Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Ananda-bibek

Saraswati ,paramananda · 2009/12/4

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

আনন্দ-বিবেক
রচয়িতা
প্রণবসি মহাক্ষ্মা ওঁম বাবা
(শ্রীমৎ পরমানন্দ সরস্বতী )
প্রকাশক
মৎ আচৈতন্য ব্রহ্মচারী।
শঙ্কর-মঠ, রামরাজাতলা, হাওড়া।
গ্রিটার-ভােলামাখ বই
দয়াময় প্রিন্টিং ওয়ার্ক
১নং রামশেঠ বােড়, কলিকাতা।
সর্বস্বত্ব সুরক্ষিত ]
[ মূল্য ১• পাঁচ সিকা।

প্রস্তাবনা ।
“মন্দ বলি ত্যজ্য যাহা,
গুপ্ত তাহে গ্রাহের বিষয়”।
“আনন্দ-বিবেক”-ব্যক্ত,
দিতে তার পূর্ণ পরিচয়।
সমর্পণ।
আনন্দ-বিবেক-মালা,
আমি যাহা করেছি গ্রন্থন।
ভাবি তা আমার ভূতি,
আমাকেই করিনু অর্পণ।

মুখবন্ধ। “আনন্দ-বিবেক” অদ্বয় ব্ৰহ্মবাদের একখানি অমূল্য ও অপূর্ব গ্রন্থ। এই গ্রন্থের রচয়িতা হাবড়া রামরাজাতলা- সাবিত্রী পীঠস্থ শমকের বর্তমান অধীশ্বর, তত্ত্ব- দশী, ব্যক্ত ব্ৰহ্মাবধূত শ্রীমৎ পরমানন্দ-সরস্বতী স্বামী। আলােচ্য পুস্তকখানি “আছভাতি” ও “অন্তভাতি” এই দুই ভাগে বিভক্ত। “আভাতিতে” কি প্রকারে অহমতত্ত্ববিচার-জ্ঞানে, অভেদাত্মক ভাবে পরব্রহ্মের সম্যক অনুভূতি ঘটে, তাহাই অকাট্য মুক্তি-সহকারে, স্বভাবসুলভ সরল গাথায় বর্ণিত। ‘‘অন্তভাতিতে” স্বভাবের-বিষম ভাবাবলম্বনে, কি করিয়া সাম্যের পরিচয় মিলে এবং দুৰ্মীমাংশ্য বিষয়ের একটি স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়, ব্ৰহ্মবেত্তা মহাকবির চিরনূতন কবিত্ব-সম্পদে, তাহাই উজ্জ্বল- ভাবে পরিস্ফুট। সত্যকথা বলিতে কি—এরূপ একখানি নিগূঢ়তত্ত্বসিদ্ধান্তমূলক গ্রন্থ, বঙ্গ কি সমগ্র জগতে কোন স্থানে, কোন ভাষায় রচিত হইয়াছে কি না, তদ্বিষয়ে বিশেষ সন্দেহ! শুদ্ধ অদ্বয়তত্ত্বব্যক্তকরণে, আমাদের পরম শ্রদ্ধেয়, বিশ্ববরেণ্য, স্বভাবজ্ঞ মুক্তকবির অসন, বিশ্বকবি রবির আসন হইতেও অনেক উচ্চে। মায়াতত্ত্ববিশ্লেষণ, লইয়া বসুধার কবিকুলের মধ্যে, বােধহয় কেহই, সত্যনিষ্ঠ, দার্শনিক, স্বামীজীর ন্যায় সাফল্য লাভ করিতে সমর্থ হন নাই।

জ্ঞানগুরু, ভিক্ষুকবিকে অযথাস্তুতি বা উহাকে প্রচার করিবার জন্য, আমি, আমার লেখনীকে স্বাধীনতা দান করি নাই। যাহা তথ্য—যাহা সৰ্ববাদীসম্মত ধ্রুব সত্য, তাহা কখনও অপ্রকাশিত থাকে না বা থাকিতেও পারে না। আমার সুদৃঢ় বিশ্বাস এই যে,—এই বঙ্গভূমি কি,—সারা বিশ্বে এমন এক দিন আসিবে, যে দিন আত্মজ্ঞ কবশের সদ্ভাবের বিজয়দুন্দুভি, গগন-পথে স্বতঃই বাজিয়া উঠিবে এবং গুণগ্রাহী, সাবরসিক পাঠকবর্গ, এই দুর্লভ গ্রন্থপাঠে, স্বভাবসিদ্ধ কবির অমরত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব, যুগপৎ উপলব্ধি করিয়া ধন্য হইবেন। আমার ন্যায় ক্ষুদ্র ব্যক্তির এই গ্রন্থের মুখবন্ধ বিস্তারিত ভাবে লিখিতে যাওয়া, এক প্রকার ধৃষ্টতা মাত্র। তাই অতি অল্প কথায়, এই মুখবন্ধের পরিসমাপ্তি ঘটিল। অদূর ভবিষ্যতে, যদি কোন তত্ত্ববেত্তা, রসজ্ঞ কবি, এই ধাবক্ষ, অলঙ্কত করেন, তঁাহার করাই কবিস্বামীর অক্ষয় কীর্তি, মধ্যাহুকালীন মার্তণ্ডভাতির ন্যায়, সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িবে ; তখন লােকে অসামান্য প্রতিভাবান্, ধৰ্মনায়ক, দার্শনিক কবির, কবিত্বশক্তির সমাদর করিতে প্রযত্ন করিবে। ইহ- সংসারে প্রকৃত রত্ন চিনিতে অনেকেই অক্ষম। সুনিপুণ মণিকারই তদ্বিষয়ের উপযুক্ত পাত্র। ইতি বিনীত

ঔম্
আনন্দ-বিকেক
(আদ্য-ভাতি)
আমার কাযে, আমির শ্রেষ্ঠত্ব।
আমার কাযে সদাই ‘‘আমি,”, -প্রদীপ্ত জ্ঞান-আলাে।
আমার কাছে আমি ত তাই, সকল কালে ভালাে।
“আমি” বই কেহ আর,
নহে মাের আপনার,
“আমি” মাের সারাৎসার, নাইকো তাহে কালাে।
চাও তা যদি বুঝতে কেহ, তত্ত্বের দীপ জ্বালাে।
তত্বের বােধ হবে যবে, অন্য ভাব যত,
আপনি এসে “আমির” কাছে, রইবে সুসংযত ;
যাহে সে বােধ ত্বরা জাগে, “আমির” পরে দৃষ্টি লাগে,
করতে তাহ, চিত্ত আগে, গুরুর পদে ঢালল।
অনুরাগে-যােগে-যাগে, গুরুর কথা পালাে।
তা’তেই শান্তি, তাতেই মুক্তি, তাই তা, নিতি ঝালাে

আনন্দ-বিবেক
আমি, আমাকেই চাই।
২
আমায় আমি লাগাতে চাই, আমার সব প্রয়ােজনে।
পূরিবে আমার আশা, অন্য কোন আয়ােজনে।
আমি যদি আমার সেবায়,
অবিরত লাগাই আমায়,
না দেখায় ভয়, কভু অপায়, অসদ্ভাব-সংযােজনে।
আমার সেবায় আমায় পেলে, কি কার্য নিয়ে অন্য জনে ?
“মাের যা’বলি, ব্যক্ত তাহা—আমির সেবা তরে,
এ সার তত্ত্ব না বুঝিলে, কেউ না ভ্রমে তরে ;
অন্য যারা সেবে মােরে, পলায়, ফেলে’ বিপদ-ঘােরে,
বাঁধতে পারি আমায় ডােরে, আমি শক্তি-নিয়ােজনে।
আমি ত তাই আমাকে চাই, অপর ভাব-বিয়ােজনে।

আনন্দ-বিবেক
আমার শক্তি, আমারই সেবিকা।
আমার চিরসেবা-তরে, আত্মমায়া নানাকারে,
ব্যক্ত হয়ে আমার সাথ, করে লীলা অহঙ্কারে।
লাগে বলি’ মম সেবায়,
সাহঙ্কারে সে ত বেড়ায়,
আমাকে না পেলে গােড়ায়, যায় সে মারা পড়ে কারে।
আমিও তার সঙ্গ নিয়ে, বুঝতে নারি ঠিক আমারে।
জ্ঞানরূপী পুরুষ ‘আমি, ভক্তি--শক্তি-মায়া,
আমার সেবায় থাকিয়ে তা’র, সুপুষ্ট ভাব-কায়া ;
সদাই সে মাের সেবা লাগি, অনুরাগে আছে জাগি,
ছেড়ে কোথা না যায় ভাগি, ভুলাই দায়, তাই ত তারে।
তাই ত সে সেবার জোরে, যা ইচ্ছা তা করতে পারে।
‘আমি’ ‘আমার’ এই দ্বিভাবে, দেব-দেবী-ভাব এ সংসারে।
“আমার শক্তি আমায় সেবে,” এ তথ্য আর বলবাে কারে ?
বলতে গেলে যাকে তাকে, দাড়ায় তা ব্যভিচারে।
সত্যসেবী যেবা ভবে, মূল কি তথ্য, বুক ঠারে।
তত্ত্বকথা কইলে জোরে, অনভিজ্ঞ সইতে নারে ?
না বুঝলে “আমি-আমার-তত্ত্ব”, কেউ না পারে যেতে পারে।

আনন্দ-বিবেক
আমার প্রকৃতি, আমার মহত্ত্বানুভবের হেতু।
৪
আমির মহত্ত্ব আগে,
অনুভবে আনিবারে।
প্রকৃতি আমার হয়ে, লাগে বহু ব্যবহারে।
সেবায় যবে জাতে পারে, ‘পর না ভাবি আমি তারে,
তখন হ’তে সে আমারে, না চায় কভু ফেতে কারে।
বুঝিয়ে মাের উদারতা, সদাই মম অধিকারে।
যদিও মাের বাড়া-স্ব-ভাব, সে সাথে সেও বাড়ে,
সাধ্বী সতী নারীর মত, সঙ্গ নাহি ছাড়ে ;
অহম্‌-জ্ঞানে আমিই শিব, “আমার”-জ্ঞানে আমিই জীব,
শিবকে জীব অহর্দিব, না ভজি’ না থাকতে পারে।
মূলতঃ নাই দ্বন্দ্ব কোন, দ্বন্দ্ব মাত্র ভাব-স্বীকারে ।
‘আত্মমূলে আত্মদৃষ্টি’, এভাব কোথা কে নিবারে ?
ব্ৰহ্ম-মায়া-তত্বই এই, ব্যক্ত ইহা জ্ঞান-বিচারে !
মূৰ্ত্ত ভাব যা’ প্রকটিত, তাত ভ্ৰম-জ্ঞান-বিকারে।
কাটুলে বিকার, এই ‘যা সাকার, গণ্য তাহা নিরাকারে!
ভাসূলে প্রমা যায়গাে জানা, আপনা হ’তে আপনারে ।
আপনা পেলে পরও আপন, আত্মিক বােধ সর্বাধারে।
আত্মভাবে আত্মসেবা, সার সত্য ভূ-সংসারে।
গ

আনন্দ-বিবেক
মূলকে প্রচার করাই, স্কুলের কাৰ্য।
অামায় আমি তােমার কাযে, না চাই যেন প্রচারিতে।
ভাবি যেন—“তােমারি সব, ভাবী কৰ্ম্ম আচরিতে”।
পেয়ে মম জীবন-বাস,
পুরু তব সকল আশ,
দেখে’ সর্বব-উদয়-নাশ, বাঞ্ছা--সাম্যে বিচরিতে।
(আমি) তব চিন্তায় কু-চিন্তা মাের, পারি যেন পাসরিতে ।
তুমি যেমন সদা সম, বিষম ভাবে থেকে,
তেমনি আমি তােমার ভাবে, উঠবো কবে পেকে ?
কবে ওগগা হৃদয়স্বামী,
তুমি-কামী হয়ে আমি,
হ’ব ‘মাের’-অনুগামী, পা’রবাে সত্য বিসারিতে ?
‘তুমি-আমি’ এ বােধ কবে, ফুটবে মােকে উদ্ধারিতে
•
জীবন্মুক্তভাবও, জীবনযুক্ত।
“জীবমুক্তি ঘটলে পরে, এ ভবে জীব আর না আসে।
চিররুদ্ধ জনম-স্রোত, কেউ না যেন রয় এ আশে!

;
আনন্দ-বিবেক
ধৰ্মী-ধৰ্ম্ম কোন কালে,
আবৃত নয় মায়াজালে,
মহাসিন্ধু ঊর্মিতালে, স্বধৰ্ম্ম তা’র পরকাশে ।
চেষ্টাতেও তা রুখতে নারে, আপনা হ’তে অঙ্গে ভাসে !
বিমুক্ত জীব শিবরূপে, দাঁড়ায় সত্য বটে,
তা’তেও কিন্তু প্রকৃতি তার, আশ্রিত মূল-ঘটে
যার যা ধরম, তা’য় সে ছাটি, কোথায় রয় পূর্ণ খাঁটি ?
ধৰ্মী-ধৰ্ম্ম-চিরঘাটি, উঁটি’ কে তা’র সত্তা নাশে ?
আ’জ যা’ গুপ্ত কিম্বা সুপ্ত, লুপ্ত না তা চিদাকাশে ।
বারেক যাহা ব্যক্ত যথা, গণ্য তাহা চিদাভাসে।
যাহা চিদ, তাই চিদাভাস, সহজ চিস্পন্দ-ভাসে ।
চিত্তাবে যা’র নিত্য স্থিতি, সকলি তা’র চিদাবাসে।
চিদই যবে চিদাভাস-মূল, কি নয় তবে সে চি-পাশে ?
জন্ম, মৃতি, তেয়াগ, ধৃতি, ভাসিত চি-প্রতিশ্বাসে ।
চিরকালই সে শ্বাসরূপে, স্ব-ভাব-লীলা তাহার খাসে।
রইলে খাসে সঙ্কল্প-বীজ, চিত্ত ভরা ভাবােচ্ছাসে !
মুক্ত তবে কি ভাব-ত্যাগে, আর না মাতে গুণােল্লাসে ?
মুক্ত—নিত্য স্বভাবযুক্ত, না রয় সুপ্ত গুপ্তি-বাসে।
সংস্কারে-সর্বকারে, স্বস্থ সব-অবভাসে।
জম্মিলেও তাই জীবমুক্ত, না দেয় গলা মায়া-ফঁসে !
নর যে লীলা-রঙ্গ, মিথ্যাভাবে সত্য-পাশে।
ব্ৰহ্ম যদি হয় ব্রহ্মবিদ, কোথায় মায়া তাকে শাসে?

আল-বিবেক
স্ব-স্বরূপজ্ঞ, সর্বাবস্থাতেই ভবকারামুক্ত।
৭
“ভবে আর না ফিরে আসা,” এ'নয় চিরমুক্তি-ধারা।
“আত্মস্বরূপ-ভাতি কিরূপ”, এ'জ্ঞানে লীন এ ভূ-কারা।
*
ত্মিজ্ঞানে যেজন বুদ্ধ,
হয়েও কৰ্মী সে ত শুদ্ধ,
শক্তি সনে করেও যুদ্ধ, না রয় কভু আত্মহারা।
আত্মভ্রান্তি বাড়ায় ক্লান্তি, সরায় সুখ-শান্তি-চারা !
হলেও জনম, আত্মজ্ঞজন, আপনা ভাবে অজ।
সদাই তা’র আত্মবশে, সত্ত্ব, তমঃ, রজঃ।
মস্তি-ভাতি-প্রিয়-জ্ঞানে,
নাম-রূপের অনুধ্যানে,
মত্ত না সে অভিমানে, সর্বকাল শিবপারা।
মায়া যেন ছায়ার মত, সঙ্গে ফিরে সেজে দারা ।
প্রতিক্ষণে এভাব মনে,-বিভূতি তার বিশ্ব সারা!
সকল সাজে সকল কাযে, মনকে শুধু আঁখি-ঠার ।
বুঝলে ধৰ্ম্মী স্বধৰ্ম্ম-তা’র, কৰ্ম্মে মতি নির্বিকার।
ধৰ্মী-ধৰ্ম্ম-তত্ত্ববােধে, স্বভাব কভু না যায় মারা।
স্বভাব বশে স্বতঃই ভাসে, স্ব-ভাব-ব্যোমে স্বভাব-তারা।
তা’ই জীবত্ব—শিবত্ব-রূপ, মূল না ত্যজে সে মূল-ধারা।
প্রজ্ঞা-কোলে সকালে, উন্মুক্ত নাম-রূপের ঝারা।

১
আনন্দ-বিবেক
স্বরূপজ্ঞানী, সর্বাবস্থাতেই নিরভিমান।
জ্ঞানী যদি স্ব-স্বরূপ, কিরূপ, ঠিক বুঝতে পারে।
ব্ৰহ্ম সম রয় সে সম, ভেসেও বিষম ভাব-পাথারে ।
হলেও নবকল্প-সুরু,
স্বভাবে সে সদা গুরু,
কেউ না হয় তাহার গুরু, নিলেও রূপ এ সংসারে।
লয় কি না, সেই ত কথা, চাই তা জানা জ্ঞান-বিচারে ।
যে সত্য-সঙ্কল্প-বলে, সৃষ্টির এই ধারা,
অনন্তের সাক্ষীরূপে, না হয় আত্মহারা ;
কত মহাকল্প গত,
হবে গত আরাে কত,
র’বে তা অপ্রতিহত, সত্তা-বােধ-সংস্কারে।
শুদ্ধ জ্ঞানে বুদ্ধ
মতি, সদাই শুদ্ধ সর্বকারে !
হয় যে জ্ঞানে ব্রাহ্মী-স্থিতি, নষ্ট নয় তা ভাব-বিকারে।
স্ব-সত্তা জ্ঞান পাকা যবে, জীব ভাবে কে আপনারে ?
আত্মস্রষ্টা তাই না ভ্রান্ত, কভু কোন ব্যবহারে।
স্বভাবে তার ভাসুক যে ভাব, স্ব-ভাব তার স্বাধিকারে।
চিদসাগরে জাগুক ঢেউ, নীরধি রয় নির্বিকারে।

আনন্দ-বিবেক
৯
বিমুক্ত, ব্ৰহ্ম সম সদৈব মুক্ত।
৯
“বিমুক্ত জীব কোন রূপে, আর না ভবে ফিরে আসে।”
এ সিদ্ধান্ত পাকা ভাবি, অনেকে সেই মুক্তি-আশে ।
সত্তা যদি হয় অনন্ত,
ক্রমবিকাশ তা’র না ক্ষান্ত,
তাই সত্য-সঙ্কল্লান্ত, কল্পান্তেও না কারাে খাসে।
বিকল্প বা বিলয় যা’, সত্তার তা” ভাব বিকাশে।
সত্তানন্ত-ক্ৰমবিকাশই, বিলয়-রূপ পায়,
তাই ত একই অভিব্যক্ত, ত্যক্ত যা’,-তা’র কায় ;
বুঝলে এই এক-তত্ত্ব,
আয়ত্ত বা অনায়,
কোন ভাবে জীব না মত্ত, নহে ত্রস্ত ভাবােচ্ছাসে।
ঘটুক তা’, যা হ’বার যবে, কিছুতে না ভ্রান্তি-পাশে।
ব্ৰহ্ম সম বিমুক্ত সে, যুক্ত নহে বিকাশ-নাশে।
যুক্ত যেবা না ঝুলে সে, আত্মশক্তি-মায়া-ফঁসে।
ইচ্ছালব্ধ ভাবরূপে সে, ভবের সম এ ভূ-বাসে !
তাই ত বলি—আত্মবলী, স্বস্থ আত্মজ্ঞনােল্লাসে।
তবে কা’ কি ভাবনা, মুক্ত জীবের জন্ম-ভাষে ?
কোন কৰ্ম্ম-দাগ না লাগে, জীবন্মুক্ত-চিত্তাকাশে।

১০
আনন্দ-বিবেক
সত্য এক, বহু নয়।
“যে যা বলে, যার যে মত,” হয় যদি সত্য তাই।
তা হলে যা আমি বলি, তাতে কোন মিথ্যা নাই।
এই ভাবে চল্লে কৰ্ম্ম,
গণলে আত্মনাত্ম-ধৰ্ম্ম,
বুঝতে নিত্য-সত্য-মৰ্ম্ম, ঘৰ্ম্ম ছুটে সর্বদাই।
“যা হবার তা অবাধে হাে’ক,” দাড়ায় পাকা এই দশাই।
৫
যা’ হতে যা’ যখন ঘটে, মানলে সেটি সার,
কারাে কোন ভাবকে দূষ, উচিত তবে কার ?
“যে যা’ করে সবই সত্য,
এভাবে ঠিক সত্যাসত্য,
ব্যক্ত কোথা? গুপ্ত তথ্য, দ্বন্দ্বযুক্ত সঠাই।
নহে বহু, সত্য এক, বহুত্বে তা’ কোথা পাই?
বহুভাবে মিলে সত্য, স্বাতন্ত্র্য তার কেন চাই?
স্বাতন্ত্র্য-বােধ দীপ্ত যবে, সবাই নয় ধৰ্ম্মে চাই।
• সবার মত সত্য হলে, সাম্য-মুখে পড়ে ছাই ।
যা খুসী তাই করে লােকে, নাহি মানে ডাক দোহাই।
বিনা নিয়ম কেহই না কম, ক’রতে মিছা ঝাঁই-ঝই।
থাকলে নিয়ম, করতে যা’’, কেহই না পায় নাই।
বিরােধ-নাশে, শান্তি-আশে, ভাবের স্তর চাই মানাই।
মাতে গেলে ভালমন্দ, বিচার নয় ঘাের বালাই।
ভালমন্দ-বিচার-দ্বন্দ্ব, চি-সাগরে মিলায় থাই।
ভাবাতীত বস্তুকে তাই, জ্ঞানেই মাের পেয়ে যাই ।
পড়লে লক্ষ্য অহম্‌’পরে, কিছুই মােরা না হারাই।

মানন্দ-বিবেক
অমৃতত্ত্ব, লােকের মাপের বহিভুত।
যে ভাবে যে মাপুক মােরে, আমি সেই মাপে তার,
আমি যা, তা বুঝি’ যেন, তৃপ্ত থাকি অনিবার।
লােকের কথা দিয়ে ছেড়ে, দেখলে মনের কথা পেড়ে,
মাপতে মােকে যেয়েও বেড়ে’, শেষটা করে নমস্কার।
“আমিকে” ঠিক না জানি আমি, এমনি “আমি” চমৎকার !
‘তবে যে যা বলে মেপে’, যেরূপ ভাব-ডােরে,
মনে মনে আর যা ভাবে, সে তা’র গা’র জোরে ;
বিচারেও অহতত্ত্ব,
আমিত্বের অনায়ত্ত,
পেয়েও বুদ্ধি, শুদ্ধি, সত্ত্ব, না করে ছার অহঙ্কার।
লােকের কথাকথা মাত্র, ব’লতে অহম্‌-তত্ত্ব-সার!
কথায় শুধু যায় এ বলা,-“আমি সৰ্ব্ব, সাধার”।
“আমিই সচ্চিদানন্দ—অস্তি-ভাতিপ্রিয়াকার”।
“অবশিষ্ট থাকে কিছু বলেও ব্ৰহ্ম সারাৎসার”।
‘আরাে, আরাে যত বলি, আরাে তত সে উদার”।
আমাকে তাই যে যা বলে, সে সব প্রিয় উপহার।
আমায় নিয়ে যে যা করে, সে ত প্রিয় ব্যবহার ।
আমি যদি হই অনন্ত, আয়ত্ত তা', কবে কার ?
অনন্ত যা’ সান্তভাবে, তার কি কভু কমে ভার ?

আনন্দ বিবেক
ধর্ম দোষী নয়, গোঁড়ামীটাই দোষী।
ধৰ্ম্মকে কে দূষে কোথা? গোঁড়ামীটাই লাগে চোকে।
সার না বুঝে গোঁড়ামীকে, রাখলে
ধরি’ সবে টোকে।
ভাবের গােড়ায় রয় যে ‘আমি’, সে নয় ভ্রান্ত, যে তার কামী,
সে ভাব হ'তে পড়লে নামি, অহঙ্কারে মনটা ঝোঁকে।
থাকলে গোড়ায় অহমিকা, গোঁড়ামী তা”, বলে লােকে !
গোঁড়ামী আর একনিষ্ঠা, কভু না একরূপ,
গোঁড়ামীতে ন্যায়-ভূমিতে, দৃষ্ট বিষ-কূপ ;
হলে সত্য আমির গোঁড়া,
অহঙ্কার দাড়ায় পেঁঢ়া,
গোঁড়ামীতে আগাগােড়া, বিদ্বেষভাব প্রাণে ঢােকে।
গোঁড়ামীর শেষভড়ামী, নিদ্বন্দ্বে তার কায না চোকে ।
একনিষ্ঠা-পরাকাষ্ঠা, না দেয় আমল একে-ওকে!
সেব্য যে তা’র, তাকেই ধরি', তারই পদে মাথা ঠোকে।
খণ্ডে না তা’য় তুষ্টি বাড়ে, সদাই দৃষ্টি থাকে থােক।
একনিষ্ঠ ধৰ্ম্মীকে তাই, পড়তে না হয় মিথ্যা শশাকে।
একনিষ্ঠ গোঁড়ার মত, জাহির হতে শখ না ফেঁাকে।
দু’য়েরই বা’র ‘আমি’ যবে, আত্মজ্ঞের ভাব কে রােখ?
দেহাত্মবােধ থাকতে, কাকে, তেয়াগে কাল-চিন্তা-পােকে?
. . সবাই ত্রস্ত, ব্যাধিগ্রস্ত, অনাত্মজ্ঞান-চিলের ঠোকে।

আনন্দ-বিবেক
কালজ্ঞানই, কালজয়ের প্রকৃষ্টোপায়।
ভীমকায় কালকে ডাটা, নহে সত্য কালজয়।
পাঁজির কাল শিশুর কাল, যীশুর না তা’য় বাড়ে ভয়।
যে ভাবে যা’ কালরঙ্গ,
ঘটুক যে ভাব-সঙ্গ,
যদি না তা টলায় অঙ্গ, কালজয় ত তাহাই হয় ।
বুঝলে চিত্ত কালিক তত্ত্ব, আপনি কাল বশে রয় ।
কালক্রমে যে ভাব যথা, চোখের’ পরে ভাসে,
কালের ক্রম থাকলে জানা, মনে না ত্রাস আসে ;
জ্ঞানে চিত্ত কালমুক্ত,
অজ্ঞানে ত’ শঙ্কাযুক্ত,
হলে অজ্ঞান জ্ঞানভুক্ত, উপরােক্ত দোষের ক্ষয়।
যাহাই কালে সামনে আসে, জ্ঞান হয়—তা সত্য নয় !
কালের খেলায় মুগ্ধ না যে, সেই কালজ্ঞ মৃত্যুঞ্জয় ।
বিমুগ্ধ জীব কালকে ডরে, গণি’ সত্য ক্ষয়ােদয় ।
কাল ত চেতন-স্পন্দ-ধৰ্ম্ম, সে হেতু লয়, অভ্যুদয় !
চি-সম্বি ভা’সলে হৃদে, স্বতঃই তার পরাজয়।
কাল না কাছে নৃত্য করে, যে হেরে সব ব্ৰহ্মময় !
ধৰ্মীকে তাই বুঝাই চাই, হয় যা’ কালের গুপ্তালয় ।
জ্ঞান-বলে যে স্থিত তথা, কালজয়ী সে অনাময়।

আনন্দ-বিবেক
পরমাত্মা সরসাত্মক।
১৪
রসময়কে চিন্‌তে যেয়ে, নীরস ভাবে কেন র’ব ?
সরসের খনি যিনি, সৰ্বরসেই তাকে পাব।
করুক মন যে বস পান,
যে রসে হােক সুপ্ত প্রাণ,
সেই রসেই ত তাঁহার স্থান, কেন তাহা ছাড়তে যাব?
রসস্বরূপ আত্মা অরূপ, আত্মভাবেই ধন্য হ’ব ।
আত্মা যবে সর্বব্যাপী, সৰ্বগুণাধার,
কিসে তবে বিশাল ভবে, কাহার ব্যভিচার ?
মূলকে ভুলে’ করলে কৰ্ম্ম,
ধম্মী-ভ্রমে ধ’রলে ধৰ্ম্ম,
এ’ রসভা-সারমর্ম, কে বলে ঠিক বুঝে’ ল’ব ?
আত্মনিষ্ঠ শিষ্ট হলে, আমরা কভু দুখ না স’ব !
সবার মাঝে সকল কাযে, আত্মরসে থাকবে নব !
মিথ্যাভােগী না হই যদি, তেমনি আমি,-যেমন ভব?

১৫
আনন্দ-বিবেক
একত্ব-জ্ঞানেই নিৰিকল্প-স্থিতি।
একই পথে, একই-মতে, একই সাথে ঘুরা ফেরা।
নির্বিকল্প ভাব বই তা’, সবিকল্প না যায় ধরা।
শ
মূলের এই সুসিদ্ধান্ত,
হলেও ক্রমে সর্বস্বান্ত,
ত্যাগ না করে কভু শান্ত, প্রাপ্ত হয়ে আপ্ত ডেরা।
বহুত্বে তার একত্ব-ভাষ, যে ভাবে তা’য় কর জেরা !
শক্তি-তালে এ দেহ, মন, না রয় এক ভাবে,
কভু আসে, সুভাব-বশে, কখন অসদ্ভাবে ;
তাদের ভিন্ন ভিন্ন কাৰ্য্য,
যদিও হয় অনিবাৰ্য্য,
তবু তা নয় পরিহার্য্য, মুলজ্ঞান যা সর্বসেরা।
তাই ত জ্ঞানী দোষ না গণে,—জ্ঞানে কোন কৰ্ম্ম করা ।
কৰ্ম্ম-প্রকৃতির ধৰ্ম্ম, জ্ঞানী ত তা’য় মরে ঢেরা।
সােজা কথা—তেনি তাহা, চাউনি যেমন চালায় টো!

আনন্দ-বিবেক
আত্মসত্তাই, সৰ্বাকারে অভিব্যক্ত।
চিতি-স্পন্দে নানা ছন্দে, আত্মসত্তা সৰ্বাকারে।
একের যা’, তা অপরে তাই, আনুতে চাহে স্বাধিকারে।
লুটতে চায় যা, যে যেরূপে, লয় লুটে’ ত’, সে সেরূপে,
করলেও কাষ চুপে চুপে, শেষটা চেপে রাখতে নারে।
ব্ৰহ্ম হ’তে কীটাবধি, সবাই ব্যগ্র লুটিবারে।
মানব, দানব, পশু, পাখী, পতঙ্গ, কীট, সবে,
ল’বেই ল’বে অংশ স্ব স্ব, সাজালে ঘর ভবে ;
হয়ে আত্মপূৰ্তিভাগী,
আত্মমুর্তি-ঘূৰ্ত্তি লাগি’,
জীব আত্মসেবাগী, লক্ষ্য রাখি’ সৰ্ব্বধারে।
আত্মসত্ত্ব—আত্মভােলা, পরতত্ত্ব-সিন্ধু-পারে ।
“পরই পর” এ বােধােপর, আত্মতা না টেকতে পারে !
বিকল্পই দাড়ায় পর, স্ব-সঙ্কল্প-ব্যবহারে।
আত্মসত্ত্ব আত্মবােধে, আপনা-ঠই আপনি হারে।
“মূলতঃ এক, নয় অনেক” এও না পারে বলতে ঠারে।
তাই সে নিজে সত্তা খুঁজে, সাজা’য়ে পর আপনারে !
পর ত আপন সত্তা-ফুরণ, নিজত্ব কি, জানিবারে।

আনন্দ-বিবেক
১৭
সত্ত্বাবরণই, সত্তাবােবক
১৭
আত্মসত্ত্ব-বােধই, সত্য আত্মসত্ত্ব-আবরণ।
পূর্ণ নহে, আংশিক তাই, আত্মজ্ঞান-বিবরণ।
ভাবের মাঝে যাহার সাড়া, খায় সে সদা কালের তাড়া,
পূর্ণতা না অশেয-ছাড়া, অশেষই তার আচরণ।
অব্যক্তেই পূর্ণত্বের, গুপ্ত-লীলা-নিকেতন !
পরে পরে পরিব্যক্ত, যে সব পূর্ণ-মাঝে,
যদিও তা পূর্ণে গণ্য, পূর্ণের ভাব-সাজে ;
তথাপি যা’র আবির্ভাব,
দেখি তার প্রাদুর্ভাব,
যায় দূরে অসাব, ভিন্ন তত্ত্ব-প্রকরণ।
“একত্বই ভিন্নত্ব-মূল,” এ সিদ্ধান্ত সনাতন।
ভিন্নত-মূল হ'লেও এক, পূর্ণত্বে তার বিস্মরণ।
পূর্ণে এক, দুই বা বহু, নাইকো কারাে স্থিরাসন।
যা অনন্ত, তাহাই পূর্ণ, পূর্ণ ই পূর্ণ-আস্তরণ!
অনন্ত হয় পূর্ণ যদি, কিছুই নয় অকারণ!
কেবা তবে চায় এভবে, করতে কি ভাব সম্বরণ?
পূর্ণ হ’তে নহে ত্যক্ত, ব্যক্ত-ভাব সাধারণ।
তবু পূর্ণ আত্মসত্বে, কাল না করে বিচরণ।
আবরণ হয়েও জ্ঞান, আত্মসত্ত্ব-আভরণ।
আত্মসত্ত্ববােধেই তাই আত্মত্বের প্রসারণ।

১০
আনন্দ-বিবেক
চঞ্চলতাই, চেতন-ভাব।
স্থিরত্ব হয় জীবন-মরণ, চাঞ্চল্য তার ব্যবহার।
নহে স্থৈৰ্য্যে, জলােচ্ছাসে, খ্যাত মহাপারাবার ।
অন্য সব দূরে রেখে,
কোন এক ভাব দেখে,
মতি তাহে রাখলে রুখে, অজ্ঞানই শেষ পুরস্কার ।
চেতন জীব চায় চেতনা, জড়ত নয় লক্ষ্য তার!
•
যে ভাবেই ব্যক্ত হউক, যেথায় যাহা যবে,
দেখতে দেখৃতে এগিয়ে গেলে, মন না মুগ্ধ র’বে ;
কোন ভাব সামনে এলে,
প্রাণ তাহে দিয়ে ঢেলে',
চলিয়ে দাঁড়িয়ে গেলে, কি-ই বা সিদ্ধি ঘটে কা’?
থেমে যাওয়া—দাগা পাওয়া, টেনে লওয়া অন্ধকার ।
জীবন-পথে এগিয়ে যাওয়াই, বাড়ায় শান্তি-অধিকার।
বিনা-স্পন্দ চিররুদ্ধ, অনন্ত-হগ্ম-দ্বার।
স্বভাবতঃ তাই ভূ ব্যক্ত, রক্ষা তরে সত্যসার।
চঞ্চলতাই চেতনতা, অন্যথা যা’, অ’ বিকার ?

আনন্দ-বিবেক
কৰ্মই, চেতনের ধর্ম বিশেষ।
বাঁধাবাঁধি, ছাঁদাছদি, সবই জাবভাবকে ল’য়ে।
জীবত্ব কি, বুঝলে পরে, সকলি যায় ঢিলা হয়ে ।
যে সত্তায় ভূ-কল্পনা,
নিত্যনব তার স্ফুরণ,
ধৃতি যথা—মৃতি তথা, বিস্মৃতি-স্রোত যায়গাে ব’য়ে।
কে তবে চাও চির-বিরাম, অচল ঠাটে সুপ্ত রয়ে?
•
প্রকৃতিতে যা’র যা’ কায, যে রূপ যেথা ধরি,
সে কায সে ফেলে ছেটে, রয় যে প্রাণে মরি’
লীলায় ব্যক্ত চেতন-বিলাস, লীলাই লয়, লীলাই বিকাশ,
করতে গেলে তাকে বিনাশ, আত্মত্ব-নাশ দুঃখ স’য়ে।
কৰ্ম্মই তা’ই বেড়ায় সদা, চেতন-গুণ শিরে ব’য়ে।

২০
আনন্দ-বিবেক
ঠেলা খেয়েও মেলা।
২০
কে আর মােরে এ সংসারে, করতে পারে এবে হেলা।
বিদঘুটে বা বিজ্ঞান যা’, তাহাই ল’য়ে আমার খেলা।
রেখেও জমি নাইকো ফসল, নকল-নাড়া থাকতে আসল,
কৰ্মী ল’য়ে কায না সফল, ভিক্ষা-পুঁজি থেকেও চেলা।
গাভী পুষি’ প্রাপ্তি চোনা, ঠেলাই সার আসূলে মেলা!
পেয়েও গেহ, ভিজে দেহ, বল না তাহে, যায় যা গেলা !
শরীর ধরি’ সােয়াস্তি নাই, চিন্তার জ্বর সারা বেলা।
জ্বালার’পরে বাড়ে জ্বালা, দুখের’পরে দুখ,
বিনা দোষে হ'য়ে দোষী, সদাই পুড়ে মুখ ;
তবু আমি কোমর বেঁধে,
কভু হেসে কভু
কেঁদে,
আত্মকর্ম যাচ্ছি সেধে,' দেখেও কাছে পারের ভেলা।
যেথায় মাের কৰ্ম্ম-ভূমি, সেথায় পথে কাঁটা ফেলা !
জানি না কে কোথা হেন, এ' চেয়ে যে সহে ঠেলা ?
যে সব নিয়ে যত জ্বালা, সে সাথে মাের তত মেলা।
এ ভাবে কে আমার আগে, খেয়ে এত নিন্দা-ঢেলা ?

আনন্দ-বিবেক
বস্তুতে বস্তুত্ব নাই, বস্তু-সত্তা জ্ঞানে।
বস্তুতে না বস্তু ভাসে, বস্তু ভাসে মাত্র জ্ঞানে।
বস্তুর বস্তুতা তাই, সে জ্ঞান তরে সবে মানে।
জ্ঞানই সত্য বস্তুর রূপ,
মিথ্যাও জ্ঞান-প্রতিরূপ,
জ্ঞান—সব ভাব-ভূপ, জ্ঞান-লক্ষ্য সৰ্বস্থানে।
কৰ্ম্মে নহে কৰ্ম্মের শেষ, জ্ঞানেই তাকে অন্তে টানে।
যাহাকে যা বলি মােরা, তাহাও জ্ঞান-বলে,
জ্ঞানকে ছেড়ে অজ্ঞান না, কোথাও একা চলে ;
সকল রূপ, সকল নাম,
সকল ভাব, 'সকল কাম,
জ্ঞানেই ভাসে অবিরাম, সবার দৃষ্টি জ্ঞান-ধ্যানে।
জ্ঞানই যদি সবারি মূল, কে তা’র শিরে খাড়া হানে ?
যাহাই সত্তা তাহাই জ্ঞান, তাই অনন্ত-অভিধানে।
জ্ঞানই সকাল-সাক্ষী, সতত্ত্ব-সমাধানে।
বিরাটত্ব—সসীমত্ব, একই জ্ঞান-অধিষ্ঠানে।
তাই যা কিছু ভেতর-বার, সবার আঁখি জ্ঞান-পানে।
জ্ঞানের কার্য সমান চলে, আবির্ভাব-তিরােধানে ।
জ্ঞানের করে জ্ঞান না মরে, কালের খ্যাতি অভিজ্ঞানে।
জ্ঞানই যুক্তি, জ্ঞানই মুক্তি, জ্ঞানই ব্ৰহ্ম, জ্ঞানী জানে।
জ্ঞানই ভক্তি, জ্ঞানই শক্তি, জ্ঞানকে পূজে শক্তিমানে !

আনন্দ-বিবেক
বিকাশ-মুখে নয়, বিনাশ-মুখেই বস্তুজ্ঞান।
২২
বস্তু-জ্ঞান না বিকাশ-মুখে, বিনাশ-মুখেই ভাসে জ্ঞান।
বিনাশের বিনাশ তরে, তবু সবে যত্নবান্।
ক্রমবিকাশই-“বেড়ে যাওয়া, এক হ’তে আর দশা পাওয়া,”
এই দশাতেই বিলয়-হাওয়া, সদাই রয় বহমান।
তা’তেই জাগে বস্তুর জ্ঞান, তাতেই জীব চক্ষুষ্মন্ ।
ক্রমবিকাশের জ্ঞান ত ভাসে, বিনাশ-কৰ্ম্মফলে,
“হরই—জ্ঞান-ভাবমূর্তি”, অভিজ্ঞ তাই বলে ;
কোথা কিছু করলে স্বীকার, বিনাশধৰ্মী অস্তিতা তার,
অস্বীকারে সমত্ব সার, ভেদত্ব আর না পায় স্থান।
বিনাশ-ভাবেই পড়ে ধরা, বিকাশের কি অধিষ্ঠান।
সৃষ্টি-স্থিতি-ব্যাপার-মূলে, বিনাশ-লীলাই বৰ্ত্তমান।
বিনাশ-হাতে ত্রাণ না তার, জীবনে যে আস্থাবান !
বিনাশই ঠিক রক্ষা করে, জীবনের যােগ্য মান !
বিনাশ নামে তাই ত জ্ঞানী, ভয়ে না হয় মুহমান।
অনন্তের অশেষ কায়, বিনাশ-ক্রমে বর্ধমান।
“বিনাশশূন্য বিকাশ—শূন্য,” ইহাই সত্য-সমাধান।
বিনাশ-কোলেই তাহার লীলা, হাে’ক যে যত সাবধান।

আনন্দ-বিবেক
কামিনী-কাঞ্চন-কায়া, আত্মমায়ারই
প্রতীক।
কামিনী, কাঞ্চন, কায়া, সবই আত্মমায়ারূপ।
জোর করে তা ছাটতে গেলে, দাঁড়ায় মূল অন্যরূপ।
“শক্তিমান শক্তিশূন্য,”
এ কথার মূল্য---শান্ত,
শক্তি-তরেই মূল না ক্ষু,-গণ্যমান্য স্ব-স্বরূপ।
স্বভাব-তত্ত্ব-নীরাজনে, নারী, সােণা-দীপ—ধূপ !
অন্যথা তা’র না হয় যদি, ছাড়বে কে কি ভবে ?
তত্ত্ব বিনা তথ্যের জ্ঞান, হয় নি, নাহি হবে ;
তবু সেই তত্ত্ব-ত্যাগে, কোমর বেঁধে যা’রা লাগে,
তারা ভ্রান্তি-শরণ মাগে, না ভাবে তা' জ্ঞান-কূপ।
রূপের মাঝে বিরাজ করে, চিদাকৃতি অপরূপ !
বিশ্বের ভাব তাই ত ব্যক্ত, হইয়ে চি-অনুরূপ।
থাকতে কায়া না যায় মায়া, জানায় সে, কে কিরূপ।
সৃষ্টিতে যা ব্যক্ত যবে, সে ত সত্য-প্রতিরূপ।
সৃষ্টি যদি ব্যর্থ না হয়, সৃষ্টভাষ কা’র বিরূপ?
সংযমে যে ভােগরত, সে ভােগে সে ত্যাগী-ভূপ।
কোথা তবে বস্তুর দোষ, দীপ্ত যাহা মূল সরূপ ?

২৪,
আনন্দ-বিবেক
স্বপ্নের গানেই অধিক শান্তি।
২৪
কে তুমিগে। কি গান গাও, স্বপনে মাের ভেসে ?
এমন গান ত কেউ না গাহে, আমায় ভালবেসে।
যবে আমি জেগে উঠি,
সেই স্মৃতি থাকে ফুটি,
মনে ভাবি-কখন ছুটি, আবার সেই দেশে।
এমন গান ত শুনায় না কেউ, স্বপ্নে কাছে এসে !
জাগৰ্ত্তির এই যে জগৎ, সদাই দ্বন্দ্বময়,
স্বপ্নজগৎ সেরূপ কভু, শঙ্কাপ্রদ নয় ;
হাসি-কান্না, সকল সুরে,
সেথায় বটে কর্ণ পূরে,
তবু তা না হৃদয়পুরে, ভয়কে রাখে ঠেসে।
এ দেশের যে সুর হাে’, সেথার সুরে মেশে।
তা’ই ত বলি—সেথার গানে, বিমুগ্ধ হয় যে-সে ।
সেথার ভাবে হেথার ভাব, উড়ায় লােকে হেসে।
হেথায় সবার লীলা যেন, সেথার ভাববেশে !
সেথায় যেন শান্তিতে বাস, হেথার লীলা-শেষে !

আনন্দ-বিবেক
দু’কুড়ি সাত তুলে’, হাতের পাঁচ
রাখাই ভাল।
২৫
দু’ কুড়ি সাত নাহি রেখে, লক্ষ্য যাহার হাতের পাঁচে।
পাকা গুটি হয়েও সে, বুদ্ধিদোষে আপনি কঁচে।
দু’কুড়ি সাত তুলে ঘরে,
হাতের পাঁচ যে রক্ষা করে,
খেলার হাটে সে কাটে দরে, যাচাই তরে নাহি যাচে।
জগুণে কৰ্ম্মাগুনে, দিয়েও ঝাপ শেষে বাঁচে।
•
ভবের খেলায় যেবা হেলায়, মূলকে ফেলে ছেটে,
রাখতে শাখা করে আশা, ভুল সে ধরে এঁটে
মূল-সত্যে থাকলে দৃষ্টি,
বৈষম্যের এই সৃষ্টি,
বিনাশে না কারাে হৃষ্টি, না পড়ে কেউ ভ্রান্তি-ছাঁচে।
আপন ভাবে আপনা রাখি’, আপন তালে আপনি নাচে।
আপন বৃতন থাকতে কাছে, তুষ্ট কেবা তুচ্ছ কঁচে?
কেবা আত্মজ্ঞান-নিধিকে, কঁাচের সম অসার আঁচে ?
অজ্ঞানে যা’র চিত্ত রত, দগ্ধ সে দুখ-বহি-আঁচে।
৩

আনন্দ-বিবেক
অহঙ্কার নয়, অহম-সঙ্গই প্রার্থনীয়।
২৬
আমার আমিত্ব-জ্ঞান, না হয় যেন দেহ ধরি'।
জাগে যেন আমিত্ব-বােধ, অহমের সঙ্গ করি।
যদিও আমিত্ব মাঝে,
অহমের বীণা বাজে,
তবু তার বহু কাযে, (আমি) বৃথা বহু কাল হরি !
থাকিতেও চেষ্টা শত, এ দেহ যায় দূরে সরি’ ।
অহ-বীণার সুরকে ধরে’,যে সেই অহসনে,
ভিড়তে পারে, কোনও চাপ, না রয় তার মনে ;
হয়ে মােরা অহঙ্কারী,
যে কায না করতে পারি,
করতে তা না কভু হারি, চিন্তা-জ্বরে আর না ডরি।
দেহ দূরে গেলেও স’রে, সত্য-বােধে সদাই চরি।
“অহমসত্ত্ব তত্ত্ববােড়া,” এ বােধে সব দুঃখে তরি।
অহম্ পরে দৃষ্টি যাহার, অহঙ্কার তা’র না অরি!
অহঙ্কারে সে নয় কারে, অহমকে ঠিক লয় যে বরি’।
অহঙ্কারে চায় সে তবে, অহম-সেবা প্রাণ ভরি।
অহঙ্কার ত—“সে অহম কার?” বুঝিয়ে তা না রয় জরি’ ।
সে অহঙ্কারে অহম্ কারে, না পড়ে, মূল সত্য স্মরি।
বাদানুবাদ-তত্ত্ব-বিবাদ, যায় মিটিয়ে সরাসরি।

আনন্দ-বিবেক
অনন্ত ব্ৰহ্ম, মাত্র জ্ঞানাধিগম্য।
অনন্ত যা তাকে পাওয়া,জ্ঞানেই পাওয়া জানাে সবে।
আর যে রূপে যে যাকে পাও, তাই তা’, যাহা মানাে ভবে।
নহে বিভু কভু সান্ত,
তাই না কারাে চিত্ত শান্ত,
সদাই ক্ষুব্ধ, কৰ্ম্মক্লান্ত, ভ্রান্ত হয়ে ভাবােৎসবে।
“হয় না—জ্ঞানেই সান্ত, জ্ঞানী বই তা’ কে কয় কবে ?
#
“যা’ অনন্ত, নয় তা’ সান্ত” সান্ত তা সেই জ্ঞানে,
নইলে তাকে সান্ত রূপে, না পায় কেহ ধ্যানে ;
জ্ঞান-অনন্ত ব্ৰহ্ম-রূপ, তাই জ্ঞানে সে সাত-সরূপ,
মায়িক জ্ঞান হয় না সেরূপ, হয় তা’, ভাসে প্রম যবে।
ব্ৰহ্ম হলে সর্বব্যাপী, নূতন বস্তু কে কি ল’বে ?
নব ভাবে কে কি পাবে, কি উপায়ে কোথা তবে?
পা’বার যা তা’ পেয়েই আছে, বুঝুক ভ্রান্ত অনুভবে !
“সাধন ত সেই অনুভূতি, কই তা আমি উচ্চরবে।”
সাধক তবে অসত্ ভাবের, অসার-ধ্যানে কেন র’বে ?
অহম্‌-অন্য, নয় তা ব্ৰহ্ম,” এ ভার গণ্য জ্ঞানাভাবে।
অহম্ পেয়ে জানি না কা’র, আর কি সার পেতে হবে।
অহম পাওয়া সবই পাওয়া, সবকে পেয়ে দুখ কে স’বে ?

২৪
আনন্দ-বিবেক
বস্তুর ক্রিয়াশক্তিলােপে, বস্তুজ্ঞান
অসম্ভব।
২৮
আমার আত্মমায়াশক্তি, যে রূপে যে বস্তু সহ,
ব্যক্ত এই বিশ্বভাবে, দীপ্তি ত তার অহরহঃ ।
জোর করি’ তদন্যথা,
ঘটাতে যে চাহে যথা,
মুক্তি তথা কথার কথা, বাড়ে ব্যথা দুর্বিষহ।
আত্মশক্তি-ধারা রােধি’, কেবা তবে শান্ত রহ?
আত্মমায়াশক্তি যদি, বস্তুর রূপ ধরে,
সদাই ত তার চলবে ক্রিয়া, স্বতঃই অহম’পরে ;
রুদ্ধ হলে শক্তির কার্য,
পড়ে আমির-মাথায় বাজ,
ছাড়লে আমি ভাবের সাজ, কি কথা কে কারে কহ ?
“স্বভাবে নাই ভাবের অভাব”, এ ভাবে সার বুঝে লহ।
“ভাবকে ধরি’ স্বভাব-বােধ” এ সত্য-ভার সবে বহ।

আনন্দ-বিবেক
“আমার” নিয়াই “আমি” তৃপ্ত।
“আমার” বই “আমি” ভবে, না করে আর কারাে আশা।
“আমার” সম “আমির প্রতি, কেউ না দেখায় ভালবাসা।
রেখে তাকে ভাল বাসে,
অনেকেই ভালবাসে,
“আমার” থাকিলে খাসে, সমান গণে কাঁদা-হাসা।
আমা ভিন্ন “আমির” কাছে, সবারি ভাব ভাসা-ভাসা।
অনুরক্ত ভক্ত সাজে, সুখের কালে যারা,
শক্ত হয়ে রক্ত আঁখি, দেখায় দুখে তারা;
আর আর যা’, সবই চলে,
কেবল গুরু যাহা বলে,
পালে তা’ গায়ের বলে, এমনি নীচ, মূখ চাষা।
দেষের আগুন জ্বালে রাষে, একটু যদি যায়গাে তাসা!
‘সু-শীলের” শীল-লােপ, না পড়িতে উল্টা পাশা!
“আমি” কিন্তু “আমার”-ভাবে, সর্বদাই থাকে খাসা।
“আমি” ভাবে,—“আমার-ভাবে তাহার চিরশান্তি-বাসা।
‘‘আমার” কোন কাযে “আমি”, না গণে ক্লেশ রতি, মাষা।
অন্য ভাবে অন্তরে তা’র, অভাব-ভয়-ভ্রান্তি-বাসা ।
“আমার” লাগি’ “আমি” সােণা, অন্য লাগি’ পিতল-কাঁসা।
===

আনন্দ বিবেক
জ্ঞানআঁখিই, অন্ধের ঈস্পিত বস্তু।
তুমি চিরজ্ঞানআঁখি, চিরদীপ্ত নির্বিকারে
অন্ধ আমি, দিবাযামি, ভ্ৰমি ভ্রান্তি-অন্ধকারে
ভেদি সেই মােহ-তমঃ,
কবে তুমি প্রিয়তম,
ফেলবে ছেয়ে হৃদি মম, ছড়িয়ে দিয়ে আপনারে।
জ্ঞান-আঁখি, তােমা আমি, পেতেই চাই হৃদাগারে।
সবই মাের সে দৃষ্টি-পথে, সদাই আছে পড়ে,
সবাই যাচে-সে ভাব-ছাঁচে, উঠতে ত্বর। গড়ে ;
সে ভাব বই যাহা অন্য,
নয় তা মম কাম্যে গণ্য,
কেবল তুমি, তােমার জন্য, খিঃ মতি শূন্যকারে।
তব দিব্য জ্যোতিঃ-জাল, বিকীর্ণ হােক এ আঁধারে।
দেখলে জ্যোতিঃ ভুলবে মতি, ফুলবে না আর অহঙ্কারে!
জ্যোতিঃ-ধ্যানে, জ্যোতিঃ-জ্ঞানে, রইবে আত্মসত্ত্বাধারে।

আনন্দ-বিবেক
ভক্তি, জ্ঞানের স্কুলদেহ।
ভক্তি-জ্ঞান-স্থূলদেহ, জাগে তাহে চেতন-জ্ঞান।
দেহীর কাযে দেহের মত, অন্য না কেউ যত্নবান্।
ভক্তি ভিন্ন জ্ঞানের সেবা, করতে পারে অন্য কেবা ?
করতে ত’ চায় অন্য ষেবা, সে যেন তার মৃত্যুবাণ ।
ভক্তি-হাওয়ায় জ্ঞান না ঘুমায়, দাঁড়ায় সর্বশক্তিমান্ ।
ভক্তি-তনু অচল হ'লে, সেবার ত্রুটি-দোষে,
পঙ্গু সম জ্ঞানের দশা, বিজ্ঞানময় কোষে ;
ভক্তি লাগি জ্ঞান বুদ্ধ,
ভক্তি লাগি’ জ্ঞান শুদ্ধ,
হয় তার স্রোত রুদ্ধ, সবার কাছে বাড়ে মান।
নারীর আদর-যত্ন বিনা, তৃপ্ত কোথা নরের প্রাণ?
করে ভক্তি জ্ঞানের সেবা, সব তা’র করি’ দান।
ভক্তিকে তাই জ্ঞান না ছাড়ে, ভক্তি যেন জ্ঞানের যান।
যেথায় ভক্তি সেথায় জ্ঞান, কারূপে ভাসমান ।
দু’য়েই যেন দু’য়ের প্রতি, দেখায় সম প্রীতি-টান।
ভক্তি-জ্ঞান-লীলাভূমি, জ্ঞানও ভক্তি-অধিষ্ঠান।
ভক্তিকে জ্ঞান সঙ্গে রাখি’, জয়ী সব-সন্নিধান।
ভক্তিও জ্ঞানসেবা-ছাড়া, আর যা’ করে প্রত্যাখ্যান।
জ্ঞানের সেবায় ভক্তি সতীর, ব্যভিচারের নাইকো স্থান।
ভাষা-ভাব সম দু’য়ের, এক ক্ষেত্রে অবস্থান।

আনন্দ-বিবেক,
জ্ঞানের হাতেই ভক্তির খােলতাই।
জ্ঞানের হাতে না সাজিলে, নিখুত না হয় ভক্তির সাজা।
অন্য কেহ সাজা’লে তা’য়, বাড়ে তাহার অশেষ সাজা।
ভক্তি-পত্নী, জ্ঞান-পতি, তােষিতে তাই পতির মতি,
ভক্তি যেন সাধ্বী সতী, প্রীতি-ভাবে সদাই তাজা!
জ্ঞানও ভক্তি-অনুরাগী, হইয়ে তার হৃদয়-রাজা।
সকল ক্ষেত্রে কনে চেয়ে, বয়সে বর বড়,
ক’নে চেয়ে সর্বত্র রয়, সকল কাযে দড় ;
বর আগে প্রাণের টানে,
ক’নেকেই ঘরে আনে,
ক’নে ত তাই তাকে মানে, বরেরও কায ঘসা-মাজা।
বরই সাজে ক’নের খোঁজে, এমনি বিশ্বপ্রেমের ধাঁজা।
জ্ঞানই জানে—কি ভাব-দানে, বাজা’তে হয় ভক্তি-বাজা।
ভক্তি-বারি না পড়িলে, জ্ঞানভূমিতে শুখা—হাজা!
জ্ঞানের বহির্বিকাশ-শক্তি, ভক্তি-নামে উড়ায় ধ্বজা।
জ্ঞান ত তাহে বুদ্ধ, ভক্তি, তাহার লাগি করে যা, যা।
ভক্তি সেবা না করিলে, দাড়ায় জ্ঞান ডাহা খাজা!
ভক্তি যেন জ্ঞানের প্রাণ, নইলে সে ত পােড়া ভাজা

আনন্দ-বিবেক সংখল্বিদংব্রহ্ম। - “সব বস্তু ব্ৰহ্মময়,” এ বাক্যের এ অর্থ নয়- “দৃশ্য না আর ভাসে চোখে, যবে ব্ৰহ্মজ্ঞানােদয়”। পরিদৃষ্ট যা যা ভবে, ব্ৰহ্মসত্তা-ভাতি সবে, কিসে দৃশ্য লুপ্ত হবে ? তাত ব্ৰহ্ম-পরিচয় ! দৃশ্যাভাবে দ্রষ্টা নাহি, দ্রষ্টা-জ্ঞানে জেগে রয়। সবে ব্ৰহ্ম, ব্রহ্মে সব, গণলে সত্য সার, কি ভাবে ভূ ব্রহ্মময়, বুঝতে দেরী কার ? “ভিন্ন ভাবে প্রতিরূপ,” মালে ব্ৰহ্ম অপরূপ, সে যে শুদ্ধ, এক, অরূপ, কিরূপে তা সিদ্ধ হয় ? এক অধিষ্ঠান-জ্ঞান, দ্বৈত-প্রম করে লয়। দাড়ালে মূল চিদধিষ্ঠান, ভাব-কৰ্ম্ম-সমুচ্চয়। থাকিলেও দৃশ্য ব্যক্ত, না ঘটে তার অপচয়। আর এক কথা, যথা-তথা, লােকে যা’কে ব্ৰহ্ম কয়, আত্মাই সে"ব্রহ্মের রূপ, আত্মাতে সব ভাসে বলি, আত্মময় দৃশ্যচয়। অহরূপে আত্মভাতি, যাহা সৰ্ব্ব-ভাবালয়। যা’ হ’তে যা ভাসে, তার, তাহাই ত মুল নিসংশয়। নীরবি ভাসে নীরে, নীরই তার সাশ্রয়। শ। তাতেই দীপ্ত সমুদয়।

১৪
আনন্দ-বিবেক
কেউ নাই যা’র, বিভু সঙ্গী তা'র।
৩৪
যাহার পক্ষে কেউ না থাকে, বিভুই তা’র পক্ষ লয়।
বিভু’পরে থাকলে আস্থা, দুরবস্থা দূর হয়।
**
ভক্ত যদি থাকে দীন,
নয় সে ভাবে তুচ্ছ, হীন,
রাজাও তার ভাবাধীন, কেহই সমকক্ষ নয়।
লােকই লােকের মহা অরি, মিত্রভাবে ক’জন রয় ?
আত্ম-যিনি বিভুরূপে, আছেন হৃদে জেগে,
তাহার সম বন্ধু কোথা, পায় কি কেহ মেগে ?
সম্পদেই বন্ধু সবে,
আসে, কাছে, বিপদ যবে--
সকল বন্ধু সরে তবে, কেহই না সহৃদয়।
কেবল এক বিভু-আত্মা, কখন ন’ন নিরদয় ।
সদয় হয়ে সাহস দিয়ে, নাশেন দুঃখ, ভ্রান্তি, ভয়!
আত্মাই তাই চিরবন্ধু, গাও সকলে ত’রি জয়।

আনন্দ-বিবেক
স্বভাবেই আসে লােগ, স্ব-ভাবেই সরে।
“স্ব-ভাবেই আসে রােগ, স্ব-ভাবেই তা সরে যায়”।
বিশ্বাস যা’র হেন ভাবে, সেই, ভবে শান্তি পায়।
যাহে স্ব-ভাব-বিধি-হানি,
নিলে তাহা সত্য মানি’,
মরণ লয় কোলে টানি, কেউ না তবে ফিরে চায়।
স্বভাব-বিধি যে না মানে, কুঠার হানে সে ত পায়।
দ্বিশক্তিতে স্বভাব-কায, একের হ্রাস যবে,
অনুকূল বােধে অন্যে, মাতে হবে তবে ;
হলেও তা বিপরীত,
তাহাতেই ঘটে হিত,
অন্যথায় অত্যহিত, না রয় আত্মত্রাণােপায়।
গােলার ঘাত লাগলে ভূমে, প্রতি-ঘাতে সে লাফায় !
উৰ্দ্ধ হতে পতন-কালে, উদ্ধ, কভু না বাঁচায়।
পতন-মুখে ঢেউ কে রুখে ? পড়লে, পুনঃ উন্ধে ধায় !
যেথায় রােগ ওষুধ সেথা, যেথায় ছায়া সেথায় কায় ।
এক কালে যা’ রোগের হেতু, অন্য কালে তা পলায়।
রােগৌষধ সবকে নিয়ে, জাগ্নে স্ব-ভাব স্ব-সত্তায়।
কভু সে রােগ, কভু ভেষজ, কভু রয় সে সমতায় ।
পূর্ণ-গতি, পূর্ণ-স্থিতি,
স্বভাবের অন্তরায়।
নিয়ে স্ব-ভাব ফিরে স্বভাব, নাইকো তার প্রত্যয়।
স্বভাবতত্ত্ব অনায়, তবু জ্ঞানী তা জানতে চায়।

আনন্দ-বিবেক
স্বভাবের কার্যও একরূপ নয়।
স্বভাবের মাঝে যবে, ক্রমব্যক্ত ঋতু ছয়।
এক ভাবে কাৰ্য্য করা, জীবের কভু সাধ্য নয় !
স্বভাব যেমন নিত্য নূতন, জীবের ভাবও নব তেমন,
কভু হর্ষ, কভু রােদন, গ্রীষ্ম, বর্ষা যেমন হয়!
সমভাবে কার্যে ভবে, কেউ না করে কাল-ক্ষয়।
৩
কৰ্ম্ম-ছাড়া প্রমাজ্ঞান যা’, বদল ত’র নাই,
তাহাই মাত্র নির্বিকার, দেখতে মােরা পাই ;
বস্তু-জ্ঞান যা সাধারণ,
সে জ্ঞানেও আবরণ,
করবে কে তা নিবারণ ? সবার আছে ক্ষয়ােদয়!
বিপরীত ভাব-ক্রুমে, কালের বশে সমুদয়।
স্বভাবেরও স্বভাব-বশে, অসম্ভব স্ব-ভাব-জয় !
চিরকাল একই ভাবে, কোন কৰ্ম্মে কেউ না রয় ।
কাল-জ্ঞানে জ্ঞানীর তবে, অন্তর্হিত কাল-ভয়।
স্ব-ভাব-বিবৰ্ত্তন সম, ভাবও পরিবৰ্ত্তময়।
ভাবের যে বিবর্তন স্বভাবের তা’ পরিচয়।
মুখ-ভাবে—সেই-ই জ্ঞানী, এ দেহ যা’র অনাময়।
ধরলে দেহ, দেহের ধৰ্ম্ম, বিধিও নারে করতে লয়!
দেহ-ধৰ্ম্ম-বিজ্ঞাত যে, সেই ত বুদ্ধ সদাশয়।

৩৭
আনন্দ-বিবেক
সাজের মতই কাষ।
সেরূপ সাজে সাজে সাজে, যেরূপ কাযে শােভা ভার।
যে কাযের নহে যে সাজ, সে সাজে হয় সাজা সার।
সাজের মাঝে কাযের গােড়া, সাজই সাজায় কাযের গোঁড়া,
সাজে যেন কায মােড়া, সাজেই ব্যক্ত কাযের ঠার।
তাই ত যাহার যেরূপ সাজ, সেরূপ কার্য-ব্যবহার।
যে সাজে না যে কায সাজে, সে কায যেথা ঘটে,
জাতে হবে সাজের গুণ, সেথায় আগে রটে ;
ব্যক্ত তা না হলে আগে, কাষ না কারাে ভাল লাগে,
সাজেই তা’ই আস্থা জাগে, তাই ত কায সে প্রকার।
সাজের মত কাযে কোথা, ঘটতে পারে ব্যভিচার ?
সাধুর সাজে সেজেও চোর, প্রকাশে ভান সাধুতার!
যথায় তা’র বৈপরীত্য, সেথাও জয় মূলেজার!
“সাজের প্রতি কাযের প্রীতি” সত্যই এ সমাচার।
সাজ না হলে কায না চলে, দু’য়েই দুয়ের অধিকার।

আনন্দ-বিবেক
যে কাযের যা’ মূল, সে কাযের জন্য তার
সাহায্যই প্রয়ােজন।
“অনাদিকাল যে ভাবে যে, যে কার্য নিয়ে ব্যক্ত ভবে।
সে কায তার পূরণ-তরে, সাধতে তা’কে হবেই হবে”।
হলে সত্য এ ভাব-তত্ত্ব,
যে শক্তি যা’র করায়ত্ত,
তদ কৃপা বই তাহে মত্ত, হয় কেবা কোথা কবে ?
যা’র হাতে যা', তার কাছে তা’, চাইতে হবে, যে তা’ ল’বে।
“ভিন্ন ভিন্ন শক্তিকামী, ভিন্ন ভিন্ন ভাবে,
ভিন্ন ভিন্ন শক্তিপূজায়, রয় যে শক্তি-তবে,
নয় এ শুধু ছার বারতা,
কাযে ব্যক্ত এ’ সত্যতা,
তবে আত্মনির্ভরতা, যথার্থই আসে যবে
শক্তিমান্ চৈতন্যেই, ভাসে তাহ, যা এ ভবে।
অন্যথায় শক্তিসাধক, শক্তি নিয়াই মত্ত রবে।
মূর্তি-পূজা না ছাড়ে সে, আসক্তি যা’র ভাবাসবে।

আনন্দ-বিবেক
আত্মভাবের ছাড়া-বেড়ায়,
শত্রু-মিত্রভাবের খেলা।
আত্মভাবের ছাড়া-বেড়ায়, শত্রু-মিত্র-ভাবের খেলা।
বাইরে যা’কে যায় যা গণা, অন্তরেই ত তাহার মেলা।
যাহা ঘাের বিঘ্ন বলি,
এড়াইয়া আমি চলি,
তা’ই মাের শত্রু বলী, কঠিন তার সঙ্গে মেলা।
মিলতে গেলে বিরােধ ঠেলে’, কূলেই ডুবে পারের ভেলা।
নূতন ভাব যেরূপই হাে’ক, তখন তার সনে,
রাখিতে মিল, চাহেগাে দিল, না চায় পুরাতনে ;
সে নবত্ব এত মিত্র,
ভাসে হৃদে তার চিত্র,
জীবন-লীলার এ বৈচিত্র্য, কখনও না যায় ঠেলা।
যত্র তত্র ইহারই জের, পরিদৃষ্ট সারাবেলা।
অসস্তাবে র’বেই ত ভেদ—শত্রু-মিত্র, তােলা-ফেলা।
নিজেই নিজ স্বার্থ-বশে, কভু গুরু-কভু চেলা।

30
আনন্দ-বিবেক
তসত্তাতেই তসত্তাবোধ।
আমি যে মাের চেতন-বলে, “আমি আছি” মনে করি।
“ত সত্তায়, তসত্তাবােধ, ইহাই তার সূত্র ধরি ।
“অণু হ’তে অনীয়া,
মহৎ হ’তেও মহীয়া,
এই জ্ঞানই—চেতন-জ্ঞান, তাই ত আত্মভাববাপরি
ভাসে সর্বভাবের ছায়া, রয় কিছু দূরে সরি’!
আত্মভাবে সকল ভাব, প্রকাশ পায় বলি,
“আত্মাই যে সবার মূল,” এ জ্ঞানে জীব বলী ;
বিভু-জ্ঞানে জগতে তাই,
সকলেই সৰ্ব্বদাই,
চেতনার দেয় দোহাই, ভক্তিভরে তাঁকে স্মরি।
এ দেহে ’র বিকাশ-হেতু, দেহকে না ভাবে অরি।
মানে এ দেহ তা’রই দেহ, তাই না চাহে“কভু মরি”।
চাহে আরাে—“সেই চেতনে, নির্বিকারে সুখে চরি।
কভু যেন সে ভাব হতে, অন্যত্র না পড়ি ঝরি”।
”ই “আমিকে” চেতন-জ্ঞানে, মানে ভবপারের তরি।

আনন্দ-বিবেক
৪১
আত্মজ্ঞানে সকলি আমার।
৪১
ভানু মাের আত্মদৃষ্টি, শশধর-মম মন।
তারারাজি—আশারাশি, শূন্য-মম আয়তন।
স্পন্দশক্তিমাের চিত্ত,
তন্মাত্র পাঁচ-মুম বিত্ত,
কাল-মাের ভাব-নৃত্য, স্মৃতি-লীলা-নিকেতন।
নিদ্রা আর জাগরণ—আকুঞ্চন-প্রসারণ ।
•
এইরূপে এ ভূ-রূপে, অনাদি কাল আমি,
যে ভাবে যা ব্যক্ত যথা, হইয়ে তার স্বামী ;
প্রতিপরমাণু-সঙ্গে,
সৃষ্টি-স্থিতি-লয়-রঙ্গে,
লিপ্ত সদা, তবু অঙ্গে, নাইকো কোন আবরণ।
সত্তা-জ্ঞান থাকাতেই, “আমি”—ব্রহ্ম নিরঞ্জন।
“আমি” স্ব-প্রকাশ তাই, স্ব-ভাব মাের সচেতন।
চেতনাই অনন্তের, এক সাক্ষী সনাতন।
ভাব ভিৱ অসম্ভব--চেতনার প্রস্ফুরণ।
ভাবময় বিশ্ব ত তাই, মূলবস্তু-নিদর্শন।
Y

আনন্দ-বিবেক
মানুষই, মানুষের ভয়ঙ্কর শত্রু।
মানুষ চেয়ে মানুষের আর, নাইকো শত্রু ঘােরর।
মানুষ মাঝে স্বজন আবার, আরও অধিক ভয়ঙ্কর।
স্বজন চেয়ে আত্মীয়চয়,
অধিকতর শত্রু হয়,
পর হ’তে যে আসে ভয়, আত্মীয়ই তার গুপ্তচর।
বুনাে বাঘের ভীতি বনে, কুনাের ভয় নিরন্তর।
আত্মীয় সাথ থাকলে ভিড়ে, পরকে করি’ হেলা,
এমন দশা আসে শেষে, কূলেই ডােবে ভেলা;
দেখা যায় এ যথা তথা,
“সাধুলে, পরে শুনে কথা,
হেন স্বজন ক’জন কোথা, না চাপে যে মাথারপর ?
পরই সত্য ব্যথার ব্যথী, করলেও তা’য় অনাদর ?
স্বজন যে, সে খেতে মাথা, খুঁজে মাত্র অবসর !
যে হােক সে-জায়া, সুত, শিষ্য, চেলা, বন্ধুবর ।
বিপদ এলে দেয় সে বলে-কে আপন, কেবা পর।
আত্মাই এক চিরমিত্র, সর্বকালে শুভঙ্কর।
আত্মা’পরে বিশ্বাস যা’র, তারই ছুটে মায়া-জ্বর ।
-

আনন্দ-বিবেক
ভুল-ছাড়া ও ভুল-বাড়া নিয়াই,
জীবন-খেলা।
॥
৪৩
‘ভুল-ছাড়া, ভুল-বাড়া, এ’দুই নিয়া জীবন-খেলা ।
আদ্যভাবে নানা ভাবে, সজ্জিত এই ভব-মেলা ॥
হয়েও অন্ত অফুরন্ত,
কভু তার কৰ্ম্ম সান্তু,
নহে আদি কর্মে ক্ষান্ত, কঠিন আদির অন্ত-মেলা।
আদি যেন অনন্তের, চিরসঙ্গী, বীর চেলা !
।
“চ'ল্লেও ঠিক আদির কায, অন্ত-স্ব-স্বভাব,
না রুখেও আদির গতি, জাগায় প্রাদুর্ভাব ;
এই ভাবের ল’য়ে স্মৃতি,
কর্মে যা’র সমাদৃতি,
সব ভাবে সে রাখে ধৃতি, কিছুতে তা’র নাইকো হেলা।
ভুল-সঙ্গে, ভুল-রঙ্গে, অভ্রান্ত রয় সারা বেলা।
ভুল-ছাড়ার আশাও ভুল, তা’কে চাই বােধে ঠেলা।
বোধ-স্মৃতি, একমাত্র মায়াসিন্ধুপারের ভেলা।
ক
।

৪৪
আনন্দ বিবেক
যে ভাব আমার, সে ভাব মতই
আমার পূজা।
৪৪
যা’ আছে মোর তাই দিয়ে ত, করবাে আমি পূজা তব।
আছে মাত্র আধি, ব্যাধি, সে উপচার অভি-নব।
অন্যের ঠাই যাহা মিলে, কি ফল তাহা তােমায় দিলে?
আমার যা’, তা তুমি নিলে, আমি ভবে ধন্য হ’ব।
আমার ধনে তােমার পূজা, সাঙ্গ হলে সিদ্ধ সব।
নিজস্ব যা’, যা হাে’ক তা’, তাহাই তােমা দিতে,
ব্যস্ত সদা চিত্ত মম, চায় কিছু নিতে ;
কামীর পূজা কামকে দিয়ে, লােভীর পূজা লােভকে নিয়ে,
যে ভাব যা’র সেরূপ তার, অনুষ্ঠান তথা স্তব।
আমার ভাবে তােমার পূজায়, পূরুক মম ইচ্ছা, ভব?

আনন্দ-বিবেক
৪৫
আত্মশক্তিস্ফূর্তিতেই আত্মবােধ।
৪৫
মাের’ পরে যে টেক্কা দিয়ে, প্রকৃতি মাের চলতে চায় ।
“আমি সর্বশক্তিমান” এ’তেই তা ঠিক জানা যায়।
হলে তার কাৰ্য সেরূপ, “আমি যে হই আমার স্বরূপ,
ব্যক্ত কিছু তদনুরূপ, থাকতাে না এ বসুধায়।
আত্মবশ্য সদা “আমি,” আত্মমায়া-প্রতিষ্ঠায় ।
শক্তিরূপে যে ভাব যবে, উদিত মাের মনে,
আমার সুখের হেতু তাহা, জড়িত মাের সনে ;
সে যখন যাহা করে,
তা’ মাের প্রতিষ্ঠা-তরে,
নহে মাের অগােচরে, কভু কোন অবস্থায়।
তবু শক্তি-ব্যক্তি বিনা, “বিভু-আমি” কে জানায় ?
আত্মবােধই আত্মশক্তি, শক্তি-রােধ না মােক্ষোপায় !
আত্মশক্তি-ফুর্তি সহ, আত্মরুল বৃদ্ধি পায়।

৪৬ আনন্দ-বিবেক আত্মপ্রকৃতি-জ্ঞানেই, ব্ৰহ্মপ্রকৃতি-জ্ঞান। ৪৬ ** ব্ৰহ্ম স্বপ্রকৃতির সন্তোষ সাধনে,আত্মানন্দভােগ নিশ্চিত জানিয়ে, বিবিধপ্রকারে আত্মপ্রকৃতিকে,রেখেছে সাজায়ে নিজে না সাজিয়ে। আত্মপ্রকৃতির আনন্দ-কারণ, ব্রহ্মের যবে এ বিপুলায়ােজন, জীবপ্রকৃতিকে সাজাতে তখন, ক্ষান্ত র’বে জীব কি দোষ লাগিয়ে? তাই সে কাহারাে না শুনে বারণ,সাজায় তাহাকে স্বভাব ভাবিয়ে। জীব-প্রকৃতির না নিলে সন্ধান, ব্ৰহ্ম-প্রকৃতিকে জীব না জানে, “আত্মভাব জ্ঞান-ব্ৰহ্মত্ব-বিজ্ঞান” তত্ত্বজ্ঞানী ইহা প্রকৃত মানে ; জ্ঞানে জীব-ব্রহ্মে না রয় বিভেদ, স্বতঃই প্রকৃতি-বিভাগ-উচ্ছেদ, না বাড়ায় খেদ,অভাব, বিচ্ছেদ, নাশে পরিচ্ছেদ সমতা ভাসিয়ে। তাই জীব কভু জীবতত্ত্বজ্ঞানে, জীবত্বে না রয় এ’দেহে থাকিয়ে। কেহই কোথায় ব্ৰহ্মত না পায়, হেলায় আপন প্রকৃতি ছাড়িয়ে। নানা সাজে তাকে সাজাতে সাজাতে, বশে সে ত শেষে শরণ মাগিয়ে। “পুরুষ অশেষ” এই ভবিবােধে, লয় সে নিজের সান্ততা মানিয়ে। সজোরে তাহারে চাহে যে ছাড়িতে, পড়ে সে অজ্ঞানে স্বজ্ঞান নাশিয়ে। ,

৪৭
আনন্দ-বিবেক
আত্মপ্রকৃতিই আত্মতাদীপিকা।
৪৭
আমার প্রকৃতি আমার সেবাতে, নিয়ত নিরত আমাকে তুষিতে।
সে যদি না থাকে,অপরে না মােকে,আনন্দ যােগায় আপন খুসীতে।
আনন্দবিবােধ প্রকৃতি-সংযােগে,
অসংযােগে তাহা নাহি ভাসে যােগে,
আত্মজ্ঞানাভাব কোথা যােগাযােগে ?
প্রকৃতিকে তাই কে পারে দূষিতে ?
আনন্দবিকাশ যবে সত্তাজ্ঞানে,অনিচ্ছুকে তবে তাহাকে পুষিতে?
যদিও ব্ৰহ্মাত্মা-আনন্দ-স্বরূপ, তথাপি স্ব-ভাব স্পন্দন বই,
সে আনন্দ-জ্ঞান না জাগে তাহার,
জানে “কে আমি, কি ভাবে রই” ;
সে হেতু প্রকৃতি ব্ৰহ্ম-সহচরী, অথচ কখন নহে তা’র অরি,
অধিষ্ঠান-ব্রহ্মে বিচরণ করি, প্রকাশে ব্ৰহ্মতা হাসিতে হাসিতে।
মােরও প্রকৃতি আমাক্ষ লাগিয়ে, মগনা সতত করম-রাশিতে !
সে আমার তাই প্রিয়া মনােরমা,আমি তাকে চাই উঠিতে বসিতে।
তা’র সেবা বিনা স্ব-জ্ঞানে আমি না,
পারি না আনন্দ-সাগরে ভাসিতে!
থাকিলে সে জেগে সকলি আমার,
পারে অজ্ঞান আমাকে শাসিতে ।
প্রকৃতিশূন্যতা নহে জ্ঞানােপায়, সে ভাব প্রকট জ্ঞানকে নাশিতে।
ব্ৰহ্ম স্বপ্রকাশ প্রকৃতি জাগা’য়ে, অজ্ঞানতা যা’য় অশক্ত আসিতে।
প্রকৃতিবিলয়-অন-আলয়, সাড়ায় রহে সেব্ৰহ্মতা ঘােষিতে।

৪৮
আনন্দ-বিবেক
সকলি আমার আত্মপূজার উপচার
৪৮
যা আছে আমার, যথায় যা আর, কুড়াইয়া আমি আনি।
সকলি আমার আত-পূজার, উপচার-রূপে মানি।
প্রকৃতি মাের তাই যা’ করে, শুধু তা’ মাের সুখের তরে,
সাঁপিয়ে সব তাহার করে, না রই আমি অভিমানী।
“করে সে যা’, তাতেই মজা,” এই মাত্র আমি জানি ।
!
তাহার লাগি’ আমি ত্যাগী, সদাই সচেতন,
তাহার ডালি যত্নে নিতে, আমার আকিঞ্চন ;
জেনে’ তা’কে জ্ঞানের হেতু,
মেনে তাকে পারের সেতু,
আমি তাহার গুণের কেতু, উড়াই, তাকে অঙ্কে টানি।
নাহি ভাবি-তা’ হ’তে মাের, ঘটতে পারে কোন হানি।
যে-সে ধন সে নহে মম, সে মাের প্রেমের রাজধাণী !
আমায় রাজা করে সে ত, হয়েছে মাের রাজরাণী ।
আমায় কৃষ্ণ সাজায়ে সে, সেজেছে মাের রাধারাণী!
। সকল কাযে চিত্ত সাজে, পশলে কাণে তাহার বাণী।
সে মাের পূজায় মােকে জাগায়, তাই ত আমি আত্মজ্ঞানী।

আনন্দ-বিবেক
সব নিয়ে আমি এক।
৪৯
সবই আমার ভাবের আকার, “আমি” একা সবকে লয়ে।
ভাল-মন্দ-ভােদ যা’ তবে, ইচ্ছা-ক্রমে প্রান্ত হয়ে ।
কল্পনার অভাব যবে,
আত্মভােলা “আমি” তবে,
আত্মবােধ তরে ভবে, বেড়াই ইচ্ছা-চাপ স’য়ে।
মুলতঃ যা’, তাহাই “আমি” ভাবস্রোতে না যাই ব’য়ে ।
4
“আমি—এক পূৰ্ণানন্ত”, এই যে জ্ঞান মম,
মাের’পরে মাের দৃষ্টি বিনা, গণ্য শূন্য সম ;
তা’ই ‘“আমি” কল্পনায়,
স্বভাবজ বহুতায়,
জ্ঞাত হই আপনায়, আত্মভাবে মুক্ত র’য়ে।
অন্তরে মাের দাগ না লাগে, থেকেও মিশে দ’য়ে খ’য়ে।
‘সু’-“কু-ব্যাপার-ইচ্ছা-বিকার, ইচ্ছা নিজে দেয় তা কয়ে।
হলেও “আমি” স্ব-ভাব-স্বামী, স্ব-ভাব না ন্যূন আমা চেয়ে !
৪

৫০
আনন্দ-বিবেক
স্বশক্তিই আত্মত্ব ও ব্ৰহ্মত্ব-সাধিকা
ব্ৰহ্ম কি তা বুঝতে গেলে, নিজেকে চাই আগে জানা
আপনাকে জানার হেতু,
স্ব-শক্তিকে নিজে মানা ।
শক্তি যদি থাকে সুপ্ত,
নিজত্বের নাম লুপ্ত,
নিজত্ব বই ব্ৰহ্ম গুপ্ত, দীপ্তিতে তা’র পড়ে হানা।
আত্মভাবেই ব্ৰহ্ম-ভাতি, শক্তি বিনা সে ত কানা।
•
সতত তাই শক্তি-বিলাস, স্বতঃই নিজ-মাঝে,
তা’ হ’তেই ব্ৰহ্ম অরূপ, নিজের জ্ঞানে রাজে;
জ্ঞান-ছাড়া না নিজে যবে,
স্ব-স্বরূপই ব্ৰহ্ম তবে,
তাই “অহং ব্ৰহ্মাস্মিবৎ,” ব্যক্ত বেদবাক্য নানা।
নাহি চলে শক্তি বিনা, কারাে কোন মুন্সিয়ানা।
নিজ হ’তে শক্তিকে তাই, কখনও না যায় ছানা।
আত্মশক্তি-ব্ৰহ্মত্বের সনাতন কারখানা।
আত্মজ্ঞানীই-ব্রহ্মজ্ঞানী, নইলে যা’ আর, সত্য তা না ।
।

আনন্দ-বিবেক অহঙ্কার, মােক্ষের অবিরােধী। জীব যদি পূষে স্মৃতি, নিজ মােক্ষ-অবস্থান্ধ । সেইখানেই আপনা হতে, জাগে তার অহঙ্কার। অহঙ্কারই ব্রহ্মের জ্ঞান, নইলে ব্রহ্মে অজ্ঞান-ভান, তাই ত ব্যক্ত অভিমান, জাগাইতে সত্য সার। অহঙ্কার করে দান, পরিচয় ব্রহ্মতার। অহঙ্কারকে না দূষিয়ে, যে তার তত্ত্ব বুঝে, সেই প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞানী, আর না কিছু খুঁজে ; মেধায় কোন বােধ না থাকে, সেথা কে কয় মুক্ত কাকে ? লােকে মুক্ত বলে তাকে, রাখে যে জ্ঞান-ব্যবহার। অহঙ্কারেই সে ব্যবহার, সুরক্ষিত অনিবার। অহঙ্কার-মুখে ব্যক্ত- অনন্ততা স্ব-সত্তার! “নান্ত আমি” এই জ্ঞানেই, মুক্ত মােহৰ্ম্ম-দ্বার। থাকে যা’র অহঙ্কার, উক্তি মাত্র মুক্তি তার । ‘‘অহং মুক্ত” এই যে জ্ঞান, অহঙ্কার-দিব্যাকার ! · নাইকো যথা এ জ্ঞান, তথা, আবির্ভাব শূন্যতার। কোথা তবে যুক্তি, মুক্তি, অনুভূতি আত্মতার ? অহঙ্কার থাকা হেতু, সত্তাবােধ আপনার। সত্তাজ্ঞানই মােক্ষজ্ঞান-নয় তা তত্ত্ব-পরিহার ! অহঙ্কার-প্রসারেই, বাড়ে সে জ্ঞান-অধিকার। অহষ্কৃতি-সঙ্কোচেই, ঘিরে মােহ-অন্ধকার। হয়ে তাই মােক্ষ-সাক্ষী, অহঙ্কার-হুহুঙ্কার ! অহঙ্কার-সাক্ষ্য-হেতু, জীব ত জ্ঞাত মােক্ষ-ঠার ।

আনন্দ-বিবেক
প্রকৃত অভিমানীই—প্রকৃত আত্মজ্ঞানী।
প্রকৃত যে অভিমানী, সেই ত সত্য আত্মজ্ঞানী।
সত্তা-অভিমানে কারাে, হয় না কভু
সত্ত্ব-হানি।
সত্তাকে যে বড় ভাবে,
থেকেও সে অসঙাবে,
মত্ত নহে কোন ভাবে, হয়ে সত্ত্ব-অভিমানী।
‘মুক্তই—মুক্তাভিমানী,” মিথ্যা নয় এ ঋষি-বাণী।
অভিমান পূর্ণতা পায়, সত্তা-অভিজ্ঞানে,
তদ্ব্যতীত অন্য ভাবে, না রয় পূর্ণ-মানে ;
“আত্মসত্ত্ব বিশ্ব-যােড়, নাইকো ইহার আগা, গােড়া,
এ’ জ্ঞানে সে যবে মােড়া, তখনি হয় পূর্ণমানী।
কারো হ’তে দণ্ড না পায়, নিজেই সাজে দণ্ডপাণি ।
অভিমানের শােভা জ্ঞানে, সবই লয় সে ভেতর টানি।
শ্রেষ্ঠের ঠাই শ্রেষ্ঠ সে রয়,
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রতাকে মানি’!
যে ভাবেই থাক, সেই ভাব সে, ছড়ায় সুখে সেজে দানী।
স্বাতন্ত্র্য সে রক্ষা করে, মূল ভাবে না অস্ত্র হানি'।
যে তাকে তাই চায় নাশিতে, সে ত মূখ-হতমানী।
অভিমানে মূলকে জানায়, মূলের পানে টেনে আনি।
তাই যে সত্য অভিমানী, সেই অভিজ্ঞ সত্য জানি।

আনন্দ-বিবেক
আত্মজ্ঞানে ত্যজ্য-গ্রাহের স্থানাভাব।
ব্রহ্ম যবে সবকে নিয়ে, মুক্তসত্ত্ব, স্বপ্রকাশ।
আমি তবে কোন্ বিচারে, পুষবাে মিথ্যা ত্যাগের আশ?
আত্মসত্ত্বে বিশ্ব ভরা,
যায় কি সত্ত্ব তেয়াগ করা ?
ত্যাগের যা’, তা তাতেই ধরা, অনর্থক সে প্রয়াস ।
সঙ্কোচই ত ত্যাগের রূপ, অন্য ভাবে আত্মনাশ !
বস্তু প্রতি বিরাগভাব, ত্যাগের নামান্তর,
তবে লােকে চাহে যে ত্যাগ, ভুল তা ভয়ঙ্কর ;
উদাস সম যেবা থাকে,
ভয় না কভু ঘিরে তাকে,
সবে থেকে সবার ফঁাকে, নির্ভয়ে সে করে বাস।
নিয়ত তার ব্ৰহ্ম সম, আত্মসত্ত্ব-সমুদ্ভাস।
থেকেও সে ভােগ-নিরত, কখন নয় ভােগের দাস।
স্ব-কল্পিত কোনও ভাব, না হয় তার বন্ধ-ােশ।
বিষয়-ভয়ে লােক ত ত্যাগী, নাইকো জ্ঞানে বিষয়-বাস।
ত্যজ্য-গ্রাহ্য-অধ্যস্ত সব, “আমি” পূর্ণ চিদাকাশ !

৫৪
আনন্দ-বিবেক
“আমি” মূলতঃ যে ব্ৰহ্ম, বাসনাতেই
তাহা ব্যক্ত।
৫৪
আমি যা হারাই তাহা, পেতে কেন ব্যস্ত হই ?
কেন ভাবি–“নাহি মরি, চিরকাল বেঁচে রই” ?
“এ ভবের প্রভু হয়ে,
ভােগ্য সব কাছে ল'য়ে,
অবাধে ত’ ভােগ করি,” এ ভাব-ছাড়া কেন নই ?
কেন নিরানন্দ-ভয়ে আনন্দের পক্ষ লই ?
;
সবকে নিয়ে পূর্ণ আমি, সকলি তাই চাই,
সপী, তাই আশ না করি,—“মরণ-পথে ধাই” ;
চিদানন্দস্বরূপ মাের,
তাই আমি কাটা’তে ঘাের,
জ্ঞানের’পরে লাগাই জোর, দুখ না মাগি হর্ষ বই।
স্বাধীন আমি, বাসনা তাই—“অধীনতার চাপ না সই”।
প্রকৃতি মাের শকতি, তাই-তাহার ভার আমি বই।
সকল ভাবে ভরা আমি, কাকেও না তাই শ্রেষ্ঠ কই।
আমি শুদ্ধ, শান্ত, তাই এড়াতে চাই হৈ-চৈ !

আনন্দ-বিবেক আমিকে জানাই- কর্ম-বিমুক্তি। মামি যা করেছি, করিতে বসেছি, করিব বলিয়া পুষি যে আশ। সে তার স্ফুরণা—সে তার প্রেরণা,হৃদে সদা যেবা করিছে বাস। এই যে শরীর, মন, অহঙ্কার, তাহার চেতন-স্পন্দন-আকার, যা কিছু হয়েছে—হ’তেছে-হ’বার,সকল ব্যাপার চেতনাভাস। আভাসে প্রকাশ আনন্ত্য-বিলাস, কিসে তবে কায জীবের পাশ? জীব যদি রয় কাহারাে অধীন, কোনও করমে দোষী সে নয়, যাহার আদেশে কাযে সে নিরত, সবদোষভাগী সেই ত হয় ; আর যদি থাকে স্বাধীনতা তার, তা’তেও না দোষী, মুক্ত অনিবার, তবে যে প্রকার কৰ্ম্ম-ব্যবহার,নাই কারাে তরে সে ভাবে ত্রাস। জীবের অন্তরে জাগে স্বাধীনতা, তাই সে মুলতঃ কারাে না দাস। জীবের স্বরূপ-ব্ৰহ্মত্ম অরূপ, কল্পনার রূপ-সংযােগ-নাশ। কি তবে বিকাশ ? কি তবে বিনাশ? শকতি-উল্লাস—অধ্যাসাবাস!

আনন্দ-বিবেক
আপন চেয়ে পর ভাল।
যাদের তরে যত কর, ততই তারা অপকারী।
নাইকো দৃষ্টি যা’দের’পরে, সবাই তারা হিতকারী ।
যাদের অন্নে যা’রা পুষ্ট,
তারা হেন স্বার্থদুষ্ট,
ত্রুটি পেলে হয়ে রুষ্ট, ইস্তাহার করে জারি !
পেছন থেকে অস্ত্র হানে, সামনে শিষ্ট আজ্ঞাকারী।
করতে গেলে বর্ণনা সব, আপনজন-লীলা,
হৃদয়টাকে রাখে চাপি', ক্ষোভের গুরু শিল;
পরকে আপন ভাবলে পরে, দুখ না বাড়ে তাহার তরে,
বিপদে পর যাহা করে, স্বজন না তার অধিকারী।
পরের মত নহে উদার, হলেও স্বজন দণ্ডধারী।
পরের বােঝা হালকা অতি, স্বজন-বােঝা বিষম ভারী ।
দিলেও রাজ্য রুষ্ট স্বজন, পর ত মধুর বাক-ভিখারী।

আনন্দ-বিবেক
কর্ম, কোন কালেই ত্যজ্য নয়।
৫৭
“নিয়েছি সব পুটলি বেঁধে, নাইকো কিছু নিতে বাকী”।
এভাবে যে কৰ্ম্ম ত্যজে, চরমে সে পড়ে ফাকী ।
শক্তিমান্ যতদিন,
শক্তি-স্ফুৰ্ত্তি ততদিন,
লােকে তবে কৰ্ম্মহীন, হয় কিসে, ভাবে তা কি ?
কথায় কৰ্ম্ম-ত্যাগী যারা, তারাই শুধু বেড়ায় চাকি।
আত্মভাবে দৃষ্টি যা’, তাই—আদ্যকৰ্ম্ম-রূপ,
বিনা কৰ্ম্ম,আত্মধৰ্ম্ম- দাঁড়ায় শূন্যরূপ ;
রয় যদি আত্মজ্ঞান,
নাহি থাকে তৃপ্ত প্রাণ,
বােধ-হেতু কর্মের মান, স্বভাবকে সে আছে ঢাকি।
স্বতঃই তার স্বভাবে স্থান, কেউ না তা’কে আনে ডাকি।
কৰ্ম্ম-ধৰ্ম্ম-বহির্ভাব, তাই ত বাড়ে হাঁকাহাঁকি!
কৰ্ম্ম—চিরজ্ঞানবুদ্ধ, ধর্মভাবকে হৃদে আঁকি’ ।

( অন্তভাতি)
কর্মের মাঝেই অকৰ্ম্ম।
৫৮
দেহাত্মবােধ কৰ্ম্মের মুল, কৰ্ম্মই কাল-ব্যবহার।
কালজ্ঞানে কায যে করে, অকৰ্ম্মই কৰ্ম্ম তার।
এই দেহকে “আমি” ধরি, যে সব কায আমি করি,
তাহাই ত সত্য-অরি, বাড়ায় মিথ্যা অহঙ্কার।
কৰ্ম্মই পায় তত্ত্ববােধে, অকর্মের অধিকার।
রুদ্ধ কবে কৰ্ম্ম-ধারা, আত্মপ্রকৃতির ?
মুকোষ তা’র আপনি খসে, রইলে জ্ঞানে স্থির ;
স্বরূপ তার দেখা গেলে,
ভ্রান্তির জাল দূরে ফেলে,
ভূতাকাশে চিত্ত খেলে, পেয়ে দিব্য চিদাকার।
কৰ্ম্মই তাই অকর্মের, নিত্যদেহ-অলঙ্কার !
কৰ্ম্ম-আত্মপ্রকাশ-রূপ, অকৰ্ম্ম তার জীবন সার ।

আনন্দ-বিবেক
বন্ধের মাঝেই মােক্ষ।
বন্ধন রূপ নাগপাশে, খেলে মােক্ষ-মৃগরাজ।
বিক্রম তার দেখতে গেলে, দেখাই চাই বন্ধ-কায।
আঁকড়ে ধরে বন্ধ যত,
মুক্তি-স্মৃতি মূৰ্ত্ত তত,
তাহাই পরে শূন্য মত ; হরে চিত্তবৃত্তি-সাজ।
বন্ধ-সখ্য ভিন্ন, মােক্ষ, নীরবে রয় পেয়ে লাজ।
অহঙ্কারে ফেলায় কারে, জীবকে বাঁধি’ গুণে,
“পড়ে কারে ধ’রবাে কারে,” এছার চিন্তাগুনে—
তপ্ত যত ভ্রান্ত চিত,
ততই সে হয়ে ভীত,
মােক্ষ তরে আশান্বিত,বন্ধে যাহে পড়ে বাজ।
বন্ধ তবে মােক্ষ-ভাবে, উদয় হয় হৃদয় মাঝ ।
মােক্ষভাব-অনুবন্ধ, বন্ধে করে সুবিরাজ।
বলে মুখে “মােক্ষের জয়”, হলেও বন্ধ পট্টিবাজ ।
জীবের লক্ষ্য মােকালােকে, এলেও বন্ধ-দুঃখ-সাঁজ।
নহে মােক্ষ লীলা-দক্ষ, বন্ধই তার জীবন-ভাজ।
মােক্ষ আত্মকৰ্ম্ম-পক্ষ, পরি’ শিরে বন্ধ-তাজ।
==

আনন্দ-বিবেক
বিরহের মাঝেই মিলন
বিরহের দীর্ঘশ্বাসে, ভাসে মিলন-সাম্য-তান।
তা’ই বিরহে যেবা রহে, আকাশ-ষােড়া তাহার প্রাণ।
বিরহ-বৈচিত্র্য-ঘড়া,
মিলন-স্মৃতিতে গড়া,
যত খেলা—উঠা-পড়া, বিরহ তা’র অধিষ্ঠান।
মিলনের যত রাগ, বিরহে তা’ মুর্তিমান্ ।
অণু-রূপে চুপে চুপে, বিরহ-কায় বাড়ি,
দাড়ায় ক্রমে মিলন-রূপে, পূর্বের রূপ ছাড়ি’ :
বিরহের প্রতি স্পন্দ,
মিলনের ভাবছ,
মিলনে যে জাগে সন্দ, বিরহে তা’র সমাধান।
মিলনের ছাপে ভরা, বিরহের মর্মস্থান!
বিরহেই ভাব-স্ফুর্তি, মিলনে তার অন্তর্ধান !
বিরহেই সত্যাদর, মিলনে তা’ মিথ্য-ভান।
বিরহেই—মিলনের সূত্র ক্রমবর্ধমান।
বিরহের সাক্ষ্য করে, মিলনের প্রেমান !
মিলনের ইতিবৃত্ত, বিরহের অবদান।
বিরহের বিস্মৃতি ত,
মিলনের মৃত্যুবাণ।
বিরহের নানা আশা, রক্ষা করে মিলন-মান।
মিলন-সিন্ধু নীরব সদা, বিচ্ছেদ তার প্রাণের গান।
বিচ্ছেদই মিলন-করে, যােগায় সব উপাদান।
বিচ্ছেদের স্তন্তে উড়ে-মিলনের জয়-নিশান।

আনন্দ বিবেক
আবিদ্যার মাঝেই বিদ্যা।
অবিদ্যাজ্ঞান-শয্যাতলে, মুকা’য়ে রয় বিদ্যাজ্ঞান।
আঁখি তুলে সাজ খুলে তা’, যে দেখে-সে মুক্তপ্রাণ।
অশেষ গর্ভে যা অব্যক্ত,
ভবিষ্যে তা’ ক্ৰমে ব্যক্ত,
অবিদ্যা তাই নহে ত্যক্ত, অনন্তাঙ্কে পেয়ে স্থান।
অজ্ঞান হয় জ্ঞানের বাচক, অনন্তের রাখতে মান !
;
শুধু কি তাই, অবিদ্যা ত, বিদ্যা-মানা রূপ,
মানাতেই জানায় সে-“স্ব-রূপ অপরূপ”;
জ্ঞানও আত্মচেতন লাগি,
হয়ে মান-জ্ঞানরাগী,
করে তাহায় অভাগী, থাকতে চিরদীপ্যমান।
অবিদ্যার বীণা-যন্ত্রে, ব্যক্ত বিদ্যা-গুণ-গান।
* চলে বিদ্যা-প্রতিশ্বাস, পেয়ে অজ্ঞানাধিষ্ঠান।
কৰ্ম্ম-পথে অবিদ্যাই, একমাত্র বিদ্যা-যান।
অবিদ্যার স্কন্ধে চাপি’, সুরু বিদ্যা-অভিযান।
অবিদ্যাকে গণ্ডি করি’, কাল-রণে বিদ্যা-ত্রাণ।
বিদ্যাপক্ষে পূর্ণতা তার, অবিদ্যার আত্মদান!
বিদ্যা-অর্থবােধ-তরে,
অবিদ্যাই অভিধান'!
বিদ্যাবিদ্যা-দ্বন্দ্ব-মুক্ত,
ব্ৰহ্ম মাত্র বিদ্যমান।
* দ্বন্দ্বযুক্ত যাহা কিছু, তাতেই মিথ্যা অভিমান।

আনন্দ-বিবেক
মায়ার মাঝেই ব্ৰহ্ম।
«
এই যে ব্যক্ত মায়াতত্ত্ব, এ ত মাত্র ব্রহ্মাভাস।
এই আভাসে, এই ভূ-বাসে, ব্ৰহ্ম-স্বরূপ স্বপ্ৰকাশ ।
দৃশ্য যাহা হয় দৃষ্ট,
ব্ৰহ্ম হ’তে নয় তা’ সৃষ্ট,
হলে আত্মমায়াস্পষ্ট, মিথ্যামৃষ্ট ভূ-বিলাস।
মায়া মিথ্যাভাবরূপে, ঘুচায় ভুল, অবিশ্বাস।
••
“ব্যক্ত যা যা’, মিথ্যা তা তা”, এভাব-ক্রম ধরি’
‘মূল অনন্ত” এসার সত্য, না যায় কোথা সরি’
তাই মায়া ত মিথ্যাভাসে, সত্যকে না কভু নাশে,
অভাসেই সে সত্য ভাসে, সান্ত না হয় চিদাকাশ।
আভাসেই ত ক্মব্যক্ত,
অনন্তের গুপ্তাবাস ?
জানায় মায়া-সত্য কিরূপ, পরি’ অঙ্গে মিথ্যাবাস।.
মায়াই এই তথ্য ফুটায়, “সে অনন্ত-প্রতিভাস”।
ধরলে মায়া শূন্য-কায়া,
রুদ্ধ ব্ৰহ্ম-ভাবােচ্ছ,সি।
শুদ্ধ ব্ৰহ্ম অপ্রবুদ্ধ,
অনধ্যক্ষ, অপ্রকাশ।
মায়াদর্শে মূর্তিমান্,
ব্ৰহ্মত্বের প্রতিশ্বাস।
দেহে ব্ৰহ্মপ্রাণরূপী, মায়া-ওজঃ, অস্থি, মান।

আনন্দ-বিবেক
জীবত্বের মধ্যেই শিবত্ব।
জীবত্বরূপ অহঙ্কারে, শিবত্বরূপ অহম-বাস।
উড়ালে সেই জীবাবাস, শিবত্ব রয় অপ্রকাশ।
জীবত্ব-বাল অঙ্গে পরি,
তদ্ভাবের জ্ঞানােপরি,
বিরাজ করে শান্তি-পরী, ল’য়ে শিবত্বের শ্বাস ।
শিবত্ব ত জড়ত্ব প্রায়, জীবত্বে তা’র সমুচ্ছাস !
আত্মশক্তি-মায়া’পরে, আত্মদৃষ্টি যবে,
সে স্ব-ভাবে দ্বিভাব যেন, আপনি ভাসে তবে ;
যাহার মাঝে যেটি ভাসে, মূলের ভাব সে পরকাশে,
মুলে ভ্রান্তি তাই ত আসে, সত্য ভাবি’ ভাবােল্লাস।
স্বভাব, ভাবে পড়লে চাপা, লুপ্ত না হয় স্ব-ভাব-ভাস।
বজ্ঞানেই স্বভাব-জ্ঞান, নইলে তা’ ঘাের বিপৰ্য্যাস।
স্বভাব-স্পন্দ-প্রকাশই ভাব, ভাবে ব্যক্ত যা’ তা’র খাস ।
চিরতরে জীব-লােপ, ঘটায় মূলস্মৃতি-নাশ !
জীবই সত্য সত্য,
শিবত্বের রক্ষা-পাশ।
জীবত্বের মূল—শিবত্ব, জীবত্বে তার রসাভাস।
মুলতঃ জীব স্বভাবরূপী, নয় কখন স্বভাব-দাস।
জীবতত্ত্ব জ্ঞানেই দীপ্ত, শিবতত্ত্ব—স্বপ্রকাশ।
জীবত্বেই পরিদৃষ্ট,
শিবত্বের অবভাস ।

আনন্দ-বিবেক
বর্তমানের মধ্যেই ভবিষ্যৎ।
৬৪
বৰ্ত্তমান না বৰ্ত্তমান, যায় বলা যা’ “বৰ্ত্তমান।”
তা ভবিষ্য-পূর্বাভাস, অব্যক্ত তার শান্তিস্থান ।
আভাস-মূল অশেষ বলি’,
বৰ্তমান-ক্ৰমে চলি’,
বুঝে লয় সে আত্মবলী, অব্যক্তের রেখে মান।
অব্যক্ত তাই অশেষ-রূপে, ব্যক্ত হতে চেষ্টমান ।
ব্যক্ত মাঝে অব্যক্তের নান্ত-শ্রোত বহমান।
বিনা ব্যক্তি বন্ধ্যা উক্তি, না হয় সত্য-সমাধান।
অতীত-নামে যায় যা গণ, ভবিষ্য-রূপ তাও,
অব্যক্তে তাই তাহার স্থিতি, না সরে এক পাও ;
তবে তার যে স্মৃতি জাগে,
বর্তমান তা’ অনুরাগে,
বহন করি’ চলতে আগে, সেই অব্যক্তে সপে প্রাণ।
বৰ্তমানই অব্যক্তরূপ-ভবিষ্যের সত্তাজ্ঞান।
ভবিষ্যই বর্তমানে, স্বাভাসরূপে বিদ্যমান।
তাই সদা সে ভবিষের, এক মাত্র সচল যান ।
সচল ভাবেই এ অচল জ্ঞান, “ভাবী ভাবই বৰ্তমান”।

বৈষম্যের মাঝেই সাম্য।
বিষম-ভাব ব্যক্ত যাহা, সাম্যই তা’র অধিষ্ঠান।
গ্রহরূপে যাহা ভাসে, শূন্যই তার লীলাস্থান।
d,
বৈষম্যই চেতন-সাড়া,
চেতনই দেয় নাড়া-চাড়া,
সাম্য-সৰ্বভাব-ছাড়া, তথাপি সে সৰ্ব-প্রাণ।
যাহা নিত্যজ্ঞানের ভাব, তাতেই সাম্য সত্তাবান।
থাকিলে জ্ঞান, করম তা’র, আছেই আছে ভবে,
বৈষম্য সেই কৰ্ম্মের রূপ, কৰ্ম্ম লুপ্ত কবে ?
শক্তি গণ্যা কাৰ্য্য তরে,
শক্তি-খেলা সাম্যোপরে,
বৈষম্য তাই যাহা করে,
তাহাই সাম্যে বর্তমান।
হলেও সাম্য জীবের কাম্য, বৈষম্যে তার বাড়ে মান।
সাম্য-ছায়ারূপ-বৈষম্য, করতে সাম্য-গুণ-গান।
বৈষম্যের মাঝে নিত্য, চলে সাম্য-প্তদান।
বৈষম্য না যথা,
তথা-সাম্য-দীপ্তি-অবসান।
বৈষম্যের খেলা দেখি’, সাম্যে না কেউ সন্দিহান।
বৈষম্যের সাজে সাম্য, লভে সত্য-আত্মজ্ঞান।
“বৈষম্যই সাম্যকে চায়,” এই ত সত্য-প্রতিদান।
বৈষম্যের সচল ঠাটে, সাম্য যেন মূৰ্ত্তিমা।
দ

আনন্দ-বিবেক
ভয়ের মাঝেই অভয়।
ভীতি সহ মৃতি-প্রীতি, এত গাঢ় দৃষ্ট হয়।
যথায় ত্রাস, তথায় নাশ, গুপ্তভাবে জেগে রয় ।
ক
L
যদিও ভয় ধরি তনু,
তথাপি তার প্রতি অণু,
ধৃত যাহে, সে স্থির স্থাণুভানু সম তেজোময়।
শঙ্কা মাঝে তাই ত বাজে, অভয়-ডঙ্কা নিরত্যয়।
বিরাট-সত্ত্বে স্থিতি-হেতু, সকল ভাবে চিত, .
দেখিয়ে ক্ষয়, পেলেও ভয়, সদা না তা’য় ভীত ;
আতঙ্ক তাই বাড়ে যবে,
এই চিন্তা–“কিসে তবে,
অভয়-পদে শরণ ল’বে, ঘুচবে যাহে সর্ব ভয়”।
সেই ভাবে লয় সে আগে, মহাজন-পদাশ্রয়।
মহান্ ঠাই তাহাই যাচে-হয় সে যাহে মৃত্যুঞ্জয়।
ভয়-মূলে যে অভয় রাজে, এ ভাবে তা মিথ্যা নয়।
অভয়-পদে ভয়ের স্থান, তাই সে গাহে অভয়-জয়।
ভয়ের রূপে অভয় তাই, বুঝে আত্ম-অভ্যুদয় ।
বিশ্ব-যাের্ডা ভয়ের রূপে, অভয়-ভাব-স্রোত বয়।

আনন্দ-বিবেক
রােগের মাঝেই সুস্থতা।
একত্বে বহু যথা, বুদ্ধ রাখে একতাকে।
কখন না রাখে সুপ্ত, রােগ তথা সুস্থতাকে।
স্বাস্থ্যের যে পূর্ণ দেহ,
রােগ বই না দেখে কেহ,
রােগ--স্বাস্থ্য-সজ্জ-গেহ, আত্মজ্ঞানী করতে তাকে।
সুস্থতাকে সেবি’ লােগ, ধন্য মানে আপনাকে।
••
'স্বাস্থ্য হয় স্বস্থ যবে, রয় সে আত্মভােলা,
আর না থাকে সে বিস্মৃতি, লা’গলে ব্যাধি-গােলা
রােগ শুধু বাড়ায় ধাধা,
স্বাস্থ্য হয়ে সেই বাধা,
স্বাস্থ্য-ডােরে রােগ যে বাঁধা, কভু না তা ভুলে থাকে।
স্বাস্থ্য আত্মবিকাশ-তরে, রােগের পাঁকে স্বরূপ ঢাকে।
বােগ ব্যতীত স্বাস্থ্যের সুখ, বুঝায় বুল
কেবা কাকে।
রােগ ত স্বাস্থ্য-কল্পনা-রূপ, স্বরূপ-গুণ গাইতে জাকে।
রােগ-তুলীতে নানা রঙে, স্বাস্থ্য আপন রূপকে আঁকে।
রােগ-যন্ত্ৰ-প্ৰতিতন্ত্র, “স্বাস্থ্যই সার” জোরে হাঁকে।
রােগের লাগি নীরােগ তাই, স্বভাব-রস আপনি চাকে।

আনন্দ বিবেক
পরাজয়ের মাঝেই জয়।
৬
বাজে জয়-পাঞ্চজন্য, পরাজয়-মননামাঝে।
সাজে তা’ই জয়-লােভ, পরাজয় নানা সাজে
পরাজয়-জয়াশার,
ভিন্ন এক ভীমাকার,
যা’র দেখার তরে শক্তি, দৃষ্টি তার সর্বকাযে।
পরাভব জয়ের পিছে, ঘুরে ফিরে সৈন্য-সাজে।
“এত অধিক বিক্রম তার, জয়ের কাছে চলে,
পরাজয়-ভানে সে জয়, তাহার দিকে ঢলে ;
হলেও এ’ভাব-যুক্ত,
মূলতঃ রহে সে মুক্ত,
স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত, থাকতে না চায় চক্ষুলাজে ।
পরাজয় শব্দটি তার, বাজের মত হৃদে বাজে !
“পরাজয়-জয়ের গোড়া,” বলিতে হয় কাযে-কাষে।
পরাজয়-হস্ত দিয়ে,
জয় আপন অঙ্গ মাজে।
জয়ের লাগি,' কোন কথা, পরাজয় না মানে বাজে।
সদাই জয়ের জয়-কেতু,
পরাজয়ের শিরে রাজে।

আনন্দ-বিবেক
ক্ষতির মাঝে বৃদ্ধি বা পতন মাঝে উত্থান।
“ক্ষতি-মাঝে বৃদ্ধি রাজে, হানি-মাঝে লাভােদয়।
পতনে উত্থান-স্থিতি,
ক্ষয়-মাঝে অভ্যুদয়।”
এভাবে হােক যাহা গণ্য, একের ভাব বুঝলে, অন্য,
হয়ে স্বতঃই বৃতিশূন্য, মনকে রাখে অ-সংশয়।
বৈপরীত্য-রহস্য সব,
একই তত্ত্বে ব্যক্ত হয়।
•
“ক্ষতির বুকে বৃদ্ধির বাস,” ইহাই কথ্য এবে,
নিজকে চায় ভুলতে ক্ষতি, বৃদ্ধির রূপ ভেবে’ ;
সু-ভাবে না থাকতে চাহে,
বৃদ্ধির গুণ সদা গাহে,
এ তথ্যই দীপ্ত তাহে,—“স্ব-ভাবে সে তৃপ্ত নয়”।
বৃদ্ধিই তার স্বভাব, তাই—তাহার ধ্যানে মগ্ন রয়।
চায় সে শুধু বৃদ্ধি-রূপে, আপনাকে করতে লয়।
বৃদ্ধিই তার স্বরূপ, তাই—সে তার ভক্ত অতিশয়।
ক্ষয় ত তাই অভুদয়ে।
চায় নিজত্ব করতে ক্ষয়।
হানিও তাই লাভের লােভে, কোন কাযে না পায় ভয়।
পতনও ঠিক সে ভাবে,
উত্থানের পক্ষ লয়।
ক্ষতির মাঝে বৃদ্ধির ন্যায়, এসব ভাব কে মিথ্যা কয় ?

৭০
আনন্দ-বিবেক
বিকল্প মাঝেই সঙ্কল্প।
৭
সঙ্কল্পের পিছু গতি, বিকল্পের সংজ্ঞা পায় ।
বিকল্পই বৃদ্ধি করে, সঙ্কল্পের সূক্ষম কায় ।
পশ্চা-টান যদি থামে,
অগ্রগতি-আয়ু কমে,
তাই বিকল্পভাব-ক্রমে, সঙ্কল্প-বল বেড়ে যায়।
“কল্পহীন যা', তা’ বিকল্প,” অল্পজ্ঞই বলতে চায় ।
পা বাড়া’য়ে চলতে গেলে, পিছুর পায়ে ভর
দিলে, কেউ চলতে নারে, এম্‌নি এ কলঘর ;
বিকল্পের সত্তাভাবে,
সঙ্কল্প রয় পঙ্গুভাবে,
সঙ্কল্পই তাকে ভাবে, সে দিক পানে তাই সে চায়।
সে’ চাওয়াতে, ভাব-হাওয়াতে, সঙ্কল্প ত আগে ধায়।
নয় বিকল্প কোন কালে, সঙ্কল্পের অন্তরায়।
বিকল্পকে খাড়া করি, সঙ্কল্প তায় রাখে পায়।
তারই শিরে চেপে জোরে, আপনাকে সে চালায়।
সঙ্কল্পের গতি-সূত্র,
বিকল্পই ঠিক যােগায়।
সঙ্কল্প তার পূর্ণ কবে, যে বিকল্প-মাথা খায় ?
নির্বিকল্পভাব যা তবে,
সঙ্কল্পই তার গােড়ায় ।
সঙ্কল্পের বলেই তার, কে আত্মভাব বজায় ।
*;
===

৭১
আনন্দ-বিবেক
বাধার মাঝেই সিদ্ধি।
৭১
যে ভাবে যা’র গতি রুদ্ধ, সে’ভাব যেন বাধা তার।
বাধা যাহা দ্বারে বাঁধা, সতর্ক সে অনিবার।
সিদ্ধিশক্তি বৃদ্ধি-তরে,
কৰ্ম্ম-পথে বাধা চরে,
সিদ্ধি তাকে পালন করে, রাখতে দূরে ব্যভিচার।
বাধায় যে সিদ্ধি সাধা, অক্ষুন্ন তার অধিকার।
সিদ্ধি গণি’ ঋদ্ধির রূপ, দাড়ায় বাধা জোরে,
পড়লে চোখে সিদ্ধি-ভাতি, না রয় খাড়া দোরে ;
টুটি’ তবে বাঁধন-দড়া,
স্মৃতি দিয়ে যে রূপ গড়া,
ফেলে তা’ সে সমুখ-ছাড়া, না পােষে আর অহঙ্কার।
সিদ্ধি-জ্ঞানে, সিদ্ধি-ধ্যানে, মানে সিদ্ধি আপনার।
তাই ত বলি—বাধার থলি-সিদ্ধি-পূজার সিদ্ধাগার।
বাধাই যত্নে আনে খুজে, সিদ্ধি-পূজার উপচার।
বাধাই সিদ্ধি-অগ্রদূত,
দিতে সর্ব সমাচার।
বাধা সদা মিটায় ধাঁধা, জানায়—-“সিদ্ধি সৰ্বসার”।
বাধা-রূপে বাধা পেয়ে, চলে সিদ্ধি-ব্যবহার।
ধরে বাধা বজ্র-দেহ, বইতে সিদ্ধি-গুরুভার।

আনন্দ-বিবেক
দূরত্বের মাঝেই নৈকট্য
দূরত্বের মেঘ-মন্দ্রে, জাগে নৈকট্যের সুর।
সে সুরে ত দূরতার, দুর্ভাবনা করে দূর ।
ছাড়িলে সন্নিধি-সঙ্গ,
বিকল ব্যবধি-অঙ্গ,
অঙ্গ-ভঙ্গে সাঙ্গ রঙ্গ-সাঙ্গোপাঙ্গ-গর্ব
সামীপ্যের নেশায় তাই, দূরত-প্রাণ ভরপূর !
সন্নিধের চিন্তা নিয়ে, ধেয়ান দূরত্বের,
তাহার সকল কৰ্ম্ম মাঝে, তা’রই চলে জের ;
সেইটা তার এমন সাধা,
কাটা’য়ে সে সব বাধা,
সদা তা’র গুণে বাধা, সান্নিধ্যকে ভেবে’ সুর।
নৈকট্যই ব্যবধার, শ্রান্তিহরা শান্তিপুর ।
সামীপের সুধা-পানে, দূরত্ব নয় ক্ষুধাতুর !
অসামীপ্য-রত্নহারে, সামীপ্যই কোহিনুর ।
সামীপ্যই দূরত্বের,
বাড়ায় কৰ্ম্ম-চক্ৰ-ঘূর।
ব্যবধির অন্তরেই, সন্নিধির অন্তঃপুর।
সামীপ্যের প্রভাবেই,
শূর ।
।
দূরতা হয় দপী
܂ ܚܫ

৭৩
আনন্দ-বিবেক,
অন্যায়ের মাঝেই ন্যায় ।
৭৩
অন্যায়ের অগ্নি-কুণ্ডে, বিচরে স্যায় দণ্ড ধরি।
অন্যায় তাই মনে ভাবে,—“চুপে চুপে কাৰ্য্য করি”।
চলুক সে, যে ভাব চেপে’, শঙ্কাতে বুক উঠে কেঁপে,
ন্যায়ের ফাগ, অঙ্গে লেপে’, সামলে নিজে বেড়ায় চরি।
মাতলে কাযে সেরূপ দশা, যেরূপ বুনাে মত্তকরী।
•
সত্যের হাঁক শুনতে পেলে, আর না চলে বেড়ে,
মুখে বলে-“রই না আমি, ন্যায়ের সঙ্গ ছেড়ে;
ন্যায় না তার হৃদে সুপ্ত,
তাই না কোন ক্রিয়া লুপ্ত,
নাহি পারে থাকতে গুপ্ত,
ন্যায়কে দূরে পরিহরি।
যেথায় সে যে কাষ করে, করে তাহা ন্যায়কে ডরি।
যে কায যেথা করে জোরে, ন্যায়ের নামের মালা পরি।
অন্যায় চায়—“অন্যই আয়”, “আন্ ন্যায়-যা পারের:তরি”।
অন্যায় না থাকলে, ন্যায়ের—অবিশ্বাস আত্মােপরি !

৭৪
আনন্দ বিবেক
নাস্তির মাঝেই অস্তি।
৭৪
নাস্তি-ঘােরাসুপ্তি-ঘােরে, ঘুরে অস্তি বারমাস।
হলেও নাস্তি কিছু, অস্তি তার অস্থিমাস।
কোন ভাব না যদি ভাসে, ‘নাস্তি’ কথা নাহি আসে,
অস্তিতার সংজ্ঞা-নাশে, রুদ্ধ নাস্তি-কণ্ঠশ্বাস।
নহে নাস্তি ভিন্ন বস্তু, মাত্র অস্তি-অব-ভাস!
নাস্তির প্রতিরক্তকণা, অস্তির ভাব-দান,
অন্তি আগে স্বীকার করি’, বাঁচায় নাস্তি প্রাণ ;
অস্তিকেই কোন রূপে, নাস্তি নারে রাখতে চেপে,
নাস্তি পড়ে অন্ধকূপে, অস্তি না তা’র করলে আশ ।
‘নাস্তি’ নাস্তি, অস্তি-ভাবে—অস্তিবৎ তদ্ বিকাশ !
অস্তি—সত্য-ভাব-উৎস, নাস্তি ত ভাব-পরিহাস।
নাস্তিভাবরূপে অস্তি, করে আত্ম-পরকাশ।
বাড়ায় নাস্তি যে ভয় মনে, নাশে অস্তি সেই ত্রাস।
অস্তি নাস্তি-মানাতেই, তা’র আত্মবােধােল্লাস!
‘অস্তি’ অস্তি, পায় সােয়ান্তি, নিয়েও মানা-ভাবের পাশ।
নাস্তিভাবও জানায় তাই—“সদাই “আমি” অস্তি-দাস”।

আনন্দ-বিবেক
অমঙ্গল মাঝেই মঙ্গল।
৭৫
অমঙ্গল-ঝঞ্চাবাতে—বুদ্ধ মঙ্গলের প্রাণ।
একমাত্র মঙ্গলই, অমঙ্গল-অধিষ্ঠান ।
অমঙ্গলই কালক্রমে
মহলের রূপে ভ্রমে,
পেয়ে যায় ক্রমে ক্রমে, মঙ্গলের প্রিয়স্থান।
অমঙ্গল-জঙ্গলে তা’ই-মঙ্গলের অবস্থান ।
অকল্যাণ-কল্যাণের ভাড়ার পুরাতন,
সে ভাণ্ডারে ঢুকলে পরে, বিশুদ্ধ হয় মন ;
ধন-স্পৃহা নাহি থাকে, সাধতে না হয় যাকে তাকে,
পড়তে না হয় মায়া-পাঁকে, ছুটে জোরে ভক্তি-বান।
অমঙ্গল-মুখে ফুটে, মঙ্গলের প্রেমাদ্বান।
অকল্যাণ থাকাতেই, কল্যাণের বাড়ে দান।
অকল্যাণ-রূপেই সে, রাখে সদা আত্মমান ।

আনন্দ-বিবেক
অসত্য মাঝেই সত্য।
৭৬
অসত্যের শূন্য-গেহে, নাচে সত্য তুলি’ কর।
অসত্যের ব্যক্তি তাই, নিত্য সত্য-সহােপর ।
সত্যের বল পায় বলি,
সসত্ত্ব সে—মহাবলী,
হলেও অতি দুষ্ট, ছলী, সত্যের ঠাই প্রিয়তর।
সহে সত্য দর্প তার, নির্বিকারে নিরন্তর ।
অসত্যের অঙ্গরাগে, সত্যের রাগ বাড়ে,
স্ব-প্রভাব-বিসার লাগি’, তা’র না সঙ্গ ছাড়ে ;
অসত্য সেই সূত্র পেয়ে,
বেড়ায় সত্যের গুণ গেয়ে,
সত্যও তার মুখ চেয়ে, ঘুচায় ক্রমে দুঃখ, ভর।
অসত্যের কোন কাযে, না দাঁড়ায় সে কভু পর।
অসত্যের সব ভাবে, রাখে দৃষ্টি খরতর।
অসত্যের ব্যবহারে, পায় সত্য সমাদর।

আনন্দ-বিবেক
কারণের মধ্যেই অকারণ।
৭৭
কারণের মহাব্যোমে, অ-কারণ-চিবিলাস।
বায়ুতে যে স্পন্দ-শক্তি, স্বতঃই তার সু-বিকাশ।
অকারণ-কারণ-যােড়,
তা’ই কারণের আগাগােড়া,
খুঁজতে গেলে মনটা খোঁড়া, বিফল সদা সে প্রয়াস।
কারণ-মূলে অকাণ, নির্বিরােধে করে বাস।
কারণ হ’তে কায যা ঘটে, স্ব-ভাব-সু-নিয়মে,
রােধিতে সেই কৰ্ম্ম-গতি, কাল যে, ভ্রমে ভ্রমে ;
হেতু ত তা’র অ-কারণ,
সৃষ্টি-ক্রম সহ রণ,
চায় বিজ্ঞ কদাচন, ঘটলে তাহা,–আত্মনাশ।
কারণের যে স্বাধীনতা,অ-কারণ-বিত্ত খাস।
কারণ তার হইলে মূল, কাৰ্য্যে তার ঘ’টতে নাশ।
কারণে যে রয় অ-কারণ,
কাৰ্য্যই দেয় তদাভাস!
কারণ বই না কাৰ্য্য ঘটে, কায বিনা না মিটে আশ।

৭৮
আনন্দ-বিবেক
স্বার্থের মাঝেই পরার্থ।
।
৭৮
স্বার্থ-যজ্ঞক্ষেত্রে বহে--পরার্থের স্নিগ্ধ হাওয়া।
স্বার্থ নহে দূষ্য কভু, স্ব-অর্থ যদি যায় পাওয়া।
#
১।
“আমি ক্ষুদ্র” আমি স্মরি,
গণ্ডী মাঝে যদি চরি’,
তবেই ত স্বার্থ-অরি,-তত্তাবে রয় হৃদি ছাওয়া।
গণলে তাকে আত্মভাবে, হয় সে স্বার্থ-মাথা-খাওয়া।
‘আত্মা হন সর্বব্যাপী’, এভাব যদি জাগে,
অস্তি-ভাতি-প্রিয়-অর্থ, কা’ না কাযে লাগে ?
সে অর্থই হয় পরার্থ,
স্ব-অর্থে তা নহে ব্যর্থ,
স্বার্থেই তাই ঢাকা স্বার্থ, ভুল ত তাকে ছাড়তে যাওয়া।
ছাড়লে স্বার্থ-ঘাের অনর্থ, স্ব-ভাব পানে না যায় চাওয়া!
নিজেকে বাদ দিতে গেলে, পরার্থ-গুণ হয় না গাওয়া।
স্বার্থ বশে পুরার্থের, মিটে সব দাবী-দাওয়া।

আনন্দ-বিবেক
বিকারের মাঝেই নির্বিকার।
৭৯
বিকারের আঁস্তাকুড়, নির্বিকার-সু-বাস ভরা।
বিকাকে তাই কোন রূপে, না যায় কভু নিন্দা করা।
নির্বিকার-ব্যোমযানে,
চাপিয়ে সে সর্বস্থানে,
চলে ফিরে মূল-জ্ঞানে, যাহে তা’র সত্তা ধরা।
বিকারের মূল লক্ষ্য—নিৰ্বিকারে সদা চরা।
নির্বিকার—বিকার-মূল, তাই তা স্বপ্ন তার,
স্বভাবে না বিশ্বাসী তাই, মূলকে গণি’ সার ;
ভেবেও সার মূলাধার,
যদিও রয় অহঙ্কার,
তবু চিন্তা অনিবার--“ঘুচবে কিসে জরা-মর”।
“নির্বিকারে কি প্রকারে, আপনারে রাখবে ভরা”।
নির্বিকারকে বুঝতে গেলে, বিকার ছেড়ে না যায় সরা!
বিকারে যে শক্তি জাগে, তাহাই নির্বিকারা পরা।

৮০
আনন্দ-বিবেক
কম্মের মধ্যেই অকৰ্ম্ম।
(২য়-বিচার)
কৰ্ম্ম কাল-ব্যবহারে, অকৰ্ম্ম রয় স্বপ্রকাশ।
কৰ্ম্ম-ছাড়া নয় সে কভু, কৰ্ম্মই তার সন্তাভাস।
কৰ্ম্মকে যে মন্দ ভেবে, রাখিতে চায় তাকে দেবে,
ধৰ্ম্মকে সে নাহি সেবে, ঘটায় ভ্রমে আত্মনাশ !
কৰ্ম্ম-ধৰ্ম্ম-বাহরঙ্গ, অভাবে তার সর্বনাশ !
ক্রিয়া ছেড়ে নিষ্ক্রিয় যা’, যায় দূরে সরি’,
সব সময়ে ক্রিয়াকে সে, নাচায় কোলে করি;
কর্ম যদি হয় রুদ্ধ,
জ্ঞান নাহি থাকে বুদ্ধ,
অকৰ্ম্ম যা’ নিত্যশুদ্ধ, তা’রও ঘটে অপ্রকাশ।
নহে কৰ্ম্ম ত্যজ্য কভু, ত্যজ্য-কৰ্ম্মফল-আশ।
করমের প্রতি স্পন্দে, অকর্মের সমুল্লাস।
“কৰ্ম্ম-প্রকৃতির ধর্ম,” রাখা চাই এ বিশ্বাস।
এ বিশ্বাসে স্বতঃই মনে, অকৰ্ম্ম-বােধ-সমুদ্ভাস।
২

আনন্দ-বিবেক
ঢাকার মাঝেই কঁকা।
“টাকার মাঝে “ক্ষাকার” রূপ বকালে নির্বিকার।
পড়িলেও মেঘে ঢাকা, বিকৃত নয় শুন্যধার !
যাকে মােরা বলি—ঢাকা, ফাকার’পরে তা’র তু থাকা,
ফঁকাতেই ঢাকা আঁকা, ঢাকা কঁকার হাক্কার।
ভবে যাহা বস্তু গণ্য,
ঢাকাই তার অলঙ্কার।
;
“ঢাকা” যবে না রয়, তবে আত্মভােলা ফঁাকা,”
রূপ ব্যতীত স্ব-রূপ-জ্ঞান, হয় না কভু পাকা ;
ঢাকার জ্ঞান নহে ঢাকায়,
ফাঁকায় সে সত্তা জাগায়,
তবে ঢাকা যায় যা দেখা, নিদর্শন তা’ ফাঁকার।
ফাঁকার-ভাব-বােধের তরে, ঢাকাই চিরসঙ্গী তার।
নিজ রূপ না থাকিলে, স্ব-চেতনে আস্থা কার?
স্ব-ভাব মাঝে ঢাকাই করেফাকার গুণ ব্যবহার।
ঢাকার নিবিড় আঁধার-ঘরে, নৃত্য ফক্কার-অস্তিতার !

আনন্দ-বিবেক
নিষেধের মাঝেই বিধি।
নিষেধের গণ্ডী মাঝে, জাগে বিধি তুলি’ শির।
নিষেধ-মুখে তাই সার সত্য যাহা, হয় স্থির।
নিষেধ যা তা ত বিধি,
সে বিধিতে মিলে নিধি,
শুধু তা নয়-ব্যক্ত বিধি, চিত্ত সদা শান্ত-ধীয় !
নিষেধের তরি চাপি’, যায় তরি’ কর্মবীর ।
;
নিষেধ-মুখে বিধি-মন্ত্র, সদাই উচ্চারিত,
নিষেধ মেনে ভ্রান্তি-শান্তি-শক্তি বিসারিত ;
নিষেধ-বিধি-বেদোপাঙ্গ, নিষেধ-বিধির মহিমাঙ্গ,
নিষেধ পালি’ বিধি-সাঙ্গ, ভাসে জ্ঞান ধরণীর।
নিষেধ বিনা না যায় জানা, আত্মতত্ত্ব সুগভীর।
নিষেধের প্রতি অণু, পুষ্ট পেয়ে বিধি-নীর।
নিষেধই কালক্রমে, দেখায় বিধি-সিন্ধু-তীর !

৮৩
আনন্দ-বিবেক
বিশ্রী মাঝেই সুশ্রী।
৮৩
বিশ্রী-মলস্তুপ সনে, রাখে সুশ্রী ব্যবহার।
কদৰ্য যা’ তাই না করে, সৌন্দৰ্য্যকে পরিহার ৪
বর্তী৷ যাহা,দৃষ্ট আজ, ,
সুশ্রীর ত, অঙ্গ-সাজ,
বিশ্রী নিয়ে সুশ্রীর কাষ, নইলে ভক্ত কে হয় তার?
সুশ্রীর যা’ অতীত ভাব, বিশ্রী ধরে তদাকার !
কদাকার যা’, সে ভাবে তা মৌলিক গুণ ধরে,
“সে ভাবে তা’অদ্বিতীয়,” সবাই মনে করে ;
তবে বল লােকের কাছে,
বিশ্রী ব'লে কি রূপ আছে ?
সুশ্রীই ত বিশ্রী-পাছে, ছড়ায় ধন আপনার।
আপন ভাবে বি ত তাই, বাড়ায় নিজ অধিকার।
বিশ্রী দেখে’ সুশ্ৰী বুঝে-কাহার তরে বড়াই কা’?
বিশ্রীও ঠিক মনে ভাবে, “কি লক্ষ্য কার? কে আমার ?”

শত্রুতা মাঝেই মিত্রতা।
৮৪
শত্রুতার কাটা-তারে, বেড়া মিত্রতার কায় ।
মিত্রতার ত্যক্ত অংশ, শত্রুতার আখ্যা পায়।
•
পূর্বে যাহা গেছে সাধা,
পরে তা’ স্বেচ্ছার বাধা-
দাঁড়ায় যদি, বাড়ে ধাধা, তাই তা’ পর গণা যায়।
মিত্রতার স্মৃতিচিহ্, শত্রুতার সারা-গা’য় ॥
“শত্রুতার আবির্ভাব, যেরূপেঁহােক ভবে,
মিত্ৰতাকৈ দাবিয়ে নিয়ে, সে তার পক্ষ হবে”
সতত তার এই আশা,
যতই তাকে যা’ক তাসা,
ছাড়ে সেসে ভাব-নেশা, সব শক্তি লাগায় তা’য় ।
যতদিন না পূর্ণকাম, ততদিন সে দ্বন্দ্ব চায়।
মিত্রতার বীতরাগ, জমে আসি’ শত্রুতায়।
মিত্রতার বার্তা সহ, শত্রুত তার পিছু ধায়।
মিত্ৰতা ত শত্রুতা-ঠাই, বিকা’য়ে দেয় আপনায়।
শত্রুতাই দম্ভে তাই, মুলের পানে সদাই চায়।
শত্রুতার-তিরােভাবে, মুলের বল কে জানায় ?
শক্রতার রূপেই ত, মিত্রতা রয় মৰ্যাদায়।
শত্রুতাও নিত্য পুষ্ট, মিত্রতা-ত্যাগশীলতায়।
শক্রতার প্রতিশ্বাস, মিত্রতার ত্যক্ত বায়।
মূলতঃ শত্রুতা নয়, মিত্রতার অন্তরায়।

আনন্দ-খিকে
৮৫
{
দেহের মাঝেই দেহী।
।
দেহের মাঝে দেহী তথা, ঘনে যথা শুন্যবাস।
ঘাটলে দেহ, নিঃসন্দেহ—দেহীর জ্ঞান-পরকাশ ।
দেহ-দেহীপদলেহী,
তাই রব ‘দেহি’-দেহি,
দেহ রথ, রথী-দেহী, দেহী মাত্ৰ দেহ-দাস।
দেহশূন্য দেহী—শূন্য, দেহই দেহীর প্রিয়াবাস
ঘরের খবর না রাখিয়ে, ক’রলে পর-আশ,
কামনা না পূর্ণ তাহে, বরং বাড়ে ত্রাস ;
দেহতত্ত্ব না জানিয়ে,
“দেহী ধূয়ে” এই ভাবিয়ে,
বেড়ায় যে তার খোঁজ করিয়ে, সংশয়ে তার ঘটে নাশ।
‘দেহেই দেহী’ ঠিক যে জানে, ছিন্ন তার অষ্টপাশ !
দেহজ্ঞানে দেহীর কায, হলেও দেহী চিদাভাস।
মানা ভিন্ন জানার বল, সদাই থাকে অপ্রকাশ।
দেহ—জন্য তবু তদ্ভিন্ন, রুদ্ধ দেহীর ভাবােচ্ছ।

আনন্দ-বিবেক
কুবল মাঝেই কেবল।
কু-বল চেয়ে কে বল ধরে ? “কেবল”-মহাবলীয়ান।
“কেবলকে” যে সেবে কেবল, কে বল আর ত সমান ।
কেবলে যে গুপ্তশক্তি,
কু-বলে তার অভিব্যক্তি,
কেবল’পরে আনুরক্তি, “কেবল-পদ” করে দান।
কু-বলের লীলা যা’ যা’, কেবলে তা বিদ্যমান।
যদিও লােকে কু-বল দেখে’, কেবল করে স্থির,
তবুঝল নহে সবল কেবল সম বীর ;
চল্লেও সে নানা ভাবে,
কেবলবল সার ভাবে,
কিরূপে তার সঙ্গ পাবে, সে ভাবেই ঢালে প্রাণ।
“কাল বশে কোথায় সে”, পায় কু-বল সে সন্ধান।
খােজ পেয়ে বসলে ধ্যানে, কেবল-জ্ঞান দীপ্যমান্।
কেবল—কেবল পুষ্কল-জ্ঞান, কু-বলের অধিষ্ঠান।
কুবল-মূলে পূর্ণ বলে, কেবলের অবস্থান।
কু-বল তাই কেবল-ঠাই, পায় তা’, যা তার অবদান।
}

৮৭
আনন্দ-বিবেক
হেথার মাঝেই সেথা।
৮৭
হেথায় কালে অভিব্যক্ত, সেথার সব গুপ্তধন।
আগেই তাই হেথায় চাই-সেথার সব-অন্বেষণ ।
{
থাকিয়ে—সেজে কুড়ে, হেথার সব দেখলে ঢুড়ে,
চোখে পড়ে-হেথা যুড়ে, সেথার ধন অগণন ।
কি আছে কা’র কৰ্ম্ম সেথা? হেথা কৰ্ম্ম-আচরণ।
হেথার সব দিতে ছেড়ে, চেষ্টা বাড়ে যা’র,
স্বপ্নেও না সেথার ধনে, দৃষ্টি পড়ে তার ;
হেথায় “সেথা” এম্‌নি মাখা, না যায় তাকে দূরে রাখা,
হেথা-সেথা-বৃক্ষশাখা-বৃক্ষের যা’ প্রয়ােজন।
হেথার ধন না তুচ্ছ গণে, আত্মজ্ঞ যে মহাজন!
হেথা ছেড়ে সেথার কথা, তেমনি—যেমন ঘুম-কথন।
হেথা সনে তাই ভূজনে, বাড়ায় নিত্য আলিঙ্গন।
হেথা যেন সেথার এক-অপরূপ আয়তন !
হেথা-“সেথা”-হরিহর, এক-ছাড়া না আর কখন।
.

আনন্দ-বিষেক
ব্যয়ের মাঝেই অব্যয়।
سامسا
ব্যয়-ঝারির ছিদ্রপথে, অব্যয়ের গতায়াত।
ব্যয়ের তাই কোন কাযে, নাহি আপনার হাত
জমা কিছু থাকলে ঘরে,
তা’ হতে হয় ব্যয় করে,
ব্যয়ের দর্প—জমা-তরে, নইলে ত তা’র মুণ্ড-পাত!
অব্যয়ের অনন্ততা, ব্যয়-মুখে প্রতিভাত।
"
ব্যয়ে যাহার ঘাটতি না হয়, অব্যয় সেই ধন,
অকাতরে সেই ত করে, স্ব-ভাব-বিতরণ ;
ব্যয় স্বর্ণ-সুযােগ পেয়ে,
অব্যয়ের মুখ চেয়ে,
যথা তথা বেড়ায় ধেয়ে, শুনায় লম্বা-লম্বা বাত।
অব্যয় না দিলে সাড়া, এক চা’লে কিন্তী মাত !
ব্যয়ও কাযে ক্ষান্ত হ'লে, অব্যয়ের পক্ষাঘাত !
ব্যয়কে তাই সে ভালবাসে, রাখে সদা নিজের সাথ ।

আনন্দ-বিবেক
সামান্য মাঝেই বিশেষ
হেয় মধ্যেই
ধ্যেয়।
৮৯
সামান্য যে বিষকণা, বিশেষ-শক্তি থাকে তা’য়।
যুণ্য, হেয় দেহ মাঝে, ধ্যেয়-আম্মা শােভা পায় ।
সামান্য যা হয় নগণ্য,
তা’ হতেই বিশেষ ধন্য,
সামান্য তাই অগ্রে গণ্য, বিশেষত্ব আছে যায় ।
কত কি বিশেষ-ধন, সামান্য এ’ মৃত্তিকায় ।
সামান্যকে তুচ্ছ গণি’, বিশেষ-লাভ তরে,
ইচ্ছ। কারো জাগে যদি, সে আশ শেষে সরে ;
সামান্য এক ভিত্তি’ পরে, বিশেষ বাড়ী খাড়া পরে,
বিশেষ তবে বিকায় দরে, সামান্যকে যবে চায়।
অসামান্য-মান্য ভবে, সামান্যকে রাখি’ পায় !
বিশেষ হয়—বিশেষ সুখী, সামান্যের প্রার্থনায়।
সামান্যও বিশেষ-পদে, বিছায়ে দেয় আপনায়।
সামান্যকে হেয় ভেবে, বিশেষ-ধ্যেয় রয় কোথায় ?
না হলেও হেয়-“ধ্যেয়, নয় তা’ ধ্যেয়-অন্তরায়।
বিশেষের বৈশিষ্ট্য যায়, সামান্যই ত’ যােগায়।

৯০
আনন্দ-বিবেক
চাপার মাঝেই ফঁাপা।
“চাপার” মাঝে “পা” ফিরি’, রক্ষা করে তাহার কায়।
অনিল-চাপে সলিল কঁপে, স্ফীততা তা না হারায়।
“চাপা” কঁপায় দিলেও চাপা, স্ব-ভাব না ছাড়ে ফাপা,
বাড়ে হেন অঙ্গ-কাঁপা,যাহে চাপা সরে যায়।
মাপের ভিতর আসে চাপা, ফাপাকে ঠিক মাপা দায়।
চাপার বুকে চেপে ফাপা, আপন কায করে,
যাহার ফলে—তলে তলে, চাপার থােঝ সরে ;
“চাপা”-ফাঁপার নিম্নগতি, হয় তাহে ফাঁপার ক্ষতি,
চাপার কিন্তু ফিরে মতি, যখন জানে—“কে কা’য় চায়”।
চাপার মনে শান্তি আসে, বুঝলে ফাঁপার অভিপ্রায়।
ফাপার যা’ নিজের চাপ, তাহাই চাপা-সংজ্ঞা পায় ।
স্বরূপ-জ্ঞানে ফাঁপাইটাকে, চাপ-ভ্রান্তি তা’য় মুকায়।

আনন্দ বিবেক
বন্ধ মাঝেই মােক্ষ।
(২য়-বিচার )
বন্ধ—মােক্ষ-মুখবন্ধ, নহে প্রতিবন্ধু তার।
সেতারের গুণ গাহে, সেতারের প্রতি তার।
বন্ধ-মূল লক্ষ্য-মােক্ষ
তাই সে সসা বন্ধ-পক্ষ,
করি’ তাকে উপলক্ষ, সিদ্ধ মােক্ষ-ব্যবহার।
বন্ধন ও মােক্ষ-অশে, কাৰ্য করে আপনার ।
বন্ধ আত্মরা তরে, ব্যস্ত নহে তত,
মােক্ষ-সঙ্গ-লাভের আশে, আগ্রহ তা’র যত ;
কারণ-সে এ তত্ত্ব জানে- “কে তাহাকে কোলে টানে,
“কাহার কাছে আত্মদানে, চেষ্টিত সে নিরন্তর”।
বন্ধনের প্রতি গ্রন্থি, লয় মােক্ষ-সমাচার।
বন্ধনের অাত্মবলমােদত্ত পুরস্কার!
বন্ধনের চদু মাঝে, মােক্ষ-গুপ্তশস্ত্রাগার।
বন্ধুকেই মিত্র-জেনে, মােক্ষ-প্রাণ সমুদার!
মােক্ষ-সঙ্গ দেয় বন্ধ, নাশে তার চিন্তা-ভার।

আনন্দ-বিশেষ
বিষের মাঝেই অমৃত।
বিষ-পূতিগন্ধি-পঙ্কে, বহে অমৃতের ধারা।
নিদাঘের তাপানলে, অনিল না শান্তিহারা !
বিষে যবে বিষ-ক্ষয়,
কিসে সে বিষ মন্দ হয় ?
“বিষে যে অমৃত রয়, বিষ যে রােগে সুধা পারা” ।
এই সত্য ব্যক্ত, তাই—বিষকে দিয়ে বিষকে মারা।
বিষের জোর সুধার আশে, বিষ না তাহা জানে,
যখন জানে, স্ব-ভাব তা’র, আয় না সার মানে ;
তখন সে সত্ত্ব-বলে,
স্বধৰ্ম্মে না বেড়ে চলে,
আপনার জ্ঞানানলে, পােড়ায় শেষে কৰ্ম্ম সারা।
বিষে সুধা না জানে যে, বিষের ভয়ে হয় সে সারা।
বিষ ত সুধার বি-ভাব এক—জাগায় যে সুধার ধারা।
সুধার সঙ্গ লভিয়ে বিষ, সুধার নেশায় মাতােয়ারা।

.
নলৰিলে
শান্তি মাঝেই সােয়ান্তি।
শাস্তি-তীক্ষ শল্য-প্রান্তুে, অন্তি মােয়াস্তির সুখ।
শান্তির কোন কাৰ্যে, তা’র-নাস্তি বিন্দু মাত্র দুখ ।
শাস্তি যাহা করে ভােগ, হলেও তা ভীষণ লােগ,
খোঁজে সে ত উভযােগ, দেখতে সােয়াস্তির মুখ।
পালতে যােগ, এমন কি, নহে কভু পরাঘুখ।
যদিও সে ভয়ঙ্কর-দুঃখ মুর্তিমান্,
তবুও তার সকল কাযে, শঙ্কা বিদ্যমান ;
চেপে’ জোরে লােকের ঘাড়ে,
সােয়াস্তির কথা পাড়ে,
তাহার যেন হাড়ে-হাড়ে, খেলে সােয়াস্তির তু।
সােয়াস্তির নামে তাই, উঠে ফুলে’ তার বুক !
সােয়াস্তির দিব্যভাবে, প্রাণ তার জাগরূক ।
সােয়াস্তির গুণে সরে-গণে শান্তি যা অসুখ।

আনন্দ বিবেক
লঘুর মাঝেই গুরু।
৯৪
ছুটে শূন্যে লঘু ঘন, গুরু বজ্র বুকে ধরি।
গ্রহ-উপগ্ৰহরাজি, ভাসে মহাব্যোমােপরি !
সূক্ষম কল্পনার সাজে,
নানাভাবে বিশ্ব সাজে,
মাতে লঘু সৰ্ব্ব কাযে, গুরু-জ্ঞানে হৃদি ভরি।
গুরুতাও মান্যগণ্য, লঘুতার সঙ্গ করি।
লঘু ভাবােপরে জীবের, যতই লক্ষ্য পড়ে,
ততই যেন গুরুত্বের স্তম্ভ, নড়ে চড়ে ;
শেষে চিত্ত ধ্যান-বলে, দাড়ায় আসি’ এরূপ স্থলে,
কোন বিচার আর না চলে, সকল ভাব পড়ে সরি’ !
লঘু তাই কোন ভাবে, নহে কভু গুরু-অরি।
লঘুর দেখা না পায় যদি, রহে গুরু জ্যান্তে মরি।
রুদ্ধ লঘু-প্রাণশক্তি, গুরুত্ব-বােধ পরিহরি।

আনন্দ-বিবেক অনিয়ম মাঝেই নিয়ম- - অব্যবস্থা মাঝেই ব্যবস্থা। অনিয়ম-শিশুখেলা, নহে নিয়ম-সঙ্গ-ছাড়া। অব্যবস্থা মাঝে তাই, ব্যবস্থার নিত্য সাড়া । অ-মেলে যে মেল জাগে, ব্যক্ত তা মেল-আশা-রগে, অনিয়মের আগে আগে, নিয়ম যায় পিটে কাড়া। অনিয়ম-কৰ্ম্ম শুধু, নিয়মের ঘণ্টা নাড়া! যাহাই করুক অনিয়ম, নিয়ম তা’র মূলে, নিয়ম ভুলে’ স্থান না মিলে, তাহার কোন কূলে ; বাইরে বটে সে বিপক্ষ, ভেতর কিন্তু নিয়ম-পক্ষ, তাই সে ত্যজি’ নিয়ম-কক্ষ, অন্য কোথা নহে খাড়া। নিজে তবে সামলে চলে, নিয়ম যবে লাগায় তাড়া। অনিয়ম যা’, সে ত মাত্র—নিয়মের অঙ্গ-নাড়া । নিয়মের গণ্ডী ছেড়ে, সম্ভবে না তাহার বাড়া ।

কামক্ষ-বিকে
হারার মাঝে সারা।
হারা-কারা-অন্ধকারে, আছে “সারা” শয্যা পাতি ।
সারা তরে তাই “হারা,” আত্মহারা দিবা রাতি ॥
সারা-হারার প্রাণশক্তি, সারাতে তাই তার আসক্তি,
শুধু তা নয়—শ্রদ্ধা ভক্তি, দেখায় সে কৰ্ম্মে মাতি।
সারার নামে হারার যেন, উঠে ফুলে’ বুকের ছাতি ।
হারা আপন অবস্থাকে, সদাই হেয় গণে,
কিরূপে সে পাবে সারায়, ইহাই ভাবে মনে ;
ভাব, ভক্তি দেখি’ হারার, তাহার’পরে দৃষ্টি সারার,
তাই সে হারায় স্ব-ভাব-ধারার, ভেতর যুড়ে সায়া-ভাতি।
সায়ার দয়ায় ‘হারা” কালে, জ্বালায় মরে সুখের বাতি।
দুয়ের মাঝে দ্বন্দ্ব বেড়ে, না হয় কভু হাতাহাতি!
হারার যা যা’ বাঞ্ছিত ধন, সবই সারার অন্তঃপাতী।
সারাও হলে হারা-হারা, নাম কিনে সে আত্মঘাতী।

আনন্দ-বিবেক
লক্ষণের মাঝেই বিলক্ষণ।
লক্ষণের চিত্রপটে, চিবুদ্ধ ধিলক্ষ ।
তটস্থ যে বালুরাশি, স্ব-রূপাৰূি-নিদর্শন।
বিলক্ষণ অফুরন্তু,
সে হেতু নাই পান্তু,
হয় যদি সে কর্মে ক্ষান্ত, বিলক্ষণ-অ-লক্ষণ।
লক্ষণে যে বিলক্ষণ, বুঝে তাহা বিচক্ষণ ।
;
বা’
উপসর্গ দেখে যেমন, নির্ণীত হয় রোগ,
লক্ষণেই ব্যক্ত তাহা, কিভাব-যােগাযােগ ;
ভাল-মন্দ,
থাকে আর ’তে মল,
মিটাইতে ভি-দ্বন্দ্ব, লক্ষণই বিলক্ষণ।
লক্ষণের প্রতি স্পন্দে, বিলক্ষণ সচেতন।
বিলক্ষণ-সূত্র-লাভ, লক্ষণের সু-লক্ষণ।
বিলক্ষণ-সঙ্গ তরে, তাই সে ব্যস্ত সর্বক্ষণ।
বিলক্ষণও আত্মজ্ঞানে, করে তাকে অবেক্ষণ।
৭

আনন্দবিবেক
পরােক্ষের মাঝেই অপরােক্ষ।
১
পরােক্ষের দূর সীমান্তে, অপরােক্ষ-অভিনয়।
পরােক্ষ-পথ দিলে ছেড়ে, তা’র-সনে না দেখা হয় ।
ল’য়ে অপরােক্ষ-স্মৃতি,
পরােক্ষ ত পায় আকৃতি,
পরােক্ষের য’ বিকৃতি, প্রত্যক্ষ তার সঙ্গে রয় ।
অপরােক্ষ-নাম-রূপে, পরােক্ষের কার্যালয় ।
জ্ঞান, ধ্যান যা প্রত্যক্ষের,—প্রাণ তা’ পরােক্ষের,
প্রত্যক্ষ-ধ্যান বিনা সে না, সেবক স্বভাবের ;
অপরােক্ষই জীব-লক্ষ্য,
পরােক্ষ তা’র নয় বিপক্ষ,
করি’ তাকে উপলক্ষ, অপনােঙ্গ-অভ্যুদয় !
অপরােক্ষ-গুণ গাহি', পরােক্ষের কমে ভয়।
অপরােক্ষসর্বভার, পরােক্ষ তাই শিরে বয়।

আনন্দ-বিবেক
অসার মাঝেই সু-সার।
হউক সোঁড়া অসার তরু, সু-সার তার শক্ত মূল।
মূল না যদি যােগায় রস, সকলি তার প্রতিকূল !
সু-সার নিয়ে অসার খাড়া, রইতে নারে সু-সার-ছাড়া,
সু-সারের খেয়ে তাড়া, অসার সারে আত্মভুল।
সু-সার তাই নহে কভু, অসারের চক্ষুশূল!
সু-সার যা’র সত্তা মেনে’, জাগায় অঙ্গোপরে,
দেখায় তার কাৰ্য শেষে, আপন স্থিতি তরে ;
তাহাই অসার-নামে খ্যাত,
এই তত্ত্ব যেবা জ্ঞাত,
নয় সে ভবে অবজ্ঞা, অকূলে তা’র মিলে
কূল !
অসার ছেড়ে সুসার কভু, নাহি সরে এক চুল।
না জাগে তার এ ছাৰ আশা-“অসার-চোখে পড়ক ধূল” !
সর্বকালে থাকে অসার, সু-সারের অনুকূল।
নাই এ ভবে অসারের, নিত্য বন্ধু সু-সার তুল।
সুসারও ধন্য নিজে, নিয়ে অসার ফল, ফুল ।

১৪
আনধিকে
নীচুর মাঝেই উচু।
নীচুর নিতল-পুরে উচুর-রত্নবেলী বৰ্তমান।
নীচুর সাথে প্রণয় যায়, তথায় তার মিলে স্থান
নীচুকে না ফেলি’ পঙ্কে, মিয়ে তাকে বিশাল অঙ্কে,
আছে উচু নিরাতঙ্কে, রক্ষা করি’ তাহার মান।
উচুর অধীন থেকে নীচু, না গণে দোষ-অপমান।
নীচু যাহা-উঁচুই ত, তাহার অধিষ্ঠান,
উচুর সঙ্গ না মিলিলে, হারায় নীচু প্রাণ;
নীচু ভাবকে সাখ ভিড়ায়ে, বেড়ায় উঁচু বুক ফুলা’য়ে,
নীচুও তার সব কুড়ায়ে, উঁচুকে তা’ করে দান।
উ চুও তাই নীচুর লাগি’, সদাই রাজী দিতে যান।
উচুর এই বিশেষত্ব, না চায় দানের প্রতিদান।
নীচুকে সে মানি’ আপন, আপনা মানে ভাগ্যবান।
নীচু, উচুর ব্যাপার দেখি’, গাহে উচুর বিজয়-গান।

১০১
আনন্দ-বিবেক
ভৰ মাঝেই ভৰধৰ।
ভব মাঝে ভবধব, নিয়ে ভব বিদ্যমান।
ভবকে যে দেখে ঘেটে, সে ধনে সে ভাগ্যবান।
আছে এই জনশ্রুতি,
“ভব হয় ভব-ভূতি,”
সে বােধ হ’তে ঘটলে চ্যুতি, ব্যর্থ সব অনুমান।
ভব-ভাবে প্রমাণিত ভবে ভব বর্তমান।
ভাবকে না দেখলে ঘেঁটে, অসার হেয় গণি’,
আর না কোথাও চোখে পড়ে, সুখের মণি-খনি ;
ভব ভবরূপী হয়ে
আছে নানা ভাব ল’য়ে ;
বেড়ায় সে ভূ-ভাব ব’য়ে, তাই ত তা’র উচ্চে স্থান।
বিনা ভব, ভব—শব, না রয় জ্ঞান, অভিজ্ঞান।
তা’ই ভব-প্রাপ্তি হেতু, ভবই ভবের শ্রেষ্ঠ দান।
ভবে ভব-জ্ঞান ব্যতীত, বাঁচা-মরা—দুই (ই) সমান।
ভব-জ্ঞান অভাবে ত, সৰ্ব্ব-ভাব-অবসান।

আনন্দ-বিবেক
নকলের মধ্যেই আসল।
কৃত্রিমতায় ভরা এ সংসার।
হেথ) যাহাই দেখ তাহারি জের, যা কর, তাই বিসার তার।
চক্ষে ভাসে নকল যবে,
আছেই আছে আসল তবে
নকল ভাবে আসল ভবে, লােকের কাছে দাড়ায় সার।
নিম্মোকবৎ নকল যেন, না হাে’ক তা’, তদবিকার !
সাকার যাহা নকল তাহা, মূল ত নিরাকার,
দেহীই হয় সেই নিরাকার, দেহই সাক্ষী তার ;
মূল ভাব-ব্যক্তি তরে,
আসলই সে রূপ ধ
তাই যেথা যা যদাকারে, আসল না তা—ত বিকার।
নকল রূপে গণ্য তাহা, পরিবৰ্ত্ত ঘটে যা’র ।
রূপ ব্যতীত অনন্ততা, বিচার করে সাধ্য কার ?
সান্তভাবই অনন্তের, দেখায় গুপ্ত বােধাগার।
নকল ভাবেই আসল-জ্ঞান, অরূপ জ্ঞান—সাধার।

আনন্দ-বিবেক
পচার মাঝেই তাজা।
প’চলে গােময় যে সার হয়, কোথা হতে সে সার আসে ?
যদি আগে গােময়ে তা, আত্মসত্ত্ব না বিকাশে।
সুপক্ক লাউ পচলে পরে,
যে বীজ সে গর্ভে ধরে,
তাজাভাবে ‘তা রক্ষা করে, বীজত্ব না কভু নাশে।
ভুক্ত দ্রব্য পচলে পেটে, তাহার গুণ পরকাশে ।
প’চতে যাহা করে সুরু, হারায় না সে রূপ,
অন্যরূপে তাজা হয়ে, দাড়ায় অপরূপ ;
পচে যদি দুগ্ধ-সার,
ঘি রয় তা’য় চমৎকার,
যত মুখরােচক আচার, রক্ষিত সব পচার আশে।
পচারিষ্টে শক্তি তাজা, যায় বুঝা তা অনায়াসে।
যা পচে, তা তাতেই বাঁচে, তাহাই তাজা সম ভাসে।
প’চলে পঞ্চভূতের দেহ, সবই তাজা স্ব স্ব বাসে।
পচার ভাব ধরি’ তাজা, সদাই তাজা পচাবাসে।
পচাও তাজার সঙ্গ পেয়ে, বদ্ধ তাজার প্রেম-পাশে।
থাকতে তাজা সদাই তাজা, পচার ভাব ভালবাসে।

১০৪
আনন্দ-বিবেক
ক্ষয়ের মাঝেই উদ্ভব।
১৫৪
“ক্ষয়ের ভিতর উদ্ভবের, আকুঞ্চন-প্রসারণ”।
এই ত ভবের সৃষ্টি-নীতি, ক্রিয়াশীল। অনুক্ষণ।
বস্তুরূপে যা’র পূর্তি,
ক্ষয়ে তার সত্ত্ব-ত্তি,
স্পন্দই সেই ক্ষয়-মূৰ্ত্তি—যা নবত্ব-প্রস্রবণ।
ক্ষয়-মুখে—উদ্ভবের, নিত্য গুপ্ত-অন্দোলন।
বস্তুর যে সঙ্কোচ-ভাব, তাহারি নাম ক্ষয়,
অভ্যুদয়-প্রসার তা’র-অঙ্গ-ভূষা হয় ;
স্পনা-ক্ষয়-ইলে গুপ্ত,
অ্যুদয়-নাম লুপ্ত,
কয় না তাই কভু সুপ্ত, সদা দীপ্ত সচেতন।
যা নাতা-অভ্যুদয়, ক্ষয়েই তার উদ্দীপন!
ক্ষয়ের হাতে উদ্ভব-বীজ, উদ্ভবক্ষয়-আয়তন।
ক্ষয়াভাবে চেতনাভাব, অক্ষয় ভাব অচেতন !
বাসনায় সমতাক্ষয়, তাহাই সৃষ্টি-প্রকরণ।
তাই না ক্ষয়-আতঙ্কময়, তা অক্ষয়-বিজ্ঞাপন।

এ0
আনন্দ বিবেক
অণুর মাঝেই ভানু।
বিন্দুমাঝে সিন্ধু-স্থিতি, অণুর মাঝে ভানুর বাস।
মহীয়সী চিচ্ছক্তির, কি অপূর্ব-পরকাশ।
বিন্দু, অণু যাহা ভাসে,
পূর্ণ হতে তাহা আসে,
মূল-পূর্ণতার আশে, দু’য়েরি তাই সু-প্রয়াস।
বিন্দু-বােধে সিন্ধু’পরে, কাহার জাগে অবিশ্বাস ?
“সূক্ষ অণু কালক্রমে বিরাট রূপ ধরে,”
সূক্ষই যে বস্তু-মুল, তা’,-বিজ্ঞান স্থির করে ;
যে চেতন-অধিষ্ঠান,
সর্বস্থলে বিদ্যমান,
তদুপরে যা’র স্থান, নিত্যই তা’র সমুচ্ছাস।
স্বরূপতঃ চিদূস্বরূপ, গণলেও তা চিদাভাস।
যাহে যাহা আভাসিত, তাহা ত তার সাভাস ।
সূক্ষা বট-বীজের মাঝে, বটত্বের অব-ভাস।
অণুতে তাই ভানু-স্থিতি, অণু ভানুর প্রিয়াবাস।

আনন্দ-বিবেক
কাঁচার মাঝেই পাকা।
কাঁচা আলু, ওল, কচু, পাকার ভাব পোেষণ করে।
ঘত ত সেই গুণে গুণী, ননী আগে যে গুণ ধরে ।
যে মিষ্টতা ডাবের জলে,
তাহাই থাকে ঝুনা ফলে,
যে বল নিয়ে কাঁচা চলে, পাকা’তে তা দৃষ্ট পরে।
কাচার যা বাড়াবাড়ি, তাড়াতাড়ি পাকার তরে!
পাকার যে আদ্য দশা, অভিধা তা’র কঁচা,
কঁচার ভাব ছাড়লে পাকার, কঠিন হয় বাঁচা,
কাঁচাই পাকার পক্ষ হয়ে, আর না কিছু সঙ্গে ল’য়ে
তাহারি গুণ শিরে ব’য়ে, কাটায় কাল অকাতরে ।
পাকা কঁচার স্ব-ভাব দেখে, আস্থা রাখে তাহার পরে।
আস্থা-ফলে রাস্তা মেলে, দুরবস্থা ভাগে ভরে।
সার্থক হয় কঁাচার বাঁচা, ঢুকলে বারেক পাকার ঘরে।
কঁচা যা’, তাই পাকা শেষে, বৃদ্ধি পেয়ে পাকার করে।

১০৭
আনন্দ-বিবেক
কঠিনের মাঝেই কোমল।
১০৭
কঠিন কাঠের বেণু রবে, উঠে ভেসে কোমল সুর।
শক্ত দাড়িম্বের মাঝে, কোমল দানা সুমধুর।
হিলের মাঝে তৈল যেমন, কঠিন মাঝে কোমল তেমন,
গলে বীরের কঠিন মন, দেখলে কাছে শােকাতুর ।
শিলা কঠিন হীরার ভিতর, শােভে কোমল জ্যোতি-পুর!
লাগবে বলে, পঞ্চভূতের আঘাত অণুক্ষণ,
প্রতি বস্তুর উপর ভাগে,-কঠিন আবরণ ;
শক্ত আটি, কোমল শাঁস, শক্ত মাটি, কোমল ঘাস,
কঠিন হয় কোমল-বাস, কারে ছেড়ে কেউ না দূর।
কঠিন যদি না রয় সাথে, কোমলের গর্ব
চুর !
কোমল ত শিশু সম,
কঠিনই রক্ষী শূর !
কঠিন বটে পরাক্রমী, কোমল কিন্তু সুচতুর !

১০
দীনতার মধ্যেই ঈশিতা।
১০৮
দীনতার জীর্ণবাসে, ঈশিতার স্বর্ণ-ছাতা।
দীনতা না জানি তাহ, ঘাটে বৃথা স্ব-ভাৰ-খাতা।
ঈশিত্বের বীণা-সুরে,
দীনতা-প্রাণ উঠে পূরে’,
দীনতার ভগ্নপুরে,
ঈশিতার আসন পাতা।
চলে দিন দীনতার, ঈশিতা-ঠাই নিয়ে ভাতা !
}
ঈশিত্বের কোমল ভাৰ-আকার দীনতার,
দীনতা বই আর কে জানে, কি গুণ ঈশিতার ?
দীনতাই ঈশিতাকে,
সদাই উপদে রাখে,
ঘৃণা চোখে কভু তা’কে, নাহি দেখে ভেবে’ যা’ তা'।
দৈন্ত কাছে ঈশিতাই, পাতা, ত্রাতা, শ্রেষ্ঠ দাতা।

বিষয় মাঝেই নিষিয়।
*
মুক্ত-প্রাণে বিষয়-বনে, সদাই ভ্রমে নিবিষয়।
জীব তাই বিষয়-পথে, তঁাহার খোঁজে ব্যস্ত রয়।
খুলেছে যা’র জ্ঞান-নেত্র, তার কাছে এ বিষয়-ক্ষেত্র,
‘নির্বিষয়-ভাব-যােত্র’, ইহা মাত্র দৃষ্ট হয়।
না আনে তার চিন্তা-ভীতি, অবস্থার-বিপৰ্যয়
!
নিৰ্দিষয় ত কেবল বােধ, বিষয় তা’র হেতু,
বিষয় বিনা উড়ায় কে আর, তাহার জয়-কেতু ?
তাই তা কভু নহে ত্যজ্য,
বিষয়-নির্বিষয়-রাজ্য,
‘রাজ্যহারা রাজা পূজ্য, এ বাক্য ত গ্রাহ নয় !
নির্বিষয়-ভাব লুপ্ত,
ঘটে যদি বিষয়-লয় ।
নির্বিষয়ে বিষয়-ভান, নির্বিষ-পরিচয়।
বিষয়-ধ্যেয়-নির্বিষয়, অজ্ঞানকে ক’রতে জয় ।

১১০
আনন্দ-বিবেক
কার মাঝেই সােজা।
১১০
বাঁকা দেহের চলন সােজা, চাউনি সরল বাঁকা চোকে।
‘বাঁকার মাঝে রয় যে সােজা, এসব দেখে বুঝে লােকে।
একটা কিছু সােজা পেলে,
বাঁকার গতি সােজা চেলে,
সােজা’পরে হৃদয় ঢেলে’, সােজার দিকে বাঁকা ঝোকে।
সােজা-পদে নিরাপদে, বাঁক। নিজের মাথা ঠোকে ।
সােজার যথা কৰ্ম্মগতি, বিভিন্ন রূপ ধরে,
বকার তথা আবির্ভাব, সে ভাব পূর্ণ তরে;
তাই ত বাঁকা নয় বিকৃতি, সােজার ত’ ভাবাকৃতি,
সােজার হয় এই প্রকৃতি,-বাঁকাকে সে সদাই টোকে।
বাঁকারও ঈ এই—ঘুরুতে সােজার প্রেমালােকে ।
সােজা-পথ না মিলে যদি, বাঁকা ভয়ে গৃহে ঢােকে।
সােজাও তার স্বভাব লাগি’, পথ দিতে না বাঁকায় রােখে ?

আনন্দ-বিবেক
পিছুর মাঝেই আগু।
১১১
পিছুর মাঝে আগুর চলে, অটুট প্রেম-আকর্ষণ।
পিছুর তাই আগে যে’তে, সব্বদাই আকিঞ্চন।
পিছু আগুর গুপ্ত গেহ,
যা’র না খবর রাখে কেহ,
সামনে তবে দেখায় দেহ, আগুর যবে বিবর্তন।
যা’ তা কিছু নহে পিছু পিছু-আগুর নাস্তধন !
পিছু যদি না রয় পিছু, আগু ত হীনপ্রাণ,
যােগায় পিছু আগুকে বল, তাই সে বলীয়ান্ ;
আগু পিছু-সজ্জা-ঘরে,
কখন ঢুকে' কি সাজ পরে,
* কি কাই বা কখন করে, পিছুই জ্ঞাত তৎ কারণ।
হয় যা পিছু পিছু', তাহাই আগুর আয়তন।
আগুর সেবায় পিছু রত, রাখতে তাকে সচেতন।
আগুও তার গুণে বাঁধা, এমনি দু’য়ের সম্মিলন।
১.

আল-বিবেক
অপরা মাঝেই পরা ।
অপরা-তটিনী পারে, পরা প্রকৃতির ঘর।
জ্ঞানীর না আস্থা কভু, এই মিথ্যা বাক্যোপর ।
অপরা মাঝেই পরা,
যায় তাকে বিভাগ করা,
অপরা তার হাতধরা, প্রিয়তর নিরন্তর।
পরার কল্পনা জাত,
অপরার কলেবর !
পরাব্ধিতে যখন যেমন, কল্পনা-ঢেউ উঠে,
তখনি তা সেই প্রকার, আকার সহ ফুটে ;
অপরা সেই কল্পিত রূপ,
পরা যা’, তা-তৎস্বরূপ,
পর চেয়েও অপরূপ, শক্তিমান্ পরাৎপয় ।
অপরা ভাবেই ব্যক্ত, পরাশক্তি--শক্তিধর ।
মর সম থাকে পরা, অপরাকে ভাবলে পর !
প্রকাশ পায় পরাশক্তি, অপরার হলে ভর !
অপরার ক্রিয়া-গুণে, নাইকো পরার প্রাণের ভর !
*
'

আনন্দ-বিবেক
জপের মধ্যেই অজপা।
জপের মাঝে অজপার, গগন ব্যাপী স্পন-রােল।
সেই নাদে যে বীণা বাঁধে, মিটে তাহার সকল গােল।
হৃদ্‌-বীণাতে সেই ধ্বনি,
শুতে থাকে জপ যখনি,
সার্থক তার শ্রম তখনি, পায় সে পরাশান্তি-কোল।
শঙ্কা না আর জাগে মনে, দেখে’ মায়া নদীর ঘােল ।
অজপার শক্তি-ক্রিয়া, প্রকাশ পায় জপে,
জপ ত মাত্র তাহার ভান, তাই সে তাকে জপে ;
বন্ধ হলে জপের কার্য,
খসে পড়ে অজপ-সাজ,
আর না সাজে সে হৃদি-মাঝ, জপ-দোলাতে খেতে দোল।
জপকে নিয়ে অজপা তাই,
বাজায় সদা জয়ের, ঢােল।
জপও সেই বাদ্য শুনে, সাধতে থাকে নিজের বােল ।
১

আনন্দ-বিবেক
রতির মাঝেই অরতি।
১১৪
আসক্তির লেপে যথা, বিরক্তির সমাবেশ।
রতি মাঝে সে’ প্রকার, অরতির ভাবােন্মেষ ।
যে কমে যাহার রতি, ’তেই আবার তার অরতি,
বিরতির যে হয় আরতি, রতির তা’য় রতি-শেষ।
রতির দেহে সূক্ষভাবে,
অরতির সম্প্রবেশ !
명
অরতির স্ব-ভাব-চিন্তা, রতির আখ্যা পায়,
রতি হতে তাই অরতি, না মাখে পাক গা’য়';
* রতি না তার কভু বাম,
রতি হতেই তাহার নাম,
অরতি যে পূর্ণকাম, প্রকাশে তা রতির বেশ।
ৰতির কাযে নাইকো কোথা, অরতির ঘৃণা, দ্বেষ।

আনন্দ-বিবেক
বৈফল্যের মাঝেই সাফল্য।
১১৫
ভয় কি ভাবে বিফল ভাবে, সেই ত সফল ভাবের ঘর।
সে ঘরে যে টেকতে পারে, সিদ্ধিতে সে দিগম্বর।
হাওয়ায় কি শান্তি মিলে, ব্যক্ত তা’, ঘাম দেখা দিলে,
আঁধার-লীলা না দেখিলে, হয় কি আলােক তৃপ্তিকর ?
মিথ্যারূপে সত্যের কার্য, স্বরূপে সে স্বার্থপর !
ভাবেই দৃষ্ট * পুরুষত্রয়,
স্বভাবে নাই আত্মপর।
বিফলতার নামেই যার, আঁতকে উঠে প্রাণ,
সে ফল তা’র নাহি মিলে, সাফল্যে য়ার স্থান ;
টু’লেও সে সুখের কায়া, দুঃখই ঈ’র প্রতিচ্ছায়া,
বুঝি’ সে আত্মমায়া, ভ্রমেই থাকে নিরন্তর।
নিত্যভাবে নিত্য-মরণ, অনিত্য ত’র গুপ্তচর!
* পুরুষত্ৰয়—উত্তম, মধ্যম ও প্রথম বা আমি, তুমি ও তিনি।

১১৬
আনন্দ-বিবেক
মরণের মাঝেই জীবন।
মরণ, তােমার মাঝে সবার, নিত্যজীবন-জয়ােল্লাস।
যে তােমারে চিনতে নারে, নামেই তার বাড়ে ত্রাস
দুই তালে যে শক্তি-রঙ্গ, নিম্নটি তার তােমার অঙ্গ,
করলে জীব তব সঙ্গ, বীজত্বের না রহে আশ ।
তব অঙ্ক-সমায়ে, প্রবাহের নিত্য রাস ।
উৰ্দ্ধ যে তাল-বিস্তার-জাল, তােমার গুপ্তবেশে,
সেজে এসে, লীলা-শেষে, মুকায় তব দেশে ;
নাচাও তুমি প্রাণের তার, তা’তেই চলে জীবন তার,
প্রতি স্পলে তদস্তিতার, তব নবভাবােচ্ছাস।
সৰ্বমুলে এক আত্মার—ব্যাপকতা-স্বপ্রকাশ ।

আনন্দবিবেক
মানার মাঝেই জানা।
১১৭
মানা হ’তে যায় তা জানা, জানার শেষ যে অশেষ ধন।
মানাতে তাই দেয় না হানা, মানলে প্রাজ্ঞ-প্রবচন ।
মানায় বটে ভাসে নানা, তাহাই সত্য, কিছুই যা না,
সেই তথ্য গেলে জানা, আর না মানা সচেতন।
জানারূপে জানার মত, করে সত্ত্বে বিচরণ।
মানা-জানার পূর্ণাভাবে, অজানা হয় জানা,
সে অজানা জানার তরে, জানাই চাই মানা;
ছাড়তে গেলে মানা-রঙ্গ,
ছাটা পড়ে জানার অঙ্গ,
মানা নিয়েই জানার সঙ্গ, মানাই তার জাগরণ।
অজানা যামানায় জানা, তাও মানা-যা’ নিরঞ্জন ।
জানার জানায়, জানা ঘুমায়, নাহি জানায় সে কেমন।
অজানাকে জানতে ব’সে, জানাই সাজে মানা,
বিনা মানা, জানায় জানায় সে সদা কানা;
“ব্ৰহ্ম পূর্ণ” এই যে জানা, মানা বই তা” আর কিছু না,
তাই যা জানা—সবই মানা, জানায় তা মানা মন।
মন-স্পন্দ রুদ্ধ যবে, আল-জুনা নাই তখন।
যা মানা, ত’র মূলটি জানা, নার 'শেষ বিজ্ঞাপন!

১১৮
আনন্দ-বিবেক
ছাড়ার মাঝেই বেড়া।
১১৮
কি সার কাযে বিশ্বমাঝে, ছাঁড়বি কি—তুই মুগ্ধমন?
ছাড়বি যা’, তা রাখবি কোথা? ব্যাপক যে নিত্যধন!
তা ছাড়া নয় বস্তু যবে,
যখন তার সত্তা সবে,
কি ছাড়তে কে খাড়া হবে ? বেড়া ত তা’য় সচ্চেতন।
সবার মুলে থাকলে চেতন, লুপ্ত তা না হয় কখন।
আকাশ হ’তে ঠেলে বাতে, ছাড়ে কি মূল সমীরণ ?
এই যে বিশ্ব—এই যা দৃশ্য—একই ব্ৰহ্ম-রূপ,
সেই স্বভাবে স্ব-ভাব ভাসে, তাই ত’ অপরূপ ;
যায় তাই ভাবকে ঠেলা, ভাবেই নিত্য স্বভাব-মেলা,
থাকলে স্বভাব, তা’র না অভাব, ভাবই স্বভাব-নিদর্শন।
“দ্রষ্টা অস্তি, দৃশ্য নাস্তি,” নয় এ সত্য-সুদর্শন।
দৃশ্য ভিন্ন দ্রষ্টা শূন্য, দর্শনেরও অদর্শন।
অশেষরূপী দ্রষ্টা যবে, শুদ্ধ এক সার,
স্বসত্তায় স্ব-বিজ্ঞানে, সে ভাব ব্যক্ত তার
সাগরে ঢেউ উঠুক যেরূপ, একাক্কিই সবার স্বরূপ,
বুঝলে স্বরূপ, এই যে ভূ-রূপ, করতে চায় কে বিসর্জন ?
কেই বা ভূ-তে ভূতের ভয়ে, চাঁয় বহুত্ব-নির্বাসন ?
ত্যজ্য, গ্রাহ—সব অগ্রাহ, ঘটুলে আত্মদরশন।

আনন্দ-বিবেক
লয়ােদয় মাঝেই একত্ব।
১১৯
উদ্ভব, লয়—দু’ভাব মুখে, প্রকাশ যা’র একই রূপ।
সেই ত সত্য—সেই ত নিত্য, কোথায় তার প্রতিরূপ?
করুক যে যা’ তােলাপাড়া, তাহার মূলে চেতন-সাড়া,
কিছুই নাই চেতন ছাড়া, চেতন-সাড়াই এ ভূ-রূপ।
নয় তা অন্য—এক হিরণ্যই যা’-হেম-বলয়-হার-স্বরূপ।
উঠা পড়ায় সম যে রয়, সেই ত খ মূল,
স্বভাবে সে সদাই ভাসে, মিথ্যা—“এই যা’ স্থূল” ;
দেশ, কাল, পাত্র, কৰ্ম্ম,
নয় তা কভু স্বরূপ-ধৰ্ম্ম,
যে বুঝে এ ভাবের মৰ্ম্ম, রূপের মাঝে সে অরূপ।
সেই জানে—“সব একের রূপ,” এক-অনন্ত, অপরূপ।
নিজেই জ্ঞান, নিজেই জ্ঞেয়, নিজেই জ্ঞাতা, সে এরূপ!

১২০
আনন্দ-বিবেক
সুপ্তির মাঝেই আত্মদীপ্তি।
থেকেও আমি নাই যে আমি, এই ত আমির পূর্ণরূপ।
নিদ্রায় ভাব শূন্য বটে, । তবু সে এক অপরূপ।
স্বতঃই যদি সুপ্তি সম,
জাগে নিত্য নিবিড় তম,
থাকে আত্মস্থিতি-ভ্রম, না জানে সে-সে কিরূপ।
আমি যবে “আমি-জ্ঞানে, কখন নয় সেসেরূপ।
যাহা ব্যক্ত—ভক্ত—ত্যক্ত, আমি-যুক্ত তৎস্বরূপ।
আমি হ’তে আমি যাহা, ভিন্ন ভাবে বুঝি,
ক্রমান্বয়ে আন্য তা’র, আমি ত তা’য় খুঁজি ;
ইহাই ত আমির সাড়া,
নয় এ অন্ত, আমি ছাড়া,
করলে “আমি-নাড়াচাড়া,” জ্ঞান হয়—সে-এ ভূ-রূপ।
এক কালে সে নহে ব্যক্ত, তাই না সত্য প্রতিরূপ।
প্রতিরূপই জানায় আমির, সন্ধ্রপ যা’’ অরূপ ।
অরূপ আমির অশেষত্ব, সঙ্কল্পে সব ফুটে,
* স্বতঃই তার স্ফুরণ তা’য়, না যায় কভু ছুটে ;
এক আমি বহু হ’ব,”
এ সঙ্কল্প চিরনব,
ক’রূলে সত্তা-অনুভব, কোনও রূপ নয় বিরূপ।
সর্ব রূপের স্বরূপ “আমি,”কিছুই না তার অনুরূপ।
নই এ আমি—অরূপ আমি,
তবুও তার অভিরূপ।

আনন্দ-বিবেক
বিলাপ মাঝেই সান্ত্বনা।
বিলাপ মাঝে বিরাজে যে, সান্ত্বনার পূর্ণ-রাগ।
গুনতে না পায় সে সুর অসুর, শােনে তা’ সুর মহাভাগ ।
বাড়ে বিলাপ যে ভাব-নাশে, বিলাপেই তা সামনে ভাসে,
সম্মুখে যা, কে তার আশে, মানে প্রাণে অভাব-দাগ ?
অভাবেই ত ব্যক্ত স্বভাব, স্বভাবে তার মৃত্যু-যাগ।
সান্ত না যা’-শান্ত না যা’, সান্তনা—তা জানা,
বিলাপ-লােপে সান্তুনে তা’, সান্ত-সান্ত যা’ না ;
বিলাপ হয় সান্ত্বনা-গান, বিলাপ মাঝে সান্ত্বনা-প্রাণ,
রাখতে বজায় অনন্ত তান, বিলাপই তার অগ্রভাগ ।
সান্ত্বনা—রাগ, বিলাপ-আলাপ, তাই ত তাতে অনুরাগ ॥
সান্ত্বনা-ভাব-সুপ্তস্বভাব, বিলাপ-ভাবশেষনাগ!

১২২
আনন্দ-বিবেক
নিরানন্দ মাঝেই আনন্দ।
১২২
সদাই দীপ্ত আনন্দ-দীপ, নিরানন্দ-ধ্বান্ত-পুর।
ভ্রান্তজনে ভাবে মনে-রয় তা কোথা বহুদূর!
স্মৃতিবশে অভাবরূপে,
মনটা যবে দুঃখ-কূপে,
তখনি সে মূল স্বরূপে, সুখকে গণৈ সুমধুর।
নিরানন্দ-বীণে ব্যক্ত, আনন্দের সুপ্ত সুর ॥
করে যে আশ নিরানন্দ, আনন্দ-মূল তাই,
না ভাসূলে সে নিরানন্দ, তারও ভাতি নাই ;
নিরানন্দ-মূল আনন্দ,
অজ্ঞ ’তে করি’ সন্দ,
জাগায় নাম-রূপ-দ্বন্দ্ব, বাড়ায় ভবচক্ৰ-ঘূর।
অণু মিলি’ হয় এ তনু, তনুই ভাতি চিদণুর ।
এক আনন্দলাড্ড গােটা, নিরানন্দ-এলাে, চুর ।

আন-বিবেক
যােগ-রাগ-ভােগর মাঝেই
বিয়ােগ-বিরাগ-ত্যাগ।
যােগ-রাগ-ভােগ-রঙ্গভূমে, বিয়ােগ-বিরাগ-ত্যাগের বাস।
আদি ছেড়ে অন্তের খোজ, করতে গেলে বিফল আশ ।
আদি তিনের লক্ষ্য যে স্কুল,
নয় তা অন্ত-অনুকূল,
তবু আদি অন্তের মূল,
তা’তেই অন্ত-অন্তশ্বাস।
আদি তিনের সংযােগ তাই, জাগায় অন্তসত্বাভাস |
যেরূপ ভাবে, যে নাম-রূপে, ব্যক্ত আদ্য তিন,
উপসর্গ তাহার অগ্র,
তবু তা নয় লীন ;
ঐশ্বর্যের এই যে ধরা,
মাধুৰ্য তার ভেতর ভরা,
আদ্যভাবে অস্ত--মরা, আছ—অন্ত-বহির্বাস ।
আদিতে তাই অন্ত ভাসে, নয় তা কভু অন্ত-পাশ।
অন্তত তার অন্তক তুল, চায় যে আদির সর্বনাশ।
*

১২৪
আনন্দ-বিবেক
আঁধারের মধ্যেই আলােক।
১২৪
আঁধার-কূপে ক্ষীণরূপে, আলােক-ভাতি অনুক্ষণ।
আঁধারে যে দৃষ্ট আঁধার, সেই ত আলােক-নিদর্শন।
তেজের যে উপর রূপ,
সে রূপ ত’র মল-সরূপ,
বস্তুতঃ তেজ তমঃ-স্বরূপ, ভিন্ন না তা’র আয়তন।
বস্তুর যে প্রকাশ ভাব, বস্তুর তাই আবরণ।
স্পন্দতালে তৈজসাণুর, ঊদ্ধে যে প্রসার,
তাই ত আলােক, নিম্ন যে ভাব, সেইটি অন্ধকার ;
স্পন্দ-যােগে যে তেজ ভাসে, আবৃতি তা’য় আপনি আসে,
স্পন্দমুক্ত-তেজ-ভাসে—তেজই পূর্ণ নিরঞ্জন।
তিমির রূপ—তিমির নয়—তৈজসাণু-সঙ্কোচন!
আঁধারে তাই আলাের স্মৃতি, স্ব-রূপে তার বিস্মরণ।

আনন্দবিবেক
মিথ্যার মাঝেই সত্য।
।
মিথ্যারূপে দাপে হুপে, বাজায় সত্য জয়ের ঢাক।
না সাজলে সে সেরূপ সাজে, শুনবে কে তার প্রাণের ডাক ?
কল্পনা-সাজ অঙ্গে পরি’,
ব্যক্ত সত্য যে রূপ ধরি,
তাই সে সত্য মনে করি, দেখায় ক্রমে আপন জাঁক।
মিথ্যাবেশে সত্য ভেসে, জানায় শেষে মিথ্যা—ফঁাক !
“সত্য-নিত্য-ভাবমুক্ত, মিথ্যা যে তা নয়,”
তাহার মানা-মিথ্যাভাবে, সেই স্ব-ভাবােদয় ;
তাই যখন জ্ঞানের স্ফুর্তি, মিথ্যা তখন সত্যমুর্তি,
সত্যে আত্মসত্ত্ব-পূৰ্ত্তি, ভৰ্ত্তিতে নাম-রূপের পাক।
মিথ্যাকে তাই ছাঁটতে গেলে, সত্য-ভুলে লাগে তাক !
সত্যজ্ঞানে, মিথ্যা-ধ্যানে-না বাড়ে আর দুর্বিপাক।

৮
আনন্দ-বিবেক
কান্নার মাঝেই হাসি।
*,
হাসি, কান্না দু’য়ের মাঝে, দেয় কে প্রাণে শান্তি-বল ?
হাসি ফুটে অধর-পুটে, কান্নায় ছুটে চোখে জল।
হাসির ছবি বুকে ধরি,
তাহার ছাপে চক্ষু ভরি,
ভাসে কান্না তদুপরি, মিলবে বলি’ হাসির ফল ;
কাণ না দিলে কান্না দিকে, পা না কেহ পান্না-ফল।
প্রিয়ভােগ্য তৈজস ভাব, তা’ যে সমুচ্ছাস,
হৃদে যবে ছড়িয়ে পড়ে, স্বতঃই ফুটে হাস;
মুখেই তা’র চলে লীলা,
বাগ্রন্থি দাঁড়ায় ঢিলা,
চাপল্যে সে টলায় শিলা, বাদ না পড়ে হিমাচল।
হাসিতে প্রাণ শূন্য সমান, কান্না মাঝে ভূ-মণ্ডল !
যেথায় হাসি না রয় ভাসি’, সেথায় কান্নালীলাস্থল।
কালের চাপে তৈজসাণু, যখন ঘনরূপে,
তখনি সে বরষে নীর, তাহাই চক্ষু-কূপে
ভাসতে থাকে কান্নাকারে, বিশ্ব-স্মৃতি তাহার ধারে,
ঢেউ যেমন পারাবারে, তেমনি খেলে অবিরল।
কান্না আনি’ একাগ্রতা, অভেদ গণে উপর তল ।
হাসি চেয়ে কান্নায় তাই, বৃদ্ধি না পায় মায়া-ছল।

১২৭
আনন্দ-বিবেক
অধর্মের মধ্যেই ধর্ম।
১২৭
অধৰ্মাচল-গভীর তলে, নিত্যদীপ্ত ধৰ্মাকর ।
যা’র সে তলে চোখ না চলে, না মিলে তা’র মণিস্তর
অধৰ্ম্ম যা-ধৰ্ম্মে মানা,
তা’ বই ধরম রয় অজানা,
না দেখলে ভাব-রঙ্গ নানা, স্ব-ভাব জানা সুদুষ্কর।
ধরি’ ধৰ্ম্ম অধৰ্ম্ম-রূপ, জাগায় স্ব-রূপ নিরন্তর।
ধৰ্ম্মরূপেই অধর্মের কর্ম শুরু হয়,
ধৰ্ম্ম-পিছু, তাই অধর্ম, বন্ধুরূপে রয় ।
এককে ছাড়ি’ রয় না অন্য, একের ঠাই এক কি গণ্য ?
অধর্মেই ধৰ্ম্ম ধন্য, তাই সে ধৰ্ম্ম-সহচর।
ধৰ্ম্ম-বােধে অধৰ্ম্মরূপ, সদাই সেই ধৰ্ম্মপর।
ধৰ্ম-মৰ্ম্ম যেজন বুঝে, অধৰ্ম্ম তা’র নহে পর।

১২৮
আনন্দ-বিবেক
কর্মের মাঝেই অকৰ্ম্ম।
,
২য় বিচার)
১২৮
কৰ্ম্ম-গতি গহন অতি, উঠা-নামা স্বভাব তার।
তাই ত কৰ্ম্ম-মনােধৰ্ম্ম, অকর্মের সিদ্ধাগার ।
আবির্ভাবতিরােভাবে,
কৰ্ম্ম-স্পন্দ বহুভাবে ;
ঠেকে’ লােকে ভাবাভাবে, অকৰ্ম্মকে ভাবে সার।
মানে ভ্রমে-“সে করমে, দেখায় ক্রমে মােক্ষদ্বার।”
হীনজ্যোতি হ'লে মতি, মতি প্রতি লক্ষ্য কার ?
কৰ্ম্ম-দ্বন্দ্ব, বাইরে মন্দ, দৃষ্ট যবে মূল,
নিষ্ক্রিয় এক সাক্ষী চেতন, ছুটায় সব ভুল ;
তাই সে সৰ্বভাবের গোেড়া, সকল ভাব তা’তেই যােড়া,
নিতান্ত যা’র কপাল পােড়া, কৰ্ম্মকে সে গণে ছার।
কৗঁছাড়া চেতন-সাড়া, নাড়ায় না হৃদ-বীণা-তার।
কৰ্ম্মের রব বহে-নীরব অকর্মের সমাচার।

১৯
আনন্দ-বিবেক
তাপের মাঝেই শান্তি।
তাপ-মরুতে শােভে শান্তিধাম।
সে ছবি না ভাসূলে চোখে, কে লয় মুখে শান্তি-নাম ?
তাপের ছাপ হৃদে রেখে, কার্য করে যে, তাকে দেখে,
শান্তি-াদের কিরণ মেখে,
হয় সে বুদ্ধ, সিদ্ধকাম।
তাপেই শান্তি-তাপের স্মৃতি, জাগলে প্রাণে অবিরাম।
শূন্যরূপা পরাশান্তি, আত্মভ্রান্তি-দ্বীপ,
জ্বালার প্রাণে তাই ত জ্বালা-শান্তি-রত্ন-দীপ;
জালায় হলে ঝালাপালা, কোথায় সত্য শান্তি-শালা ?
খুজতে তাহা জ্ঞানের আলা, জাতে ত্বর বাড়ে কাম।
কোথাও না আর, তাপ-মরুতেই-শান্তিত অভিরাম।

১৩০
আনন্দ-বিবেক
কামের ভিতরেই অকাম।
কাম-বিপঞ্চী-সসীম তারে, স্বতঃই জাগে অকাম-স্বর।
শ্রুতি যা’র সে শ্রুতি-পানে, সেই ত শ্রৌত শ্রুতিধর।
থাকলে কৰ্ম্মে ফলের আশ,
মনটা সত্য তাহার দাস,
দাস না হলে চায় কি স্ব-বাস-প্ৰকাশ যা’র নিরন্তর ?
পড়লে পাশে, মুক্তি-আশে, কাম-বাসে কে কামচর?
মুক্তি-কামে সজীব সদা, অকাম হয় স্মৃতি-পর ।
কামের নামে কৰ্ম্মভূমে, যাহার মনে ভয়,
মমাহে পড়ে কায সে ছেড়ে, কামকে বেড়ে রয় ;
অকাম নয় কোন কর্ম,
কৰ্মই হয় মনােধৰ্ম্ম,
কামেই বুঝি’ অকাম-মৰ্ম্ম, ছুটায় কামী কামজর।
কামকে ত্যজি’ অকাম ভজি’, ধৰ্ম্মজী হানে শর!
ভাবীবল্কমুক্ত যে কাম, তাই ত অকাম শান্তিকর।

আনন্দ-বিবেক
বহুত্বের মাঝেই একত্ব।
বহুভাব-উৰ্ম্মি-তালে, নাচে এক-পারাবার।
মূলতঃ তাই বহুত্ব নাই—একত্বের সুপ্রসার ।
বহুভাব যে ব্রহ্মে দৃষ্ট,
কল্পিত ভা, নহে সৃষ্ট,
অনন্ত রূপ-যা অদৃষ্ট, ক্রম-অভিব্যক্তি তার।
বহুত্ব যা এক হতে তা’, স্বতন্ত্র নয়-একাকার।
ভিন্ন যে জ্ঞান, মান। সে জ্ঞান, দেখা’তে এক সাধার।
বহুত্ববােধ হলে নিরােধ, একত্ববােধ-লয়,
বহুত তাই স্বভাবজ,-একের পরিচয় ;
সে ভাব না থাকলে পরে,
এক বলে কে এক-কে ধরে?
একের মান বহুর দুরে, বহুই একের লীলাগার।
একে তনু স’পলে, বহু—দাড়ায় এক নিরাকার।
এক স্বভাবে বহু ভাবে, এক-শক্তি ব্যবহার।

আনন্দ-বিবেক
স্পন্দের মাঝেই স্থৈর্য্য।
স্পন্দ-তালে স্থৈর্য খেলে, স্পন্দ—স্থ্যৈ-অগ্রদূত।
বিনা স্পন্দ-ভাব-দ্বন্দ্ব, হয় না তাহা অনুভূত ।
স্পন্দ-স্থৈর্য্য-প্রাণ-বায়ু,
স্পন্দই তা’র সূক্ষম স্নায়ু,
বহে স্পন্দ স্থৈর্য-আয়ু, রয় না কভু অভিভূত।
সিন্ধু-বুকেঁ তরঙ্গ প্রায়, স্পলে স্থৈর্য অনুসূত।
এক-কে ছাড়ি’ অপর যেন, আত্মবােধ-বহিভূত !
স্পন্দ যত কৰ্ম্মরত, স্থৈর্য তত তার,
বুঝতে স্বভাব আত্ম স্বভাব, যােগায় উপহার ;
অধিষ্ঠান যা সদৈব স্থির,
মূল তা স্পন্দ-শকুতির,
স্পন্দই সেই ভাবস্মৃতির, চিরসাথী অনাহুত।
স্থৈর্যতত্ত্ব স্পন্দে ব্যক্ত,
পরেই রূপ মহাভূত।
স্পন্দই হয় সত্তার-জ্ঞান, সত্তা হ’তে নয় তা চ্যুত ।
স্পনের যে সদা গতি,
স্বতঃই স্থৈৰ্য্যে-সমুদ্ভূত।
সত্তাজ্ঞান-ভাতিহেতু সে, সদাকাল সত্তাযুত।

আনন্দ-বিবেক
রাগের মধ্যেই বিরাগ।
রাগ-হিল্লোলে বিরাগ দেয় সাড়া।
রাগ ব্যতীত বাজায় কেবা, বিরাগ-জয়-কাড়া?
বিরাগ একা-আত্মহারা, রাগই ত তার জীবনধারা,
রাগকে ভাবি’ আত্মপারা, বিরাগ রয় খাড়া।
বিরাগ যেন আত্মত্যাগী, না দিলে রাগ তাড়!
রাগের কাযে, রাগের ঝাঁজে, দুগ্ধে ননী প্রায়,
বিরাজ করে বিরাগ সদা, ঘাঁটলে জানা যায় ।
রাগ-বিরাগ, দ্বয়াদ্বয়,
এ ভাবে আর ব্যক্ত যা হয়,
আদি-মায়া, অন্ত তা নয়, সেইটি শিরদাড়া ।
সেইটি সৰ্বভাবধিষ্ঠান, সকল ভাব-ঝাড়া!
রাগ-বিরাগ-তত্ত্বই এই,—“গুণী না গুণ ছাড়া”।

আনন্দ-বিবেক
পুরাতনের
মাঝেই নূতন
১৩৪
নূতন কি আরপুরাণ সব, নূতন মাত্র উপর সাজ।
বস্তু-মূল যা’, তাহাই আছে—তাহাই র’বে ভবের মাঝ ।
বস্তুশক্তি-প্রতিস্পন্দে,
নবভাব জাগে দ্বন্দে,
দ্বন্দ্ব হ’তে নানা ছন্দে, অভিব্যক্ত নানা কায ।
কৰ্ম্ম-ভাব-ব্যবহার, পুরাতন-জয়তাজ ।
গুপ্ত, ব্যক্ত যে পদার্থ, স্বভাব রাখে ঘরে,
তাহাই কালে সুবিচারী, সামনে আনি’ ধরে ;
ইহাই মাত্র নবীনত্ব,
এই বিজ্ঞ-বিশেষত্ব
নতুবা কে নব তত্ত্ব, প্রকাশিয়া হয় ধীরাজ ?
তা’ই নবতত্ত্ব-কথা, শুনলে--জ্ঞানীর আসে লাজ ।
তবে জ্ঞানী তত্ত্ব জানি’, ভ্রান্তি-শিরে হানে বাজ।

আনন্দ-বিবেক
ভক্তিমায় মধ্যেই জ্ঞানব্ৰহ্ম।
১৩৫
জ্ঞান-পুরুষ-ব্ৰহ্মরূপ, ভক্তি ত তার শক্তি-মায়া।
মূল কায়ার সেবা লাগি, সঙ্গে সঙ্গে ফিরে ছায়া।
জ্ঞানের নিত্যসেবা তরে,
ভক্তি বহুভাব ধরে,
ভক্তি কভু তাই না সরে, সুদাই সেবে জ্ঞান-কায়া।
জ্ঞান-ধৰ্মী, ভক্তি-ধৰ্ম্ম, জ্ঞান—পতি, ভক্তি-জায়া !
যে দিক দিয়ে বিচার কর, “দেবতা হয় জ্ঞান,
ভক্তি-সতী, শক্তি, দেবী, সেবায় ঢালা প্রাণ ;
শক্তি জাগে সত্তা বেড়ে
সত্ত্বা না রয় শক্তি ছেড়ে,
যে দেখে এক অহম্ নেড়ে, যায় বেড়ে সে ভক্তভায়া।
অন্য ভাবে মনটা ভাবে, ঘুচে না ভয়, ভ্রান্তি, হায়া।
অহ কি, তা সেজন বুঝে, যে পায় সদ্গুরুর দয়া । -

আনন্দবিবেক
ছায়ার মাঝেই কায়া।
এই যে দীর্ঘ ছায়াটি।
সদাই এটি সঙ্গে ফিরে, পাড়ে মম কায়াটি ।
সামনে কভু, কভু পাশে,
কভু ঘুরি’ পেছন আসে,
কভু পায়ের তলে ভাসে, এমনটি না জায়াটি।
কতই ঢঙ জানে আহা, এই যে মম ছায়াটি।
কেবল এটি মাথার’ পরে, খেলতে নাহি পারে,
ভাসূলে শিরে পূর্ণজ্যোতিঃ, ঘেঁসে না তা’র ধারে ;
যে দিকে তা’ই নাইকো আলাে, সেথায় রূপ ফুটায় ভাল,
চৌদিকে দীপ যদি জ্বাল, থাকে না তার মায়াটি।
ব’লেও, সব না যায় বলা, “কেমন এই ছায়াটি” ।

আনন্দ-বিবেক
১৩৭
তােমার লীলাভূমিই—আমি।
১৩৭
আমি তােমার লীলাভূমি, তােমার ভাব জানি।
যে রূপে তাই ভাস তুমি, সবই ভাল মানি।
যখন নিদাঘ, বর্ষা আসে, মনে মাের এ ভসা ভাসে,
“শরৎ এসে জোছনা-হাসে, ভ’রবে গেহখানি।”
যে রূপ তাই দেখাও তুমি, তােমায় আমি জানি।
আবার যবে শীতের দাপে, কম্পিত রয় প্রাণ ;
বহি’ শেষে বসন্ত বায়, করেগাে তা’য় ত্রাণ ;
উঠ-পড়া, ছাড়া-বেড়ায়,
যে ভাব তব খেলে বেড়ায়,
স্ব-ভাব জেনে আমি তােমায়, না লই তাহে টানি।
সকল রূপের সেবক আমি, স্বরূপ তব জানি।

আনন্দ-বিবেক
আমার মূলে তুমি।
নদীর পিছে মূল ধারাটি, যেমন আছে লেগে ।
আমার পিছে তেমনি তুমি, সদাই আছ জেগে
রুদ্ধ হলে মুলের ধারা,
দাড়ায় নদী মরুপারা,
হলেও পরাণ তােমা-হারা, বেড়ায় দুখে মেগে।
প্রাণে তুমি জাগছে সদা, র’য়েছি তাই জেগে !
মূল ধারাতে নদীর যেমন, সমুখ বাধা কাটে,
গর্ভে পলি নাহি পড়ে, বয় সে বেগে ঠাটে ;
তেমনি তােমার নিত্য সাড়া করি’ মােকে কুভাব-ছাড়া,
নিত্যভাবে রাখে খাড়া,
বিচার-তােপ দেগে।
তুমি আমার কোন দোষে, রও না কভু রেগে ।
আমিও নাথ, তােমায় ছেড়ে, না যাই দূরে ভেগে ?

আনন্দ-বিবেক
অপ্রাপ্ত ভাব মাঝেই প্রাপ্তিবােধ।
••
পাবে কে কি ? পাওয়া কঁকি, পা’বার ধন না অশেষ-প্রাণ।
পায় যা লােকে এ ভুলােকে, সান্তপদে তাহার স্থান।
অনন্ত যা স্বভাব মাঝে, এক কালে তা’ নাহি রাজে,
কালক্ৰম-স্পন্দ-কাযে, দীপ্ত রাখে তাহার মান।
অশেষ সত্ব-অনায়ত্ত, তত্ত্ব মাত্র সত্য-ভান।
ঠিক যে সত্তা, তা’, সদসৎ-সর্বভাব-অধিষ্ঠান।
আত্মবশে যে রূপ ভাসে, সে রূপ-কল্পনার,
দ্রষ্টা
কভু হয় না দৃশ্য, দৃশ্য-দ্রষ্টাকার
“চিদনন্ত দ্রষ্টার রূপ,
বিশ্বরূপেও তাই সে অরূপ,
বুঝিতে সেই অরূপ স্বরূপ, জ্ঞানই ক্রমবর্ধমান।
“ব্ৰহ্মানন্ত্য না হয় সান্ত, ইহাই স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞান।
এই বেদান্ত-এই সিদ্ধান্ত—এই চূড়ান্ত সমাধান।
“নেতি-নেতি, এ নয় শেষ, আরও কিছু আছে,”
এ বিশ্বাসে সদাই জ্ঞান, বেড়ায় বস্তু কাছে ;
বস্তু সে ত নাহি মিলায়, অজ্ঞান-মেঘ শুধু উড়ায়,
স’রলে ঘন সেই-ই গােড়ায়, পূর্ণ রূপে বৰ্ত্তমান।
জ্ঞানে কর্ম হয় না লুগু,
কৰ্ম্মাসক্তি-অবসান ।
জ্ঞানে কর্ম-নৈকৰ্ম্মরূপ, জ্ঞানই ব্ৰহ্ম-অভিধান !
তাই অনন্ত-জ্ঞানের অন্ত, ভ্রান্তে করে অনুমান।

১৪০
আনন্দ-বিবেক
আমার ভাবেই আমি।
১৪০
ফুটছি আমি, সদাই আমার-আত্মভাব-স্পন্দনে।
“অনন্তারূপ আমার স্বরূপ,” ব্যক্ত ভূ-রূপ-দর্শনে।
আমি আত্মা সর্বব্যাপী,
সৎ-চিৎ-আনন্দরূপী,
আত্মধৰ্ম্মে বহুরূপী, বহুবিধ কল্পনে।
হলেও আমি ভাবে বহু, মুলতঃ এক-স্যন্দনে !
সাগরে ঢেউ স্বতঃই জাগে, কোথায় ইচ্ছা তা’য় ?
স্বভাবতঃ আমাতে, এই জগৎ শােভা পায় ;
নাম-রূপে যা ভাসে সােণায়, ভিন্নতা তার ভ্রমে ঘটায়,
প্রমা-জ্ঞানে ভ্রান্তি ছুটায়, শান্তি-মূল-চিন্তনে।
“সােণাতে সব, সবই সােণা,” বাজে এ সুর শ্রবণে।
“আমাতে সব, সবই আমি,” তাই না কোন বন্ধনে।

১৪১
আনন্দ-বিবেক
ভাষার মাঝেই ভাব।
ভাষার ঢেউ না লাগলে কভু, ভাব-দেহ না বৃদ্ধি পায়।
ভাষাই যেন ভাবের প্রাণ, প্রাণহীন সে অন্যথায়।
ভাবের সাজ হ’লে লুপ্ত,
থাকে স্ব-ভাব চিরসুপ্ত,
সেই হেতু না ভাব গুপ্ত, নিত্য দীপ্ত স্বপ্ৰভায়।
ভাবের অভাব, ডুবায় স্বভাব, স্বভাবই তার বিরাট কায় ।
যে স্পন্দনে ভাবটি জাগে, ভাষা ত হয় তাই ;
বিনা ভাষে ভাব না ভাসে, ভাবনা কিছু নাই।
স্পন্দ-স্বভাব-ধৰ্ম্ম যবে, ভাব ছেড়ে সে কোথা র'বে ?
ভাবেই ত সে ব্যক্ত হবে, র’বেই লেগে ভাবের গা’য়।
ভাবের প্রাণ ভাষায় ভাসা, সদাই তাই সে তাকে চায় ।
স্বভাব-জ্ঞানে শান্তি আনে, সকল দ্বন্দ্ব কেটে যায়।

১৪২
আনন্দ-বিবেক
জাগৰ্তি মাঝেই সুপ্তি।
১৪২
জাগৰ্তিতে যে সুপ্তি-বাস, সেই সুষুপ্তি শান্তিভরা।
স্বপ্নজ্ঞান-ভিন্ন তাকে, সত্যরূপে না যায় ধরা ।
জাগ্রত ভাব হয় যা দৃষ্ট,
তা’ ত স্বপ্নভাব-স্পৃষ্ট,
তা’য় না যবে চিত্তাকৃষ্ট, সুপ্তিনিষ্ঠ সৃষ্ট ধরা।
তাই সে জ্ঞান-জাগরণে—“সুপ্তভাবে সুপ্তি মরা”।
যে বিস্মৃতি—যে সমতা, সুপ্তিরূপে ভাসে,
থাকিলে জাগৰ্ত্তি-বােধ, কে তা’য় ভালবাসে?
“চিরন্থির অধিষ্ঠান,
সদৈব সে বৰ্ত্তমান”
প্রমাণ তার বর্তমান, তাতেই ব্যক্ত সে ভাব পরা।
জাগরণে সুপ্তি-স্থিতি, সে হেতু তা’ মনােহরা
সুপ্তি কেন ? তুৰ্যও যা’, সহজ তা ব্যক্ত করা।

১৪৩
আনন্দ-বিবেক
শিষভাবেই গুরুত্ব।
১৪৩
রু, শিষ দু’ভাবই, এক গুরুত্বে সু-প্রকাশ।
শিষ্যত্বই গুরুত্বের,
একমাত্র বহির্বাস।
স্ব-শিষভাব-বুদ্ধ যেবা,
তাহার সম গুরু কেবা ?
চলে শিষভাব-সেবা, ছিন্ন শিষ্যতার পাশ।
গুরুত্বে নয় গুরু-গুরু শিষ্যত্বেই তদুচ্ছাস !
আত্মনাত্ম, জ্ঞানাজ্ঞান, সবই একাত্মায়,
গুরু-আত্মজ্ঞানময়,
শিষ্য অন্যথায় ;
তা’ই যে আত্মশিষ্যভাবে,
আত্মগুরুতাকে ভাবে,
থাকে সে অসম্ভবে,
সপ্তাবে রয় বারােমাস।
চিরসত্য-স্বভাব-যােগে, কে প্রভুকে প্রভু-দাস?
থাকুক ভাষে অব্যক্ত তা’, শিষ্যত্বে তা’র সমুদ্ভাস!
* সদ্গুরুর স্বরূপ-জ্ঞানে,
সব উপাধির নাশ।

১aa আনন্দ-বিবেক নীরব শূন্যতা মাঝেই সরব বিশ্ব। ১৪৪ * নীরব, নিঝুম, সমতা-উদরে, সুদূর কি এক অচেনা দেশে। সুপ্তি-মগনা, শান্তি-লগনা ছিল ভূ-নগনা ললনা-বেশে! ‘সহসা তথায় কি এক আভাস, জাগা’য়ে তুলিল একটি নিশ্বাস, ‘তাহাই কেবল করিয়া বিশ্বাস, বাড়িল আশ্বাস সে ভাবাবেশে। আবেশে সে এক,দাড়াল অনেক,অনন্ত যে তা’ই জানা’য়ে শেষে। সে অনন্তরূপা বসুধা রূপসী, ভাসিছে ক্রমশঃ বাড়া’য়ে কায়, রুদ্ধ না আজিও সে ভাব তাহার, মূলের খবর তবু না পায় ; যে নাদে এরূপ অঘটন ঘটে, কি না আছে সেই বিন্দুরূপী ঘটে? বুঝিয়া, মজিয়া বুধে এই রটে -“বিন্দু-সিন্ধু-তটে, উঠে ভূ ভেসে।” ভাসার কারণ-চেতন-স্পন্দন, সাধক বই তা না জানে যে সে। সাধকেই বুঝে “কেন এস্পন্দন,ফুটায় ভূ-ভাব কি ভাবােদ্দেশে”। যে সিসৃক্ষায় ভূ, ভাসিয়া উঠিয়া, করে অভিনয় বিরাট-ভাব, সে ভাব-প্রকৃতি না হলে সূচিত, পুরুষে স্ব-ভাব বিজ্ঞানাভাব সৰ্বরসময় পুরুষ যেমন, সৰ্বরসময়ী প্রকৃতি তেমন সিন্ধু-বিন্দু-গুণ-সিন্ধুর মতন, নহে তা’ নূতন, ভেদত্বে ফেঁসে ! জাগায় চেতন আপন চেতন, শ্রী প্রকৃতিরূপ-সাধনে এসে। সে ভাবে দুনিয়া, ব্যক্ত এ দুনিয়া, জাগিছে সতত বহু ঘেঁসে’ ঘটে যা বিনাশ-সেনাদ-বিলাস,খুজে স্ব-স্ব ভাব স্বভাবাদেশে

অলিন্দবিবেক
১৫
সখীভাবেই সখি ।
১৪৫
সখী-ভাবের সাধনা বই, সখিকে কে পায় ?
“মনােমত সখীর ভাব-প্রাপ্তির উপায়।
সাজিলে থ-সখী,
দাড়ায় ভাব মণ-মত কি ?
সার শুধু বকাবকি, প্রাণ না জুড়ায়।
প্রকৃতিকে সখী দেখি’, সখি তা’কে চায় ।
“মায়া-সখী, পুরুষ সখি, দু’য়েই দেহে মাগে,
রাধাকৃষ্ণ-তত্ত্ব যা’, তা’–এ ভাবে ঠিক জাগে ?
সখিলক্ষ্য স্ব-স্বভাবে
সখী চায়—“সে আনু ভাবে,
সখী ভিন্ন ভাবাভাবে, সখি-সংজ্ঞা যায়।
স্বভাবেই সখী-ভাবে, সখিকে নাচায়।
সখি-বােধে সখী তার স্বভাব হারায়।
আর না সখী সখি-ঠাঁই, চাতুরী দেখায়।
১০

আনন্দবিবেক
ছায়ার মধ্যেই কায়া।
১১৬
ছায়া-রূপে ভুগছে সবে, সুস্থ না কেউ কায়া দেখে।
ছায়া তেমন,—দেখা যেমন, জলের ছবি জলে এঁকে।
কায়ার লক্ষ্য কায়ার ছায়া, তা’কেই লােকে বলে মায়া,
তাহাই সাজে প্রিয়া জায়া, কায়ার ভাব মৰ্ম্মে মেখে।
ভাসে জায়া-মায়া হ’তে—“অনেক রূপ অরূপ একে”।
+
ছায়াকারে অরূপ কায়া, দৃষ্ট যবে জ্ঞানে,
মায়া-সৃষ্ট বিশ্বকে জীব, স্বপ্ন সম মানে ;
স্বপ্ন—মাত্র স্মৃতি-মেলা,
স্মৃতি-আত্মস্পন্দ-খেলা,
আত্মস্পন্দে আত্মহেলা, সম্ভবে কি স্বস্থ থেকে ?
সম্ভব না, স্বতঃই তাই—ছায়া আছে কায়া ঢেকে।
শক্তিরূপে গণলে ছায়া, কায়ার জ্ঞান উঠে পেকে।
পাকা জ্ঞানে মায়া-ভানে, কে চায় ছায়া কায়া রেখে ?

১৪৭
আনন্দ-বিবেক
পথের মাঝেই পথের খবর।
১৪৭
পর-কাছে কে, কি জানতে চাও? পথের খবর পথই দিবে
সুখ বা দুখের বস্তু কি, তা’, পথেই লােক চিনে নিবে।
পথের মাঝে জনম, মরণ,
পথেই ব্যক্ত করম, কারণ,
পথেই কালের লীলা-সদন, পথই জ্ঞান ফুটাইবে।
পথকে ছাড়ি’ অন্যে বেড়ি', মােহের বেড়ী কে পরিবে ?
পথকে যেবা গুরু ভাবি, শরণ লয় তার,
পথই কালে বিনাশে তার, ভ্রমের অন্ধকার ;
ভাল-মদ-দ্বন্দ্ব-ভাবে,
সে আর কভু নাহি ভাবে,
পথ ছেড়ে কে কোথা যাবে? পথই সব প্রকাশিবে।
বন্ধ, মােক্ষ, সবই পথে, পান্থ বই তা’ কে বুঝিবে ?
কেন ক্ষান্ত ভ্রান্ত পান্থ । এগিয়ে চল—সার লভিবে।
এলে ক্ষান্তি,—আত্মভ্রান্তি—আনন্ত্যের লােপ ঘটিবে।
সত্য যা, তা মিথ্যা না হয়, সত্যকে কে তেয়াগিবে ?

১৪
আনন্দ-বিবেক
পরসেবাতেই আত্মসেবা।
১৪৮
পরকে বড় পুঁছে না কেউ, আপনা নিয়ে ব্যস্ত সবে।
‘পরসেবা যে আত্মসেবা,” তাও বা বুঝে ক’জন ভবে
আত্মসেবায় ঠিক যে রত,
অন্য ত তার আত্মমত,
আত্মপানে লক্ষ্য যত, ততই ভেদ স’রতে র’বে।
“আত্ম-পর” এই যে দ্বন্দ্ব, সনে না আর টেনে ল’বে।
অভাবকে না স্বভাব যাচে, না চায় আপনায়,
তবু অভাব সেবায় তার, স্বতঃই ভাসি’ রয় ;
স্বভাব-শক্তি-ধৰ্ম্ম-হেতু,
স্বভাব-অঙ্গে অভাব-কেতু,
রচি’ আপন কৰ্ম্ম-সেতু, উড়ায় কেতু ভাবােৎসবে।
রেখেও ভাব, সদা স্বভাব, স্ব-ভাবেই রয় গৌরবে।
“ভাব-গুপ্তি—স্বভাব-সুপ্তি,” থাকলে অভাব, হয় তা কবে ?
আত্মতত্ব খুলে সত্য, থেকেও পর, পর না তবে।

আনন্দ-বিবেক
প্রবৃত্তি মাঝেই নিবৃত্তি।
১৪৯
কেউ না ক্ষান্ত, কেউ না শ্রান্ত, কোথাও কোন কাযে।
পান্থ আমি, ক্ষান্ত কেন, একলা ভব মাঝে ?
কাম না ছাড়ি, কাকে ছেড়ে, ক্ষান্তি-কথা মুখে পেড়ে,
শুধুই যায় ভ্রান্তি বেড়ে, হৃদয়ে ঘাের রাজে।
কৰ্মী সবে, ব’সে আমি, রইবো কোন্ লাজে ?
পথ অনন্ত, ভাব অনন্ত-অনন্ত সব বুঝি,
কেয় তবে চক্ষু বুজি’, কি ধন লয়ে খুঁজি ?
অকর্মা যে, যা’ তা’ পেয়ে,
সিদ্ধ বলে বেড়ায় গেয়ে,
দ্যাখে এ ভিতর চেয়ে, “বদ্ধ মােহ-সাজে”।
সাজের মত কাষ যে করে, সেজেও না সে সাজে।
কালের চোটে অন্তরে তার, দুখ না কভু বাজে!

আনন্দ-বিবেক
পথেই পাথেয়।
১৫০
চায় যেবা যা’, পথেই তাহ, পথ-শেষে না কোন ধন
“আমি-তুমি-তিনি যে হাে’ক, সবাই পান্থ অকিঞ্চন
পান্থ হয়ে পথে যেতে,
ক্ষান্ত যে, সে ভ্রমে মেতে
পথেই সব হবে পেতে, পথেই সব আন্দোলন।
যে ভাব পেয়ে পান্থ ক্ষান্ত, নয় তা ব্ৰহ্ম নিরঞ্জন ।
ব্ৰহ্মরূপে মালে সে ভাব, সীমার দোষ আসে,
সীমায় যাহা নিত্য না , কাল ত তাকে নাশে ;
হলে “ব্ৰহ্ম নিরাময়,
সত্যজ্ঞানানন্তময়,
পেয়েছি তা’, বলার নয়, পাওয়া মাত্র বিকম্পন।
‘অশেষ-বােধে অশেষ পাওয়া, তাতেও কৰ্ম্ম-আয়ােজন।
অশেষ-বােধ রাখতে গেলে, রইবে বস্তু-অন্বেষণ ।
পথেই ভাবি’ সকল লীলা, খোঁজ না ছাড়ে মহাজন।

আনন্দ-বিবেক
পরত্ব মাঝেই নিজত্ব।
১৫১
পরকে খোচা দিতে যাওয়া, আপন প্রাণে ঘোচা খাওয়া।
পরের দোষ গাইতে গেলে, আপন দোষ হয়গাে গাওয়া ।
পরের ছেদা দেখার আগে, কত যে তা নিজের ভাগে,
দেখতে যদি ইচ্ছা জাগে, ত্বরায় যায় সত্য পাওয়া।
পর বলিয়ে যায় যা ধরা, তাহাও নিজ রূপ,
সত্তা-জ্ঞানে সে পরত্ব, না রয় অন্য রূপ;
তবে, যে ভেদ দৃষ্ট তা’তে, মূলত তার একতাতে,
একতাতে মন না তাতে, সদাই বয় শান্তি হাওয়া।
ভেতরে যে একত্ব-রূপ, বহুত্বে তা বাইরে ছাওয়া।
সকল ভেদ-মুক্তি-হেতু—“আমির পানে আমার চাওয়া”।
“আমির জ্ঞান” হলে পাকা, আমার সব—“ডি-বাওয়া।

আনন্দ-বিবেক
ভুরূপেই—অনন্তরূপ।
১৫২
ছড়িয়ে গেছ তুমি আমার, অশেষরূপী হয়ে।
(আমি) কুড়িয়ে নিতে তাই না পারি, সদাই পিছু র’য়ে।
কুড়া’য়ে যা’ পাত্র ভরি’
“পেয়েছি সব মনে করি,
চলতে পথে যায় তা সরি হৃদয়-বল লয়ে।
কারাে ভাবে না রও তুমি, যে যাহা যা’ কয়ে।
৪
অনন্তকাল জানতে পেরে, “অনন্ত রূপ তব,”
শয্যা সম বিছিয়ে দেহ, দেখছে নিত্য নব ,
শক্তি-মায়া-রমাদেবী,
চিরধন্যা চরণ সেবি’,
কবে তােমার স্বরূপ ভাবি’, (আমি) থাকবাে সব স’য়ে?
যাবে যাহে জীবন-স্রোত, সে সার দিকে ব’য়ে।

আনন্দ-বিবেক
আত্মভাবই আত্মপূজার উপচার।
যে ভাবে যে, সেই ভাব তার, আত্মপূজায় যদি লাগে।
পূজার ফল না যায় বৃথা, সুপুষ্ট মন অনুরাগে।
সহজ ভাব চাপি’ ছলে,
বিরােধ-ভাবে যেজন চলে,
উপচার সে নাশে বলে, পরভাবের অংশ মাগে।
•
ভাবের ঘরে চুরি কভু, না হয় যেন কারাে,
পরের চোখে মন্দ যে ভাব, কাৰ্য আছে তারে
নিয়েও তা করলে পূজা,
অনেক কমে মনের বােঝ,
কমে ক্রমে অসার খোঁজা, অন্তরে রাগ নাহি জাগে।
তাই ত সবার সকল ভাব, লাগান চাই আত্মযাগে।

১৫৪
আনন্দ-বিবেক
দুঃখ ঘেঁটে দুঃখের ইতি।
১৫৪
দুঃখ ঘাঁটি দুখের ইতি,—বিষের দ্বারা বিষকে মারা।
সুখকে ছাঁটি’ সুখের স্থিতি,আত্মভাবে আত্মহারা ।
সুখের হেতু নাহি ঠেলে,
দুখকে জোরে চাপতে গেলে,
চিন্তা-আগুন দেয় সে জ্বেলে, না মেলে তা’য় শান্তিধারা।
বিষয়-জাত সুখের বাসা, ভাবান্তরে দুখের কারা।
দুঃখ দেখে যাহার ভীতি, দুঃখ না তা’র সরে,
সুখেও সে দুঃখের রূপ, শঙ্কার সাথ স্মরে ;
সুখে তাই বহু দ্বন্দ্ব,
বহু ভাবে জাগে সন্দ,
বিপরীত দুঃখ-ছন্দ ;
দুখের কেন্দ্রে সুখের ঝারা।
সুখ-দুখের বাইরে যাহা, তারই ভক্ত—বােন্ধা যারা ।

১৫৫
আনন্দ-বিবেক
আমায় নিয়া আমির গর্ব।
এ সংসারে “আমির” শুধু, “আমার” নিয়ে গর্ব করা।
যথা যাকে দেখছি যাহা, সেই মমত্ব-হাতধরা।
“আমার ডানা” পড়লে ছাঁটা, ‘আমির দ্বারে পড়ে কাটা,
“আমির কার্য”“আমার-ঘাটা,” তাতেই নিত্য নব ধরা।
নবত্বেই মমত্ব-বােধ, আমির মাঝে থাকে ভরা।
অহ-বীণে মমত্ব-রাগ, স্বতঃই সদা বাজে,
অহম-লক্ষ্য যখন তা’য়, অহঙ্কারের সাজে,
সাজিয়ে সে মােহ-মত্ত,
আপাত যেন কৰ্ম্মায়ত্ত ;
জ্ঞানে কালে জাগি’ সত্ত্ব, অসত্য-সাজ ঘুচায় ত্বরা।
জাগলে বােধে আত্মধৰ্ম, অহঙ্কার জ্যান্তে মরা।
“আমি কি, তা’ ভাল জানা,” “আমার” হতে দূরে সরা।

আনন্দ-বিবেক
শক্তিতেই শক্তিমান্।
শক্তিমান্ আত্মভােলা, শক্তিই তার জাগরণ।
স্পন্দ-রূপে তাই সে ত, ব্ৰহ্ম-সত্তা-বিজ্ঞাপন।
“প্রতিস্পলে প্রতি কৰ্ম্ম,
প্রতিকর্মে নব ধর্ম,
এই অনশুতা-মৰ্ম্ম, সান্ত-ভ্রান্তি-সংশােধন।
শক্তি-শয়ে রুদ্ধ রহে-আত্মবােধ-উচ্ছ সন।
শক্তিমানের মান যা, শুধু-শক্তি-অভিমানে,
শক্তি ছাড়া কে আর কোথা, শক্তিমানে মানে ?
শক্তিরূপী-চিত্ত-নাশে,
যেবা শক্তি পরকাশে,
রয় সে বদ্ধ শক্তি-পাশে, না হয় মুক্ত ত্রিলােচন।
গেলে শক্তি, শিশব, থাকতে নারে সচেতন।
অচেতনকে মানি’ চেতন, চৈতন্যের উদ্বোধন

আনন্দ-বিবেক
১০৪
ত্যজ্য মাঝেই গ্রাহ।
১৫৭
কি বা ত্যজ্য ? সবই গ্রাহ, একরূপে না একরূপে
মনের ভিন্ন ভিন্ন স্তরে, রয় সে ত্যজ্য চুপে চুপে।
মনে যবে ত্যজ্য-স্মৃতি,
মনেই সে বস্তু-ধৃতি,
পরিবর্তে কোথা মৃতি? ভাবাকৃতি চিত্ত-কূপে।
ভাব-সত্তা না যায় যদি, পরিত্যজ্য কি-কিরূপে?
ত্যজ্য যা যা’, পর-পর ত’, গ্রাহ নবাকারে,
জানায় স্বরূপ-অনন্ত, জাগিয়ে হৃদাগারে ;
“এক ব্ৰহ্ম” বস্তু যবে,
ত্যাগের কি-কোথা তবে?
স্বভাবে সব আছে, র’বে, স্ব-ভাব-লীলা দাপে হুপে।
ভাবতে না রুদ্ধ কভু, হলেও বুদ্ধ স্বরূপে!
স্ব-স্বরূপে নিত্য স্থিত, কেবল এক জ্ঞানী-ভূপে।
নির্বিকল্প-জড়ভাবে ত, ।
সত্তাশূন্য চিতি-লােপে।
সবিকল্পে পূর্ণতা-বােধ,
লুপ্ত না হয় প্রতিরূপে।

১০
আনন্দ-বিবেক
জীবত্ব মধ্যেই শিবত্ব।
১৫৮
নিজের জীবদ্ধ দিয়া, নিজের শিবত্ব ধরা।
ধ্যেয়-ধ্যাতা-ভাবে তাই, নিজের ধ্যান নিজে করা।
পর ভেবে’ যা’, নানা সাজে,
লাগাই আমি আত্মকাযে,
একেবারে নয় তা বাজে, আমিত্বে তা সদা ভরা !
সে ত আমার চিন্তাধারার, তরঙ্গ-সাজ অঙ্গে পরা।
অনন্ত-গুণ জানতে আমার, “আমার” ভাবে আমি,
স্ব-ভাব ক্রমে প্রকাশ পাই, স্ব-ভাব-পথে নামি’ ;
যদিও “এক-সাধার,
অস্তি-ভাতি সবাকার,”
তবু বিনা দ্বিত্ব-স্বীকার,
বেঁচে আমি থাকি মরা।
ভাব-জ্ঞানে দূর তা ত্বর, পােকা না আর দেয় ধরা।
অপরা ভাব না মানিলে, না যায় বুঝা ভাব যা পরা।
তাই ত আমি, আমার-জ্ঞানে, না ভাবি ভূ মনােহর।
জ্ঞানের মাঝেই ধ্যান।
জ্ঞান-বস্তু-সত্তা-জাগা, ধ্যান ত' তা’হে কালি দেওয়া।
ধ্যানে ধ্যেয় নাহি ভাসে, জোর করে তা মেনে নেওয়া।

আনন্দ-বিবেক
স্ব-স্বরূপ-ভাতি-জ্ঞান,
তৎপ্রতি লক্ষ্য-ধ্যান,
বিনা জ্ঞান-অভিজ্ঞান, না মিলে সার শাস্তিমেওয়া।
যে কয় “ধ্যানে বস্তু ভাসে, সে ত মূখা নারী বেওয়া!
ধ্যানের ফল যে হয় সমাধি, সে ত জ্ঞানে যুক্ত হওয়া।
জড় সমাধি-নয় সমাধি, সমাধি ত “জ্ঞানে রওয়া”।
মন্দির-মাঝ জ্ঞান-বিগ্রহ, দীপ্ত সর্বক্ষণ,
ধেয়ান-সেবা, মার্জনা-ভাব, নিত্য অবেক্ষণ;
থাকলে ধ্যান জ্ঞান প্রতি, উপর উপর ঘটে ক্ষতি,
হােক ভবে যা ভাল অতি, সয় কত সে মন্দ-হাওয়া?
অসদ্ভাবে বাড়লে খেয়াল, অসার—“সার-তত্ত্ব পাওয়া”।
জ্ঞান-কৃপাণ, ধেয়ান-শান্, শান ত অসির ধারে চাওয়া।
জ্ঞান-বেদ, ধেয়ান-গান, ভ্রান্তি ত তা”, অন্য গাওয়া।
ধেয়ান-রূপে সাজিয়া জ্ঞান, মিটায় নিজের দাবী দাওয়া ।
;
চিন্ময় যে জীব-সত্ত্ব, তাহাই সত্যজ্ঞান,
সে জ্ঞান-দেহে পূর্ণ দৃষ্টি-ধেয়ান-অভিধান
ধ্যেখােৎপত্তি না হয় ধ্যানে, ধ্যেয়-স্বরূপ দীপ্ত জ্ঞানে,
ধ্যান ত মাত্র জ্ঞানকে মানে, জ্ঞানের পানে তাহার খাওয়া।
জ্ঞানকে ছেড়ে খেয়াল-ধ্যানে, প্রাপ্য শুধু ডিম্ব বাওয়া।
জ্ঞানেই যা'র নিত্য স্থিতি, সমাধি তার বৃথা চাওয়া।
অভিজ্ঞানী যেজন ভবে, মােক্ষাশা তার বােঝা বওয়া।
জ্ঞানীই স্বস্থ, সমাধিস্থ, অন্য ভাব ত মাথা খাওয়া।
অন্য ভাবে রুদ্ধ না হয়, “ভােগ-ক্ষেত্রে আসা-যাওয়া”।

আনন্দ-বিবেক
অহঙ্কার মাঝেই অহমু।
১৬০
ছড়িয়ে আছে অহম্ সদা, ব্যক্তাব্যক্ত ভাবাকারে।
অংশ নিয়ে পূর্ণ হতে, সকলি তাই সবার দ্বারে।
কেউ না ঠেলে’ আমিত্বকে, কেই না ফেলে’ স্বামিত্বকে,
দিয়ে ঢেলে’ স্ব-সত্ত্বকে, তত্ত্ব খুজে অহঙ্কারে।
স্বত্ব যা’তে, মত্ত তাতে, আত্মসত্ব-ব্যবহারে।
‘সব যে আমি,” “সবার আমি,” ইহাই হেতু তার,
সবই মাের থাকুক বশে,” এ ভাব সবাকার ;
“সকল ভাবে পূর্ণ রই,
সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হই,
কেউ না ভবে এ ভাব বই; তাই ত কেহ স্বত্ব কারে,
কোন মতে না চায় দিতে, ক্ষুদ্র করি আপনারে !
পূর্ণ বলে স্বত্ব তুলে,
সর্বকালে সৰ্বধারে।
আত্মশক্তি-প্রকৃতি তার স্পন্দ-ধৰ্ম্ম-অনুসারে,
সদাই জাকে জাগিয়ে রাখে, খণ্ড খণ্ড করি’ তারে।
খণ্ড তরে সে না মরে, অখণ্ড বােধ-সংস্কারে।
অখণ্ড-বােধ খণ্ড নিয়ে, তাই না কিছু শক্তি-পারে।
সবার ধনে সবার তাই, স্বত্ব-দ্বন্দ্ব ভূ-সংসারে।

আনন্দ-বিবেক
কালের মাঝেই মহাকাল।
কাল ত সর্বপ্রকাশক, কিছুই না সে করে লয়।
তবে যে তা’র ধ্বংসলীলা, সে ত সত্তা-অভিনয়।
“থাকলে বস্তু, আছে সত্ত্ব,
সত্তামূলে অনন্ত,
কালই এই মূলতত্ত্ব, করে ব্যক্ত বিশ্বময় ।
কালের কোলে কোথা মৃতি ? স্থিত ধৃতি, অভ্যুদয় ।
অনন্তনাগ-রূপ ধরি’, সদ্ভাবে কাল খাড়া,
কালের সাড়া-কর্মের রূপ, তাতেই তােলা-পাড়া;
নবত্ব-তাল “উঠায়” যেমন “পড়ার প্রতি ভাবে তেমন ;
‘নূতন” যদি সদাই চেতন, কোথা কাল–কি করে ক্ষয়?
ত্রিরূপে তা’র একই লীলা, বুঝার ভুলে নামে ভয়!
কালকে ছেড়ে মহাকাল, শবাকারে সুপ্ত রয়।
কাল-রঙ্গ–সুপ্তি-ভঙ্গ, অব্যক্তের সাক্ষী হয়।
কালই-চেতন, চেতনই-কাল, অশেষ-ভাব কালই বয়।
কাল না যথা, ব্ৰহ্ম তথা, থেকেও আত্মজ্ঞানী নয়।
১১

আনন্দ-বিবেক
গুণের মাঝেই নিগুণ।
গুণের মাঝে নিগুণের লীলা চমৎকার।
গুণ দেখা’য়ে গুণ ত সরে, নিগুণ রয় নির্বিকার।
পড়িলে গুণের ছাঁচে, নিগুণ না আপনা আঁচে,
গুণকে দেখে সে ত বাঁচে, হয়েও সর্বগুণধার ।
}
গুণকে কভু এক ভাবে না, টেকতে দেখা যায়,
চি-সাগরে ঢেউ সম সে, নাচিয়ে তুলে কার ;
কখন উঠে কখন পড়ে,
স্বভাব ছেড়ে নাহি নড়ে,
পাঁচ ভূতের ঘাড়ে চড়ে, কাল-ঝড়ে না সাম্য তার।
নিগুণ যে, চেতন রূপে মহাব্যোম প্রায়,
সর্বকালে সকল গুণে, দ্যাখে আত্মকায় ;
গুণ ত তারে ছাঁদুতে নারে, ছাদুতে যেয়ে আপনারে,
হারিয়ে ফেলে মূলাধারে, নিগুণ হয় সত্তা যার।

আনন্দ-বিবেক
শেষের ভিতরেই অশেষ।
শেষের ভিতর অশেষ তােমার, জাগে রে রাগ বেশ।
(আমি) মনের মাঝে তাই না দেখি, অনুরাগের শেষ ॥
অস্ত গেলেও রাঙা ভানু,
তপ্ত থাকে ধরা-তনু,
বেজে’ জোরে, থামলে বেণু, চলে রে তার রেশ ॥
কথা যবে যায় ফুরা’য়ে,
তখনাে ভাব রয় জড়ায়ে,
যৌবন যায় গা’য় লুকা’য়ে, রয় সে ভাবােন্মেষ ;
আকাশ পানে দেখা ত যায়,
অসীমতা ভাসে সীমায় ;
জীবনের সীমা যথায়, অসীম সে দেশ।
সাদি-সান্ত হয় গো যাহা,
অনন্তের সাক্ষী তাহা,
সান্তের যা বহুভাব,-তা’ অনন্ত-বেশ।

আনন্দ-বিবেক
সাকার মাঝেই নিরাকার।
১৬৪
সাকার মাঝে সারই নিরাকার ।
চিতিময় সে ব্ৰহ্ম ভিন্ন, নয় তা কিছু আর।
একই ব্ৰহ্ম চিদাকারে,
শক্তিরূপে সর্বাধারে ;
অজ্ঞ তা না বুঝতে পারে, হেরে ভূতাকার।
ভূত তশক্তি-ক্রিয়া-রূপ,
নহে স্থির, একরূপ,
শক্তি-মূলে অপরূপ, স্বরূপ-প্রসার ;
তাই হেরি বস্তু যত,
বিশ্লেষে তা হলে রত,
নাম-রূপ সয় গত, স্মৃতি মাত্র সার।
স্মৃতি-চিতি-সত্তা মাঝে, সত্তা—পূর্ণভাবে রাজে,
সে ভাবে যে, সেই বুঝে, “আকার”—বিকার।

আনন্দ-বিবেক
খণ্ড মাঝেই অখণ্ড।
১৬৫
খণ্ড মাঝে অখণ্ডের বাস।
সে অখণ্ড কাণ্ড দেখি’, কাল ভয়ে দাস।
কালের যা’ বাহাদুরী,
অখণ্ডের বুকে ঘুরি’,
দেখা’তে তাই নিজপুরী, সদাই নানা আশ।
ঘন-জালে শূন্য যথা,
পূর্ণতাহীন নহে কোথা,
খণ্ডভাবে হয় না তথা, অখণ্ডত্ব-নাশ ;
যে শক্তির ভূখণ্ডাকার,
অখণ্ড-চিৎ স্বরূপ তার,
খণ্ডত্বে তাই অখণ্ড সার, নিত্য স্বপ্রকাশ।

আনন্দ-বিবেক
অভাব মাঝেই স্বভাব।
অভাব-কোলে স্বভাব খেলে, ভাবের ঢেউ তুলে।
ভাবকে ছেড়ে অভাব বেড়ে, রয় না কেউ ভুলে।
যে অভাব যা’র জাগে মনে, জাগে তা তার স্বভাব সনে,
ভাব যা’ শেষে, তাহে ভাসে, টানিয়ে লয় মূলে।
ভাব ছাড়া না অভাব ফুটে, অভাব ত ভাব-রূপে যুটে,
যত তাহা নিকট, তত—স্বভাব যায় খুলে ;
সত্তা যাহার নাই এ ভবে, তেমন ভাবের অভাব কবে ?
অভাব ত তা’র, সত্তা যাহার—মনটা থাকে ভুলে।
সত্ত্ব ত ঠিক শূন্য সমান,
সর্ব ভাবে বিরাজমান,
আমরা তাই স্বভাব-ই চাই, অভাব-ভাবে ফুলে।

আনন্দ-বিবেক
শূন্য মাঝেই পূর্ণ।
১৬৭
শূন্য-শূন্য, শূন্য কোথা র’বে।
শূন্য যা’—তা’ পূর্ণ কিছু, পূর্ণভাবে সবে।
যেরূপ যা যথা জাগে,
শূন্যে মােরা ভাবি আগে,
পূর্ণ যবে আত্মরাগে, শূন্য ছুটে তবে।
পূর্ণ এক সত্তা মাঝে,
দেশ, কাল, পাত্র রাজে,
অন্য কিছু শূন্য সাজে, নাহি সাজে ভবে ;
(মােরা) দেখি যদি সংখ্যা ধরি, নহে শূন্য শূন্যোপরি,
যথা শূন্য গণ্য করি, এক তা হবেই হবে।

আনন্দ-বিবেক
অজ্ঞানের মাঝেই জ্ঞান।
১৬
অজ্ঞানে না জ্ঞানকে করে লয়।
অজ্ঞান যা যায় গো ভাবা, তাতেই জ্ঞান জেগে রয়।
শিশু যে মা’র স্তন ধরে,
সে কি শুধু ক্রীড়া তরে?
পিয়ে সুধা মিটায় ক্ষুধা, বাড়ে না তাই কোন ভয়।
করে যে কায যে যখনি, হাজির তথা জ্ঞান তখনি,
অজ্ঞানে না যায় গাে জানা, কি হেতু কি কাৰ্য হয় ;
মেঘে যবে সূৰ্যে ঢাকে, তখনাে তার কিরণ থাকে,
তাই তা’ লােকে তা’তেই দ্যাখে, অন্য ভাবে ব্যক্ত নয়।
ঘাের যে জাগে নিশাভাগে, দেখতে তাহা দীপ কি লাগে ?
আঁধারে যে আলােক রাজে, তাহে চোখ তা দেখে লয়।
জ্ঞানরূপী আত্মা যবে,
সভাবে ব্যাপ্ত ভবে,
মুকাবে জ্ঞান কোথা তবে ? “জ্ঞানই ব্ৰহ্ম” জ্ঞানী কয়।

আনন্দ-বিবেক
জড়ের মাঝেই চেতন।
১৬৯
জড় বলে যা’ মানে এ সংসার।
চেতন ভিন্ন অন্য ভাবে, নাই কো সত্তা তার।
“করে না যা নড়াচড়া, পড়ে থাকে—যেমন মড়া,”
জড় ত তাহা, চেতন যাহা-তা’রই ত প্রসার ।
অচল দেখ অচল, স্থির,
পুষ্ট তবু তার শরীর,
কিবা তবে জড় এ ভবে ? সবই চিদাকার ;
চেতন রূপে ভূতের খেলা,
স্কুল পাত্র-ভুল মাত্র, কল্পনা-বিকার।
মূল শক্তি স্থূল রূপে,
ব্যক্ত হয়ে নামরূপে,
‘মূলই সত্য,” এই তথ্য, করে সুপ্রচার।
চৈতন্যময় এ ভূ-মেলা,

১৭০
আনন্দবিবেক
দেহরূপী আমির মাঝেই চেতনামি।
১৭
এই আমিতে দুই আমির খেলা।
এক ত মাঝি-সাক্ষী শুধু, অন্য ত হয় ভেলা।
-
দেহরূপী এই যে আমি,
ভব-ভাবে সদাই কামী,
আর যে “পাকা আমি—স্বামী, নয় সে কারাে চেলা।
দেখতে সদা শক্তি আপন, জীবকে মানি’ আত্মমতন,
ক্রিয়াতে তার পূরায় মনন, খুলিয়ে এই মেলা ;
বিকার নাই সে অস্তৰ্য্যামীর, “জনম-মরণ, নিঃস্ব-আমীর”
এ সব ভাব এ কঁচা আমির, ফুটছে সারা বেলা।
যখনি যা ঘটুক ব্যাপার, পড়ে তা সব চোখে পাকার,
দেখতে কভু হয় না বেজার, কিছুতে নাই হেলা ;
পাকার’পরে লক্ষ্য যাহার, কাঁচার লীলায় তুষ্টি না তার,
ভয় না ঢুকে হিয়ার মাঝাৰ, গা’য় না লাগে ঢেলা।
সবার সঙ্গ করি’ সে জন, স্বভাব ভুলে যায় না কখন,
চায় শুধু নয় যে মগন, খায় সে কালের ঠেল।

১৭১
আনন্দ-বিবেক
রূপের মাঝেই অরূপ।
১৭১
(আমি) আসি নাইকো রূপের হাটে, রূপে মজে থাকবে বলে।
অরূপ-স্বরূপ-লাভের আশে, পড়েছে প্রাণ রূপে ঢ’লে ।
বিন্দু-বােধ বিনা যেমন, যায় না জানা-শূন্য কেমন
অরূপ-জ্ঞান হয় না তেমন, রূপাগ্নি না উঠলে জ্বলে।
“নিদ্রায় কোন জ্ঞান না থাকে,” কে তা’ তখন বলে কাকে?
যায় তা বলা যা’কে তা’কে, জাগৰ্ত্তিতে দৃষ্টি প’লে ;
ক’রূলে বিচার ল’য়ে অণু,
শূন্য রূপে দাড়ায় তনু,
টেকতে নাহি পারে মনু, অরূপে রূপ যায় গাে গলে।
সেই যে অরূপ—পূর্ণ চেতন,
এই বিশ্ব-রূপ-কারণ,
চাই গাে আগে রূপকে বরণ, অরূপে রমণ করতে হলে।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Ananda-bibek

Author
Saraswati ,paramananda
Title
Ananda-bibek
File name
Ananda-bibek
Text
OCR done
Citation
1932
Published
2009/12/4
Publisher
Srimath Atmachaitanya Bramhachari , Howrah
Language
Sanskrit
Pages
182
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Ananda-Bibek
DLI number
512299
Barcode
4990010019389.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
DzRntvbxKWY
Download PDF

Ananda-bibek