম। স্বামীর গৌরবের এক কণা ভাগ পাইনি, কিন্তু তাকে আমার কলঙ্কের ভাগীদার করতে পেরেছি। তারপর যতবার ছাপা হয়েছে আমার নাম, পােষ্টার পড়েছে দেয়ালে দেয়ালে, ইলুলতার সঙ্গে চতুর্বেদীটুকু যােগ করে দিতে ভুলিনি। বৃষ্টি থেমেছে। তবলা মেরামতের দোকান থেকে সামান্যতম বােলও আর শােনা যায় না। ভিজে হাওয়ায় আনালার পান্না মাঝে মাঝে থর থর করে উঠছে। হঠাৎ অসহায় শিশুর মত একটা বালিশে মুখ ঢাকলেন ইলতা, তীব্র দ্রুত স্বরে বলে উঠলেন, কিন্তু সব মিথ্যে হয়ে গেছে, উপেনবাবু। আমি সারা জীবন মাইনর বােলের পাঁকে হাবুডুবু খেয়েছি, উনি একটার পর একটা গৌরবের সিড়ি টপকে গেছেন। আমাকে ততা কারুর মনেও নেই। আজও শােকসংবাদে দেখুন, সবাই ওঁর সাধনা, কৃতিত্ব, অধ্যবসায়ের কথা লিখেছে; বার বার এসেছে কিঙ্কিণীর নাম, আমি যে আছি, কোনদিন ছিলুম, সে-কথাটাও কেউ উল্লেখ করেনি। ওকে আমার কলঙ্কের ভাগ দিতে পারলুম কই পরিমলবাবু। এবারও ইলতা আমার নামটা ভুল বললেন। কিন্তু শুধরে দেবার কিছুমাত্র প্রয়ােজন বােধ করলুম না।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.