Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Swarger Jyoti
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
গভর্ণমেন্ট কর্তৃক লাইব্রেরী ও প্রাইজবুকের
জন্য মনােনীত।
স্বর্গের জ্যোতি
মিসেস্ সারা তয়ফুর
প্রণীত।
Fourth Edition.
i930
Rights Reserved.
মূল্য ১০ টাকা।
No text on this page.
স্বর্গের জ্যোতি
No text on this page.
উপক্রমণিকা। ; যাঁহার অসীম কৃপায় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিচালিত, যাহার অপার করুণায় সমগ্র প্রাণিজগৎ প্রতিপালিত ; প্রত্যেক নিশ্বাস প্রশ্বাসের ক্ষমতা প্রদান হেতু যে প্রভুর কৃতজ্ঞতা রাশি সারাটি জীবন গাহিয়া বেড়াইলেও অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায় ; যাহার মেহ চক্ষে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, দুর্বল- সবলের কিছুমাত্র পার্থক্য নাই; প্রাণিজগতের কল্যাণ কামনায় যিনি অহর্নিশ রত; যিনি তাঁহার দরবারে অভিযুক্ত ঘাের কৃতঘ্ন বিদ্রোহীকেও ক্ষমা বিতরণ দ্বারা বারম্বার অনুতাপ ও সংশােধনের সুযােগ প্রদান করিতেছেন; যাহার আহার নাই, নিদ্ৰা নাই, শ্রান্তি নাই,বিশ্রাম নাই মিনি সুতীক্ষ্ণ ও সতর্ক চালকের ন্যায় তাহার স্বর্গ-মর্তের বিশাল সাম্রাজ্যকে অনবরত্ব’ ম ( ৩ ) গভীর কৌশলে পরিচালনা করিতেছেন; পৃথিবীর প্রাচীর ও তােরণ গাত্রে যাহার অক্ষয় গৌরব ও অবিনশ্বর বিজয় বাণী উজ্জ্বল অক্ষরে অঙ্কিত ; যিনি সামান্য ইঙ্গিতে ধূমবর্ণ মেঘমালাকে স্বচ্ছ সলিল ধারায় প্রবাহিত করাইয়া উদ্ভিদ জগৎকে সঞ্জীবিত করতঃ তাহাতে মানবজাতির হিতার্থে স্তরে স্তরে সজ্জিত শ্যামল শস্যরাজি উৎপাদন করিয়াছেন, যিনি পৃথিবীর উদ্যানে বিচিত্র পল্লবশশাভিত ঘনসন্নিবিষ্ট তরু- লতা-গুল্মদি উৎপাদন করিয়া তাহাতে দোদুল্যমান দ্রাক্ষা, কমলা, সেব, আনার, খর্জুর, আম্র প্রভৃতি সুবর্ণ ও সুস্বাদু ফল সজ্জিত করিয়াছেন; কাননে কাননে মনােহর সুরভি কুসুমরাজি, বিহঙ্গম ও পতঙ্গের বিচিত্র পক্ষাবলী যে অদ্বিতীয় শিল্পীর কারুকার্যের নিদর্শন ; বুলবুল ও পাপিয়া সুললিত মধুর তানে যে প্রেমময়ের মহিমাগান গাহিয়া জগৎ বিমােহিত করিতেছে ; যে অতুলনীয় সৌধশিল্পী ও বৈজ্ঞানিকের অগাধ ক্ষমতার নিকট পৃথিবীর যাবতীয় অনুকরণ শক্তি, হীন, দুর্বল ও নিস্তেজ ; যাহার রােষ কটাক্ষে এই বিশ্বজগৎ মুহূৰ্ত্ত মধ্যে ভস্মসাৎ হইয়া এক অঙ্গার স্তুপে পরিণত হইতে পারে ; যিনি মানবজাতিকে জ্ঞানরত্নে বিভূ যত করিয়া তাহাতে অহিত হইতে হিত বাছিয়া-কমার শক্তি প্রদান করতঃ তাহাকে সমগ্র প্রাণিজণতের উপর প্রাধান্য প্রদান করিয়া, ‘আশ- ;
; ( ৩ ) রফু-উ-মখলুকাত' (জীবশ্রেষ্ঠ) রূপে সৃজন করিয়াছেন; যাহার জ্ঞান নিঝরিণীর একটি ক্ষুদ্র প্রবাহ ধরিয়া মানব- জাতি সদাই উন্নতির মার্গে ধাবিত ও যাহার অশেষ অনুগ্রহ রাশি হইতে হিত সঞ্চয় করিবার জন্য তাহাতে প্রবল আকাঙক্ষা উদ্দীপিত করিয়াছেন; সেই প্রেমময় বিশ্বপালক, সেই করুণাময়, অনুকম্পাশীল, অনাদি, অনন্ত, এক ও শরিকশূন্য, নিরাকার চৈতন্যস্বরূপ ‘রব্বেল আলমীনের স্তুতিগানে আমার এই কৃতজ্ঞতার ভারবাহী শির মৃত্তিকায় স্থাপন করিতেছি। তৎপর সেই বিশ্বপালকের আজ্ঞাবহ শেষ প্রেরিত মহাপুরুষ মােহাম্মদ (দঃ) যিনি মানবজাতিকে আত্মার পবিত্রতা ও কল্যাণ সাধন এবং সভ্যতা ও সদাচারের সরল পথ দেখাইবার জন্য সৃজনকর্তার অনুজ্ঞাবাণী কোরাণপাক- রূপ অমূল্যরত্ন প্রদান করিয়াছেন; যিনি নিজে সেই সকল সদনুষ্ঠানের মূর্তিমান আদর্শরূপে মানবজাতিকে তাঁহার পবিত্র পদাঙ্কের অনুসরণ করিতে আদেশ করিয়া গিয়াছেন এই পুস্তিকা যে নরকুলােত্তম মহাজনের অসাধারণ গুণ- কীৰ্ত্তনের একটি নিস্তেজ চেষ্টা মাত্র ; কোরাণপাক যাহার ভূয়সী গুণরাশির সাক্ষ্য দিতেছের প্রতি অসংখ্য দরূদ ও সালাম প্রেরণ করিতেছি। •• ( ৩ ) আমাদের দেশের কোন কোন মুসলমান ভ্রাতা বঙ্গ- ভাষায় হজরত মোহাম্মদের জীবনী লিখিয়া বাঙ্গালার মুসল- মান সমাজের বিশেষ উপকার সাধন করিয়াছেন, তজ্জন্য তাহারা সমাজের নিকট ধন্যবাদাহ। কয়েকজন হিন্দু মহােদয়ও হজরতের জীবনী লিখিয়া তাহাদের মহৎ অন্তঃ করণের পরিচয় দিয়াছেন। তাহারা বেশ বুঝিতে পারিয়া- ছেন যে হজরতের নিষ্কাম চরিত্রের আদশ শুধু তাঁহার অনুগামী সম্প্রদায়েরই নিজস্ব নহে, সমগ্র মানবজাতিই তাহার উদাহরণ দৃষ্টে আত্মার উন্নতি ও জীবনের উৎকর্ষ সাধনে অধিকারী। আমার এই পুস্তিকাখানি উক্ত মহােদয়- গণের সহিত সাহিত্যিক প্রতিযােগিতা উদ্দেশ্যে লিখিত হয় নাই। হজরতের আদর্শ জীবনের কথা মানব সমক্ষে বিবৃত করিতে চেষ্টা করাও আমাদের ধর্মে পুণ্যকাৰ্য বলিয়া পরিগণিত। সেই উদ্দেশ্যের বশবর্তী হইয়াই আমি এই ক্ষুদ্র পুস্তকে হজরতের জীবনের ঘটনাবলী অতি সংক্ষেপে বিবৃত করিয়া আমাদের দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার সম্মুখে ধরিতে প্রয়াস পাইয়াছি। এতদ্দেশীয় মুসলমানবৃন্দ প্রায়ই বাঙ্গালাভাষাভিজ্ঞ। আরবী ফার্সিযুক্ত উর্দ, ভাষায় লিখিত হজরতের জীবনকাহিনী তাহারা খুব অল্পই বুঝিতে পারেন। হজরত
(1/০ )
মানব ছিলেন, মানবের রক্তমাংসে তাহার শরীর গঠিত
ছিল, আত্মার পবিত্রতা ও নিস্পাপ চরিত্রগুণে খােদাতালা
তাহাকে নষ্ট ও ভ্ৰমান্ধ জাতির মুক্তি ও উদ্ধারার্থে নবী
নির্বাচিত করিয়াছিলেন। কোরাণ পাকে আছে :-
“( মােহাম্মদ) বল, নিশ্চয় আমিও তােমাদেরই মত
একজন মানুষ ! তােমাদের খােদাতালা এক ও অদ্বিতীয়,
তিনি আমাদ্বারা তােমাদের কাছে এই সুসংবাদ প্রেরণ
করিয়াছেন মাত্র”। * এই কথা এবং হজরতের জীবনের
প্রকৃত উদ্দেশ্য তাহার চরিত্রের অতুলনীয় গুণরাশি সকলের
নিকট বিবৃত করার জন্যই আমার মত ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র জনার
এই প্রয়াস।
বর্ধিত আয়তনের গ্রন্থ ভাবে ও ভাষায় বয়স্থ লােকের
পক্ষে বিশেষ উপভােগের জিনিস হইলেও বালকবালিকাগণ
তাহা পাঠ করিয়া কিছুই বুঝিতে পারে না। আমার এই
ক্ষুদ্র আখ্যায়িকাখানি যাহাতে বালকবালিকাগণ সাদরে গ্রহণ
করিতে পারে, তন্নিমিত্ত ইহার ঘটনাবলী তদুপযােগী করিয়া
বর্ণনা করিতে বিশেষভাবে চেষ্টা করিয়াছি, এবং তাহাদের
চরিত্র গঠন মানসে এই পুস্তিকার উপসংহার ভাগে হজরতের
‘চরিত্র’ শীর্ষক প্রবন্ধ কিছু বিস্তৃতভা লিখিয়াছি।
* কোরাণ পাক ১৮ অরা।
(1 v০ )
যে উদ্দেশ্য লইয়া আমি এই পুস্তক রচনা করিয়াছি
তাহাতে ইহার আয়তন বৃদ্ধি করা আমার অভিপ্রেত নহে,
সেইজন্যই হজরতের জীবনের কোন কোন ঘটনা আমি
ইহাতে উল্লেখ করি নাই। বিশেষতঃ জনাব পয়গম্বর
সাহেবের জীবনের যে সমস্ত ঘটনা অবলম্বনে বিজাতীয়গণ
নির্বুদ্ধিতা ও অজ্ঞতা হেতু তাহার প্রতি অলীক ও
মিথ্যা দোষারােপ প্রয়ােগ করিয়া থাকে, তাহা আমি
ইচ্ছা করিয়াই পরিত্যাগ করিয়াছি। কারণ সেই সমস্ত
বিষয় লইয়া আলােচনা করিতে গেলে ইহার কলেবর অনেক
বৃদ্ধি করিতে হয়। হজরতের জীবনী সম্বন্ধে এই পুস্তিকা-
খানিকে আমি প্রথমােঠরূপে পরিগণিত করিতে প্রয়াস
জানি না আমার শ্রম সার্থক হইয়াছে
পাইয়াছি।
কি না।
আমি আরবী ভাষায় সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞা। সেইজন্য এই
পুস্তক প্রণয়নে নানাবিধ উৰ্দ, পুস্তকের ও কোরাণ পাকের
উর্দ, অনুবাদের সাহায্য লইয়াছি। আমার এক পরম
পূজনীয় হিতাকাঙ্ক্ষী মহদয়ের সহায়তায় কোন কোন
ইংরাজী গ্রন্থের সাহায্যও আমাকে লইতে হইয়াছে। স্থানে
স্থানে যে আরবী
ও উর্দ, কবিতা সংযােগ করিয়াছি
তাহার অধিকাংশই উর্দ পুস্তকের অনুসরণ মাত্র।
( ৮০ )
এই ক্ষুদ্র পুস্তিকা আমার বঙ্গসাহিত্যে প্রথম প্রয়াস
মাত্র। সুতরাং অনেক স্থলে আমার ভ্রমপ্রমাদ হওয়াই
খুব সম্ভব। সহৃদয় পাঠকগণ যদি আমাকে তাহা নির্দেশ
করিয়া দেন, তবে পরম কৃতার্থ হইব এবং ভবিষ্যতে
সংশােধনে যত্নবান হইব ।
আমার এই পুস্তিকা প্রণয়নে ভূতপূর্ব নব-নূর
পত্রিকা সম্পাদক বঙ্গভাষাবি শ্রদ্ধাস্পদ মৌলবী সৈয়দ
এন্দাদ আলি সাহেব আমাকে অনেক সাহায্য করিয়াছেন
এবং তাঁহার নিকট হইতে আমি যে অকৃত্রিম সহানুভূতি
লাভ করিয়াছি তজ্জন্য আমি তাঁহাকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা
জ্ঞাপন করিতেছি।
আমার অনুজোপম কনিষ্ঠ দেবর মৌলবী সৈয়দ
আবুল বতুল মােহাম্মদ নুরুল হক ‘তালা ওহু’ (দীর্ঘ
জীবেষু) যে বহুবিধ ঐতিহাসিক উদ্দগ্রন্থ দ্বারা সাহায্য
করতঃ আমার উৎসাহ বর্ধন করিয়াছে, তজ্জন্য তাহাকে
আমার আন্তরিক ধন্যবাদ প্রদান করিতেছি।
‘ফ্লোরাহাউস, বরিশাল।
১লা অক্টোবর, ১৯১৬।
}
(মিসেস) সারা তয়ফুর।
চতুর্থ সংস্করণ
সে আজ চৌদ্দ বছরের কথা – আমার বরিশালের বাড়ীতে
ব’সে স্বর্গের জ্যোতির’ Finishing touch দেই। আমার মনে
আছে বইখানা এক মাস সতর দিনে লিখে সারা করেছিলাম।
আজ তা ভাবলেও অসম্ভব মনে হয়। তখন মাসিক পত্রিকায়
প্রায়ই প্রবন্ধ লিখতাম্। সে সময় উৎসাহ ছিল, উদ্যম ছিল ।
লিখবার সখ ছিল—এখন সব গেছে। তারপর অনেক বার মনে
ক'রেছি বইখানার এবারত আরও কিছু বাড়াব ও ভাষা একটুক
সহজ করিব। সে জন্য অনেক বইও ঘাটিয়াছি। কিন্তু বার বার
পীড়ায় এমন দুর্বল হয়ে পড়েছি ( কয়েকবার মরুতে মরুতে
বেচেছি )বে এক ছতর লিখতেও ইচ্ছা করে না। মস্তিষ্ক দুর্বল
দু’মিনিট ভাবলেও হয়রান হয়ে পড়ি। এ ছাড়া সাংসারিক
আবল্য এবং আমার দুনিয়ার ধনরত্ন শিশুগুলির আব্দার ও চেচানী।
মেহেরবান পাঠকগণ, মাফ করবেন। আল্লাহতালা এদের
বাঁচিয়ে রাখলে বড় হয়ে এরা আমার যায়গায় বসে আমাহতে
শতগুণ উৎসাহে লিখনী হাতে নিতে সমর্থ হবে এই আমার
একান্ত বাসনা।
আর একটি কথা। শুনে আমি বড়ই খুসী হয়েছি যে বাংলার
কোন কোন গ্রামের শিক্ষিত যুবকগণ আমার এই বইখানা মিলাদ
শরিফের মহ ফেলে পাঠ করিয়া থাকেন। এতে আমার সম্মান ত
নিশ্চয়ই বেড়েছে। তা ছাড়া সময়ের এই আশ্চৰ্য্য পরিবর্তন দেখে
আমি বড়ই উৎসাহিত হয়েছি। খােদা তালার কাছে তাদের
কল্যাণ কামনা করি।
।
“কওসর হস, ঢাকা।
১৯ অক্টোবর, সন ১৯৩০।
স্বর্গের জ্যোতি প্রথম পরিচ্ছেদ মক্কার ইতিবৃত্ত প্রভাে! আমি তােমার এই পবিত্র গৃহের নিকটে এই বিজন উপত্যকায় আমার বংশধরকে রাখিয়া গেলাম। হে দয়াময়, যেন ইহারা এথায় তােমার উপাসনায় রত থাকে। তুমি মানব- হৃদয়কে তাহাদের প্রতি আকৃষ্ট করিও এবং নানা দেশের উৎপন্ন- জাত হইতে তাহাদের আহাৰ্য্য যােগাইও, যেন তাহারা তােমার অনুগ্ৰহ রাশির জন্য চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকে। (কোরাণ পাক, সুরা এব্রাহীম) And as for Ishmael, I have heard thee ; Behold, I have blessed him, and will make him fruitful, and will multiply him exceeding twelve princes shall he beget, and I will make him a ğ eat nation. -(Gen, xviII-20).
স্বর্গের জ্যোতি
এসিয়ার পশ্চিম প্রান্তে আরব দেশ অবস্থিত। ইহার
দক্ষিণে আরব সাগর, পূর্বে ওমান ও পারস্য উপসাগর,
পশ্চিমে লােহিত সমুদ্র এবং উত্তরে শাম (সিরিয়া) ও এক
(মেসােপটামিয়া) প্রদেশ। আরবের মধ্যস্থিত বিস্তীর্ণ
ভূখণ্ড এক বিশাল মরুভূমি। এই দেশ উরুজ, এয়ামেন,
তাহামা, নজদ এবং হেজাজ প্রভৃতি পাঁচটি প্রদেশে বিভক্ত।
এই হেজাজ প্রদেশে লােহিত সমুদ্রের প্রধান বন্দর জেদ্দা
হইতে কিছু পূর্বদিকে গিরিমালা বেষ্টিত এক সমতল ভূমে
মহা-পুণ্যধাম মক্কা নগরী অবস্থিত। এই নগরে দাঁড়াইয়া
চতুর্দিকে দৃষ্টি সঞ্চালন করিলে বােধ হয় যেন প্রকৃতি ইহার
প্রহরী স্বরূপ গিরিময় দুর্গগুলি পরিবেষ্টন করিয়া দণ্ডায়মান
রহিয়াছে। এই নগরেই পবিত্র কাবাগৃহ বিরাজিত এবং
এই নগরই এস্লাম-ধৰ্ম্ম প্রতিষ্ঠাতা হজরত মােহম্মদের
জন্মভূমি। প্রভু মােহাম্মদের জন্মের বহুপূর্ব হইতে এই
স্থানের অধিবাসিগণ ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ে গঠিত ছিল। তাহারা
আজীবন এক সম্প্রদায় অপর সম্প্রদায়ের সহিত দ্বন্দ্ব ও
বিবাদে লিপ্ত থাকিত। সামান্য সামান্য কারণে ও ঈষৎ
উত্তেজনার বশবর্তী হইয়া অহরহঃ পরস্পর পরস্পরের
শশাণিত-পিপাসু হইত এবং বিদ্বেষাগ্নি হৃদয়ে পােষণ করিয়া
২
স্বর্গের জ্যোতিঃ বুংশানুক্রমে প্রতিহিংসা উদ্ধারে সচেষ্ট থাকিত। সুনীতি ও সভ্যতা তাহাদের নিকট সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। তাহাদের অনেকেই কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্রই বধ করিত। তাহাদের মধ্যে পরিণয়ের পবিত্র বন্ধন কোন নিয়মের বশবর্তী ছিল না, সকলে যথেচ্ছা নারী গ্রহণ করিত। সুরাপান, জুয়াখেলা, চৌর্যবৃত্তি, প্রবঞ্চনা ইত্যাদি যাবতীয় সুনীতি বিগর্হিত কাৰ্য তাহাদের প্রকৃতিগত ধৰ্ম্মমধ্যে পরিগণিত ছিল। মৃত ও গলিত পশ্বাদির মাংস তাহাদের সুস্বাদু খাদ্য ছিল। তথাকার অধিবাসিগণ অধিকাংশই পৌত্তলিক ছিল। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের পূজার জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রতিমূর্তি নির্দিষ্ট থাকিত। আবার সমগ্র আরবীয় সম্প্রদায়ের উপাসনার্থে পবিত্র কাবাগৃহে বৎসরের ৩৬০ দিবসের প্রত্যেক দিনের উপাসনার জন্য স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র পুত্ত- লিকা প্রতিষ্ঠিত ছিল। তন্মধ্যে প্রধান কয়েকটি প্রতিমা, হােবল, ওযু, লাত, মনাত ইত্যাদি নামে অভিহিত হইত। এদ্ব্যতীত কোন কোন সম্প্রদায় গ্রহ নক্ষত্রের উপাসনা করিত। ইহারা ‘সাবেঈন’ নামে ইতিহাসে পরিচিত। এখন যেখানে কাবাগৃহ অবস্থিত, তাহার অদূরেই হজরত এব্রাহীম, তাঁহার দ্বিতীয় পত্নী বিবি হাজকে, শিশুপুত্র
স্বর্গের জ্যোতিঃ
ওEে
হজরত এমাইলসহ, এক বিজন উৎস সন্নিকটে নির্বাসিত
করিয়াছিলেন। বহুকাল পর সেই
কাবাগৃহ, যম যম্
কূপ ও কৃষ্ণ প্রস্তর। প্রস্রবণ শুষ্ক হইয়া গেলে পয়গম্বর
সাহেবের পিতামহ হজরত আবদুল মােত্তালেব উহা সংস্কার
করাইয়া একটি বৃহৎ কুপাকারে পরিণত করেন। সেই
পূতপয়স্বানই আজ পর্যন্ত যম্ যম্ কূপ নামে পরিচিত।
হজরত ঈসার জন্মের আঠার শত বৎসর পূর্বে হজরত
এব্রাহীম হজরত এস্মাইলকে সহ এই স্থানে সর্বশক্তিমান
একমাত্র আল্লাহতালার উপাসনা মানসে যে গৃহ নির্মাণ
করেন, তাহাই পরবর্তীকালে পবিত্র কাবাগৃহ নামে জগতে
সুপরিচিত হইয়াছে। বায়ততাল্লাহ, শরিফের খােদাতালার
পবিত্র গৃহ) দক্ষিণ-পূর্বকোণে যে কৃষ্ণপ্রস্তরখণ্ড প্রতিষ্ঠিত
আছে, আরবী ভাষায় তাহাকে ‘হাজরে আওয়াদ কহে।
* ইহা সৰ্ববাদী সম্মত ও ঐতিহাসিক ভিত্তিমূলে সপ্রমাণিত যে কাবাগৃহ
হইতে অধিকতর প্রাচীন কোন উপাসনা গৃহ কোন কালেই পৃথিবীতে বিদ্যমান
ছিল না। নরপিতা হজরত আদম একমাত্র আল্লাহতালার উপাসনার্থে সর্বপ্রথম
এই পবিত্ৰগৃহ নির্মাণ করেন। পরে হজরত নূহের আমলে তাহা বন্যার জলপ্লা
বনে বিনষ্ট হইলে, হজরত এব্রাহীম সেই ভিত্তির উপরেই বর্তমান কাবাগৃহ নির্মাণ
হজরত মোহাম্মদের পরেও উহা দুই একবার অতিরিক্ত জল প্রবাহ
ইত্যাদি কারণে কিঞ্চিৎ বিনষ্ট হইয়া পুনঃ সংস্কৃত হইয়াছে।
করেন।
৪
স্বর্গের জ্যোতিঃ
হাজিগণ ‘বয়তােল্লাহ’ (কাবাগৃহ) প্রদক্ষিণকালে এই
প্রস্তরখণ্ড স্পর্শ করতঃ সসম্ভ্রমে হস্তচুম্বন করিয়া থাকেন।
অতীতকালের অনন্ত সাগরে অনেক কিছুই বিলীন হইয়াছে,
কিন্তু কি মহান স্মৃতি বুকে মাখিয়া এই প্রাচীন পাষাণখণ্ড
এখনও বিদ্যমান রহিয়াছে ! একদিন হজরত এব্রাহীম,
হজরত এসমাইল, হজরত মুসা এবং হজরত মোহাম্মদের
ন্যায় নবিগণের পবিত্র করও ইহাতে স্পষ্ট হইয়াছিল।
কালচক্রের পরিবর্তনে সর্বশক্তিমান নিরাকার খােদাতালার
এই পবিত্র গৃহ অসংখ্য নির্বাক নিঃশক্তি পুত্তলিকারাশিতে
পরিপূর্ণ হইয়া দেবতা মন্দিরে পরিণত হয়। কিন্তু খােদা-
তালার ইচ্ছা অন্যরূপ ছিল, তাই আজ এই পবিত্ৰগৃহ পুরা-
কালের আশ্চৰ্য্য স্মৃতি বুকে করিয়া স্বর্গমৰ্ত্তের একমাত্র
অধীশ্বর পরম করুণাময় আল্লাহ তালার গৌরব ও বিজয়
ঘােষণা করতঃ এসলাম জগতের অসংখ্য নরনারীকে বৎসরে
একবার মহাপুণ্য হজতীর্থে আহ্বান করিতেছে।
এই স্থানের আদিম অধিবাসিগণ হজরত এমাইলের
বংশােদ্ভব বলিয়া ইতিহাসে পরিচিত।
কোরেশ ও বণিহাশেম।
মক্কাতে হজরত এসমাইলের বংশােব
যাবতীয় সম্প্রদায় মধ্যে কোরেশগণ তাহার অকৃত্রিম সাক্ষাৎ
স্বর্গের জ্যোতিঃ বংশধর বলিয়া বিশেষ ভক্তি ও শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। ইতিহাসের অনুসরণ করিয়া আমরা জানিতে পারি যে হজরত এসমাইল হইতে একাদিক্রমে একসপ্ততি নিনুতন পুরুষে হজরত মােহাম্মদের জন্ম হয়। প্রভু মােহাম্মদের একাদশ ঊর্ধ্বতন পুরুষের নাম ‘ফেহর’ ছিল, ইহারই চলিত নাম কোরেশ । ইহার বংশধরগণ মক্কায় প্রসার লাভ করিয়া ‘আহলে কোরেশ’ নামে বিখ্যাত হইয়াছেন। পূর্ব- কাল হইতেই নিয়ম ছিল, মক্কার যেসম্প্রদায়ের লােক অতীব নিষ্ঠাবান ও বংশমর্যাদায় শ্রেষ্ঠ, তাহাদেরই দলপতির উপর কাবাগৃহের রক্ষণাবেক্ষণের ভার ন্যস্ত হইবে। তদনুযায়ী কোরেশবংশের প্রতি কাবার পরিচৰ্য্যাভার অর্পিত ছিল। এই বংশের মধ্যে যিনি জ্ঞানে, ধৰ্ম্মে ও চরিত্রে প্রধান হইতেন, তাহারই কাছে কাবাগৃহের চাবি থাকিত। তিনি ‘সৈয়দ * কোরেশ অর্থ বণিক। ফেহর দ্বারা মক্কার বাণিজ্যের বিশেষ উন্নতি সাধিত হয় বলিয়া ইনি “কোরেশ” নামে আখ্যাত হন। ফেহর হইতে হজরত মােহা- স্মদের নিম্নতম পুরুষের নাম নিয়ে প্রদত্ত হইল—ফেহর, গালিব, লওয়ী, মােরা, কেলাব, কোসে, দামনাফ, হাশেম, আবদুল মােত্তালিব, মােহাম্মদ (দঃ)।
স্বর্গের জ্যোতিঃ Co নামে অভিহিত হইতেন এবং কাবাগৃহের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক বলিয়া লােকে তাহাকে ‘শরিফ’ বলিয়া সম্মান করিত। হজরতের প্রপিতামহ হজরত আবদুল মােত্তালেবের পিতার নাম হাশেম ছিল। কোরেশ বংশীয়গণ যখন লােক- সংখ্যার আধিক্য হেতু মক্কার চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িলেন, তখন কাবাগৃহের তত্ত্বাবধানভার হজরত হাশেমের প্রতি অর্পিত হয়। ইহারই নামানুসারে ‘রসুলে করিমের’ বংশ ‘বনি হাশেম’ নামে অভিহিত হইয়াছে। হজরতের জন্ম সময়ে কাবাগৃহের রক্ষণাবেক্ষণরূপ শ্লাঘাপূর্ণ কাৰ্যভার তাঁহার পিতামহ হজরত আবদুল মােত্তালেবের হস্তে ছিল। তাহার পুত্রগণমধ্যে আবু লহব (আবদুল ওজ্জা), আবু তালেব, আবদুল্লাহ, আব্বাস, ও (আমীর) হাজার নাম ইতিহাস পাঠকের নিকট সুপরিচিত। হজরত আবদুল মােত্তালেবের কর্তৃত্বকালে এয়ামেনের খৃষ্টান শাসনকর্তা আব্রাহাতুল আশরম পবিত্র কাবাগৃহ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এক বিরাটবাহিনী সহ মক্কা আক্রমণে অগ্রসর হয়। কিন্তু অাক্রমণ উদ্যোগ। সর্বশক্তিমান ‘আল্লাহ পাকের কি প্রভূত ক্ষমতা ! আব্রাহা মক্কার নিকটবর্তীলে আবাবীল’ আব্রাহার মক্কা ৭ স্বর্গের জ্যোতিঃ Seo নামক অসংখ্যক্ষুদ্র পক্ষিশ্রেণী মেঘের ন্যায় শত্রুর মস্তকোপরি উড্ডীয়মান থাকিয়া চক্ষু হইতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করতঃ তাহাদের নিধন করিতে থাকে। তখন আব্রাহা হতাবশিষ্ট সৈন্যসহ ব্যতিব্যস্ত হইয়া পলায়ন করে। আব্রাহার সহিত এক বিরাটকায় হস্তী ছিল, আরববাসীর নিকট ইহা এক অভিনব জন্তু বলিয়া পরিগণিত হওয়ায় এই শত্রুদল ‘আসহাবে-ফীল (হস্তীর সহচরগণ) নামে খ্যাত হইয়াছে। মক্কার ইতিহাসে এই ঘটনাটি এতই প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল যে এই সময় হইতেই এক নব- বর্ষের গণনা আরম্ভ হয়। পয়গম্বর সাহেবের হেজরতের পূর্ব পর্যন্ত এই বর্ষই প্রচলিত ছিল। কোরাণপাকে সুরা ফীলে’ এই ঘটনার বিশেষ উল্লেখ আছে। সমগ্র আরব দেশযখন এইরূপ ঘাের মূখ তা ও কুসংস্কারের চরম সীমায় উপনীত হইয়া পতনােম্মুখ ঘন ঘটায় আচ্ছন্ন ছিল, সেই সময় হজরত আবদুল্লার ঔরসে জন্ম-১২ রবিউল আউয়ল, আগষ্ট ৫৭• ও যােহরী সম্প্রদায়ের ওহব তনয়া বিবি আমেনার গর্ভে ১২ রবিয়ল আউয়ল ঊষা- গমে সেই ঘনজাল ভেদ করিয়া জনাব আফতাবে রেসালাৎ সারওয়ারে কায়েৎ আহমদ মােজতবা মােহাম্মদ মােস্তফা খ্রীষ্টাব্দ। ৮
স্বর্গের জ্যোতিঃ
OSE
সাল্লাল্লাহহা আলায়হে ওয়া সাল্লাম এই পাপপূর্ণ ধরাধামে
স্বর্গের জ্যোতিঃ বিকীর্ণ করিতে জন্মগ্রহণ করিলেন।
هوئی پہلوے آمنه سے هويدا
ے خلیل و نوید مسیحا
হজরতকে ছয় মাসের গর্ভে রাখিয়া তাহার পিতা, হজরত
আব্দুল্লাহ মানবলীলা সংবরণ করেন। তৎকালে আরবদেশের
সম্রান্ত পরিবারবর্গের প্রথানুযায়ী ধাত্রিগণ সকল
শৈশব।
দায়িত্ব গ্রহণপূর্বক শিশুগণকে তাহাদের
নিজ নিজ তত্ত্বাবধানে নিয়া প্রতিপালন করিত। তদনুসারে
সাদ সম্প্রদায়ভুক্তা ভাগ্যবতী ‘হালিমা’, পিতৃহীন শিশু
মােহাম্মদের (দঃ) সুধা বিনিন্দিত অপরূপ স্বর্গীয় কান্তির
মােহিনী শক্তিতে আকৃষ্ট হইয়া সাগ্রহে তাহার প্রতিপালন
ভার গ্রহণ করিলেন। হজরত প্রায় পাঁচ বৎসর কাল
বিবি হালিমার গৃহে প্রতিপালিত হন। পরে বিবি হালিমা
নির্দিষ্ট কাল শেষ হইলে হজরতকে হার মাতা ও পিতা-
মহের হস্তে সমর্পণ করতঃ যথােচিত পারিতােষিক পাইয়া
গৃহে প্রত্যাগমন করেন। ইহার পর প্রভু মােহাম্মদ, মাতা
* পূর্বোক্ত ফীল সনের প্রথম বর্ষে হজরতের জন্ম হয়। জন্মের যথার্থ তারিখ
সম্বন্ধে মতভেদ আছে, কিন্তু উপরােক্ত তারিখই সর্বত্র প্রচলিত।
স্বদের তে
SOCE
ও পিতামহের স্নেহ-ক্রোড়ে বর্ধিত হইতে লাগিলেন। এই,
সময় হইতেই হজরতের চরিত্রগত অস্বাভাবিক গুণরাশি
দর্শনে সকলে বিস্ময়াপন্ন হইত।
ছয় বৎসর বয়সের সময় এক তুমুল ঝটিকা শিশু
মােহাম্মদের (দঃ) তরুণ হৃদয়টাকে বিক্ষুব্ধ করে। বিবি
আমেনা স্বীয় আত্মীয়গণের সহিত মিলনা-
মাতৃবিয়ােগ।
কাঙক্ষায় শিশুপুত্র মােহাম্মদ (দঃ) সহ ইয়ব
নগরীতে যান। তথায় একমাস কাল অবস্থানপূর্বক মক্কায়
প্রত্যাবর্তন কালে পথিমধ্যে আবওয়া নামক স্থানে অতীব
স্নেহের ধন শিশু মােহাম্মদকে (দঃ) কাঁদাইয়া তিনি অমরধামে
গমন করেন। তাঁহার সঙ্গিনী উম্মে আয়মন (অন্য নাম
বকত) নাম্নী একমাত্র পরিচারিকা এই নিঃসহায় এতীম
বালককে মক্কায় লইয়া আসিয়া তাঁহার পিতামহ হজরত
আবদুল মােত্তালেবের হস্তে সমর্পণ করেন।
হজরত আবদুল মােত্তালেব মাতাপিতৃহীন পৌত্রটিকে
সযত্নে লালন পালন করিয়াছিলেন। বালক
মােহাম্মদ (দঃ) অষ্টমবর্ষে পদার্পণ করিলে আবার
বাল্যকাল ও
যৌৰন।
* মদিনার প্রকৃত নাম ইয়রবু। কি প্রকারে ইহার মদিনা নাম হইল, তাহা
যথাস্থানে বর্ণিত হইবে।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
একটি দারুণ যাতনা তাহার কচি হৃদয়টিকে দলিত করে।
এবার তাহার পৃথিবীর সহায়, পিতামহ হজরত আবদুল
মােত্তালেবও এন্তেকাল’ (পরলােক গমন) করিলেন।
আবদুল মােত্তালেবের ‘ওসিয়’ ( অন্তিমকালীন্ আদেশ
বাক্য) অনুসারে তাহার পুত্র আবু তালেব এই নিঃসহায়
ইলাম-রবির তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন।
বাল্যবয়সে হজরত তাঁহার পিতৃব্য আবুতালেবের মেষ
চরাইতেন। এই সময়ে তিনি মেষপাল মাঠে তাড়াইয়া
দিয়া ধ্যানমগ্ন হইতেন। তাহার শিশুচিত্ত না জানি তখন
কোন্ স্বর্গলােকের সন্ধানে নিযুক্ত থাকিত ?
আবুতালেব বেশ সঙ্গতিপন্ন লােক ছিলেন। সিরিয়া,
এয়ামে, প্রভৃতি স্থানের সহিত প্রায়ই তিনিতেজারতে লিপ্ত
থাকিতেন। বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হজরত প্রায়ই তাহার
পিতৃব্যের সহিত এই সব দেশে গিয়া ব্যবসায় বাণিজ্য শিক্ষা
করিতেন। এই প্রকারে বহু দিন কাটিয়া গেল। ক্রমে
ক্রমে হজরত, সাধুতা ও বাণিজ্যনিপুণতার জন্য মক্কার
সর্বত্র সুপরিচিত হইয়া পড়িলেন। সেই সময়ে মক্কা
নগরে কোরেশবংশীয়া পরমা রূপবতী ও বহু গুণালঙ্কতা
এক বিধবা রমণী ছিলেন, তাহার নাম বিবি খাদায়জা? বিবি
"স্বর্গের জ্যোতিঃ
জE
খােদায়জা ধনাঢ্যা ছিলেন। তিনি হজরতের সাধুতা এবং
বাণিজ্য ব্যবসায়ে দক্ষতার বিষয় অবগত হইয়া তাঁহার প্রতি
বিশেষ আকৃষ্ট হন এবং হজরতের বয়ঃক্রম যখন ২৫ বৎসর,
পরিণয়।
সেই সময় তাহাকে নিজ কার্যে নিযুক্ত
৫৯৫ খ্রঃ। করিয়া বাণিজ্য উপলক্ষে একবার সিরিয়া
প্রেরণ করেন। কথিত আছে তাহার এই বাণিজ্যাভিযান
বিশেষ ফলপ্রসু হইয়াছিল। হজরত অসাধারণ রূপের অধি-
কারী ছিলেন। তাঁহার রূপ, গুণ, ধৰ্ম্মভাব ও কৰ্ম্মকুশলতা
বিবি খােদায়জার গুণগ্রাহী হৃদয়ে ভক্তি ও শ্রদ্ধার উদ্রেক
করিল,—তিনি হজরতের করপ্রার্থিনী হইলেন। যথাকালে
সেই দেশের রীতি অনুসারে শুভ ‘নেকাহ’ (উদ্বাহ) সম্পন্ন
হইলএবং তাহারা পরম দাম্পত্যসুখ-শান্তিতে কালাতিপাত
করিতে লাগিলেন।
বিবি খােদায়জাকে হজরত অত্যন্ত ভালবাসিতেন; তাঁহার
জীবদ্দশায় হজরত অন্য কোনও দার পরিগ্রহ করেন নাই,
এবং আজীবন হজরত, বিবি খােদায়জার প্রগাঢ় প্রণয় হৃদয়ে
* বিবাহকালে তাহার পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত দুই পুত্র ও এক কন্যা বিদ্যমান
ওলামা শিবলি লিখিয়াছেন যে পাঁচশত সুবর্ণ দেহম মােহ রানা
ধাৰ্যে হজরতের সহিত তাহার বিবাহ হইয়াছিল।
ছিল।
১২
স্বর্গের জ্যোতিঃ
POEo
পােষণ করিয়াছেন। তাহার মৃত্যুর পর বিবি আয়শাকে
হজরত একদা বলিয়াছিলেন যে, “আমি যখন দরিদ্র ছিলাম,
ধনশালিনী খােদায়জা আমাকে পতিত্বে বরণ করিয়াছিল,
আমার নবুওতে খােদায়জাই প্রথমে বিশ্বাস স্থাপন
করিয়াছিল। তাহার তুলনা নাই।” রাজনৈতিক কারণে
হজরত পরে আরও কয়েকটি বিবাহ করেন বটে, কিন্তু তিনি
কখনও বহুবিবাহ প্রথার সমর্থন করিতেন না। কোরাণ
পাকের অনুজ্ঞাতেও বহুবিবাহ প্রথা প্রকারান্তরে নিষিদ্ধ
প্রতীয়মান হয়।
‘উম্মােহাতুল মােমেনীন’* মধ্যে বিবি আয়শার পরিণয়
বিষয় স্থানান্তরে উল্লিখিত হইবে।
* বিশ্বাসীদের (মুসলমানগণের) মাতাগণ অর্থাৎ হজতের স্ত্রীবৃন্দ ।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ নবুওৎ ও এলাম হে মােহাম্মদ তুমি মানবগণকে সেই দিনের কথা স্মরণ করাইয়া দাও, যে দিন মরিয়মের পুত্র ঈসা, এরাইলের অনুগামীজনকে সম্বােধন করিয়া কহিয়াছিল ‘হে বনি এরাইল, আমি আল্লাহতালা কর্তৃক তােমাদের কাছে প্রেরিত হইয়াছি এবং এই তওরাত গ্রন্থে যে সকল অনুজ্ঞাবাণী আমার পূর্বে অবতীর্ণ হইয়াছে তাহার সত্যতার সাক্ষ্য দিতেছি ও আরও একজন, নবীর আগমনের সুসংবাদ প্রদান করিতেছি যিনি আমার পরে অভ্যুদয় হইবেন এবং যাহার নাম ‘আহমদ’ হইবে। (কোরাণ পাক-সুরা আফ) I will raise up a prophet from among their brethren like unto thee, and will put my words into his mouth, and he shall speak unto them all that I shall command him. (Deut XVIIl-18) Nevertheless I tell you the truth, it is expedient for you that I go away; that if I depart, I will send him unto you. And when he is come, he will reprove the world of sin, and of righteousness, and of judgment. (John, XVI-7 and 8). কোন বিশেষ মানব-সম্প্রদায় যখন পথভ্রান্ত পথিকের ন্যায়সুপথ ছাভিয়া বিপথে পতিত হয়, যখন তাহারা ঘাের ১৪
স্বর্গের জ্যোতিঃ
কুসংস্কার ও অজ্ঞতায় আচ্ছন্ন হইয়া তাহাদের প্রকৃত সৃষ্টি
কর্তাকে ভুলিয়া অলীক ও কাল্পনিক ঈশ্বরের উপাসনা
করিতে প্রবৃত্ত হয়, তখন খােদাতালা সেই জাতির উদ্ধার ও
মুক্তির জন্য সেই জাতির মধ্য হইতেই বিশেষ কোন এক
পুণ্যাত্মাকে ‘নবী’ (প্রবর্তক) বা রসুল (প্রেরিত পুরুষ)
নির্বাচন করতঃ সেই ভ্ৰমান্ধগণকে সৎপথ দেখাইবার জন্য
উক্ত ‘নবী’র প্রতি আদেশসমূহ প্রেরণ করেন। কালের পর
কাল চলিয়া যায়, মানব-সম্প্রদায় ভূতপূৰ্ব্ব নবীগণের হিতাে-
পদেশ ভুলিয়া গিয়া তাহাদের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা প্রভুর
সহিত বিদ্রোহাচরণে প্রবৃত্ত হয় এবং ধৰ্ম্মসাম্রাজ্যে কল্পনার
অদ্ভুৎ ঈশ্বররাজি প্রতিষ্ঠিত করে। তখন খােদায়ে পাক’
আবার এই ভ্রান্তসম্প্রদায়কে একত্ব, সুনীতি ও সভ্যতা,
শিক্ষা দেওয়ার নিমিত্ত একজন নবীকে প্রেরণ করতঃ তাঁহার
আদেশপূর্ণ একটি ধর্মগ্রন্থ অবতীর্ণ করেন। ইহারই অর্থ
‘নবুওৎ। এই প্রকারে আমরা পৃথিবীর ইতিহাসে হজরত
নূহ হজরত এব্রাহীম, হজরত মুসা, হজরত দাউদ ও হজরত
ঈসা প্রভৃতি নবীগণের ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের হিতার্থে
তৌরাত, জবুর ও ইঞ্জিল নামক ধর্মগ্রন্থাবলীসহ অভ্যুদয়
দেখিতে পাই।
এমনি করিয়া যুগের পর যুগ কাটিয়া গেল, •ভূতপূর্ব
স্বর্গের জ্যোতিঃ নবিগণের হিতােপদেশ কালের গর্ভে বিলীন হইল, পৃথিবীর সমগ্র মানবজাতি আবার কুসংস্কার ও কুনীতির ঘনঘটায় আচ্ছন্ন হইল, তখন খােদায়ে বে নেয়াজ সমগ্র মানব জগতের মুক্তি ও শান্তি কামনা করিয়া তাহাদিগকে “ওহ- দানিয়ৎ' (একেশ্বরবাদ), সুনীতি ও সভ্যতার জ্যোতির্ময় আলােকে আনিতে ইচ্ছা করতঃ হজরত সরওয়ারে কায়েনাত জনাব আহমদ মােজতবা মােহাম্মদ মােস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হেসসাল্লাম’কে প্রেরণ করিলেন। পয়গম্বর সাহেবের পূর্ববর্তী নবিগণের প্রতি অবতীর্ণ ধর্মগ্রন্থের বিধানসমূহ বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়ের ও বিশেষ বিশেষ দেশের জন্য নির্দিষ্ট ছিল বলিয়া তাহা সমগ্র মানবজাতির ক্রমােন্নতির সহায় স্বরূপ হইতে অসমর্থ হইয়া পড়িল। তখন খােদা- তালা তাঁহার এই নির্বাচিত মহাপুরু ের প্রতি কোরাণ পাকঃঅবতীর্ণ করিলেন। পূৰ্ব্ব ধর্মগ্রন্থসমূহে যে অসম্পূর্ণতা ছিল কোরাণ পাকে তাহা সম্পূর্ণ হইয়াছে এবং ইহাই সর্ব জাতি ও সর্বকালগ্রাহ্য একমাত্র তুলনাহীন মহাগ্রন্থ। খােদাতালা এই মহাগ্রন্থের বিধানানুযায়ী ধৰ্ম্ম মানবজগতে কোরাণ মজিদের স্থানে স্থানে এই পবিত্র গ্রন্থকে ‘ফোরকান’ বলি। অভিহিত করা হইয়াছে।
এবং এই স্বর্গের জ্যোতিঃ ৩ ঘােষণা করিতে হজরতকে আদেশ করিলেন। বিঘােষিত ধৰ্মই পবিত্র ইসলাম নামে খ্যাত হইল। এই অপূর্ব গ্রন্থে আধা ত্মক, ঐহিক, পারত্রিক, রাজ- নৈতিক ও সমাজনৈতিক বিষয়ের সারতত্ত্বাবলী একাধারে সন্নিবিষ্ট আছে। ইহাতে ধর্মের জয়, অধৰ্ম্মের ক্ষয়, পুণ্যের পুরস্কার, পাপের দণ্ড, মানবজাতির কর্তব্য, সুনীতি ও সভ্যতার যাবতীয় নিয়মাবলী উজ্জ্বল দৃষ্টান্তদ্বারা বর্ণিত হইয়াছে। ইহা পাঠ করিতে করিতে এক ও অদ্বিতীয় খোদাতালার অসংখ্য অনুগ্রহরাশি মনে উদয় হইয়া হৃদয় ভক্তি শ্রদ্ধায় উদ্বেলিত হইয়া পড়ে, মানবজীবনের অসারতা স্মরণ করিয়া হৃদয় ব্যাকুল হইয়া উঠে! ইহাতে পাপের ভীষণ পরিণাম পাঠে শরীর রােমাঞ্চিত হয় ; আবার পুণ্যের প্রতিদান পাঠে অন্তর প্রফুল্ল হইয়া উঠে। ইহার নিঃস্বার্থ হিতােপদেশগুলি হৃদয়ঙ্গম করিলে অন্তরাত্মা বিশুদ্ধ হইয়া হৃদয়ে শান্তি ও প্রসন্নতা উৎপাদন করে। ইহা পাঠে অন্তরে এক অভিনব ভাবের উদ্রেক হয় এবং অনেক সময় অশ্রু সংবরণ করা দুঃসাধ্য হইয়া পড়ে! এই আশ্চৰ্যগ্রন্থের নিকট * ইসলাম অর্থ-নিৰ্ম্মল শান্তি, অষ্ণ অর্থ খােদাতালার ইচ্ছার নিকট শির অবনত করা। ১৭
স্বর্গের জ্যোতিঃ
পৃথিবীর যাবতীয় বিজ্ঞান, দর্শন ও নীতি প্রভৃতি সম্পৰ্কীয়
গ্রন্থ নিচয় পরাজিত।
بهار عالم حسنش دل و جان تازه میدارد
برنگ اصحاب صورت راببوارباب معنی را
হজরত অতি অল্প বয়স হইতেই এ নশ্বর পৃথিবীর যাবতীয়
অসার আমােদ হইতে দূরে থাকিয়া নির্জনে বাহ্যজ্ঞান রহিত
নবুওৎ। ৮ রবিউল হইয়া খােদাতালার ‘নিরাকার চৈতন্য
আউওল। ৬১০ খ্রীঃ স্বরূপ’ ধ্যান করিতেন। তিনি সমাজের
অধঃপতনের অবস্থা দেখিয়া সদাই বিমর্ষ থাকিতেন। হজরত
অহর্নিশইহাই ভাবিতেন যে,এ পৃথিবী কৰ্ম্মক্ষেত্ৰ-অলসতায়
ও অযত্নে ক্ষণস্থায়ী জীবনের অপচয় করা মানবের কর্তব্য নহে।
আমি কে? কেন এ পৃথিবীতে আসিয়াছি ? আমাকে এখানে
কি করিতে হইবে ? আবার আমাকে পুনঃ কাহার কাছেই
বা ফিরিয়া যাইয়া আমার কাৰ্য-কলাপের বিবরণী প্রদান
করিতে হইবে ?”—এই সব ভাবিয়া হজরত অধীর হইতেন
এবং তাহার গণ্ডদ্বয় বাহিয়া অবিরল অশ্রুধারা ছুটিত।
মক্কা হইতে তিন মাইল ব্যবধানে হেরা নামক একটি
ক্ষুদ্র গিরিগুহায় গমন পূর্বক হজরত প্রায়ই পারমার্থিক
চিন্তায় নিমগ্ন হইতেন। তাঁহার বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই
?
স্বর্গের জ্যোতিঃ ASE তাহাতে খােদাতালার অনুরাগ প্রবলতর হইতে লাগিল। হার দিব্য চক্ষে সর্বত্রই যেন তিনি খােদাতালার পবিত্র জ্যোতিঃ প্রতিফলিত দেখিতে লাগিলেন। হেরাগুহার গমনারম্ভের ৬মাস পর যখন হজরতের বয়ঃক্রম ৪০ বৎসর* তখন ঐ গুহায় একদিন পয়গম্বর সাহেব ‘আল্লাহতালার আরাধনায় নিমজ্জিত ছিলেন। সে দিন ৮ রবিউল আউও সােমবার, নিশার ত্রিযাম অতীতপ্রায়, প্রকৃতি নীরব, নিস্তব্ধ ! এমন সময় সেই নৈশ নিস্তব্ধতা ভেদ করিয়া অকস্মাৎ একটি ধ্বনি তাহার ধ্যানভঙ্গ করিল। তিনি চকিতে চাহিলেন, এ শব্দ কিসের, কোথা হইতে আসিল,ইহা ভাবিতে লাগিলেন। তখন আবার দিঙমণ্ডল ধ্বনিত করিয়া সেই শব্দ স্পষ্টতর- রূপে তাহার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিল। হজরত কান পাতিয়া শুনিলেন কে বলিতেছে—“উঠ! বল !” প্রভু মােহাম্মদ ভীতিবিহ্বল-হৃদয়ে কঁপিতে কাপিতে বলিলেন, “আমি কি কহিব ?” আবার রজনীর নিস্তব্ধতা ভেদ করিয়া উত্তর হইল—“বল ! তােমার সর্বশক্তিমান প্রভুর নাম উচ্চারণ করিয়া বল... ......”। তৎপর হজরত কম্পিত * কেহ কেই বলেন ৪৩ বৎসর। * কোরাণ পাক, সুরা আলক”। এ সম্বন্ধে আলেমগণের মতভেদ আছে। কেহ কেহ বলেন, পয়গম্বর সাহেবের উপর সর্ব প্রথম সুর। “ফাতেহা অবতীর্ণ হয়।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
ভদ্র
কলেবরে গুহা হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া গৃহে ফিরিতে ফিরিতে
একেবারে অবসন্ন হইয়া পড়িলেন এবং গৃহে পৌছিয়া আপাদ
মস্তক আচ্ছাদন করতঃ শয়ন করিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে
একটু সুস্থির হইয়া বিবি খােদায়জার নিকট সমুদয় বিবৃত
করিয়া কহিলেন, “আমি কোন সমূহ বিপদের আশঙ্কায়
ভীত হইয়াছি।” বিবি খােদায়জা তাহাকে সান্ত্বনাবাক্যে
প্রবােধ দিয়া বলিলেন, “প্রভাে! কেন আপনি অযথা ভীত
হইতেছেন ? আপনি ত বিপন্ন ও নিঃসহায়ের বন্ধু, দীন
দুঃখীর সহায়, এতীম (পিতৃহীন শিশুদের) প্রতিপালক,
অনাথার সাহায্যকারক, আত্মীয় স্বজন প্রতি সেহবান। এহেন
পুণ্যাত্মার সৎকাৰ্যসমূহ পরম করুণাময় খােদাতালা কখনই
নিস্ফল করিবেন না। তিনি পরম দয়াময়! তিনি আপনার
হিত বৈ অনিষ্ট করবেন না। খােদাতালা নিশ্চয়ই আপনার
দ্বারা নষ্ট জাতিসমূহের উদ্ধারসাধন ইচ্ছা করিয়াছেন।”
তখন বিবি খােদাজা হজরতকে সঙ্গে নিয়া স্বীয় পিতৃব্যতনয়
ওয়ারকার নিকট গমন করিয়া সমুদয় বৃত্তান্ত জ্ঞাপন
করিলেন। তৌরাত ও ইঞ্জিল শাস্ত্রে ওয়ারকা বিশেষ
ব্যুৎপন্ন ছিলেন। তিনি ঐ সমস্ত ধর্মগ্রন্থে একজন মহান
ধৰ্ম্মপ্রবর্তক—নবীর’—আগমন বিষয় পূর্ব হইতেই অবগত
২০
স্বর্গের জ্যোতি ভe ছিলেন। এই ঘটনা শ্রবণে তিনি পুলকিত হইয়া কহিলেন, “ইনি নিশ্চয়ই সেই মহাপুরুষ যাহার আগমনবার্তা তৌরাত ও ইঞ্জিলে উল্লেখ আছে। ইহার পর বিবি খােদায়জা সর্ব- প্রথমে কলেমা তৈয়ব’ পাঠ করিয়া রসুলে খােদার উপর ঈমান (বিশ্বাস) আনিলেন। তৎপর ক্রমান্বয়ে হজরত আলী, আব্দুল্লাহবেন্ আবু কোহাফা (হজরত আবুবকর), যয়েদ বেন্ হারেস, ওসমান্ বেন্ আফান, ও সাবেওক্কাস প্রভৃতি ঈমান আনয়ন করেন। এই ঘটনার পরও রসুলে খােদা প্রায়ই নিশীথে হেরা গুহায় যাইয়া নামাজ ও মােরাকেয়’ (খোদাতালার ধ্যানে) নিযুক্ত থাকিতেন। এবং সময় সময় ঞ্জিলে কোরাণ। হজরত জিব্রাইল (খােদাতালার বার্তাবহু প্রধান ফেরেস্তা) খোদাতালার আদেশে হজরতের প্রতি কোরাণ পাকের ভিন্ন ভিন্ন আয়েত (শ্লোক) নাযেল’ করিয়া যাইতেন। কেবল হেরাগুহাতেই হজরতের প্রতি এলহাম (প্রত্যাদেশ) হয় নাই। শয়নে স্বপনে, আহারে * “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহহা মােহাম্মদ রাসুলেল্লাহ”-অর্থাৎ খো। এ ও অদ্বিতীয় এবং মােহাম্মদ (দঃ) তাহারই প্রেরিত। * হজরত আলীর বয়স তখন ১৩ বৎসর ছিল।
স্বর্গের জ্যোতিঃ ৩SE বিহারে, শান্তি ও সমরে যখন যে অবস্থায় খােদাতালা প্রয়ােজন বােধ করিয়াছেন, অবস্থা ও প্রয়ােজনানুযায়ী তখনই হজরতের উপর কোরাণ পাকের ভিন্ন ভিন্ন অংশ নাযেল করিয়াছেন। এই সমস্ত অংশ রেসালাৎ মাবের পবিত্র মূখনিঃসৃত হওয়া মাত্রই আসহাববৃন্দ (সঙ্গীগণ) মুখস্থ করিয়া রাখিতেন, কেহ কেহ প্রস্তরফলকে বা ছাগমেযাদির চৰ্ম্মখণ্ডেও লিখিয়া লইতেন। এই সমস্ত অংশের সমষ্টি পরে হজরত ওসমান ‘যুন্নয়নের খেলাফতে শৃঙ্খলাবদ্ধ হইয়া বর্তমান কোরাণ মজিদে পরিণত হইয়াছে। নবুওতের পর হইতে তিন বৎসরকাল পর্যন্ত পয়গম্বর সাহেব গােপনে গােপনে এলাম প্রচার করিয়া কোরেশী- গণকে পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কার হইতে এমি প্রচার। দূরে রাখিতে ও একমাত্র নিরাকার ওয়াহ- দহু লা শরিকের’ (এক ও অদ্বিতীয় শরিকশূন্য) উপাসনায় রত করাইতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। পরে হজরত ‘আবুবকর সিদ্দিকের সাহায্যে আরও কয়েকটি প্রধান ব্যক্তিকে (তন্মধ্যে হজরত ওসমান যুনুরয়েন একজন ছিলেন) পবিত্র এলামে দীক্ষিত করিলেন। প্রথম তিন বৎসরকাল মধ্যে তিনি মাত্র ৩০ জনকে এস্লামে দীক্ষিত করিতে সমর্থ হন। ৫ ২২
স্বর্গের জ্যোতিঃ
কিন্তু তিনি ইস্লাম প্রচারে যতই চেষ্টা করিতে লাগিলেন
কোরেশীগণ ততই ভঁহার সহিত শত্রুতা বৃদ্ধি করিতে লাগিল।
এমন কি পরিণামে তাহারা তাহার রক্তপিপাসু হইয়া উঠিল।
এই তিন বৎসর পর খােদাতালা প্রকাশ্যে ইস্লাম প্রচারের
জন্য হজরত ‘রেসালাৎ মাব’কে ‘এলহাম’ করেন।
বাল্যকাল হইতে পয়গম্বর সাহেব সর্বজনপ্রিয় ছিলেন।
তঁাহার সত্যবাদিতা ও কর্তব্য পরায়ণতায় মুগ্ধ হইয়া মক্কার
আবালবৃদ্ধবনিতা তাহাকে আন্তরিক শ্রদ্ধা করিত। কিন্তু
যখন তিনি প্রকাশ্যে তাহাদের মিথ্যা ধৰ্ম্ম ও অন্যায় দেশাচার
এবং নীতি ও সভ্যতা বিরহিত কার্যকলাপের বিরুদ্ধে দোষা-
রােপ করিতে আরম্ভ করিলেন, তখন হইতে হজরত তাহাদের
চক্ষুশূল হইয়া পড়িলেন। কিন্তু সত্যপ্রচারই যাহার জীবনের
মূল মন্ত্র, তিনি অন্যের ভ্রুকুটিভঙ্গিতে কখনও কর্তব্য পথভ্রষ্ট
হন না। তাই একদিন হজরত ‘সাফা’ শৈলে আরােহণ
করিয়া মক্কার অধিবাসীবৃন্দকে আহ্বান করিতে লাগিলেন।
সেই আহ্বানে আবালবৃদ্ধবনিতা সকলে গিরিমূলে আসিয়া
সমবেত হইল। তাহারা ভাবিল হয়ত কোনও সামাজিক
ব্যাপার উপস্থিত, যাহার মীমাংসা হওয়া প্রয়ােজন।
* কোরাণ পাক, সুরা আল মােদাসসের’ দেখ।
তখন
স্বর্গের জ্যোতিঃ
হজরত তাহাদিগকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, “মানবগণ।
যদি আমি তােমাদিগকে বলি যে, এই পর্বতান্তরাল
হইতে এক বিশাল শত্রু অকস্মাৎ তােমাদিগকে আক্রমণ
করিয়া সংহার করিতে উদ্যত, তবে কি তােমরা ইহা
প্রত্যয় করিবে ?” সকলে একবাক্যে উত্তর করিল, “হাঁ,
নিশ্চয়ই। মােহাম্মদ (দঃ)! তুমি পরম সত্যনিষ্ঠ। আজ
পৰ্য্যন্ত আমরা তােমার কোনও মিথ্যা আচরণ দেখি নাই,
তবে কেন তােমার উক্তি আমরা মিথ্যা বলিয়া সন্দেহ
করিব ?” হজরত কহিলেন, “তবে শ্রবণ কর, ভবিষ্যতে
তােমাদের উপর এক বিষম বিপদ উপস্থিত হইবার উপক্রম
হইয়াছে। তৌহীদ’ ( একেশ্বরবাদ) অবলম্বন ব্যতীত
তােমাদের সে বিপদ হইতে কিছুতেই নিস্তার নাই।”
ইহা শুনিয়া সকলে হজরতকে মতিচ্ছন্ন বলিয়া প্রতিপন্ন
করিল। ‘আবুলহব
বলিয়া উঠিল, “তুমি নিপাত হও !
এই জন্যই কি আমাদিগকে ডাকিয়াছিলে ?”
ইহার পর হজের নিরূপিত কালে যখন যাত্রিগণ মক্কায়
আসিত, তখন হজরত তাহাদিগকে পবিত্র ইসলামে আহ্বান
করিতেন। তাহাতে কেহ কেহ ইলামের মাহাত্ম উপলব্ধি
করিতে পারিয়া তাহাতেীক্ষিতও হইতেন। কিন্তু আবুলহব
২৪
স্বর্গের জ্যোতিঃ দূর হইতে তখন হজরতের প্রতি প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করিয়া তাহাকে আহত করিত এবং হজরতকে যাদুকর ঐন্দ্র- জালিক বা উন্মাদ বলিয়া আখ্যাত করিয়া যাত্রীগণকে তাহার প্রতি বিমুখ করিতে চেষ্টা করিত। তাহাতে কিছুমাত্র বিচলিত হইতেন না, তিনি স্থির ও সংযত মনে তাহার কৰ্তব্য করিয়া যাইতেন সে কালে প্রায়ই মক্কার রাজপথে এই সাম্য মূৰ্তি মহাপুরুষকে দেখিবামাত্র বর্বরগণ তাঁহার প্রতি পুরীদি আবর্জনা নিক্ষেপ করিত এবং শিশ ও করতালি দিয়া তাঁহার পিছু কেহ বা তাহাকে প্রস্তরাঘাতে রুধিরস্নাত করিয়া কৌতুক বশতঃ বিকট হাস্যে দিগন্ত কম্পিত করিত। কিন্তু সেই নরশ্রেষ্ঠ যে মহামন্ত্রে অনুপ্রাণিত, তাঁহার মুখে সেই একই মন্ত্র উচ্চারিত—“মানবগণ! এস এক ও অংশীহীন অনাদি অনন্ত পবিত্র আল্লাহতালার উপাসনায় ও আদেশ পালনে রত হও, অনাচার ও দুস্ক্রিয়া পরিত্যাগ করিয়া সুনীতি ও সভ্যতা অবলম্বন কর।” হজরত কেবল নিজে কোরেশ সম্প্রদায়ের দ্বারা অবমানিত ও লাঞ্ছিত হন নাই, যাহারা ঈমান (খােদা- তালায় বিশ্বাস) আনিয়াছিলেন তাহারাও কোরেশীদের ছুটিত।
স্বর্গের জ্যোতিঃ @jEm হাতে নানা-প্রকার পাশব অত্যাচার সহ্য করিয়াছেন হজরত বেলাল প্রতি সেই মহাত্মাদের মধ্যে এস্লামের নির্যাতন। সর্বপ্রথম ‘মােয়াজ্জেন’ (আজান- দাত। অর্থাৎ যিনি উপাসনার্থে আহ্বান করেন। হজরত বেলাল একজন ছিলেন। হজরত বেলাল ‘ওমাইয়া নামক জনৈক ব্যক্তির ক্রীতদাস ছিলেন। এলামে দীক্ষিত হওয়ার অপরাধে তাহার প্রভু তাঁহাকে নগ্নপৃষ্ঠে বক্ষের উপর শিলাখণ্ড চাপাইয়া জ্বলন্ত বালুকাময় মরুভূমে সূর্যের প্রখর উত্তাপে ফেলিয়া রাখিত। এইরূপে কতক দিন পৰ্য্যন্ত যাতনায় ও কষ্টে ছট্ফট্ করিতে করিতে যখন তিনি মৃতপ্রায় হন, তখন হজরত আবুবকর সিদ্দিক তাহাকে প্রচুর মুদ্রা দ্বারা ক্রয় করিয়া মুক্ত করেন। কিন্তু ধন্য তাহার সহিষ্ণুতা ও সংযম ! এত কষ্ট ও যাতনা সহ্য করিয়াও তিনি ঈমান ও কর্তব্য হইতে এক তিল পরিমাণেও বিচলিত হন নাই। হজরত এয়াসের ও তাঁহার সহধর্মিণী এবং হজরত এমার ও তঁাহার মাতা এামে আস্থা স্থাপন করার অপরাধে এই নৃসংশ ধৰ্ম্মদ্রোহীগণের হস্তে শহীদ হন। এই সময় শত্রুগণের অত্যাচারে ও যন্ত্রণায় প্রপীড়িত স্বর্গের জ্যোতিঃ হইয়া মক্কার ‘মােমেনগণ’ (যাহারা ঈমান আনিয়াছেন) মধ্যে ১৫ জন পুরুষ ও ৪ জন স্ত্রীলোেক নবুওতের মােমেনগণের এবিসি- পঞ্চমবর্ষে হাসের (এবিসিনিয়া) নিয়ার হেজবুত। ৬৫১ খৃঃ নজাশী নামক রাজার দরবারে রজব, নবুওতের ৫ম বর্ষ। আশ্রয় লইলেন। এই সঙ্গে হজরত ওসমান যুনুরয়েন ও তাহার সহধর্মিণী হজ- রােকেয়া (পয়গম্বর সাহেবের দ্বিতীয়া কন্যা ) তথায় হেজরত করেন। কোরেশীগণ পলাতকগণকে ধৃত করিয়া আনার জন্য উক্ত রাজদরবারে ওমরু বেন্ আল আসকে বহু উপঢৌকনাদি সহ দূত স্বরূপ প্রেরণ করতঃ অনেক চেষ্টা করিল। কিন্তু উদারমতি রাজা আশ্রিত গণকে কিছুতেই শকবলে দিলেন না, পরন্তু ভঁহা- দিগকে সম্মানের সহিত গ্রহণ করিলেন। আদেশক্রমে যখন মুসলমান ও কোরেশী দূতগণ তৎসমীপে উপস্থিত হইল, তখন কোরেশী দূতগণ দূর হইতে রাজাকে সাষ্টাঙ্গে ‘সেজদা (প্রণিপাত) করিল; কিন্তু আত্ম- নৃপতির •• * ইহার কয়েক মাস পর দ্বিতীয় বার আরও অনেক মুসলমান তথায় হজরত করেন। ইহাদের মােট সংখ্যা ৮৩ জন পুরুষ ও ১৮ জন স্ত্রীলােক হইয়াছিল। = ২৭ স্বর্গের জ্যোতিঃ মৰ্য্যাদাশীল মুসলমানগণ নির্ভীকহৃদয়ে রাজাকে হস্তো- ত্তোলন করিয়া ‘সালাম’ ( অভিবাদন) করিলেন। তখন মুসলমানগণকে এই দরবার-রীতি-বহির্ভূত ব্যব- হারের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। সত্যধৰ্ম্মে বলীয়ান মুসলমানগণ উত্তর করিলেন “খােদাতালা ব্যতীত মানব- সমক্ষে মস্তক অবনত করা আমাদের এসলাম-ধৰ্ম্মে নিষিদ্ধ।” এই উত্তরে মােসলেমগণের প্রতি ন্যায়দর্শী রাজা ‘নজাশীর’ ভক্তি ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পাইল। ইহার পর কোরেশী দূতগণের নিকট রাজা সমস্ত অভিযােগ শ্রবণ করিলেন। তখন হজরত জাফর তাইয়ার রাজাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, “হে বাদশাহ! আমরা মুখ ও অজ্ঞতায় আচ্ছন্ন ছিলাম, প্রস্তর ও কাষ্ঠপুত্তলিকার পূজা করিতাম, দিবা-রাত্র অপবিত্রতায় নিমজ্জিত থাকিতাম, মৃত জন্তু আমাদের আহাৰ্য ছিল, পরদুঃখ- কাতরতা, প্রতিবেশীর প্রতি সহানুভূতি, অতিথিসৎকার প্রভৃতি সদ্গুণরাশি আমাদের নিকট সম্পূর্ণ অপরিজ্ঞাত ছিল। এমন সময় পরম কারুণিক আল্লাহ তালা আমাদের মধ্য হইতেই এক পুণ্যাত্মাকে আমাদের পথপ্রদর্শকরূপে নির্বাচিত করিয়া পাঠাইলেন। তিনি ২৮ স্বর্গের জ্যোতিঃ শ্রেষ্ঠ কোরেশ কুলােব এক পবিত্ৰাত্মা মহাপুরুষ। তিনি আমাদের আবাল্য পরিচিত বলিয়া তাঁহার অনুপম গুণ- রাশি আমরা প্রত্যক্ষ দেখিয়া আসিয়াছি। তিনি আমা- দিগকে এই শিক্ষা দেন যে আল্লাহ ব্যতীত দ্বিতীয় উপাস্য নাই। সত্যবাদিতা, অঙ্গীকারপালন, প্রতিবেশীর প্রতি সহানুভূতি, ইন্দ্রিয়দমন, স্ত্রীজাতির প্রতি সম্মান, অনাথের সহায়তা প্রভৃতি চরিত্রের উন্নত আদর্শসমূহ যাহাতে আমাদের হৃদয়ে স্থান পায় সেজন্য তিনি অামা- দিগকে সর্বদা প্রবুদ্ধ করেন এবং যাবতীয় দুঞ্জিয়া হইতে দূরে থাকিতে উপদেশ দিয়া আমাদিগকে সৎপথে আনিতে চেষ্টা করেন। আমরা এই সমস্ত সদাচারের অনুশীলন করি বলিয়াই আজ সমাজ কর্তৃক নিষ্পীড়িত ও বিতাড়িত হইয়া আশ্রয়ান্বেষণে আপনার দরবারে উপ- স্থিত হইয়াছি। রাজন! আমাদিগকে শকবলে সমর্পণ করিয়া সংহার করিবেন না ;—আমাদিগকে আশ্রয়দানে পুণ্য সঞ্চয় করুন।” নজাশী খৃষ্টান ছিলেন, তিনি হজরত জাফর তাইয়ারের সুমধুর কণ্ঠনিঃসৃত কোণ পাকের সুরা মরিয়ম শ্রবণে বিমােহিত হইলে এবং উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিলেন, ২৯
স্বর্গের জ্যোতিঃ
NOSE
“মুসলমানগণ ! তােমাদের ধর্ম ও নবীকে ধন্য, আমি
সাক্ষ্য দিতেছি যে, মােহাম্মদ (দঃ) সেই মহাপুরুষ যাঁহার
প্রশংসা ও আগমনবার্তা আমি ইঞ্জিলে পাঠ করিয়াছি।”
কথিত আছে যে, নজাশী তখনই এসলাম ধর্ম গ্রহণ
করেন,
এবং, কোরেশী
দূতগণকে
ভৎসনা করিয়া দরবার
হইতে তাড়াইয়া দেন।
মােমেনগণকে আপাততঃ বিদেশের আশ্রয়ে পাঠাইয়া
হজরত স্থির ও অটল ভাবে নানা প্রকার যাতনা ও লাঞ্ছনা
উপেক্ষা করতঃ নিজ কর্তব্যে রত রহিলেন,
এবং
কাফেরগণের অলৌকিক কোরেশীগণকে পৌত্তলিকতা ও
কুসংস্কারের
তমােজাল
দৃশ্য দেখার ইচ্ছা।
হইতে
“ওহ দানিয়ৎ' (একত্ব) ও সুনীতির
জ্যোতির্ময় আলােকে আনয়ন করিতে চেষ্টা করিতে
লাগিলেন। উপহাস ও বিদ্রুপকারী সম্প্রদায়গণ হজরতকে
বলিত, “মােহাম্মদ (দঃ)! যদি তুমি প্রকৃত প্রেরিতপুরুষ
হইয়া থাক, তবে আমাদিগকে একটী অলৌকিক
দৃশ্য
দেখাও দেখি !” তখনই হজরতের উপর ‘এলহাম’
(প্রত্যাদেশ) হইত ও তিনি উত্তর করিতেন, “খােদাতাল
আমাকে অলৌকিক দৃশ্য দেখাইতে পৃথিবীতে পাঠান
স্বর্গের জ্যোতিঃ নাই, তিনি আমাকে মানবের শিক্ষার জন্য পাঠাইয়াছেন মাত্র। সেই প্রভুই যাবতীয় প্রশংসার অধিকারী ! আমি কি পয়গম্বর-স্বরূপ আসিয়া মানব-প্রকৃতির সীমা অতিক্রম করিয়াছি ?” কখন বা বলিতেন, “তােমরা চারিদিকে চাহিয়া দেখ, এই আশ্চর্য পৃথিবী, ঐ চন্দ্র- সূৰ্য্য নক্ষত্ররাজি-বিভূষিত নীরব আবর্তনশীল নীল নভাে- মণ্ডল, এই শুষ্ক মৃত্তিকাকে পুনর্জীবন দিতে বারিপাত, মানুষের প্রয়ােজনীয় সামগ্রী পরিপূর্ণ সাগরবক্ষে ইত- স্তত বিক্ষিপ্ত বাণিজ্যপােত, সুবর্ণফলবিলম্বিত রমণীয় বৃক্ষশ্রেণী, প্রকৃতির এই সব নিয়ম ও রীতি, ইহা কি কাষ্ঠ ও প্রস্তরনিৰ্ম্মিত জড় পুত্তলিকার কাৰ্য্য ?” আবার কখনও বা কহিতেন, “হায়, নির্বোধ ! তােমরা আর কি অলৌ- কিক চিহ্ন দেখিতে চাও! সমস্ত সৃষ্টিই ত তাহারই চিহ্নে পরিপূর্ণ! কি আশ্চৰ্য কৌশলবিনিৰ্ম্মিত তােমার দেহ, কি সুঠাম ও সুগঠিত তােমার শরীর! রাত্রি দিবার পরিবর্তন, জীবন ও মৃত্যুর নিয়ম, তােমার শয়ন ও জাগরণ -খোদাতালার অশেষ অনুগ্ৰহরাশি হইতে হিত সঞ্চয় করিবার জন্য তােমাতে প্রবল আকাঙ্ক্ষা, তােমার সৃষ্টিকর্তার কৃপাজ্ঞাপক উর্ধে ঐ ত্যাতাড়িত জলরাশি, ৩১
স্বর্গের জ্যোতিঃ
•
আনয়ন। নবুওতের
প্রকৃতির বহুল বিভিন্নতা মধ্যেও এক বিচিত্র সুনিয়ম ও
সুশৃঙ্খলা, ভিন্ন ভিন্ন জাতির মানববৃন্দের মধ্যেও এক
সুন্দর সামঞ্জস্যতা, ফল ও ফুল এই সমস্ত কি কোন
প্রবল শক্তির আয়ত্তাধীন নহে?”
আবুজেহেল * হজরতের ঘাের শত্রু ছিল। সে এক
দিন হজরতকে পশ্চাদ্দিক হইতে নির্দয়রূপে আক্রমণ
হজরত হামজার ঈমান করিয়া আহত করিল। এই সংবাদ
হজরতের পিতৃব্য হজরত হামজার
বই বর্ষ।
কর্ণগােচর হইলে তিনি ক্রোধে
অধীর হইয়া অবুজেহেলকে যথােচিত প্রতিশােধ দিয়া
পয়গম্বর সাহেবকে আসিয়া কহিলেন, “মােহাম্মদ (দঃ)!
তুমি নিশ্চিন্ত হও, আমি তােমার শত্রুর মস্তক চূর্ণ
করিয়াছি; কেমন, এখন সন্তুষ্ট হইলে ত?” হজরত
উত্তর করিলেন, “পিতৃব্য! আমি এ সংবাদে কিরূপে
সন্তুষ্ট হইব? আমার সন্তুষ্টি ত আপনি মােমেন হইয়া
সৎপথ অবলম্বন করার উপর নির্ভর করে।” হজরত
হামজা কহিলেন, “আমিও আজ সেই অভিপ্রায়েই
* ইহার প্রকৃত নাম ওম বেম হেশাম। মুখ ও অসভ্য হওয়া হেতু ‘আবু
জেহেল (মুর্থতার পিতা) নামে অভিহিত হইয়াছে।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
@@E
বই বর্ষ।
আসিয়াছি।” ইহা শ্রবণে পয়গম্বর সাহেব উৎসাহে উঠিয়া
দাড়াইলেন এবং পিতৃব্যের শিরম্বন পূর্বক তাহাকে
পবিত্র এস্লামে দীক্ষিত করিলেন।
এসূলামের দ্বিতীয় খলিফা, প্রবল পরাক্রমশালী
হজরত ওম বেন্ খাত্তাব, এই সময়ে পয়গম্বর সাহেবের
এক প্রবল শত্রু হইয়া দাড়াইলেন। হজরত তাহার
হজরত ওমরের ইমাম
পীড়নে ব্যতিব্যস্ত হইয়া সর্বশক্তি,
আনয়ন। নবুওতের মান আল্লাহ তালার নিকট প্রার্থনা
করিলেন, “হে রব্বেল আলামীন ।
(নিখিলব্রহ্মাণ্ডের প্রভু) দীন্ এলামকে দৃঢ় কর এবং
ওমরকে সুমতি দাও।” তাঁহার প্রার্থনা পূর্ণ হইল!
নবুওতের ষষ্ঠ বর্ষে একদা হজরত ওমর নিষ্কোষিত
অসি-হস্তে হজরতের হত্যা মানসে তাহার গৃহাভিমুখে
যাইতেছিলেন, পথিমধ্যে শুনিতে পাইলেন যে, তাহার
ভগ্নী ফাতেমা ও ভগ্নীপতি সয়ীদ পবিত্র এস্লামে ভক্তি
স্থাপন করিয়াছেন। এতচ্ছু বণে হজরত ওমর রােষাক্রান্ত
হইয়া সহােদর গৃহে গমন করিলেন। তথায় গিয়া
দেখেন দ্বার রুদ্ধ, কিন্তু ভিতর হইতে কিছু পাঠের শব্দ
আসিতেছে। তিনি ডাকিলেন, তাহার ভগিনী ত্বরিতে
স্বর্গের জ্যোতিঃ
এ@se
কোরাণ পাকে সুরা ‘
তাহা লিখিত একখানি চৰ্ম্মখণ্ড
লুক্কায়িত করিয়া দ্বার উদঘাটন করিলেন। হজরত ওমর
গৃহে প্রবেশ করিয়াই ভগিনীকে এলাম গ্রহণ করাতে
অত্যন্ত তিরস্কার ও নিষ্ঠুরভাবে প্রহার করিতে লাগিলেন।
তখন সেই ধৰ্ম্মশীলা রমণী রুধিরাক্ত কলেবরে কাদিতে
কঁদিতে বলিলেন, “ভাই! তুমি আমার প্রাণ নাশ
করিলেও আমি সত্য পথ হইতে কিছুতেই বিমুখ
হইব না।” হজরত ওমর ভগিনীর এবম্বিধ অবস্থা দেখিয়া
আত্মসংবরণ করিলেন এবং নিজের নিষ্ঠুর আচরণের জন্য
বিশেষ অনুতপ্ত হইয়া বলিলেন, “বেশ, তুমি যাহা পড়িতে-
ছিলে, তাহা আমাকে দেখাও দেখি।” হজরত ফাতেমা
তখন সেই চৰ্ম্মখণ্ড ভঁহার সম্মুখে ধরিলেন, হজরত ওমর
ফারুক তাহা মনে মনে পাঠ করিয়া ভক্তি-বিগলিত
হইলেন এবং তাহার নয়নযুগল হইতে অবিরল অশ্রুধারা
নির্গত হইতে লাগিল। অতঃপর
তিনি তথা
হইতে সেই উন্মুক্ত তরবারি হস্তে বাহির হইয়া যে
স্থানে জনাব পয়গম্বর সাহেব সাহাবাগণ (সহচরগণ)
সমভিব্যাহারে রুদ্ধ কক্ষে সমাসীন ছিলেন, তথায়
উপস্থিত হইয়া দ্বারে করাঘাত করিয়া ডাকিতে লাগিলেন।
৩৪
স্বর্গের জ্যোতিঃ
হজরত ওমরের কর্কশ স্বর শ্রবণে সাহাবাগণ দ্বার
উদঘাটনে ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন ; কিন্তু পয়গম্বর
সাহেব আদেশ করিলেন, “তােমাদের ভয় নাই, দ্বার
খুলিয়া দাও।” হজরত হামজা তখন দ্বার খুলিয়া
দিলেন। হজরত রসুলে করিম জিজ্ঞাসিলেন, “কিহে
খাত্তাব-তনয় ! কি অভিপ্রায়ে আসিয়াছ ?” জনাব
ফারুকে আজম’ তখন খােদা-তালার ভয়ে কঁপিতেছিলেন,
তিনি হজরতের নিকট সমস্ত অবস্থা নিবেদন করিয়া
‘কালেমা শাহাদৎ পাঠ করতঃ এলাম গ্রহণ
করিলেন,-মুসলমানগণ হর্ষোল্লাসে ‘তীর (আল্লাহ
আকবর—আল্লা মহান্) উচ্চারণ করিলেন। নমাজের
সময় আগত প্রায় দেখিয়া হজরত ওমর নিবেদন করিলেন,
“হে রসুলােল্লাহ! কাফেরগণ ( ধৰ্ম্মদ্রোহীগণ) নিজ নিজ
কল্পিত উপাস্যের প্রকাশ্যে পূজা করে, আমরাও কেন
* “আশহাদে অন্ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহহ ওয়াহ, দহু লা শারিকা লহু ওয়া
আশহাদোআন্না মােহাম্মদ, আব্দুহু ওয়া রসুলুহু”—আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে,
আল্লাহ ব্যতীত কোনও উপাস্য নাই, তিনি এক ও শরিকশূন্য এবং আমি
পুনঃ সাক্ষ্য দিতেছি যে, মােহাম্মদ তাহারই প্রেরিত ও আজ্ঞাবহ।
৩৫
স্বর্গের জ্যোতিঃ
OCED
আমাদের একমাত্র সৃষ্টিকর্তার প্রকাশ্যে উপাসনা করি না ?”
পয়গম্বর সাহেব এ প্রস্তাব অনুমােদন করিয়া তখনই
চল্লিশ জন সাহাবাসহ প্রকাশ্যে নমাজ পড়িবার জন্য
কাবাগৃহে গমন করিলেন। কোরেশী কাফেরগণ জনাব
পয়গম্বর সাহেবের ছিন্নমুণ্ড হজরত ওমরের হস্তে দেখিবে
আশায় মহােল্লাসে কাবাগৃহে অপেক্ষা করিতেছিল,
তৎপরিবর্ত্তে হজরত ওমরকে জনাব রেসালাৎমাবের সঙ্গে
নামাজ পড়িবার জন্য ‘হেরম্ শরিফে (কাবাগৃহে)
আসিতে দেখিয়া হতাশ হইয়া পড়িল।
হজরত হাজা ও হজরত ওমরের ন্যায় এত বড়
শক্তিশালী কোরেশী বীরদ্বয়কে হস্তঙ্খলিত হইতে দেখিয়া
কাফেরগণ হতাশ হইয়া পড়িল বটে, কিন্তু তাহাদের
বিদ্বেষানল শততেজে জ্বলিয়া উঠিল। ইতিমধ্যে এবিসিনিয়া
হইতে মুসলমান পক্ষের দূত বিশেষ কৃতকাৰ্য্য হইয়া ফিরিয়া
আসিলেন। কোরেশীয় কাফেরগণের রােষের আগুন ইহাতে
আরও জ্বলিয়া উঠিল এবং তাহাদিগকে এস্লামের সর্বনাশ
সাধনে বদ্ধপরিকর করিল।
পৌত্তলিকতার মূল উৎপাটনের চেষ্টা হইতে
হজরতকে নিবৃত্ত রাখার উদ্দেশ্যে কাফেরগণ তাহাকে
স্বর্গের জ্যোতিঃ
প্রলোভন।
ওৎবা ৰেন
নানা প্রকার সাংসারিক প্রলােভন
রবিয়ার হজরতকে
দ্বারা বশীভূত করিবার জন্য বহু
চেষ্টা করিতে লাগিল। একদা
'ওৎবা বেন্ রবিয়া নামক মক্কার জনৈক প্রবীণ
সর্দার হজরত সমীপে আসিয়া কহিল, “মােহাম্মদ
(দঃ)! তুমি কোন্ অভাবের বশবর্তী হইয়া আমাদের
জাতীয় ধর্মের বিনাশ ও আমাদের পরস্পরের বিরােধ
সংস্থাপনে সচেষ্ট—যদি ধন রত্নাদির অভিলাষী হও,
তবে আমরা তােমাকে অচিরেই অগাধ ধন-রত্নের
অধীশ্বর করিব। যদি মৰ্যাদা ও সম্মানের আকাঙ্ক্ষা
থাকে, তবে আমরা সমগ্র সম্প্রদায় তোমাকে শিরােভূষণ
করিয়া তােমার আজ্ঞাবহ হইব। যদি রাজৈশ্বৰ্য্যে
তােমার সাধ থাকে, তবে আমরা তোমাকে নৃপতি
রূপে বরণ করিয়া তােমারই আদেশে শির
আর যদি তােমার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটিয়া
থাকে তবে বল, এই বিস্তৃত আরব দেশে এমন
ভিষকপ্রবর কে আছে যাহাকে তােমার
কুশল
কামনায় তােমার চরণপ্রান্তে লুটাইয়া না দিতে
পারি।”
এই প্রলােভন বাক্য
নত
করিব।
হজরত নীরবে
৩৭
e
স্বর্গের জ্যোতিঃ
শ্রবণ করিলেন এবং প্রত্ত্যত্তরে কোরাণ পাকের
সুরা হা-মিম সেজদাহ” হইতে কয়েকটী আয়েত
পাঠ করিলেন।
কাফেরগণের অহর্নিশ প্ররােচনায় স্থির থাকিতে
পারিয়া, একদা হজরত আবুতালেব হজরত
হজরত আবুতালেবের
মােহাম্মদের নিকট উপস্থিত
উপদেশ ও বনু হাশেমকে হইয়া তাহার উদ্দেশ্য ও কর্তব্য
আশ্রয় দান। নবুওতের
হইতে তাহাকে ফিরাইতে প্রয়াস
সপ্তমবর্ষের আরম্ভ ও নবম
বর্ষের শেষ।
৬১৬ হইতে
পাইলেন। হজরত
বলিলেন,
৬১৯ খ্রীঃ।
‘ততঃ ! যদি তাহারা আমার
দক্ষিণ হস্তে চন্দ্র ও বাম হস্তে সূৰ্য্য আনিয়া দেয়,
তথাপি আমি আমার সৃষ্টিকর্তার আদেশ ব্যতীত
প্রাণান্তেও কর্তব্য পথ বিচ্যুত হইব না।” আবুতালেব,
ভ্রাতুস্পুত্রের ঈদৃশ দৃঢ়সঙ্কল্পতা দেখিয়া স্নেহ বচনে
কহিলেন, “মােহাম্মদ (দঃ) ! শত্রুগণ যাহাই করুক না
কেন, আমি শপথ করিয়া বলিতেছি, আজীবন কিছুতেই
তােমাকে পরিত্যাগ করিব না।” যত দিন হজরত
আবুতালেব জীবিত ছিলেন, এই পরম স্নেহাস্পদ
ভ্রাতুষ্পত্রের সাহায্য ও সহানুভূতি করিতে তিনি
গের জ্যোতিঃ
জ
বিরত হন নাই। আবুতালেব কোরেশ সম্প্রদায় মধ্যে
বিশেষ ক্ষমতাবান ও সম্মানিত ছিলেন। হারই
পৃষ্ঠপােষকতায় হজরত অবিলম্বে কোরেশীয় প্রধান
প্রধান ক্ষমতাশালী কয়েকটী লােককে হস্তগত করেন।
যখন আবুতালেবের চেষ্টাতেও কাফেরগণ অকৃতকাৰ্য
হইল, তখন তাহারা হজরতের প্রাণনাশের জন্য দৃঢ় সঙ্কল্প
করিল। হজরত আবুতালেব এই অবস্থা দেখিয়া
নবুওতের সপ্তম বর্ষের প্রারম্ভে পয়গম্বর সাহেবকে
সমগ্র বনুহাশেম সহ, তাহার সুবিস্তৃত গৃহে ‘লুক্কায়িত
রাখিলেন। কোরেশীগণ তখন তাহাদের বিরুদ্ধে ধৰ্ম্মঘট
করিয়া তাহাদিগকে নানাপ্রকারে উৎপীড়ন করিতে লাগিল।
দুর্দমনীয়দের যন্ত্রণায় মুসলমানদের গৃহবহির্গমন পৰ্যন্ত
বন্ধ হইল। হাশেমীগণের এই অবরােধ অবস্থার কষ্ট ও
যন্ত্রণা স্মরণ করিলেও প্রাণ শিহরিয়া উঠে! এই অবস্থায়
তিন বৎসর কাল অতিবাহিত হওয়ার পর অবশেষে
হেশাম এবং যােবের নামক দুই জন ক্ষমতাপন্ন হৃদয়বান
মােসলেমের সাহায্যে ও চেষ্টায় নবুওতের নবম বর্ষের
শেষে কাফেরগণের সহিত এক সন্ধি স্থাপিত হইয়া আবার
মুসলমান এবং কাফেরগণ একত্রে মিলিত হইল।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
তও
ও মানবকর্তৃক লাঞ্ছনার জন্য তোমারি কাছে অভিযােগ
করিতেছি! তুমি দয়ার সাগর, তুমি আমা হেন
নিরাশ্রয়ের আশ্রয়দাতা। প্রভাে, তুমি কি আমাকে
এমন এক অপরিচিতের হাতে ছাড়িয়া দিয়াছ যে আমাকে
দেখিয়া ঘৃণায় মুখ ফিরাইয়া লয়? প্রভাে! কোপান্বিত
হইয়া এই ভৃত্যের প্রতি বিমুখ হইও না। তুমি যে
পৰ্যন্ত সন্তুষ্ট না হও, আমি তােমারি আজ্ঞা শিরােধার্য্য
করিয়া লইব। কৃপাময় !
কৃপাময় ! আমাকে অহিত ও অনিষ্ট
হইতে বাঁচাও। কৃপাময়! পুণ্যকাৰ্য্যের শক্তিদান ত
তােমারি হাতে ন্যস্ত।”
ইহার পরই হজরত মক্কায় ফিরিয়া আসিলেন এবং
নূতন উদ্যমের সহিত আবার প্রচার কাৰ্য আরম্ভ করিলেন।
ইহার কিছুদিন পরে, নবুওতের দশমবর্ষের শেষে,
হজরতের বিবি আয়শার
হজরত আবুবকর সিদ্দিকের
সহিত বিবাহ। নবুওতের
কন্যা উম্মেল মােমেনীন
১ম বর্ষের শেষ। ৬২০ খ্রঃ।
(মােমেনগণের মাতা)
মাতা) বিবি
আয়শার সহিত হজরতের নেকাহ হয়। গ
৭ বৎসর বয়সে হজরতের সহিত তাঁহার পরিণয় হয়। হজরতের
মৃত্যুর পর তিনি বহুকাল জীবিত ছিলেন। ৫৮ হিজরীতে (৬৭৮ খ্রঃ)
তিনি ৬৭ বৎসর বয়সে মানবলীলা সংবরণ করেন।
৪২
স্বর্গের জ্যোতিঃ
৩০
নবুওতের একাদশবর্ষে পয়গম্বর সাহেব একদা
‘মেনার’ মেলা হইতে ফিরিতেছিলেন। পথিমধ্যে
দেখিলেন যে, আকাবা নামক গিরির উপরে
ইয়সরবের আওস ও খরজ সম্প্রদায়ের ৬ জন হজযাত্রী
এক নির্জন স্থানে দাড়াইয়া কি কথােপকথন করিতেছে।
হজরত তাহাদের কাছে অগ্রসর হইয়া তাহাদিগকে
ইয়সবীদের এসলাম এসলামে ‘দাও' (আহ্বান)।
গ্রহণ। নবুওতের একাদশ
করিলেন।
হজরতের প্রচার
বর্ষের শেষ ও দ্বাদশ বর্ষের
মাহাত্মে আকৃষ্ট হইয়া তাহারা
প্রারম্ভ। ৬২১ খ্রঃ।
তখন এলাম গ্রহণ করিলেন।
পর বৎসর (নবুওতের
দ্বাদশবর্ষে) ইয়বের
উপরােক্ত
সম্প্রদায়ের আরও দ্বাদশটি লােক পূর্বোক্ত স্থানে পয়গম্বর
সাহেবের সম্মুখে গােপনে উপস্থিত হইয়া এলাম
গ্রহণ করেন এবং এস্লামের সমৃদ্ধি সাধনের জন্য দৃঢ়
প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হয়েন।
কথিত আছে যে, নবুওতের দ্বাদশবর্ষে একদা
গভীর নিশীথে খােদাতলার আদেশক্রমে হজরত
মেরাজ। নবুওতের দ্বাদশ জিব্রাইল (খােদাতালার বার্তাবহ
মেরাজ ২৭ রজব। ৬২১ খ্রঃ। প্রধান ফেরেস্তা) সকল সারতত্ত্ব
স্বর্গের জ্যোতিঃ
জ্ঞাতার্থে রসুলােল্লাহকে সপ্তম স্বর্গে লইয়া যান
এবং তথায় খােদায়ে পাক তাঁহার নির্বাচিত বন্ধুকে
জ্যোতির্ময়রূপে দর্শন দিয়া কথােপকথন করেন।
এলামের ইতিহাসে ইহাই ‘মেরাজ’ বলিয়া কথিত,
এবং সমগ্র এলাম জগতে এই রাত্রির উপাসনা বিশেষ
পুণ্যজনক বলিয়া পরিগণিত।
এদিকে মক্কাতে প্রত্যহই কাফেরগণের হস্তে পয়গম্বর
সাহেবের অলৌকিক
সহিষ্ণুতার পরীক্ষা
হইতেছিল। মােলেমগণের প্রতি কাফেরগণের অত্যাচার
ও উৎপীড়ন, শােণিত-লােলুপ হিংস্র পশু প্রকৃতিকেও
অতিক্রম করিতে লাগিল। কিন্তু মােস্লেম-কুলগৌরব
পয়গম্বর সাহেব ইহাতে এক তিল পরিমাণও সাহস ও
সংযম হারাইলেন না। তিনি সর্বনিয়ন্তা খােদাতালার
প্রতি আত্মসমর্পণ করিয়া সকল যাতনা নিরবে সহ্য করিতে
ধৈৰ্য্য ও
* পয়গম্বর সাহেব সশরীরে ‘মেরাজ ভ্রমণ করিয়াছিলেন কি শুধু তাহার
‘রুহ (আত্মা) এ ভ্রমণ সমাধা করিয়াছে, সে বিষয় ‘আলেমগণের
মধ্যে মতভেদ আছে ; সুতরাং আমাদের সে সম্বন্ধে আলােচনা নিষ্প্রয়ােজন।
কোরাণপাক সুরা মেরাজ’ দেখ। মেরাজ অর্থ উত্থান।
। এই রাত্রি হইতে মুসলমানদের প্রতি সাময়িক ‘নমাজ’ ও ‘রােজা ফরজ
( অবশ্য পালনীয়) বলিয়া নির্দিষ্ট হয়।
৪৪
স্বর্গের জ্যোতিঃ
খ্রঃ।
লাগিলেন এবং এস্লামের জয় সুনিশ্চিত এই দৃঢ় বিশ্বাসে
বলীয়ান হইয়া তাহার কর্তব্য করিতে রহিলেন।
পূর্বোক্ত যে স্থানে ইয়বের ছয় জন লােক পূর্বে
এসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন, তথায় নবুওতের ত্রয়ােদশ
বর্ষে একদা অতি • সংগােপনে
আকাবা গিরিপরি অঙ্গীকার।
আরও ৭২ জন ইয়স্ববাসী
নবুওতের ত্রয়ােদশ বর্ষ। ৬২২
একত্রিত হইয়া হজরতের
নিকট এসলাম গ্রহণ করতঃ পয়গম্বর সাহেবকে প্রচার
কল্পে ইয় রবে লইয়া যাইতে বিশেষ প্রয়াস পাইলেন, এবং
তিনিও সুযােগমত তথায় যাইতে প্রতিশ্রুত হইয়া
তাঁহাদিগকে উৎসাহিত করিলেন।
করিলেন। অতঃপর হজরত
তাহাদিগকে এসলামে
দৃঢ় থাকিতে এক কঠোর
অঙ্গীকারে আবদ্ধ করাইয়া মক্কার কতিপয় মুসলমানকে
এসলাম প্রচার জন্য নকীব (বার্তাবহ) নিযুক্ত
করতঃ তাহাদের সহিত ইয়সরব প্রেরণ করিলেন।
বিধৰ্ম্মী কোরেশের
গুপ্তচরবর্গ এই ঘটনা তাহাদের
নেতাদিগকে জানাইল। কোরেশীগণ যখন দেখিল
যে মদিনাতেও এপ্লামের আধিপত্য বিশেষ বিস্তৃত
হইয়া পড়িতেছে, তখন তাহার এক সভা আহূত
৪৫
স্বর্গের জ্যোতিঃ
তভoa০
।
তদনুযায়ী
;
করিয়া হজরতের জীবন সংহার করা স্থির করিল
হজরত এই সংবাদ পাইয়া কতিপয় মমামেনকে
সমূহ বিপদাশঙ্কায় ইয়স, রবে চলিয়া যাইতে আদেশ
করিলেন।
হজরত ওমর ফারুক
জন মুসলমানসহ মক্কা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক ইয় রব
নগরীতে আশ্রয় লইলেন। পয়গম্বর সাহেব হজরত
আবুবক্র ও হজরত আলী মােৰ্ত্তজাকেসহ মক্কাতেই
অবস্থান করিতে লাগিলেন। এই অবস্থা দৃষ্টে কাফেরগণ
পরম পুলকিত হইল ; তাহারা ভাবিল, তাহাদের বধ্য
তাহাদেরই আয়ত্তে রহিল। তখন একদিন কাফেরগণ
মধ্যে কতিপয় ব্যক্তি নিশাযােগে হজরতের হত্যা উদ্দেশ্যে
তাহার শয়নকক্ষের চারিদিকে উন্মুক্ত কৃপাণহস্তে অলক্ষ্যে
সুযােগ প্রতীক্ষা করিতে লাগিল। তাহারা নিশ্চিন্ত
ভাবিল যে, হজরত যখন নিশীথ উপাসনার্থে গাত্রোত্থান
করিবেন, তখনই তাহারা তাহার শিরচ্ছেদ করিবে।
কিন্তু খােদাতালা যাঁহার রক্ষক, ছার মানুষের সাধ্য কি
তাঁহার কেশাগ্রও স্পর্শ করিতে পারে। জনাব
রেসালামাব এই ষড়যন্ত্র টের পাইয়া হজরত আলীকে
কহিলেন, “কাফেরগণ আমার রক্তপিপাসু হইয়া রহিয়াছে,
Eo
স্বর্গের জ্যোতিঃ
তুমি আমার শয্যাপরি আপাদমস্তক আবৃত করিয়া শয়ন
কর। খােদাতালা তােমাকে রক্ষা করিবেন, তুমি নিশ্চিন্ত
থাক।” এই বলিয়া পয়গম্বর সাহেব হজরত আলীর
হস্তে অপরের গচ্ছিত সামগ্রীগুলি প্রদান করতঃ তাহা
যথাস্থানে বুঝাইয়া দিবার আদেশ প্রদান করিলেন।
হজরত আলীও হৃষ্টচিত্তে এই বিপদের সম্মুখীন হইতে
সম্মত হইলেন। পয়গম্বর সাহেব তখন এক গুপ্তদ্বার
দিয়া অন্তর্হিত হইলেন। কাফেরগণ কক্ষের বাহিরে
অপেক্ষা করিতে করিতে
অধৈৰ্য্য হইয়া বলপূর্বক
কক্ষে প্রবেশ করতঃ যাহা দেখিল তাহাতে তাহারা
অবাক হইয়া গেল ! তাহারা পয়গম্বর সাহেবের
গন্তব্য স্থান জানিবার জন্য হজরত আলীকে অনেক
ভয় প্রদর্শন করিল, কিন্তু হজরত আলী কেবল মাত্র ইহাই
বলিতে লাগিলেন যে, “একমাত্র আল্লাহতালাই ভঁহার
প্রেরিত রসুলের গন্তব্যস্থান জ্ঞাত আছেন।”
=
৪৭
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
হেজরত * ও মদিনা
এই বিশাল আরবদেশ হইতে তােমার শত্রুর চিহ্ন মাত্র
বিলুপ্ত হইবে।
(কোরান পাক্ সুরা আল্ কওসর)।
And I will shake all nations, and the desire of
all nations shall come, and I will fill this house with
glory, said the Lord of the hosts. (Hag. Il-7)
এদিকে পয়গম্বর সাহেব কক্ষ হইতে বাহির হইয়া
হজরত আবুবকরের গৃহে উপস্থিত হইলেন। বিশ্বস্ত
বন্ধু হজরত আবুবকর ‘সিদ্দিক’ নিজ আত্মীয় পরিবারকে
শক্তহস্তে ছাড়িয়া হজরতের সহচর হওয়ার জন্য প্রস্তুত
হইতে লাগিলেন। পরদিন সমস্ত দিন তথায় অবস্থান
করিয়া নিশীথের অন্ধকারে জনাব রেসালাৎ মাৰ হজরত
হেজরত অর্থ নিবাস পরিবর্তনক্রমে অন্যত্র গমন।
৪৮
স্বর্গের জ্যোতিঃ
উঠিল।
আবুবকরসহ নিষ্ক্রান্ত হইয়া সূর নামক এক সঙ্কীর্ণ
গিরিগহ্বরে লুকাইয়া রহিলেন।
সাধারণতঃ এই ঘটনা হইতেই হিজরী সনের আরম্ভ
হইয়াছে বলিয়া লােকের ধারণা। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে
হিজরী সন আরম্ভ।
দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর
১ম মহরম। ১৬ই জুলাই
ফারুকের খেলাফতকালে এই
৬২২ খ্রঃ
ঘটনার পরবর্তী প্রথম মহরম
হইতে হিজরী সন প্রচলিত হয় ।
হজরতকে গৃহে না পাইয়া কাফেরগণ মরিয়া হইয়া
মক্কার প্রান্তে প্রান্তে তাহাকে ধৃত করার জন্য
বহুমুদ্রা পুরস্কার বিঘােষিত হইল। হজরতের উদ্দেশ্যে
নিষ্কোষিত তরবারি হস্তে চারিদিকে অশ্বারােহিগণ ছুটিল
এবং যে গিরিকরে তিনি লুকাইয়া ছিলেন, তাহারই
পার্শ্ব দিয়া তাহারা ছুটাছুটি করিতে লাগিল। হজরত আবুবকর
এই অবস্থা দেখিয়া একটু অধীর হইয়া বলিলেন, “হজরত !
এই বিপদ সময়ে আমরা মাত্র দু’জন!” হজরত বাধা
দিয়া উত্তর করিলেন, “চিন্তা নাই, খােদাতালাও আমাদের
সঙ্গে আছেন।” তাঁহারা তিন দিবারাত্র গহ্বরে অবস্থান
করিলেন। সেই সময় হজরত আবুবকরের আসমা
৪৯
স্বদের জ্যোতিঃ
®ভ/৩
নাম্নী এক দুহিতা-রত্ন নৈশ অন্ধকারে লুক্কায়িত হইয়া
তাহাদের খাদ্যসামগ্রী দিয়া যাইতেন। চতুর্থ দিবসে
পয়গম্বর সাহেব, হজরত আবুবকর, তঁাহার পুত্র আব্দুল্লা
ও ভৃত্য আমের সহ ইয়ব যাত্রা করিলেন।
অনুসন্ধানকারী
জনৈক অশ্বারােহী শত্রু হাদের
পশ্চাদ্ধাবন করিল এবং যে মুহূর্তে সে হজরতকে
আক্রমণ করিবে, ঠিক সেই সময়ে তাহার অশ্বের পদস্খলন
হওয়ায় সে ভূতলে পতিত হইল। তখন সে শক্তিবিরহিত
হইয়া হজরতের নিকট আত্মসমর্পণ করিল।
হজরত
তাহাকে ক্ষমা করিলেন এবং ফিরিয়া যাইতে আদেশ
করিলেন। সে ফিরিয়া গেল এবং পথিমধ্যে অকৃতকাৰ্যতার
ভাণ করিয়া অন্যান্য অনুসরণকারিগণকেও ফিরাইয়া
লইয়া গেল। *
এইরূপে পয়গম্বর সাহেব ইয়সরব হইতে দুই মাইল
দূরে কোবা নামক স্থানে
মজিদ স্থাপন
কোবা প্রবেশ ও মসজিদ
করেন এবং তথাকার অধি-
নিৰ্মাণ। ১২ রবিউল আউওল বাসিগণকে এলামে দীক্ষিত
২৮শে জুন, ৬২২ খ্রঃ
* এই ব্যক্তির নাম সুরাকা বেন মালেক। সে পরে মক্কা বিজয় কালীন
এসলাম গ্রহণ করে।
৫০
স্বর্গের জ্যোতিঃ
করিয়া পুনঃ ইয়সব যাত্রা করেন। এসলামের ইতিহাসে
ইহাই সর্ব প্রথম মজিদ। আজপর্যন্ত এই মসজিদ
বিদ্যমান থাকিয়া পৰ্যটকগণকে মােসলেমের অতীত কীর্তি
স্মরণ করাইয়া দিতেছে।
১৬ই রবিওল আউওল শুক্রবার ও প্রত্যুষে তিনি
ইয়রব নগরীতে শুভাগমন করেন। এই নগরের
এক স্থানে হজরতের উষ্ট্র নিজ
ইসরব প্রবেশ। ১৬ রবিউল হইতেই থামিয়া যায়। ইহার
আউওল। নবুওতের চতুর্দশ অনতিদূরেই হজরত আবু আইয়ুব
বষ। ২ জুলাই ৬২২ খ্রঃ।
আত্সারীর ভবনে রসুলে করিম
আতিথ্য গ্রহণ করেন।
মােমনগণ মধ্যে যাঁহারা ইয়স্ব নগরে
আশ্রয় লইলেন, তাহারা মহাজেরীন’ + এবং ইয়স্রবের
মােমনগণ ‘আনসার’ নামে
মহাজেমীন ও আর
খ্যাত হইলেন।
* এই ঘটনার দিন হইতে মুসলমানদের মধ্যে জুমার নামাজ প্রচলিত
। মহাজেরীন অর্থ বাসস্থান পরিবর্তনকারিগণ।
অার অর্থ সাহায্যকারিগণ।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
n
•
ইয়ব নগরী মক্কা হইতে ২৫০ মাইল উত্তরে
অবস্থিত। পয়গম্বর সাহেবের তথায় আগমনের পর
হইতে উহা ‘মদিনাতুন্নবী (নবীর সহর) এবং সংক্ষেপে
মদিনা বলিয়া জগতে পরিচিত হয়। আমরাও এখন
হইতে ইয়স্ব নগরীকে মদিনা বলিয়াই উল্লেখ করিব।
তৎকালে এই স্থানের অধিবাসিগণ অধিকাংশই ইহুদি
সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল।
ইহারা রােমীয়গণের অত্যাচারে
প্রপীড়িত হইয়া তাহাদের আদিম আবাস ভূমি ফলস্তীন
(Palestine) প্রদেশ হইতে পলায়নপূর্বক এই নগরে ও
ইহার চতুষ্পর্শ্বস্থিত স্থানে কঠোর দুর্গশ্রেণী নির্মাণ করিয়া
তাহাতে আশ্রয় লয় ।
মদিনায় ‘আওস’ ও ‘খ্যেরজ’ নামক দুইটি প্রভূত
প্রতিপত্তিশালী সম্প্রদায় ছিল। পয়গম্বর সাহেবের
মদিনায় শুভাগমনের পূর্বে ইহারা
‘আওস ও ‘খেরজ’
একে অপরের ঘাের প্রতিদ্বন্দ্বী
সম্প্রদায়েয় এলাম
ছিল । হজরতের তাগমনের পর
এই দুই সম্প্রদায়ের সকলেই
ঈমান আনয়ন করিলেন এবং এসলামের একতা
ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হইলেন। পরে এই স্থানের ইহুদী
গ্রহণ
স্বর্গের জ্যোতিঃ
এক
সােহেল ,
সম্প্রদায়ের ক্ষমতাপন্ন সরদার অব্দিল্লা বেন্ সালামও
এসলাম গ্রহণ করেন।
মদিনায় পরস্পরের মধ্যে একতা ও সৌহার্দ
স্থাপন করিবার পর, যে স্থানে হজরতের বাহন-উষ্ট্র
থামিয়াছিল তথায় হজরত
মসজিদে নববী নির্মাণ।
মজিদ নির্মাণে প্রবৃত্ত হইলেন।
নবুওতের চতুর্দশবষ।
৬২২ খ্রঃ।
সেই স্থানটীর স্বত্বাধিকারী
সহল
নামক
দুইটি এতীম বালক ছিল, তাহারা মজিদ নির্মাণ
রূপ পুণ্যকাৰ্যে সে স্থানটি বিনা মূল্যে দিতে আগ্রহ
প্রকাশ করিলে, পয়গম্বর সাহেব তাহা কিছুতেই শুনি-
লেন না। পরে তিনি দশ ‘মেসকাল * স্বর্ণমুদ্রাদ্বারা
ঐ স্থানটি ক্রয় করিয়া স্বয়ং ও অন্যান্য মােমনগণের
সহায়তায় তথায় এক মসজিদ নির্মাণে রত হইলেন। অপক্ক
ইষ্টক দ্বারা উহার প্রাচীর, খৰ্জর পত্র দ্বারা ছাদ, এবং
খোৰ্ম্মা বৃক্ষ দ্বারা উহার খুঁটি নির্মাণ করিলেন। পরে
মােস্লেমগণের সহিত সেই মজিদে একমাত্র আল্লাহ
পাকের সাময়িক উপাসনায় রত হইলেন।
হজরত
# তৌল বিশেষ।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
১WS
। প্রথম
নিজ অন্তঃপুরিকাদের বাসের নিমিত্ত এই মসজিদের
সংলগ্ন ভূমিতে গৃহাদি নির্মাণ করতঃ যয়েদ বেন্
হারেসকে পাঁচ
শত মুদ্রা
দুইটি উষ্ট্রসহ
‘উম্মেহাতুল মােমেনীন’কে আনিতে মক্কায় পাঠাইলেন।
যথাসময়ে তাঁহারা নিরাপদে মদিনায় আসিয়া
পৌছিলেন।
হেজরতের সপ্তম মাস হইতে জনাব পয়গম্বর
সাহেব . হজরত আবু আইয়ুবের ভবন হইতে উঠিয়া
এই মসজিদের এক কক্ষে
বসবাস আরম্ভ করিলেন।
হিজরী। ৬২৩ খ্রঃ।
তখন ভিন্ন ভিন্ন উপাসনালয়ে
ঘণ্টা ইত্যাদি বাজাইয়া উপাসকগণকে আহ্বান করা
এই সময় হইতে পয়গম্বর সাহেব হজরত
বেলালকে এই মসজিদে মনােমুগ্ধকারী আজান ঘােষণা
করিয়া উপাসকবৃন্দকে আহ্বান করিতে আদেশ করেন।
যখন হজরত বেলালের কণ্ঠঃনিস্ত সুমধুর ‘আল্লাহহ
অক্বাির’ (আল্লাহ, মহান্ !) ধ্বনি দূর দূরান্তরে পরিব্যাপ্ত
হইত, তন্মুহূর্তেই শ্রোতৃগণ স্ব স্ব কৰ্ম্ম পরিত্যাগ পূর্বক
এই মসজিদে সমবেত হইতেন এবং ইতর, ভদ্র, ধনী,
হইত।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
দরিদ্র নির্বিশেষে একপ্রাণ হইয়া বিনয় ও ভক্তির
পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিতেন।
হিজরীর দ্বিতীয়বর্ষ হইতে মজিদে নববীতে কাবা
শরিফকে ‘কেবলা করিয়া (মান্যের সহিত সম্মুখে
রাখিয়া) মুসলমানগণ নামাজ
কেবলা। দ্বিতীয় হিজরী।
পড়িতে থাকেন। ইতঃপূর্বে
৬২৩ খ্রীঃ।
তাহারা জেরুজালেম স্থিত
‘বয়তুল মােকাদ্দেস’কে (মসূজেদ-উল-আসা) কেবলা
করিয়া নামাজ পড়িতেন।
জনাব রেসালা-মাবের হেজরতের পর কোরেশগণ
বড়ই বিচলিত হইয়া উঠিল। তাহারা স্থির ভাবিল যে,
মদিনাবাসীদের সহিত মিলিত হইয়া হজরত অচিরেই
এই নবধর্মের প্রসার সাধন
মােনাফেকীন।
করিবেন এবং তাহার ফলে
তাহাদের জাতীয় ধৰ্ম্ম সম্পূর্ণ ধ্বংস
হইবে।
এদিকে মদিনার এক ইহুদি সম্প্রদায়, যাহারা বাহিরে
এলাম গ্রহণ করিয়া অন্তরে কপটতা লুক্কায়িত রাখিত
বলিয়া ‘মােনাফেকীন’ নামে অভিহিত হইয়াছিল, তাহারা
এলামের মূল উৎপাটনে দৃঢ়সঙ্কল্প হইয়া গােপনে
oC
স্বর্গের জ্যোতিঃ
RE
.
কোরেশীদের সহিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইল। সুদূরদর্শী
পয়গম্বর সাহেব মুসলমানগণকে এই অসৎ প্রতিবেশীর
সহিত সংশ্লিষ্ট দেখিয়া মােনাফেকীন’ সঙ্গে এক সন্ধি
স্থাপন করিলেন।
পয়গম্বর সাহেবকে নিষ্কামধৰ্ম প্রচারে বাধা দিয়া
মুসলমানগণের ক্ষুদ্র দলকে সমূলে বিনাশ করার উদ্দেশ্যে
বিধর্মী কোরেশীগণ ও মদিনার
জেহাদ। *
চারিদিকস্থ ভিন্ন ভিন্ন ইহুদী ইত্যাদি
সম্প্রদায়গণ তাঁহাদিগকে অনেকবার আক্রমণ করিয়া
পরাজিত ও বিধ্বস্ত হইয়া ফিরিয়া যায়। মুসলমানগণ
* এখানে প্রসিদ্ধ আয়েত দ্বয়ের অনুবাদ নিম্নে প্রদত্ত হইল :-
“যাহার শত্রু কর্তৃক অন্যায়রূপে আক্রান্ত হইয়াছে তাহাদিকে এই অযথা
নিষ্পীড়নের বিনিময়ে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার আদেশ দেওয়া হইল।”
“আল্লাহতালা নিশ্চয়ই তাহাদের জন্য সাহায্য বিধান করিয়াছেন, যাহারা
এইরূপে উৎপীড়িত হইয়া সম্পূর্ণ অবিচারে তাহাদের গৃহ হইতে বিতাড়িত।”
তাহাদের শুধু এইটুক বলায় অপরাধ হইয়াছে যে “আল্লাহতালাই আমাদের
একমাত্র উপাস্য প্রভু!” যদি আল্লাহতালা এই ব্যক্তিগণকে অপর কর্তৃক দমন
করিতেন তবে ইহুদীর ভজনালয়, খ্রীষ্টানের গির্জা ও মুসলমানের মাজেদ
যথায় অহঃরহ আল্লাহতালার স্তুতিবাদ হইয়া থাকে, বহুপূৰ্বেই এই ধৰ্ম্মদ্রোহিগণের
হস্তে তুমিস্যাৎ হইত। আল্লাহতালা নিশ্চয়ই সেই ব্যক্তিকে সাহায্য করেন
যে নিজে নিজের সাহায্যে তৎপর । কোরাণ পাক, সুরা হজ,)
স্বর্গের জ্যোতিঃ আত্মরক্ষা ও ধৰ্ম্মরক্ষা হেতু এই অযথা আক্রমণ প্রতিহত করিবার জন্য যে যুদ্ধ করিতে বাধ্য হন, তাহারই নাম ‘জেহাদ। কোরাণপাকে এই ধৰ্ম্মযুদ্ধের উদ্দেশ্য ও প্রয়ােজনীয়তা দেখাইয়া স্থানে স্থানে আয়েত নাজেল হইয়াছে। আমরা এস্থলে এইরূপ কয়েকটি প্রসিদ্ধ সংগ্রামের বিবরণ দিব। বদর যুদ্ধের পূর্বে কোরেশীগণ মদিনার মুসলমানগণকে আরও কয়েকবার আক্রমণ করিয়া পরাজিত হইয়া ফিরিয়া যায়। সিরিয়া হইতে ত্রিশ চল্লিশ জন লােক গঠিত এক যাত্রিদল বাণিজ্য ১৮ রমজান, ২ হিজরী। ৭ জানুয়ারী, দ্রব্য সম্ভারসহ মদিনার নিকট ৬২৪ খ্রঃ। দিয়া মক্কায় ফিরিতেছিল। এই যাত্রিদলের অধিনায়ক আবু সুফিয়ান মুসলমান কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার অমূলক ভীতিতে সত্বর মক্কাতে লােকসাহায্য চাহিয়া পাঠায়। এই সংবাদ পাইয়া মুসলমানগণের পরম শত্রু আবু জেহেল, বিধৰ্ম্মি কোরেশীগণকে উত্তেজিত করিয়া বলিল যে, “মুসলমান- গণ তােমাদের যাত্রিদলকে লুণ্ঠন করিতে প্রস্তুত তােমরাও তাহাদেয় প্রতিহিংসা লইতে বদরের যুদ্ধ। হইয়াছে, ৫৭
স্বর্গের জ্যোতিঃ
হইল।
প্রস্তুত হও।” তাহার ইচ্ছা ছিল যে এই কৌশলে
মুসলমানদিগকে আক্রমণ করিয়া তাহাদের বিনাশ
সাধন করে। তখন আবু জেহেল এক সহস্ৰ বৰ্মাচ্ছাদিত
সশস্ত্র বীরগণসহ, ৭০০ শত উষ্ট্র ও এক শত
অশ্ব -সমভিব্যাহারে মদিনাভিমুখে অগ্রসর
হজরত এই সংবাদ পাওয়া মাত্র ৩১৩ জন মহাজেরীন ও
আনসার, ৭০টি উষ্ট্র, ৩টি অশ্ব এবং মাত্র ৬টি বৰ্ম্মসহ
এই অসম শত্ৰুদলকে বাধা দিতে যাত্রা করিলেন।
জনাব পয়গম্বর সাহেব দূর হইতে এই প্রবল শত্রুর
রণসজ্জা দেখিয়া সঙ্গীগণ সহিত মন্ত্রণা করিলেন।
সকলেই একবাক্যে বলিলেন, “হজরত ! আজীবন
আপনার সহায়তায় প্রতিশ্রুত হইয়াছি, অগ্রসর হউন,
খােদাতালার ইচ্ছায় নিশ্চয়ই শত্রুর পতন হইবে।”
হজরত পরম প্রীত হইয়া উত্তর করিলেন, “খােদাতালার
তােমাদের সহিতই রহিয়াছে, অগ্রসর হও,
শক্রর পতন অনিবার্য।” অতঃপর জনাব রেসালামাব
১৭ই রমজান দ্বিতীয় হিজরীতে মুসলমানগণসহ খাদ্য
ও জলকষ্টে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হইয়া বদর প্রান্তরে
উপস্থিত হইলেন। জলতৃষ্ণায় মুসলমানগণ অস্থির হইয়া
স্বর্গের জ্যোতিঃ জE ; উঠিলেন; পরন্তু জলও শত্রুর করালকবলে সুরক্ষিত ছিল। কিন্তু সেই খােদায়ে পাকের কি বিচিত্র মহিমা। হঠাৎ আকাশ ঘনঘটায় আচ্ছন্ন হইয়া বারিপাত হইল এবং মােসলেমগণ পরম করুণাময়ের নাম লইয়া তৃষ্ণা নিবারণ করতঃ নবােৎসাহে উৎসাহিত হইলেন। পরদিন প্রত্যুষে উভয় সৈন্যদল সম্মুখীন হইল। হজরত, মুসলমান- গণকে আদেশ করিলেন, “যতক্ষণ শত্রুসৈন্য আক্রমণ করে, নীরবে দাড়াইয়া থাক।” যখন শত্রুপক্ষ হইতে প্রথমে আক্রমণ আরম্ভ হইল, মােসলেমগণ তখন অগ্রসর হইলেন। কাফেরগণ মধ্যে ওৎবা বেন্ রবিয়া গর্জন করিয়া বলিল, “হে মােহাম্মদ (দঃ)! মদিনার এই ঘৃণিত কৃষক শ্রেণীর সহিত কি যুঝিব ? যদি সাধ থাকে, তবে কোরেশী বীরগণকে পাঠাও।” জনাব রেসালাৎ মাব তখন হজরত আলী, হজরত হাজা ও হজরত যয়েদ বেন্ আল হারেসকে অগ্রসর হইতে আদেশ দিলেন। যুদ্ধ আরম্ভ হইল। হজরত আলী প্রথম আঘাতেই ওলীদকে দ্বিখণ্ড করিলেন, হজরত হাজ্জাও ওৎবাকে ভূতলশায়ী করিলেন। এই বীরদ্বয়ের পতনে কাফেরগণ প্রমাদ গণিল, তাহারা তখন সকলে
স্বর্গের জ্যোতিঃ
০১)
একত্রিত হইয়া আক্রমণ করিল। এই সময় হজরত্ব
আলীর বয়স মাত্র ২৩ কি ২৪ বৎসর ছিল। তিনি ও
হজরত হাজ্জা অচিরেই শত্ৰুচ্ছত্র ছিন্ন-ভিন্ন করিয়া
ফেলিলেন। আবু জেহেল এই অবস্থা দেখিয়া মরিয়া
হইয়া পুনঃ, আক্রমণ করিল এবং মুসলমানগণকে
পশ্চাৎপদ করিবে এমন সময় হজরত খোদাতালার
কাছে হস্ত প্রসারণ করিয়া বলিতে লাগিলেন, “প্রভাে!
তােমার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ কর। হে করুণাময়! যদি
মােসলেমগণের এই ক্ষুদ্র দল আজ নিধন হয়, তবে
তােমার পবিত্র উপাসনা করিতে আর কে থাকিবে
প্রভু ?” অনেকক্ষণ পর্যন্ত পয়গম্বর সাহেব একাগ্রচিত্তে
এই অবস্থায় থাকিয়া হর্ষোল্লাসে উঠিয়া দাড়াইলেন
এবং মুসলমানগণকে কোরাণ পাকের কয়েকটি আয়েত
শুনাইয়া উৎসাহিত করিলেন। হজরত মায তখন
তীব্রবেগে আক্রমণ করিয়া আবু জেহেলের পা দ্বিখণ্ড
করিয়া ফেলিলেন। আবু জেহেলের পুত্র আক্রামা
হজরত মাযের বাহু ছিন্ন প্রায় করিয়া দিল। তিনি
স্বীয় আহত বাহু ক্ষিপ্রবেগে পদনিম্নে চাপিয়া ছিড়িয়া
ফেলিলেন এবং আবার শত্রু নিপাতে প্রবৃত্ত হইলেন।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
ভo
তখন।
হজরত মাযের ভ্রাতা হজরত মউয সিংহবিক্রমে
আক্রমণ করতঃ আবু জেহেলকে নিহত করিলেন।
কাফেরগণ পরাজিত হইয়া পলায়নপর
হইয়া পলায়নপর হইল, এবং
তাহাদের ৭০ জন বন্দী হইল। তদ্ব্যতীত বহুবিধ যুদ্ধসামগ্রী
মােস্লেম হস্তে পতিত হইল। ইতঃপূর্বে আরবদেশ
প্রচলিত প্রথানুযায়ী যুদ্ধের বন্দীগণকে হত্যা করা হইত।
জনাব পয়গম্বর সাহেব এই নিয়ম সম্পূর্ণ রহিত করিয়া
তাহাদের প্রতি সদয় ব্যবহারের আদেশ প্রদান করেন।
এই যুদ্ধে মুসলমান পক্ষে ৬ জন মহাজেরীন ও ৮ জন
অার ‘শহীদ (ধৰ্ম্মযুদ্ধে হত) হন। পয়গম্বর সাহেব
আরও দুই তিন দিবস বদরে অপেক্ষা করিয়া খোদাতালার
বিজয় ঘােষণা করিতে করিতে মদিনায় প্রত্যাগমন
করলেন।
পরম শত্ৰু স্থানীয় ইহুদীগণ, এই বিজয় সংবাদে
ঈর্ষায় মরমে মরিয়া গেল। তাহারা পয়গম্বর সাহেব
'ও মুসলমানগণকে নানা প্রকারে নির্যাতন করিতে
আরম্ভ করিল। পরিণামে মুসলমানগণও আত্ম ও
ধৰ্ম্মরক্ষার্থে তাহাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘােষণা করিতে
বাধ্য হইলেন। কিন্তু ইহুদীগণ প্রত্যেকবারেই পরাজিত
স্বর্গের জ্যোতিঃ
হয় এবং তাহাদের মধ্যে জীবিতগণ কেহ বা পলাইয়া
প্রাণরক্ষা করে, আর কেহ বা মােসলেম হস্তে বন্দী হয়।
বদরের যুদ্ধের কিছু দিন পর যি-আর নামক
স্থানের যুদ্ধের সময় একদা পয়গম্বর সাহেব নিরস্ত্র হইয়া
একাকী শিবির
শিবির হইতে
দারের এসলাম গ্রহণ
দূরবর্তী এক বৃক্ষনিম্নে
দ্বিতীয় হিজরী। ৬২৪ খ্রীঃ।
ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত দেহে
‘বিশ্রাম করিতেছিলেন। তিনি হঠাৎ চক্ষু উন্মীলন করিয়া
দেখেন, দাসুর নামক তঁাহার এক মারাত্মক শত্রু উলঙ্গ কৃপাণ
তাহার মস্তকোপরি উত্তোলন করতঃ দাড়াইয়া রহিয়াছে।
দাসুর গৰ্জ্জন করিয়া কহিল, “মােহাম্মদ (দঃ) আমার
এই রক্তপিপাসু তরবারীর অব্যর্থ আঘাত হইতে এখন
তােমাকে কে বাঁচাইবে ?” হজরত অটল ও নিশ্চিন্ত
ভাবে উত্তর করিলেন, “আমার রক্ষক আমার সেই
একমাত্র সৃজনকর্তা।” হজরতের এই দ্বিধাহীন স্থিরবাক্যে
দাসুরের অন্তর কাপিয়া উঠিল এবং সে কিংকর্তব্যবিমূঢ়
হইয়া পড়িল। তখন স্খলিত শুষ্ক পত্রের মত তাহার
হাত হইতে তরবারী পড়িয়া গেল।
হজরত তখনই
উহা নিজ হস্তে উঠাইয়া লইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেমন,
e
স্বর্গের জ্যোতিঃ
62ষ্ঠত
এখন তােমাকে কে বাঁচাইবে দাসুর ?” সে নিরাশ হইয়া
উত্তর করিল, “হায়, কেহ না।” হজরত তখন দাসুরের
সম্মুখে তরবারী নিক্ষেপ করিয়া কহিলেন, “দাসুর !
আমার কাছে দয়া শিক্ষা কর।” হজরতের মহত্ত্বে আকৃষ্ট
হইয়া দাসুর তৎক্ষণাৎ এলাম গ্রহণ করিল।
বদরের যুদ্ধের পর পরাজিত কোরেশীগণ মক্কায়
ফিরিয়া তাহাদের লাঞ্ছনা ও অবমাননার প্রতিশােধ
নেওয়ার জন্য মােস্লেমগণের
ওহযুদ্ধ। ১১ সওয়াল ৩য়
বিরুদ্ধে আবার এক যুদ্ধের
হিজরী। ৬২৫ খ্রঃ।
আয়ােজন
কাব
বেন আশরফ, নামক জনৈক খ্যাতনামা ইহুদী কবি বদর
যুদ্ধের শােচনীয় পরিণাম কাহিনী সঙ্গীতরূপে গাহিয়া,
তাহার রচনার বৈদ্যুতিকচ্ছটায় মক্কার ঘরে ঘরে যুদ্ধের
আগুন জ্বালিয়া দিল। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে অচিরেই
ত্রিসহস্র রণদুর্ধর্ষ সৈন্য সজ্জিত হইল ; তাহাদের মধ্যে
৭০০ বৰ্ম্মাচ্ছাদিত যােদ্ধা ছিল। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী
‘হেন্দা পঞ্চদশটী আরও কোরেশরমণীসহ, সৈন্যগণকে
করিল।
* ইহার পিতা ওবা করের যুদ্ধে হজরত হাজার হস্তে নিহত
হইয়াছিল।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
প্রতিহিংসাপূর্ণ বীরত্বগাথা গাহিয়া সমাগ্নিতে আহুতি
দিবার জন্য প্রবুদ্ধ করিতে করিতে, তাহাদের সহগামিনী
হইল। সেই সঙ্গে কোরেশীগণ তাহাদের প্রধান দেবমূর্তি
‘হােবল’কেও সঙ্গে লইল। হজরত আব্বাস এই অবস্থা
দেখিয়া মক্কা হইতে ত্বরিতে এক কাসেদ (বার্তাবহ )
মদিনায় প্রেরণ করিয়া এই প্রলয় ঝটিকার উপক্রমবার্তা
জ্ঞাত করাইলেন। ১০ সওয়াল ৩ হিজরীতে জুমার
নমাজের পর পয়গম্বর সাহেব,
৭ ০ ০ মহাজেরীন ও
আনসারসহ মদিনা পরিত্যাগ করিয়া সন্ধ্যাকালে তথা হইতে
তিন মাইল দূরবর্তী ওহদ নামক গিরিপথে শিবির সন্নিবেশ
করিলেন। পরদিন প্রাতঃক্রিয়ার পর হজরত সৈন্য
সমাবেশ করিয়া সমরাঙ্গণে
পৌছিলেন। আওস
সম্প্রদায়ভুক্ত আবু আমের নামক জনৈক বিশ্বাসঘাতক
ইতঃপূর্বেই মদিনা পরিত্যাগ করতঃ কোরেশীদের সহিত
মিলিত হইয়া তাহাদের বিশ্বাস জন্মাইয়াছিল যে তাহার
ন্যায় নেতাকে সমরক্ষেত্রে দেখিলে মদিনাবাসী নিশ্চয়ই
নিরস্ত হইবে। আবু আমের সর্বপ্রথমে যুদ্ধক্ষেত্রে নামিয়া
মদিনাবাসিগণকে হজরতের সঙ্গ পরিত্যাগ করাইতে
চেষ্টা করিল। কিন্তু মােসলেমগণ সেই বিশ্বাসঘাতক
স্বর্গের জ্যোতিঃ
BE
সমাজ-দ্রোহীকে ধিক্কার দিয়া আক্রমণ করিলেন। (म
অচিরেই পরাজিত হইয়া পলায়ন করিল। হজরত যােবের,
খালেদ বেওলীদের দলকে আক্রমণ করতঃ তাহা-
দিগকে পশ্চাৎপদ করিয়া ছত্রভঙ্গ করিলেন। তখন
আবু সুফিয়ান এক সহস্র সৈন্যসহ অগ্রসর হইয়া
আক্রমণ করিল ; কোরেশী নারীগণ দামামা বাজাইয়া
প্রতিহিংসা-উদ্দীপক রণগীতি গাহিয়া সমরাগ্নি প্রজ্জ্বলিত
করিতে লাগিল। কিন্তু মােসূলেম বীরগণ অটল ও
অচলভাবে শর নিক্ষেপ করিয়া শত্রুর গতিরােধ করি-
লেন। কোরেশীগণের পতাকাবাহী তলহা বেন্ আবি
তলহা আস্ফালনপূর্বক পয়গম্বর সাহেবকে বিদ্রুপবাক্যে
যুদ্ধে আহ্বান করিল। হজরত আলী তৎক্ষণাৎ বীর
হুঙ্কারে তলহাকে আক্রমণ করিয়া যমালয়ে প্রেরণ করি-
লেন। এইরূপে ক্রমান্বয়ে নয় জন কোরেশী বীর পতিত
পতাকা উঠাইবার চেষ্টা করিয়া ভূতলশায়ী হইলেন।
হজরত হামযাও একদল মােসলেম সহ ঘােরযুদ্ধে লিপ্ত
হইলেন। পয়গম্বর সাহেব তখন তঁাহার উন্মুক্ত তরবারি
উত্তোলন পূর্বক ডাকিয়া বলিলেন, “মােসলেম বীরগণ !
তােমাদের মধ্যে এমন কে আছ যে আমার এই তরবারি
স্বর্গের জ্যোতিঃ
©
প্রতিহিংসাপূর্ণ বীরত্বগাথা গাহিয়া সারাগ্নিতে আহুতি
দিবার জন্য প্রবুদ্ধ করিতে করিতে, তাহাদের সহগামিনী
হইল । সেই সঙ্গে কোরেশীগণ তাহাদের প্রধান দেবমূর্তি
‘হােবল’কেও সঙ্গে লইল। হজরত আব্বাস এই অবস্থা
দেখিয়া মক্কা হইতে ত্বরিতে এক কাসেদ' (বার্তাবহ )
মদিনায় প্রেরণ করিয়া এই প্রলয় ঝটিকার উপক্রমবার্তা
জ্ঞাত করাইলেন। ১০ সওয়াল ৩ হিজরীতে জুমার
নমাজের পর পয়গম্বর সাহেব, ৫০০ মহাজেরীন ও
আসারসহ মদিনা পরিত্যাগ করিয়া সন্ধ্যাকালে তথা হইতে
তিন মাইল দূরবর্তী ওহদ নামক গিরিপথে শিবির সন্নিবেশ
করিলেন। পরদিন প্রাতঃক্রিয়ার পর হজরত সৈন্য
সমাবেশ করিয়া সমরাঙ্গণে
পৌছিলেন। আওস
সম্প্রদায়ভুক্ত আবু আমের নামক জনৈক বিশ্বাসঘাতক
ইতঃপূৰ্বেই মদিনা পরিত্যাগ করতঃ কোরেশীদের সহিত
মিলিত হইয়া তাহাদের বিশ্বাস জন্মাইয়াছিল যে তাহার
ন্যায় নেতাকে সমরক্ষেত্রে দেখিলে মদিনাবাসী নিশ্চয়ই
নিরস্ত হইবে। আবু আমের সর্বপ্রথমে যুদ্ধক্ষেত্রে নামিয়া
মদিনাবাসিগণকে হজরতের সঙ্গ পরিত্যাগ করাইতে
চেষ্টা করিল। কিন্তু মােসলেমগণ সেই বিশ্বাসঘাতক
৬৪
স্বর্গের জ্যোতিঃ
সমাজ-দ্রোহীকে ধিক্কার দিয়া আক্রমণ করিলেন। সে
অচিরেই পরাজিত হইয়া পলায়ন করিল। হজরত যযাবের,
খালেদ বেওলীদের দলকে আক্রমণ করতঃ তাহা-
দিগকে পশ্চাৎপদ করিয়া ছত্রভঙ্গ করিলেন। তখন
আবু সুফিয়ান এক সহস্র সৈন্যসহ অগ্রসর হইয়া
আক্রমণ করিল ; কোরেশী নারীগণ দামামা বাজাইয়া
প্রতিহিংসা-উদ্দীপক রণগীতি গাহিয়া সমরাগ্নি প্রজ্জ্বলিত
করিতে লাগিল। কিন্তু মােসূলেম বীরগণ অটল ও
চলভাবে শর নিক্ষেপ করিয়া শত্রুর গতিরােধ করি-
লেন। কোরেশীগণের পতাকাবাহী তলহা বেন্ আবি
তলহা আস্ফালনপূর্বক পয়গম্বর সাহেবকে বিদ্রুপবাক্যে
যুদ্ধে আহ্বান করিল। হজরত আলী তৎক্ষণাৎ বীর
হুঙ্কারে তলহাকে আক্রমণ করিয়া যমালয়ে প্রেরণ করি-
লেন। এইরূপে ক্রমান্বয়ে নয় জন কোরেশী বীর পতিত
পতাকা উঠাইবার চেষ্টা করিয়া
হইলেন।
হজরত হামযাও একদল মােসলেম সহ ঘােরযুদ্ধে লিপ্ত
হইলেন। পয়গম্বর সাহেব তখন তঁাহার উন্মুক্ত তরবারি
উত্তোলন পূর্বক ডাকিয়া বলিলেন, “মােসলেম বীরগণ !
তােমাদের মধ্যে এমন কে আছ যে আমার এই তরবারি
ভূতলশায়ী
স্বর্গের জ্যোতিঃ ®® বীরত্বের পুরস্কারস্বরূপ গ্রহণ করিয়া ইহার সম্মান রক্ষা, করিতে সক্ষম?” আসহাবৃন্দের অনেকেই পুরস্কারের জন্য অগ্রসর হইলেন; পয়গম্বর সাহেব তখন হজরত আবু ওজানা আত্সারীকে ঐ তরবারি প্রদান করলেন। হজরত আবু ওজানা তখনই তরবারি হস্তে অপ্রতিহত- বেগে আক্রমণ পূর্বক শত্রুশ্রেণী ছিন্ন-ভিন্ন করিয়া এক গিরিপার্শ্বে উপনীত হইলেন। তথায় আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেদা অন্যান্য কোরেশী রমণীগণসহ সমর-সঙ্গীত গাহিয়া কোরেশীগণের হৃদয়ে বৈরীভাব প্রজ্জ্বলিত করিয়া দিতেছিল। হজরত ওজানা তখন এই অগ্নি- স্ফুলিঙ্গরূপিণী হেন্দার সংহারে উদ্যত হইলেন। কিন্তু পর মুহূর্তেই তিনি জনাব পয়গম্বর সাহেবের পুরস্কৃত অসিকে নারীরক্তে কলঙ্কিত করা অবৈধ মনে করিয়া ফিরিয়া গেলেন। হজরত আবু ওজানার’ বীরত্বে কাফেরগণ বিত্ৰস্ত হইয়া পড়িল এবং দ্রব্যসামগ্রী ফেলিয়াই পলায়ন করিল। মুসলমানগণ কিয়দ্দর পর্যন্ত শত্রুর পশ্চাদ্ধাবন করিয়া নিঃশঙ্কচিত্তে তাহাদের পরি- ত্যাজ্য ধনসামগ্রী হস্তগত করিতে লাগিলেন। এদিকে পশ্চাৎ দিকের গিরিদ্বার রুদ্ধ করিয়া যে সকল মােসলেম স্বর্গের জ্যোতিঃ তাহার প্রহরায় নিয়ােজিত ছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে পরম- কৰ্ত্তব্যপরায়ণ কয়েকজন ব্যতীত সকলেই লুণ্ঠনে যােগ দিলেন। খালে বেন্ ওলী দূর হইতে এই গিরিপথ অরক্ষিত দেখিয়া কতিপয় সাহসী যােদ্ধাসহ রক্ষকগণকে নিহত করতঃ পশ্চাদ্দিক হইতে মোস্লেমগণকে আক্রমণ করিল এবং আবু সুফিয়ানকে সম্মুখ পথ দিয়া পুনঃ অগ্রসর হইতে সংবাদ পাঠাইল । পলায়িত কাফেরগণ দূর হইতে পতাকা পুনঃ উত্থিত দেখিয়া আবার আক্রমণে অগ্রসর হইল। হর্ষোৎফুল্ল মােসলেমগণ অকস্মাৎ এই- রূপে উভয় দিক হইতে আক্রান্ত হইয়া আত্মরক্ষার্থে শত্রু মিত্র ভুলিয়া তুমুল যুদ্ধে রত হইলেন। এই যুদ্ধে কতিপয় সাহাবা নিজ সঙ্গীগণহস্তে নিহত হইলেন। কাফেরগণ মুসলমানগণকে চারি দিক হইতে বেষ্টন করিয়া আক্রমণ করিল এবং ভঁহাদিগকে আত্মসংবরণ করিবার জন্য আদৌ সুযােগ দিল না । হজরত হাম্য। কতিপয় কাফের সরদারকে ভূতলশায়ী করিয়া যখন বীরদর্পে ফিরিতে- ছিলেন, এমন সময় জাবের বেন্ মোতাম নামক অব্যর্থ লক্ষ্য জনৈক হাবশী দাস, এক শিলাখণ্ডের অন্তরাল হইতে হজরত হামাকে লক্ষ্য করিয়া এক শর নিক্ষেপ স্বর্গের জ্যোতিঃ ত করিল। শর বিদ্যুৎবেগে তাহার নাভিদেশ ভেদ, করিয়া বাহির হইয়া গেল। হজরত হাম তন্মুহূর্তেই শত্রুর দিকে লাফাইয়া পড়িলেন; কিন্তু আঘাত গুরুতর বিধায় ক্ষত যন্ত্রণায় ছট ফট্ করিয়া ভূতলশায়ী হইলেন— ‘রাজি আল্লাহে আহু’ (খােদাতালা তাহার প্রতি প্রসন্ন থাকুন)। ঐ হাবশী দাস তখন হজরত হামার বক্ষ- বিদারণপূর্বক হৃৎপিণ্ড বাহির করিয়া পিশাচিনী হেদার হাতে দিল। প্রতিহিংসাপরায়ণা ভুজঙ্গিনী তাহা দন্তে চর্বণ করিয়া নিক্ষেপ করিল এবং তাহার দেহস্থিত বহু- মূল্য অলঙ্কাররাজি উন্মােচন করতঃ উক্ত হাবশীকে পুরস্কার স্বরূপ প্রদান করিল। পয়গম্বর সাহেব এতক্ষণ এক উন্নত স্থানে নিস্পন্দভাবে দাঁড়াইয়া এই সকল পৈশাচিক কাণ্ড পৰ্যবেক্ষণ করিতেছিলেন। এমন সময় কাফেরগণ তঁাহার দিকে অগ্রসর হইল। কিন্তু হজরত আলী তাহাদিগকে কিছুতেই অগ্রসর হইতে দিলেন না। তখন মাত্র ১১ জন সাহাবা হজরতের জন্য প্রাণপণ করিয়া তাহার চতুষ্পর্শ্বে দাঁড়াইয়া যুঝিতেছিলেন। এই বীরগণ মধ্যে আনিসা বেন্তে কাব (প্রসিদ্ধ নাম উম্মে আমারা) নাম্নী এক মােসলেম বীররমণীও ছিলেন। ইনি স্বর্গের জ্যোতিঃ মােসলেমগণের তৃষ্ণা নিবারণার্থে ‘মশক’ স্কন্ধে দাঁড়াইয়া ছিলেন। এতাদৃশ অবস্থা দর্শনে তিনি মশক দূরে নিক্ষেপ করতঃ ত্বরিতে ঢাল ও তরবারি উত্তোলন পূর্বক স্থিরপদে দাঁড়াইয়া কাফেরগণের সংহারে প্রবৃত্ত হইলেন। চারিদিকের তীররাশি তাহার তাহার শরীরে বিদ্ধ হইতে লাগিল ; কিন্তু এই নির্ভীক রমণী কিছুতেই পশ্চাৎপদ হইলেন না; সাহাবাগণ ক্রমান্বয়ে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করিয়া ‘শহীদ হইতে লাগিলেন, যাঁহারা অবশিষ্ট রহিলেন, তাঁহারা অধি কাংশই আহত হইলেন। তখন মালেক বেন্ যােবের হজরতকে লক্ষ্য করিয়া এক শর নিক্ষেপ করিল, তদঘিতে তাহার ললাট হইতে শােণিতধারা ছুটিল। ওৎবা বেন্ আবি ওক্কাস নামক আর এক ব্যক্তি হজরতের বদন- মণ্ডল লক্ষ্য করিয়া আবার এক প্রস্তরখণ্ড নিক্ষেপ করিল, তাহাতে হজরতের নিম্ন পার্টির দুইটী দন্দান ( দন্ত) শহীদ’ হইল। হজরত উত্তরীয় দ্বারা রুধিরস্রোত মুছিতে মুছিতে খোদায়ে-বে-নেয়ামের নিকট হস্ত প্রসারণ করতঃ কহিলেন,“হে আল্লাহ পাক! আমার কওমকে (সমাজকে) * জলবাহনার্থে ছাগ মোদির শােধিত চৰ্ম্মের থলিয়া বিশেষ।
স্বর্গের জ্যোতিঃ ক্ষমা করিও, ইহারা নির্বোধ।” পয়গম্বর সাহেব তখন অনর্গল রক্তপ্রবাহে দুর্বল ও নিস্তেজ হইয়া পার্শ্বস্থ এক গর্তে ঘুরিয়া পড়িলেন। এতদ্দর্শনে ওমরু এবনে কমিয়া এক উন্নত স্থানে দাঁড়াইয়া পিশাচবৎ চীৎকার করতঃ হজরতের মৃত্যু ঘােষণা করিতে লাগিল। মুসলমানগণ ইহা শ্রবণে আত্মহারা হইলেন, কেহ পলায়ন করিলেন, কেহ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করিয়া শহীদ হইলেন। মদিনায় ৩.এই ভয়াবহ সংবাদ পৌছিলে মােসলেম রমণীগণ শশাকে- দুঃখে আত্মহারা হইয়া বিলাপ করিতে করিতে যুদ্ধক্ষেত্রে যাত্রা করিলেন। আসারগণ এই মহাপুরুষের বিয়ােগ সংবাদে উন্মত্তপ্রায় হইয়া নিষ্কোষিত অসিহস্তে যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রসর হইলেন। জনাব পয়গম্বর সাহেব যখন এইরূপ অজ্ঞান হইয়া পতিত হন, তাহার কিয়ৎক্ষণ পর হজরত তলহা, হজরত আলীর সাহায্যে তাঁহাকে সেই গর্ত হইতে উত্তোলন করতঃ এক নিরাপদ স্থানে লইয়া শুশ্রুষা আরম্ভ করেন। হজরতের কন্যারত্ন নারীশ্রেষ্ঠ বিবি ফাতেমা মদিনার অন্যান্য রমণীগণসহ তথায় উপস্থিত হইয়া অবিগলিত- নেত্রে পিতার শুশ্রুষায় রত হইলেন। পয়গম্বর 40
স্বর্গের জ্যোতিঃ
SO
সাহেবকে জীবিত দর্শনে আতঙ্কবিহবল মােসূলেমগণের
ধমনীতে আবার নূতন রক্তস্রোত প্রবাহিত হইল।
এদিকে কোরেশীগণ যুদ্ধক্ষেত্র পরিষ্কার দেখিয়া
উল্লাসে মাতিয়া উঠিল। পিশাচিনী হেন্দার প্রতিহিংসা
পূর্ণ হওয়ায় সে আনন্দে বিভাের হইয়া, হজরত হামজা
ও অন্যান্য শহীদগণের নাসিকা, কর্ণ ও হৃৎপিণ্ড ছেদন
করতঃ তদ্বারা মালা প্রস্তুত করিয়া পরমানন্দে তাহা
পরিধান করিয়া পৈশাচিক গান ও নৃত্য করিতে লাগিল।
ইতিমধ্যে পয়গম্বর সাহেবের বাঁচিয়া থাকার কথা চারি-
দিকে ছড়াইয়া পড়িল। এতদৃষ্টে নববলে বলীয়ান
হইয়া সাহাবাগণ পূর্ণোদ্যমে কাফেরগণকে আক্রমণ
করিলেন। কাফেরগণ তখন সমূহ বিপদ গণনা করিয়া
যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ পূর্বক উৰ্দ্ধশ্বাসে পলায়ন করিল।
পয়গম্বর সাহেব একটু সুস্থির হইয়া শহীদগণের সৎকারে
রত হইলেন। তিনি ঐ সকল শবদেহ পৈশাচিকভাবে
ছিন্ন দেখিয়া শিহরিয়া উঠিলেন ও কহিলেন, “ভবিষ্যতে
হৃদয়হীন কোরেশীর প্রতিও এইরূপ ব্যবহার করা
হইবে।” এই কথা বলা মাত্রই তাহার প্রতি
এই ওহী’ নাযেল হয় “যদি তােমার প্রতি শত্রুগণ
৭১
স্বর্গের জ্যোতিঃ
১০
অত্যাচার করে, তবে তুমিও তাহাদের সহিত সেইরূপ
আচরণ করিও, কিন্তু মনে রাখিও সহিষ্ণুগণই সর্বাপেক্ষা
উৎকৃষ্ট।”
এই যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবা শহীদ হন। যুদ্ধের পর
হজরত মুসলমানগণ সহিত মদিনায় ফিরিয়া যান।
ওহদের যুদ্ধের পর বিধৰ্ম্মী কোরেশ ও ইহুদী সম্প্রদায়ের
সহিত মােলেমগণের আরও কয়েকটী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যুদ্ধ
হয়; কিন্তু প্রত্যেক বারই শত্রুগণ
খন্দক যুদ্ধ।
পরাজিত হইয়া পলায়ন করে।
যি-কাণ, ৫ হিজরী। বনি যের নামক ইহুদী
৬২৬ খ্রীষ্টাব্দ।
সম্প্রদায়কে মুসলমানগণ এই সমস্ত
অনিষ্ট ষড়যন্ত্রে বিশেষভাবে লিপ্ত দেখিয়া মদিনা
হইতে তাড়াইয়া দেন। তখন তাহারা খয়বর নামক
স্থানের দুর্গম দুর্গে বনি কয়নকা ইত্যাদি ইহুদী
সম্প্রদায়ের সহিত মিলিত হয়।
এই ইহুদীগণ আবু
সুফিয়ানের অধ্যক্ষতায়, কোরেশ এবং আরবের অন্যান্য
অসভ্য সম্প্রদায়সহ দশ সহস্র সৈন্য দ্বারা এক প্রবল
বাহিনী গঠিত করিয়া মদিনা আক্রমণের উদ্যোগ করিল।
* কোয়াণ পাক, যা নহল।
}
৭২
স্বর্গের জ্যোতিঃ
আ@
• পয়গম্বর সাহেব এই সংবাদ পাইয়াই ত্রিসহস্র মুহাজেরীন
ও আসার সমভিব্যাহারে তাহাদের গতিরােধ করিতে
প্রস্তুত হইলেন। তিনি অন্যান্য মােলেমগণসহ,
হজরত সলমান ফারসীর পরামর্শানুযায়ী, ছয় দিবসের
অবিশ্রান্ত পরিশ্রমের পর মদিনার প্রান্তদেশে এক
প্রকাণ্ড মরুচা খনন করিলেন এবং তন্মধ্যে সুরক্ষিত
থাকিয়া শত্রুর প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। শত্রুগণ
তিন পার্শ্ব হইতে মরুচা আক্রমণ করিল। মােসলেমগণ
এই বেষ্টিত অবস্থাতে তিন সপ্তাহাধিক কাল অন্ন কষ্ট
পাইয়াও কিছুতেই সাহস হারাইলেন না। এই সময়
পয়গম্বর সাহেব হজরত আলীকে তাঁহার ‘যােফোকার’
নামক ইতিহাস প্রসিদ্ধ তরবারি বীরােচিত
বীরােচিত পুরস্কার
স্বরূপ প্রদান করেন। হজরত ‘শেরে খােদা,
(হজরত আলীর উপাধি বিশেষ ) এই তরবারি পাইয়া
এলামী জোসে’ ( উত্তেজনায় ) উদ্দীপ্ত হইলেন এবং
সিংহপরাক্রমে শত্রুগণকে আক্রমণ করিয়া বিধ্বস্ত করিতে
লাগিলেন।
তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হইল। এমন সময়
প্রকৃতির রক্তিম নয়ন ঘােষণা করিয়া এক প্রবল ঝটিকা
উখিত হইয়া শত্রুশিবির উড়াইয়া
লইয়া গেল।
৭৩
স্বর্গের জ্যোতিঃ
@@
বায়ুতাড়িত বালুকারাশি শত্রুর চক্ষু অন্ধ করিল এবং তাহার
ভীতি-বিহ্বল হইয়া পলাইয়া বাঁচিল।
খন্দক যুদ্ধের পরও প্রায় এক বৎসর কাল এইরূপ
যুদ্ধ বিগ্রহ চলিতে থাকে। ইতি মধ্যে অনেক বার
হদিবার সন্ধি
হজরতকে স্বয়ং উপস্থিত হইয়া
যি-কাদ, ৬ হিজরী। আরবের অসভ্যসম্প্রদায়গণের মধ্যে
৬২৮ খ্রীষ্টাব্দ।
আত্মবিগ্রহ মিটাইয়া তাহাদিগকে
এসলামের বশ্যতায় আনিতে হইয়াছে। ক্রমে হজের সময়
আসিয়া উপস্থিত হইল। মুহাজেরীন আজ প্রায় ৬ বৎসর
কাল জন্মভূমি দর্শনে বঞ্চিত হইয়া ব্যাকুল হইয়া পড়িলেন।
ইহারা পুরুষানুক্রমে পুণ্যময় হজে অভ্যস্ত। এখন হজের
সময় আগত দেখিয়া তাঁহারা হজ, আকাঙ্খায় আরও
অধীর হইয়া উঠিলেন; কিন্তু মক্কার শত্রুগণের বিষয়
চিন্তা করিয়া ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন। পুরাকাল
হইতে কাবাগৃহ আরবের সমগ্র সম্প্রদায়ের উপাসনার
কেন্দ্রস্থল ছিল এবং বৎসরের চারি মাস-রজব, যি-কাদ,
যেলহজ, ও মহরম, উপাসনা ও ব্ৰতাদির জন্য নিরূপিত
থাকিত। এই মাস চতুষ্টয় মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহাদি 'হারাম’
( মহাপাতক) বলিয়া “পরিগণিত ছিল। সুতরাং সেই
৭৪
•
স্বর্গের জ্যোতিঃ
সময় শত্রু মিত্র নির্বিঘ্নে হজব্রতাদি নির্বাহ করিত।
জনাব ‘রেসালাৎ মাব’ও ভাবিলেন যে এই পবিত্র সময়ে
শত্রুগণ হয়ত প্রতিবাদী না হইয়া অবাধে তাহাদিগকে
হজ, সমাধা করিতে দিবে। বিশেষতঃ শত্রুগণ উপযুপরি
যুদ্ধে নিস্তেজ হইয়া পড়ায় তাহার এই ধারণা আরও
বদমূল হইয়াছিল। সুতরাং পয়গম্বর সাহেব ১৪০০ শত
মােসলেম সহ কোরবাণীর’ উদ্দেশ্যে ৪০টী উষ্ট্র লইয়া
ষষ্ঠ হিজরীর যি-কাদ মাসে মদিনা হইতে মক্কাভিমুখে
যাত্ৰা করিলেন। মােসলেমগণের সঙ্গে আত্মরক্ষার্থে এক
একটি কোষবদ্ধ অসি ব্যতীত আর কোন অস্ত্রই ছিল না।
পাপাত্মা কোরেশী কাফেরগণ সমস্ত পাপ উপেক্ষা করত
মােসলেমগণকে এই পুণ্যকাৰ্যে বাধা দিতে প্রস্তুত হইয়া,
খালেদ বেন্ ওলীদ ও আক্রামা বেন্ আবু জেহেলকে
সর্বাগ্রে সৈন্যসহ প্রেরণ করিল। হজরত এই সংবাদ
প্রাপ্তে এক দুর্গম উপলময় পথ দিয়া দ্রুত যাত্রা করতঃ
মক্কা হইতে কিছু দূরবর্তী হদিবা নামক স্থানে শিবির
সন্নিবেশ করিলেন এবং কোরেশীগণকে তঁাহার পবিত্র
উদ্দেশ্য জানাইলেন। কলহপ্রিয় কাফেরগণ তাহা
শুনিল না। তৎপর পয়গম্বর সাহেব স্বীয় জামাতা হজরত
৭৫
স্বর্গের জ্যোতিঃ
ওসমানকে প্রেরণ করিয়াও অনেক চেষ্টা করিলেন;
কিন্তু হৃদয়শূন্য কাফেরগণ কিছুতেই নিরস্ত হইল না,
পরন্তু হজরত যুন্ন রায়েনকে (হজরত ওসমানের উপাধি
বিশেষ) বন্দী করিয়া ফেলিল।
এদিকে মােসলেম
শিবিরে হজরত যুনুরায়েনের’ শক্তহস্তে নিহত হওয়ার
সংবাদ রাষ্ট্র হইল। হজরত এতৎশ্রবণে বিষাদিত হইয়া
মােসলেমগণকে জীবনে মরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকিবার জন্য
-এক কঠোর অঙ্গীকারে আবদ্ধ করিয়া মক্কার দিকে
অগ্রসর হইতে আদেশ দিলেন। কাফেরগণ এই অবস্থা
দেখিয়া শঙ্কট গণিল এবং মােস্লেমগণের সহিত এক সন্ধি
বন্ধনে আবদ্ধ হইতে প্রস্তাব করিল। শান্তিপ্রিয় পয়গম্বর
সাহেবও ইহাতে সম্মত হইলেন। সন্ধির বিধান মতে
দশ বৎসর পর্যন্ত কোরেশী ও মােস্লেমগণের বিগ্রহ
নিবৃত্ত হইল এবং সেই বৎসরের হজ, স্থগিত রহিল।
পয়গম্বর সাহেব মােসলেমগণসহ হদিবাতে মাত্র কোরবাণী
ইত্যাদি অনুষ্ঠান সমাধাপূর্বক মদিনায় প্রত্যাবর্তন
করিলেন।
এই সন্ধির পরিণামে এসলাম-মাহাত্ম্য
উপলব্ধি করিয়া বহুসংখ্যক কোরেশী কাফের এলাম
গ্রহণ করে।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
•
কোরেশীদের পক্ষ হইতে সন্ধির কথােপকথন জন্য
আরওয়া বেন মউদ নামক জনৈক দূত হজরত সমীপে
উপস্থিত হয়।
সে ফিরিয়া গিয়া কোরেশীগণকে জ্ঞাপন
করে’ “আমি পারস্য ও বােম রাজন্যবর্গের সভাসদগণ
বেষ্টিত সমারােহপূর্ণ দরবার দেখিয়াছি, কিন্তু মােহাম্মদের
(দঃ) প্রতি তাঁহার আহববৃন্দ যে অসীম ভক্তি ও
শ্রদ্ধাপূর্ণ ব্যবহার করে এরূপ কুত্রাপি আমার দৃষ্টিগোচর
হয় নাই।”
জনাব রসুলে-খােদা কোরেশী শত্রুগণ হইতে
আপাততঃ নিশ্চিন্ত হইয়া পরম করুণাময় ওহদহু
নৃপতিবৃন্দকে
লা-শরকের পবিত্র এলাম, সেই
এসলামে দাও।
বিশ্ব-বিধাতার সুবিস্তৃত ভূমণ্ডলে
৬ হিজরী।
প্রচারে ব্রতী হইয়া মিশর, হাবশ,
ফারেস, রুম প্রভৃতি ভূখণ্ডের প্রবল পরাক্রমশালী নৃপতি-
বৃন্দকে এসলাম গ্রহণের জন্য ‘দাওৎ' (আহ্বান) করতঃ
প্রত্যেকের দরবারে প্রতিনিধি প্রেরণ করিলেন। এবিসিনি-
য়ার (হাবশ) নৃপতি পূর্বেই এসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন।
তিনি দূতকে যথােপযুক্ত পারিতােষিক দিয়া জনাব
রেসালাৎ মাবের জন্য তাহার সহিত
বহুমূল্য
৬২৮ খৃঃ।
৭৭
স্বর্গের জ্যোতিঃ
৩SE
উপঢৌকনাদি প্রেরণ করেন। রােম-নৃপতি হারকোল
(Heracleus) এবং মিশরনৃপতি মকুকশ পরম সম্মানের
সহিত জনাব পয়গম্বর সাহেবের প্রতিনিধিকে অভ্যর্থনা
করিলেন এবং মনোেযােগ দিয়া এই নবধৰ্ম্মের সারতত্ত্ব
শ্রবণ করিলেন। ঐতিহাসিকগণ বলেন যে পারস্য রাজ
খসরু পরবেজ প্রকাশ্য দরবারে হজরতের আহবান পত্র
শ্রবণান্তর ক্রোধে অধীর হইয়া কটিস্থ ছুরিকা দ্বারা
পত্রখানি খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিল এবং দূতকে কঠোর শাস্তি
প্রদান করতঃ পয়গম্বর সাহেবকে এক অবজ্ঞাসূচক প্রতি-
উত্তর পাঠাইল। কাসেদ আসিয়া পয়গম্বর সাহেব সমীপে
সমস্ত নিবেদন করিলে, হজরত কিয়ৎক্ষণ মৌনাবলম্বন
করিয়া কহিলেন, “সেই সর্বশক্তিমান অচিরেই পারস্য
রাজ্যের গৌরব ধূলায় মিশাইবেন।” একদিন প্রাতে
মদিনাবাসিগণ হজতের প্রমুখাৎ শুনিয়া বিস্মিত হইল
যে, যে ছুরিকা দ্বারা যে দিবস খসরু তাহার পত্রের
অবমাননা করিয়াছিল, ঠিক সেই রজনীতে সেই ছুরিকা
খসরুর প্রিয়পুত্র শেবােয়ান, পিতার গর্বিত হৃদয়ে আমূল
বিদ্ধ করিয়া তঁাহার জীবনাভিনয় সাঙ্গ করিয়াছে।
জনাব রেসালাৎ মারেই ভবিষ্যদ্বাণীও বর্ণে বর্ণে
৭৮
স্বর্গের জ্যোতিঃ
ফলিল। কারণ তাঁহার ওফাতের (মৃত্যুর) অল্প কতিপয়
বৎসর পরেই বিজয়ী মােসলেমগণ হস্তে পারস্তরাজ্যের
গৌরব ধূলিকণাবৎ উড়িয়া গেল।
উত্তরােত্তর এসলামের এই দ্রুত উন্নতি দেখিয়া
ইহুদীগণ ঈর্ষায় জর্জরিত হইতে লাগিল। মদিনা-হইতে প্রায়
একশত মাইল পূর্বোত্তর দিকে খয়বর
খয়বরের যুদ্ধ।
জমাদিউল আখের,
নামক স্থানের দুর্ভেদ্য দুর্গে বেষ্টিত
৭হিজরী। ৬২৮ খৃঃ। হইয়া মদিনা হইতে বিতাড়িত 'বনি
নযে ও বনি কয়নকা সম্প্রদায়ের ইহুদীগণ বাস
করিত। তাহারা এসলামের ধ্বংস কামনায় ক্রমে ক্রমে
দশ সহস্র যােদ্ধা একত্রিত করিল ও আরব মরুভূমের
অসভ্য বেদুইনদিগকে নিজ দলভুক্ত করতঃ মদিনা আক্রমণে
উদ্যত হইল। পয়গম্বর সাহেব এই সংবাদ পাইয়া
সত্বর ১৬০০ শত সাহাব। সমভিব্যাহারে যাত্রা করিলেন
এবং পরদিন অতি প্রত্যুষে ‘আল্লাহে আকবর’ রবে
দিগন্ত ধ্বনিত করিয়া খয়বর দুর্গদ্বারে উপনীত হইলেন।
ইহুদীগণ এই আকস্মিক আক্রমণে অশ্চর্যান্বিত হইল
বটে, কিন্তু তাহারা ভাবিল এ দুর্জয় দুর্গশ্রেণী মোসলেমগণ
কিছুতেই ভেদ করিতে পারিবে না। কিন্তু পরম কৃপাময়ের
৭৯
স্বর্গের জ্যোতিঃ য় মােসূলেমগণ অচিরেই দুই তিনটি দুর্গ জয় করিয়া অগ্রসর হইলেন। মাত্র 'হ-অল-কমুস’ নামক দুর্গটি কিছুতেই অধিকার করিতে পারিলেন না। পয়গম্বর সাহেব তখন হজরত আলীকে এলাম-পতাকাধারী নিযুক্ত করিয়া-এই দুষ্কর কার্যে নিযুক্ত করিলেন। হজরত ‘শেরে খােদা’ ভীষণহুঙ্কারে আক্রমণ করিয়া মােসলেমগণসহ দুর্গপ্রাচীর উল্লঙ্ঘন করতঃ তাহার সেই সুপ্রসিদ্ধ ‘গােলফোকার’ অসি সাহায্যে শত্রুশ্রেণী ছিন্ন-ভিন্ন ও বিপর্যস্ত করিতে করিতে 'হস্-অল-কমুস’ দুর্গে মােসূলেম- পতাকা উড্ডীন করিলেন। বিজয়ী মােসলেমগণ তথায় যথেষ্ট ধনরত্নাদি হস্তগত করিয়া হর্ষোৎফুল্ল-হৃদয়ে খােদাতালার বিজয় ঘােষণ পূর্বক মদিনায় প্রত্যাগমন করিলেন। পরাজিত ইহুদীগণ তখন মােস্লেমগণের সহিত এক সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হইল। এই যুদ্ধে হজরত আলী মাের্ভযার অলৌকিক বীরত্ব প্রভাব ও অসাধারণ যুদ্ধবিদ্যার পরিচয়ের কথা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। সন্ধির পর হত খয়বরে অবস্থান করিতেছিলেন, তখন একদিন যয়নব শম্নী এক ইহুদীরমণী পয়গম্বর ৮০
স্বর্গের জ্যোতিঃ
হজরতের প্রতি
সাহেবকে স্বীয় ভবনে নিমন্ত্রণ করতঃ তাহার সম্মুখে
খাদ্যসামগ্রী স্থাপন করিল। হজরত
আহারে বসিয়া এক গ্রাস আহার
বিষ-প্রয়ােগ।
মাত্রই হাত উঠাইয়া লইলেন।
পিশাচিনী আহারে যে বিষ প্রয়ােগ করিয়াছিল, তাহা
হজরতের প্রত্যেক ধমনী ও শিরায় তাড়িতবেগে পরিচালিত
হইয়া তাহার সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া উঠিল। কিন্তু ধন্য আত্মত্যাগ !
জনাব রসুলে করিম নিজ স্বার্থের জন্য এই পিশাচিনীৰ
প্রতিশােধ লওয়া যুক্তিসঙ্গত মনে করিলেন না। তিনি
পাপিষ্ঠাকে ক্ষমা করিলেন। দিন দিন তাহার শরীরে
সেই বিষ ক্রিয়া করিতে লাগিল এবং পরিণামে এই
বিষক্রিয়াই হজরতের অন্তিম রােগের কারণ হইল। হজরত
আপাততঃ সুস্থ হইয়া মদিনায় ফিরিলেন।
খয়বর হইতে ফিরিবার কয়েক মাস পরে পয়গম্বর
সাহেব হদিবার সন্ধি অনুযায়ী প্রথম যি-কাদ তারিখে
দ্বিসহস্র মােসলেম সমভিব্যাহারে হজ, উদ্দেশ্যে মক্কা যাত্রা
করিলেন, এবং শান্তিতে মক্কা প্রবেশপূর্বক যথাসময়
সমাধা করিলেন। পয়গম্বর সাহেব
যখন সন্ধিপত্রের বিধানানুযায়ী ঠিক তিন দিবস পরে
হজব্রতাদি
স্বর্গের জ্যোতিঃ
হজযাত্রা। আস্হাবৃন্দসহ নীরবে মক্কা পরিত্যাগ
যি-কাদ ৭ হিজরী করিলেন, তখন কোরেশীগণের হৃদয়ে
৬২৯ খ্ৰীষ্টাব্দ।
তাঁহার অসাধারণ গুণ ও মহত্ত্বের কথা
উদয় হইতে আরম্ভ করিল।
এই সময় খালেদ বেন্ ওলীদ, ওমরু বেন্ আল আস
এবং আরও কতিপয় কোরেশীনেতা এলাম গ্রহণ করেন।
ইহারাই পরবর্তীকালে এপ্লামের বিজয়বৈজয়ন্তী
দেশ
দেশান্তরে উড্ডীন করিয়া পৃথিবীর প্রসিদ্ধ সেনাপতি ও
বিজেতারূপে বিখ্যাত হইয়াছিলেন।
রােম রাজ্যাধনি গান সম্প্রদায়ের শাসনকর্তাকে
এসলামে আহবান করিতে যে দূত
মূতার যুদ্ধ।
প্রেরণ করা হয়,
৮ হিজরী, জমাদি-
মুতা নামক স্থানে
উল আউওয়াল।
শাসনকৰ্ত্তার ইঙ্গিতক্রমে সেই
৬২৯ খ্রীষ্টাব্দ।
দূত
পয়গম্বর সাহেব
এই নির্দোষীর হত্যাপরাধে এই শাসনকর্তার বিরুদ্ধে
তিন সহস্র মােসলেমকে হজরত যয়দ বেন্ হারেসের,
নেতৃত্বে প্রেরণ করেন। হজরত খালেদ বেন্ ওলীদ,
হজরত জাফর তাইয়ার প্রভৃতি জগদ্বিখ্যাত বীরগণও
এই সঙ্গে ছিলেন। শত্রুগণ প্রায় একলক্ষ সৈন্য লইয়া
নিহত হয়।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
যুদ্ধক্ষেত্রে অবতরণ করে। কথিত আছে স্বয়ং রােম
সম্রাট হারকোল এই বিশাল সৈন্যদলের নেতা ছিলেন।
রােমীয় সৈন্যগণ যেমন প্রত্যেকেই রণদুর্ধর্ষ ও যুদ্ধ বিদ্যায়
অদ্বিতীয় ছিল, মােসলেমগণও সেইরূপ সাহস ও শৌর্য্যে
অতুলনীয় ছিলেন।
বীরবর হজরত ম্যায়েদ বেন্
হারেস সর্বাগ্রে বিপুল বিক্রমে শত্রুরাশিকে আক্রমণ
করিয়া বহুক্ষণ যুদ্ধ করার পর শহীদ হইলেন (রজিঃ)।
এতদৃষ্টে হজরত জাফর তাইয়ার ক্ষিপ্রহস্তে এসলাম
পাকা লইয়া শত্রুর দিকে লাফাইয়া পড়িলেন। কিয়ৎকাল
যুদ্ধের পর, শত্রুর তরবারির আঘাতে তাহার দক্ষিণ বাহু
বিচ্ছিন্ন হইয়া গেল। তিনি তৎক্ষণাৎ বাম হস্তে নিশান
ধারণ করিয়া সৈন্য চালনা করিতে লাগিলেন। শত্রুর
উপযুপরি আঘাতে তাহার বাম হস্তও খণ্ডিত হইয়া
পড়িল। তখন তিনি এস লাম পতাকা ছিন্ন হস্ত দ্বারা
বক্ষে বেষ্টন করিয়া অগ্রসর হইলেন। কিন্তু কিয়ৎক্ষণ
পরই তাহাকে ‘শাহাদতের স্বর্গীয় সুধা পান করিতে
হইল (রজিঃ )। এমন সময় মােসলেমগণের স্থির পদ
স্মলিত প্রায় দেখিয়া বীরেন্দ্রকেশরী হজরত খালেদ বেন্
ওলীদ ভীষণ হুঙ্কারে শত্রুবাহিনীকে আক্রমণ করিয়া
স্বর্গের জ্যোতিঃ
এ99c
অগ্রসর হইতে লাগিলেন। তিনি এই যুদ্ধে একটির পর
একটি করিয়া নয়টী তরবারি ব্যবহার করিয়াছিলেন।
সে দিবস কোন পক্ষেরই জয় পরাজয় হইল না। দিবার
অবসানে যুদ্ধ স্থগিত রহিল। পরদিন প্রত্যুষে হজরত
খালেদের বীরবাণীতে সৈন্যগণ নবােৎসাহে মাতিয়া
উঠিল। তখন তিনি নূতন ভাবে ব্যুহ রচনা করিয়া
আবার তুমুল বেগে শত্রুরাশিকে আক্রমণ করিলেন।
হজরত • খালেদের বীর্য প্রভাবে এই বিশাল শত্রদল
কিছুতেই এই মুষ্টিমেয় মােসলেমগণের সম্মুখে স্থির
থাকিতে না পারিয়া রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিল।
মােসলেমগণ সংখ্যায় অল্প বিধায় আর তাহাদের
পশ্চাদ্ধাবন না করিয়া মদিনায় ফিরিয়া আসিলেন। এই
সংগ্রামেই সর্ব প্রথম দিগ্বিজয়ী হজরত খালেদের অলৌকিক
বীরত্ব কাহিনী পৃথিবীতে ব্যাপ্ত হয় এবং এই অসীম বীরত্বের
পারিতােষিক স্বরূপ পয়গম্বর সাহেব তাঁহাকে ‘সয়ফোল্লাহ
(আল্লাহর তরবার) উপাধিতে ভূষিত করেন।
আরবের ইতিহাসবেত্তাগণ এই অসম সংগ্রামে
মােসলেমের বীরত্বের কথা উজ্জ্বল অক্ষরে ইতিহাসের প্রতি
পৃষ্ঠায় অঙ্কিত করিয়াছেন
৮৪
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
বিজয়
(হে মােহাম্মদ) আমি তােমাকে জাজ্বল্যমান বিজয় প্রদান
করিলাম, যেন তুমি আমার এই অনুগ্রহের ধন্যবাদ স্বরূপ সত্যধৰ্ম্ম
প্রচারে আরও অধিকতর সচেষ্ট হও••••••
(কোরান পাক, সুরা ফতহ)
...... He shined forth from Mount Paran, and he
came with Ten Thousands of Saints ; from his
sight hand went a fiery law for them.
( Deut. xxxiii-2)
এই সংগ্রামের কয়েক মাস পরেই কোরেশীগণ
তাহাদের মিত্র বনু বকরের সহিত মিলিত হইয়া
হদিবার সন্ধি
সন্ধি ভঙ্গ
মােসলেম-আশ্রিত বসু
খুযাকে আক্রমণ করে। বনুখুগণ
মক্কা-বিজয়।
কাবা গৃহপার্শ্বে আত্মরক্ষার্থে
৮ হিজরী। ৬২৯ খ্রঃ। আশ্রয় লয়। কিন্তু কাফেরগণ
ধৰ্ম্মবিরুদ্ধতা সত্ত্বেও কাবার সীমা মধ্যে প্রবেশ পূর্বক
এই নিঃসহায়দিগকে হত্যা করে। পয়গম্বর সাহেব
এই সংবাদ পাইয়া দশ সহস্র মােসলেম ও সাহাবাগণ
সহ সন্ধি ভঙ্গকারী এই দুর্বত্তর বিরুদ্ধে মক্কাভিমুখে
৮৫
স্বগের জ্যোতিঃ
O
যাত্রা করেন। পথিমধ্যে কয়েকটি
কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র
সংগ্রাম হয় ও তাহাতে কয়েক জন সাহাবা নিহত হন।
কিন্তু অবশেষে জনাব রেসালাৎ মাব আত্মীয় স্বজন
বন্ধু বান্ধব পরিবেষ্টিত হইয়া বীরদর্পে তাহার সেই
বাল্যক্রীড়াভূমি মক্কানগরে প্রশে করেন। সর্বনিয়ন্তা
রলে আলামীনের কি আশ্চৰ্য্য মহিমা! যে
ভূমি হইতে পয়গম্বর সাহেব নিগৃহীত ও লাঞ্ছিত হইয়া
দুঃসহ যন্ত্রণায় অন্যত্র চলিয়া গিয়া অব্যাহতি পান, আজ
সেই ভূমিই আবার তাহারই পদানত ও দয়ার প্রত্যাশী !
যখন রেসালাৎমাবের সেই সুপরিচিত কণ্ঠে আবার ধ্বনিত
হইল—“স্বর্গের জ্যোতিঃ আবিভূত হইল, মিথ্যার
অন্ধকার তিরােহিত হইল—মিথ্যা নিশ্চয়ই ক্ষয়শীল” ;
তখন কাফেরগণ ভীতিবিহ্বলহৃদয়ে অলক্ষে হজরতের
কাৰ্যকলাপ পৰ্যবেক্ষণ করিতেছিল। কাবাগৃহের সেই
শক্তিবিরহিত জড় পুত্তলিকারাশি যেন বিস্ময়বিস্ফারিত
নেত্রে বিকট মুখব্যাদান করিয়া এ দৃশ্য দেখিতেছিল।
* جاء الحق وزهق الباطل ان الباطل كان زهوقام
কোরান পাক, সুরা বনিইসরাইল।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
B3CE
জনাব পয়গম্বর সাহেব ইহার পর কাবাগৃহে প্রবেশ
করিয়া হস্তস্থিত যষ্টি দ্বারা পুতুলরাশিকে ধূলায় পরিণত
করিলেন এবং হজরত বেলাল সেই বিচুর্ণ স্তপ রাশির উপর
দাঁড়াইয়া উচ্চৈঃস্বরে কলেমা শাহাদৎ ঘােষণা করিলেন।
তৎপর হজরত রসুলে খােদা সমাগত জনমণ্ডলীকে সম্বােধন
করিয়া ‘খােৎবা (বক্তৃতা )
পাঠে রত হইলেন। প্রথমে
তিনি এত্তেহাদ’ (এক) ও ‘এখ, ওৎ' (ভ্রাতৃত্ব) সম্বন্ধে
বক্তৃতা করিলেন,পরে বলিলেন, “কোরেশীগণ, আমি আজ
তােমাদের সহিত কিরূপ ব্যবহার করিব, তাহা কি তােমরা
অবগত আছ ?” সকলে একবাক্যে উত্তর করিল, “দয়া ও
অনুগ্রহের সহিত।” তখন রসুলেখােদার গণ্ড বহিয়া
অশ্রুধারা প্রবাহিত হইল, তিনি মক্কাবাসিগণের পূর্বকৃত
নৃশংস ব্যবহার সম্পূর্ণ রূপে বিস্মৃত হইয়া কম্পিকণ্ঠে
কহিলেন, “ভাই, আজ আমি তােমাদিগকে তিরস্কার
করিব না। আল্লাহতালা তােমাদিগকে মার্জনা করুন।
তিনি পরম কৃপাময় ও অনুকম্পাশীল।”
হজরতের
এই অসাধারণ ক্ষমা ও মহত্ত্ববাণী শ্রবণে মক্কাবাসিগণ
ভক্তি-বিগলিত হইয়া একবাক্যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ,
মােহাম্মদর রসুললাল্লাহ” দিগন্ত প্রতিধ্বনিত
৮৭
স্বর্গের জ্যোতিঃ
@@
করিল,সমগ্র আরব দেশে
আরব দেশে এসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত
হইল।
হইল।
লাগিল।
;
এখন হইতে ইতিহাসের সেই অদ্বিতীয় ঘটনা আরম্ভ
জনাব পয়গম্বর সাহেব সাফা গিরির উপরে
উপবেশন করিলেন এবং কাফেরগণের ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়
দলে দলে আসিয়া হজরতের হস্তধারণ পূর্বক
অঙ্গীকারাবদ্ধ হইয়া পবিত্র এসলামে দীক্ষিত হইতে
ইসলাম-প্রচার
জন্য চারিদিকে ‘নকীব
(ঘঘাষণাকারী) ছুটিল ; সমস্ত নগরে শান্তি ও ক্ষমা বিঘােষিত
হইল ; চতুর্দিকে এসলামের জয় প্রচারিত হইতে
লাগিল। এই সময় বােরকা পরিহিতা একটি রমণী
ধীরপদবিক্ষেপে পয়গম্বর সাহেবের সম্মুখে রােদন করিতে
করিতে উপস্থিত হইয়া করজোড়ে প্রাণভিক্ষা চাহিল।
উদারমতি পয়গম্বর সাহেব এই নারীকে ক্ষমা করিলেন।
তখন রমণী তাহার হস্তস্থিত বস্ত্রের প্রান্ত ধারণ পূর্বক শপথ
করিয়া এসলামের সুশীতল ছায়ার আশ্রয় গ্রহণ করিল।
এই নারীই পাঠকগণের পূর্বপরিচিত সেই হেলা।
ইহার কিছু দিন পর ‘আবু সুফিয়ান’ ও আবু জেহেলের
পুত্র আক্রামা এসলাম গ্রহণ করে।
৮৮
স্বর্গের জ্যোতিঃ
OEo
মক্কার প্রান্তদেশস্থিত বেদুইন সম্প্রদায় এই নবধৰ্ম্মের
প্রসার দেখিয়া মহা উৎপাত আরম্ভ করিয়া মুসলমানদিগকে
নানা প্রকারে নির্যাতন করিতে লাগিল। পয়গম্বর
সাহেব অষ্টম হিজরীর ষষ্ঠ সওয়াল তারিখে দ্বাদশ সহস্র
হােনেন যুদ্ধ।
মােস্লেম ও অন্যান্য সম্প্রদায় সহ মক্কা
সওয়াল, ৮ হিজরী
হইতে দশ মাইল দূরবর্তী হােনেন
৬৩০ খ্রঃ।
নামক স্থানে উপস্থিত হইয়া এক
সুশৃঙ্খল যুদ্ধে এই শত্রুগণকে পরাজিত করিলেন। পরাভূত
শত্রুগণ তখন তায়েফ ও আওতাস স্থানদ্বয়ের সুরক্ষিত দুর্গে
আশ্রয় গ্রহণ করিল।
এই যুদ্ধে বিজেতৃগণ বহুসংখ্যক বন্দী ও অগাধ
ধনরাশি হস্তগত করিতে সমর্থ হন। এতদ্ব্যতীত চতুর্বিংশ
সহস্র উষ্ট্র ও চত্বারিংশ সহস্র ছাগ এবং বহুল পরিমাণ
স্বর্ণরৌপ্যও তাহাদের হস্তগত হয়। হজরত তখন
তায়েফ আক্রমণ করতঃ উহা কতিপয় দিবস অবরােধ করিয়া
রাখিলেন। কিন্তু বৃথা রক্তপাত অবৈধ মনে করিয়া
পরে তায়েফের অবরােধ উঠাইয়া জবালা নামক স্থানে
ফিরিয়া আসিলেন । তিনি স্থির ভাবিলেন যে,
এলামের পুণ্য প্রভায় আকৃষ্ট হইয়া তায়েফবাসিগণ
স্বর্গের জ্যোতিঃ
অচিরেই বশ্যতা স্বীকার করিবে। এই স্থানে বন্দিগণের
মুক্তি প্রার্থনা লইয়া হাওয়াযেন সম্প্রদায়ের সর্দারগণ
রসুললাল্লাহু সমীপে উপস্থিত হইল। তাহাদের কাতর
প্রার্থনায় হজরতের হৃদয় বিগলিত হইল। তিনি তখনই
তাহার আয়ত্তের বন্দিগণকে মুক্তি প্রদান করিলেন।
পয়গম্বর সাহেবের এই উদার ব্যবহারে মুগ্ধ হইয়া
তৎক্ষণাৎ সকলেই তাহার অনুকরণ করিলেন এবং
মুহূৰ্ত্ত মধ্যে ছয় সহস্র বন্দী মুক্তি পাইল। হজরতের
এই মহত্ত্ব দর্শনে তায়েফবাসিগণ অনেকেই ভক্তি
বিগলিত হইয়া ইসলামের পুণ্য ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ
করিলেন।
বন্দিগণ মধ্যে হজরতের ধাত্রী বিবি হালিমার কন্যা,
‘শেমা ছিলেন। হজরত শেমার পরিচয় পাইয়া
তৎক্ষণাৎ নিজ উত্তরীয় বিছাইয়া সাদরে তাহাকে নিকটে
বসাইলেন ও হালিমার বিষয়ে নানা প্রকার
জিজ্ঞাসাবাদের পর তাহাকে যথেষ্ট অর্থ দিয়া বিদায়
করিলেন।
তায়েফ অবরােধের
অবরােধের কতিপয় মাস পরে
হিজরীর প্রারম্ভে হজরত আলী মােৰ্ত্তজা দেড় শত
স্বর্গের জ্যোতিঃ
UpE
তায় সম্প্রদায়ের
সে বিজয়ী
মােসূলেম সহ অগ্রসর হইয়া ইস্লামদ্রোহী ‘তায়’ সম্প্রদায়ের
খৃষ্টান পৌত্তলিকগণকে এক ক্ষুদ্র
বশ্যতা। ৯ হিজরী। যুদ্ধে পরাজিত করেন। বিশ্ববিখ্যাত
খ্রঃ।
দানবীর মহাত্মা হাতেমতাই এই
সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। এই যুদ্ধে হাতেমের পুত্র
‘আদি’ তায় সম্প্রদায়ের নেতা ছিল।
মােসূলেমগণের নিকট পরাভূত হইয়া পলায়ন করে কিন্তু
তাহার ভগিনী সুফানা স্বীয় দলসহ বন্দিনী হইয়া, মদিনায়
আসে।
সুফানা পয়গম্বর সাহেবের সমীপে উপনীত হইয়া
তাহার পিতার মহত্ত্ব ও সুকৃতির বিষয় হজরতকে স্মরণ
করাইয়া দিয়া তাঁহার কৃপা যাঞা করিল। হজরতের
দয়াপ্রবণ হৃদয় ইহা
হৃদয় ইহা শ্রবণে বিগলিত হইল, তিনি
কহিলেন, “সুফানা !
তােমার পিতা মােমনগণের
সদ্গুণে ভূষিত ছিলেন, আমি তোমাকে তােমার পিতার
সম্মানার্থে মুক্তি দিলাম।” সুফান উত্তর করিল,
হজরত ! আমার মহামতি পিতার শােণিত আমার
শরীরে প্রবাহিত, আমি আমার সঙ্গীগণের মুক্তি ব্যতীত
আপনার দয়া
গ্রহণে অসমর্থ।” পয়গম্বর সাহেব
স্বর্গের জ্যোষ্টি
এOCEo
৪
তৎক্ষণাৎ এই মহৎহৃদয়া নারীর অনুরােধ রক্ষা করিয়া
তাহার দলের সমস্ত বন্দিগণকে মুক্তি দিলেন এবং
সুফানাকে পাথেয় দিয়া তাহার পলায়িত ভ্রাতার নিকট
প্রেরণ করিলেন। আদী বেন্ হাতেম, ভগিনীর প্রমুখাৎ
হজরতের মহত্ত্ব ও গুণকীৰ্ত্তন শ্রবণ করিয়া দ্রুত মদিনায়
আসিয়া ইসলাম গ্রহণ করিল।
ইতিমধ্যে শাম হইতে একদল বাণিজ্যযাত্রী মদিনায়
আসিয়া রটাইল যে, রােমীয়গণ এক বৃহৎ সৈন্য
তবুকে যুদ্ধাভিযান।
সমাবেশ করিয়া মদিনা আক্রমণের
৯ হিজরী। ৬৩০ খ্রঃ। উদ্যোগ করিতেছে। সংবাদটি
নিতান্ত অমূলক ছিল না; বােমরাজ
মুতাযুদ্ধে পশ্চাৎপদ হইয়া ও দিন দিন ইসলামের
অসাধারণ উন্নতি দেখিয়া শঙ্কিত এবং এই নব বল
ভঙ্গ করিবার চেষ্টায় নিযুক্ত ছিল।
ছিল। পয়গম্বর সাহেব
মুসলমানগণকে শীঘ্র রােমীয়গণের গতিরােধ করিতে
আদেশ করিলেন। এই বৎসর বিষম গ্রীষ্ম ও অনাবৃষ্টি
হয়, সেই সমুদয় উপেক্ষা করিয়া জগৎকে আত্মােৎসর্গের
পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিবার জন্য মােসলেমগণ প্রাণ বিসর্জনে
বদ্ধপরিকর হইলেন এবং
যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহার্থে
;
স্বর্গের জ্যোতিঃ অর্থ সংগ্রহ করিতে লাগিলেন। হজরত ওসমান যুনুরয়েন বহু অর্থ প্রদান করিলেন। অন্যান্য সাহাবা- গণও স্ব স্ব সামর্থ্যানুযায়ী এই মহাপুণ্যকাৰ্য্যে সাহায্য করিতে লাগিলেন। আবু আকেল নামক একজন দরিদ্র সাহাবা দুই সের খােৰ্ম্মা আনিয়া পয়গম্বর সাহেবের সমীপে উপস্থিত করতঃ কহিলেন, “হজরত, সারা রাত তৃষ্ণাৰ্ত্তের জল যােগাইয়া চারি সের খােৰ্মা পারিশ্রমিক পাইয়াছি; পরিবারবর্গের ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য দুই সের রাখিয়া, দুই সের জনাবের নিকট আনিয়াছি।” হজরত ওমর ফারূক ফারূক তঁহার অর্ধেক ধন জনাব রেসালাৎ মাবের সমক্ষে উপস্থিত করিলেন। হজরত আবুবকর তঁাহার সমুদয় ধন রত্নাদি আনিয়া এই পুণ্যকাৰ্য্যে উৎসর্গ করলেন। হজরত তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “পিরবারবর্গের জন্য কি রাখিলে আবুবকর” ? সিদ্দিকে আবুবকর উত্তর করিলেন, “আমার অক্ষয় ধন আল্লাহ ও তাহার রসুল”। যথাসময়ে জনাব পয়গম্বর সাহেব হজরত আলি মােৰ্ত্তজাকে স্বীয় স্থলাভিষিক্ত করিয়া ত্রিশ সহস্র মােসলেম- সহ ৯ই হিজরীর রজব মার্সে সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা স্বর্গের জ্যোতিঃ করিলেন এবং সিরিয়ার সীমান্তে পৌছিয়া তবুক নামক স্থানে শিবির সন্নিবেশ করিলেন। শত্রুগণ এই প্রবল নবশক্তির অগ্রসর বার্তায় ভীত হইয়া নিজ স্থানেই স্থির রহিল। পয়গম্বর সাহেব প্রায় এক মাসকাল তবুকে অবস্থান করিয়া পার্শ্ববর্তী খৃষ্টান সম্প্রদায়দিগকে ইসলামের বশ্যতায় আনয়ন করতঃ পুনঃ সগৌরবে মােসূলেমগণসহ মদিনায় ফিরিয়া আসিলেন। ' পূর্বে বলা হইয়াছে যে হজরত তায়েফের অবরােধ উঠাইয়া আনেন। ইহার কতিপয় মাস পরে তায়েফ- বাসিগণের পক্ষ হইতে ছয় জন সর্দার হজরত সমীপে উপস্থিত হইয়া সন্ধি ও শান্তি প্রার্থনা করে। পয়গম্বর সাহেব তাহাদের প্রার্থনা গ্রাহ্য করতঃ তাহাদিগকে অভয় দেন। পরিণামে সমস্ত তায়েফবাসী ক্রমে ক্রমে পবিত্র ইসলামরত্নে ভূষিত হয়। পাঠকগণের বােধ হয় স্মরণ আছে যে জনাব পয়গম্বর যে জনাব পয়গম্বর সাহেব নবুওতের প্রারম্ভে হলাম প্রচার করিতে গিয়া এই তায়েফ নগর হইতেই রুধিরাপ্লত কলেবরে ফিরিয়া আসিয়াছিলেন। তায়েফের প্রতিনিধিগণের সঙ্গে হজরত হামযার
স্বর্গের জ্যোতিঃ
ত
হত্যাকারী সেই হাবশী গােলামও আসিয়াছিল। সে
হজরতের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে। হজরত তাহাকে
ক্ষমা করেন এবং ক্ষমা সম্বন্ধে কোরাণ পাকের একটী
আয়েত পাঠ করতঃ তাহাকে পবিত্র ইস্লামের শান্তিময়
অলােকে আনয়ন করেন।
এই কালে কাব বেন্ যহীর নামক আরবের এক
প্রসিদ্ধ কবি তাহার ওজস্বিনী কবিতার উদ্দীপনায়
সমগ্র আরব প্রদেশকে এল্লামের বিরুদ্ধে উত্তেজিতু করিতে-
ছিল। সে নিজের
সে নিজের অপরাধে লজ্জিত হইল,
কিন্তু
কিছুতেই জনাব রেসালাৎ মাবের সম্মুখীন হইতে সাহসী
হইল না। একদা পয়গম্বর সাহেব মসজিদে নববীতে
‘ওয়াজ (ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে উপদেশ ) করিতেছিনে। কাব
ছদ্মবেশে সেই সময় তথায় আসিয়া উপস্থিত হইল।
‘ওয়াজ সমাধা হইলে কাব অগ্রসর হইয়া বলিল, “হজরত,
আমি যদি কাবকে আপনার সম্মুখে উপস্থিত এ রি ও সে
ইসলাম গ্রহণ করে, তবে কি আপনি তাহাকে ক্ষমা
করিবেন ?” হজরত কহিলেন, “হাঁ, আমি তাহাকে
ক্ষমা করিব।” তখন কাব উত্তর করিল, “হে
রসুলাল্লাহ, আমিই সেই কাব বেন্ যহীর”! তখন
স্বর্গের জ্যোতিঃ
SEo
মুসলমানগণ রােমাঞ্চিত হইয়া তাহাকে হত্যা করিতে
উদ্যত হইলেন। পয়গম্বর সাহেব বাধা দিয়া কহিলেন,
“ক্ষান্ত হও আমি কাবকে অভয় দিয়াছি।” কাব তৎপর
কলমায়ে শাহাদৎ পাঠ করিয়া ইলাম গ্রহণ করিল।
কাব হজরতের এই মহদাচরণে মুগ্ধ হইয়া তাঁহার গুণ
কীৰ্ত্তন করতঃ তমুহূর্তেই যে একটি মনােমুগ্ধকারী কবিতা
রচনা করিয়া পাঠ করেন, তাহার পুরস্কার স্বরূপ হজরত
তাহাকে তখনই স্বীয় অঙ্গাবরণ খুলিয়া পাতিতাষিক
দেন। পরে খলিফা মাবিয়া, কাবের বংশধরগণ হইতে এই
অঙ্গাবরণ চল্লিশ সহস্র মুদ্রার বিনিময়ে ক্রয় করেন।
কথিত আছে এই অঙ্গাবরণ এখনও তুরস্কের সুলতানের
নিকট যত্নের সহিত রক্ষিত আছে।
এই বিশ্বভূমণ্ডলে এমন ধৰ্ম্ম-প্রবর্তক কেহই জন্ম গ্রহণ
করেন নাই, যিনি তাহার নিয়ােজিত কার্যের পূর্ণ
সফলতা নিজ চক্ষে দর্শন করিয়া
দূতগণের বর্ষ ১০
প্রীত হইতে পারিয়াছেন। কিন্তু
হিজরী।
৬৩১ খ্রঃ।
বােধ হয় এই অসীম আনন্দ ও
নিৰ্ম্মল সুখ খােদাতালা শুধু তাঁহার এই নিরক্ষর নবীর
উপভােগের জন্যই বিশেষভাবে রক্ষা করিয়াছিলেন।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
পয়গম্বর সাহেব তবুক হইতে ফিরিবার পর সমগ্র আরব
প্রদেশের পৌত্তলিক, ইহুদী, খৃষ্টান ইত্যাদি সম্প্রদায়ের
পক্ষ হইতে সর্দার ও দূতগণ অবিরত হজরতের সমীপে
উপস্থিত হইয়া নিজ নিজ সম্প্রদায়ের পক্ষ হইতে বশ্যতা
স্বীকার ও ইলাম গ্রহণ করিতে লাগিল। এই কারণে
ইসলামের ইতিহাসে এই বৎসরকে ‘দূতগণের বৎসর
বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে।
দ্বাদশ হিজরীর ২৫ যিকাদ তারিখে পয়গম্বর সাহেব
এক লক্ষ চব্বিশ সহস্র মােসূলেমগণের সহিত মদিনা
পরিত্যাগ করতঃ যথা সময় কাবা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করিলেন।
শুক্রবার ৯ম যিলহজ, তারিখে
হজ্জল-বেদা। (বিদায়ের,
হজ) ৯ যিলহজ ১০, হিজরী। আরফাতের
আরফাতের ময়দান মােস্লম
৭ মার্চ, ৬৩২ খ্রঃ।
জন সমুদ্রে পরিণত হইয়া মধ্যাহ্নের
উজ্জ্বল সূৰ্য্যরশ্মিতে এক অপরূপ শােভায় উদ্ভাসিত হইয়া
উঠিল। সায়াহ্নে রসুলে খােদা তঁাহার সুললিত স্বরে
শ্রবণাকাঙক্ষী উৎসুক জনমণ্ডলীর হৃদয়ে এক সুমহান
গম্ভীর ভাবের উদ্দীপন করিয়া কহিলেন, “মােসলেমগণ !
মনােনিবেশ পূর্বক আমার
শ্রবণ
খােদাতালা জানেন আগামীবর্ষে তােমাদের সা= আমার
১৭
স্বর্গের জ্যোতিঃ
•(XvE
মিলন হওয়া অদৃষ্টে আছে কি না। তােমরা যেমন
অদ্যকার হজের দিনকে পবিত্র মনে কর, সেই প্রকার
কাহাকেও হত্যা করা ও অপরের দ্রব্য আত্মসাৎ করা
মহাপাপ বলিয়া জানিও। মনে রাখিও তােমাদিগকে
এক দিন খােদাতালার কাছে উপস্থিত হইতে হইবে এবং
তখন সেই সর্বশক্তিমান আল্লাহতালা তােমাদের নিকট
হইতে তােমাদের সকল কর্মের বিবরণী গ্রহণ করিবেন।
মােসূলেমগণ ! যেমন তােমাদের প্রতি তােমাদের স্ত্রীগণের
বিশেষ বিশেষ কৰ্তব্য আছে, তাহাদের প্রতিও তােমাদের
সেইরূপ কৰ্ত্তব্য আছে ; তাহাদের সহিত সযত্ন ব্যবহার
করিও। স্মরণ রাখিও খােদাতালা নিজ দায়ীত্বে স্ত্রী
জাতিকে তােমাদের হস্তে ন্যস্ত করিয়াছেন; অতএব
তাহাদের প্রাপ্য মীমাংসা বিষয়ে খােদাতালার ভয় মনে
রাখিও।
এখন আমি গােলামগণের কথা বলিব।
সাবধান! তুমি যেরূপ আহার কর, তাহাদিগকেও সেইরূপ
আহার করাইও; তুমি নিজে যেরূপ বস্ত্র পরিধান কর,
তাহাদিগকেও সেইরূপ বস্ত্র পরাইও। যদি তাহারা
এমন কোনও দোষ করে যাহা তােমার ক্ষমার অতীত, সে
অবস্থায় তাহাদিগকে বর্জন করাই তােমার পক্ষে শ্রেয়ঃ ;
স্বর্গের জ্যোতিঃ
==
E
কারণ তাহারাও খােদাতালার সৃষ্ট জীব। মােসলেমবৃন্দ।
আমার বক্তব্যে বিশেষরূপে কর্ণপাত কর এবং ইহা
অবগত হও যে, মােসলেমগণ পরস্পর ভাই ভাই
সমগ্র মােসূলেম জগৎ এক ভ্রাতৃত্ব-বন্ধনে আবদ্ধ।
তােমার ভ্রাতার দ্রব্যও তােমার জন্য নিষিদ্ধ যে পৰ্যন্ত সে
তাহা তােমাকে সন্তুষ্টির সহিত না দেয়। সাবধান!
অবিচারের ছায়াও স্পর্শ করিও না। আমি তােমাদিগের
ভিতর এমন এক বস্তু রাখিয়া যাইতেছি, যাহা তােমরা
দৃঢ়রূপে ধারণ করিলে কিছুতেই বিপথগামী হইবে না—সে
বস্তু কোরআন্। মােস্লেমবৃন্দ! সরলাচরণ, অপরের
হিতাকাঙক্ষা পােযণ এবং পরস্পর পরস্পরের সহিত একতা
সূত্রে বদ্ধ হওয়া—এই তিনটী বিষয় হৃদয়কে পবিত্র ও
উন্নত করে। উপস্থিত জনমণ্ডলী! তােমাদের উচিত মে
আমার বক্তব্য অনুপস্থিত ব্যক্তিগণকে জ্ঞাপন কর।
বিচিত্র নহে যে, অনুপস্থিত ব্যক্তিগণ তােমাদের অপেক্ষা
ইহা অধিক স্মরণ রাখিতে সক্ষম হইবে।” এই খোৎবা
সমাপনান্তর হজরত সকলকে সম্বােধন করিয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন—“মোসলেমবৃন্দ! কেয়ামতের দিন (মানবের
কৰ্ম্ম ফলের শেষ বিচারের দিন) যখন তােমাদের কাছে
স্বর্গের জ্যোতিঃ
ত
জিজ্ঞাসা করা হইবে যে আমি তােমাদের সহিত কিরূপ
ব্যবহার করিয়াছি ও তােমাদের মধ্যে কিরূপে জীবন
যাপন করিয়াছি, তখন তােমরা কি উত্তর দিবে ?”
তখন সহস্র কণ্ঠে ধ্বনি উত্থিত হইল, “অামরা সাক্ষ্য দিব
যে খােদাভালার সমস্ত আদেশই আপনি আমাদিগকে
অকপটে জ্ঞাত করাইয়াছেন এবং রেসালতের প্রত্যেক
কর্তব্য আপনি সমাধা করিয়াছেন।” হজরত ইহা শ্রবণে
তেশ্রুবিগলিতনেত্রে আকাশ প্রতি তিনবার অঙ্গুলি নির্দেশ
পূৰ্ব্বক কহিলেন, “হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী রহিলে।”
এই ঘটনার পরই তিনি তাঁহার সৃজনকর্তা প্রভুর
নিকট হইতে এই অনুজ্ঞা প্রাপ্ত হইলেন-“আজ আমি
তােমাদের ধর্মকে সম্পূর্ণ করিলাম এবং আমার অনুগ্রহ
পরম্পরা দ্বারা তােমাদিগকে বিভূষিত করিয়া ইলামকে
তােমাদের জীবনের লক্ষ্য রূপে নিয়ােজিত করিলাম।”
সত্যই আজ ইজরতের জীবন ধন্য, আজ মানবজাতি
ধন্য, আজ বিশ্বচরাচর ধন্য! এমন করিয়া কে কবে
A A A
A A AIMO JA AAJA ADAMMA
علیکم نعمتی ورضیت لکم الاسلام
اليوم اکملت لکم دینکم را دمت
৮
* কোরাণ পাক, সুরা আ-মায়েদ।
دينة
১০০
স্বর্গের জ্যোতিঃ কোথায় ভঁহার বিশ্বনিয়ন্তার নিকট হইতে তাঁহার একাগ্রতা, ভঁহার শ্রম, তাহার সহিষ্ণুতা ও তাহার ধৰ্ম প্ৰাণতার পুরস্কার প্রাপ্ত হইয়াছেন ? পৃথিবীর ইতিহাসে ইহার তুলনা নাই! পয়গম্বর সাহেব মক্কা হইতে হজ ব্ৰতাদি উদযাপন করিয়া সাহাবা সমভিব্যাহারে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন। তখন হিজরীর একাদশ সন- অন্তিম রোগ ও অন্তিম কাল। সফর হইতে রবিউল সফর মাস। এই মাসের শেষভাগ আউওল, হিজরী। হইতে হজরত এ নশ্বর পৃথিবী ৬৩২ খ্রঃ। পরিত্যাগপূর্বক সেই অবিনশ্বর জগতে মহাযাত্রার আয়ােজন করিতে লাগিলেন। সৃষ্টিকর্তার আজ্ঞানুযায়ীসমস্ত কর্তব্য সাঙ্গ হইয়াছে, এখন এই ক্ষণভঙ্গুর শরীরের এ ধরাধামে আর থাকিবারইবা প্রয়ােজন কি! খােদাতালা এখন তাহার নির্বাচিতবন্ধুকে নিজ শান্তি- নিকেতনে নিতে ইচ্ছা করিলেন। এই সময় জনাব ‘রেসাল পানাহ, উৎকট জ্বরাক্রান্ত হইলেন। * পীড়া বৃদ্ধি হইতে * ইতিমধ্যে তিনি কিঞ্চিৎ স্বাস্থ্য লাভ করিয়া এই সফর মাসে শেষ বুধবার দিবস (২৭ সফর) অবগাহন করেন। মােসলেম জগতে এই দিনের অবগাহন ও উপাসনাদি বিশেষ পুণ্য কাৰ্য বলিয়া গণনা করা হয়। সাধারণতঃ এই দিন “আখেরী চাহার শম্বা বলিয়া আখ্যাত হইয়া থাকে। ১০১
স্বর্গের জ্যোতিঃ
দেখিয়া সাহাবাবৃন্দ বিচ্ছেদাশঙ্কায় অধীর হইয়া পড়িলেন।
যতদিন উত্থান শক্তি ছিল, জনাব পয়গম্বর সাহেব প্রায়ই কক্ষ
হইতে বাহিরে আসিয়া তাহাদিগকে সান্ত্বনা বাক্যে বলিতেন,
“ভাই, তােমরা আমার মৃত্যুর আশঙ্কায় কেন অধীর হইতেছ,
কোন নবীই চিরদিন তাহার উম্মতের, (অনুগামী জনের)
সঙ্গে থাকেন নাই। সকলকেই এক দিন আল্লাহ পাকের
কাছে ফিরিয়া যাইতে হইবে। দেখ, সাবধান ! আমার
সমাধিকে পূজা করিয়া ভ্ৰমান্ধ জাতিগণের ন্যায় ‘গােরপরস্ত’
( সমাধি উপাসক) হইও না। একে অন্যের প্রতি সদাচরণ
করিও, কৃতজ্ঞ আন্সারদের সহিত সদ্ব্যবহার করিও এবং
আমার পরিবারবর্গের সম্মানের প্রতি লক্ষ্য রাখিও।
নিষ্ঠাচার অবলম্বন করিও।” হজরত রােগ-যন্ত্রণায় যখন
কাতর হইয়া পড়িলেন, তখন হজরত আলী ও হজরত
ফজলের স্কন্ধোপরি ভর দিয়া শেষ আর একবার
মসজিদে নববীতে আসিলেন। মদিনার আবাল-বৃদ্ধবণিতা
হজরতের শেষবাণী শ্রবণাকাঙক্ষায় মসজিদে সমবেত
তখনও হজরতের সেই রােগক্লিষ্ট বদনমণ্ডলে
এক অপরূপ জ্যোতিঃ ও স্থিরতা বিকসিত ছিল ও
তাহার অধরপ্রান্তে স্বাভাবিক মৃদু হাসি প্রস্ফুট ছিল।
১০২
হইল।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
খােদাতালার স্তুতি ও যশঃগানের পর হজরত উপস্থিত
জনতাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, “বন্ধুগণ! আমার
অন্তিম সময় উপস্থিত হইতেছে। আমি যদি কখন
কাহারও অনিষ্ট করিয়া থাকি, তবে এই তাহার প্রতিশোেধ
লওয়ার সময়। যদি কাহারও কাছে আমি কোন প্রকার
দায়ী থাকি, তবে সে নিঃশঙ্কচিত্তে বলুক,
আমি ধন প্রাণ
দিয়া তাহা পরিশােধ করিতে প্রস্তুত আছি।” ইহা
শুনিয়া জনৈক ব্যক্তি উত্তর করিল, “হজরত, আপার
কাছে আমার তিনটি মুদ্রা প্রাপ্য আছে, যাহা আপনি নিজ
নামে কোন প্রার্থীকে দিয়াছিলেন। জনাব রেসাল
মাব তখনই হজরত ফজলকে তাহা পরিশােধ করিতে
ইঙ্গিত করিয়া কহিলেন, “এ পৃথিবীর লজ্জা পরকালের
লজ্জা অপেক্ষা শ্রেয়ঃ।” তৎপর তিনি উপস্থিত জনগণের
জন্য ‘খােদায়ে বে-নেয়াযের নিকট প্রার্থনা করতঃ ধীর
পাদক্ষেপে প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিলেন ।
এই ঘটনার তিন দিবস পরে—সসামবার ১২ রবিউল
আউওল * বেলা দ্বিপ্রহরের পর হজরতের পবিত্র আত্মা
* ইহা বড়ই বিচিত্র যে হজরতের জন্ম ও মৃত্যু ঠিক একই তারিখে
হইয়াছিল। মােসলেম জগতে এই দিন “ফাতেহায়ে দো আজ দহম” অথবা
“বারে ওফাত' নামে পরিচিত।
১০৩
স্বর্গের জ্যোতিঃ
E0
৬২ বৎসর ১১ মাস ও কতিপয় দিবস এই অনিত্য ধরাধামে
অবস্থান করিয়া সেই অমর রাজ্যে চলিয়া গেল।
(৪ঠা জুন ৬৩২ খ্ৰীঃ ) ।
‘ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হে রাজেউন’ (নিশ্চয়ই আল্লার
নিকট হইতে আগমন এবং তাহারই কাছে প্রত্যাগমন)
ওফাতের সময় অস্ফটম্বরে তাহার পবিত্র কণ্ঠ হইতে
এই কয়েকটি কথা বাহির হইয়াছিল :-
“হা আল্লাহ-আমার অপরাধ মার্জনা কর—-
আমি আসিতেছি—সেই ঊর্ধে—আমার বন্ধুর সমীপে।”
জনাব রেসলৎ মাব বিবি ‘আয়শার কক্ষে তাঁহারই
অঙ্কোপরি শির রাখিয়া ওফাত পান এবং সেই কক্ষেই
তাহার সমাধি হয়। মৃত্যুকাল পর্যন্ত বিবি ফাতেমার
হস্ত তাহার বক্ষোপরি ছিল এবং শেষকাল পর্যন্ত তিনি
হাস্নায়েন (ইমাম হাসন ও হােসাইন) কে বার বার
সাদরে চুম্বন করিয়াছেন।
حیف در چشم زدن صحبت یارآ خر شد
بوے گل سیر ندید یم بہار آخرشد
* হজরতের মৃত্যুর যথার্থ তারিখ সম্বন্ধে ঐতিহাসিকগণের মত পার্থক্য
আছে; কিন্তু উপরােক্ত তারিখই অধিকতর প্রচলিত।
১০৪
b 8U إن الله وملكته يصلون علی النبی ا پایا الذين أمنوا صلوا عليه وسلموا تسليما ہ A চরিত্র بلغ العلی بکماله و کشف الدجی بجماله صلوا عليه و آله جماع خصاله অu০ জনাব রেসালৎ পানাহের চরিত্রের ভিন্ন ভিন্ন দিক অামার এই ক্ষুদ্র অখ্যায়িকায় ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা অবলম্বনে লিখিত হইয়াছে। নিরপেক্ষ পাঠকগণ যদি তাহা আলো- চনা করেন, তবে দেখিতে পাইবেন যে, মানবচরিত্রের যাহা কিছু সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট ও উন্নত, যাহার অনুশীলনে আত্মা পবিত্র হয় ও মানব ভূতলেই “ফেরশতা” বলিয়া প্রতীয়মান হয়, হজরতের জীবনে তাহার কিছুরই অভাব ছিল না। খােদাতালার ইচ্ছার উপর অটল বিশ্বাস, সাধুতা, সত্যবাদিতা, নিষ্ঠাচার, কৰ্ত্তব্যপরায়ণতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অসাধারণ হৃদয়বল, সাহস, উৎসাহ, উদ্যম, ধৈৰ্য্য, কষ্ট- সহিষ্ণু, দয়া, ভক্তি, ভালবাসা, স্নেহ, বিনয়, পরদুঃখ- ১০৫ স্বর্গের জ্যোতিঃ কাতরতা প্রভৃতি সমস্ত সদ্গুণরাশি এই মহাপুরুষের জীবনে একাধারে সন্নিবেশিত ছিল। حسن یوسف دم عیسی بد بیضا داری آنچه خوبان همه دارند تو تنها داری এই ক্ষুদ্র পুস্তিকা মধ্যে সেই পুণ্যাত্মা মহাপুরুষের গুণ- কীর্তনের চেষ্টা করাও বাতুলতা মাত্র। পাঠক ! সেই অসহায় এতীম মেষপালকের অবস্থা হইতে আরম্ভ করিয়া আজ এই আত্মােৎসর্গকারী সভাসদগণ বেষ্টিত শাহানশাহের ( রাজাধিরাজ) প্রতি দৃষ্টিপাত করুন। দেখুন আজ তাহার দরবারে পৃথিবীর কত প্রভাব- শালী গর্বিত বাদশাহগণের দূতশ্রেণী নতশিরে দণ্ডায়- মান রহিয়াছে। পাঠক! মক্কা হইতে নিগৃহীত ও নির্বা- সিত সেই অসহায় পথিকের কথা স্মরণ করুন আর আজ এই বিশাল মােসলেমজগতের গুরুর দিকে চাহিয়া দেখুন। আবার সেই পর্ণকুটীর বাসী শতগ্রন্থিযুক্ত বস্তু- পরিহিত বিনয়ী শাহান শাহ’কে, প্রাসাদবাসী রত্নরাজি বিভূষিত, গর্বিত ও বিলাসী বাদশাহদের সহিত তুলনা করুন! তিনি মানবদুলভ সদগুণ রাশিতে বিভূষিত ছিলেন বলিয়াই মুসলমানগণ সৃষ্টিকর্তার নির্বাচিত এই মহাপুরুষকে এক অতি ১০৩ স্বর্গের জ্যোতিঃ VpCE অসাধারণ মানব ভাবিয়া তাঁহার নামে শির নত করে ও তাহার আদর্শ জীবনী (মিলাদ শরীফ) পাঠ করা পুণ্য- কাৰ্য মনে করে। ইল্লামধৰ্ম্মের মারাত্মক শত্রুগণ এবং অনেক ইস্লাম বিদ্বেষীগণও মুক্তকণ্ঠে হজরতের গুণ- রাশির ভূয়সী প্রশংসা করিতে বাধ্য হইয়াছেন। হজরত মােহাম্মদ (দঃ) মানবজাতিকে কেবল কোরাণ পাকের অনুজ্ঞার দ্বারা নানা প্রকারের হিতােপদেশ দিয়াই ক্ষান্ত হন নাই। তিনি নিজ গার্হস্থ্য ও প্রকাশ্য জীবনে তাহার প্রত্যেক কাৰ্য-কলাপ, রীতি- নীতি, আচার-ব্যবহার দ্বারা প্রতি বর্ণে বর্ণে কোরাণ পাকের অনুজ্ঞাবলীর মূর্তিমান আদর্শ সাজিয়া মানব- জাতিকে তঁাহার পদাঙ্কের অনুসরণ করিতে আদেশ করিয়া গিয়াছেন। কোরাণ পাকে বর্ণিত আছে (“হে মােহাম্মদ (দঃ) (মানবগণকে) বল, যদি আল্লাহ তালার প্রতি তােমাদের, অনুরাগ থাকে তবে এস আমার পদাঙ্কের অনুসরণ কর।” এই পবিত্র পদাঙ্কের অনুসরণ করিয়া ইসলামের নায়কগণ জগতে মানবের সভ্যতা ও অভ্যুত্থানের গৌরবময় কীর্তি সমূহ রাখিয়া গিয়াছেন। এই পাদপদ্মাঙ্কের অনুসরণ করিয়াই হজরত ১০৭ ©© স্বর্গের জ্যোতিঃ সিদ্দিকে আকবর, ফারুকে আজম, যুনুরয়েন, মােৰ্ত্তজা প্রভৃতি রাশেদীন খলিফাগণ আরবের ঘাের মুখতা ও কুসংস্কারের আবর্জনা হইতে হঠাৎ উথিত হইয়া সসাগরা পৃথিবীকে ন্যায়পরায়ণতা ও সদনুষ্ঠানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দ্বারা মােহিত ও স্তম্ভিত করিয়াছেন। এই চরণ কম- লাঙ্কের অনুসরণে অনুপ্রাণিত হইয়াই হজরত খালেদ বেন্ ওলীদ, ওমরু বেন্ আল্ আস, সাদ বেন ওক্কাস, ও বেন্ নাফি, মুসা বেন্ নসীর প্রভৃতি ইস্লামের মশালবাহী জগৎ বিখ্যাত সেনাপতিগণ পারস্য, রােম, মিসর, স্পেন প্রভৃতি রাজ্যের প্রবল পরাক্রমশালী সম্রাটগণের বল ও দর্প মুহূর্ত মধ্যে চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া ইসলামের পুণ্যপ্রভায় দিগন্ত আলােকিত করিয়াছিলেন । সে কালের কথাগুলি আজ অতীতের করালগর্ভে বিলীন হয় নাই। ইতিহাস ও হদীস শাস্ত্র যাবচ্চন্দ্র দিবাকর তাহার সাক্ষ্য দিতে থাকিবে। ইসলামের সেই স্বর্ণ যুগের সহিত মােসলেম-জগতের বর্তমান অধঃপতনের অবস্থার তুলনা করিয়া এমন হৃদয়বান কে আছেন যিনি অশ্রু সম্বরণ করিতে পারেন ? ইহার যথার্থ কারণ অনুসন্ধান করিলে প্রত্যেক সুধীজন দেখিতে পাইবেন ১০৮
স্বর্গের জ্যোতিঃ
যে, যতদিন পর্যন্ত আমরা কোরাণ পাকের অনুজ্ঞার
অনুশীলন করিয়াছি, যতদিন আমরা সেই নরকুলােত্তম
মহাপুরুষের পদাঙ্কের অনুসরণ করিয়া চলিয়াছি, ততদিন
আমরা উন্নতির একস্তর হইতে অন্যস্তরে অবলীলাক্রমে
দ্রুত গতিতে উপস্থিত হইয়াছি। আর যে দিন হইতে
আমরা লক্ষ্য ভ্রষ্ট হইয়াছি, আদেশ পালন অপেক্ষা উহা
অবহেলা করিতেই অভ্যস্থ হইয়াছি, সেই দিন হইতেই
আমাদের অবনতি আরম্ভ হইয়াছে। আমাদের এই
পতনােম্মুখ গতি যে কোথায় গিয়া থামিবে তাহা কে
বলিতে পারে! কোরাণপাকে বর্ণিত আছে যে “আল্লাহ
তালা মানবের অবস্থাকে কখনও পরিবর্তন করেন না,
যে পর্যন্ত মানব নিজে নিজের অবস্থার সংস্কার না
করে।” ঐ মহাগ্রন্থেরই অন্যত্র আছে “তােমার উপর
যখন কোন বিপদ আসিয়া পড়ে তখন মনে করিও যে
তাহা তােমার নিজ কৰ্ম্মফলেই আনীত হইয়াছে।”
এক ব্যক্তি হজরত আয়শা সিদ্দিকাকে জরতের
গার্হস্থ্য জীবন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। তিনি
তদুত্তরে বলেন “কেন! তাহার অভ্যন্তরীন জীবন ত
কোরাণ পাকেরই অনুরূপ। তাহার গার্হস্থ্য জীবনের
স্বর্গের জ্যোতিঃ
অনুসন্ধিৎসুকে কোরাণ পাকের অনুজ্ঞাবলী দেখিলেই
চলে।"
আরবের যাের
কুসংস্কার ও অজ্ঞতার মধ্যে
জন্মগ্রহণ করিয়া, দেশাচার অনুযায়ী হজরত আমাদের
আধুনিক শিক্ষার মত কোন লেখাপড়া শিক্ষা করেন
নাই; কিন্তু ইহা সত্ত্বেও সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষিত পণ্ডিতগণ
তাহার সহিত কথােপকথনে ও তঁাহার বক্তৃতা শ্রবণে
স্তম্ভিত হইয়া যাইতেন। কোরাণ মজিদে আল্লাহতালা
হজরতকে “উম্মী” (মূখ) বলিয়া সম্বােধন করিয়াছেন।
কিন্তু কি অপূর্ব ভাষাতেই খােদাতালা তাঁহার বাণী
হজরতের যােগে প্রচার করিয়াছেন! কোরাণ পাকের
সুললিত ও প্রাঞ্জল ভাষা, ইহার মনােমুগ্ধকারী অলৌকিক
রচনা প্রণালী, ইহার মহাব-পরিপূর্ণ গাম্ভীৰ্য্য, ইহার
নিঃস্বার্থ হিতােপদেশ, সমস্ত শিক্ষিত জগৎ মুক্তকণ্ঠে
স্বীকার করিয়া আসিয়াছেন—করিতেছেন ও পৃথিবীর
প্রলয় কাল পৰ্য্যন্ত করিতে থাকিবেন।
ابد
بلغ الله صلوتي و سلا
في خرمي
১৬
صل
النبي عربي
আরবের খ্যাতনামা কবিচূড়ামণি লবীদ বেন্ রবিয়া
১১০
স্বর্গের জ্যোতিঃ
৩১©©©
তাহার এক প্রসিদ্ধ রচনা কাবাগৃহদ্বারে ঝুলাইয়া রাখিয়া
তাহার প্রত্যুত্তরে রচনার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে।
পরদিন প্রত্যুষে লবীদ আসিয়া দেখে যে, তাহার
প্রত্যুত্তরে কোরাণ পাকের সুরা এখলাস’ তাহার রচনা
পার্শ্বে বিলম্বিত রহিয়াছে। লবীদ উহার মাধুৰ্য্য ও
রচনা কৌশল দৃষ্টে বিস্ময়াপন্ন হইয়া কহিল, “নিশ্চয়ই,
এ রচনা মানবের কৃত নয়।" তৎপরই লবীদ ইসলাম ধৰ্ম্ম
গ্রহণ করেন। কোরাণ পাক খোদাতালার এক
অলৌকিক সৃষ্টি।
জনাব রেসালৎ পানাহ সর্বদাই আড়ম্বর ঘৃণা
করিতেন। সাহাবাগণের প্রতি তাঁহার বিশেষ আদেশ
এই ছিল, যেমন তাঁহাকে দেখিয়া কেহ সম্মানার্থে উঠিয়া
না দাঁড়ান। আমাদের দেশের দরিদ্র কৃষক যে কাজ
করিতে অপমান মনে করে, হজরত পরম অহলাদের
সহিত সেই সকল কাৰ্য্য স্বহস্তে করিতেন। তিনি
নিজ হস্তে দুগ্ধ দোহন করিতেন, গৃহ মার্জনা করিতেন,
ছিন্ন পাদুকা ও ছিন্নবস্ত্র নিজেই সংস্কার করিয়া লইতেন।
তাহার এবং তাহার পরিবারবর্গের জীবিকা নির্বাহার্থে
* কোরাণ পাক, সুরা বকর।
১১১
স্বর্গের জ্যোতিঃ
@E0
স্বােপাজ্জিত সংস্থান ব্যতীত অপরের দান তিনি গ্রহণ
করিতেন না। সভ্যতার বশবর্তী হইয়া যে খাদ্য আমরা
দুঃখী দরিদ্রের উপযােগী মনে করিয়া ঘৃণায় নাসিকা
কুঞ্চিত করি, হজরত তাহা পরম আনন্দের সহিত
আহার করিতেন। খােৰ্ম্মা ও জল হজরতের নৈমিত্তিক
আহাৰ্য্য ছিল। দুগ্ধ ও মধু তাহার অতি উপাদেয় খাদ্য
ছিল। কচিৎ তিনি যবরুটিও আহার করিতেন।
আহারের সময় প্রায়ই কোন না কোন দরিদ্র ব্যক্তিকে
সঙ্গে নিয়া আহার করিতেন। তিনি অনেক সময়
অনাহারে থাকিতেন ; এমন কি খাদ্যাভাবে তাহাকে
ক্রমাগত তিন চারি দিনও অনশনে থাকিতে হইয়াছে ।
ক্ষুধায় দুর্বল ও নিস্তেজ হইয়া পড়িলে তিনি নিজ
উদরােপরি শিলাখণ্ড বাঁধিয়া রাখিতেন।
একদা হজরত মসজিদে নববীতে বসিয়া নামাজ
পড়িতেছিলেন। নামাজ শেষ হইলে পর এক ব্যক্তি
তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “হজরত, আপনি বলিয়া-
ছিলেন বসিয়া নামাজ পড়িলে অর্ধেক পুণ্য পাওয়া
যায়।” হজরত উত্তর করিলেন, “ভাই, আমি আজ
তিন দিবস যাবত অনাহারে আছি, আমার দাঁড়াইয়া
১১২
স্বর্গের জ্যোতিঃ
©©E0
;
নমাজ পড়িবার শক্তি নাই”। হজরত তখন
উদরের আবরণ উন্মােচনপূর্বক দেখাইলেন, তাহাতে
এক খণ্ড প্রস্তর বাঁধা আছে। তৎপর হজরত উঠিয়া
বিবি ফাতেমার কাছে গিয়া বলিলেন, “বৎসে যদি
কিছু আহাৰ্য্য থাকে, তবে আনিয়া দাও।” বিবি ফাতেমা
অপূর্ণ-লােচনে এক দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন
“বাবা, আজ দুই দিন যাবত আমি দুগ্ধপােষ্য শিশু
দুইটি (এমাম হাসন ও হােসইন ) কে লইয়া অনাহারে
আছি ; হাসনের পিতা (অর্থাৎ হজরতআলী) আহারান্বেষণে
প্রাতঃকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত চেষ্টা করিয়াও অকৃতকাৰ্য্য
হইয়াছেন। হজরত তখন বাহিরে আসিয়া দেখিতে
পাইলেন, জনৈক ইহুদী কূপ হইতে জল তুলিবার জন্য
একটি মজুর খুজিতেছে। হজরত স্বয়ং তাহার জল
তুলিতে প্রস্তুত হইলেন এবং প্রতি ভােলের জন্য তিনটি
খােৰ্মা পারিশ্রমিক স্থির হইল। কয়েক ডােল জল
তুলিবার পর দুর্বলতা নিবন্ধন ডােল হজরতের হস্তলিত
হইয়া কূপে পতিত হইল। তখন ইহুদী ক্রোধান্বিত হইয়া
পয়গম্বর সাহেবের গণ্ডে
গণ্ডে সবেগে করাঘাত করতঃ
অকথ্যভাষায় গালি বর্ষণ করিতে লাগিল। হজরত ইহুদীর
১১৩
স্বর্গের জ্যোতিঃ
কাছে ক্ষমা চাহিবার পর নিকটস্থ একটী বৃক্ষের সহিত
রঞ্জু বাঁধিয়া কূপে অবতরণপূর্বক ডোল উঠাইয়া আনিলেন,
এবং পারিশ্রমিক খােৰ্ম্মা লইয়া বিবি ফাতেমাকে দিলেন।
এই ঘটনার কিয়ৎক্ষণ পরে ইহুদী জনাব রেসালৎ মাবের
পরিচয় পাইয়া ক্ষমা প্রার্থনা মানসে তাহার অনুসরণ
করিল। সে গিয়া দেখে ‘রহমতুল্লিল আলমীন’ (নিখিল
ব্রহ্মাণ্ডের কৃপাধার) নিবিষ্টমনে খােদাতালার কাছে
প্রার্থনা করিতেছেন “প্রভাে! যে আমাকে চিনিতে না
পারিয়া এরূপ দুর্ব্যবহার করিয়াছে, তুমি তাহাকে ক্ষমা
করিও।” ইহুদী হজরতের মধ্যে এইরূপ সহিষ্ণুতা, দয়াও
ক্ষমা গুণ দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইল এবং হজরতের পদতলে
পড়িয়া ক্ষমা প্রার্থনাপূর্বক তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করিল।
وما ارستك ال
الا رحمة للعالمين
0
হদিবার সন্ধির সময় যখন হজরত তথায় অবস্থান
করিতেছিলেন, তখন যয়নব নাম্নী হজরতের জ্যেষ্ঠা
কন্যা অন্তঃসত্বা অবস্থায় মক্কা হইতে তাঁহার নিকট
আসিতেছিলেন। পথিমধ্যে এক হৃদয়হীন বেদুইন
তাহাকে বর্শার আঘাতে আহত করিয়া ফেলে এবং কিছু
১১৪
স্বর্গের জ্যোতিঃ
OজEঠ
দিন পরে সেই যাতনায়ই তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন।
হজরত এই সংবাদে যৎপরোনাস্তি শােকার্ত হইয়াছিলেন ;
কিন্তু মক্কা বিজয়ের সময়, সেই আততায়ী হজরত
সমীপে উপনীত হইয়া ক্ষমা ভিক্ষা চাহিলে ‘রহমতুল্লিল
আলমীন’ তাহাকে সরল অন্তঃকরণে ক্ষমা করিয়াছিলেন।
شفيع مطاع نبی کریم
سليم بسيم وسيم
قسيم
পরদুঃখ দেখিলে হজরত বড়ই বিচলিত হইতেন
ও তাহার চক্ষু অশ্রুপূর্ণ হইত। তিনি শত্রু মিত্র
নির্বিশেষে সকলের সহিতই বিনয় ও সদয় ব্যবহার
করিতেন। অতীব পাষাণ হৃদয়ও তাহার সকরুণ
কণ্ঠস্বরে দ্রবীভূত হইত। হজরতের দৈনন্দিন কাৰ্যা-
বলীর মধ্যে উৎপীড়িত ও রোগব্লিষ্টদিগকে দেখা এবং
সান্ত্বনা ও সহানুভূতি বাক্যে তাহাদিগকে আশ্বস্ত
করাও একটি বিশেষ কাৰ্য্য ছিল। তিনি দীন ও
দরিদ্রের পরম বান্ধব ছিলেন। অতীব দরিদ্রের আবে-
দনেও তিনি বিশেষ কর্ণপাত করিতেন এবং তৎক্ষণাৎ
১১৫
স্বর্গের জ্যোতিঃ
তাহার প্রতিকারে যত্নবান হইতেন। পথিমধ্যে কোন
শবদেহ লইয়া যাইতে দেখিলে, উদ্বেলিত হৃদয়ে তিনি
তাহার সঙ্গী হইতেন।
بنی آدم اعضای یک دیگر ند
که در آفرینش ز یک گوهرند
چو عضوی بدردآور درد زار
دگر عضوها را نماند قرار
একদা পয়গম্বর সাহেব মসজিদে বসিয়া আছেন,
এমন সময় একটি বালিকা আসিয়া তাঁহার বসন প্রান্ত
ধরিয়া টানিতে লাগিল। ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে
বালিকা অপ্রতিভ হইবে ভাবিয়া হজরত বিনা বাক্য
ব্যয়ে বালিকার সঙ্গী হইলেন। বালিকা তাহাকে
টানিতে টানিতে একটি গৃহে লইয়া গেল।
দেখিলেন, তথায় একটি রুগ্নব্যক্তি শয্যায় শয়ান আছে।
তাহাকে দেখিয়া রােগী কাতরকণ্ঠে কহিল “হজরত,
আমি আজ কয়েক দিন যাবত অনাহারে আছি, আমার
সাহায্যার্থে আপনাকে সংবাদ দিবার জন্য এই বালিকাকে
প্রেরণ করিয়াছিলাম।” সেই সময় তিনি নিজেই অভাব
পড়িত ছিলেন, তথাপি তাহার দয়াদ্ৰহৃদয় এই দৃশ্যে
১১৬
স্বর্গের জ্যোতিঃ
করিল।
কাতর হইয়া পড়িল। তিনি তখন রােগীর গৃহ হইতে
নিষ্ক্রান্ত হইয়া এক যববিক্রেতার কাছে গিয়া কিছু
যব ধার
চাহিলেন। বিক্রেতা ধার দিতে অস্বীকার
হজরত কহিলেন “ভাই, আমি তােমায় যব
পেষণ করিয়া দিতেছি, অন্ততঃ আমার পারিশ্রমিক
স্বরূপ কিছু যব দাও।” বিক্রেতা সম্মত হইল। হজরত
যব পেষণের পারিশ্রমিক লইয়া রােগীকে দিয়া আসিলেন।
হজরত একদিন একটি দরিদ্র লৌহকারেরু মুমূর্ষ
পীড়িত শিশুকে নিজ ক্রোড়ে লইয়া তাহার পরিচৰ্য্যায়
নিযুক্ত হইলেন। কিন্তু তিনি বহু চেষ্টা করিয়াও
শিশুটীকে মৃত্যুর কবল হইতে রক্ষা করিতে পারিলেন না।
পরে সেই মাসুম ( নিস্পাপ শিশুটি তাহারই শান্তিময়
ক্রোড়ে চির নিদ্রায় অভিভুত হয়।
তিনি আশৈশব জানিতেন :-
درد دل کے واسطے پیدا کیا انسان کو
و رفته طاعت کیلئے کچھ کم نہ تھے کروبیان
যুদ্ধের লুষ্ঠিত
ধন রত্নাদিতে হজরতের এক পঞ্চম
অংশ থাকিত। এই পঞ্চমাংশ তঁাহার আদেশে বয়তুল
১১৭
স্বর্গের জ্যোতিঃ
9
মালে’ (সেকালের Public Treasuryto দীন,
দরিদ্র, এতীম এবং প্রপীড়িতদের জন্য সঞ্চিত হইত।
তিনি সেই ধন রত্নাদি কখনও নিজের কাজে ব্যবহার করেন
নাই। তাহার মৃত্যু সময়ে বিবি আয়শার তহবীলে বহু
যত্নে সঞ্চিপাঁচ কি দশটি মুদ্রা মাত্র ছিল।
‘ওসিয়ৎ করিয়া যান যে, তাহার মৃত্যু হওয়ামাত্রই ঐ
গুলি দীন দরিদ্রকে যেন দান করিয়া দেওয়া হয়, তাহার
পরিত্যজ্য বলিয়া যেন কোনও সম্পত্তি না থাকে।
হজরত আয়শা বলিয়াছেন, যে দিবস হজরতের ওফাত হয়,
সেই রজনীতে তৈল অভাবে তঁাহার কক্ষের প্রদীপ অতি
ক্ষীণপ্রভায় জ্বলিয়াছিল।
জনাব পয়গম্বর সাহেবের ভৃত্য আনস্ বলিত, আমি
দশ বৎসর পয়গম্বর সাহেবের দাসত্ব করিয়াছি, কিন্তু তিনি
আমার শত অপরাধ সত্ত্বেও এক দিনের তরে ‘ওফ,
(আক্ষেপ সূচক ধ্বনি) পর্যন্ত বলেন নাই। আমি দাস
হইয়া তাহার যত কাজ করিতাম, তিনি প্রভু হইয়া আমার
তদপেক্ষা অধিক কাজ করিতেন।
বাৎসল্যের বশবর্তী হইয়া তিনি স্বীয় দৌহিত্র দুটীর
(ইমামুল-মােরসলীন হজরত হাসন ও হােসাইন) সহিত
১১০
স্বর্গের জ্যোতিঃ
কখন কখন বাল্যোপযােগী ক্রীড়া করিতেন। শিশু
দু’টীকে কখন কোলে, কখন বা গলদেশে জড়াইয়া
আবার কখন বা পৃষ্ঠোপরি নিয়া কৌতুক করিতে কতই
সুখানুভব করিতেন। মাসুম শিশু দুইটী তখন তাহার শ্মশ্রু
ও কেশরাশি ক্রীড়াচ্ছলে টানিয়া ছিড়িত হজরত ইহাতে
আরও আমােদ পাইতেন। ইহা হইতেই বিশেষ ভাবে
প্রতীয়মান হয় যে, তিনি অসাধারণ সরল ছিলেন।
তিনি এই সকল মহৎ গুণরাশির অধিকারী ত
ছিলেনই, ইহা ছাড়া তিনি অত্যন্ত অমায়িক ছিলেন।
একদা এক বৃদ্ধা মােস্লেম নারী তাহার কাছে আসি।
বলিল, “মােহাম্মদ (দঃ) ! বল দেখি আমি ‘বেহেশতে
যাইতে পারিব কি না।” হজরত উত্তর করিলেন না,
তােমার ন্যায় বৃদ্ধা কখনই ‘বেহেশতে যাইতে পারিবে না।”
সরলা বৃদ্ধা ইহা শুনিয়া কাঁদিয়া আকুল হইল।
তখন মৃদু হাস্যে সেই নারীকে সান্ত্বনা দিয়া কহিলন
“বৃদ্ধা। তুমি কেন অধীর হইতেছ ? বেহেস্তে সকলেই
পূর্ণ যৌবনে বিকশিত হইয়া প্রবেশ করিবে, তুমি কি
তখন আর বৃদ্ধা থাকিবে ?” এই কথা শ্রবণ করিয়া
বৃদ্ধার বিষন্ন বদন আবার প্রফুল্ল হইয়া উঠিল।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
با خلاق الہی منصف بودن اگر خواهی
سرا پا سیرت وخوي محمد شر محمد شو
হজরত পথ দিয়া চলিয়া যাইতে যাইতে হঠাৎ থামিয়া
নিকটস্থ বালক বালিকাগণকে সাদর করাঘাতে আমােদিত
করিতেন।এক দিন একটি বালককে পথে দেখিয়া
কৌতুকচ্ছলে কহিলেন “আবু আমের ! তােমার বুলবুলিটি
কি করিলে বৎস ?”
জনাব সরওয়ারে কায়েনাত এক দিন পথ দিয়া যাইবার
সময় দেখিলেন একটি লােক তাঁহার পথ রােধ করিয়া
দাঁড়াইয়া আছে। তিনি হস্তস্থিত যষ্টি দ্বারা ধীরে
লােকটীকে সরাইতে চেষ্টা করিলেন। লােকটী তৎক্ষণাৎ
ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল “মােহাম্মদ (দঃ) ! তুমি আমাকে
আঘাত করিলে কেন ? আমাকে তােমার এবম্বিধ
আচরণের প্রতিদান দাও।” হজরত তখন একটু অপ্রস্তুত
হইলেন এবং তাহার দিকে অগ্রসর হইয়া কহিলেন—“ভাই
আমি যদি তােমাকে আঘাত করিয়া থাকি, তবে এই নাও
প্রতিদান !” এই বলিয়া তিনি বক্ষের আবরণ উন্মােচন
পূৰ্ব্বক তাহার সম্মুখে বক্ষ পাতিয়া দিলেন। লােকটি
তখনই আবেগভরে তাহার বক্ষ চুম্বন করিয়া কহিল, “হজরত
১২০
স্বর্গের জ্যোতিঃ অনেক দিন হইতে আপনার পবিত্র শরীর স্পর্শ করিয়া পুণ্য সঞ্চয় করিবার আমার সাধ ছিল, আজ সে সাধ পূর্ণ হইল।” نك لعلى خلق عظيم و পয়গম্বর সাহেব জীবনে কখনও মিথ্যা কথা বলেন নাই। তাহার বয়স যখন ২০ বৎসর তখন তাহার সত্য- বাদিতায় মুগ্ধ হইয়া মক্কাবাসিগণ তাহাকে ‘আল আমীন ( বিশ্বাসী) উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁহাকে পথ দিয়া চলিতে দেখিলে তৎকালে লােকে ‘ঐ আল আমীন যাইতেছে বলিয়া নির্দেশ করিত এবং সসম্রমে পথ ছাড়িয়া দিত। জনাব রেসালত পানাহ জীবনের একটা মুহূর্তও বৃথা অতিবাহিত হইতে দেন নাই। আমার এই ক্ষুদ্র অখ্যায়ি- কাতে তাহার প্রত্যেক কাৰ্যবিবরণী দেওয়া সম্ভব নয় ; কিন্তু পাঠকগণ যদি ইতিহাস ও হদীস অনুসন্ধান করেন, তবে দেখিতে পাইবেন যে এই মহা পুরুষের জীবনের প্রায় প্রত্যেক মুহূর্তের কার্যাবলী তাহাতে অঙ্কিত রহিয়াছে। তিনি এ নশ্বর জগৎকে মানবের কর্মক্ষেত্র মনে করিতেন ও সেই অবিনশ্বর জগৎকে বিশ্রাম ও
স্বর্গের জ্যোতিঃ
WEo
শান্তির আলয় ভাবিতেন। তিনি বেশ বুঝিতেন যে এই
ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী মানবের এক ক্রীড়া সামগ্রী মাত্র।
তিনি নিশ্চিত জানিতেন যে সুদূর গন্তব্য স্থানে যাইতে
যেমন, পথিককে ক্ষণেক পান্থশালায় অবস্থান করিতে হয়,
এ পৃথিবীও নিত্যধামের পথে একটী পান্থশালা বিশেষ।
তিনি বেশ জ্ঞাত ছিলেন যে, এ অনিত্য জগতে যিনি যে
বীজ বপন করিবেন তাহার ফল সেই অমর জগতে নিশ্চয়ই
তিনি ভােগ করিবেন।
لقد کان لکم فی رسول الله أسوة حسنة و
মানব সেবা, সুনীতি ও সভ্যতার বিধান ও অনুষ্ঠান
এবং নিগূঢ় রাজনৈতিক কার্যাবলী হইতে তিনি যখনই
অবসর পাইতেন, তখনই তিনি সৃষ্টিকর্তার উপাসনা ও
আরাধনায় নিযুক্ত হইতেন। তিনি নিশীথে সামান্য সময়
ঘুমাইতেন মাত্র, অনেক সময় আদৌ ঘুমাইতেন না।
তিনি ধ্যান ও উপাসনায় এমন তন্ময়চিত্ত হইয়া থাকিতেন
যে, কোলাহল মুখরিত এই প্রাণী জগতের কোন সঞ্চালনই
তিনি অনুভব করিতে পারিতেন না। কখন কখন এরূপও
হইত যে উপাসনায় দাঁড়াইয়া থাকিতে থাকিতে তাহার
১২২
স্বর্গের জ্যোতিঃ
পদদ্বয় স্ফীত হইয়া শ্লীপদের আকার ধারণ করিত।
তিনি আজীবন কওমের’ (সমাজের) কল্যান কামনায়
কাটাইয়াছেন। নিজ স্বার্থের জন্য বা নিজ আত্মার
মঙ্গলার্থে কচিত উপাসনা করিতেন। কৃপাময়ের নিকট
কওমের মুক্তি প্রার্থনা করিয়া যখন হস্ত প্রসারণ
করিতেন, তখন নয়নাসারে তাহার বক্ষস্থল সিক্ত হইয়া
যাইত।
کریم السجايا جميل الشيم
نبی البرا يا شفيع الامم
পয়গম্বর সাহেব শক্তহস্তে এত অত্যাচার ও নিৰ্যা-
তন সহ্য করা সত্ত্বেও জীবনে একদিন ব্যতীত কখনও
কাহাকে অভিশাপ দেন নাই। একদা কাবাগৃহে
তিনি উপাসনায় রত ছিলেন, এমন সময় তাহার শত্রু
‘আবু জেহেল কোন এক মৃত পশুর গলিত অন্ত্র
আনিয়া হজরতের গ্রীবায় ঝুলাইয়া দেয়। হজরত
তখন উপাসনায় এমন তথয় চিত্ত ও বাহ্যিক জ্ঞান
বিরহিত ছিলেন যে, তিনি এই সকল পৈশাচিক
আচরণের বিষয় কিছুই অনুভব করিতে পারেন নাই।
বিবি ফাতেমা কোনও প্রকারে এই সংবাদ পাইয়া
স্বর্গের জ্যোতিঃ
BET
কাদিতে দিতে দৌড়িয়া আসিলেন এবং পিতার
গলদেশ হইতে সেই দুর্গন্ধময় অন্ত্র উন্মােচন করিলেন।
তখন হজরতের সংজ্ঞা হইল; তিনি ঘটনা বুঝিতে
পারিয়া খােদাতালার কাছে হস্ত প্রসারণ পূর্বক
আবুজেহেলের বিচার প্রার্থনা করিলেন। পরিণামে
আবুজেহেল বদরের যুদ্ধে ভীষণ অবস্থায় নিহত হয়।
;
।
A
انا ارسلناك بالحق بشيرا ونذيرا
পরিচ্ছন্নতা হজরতের স্বভাবসিদ্ধ গুণ ছিল। অন্তিম
সময়ে একদা যখন তাহার সংজ্ঞা বিলুপ্তপ্রায় তখন আব্দুর
রহমান বেন্ আবুবকর একটি মেস্ওয়াক’ (তিন)
হস্তে হজরতের প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিলেন। হজরত
তখন বিবি আয়শাকে সেই ‘মেস্ওয়াকের জন্য ইঙ্গিত
করিলেন। বিবি আয়শা আব্দুর রহমানের (তাহার
ভ্রাতা) নিকট হইতে মেসওয়াক লইয়া চর্বণ করতঃ
উহার অগ্রভাগ কোমল করিয়া হজরতের হাতে দিলেন ;
হজরত প্রীত হইয়া মেস্ওয়াক করিতে লাগিলেন।
স্বভাবতঃই অতি অল্পভাষী ছিলেন।
প্রয়ােজন বশতঃ সংক্ষেপে যাহা বলিতেন, বােধ হইত যেন
হজরত
১২৪
স্বর্গের জ্যোতিঃ
সেই অকপট বাক্য কয়টি ভঁহার সরল উন্মুক্ত হৃদয়ের
অন্তঃস্থল হইতেই নির্গত হইতেছে।
بتر صيغ لب لعل محمد شكر افشانم
شومانورد هانم گر زبان رطب اللسان بهدا
وما ينطق عن الهوى 0
১২৫
অবয়ব ও মুখাকৃতি।
در چشم نرگسینش را که ما زاغ البصر خوانند
در زلف عنبرینش را که و اللها اذا بغني
জনাব পয়গম্বর সাহেবের অবয়ব নাতি খর্ব নাতি
দীর্ঘ.. ছিল। তাহার মস্তক সুবৃহৎ স্কন্ধ বিশাল,
বাহুদ্বয় দীর্ঘ ও বলিষ্ঠ, বক্ষঃস্থল বিস্তৃত, কেশ কৃষ্ণ ৪
ঈষৎ কুঞ্চিত ছিল। তাঁহার মুখমণ্ডল ডিম্বাকার,
ললাট প্রশস্ত, জ্ব-যুগল দীর্ঘ, সুবঙ্কিম ও যুক্ত প্রায়,
লােচনদ্বয় উজ্জ্বল কৃষ্ণায়ত এবং তৎপল্লবাগ্রে পক্ষমাবলী
নিবিড় কৃষ্ণ ছিল। দীর্ঘোন্নত নাসিকা, সুডৌল গণ্ডদ্বয়,
শুভদ্রাজ্জ্বল ও সুবিন্যস্ত দন্তশ্রেণী, ঘন শ্মশ্রুরাজি,
গাত্রচর্ম কোমল ও মসৃণ, নাতি গৌর কমনীয় কান্তি
বিশিষ্ট বর্ণ, কর ও করতল নম্র ও মাংসপূর্ণ এবং
অঙ্গুলী সমূহ সুগঠিত ছিল। কপােত ডিম্ব সদৃশ রক্তাভ
ঈষদুন্নত একটি চিহু পৃষ্ঠোপরি ছিল, যাহা কেহ কেহ
“মােহরে নবুওৎ’ বলিয়া নির্দেশ করিত।
স্বর্গের জ্যোতিঃ
হজরত পথে চলিবার সময় নত নেত্রে ক্ষিপ্রগতিতে,
অথচ স্থির পদক্ষেপে চলিয়া যাইতেন। তখন তাহার
বদন মণ্ডল দেখিলে বােধ হইত যেন কত গভীর চিন্তায়
নিমগ্ন হইয়া তিনি আপন মনে চলিয়া যাইতেছেন।
অহহ! সেই বিনিদ্র রজনীর ক্রন্দনীয় লােহিত
নয়নযুগলের ভাবাবেশ দৃষ্টি কোন দার্শনিক হৃদয়ে কতই
মহতীভাব জাগাইয়া তুলিবে ।
هر کس که شد از نرگس مستانه ارمست
دیگر نکشد جام شراب عنبی را
تبارك الله أخس زلخالقين
الحمد لله رب العاليين
দুইটি সমালােচনা।
স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন আপনার স্বর্গের জ্যোতিঃ
গ্রন্থখানি পাঠ করিয়া আনন্দিত হইলাম, ইহার ভাষা ও রচনা
সুন্দর হইয়াছে। বাংলা ভাষায় এরূপ গ্রন্থের অভাব ছিল, আপনি
করিয়াছেন।
তাহা দূর
THE MUSSULMAN WRITES :-
(Shargir Joti-BY MRS. SARAH TAIFOOR)
she has presented in a simple and
nice style the model life of our prophet before
young learners and has thus held up before them
an example to be followed in every sphere of life.
To the mussulman of Bengal it is a matter of special
gratification that the book has been written by a
moslem lady-a lady who has tried to infuse
Islamic spirit into the vernacular of the Province.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.