Makardah Saraswat Library, Howrah

Garmanir Sera Galpo Ed. 1st

Ghosh, Shailobihari · 2009/08/14

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সেরা গল্প সিরিজ (১)
জামাণীৱ
সেৱা গল্প ।
অনুবাদক
শৈলবিহারীঘােষ
বুক ৪াণ্ড
১১এ, বঙ্কিম চাটার্জী ষ্টীট
কলিকাতা

প্রকাশক : কিরণবিহারী ঘােষ বুক ষ্ট্যাণ্ড ১/১১এ বঙ্কিম চাটার্জী ষ্টীট প্রচ্ছদপটে রূপ দিয়েছেন- শিল্পী-অনাথবন্ধু সেন প্রচ্ছদপট ভারত ফটোটাইপ ষ্টুডিও প্রথম সংস্করণ সেপ্টেম্বর ১ ১৯৪৫ দাম-তিন টাকা প্রিন্টার—গাবিন্দ পদ ভট্টাচার্য শৈলেন প্রেস ৪, সিমলা স্ট্রীট, কলিকাতা শ্রীফণীন্দ্র নাথ মুখােপাধ্যায় শ্ৰদ্ধাস্পদে-

No text on this page.

ভূমিকা বাংলা ভাষায় তর্জমা-সাহিত্যের দ্রুত পরিণতি খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার। অত্যল্পকাল পূবেও বিদেশী রচনার অনুবাদ কচিৎ দেখা দিত এবং তার একমাত্র দাম ছিল য়ুরােপীয় লেখকের নামের প্রসঙ্গিত। অর্থাৎ বাংলা ভাষায় রচিত শ্রেষ্ঠ সাহিত্যহিসাবে তর্জমাকে গ্রহণ করা হত , অনুবাদক পেতেন পরিচয়পত্র বাহকের আসন। পরিচয়পত্র বাহকের আসন। এখন সবই বলেছে ; ভাললা তর্জমা যে সৃষ্টিশীল লেখকেরই সাধ্য, কেবলমাত্র • ভাষাবিদ হলেই চলে না একথা পাঠক এবং প্রকাশকেরা স্বীকার করে নিচ্ছেন। যুদ্ধের বাজারে কী উপায়ে বহুলসংখ্যক অনুবাদগ্রন্থ ছাপবার কাগজ পাওয়া যাচ্ছে এবং যথেষ্ট দাম দিয়ে যে-সকল পাঠক পাঠিকা বই কেনেন তারা ইংরেজি ভাষা জানেন কিনা, অথবা ইংরেজি জেনেও বাংলা অনুবাদই তারা কেন পছন্দ করেন এই সব প্রশ্নের আলােচনা এখানে নিষ্প্রয়ােজন। যথেষ্ট অনুবাদ বেরােচ্ছে এবং তার প্রচলনও যথেষ্ট এইটেই বড়াে কথা। গােলদিঘির চারপাশে ছােটো বড়াে বইয়ের দোকানগুলিতে বাংলা অক্ষরে লেখা বিবিধ বিদেশী নাম দেখতে পাওয়া যায়। বেশি দিন একই অনুবাদ-গ্রন্থ, বিশেষ করে উপন্যাস এবং ছছাটো গল্প কঁাচের আড়ালে শােভমান হয় না; পুস্তকবিলাসী পদাতিকেরা সেটা লক্ষ্য করে থাকেন। তারপর হঠাৎ একদিন মাসিকপত্রে দেখা, যায় দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপন। শুনতে পাই রাশিয়া সাহিত্যের অনুবাদই বাংলাদেশে সব চেয়ে বেশি ছাপা হয়। তার অন্যান্য কারণের মধ্যে একটি এই যে যুদ্ধকালেও ঐ দেশে যতু আশ্চর্য গল্প লেখা হয়েছে—অন্ততপক্ষে যুদ্ধের প্রথমদিকে ছ তার তুলনা নেই। য়ুরােপের বাকি ভূখণ্ড আমাদের কাছে নীরব হয়ে রইল একমাত্র ইংলণ্ড, ছাড়া। কিন্তু ফ্রান্সে জর্মানিতে, হাঙ্গেরি বা গ্রীস দেশে কি দুচারটিও শ্রেষ্ঠ লেখা বেরােয়নি। লেখকের দল তাে সকলেই শাসক সম্প্রদায়ের পােয্যপুত্র নন, তাঁরা রক্তচক্ষুকে এড়িয়েই শান্ত দৃষ্টিতে দেখা জগৎকে ব্যক্ত করে থাকেন, তাঁদের পরিচয় কই । যুদ্ধাবসানে কি তাদের লেখা পড়তে পাবো না? যাদের কলম সন্ত্রাসে থামেনি, যাঁরা অগােচরে তাদের শিল্প-বিচারের সাক্ষ্য রেখে গেছেন তাদের রচনাও বাংলা ভাষায় উত্তীর্ণ হােক। শৈলবাবু জর্মান গল্পের এই তর্জমাগুলি ছাপিয়ে পথপ্রদর্শকের কাজ করেছেন। পাশ্চাত্য সাহিত্যকে চিনতে হলে য়ুরােপের প্রত্যেক ভাষার দ্বারস্থ হতে হবে, কোনাে দেশকে বাদ দিলে চলবে না। এই বইয়ের গল্পগুলি অবশ্য প্রাক্‌-যুদ্ধকালীন জর্মানিতে লেখা, কিন্তু এর মধ্যে সাহিত্যের বিশিষ্ট একটি স্বাদ পাওয়া গেল যা ঐ দেশেরই উৎকর্ষজাত। পরবর্তী জর্মান সাহিত্যে নিশ্চয়ই রাষ্ট্রযন্ত্রে নিপীড়িত স্বাভাবিক মানুষের কাহিনী শােনা যাবে। পােলণ্ড, ডেনমার্ক, হল্যাণ্ড প্রভৃতি দেশ হতেও নূতনতর সাহিত্যের সংবাদ পাওয়া যাবে, তারও তর্জমা বাংলায় বেরােবে আশা করে রইলাম। “জাৰ্মানীর সেরা গল্প” বইখানি যথার্থ ই উৎকৃষ্ট গল্পের সংগ্রহ। বাংলা সাহিত্যে তার বিশেষ স্থান হবে। অনুবাদকের রচনাভঙ্গী সহজ এবং সাবলীল, পড়লে ভুলে যেতে হয় তর্জমা পড়ছি। চয়নের শিল্পরুচি এই অনুবাদ গ্রন্থকে যথার্থ ই সমৃদ্ধ করেছে ; শৈলবাবুকে আমার অভিবাদন জানাই। পাঠককে অনুরােধ করি ভূমিকা ত্যাগ করে এখন সাহিত্যের আসরে প্রবেশ করুন। অমিয় চক্রবর্তী

সুচীপত্র
হারমান্ সুডারমান
[ ১৮৫৭-১৯২৮ ]
বড়দিনের স্বীকারােক্তি
গেরহার্ট, হাউপমান
( ১৮৬২)
ঝাণ্ডাওয়ালা
১২
৫০
য়কব, ওয়াসারমান্
(১৮৭৩— ')
লিউকারডিস
আর্থার স্কলিজলার
১৮৮২-১৯৩১
জমিদারের ভাগ্য
ষ্টেফান্ সােয়াইগ,
( ১৮৮১••• )
পরিহাস
যােহান্ হাইনরি দানিয়ে জকে
(১৭৭০-১৮৪৮ )
সরাইখানা
থিয়ােডাের ফোর
(১৭৯১-১৮১০ )
বীণা
•••
৮২
১২৭
১৬৩

No text on this page.

বড়দিনের স্বীকারােক্তি ভদ্রলোেকটী মহিলাটীকে সম্বােধন করে বললেন,-“বেশ ভালই হয়েছে, এবারে একসঙ্গে মেলা গেছে, সময়টা মধুর আলাপ-আলােচনায় বেশ কাটান যাবে। চুটীটা ফুরিয়ে গিয়ে মন্দ হােল না ; অসংখ্য লােকের কলরব থেকে নিষ্কৃতি আপনিও পেলেন, আমিও পেলাম। কি বলুন, একটু অবসর পেয়ে বাঁচা গেল ?” ভদ্রলােক আবার বলে চললেন—“বড়দিনের ছুটীর এই বিরাট অবসরের সময়টা আমাদের মত চিরকুরদের কাছে কি রকম যন্ত্রণাদায়ক বলুন তাে? নির্জনতার মধ্যে পড়ে মনটা যেন হাঁফিয়ে ওঠে। আনন্দকে সকলের মধ্যে চারিয়ে দেবার ক্ষমতা আমাদের আছে বটে, কিন্তু সত্যি বলতে কি, অপরের আনন্দের অংশীদার আমরা হতে পারি না। তার প্রথম কারণ, মনের ভেতর নিজের সম্বন্ধে ভালমন্দ অনেক কিছু সমালােচনার ঢেউ উঠতে থাকে ; দ্বিতীয় কারণ, নিঃসঙ্গ মরু জীবনের অনন্ত শূন্যতা।” ভদ্রলােক আরও বললেন—“আপনার মনে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, আমার হৃদয়ের গােপন কক্ষের জানালাগুলি আপনার সামনে খুলে ধরি না কেন। তাহলে সমবেদনাও হয়ত আপনার কাছে অনেক পেতে পারি। একটী লােকের উক্তি আমার মনে পড়ে গেল। তিনি কি বলেছিলেন, জানেন ?” মহিলাটী উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—“কি, বলুন না ?, জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ভদ্রলােক বললেন-“প্রকৃত চির কুমারের মধ্যে সান্ত্বনা পাবার লালসা থাকে না। একবার যখন সে অসুখী হয়েছে, সেই চিরন্তন্ বেদনার মধ্যেই সে স্বর্গের নীড় রচনা করে থাকে। এ ছাড়া আরেক ধরণের চিরকুমার দেখা যায়। আমি অবশ্য এমন ধরণের চিরকুমারের কথা বলছি না, যারা বন্ধুত্বের ভাণ করে কোন সংসারের মধ্যে অশান্তির সৃষ্টি করেন। আমি এমন সব লােক জানি, যারা এক বিশিষ্ট পরিবারের বন্ধুত্ব লাভ করে কোন নারীকে নিষ্কামভাবে ভালবেসেছেন এবং চিত্তমন্দিরে বেদী স্থাপন করে তাকে দেবীর আসনে স্থান দিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্য্যন্ত কাটিয়ে গেছেন।” মহিলাটা মাথা নেড়ে বললেন- “একি সম্ভব।” এতে ভদ্রলােকটী জবাব দিলেন,-“ভালবাসা নিষ্কাম হতে পারে, এ হয়ত আপনি মানছেন না। তবে হ্যা, খুব শান্ত স্থির উচ্চমনা লােকের মধ্যেও মাঝে মাঝে পশু-প্রবৃত্তি উকি ঝুকি মারতে পারে, এটা অসম্ভব নয় ; কিন্তু তাকে প্রতিবােধও সে করতে পারে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, এবারের বড়দিনের ঠিক আগের দিন দুটী ভদ্রলােকের মধ্যে যে কথাবার্তা হয়েছিল তা বলে আপনাকে পরিষ্কার করে জিনিষটা বুঝিয়ে দিচ্ছি। প্রতিশ্রুতি দিন যে আমি কেমন করে এই কথাবার্তার মাঝখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম তা জানবার জন্য মােটেই অনুরােধ করবেন না, আর যা বলে যাব তা কাকেও ব্যক্ত করবেন না। মেয়েদের মন ত, কোন কথাই তারা চেপে রাখতে পারে না।” মহিলাটী উত্তর দিলেন—“বিশ্বাস করুন, পৃথিবীর কেউ একথা জানতে পারবে না, আমার কাছ থেকে।” ভদ্রলােক আরম্ভ করলেন। ঘরখানি বেশ বড়, পুরােনাে ধরণের আসবাব আর কার্পেটে পরিপাটী বড়দিনের স্বীকারােক্তি ৩ করে সাজান। এর থেকে গৃহস্বামীর বেশ মার্জিত রুচির পরিচয় পাওয়া যায়। সিলিংয়ের মাঝখান থেকে একটা ঝাড়লণ্ঠন ঝুলছে, তার থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে ফিকে সবুজ রংএর আলাে ; আলােটা সাদা চাদর ঢাকা টেবিলের উপর গিয়ে পড়েছে। টেবিলের উপর রয়েছে পানীয় বস্তুর সরঞ্জাম। দুটী ভদ্রলােক সামনাসামনি অশায়িতভাবে বসে আছেন ; বহু বসন্ত তাদের উপর দিয়ে বয়ে গেছে। দুজনের দৃষ্টি যেন উদাস। গৃহস্বামীর চোখাল সরু কামানাে গোফ জোড়া আর কেঁচকান ভুরু দুটি থেকে একটা, সৈনিকসুলভ রুক্ষ দৃষ্টি ফুটে বেরুচ্ছিল। স্পষ্টই বোঝা মাচ্ছিল, তিনি এক সময় সৈনিক ছিলেন। দোলনা চেয়ারের উপর দেহটাকে এলিয়ে দিয়ে হাতল দুটোকে দুহাতে খুব শক্ত করে ধরে ছিলেন তিনি। মাঝে মাঝে তার নীচের ঠোটটি কেঁপে উঠছিল ; মনে হচ্ছিল, কিছু হয়ত চৰ্ব্বণ করছেন। সামনের ভদ্রলােকটী কোচের উপর বসে ছিলেন। তার দেহটী দীর্ঘ এবং কশ, কঁধ দুটী সরু ; মাথা, কপাল ও জ থেকে তাকে দার্শনিক প্রকৃতির বলেই অনুমান হয়। মুখের লম্বা পাইপ থেকে নির্গত হচ্ছিল সাদা কুণ্ডলি পাকান ধোঁয়ার সারি। ধোঁয়ায় মুখটাকে যেন আবছা করে দিচ্ছিল। মসৃণ শুকনাে বহু রেখা পরিবৃত মুখ থেকে এক রকম শান্ত হাসির আভাস ফুটে বেরুচ্ছিল, এ থেকে অন্তরের একটা নিবিড় আনন্দ আর বৈরাগ্যের পরিচয় মেলে। দুজনেই মােনব্রত অবলম্বন করেছিলেন। মাঝে মাঝে জ্বলন্ত আলাের তেল ও তামাকের পাইপের মুখ থেকে আওয়াজ বেরিয়ে এসে ঘরের স্তব্ধতা ভঙ্গ করছিল। আবছা অন্ধকার ঘরের পিছন থেকে ঢং ঢং করে এগারােটা বেজে উঠল । একটু মৃদু ও কঁপা গলায় দার্শনিক ভদ্রলােক বললেন—“এই সময়েই ত আপনি পান করে থাকেন।” ৮ ৪, জাৰ্মাণীর সেরা গল্প গৃহস্বামী অভ্যাসমত একটু সামরিক কর্কশস্বরে জবাব দিলেন, “হঁ্যা, ঠিক এই সময়েই।” অতিথি উত্তর দিলেন—“একথা কেন মনে পড়লো জানেন ? আপনার স্ত্রী আজ নেই, সত্যিই তার অবর্তমানে একটা অভাব রয়ে গেছে।” গৃহস্বামী মাথা নাড়লেন। অতিথি বললেন, “শুধু একবার নয়, চুয়াল্লিশটি বড়দিনে তিনি আমাদের পানীয় পরিবেশন করেছেন।” গৃহস্বামী –“হ্যা, যতদিন আমি কর্লিনে বাস করেছি ও তাপনি যতবার আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, এ অভ্যাসের ব্যতিক্রম আমি তার মধ্যে দেখিনি।” অতিথি —“গত বছর এই সময়ে আমরা তিনজনে মিলিত হয়েছিলাম, এই মিলনের মধ্যে কি আনন্দই না অনুভূত হয়েছিল ! তিনি ঐ আরাম কেদারাটীর উপর উপবিষ্ট হয়ে নিবিষ্টচিত্তে পলের জ্যেষ্ঠ সন্তানের জন্য মােজা বুনছিলেন ; খুব দ্রুতগতিতেই বুনছিলেন, কারণ বারােটার মধ্যেই বােনাটা শেষ করতে হবে তার। কথামত ঠিক সেই সময়ে মােজাটা বুনেও ফেলেছিলেন। তারপর আমরা সকলে মিলে সুরা পান করে মৃত্যুর রহস্য নিয়ে আলােচনা করেছিলাম। আশ্চর্যের বিষয়, এর তিন মাস পরে মৃত্যু এসে তাকে হাত ধরে নিয়ে চলে গেল। তারপর আমি আত্মার অবিনশ্বরতা সম্বন্ধে একটা বিরাট প্রবন্ধ লিখি। আপনি সেটা শুনে শােকে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। তার এই তিরােধান আমাকেও বড় ব্যথা দিয়েছিল। যাই হােক, কষ্ট হয় বলে সে চিন্তাকে আর মনে স্থান দিই না।” সৈনিক ভদ্রলােকটী উত্তর দিলেন—“সত্যিই তার তুলনা হয় না ; আমাকে কি যত্নই না সে করতাে। প্রত্যহ ভােরবেলা আমার অফিসে বড়দিনের স্বীকারােক্তি যাবার আগে সে নিয়মিত আমাকে এক পেয়ালা করে কফি বানিয়ে দিত, এর মধ্যে যেন তার স্নেহকে সে নিংড়ে দিত। সত্যি কথা বলতে কি, তার দোষও ছিল। আমি জানি, আপনার সঙ্গে সে একবার সস্তা রকমের দার্শনিক মতবাদ নিয়ে জড়িয়ে পড়েছিল।” অতিথি ভদ্রলােকটী এই কথাটীতে একটু চমকিত ও বিচলিত হয়ে বলে উঠলেন,-“আপনি তাকে ভুল বুঝেছেন।” বলার সময় তার ঠোঁট দুটী, যেন একটু কেঁপে উঠল ; সৈনিক বন্ধুটীর চোখের প্রতি তাঁর করুণ ও শান্ত চোখ দুটী নিবদ্ধ হয়ে গেল। দার্শনিক বন্ধুর অন্তলোকে অতীতের গােপন পাপের ছায়া ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছিল। এই মােনতাকে ভঙ্গ করে ভদ্রলােক বললেন,—“বন্ধু, শুনুন, আমার মনের ভেতর এমন একটা গুরুভার জমে আছে, যেটা আজ প্রাণ খুলে আপনার কাছে না বলে ফেললে আমার মনে শান্তি আসছে না। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এ বিরাট বেদনাদায়ক বােঝা বহন করে চলা আমার পক্ষে অসম্ভব।” সৈনিক বন্ধুটী পাইপের মধ্যে তামাক ঠেসে চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন—“বলে যান বন্ধু।” দার্শনিক কম্পিতম্বরে আরম্ভ করলেন : “এক সময় আপনার স্ত্রী ও আমার মধ্যে একটা ব্যাপার ঘটেছিল— সৈনিক বন্ধুটী বললেন, “ঠাট্টা করবেন না বন্ধু।” দার্শনিক—“চল্লিশ বৎসর ধরে এ ব্যাপারটা আমার মনের মধ্যে জমা হয়ে রয়েছে । এখন আমি এটা সম্পূর্ণভাবে ব্যক্ত করে মনটাকে হাল্কা করে দিতে চাই।” খুব উগ্রম্বরে সৈনিক বন্ধুটী বললেন—“তা হলে আপনি কি বলতে চান, আমার স্ত্রী আমাকে প্রতারণা করেছে ?” ;

(৫)
জাৰ্মাণীর সেরা গল্প
দার্শনিক দুঃখজড়িতস্বরে হেসে বললেন—“ছিঃ, আপনি একথা
বলছেন!”
সৈনিক বন্ধুটী বিড়বিড় করে কি যেন বলে পাইপট ধরালেন।
দার্শনিক বন্ধু বলে যেতে লাগলেন,—“তিনি ছিলেন স্বর্গের পরীর
মতই পবিত্র। আমরা দুজনেই হলুম পাপী। তাহলে ভাল করেই বলে
ফেলি।
তেতাল্লিশ বছর আগেকার কথা। সে সময় আপনি বার্লিনে
ক্যাপটেনের পদে অধিষ্ঠিত। আর আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই।
আপনার স্মরণ আছে, আপনি তখন কি রকম আসুরিকভাবে জীবন যাপন
করতেন।”
৫
র
সৈনিক ভদ্রলােকটী কম্পিতহস্তে গোঁফ পাকাতে লাগালেন ।
দার্শনিক বলে যেতে লাগলেন,
মিয় একজন পরমা সুন্দরী অভিনেত্রী বাস করতো, যার চোখ
দুটি ছিল হরিণের মত টানা টানা, আর দন্ত-পংক্তি ছিল ঝকঝকে আর
ছােট ছােট। আপনার মনে পড়ে বােধ হয় ?”
সৈনিক বন্ধু একটু কঁপা গলায় উত্তর দিলেন-“হা মনে পড়ে, তার
নাম ছিল বিয়াকা।” বৃদ্ধের শুষ্ক ও কঠিন মুখের উপর দিয়ে একটা
কঠোর হাসি খেলে গেল। তিনি আরও বলে যেতে লাগলেন—“জানেন,
কি ভয়ঙ্কর মেয়েমানুষই না সে ছিল, কী ভীষণ কামড়াত ও মারত।”
দার্শনিক বলতে লাগলেন—“আপনি আপনার স্ত্রীকে প্রতারণা
করেছিলেন, সে কথা তিনি বুঝে নীরবে এই বেদনা সহ্য করে গেছেন।
কোনদিন আপনার কাছে এ নিয়ে অভিযােগ করেন নি। এটা আপনার
দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে, কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি। আমার মার মৃত্যুর পরে
তিনিই প্রথম নারী যার সংস্পর্শে আমি এসেছিলাম। তিনি আমার

বড়দিনের স্বীকারােক্তি ০ জীবনপথে ধ্রুবতারার মতই দেখা দিয়েছিলেন। একদিন সাহস করে • তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তার অন্তর্বেদনার কারণটা কি। তিনি শুধু মৃদু হেসে জবাব দিয়েছিলেন যে, তাঁর মনের অবস্থা সে রকম ভাল যাচ্ছে । এটা পল জন্মাবার কিছুদিন আগেকার কথা। তারপর এল বড়দিনের ঠিক আগের দিন। ঠিক আজ থেকে তেতাল্লিশ বছর আগেকার দিনের রাত্রির কথা বলছি। প্রত্যহের অভ্যাসমত রাত্রি আটটার সময় আপনার বাড়ীতে উপস্থিত হয়েছি। তিনি তখন একটা কাপড়ের উপর ছুচ দিয়ে ফুল তুলছিলেন, আর আমি তাকে বই পড়ে শশানাচ্ছিলাম। আমরা দুজনেই আপনার প্রতীক্ষায় ছিলাম। ঘড়ির কাটা ঘুরে যেতে লাগল, কিন্তু আপনি ফিরলেন না। তখন তার মনের অবস্থা যে কী রকম হচ্ছিল তা লক্ষ্য করলুম, তার সর্বাঙ্গ যেন কেঁপে উঠল, আর তার সঙ্গে আমার শরীরও কণ্টকিত হয়ে উঠল। আমি জানতাম, কি আকর্ষণে আপনাকে সে টেনে রেখেছে। আমার কেমন যেন ভয় হােল ; সেই মাদকতাময়ী অভিনেত্রীর বাহুবেষ্টনের মধ্যে থেকে বুঝিবা ' আপনি বারােটা বাজার কথা ভুলে গেছেন। আস্তে আস্তে ঘড়ির কাটা বারােটা পেরিয়ে গেল। তিনি বােনা বন্ধ করলেন, আমার পড়াও বন্ধ হয়ে গেল। একটা ভীতিজনক স্তব্ধতায় ঘরটা যেন আচ্ছন্ন এল। আমি লক্ষ্য করলাম, এক ফোটা চোখের জল তাঁর গাল বেয়ে বােনাটার উপর গিয়ে পড়েছে। আমার সেই সময় মনে হল, লাফিয়ে ছুটে বেরিয়ে গিয়ে আপনাকে বাড়ীতে ফিরিয়ে আনি। আমি বেশ অনুভব করলাম, সেই নারীর কবল থেকে আপনাকে ছিনিয়ে আনার ক্ষমতা আমার আছে। ঠিক সেই মুহুর্তে তিনি চেয়ার থেকে লাফিয়ে চীৎকার করে বলে উঠলেন—“কোথায় যাচ্ছেন ?” ভয়েও যেন মুখটা তার কি রকম হয়ে গিয়েছিল। আমি উত্তর করলাম- ৮ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প “ফ্রাঙ্ককে ফিরিয়ে আনতে চলেছি।” এ কথা শুনে তিনি চীৎকার করে উঠে বললেন,—“দোহাই আপনার, আপনি এখানে থাকুন ; আমাকে একলা ফেলে যাবেন না।”, কথা বলতে বলতে তিনি তার হাত দুটীকে আমার কাঁধের উপর রেখে, অশ্রুসিক্ত মুখখানি আমার বুকের মধ্যে লুকিয়ে ফেললেন। আমার সর্বশরীর কেঁপে উঠল। কোন নারীর এত নিকট সান্নিধ্য আমি এর আগে অনুভব করিনি। মনকে সংযত করে তাকে সান্ত্বনা দিতে আরম্ভ করলাম। মুখচোখ থেকে বুঝলাম, সত্যিই তিনি সান্ত্বনার প্রয়াসী। আপনি ফিরে আসবার পর, আমার মুখের কি অবস্থা হয়েছিল, আপনি তালক্ষ্য করেন নি। আপনার মুখ থেকে লাল আভা ফুটে বেরুচ্ছিল। আর মনে হচ্ছিল, আপনার চোখ দুটী ভালবাসার মাদকতায় জড়িয়ে আসছে। সেবারে বড়দিনের আগের দিনের ঘটনা আমার মনের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছিল ; লজ্জাও এনেছিল কম নয়। তার বাহুদ্বয়ের কোমলতার স্পর্শ ও কেশপাশের সুন্দর সুরভি অনুভব করার পর থেকে মনে হােল যেন আমার সেই কল্পিত ধ্রুবতারাটী চিত্তাকাশ থেকে খসে পড়লাে ; তার থেকে ক্রমবিকাশ লাভ করে দেখা দিল নারীরূপে, সুন্দরী রমণী হয়ে, তার আপাদমস্তক যেন ভালবাসা আর প্রেম দিয়ে ঘেরা। আমার দৃষ্টির মধ্যে একটা আকুলতার আমেজ ছিল। আমি নিজেকেই নিজে প্রবঞ্চক বিশ্বাসঘাতক বলে ভৎসনা করেছিলাম। আমার বিবেকের গ্লানি কিছুটা মুছে ফেলবার প্রয়াসে আপনাকে সেই অভিনেত্রী নারীর কবল থেকে ফিরিয়ে আনতে মনস্থ হয়েছিলাম। সৌভাগ্যবশত আমার হাতে কিছু অর্থও ছিল, যেটা আমি উত্তরাধিকারীরূপে লাভ করেছিলাম। আমি তাকে সেই অর্থ দিতে চাই, সে সেটা গ্রহণ করে খুসীই হয়েছিল।” সৈনিক বন্ধুটী কথার মাঝে বাধা দিয়ে বললেন—“বুঝেছি, বিয়াঙ্কা বড়দিনের স্বীকারােক্তি ০ তার চিত্তাকর্ষক বিদায়পত্রে আমাকে জানিয়েছিল, অতি কষ্টে ভগ্ন-হৃদয়ে সে আমার প্রেমকে প্রত্যাখ্যান করেছে ; এজন্যে ত শুধু দায়ী আপনি, না?” “হুঁ, আপনার কথা আমি সমর্থন করলাম। শুনুন, আরও বলি। আমি ভেবেছিলাম যে, সেই লালসাময়ী নারীকে অর্থ দিয়ে তার বিনিময়ে শান্তি ফিরে পেলাম ; কিন্তু আমি ভুল বুঝেছিলাম। আসুরিক পশুপ্রবৃত্তি আমার মনে এসে জট পাকাতে সুরু করলাে। মন কিছুতে স্থির রাখতে পারছিলাম না। নিষ্কৃতি পাব এই আশায় কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিলাম, কিন্তু মনে শান্তি এলাে না। বছর গড়িয়ে আবার সেই নতুন বছরের আগের দিনে এসে থামলাে। অভ্যাসমত আবার একবার এইরকমভাবে তার পাশে গিয়ে বসেছিলাম। আপনি সে সময় বাড়ীতে ছিলেন ; ক্লাবে নৈশ আনন্দের পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পাশের ঘরের কোচে গভীর নিদ্রায় মগ্ন হয়েছিলেন। তার খুব নিকটে বসে সেই ফ্যাকাসে সুন্দর মুখখানির দিকে তাকাতেই সেই বড়দিনের আগের দিনের স্মৃতির টুকরােগুলাে এসে মনের মধ্যে ভীড় করতে লাগল । আর একবার আমার কঁাধে তার কেশপাশের স্পর্শ ও চুম্বন করার লালসা আমার হৃদয়কে অভিভূত করে ফেলল। ভাবলাম, বাসনা চরিতার্থ করে ফেলি। একটু পরেই আমাদের পরস্পরের মধ্যে দৃষ্টির বিনিময় হয়ে গেল। তার চোখ দেখে মনে হােল, তিনি আমার গােপন বাসনাকে অনুভব করতে পেরেছেন। আমি কোন মতে আর নিজেকে সামলাতে পারলাম । আমি অভিভূত হয়ে তার পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ে, আমার জ্বলন্ত মুখখানি তার কোলের মধ্যে লুকিয়ে ফেললাম। কিছুক্ষণ এইভাবে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইলাম ; তারপর হঠাৎ তার স্নেহ শীতল হস্তের স্পর্শ মাথায় অনুভব করলাম। তিনি যেন শান্ত সহজ স্বরে আশীর্বাদ করে বললেন, “আপনি ভাল হয়ে উঠুন ; আপনার মনের ব্যাধি সেরে যাক।” ০ ;

জাৰ্মাণীর সেরা গল্প আমার বিবেকে ঘা লাগতেই আমি লাফিয়ে উঠে তাকে প্রতিশ্রুতি দিলাম-“আমি এবার থেকে ভাল হবই। আমার নিদ্রিত বন্ধু যে আমায় এত বিশ্বাস করে তাকে আমি কিছুতেই বঞ্চনা করতে পারি না। তিনি টেবিল থেকে একখানি বই এনে আমার হাতে সমর্পণ করলেন। আমি বুঝতে পারলাম, তার উদ্দেশ্য কি। আমি পাতাগুলি উল্টে চেঁচিয়ে পড়তে লাগলাম, কি পড়েছিলাম তা জানি না। পাতার অক্ষরগুলাে যেন আমার চোখের সামনে কেঁপে উঠতে লাগল। আমার চিত্তাকাশে যে ঝড়ের কলরােল উঠেছিল, ধীরে ধীরে সেটা থেমে এল, হৃদয়ে গ্লানির আভাস যেন মিলিয়ে যেতে লাগল। ' বারটা বাজতেই আপনি তাজড়িত চোখে আমাদের নতুন বছরের শুভ ইচ্ছা জ্ঞাপন করতে উঠে এলেন, তখন আমার মনে হল, আমার মনের গ্লানি কোথায় মিলিয়ে গেছে। এই ঘটনার পর থেকে আমি হয়ে গেলাম শান্ত, স্থির। আমি জানি, তিনি আমার ভালবাসার প্রত্যুত্তর দিতে পারেন নি। তাতে কি যায় আসে। এর পরে তার কাছ থেকে আমিশুধু আশা করেছিলাম সহানুভূতি, মমতা। বছরের পর বছর ঘুরে গেল, আপনার ছেলে মেয়েরা বড় হল, তাদের বিবাহ হয়ে গেল। আমরা ধীরে ধীরে বার্ধক্যের দরজায় এসে পৌঁছলাম। আপনি আগের ব্যাভিচারী জীবন পরিত্যাগ করে একটী নারীর মধ্যেই চিত্ত স্থাপন করলেন। সে নারীর প্রতি আমার ভালবাসা কিছুমাত্র কম ; কিন্তু এ ভালবাসা অন্যরূপ নিয়ে বসল। পার্থিব আকাঙ্ক্ষা কেটে গিয়ে আমাদের মধ্যে একটা আধ্যাত্মিক ঐক্যতান সংযােজিত হােল। আমরা যখন দার্শনিক তত্ত্ব নিয়ে আলােচনা করতাম, তা শুনে আপনি কী উপহাস করতেন। কিন্তু ভাবতে পারতেন যে, আমাদের আত্মায় আত্ময় মিলন সাধিত হয়েছিল! এটা বুঝতে পারলে, আপনি হয়ত আমার উপর ঈর্ষান্বিত হতেন বড়দিনের স্বীকারােক্তি এখন তিনি গত হয়েছেন ; সম্ভবত সামনের বছুরের এমনটী দিনে আমরা তাঁকে অনুসরণ করতে পারি। সেইজন্যে ভাবলাম, মনের গােপন কথা আপনার কাছে ব্যক্ত করে হাল্কা হয়ে ওঠার এই উত্তম সময়। একটু থেমে গদগদ কণ্ঠে আবার বলতে লাগলেন, “বন্ধু, আপনার প্রতি যে অন্যায় আচরণ করেছি তার জন্য আপনি আমায় ক্ষমা করুন।” সৈনিক বন্ধুটী বললেন—“কি যে বলেন, এর ভেতর ক্ষমা করার কি আছে ? আপনি যে স্মৃতি বিজড়িত ঘটনাটীর বর্ণনা আমার কাছে করে গেলেন, এ তো পুরণাে ব্যাপার, আমি আগেই জানতাম। চল্লিশ বছর আগেই সে আমায় এ ঘটনাটী খুলে বলেছিল। আমি আরেকজন নারীর প্রতি এত গভীরভাবে আসক্ত হয়েছিলাম কেন, তার কারণ জানেন ? দার্শনিক বন্ধুটী উদ্গ্রীব হয়ে উঠলেন। সৈনিক বন্ধুটী আবার আরম্ভ করলেন—“সে আমায় যেদিন জানাল যে পৃথিবীতে আপনাকে ছাড়া অন্য কারুকে ভালবাসার কল্পনাই সে করতে পারে না, সেইদিন থেকেই আমি ওই রকম পথ বেছে নিয়ে- ছিলাম।” দার্শনিক বন্ধুটী মৌনাবলম্বী হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। দেওয়ালের ঘড়িতে ঢং ঢং করে বারােটা বেজে উঠল ।

ঋণ্ডিওয়ালা 2 প্রত্যেক রবিবারে ঝাণ্ডাওয়ালা থিয়েলকে নিউজিটাউ চার্চের মধ্যে নিয়মিত সময়ে বসে থাকতে দেখা যেত। কোন রবিবারে অনুপস্থিত থাকলে বােঝা যেত, নিশ্চয়ই তার কোন একটা জরুরী কাজ পড়েছে অথবা সে পীড়িত। সুদীর্ঘ দশ বৎসরের মধ্যে শুধু দুদিনের জন্য তার এই ব্যতিক্রম হয়েছিল। বাড়ীতে এ দুদিন অসুস্থ অবস্থায় সে শয্যা নিয়েছিল। একবার একটা দ্রুতগামী ইঞ্জিন থেকে একটা প্রকাণ্ড কয়লার টুকরাে বিদ্যুৎগতিতে ছিটকে এসে তার পায়ে লাগতেই সে ঠিকরে গিয়ে পড়ে খাদের মধ্যে। আরেকবার একটা চলন্ত একপ্রেস থেকে একটা খালি মদের বােতল ছিটকে এসে তার বুকে সজোরে লাগে। এই ছােট দুটী দুর্ঘটনার জন্য শুধু এই দুটো দিনই তাকে চার্চের প্রার্থনায় যােগ দিতে দেখা যায়নি। প্রথম পাঁচ বৎসর তাকে একা একাই স্কোরেন্টি গ্রাম থেকে নিউজিটাউএ আসতে হত। তারপর এক সুপ্রভাতে একজন চপলা ক্ষীণাঙ্গী তরুণীর সঙ্গে তাকে দেখা গেল। স্বাস্থ্যবান থিয়েলের সঙ্গে ক্ষীণাঙ্গী নারীটীর এই অসামাঞ্জস্য মিলনকে কেউ অনুমােদন করতে পারেনি। তারপর এক রবিবার বিকেলে তারা দুজনে চার্চের বেদীতে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হল । দুবছর এই ক্ষীণাঙ্গী নারীটীকে চার্চে থিয়েলের পাশে বসতে দেখা গেল। তার সুন্দর চিবুকখানি সেই পুরাতন চার্চের সঙ্গীত শ্রবণে নুয়ে পড়ত, তার পাশে থিয়েলের রৌদ্রদগ্ধ মুখখানিও দেখা যেত। হঠাৎ একদিন থিয়েলকে আগের মত একা বসে থাকতে দেখা যায়। এর মধ্যে একদিন মৃত নারীটীর জন্য চার্চে শােকসূচক শব্দে ঘণ্টা বেজে ওঠে।

ঝাণ্ডাওয়ালা লােজনেরা লক্ষ্য করলাে, স্ত্রীর মৃত্যুতে তার অবয়বের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। দেখা গেল, সে আগের মতই প্রতি রবিবারে চক্চকে পরিষ্কার পরিচ্ছদে নিজের দেহকে আবৃত করেছে। শুধু পরিবর্তনের মধ্যে এইটুকু দেখা গেল, তার লােমশ গলাটী একটু সামনের দিকে ঝুলে পড়েছে, আর খুব দরদের সঙ্গে সমবেত ধৰ্ম্ম সঙ্গীতের সুরে তার গলা মিলিয়ে দিচ্ছে এবং একাগ্রচিত্তে ধৰ্ম্ম-যাজকের উপদেশবাণী শ্রবণ করছে। সর্বসাধারণের মনে একটা ধারণা জন্মে গেল যে, স্ত্রীর মৃত্যু তার মনে সেরকম আঘাত দেয়নি। আবার দ্বিতীয়বার যখন সে দারপরিগ্রহ কোরল, তখন সে • ধারণাটা সকলের মনে বদ্ধমূল হয়ে যায়। দ্বিতীয় স্ত্রীর স্বাস্থ্য ছিল অটুট। সে ছিল আগুদের গয়লানীর মেয়ে। থিয়েল যখন তার বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে ধর্মযাজকের কাছে যায় তিনিও একথা সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করতে পারেন নি। ধৰ্ম্ম-যাজক বললেন, -এত তাড়াতাড়ি আবার বিবাহের কথা কেন ; সে গত না হতে হতেই এত শীঘ্র তুমি আবার বিয়ে করতে যাচ্ছ ? খিয়েল—আমার স্ত্রী তােল গত হলেন, এখন কি ভাবে সংসার বজায় রাখি বলুন ? ধৰ্ম্ম-যাজক উত্তর দিলেন, তুমি দেখছি বিয়ের জন্য অসম্ভব রকম ব্যস্ত হয়েছ। থিয়েল—শুধু ওই বাচ্চা ছেলেটার জন্যেই আমায় বিয়ে করতে হচ্ছে। শিশুটীর জন্ম হবার সঙ্গেই থিয়েলের স্ত্রী মারা যায়, শিশুটী জীবিতই ছিল, তার নামকরণ হয়েছিল টোবিয়াস। ধৰ্ম্ম যাজক বললেন, আমি ওই কথাটা উত্থাপন করার সঙ্গেই তােমার খােকার কথা মনে হােল নাকি? এতদিন তুমি কাজে যাবার সময় শিশুটীর কি ব্যবস্থা করে যেতে ? উত্তরে থিয়েল জানালাে যে সে টোবিয়াসকে একটী বৃদ্ধা নারীর ১৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প তত্ত্বাবধানে রেখে কাজ করতে যেত। অযত্ন, অবহেলার জন্য শিশুটী একদিন আগুনে হাত পুড়িয়ে ফেলে ; আর একদিন বৃদ্ধার কোল থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতরভাবে আহত হয়। এ অবস্থায় তার দিন কাটান অসম্ভব হয়ে উঠে। ছেলেটী একেবারেই বাচ্চা, আর দুৰ্বল, তার যত্নের বিশেষ প্রয়ােজন হয়েছে। সে তার স্ত্রীর মৃত্যুশয্যায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তার অবর্তমানে শিশুটীর কোনই অযত্ন হবে না ; তার তত্ত্বাবধানের জন্যই আবার সে বিবাহ করবে। লােকেরা আর এই বিবাহিত দম্পতিকে নিয়ে বাজুে হাল্কা আলােচনায় মনােনিবেশ করে না। গয়লানীর মেয়েটীকে দেখে মনে হত যেন ঝাণ্ডা- ওয়ালার জন্য মাপ দিয়ে তাকে গড়ান হয়েছে। দুজনকেই মানাত বেশ। সে দীর্ঘতায় ঝাণ্ডাওয়ালার থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি ঘােট ছিল বটে, কিন্তু চওড়ায় তাকে ছাপিয়ে যেত। দেহ তার স্বামীর মতই শক্ত, মজবুত ছিল, কিন্তু তার মনের মধ্যে ছিল সৌন্দৰ্যবােধের একান্ত অভাব। বিবাহের বিনিময়ে এই কয়েকটা বিষয় ছাড়া তার আরও তিনটী গুণের সঙ্গে থিয়েল পরিচিত হতে লাগলাে ; যেমন—তার প্রভুত্ব করবার ইচ্ছে, ঝগড়াটে প্রকৃতি আর আসুরিক যৌন-প্রবৃত্তি। 'হু’মাসের মধ্যে প্রতিবাসীরা জেনে গেল, ঝাণ্ডাওয়ালার গৃহের সর্বময় কীটী কে। থিয়েলের জন্য সকলে সহানুভূতি প্রকাশ কোরত। অন্যান্য পরিবারের কর্তারা বলতেন, মেয়েটির খুবই ভাগ্য ভাল যে এমন নিরীহ স্বামীর হাতে পড়েছে ; অন্য লােকের উপর সে এতটা প্রভুত্ব করতে সাহস পেত । অন্য লোেক হলে মাগীটাকে উত্তম মধ্যম প্রহার খেতে হােত। এই রকম আসুরিক প্রকৃতির নারীকে সায়েস্তা করতে গেলে চাবুকের প্রয়ােজন হয়ে পড়ে। থিয়েলের উন্নত বুক, পেশীবহুল হাত থাকা ত্বেও সে কোনদিন স্ত্রীকে ঝাণ্ডাওয়ালা মারতে চেষ্টা করেনি। মারধাের করার মত প্রকৃতি তার ছিল না। নারীটির আচরণে প্রতিবাসীরা বিরক্ত হলেও থিয়েলের প্রকৃতির মধ্যে কোন পরিবর্তন দেখা যায়নি। স্ত্রীর কর্কশ ছােটখাট অভিযােগ সে নীরবে শুনে যেত; কোন উত্তরই দিত না। যদি কখন থিয়েল মৃদুস্বরে এর সমালােচনা কোরতে চেষ্টা করত, প্রত্যুত্তরে নারীটী কর্কশ স্বরে হৈ চৈ লাগিয়ে দিত। বাইরের জগতের সঙ্গে থিয়েলের যােগাযােগ যেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অন্তরে একটা গুরুভার সদা সর্বদা সে বহন করে চলতে, থিয়ে ছিল একেবারে শান্ত প্রকৃতির ; কিন্তু শিশু টোবির প্রতি একটু অযত্ন ইলে কিছুতেই সে তা সহ্য করতে পারত না ; থিয়েলের শিশু সুলভ কোমলতা, বশ্যতাসূচক প্রকৃতি এমন এক উগ্ররূপ ধারণ কোরত যে হিংস্র প্রকৃতির লেনাও সে সময় তার মুখের উপর একটা কথা বলতে সাহস পেত না। বিবাহের প্রথম বছরে থিয়েল লেনার অন্যায় আচরণে খানিকটা বাধা প্রদান কোরত। দ্বিতীয় বছর থেকে এ অভ্যাসও থিয়েল ছেড়ে দিল। প্রায়ই থিয়েল স্ত্রীকে তার প্রতি সদয় হতে অনুরােধ কোরত। ব্র্যাডে বার্গের ঘন দেবদারু বনস্থিত নির্জনতাপূর্ণ কৰ্ম্মস্থলটি তার কাছে স্বর্গের সমান মনে হত ; সে অনুভূতি সে এখন হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমান স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ আলােচনার সময়, গত পত্নীর সকরুণ মূর্তিটী তার মানসচক্ষে ভেসে উঠত। সে যে অনিচ্ছাসন্তে কর্মস্থল থেকে বাড়ীর দিকে ছুটত তা নয়, এই চলার গতির মধ্যে কেমন যেন একটা উন্মাদনা সে অনুভব কোরত। তার প্রথম স্ত্রীর ভালবাসার মধ্যে একটা আধ্যাত্মিকতার আমেজ ছিল ; কিন্তু দ্বিতীয় স্ত্রীর মধ্যে এই অভাব পূর্ণ মাত্রায় প্রকাশ পেত। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে থিয়েল তার প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। মনের ;

জাৰ্মাণীর সেরা গল্প নিরানন্দকে মুছে ফেলবার জন্য থিয়েল অনেক রকম উপায় অবলম্বন কোরতে থাকে। কৰ্ম্মস্থানের ঘরটিকে সে খুব পবিত্র মনে করে, কারণ তার মধ্যে গত স্ত্রীর স্মৃতির দিনগুলিকে সে ফিরে পায়। নানারকম ওজর দেখিয়ে থিয়েল স্ত্রীকে কৰ্ম্মস্থানের পথে অনুসরণ কোরতে প্রতিনিবৃত্ত করে। থিয়েলের কর্মস্থলের ঘরগুলি এবং তাদের অবস্থিতির সম্বন্ধে মহিলাটি অজ্ঞাত ছিল ! দিবাভাগে কর্তব্যের সময় গত স্ত্রীর আত্মার সঙ্গে তার একটা অধ্যাত্মিক যােগাযােগ স্থাপিত হত। গভীর রাত্রে হঠাং ঝড় এসে যখন পাইন বনটীকে আলােড়িত করতে, সেই সময় ঘরের লণ্ঠনের মৃদু আলােতে ঘরটী ধৰ্ম্মমন্দিরের রূপ নিত। টেবিলের উপর গত স্ত্রীর ছবিটি সে সাজিয়ে রেখেছিল। সময় সময় বাইবেল হাতে নিয়ে উপদেশ বাণী পাঠ করে যেত, আবার কখনও বা ধৰ্ম্মসঙ্গীত গেয়ে সারা রাতই কাটিয়ে দিত। এই সময় তার মনে এমন একটা আনন্দের উপলব্ধি হত যে প্রথমার উপস্থিতিই যেন সে অনুভব করতাে। এইভাবে নিৰ্জন কৰ্ম্মস্থানটীর রহস্য ও আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ পারিপার্শ্বিকে থিয়েলের দশ বছর কেটে গেল। লােকালয় থেকে তার কর্মস্থলের ঘরটি ছিল কুড়ি মিনিটের পথ। ঘন বনের মধ্যে ছিল তার ঘর টী। তার সামনেই ছিল রেলের গুমটী। গুমটীর গেটটীকে ওঠানাে নামানােই ছিল থিয়েলের কাজ। শীতকালের বৈচিত্র্যহীন দিনগুলি এইভাবে সে একাই কাটিয়ে যাচ্ছিল। কখনও বা দু একটী শ্রমিককে লাইনের কাজে নিযুক্ত দেখতে পেত। চার বছর আগে এই ঘন বন ও থিয়েলের ঘরের নির্জনতাকে ভঙ্গ করে ব্রেসূলে গামী কাইজারের ট্রেন বিদ্যুৎগতিতে ছুটে গিয়েছিল । আর একবার একটা দ্রুতগামী ট্রেন একটা হরিণকে চাপা দিয়ে যায়। এইসব ছােটখাট ঘটনা ঝাণ্ডাওয়ালাদের মনে বেশ একটু বৈচিত্র এনে দেয়। • ঝাণ্ডাওয়ালা ১৭ থিয়েলের ঘরের পাশে ছিল একটা ঝরণা। সময় সময় লাইনে কর্মরত শ্রমিকরা এসে তা থেকে জল পান করতে এবং খানিকটা হয়ত বিশ্রাম নিয়ে পরস্পরে আলাপ আলােচনা করতাে। এই সব দৃশ্য তার একঘেয়ে জীবনে কিছুটা বৈচিত্র্য আনে। ধীরে ধীরে শিশুটা বাড়তে লাগলাে। দু’ বছর বয়স হতে না হতেই হাঁটতে ও কথা বলতে শিখলল। শিশুটীর চাহনি থেকে মাঝে মাঝে একটা পিতৃ অনুরাগের আভাস ফুটে বেরুত। পরের বছর তাদের আর একটা সন্তান লাভ হতে লেনার মনে টোবির প্রতি একটা বিদ্বেষ এনে দেয় ; কিন্তু থিয়েলের স্নেহ দ্বিগুণতর হয়ে ওঠে। লেনা মনে মনে টোবিয়াসকে অভিশাপ দেয় কিন্তু সামনে কিছু বলতে সাহস করে না। একদিন থিয়েল তার রাত্রির কর্তব্য সমাধা করে সকাল সাতটায় বাড়ীতে ফিরলাে। লেনা অভ্যাসমতাে নানারকম অভিযােগ তার কাছে উপস্থিত করলাে। কিছুদিন আগে তাদের ভাড়াটে জমির মালিক নােটীশ পাঠিয়েছিল, আর তারা তাদের জমিতে আলুর চাষ করতে পাবে না। এ জমি ছাড়া অন্য জমি সংগ্রহ করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল । জমি চাষের ভার লেনার উপরেই ছিল। এই ব্যাপারে থিয়েলকে লেনার কাছ থেকে অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছিল । এর উত্তরে সে একটাও কথা না বলে বিছানায় গিয়ে ঘুমন্ত শিশুর মুখের ওপর একাগ্র- চিত্তে তাকিয়েছিল। মাঝে মাঝে তার মুখের ওপর থেকে হাত দিয়ে মাছি তাড়িয়ে দেয়। আস্তে আস্তে সে টোবিয়াসের ঘুম ভাঙিয়ে দিল। অপূৰ্ব আনন্দে শিশুটীর চোখ দুটী উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। থিয়েল তার অসংলগ্ন জামা-কাপড়গুলিকে ঠিক করে পরিয়ে দেয়। হঠাৎ তার লক্ষ্য পড়ে যে শিশুটীর ডানদিকের গাল ঈষৎ ফুলে উঠেছে, তাতে আঙ্গুলেরও ১৮ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প যেন দু একটা দাগ বসে গেছে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সেই জমি নিয়ে কিছু তর্ক বিতর্ক হয়ে গেল। তারপর হঠাৎ মনােহারী ফিরিওয়ালার ঘণ্টার আওয়াজে আকৃষ্ট হয়ে লেনা ছুটে গেল, কি রকম নতুন জিনিস এসেছে দেখতে। থিয়েল তখন টোবিয়াসকে নিয়ে মসগুল হয়েছিল; খােক। বাবার কোলে বসে পাইন ফল নিয়ে খেলা করছিল। থিয়েল খােকাকে জিজ্ঞাসা করে,—বাবু, তুমি বড় হয়ে কি হবে ? টোবিয়াস তার শিশুসুলভ সরলতার সঙ্গে উত্তর দেয়—কেন, রেল-রােড ইস্পেক্টর হব, বাবা। থােকার এই উত্তরে থিয়েলের বুকটা আনন্দে ফুলে ওঠে; সে ভাবে, ঈশ্বরের কৃপায়, টোবি আমার বড় কিছু একটা হয়ে উঠবে। থিয়েল বলল, “যাও বাবা, এখন খেল গে, কেমন।” পােষাক পরিচ্ছদ খুলে ঝাণ্ডাওয়ালা খানিকটা আরামের সঙ্গে ঘুমিয়ে নিল। বাবােটার একটু আগেই তার ঘুম ভেঙে যায়। লেনা তখন মধ্যাহ্নের আহাৰ্য্য তৈরী নিয়ে ব্যস্ত। থিয়েল পরিচ্ছদ পরিধান করে টোবিয়াসের অন্বেষণে বেরিয়ে পড়ে দেখে, সে এক টুকরাে ভাঙা সিমেন্ট মুখে পুরেছে। থিয়েল থােকার হাত ধরে পর পর গ্রামের আটখানি বাড়ী পেরিয়ে একটা ছােট পাহাড়ে নদীর ধারে এল। নদীর কালাে জলের ধারা কঁচের মত স্বচ্ছ। ধারে ধারে পপলার গাছের সারি। ঝাণ্ডাওয়ালা জলের ধারে একটা প্রস্তরখণ্ডের উপর বসে পড়ল, প্রত্যেক হাটের দিন গ্রামবাসীরা তাকে ঠিক এই নির্দিষ্ট স্থানে দেখতে পায়। গ্রামের ছেলেরা তাকে খুব ভালবাসে আর ‘ফাদার থিয়েল’ বলে ডাকে ; থিয়েল তাদের নানারকম খেলা শেখায়, টোবিয়াসের জন্য ধনুক তৈরী করে দেয় এ ছাড়া তাদের জন্য অনেক দায়িত্বপূর্ণ কাজও সে হাতে নেয়। বড়দের ঝাণ্ডাওয়ালা সে পড়া শশানে, বাইবেল পড়ায় তাদের সাহায্য করে, আবার উচ্চারণও শেখায়। মধ্যাহ্ন ভােজন শেষ করে থিয়েল কিছুটা সময় বিশ্রাম নিত ; তারপর এক পেয়ালা কফি পান করে কাজে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিত। জিনিসপত্র গােছগাছ করে নিতে তার বেশ একটু সময় লাগলাে। টেবিলের ওপর গুছিয়ে রাখা ছবি, নােটবুক, চিরুণী, পকেট ঘড়ি আর লাল কাগজে মােড়া থিয়েলের নামে একটা সেভিং ব্যাঙ্কের পাশ বই সে তার বিভিন্ন পকেটের মধ্যে পুরে নেয়। সেদিন ঠিক চারটে পয়ত্রিশ মিনিটের সময় সে বেরিয়ে পড়ে। তার নিজের নৌকোতে নদীটি পার হয়ে যায় ; তারপর চওড়া বনপথ ধরে চলতে আরম্ভ করে কয়েক মুহূর্তেই গভীর পাইন বনের মধ্যে এসে পড়ে। কখনও দীর্ঘ পুরােণাে গাছের পাশ দিয়ে, কখনও বা সবুজ পত্রশােভিত ছােট ছােট পাইন শ্রেণীর মধ্য দিয়ে সে চলতে থাকে। মাটী থেকে সর্পিল রেখার আকারে উত্তপ্ত বাষ্প উঠে গাছগুলােকে ঝাপ স করে দেয়। মাঝে মাঝে বাতাসের সঙ্গে পাইনের একটা সুগন্ধ সে অনুভব করে। বৃক্ষ- শ্রেণীর ফাক দিয়ে মাঝে মাঝে নীল আকাশ উকি ঝুকি মারে। প্রকৃতি থেকে তার চিন্তাটা হঠাৎ অন্যদিকে ফিরে যায়, তার মনে হয়, কি যেন একটা জিনিস সে বাড়ীতে ফেলে এসেছে। তারপর পকেটে হাত দিয়ে সে বুঝতে পারে স্যাণ্ডউইচের টুকরােগুলি আনতে ভুলে গিয়েছে। ওই খাদ্যগুলির তার বিশেষ প্রয়ােজন, কারণ তার সেদিন কাজের মাত্রা ছিল অত্যন্ত বেশী। প্রথমে সে কি করবে ভেবে পেল না ; তারপর সে গৃহে প্রত্যাবর্তন করাই মনস্থ করে। অল্প সময়ের মধ্যেই সে নদীর ধারে এসে নৌকায় উঠে নিজেই সেটাকে চালিয়ে, তাদের জাৰ্মাণীর সেরা গল্প গ্রামের পথের ধারে এসে পৌছল। একটা উচ্চ গ্রামের স্বরে সেখানকার নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হয়ে যায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও থিয়েল দাড়িয়ে পড়ে। একটা বিএ কর্কশ স্বর তার কানে এসে বাজে ; তার বুঝতে বিলম্ব হয় না যে সে স্বরটা কোন্ গৃহ থেকে আছে। ধীরে ধীরে পা টিপে কুটীরটীর নিকটে এগিয়ে এল ; এখন সে নিশ্চিত করে জানলাে যে সেটা তার স্ত্রীরই কণ্ঠস্বর। টোবিয়াসকে লেনা অত্যন্ত তিক্ত ও কটুভাবে ভৎসনা করে বলে উঠল, “এই কুকুরছানা, তুই কি ভাবি যে তাের জন্যে আমার ছেলে না খেয়ে মরবে ? মুখ বন্ধ কর, না হলে মেরে তােকে ঠাণ্ডা করে দেব।” মনে হল টোবিকে মারধােরও যেন সে করেছে। রাগে থিয়েলের সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে। কাঠের সিড়ি দিয়ে উঠে সে শুনতে পায়, তার স্ত্রী গলা দিয়ে যেন জ্বলন্ত অগ্নি উদগীরণ করছে। থিয়েল আর স্থির থাকতে পারলাে না, চীৎকার করে সে বলে উঠলাে, -“তুমি আমার ছেলেকে মেরে ফেলতে চাও, বৰ্বর কোথাকার? এই অসহায় শিশুকে মারতে তােমার একটু. বাধলাে না?” ঘৃণামিশ্রিতস্বরে আবার সে বললাে,-“জান, আমি তােমায় মেরে সায়েস্তা করতে পারি। , তা আর করতে চাই না।” সেই মুহূর্তেই সামনের দরজাটা খুলে গেল। ভীতা রমণীর মুখ থেকে আর একটীও কথা বেরুল না ; রাগে তার নিজের ঠোট দুটী কামড়াতে আরম্ভ করে। খােকার দুধের বােতলে দুধ ঢালতে গিয়ে বেশী অংশটাই বাইরে পড়ে যায়। আস্তে আস্তে সে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বামীকে কর্কশম্বরে এই অসময়ে বাড়ী ফেরার কারণ জিজ্ঞাসা করে,—“আমার ঝাণ্ডাওয়ালা আচরণকে সন্দেহ করে এই রকম লুকিয়ে লুকিয়ে গােয়েন্দাগিরি করতে আসা হয়, না ?” থিয়েলের মনের মধ্যে যে ভয়ঙ্কর রকমের একটা উত্তেজনার ঝড় উঠছিল তাকে সে সংযত করে ফেলল। তার বলিষ্ঠ দেহের শিরা উপশিরাগুলি চঞ্চল হয়ে উঠল। একটা উগ্র কামার্ত ভাব তার চোখের মধ্য দিয়ে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। উত্তেজনায় মহিলাটির নিটোল পয়ােধর যুগল শাসন না মেনে কসেট, ফুটে বেরিয়ে আসতে চায় ; তার স্কার্টের ভেতর থেকে চওড়া নিতম্ব দুটা পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। লেনার মধ্য থেকে একটা ভয়ানক রকমের তেজ বেরিয়ে আসছিল। থিয়েল অনুভব করলাে, এ থেকে তার নিষ্কৃতি পাবার কোন উপায় নেই ; যেন মাকড়সার জালের মত ইস্পাতের পাত দিয়ে নারীটী থিয়েলকে ঘিরে রেখেছে। থিয়েল স্ত্রীকে আর কিছু বলতে সাহস করলাে না। সে আস্তে আস্তে বেঞ্চের কাছে গিয়ে কোনদিকে দৃষ্টিপাত না করে স্যাণ্ডউইচ,গুলি সংগ্রহ করে, তার স্ত্রীকে ঘরে ফিরে আসার কারণ জ্ঞাপন করে, অভিনন্দন জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাে। খুব দ্রুতগতিতে থিয়েল তার নির্জন কর্মস্থলের দিকে রওনা হলাে। তার নির্দিষ্ট স্থানে পৌছতে অন্যদিনের থেকে পঁচিশ মিনিট বিলম্ব হয়ে গেল। থিয়েলের সহকারী লােকটী কাসির অসুখে ভুগছিল, সে থিয়েলের আগমন প্রতীক্ষায় এতক্ষণ বসেছিল। এইবার তারা দুজনে করমর্দন করে বিদায় গ্রহণ করলাে। থিয়েল ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে রাত্রির ব্যবহারের জন্য জিনিসপত্রগুলি নিজের ইচ্ছামত গােছগাছ করে নিতে লাগলাে। প্রথমে সে জানালার ধারের বাদামী টেবিলের ওপর রাত্রের খাবার - ২২ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প সাজিয়ে রাখলাে ; তারপর আলােটা পরিষ্কার করে, তার মধ্যে তেল ভরে দিল। সিগন্যাল বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে থিয়েল অভ্যাসমত ঝাণ্ডা ও কার্টরিজের বাক্স হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাে। একটু অলসতার সঙ্গে সে গুষ্ঠীর কাছে হেঁটে গেল। যদিও সেখানে লােক চলাচল একেবারে ছিল না, তবুও সে নিয়মমত গেটটা নামিয়ে দিল, এবং ট্রেণ চলে যাওয়ার পর সেটা উঠিয়ে দিল । এই কাজটী সমাপ্ত করে সে সাদা রং করা মাইলপোেষ্টএর ওপর অলসভাবে হেলান দিয়ে দাড়াল। কালাে লাইনগুলি সাপের মত একে বেঁকে কোথায় গিয়ে মিশে গেছে। টেলিগ্রাফের তারগুলি থেকে একটা সুর ভেসে আসে। অস্তগামী সূর্যের আভায় বনানীর শীর্ষভাগ রক্তরাগে রঞ্জিত হয়ে ওঠে। ঝাণ্ডাওয়ালা নিস্তব্ধ হয়ে এই মনােরম দৃশ্য উপভােগ করছিল। সে কিছুদূর এগিয়ে গেল। দূর দিগন্তে বিন্দুর মত কি একটা দেখা গেল ; ক্রমশঃ সেটা তীব্র গতির সঙ্গে এগিয়ে আসে ; একটা ছন্দময় কম্পিত সুর লাইনের উপর দিয়ে ভেসে যায় ; ক্রমশঃ আওয়াজটা আরও স্পষ্টতর হতে থাকে। যেন মনে হতে লাগল সহস্র ঘােড়-সওয়ার ঝড়ের মত তীব্রবেগে ছুটে আসছে। কী ভীষণ আর্তনাদ! মনে হােল, একটা বিরাট দৈত্য বিকট আওয়াজ করে, মাটি কঁপিয়ে, ধূলাে উড়িয়ে ফেয়ার রাশি উদগীরণ করতে করতে বিদ্যুৎগতিতে সামনে দিয়ে ছুটে গেল। আস্তে আস্তে আওয়াজটা আবার ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হতে আরম্ভ করলাে ; ট্রেণখানি চোখের আড়ালে মিশে গেল। অরণ্যের স্তব্ধতা আবার ফিরে এল। ঝাণ্ডাওয়ালা কুটীরের মধ্যে ফিরে এসে এক কাপ কফি বানিয়ে ঝাণ্ডাওয়ালা চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজে মনােনিবেশ করলো। ধীরে ধীরে এক প্রকারের অস্থিরত্না এসে তার মনকে চঞ্চল করে তােলে। ঘরে গরম লাগাতে গায়ের জামা খুলে ফেলে সে ঘরের কোণ থেকে কাস্তে নিয়ে ইস্পেক্টর প্রদত্ত জমিটির দিকে এগিয়ে যায়। জমিটা আগাছায় পূর্ণ ছিল। থিয়েল কাস্তে দিয়ে আগাছাগুলি পরিষ্কার করতে আরম্ভ করলাে। অনেকটা সময় তার এইভাবে কেটে যায়, তারপর আস্তে আস্তে কাস্তেটা তুলে নিয়ে ঘরের মধ্যে ফিরে আসে। আবার যেন তার মনটা বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। তার মনে হােল, এই কর্তব্যের স্থানে লেনার উপস্থিতি, তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠবে। তার ধর্মমন্দিরের পবিত্রতাকে যদি কেউ নষ্ট করে ফেলতে চেষ্টা করে, সেই অমূল্য সম্পদকে তার প্রাণ দিয়ে রক্ষা করতেই হবে —এই কথা তার বারে বারে মনে হতে থাকে। তার হাতের মাংসপেশীগুলি আপনা থেকেই ফুলে উঠল, একটা অট্টহাসি মুখের ওপর দিয়ে খেলে গেল , চিন্তাধারার যােগসূত্রগুলি সে যেন আবার হারিয়ে ফেললাে। সেদিন দ্বিপ্রহরে সন্তানের প্রতি উৎপীড়নের কথা বারে বারে তার স্মৃতির পটে এসে ঘা দিতে থাকে। তার মনে হতে লাগল যে সন্তানের প্রতি যে অত্যাচার অবিচার চলেছিল, তার প্রতিবিধান সে কখনও করেনি। করুণায়, দুঃখে ও লজ্জায় তার হৃদয় আর্দ্র হয়ে গেল। এইভাবে চিন্তা করতে করতে থিয়েল কখন গভীর নিদ্রায় অভিভূত হয়ে পড়লাে। ঘুমের ঘােরে সে মাঝে মাঝে ডাকছিল ‘মিন্না, মিন্না বলে। ; হঠাৎ একটা বিকট আওয়াজ হওয়াতে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল ; সারা ঘরটা যেন অন্ধকারে ভরে এলাে। ভয়ে, আতঙ্কে সে বিছানা থেকে উঠে পড়লাে। বাইরের বনের মধ্য থেকে সমুদ্র গর্জনের মত একটা আওয়াজ ২৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প আসছিল ; ঝড় ও বৃষ্টির প্রচণ্ড ঝাপটা এসে কঁচের জানালার উপর ধা দিতে লাগল। তারপর চোখ ঝলসানাে একটা আলাে এসে সারা ধরিত্রীকে আনলাকিত করে আবার মিলিয়ে গেল। অন্ধকার ঘরের মধ্যে সে আলােটা খুজে বেড়াতে লাগলাে। এর একটু পরেই আকাশের এক দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্ত পর্যন্ত একটা গভীর নীল রেখা উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠলাে। প্রথমে একটু গুরু গুরু আওয়াজ শুরু হয়ে সেটা কামান গর্জনের মত ভীষণ শব্দে পরিণত হয়ে মেদিনীকে কাঁপিয়ে দিল। জানালার *চিগুলি ঝন্‌ঝন্ শব্দে বেজে উঠলো। আলােটা জ্বালিয়ে থিয়েল ঘড়ির দিকে তাকায়। পাঁচ মিনিট পরেই একটা ট্রেণ আসার কথা। তার মনে হােল-গাড়ীর বংশীধ্বনি সে শুনতে পায়নি। এই ভেবে সে ঝড় ও অন্ধকার ভেদ করে অবিলম্বে গুমটীর ধিকে অগ্রসর হয়। থিয়েল গেটটী নামিয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেণের বংশীধ্বনিতে চারিদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। কিছু পরেই টুকরাে টুকরাে মেঘের ফাক দিয়ে চন্দ্রমার আবির্ভাব হয়। আবছা চাদের আলােয় বৃক্ষের শীর্ষাগ্নের কম্পায়মান পত্রদলগুলিকে দেখা যেতে লাগলাে। থিয়েল মাথার টুপি নামিয়ে ফেললো। বর্ষণের স্পর্শে সে কিছুটা আরাম বােধ করে। বৃষ্টির ধারার সঙ্গে তার চোখের জল মিশে একাকার হয়ে গেল। টোবিয়াসের প্রতি অত্যাচারের দৃশ্যটা যেন তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে। আরও যেন মনে হােল তার গত স্ত্রী রেলের লাইন ধরে ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে। ছিন্ন বসনে তাকে খুব দুর্বল ও পীড়িত বলে মনে হচ্ছে। কোনদিকে না চেয়ে সে যেন ঘরটীর মধ্যে প্রবেশ করলাে। এইখানেই তার স্মৃতিশক্তি ঝাপসা হয়ে এলাে। তার মনে হচ্ছিল, তার 6 ঝাণ্ডাওয়ালা প্রথমা স্ত্রী যেন হাওয়ার ওপর দিয়ে বিচরণ করছে ও কাপড়ে মুড়ে একটা রক্তাক্ত মাংসপিণ্ড বহন করে চলেছে ; •তার চাহনি থিয়েলকে অতীত দৃশ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিল,—সেই মুম্ষু নারী, যেন স্থির, সকরুণ নেত্রে তার নবজাত শিশুটীর দিকে ব্যথাপূর্ণ হয়ে তাকিয়ে ছিল। এ দৃশ্যটা যেন তার প্রাণে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল, কিছুতেই সে তা ভুলতে পারছে না। হঠাৎ কোথায় সে মিলিয়ে যায়, থিয়েল কিছুই ঠিক করতে পারে না। “মিন্না, মিন্না করে সে চেঁচিয়ে ওঠে আর নিজের কণ্ঠস্বর তার কাণে প্রবেশ করতেই সে জেগে ওঠে। দুটী গােল লাল আলাে যেন একটা বিরাটকায় দৈত্যের বিকট ও স্থির • চাহনির মত অন্ধকার ভেদ করে ছুটে আসছিল। একটা উজ্জ্বল রক্তাভ আলাে যেন বৃষ্টি বিন্দুকে রক্তধারায় পরিণত করছিল। মনে হচ্ছিল, আকাশ থেকে রক্তধারার বর্ষণ হচ্ছে। ট্রেণটা যতই এগিয়ে আসে, থিয়েলের মনে ততই একটা ভয়ের উদ্রেক হতে থাকে। এখনও যেন থিয়েল দেখতে পাচ্ছে যে তার স্বর্গগত। স্ত্রী লাইনের ওপর দিয়ে বিচরণ করছে। যেন চলমান ট্রেণটীকে থামাবার জন্যই তার হাতটা কার্টরিজটার দিকে হঠাৎ এগিয়ে এলাে। বিলম্ব হয়ে গিয়েছিল। তার চোখের ওপর আলাে ফেলে ট্রেণটা দ্রুতগতিতে চলে গেল। অবশিষ্ট রাত্রিটুকু মনে অশান্তি নিয়েই কাটল। শিশু টোবিকে দেখবার জন্য তার মন উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে, মনে হলাে কতদিন যেন সে তাকে দেখেনি। শিশুটী অবস্থায় আছে এই চিন্তা তার মনে বারে বারে উকি ঝুকি মারতে লাগলাে। সকাল ছ'টায় তার ছুটী হবার পর একটুও বিলম্ব না করে সে ঘরের দিকে ছুটে চললাে। রবিবারের উজ্জ্বল প্রভাত। মেঘ কেটে গিয়ে আকাশ ফস হয়ে ২৬ জাৰ্ম্মাণীর সেরা গল্প •• এলাে। সূৰ্য্যদেবকে দেখাচ্ছিল যেন একটা অজ্বলে রক্তবর্ণের পাথরের মত ; তার রক্তিম আলােতে সারাটা বন রাঙ্গিয়ে গেল। ক্রমশঃ আলােটা উজ্জ্বল হয়ে গাছের পাতার ফাক দিয়ে টুকরাে টুকরাে হয়ে মাটিতে পড়ে প্রবালের আকার ধারণ করছিল সারা বিশ্বটা যেন আলাের খেলায় মেতে উঠলো। এই মধুর আলাের স্পর্শে থিয়েলের রাত্রির জড়তা ক্রমশ কমতে আরম্ভ করলাে। যখন সে ঘরে ঢুকে রৌদ্রে উদ্ভাসিত টোবির ঘুমন্ত মুখখানি আবিষ্কার করলাে, সেই মূহুর্তেই যেন তার রাত্রির ঘাের ভাবটা একেবারে কেটে গেল। লেনা সেদিন থিয়েলের আচরণে একটা অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করে। সেদিন চার্চে থিয়েলের দৃষ্টি বইএর মধ্যে নিবদ্ধ ছিল না, অন্য- দিকে সে তাকিয়ে ছিল। দিনের বেলায় কাজ থাকায় থিয়েল রাত্রি ন’টার মধ্যেই শুয়ে পড়ে ; ঘুম আসবার ঠিক আগেই লেনা পরের দিন সকালে থিয়েলের সঙ্গে গিয়ে জমিটা খুড়ে আলুর চাষ করবার ইচ্ছা জানায়। থিয়েল নড়ে উঠল ; ঘুম আর হোল না ; কিন্তু ঘুমােবার. ভাণ করে পড়ে রইল। লেনা বলে যেতে লাগলাে,—এই ঠিক চাষ করবার সময়, আর বিলম্ব করা উচিত নয়। উত্তরে থিয়েল অস্পষ্টভাবে কি যেন বললাে। তারপর লেনা পাশ ফিরে মােমবাতির ক্ষীণ আলােয় কসেট, আগা করে, দেহ থেকে স্কার্টকে সরিয়ে ফেলে দিল। অজান্তে হঠাৎ লেনা ঘুরে গিয়ে আবিষ্কার করলাে যেন কি একটা কামদগ্ধ বেদনায় তার মুখটী বিকৃত হয়ে গিয়েছে। থিয়েল শরীরটা কিছু পরিমাণ তুলে বিছানার কোণে হাত দুটী রেখে শরীরের ভার রক্ষা করলাে । তার জ্বলন্ত চোখদুটী লেনার প্রতি নিবদ্ধ ছিল। সে তখন কিছুটা রেগে,. কিছুটা ভয় পেয়ে থিয়েলের নাম ধরে চেঁচিয়ে উঠলাে। এতে থিয়েলের ঝাণ্ডাওয়ালা ২৭ তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব কেটে গেল ; কি যেন অস্পষ্ট স্বরে বলে, বালিশের উপর মাথা রেখে, কম্বলে কাণ পৰ্যন্ত দেহকে আবত করে আবার সে শুয়ে পড়লাে। প্রত্যুষে সকলের আগে লেনাই জেগে উঠলাে। কল্পিত অভিযানের জন্য সে নীরবে সবরকম ব্যবস্থা করতে মনােনিবেশ করলাে। ছােট শিশুটীকে দোলনা গাড়ীতে বসিয়ে দিয়ে টোবিয়াসকে তুলে তার পােক পরিয়ে দিল। বেড়াতে যাবার কথা শুনে টোবিয়াসের মুখ খুসীতে ভরে গেল। যখন সব রকম ব্যবস্থা হয়ে গেছে আর টেবিলে কফি সাজান হয়েছে, ঠিক সেই সময় থিয়েল জেগে উঠলাে। অভিযানের এই ব্যবস্থা দেখে থিয়েলের মন কিন্তু নিরানন্দে ভরে গেল। সে ভেবেছিল, তার সঙ্গে লেনার অনুগমনের পথে সে বাধা নিশ্চয়ই দেবে, কিন্তু আবার ভাবল, কি বলে সে লেনাকে বাধা দেবে। আবার ছোট শিশুটীর মুখ থেকে খুসির হাসি ফুটে বেরুতে দেখে আনন্দের মাত্রা ক্রমশ তার বেড়েই চললাে। স্ত্রীর গমনের পথে থিয়েলের আর বাধা দেওয়া হোল না। লেনা বনপথ দিয়ে ছােট শিশুটীকে ঠেলা গাড়ীতে করে উচু নীচু জায়গা দিয়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল টোবিয়াস ফুল সংগ্রহ করে শিশুটীর গাড়ীতে রাখছিল। তার মুখ এত উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল যেন এত আনন্দের স্বাদ সে কখনও পায়নি। সে ছােট বাদামী রঙের টুপি মাথায় দিয়ে এদিকে ওদিকে ছুটে উড়ন্ত প্রজাপতি ধরবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল। নির্দিষ্ট স্থানে পৌছানর পর লেনা জমিটীর চারিধারে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিল। তারপর বস্তা খুলে আলুর বীজগুলােকে ঘাসের ২৮ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ওপর ঢেলে ফেলে হাঁটু গেড়ে বসে আঙ্গুল দিয়ে মাটির উর্বরতা অনুভব করতে লাগলাে। থিয়েল লেনাকে জিজ্ঞাসা করলাে--কেমন জমি বলতাে ? লেনা বললাে-ঠিক নদীর ধারের জমির মত উৰ্বর। থিয়েল ভেবেছিল যে লেনার হয়তত জমিটা ভাল লাগবে না, কিন্তু তার জমিটা পছন্দ হওয়ায় থিয়েলের মন থেকে একটা দুশ্চিন্তার ভার নেমে গেল। মহিলাটা তাড়াতাড়ি মােটা এক টুকরাে রুটী খেয়ে নিয়ে, মাথার টুপি ও জামার ওপরের কোটটা খুলে ফেলে একধারে সরিয়ে রাখলাে ; তারপর কাস্তে দিয়ে মেসিনের মত দ্রুতগতিতে জমি খুঁড়তে আরম্ভ করে দিল। পরিশ্রান্ত হয়ে মাঝে মাঝে তাকে থামতে হচ্ছিল, আর তার বুক কে ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছিল। এর মধ্যে একটু সময় করে তার ঘর্মাক্ত বুক থেকে শিশুটিকে দুধ খাইয়ে দিচ্ছিল। কিছু পরেই ঝাণ্ডাওয়ালা তার ঘরটীর সামনে থেকে লেনাকে সম্বােধন করে বললাে--আমাকে এখনই লাইন পরীক্ষা করতে যেতে হবে ; টোবিয়াসকে আমি সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। মহিলাটী আপত্তি জানাল, সে টোবিকে নিয়ে গেলে, কে তার ঘােট শিশুকে সামলাবে?” থিয়েল স্ত্রীর কথায় কাণ না দিয়ে টোবিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে লাইন ধরে চলতে আরম্ভ করলো। আনন্দের উত্তেজনায় বালকটীর মন ভরে গেল ; এটা যেন তার কাছে একটা নতুন জগতের মত ঠেকলাে। রৌদ্রদগ্ধ সরু সরু লাইনগুলি দেখে সে কিছুতেই ঠিক করতে পারছিল না, এর প্রয়ােজনীয়তা কি হতে পারে। এই নিয়ে সে বাবাকে নানা রকমের কৌতুহলজনক প্রশ্ন করে যাচ্ছিল। টেলিগ্রাফের তারের মৃদু আওয়াজ তার কাছে সব চেয়ে বিস্ময়কর বােধ হচ্ছিল। টোবিয়াস টেলিগ্রাফের ঝাণ্ডাওয়ালা ২৯ স্তম্ভের কাছে ছুটে গেল। তার মনে হােল, এর মধ্যে কোন ছিদ্র দিয়ে এই সুন্দর গুঞ্জন ধ্বনির স্রষ্টাকে, যদি সে আবিষ্কার করে ফেলতে পারে। চার্চে সঙ্গীতের মধ্যে থিয়েল যেমন ডুবে যেত, এই শব্দের মধ্যেও সে সেই রকম তলিয়ে গেল। চার্চে অপরের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে তার প্রথমার গলা যেমন মিলে যেত, এই শব্দও তার কাছে সেই রকম ঠেকলাে, উচ্ছ্বাসে তার চোখ দুটী জলে ভরে গেল। টোবি লাইনের ধারে ফুল সংগ্রহ করছিল । পিতৃসুলভ আনন্দে থিয়েল শিশুর এই খেলা উপভােগ করতে লাগলাে। গাছের ওপর একটা বাদামী রঙের কাঠবেড়ালীকে দেখিয়ে টোবি জিজ্ঞাসা করে, “বাবা, এই কি সেই সুন্দর প্রভু (ঈশ্বর), যার কথা তুমি আমায় মাঝে মাঝে বল।” থিয়েল উত্তরে বললাে,-বােকা ছেলে কোথাকার, কি বলে যে তার ঠিক নেই। থিয়েল ও টোবিয়াস যখন ফিরে এল, তখন লেনা প্রায় অর্ধেক জমি পরিষ্কার করে ফেলেছে। মাঝে মাঝে দু'একখানা ট্রেণ ছন্দিত গতিতে লাইন ধরে যাচ্ছিল, আর টোবিয়াস মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সেগুলি নিরীক্ষণ করছিল, এমন কি, তার সৎমাও তার এই আনন্দে অংশগ্রহণ করছিল। তার ঘরের মধ্যেই তাদের মধ্যাহ্ন ভোেজন শেষ করে নিল। আহারের পূর্বেই লেনা তাদের জমি পরিষ্কার করে ফেলেছিল, এখন খাওয়া শেষ করে সে জমিতে আলুর বীজ বপন করতে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। ছােট শিশুটীর প্রতি দৃষ্টি রাখবার জন্য টোবিকেও সে সঙ্গে নিয়ে যাবার অনুমতি স্বামীর কাছে চায়। প্রত্যুত্তরে থিয়েল তার অনুমতি জানিয়ে লেনাকে বলে, সে যেন লক্ষ্য রাখে টোবিয়াস যাতে লাইনের উপর যায়। লেনা সম্মতি জানায়। ০ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ০ সাইলেসিয়ান এক্সপ্রেস আসার সঙ্কেতধ্বনি বেজে ওঠে। গেটের সামনে প্রস্তুত হয়ে নেবার সঙ্গে সঙ্গেই থিয়েল নিকটবর্তী ট্রেণের আওয়াজ শুনতে পায়। মুহুর্তের মধ্যে ট্রেণ কাছে এসে যায়। ইঞ্জিনের কালো চোঙার মধ্য থেকে অসংখ্য ধোঁয়ার রাশি নির্গত হচ্ছিল ; ইঞ্জিন থেকে পরপর তিনটী সঙ্কেতসূচক বংশীধ্বনি হােল। থিয়েলের কেমন যেন মনে হােল যে ট্রেণটা নিশ্চয়ই থেমেছে। থামার কারণ অনুমান করতে না পেরে থিয়েল গেট পেরিয়ে লাইনের ধারে গিয়ে বাক্স থেকে লাল ঝাণ্ডা বার করে ট্রেণের সামনে মেলে ধরে। তার মনে হােল লাইনের মধ্যে কি যেন একটা পড়েছে। সে গলা ফাটিয়ে চীৎকার করে বলে উঠলাে, “ট্রেণ থামাও, ট্রেন থামাও”। কিন্তু হায়, বৃথাই তার চীৎকার করা ! কি যেন একটা গােলাকার কালাে বস্তু ট্রেণের মাঝখানে ঢুকে চাকার সঙ্গে রবারের মত জড়িয়ে গেছে। এর কয়েক মুহুৰ্ত্ত পরেই ব্রেক কসার আওয়াজ হয়। এক নিমেষেই এই নির্জন স্থানটী কলরবে মুখরিত হয়ে ওঠে। ট্রেণ চালক ও ব্ৰেক রক্ষক লাইনের পাশের রাস্তা ধরে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যায়। ট্রেণের প্রত্যেক জানালা দিয়ে যাত্রীরা উদ্গ্রীব হয়ে মুখ বাড়িয়ে দেয়। ট্রেণের পিছনে ভীড় জমে গেল, ক্রমশঃ তারা দল বেঁধে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। দুর্ঘটনার স্থান থেকে একটা গুমরানাে আওয়াজ ভেসে আসছিল— একটা পশুর ক্রন্দন বলেই মনে হােল । এ কি, লেনার কণ্ঠস্বর, না ! আবার সে ভাবলাে,-না, তা হতে পারে না। একটী লােক লাইনের পাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে এসে বললাে— ঝাণ্ডাওয়ালা, ব্যাপার কি, বল তাে? থিয়ল উত্তরে জানালাে, একটা দুর্ঘটনা মানুষটা এখনও হয়ত বেঁচে আছে, চেষ্টা করলে এখনও বাঁচান ;

ঝাণ্ডাওয়ালা যেতে পারে। লােকটী বললাে,-তাড়াতাড়ি ছুটে এস। থিয়েল লােক- টীকে অনুসরণ করলাে। গাড়ীর জানালা থেকে ভয়ার্ত শুষ্ক মুখগুলি উকি ঝুকি মারছিল। একটী নব বিবাহিত দম্পতি জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ছিল ; তারা বিবাহের পর মধুচন্দ্র যাপন করতে চলেছে। এই দুর্ঘটনা ও কলরব তাদের মনে একটুও রেখাপাত করতে পারলাে না ; তাদের এতে কি এসে যায় ? নিয়তির কি পরি হাস, কেউ ঘর বাঁধতে যায়, আবার কারুর ঘর ক্রমশঃ ভাঙ্গতে সুরু করে ! লেনার গভীর আর্তনাদে থিয়েলের কাণ ভরে যায়। তার দৃষ্টি ক্রমশঃ ঝাপসা হয়ে আসে ; সে স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে পড়ে। লাইনের মধ্য থেকে একটা শিশুর ফ্যাকাশে রক্তাক্ত দেহ দেখতে পাওয়া গেল, তার কপালটা আঘাত লেগে কালাে হয়ে গিয়েছে, ওষ্ঠদ্বয় নীল হয়ে গেছে বাছর, আর তার থেকে অঝােরে রক্ত ঝরে পড়ছে। থিয়েলের মুখ থেকে একটা কথাও বেরুলে না ; তার মুখ কঠিন ও ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তারপর সে নতজানু হয়ে কঠিন দেহটী তুলে নিয়ে রেলওয়ে ডাক্তারকে ছুটে গিয়ে ডেকে আনবে স্থির করলাে । গাড় ও গাড়ীর অন্যান্য সকলে বলে ওঠে, তারাই শিশুকে বহন করে নিয়ে যাবে, ঝাণ্ডাওয়ালার কোন চিন্তা নেই। কিন্তু বৃথাই তাদের অনুরােধ করা, থিয়েলের সামনে থেকে কেউ শিশুকে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারলাে না। গাড গাড়ী থেকে একটা স্ট্রেচার বার করে তার দু’একজন সহকর্মীদের শিশুর পিতার কাছে গিয়ে দাড়াতে অনুরােধ করে। সময়ের মূল্য আছে; গাড়ীর বাণী বেজে ওঠে। গাড়ীর জানালা থেকে অজস্র টাকা পয়সার বর্ষণ হতে থাকে। লেনা পাগলিনীর মত জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ; আর্তনাদ করে ওঠে। গাড়ীর সকলে সমস্বরে বলে উঠলাে,-“হায় অভাগিনী নারী, অভাগিণী মা, কি দোষে তাের এমন দশা হলাে।” গাড কয়েকবার বাঁশী বাজিয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গেই শাদা ধোঁয়ার রাশি উদগীরণ করতে করতে ট্রেণটা তীব্র গতির সঙ্গে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বনপথ দিয়ে দিগন্তে মিলিয়ে যায়। এতক্ষণে ঝাণ্ডাওয়ালার যেন একটু জ্ঞান ফিরে আসে। সে অর্ধমৃত শিশুটাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে দিল। বাছার ছােট দেহটা একেবারে -ষে গিয়েছে। খােকার গলা থেকে একটা ঘড়ঘড়ে আওয়াজ বেরুচ্ছিল ; তার হাত পায়ের গ্রন্থিগুলি একেবারে শিথিল হয়ে গিয়েছিল আর পায়ের গােড়ালি দুটী মুড়ে উল্টোদিকে ঘুরে গিয়েছে। থিয়েল এ দৃশ্য অরে সহ্য করতে পারলাে না। চারিদিক নিঃস্তব্ধতায় ভরে যায়। শুধু দুটী লােকে পরামর্শ করলে যে শিশুকে ফ্রায়েড রিক্সাগেনে নিয়ে যেতে হলে পরবর্তী ষ্টেশনে তাদের হেঁটে যেতে হবে। কারণ মেষ্টা এখানে থামে না। থিয়েল চিন্তা করলাে, তাদের অনুগমন করবে কিনা। ঝাণ্ডাওয়ালার কর্তব্যের সম্বন্ধে লােক দুটীর কোন ধারণাই ছিল না। থিয়েল ইসারা করে তার স্ত্রীকে চোরটা ধরতে আজ্ঞা করলাে। লেনা তাকে অবজ্ঞা করতে পারলাে না। থিয়েল টোবির বহনকারীদের সঙ্গে কর্মস্থল পর্যন্ত এগিয়ে এসে, সেখান থেকে উদাস দৃষ্টিতে তাদের গতি লক্ষ্য করতে লাগলাে। হঠাৎ উত্তেজনার বশে হাত দুটী দিয়ে কপাল চাপড়াতে থাকে ; যা কিছু দেখল সবই হয়তাে গত রাত্রের মত স্বপ্ন। টলতে টলতে কোন রকমে সে তার নির্দিষ্ট ঘরটীতে যেতে না যেতেই উপুড় হয়ে পড়ে গেল। সে যেন স্পষ্ট দেখতে পেল তার টোবীর রক্তাক্ত দেহকে গাড়ীতে ভােলা হচ্ছে। বাছারে ! ;

ঝাণ্ডাওয়ালা থিয়েলের জ্ঞান ফিরে আসতেই সে অনুভব করে যে গেটের কাছে রৌদ্রতপ্ত • স্থানেই সে পড়ে আছে। তার মাথা এবারে যেন বেশ একটু পরিষ্কার হয়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গেই বােধশক্তিও ফিরে আসে। ঘড়িটা তুলে নিয়ে সে দু'ঘণ্টা ধরে মুহূর্তের কাঁটাটীর প্রতি লক্ষ্য করে সে ভাবে, এতক্ষণে হয়ত লেনা টোবিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে পৌঁছেচে ; ডাক্তার পরীক্ষা করে যেন বলছেন,-সব শেষ, বড়ই দুর্ভাগ্য। ঝাণ্ডাওয়ালা আপন মনে চীৎকার করে বলে ওঠে, “তাহলে সত্যিই কি সব শেষ হয়ে গেল, আর কি তাকে ফিরে পাব না?” তারপর দাড়িয়ে উঠে আকাশের দিকে হাত মেলে দিয়ে চীৎকার করে বলতে থাকে, -না, তার বাঁচা চাই ; তাকে বাঁচতেই হবে, তাকে বাঁচতেই হবে। এই করুণ চীৎকার গগন বিদীর্ণ করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পাগলের মত ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে সে দেখলাে অস্তাচলের রক্তরাগে সারা আকাশ যেন রঙিয়ে গেছে। দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে সে থমকে দাড়ায় ; তারপর দুই বাহু প্রসারিত করে লাইনের মাঝখান দিয়ে চলতে সুরু করে দেয় ; মনে গেল, কি যেন সে ধরতে চলেছে। ক্রমশঃ তার দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসে ; কাকে যেন উদ্দেশ করে সে বলে ওঠে, “পালিয়ে যেও না, যেও না; শােন ; থামাে, থামো; তাকে আমায় ফিরিয়ে দাও। বাছা আমার আঘাত পেয়ে কালো আর নীল হয়ে গেছে। মিন্না, আমি তােমার কাছে শপথ করছি, তাকে মেরে শেষ করে ফেলব।” ছােট শিশুর মত সে চেঁচিয়ে ওঠে, মিন্না, মিন্না’ বলে ; আবার সে উন্মাদের মত চেঁচিয়ে বলে ওঠে, “লেনাকে আমি মেরে ওই খােকার মতই কালাে আর নীল বানিয়ে দেবাে ; এই কুড়ল দিয়ে আমি তাকে টুকরাে টুকরাে করে ফেলবাে, তবে আমার শান্তি ৩৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প আসবে মনে।” তার মুখ থেকে ফেনা কাটতে থাকে, চোখ দুটী কাচের মত স্থির হয়ে আসে। একটা মৃদুমন্দ সমীরণে বনানী আলােড়িত হয়ে উঠলাে ; ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। পশ্চিম আকাশের গায় কয়েক খণ্ড গােলাপী রংয়ের মেঘের আবির্ভাব হােল। থিয়েল ঘুরে দাড়িয়ে যে পথ দিয়ে এসেছিল, সেই পথ অনুসরণ করে আবার চলতে আরম্ভ করে দিলাে। বৃক্ষশাখার ওপর থেকে সূর্যের শেষ লাল আভাসটুকু মিলিয়ে গেল। দূরে শুধু একটা কাঠুরিয়া কুঠারের আঘাতে বনের ভঙ্গ হতে থাকে। ঝাণ্ডাওয়ালার সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠবার সঙ্গে সঙ্গেই একটা উন্মাদনার ভাব তাকে পেয়ে বসে। শিশুটীর ক্রন্দনধ্বনি যেন এখনও তার কানে বাজছিল। এইটাই তার উন্মাদনার প্রথম লক্ষণ। তার মনে হতে লাগলাে, লেনাই তার শিশুর মৃত্যুর কারণ ; আবার দাত চিবিয়ে চীৎকার করে বলে ওঠে, “সৎমা, পিশাচিনী কোথাকার।” এর কিছু পরেই তার মনে হয়, শিশুটী যেন বেঁচেই রয়েছে, মরেনি। বাতাসে আলােড়িত হয়ে দূরে একরাশি ধোঁয়ার কুণ্ডলী এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়তে থাকে ; ইঞ্জিনের ধ্বনিটা তার কাছে একটা নির্যাতিত দৈত্যের আর্তনাদের মত ঠেকলাে। আকাশের গা থেকে আস্তে আস্তে ধোঁয়াগুলি সরে যেতে থিয়েলের বুঝতে দেরী হল না যে দিবা অবসানে লাইনের কুলীরা খালি মালগাড়ীতে করে ঘরের দিকে ফিরছে। কিছু দূরে ব্রেক কসার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ীটা দাড়িয়ে পড়ে। যাত্রীরা সবাই নিৰ্বাক হয়ে ঝাণ্ডাওয়ালাকে দেখে ফিস্ ফিস্ করে নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি করছিল। গার্ড গাড়ী থেকে নেমে থিয়েলের সঙ্গে করমর্দন কোরল। হায়, সে ঝাণ্ডাওয়ালা আর এ জগতে নেই! লেনাও শিশুর সঙ্গে নেমে পড়লাে, শশাকে তার চোখে কালাে রেখা ফুটে উঠেছিল। লেনা তার স্বামীর চেহারা দেখে চমকে উঠে লক্ষ্য করে, থিয়েলের গাল দুটী ভয়ানকভাবে বসে গিয়েছে, আর একদিনেই যেন চুলগুলি সব সাদা হয়ে গিয়েছে; সেই অশ্রুসিক্ত মুখখানি থেকে একটা উন্মাদনার আভাস ফুটে বেরুচ্ছে। মৃতদেহটী বহন করার করার জন্য চোর আনা হােল। চারিদিক নিস্তব্ধ। থিয়েল যেন কি এক গভীর চিন্তায় মগ্ন। ধীরে ধীরে সন্ত্রণ ঘনিয়ে আসে। সচকিত হরিণগুলি উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে লাইনের পাশে দাড়িয়েছিল। ইঞ্জিনের বাঁশী বাজতেই তারা বিদ্যুৎগতিতে ছুটে পালালাে। ট্রেণ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই থিয়েল জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। শিশুটীর মৃতদেহ ঘরের মধ্যে রেখে থিয়েলকে তারা স্ট্রেচারে বহন করে নিয়ে যায়। তাকে অনুসরণ করার সময় লেনার গণ্ডদ্বয় দিয়ে অবিরাম অশ্রুবারা ঝরে পড়তে থাকে। গ্রামের কাছে এসে পৌঁছতেই দুঃসংবাদ পেয়ে গ্রামবাসীরা ছুটে আসে। অতি কষ্টে থিয়েলকে সরু শিড়ির ওপর দিয়ে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেওয়া হল। অন্য লােকেরা টোবির দেহকে বহন করে আনবার জন্য কুটীর অভিমুখে গমন করলাে। প্রবীণদের কথামত লেনা থিয়েলের শরীরে সেক দিতে থাকে। সারাদিনের পরিশ্রমে তার শরীর ক্লান্ত হয়ে আসে। ছােট শিশুটীর চোখও ঘুমে বুজে যায়। মুচ্ছিত থিয়েলের মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দেয়। চন্দ্রমার আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই ঘন মেঘে আকাশ আচ্ছন্ন হয়ে আসে, ঘরটীও আঁধারে ভরে যায়। শুধু স্বামীর ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প লেনার কাণে এসে বাজছিল। সে ভাবলাে, একটা মােমবাতি জ্বালাবে কিনা; এমন সময় সে অনুভব করে, সাঁড়াশীর মত দুটো হাত সজোরে তার গলা চেপে ধরছে । আস্তে আস্তে লেনার চোখের তারা দুটী বুজে আসে। কিছু পরে গ্রামবাসীরা টোবির দেহ বহন করে নিয়ে এলাে ; থিয়েলের শশাবার ঘরের দরজা খােলা দেখে তারা আতঙ্কে চীৎকার করে উঠে লেনার নাম ধরে ডাকতে লাগলাে। একজন দেশলাইএর কাঠী জ্বেলে যা আবিষ্কার করলে তা অত্যন্ত ভয়াবহ। লেনার সারা দেহ রক্তাক্ত, তার মাথার খুলিটা ভেঙ্গে দুফাক হয়ে গিয়েছে। সকলেই আতঙ্কে সমস্বরে বলে ওঠে, “খুন ! খুন! থিয়েল তার স্ত্রীকে হত্যা করেছে।” আরও তাদের দৃষ্টি পড়লো ছােট শিশুটীর প্রতি, তার গলাও কাটা ঝাণ্ডাওয়ালাকে দেখা গেল না, সে কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছে । সেই রাত্রে তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। পরদিন প্রাতে তাকে দেখা গেল সেই দুর্ঘটনার স্থানে। আগ্রহের সঙ্গে টোবির বাদামী রঙের টুপীটা নিয়ে সে নাড়াচাড়া করছে। টোবির স্মৃতি তার মৰ্ম্মে মর্মে গেঁথে গেছে। অনেক চেষ্টা করে সকলে মিলে তাকে লাইন থেকে তুলে আনলাে। আনবার সময় বলপ্রয়ােগ পর্যন্ত করতে হয়েছিল তাদের। তার হাত পা না বেঁধে উপায় ছিল না, দু’চারজন পুলিশের হেপাজতে দিয়ে তাকে বালিনে পাঠিয়ে দেওয়া হলাে। সেখানে জেলে পরীক্ষা করে ডাক্তার তাকে দাতব্য মানসিক চিকিৎসালয়ে ভর্তি করে দিলেন। এখনও টুপীটা সে হাতছাড়া করেনি। পিতৃসুলভ স্নেহে মাঝে মাঝে যেমনভাবে টোবিকে আদর করতাে, আজও পৰ্য্যন্ত সে টুপীটিকে সেই রকম ভাবেই নাড়াচাড়া করে থাকে।

লিউকাডিস ; ঠিক রুশ বিদ্রোহের সময় মস্কো নগরীর রাজপথে একদিন একটা কোলাহলের সৃষ্টি হয়। জনতার উত্তেজনার কারণটা এই রকম,—ছত্রিশটী ছাত্র ছাত্রী তাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের জয়ন্তী উৎসব নিয়ে মাতে। পুলিশ শিক্ষকটীকে খুব সন্দেহের চোখে দেখতাে। এই নিৰ্বাসন দণ্ডের আরও একটা কারণ হােল তারা এই জয়ন্তীকে উপলক্ষ্য করে কয়েকটা গুপ্ত অধিবেশনে যােগ দেয়। এতে মস্কো সহরের কয়েকটী সম্রান্ত বংশীয় পরিবার মর্মাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নির্বাসিতদের মধ্যে এন্না প্যাভ- লােভনা নামে একটা মেয়েও ছিল ; ইভজেন নামে তার এক ভাই মস্কোতে বাস কোরত। ইভ জেন একটা সৈদলের কর্মচারীর পদে অধিষ্ঠিত ছিল ; তার বয়স ছিল মাত্র তেইশ। সকলেরই ধারণা ছিল, এই গর্বিত সুন্দর যুবকটীর ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। ইভ জেন তার বােনকে প্রাণের চেয়েও বেশী ভালবাসত, তার জীবনে সেই ছিল একমাত্র বান্ধবী। চিরদিনের মত তাকে সে হারাবে এই বিচ্ছেদ বেদনায় তার মন জর্জরিত হয়ে উঠলাে। এই অবিচারের প্রতিবাদ সে কোরবেই স্থির কোরল। পুলিশের এই কঠোর ব্যবস্থার কয়েকদিন পরেই তার অধীনস্থ সৈন্য- দলকে একটা উত্তেজিত জনতাকে দমন করবার আদেশ দেওয়া হয়। হঠাৎ ইভ জেন তার দলের মধ্য হতে ছুটন্ত ঘােড়ার ওপর থেকে লাফিয়ে পােড়, যেখানে ভাঙ্গা পাথর, গাড়ীর, চাকা, বাক্স আর আসবাবপত্র দিয়ে আক্রমণকে প্রতিরােধ করবার জন্য বেড়া দেওয়া হয়েছিল, সেইদিকে ছুটে ০ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ; গেল। ইভ জেন তার দেশের প্রকৃত শত্রুদের সঙ্গে সংগ্রাম করার মানসে যেই বেড়াটীর ওপর উঠেছে, এমন সময় তারই অধীনে চালিত সৈন্যদের বন্দুক থেকে দুটী গুলি ছুটে এসে, তাকে বিদ্ধ কোরতেই সে ধরাশায়ী হােল। উত্তেজিত জনতা, তার দিকে হস্ত প্রসারিত করে তাকে বীরত্ব- ব্যঞ্জক সুরে অভিনন্দন জানালাে ; কেউ কেউ তার নাম ধরে ডাকছিল ; মনে হােল, এই বিদ্রোহীদের কাছে হয়তাে সে খুব পরিচিত। সে খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিল, কিন্তু জনতার অভিনন্দন তার কাণে এসে পৌছতে যন্ত্রণার যেন অনেকটা উপশম হােল । হঠাৎ উঠে দাড়িয়ে সে রিভলবার থেকে আততায়ীদের ওপর অগ্নি বর্ষণ কোরল ; তারই সৈন্যদলের কয়েক জন ছুটে এসে তার হাত ধরে ফেললাে ; ধস্তাধস্তি চলেছে এমন সময় দুটী যুবক এসে তাকে সৈন্যদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। একটু পরেই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাে। ইভ জেনের অসাড় দেহকে বহন করে এনে একটা প্রস্তরখণ্ডের ওপর তারা শুইয়ে দেয়। অবিলম্বেই তার কোটটা খুলে ফেলে, আস্তে আস্তে রক্তাক্ত স্থানটী ব্যাণ্ডেজ দিয়ে জড়িয়ে ফেললাে। সামনেই একটা ফিরি- ওয়ালার গাড়ী পড়েছিল। গাড়ীর মালিকটী কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছে ; ঘােড়া দুটীও প্রচণ্ড শীতে যেন জমে গিয়েছে। অবিলম্বেই তারা কৰ্ম্মচারীটীকে সেই সবজীর গাড়ীর মধ্যে শুইয়ে, পাতা দিয়ে তার সারা অঙ্গ আচ্ছাদন করে দিল। তাদের মধ্যে একজন বেড়াটীর দিকে চলে গেল, অপরজন বহু রাস্তা অতিক্রম করে একটা গলির মধ্য দিয়ে ইউনিভার্সিটীর হাসপাতালের সামনে এসে এসে পৌঁছল। হাসপাতালের প্রাঙ্গনে নেমে সে একজন সহকারী ডাক্তারের কাছে বিয়য়টা ব্যক্ত কোরল। ডাক্তার ইভ,জেনকে একটা ওয়ার্ডে ভর্তি করে নিলেন। গুরুতর ভাবেই সে আহত হয়েছিল। তৃতীয় দিনে তার জ্ঞান ফিরে আসে। আস্তে লিউকাডিস্ আস্তে সে তার অবস্থা উপলব্ধি করে, আর বুঝতে পারে, কোথায় সে এসেছে। ইতিমধ্যে সারা মস্কো সহরে সেই যুবক সামরিক কর্মচারীর পলায়ন নিয়ে আলােচনা হতে থাকে। অচিরেই পুলিশ, গােয়েন্দার সাহায্যে ইভজেনের হদিস বার করে ফেললাে। একজন গােয়েন্দা পুলিশ অর্ধমৃত লােকটীকে ধরবার জন্য হাসপাতালে ঢুকে বুঝতে পারে যে রােগীর অবস্থা খুবই শশাচনীয়, কিন্তু তথাপি সে শমন বার করে যুবকটীকে গ্রেপ্তার করার ইচ্ছা জানায়। সহকারী ডাক্তারের সঙ্গে এই নিয়ে তার তুমুল তর্ক চলেছে এমন সময় ডাক্তার বেরিয়ে এসে ৷ যুবকটীর অসহায় মুখের প্রতি তাকিয়ে করুণায় আর্দ্র হয়ে গেলেন। তিনি মিনতির সুরে বােললেন, “ওকে এখন সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করাই বৃথা ; পথের মধ্যেই হয়তাে ওর মৃত্যু হতে পারে। কিছুক্ষণ চিন্তার পর পুলিশ কর্মচারীটি ঠিক কোরল যে রােগী আরােগ্যলাভ কোরলেই তাকে গ্রেপ্তার করা যাবে। এইভাবে কিছুদিনের জন্য ইভ জেন গ্রেপ্তারের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেল। ডাক্তারের রােগীটির প্রতি সহানুভূতির মাত্রা ক্রমশ বেড়েই যেতে লাগলাে,সকলেই যাতে রােগীর প্রতি যত্ন নেয় এ ব্যবস্থাও তিনি কোরলেন। বন্ধুরা ইভ জেনের পলায়ন পথে সাহায্য করার মানসে এগিয়ে এলাে। একদিম প্রভাতে তাকে একটি গুপ্ত কক্ষের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হােল। সেইদিনই সায়াহ্নে ছদ্মবেশে যাতে ইভ জেনকে সােকনিকিনে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেই উদ্দেশে একটী যুবক আরদালির পােষাক সমেত এসে হাজির হলো। ইভজেনও তাকে অনুসরণ কোরতে মনস্থ কোরল। যদি সে এখানে আর বেশী দিন থাকে, তাহলে হয় তার ফাসি হবে, নতুবা তুষারমণ্ডিত সাইবেরিয়ার নির্জন প্রান্তরে তাকে নির্বাসিত জীবন যাপন করতে হবে। p ৪০ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প গভীর রাত্রে তুষার পতনের মধ্য দিয়েই পলাতককে সােকনিকিনে নিয়ে গিয়ে এক বৈজ্ঞানিকের কুটীরে থাকার ব্যবস্থা করা হােল। চব্বিশ ঘণ্টা না পেরুতেই বার্তাবহনকারীরা এসে জানিয়ে দিল যে সেই রাত্রেই ইভ জেনকে অতর্কিতভাবে গ্রেপ্তার করার মানসে পুলিসের একটা ষড়যন্ত্র চলেছে। স্থান পরিবর্তনের জন্য সে অস্থির হয়ে উঠলাে। বৈজ্ঞানিক ভদ্রলােক জাতিতে ছিলেন জার্মান ; তিনি তার প্রিয় ভগ্নীর সঙ্গে একত্র বাস কোরতেন। ভগ্নী এনেসথেসিয়া যেমন ছিলেন সাহসী তেমনই ছিল তার হৃদয়ের মধ্যে করুণার প্রস্রবণ। মস্কো নগরীতে চল্লিশ বছর ধরে বা করার জন্য মহিলাটীর সহিত বহু সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সখ্যতা জন্মেছিল ; সাধারণ লােকেও আঁকে কম স্নেহ কোরত না। বৈজ্ঞানিকের ঘরের সব কিছুই এই মহিলাটীকে দেখতে হােত। এ ছাড়া এনেথেসিয়া রােগীটিকে সেবা যত্নও কোরতে লাগলেন। তরুণ কর্মচারীর অবস্থান সম্বন্ধে যাতে সকলেই অজ্ঞাত থাকে এদিকেও তিনি বিশেষ দৃষ্টি রাখতেন। ইভ,জেনের বেশভূষা একেবারে বদলে দেওয়া দরকার এই ভেবে মহিলাটী তাকে মজদুরের বেশে আচ্ছাদিত করে সহর- তলীর একটা কাঠুরিয়ার ঘরের মধ্যে নিয়ে গেলেন। ইভজেন সেখানে এক রাত্রির বেশী আশ্রয় পেল না, কারণ কাঠুরিয়া নিজে এবং তার পরিবার পলাতককে আশ্রয়দানের জন্য বিপদের ঝুকি ঘাড়ে নিতে পারে না। এইভাবে কোনদিন বা সহিসের ঘরে ইভ জেন আশ্রয় নেয়, আবার অন্যদিন ল্যাবরেটরীর এক কর্মচারীর ঘরে রাত কাটিয়ে দেয়; কেউই ভয়ে তাকে একদিনের বেশী আশ্রয় দিতে সাহস করে না ; মহিলাটীর শত অনুবােধ সত্ত্বেও তারা পুলিশের ভয়ে তাকে আর বেশীদিন আশ্রয় দিতে পারলাে না। ইভজেনের অবস্থা দেখে তার ক্ষতস্থানগুলিকে নিয়মিতভাবে পরিষ্কার করে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দেবার জন্য এনেথেসিয়াকে সেই রাত্রে লিউকাডিস্ ৪১ ইভজেনের কাছে থাকতেই হােল। বিশ্রামের অভাবে ঘাগুলােও তার এখনও সম্পূর্ণভাবে শুকিয়ে যায়নি। ল্যাবরেটারীর কর্মচারীটি ইভ,জেনকে আরঅধিক সময় থাকতে দিতে কাজী হােল না। মহিলাটী হতাশ হােয়ে ভাবলেন, কি করা যায়। তাঁর বন্ধু ও বান্ধবীরা বিদ্রোহীর জন্য আর বিশেষ কিছু ব্যবস্থা কোরতে সাহস কোরল না ; তারা বুঝতে পারলো প্রতি পদেই পুলিশ তাদের অনুসরণ করছে, একবার ধরা পড়লেই সৰ্ব্বনাশ। আর একবার তরুণীটি করযােড়ে ল্যাবরেটারীর কৰ্ম্মচারীর কাছে শুধু এক রাত্রির জন্য আশ্রয় ভিক্ষা চাইলেন। অনেক অনুরােধে শুধু তিন ঘণ্টার জন্য আশ্রয় মিললাে । 'ঘড়িতে তিনটা বাজলাে, আর তিন ঘণ্টা মাত্র হাতে সময় ; দু’টার মধ্যেই তাকে অন্য স্থানে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আশ্রয়ের অনুসন্ধানে মহিলাটা এ রাস্তা ও রাস্তা ঘুরে অনেক চেষ্টা কোরলেন, কিন্তু আশ্রয় কোথাও মিললনা। দুশ্চিন্তায় নারীটির মন ভরে গেছে; এমন সময় হঠাৎ তার মনে হল যে প্রেমিক প্রেমিকাদের নিশি যাপনের জন্য এক ধরণের ঘর তত ভাড়া পাওয়া যায় । এই রকম স্থানে পাসপােট- হীন ব্যক্তিও তত আশ্রয় পেতে পারে। দুদিন বিশ্রাম লাভ কোরলেই কৰ্ম্মচারীটি অনেকটা সুস্থ হয়ে নিজেই নির্ভয়ে সীমান্ত অতিক্রম কোরে যেতে পারবে। এই কল্পনাকে বাস্তবে পরিণত কোরতে হােলে এমন একটী তরুণীর প্রয়ােজন য়ে হবে খুব বুদ্ধিমতী, সাহসী এবং প্রেমের অভিনয়ে দক্ষ। এনেথেসিয়া এমন একটা নারীর কথা মনে কোরতে পারলেন না, যার দ্বারা এ কাজ সম্ভব হতে পারে। বিদ্রোহীদের সঙ্গেও তার সে রকম পরিচয় ছিল না, যাও বা দু’একজনের সঙ্গে আলাপ ছিল, তাদের এ কাজের ভার দিতে তার সাহস হােল না, কারণ পুলিসের সতর্ক দৃষ্টি থেকে তাদের রেহাই পাওয়া মুস্কিল। এমন একটা সম্ভান্ত ঘরের ৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প সুন্দরী কিশােরীর প্রয়ােজন, যার প্রতি পুলিসের একটুও সন্দেহের উদ্রেক হােতে না পারে। এইভাবে চিন্তা কোরতে কোরতে ও ক্ষুধা নিবৃত্তির আশায় এনেথেসিয়া একটি রেস্তোরাঁতে ঢুকে পােড়লেন। ঘরের মধ্যে তার দৃষ্টি পােড়ল দুটি নারীর প্রতি ; তারা সামনা-সামনি বসে তরল চকোলেট পান করছে। অন্যদিকে দৃষ্টিপাত না করে একটা চেয়ার টেনে তিনি বসে পড়লেন। হঠাৎ তার চোখ পােড়ল উপবিষ্টা নারীদের মধ্যে বয়ােজ্যেষ্ঠ নারীটির প্রতি,তিনি যেন হাত তুলে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। এনেথেসিয়ার আর বুঝতে বিলম্ব হােণ মা যে সেই নারীটি হােলেন একজন অবসর প্রাপ্ত সৈন্যাধ্যক্ষের বধির ও বাহীন স্ত্রী ; তার পাশে লিউকাডিস নামে উনিশ বছরের পরমা সুন্দরী মেয়েটা বসেছিল। লিউকাডিসের ওপর চোখ পােড়তেই এনেথেসিয়ার মনে হল যে তার কল্পিত কাজটী এর দ্বারাই শুধু সম্ভব হোতে পারে। কয়েক বৎসর আগে তিনি মধ্যে মধ্যে এই সৈন্যাধ্যক্ষের বাড়ীতে এসে অতিথি হােতেন ; তখন লিউকাডিস্ ছিল কয়েক বৎসরের মাত্র বালিকা। কিশােরী টির মা ছিলেন খুব সরল, ধার্মিক ও সাহসী। এনেসথেসিয়া তাদের পাশে বসে ইঙ্গিতে কুশল সমাচার জেনে নিলেন। এরপর খুব আস্তে আস্তে লিউকাডিসের সঙ্গে কথাবার্তা চলতে লাগলাে। সৈন্যাধ্যক্ষের স্ত্রী তাদের মুখের দিকে চেয়েছিলেন ; পাছে এই অকারণ দৃষ্টিপাতকে মহিলাটী অশিষ্ট আচরণ বােলে মনে করেন, এই ভেবে তিনি চোখ নামিয়ে নিলেন। এনেথেসিয়া মাঝে মাঝে উত্তেজিত হয়ে উঠছিলেন ; কেবলই তার মনে হচ্ছিল, এই অভিসন্ধি কি ভাবে পূর্ণ হতে পারে ; আর বিলম্ব করার সময় নেই ; সংক্ষেপে এই অভিসন্ধিটা এমন ভাবে ও ভাষায় ব্যক্ত করতে হবে, যাতে লিউকাডিসের • ৪৩ লিউকারডিস্ অন্তরের মধ্যে যুবকটীর জন্য সহানুভূতির উৎস, জেগে ওঠে। বলার কৌশলে যদি ভ্রান্তি এসে যায় তাহলে সমস্ত বিষয়টা পণ্ড হয়ে যাবে। বিদ্রোহের বিচিত্ৰগতির সম্বন্ধে লিউকাডিসের কোন ধারণাই ছিলনা। কিশােরী স্বপ্নরাজ্যে বাস করে ; ঐশ্বর্যের মধ্যে সে ডুবে আছে, কিন্তু অন্তরের মধ্যে এমন একটা তেজস্বীতার ভাব রয়েছে যা সব সময় তার বাইরের আচরণে প্রকাশ পায় না ; প্রয়ােজন হলে সে যে কোন রকম দুঃসাহসিকতার কাজে হাত দিতে পারে ; সময় সময় তার অন্তরে একটা অস্বস্তির ঝড় বয়ে যায় ; তা থেকে সে নিষ্কৃতি পেতে চায় ; মনে হয় তার কুটীরের বাইরে যা কিছু, সবই যেন অসুন্দর ও নােংরামাত ভরা ; এই প্রতিকুল আবহাওয়ার মধ্যে যেন তার প্রাণটা হাঁপিয়ে ওঠে। স্থির হয়ে সে এনেথেসিয়ার কথাগুলি শুনে গেল ; ঈষৎ চঞ্চলতার আভাস, বা মােহ, উত্তেজনা অথবা অপবিত্রতার ভাব কিছু তার মনের মধ্যে এলােনা। এনেথেসিয়ার মুখ দেখে সে বুঝতে পারলাে যে কর্তব্যের প্রেরণায় মন তার চঞ্চল হয়ে উঠেছে। সহসা লিউকাডিস্ কোন মতামত প্রকাশ করতে পারল না, শুধু কি ভাবে তাকে কাজ করে যেতে হবে সেই উপায়গুলিই ভাল করে বুঝে নিল। ছয় সপ্তাহ হ’ল পিটার্গ সহরের একটী সম্রান্ত শিক্ষিত ব্যক্তির সঙ্গে তার বিবাহের কথা, পাকাপাকি হয়ে গিয়েছে ; আত্মীয়-স্বজন সকলেই ভাবল যে এই ভদ্রলােকটীর স্ত্রী হােলে সে খুব সুখীই হবে ; কিশােরীরও এতে কম আনন্দ হয়নি। এনেসথেসিয়া তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে আশ্বাস দিয়ে বললেন, “এর মধ্যে কোন ভয়ের কারণ নেই, তােমার মনকে শান্ত স্থির করে রাখতে পার।”, লিউকাডি মাথা নেড়ে জানালাে,-এ প্রতিশ্রুতির ৪৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প { কোন প্রয়ােজনই নেই ; ভাবী স্বামী কল্পনাও করতে পারেন না, আমার দ্বারা কোন কুৎসিত ও অসুন্দর কাজ হতে পারে।” এনেথেসিয়া--তা’ হলে অভিনয়ের কাজে তােমার মত আছে ? লিউকাডি–হাঁ, কিন্তু এর মধ্যে একটা অসুবিধাও আছে। এনেসথেসিয়া গম্ভীর স্বরে এই কথায় বাধা দিয়ে উঠলেন। লিউকাডিস্-দু’দিন দু’রাত্রি অনুপস্থিত থাকলে বাড়ীর লােকেরা কি ভাববে বলুন তাে? হ্যা, ঠিক হয়েছে, একটা কাজ করলে তাে পারি ; মাকে একটা চিঠি লিখে রেখে সরে পড়লেই হবে। নেসথেসিয়া-হা, শুধু কয়েক লাইন লিখলেই হবে, আর তাতে একটু অনুরােধের কথাও থাকবে যে তিনি যেন একথাটা গােপন রাখেন, কারুকে যেন না বলেন। আর একটু পরিষ্কার করে জানিয়ে দেবে, তুমি ফিরে এসে সব কথা তাকে খুলে বােলবে। তুমিও কিন্তু এমনভাবে থাকবে যে কেউ যেন না বুঝতে পারে, তুমি কি করে যাচ্ছে। লিউকাডি স্থির নেত্রে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু মাথা নাড়লো। এনেথেসিয়া একে একে বুঝিয়ে দিলেন, ছদ্মবেশে কি ভাবে তাকে অভিনয় করে যেতে হবে। আশ্বাস পেয়ে তিনি ইভ জেনের কাছে ফিরে গিয়ে আসল উদ্দেশ্যট৷ ব্যক্ত করে ফেললেন। ইভ জেন ল্যাবরেটরীর কর্মচারীর ঘরের মধ্যে শুয়েছিল ; মহিলাটীর হাত ধরে সে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে উঠলাে, “আপনিই আমার জীবনদাত্রী”। এনেথেসিয়া ধন্যবাদ জানিয়ে তার বেশ পরিবর্তনের কথা উত্থাপন করলেন। ইভ জেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাে, “বেশ পরিবর্তন করে কি হবে ; আমি একেবারে বদলে গেছি ; দৃষ্টিশক্তি বােধশক্তি সবেরই আমার রূপান্তর হয়েছে ; মনে হচ্ছে চারদিক থেকে কারা আমায় । ঘিরে ধরেছে। আমি স্পষ্ট মাকে দেখতে পাচ্ছি, তিনি যেন হারের লকেট ; • লিউকাডিস্ ৪৫ খুলে আমার ছবিটীর দিকে চেয়ে আছেন। আমার অনুভবশক্তি যেন একেবারে নষ্ট হয়ে গিয়েছে ; সারা পৃথিবীটা এখন কৃত্রিম বলে মনে হয় ; ভালবাসা, আসক্তি সবই যেন লােপ পেয়েছে মন থেকে।” এনেসথেসিয়ার বুঝতে অসুবিধা হােল না যে তার অন্তরের মধ্যে একটা অস্বস্তির ঝড় বয়ে চলেছে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দরজার কাছে একটা গাড়ী এসে থামলাে। ইভ,জেনকে স্নান করানাের পর সুন্দর করে পােষাক পরিয়ে নীচে নামিয়ে আনা হােল। লিউকাড়ি গাড়ীতে ভেল্ আচ্ছাদিত, মুখে রসেছিল। এনেসথেসিয়া তার হাতে এক প্যাকেট ব্যাণ্ডেজ ও গজ দিয়ে ইভ জেনকে জানালেন যে দ্বিতীয় দিনের প্রত্যুষে তার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষা করবেন, আর তার বিদেশ গমনের ছাড়পত্র তিনি ইতিমধ্যে সংগ্রহ করে ফেলবেন। কথা শেষ করে গাড়ােয়ানকে গন্তব্য স্থান বুঝিয়ে দিয়ে তিনি হাত তুলে বিদায় জানালেন। গাড়ী চলেছে, লিউকাডি ও ইভ জেন পাশাপাশি মৌন হয়ে বসে আছে, মাঝে মাঝে রাস্তার আলাে গাড়ীর মধ্যে এসে পড়ছে ; কিশােরী আলােতে স্পষ্ট দেখতে পেলাে ইভজেনের চোখ দুটী বােজা, মুখখানি ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। ইভজেন তার হাতখানি তরুণীর হাতের মধ্যে রাখলাে ; এত কাছাকাছি বসেও লিউকারডিসের মনে উত্তেজনা অথবা ভয় কিছুই এলাে না ; এই মৌনতা তার বেশ ভালই লাগছিল। একটী বাড়ীর সামনে গাড়ী এসে দাড়াল। দুৰ্বলতার জন্য গাড়ী থেকে উঠে নামতে ইভজেন বেশ একটু পরিশ্রান্ত বােধ করছিল। দুটী ঘরের জন্য আবেদন করাতে গৃহস্বামী তাদের রীতিমত অভ্যর্থনা করলেন। শরীরটাকে কোন রকমে টানতে টানতে সিড়ি দিয়ে সে ওপরে উঠে ৪৬ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প • গেল। ঐশ্বৰ্য্যবান লােক যেমন তার অবসর সময় আনন্দে ও স্ফুর্তিতে কাটায় তাকে এ রকম ধরণের একটা ভাণ করতে হােল । প্রথা অনুযায়ী হুকুম তদারকের জন্য একটী চাকর এসে হাজির হােল ; বেহারাটীর পোষাক ছিল জমকালাে ধরণের। তার শুকনাে মুখ থেকে একটা অস্বাভাবিক রকমের হাসি বেরিয়ে আসছে, আর অতি বিনয়ে দেহ নুয়ে পড়েছে। টেবিলটা সাজিয়ে ফেলে সে যেন কুকুরের মত আজ্ঞার প্রতীক্ষায় দাড়িয়ে রইলাে। পরিশ্রান্ত ইভ,জেন নৈশ ভােজন, হুইস্কি ও শ্যাম্পেন আনতে আদেশ কোবুল ; সে বেশ হৃদয়ঙ্গম করছিল যে এর পিছনে রয়েছে এক বিরাট অভিনয়। লিউ কাডিস্ মুখে খানিকটা রং বুলিয়ে ও কোন রকমে সন্ত্রম বজায় রাখার জন্য একটা ছোেট গাউনে দেহকে ঢেকে দিয়েছিল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার সরল শিশুসুলভ মুখে জোর করে পতিতা নারীদের মত একটা স্কুত্তির ভাব আনতে হােল। সে বুঝেছিল, এটা অভিনয় মাত্র আর কিছু নয়। অনর্গল কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ছিনালার ভঙ্গীতে তাকে মুচকে মুচ কে হাসতেও হচ্ছিল, আর মাঝে মাঝে ইভ,জেনের গলা জড়িয়ে ধরে কোলে গিয়ে বসছিল। থেকে থেকে সে কটাক্ষে কামাতুরা বিরহিণীর ভাব ফুটিয়ে তুলছিল। যে সব জিনিষ সে কখন দেখেনি, দেখতেও চায়নি বা ভাবতেও পারেনি সেই সব কাজ বেহারাকে ঠকাবার জন্য তাকে করে যেতে হােল। জ্বলজ্বলে আলােয় ভরা ঘর, রঙীন কুশান ও আয়না পরিবৃত ঘরখানির সঙ্গে সে কোন রকমে খাপ খাইয়ে নিল। এই লজ্জাজনক জমকালাে স্থানে তার মনে বিদ্রোহের সঞ্চার হয় ; শুধু তাই নয়, তাকে আবার এমনভাবে আচরণ করতে হয়, যাতে কেউ তার ব্যবহারের স্বাভাবিকতার সম্বন্ধে সন্দেহ করতে না পারে। খুব সতর্কতার সঙ্গে তাকে এই অভিনয় করে যেতে হয়। সে সব রকমের আহার ও পানীয়ের লিউকাডিস্ ৪৭ স্বাদ গ্রহণ করে; আবার ওয়েটার বেরিয়ে যাবার পর তাকে ইভ জেনের পেয়ালা থেকেও মদ নিঃশেষ করে ফেলতে হয়, কারণ অসুস্থ শরীরে মদ্য পানের মত অবস্থা তার ছিল না। জীবনে এর আগে সে মদ স্পশ ই করেনি। এই অস্বাভাবিক আবেষ্টনীর মধ্যে তার মন অবসাদে ভরে আসে, কিন্তু উপায় কি, স্বেচ্ছায় সে এই আত্মােৎসর্গকে বরণ করে নিয়েছে। ওয়েটার ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে উঠে পড়ে। এই নৈশ বীভৎসতার মাঝে পােড় তার শিরা উপশিরার রক্ত চঞ্চল হেয়ে ওঠে; মুখেও একটা গ্লানিজমক অবসাদের ভাব ফুটে ওঠে। মনে হয়, কতদিনই না সে বাবা, মা’কে ছেড়ে এসেছে। তার অবস্থা লক্ষ্য করে ইভ জেনেরও মন গভীর দুঃখে ভরে ওঠে। • ইভ,জেন মনে মনে তার জন্য সহানুভূতি প্রকাশ করলাে, বেহারাটা ঘরে ঢুকতে আবার মুখে অভিনয়ের হাসি টেনে আনলাে। টেবিলটী পরিষ্কার করে নিয়ে যাবার পর, শাদা টুপী মাথায় একটী পরিচারিকা এসে ঘরের মধ্যে দাড়াল ; তরুণী হােলেও বয়স তার বেশীই দেখাচ্ছিল, এই কৃত্রিম আলাে ও অবরুদ্ধ আবহাওয়ার মধ্যে বাস করে তার অবস্থা এই রকমই দাড়িয়েছিল। পরিচারিকা জিজ্ঞাসা কোরল, তাদের সুবিধার জন্য সে কি করতে পারে। পরিচারিকার দিকে চোখ পােড়তেই লিউকাডিসের পা কেঁপে সে নিজেই নিজের নগ্ন পা, হাত, গলা ও কঁাধের অবস্থা দেখে লজ্জায় অধীর হােয়ে পড়েছিল। নিজের অজ্ঞাতে এই কঠোর পরীক্ষায় কোন রকমে সে উত্তীর্ণ হােল। পরিচারিকা চলে যেতেই তারা ঘর বন্ধ করে বাঁচলাে। দেওয়ালের ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বেজে গেল। লিউকাডি উঠলাে।

জাৰ্মাণীর সেরা গল্প পীড়িত ইভ,জেনের রাত্রির বেশ পরিবর্তনে সাহায্য করে তার শায়িত দেহটাকে চাদরে আচ্ছাদন করে দেয়। লিউকাডিস মনে মনে ভাবে, এই তাে প্রকৃত মানুষ। ভাবী স্বামী আলেকজাণ্ডারের কথা স্মরণ হােতে তার চোখ জলে ভরে আসে। স্থিরচিত্তে সে ইভজেনের ক্ষতস্থানে ব্যাণ্ডেজ জড়িয়ে দেয়। স্বপ্নজড়িত চোখে ইভ জেন তার সুন্দর হাতগুলি লক্ষ্য করে যায়। ধন্যবাদ জানাবার সাহস পর্যন্ত তার হয় না ; কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কোরলে পাছে সে অপমানিত বােধ করে, এই ভয়ে সে কিশােরীর মুখের দিকে তাকাতেও সাহস করে না । ইভজেন গভীর নিদ্রায় অভিভূত হয়ে পােড়ল। লিউকারডি একটা আরাম কেদারায় স্থির হয়ে বসলাে। সে ব্যাগের মধ্যে একটা বই এনেছিল কিন্তু পড়ার মত অবস্থা তার ছিল না। বাপ-মা, বন্ধু-বান্ধবী এই সব চিন্তার রাশি চলচ্চিত্রের মত তার মাথার মধ্য দিয়ে ঘুরে গেল। সে ইভজেনের নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ও সুন্দর অবয়বের প্রতি লক্ষ্য করছিল ; ধীরে ধীরে রােগীর চিন্তাও যেন তার মন থেকে সরে যাচ্ছিল। সিডির ওপরের একটা খসখসানি পায়ের শব্দ তার কানে এসে বাজতে থাকে। মাঝে মাঝ নারী ও পুরুষের উচ্ছসিত গলার আওয়াজ নীচের দেওয়ালে এসে ঘা দিচ্ছিল। কঁচের পেয়ালার ঠুনঠু আওয়াজে চারিদিক ভরে ওঠে; গানের সুরের তরঙ্গে বাড়ীটা মুখরিত হতে থাকে। একটু পরেই পিয়ানাের শব্দ থেমে যায়। সহসা ঘরের দেওয়ালের বাম দিক থেকে কিছু একটা ভাঙ্গার শব্দ লিউকাডিসের কানে এসে বাজতেই সে আতঙ্কে শিউরে ওঠে। বদ্ধ ঘরগুলি থেকে সেন্টের সুগন্ধ ভেসে আসে, আর পােষাকের খখসানি আওয়াজের সঙ্গে দরজা বন্ধের শব্দও তারা বেশ শুনতে পায়। জগৎ যে এই রকম ভীষণ হতে পারে, মানুষের জীবনের স্তর বিভাগ ;

লিউকাডিস্ ৪৯ যে এত হীন হয়, একথা লিউকাডিস্ স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। অন্ধকারে নারী পুরুষ পরস্পরে আলিঙ্গন করা, আলােয় ভরা ঘরের মধ্যে আয়নার সামনে নানা প্রকারের দেহ ভঙ্গিমা করা, আপত্তিজনক কথার মধ্য দিয়ে কুপ্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করা—এই সব পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে তার মনের পবিত্র দেউলটী যেন কিছু মাত্রায় কলুষিত হতে আরম্ভ কোরল। এই আবেষ্টনীর লজ্জাকে এড়াবার জন্য সে হাত দিয়ে তার মুখ ঢেকে ফেলে ভয়ে ও আতঙ্কে শিউরে উঠলাে। কিন্তু ইভজেন হঠাৎ চোখ মেলে চীৎকার করে উঠতেই লিউ কাডিস্ চমকে উঠে এক গ্লাস জল নিয়ে তার কাছে এগিয়ে এসে তার উত্তপ্ত কপালে এক টুকরাে ভিজে কাপড় জড়িয়ে দেয়। তারপর ইভজেন জেগে উঠে ডাক্তার ও এনেসথেসিয়ার কথা বলতে শুরু করে। সে বললাে,-পরের দিন একটু সুস্থ হলেই আমি গন্তব্য স্থানে যেতে পারবাে। উত্তরে লিউকাডিস্ বলে,—এটা অসম্ভব, এখনও আপনার গায়ে বেশ জ্বর রয়েছে। পরদিন প্রত্যুষে সাতটার আগে ইভ জেনের সঙ্গে এনেসথেসিয়ার সাক্ষাৎ হওয়া অসম্ভব—এ কথাও কিশােরীটি জানিয়ে দিল। এই রকম মিষ্টি আলাপের মধ্যে তার অন্তরের মাধুৰ্য্য ফুটে উঠছিল। আরেকবার পিয়ানাের আওয়াজে সারা বাড়ীটা মুখরিত হয়ে উঠলাে; এবারের সঙ্গীতে যেন একটা বীভৎসতার ছোঁয়াচ ছিল। মাঝে মাঝে সুরাপায়ীদের কর্কশ স্বরে চারিদিক বিদীর্ণ হচ্ছিল। ঘড়ির কাটা বারােটার দিকে ঘুরে যায়। তারা দুজনেই ভীতিপূর্ণ নেত্রে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। হলঘরের কোলাহলের শব্দ তাদের কানে এসে বাজে ; পরক্ষণেই আবার সব যেন স্থির হয়ে আসে। এই বীভূল মাদকতাপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে তাদের শিরা উপশিরাগুলি যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে ; কয়েক মিনিটের উত্তেজনায় তারা যেন সাধারণ • ; ৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প শত্রুদের প্রতিরােধ করবার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয় ; তারা যেন এক ভীষণ ঝড়ের মধ্যে আশ্রয় অন্বেষণে বেরিয়ে বাঁচবার উপায় অনুসন্ধান করছিল ; লিউকাডিস্ নিজেকে হারিয়ে ফেলে, ইভ জেনও নিজের সত্ত্বা ভুলে যায়। যুবকের অন্তরে শুধু দুঃখিত ও নিপীড়িত লিউকাডিসের মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে আর তরুণীটী ইভ,জেনের ভাগ্য ও তার মহান্ উদ্দেশ্য নিয়ে আপন মনে আলােচনা করতে থাকে। ধীরে ধীরে তার অন্তরের আলােড়ন আবার থেমে আসে আর ক্লান্ত ইভ জেনের চোখ ঘুমে জড়িয়ে যায়। ঘরে আলাে জ্বলার জন্য তার সে রকম ভাল ঘুম হলাে না। পাছে লিউকাডিসের কষ্ট হয়, এজন্য সে আলাে নিভিয়ে দিতে পারলাে না। লিউকাডি যুবকের কষ্ট হৃদয়ঙ্গম করে আলাে নিভিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে একটা মােমবাতি জ্বললাে ; তারপর ইভ,জেনের ঘর থেকে কার্পেটটা এনে মেঝেয় ছড়িয়ে দিয়ে তার ওপর নিজের ফাহ্ কোটটা কুণ্ডুলী পাকিয়ে তাতে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাে। শিলাবৃষ্টির শব্দে জানলাগুলাে মাঝে মাঝে ঝন্ ঝন্ করে বেজে উঠছিল। পাশের ঘরে ঘুমন্ত ইভ জেমের নিঃশ্বাসের শব্দ লিউকাডিস্ যেন স্পষ্ট অনুভব করছিল। তার মনে হচ্ছিল যেন নিজের ভাগ্যের সঙ্গে ইভজেনও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তার আবার মনে হলাে, সে যেন এক জাহাজের ডেকের ওপর দাড়িয়ে দূরে তাদের গৃহটী নিরীক্ষণ করছে। ঘুম তার এসেও এলাে না। ইভ,জেন তাকে কতই না সান্তনা দিয়েছে, কিন্তু এসব তার কাছে স্বপ্ন বলেই মনে হয় ; স্বপ্নে দেখে সে যেন ইভ জেনকে সেবা করছে। প্রভাতের ঝাপ সা আলােয় সে দেখতে পেল একটা ইদুর কারূপেটের ওপর দিয়ে বিচরণ করছে ; ক্রমশঃ ইরটা যেন বড় হয়ে একটা বিরাট দৈত্যের আকার ধারণ করেছে। উত্তেজনায় লিউকারডিস্ তার মাথা ঘুরে যায় ; অসহায়ের মত ছুটে গিয়ে ইভ,জেনের ঘরে ঢুকে পড়ে। সে দেখতে পায় ইভজেনের হাত দুটী, বিছানা থেকে ঝুলে পড়েছে, আর কপালে তার বিন্দু বিন্দু ঘামও দেখা দিয়েছে, মুখটা তার ভয়ে একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ নিজের প্রতি একটা ঘৃণা ও অবজ্ঞায় তার মনটা ভরে উঠলাে; পৃথিবীতে এমন কোন লােক নেই যার প্রতি এ রকম মমতার সঙ্গে সে তাকিয়ে থাকতে পারে। তারা এখানে আসবার পর গৃহস্বামী তাদের অবস্থানের কথা কিছুই জানতে চায়নি। এক রাত্রের জন্য ঘর ভাড়া দেওয়া তাদের রীতি। এনেসথেসিয়ার অভিপ্রায় ছিল যে কৌশলে তারা দু’দিনের জন্য থাকবার ব্যবস্থা করে নেবে। ইভ জেন অর্ধনিমিলিত চোখে বিছানায় শুয়ে ছিল ; সে নিজেই প্রথম এই স্থানে দ্বিতীয় রাত্রি যাপনের কথা উত্থাপন কোরল । সে আবার ভাবলাে, গৃহস্বামীকে দুটি স্বর্ণমুদ্রা ঘুম্ দিলে এ প্রস্তাবে সে রাজী হবেই। সে লিউকাডিকে বললাে যে পঞ্চাশ রুবলের মত না দিলে হবে না। প্রত্যুত্তরে লিউকারুডি জানালাে যে এই রকম উদারভাবে খরচ করলে গৃহস্বামীর মনে সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে এবং তাদের কার্যকলাপের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য হয়ত রাখবে। লিউকাডিসের কৃতজ্ঞতাকে স্মরণ করে ইভ,জেনের বিদ্রোহী মন জেগে উঠলাে। তার মনে হলাে, এ জঘন্য নরক লিউকারুডিসের মত সুন্দরী তরুণীর জন্য নয়, বাহিরের মুক্ত আকাশ ও আলাের মাঝেই তার স্থান। কিশােরীর মধুর ব্যবহারে সে মুগ্ধ হয়ে যায় ; ভাগ্যদোষে ফুলের মত সুন্দর এই কিশােরীকে এই রকম কুৎসিৎ আবহাওয়ার মধ্যে আটাশ ঘণ্টা টিাতে হয়। পূর্বে তাকে সে দেখেছিল একটা পবিত্র শুভ্রবেশে, ওষ্ঠ দুটীও কি সুন্দর তার মনে হয়েছিল; কিন্তু এখন যেন তার রূপান্তর জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ঘটেছে, সেই অপূৰ্ব শ্ৰীও যেন সে হারিয়ে ফেলতে বসেছে। লিউকাডিসের উপস্থিতিতে তার বিদ্রোহী মনে এখন একটা সত্যিকারের অনুপ্রেরণা জেগে উঠেছে। তার আবার মনে হয় যে তার এইভাবে গা ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে থাকা একটা লজ্জাস্কর ব্যাপার; এই কাপুরুষতাই যেন তাকে লিউকাডিসের কাছে অনেকটা ছােট করে দিয়েছে। এই ভেবে সে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়। লিউকারূডিকে বােঝাতে চেষ্টা করে, তার এ জীবনের কোনই মূল্য নেই ; তার দেশবাসী এর চেয়ে অনেক স্বার্থ ত্যাগ করেছে, অনেক বেশী সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে কারাবরণ করে নিয়েছে। সে আরও বললো, যে সীমান্ত অতিক্রম করে কোন লাভই হবে না, দেশবাসীর সঙ্গলাভ ত হবেই না, তা ছাড়া অসহায় ভগ্নীর সান্নিধ্যও সে পাবে না। লিউকাডিস তার মনকে সংযত করতে অনুরােধ করে, কিন্তু তাতে অকৃতকার্য হয়ে সে আদেশকারিণী সম্রাজ্ঞীর মত ভাব ধারণ করে। হঠাৎ বাইরে কিসের যেন একটা শব্দ সে শুনতে পায় ; পায়ের আওয়াজের মত তার কানে এসে বাজে ; ভয়ে তার আঙ্গুল কামড়ে ফেলে। তার মনে হােল, বাইরে থেকে কেউ যেন তাদের কথাবার্তা শুনছে। আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠে পড়ে সে দরজাটা খুলে ইভ,জেনের পাশে গিয়ে বসে কলিং বেলটা টিপে দেয়। একটু পরেই দরজায় করাঘাত হােতেই তাদের বুঝতে দেরী হােল না যে এ পরিচারিকা ছাড়া আর কেউ নয়। ইভ,জেন দরজা খুলে পরিচারিকাকে প্রাতরাশ ও পানীয় জল আনতে আদেশ কোরল। আজ্ঞামত ঝি ওয়েটারকে সঙ্গে করে জল নিয়ে ঘরে প্রবেশ কোরল। ইভজেন তাদের পঞ্চাশ রুবলের মত বাশ দিয়ে পরের দিন সকাল পর্যন্ত সেখানে থাকবার ব্যবস্থা করে দিতে অনুরােধ ; লিউকারডিস্ কোরল। ওয়েটার মাথা নীচু করে বললাে, আপনারা যা হুকুম করবেন, আমরা তাই পালন করতে প্রস্তুত। আধঘণ্টা পরে বেহারা চা ও অন্যান্য আহাৰ্য্য নিয়ে ঘরে ঢুকলাে। লিউকাডিসের মনে হচ্ছিল, সে যেন জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর শুয়ে আছে। কী যেন একটা বেদনা ও ভয়ে তার শরীর অবসন্ন হয়ে এলাে। ইভ জেন স্থির হােয়ে শুয়েছিল ; লিউকারডিসের বেদনা ও দুঃখ অনুভব করে সে অন্যদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ কোরল। ওয়েটার টেবিল সাজিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পরিচারিকা ঘর থেকে চলে যাবার পর লিউকাডিস্ বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠলাে। তার মনে হােল, যেন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে সে উঠে আসছে। দরজাটা বন্ধ করে বাতায়ন উন্মুক্ত করে দিল। কেশদাম খুলে গিয়ে তার উন্মুক্ত বক্ষে লুটিয়ে পােড়ল। ঘর বাতাসে ভরে যেতে সে আবার জানালা বন্ধ করে, ক্ষতস্থানের ব্যাণ্ডেজ বদলাবার জন্য ইভজেনের অনুমতি চাইলাে। আস্তে আস্তে ক্ষতস্থানটী খুলে ফেলে বুঝতে পারলাে যে ঘা প্রায় শুকিয়ে এসেছে, আর গায়ে হাত দিয়ে অনুভব কোরল, জ্বরও ছেড়ে গেছে। খুব নিপুণভাবে সে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ব্যাণ্ডেজ দিয়ে বেঁধে দিল। তারপর লিউকারূডিস্ রােগীকে রুটী ও দুধ খেতে দেয় ; ক্ষুধার উদ্রেক হওয়ায় সে নিজেও তাড়াতাড়ি কিছু খাবার খেয়ে নেয়। বাড়ীর মধ্যে একটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে থাকে। ইভ জেন শান্তিতে ঘুমিয়ে পােড়লে লিউকাডি তার ঘরের মধ্যে চলে যায়। চটী জুতাে খুলে বিচরণ করার সময় মাঝে মাঝে ঘরের ছবির প্রতি তার দৃষ্টি পড়ছিল। জানালার ধারে দাড়িয়ে আত্মীয়স্বজন, স্নেহের পাত্রদের কথা তার মনে পড়ে, সে ভাবে, যার আশৈশব কেটেছে এক সৈন্যাধ্যক্ষের ঘরে, তার কিনা আজ এই অবস্থা! আলেকজাণ্ডারের ০ ৫৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প হাস্যময় মুখখানিও তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে; আরও মনে হয়, কোথায় সেই মস্কো সহরের জনতা আর সুন্দর দোকানের সারি, কোথায় সেই যুবক কৰ্ম্মচারীবৃন্দ ও সুন্দরী রমণীর দল ? এ সবের পরিবর্তে সে শুধু দেখতে পাচ্ছে একটা মানুষ আর তার ক্ষতস্থানটীকে—এ শুধু নিয়তিরই পরিহাস। ঘড়িতে ঢং ঢং করে বারােটা বেজে ওঠে ইভ জেনেরও ঘুম ভেঙ্গে যায়। যুবকটী বেশ জোর গলায় বলে উঠলাে, লিউকাডি, আজ সন্ধ্যায় তুমি ছুটী পাবে, একা থাকবার মত অবস্থা আমার ফিরে এসেছে। লিউকারডিস্ মাথা নেড়ে বােলল যে তার ক্ষতস্থান যতক্ষণ না শুকিয়ে যাচ্ছে ততক্ষণ সে তাকে ছেড়ে কোন মতে যেতে পারবে না ; এ অবস্থায় লিউকাডিসের সাহায্যের প্রয়ােজন খুবই রয়েছে। তরুণীটীর মনে হােল যে তার অবর্তমানে যদি কোন বিপদ ঘটে তাহলে সেজন্য সেই দায়ী হবে। ইভ,জেন আগ্রহের সঙ্গে লিউকার্ডিসের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। তার একটু পরে যুবকটী তরুণীর হাতের স্পর্শ পাবার জন্য নিজের হাত বাড়িয়ে দেয় ; দুজনের মুখেই কেমন যেন একটা ভীতিজনক ভাব পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। চমকে উঠে স্পন্দিত হৃদয়ে লিউকারূডিস্ আয়নার সামনে গিয়ে চুল বেঁধে নেয় ; যুবকটীর আঙ্গুলগুলিও যেন কাঁপতে থাকে, লিউকাডি আজ্ঞা কোরলেই হয়ত সে এই মুহূর্তেই ঘর থেকে বেরিয়ে পােড়তে পারে, কিন্তু তার মনে হতে লাগলাে যে যু৷ে সংগ্রাম করে মরাই তার পক্ষে শ্রেয় ছিল। নিপীড়িত কমরেডদের কথা তার মনে এলাে ; বিদেশে গিয়ে তার উপার্জনের উপায় কি হবে, একথা ভেবেও হতাশায় তার মন ভরে গেল। লিউকাডি আয়নার সামনে দাড়িয়ে তার নিজের ক্লান্ত মুরু দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বিছানার একধারে গিয়ে বােল। তরুণীটী শাও • ; লিউকারডিস্ স্থির নেত্রে ইভ,জেনের দিকে তাকাল ; তার মুখ থেকে একটা কিশােরী সুলভ সরলতা পরিস্ফুট হচ্ছিল। ইভ জেনের মনে হােল এই দুর্দিনে তরুণীটি যেন ঈশ্বর প্রেরিত দূতের মত এসে তার ভগ্ন হৃদয়ে আশার সঞ্চার করেছে। আনন্দে যুবকের মন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ক্রমশঃ রাত্রি ঘনিয়ে আসে ; অন্ধকারের মধ্যে তারা মৌন হ'য়ে বসে থাকে। লিউকাডি ঘরের আলো জ্বেলে দিল। কোটটা পরিয়ে দেবার জন্য সাহায্য করতে ইভডেন তাকে অনুরােধ করে। গতদিনের সন্ধ্যার মতই ওয়েটার নৈশ আহার পরিবেশন করে গেল। ওয়েটারের আচরণে একটা বিশেষ রকমের নম্রতা অনুভব করে তাদের মনে হােল, লােকটি খুব চতুরতার সঙ্গে তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করছে। তারা নির্বাক হয়ে বসে রইলাে, শুধু তাদের হাত দুটী মাঝে মাঝে নড়ে উঠতে লাগলাে। এই সন্ধ্যায় লিউকাডিসের অভিনয় আগের মত তেমন জমে উঠলাে ; তরুণীটীর হাসি ও আচরণের মধ্যে একটা কৃত্রিমতার ভাব ফুটে উঠছিল। ইভজেন তরুণীর কাছে গিয়ে কাণে কাণে বললাে যে এখন তাদের একটা ঝগড়ার অভিনয় করে পারিপার্শ্বিক আবহাওয়াকে বদলে দিতে হবে। সুন্দর একটা কাহিনী রচনা করে সে তরুণীটীকে বােলল যে রাজকুমারী ক্রাসিনের অভিনন্দনের দিনে সে যে মুক্তার কলারটা পরেছিল সেটা ছিল একেবারে নকল। এই কথায় লিউকাডি প্রতিবাদ করে উঠলাে। যুৰকটীর অভিনয় কৌশলে সে মুগ্ধ হয়ে গেল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ইভ জেনের জন্য তার দুর্ভাবনা কম হচ্ছিল না। ওয়েটার ঘরের মধ্যে ঢুকে পেয়ালায় শ্যাম্পেন ঢেলে তাদের মুখের দিকে চেয়ে ভাবলল, এরা আসলেই প্রেমিক প্রেমিকা। হঠাৎ বেরসিকের মত উঠে পড়ে ইভ জেন বেয়ারাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে আদেশ করলাে। লিউকারডিসের অনুনয়সূচক চোখের প্রতি দৃষ্টি পড়তে সে জাৰ্মাণীর সেরা গল্প চমকে গেল। এই আকস্মিক আচরণে সে দুঃখিত এই ভাণ করে ইভ,জেন হাত দুটা বাড়িয়ে দিয়ে লিউকাডিসের দিকে এগিয়ে গেল। ওয়েটার এই দৃশ্যটী উপভােগ কছিল। তরুণীটাও দাঁড়িয়ে উঠে তার মাথাটা ইভ জেনের বুকের মধ্যে রেখে চুপি চুপি তাকে স্মরণ করিয়ে দিল যে পরের দিনই গাড়ীর ব্যবস্থা করার প্রয়ােজন। হঠাৎ বাড়ীর মধ্যে একটা আৰ্তনাদের স্বর শােনা যেতে লিউকারডিস্ আতঙ্কে শিউরে উঠলাে। ইভ,জেন দুশ্চিন্তার সঙ্গে দরজার দিকে তাকালাে। খােল দরজার সামনে দিয়ে একটা অর্ধ উলঙ্গ নারী ছুটে গেল। ইভজেন এই দৃশ্য দেখে বেয়ারাকে দরজা বন্ধ করে দিতে আদেশ কোরল। একটা গুলির আওয়াজ ও তার সঙ্গে একটা পুরুষের বিকট চীৎকারে সারা বাড়ীটা কেঁপে ওঠে। ইভ,জেন ভৃত্যটীকে বার করে দিয়ে দরজা বন্ধ কোরল। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে যায় । ক্রমশঃ জনতার কোলাহল চারিদিকে ছড়িয়ে পােড়ল। একটা আজ্ঞাসূচক কণ্ঠ নীচে থেকে শােনা গেল ও তার সঙ্গে আর একটা বুকফাটা কান্নার সুরও কাণে এসে বাজলাে। লিউকারডিস্ ভীত, সন্ত্রস্ত হয়ে কোচের ওপর হাত-পা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পােড়ল। রাস্তায় লােকের ভিড় জমে যায়, এর মধ্যে থেকে একজন পুলিশ কর্মচারীর গলার আওয়াজ স্পষ্ট শােনা গেল। হলের ভেতরের পায়ের শব্দে অনুমান হােল কারুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওয়েটার এসে বােলল, “আপনাদের কোন চিন্তা নেই”; আবার লিউকাডিসের প্রতি কটাক্ষ করে বােলল, “আপনি শান্ত হােন; এটা একটা সামান্য ব্যাপার, ছােটখাট রকমের একটা দুর্ঘটনা মাত্র ; আপনাদের বিচলিত হবার কিছু নেই।” এই কথাগুলি বলে সে বেরিয়ে . গেল। এতে লিউকাডিস ইভজেন লিউকাডিসের পাশে বসে কম্পিত হস্তে মাঝে মাঝে তার চুলের মধ্যে অঙ্গুলি সঞ্চালন করছিল। তরুণীটী তার স্পর্শে শিউরে উঠে মাথা সরিয়ে নিতে চেষ্টা কোরল। ইভজে হাত তুলে নিল, অবসাদে তার মন ভরে গেল। ঝড়ের ঝাপটা এসে জানালায় লাগছিল। তাদের মনে হচ্ছিল যেন বছর কেটে গেছে ; কত রকম বৈচিত্রের মধ্য দিয়েই তাদের সময় কাটছে। ইভজেন ভাবলাে, এইখানেই কি সব শেষ? আরও একটা রহস্যপূর্ণ রাত্রির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কি তাকে যেতে হবে না? নানা রকম দুশ্চিন্তার কথা ভাবতে ভাবতে পাশের ঘরে গিয়ে সে শুয়ে পােড়ল। লিউকাডি ঘরের মধ্যে প্রবেশ কোরল। বসবার ঘরে একটা আলে মিন্টু মিট করে জ্বলছিল, কিন্তু এ ঘরটা ছিল একেবারে অন্ধকারে ভরা। আলােটা জ্বেলে লিউকারুডিস্ দেখতে পেল একটা পাত্র জলে ভর্তি রয়েছে। পুনরায় সে ইভ,জেনের ক্ষতস্থানটা পরিষ্কার করতে লাগলাে। ব্যাগ থেকে নতুন ব্যাণ্ডেজের সঙ্গে একখানা বইও বার করে ফেললো। তরুণীটী ইভজেনের ক্ষতস্থানে ব্যাণ্ডেজ জড়িয়ে দিচ্ছে এমন সময় সে তাকে বই থেকে কিছু পড়ে শােনাতে অনুরােধ কোরল। বইখানি ছিল লারমােন্টভের কবিতার সঞ্চয়ন। কবিতা পড়ে শােনাবার সময় লিউকাডিসের চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে। ইভজেন তার নিদ্রায় কোন রকম বাধা দান করতে চাইলে না। যুবকটীর মন শান্তিতে যেন ভরে এলাে। সে পা ছড়িয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাে। তরুণীটীর ঠোট দুটা মাঝে মাঝে নড়ে উঠছিল, আর ঘুমের ঘােরে হেসে উঠে ফিস্ ফিস্ করে কি যেন বলছিল। তার হাত থেকে বইটা হঠাৎ মেঝেতে পড়ে গেল ; ভয়ে চোখ দুটী খুলে এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার সে ঘুমিয়ে পােড়ল। . ঘুমে তরুণীটী এতই আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল যে ইভ জেন যদি তাকে না ধরে ফেলতাে তাহলে সে মাটীতে নিশ্চয়ই পড়ে যেত।

৫৮ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ওঠে। ইভজেন তাকে নিজের বিছানার ওপর শুইয়ে দিয়ে তার মাথাটা নিজের কোলের ওপর তুলে নিল। পরে তরুণীর বালিশে মাথা রেখে তার পাশে আস্তে আস্তে সে শুয়ে পড়ল। আচ্ছাদনের ভেতর থেকে হাত বার করে তরুণীর পিঠের ওপর রেখে তার ঘুমন্ত দেহটাকে ধরে রাখতে চেষ্টা কোরল। তরুণীর কোমল দেহের স্পর্শে তার মন পুলকিত হয়ে সে ভাবে লিউকাডিসের কষ্ট ও যত্নের প্রতিদান সে যেন দিচ্ছে। লিউকারূডিসকে এত কাছে পেয়েও তার মনে হচ্ছিল কত দূরেই না সে রয়েছে। বহুক্ষণ ইভ,জেনের চোখদুটী তরুণীটীর প্রতি নিবদ্ধ ছিল, কিন্তু আসলে তার মনটা কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এই জর্জরিত নিপীড়িত পৃথিবীর পটভূমিকার সম্মুখে সুন্দরী লিউকাডিসের অপরূপ সুষমা মণ্ডিত দেহ থেকে যেন একটা স্বর্গীয় জ্যোতি বেরিয়ে আসছিল। কিছু পরে রাস্তায় সৈনিকদের কুচকাওয়াজে তরুণীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। ইভ,জেন লিউকাডিসের গা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে বসে পােড়ল। সে লক্ষ্য কোরল যে তরুণীটির মুখ বিস্ময়ে ভরে গিয়ে লজ্জায় রাঙা হয়ে গেছে। লিউকারূডিস্ ছােট রকমের একটা আওয়াজ করে দাড়িয়ে উঠে বুকে হাত রেখে বােবার মত এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাে। ইভ,জেনের কথাগুলি যেন তার কাণের মধ্যে প্রবেশ করতে চাইছিল না। মাঝে মাঝে আবহাওয়া, সময়ের গতি নিয়ে কথা বলে যুবকটী তরুণীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা করছিল। অন্যমনস্কভাবে তরুণীটী তার কথার জবাব দিয়ে যেতে লাগলাে। অতি কষ্টে নিজেকে সংযত করে নিয়ে লিউকাডি শেষবারের মত ইভ জেনের ক্ষতস্থান ধুয়ে পরিষ্কার করে বেঁধে দিল। তরুণীর মনে হতে লাগলে৷ বাইরের পৃথিবীটা যেন একটা বিরাট হিংস্র জন্তুর রূপ নিয়ে তার সর্বাঙ্গ গ্রাস করতে আসছে। ঘড়িতে সাড়ে ছ'টা বাজার সঙ্কেত ধ্বনি হােল। তাদের এখ- লিউকাডিস্ • যায়। প্রস্তুত হয়ে নিতে হবে। ক্রমশঃ ইভ,জেনের চিত্ত স্থির হয়ে আসে। লিউকাডিসের ঘরে প্রবেশ করবার সময় তাকে খুব দুর্বল দেখাচ্ছিল । সামনা-সামনি বসে তার পরিত্রাণের সময়সীর জন্য নীরবে অপেক্ষা করছিল রাস্তা থেকে গাড়ীর চাকার শব্দ আসার সঙ্গে সঙ্গে ওয়েটার ঘরে ঢুকে ইভ,জেনের সামনে বিলটা ধরলাে। পাওনা মিটিয়ে দিযে তারা নীচে নেমে গেল। গাড়ী করে ষ্টেশনে যাবার পথে একটা জনপ্রাণীও তাদের চোখে পড়েনা। ওয়েটিং রুমের পাশে এনেসথেসিয়াকে দাড়িয়ে থাকতে দেখা অভ্যর্থনা করে তিনি ইভ,জেনের স্বাস্থ্যের কুশল জানলেন। এনেসথেসিয়া যুবকটীর হাতে একটা ব্যাগ দিয়ে তাকে প্ল্যাটফর পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। ইভ জেন ট্রেণের মধ্যে ঢুকে গেল ; একটু পরেই আবার নেমে এসে লিউকাডিসের হাত দুটী নিজের হাতের মধ্যে পুরে নিল। মনে হতে লাগলাে যেন একসূত্রে গাথা দুটী ফুল। কিছুক্ষণ এইভাবে তারা স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলাে। এনেথেসিয়া ইসারায় তাদের সতর্ক করে দিলেন। ছুটে গিয়ে গাড়ীতে উঠে সে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেয়। জানলার কালাে ফ্রেম ও কুয়াসা ভেদ করে তার মুখখানি শাদা খড়ির তালের মত দেখায়। বাঁশী বেজে ওঠে। ট্রেণখানি ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর ছাড়িয়ে দূরে মিলিয়ে যায় । লিউকাডি বাড়ী ফিরে দেখলো, তার মা অশ্রুসিক্ত নয়নে বসে আছেন। বৃদ্ধা তার স্বামীকে মেয়ের চিঠির কথা বলতে সাহস করেননি। মা ও মেয়ের মধ্যে অনেক তর্কবিতর্ক হয়ে গেল। মার কাছে অনেক ভৎসনা তাকে শুনতে হয় ; নীরবে সবই সে সহ্য করে গেল। প্রতিমা ক্রমশ বিরক্ত হয়ে ওঠে; লিউকারডিস্ ভাবী স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করতেই তাঁর বিরক্তির মাত্রা আরও বেড়ে যায় । ০ মেয়ের জাৰ্মাণীর সেরা গল্প লিউকাডিসের বাবাও তার ওপর বেশ একটু কষ্ট হলেন। তরুণী একটা কথাও না বলে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলাে। লিউকাডিসের এনগেজমেন্ট, ভেঙ্গে গেল। সে লােক জন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সকলের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ করে দিয়ে নীরবে নিজের মধ্যে ডুবে যায়। ডাক্তাররা তাকে চেঞ্জে নিয়ে যাবার আদেশ কোরলেন। প্রথমে তার মা তাকে প্যারিসে নিয়ে গেলেন, তারপর তাকে জাহাজে করে সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে বৃটেনে পৌছলেন। একদিন রাত্রে সৈন্যাধ্যক্ষের স্ত্রী বেরিয়ে এসে দেখেন, লিউকাডি তারই ঘরের সংলগ্ন ছাদে শুয়ে হাতের ওপর মাথা রেখে নক্ষত্রখচিত অনন্ত নীল আকাশের দিকে চোখ মেলে দিয়েছে। ইভ জেন্ কোথায় যেন চলে গেছে ; ললাকে বলে থাকে, পশ্চিম ক্যানাডার কোন গ্রামে সে ঘর বেঁধেছে। শুধু ক্লান্ত ইভজেনের মুখচ্ছবি লিউকাডিসের মনে মাঝে মাঝে দোলা দিয়ে যায়, আর ইভজেন সুন্দরী লিউকাডিসের মধুর অভিনয়ের কথা স্মরণ করে বিমনা হয়ে পড়ে।

জমিদারের ভাগ্য মে মাসের এক সন্ধ্যায় ক্লেয়ার হেকে আবার রাণীর ভূমিকায় ষ্টেজে দেখা যায়। অভিনেত্রীর এ দু’মাস অনুপস্থিতির কারণ সকলেই জানে মার্চ মাসের পনের তারিখে যুবরাজ রিচার্ড বেডে ঘােড়া থেকে পড়ে গিয়ে আহত হন, তাঁর সেবার ভার ক্লেয়ার নিজের হাতে নেয় ; অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাচাতে পারেনি। শােকটা এত গভীরভাবে লেগেছিল যে সকলেই ভেবেছিল, ক্লেয়ার এ আঘাত হয়তো সহ করতে পারবে না। সকলের বিশেষ চিন্তার কারণ হয়েছিল যে গায়িকার সুমধুর কোকিলকণ্ঠ হয়তাে আর শােনা যাবে না। তাদের এই দুশ্চিন্তাকে ব্যর্থ করে দিয়ে যেদিন সে আবার ষ্টেজে অবতীর্ণ হয়, সেদিন দর্শকেরা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। গ্যালারীর ওপর ফ্যাণীর শিশুসুলভ সুন্দর মুখখানি দেখা যায়, ওপরের দর্শকেরা তাদের ছােট বান্ধবীকে আবিষ্কার করে কম আনন্দ লাভ করেনি; ; সকলেই জানত যে ফ্যাণী সামান্য একজন দোকানের কৰ্ম্মচারীর মেয়ে হয়েও সুন্দরী ক্লেয়ারের সখ্যতা লাভ করেছে। ফ্যাণী ছিল ক্লেয়ারের গায়িকাদলভুক্ত বান্ধবীদের মধ্যে একজন। মাঝে মাঝে ক্লেয়ারের বাড়ীতে সে নিমন্ত্রিত হােত আর মৃত রাজকুমারের সঙ্গেও প্রণয় ঘটিত ব্যাপারে সে একবার জড়িয়ে পড়েছিল। ইন্টারভ্যালের সময় ফ্যাণী তার বান্ধবীদের বােলল যে জমিদার লিসেভগ, ক্লেয়ারকে সেদিন সন্ধ্যায় রাণীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে 'অনুরাধ করেন। জমিদার সামনের বক্সেই বসেছিলেন। পরিচিত ভদ্রমণ্ডলীর সাদর অভ্যর্থনা তিনি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারেননি, জাৰ্মাণীর সেরা গল্প কারণ সেদিনই সন্ধ্যায় লিসেম্ভগের মনে অনেকগুলি স্মৃতিবিজড়িত দুঃখের দিনের কথা ভেসে আসছিল। দশ বছর আগে জমিদারের সঙ্গে ক্লেয়ারের প্রথম পরিচয় হয়। একদিন সন্ধ্যায় জমিদার থিয়েটারে একটী দৃশ্যে সুন্দরী ক্লেয়ারকে ফিলিনের ভূমিকায় দেখতে পান ; তখন তিনি ছিলেন মাত্র পঁচিশ বছরের যুবক। অভিনয়ের শেষে তিনি ইসেন্ষ্টীনের সাহায্যে অভিনেত্রীর সঙ্গে পরিচিত হন ; ক্লেয়ারের কাছে প্রেম নিবেদন করে তিনি বলেন যে সুন্দরীর বিলাস, প্রসাধন, অপেরার খরচ এ সবের জন্য তার সমস্ত সম্পত্তি ব্যয় কোরতে তিনি প্রস্তুত। ক্লেয়ারের মা ছিলেন পােষ্ট অফিসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারীর স্ত্রী, মা ও মেয়ে এক সঙ্গেই বাস কোরত। ক্লেয়ারের সেই সময়ের প্রণয়ী ছিল মেডিকেল কলেজের একজন ছাত্র। যুবককে মাঝে মাঝে তরুণীর ঘরে চায়ের মজলিসে যােগ দিতে দেখা যেত, একথা জেনেও সুন্দরীকে পাবার কল্পনা জমিদারের মন থেকে মুছে যায়নি। প্রতি উৎসবেই জমিদার অভিনেত্রীকে ফুলের সঙ্গে অনেক রকমের উপহার পাঠিয়ে দিতেন। মাঝে মাঝে ক্লেয়ারের বাড়ীতে তিনি নিমন্ত্রিত হােতেন। সেই বছর হেমন্তকালে ডেমণ্ডে অনিয় করার অনুরােধ ক্লেয়ারের কাছে আসে। সেই সময় লিসেম্ভগ, গভর্ণমেন্টের একটী কাজে নিযুক্ত ছিলেন ; বড়দিনের ছুটীর সুযােগ নিয়ে সেবারে তিনি ক্লেয়ারের সঙ্গে দেখা কোরতে যান। ছাত্ৰটী সেই বৎসর ডাক্তারি পাস করে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়েছে জেনেও তিনি আর একবার ক্লেয়ারের কাছে প্রেম নিবেদন করেন। প্রত্যুত্তরে ক্লেয়ার সােজাসুজিভাবে জমিদারকে জানিয়ে দিল যে বর্তমানে কোর্ট থিয়েটারের মালিকের সঙ্গে তার একটা মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ; শুধু জমিদারের চিত্তবিনােদনের জন্য তার সঙ্গে পার্কে গিয়ে আলাপ আলােচনা করে অথবা থিয়েটারের রেস্তোরাতে জমিদারের ভাগ্য অভিনেতা অভিনেত্রী সমভিব্যাহারে নৈশ ভােজন করে তাকে আনন্দ দিতে পারে। নিরুৎসাহ না হয়ে লিসেভগ, ক্লেয়ারের দর্শন মানসে কয়েকবার ডেমণ্ডে গিয়ে তার অভিনয় কৌশলে মুগ্ধ হয়ে তাকে অন্তরের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। পরের বৎসর ক্লেয়ার হামবুর্গে গান গাইবার চুক্তি করে। সেবারেও জমিদারকে ব্যর্থ মনােরথ হয়ে ফিরে আসতে হয়, কারণ গায়িকা এক ডাচ, বণিকের সঙ্গে ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে জড়িয়ে পড়ে। এই ডাচ বণিকের সংস্পর্শ থেকে সে আর্থিক অবস্থা অনেকটা ফিরিয়ে নেবে, আশা করেছিল। তৃতীয় বৎসরে ড্রেডেন্ কোর্ট থিয়েটারের সঙ্গে ক্লেয়ারের আর একটা চুক্তি হয়। এই বৎসরেই লিসেম্ভগ, গভর্ণমেন্টের কাজ ছেড়ে দিয়ে রমণীর মােহিনী মায়ায় মুগ্ধ হয়ে ড্রেসডেন্ যাত্রা করেন। সেখানে ক্লেয়ার ও তার মা’র সঙ্গে তিনি প্রতি সন্ধ্যায় আলাপ কোরতে যেতেন। ক্লেয়ারের মা’ও ছিলেন বুদ্ধিমতী, খুব চতুরতার সঙ্গে মেয়ের বন্ধু-বান্ধবীদের আদর আপ্যায়ন কোরতেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ ডাচ, ভদ্রলােকটী হঠাৎ একদিন তার আগমনের কথা ক্লেয়ারকে চিঠিতে জানিয়ে সাবধান করে দিলেন যে তিনি তার পিছনে গুপ্তচর লাগিয়ে রেখেছেন, যদি রমণীর কোনরূপ বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় মেলে তাহলে তার মৃত্যু অনিবার্য। ডাচ, ভদ্রলােক নির্দিষ্ট সময়ে না আসাতে ক্লেয়ার বিশেষ চিন্তিত হয়ে পড়ে। লিসেভগ, ভাবলেন, এ সমস্যার সমাধান তিনি করেই ফেলবেন। এই স্থির করে তিনি ডেটুণ্ডে ডাচ ভদ্রলােকের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। ভদ্রলােক জানালেন যে শুধু তার একটা জোর ও দাবী দেখাবার জন্যই তিনি এইভাবে ভয় দেখিয়ে চিঠি দেন ; কোন বিষয়েই তিনি গভীরভাবে ৬৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প • জড়িয়ে পড়তে চান না। ভদ্রলােকের এই স্বীকারােক্তিতে জমিদারের মন আনন্দে ভরে গেল। লিসেভগ, ড্রেডেনে ফিরে গিয়ে ক্লেয়ারের কাছে আসল ব্যাপারটা খুলে বলেন। ক্লেয়ার তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন জানায়, কিন্তু জমিদারের প্রেমনিবেদনে কোনই সাড়া দেয় না; এই আচরণে লিসেভগ, যেন অবাক হয়ে গেলেন। জমিদারকে বারে বারে প্রত্যাখ্যান করার কারণ জিজ্ঞাসা করাতে ক্লেয়ার শুধু বলে যে জমিদারের অবর্তমানে প্রিন্স, কাজেটা তার প্রতি এমন গভীরভাবে আকৃষ্ট হন যে ক্লেয়ারকে তিনি একান্ত করুণভাবে বলেন, তাহাকে প্রত্যাখ্যান করলে তিনি নিশ্চয়ই আত্মহত্যা করবেন। যাতে রাজসংসার ও দেশ দুঃখে ভেসে না যায় সেই ভেবে রাজকুমারের কথায় ক্লেয়ারকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও সম্মতি দিতে হয়। নিরুৎসাহ না হয়ে লিসেম্ভগ, ড্রেসডেন্ পরিত্যাগ করে ভিয়েনায় গিয়ে উপস্থিত হন। জমিদারেরই বহু চেষ্টায় ভিয়েনা অপেরায় গাইবার জন্য ক্লেয়ারের ডাক পড়ে। ক্লেয়ার অন্যান্য স্থানে সাফল্যের সঙ্গে অভিনয় করে অক্টোবর মাসে নির্দিষ্ট অপেরায় এসে যােগ দিল। সন্ধ্যায় অভিনয়ের পর জমিদার সাজঘরে উপহারস্বরূপ তাকে একরাশ ফুল পাঠিয়ে দেন। অভিনেত্রীর মুখ দেখে লিসেভগের মনে একটু আশার সঞ্চার হয়েছিল, কিন্তু যখন তিনি শুনলেন ক্লেয়ারের সহ-অভিনেতার সঙ্গে তার বেশ একটা মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তখন তার সে আশা সমূলে উৎপাটিত হােল। সাত বছর কেটে গেল। অভিনেত্রীর মন চায় নিত্য নতুন। ফ্রেমেন নামে এক তরুণ নামজাদা জকির সঙ্গে ক্লেয়ার প্রেমাসক্ত হােল। ফ্লেমেনের পর এক গানের মাষ্টারের সঙ্গে তার একটা যােগাযােগ হয়। এর কিছুদিন পর জমিদার এলবান্ রেটনির প্রতি সে আসক্ত হয়ে পড়েছিল, এই জমিদারের সমস্ত সম্পত্তি জুয়া খেলায় নষ্ট হয়ে যায়।

জমিদারের ভাগ্য পরের বছর এড গার নামে এক কবির সঙ্গে ক্লেয়ার প্রণয়াসক্ত হয়। যুবকটী নিজের খরচেই থিয়েটারে বিয়ােগান্ত’ নাটক অভিনয়ের ব্যবস্থা কোরত। মন তবুও নতুনের মােহে ভােলে ; এবারে উইলহেলম্ নামে উনিশ বছরের এক তরুণের সঙ্গে সে জড়িয়ে পােড়ল। পরিচ্ছদের পারিপাট্যে 'তার সমকক্ষ সে সময় কেউই ছিল না, তার চেহারাও ছিল কর্পের মত। লিসেম্বগের কাছে ক্লেয়ার কোন কথাই গােপন রাখেনি। নিজের ঘরে তরুণ তরুণীদের নিমন্ত্রণ করে আনন্দ বিতরণ করাই ছিল কেয়ারের স্বভাব ; উচ্চ সম্প্রদায়ের মধ্যেও তার খ্যাতি বড় কম ছিল না। বাজারে কোথাও মেলা বসলে সে একটা ষ্টল নিয়ে বােসত ; বড় ঘরের মেয়েরা ও ইহুদী ধনী সম্প্রদায় তার কাছ থেকে কিছু জিনিষ কিনে নিজেদের ধন্য মনে কোরত। ষ্টজের দরজার সামনে দাড়ান উৎসুক যুবক-যুবতীদের প্রতি সে মধুর কটাক্ষপাত কোরত। জনতার প্রতি সে পুস্প বর্ষণ কোরত, কেউ যদি ফুল না পেত তাহলে তার প্রতি স্নেহের কটাক্ষপাত করে মিষ্টি ভিয়ানিজ, ভাষায় বােলত, “আমি অত্যন্ত দুঃখিত, কাল আবার এমনিট সময় এলে দেব, কেমন ?” এর পর সে গাড়ীর ওপর উঠে জানলা দিয়ে মুখ বার কোরে দুঃখিত জনতার প্রতি তাকিয়ে বলত, “ফুলের সঙ্গে তােমাদের কফিও দেব।” ফ্যাণীও ক্লেয়ারের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে ; তরুণীটির কথাবার্তায় ও আচরণে সে এতই মুগ্ধ হয় যে ফ্যাণীকে পুনরায় তার কাছে আসতে অনুরােধ করে। ফ্যাণী নিয়মিতভাবে ক্লেয়ারের কাছে যাওয়া আসা আরম্ভ কোরল ; দুজনের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক আরও মধুর হলাে। ফ্যাণী যে সমস্ত দোকানদারের ছেলেদের সঙ্গে নাচতে যেত, তাদের অনেকের কাছ থেকে বিবাহের প্রস্তাব তার কাছে এসেছিল। ফ্যাণী তাদের কথায় ৫ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প সম্মতি দিতে পারেনি, কারণ সে ক্লেয়ারের প্রশংসাকারী বন্ধুটীর সঙ্গে জীবনে এই প্রথম প্রেমাসক্ত হয়ে পড়ে। ক্লেয়ার যুবরাজ ডেককে প্রাণ অপেক্ষাও ভালবাসতাে। লিসেৰ্ভগ, বহুবার ব্যর্থ মনােরথ হয়েও ক্লেয়ারকে পাবার আশা ছাড়তে পারেন নি ; দশ বৎসর ধরে যে আনন্দের প্রত্যাশী তিনি হয়েছেন, তা বুঝি আর ফলপ্রসূ হয় না। যখনই ক্লেয়ার কারুকে প্রত্যাখ্যান করে, তখনই লিসেম্ভগের মনে আশার সঞ্চার হয় যে হয়ত এইবারেই তাঁর প্রেমাস্পদকে পেয়ে যাবেন। যুবরাজের মৃত্যুর পর জমিদার তার সুন্দরী রক্ষিতাকে ত্যাগ করে ভাবলেন, এবারে হয়তাে তার মনস্কামনা পূর্ণ হবে। যুবরাজের মৃত্যুতে তরুণীটী এতই গভীর শােকে অভিভুত হয়ে পড়ে যে সকলেরই মনে হয়, ক্লেয়ার প্রেমের প্রকৃত আস্বাদন থেকে চিরকালের মত বঞ্চিত হােল। ক্লেয়ার প্রতিদিনই যুবরাজের কবরের ওপর ফুল রেখে আসে ; বেশভূষার মধ্যেও তার অসম্ভব পরিবর্তন দেখা যায় ; চটকদার গাউন অথবা মূল্যবান অলঙ্কার ব্যবহার করা সবই সে একেবারে ছেড়ে দিয়েছে। অনেক চেষ্টা ও অনুরােধ করে তাকে ষ্টেজে আটকাতে হয়। এই ঘটনার পর ক্লেয়ার যখন আবার ষ্টেজে নামে, তার বাইরের আচরণে শশাকের কোনই আভাস পাওয়া যায়নি। শুধু পূৰ্বের পরিচিত কয়েকটা বন্ধু ও বান্ধবীর সঙ্গে মেলামেশা কোরতে দেখা যেত। যুবরাজের দুটী মাসতুতাে ভাইএর সঙ্গে সে হাল্কাভাবে প্রেমের অভিনয় কোরত। একদিন ফরাসী রাষ্ট্রদূতের দপ্তরের একটী ভদ্রলােক ও আরেকজন চেক্ পিয়ানাে-বাদক ক্লেয়ারের দর্শন মানসে উপস্থিত হয়। এগারই জুন তারিখে পুনরায় ঘােড়দৌড়ের মাঠে উপস্থিত হয়ে ক্লেয়ার সকলের মনে চমক লাগিয়ে দেয়। যুবরাজের মাসতুতে জমিদারের ভাগ্য ভাই লুসিয়াস ছিল কবি প্রকৃতির যুবক, সে কবিত্বপূর্ণ ভাষায় প্রেম নিবেদন কোরলে ক্লেয়ারের মন পুলকিত হােত বটে, কিন্তু অন্তরাত্মা সাড়া দিত না। ক্লেয়ারের কোন পুরােন বন্ধু বা বান্ধবী প্রেম ও অনুরাগ নিয়ে আলােচনা কোরলেই তার মুখ থেকে খুসির হাসি মিলিয়ে যেত। মাঝে মাঝে সে ওপরের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকতে যে পৃথিবীর সকল পুরুষকেই উদ্দেশ্য করে কি যেন সে বলতে চায়। জুন মাসের মাঝামাঝি উত্তর প্রদেশ থেকে ওসি নামে একজন গায়ক এসে থিয়েটারে ওয়েগনারের স্বরলিপি থেকে একটী গান আরম্ভ করে দেয়। তার গলার স্বর উচ্চ গ্রামে উঠতো বটে, কিন্তু তা থেকে তাকে প্রথম স্তরের গায়ক বলা চলে না। তার দেহ ছিল খুব বলিষ্ঠ, কিন্তু মুখের প্রকাশভঙ্গী মােটেই চিত্তাকর্ষক ছিল না; কিন্তু তবুও গানের সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ থেকে এমন একটা দীপ্তি ফুটে বেরিয়ে এসে তার হৃদয়ের সৌন্দর্য্যকে বিকসিত করে দিত যে কোন তরুণীই তাতে মুগ্ধ না হয়ে পারতাে না। ক্লেয়ার গায়িকাদের সঙ্গে থিয়েটারের বক্সে স্থির চিত্তে বসে তার অভিনয় লক্ষ্য করে। পরেরদিন প্রভাতে ওসির সঙ্গে ম্যানেজারের আফিসে ক্লেয়ারের পরিচয় হয়। অভিনেত্রী তার সঙ্গে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেছিল বটে, কিন্তু ওসির গত সন্ধ্যায় অভিনয়ের সম্বন্ধে সে কোন উল্লেখই কোরল না। সেদিন সন্ধ্যায় ওসি অনিমন্ত্রিতভাবে ক্লেয়ারের কাছে উপস্থিত হয়। লিসেম্ভগ, আর ফ্যানিও সেখানে উপস্থিত ছিল ; তারা ওসির সঙ্গে একত্রে বসে চা পান কোরল। চায়ের টেবিলে ওসি তার জীবনের সুখ দুঃখের কথা বলে, “একবার একজন ইংরেজ ভদ্রলােক আমার গানে এতই মুগ্ধ হন যে জাহাজ থেকে তিনি নেমে আসেন; কিন্তু এই সঙ্গীতের পেছনে কি যে বেদনা ৬৮ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ছিল তাতে তিনি জানতেন না। আমার নববিবাহিত ইটালিয়ান স্ত্রীকে নিয়ে অনন্ত সমুদ্রের মাঝে পাড়ি দিয়েছিলাম ; কিন্তু অদৃষ্ট-দেবতা বিমুখ হলেন, তাকে চিরকালের জন্য সমুদ্রেই ফেলে আসতে হয়।” . কোন রকমের দুঃখের ছোঁয়াচে অভিনেত্রীর মনে যুবরাজের স্মৃতি জাগিয়ে দেয়। গায়কের দুঃখের গাথা শুনে ক্লেয়ার সকলের অলক্ষ্যে বেশ একটু বিচলিত হয়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সে মুখের স্বাভাবিকভাব ফিরিয়ে আনে ; এটা লিসেৰ্ভগের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ায় না। ওসি বিদায় নিল, কিন্তু অন্য সকলে সেখানে কিছুটা সময় মৌন হয়ে বসে রইলো। এরপর ও িকয়েকটা উচ্চাঙ্গের সুর আলাপ করে। ক্লেয়ার গানের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত স্থির হয়ে বসে শুনে যায়। প্রতিদিনই বিকেলে ক্লেয়ারের বাড়ীতে গায়ককে দেখা যেত। এর মাঝে একদিন ক্লেয়ার ফ্যাণীকে সঙ্গে করে যুবরাজের কবরের ওপর একটা ক্ৰশ চিহ্ন রেখে আসে। জুন মাসের শেষের দিকে একদিন ওসি ওয়েগনারের স্বরলিপি থেকে শেষবারের মত কয়েকখানা গান গেয়েছিল। গায়কের বিদায় উপলক্ষে ক্লেয়ার একটা বড় রকমের ভােজ দেয় ; অভিনেত্রীর বন্ধু ও বান্ধবীর সকলেই তাতে উপস্থিত ছিল। গায়ক “ক্লেয়ারের প্রতি যে গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল, একথা সকলেই জানতত। ভােজের সময় আলাপ আলােচনার মধ্যে দিয়ে ওসির সঙ্গে লিসেস্তুগের একটা প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওসি ফ্যানিকে সম্বােধন করে কথা বলতে সে বেশ একটু বিচলিত হয়ে ওঠে। আবার যখন ওসি জানায় যে শীঘ্রই সে এদেশ ছেড়ে চলে যাবে, ফ্যাণী আর থাকতে পারে না, অশ্রুধারায় তার বসন সিক্ত হয়ে যায়, কিন্তু ক্লেয়ারের মধ্যে কোন চিত্তচাঞ্চল্য দেখা যায় না। অন্য অতিথিদের যে ভাবে ভাষণ করে, ঠিক সেইভাবেই ক্লেয়ার তার সঙ্গে জমিদারের ভাগ্য কথা বােল। ওসি ক্লেয়ারের হাতে ওষ্ঠের স্পর্শ বুলিয়ে দেয় ; তার চাহনি থেকে একটা হতাশার ভাব ফুটে ওঠে ; কিন্তু তরুণীর চিত্ত জলের মতই স্থির থাকে। লিসে, তাদের এই গতিবিধিকে সন্দেহের চোখে দেখে। অনুষ্ঠানের শেষে অতিনেত্রীর একটা আচরণে লিসেভগ, বিচলিত হয়ে ওঠেন। গায়ক তরুণীকে যেই অভিনন্দন জানিয়ে চলে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে ক্লেয়ার তার হাত মুঠোর মধ্যে নিয়ে কানে কানে বলে, “বন্ধু, আবার আসা চাই।” গায়ক তার কথা যেন শুনেও শুনতে পায় না, এমন সময় ক্লেয়ার তার ঠোট দুটী কানের কাছাকাছি এনে আবার আরম্ভ করে, “বন্ধু আসা চাই-ই, পথ চেয়ে বসে রইলুম, এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসতেই হবে।” আনন্দিত চিত্তে গায়ক ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। জমিদার ভদ্রলােক ফ্যানি ও গায়ককে সঙ্গে নিয়ে তার হােটেলে যান। কিছু পরে ফ্যানির হাত ধরে জনশূন্য রাস্তা দিয়ে রাত্রের স্নিগ্ধ বায়ু উপভােগ করে চলতে চলতে ওসির যেন মনে হােল তরুণীর গাল বেয়ে অশ্রুধারা ঝরে পড়ছে। তাকে বিদায় দিয়ে গায়ক গাড়ীতে করে আবার ক্লেয়ারের আবাসে গিয়ে উপস্থিত হােল। ক্লেয়ারের ঘর থেকে একটা ফিকে আলাে বেরিয়ে আসছিল, জানালার ভেতর থেকে তরুণীর গলা বেরিয়ে এসে মনােমুগ্ধকর দৃষ্টি দিয়ে গায়ককে অভ্যর্থনা কোরল। বিরহিনী, ওসির প্রতীক্ষায়-ই বসে ছিল। পরের দিন সকালে লিনেভগ, ঘােড়ায় চড়ে বেড়াতে বেরলেন সেদিন যেন তঁার চিত্তাকাশে আনন্দের ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। জমিদার ভবিষ্যতের দিনগুলির কথা ভাবেন ; ক্লেয়ার তাকে এইভাবে আর কতদিন বঞ্চনা করবে, আর কতদিনই বা সে অভিনেত্রীর জীবন যাপন করবে ? আবার তার মনে হয়, হয়তাে সময় এগিয়ে আসছে, কয়েক বৎসরের মধ্যেই হয়তাে ক্লেয়ার ষ্টেজ থেকে বিদায় গ্রহণ করবে ; তারপর দুজনে } ৭০ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প * বিবাহ-বন্ধনে বদ্ধ হয়ে ভিয়েনার কাছাকাছি কোথাও একটা ঘর বেঁধে নেবেন। আবার কল্পনার স্বপ্ন দেখেন—তাঁরা যেন পৃথিবী প্রদক্ষিণ কোরবেন, কখনও স্পেনে দিন কাটাবেন, কখনও ইজিপ্টে আবার কখনও বা ভারতবর্ষে। ঘােড়ার পিঠে এই রকম কল্পনার জাল বুনতে বুনতে তিনি বাড়ীর সামনে এসে পৌছলেন। কোচম্যানের হাতে একরাশ গােলাপ দিয়ে অভিনেত্রীর হাতে পৌঁছে দিতে আদেশ কোরলেন। একলাই খাওয়া শেষ করে জমিদার শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দিলেন। অভিনেত্রীর চিন্তায় তার মন আচ্ছন্ন হয়ে যায় ; অন্য কোন নারীই তার মনে এতটা দোলা দিতে পারেনি; চিত্তবিনােদনের জন্য কয়েকটী সুন্দরী নারীর সঙ্গলাভ করেছেন মাত্র। কল্পনার রঙীন স্বপ্নে বিভাের হয়ে লিসেভগ ভাবেন একদিন হয়তাে আসবে, যেদিন ক্লেয়ার তার অন্তরের দ্বার খুলে মধুর স্বরে বােলবে, “প্রিয়তম, এসস ; তােমারই জন্য এখানে আসন বিছিয়ে রেখেছি ; তুমিই একমাত্র এই শূন্য আসনের অধিকারী ; এসাে।” লিসেম্ভগের মাথার মধ্যে এই ধরণের চিত্রগুলি ভেসে আসে। তার আবার মনে হয়, পৃথিবীতে ক্লেয়ার তাকে ছাড়া আর কাকেও ভালবাসার কল্পনাও করতে পারে না। জমিদার বেশ পরিবর্তন করে পরিচিত পথ দিয়ে অভিসারে চললেন। গ্রীষ্ম আগতপ্রায়। তিনি স্বপ্ন দেখেন, নির্বিঘ্নে দু’জনে মিলে ভ্রমণপথে পৰ্বতের সৌন্দৰ্য্য ও সমুদ্রের বিরাটত্ব উপলব্ধি কোরবেন। কেটে যেতে তিনি দেখেন সামনেই ক্লেয়ারের বাড়ী। উদাস দৃষ্টিতে অভিনেত্রীর জানালার দিকে তাকাতে তাকাতে সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দরজায় মৃদু করাঘাত করে কোনই উত্তর না পেয়ে আবার দরজায় আঘাত ক'রে যান ; কিন্তু দরজা খােলে না। হতাশ হয়ে আবিষ্কার করেন, যে দরজার গায়ে ক্লেয়ারের নামের পরিবর্তে আরেকজনের নাম লেখা রয়েছে।

জমিদারের ভাগ্য ৭১ লিসেভগ, বিস্মিত হয়ে নীচে নেমে গিয়ে চাকরের কাছে অনুসন্ধান করে জানলেন, ক্লেয়ার কোথায় চলে গিয়েছে। দ্রুতগতিতে রাস্তায় নেমে পড়লেও অজান্তে কখন তার দৃষ্টি তরুণীর বাড়ীর দিকে ফিরে আসে। অন্যদিন সন্ধ্যার রক্তরাগে অভিনেত্রীর গৃহ কি অপূৰ্বই না দেখাত, কিন্তু আজকের এই দৃশ্য তার মনে একটুও রেখাপাত করতে পারলাে না ; শুধু পানপাত্রই যেন পড়ে আছে, তাতে সুরা নেই। সত্যই কি ক্লেয়ার চলে গেল ? আর কি সে ফিরবে না ? এই ধরণের দুশ্চিন্তায় অভিভূত হয়ে লিসেভগ, থিয়েটারের বাড়ীর দিকে এগিয়ে যাবার সময় তাঁর মনে পড়ে, দু'দিন আগেইতাে তাকে অভিনয় করতে দেখা যায়নি। চিন্তার মধ্যে ডুবে গিয়ে তিনি রিসােরের বাড়ীর দিকে যান। পরিচারিকা দরজা খুলেই জমিদারকে চিনতে পেরে অভিনন্দন করলাে। রিঙ্গের আসতে লিসেম্ভগ তার কাছে ফ্যানির খবর জানতে চান। রিঙ্গের তাঁকে অভ্যর্থনা করে ঘরে নিয়ে গিয়ে বললো, ফ্যানি বাড়ীতে নেই, ক্লেয়ার তাকে সঙ্গে নিয়ে ছুটীর দিনগুলি কাটাতে গেছে। জমিদার—কোথায় সে গেছে জানেন ? রিসাের’তাে বলতে পারি না ; আজ সকালে আটটা পর্যন্ত ক্লেয়ার এখানে ছিল, অনেক অনুরােধের পর আমার কাছে মত পেয়ে ফ্যানিকে সঙ্গে নিয়ে গেছে। লিসেভগের মনে প্রশ্ন আসে, তারা কোথায় যেতে পারে? কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে থেকে মহিলার সঙ্গে করমর্দন করে বিদায় গ্রহণ করেন। কোচম্যানকে সােজা হােটেল ব্রিষ্টলে নিয়ে যেতে আদেশ করলেন। ওসি এখনও স্থান পরিত্যাগ করেনি, সে লিসেগকে অভ্যর্থনা করে ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে ভিয়েনায় তার সঙ্গে শেষ সন্ধ্যা কাটাতে অনুরােধ করে।

१२ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প জমিদার ওসির বর্তমানে ভিয়েনায় অবস্থানে একটু আশ্চর্যান্বিত হয়ে যান। ওসি ক্লেয়ারের সম্বন্ধে কথা বলতে আরম্ভ করে। গায়কের সহানুভূতিতে লিসেম্বপ্নের চোখ জলে ভরে আসে ; গায়ক আগ্রহান্বিত হয়ে জমিদারের কাছ থেকে ক্লেয়ারের সবিশেষ জানতে চায়। লিসেভগ ওসির বাক্সের ওপর বসে তরুণীর গুণাগুণ বর্ণনা করে যান। ক্লেয়ারের সম্বন্ধে কথা বলতে বলতে জমিদারের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। গায়কের কাছে শুধু যে কথাগুলি বললে অভিনেত্রীর সম্মানে আঘাত লাগতে পারে, সে কথাগুলি তিনি একেবারে গােপন রেখে যান। ওসি মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনে যায় | নৈশ ভােজনের সময় ওসি লিসেভগকে তার জমিদারীতে যাবার জন্য নিমন্ত্রণ করে। জমিদার গায়কের এই অনুরােধে খুসী হয়ে গ্রীষ্মকালে তার নিমন্ত্রণ রক্ষা করবেন প্রতিশ্রুতি দেন। আহারের শেষে তারা দুজনেই ষ্টেশনের অভিমুখে রওনা হন। পথে ওসি বলে, “জানেন, আমি খুব মন-খােলা প্রকৃতির লােক। বলতে বাধা কি, ক্লেয়ারের বাতায়নের দিকে আমার একবার তাকাতে ইচ্ছে হচ্ছে।” লিসেভগ আড়চোখে একবার ওসির দিকে তাকান। অভিনেত্রীর বাড়ীর সামনে দিয়ে যাবার সময় ওসি কয়েকটি উড়ন্ত চুম্বন ছেড়ে বলে উঠলাে, “সুন্দরী, বিদায়, বিদায়।” লিসেম্ভগ বােলেন, “ক্লেয়ার ফিরে এলে আপনার এই অভিনন্দন বাণী আমি নিজেই বহন করে দেব।” ওসি তার এই কথায় আশ্চর্যান্বিত হয়ে যায় । লিসেগ আবার আরম্ভ করেন, “আজ সকালে কারুকে একটা কথাও না বলে ক্লেয়ার চলে গেছে। ওসি একটু বিস্মিত হয়ে বলে, “চলেগেছে?” এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে, গাড়ীতে জমিদারের ভাগ্য ৭৩ দু’জনেই স্তব্ধ হয়ে বসেছিলেন। ট্রেন ছাড়ার আগে পরস্পর পরস্পরকে একান্ত পরিচিত বন্ধুর মত আলিঙ্গন কোরল। সেই রাত্রে “জমিদার তার বিছানায় শুয়ে ছােট শিশুর মত গুমরে গুমরে কেঁদে ওঠেন। ক্লেয়ারের সঙ্গে কাটান মধুর রাত্রিগুলির তুলনায় আজকের রাত্রির কতই প্রভেদ রয়েছে ; দুঃখে, বিরহে ভদ্রলােক আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তার মনে পড়ে, শেষ মিলনের রাত্রে ক্লেয়ারের মধ্যে তিনি একটা উন্মাদনার ভাব লক্ষ্য করেন। এর তাৎপৰ্য তিনি এখনই উপলব্ধি করতে পারলেন। যুবরাজের প্রেতাত্ম। ক্লেয়ারের চারিপাশে যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে ; হয়তাে ক্লেয়ারকে চিরকালের মত হারাতে হবে, এই ভেবে তিনি শিউরে ওঠেন। লিসেভগ, কয়েকদিন ভ্রাম্যমানের মত ভিয়েনার পথে পথে ঘুরে বেড়াতে থাকেন ; কি ভাবে তিনি দিন কাটাবেন কিছুই স্থির করতে পারেন না; কখনও ব্রিজ খেলে, কখনও তাস খেলে, কখনও বা ঘােড়ায় চড়ে তার দিন কেটে যায় ; কিছুতেই তার মনের স্থিরতা ফিরে আসে । তিনি ভাবেন, তার সব কিছুই নির্ভর করছে ক্লেয়ারের ওপর ; সমগ্র ভিয়েনা সহরটা যেন একটা কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেছে। সমস্ত লােকের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা হচ্ছিল, তার মধ্যে আন্তরিকতার একান্তই অভাব দেখা যায়। একদিন সন্ধ্যায় লিসেভগ, ষ্টেসনে গিয়ে ইচেলের টিকিট কাটেন। সেখানে অনেক পরিচিত বন্ধুর সঙ্গে তার দেখা হয়, তারা জমিদারের কাছে ক্লেয়ারের খবর জানতে চায়। তিনি অত্যন্ত কর্কশ ও অপমানজনক স্বরে জবাব দেওয়ায় কলহের সৃষ্টি হয়, এমন কি তার সঙ্গে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে যায় ; একটা গুলিও পৰ্য্যন্ত তঁার কাণ ঘেসে বেরিয়ে যায়, ফলে আধ ঘণ্টার মধ্যেই তাকে সেস্থান পরিত্যাগ করে যেতে হয়। এখান থেকে লিসেনভগ টাইরলে যান, ;

৭৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প সেখান থেকে ওবারল্যাণ্ড, ওবারল্যাণ্ড থেকে জেনেভা হ্রদ, জেনেভা হ্রদ সাঁতরে পার হয়ে তিনি পার্বত্য উপত্যকায় গিয়ে পড়েন ; উপত্যকা থেকে কয়েকটী পর্বতশৃঙ্গ অতিক্রম করেন। করেন। কিসে যে তিনি শান্তি পাবেন, কিছুই ঠিক করতে পারেন না। একদিন লিসেভগ ভিয়েনা থেকে একটা টেলিগ্রাম পেয়ে খুব আ গ্রহের সঙ্গে খুলে দেখেন, “যদি আপনি আমার প্রকৃত বন্ধু হন, বিলম্ব না করে অবিলম্বে চলে আসুন-ওলসি।” লিসেম্ভগ, ভাবলেন, এই টেলি গ্রামের সঙ্গে হয়তাে ক্লেয়ারের কিছু একটা সম্পর্ক আছে। অবিলম্বে তিনি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে এই পরিত্যাগ করে হামবুর্গ হয়ে সােজা মিউনিকে গেলেন, সেখান থেকে জাহাজে করে এক সুপ্রভাতে মােল্ডে এসে পৌঁছলেন । এই দীর্ঘ ভ্রমণ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যেও লিসেম্ভগ, কোনরূপ শান্তি পান না। ক্লেয়ারের চেহারাও তিনি স্মরণ করতে পারছিলেন , গানের মধুর স্বরও তাঁর মনে আসছিল না। লিসেভগের মনে হােল যেন দশ বছর তিনি ভিয়েনা পরিত্যাগ করেছেন। সাদা ফ্ল্যানেল সুট পরা ওসিকে সমুদ্রতীরে দাড়িয়ে থাকতে দেখে জমিদার আনন্দে লাফিয়ে ওঠেন। ডেকের ওপর থেকে গায়কের সঙ্গে তাঁর দৃষ্টির বিনিময় হয়ে গেল। জাহাজ থেকে লিসেভগ, তীরে নেমে এলেন। ওলসি আরম্ভ কোরল, “বন্ধু, এইভাবে এখানে আসার জন্যে আপনাকে সহস্র ধন্যবাদ। জানেন, আমার অবস্থা হয়ে এসেছে।” জমিদার তার দিকে তাকিয়ে দেখেন যে তার মুখটা খুব ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, আর চুলগুলিও সাদা হয়ে গেছে। লিসেভগ, উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, “কি ব্যাপার বলুন ত, আপনার কি হয়েছে?” ওলসি—আপনাকে সমস্ত ঘটনাটা খুলে বােলব।

জমিদারের ভাগ্য লিসেভগ, ওসির গলার আওয়াজে কেমন যেন একটা অস্বাভাবিকতা অনুভব কোরলেন। তারা উভয়েই নীল সমুদ্রের ধারে মননামুগ্ধকর এভেনিউএর মধ্য দিয়ে গাড়ী করে চললেন, দুজনেই মােন হয়ে বসেছিলেন। লিসেভগ, একটিও প্রশ্ন না করে অনন্ত জলরাশির দিকে উদাসনেত্রে তাকিয়েছিলেন। ছােট ছােট ঢেউগুলিকে অকারণ তিনি গুণে যান, উন্মুক্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয় যেন তারাগুলি আস্তে আস্তে খসে পড়ে পৃথিবীর দিকে নেমে আসছে। অবশেষে মনে হােল, ক্লেয়ার নামে কোন এক গায়িকা যেন পৃথিবীর এক প্রান্তে বিচরণ করে বেড়াচ্ছে। গাড়ী এসে একটি সাদা বাড়ীর সামনে দাড়ায়। সন্ধ্যায় তারা বারান্দার ওপর বসে আহার করছিলেন, সামনেই চোখে পড়ছিল দিগন্তব্যাপী নীল সমুদ্র। একজন বেয়ারা মাঝে-মাঝে খালি পেয়ালায় সুরা ঢেলে দিচ্ছিল। লিসেভগ, হঠাৎ বলে ওঠেন “ভাল কথা, আপনি যে চুপ করে রইলেন।” ওসি সামনের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমার কোনই মূল্য নেই, আমি শেষ হয়ে গেছি।” প্রত্যুত্তরে জমিদার বলেন “আপনি কি ব’লছেন, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না ; আপনার জন্য আমি কি কোরতে পারি, বলুন?” “কিছুই না” এই কথা বলার পরে ওসির দৃষ্টি ক্রমশঃ' টেবিল ক্লথের ওপর থেকে গিয়ে পড়লো বারান্দায়, বারান্দা থেকে বাগান, বাগান থেকে নীল সমুদ্রের দিকে । লিসেন্ভগ, হতভম্ব হয়ে যান ; নানা প্রকারের দুশ্চিন্তা তার মাথার মধ্যে জমা হতে থাকে ; তার মনে প্রশ্ন জাগে, “ক্লেয়ার কি তবে মরে গিয়েছে ? ওসি কি তাকে হত্যা করেছে ? অথবা ক্লেয়ারকে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে ? ওলসিও কি মরে গেছে ?” আবার তার মনে হয়, “না তা অসম্ভব ; সামনেই ত তাঁর বন্ধু বসে রয়েছে; কেন ভদ্রলােক কথা ৭৬ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প বলছেন না ?” লিসেম্ভগ, হঠাৎ চেঁচিয়ে বলে ওঠেন, “ক্লেয়ার কোথায়?” ওসি আস্তে আস্তে তার দিকে এগিয়ে আসে। সামনে উপবিষ্ট বন্ধুকে দেখে জমিদারের মনে হােল ঠিক থিয়েটারের সংএর মত মুখােস পরে ওসি যেন তার দিকে কটু করে তাকিয়ে আছে। বারান্দার রেলিংএর ওপর ঝােলান সবুজ শালটি দেখে তার পরিচিত পুরানাে বন্ধু বলে ভ্রম হচ্ছিল। হঠাৎ র ঘাের কেটে যায় ; আবার স্থির ও মার্জিতস্বরে তিনি বলে ওঠেন, “ক্লেয়ার কোথায় ?” গায়ক ভদ্রলােক কয়েকবার মাথা নেড়ে বলেন, “তার সম্বন্ধে নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে। সত্যিই কি আপনি আমার বন্ধু, বলুন?” লিসেম্ভগ, মাথা নেড়ে বলেন—সত্যিই আমি আপনার বন্ধু, আমায় কি করতে হবে বলুন ?” ওসি বােলল, “আপনার কি মনে আছে, সন্ধ্যায় ভিয়েনা পরিত্যাগের আগে ব্রিষ্টল হােটেলে আপনার সঙ্গে একত্রে বসে আহার করার পর, দুজনে মিলে ষ্টেসনে গেলাম। লিসেম্ভগ, আরেকবার মাথা নাড়লেন।” ওসিক্লেয়ার যে ওই একই ট্রেণে ভিয়েনা পরিত্যাগ করেছিল, আপনার এ বিষয়ে একেবারে ধারণা ছিল না, নিশ্চয় ? লিসেভগের মাথাটা নীচের দিকে নুয়ে পােড়ল। ওসি আবার সুরু কোরল-~ -তার ভিয়েনা ত্যাগ সম্বন্ধে আমার কোন ধারণাই ছিল না। সকালে একটা ষ্টেসনে নেমে প্রাতঃরাশের সময় আমি ক্লেয়ারকে আবিষ্কার করে ফেলি, দেখলাম ক্লেয়ার ফ্যানির সঙ্গে একত্রে খাবার ঘরে বসে কফি পান করছে।” জমিদারবঙ্গে যান বন্ধু। ওসি—সেদিন সকালে ক্লেয়ার ফ্যানিও আমি অষ্ট্রিয়ার লেকের ধারে একটি সুন্দর কক্ষে সময় কাটাই, বেশ আনন্দেই আমরা ছিলাম।

জয়িদারের ভাগ্য ৭৭ 1 গায়ক ভদ্রলােকটি এত অস্পষ্টভাবে কথা বলছিল যে লিসেম্ভগের মনে হােল, তার যেন মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে। লিসেভগ, আবার ভাবল, কেন সে আমায় ডেকেছে, সে আমার কাছে কি চায় ? ক্লেয়ার কি কোন গােপন কথা তাকে বলেছে ? কেন গায়কটী আমার প্রতি ওইভাবে তাকাচ্ছে ? কেন আমি বারান্দায় একজন সংএর সঙ্গে এইভাবে বসে আছি ? একি শুধুই স্বপ্ন, সম্ভবত আমি এখনও ক্লেয়ারের বাহুবন্ধনের মধ্যে ঘুমিয়ে রয়েছি, এখনও আমাদের রাত্রি বুঝি শেষ হয়নি; এই রকম চিন্তা করতে করতে তার মুদ্রিত চোখ দুটী হঠাৎ খুলে গেল। ওসি, হঠাৎ বলে উঠল, “আপনি প্রতিশােধ নেবেন না ?” জমিদার—প্রতিশােধ নেব, কেন কিসের জন্য ? ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছি না। ওসি -কারণ, সে আমায় নষ্ট করে ফেলেছে ; আমি একেবারে শেষ হয়ে গেছি। লিসেগ—সমস্ত ব্যাপারটা খুলে বলুন। ওসি—ফ্যানি আমাদের সঙ্গেই ছিল, সে খুব চমৎকার মেয়ে, নয় কি ? লিসেভগ, হ্যা, খুবই চমৎকার মেয়ে সে। তারপর আবছা আলােয় ঘরের মধ্যে নীল ভেলভেটে মােড়া আসবাব- গুলি তার চোখে পােড়ল ; জমিদারের মনে হল যেন শত বৎসর পূর্বে এই ঘরেই ফ্যানির মার সঙ্গে তার আলাপ পরিচয় হয়েছিল। লিসেঙ্গ বােললেন, “থামলেন কেন, ব’লে যান।” ওসি-একদিন সকালে গিয়ে দেখি ক্লেয়ার নিদ্রিত ; একটু বেলাতেই তার ঘুম ভেঙ্গে থাকে। আমি আর কি করি, বনপথ ধরে বেদাতে চলে, ;

৭৮ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প গেলাম ; হঠাৎ পেছন ফিরে দেখি ফ্যানি আমার দিকে দৌড়ে আসছে ; চীৎকার করে সে বলে ওঠে, “আপনি পালিয়ে যান, আমার একান্ত অনুরােধ, দেরী কোরবেন না, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, একটা বিপদের বেড়াজাল দিয়ে আপনাকে কারা ঘিরতে আসছে।” এর পর সে আর কিছুই বােলল না। আমি বুঝতে পারলাম, কি বিপদের কথা সে অনুমান করছে। ফ্যানির স্থির বিশ্বাস ছিল, আমি ইচ্ছা করলেই এই বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারি। রেলিংএর ওপরের সবুজ শাল টী হঠাৎ জাহাজের পালের মত ফুলে উঠলাে, টেবিলের ওপরের আলেটী থেকে থেকে দপ দপ করে উঠছিল। লিসেভগ আগ্রহের সঙ্গে বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলেন--ফ্যানি আপনাকে কি বলেছিল ? ওসি—সেদিনের সন্ধ্যার কথা কি আপনার মনে আছে ? আমরা দু’জনেই সেদিন ক্লেয়ারের বাড়ীতে উপস্থিত ছিলাম। তার ঠিক পরের দিন ক্লেয়ার ফ্যানিকে সঙ্গে নিয়ে যুবরাজের কবরস্থানে উপস্থিত হয়ে একটা ভীতিজনক রহস্যের কথা তার কাছে ব্যক্ত করেছিল। জমিদার কম্পিতস্বরে বলে উঠলেন, “ভীতিপূর্ণ এক গুপ্ত রহস্য! কিছুই তাে বুঝতে পারছি না।” ওসি—আপনি বােধ হয় জানেন যে, যুবরাজ ঘােড়া থেকে পড়ে এক ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুমুখে লিসেম্ভগ,—আমি জানি। ওসি-শুধু একমাত্র ক্লেয়ারই যুবরাজের পাশে উপস্থিত ছিল। লিসেন্ভগ,—সে কথাও জানি। ওসি—যুবরাজ অভিনেত্রীর প্রতি তাকিয়েছিলেন, আর মৃত্যুর পূর্বেই তিনি একটা অভিসম্পাতও দিয়ে গিয়েছিলেন। পতিত হন ?

জমিদারের ভাগ্য ৭৯ t জমিদার—অভিসম্পাত ! ওসিহঁ্যা, যুবরাজ ক্লেয়ারকে বলেছিলেন আমি যাবার আগে একটা অভিসম্পাত রেখে যাচ্ছি। দেখাে, আমাকে তুমি ভুলে না ; ভুলে গেলে আমি মরেও শান্তি পাব না।” প্রত্যুত্তরে ক্লেয়ার বলেছিল, “আমি ভুলব না।” যুবরাজ পুনরায় ক্লেয়ারকে শপথ গ্রহণ করিয়ে বলেছিলেন, “প্রতিজ্ঞা কর, ভুলবে না আমায় ?” ক্লেয়ার প্রত্যুত্তরে বলেছিল, “প্রিয়তম, আমি ভুলব না, ভুলব না।” যুবরাজ আবার বলেন “ক্লেয়ার, তােমাকে আমি প্রাণ অপেক্ষাও ভালবাসি ; এইবারে আমি পৃথিবীর কাছ থেকে চিরবিদায় গ্রহণ ক’ছি।” জমিদার চেঁচিয়ে বলে উঠলেন,—কে কথা বলছে ? ওসি উত্তরে বােল্ল, “আমি। ফ্যানি আমায় যে কথাগুলি বলেছিল, আমি শুধু তারই উল্লেখ করছি। ফ্যানির সঙ্গে ক্লেয়ারের যা’ আলােচনা হয়েছিল, সমস্তই সে আমার কাছে খুলে বলেছে। ক্লেয়ারের সঙ্গে যুবরাজের যা’ কথাবার্তা হয়েছিল, সেগুলি সে ফ্যানির কাছে খুলে বলেছিল। এখন আপনি নিশ্চয়ই সব বুঝতে পারছেন।” লিসেভগ, মনােযােগর সঙ্গে কথাগুলি শুনে যাচ্ছিলেন, তার মনে হােল যেন মৃত যুবরাজের কণ্ঠস্বর রাত্রির স্তব্ধতা ভঙ্গ করে কবর থেকে বেরিয়ে আসছে, যেন সে বলছে, আমি তােমায় প্রাণ অপেক্ষাও ভালবাসি, কি কোরব আমার আয়ু শেষ হয়ে আসছে, বেশ বুঝতে পারছি। আমি জানি, আমার মৃত্যুর পর আরেকজন তরুণ তার প্রেম নিবেদন করে তােমার কাছে এগিয়ে আসবে, তােমার বাহুবন্ধনের মধ্যে সে আনন্দলাভ কোরবে। কিন্তু কিছুতেই এ আনন্দকে সে ধরে রাখতে . পারবে না। ক্লেয়ার, আমার অভিসম্পাত কি তুমি শুনতে পাচ্ছ ? আমি গত হােলে যে লােক ওষ্ঠ চুম্বন করে তােমার দেহকে জড়িয়ে ধরবে, তাকে জাৰ্মাণীর সেরা গল্প নরকবাস করতেই হবে। জান, মৃত লােকের অভিসম্পাতে স্বর্গের দেবতারাও সাড়া দেন? ক্লেয়ার, তাকে জানিয়ে দিও, তাকে পাগল হয়ে যেতে হবে ; বিষাদে অসন্ন হয়ে তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে।” তিনি যেন স্পষ্ট শুনলেন, ওসির মুখ থেকেই যেন মৃত যুবরাজের, উক্তি বেরিয়ে এল।—আবার তার মনে হােল, যেন সবুজ রংএর শালটা রেলিং থেকে বাগানে পড়ে যাচ্ছে। জমিদার যেন আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়লেন, তার সারা অঙ্গ অসাড় হয়ে আসছে। মুখ থেকে তার আর কোন কথাই বেরুলাে না। গানের মাষ্টারের ঘরে ক্লেয়ারের সঙ্গে প্রথম মধুর আলাপের দিনটির কথা, লিসেভগের মনের মাঝে উকি ঝুকি মারতে লাগলাে। আরও তঁার মনে হােল, স্টেজের ওপর একটা সং দাড়িয়ে যেন বলছে “যুবরাজ অভিসম্পাত করেছিলেন, যে পুরুষ তার প্রণয়ীর প্রতি আসক্ত হবে তার মৃত্যু অনিবার্য।” আবার যেন দেখলেন, স্টেজটা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ দুটো অনন্ত নীল সমুদ্রে গিয়ে যেন মিশে যাচ্ছে। হঠাৎ চেয়ারের ওপর তার দেহ এলিয়ে পােড়ল । ওসি সাহায্যের জন্য চীৎকার করে ওঠে। দুটি চাকর ছুটে এসে জ্ঞানহারা জমিদারকে ধরে একটা ইজিচেয়ারের ওপর শুইয়ে দেয় । একজন ডাক্তার আনতে ছুটে গেল, আরেকজন জল ও ভিনিগার নিয়ে এলাে। ওসি জমিদারের কপালে অনেক মালিস কোরল, কিন্তু তার কোন চেতনাই ফিরে এলাে না। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বললেন “সব শেষ হয়ে গেছে।” ওসি সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠে তার শয়নকক্ষে প্রবেশ করে এইভাবে একখানা চিঠি লিখে ফেললাে, “ক্লেয়ার আমি মােন্ডে গিয়ে তােমার টেলিগ্রাম পেয়েছিলাম। তােমার কাছে স্বীকার করছি, তােমায় আমি ৮১ হন।” জমিদারের ভাগ্য আগে বিশ্বাস কোরতাম না ; আমি ভেবেছিলাম তুমি আমায় প্রবঞ্চনা করবার চেষ্টা কোরছ। আমায় ক্ষমা কর ; এখন তােমায় আর আমি অবিশ্বাস করি না। আমার নিমন্ত্রণেই লিসেম্ভগ, এখানে এসেছিলেন। আমি একটা অদ্ভুত রকমের প্ল্যান খাটিয়েছিলাম, তাঁকে আমি মৃত যুবরাজের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেই সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দেহ অসাড় হয়ে যায়, তিনি মৃত্যুমুখে পতিত ওসি গভীরভাবে কি যেন চিন্তা করছিল ; একটু পরে ঘরের মাঝখানে গিয়ে সে আনন্দচিত্তে হঠাৎ গান গাইতে শুরু করে দিল। তার গলার স্বর ক্রমশঃ নিম্ন থেকে দ্রুত লয়ে গিয়ে ওঠে , ক্রমশঃ সেই সঙ্গীতের রাগিণীটা সমুদ্র গর্জনের মত দিগন্তকে মুখরিত করে তােলে। ওসির মুখে একটা শান্ত হাসির আভাস ফুটে ওঠে। আবার একবার তার পড়বার টেবিলে বসে অসমাপ্ত চিঠিখানা এইভাবে শেষ করে ফেলল, “প্রিয়তমে ক্লেয়ার আমাকে ক্ষমা কর ; আবার আমার মন আনন্দে ভরে উঠেছে ; বিরহিণী, ভেব না, আমি তিনদিনের মধ্যেই তােমার প্রেমের দেউলে গিয়ে উপস্থিত হব।”

পরিহাস ১৯১২ সালের মার্চ মাসে নেপলস সহরে জাহাজ থেকে মাল নামাবার সময় একটা দুর্ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে খবরের কাগজ- গুলিতে অনেক ধরণের আজগুবি খবর বেরিয়েছিল। অন্যান্য সহযাত্রীর মত ঘটনাটির দিকে লক্ষ্য না করে, ভীড় ও গােলমাল থেকে নিষ্কৃতি পাবার আশায় ও সন্ধ্যাটা শান্তিতে কাটাবার জন্যে, আমি সমুদ্রতীরে নেবেছিলাম। দুর্ঘটনাটা কি ভাবে ঘটেছিল, আমি তা জানতাম। এই ঘটনার পর অনেক বছর কেটে গেল ; এখন মনে হয়, আমার মৌনতা ভঙ্গ করে প্রকৃত ঘটনাটা খুলে বলি। আমি মালয় ষ্টেটের মধ্যে তখন ঘুরে বেড়াচ্ছি, সেই সময়েই ব্যক্তিগত ব্যাপারে বাড়ী থেকে হঠাৎ একটা তার আসায় আমাকে সিঙ্গাপুর বন্দরস্থিত উটন্ নামক জাহাজে উঠতে হয়। জাহাজে যায়গার অভাব, বােধ করেছিলাম। ইঞ্জিনের পাসেই ছিল আমার ছােট কেবিন, ভয়ানক গরম বােধ কোরতাম সেখানে। আলােও সেখানে তেমন প্রবেশ কোরতনা। ঘরটার মধ্যে বাতাস একেবারেই আসতনা, কাজেই আমাকে পাখাটা সব সময়েই চালিয়ে রাখতে হােত। নীচে থেকে সব সময়ই ইঞ্জিনের ঝক ঝকানি আওয়াজ এসে ঘরটাকে কাঁপিয়ে তুলতে, যেন মনে হােত, চব্বিশ ঘণ্টাই একজন কয়লাবাহী কুলি দ্রুতগতিতে সিড়ি দিয়ে ওঠা নামা করছে। আবার জাহাজের উপরতলা থেকে পায়ের মস মসানি আওয়াজ সব সময়েই কানে এসে বাজে। আমি মালপত্র ঘরের এককোণে গুছিয়ে রেখে, ওপরের ডেকে গেলাম। সেখানে দক্ষিণ বাতাস উপভােগ করে শরীর মন যেন জুড়িয়ে পরিহাস ৮৩ ঘুরে যায়। যায়। এই জনতা পরিবৃত জাহাজের ডেকের ওপরেও ভীড় ও কোলাহল বড় কম ছিল না। আমার আশেপাশে মানুষে ভরে গিয়েছিল, তারা অনর্গল কথা বলতে বলতে ডেকের চারিপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ডেক চেয়ায়গুলিতে শায়িত রমণীদের হাল্কা হাসি, লােক জনের অফুরন্ত চলা ফেরা আর কলরব আমার মনের মধ্যে কেমন একটি অস্বস্তির ভাব আনছিল। মালায়ায়, তার আগে বৰ্ম্মা এবং সায়াম প্রভৃতি অপরিচিত স্থানেও আমি গিয়েছি। স্মৃতির ছবিগুলি পর পর মাথার মধ্যে দিয়ে অবসরের সময় আমি সেই স্মৃতিগুলি নিয়ে, চিন্তা করে সাজিয়ে মনের পটে একে রাখতে চেয়েছিলাম। এই কোলাহল ও উত্তেজনা পূর্ণ স্থানে বিশ্রাম নে বার আর কোন উপায়ই ছিলনা। পড়তে চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু বইএর মধ্যে কোন রকমেই আমি মন বসাতে পারিনি। তিনদিন ধরে অন্ত রলােকে প্রবেশ করে আমি সহযাত্রীদের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে, অনন্ত নীল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে, সময় কাটাবার চেষ্টা করেছিলাম। যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই দেখি অনন্ত নীল জল- রাশি, কেবল রাত্রে মাঝে মাঝে সমুদ্রের খানিকটা অংশ আলােয় ঝিমিক করে ওঠে। এইভাবে তিনদিন কেটে যায়, যাত্রীদের কোলাহলের মধ্যে থেকে একটা অস্বস্তির ভাব মনে আনে। নিরুপায় হয়ে কামরার মধ্যে প্রবেশ করি। আমার দ্রুত পলায়নের কারণটা এই রকম, সাংহাই থেকে আগত কয়েকটী ইংরেজ তরুণী আহারের সময়ের আগে পর্যন্ত উৎকট সুরে নাচের গৎ বাজাচ্ছিল। নির্জনতা, নীরবতাই হােল আমার কাম্য। বিকেলের আহার শেষ করে, দু’বােতল বিয়ার চাপিয়ে ভাবলাম, নৈশ ভােজন ও নাচের হাত থেকে অব্যাহতি লাভ কোরব। ঘড়ির কাটাকে .

৮৪ জাণীর সেরা গল্প এইভাবে এড়িয়ে গিয়ে স্বপ্নলােকে বাস কোরব ভাবলাম। ঘুম ভাঙ্গতেই অনুভব করলাম, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে ; ঘরটাও যেন বেশ গরম হয়ে উঠেছে। গা দিয়ে ঝ ঝ করে ঘাম পড়ছিল। পাখাটা খুলে দিলাম। মনে হল, সময়টা মধ্যরাত্রিই হবে, কারণ সঙ্গীতের ধ্বনি আর শােনা যাচ্ছিল না। মাথার ওপরে মনুষ্য চলাচলের শব্দও থেমে গিয়েছিল। শুধু যন্ত্র-দানবের হৃদকম্পন নৈশ স্তব্ধভাকে ভঙ্গ করছিল। আমি কোনরকমে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে ডেকে গিয়ে আবিষ্কার কোরলাম, সেখানে একটীও জনমানব নেই। প্রথমে আমার দৃষ্টি পােড়ল জাহাজের চোঙ্গাগুলির প্রতি, সেখান থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে উর্ধে তারায় ভরা নীল আকাশে চোখ মেলে দিলাম। এমন অনন্ত, সুন্দর, আকাশ আগে কখনও দেখিনি। রাত্রির হাওয়ায় বেশ শীতলতার স্পর্শ অনুভব কোরছিলাম। দূরে দ্বীপগুলি থেকে হাওয়ার সঙ্গে সুগন্ধি ভেসে আসে। জাহাজে এই প্রথম, স্বপ্নের মত মধুরতার সঙ্গে বিরহিনী নারীর ন্যায় রাত্রির আলিঙ্গনের মধ্যে নিজেকে এলিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। ডেকের ওপর শুয়ে অগণিত তারার ভাষা উপলব্ধি করতে মন চায়। ডেকে চেয়ারগুলি যাত্রীরা অধিকার করে বসেছিল। সেখানে এমন একটা নির্জন স্থান চোখে পােড়ল না, যেখানে আমার মত ভাবুক প্রকৃতির লােকেরা বিশ্রাম- লাভ করতে পারে। কি আর করি, চোখ মুদ্রিত করে রাত্রের মাদকতার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিলাম। আমার চিন্তা ও বােধশক্তির সূক্ষ্ম সূত্রগুলি ধীরে ধীরে গুটিয়ে আসে। c হঠাৎ একটা শুষ্ক কাশির আওয়াজে আমি চমকে উঠি। আবছা আলােয় একজোড়া চশমার কাচ আমার চোখে পড়ে। আমি লােকটির কাছে এগিয়ে গিয়ে চলতি জাৰ্মাণ ভাষায় বােললাম আমাকে ক্ষমা পরিহাস ৮৫ কোরবেন।” সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলােকটী জার্মান ভাষায় উত্তর দিলেন, “ক্ষমা করার কি আছে, বন্ধু ?” আমার মনে হােল, যে উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে আমি তার দিকে তাকালাম তিনিও সেইভাবে আমার প্রতি দৃষ্টিপাত কোরছেন। কালাে ও ধূসর পট- ভূমিকার সামনে তার ঝাপসা অবয়বটা ভেসে ওঠে। তার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ও জ্বলন্ত পাইপের মৃদু শব্দ আমার কানে এসে বাজে। এই স্তব্ধতা আমার কাছে অসহ্য ঠেকে। মনে হােল, এস্থান ছেড়ে অন্য কোথাও যাই। অস্বস্তি বােধ কোরছি, এমন সময় একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেললাম। দীপ শলাকার মৃদু আলাের মাঝে আমাদের দৃষ্টির বিনিময় হয়ে যায়। ভদ্রলােকটীকে দেখে অপরিচিত বলেই মনে হােল। আমাদের মধ্যে কথা- বার্তার কোন আদান-প্রদানই হােল না। এই দীর্ঘ মৌনতা কেমন একটা অস্বস্তি এনে দিচ্ছিল মনে। আমি আর চুপ করে থাকতে না পেরে দাড়িয়ে বলে উঠলাম, “রাত্র প্রণাম।” এটা জড়ানাে কর্কশ স্বরে জবাব এল, “নমস্কার।” ভদ্রলােক খুব দ্রুতগতিতে বলে যেতে লাগলেন, ক্ষমা কোরবেন, আপনার কাছে আমার একটা অনুবােধ আছে, কোন একটা ব্যক্তিগত শশাকের ব্যাপারে আমি অভিভূত হয়ে আছি, সেইজন্য এখানে কারুর সঙ্গে আলাপ পরিচয় পৰ্য্যন্ত করতে পারিনি। আপনি যদি দয়া করে এখানে আমার, অবস্থিতির সম্বন্ধে কারুকে না জানান, তাহলে আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। কথা বলতে বলতে তিনি হঠাৎ থেমে গেলেন। আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিলাম,—এ অনুবােধ আমি নিশ্চয়ই রক্ষা কোরব। .-তাকে আবার জানালাম,-আমি একজন সাধারণ প্রমণকারী মাত্র, এখানে আমার ক্লোনই পরিচিত লােক নেই।

৮৬ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প সে •• ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসতে, কেবিনের মধ্যে প্রবেশ কোরলাম। রাত্রে আমার সুনিদ্রা হােল না। সমুদ্রযাত্রার পথে ছােটখাট ঘটনা মনে গভীর ছাপ রেখে যায়। এই বিশিষ্ট সহযাত্রীর প্রতি কেন আমার একটা আকর্ষণ আসে। সমস্ত দিন একটা অধৈর্য্যের ভাব নিয়ে আমার সময় কেটে যায় ; রাত্রে আবার সেই ভদ্রলােকটাকে দেখবার জন্যে মন উদগ্রীব হয়ে ওঠে। দিনটা খুবই দীর্ঘ বলে মনে হতে থাকে। বিলম্ব না করে শুয়ে পােড়লাম। রাত্রের মত ঠিক নির্দিষ্ট সময়ে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। রেডিয়াম লাগান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ঠিক দু'টো বেজেছে। তাড়াতাড়ি ডেকের দিকে গেলাম। গত গত রাত্রের মত আজকের রাত্রিটাও ছিল গভীর। অগণিত তারায় সারা আকাশ ছেয়ে গেছে। মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা অনুভব করাতে, ডেকের ওপর দিয়ে এগিয়ে গেলাম। আমি জানতে চাইছিলাম যে সেই রহস্যজনক আগন্তুকটী সেই জড়ান দড়ির ধারে আবার একা বসে আছেন কিনা। যায়গাটীর কাছে অগ্রসর হােতেই সেই পাইপের লাল আভাটা আবার চোখে পােড়ল। দেখলাম, ভদ্রলােক ঠিক নির্দিষ্ট স্থানেই বসে আছেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও থেমে গেলাম, ভাবলাম সরে পড়ি, এমন সময় ভদ্রলােক আমার কাছে এগিয়ে এসে বিনীতসুরে বােললেন,—আমি অত্যন্ত দুঃখিত, আপনি এত কাছে এসে আমায় দেখে ফিরে যাচ্ছিলেন, আসুন, আমার কাছে বসুন। আমি ভেবেছিলাম, হয়তাে আপনাকে বিরক্ত কোরব, এই ভেবেই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি একটু দুঃখ- জড়িত স্বরে বললেন—আপনার উপস্থিতিতে বিরক্ত হওয়া দূরের কথা, আনন্দলাভই আমার খুব হবে। অনেকদিনই আমার এইভাবে একা একাই কেটেছে, কার সঙ্গে পরিহাস ৮৭ ০ প্রাণ খুলে একটা কথা পৰ্য্যন্ত বােলতে পাইনি। মৌন হয়ে থাকতে আর ভাল লাগে না। কয়েদীর মত কেবিনের মধ্যে একা আর বন্দী হয়ে থাকতে পারি না। সাধারণ যাত্রীদের কলরব ও হাসি আর সহ্য হয় । তিনি হঠাৎ উঠে পড়ে বােললেন—আমি হয়তাে অনর্গল কথা বলে আপনাকে কষ্ট দেব। কথা শেষ করে তিনি উঠতে উদ্যত হােলে, আমি তাকে বসতে অনুরােধ করে বােললাম—আপনার সঙ্গলাভ করে কষ্ট পাওয়া ত দূরের কথা, এই তারায় ভরা আকাশের তলায় আপনার সঙ্গে মধুর বাক্যালাপ করে কতই না আনন্দলাভ কোরব। আসুন, একটা সিগারেট ধরান। দেশলাইএর আলােয় সেই পরিচিত মুখখানি আরেক বার দেখে নিলাম। ভদ্রলােকটির মুখ দেখে মনে হােল, তিনি যেন একটা গল্প বলতে উৎসুক। আমরা দুজনেই জড়ান দড়ীর কুণ্ডলীর পাশে বসেছিলাম। ভদ্রলােক হঠাৎ মৌনতা ভঙ্গ করে বলে উঠলেন—আপনি কি পরিশ্রান্ত ? আমি উত্তর কোরলাম—না তাে। তিনি সােজাসুজিভাবে বললেন—আপনাকে আমি কিছু বলতে চাই। শরীরে একটু ঝাকানি দিয়ে তিনি পরিষ্কার ভাষায় শুরু কোরলেন- আপনাকে বুঝতে হবে যে আমি হােলাম একজন ডাক্তার, ধরুন ঘটনাটা আমাকে কেন্দ্র করে ঘিরে আছে। আমার এই উত্তেজনা দেখে আপনি কিছুমাত্র বিচলিত হবেন না। মদ খেয়েছি বলেই যে আমি এত চঞ্চল হয়েছি, তা ভাববেন না। এটা খুবই সত্যি কথা যে জাহাজের ওপর আমি ইচ্ছে করেই একটু বেশি মাত্রায় মদ খেয়েচি। প্রাচ্যে আমার এই একঘেয়ে জীবনে মদ খাওয়া ছাড়া উপায় নেই। ভেবে দেখুন, আমাকে সাত বছর এই দেশের লোক ও জন্তু জানােয়ারের মধ্যে সময় অতিবাহিত করতে হয়েছে, এ অবস্থায় মাথা ঠিক bobo জাৰ্মাণীর সেরা গল্প করে ভদ্রভাবে চলা অসম্ভব। যদি এই সুদীর্ঘ সাত বছরের মধ্যে কোন দেশবাসীকে সামনে পাওয়া যায়, তার সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা না বলে কি কেউ থাকতে পারে ? তিনি আবার হঠাৎ অন্ধকারে কি যেন হাতড়াতে লাগলেন, মনে হােল। একটা ঠুনকো আওয়াজ পেলাম, যেন মনে হােল দু’টো মদের বােতল তার পাশে রয়েছে। বােতল থেকে তিনি খাটি এক পেগ, হুইস্কৗ ঢেলে আমায় বােললেন--একটু খাবেন না? আমি চুমুক দিয়ে কিছুটা খেলাম। গ্লাসের অভাবে তিনি বােতলে মুখ দিয়ে বেশ কিছুটা মদ খেয়ে নিলেন। ঘড়িতে আড়াইটে বেজে উঠল। তিনি কিছুক্ষণ ইতস্বতঃ করে আরম্ভ কোরলেন- আমি আপনাকে ঘটনাটা হুবহু প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পরিস্কারভাবে বলে যাব। এর মধ্যে কোন লজ্জা ও লুকোচুরি নেই। রুগীরা আমার কাছে চিকিৎসার পরামর্শ নিতে আসত ; গােপনীয় কোন ব্যায়রামের জন্যে তাদের অনাবৃত দেহের কোন বিশিষ্ট স্থান আমায় পরীক্ষা করে দেখতে হােত। এই সব ভয়ঙ্কর স্থানে আমি সূক্ষ্ম রুচিবােধ হারিয়ে ফেলেছিলাম। প্রাচ্যের রহস্য ও মন্দিরের মধ্যে একটা সৌন্দৰ্য আছে বটে, কিন্তু সময় সময় জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, শরীরের সমস্ত শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। ম্যালেরিয়া জ্বরে কুইনাইন খেতে পারেন বটে, কিন্তু এই ধরণের জ্বরে শরীর একেবারে ভেঙ্গে যায়, মানুষকে একেবারে অকেজো করে তােলে। যদি কোন ইউরােপীয় ভদ্রলােককে বড় সহর থেকে মফঃস্বলে যেতে হয়, তাহলে তাকে মনের সুস্থতা অচিরেই হারিয়ে ফেলতে হয় ; এই অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য কেউ কেউ মদ খাওয়া অভ্যাস করেন। ঘরের জন্য কারুর মন কেঁদে ওঠে। ছেরের পর বছর পরিহাস ৮১ বৈচিত্র্যহীন দিনগুলি এইভাবে কেটে যায়। তার মনে হতে থাকে, বাড়ী ফিরেই বা লাভ কি, কেই বা তাকে চিনবে, অথবা তাকে অভ্যর্থনা কোরবে? আমি জাৰ্মাণীতে ডাক্তারী শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলাম ; ডাক্তারী পাশ করার সঙ্গে সঙ্গেই লিপজিগের ক্লিনিকে একটা চাকরী পাই। আমার নাম ও পসার ধীরে ধীরে জমে উঠলাে, এমন সময় একটা প্রেম সংক্রান্ত ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ে আমার ভবিষ্যৎ একেবারে মাটা হয়ে যায়। হাসপাতালে একটি নারীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সেই নারীটি এক ভদ্রলােকের সঙ্গে প্রণয়াসক্ত হয়, ভদ্রলােকটিকে সে পাগল করে দিয়েছিল, মাথা ঠিক রাখতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা পর্যন্ত কোরতে চেষ্টা করেছিলেন। আমার অবস্থাও সেই ভদ্রলােকের মত দাড়িয়েছিল। যে সব নিলজ্জ নারী পুরুষের ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করতে পারে, আমি তাদের কাছে বশ্যতা স্বীকার না করে পারি না। এই ধরণের এক নারীর কাছে আমি সম্পূর্ণভাবে বশীভূত হয়ে পড়েছিলাম। সে আমায় যখন যা হুকুম কোরত, আমি তাই পালন করে য়েতাম। তার জন্যই আমি একবার হাসপাতালের সিন্ধুক থেকে টাকা চুরি করেছিলাম। আমার এই চুরির ব্যাপারটা বেরিয়ে পড়ে। সে যাত্রায় আমার এক কাকার দয়ায় বেঁচে যাই, তিনিই আমার টাকাটা’পরিশােধ করে দেন। লিপজিগে আমার আর কোন চাকরিই জুটল না। ঠিক এই সময়েই খবর পেলাম যে ডাচ গভর্ণমেন্ট তাদের উপনিবেশের জন্য কয়েকজন ডাক্তার চান। দরখাস্ত করতেই একটা চাকরী জুটে গেল। দশ বৎসরের চুক্তিতে সই করে আগেই অনেক টাকা পেয়ে গেলাম।, টাকার অর্ধেক অংশ কাকাকে দিলাম, বাকীটা সহরের একটি তরুণীর হাতে জাৰ্মাণীর সেরা গল্প সমর্পণ কোরলাম। আমি এইভাবে অর্থহীন হয়ে ইউরােপ থেকে পাড়ি দিলাম। আপনি যেভাবে এখন বসে আছেন আমিও তখন ওইভাবে বসেছিলাম। আমার এই নির্জন দিনগুলি একে একে কেটে গেল। ডাচ, গভর্ণমেন্ট ব্যাটেভিয়া অথবা অন্য কোন শ্বেতকায় নরনারী পরিবৃত বড় সহরে না পাঠিয়ে একটা ছােট যায়গায় আমার কর্মস্থল নির্দিষ্ট করে দিলেন। কয়েকজন বেরসিক রাজকর্মচারীকে নিয়ে ছিল সেখানকার সমাজ ; আবার সেখানে একটা দো-আঁসলা জাতের বাসও ছিল। ক্রমশঃ যায়গাটা গা-সওয়া হয়ে এসেছিল। পড়াশুনার সময় খুব অল্পই পেতাম। ক্রমশঃ যায়গাটীর জলহাওয়া সহ্য হয়ে এলাে। উপনিবেশের শ্বেতকায় লােকগুলির সংস্পর্শে আমি হাঁফিয়ে উঠতাম। ভাল না লাগাতে তাদের সংস্পর্শ ত্যাগ করে মদের মাত্রা বাড়িয়ে দিলাম আর অবসরের সময় চিন্তার মধ্যে ডুবে যেতাম। আমার কাজের সময় সম্পূর্ণ হতে আর দু’বছর মাত্র বাকী ছিল। এর পর অবসর গ্রহণ করে স্বচ্ছন্দে ইউরােপে গিয়ে নতুনভাবে জীবনযাপন কোরতে পারতাম ; অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। এর মধ্যে হঠাৎ একটা ব্যাপার ঘটে গেল। অন্ধকারের স্তব্ধতা হঠাৎ ভঙ্গ হােল ; রাত্রি এত নিস্তব্ধ ছিল যে জাহাজের চাকার আওয়াজটা আমি পরিস্কার শুনতে পাচ্ছিলাম। মনে হােল, একটা সিগারেট ধরালে মন্দ হয় না, কিন্তু আমার আশঙ্কা হােল যে সামান্য শব্দে ও আলাের ঝলকে তিনি চমকে উঠতে পারেন। চারিদিক নিস্তব্ধ, তিনি কি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছেন? এই রকম চিন্তা করছি, এমন সময় দু’বার ঘণ্টা বেজে উঠলাে। তখন তিনটে বেজে গিয়েছে। তিনি হঠাৎ নড়ে উঠলেন, মনে হােল হাতে করে তিনি একটা হুইস্কির পরিহাস ৯১ বােতল তুলছেন। আবার তিনি উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে যেতে লাগলেন— আমি আমার অপ্রিয় কৰ্ম্মস্থলে জালের মধ্যে মাকড়সার মত আটকে গেলাম। সময় যেন কাটে না, বর্ষা শেষ হয়ে এল, এক সপ্তাহ ধর ছাতের ওপর অবিরাম বৃষ্টিপতনের শব্দ অনুভব করেছিলাম। একটীও জনপ্রাণী অথবা কোন ইউরােপীয় ভ দ্রলােক আমার বাড়ীতে একবারের জন্যেও পদার্পণ করেননি। বাড়ীতে দেশীয় চাকর ও হুইস্কির বােতলই ছিল আমার সাথী। নভেলের মধ্যে যখন আলােকমালায় 'শশাভিত রাস্তার সারি ও ইউ রােপীয় সুন্দরীদের কথা পােড়তাম তথনই দেশের জন্য মনটা কেঁদে উঠত। তিনি আবার আমাকে বােললেন—আপনি হলেন ভূপৰ্যটক। ওই সব দেশে লােকের অবস্থা যে কিরকম হয়, আপনার তা জানা নেই। শ্বেতকায় ভদ্রলােকেরা কোননা কোন দেশীয় ব্যায়ামে ভুগে থাকেন। সময় সময় তাদের গৃহে ফেরার জন্য মন এত কাতর হয়ে ওঠে, যে তাঁরা ভুল বকতেও আরম্ভ করেন। এই রকম একটা বেদনা মনে অনুভূত হচ্ছিল, এমন সময় টেবিলে ম্যাপ ছড়িয়ে আমার গন্তব্য স্থানগুলির কথা ভাবছিলাম। হঠাৎ আমার চাকর দুটি ছুটে এসে জানাল যে একজন ইউরােপীয় মহিলা আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। কথাটা শুনে আমি একটু আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেলাম। ঘােড়র গাড়ী অথবা মােটারের কোন আওয়াজই আমার কাণে এলনা। মনে প্রশ্ন এলাে, হঠাৎ এই নির্জন স্থানে ইউরােপীয় মহিলাটীর আসার কারণ কি হােতে পারে ? আমি তখন দোতলার সংলগ্ন বারান্দার ওপর বসেছিলাম। মিনিটের মধ্যে বেশ পরিবর্তন করে, নিজেকে একটু সংযত করে নিলাম। নীচে নামবার সময় একটা স্নায়বিক দুর্বলতা অনুভব কোরছিলাম ।

জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ভাবলাম, এ মহিলাটী কে হােতে পারে? এই জনবিরল স্থানে শ্বেতাঙ্গিনীর আসার মধ্যে কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে ? মহিলাটী ঘরের মধ্যে চেয়ারে বসেছিলেন, পিছনে একটি চীনা বালক দাড়িয়েছিল, মনে হল তার চাকর হয়ত হবে। তিনি লাফিয়ে উঠে আমায় অভ্যর্থনা করার সময় লক্ষ্য কোরলাম, তার মুখটি ওড়না দিয়ে ঢাকা। আমাকে কথা বলতে না দিয়ে তিনি ইংরেজী ভাষায় আরম্ভ কোরলেন—ডাক্তার নমস্কার, আপনার সঙ্গে আগে থেকে কোন ব্যবস্থা না করে আসার জন্য আমায় ক্ষমা কোরবেন। তিনি আবার দ্রুতগতিতে বলে চললেন—এই বসতির পাশ দিয়ে মোটারে করে যাবার সময়, আমার মনে পড়ে গেল, আপনি এখানে বাস করেন। আপনার প্রশংসা অনেকের কাছে শুনেছি। এদেশে আপনাকে চেনে না এমন কোন লােক নেই। আপনি সহরে কেন আসেন না ? এখানে আপনার যােগীর মত জীবন- যাপনের কারণটা কি বলতে পারেন? মহিলাটী আমায় উত্তর দিতে সুযােগ না দিয়ে অনর্গল কথা বলে যেতে লাগলেন। র দেহের অঙ্গ-ভঙ্গিমার মধ্যে থেকে একটা স্নায়বিক দুৰ্বলতার ভাব পরিস্ফুট হয়ে উঠছিল। ভাবলাম, তার এই কথার পর কথা বলে যাওয়ার কারণটা কি হতে পারে ? মহিলাটী পরিচয় গােপন করছেন কেন, এই ভেবে আশ্চৰ্য্যাম্বিত হােলাম। ভাবলাম তার কি কোন অসুখ করেছে, আবার মনে হােল তিনি কি তাহলে উন্মাদিনী ? ক্রমশঃ আমি অন্যমনস্ক হয়ে পােড়লাম, মহিলাট কিন্তু বাক্যবাণে আমায় অস্থির করে তুললেন। তার কথা শেষ হতে অভ্যর্থনা করে ওপরে নিয়ে গেলাম। আমার বসবার ঘরের চারিপাশে চোখ বুলিয়ে তিনি আরম্ভ কোরলেন—এখানকার বাড়ীগুলাে কি সুন্দর ; আপনার বই- গুলােও কি চমৎকার, মনে হয় সবকটাই পড়ে শেষ করে ফেলি।

পরিহাস মহিলাটী বইএর সেফের কাছে গিয়ে বইএর নামগুলি লক্ষ্য করতে লাগলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা কোরলাম—আপনাকে কি এক পেয়ালা চা দিতে পারি ? প্রত্যুত্তরে তিনি বােললেন—ধন্যবাদ, আমার হাতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় আছে। দেখুন, আপনার বইগুলি দেখে মনে হচ্ছে, আপনি ফরাসী ভাষায় খুব অভিজ্ঞ, না? আমাদের যে ডাক্তার, তিনি ব্রিজ খেলতেই ওস্তাদ, আর কিছুই না। এই বসতির মধ্য দিয়ে মোেটারে করে চলেছি এমন সময় আমার হঠাৎ মনে হল আপনার কাছ থেকে একটা ব্যক্তিগত ব্যাপারে মত গ্রহণ করি। এই কথাগুলি তিনি বই দেখতে দেখতে আমার দিকে না তাকিয়ে বলে গেলেন। একটু থেমেই আবার তিনি সুরু কোরলেন,আপনি এখন অসম্ভব রকম ব্যস্ত, না? যাক, আরেকদিন আপনার কাছে আসব। আমি তাঁকে বােললাম, -আমার দরজা সব সময়ই ভােলা, যখনই আপনার কোন সাহায্যের দরকার হবে তখনই কোন দ্বিধা না করে আমার কাছে চলে আসবেন। মহিলাটা একটু ঘুরে দাড়িয়ে আমার দিকে দৃষ্টিপাত না করে সে থেকে বই নিয়ে পাতা ওল্টাতে ওটাতে বলতে লাগলেন, “আমার অসুখটা এমন কিছু শক্ত নয়, মেয়েরা প্রায়ই যে সব কষ্টে ভােগে, . আমার কেষ্টাও প্রায় সেই ধরণের, যেমন ঘন ঘন মাথা ধরা, ফিট হয়ে পড়া, গা বমি বমি করা, এ ছাড়া আর কিছু নয়। আজ সকালেই মােটারে করে যাবার সময় এক যায়গায় মােড় ঘােরবার সময় হঠাৎ আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি, চাকরটা আমায় ধরে ফেলেছিল, না হলে নীচে পড়ে যেতাম। খানিকটা জল খাবার পর আমি কিছুটা সুস্থ বােধ ১৪ জাৰ্মাণীর সেরাগল্প কোরলাম। ডাক্তার, এ থেকে কি আপনার মনে হয় না যে সােফার অসম্ভব জোরে গাড়ী চালিয়েছিল ?” আমি বােললাম, “আপনার প্রশ্নের হঠাৎ জবাব দিতে পারি না। আমাকে খুলে বলুন তাে, এই রকম ফিট কি আপনার প্রায়ই হয়ে থাকে ?” মহিলা —এর মধ্যে হয়নি; কিন্তু গত সপ্তাহে কয়েকবার হয়েছিল। আজকাল সকালে খুব দুৰ্বলতা অনুভব করি। কথা বলতে বােলতে মহিলাটী আবার বইএর আলমারীর দিকে গিয়ে একখানা বই টেনে বার করে আপনার মনে পাতা উলটে যেতে লাগলেন। র চলার মধ্যে কেমন একটা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য কোরলাম। আমি ইচ্ছা কোরেই কোন জবাব দিলাম না। তার এই অবস্থিতি আমার বেশ ভালই লাগছিল। মহিলাটী হঠাৎ হাল্কাভাবে বলে উঠলেন, “ডাক্তার আপনার মত আছে ? ব্যাপারটা এমন কিছুই নয়, দেশীয় কোন শক্ত ব্যায়রামে যে ভুগছি, তা ভাববেন না ; কোন ভয়ের কারণ নেই।” উত্তরে বােললাম, “আমি আপনাকে প্রথমে পরীক্ষা করে দেখবাে, জ্বর আছে কিনা ; এগিয়ে আসুন, দেখি আপনার নাড়ীটা।” আমি তার দিকে এগিয়ে যেতে তিনি সরে দাড়িয়ে বােললেন, “না, ডাক্তার না, আমার জ্বর মােটেই হয়নি; ফিট হবার পর থেকে প্রত্যেক দিনই টেম্পারেচার নিয়ে দেখেছি জ্বরের কোন লক্ষণই নেই ; হজমও আমার বেশ ভালই হচ্ছে।” মহিলাটীর আচরণে কেমন যেন একটু সন্দেহ লাগলাে। মনে হােল, তিনি যেন কি বােলতে চাচ্ছেন অথচ বােলতে পারছেন না। ভাবলাম, এই যে দীর্ঘ দু’শশা মাইল পথ মােটারে করে এখানে তিনি এসেছেন, পরিহাস নিশ্চয়ই ফ্লবার্টের সাহিত্য নিয়ে আলােচনার জন্য নয়। মৌনতা ভঙ্গ করে বােললাম, “মাপ কোরবেন, আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন কোরতে পারি কি?” প্রত্যুত্তরে মহিলাটী বােললেন, “নিশ্চয়ই, ডাক্তারের কাছে আমার ততা ওই উদ্দেশ্যেই আসা।” আবার পেছন ফিরে মহিলাটী বই নিয়ে নাড়াচাড়া কোরতে লাগলেন। আমি প্রশ্ন কোরলাম, “আপনার কোন ছেলেপিলে আছে কি?” মহিলাটী উত্তরে বােললেন, “আমার একটীমাত্র ছেলে।” আমি জিজ্ঞাসা কোরলাম, “আপনি যখন প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হন তখন কি এই রকম সব লক্ষণ অনুভব করেছিলেন ?” মহিলাটী বােললেন, এবারের উত্তরের মধ্যে একটা উত্তেজনার ভাব লক্ষ্য কোরলাম। আমি বললাম, “তাহলে আমি যা অনুমান করেছি তা ঠিকই, কি বলুন ?” সঙ্গে সঙ্গে মহিলাটী জবাব দিলেন, “আজ্ঞে হ্যা।” তাকে পরীক্ষা করার জন্য পাশের ঘরে আসতে অনুরোেধ কোরলাম। মহিলাটী আমার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বােললেন, “পরীক্ষার কোনই প্রয়ােজন নেই ; আমার কি অবস্থা হয়েছে, বেশ উপলব্ধি করতে পারছি।” আর এক পেগ মদ চড়িয়ে নিয়ে আমাকে সম্বােধন করে ভদ্রলােক বােললেন,—ভেবে দেখুন, সেই জনবিরল স্থানে একা একাই আমার দিন কাটছিল ; নিঃসঙ্গ জীবনে মােটেই শান্তি পাচ্ছিলাম না, এমন সময় ওই মহিলাটী আমার ওখানে উদয় হােলেন। অনেক বছর পরে এই প্রথম একজন শ্বেতাঙ্গিনী নারীকে দেখলাম। মহিলাটী ঘরের মধ্যে প্রবেশ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ; . ; কোরতে মনে কেমন একটা আতঙ্কের সৃষ্টি হােল। প্রথমে মনে হােল, তিনি আমার কাছে থােস গল্প কোরতে এসেছেন; কিন্তু এর একটু পরেই তিনি এমন একটা দাবী করে বােসলেন যে মনে হােল একটা তীক্ষ্ণ ছােরার ফলকে আমাকে বিদ্ধ কোরতে তিনি যেন উদ্যত হয়েছেন। তিনি আমার কাছে কি ধরণের সাহায্য আশা করেছিলেন তা আমার বুঝতে বিলম্ব হােল না। এই প্রথম নয়, এর আগে বহু নারী এই ধরণের দাবী নিয়ে আমার কাছে এসেছিল ; তারা অশ্রুসিক্ত নয়নে বিপদ থেকে নিষ্কৃতি পাবার আশায় আমার কাছে এসেছিল। এই শেষােক্ত নারীটীর ধরণ ছিল অন্য রকমের, মনে হয়েছিল যে একটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে তিনি আমার কাছে এসেছেন। অনুভব কোরলাম যে তেজীতার দিক থেকে নারীটী আমাকে অতিক্রম করে যান ; তিনি আমাকে দিয়ে ইচ্ছামত কাজ করিয়ে নিতেও পারেন। আমার মনের মধ্যেও একটা পাপের ছায়া ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছিল, এমন সময় মনটা হঠাৎ তিক্ততায় ভরে উঠলাে। মহিলাটীর প্রতি কেমন যেন একটা বিদ্রোহের ভাব আমার মনে জেগে উঠলাে। মনে হােল তিনি যেন আমার শত্রু। কিছুক্ষণের জন্য নিঃস্তব্ধ হয়ে শুয়ে রইলাম। মনে হল, তিনি যেন ওড়নার মধ্য থেকে আজ্ঞাসূচক নেত্রে আমার দিকে চেয়ে আছেন। আমি কিন্তু তার আজ্ঞা মেনে চলতে রাজি হইনি ; কোন জবাব না দিয়ে আমি এমন ভাণ কোরলাম, যেন তার কোন কথাই আমি বুঝতে পারিনি। তার সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলােচনা করে বােললাম, “চিন্তিত হবার কোন কারণ নেই ; আর জানালাম যে এই ধরণের ফিট গর্ভের প্রথম দিকে হয়েই থাকে।” মহিলাটা আমার কথায় বাধা দিয়ে আবার বলে উঠলেন “হৃদ্যন্ত্রই শুধু আমায় কষ্ট দিচ্ছে, এ ছাড়া কোন উপসর্গই নেই।”

পরিহাস
৯৭
আমি বােললাম, “আপনার শুধুই হৃদ্যন্ত্রের কষ্ট, না?” কথা
বােলতে বলতে আমি ষ্টেথিসকোপটার দিকে যেই হাত বাড়িয়েছি
অমনি তিনি বাধা দিয়ে বােললেন, “বিশ্বাস করুন, আমার শুধু হৃদযন্ত্রেরই
কষ্ট হচ্ছে ; অযথা পরীক্ষা করিয়ে আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট কোরতে
চাইনা। আমার একান্ত অনুরােধ যে আমি যা বলছি আপনি তা
বিশ্বাস করুন। সত্যি করে বলছি, আমি আপনার ওপর একান্ত
নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি।”
প্রত্যুত্তরে আমি বােললাম, “অনুগ্রহ করে আমার কাছে সব কথা
খুলে বলুন। সবার আগে আপনার মুখের ওড়নাটা খুলে ফেলে বসুন।
ডাক্তারের কাছে পরামর্শ নিতে আসার সময় কেউ এইভাবে মুখে ওড়না
ঢাকা দেয় না।”
আমার সামনে বসে তিনি মুখ থেকে ওড়নাটা সরিয়ে দিলেন।
মহিলাটী ছিলেন জাতিতে ইংরাজ ; তার পরিপূর্ণ যৌবনের উচ্ছলতা
আমার চোখে পড়ছিল। পুরাে এক মিনিট ধরে আমরা দুজনেই
পরস্পরের প্রতি চেয়ে রইলাম।
মহিলাটীর মধ্যে আগের মতই
স্নায়বিক দৌর্বল্যের লক্ষণ দেখা
যাচ্ছিল। তিনি কম্পিতস্বরে বােললেন, “ডাক্তার, আমি আপনার কাছে
কি সাহায্য চাই বুঝতে পারছেন, না বুঝতে পারছেন না?”
উত্তরে আমি বােললাম, “হ্যা, আমি অনুমান করেছি আপনি কি
চান। আমাদের ভেতর খােলাখুলি ভাবে কথা হয়ে যাওয়াই ভাল।
আপনি চান যে আপনার এই মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়া ও গা বমি বমি
ভাব থেকে নিষ্কৃতির একটা উপায় করে দিই। তাই নয় কি ?
মহিলাটা উত্তরে বােললেন,“আপনি ঠিকই বলেছেন।
আমি বােললাম, “জানেন, এতে আমাদের দুজনেরই বিপদে পড়ে

৯৮ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প যাবার সম্ভাবনা আছে ; এই ব্যাপারে এখানে অস্ত্রোপচার করাটা বে- আইনী হবে, এ ধারণা বােধ হয় আপনার নেই ?” মহিলাটী উত্তর কোরলেন, “আমি জানি, এমন অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তারী শাস্ত্রে এ ধরণের অস্ত্রোপচারকে অবৈধ না বলে বৈধই বলা হয়ে থাকে।” আমি বােললাম,-অবশ্য প্রয়ােজন মনে করলে এ ধরণের অস্ত্রোপচার ডাক্তারেরা করে থাকেন। মহিলাটী বােললেন,—আপনি ডাক্তার, অস্ত্রোপচার করা না করা আপনারই হাতে। মহিলাটীর চোখ দেখে মনে হােল, তিনি যেন আমায় এ কাজটা কোরতে আজ্ঞা করছেন। তাঁর তেজের সামনে নিজেকে খুব দুর্বল অনুভব কোরলাম। প্রতিজ্ঞা কোরলাম, তার করায়ত্বের মধ্যে কিছুতেই যাব না। একটু ভেবে বােললাম, “অন্য ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ না করে এ দায়িত্বপূর্ণ কাজে হাত দিতে সাহস হচ্ছে না।” মহিলাটী বােললেন,—অন্য ডাক্তারের কাছে পরামর্শ নিয়ে লাভ কি ? আমি তাে শুধু আপনারই মতামত চাই। আমি বােললাম,আমার কাছে কেন ? মহিলাটী শুষ্ককণ্ঠে জবাব দিলেন,—ভাবলাম, আপনি লােকালয়ের বাইরে থাকেন, আর আমার পরিচয়ও আপনি একেবারে জানেন না, আপনার হাতযশের কথা শুনেছি, এই ভেবেই আপনার শরণাপন্ন হােলাম। ধরুন, এই সাহায্যের জন্য আপনাকে যদি প্রচুর অর্থ দিই তাহলে বােধ করি, অনায়াসেই একাজে হাত দিতে পারেন? আমার শরীরের ভেতর বেশ একটা কম্পন অনুভব কোরলাম। ভাবলাম, অস্ত্রোপচারের বিনিময়ে এভােগুলাে টাকা পাব ; আবার মনে পরিহাস হেল, নারীটী আমাকে বশ করবার চেষ্টা করছে। একটু বিদ্রুপের সঙ্গে বােললাম, “এতগুলাে টাকা আপনি আমায় দেবেন ?” ' মহিলাটী বােললেন,—টাকাটা দেবাে, এই সৰ্তে যে প্রথমতঃ আপনি আমার প্রস্তাবে রাজী হবেন, আর দ্বিতীয়তঃ আপনি এই ডাচ, উপনিবেশ পরিত্যাগ করে দেশে ফিরে যাবেন। আমি উত্তর কোরলাম, আপনি জানেন, এতে আমার পেন্স একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে ? মহিলাটী উত্তর দিলেন, আপনাকে যা ক্ষতিপূরণ স্বরূপ দেব, তা আপনার পেনের টাকাকেও ছাপিয়ে যাবে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম,-কত টাকা আপনি দিতে পারেন ? মহিলাটী উত্তর দিলেন,আমি এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা আপনাকে দেবাে। আমি ভয়ে ও রাগে কেঁপে উঠলাম। ভাবলাম, মহিলাটী টাকার বিনিময়ে আমায় কিনে ফেলে ডাচ, গভর্ণমেন্টের সঙ্গে চুক্তিটা নষ্ট করে দিতে চান। মনে হােল, নারীটী আমায় যেন বশীভূত কোরতে চলেছেন ; রাগে আমার অন্তরটা জ্বলে উঠলাে। অন্তদহ নিয়ে যেই উঠে পড়েছি, এমন সময় তার গর্বিত চোখ দুটীর প্রতি আমার দৃষ্টি পড়াতে একটা আসুরিক প্রবৃত্তি আমার মনের মধ্যে জেগে উঠলােকামার্ত বেদনায় সারা শরীরে রোমাঞ্চ অনুভব কোরলাম। এরপর নারীটীর প্রতি আমার একটা ঘৃণার উদ্রেক হােল। মনে হােল, যেন একটা বিষাক্ত সাপ আমাকে দংশন করে সারা শরীর জ্বলিয়ে দিচ্ছে। কোন দ্বিধা না করে তাকে বলে ফেললাম—আমি আপনাকে এখন বলে যাব, কখন কি ভাবে আমার মধ্যে এই উন্মত্ত ভাব এসেছিল। ভদ্রলােকটী থেমে গিয়ে বললেন, “মদ, মদ, আর একটু মদ চাই।

১০০ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প পেয়ালাটায় একটা বড় রকমের চুমুক দিয়ে তিনি জোর গলায় আবার আরম্ভ কোরলেন-- বন্ধু, আশা করি আপনি আমায় ভুল বুঝবেন না। আমি যে একটা মহৎ লােক তা নয়, কিন্তু সব সময়ই আমি সাহায্যপ্রার্থী নরনারীর উপকারই করে এসেছি। আমি যে কুৎসিৎ পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে বাস কোরতাম, সেখানে ভগ্ন স্বাস্থ্য ও দুৰ্বল নরনারীর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করাই আমার ধর্ম মনে কোরতাম। মানুষের মধ্যে যখন কার্যকরী শক্তির লীলা চলে, তখন মনে হয়, এ দেহ তত তারই আধার। কি জানি, কেন এই মহিলাটীর প্রথম দর্শনে আমার মনে বেশ একটা উত্তেজনা অনুভব করে- ছিলাম। তাঁর আচরণে, কেন জানি না, আমার ঘুমন্ত পশুপ্রবৃত্তি জেগে উঠেছিল। আমি তার কথাবার্তা থেকে অনুমান কোরলাম, নারীটা তিন- মাস আগে একদিন হঠাৎ এত কামার্ত হয়ে পড়েছিল যে সেই দুৰ্বল মূহুর্তেই গর্ভস্থিত এই অবৈধ সন্তানের পিতাকে দেহ দান করে ফেলেছিল। এই কলঙ্ক যাতে না বেরিয়ে পড়ে সেইজন্যই তিনি আমার শরণাপন্ন হন। এর পূর্বে কখনও আমার পেশাদারী ব্যবসার সুযােগ নিয়ে এ ধরণের ব্যাপারে জড়িয়ে পড়িনি। ঠিক যৌন প্রবৃত্তির তাড়নায় আমি যে নারীটীর প্রতি আসক্ত হয়েছিলাম তা নয় ; আমার পুরুষকার দিয়ে এই গর্বিত নারীটীর ওপর প্রাধান্য লাভ কোরব, এই ছিল আমার একান্ত কামনা। সত্যি বলতে কি, এই সতেরাে বছরের মধ্যে কোন শ্বেতাঙ্গিনী নারীর বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হবার সুযােগ আমার একবারও আসেনি; প্রণয়ঘটিত ব্যাপারে এ ধরণের বাধা আমি কখনাে পাইনি। দেশী তরুণীরা শ্বেতকায় পুরুষদের ভয় ও ভক্তি করে থাকে, সামান্য চেষ্টাতেই তারা বশীভূত হয়ে পড়ে। এই গর্বিতা রহস্যময়ী নারীটীর প্রথম দর্শনেই আমি বেশ বিচলিত পরিহাস হয়ে উঠেছিলাম ; আমি চেয়েছিলাম, গৰ্বিতা দর্পভরে আমার ন্যায় তৃষ্ণার্ত আদিম মানুষের বংশধরের ঘরে চলে আসুক। এই ধরণের চিন্তার রাশি আমার মাথার মধ্যে জট পাকাতে সুরু কোরল। অনাসক্তের মত ভাণ করে তাকে বােললাম, “সামান্য এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে আমি ওকাজে হাত দেব না।” আমার দিকে চেয়ে মহিলাটী হতাশার সুরে বােললেন, “তাহলে আপনি কত দক্ষিণা চান, শুনি?” উত্তরে আমি বােললাম—“আমায় অভাবগ্রস্থ ক্ষুদ্র ব্যবসাদার প্রকৃতির লােক'ঠাওরাবেন না, যদি ওই ধরণের লােক আমাকে ভেবে থাকেন, তাহলে কোন সাহায্য আশা করাই আপনার ধৃষ্টতা হবে। টাকার বিনিময়ে একাজ আমার কাছে আশা কোরবেন না।” মহিলাটী জিজ্ঞাসা কোরলেন, “তাছাড়া আপনি আমার কাছে কি আশা করেন ?” আমি গলা এক পৰ্দা চড়িয়ে উত্তর দিলাম—আমার কাছে কেউ টাকার গৰ্ব দেখিয়ে সাহায্য নিতে আসবে, আর আমি তাতে রাজি হব, সে প্রকৃতির মানুষ যদি আমায় ভেবে থাকেন, তাহলে মন্ত ভুল করেছেন। আমার কাছে যে বিনীত ভাবে প্রার্থনা নিয়ে এগিয়ে আসে, তাকেই আমি শুধু সাহায্য করে থাকি। মহিলাটী উত্তর কোরলেন, “আপনার কাছে তাহলে কি করযােড়ে সাহায্যের জন্য প্রার্থনা কোরতে হবে ?” আমি বােললাম, “তাই কোরতে হবে আপনাকে।” দর্পভরে মাথা নেড়ে তিনি বােললেন, “ওইভাবে আপনার কাছে সাহায্য ভিক্ষা করা আমার পক্ষে অসম্ভব! তা হতেই পারেনা ! এর চেয়ে আমার কাছে মৃত্যুও শ্রেয়।”

১০২ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প আমি সাহস করে বলে ফেললাম, “বুঝতে পেরেছেন তাে, কি চেয়েছি ? আমার দাবী মিটলেই, আপনাকে সাহায্য কোরব।” মহিলাটা আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে, একটা বিদ্রুপের হাসিতে ঘর ভরিয়ে দিলেন। ভাবলাম, তার কাছে নিজেকে খুব ছােট করে ফেললাম। হাসির রেশটা একটা বর্জনাদের মত আমার কাণে গিয়ে ঠেকলাে। মাথাটাও যেন একটু ঘুরে গেল। ভাবলাম, নতজানু হয়ে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি । ভগ্ন হৃদয়ে বােললাম, “আমার অন্যায়ের জন্য ক্ষমা করুন।” তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে আজ্ঞাসূচক স্বরে বলে উঠলেন —“আমাকে অনুসরণ কোরলে আপনাকে পরে অনুশােচনা কোরতে হবে, জানবেন।” কথাটা শেষ করে নিমেষের মধ্যে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মনের মধ্যে তাকে অনুসরণ করার বাসনা প্রবল হয়ে উঠলাে। কেন জানি না, আমার ইচ্ছা হতে লাগল, তাঁকে ধরে এনে বেশ ভাল করে দু’ঘা দিয়ে গলাটা চেপে ধরি। আস্তে আস্তে আমার এই আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল। সিড়ি দিয়ে নীচে নেমে এসে ঘর থেকে বাইকটা বার করে উদ্ধশ্বাসে চালিয়ে গেলাম ; ভাবলাম, যদি তাকে কোনমতে ধরে ফেলতে পারি। মনে হােল, মােটারে ওঠার আগেই তাকে ধরে ফেলবাে। জঙ্গলের ধারে রাস্তার বাঁকে, কে আবিষ্কার করে দেখলাম, তিনি খুব দ্রুতগতিতে চলেছেন, আর তার পিছনে রয়েছে একজন চীনা বালক। আমার এই পশ্চাৎধাবন লক্ষ্য করে তিনি ছেলেটীকে পথের সামনে দাড় করিয়ে একাই চলতে শুরু কোরলেন। আমি চাকায় একটু জোর দিয়েছি এমন সময় ছেলেটি এসে সামনে পরিহাস দাড়িয়ে পােড়ল। তাকে বাঁচাতে গিয়ে খাদের মধ্যে পড়ে গেলাম। দাড়িয়ে উঠে তাকে খুব ভৎসনা কোরলাম। সাইকেলে উঠে আবার যেই চালাতে যাব এমন সময় ছেলেটী এসে বাইকের ব্যাণ্ডেল ধরে চীনা ইংরেজীতে বােলল, “প্রভু, দয়া করে একবার গাড়ী থামান।” ইচ্ছা হােল তাকে দু’ এক ঘা ঘুসি লাগিয়ে দিই ; আবার ভাবলাম থাক। চাকরটা ভয়ে শিউরে ওঠে, কিন্তু সাইকেল থেকে হাত সরায় না। পুনরায় চাকরটা আরম্ভ কোরল, “আপনার পায়ে পড়ি ; একবার আপনি থামুন।” আমি ভৎসনা করে বােললাম, “পালা বলছি, নাহলে তাের মাথা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেব।” ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু নড়েনা। আমি বেশ বুঝতে পারলাম যে মহিলাটাকে যাতে আমি অনুসরণ না করতে পারি, সেই উদ্দেশ্যেই সে আমার চলার পথে বাধা দিচ্ছে। আমি আর স্থির থাকতে না পেরে এক ঘুষিতে তাকে ধরাশায়ী করে দিলাম। সাইকেলে উঠতে গিয়ে দেখি সামনের চাকাটা বেঁকে গেছে। কি আর করি করি ; শেষকালে দৌড়ানই মনস্থ কোরলাম। দেশীয় ললাকেদের সামনে দিয়ে মান-সম্রম বর্জন করে ছুটতে আরম্ভ কোরলাম। দেশীয় লােকেরা হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়েছিল। এবারে আমি, উপনিবেশের মধ্যে এসে পােড়লাম। হাঁফাতে হাঁফাতে চীৎকার করে বলে উঠলাম, “গাড়ীটা কোথায় গেল ?” দেশীয় লােকেরা উত্তর কোরল, “এই মাত্র চলে গেল, সাহেব।” তারা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। যতদূর দৃষ্টি যায় ১০৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প তাকিয়ে দেখি, কিন্তু মােটারেয় চিহ্নমাত্র চোখে পড়ে না। বুঝলাম, ছেলেটীকে দিয়ে আমার অনুসরণের পথে বাধার সৃষ্টি করে তিনি পালিয়ে গেছেন। এরকমভাবে পালিয়ে যাওয়ার কোন অর্থই হয়না, কারণ এদেশে শাসনকারী মুষ্টিমেয় ইউরােপীয়দের কাৰ্যকলাপ সকলে জানতে পারে। যাভার মত ছােট জায়গায় এই সব ঘটনা নিয়ে আলাপ আলােচনা প্রায়ই হয়ে থাকে। মহিলাটী আমার বাড়ীতে আসার সময়ই তাঁর সােফারের কাছ থেকে নাম, ধাম সবই জেনে নিয়েছিলাম। তিনি প্রদেশীয় রাজধানী থেকে একশ পঞ্চাশ মাইল দূরে বাস কোরতেন। একজন প্রসিদ্ধ ডাচ দেশীয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার বিবাহ হয়। ভদ্রলােকটী ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপারে পাঁচ মাসের জন্য আমেরিকায় গিয়েছিলেন। আমি কিন্তু স্পষ্ট কোরেই বােলতে পারি মহিলাটী ঠিক তিন মাস পূৰ্বেই গর্ভবতী হন। এখন আমি আপনাদের সমস্ত বিষয়টা খুলে পরিষ্কার করে বােঝাতে পিরবাে। নিজের কোন ব্যাধি হলে সহজেই তা নির্ণয় করতে পারতাম। তখন থেকে আমার অবস্থা হয়েছিল জ্বরের ঘরে ভুল-বকা রােগীর মতাে। আমি আর যেন নিজেকে সংযত করে রাখতে পারছিলাম না। বুঝতে পারছিলাম, আমার আচরণ অসঙ্গত হচ্ছে, তবুও আমি বারে বারে সেই ভুলই করে যাচ্ছিলাম। আপনি হয়তাে জানেন না যে মালয়ার লােকেরা এক ধরণের মানসিক ব্যাধিতে ভােগে ; আমার ব্যধিও হয়েছিল সেই ধরণের। এই রােগের লক্ষণটা এই রকম,-রােগী চুপচাপ নিৰ্ধিকারের মতাে বসে থাকে, বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, কোন কিছুই হয়নি। আমার ঘরে মহিলাটা আসবার আগেই আমি ঠিক ঐ রকমভাবে বসে ছিলাম। এই রােগে আক্রান্ত মালয়ার লােকেদের সেই সময়ের মনের অবস্থা এমন হয় যে তারা পরিহাস ১০৫ ; যাকে তাকে ছােরা দিয়ে খুন পর্যন্ত করে ফেলতে পারে । একটা লােককে খুন করে সে থামে না, খুনের নেশা তার মাথায় এমনই চেপে ধরে যে পর পর সে খুনই করে চলে ; শেষকালে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা ছাড়া আর কোন উপায়ই থাকে না। আমিও ঠিক এই রকম ব্যাধিগ্রস্থ লােকের মত মহিলাটীকে আর একবার দেখবার জন্য উন্মাদের মত তার পেছনে পেছনে ছুটেছিলাম ; আমার ঘাড়ে তিনি যেন ভূতের মতােই চেপেছিলেন। আমি আর বিলম্ব করে সুটকেশের মধ্যে কিছু টাকা ও পােষাক-পরিচ্ছদ ভরে নিয়ে সাইকেলে করে নিকটবর্তী ষ্টেশনের দিকে ছুটলাম। এত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আমার কোন লাভই হল না। যতদূর মনে পড়ে ষ্টেশনে পৌঁছবার সঙ্গে সঙ্গে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলাে। ওই পার্বত্য প্রদেশে রাত্রে পাহাড়ের ওপর দিয়ে ট্রেণ চলাচল বন্ধ থাকে, কাজেই আমায় রাত্রিটা ডাক বাংলােয় শুয়ে কাটিয়ে দিতে হােল। পরের দিন সন্ধ্যায় মহিলাটীর দেশে গিয়ে পৌঁছলাম। ষ্টেশন থেকে তার বাড়ী পৌছতে মাত্র দশ মিনিট সময় লাগলাে। আপনি হয়তাে ভাববেন, এ লােকটা পাগল নাকি? সত্যি বলতে কি, আমি কোথায় যাচ্ছি আর কেন যে যাচ্ছি কিছুই ঠিক কোরুতে পারছিলাম না। কার্ড বার করে চাকরীর হাতে দিলাম, কিন্তু সে ফিরে এসে জবাব দিল যে মহিলাটীর শরীর তেমন ভাল নেই, আর এ অবস্থায় কারুর সঙ্গে দেখা কোরতে তিনি প্রস্তুত নন। রাস্তায় নেমে পড়ে অনেকক্ষণ তার বাড়ীর আশে পাশে ঘুরে ঘুরে ভাবতে লাগলাম, যদি তার দেখা মেলে। ব্যর্থ মনােরথ হয়ে সামনেই একটা হােটেলে ঘর ভাড়া নিলাম। কিছু বেশী মাত্রায় হুইস্কি চাপিয়ে ও তার সঙ্গে একটা ভেরান স্ ট্যাবলেট খেয়ে অজগরের মত গভীর নিদ্রায় মগ্ন হােলাম। = ১০৬ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প খ জাহাজে আটবার ঘণ্টা বেজে ওঠে। তখন প্রায় ভাের হয়ে এসেছে। বক্তার ঘুম ভেঙ্গে যেতে আবার গত রাত্রের কাহিনীর যােগসূত্রটা ধরে আরম্ভ কোরলেন : ঘুম ভাঙ্গতেই মনে হােল, যেন জ্বর হয়েছে আর একটা"উন্মাদনার ভাবেও যেন মাথা চঞ্চল হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার বিকেলে বন্দরস্থিত সহরে গিয়ে জানলাম যে শনিবার দিনই তাঁর স্বামীর আসার কথা। ভাবলাম এখনও তিনদিন সময় হাতে রয়েছে, এর মধ্যেই মহিলাটিকে বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়ে ফেলতে পারি। আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করা উচিত নয়। প্রতি মূহুৰ্তই মূল্যবান বলে মনে হতে লাগলো । আমি মহিলাটীর সঙ্গে এমনই অসম্মানজনক আচরণ করেছিলাম যে তার কাছে আর দ্বিতীয়বার অগ্রসর হতে সাহস হচ্ছিল না। কল্পনা করুন, আপনি একজনকে গুপ্তঘাতকের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য সতর্ক কোরতে প্রস্তুত, কিন্তু সে ভুল করে আপনাকেই ভাবী হত্যাকারী মনে করে ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে। মহিলাটী আমার মধ্যে দেখতে পেতেন শুধু উন্মত্ত অনুসন্ধানকারীকে, যে কুপ্রস্তাবে তার সম্রমে আঘাত দিয়েছে। সত্যি বােলতে কি, তাঁকে বিপদ থেকে বাঁচানই ছিল আমার একান্ত কামনা। পরের দিন সকালে চীনা বালকটীকে দরজার সামনে দাড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমি সত্যিই মহিলাটীকে সাহায্য কোরতে প্রস্তুত হয়েছিলাম, ভেবেছিলাম তিনি আমার সাহায্যে সম্ভবতঃ গ্ৰহণ কোরবেন। চাকরটীকে দেখে আবার পুরােনাে কথা মনে হােল, দেখা কোরতে আর সাহস হােলনা। দুঃখিত মনে ফিরে গিয়ে ভাবলাম, তিনিও বেদনাযুক্ত মনে আমার সাহায্যের আশাই যেন প্রতীক্ষা করছেন। এই অপরিচিত সহরে কি ভাবে সময় কাটাবাে কিছুই ভেবে ঠিক পরিহাস ১০৭ কোরতে পারছিলাম না। তারপর ডাচ, রাজপ্রতিনিধির কথা মনে পড়ে গেল, মােটার দুর্ঘটনায় তার একটা পা জখম হয়ে গিয়েছিল ; আমার চিকিৎসায় তিনি সেরে ওঠেন। তাঁর সঙ্গে দেখা কোরতে গিয়ে আমায় সেই স্থান থেকে বদলি করবার জন্য অনুরােধ করলাম। আরও জানালাম, এই বন্যস্থানে বাস করা আমার পক্ষে একেবারে অসম্ভব। ডাক্তার যেমন রােগীর প্রতি তাকায় তিনি সেইভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি স্নায়বিক দুৰ্বলতায় ভুগছেন, না ?” তিনি আরও জানালেন যে আমার পরিবর্তে আরেকজন ডাক্তার এসে পৌঁছলেই চুচী পাওয়া যাবে। ভাবলাম, দাসত্ব করে নিজেকে একেবারে বিক্রি করে ফেলেছি ; তার আদেশ অমান্য করাই আমার পক্ষে শ্রেয়। আমার অভিসন্ধি বুঝতে পেরে বুদ্ধিমানের মতােই আমাকে না চটিয়ে তিনি বললেন, “আমি লক্ষ্য করেছি, আপনি সাধুর মতই জীবন যাপন করছেন ; আমরা আমরা আশ্চৰ্য্য বােধ কোরছি, আপনি এত দিনের মধ্যে একেবারেই ছুটী নেন নি। সেরকম আমুদে লােকের সংলাভ কোরলে হয়তাে আপনার এ অবস্থা হোত না। আজ সন্ধ্যায় সরকারের কুঠীতে আমােদ প্রমােদের একটা বন্দোবস্ত রয়েছে ; উপনিবেশের সব লােকই সেখানে যাবে ; আপনার পরিচিত অনেককেই সেখানে দেখতে পাবেন।” ভাবলাম, তাহলে কি এই পরিচিতদের মধ্যে সেই মহিলাও থাকবেন নাকি ? এই নিমন্ত্রনের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানালাম। সবার আগেই রাষ্টদূতের বাসভবনে গিয়ে উপস্থিত হলাম। কুড়ি মিনিট ধরে একাই ঘরের মধ্যে বসেছিলাম। তারপর ধীরে ধীরে অন্য অতিথিরাও আসতে আরম্ভ করলেন ; তাঁদের মধ্যে কোন কোন রাজ- জাৰ্মাণীর সেরা গল্প কর্মচারী সন্ত্ৰীক এসেছিলেন। রাজপ্রতিনিধি সাদরে আমাকে অভ্যর্থনা কোরলেন। এর একটু পরেই একটা স্নায়বিক দুর্বলতা কেরলাম। আমাকে আশ্চৰ্য্য করে দিয়ে হঠাৎ সেই মহিলাটী ঘরের মধ্যে প্রবেশ কোরলেন। হলদে রঙের পােষাকে তাকে বেশ মানিয়েছিল। তার কঁধ দুটী ঠিক আইভরির মতােই শাদা দেখাচ্ছিল। সকলের সঙ্গে তিনি বেশ মধুরভাবে বাক্যালাপ কোরছিলেন। তিনি যে অন্তরে একটা যাতনা বােধ কোরছিলেন, তার মুখ থেকে শুধু আমিই সেটা বেশ অনুভব কোরছিলাম। আমি তাঁর কাছে এগিয়ে গেলাম, কিন্তু তিনি আমায় দেখেও যেন দেখতে পেলেন না। তার মুখ থেকে একটা হাসির ভাব ফুটে বেরুলাে। ভাবলাম, দু’একদিনের মধ্যেই তার স্বামী এসে হাজির হবেন, আর তিনি নিশ্চিন্ত মনে হাসচেন ; আর আমি আগন্তুক হয়েও তার ভবিষ্যৎ বিপদের কথা স্মরণ করে বিচলিত হয়ে উঠেছি। বুঝতে পারলাম অন্তরের বেদনাকে তিনি হাসিমুখে ঢেকে ফেলবার চেষ্টা কোরছেন। পাশের ঘর থেকে সঙ্গীতের রেশ ভেসে আসছিল ; এবারে নাচ সুরু হবে। একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলােক মহিলাটীকে নাচের সঙ্গিনী হােতে অনুরােধ কোরলেন। অন্য লােকদের কাছে বিদায় নিয়ে ভদ্রলােকের হাত ধরে তিনি নাচ ঘরের দিকে এগিয়ে এলেন। সামনে আমায় দেখে পরিচিতার মত তিনি বােললেন, “নমস্কার ডাক্তার।” শুধু এই কথাটা বলে তিনি চলে গেলেন। তাঁর এই দৃষ্টির মধ্যে কি ভাব যে গােপন ছিল, কেউই তা বুঝতে পারেনি। তাঁর এই অন্তরঙ্গ বান্ধবীর মত আচরণে আমি একেবারে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ভাবলাম, আমাদের পুরােনাে’ঝগড়াটা কি ;

পরিহাস ১০৯ তিনি মিটিয়ে ফেলতে চান ? তঁার মনের প্রকৃত কি ইচ্ছা তা আমি অনুমান কোরতে পারলাম না। বেশ একটু বিচলিত হয়ে পােড়লাম। নাচবার সময় তার মুখ থেকে একটা হাসির আভাস ফুটে বেরুচ্ছিল। মনে হােল, নাচের সঙ্গে এ হাসির কোন সম্পর্ক নেই, নিশ্চয়ই আমাদের সেই পুরােনাে আলাপ আলােচনার কথা স্মৃতির পটে এসে তাকে বেশ বিচলিত করে তুলেছে। কথাটা স্মরণ করে আমি বেশ একটু উত্তেজিত হয়ে পােড়লাম। আমি শুধু তারই দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিলাম, এ চাহনি খুব সম্ভব তার কাছে ভাল লাগছিল না। নৃত্য-চঞ্চল দেষ্টাকে ঘােরাবার সময় তিনি তেজ মিশ্ৰিত চাহনির দ্বারা আমাকে আত্মসংযম কোরতে সাবধান করে দিলেন। মনে হল, মানসিক ব্যাধিটা আমাকে যেন বেশ জোর করে আঁকড়ে ধরেছে। মহিলাটির ইঙ্গিতের অর্থ কি আমি বেশ বুঝতে পেরেছিলাম। নিজেকে আর সংযত রাখতে না পেরে নবাগত অতিথিদের ভীড় ঠেলে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। অভিনন্দন জানানাে দূরের কথা, কেউই আমার সঙ্গে কথা পর্যন্ত বােলল না। তার আচরণ থেকে বেশ বুঝতে পারলাম যে আমার এই অনধিকার প্রবেশকে তিনি কোনমতেই অনু- মােন কোরতে পারেন নি। আমি কিন্তু মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার দিকে চেয়ে ছিলাম। তিনি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে সকলের কাছে বিদায় নিয়ে বােললেন, “আমি আজ বড়ই পরিশ্রান্ত, মাপ করবেন, আর থাকতে পাচ্ছিনা চোললাম, আবার আসবাে, নমস্কার।” আমার দিকে চেয়ে একটু মাথা নেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় তাকে অনুসরণ কোরলাম। নিমন্ত্রিত সকলেই আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন, আমিও লজ্জায় অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু নিজেকে আর সামলাতে না পেরে তাঁর হাত ধরে ফেলতেই তিনি ১১০ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ঘুরে দাঁড়িয়ে আমার প্রতি জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ কোরলেন। একটু পরেই ক্রোধকে দমন করে এক ঝলক হাসি তুলে বােললেন, “ডাক্তার, আমার ছােট ছেলের ওষুধের কথা, আপনার মনে পড়ে গেছে, না? আপন ভােলা বৈজ্ঞানিক মানুষ আপনারা, আপনাদের কথাই আলাদা।” র এই উপস্থিত বুদ্ধি দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। পকেট থেকে নােটবুক বার করে একটা মেকী প্রেক্রিপসন্ লিখে তার হাতে দিতে তিনি সেটা নিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে পােড়লেন। সাধারণের সন্দেহের হাত থেকে তিনি আমাকে এইভাবে বাঁচিয়ে দিলেন। আমার কিন্তু মনে হােল, তিনি আমাকে কুকুরের মতােই ঘৃণার চোখে দেখে থাকেন। আমি ঘরের মধ্যে দিয়ে টতে টতে কাঠের তাকের কাছে গিয়ে বােতল থেকে চার পাঁচ পেগ মদ ঢেলে খেয়ে নিলাম। এততাই দুৰ্বল বােধ করছিলাম যে মদ না খেয়ে আমার পক্ষে এক পাও চলা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। পাশের দরজা দিয়ে চোরের মত চুপি চুপি বেরিয়ে গেলাম। ভাবলাম, প্রচুর মদ খেয়ে অদৃশ্য জগতের মধ্যে তলিয়ে গিয়ে, সব ভুলে যাবে, কিন্তু তা হােল না। মহিলাটীর বিদ্রুপের হাসি আমার কানে এসে প্রবেশ কোরছিল। সমুদ্রের ধারে বিচরণ কোরতে কোরতে হঠাৎ মনে হােল, একটা পিস্তল সঙ্গে আনলাম না কেন; তাহলে একটা সমস্যার সমাধান হােয়ে যেতাে। ক্লান্ত হােয়ে হােটলে ফিরে গেলাম ; আত্মহত্যা কোরতে যে ভয় পেয়েছিলাম, তা ভাববেন না। কর্তব্যের কথা স্মরণ করে আমাকে আত্মহত্যা স্থগিত রাখতে হােল। ভাবলাম, আমার সাহায্যের তাঁর একান্ত প্রয়ােজন রয়েছে। আর দু'দিন পরেই মহিলাটীর স্বামীর আসার কথা। গােপনীয় ব্যাপারটা বেরিয়ে পােড়লে মহিলাটীর যে লজ্জায় অপমানে মাথা কাটা যাবে।

পরিহাস ১১১ কি ভাবে তার কাছে এগিয়ে বলা যায় যে আমি তাকে সাহায্য কোরতেই এসেছি; এইরকম ভাবতে ভাবতে একটা-চেয়ার টেনে বসে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ক'রে একটা চিঠি লিখলাম। চিঠিতে আরও জানালাম যে আমার কাজ হয়ে গেলেই চিরকালের জন্য তার কাছ থেকে বিদায় গ্রহণ কোরব। আমার লেখার ভাষা ও ভাব দেখলে লােকে হয়তাে পাগলের চিঠি বলেই মনে কোরত। চিঠিখানা শেষ করে ওঠার সময় আমার মাথা যেন ঘুরতে লাগলো। এক গ্লাস জল খেয়ে খামের মধ্যে চিঠিটা পুরে তার পেছনে লিখে দিলাম, আপনার ক্ষমার প্রত্যাশায় এখানে রইলাম ; আজ সন্ধ্যার মধ্যে যদি আপনার কাছ থেকে কোন জবাব না পাই, তাহােলে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা, জানবেন। চিঠির উত্তরের অপেক্ষায় বসে রইলাম।” এইভাবে চুপ করে বসে সারাদিন কাটিয়ে দিলাম ; অনুভব কোরলাম সেই পুরােনাে মানসিক ব্যাধিটা আমার ওপর ভূতের মত চেপে বসেছে, এর থেকে যেন নিষ্কৃতি নেই। এইরকম ভাবছি এমন সময় হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল। একটী দেশী বালক এক টুকরো কাগজ এনে আমার হাতে তাতে লেখা ছিল, “ভয়ানক দেরী হয়ে গিয়েছে, যাহােক, আপনি এখন হােটেলে অপেক্ষা করুন, সম্ভবত শেষের দিকে আপনার সাহায্যের প্রয়ােজন হবে।” আমার জবাব তিনি দিয়েছেন, এই ভেবে একটু আনন্দ বােধ কোরলাম। আমাকে বেঁচে থাকতেই হবে ; আমার সাহায্য না হােলে ' যে তার চলবেনা, এই রকম ভাবতে ভাবতে চিঠিটা হাতে নিয়ে তাতে চুম্বনের প্রলেপ দিলাম ; ক্রমশঃ মনে হােতে লাগলাে যেন জ্ঞান হারিয়ে ফেলছি। তন্দ্রাচ্ছন্নভাবে আমার চার ঘণ্টা কেটে গেল। ক্রমশঃ সন্ধ্যা ঘনিয়ে দিল ;

১১২ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প এলাে। দরজায় একটা টোকা মারার আওয়াজ হােতে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম যে সেই চীনা বালকটা দাড়িয়ে আছে। সে বােলল, “আমার সঙ্গে শীঘ্র চলে আসুন, দেবী কোরবেন না। তাকে অনুসরণ করে নীচে নেমে গাড়ীতে উঠে পােড়লাম। গাড়ী ছেড়ে দিতে তাকে জিজ্ঞাসা কোরলাম, “ব্যাপার কি বল তে, কি হয়েছে?” ছেলেটী উদাস দৃষ্টিতে ঠোট দুটী কামড়ে আমার দিকে তাকাল। বহু প্রশ্ন করে তার কাছে কোন জবাব না পেয়ে রাগ হােল ভাবলাম, দু’এক ঘা বসিয়ে দিলে হয়, কিন্তু তার বিশ্বস্ততা দেখে করুণায় আমার মন আদ্র হােয়ে গেল; হাত আর এগুল না। কোচম্যান্ ঘােড়াগুলির ওপর সজোরে চাবুক চালাতে এত জোরে গাড়ী চলতে লাগলাে যে চাপা পড়ার ভয়ে রাস্তার লােকগুলিকে ছুটে পালাতে হচ্ছিল। আমরা আস্তে আস্তে ইউরােপীয়ানদের বসতি পেরিয়ে চীনাদের বস্তিতে এসে পােড়লাম। এখানে গাড়ীটা একটা সরু গলির সামনে এসে থামলাে। বস্তির পাশে হােটেল থেকে একটা দুর্গন্ধ বেরিয়ে আসছিল কয়েকটা ঘরের মধ্যে আফিংএর আড্ডা চলেছে আবার দু’চারখানি ঘরের সামনে বেশ্যারা দাড়িয়ে রয়েছে। এই ধরণের পারিপার্শ্বিকতার মধ্য দিয়ে নিয়ে গিয়ে সে আমায় একটা ঘরের সামনে এনে হাজির কেরিল। দরজায় ধাক্কা দিতে একটী চীনা মহিল, চীৎকার করে বেরিয়ে এলাে। আমি ছেলেটিকে সঙ্গে করে সরু পথ ধরে আর একটি ঘরের সামনে এসে পৌছলাম। দরজাটা খুলতেই একটা গুনাে আওয়াজ এসে আমার কানে বাজলাে। অন্ধকারে কিছু ঠিক কোরতে না পেরে শব্দটাকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেলাম ; ছেলেটী কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাে পরিহাস ১১৩ উঠলাে । আমি একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলাম যে আমার সেই পরিচিত মহিলাট একটা নােংরা মাদুরের ওপর পােড় অসহ্য যন্ত্রনায় ছটফট্‌ কোরছেন ; অন্ধকারে তাঁর মুখখানা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না ; তার গায়ে হাত দিয়ে বুঝলাম, খুব জ্বর হহয়েছে। তার অবস্থা অনুভব করে আমার গা শিউরে বােঝা গেল, আমার কাছে সাহায্য না পেয়ে তিনি চীনা ধাত্রীর শরণাপন্ন হন। আমার ব্যাবহার ও অন্যায় দাবীতে তিনি এতই কষ্ট হেয়েছিলেন যে এই অশিক্ষিত চীনা ধাত্রীর হাতে মরাও শ্রেয় জ্ঞান কোরেছিলেন। আলাের জন্যে চীৎকার করতে নাস একটা কেরােসিনের আলাে এনে হাজির কোরল। মনে হােল, তার গলাটা টিপে ধরি আবার ভাবলাম, তা কোরেই বা কি ভ হবে। আলাের আভায় আমি অভাগিনীর দেহটা দেখতে পেলাম। আমার মন থেকে আস্তে আস্তে ভয় চলে যাওয়াতে ভাবলাম, আমি ডাক্তার হিসেবে একজন মুমূষু রােগীর চিকিৎসা কোরতে এখানে এসেছি। মাথা পরিষ্কার করে নিয়ে মহিলাটীকে বাঁচাতে হবে, ঠিক কোরলাম। যে দেহের প্রতি আমি প্রবল ভাবে আসক্ত হয়েছিলাম, রুগ্নার সেই নগ্ন শরীরের ওপর হাত চালাবার সময় আমার মনে কোনই চাঞ্চল্য এলাে• না। ভাবলাম, কোন রকমে যদি মৃত্যুপথের যাত্রীকে ফিরিয়ে আনতে পারি। চিকিৎসার ভ্রান্তিতে তার শরীর থেকে অবিশ্রাম রক্ত ধারা বয়ে যাচ্ছিল। ভাবলাম, এই অপরিচ্ছন্ন নােংরা স্থানে কি ভাবে রক্তস্রাবকে বন্ধ করা যায় ; সামনে পরিষ্কার জল অথবা কাপড় কিছুই মিললাে না। মুমূর্ষ রােগীকে সম্বােধন করে বললাম, “আপনাকে এখনই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার।” তিনি একটু কেঁপে হাত পা ছুড়ে ৮ ১১৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প বলে উঠলেন, “না, ন, তা হােতে পারে না; এখানে মরে যাই সেও ভাল, কেউ যে আমার কথা জানতে পারবে, তা হবে না, হবে না ; আমায় আপনি বাড়ী নিয়ে চলুন বাড়ী নিয়ে চলুন।” বুঝতে পারলাম, জীবনের চেয়েও চরিত্রের দাম তার কাছে অনেক বেশী। আমরা একটা চৌকিতে করে তাঁর অর্ধমৃত দেহটাকে বহন করে নিয়ে এসে বাড়ীতে তার নিজের ঘরের মধ্যে শুইয়ে দিলাম। অনুভব কোরলাম, তিনি জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছেছেন। ভদ্রলােকটা আমার হাত জড়িয়ে ধরে বেদনা জড়িত স্বরে চীৎকার করে উঠলেন। তারার আলােয় আমি তার ঝকঝকে দন্তপংক্তি ও চশমার কাচ দুটী দেখতে পেলাম। তিনি বেশ চড়া গলায় আরম্ভ কোরলেন—আপনি তাে সাধারণ একজন ভ্রমণকারী মাত্র। মৃত্যুর যে কি ভীষণ যাতনা, আপনি কি তা অনুভব কোরতে পারেন ? মৃতপ্রায় ব্যক্তি বাঁচবার জন্য যে প্রবল সংগ্রাম করে থাকে আপনি কি তা কখনাে লক্ষ্য কোরেছেন? আপনি সামান্য একজন ভূপৰ্যটক মাত্র, এ সবের সম্বন্ধে আপনার কোন ধারণাই আসতে পারে না। মুত্যু যে কী ভীষণ হতে পারে, ডাক্তারী জীবনে আমি তা লক্ষ্য করেছি ; বহু মুমূষুর পাশে বসে জীবনের দীপশিখা নিভে যেতে দেখেছি। কত অনুরােধ কোরলাম, কিন্তু মহিলাটী কোন মতেই হাসপাতালে যেতে রাজী হােলেন না। নিরুপায়ের মত তার পাশে বসে মৃত্যু যন্ত্রণা দেখতে হােল। আমি বুঝতে পারি না, তার সঙ্গে শুশ্রুষাকারী কেন মরে গেল না ; আবার পরের দিন সকালে উঠে আমার সাধারণ ভাবে জীবন যাপন করা, এসবের কি মূল্য? তাকে বাঁচাবার জন্য এত চেষ্টা কি ব্যর্থ হবে ? কোন ফলই কি মিলবে না ?

পরিহাস চীনা বালকটা মেঝের ওপর নতজানু হয়ে বসে ঈশ্বরের কাছে তাঁর জীবন ভিক্ষা কোরছিল ; মাঝে মাঝে ব্যাকুল নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, কোন রকমে আমি যদি তাকে বাঁচাতে পারি। চীনা বালকী রক্তদান করে তাকে বাঁচাতে প্রস্তুত ছিল ; আমিও তা কোরতে পারতাম। আবার মনে হােল, রক্ত সঞ্চারণ করে লাভই বা কি হবে, তার কষ্ট বাড়ানাে ছাড়া আর তাে কিছুই হবে না। আমি ও চীনা বালকটী তার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত ছিলাম। ভাবুন, তার কি ক্ষমতাই না ছিল । প্রত্যুষে তার জ্ঞান ফিরে এলাে। তার সেই সময় কার চাহনির মধ্যে একটুও গর্বের চিহ্ন ছিল না ; আমার দিকে হতভম্ব হয়ে তিনি তাকিয়ে রইলেন। তার দৃষ্টি থেকে মনে হােল, আমাদের গত ঝগড়ার কথা জঁর মনে পড়ে গেছে ; ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেই যেন তিনি শান্তি পান। শান্ত স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তিনি বসবার চেষ্টা করে কথা বােলতে উদ্যত হােলেন। আমি তাকে শুয়ে থাকতে অনুরােধ কোরলাম। তার কথা জড়িয়ে আসছিল। অস্পষ্ট গলায় চুপি চুপি তিনি বলে উঠলেন, “কেউ যেন আমার কথা না জানতে পারে।” প্রতিশ্রুতি দিলাম, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন যে আপনার কথা পৃথিবীতে আর কেউই জানতে পারবে না।” লক্ষ্য কোরলাম, তার চোখ থেকে একটা অস্বস্তির ভাব ফুটে বেরুচ্ছে। অতি কষ্টে শুধু তিনি এই কথাটী উচ্চারণ কোরলেন, “আমার কাছে প্রতিজ্ঞা করুন যে একথা কেউ জানতে পারবে না; প্রতিজ্ঞা করুন।” আমি হাত তুলে শপথ জানালাম। এবারে তিনি আমার দিকে কৃতজ্ঞতাসূচক নেত্রে চাইলেন। এত অন্যায় করা সত্ত্বেও তিনি আমায় ক্ষমা কোরলেন। আরেকবার কথা বােলতে চেষ্টা কোরলেন ; • কিন্তু হায়, সব চেষ্টাই আমার ব্যর্থ হােল; শান্তিতে ১১৬ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প • , যেন গভীর নিদ্রায় তিনি অভিভূত হয়ে পােড়লেন। দিবা অবসানের আগেই সব শেষ হয়ে গেল। চারিদিক নিঃস্তব্ধ। কথা পােলতে বােলতে অবসাদে ভদ্রলােকের মুখটা আচ্ছন্ন হয়ে এলাে, চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন। তারাগুলি আকাশ থেকে ক্রমশঃ মিলিয়ে যেতে লাগলাে; চারিদিক ফর্সা হয়ে এলো। আলােয় লক্ষ্য কোরলাম, তার মুখখানি বিষাদে পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। তিনি গল্পের যােগসূত্রটা ধরে আবার আরম্ভ কোরলেন,--অবস্থাটা ভেবে দেখুন। তিনি তো গত হেলেন, কিন্তু তার মৃতদেহের পাশে আমায় বসে থাকতে হোল। এরকম জায়গায় কতরকম মিথ্যা আজগুবি কথা নিয়ে আলােচনা হয়। আমার সেখান থেকে এক পাও নড়ার উপায় ছিলনা, কারণ আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে ব্যাপারটা কেউই জানতে পারবে না। চিন্তা করুন, মহিলাটা সেখানকার ভদ্র সমাজে মেলামেশা কোরতেন, আগের দিন সন্ধ্যায় গভর্ণমেন্ট হাউসে নেচে পর্যন্ত এসেছেন। এখন ঘটনাটা চারিদিকে ছড়িয়ে পােড়বে, আর আমাকে এই মৃত্যুর সঠিক কারণ সকলের কাছে ব্যক্ত কোরতে হবে। ভাবলাম, সহকারী ডাক্তারের কাছে এ দায়িত্ব দিয়ে সরে পড়লেই তাে পারি। কি মুস্কিলেই যে পড়েছিলাম, কি বােলব। চীনা বালকটাকে বললাম, “তাের প্রভুর শেষ ইচ্ছা ছিল, ঘটনাটা যেন কেউই না জানতে পারে ; তা কি তুই জানিস ?” সে সরলভাবে উত্তর দিল, “হ্যা, আমি জানি।” মেঝের রক্ত ও ময়লা ধুয়ে মুছে ঘরটাকে সে এমনভাবে পরিষ্কার করে সাজিয়ে ফেললো যে কারুর মনে একটুও সন্দেহের উদ্রেক না হতে পারে। অনুভব করলাম, আমার কর্মক্ষমতা যেন অসম্ভব রকম বেড়ে গেছে।

। পরিহাস ১১৭ ; যখন একজন সব হারাতে বসে তখন একটা সামান্য বস্তুকেও কেন্দ্র করে সে বেঁচে থাকতে চায়। আমার অবস্থাও হয়েছিল ঠিক সেই রকম। তার সেই অনুরােধটুকুই ছিল আমার শেষ সম্বল ; সেইটেকে বজায় রাখাই হােল আমার শেষ কর্তব্য। মনকে সংযত করেছিলাম ; ভাবলাম, যদি কেউ তার মৃত্যুর অনুসন্ধান করে, তাহলে একটা ব্যাধির নাম করে দেওয়া যাবে বেটা সচরাচর গ্রীষ্মপ্রধান দেশে হয়ে থাকে। আমি তাে ডাক্তার আমার কথায় কেউই অবিশ্বাস কোরতে পারেনা। সাধারণ লােকে অনুসন্ধান কোরতে, আমি বােললাম যে মহিলাটা পীড়িত হবার সঙ্গে সঙ্গেই চীনা চাকরটীকে দিয়ে আমায় ডেকে পাঠান। আমি প্রধান চিকিৎসকের জন্যে অপেক্ষা কোরছিলাম, তারই মৃতদেহ পরীক্ষা করার কথা। ন'টার সময় তিনি উপস্থিত হেলেন। আমাকে বদলী করার ক্ষমতা তার হাতের মধ্যেই ছিল। ভদ্রলােক আমার হাত যশের জন্য ঈর্ষান্বিত ছিলেন। তার ঘরের মধ্যে প্রবেশ কোরতে, তিনি আমায় প্রশ্ন কোরলেন, “ম্যাডাম ব্লাঙ্ক, কি মারা গেছেন ?” আমি উত্তর দিলাম -আজ্ঞে হঁা, আজ সকাল ছ'টায় । তিনি আবার প্রশ্ন কোরলেন,-আপনাকে তিনি কোন সময় ডেকে পাঠান ? আমি বােললাম,—গতকাল সন্ধ্যায় । ভদ্রলােক উত্তর দিলেন,—জানেন, আমিই তার বাড়ীর ডাক্তার ; একথা জেনেও আপনি আমায় ডাকলেন না কেন ? আমি বােললাম,-ডাকবার আর সময় ছিলনা, আমার ওপর তিনি নির্ভরশীল হয়ে বলেছিলেন, আমি যেন আর অন্য কোন ডাক্তারকে না ডাকি।

১১৮ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প তিমি রাগান্বিত স্বরে উত্তর দিলেন,—আপনি আপনার কর্তব্য কোরেছেন বটে, কিন্তু আমায় পরীক্ষা করে দেখতে হবে, এই অকস্মাৎ মৃত্যুর প্রকৃত কারণটা কি। কোন উত্তরই আমার মুখে এলাে না। ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে তিনি সেই মৃতার দেহ পরীক্ষা কোরতে উদ্যত হয়েছেন এমন সময় আমি বলে উঠলাম, “মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করে কি হবে, আমি আপনাকে সব খুলে বলে যাচ্ছি, শুনুন। ম্যাডাম ব্লাঙ্ক, একজন দেশী চীনা নাসকে দিয়ে গর্ভপাতের চেষ্টায় অকৃতকার্য হয়ে আমায় ডেকে পাঠান। পৌছলাম, রােগীর অবস্থা তখন খুবই খারাপ। তাকে কোনমতেই বাঁচান গেলনা। । মৃত্যুর পূর্বে আমাকে তিনি মিনতি করে বলেছিলেন, তার কলঙ্ক যেন কেউ না জানতে পারে। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তার এ অনুরােধ আমি রক্ষা কোরব। ভদ্রলােক একটু বিদ্রুপের সঙ্গে উত্তর দিলেন, “আপনি কি চান, আপনার কলঙ্ককে আমি চেপে যাব ?” আমি উত্তর দিলাম,--আপনি ব্যাপারটা ভাল করে বুঝে দেখুন। তার এই কলঙ্কে অন্য লােক লিপ্ত ছিল। আপনি ভুল বুঝবেন না, 'আমি এর মধ্যে নেই। আমি এপাপে লিপ্ত হলে, নিশ্চয় আমায় জীবিত অবস্থায় দেখতে পেতেন না। মহিলাটীর চরিত্র মসীলিপ্ত না করে আপনি অপরাধীকে অভিযুক্ত কোরতে পারেন না। এতে আমারও প্রাণে বড় ব্যথা লাগবে, জানবেন। ডাক্তার জবাব দিলেন, এতে আপনার ব্যথিত হবার কি আছে ? আপনি যে প্রভুর মত ভৃত্যকে আজ্ঞা কোরছেন, দেখতে পাচ্ছি। পরীক্ষা পরিহাস ১১৯ করে মৃত্যুর সঠিক কারণ লিখে যাব। মেকী সার্টিফিকেট কোন মতেই দিতে পারবনা। আমি উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলাম,—আপনাকে দিতেই হবে, তা না হােলে জীবিত অবস্থায় এ ঘর থেকে আর বেরুতে হবেনা। আমি খালি পকেটে হাত দিয়ে একটা পিস্তল ওঠাবার ভাণ কোরতেই তিনি ভয়ে পেছিয়ে গেলেন । আবার আরম্ভ কোরলাম,আমার জীবনকে সামান্যই জ্ঞান করে থাকি। মহিলাটীকে যে প্রতিশ্রুতি আমি দিয়েছি তা পালন কোরবই। শুনুন, আপনি সার্টিফিকেটে লিখে দিন, কোন এক সংক্রামক ব্যাধিতে মহিলাটী আক্রান্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় ; তাতেই মৃত্যু ঘটে। আমার অনুরােধ রক্ষা করুন, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, এক সপ্তাহের মধ্যে প্রাচ্যদেশ ছেড়ে চলে যাব । এতেও যদি সন্তুষ্ট না হন আমি এমন কথাও বলছি যে মহিলাটীকে কবর দেবার পর, রিভলভারের গুলিতে আমার মাথার খুলি নিজেই উড়িয়ে দেব। এতে আপনি নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট হবেন আশা করি। আমার উত্তেজিত কণ্ঠস্বরে তিনি বেশ ভয়ে পেয়ে গেলেন। তিনি আবার আরম্ভ কোরলেন,—জীবনে আমি কারুকে এই ধরণের মেকী সার্টিফিকেট দিইনি। এরকম কাজ আমার কাছে অধৰ্ম্ম বলে মনে হয়। আমি বােললাম,—আপনি ঠিক বলেছেন, এ ধরণের কাজ কোরতে আপনাদের আত্মসম্মানে বাধে, কিন্তু এটা একটা গুরুতর ব্যাপার। বুঝতে পারছেন, এ ক্ষেত্রে সত্য ঘটনাটা বেরিয়ে পােড়লে, জীবিত ভদ্রলােকটীকে সারা জীবন মানসিক অশান্তি নিয়ে কাটাতে হবে, আর তার সঙ্গে মৃতা ১২০ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প নারীর কলঙ্কও চারিদিকে ছড়িয়ে পােড়বে। আপনি কেন এত বিচলিত হচ্ছেন ? মত দিয়ে ফেলুন। ০ ভদ্রলােক সম্মতি জানাতে আমরা দুজনে মিলে সার্টিফিকেটের খসড়া তৈরী করে ফেললাম। এরপর তিনি উঠে দাড়িয়ে বােললেন, আপনি জাহাজে করে সামনের সপ্তাহে ইউরােপে রওনা হবেন । উত্তরে আমি বােললাম, “নিশ্চয়ই, সে প্রতিশ্রুতি তাে আগেই আমি দিয়েছি।” ভদ্রলােকের আচরণে ও কথাবার্তায় মনে হচ্ছিল, ব্যবসাদারী বুদ্ধিতে তিনি ওস্তাদ। মানসিক চঞ্চলতাকে চাপা দেবার জন্য তিনি আরম্ভ কোরলেন, “ভদ্রলােক সম্ভবতঃ স্ত্রীর মৃতদেহ ইংলণ্ডে নিয়ে যাবেন। বড় লােকের খেয়াল তাে। আপনি ভাববেন না, আমি কফিন তৈরী করিয়ে তার মধ্যে মৃত দেহটি খুব ভাল করে শীল করার ব্যবস্থা করে দেব। ভদ্রলােক এলেই বুঝতে পারবেন যে এরকম গ্রীষ্মপ্রধান দেশে, মৃতাকে নিয়ে তাঁর আগমন প্রতীক্ষা করে বসে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।” এই সামান্য সময়ের মধ্যেই ভদ্রলােকটী আমার বন্ধুতে পরিণত হয়ে গেলেন ; অবশ্য এর প্রকৃত কারণ হােল, আমার কাছ থেকে চিরকালের মত নিষ্কৃতি লাভ করে তিনি পুরােদস্তুর লাভবান হবেন। এর একটু পরেই আমার সঙ্গে করমর্দন করে তিনি বলে উঠলেন, “আশা করি আপনি শীঘ্রই সেরে উঠবেন।” তাঁর কথা থেকে মনে হােল, তিনি আমায় ব্যাধিগ্রস্থ অথবা উন্মাদ ভাবলেন নাবি? তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই আমার পরিহাস ১২১ শরীর অবসন্ন হয়ে এলাে। মৃতার শয্যার পাশে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম । কতক্ষণ এইভাবে অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলাম জানিনা। হঠাৎ কাণের মধ্যে একটা আওয়াজ প্রধেশ কোরতে চোখ মেলে দেখলাম, চীনা বালকটা দাড়িয়ে আছে। সে বােলল, “কে একজন ভদ্র- লােক এসেছেন”। আমি বোললাম,-যেই হােক, খবরদার, ভেতরে আসতে দিবি না। ছেলেটা কথা বােলতে গিয়ে থেমে যাচ্ছিল, আমি জিজ্ঞাসা কোরলাম, “কে সে লােকটা?” সে শুধু বােলল, “সেই লোকটা”। মনে হোল, লজ্জায় সে কোন নামই বােলতে পারছিল না। আমি তার কথার ভাবেই বুঝে নিলাম লােকটা কে । আপনি হয়তাে শুনলে অবাক হয়ে যাবেন যে ভদ্রমহিলা আমার অন্যায় দাবীটা প্রত্যাখ্যান করার পর থেকে গােপনীয় ব্যাপারে লিপ্ত ভদ্র- লােকটির কথা একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম। লােকটীকে ভালবেসে কোন দুব্বল মূহুর্তে মহিলাটা দেহ দান করে আমার অন্যার দাবীকে কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান কোরেছিলেন। আগে হলে, হয়তাে তাকে টুকরো টুকরাে করে ছিড়ে ফেলতাম, কারণ সেই ছিল তার আসল প্রণয়ী। পাশের ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখতে পেলাম একটা সুন্দর তরুণকে, বেদনায় তার মুখখানা যেন ভরে গিয়েছে ; একটা তরুণসুলভ কোমলতাও তার মধ্যে দেখতে পেলাম। নমস্কার কোরতে গিয়ে তার হাতটা কেঁপে গেল, ভাবলাম, তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করি। প্রকৃত প্রেমিক হােতে গেলে যে ক'টি গুণের '১২২ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প - প্রয়ােজন, সব কটিই তার মধ্যে রয়েছে, লক্ষ্য কোরলাম। মহিলাটি যে তার প্রতি আসক্ত হবেন, এতে আশ্চর্য হবার কি আছে? অশ্রুসিক্ত নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে সে শুধু একবার বােলল, “আমি ম্যাডাম ব্লাঙ্ককে মাত্র একবার দেখতে চাই।” তরুণের কাধে হাত দিয়ে ঘরের দিকে নিয়ে যাবার সময়, কৃতজ্ঞতা- সূচক নেত্রে সে আমার দিকে তাকালাে। মনে হােল, যেন ঠিক টানা- পােড়েনের সূতাের মত আমরা দুজনে আবদ্ধ হয়ে গেছি। দুজনেই মৃতার শয্যাপাশ্বে গেলাম, কাছে থাকলে যদি তার মনে সঙ্কোচ আসে, এই ভেবে আমি একটু দূরে সরে গেলাম। হঠাৎ যুবকটি অভিভূত হয়ে মাটিতে পড়ে গুমরে গুমরে কেঁদে উঠল। আমি আর কি করতে পারি, এই ভেবে তাকে তুলে, সঙ্গে নিয়ে সােফায় বসে পােড়লাম। সান্ত্বনা দেবার প্রয়াসে তার কুঞ্চিত সুন্দর চুলগুলির মধ্যে অঙ্গুলি সঞ্চালন কোরতে লাগলাম। যুবকটি আমার হাতটা মুঠোর মধ্যে নিয়ে করুণনয়নে জিজ্ঞাসা কোরল, “ডাক্তার, আমায় বলুন, সত্যিই কি তিনি আত্মহত্যা কোরেছেন ?” আমি বােললাম—“না” । তরুণটি আবার জিজ্ঞাসা কোরল,—তাহলে কি এর জন্য অন্য কেউ । দায়ী ? পুনরায় আমি বােললাম,-কেউই না, এ শুধু নিয়তিরই পরিহাস। * সে চেঁচিয়ে বলে উঠলাে,-আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। গতরাত্রের ঠিক আগের রাত্রে তার সঙ্গে নাচঘরে আমার দেখা হয়েছিল। শীঘ্র কি করে তিনি মরতে পারেন ? আমি নানারকম মিথ্যা কথা বলে, প্রকৃত ঘটনাটা চেপে গেলাম। পাছে মৃতার প্রেমিকের মনে কোন আঘাত লাগে, সেদিকে আমায় বেশ । পরিহাস ১২৩ । লক্ষ্য রাখতে হয়েছিল। তাকে আমি জানতে দিইনি যে মহিলাটি গর্ত- পাতের জন্য আমার কাছে এসেছিলেন, আর তার সেই অনুরােধ আমি প্রত্যাখ্যান করেছি। তার সঙ্গে দুদিন ধরে ' শুধু মহিলাটিকে নিয়ে আলােচনা হয়েছিল। কফিন বন্ধ করবার পর মৃতার স্বামী এসে হাজির হলেন। চারদিকে নানারকম আজগুবী ধরণের খবর ছড়িয়ে পােড়ছিল। ভদ্রলােক সন্দিগ্ধ- চিত্তে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করার জন্য আমার খোঁজ কোরছিলেন । যে নারী তার হাতে নির্যাতিত হয়েছে, তার সঙ্গে দেখা কোরতে আমার প্রবৃত্তি হােল না। চারদিন ধরে নিজের ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রইলাম। মৃতার প্রেমিক আমার জন্য ছদ্মনামে একটা পাপাের্ট সংগ্রহ করে দিল, সেটা নিয়ে গভীর রাত্রে আমি সিঙ্গাপুরগামী জাগজে আরােণ কোরলাম। আমার যা কিছু ধন, দৌলত সবই পেছনে ফেলে এলাম। তাঁর জন্য আত্ম- সম্মানকেও জলাঞ্জলি দিয়ে এলাম। বাড়ীর ওই আবহাওয়ার মধ্যে বাস করে আমার প্রাণ হাঁফিয়ে উঠেছিল, তাই রাত্রে চুপি চুপি বেরিয়ে পড়ে- ছিলাম তাকে ভােলবার জন্য, তাঁর স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলবার জন্য। আমার সে চেষ্টা ব্যর্থ হােল। মধ্যরাত্রে আমার বন্ধুর সঙ্গে জাহাজে উঠেছি, এমন সময় লক্ষ্য পােড়ল, কপিকলে করে পেতলে মােড়া একটা কফিন তােলা হচ্ছে । মনে হােল, আমি যেমন তাঁকে পাহাড় থেকে সমুদ্রের তীর পর্যন্ত অনুসরণ করেছি, এই কফিনটাও ঠিক তেমনিভাবে আমার পেছু নিয়েছে ; এ থেকে যেন নিষ্কৃতি নেই।' কফিনের পাশেই মৃতার স্বামী দাড়িয়ে- ছিলেন ; সেদিকে চাইতে আর আমার ইচ্ছা হল না। বুঝতে পারলাম, ১২৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ভদ্রলােক ইংলণ্ডে গিয়ে মৃতার দেহ পরীক্ষা করিয়ে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় কোরতে চান। ঠিক কোরলাম, যাই হােক, এই কফিনটাকে আমি শেষ পর্যন্ত অনুসরণ করে যাব আর প্রাণ দিয়ে চেষ্টা কোরব, যাতে 'ভদ্রলােক স্ত্রীর মৃত্যুর কারণটা জানতে না পারেন । এখন আপনি বুঝতে পারছেন, কেন আমি যাত্রীদের অনর্গল হাসি আর কলরব সহ কোরতে পারিনা। তার মৃতদেহ এই জাহাজের নীচের তলায় রয়েছে। দিবারাত্র শুধু সেই কফিনের কথাই আমার মনে হচ্ছে ; মৃতার সেই অন্তিম অনুরােধের কথা আমার মনে পড়ে যাচ্ছে। যেরকম কোরেই হােক, আমার সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা কোরতে হবে। এখনও ভয় হচ্ছে, বুঝিবা গােপন কথাটা বেয়িয়ে পড়ে ; যেমন ভাবেই হােক, তার সুনাম রক্ষা আমি কোরব। জাহাজের মাঝখান থেকে হঠাৎ কিসের একটা আওয়াজ হােতে ভদ্রলােক লাফিয়ে উঠে বােললেন, “এখানে আর আমি বােস না।” নেশার ঘােরে ভদ্রলােকের চোখ দুটি রক্তবর্ণ হােয়ে উঠেছিল। তার এই আকস্মিক আচরণে আমি একটু অবাক হয়ে গেলাম। আমার কাছে এইভাবে তার হৃদয় উন্মুক্ত করার জন্য তিনি বেশ একটু লজ্জা বােধ কোরলেন। বন্ধুত্বসূচক স্বরে আমি বােললাম, “আজ সন্ধ্যায় আমার কামরায় দয়া করে কি পায়ের ধূলাে দেবেন ?” প্রত্যুত্তরে তিনি বিদ্রুপের সঙ্গে পরিহাস ১২৫ একটু হেসে ঠোট দুটি কামড়ে বােললেন, “ধন্যবাদ, আমার একা থাকাই ভাল। আরেকটা কথা শুনবেন ?” আমি বােললাম--বলে যান। ভদ্রলোক বােললেন,-কল্পনাও কোরবেন না যে সব কথা আপনাকে খুলে বলে আমি সান্ত্বনা লাভ করেছি। জানেন, আমার জীবনটা ভেঙ্গে টুকরাে টুকরাে হয়ে গেছে। এ’বে জোড়া লাগাবার কোন উপায় দেখছি না। ডাচ, উপনিবেশে চাকরী করে আমার কোন লাভই হোল না। পেন্সন বন্ধ হয়ে গেল। এখন আমায় জাম্মানীতে ভিখারীর মত কপর্দক- হীন হয়ে ফিরতে হবে। বেশ বুঝতে পারছি, আমার দিন ঘনিয়ে আপনার সঙ্গ লাভ কোরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। নিচ্ছন কামরার মধ্যে আমার সময় কাটাবার একমাত্র সাথী হল, সুরা ; শুধু এই জিনিসটা আমার প্রাণে এনে দিতে পারে নিবীড় শায়ি। আর এক দোযরের কথা আপনাকে বােতে ভুলে গেলাম, সেটা হচ্ছে পিস্তল। স্বীকারোক্তিতে যে অন আমি লাভ কোরলাম, তার থেকে আমার আত্মার মধ্যে অনেক বেশী শা; আনয়ন কোরবে এই পিস্তল। তিনি একটু থেমে আবার আরম্ভ কোরলেন, “আপনাকে আটকে রেখে আর আমি কষ্ট দিতে চাই না” । তার চাহনি থেকে বেশ বুঝতে পারলাম, তার অন্তরের মধ্যে একটা অস্বাভাবিক রকমের লজ্জা আশ্রয় করে রয়েছে। আমাকে আর একটি কথা না বলে তিনি কামরার দিকে চলে গেলেন। গভীর রাত্রে ডেকের ওপর কয়েকবার অন্বেষণ কোরেও তার দেখা পেলাম না। এদিক ওদিক তাকিয়ে সেই শােকার্ত ডাচ, ভদ্রলােককে আবিষ্কার জাৰ্মাণীর সেরা গল্প করে ফেললাম। তিনি নীরবে আপনার মনে ডেকের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। নেপ বন্দরে জাহাজ এসে পৌঁছাবার পর অধিকাংশ যাত্রীরাই সেখানে নেমে গেল। তাদের সঙ্গে আমিও নেমে অপেরায় নাচ দেখে, একটা সুন্দর কাফেতে রাত্রির আহার শেষ কোরলাম। জাহাজে ফিরে আসার সময় একটা গােলমালের শব্দ আমার কাণে এসে পৌঁছল। দেখলাম, সামনেই নৌকোগুলি থেকে মাঝিরা টর্চ ফেলে কি যেন অন্বেষণ কোরছে। ব্যাপারটা কি, কিছুই বুঝতে পারলাম না । জাহাজটা জেনােয়ায় এসে পৌছাবার পর, একখানা খবরের কাগজ কিনে পােড়ছি এমন সময় একটা সংবাদের দিকে নজর পােড়তে চমকে উঠলাম। তার বিবরণটা হােল এই রকম, অন্ধকারের মধ্যে ডাচ, বন্দর হােতে আগত একটি মহিলার শবাধার জাহাজ থেকে নৌকোয় নামান হয়, মৃতার স্বামীও সেই নৌকোর মধ্যে ছিলেন ; নৌকোটা সামান্য একটু এগিয়েছে, এমন সময় একজন পাগল হঠাৎ জাহাজের ওপর থেকে লাফ দিয়ে নৌকোর ওপর পড়বার সঙ্গে সঙ্গেই ক’ফিন সমেত নৌকোটা ডুবে বায়। মৃতার স্বামী ও অন্যান্য আরােহীরা কোন রকমে বেঁচে যান। এই সংবাদের গায়েই আরেক যায়গায় লেখা রয়েছে-নেপক্স বন্দরের ধারে একজন অপরিচিত লােকের মৃতদেহ পাওয়া গেছে ; মৃত ব্যক্তির মাথায় একটা গুলির চিহ্নও রয়েছে- কোন লােকই মৃত ব্যক্তির সঙ্গে এই ঘটনার যােগ আছে বলে মনে করে না। এতক্ষণ যার কথা বলে গেলাম, কাগজটা পড়ার সময় শুধু সেই ভদ্রলােকের বিষাদপূর্ণ মুখখানিই আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগলাে। .

সরাইখানা ডাক পিয়নকে জিজ্ঞাসা কোরলাম,—যায়গাটার কি নাম বােলতে পার ? সে বােলল,ক্রানসা। আমি জিজ্ঞাসা কোরলাম,এখানে রাত্রে আরাম করে থাকবার কোন ব্যবস্থা আছে, বােলতে পার ? (म বােলল,—এখানে খুব ভাল একটা সরাইখানা রয়েছে ; কাছাকাছি এমন সুন্দর বিশ্রামের জায়গা আর কোথাও পাবেন না। এত পরিশ্রান্ত হয়েছিলাম যে আশ্রয়ের কথা কর্ণে প্রবেশ করাতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। অসুখ থেকে সবেমাত্র সেরে উঠেছি, তার ওপর আবার কয়েকশ' মাইল পথ এখনও পর্যন্ত যেতে বাকি রয়েছে। আমার সৈন্যদল পাপিগ নাতে বর্তমানে ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে। স্থানটির দূরত্ব এখান থেকে বড় কম হবেনা।. অরণ্যপরিবৃত পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত, সুন্দর সরাইখানার সামনে এসে পৌঁছলাম। পিয়ন টমাস গাড়ী থেকে মালপত্র নামিয়ে নিল। গৃহস্বামী আমাকে অভ্যর্থনা করে, ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে লােকজনদের মালগুলি তুলে আনতে হুকুম কোরলেন। ঘরখানি প্রশস্ত ও সুসজ্জিত। ছােট ছােট মেয়েদের মেলা বসেছে সেখানে। কেউ টেবিলের ওপর '।

১২৮ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প বসেছে, কেউ বা নীচে বসে আছে, দু'এক জন জানলার ধারেও গিয়ে দাড়িয়েছে। একজন সুন্দরী ষােড়শীও এক বছরের একটি শিশুকে কোলে নিয়ে অন্যজনদের সঙ্গে নাচতে আরম্ভ করে দিয়েছে। ঘরের কোণে একজন যুবক মাথাটা নীচের দিকে নামিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন কলরব ও নাচের শব্দে সে একটু যেন অস্বস্তি বােধ কোরছিল । গৃহস্বামী ঘরের মধ্যে ঢুকে বােললেন,-অ্যানেট, তুমি তােমার দলবল নিয়ে বাইরে বাও; আর ফ্যানী, তুমি আট নম্বর ঘরে এই ভদ্র- লােকের থাকার ব্যবস্থা করে দাও। করে দাও। শুধু আজকের রাত্রের মত ইনি এখানে থাকবেন। কিশােরী অ্যানেট ছছাটদের দলবল নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পােড়ল। সুন্দরী ফ্যানী নৃত্যচপল ভঙ্গিমায় যুবকটির কাছে এগিয়ে গিয়ে বােলল, “দার্শনিক, আমার ছােট বােনটিকে একটু আগলাতে হবে”। এই বলে শিশুটিকে তার কোলের ওপর ফেলে দিয়ে কাজ কোরতে চলে গেল। গৃহস্বামীকে সম্বােধন করে আমি বললাম, “আপনি খুবই ভাগ্যবান ; এ শিশু সন্তান আপনার, না ?” মি; আলব্রেট–অর্ধেকগুলি আমার বটে, আর অন্য যে সব শিশু দেখছেন তার আমার তৃতীয় মেয়ের জন্মােৎসব উপলক্ষে এখানে এসেছে। আমি জিজ্ঞাসা কোরলাম, “আপনার ক’টি ছেলে মেয়ে, মিঃ আলব্রেট ? মিঃ আলব্রেট বেশী নয়, মাত্র ছ’টি মেয়ে। আমি বােলে উঠলাম, “হায় ভগবান, সবই মেয়ে ! ছ'টিই মেয়ে।” মিঃ আলব্রেট-ক্যাপ্টে জানেন, মেয়েরা যদি সুন্দরী হয়, তাহলে বাপের মনে আনন্দের সীমা থাকে না। মেয়েদের জন্য বাপকে সকলেই তােমােদ করে থাকে। ফ্যানীর অবস্থা দেখে আমার ওই কথাই মনে 'সরাইখানা ১২৯ •• হয়। ফ্যানী চলে গেলে অ্যানেট তার পদাঙ্ক অনুসরণ কোরবে । অ্যানেট, বিদায় নিলে, জুলিয়েট তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে ; সে চলে গেলে, কেট তার স্থান দখল কোরবে। কেটের পরে আসবে সিলেস্টাইনের পালা আবার, পঞ্চম মেয়েটি বিদায় নিলে, যষ্ঠ মেয়ে লিসে এসে অভিনয়টা বজায় রাখবে। আমি বললাম,—সব ক’টি মেয়ে এই ভাবে স্বামী জুটিয়ে সরে পড়বে, এতাে ভাল নয় ; সব মেয়ে চলে গেলে আপনার অবস্থা কি হবে ? মিঃ আলব্রেট—আমি একেবারে অন্য ধরণে জিনিসটা ভেবে থাকি। এটা বুঝতে পারছেন না যে মেয়েদের বিয়ে দেবার পর, আমি কতটা লাভবান হবে ? চারদিক থেকে দাদু বলে ডাকতে থাকবে, সে আনন্দের অনুভূতিটা কি রকম হবে ভেবে দেখুন তাে একবার ? বললাম,-মিঃ আলব্রে, আপনি মনকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা কোরছেন। ভেবে দেখুন তাে, ছ’টি মেয়ের বদলে যদি ছ’টি ছেলে এসে ঘর আলাে কোরত, আপনার বুকটা কি আরাে বেশী আনন্দে ফুলে উঠতাে না? মিঃ আলব্রেট -বাপরে, অশান্ত ছেলেগুলাের ভাবনায় এতদিনে চুলগুলাে সব পেকে যেত। সৰ্ব্বক্ষণ তাদের চিন্তায় মনটা ভরে থাকতাে। বেঁচে থাক আমার মেয়েরা, এরাইতাে আমার মনকে এখনও পর্যন্ত সবুজ করে রেখে দিয়েছে। ছেলেরা বড় হলে তাদের মধ্যে কেউ হয়তাে ব্যবসাদার হয়ে সর্বক্ষণ হিসেব নিয়ে ব্যস্ত থাকতত, দ্বিতীয় জন দেশ রক্ষা করতে গিয়ে হাত পা ভেঙ্গে অকর্মন্য হয়ে পড়ত; তৃতীয় জন যুদ্ধে প্রাণ হারাতে ; চতুর্থজন জলে স্থলে ভ্রমণ করে বেড়াতে ; পঞ্চমটি টাকা পয়সা নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে, আর ষষ্ঠ বুদ্ধির দিক দিয়ে বাগকে ছাপিয়ে যেত।

জাৰ্মাণীর সেরা গল্প
ফ্যানী নৃত্যভঙ্গিমায় মাথা নীচু করে অভিবাদন জানিয়ে আমাকে
বােলল, “থাকবার সবকিছু বন্দোবস্ত করে দিয়েছি, দয়া করে এখন
ঘরের মধ্যে এলেই হয়।”
আমি টুপিটা খুলে ঘরের মধ্যে যাবার জন্য প্রস্তুত হােলাম।
ফ্যানী আবার শুরু কোরল, “আদেশ কোরলে আমি নিজেই আপনাকে
ঘরটি দেখিয়ে দিতে পারি।”
এর ঠিক পরেই দার্শনিকের কাছে এগিয়ে সে বােলল, “দার্শনিক
মশাই, আপনি ছােট মহিলাটির সঙ্গে মােটেই ভাল ব্যবহার করছেন না ;
ওর দিকে চেয়ে দেখুন, কেমন আপনার দিকে চেয়ে হাসছে। হাতে
একটা
চুমা
দিয়ে বলুন, আমায় মাপ করাে।”
কথা বােলতে বােলতে ফ্যান। শিশুটির কচি হাত নিয়ে ভদ্রলােকের
ঠোটে চুইয়ে দিল। দার্শনিক একটা দূঃখপূর্ণ হাসির সঙ্গে চোখটা
একবার ঘুরিয়ে নিলেন।
ফ্যানী নাচতে নাচতে আমার কাছে এগিয়ে এসে বােলল, আজ্ঞা
হােক; কি কোরতে হবে।
এই বলে সে আমার সামনে দিয়ে ওপরে উঠে গেল। সে সুন্দর
ঘরখানির দরজা খুলে আমার জন্য অপেক্ষা কোরতে লাগলাে। কিছুক্ষণ
পরে ওপরের ঘরের কাছে এসে বােললাম, “দেরীর জন্য আমায় মাপ কর,
ভাই। জান তাে, এই সবে মাত্র আমি অসুখ থেকে উঠেছি।”
ফ্যানী --আপনি মােটেই ভাববেন না এখানকার ঝরণার এমন
আশ্চৰ্য্য গুণ যে তাতে স্নান কোরলে আপনি একেবারে সেরে যাবেন।
আমি-ফ্যানী সুন্দরী, এ খবরতাে আমি মােটেই জানতাম না।
এখানকার রণার জল বুঝি ওষুধের মত কাজ করে?

* সরাইখানা ফ্যানী—সারা পৃথিবীতে এর নাম ডাক আছে, জানেন? টাউলাউস এমন কি মণ্ট পেলিয়ার থেকে লােকেরা এখানে এসে থাকে। রােগীরা এখান থেকে একেবারে সেরে গিয়ে হাসিমুখ নিয়ে বাড়ী ফেরে, জানেন? আমি-ফ্যানী সুন্দরী, তােমায় ছেড়ে গিয়ে মনে সত্যিকারের আনন্দ আসতে পারে কি ? ফ্যানী--ওসব কথা এখন রাখুন। জানেন তাে, লােকেদের এমনই বিরক্ত করি যে না পালিয়ে আর তাদের উপায় থাকে না। আমি—তােমার কাছে আমার প্রার্থনা, আমার পেছনে ওরকম একটু লাগােনা। ফ্যানী—আচ্ছা, এখনকার মত নীচের তলায় গিয়ে দার্শনিকের কাছ থেকে বােনটিকে নিয়ে আসি তাে, তার পর দেখা যাবে। আমি–আচ্ছা, তােমরা যাকে দার্শনিক বল, তিনি কে, জিজ্ঞাসা কোরতে পারি ? ফ্যানি-যুবকটি হােলেন খুব ভদ্র, অমায়িক, চতুর, কিন্তু তার একটা শুধু দোষ, তিনি মােটে, হাসতেই পারেন না। কথা বলেন খুব অল্পই, আর মনে হয় কিছুতেই যেন শান্তি পান না। ভদ্রলােকের নাম হােল—ওরনি। মাঝে মাঝে তিনি স্নান কোরতে এখানে আসেন। কথা বলতে বােলতে মাথা নীচু করে নমস্কার জানিয়ে ফ্যানি চলে যায়। আমার মনে হােল, সত্যিই মেয়েটি যে কোনও লােককে ব্যতিব্যস্ত করবার পক্ষে যথেষ্ট সুন্দরই, বটে। না, স্নানের নাম করে আরেক দিন : এখানে থেকেই যাই। এরকম অনাবিল আনন্দ আর কোথায় পাব? মনের আনন্দ একটু চাই বৈকী! এ না হােলে, বাঁচব কেমন করে? ঘরে একা একা বসে ক্লান্তি আসে, ভাল লাগেনা, এবার বেরিয়ে পড়া যাক । কৈ পাখীটা কোথায় গেল ; ফ্যানি পাখী আমার, কোথায় আপনার

জাৰ্মাণীর সৈরা গল্প
মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কে জানে! আমার সার্থী হিসেবে এখানে তো
একমাত্র দার্শনিককে দেখতে পাচ্ছি।
মাঝে মাঝে দার্শনিক ভদ্রলােকটি জানালার কঁাচে সামরিক কায়দায়
টোক্কা মেরে যাচ্ছিলেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা কোরলাম, “এখানকার
ঝরণার জল কেমন, বােলতে পারেন ?”
দার্শনিক -বিশ জল, পচা ডিমের মত গন্ধ।
আমি অবশ্য আমি যে ঠিক স্নানের জন্য এসেছি তা নয়, মনে
হােল, যায়গাটার আশপাশ দেখতে বেশ সুন্দর, এই ভেবেই এখানে
এলাম, আর ।
দার্শনিক জায়গাটা অবশ্য ভাল, তা হলে হবে কি, আমি কিন্তু
এখানকার লােকগুলােকে একেবারে বরদাস্ত করতে পারি না।
আমি -তাহলেও ফ্যানীর উৎপীড়ন নিশ্চয় সহ্য করা যায় ।
দার্শনিক মৌমাছির মত গুন্ গুনানি আমার ভাল লাগেনা।
আমি ার দিক থেকে চোখ ফেরাতেই হঠাৎ ভদ্রলােকের এক তীব্র
চীৎকার কাণে এলাে ; ফিরে দেখি, ফ্যানী মধুর দৃষ্টিতে একটা আক্রমণের
ভাব নিয়ে দার্শনিকের পাশে দাড়িয়ে আছে। লক্ষ্য করে বুঝলাম, দুষ্ট,
ফ্যানী দার্শনিকের পিঠে পিন্ ফুটিয়ে সেটি হাতে করে দাড়িয়ে আছে,
আর দুষ্টুমির হাসি হাসছে।
ফ্যানী বললে,—বুঝতে পারছেন তাে মৌমাছির হুল ফোটাতেও
জানে। শুনছেন, এটা আমার একটা ছােট ধরণের শাস্তি।
আমি বােললাম, তা বােলে তুমি ওর বুকে ওই রকম আঘাত দেবে?”
ফ্যানী—আপনি তত জানেন না, ভদ্রলােকের কি কঠিন প্রাণ,
ওটুকুতে ও কিছুই হয় না।
;

সরাইখানা ফ্যানির কথায় দার্শনিক কি যেন বিড় বিড় করে বােলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি ভাবতে লাগলাম, আশ্চর্য, এত সুন্দর চেহারা থাকতেও ভদ্রলােক এই সুন্দরী মেয়ের রসিকতাও পর্যন্ত সহ কোরতে পারেন না। একা থাকতে ভাল লাগে না, ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ীর চার পাশ তন্ন তন্ন করে দেখতে দেখতে সংলগ্ন বাগানের মধ্যে ঢুকে পােড়লাম। ফ্যনির ছােট বােন অ্যানেট্‌ গাছে জল দিচ্ছিল তার কাৰ্য কলাপ আমার বেশ ভালই লাগছিল। মনে হােল, এরকম মেয়ে যার সতিই সে ভাগ্যবান বৈকী। ফ্যানী যৌবনের দরজায় পা দিয়েও স্বর্গের পরীর মত পবিত্রতা রক্ষা করে আসছে ; রং বেরংএর ফুলের মাঝখানে ঘুরে বেড়াবার সময় মনে পড়িয়ে দেয়, লিয়নাদ্দেদ্য-ভিন্সির আঁকা ভার্জিন মেরীর কথা । আমার পায়ের শব্দে চমকে গিয়ে অ্যানেট জিজ্ঞাসা করে, “কে?” —“চোর,” আমি বলি। হেসে জিজ্ঞাসা করে, “কি চুরি করবে সে?” আমি উত্তর দিই,--- কেন, অ্যানেটের প্রিয় ফুলটি। মেয়েটি ফুলের সাজিটি রেখে লজ্জার ভাণ করে এগিয়ে এসে বলে, “তাহলে নিজের চোখে দেখতে চাই, কেমনতর চোর।” আধফোটা গােলাপের দিকে চেয়ে বলি, “ওটা কি তুলতে পারি?” —চোর কি বলে কয়ে চুরি করে নাকি-ব’লে অ্যানেট ? একটা ফুলকাটা কঁচি নিয়ে এগিয়ে আসে। —নিজের জন্য চুরি কোরবনা এটা ঠিক,উত্তরে আমি বলি । –কাকে ফুলটা দেওয়া হবে শুনি? —অ্যানেট প্রশ্ন করে। আমি বলি-ক্রাকের মধ্যে সবচেয়ে যে সুন্দর মেয়ে, তাকেই দেব ফুল।

১৩৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প আনেট—সেতত ভাল কথা; কিন্তু এক ঘণ্টার মধ্যে এখানকার সব মেয়েকে চিনে ফেলেছেন, আশ্চর্য কথা ! আমি—এখানকার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে কে, আমি ভাল রকম জানি। অ্যানেট—আমায় দেখিয়ে দেবেন তাকে ? আমি, “একটু দাড়াও”, এই বলে যেই মেয়েটির সুন্দর অলকগুচ্ছের মাঝে ফুলটি গুজে দিয়েছি, অমনি হাসির ঝলক তুলে আনে বলে উঠলাে, “আপনি ভুল করেছেন, আমার বােন ফ্যানিই কিন্তু সকলের থেকে আমি-অ্যানেট সুন্দরী, তর্ক কোরলে চলবেনা, তােমার রূপের কথা তুমি নিজে কি বুঝবে ! যদি আমি বলি, ক্ৰান্সাকের মধ্যে তুমিই সবচেয়ে সুন্দরী, এর উত্তরে কি বােলবে, শুনি? অ্যানেট—আমি কিছুই বােলবনা, কিন্তু আমার পর আর কাকে সুন্দর লাগে, দেখিয়ে দিতে হবে। তর্ক বিতর্ক হবার পর সে আমায় তার সুন্দর ফুলের কেয়ারীগুলি দেখাতে সুরু কোরল ; অল্প সময়ের মধ্যে কতই যেন আপনার হয়ে গেল সে। সন্ধ্যার আগেই বাড়ীর সকলের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়ে গেল। মেয়েগুলির মা’ও ছিলেন খুব সুন্দরী, সুরসিকা ও প্রাণময়ী। আমাদের এই হাস্য কৌতুক ও আলাপ আলােচনায় দার্শনিককে শুধু যােগ দিতে দেখা যেতনা। পরের দিন সকাল বেলা চলে যাব, এই মনে করে জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখেছিলাম ; ভাের হতেই মত বদলে গেল । যাওয়া আর হেলনা। স্যানি তার প্রতিজ্ঞা রেখেছিল, নানারকম মধুর জ্বালাতনে আমায় সরাইখানা ১৩৫ ভুলিয়ে রাখত ; আমি অনুভব করেছিলাম, কী ভীষণ ভাবে কিশােরী আমার মনের শান্তিকে ভঙ্গ কোরছে। নিজেকে কি ভাবে সংযত করে রাখতাম, অবুঝ ষােড়শী তা বুঝতােনা। পঞ্চশরের আঘাতের বেদনা সে বুঝবে কেমন করে ! তার বিকশিত যৌবনের সঙ্গে মিশেছিল একটি শিশুসুলভ সরলতা। সময় সময় মনে হােত, সে আমার প্রতি যেন আকৃষ্ট হয়েছে। আবার যখন ভাল করে বােঝবার চেষ্টা কোরতাম তখন স্পষ্টই মনে হােত যে ফ্যানীর চাহনির মধ্যে উত্তেজনা থাকা তত দূরের কথা, তার মধ্যে রয়েছে একটা প্রীতির পরিব্যাপ্তি। শিশুসুলভ ১রলতায় তার মুখখানি পূর্ণ হয়ে থাকতাে। শিশুরা যেমন সকলের সঙ্গে সমান ভাবে মিশে যেতে পারে, তার আচরণও ছিল সেই ধরণের। নারীসুলভ কোমলতা, নিস্পাপ মন, এই সব মিলে তার মধ্যে এমন একটা বৈশিষ্ট্য এনে দিয়েছিল যে কেউই তার সঙ্গে অশিষ্ট আচরণ কোরতে সাহস পর্যন্ত কোরতনা। নিস্পাপ মন নিয়ে সকলের কাছে সে এগিয়ে যেত। মাঝে মাঝে আমার মনে হােত যে অসুখী ওরনি, মেয়েটির মনকে যেন অধিকার করে আছে। দার্শনিকের বাইরেটা খুব সুন্দর, কিন্তু লক্ষ্য কোরলে বােঝা যায়, অন্তরে বিষাদের ফধারা ছুটে চলেছে। তার এই করুণ চাহনি কেমন যেন একটা আকর্ষণ এনে দেয় মনে। সদা সর্বদা তার মনে একটা অস্বস্তির ঝড় বয়ে গেলে কি হবে, সৎপথ অনুসরণ কোরেই সে চোলত। পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে না চলতে পারলেও তার হৃদয়ে পাকা সােনার কস্ ধরানাে ছিল। একবার ঘরের মধ্যে গিয়ে দেখতে পেলাম, ফ্যানি ভদ্রলােকের আলুথালু চুলগুলি ওপরের দিকে সরিয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে কপালের জাৰ্মাণীর সেরা গল্প কোচকানাে•রেখার ওপর স্নেহের স্পর্শ বুলিয়ে দিচ্ছে ; দার্শনিক অন্যদিকে চেয়ে আপনার মনে সেটা উপভােগ করছেন। আমি মেয়েটির আচরণে একটু ঈর্ষান্বিত হয়েছিলাম । মেয়েটির মন এমনই নিষ্কলুষ ছিল যে মিঃ আলব্রেট ঘরের মধ্যে প্রবেশ কোরতে একটু মাত্র বিচলিত না হয়ে দার্শনিককে একই ভাবে সেবা করে যাচ্ছিল। তার এই আচরণে আমরা না হেসে থাকতে পারলাম না। দার্শনিকের চলে যাবার কথা উঠলে এতটুকুও বিচলিত না হয়ে কিশােরী তাকে উপদেশ দিয়ে বােলত, “ক্যাপটেনের সঙ্গে স্পেনে চলে যাও বন্ধু, তােমার কাছে সেটা স্বর্গের সমান মনে হবে। যা হােক, সেখানে মানুষ-বিদ্বেষী লােকের মাঝে মন্দ লাগবে না। এখানকার ললাকেদের হাত থেকে নিষ্কৃতি তো পেয়ে যাবে।” তার বােন অনেটের মধ্যে শিশুসুলভ সরলতা ও প্রাণশক্তি বড় কম ছিলনা। অনুভব শক্তি তার মধ্যে ছিল সবচেয়ে বেশী । সরলা হলেও আত্মসম্মান জ্ঞানও বড় কম তার ছিলনা। কারুর চোখে ফ্যানিকে হয়তাে আরও সুন্দর লাগতাে, কিন্তু দুজনের মধ্যে সত্যিকারের কে যে বেশী সুন্দরী অনুমান করা বেশ শক্ত ছিল। অ্যানেট আমার ওপর বেশ একটু আকৃষ্ট ছিল কেন, জানিনা। ওরনির অস্বাভাবিক মেজাজকে সে বরদাস্ত কোরতে পারত না।—'ওদের মনের সঙ্গে আমার মােটেই খাপ খায়না। অ্যানেট আমায় অভিযােগ কোরত। শিশুসুলভ সরলতার সঙ্গে মনের গােপন কথাগুলি সে আমায় বলে যেত। কি ধরণের পােষাকে তাকে মানাবে সবই আমায় পছন্দ করে দিতে হােত। তাকে আমার এত ভাল লাগত, বলতে পারিনা। যাবার কথা তুললে অ্যানেট এমন একটা মিনতির স্বরে আমায় বাধা দিত যে সে কথা বন্ধ না করে উপায়ই ছিল না।

সরাইখানা
১৩৭
ওরনি এসে আমায় আরও সাতদিনের জন্য থাকতে অনুরােধ করাতে
একটু আশ্চর্ষান্বিত হয়ে গেলাম।
-অ্যানেট কি আপনার যাবার পথে বাধা দিচ্ছে ?
একথা অস্ত্র না বলে থাকতে পারলাম না।
“ঠিক বলেছেন, এই কথা বলে তাঁর হাস্যমুখর ভাবটী গােপন
রাখার জন্য মুখটী হাত দিয়ে ঢেকে ফেললেন ।
দার্শনিক-জানেন, যাবার কথা শুনে অ্যানেটের চোখদুটী জলে ভরে
এল, মত না বদলে পারলাম না। মেয়েদের চোখে কি যে যাদুমন্ত্র আছে,
জানিনা। ছােট ডাইনিটী আমাকে এখানে আরাে আটদিন থাকার
প্রতিশ্রুতি নিয়ে ছাড়লাে । আমার কথা পেয়ে তার কি আনন্দ! খুসীর
হাসিতে
মুখ
ভরিয়ে তুলে লতার মত দুটী হাতে গলা জড়িয়ে ধরে আমার
গালে একটা চুম্বনই একে দিলে। জলভরা মেঘ সরে গেলে আকাশ
যেমন আলাের খেলায় মেতে ওঠে, তার খুশীর হাসিতে ঘরের আবহাওয়া
একেবারে বদলে গেল।
আমি বােললাম,-বুঝেছি, এরকম অমূল্য সম্পদ পেলে সহযাত্রীকেও
মানুয ভুলে যায়।
দার্শনিক--এখন আপনার যা ইচ্ছে তাই কোরতে পারেন। কথা
দিয়েছি, আমাকে এ ক'দিন থাকতেই হবে ; তবুও একথা বলছি,
আপনার সঙ্গে পারপিগনানে যেতে পারলে খুবই আনন্দলাভ কোরব।.
দার্শনিকের সঙ্গ পাবার লােভে আমাকে আরও একসপ্তাহ থেকে যেতে
হােল। এই সামান্য বিশ্রামেই আমার মন সুস্থ হয়ে গেছে।
জয়ের আনন্দে অ্যানেট নাচতে নাচতে আমার দিকে এগিয়ে এসে
বােলল, “বলুন আমরা ওরনির মত বন্য লােককেও পােষ মানাতে পারি,

১৩৮ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প কি বলেন?” কথা বলবার সময় ঝর ঝ করে তার হাসি ঝরে পড়তে লাগল। বােললাম—বেশ বুঝতে পারছি, যে অস্ত্রে তাকে জখম করেছ, আমাকেও তা করতে পার। আগ্রহের সঙ্গে আমার দিকে চাইতেই তার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠলাে ; গুন্ গুন্ করে একটা গানের সুর ধরে নাচতে নাচতে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল । এইভাবে আটদিন কেটে যায়, আমি ভাবতে লাগলাম, -এই সুন্দর পরিবারের মাঝখানে থেকে গােল কি, ভালবাসার বন্ধনে এদের সঙ্গে জড়িয়ে পােড়লাম নাকি? ফ্যানীর সৌন্দৰ্য্য একটা গভীর রেখা টেনে দিল আমার স্মৃতির পটে। ছােট মেয়েটীকে আমি সত্যিই ভালবেসে ফেলেছিলাম। ভালবাসার মধ্যে যে মাদকতা অবুঝ মেয়ে তা বুঝবে কি । বয়সে আমি ও ওরনি তাে প্রায় সমান হব, কিন্তু তার প্রতি মেয়েটার এত আকর্ষণ কেন? আমি স্বীকার কোরছি, এখনও পর্যন্ত কোন মেয়েকে আত্মসচেতন হয়ে ভালবাসিনি। ফ্যানিই আমার মনে প্রথম সােনার কাঠি বুলিয়ে দেয়। আত্মসংযম করে আমায় চলতে হয়, পাছে অশােভন একটা কিছু করে বসি। যাবার দিন এগিয়ে আসছে ভেবে আনন্দ হচ্ছিল, কিন্তু এর সঙ্গে বিষাদের ছিটে ফোটা মিশে গিয়ে একটা 'অলােড়ন এনে দেয় মনের মধ্যে। যাবার দিন পর্যন্ত গৃহকত্রী আমাদের দুজনের সঙ্গে মধুর ব্যবহার করে গেলেন। যাত্রার সময় ওরনিকে একটুও বিচলিত হােতে দেখা গেলনা। যাবার দিনে ফ্যানীকে দেখে আমার মনে হয়েছিল, তার রূপান্তর ঘটেছে। আমাদের বিদায়ের সময় খুব সহজভাবে ফ্যানী অভিনন্দন জানালাে।

সরাইখানা উঠেছে। অ্যানেটকে দেখে বােঝা গেল, সে বেশ বিচলিত হয়ে আমার হাতখানিকে কিছু সময়ের জন্য ধরে হঠাৎ সে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে ; তারপর একটা ফুটন্ত গােলাপ এনে আমার হাতে দিল। আরেকটা হাতে আমার দেওয়া শুকনাে গােলাপটি সে ধরে ছিল। বিষাদে অনেটের মুখখানি ভরে আসে, একটা কথাও বেরােয় না। আমি যেই তার হাতখানি নিয়ে তাতে একটা বিদায় চুম্বন দিয়েছি, অমনি সে আমার গলা জড়িয়ে ধরে চুম্বন করার সঙ্গে সঙ্গে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাে। এই প্রথম ফ্যানি ও তার মায়ের চোখে জল দেখতে পেলাম। আর বিলম্ব না করে বিদায় নিয়ে আমরা গাড়ীতে উঠে পােড়লাম। গাড়ী চলতে আরম্ভ কোরল। ওরনির মুখটা বিষাদে ভরে গিয়েছিল ; আমি কিন্তু আনন্দচিত্তেই তার পাশে বসেছিলাম। মাঝে মাঝে ফ্যানির অশ্রুসিক্ত মুখখানি অন্তরে ভেসে উঠছিল। হঠাৎ এই মৌনতা ভঙ্গ করে দার্শনিক আরম্ভ কোরলেন, “কি বড়লােকের প্রাসাদে, কি চাষাদের কুটীরে মানুষ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে কেন, বুঝতে পারি না। সম্ভবতঃ আমিই সকলের কষ্টের কারণ। জানেন, সকলে আমায় কষ্ট দেয় বলেই বাধ্য হয়ে আমাকেও ওই রকম হতে হয়।” আমি বােললাম,--সুন্দরী ফ্যানি নিশ্চয়ই আপনার কষ্টের কারণ হয়নি, আশা করি ? দার্শনিক বােললেন,--আপনার কথা অস্বীকার কোরতে পারি না, যদিও জানি, এ পৃথিবীতে শিশুরাই তাে আমাদের মত দুঃখ জর্জরিত আত্মার একমাত্র সান্ত্বনাস্থল এই ফ্যানির কথাই ভাবি, কি সুন্দরই মেয়ে না সে ! , ওকে আমি ইচ্ছে করে এড়িয়ে চলি। ক্ৰান্সা ১৪ ০ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ; •শুধু ; . জায়গাটা আমার খুব ভালই লেগেছিল ; হয়তাে আরও কিছুদিন থাকতাম ; কিন্তু সত্যি কথা বােলতে কি, ওই ফ্যানির জন্য আর আমার ওখানে থাকা হােল না। আমি বােললাম,—আপনার কথাগুলো হেঁয়ালিপূর্ণ মনে হচ্ছে । ওরনি---মােটেই না, আপনাকে পরিষ্কার করে বলছি। আমি এই ভাবি যে এতদিন ধরে যে জ্ঞান আমি সঞ্চয় করেছি, ওই মেয়েটির সংস্পর্শে হয়তাে সবই নষ্ট হয়ে যাবে ; মানসিক কষ্ট হয়তাে আরাে বেড়ে যাবে। আমি দার্শনিকের কাছে আলব্রেট পরিবার সম্বন্ধে কয়েকটা প্রশ্ন কোরলাম, কিন্তু তিনি খােলাখুলিভাবে তেমন কিছু বললেন না। আমার সঙ্গে আলােচনার সময় দার্শনিক ভদ্রলোেকটী বােললেন, “ভাবছি, প্রথমে যাব মারসেসে, সেখান থেকে যেতে হবে ইটালীতে।” রাত্রি নিস্তব্ধ। দুজনে গাড়ীর মধ্যে বসে ; চাঁদের আলােয় চারিদিক ছেয়ে গেছে। গাড়ীর জানালা দিয়ে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে অরণ্যপরিবৃত গগণচুম্বী পৰ্ব্বতের শ্রেণী । দার্শনিক হঠাৎ জানালা দিয়ে মূখ বার করে গ্রামগুলির দিকে তাকিয়ে কোচম্যান্ক জিজ্ঞাসা কোরলেন, “পাহাড়ের ওপর ওই ভাঙ্গা বাড়ীটা কার, বলতে পার ?” কোচম্যান-ওটা লুবের কেল্লা। ওরনি-~-ওর পাশ দিয়ে সিজিয়ানের রাস্তা চলে গেছে, না ? কোচ ম্যান—ঠিক বলেছেন। দার্শনিক--আচ্ছা, আমরা বেলকের খুব কাছে এসে পড়েছি, না? ক্যোচ ম্যান—আজ্ঞে, হঁ্যা। ; .

সরাইখানা
১৪১
D
;
দাশনিক গাড়ীর কোণে শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে চুপ করে পড়ে
রইলেন।
আমি নিবিষ্টচিত্তে সেই দুর্গের দিকে তাকিয়ে রইলাম ; বিরাট দুৰ্গটা
অরণ্য ভেদ করে দাড়িয়েছিল ; মনে হচ্ছিল, স্থানটী যেন রহস্যময়।
—কেল্লাটার অবস্থা কতদিন থেকে এই রকম হয়েছে ?—আমি
কোচম্যানকে জিজ্ঞাসা করলাম।
কোচম্যান—আমি যতদূর জানি, দশ বছর আগে অধিবাসী সমেত
কেল্লাটা পুড়ে ছারখার হয়ে যায়।
বােললাম কি ভয়ানক কথা !
এ ব্যাপারটা কিভাবে ঘটলো ?
কোচ ম্যান-কেন, বিদ্রোহে দেশ মেতে ওঠবার ঠিক আগেই দেশের
লােকেরা একজোট হয়ে কেল্লার গেট ভেঙ্গে টুকে জিনিষপত্র, আসবাব সব
পুড়িয়ে একাকার করে ফেলে ; তার সঙ্গে কেল্লার কাউন্টেকেও
তারা পুড়িয়ে শেষ করে দেয়, কারণ অত্যাচারের জন্য সকলেই তঁাকে ঘৃণা
কোরত।
—মিথ্যে কথা, সব মিথ্যে,--হঠাৎ দার্শনিক : চীৎকার করে বলে
ওঠে।
কোচ ম্যান—দেখুন এসব কথা আমি খুব বিশ্বস্ত লােকেদের মুখে
শুনেছি আরও বােলেছি, আগুন লাগার সময় কাউন্টেসের একমাত্র ছােট
শিশুটীও পুড়ে মারা যায় ।
—তারা মিথ্যা কথা বলেছে,ওরনি উত্তর দেয়।
আমি বােললাম,-তাহলে, ওই কেল্লার ইতিবৃত্ত আপনার জানা
আছে ?
ওরনি—যে ছেলেটীর পুড়ে মারা যাবার কথা আপনি শুনলেন, সে
হলুম আমি নিজেই, আর কেউ নয় ।

১৪২ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প বােললাম,—আপনি তাহলে ওই কেল্লায় যারা থাকতাে, তাদের বংশধর। “আমি কারুর সন্তান নয়”,—বিচলিত হয়ে বলে ওঠে ওরনি। বােললাম, কিন্তু একটু আগেই আপনি বােললেন যে, •••• —হঁ্যা, সত্যি কথাই, এর মধ্যে তর্ক করার কিছু নেই,-বলে ওঠে ওরনি একটু পরেই দার্শনিক আরম্ভ করে, পনের বছর বয়স পর্যন্ত গ্রামের পাদরী সাহেবের কাছে আমি মানুষ হই। প্রথমে ভেবেছিলাম তিনি আমার কোন নিকট আত্মীয় অথবা বাবাই হবেন। আমার ধারণা ভুল হয়েছিল; পরে জানতে পারলাম আমি অন্য লােকের সন্তান। বৎসর বয়স থেকে আমাকে তার কাছে রেখে দেওয়া হয়। আমাকে মানুষ করবার জন্য প্রচুর অর্থ তার কাছে আসত। বাবা মার সম্বন্ধে প্রশ্ন কোরলে তিনি বােলতেন, “থােকা তুমি বড় বেশী কথা বল। শােন, তােমার বাবা মা অনেকদিন হােল মারা গেছেন। ভাবনা কি, তােমাকে মানুষ করার ভার আমার হাতের দিয়ে গেছেন।” ভদ্রলােককে মনে মনে শ্রদ্ধা কোরতাম। কোন একটা ভালবাসার বস্তুকে কেন্দ্র কোরতে চাইত ; শিশুর মন ভদ্রলােক নিজের মনের মত করে আমায় শিক্ষিত করে তুলছিলেন। তার কাছ থেকে বিজ্ঞান ও কয়েকটী ভাষা বেশ ভাল করে শিখেছিলাম। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্যে তিনি আমায় টাউলাউসে নিয়ে যান। কিছু দিনের মধ্যেই হঠাৎ তিনি মারা গেলেন। পৃথিবীতে আমাকে দেখবার আর কেউ রইল না। ভদ্রলােক ব্যাঙ্কে আমার নামে টাকা জমা রেখে- । সরাইখানা ১৪৩ ছিলেন, সেখান থেকে নিয়মিতভাবে খরচের টাকা আমার হাতে আসতাে। এই অর্থলাভের জন্যে ভদ্রলােকের কাছে নিজেকে কৃতজ্ঞ মনে কোরতাম। পরে শুনতে পেলাম, প্যারিসের’কয়েকটী ভদ্রলােকের কাছ থেকে আমার নামে টাকা এসে ব্যাঙ্কে জমা হয়। তখন সবেমাত্র যৌবনে পদার্পণ করেছি। একটা রােমাঞ্চকর ভাব এসে মাঝে মাঝে মনের মধ্যে স্পন্দন জাগাত। আমি একটু কাল্পনিক প্রকৃতির ছিলাম, কবিত্বে মনটা সব সময় ভরপুর হয়ে থাকত। অনুভব কোরতাম, পৃথিবীটা যেন রূপ, রস, গন্ধে ভরে গিয়েছে। কল্পনার রঙ্গীন স্বপ্নে মন বিভাের হয়ে থাকত। প্রচুর অর্থ হাতে ছিল, তা দিয়ে স্বচ্ছন্দে নিজের ইচ্ছামত দিন কাটাতে পারতাম। একজন বান্ধবী ছিল, যাকে আমি অন্তরের সঙ্গে ভাল- বাসতাম। জীবনে এই প্রথম আমি অনুভব করেছিলাম, ভালবাসার আদান প্রদানের কি । জীবনকে পূর্ণ মাত্রায় উপভােগের লালসা আমায় পেয়ে বসেছিল। অল্পদিনের মধ্যেই সেই সুখস্বপ্ন তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে গেল। আমার প্রিয়তমা ছিল সৎবংশের মেয়ে। তাকে সম্পূর্ণভাবে সুখী কোরতে চেয়েছিলাম। এক বন্ধুকে দিয়ে আয়ের অধিকাংশ ভাগ তাকে পাঠিয়ে দিতাম। বন্ধুকে অনুরােধ করেছিলাম, আমার সাহায্যের কথা যেন কেউ না জানতে পারে। কল্পনাও কোরতে পারিনি যে আমার বন্ধু প্রতারণা করে মেয়েটীর মন নিজেই দখল করে নেবে। 'আমার অর্থ, সে তাে আত্মসাৎ করেছিল, তার ওপর আমার প্রিয়তমার টাকা নিয়েও সে ছিনিমিনি খেলতে। নিৰ্ব্বোধ কিশােরীর জন্য আমার মনে করুণার সঞ্চার হোত। হতাশায় মন ভরে যায়। এই ঘটনার ঠিক পরেই অসুখে আমার ১৪৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প শরীর ও মন জর্জরিত হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বাসঘাতকের মুখ দর্শন করা পাপ। এই ঘটনার পর থেকে তাকে আমি পরম শত্রুর মত জ্ঞান কোরতাম। একদিন সকলের সামনে সে আমায় অপমান করে। রাগের মাত্রা এতই বেড়ে গিয়েছিল যে তার হাতে গুলি পর্যন্ত চালিয়েছিলাম। আহত হয়ে সে আমায় অভিসম্পাত করেছিল। এই ঘটনার কিছুদিন পরে একটী ভদ্রলােক এসে আমার হাতে একটা বন্ধ মােড়ক দিয়ে বােললেন, “এর প্রাপ্তি স্বীকার করে আমায় একটা রসিদ দিন। 1. প্যাকেটটা নিয়ে সই করে দিলাম। তিনি আবার সুরু কেরিলেন, “মিঃ ওরনি, লুবের কেল্লায় কাউন্টেসের কাছে গিয়ে আপনি যে তার সন্তান এই' দাবী করুন। আসলে কাউন্টেসই আপনার মা। সম্প্রতি স্কল্যাণ্ডে আপনার বাবা মারা গেছেন। সে খবরও এর মধ্যে আছে। আগে সব খরচ তিনিই আপনাকে দিতেন। আমাকে তিনি জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে আপনার সমস্ত খরচ কাউটেসকেই বহুন কোরতে হবে।” কথাটা শুনে আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে জিজ্ঞাসা কোরলাম, “আমার মা কোথায়, কোথায় গেলে আমি তাকে পাব ?” আগন্তুক ভদ্রলােকটী জানালেন যে আমার মা আঠার বছর প্যারিসে ছিলেন, তারপর কোন একটা পারিবারিক ব্যাপারে তাকে লুবের কেল্লার -আসতে হয়। আগন্তুক ভদ্রলােকটা আমার মৃত পিতার তরফ থেকে এসেছিলেন। তিনি তার কর্তব্য শেষ করে চলে গেলেন। চিঠি থেকে আমার মা, বাবার সম্বন্ধে সঠিক কিছু ধারণা :কোরতে পারলাম না। ভাবলাম, আমাকে তারা সন্তান বলে স্বীকার কোরতে এত বিলম্ব কোরছেন কেন? মােড়কের মধ্যেকার চিঠি থেকে বুঝে- সরাইখানা ১৪৫ ছিলাম, চার বৎসর বয়স পর্যন্ত আমাকে একজন চাষার ঘরে রাখা হয়। শ্রদ্ধেয় পাদরী মশাইএর লেখা চিঠি ও অন্যান্য কাগজ পড়ে যদিও বুঝতে পারিনি, আমি বৈধ সন্তান কিনা, তবুও তার মধ্যে আমার জন্মবৃত্তান্ত সবই পেয়ে গেলাম। ভাবলাম, ধৰ্ম্মযাজকের মধ্যে সত্যিকারের শুভাকাঙ্কাকে হারিয়ে মাকে তাে পেলাম। ভদ্রলােকের সঙ্গে বাস করবার সময় অনেকবার কাউন্টেসের কথা শুনেছি। সুন্দরী হয়েও তিনি ছিলেন অভাগিনী । আমার মনে হােত, তাঁর এই অশান্তির কারণ তাে আমিই। এই রকম চিন্তা কোরতে কোরতে দুর্গে পৌঁছেই আমার আগমনের সংবাদ জানালাম ; যাবার পথে কেবলই মনে হচ্ছিল, কি বলে যার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ব। ভাবলাম, হঠাৎ হারানাে ছেলেকে দেখে, আনন্দে অভিভূত হয়ে যদি তঁার হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। তার ঘরের মধ্যে গেলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর তিনি ঘরে ঢুকলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও গাম্ভীর্ষে সত্যিই মনের মধ্যে ভয় ও ভক্তির সঞ্চার করে। তার সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। ভাবলাম, এর রক্ত মাংসেই না আমার শরীর গড়ে উঠেছে। উনচল্লিশ বৎসরের থেকে তাকে অনেক ছােট দেখাচ্ছিল। অপূর্ণ চোখে তার দিকে এগিয়ে গেলাম ; আনন্দে ও উচ্ছাসে মন এত ভরে গিয়েছিল যে একটা কথা পৰ্য্যন্ত মুখ থেকে বেরুতে চাইছিল না। তার পায়ের নীচে লুটিয়ে পড়ে, কোন রকমে আমার নামটা উচ্চারণ কোরে বােললাম,-হারান ছেলের কথা ভেবে আপনার মনে একটুও কি কষ্ট হয়নি? তিনি গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলেন,-যুবক তুমি ভুল বুঝেছ। যাকে তুমি খুজছাে, আমিই সেই কাউন্টেস্, এটা সত্যি কথা। শুনলে আশ্চর্য ;

১৪৬ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প । t হবে, আমার বিয়েই হয়নি। লােকেরা আমার চরিত্রে কলঙ্ক আনবার জন্যে এই ধরণের একটা ফন্দী করেছে। তিনি আমায় উঠে দাঙ্গতে আজ্ঞা কোরলেন। তার কথায় হতভম্ব হয়ে উঠে দাড়ালাম। লক্ষ্য করে বুঝলাম, তার মনের মধ্যে একটা আলােড়ন চলেছে ; বাইরে থেকে সেটা অনুমান করা শক্ত। তিনি বিদ্রুপের সঙ্গে কথা বলে গেলেন। তার আচরণে ব্যথিত হয়ে তারই হাতে লেখা কাগজগুলি সামনে মেলে ধরে বললাম, আপনার হাতেই তাে লেখা রয়েছে, বর্তমানে ও ভবিষ্যতে আপনার সম্পত্তি থেকে একটা মােটা ধরণের অংশ পাব; যাতে করে স্বচ্ছন্দে আমার দিন কেটে যাবে। তাকে আঙ্গুল দিয়ে দলনে তার নিজের লেখা সহ দেখিয়ে দিলাম। তার চিঠি থেকে পরিষ্কার বােঝা যাচ্ছিল, আমি যে তার প্রকৃত সন্তান, এর কোন উল্লেখই নেই। শুধু অনুরােধ করে জানতে চাইলাম, তার আসল উদ্দেশ্য কি । আমার কথা শুনে হতভম্বের মত তিনি বললেন, ---আমারতাে বিয়েই হয়নি তােমাকে ছেলে বলে গ্রহণ করে এই বৃদ্ধবয়সে অপশের বােঝ কঁাধে নেব, মনে কর ? কাগজগুলি আমার হাতে দাও, বেশ তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করে দেখব, কি লেখা আছে এগুলির মধ্যে। আসলে তুমি কে, এটাও আমার ভাল করে জানতে হবে। এখন তুমি স্বচ্ছন্দে এখানে থাকতে পার। প্রথমে মনে হােল, হয়ত তিনি আমায় সন্তান বলে গ্রহণ কোরবেন ; আবার ভাবলাম, দলিলগুলােকে হস্তগত কোরে আমাকে বঞ্চনা করবার মতলব নয় তাে। কাগজগুলি পকেটের মধ্যে ভরে বােললাম,-আপনার মনে একটুও দয়ার সঞ্চার হােলনা! ভেবেছেন, আপনার হাতে সব কাগজপত্রগুলি • সরাইখানা ১৪৭ দেব ? তা যদি মনে করে থাকেন, ভুল করেছেন। প্রয়ােজন হলে আদালতে এগুলি পেশ কোরব। আপনাকে আটদিনের মত সময় দিলাম ; ভেবে দেখবেন। তিনি নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে ছিলেন। ব্যথিত মনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছি এমন সময় শুনতে পেলাম, তিনি অকথ্য ভাষায় গালাগালি দিয়ে কাদের বােলহন,—ধরে নিয়ে এস ছােকরাকে ; সাবধান, যেন দুর্গের বাইরে না যেতে পারে। পরিচারিকার ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ১মস্বরে “বলে উঠল, দারােয়ান, গেট বন্ধ কর।” আমি আর কোন দিকে না চেয়ে লােকটাকে ধরাশায়ী করে ঘােড়ার পিঠে উঠে তীরের গতিতে, বেরিয়ে গেলাম। কাণ ঘেসে একটা গুলি ছুটে গেল, অনুভব কোরলাম। মুখ ফিরিয়ে দেখি, গেটের সামনে সন্ত্রস্ত হয়ে চাকরগুলি দাড়িয়ে আছে, আর কাউন্টেস্ ওপরের জানালা থেকে মুখ বার করে রয়েছেন। দার্শনিক আবার বােলতে সুরু কোরলেন,-সিগিয়ানের নােংরা সরাইখানাতে, বাধ্য হয়ে আটদিনের জন্য অপেক্ষা কোরতে হোল। তৃতীয় দিনের রাত্রে একটা গােল মেলে আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে যেতে লক্ষ্য কোরলাম, ঘরের সিলিংটা লাল আভায় ভরে গিয়েছে। আলােটা একটা কালো লণ্ঠন থেকে বেরিয়ে আসছিল। পাগলের মত বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অনুভব কোরলাম, লণ্ঠন সমেত একটা লােক মাটিতে পড়ে গেল। অপর আরেকজন অস্বাভাবিক স্বরে চেঁচিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমি তাদের ঘাড়ের ওপর পড়ে, ঘুসি চালাতে লাগলাম। এত পরিশ্রান্ত হয়েছিলাম যে মনে হােল, দম বন্ধ হয়ে আসছে। বাতিটা জ্বেলে দেখতে পেলাম যে সেই লােকটী অজ্ঞান হয়ে ১* ৮ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ৫ মাটিতে পড়ে আছে। অসংলগ্ন জামা কাপড়গুলি গুছিয়ে নিচ্ছি, এমন সময় দেখতে পেলাম সেই অদ্ভুত লােকটার নাক মুখ দিয়ে ঘন ঘন নিশ্বাস বেরিয়ে আসছে। আর এক মুহূর্ত দেরী না করে লােকটীর ওপর লাফিয়ে পড়ে, তার পকেটে অম্বেষণ করে একটা পিস্তল পেলাম। দড়ি দিয়ে ট্রাঙ্কের সঙ্গে আষ্টেপিষ্টে তাকে বেঁধে ফেললাম, যাতে না পালাতে পারে। জ্ঞান ফিরে আসতেই যন্ত্রণায় সে ছটফট কোরতে লাগল। একখানা ছুরি নিয়ে তার বুকের ওপর বসে ভৎসনা করে বললাম, —তুই কি চাস বল, তা না হলে তােক মেরে শেষ করে ফেলব। কেঁপে সে বলে উঠল,-আমি টাকাকড়ি কিছুই নিতে আসিনি । কাউন্টেসের আজ্ঞামত শুধু দলিলগুলাে নিতে এসেছিলাম । আমার অগােচরে তারা কাজ হাসিল করে ফেলবে ভেবেছিল । মেঝেতে একটা মুখােস পড়ে আছে দেখতে পেলাম। লােকটীকে যদিও আমার ঘরে বন্দী কোরে রেখেছিলাম, তবুও আতিথেয়তার দিক থেকে কোন ত্রুটি করিনি। পত্রবাহকের মারফৎ কাউন্টেকে একখানি চিঠি দিয়ে জানালাম, যাতে তিনি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই লােকটিকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবার বন্দোবস্ত করেন। ঠিক নির্দিষ্ট সময়ে কাউন্টেসের কাছ থেকে পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে একটি লােক, আমার । কাছে এল। বছরে কাউন্টেসের কাছ থেকে পনের হাজার টাকা পাব, কয়েকজন উকিলের সামনে এই চুক্তি করিয়ে নিয়ে কাগজগুলি লােকটীর হাতে সমর্পণ কোরলাম। তার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যাবার পর বুঝতে পারলাম, পৃথিবীতে আর আপনার বােলতে কেউ রইল না। শৈশবের বন্ধু আমার সঙ্গে বিশ্বাস- ঘাতকতা কোরল ; প্রিয়তমা আমার সঙ্গে প্রবঞ্চনা ক'রে দূরে সরে গেল ;

•সরাইখানা ১৪৯ মাও পর্যন্ত আমাকে সন্তান বলে স্বীকার কোরলেন না। এইগুলিই হােল আমার জীবনের ইতিবৃত্ত। এই ধরণের আলােচনা কোরতে কোরতে আমরা একটা ছােট সহরে এসে পৌছলাম । রাত্রিটা সেই খানেই কাটান গেল। পরের দিন সকালে প্রাতঃরাশের সময় দার্শনিক আমাকে সম্বােধন কোরে বােললেন,-- জানেন তে, এবারে আপনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রথমে আমাকে মারসেসে যেতে হবে ; সেখান থেকে যাব ইটাল। আমি বােললাম,-মিঃ ওরনি, কেন জানিনা, আপনার জন্য সহানু, ভূতিতে আমার মন ভরে গিয়েছে। যদি আমার দ্বারা কোন রকমের একটু সাহায্য হয়, আমি প্রাণ দিয়ে তা আপনার জন্য কোরতে প্রস্তুত। আমার দুর্ভাগ্য যে সামান্য একটা উপদেশ ছাড়া আর কি দিয়ে আপনাকে সাহায্য কোরতে পারি ? ID মিঃ ওরনি—আপনি স্বচ্ছন্দে উপদেশ দিতে পারেন। বােললাম—এতগুণের অধিকারী হয়েও আপনি অসুখী, এ কথা ভেবে সত্যিই আমার প্রাণে কষ্ট হয় । আপনার মধ্যে সত্যিকারের মানুষটাকে লােকে দেখতে পায় না। বেশ বুঝতে পারি প্রিয়জনেরা আপনাকে প্রতারণাই করে এসেছে। সামান্য কয়েকজন লােকের অসৎ ব্যবহারের জন্যে আপনি সারা পৃথিবীর লােককে কিন্তু দোষী কোরতে পারেন না। এই রকম বিমর্ষচিত্তের পরিবর্তে খুস মনে সকলের সঙ্গে মিশলে, হয়ত এতদিনে আপনার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু জুটে যেত। আমার মনে হয় মারসে অথবা ইটালিতে না গিয়ে আপনার কানসাকে যাওয়াই শ্রেয়। বলে রাখছি দেখবে, আলব্রেট পরিবারের মধ্যে থেকে আপনার মন সুস্থ হয়ে উঠবে। সেখানে আপনার দুৰ্ব্বলতা নিয়ে কেউ উপহাস না করে আপনার গুণেরই সমাদর কোরবে। বন্ধুর মতই এ কথাগুলি দার্শনিককে জাৰ্মাণীর সেরা গল্প আমি বলে গেলাম। দার্শনিক আমাকে গাড়ীর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। । “আপনার ব্যায়রামের ওষুধ ক্রাণসাকে রয়েছে।” এই কথাটা বলে . আমি গাড়ীতে উঠে পােড়লাম। পারপিগনানে পৌছে সৈন্যাধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানতে পারলাম যে আমার সৈন্যদল দুদিন পূৰ্বেই ক্যাটালােনিয়ার পথে যাত্রা কোরেছে। এর কিছু পরেই সৈন্যাধ্যক্ষের কাছে শুনতে পেলাম যে সম্রাট আমাকে মেজরের সম্মানে ভূষিত করেছেন। তারপর ক্যাটালােনিয়ায় গিয়ে নিজেও সৈন্যদলের সঙ্গে মিলিত হয়ে স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা কোরলাম। দু’বছর যুদ্ধ চলল। প্রত্যেক দিনই আমাকে যুদ্ধের সম্মুখীন হ’তে হােত। জায়গাটীর অস্বাস্থ্যকর জল বায়ুর জন্যে আমাকে খুব কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হােল। মাঝে মাঝে ক্ৰানক ও ফ্যানীর কথা মনে আসছিল। সেখানকার লােকজনের সঙ্গে আমার মােটেই মনের মিল হােত না। এই অপ্রীতিকর স্থানে শুধু আব্রেট পরিবারের কথা স্মরণ করে কিছুটা শান্তি লাভ কোরতাম। এইভাবে দু’বছর কেটে যায়। একদিন ট্যারাগােনার প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে আছি এমন সময় হঠাৎ একটা গুলি এসে আমাকে ধরাশায়ী কোরে দেয়। এই দুর্ঘটনার কয়েকদিন আগেই আমি লেফটন্যান্ট কর্ণেলের পদে উন্নীত হই। ট্যারাগােনার দূর্গ কামানের গােলায় উড়ে যায়, একটা গুলি এসে আমার একটা পা’কে বিদ্ধ করে, শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাতের জন্য আমার শরীর অবসন্ন হয়ে পড়ে। বুঝতে পারলাম হয়ত আমার সৈনিক জীবন শেষ হয়ে গেল। দুজন সার্জেনের মধ্যে আমার পা অস্ত্রোপচার করা নিয়ে তর্ক বিতর্ক হয়ে গেল । প্রথম জন বােললেন,-পা কেটে না ফেললে রুগীর মৃত্যু নিশ্চিত : :

সরাইখানা ১১ দ্বিতীয়জন জবাব দিলেন,---অস্ত্রোপচার না করেই রুগীকে বাঁচান যাবে। শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের প্রয়ােজন হোল না ; আমি বেঁচে গেলাম। পেনস নিয়ে কোথায় যাব চিন্তা কোরতে লাগলাম। ডাক্তারেরা ঝর্ণায় স্নান কোরতে উপদেশ দিলেন। প্রথমে ভাবলাম, আমার দেশে পৈত্রিক সম্পত্তির দখল নিতে যাবাে ; আবার চিন্তা কোরলাম যে সম্পত্তি তদারকের জন্য একজন নিকট আত্ময় তো রয়েছেন। শেযে মনে হোল ক্রাসাকে গেলে মন্দ হয় না। ফ্যানী সুন্দরীর নিশ্চয়ই এতদিনে বিয়ে হয়ে গেছে। এতদিনে আব্রেট পরিবারের কতই না পরিবর্তন হয়েছে। ফাণীকে আমি ভাল- বেসেছিলাম, কিন্তু সে তো তার কোন প্রতিদান দেয়নি। সেখানে গেলে যদি আবার মনের শান্তি ভেঙ্গে যায়, কি হবে ? হয়ত ফ্যানী মরে গেছ, , না, সেখানে যাওয়া হবে না। এই রকম নানা চিন্তায় আমার মন ভরে যায়। যতই ভাবি ততই আৱে পরিবারের ছবিখানি আমার অন্তরে ভেসে ওঠে, শেষে ক্রানসকে যাওয়াই ঠিক কোরলাম। আমার বিশ্বস্ত ডাক পিয়ন টমাসকে সঙ্গে নিয়ে কানসাকের পথে রওনা হলাম। কদিন গাড়ীতে করে যাবার পর দূরে, ক্ৰানসাকের বাড়ীগুলি দেখতে পেয়ে বিচলিত হয়ে উঠলাম। একবার মনে হােল ফিরে যাওয়াই শ্রেয়। আবার একটা কাল্পনিক দুর্ঘটনার ছবিও আমার অন্তরে ফুটে ওঠে। গাড়ীটা পরিচিত সরাইখানার কাছে এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমার বুকটা দুরু দুরু করে উঠলাে। এ দিনটা রবিবার, শুধু ফ্যানী ছাড়া আলব্রে পরিবারের সকলেই চার্চে গেছে। গাড়ী থেকে নামবার সঙ্গে সঙ্গেই কিশােরী এসে অভ্যর্থনা কোরল ; আমি তাকে দেখে একটু অবাক হয়ে ভাবলাম, না এ তাে ফ্যানী নয়। : মনে হােল, ফ্যানী থেকে ক্রমবিকাশ লাভ করে এ যেন স্বর্গীয় পরীতে পরিণত ;

১৫২ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প হয়েছে। মনে মনে বােললাম,~-না এ তাে দেখছি বিশ্ব-শিল্পী তুলি দিয়ে নিখুত করে এ প্রতিমাটী একেছেন। সৌন্দর্য্যের উপলব্ধিতে আমার মন বিভাের হয়ে ওঠে। আমার মনে হয়, এক অপূৰ্ব্ব সুন্দরীর অশরীরী ছায়া এসে যেন আমার সামনে দাড়িয়েছে। আমি মুগ্ধ নেত্রে সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু কোরলাম। কিশােরী বন্ধুর মতই আমাকে অভ্যর্থনা কোরে মনােমুগ্ধকর হাসিতে একটা সুন্দর আবহাওয়ার সৃষ্টি কোরল। “কি সুন্দরই না তােমায় দেখতে হয়েছে ! আমার কথা কি তােমার মনে পড়ে?”--আমি বােললাম। “আপনি কি ভাবেন আমাদের স্মৃতিশক্তি এতই খারাপ ? বােললে হয়ত বিশ্বাস কোরবেন না , গতকাল সন্ধ্যায় আপনার সম্বন্ধে আমাদের ভেতর আলােচনা হচ্ছিল। ভেবেছিলাম, এতদিন খবর নেই আর বােধ হয় কখনও দেখা হবে না। আশ্চর্য, আমাকে অবাক করে দিয়ে আপনি সশরীরে এসে উপস্থিত হলেন! কি করে এলেন ? মনের কি বিচিত্র গতি! মনেপ্রাণে কামনা কোরলেই বােধ হয় সব জিনিষই পাওয়া যায়,”–তরুণী বােললে। আমি সুন্দরীর হাতের চম্পক-অঙ্গুলিতে ওষ্ঠের স্পর্শ দিয়ে বােললাম, “আমি কি তােমার এই ভুবনমােহিনী মূর্তি আমায় টেনে এনেছে ! স্পেনে যদি আমার মৃত্যুও হােত তাহলেও আমার অশরীরী আত্মা তোমার চারপাশে। বেড়াত। “সত্যিই তাহলে আমার এত ক্ষমতা !”—দুষ্ট, মিভরা হাসির সঙ্গে কিশােরী জবাব দেয় । “এখানে , স্বর্গের নীড় রচনা করে থেকে যাই। বল, মত, আছে এসেছি ? এসে সরাইখানা ১৫৩ কিনা ? সত্যি বলতে কি সুন্দরী, তােমাকে ছেড়ে যাবার পর থেকে একটুও শান্তি পাইনি মনে,” – আমি বােললাম । “আপনি দেখছি শাপভ্রষ্ট দেবতার মত পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছেন,”—কিশােরী বলে । “তােমার স্নেহের স্পর্শ দিয়ে আমার মনের ব্যাধিকে সারিয়ে দাও ! আমি ভাল হয়ে উঠব ; সেই প্রলােভনেই না তােমার কাছে ছুটে এসেছি ! তুমি পায়ে করে না ঠেললে এখান থেকে বিদায় নেব না। সত্যি আমায় কি এখান থেকে তাড়িয়ে দেবে ?” ---আমি আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলাম । “বেশ, আপনার আচরণের প্রতি লক্ষ্য রেখে যাব ; পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হােলে তারপর দেখা যাবে। আমার সন্দেহ হয়, স্প্যানিশ সুন্দরীদের অন্তরে কি রকম মণিমুক্তার খনি যে রয়েছে, তা আপনার বােধ হয় জানা নেই, সুন্দরী ছন্দিত গতিতে বলে যায়। দরজা খােলার সঙ্গে সঙ্গে মি: ও মিসেস্ আলব্রেট মেয়েদের সঙ্গে ঘরের মধ্যে ঢুকে আমার সঙ্গে করমর্দন কোরলেন। আমি তাদের কাছে ফিরে আসার কারণ ব্যক্ত কোরতেই সকলের মুখ আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলাে। মেয়েরা আমাকে ঘিরে ফেলে। অ্যানেটকে না দেখতে পেয়ে আমি বেশ বিচলিত হয়ে উঠলাম। আমার মুখের ভাব লক্ষ্য করে মিঃ আলব্রেট বােললেন, “কাকে খুজছেন আপনি, শুনতে পারি কি?” বােললাম—একজনকে শুধু দেখতে পাচ্ছি না। মিসেস্ আলব্রেট–ও বুঝেচি, জুলিয়েট যাও, ছুটে গিয়ে ফ্যানীকে ধরে নিয়ে এস। আপনাকে দেখে কতই না খুসী হবে সে । তাহলে অনেকেই কি ভুল করে ফ্যানী মনে করেছি। চারটা বসন্ত তার ওপর দিয়ে পেরিয়ে গিয়ে তাকে আঠারাে বছরের সুন্দরী ১৫৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প তরুণীতে পরিণত কোরেছে। অ্যানে আমাকে দেখে গম্ভীর হয়ে যায় কেন, বুঝতে পারি না। অনেটের কাছে এগিয়ে গিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করি, “শরীর বুঝি ভাল নেই তােমার ?” অ্যানে আমার কথা শুনে জোর করে মুখে হাসি টেনে আনে। মেয়ের অবস্থা লক্ষ্য করে মিসেস্ আলব্রেট তাকে বাইরের মুক্ত হাওয়ায় ঘুরে আসতে আদেশ করেন। “আপনার এই আকস্মিক আগমনে আমার মেয়ে বেশ চমকে গেছে, আপনাকে দেখে ফ্যানারও ওই অবস্থা হবে মনে হচ্ছে। যাতে সে বিচলিত হয়, আমাদের সে ব্যবস্থা কোরতে হবে। চমকে গেলে মূঙ্কিলের কথা। জানেন, কয়েক মাস পরেই হয়তাে আমাকে দিদিমার স্থান অধিকার কোরতে হবে। “আপনি কি বলছেন ? ফ্যানীর কি সত্যিই বিয়ে হয়ে গেছে ?” আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করি। “আপনাকে কি আগে আমরা কেউই জানাহনি যে তিন চার বছর আগেই ফ্যানীর বিয়ে হয়ে গেছে ?”–মিসেস্ আলব্রেট উত্তর দেন। বােললাম—শেষকালে সেই মানুষবিদ্বেষী লােকটীর সঙ্গে বিয়ে দিলেন ? মিঃ আলব্রেট -তাই তাে দিয়েছি, কিন্তু জানেন, সেই অদ্ভুত লােকটাকে আমার মেয়ে একেবারে বদলে দিয়েছে। তার আচার ব্যবহার একেবারে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। ওরনি এখানে একটা চমৎকার বাড়ী কিনে তাতে বরাবরের জন্য বাস কোরবে ঠিক করেছে, কারণ আমি ঠিক করেছি, আমার কোন মেয়েকে ক্রাসা ছেড়ে যেতে দেব না।

সরাইখানা
আমি—দেখুন, আমি বলছিলাম, কানসাকে কি আরেকটা ওই
ধরণের বাড়ী কিনতে পাওয়া যাবে না ।
মিঃ আলবেটা, এখানে আরও একটা নতুন বাড়ী বিক্রি আছে,
এই নিয়ে আমরা কিছুদিন আগে নিজেদের মধ্যে আলােচনা কোরে-
ছিলাম। অ্যানেটকে জিজ্ঞাসা করুন, এ খবর আপনাকে সে ভাল
কোরেই দিতে পারবে।
আমি মেয়েদের সঙ্গে আবার নতুন করে আলাপ জমাবার চেষ্টা
করছিলাম, কারণ বর্তমানে তারা বেশ বড় হয়ে গিয়েছে, আর বয়সের সঙ্গে
সঙ্গে একটা সলজ্জভাব তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে।
খানিক পরে দেখি, ওরনি এক সুন্দরী কিশােরীর গত ধরে আমার
দিকে এগিয়ে এলাে, তার হাতে ছিল টুকটুকে একটা ছেলে। কিশােরীকে
দেখে বুঝতে পারলাম, এ ফ্যানী ছাড়া আর কেউ নয়।
আমাদের পরস্পরের মধ্যে অভ্যর্থনার বিনিময় হয়ে গেল।
মিঃ ওরনি আপনার কাছে আমি সত্যিই ঋণী ; দয়া করে একবার
আমার বাড়ীতে অতিথি হবেন। আপনার উপদেশে আমি বিশেষ উপকৃত
হয়েছি। ইতালীর পরিবর্তে আমাকে জান্সাকে আসতে আপনিই
উপদেশ দিয়েছিলেন, একথা বােধ হয় আপনার স্মরণ আছে। এখানে
অসুখের প্রকৃত ওষুধ আমি পাব, একথাও আপনি আমাকে জানিয়ে-
ছিলেন। ইতালীতে গিয়ে আমার কোনই সুবিধা হয়নি, তারপর
ফ্লোরেন্সে গিয়ে আপনার কথা মনে হােতেই আমি ক্ৰান্সাকে ফিরে
এসে সত্যিকারের
ওষুধ
পেলাম।
কথা শেষ কোরেই দার্শনিক ভদ্রলােক তার সুন্দরী স্ত্রীর মুখ চুম্বন
কোরলেন।
“ওর কথা একটুও বিশ্বাস কোরবেন না, কর্ণেল। মাঝে মাঝে মুখ

১৫৬ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প ভার করে আমায় শুধু বলে, এখানকার ওষুধ মােটেই ভাল নয়, ভয়ানক তেতাে”,-সুন্দরী ফ্যাশী বলে যায় । ওরনি আমাকে তার বাড়ীতে একদিন নিমন্ত্রণ কোরল। আলব্রেট পরিবার প্রতি রবিবারেই দার্শনিকের বাড়ীতে আসতাে। ওরনি মাকে তার বাড়ীতে নিয়ে এসেছে, তাদের মধ্যে ঝগড়ার মীমাংসা হয়ে গেছে ওরনির বিবাহের ঠিক পরেই ; ফ্যানীর অনুরােধে মাকে সে নিয়ে আসে। কাউন্টেসের সঙ্গে কর্ণেলেরও পরিচয় হয়ে গেল। মহিলার সঙ্গে কথা বােললেই বুঝতে পারা যায় যে তিনি সত্যিই বিদূষী। অনেক দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিয়ে গিয়ে, কাউন্টেসের মন শান্ত ও স্থির হয়ে গিয়েছে, তার সঙ্গে একটা ধৰ্ম্মভাব এসে তাকে আরও সুন্দর করে তুলেছে। টেবিলের পাশে উপবিষ্ট ফ্যানী ও ওরনি আমাকে ক্রাসাকে কিছু- দিনের জন্য থাকতে অনুরােধ কোরল। মি: ও মিসেস্ আলব্রেটের সঙ্গে জুলিয়েট, কেট ও সিলেষ্টাইন যুক্ত হয়ে আমাকে সেখানে থাকতে অনুরােধ করে, কিন্তু অ্যানেট সুন্দরী একটীও কথা না বােলে চুপ করে বসেছিল। আমি আশা করেছিলাম, সে হয়ত মুখ ফুটে কিছু বােলবে, কিন্তু তার মুখ থেকে কোন কথা না পেয়ে আমার মন বেদনায় ভরে ওঠে। আমি খোড়া পায় নিরাশ না হয়ে একবার ওরনির বাড়ী যাই, আরেকবার মিঃ আলব্রেটের কাছে ঘুরে আসি। অ্যানেট ছাড়া আমার কাছে সকলেই অভিযােগ করে যে চার বছর হােল পাইরেনিস্ থেকে ক্ৰান্সাকে আমি কোন চিঠিপত্রই দিইনি। হঠাৎ অ্যানেট আরম্ভ করে-কর্ণেল না থাকলে কি হবে ; তার মনটা ততা এখানে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছিল। সত্যিই যাদের মধ্যে বিচ্ছেদই হয়নি, সেখানে চিঠি দেবার তাে কোন প্রয়ােজনই হয় না। এই কথায় আমি জানালাম যে বিদেশে থাকতে আলব্রেট ;

সরাইখানা ক পরিবারের ছবি আমি প্রায়ই কাগজ কেটে তৈরী কোরতাম। যােগাযােগটা এইভাবেই বজায় রেখেছিলাম। ওরনির বাড়ী দেখে আমার মনে হয়েছিল, যেন ফ্যানীকে নিয়ে সে সেখানে স্বর্গ রচনা কোরেছে। বাড়ীর ঘরগুলি প্রশস্ত, আলাে বাতাসে ভরা, মার্জিতভাবে সাজান, সামনেই সুন্দর বাগান। ঝরণা থেকে স্নান সেরে আমি প্রায়ই ওরনির বাগানের ছায়া বীথিকার মধ্যে গিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। দাশনিককে প্রায়ই বাগানে শেওলা ঘেরা হ্রদের ধারে ফ্যানীর সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। মাঝে মাঝে মৃদু গুঞ্জরণে প্রেয়সীর কাণ ভরিয়ে তুলতেন। আমি ভাবি, যদি এই রকম ধারা অনেটের সঙ্গে আমিও ঘুরে বেড়াতে পারতাম তাহলে কি আনন্দের স্বাদই না আমি পেতাম অ্যানেটের কথা সদা সর্বদাই আমার মনে এসে দোলা দিয়ে যায় । তিন সপ্তাহ ক্ৰানসাকে থেকেও অ্যানেটের কাছ থেকে আমি কোন সাড়া পেলাম না। দিনের পর দিন আমার এইভাবে কেটে গেল, আর মনে হােল, কি যেন এক মায়ার জালে মায়াবিনী অ্যানে আমাকে বেঁধে | রেখেছে। মাঝে মাঝে সেই পবিত্র, সুন্দরী অনেটের সামনে আমার রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠত ; নিজের অবস্থা বুঝতে পেরে বেশ একটু লজ্জা পেতাম। মদনের পঞ্চশরের হাত থেকে আর নিষ্কৃতি পেলাম না, হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে গেল। আমার মনের মধ্যে একটা ঝড় বয়ে যায় । ব’য়ে যায়। আবার শরতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আমি নিরাশ হয়ে পােড়লাম। ভাবলাম, এ জায়গা ছেড়ে না গেলে মনের বেদনা থেকে নিষ্কৃতি লাভের আর কোন উপায় হবে না। অনুভব করি, মনের সে আনন্দ হারিয়ে ফেলেছি। একটা ১৫৮ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প জরুরি ব্যাপারে দেশে ফিরতে হবে, একথা জানিয়ে জিনিষপত্র গুছিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হােলম। আমার কথা শুনে অ্যান্টুে পরিবারের সকলেরই চোখ ছল্ ছল্ করে ওঠে। অ্যানেট ছাড়া সকলেই অনুরােধ করে যাতে আমি আবার সামনের বসন্তে তাদের এখানে ফিরে আসি। অ্যানেট আমাকে ভাবিয়ে তোলে ; ভাবি, আমায় সে ভালবাসে, না আমার কাছ থেকে নিষ্কৃতি পেতে চায়। একদিন সকালে আমি মানেট ও ফ্যানীর সঙ্গে ওরনির বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। একটা গােলাপ ঝাড়ের সামনে হঠাৎ থেমে একটু ঠাট্টার ছলে বােললাম, “অ্যানেট সুন্দর, মনে আছে ক্ৰান্সাক্পরিত্যাগের আগে আমাদের মধ্যে ফুলের বিনিময় হয়েছিল ? এবারে কিন্তু দিলেও আমি সে ফুল নেব না। ফুলের রাণী, সে তো শেষ হয়ে গিয়েছে, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুসীর হাসিও তার মুখ থেকে মিলিয়ে গেছে, রয়েছে শুধু কাটা।” ফাটা শুনে অ্যানেট লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে উঠে, প্রাণ মাতানো হাসির ঝলক তুলে বােলল, “এবারে আমার বােনের পালা।” ফ্যানী জবাব দিতে যাচ্ছিল এমন সময় একটি ছোট্ট মেয়ে, ছুটে এসে তাকে ডেকে নিয়ে গেল। “আমি এখুনি ফিরে আসছি, এর মধ্যে আপনাদের ভেতর একটা বােঝাপড়া হয়ে যাক,” এই কথাটি বলে একটু সময় না দিয়ে ফ্যানী চলে গেল। “যাবার বেলা ও হাত থেকে স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ কিছু মিলবে না,?” আমি অ্যানেটুকে বলি।

. সরাইখানা
—“ওঃ, একটা কিছু স্মরণচিহ্ন আপনি চান ?”-উত্তরে অ্যানেট
বলে।
আমি—হায় ভগবান! তােমাকে স্মরণ করিয়ে দেবার মত কোন
উপহারই কি পার না? তােমার আমার মধ্যে যে ব্যবধানের সৃষ্টি হবে,
তাকে সংযোগ করবার জন্য একটা কিছু দাও সুন্দরী,. যাতে করে সম্পূর্ণ
অভাবটা আমার মনকে চঞ্চল না করে তােলে।
চোখের কোণে একটু মুচকে হেসে অ্যানেট বােলল, “যে অ্যানেট
আপনাকে ফুল দিয়েছিল, স্পেনে থাকবার সময় সে আপনার মনে স্থান
পেল না ; কিছু না দিয়েই সে স্থান পেল ফ্যানী ! ফ্যানীর সঙ্গে হাত
বদল করুন না ! জানেন, আমি কিন্তু ভয়ানক স্বার্থপর !”
আমি-হ্যা, অবুঝ, নির। আমার ক্রাাকে না আসাই ছিল
ভাল।
এসে এখান থেকে লাভ করে গেলাম অশান্তি ; চিরদিনই
বেদনার বােঝা বহন করে চলতে হবে। মরে গেলেও আর আমি
ক্রানুসাকে আসছি না।
“ভয় দেখাচ্ছেন কর্ণেল সাহেব, আমাকে দোষ দেন কেন ? (বে
তাে,”—অ্যানেটু বলে।
আমি-- কথাটা মিথ্যে নয়, পৃথিবীর মধ্যে সব চেয়ে প্রিয় স্থানটা থেকে
আমায় তুমি তাড়িয়ে দিচ্ছ ?
—“হায় ভগবান, আপনি কি স্বপ্ন দেখছেন ? আমি আপনাকে
তাড়িয়ে দিচ্ছি ! ভগবান, মুখ তুলে চাও! বাড়ীর সকলেই আপনার
যাওয়ার কথায় দুঃখিত, আর আমিও কি কম ব্যথা পেয়েছি। আর
আপনি কিনা এই কথা বলছেন?”—ছলছল চোখে অ্যানেটু বলে
যায়।
আমি-আমার যাওয়া না যাওয়া নির্ভর করছে তােমার ওপর,

জাৰ্মাণীর সেরা গল্প সুন্দয়ী। তােমার একটু সামান্য ইঙ্গিতেই, আমার জয় পরাজয়ের বিচার হয়ে যাবে। তুমি কি জান, তােমাকে শুধু ভালবাসার জন্যেই বেঁচে আছি । এ পৃথিবীতে তােমার মত প্রিয় আর আমার কাছে কিছু নেই। আমায় কি থাকতে অনুমতি দিচ্ছ, বল ? অ্যানেট নতমুগে, নীরবে, গাছের সারির মাঝখান দিয়ে চলতে আরম্ভ কোরল। • আমি আর থাকতে না পেরে, তার কোমল হাতখানি ধরে ফেলে, আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা কোরলাম, “আমি কি এখানে থেকে যাব ?” “কর্ণল সাহেব, নিজেকে অথবা আমাকে বঞ্চনা করে কোন লাভ নেই। স্পেনে থাকার সময় অনেটের চিন্তা মন থেকে সরে গিয়ে, সেই স্থান অধিকার করেছিল ফ্যানী, আমি কি বুঝি না?” —-গাম্ভীর্যের সঙ্গে অ্যানেট্‌ বলে যায় । আমি-কথনই না। অ্যানেটের চিন্তায় আমার মন বিভাের হয়েছিল। ফ্যানির কথাও আমি ভুলিনি, একথা সত্যি। অ্যানেটের দেওয়া ফুলটিকে মূল্যবান পাথরের মত যত্ন করে রেখে দিয়েছি। যেদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নেব, ফুলটিও আমার মৃতদেহের সঙ্গে অনুগমন কোরবে, এই আমার শেষ ইচ্ছা। অ্যানেকর্ণেল সাহেব, স্পেন থেকে ফিরে এসে ভুল কোরে আমায় ফ্যানী ভেবেছিলেন, না ?” আমি সত্যিই তাই ভেবেছিলাম, সুন্দরী। ফ্যানীর থেকে শতগুণ সুন্দর তােমায় মনে হয়েছিল। চার বছর আগে ফ্যানীর পরিবর্তে তােমায় ফুলটি দিয়েই সত্যিকারের আনন্দ পেয়েছিলাম, বিশ্বাস কোরবে ? তুমি কি জান, স্পেনে থাকার সময় তােমাকে আমার হৃদমন্দিরে দেবীর আসনে বসিয়েছিলাম। ভাবতাম, পরীর মত যে পবিত্র তার স্থান স্বর্গে, ।

সরাইখানা
১৬১
এ পৃথিবীতে নয় । মনে হয়, তােমার ওই উচ্চ আসনের পাশে আমার
স্থান হােতেই পারে না।
“কে আপনাকে একথা বােললে ?”—অপূর্ণ চোখে কিশােরী বলে
যায়।
অভিমানের অশ্রুধারায় তার মুখখানি অপূর্ব সুন্দর হয়ে ওঠে।
আননে আমার মন ভরে যায়।
আমি—“অ্যানেট, বল, বল, তােমার পাশে এখানে আমায় একটু স্থান
দেবে ?
“ওকথা বলে, আমার মনে কেন ব্যথা দেন?” আমার বুকের ওপর
মাথা রেখে কিশােরী ধীরে ধীরে ব’লে যায়।
তার বাহুবন্ধনের মধ্যে থেকে মনে হােল, কোন্ স্বপ্নলােকে যেন চলে
গেছি ; এমন সময় এক জোড়া হাতের স্পর্শ পেয়েই বুঝলাম, এ ফ্যানী
ছাড়া আর কেউ নয়। লতার মত কোমল দুটি হাত দিয়ে আমাদের
জড়িয়ে ধরে তার বােনের ওষ্ঠে দিল প্রথম চুম্বনের স্পর্শ, দ্বিতীয়টী দিল
আমায়।
“তােমার প্রিয়তমকে যে চুম্বন দিলাম তার জন্য রাগ কোর না,
বােন,” --ফ্যানী বলে যায়।
ফ্যানীর
মধুর ব্যবহারে ও গুঞ্জরণের মাঝে পড়ে আমাদের তন্দ্রাভাব
কেটে যায়।
“ওরনির কাছে আমরা ফিরে গেলাম। সত্যিই আজ আনন্দে
জীবন আমার কানায় কানায় পূর্ণ।” দার্শনিক উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে
ওঠে।
যে বাড়ী বিক্রি হবার কথা ছিল, তার মালিকের কাছে, কারুকে
কিছু না জানিয়ে ছুটে চলে গেলাম। আগেই কয়েকবার এই বাড়ীটীর

* ১৬২ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প মধ্যে গিয়ে তন্ন তন্ন করে সব কিছু দেখেছি। অ্যানেটের মত পেলে অনেক আগেই হয়তাে বাড়ীখানা কিনে ফেলতাম। সেদিনই আমি বাড়ী কিনে দলিলে সই করিয়ে নিয়ে তাদের কাছে ফিরে এলাম। অ্যানেট আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে আগ্রহের সঙ্গে প্রশ্ন কোরল, “সরে পড়ে এতক্ষণ কোথায় থাকা হয়েছিল, শুনতে পারি কি ?” f “জান, গােলাপে ভরা চমৎকার একটা বাগানবাড়ী কিনেছি। আজ থেকে এটা তােনার হেল, সুন্দরী,”—আমি দ্রুতগতিতে বলে গেলাম । কথাটা শুনে আনন্দে কিশােরীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আমরা সকলে মিলে দল বেঁধে আনন্দের ঝড় বইয়ে দিয়ে সরাইখানায় গিয়ে উঠলাম। মিঃ ও মিসেস্ আলব্রেটকে বাড়ী কেনার কথাও জানিয়ে দিলাম। মিঃ আলব্রেট আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে অনেটের দিকে একবার দৃষ্টিপাত কোরলেন । কিশােরী ছন্দিত গতিতে বাপের কাছে ছুটে যায়, আবার আনন্দে অধীর হয়ে ছুটে গিয়ে মার বুকে ফুলের মত কোমল মুখখানি লুকিয়ে ফেলে। এই দিন থেকে পৃথিবীটা আমার কাছে স্বর্গের সমান মনে হােল। বােলতে বাধা কি, এখন থেকে আনে আমার চির সঙ্গিনী। সরাইখানা আমার ও ওরনির মনের মধ্যে আনন্দের উৎস জাগিয়ে দিয়েছে। মনের ব্যাধি নিয়ে যে কোন লােকই আমাদের এখানে আসুক, আমি জোর গলায় বলতে পারি, এই মধুর পরিবেশে তাকে সুস্থ হতেই হবে।

বীণা নববিবাহিত দম্পতি মধু-চন্দ্র নিশির আনন্দে বিভাের। তাদের দেখে মনে হয়, প্রেমের রাজত্বকে শুধু এরাই অধিকার কোরে রসে আছে। আনন্দ সাগরে তারা ডুব দিয়েছে। ভবিষ্যতের ভাবনা একটুও তাদের মনে স্থান পায় না। আশৈশব কিশােরী ছিল তরুণের বান্ধবী, খেলার সাথী। অবস্থার বিপাকে পড়ে এই শান্তির নীড় গড়ে নিতে সেনাকে অনেকটা সময় অপেক্ষা কোরতে হয়েছিল। প্রকৃত প্রেমিক তার প্রিয়তমাকে লাভ করার জন্যে যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা কোরতে পারে। অবশেষে প্রচুর ঐশ্বর্য লাভ করে রবিবার দিন তরুণ তার প্রিয়তমাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন বাসভবনে প্রবেশ কোরলেন । আত্মীয়দের মাঝে উৎসব ও শুভেচ্ছার মধ্যে দিয়ে একে একে দিনগুলি কেটে গেল। এরপর নীরবতার মাঝে এসে তারা যেন স্বর্গ সুখ লাভ কোরল। কত মধুর দিন রাত্রি তাদের প্রেমের গুঞ্জরণের মধ্যে দিয়ে কেটে যায়। কখনও সে বাঁশী নিয়ে বসে, বাঁশীর রঞ্জ থেকে বেরিয়ে আসে সুমধুর রাগিনী। আবার তরুণীর হস্তের স্পর্শে বীণার তন্ত্ৰীগুলি ঝঙ্কারিত হয়ে ওঠে। তাদের এই মধুর মিলন দেখে মনে হয়, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তাদের সাদর অভ্যথনার জন্য আসন বিছিয়ে রেখেছে। একদিন সন্ধ্যায় পরস্পরের সঙ্গীত চর্চা শেষ হয়ে গেলে, জোসেফাইন তাঁর প্রিয়তমকে জানালেন, মাথায় তিনি একটা বেদনা অনুভব কোরছেন।

১৬৪ জাৰ্মাণীর সেরা গল্প পাছে স্বামী চিন্তিত হােয়ে পড়েন এই ভেবে রমণী দিনের মধ্যে একবারও এ বেদনার কথা তাকে জানাননি। স্নায়বিক দুর্বলতার জন্য সন্ধ্যার সঙ্গীতের উত্তেজনায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্বামীর কাছ থেকে ব্যথাকে তিনি গােপন রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি। যুবক চিন্তিত হােয়ে ডাক্তারকে সংবাদ দিলেন। ডাক্তার অভয় দিয়ে বােললেন -চিন্তার কোন কারণ নেই, সকালের মধ্যে সব কষ্ট চলে যাবে। সারা রাত্রি রুগ্না অজ্ঞান অবস্থায় ভুল বকে গেলেন। ডাক্তার পরীক্ষা কোরে জানালেন, যে একটা বিশেষ রকমের স্নায়বিক দুর্বলতায় আক্রান্ত হােয়ে, রমণীর এই অবস্থা হয়েছে। চিকিৎসা ও সেবার দিক থেকে কোন ত্রুটি হােল না, কিন্তু রুগ্নার অবস্থা দিন দিন সঙ্গীন হােয়ে এল। মিঃ সেনার বিশেষ রকম চিন্তিত হয়ে পড়লেন। নবম দিনে যােশেফাইন হৃদয়ঙ্গম কোরলেন, পৃথিবীতে তার আর বেশীদিন থাকা হবে , ডাক্তার বৃথাই তাকে এ ধরণের আশ্বাস দিচ্ছেন। রমণীর বুঝতে বিলম্ব হােল না, দিনগুলি তাঁর শেষ শেষ হয়ে আসছে ; একথা ভেবে জোসেফাইন মনকে শক্ত করে বেঁধে নিলেন। শেষবারের মত প্রিয়তমের হালখানিকে ধরে অশ্রুপূর্ণ নয়নে রমণী বােললেন,-এমন সুন্দর পৃথিবী, যেখানে আমরা সুখের নীড় বেঁধেছিলাম সেখান থেকে বিদায় নিতে সত্যিই আমার মন বেদনায় ভরে আসছে। তােমার বাহুবন্ধনের মধুরতা থেকে বঞ্চিত হলেও, জানি আমার অশরীরি আত্মা তােমার চারি পাশে ঘুরে বেড়াবে। আবার পরজন্মে তােমায় আমায় মিলন হবে। এই কথাগুলি বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীর অসাড় হয়ে আসতে লাগলাে। জোসেফাইন চিরনিদ্রায় অভিভূত হয়ে পােড়লেন। রাত্রি তখন নটা। ।

বীণা শশাকে সেরের হৃদয় বিদীর্ণ হােয়ে গেল। তার শরীর ভেঙ্গে পােড়ল। কয়েক সপ্তাহ ধরে নীরবে এই বেদনাকে সহ্য করার পর, ধীরে ধীরে তার মন সুস্থ হতে লাগলাে। যৌবনের সৌকুমাৰ্য্য, অনুপ্রেরণা হারিয়ে, বিষাদপূর্ণ চিন্তার মধ্যে তার মন তলিয়ে গেল। মাঝে মাঝে অতীতের বেদনা দায়ক স্মৃতির টুকরােগুলি এসে তার চিত্ত-সরােবরে। আলােড়ন এনে দেয়। জোসেফাইন গত হবার পর, তার জিনিষপত্রগুলি একইভাবে পড়ে থাকে, সেগুলিকে কেউই স্পর্শ করে না। করে না। বােনার জিনিষগুলি আগের মতই টেবিলের ওপর পড়েছিল। বীণাটিও ঘরের কোণে নির্দিষ্ট স্থানেই দেখতে পাওয়া গেল। সন্ধ্যায় যুবক প্রিয়তমার স্মৃতিবিজড়িত ঘরখানির মধ্যে গিয়ে, জানলার ধারে দাড়িয়ে বাশটি মুখে লাগিয়ে স্বপ্ন জগতের মধ্যে তলিয়ে যেতেন। এক চাঁদিনী রাতে সামনের দুর্গের চূড়া থেকে প্রহরী নটা বাজার সময় সঙ্কেত করার সঙ্গে সঙ্গেই জোসেফাইনের বীণা থেকে সঙ্গীতের মূচ্ছনা বেরিয়ে এল। যুবক এই অলৌকিক ঘটনায় চমকে গিয়ে তার বাঁশী বাজান থামিয়ে ফেললেন বীণার ঝঙ্কারও থেমে গেল। কিছু পরে আবার যেই তিনি জোসেফাইনের প্রিয় রাগিনীটি নিয়ে বর্শাতে আলাপ কোরছেন, এমন সময় হঠাৎ তার সুরে সুর মিলে গিয়ে বীণাটি বেজে উঠলো। আনন্দে তার দেহ রােমাঞ্চিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই মেঝেতে পড়ে অনুভব কোরলেন যেন তাঁর প্রিয়তমার অশরিরী কায়াকে তিনি জড়িয়ে ধরেছেন। এর কিছু পরেই, উত্তপ্ত বায়ুর সঙ্গে সঙ্গে একটা আবছা আলােয় ঘর ভরে গেল। উচ্ছ্বসিত হয়ে যুবক বলে উঠলেন, তুমিই তাে আমার জোসেফাইনের অশরীরি ছায়া। আমার কাছে এসে মাঝে মাঝে মেহের স্পর্শ দিয়ে যাবে, সত্যিই তুমি আমায় এখনওভালবাস, না?

১৬৬ জাৰ্ম্মাণীর সেরা গল্প তােমার নিঃশ্বাস ও চুম্বনের স্পর্শ আমার ওষ্ঠে অনুভব কোরছি। তােমার উপস্থিতিতে আমার সারা অঙ্গ রােমাঞ্চিত হয়ে উঠছে। আরেকবার যুবক যেই বাঁশী তুলে ধরেছেন, অমনি বীণাটা বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই মূৰ্চ্চনাটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। সন্ধ্যার উত্তেজনায় যুবকের স্নায়ুতন্ত্রীগুলি ভীষণভাবে আলােড়িত হয়ে ওঠে। রাত্রে তার সুনিদ্রা হয় না। ঘুমের মাঝে মুচ্ছনাটা যেন তাকে ডাকছে, “চলে এস, আমি তােমায় ডাকছি”। একটু দেরীতেই তার ঘুম ভাঙ্গে। রাত্রের সেই স্বপ্নের আমেজটা তার মন থেকে এখনাে সরে যায়নি। তাঁর স্ত্রীর আত্মা তাদের প্রেমকে দেহাতীত কোরে তুলেছে, এই ভেবে তার অন্তর্জগতে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। জোসেফাইনের ঘরে গিয়ে বাঁশী বাজিয়ে সুরের মধ্যে দিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে যােগাযােগ স্থাপন কোরবেন, তিনি এই ভেবে সন্ধ্যার অপেক্ষায় অধীর চিত্তে বসে থাকেন। নটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে যেই না যুবক বাণীতে সুর ধরেছেন অমণি বীণার ঝঙ্কারে সারা ঘরটা গম্ গম্ করে ওঠে। বাশীর শব্দ থামার সঙ্গে সঙ্গেই বীণার মূৰ্ছনাও বন্ধ হয়ে যায়। আবছা আলােটা যেই না তার মাথার ওপরে দাড়ায় অমনি তিনি উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে ওঠেন -জোসেফাইন! জোসেফাইন! তােমার বুকে আমায় তুলে নাও। বীণার মূচ্ছণার রেশটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। প্রথম বারের থেকে এবারের উপলব্ধি তাঁর মনে গভীর ছাপ রেখে যায়। সেনার তার নির্জন ঘরখানির মধ্যে প্রবেশ করেন। তার বিশ্বস্ত চাকর প্রভুর অবস্থা দেখে এতই ব্যথিত হয়ে পড়ে যে, কারুকে কিছু না জানিয়ে ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসে। ডাক্তার ছিলেন সেরেরই বন্ধু। তিনি পরীক্ষা কোরে দেখলেন জোসেফাইনের বীণা অসুখের, লক্ষনের সঙ্গে কোনই পার্থক্য নেই, এমন কি মৃতার থেকেও তার অবস্থা শােচনীয়। রাত্রে সোরের জ্বরের মাত্রা খুবই বেড়ে গেল। জ্বরের ঘােরে মাঝে মাঝে তিনি জোসেফাইন আর তাঁর বীণার কথা বােলে যাচ্ছিলেন। সকালে তার অবস্থার কিছু পরিবর্তন হােল। মানসিক চঞ্চলতা কমে গেল। যাতনার অবসান হােল বটে কিন্তু তার মনে 'হােল জীবনের শেষ অধ্যায়ে আসতে আর বেশী দেরী নেই ! ডাক্তার সেনারকে অভয় দিলেন। রুগী গত সন্ধ্যার বিবরণগুলি তার কাছে একে একে দিয়ে গেলেন, ডাক্তারের কথায় তিনি আশ্বস্ত না হয়ে নিজের মতকেই ধরে রইলেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার দেহ দুর্বল হয়ে পােড়ল। কম্পিত স্বরে সেনার সকলকে অনুরােধ কোরে বােললেন-আমাকে জোসেফাইনের ঘরে আপনারা পৌছে দিন। কথা মত তাকে স্থানান্তরিত করা হোল। সেলনার স্থির চিত্তে চারিদিকে একবার তাকিয়ে নিলেন। তার চোখের জল ঝরে পােড়ছিল। সেলনার স্পষ্ট অনুভব কোরলেন, ন'টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই তার জীবনের দীপশিখা নিতে যাবে। সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তটী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগলাে। সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, ডাক্তার ছাছা অন্য সকলকে ঘরের বাইরে যেতে অনুরােধ কোরলেন । আরেকবার দুর্গের চুড়া থেকে নটার ঘণ্টা বেজে উঠলো। সেলনারের চোখদুটি স্থির হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে একটা স্বর্গীয় উজ্জ্বলতায় তার মুখখানি ভরে গেল। মৃদুস্বরে একবার তিনি বলে উঠলেন ;—এখান থেকে বিদায় নেবার আগে, জোসেফাইন আমার পাশে এসে দাড়াও। তােমার প্রেমের স্পর্শে যাতে মন থেকে ভয় দূরে সরে যায় সেই আশ্বাস দাও। সঙ্গে সঙ্গেই বীনার তন্ত্ৰীগুলি থেকে সুমধুর সুর ( রাগিনী) বেরিয়ে এলাে অঝরে ১৬৮ জাম্মাণার সেরা গল্প আর মৃত্যুপথের যাত্রীর দেহের ওপরে একটা উজ্জল আলাে এসে ঘুরতে লাগলাে। আমি আসছি ! আমি আসছি ! এই কথা দুটি বােলে তিনি যেন মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাজয় স্বীকার কোরে নিলেন। বীনার ঝঙ্কার ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। সেনারের দেহ অসাড় হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে যেন কোন অদৃশ্য হাত এসে বীনার তারগুলিকে ছিড়ে দিল। ডাক্তার দুঃখে বিচলিত হয়ে যুবকের চোখ দুটি বন্ধ করে দিলেন। মনে হচ্ছিল মিঃ সেলুনাহ্ যেন শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। শশাকে অধীর হয়ে ডাক্তার বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলেন। বন্ধুর মৃত্যু সচক্ষে দেখে ডাক্তার শােকে এতই অভিভূত হয়ে পােড়েছিলেন যে তার অন্তরঙ্গ বন্ধুদের কাছে এই দুঃসংবাদ সঙ্গে সঙ্গে বহন করে নিয়ে যেতে পারেননি। ভগ্নবীনাটিকে বন্ধুর স্মৃতি চিহ্ন স্বরূপ যত্ন করে রেখে দিয়েছেন।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Garmanir Sera Galpo Ed. 1st

Author
Ghosh, Shailobihari
Title
Garmanir Sera Galpo Ed. 1st
File name
Garmanir Sera Galpo Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1945
Published
2009/08/14
Publisher
Kiranbihari Ghosh, Koklata
Language
Sanskrit
Pages
182
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Short stories
DLI number
512642
Barcode
4990010019697.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
DjhwMUPXHf2
Download PDF

Garmanir Sera Galpo Ed. 1st