Bally Sadharan Granthagar

Trilochan Kabiraj

Maitra, Trilochan · 2009/10/14

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ত্রিলােচন কবিরাজ
রবীন্দ্রনাথ মৈত্র
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড, সল্স
২০৩-১-১ কর্ণওয়ালিস্ স্ত্রী
কলিকাতা
১৩ঃ০

মূল্য এক টাকা গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এও সনস এর পক্ষ হইতে নরেন্দ্রনাথ কোঙার আর মুদ্রিত ও প্রকাশিত—২৩-১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা ত্রিলােচন কবিরাজ । আর কোনও শব্দ কানে আসিতেছিল না, শুধু পায়ের খড়ম জোড়ার সঙ্গে ফুটপাথ ঘর্ষণের ফলে অবিশ্রাম নানা ছন্দে খটা খটাস ধ্বনি উঠিতেছিল, তাহাই শুনিতে শুনিতে উদ্ভ্রান্ত হইয়া চলিতেছিলাম। সমস্ত জীবনটা ব্যর্থ মনে হইতেছিল। সকালে ‘জেণ্ট রেস্তোর। ডি লুক্স’-এ এক পয়সার এক কাপ চায়ের সঙ্গে তিন দিনকার বাসি রুটির একখানা পােড় টোষ্ট খাইয়াছিলাম, ক্রমাগত তাহারই ঢেকুর উঠিতেছিল। দিন বাড়ী ফিরিব না সঙ্কল্প লইয়া বাহির হইয়াছিলাম, কিন্তু কোথায় দিন কাটাইব স্থির করিযা উঠিতে পারিতেছিলাম না। পরিচিত দুই একটি বন্ধুর বাড়ী কাছেই ছিল, যাইতে পারিতাম, কিন্তু মনে মনে বন্ধু- বান্ধব আত্মীয়-স্বজন সকলের উপরই কেমন বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছিলাম, কাহাবও কাছে যাইতে প্রবৃত্তি হইল না। দুই একটি ঝি বাজার লইয়া পাশ দিয়া চলিযা গেল, ফিরিয়াও চাহিলাম না। প্রতি মুহূর্তেই মন উত্তরােত্তর সংসারে বীতরাগ হইয়া উঠিতেছিল। সমস্ত জগৎটাই যদি কেওড়াতলা অথবা কাশমিত্রের ঘাট হইয়া যাইত তাহাতেও কোন আপত্তি ছিল না। সহসা পথের ধারের একটি ঘরের মধ্যে পুরুষের ক্রন্দনধ্বনি শুনিয়া থমকিয়া দাড়াইলাম। জানালা দিয়া দেখি অনেকগুলি লােক, কেহ • ত্রিলােচন কবিরাজ সৰে কঁদিতেছে কেহ রুমালে চোখ মুছিতেছে। কেহ মরিষছে মনে হইল, কিন্তু বাড়ীর সম্মুখে খাটিয়া দেখিলাম না ; উপবে চাহিলাম দেখিলাম বাড়ীখানার প্রান্ত হইতে প্ৰাস্তাত্তর পর্যন্ত বিস্তৃত একটা সাইন- বােঙ, তাহাতে সােনালি অক্ষরে লেখা ‘প্ৰেমাৰ্ত্তিহরণ ঔষধালয’, তাহার নীচে লেখা-ত্রিলােচন কবিবাজ। ঔষধালয় ও কবিরাজ উভয়কেই নূতন মনে হইল, কাজেই কৌতুহলী হইযা দাড়াইলাম। কিন্তু অচিরাৎ বুঝিলাম ভুল করিছি, কবিরাজ এবং ঔষধালয কোনটিই নূতন নহে, যেহেতু সাইন বাের্ডের সােনালি অক্ষরে কালাে দাগ পড়িয়াছে এবং সরের যে ঘরে রুদ্যমান জনগণকে দেখিলাম তাহারই পাশে একটা বড় হল ঘর, তাহার আসবাব পত্রও অতি পুরাতন এবং ফবাসের একশ’-একটি স্থানে কালি এবং তেলের দাগ ; ক্যাশবাক্সের সম্মুখে যে লােকটি বসি- ছিলেন তিনিও অতি প্রাচীন। বুঝিলাম এইটি কবিরাজ মহাশযের ডিসপেনসারী। ক্যাশবাক্স রক্ষক ভদ্রলােকটি আমাকে আগ্ৰহেব সঙ্গে দেখিতেছিলেন, সহসা ডাকিলেন, “আসুন, ভিতবে আসুন!” ভিতরে ঢুকিয়া ফরাসে বসিলাম। দেয়ালে একখানি প্রকাণ্ড আকারের মনভস্মের অযেল পেন্টিং ছিল, সেইখানি দেখিতেছি এমন সময় ভদ্রলােকটি কহিলেন, “জানেন তাে বাড়ীতে ব্যবস্থা নিলে দর্শনী আট টাকা?” কহিলাম, “কিসের দর্শনী?” “কবরেজ মশাযের। ব্যাধি অবশ্য আপনাব তিনদিনেই নির্মূল হবে। সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি।” বিরক্ত হইয়া কহিলাম, “এই কথা বলার জন্যে ডেকেছেন বুঝি? ব্যাধি আমার নেই।”

বিলােচন কবিরাজ বৃদ্ধ কহিলেন, “অবশ্য আছে। এই ব্যাধি নেই এমন পুরুষ এক নারী জগতে নেই মশাই, রাজা রাজড় থেকে কথা সমাপ্ত হইতে দিলাম না, বিপ করিয়া কহিলাম, “আপনি অন্তর্যামী দেখছি।” বৃদ্ধ নির্বিকার ভাবে কহিলেন, “প্রায়। এই তেষটি বচ্ছর বয়স হল মশাই, আঠার বছর থেকে কবরেজ মশায়ের কম্পাউণ্ডারী কচ্ছি। এত্যহ গড়পড়তায় তিন শ রুগীকে ওষুধ দেই। বর্ষা আর বসন্তে এই রুগী হয় দুননা। ত্রিশটি ছেলে মােড়ক বেঁধে অবকাশ পায় না। নিজে দেখছি তাে কবরেজ মশাযের ওষুধ নৈলে কারাে চলে না। আর আপনি কি না—” একটু সন্ত্রম হইল, কহিলাম, “কি ব্যাধির কথা বলছেন জালে বৃদ্ধ কহিলেন “সাইনবোের্ড দেখেন নি? যাবতীয় প্রণয়ঘটিত ব্যাধির চিকিৎসা এখানে ওষুধ এবং মুষ্টিযােগ সহযােগে করা হয়। দর্শনী আট টাকা, ওষুধ বিনামূল্যে। এর চেয়ে সুবিধে পাবেন কোথাও?” শিয়ােঘূর্ণন, হৃৎকম্প প্রভৃতি প্রণয়ঘটিত অনেক প্রকার ব্যাধির নাম ও তাহার বহুবিধ পেটেন্ট ঔষধের বিজ্ঞাপন বড় বড় মাসিক ও সংবাদপত্রে আবাল্য দেখিয়া আসিতেছি,এপর্যন্ত তাহার প্রয়ােজন হয় নাই। আর আজ-বৃদ্ধ কহিলেন, “ভাবছেন? ভাবছেন বুঝি কোনও ব্যাধি নেই আপনার? কবরেজ মশায়ের সঙ্গে চোখােচাখি হলেই বুঝতে পাবেন ব্যাধি আছে কিনা? আপনার আর বয়েস কি মশাই, আমি বলরাম রসনিধি, পাঁচ পাঁচটি স্ত্রীকে নিমতলার ঘাটে পার করেছি, এই তেষটি বছর বয়েস, এখনও আমাকে মাঝে মাঝে কবরেজ মশায়ের কাছে ব্যবস্থা নিতে হয়। প্রতিবাদ ত্রিলােচন কবিরাজ করিলাম না, কিন্তু মনে হইল হয় তাে ব্যাধি আমারও কোথাও আছে। গৃহিণীর সহিত ঝগড়া করিয়া আসা অবধি মাথাটা টন টন করিতেছিল, ভাবিলাম হয় তাে এটাও প্রণয়ঘটিত কোনও ব্যাধি হইবে, কিছু জিজ্ঞাসা করিব এমন সময় বসনিধি মহাশয় সসম্রমে কহিলেন, “ওই কবরেজ মশাই আসছেন!” পরক্ষণেই হুকা হাতে ত্রিলােচন কবিরাজ মহাশয় মােহমুদগর আবৃত্তি করিতে করিতে ঘরে প্রবেশ করিলেন। বয়স সত্তর পার হইয়া গিয়াছে, মাথার সম্মুখের দিকে চুলের উৎপাত নাই, পিছনে কয়েক গুচ্ছ শুভ্র কেশ, তাহাতে একটি ধুতুরা ফুল। কবিরাজ মহাশয়ের ললাটে একটি যাত্রার দলের মহাদেবের ধরণে ললাটনেত্র আঁকা, তার মধ্যে একটি রক্তচন্দনের অক্ষিতারকা। ফরাসে বসিয়াই কবিরাজ মহাশয় আমার দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন, কেন জানি না, আমি চোখ বুজিলাম। কবিরাজ মহাশয় কহিলেন, “ভয় নাই, আরােগ্য হবে।” পরে হুকায় টান দিয়া কহিলেন, “রােগিগণকে উপস্থিত কর মাধাই।” কবিরাজ মহাশয়ের আহ্বান শুনিয়া গুটিকয়েক অল্প বয়সের শিক্ষার্থী ডিসপেনসারীতে আসিয়া উপস্থিত হইল এবং কবিরাজ মহাশয়কে প্রণাম করিয়া রােগীদের বসিবার ঘরে চলিয়া গেল। আমি ফরাস ছাড়িযা একটি টুলের উপর গিয়া বসিয়া সতৃষ্ণনেত্রে রােগীদের ঘরের দরজার দিকে চাহিয়া রহিলাম। নােগীদের ঘর হইতে নানারূপ গুঞ্জন দীর্ঘশ্বাস অস্ফুট স্ফুট লােদন নিতে পাইলাম। তাহার পরই কবিরাজ মহাশয়ের ছাত্রদের কাঁধে ভর দিয়া রােগীরা আসিতে সুরু করিল। একি! প্রায় যে সকলেই আমার পরিচিত। রসনিধি মহাশয় যাহা বলিয়াছিলেন তাহা দেখিতেছি মিথ্যা নহে। রাজনৈতিক নেতা হইতে আরম্ভ করিয়া মাসিক পত্র ৪ ত্রিলােচন কবিরাজ সম্পাদক পৰ্য্যত সর্ববিধ ব্যক্তিই কবিরাজ মহাশয়ের নিকট চিকিৎসার্থ আসিয়াছেন। একটা বিশেষত্ব এই দেখিলাম যে, সকলেই দিতেছেন, কিন্তু কেহ কাহারও দিকে চাহিতেছেন না। অতি বৃদ্ধ হইতে আরম্ভ করিয়া দশ বৎসরের বালক পৰ্য্যন্ত রােগ দেখাইতে আসিয়াছে। একটা প্রশ্ন মনে জাগিল, উঠিয়া রসনিধি মহাশয়ের কানে কানে জিজ্ঞাসা করিলাম, তিনি কহিলেন, “মেযেরাও আছেন, তবে তাঁরা দোতলায়। এদের ব্যবস্থার পর তাদের ব্যবস্থা হবে।” কবিরাজ মহাশয় হকিলেন, “অগ্রে অল্প বয়স্কগণকে উপস্থিত কর।” এক সঙ্গে পাঁচ সাতটি স্কুলের ছেলে চোখ মুছিতে মুছিতে আসিয়া ফরাসে বসিল! কবিরাজ মহাশয় গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করিলেন, “পরীক্ষায় ফেল করিয়াছ ?” সকলেই সমস্বরে ফোপাইতে ফেঁপাইতে উত্তর দিল, “হু।” কবিরাজ মহাশয় আর কিছু জিজ্ঞাসা করিলেন না। রসনিধির দিকে ফিরিয়া কহিলেন, “প্রাতে মােহদগর গুড়িকা একমাত্রা, পথ্য উপবাস।” ব্যবস্থাপত্র লইয়া ছেলে কয়টি দর্শনী দিয়া চোখ মুছিতে মুছিতে চলিয়া গেল। এইবার বয়স্ক রােগীরা আসিতে সুরু করিলেন। প্রথমে যিনি আসিলেন তাঁহাকে চিনিতাম না। তিনি কবিরাজ মহাশয়ের সম্মুখে বসিয়াই হাউ হাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। কবিরাজ মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “পেশা কি?” ভদ্রলোেক কাঁদিতে কাদতেই কহিলেন, “পত্রিকা সম্পাদক।” ই! কবিতা ছাপা হয়?”

মিলােন কবিরাজ “আজ্ঞে তাতেই তাে “হ! লেখিকার কাছে পত্রলিখন কাৰ্য করা হইয়াছে ?” “আক্তে। তার জবাব পেয়েই তাে- বলিয়াই ভদ্রলােক আবার কালিয়া উঠিলেন। আমি কবিরাজ মহাশয়ের অভ্রান্ত নির্দেশ দেখিয়া আশ্চর্য হইলাম! কবিরাজ মহাশয় হাত বাড়াইয়া রােগীর নাড়ী দেখিলেন, তাহার পর কহিলেন, “ব্যবস্থা--প্রাতে ও সন্ধ্যায় অভৈরব বটি, মধ্যাহ্নে স্বল্পপ্রণয়ান্তক।” তাহার পর রােগীর দিকে ফিরিয়া কহিলেন, পত্রিকা সম্পাদন ত্যাগ কর।” এই সময় ক্ষীণ একটি আর্তনাদ শুনিলাম, পরক্ষণেই মাধাই আসিয়া জানাইল যে, দ্বিতলে একটি রােগিণীর মূচ্ছা হইতেছে। বিলােচন কবিরাজ উঠিলেন এবং একটিপ নস্য নাসারন্ধ্রে টিপিতে টিপিতে দ্বিতলে চলিয়া গেলেন, এই অবসরে আমি সনিধি মহাশয়ের নিকট গিয়া বসিয়া কহিলাম, “যদি কিছু মনে না করেন- রসনিধি কহিলেন, “আদৌ মনে কৰ্ব না, প্রশ্ন করুন। ত্রিলােচন কবিরাজের জীবন-কাহিনী জানিবার জন্য দুর্নিবার আগ্রহ হইতেছিল, কহিলাম কবিরাজ মশায়কে অনেক দিন থেকেই জানেন আপনি। তাঁর সম্বন্ধে রসনিধি কহিলেন, “ত্রিলােচন কবরেজের কথা জানেন না আপনি? আচ্ছা সংক্ষেপে শুনুন তবে। পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা। কবরেজ মশায় পড়তেন সিদ্ধান্ত-কৌমুদী, আমরা পড়তাম মুখবােধ। অকস্মাৎ একদিন গ্রামের রজকনন্দিনী ধৈৰ্য্যময়ী বিলােচন কবরেজের নামে অভিযােগ কম্বল যে, তিনি তার অঙ্গ স্পর্শ ত্তিলােন কবিরাজ করেছেন। অধ্যাপক মশায় চতুম্পাঠী থেকে তাকে বিদায় দিলেন। বিলােচন কবরে সেই থেকে সংসার ত্যাগ করেন। তারপর এ দেশ সে দেশ ঘুরে দেখলেন যে, জগতে প্রেমব্যাধিই সর্বাপেক্ষা মারাত্মক। তখন জীবহিতের জন্য এই ব্যাধির ওষুধ খুজতে তিনি গেলেন হিমালয়। সেখানে সিদ্ধবাবা মনমথনজীর নিকট দীক্ষা নেন, তিনিই তার প্রেম- ব্যাধি আরাম করেন। তারপর গুরুর আদেশে তিনি পােকবিত সাধনের জন্য গুরুত্ত ওষুধ পত্তর নিয়ে সংসারে আসেন এবং ডিসপেনসারী খােলেন। তাঁর ছাত্রেরা কেউ বিবাহ কর্তে পারে না । তবে আমার পৈতৃক বৃত্তি বলে আমার সম্বন্ধে তার অন্য ব্যবস্থা ছিল। তা তার কৃপাতেই হােক আর ভাগ্যবলেই হােক পীচ পাঁচটার হাত থেকে উদ্ধার পেয়েছি। গুরু হে তুমিইত্য।” বলিয়া রসনিধি হাত- যােড় করিয়া উদ্দেশে নমস্কার করিলেন। এই সময় কবিরাজ মহাশয় আবার আসিয়া ফরাসে বসিলেন। এইবার আমিও ভক্তিভরে কবিরাজ মহাশয়ের পদধুলি লইলাম। কবিরাজ মহাশয় মাথায় হাত দিয়া আশীর্বাদ করিলেন। রােগীরা তখনও কাঁদিতেছিল। বিলােচন কবিরাজ হাঁকিনেন, “চুপ।” ক্রন্দনধ্বনি থামিয়া গেল, শুধু ফেস-ফোসানি শােনা যাইতে লাগিল। দ্বিতীয় রােগী আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বয়স বছর পচিশ, গায়ে একটা রঙ্গীন পাখাৰী, চোখ কাঁদিয়া কাঁদিয়া লাল হইয়া উঠিয়াছে, মাথার চুল কম। ফরাসে বলিয়াই ভদ্রলােক দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলেন। বিলােচন কবিরাজের খােলা নানী হইতে খানিকটা ন ফরাসে উড়িয়া পড়ি, ত্রিলােচন কবিরাজ কবিরা মহাশয় তাহা লক্ষ্য করিলেন। তাহার পর রােগীর নাড়ী দেখিয়া কহিলেন, “রােগের বিবরণ বর্ণনা কর।” কেমন করিয়া পাশের বাড়ীর হাতে শাড়ী শুকাইতে দেখিয়া তাহার রােগের প্রথম সূত্রপাত হয় এবং তাহার পর ক্রমে ক্রমে অনিদ্রা অরুচি দীর্ঘনিঃশ্বাস প্রভৃতি উপসর্গ প্রকাশ পায়, ভদ্রলােক তাহা বর্ণনা করিতে লাগিলেন। শেষে গত সন্ধ্যায় শাড়ীর অধিকারিণী তাহার মাথায় ছাত হইতে একঝুড়ি তরকারীর খােসা ফেলিয়া দেওয়াতে অনেকগুলি নূতন উপসর্গের সৃষ্টি হইয়াছে। কবিতা রচনা করিবার প্রবৃত্তি তাহার অন্যতম। এই পর্যন্ত বর্ণনা করিয়া পকেট হইতে একটি কলার খােসা কবিরাজ মহাশকে দেখাইয়া দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া রােগী পুনরায় কহিলেন, “তার স্মৃতিচিহ্ন রেখেছি আমি—খােলা নয়, এ ফুল।” কবিরাজ মহাশয় তাহার হাত হইতে খােসা লইয়া পরীক্ষা করিলেন। তাহার পর সেটা ফেলিয়া দিয়া প্রশ্ন করিলেন, “হু! জঞ্জাল প্রক্ষেপকারিণীর বয়স কত?” রােগী চীৎকার করিয়া উঠিলেন, “যােলাে—যােলাে ! sweet বিলােচন কবিরাজ ধমক দিয়া কহিলেন, “চুপ! ব্যবস্থা—কিশােরী- কালানল প্রাতে ; সন্ধ্যায় দীর্ঘশ্বসারি ঘৃত, বুকে মালিশ। যাও দক্ষিণের বাতায়নে একটি স্কুল যবনিকা প্রলম্বিত কর গে।” ইহার পর ক্রমাগত রােগীরা আসিতে লাগিলেন; একটা আশ্চর্য ব্যাপার লক্ষ্য করিলাম যে, সকলেই অসঙ্কোচে সকলের সম্মুখে রােগের গুঢ় নিদান উদঘাটন করিতেছেন। লজ্জার লেশমাত্র কাহারও নাই। বৃদ্ধ অনুকুল চক্রবর্তীকে চিনিতাম। চতুর্থ পক্ষের স্ত্রীর সহিত বনিবনা হওয়াতে তিনি সম্প্রতি বিশ্বম্ভর পাকড়াশীর প্রৌঢ়া পত্নীকে দেখিয়া ত্রিলােচন কবিরাজ রােগগ্রস্ত হইয়াছেন এবং এদিকে পাকড়াশী মহাশয় অনুকুলবাবুর চতুর্থ পক্ষের সহধর্মিণীকে কাশীবাস করাইবার সঙ্কল্প করিয়াছেন—সঙ্কল্পের ফলে তাহার অরুচি শিরঃশূল ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিয়াছে। উভয়ের রােগের এই পারিবারিক গােপন নিদানের কথা উভয়ে পরস্পরের সম্মুখেই বর্ণনা করিয়া গেলেন, বলিতে বাধিল না। দেখিয়া ত্রিলোচন কবিরাজের আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতি আমার ভক্তি উত্তরােত্তর বর্ধিত হইতে লাগিল। রােগী ক্রমাগত আসিতেছে, ব্যবস্থা লইতেছে, বিরাম নাই। এদিকে বেলা বাড়িয়া উঠিল দেখিয়া উঠিবার উপক্রম করিতেছি, এমন সময় ঝড়ের মত একজন ঘরে প্রবেশ করিয়াই চীৎকার করিয়া উঠিলেন—“প্রাণ যায়— প্রাণ যায়।” আতঙ্কে শিহরিয়া উঠিলাম। বাস্তবিকার অন্যতম সদস্য রাতুল রাহা! সহসা রাতুল রাহা হরিকুমারের স্বপ্নরাজ্য হইতে বাস্তব সহরে আসিলেন কি করিয়া ? ঘর শুদ্ধ সমন্ত লােক নিস্তব্ধ। যে সকল রােগীরা ক্ষণকাল পূর্বেও ফোস ফোস করিয়া নিঃশ্বাস ফেলিতেছিলেন তাঁহারাও নবাগত রােগীর অবস্থা দেখিয়া কৌতুহলে নিঃশ্বাস বন্ধ করিয়া রহিলেন। ত্রিলােচন কবিরাজ রাতুল রাহার দিকে একবার চাহিলেন—তাহার পর উঠিয়া আলমারী হইতে বেল কাঠের ষ্টেথসকোপটি বাহির করিয়া রাতুল রাহার বুকে লাগাইলেন, রােগী চীৎকার করিয়া উঠিলেন, “ব্যথা। ব্যথা! বুক আর নেই—ঝাঁঝরা হয়ে গেছে কবরেজ মশাই।” ত্রিলােচন কবিরাজ ধমক দিলেন, রােগী চুপ করিলেন। নাড়ী পরীক্ষা করিয়া কবিরাজ মহাশয় কহিলেন, “হু। রােগ জটিল।”

বিলােচন কবিরাজ রাতুল রাহা হতাশ হইয়া কহিলেন, “সারবে কি? না ফয়ে বিলােচন কবিরাজ আখাস দিয়া কহিলেন, “তয় নাই। অব বল। মােগ কহিলেন, “অবস্থা নেই আর। হৃদয়ের নাভিশ্বাস উঠেছে। বিলােচন কবিরাজ চক্ষু মুদিয়া কহিলেন, “ই। বল।” রাতুল রাহা বলিতে আরম্ভ করিলেন, “প্রেম আমার বুকে নীড় বেঁধেছিল-সেই হােট বেলা থেকে। সেই নীড়ে হাজারাে প্রেমপাখী ডিম ফুটে বেরিয়েছে। তারা জগৎ ঘুরে সবাই এখন হৃদয়-খাঁচায় আসতে চায়। কিন্তু ঠাই নাই, ঠাই নাই!” বলিয়া রাতুল রাহা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলেন। বিলােচন কবিরাজ ঐকুঞ্চিত করিয়া কহিলেন, “স্পষ্ট করে বল।” রাতুল আহা যাহা বলিলেন তাহার ভাবার্থ এই যে, একাদিক্রমে উনিশটি কুমারীকে তিনি প্রেম নিবেদন করিয়াছিলেন। পরে নিবেদিতা- গণের অভিভাবক এবং অভিভাবিকার সন্ধান পাইয়া রাহা মহাশয়কে ‘বান্তৰিকা হইতে কুমারীগণের প্রেমার্ঘ্য গ্রহণ করিবার জন্য ধরিয়া আনিয়াছেন; ফলে তাহার ইহলৌকিক জনক জননী শশব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছে। ঘটক বলিতেছেন যে, রাহা মহাশয়ের অতিবৃদ্ধ এপিতামহ এক বৎসরে একটি বিবাহ করিয়াছিলেন এবং যথােপযুক্ত মৰ্যাদা পাইয়াছিলেন। শুনিয়া পুরােহিত ঠাকুরের অত্যন্ত খুশী হইয়াছেন এবং পরিকা দেখিয়া একটা আসন্ন মুহিবুক যােগের সন্ধান করিতেছেন। ত্রিলােচন কবিরা নিকক্ষণ ধ্যানস্থ হইয়া রহিলেন, পরে কহিলেন, ত্রিলােচন কবিরাজ ; *রােগ জটিল। রীতিমত চিকিৎসা আবশ্যক।” তাহার পর চক্ষু মুহিত করিয়া ব্যবস্থা বলিতে লাগিলেন, “প্রাতে বৃহৎ প্রেমাঙ্কুশলৌহ পূর্ণমাত্রা ও পুরােহিত- নিন রস অর্ধবটি; মধ্যাহ্নে বিবাহ-বিভ্রাবণ রস ও সন্ধ্যায় ঘটকাশনি ও খট্টাঙ্গাবলেহ। পথ্য প্রথম তিন দিবস লক্ষন পরে অবস্থা মত।” ব্যবস্থা মত ঔষধ লইয়া যখন রাহা মহাশয় বাহির হইয়া যাইতে ছিলেন তখন হরিকুমারের বর্তমান সংবাদ জানিবার অভিপ্রায়ে আমিও উঠিলাম। ত্রিলােচন কবিরাজ পিছন হইতে ডাকিলেন, “অপেক্ষা কর।” ফিরিলাম, কবিরাজ মহাশয় কহিলেন, “তােমাকে আমার একটু প্রয়ােজন আছে।” বসিয়া রহিলাম। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সমস্ত রােগী বিদায় হইয়া গেল। তখন ত্রিলােচন কবিরাজ কহিলেন, “তােমাকে এই এম দেখিলাম কিন্তু তােমার প্রতি আমার কিঞ্চিৎ মমতার সঞ্চার হইয়াছে, যেহেতু দেখিতেছি এই ব্যাধি তােমাকে আক্রমণ করিতে পারে নাই। কিন্তু দেখিলে তােত বিদ্বান্ বুদ্ধিমান খ্যাতিমান ধনী দরিদ্রকেই এই নিদারুণ প্রেমব্যাধি হইতে পরিত্রাণ পান নাই। আমি যদি তােমাদের শহরে চিকিৎসালয় খুলিয়া না বসিতাম তাহা হইলে কি হইত তাহা ভাবিতে পারিতেছি না। প্রথম যৌবনে এই ব্যাধি আমাকে ভীষণভাবে আক্রমণ করিয়াছিল, গুরুদীক্ষা লইয়া উমর পাইয়াছি কিন্তু এখনও আমার মাঝে মাঝে তােমাদের নূতন নূতন উপন্যাস ও কবিতার বই পড়িয়া আবার দুই একটি উপসর্গ দেখা দিতেছে। কাজেই গ্রন্থপাঠ একরূপ বর্জন করিয়াছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমার প্রাণান্ত চেষ্টা সত্বেও এই দারুণ সংক্রামক ব্যাধি চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িতেছে। তােমরা পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে অত্যন্ত ১১ ত্রিলােচন কবিরাজ দুর্বল হইয়া পড়িয়াছ বলিয়াই বােধ হয় এত শীঘ্র রােগগ্রস্ত হও। পূর্বে যেখানে কাশ্লেষ ব্যতীত নােগােৎপত্তি হইত না সেখানে এখন একটি কটাক্ষই দেখিতেছি যথেষ্ট-আবার স্কুল কলেজ এবং তােমাদের মধ্যে শাড়ীর আঁচল ও চাবির গুচ্ছ পৰ্য্যন্ত রােগবীজাণু ছড়াইতেছে। ভবিষ্যতে সম্ভবতঃ পদশব্দ শুনিয়াই তােমরা মুচ্ছা যাইবে।” লজ্জায় লাল হইয়া উঠিলাম। পকেটে পয়সা না থাকিলে এখনও গৃহিণীর আসিবার শব্দ শুনিলে মুচ্ছার উপক্রম হয় তাহা আর বলিতে পারিলাম না। বিলােচন কবিরাজ কহিলেন, “তুমি অন্য যাও। তুমি রােগগ্রস্ত হও নাই সুখের কথা, কিন্তু এ ব্যাধিসঙ্কুল নগরে যেখানে মেয়ে- স্কুলের গাড়ী হইতে বায়স্কোপের ছবি পর্যন্ত এই দারুণ রােগের বীজাণু বহন করিতেছে সেখানে রােগগ্রস্ত হইতে বেশী সময় লাগে না। সাবধানের বিনাশ নাই, কাজেই প্রতিষেধক মদনমর্দন বটি ও কটাক্ষারি অঞ্জন লইয়া যাও। সপ্তাহে একটি করিয়া বড়ী শীতল জল সহ সেবন করিবে ও প্রত্যহ চক্ষে কটাক্ষারি অঞ্জন একবার করিয়া লাগাইবে। আমি আর বিলম্ব করিতে পারিতেছি না, রােগিণীরা অপেক্ষা করিতেছেন।” আমি প্রণাম করিলাম। কবিরাজ মহাশয় পুনরায় মােহমুদগর আবৃত্তি করিতে করিতে দোতলায় চলিয়া গেলেন। বাহির হইয়া প্রথমেই দ্রুতপদে কাশীমিত্রের ঘাটে আসিয়া উপস্থিত হইয়া গঙ্গাজল অনুপানে ত্রিলােচন কবিরাজের একটি বটি গলাধকরণ করিয়া ফেলিলাম। সেবনের সঙ্গে সঙ্গে নারীজন সংক্রান্ত সর্বপ্রকার চিন্তা তিরােহিত হইল, গৃহিণীর কথাও ভুলিয়া গেলাম, মনে হইতে লাগিল জগতে আমি একাকী—আমার কেহ নাই, কেহ নাই কেহ নাই। ১২ ত্রিলােচন কবিরাজ সম্মুখে দুর্গতিনাশিনী গঙ্গা খল খল করিয়া হাসিতে হাসিতে বমি যাইতে লাগিলেন। * এই রচনা প্রেসে দিবার পরই আমরা বিপন্ন হইয়া পড়িলাম। আমাদের বুড়া কম্পােজিটার হইতে আরম্ভ করিয়া দপ্তরীর নয় বৎসরের ছেলেটি পৰ্যন্ত বিলােচন কবিরাজের ঠিকানা জানিবার জন্য বার বার বিরক্ত করিতে লাগিল। এমন কি প্রসিদ্ধ মুষ্টিবীর অবলোেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ঐতিহাসিক ও সংবাদপত্র-তাত্ত্বিক বৈকুণ্ঠ চাটুষ্যে সেলটিকসভ্যতার অপ্রতিদ্বন্দ্বী গবেষক বারিদবরণ চৌধুরী, সংবাদপত্র-সেবক ঔপন্যাসিক উৎফুল্ল দত্ত, প্রসিদ্ধ পাঁচালী-গায়ক সুবর্ণবণিককুলতিলক ভবভূতি লাহা পর্যন্ত পত্র লিখিলেন। রচনায় ঠিকানা না থাকাতে-অবস্থা বুঝিয়াআমরা শ্রীযুক্ত দিবাকর শৰ্মাৰ নিকট পত্র লিখি। তিনি উত্তরে জানাইয়াছেন— “গৃহিণী কর্তৃক তাড়িত হইয়া সমস্ত জগতের উপর ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিয়া অভুক্ত অবস্থায় বাড়ী হইতে বাহির হই। শেষে ক্লান্ত হইয়া গয়লামাসীর খােলর ঘরের বারান্দায় চাদর বিছাইয়া শুইয়া পড়ি। নিদ্রিত অবস্থায় ত্রিলােচন কবিরাজকে স্বপ্নে দেখি এবং বাড়ীতে ফিরিয়াই স্বপ্নবৃত্তান্ত লিখিয়া ফেলি। রচনাটি তাহাই। তবে ভরসা আছে স্বপ্ন ফলিবে- যেহেতু এয়ােদশীর দিন স্বপ্ন দেখিয়াছি। এই কথা বলিয়া আপনার বন্ধুদিগকে ভরসা দিবেন। ইতিমধ্যে পারিবারিক তাড়নার ফলে যদি পুনরায় স্বপ্ন দেখি তরে বিলােচন কবিরাজকে তাহার পার্থিব ঠিকানাটি জিজ্ঞাসা করিব। ইতি-ঐদিবাকর শর্মা।” সম্পাদক, শ. চি.

No text on this page.

অলস্টার টাজেডি তাহলে কি বলতে চান পােলানেত্রী সতী নয় ? এই কথা বলিয়াই মুক্ত দ্বারপথে চটক আসিয়া বৈঠকখানায় ঢুকিল। সস্থ সকলে চমকিয়া উঠিলেন। সৰ্বেশ্বর ঘােষের চশমা চকু হইতে নাকের ডগায় নামিয়া আসিল। যাঁহারা ইতিপূর্বেও তারে চীৎকার করিতেছিলেন তারা নির্বাক হইয়া বসিয়া রহিলেন। চটক প্রশ্নটি পুনৰ্ব্বায় উচ্চারণ করিয়া কোমরে হাত দিয়া গড়াইল। ব্যাপারটা সংক্ষেপে এই। কয়েক দিন হইতে বাড়ীর দেয়ালে এবং সংবাদপত্রের স্তম্ভে দেখিতে দেখিতে বিপন-বিহ্বল হইয়া পাড়ার এবীণেরা মাথায় চাদর ঢাকা দিয়া ও নবীনেরা সিগারেট ফুকিতে কিতে গত রাত্রে ‘মডেল সিনেমায় নগ্ন ও অর্ধনগ্ন রূপসীদের ছায়াচিত্রে নৃত্য দেখিতে গিয়াছিলেন। আজ সকালে সর্বেশ্বরবাবুর বৈঠকখানায় গত রাত্রির চিত্রাভিনয়ের সমালােচনা হইতেছিল। আলােচনা ক্রমে চিত্র হইতে চিত্রনটীগণের বয়স, রূপ, উপার্জন এবং চরিত্রকে কে করিয়া আবর্তিত হইতে লাগিল, কাল রাত্রে যাহারা বেশী করিয়া করতালি দিয়াছিলেন আজ তাহারাই অভিনেত্রীদের কিতায় উমা এবং সতীকে সন্দেহ প্রকাশ করিতেছিলেন। পথ দিয়া চটক যাইতেছিল, মিনিট খানেক স্থির হইয়া দাড়াইয়া তুমিল, তাহার পর ত্রিলােচন কবিরাজ সর্বেশ্বর ঘােষের বৈঠকখানায় প্রবেশ করিয়া-তার পর পাঠকেরা জানেন। সভাস্থ সকলের সন্ত্রস্ত হওয়ার হেতু ছিল। চক্রপাণি চাকীর পুত্র চটক চাকী ; পাড়ার সকলের চেয়ে পণ্ডিত, বি, এ পাশ এবং সকলের চেয়ে ধনী—এ পাড়ার বারাে আনা বাড়ীর মালিক। অবিবাহিত। মঞ্চনাট্য ও ছায়ানাট্য সম্বন্ধে অগাধ জ্ঞান। পিতা সমস্ত সম্পত্তি দেবােত্তর করিয়া গিয়াছিলেন বলিয়া আজ পর্যন্ত ফিলম্ কোম্পানী খুলিতে পারে নাই। কিন্তু না খুলিলেও প্রত্যহ বায়স্কোপ দেখিত এবং হলিউডের প্রত্যেক অভিনেত্রীর কাছে চিঠি লিখিত। তেতলার পড়ার ঘরে বড় বড় আয়না টাঙ্গাইয়া ভ্যালেন্টিনাে এবং নােভাবাের মুখভঙ্গী আয়ত্ত করিত এবং ঘরের কী এক মাসতুত ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীর কাছে তাহার আয়ত্ত বিদ্যার পরীক্ষা দিত। একদিন একখানা ছবি পর পর তিনবার দেখিয়া বাড়ী আসিয়া চটক দরজায় খিল দিল এবং রুডলফের নেত্রভঙ্গিমার অনুকরণ করিয়া ফেলিল। তাহার পর রান্নাঘরের দরজায় আসিয়া ডাকিল, “বৌদিদি?” বৌদিদি খস্তি হাতে দরজায় আসিয়া দাড়াইলেন। চটক কহিল, “আজ এক মহাপরীক্ষার দিন। বিশেষ করে তােমার পক্ষে। আমি তােমার দিকে চাইব-তােমার মনে যে ভাব হয় সত্যি বলবে আমাকে বল।” বােদি কহিলেন, “স্থা, বলব।” “তবে স্থির হয়ে দাঁড়াও!” বলিয়া ওষ্ঠপ্রান্ত কুঞ্চিত করিয়া মদিয়-স্তিমিত নেত্রে চটক হার দিকে চাহিয়া কহিল, “কি ? বুকের মধ্যে কু কু কমছে না ?” ১৬ অল-ষ্টার ট্রাজেডি বৌদি মুখে কাপড় দিয়া কহিলেন, “না ভাই, হাসি পাচ্ছে। চটক মুড়িয়া গেল। সেই দিন হইতে সে বাঙ্গালী নারীজাতির প্রতি এ হারাইল এবং প্রতি করিল বিবাহ করিবে না। করিলেও ভারত- বর্ষের নারীকে নহে। কিন্তু ওদিকেও অন্তরায় ছিল—চক্রপাণি চাকীর উইলের সর্তের মধ্যে প্রধান সৰ্ত ছিল -ছেলে ম্লেচ্ছায় গ্রহণ করিলে সেবায়েৎ পদ হইতে অপহৃত হইবে, কাজেই চটক মনে মনে হলিউডের প্রায় সকল অভিনেত্রীকেই বিবাহ করিয়া ফেলিল এবং তাহার মান বধুদের ফটোগ্রাফে ‘চক্রপাণি নিবাসের একতলার বারান্দা হইতে তেতলার চিলেকোঠার দেয়াল পর্যন্ত ঢাকিয়া ফেলিল। তাহার এক শিষ্য ছিল সােমন। সেও চটকের সহিত বহুকাল ভাবের আদানপ্রদান করিবার ফলে নিজের বাড়ীখানিকে হলিউড করিয়া তুলিয়াছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন কি হইতে কি হইল! দেখা গেল যে, সােমেন টোপর মাথায় দিয়া মােটরে চাপিয়া একটা বাঙ্গালী মেয়েকে বিবাহ করিতে চলিয়াছে। চটক চটিয়া গেল, সােমেন নিজের পৈতৃক বাড়ীতে বাস করিত বলিয়া বাড়ীভাড়া দুননা করিতে পারিল না, তবে তাহার ইচ্ছার কথা সর্বত্র প্রকাশ করিয়া দিল। আসল ভয়ের কারণ ছিল ইহাই, কাজেই চটকের প্রশ্নের জবাব দিবার ইচ্ছা কাহারো থাকিলেও সর্বেশ্বর ঘােষের বৈঠকখানাস্থ কেহই বানিস্পত্তি করিলেন কেবল একটি ভদ্রলােক একটু অস্বস্তি বােধ করিতে লাগিলেন। নাম ব্যোমকেশবাবু। গত দুই বৎসর হইতে নিজের জন্য একটা সুপাত্রীর সন্ধান করিতেছিলেন এবং বৎসরের তিন শ ষাট দিন পাত্রী অভিভাবকদের বাড়ীতে লুচি ও ক্ষীরের সদ্ব্যবহার করিয়া ফিরিতেছিলেন। না। ১৭ ত্রিলােচন কবিরাজ গত তিন দিন হইতে সর্বেশ্বরবাবুর বাড়ীতে অতিথি হইয়া রহিয়াছেন। সকলের মত চটককে দেখিয়া তাহারও একটু সম্ভ্রমের উদয় হইয়াছিল, কিন্তু সেটা বেশীক্ষণ রহিল না। অন্য কেহ চটকের প্রশ্নের জবাব দিল না দেখিয়া তিনি কথা কহিলেন। চটকের দম্ভ দেখিয়া তাহার রাগ হইল। তাহার কথা শেষ হইতে না হইতেই চটক জবাব দিল । মিনিট দুয়ের মধ্যে উত্তর প্রত্যুত্তর উদারা হইতে তারায় চড়িল এবং সতী এবং সতীধৰ্ম্ম সম্বন্ধে বিরাট তর্কযুদ্ধের আরম্ভ হইল। নূরজাহান বড় সতী কিংবা ক্যাথেরিন বড় সতী তাহার সিদ্ধান্ত হইবার পূর্বেই প্রথমে একখানি চুড়ি-পরা সুডৌল হাত, তাহার পর এক গােছ কোঁকড়ানাে চুল, তাহার পরে একখানি সুন্দর মুখ বৈঠকখানার পিছনের দরজার ফাকে দেখা গেল, এবং শব্দ হইল, “বাবা! আমার চটক তর্কে ক্ষান্ত দিয়া তরুণীর দিকে চাহিয়াই মুখ নীচু করিল, চোখের ভঙ্গী কাহার মত করিবে সহসা তাহা স্থির করিয়া উঠিতে পারি না। ব্যোমকেশবাবুর তর্কের খেই হারাইয়া গেল, তিনি অনাবশ্যক ভাবে নাক চুলকাইতে লাগিলেন। সর্বেশ্বরবাবু অপ্রতিভ হইয়া কহিলেন, “হ্যা। এই আমরা সবাই যাচ্ছি মা।” তারপর চটকের দিকে চাহিয়া কহিলেন, “মেয়েটার বি, এ, এগজামিন কি না-* চটক গদ্গদ কণ্ঠে কহিল, “যে অপরাধ করেছি আজ, তার জন্য ক্ষমা কনে” বলিয়া বাষ্টার কীটনের মত করুণ দৃষ্টিতে তরুণীর দিকে চাহিল, কিত র তখন বন্ধ হইয়া গেছে।

সন্ধ্যায় সিনেমা যাইবার পথে গলি ঘুরিয়া অকারণেই চটক একবার সর্বেশ্বরবাবুর বাড়ীর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল ; দরজা বন্ধ। উপরে চাহিয়া দেখিল বারান্দার এক কোণে ব্যোমকেশবাবুর মুখ। অকারণেই ঝা করিয়া বাড়ীর বন্ধ ও খােলা জানালা-দরজাগুলির উপর একবার চটক চোখ বুলাইয়া গেল। ব্যোমকেশবাবুর পরিচয় ইতিপূৰ্বেই সে লইয়াছিল। দাতে ঠোট চাপিয়া কহিয়া গেল, “লােফার!” রাত্রে খাইতে বসিয়া নানা কথার মাঝে ফস্ করিয়া চটক কহিল, “আজ একটা মেয়ে দেখলাম।” বৌদি প্রত্যহের মতই কহিলেন, “কে? ম্যাডাম ফ্যারারা ?” ক্রমাগত শুনিতে নিতে অনেকগুলি নাম বৌদির মুখস্থ হইয়া গিয়াছিল। চটক কহিল, “না। বাঙ্গালী।” বৌদি ভবিষ্যৎ ভাবিয়া খুশী হইলেন, কহিলেন, “রূপসী বুঝি?” “এমন রূপ নয় যে চোখে কুলের কাঁটার মত বিধে থাকবে, তবু রূপসী। যাক” বলিয়া সে আহার শেষ করিয়া উঠিল। বৌদি চট্‌ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “ঘটুকী পাঠাব?” চটক ঘাড় হইতে মাথাটাকে ইঞ্চি তিনেক কাৎ করিয়া কহিল, “ঘকী! উহু! তত দূরে যেতে হবে না।” বৌদি আর অগ্রসর হইলেন না, তবে বুঝিলেন যে, দেবরের বাঙ্গালী মেয়ের প্রতি শ্রদ্ধা পুনরায় গজাইতেছে। ১১ ত্রিলােচন কবিরাজ পরদিন প্রাতঃকালে আবার অকারণে চটক সর্বেশ্বরবাবুর বৈঠকখানার জানালার ধারে আসিয়া দাড়াইল, শুনিল গান হইতেছে। হারমােনিয়ামের আওয়াজে গলার স্বর কাহার বােঝা গেল না ; তবে প্রভাতী গজলের সুর বড় ভালাে লাগিল, চটক নিস্তব্ধ হইয়া নিতে লাগিল- বাগিচার নাচদুয়ারে আয় নেচে রে বুলবুলিয়া। তপনের চুম লেগেছে ঘুম ভেগেছে ফুল গুলিয়া। আঙ্গিনার কতলাতে কমল-হাতে মাজুছে হাঁড়ি হা রে হা রূপগরবী সৈরভী ঝি চুল খুলিয়া ; বাহিরে সজনে-শাখে ডাকছে কাকে কাক-বধূটি ‘হাঁসের ডিম্ যাচ্ছে,হেঁকে পথের বাঁকে ফজলু মিঞা। গান, শেষ হইতেই ‘সর্বেশ্বরবাবু আছেন কি? বলিয়াই চটক বৈঠকখানায় ঢুকিল ; দেখিল ফরাসে ব্যামকেশবাবু, তাহার সামনে হারমােনিয়াম, পাশে একখানি রেকাবে খানকয়েক বেগুনী ও এক পেয়ালা চা। চটকের যেন সহসা মনে হইল সে শত্ৰুপুরীতে প্রবেশ করিয়াছে; অভ্যাসমত পকেটে হাত দিল কিন্তু পিস্তলের পরিবর্তে উঠিল একটা লাল-নীল পেন্সিল। সেইটিকে মুষ্টিবদ্ধ করিয়া বব্যামকেশ বাবুর দিকে চাহিয়া সে গম্ভীর কণ্ঠে কহিল, “আছেন আপনি আজও- ব্যামকেশবাবু তাড়াতাড়ি উঠিয়া তিন পা পিছাইয়া গেলেন ; চায়ের পেয়ালা উল্টাইয়া পড়িয়া গেল। চটক ফরাসে শায়িত চায়ের পোলার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া কহিলেন, “ভাল করে বসিয়ে . • রাখুন।

অল-ষ্টার ট্রাজেডি ব্যোমকেশবাবুর অকস্মাৎ পশ্চাদগমনে ধুপধাপ শব্দ হইয়াছিল, বােধ হয় শব্দটি ভিতরে পৌছিয়াছিল। কালিকার মতই পিছনের দরজা খুলিয়া গেল এবং তিনিই প্রবেশ করিলেন। এক চক্ষু বিস্তৃত, অপর চক্ষু স্তিমিত করিয়া চটক চাহিল ; তরুণী কহিল, “বাবা বাড়ী নেই—* চটকের হাতের পেন্সিল কঁপিয়া গেল। মিগ্ন কণ্ঠে সে কহিল, “বব তা হলে তরুণী পুনরায় কহিল, “আমার এগৃজামিন- চটকের চোখে আগুন জ্বলিল, মনে মনে কহিল, ব্যোমকেশের বেলায় 'চা আর বেগুনী, আর আমার বেলায় এগজামিন! মুখে কহিল, “আচ্ছা তরুণী চলিয়া গেল। চটক ব্যোমকেশের দিকে চাহিয়া কহিল, “আর কত দিন থাকবেন?” ব্যোমকেশবাবু আর এক পা পিছাইয়া গেলেন, কহিলেন, “ঘােষ মশাই যেতে বললেই চটক আর দাড়াইল না। সেদিন রাত্রে জোয়ান ক্রফোর্ডের ছবিখানার দিকে চাহিয়া চটক দেখিল যে, ছবিখানার মুখখানি যেন অনেকটা সর্বেশ্বর ঘােষের মেয়ের মত হইয়া গিয়াছে। চটক বাতি নিভাইয়া দিল।

পরদিন রাতে ব্যোমকেশবাবু অমলাকে কহিলেন, “আমাকে যেতে অমলা কহিল, “বেশ যাবেন। বাবাকে বলুন।” সর্বেশ্বরবাবুকে পূর্বেও ব্যামকেশবাবু বলিয়াছেন, পাত্রী পছন্দ হইয়াছে তাহাও জানাইয়াছেন। সর্বেশ্বরবাবু আহলাদিত হইয়া কন্যার নিকট অনুমতি লইতে অনুমতি দিয়াছেন। ব্যোমকেশবাবু কহিলেন, “আমি যেতাম না, কিন্তু অমলা Hamlet থানা উল্টাইয়া রাখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কিন্তু কি?” “চটকবাবু আমাকে পছন্দ করেন না।” বলিয়াই ব্যামকেশবাবু একটি নিঃশ্বাস ফেলিলেন। “চটকবাবুর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কি? মনিব?” অমলা জিজ্ঞাসা করিল। “না, তবে আপনাদের বন্ধু তাে বটে।” অমলা রাগিয়া গেল, “আমাদের বন্ধু কেউ নেই। থাকুন আপনি। আমি দেখব।” ব্যোমকেশবাবু খুশী হইয়া বৈঠকখানায় বসিয়া ঘরের দরজায় খিল আঁটিয়া দিলেন। আধঘণ্টা পর দরজার কাছে চটকের আওয়াজ শােনা গেল, “সর্বেশ্বর- বাবু আছেন? ব্যামকেশবাবু দরজার খিলের দিকে একবার চাহিয়া কহিলেন, “না, নেই। অমলার এগজামিন ; অল-ষ্টার ট্রাজেডি বাহিরে একটা অর্থস্ফুট আক্রোশ-বাণী শােনা গেল, তাহার পরেই এন, “আপনি আছেন আজও?” ব্যোমকেশবাবু পিছনের দরজার দিকে চাহিয়া দেখিলেন, অমলা দরজার পাশেই পড়িতেছে; সদম্ভে কহিলেন, “হ্যা, আছি।” “বাইরে আসবেন ?” “না।” বলিয়াই হারমােনিয়াম খুলিয়া তান ধরিলেন- বাগিচার নাচদুয়ারে তাহার পরই হারমােনিয়াম বন্ধ করিয়া দরজায় কান লাগাইলেন- বাহিরে কোনও শব্দ নাই। পাত্রের তত পছন্দ হইয়াছে, এখন আসল কাজ নির্ভর করিতেছে পাত্রীর পছন্দের উপর। ব্যোমকেশবাবু পাত্রীর দিকে বার বার চাহিতে লাগিলেন, মুখে প্রণয় কিংবা লজ্জা কিছুর চিহ্নই দেখিতে পাইলেন না। মােগল থিয়েটারে ‘হ্যামলেট' ছবি দেখানাে হইতেছে। সর্বেশ্বর বাবু যাইতে পারিলেন না। অগত্যা ব্যামকেশবাবু অমলার শেক্স- পীয়ারের নােটবহিথানা বগলে করিয়া তাহার পিছনে পিছনে গিয়া ট্রামে চড়িলেন। Interval-এর সময় কে যেন ব্যোমকেশবাবুর কাঁধে হাত দিল। ব্যামকেশবাবু চাহিয়া শিহরিয়া উঠিলেন, চটক! চটক কহিল, “বাইরে আন।” ব্যোমকেশ অমলার খাতাখানা মুঠা করিয়া ধরিয়া কহিল, “এখানেই বলুন।”

ত্রিলােচন কবিরাজ নাই। “সে এখানে বাবার কথা নয়,” বলিয়া চটক ব্যোমকেশবাবুর হাত ধরিয়া টান দিল। অমলা কহিল, “যান না বাইরে।” অগত্যা ব্যোমকেশবাবু বাহিরে আসিয়া দাড়াইলেন। চটক কহিল, “আর একটু দূরে ওই চামড়ার গুদামের পিছনে।” মন্ত্রচালিতের মত ব্যোমকেশবাবু চটকের পিছনে পিছনে চলিলেন। চটক বা হাতের Oxford Edition Shakespeare-খানা ডান হাতে লইয়া কহিল, “শােন ব্যোমকেশ ! এ সংসারে অমলার দুই প্রণয়ীর স্থান হয় তুমি থাকবে, নৈলে আমি। এই অন্ধকার রালি, এই নির্জন গলির মােড়—পাহারাওয়ালা নেই। তােমার সঙ্গে ডুয়েল লড়ব। যে জিতবে অমলা তার।” ব্যোমকেশবাবু কম্পিতকণ্ঠে কহিলেন, “আমি পারব না।” পারতে হবে তােমাকে কাপুরুষ! দাড়াও গলির ওধারে। তােমার হাতে ওই খাতা, আর আমার হাতে এই শেক্সপীয়ার। এই দুই পিস্তল, ছোঁড় গুলি! এক দুই তিন।” বোঁ করিয়া গলির দু’ধার হইতে বহি ছুটিল, কিন্তু লক্ষ্যে পৌছিবার পূর্বেই চলন্ত একটি সাইকেলের সমুখের চাকায় দুই অস্ত্র ঠেকিয়া গেল; আরােহী সাইকেল থামাইয়া নামিয়া পড়িলেন। ব্যোমকেশবাবু গলির উত্তর দিকে ভো করিয়া ও চটক দক্ষিণ মুখে ক্লাইভ ব্রুকের ধরণে লম্বা লম্বা পা ফেলিয়া দৌড় দিল। সাইকেলের আরােহী একবার চাহিয়া দেখিলেন কোথাও পুলিশ নাই, অগত্যা নিমেষমধ্যে বহি দু’খানি কুড়াইয়া লইয়া গলির পূর্ব দিকের রাস্তা দিয়া সাইকেল চালাইয়া দিলেন। 28 ৪ প্রকৃতপক্ষে ইহা গল্প নহে, উপন্যাস। কাজেই পাঠক-পাঠিকা জিজ্ঞাসা করিতে পারেন, আমার কি হইল? কিছু হইল না, অমলা বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া চা তৈয়ারী করিয়া পান করিল, তাহার পর জিজ্ঞাসা করিল, “ব্যোমকেশবাবু কোথায়?” কেহ কিছু বলিতে পারিল না। পরদিন রাতে দেখা গেল, ব্যোমকেশবাবুর আহাৰ্য্য লুচী তেমনই ঢাকা রহিয়াছে। ব্যোমকেশ নাই। অমলা কহিল, “আমার থা?” সর্বেশ্বরবাবু কহিলেন, “দেখিনি। ব্যামকেশ দিয়ে যায় নি ?” অমলা কহিল, “আমার এগজামিন—যাও বাবা চটকবাবুর বাড়ীতে, সেখানে ব্যোমকেশবাবু আছেন হয় তাে।” সর্বেশ্বরবাবু চলিলেন। কিন্তু চটক শয্যাগত। গলি দিয়া ছুটিবার সময় বিড়ির দোকানওয়ালা তাহাকে চোর বলিয়া তাড়া করিয়াছিল, সে ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্কসের অনুকরণে লাফ দিয়া চলন্ত রিকসাতে উঠিতে গিয়া চার্লি চ্যাপলিনের ভঙ্গীতে উল্টাইয়া পড়িয়া চোট খাইয়াছে। সে কথা সর্বেশ্বরবাবু জানিলেন না, শুধু শুনিলেন ব্যোমকেশবাবু সেখানে নাই। খাতাও নাই। গুনিয়া অমলা কাঁদিয়া ফেলিল, ব্যোমকেশবাবুর জন্য নহে, খাতার জন্য। কাল তাহার টেষ্ট। এমন সময় বাহিরে কড়া বাজিয়া উঠিল। সর্বেশ্বরবাৰু দরজা খুলিয়া

৪
ত্রিলােচন কবিরাজ
দিলেন। একটি ভদ্রলােক বৈঠকখানায় প্রবেশ করিয়া কহিলেন, “মিস্
অমলা ঘােষ এখানে?”
অমলা আসিয়া দাড়াইল, কহিল “আমি।”
ভদ্রলােক কহিলেন, “এই আপনার খাতা। কাল কুড়িয়ে পেয়েছি।” ।
অমলা হাসিয়া কহিল, “বাচালেন আপনি। আমি খাতা না পেয়ে
কেঁদে ফেলেছিলাম। কোথায় পেলেন?”
আগন্তুক বীরেশ দাস হাসিয়া কহিলেন, “সে কথা নাই-ই শুলেন।
আপনার খাতার সঙ্গে এটাও নিন-আমার নিজের নােট, ধীফেন
সাহেবের কাজে লাগবে।”
অমলা কহিল, “ধন্যবাদ! চা খান।”
চা খাওয়া হইল।
অধ্যাপক বীরেশবাবুর সে দিন প্রথম ঘণ্টায় ক্লাশ করা হইল না।
চটকের গায়ের ব্যথা সারিয়াছে। আবার অকারণে সেদিন সে
সর্বেশ্বরবাবুর বৈঠকখানার জানালায় আসিয়া দাঁড়াইল—দেখিয়া
এন্টোনিও-মরেপাের কুঞ্চিত মত করিল–অধ্যাপক বীরেশ দাসের বড়
বেশী কাছাকাছি বসিয়া অমলা শেক্সপীয়ার পড়িতেছে। ধিক!
বাড়ীতে ফিরিবার পথে দেখিল যে ব্যোমকেশবাবু চানাচুর খাইতে
পাইতে চলিয়াছেন। তাহার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়া চটক
কহিল, “এবার।”
গলায় চানাচুর আটকাইয়া গেল; একটু কাশিয়া গলা সাফ করিয়া
ব্যোমকেশবাবু কহিলেন “অমলার বাড়ীতে আর যাইনি তাে?”
চটক সে কথা কানে শুনিল না, কহিল, “এখন ?”
২৬

অল-ষ্টার ট্রাজেডি
“মদন বড়ালের লেনে যাচ্ছি সেখানে একটা পাত্রী আছে।”
বলিয়া এক লঙ্কে ব্যোমকেশবাবু দণ্ডায়মান বাসখানিতে গিয়া
উঠিলেন।
চটক চলন্ত বাসখানির দিকে রােনাল্ড কোলম্যানের মত বিজপ
ভঙ্গীতে চাহিয়া কহিল, “কাউয়ার্ড।
২৭

No text on this page.

নারী-নির্যাতন চটকের ভাবদীক্ষিত যে ভক্তটির উল্লেখ ইতিপূর্বে করিয়াছি তাহার একটু সবিস্তার-পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। অতি সংক্ষেপে এবং অবলীলাক্রমে লিখিয়া যাইতেছি, গল্পও হইতে পারে, উপন্যাসও হইতে পারে, ইতিহাস হওয়াও বিচিত্র নহে। সােমেন সমাদ্দার। য়ুনিভার্সিটির পঞ্চম বার্ষিক ইংরেজী শ্রেণীর ছাত্র। জীবনাঙ্ক স’ের প্রেসিডেন্ট। সঙ্ঘের নির্ধারণ ছিল যে সমস্ত জীবনটাই একটা একাণ্ড নাটক ; প্রতি দিবস তাহার নব নব দৃশ্যপট, মানব মানবী প্রত্যেকেই নট নটা। আহারে বিহারে সর্ববিষয়ে এই নাটকীয় অনুভূতির উপলব্ধিই মানব জীবনের চরম লক্ষ্য। চটক ছিল এই সজের পেট্রণ, কিছু টাকাও দিয়াছিল; কিন্তু সােমেন সহসা সঘের নীতি বহির্ভূত একটা গর্হিত কাজ করিয়া ফেলিল। “জীবনাঙ্ক সঘের’ জীবনান্ত হইল, বন্ধুবিচ্ছেদ হইল, ভবিষ্যতে সােমেনের এই দুষ্কর্মের ফল ফলিলে কি হইবে কে জানে? যাহা হইবার হইবে, এখন তাহার জন্য চিন্তা করিয়া লাভ নাই। যাহা বলিতে ছিলাম- চটকের ভাবদীক্ষিত শিষ্য ও বন্ধু সােমেন। থার্ডক্লাশ হইতে চটকের সঙ্গে রীতিমত থিয়েটার ও বায়স্কোপ দেখিয়া ফিরিতেছে। এতিজা করিয়াছে বিবাহ আদৌ করিবে না, হলিউডের কোনও রূপসী আসিয়া বিলােচন কবিরাজ পাণি প্রার্থনা করিলেও-না। সােমেনের দিদিমা ও বৌদিদি উভয়েই বাবা তারকনাথের মানৎ করিয়াছিলেন কিন্তু সােমেনের মতের পরিবর্তন হইল না। তবে একবার দিদিমা জোর করিয়াই তাহাকে পাত্রী দেখিতে পাঠাইয়াছিলেন কিন্তু তাহার ফল ভাল হয় নাই। ব্যাপারটা এইরূপ। শিবরাত্রির রাত্রে চন্দ্রশেখর অভিনয় দেখিয়া সােমেন বাড়ীতে ফিরিয়া দেখিল, বারান্দায় শৈলি ঝি—ভাল নাম শৈবলিনী—অঘােরে ঘুমাইতেছে। নিদ্রিতা শৈলি ঝিকে দেখিয়া সােমেন প্রতাপের ভাবে আবিষ্ট হইয়া পড়িল ; রেলিংএ ভর দিয়া ডান হাত তুলিয়া সে কহিয়া উঠিল, “এ কি সেই শৈবলিনী ? বাল্যকালে যার সঙ্গে-শৈবলিনী—শৈ-* শৈলি ঝি হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। দিদিমা শিবম ভুলিয়া ছুটিয়া আসিলেন। বৌ-দিদি কাদিয়া কাটিয়া সােমনের মাথায় জল ঢালিলেন। পরদিন বৌ-দিদি ও দিদিমা উভয়ে যুক্তি করিয়া উপবাস করিয়া রহিলেন, বাধ্য হইয়া সােমেন পাল-পাড়ার বিশ্বাসদের বাড়ী কনে দেখিতে গেল। বিবাহের কথাবার্তা চলিতেছিল। ক’নে সাজিয়া গুজিয়া আসিয়া দাড়াইতেই সােমেন তাহার বাঁ হাত খানি মুঠা করিয়া ধরিয়া কহিল, -ব্রহ্মচারী ব্রতধারী আমি পতিযােগ্য নহি বরাঙ্গনে।” তলে তলে কনেটি থর থর করিয়া কাঁপিতে লাগিল, বেদনায় অথবা লজ্জায় জানি না। কনের দাদা অবিনাশ হা-হা করিয়া ছুটিয়া আসিল কিন্তু নারী-নিৰ্যাতন ফাষ্ট ফ্লাশ ফাষ্ট সােমেন সমাদ্দারের গায়ে সেকেণ্ড ইয়ারের ফেল করা ছেলে হাত দিতে সাহস করিল না। সােমন সহসা দ্রুতপদে বাহিরে আসিয়া ট্রাম ধরিল এবং বাড়ীতে আসিয়া বৌদি এবং দিদিমাকে শাসাইল যে ইহার পর এ বাড়ীতে যদি কেহ তাহার বিবাহ সম্বন্ধে আলাপ করে তাহা হইলে সে খালধারের নিক্রিয়ানন্দ মঠে গিয়া সন্ন্যাস লইবে। দিদিমা বত্রিশ পাটী দাতের অবশিষ্ট সম্মুখের দু’টি দাত দিয়া জিভ কাটিয়া কহিলেন, “ষা! যাট। ও কথা বলিনে মাণিক।” সােমেন পড়ার ঘরের দরজা সশব্দে বন্ধ করিয়া কহিল, “বলব! সহস্রবার বলব। আকাশের চন্দ্রতারা সাক্ষী! স্বর্গে মন্দাকিনী সাক্ষী আর শােনা গেল না, জানালাটিও বন্ধ হইয়া গেল, রান্না ঘরে বসিয়া বৌদিদি ‘দুর্গেশনন্দিনীর’ খােল পাতার উপর মুখ রাখিয়া ফেঁাপাইয়া ফেঁপাইয়া কাঁদিতে লাগিলেন। ইহার পর হইতেই বাড়ীতে সােমেনের বিবাহপ্রসঙ্গ একেবারে বিবর্জিত হইল, ভূমিকা এই পৰ্য্যন্ত। এখন কাহিনীর পালা। সেদিন আষাঢ়ের প্রথম দিবস। নবমেঘভারে আচ্ছন্ন নীল আকাশ যেন একটি তরুণীর সর্বাঙ্গ বেড়িয়া একখানি গাঢ়নীল শাড়ীর অঞ্চল। বিদ্যুৎ চমকাইতেছে যেন সেই অঞ্চলে খচিত মণিমালা। আকাশে মেঘের গর্জন, নীচে ট্রামের ঘর্ঘর আর গলির মােড়ে মােড়ে গরম চানাচুর

ত্রিলােচন কবিরাজ
ওরালার অশ্রান্ত চীৎকার। সােমেন এক ঠোঙ্গা চানাচুর লইয়া বাসে
উঠিল। দশটার বাস্। পরিপূর্ণ যাত্রী-সমারােহ। পিছনের বেঞ্চির
এককোণে একটু স্থান করিয়া লইয়া সােমন বসিল। বাস চলিতে
চলিতে থামিয়া গেল। হাতে বহি আর খাতা সইয়া উঠিল এক
অষ্টাদশ। গাড়ীশুদ্ধ সমস্ত যাত্রীই একবার ঘাড় বাঁকাইয়া দেখিয়া লইল,
শুধু সােমমন দেখিল নির্বিকারভাবে। গাড়ী চলিল। মেয়েটি একবার
চাহিয়া সােমেনের কাছে আসিয়া দাড়াইয়া লােলুপ দৃষ্টিতে সােমেনের
পাশের বহির গাদার দিকে চাহিল। বহিগুলি তুলিয়া লইলে তন্বীর স্থান
হয় কিন্তু অত কাছাকাছি। ঘৃণায় সােমেনের সর্বাঙ্গ কাটা দিয়া উঠিল।
সে বহি লইয়া উঠিয়া গাড়ীর দেয়াল ঠেস দিয়া দাঁড়াইল এবং
তরুণী অবলীলাক্রমে বসিয়া পড়িয়া কহিল, “থ্যাঙ্কস! কোথা
যাচ্ছেন?”
সােমেন হাতের বইগুলিকে নির্দয়ভাবে টিপিয়া ধরিয়া কহিল,
“চুলােয়।”
তরুণী কহিল, “সেটা বুঝি দ্বারভাঙ্গা বিল্ডিংএ ?”
সােমেন তেমনি নির্বিকারভাবে কহিল, “হ্যা।”
তরুণী কহিল, “চলুন, আমিও যাচ্ছি।”
সােমেন কহিল, “থ্যাঙ্কস্।”
দু’জনেই এক ক্লাশে পড়ে, মুখ দেখাদেখি হিল, আলাপ হইল
এই প্রথম।
কমলা ও ফাঙ্গাশ তৰে সােমেনের দুই ধাপ নীচে। সােমেনের
সহিত আলাপ করিবার ইচ্ছা তাহার বরাবরই ছিল, পড়াশুনার সুবিধা
৩২

নারী-নির্যাতন হইবে বলিয়া। কিন্তু সােমেনের রীতি-প্রকৃতির কথা শুনিয়া কাছে ঘেসে নাই। দৈবক্রমে পরিচয় হওয়াতে সে খুশী হইল। সােমেনকেও চিনিয়া ফেলিল। বাস হইতে নামিয়া হহ করিয়া সােমন তেতলায় উঠিল, উঠিয়াই দেখিল দরজার কাছে কমলা দাড়াইয়া ! সে লিফটে উঠিয়াছে। সােমেনকে দেখিয়াই সে চানাচুরের ঠোঙ্গাটি আগাইয়া দিয়া কহিল, “নি! বাসে ফেলে এসেছিলেন।” এই অসঙ্গত ঘনিষ্ঠতার চেষ্টা দেখিয়া সােমন রাগিয়া গেল, কহিল “চাইনে। টিফিন কৰ্বেন।” কমলা কহিল, “থ্যাঙ্কস!” আরও মিনিট পাঁচেক পরের কথা। সােমেন নিবিষ্ট মনে কি লিখিতেছিল, কমলা পিছন হইতে আসিয়া কহিল,“আপনার পেন্সিলটা?” সােমন একবার চাহিল, তারপর মনে মনে কত খি চাইয়া পকেট হইতে একটা পয়সা বাহির করিয়া ডেস্কের উপর রাখিয়া কহিল, “কিনে নিন্ গে।” কমলা পয়সাটা তুলিয়া লইয়া কহিল, “থ্যাঙ্কস্।” তারপর বেলা চারটে। সােমেন লাইব্রেরীতে বসিয়া Apo ogia, একটি নূতন সংস্করণ হইতে নােট করিতেছিল, কমলা আসিয়া থােকা বহিখানার উপর একটা পয়সা ফেলিয়া দিয়া কহিল,চানাচুরের পয়সাটা।” বহির উপর এক ঘুষি মারিয়া সােমেন দাতে ঠোট চাপিয়া কহিল, “ড্যা—” তারপর সম্মুখে অকস্মাৎ জয়গােপালবাবুকে দেখিয়া কহিল, “আস।” কমলা পিছন হইতে মৃদুস্বরে কহিল, “ভ্যাঙ্কস!” এবং ঈষৎ হাসিয়া বাহির হইয়া গেল।

ত্রিলােচন কবিরাজ সােমেনের সম্মুখের বহিখানার ইংরাজী অক্ষরগুলি ফারসীর মত জড়াইয়া যাইতে লাগিল। সেদিন আর নােট লেখা হইল না। সন্ধ্যাকালে দিদিমার সহিত বৌদিদি ছাতে আসিয়া দেখিলেন যে সােমেন কারারুদ্ধ জগৎসিংহের মত পদচারণা করিতেছে ও বলিতেছে “কমলা, এটেকলা, কাণমলা-হু! হু!” লেখক বুঝিলেন যে এই অস্থিরতার হেতু ছন না মিলিবার দরুণ, দিদিমা বুঝিলেন যে তাঁহার নাতির কমলালেবু খাইবার সাধ হইয়াছে, বৌদিদি বুঝিলেন যে কমলা কাহারও নাম। দিদিমা ও বৌদিদি কোনও কথা না কহিয়া নিঃশব্দে নামিয়া গেলেন, কিন্তু আমি লেখক বাধ্য হইয়া কাহিনী-সমাপ্তির জন্য অশরীরী অবস্থায় সােমেনের সহিত রহিয়া গেলাম এবং ঘণ্টাখানেকের মধ্যে দেখিলাম যে জগতের যাবতীয় অভব্য অমেধ্য ‘লা’ সংযুক্ত শব্দের সহিত কমলার নাম সংযুক্ত করিয়া দিব্য একটি কবিতার সৃষ্টি হইল এবং প্রতিহিংসা চরিতার্থ করিয়া ইজিচেয়ারে শুইয়া সােমেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিল। পরদিন। প্রােফেসার আসিবার দেরী ছিল। কমলা আর তাহার সহাধ্যায়িনীরা যে বেঞ্চিটাতে বসে, সােমেন আপনার অজ্ঞাতসারেই কুদৃষ্টিতে বারবার সেইদিকে চাহিতেছিল, এমন সময় ডানদিক হইতে প্রশ্ন আসিল, “আজ মেজাজ কেমন আছে সােমেনবাবু?” সােমেন চাহিয়া দেখিল, কমলা। ঘরভরা ছেলে, চটিয়া উঠিতে পারিল না। ৩৪ নারী-নির্যাতন কাল সন্ধ্যায় রচিত কবিতার কাগজখানি কালার হাতে দিয়া কহিল, “এটা আপনার। নিয়ে যান।” কমলা চলিয়া গেল। যাইবার সময় কহিয়া গেল, “ড্যাঙ্ক!” সােমেন মনে মনে গর্জন করিতে লাগিল। কমলা পরিহাসের উপযুক্ত জবাব পাইয়াছে এই সান্ত্বনা লইয়া সেদিন বায়স্কোপ দেখিয়া সােমন ফিরিল। ফিরিতেই বৌদিদি চিঠি দিলেন- প্রকাণ্ড একখানি খাম। সােমেন তেতলায় গিয়া চিঠি খুলিল, লেখা আছে—“ড্যাস ফর ইওর কমপ্লিমেন্ট! কিন্তু দুঃখ যে আমি ছবি আঁকতে জানি কিন্তু কবিতা লিখতে পারিনে, কাজে-ইতি কমলা” মােটা চৌকা আর্টপেপারে লেখা কয়টি কথা পড়িয়া সােমন চিঠি উল্টাইল, দেখিল একখানি ছবি অবিকল সােমেনের চেহারা, হাতে বই আর মাথায় চানাচুরের ঠোঙ্গা, নীচে লেখা, চানাচুর সমাদ্দার। নির্লজ্জ নারী। হাতের কাছে পাইলে চুলের মুঠা ধরিয়া এমনি করিয়া দুই ঘুষি লাগাইয়া দেয় ! সােমেন ঘুষি চালাইতে লাগিল। কাহার চিঠি খোঁজ লইতে আসিয়া জানালা দিয়া বৌদিদি দেখিতেছিলেন, জিজ্ঞাসা করিলেন “ওকি ঠাকুরপাে ! কাকে ঘুষি মারছ?” উদ্যত ঘুষিটাকে পকেটে লুকাইয়া সােমেন কহিল, “বিরক্ত কোনাে না! এক্সারসাইজ কচ্ছি।” বৌদিদি কহিলেন, “ডাম্বেল কোথায়?” পকেট হইতে হাত বাহির করিয়া মুঠা পাকাইয়া সােমেন কহিল, “ডাম্বেলে হবে না, এখন মুগুর।” সােমেনের চোখ দেখিয়া বৌদিদির ভয় হইল, তাড়াতাড়ি নীচে নামিয়া গেলেন। সােমেন আবার ছবিখানি দেখি, দেখিল যে এ ত্রিলােচন কবিরাজ ছবির কাছে কবিতাটা কিছুই নয়। যেন পিনের আঁচড়ের বদলে ছুরীর খো। এমন সময় দিদিমা বাহির হইতে কহিলেন, “দাদা, আয় তােক একটু ত্রিফলার জল খাইয়ে দিই।” সােমেন তীব্রস্বরে কহিল, “তিনফাতে হবে না দিদিমা, চৌফলা চাই।” ত্রিফলার বদলে চোফল পাওয়া যায় কি না জানিবার জ দিদিমা তাড়াতাড়ি আসিয়া শৈলি ঝিকে কৃষ্ণধন কবিরাজের বাড়ী পাঠাইয়া দিলেন। ত্রিফলার জল খাইয়াও সেদিন রাত্রে সােমেনের ঘুম হইল না। সমস্ত রাত্রি ধরিয়া কমলার ধৃষ্টতার উপযুক্ত এতিশােধ দেওয়ার উপায় ভাবিতে লাগিল। কবিতাতে আর চলিবে না, কমলার একখানি ফটোগ্রাফ পাইলে কোনও আর্টিষ্টকে দিয়া একখানা কার্টুন আঁকা যায়, ভালই, কিন্তু ফোটোগ্রাফ চাওয়া যায় না, সব ফাস হইয়া যাইবে। তবে উপায় উদ্ভাবনের পূর্বেই তাের হইয়া গেল। কখনও অ্যাটালান্টা, কখনও কমলা, কখনও মিলটন-বিচিত্র বস্তুতে ধাক্কা খাইতে খাইতে মন অবশ হইয়া পড়িতােছল, তখন দশটা বাজিল। ট্রামে চাপিয়া একরশি পথ গিয়াছে এমন সময় আর একটি তরুণীর সহিত কমলা ট্রামে উঠিল। সােমন গম্ভীরমুখে বহিগুলি গুছাইয়া নামিবার উপক্রম করিতেছে, কমলা কহিল, “কোথা যাচ্ছেন?”

নারী-নিৰ্যাতন সােমেন কহিল, “চানাচুর কিনতে।” কমলা মুচকি হাসিয়া কহিল, আনবেন চাটি আমার জন্যে-ড্যাঙ্কস্!” সলের সহাখ্যায়িনী খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। সােমেন চোখ লাল করিয়া নামিয়া গেল। ঘণ্টাখানেক পর কমলার ডেস্কে চানাচুরের একটি ঠোঙ্গা পোঁছিল, কমলা খুলিয়া দেখিল তাহার মধ্যে চানাচুরের পরিবর্তে কলার খােসা, সে হাসিল। দূর হইতে সােমমন দোখল, কমলা চটিল না। আঘাতটা লাগিল না দেখিয়া সে একেবারে মুষড়িয়া গেল। ছুটির পর সােমন গােলদীঘির মােড়ে দাড়াইয়া বাসের প্রতীক্ষা করিতেছিল। পিছনে কথন স-সঙ্গিনী কমলা আসিয়া দাঁড়াইয়া মুখ টিপিয়া হাসিতেছিল তাহা লক্ষ্য করে নাই। বাসে উঠিয়া বসিয়াছে ; তখন কমলার সহিত চোখােচাখি হইল। কমলা সপ্রতিভভাবে কহিল, “আপনার খাবার আমাকে পাঠিয়েছেন সােমেনবাবু—তার জন্য ভ্যাঙ্কস!” সােমেন মুখ ফিরাইল, ইচ্ছা হইল মেয়েটাকে দাত নখ দিয়া কামড়াইয়া আঁচড়াইয়া টুকরা টুকরা করিয়া ছিড়িয়া ফেলে। পরদিন সােমেন কলেজের সময়ের একঘণ্টা আগে বাহির হইল এবং ছুটির আগেই ফিরিল। কলেজে অবশ্য অজ্ঞাতসারে দু-একবার কমলার দিকে চাহিয়াছিল গম্ভীরমুখে, কমলাও চাহিয়াছিল কিন্তু তাহার দৃষ্টিতে কৌতুক আর বিদ্ধপ! এইরূপে প্রায় দিন পনেরাে কাটিল। কথাবার্তা না হইলেও তখনও এতিশােধ লইবার কল্পনা সােমেনের মগজে বাসা বাঁধিয়াছিল। একটা তুচ্ছ নারী তাহাকে পরাজিত করিয়া এনে তাহারই চক্ষের সম্মুখে বিচরণ করিতে থাকিবে, এ অসহ। বৌদিদিকে সমস্ত ঘটনা বলিলে তিনি অবশ্যই প্রতিশােধের একটা ত্রিলােচন কবিরাজ সদুপায় উদ্ভাবন করিয়া দিতে পারিবেন এ বিশ্বাস তাহার ছিল, কিন্তু এক নারীকে জব করিবার জন্য অপর নারীর সাহায্য লইতে কিছুতেই মন সরিতেছিল না। শেষে হঠাৎ এতিশােধ লইবার এক মহা সুযােগ উপস্থিত হইল। প্রতিশােধ না লইলেও আর চলিতেছিল না। একে তাে প্রত্যহ কমলার সেই অসহ কৌতুক-হাস্য, তাহার পর একসঙ্গে বাসে আসিবার ভয়ে ক্রমাগত ক্লাস কামাই করিতে হইতেছে। যেমন করিয়া হােক চিরকালের মত কমলাকে জব করিতেই হইবে। সেদিন সুযােগও জুটিয়া গেল। পথের মােড়ে আসিতেই সােমমন দেখিল, ক্লাসের আর দুটি ছাত্রীর সহিত কমলা এক ট্যাক্সিতে উঠিয়া হাঁকিল, “বােটানিক্যাল গার্ডেন।” সােমেন মিনিটখানেক ধরিয়া কি ভাবিয়া লইল, তাহার পর চলন্ত একখানি ট্যাক্সি থামাইয়া তাহাতে উঠিয়া পড়িয়া হাঁকিল, “বােটানিক্যাল গার্ডেন।” বােটানিক্যাল গার্ডেন। কাল সায়াহ্ন। সঙ্গিনীরা গাছপালা পৰ্যবেক্ষণ করিয়া ফিরিতেছিল, একটা বেঞ্চে হেলান দিয়া কমলা বসিয়াছিল। জনপ্রাণী নাই। সােমন বােপ হইতে ঝােপান্তরের অন্তরালে আত্মগােপন করিয়া এই সুযােগেরই প্রতীক্ষা করিতেছিল, কমলার সম্মুখে আসিয়াই কহিল, “খানে চানাচুর ?” কমলা চমকিয়া উঠিল, তেমন করিয়া হাসিতে পারিল না, তবু অভ্যাসবশে কহিয়া উঠিল, “থ্যাঙ্কস! দিন- ৩

নারী-নির্যাতন
সােমেন রক্তচক্ষু হইয়া কমলার ডানহাতখানি দৃঢ়মুষ্টিতে ধরিয়া
কহিল, “ইচ্ছে করে, চুলের মুঠি ধরে”
বলিয়াই সে নিজেই চকাইয়া উঠিল, দেখিল যে মলার চুলের
গােছ আপনা-আপনিই যেন তাহার বুকের কাছাকাছি আসিয়া
পড়িয়াছে। কমলা নিস্পন্দ।
হতভম্ব হইয়া ধপ করিয়া সােমেন বেঞ্চির উপর বসিয়া পড়িল। এই
সময় কমলা চোখে আঁচল দিল। সােমন দেখিল, কমলা কাঁদিতেছে।
হাতের মুঠা খুলিয়া শশব্যস্তে কহিল, “হাতে লেগেছে ?” কমলা হাত না
সরাইয়াই কহিল, “না।” সােমেন কিছুই বুঝিল না, কহিল “তবে -
কমলা চোখ হইতে আঁচল না খুলিয়াই কহিল, “ছবিটা ছিড়ে ফেলে
দেবেন—আর ক্ষমা
সােমেনের কথা জোগাইল না। নির্বাক হইয়া বসিয়া রহিল।
সহসা দূরে হাসির শব্দ শুনিয়া তাহার চমক ভাঙ্গিল। দেখিল কমলারই
দুই সঙ্গিনী হাসিতেছে। তাড়াতাড়ি উঠিয়া সে কহিল, “হাত মচু ক
গেছে-টিচার আইয়ােডিনের পটি একটা বলিয়া কমলাকে দেখাইয়া
দিয়া সে অন্তর্হিত হইয়া গেল। দূর হইতে একবার চাহিয়া দেখিল যে
মুখ নীচু করিয়া কমল দাড়াইয়া আছে।
.
তেতলার ঘরে ঢুকিয়াই সােমমন দেখিল যে বৌদিদি কমলার
আঁকা সেই ছবিখানা দেখিতেছেন আর হাসিতেছেন। সােমেন
কহিল, “বৌদিদি! সর্বনাশ করেছি।”
বৌদিদি চমকাইয়া উঠিলেন, কহিলেন “কি ?”

ত্রিলােচন কবিরাজ সােমেন বিছানায় চিৎ হইয়া শুইয়া পড়িয়া কহিল, “নারী-নির্যাতন। বৌদিদি সভয়ে কহিলেন, “নাটক রাখ ঠাকুরপাে! বড় ভয় করে আমার!” সােমেন চোখ বুজিয়া কহিল,-“শুনবে তবে? শােন, সােমমন নামে একটি ছেলে ছিল” —তার পর এই কাহিনীরই পুনরাবৃত্তি। বৌদিদি সমস্ত শুনিয়া কহিলেন, “আগে যদি বলতে ঠাকুরপো, তাহলে ছবি পাবার পর দিনই আমি পাল্টা জবাব দিয়ে দিতাম। তুমি থাক আমি তাকে জব্দ করে দিচ্ছি।” পরদিন সােমেন ঠিক দশটায় কলেজে গেল, কমলাকে দেখিল না। তাহার সঙ্গিনী দুইটি তাহার দিকে চাহিয়া হাসিল, হাত তুলিয়া, নমস্কারও করিল। পর দিনও কমলা আসিল না। ইতিমধ্যে স্ত্রীর তার পাইয়া সােমেনের দাদা ছাপরা হইতে আসিলেন; চিঠির ঠিকানা দেথিয়া ইতিপূর্বেই বৌদিদি ও দিদিমা কমলার বাড়ী ঘুরিয়া আসিয়াছিলেন। ফলে একদিন কমলার মামা ও সােমেনের দাদার সহিত ঘন্টাখানেক পথে কথাবার্তা—উভয়ে উভয়ের বাড়ীতেই আসিতেছিলেন। পরে একদিন কমলার সহিত কলেজে সােমেনের দেখা হইল। কমলা হঠাৎ আঁচলটি মাথায় টানিতে গেল, কিন্তু আঁচল ঢোচে আটকান ছিল বলিয়া পারিল না, অগত্যা মুখ নীচু করিয়া অত্যন্ত নিরীহ প্রাণীর মত বসিয়া রহিল আর সােমেন নীরবে পেন্সিল কাটিতে লাগিল। শেষে একটা সামান্য নারীকে অন করিবার জন্য এক দিন সন্ধ্যাকালে ট্যাক্সিতে চাপিয়া দুর্বোধন বেশে সােমেন কমলার মামা হারা? মজুমদারের বাড়ীর দিকে যাত্রা করিল। ৪০ জোয়ার যে বয়সে কাক ডাকিলেও কোকিল বলিয়া ভ্রম হয় সেই দ্বাবিংশ বর্ষ বয়সে বেচারাম বাবু লবঙ্গমঞ্জরীকে বিবাহ করিয়াছিলেন। তখন ভবিষ্যৎ কেহই বিচার করেন নাই; বর, বধু এবং তাহার আত্মীয় পরিজনের দৃষ্টি বর্তমানেই একান্ত ভাবে নিবদ্ধ ছিল। বেচারাম বাবু দেখিয়াছিলেন এক জোড়া পটল-চেরা চক্ষু, মুক্তার নােলক ও তাম্বুল- চৰ্বণে ঈষৎ আরক্ত দুই পাটি দুগ্ধধবল দন্ত। বধূ দেখিয়াছিলেন ধৃত- ছানাসেবনে নধরায়িত দেহ, স্ফীতগও একটি নবীন জলধরশ্যামল দেবমূর্তি। লবঙ্গমঞ্জরীর মাতা দেখিয়াছিলেন একটি গােবেচারী ধরণের বালক, চাহিয়া খাইতে জানে না এবং তাঁহার পিতা দেখিয়াছিলেন বেচারাম বাবুর পিতা কেনারাম বাবুর কলিকাতার তিন খানা ভাড়াটিয়া বাড়ী এবং সুন্দরবনের তিন শত বিঘা আবাদী জমি। বিবাহ সাড়ম্বরেই হইয়াছিল—সেদিনের কথা মনে হইলেই আজও কোরাম বাবু গ্রামােফোনে দম এবং তাহাতে পিলু রাগিণীর সানাইয়ের রেকর্ড জুড়িয়া দিয়া স্তব্ধ হইয়া বসিয়া থাকিতেন ও লবঙ্গমঞ্জরী ভাড়ার ঘরের বারান্দায় বসিয়া বেগুণ কাটিতে আঙ্গুল কাটিয়া ফেলিতেন। নদীর জোয়ারের জল খাইয়াছে আর তার দুই তীরে ভগ্ন ইষ্টকের পঞ্জর প্রকট করিয়া জরাজীর্ণ ঘাটের সােপানগুলি ক্রমে ক্রমে জাগিয়া উঠিতেছে। কিন্তু এমন কেন হইল ? ৪১ ব্রিলােচন কবিরাজ তাহার বিস্তৃত বিবরণ এই কাহিনীর প্রসঙ্গে অনাবশ্যক। তথাপি সংক্ষেপে কিঞ্চিৎ আভাস দিলে এই পার্থিব নশ্বর জগতের নশ্বরতর প্রেম-মরীচিকা সম্বন্ধে পাঠক পাঠিকাগণ সচেতন হইয়া সাবধান হইতে পারিবেন সেই জন্যই বলিতেছি। ফুলশয্যার রাত্রি হইতেই আরম্ভ করা যা! জ্যোৎঙ্গা রাত্রি। বাড়ীর আঙিনায় নিমগাছটিতে একটি রাত্রিচর পেচক পক্ষি-ভাষায় তাহার সখীর নাম ধরিয়া চীৎকার করিতেছিল। বেচারাম বাবুর পিসীমা বারান্দায় দাঁড়াইয়া ‘দূর দুর’ বলিয়া তাহাকে তাড়াইতে চেষ্টা করিতেছিলেন, ছাতের চিলেকোঠায় ফুলের বিছানায় শুইয়া পিঠ, চুলকাইতে চুলকাইতে বেচারাম বাবু নববধূর আগমনেব প্রতীক্ষা করিতেছিলেন, সিড়িতে পাহাসি, সতর্ক পদশব্দ ও চাবির গােছর ঝনৎকার শােনা যাইতেছিল, ক্ৰমে সমস্ত শব্দ ক্ষান্ত হইল এবং মিনিট দুয়েকের মধ্যে সিড়ির দরজার পাশে কাহার চুড়ির টুং টুং শােনা গেল এবং তাহার পরই হাতে একটা বেলফুলের মালা লইয়া নববধূ লবঙ্গমঞ্জরী কক্ষে প্রবেশ করিলেন, চক্ষের পলকে বেচারাম বাবু নিদ্রিত হইয়া নাসিকা গর্জন আরম্ভ করিলেন। বধূ লবঙ্গমঞ্জরী দেখিল স্বামী ঘুমাইতেছেন, তৎক্ষণাৎ সে বাতি নিভাইয়া দিল। বেচারাম বাবু শশব্যন্তে কহিলেন ওকি, বাতি নিভিয়ে দিলে যে।” লবঙ্গমঞ্জরী কহিল—“তুমি যে ঘুমুচ্ছ ?” বেচারাম বাবু বিপদে পড়িয়া কহিলেন-“ঘুম নয়, তা। বাতি জ্বেলে দাও, তােমাকে দেখি একটু!” লবঙ্গমঞ্জরীর বয়স তখন সতেরাে বৎসর, ল্যাম্ব টেলস ফ্রম ৪২ সেক্সপীয়ার পড়িয়া শেষ করিয়াছে, একটু হাসিয়া কহিল, “কি দেখবে আবার? দিন-তাের-তাে জানালা দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখলে?” বেচারাম বাবু কহিলেন-“আবার দেখব।” “দ্যাখাে” বলিয়া লবঙ্গমঞ্জরী সুইচ টিপিল এবং সেই দীপালােকিত কক্ষে পুষ্পশয্যায় বসিয়া উভয়ে উভয়কে জানাইল যে জগতে আর কিছু থাকিলেও তাহারা দুই জন দুই জনকে ভালবাসিয়াই বাচিয়া থাকিতে পারিবে। গৃহ না থাকিলে বনে গিয়া এবং অয় না থাকিলে ফল মুল খাইয়া জীবন ধারণ করিবে, তােয়ালে না থাকিলে কেশরাশি দিয়া সুবঙ্গমঞ্জরী বেচারামের পা মুছাইবে এবং আলতার অভাব হইলে বেচারাম নিজের বুকের রক্ত দিয়া লবঙ্গমঞ্জরীর পেলব চরণ রাঙাইবে; কেবল মাত্র এম্-এ পরীক্ষাটা পাশ করা আবশ্যক নতু পিতা গালাগালি দিবেন। লবঙ্গমঞ্জরীও জানাইল যে বেচারাকে দান করিয়াই তাহার নারীজীবন সার্থক হইয়াছে এখন একমাত্র ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করিতে পারিলেই জীবনের কোনও সাধ আর অপূর্ণ থাকিবে না। কিন্তু যেমন গাছের সব আম পাকে না তেমনি জীবনের সকল সাধ পুর্ণ হয় না। বেচারাম ও লবঙ্গমঞ্জরীর সাধেও ভগবান বাদ সাধিলেন। ঠিক ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার পনেরাে দিন পূর্বে বেচারামের পিসীমাতা ঠাকুরাণী ভ্রাতুষ্পত্রের মাথায় হাত রাখিয়া আশীর্বাদ করিতে করিতে মরলােক ত্যাগ করিলেন। পিতৃগৃহে জিওমেট্রীর প্রবলেম কষিতে কষিতে এই সংবাদ পাইয়া লবঙ্গমঞ্জরী কাঁদিয়া উঠিল। পরদিন তাহার শ্বশুর কেনারাম বাবু স্বয়ং তাহাকে লইতে আসিলেন। লবঙ্গমঞ্জরী কাদিতে কাদিতে তাহার বহিগুলি বাক্সে গুছাইয়া তুলিয়া পিসশাশুড়ীর শূন্য স্থান ৪৩ ভিলােন কবিরাজ অধিকার করিতে পতিগৃহে যাত্ৰা করিল। এদ্ধান্তে ব্রাহ্মতােজন, তৎপর দিবস কাঙ্গালী বিদায় এবং শেষ দিন কুটুম্বিনীগণের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ সমাপ্ত করিয়া লবঙ্গমঞ্জরীর মনে পড়িল যে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা সে বৎসরের মত শেষ হইয়া গেছে। ঘরে গিয়া চেয়ারে বসিয়া সে কাঁদিতে লাগিল, পিছন হইতে বেচারাম বাবু আসিয়া অতিরিক্ত আগ্রহে চেয়ারশুদ্ধ লবঙ্গমঞ্জীকে গাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিয়া কহিলেন -“কেঁদোনা তুমি, আমি তােমাকে নিজে পড়িয়ে আসছে বছর নিশ্চয় পাশ করাব।” লবঙ্গমঞ্জরী চোখের জল মুছিয়া কহিলেন “এবার আমি স্কলারশিপ পেতাম যে!” বেচারাম কহিলেন, “আসছে বছর মেডেল পাবে।” স্বামীর প্রেমে মুগ্ধ হইয়া লবঙ্গমঞ্জরী তখনকার মত পরীক্ষার কথা ভুলিয়া গেলেন। বলা বাহুল্য পাঠের নানারূপ প্রতিবন্ধকতা বশতঃ বেচারাম বাবুও পাশ করিতে পারিলেন না। পরীক্ষার খবর যেদিন বাহির হইল, সেদিন বেচারাম বাবু পিতার সহিত সাক্ষাৎ না করিয়া রিক্সা চাপিয়া বাগবাজারে লবঙ্গমঞ্জরীৰ পিতৃ- গৃহে গমন করিলেন। লবঙ্গমঞ্জরী তখন ছাদে রেলিং ভর দিয়া দাড়াইয়া পাশের বাড়ীর বাতায়ন লক্ষ্য করিয়া কাহাকে যেন কি বলিতেছিলেন, স্বামীর পদশব্দ শুনিয়া মুখ ফিরাইয়াই জিজ্ঞাসা করিলেন—“ফল বেরিয়েছে?” বেচারাম বাবু কহিলেন, “ফেল করেছি।” লবঙ্গমঞ্জরীর মুখ শুকাইয়া গেল। কহিলেন “যে বিপদ আপদ গেল। তা নৈলে তােমার মত হেলে- ৪৪ জায়ার বেচারাম বাবু কহিলেন, “সেজন্য নয়। তুমি পরীকে দিতে পারে আর আমি তােমার অভিন্নহৃদয় স্বামী হয়ে কেমন করে পাশ ক ? সেই জন্থে—* লবঙ্গমঞ্জরী স্বামীর অপূৰ্ব পত্নীপ্রেমে আবিষ্ট হইলেন এবং চকিত দৃষ্টিতে একবার পাশের সমস্তগুলি বাড়ীর ছাত দেখিয়া লইয়া বেচারাম বাবুর বুকে মুখ লুকাইলেন। তাহার পর হাতে বসিয়া দুইজনে প্রতিজ্ঞা কৰিলেন যে এবার উভয়কেই পাশ করিতে হইবে। তাহার জন্য যদি কালীঘাটে তিন জোড়া পাঁঠা দিতে হয় তাহাও স্বীকার। লবঙ্গ- মঞ্জরী তাহার মাসিক হাত-খরচের টাকা হইতে জমাইয়া সে পাঠা কিনিয়া দিবেন। পরীক্ষার খবর শুনিয়া কেনারাম বাবু পুত্রকে কিছু বলিলেন না, পুত্রবধূকে ডাকিয়া কহিলেন, “তুমি একটু শানে রেখে বৌমা ! তেতলার চিলে কোঠায় ও পড়বে আর তুমি দোতলার বারান্দায় বসে কাজকর্ম সব দেখবে আর পাহারা দেবে, বুঝলে?” লবঙ্গমঞ্জরী দাতে ঠোট চাপিয়া হাত রােধ করিয়া ঘাড় নাড়িলেন। অতএব বেচারাম বাবুকে গৃহস্থ হইয়াও সন্ন্যাসী সাজিতে হইল। তিনি তেতলার চিলেকোঠা ঘরে বাণপ্রস্থ অবলম্বন করিয়া অধ্যয়নে ব্যাপৃত হইলেন। কিন্তু স্বভাবদোষ ত্যাগ করিতে পারিলেন না। এক পাতা পড়িয়াই সিড়ির দিকে মুখ ফিরাইয়া ডাকিতেন, “ওগাে! ছ?” লবামঞ্জরী দাতলা হইতে জবাব দিতেন-“শুনছি।” “আমার পায়ের তলাটায় একটু সুড়সুড়ি দিয়ে যাও তত, বড় ঘুম পাচ্ছে।” ৪৫ বিলােচন কবিরাজ লবঙ্গমঞ্জরী কহিতেন-“ঠাকুর কিন্তু বাড়ীতেই আছেন!” পিত বাড়ীতে আছেন শুনিয়াই বেচারাম বাবুর নিদ্রার আবেশ ছুটিয়া যাইত, তিনি তারস্বরে আবার পড়িতে আরম্ভ করিতেন এবং দশ মিনিট পড়িয়াই আবার ডাকিতেন, “ওগাে শুনছ, বাবা বেরিয়ে গেছেন?” স্বামীর নিকট বারবার মিথ্যা কথা বলা মহাপাপ কাজেই লবঙ্গমঞ্জরী কহিতেন “হা, কেন?” “ছাদে একটা কাক বড় ডাকছে, তাড়িয়ে দিয়ে যাও তত লক্ষ্মী।” বেচারাম বাবুর লক্ষ্মী দোতলার বারান্দায় দাড়াইয়াই কাল্পনিক কাকের উদ্দেশ্যে ‘হু হু শব্দ করিতেন। বেচারাম বাবু খানিকক্ষণ কাণ পাতিয়া থাকিয়া আবার ডাকিতেন, “ওগাে জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে যাওতে। শরঙ্গমঞ্জরী কহিতেন, “পাৰ্ব না। হিট্টী পড়ছি এখন!” বেচারাম বাবু আর কথা কহিতেন না, বালিশ বুকে টানিয়া চোখ বুজিয়া পড়িয়া থাকিতেন আর এদিকে লবঙ্গমঞ্জরী তাহার দক্ষিণ কর্ণ একতলায় কেনারাম বাবুর বৈঠকখানার দিকে ও বাম কর্ণ বেচারাম বাবুর তেতলার সিড়িঘরের দিকে উৎকৰ্ণ করিয়া দোতলার বারান্দায় বসিয়া সিপাহী বিদ্রোহের কারণাবলী কণ্ঠস্থ করিবার ব্যর্থ চেষ্টা করিতেন। শেষে রাগিয়া ‘ম্যাট্রিকুলেশন হিষ্ট্ৰী অফ ইণ্ডিয়া’ খানা পানের বাটার উপর চুড়িয়া ফেলিয়া দিতেন ও একতলার সিড়িদরজায় শিকল লাগাইয়া তেতলায় গিয়া উপস্থিত হইতেন। তারপর বেচারাম বাবুর মাথায় হাত দিয়া কহিতেন-“হ্যা গা, রাগ কল্পে ?” ৪৬ জোয়ার বেচারাম বাবু মুখ না তুলিয়া গাঢ়স্বরে কহিতেন-“যাও, যাও ত্রিী পড়-মর মানুষের নাম মুখস্থ করগে !” লবঙ্গমঞ্জরী বেচারাম বাবুর ছােট বালিশটাতে নিজের মাথা রাখিবার একটু স্থান করিয়া লইয়া কহিতেন, “আর কোৰ্বনা। এই বারের মত মাফ কর!” অগত্যা বেচারাম বাবু ক্ষমা করিতেন এবং তাহার পর উভয়ের মধ্যে অন্ধ্র প্রহর ধরিয়া যে কথাবার্তা হইত তাহার সহিত ভকটিন অফ, ল্যান্স, অথবা কেবল মিনিক্তির কোনও সম্পর্ক থাকিত না। কথা ফুরাইতেই একতলায় সিড়ির শিকল ঝন্‌ ঝন্ করিয়া উঠিত, মৃদুকণ্ঠে আহ্বান আসিত—“বৌমা !” লবঙ্গমঞ্জরী তাড়াতাড়ি নামিয়া হাতের কাছে যাহা পাইতেন-সুচ সুতা, পানের বাটা অথবা তেলের বােতল, তাহা বাম হাতে লইয়া ডান হাতে শিকল খুলিতেন। কেনারাম বাবু স্মিতমুখে প্রশ্ন করিতেন, “বেচু পড়ছে তাে?” লবঙ্গমঞ্জরী করিতেন,“হ”। কেনারাম বাবু কহিতেন “আচ্ছা, এইবার নেয়ে খেয়ে নি! বেশী পড়াও ভাল নয় আবার! যাও, ডেকে দাও গে।” লবঙ্গমঞ্জরী বেচারাম বাবুকে ডাকিয়া দিতেন। বেচারাম বাবুললাটের শিরা টিপিতে টিপিতে নামিয়া আসিতেন, কেনারাম বাবু কহিতেন, কপাল তাে টটন কৰ্বেই। এক সঙ্গে বেশী পড়াতে মাথায় ঝাকানি লাগে। খানিকটা পড়বে আর খানিকটা ঘুরবে—ছাতে- বেচারাম বাবু “আজ্ঞে আচ্ছা” বলিয়া মানের ঘরে প্রবেশ করিতেন। - মার্চ মাসে ম্যাট্রিকুলেশন, জুলাইতে এ-এ। হঠাৎ একদিন ডিসেম্বর মাসে মুখ অত্যন্ত বিমৰ করিয়া লবঙ্গমঞ্জরী বেচারাম বাবুকে ৪৭ ত্রিলােচন কবিরাজ কহিলেন-“এবারও পরীক্ষা দেওয়া হােলনা!” বেচারাম বাবু মুড়িয়া গিয়া কহিলেন, “দ্যাখাে যদি কোনও মতে পার।” লবঙ্গমঞ্জরী আঙ্গুলের কর গণিয়া কাঁদো কাঁদো হইয়া কহিলেন, “কোনােমতেই হয় না আর।” বেচারাম বাবু শুদ্ধ কহিলেন, “তাইতাে!” তাহার পরই মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে পেন্সিল কিনিতে বাহির হইয়া গেলেন। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার কয়েকদিন লবঙ্গমঞ্জরীকে কাৰ্যান্তরে ব্যাপৃত থাকিতে হইল। পরীক্ষার দিন কয়েক পর একদিন বেচারাম বাবু অত্যন্ত করুণা-মধুর খরে লবঙ্গমঞ্জরীকে কহিলেন, “এবার পরীক্ষা দিলে তুমি নিশ্চয় মেডেল পেতে।” লবঙ্গমঞ্জরী হরিদ্রাবণের বস্ত্রখণ্ডে বিজড়িত শিশুকন্যাটিকে বেচারাম বাবুর দিকে তুলিয়া পিরয়া তীক্ষ্ণস্বরে কহিলেন, “এই যে মেডেল দিয়েছ।” বেচারাম বাবু অত্যন্ত অপরাধীর মত মুখ নীচু করিয়া প্রস্থান করিলেন। কিছুকাল আর পরীক্ষার প্রসঙ্গ হইল না। মাস ছয় পর একদিন বেচারাম বাবু হাসিতে হাসিতে আসিয়া লবঙ্গমঞ্জরীকে বলিলেন, “আমি সেকেন ক্লাস পেয়েছি। লবঙ্গমঞ্জরী প্রথমে উল্লসিত হইয়া উঠিলেন, পরক্ষণেই তাহায় পতিভক্তিতে আঘাত লাগিল, মনে হইল বেচারামবাবু প্রতারক, স্বার্থপরবঙ্গমঞ্জরীকে নারীজন্ম সার্থক করিবার কাজে নিযুক্ত রাখিয়া নিয়ে এনে পরীক্ষা দিয়া পাশ করিয়া গিয়াছেন। লজমঞ্জরীর প্রাণে সেই প্রথম ঈৰ্যার আঁচড় লাগিল। পর বৎসর হাম হইতে পড়িয়া ঠিক মাৰ্চমাসে কেনারাম বাৰু পঞ্চত্ব পাইলে লমারীর প্রাণের এই আঁচটি রেখা হইতে একটি চাগে পরিণত হইল। তৎপর বৎসর লবঙ্গময়ী ঠিক মার্চ মাসেই পুনরায় প্রথম ৪ জোয়ার বৎসরের মত বিপন্ন হইয়া পড়িলেন। বেচারাম বাবু পুত্র ভূমিষ্ঠ হইবার পর দিবসেই শ্বাশুড়ীর তত্বাবধানে তদীয় কন্যাকে সমর্পণ করিয়া লৰঙ্গমঞ্জরীর ভয়ে পুরী যাত্ৰা করিলেন। চতুর্থ বৎসরে মাৰ্চমাসে খুকীর ইনফ্লুয়েঞ্জা ও পঞ্চম বৎসরে ঠিক মার্চ মাসেই আবার থােকার টায়ফয়েড় হইল। এইরূপে লবঙ্গমঞ্জরীর বিবাহিত জীবনের চতুর্দশটি মার্চ মাস কাটিয়াছে এবং প্রাণের সেই আঁচড়ের দাগটি ক্রমে ক্রমে একটি চৌদ্দ ইঞ্চি প্রস্থ বিশিষ্ট অক্ষতে পরিণত হইয়াছে। লবঙ্গমঞ্জরীর ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেওয়া হয় নাই তবে তাহার খুকী বই খাতা ফাণ্ডবগে ভরিয়া প্রতিদিবস ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলে যাতায়াত করিতেছে। জীবন-নদীর ভাটার টানে এমনই একটা দিনে আমাদের কাহিনীর ব্যাপারটা ঘটিয়াছিল। তখন বড়দিন। সিমলা, বােৰাই, ওয়ালটেয়ার, দিল্লী, কাণপুর প্রভৃতি স্থান হইতে লবঙ্গমঞ্জরীর বাল্যসখীরা তাঁহাদের স্বামীদের বেতনের আয়তন অনুযায়ী কলেবর লইয়া কলিকাতায় বেড়াইতে আসিয়াছিলেন। কলিকাতায় সে বৎসর নিখিল-ভারত-শিল্প-প্রদর্শনী। প্রথম শ্রেণীর সমস্ত হােটেল বারান্দায় স্থানাভাবের নােটাশ লটকাইয়া দিয়াছে ও কলিকাতার বাজারে মুর্শিদাবাদী শিঙ্কের শাড়ীর দাম টাকায় দুই আনা হিসাবে চড়িয়া গিয়াছে। উক্ত শিল্প-প্রদর্শনীতে একদিন সন্ধ্যাকালে লবঙ্গমঞ্জরী সকন্যা ভ্রমণ করিতেছিলেন। এমন সময় তাহারই সমানবয়সী একটি মহিলা তাঁহার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়া প্রশ্ন করিলেন, “হ্যা ভাই, তুমি লবঙ্গ না?” ৪১ ৪ ত্রিলােচন কবিরাজ লবঙ্গমঞ্জরী আগন্তুকার পায়ের জরি-বসানাে নাগরা ও পরণের পাশী- শাড়ীর ঘাগরাবৎ ঢেউ দেখিয়া ভাবিলেন, বাইজী-পরক্ষণেই স্মৃতি গহ্বরে একটি আবছায়া মূর্তি জাগিয়া উঠিল। কিন্তু সে অতীব শীর্ণকায়া এবং সম্মুখবর্তিনী একেবারে বরনারী, কাজেই কি বলিবেন স্থির করিতে পারিলেন না। আগন্তুকা হাসিয়া কহিলেন—“চিনতে পানাে ভাই—আমি পঙ্কজ। লবঙ্গমঞ্জরী হাসিয়া কহিলেন, “যে মুটিয়ে গিয়েছ ভাই!” পঙ্কজিনী কহিলেন, “উনিও তাই বলেন, কি করি বল দেখি ভাই?” বলিয়া পরুজিনী দেবী একখানি বার বর্গগজ প্রমাণ ফুলদার রুমাল পাতিয়া তদুপরি তৃণ-শয্যায় উপবেশন করিলেন। সেখানে বসিয়াই উভয় সখীতে কথাবার্তা হইতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে পজিনীর বেলফুল কমলিনী, কমলিনীর গঙ্গাজল নিঝারণী, নিঝরিণীর দেখহাসি পূজারিণী, পূজারিণীর ফাগ সুভাষিণী ইত্যাদি সখীত্বসূত্রে গ্রথিত অর্ধডজন নারী একটি পুষ্পমালার মত লবঙ্গমঞ্জরীকে বেষ্টন করিলেন, তাহাদের স্বামীরা দূরে বটগাছের তলে দাড়াইয়া উর্ধনেত্রে গাছের ডালের সংখ্যা নির্ণয় করিতে করিতে সভঙ্গের অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। অর্ধপ্রহর রাত্রে কলহাস্যধ্বনিসহ সভাভঙ্গ হইল। একমাত্র তিনিই কলিকাতাবাসিনী বলিয়া আগামী দিবস অপরাহ্নে তাহার গৃহে সকলকে নিমন্ত্রণ করিয়া লবঙ্গমঞ্জরী বিদায় ইলেন। পথে আসিতে আসিতে লবঙ্গমঞ্জরী আপনার অবস্থা একবার চিন্তা করিলেন, বুঝিলেন যে তিনি নিতান্তই অভাগিনী। সকলের স্বামীরা তাহাদের পত্নীকে সঙ্গে লইয়া প্রদর্শনী-ভ্রমণে আসিয়াছেন আর তাহার জোয়ার সঙ্গে আসিয়াছে অগু কোচম্যান, মহাদেও বরকন্দাজ আর মাধাই সহিস। লবঙ্গমঞ্জরীর মানসিক বিলাপ শেষ হইবার পূর্বেই গাড়ী ফটকে প্রবেশ করিল। বেচারাম বাবু অস্থির হইয়া তখন এঘর ওঘর করিতেছিলেন এবং গেমী ঝি কেন লবঙ্গমঞ্জরীর সঙ্গে যায় নাই, এইজন্য তাহাকে তিরস্কার করিতেছিলেন। লবঙ্গমঞ্জরীকে দেখিয়া বেচারাম বাবু সহর্ষে কহিলেন, “যা হােক, এলে?” লবঙ্গমঞ্জরী নিজের দুর্ভাগ্যের কথা তখনও ভুলিতে পারেন নাই, কহিলেন, “না এলেই ভালাে হত!” বেচারাম বাবু সাহস করিয়া আর কিছু বলিতে পারিলেন না, খুকীকে ডাকিয়া গােপনে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তাের মা টাকা নিয়ে যায় নি বুঝি, না?” খুকী ‘জানি নে’ বলিয়া চলিয়া গেল। তখন বেচারাম বাবু নীচে নামিলেন এক সহিসকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলেন যে পথে ঘােড়া দুষ্টামি করে নাই। তবে সহসা লবঙ্গমঞ্জরীর এরূপ রুদ্রমূর্তি ধারণের কারণ কি ? কিছু বুঝিতে না পারিয়া তাড়াতাড়ি আহার সমাপ্ত করিয়া বেচারাম শয়ন করিলেন। পরদিন লবঙ্গমঞ্জরীর রূদ্ররূপের হেতু বেচারাম বাবুর চক্ষে প্রাতঃসূর্যের মতই প্রত্যক্ষ হইল। বেচারামবাবু তখন আহারান্তে নিদ্রিত। অকস্মাৎ সিড়িতে অনেকগুলি পদশব্দ, চুড়ীকঙ্কণের ঝণৎকার, গরদের শাড়ীর খসখানি, কলহা শুনিয়া তিনি চমকিত হইয়া শয্যার উপর উঠিয়া বসিলেন। পরক্ষণেই, “এসাে ভাই।” “মাইরি, কি মানিয়েছে। ওটা ক’ভরির?” “মজুরী কি নিলে?” “পান্নাখানা ক’ বৃতি?” “আসতে দিলে তাে ?” এই প্রকার বিচিত্র প্রশ্ন শুনিয়া বুঝিলেন যে লবঙ্গমঞ্জরীর ত্রিলােচন কবিরাজ ককে সখীসমাগম হইয়াছে। বাহিরে যাইতে হইলে লবঙ্গমঞ্জরীর কক্ষ তিনখানির সম্মুখ দিয়া যাইতে হয়—কিন্তু বেচারামবাবু গত পাঁচ দিন সময়াভাবে ক্ষৌর-কাৰ্য্য করেন নাই, কাজেই করুত্যাগ করিতে না পারিয়া বিছানায় মুদ্রিত নেত্রে শুইয়া পার্শ্বের কক্ষের স্বামীগৃহ, সন্তান এবং বিবাহতাহিক আলােচনা শুনিতে লাগিলেন। শুনিতে নিতে বেচারামবাবু তন্দ্রাবিষ্ট হইয়া পড়িয়াছিলেন, সহসা লবঙ্গমঞ্জবীর উচ্চ করে তাহার চমক ভাজিল, লবঙ্গমঞ্জরী কহিতেছেন, “তােদের স্বামী ঘরে মাষ্টার বেখে পড়িয়ে পাশ করিযেছে—ভাগ্যি ভাল। আমার স্বামীর মত মানুষের হাতে পড়লে ফাষ্ট বুকেই শেষ হত। আমি আবাব পাশ দেব।” বেচাবামবাবুর আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগিল। রাগও হইল, কিন্তু ক্রোধের উদ্রেক হইলেই তিনি গ্ৰী নীতি-উপদেষ্টার উপদেশ অনুসারে মনকে বিক্ষিপ্ত করিবার জন্য এক হইতে একশ পর্যন্ত গণিতেন, আজও সেই পন্থাই অবলম্বন করিলেন। কিন্তু যখন দেখিলেন যে হাজার পর্যন্ত গণিয়াও ক্রোধের শান্তি হইল না, তখন ছাদে গিয়া পদচারণা করিতে লাগিলেন। ক্রমে সন্ধ্যা হইয়া আসিল, লবঙ্গমঞ্জরীর অতিথিবা যুথবদ্ধ হইয়া মােটর-আরােহণে প্রস্থান করিলেন, ছাদ হইতে রক্তনেত্র বেচারামবাবু তা দেখিলেন। তারপর ধীরে ধীরে নীচে নামিয়া আসিলেন। লবঙ্গমঞ্জরী প্রশ্ন করিলেন, “দুখানা সুচি মুখে দেবে?” বেচারামবাবু কহিলেন, “না।” তারপর নীচে নামিয়া গিয়া একখানি চিঠি লিখিয়া কেমী ঝির হাতে দিয়া লবঙ্গমঞ্জুরীর নিকট পাঠাইয়া দিলেন। লবঙ্গমঞ্জরী কুঞ্চিত করিয়া পাঠ করিলেন- জোয়ার “তুমি আমার অপমান করিয়াছ। আমি তােমাকে মাষ্টার রাখিয়া পড়াইয়া পাশ করাই নাই এই কথা ভদ্রমহিলাদের নিকট বাইয়া। কালই এই কথা তাহাদের স্বামীর নিকট এবং স্বামীদের মুখ হইতে তাহাদের বন্ধুবান্ধবেরা শুনিবেন। প্রথমে কলিকাতা শহরে, তাহার পর দিল্লী, আগ্রা, দেরাদুন, সিমলা, কাণপুব, বােম্বাই, মাদ্রাজে এই অখ্যাতি প্রচার হইয়া যাইবে। লােকে মনে করিবে আমি স্ত্রীকে যন্ত্রণা দিই এবং তাহাকে স্বেচ্ছাপূর্বক বর্বর করিয়া রাখিয়াছি। এ ক্ষেত্রে আমি তােমার স্বামী হইবার উপযুক্ত নহি, কাজেই অন্য হইতে আমি বৈঠকখানায় শুইব এবং নীচের ঘরেই আহারাদি করিব। ইতি বেচারাম।” লবঙ্গমঞ্জরীর চক্ষু রক্তবর্ণ হইল, কহিলেন বেশ।” আহারান্তে বৈঠকখানার ঘরে ছারপােকার দংশনে অতিষ্ঠ হইয়া বেচারামবাবু ছট ফট্‌ করিতেছিলেন এমন সময় ক্ষেমী ঝি একখানি পত্র লইয়া উপস্থিত হইল, বেচারামবাবু পড়িলেন। “তােমার পত্র পাইয়া সমস্ত বিষয় অবগত হইলাম। তােমার ছেলে মেয়েদের খাওয়াইতে পরাইতে আমার জীবন ব্যর্থ হইল, আবার তুমিই রাগ করিতেছ। আমি কল্য হইতে তােমার সংশবে থাকিব না, অশান্ত ছেলে মেয়ে কেমন করিয়া সামলাও তাহা দেখিব। লােকে সাত থাকিতে দাতের মৰ্য্যাদা বােঝেনা। ইতি—শ্রীমতী লবঙ্গমঞ্জরী দেবী।” প্রথমে বেচারামবাবুর মাথা ঘুরিয়া উঠিল কিন্তু তিনি আত্মসম্বরণ করিয়া কােমী বিকে কহিলেন “বেশ।” .

বিলােচন কবিরাজ সমস্ত রাত্রি নানা দুর্ভাবনা ও নির্মম ছারপােকা-দংশনের ফলে গতনি হইয়া রাত্রিশেষে বেচারামবাবু ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলেন—ঘুম ভাঙ্গিল ছােট খােকার চীৎকারে। সে আসিয়া বেচারামবাবুর হাত ধরিয়া টানিয়া কহিল, “খিদে পেয়েছে বাবা?” তাবিজড়িত নেত্র ঈষদুন্মীলিত করিয়া বেচারামবাবু কহিলেন—“বিরক্ত কোরােনা থােকা, তােমার মার কাছে যাও।” থােকা কহিল—“মা যে নেই।” সর্পদষ্টবৎ চমকিত হইয়া বেচারামবাবু শয্যার উপব উঠিয়া বসিলেন, গত দিবসের যাবতীয় ঘটনা মনে পড়িল। তাড়াতাড়ি দোতলায় উঠিয়া দেখিলেন দোতলা শূন্য—কেবল বড় খুকী ছবি আঁকিতেছে এবং বড়, খােকা ও ছােট খুকী দুই জনে পিতার পরিত্যক্ত ছেড়া চটিগুলি সংগ্রহ করিয়া লবঙ্গমঞ্জরীর রজতশুভ্র প্রশস্ত শয্যার উপর একটি ছিন্ন পাদুকার মনুমেন্ট প্রস্তত করিতেছে। বেচারামবাবুকে দেখিয়াই বড়খুকী কহিল,-“আজ আমার স্কুলের মাইনের দিন বাবা, টাকা দিয়ে বাড়ী থেকে বেরিও। বার বার চাইতে পাৰ্বনা।” বেচারামবাবু প্রশ্ন করিলেন-“তােমার মা- বড়খুকী কহিল-“মা দিয়ে যায়নি, বলে গেল যে সব তােমার কাছ থেকে নিতে হবে। এই তােমার ভাঙ্গা বাক্সটার চাবী রেখে গেছে।” বলিয়া একটা চাবী পিতার হাতে চুড়িয়া ফেলিয়া দিল। বেচারামবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন-“কোথায় গেছেন ?” বড় থােকা কহিল “বাগবাজার। আর বলেছে তুমি যদি ওমুখাে হও—* বড়খুকী তাহাকে ধমক দিয়া কহিল, “চুপ কর থােকা! বাপের সঙ্গে বুঝি ও রকম করে কথা কইতে হয়? শােন বাবা, মা বলেছে যে জোয়ার যদি তুমি বাগবাজারের দিকে যাও তা হলে মা দুঃখিত হবেন, তারপর, কলকাতা ছেড়ে চলে যাবেন-কাশীও যেতে পারেন, কাটোয়ায়ও যেতে পারেন।” ছােট খুকী কহিল—“মা বলেছে—যে সে আর আমাদের মা নয়, নতুন মা আসবে। হ্যা বাবা, কবে আসবে ?” বেচারামবাবু কহিলেন-“হুম্ ! আচ্ছা!” তাহার পর একখানি চাদর গায়ে ফেলিয়া বাহির হইবার জন্য কেবল ঘরের বাহির হইবেন এমন সময় বড় থােকা কহিল, “আমাদের খাবার আনিয়ে দাও বাবা। আমার কচুরী, আমার কচুরী, ছােট খুকীর বার্লির বিস্কুট। বড় খুকী ও ছােট থােকা সমস্বরে কহিল—“আমাদের গরম বেগুনী।” বেচারামবাবু একটু ভীত হইলেন তারপর কহিলেন- “কেমীকে ডাক।” “সে তাে নেই বাবা!” বড় খুকী কহিল। “কোথায়?” “সে আজ সকালে মার কাছ থেকে ছুটি নিয়ে মার গাড়ীতেই চলে গেছে।” বেচারামবাবু বুঝিলেন যে ষড়যন্ত্র। কহিলেন—“হুম! বেশ দেখব। ঠাকুর?” গণপতি ঠাকুর আসিয়া সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করিল যে সজিনার চচ্চড়িতে লঙ্কা বাটা দিতে হইবে কিনা। বেচারামবাবু কহিলেন, “না। তুমি থােকা খুকীদের খাবার শানিয়ে দাও।”

. বিলােন কবিরাজ গণপতি কহিল—এখন আবার কি খাবে বাবু। দশটা বাজে। একবার তাে খেয়েছে।” বেচারামবাবু বুভুক্ষু চতুষ্টয়ের প্রতি ক্রুদ্ধ দৃষ্টি হানিয়া কহিলেন- “খেয়েছিস?” বড় খুকী কহিল-“অল্প।” বেচারামবাবু কহিলেন-“এখন থাক তবে, বিকেলে বেশী করে সে দিন বেচারামবাবু গৃহস্থালীতে মনােযােগ দিলেন, সমস্ত গুছাইয়া থােকাখুকীদেব আহারের নিয়ম ও পরিমাণ একখানি কাগজে লিখিয়া রান্নাঘবের দরজায় সাটিয়া দিলেন এবং ঠাকুর ও চাকরকে জানাইলেন যে সমস্ত কাজ নিয়মমত হওয়া চাই। মাইজী নাই বলিয়া চালাকী করা চলিবেনা। রাত্রে বেচারামবাবুব তন্দ্রাকর্ষণ হইবার উপক্রম হইতেছিল, ছােট থােকা আসিয়া কহিল-“বাবা আমার লাল জামাটা পরিয়ে দাও না- বেচারামবাবুব তন্দ্রা টুটিল—“রাত্রে কি হবে জামা ?” ছােট থােকা কহিল—“নৈলে ঘুম পাচ্ছে না আমার।” বেচারামবাবু হাকিলেন—“বড় খুকী।” বড়খুকী জবাব দিল—“আমার বড় কাণ কট কটু কচ্ছে বাবা!” বেচারামবাবু কহিলেন—“আচ্ছা। প্রভাতে বৈঠকখানায় বসিতেই জগু কোচম্যান আসিয়া জানাইল ঘােড়া দানা খাইতেছে না। বেচারামবাবু কহিলেন-“ডাক্তার দেখাও।”

জোয়ার জও চলিয়া গেল এবং সন্ধ্যার সময় আসিয়া জানাইল বে ঘােড় হট ফট করিতেছে। বেচারামবাবু ধােপার কাপড় হিসাব করিতেছিলেন। নির্বিকার চিত্তে হুকুম দিলেন, ঘােড়াকে পিজরা-পােলে পাঠাইয়া দেওয়া হোক। দুপুর বেলা বেচারামবাবু ঘুমাইতেছিলেন, এমন সময় একটি কনষ্টেবল দুই হাতে ছােটথােকা ও ছােটখুকীর হাত ধরিয়া আনিয়া হাজির করিয়া জানাইল যে বড় রাস্তার মােড়ে দাড়াইয়া দুই জন কাদিতে দিতে বাগবাজারের কথা জিজ্ঞাসা করিতেছিল। বেচারাম বাবু কনষ্টেবলকে একটি সিকি বখশিস দিয়া বিদায় করিলেন, কিন্তু বুঝিতে পারিলেন কলিকাতার গাড়ীঘােড়াসঙ্কুল সহরে এইসব অশান্ত ছেলে মেয়ে লইয়া বাস করা নিতান্তই বিপদজনক। তৎক্ষণাৎ বরকন্দাজ ডাকিয়া টাইমটেবিল কিনিতে হাওড়া স্টেশনে পাঠাইয়া দিলেন। টাইমটেবিলের পাতা উল্টাইয়া আইন কানুন দেখিয়া বেচারামবাবু মনে মনে কি স্থির করিলেন তাহা তিনিই জানেন। সন্ধ্যাকালে এক বাক্স হােমিওপ্যাথিক ঔষধ, এক ঝুড়ি কমলা লেবু ও হমিওপ্যাথি চিকিৎসাবিজ্ঞান নামক একখানি বহির এগারাে ভম কিনিয়া বাড়িতে পৌছিয়াই দেখিলেন দোতালায় হৈ চৈ আরম্ভ হইয়া গিয়াছে। এক গামলা রসগােল্লা সম্মুখে লইয়া তাহার দুই থােকা ও দুই খুকী মহা সমারােহে ভােজন আরম্ভ করিয়া দিয়াছে। বেচারামবাবু স্থির হইয়া দাঁড়াইলেন এবং অতিরিক্ত রসগােল্লাভােজনে উদরাময় হইলে মক্স কিংবা পালসেটিলা দিতে হইবে চক্ষু মুদ্রিত করিয়া তাহাই ভাবিতে লাগিলেন। এমন সময় দাদার সহিত পাল্লা দিতে গিয়া ঘােট থােক।

ত্রিলােচন কবিরাজ এক সঙ্গে দুইটি রসগােল্লা গালে ফেলিয়া দিয়া চক্ষু কপালে তুলিল। বড়খুকী তাড়াতাড়ি চেঁচাইয়া উঠিল—“ওরে মৰ্বি যে—বমি কয়।” ছােট থােক। সেই অবস্থাতেই মাথা নাড়িয়া অসম্মতি জ্ঞাপন করিয়াই চিৎ হইয়া শুইয়া পড়িল। বড়খুকী কঁদিয়া উঠিল এবং ঠিক সেই সময় ঘরের দরজার আড়াল হইতে কেমী ঝি তাড়াতাড়ি বাহিরে আসিয়া ছােট থােকাকে কোলে লইয়া তাহার মাথায় জল ঢালিয়া বাতাস করিতে বসিল। বেচারামবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন—“তুমি এখানে কেন?” ফেমী কহিল—“গিন্নিমা থােকাখুকীদের রসগােল্লা পাঠিয়েছিলেন। ই- বেচাবামবাবু কহিলেন-“হুম! ফিরিয়ে নিয়ে যাও।” রসগােল্লা ফিবাইয়া লইবার কথায় ছােট থােকা উঠিয়া বসিয়া কহিল—“উহু! ও আমার।” বলিয়া আড়াই সেব রসগােল্লার অবশিষ্ট তিনটি খপ করিয়া মুঠা করিয়া লইয়া সে একতলার সিড়ি ধরিল। বেচারামবাবু আঙ্গুল তুলিয়া মেীঝিকে কহিলেন—“গামলাটা ফিরিয়ে নিয়ে যাও।” ক্ষেমী ঝি চলিয়া গেল। সারারাত্রি ধরিয়া বেচারামবাবু নানাপ্রকার যুক্তিতর্কসমন্বিত চিন্তা করিয়া দেখিলেন যে কলিকাতায় লবঙ্গমঞ্জরীর এবম্বিধ ঔদরিক অশান্ত সন্তানাদি লইয়া বাস করিলে আও বিপৎপাত অবশ্যম্ভাবী। ভবিষ্যৎ চিন্তায় তিনি ব্যাকুল হইয়া পড়িলেন। পরদিন প্রাতঃকালে চার টুকরা পেষ্টবাের্ডে তাহার চারিটি সন্তানের ৫৮ নাম পরিচয়সহ লিখিয়া দুই থােকা ও দুই খুকীর গলায় ঝুলাইয়া দিয়া বেচারামবাবু হাকিলেন—“মহাদেও, ট্যাক্সি নিয়ে এস।” বড় খুকী জিজ্ঞাসা করিল—“গলায় টিকিট দিলে কেন বাবা?” বেচারামবাবু কহিলেন—“বেড়াতে যাচ্ছি। পরে যদি কেউ হারিয়ে যাস তবে এই টিকিট দেখালে কলকাতায় এই বাড়ীতে পৌঁছে দেবে। গাড়ীতে যদি কলিশন হয়, আর তাতে যদি আমি—বুঝলি, তবে তােদের গলায় এই টিকিট দেখে রেলের লােক তােদর খবর জানতে পাৰ্বে। বুঝলি?” বড়খুকী বুদ্ধিমতী, সমস্তই বুঝিল। বেড়াইতে যাইবার আশায় অত্যন্ত উৎসাহিত হইয়া সে হাতের কাছে জামা-কাপড় যাহা পাইল গুছাইয়া লইল। বেচারামবাবু জগুর সাহায্যে ছয়খানা লেপ ও সাতখানা হােষকের একটা একাণ্ড বিছানার বাণ্ডিল করিয়া স্বতন্ত্র ট্যাক্সিতে অন্যান্য দ্রব্যাদি সহ জগুকে ষ্টেশনে পাঠাইয়া নিজের ঘরে কুলুপ দিয়া ও লবঙ্গমঞ্জরীর ঘরগুলি খােলা রাখিয়া মহাদেও বরকন্দাজের প্রতি গৃহরক্ষার ভার অর্পণ করিলেন। তাহার পর সিদ্ধিদাতা গণেশের নাম জপিতে জপিতে ছেলেমেয়ের হাত ধরিয়া ট্যাক্সিতে গিয়া উঠিলেন। বেচারামবাবু টিকিট কিনিয়াছিলেন মথুরার। কিন্তু বর্ধমানে গাড়ী পৌছিলেই হঠাৎ হাতের খবরের কাগজখানা মুঠা করিয়া কহিলেন- “বড়পুকী! তােরা সব নেমে পড়।” ছােট খােকা কহিল “দাদা নাম, বাবা সীতাভােগ খাওয়াবে।” বড়খুকী কহিল—“নামবে কেন বাবা?” বেচারামবাবু খবরের কাগজখানা বড়খুকীর গায়ে ফেলিয়া দিয়া ত্রিলােচন কবিরাজ কহিলেন—“দ্যা না পড়ে মধুরীর কাছে কেবলই ইদুর মéে-প্লেগে মৰ্বি নাকি সবশুদ্ধ? নাম না- ছােটখােক পূৰ্বেই নামিয়া সীতাভােগওয়ালাকে ডাকিতেছি, বেচাবামবাবু বাকী তিনটিকে সঙ্গে করিয়া নামিয়া পড়িলেন। প্লাটফমে দাড়াইয়া খানিকক্ষণ ভাবিয়া দেখিলেন যে কাছে স্বাস্থ্যকর স্থানের মধ্যে আছে উত্তপাড়া -সেখানে গঙ্গার ধাবে তাহার স্বর্গীয় পিতা কেনারামবাবুর বাগানবাড়ীও আছে। ভাবিতে ভাবিতে একখানি ডাউন প্যাসেঞ্জার ট্রেণ আসিয়া পড়িল। তাড়াতাড়ি এক সের সীতাভােগ কিনিয়া সেই গাড়ীতেই উঠিয়া বসিলেন এবং যথাকালে উত্তরপাড়ায় অবতরণ করিয়া জঙ্গলাকীর্ণ কেনারাম-উদ্যানে স্থান গ্রহণ করিলেন। জগু প্রভুভক্ত কোচম্যান। প্রভুর গাড়ী যখন ডিসট্যান্ট সিগন্যাল ছাড়াইয়া গেল, তখন সে ট্যাক্সি চাপিয়া বাগবাজারে গিয়া প্রভুপত্নীকে জানাইল যে বাবু অদ্য প্রাতে পুত্রকন্যাসহ মথুরা যাত্রা কবিয়াছেন। লবঙ্গমঞ্জরীর হাত হইতে প্রাতঃকালীন গরম সিঙ্গাড়াব ঠোঙ্গাটি পড়িয়া গেল। তিনি কথা কহিতে পারিলেন না, বিচিত্র দুর্ভাবনায় বিমূঢ় হইয়া পড়িলেন। মধুবার পাণ্ডারা নাকি ডাকাত এই কথা ছেলেবেলায় তাহার ঠাকুরমার নিকট শুনিয়াছিলেন। মনে হইতে লাগিল এতক্ষণ মারিয়া পাণ্ডারা খুকীর গলার হার, হােটখুকীর কোমরপেটা সমস্ত কাড়িয়া লইয়াছে। ভাবিতে ভাবিতে আতঙ্কে তিনি কাঁদিয়া ফেলিয়া কহিলেন-“তােরা কেন যানি সঙ্গে?

জও কহিল—“বাবু নিলেনা কি করি? তা নৈলে বুঢ়াকালে মথুরাজী দর্শন লবঙ্গমঞ্জরীর মাতা আসিয়া সমস্ত নিয়া তাহার পুত্রকে কহিলেন —“তুই যা হক। দস্যি ছেলেমেয়ে নিয়ে পথে ঘাটে একা মানুষ হরুর দেশ ভ্রমণের দারুণ সখ ছিল,—পয়সার অভাবে কোথাও যাইতে পারে নাই বটে কিন্তু ভারতবর্ষের সমস্ত রেলওয়ে কোম্পানীর টাইমটেবিল পড়িতে পড়িতে একেবারে কণ্ঠস্থ করিয়া ফেলিয়াছিল। মাতার প্রস্তাব শুনিয়াই সােৎসাহে কহিল-এ তত অতি অবিহি কথা- “ওদের সঙ্গে দেখা হলেই আমাকে একখানা তার করে দিবি বুঝলি?” বলিয়া লবঙ্গমঞ্জরী একশ টাকার একটা পুটুলী হরুর হাতে গুজিয়া দিলেন। হৰু হাতে সুটকেস ঝুলাইয়া বাহির হইয়াই বাসে চড়িল। এমন সময় বাহিরের দরজার কাছে এক ভিখারী আসিয়া গান ধরিল- আর তো ব্ৰজে যাবনা তাই যেতে এণ আর নাহি চায়। ব্রজের খেলা ফুরিয়ে গেছে তাই এসেছি মথুরায়। শুনিয়া লবঙ্গমঞ্জরী শিহরিয়া উঠিয়া কহিলেন—“কি অনুণে গানরে বাপু! দূর করে দে ও হতভাগাকে।” ভিখারী বিড়বিড়, করিয়া বকিতে বকিতে চলিয়া গেল, তথাপি কীর্তনের শেষ চরণটি ত্রিলােচন কবিরাজ লবঙ্গমঞ্জরীর মনের মধ্যে ক্রমাগত হাতুড়ীর আঘাত করিতে লাগিল। শেষে অতিষ্ঠ হইয়া মেীঝিকে সঙ্গে লইয়া চোখের জল মুছিতে মুছিতে লবঙ্গমঞ্জরী ট্যাক্সি আরােহণে পতিগৃহ অভিমুখে যাত্রা করিলেন। বাড়ীতে পেীছিয়া লবঙ্গমঞ্জরীর দুশ্চিন্তা তিনগুণ বাড়িয়া গেল। দেখিলেন যে বেচারামবাবু গরম ওভারকোট লইয়া যান নাই। থােকাখুকীদের চল্লিশ জোড়া পশমী মােজ ঘর ও বারান্দায় ছড়াইয়া পড়িয়া আছে। লবঙ্গমঞ্জরী কঁদিয়া কেমীকে কহিলেন—“কি শান্তি হ’ল আমার ক্ষেমী! এই শীতের দিন গরম জামা মােজা সব ফেলে উনি চলে গেলেন। ফেমী সানা দিয়া কহিল-“সে তুমি ভেবােনা। সঙ্গে টাকা পয়সা আছে—কিনে নেবেন।” । লবঙ্গমঞ্জরী কহিলেন—“সে কি কলকাতার সহর ক্ষেমী যে পয়সা দিলেই জিনিষ মিলবে ? রাগ করে কি ছাই খেয়েছি আমি।” বলিয়াই লবঙ্গমঞ্জরী শয্যা গ্রহণ করিলেন—ক্রেমী তাহার পায়ে হাত বুলাইতে লাগিল। উত্তরপাড়ার বাগান-বাড়ীর সম্মুখে গঙ্গার ঘাটে বসিয়া বেচারাম বাবু তাহার সংসারের কথা ভাবিতেছিলেন। দারুণ দুঃখময় বিশৃঙ্খল সংসার। প্রাণাধিক পত্নী—যাহার সহিত কত গভীর রাত্রে দশবৎসর পূর্বে এই গঙ্গার এই ঘাটেই সাঁতার কাটিয়াছেন, সুরে সুর মিলাইয়া রবি ঠাকুরের প্রেমের গান গাহিয়াছেন-সে পত্নী বিমুখ; বড় খুকী ঝাধিতে গেলেই ঘুমাইয়া পড়ে, বড় থােক বাগানবাড়ীর মালী সহদেব জোয়ার গােয়ালার যন্ত্রপাতি সুবিধা পাইলেই গঙ্গাগর্ভে বিসর্জন দেয়ােট থােকার দুই আনা মূল্যের পাউরুটি ও পােয়দেড়েক ঝােলাগুড় ব্যতীত প্রাতে ক্ষুন্নিবৃত্তি হয় না, ছােটখুকী জোনাকী দেখিলেই ভয়ে চীৎকার করিয়া কাঁদিতে থাকে। বাগানে মশা এবং কটকটে ব্যাং সমানে সমস্ত রাত্রি শব্দ করে—সহদেব মালী তাহার গৃহবাসিনী প্রণয়িনীর নাম ধরিয়া ঘুমের ঘােরে উড়িয়া ভাষায় নিদারুণ চীৎকার করিতে থাকে— বেচারাম বাবুর ঘুম ভাঙিয়া যায়। এই প্রকার বিচিত্র উৎপাত বেচারাম বাবুকে মুহমান করিয়া তুলিতেছিল। নিঃসঙ্গ জীবন কিছুতেই আর ভাল লাগিতেছে না। মনে হইল ষ্টীমারযােগে একবার তাঁহার সুন্দরবনের প্রজাদের মধ্যে গিয়া উপস্থিত হইলে হয়-তাে অনেকটা শান্তি লাভ হইতে পারে। ভাবিয়া ভাবিয়া সঙ্কল্প অনেকটা স্থির করিয়া আনিতেছিলেন এমন সময় কে কহিল-বেচুবাবু যে নমস্কার!” বেচারাম বাবু মুখ ফিরাইয়া দেখিলেন-তালতলার বিপিন চৌধুরী। আগে শিয়ালদয় টিকেট কালেক্টার ছিলেন তারপর পুরাণাে রিটার্ণ টিকিট বিক্রয় করিয়া চাকুরী হারাইয়া উত্তরপাড়ায় ভূষির আড়ত খুলিয়াছেন। পরিচয় ছিল—বেচারাম বাবু কহিলেন—হা।” বিপিন কহিল—“বেশ বেশ! অনেক কাল পর দেখা হল। বাগানে এসেছেন বুঝি? সপরিবারে ? বেচারাম বাৰু মুখ বিমর্ষ হইলেন, বলিলেন-“পরিবার নেই।” বিপিন কহিল-“পরিবার নেই কি মশাই ? জানতুম না তাে! বড় দুঃখের কথা।” বেচারাম দার্শনিকের মত গল্পীর কণ্ঠে কহিলেন-“দুঃখ আর কি ?

বিলােচন কবিরাজ জগতে মিলন-বিরহ, দিন-রাত সবইতাে আছে। সবই তাে সৈতে হয়। বিপিন একটু দম লইয়া কহিল,—“তা যদি মনে করেন। আমার শালীর বয়স একুশ। রং আমার স্ত্রীর মত ফর্সা, চোখ অত টানা নয়, তবে এদিকে বুঝছেন—ভারী সু, ডাগর। গরীব ব্রাহ্মণ। যদি অনুমতি করেন তা হলে গঙ্গার দিকে চাহিয়া লবঙ্গমঞ্জরীর সন্তরণ-চঞ্চল দেহের স্মৃতি বেচারাম বাবুর অন্তরে তরঙ্গায়িত হইয়া উঠিতেছিল। বিপিনের কথা তাহার কাণে গেলনা, অন্যমনস্কভাবে কহিলেন, “দেখব।” বিপিন বাড়ীতে ফিরিয়াই প্রথমে তাহার স্ত্রী, তৎপর তাহার শাশুড়ী তাহার পর তাহার পশুর মালগুদামের কেরাণী জলধর বাবুকে জানাইল যে সে বড় শীকার গাঁথিয়াছে। সেই সঙ্গে তাহার শ্যালিকা বন্দারাণীর খুৎনিতে চিমটি কাটিয়া দুই অক্ষরের একটা রসিকতা করিতেও ছাড়িল না। বেচারামের দ্বিতীয়পক্ষ হইলে কি হয়—তাহার অবস্থা ইত্যাদি বলিয়া বিপিন কাভার-কাতর জলধর বাবুকে ও তাহার পত্নীর অন্তরাত্মাকে লােলুপ করিয়া তুলিল। বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা সারারাত্রি ঘুমাইতে পারিলেন না, তৎপর দিবস সূৰ্য্য উদিত হইবার পূৰ্বেই অলর বাবুর পত্নী স্বামীকে বেচারাম বাবু সম্বন্ধে সাক্ষাৎ-সন্ধান পানিতে ভােরের গাড়ীতেই কলিকাতায় পাঠাইয়া দিলেন। কয়েক দিন হরুর টেলিগ্রামের প্রতীক্ষায় পিওনের পথপানে চাহিয়া লবঙ্গমঞ্জরীর চক্ষের দীপ্তি নিষ্প্রভ হইয়া আসিয়াছিল। বেচারাম বাবুর ৬৪

মধুরাষার দিবস হইতেই নিদ্রা ঘুচিয়াছে, হরুর টেলিগ্রাম না পাইয়া
আহারও ঘুচিল। তিনি কেবলই কাঁদিতে লাগিলেন।
সে দিনও
বিএহরে বসিয়া কাঁদিতেছিলেন, এমন সময় দরজার বাহিরে কে
একজন ডাকিল—“এটা কি বেচারাম বাবুর বাড়ী। লবঙ্গমঞ্জরী
নিদ্রিতা ক্ষেমী ঝির চুল ধরিয়া টানিয়া তুলিয়া বলিলেন-“কেমী
দেখ তাে, টেলিগ্রাম এলাে বুঝি
ফেমী উঠিয়া একতলা ঘুরিয়া আসিয়া কহিল—“ভদ্দর লােক।
বুড়ো।” স্বামীর সংবাদ পাইবে ভাবিয়া লবঙ্গমঞ্জরী কেমীকে সঙ্গে
করিয়া নীচে নামিলেন। ভদ্রলােককে বৈঠকখানায় বসাইয়া এক্স
করিলেন-“কোখেকে আসছেন ?”
জলধর বাবু কহিলেন-“ওতােপাড়া থেকে। এটা বেচারাম
বাবুর নিজ বাড়ী। পৈতৃক?”
লবঙ্গমঞ্জরী কহিলেন—ই।
“পথ ভুলে কালিঘাট গিয়ে পড়েছিলুম, তা বেশ!” বলিয়া
জলধর বাবু ঘুরাইয়া ফিরাইয়া বহু পারিবারিক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া
বুঝিলেন যে বেচারাম বাবুর হাতে পড়িলে তাহার আদরিণী কন্যা
রাণীর হাতে থাকিবে। যাইবার সময় অনুচ্চ স্বরে জলধর বাবু কহিলেন
-“এখন প্রজাপতির নির্বন্ধ।”
কথাটি লবঙ্গমঞ্জরীর কাণে গেল--কহিলেন-“কি বললেন ?
জলধর বাবু কহিলেন, “কি বলব আর মা, একটা বয়স্থা মেয়েকে
নিয়ে বিপদে পড়েছি। আমার জামাই বিপিন-বেচারামের বন্ধু
বলে তাঁর দ্বিতীয় পক্ষ কবার ইচ্ছে।”

ত্রিলােচন কবিরাজ গেমী ঝি বিস্ময়ে হাঁ করিয়া ফেলিল। লবঙ্গমঞ্জরীর নিষ্প্রভ চক্ষুতে দীপ্তি ফিরিয়া আসিল—তিনি প্রশ্ন করিলেন-“তিনি কোথায়?” “ওতােরপাড়াতেই আছেন” বলিয়া শুভকর্ম শেষ হইল ভাবিয়া কন্যার রাজরাণী হইবার সম্ভাবনায় উল্লসিত জলধরবাবু লাঠি ঠক্ ঠক্‌ করিতে করিতে প্রস্থান করিলেন। বেচারামবাবু মথুরা যাইবার ভাণ করিয়া উত্তরপাড়ায় গিয়া গােপনে বিবাহ করিবার ষড়যন্ত্র করিতেছেন। লবঙ্গমঞ্জরীর মগজে বিদ্যুৎ খেলিতে লাগিল। মনে হইল বেচারামবাবুই একটি মূর্তিমান ষড়যন্ত্র ! নানাপ্রকারে ম্যাটিকুলেশন পরীক্ষা হইতে তাহাকে বিরত রাখিয়া আজ পৰ্যন্ত লবঙ্গমঞ্জরীর সহিত তিনি যতকার ব্যবহার করিয়াছেন সমস্তই ষড়যন্ত্রমূলক। কি করিবেন কিছুই লবঙ্গমঞ্জরী স্থির করিতে পারিলেন না। গােমী ঝি এই সময় কহিল-“ভেবে আর কি কৰ্ব্বে মা? এখনও সময় আছে। তােমাকে দেখলেই *আমি তাকে চাইনে। আমার ছেলেমেয়ে নিয়েই সংসার। মহাদেও। হুকুম পাইয়া মহাদেও ট্যাক্সী লইয়া আসিল। শীতের সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিয়াছে। বাগানবাড়ীর একতলায় ইজিচেয়ারে বালাপােষ গায়ে জড়াইয়া বেচারামবাবু বিবর্ণমুখে বসিয়াছিলেন। সম্মুখের চেয়ারে বিপিন চৌধুরী বসিয়া কহিতেছিল— “এ কি রকম কথা মশাই, অনর্থক বুড়াে ভদ্রলােকের চৌদ্দ আনা গাড়ীভাড়া খসিয়ে এখন বলছেন- জোয়ার বেচারাম বাৰু কহিলেন—“ভুল শুনেছেন। আমি সেসব বলিনি। বিপিন কহিল-ভুল শুনব আমি মশাই? ভুষির দালালী করে খাই-কড়াক্রান্তির পাওনাগণ্ডা মনে থাকে, আর আমি খুব ভুল। স্পষ্ট বলুন না, বিয়ে কৰ্বেন কিনা? বেচারামবাবু মাথা টিপিয়া ধরিয়া কহিলেন—“মশাই বিরক্ত কৰ্বেন । আর ভাল লাগছে না। আমার স্ত্রী আছেন বাপের বাড়ীতে। কাজেই বলেছিলুম পরিবার নেই। আর তিনি না থাকলেও আমি বিয়ে কৰ্ত্তাম না জানেন ? তাকে ছাড়া অচেনা কাউকে বিয়ে কর্তে পারিনে তার সঙ্গে চোদ্দ বছরের পরিচয়—বুঝছেন?” বিপিন কহিল,—“খ্রীলােক আবার অচেনা কি? একবার দেখেই তাে নাড়ীনক্ষত্র চেনা যায়। দেখছি ফাকিবাজী আপনার স্ত্রী একটা থাকল ত হল কি? আর একটা বিয়ে করে এখানে রেখে যান—মাস মাস খােরাকীর টাকা দেবেন।” বেচারামবাবু বিব্রত হইয়া কহিলেন—“বছি যে মশাই মাথা টন টন কর্জে-কথা কইতে পাৰ্জিনে— এতক্ষণ দরজার অন্তরালে প্রচ্ছন্ন হইয়া লবঙ্গমঞ্জরী স্বামীর কথা শুনিতে নিতে অনুতাপানলে দগ্ধ হইয়া নিঃশব্দে কাঁদিতেছিলেন। এইবার প্রবেশ করিয়া বিপিনের সম্মুখে দাড়াইলেন। বেচারাম- বাবু—“তুমি।” বলিয়া উঠিবার চেষ্টা করিয়াই ইজি-চেয়ারে পুনরায় শুইয়া পড়িয়া চোখ বুজিলেন! বিপিন অবস্থা বুঝিয়া দ্রুতপদে প্রস্থান করিল-চৌদ্দমানা আদায় করিতে পারিল না। কেমী ঝির মুখে সংবাদ পাইয়া মুহূৰ্তমধ্যে ভাতের থালা ফেলিয়া থােকাখুকু চতুষ্টয় ৬৭ ত্রিলােচন কবিরাজ আলিয়া মন মাতাকে ঘিরিয়া ফেলিল। লবঙ্গমারী দিতে কাঁদিতে সব ক'টিকে একসঙ্গে বুকে চাপিয়া ধরিয়া ইজিচেয়ারে শয়ান বেচারামবাবুর বিবর্ণ ওষ্ঠাধরের দিকে বারবার সতৃষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। দুজনে চোখােচাধী হইল অনেকবারই। কিন্তু কথা কে আগে কহিবে তাহা স্থির হইল না। সুচী পরিবেষণের ফাকে—“আর দু’থানা দিই--বলিয়া আলাপ আরম্ভ করিলে কাৰ্যসিদ্ধি হইবে কিন্তু মাসের হানি হইবে না ভাবিয়া লবঙ্গমঞ্জরী রন্ধনশালায় প্রবেশ করিলেন। কিছুকাল পর লুচীর থালা হাতে লইয়া আসিয়া দেখিলেন, ইজিচেয়ার শু, বেচারাম নাই। আশঙ্কায় লবঙ্গমঞ্জরীর হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হইতে লাগিল। গার ঘাটে বেচারামবাবু নিশ্চিন্ত হইয়া বসিয়া আছেন। বাস- কোনও উৎপাত নাই—সংসার এখন স্বচ্ছন্দে রসাতলে যাইতে পারে। ভাবিতেছিলেন, এমন সময় মৃদুপদক্ষেপে কে আসিয়া, তাহার পার্শ্বে নীরবে বসিল। দেখিলেন লবঙ্গমঞ্জরী! তাহার দেহে বিদ্যুৎ ফুরণ হইল, তথাপি বেচারাম নির্বাকৃ। লবঙ্গমঞ্জরীর গায়ে সেমিজ ও ব্লাউজ ছিল না। চুপ করিয়া বসিয়া থাকিয়া তিনি পৌষের দারুণ শীতে কপিতে লাগিলেন। বেচারামবাবু আড়চোখে অর্ধাঙ্গিনীর অবস্থা দেখিয়া তাহার বালাপােষখানি একটু উমােন করিলেন এবং লবঙ্গ মরীর কম্পমান দেহখানি তন্মধ্যে এবিষ্ট হইল। তাহার পর তাহার জোয়ার বাম স্কন্ধে লবঙ্গমঞ্জরীর মন্তক ও দক্ষিণ স্কন্ধে লবঙ্গমঞ্জরীর দক্ষিণ বাই অবাধে স্থানলাভ করিল। গঙ্গায় তখন জোয়ার আসিয়াছে। জোয়ারের টানে নৌকা ভাসাইয়া জনকয়েক মাঝি পূর্ববঙ্গের ভাটিয়ালের টানাসুরে কোরাস গাহিয়া চলিয়াছে- দক্ষিণ হাওয়ায় নৌকার পাল ছিড়াছে ওরে ও মাঝি খবরদার। দণ্ডে দওে প্রেমের নদী হয় সাঁতার। শুনিয়া তীরস্থ দুইটি নির্বাক প্রাণী মৃদু হাস্য করিলেন। কথা ফুটিল। এক জন অশ্রুগদগদকণ্ঠে ডাকিলেন লবং! অন্য জন ফেঁপাইতে ফোপাইতে জবাব দিলেন- বেচারা!

No text on this page.

সংস্কারক অদ্য হইতে (ক) অনুন্নত জনসাধারণের সেবা আমার জীবনের লক্ষ্য হইবে। (খ) তাহাদের সামাজিক উন্নতি বিধান আমার জীবনের মন্ত্র হইবে। (গ) বিধবার দুঃখ মােন আমার জীবনের ব্রত হইবে। ভগবান আমার সহায় হউন। দৃঢ়কণ্ঠে এই কথা কয়টি পাঠ করিয়া শ্ৰীমান অনাদিচরণ চক্রবর্তী বি, এ, নাম সহি করিলেন। পিতা শ্যামাচরণ চক্রবর্তী সাং পদমী, জিলা যশােহর। নাকের স্কুল ডগাটিতে চসমা নামাইয়া সমাজ সংস্কার সমিতির প্রবীণ সম্পাদক মহাশয় কহিলেন “যে ব্ৰত আজ নিলে এই ব্রতের উদযাপন যদি করিতে পার তা হলেই জীবন সার্থক হবে। তুমি কবে যাচ্ছ?” “আজই। আর বিলম্ব করব না। জাতির দুর্দশা দেখে ধৈৰ্য্য রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়েছে।” “যাও। তােমার জীবন অন্য সকলের আদর্শ হােক।” বলিয়া সম্পাদক মহাশয় উপস্থিত অন্য পাঁচজন যুবকের দিকে চাহিলেন। অনাদি নমস্কার করিয়া বাহিরে আসিল। তখন সমাজ সংস্কারের জন্য শহরে মুহুলুস্থ সভা সমিতির ৭১ ভিলােচন কবিরাজ সৃষ্ট হইতেছে। এমনই একটি সভার কর্মী ও প্রচারকের পদ মান অনাদিচরণ গ্রহণ করিলেন। গত কল্য গােলদীঘিতে সম্পাদক মহাশয়ের বক্তৃতা শুনিয়া তাহার মনে জাতির সেবার জন্য যে দারুণ আগ্রহ জাগিয়া উঠিয়াছিল আজ এই পদ গ্রহণে তাহার পরিণতি হইল। মেসে ফিরিয়া অনাদি বন্ধুদের কিয়া কহিল “আমি আমার জীবনের স্বপ্ন সফল কৰ্বার সুযােগ পেয়েছি, কর্মের পথে চল্লাম। তােমরা সব পেছনে এস।” এই বলিয়া অনাদি আজিকার সন্ধ্যার সকল ঘটনা বন্ধুদের কাছে বলিল। সকলে এক বাক্যে বলিল, “ একটা কাজের মত কাজ, তুমি যাও।” দুই একজন আইনের পরীক্ষা শেষ হইলেই তাহার সঙ্গ লইবে এ ভরসাও দিল। অনাদি চাকর হরিচরণকে ডাকিয়া চা আনিবার আদেশ দিল। হরিচরণ যখন সিড়ির অর্ধেক নামিয়াছে তখন অনাদি কহিল, “মােড়ের দোকান থেকে চা এনে হরি।” হরি কহিল “সে কি বাবু, সে যে মানকে সােপার দোকান।” অনাদি দৃঢ়ম্বরে কহিল, “পৃথিবীতে কেউ ধােপা নাপিত নেই হরি, সব সমান, একই স্থলে জলে হরি সকল কথা শুনিল না, “আচ্ছা” বলিয়া নীচে নামিয়া মৃদুস্বরে কহিল, “রাতে বাবু আমাকে ‘চান করালেন।” চা যখন আসিয়া পেীছিল তখন এগারােজন বন্ধুর মধ্যে মাত্র জিন কক্ষে বর্তমান ছিল। বাকী সকলে চা আনিবার অবকাশে উঠিয়া গিয়াছিলেন। কাজেই মাণিকের দোকানের চা চার পেয়ালা বা অবশিষ্ট নর্দমায় গেল, ভাবাবিষ্ট অনাদি তাহা লক্ষ্য করিলেন। ৭২ ২ ট্রেন হইতে নামিয়া বেলা তিনটায় অনাদি ব্যাগ হাতে চারখণ্ডির ঘাটে আসিয়া পেীছিলাে। সমস্ত রাত্রি নৌকায় কাটাইতে হইবে কাজেই বড় দেখিয়া একখানা পান্সি ভাড়া করিল। নৌকা যখন চারখণ্ডির ঘাটে আসিয়া পৌছিল তখন প্রায় সন্ধ্যা, হারু মাঝি অনাদিকে ডাকিয়া কহিল, “বাবু রেতে কি ফলার করিবেন-না দুটো আলু সিদ্ধ ভাত ?” অনাদি বিছানায় শুইয়া কহিল “ভাতই খাব।” “তবে দ্যান দেখি চার গণ্ডা পয়সা। বাজারটা ঘুরে আসি। পয়সা লইয়া হারু চলিয়া গেল। হারু চলিয়া গেলে মনাই মাঝির তামাকের কথা মনে হইল। অন্যদিকে ডাকিয়া কহিল “বাবু কি তামাক খান?* অনাদি কহিল “সিগারেট খাই। আমার সঙ্গেই আছে।” মনাই হাত বাড়াইয়া কহিল “একটা ছিগরেট পেসাদ পাব বাৰু?” অনাদি একটা সিগারেট ফেলিয়া দিল। সিগারেট ধরাইয়া একটা টান দিয়া কাশিতে কাশিতে মনাই কহিল, “চড়ার উপর উনুন করে দেব বাবু?” অনাদি কহিল, “চড়ার উপর কেন? তােমাদের উনুন নেই ?” মনাই কহিল, “এজ্ঞে আছে। তা আমরা হচ্ছি মাকি।” জাতি সম্বন্ধে আপনার মতামত প্রকাশের এই প্রথম অবসর অনাদি ত্যাগ করিতে পারিল না, কহিল, “মাঝি। তাতে দোষ কি? জাতে কেউ ছােট নয় তাই। তােমরা হােট বলে মনে কর, তাই তােমরা

ত্রিলােচন কবিরাজ
ছােট। তােমাদের এই ভুল ঘােচাতে আমি এসেছি। আমি নিজে
ব্রাহ্মণ, তােমাদের হাঁড়িতে খেয়ে দেখাব যে মাঝির হাতে পেলে
ব্রাহ্মণের জাত যায় না।”
মনাইয়ের চক্ষু কপালে উঠিল। সে আর কথা কহিতে পারিল না।
কথাগুলি মনাইয়ের মর্মস্পর্শ করিয়াছে বুঝিয়া অনাদি নীরব রহিয়া
তাহাকে ভাবিবার অবসর দিল।
খানিকক্ষণ পরে হারু আসিয়া পৌছিল। আসিয়াই কহিল,
“মাটির গামলাটা দে।”
মনাই কহিল, “ক্যান?”
হারু বলিল, “কে আবার রাতের বেলায় হালাম কবে ? দে
গামলা। চিড়ে কিনে আনছি সওয়া সের। জল দিয়ে রাখি।”
মনাই উকি দিয়া দেখিল, অনাদি চক্ষু বুজিয়া শুইয়া আছে।
তখন সে হারুকে কহিল,-“দুসনে পালী, গামলা দিচ্ছি—আলগােছে
নিয়ে চড়ায় রাথু।”
হারু আশ্চর্য হইয়া কহিল-“ক্যান রে?”
মনাই হারুর দিকে গলা বাড়াইয়া মৃদুস্বরে কহিল, “বাবু
থেরেস্তান।”
হারু চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া কহিল, “জালি ক্যামনে? গলায়
যে পৈতে।”
ও মানুষ দেখানাে। বাবু আমার উনুনে পাক করি খাতি চায়।”
এই কথা শুনিয়া হারুর আর অনাদির খৃষ্টান সম্বন্ধে সংশয় রহিল
না। সে কহিল,-“কে গামলাটা আলগােছে আমার হাতের উপর।
৭৪

সংস্কারক
মাই গামলা দিয়া অনাদিকে ডাকিল, অনাদির তা বােধ
হইতেছিল, উঠিয়া কহিল, “উনুন ধরিয়েছ ?
হারু মহা বিপদে পড়িয়া গেল। খৃষ্টান চুইলে উনুনের জাতি যায়
এদিকে ব্রাহ্মণ ব্যবহার করিলেও মহাপাতক। একটু ভাবিয়া হারু
কহিল “এজ্ঞে বাবু, সে উনুনে কাজ চলে না, আমরা রাতের বেলায়
ফলারের চিড়ে আনিছি।”
পাক কবিয়া খাওয়া অনাদিব কোনও জন্মে অভ্যাস ছিলনা।
চিড়াব কথা শুনিয়া কহিল, “আমারও চিড়েই আন তবে। রাতে
আর বাজা-বান্নার হাঙ্গামে কাজ নেই।”
এই প্রকারে উনুনের জাতি বাঁচাইয়া হারু পুনরায় বাবুর চিড়া
আনিবার জন্য চলিয়া গেল।
পরদিন বেলা একপ্রহরেব সময় পদমীর ঘাটে পালী লাগিল।
অতি শৈশবে গ্রাম ছাড়িয়াছে তাহার পর সহরে বিশ বৎসর কাটাইয়া
দিয়াছে। কাজেই গ্রামে তাহার পরিচিত কেহ ছিল না। মুঙ্গেরে
শ্যামাচরণ বাবুব গৃহে গ্রামবাসী যাহারা মধ্যে মধ্যে স্বাস্থ্যের অন্বেষণে
তিন চারি মাসের জন্য অতিথি হইতেন তাহাদের নামও অনাদির
অজ্ঞাত ছিল।
অনেক ভাবিয়া খোজ লইয়া সে নিজের বাড়ীতে গিয়াই উপস্থিত
হইল। পথচারী দুই একজন লােক কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাহাকে

ত্রিলােচন কবিরাজ দেখিতে লাগিল। কানাকানিও করিতে লাগিল কিন্তু কেহই তাহাকে কোনও কথা জিজ্ঞাসা করিল না। তাহার সর্বাঙ্গ মােটা কৰলৈ আবৃত এবং এই বেশটাকেই গ্রামের লােক ভয় করিত। কারণ অল্প- দিন হইল প্রেসিডেন্ট পঞ্চায়েৎ মহাশয় ইস্তাহার জারি করিয়া সকলকে জানাইয়া দিয়াছেন যে গান্ধীর চেলাদের সঙ্গে কোনওরূপ আলাপ আলােচনা করিতে সরকার বাহাদুরের নিষেধ আছে। গান্ধীর চেলাদের লক্ষণ সম্বন্ধে ইস্তাহারের নীচে এইরূপ লেখা ছিল- (ক) তাহারা মাথায় সাদাটুপী পরিয়া থাকিবে। (ক) মােটা কাপড় পরিয়া থাকিবেক, মােটা কাপড়ে নির্মিত কোর্তা অথবা কল গায়ে দিবে। (গ) হিন্দু হইলে ‘বন্দেমাতরম ও মুসলমান হইলে ‘আল্লাহে আকবর’ বলিবেক। (ঘ) তাহারা সভা করিয়া বক্তৃতা করিবেক এবং সকলের নিকট হইতে চারি আনা করিয়া পয়সা লইবেক। সকল লক্ষণের সঙ্গে না হউক গান্ধীব চেলাদের একটি লক্ষণ অনাদির সর্বাঙ্গে বিদ্যমান ছিল, তাহা ছাড়া ইতিপূর্বে গান্ধীর যে সকল চেলা গ্রামে মুষ্টি ভিক্ষা সংগ্রহ করিয়া গিয়াছে তাহাদের চলিবার ভঙ্গীও হিল এই রকম। যাহা হৌক কোনমতে সন্ধান লইয়া অমাদিচরণ নিজ গৃহে আসিয়া উপস্থিত হইল। বাড়ীর উঠানটি জঙ্গলাকীর্ণ। চক- মিলান বাড়ীর দুইদিকের প্রাচীর ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। ভগ্ন প্রাচীরের ইষ্টকগুলি প্রতিবেশীদের কাহারও পৈঠা কাহারও বা ঘাট বাঁধানাের কাজে লাগিয়াছিল। রান্নাঘরটির একখানি চালাতে শত ছিদ্র টানে সংস্কারক আজান তখনও ছিল, অপব চালাখানির টান নষ্ট হইয়া যায় দেখিয়া অনাদির এক জাতি তাহার গােহাল ঘর তৈয়ারীর কাজে লাগাইয়া ছিলেন। বাগানের বেড়াটির শালের খুঁটিগুলির দুই একটি জরাজীর্ণ অবস্থায় তখনও ছিল; কিন্তু কাঠেব নকসা কাটা দাড়িগুলি রাখালদের গরু চরাইবার লাঠি ও বর্ষাকালে পড়শীদের জালানী কাঠ রূপে ব্যবহৃত হইয়া বহু পূর্বেই নিঃশেষ হইয়া গিয়াছিল। কিছুদিন থাকিয়া বাড়ীটার সংস্কার করিয়া যাইবার সঙ্কল্প করিয়া সে একটা মরিচা ধরা তালা খুলিয়া দক্ষিণের ঘরে প্রবেশ কবিল। তাহার পর ঘর হইতে কোনও মতে একটা চৌকি বাহিরে টানিয়া সেখানে বসিয়া আধঘণ্টা বিশ্রাম করিয়া খিড়কীব ঘাটে হাত মুখ ধুইতে বসিয়া গেল। এই সময় পশ্চাৎ হইতে একজন প্রশ্ন করিল—“মশায়ের কোথা থেকে আসা হচ্ছে ? অনাদি মুখ ফিরাইয়া প্রশ্নকারীকে দেখিয়া লইল, তার পর কহিল, “কলকাতা থেকে “নাম ? অনাদিচরণ চক্রবর্তী পিতা শ্যামাচরণ চক্রবর্তী। প্রশ্নকারী চৰ্বিত দন্তকাষ্ঠটি ফেলিয়া কহিলেন, “ওঃ-তুমি আমার খামাচরণ দা’র ছেলে ? দেশে ফিরেছ? ভাল! ভাল।” আগন্তুক কে অনাদি চিনিত না। কোনও আত্মীয় হইবেন ভাবিয়া সমের সহিত কহিল “আজ্ঞে হাঁ। এখন কিছু দিন এখানে থাকব।” “বেশ আমরা আছি। কোন ভাবনা নাই—তবে সে রাম নাই সে পযােখ্যাও নাই। গাঁয়ের যারা মাথা ছিলেন একে একে ৭৭

ত্রিলােচন কবিরাজ
সকলেই গেছেন।
এখন আছি আমি অর নটু খুড়াে। তা
আমাদেরও যাবার বয়স হয়ে এল। তুমি আমাকে চিনতে পাছ না ?
আমি রসিক ঘােষাল, একবার মুঙ্গেরে গিয়ে তােমাদেব বাড়ীতে মাল
খানেক ছিলাম, তখন তুমি ছােট।” এই বলিয়া রসিক ঘােষাল অনাদির
স্বগীয় পিতার আতিথেয়তা সম্বন্ধে অনেক কথা কহিলেন।
অনাদি স্নান করিয়া উঠিলে কহিলেন, “বাবাজি বৈকালে বাড়ী
থেকো, আমি আসব। গাঁয়ের হাব ভাব সব জানাব। এখানে থাকতে
হলে খুব সামলে চলতে হবে।
“আচ্ছা বলিয়া অনাদি গৃহে ফিরিল।
মধ্যাহ্ন ভােজনের পর জন কয়েক মজুব লাগাইয়া অনাদি গৃহ
প্রাঙ্গণ পরিস্কার করাইয়া ফেলিল। গ্রামে নিম্নশ্রেণী কত ঘর আছে
এবং মােট বিধবার সংখ্যা কত তাহারও সংবাদ কৃষাণদের নিকট হইতে
সংগ্রহ করিল। অতঃপর কাজ আরম্ভ করিবার পালা। কি করিয়া
কাৰ্যে অগ্রসর হইবে ভাবিতেছে এমন সময় রসিক ঘােষাল মহাশয়
আসিয়া উপস্থিত হইয়া কহিলেন, “এই যে বাবাজী, এক দিনেই বেশ
গুছিয়ে নিয়েছ দেখছি।”
অনাদি তাহাকে বসিতে দিয়া কহিল আজ্ঞে হ্যা, দিন কতক
থাকতে হবে।”
* থাকবে বৈ কি? কিছু দিন না থাকলে সব ঠিকঠাক করে
৭৮

সংস্কারক নিতে পারবে না। এই দেখ না, কি হয়েছে। ঐ যে শুপুরি গাছটি ওটি ছিল তােমাদের সীমানায়, বেদখল করে খাচ্ছে নন্দ চক্কোতি। কিছু না শুধু এক নম্বর স্বত্বের মামলা করিলেই বাছাধনকে বাপ বাপ করে বেড়া সরিয়ে নিতে হবে।” অনাদি কথা কহিল না। রসিক ঘােষাল কহিলেন তার পর পুকুরের ওপাড়ের বাঁশ ঝাড়টা, সেটার তাে সবাই মালিক। যার বাঁশের দরকার, সেই আসে এই ঝাড়ে। ওদিকে ও একটু বৃষ্টি দিতে হবে।” অনাদি কহিল, “আজ্ঞে হা।” রসিক ঘােষাল কহিলেন, “মামলা করতে কষ্ট নেই, দুটো টাকা ফেলে দিলে আমার ভাগ্নী জামাই সােমনাথ আছে বড় উকীলের মুহুরী, সব গুছিয়ে সেই করে নেবে। তদ্বির তদারক আমিই করব।” অনাদি শুধু কহিল “বেশ।” ইহার পরও রসিক ঘােষাল মহাশয়ের অনেক বক্তব্য ছিল কিন্তু গ্রামের অনেকগুলি ভদ্রলােক আসিয়া উপস্থিত হইলেন। শ্যামাচরণ চক্রবর্তী অগাধ বিত্ত রাখিয়া গিয়াছিলেন; তাহার অবিবাহিত পুত্র মান অনাদিচরণ তিনটী পাশ দিয়া গ্রামে আসিয়াছে, অভিভাবক কেহ কাজেই এই পদটি নিবার জন্য সকলেরই আগ্রহ ছিল। কেবল দুই একটি ভদ্র যুবক আসিয়াছিলেন অন্য উদ্দেশ্যে। তাহাদের গ্রামে ‘পদমী ন্যাশনাল ব্রিটিশ ড্রামাটিক ক্লাব’ খােলা হইয়াছিল। তাহার অন্য কিছু সরঞ্জাম অভাব পক্ষে কিঞ্চিৎ চাঁদা সংগ্রহ করা ছিল তাহাদের অভিপ্রায়। অনাদি সকলকে অভিবাদন করিয়া যথা যােগ্য নাই। ৭১ বিলোচন কবিরাজ আসন দিয়া কহিল “আপনাদের সঙ্গে দেখা হয়ে বড় খুশী হয়। অনেক দিন দেশ ছাড়া, পরিচয় ত হয় নি।” তখন সকলেই আপন আপন পরিচয় দিয়া গেলেন। আমারে সহিত সকলেরই যে অতি গভীর বন্ধুত্ব ছিল অনাদি তাহা বুঝিতে পারিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই অনাদি দেখিল, সে গ্রামে নির্বান্ধব নহে। সমাগত সকলেই তাহার সহিত সম্পর্কিত। মামা, দাদা, কাকা, জেঠা, মায় ভগ্নীপতি পৰ্যন্ত সর্বপ্রকার অত্মীয়ের সন্ধান পাইয়া অনাদি অত্যন্ত খুসী হইল। প্রাথমিক পরিচয় হইয়া গেলে একজন প্রশ্ন করিলেন- “ভায়া গান্ধীর চেলা নও তাে ?” প্রশ্নটির ভঙ্গী প্রশ্নকারীর দৃষ্টি এবং যুগপৎ সমাগত আত্মীয় মণ্ডলীর কৌতুহলী অবস্থা দেখিয়া হঠাৎ অনাদির মনে হইল যে, সত্য কথা বলাটা সুবুদ্ধির কাজ হইবেনা; এক পল্লীগ্রামে জনৈক কংগ্রেস-কর্মীকে বিপদে পড়িতে হইয়াছিল তাহাব বিবরণ সে অতি অল্পদিন হইল সংবাদ পত্রে পড়িয়াছে। এখন সেই কথাটা মনে পড়িল, কহিল “আজ্ঞে, না আমার কাজ অন্য ধরণের। আমি একটা বড় উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছি।” সকলেই এই বড় উদ্দেশ্যটা জানিবার অন্য কৌতুহলী হইয়া উঠিল। একজন বৃদ্ধ কহিল সেটা কি বাবাজী ? অনাদি কহিল, “পতিত জাতির উদ্বার। এই দেখুন না এই গ্রামেই যে সব জেলে ছুতাের, নমঃশূদ্র, বাগীর বাস তারা কি অবস্থায় আছে। এদের উদ্ধার করাই আমার উদ্দেশ্য। এদের জল ব্ৰহ্মণকে ব্যবহার করে দেখাতে হবে এরাও মানুষ। শেষের কথাটায় উপস্থিত সকলেই একটু চঞ্চল হইয়া উঠিলেন।

* ইতিমধ্যে তাহারা যে একখানি খবরের কাগজে পড়িয়াছিলেন একাল ভােবাপন্ন শিক্ষিত হিন্দু যুবক বর্ণাশ্রম ধর্মকে ধবংস করিবার বক্তৃতা ও প্রচার করিতেছে সে কথাটা তাহা হইলে মিথ্যা নয়। কিন্তু কেহই সম্মুখে কোনও অভিমত প্রকাশ করিলেন না। ইহার পরও অনাদি অনেক কথা বলিয়া গেল। সন্ধ্যা হইলে ভদ্রগণ একে একে প্রস্থান করিলেন, রহিলেন সুধু থিয়েটারের পাণ্ডা যুবক কয়টি। তাহারা সকলেই অনাদিকে সাহায্য করিবেন বলিয়া একটি টেবিল হাশ্মোনিয়াম দানের প্রতিশ্রুতি লইয়া গেলেন। পরদিন হইতে অনাদির সংস্কার চেষ্টা আরম্ভ হইল। প্রাতঃকালে ধীবর পল্লীর মাতব্বরগণকে ডাকিয়া সে সকলকে নিজের উদ্দেশ্য বুঝাইয়া দিল। এই তিনটা পাশকরা দিগগজ বিদ্বানের সকল মন্তব্যই তাহারা স্বীকার করিয়া লইল। তাহার পর সূত্রধর পল্লী এবং সর্বশেষে গ্রামের বাগীদের মধ্যে প্রচার কাৰ্য শেষ করিয়া সে সর্বশ্রেণীর অবনত হিন্দুদিগের এক বিরাট সভা আহ্বান করিল। ধীবর ও সূত্রধর পল্লীতে দুই একটি যুবক ছিল, তাহারা স্কুলের থার্ড ক্লাশ পৰ্য্যন্ত পড়িয়া মা সরস্বতীর নিকট হইতে বিদায় লইয়া ঘরে বসিয়া ছিল। জাতব্যবসা করা ছিল তাহাদের পক্ষে আয়াসসাধ্য ও লা- জনক; অথচ সমাজের উন্নতি করিবার জন্য তাহাদের আগ্রহের অন্ত ছিল তাহারা রীতিমত নিজ নিজ সমাজের মুখপত্রগুলি পড়িত এবং তাহাদের প্রতি উচ্চবর্ণের ব্যবহার যে একান্তই অন্যায় ও বিয়ে মূলক এই কথা সময়ে অসময়ে আপন গতির পঞ্চায়েতের বৈঠকে প্রকাশ করিত। কিন্তু এ উপায়ে স্বজাতির চৈতন্যের উদ্রেক এ পর্য ১ ত্রিলােচন কবিরাজ তাহারা করিয়া উঠিতে পারে নাই। অনাদির অভিপ্রায় জানিয়া তাহারা তাহার অনুরক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। সভায় বিভিন্ন গ্রাম হইতে আপন আপন সমাজের প্রতিনিধি উপস্থিত করিবার ভার তাহারাই লইল। সভা হইবার দিন দশেক বিল ছিল। এ কয়টি দিন অন্য একটি কাজ করিবার ইচ্ছা করিয়া অনাদি তাহার থিয়েটার পার্টির সঙ্গীদিগকে ডাকিয়া পাঠাইল। তাহারা আসিলে সকলের পরামর্শে স্থির হইল যে আগামী রবিবার ‘কীচক সংহার' নামক পঞ্চাঙ্ক নাটক অভিনয় করা হইবে। পৌরাণিক নাটকের কথা শুনিলে বিস্তর বিধবার সমাগম হইবে এবং অভিনয় আরম্ভের পুর্বে অনাদি বিধবাদিগকে উদ্দেশ করিয়া বক্তৃতা দিবে। সঙ্কল্প স্থির হইল এবং সেই সঙ্গে কীচক সংহার’ নাটকের মহলা আরম্ভ হইয়া গেল। এই নাটকটির মহলা থিয়েটার পার্টির পূর্বেই দেওয়া ছিল, কেবল মাত্র যে শয্যাটিতে বসিয়া কীচক দ্রৌপদীকে প্রেম সম্ভাষণ করিবেন সেই শয্যাটি তাহাদের জুটিতেছিল না। অনাদির ঘরে অনেকগুলি গিন্দা বালিশ ও কার্পেট ছিল, সেইগুলি দেখিয়া কর্মকর্তাদের মনে বহুদিনের অভীপ্সিত এই নাটকটির অভিনয় করিবার আকাঙ্কা জাগিয়া উঠিয়াছিল। কয়দিন ধরিয়া সেন্সসের সংক্ষিপ্তসার ও বিচিত্র সাময়িক পত্র হইতে বালার বিধবা ও পাত্রী অভাবে অবিবাহিত যুবকের সংখ্যা ও দেহ এবং মস্তিষ্কের উপর ক্রমাগত নিরামিষ তােজনের ফল সম্বন্ধে বৈদেশিক স্বাস্থ্য ও সমাজতত্ত্ববিদ পণ্ডিতগণের মতামত সংগ্রহ করিয়া লে একটি একাণ্ড ৰকৃতা খাড়া করিল।

সন্ধ্যায় থিয়েটার আরম্ভ হইবার কথা; কিন্তু তখনও হাট ভাঙ্গে নাই বলিয়া শােতৃসমাগম আরম্ভ হইতে বিলম্ব হইল। রাত্রি এগারােটার সময় মহিলাদের নির্দিষ্ট আসন ভর্তি হইয়া গেল। পুরুষেরা পূর্বেই আসিয়াছিলেন। রঙ্গমঞ্চে যবনিকার অন্তরালে বেহালা পিড়িং পিড়িং করিয়া গলা সাধিয়া রাগিণী আলাপের জন্য প্রস্তুত হইতেছিল। এমন সময় করতালি ধ্বনিতে শ্রোতৃবর্গ সচকিত হইয়া উঠিলেন। অনাদি আসিয়া মঞ্চের উপর দাড়াইল। বক্তৃতা পাঠের সময় শ্রোতৃগণের মধ্যে মৃদুস্বরে যে সমালােচনা হইতেছিল অনাদি তাহাতে কাণ দেয় নাই। মাঝে মাঝে দুই চারিটা বয়াটে ছেলের ‘অর্ডার’ ‘অর্ডার’ চীৎকার শুনিতে পাইতে ছিল মাত্র ; কিন্তু ঘণ্টা খানেক পর বক্তৃতা যখন শেষ হইল, তখন অনাদি দেখিল সাজঘরে দারুণ গােলযােগ শুরু হইয়া গিয়াছে। একজন ভদ্রলােক থিয়েটারের উদ্যোগী একটি যুবকের সম্মুখে গড়াইয়া বলিতেছিলেন, “যত সব নচ্ছার বয়াটের দল! ভদ্র লােকের মেয়েদের ডেকে এনে অপমান করা। যুবক প্রত্যুত্তরে ততােধিক রূঢ় ভাষায় একটা জবাব দিল। ক্রমে কমে আসন ছাড়িয়া আরও অন দুই খােতা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। উভয় পক্ষেই অপূৰ্ব চলিত ভাষায় উত্তর প্রত্যুত্তর চলিতে লাগিল। এই সময়ে বক্তৃতার কাগজ বগলে করিয়া অনাদিচরণ আলিয়া ভাইল।

বিলােচন কবিরাজ তাহাকে দেখিবামাত্র চারিদিক হইতে যে ধরণের বাক্যের স্রোত বহিতে সুরু করিল তাহাতে যে কোনও মানুষের ধৈৰ্য্য টলিতে পারিত কিন্তু সমাজ-সংস্কারক অনাদিচরণ টলিল না, কিন্তু সে বিম্বিত হইল। তাহার অপূর্ব বক্তৃতাটির পরিণাম ফল এইরূপ হইবে সে তাহা ভাবিতে পারে নাই। ক্রমে একতরফা গালাগালি নিঃশেষ হইয়া গেল তথাপি অনাদি বলিবার মত একটি কথাও খুঁজিয়া পাইল না। এমন সময় একটি অতি কৃষ্ণবর্ণ বালক আসিয়া অনাদির হাত টানিয়া ধরিয়া কহিল, “ডাকছে তােমাকে কে ডাকিতেছে তাহা জিজ্ঞাসা না করিয়া অনাদি বাহিরেআসিল। সজাগৃহের পিছনে একটি তেঁতুল গাছ অনেকখানি ছায়া বিস্তার করিয়াছিল। সেখানে অনাদির প্রতীক্ষায় যে স্ত্রীমূর্তি দাঁড়াইয়া ছিল সে ভূমিষ্ঠ হইয়া অনাদিকে প্রণাম করিয়া অনাদিকে প্রণাম করিয়া কহিল-“পেরণাম বাবাঠাকুর! আমার একটা গতি করে দিতে হবে। কি গতি করিতে হইবে তাহা বুঝিতে না পারিয়া অনাদি কহিল, “আমার সাধ্যে হলে হবে।” স্ত্রীলােকটি কহিল—“সে আপনার খুব সাধ্যি আছে বাবাঠাকুর। আমার আবাগী মেয়েটাকে তাতে হবে। আট বছরে রাড়ী হয়ে সে এই উনিশে পড়েছে বাবাঠাকুর! খাওয়াতে আর পারিনে যদি কেউ নেয় তবে অনাদি সমস্ত কথা বুঝিয়া লইল। তাহার বক্তৃতাটি যে একেবারে নিরুল হয় নাই দেখিয়া আনন্দও হইল। কহিল, “লে হবে। কাল আমার অবসর মত যেও সব ঠিক করে দেব। ৮৪ সংস্কারক কি এখানে হবে। জানা ভাল ছেলে আছে যে বিধবা বিয়ে কৰ্তে চায়?” স্ত্রীলােকটি কহিল, “এখানে বিয়ে কে কৰ্বে বাবাঠাকুর? ভটচাজ ঠাকুর বলে বিধবা বিয়ে করে হয় মুসলমান নয় খেরেস্তান। হিন্দুর মধ্যে কল্পে মহাপাতক। অনাদি বিপের হাসি হাসিয়া তারপর কহিল, “যেও তুমি দে।” স্ত্রীলােকটি প্রণাম করিয়া চলিয়া গেল। অনাদি ঘরে ফিরিল। ইতিমধ্যে সমাজরক্ষকদের ক্রোধ গিয়া পড়িল অভিনেতাদের উপর ; যে ছেলেটির উত্তরা সাজিবার কথা ছিল তাহার কর্ণ আকর্ষণপূর্বক বকসী মহাশয় লইয়া গেলেন; অভিমন্যু তাহার মাতুলের রক্তচক্ষু দেখিয়া ইতিপূৰ্বেই পলায়ন করিয়াছিল। কাজেই রাত দুইটায় থিয়েটার আরম্ভ হইয়া তিনটায় ভাঙ্গিয়া গেল। পরদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে অনাদিচরণের সংস্কার চেষ্টার প্রথম ফল ক্ষেমঙ্করীকে লইয়া গত রাত্রির সেই স্ত্রীলােকটি আসিয়া উপস্থিত হইল, কথায় কথায় অনাদি তাহাদের সমস্ত অবস্থা জানিয়া লইল। মেয়েটি অল্প বয়সে বিধবা হইয়া এতদিন কাটাইয়াছে, এখন মায়ের ইচ্ছা তাহাকে সংসারী করে। অনাদি সমস্ত শুনিয়া কহিল, আমি যেদিন ফিরব সেদিন তুমি তােমার মেয়েকে নিয়ে আমার ৮৫ প বিলােচন কবিরাজ লতে যাবে। এখন চুপচাপ থাক, গ্রামটা সুবিধে নয়। জানাজানি হলে কিছু করতে পারবে না।” মাতা ও কন্যা চলিয়া গেল। ইতিমধ্যে অনাদির চরগণ বিরাট জাতীয় সভার জন্য শ্রোতৃ সংগ্রহ করিয়া বেড়াইতেছিল। অনাদি এবার সংহিতা-সাগর মন্থন করিয়া শ্লোক উদ্ধার করিতে ব্যস্ত ছিল। উনবিংশ সংহিতাকারের সহিত পরিচয় সমাপ্ত হইবার পূর্বে হঠাৎ একদিন প্রাতঃকালে আদালতের এক চাপবাশী আসিয়া অনাদির হাতে একখানি শমন দিল। অনাদি দেখিল সাক্ষীর শমনু। হঠাৎ সে কেমন করিয়া সাক্ষী হইল, তাহা যে বুঝিল না। শমনখানি হাতে করিয়া একেবারে ঘােষাল মহাশয়ের বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইল। ঘােষাল মহাশয় আদ্যোপান্ত দেখিয়া কহিলেন, “এটা আর শক্ত কি? বলবে যে এটা পােদারের সীমানার মধ্যে নয়।” “ওটা কি?” অনাদি প্রশ্ন করিল। ঘােষাল মহাশয় বুঝাইয়া দিলেন যে “দীনু পােদার একটা কাটাল গাছের কাটাল পাড়িতে যাওয়ায় বসীদের বড়বাবু আপত্তি করেন। তাহাতেই এই মামলার উৎপত্তি। বক্সী মহাশয় তাঁহাকে সাক্ষী মানিয়াছেন।” অনাদি অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া কহিল, “আমি এসবের কি জানি ? আর অনর্থক আমাকে হয়রাণ করা। আমি এদের ভাল কণ্ঠে এসেছিলাম এরা দেখছি ঘােষাল কহিলেন, “হয়রাণ কিসের বাবাজী ? মহকুমা এখান থেকে ছ’ক্রোশ দূর বৈ ত নয়। আর ভাল কথা আগেই শুনবে লােকে? আগে দুটো চারটে সাক্ষী দেও, দুচার নম্বর মামলা কর। তবে ত গাঁয়ের লােক ভাববে তুমি গাঁয়ের একজন।” অনাদি জবাব না দিয়া ফিরিয়া আসিল। থিয়েটারের বন্ধুগণ শমন দেখিয়া সত্য কথা কহিল। অন্যদিকে সাক্ষী মানিয়া হয়বাণ করিবার যুক্তি সেদিন দক্ষিণপাড়ার চণ্ডীমণ্ডপে হইতেছিল। তাহা তাহাদের মধ্যে একজন কর্ণে শুনিয়াছে। অনাদি শুনিয়া ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিল; কহিল, “আচ্ছা আগে জেলে ছুতােরগুলােকে একজোট করে দিই। তার পর বুঝব।” মহা উৎসাহে অনাদি সংকল্পিত কাজে লাগিয়া গেল। ভদ্রলােক ব্যতীত আর সর্বশ্রেণীর লোেক অনাদির অনুগত হইয়া পড়িল। সভাস্থল প্রায় পবিষ্কার হইয়া গিয়াছে। কাল মহাস হইবে, বিভিন্ন গ্রাম হইতে নৌকায় ও পদব্রজে পােক আসিতে সুরু করিল। অনাদি তাহার চরদের কর্মতৎপরতায় বিস্মিত হইল। সে এতখানি আশা করে নাই। চরদের প্রধান সেই সূত্রধর যুবকটিকে ডাকিয়া সে কহিল, “তুমি খুব কাজের লােক। তুমি প্রচার কাজ চালাতে থাকবে। আমি কলকাতা থেকে মাস মাস তােমার খরচ পাঠাব। সে একগাল হাসিয়া কহিল-“এই লােকগুলাকে কেমন করে যে এনেছি তা জানেন বিশকরম। কেউ কি আসতে চায় ? বলে, ওতে কি হবে? তারপর যেই বলেছি, কলকাতার এক পণ্ডিত ভাগবত পড়বেন, অমনি সবাই রাজী হল। এখন আপনি যা পারেন করে নেন। সামাজিক উন্নতির জন্য কেহ আসিতে চায় না, অথচ ভাগবত শনিবার কষ্ট নিরাপত্তিতে সকলেই আসে শুনিয়া অনাদি আশ্চৰ্য্য হইল সামাজিক উন্নতিটা যে কত বড় প্রয়ােজন তাহা এবার ভালাে করি ৭ ত্রিলােচন কবিরাজ এই সব অজ্ঞ, মূর্খ, অসহায়দের বুঝাইতে হইবে, এই কথা মনে সে স্থির করিয়া রাখিল। পরদিন অবনত জাতিদের বিরাট সভা বসিল। গ্রামের ভলােক সকলেই কৌতুহলী হইয়া সভা দেখিতে আসিয়াছিলেন। অনাদি সাজ পােষাক করিতে বাড়ী গিয়াছিলেন। এমন সময় গ্রামের পণ্ডিত মাধব ভট্টাচাৰ্য মহাশয় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহাকে দেখিয়াই গ্রামের জেলেদের মণ্ডল নিতাইচাদ সসম্ভ্রমে উঠিয়া আসিয়া গললগ্ন- অঞ্চল হইয়া প্রণাম করিল। পণ্ডিত মহাশয় বিদ্রুপের হাসি হাসিয়া কহিলেন, “কি মণ্ডলের পাে! বামুন হতে যাচ্ছ বুঝি?* দাঁতে জিব, কাটিয়া নিতাইাদ কহিল, “সর্বনাশ! এসব কি কথা?” পণ্ডিত মহাশয় কহিলেন, “তবে এসব বেহ্মজ্ঞানী দলে মিশছ কেন?” বেহ্মজ্ঞানী কথাটি শুনিয়া নিতাইচাদের মুখ শুকাইয়া গেল। কহিল, “আজ্ঞে বাবাঠাকুব, অপরাধ নিবেন না, ওই চ্যাংড়াগুলাের কাণ্ড সব।” এই বলিয়া কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমাভিক্ষা করিয়া নিতাইচাদ আসিয়া বসিল। আধ ঘণ্টা পর অনাদি আসিল। তাহার মাথায় সিবে গেরুয়া পাগড়ী, পরণে গেরুয়া আলখাল্লা, বুকের উপর লাল রজের কাপড়ের ফুল তাহার মধ্যে সাদা সুতার হরপে লেখা, “তাে ধর্ম তাে জয়ঃ।” তাহাকে দেখিয়া তাহার ভক্ত চরগণ জয়ধ্বনি করিয়া উঠিল—“বন্দে মাতরম্”। এ শব্দটি সকলের বলা অভ্যাস ছিল না, কাজেই অনসঙ্গম নীরব হইয়া রহিল। তথন উৎসাহী সূত্রধর যুবকটি কহিল “বল ভাই সব কথা ফুরাইতে না ফুরাইতে সমবেত জনমণ্ডলী A ৮৮ সমস্বরে চীৎকার করিয়া কহিল রাধাকৃষ্ণামতে হরিধবনি বল, বা হরি হরি বােল। তখন অনাদি দিস্তা তিনেক কাগজ বাহির করিয়া শ্রোতৃবর্গকে বুঝাইতে লাগিল, উত্তেজনার মুখে কত কি বলিয়া গেল। অবনত জাতিদের উন্নতি করা দরকার, ব্রাহ্মণের জন্য জাতির এই অপােগতি, শাস্ত্রকারদের অবিচার ইত্যাদি। যাহারা ভাগবত নিতে আসিয়াছিল তাহারা ধৈৰ্য্য হারাইল। দুই একজন উঠিয়া গেল। অপর সকলে গল্প জুড়িয়া দিল। ঘণ্টা দুইয়ের পর বক্তৃতা সমাপ্ত করিয়া অনাদি চেয়ারে বসিয়া কহিল । “আমার যা বলার বল্লাম, এখন উন্নতি করা তােমাদের হাত। উন্নতি হলে ছােট বড় মানলে চলবেনা, জল চল সকলের করতে হবে। এ বাধাটা দূর করতেই হবে।” সভামধ্য হইতে একজন কহিল, ‘এজ্ঞে ভদ্র বাবুরা বামুন ঠাকুরের যদি খান তবে আমরা খাব।” তখন চেয়ারের উপর দাড়াইয়া অনাদি কহিল, “শােন ভাই সব, আমি ব্রাহ্মণ আমি যা কৰ্ব তাই করবে ?” অনাদির অনুচরের সমম্বরে কহিল, “হা।” আয়ােজন পূর্বেই করা ছিল। অনাদি কহিল “জল দাও লােচন। লােচন নামক বাগী বালকটি উঠিয়া আসিয়া জলের ঘটা অনাদির হাতে দিল,অনাদি এক নিঃশ্বাসে জলটুকু নিঃশেষ করিয়া কহিল, *যে আমাকে জল দিল সে যেতে বাগী, আমি পথ দেখালাম, এখন তােমরা এস।” মুহুর্ত মধ্যে সভাস্থল বঙ্গস্থলে পরিণত হইল। পশ্চাৎ হইতে ভট্টাচাৰ্য মহাশয় চীৎকার করিয়া উঠিলেন, “চ্ছে, খৃষ্টান।

ত্রিলােচন কবিরাজ সস্থল হইতে অনেকগুলি কওঁ সমস্বরে কহিল, “স্ফাকি দিয়ে মারা। খেরেস্তান, বেহ্মজ্ঞানী।” অনাদি তাহাদিগকে বুঝাইবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়া বাহির হইয়া আসিল। তাহার মাথার মধ্যে তখন আগুনের হল্কা ছুটিতেছিল। সঙ্কল্প ভঙ্গে হতাশ হইয়া একেবারে সে গৃহে আসিয়া উপস্থিত হইল। ইহার পর সভায় কি হইল জানিবার প্রবৃত্তি রহিল না। কিন্তু সন্ধ্যার সময় রক্তাক্ত কলেবরে বাগী ছেলে লােচন আসিয়া সানেত্রে তাহার সম্মুখে দাড়াইল এবং অন্যদিকে জল দিবার অপরাধে খড়ম, জুতা ও লাঠির দ্বারা যতগুলি শান্তি সে পাইয়াছে তাহা দেখাইয়া সে কঁদিতে লাগিল। অনাদি তাহাকে পাঁচটি টাকা দিয়া বিদায় করিয়া তাহার পুথি পত্র গােছাইবার কাজে বসিল। তাহার এত পরিশ্রম আয়ােজন চেষ্টা, এমন উদার সঙ্কল্প সমস্তই লােচন বাগীর এক ঘটি জলে ভাসাইয়া দিয়া পরদিন অনাদি গ্রাম ত্যাগ করিল। অনাদির পালী যখন পূর্বপাড়ার বাকে গিয়া পৌছিয়াছে তখন হঠাৎ কাহার কণ্ঠস্বর শুনিয়া বাহিরে আসিয়া দেখিল, একটি পুটুলি হাতে ক্ষেমঙ্করী ও সঙ্গে তাহার মাতা দাড়াইয়া। ক্ষেমঙ্করীর মাতা কহিল, আমাদের ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন বাবাঠাকুর। অনাদি কহিল, “এর পর বার এসে নিয়ে যাব।” *আপনার কথায় সব মাটির দামে বেচে দিয়ে মাতার কথায় বাধা দিয়া ক্ষেমঙ্করী কহিল,—“জানিনি মা গাছে তুলে মই কেড়ে নেওয়া,এত দেখুলি তবু শিক্ষা হল না ?” অনাদি এই কুৎসিত পরিহাসটি শুনিয়া অবাক হইয়া গেল। মুহূর্তেই পাণীর ভিতর বসিয়া মাঝিকে বলিল, “ছাড় নৌকা।”

তীরের তীব্ৰস্বর কথা শুনিতে আর কান দিল না। নৌকা কিছু দুর
অগ্রসর হইলে অনাদি বাহিরে আসিয়া মাঝিকে প্রশ্ন করিল,
মেয়েটিকে জান?”
মাঝি একটু মৃদু হাসিয়া কহিল, “বাবু জানেন না? ও ভটচাজ
মহাশয়ের বেটি।
অনাদি অাশ্চৰ্য্য হইয়া কহিল, “কি রকম?
-“ওর মা ভটচাজ মশায়ের বাড়ীতে দাসী খাত। জাতে বাণী।
অনাদি চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। অনাদি আজ কাল মাষ্টারি
করে-তবে সমাজ সংস্কার করিবার ঝোক এখনও যায় নাই, এই অঙ্গ
প্রতি রবিবার গােলদীঘি নচেৎ হেদোর ধারে তাহাকে বক্তৃতা করিতে
দেখা যায়।
প্রচারক অভাবে তাহাদের সমিতিটি উঠিয়া গেছে।

No text on this page.

একটি আধুনিক গল্প সম্পাদক মহাশয় আসিয়া একটি বিনীত নমস্কার সহকারে কহিলেন, "একটা লেখা আবশ্যক।” জিজ্ঞাসা করিলাম, “হেতু ?” “আমার পত্রিকার জন্য। দেরী কর্নার উপায় নেই, কাল থেকেই ছাপা শুরু হবে। একটা গল্প চাই, অভাবে একটা রস রচনা, সেই সঙ্গে সম্ভব হলে একটা কবিতা, নিতান্ত না পারলে আপনার উপন্যাসখানির প্রথম অংশ—দুটি পরিচ্ছেদ। তারপর মাসে মাসে দু’ তিন পরিচ্ছেদ ছেপে দেব। কপি দিন।” সম্পাদক মহাশয় চেয়ারে বসিয়াই কপি দেখিবার জন্য গায়ের চাদরে চশমা জোড়া মুছিতে লাগিলেন। সভয়ে তাহার দিকে চাহিয়া কহিলাম, ‘কাল হলে হয় না?” সম্পাদক কহিলেন, “না। এক্ষুণি ! বরং আমি বসছি, আপনি কিছু জল খাবার আর চা আনিয়ে দিন। আমি বৈঠকখানায় খবরের কাগজটা দেখি গে।” সম্পাদক মহাশয় বাহির হইয়া যাইতেছিলেন, ডাকিয়া কহিলাম, *এত তাড়াতাড়ি কি লিখব ? কিছুই তাে আসছে না মাথায়।” সম্পাদক বারান্দা হইতে ধিক্কার দিলেন, “কী আপনারা! নকুল বাবু তিন ঘণ্টায় একটা গল্প লেখেন, মন্তু বাবু চার গল্প একসঙ্গে ফেলে নিয়ে চার প্রহরে চাৰুটে শেষ করে ফেলেন, দাখ বােস বায়স্কোপ দেখে ত্রিলােচন কবিরাজ ফিরে এসেই-গল্প লিখুতে কি লাগে ? সেকেলে ধরণে লিখতে অবিশ্যি চার দিন লাগতে পারে কিন্তু আধুনিক গল্প লিখৃতে গােটা দুই চুরুট আর দু পেয়ালা চা শেষ কর্তে যে সময়টুকু দরকার তার চেয়ে বেশী সময় লাগে না।” অত্যন্ত ম্রিয়মাণ হইয়া কহিলাম, “প্লট ? “প্লট কিসের ? জগৎ জোড়াই তাে প্লট ছড়িয়ে রয়েছে, আপনার সঙ্গে আমি কথা বলছি—প্লট। চাকর খাবার আনতে গিয়ে ময়রার সঙ্গে দপ্তরী নিয়ে মারামারি কচ্ছে-প্লট। আপনার মাথায় গল্প আসছে না—প্লট। গল্প মাথায় আসছে না এই নিয়েই ফেলুন না একটা গল্প লিখে। প্লট ভাবতেই যদি দিন গেল তবে গল্প লিখবেন কখন? গল্প মাথায় আসছে না-মাথা চুলকাচ্চেন—মন ভারাক্রান্ত, মাখা টন্ টন্ কৰ্দে-কাগজের উপর ছবি আঁকছেন—অত্যন্ত ব্যাকুল প্রত্যাশায় বিরহিণী বধুর মত ষ্টেশনের পথের দিকে চেয়ে- কহিলাম, “চুপ করুন!” “ওঃ! তাই তাে আপনার আবার স্ত্রীলােক-ঘটিত উপমায় আপতি! মনে ছিল না। sorry। তবে লিখুন-কলেজের ছেলের মত ইংরেজী মাসের তেসরা তারিখে পৈত্রিক মণিঅর্ডারের প্রত্যাশায় পথের দিকে চেয়ে—কী করুণ সে চাওয়া। এই সময় সম্পাদক মহাশয়ের চা এবং জলখাবার আসিল। তিনি কহিলেন, “এই যে চা আর জলখাবার, এই নিয়েই তাে একটা এক ফৰ্মা গল্প কেঁদে দেওয়া যায়। এ যদি আপনার বাবুরাম না নিয়ে এলে, আসতে কোনও তন্বী গৌরাঙ্গী- ১৪ একটি আধুনিক গল্প বুঝিলাম সম্পাদকের মগজে মলয় বাতাস ঘূর্ণীবাত্যার সৃষ্টি করিয়াছে। কহিলামও সব কথা রাখুন। কোনও প্লট মাথায় থাকে বলে যান লিখে দিচ্ছি।” “বল্লুম তাে-প্লট করে নিন, যা ঘটছে সব প্লট। লিখে গেলেই হবে গল্প। আপনি তাে ট্রামে আর বাসেই দিন কাটান ; যে কোনও দিনের একটা টিপের কথা লিখে গেলেই শেষে দেখবেন গয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তাই হবে খাঁটি গল্প—স্বচ্ছ, সহজ।” চট করিয়া মাথায় বিদ্যুতের মত একটা উপায় ঝলকিয়া উঠিল, কহিলাম—“বেশ, বাইরে বসুন। যে কোনও দিনের একটা টিপের কাহিনী স্বচ্ছ সহজ সরল করে—লিখে যাচ্ছি। সম্পাদক মহাশয় কথা কহিতে • পারিলেন না। সিঙ্গাড়ার আভ্যন্তরীণ একটা আলুর খােসা দেশলাইয়ের কাঠির সাহায্য পাতের ফাক হইতে বাহির করিবার চেষ্টা করিতে করিতে বাহির হইয়া গেলেন। কবে কোথায় গিয়াছিলাম ভাবিতে লাগিলাম। কাল বাবু ঘাট, পর ‘শনিবারের চিঠি ‘আনন্দ বাজার—কোনও প্লট পাইতেছি না। বুধবারে ? বুধবারে শ্যামবাজারে অকারণ যাত্রা। অকারণ যাত্রার কাহিনীটা লিখলেই স্বচ্ছ সহজ যাহা কিছু একটা হইতে পারে। কাগজের প্যাড় লইলাম! বৈঠকখানা হইতে সম্পা মহাশয় হকিলেন, “আধুনিক ধরণের কৰ্বেন, আর ফৰ্ম্মা দেড়েকের বেশী না, হয় যেন। আর একটু করুণ, একটু হাস্যরস কহিলাম, না। আপনি চুপ করুন। দরকার হয় আর এক

ত্রিলােচন কবিরাজ
পেয়ালা চা আনিয়ে নিন নৈলে বায়স্কোপের বইয়ের ছবি দেখুন।
আমি লেখা শুরু কচ্ছি। বুধবারের টিপের কথাটাই লিখছি।”
লিখিলাম—
শ্যামবাজারের মােড়-রৌদ্রস্নাত ইন্দ্রলােকের মত দেখতে। বাড়ীতে
ভালাে লাগছিল না বলে বেরিয়েছিলুম, বাইরে ভালাে লাগছেনা বলে
ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে। লাল রংয়ের বাস একখানা ছােট।
ভিতরে বােঝাই হয়ে গেছে, জন তেরাে যাত্রী—না তেরাে নয় চোদ্দ,
বসে তের জন, একজন এক কোণে দাঁড়িয়ে। ড্রাইভারের পাশে
বসলুম। ভিতরের যাত্রীদের কথায় বুঝলুম সকলেই অত্যন্ত শশাকার্ত।
একজন বললেন-“কিন্তু বড় অকস্মাৎ।”
দ্বিতীয়—আমি তাে অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে পড়েছি। তাঁর সেই যে
বইটা-“আলু পটোল”-
তৃতীয়-আলু পটোল” নয় “ধূলিপটল”।—যাতে বিধবা বিষ্ণু
কাৎলা মাছের দিকে চেয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলছে
চতুর্থ—কিন্তু কি আশ্চৰ্য্য কবিতা।
পঞ্চম-আর গান ?
যষ্ঠ-গল্প ? কি চমৎকার করুণ
সপ্তম—আর সেই একাঙ্ক নাটক দুটো
অষ্টম—কি অদ্ভুত চরিত্র মিনি বােসের
নবম-আর তার বাবার
দশম-বেঁচে থাকলে গজানন বাবু গলসওয়ার্দির মত

একটি আধুনিক গল্প একাদশ-বাঙ্গলার দুর্ভাগ্য- দ্বাদশ—ওর আছেন কে? এয়ােদশ-পাছেন স্ত্রী। আর সে স্ত্রী কি স্ত্রী। সরস্বতী, তাঁর হেয়াচ লেগেই তাে গজানন বাবুর প্রতিভার উন্মেষ প্রথম। কি রকম? দ্বিতীয়। জানেন আপনি ? এয়ােদশ। জানিনে ? তার বিয়েতে আত্মীয় স্বজন কেউ এলােনা। তখন তিনি এসে বল্লেন, পাচু বাবু যেতে হবেই আপনাকে! তার আগ্রহ তৃতীয়—তার আগ্রহের কতক পরিচয় পেয়েছি আমি তার ছেলের অন্নপ্রাশনে। আমার জর, খাবনা, বাড়ীতে শুয়ে আছি। সন্ধ্যাকালে দরজায় মটরের ভেপু বেজে উঠল। লেপের তল থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দেখি গজানন বাবু নিজেই এসে উপস্থিত। চতুর্থ। অমন উদার মানুষ হয় না! মবার আগের দিনও আমাকে বলেন যে তার শ্বশুরের শ্রয়ে আমাকে দেতে শুনতে দ্বিতীয়—ছেলে শ্বশুরের কথা রাখুন না মশাই! স্ত্রীর কথা বলুন পাঁচু বাবু-কি রকম সরস্বতী ? যােদশ। অনেক কথা সে, শুনবেন? আচ্ছা বিড়ি দিন একটা। থ্যাঙ্কস। আমি তখন ম্যাকেঞ্জী লায়ালের ওখানে-Show room দ্বিতীয়-তার সঙ্গে সম্পর্ক কি?

ত্রিলােচন কবিরাজ ? এয়ােদশ। আছে শুনুন। নম্বর লাগাচ্ছি একদিন নীলামী কতক গুলাে ফার্ণিচারে, এমন সময় একটি ভদ্রলােক এসে বললেন, মশাই আবলুসের Book Case হবে একটা ? ছিল। বন্ধুম হবে। ভদ্রলােক দাম জানতে চাইলেন। বন্ধুম, নীলাম ডেকে নিলে কত উঠবে জানিনে, এখন নিলে একশ। ভদ্রলােক Book Caseটা দেখলেন তার পর মিনিট পাঁচেক ধরে তাতে হাত বুলিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বল্লেন, পছন্দ খুবই হয়—কিন্তু টাকায় কুলােবে না। আমার বড় দুঃখ হল। বন্ধুম, আচ্ছা টাকা যােগাড় করুন আপনি, ওটার ডাক আমি Stay করে রাখব’খন। ভদ্রলােক আমার দুটি হাত ধরে বল্লেন, রাবেন দাদা--ওটি নৈলে আমার চলবে না। দ্বিতীয়। Book Caseএর সঙ্গে স্ত্রীর সম্বন্ধ ? ত্রয়ােদশ। সমস্ত Caseএর সঙ্গেই স্ত্রীর সম্বন্ধ আছে মুটুবাবু, থামুন বলছি। পরদিন আবার তিনি এলেন, অনেকক্ষণ Book Caseটার গায়ে ঘুমন্ত নববধূব গায়ে নববর যেমন হাত বুলােয় তেমনি হাত বুলিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে চলে গেলেন। এমনি করে তিনটি দিন পর পর। একদিন আমি জিজ্ঞেস করলুম, আচ্ছা, এরকম করেন কেন আপনি বলুন তাে? নাম কি আপনার ? বল্লেন—গজানন চাটুষ্যে। কেন এ রকম করি শুনবেন? যাবেন আমার সঙ্গে ? সে দিন হাতে কাজ ছিলনা, বেরিয়ে পড়লুম। গরাণহাটায় গিয়ে উপস্থিত। বাড়ীখানা ভদ্রলােকের নয়। উপরে গেলুম। উঃ সে কি অদ্ভুত রূপ! সতের আঠারাে বছরের একটি মেয়ে বই পড়ছিল, ১৮ একটি আধুনিক গল্প তাড়াতাড়ি বইখানা ফেলে দিয়ে আমার সামনেই গজাননের গলা জড়িয়ে ধরে বললে—“আজ এনেছ?” গজানন মুখ নীচু করে বললে, পারিনি।” মেয়েটা অমনি গজাননের কাছ থেকে সরে এসে বিছানায় পড়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে সুরু করে দিলে। গজানন চোখের জল মুছে আমাকে বললেন, দেখছেন ? সব শুনলুম। মেয়েটা কীৰ্ত্তনওয়ালী বিধুমুখীর। গজানন মাষ্টার, বিনি পয়সায় পড়ান। উভয়ের গভীর প্রেম। মেয়েটির আবদার, একটা আবলুস কাঠের Book Case! গজানন গজানন সেই জন্যেই ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন, আর সে কী ব্যাকুলতা! দ্বিতীয়। সে ব্যাকুলতা থাক, এখন তার পর বলুন- ত্রয়ােদশ। বল্লুম আমি, ভয় নেই আপনার, আমি ব্যবস্থা করে দেব। কাল আসবেন। পরদিন এলেন গজানন, মুখে তার প্রত্যাশার দীপ্তি! কী- দ্বিতীয়। আরে থাক্ মশাই-আসল কথাটা বলুন না। ব্রয়ােদশ-—বলছি। টিকিট বলে সাড়ে সাতাশ টাকায় Book Case দিয়ে দিলুম গজাননকে। গজানন আমার পায়ে হাত দিয়ে দ্বিতীয়। বামুনকে পায়ে হাত দিতে দিলেন আপনি? ৰয়ােদশ। কৃতজ্ঞতা, স্রেফ, কৃতজ্ঞতা ! তার কাছে জাত বিচার নেই। যা Book Case নিয়ে গেলেন গজানন। সন্ধ্যায় গেলুম গরাণহাটায়। বরাবর উপরে উঠে দেখি Book Caseটার উপর মাথা রেখে মুখখামুখী গজানন আর সেই মেয়েটা-ইন্দুমুখী বলে, চোখে তাদের প্রগাঢ় প্রণয়ের নিগুঢ় ঘুম

মিলােন কবিরাজ
বিতীয়-হল কি বলুন না পাঁচুবাবু।
অােদশ। যা হয় এবং হওয়া উচিত-গজানন চাটুয্যে আর
ইমুখীর বিয়ে। আর কেউ গেল না, আমিই বরকর্তা হয়ে গেলুম।
দ্বিতীয়। বিধুমুখীর মেয়ের সঙ্গে বে হ’ল—তাহলে আবার
তরের শ্রদ্ধের কথা বললেন যে হারুবাবু?
চতুর্থ। মশাই, আপনার কাছে কিছু বলবার যাে নেই—কেবল
বেরা, কেবল জেরা।
মেয়ের বে হবার পরই বিধুমুখী ‘কলা মন্দির’ থিয়েটারের এ্যাক্টার
গােবিন্দ মহান্তির সঙ্গে মালা চন্দন কল্লেন! সে গােবিন্দ মহাল্কি মারা
গেছেন আজ দিন সাতেক।
দ্বিতীয়। তার পর পাঁচুবাবু।
ব্রয়ােদশ। তার পর থেকেই গজানন বাবুব লেখা বেরুতে সুরু
কল্প-উঃ কি সে লেখা। গল্প, কবিতা, উপন্যাস। উপন্যাস, কবিতা,
গল্প! আর ইন্দুমুখী দিনরাত দেখছে প্রুফ,আহার নেই, নিদ্রা নেই
-সেই আবলুস কাঠের Book Gaseটার সামনে বসে-
প্রথম। বৈঠকখানার দক্ষিণ দিকের কোণটায় যে Book
Casedi?
দ্বিতীয়। না, মাঝখানে।
তৃতীয়। ঠিক মাঝখানে বলা যায় না—একটু কোণের দিকে
এয়ােদশ। যেখানেই হােক, Book Caseটা থেকেই সব হল—
এই Book Case থেকেই মিলন, লেখা, সব কিছু
এমন সময়ে একটি গম্ভীর কণ্ঠস্বব শুনে মুখ ফেরালেম। দেখি,

একটি আধুনিক গল্প যিনি বাসের একটি কোণে জানালায় হেলান দিয়ে দাড়িয়ে ছিলেন, তিনি বলছেন—সবই বললেন আপনারা, কিন্তু শেষ রক্ষা কতে পাবেন না। Book Caseটা থেকেই সব হ’ল, কারণ তারই নীচের একটা লুকোনাে ড্রয়ারে ছিল অনেকগুলাে manuscript-গজানন বাবু ক্রমাগত নিজের নামে তাই ছেপে যেতে লাগলেন তেবােটি যাত্রী সমস্বরে চীৎকার কবে উঠলেন-বাজে কথা! অপমান কচ্ছেন আপনি গজানন বাবুকে! লায়ার! ভদ্রলােকটি বিচলিত না হয়ে বললেন—না, কথা সত্যি।-গজানন বাবু নিজে বলেছেন আজ যাত্রীদল। ষ্টুপিড় ! কাল মারা গেছেন তিনি। ভদ্রলােকটি বললেন—যিনি মারা গেলেন তিনি গজানন গাঙ্গুলী এটর্ণী, ‘আয়ুর্বেদীয় মতে গাে চিকিৎসা যিনি লিখেছেন- যাত্রীদল। কিছু জানেন না তা হলে আপনি! ভদ্রলােকটি একটি মৃদুহাস্য সহকারে বললেন—জানি। যেহেতু গজানন বাবুব যে বইটাতে বিধবা বিনু কাৎলা মাছের দিকে চেয়ে আছে সেই বইটা আলু-পটোল কিংবা ‘ধূলি পটল’ নয়, তার নাম ‘জটামুকুট’, তিনি আবলুস কাঠের Book Case কোনােদিন চোখে দেখেন নি এবং গরাণহাটায় বিধুমুখী কীৰ্ত্তনওয়ালীর মেয়েকে বিয়ে করেন নি—বিয়ে করেছেন ভাটপাড়ার নরহরি শিরােমণির প্রথমা কন্যা দাঙ্গায়ণীকে। তিনি শেয়ালদার মালগুলামে কাজ করেন এবং এখনই নেমে যাচ্ছেন। আমার নাম গজানন চাটুয্যে এবং আমি আপনাদের কাউকেই চিনিনে। নমস্কার! ভদ্রলােক নেমে চলে গেলেন। ১১

ত্রিলােচন কবিরাজ
যাত্রীদল সমস্বরে বলে উঠল—ধাপ্পাবাজ ! আমরা সবাই
আর কিছু শুনতে পেলাম না। নেমে পড়ে গজানন বাবুর পিছু
নিলাম-আমার নূতন বইটা তাকে দেবার প্রয়ােজন ছিল। কিন্তু
লােকের ভিড়ে তাকে খুঁজে বের কর্তে পালাম না।
সম্পাদক মহাশয় আসিয়া কহিলেন, “হ’ল ?”
লেখাটি দিলাম। পড়িয়া কহিলেন, “বড় বড় করে ফেললেন।
আধুনিক ধরণের হ’লনা।”
সঙ্কুচিত হইয়া কহিলাম—“আর কি রকম হবে তাহলে?”
সম্পাদক কহিলেন, “Book Case কেনার পর লিখুন—দেখলুম
Book Caseএর উপর মাথা রেখে মুখে মুখ লাগিয়ে পাশাপাশি বসে
মরণাহত গজানন আর ইন্দুমুখী—পাওয়ার আনন্দে উভয়ের হার্টফেল
করেছে—আর এই Book Case হ’ল তাদের কফিন! আর সেই
থেকে আমি ম্যাকেঞ্জী লায়ালের কাজ ছেড়ে দিয়েছি।”
১০২

শেষ-পৃষ্ঠা ঠিক মনে পড়িতেছে না তবে সেদিন বােধ হয় প্রাতঃকালে সদর দরজা খুলিয়াই প্রথমে পাশের বাড়ীর ভৃত্য গােপীবল্লভের মুখ দেখিয়া- ছিলাম, যেহেতু জানিতাম গােপীবল্লভ প্রেমিক-সে প্রত্যহ রাত্রি বাবােটার পর তাহার ডিউটির শেষ-কাজ প্রভুর পদতলে সুড়সুড়ি দিয়া ঘুম পাড়াইয়া গলির মােড়ের পােড়ড়া বাড়ীটার বােয়াকে বসিয়াই ভৈরবীতে গান ধরিত- প্রেমের তরে পাগল হলাম আমি বৈরাগী সম্ভবতঃ তাহাই হইবে, কারণ অনুরূপ কোনও হেতু না থাকিলে সেদিনকার চারিটি প্রহরেই প্রেম সম্বন্ধীয় ব্যাপার লইয়া বিব্রত হইতে হইত না। প্রথম প্রহরে বন্ধু যামিনীর পত্র পাইলাম—তাহার স্ত্রীকে দুই এক- দিনের মধ্যেই আনিতে হইবে, কেননা পৌষ মাসে যাত্রা নাই অথচ মাঘ পৰ্য্যন্ত অপেক্ষা করিতে সে পারে না। কপি ও মটরশুটির স্বাদ ততদিন খারাপ হইয়া যাইবে, তাহা ব্যতীত—যা সে কথায় আবশ্যক নাই,-মােট কথা টাকা চাই। স্ত্রীকে আনিবার খরচ অন্ততঃ পঞ্চাশ টাকা তার করিয়া পাঠাইতে হইবে। প্রয়ােজন অত্যন্ত গুরুতর বুঝিয়া তাড়াতাড়ি নিজেই ডাকঘরের দিকে চলিলাম। মােড় ফিরিতেই এক রিক্স-ওয়ালার সহিত ধাক্কা ত্রিলােচন কবিরাজ লাগিল। বিনাবাক্যে ভুতলস্থ হইলাম। জুতার ফিতা ও পায়ের চামড়া কিঞ্চিৎ পরিমাণ ছিড়িয়া গেল। দ্বিপ্রহরে টেলিফো যােগে দীপশিখা পত্রিকার সম্পাদিকার আদেশ আসিল তাহার পত্রিকার জন্য একটি প্রেমের কবিতা দিতে হইবে। দক্ষিণের জানালা খুলিয়া দিয়া গুটিকয়েক ফুটন্ত ফুলের গাছের টব বারান্দায় সাজাইয়া সেই দিকে চাহিয়া কলম কামড়াইতে লাগিলাম। মন কিছুতেই রসস্থ হইল না। অনেকক্ষণ বৃথা চেষ্টা করিয়া অবশেষে রাগিয়া লিখিলাম- জনম অবধি প্রেম সাথে যার অহি-নকুলের সখ্য, তার কাছে খোজ প্রেমের কবিতা ? ধর্মতলায় মােক । তৃতীয় চরণে লেখনী ক্ষেপ করিব এমন সময় আঙিনায় সশব্দ পদক্ষেপ, তাহার পরেই আহ্বান। বারান্দায় দাঁড়াইয়া দেখি পাড়ার ‘ইয়ং মেনস্ ক্ল্যাসিকো-রােমান্টিক ডিবেটিং ক্লাবের যুগল সেক্রেটারী কানাই ও শশধর। বসিতে বলিলেই বক্তৃতা শুনিতে হইবে ভয়ে বারান্দা হইতেই প্রশ্ন করিলাম –“অকস্মাৎ ? কানাই কহিল, “জটিল সমস্যা। মীমাংসার জন্যে এসেছি।” সপ্তাহে দুই তিনবার ইহাদের সমস্যা উপস্থিত হইত এবং তাহার অনিবাৰ্য ফল স্বরূপ আমাকে নূতন করিয়া প্রতি সপ্তাহে হােম লাইব্রেরীর বহিগুলি গুছাইতে হইত। কাজেই সমস্যার কথা শুনিয়া কিঞ্চিৎ বিমর্ষ হইলাম, সভয়ে প্রশ্ন করিলাম-“কি রকম সমস্যা রাজনৈতিক?” ১৪

শেষ-পৃষ্ঠা
কানাই কহিল, “উহু, প্ৰেমনৈতিক।
বাঁচিয়া গেলাম। প্রেম সম্বন্ধে আমি বিশেষজ্ঞ নই, এ বিষয়ে
কোন গ্রন্থও আমার ছিল না। কাজেই সাহস করিয়া কহিলাম--
*বেশ! বল।”
কানাই কহিল, “প্রেম আছে কি না? যদি থাকে তবে তাহার
পাত্ৰাপাত্র আছে কি না? প্রেমের মেয়াদ কতদিন ? অর্থাৎ
বুঝিলাম প্রশ্ন অনেক দূর গড়াইবে। কাজেই আবার বাধা দিয়া
কহিলাম—“এর মধ্যে সমস্যা কোথায় ? সােজা ভবকান্তদার ওখানে
গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস কর—
কানাই কহিল, “দেখুন, কাল আমাদের ডিবেট—
কহিলাম, “বেশ তাে। প্রেম সম্বন্ধে অবকান্তদা’র মত অথরিটি এ
পাড়ায় নেই।”
কানাই কহিল, “সে কথা জানি, কিন্তু তিনি যে কথা বলেন
মােটেই।”
কহিলাম, “কথা আদায় করা শিখতে হয়। এখন যাও, সন্ধ্যার পর
একসঙ্গে সেখানে গিয়ে বসা যাবে। প্রশ্নগুলাে লিখে নিয়ে যেও।”
কানাই ও শশধর চলিয়া গেল।
সন্ধ্যার পর শশধর আর কানাইকে সঙ্গে লইয়া ভবকান্তদার
বাড়ীর বৈঠকখানার দরজায় দাঁড়াইয়া কড়া নাড়লাম। আহ্বান
আসিল, “এসে ভিতরে।”
ঘরে ঢুকিলাম। ভবকান্তদা একখানি ইজিচেয়ারে সমান হইয়া

ত্রিলােচন কবিরাজ
সটকার নল মুখে দিয়া ঝিমাইতেছিলেন, চোখ মেলিয়া আমার দিকে
চাহিয়া কহিলেন, “অকস্মাৎ ?”
কহিলাম, “প্রয়ােজন অকস্মাৎ উপস্থিত বলেই
ভবকান্তদা সােজা হইয়া বসিয়া কহিলেন, “বিশেষ জরুরী দরকার
হয় যদি, তবে বল বিদিকে ডাকি চা নিয়ে আসুক।”
কানাই ও শশধর সমস্বরে কহিল, “সে সব হাঙ্গামে কাজ নেই।
আমরা গুটিকয়েক প্রশ্ন নিয়ে এসেছি, জবাব নিয়ে তাড়াতাড়ি
ফিরতে হবে।”
ভবকান্তদা’ আবার ইজিচেয়ারে লম্বমান হইয়া আমার দিকে
চাহিয়া কহিলেন,-“এ সময়টা ঠিক প্রশ্নের জবাব দেবার মত নয়, স্বপ্ন
দেবার সময় এটা--
আমি কহিলাম, আপনাকে অসময়ে বিরক্ত কর্তে বাধ্য হলাম
এই জন্যে যে ছেলেদের কাল সভা—তাতে প্রেম সম্বন্ধে কতকগুলি
জটিল তত্ত্বের আলােচনা হবে। কতকগুলি বিষয়ে আপনার অভিমত
জানা দরকার কাবণ – বলিয়াই ইতস্ততঃ করিতে লাগিলাম।
ভবকান্ত বলিলেন, “কারণ তােমাদের সকলেরই বিশ্বাস প্রেম
সম্বন্ধে আমি একজন বিশেষজ্ঞ। আর শুধু তােমরা নও অনুকুল
ঠাকুর্দা সুদ্ধ তাই বিশ্বাস করেন, সেদিন ঠাদির সঙ্গে ঝগড়া করে
আগে প্রশ্নগুলাে কি বল শুনি।
শশধর একখানি কাগজ তাহার হাতে তুলিয়া দিল। ভবকাদা
পড়িয়া বলিলেন-“প্রশ্নগুলি একটুও জটিল নয়। কিন্তু তােমরা ছেলে
মানুষ এ নিয়ে মাথা ঘামা কেন?”
১০৩

শেষ-পৃষ্ঠা শশধর কহিল, “তা নৈলে ডিবেটিং ক্লাবটা উঠে যায়। একটা ‘সবজেক্ট' তাে চাই। পলিটিক্স, কৰ্বার যাে নেই-অর্ডিনাল! লাঠি কুস্তি ছােরা ছুরি খেলা অথবা সে সম্বন্ধে আলােচনা করা সি-আই-ডি! অস্পৃশ্যতা আর শাস্ত্র নিয়ে কথা কইতে গেলে সংস্কৃত জানা দরকার, কাজেই ভবকান্তদা’ মুখের উপর কাগজখানি চাপিয়া অর্ধশয়ান অবস্থায় চুপ করিয়া ছিলেন, শশধরের কথা শুনিয়া উঠিয়া বসিয়া বলিলেন, “কিন্তু আর কিছু কৰ্বার নেই বলে প্রেম নিয়ে ঘাটাঘাটি কৰ্ব্বে-প্রেম জিনিষটা তাে তত সহজ নয়। এত বড় একটা সার্বজনীন ব্যাপার শশধর বাধা দিয়া কহিল, “একটু অপেক্ষা করুন আমরা নােট করে নিচ্ছি। কানাই কানাই নােট বুক বাহির করিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ভবকান্তদা’র মতে তা হলে কি ভবকান্তদা কহিলেন, “প্রেম আছে। তবে তা একটি নেশা মাত্র। গাজা, আফিম, চরস প্রভৃতির একটা মােলায়েম ধরণের রকমফের। উক্ত বস্তুগুলির মত প্রেম সেবনেও মত্ততা জন্মে এবং ছ্যাকরা গাড়ীর ঘােড়াকে উচ্চৈঃশ্রবা, বস্তির খােলার ঘরকে ভিক্টোরিয়া মেমােরিয়াল এবং নর্দামাকে মা ভাগীরথী বলে মনে হয়।” বলিয়াই ভবকান্তদা’ পুনরায় ইজিচেয়ারে লম্বমান হইলেন। বুঝিলাম ভবকান্তদা’ আর কিছু বলিতে নারাজ। শশধর আমার মুখের দিকে হতাশ হইয়া চাহিল। তাহার কথার প্রতিবাদ না করিলে ভবকান্তদা’র নিকট হইতে কথা আদায় করা যায় না তাহা আনিতাম, C ১৭ ত্রিলােচন কবিরাজ কাজেই শশধরের অভিপ্রায়-সিদ্ধির জন্য কহিলাম, “বল্লেন অবকান্তদা আমরাও শুনলাম কিন্তু বিশ্বাস কর্তে পাচ্ছিনে। “বটে।” বলিয়া ভবকান্তদা’ পুনরায় সােজা হইয়া বসিয়া কহিলেন, “ হলে প্রেমের সঙ্গে পরিচয় হয়নি তােমার। পদার্থটার প্রথম আক্রমণ যে কি ভীষণ এবং তার অনিবার্য ফল-মত্ততা, যে কি পরিমাণ মারাত্মক তা যদি জানতে তা হলে ছেলেমানুষের মত আমার কথায় অবিশ্বাস কৰ্তে না! তা হ'লে শুনবে?” অভিপ্রায় সিদ্ধ হইল, কানাই ও শশধর সমস্বরে সাগ্রহে কহিয়া উঠিল, “বলুন।” ভবকান্তা কহিলেন, “ছেলেমানুষ তােমরা শােনা উচিত নয়, তবু শােন। একটা থিওরি’র ভাষ্য হিসাবে শুনে যাও।” তাহার পর আমার দিকে ফিরিয়া কহিলেন, “আমাদের ওই সাত নম্বরের বাড়ীটা দেখেছ তাে? যার হাতের প্রাচীর নেই গলির শেষ বাড়ীটা ?” সকলেই সম্মতিসূচক ইঙ্গিত করিলাম। ভবকান্তদা কহিলেন, “বেশ! শােন তবে, বছর বিশেক আগেকার কথা বলছি। বাবা আর মা উভয়েই তখন সাংসারিক ঝাটে ইস্তফা দিয়ে কাশীবাস কচ্ছেন, আমি একা কলকাতায় ঠাকুর চাকর নিয়ে সংসার পেতে বসে আছি। তােমার প্রথম বৌদিদি আসি আসি কচ্ছেন, ফেল কৰ্বার ভয়ে যথাবিধি আঁকে আনতে পাচ্ছিনে-বৈশাখ মাসের প্রতীক্ষায় আছি। ঠিক প্রতীক্ষা বলা চলে না—বিয়ে কৰ্বার ইচ্ছেও বড় ছিলনা। হাতের চিলেকোঠায় বসে ‘অভিজ্ঞান’ ‘ম্যাকবেথ’ আর ‘প্যারাডাইজ লষ্ট নিয়ে Sob

শেষ-পৃষ্ঠা
দিন কাটাই, ওই রকম জীবনই অভ্যাস হয়ে গিয়েছে তখন, আর
একটা নতুন লােক এসে খবরদারী কৰ্বে এ কল্পনাটা সহ কর্তে
পাচ্ছিনে।
সেদিন সকাল বেলা চাকর বাইরের ঘরে ডেকে নিয়ে এল।
বাড়ীভাড়া কর্তে লােক এসেছে। বাড়ীটা খালি ছিল। বাইরের ঘরে
চেয়ারে একটি ভদ্রলােক বসে ছিলেন-বাড়ীটা তারই দরকার।
জিজ্ঞাসা কঞ্জাম, “পরিবার নিয়ে থাকবেন না মেস ?”
ভদ্রলােক অত্যন্ত বিনীতভাবে বললেন, “পরিবার বিশেষ নেই।
আমি আমার ছােট বােন, আমরা-
বাধা দিয়ে বল্লাম, “কত দিন থাকবেন ?”
ভদ্রলােক বল্লেন, “ববাবরই থাবার ইচ্ছে।”
বল্লাম-“ভাড়া ত্রিশ।”
ভদ্রলােক পকেট থেকে দশ টাকার তিনখানা নােট বের করে
টেবিলের উপর রেখে বল্লেন, “মণিমােহন চৌধুরীর নামে জমা করে
নিন—প আসব আমরা।”
“সাতনবের বাড়ীর ভাড়াটেরা পশু এলেন কি তিন দিন পরে
এলেন সে খবর রাখিনি। একদিন ছাতে উঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি অকস্মাৎ
গানের আওয়াজ শুনে সাত নম্বরের ছাতের দিকে নজর পড়ল। তিন
ফিট উচু ছাতের প্রাচীর—কিছু দেখতে পেলাম না, কিন্তু মনে হল যে
গান গাইছে সে স্বীলােক এবং সুন্দরী।
১০১

ত্রিলােচন কবিরাজ a এবার আমি বাধা দিয়া কহিলাম, “হঠাৎ এরকম অনুমানের হেতু কি তবকাতা’ ?” তবকান্তদা’ উত্তেজিত হইয়া কহিলেন, “মৃত্যুর কোনও হেতু নেই। শুনে যাও। সে রকম আশ্চর্য সুর আমি জীবনে শুনিনি, একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ক্রমে গান শেষ হয়ে গেল কিন্তু নড়তে আমি পাল্লাম না, সাতনধরের ছাতের দিকে হাঁ করে চেয়ে রইলাম। মিনিট পাঁচেক পর দেখলাম একটি মাথা আব তাতে একরাশ কেঁাড়ানাে চুল। তার কিছুক্ষণ পরেই মাথাটি মুখসুদ্ধ দেখলাম—সুরের মত রূপও তার আশ্চর্য্য। বর্ণনা কৰ্ব না। মাথার মালিক পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে প্রাচীরের উপরে ঝুকে পড়ে আমাদের ছাতের দিকে চাইলেন বেশী দুর তাে নয় মাঝে কাঠাখানেক জমিতে নেপাল ধােপর খােলার ঘর দুখানা ছিল—দু’জনে চোখােচাখী হ’ল। আমি লজ্জায় মুখ ফেরালাম এবং আড়চোখে একবার দেখলাম—ও ছাতে লজ্জার বালাই নেই মােটে। তখন সাহস হ’লছাতের ধারে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তােমরা নতুন এলে বুঝি ? নাম কি তােমার ?” অতি স্নিগ্ধকণ্ঠে জবাব এল, “নলিনী।” আর কিছু জিজ্ঞাসা কর্তে সাহস হল না। কি যেন একটা বলে ঘরে এসে ম্যাকবেথ খুলে বসলাম । কিন্তু একছত্র পড়তে ইচ্ছে হ’ল না। কোকড়ানাে চুলওয়ালা মাথা আর একখানি চমৎকার সুন্দর মুখ মনে পড়ে যেতে লাগল।” এই সময় দেখিলাম কানাই মুচকি হাসিয়া শশধরকে চিমটি কাটিতেছে—ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে কানাইয়ের দিকে চাহিলাম। সে গম্ভীর হইয়া ১১০ শেষ-পৃষ্ঠা বসিল। ভবকান্ত দা’ ইতিমধ্যে একটি চুরুটে অগ্নি সংযােগে ব্যক্ত ছিলেন। চুরুটে একটি টান দিয়া নাক দিয়া ধোয়া ছাড়িতে ছাড়িতে বলিলেন- পরিচয় হতে দেরী হ’ল না। পরদিন বিকেলে বৈঠকখানায় বসে আছি, দোম ‘সেলার সুট’ পরে বছর ষােলাে বয়সের একটি ছেলে বই হাতে করে আসছে—সম্ভবতঃ স্কুল থেকে। জানালা দিয়ে দেখেই চমকে উঠলাম। মাথায় হাট, চুল দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু মুখখানা অবিকল সেই নলিনীর মত। তাকে ডাকলাম। ঘরে এসে ঢুকতেই তাকে কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম—“তুমি আমাদের সাতনম্বরের বাড়ীতে থাক বুঝি?” ছেলেটি বেশ সপ্রতিভ ভাবে বলল, “হ্যা। কেন বলুন তাে?” একটু হেসে বল্লাম-“ছাতে যিনি গান করেন তিনি—প্রশ্নটা সমাপ্ত কর্তে লজ্জা হ’ল। ছেলেটিরও দেম মুখ লাল হয়ে উঠেছে, বলে,-“দিদি। আমরা যমজ। একটু সাহস করেই বল্লাম—“তােমার দিদিকে বােলাে তার গান আমার খুব ভাল লাগে।” ছেলেটি মুখ নীচু করে হেসে বললে—“আচ্ছ।” গান শােনার পর গল্প গুজব, তারপর আমার প্রেম নিবেদন এবং নলিনীর কৌতুকহাস্য-সহকারে সে প্রেম গ্রহণ ইত্যাদি আনুষঙ্গিক ব্যাপার সপ্তাহখানেকের মধ্যে ঘটল। দুপুর বেলা নলিনীর সঙ্গে দেখা হত না, সে বলেছিল তার কোন্ মাসী না কে আছেন, তিনি ১১১ ত্রিলােচন কবিরাজ রাতে এসে রান্না-বান্না শেষ করে সারা দুপুর বাড়ীতে কাটিয়ে সন্ধ্যায় চলে যান। কাজেই দুপুর বেলা সে ছাতে আসতে পারে না। এক সন্ধ্যাকাল ছাড়া আর দু’জনার দেখা হবার উপায় নেই। কাজেই প্রাতঃকাল থেকে আরম্ভ করে সমস্ত দিনটা দীর্ঘকালের রােগী যেমন অন্নপথ্যের দিনের জন্য প্রতীক্ষা করে তেমনি করে বসে থাকতাম। সে প্রতীক্ষার তীব্রতা যে কি এখন বলে তােমাদের বােঝাতে পার্ব তা মনে হচ্ছে না। সেই সমস্ত দুপুর চিলেকোঠায় শুয়ে আর-একবাড়ীর ছাতে পদশব্দ শােবার জন্য কাণ পেতে থাকা-আর নেপাল ধােপর বেলগাছ থেকে বেল পড়লে তার শব্দে লাফিয়ে ওঠা তাও একদিন দু’দিন নয় পূবােপুরি পাঁচমাস ধরে, সে সব কথা ঠিক নিজে অনুভব না করলে বক্তৃতা করে বােঝানাে যাবে না।” এই সময় শশধর একটি সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিল। তাহাদের পাশের বাড়ীর ভাড়াটের পরিবারস্থ কাহারও কল্যাণে সে বার তিনেক বি-এ ফেল করিয়াছিল শুনিয়াছিলাম—বুঝিলাম শশধর কাহিল হইয়া পড়িয়াছে। ভবকান্তদা তাহার প্রথম প্রেমের অনুভূতি এরকম রসঘন করিয়া পরিবেষণ করিতে থাকিলে বেচারীকে লইয়া বিপদে পড়িতে পারি ভাবিয়া কহিলাম,-“মিলনের আর কত বাকী অবকান্তদা’ ?” ভবকান্তদা’ কিন্তু চুরুটে একটি প্রবল টান দিয়া তাহার মুখাগ্নি উদ্দীপিত করিয়া কহিলেন,—“হচ্ছে। শােন, শুধু মৌখিক প্রেম নিবেদন এবং গ্রহণ করে আমি খুশী হতে পারিনি। ভাল খাবার ফলমূল মিষ্টি একা খাইনি কোনােদিন, আমার ভাগের বারাে আনা ১১২ এই ভয়ে, = শেষ-পৃষ্ঠা রুমালে বেঁধে যথাস্থানে ফেলে দিয়েছি। নলিনীর দাদা বাড়ীভাড়ার টাকা দিয়েছেন, নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বে, তিনি পাছে সন্দেহ করেন, নিয়েছি; কিন্তু সন্ধ্যাকালে ন্যাকড়ায় জড়িয়ে নলিনীদের হাতে ফেলে দিয়ে বলেছি—“তােমার দাদা ভাড়ার টাকা দিয়েছেন, নাও, আমিও তুমি।” নলিনী একটু থমকে দাড়িয়ে কি ভেবেছে আর কুড়িয়ে নিয়েছে। এমনি করে মাস চারেক কাটবার পর শেষে একদিন-না থাক্। কানাই ও শশধর হা হা করিয়া উঠিল। আমিও কহিলাম, বাকীটা চুকিয়ে দিন একেবারে ভবকান্তদা।” ভবকান্তদা অত্যন্ত করুণস্বরে কহিলেন, “বেশ! হঠাৎ একদিন ভােরে দরজায় হিন্দী ভাষায় চীৎকার শুনে দেখি গলিময় লালপাগড়ী, নলিনীদের বাড়ীর ঠিক সামনে আধ ডজন সার্জেন্ট। নীচে নেমে এলাম। নলিনীদের বাড়ীর দরজায় তালা বন্ধ। ইনস্পেক্টার বল্লেন- এটা আপনার বাড়ী ?” বল্লাম-“হ্যা। কেন?” “সার্চ কর।” “ব্যাপার কিছু বুঝতে পাল্লাম না। আর তখন বছর উনিশ বয়স পুলিশ দেখে ভয় একটু ছিলই, বল্লাম-“করুন।” এদিকে মনে মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা কৰ্তে লাগ্লাম-নলিনী যেন বাড়ীতে না থাকে। তালা ভেঙে ইনস্পেক্টার ঢুকলেন—বাড়ী খালি—কেউ নেই, শুধু কলতলায় একগণ্ডা ভাঙা হাঁড়ি পড়ে আছে।” ইনসপেক্টার মুখ ফিরিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-“এরা গেল কোথায় ? ১১৩ ত্রিলােচন কবিরাজ বু খকিয়ে গেল, বল্লাম, “কারা ?” “নীরদ খাস্তগীর আর বিনােদ চৌধুরী ?” আশ্চর্য হয়ে বল্লাম-“তাদের তাে চিনিনে।” ইনসপেক্টার তীব্ৰদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলে,-“বাড়ী শাপলার- বাম—“আমাদের ভাড়াটের নাম ছিল মণিমােহন চৌধুরী “কজন লােক ছিল এ বাড়ীতে?” অনায়াসে মিথ্যা কথা বলে দিলাম—একজন ভদ্রলােক মাত্র। তারপর গােয়েন্দা আপিসে যেতে হ’ল, আমাকে কিন্তু অনেক সেরা করেও সাহেব নলিনীর কথা আমার মুখ থেকে বের কর্তে পানে না। কানাই কহিল—“সেই নীরদ খাস্তগীর তা হলে?” শশধর তাহাকে ধমক দিয়া কহিল, “চুপ! আপনি বলুন ভবকান্তদা’!* ভবকান্ত কহিতে আরম্ভ করিলেন-“সমস্ত দিন যে সেদিন কি যন্ত্রণা ভােগ কল্লাম তা বলবার নয়। কোথায় গেল নলিনী ? ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছি হঠাৎ দেখি সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। চোখ মেলেই দেখি আমার চায়ের টেবিলের উপর একখানা মােটাখামের চিঠি। খুললাম—নলিনীর চিঠি। চিঠিখানা না পড়েই বুকে চেপে দীখনিঃস ফেলে আপন মনেই বল্লাম বাচালে ভগবান। তারপর বাতি জেলে চিঠি পড়তে আরম্ভ করে দিলাম। বড় চৌকো কাগজের পাঁচপৃষ্ঠা। প্রথম চার পৃষ্ঠা পড়তে পড়তে প্রায় পাঁচ সাতবার আমাকে চোখের জল মুছতে হ'ল-নলিনী তার প্রতি ১১৪

শেষ-পৃষ্ঠা
আমার স্নেহের যে পরিচয় পেয়েছে তারই একটি বর্ণনা দিয়ে বার
দশেক আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে—চিঠিখানাকে দু একবার
গে। কিন্তু শেষ পৃষ্ঠায় চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম—এ কি
কখনও সম্ভব হতে পারে ? নলিনী—ভাবতে আর পাল্লাম নাম
ঘুরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম।
কানাই এবং শশধর সমবে চীৎকার করে উঠল—“কি হল
শেষ পৃষ্ঠায়।”
ভৱকান্তদা’ কহিলেন, খুখে বলতে পাৰ্বনা। জীবনে কাজে
শবে বলে চিঠির সে পাতাটা আমি রেখেছি তােমরা পড়ে নাও।”
বলিয়া ভবকান্তদা’ টেবিলের টানা দেরাজ খুলিয়া ফ্রেমে বাঁধানাে
একখানি কাগজ বাহির করিয়া দিলেন। শশধর পড়িতে লাগিল—“কিন্তু
একটা কথা আপনাকে না বলে পাচ্ছিনে। আপনার অগাধ গেহ
দয়ার চক্ষেই পরিচয় পেয়েছি-কাজেই আপনাকে একটু সতর্ক করা
দরকার। আপনার বুদ্ধিটা বড় সরল-লােক চিনতে আপনি পারেন
। আমি আলিপুরের ডাকাতির ফেরারী আসামী, পিছনে অনবরত
ফেউ ঘুবছে—নৈলে নিজ মুখেই সব বলতাম। আমি পুরুষ মানুষ যে
ছেলেটাকে বই-হাতে আসতে দেখেছেন সে আমার যমজ ভাই নয়, সে
আমিই। পুলিশের চোখ এড়াবার জন্য মেয়ে সেজে আমাকে বাড়ীতে
থাকতে হত—সকালে ফিরিঙ্গির ছেলে সেজে কনভেন্টের ইস্কুলের দিকে
যেতাম—কাজেই দুপুরে কোনদিন আমাকে দেখতে পান নি।
আর কিছু ভাববার নেই। যদি বেঁচে থাকি কখনও দেখা হবে।
তবে একটা কথা-সত্যি কথাই বলছি—আপনার যে মূর্তি
১১৫

ত্রিলােচন কবিরাজ
আমি দেখেছি তাতে মেয়ে হয়ে জন্মাতেও আমার আপত্তি
ছিলনা।”
শশধর চিঠি পড়িয়াই আর একবার দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া কহিল,
ট্র্যাজেডি।”
কানাই মুচকি হাসিয়া কহিল—“বেশ মজার কথা তাে।”
আমি জিজ্ঞাসা কবিলাম “কি কল্লেন তাবপব ?
ভবকান্তদা কহিলেন—যা করা উচিত অর্থাৎ যা না কৱে চলত-না
তাই—বিবাহ। নলিনীকে ভুলবার জন্য। বাগবাজাবের মুখুয্যেদেব
বাড়ীর বিধুমুখীব শবণ নিলাম! সে বেচারী বছর খানেক পর নিমত
যাটে—আর সে তাে জানই। তাবপব বিধুমুখীকে ভুলবার জন্য
ভবানীপুবের মালতীকে।”
কহিলাম-“কিন্তু যাই বলেন ভবকান্তদা’, মালতী-বৌদিব মৰ্বার
পর আপনাব আব তিন নম্বব কবা উচিত হয়নি।”
ভবকান্তদা’ কহিলেন—“উপায় ছিলনা ভাই। বলেছি তাে প্রেম
একটা নেশা এবং বিবাহ একটা মুদ্রাদোষ,-একবার অভ্যাস হয়ে
গেলে আর ছাড়াবাব কোনও উপায় নেই–উপায় নেই।
বলিয়াই পিছনেব খােলা দরজার দিকে চাহিয়া ভবকাদা’ তারস্বরে
কিলেন “গিন্নি! পেয়ালা চারেক চা!”

গ্রন্থকার প্রণীত
উদাসীৰ মাই
- অপূর্ব গল্প-সংগ্ৰহ গ্রন্থ
চমৎকার ছাপা ও বাঁধা
মুল্য-এক টাকা
মানময়ী গার্লস স্কুল
(নাটক)
স্টার থিয়েটারে অভিনীত
মূল্যবার আনা

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Trilochan Kabiraj

Author
Maitra, Trilochan
Title
Trilochan Kabiraj
File name
Trilochan Kabiraj
Text
OCR done
Citation
1933
Published
2009/10/14
Publisher
Gurudas Chattopadhya And Sons, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
129
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Bengali Fiction
Keywords
Jouar
DLI number
513421
Barcode
4990010020400.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
DyNF8QoukVX
Download PDF

Trilochan Kabiraj