Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Hajrat Musa Ed. 1st

Wase, Abu Ahamed Abdul · 2010/02/15

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

হঙ্গত মুসা
আবু আহমদ আবদুল ওয়াসে
প্রণীত
প্রথম অংঘরন
বার আনা

ওয়াজিদ আলি খান
ভাৱতী লাইবেৱী
বাঙ্গালাবাজার
প্রিন্টার—দুৰ্গামােহন চৌধুরী
এসােসিয়েটেড, প্রিন্টিং এণ্ড পারিশিং কোং লিমিটেড,
৪•, কলতাবাজার, ঢাকা

আমার বড় ভাই
মৌলভী শামসুজ্ঞজমান
মরহুম সাহেবের
পবিত্র আত্মার উদ্দেশে
আমার অতি সাধের
হজরত মুসা
উৎসর্গ করিলাম
আবু আহমদ আবদুল ওয়াসে
নূরপুর—মৌলভী বাড়ী
ময়মনসিংহ

নতুন বই কিনিবার আগে উপন্যাসের উজ্জ্বল নক্ষত-মণি-উপহারের সেরা মুসলিম বিদুষী নার্গি-আসার খানম সাহেবার তহমিনা সণo ধূমকেতু ১০ পথিক-হাওয়া । একবার দেখিবেন যেন। অার দেখিবেন আপনাদের চিরপরিচিত বাঙ্গালার একমাত্র মুসলিম ঐতিহাসিক ও নাট্যকার মৌলভী আলি আকবর খান, বি-এ সাহেবের বিরাট কল্পনার কীর্তিস্তম্ভ-মুসলিম এতিভার দীপ্তসূর্ষ- ঐতিহাসিক নাটক শেৱশাহ, ১া অৱগজেব, ১০ ভূইংরি মসনদ তারপর যুগান্তরকারী ঐতিহাসিক পঞ্চাঙ্ক নাটক बिशनर.० কাজ যেখানে হিমালয় প্রমাণ, কথার আলো জ্বালাইয়া সেখানে কাজ নাই। মৌলভী আলতাফ আলি খান ভাৱতী লাইব্রেৱী বাঙ্গালাবাজার ভাগ হজরত মুসা ১ হজরত মূসার বংশ পরিক্ষ্ম ও জন্ম। মেহেরবান আল্লাহতাআলা যুগে যুগে দুনিয়াতে পয়গম্বর পাঠাইয়া অজ্ঞানান্ধকার দূর করিয়াছেন। এক পয়গম্বরের প্রভাবে জগতের যাবতীয় কাৰ্য্য সুচারুরূপে সম্পন্ন হইতে থাকে, মানুষ আল্লাহতাআলাকে চিনে, আল্লাহতাআলার কাজে আত্মনিয়ােগ করে তার অন্তরে ভয়-ভক্তি জাগে। আবার যখন আল্লাহতাআলার নির্দেশ অনুযায়ী পয়গম্বর নখর জগত পরিত্যাগ করিয়া শাখতের দিকে প্রমাণ করেন, তখন জগতের রীতি-নীতি পরিবর্তন হইতে থাকে। প্রাণীজগতে মত-বৈষম্য লেখা দেয়, ফলে উহা চরমে উঠিয়া মানুষে-ইতরে প্রভেদ থাকে না। তখনই বিতীয় ব-বাণীর অত্যুদয় হয়। আবহমানকাল হইতে দুনিয়াতে এই বিধান চলিয়া আসিতেছে। পহেল মানুষ ও পহেলানবী হজরত আদমের পর, তাঁহার বংশধর হইতে যুগে যুগে বহু পয়গম্বর পয়দা হইয়া, স্বীয় কাৰ্য সমাপ্ত করিয়া এতেকাল হজরত মুলা করিয়াছেন। হজরত আদমের বহু জমানা পরে, তাহার বংশধর হজরত ইয়াকুবের য়ুসূফ নামে এক পুত্র জন্ম গ্রহণ করেন। এই হজরত নূহফ জন্মভূমি কিনান হইতে ধৃত হইয়া মিসর দেশের বাদশাহ, আজীজের নিকট গােলামরূপে বিক্রিত হন। এই স্থানেও নানা প্রবঞ্চনায় পড়িয়া তাহাকে কারাযন্ত্রণা ভােগ করতে হয়। আল্লাহ তাআলার কুদরতে কারামুক্তির পর, তিনি মিসর দেশের বাদশাহ, হন। প্রকৃতির রঙ্গভূমি মিসরের মনাফত শহর তাহার রাজধানী ছিল। তাঁহারই বংশধরগণ বনি-ইসরাইল বা সিক্ত নামে পরিচিত; আর মিসরের আদিম অধিবাসী ও ঔপনিবেশিক গণ কি তি নামে অভিহিত । হজরত য়ুসুফের এন্তেকালের পর, তাহার বংশধরগণ কিছুকাল মিসরে রাজত্ব করেন, কিন্তু অচীরেই বিশাল মিসর রাজ্য ধ্বংলােসুখী হইয়া কিবতিদিগের হস্তগত হয়। হজরত মূসুফের পর বহুকাল যাবৎ জগতে আর কোনও পয়গম্বরের আবির্ভাব হয় নাই। কাজেই মিসর রাজ্যও আর উদ্ধার হয় নাই। এই সময়ে মিসরের অধিপতিগণ ‘ফেরাউন নামে বিখ্যাত ছিল। মিসরের শেষ কিবতি বাদশাহ, অলিদ-ইবনে-মাসায়েরের রাজত্বকালে, ইসরাইল ইমরান-ইবনে-নাসীরের ঔরষে বিবি মুখায়েলের গর্ভে, ফেরাউনের দুশমন হজরত মূসার জন্ম হয়। অলিদ-ইবনে-মাসায়ের পূর্ণ চারি শত বৎসরকাল অক্ষত স্বাস্থ্যে মিসরে রাজত্ব করে। তাহার জীবনের কথা অতি কৌতুহলজনক। অলিদ বলখের অধিবাসী দরিদ্র মাসায়েরের গৃহে জন্ম গ্রহণ করে। আজন্ম দুঃখী অলিদ পেটের দায়ে স্বদেশ পরিত্যাগ করিয়া চাকুরীর তালাশে মিসরে আগমন করে। মিসরে প্রবেশকালে, ছিয়াহতের পথে, হামান নামক হজরত মুলা ১০% এক ব্যক্তির সহিত তাহার সাক্ষাৎ হয়। বাক্যালাপের পর উভয়ের মধ্যে সৌহৃদ্য জন্মে ; ইহার ফলে, উভয়েই পরস্পরকে সাহায্য করিতে প্রতিশ্রুত হইয়া মিসরে প্রবেশ করে। সে কালে মিসর ইসরাইলদিগের হস্তগত ছিল। অলিদ রাজ দরবারে উপস্থিত হইয়া, চাকুরীর দরখাস্ত করিলে, বাশাহ, তাহাকে শহরের গাে-রক্ষী পদে নিযুক্ত করিলেন, এবং শবদেহ সমাহিত করিবার কালে প্রত্যেক শবের জন্য এক দিরহাম করিয়া মাশুল লইবার আদেশ প্রদান করেন। আল্লাহ তাআলার কুদরতে সেই বৎসর দেশে মহামারী দেখা দিয়া সর্বত্র লােক মরিতে থাকে। ফলে সেই বৎসর অলিদের অনেক টাকা হস্তগত হইল । অলিদের ভাগ্যাকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র বিমল প্রভা বিকাশ করিতে লাগিল। কতিপয় দিবস মধ্যেই অলিদ বাদশাহের সু-দৃষ্টিতে পড়িয়া সৈন্যাধ্যক্ষের পদ লাভ করে। আলদের কাৰ্যকুশলতা গুণে বাদশাহ, তাহার উপর প্রসন্ন হইলেন। কিছুকাল পরে যখন বাদশাহের উজির কালকবলে নিপতিত হইল, চতুর অলিদ বাদশাহের অনুকূল্যে উজিরের পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া, দ্বিগুণ প্রভাবে রাজকাৰ্য চালাইতে লাগিল। কালক্রমে যখন স্বয়ং বাদশাহ, কালগ্রাসে পতিত হইলেন, সমগ্র মিসর রাজ্য তখন অলিদের পদতলে লুটাইয়া পড়িল। সুতরাং আলদ ফেরাউন উপাধি গ্রহণ পূর্বক মিসরের সিংহাসনে আরােহণ করিয়া পূৰ্ব্ব প্রতিজ্ঞানুযায়ী হামানকে উজিরের পদে নিযুক্ত করিল এবং সঙ্গে সঙ্গেই বনি-ইসরাইলদিগের উপর নানারূপ অত্যাচার উপদ্রব আরম্ভ করিয়া দিল। ইসরাইলদিগের মৌরসী জায়গীর ও উচ্চপদসমুহ ছিনাইয়া নিয়া কিবতিদিগকে প্রদান করিল। কিবতিগণ হজরত মুসা ১০ সর্বশ্রেষ্ঠ আর সিবতিগণ অধমে পরিণত হইল। দেশের নিকৃষ্ট কাৰ্য্যসমূহ তাহাদের দ্বারা সম্পাদিত হইতে লাগিল। কিছুকাল রাজত্বের পর ফেরাউনের দাম্ভিকতা অহমিকার চরমে উঠিল। এমন কি খােদায়ীর প্রবলাকাঙ্ক্ষা তাহার মনে উদয় হইল। একদা ফেরাউন হামানকে ডাকিয়া ফেরাউনের দুরাকাঙ্ক্ষা সম্বন্ধে অভিমত চাহিল। দুৰ্ম্মতি হামান বহুক্ষণ মৌন থাকিয়া উত্তর করিল, “বাদশাহ ! খােদায়ীর দাবী করিবার সময় এখনও উপস্থিত হয় নাই। মানুষের খােদায়ীর দাবী করিবার কতকগুলি উপকরণ আছে। প্রথমতঃ দেশ হইতে একেশ্বর বাদের মূলােৎপাটন করিতে হইবে। দ্বিতীয়, বিদ্যাশিক্ষা ও ধর্মালােচনা, ধর্মোপদেশ দেশ হইতে একবারে উঠাইয়া দিতে হইবে। যখন লােক অজ্ঞানতার তিমিরে পডিয়া মুক্তির পথ অন্বেষণ করিবে, তখন তাহাদের উপর খােদায়ীর দাবী করিলে অনেকটা সুফল ফলিবার কথা। ইহার পর বিদ্যাচর্চা ও ধর্মালােচনা দেশ হইতে একবারে উঠাইয়া দিল। চল্লিশ বৎসর মিসরবাসিগণ অজ্ঞান-অন্ধকারে ডুবিয়া রহিল। তারপর দুরাত্মা কিবতিদিগকে পুতুল পূজা করিতে আদেশ প্রদান করিল। কিবতিগণ বরং বিনা আপত্তিতেই ফেরাউনের আদেশ মানিয়া লইল। দুরাচারও খুশী হইয়া তাহাদের প্রতি যথেষ্ট আনুকূল্য প্রদর্শন করিল। এইরূপে বিশ বৎসর প্রতিমা পূজায় অবসান হইলে, ফেরাউন স্বয়ং খােদায়ীর দাবী করিয়া বসিল এবং প্রজাদিগকে তাহার আরাধনা করিতে আদেশ প্রদান করিল। কিবতিগণ এই আদেশে উৎসাহিত হইয়া তাহার পূজা করিতে লাগিল। বিশাল সাম্রাজ্য মিসরের প্রতিকিবতি গৃহে গৃহে নানা নৈবেদ্য হজরত মুল উপচারে মহা ধূমধামে অহােরাত্র তাহার পূজা হইতে লাগিল। অপর পক্ষে সিবতিগণ তাহার আদেশ প্রাণের সহিত প্রত্যাহার করিল। কারণ যদিও তাহারা বর্তমানে অজ্ঞানান্ধ, তথাপি তাহাদের পূর্ব পুরুষ হজরত ইয়াকুব ও হজরত য়ুসুফের একেশ্বরবাদ রক্ত তখনও তাহাদের প্রত্যেকের শিরায় শিরায় যৎসামান্য ক্রিড়া করিতেছিল। কাজেই তাহারা মানব পূজায় বিমুখী হইয়া ফেরাউনের বিরুদ্ধাচরণ করিতে লাগিল। ফেরাউন দেখিল সিবতি ব্যতীত রাজ্যের সর্বত্রই আর সকলে তাহার গুণ গরিম গাহিতেছে। ইহার প্রতিকার করিবার উদ্দেশ্যে ফেরাউন রাজ্যের সমুদয় সিবতিকে ডাকাইয়া আনিয়া, প্রিয়স্বরে বলিল, “দেখ সিবতিগণ ! আমি সমগ্র মিসরের একচ্ছত্র অধিপতি এবং খোদা। কেবল তােমরা ব্যতীত আর সকলেই আমার এবাদত করিতেছে। অতএব তােমরাও আমাকে খােদা বলিয়া মান্য কর, পূজা কর, আমি তােমাদিগকেও তাহাদেরই মত নানা সুখ সম্ভোগের উপকরণাদি প্রদান করিব।” সিবতিগণ তাহার কথা শুনিয়া কানে আঙ্গুল দিয়া দরবার পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গেল। পাপীর শত প্রলােভনেও তাহারা ভুলিল না। ফেরাউন পূর্ব হইতেই তাহাদের উপর খড়গহস্ত ছিল। আজ রাজাদেশ অমান্য করাতে, রাজকীয় আইনের বলে, তখন হইতে সিবতি দিগকে কিবতিদিগের দাসদাসীরূপে পরিণত করিল। নিরীহ সিবতিদিগের আর দুঃখের সীমা রহিল না। আবাহমান কালের স্বাধীন জীবন পরাধীনতার কঠিন নিগড়ে জড়িত হইল ফলতঃ, দেশের নিকৃষ্ট কাৰ্যসমূহ তাহাদেরই স্কন্ধে পতিত হইল। ফেরাউনের এই অমানুষিক নির্মম অত্যাচার সহ করিয়াও ধর্মভীরু হজরত মুসা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ইসরাইলগণ ধৰ্ম্মপথ হইতে একপদ ও বিচ্যুত হইল না। অনিবার অত্যাচারের ফলে, তাহাদের ধর্মপরায়ণতা আরও হইতে লাগিল। সিবতিদিগের ধর্মপ্রবণতার সঙ্গে সঙ্গে ফেরাউনের কঠোরতাও বৃদ্ধি হইতে লাগিল। একদা ফেরাউন গভীর রজনীতে স্বপ্নাবেশে দেখিতে পাইল যে বায়তুলমুকাদ্দাস্ অর্থাং জেরুসালেম হইতে এক হজরত মুসার বিভীষিকময়ী প্রকাণ্ড অগ্নিশিখা নির্গত হইয়া জন্ম বিবরণ। তাহার রাজদুর্গে পতিত হইয়াছে। উক্ত পাবক শিখার দুর্দন্ত তাপে সিবতি-বাস ভূমি ব্যতীত বাকী সমগ্র মিসর দাঞ্চিভূত হইয়াছে। ইহার কিছুদিন পর আবার স্বপ্নে দেখিল যে, সিবতি- দিগের গ্রাম হইতে এক ভীষণ বিষধর সর্প নির্গত হইয়া চতুর্দিকে বেগে দৌড়াইতেছে। ভুজঙ্গ ভয়ে ভীত ফেরাউন ভয়ে জড়সর হইয়া সিংহাসন হইতে ধরণী তলে লুটাইয়া পড়িল। উক্ত বিভীষিকাময়ী স্বপ্ন দেখিয়া ফেরাউন চমকিয়া উঠিল। চিন্তা ভুজঙ্গিনী তাহার হৃদয় মুলে তীব্র দংশন করিতে লাগিল। ফেরাউন প্রত্যুষে নজুমদিগকে ডাকাইয়া স্বপ্নবৃত্তান্ত বিবৃত করিল। নজুমগণ অনেকক্ষণ মৌন থাকিয়া কহিল, “জাহাপনা ! জ্যোতিষ শাস্ত্র আলােচনা করিয়া জ্ঞাত হইলাম যে, তিন বৎসবের মধ্যে হজরত ইয়াকূবের বংশধর হইতে এক বুদ্ধিমান বালক জন্মগ্রহণ করিবে, তাহার কঠোর হস্তের সম্মুখে আপনার বিশাল সাম্রাজ্য ধ্বংসস্তুপে পরিণত হইবে, এবং সে কিবতিগণসহ আপনাকে নীল দরিয়ায় ডুবাইয়া মারিবে।” ইহার কিছুকাল পর ফেরাউনকে উদ্দেশ করিয়া গায়েব হইতে শব্দ হজরত মুল হইল, “আয় ফেরাউন! তুমি ইসরাইলদিগের উপর আর উপদ্রব করিও না, সময় অতি সন্নিকটে। তাহাদের মধ্য হইতে এক মেধাবি বালক জন্মগ্রহণ করিয়া তােমার রাজ্য ধূলিসাৎ করিবে”। ইহা শ্রবণ করিয়া ভীত ফেরাউন ক্ষিপ্তের মত জাগিয়া উঠিল এবং সঙ্গে সঙ্গেই ইসরাইল- দিগের পাড়ায় পাড়ায় চৌকিদার নিযুক্ত করিয়া, প্রত্যেক বাড়ীতে একজন করিয়া পাত্রী নিয়ােগ করিয়া ইসরাইলদিগের পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করিলেই তৎক্ষণাৎ তাহাকে কতল করিয়া ফেলিতে আদেশ প্রদান করিল। দুরাত্মার কঠোর আদেশ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত হইতে লাগিল। সেই সঙ্গে বিতিদের সদ্য প্রসূত কচি কুসুমবৎ শিশুসন্তানগুলি স্নেহ পূর্ণ মাতৃ বক্ষ হইতে জোরে অপসারিত হইয়া, কঠিন হৃদয় রাজ পুরুষদের তীক্ষ্ণ তরবারীর নীচে অবাধে গড়াইয়া মিসর ভূমি কলঙ্কিত হইতে লাগিল। উপর্যুপরি কয়েক বৎসর এরূপ ভীষণ নরহত্যার উপর দিয়া চলিয়া গেলে, দেশে সিবতি পুরুষের সংখ্যা খুব কমই পরিলক্ষিত হইল। পক্ষান্তরে কিবতিদিগের দাসদাসীর বড় অভাব পড়িয়া গেল। অতএব দেশের সমগ্ৰ কিবতি একত্র হইয়া সিবতিদিগের সন্তান বধ করিবার প্রথা উঠাইয়া দিতে ফেরাউনের সম্মুখে দরখাস্ত করিল। দরখাস্ত মঞ্জুর হইল। ফেরাউনের আদেশে তখন এক বৎসরের জন্য সিবতিদিগের সন্তান হত্যা স্থগিত হইল। ঠিক এই সময়ে হজরত হারুণ জন্মগ্রহণ করেন। পরবৎসর নর রক্ত পিপাসু ফেরাউন পুনরায় শিশু বধের আদেশ প্রচার করিল। আবার নিরপরাধ শিশুগুলি জালিমের তরবারীর মুখে লুটাইয়া পড়িতে লাগিল, সমগ্র সিবতি মহল্লায় হাহাকার পড়িয়া গেল। নজুম- গণ আবার আসিয়া কযােড়ে আরজ করিল, “জাহাপনা ! ৰে শিশু- ৭ হজরত মুলা দ্বারা আপনার বিশাল সাম্রাজ্য ভীভূত হবে, সেই শিশু অন্য রাত্রেই মাতৃগর্ভে পয়দা হইবে।” নজুমের কথা শুনিয়, ফেরাউনের অন্তরাত্মা কাঁপিয়া উঠিল, শরীর শিহরিয়া উঠিল ; জাগ্রত ফেরাউন চক্ষের সম্মুখে নানা বিভীষিকা পূর্ণ স্বপ্ন দেখিয়া মুহুর্মুহু কঁপিয়া উঠিতে লাগিল। পরন্তু আদেশ প্রচার করিল যে, দেশের সিবতিদিকে আগামী কল্য হইতে স্বাধীনতা প্রদান করা হইবে, কিন্তু তাহাদিগকে আমার একটা মাত্র বাক্য প্রতিপালন করিতে হইবে। আমার বাক্যও বিশেষ কিছু নহে, কেবল অন্য রাত্রির জন্য শহরের যাবতীয় পুরুষ বনি ইসরাইল- দিগকে, স্ত্রী পরিত্যাগ পুৰ্ব্বক সিকান্দরী নামক স্থানে বাস করিতে হইবে। আমি প্রভাতে তাহাদিগকে মুক্তি প্রদান করিব। পাপীর অহােরাত্র নির্মম অত্যাচারে জর্জরিত ইসরাইলগণ দ্বিরুক্তি করিয়া তাহাই করিল। ইসরাইল বংশীয় আসিয়া-ইবনে-মুজাহহম দুরন্ত ফেরাউনের রাণী ছিলেন। পাছে তাহার গৃহ হইতে উক্ত কালভুজঙ্গ শিশু জন্ম গ্রহণ করে এই সন্দেহে স্বয়ং ফেরাউন বিবি আসিয়া সহ উক্ত দিবস সিকান্দরীতে উপস্থিত হইয়া স্বীয় আদেশ কতদুর প্রতি- পালিত হইতেছ তাহা পৰ্যবেক্ষণ করিতে লাগিল। যিনি বিশ্বনিয়ন্তা খােদ, তাঁহার অপার মহিমাময় কৌশল চাতুর্যে হস্তক্ষেপ করে কাহার সাধ্য ? যাহার রচনা নৈপুণ্যে ভীষণ সাহারায়ও ক্ষণিকে জগতের অতুল কুসুম মুকুলিত হইতে পারে, তাহার রচনা কুশল কি দুরন্ত ফেরাউনের সামান্য বিম্নে পরাস্ত হইবে ?-কখনই না। তাহার ইচ্ছা শত বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করিয়াও অঙ্কুরিত হয়। পূৰ্বেই বলা হইয়াছে যে, সিবতিগণ মিসরের সম্পূর্ণ হীন কার্ষা ভার হজরত মুসা মস্তকে বহন করিয়াছিল। হজরত মুসার পিতা ইমরান-ইবনে-নাসীরও ফেরাউনের কূটনীতির আবর্তে পতিত হইয়া, তাহার দৌবারিক কার্যে নিযুক্ত ছিলেন। ফেরাউন সিকান্দরী গমনকালে তাহাকে সঙ্গে লইয়া গিয়াছিল। ফেরাউনের রাণী পুণ্যবতী আসিয়া হজরত ইমরানের খুল্ল- তাত ভগ্নী ছিলেন। সেই সূত্রে ইমরান ও তদীয় জায়া বিবি মুখায়েলের রাজ বাটীতে পূর্ব হইতেই যাতায়াত ছিল। চিরন্তন বিধানে বিবি মুখায়েল আজও বিবি আসিয়ার নিকট সিকান্দরীতে বেড়াইতে যাইয়া, লােকের অলক্ষে স্বামী ইমরানের প্রকোষ্ঠে প্রবিষ্ট হইলেন। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা পূর্ণ হইল। গভীর রংনীতে নজুমগণ কোলাহল করিয়া উঠিয়া কহিল, এইক্ষণেই ফেরাউনের চির শত্ৰু মাতৃ গর্ভে স্থান গ্রহণ করিয়াছেন। অবিরত কোলাহলে ফেরাউনের সুখ নিদ্রার ব্যাঘাত জন্মিল। পাপী জাগ্রত হইয়া ইমরানকে কোলাহলের বিষয় জিজ্ঞাসা করিল। ইমরান কিন্তু আসল কথার মুলে চাপা দিয়া বলিলেন, “আমি সঠিক সংবাদ অব- গত নহি। তবে বােধ হয় সিবতিগণ আপনার দয়া ও বদান্যতার যশাে- গান করিতেছে।” ফেরাউন আর শব্দ করি না। আবার দুগ্ধ ফেননিভ কোমল শয্যায় শয়ন করিল। কিন্তু দুর্ভাবনায় তাহার আর নিদ্রা হইল না। খুব ভােরে নজুমগণ আসিয়া ফেরাউনকে শিশুর জন্ম বৃত্তান্ত অবগত করাইল। ফেরাউন চমকিয়া উঠিল, তাহার মন দমিয়া গেল, শ্বাসরােধ হইবার উপক্রম হইল, চক্ষু নিষ্প্রভ বোধ হইতে লাগিল। বহুক্ষণ চিন্তার পর ফেরাউন ইমরানকে আদেশ করিল, “সিবতিদের প্রত্যেক গ্রামে ভীম প্রহরি নিযুক্ত করিয়া প্রতি গৃহে একজন করিয়া ধাত্রী হজরত মুসা নিযুক্ত করা দাও । আজ হইতে ইসরাইলদের যত পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করিবে, বিনা এভেলায়ে যেন তৎক্ষণাৎ কতল করা হয়।” আদেশ অনুযায়ী ফেরাউনের ফউজ গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় প্রবেশ করিল, ধাত্রী গৃহে গৃহে গমন করিল ; সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইলদিগের কোমল কমলগুলিও অকালে কীট দষ্ট হইয়া ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। বিবি মুখায়েলের গর্ভ যদিও লােক চক্ষুতে ধুলি নিক্ষেপ করিতে সমর্থ হইয়াছিল, তথাপি গ্রাম্য প্রথানুযায়ী, তাহার নিকট একটি ধাত্রী থাকিতে কসুর হয় নাই। সিবতি শিশুর শােচনীয় পরিণাম দর্শন করিয়া, বিবি কুয়েল কখন কখন তন্ময় চিত্তে ভাবিতেন, ‘হায় যদি পুত্র জন্মগ্রহণ করে, তবে 14 উপায়ে তাহাকে ফেরাউনের হস্ত হইতে রক্ষা করিব। • যে মনের নিভৃত কোণ হইতে তাহাকে বলিত, “দুপায়েল! চিন্তা করিও না। পুত্রসন্তান জন্ম গ্রহণ করিলে তােমার ভীতির কোন কারণ নাই, স্বয়ং আল্লাহ-তাআলা তােমার সহায়। যখন শিশুর প্রাণ নিয়া তুমি কাতর হইবে, তখন তুমি শিশুটীকে উত্তম মঞ্জুষায় পুরিয়া নীল নদীর গভীর গর্ভে দৃঢ় মনে ভাসাইয়া দিও। দেখিবে, শিশু কুল পাইয়া তােমারই ক্রোড়ে প্রতিপালিত হইয়া মানুষ হইবে। এইজন্য তুমি চিন্তা করিও না।* ক্রমে নুখায়েলের প্রসবের সময় নিকটবর্তী হইল । রাজচরেরাও মুখায়েলেয় বাড়ীতে ঘনঘন যাতায়াত করিতে লাগিল। গর্ভকাল পূর্ণ হইয়া প্রসব বেদনা উপস্থিত হইলে, যমকিঙ্করী ধাত্রী সম্মুখে আসিয়া হাজির হইল। ক্ষণিক পরেই ভূবনমােহন শিশু পুত্র ভূমিষ্ট হইল। শিশুর অঙ্গসৌষ্টব দর্শন করিয়া, ধাত্রীর রক্ত পিপাসা একবারে হজরত মূল 0 তিরােহিত হইল। সর্বাগ্রে ধাত্রীই শিশুর সঙ্কটের কথা ভাবিয়া ব্যাকুল হইল। বাদশাহের হুকুমানুযায়ী শিশুকে বধ করিতেই হইবে। কিন্তু এশিশু যে, মনােমুগ্ধকারী নন্দনের পারিজাত কুসুমতুল্য, সুতরাং তাহাকে বধ করা যায় না। অগত্যা ধাত্রী বিবি মুখারেলকে উভয়ের প্রাণ রক্ষার উপায় করিয়া দিতে বলিল। প্রত্যুৎপন্নমতি নুখারেল তৎক্ষণাৎই খানিকটা ছেড়া কাপড়ে রক্তের ছাপ লাগাইয়া সঙ্গে কতকগুলি জীব জন্তুর হাড়েও রক্ত লাগাইয়া, একটা ছােট ঝুড়িতে ভরিয়া তাহার হাতে দিলেন। চতুর। দাই বুড়ি হাতে করিয়া প্রহরীর সম্মুখ দিয়া, জঙ্গলে রওয়ানা হইল। প্রতিৰি ঝুড়িতে রক্ষিত দ্রব্যের কথা জিজ্ঞাসা করিলে, ধাত্রী উওর করিল, “আজ মুখায়েলের একটী পুত্র সন্তান ভূমিষ্ট হইয়াছিল। আমি স্বহস্তে তাহাকে বধ করিয়া নিক্ষেপার্থে জঙ্গলে চলিয়াছি।” প্রহরী আর কিছু বলল না। এই সময়ে নজুমগণ রাজদরবারে আসিয় প্রচার করিল যে, এইমাত্র ফেরাউনের শক্ত ভূমিষ্ট হইয়াছে। আর কথা কি ! সারা শহরে শিশুকে তালাশ করিয়া বাহির করিবার ধূম পড়িয়া গেলা! উর্দ্ধতন কর্মচারী, অধতন কৰ্ম্মচারীদিগকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল, আজ কে কত শিশু কাহার বাড়ীতে বধ করিয়াছে। ইহা শুনিয়া একটা নিম্নপদস্থ পুলিশ কর্মচারী উত্তর করিল, “হুজুর। আমার পাড়ায় আজ যথেষ্ট শিশু বধ হইয়াছে, মাত্র মুখায়েলের পুত্রটা নিজহাতে বধ করি নাই। ধাত্রীর কথায় বিশ্বাস করিয়া ছাড়িয়া দিয়াছি।” ইহাতে ফেরাউনের মনে বিষম সন্দেহ উপস্থিত হইল। ফেরাউন কয়েকজন পুলিশ সহ স্বয়ং খানাল্লাশে আসিয়া নিঃশব্দে মুখায়েলের ঘরে ঢুকিয়া তন্ন তন্ন করিয়া তালাশ করিতে লাগিল ।

হরত মুলা এই সময়ে নুখায়েলের এক মাত্র কন্যা মরিয়ম কাপড়ে জড়িত শিশু ভাইটীকে বুকে করিয়া উনানের পার্শ্ব হইতে দুশমনের গতিবিধি পৰ্যবেক্ষণ করিতেছিল। ফেরাউন লােকজনসহ নিঃশব্দে গৃহে প্রবেশ করিলে, মরিয়ম মনে মনে প্রমাদ গণিল। মরিয়ম ভাবিল, “হায় ! বুঝি সােনার কমল অকালে বৃন্তুচ্যুত হয়।” এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে তাহার দিকবিদিক জ্ঞান রহিল না। জলন্ত অগ্নিকুণ্ডে পড়িলে শিশুর যে, কি দশা হইবে ভ্রমেও একবার তাহা তাহার মনে হইল না। কেবল চরগণের চক্ষুর অগােচরে অন্যমনস্কভাবে শিশুটাকে জলন্ত উনানে নিক্ষেপ করিয়া হাফ ছাড়িয়া বাঁচিল। পুণ্যাত্মা শিশু অগ্নিকুণ্ডে পড়িয়াও শব্দ করিল না। চরগণ গৃহের কোণে কোণে অন্বেষণ করিয়া কোন কিছু না পাইয়া ফিরিয়া গেল। মরিয়মের কোল শূন্য দেখিয়া চকিত হইয়া, নুখায়েল জিজ্ঞাসা করিলেন, “শিশুর কি হইল?” মায়ের কথা শুনিয়া মরিয়ম উত্তর করিল, “দুশমনের ভয়ে তাহাকে আমি উনানের ভিতরে ফেলিয়া দিয়াছি।” মাতৃপ্রাণ শিহরিয়া উঠিল, তিনি প্রাণের মায়। ছাড়িয়া উনানে ঝাপাইয়া পড়িলেন। কি আশ্চর্য্য! উনানের আগুন দক্‌ দক্‌ করিয়া জ্বলিতেছে, ইন্ধন পুড়াইয়া ছারখার হইতেছে। কিন্তু বস্ত্র জড়িত শিশু নিরাপদে উনানে পঙিয়া রহিয়াছে। পুত্র বৎসলা মা উনানে পড়িয়া আরও বিষ্মিত হইলেন। জ্বলন্ত আগুন তাহার কাছে ঠাণ্ডা বােধ হইল। তিনি শিশুটীকে ক্রোড়ে তুলিয়া লইয়া বক্ষে চাপিয়া ধরিয়া প্রাণ ঠাণ্ডা করিলেন।

২ হরভ মূসার প্রতিপালন। মুখায়েল পুত্র কোলে তুলিয়া প্রাণ শীতল করিলেন বটে, কিন্তু তাহার চিন্তা দূর হইল না। শিশুর বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চিন্তাধারাও ক্রমশঃ বৰ্ধিত হইয়া চলিল। চিন্তার দাবানল অন্তরে রাখিয়া, মা শিশুপুত্রকে তিন মাস কাল বিষম কষ্টে প্রতিপালন করিলেন। কিন্তু এই দীর্ঘ কালের মধ্যেও উক্ত শিশুর জন্ম বিবরণ ধাত্রী, মরিয়ম ও মুখায়েল ব্যতীত আর কেহই জানিতে পারে নাই। পক্ষান্তরে শিশু কোন দিন কাদে নাই। তবে কি না জগতের চিরন্তন বিধানকে কেহ দলন করিতে পারে না। কারণ কথা ভালই হউক আর মন্দই হউক কতদিন চাপিয়া রাখা যায়? অবশ্য কোন না কোন দিন বাহির হইয়া পড়েই। বিবি মুখায়েলের প্রসবের বিবরণও সেইরূপ বেশী দিন চাপা রহিল না। ক্রমশঃ লােক মুখে এই বিষয় বিঘােষিত হইতে লাগিল। গুপ্তচরেরাও গােপনে নুখায়েলের বাড়ীতে আনাগােনা করিতে লাগিল। মায়ের বিশেষ সতর্কতার ফলে সন্তানের কোন বিঘ্ন ঘটিল না বটে, বিপদের আশঙ্কা কিন্তু ক্রমেই ঘনিভূত হইয়া আসিতে লাগিল। মুখায়েল যথেষ্ট চেষ্টা সত্ত্বেও তাহাকে আর বাঁচাইবার উপায় স্থির করিতে পারিলেন । আল্লাহতাআলার মেহেরবানীতে শিশুটীকে নদীর জলে ভাসাইয়া দিয়া নিশ্চিন্ত থাকিবার কথা তাহার স্মরণ হইল। গায়েবী আদেশ পালন করিতে স্থির প্রতিজ্ঞ হইয়া, ছালুম নামক এক মিস্ত্রিকে, শিশুর পরিমিত হজরত মূল একটা কাষ্ট মঞ্জু যা প্রস্তুত করিয়া দিতে, নুয়েল আদেশ করছেন। ছালুম মঞ্জুষা তৈয়ার করিয়া দিয়া শিশুর জন্ম বৃত্তান্তও জানিয়া লইল । নুখায়ের পেটের ইয়া চলিয়া গেলে, ছালুম শিশুর কথা রাজদরবারে বলিয়া পারিতােষিক পাইবার আশায় গৃহ ত্যাগ করিল। খােদার কুদরতে গৃহ নিষ্ক্রান্থ ছালুম অন্ধ হইয়া গেল। ছালুম মনে মনে ভাবি, এই বাে। হয় সেই মালােক সামান্য শিশু। সুতরাং সে স্বীয় দুক্কা হইতে বিরত হইয়া তো করিল এবং শিশুর উপর ইমান আনিল। এদিকে নুয়েল প্রাণের প্রাণ শিশুপুত্রকে অশ্রুপ্লাবিত বদনে পেটেরার পুরির। গভীরা-তামসী-রজনীতে, নীল নদীর বক্ষে দৃঢ় মনে ভাসাইয়া- দিলেন। অনুকুল স্রোতবেগে মঞ্জুষা শিশুকে বক্ষে করিয়া ফেরাউনের বাড়ীর দিকে ভাসিয়া চলিল। মাতা আঁচলে নয়ন মুছিতে মুছতে বাড়ী ফিরিলেন । বা। 'ফরিয়া তাহার মেহসিক্ত করুণ মনে কিছুতেই ধৈয্য ধরিল না। তিন পুত্রের মায়া বিসর্জন করতে না পারিয়া, তদীয় বুদ্ধিমতি কন্য) মরিয়মকে নদীর তীরে প্রেরণ করলেন। যাইবার কালে মারয়মকে বলিয়া দিলেন, “মা মরিয়ম ! নদীর তীরে, দূরবর্তি স্থান থেকে তাবুয়তের দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখিবে। তবুয়তস্থিত শিশুর পিরণাম দশা কি হয়, তাহা লক্ষ্য করিবে যেন। সাবধান উন্নমনভাবে পরিচালিত হইয়া যেন শিশুর বধকামী হইও না।” বুদ্ধিমতি চঞ্চলা বলিকা মায়ের আদেশ শিরােধার্য্য করিয়া তড়িৎবেগে নদীর তীরে উপস্থিত হইল। তথায় গিয়া মরিয়ম দেখিতে পাইল রে দারুময় তাবুয়ত স্বর্গীয় শিশুকে বুকে করিয়া নীল নদীর ঢেউয়ের মুখে হজরত মুসা পডিয়া, ডুবিয়া ভাসিয়া, নাচিয়া নাচিয়া, ক্রিড়া করিয়া বহিয় চলিয়াছে। ভ্রাতৃ স্নেহান্ধ ময়িয়। তবুয়তের শােচনীয় অবস্থায় বিহ্বল হইয়া ভাবিল, “হায় ! এই বুঝি নীল পয়স্বিনী দয়ামায়ার মস্তকে পদাঘাত করিষা কচি- শিশুকে উদরসাৎ করিল।” তাবুতে কোন বাধা না পাইয়া ফেরাউনের আইনু-শাস্ ঘাটের দিকে চলিয়াছে। সে কালে ফেরাউনের দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজাত খেত রোগাক্রান্ত। এক কন্থা ছিল। শত ঔষধ প্রয়ােগেও কোন ফলােদয় হর নাই । হকিমগণ তাহার চিকিৎসা করতে গিয়া হার মানিলেন। কিন্তু নজুমগণ হার না মানিয়া বলিয়া দিল যে এ রােগের ঔষধ হাক কবিরাজের নিকট নাই। পরন্তু জ্যোতিষ্কালােচনায় জ্ঞাত হইলাম যে, অমুক অমুক মানের অমুক তারিখে, প্রদোষ ঊষায় আপনার আইনু-শামস ঘাটে একটী রুনয় তঁাবুয়ত আসিয়া লাগিবে। তবুয়তের ভিতর এক জগদ্দল্লভ পরম রূপবান শিশু পাওয়া যাইবে। উক্ত শিশুর মুখের লালাই এই রােগের অমােঘ ঔষধ হইবে। অন্ত সেই শুভদিন। ফেরাউন স্বপরিবারে বহু চরসহ কথিত সময়ের বহু পূর্বেই ঘাটে যাইয়া তাবুতের অপেক্ষায় রহিল। পূর্বদিকে তরুণ রবি অরুণ বেশে আঁখি খুলিল, চতুর্দিক রবি করে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল । লােক চক্ষুতেও ভাসিয়া উঠিল ঘাটের অনতি দূরে অনুকুল স্রোতে ছােট একটী কাষ্ট তবুয়ত ভাসিয়া যাইতেছে। ফেরাউনের আশা কম বিকশিত হইল, পাপা মৃদু মধুর হাসিয়া চরকে ইঙ্গিত করিল। সন্তরণ পটু চরেরা তৎক্ষণাৎ আদেশ তামিল করিল। ফেরাউন তবুয়ত খুলিতে চেষ্টার ত্রুটি করিল না কিন্তু কিছুতেই খুলতে হজরত মুসা পারিল না। একে একে সামন্তবৃন্দ সকলেই চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হইল। অবশেষে পুণ্যবতি বিবি আসিয়ার পালা আসিল। তিনি তাবুয়তের আগলে হস্ত দিবামাত্র উহা খুলিয়া গেল। খুলা মাত্রই দেখা গেল, ভিতরে এক অতি সুন্দর শিশু। হস্ত পদাদি সঞ্চালন পূর্বক দক্ষিণ হস্তের তর্জনি চুষিয়া খেলা করিতেছে। বিবি আসিয়া ভূবন মােহন শিশুকে ক্রোড়ে তুলিয়া লইলেন, এবং শিশুর মুখের লালা লইয়া পীড়িতা কার অঙ্গে প্রলেপ দিলেন। খােদার কুদরতে রােগিণী তৎক্ষণাৎ আরােগ্য লাভ করিল। সকলেই শিশুকে দেখিয়া বিমুগ্ধ হইল, কিন্তু দুরাত্মা শয়তান হামান তৎক্ষণাৎ বলিয়া উঠিল, “বাদশাহ! এই শিশু আপনার রাজ্য ভস্মসাৎ করিবে। ইহাকে এখনই বধ করিয়া আপনার রাজ্যের ভিত্তি দৃঢ় করিয়া লউন।” ফেরাউন বিশেষ চিন্তা করিয়া বলিল, “বটেই ত।” ইহা শুনিয়া দয়াবতী কোমল প্রাণ আসিয়ার প্রাণে বড় আঘাত লাগিল। তিনি স্বর্গীয় শিশুকে বুকে জড়াইয়া বিনম্র ভাবে বললেন, “বাদশাহ! আমার অপরাধ মার্জনা করবেন। উক্ত শিশু দ্বারা আপনার আজন্ম পীড়িত কন্যার যে মহৎ উপকার হইয়াছে, তাহা সহসা কেমনে ভুলিয়া ন্যায়ের মস্তকে ভীষণ পদাঘাত করিবেন ? এ যে কোমলমতি শিশু—এই শিশু দ্বারাই যে, আপনার ভবিষ্যৎ অন্ধকার হইবে তাহাই বা কতটুকু সত্য? আপনি মহজ্জন হইয়া এমন কচি শিশুকে বৃথা বধ করিয়া কলঙ্কিত হইবেন না।” ইহার পর ফেরাউন শিশু বধে নিরস্ত হইলে, বিবি আসিয়া পুনরায় হজরত মুসা বলিলেন, “বাদশাহ ! এমন সৰ্বাঙ্গ সুন্দর শিশু বাদশাহের ঘরেই শােভা পায়। চলুন আমরা এই শিশুটীকে পালন করিয়া পুত্রের অভাব দূর করি। অচিরে শিশু বার্ধক্যের সহায় হইবে সন্দেহ নাই।” পত্নীর বাক্যে ফেরাউনের প্রস্তর প্রাণেও পুত্র বাৎসল্য জাগিয়া উঠিল। ফেরাউন কহিল, “তবে তােমাৰ ইচ্ছাই পূর্ণ হউক।” অতঃপর ফেরাউন শিশুটাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করিল। শিশুর নাম করণ হইল মুসা। এখন ধাত্রীর আবশ্যক। ধাত্রীর খোজ পড়িয়া গেল। যথা সময়ে শহরের সকল ধাত্রী রাজবাড়ীতে আসিয়া জড় হইল। কিন্তু জড় হইলে কি হয়, শিশু কাহারও স্তন মুখে লয় না। গোর করিয়া মুখে দিলেও চল চলে, দুইটী নেত্র নীলােৎপলে এক দৃষ্টে ধাত্রীর দিকে চাহিয়া থাকে, পান করে না অথচ হাসে। এখন কি প্রকারে শিশুকে দুগ্ধ পান করাইতে হইবে, তাহাই ভাবিয়া ফেরাউন হয়রান হইয়া গেল। এদিকে ফেরাউনের চরগণ যখন নদী বক্ষ হইতে মঞ্জুষা উঠাইতেছিল, তখন মরিয়ম দূরবর্তি স্থান হইতে ইহা দেখিতেছিল। মরিয়ম আকাশ পাতাল ভাবিতে লাগিল, “হায় ! যে বিপদের আশঙ্কায় পানিতে ভাসাইয়া দিয়াছিলাম, তাহার হাত হইতে রক্ষার আর বুঝি উপায় নাই।” মিরয়মের হৃদয় কাপিয়া উঠি। আর এক পদও অগ্রসর হইতে সাহস হইল না। দূরে অদৃশ্য স্থানে থাকিয়া দেখিল যে, লােকজন একই ভাবে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে কিন্তু শিশুকে বধ করিবার কোন আয়ােজন হইতেছে না। ইহাতে তাহার প্রাণে শান্তি ফিরিয়া আসিল; মরিয়ম ধীরে ধীরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়া দেখিল যে, ফেরাউন শিশুটীকে বধ করিয়া তাহার রক্ষণার্থে ধাত্রী অন্বেষণ করিতেছে। সময় ও সুযােগ ১৭ হজরত মুসা বুঝিয়া মরিয়ম ফেরাউনকে লক্ষ্য করিয়া বিনম্র বচনে কহিল, ‘বাদশাহ। আমার অনুসন্ধানে একটা ভাল ধাত্রী আছে। সে নিশ্চয়ই সম্পূর্ণরূপে শিশুর পরিচর্যা করিতে পারিবে এবং তাহার শুভাশুভের দিকেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিবে। জাহাপনার আদেশ হইলে তাহাকে হাজির করিতে পারি।” ফেরাউন হাস্যমুখে কহিল, “অতি উত্তম কথা। যাও, তুমি এখনই তাহাকে লইয়া আইস, আমি তােমার প্রতীক্ষায় থাকিব।” মরিয়ম বাদশাহকে সালাম জানাইয়া দ্রুতপদে গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়া নুখায়েলকে কহিল, “মা ! চিন্তিত হইও না। আল্লাহতাআলার মেহেরবানীতে তােমার প্রাণ জুড়াইবার উপায় হইয়াছে। এখনই তুমি ফেরাউনের গৃহে গিয়। শিশুর ধাত্রীর পদ গ্রহণ করিয়া প্রাণ ঠাণ্ডা কর।” কন্যার কথা শুনিয়া নুয়েল তৎক্ষণাৎ মরিয়মের সঙ্গে রাজ বাটীতে গিয়া বাদশাহের হুকুমে শিশুকে ক্রোড়ে উঠাইয়া পীযূষ পূর্ণ স্তন মুখে তুলিয়া দিলেন। অমনি শিশু স্তন পান করিতে লাগিল। উপস্থিত সকলে বিস্ময়ে বুগপৎ আশ্চৰ্য্যাম্বিত হইয়া, শিশুর দুগ্ধ পানের বিষয়ে তাহাকে নানা প্রশ্ন করিতে লাগিল। বিবি থায়েল স্বীয় মনােভাব গােন করিয়া কহিলেন, “আমার শরীরের গন্ধ ও দুগ্ধ উভয়ই উপাদেয় ; তাই শিশু আমার দুগ্ধ পান করিতেছে।” অতঃপর শিশুর দুগ্ধ পানের জন্য বিবি মুখায়েলকে দৈনিক একটা করিয়া স্বর্ণ মুদ্রা দিতে প্রতিশ্রুত হইয়া ধাত্রী নিযুক্ত করিল। কথা রহিল যে, মুখায়েল সপ্তাহে একদিন করিয়া শিশুকে দরবারে আনিয়া দেখাইবে। মুখায়েল স্বীকৃত হইয়া শিশুকে বুকে করিয়া গৃহে ফিরিলেন হজরত মুসা কয়েকমাস গত হইল। কথামত বিবি মুখায়েল শিশু মুসাকে লইয়া ফেরাউনের পুবীতে বরাবর যাতায়াত করিতে লাগিলেন। একদা সারাদিনের খেলার পর, বিবি আসিয়ার ইচ্ছানুযায়ী হজরত মুসার সেই দিনের মত মুসা তঁাহারই নিকট রহিয়া গেল। শৈশবকাল। ফেরাউন শিশুকে দেখিতে পাইয়া কোলে তুলিয়া লইল। মূসা এতটুকু বয়সের শিশু হইলেও আল্লাহতাআলার কুদরতে বাম হাতে ফেরাউনের দাড়ি ধরিয়া ডান হাতে এত জোরে গণ্ডে চপেটাঘাত করিল যে, ক্ষণিকের জন্য ফেরাউনের বাকশক্তি রােধ হইয়া গেল। ফেরাউন কোনও রকমে নিজকে সামলাইয়া লইয়া ক্রোধভরে কহিল, *নিশ্চয় এই সেই-শিও—ইহার হাতেই আমার রাজ্য বিনাশ হইবে। কাজেই ইহাকে আর দুনিয়াতে রাখা সঙ্গত নয়। এখনই ইহাকে বধ করিয়া নিশ্চিন্ত হইতে হইবে।”—এই বলিয়া জল্লাদকে ডাকিয়া দিবার জন্য প্রহরীকে হুকুম করিল। ফেরাউনের সঙ্কল্পে ভীত হইয়া, বিবি আসিয়া বিনীতভাবে তাহাকে কহিলেন, “বাদশাহ! অবােধ শিশুর উপর ক্রোধ করা আপনার শােভা পায় না। দোস্ত-দুশমন ভেদাভেদের জ্ঞান এখনও তাহার তেমন জ্ঞান হইলে আপনার সঙ্গে কখনও এইরূপ আচরণ করিত না। আমার কথা বিশ্বাস না হয়, আপনি তাহাকে পরীক্ষা করিয়া দেখুন।” “সে-পরীক্ষা কিরূপে হইবে”—বলিয়া ফেরাউন নীরব হইল। বিবি আসিয়া পুনরায় ধীরে সুস্থে কহিলেন, “পাশাপাশি দুইটা পাত্রের একটা হজরত মুসা জ্বলন্ত মণিকাঞ্চন দ্বারা পরিপূর্ণ করিয়া মূসার সম্মুখে রাখিয়া দিন। আগুনে হাত দিলে বুঝিতে হইবে, এখনও তাহার হিতাহিত জ্ঞান হয় নাই।” ‘উত্তম কথা—বলিয়া ফেরাউন বিবি আসিয়ার কথায় স্বীকৃত হইল। কথা অনুযায়ী কাজ হইল। যথা সময়ে পাশাপাশি দুইটী পাত্র সুসজ্জিত করিয়া শিশুর সম্মুখে রাখা হইল। মুসা মণিকাঞ্চন পরিপূর্ণ পাত্রের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করিয়া, অপর পাত্র হইতে জ্বলন্ত অঙ্গার লইয়া একেবারে মুখে পুরিয়া দিয়াই চীৎকার করিয়া উহা ছাড়িয়া দিল। ইহাতে মূসা নির্দোষ ব’লয়া প্রমাণ ২ ইয়া গেল। সেইবারের মত জন্ম দুশমন ফেরাউনের কোপ হইতে রক্ষা পাইল। কিন্তু মুসা চিরকালের জন্য তােলা হইয়া গেলেন। এইরূপে বার বছর গত হল। এই সময়ে একদিন ফেরাউন একই দস্তরখানে মূসার সহিত আহার করিতে নানাবিধ উপাদেয় খাদ্যের পাত্ৰ সমূহ আসিলে, মূসা দেখিতে পাইলেন যে, একটা আস্ত ছাগছান। কাৰ্য্য। কাবাবরূপে আহার্যের শােভা বর্ধন করতেছে । কাবাবের প্রতি লক্ষ্য করিয়া যেমনি মূসা কহিলেন, “আল্লাহ তাআলার আদেশে দণ্ডায়মান হও”—অমনি ছাগছানা নাচিতে নাচিতে উঠিয়া দাঁড়াইল। এই অলৌকিক ঘটনা দর্শন করিয়া ফেরাউন শঙ্কিত হইল— তাহার হৃদয় নিহিত আশঙ্কা ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। কালে অবস্থা যে কি দাড়াইবে ভাবিয়া তাহার কূলকিনারা করিতে পারিল না। বসিল। সম্মুখে মুসার অলৌকিক হজরত মূসা সম্মুখীন এই সময়ে আর এক দিন মূসা ঘােড়ায় চড়িয়া শহরের বাহিরে বেড়াইতে বাহির হইলেন। ক্রমে মিসরের পুরাতন রাজধানী মনাফ শহর পশ্চাতে রাখিয়া, ইহার সম্মুখের প্রান্তরে উপস্থিত হইয়া দেখিতে পাইলেন, জনৈক কিবতি ও সিবতি ঝগড়া করিতেছে। তিনি উভয়ের হইলে, উৎপীড়িত সিবতি করযােড়ে কহিল, “হজরত । মেহেরবানী করিরা জালিমের অত্যাচার হইতে আমাকে রা করুন। জীবিকা নির্বাহের জন্য বহু কষ্টে আমি এই কাঠগুলি আহৰণ করিয়াছি। এক্ষণে এই কিবতি বলপূৰ্ব্বক আমার কাষ্ঠশি আত্মসাৎ করিয়া আমার দ্বারাই মােট বহন করাইয়া নিজের বাড়ীতে নেওয়াইবার জন্য অামার উপর জুলুম করিতেছে”। নিঃসহায় সম্বলহীন সিবতির অবস্থা দেখিয়া মূসার প্রণে দুয়ার উদ্রেক হল। উক্ত অন্যায় কাৰ্য্য হইতে নিরস্ত হইবার জন্য তিনি কিবতিকে বারবার অনুরােধ করিতে লাগিলেন। কিন্তু চোরা না শুনে ধৰ্ম্মের কাহিনী; কিবতি তাহার অনুরােধে আরাে বেশী উত্তেজিত হইয়া কহিল, “তােমার মত দরদী লােক বহুত দেখিয়াছি। সিবতির জন্য এতই যদি তােমার দরদ হইয়া থাকে, তবে না হয় তুমি নিজেই কাঠের বােঝাটী ফেরাউনের বাবুর্চিখানায় পৌছাইয়া দাও। তবেই ত সব গােল মিটিয়া যায়।” কিবতির কথা শুনিয়া রাগে তঁাহার শরীর কাপতে লাগিল। তিনি আর সহ্য করিতে পারিলেন না। তবে রে বেয়াদব-বেঈমান- বলিয়া সজোরে কিবতির পৃষ্ঠে এক মুষ্ট্যাঘাত করিলেন। কিলের চেটে চতুর্দিক অন্ধকার দেখিতে দেখিতে কিবতি মাটীতে পড়িয়া

হজরত মুসা
শীঘ্রই প্রাণত্যাগ করিল।—কিবতির মৃত্যুতে তিনি বড়ই অনুতপ্ত হইয়া
আল্লাহতাআলার দরগায় ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। ইহার পর কিবতির
লাশ দফন করিয়া বাড়ীতে ফিরিয়া গেলেন।
মৃত কিবত ছিল খােদ ফেরাউনের বাবুচ্চি। কাজেই তাহার
আকস্মিক তিরােধানে চতুর্দিকে হৈচৈ পড়িয়া গেল। তাহার
অনুসন্ধানের জন্য দেশময় ঢােল পিটাইয়া দেওয়া হইল। ইহার ফলে,
বাবুর্চির অন্তর্ধানের কথা শীঘ্রই ফেরাউনের কর্ণগােচর হইল।
ফেরাউন রাগে আগুনের মত লাল হইয়া, মূসাকে বধ
মূসাকে বধ ক রয়।
প্রতিশােধ লইবার আদেশ প্রদান করিল।
হুকুম অনুযায়ী ফেরাউনের
লোক-লস্কর লাঙ্গা তরবারী হস্তে মূসার অন্বেষণে শহরের দিকে দিকে
বাহির হইয়া গেল।

হজরত মুসার মিসর ত্যাগ ও মদায়ুনন গমন। আসন্ন বিপদের খবর পাইয়া, হজরত মুসা জালিমের রাজ্য ত্যাগ করা বিধেয় মনে করিয়া, দ্রুত পদবিক্ষেপে শহরের বাহির হইয়া পড়িলেন। কোথা গিয়া কিরূপ দুশমনের উদ্যত তরবারীর মুখ হইতে জীবন রক্ষা পাইবে, তাহা ভাবিতে ভাবিতে মনে বিষম উদ্বেগ জন্মিল। বিশেষ চিন্তার পর সিরিয়ার অন্তর্গত মদায়ূনে গমন করাই সৰ্ব্বতােভাবে শ্রেয় বণিয়া মনে হইল ; কারণ সেখানে ফেরাউনের আধিপত্য নাই—সেখানে গেলে সম্পূর্ণ নিরাপদে বাস করা যাইবে। কিন্তু মদায়ূনের পথ তাহাকে কে দেখাইয়া দিবে ? বিষম সমস্যায় পড়িয়া, হজরত মূনা পথের উপর বসিয়া নিমীলিত নয়নে আল্লাহ তাআলার দরগায় মোনাজাত করিলেন, “হে অগতির গতি দীন- দুনিয়ার মালিক! বান্দার প্রতি কৃপা বিতরণ করিয়া তােমার দাসানু- দাসকে অপরিচিত মদায়ূনের পথ প্রদর্শন কর এবং সেই স্থানে তাহাকে পৌছাইয়া দাও। হে রহীম! হে রহমান! তুমি ব্যতীত এই দাসকে সঙ্কট হইতে তরাইবার আর কেহ নাই।”—এই বলিয়া হজরত মুসা চা হয়া দেখিলেন এক দিব্য কান্তি পথিক নীরবে তাহার সম্মুখ দিয়া চ,লয়া যাইতেছে। দ্রুতপদে পথিকের পার্শ্বে গিয়া তিনি বিনীত ভাবে কহিলেন, “আগা! আপনি কোথা যাইতেছেন?” “মদায়ূনের পথে চলিয়াছি”—বলিয়া পথিক নীরব হইলেন ।

হজরত মুল “আমিও মদায়ূনে চলিয়াছি। কিন্তু সেই দেশে যাইবার পথট আমার মােটেই জানা নাই। ইহার উপর আমি নিঃসম্বল।” “কোনও চিন্তার কায়ণ নাই। আমার সঙ্গে চলিয়া আসিল সহজেই মদায়ূনে যাওয়ার সুবিধা হইবে।”—এইরূপ বাক্যালাপ করিতে করিতে উভয়ে মদায়ূনের পথে চলিলেন। কয়েক দিন অবিশ্রান্ত পথ চলিয়া, একদিন মধ্যাহ্ন »ালে হ রত মূসা মায়ুনের এক ক্ষুদ্র জনপদে গিয় উপস্থিত হইলেন। সিরিয়ার জ্বলন্ত সূৰ্য্য মদায়ুনের আকাশ হইতে তখন অগ্নি বর্ষণ করিতেছিল। রৌদ্রতাপে ক্লান্ত ও ক্ষুৎপিপাসায় একান্ত কাতর হইয়া, গ্রামের অনতিদূরে এক ছায়া শীতল বৃক্ষতলে বিশ্রামার্থ মূসা আশ্রয় গ্রহণ কেিলন। তিনি দেখিতে পাইলেন যে, অদূরে এক কূপ হইতে পানি তুলিয়া রাখাল বালকগণ স্ব ৭ ছাগল ও মেষকে পান কইছে। সকলেই আপন আপন কাজে ব্যস্ত, কেই হার দিকে ভ্রুক্ষেপ করিতেছে না; বরং প্রত্যেকেই সর্বাগ্রে আপন কাৰ্য্য সাধন করিতে ব্যর্থ। হজরত মূসা স্থিরনেত্রে তাহানে। কার্যকলাপ দেখিতেছিলেন। কূপের নিকটবর্তী প্রাঙ্গণের পার্শ্বে দুইটা অনূঢ়। কিশােরীকে দেখিয়া তিনি বিস্মিত হইলেন। তাহারা মেষপাল সঃ সেইস্থানে শান্তভাবে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। তৃষ্ণার্ত পশুগুলি কূপের পানি দেখিয়া, ক্ষণে ক্ষণে কূপের দিকে ধাইয়া যাইতেছে, আর কিশােরী দুইটা হস্তস্থিত লাঠি দ্বারা উহাদিগকে নিবৃত্ত করিয়া রাখিতেছে। পশুগুলি যত বারই এইরূপ করিতেছে, কিশােরীদ্বয় ততবারই উহাদিগকে বাধা দিতেছে। ইহার কারণ অনুসন্ধান করিবার জন্য, হজরত মূসা তাহাদের নিকটবর্তী হইয়া সকল বিষয় জিজ্ঞাসা করিলেন। তাহার জানাইল সকল হজরত মুসা মেষ ও বকরী একত্রে মিশিয়া গেলে, নিজেদের পশু চিনিয়া লওয়া শক্ত হইবে বলিয়া তাহারা সৰ্বশেষে পশুগুলিকে পানি খাওয়াইতে ইচ্ছা করিয়াছে। এই কথা শুনিয়া হজরত মুসা কহিলেন, “তােমাদের কি এম- কেহ নাই যে, সময় মত পশু গুলিকে গােঠে লইয়া যায় ও প্রয়ােজন মত ভলপান করায় ?” এক বৃদ্ধ পিতা ব্যতীত সংসারে তাহাদের আর কেহ নাই বলিয়া, তাহারা জানাইলে, হজরত মূসার হৃদয়ে দয়ার উদ্রেক হইল। ইতস্ততঃ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া নিকটে আর একটী কূপ দেখিয়া, কিশােরীদ্বয়ও তাহাদের মেষপাল সহ তিনি উক্ত কূপের নিকট উপস্থিত হলেন এবং কূপের মুখের পাথর খানা পাভরে সরাইয়া, স্বয়ং কূপ হইতে পানি তুলিয়া পশুগুলিকে খাওয়াইলেন। তৃষ্ণা নিবারণ করিয়া পশুগুলি আনন্দে নাচিতে নাচিতে বাড়ীর দিকে ছুটিয়া চলিল। সঙ্গে সঙ্গে কিশােরীদ্বয় ও কৃতজ্ঞপূর্ণ হৃদয়ে হজরত মূসাকে নীরবে ধন্যবাদ প্রদান করিয়া, নিজ গৃহে প্রত্যাগমন করিল। মূসা সেই গাছতলায় পুনরায় আশ্রয় গ্রহণ করিলেন । অসময়ে পশুপাল সহ কন্যাদ্বয়কে গৃহে প্রত্যাগমন করিতে দেখিয়া বৃদ্ধ পিতা হজরত শােয়ায়েব কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। কন্যাদ্বয় হাসি মুখে এক বিদেশী যুবকের দয়ার কথা বিশেষরূপে পিতার নিকট বিকৃত করিল। ইহাতে হজরত শশায়ায়েব পরম প্রীত হইয়া, কথিত যুবককে তাহার সম্মুখে হাজির করিতে জ্যেষ্ঠা কন্যা সফুরাকে আদেশ করলেন। তখন আহারের সময় হইয়া গিয়াছে। হজরত শােয়ায়েব দস্তর খানের উপর আহাৰ্য্য বস্তু লইয়া সবে মাত্র বসিয়াছেন। এমন সময়ে বিদেশী যুবককে সঙ্গে করিয়া, সফুরা পিতার নিকট ফিরিয়া আসিল।

হজরত মুসা হজরত শােয়ায়েব যুবককে সাদর সম্ভাষণে দস্তরখানে বসাইয়া, উভয়ে আহার করিতে বসিলেন। আহারান্তে হজরত শােয়ায়ে যুবকের সম্পূর্ণ পরিচয় পাইয়া কহিলেন, ‘মুসা! চিন্তা করিও না। এখানে থাকিয়াই তুমি নির্বিঘ্নে কাল যাপন এখানে ফেরাউনের অত্যাচার-উৎপীড়নের ভয় নাই। এই সংসারে আমার দুই কন্যা ব্যতীত আর কেহই নাই। আমার জ্যেষ্ঠা কন্যা সফুরার সহিত তোমাকে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করিতে আমি ইচ্ছা করিয়াছি। তাহার মোহরানা সরূপ তােমাকে দশ বৎসর আমার পশুপা চরাইতে হইবে।” ‘শােকর আলহামদুলিল্লাহ'—বলিয়া হরজত মুসা উক্ত বাক্যে স্বীকৃত হইলেন। তারপর যথা সময়ে উভয়ের উদ্বাহ ক্রিয়া সমাধা হইল হজরত শােয়ায়েব ওয়ারিসী স্বত্বে বিগত পয়গম্বরগণের বহুগুণ সম্পন্ন ষষ্টি প্রাপ্ত হন। এই সঙ্গে বেহেশত হইতে আনীত হজরত মূসর ‘আসা * হজরত আদম আলাহেস সালামের অশেষ গুণ লাই। সম্পন্ন ‘আসা তাহার মৌরিসী হইয়া যায়। এতকাল তিনি উক্ত যষ্টিখানা বিশেষ সতর্কতার সহিত রক্ষা করিতেছিলেন। কারণ তিনি পূর্বপুরুষ হইতে আদেশ পাইয়াছিলেন যে, এই অশেষ গুণসম্পন্ন ‘আসা হজরত মূসাকে প্রদান করিতে হইবে। * ‘আসা সম্বন্ধে মতভেদ দেখা যায়। অধিকাংশের মতে ইহা কোন অজ্ঞাত নামা ব্যক্তি কর্তৃক হজরত মূসাকে দান করিবার জন্য রক্ষিত হয়। আবার কাহারও কাহারও মতে ইহা হজরত আদম কর্তৃক বেহেশত হইতে আনীত লাঠি। ইহাতে দুইটী বাক। শিঙ ছিল ও নীচে একটী লৌহ শলাকা ৰিজ ছিল। ইহা দশ গজ লম্বা ছিল।

হজরত মূল। ar বিবাহের পর হজরত শােয়ায়েব পশুপাল চরাইবার জন্য রক্ষিত লাঠি হইতে জামাতাকে একখানা লাঠি উপহার দিতে, কন্যা সফুরাকে আদেশ করিলেন। সফুরা তাড়াতাড়ি একখানা লাঠি আনিয়া দিল। ইহা দর্শন করিয়া হজরত শােয়ায়েব কহিলেন, “ইহা গচ্ছিত স্থানে রাখিয়া পরিবর্তে আর একটী লাঠি আনিয়া দাও।” উক্ত লাঠি পূৰ্ব্বস্থানে রাখিয়া, সফুরা পুনরায় লাঠি লইয়া ফিরিয়া আসিলে, হজরত শােয়ায়েব দেখিলেন যে, ইহা আগেকার লাঠি ব্যতীত আর কিছুই নয়। সুতরাং পুনরায় ইহা পরিবর্তন করিয়া,সত্বর আর একটা লাঠি দিতে ইঙ্গিত করিলেন। সফুরা এইরূপে ক্রমে তিনবার লাঠি পরিবর্তন করা সত্বেও কিছুতেই উক্ত লাঠি পরিবর্তিত হইল না দেখিয়া, আপন জামাতাকে পূর্বপুরুষ হইতে উপদিষ্ট হজরত মুসা বলিয়া তাহার পূর্ণ ধারণা জন্মিল। কাজেই তিনি আর ইতস্ততঃ না করিয়া লাঠিখানা নীরবে হজরত মুসার হাতে দিয়া,ইহার সম্বন্ধে যাবতীয় জ্ঞাতব্য উপদেশ প্রদান করিলেন এবং পশু চরাইতে তাহাকে নিকটবর্তী বনে পাঠাইলেন। যাইবার কালে হজরত শােয়ায়েব বলিয়া দিলেন, “বাবা! যে বনে পশুপাল চরাইতে তােমাকে পঠাইতেছি, তাহা ব্যতীত ইহার নিকটস্থ অন্য বনে কখনও যাইবে না; কেননা সেই বনে এক ভয়ঙ্কর অজগর বাস করে।” উক্ত আদেশ শিরােধার্য্য করিয়া, হজরত মূসা প্রত্যহ পশু চরাইতে গিয়া থাকেন। ইতিমধ্যে একদিন পঙগুলি গােয়াল ঘর হইতে বাহির হইয়াই, হজরত শােয়ায়েবের নিষিদ্ধ বনের দিকে সর্প। ১৮ করিয়া চলিয়া গেল। হজরত মূসা সাধ্যমত চেষ্টা করিয়াও পশুদিগের গতি রোধ করিতে পারিলেন না এবং অগত্যা বাধ্য হজরত মুসা ৯o হইয়া তিনিও পশুগুলির অনুসরণ করিয়া সেই বনে উপস্থিত হইলেন। নিতান্ত ক্লান্ত হইয়া, তিনি সেই বনের এক অতি উচ্চ স্থানে বসিয়া পশুগুলির গতিবিধি লক্ষ্য করিতে লাগিলেন। বসিয়া থাকিতে থাকিতে তাহার তা আসিল। হস্তস্থিত যষ্ঠি শিবের নীচে রাখিয়া, প্রকৃতির কোমল শয্যা শ্যামল দুৰ্ব্বার উপর শয়ন করিয়া, অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিদ্রার ক্রোড়ে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। এদিকে অজগরও জীব-জন্তুর গন্ধ পাইয়া সদন্তে গর্ত হইতে উঠিয়া, পশুদিগকে আক্রমণ করিতে উদ্যত হইলে, হজরত মূসার শিয়রের নীচের ‘আসা বৃহদাকার ভূজঙ্গে পরিণত হইয়া ফণা বিস্তার করিয়া অজগরেব সম্মুখীন হইয়া ভীষণরূপে আক্রমণ করিল। অচিবেই অজগর মৃত্যুমুখে পতিত হইল। হজরত মূসার ‘আসাও নিজের বেশেই পুনরায় তাহার শিয়রের নীচে আনিয়া পড়িয়া রহিল। নিদ্রাভঙ্গ হইলে পর, হজরত মুসা দেখিতে পাইলেন যে, রক্তাক্ত কলেবরে এক ভীষণ অজগর তাঁহার নিকটেই মৃত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। তিনি সবিস্ময়ে আল্লাহ- তাআলার শোকর গুজারী করিলেন। সন্ধ্যাকালে হজরত মুসা পশুপাল সহ গৃহে প্রত্যাগমন করিয়া, ইজরত শােয়ায়েবের নিকট আদ্যন্ত সকল ঘটনা বর্ণনা করিলেন। আলা’ সম্বন্ধে পূৰ্ব্ব হইতে যাহা শুনিয়া আসিয়াছেন, তাহার ফল দুশিতে আরম্ভ হইয়াছে দেখিয়া, তিনি নীর। রহিলেন। * তাসার অশেষ গুণাবলী সম্বন্ধে কাহারও মতভেদ নাই। সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেন যে, নির্জনতায় একাকী পথে চলিবার সময়, ‘আসা হজরত মূসার সহিত কথােপকথন করিয়া বন্ধুর কাজ করিত। হিংস্র জন্তুর মুখে পড়িলে অবলীলাক্রমে, তিনি আসার কল্যাণে আসন্ন বিপদ হজরত মুসা হইতে রক্ষা পাইতেন। পশুর দল চরাইতে চাইতে তিনি নিদ্রিত হইয়া পড়িলে, ‘আসা তাঁহার রাখালের কাজ করিত। গভীর কূপ হইতে পানি তুলিবার কালে আসা অপরিসীম লম্বমান রঞ্জুতে পরিণত হইত এবং ইহার মস্তকোপরিস্থিত শিঙ দুইটা জল পাত্রের কার্য সম্পাদন করিত। প্রচণ্ড আতপতাপে ভূপ্রােথিত করিলে, ‘আসা ছায়াময় রসাল ফলবান বৃক্ষে পরিণত হইয়া ফল প্রদান করিত। ঘাের অন্ধকার রজনীতে দীপ্ত প্রদীপের কাজ করিত। বিসমিল্লাহ-বলিয়া প্রস্তরের উপরে লাঠি দ্বারা আঘাত করিলে, তরতর বেগে ঝরণা প্রবাহিত হইত। অথচ লাঠি উঠাইয়া লইলে পুনরায় পাষাণে পরিণত হইয়া শুষ্ক ভূখণ্ড পড়িয়া থাকত। পথশ্রমে ক্লান্ত হইয়া পড়িলে, ‘আসা দ্বারা হজরত মূসার অশ্বের কাৰ্য্য হইত। স্বীয় প্রতিভা প্রদর্শন কালে, ‘আসা’ সত্তর গজ দীর্ঘ বিষধর সর্পে পরিণত হইয়া লােল জিহ্বা বাহির করিয়া ফণা বিস্তার করিত। বৃঃ দাকার গুরুরাজী নিশ্বাসে সমূলে উৎপাটিত হইয়া নাসা রন্ধ্রে প্রবিষ্ট ইত। এমনি ছিল 'আসার অশেষ গুণ। এইরূপে হজরত মূস। আট বৎসর কাল পশু চরাইয়া, আপন অঙ্গীকার পালন করিলেন। ইহাতে হজরত শােয়ায়েব অতিশয় খুশী হয়। জানাইলেন যে, চালত বৎসরে যত নর ছাগছানা জন্ম গ্রহণ করিবে, সকলই মূসাকে দেওয় হইবে। আল্লাহতাআলার কুদরতে সেই বৎসর সকল বই নর ছানা প্রসব করিল। এইরূপে আরও চারি বৎসর পখ্যায়ক্রমে হজত শােরায়েব অঙ্গীকার করিলেন। প্রতি বৎসরই বকরীর দল প্রথম বৎসরের মত নর ছানা প্রসব করিল। ইহাতে হজরত মুসার আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল হইয়া, তাহার ভাগ্য প্রসন্ন হইল।

৪ হজরত মূসার মিসরে প্রত্যাগমন। এইরূপে হজরত মুসা অনেক পশুই লাভ করিতেন। সে কালে যাহার বেশী পশু থাকিত, তিনি ধনী শ্রেষ্ঠ বলিয়া গণ্য হইতেন। হজরত মূসা একজন ধনী বলিয়া পরিচিত হইলেন। কিন্তু ধন হইলে কি হয়? ধনে সুখ মিলে না। মানসিক সুখ না থাকিলে জাগতিক ঐশ্বৰ্য্য সুখ মিলে না। অহর্নিশ, মাতাপিতা, ভ্রাতা-ভগ্নী, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজনের ক্লেশকর চিন্তায় হজরত মুসার মনে সুখ ছিল না। এদিকে আবার ফেরাউনের ভয়ও প্রাণে জাগরিত হইয়া, ক্ষণে ক্ষণে আশার জীবন্ত আলেটী, নিঝাণ করিয়া দিতে পশ্চাদপদ হইত না। কিয়দ্দিশ দুর্নিবার চিন্তার পর মিসর যাওয়াই স্থির হইল। নির্দিষ্ট সময়ে হজরত শোয়ায়েবের নিকট হইতে বিদায় লইয়া স্বীয় পরিণীত ভাৰ্য্যা সফুরা ও কতিপয় সঙ্গী সমভিব্যাহারে পশুদল সহ মিসর অভিমুখে যাত্রা করিলেন। তখন হজরত সফুরা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। কিয়দ্দিবস অবিশ্রান্ত পথ চলিয়া, ভঁহারা মদায়ুন হইতে অনেক দূরে সরিয়া পড়িলেন। দৈবনিবন্ধন একদা নিশিতে পথ অতিক্রমকালে আকাশ ঘাের কৃষ্ণবর্ণ মেঘ জালে আবৃত হইয়া গেল। দেয়া গুরু গম্ভীর গর্জন করিতে লাগিল। খানিক পরই মুষলধারে বৃষ্টিপাত হইতে লাগিল ; সঙ্গে সঙ্গে ভীম বেগে বায়ু প্রবাহিত হইতে লাগিল। পশুগুলি শীতের প্রকোপে ও দুর্যোগে কাতর ও ভীত চকিত হইয়া উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিতে করিতে হজরত মুসা ৯o ; ইতস্ততঃ ছুটিয়া বেড়াইতেছিল। এদিকে হজরত সফুরার প্রসব বেদনা উপস্থিত হইল ; তিনি আগুনের জন্য বড়ই কাতর হইয়া পড়িলেন। ভাগ্যক্রমে হজরত মূসা ভীষণ তমসাময়ী ঘাের রজনীতে পথ হারাইয়া ফেলিলেন। এখন কি করিবেন, কোথায় যাইবেন, কোথা হইতেই বা শীত ও বেদনাতুরা ভাৰ্যাকে আগুন আনিয়া দিবেন, তাহা ভাবিয়া কূল কিনারা করিতে পারিতেছিলেন না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া, তিনি আকাশ পাতাল ভাবিয়া অস্থির হইয়া পড়িলেন। হঠাৎ দেখিতে পাইলেন, সম্মুখদিকে ধুম্র বিহীন উজ্জ্বল অগ্নিশিখা বায়ুভরে দপ দপ করিয়া জ্বলিতেছে। তৎক্ষণাৎ গমনে ক্ষান্ত দিয়া, বিবি সফুরাকে বলিলেন, “প্রিয়ে ! তুমি খানিক অপেক্ষা কর, আমি ঐ প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখা হইতে তোমার জন্য আগুন আনিতেছি; সঙ্গে সঙ্গে পথেরও সন্ধান করিয়া আসিতেহি।” অতঃপর হজরত মুসা অগ্নি লক্ষ্য করিয়া উৰ্দ্ধশ্বাসে ছুটিয়া অগ্নির নিকট উপস্থিত হইয়া দেখিতে পাইলেন যে, পৰ্বত শৃঙ্গস্থিত তরু শাখা সমূহ ধূম্র বিহীন উজ্জ্বল আলোকে প্রজ্জ্বলিত হইয়া রহিয়াছে। সবুজ মহীরুহের পল্লব সমূহ অগ্নি রাশিতে অপূর্ব শােভা ধারণ করিয়া রহিয়াছে। কিন্তু কোথাও আগুন দেখিতে না পাইয়া, তিনি কাঠপুত্তলিকার ন্যায় নির্বাক বিস্ময়ে দাঁড়াইয়া রহিলেন। চতুর্দিক কম্পিত করিয়া সেই অগ্নিশিখা হইতে শব্দ হইল, “আয় মূসা ! তুমি পবিত্র তুর পৰ্বতে পদার্পণ করিয়াছ। অতএব পাদুকাদ্বয় খুলিয়া ফেল। হজরত মূসা ত্বরিত গতিতে পাদুকা খুলিয়া লইলে, পুনরায় শব্দ হইল “হে মূসা ! আমিই তােমার সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা ও অখিল ব্রহ্মাণ্ডের সৃজনকারী প্রভু। আমিই তােমাকে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান হজরত মুসা করিয়াছি। আমিই অদ্বিতীয় নিরাকার বিশ্বব্যাপী আল্লাহ; অতএব তুমি আমাকেই পূজা কর।” অনন্তর অবার শব্দ হইল, “হে মূসা ! তােমার দক্ষিণ করস্থিত দ্রব্যটী কি?” “ইহা আমার লাঠি। ইহা দ্বারা অমি বৃক্ষ হইতে নিজের খাদ্যজাত ফলমূর্ণ আহরণ কর ও সময় মত হলান দিয়া শরীরের ক্লান্তি দূর করি। কখনও বা আমার পােষা জলদের জন্য বৃক্ষাগ্র হইতে পত্র ছিড়িয়া লই।” “ইহা ভূতলে নিক্ষেপ কর।” হজরত মূসা বিনা বাক্য ব্যয়ে স্বীয় যষ্টি ভূতলে নিক্ষেপ করিয়া নতণীবে দাঁড়াইয়া রহিলেন। যষ্টি ভূতলে নিক্ষিপ্ত হওয়া প্রকাণ্ড ভুঙ্গে পরিণত হইয়া করা মুখ ব্যাদন করিয়া চতুর্দিকে ঘুরি। বেড়াইতে লাগিল। হজরত মুসা তাহা দেখিয়া আতঙ্কে কাপিয়া উঠিয়া প্রাণ ভয়ে একদিকে দৌড়াইয়া ছুটিলেন । অমনি পুনরায় গায়েব হইতে আওয়াজ হইল, “হে মুসা! তােমাকে অভয় দান করা হইয়াছে, সুতরাং তুমি ভয় করিও না। নির্ভয়ে সর্পের মুখে হাত প্রবেশ করাইয়া দাও।” ইহাতে হজরত মূসা হৃদয়ে সাহস সঞ্চয় করিয়া বিরূপাক্ষ নাগরার করল মুখে হস্ত প্রবেশ করাইয়া দেওয়া মাত্র যষ্টি পূর্বের আকার ধারণ করিল। “তোমার দক্ষিণ হস্ত জামার জেবে প্রবেশ করইয়। পুনরায় বাহির - কর।* হজরত মুসা হুকুম অনুযায়ী কাৰ্য্য করিয়া হাত বাহির করিলে, দেখা গেল হাতের যতটুকু জেবের ভিতর ছিল, ততটুকুই উজ্জ্বল নূরানী রঙ্গে রঞ্জিত হইয়া গিয়াছে।

হজরত মুসা “হস্ত বক্ষে রাখিয়া বাম করে আবৃত করিয়া রাখ।” আদেশ প্রতিপালিত হইল ; সঙ্গে সঙ্গেই হস্ত নিষ্প্রভ বােধ হইতে লাগিল। পুনরায় আদেশ হইল, “হে মূসা ! আমি তােমাকে নবুয়ত প্রদান করিলাম এবং তাহার প্রমাণ সরূপ ‘আসা ও উজ্জ্বল হস্ত দিলাম। তুমি এখনই মিসরের দিকে যাত্রা কর ; কারণ সেখানে ফেরাউন সৰ্ব্বে সৰ্বা হইয়া উঠিয়াছে। তাহার অমানুষিক দৌরাত্ম্যে সিব তিদিগের কষ্টের সীমা নাই। তুমি তাহাকে নসীহত করিয়া সৎপথে আনিতে চেষ্টা কর। আর বনি-ইস্রাইলদিগকে দাসত্ব হইতে মুক্তি দান করিয়া, তােমার সহিত তাহাদিগকে সিরিয়া দেশে প্রেরণ করিতে, আমার হুকুম তাহাকে জানাও।” অনন্তর হজরত মুসা সিজদা করিয়া কহিলেন, “হে অনাথ শরণ প্রভাে! আমি মিসর পরিত্যাগের অব্যবহিত পূর্বে এক কিবতিকে বধ করিয়াছিলাম। এই কারণে ফেরাউন আমাকে হত্যা করিবার আদেশ প্রদান করে। এখন তাহার সম্মুখে পুনরায় ফিরিয়া যাইতে, আমার অন্তরাত্মা আতঙ্কে শিহরিয়া উঠিতেছে। আকাশ, পাতাল, অন্তরীক্ষ ভেদ করিয়া শব্দ হইল, “হে মূসা ! তোমাকে অভয় দান করা হইয়াছে। ফেরাউনের সাধ্য কি যে, তােমার কেশাগ্র স্পর্শ করে। সর্বদাই আমি তােমার অনুগামী হইয়া তোমার কাৰ্য্য সম্যক দেখিতেছি।” জওয়াবে হজরত মূসা পুনরায় আরজ করিলেন, “হে প্রভো! আমি তােতলা; এই নিমিত্ত সম্পূর্ণ বাক্য স্ফুরণে অক্ষম। ইহাতে শক্তগণ আমাকে অলীক অপবা করিবে। কৃপা বিতরণে তুমি আমাকে বাঙময় হজরত মুসা করিয়া দাও এবং পৃষ্ঠপােষ তার জন্য ভ্রাতা হারুনকে আমার সঙ্গী করিয়া দাও।” “তাহাই হইবে।”—বলিয়া সঙ্গে সঙ্গেই নূবের রােশনাই ক্রমশঃ নিষ্প্রভ হইয়া গেল। এই ঘটনার পর সফুরার নিকট হজরত মুসা ফিরিয়া গিয়া দেখিলেন, আল্লাহ-আলার কুতে বেহেশতের হুরীনল বেষ্টিত হইয়া, বিবি সফুরা শিশু পুন্ন ক্রোড়ে লইয়া তাহারই আগমন প্রতীক্ষা করিতেছে । তিনি আরো দেখলেন যে, প 'গুলি শ্বাপদ জন্তু কর্তৃক যত্নে রক্ষিত হইতেছে। যথা সময়ে হজরত মূসব মুখে আল্লাহ তাআলার আদেশ শ্রবণ করিয়া, বিৰি সফুর হর্ষোৎফুল্ল চিত্তে কহিলেন, “খাবিক ! আপনি এই মুহূর্তেই মিসরে যাত্রা কম্নি কম্নি আল্লাহ তাআলা হুকুম পালন করুন। হজরত মূসা স্বীয় প্রাণাধিকা ভাৰ্য্যাকে পুনরায় দায়নে প্রেরণ করিনা, স্বয়ং মসরের দিকে রওয়ানা হলেন । ওদিকে হজরত হারুন কোথা হতে আসিয়া, পথিমধ্যে তাহার সহিত মিত হলেন। তারপর উভয়ে একত্র হইয়া ফেরাউনের দরবারে উপস্থিত হইলেন। হরত মূসা ফেরাউনকে লক্ষ্য করিয়া কহিলেন। “আমি ৩াল্লাহ-তালার প্রেরিত রসূন ; তােমাকে হেদ:য়েত করিবার জন্য আল্লাহ তাআলা আমাকে প্রেরণ করিয়াছেন। 'নাহ ইস্রাইলদিগকে দাসত্ব নিগড় হইতে মুক্তি প্রদান কর। তাহারা যথেচ্ছা চলিয়া গিঙ্গা আল্লাহ-আলার এদিত বন্দেগী করুক।” ইহাতে ফেরাউন ক্রোধে অগ্নি শৰ্ম্মা হইয়া শ্লেষকণ্ঠে কহিল, “তুমি কি সেই-মূসা নয়, যে শৈশব হইতে সহায় ।

হজরত মুসা সম্বলহীন হইয়া বহু বৎসর আমারই অনুবস্ত্রে ও হিরন্ময় হৰ্ম্মতলে শরীরের পুষ্টি সাধন করিয়াছে। তারপর তাহার প্রতিদান সরূপ আমার কিবতি ভৃত্যকে হত্যা করিয়া স্বীয় প্রাণের মায়ার রাজ্য হইতে চলিয়া গিয়াছ ? আজ আবার পয়গম্বর হইয়া তুমি আমাকেই ছলনা করিতে আসিয়াছ।” হজরত মূসা উত্তর করিলেন, “হাঁ, আমিই সেই-মুসা। তােমাকে সদুপদেশ প্রদান (রিয়া সৎপথে আনিবার অন্য মেহেরবান আল্লাহ, আমাকে পয়গম্বর করিয়া পাঠাইয়াছেন। তুমি যদি নিজের মঙ্গল কামনা কর, তবে আমার কথা শুন!” “খােদা আর কে ? কোথায় সে?”-বলিয়া রােষ কষাইত নেত্রে ফেরাউন লাফাইয়া উঠিল। মুসা। খােদাই গগন, ভুবন, অন্তরীক্ষ পূৰ্ব্বাপর যাবতীয় পদার্থের এবং দশদিকের একমাত্র স্রষ্টা। ফেরাউন। য িভুমি আমাকে ব্যতীত অন্য খোদার সত্ত্বা স্থাপন করিতে পরায়ু না হও, তবে নিশ্চয়ই তোমাকে রাজদ্রোহী ঘোষণা করিয়া খাবদ্ধ করা হইবে। মুস।। হাঁ, আমি যদি নবুয়তের কোন প্রকৃষ্ট প্রমাণ দিতে পারি, তথাপি কি আমাকে বন্দী করা হইবে ? ফেরাউন। যদি সত্য পয়গম্বররূপে অবতীর্ণ হইয়া থাক, তবে তাহার জাজ্বল্যমান প্রমাণ পেশ কর। ফেরাউনের কথা শেষ হওর সঙ্গে সঙ্গেই হজরত মূসা হস্তস্থিত পবিত্র যষ্টি ভূতলে নিক্ষেপ করিলেন। 'হাল্লাহু তাআলার হেকমতে যষ্টি মাটীতে হজরত মুসা পড়িয়াই এক ভীষণ ভুজঙ্গের আকার ধারণ করিল। নাগরাজ বিশাল ফণা বিস্তার করিয়া লােল জিহ্বা বাহির করিয়া, ফোস ফোস রবে, গজ্জন করিতে করিতে রােষভরে ফেরাউনের দিকে ধাবিত হইল। “হে মুসা! তােমার খোদার শপথ। তুমি আমাকে অহিরাজের করাল গ্রাস হইতে রক্ষা কর। আমি তােমার খােদর উপর ঈমান আনিব।”—ফেরাউনের এইরূপ স্তুতিবাক্যে, তিনি স্বীয় ‘আসা হাতে উঠাইয়া লইলেন। অতঃপর পবিত্রতম হস্ত ক্ষণিকক্ষণ জেবে লুকাইত রাখিয়া পুনরার বাহির করিয়া, সকলের সম্মুখে ধরিলেন। হাত সূৰ্য্য করাপেক্ষা উজ্জ্বলরূপে ভাতিয়া উঠিল। সকলে অলৌকিক কাৰ্য্য দর্শন করিয়া বিস্ময়ে নির্বাক হইয়া রহিল। আসন্ন বিপদ হইতে অব্যাহতি লাভ করিয়া, ফেরাউন হজরত মূসাকে জিজ্ঞাসা করিল, “যদি আমি আপনার পয়গম্বরীতে বিশ্বাস স্থাপন করিয়া খােদাকে অদ্বিতীয় বলিয়া বিশ্বাস করি, তাহা হইলে খােদার নিকট হইতে আমি কি পাইব?” হজরত মূসা কহিলেন, “আল্লাহ-তাআলার উপর ঈমান আনিয়া সরল চিত্তে তাহার এবাদত বন্দেগী করিলে, তুমি চিরযৌবন প্রাপ্ত হইয়া, মিসরের একচ্ছত্র আধিপত্য সর্বদা সমভাবে ভােগ করিবে, আর তুমি আজীবন অক্ষত স্বাস্থ্য ভােগ করিয়া, মৃত্যুর পর চির সুখময় বেহেশতে থাকিবে। আগামী কল্য যাহা করিতে হয় করিবে বলিয়া, সেই দিনের মত হজরত মূসার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়া, ফেরাউন অন্তঃপুরে চলিয়া গেল। রজনীতে উজির হামানের সহিত মন্ত্রণা গৃহে প্রবিষ্ট হইয়া আল্লাহ। তাআলার উপর ঈমান আনিবার সম্বন্ধে তাহার অভিমত জানিতে হজরত মূল চাহিলে, কুটমতি হামান কহিল, “এই সুদীর্ঘকাল ঈশ্বরত্বের দাবী করিয়া আজ খােদাকে পূজা করিলে, লােকে উপহাস করিবে। তাহার উপর মূসার কথা সত্য নয়। সে একজন হরত মূসার পাকা যাদুকর ছাড়া আর কিছুই নয়। তাহার সহিত ফেরানের যাদু যুদ্ধ। ভেল্কীতে আপনি কদাচ মুগ্ধ হইবেন না। আজই রাজ্যময় ঢােল পিটাইয়া দেশের যাদুকরদিগকে একত্র করিয়া, তাঁহার সহিত যাদুযুদ্ধে প্রবৃত্ত হউন। দেখিবেন, মূসা পরাভূত হইয়া সত্বর পলায়ন করিবে। হামানের উপদেশ অনুযায়ী পরদিনই রাজ্যময় প্রচার করিয়া দেওয়া হইল যে, রাজ্যের বড় বড় যাদুকরগণ ঈদের দিন মিলিত হইয়া মুসার সহিত যাদুযুদ্ধ করিবে। যে এই যুদ্ধে পরাভব স্বীকার করিবে তাহাকেই নিরাপত্তিতে বিজয়ীর ধর্ম গ্রহণ করিতে হইবে। যথা সময়ে রাজ্যের নানাস্থান হইতে বড় বড় যাদুকর সব রাজ- বাড়ীতে উপস্থিত হইল। রাজবাড়ীর সম্মুখস্থ ময়দানে লােক জমায়েতের স্থান নির্দিষ্ট হইল। যাদুকরগণ আসিয়া স্ব স্ব পদমর্যাদানুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে আসন গ্রহণ করিল। বাহাত্তর হাজার যাদুকর প্রত্যেকে একগাছি রজু ও একখানা লাঠি হাতে করিয়া, সেই দরবারে হাজীর হইল। ফেরাউন সর্বোপরি সুবর্ণ সিংহাসনে উপবিষ্ট হইল। তাহার পার্শ্বে উজির হামান আসন গ্রহণ করিল। উলঙ্গ কৃপাণ হস্তে ভীমকায় প্রহরী, যম কিঙ্কর বেশে সভামণ্ডপের চতুপার্শ্বে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল। হিরন্ময় সিংহাসনের চতুর্দিকে সুবর্ণ পতাকা সমুহ বায়ুভরে উড়িতে লাগিল। প্রান্তরের চতুর্দিকে দামামা নাকাড়া বাজিতে লাগিল।

হজরত মুসা ইতিমধ্যে হজরত মুসা তদীয় ভ্রাতা হারুনকে সঙ্গে করিয়া, যােগী বেশে সভামণ্ডপে প্রবেশ করিলে পর, যাদুকরগণের সহিত যুদ্ধ আরম্ভ হইল। মুহূর্তের মাঝে চতুর্দিক হইতে একলক্ষ চৌচল্লিশ হাজার যষ্টি ও রজ্জ্ব ভূতলে নিক্ষিপ্ত হইয়া মন্ত্রপূত হইল। অমনি অসংখ্য বিষধর সর্প ফণা বিস্তার করিয়া শে। শে। রবে চৌদিক থেকে মুসাকে আক্রমণ করিল। মুসা প্রমাদ গণিলেন ; তৎক্ষণাৎ গায়েব হইতে শব্দ হইল, “আয় মুসা ! ভীত হইও না। তােমার লাঠিখানা মাটীতে ফেলিয়া দাও।” মূসার চমক ভাঙ্গিয়া গেল। তিনি চক্ষের পলকে স্বীয় যষ্টি মৃত্তিকায় নিক্ষেপ করিলেন। মুহূর্তে ত দ্রুত কাণ্ড ঘটিল। লাঠি প্রথমতঃ একটা ছোট সর্প হইয়া নানাদিকে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল। শেষে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়া, এক মাইক দীর্ঘ হইয়া, ফনা বিস্তার করিয়া উঠিল ; ইহার চোখ দিয়া আগুন ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। তারপর লাঙ্গুলের অগ্রভাগে দাঁড়াইয়া মুখ ব্যাদন করিয়া যাদুকৃত সর্পগুলি একে একে গিলিয়া ফেলিল। বুভুক্ষু সর্পের রাগ যেন তখনও কমে নাই, ক্রোধান্বিত শ্বাস প্রশ্বাসের সম্মুখে তরুরাজী সমূলে উৎপাটিত হইয়া নাসারন্ধ্রে প্রবিষ্ট হইতে লাগিল। এই আজব কারখানা দেখিয়া দরবারে মহাকোলাহল শুরু হইল। যে যেখানে পারিল, প্রাণভয়ে দৌড়াইয়া ছুটিল, কেহ কাহার দিকে ফিরিয়া চাহিবার অবসর পাইল না। শঙ্কিত জন প্রাণী এত উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়িয়া ছুটিল যে, পরস্পরের ঘর্ষণে পঁচিশ হাজার লোক প্রাণ হারাইল। অতি অল্প কালের মধ্যেই জনপূর্ণ বিশাল প্রান্তর নির্জনতায় পরিণত হইল।

হজরত মুসা গ্রহণ। সর্প করাল মুখ ব্যাদন করিয়া, ফেরাউনের দিকে দ্রুতবেগে অগ্রসর হইতেছে দেখিয়া, ফেরাউন চীৎকার করিয়া কহিল, “হে মুসা! তােমার খােদার কসম। এবার আমাকে আসন্ন বিপদ হইতে উদ্ধার কর। আমি আর কাহারও বাক্যে মুগ্ধ হইব না। নিশ্চয়ই ভােমার অনন্ত মহিমাময় খােদার উপর ঈমান আনিব।” ফরাউনের কা র ক্রন্দনে মূসার হৃদয় বিগলিত হইল। তিনি অবিলম্বে লাঠি হাতে উঠাইয়া লইলেন। ইহা দর্শন করিয়া যাদুকরগণ বিস্মিত হইল। এত যাদুর গুণ নয় ; ইহা যে, দৈবগুণ যাদুকরগণের সত্যধৰ্ম্ম বলিয়া সত্যই প্রতীয়মান হইল। যার গুণে হইলে নিশ্চয়ই তাহাদের যাদুতেও কিছু না কিছু কাৰ্য্য হইত। এই মুসা সামান্য লোক নয়। নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রেরিত রসূল। তাহার বাক্যে থ্যিার লেশ মাত্র নাই।--এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে পরাজিত যাদুকরগণ ভক্তিপূর্ণ হৃদয়ে, হজরত মুসার কাছে দীক্ষিত হইয়া, সত্যধর্ম গ্রহণ করিল। এত গুলি লােককে একসঙ্গে হজরত মূসার ধর্ম গ্রহণ করিতে দেখিয়া, ফেরাউনের আর সহ্য হইল না। নিজের প্রতিজ্ঞা ভুলিয়া, ফেরাউন ক্রোধ স্পিত করে তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া কহিল, “সব সিংহের একই গর্জন। মূসাই তোমাদের ওস্তাদ। তােমরা আমার বিনা অনুমতিতে তাহার ধৰ্ম্ম গ্রহণ করিয়াছ। ইহার জন্য তােমাগিকে কঠোর শাস্তি ভােগ করিতে হইবে। আমি তােমাদের প্রবেকের দক্ষিণ হস্ত ও বাম পদ ছেদন করিয়া শূলে চড়াইব।” ঈমানদারগণ সমস্বরে আল্লাহতা'আলার বির ঘােষণা করিয়া কহিল, “পাপী, তুমি যাহাই কর না কেন, আমরা হজরত মুসা s কিছুতেই সত্য ধৰ্ম্ম হইতে বিচ্যুত হইব না। তুমি সমগ্র মিসরের একচ্ছত্র অধিপতি। যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পার। অদ্ধ যদি তােমার উৎপীড়নে কিংবা অন্য কোন কারণে আমাদের প্রাণান্ত হয়, পরিণামে আমরা বেহেশতে স্থান পাইব। অবিনশ্বর জগতে কেহই শাশ্বত সুখ ভােগ করিতে পারে না। কাজেই আমরা তােমার অত্যাচারে ভীত নহি। ইহাতেও ফেরাউনের চৈতন্যোদয় হইল না। নিরপরাধ নূতন ঈমানদারগণকে তাহার আদেশ অনুযায়ী নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করা হইল। ইহার পর হইতে ফেরাউন মরিয়া হইয়া, মূসার সঙ্গে দুশমনী করিতে লাগিল। ও তার বধ। ইহার কিছুদিন পরই বিশেষ অনুসন্ধানের পর ফেরাউন জ্ঞাত হইল যে, হজরত মূসার গুণে মুগ্ধ হইয়া মিসরের রাণী বিবি ফেরাউনের কঠোর আসিয়া এবং তাহার স্নেহপালিত কন্যা ধাত্রীসহ আদেশে তদীয় পত্নী গগাপনে সত্য ধর্ম গ্রহণ করিয়াছেন। ফেরাউন আপন কন্যাকে কাছে ডাকিয়া অনিয়া, নানা প্রলােভন দেখাইয়া, হজরত মূসার ধর্ম পরিত্যাগ করিতে আদেশ করিল। কিন্তু তাহার কথায় কন্যার মন সত্য পথ হইতে বিন্দু পরিমাণ টলিল না। সুতরাং ফেরাউনের আদেশে তাহার আদুরে কন্যার প্রাণও চক্ষের নিমিষে শেষ হইল। অতঃপর ফেরাউন প্রাণাধিকা ভাৰ্য্যা বিবি আসিয়াকে প্রিয়ম্বরে বলিল, “প্রিয়ে। আমি তোমাকে প্রাণাপেক্ষা ভালবাসিয়া থাকি। তুমি মুসার ধর্ম পরিত্যাগ কর ও আমাকে খােদা বলিয়া স্বীকার কর, আমি তােমাকে পূৰ্ব্বাপেক্ষা দ্বিগুণ বিলাস ব্যসনে রাখিব। তােমার নয়ন রঞ্জনের নিমিত্ত হিরন্ময় অট্টালিকা নির্মাণ হজরত মূল করাইয়া দিব।” এইরূপে অহর্নিশ ফেরাউন তাহাকে প্রলোভনে প্রলুব্ধ করিতে লাগিল। বিবি আসিয়ার দৃঢ় মন কিন্তু এক মুহূর্তের তরেও টলাইতে পারিল না। বহু প্রলােভনের পর ফেরাউন বিফল মনােরথ হইয়া, মধ্যাহ্ন-সূর্য-কিরণে তপ্ত কঙ্কর ও বালুকারাশির উপর শােয়াইয়া, হস্ত পদাদি লৌহময় কণ্টকে মৃত্তিকার সহিত আবদ্ধ করিয়া, বক্ষদেশে গুরুভার পাষাণ চাপাইয়া দিয়া, বিবি আসিয়াকে হত্যা করিতে হুকুম দিল। অকালে বিবি আসিয়ার জীবন লীলা শেষ হইল। বিবি আসিয়া এই মর জগত পরিত্যাগ করিয়া বেহেশতে চলিয়া গেলেন। বিবি আসিয়ার হত্যার পর হইতে ফেরাউনের দৌরাত্ম্য দিন দিন আরও বৃদ্ধি হইল। দৌরাত্ম্য চরমে উঠিলে, হজরত ফেরাউনের উপর মুসা খোদার কাছে আরজ করিলেন, “হে খােদা! গজব নাজিল। আমার অনবরত হেদায়েতে এবং মােজজা প্রদর্শনে ফেরাউনের ও তাহ:র লোক-লস্করের মত পরিবর্তন হইতেছে না। অতএব তুমি তাহাদের উপর গজব নাজিল কর।” খােদার দোরগায় দোয়া কবুল হইল। অতি অল্প দিনের মধ্যেই দেশে দুর্ভিক্ষ রাক্ষসী করাল বদনে দেখা দিল। কতিপয় দিবস মধ্যেই দেশের নানা স্থানে অন্নাভাবে লোক প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল। কবতিগণ দেখিল যে মহা সর্বনাশ হইতেছে। কাজেই তাহার দায়ে পড়িয়া দলে দলে আসিয়া, হজরত মুসাকে বিনীতভাবে কহিল, “হে মুসা! তুমি তােমার খােদাকে বলিয়া আমাদিগকে এই অসন্ন বিপদ হইতে উদ্ধার কর। আমরা তোমাকে খােদার রসূল বলিয়া মান্য করিব।” তাহাদের কথায় মুসার পবিত্র হৃদয় বিগলিত হইল। তিনি খােদার নিকট দোয়া করিয়া হজরত মুসা সেই বারের মত তাহাদিগকে বিপদ হইতে উদ্ধার করিলেন। বিদ অপসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কিবতিগণ আগের মূর্তি ধারণ করিল। তাহার পূর্ব লক্ষিত পথ পরিত্যাগ করিল না; বরং হজরত মুসার উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়াইয়া দিল। অঃনিশ নির্মম অত্যাচারে প্রপীড়িত হইয়া, হজরত মূসা পুনরায় খােদার নিকট আরজ করিলেন। এইবার দুষ্ট কিবতিদের উপর এক নূতন বিপদের সূচনা হইল তাহাদের ফলবান বৃক্ষ লতা সমূহ নিষ্ফলা তুঙ্গ-শির হইয়া গেল। কাজেই এবারও দেশে নানা অভাব অনটন দেখা দিল। এবারও তাহারা বিপদ অবশ্যম্ভাবী ভাবিয়া, নানারূপ অঙ্গীকারাদির পর মূসাকে বাধ্য করিল। হজরত মূসা তাহাদের বিনয় বাক্যে মুগ্ধ হয়, পুনরায় খােদার কাছে দোয়া করিলে তাহারা বিপদ হইতে মুক্ত হইল। কিন্তু হইতে কি হয় ? পাপীষ্ঠগণ অচিরেই পুনরায় পাপ পঙ্কে নিমজ্জিত হইল। হর্জরত মূসা দেখিলেন ফেরাউন ও তাহার অনুচগণের অনাচার ও অত্যাচারের মাত্রা চরমে উঠিয়াছে। তাই তিনি বিরক্ত হইয়া খোদার নিকট আরজ করিলেন। তঁাহার দোয়া কবুল হই। সঙ্গে সঙ্গেই ভীষণ বেগে বন্যার জল প্রবাহিত হইয়া দেশ ভাসাইয়া দিল। অহােরাত্র ঝড়-তুফানসহ মুষল ধারে বৃষ্টি পতিত হইতে লাগিল। খােদার কুদরতে কিবতিদিগের প্রত্যেকের প্রাঙ্গণ ও আঙ্গিনা দুই দিনে পানিতে ভাসিয় গেল। সিৰতিগণ ইহার খবরও জানে না। পাও আবার কম নহে, এবারে মুখ ববয়ে সমান সমান, সামান্য একটু নাড়া পাইলেই নাকে মুখে প্রবেশ করিয়া বিষম যন্ত্রনা দেয়। স্বভাব দুষ্ট কিবতিঃদগের কষ্টের আর সীমা রহিল না। সিবতিদিগের হজরত মুসা পর্ণ কুটিরগুলি বেশ শুকনা। একটু বিশ্রাম লাভের আশায় সেখানে গেলেও অব্যাহতি নাই, অভিসম্পাতের ন্যায় পানি কুকুর তাড়া করিয়া তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চাত অনুসরণ করে। এইরূপে হয়রান-পেরেশান হইয়া, সকলে মিলিয়া দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিল, “মূসা ! এবার আমাদিগকে সমূহ বিপদ হইতে উদ্ধার কর। ভবিষ্যতে আমরা আর তোমার বিরুদ্ধাচরণ করিব না।” হজরত মূসার মনে দয়ার উদ্রেক হইল। তাহাদের কষ্টে তাহার মন বিগলিত হইল। তিনি খােদর নিকট আরজ করিয়া, এইবার ও তাহাদিগকে বিপদ হইতে মুক্ত করিয়া দিলেন বিপদ সারিয়া গেলে, কে কাহার কথা শুনে ? কাফিরগণ হজরত মূসাকে খুন করিয়া সকল দুঃখের লাঘব করিতে এইবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইল। তাহাদের উৎপীড়ন সহ্য ঋরিতে না পারিয়া, তিনি পুনরায় খোদার নিকট দোয়া করিলেন। হঠাৎ পঙ্গপালে দেশ ছাইয়া গেল। উলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে কেবল পঙ্গপাল আর পঙ্গপাল। এবার নিসরে সবুজ পত্র অথবা তরুলতার নামমাত্র রহিল না। এমন কি শেষে বৃক্ষাদির শুষ্ক কাণ্ড ও গৃহের লৌহয় কড়ি বরগা ইত্যাদির উপর পঙ্গপালের আক্রমণ শুরু হইল। কিবতিগণ বিপদে পড়ি আবার উঁহু। নিকট কঁাদিয়া পড়িল। উদার স্ব ভা, নবী তাহাদের রুণোদ্যমান মুখের দিকে চাহিয়া, সকল যাতনা ভুলিয়া গেলেন । তাহাদের মিনতিপূর্ণ প্রতিজ্ঞয় ভুলিয়া, তিনি তাহাদের জন্য আবার দোয়া করিলেন। দোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিপদ হইতে উদ্ধার লাভ করিয়া দুরাচারগণ স্বীয় প্রতিজ্ঞা ভুলিয়া, পুনরায় নবীর প্রতি অমানুষিক অত্যাচার করিতে লাগল।

হজরত মুসা নির্যাতিত হজরত মুসা আবার তাহাদের প্রতিকূলে দোয়া কেিলন। সঙ্গে সঙ্গেই দেশ উকুনে ভরিয়া গেল। চৌদিকে শুধুই উকুন। শরীরে, কাপড়ে, ভাতে, পানিতে, তৈজস পত্রাদিতে পৰ্য্যন্ত উকুন। অনবরত উকুনের কামড়ে হতবুদ্ধি কিবতিগণ, হজরত মূসার পায়ে পড়িয়া ক্ষমা প্রার্থনা করিল। তাহাদের কারােক্তিতে তাহার হৃদয় বিগলিত হইল। তিনি তাহাদের অনুকূলে দোয়া করিলেন। দুষ্টের মুক্তি লাভ করিয়া আবার দ্বিগুণ বেগে অত্যাচার আরম্ভ করিয়া দিল। তিনিও অনতিবিলম্বেই অভিসম্পাত করিলেন। আর চাই কি? চৌদিকে কেবলই বেঙ আর বেঙ বাড়ীঘর, উঠান, আঙ্গিনা, ময়দান, জঙ্গল কেবল বেঙে পরিপূর্ণ হইয়া গেল। এমন কি কিব, তিদিগের খাদ্য সামগ্রীও বেঙের আক্রমণ হইতে অব্যাহতি পাইল না। মুখ ব্যাদন করিলেই অলক্ষিতে লম্ফ দিয়া বেঙ মুখ বিবরে প্রবিষ্ট হয়। এইবার দুরাচারগণ বিষম দায়ে ঠেকিল। কি করিবে অনন্যোপায় হইয়া পুনরায় গলায় কুঠার বাঁধিয়া, খােদার নামে কসম করিয়া, হজরত মুসার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিল। কিবতিদিগের বিপদ দূরীভূত হইল। পাপীদের পাপপূর্ণ হৃদয় কিন্তু ইহাতেও পরিষ্কার না হইয়া বরং কলুষতার ঘন তিমিরে গাঢ় ভাবেই সমাচ্ছন্ন হইয়া রহিল। সুতরাং আবার হজরত মূস। দোয়া করিলেন। তখনই সারা শােনিত প্লাবনে ভাসিয়া গেল। কিবতিদের যেখানেই হাত দাও না কেন, কেবল সই রক্ত। কলসী পূর্ণ বিশুদ্ধপানি মুখে ঢালামাত্রই রক্তের স্বাদ পাওয়া যায়। মুখ হইতে ফেলিয়া দিলেই টাটকা রক্তের মত দেখা যায়। ইসরাইলদিগের কিন্তু কোন বিষয়েই এইরূপ হইল না। উঃ হজরত মুসা কিবতিগণ সিব তিদিগকে নানা কথায় মুগ্ধ করিয়া, তাহাদের মুখে পানি লইয়া কিবতিদিগরে মুখে দিতে বলে। পানি তাহাদের মুখে দেওয়া মাত্রই লােহু হইয়া যায়। এইরূপে এইবারও তাহার বিষম নাকাল হইল। অনন্যোপায় হইয়া শেষে হজরত মুসাকেই পুনরায় বহু মিনতি করিয়া, ইহার সমাধান করিল। পাপীদের কলুষিত মন শত ঝঞ্চাৰাত নীরবে সহ্য করিয়াও পাপ কাৰ্য্য হইতে ক্ষতরে বিচ্যুত নাহইয়া বরং উত্তরােত্তর বর্ধিত হইতে লাগিল। উপর্যপরি এতগুলি অকাট্য মােজজা এবং বিবি আসিয়ার সানন্দ মৃত্যু দর্শন করিয়া, মাত্র ফেরাউনের সুহৃদ ফেরাউনের সুহৃদ হাজফিলের দিব্যজ্ঞান ফুটিয়া উঠিল। তিনি হালফিলের সত্যধর্ম ভাবিলেন যদি মুসার কথা মিথ্যা হইত, তবে প্রত্যহ যে সকল কাণ্ড হইয়া যাইতেছে তাহার অর্থ কি, আর বিবি আসিয়াই বা কি জন্য এত নিৰ্যাতন ভােগ করিয়া অকাতরে মৃত্যু আলিঙ্গন করিলেন ? নিশ্চয়ই মুসা ও তাহার ধৰ্ম্ম সত্য। এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে হাজফিলের হৃদয়ের অন্ধকার অপসারিত হইল। তিনি সকলকে প্রকাশ্যে ডাকিয়া, কহিলেন, “হে বেঈমানগণ ! তােমরা নিশ্চয়ই বিপথগামী। তােমরা আমার পদাঙ্ক অনুসরণ কর । আমি, তােমাদিগকে সত্যপথ দেখাইব হাজফিলের বাক্যে কিবতিগণ বুঝিতে পারিল যে হাজফিল হজরত মূসার ধর্ম গ্রহণ করিয়াছেন। অতএব তাহারা তাহাকে নানারূপ ভীতি প্রদর্শন করিয়া, হজরত মুসার ধর্ম হইতে বিরত থাকিতে যথেষ্ট চেষ্টা করিল। কিন্তু শত চেষ্টাতেও যখন কাৰ্য্য হইল না, তখন তাহারা, হণ। = হজরত মুসা বাধ্য হইয়া হাফিলের ধর্মান্তর গ্রহণের কথা ফেরাউনের কর্ণগোচর করিল। শ্রবণ মাত্রই ফেরাউন তাহাকে হত্যা করিতে আদেশ করিল। হাজফিল ফেরাউনের ভয়ে ভীত হইয়া নির্জন গিরি করে পলায়ন করিলেন। অনুচরগণ পশ্চাৎদ্ধাবিত হইয়া দেখিতে পাইল যে, হাজফিস গিরি গুহায় নিবিষ্ট মনে নমাজ পড়িতেছেন, আর নানাবিধ হিংস্র প্রাণী তাহার চারিদিকে ঘিরিয়া পাহারা দিতেছে। ইহা দেখিয়া অনুচরগণ ভয়ে আর তঁাহার নিকটে যাইতে সাহস করিল না। মাত্র ফিরিয়া গিয়া ফেরাউনের নিকট সকল কথা জ্ঞাপন করিল। ফেরাউন তাহাদের কথায় বিরক্ত হইয়া বলিল, “যাও, এ সংবাদ আর কাহাকেও নিতে দিও না।” হজরত মূসার আবির্ভাব অবধি প্রায়ই ফেরাউনের উপ নানা প্রকার বিস্ময়র কাৰ্য্য ঘটিতে থাকে। সেই সময়ই একবার শুষ্ক নীল নদ ফেরাউনের মিসরে প্রখর গরম পড়িণ গল। কোথাও বিন্দু তপস্যায় -বাহিত হয় ; পরিমাণ বৃষ্টি হইল না,মেন কি বৃষ্টি হইবার মত সামান্য ফেরাউনের নিকট বৃদ্ধের মেঘও আকাশে দেখা গেল না। নদী নালার পানি অভিযোগ। ক্রমশঃ শুষ্ক হইয়া যাইতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে কিছুদিনের মধ্যেই নীল নদের পানি শুকাইয়া শেষে ভীষণ মরুভূমিতে পরিণত হইল। দেশে হাহাকার পড়িয়া গেল, খাইবার পাওি কোথায় রহিল না। তখন বে-ঈমানগণ ফেরাউনকে কহিল, “শাহানশাহ! আপনি আমাদের খােদা। কিন্তু আপনার সম্মুখেই নীল নদ আজ ভীষণ সাহারায় পরিণত হইয়া গিয়াছে। কোথায়ও বিন্দু পানি পাওয়ার উপায় নাই। পানির অভাবে আমরা বিষম কষ্ট পাইতেছি। যদি আপনি আপনার হজরত মুলা 0 খােদায়ী রাখিতে চান, তবে যও শ হয়, শুষ্ক নীল নদে বাণ বহাইয়া আমাদের পানির অভাব দূর করুন। নতুবা আপনাকে আমরা খােদ। বলিয়া মান্য করিতে পারি না।” কিবতিদিগের কথা শুনিয়া ফেরাউন বড়ই নাজেহাল হইয়া পড়িল। এতদিনে বুঝি আর খােদায়ী রক্ষা করা চলে না! তাহার কাতরােক্তিতে নীল নদ কেন, সামান্য তরু পত্রও হেলিবে না। দীর্ঘকালের খােদায়ীর দাবী অক্ষুন্ন রাখিতে ফেরাউন অস্থির হইয়া পড়িল। বহু চিন্তার পর কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া, ফেরাউন উদাসীন ভাবে গৃহ ত্যাগ করিল। বিজন বনে গিরি কন্দরে প্রবেশ করিয়া গণ্ডে কুঠার বাধয়া, নত জানু হইয়া, খোদার সমীপে অশ্রু বিগলিত নয়নে গদ গদ কণ্ঠে আরজ করিল, “হে প্রভাে! তুমি নিখিল ভুবনের স্রষ্টা, তুমি অনাদি, অনন্ত, সজ্ঞ, পরাৎপর এবং বাঞ্ছাময়। তুমি সকলেরই বাঞ্ছা পূর্ণ কায়া থাক। প্রভাে! যদিও আমি মহাপাপী তথাপি তােনাই +রুণার ভিখারী। অতএব তুমি আমাকে তােমার মেহেরবানী হইতে বঞ্চিত করিও না। প্রভো! আমি পারলৌকিক মঙ্গল চাই না, তুমি আমার পারােকিক মঙ্গলের পরিবর্তে ইহলােকেই আমার গৌরব মৰ্য্যাদা অক্ষুন্ন রাখিয়া শুষ্ক নীল নদকে এই মুহূর্তে তরতর রবে প্রবাহিত করিয়া দাও।” এইরূপে ফেরাউন নিবিষ্ট ভাবে দোয়া করিতেছে ; ইত্যবসরে এক পকেশ বৃদ্ধ, ফেরাউনের সম্মুখে আসিয়া কহিলেন, “হে নরনাথ! আমি এক অভিযােগ লইয়া আপনার নিকট আসিয়াছি।” “এ কি বিচারালয় যে, তােমার অভিযােগের মীমাংসা করব”- বলিয়। ফেরাউন নীরব হইল। অমনি নীল নদ কলকল রবে ৪৭

হজরত মুলা
প্রবাহিত হইয়া গেল। নীল নদে পানি দেখিয়া, ফেরাউনের
প্রাণ আহলাদে নাচিয়া উঠিল। ফেরাউন তখন বৃদ্ধকে ডাকিয়া কহিল,
“বল তােমার কি অভিযােগ ?”
বৃদ্ধ। নানা সুখশান্তি ও নিত্য ভােগের উপকরণাদি প্রভুর নিকট
হইতে সর্বদা পাওয়া সত্ত্বেও যে প্রভুর বিরুদ্ধে কাৰ্য্য করে, তাহার কিরূপ
দণ্ড বিধান করা কর্তব্য ?
ফেরাউন। এইরূপ কৃতন্নকে পানিতে ডুবাইয়া বধ করাই সমুচিত
দণ্ড।
বৃদ্ধ। এই বিষয়ে আপনার অভিমত লিখিয়া দিলে খুবই ভাল হয়।
ফেরাউন। আমার কাছে লিখিবার উপকরণ নাই। এখন তাহা
কোথা পাওয়া যাইবে ?
ফেরাউনের কথা শুনিয়া বৃদ্ধ তৎক্ষণাৎ লিখিবার উপকরণ তাহার
সম্মুখে হাজির করিয়া দিলেন। ফেরাউন হিতাহিত না ভাবিয়া, নিজের
অভিমত লিখিয়া দিল। ইঙ্গিত লিপিকা পাইয়া বৃদ্ধ নিমিষে অদৃশ্য
হইয়া গেলেন।
ফেরাউনের হুকুমে আজ শুষ্ক নীল নদ পানিতে ভাসিয়া গিয়াছে।
তাহাকে এখন আর ঠেকায় কে? সে খােদা না হই আর যায় না।
কাজেই ফেরাউন খােদায়ীর দাবী করিয়া লােকের
ফেরাউনের স্তম্ভ নির্মাণ উপর জোর জুলুম করিতে লাগিল। খােদায়ীর
ও খোদার উপর তীর
দাবী কায়েম করিবার জন্য হজরত মুসাকে লক্ষ্য
নিক্ষেপ।
করিয়া একদিন ফেরাউন কহিল, “মুসা! তুমি
তােমার খােদাকে কখনও দেখ নাই। আমি কিন্তু তাহার দর্শন লাভ না.

হজরত মূল করিয়া ছাড়িব না। আজ হইতে আমি ইহার যােগাড়ে রহিলাম।” ভারপর উজির হামানকে ডাকিয়া পুনরায় কহিল, “আমার জন্য জগতের অদিতীয় উচ্চ একটী মিনার নির্মাণ করিতে হইবে। ইহার উপর দাড়াইয়া আমি মূসার আল্লাহতাআলাকে দর্শন করিব।” স্তম্ভ নির্মাণের জন্য অচিরেই তিন হাজার কারিগর নিযুক্ত হইল। রাজ্যের নানাস্থান হইতে ইহার মাল মসলা সংগৃহীত হইল। অতি অল্প কালের মধ্যেই পঞ্চাশ হাজার গজ উচ্চ স্তম্ভ নির্মিত হইল। ফেরাউন তীর ধনু হাতে লইয়া উপরে উঠিয়া হজরত মূসার খােদাকে চতুর্দিকে অম্বেষণ করিতে লাগিল। আল্লাহতাআলা ত আর স্তম্ভের মাথায় বসিয়া নাই ৰে, ফেরাউন উকি মারিয়াই তাঁহাকে দেখিয়া লইবে। কাজেই অনন্ত মহিমাময় খােদার দর্শন লাভ তাহার ঘটিল না। ফেরাউন উদ্ধে সজোরে তীর নিক্ষেপ করিয়া নীচে নামিয়া আসিয়া, লােক-লস্করকে কহিল যে, আল্লাহতাআলাকে তীর মারিয়া বধ করিয়া আসিয়াছে। নিক্ষিপ্ত তীর একটী পাখীর শরীর ভেদ করিয়া রক্তমাখা দেহে মাটীতে ফিরিয়া আসিতে দেখিয়া, সকলেই ফেরাউনের কথা ধ্রুব সত্য বলিয়া মনে করিল। সব আপদ-বালাই চুকিয়া গেল। আজ হইতে ফেরাউন সর্বেসর্বা—একমাত্র অপ্রতিদ্বী খােদা। মুসাকে আর ভয় করিতে হইবে না—তাহার খােদার দফা নিকাশ করিয়া ফেরাউন মস্ত বড় খােদা হইয়া গিয়াছে। এখন হইতে দিনরাত কিবতিদিগকে নিজের কুদরত দেখাইতে ফেরাউন বদ্ধ পরিকর হইল। একদিন ফেরাউন নিজের কেরামত জাহির করিবার ব্যবস্থা করিতেছিল; এমন সময়ে তাহার নির্মিত স্তম্ভ ঝর ঝর করিয়া মাটীতে পড়িয়া চুরমার হইয়া গেল। ০

হজরত মুসা
**
ইহাতেও ফেরাউনের হুশ হইল না। ফেরাউন খােদায়ীর দাবী
করিয়া নানা কুদরত জাহির করিয়া বেড়াইতে লাগিল। অত্যাচার,
অবিচার ও অধর্মে দেশ ছাইয়া গেল।. কিবতিদিগের দশ খুন মাপ
হইল।
ধনরত্নই কিবতিদিগের কুপথ প্রদর্শনের প্রধান সহায় দেখিয়া, ক্ষুব্ধ
হজরত মূসা তাহাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে আল্লাহ তাআলার দরবারে
আরজ করিয়া কহিলেন, “হে আল্লাহ! তুমিই কিবতিদিগকে সুখের
নানা উপকরণ দিয়াছ। এই কারণে তাহাৱা মােহশে তােমার মহিমা
উপলব্ধি করে না। প্রভাে! নিজ মহিমায় তুমি তাহাদের সুখের
উপকরণ ও ধন-রত্ব প্রস্তরে পরিণত কর।”
দেখিতে দেখিতে কিবতিদিগের ধন-রত্ন এমন কি ফলন বৃক্ষ সমূহ
হঠাৎ প্রস্তরে পরিণত হইয়া গেল। এই ব্যাপার দেখিয়া ফেরাউন
মনে মনে ভাবিল--তবে কি মূসর খােদা মরে নাই। তারপর ফেরাউন
মরিয়া হইয়া লােক-লস্কর সমেত দুষ্কাৰ্য্যে আরও অগ্রসর হইল। ঈমানদার
সিব,তিদিগের আর দুঃখের সীমা রহিল না।
বহুকাল নসীহত করিবার পরও ব্যর্থ হইয়া হজরত মুসা বড়
বেদনায় আল্লাহ তাআলার দরবারে শেষ বারের জন্য আরজ করিলেন।
হে মেহেরবান আল্লাহ! আমি অনেক চেষ্টা করিয়া
হজরত মূসার শেষ
বহু নসীহত করিয়াছি। ফেরাউন কিছুতেই খােদায়ী।
দাবী পরিত্যাগ করিতেছে না। তােমার অপমান
আমি আর সহ্য করিতে পারি না। তুমি নিজ মহিমায় বেঈমানদিগের
কঠোর মনকে প্রস্তর হইতে কঠিন করিয়া দাও।”
';

হজরত মুসা সঙ্গে সঙ্গেই গায়েব হইতে আওয়াজ হইল, “আয় মূসা! বে-ঈমান- দিগের উপর এত তাড়াতাড়ি অভিশাপ বর্ষণ করা তােমার জন্য উচিত হয় নাই। এখনও ফেরাউনের মুসাফিরখানায় বােজ মােজ বহু ভুক। মেহমান-মুসাফির ও গরীব-দুঃখীর জন্য অন্ন ব্যঞ্জন পাক হইতেছে। এখনও তাহার মুসাফিরখানায় চারি হাজার বরী, চারি শত গরু ও দুই শত উট জবেহ করা হয়।” বাহা হউক ইহার পর হইতে ফেরাউনের উপর গজব নাজিল হওয়ার ব্যবস্থা হইতে লাগিল। অন্যদিকে হজরত মুসার উন্মৎ দিন দিন বৃদ্ধি হইতেছে দেখিয়া ফেরাউনের উজির হামান হামান তাহাকে বলিল, “জাহাপান! মূসার জনশক্তি ক্রমশই বৃদ্ধি হইতেছে। তাহাকে অতি শীঘ্র দমন না করিলে ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ হওয়ার আশা নাই। ইহার জন্য এখন হইতেই আমাদিগকে তৈয়ার থাকিতে হইবে। আজকাল মুসাফিরখানার খরচ খুবই বেশী হইয়া গিয়াছে; কাজেই ইহার ব্যয়ভার কমান একান্ত দরকার।” হামানের উপদেশ অনুযায়ী ক্ৰমশঃ মুসাফিরখানার ব্যয় হ্রাস হইতে লাগিল। হজরত মূসার শেষ অভিশাপের চল্লিশ বৎসরের মধ্যে ফেরাউন যাবতীয় সদনুষ্ঠান হইতে বিমুখ হইয়া পড়িল। অপরদিকে খােদার গজবও নিকটবর্তী হইয়া আসিল। এই সময়ে হজরত মুসা চিন্তাকুলিতচিত্তে আল্লাহ তাআলার হুকুমের অপেক্ষায় সময় কাটাইতে লাগিলেন। হঠাৎ ফেরাউনের পরিণাম। একদিন মূসাকে লক্ষ্য করিয়া শব্দ হইল, “আয় মূসা ! বেঈমানদিগের উপর শঘ্রই গজব নাজিল হইবে। তুমি হজরত মুলা ; বনি-ইলদিগকে সঙ্গে করিয়া গভীর রজনীতে মিসর ত্যাগ করিয়া নীল নদের তীরে গিয়া অপেক্ষা করিবে। ফেরাউন তোমার পলায়নের কথা জানিবা মাত্র লােক-লস্কর সমেত তােমার পশ্চাদ্ধাবন কাবে। তখনই তাহার পতন হইবে।” ইতিমধ্যে দেশে হঠাৎ মড়ক লাগিয়া বহু সহস্ৰ কিবতি মৃত্যুমুখে পতিত হইল ; শহরের চতুর্দিকে হাহাকার পড়িয়া গেল। কিবতিগণ শােকে দুঃখে ও অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ায় ব্যস্ত রহিল। হজরত সুযােগ বুৰিয়া গভীর রজনীতে ঈমানদারগণ সহ মিসর ত্যাগ করিলেন। প্রাণপণে অবিশ্রান্ত পথ চলিয়াও তিনি নগর প্রান্তে পোঁছিতে পারিলেন না। বারংবার বিফল হইয়া তিনি বিস্মিত হইলেন। কিন্তু অচিরেই তিনি জানিতে পারিলেন যে, হজরত য়ুসুফের পবিত্র জানাজা মিসরের বুকে তখনও বিদ্যমান রহিয়াছে। এন্তেকালের সময় হজরত ঘুফ খােদার কাছে আজ করিয়াছিলেন যে, ফেরাউনের উপর গজব নাজিল হওয়ার সময় হজরত মূসা যেন তাহার জানাজা অভিশপ্ত মিসরে পরিত্যাগ করিয়া না যায়। আল্লাহ তাআলার দরবারে তাহার প্রার্থনা মঞ্জুর হইয়াছিল। এই কারণে হজরত মূসা তাহার জানাজা পরিত্যাগ করিয়া যাইতে পারেন নাই। হজরত য়ুসুফের পবিত্র জানাজা কোথা কোন সমাধিতে অবস্থিত তাহার বিন্দু বিসর্গও তিনি জানিতেন না। এই সমাধি আবিষ্কারের চিন্তায় নিতান্ত উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িলে, জনৈক বৃদ্ধা তাহাকে জানাইল যে, সে ইহার বিষয় সম্যকরূপে অবগত আছে। বৃদ্ধার নির্দেশ মত খনন কাৰ্য্য আরম্ভ হইল। কবর খনন মাত্রই দেখা গেল, এত দীর্ঘকালের সমাহিত লাশ তখনও যেন হাসিতেছে এবং সদ্য সমাহিত হজরত মুলা ২০১৭ লাশের ন্যায় তুলতুলে কোমল রহিয়াছে। যাহা হউক হজরত মূসা লাশ লইয়া, অতি দ্রুত সঙ্গীগণ সহ নীল নদের তীরে গিয়া আল্লাহ তাআলার হুকুমের অপেক্ষায় রহিলেন। কিবতিগণ সহ হজরত মূসার পলায়নের খবর পাইয়া, ফেরাউন সাতষট্টি হাজার লােক-লস্কর সমেত তঁাহার অনুসরণ করিল। ফেরাউন নীল নদের তীরবর্তী হইলে, ইস্রাইলগণ ভীত হইয়া হজরত মুসাকে কহিল, “হজরত! সম্মুখে নীল নদের বারি রাশি আর পশ্চাতে লােক-লস্কর সমেত ফেরাউন। আমাদের আশা ভরসা অচিরেই নীল নদের অতলে তলাইয়া যাইবে। ফেরাউনের লােক-লস্কর কর্তৃক ধৃত হওয়ার আর বেশী দেরী নাই।” মূসা আপন লােকজনকে আশ্বস্ত করিয়া বলিলেন, “ঈমানদারগণ ! ভর নাই। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা আমাদের সহায়। আমরা তাহারই হুকুমের অপেক্ষায় এখানে রহিয়াছি।” সঙ্গে সঙ্গেই শব্দ হইল, আয় মূসা ! ভীত হইও না। প্রশান্তচিত্তে পূর্ণ তেজে হস্তস্থিত ‘আসা দ্বারা নীল নদের বুকে আঘাত কর। বিরাট বারি রাশি দুই ভাগ হইয়া তােমাদের জন্য রাস্তা তৈয়ার হইবে। তােমরা শুষ্ক পথের উপর দিয়া নির্বিঘ্নে চলিয়া যাইবে।” হুকুম অনুযায়ী নীল নদের বুকে ‘আসা দ্বারা আঘাত করা হইল। অমনি কাচ সদৃশ দ্বাদশটা জলীয় গিরিসঙ্কটময় সুন্দর রাস্তা তৈয়ার হইল। ইস্রাইলগণ দ্বাদশ ভাগে বিভক্ত হইয়া দ্রুতবেগে নীল নদের উপর দিয়া চলিয়া যাইতে লাগিল। ফেরাউন এই ঘটনা লক্ষ্য করিয়া ভীত স্তম্ভিত হইয়া ফিরিয়া যাইতে উদ্যত হইল। কিন্তু তাহার অশ্ব সখস্থিত এক বেগবতী হজরত মুসা * তুঙ্গিনীর পশ্চাদ্ভাবিত হইল। সাধ্যাতীত চেষ্টা করিয়াও ফেরাউন উন্মত্ত অশ্বের বেগ বােধ করিতে পারিল না। অশ্ব যুগল ছুটিয়া চলিল। সৈন্যসামন্তগণও তাহার অনুসরণ করিল। অসংখ্য অশ্বের পদাঘাতে ধূলিরাশি শূন্তে উথিত হইয়া চতুর্দিক অন্ধকার হইয়া গেল। ক্রমে ফেরাউন লােক-লস্কর সমেত নীল নদের গভীর গর্ভে নামিয়া পড়িল। এইদিকে হজরত মূসা, ঈমানদারগণ সহ নীল নদ পার হইয়া গেলেন। ঠিক এই সময়ে ফেরাউন লােক-লস্কর সমেত নদের-মধ্যস্থলে আসিয়া উপস্থিত হইল। অমনি কাচ সদৃশ জলীয় গিরিবত্ম সমূহ ভাঙ্গিয়া কল কল রবে বারি রাশি লােক-লস্কর সমেত ফেরাউনকে ভাসাইয়া লইয়া গেল। ফেরাউন চীৎকার করিয়া বলিল, “হে মূসা! আমি তােমার আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান আনিয়াছি। আমাকে আসন্ন মৃত্যুর হস্ত হইতে রক্ষা কর।” তাহার কাতরধ্বনিতে হজরত জিবরাইল গর্জিয়া কহিলেন, “বেঈমান। খােদায়ীর দাবী করিয়া আজ দায়ে পড়িয়া ঈমান আনিতে চাহিলে কোনও ফল হইবে না।”—এই বলিয়া ফেরাউনের চক্ষের উপর একখণ্ড লিপিকা ধরিয়া আবার কহিলেন, “ইহাতে তোমারই অভিমত * কাত কাছে হজরত জিবরাইল মানুষের বেশে একটী মাদী-ঘােড়ায় আয়োহ করিয়া, ফেরাউনের ঘােড়ার আগে আগে গিয়াছিলেন। সেই মাদী-ঘােড়ার বিশেষ এই ছিল যে, যখনি করময় মরুভূমিতে পর সঞ্চালন করিত, তখনি পদত হইতে শ্যামল তৃণ উৎপন্ন হই। ইহা র্শন করিয়া ইসরাইল বংশীয় সাময়ী ইহাকে কুদরতী ঘােড়া মনে করিয়া, ইহার পদতল হইতে কিছু নাটী উঠাইয়া লয়। কালে সাময়ী এই মাটী দ্বারা স্বীয় অভিষ্ট কাৰ্য্য সাধন করে।

হজরত মুসা লিখিত রহিয়াছে। তােমারই বিচার অনুযায়ী তােমার প্রাণ লওয়া হইতেছে। পরক্ষণেই এক মুষ্টি মাটী হাতে লইয়া, হজরত জিবরাইল তাহার মুখে প্রবেশ করাইয়া দিয়া, ফেরাউনের মুখ বন্ধ করিয়া দিলেন। কেরাউন লােক-লস্কর সমেত নীল নদের বিরাট ৰারি রাশির গর্ভে কোথা ভলাইয়া গেল।

হজব্রত মুসাৱ কিভাবে এলাহী লাভ। ফেরাউনের শােচনীয় পরিণামের পর বনি-ইসরাইলদিগের অবস্থা বিশেষ উন্নত হইল। মিসর রাজ্য তাহাদের পদতলে লুটাইয়া পড়িল। রাজ্য, ধন, মান, গৌরব ও মর্যাদা সম্পূর্ণ নিরাপদ হইলে, একদিন হঠাৎ শব্দ হইল, “হে মুসা! তুমি ত্রিশ দিনরাত তুর পৰ্ব্বতে থাকিয়া রোজ করিয়া আমার এবাদত-বন্দেগী কর। আমি তােমাকে আমার কিতাৰ অৰ্পণ করিব।” আল্লাহ তাআলার হুকুম হওয়া মাত্রই খলিফা পদে হজরত হারুনকে অধিষ্ঠিত করিয়া, হজরত মূসা তুর পর্বতে গমন করিলেন এবং রোজা পালন করিয়া সেখানে এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল রহিনে। ক্রমে ত্রিশ দিন গত হইল। সত্বরই তাহার উপর কিতাবে এলাহী নাজিল হইবে। অনবরত ত্রিশ দিন রােজা রাখার ফলে, তাঁহার মুখ হইতে বদ গন্ধ বাহির হইতেছে দেখিয়া, তিনি জয়তুন বৃক্ষের ডাল ভাঙ্গিয়া, তাহা দ্বারা মিসওয়াক করিয়া মুখ পরিষ্কার করিতে লাগিলেন। সময়ে হজরত জিবরাইল তাহার নিকট উপস্থিত হইয়া কহিলেন, “হজরত! রােজার দরুন আপনার মুখ হইতে যে খারাব গন্ধ বাহির হইতেছিল, তাহা আল্লাহ তাআলার কাছে বরই পছন্দ হইয়াছিল। আপনি তাহা কৃত্রিম উপায়ে দূর করিয়াছেন। এই কারণে আপনাকে আরও দশ দিন রােজা করিতে হইবে। হজরত আরও দক রােজ করিলেন। ক্রমে চল্লিশ দিন পূর্ণ হইয়া গেলে আল্লাহত হজরত মুদ ‘আলার হুকুমে হজরত মুসার চতুর্দিকে পচিশ পচিৰ ক্ৰোশব্যাপী স্থান গভীর অন্ধকারে অাচ্ছন্ন হইয়া গেল। শয়তানকে তাহার নিকট হইতে বহুদূরে সরাইয়া দেওয়া হই । কিরামন-কাতিবিন নামক ফেরেশতাগণকে তাহার নিকট হইতে অালাদা করিয়া দেওয়া হইল। তারপর ক্রমে ক্রমে চব্বিশ হাজার বাক্যালীর পর, হজরত মূসা আল্লাহ-তাআলাকে দর্শন করিবার জন্য ব্যাকুল হইয়া পড়িলেন। আওয়াজ হইল, “আয় মূসা! আমাকে চর্মচক্ষে দর্শন করবার সাধ্য কাহারও নাই। যাহা হউক তােমার আকাক্সক্ষা পূর্ণ হইবে। এখন তুমি তূর পৰ্ব্বতের দিকে দৃষ্টিপাত কর। যদি এই বিশাল দূর কণামাত্র আমার নূরের দীপ্ত তেজ সহ্য করিতে পারে, তবে না হয় তুমি একবার আমাকে দেখিয়া লইও।” গায়েবী আওয়াজ শুনিয়া, হজরত মুসা কহিলেন, “হে আল্লাহ, তােমার . দীপ্ত নূরের তেজের সম্মুখে জ্বলিয়া পড়িয়া মরিয়া গেলেও আমার জীবন সফল হইবে। তুমি নিজ মহিমায় আমাকে দেখা দ্য ও তােমার স্বরূপ দর্শন করিয়া আমার মানব জন্ম সার্থক হউক। হঠাৎ তুর পৰ্বতের চতুর্দিক রােশেনায়ে জ্বলিয়া উঠিয়া গােজর হইয়া গেল। দেখিতে দেখিতে আল্লাহ তাআলার নূরের কণামাত্র তু পৰ্ব্বতের বুকে অবতীর্ণ হইল। উজ্জ্বল আলােকে উদ্ভাসিত হয়। ধীরে ধীরে তুর কম্পিত হইতে লাগিল। মুহূর্ত মধ্যে নূরের পূণতে সহ্য করিতে না পারিয়া, তুর পৰ্বত * খণ্ড বিখণ্ড কইয়া সশব্দে নানা বিক্ষিপ্ত খণ্ডগিৰিলির তিন আজকাল আরব দেশে, হিরা, সবুর ও সরি নামে এসিড।

হজরত মুন্স দিকে ছুড়িয়া পড়িল। হজরত মুদা মুচ্ছিত হইয়া পড়িলেন। ফেরেশতা গণ তাহার অসীম সাহস দেখিয়া, বেহেশত হইতে তাহার উপর পুষ্প- বৃষ্টি করিতে লাগিলেন। হজরত মূসা পবিত্র আরফাৎ দিবস বৃহস্পতিবার উষার অব্যব- !হত কাল পর হইতে শুক্রবার দ্বিপ্রহর পর্যন্ত মূচ্ছিত ছিলেন। সূৰ্য্য পশ্চিম গগনে ঢলিয়া পড়িলে, তাহার মূচ্ছা ভঙ্গ হয় । হুশ হওয়া মাত্র, সর্বাগ্রে তিনি তৌবা করিলেন। আল্লাহতাআলার আদেশানুযায়ী হজরত জিবরাইল বেহেশত হইতে জমরুদী তরুর তখতা আনিয়া হজরত মূসার সম্মুখে হাজির করিলেন। পবিত্র তৌরত কিতাব খোদার হুকুমে সাতটা কাঠে লিখিত হইয়া, ফেরেশতা কর্তৃক হজরত মূসার উপর নাজিল হইল। এই- রূপে কিতাবে এলাহী তৌরত পাইয়া, আনন্দিত মনে তিনি বাড়ী ইসরাইলগণের গাে যাইতে প্রস্তুত হইলেন। অমনি শব্দ হইল, হে মুসা! পূ ও সামরর আমি তােমার অগােচরে তােনার উৎগণকে পরীক্ষা আত্মকাহিনী করিয়াছিলাম: ইহার ফলে তাহারা মহা সমস্যায় পড়িয়াছে”। যথা সময়ে তোরত সহ হজরত মূসা বাড়ী প্রত্যাবর্তন করিলেন। এদিকে ইসরাইলগণ, তাঁহার দেরী দেখিয়া, সামরী নামক জনৈক দুই বনি-ইসরাইলের কুহকে পড়িয়া, গরুর পূজা করিতে শুরু করিয়া দিল। সামরী, ইসরাইল বংশসভূত জনৈক রমণীর জারজ সন্তান ছিল। মাতার বিবাহের পূর্বে তাহার জন্ম হয়। কুলে কালি পড়ে দেখি, তাহার মাতা তাহাকে অতি গােপনে এক বনে রাখিয়া প্রতিপালন করেন।

হজরত মূল কৈশােরে সামরী প্রকাশ্যে হজরত মূসার দীন মানিত, কিন্তু অন্তরে কুভাব পােষণ করিত। দুষ্ট বুদ্ধির জন্য সামরী একজন পাকা লােক ছিল। ইসরাইলগণ নদী পার হইবার কালে, যখন হজরত জিবরাইল ফেরাউনের আগে আগে অশ্ব পরিচালনা করিয়া আসিতেছিলেন, তনই দুষ্ট সামরী অশ্ব পদতল হইতে মুষ্টিমেয় মাটী কুড়াইয়া লইল। উক্ত 'টা দ্বারা কি কাৰ্য্য সম্পাদিত হইতে পারে, তাহা না জানিলেও পরে আবিস্কৃত হয় যে, ইহা যে কোন প্রতিমার মুখে গুজিয়া দিলেই, প্রতিমা জাতি নির্বিশেৰে শব্দ করিয়া থাকে। সামরী প্রথম সুযােগ পাইয়া, ই কাজে লাগাইর উপায় বাহির করিয়া বসিল। বনি-ইসরাইলগণ মিসর পরিত্যাগ করিবার কালে কিবতি মহিলাদের নিকট হইতে অনেক স্বর্ণ-রৌপ্যের অলঙ্কার ও তৈজস পত্রাদি ধারে আনিয়াছিল। সেই সব ফিরাইয়া দেওয়ার সুযােগ তাহাদের আর হইয়া উঠে নাই। নীল নদ পার হইবার পর সেইগুলি আল্লাহ তাআলার আদেশে দহ্মিভূত এই সময়ে সামরী নানা প্রবঞ্চনা করিয়া বহু স্বর্ণ রৌপ্যের অলঙ্কার আত্মসাৎ করিয়া লয়। এই সকল অলঙ্কার দ্বারা সামরী একী সৰ্বাঙ্গীন সুন্দর গরু নিৰ্মাণ করিয়া, বহুদিনের সঞ্চিত মাটী মুখে গুজিয়া, উহার জান দিল। প্রতিমাটী তখন পশুর স্বরে হাম্বা রব করিতে লাগিল। সামরীর বাসনা পূর্ণ হইল। মুগ্ধ সিব,তিদিগকে ডাকিয়া বলিল, “দেখ, ইহাই মূসার খােদা। আমি বুঝিতে পারিতেছি, মূসা পথভ্রান্ত হইয়া তুর গমন করিয়াছেন। সেখানে যাইয়া তিনি খােদাকে পান নাই । সুতরাং তিনি খােদার তালাশ করি- তেছেন। তাই ফিরিতে তাঁহার ফিরিতে তাহার এত দেরী হইতেছে। এক্ষণে হয়। সে নিরেট • হজরত মুদ তােমরা সকলে ইহাকেই খােদা জানিয়া পূজা করিতে থাক।” বনি- ইসরাইলগণ সামরীর প্ররােচনায় পড়িয়া, গরুর পূজা আরম্ভ করিয়া দিল। এইরূপে জানােয়ারের পূজা করিতে হজরত হারুন তাহাদিগকে বার বার নিষেধ করিলেন কিন্তু কেহই তাহার কথায় কর্ণপাত করিল না। ইহাতে হজরত মূসা রাগে আগুনের মত হইয়। হস্তস্থিত তোর লিখিত তথতা সমূহ সজোরে ভূতলে নিক্ষেপ করিলেন। ভীষণ আঘাতে খান কতক তপত ভাঙ্গিয়া চুরমার হইয়া গেল। পরক্ষণেই ভাত হারুনের দাড়িতে ও চুলে ধরিয়া শ্লেষপূর্ণ বাক্যে বলিতে লাগিলেন, “কি জন্য আমার অগোচরে তুমি ধৰ্ম্ম বিগর্হিত কাৰ্য্য করিয়াছ? কি জন্য তাহাদিগকে তুমি বাধা প্রদান কর নাই ? বাধা না মানিলে, তুমি কিজ তাহাদের সহিত যুদ্ধ করিলে না ?” হারুন যাতনা সহিতে না পারিয়া কহিলেন, “ভাই, বড় কষ্টই পাইতেছি। আমার চুল ও দাড়ি ছাড়িয়া দাও। আমার নিষেধ সত্ত্বেও তাহারা পাপকাৰ্য্যে রক্ত হইয়াছে। শেষে তুমি আমাকেই দোষী মনে করিবে বলিয়া, আমি তাহাদের বিরুদ্ধে কঠোরতা অবলম্বন করি নাই।” ইহা শুনিয়া হজরত মুসা ভ্রাতার চুল ও দাড়ি ছাড়িয়া দিলেন। পরে তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, সামরীর দ্বারাই এই পাপ কাৰ্য্য সম্পন্ন হইয়াছে। তিনি তৎক্ষণাৎ সামরীকে ডাকিয়া উক্ত বিষয় জিজ্ঞাসা করিলেন। পাপী কোন কথাই গােপন না করিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে সকল কথা খুলিয়া বলিল। ইহা শ্রবণ করিয়া হজরত মূসা তাহাকে অভিসম্পাৎ করিয়া বলিলেন, “বা, তােমার পরকালের শাস্তি ব্যতিরেকে ইহকালেও তােমার সুখ নাই। তােমাকে কেহ স্পর্শ করিবে না, তুমিও কাহাকে হজরত মুলা শর্শ করিতে পারিবে না।” হজরত মূসার বাক্য অলঙ্ঘনীয় ; কাজেই সামরীকে কেহ ছুইলে উভয়েরই গা ভাঙ্গা দিয়া প্রবল বেগে জ্বর আসিত। তএব সামরী ঘৃণিত কুকুরের ন্যায় অধম হইয়া গেল ; তাহাকে দেখিয়া সকলেই শত হাত সরিয়া দাড়াইত। সামরী উপায়ান্তর না দেখিয়া এক বনে গিয়া আশ্রয় গ্রহণ করিল। অতঃপর হজরত মুসার ক্রোধ থামিয়া গেলে, তিনি ভ্রাতা হারুনকে লইয়া গো পূজকদের তোবা খােদর নিকট স্বীয় ধৃষ্টতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং শান্তি বিধান। করিলেন। তৎপর গগা পূজকদিগকে তৌবা করা- ইলেন। তাহাদের তৌবা কবুল হইলে, শব্দ হইল, “প্রাণ দান কর।” প্রতিমা পূজকগণ খােদার ইচ্ছায় প্রাণ দিতে রাজী হইল, কিন্তু কেহই নিজের শরীরে সঙ্গিন বসাইতে সমর্থ হই না। সকলেই ইতস্ততঃ করিতে লাগিল। অমনি পুনঃ আদেশ হইল, “ঈমানদারগণ যেন প্রতিমাপূজক- দিগকে কৃপাণাঘাতে প্রাণ হনন করে। এবার কিন্তু অবস্থা আরও সঙ্কটাপন্ন হইল। এদিকে আল্লাহ তাআলার আদেশ অমান্য হইতেছে এলখিয়া, তাহাদের মধ্যে বেশ চাঞ্চল্য দেখা দিল। খােদার অপার মহিম। সঙ্কুচিত মনে সকলেই যথন ইতস্ততঃ করিতেছিল, ঠিক তখনই আকাশ ঘন কৃষ্ণবণ মেঘে আবৃত হইয়া গেল। গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে কেহ কাহাকে দেখিতে পাইল না। সঙ্গে সঙ্গেই রক্ত লােলুপ তীক্ষ্ণ অসি ঝন্‌ঝন্ রবে উঠিয়া পড়িয়া নৃত্য করিতে লাগিল। অজস্র ধারে শােনিত প্রবাহ বহিয়া চলিল। দুর্ভেদ্য তিমির ভেদ করিয়া নানুরূপ বিকট শব্দ হইতে লাগিল। ইহাতে হজরত মূসা ও হারুন ভক্তি ভরে মাথা নত করিয়া, আল্লাহ তাআলার নিকট কৃতজ্ঞতা হজরত মূসা As জ্ঞাপন করিয়া, ক্ষমা প্রার্থী হইলেন। ভক্তের আকুল আবেদন গ্রাহ্য হইলে, পলকে আকাশ পরিষ্কার হইয়া গেল। বাত প্রতিঘাত ও স্থগিত হইল পুনরায় আদেশ হইল, “তোরতের প্রতি অক্ষরে অক্ষরে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন কর।” ইহাতেও অনেকের মত বৈষম্য রহিয়া গেল। আল্লাহ তাআলার কঠোর আদেশে, এইবার হজরত জিবরাইল এক পাষাণময় বিশাল পর্বত তাহাদের মস্তকোপরি শূন্তে ঝুলাইয়া রাখিয়া দিলেন। বেন পর্বত তাহাদের মস্তক নিস্পেসিত করিয়া দিতে পড়ে পড়ে অথচ পড়ে ন'। পিছন দিক হইতে অনন্ত বারিধি ভৈরব হুঙ্কারে পৰ্বত প্রমান ঢেউ তুলিয়া যেন সৰ্বস্ব গ্ৰাস করিতে আসিতেছে। সম্মুখদিক হইতে এক ভীষণ অনল কুণ্ড লােল জি বিস্তার করিয়া, অনিল সঙ্গে হেলিয়া দুলিয়া, নাচিয়া নাচিয়া, শনৈ শনৈ অগ্রসর হইতেছে। এবার সকলেই প্রমাদ গণিয়া, ভাবিল আর পরিত্রাণ নাই, অথচ পলাইবারও উপায় নাই। সকল স্থানেই সর্বগ্রাসী আগুন, পানি ও পর্বত সঙ্গে সঙ্গেই যাইবে। বিদ্রোহীগণ এবার দায়ে পড়িয়া তোবা করিয়া, পুনরায় তৌরতে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করিল। ইহার কতিপয় দিবস পরেই পুনরায় আল্লাহ তাআলার তরক উৎসই হজরত হইতে আদেশ হইল, “হে মুসা! প্রতিমা পূঞ্জার মূসার ভূ-গমন। অনুশোচনাৰ্থে সাতাইশ জন ইস্রাইল সহ তুর পর্কতে গমন কর।” হজরত মুসা আর কাল বিলম্ব না করিয়া , আদিষ্ট লােক সহ তুর পৰ্ব্বতে গিয়া উপস্থিত হইলেন। তখন নিবিড় ঘন কৃষ্ণ মেঘে তাহাদিগকে আবৃত করিয়া ফেলিল; পরক্ষণেই গভীর তিমির হজরত মূল রাশি ভেদ করিয়া শব্দ হইল, “হে মুসা! আমিই পবিত্রতম কাবা গৃহের মালিক অদ্বিতীয় খােদ। আমিই তােমাকে জন্মভূমি মিসর হইতে বাহির করিয়া আনিয়াছি। অতএব আমার বন্দেগী কর।” বাক্য সমাপ্তির পরই আকাশ পরিষ্কার হইয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে ইস্রাইলগণ জিদ করিয়া এক বাক্যে বলিয়া উঠিল, “আমরা আল্লাহ তাআলাকে স্বচক্ষে দেখিতে না পাইলে, কিছুতেই বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারি না।' হজরত মুসা তাহাদিগকে নানারূপ প্রবােধ দিয়া বুঝাইতে চেষ্টা করিলেন। কিন্তু তাহারা কিছুতেই প্রবােধ মানিল না বরং বিদ্রোহী হইয়া উঠিল। তাহাদের জিদ চরমে উঠিলে, অকস্মাৎ এক গগন ভেন গভীর কর্কশনাদ তাহাদের কর্ণ কুহরে প্রবিষ্ট হইল। শব্দের প্রতিধ্বনি মিলাইয়া যাইবার পূর্বেই যাইবার পূর্বেই তাহাদের শব দেহও ভূতলে লুটাইয়া পড়িল। হজরত মুসা স্তম্ভিত ভীত হইয়া ফেলফেল নেত্রে চাহিয়া রহিলেন। পরক্ষণেই আবার নত জানু হইয়া ভক্তি গদগদ কণ্ঠে বিনীত ভাবে প্রার্থনা করিলেন, “হে অনন্ত মহিমায় পতিত পাবন প্রভাে! আমি তােমারই আদেশ পালনার্থে উম্মৎসহ এই বন ভূমিতে পদার্পণ করিয়াছি। আবার তোমারই আদেশে সঙ্গীগণের শােচনীয় পরিণাম স্বচক্ষে দর্শন করিতেছি। হে বিভাে ! এখন আমি সঙ্গীগণ ব্যতীত কিরূপে গৃহে ফিরিয়া যাইতে পারি ? মানুষ যে আমাকে আর বিশ্বাস করিবে না; বরং বলিতে পশ্চাদপদ হইবে না যে, আমি তাহাদিগকে বধ করিবার জন্যই প্রবঞ্চনা করিয়া এখানে আনিয়াছিলাম। প্রভো! আমার অপবাদ লনার্থে শব দেহে জীবন দান কর।” হজরত মুসার আকূল প্রার্থনায় জরত মুলা আল্লাহ তাআলা তাহাদের প্রাণদান করিলেন। ইহাতে তাহারা জন্ম মৃত্যুর রস আস্বাদন করিয়া লইল ও সঙ্গে সঙ্গে দেহে খােদা কর্তৃক প্রাণ সঞ্চারিণী শক্তিরও সন্দেহ ঘুচিয়া গেল। ইহার পর হজরত সঙ্গীগণ সহ হৃষ্টচিত্তে বাড়ী ফিনিলেন। সকলেরই মনে ধ্রুব বিশ্বাস হইল যে, খোদা ও গহর রসূল সত্য। কিন্তু হজরত মূসার পিতৃব্য পুত্র কারুনের মনে সন্দেহ রহিয়া গেল। কারুন নিতান্ত রূপবান ও দরিদ্র ছিল। প্রথম প্রথম হজরত মূসাকে করুন খুবই ভক্তি করিত। কথিত আছে, সেই জমানাতে কারুনের অর্থ স্পি ও আর কেহই তাহার মত এত সুন্দর করিয়া তৌরত তাহার পরিণাম। আবৃত্তি করিতে পারিত না। একদিকে করুন যেমন সর্বদাই হজরত মূসার নিকট থাকিয়া ধর্ম বিষয়ে শিক্ষালাভ করিতে চেষ্টা করিত, অপরদিকে তাহার দারিদ্র মােচন করিবার জন্য দয়া করিতে হজরতকে অনুরােধ করিত। হজরত মূসার দোয়ার বরকতে কারুনের অবস্থার পরিবর্তন হইল। ইহাতে কারুনের অর্থ লিপ্সা ক্রমেই বুদ্ধি হইতে লাগিল। শেষে হজরত মূসার নিকট কিমিয়া বিদ্যা শিক্ষা রয়া তাহার আকাঙ্ক্ষা চরমে পরিণত করিল। দেখিতে দেখিতে কারুন ধনকুবের হইয়া গেল। ধনের সঙ্গে সঙ্গে কারুন চতুর্ণ কৃপণ হইয়া উঠিল। ইহার পর হইতে হজরত মূসাকে দেখিলে, কারুন দশ হাত पूज দিয়া সরিষা যাইত। এই সময়ে একদিন কারুনকে ডাকিয়া হজরত মূসা কহিলেন, “ভাই কারুন! আল্লাহ তাআলার মেহেরবানাতে তুমি অশেষ ধনের মালিক হইয়াছ। তাঁহার হুকুম অনুযায়ী শতকরা আড়াই ভাগ হিসাবে হজরত মুসা তােমাকে মালের জাকা দিতে হইবে।” হজরতের কথা অনুযায়ী জাকাৎ দিতে গেলে, বহু ধন খরচ হইয়া যায় দেখিয়া, কারুন ইহাতে অস্বীকৃত হইয়া বলিয়া উঠিল যে, তাহার মার্জিত ধনে আল্লাহতাআলার কোন অংশ নাই—কাজেই খামাখাই সে ধন বিলাইয়া দিতে পারে না। এইরূপ তর্কের পর কারুন দম্ভভরে হজরত মুসার নিকট হইতে উঠিয়া চলিয়া গেল। সেই দিন হইতে কারুন হজরত মূসার দুশমন হইয়া দাড়াইল এবং যে কোন অসৎ উপায়ে তাহাকে নাস্তানাবুদ করিতে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া অকারণ তাহার নিন্দা করিয়া বেড়াইতে লাগিল। হজরত মূসাকে নাকাল করা সহজ নয় ; কাজেই সে নূতন রকমের এক ভীষণ উপায় উদ্ভাবন করিল। এক বারবনিতার সহিত চক্রান্ত এই হইল যে, সে প্রকাশ্য ওয়াজের মজলিসে দাঁড়াইয়া, হজরত মূসার বিরুদ্ধে অবৈধ কার্যের অভিযােগ আনয়ন করিবে। অনন্তর কারুন উক্ত বারাঙ্গনা সহ যথা সময়ে হজরত মুসার ওয়াজের মজলিসে উপস্থিত হইল। হজরত তখন আপন উম্মতদিগকে বলিতেছিনে যদি কোন বিবাহিত স্ত্রী কিংবা পুরুষ অবৈধ আচরণ করে, তবে প্রস্তাঘাতে তাহাদিগকে বধ করাই তোরতের বিধান; আর যদি কোন অবিবাহিত যুবক-যুবতী অবৈধ আচরণ করে, তবে তাহাদিগকে বেত্রাঘাত করাই তোরতের আদেশ।” হজরতের ওয়াজ শ্রবণ মাত্রই কারুন দাড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “এমন কাৰ্য্য যদি আপনার দ্বারা সম্পাদিত হয়, তবে তাহার শাস্তি কিরূপ হইবে? কারুনের কথা শুনিয়া উত্তরে হজরত কহিলেন, “সকলের জন্যই এক আদেশ।” ইহাতে কারুন নিতান্ত সুযােগ পাইয়া বলিয়া উঠিল, “ঐ বারবনি আপনার বিরুদ্ধে এইরূপ অভিযােগ করিতেছে।”

হজরত মুসা কারুনের অভিযােগে রাগে হজরত মুসা কাপিতে লাগিলেন। তাহার দুই চক্ষু দিয়া আগুন ঠিকইয়া পড়িতে লাগিল। আল্লাহতাআলার নামে শপথ করিয় সত্য কথা প্রকাশ করিবার জন্য, তিনি উক্ত রমণীকে অাহ্বান করিলেন। কথিত বারাঙ্গনা যেন কি বলিতে গিয়া হঠাৎ বলিয়া উঠিল, কখনও না। কারুনের কথা সত্য নয়। এই প্রকার অভিযােগ আনিয়া হজরতকে নাস্তানাবুদ করিবার মতলবেই করুন আমাকে শিক্ষা দিয়াছে। এই অভিযােগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। হজরত তখন সিজদা করিয়া কহিলেন, “হে মেহেরবান আল্লাহ! তােমার দুশমন আজ আমাকে অপদস্ত করিতে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিয়াছে।” অমনি শব্দ হইল, “হে মুসা! দুনিয়ার মাটীকে আজ তােমার অনুগত করা হইল। হইল। মাটী তােমার আদেশ অনুযায়ী কাৰ্য্য করিবে।” ইহাতে হজরত মস্তকোত্তলন করিয়া, কারুনের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি, কোঠা-ইমারত ও দুইজন বন্ধু সহ তাহাকে উদরস্থ করিতে বসুধাকে আদেশ করিলেন। কারুন অগাধ ধনরত্ন, বালাখানা ও দুইজন বন্ধু সং ভূগর্ভে প্রােথিত হইতে হইতে ক্রমে লীন হইয়া গেল। তাহার ধনরাশি কোন কাজেই আসিল না। হজরত মূনার সহিত আল্লাহ-তাআলার ওয়াদা ছিল যে, সিরিয়া দেশ তাঁহাকে দেওয়া হইবে। কারুনের শােচনীয় পরিণামের পর হজরত মূসা সিরিয়ার পার্শ্ববর্তী রাজ্য সমূহে সৈন্য পরিচালনা করিতে আরম্ভ করিলেন। অতি অল্পকালের মধ্যেই বহু রাজ্য বনি-ইস্রাইলদিগের হজরত মুসা পদতলে লুটাইয়া পড়িল। পার্শ্ববর্তী রাজ্য সমূহে হজরত মুসার প্রভাব সম্পূর্ণরূপে স্থাপিত হইলে, তিনি মস্তবড় একদল ফৌজসহ বলকান রাজ্য আক্রমণ করেন। হজরত মুসার সম্মুখে হজরত মূসার বলকান প্রথম যুদ্ধেই বলকান রাজ পরাজিত হইল। জয় ও বলা বাউরার পরিণাম। বলকান রাজ্যে তখন বলায়াম বাউরা নামক এক তাপস বাস করিত। পরাজিত ৰলকানবাসিগণ তঁাহার আশ্রয় গ্রহণ করিয়া মুসাকে নিপাত করিবার জন্য তাপসের সাহায্য প্রার্থনা করিল। তাপস তাহাদের প্রার্থনায় কর্ণপাত না করিয়া, হজরত মুসার ধর্ম গ্রহণ করিতে, তাহাদিগকে বিশেষ উপদেশ প্রদান করেন। বলায়ম বাউরার দোয়ার বরকতে মুসার পরাজয় অনিবাৰ্য মনে করিয়া, বলকানের লােকগণ বহু ধনরত্ন দিয়া, তাহার স্ত্রীকে বশীভূত করিয়া, দোয়ার অপেক্ষায় রহিল। কিন্তু স্ত্রীর বারবার অনুরােধেও বলায়াম হজরত মুসাকে বদ-দোয়া করিতে রাজি হইল না। মূসা এক জন মস্ত বড় পয়গম্বর। তাহার বিরুদ্ধে দোয়া করিলে, নিজের অমঙ্গল হইবে বলিয়া, তাহার বিশ্বাস ছিল। এদিকে স্ত্রীও জিদ করিয়া বসিল যে মুসার বিরুদ্ধে তাঁহাকে দোয়া করিতে হইবে; নতুবা সে রসাতল করিয়া ছাড়িবে। শেষে বলায়াম বাধ্য হইয়া মুসার প্রতিকূলে দোয়া করিবার নিমিত্ত তুর পর্বতে যাইতে প্রস্তুত হইল। যথা সময়ে বলায়াম তূর পর্বতে আরােহণ করিয়া, দুই বাহু উর্কে তুলিয়া, হজরত মুসাকে অভিশাপ করিল। অমনি তাহার জিহ্বা কুকুরের জিহ্বার ন্যায় লেলিহান হইয়া মুখ হইতে বাহির হইয়া পিড়ল হজরত মুসা এবং তাহার উজ্জ্বল মূৰ্ত্তি একখানা পােড়া কাঠের মত হইয়া গেল। কিন্তু ইহার জন্য হজরত মুসার উপর তাহার রাগ বাড়িয়া গেল। এখন হইতে বলায়াম হজরত মূসার সহিত দুশমনী করিতে প্রবৃত্ত হইল। গৃহে ফিরিয়া আসিয়া, কয়েকটা অবিবাহিত। পরমা সুন্দরী যুবতীকে মনােহব ভূষায় সজ্জিত করিয়া, কুকার্যে লিপ্ত করিবার জন্য হরত মুসার লােক-লস্করের ছাউনিতে পাঠাইয়া দিল। উপদেশ মত তাহারা রূপের তরঙ্গ তুলিয়া মধুমাখা হাসিতে চৌদিক উজ্জল করিয়া, ফৌজের আসে পাশে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল। যমরী নামক এক বনি-ইস্রাইল সিপাহী অচিরেই তাহাদের কুহকে পড়িয়া কু-কর্মে লিপ্ত হইল। ইহার ফলে, সত্বরই হজরত মুসার সৈন্যদলে মড়ক দেখা দিল , অল্প সময়ের মধ্যে বহু সৈন্য মারা গেল। কোন্ পাপের ফলে এত সব লােকজন মারা যাইতেছে, তাহার অনুসন্ধান করিবার জন্য খোজ-ইবনে-হারুন নামক জনৈক বিশ্বাসী ব্যক্তিকে নিযুক্ত করা হইল। বহু অনুসন্ধানের পর যমরীকে এক যুবতীর গুপ্ত প্রেমে কু-কাৰ্য্যে মত্ত দেখিয়া, হারুন তৎক্ষণাৎ উভয়কে বর্শায় বিদ্ধ করিয়া বধ করিল। আশ্চর্যের বিষয় সঙ্গে সঙ্গেই ছাউনি হইতে মড়ক অবসান হইল। ইহার পর বলকান- বাসীদিগের সহিত খুব বড় যুদ্ধ হইল। এই যুদ্ধে বনি-ইসরাইলগণ বিজয় লাভ করিল। হজরত মূসার বিজয় নিশান সগর্বে উড়িতে লাগিল। বণকান বিজয়ের পর সসৈন্যে তিয়ানগরে অভিযান করিবার জন্য হজরত মুসা আদিষ্ট হইলেন। দুর্ধর্ষ অমালিকাগণ তখন তিয়ানগরে বসবাস করিত। এওয়াজ-ইৰ নেউলুক তিয়ার রাজা ছিল। ইহারা হজরত মুসা অসীম শক্তিশালী ছিল এবং আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বে মােটই বিশ্বাস করিত না। হজরত কাল বিলম্ব না করিয়া, তিয়ানগর আক্রমণ। তিয়া নপর আক্রমণ করিলেন। সত্বরই এওয়াজ অংগত হইল যে, একদল ক্ষুদ্র মানুষ তাহার প্রতিকুলে যুদ্ধ করিবার জয় বারজন সৈন্যাধ্যক্ষকে পাঠাইয়াছে। এওয়াজ নগরের বাহিরে আসিয়া, পাখীর ছানার মত তাহাদিগকে ধরিয়া, থলের ভিতরে পুরিয়া বাড়ী ফিরিয়া গেল। তারপর থলের ভিতর হইতে এই বার লােককে বাহির করিয়া, স্ত্রীর সম্মুখে রাখিয়া কহিল, “বিবি ! এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলি আমার সঙ্গে যুদ্ধ করিবার জন্য সুদূর মিসর হইতে এখানে আসিয়াছে।” এওয়ারে পত্নী ইহাতে বিস্মিত হইয়া, তাহাদিগকে ছাড়িয়া দিবার জন্য স্বামীকে অনুরোধ করিল, “ইহাদের মত ক্ষুদ্র প্রাণী মারিয়া কি লাভ হইতে পারে ? ইহারা প্রাণ লইয়া ফিরিয়া গেলে, সঙ্গীদিগকে ভীতি প্রদর্শন করিয়া হয় ত লােক-লস্কর সমেত পলায়ন করিবে।” পত্নীর অনুরােধ রক্ষিত হইল। এইরূপে মুক্ত হইয়া বারজন সৈন্যাধ্যক্ষ ছাউনিতে ফিরিয়া গিয়া, আমূল বৃত্তান্ত সকলের নিকট বর্ণনা করিল। সকলেই অমালিকাদিগকে দেও-দানব মনে করিয়া ভীত হইয়া, যুদ্ধ করিতে অস্বীকৃত হইল। হজরত মূসা ও তাহার ভ্রাতা হারুন প্রমাদ গণিল। তখন গায়েব হইতে শব্দ হইল, “আয় মূসা ! ভীত হইও না। বিদ্রোহীদিগকে অন্বেষণ করিও না। আমি তাহাদিগকে চল্লিশ বৎসরের জন্য এই বিজন প্রান্তরে আবদ্ধ করিয়া রাখিলাম। সারা দিন অবিশ্রান্ত পথ চলিয়া সন্ধ্যাকালে তাহারা এখানেই ফিরিয়া আসিবে।”

হজরত মুসা কাজেও হইল তাহাই। বিদ্রোহীদিগের মধ্যে যাহারা এই রহস্য উৎঘাটন করিয়া, ছাউনিতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করিয়াছিল, তাহাদের শরীরের মাংস সমূহ গলিত শবের ন্যায় খসিয়া পড়িতে লাগিল ; দুর্গন্ধে তাহাদের কাছে তিষ্ঠান দায় হইল। আর বাদ বাকী সকলে সারা দিন বৃথা ঘুরিয়া সন্ধ্যাকালে বিজন প্রান্তরে ফিরিয়া আসিতে লাগিল। সত্বরই তাহারা বুঝিতে পারিল যে, ইহা বিদ্রোহের ফল ছাড়া আব কিছুই নয়। কাজেই তাহারা সকলে পুনরায় হজরত মুসার নিকটে ফিরিয়া আসিল। আল্লাহ তাআলার আদেশে হজরত মুসা ভ্রাতা হারুনকে সঙ্গে করিয়া এওয়াজের সম্মুখীন হইলেন। তিনি আর দেরী না করিয়া, এক লম্ফ দিয়া গদা সহ ত্রিশ গজ উর্ধে উঠিয়া, এওয়াজের পায়ের গোড়ালীতে ভীষণ আঘাত করিলেন ; গদার প্রচণ্ড আঘাতে এওয়াজ ভূতলে পতিত হইয়া প্রাণত্যাগ করিলে, অমালিকগণ বাধ্য হইয়া পলায়ন করিল। লড়াই ফতে করিয়া, হজরত মূসা ছাউনিতে প্রত্যাবর্তন করিলেন। বিদ্রোহীদিগের দুর্দশা দেখিয়া, তাহাদের খােরাক ও পােশাকের জন্য তিনি আল্লাহ তাআলার দরবারে আরজ করিলেন। আকাশ হইতে তাহাদের জন্য তরমুজ ও পাখীর গােশত নাজিল হইল; পরিতোষের সহিত আহার করিয়া তাহারা সুস্থ ও সবল হইল। অতঃপর আল্লাহ তাআলার হুকুমে তাহাদের ছিন্নবস্ত্র ধুইয়া লওয়াতে সকলই নূতন হইয়া গেল, আর ময়লা কাপড় আগুনে পুড়াইয়া লওয়াতে পরিষ্কার হইয়া গেল। এইরূপে তাহাদের দিনপাত হইতে লাগিল। তখন হইতে তাদের সন্তান সন্ততি মাতৃগর্ভ হইতে জামা পরিহিত অবস্থায় ভূমিষ্ট হইতে হজরত মুসা লাগিল। প্রচণ্ড রৌদ্রের সময় একখণ্ড মেঘ সামিয়ানার মত তাহা- দিগকে ছায়াদান করিত। রাত্রিকালে নূরের আলােতে চতুর্দিক আলাে- কিত হইত। এইরূপে চল্লিশ বৎসর গত হইলে বিদ্রোহীদিগের সকলেই কে কোথায় চলিয়া গেল। তাহাদের সন্তানদিগের দ্বারা শূন্য স্থান পূর্ণ হইয়া হজরত মূসার জনবল পরিপুষ্ট হইল। স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিবার জন্য একদিন হঠাৎ হজরত মূসার উপর আদেশ হইল। তিনি তৎক্ষণাৎ লােক-লস্কর সমেত মিসরের দিকে রওয়ানা হইলেন। বহুকাল পর জন্মভূমির মুখ দেখিতে পাইয়া হজরত আরামের নিশ্বাস পরিত্যাগ করিলেন। ৭১ হস্তৱত খিজরে দর্শন লাভ। মিসর রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। অধর্মের অবসান হইয়া সেখানে আবার ধৰ্ম্মের রাজ্য স্থাপিত হইল। হজরত মূসা এখন বনি- ইসরাইলদিগকে ধৰ্ম্মের সারগর্ভ উপদেশ প্রদান করেন। একদিন উম্মত- গণের মধ্যে কেহ তাহার গুণগরিমায় মুগ্ধ হইয়া, জিজ্ঞাসা করিল, “হজরত । আপনার চেয়ে বড় আলিম আর কেহ দুনিয়াতে আছেন কি?” “নাই” বলিয়া হজরত মূসা উত্তর দিলেন। অমনি দশদিক কাপাইয়া শব্দ হইল, আয় মূসা ! কে বলে নাই ? তােমার চেয়ে জ্ঞানী হিজাজ প্রদেশে এখনও বিদ্যমান রহিয়াছে। সেখানে গেলেই ইহা প্রত্যক্ষ করিতে পাইবে।” হজরত মুসা কথিত মহাপুরুষের সহিত সাক্ষাৎ লাভ করিবার জন্য একান্ত ব্যাকুল হইয়া, পথের ধােরাক সরূপ কিছু ভাজা মাছ ও ইউস- ইবনে-নকে সঙ্গে করিয়া, হিজাজের উদ্দেশ্যে মিসর পরিত্যাগ করিলেন। কিছু দিন পথ চলিয়া উভয়ে এক ভীষণ মরুভূমিতে উপস্থিত হইলেন। অনতিদূরে তাঁহাদের সম্মুখে সাগর দেখিতে পাইয়া, উভয়ে তীরে গিয়া বিশ্রাম করিতে একখণ্ড পাথরের উপর বসিলেন। তারপর মুখ হাত ধুইয়া আহার করিয়া সুস্থ হইলেন। নমাজের সময় হইলে, সাগরের পানিতে অজু করিয়া নমাজ পড়িলেন। ইহার পর পুনরায় গন্তব্য স্থানের উদ্দেশ্যে উভয়ে রওয়ানা হইলেন। সাগর-পার বহিয়া কিছু দূর অগ্রসর হইয়া দেখিলেন এক বৃদ্ধ গভীর ধ্যানে মগ্ন হইয়া রহিয়াছেন। ૧૨

হজরত মূসা
বৃদ্ধের আসন হইতে ভূষণ পৰ্যন্ত সবই সবুজ ; তাহার চেহারা তপ্ত
কাঞ্চনের ন্যায় জ্বলিতেছে।
হজরত মুসা পশ্চাৎ হইতে বৃদ্ধকে সালাম জানাইলেন। সালামের
শদে বৃদ্ধ তাপসের ধ্যান ভঙ্গ হইল। তিনি মস্তকোত্তলন করিয়া
উভয়ের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন।
হজরত মূসা হিলেন, “আমার নাম মূসা।”
বৃদ্ধ। তুমি কি বনি-
ইইলদিগের পয়গম্বর মুসা ?
মূসা। হা-বলিয়া নীরব হইলেন। তারপর বৃদ্ধ তাপসকে
আল্লাহ তাআলার ফথিত জ্ঞানী মহাপুরুষ বলিয়া বুঝিতে পারিয়া,
পুনরায় কহিলেন, “হজরত ! আপনার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়া কৃতার্থ
হইতে আমি সুদূব মিসর হইতে আসিয়াছি। আপনি নিজগুণে আপনার
কণামাত্র জ্ঞান দান করলে আমি নিজকে ধন্য মনে করিব।”
বৃদ্ধ। ৎৈস! আমার নাম জি র। বিজরের শিষ্যত্বের গুরুভার
বহন কর। তোমার জন্য ১ম্ভব হইবে না। অতি সহিষ্ণু না হলে
কেহই আমার শিষ্যদের গৌরব লাভ করিতে পারে না। আল্লাহ,
তাআলার স্নেহের পাত্র তুমি। এই কারণে তােমাকে এত কথা বণিলাম।
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার।”
মূসা। হজরত ! আপনার কোনাে কাজে বিচলিত হইয়া কদাচ
আমি কোন কথা জিজ্ঞাসা করিয়া, আপনাকে বিরক্ত করিব না।
নিজগুণে আমাকে আপনার শিষ্যত্বের গৌরব প্রদান করুন।
এই অনুরােধ-উপরােধের পর, হজরত খিজর তাহাকে শিষ্যত্বে
গ্রহণ করিতে স্বীকৃত হইলেন। অতঃপর ইউসাকে বিদায় দিয়া,
৭৩

হজরত মুসা । গুরু-শিষ্যে এক মনে পথে বাহির হইয়া পড়িলেন। কিছুদূর গিরা দেখিলেন তাহাদের সম্মুখে এক মস্ত বড় নদী; কিছুক্ষণ পর উভয়ে দেখিতে পাইলেন কয়েকজন লােক একখানা ক্ষুদ্র নৌকা বাহিয়া চলিয়াছে। নৌকার লােকগণ হজরত খিজরকে চিনিতে পারিয়া, উভয়কে নৌকায় তুলিয়া লইয়া, নদী পার করিয়া দিল। নৌকা হইতে নামিবার কালে, হজরত খিজর পুরস্কার সরূপ হস্তস্থিত লাঠি দ্বারা আঘাত করিয়া, নৌকার তলদেশে একটী বড় ছিদ্র করিয়া দিলেন ; নৌকা খানা অচিরেই নদীর কিনারায় ডুবিয়া গেল। ইহাতে হজরত মূসা নেহায়েৎ দুঃখিত হইয়া, হজরত থিজরকে ইহার জন্য অনুযােগ করিতে লাগিলেন; কিন্তু সত্বরই নিজের প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়া বড়ই লজ্জিত হইলেন। উভয়ে পুনরায় পথ ধরিয়া চলিতে লাগিলেন। কিছুদূর যাইতে যাইতেই একজন বণিকের সহিত সাক্ষাৎ হইল ; ইহাদের মধ্যে একটা অতি সুন্দর বালকও ছুটাছুটি করিয়া খেলা করিতেছিল। হজরত খিজর অন্যমনস্কভাবে তরবারীর এক আঘাতেই উক্ত বালকের মস্তক শরীর হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া ধরাশায়ী করিলেন। হজরত মুসা পূৰ্ব্বকৃত অঙ্গীকারের কথা ভুলিয়া গিয়া, বালকের জন্য দুঃখ করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “হায় হায় ! বিনা অপরাধে শিশু হত্যা।” ইহাতে হজরত খিজর তাহাকে ধমক দিয়া থামাইয়া দিলেন। স্বীয় প্রতিজ্ঞার কথা মনে করিয়া, হজরত মুসা বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। হজরত খিজর কিছু না বলিয়া নীরবে আবার পথ চলিয়া যাইতে লাগিলেন। হজরত মুসা অপরাধীর মত তাহার অনুমরণ করিলেন। অনবরত পথ চলিতে চলিতে ক্ষুধার জ্বালায় কাতর হইয়া ৭ঃ হজরত মুসা উভয়ে পথি পার্শ্বস্থ এক গ্রামে উঠিয়া, আহারের অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। দ্বিপ্রহর হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরিয়া কোথাও আহারের যােগাড় হইল না। উভয়ে বিষন্ন মনে গ্রাম হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া, ভুক। অবস্থায় রজনী যাপন করিলেন। প্রত্যুষে গাজোখান করিয়া আবার পথ চলিতে লাগিলেন। গ্রামের শেষ সীমায় উপস্থিত হইয়া দেখিলেন একটা অন্ধ ভগ্ন প্রাচীর কুজ পৃষ্ঠ হইয়া রহিয়াছে। সামান্য আঘাতেই ইহা ভূমিসাৎ হইবে। হজরত খিজর স্বহস্তে টিপিয়া বক্র প্রাচীরটা ঠিক করিয়া দিলেন। ই দেখিয়া হজরত মুসা বলিলেন, “এই কি সমুচিত বিধান ? সমস্ত দিন হাঁটিয়া এই গ্রামে এক মুটো অন্নের যােগাড় হইল না ; আর আপনি মজুরী বিনা তাহাদের ভগ্ন দেওয়াল মেরামত করিয়া দিলেন।” এইবার হজরত খিজর রাগিয়া কহিলেন, “এখন হইতে তােমার আমার পার্থক্য নিশ্চয়। তথাপি যে তিনটী বিষয়ের জন্য তােমার ধৈর্য্যচ্যুতি হইয়াছে, তাহার যথার্থ মৰ্ম্ম আমার নিকট হইতে অবগত হইয়া যাও। নৌকা ছিদ্র করিয়া দেওয়াতে তুমি বেজাই বিরক্ত হইয়াছিলে। কয়েকজন নিতান্ত নিঃস্ব লােক সপরিবারে উক্ত নৌকার সাহায্যে জীবিকা নির্বাহ করিতেছে। নৌকাখানাও বেশ সুন্দর এবং নিখুত। আর সামান্য দূর গেলেই এক জালিম বাদশাহ কর্তৃক নৌকাখানা জোর-জবরদস্তিতে ছিনাইয়া লওয়া হইত। আমি লাঠির আঘাতে নৈকার তলদেশ ছিদ্র করিয়া দেওয়াতে ইহা রক্ষা হইল; এখন তাহারা নৌকাখানা মেরামত করিয়া লইলেই তাহাদের জীবিকা নির্বাহের কোন কিছু হইব না। তারপর ছেলের বধে তুমি শিহরিয়া উঠিয়াছিলে। ছেলেটীর মাতাপিতা অতি নেককার লােক, তাহারা জীবনে কখনও পাপ করে নাই। ৭৫ হজরত মুসা ছেলেটী পরিণামে দুরন্তের একশেষ হইবে, জগতে এমন কোন পাপ কাৰ্য্য নাই যাহা করিতে সে পরাজুখ হইবে। এই কারণে মূলেই তাহার ধ্বংস সাধন করিলাম। আল্লাহতাআলা তাহার জনকজননীকে পুণ্যবান সন্তান সন্ততি দ্বারা তৃষ্ট * করিবেন। সকলের শেষে প্রাচীর মেরামতের কথা। এই প্রাচীরের তলদেশে দুইটী পুণ্যাত্মা পিতৃহীন শিশুর অগাধ ধন সঞ্চিত আছে। তাহাদের পিতা মৃত্যুকালে উক্ত ধন রাখিয়া গিয়াছেন। পরিণামে উক্ত ধনের অধিকাংশই বালকদ্বয় কর্তৃক সৎপথে ব্যয়িত হইবে। যদি অদ্যই দেয়াল ভূমিসাৎ হয়, তাহা হইলে সম্পূর্ণ ধন রত্নই অপরের হস্তগত হইবে। এই জন্যই আমি উক্ত দেয়ালের পুনঃ সংস্কার করিয়া, এই ধন রক্ষা করিয়া আসিয়াছি। এই সকল কাৰ্য্য করিয়া আমি আল্লাহ-তাআলার আদেশই প্রতিপালন করিয়াছি মাত্র । বাক্য সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই হজরত খিজর কোথা মিশাইয়া গেলেন! বহু অন্বেষণেও আর তাহাকে পাওয়া গেল না। * কথিত আছে যে, উক্ত ছেলে নিধনের পর তাহার মাতাপিতার অনবরত রোদনের বলে, খােদাতাআলা তাহাদিগকে এক নেককার অদ্বিতীয় রূপবতী কন্যারত্ন দান করিয়া, তাহাদের পুত্রশোক দূরীভূত করিয়াছিলেন। উক্ত কন্যার সন্তান সন্ততি হইতে সত্তর জন শ্রেষ্ঠ পয়গম্বর ভূমিষ্ট হইয়া জগতের অশেষ কল্যাণ সাধন করিয়াছিলেন।

৭ হজরত মুসার শেষ জীবন। হজরত মূসা জীবনের বাকী দিন নিরিবিলি কাটাইতে ইচ্ছা করিলেন। কিন্তু বনি-ইসরাইলগণ শেষ জীবনেও তাহাকে সম্পূর্ণ সুখভােগ করিতে দেয় নাই। হজরত মুসার কালে, স্ত্রী-পুরুষ সকলেই উলঙ্গ হইয়া প্রকাশ্য স্থানে এক ঘাটে গােসল করিত। হজরত ইহাতে নিতান্ত লজ্জা অনুভব করিয়া একাকী আলাদা ঘাটে গােসল করিতেন। এই কারণে ইসরাইলদিগের মনে সন্দেহ হইল যে, নিশ্চই তাহার কোষবৃদ্ধি রােগ আছে ; না হইলে খামাখাই কি জন্যই তিনি আলাদা ঘাটে গােসল করিবেন। তাহারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া, নানা কল্পনা জল্পনা করিতে শুরু করিল। এদিকে মেহেরবান আল্লাহতাআলা তাহার অপবাদ স্থলনের উপায় স্থির করিলেন। এই সময়ে একদিন হজরত ঘাটের উপরিস্থ একখণ্ড পাথরের উপর কাপড়-চোপড় রাখিয়া পানিতে নামিলেন ; ঘাটের অনতি দূরে বহু সিব,তি দাড়াইয়া অস্ফুট স্বরে কি বলাবলি করিতে লাগিল এবং অঙ্গুলী সঙ্কেতে তাহাকে লক্ষ্য করিয়া হাসিতে লাগিল। তাহাদের কার্যকলাপের দিকে হজরতের মােটেই লক্ষ্য ছিল না। তিনি হাঁটু পরিমাণ পানিতে নামিয়া অজু করিতে শুরু করিলেন। এদিকে অচল পাথরখণ্ড কাপড় সহ সত্মবেত লােকজনের দিকে দৌড়াইয়া চলিল। হজরত পশ্চাৎদিকে ফিরিয়া দেখিতে পাইলেন যে, তাহার কাপড় সহ পাথর চলিয়া যাইতেছে। তিনি ; ৭৭ হজরত মুন্স তৎক্ষণাৎ তীরে উঠিয়া, কাপড় ফিরিয়া পাইবার জন্য পাথরকে লক্ষ্য করিয়া, উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতে লাগিলেন। পাথর তঁাহার ডাকে কান দিবে কেন ? এক দৌড়ে সমবেত লােকজনের মধ্যে গিয়া হাজির হইল। হজরত ইহার পশ্চাতে দৌড়াইয়া গিয়া সজোরে পাথরের বুকে লাঠি দ্বারা আঘাত করিলেন। ইহার ফলে, পাথরের বুকে দাগ বসিয়া গেল এবং সেই দাগ হইতে দ্বাদশটী পরম বনণীয় নিঝর তরতর বহিয়া চলিল। সঙ্গে সঙ্গে ইইলদিগের সন্দেহ ভঞ্জন হইয়া গেল। এই ঘটনার অল্পকাল পরেই আমিন-বি-রাহীল নামক জনৈক ধনী ব্যক্তি অতি গোপনে নিহত হয়। প্রত্যুষে তাহার লাশ জনসাধারণের রাস্তার উপর পড়িয়া থাকিতে দেখা যায় । কিন্তু হত্যাকারীর কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। অবশেষে সেই সময়ের আইন- শবদেহের সাক্ষ্য দান। কানুন অনুযায়ী গ্রামবাসীদিগের নিকটে ইহার কৈফিয়ৎ তলব করা হইল। নিরীহ লােকগণ ভাবিয়া হয়রান হইয়া, ইহার অনুসন্ধান করিয়া দিবার জন্য হজরত মূসাকে বিশেষরূপে অনুরােধ করিল। গ্রামবাসীদিগকে সান্ত্বনা প্রদান করিয়া, এই হত্যার কূলকিনারা করিবার জন্য তিনি আল্লাহতাআলার বরাবরে আরজ করিলেন। শব্দ হইল, “হে মূসা ! সৰ্বাঙ্গীন সুন্দর একটা নিখুঁত গরু কোরবানী করিয়া, উহার গােশত হইতে এক টুকরা লইয়া মৃতদেহে স্পর্শ করাইলেই লাশে প্রাণ ফিরিয়া আসিবে; তখন সহজেই হত্যাকারীর অনুসন্ধান হইবে।” যথা সময়ে আল্লাহ তাআলার নামে গরু কোরবানী করা হইল। কোরবানীর গােশত হইতে এক টুকরা লইয়া মৃত দেহে স্পর্শ করান হইল। । ৭ হজরত মুসা আল্লাহ তাআলার হুকুমে শবদেহে প্রাণ ফিরিয়া আসিল। রাহীলের ভ্রাতুস্পুত্র নিরপরাধে তাহাকে হত্যা করিয়াছে বলিয়া, সকলের সম্মুখে প্রকাশ করিয়া, তাহার লাশ আবার তখনি প্রাণহীন অবস্থায় মাটীর উপর লুটাইয়া পড়িল। যথা সময়ে জানাজা ও কাফন-দফনের কাজ শেষ করিয়া, সর্বাগ্রে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করা হইল। কোরবানীর গােশত আগুনে পুড়াইয়া ছাইগুলি হজরত হারুনকে দেওয়া হইল। কথিত আছে যে, সেইছাই দ্বারা কালে কালে এইরূপ বহু সমস্যার মীমাংসা হইয়াছিল। রাহীলের মৃত দেহের সাক্ষ্য প্রদানের কিছুকাল পরে, দেশে অনাবৃষ্টি দেখা দিল। ক্রমাগত কয়েক মাস ধরিয়া আকাশে মেঘ দেখা গেল না ; পানির অভাবে কোথাও শ্যামল তৃণলতা রহিল না নিকের কাৰ্য্য। সব শুকাইয়া গেল। খাদ্যাভাবে সকলেই জীর্ণশীর্ণ হইয়া যাইতে লাগিল। চতুর্দিকে হাহাকার পড়িয়া গেল। সকলেই জ্ঞাত ছিল যে, হজরত মূসা দোয়া করিলে সহজেই বৃষ্ট হইবে ; অতএব সকলে মিলিয়া তাহাকে অনুরােধ করিল। হজরত ইব্রাইলগণ সহ এক ময়দানে জমা হইয়া, বৃষ্টির জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে দোয়া করিলেন। কিন্তু ভাগ্যবিপর্যয়ে বিন্দুমাত্রও বৃষ্টি হইল না। ইহাতে হজরত মূসা উদ্বিগ্নচিত্তে গৃহে প্রত্যাগমন করিয়া, নীরবে আল্লাহ তাআলার কাছে আরজ করিলেন, হে প্রভো! তুমিই আমাকে পয়গম্বর করিয়া পয়দা করিয়াছ, এবং আমার দোয়া কবুল করিবে বলিয়া তুমি প্রতিশ্রুতি দিয়াছ। তবে কেন প্রভাে! আজ দোয়া কবুল করিলে না? অমনি শব্দ হইল, “হে মুসা! তােমার দোয়া কবুল হইয়াছে। কিন্তু গতকল্য তােমর দলে জনৈক নিন্দক থাকাতে বৃষ্টি হয় নাই।” হজরত মূসা পুনরায় নিবেদন করিলেন,

হজরত মুসা
}
“হে ভো! ঐ ব্যক্তি কে তাহ৷ আমাকে জাইয়া দাও।* শব্দ
হইল, “হে মূসা ! পরের নিন্দায় আরও আত্মগ্লানী হয়। ইহার
উপর আমার দ্বারাই পরের নিন্দা করাইতে কৃতসংকল্প হইয়াছ ; বরং তুমি
বনি-ই-ইলদিগের নিকট প্রকাশ কর যে, আগামী কল্য তুমি বৃষ্টির জন্য
পুনরায় দোয়া করিবে; সেই সময়ে কোনও নিন্দ ক যেন তােমার সঙ্গীদের
মধ্যে না থাকে।”
যথা সময়ে আল্লাহ তাআলার হুকুম অনুযায়ী কাৰ্য্য হইল। নিলক
ভীত হইয়া সে দিন তাহাদের সঙ্গে দোয়া করিতে যায় নাই। দোয়ার
সঙ্গে সঙ্গেই মুষল ধারায় ঝমঝম্ রবে বৃষ্টি হইতে লাগিল। সকলেই বৃষ্টির
পানিতে ভিজিতে ভিজিতে হৃষ্টচিত্তে বাড়ী ফিরিয়া আসিল। ইতিমধ্যে
এক দিবস শয়তান আসিয়! হজরত মূসাকে বিনীত
শখের ন
ভাবে কহিল, “হজরত। খােদা আপনাকে পয়গম্বর
পরিশোধ।
করিয়া পয়দা করিয়াছেন এবং আপনার সহিত
কথাবার্তাও বলিয়াছেন। অতএব আপনি আমার জন্য খােদার কাছে
আরজ করুন যেন তিনি আমার দেয়া কবুল করেন। সত্যই আমার
তৌবা করতে ইচ্ছা হয়।”
শয়তানের কথা শুনিয়া হগর : দোয়া করিলেন। "মনি শব্দ হইল,
“হে মুসা! তােমার অনুরােধে আমি তাহার তৌবা কবুল করিলাম, কিন্তু
আদমের কবরকে কেবলা করিয়া একবার তাহাকে সিজদা করিতে
হজরত মুসা শয়তানকে খােদার হুকুম জানাইলেন। হাতে
শয়তান উত্তর করিল, “হরত! আদমকে কেবলা করিয়া জীবিত
অবস্থায়ও সিজদা করি নাই, আর আজ মৃত আদমের কবরকে কেবলা

করিয়া কিরূপে সিজদা করিব। হজরত। আপনি আমার জন্য সাফায়েৎ করিয়াছেন। অতএব আমি আপনার নিকট ঋণী। এই ঋণ পরিশােধ করিবার জন্য আমি আপনার উম্মতদিগকে তিনটী বিষয়ে বিশেষ সতর্ক করিয়া দিতেছি। আপনিও তাহাদিগকে উক্ত তিন বিষয়ে বিশেষ সাবধান করিয়া দিবেন। তাহারা যেন আমার কবল হইতে বাচিয়া থাকিতে চেষ্টা করে। তাহারা যখন ক্রোধােন্মত্ত হইয়া উঠে, তখন তাহাদের ধৈৰ্য্য মােটেই থাকে না এবং তাহাদের ইন্দ্রিয় ও বিবেক শক্তি সম্পূর্ণ আমার আয়ত্ত থাকে। তখন আমি তাহাদের দ্বারা আমার ইঙ্গিত কাৰ্য্য করাইয়া লইতে পারি। অতএব রাগের সময় যেন তাহারা ধীর স্থির ভাবে কার্যক্ষেত্রে অগ্রসর হয়। তারপর তারা যখন ধর্মের জন্য যুদ্ধ করিতে রণক্ষেত্রে যায়, তখন আমি তাহাদের নির্ভীক প্রাণে নিরাশার ছায়াপাত করিয়া তাহাদের হৃদয়ের পুণ্যস্নাশি অপসারিত করিয়া লই। সঙ্গে সঙ্গেই তাহারা মােহবশে রণস্থল পরিত্যাগ করিতে চায়। অতএব তাহারা সে সময় যেন বুদ্ধিমানের মত কাৰ্য্যে তৎপর হইয়া থাকে। তারা যখন পর স্ত্রীর সহিত নির্জনে পতিত হয়, তখন আমি তাহাদের দেহে ও মনে একটা শিহরণ জাগাইয়া দিই। ইহার ফলে উভয়ের রক্ত গরম হইয়া উঠে। পরিশেষে তাহারা স্বেচ্ছায় কুকর্মে লিপ্ত হয়। সুতরাং সে সময়ে যেন তাহারা আমার প্রভাব হইতে বাঁচিয়া থাকে।” দিন কাটিতে লাগিল। একদা হজরত মুসা জ্ঞাত হইলেন যে, ভ্রতা হারুনের দিন ফুরাইয়া আসিয়াছে। অতএব তিনি আল্লাহ- ‘আলার আদেশ অনুসারে হারুনকে সঙ্গে করিয়া পরিজন সহ সবিক নগর অভিমুখে যাত্রা করিলেন। কিছুদিন পথ অতিক্রম করিবার পর, হজরত মুসা সম্মুখে এক সুরম্য স্থান দৃষ্টিগােচর হইল। চারিদিকে সারি সারি মর্মর প্রস্তর নির্মিত হৰ্ম্ম, মধ্যে চত্বর, চত্বরের কোণে হজরত হারুনের কোণে সুন্দর বাগান, বাগানে ঘােট বড় মনোহর মৃত্যু গাছ। বাগানের মধ্যস্থলে কারুকার্য খচিত এক বিচিত্র শয্যা। ইহার উপর বসিয়া খানিক বিশ্রাম করিবার জন্য হারুনের বড়ই ইচ্ছা হইল। তিনি বিনীতভাবে হজরত মূসাকে কহিলেন, “ভাই, এই স্থানে বসিয়া খানিক বিশ্রাম করিতে আমার বড়ই সাধ হইয়াছে। আপনি যদি আমার সহিত বিশ্রাম করেন, তাহা হইলেই আমার সাধ পূর্ণ হয়।” হজরত মূসা ইহাতে আর দ্বিরুক্তি না করিয়া, ভাতার সহিত শয্যায় বিশ্রাম করিতে বাধ্য হইলেন। হজরত হারুন প্রথমেই গিয়া বিছানায় শুইয়া পড়িলেন। খােদার হুকুমে শয়ন মাত্রই তাহার জান কবজ হইয়া গেল। হজরত মূসা ভাতার কাফন দফনের সঙ্কল্প করিলেন। কিন্তু দেখিতে দেখিতে সুরম্য স্থান বিচিত্র শয্যা ও লাশসহ কোথায় অদৃশ্য হইয়া গেল। হজরত মূসা ক্ষুন্ন মনে বাড়ী ফিরিয়া উম্মতগণের সম্মুখে ভাগর দেহত্যাগের বিবরণ বিবৃত করিলেন। কিন্তু ইস্রাইলদিগের কেহই তাহার কথায় বিস্বাস স্থাপন করিল না। পক্ষান্তরে ভ্রাতৃহত্তা বলিয়া তাহাকে সকলেই দোষী সাব্যস্ত করিল। নিজের দোষ স্থাপন করিবার জন্য সিব তিদিগকে হারুনের লাশ দেখাইয়া, তাহাদের চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করিতে, আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা করিলেন। আকুল আবেদন গ্রাহ্য হইল। হারুনের লাশ শয্যাসহ সর্বসমক্ষে জির হইয়া আল্লাহতাআলার আদেশে নিজে উঠিয়া জবাবদিহি করিয়া কহিল, ।

। হজরত মুসা আমাকে কেই হত্যা করে নাই। খােদার ইচ্ছায় আমার মৃত্যু হইয়াছে।” বাক্য সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই শয্যা সহ লাশ অন্তর্ধান হইল । ঠিক এই স্থানেই ইআইলগণ হজরত হারুনের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করাইয়া দিল। হজরত হারুনের মৃত্যুর কিছুকাল মধ্যে হজরত মূস৷ স্বীয় আযুর স্বল্পতা অনুভব করিলেন। তিনি ইইলদিগকে একত্র করিয়া ধর্মের বিষয়ে নানা উপদেশ দান করিলেন ও মহাগ্রন্থ তোরতের পাণ্ডুলিপি তৈয়ার করিয়া লইতে হুকুম করিলেন। তিনি নিজেও একখণ্ড লিখিয়া হজরত জিবরাইল দ্বারা সংশােধন করাইয়া, ইস্রাইলদিগের জন্য রক্ষা করিলেন। ইহার পর ইব্রাইলদিগকে আল্লাহতাআলার মঙ্গলময় হস্তে সমৰ্পণ করিয়া বলিয়া দিলেন যে, তাঁহার পর য়ুসাকে যেন তাহারা হজরতের ন্যায় জ্ঞান করে এবং সম্পূর্ণরূপে তাঁহার অনুসরণ করিয়া চলে। ইাইলগণ হজরত মুসার পর হজরত নূসাকে তাহাদের পয়গম্বররূপে মান্য করিতে স্বীকৃত হইয়া, অঙ্গীকার পত্র লিখিয়া দিল। উম্মতগণের পরিণামের ব্যবস্থার পর, হজরত মূসা পুনরায় খােদার সহিত বাক্যালাপের প্রার্থনা করিলেন। তাহার দোয়া কবুল হইলে, তুর পৰ্ব্বতে গমনের আদেশ হইল। তিনি হৃষ্টচিত্তে তুরের দিকে যাত্রা করিলেন। চলিতে চলিতে শিশু সন্তানদিগের রক্ষাবেক্ষণের চিন্তা তাহার মনে উদয় হওয়াতে তিনি কাতর হইয়া পড়িলেন। হঠাৎ শব্দ হইল, “তােমার হস্তস্থিত যষ্টি দ্বারা সজোরে ভূতলে আঘাত কর।” হুকুম তামিল হইল; সঙ্গে সঙ্গেই কুল কুল রবে এক বিশাল নদী বহিয়া চলিল। আবার হুকুম হইল, “পানিতে লাঠি দ্বারা আঘাত কর।” হুকুম তামিল হইল। তৎক্ষণাৎ নদী গর্ভ হইতে এক বৃহৎ পাষাণ ভাসিয়া উঠিল।

হজরত মুলা । পুনরায় শব্দ হইল, “পাষাণ গাত্রে আঘাত কর।” হুকুম তামিল হইলে অমনি কঠিন প্রস্তর ফাটিয়া গিয়া, ভিতর হইতে একটি কীট বাহির হইল। ইহার মুখে সবুজ তৃণ অথচ তসবিহ করিতেছে, “সকল প্রশংসা আল্লাহ তা'আলায়। তিনি ভূতলের অতল তলস্থিত সমুদ্র গর্ভজাত কঠিন শিলা খণ্ডের ভিতরে আমাকে রাখিয়া, আমার অনুৰূপ খাদ্য যােগাইতেছেন। অথচ স্বীয় করুণা বলে সর্বদা আমার মিনতি পূর্ণ আবেদন গ্রহণ করিয়া আমার সংবাদ রাখিতেছেন।” হজরত মূসা ইহা দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। অমনি শব্দ হইল, “হে মূসা ! সপ্ততল ভূগর্ভ নিহিত প্রস্তর গর্ভবাসী কীটকেও আমি ভুলি না। তবে ধরাপৃষ্ঠবাসী তােমার সন্তানদিগকে কিরূপে ভুলিয়া থাকিতে পারি।” এই কথা শ্রবণ করিয়া হজরত মূসা লজ্জিত হইয়া আপন গন্তব্য পথে চদিলেন। কিছুদূর যাইয়া পথি পার্শ্বস্থ গিরিকরে এক ফকীরের সহিত সাক্ষাৎ হইল। কোথায় এবং কি উদ্দেশ্যে তিনি যাইতেছেন, ফকীর হজরতকে জিজ্ঞাসা করিলেন। হজরত উত্তর করিলেন, “আমি খোদার সহিত কালাম করিতে তুর পর্বতের দিকে যাত্রা করিয়াছি। ইহাতে ফকীর বলিলেন, “হজরত ! আপনি আমার পক্ষ হইতে খােদার নিকট এই আরজ করিবেন যে, আমি অদ্য হইতে থােদাকে পরিত্যাগ করিয়া, তাহার দিক হইতে মুখ ফিরাইয়াছি। অতএব আমার পরিণাম কি হইবে?” ফকীরের কথায় ক্ষুব্ধ হইয়া হজরত মূসা চলিয়া গেলেন। পরিশেষে তুর পৰ্বতে গিয়া যথা সময়ে কালাম ও মােনাজাত সমাধা করিয়া বাড়ী ফিরিতে, মনস্ত করিলেন।

হজরত মুসা অমনি শব্দ হইল “হে মুসা! পথি মধ্যে কেহ কি তােমাকে কোন কথা বলিয়াছিল ?” হজরত নতশিরে উত্তর করিলেন, “হে খােদা! তুমি সৰ্ব্বজ্ঞ। তােমার অবিদিত কিছুই নাই। তােমার বান্দা কিরূপ রূঢ় ব্যবহার করিয়াছে তাহা তুমি সম্পূর্ণ জ্ঞাত। আমি তাহার কথা উচ্চারণ করিয়া আমার জিহ্ব। অপবিত্র করিতে চাই না।” আদেশ হইল, “হে মুসা। ফকীরের কথা তােমার মুখেই শুনিতে চাই।” অগত্যা বাধ্য হইয়া হজরত মূসা ফকীরের কথা পুনরাবৃত্তি করিলেন। প্রত্যুত্তরে শব্দ হইল, “মুসা” তুমি গিয়া আমার বান্দাকে বলিবে যে সে আমাকে পরিত্যাগ করিলেও আমি তাহাকে পরিত্যাগ করিতে পারি না। অনন্তর হজরত মুসা গৃহে ফিরিবার কালে ফকীরকে উক্ত সংবাদ জ্ঞাপন করাইলেন। অমনি ফকীর ভূতলে মস্তকাঘাত করিয়া কহিল “প্রভাে । তােমার অজস্র করুণার তলে প্রাণ উৎসর্গ করিয়াছি।” তারপর মূচ্ছিত হইয়া ধরাশায়ী হইলে দেখিতে দেখিতে ফকীরের প্রাণ বায়ু বাহির হইয়া কোথায় মিলাইয়া গেল। হজরত মুসা সন্তপ্তচিত্তে বাড়ী ফিরিলেন। তুর হইতে প্রত্যাগত হইবার কিছুকাল পরই একদা হজরত আজরাইল আসিয়া বলিলেন, “হজরত । আমি আপনার প্রাণ লইতে আসিয়াছি।” ইহাতে হজরত মূসা রাগিয়া, হজরত আজরাইলের গণ্ডদেশে বিষম চপেটাঘাত করিয়া সঙ্গে সঙ্গে কহিলেন, 'আপনার হাতে যেন আমার প্রাণ না যায়।” ভীষণ আঘাতে হজরত আজরাইলের ডান চোখের তারা খসিয়া পড়িল।

হজরত মুসা
বছর জীবিত
হজরত আজরাইল বিফল মনােরথ হইয়া, আল্লাহ তা'আলার কাছে
আরজ করিলেন, “হে খােদা, হজরত মুসার জান কবজ করিতে গিয়া আজ
আমার এই দশা হইয়াছে।
খোদার হুকুমে তাহার চক্ষুর তারা ঠিক হইয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে
শব্দ হইল, “আয় আজরাইল! তুমি পুনরায় হজরত মূসার কাছে
গিয়া বল যদি তিনি দুনিয়াতে আরও থাকিতে ইচ্ছা করেন তবে যেন
একটা শাদা গরুর কটিদেশে হস্তাৰ্পণ করেন। তঁাহার হাতের নীচে
যতগুলি লােম পতিত হইবে, তিনি আরও তত
থাকিবেন। কিন্তু এই সঙ্গে বলিয়া দিবে যে ইহার পরও তাঁহাকে মওতের
পিয়ালা পান করিতে হইবে।”
আল্লাহ তাআলার আদেশে হজরত আজরাইল হজরত মূসার
সম্মুখে হাজির
হইয়া আল্লাহ -তাআলার হুকুম তাহাকে অবগত
করাইলেন। ইহাতে হজরত মুসা কহিলেন, “যদি মওতের পিয়াল
পান করিতেই হয় তবে দুই দিন আগে পান করাই ভাল।”—ইহা বলিয়া
আল্লাহ-তাআলায় উদ্দেশ্যে তিনি দুই হাত উর্দ্ধে তুলিয়া কহিলেন,
“হে নিখিল নাথ ! তুমি আমাকে পবিত্র বয়তুল মুকাদ্দসের নিকটবর্তী
করিয়া দাও।” ভক্তের আকুল আবেদন মঞ্জুর হইল। দোয়া
করিয়াই তিনি অন্যমনস্কভাবে বাড়ী হইতে বাহির হইয়া পড়িলেন।
কিছুদূর গিয়া একদল লােককে কবর খনন করিতে দেখিয়া তিনি জিজ্ঞাসা
করিলেন, “ভাই সব! এমন সুন্দর কবর কাহার জন্য রচিত
হইতেছে ?”
“আল্লাহ তাআলার জনৈক দোতের জন্য তৈয়ার হইতেছে ।”

হজরত মুসা ইহাতে হজরত মুসা আক্ষেপ করিয়া কহিলেন, “হায়! আমার জন্য এমন সুন্দর কবর তৈয়ার হইলে মরণ আমার কতই না সুখের হইত।”—ইহার পর তিনি গােরখানদিগের হুকুম লইয়া কবরে নামিয়া শয়ন করিয়া দেখিলেন ইহা তাহার পরিমিত হয় কি না। ঠিক এই সময়ে হজরত জিবরাইল একটা ছেফসহ আসিয়া উহা হজরত মূসার নাকের সম্মুখে ধরিলেন। ইহার ঘ্রাণ লওয়ার পরই দেখিতে দেখিতে একশত তেত্রিশ বৎসর বয়সে, হজরত মুসা আলায়হেস সালাম এন্তেকাল করিলেন। ফেরেশতাগণ যথারীতি জানাজা শেষ করিয়া সেই কবরেই তঁাহার লাশ দফন করিলেন ।* হজরত মােহাম্মদ মোস্তাফা সাল্লালাহু আলায়হে-সালাম বলিয়াছেন যে ফেরেশতাগণ হবত মূসার জানাজা শেষ করিয়া কথিত কবরেই তাহাকে দক্ষন করেন। হজরত মূসার কবর বয়তুল মুকাদ্দসের গৃহের এক কোণে খুবই নিকটে অবস্থিত। হজরত মোহাম্মদ নিশ্চয়ই এই কবর দেখাইতে পারিতেন কিন্তু আল্লাহ তাআলার হুকুম না থাকায়, তিনি তা করেন নাই।-মেশকাত শরীফ। সমাপ্ত

No text on this page.

কাজ যেখানে হিমালয় প্রমাণ, সেখানে কথার আলো জ্বালাইবার প্রয়ােজন নাই। বাহির হইয়াছে ! বাহির হইয়াছে !! একটা নতুন চেতনা, একটা নতুন প্রেরণা, একটা নতুন ভঙ্গিমা আর বর্তমানের হুবহু চিত্ৰ-বৰ্তমান সমস্যায় মুসলমানের মুক্তির দিশা বুকে করিয়া বাঙ্গালার দিশেহারা সুপ্ত মুসলিম সমাজকে জাগাইতে ইস্রাফীলের শিক্ষা নিয়া আপনাদের চিরপরিচিত বাঙ্গালার একমাত্র মুসলিম ঐতিহাসিক ও নাট্যকার আলি আকবর খান, বি-এ সাহেবের যুগান্তরকারী ঐতিহাসিক পঞ্চাঙ্ক নাটক বাব শাহ ‘বাবর শাহ’র পরিচয় দিবে বাবর শাহ। হিন্দুস্থানে মুঘল-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা, ইসলামের বিজয় বৈজয়ন্তীর বিরাট কীৰ্ত্তিস্তম্ভ, পুরুষকারের আদর্শ, এসিয়ার মনীষী, ষােড়শ শতাব্দীর রণদেবতা, অধ্যবসায়ে মূর্ত- বিকাশ, মুসলিম প্রতিভার দীপ্ত সূৰ্য্য, ইসলামের মূর্ত-প্রেরণা, জীবন- পথের শ্রেষ্ঠ বন্ধু, মুসলিমের ভাবী জাতীয় জীবনের আলোক স্তম্ভ, সেই-পুরুষসিংহ ত্যাগী মনস্বী মুঘল-বীর বাবরের জীবনের রােমাঞ্চকর ঘটনা ও বৈচিত্রময় চিত্র। আর বাল্য প্রণয়ের অনল স্মৃতি, জীবনের ব্যর্থতার মাঝে মুক্তির দিশাজাতীয় জাগরণের উদ্দীপনা, স্বদেশ প্রেমের উচ্ছাস, হিন্দু-মুসলিম-মিলনের ব্যর্থ প্রয়াস-নন-কো-অপারেশনের ব্যর্থতা হিন্দু-মুসলিমে বিচ্ছেদ, ইস্লামের বিশ্বমানবতার মাঝে মুসলিমের মুক্তি। ভাবে ভাষায়, নাটকীয় ভঙ্গিমায়, ঘটনা বৈচিত্র্যে, চরিত্র সৃষ্টিতে ও বার্তালাপে চূড়ান্ত-অপূৰ্ব আর উজ্জলে-মধুরে।

বর্তমান সমস্যায় জাতীয় জীবনের সন্ধিক্ষণে পথ-হারা হলে মুসলমানের আজ চলবে না। চৌদিক থেকে দুশমনের হামলার মুখে মুসলমানকে মানুষের মত সরল-সােজা উচু মাথা করে, আত্মার অসীম বিশ্বাস আর সহিষ্ণুতার বর্ম পরে, শ্রান্তিহীন গতির মাঝে, আপনাকে লাভ করূবার জন্য আজ “তুমি জাগাে” রবে দাঁড়াতে হবে। তবে না মুসলিমের পায়ে দুশমনের শির লুটিয়ে পড়বে—তবে না বিস্মিত আতঙ্কে মুসলিমের দিকে দুশমন চেয়ে থাকবে।-তবে না ইস্লামের বিজয়-শিঙ্গা আবার ঘণ রােলে বেজে উঠবে—তবে না এ-দেশ আবার বুঝবে ইসলামের সার্থকতা কোথায় ?—বাঙ্গালার দিশেহারা সুপ্ত মুসলিমকে জাগাতে আজ আমাদের মাঝে চাই সিক্রির রণক্ষেত্রে হিন্দুর দর্প চূর্ণকারী সেই পুরুষ সিংহ বাবরের কর্মময় জীবনের ইঙ্গিত—বাবরের আত্মার বল, সহিষ্ণুতা, পৌরষ আর জল-জেন্ত মূৰ্ত প্রেরণা।-এতখানি নিয়ে ‘বাবর শাহ’ আজ মুসলিম বাঙ্গালার দুয়ারে ডাক দিয়েছে। সবাই বাবর শাহ’কে বরণ করে নিয়ে জীবনপথে অগ্রসর হউন—জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বাসী বন্ধুরূপে ‘বাবর শাহ মুসলিমের জাতীয় জীবনের আলােক স্তম্ভের কাজ করে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। হিন্দু নাট্যকার-হিন্দু ঔপন্যাসিক সবাই একজোট হয়ে এতকাল থেকে আঘাতের পথ আঘাত দিয়া বাঙ্গালার মুসলমানের প্রাণে কত না ক্ষত তৈরী করে আসছে।—আর কত না তৈরী কৰ্বার আয়ােজন করছে। সেই-ক্ষত মুছায়ে, হিন্দু নাট্যকার ও ঔপন্যাসিকের শতাব্দীব্যাপী পুঞ্জিভুত বেদনার জলা জুড়াইতে হইলে ‘বাবর-শাহ পড়ুন-ভাবুন–অরি ভবিষ্যতের জন্য হুশিয়ার হউন। মনে রাখবেন দীন ইসলাম আনার আর আপনি দীন ইসলামের। বাবর শাহ এই দীনের সম্পদ। দীনের সম্পদের জন্য দেড় টাকা বেশী কিছু নয়।

( ৩ )
সেইবর শা’র বুকের উজ্জ্বল রত্ন-পুত্র হুমায়ুনের দুর্ভাগ্যময় জীবন-মৃতি
হুমায়ুনের আত্মজীবনী
সমসাময়িক মুসলিম ভারতের কথা তজ-কেরাতুল-ভকীয়াতের
বাঙ্গালা অনুবাদ। দাম পাঁচ সিকা।
সেই হুমায়ুনের জীবনের এক অপূর্ব অধ্যায়—মহত্বের বিরাট কীৰ্ত্তি স্তম্ভ
ভিশ তিবাদশাহ,
নাটক—অদ্ভুত অপূর্ব অথচ জীবন্ত ঐতিহাসিক সত্য। দাম আট আনা।
ভুইয়ার মসনদ
নাটক—বাঙ্গালায় মুসলিম বীর্যের অপূর্ব অবদান। বাঙ্গালার বড়
ভুইয়া বাঙ্গালী বীর ইসা খাঁর জীবনের রোমাঞ্চকর কাহিনী
স্বদেশ-স্বজাতী প্রেমের পাকা সােনায় তৈরি।
বােগদাদী কথা
নামেই পুস্তকের পরিচয়। হাসির হরর-আনলের ফোয়ারা।
দাম দশ আনা।
খান সাহেবের প্রতিভার শ্রেষ্ঠ অবদান—জীবনব্যাপী কঠোর সাধনার
ফল-দীনের সম্পদ
দীনিম্নত শিক্ষা
নমাজ-মােজা, দোয়া-দরূদ, মসলা-মাসায়েল ও আর আর দীনিয়াত
শিক্ষা বিষয়ক শুধু হৃষ্ট-স্নিগ্ধ-সুন্দর-বিশুদ্ধ কিতাব।
দাম সাত অনা।
ভারতের ইতিহাসে অসাধারণ গবেষণার শ্রেষ্ঠ অবদান
হিন্দুস্থানের ইতিহাস
নিখুত-খাটী-লজেন্তু সত্য ও নির্ভীক ইতিহাস।

( ৪ ) তাৱপর- মুসলিম মহিলা সাহিত্যিক নার্গিস আসার খানম সাহেবার অগ্নিময়ী লেখনী প্রসূত উপন্যাসের উজ্জ্বল মরকত-মণি-আর্টের চূড়ান্ত তহমিনা মেয়েদের হাতে নিঃসঙ্কোচে দিবার মত উপহার—মেয়েদের প্রাণের জিনিস। দেশ প্রেমের পাকা সােনায় তৈরি। অপূর্ব সৃষ্টি আর নারী জীবনের দুঃখ-জাগানিয়া অশ্রুময় করুণ কাহিনী। নারীত্বের গৌরব সমুজ্জ্বল ইতিহাস। পড়িতে পড়িতে আপন-হারা হইবেন—তহমিনার দুঃখে পাষাণ-চাপে-বাধা বুকে বেদনা জাগিবে, রুক্ষ চোখেও অশ্রু ঝরিৰে। আজো কত জনম দুঃখিনীর মরমের ব্যথা তহমিনার দীর্ঘ নিশ্বাসে মিশিয়া যায়। তাই গ্রন্থ কী তহমিনার দুঃখে হৃদয়ের ঝরা অশ্রু মিশাইয়া বড় বেদনায় লিখেছেন—তােমরা যে কেহ তহমিনার দুঃখজাগানিয়া কাহিনী পড়বে তার দুঃখে দু'ফোটা অশ্রু ফেলে যে- তাতেও যদি জনম দুঃখিনী তহমিনার সান্ত্বনা হয়।—আর তার মত দুঃখিনী কখনাে কাহারাে নজরে পড়ে, তাকে মানুষের চোখ দিয়ে দেশে যেন। দাম চৌদ্দ আনা। প্রাপ্তিস্থান- মৌলভী আলতাফ আলি খান ভারতী লাইব্রেরী বাঙ্গালাবাজার কা

No text on this page.

( ৪ ) তারপর মুসলিম মহিলা সাহিত্যিক নার্গিস আসার খানম সাহেবার অগ্নিময়ী লেখনী প্রসূত উপন্যাসের উজ্জ্বল মরকত-মণি-আর্টের চূড়ান্ত তহমিনা মেয়েদের হাতে নিঃসঙ্কোচে দিবার মত উপহার—মেয়েদের প্রাণের জিনিস। দেশ প্রেমের পাকা সােনায় তৈরি। অপূর্ব সৃষ্টি আর নারী জীবনের দুঃখ-জাগানিয়া অশ্রুময় করুণ কাহিনী। নারীত্বের গৌরব সমুজ্জ্বল ইতিহাস। পড়িতে পড়িতে আপন-হারা হইবেন—তহমিনার দুঃখে পাষাণ-চাপে-বাধা বুকে বেদনা জাগিবে, রুক্ষ চোখেও অশ্রু ঝরিৰে। আজো কত জনম দুখিনীর মরমের ব্যথা তহমিনার দীর্ঘ নিশ্বাসে মিশিয়া যায়। তাই গ্রন্থকী তহমিনার দুঃখে হৃদয়ের ঝরা অশ্রু মিশাইয়া বড় বেদনায় লিখেছেন—তােমরা যে কেহ তহমিনার দুঃখ-জাগানিয়া কাহিনী পড়বে তার দুঃখে দু'ফোটা অশ্রু ফেলে যে তাতেও যদি জনম দুঃখিনী তহমিনার সান্ত্বনা হয়। আর তার মত দুঃখিনী কখনাে কাহারাে নজরে পড়ে, তাকে মানুষের চোখ দিয়ে দেশে যেন। দাম চৌদ্দ আনা। প্রাপ্তিস্থান- মৌলভী আলফ আলি খান ভারতী লাইব্রেরী বাঙ্গালাবাজার এক

No text on this page.

Hajrat Musa Ed. 1st

Author
Wase, Abu Ahamed Abdul
Title
Hajrat Musa Ed. 1st
File name
Hajrat Musa Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1927
Published
2010/02/15
Publisher
Bharati Library, Dhaka
Language
Sanskrit
Pages
102
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Wase, Abu Ahamed Abdul
DLI number
511084
Barcode
4990010018264.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
DpsTBknaH4M
Download PDF

Hajrat Musa Ed. 1st