Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Uchchwas

Das,purnachandra · 2009/11/28

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

উচ্ছাস)।
শ্রীপূর্ণচন্দ্র দাস প্রণীত।
প্রকাশক
শ্রীসুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
ইউনিভার্সেল লাইব্রেরী
৫৬১ নং কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা
১৩১৮
মুল্য, আট আনা

কলিকাতা,
৫১২ সুকীয়া স্ট্রীট, মণিকা প্রেসে
শ্রীহরিচরণ দে দ্বারা মুদ্রিত।

•• নিবেদন। আজ প্রায় নয় বৎসর গত হইল, যখন আমি “গাথা লইয়া মাতৃচরণে অঞ্জলি প্রদান করি, তখন বঙ্গীয় পাঠকবর্গের নিকট প্রভূত উৎসাহ লাভ করিয়াছিলাম। বলা বাহুল্য, তাহাদের সেই উৎসাহে উৎসাহিত হইয়াই আমি পুনরায় “উচ্ছাস” রচনা করিয়াছি। দুর্লভ কবি-যশঃ লাভের আকাঙ্ক্ষা আমি করি না। তবে বাণীর চরণ পূজায় সকল ভক্তের সমান অধিকার আছে, ইহা বিবেচনা করিয়া আমি দীন-হীনভক্ত হইলেও আজি এই দরিদ্র হৃদয়ের ভক্তি-উচ্ছাস” সেই বঙ্গ-বাণীর পবিত্র চরণে অর্ঘ্য স্বরূপ প্রদান করিলাম। পরিশেষে কৃজ্ঞতার সহিত উল্লেখ করিতেছি যে উচ্ছাস” প্রকাশের জন্য আমি মহিষাদল পরগণার শ্ৰীযুক্ত হেমন্তকুমার মাইতি, শ্ৰীযুক্ত গিরীন্দ্রনাথ মাইতি, ডাক্তার শ্রীযুক্ত ক্ষীরােদচন্দ্র জানা এ, সি, পি, এস্ এবং মহিষাদল-রাজকর্মচারী শ্ৰীযুত সুরেন্দ্রনাথ জানা এই চারি- জন সহৃদয় সুহৃদের নিকট হইতে অর্থ সাহায্য প্রাপ্ত হইয়াছি। তাহাদের এই বহুমূল্য সাহায্য না পাইলে “উচ্ছাস প্রকাশ করিতে পারিতাম কি না সন্দেহ। উচ্ছাসের মুদ্রাঙ্কণ বিষয়ে আমার শ্রদ্ধাস্পদ বন্ধু “অর্ঘ্য"-সম্পাদক শ্ৰীযুত অমূল্যচরণ সেন আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছেন। তজ্জন্য তাঁহার নিকট আমি আজীবন কৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ রহিলাম। ১লা আশ্বিন, ১৩১৮। গ্রন্থকার।

No text on this page.

উ=সর্গ
বঙ্গসাহিত্যের অকৃত্রিম অনুরাগী
ও পৃষ্ঠপােষক,
বিদ্যোৎসাহী এবং দীন-প্রতিপালক
কাশীমবাজাৱাধিপতি
শ্ৰীল শ্ৰীযুত মহারাজ মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী
বাহাদুরের
শ্ৰকত্ব-কমলে অর্পিত হইল।
কর।

No text on this page.

ভ-সর্গ-পত্র।
।
এ দীনের হৃদয়-উচ্ছাস।
এতে নাই ফুল-হাসি, মলয় বাতাস।
সদা যারা ধরা-বুকে
কাটে দিন শান্তি-সুখে,
তাদের কবিত্বে স্নিগ্ধ কুসুম-সুবাস ।
এ দীনের হৃদয়-উচ্ছাস।
•
এ দীনের হৃদয়-উচ্ছাস।
তে নাই বংশীধবনি, প্রেম-নাগাস।
কে না জানে এ সংসারে
কি অশান্তি-অন্ধকারে
দরিদ্র-জীবন কাটে করি’ হা হুতাশ ?
এ দীনের হৃদয়-উচ্ছাস।
. :
এ দীনের হৃদয়-উচ্ছাস।
এতে হৃদয়ের কথা, এতে দীর্ঘশ্বাস।
হে সহৃদয়, জ্ঞানী,
কৰ্ম্মপ্রাণ নৃপমণি!
তুমি দীন-ব্যথিতের,দৃঢ় এ বিশ্বাস।
তাই তােমা’ দিনু এ উচ্ছাস।

No text on this page.

সূচীপত্র। বিষয়। ••• ০ ০ দুৰ্ব্বৎসর হতভাগ্য অনুতপ্ত ভূস্বামী প্রভাত-সঙ্গীত : : : ••• ••• ৯ ••• ••• খাট ••• । । •• ••• ••• ১৪ নাই কি সরম জ্ঞান? গরীবের কথা উন্নতি ••• • ••• ৫ । ••• ১৮ । সেদিন কোথায় ? ••• ••• জাপান • ২৩ ২৫ + + + ২৬ বিপথগামী যুবকবৃন্দের প্রতি শ্ৰীযুক্ত সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিষেকোপলক্ষে ••• ২৮ ••• ••• ••• পত্র ••• p, ৩ . মায়ের আগমন সন্ন্যাসী পল্লী-চিত্র প্রণাম ••• ৪৪ • ৪৯ (২) • ৮ ••• ৫৪ ••• কৈকেয়ী মন্থরা রামচন্দ্র ০০০ পৃষ্ঠা। সীতা ••• ৮ ০ ০ লক্ষ্মণ ভরত • • • ••• ০৭ ৫ । ••• ৫৯ ৬০ ৬১ ৬২ ৬৩ . গর্বিত রমণী জীবন-সঙ্গীত ময়ূরভঞ্জাধিপতি স্বর্গীয় কবিবর রাজকৃষ্ণ রায় ডাক্তার ললিতমােহন বন্দ্যোপাধ্যায় শুভাশীৰ্বাদ . • • ০। ••• ••• ৬৪ • • • • ৬৬ ৬৭ ৬৯ শুভ পরিণয় • (৩) হতভাগ্যের মুৰ্ম্মকথা ••• ৮১ ৮৩ । । । ০ ০ ০ আক্ষেপ তুমি ও আমি মায়া নিবেদন বিষাদ-কাহিনী ০ • • • • ৮৯ ••• ৯২ কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? ৯৮ সুদূরে শশানে ••• ১০১ সন্ধ্যায় ••• । । । অনুতাপ ০ ০ ০ ১০৭

উচ্ছাস।
দুর্বৎসর।
দুৰ্বৎসর—বড় দুৰ্ব্বৎসর
নাই বৃষ্টি, নাই জল
বরষা-জলদ-দল
গেছে বৃথা গর্জি বহুতর।
নদী ক্ষীণসলিলা দুৰ্বলা,
নাই সে তরঙ্গোচ্ছাস,
দিনে দিনে ক্ষীণশ্বাস,
শুষ্ক দীর্ণ যত খাল-নালা।
লতা-পুষ্প-কুঞ্জ-বিটপীর
নাই আঁখি প্রীতিকর
পত্র-পুষ্প মনােহর,
হা হা স্বনে বহিছে সমীর।

উচ্ছাস
পাখীর সে নাহিক সুম্বর,
যেন কোন দূরদেশে
তারা সবে চলে গেছে,
পড়ে আছে শূন্য এ প্রান্তর।
ধূ ধূ করে চারিদিক যেন,
শীর্ণ ধান্য গাছগুলি
মাটী-সনে গেছে মিলি,
সব মাটী মনে লয় হেন।
বৈশাখীর সে কাল-অনল
কে যেন ছড়া’য়ে দেশ্নে :
পােড়ায়েছে রুদ্র বেশে,
ব্যর্থ তাই আর ঋতুবল।
হতভাগ্য কৃষক-সন্তান!
তপ্ত শ্বাস ফেলাইয়ে
কি দেখিছ চেয়ে চেয়ে ?
আঁখি ফাটি’ ছােটে অশ্রু-বাণ।
সারা বর্ষ জীবন-সম্বল
হায় গেছে ? নাই, নাই ?
কিছু নাই ? কিছু নাই ?
কি করিবি, অদৃষ্টের ফল!

উচ্ছাস
কি দিবি রে ছেলেপিলে-মুখে ?
মা, বাপ প্রভৃতি মিলি
খেতে যে অনেকগুলি,
ভেবে বড় ব্যথা পাই বুকে।
হা দেশের সুশিক্ষিত সব!
দেশের সম্ভ্রান্ত! ধনি ।
কি করিছ বল শুনি,
সবে কিহে রয়েছ নীরব ?
এতগুলি বিপন্ন দেশের
উপবাসে, অন্নাভাবে
শুকিয়ে মরিয়ে যাবে,
দেখে ধৈৰ্য্য রবে কি প্রাণের ?
ঝরিবে না দুখে আঁখি-বারি ?
এদের করুণ স্বরে
এক বিন্দু অশ্রু ঝরে
পড়িবে না মৰ্ম্ম ফেটে মরি ?
—না, কেউ নহ ত পাষাণ,
সবারি কোমল চিত
রক্ত-মাংসে বিজড়িত,
সর্ব দেহে দয়া বিদ্যমান।

উচ্ছাস
ল’য়ে তবে করুণ হৃদয়
এস কর্মক্ষেত্রে সবে,
শুধু বাক্যে নাহি হবে,
চাই ক—চাই এ সময়।
তােমরা দেশের যে গাে প্রাণ।
তােমরা দয়ার চোখে
চাহিলে, কেবা দেখে?
সারা দেশ হইবে শ্মশান।
যাহা কিছু ধান্য তােমাদের
এখনাে গােলাতে আছে,
বিদেশে দিও না বেচে,
কর ’তে কল্যাণ এদের।
যে যাহার দাও শক্তিমত ;
ধৰ্ম্মপােল স্থানে স্থানে
স্থাপ সকরুণ প্রাণে,
চাই স্বার্থত্যাগ-মহাব্রত।
জীর্ণ কত খাল, বাঁধ, পুল,
তা’তে শ্রমজীবিচয়ে
খাটাও হে অন্ন দিয়ে,
এতে শুভ, রক্ষা উভকূল।
৪

উচ্ছাস
অসমৰ্থ শিশু বৃদ্ধ যারা
তাদের বিধান ভিন্ন,
দাও এক মুষ্টি অন্ন,
কাতর নয়নেচেয়ে তারা।
শত জনে কিছু কিছু দিয়ে
বাঁচালে একটি প্রাণ
তাহাতেও সুকল্যাণ,
ক্ষু-কণা সুধা দুঃসময়ে।
মােরা সবে একই মাতার,
ব্যথায় ব্যথিত হয়ে
মমতায় বুকে নিয়ে
দাও ভাই, মুছে অশ্রুধার।

হতভাগ্য। সা নাই নাই শব্দ- অভাব অভাব গৃহে শুধু রাত দিন খেটে-খুটে যত আনি নিমেষে কোথায় যায়? উপায়-বিহীন। অর্ধদিন অনশনে উপবাসে কেটে যায়, ও সয় প্রাণে ; অন্নাভাবে ছেলেগুলি দিনে দিনে কৃশ, ধরি ধৈর্য কেমনে? আষাঢ়ে বরষা যবে নেমে আসে ধরা-বুকে, বারি-বিন্দুসনে ক্ষীণ আশা জাগে বটে, ধনী-জমী ভাগে চষি- তাই ফুল্লমনে। পৌষ-শেষে ভাঙে সেই মােহ-ঘুম, বছরের জীবন-সম্বল- ধান্যগুলি ধনি-দ্বারে যায় ‘বাড়’-ধান্য-শােধে ; হা অদৃষ্ট-ফল! ঝাঁটা, কুলাে, শূন্য থলে নিয়ে ফিরি জীর্ণ গৃহে নীচু করি মুখ । ছেলেগুলি ম্লান মুখে “বাবা” বলে এসে ফিরে ; ফেটে যায় বুক।

উচ্ছাস “কি হবে ? গৃহিণী দীরঘ শ্বাস ফেলি, বলে সকাতরে উপায় বাছাদের কি খাওয়াব সারাবর্ষ ?” মুখখামুখী কঁদি দু’জলায়। আপনার স্বল্প জমী, কতই বা ফলে তায়? কয় দিন চলে? দু’মার্স না যেতে যেতে ধনীদের দোরে যাই কঁধে নিয়ে থলে। ঋণের উপরে ঋণ ; ঋণ যে মিলে না আর, দেয় লােকে কত ? কি বিশ্বাসে দেয় তারা ? ভিটেও বন্ধুকে গেছে ভেবে জ্ঞানহত। রুদ্র মূর্তি নিয়ে আসে গােমস্তার পেয়াদারা, বিষম নি ; খাজনাই দিতে নারি ‘তহরি’-পেয়াদা-বােজ নিয়ে টানাটানি। চৌকীদারী ট্যাক্স হেতু দুই দিন ছাড়া চলে বিষম জুলুম ; মােড়ল ‘মাথট’ চান, শীতলা-পূজায় হবে গান-যাত্রা-ধুম। কে বুঝে কাহার ব্যথা ? স্বার্থপর এ সংসার শূন্য দয়ামায়া ; দীর্ণ বুক চেপে তাই কত দিন নিরজনে কাদি ফোপাইয়া। ৭

উচ্ছসি
নিৰ্ম্মম ধরায় বৃথা
কি হবে প্রকাশি’ ব্যথা ?
কে এ আঁখি-জল
মুছিয়া সান্ত্বনা দিবে? কার হৃদে আছে হেন
করুণ প্রবল ?
যাদের অতুল ধন,
যাহারা পালক পিত,
মােরা মনে করি ;
ক্রর চাটুকার-দল
তাদেরে বিপথে নেয় ;
বুকে মারে ছুরি
বুঝিয়াছি এ সংসারে নাহিক আশ্রয়, নাই
জুড়াবার স্থল ;
কোথা সুখময় মৃত্যু! এস, নেও কোলে তুলে ;
ফুরা সকল।

অনুতপ্ত ভূস্বামী।
।
•হে বিধাতঃ! উচ্চপদ, এউচ্চ সম্মান
সঁপে কি যথাযােগ্যে ? গর্বোন্নত প্রাণ
তবে কেন মধুজীবি-প্রশংসা-গুঞ্জন
লভিতে উৎসুক? সাধে কোন্ প্রয়ােজন ?
এ স্বর্ণ-মুকুট যবে শিরে লই তুলি,
কেন তুচ্ছ মনে হয় ধরণীর ধূলি ?
কিসে এত উচ্চ মাথা ? দরিদ্র প্রজার
রক্ত-বিন্দু শুষে ? তাই উঠে হাহাকার ?
নৃত্য-গীত-মুখরিত সৌধালয়, দ্বারে
ঐ না অভাগা সব? মৃত্যু-ছায়া ধীরে
ঘনীভূত ম্লানমুখে ? আমি না ভূস্বামী-
রায়, রায়-বাহাদুর ? প্রজার না আমি
রক্ষক, পালক, পিতা ? হা স্তাবক-দল!
ছেড়ে দেরে, হয়ে মুক্ত, প্রাণে পেয়ে বল,
উন্মুক্ত করিয়া দি’রে মমতা-হৃদয়,
রাজগৰ্ব সিংহাসন হ’ক ধুলিময়।
এত দিন ফিরিয়াছি গৰ্বদৃষ্টি নিয়া,
দেখা যাক্‌ একবার স্নেহ-ছায়া দিয়া

উচ্ছাস
কত প্রাণ আসে পাশে, কি পূত সম্মান
কিবা শান্তি-প্রতি দেয়, কত মূল্যবান্।
হে বিধাতঃ! বিড়ম্বনা আরাে কত কাল ?
কেন গাে দুৰ্বলে হেন পরীক্ষা-জঞ্জাল ?
এ স্বর্ণ-মুকুট শিশু-শিরে দাও টানি,
কি দাও হৃদয়েতে মহত্ত্ব এমনি,
হই মােগ্য দেশের, হলে কৰ্ম্ম শেষ
পাই যেন কোল, ক্লান্ত পরাণে আয়েস।

প্রভাত-সঙ্গীত।
আহা কি মােহিনী ঊষা।
সঙ্গীত-উচ্ছাসে তােল হৃদি-বীণে
জাগাইয়ে নব আশা।
নবীন কিরণ পড়িছে ফুটিয়া,
উঠিছে বিহগ-কুল কুজনিয়া,
সমীরে দোদু
তরু, ফুল ; কিবা
প্রকৃতির নব ভূষা।
আহা কি মােহিনী উষা।
যদি চাও সুখ, প্রীতি,
মধুর প্রভাতে
এস সবে মিলি
গাহি রে মঙ্গল-গীতি।
নিয়ে হিংসা-দ্বেষ-অশান্তি বালাই
এখনাে কে কোথা আছ ? এস ভাই,
নরক-অন
যা নিভে যাক,
এস হই এক মতি,
যদি চাও সুখ-প্রীতি।
এস নিয়ে আঁখি-নীর,
ভয়ে ভয়ে কহি
প্রাণ খুলে কথা,
তবে ত ঘুচিবে চীর।

উচ্ছাস
ভায়ের মরম-ব্যথা, হাহাকার,
ভাই বিনা বল কে ঘুচাবে আর?
কেন বিসংবাদ?
কেন এক কোণে
ধূলায় লুষ্ঠিত শির?
এস নিয়ে আঁখি-নীর।
হের কি আলােক-ভাতি।
ধীরে ধীরে ধীরে
জাগিয়া উঠিছে
কত দেশ, কত জাতি।
তাদের মধুর পরশে যদি রে
ভাঙিয়াছে ঘুম, এ ভাব কেন রে ?
এস সবে মিলে
সুফলা শ্যামলা
মা’র পদে করি নতি।
হের কি আলােক-ভাতি

খাট। ভ্রান্ত। ! কেন চেয়ে পর- সৌধালয়-পানে সতৃষ্ণ নয়নে?' কেন ফির দ্বারে দ্বারে ল’য়ে ভিক্ষা-পাত্র ঘৃণিত জীবনে ? এ বিশাল কর্মক্ষেত্র হের খুলে জ্ঞান-নেত্র, চাও মুক্ত আকাশের পানে। ঐ দেখ ঝাকে ঝাঁকে উড়ে যায় পাখী ; উড়ে যায় কোথা ? অনন্ত প্রসর-দুর সিন্ধু-বুকে যায়, আছে খাদ্য তথা। কোটি ফুলে ফিরে অলি, হের মিষ্ট মধু তুলি গড়ে মধুম সহি’ ব্যথা। হের ঐ বীবরেরা দন্তে খণ্ড করে তরু সুবিশাল নদী-তীরে গড়ে সেতু, গড়ে রম্য গৃহ ধরি কত কাল ; পিপীলিকা হের হােথা নাহি ক্ষণ অলস, সংগ্রহিছে খাদ্য সুরসাল। কেন তুমি হেঁট মুখে গললগ্ন বাসে ভাস আঁখি-জলে ? নিম্নস্তর জীব চেয়ে এত ছােট তুমি ? তােমা নুর বলে? ভিক্ষা চেয়ে কি নীচতা ? খাট ত্যজি’ অলসতা ; ভাগ্য-প্রসন্ন শ্রম-ফলে।

নাই কি সরম জ্ঞান ?
একটু হও মানুষের মত, নাই কি সরম জ্ঞান?
ঘরের কোণে অমন করে রাঙা বােয়ের আঁচল ধরে
রলে পরে পেটের জ্বালা মিটে কি বাবুজান ?
যারা দরিয়ার তুফান দিয়ে আছে কতই কষ্ট স’য়ে,
চাইলে তাদের মুখের পানে নাচে নাকি প্রাণ ?
এমন ধারা বুদ্ধিহারা
নয় ত অলস প্রেমিক তারা
সদাই খাটে, লেডির রুমে দেয়নি সঁপে প্রাণ।
একটু হও মানুষের মত, নাই কি সরম জ্ঞান ?
একটু হও মানুষের মত, নাই কি সরম জ্ঞান ?
রাশি রাশি ঢাছ টাকা কোথায় ধনি! হায় কি বােকা ?
সদ্য স্বর্গ পাও কি ওতে? মিলে কি পূত মান ?
দেশের লােক না খেতে পেয়ে মছে লােণা জল যে খেয়ে,
এ দিকে নাই একটু লক্ষ্য, সােণার দেশ শ্মশান।
দেশে লেগে শনির দৃষ্টি
অতিবৃষ্টি অনাবৃষ্টি
কোথা খাল বাঁধ ? এমি হলে জন্মে কি গাে ধান ?
একটু হও মানুষের মত, নাই কি সরম জ্ঞান ?
একটু হও মানুষের মত, নাই কি সরম জ্ঞান?
কেয়া ফুর্তি! পিয়ালা-ভরা ডুক্ ডুক্ ডুক্ গিছ সুরা,
ঢলে পড় পথে, ডেনে, ঘিরে চাদ-বয়ান,
১৪

উচ্ছসি
ভ্যা ভ্যা ভ্যা মাছি উড়ে,
রাসভসুরে গলা ছেড়ে
মাতিয়ে দেশ, ভাল বটে তুল মিঠে গান।
তােমরা উচ্চ শিক্ষা পেয়ে জ্ঞানী না? দেশ মুখটি চেয়ে ?
এ কি শিক্ষা দাও? এতে বাড়ে কি ধন মান ?
একটু হও মানুষের মত, নাই কি সরম জ্ঞান ?
একটু হও মানুষের মত, নাই কি সরম জ্ঞান ?
তােদের পূর্বপুরুষ যারা দেশের মােটা কাপড় তারা
পরে কত জমিয়ে গেছে জমি-জমা-ধান ;
তারা যে সবাই নিজের হাতে ফলা’ত সােনা নিজের ক্ষেতে,
পূজা-পার্বনে কত দীনে অন্ন-বস্ত্র দান।
নিউ ফ্যাসানের চিকণ সাজে তােমরা সভ্য বাবু সেজে
পরের পায়ে লােটাও, অন্ন-চিন্তায় ম্রিয়মাণ ।
একটু হও মানুষের মত, নাই কি সরম জ্ঞান ?

গরীবের কথা।
ঘরে এল রাঙা বউ,
t
তখন আমার
অলপ বয়স,
কুঁড়ে ঘরে সুখ-ঢেউ।
তখন আমার পড়ার সময়,
ধরিয়াছি সবে মাত্র ‘বােধােদয়,
গেল কিছু দিন,
যেন মনে হয়
মুখ-পানে চেয়ে কেউ,
ঘরে এল রাঙা বউ।
বড়ই সরস,
পড়াতে নাহিক মন ;
সাধ হয় তার
চঁদ-মুখ-পানে
চেয়ে রই অনুক্ষণ।
তার কথা মিঠে-
স্বর্গসুখ তার মুহূর্ত পরশ,
তাহার পায়ের
নূপুর-ঝঙ্কার
সদা শুনি-
-আকিঞ্চন,
পড়াতে নাহিক মন।
হেসে খেলে যায় দিন ।
বিদ্যালয় হতে
বিদায়, নহি সে
নীরস নিয়মাধীন।

উচ্ছাস
কত হাসি, গল্প, বিরহের গান,
কতই কবিতা, উধাও পরাণ,
ভবিষ্যৎ-চিন্তা
নাহি, কি সুখের
নিশিদিন বাজে বীণ,!
হেসে খেলে যায় দিন।
ভরপুর মাের ঘর।
দেখিতে দেখিতে
এ ছেলে মেয়ে
নিয়ে হাসি, কি সুন্দর!
আমার দশটা ননীর পুতলী
রূপে আলাে ঘর, হায় কারে বলি
ঘয়ে নাই অন্ন,
কেমনে তাদের
পালি, চিন্তা নিরন্তর,
ভরপুর মাের ঘর।
বড় দুখে দিন যায়,
স্নেহময় পিতা
মােহে একি ফাঁসে
গেছেন জড়ায়ে হায়!
শৈশবে বিবাহ-ধিক্ দেশাচার,
এ দুর্দিনে ভ্রাতা প্রীতি মমতার
ছিড়েছে বাঁধন
পৃথকান্ন হয়ে ;
আমি ভবে নিরুপায় ।
বড় দুখে দিন যায় ।

উন্নতি
বিয়ে পুরুষের,
উন্নতি, উন্নতি, কিসের উন্নতি ?
কিছুই বুঝিতে নারি ;
দুঃখ দৈত্যাধারে পাপ-স্রোতে যদি
নিমজ্জিত দেশ হেরি।
আজো, বিপদের
মেয়ের বিবাহ,
বর-দাবী সৃষ্টিছাড় ;
কোথাও না হয়
মেয়ের বাজার চড়া।
শিশু পুত্রে পিতা আজো দেয় বিয়ে,
আশা,-পৌত্র-দরশন ;
রােগ-রুগ্ন বহু
সন্তান লভিয়ে
পুত্র ভুগে বিলক্ষণ।
আজো কেঁদে পরে বিধবার বেশ
ঘােট ঘােট রাঙা মেয়ে ;
তাহাদের কত
করে ণ-হত্যা
যৌবনে কুপথে গিয়ে।
মধ্যশ্রেণী ব্ৰাহ্মণ ও শাখারি জাতির মধ্যে বিবাহে পাত্রীপণ অত্যধিক ;
এইহেতু উক্ত জাতীয় হতভাগ্য বিবাহপ্রার্থীকে আজীবন অবিবাহিত অবস্থায়
খাকি মনের দুঃখ মনেই মিটাইতে দেখা যায় ।

উচ্ছাস শিক্ষার অভাবে আজো অন্ধকারে পুরুষ, রমণী কত ; কাটে দিন অতি দীন হীন ভাবে, আচার পশুর মত। শিক্ষার আলােকে যার উদ্ভাসিত, তাহাদের (ও) মাঝে হায় ঘাের বিলাসিতা, মাদক- মত, কদাচার দেখা যায়। আজো পরস্পরে বাদ, বিসংবাদ, রেষারেষি, দ্বেষাদ্বেষি ; মামলায় যায় সৰ্বস্ব, ভিটাতে কুগ্রহ-বিকট হাসি। ধরে কড়া সুদ আজো ধনবান্ দরিদ্র ঋণীর’ পর ; পিশাচের মত নিৰ্ম্মম নিষ্ঠুর বিকে নেয় বাস্তু, ঘর। আজো পথে পান্থ বুক ফেটে মরে, তৃষ্ণায় পায় না জল; দশ ক্রোশ (ও) মাঝে বিরাম-আশ্রয়স্থল। কলেরা-বসন্তে দীন পল্লীবাস আজিও উজাড় হয় ; নাহি চিকিৎসক করুণ-হৃদয়, দাতব্য চিকিৎসালয়। নাইক পুকুর,

छ म
মাথা কুটে মরে
আজিও কৃষক,
আজীবন ভাগ্যে ছাই ;
কৃষি-উপযােগী
নাহি খাল, নালা,
কৃষি-শিক্ষালয় নাই।
প্রজার উপর
আজো ভূস্বামীর
শ্যেনদৃষ্টি তীব্রতর ;
কোথায় মমতা ?
শুধু স্বার্থ নিয়ে।
নিষ্পেষণ নিরন্তর।
আজিও সাবান,
এসেন্স, চুরুট,
অহিফেন, গাঁজা, সুরা
দেশ-অর্থ শুষে,
আনে দৈন্য, দুখ,
আনে নানা রােগ, জরা।
বিদেশী জিনিসে আজো দেশ ছায়,
তাঁতি, জোলা, কৰ্ম্মকার,
শিল্পী, শ্রমজীবী
নাহি পায় অন্ন,
শরীর কঙ্কাল-সার।
আজো দেশে হায় দুর্ভিক্ষ পিশাচ,
হাহাকার, মহামারী ;
উন্নতি, উন্নতি, কিসের উন্নতি?
কিছুই বুঝিতে নারি।

সেদিন কোথায় ?
সেদিন কোথায় ?
স্বর্গীয় সঙ্গীত ঝরে,
শত বীণা-ধ্বনি মরে,
শত শত শ্রোতা স্তব্ধ, মন্ত্রমুগ্ধপ্রায় ;
বাজে বাদ্য শত শত খােল, করতাল কত,
পূত ভক্তি-প্রমােচ্ছাস পরাণ মাতায় ;
সেদিন কোথায়?
সেদিন কোথায় ?
প্রেমের তুফানে ঢেউয়ে শত বাধা উপেক্ষিয়ে
বিভিন্নমুখীন স্রোত এক হয়ে যায় ।
দূরে যায় ঘৃণা, ক্লেদ,
জাতিগত ভেদাভেদ,
প্রীতির বাঁধন পড়ে হিয়ায় হিয়ায় ;
সেদিন কোথায় ?
সেদিন কোথায়?
সামান্য পিন্ধন বাসে কি শান্তি পরাণে আসে।
চিকণ বিলাস-বাস ধূলায় লােটায় ;
কিবা তৃপ্তি! কিবা সুখ! মহানন্দে নাচে বুক,
কি সাধনা! আকাঙ্ক্ষা সে নত দাসপ্রায়।
সেদিন কোথায় ?

উচ্ছাস
সেদিন কোথায় ?
কোথা সে বঙ্গের প্রাণ, বঙ্গের চৈতন্য-জ্ঞান
নবদ্বীপ-চূড়ামণি গৌরচন্দ্র রায় ?
বৈষ্ণব ধরম যার
মহাশক্তি একতার,
কোথা সেই মহাজ্ঞানী, নমি তার পায়।
সে দিন কোথায় ?
२२

জাপান।
হে
জাপান
কত দৃষ্টি তব পরে
তব কথা ঘরে ঘরে,
আরাধরাব্যাপী এবে তােমার আখ্যান,
কি সুখ্যাতি পড়ে ফুটে !
জানি কি আছে লিখা, নিয়তি-বিধান ;
হে ক্ষুদ্র জাপান।
অদৃশ্য ভবিষ্য পটে
হে ক্ষুদ্র জাপান।
গর্বিত হিমাদ্রিকায় কম্পিত ও ভীম ঘায়
কোথা পেল বজ্রশক্তি অতটুকু প্রাণ?
এ গৌরবে ধন্য তুমি বীর প্রাচ্য ভূমি
ছিল যে, রেখেছে আজো সে স্মৃতি-নিশান ;
হে ক্ষুদ্র জাপান!
হে ক্ষুদ্র জাপান।
“যথা ধৰ্ম্ম তথা জয়” যদি ইহা মিথ্যা হয়,
যদি টুটে ঋষি-বাক্য, বেদের সম্মান ;
তবু রবে দেশে দেশে স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসে
তব এ বীরত্বগাথা, আত্মবলিদান ;
হে ক্ষুদ্র জাপান।
১৩১১ সালে রুষ-জাপান যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে লিখিত ।

উচ্ছাস
হে ক্ষুদ্র জাপান।
ধীরে এইরূপে ধীরে উঠ শৃঙ্গে শৃঙ্গান্তরে,
গভীর-গহ্বর নিয়ে রাখিয়ে সন্ধান ;
নীতিজ্ঞ, বীরাগ্রগণ্য টোগাে”, “কুরােকিরে ধন্য,
কি আনন্দ! প্রতীচ্যও কয়ে-গুণগান।
হে ক্ষুদ্র জাপান!
হে ক্ষুদ্র জাপান।
নাহি তত ধন-জন,
সে বিপুল আয়ােজন,
বিষম আহবে তবু নহে ভীত প্রাণ ;
নাচ রণে থিয়া থিয়া, বীর-হৃদি বলি দিয়া,
রেখেছ বিজয় লক্ষ্মী আজো মতিমান !
হে ক্ষুদ্র জাপান।
হে ক্ষুদ্র জাপান!
নীলাম্বু-সলিল-রাশি কি শ্রদ্ধাই পরকাশি
কল্লোলিয়া তব পদ ধুয়ে বহমান ;
মেঘ-অন্তরাল হ'তে
যেন দেবী ফুল্লচিতে
তব শিরে করে শুভাশীষ-পুষ্প-দান ;
হে ক্ষুদ্র জাপান।
२8

ধন্য।
জাপান! ধন্য তুমি,
নাহিক দম্ভ,
উচ্চ ভাষ,
নাহি বিকট অট্টহাস,
নাহি পিশাচ-নৃত্য, গৌরবে
উজল প্রাচ্য ভূমি।
তুচ্ছ নয় এ খ্যাতি,
এ নয় তুচ্ছ আহবে জয়,
যশঃ-সৌরভ সমীর বয়,
ধন্য তব ত্যাগস্বীকার
সদ্ভাব-বিজিত-ঐতি।
রাখিলে ভাল স্মৃতি,
ক্ষুদ্রকায় নয় তুচ্ছ,
স্থূল মাত্র নয় উচ্চ,
কৰ্ম্ম-গগনে ভাল এ চিত্র
রঞ্জিল তােমার কৃতি ।
ধন্য তুমি ধন্য,
ভাগ্য-শশী কৃষি-বাণিজ্যে,
শিল্পে, আর একতা-বীর্য্যে,
তােমাতে এই মহতী শিক্ষা
জগতে মহামান্য ;
ধন্য জাপান ধন্য।
রুষ-জাপান-যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে লিখিত।
৪
২৫

বিপথগামী যুবকবৃন্দের প্রতি।
হা ভ্রান্ত যুবকবৃন্দ, রােষে, ক্ষোভে কৰ্তব্য বিস্মরি’
চলিয়াছ কোথা ? কোন্ পথে ? দয়া, মায়া, মমতা পাশরি’!
ফিরে এস—ফিরে এস হায়! ও যে পাপ-প্রলােভন-পথ ;
বুকে শত গৰ্ত্ত তৃণে ঢাকা, বুকে
পরিপাটী বালু-রথ।
প্রভাতেব পূৰ্বাকাশ-পানে চাও, কিবা নিষ্পাপ সুন্দর
স্বর্ণচ্ছটা নিয়ে রবি উঠে হাসিমুখে ভেদিয়া অম্বর,
তােমরা চলেছ রুদ্রবেশে অজানিত কোন্ পরপার ?
তথা হ'তে আসে পূতিগন্ধ, আর্তনাদ, রক্তস্রোত আর,
রত্নময় নদী-গর্ভ ছাড়ি’, কঙ্কর-সঙ্কুল-বেলাভূমে
কোন্ কুগ্রহের বশে গিয়ে, আলিঙ্গন কর চিতা-ধূমে ?
কে শিখালে তােমাদের এই গুপ্তহত্যা-নরকের খেলা ?
আত্মহত্যা-পাপে মতি দিয়ে কে দিলে এ বােমা-অগ্নিগােলা
সহােদর ভাই ভাই মিলে থাক গৃহে, মতভেদ নিয়ে
হয় নাকি মতান্তর কভু ? তা’বলে ছুরিকা বসাইয়ে
কে দেয় কাহার বুকে কবে ? একি নয় আসুরিক লীলা ?
বুটন করেনি কভু হিত ? ধুয়ে ফেল মন-দ্বেষ-মলা।
ঠগীদের অত্যাচার হ’তে এ দেশে কে দিল মুক্তি-দান ?
গঙ্গা-গর্ভে সন্তান-নিক্ষেপ নিবারিল কোন্ মতিমান ?
কে উঠাল সতীদাহ প্রথা—জীবন্ত সে নারীর দাহন ?
গ্রামে গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপি’ কে ছড়ালে জ্ঞানের কিরণ ?

উচ্ছাস
পােষ্টাফিস, বৈদ্যুতিকতার, মুদ্রাযন্ত্র, বাষ্পীয় শকট
এ দেশে কাহার অনুগ্রহে ? মনে ভাব আনিয়া বিকট
উগ্ৰমূৰ্ত্তিধরা অতি ভুল, শতবর্ষ-উপকার-স্তুপ
এত শীঘ্র বিস্মৃতি-সিন্ধুতলে ফেলে দেওয়া অতি অপরূপ,
ফিরে
এস, ফিরেএস ঐ ভ্রমের কুটিল পথ হ’তে ;
যে স্রোত এসেছে নিজ হ’তে, নেও নেও তায় বুক পেতে
কৃষি-শিল্প-বাণিজ্য-উন্নতিকল্পে দেও ঢেলে মন প্রাণ ;
ও কুপন্থা ত্যাগ করে এস, কর্মক্ষেত্রে হও গরীয়ান্।
যে দেশ হইতে বিনিঃসৃত নীতিগর্ভ বেদান্ত-বচন ;
সে দেশ করাে না কলুষিত আর পাপ-শােণিতে এমন।

শ্ৰীযুক্ত
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
(२
মায়ের প্রিয়পুত্র, মাতৃগতপ্রাণ।
হে প্রণম্য মহামান্য সুজ্ঞানি ধীমান্!
পূজ্য তুমি গুণে মানে সুকৃতি বৈভবে ,
নহ কভু বিচলিত দুর্দৈব-আহবে।
অটল অচলসম জনম-ভূমির
সাধিতেছ সদা হিত ; বিলােল শরীর,
পক্ক কেশ, তবু কৰ্ম্মে নহ ত বিরত ;
সময়াসময় নাহি, খাটিছ সতত।
তাই এ কৃতজ্ঞ ভক্ত দেশবাসী-প্রাণ
তব পদে বিলুষ্ঠিত, ভাসে দু’নয়ান ।
চারিভিতে পুঞ্জীভূত দুঃখ-দৈন্যাধার,
’র মাঝে আহা স্বর্ণ-আলােক-সঞ্চার
উষার অরুণসম করিতেছ তুমি,
জেগে উঠে ধীরে ধীরে তমােময়ী ভূমি।
বহুবর্ষ তমঃমেঘাবৃত এ ভারত,
বিদ্যাশিক্ষা-অবসর হ’তে এ যাবৎ
উৎসর্গিয়া প্রাণ তুমি সরাইছ তায় ;
কত ঝড়, বৃষ্টি, বজ্র শির দিয়া যায়,
জানি দেবতা কোথা ? কোন্ দেবলােকে ?
মনে হয় নরকায় ধরি’ এ ভুলােকে,
২৮

উচ্ছাস
তুমি তার মাঝে এক এসেছ গুণেশ !
দেখি দেব গুণরাশি তােমাতে উন্মেষ,
হে দেবতা! নমি পায়, নমি পায় হায় !
কত কথা মনে জাগে হেরিয়া তােমায়।
নিদাঘ-সন্তপ্ত দেশে গতি বরষার
হলে যেন হয় আশা, তেম্নি গুণাধার !
তোমা পেয়ে মনে হয়—এ শ্মশান-স্থল
হবে সৌধালয়ে পূর্ণ, পুনঃ ভাগ্যফল
ফিরিয়া আসিবে কৃষি-শিল্প-ব্যবসায়,
ফিরিবে শ্রী ভারতের, শমন শঙ্কায়
লইয়া অকাল মৃত্যু
পলাইবে
দূরে ;
যাবে অন্ন-হাহাকার বিস্মৃতির পারে।
হে দেবতা! তাই হক, তাই হক—চাই ;
যেন নাহি হয় স্বপ্ন, ধাতারে জানাই।
আর গাে জানাই—দীর্ঘ আয়ু পেয়ে তুমি
দেখে যাও শেষে সুখময়ী মাতৃভূমি!

-
অভিষেকেপলক্ষে।
সপ্তম এডওয়ার্ড-বিরহ-আঁধারে ছিল বিষন্ন ধরণী,
নবীন প্রীতি আলােকাগমে হাসিল মুখ, অমনি
উঠিল ঘন তােপ-ধ্বনি দিদিগন্ত ধ্বনিয়া ;
“পঞ্চম জর্জ সম্রাট পদে আসীন” জগতে ঘােষিয়া,
রঙ্গালয়ে প্রীতিনাট্য
তুলে আনন্দ-লহরী ;
বিশাল রাজ্য জুড়ি’ আনন্দ, ভুলি দৈন্য আ মরি
সরলপ্রাণ প্রকৃতিপুঞ্জ প্রীতি-অশ্রু ঢালিয়া,
নব সম্রাটে ভক্তি-পুষ্প অর্পে হৃদয় খুলিয়া।
কি মধুর দৃশ্য জগতে! কি পবিত্র সুখ-প্রীতি।
এ থাক্ চির, যেন দু’দণ্ডের না হয় এ ক্ষীণ স্মৃতি।
হে বরেণ্য অগ্রগণ্য বৃটিশকুল-শিয়ােমণি!
প্রকৃতি-প্রাণ “পঞ্চম জর্জ" হে সম্রাট মহামানি!
উচ্চমানে গৌরবান্বিত হীরক-মুকুটে ভূষিত
আৰ্যকুল-পূজিত পূত ময়ূরতক্তে শশাভিত
হে মহান্ ভাগ্যবান্ ! লভ সুযশঃ, লভ কৃতি,
লভ পদোচিত গৌরব,—যাহা সত্য পূজ্য অতি।
রাজ-শাসন-গুরুভার, প্রকৃতি-রঞ্জন সার ধর্ম
এ জ্ঞান থাক্‌ হৃদয়ে তব, কৰ্ম্ম জগতে সার কৰ্ম্ম।
হে সম্রাট! বড়ই আশে আশ্রিত নত প্ৰজা মােরা
প্রার্থি অতি বিনীত বচনে যেন ঘুচে এ অশ্রুধারা।
করুণহৃদয়া ভিক্টোরিয়া”, “সপ্তম এডওয়ার্ড” মহামতি-
তব পিতামহী, পিতা যেন তব হৃদে জাগে নিতি।
হও দীর্ঘায়ু রামসম, হও নীতিজ্ঞ মহাষশা,
সীতাসমা হ’ মেরী, প্রকৃতিপুঞ্জ এই আশা।

পত্র।
( স্বামীর
প্রতি স্ত্রী)
প্রিয়তম! প্রীতিপূর্ণ তব লিপিখানি ;
রেখেছি হিয়ার মাঝে করিয়া গাঁথনি
প্রত্যেক কথাটী তার, প্রত্যেক অক্ষর।
কারে দিয়ে “গ্রামলক্ষ্মী” নামটী সুন্দর
দেছ লজ্জা ? মরে যাই ভালবাস অতি ;
কিসের গৌরব মম? পালি তব নীতি।
আমি ক্ষুদ্রা, ক্ষুদ্র পল্লী-প্রান্তে এক কোণে
পড়ে অন্ধকার-ক্রোড়ে ; মৃদু কলম্বনে
কৃশাঙ্গী জানুবী হেথা ধীরে বয়ে যায় ;
কত পণ্যভরা তরী বক্ষে শােভা পায় ।
ত’ দেখে অতীত কত স্মৃতি জাগে মনে ;
তুলে উদ্বেলিয়া হৃদি ; জাগ্রত স্বপনে
কত দেখি, কত কাদি, কার আশীর্বাদ
শুভ উত্তেজনা দেব! কাহার প্রসাদ
পেয়ে ক্ষীণ দেহলতা সবল সুন্দর ?
মনে হয় খাটি দিবানিশি-নিরন্তর।
তুমি যে চরকা কিনে দেছ, সূত্র তায়
কেটে পাই সুখ, ঘােট থােকার জ্বালায়

উচ্ছাস
.
তিষ্ঠিতে না পারি, করে লুমের আব্দার ;
বিদ্যালয় হতে এসে বড়দাদা তার
সুচিকণ বুনে বস্তু, সে কি রয় স্থির ?
কত মতে সুধাইয়া সাজাইয়া বীর,
হাতে যষ্টি দিয়ে তারে খেলায় প্রাঙ্গণে
ছেড়ে দি, ভাল সে যুঝি সমযােগ্যসনে
ধূলি-ধূসরিত ক্লান্ত হয়ে ক্ষণ পর
আসি ক্রোড়ে নেয় শত চুম্বন, আদর!
গরীবের মেয়ে নিয়ে এক পাঠশালা
খুলিয়াছি, গৃহ-কৰ্ম্ম অবসর-বেলা
তা’তে দি, বড়ই তারা শ্রদ্ধা করে মােরে ;
রামায়ণ-ভারতের কাহিনী সুস্বরে
যবে পড়ে, যবে পড়ে আৰ্য-গুণ গাথা
রাজস্থান-ইতিহাস, কর্ণে ঢলে সুধা।
দেবর স্নেহের মণি শিল্প-বিদ্যালয়ে
নিত্য যায় অপরাহে, অলপ সময়ে
শিখিয়াছে চারু শিল্প, টেবিল, চেয়ার
বেশ গড়ে, কৃষিতেও বড় রিজ তার।
আমাদের ছিল যত অনুৰ্বর স্থান
‘ড়ি ফেলি’ সার দিব্য করিছে বাগান।
কত আম, জাম, লিচু ভক্তি-উপহার
পাবে বাড়ী এলে ; পাবে তৃপ্তি রসনার।
এ বৎসর দেশে ধান্য ফলিয়াছে বেশ,
ভূস্বামীর কৃপাদৃষ্টি ইহাতে বিশেষ।

উচ্ছাস
খনিত হয়েছে রুদ্ধ খাল নালা যত,
নাহি জলাভাব, ক্ষেত্র শস্যে সুশােভিত।
দু’বেলা জুটিবে অন্ন, সুখের সংবাদ
এর চেয়ে কিবা আছে? ধড়ই বিষাদ
কোথা হতে আসিয়াছে ম্যালেরিয়া জ্বর ;
পল্লী জুড়ি’ বসিয়াছে করে আড়ম্বর,
দীর্ঘকাল ভুগে ভুগে যদিও তাহার
ছাড়াই হাত, দেখি ধোয়া চারিধার।
একটু হাঁটিতে গেলে মাথা পড়ে ঘুরে ;
শীর্ণ ম্লান কায় কঁপে বাতাসের ভরে।
সাধের চিকুরগুচ্ছ রুক্ষ্ম উঠে যায়,
পড়িয়া বিপদে বড়, না পেয়ে উপায়
জানাইয়াছিনু তােমা, তুমি বিচক্ষণ
বৈদ্য বটে, পাঠায়েছ করিয়া যতন
সৌরভিত সুশীতল তৈল উপকারী,
পেয়েছি সুফল মেখে, পূৰ্ব্ব শ্রী আ মরি ।
আসিয়াছে অঙ্গে, কেশে, এসেছে মাথায়
শান্ত স্নিগ্ধ ভাব, তব ব্যবস্থা-কৃপায়
এ যাত্রায় পেছি রক্ষা, এ দ্রব্য স্বদেশ
জানিয়া হইনু প্রীত, আরাে দুই শিশি
এনাে নাথ! শারদীয়
পূজা সম্মুখীন ;
পাবে ছুটী ; এসাে গৃহে উৎসবের দিন।
থেকো না বিদেশে লয়ে ম্লান মুখ-ভার,
মা চাহিয়ে পথ, চোখে স্নেহ অশ্রুধার।

উচ্ছাস
এসাে নাথ ! বড় আশা-এক প্রাণে দুটা
দুর্গতিনাশিনী দুর্গা-পদতলে লুটি
ভুলে যাই দুখ, ব্যথা, পাই শক্তি প্রাণে,
খাটিতে সক্ষম হই সংসার-প্রাঙ্গনে।
সরাইয়ে বাধা-বিঘ্ন-তমঃ-জাল-ঢাকা,
সন্তানে দেখায়ে যাই দীপ্ত আলাে-শিখা,
আমার আকাঙ্ক্ষা নাথ! আমার কামনা
কি তব অজ্ঞাত আছে ? কি তব অজানা ?
কি আর লিখিব বেশী ? জান ত সকল
স্বামি! দেবতা ! প্রভাে! হৃদয়ের বল !
শ্রীচরণে কোটি কোটি ভক্তি প্রণতি ;
খােকাদের আর সকলের শুভ ইতি।
৩৪

মায়ের আগমন (১) চারিভিতে শঙ্খ-উলু উলু ; মা বুঝি কৈলাস হতে আসিছে কনক-রথে ? নাহি খােকা-আঁখি ঢুলুঢুলু ! চারিভিতে শঙ্খ-উলু উলু। সরম-ঘােমটা থেকে ফুলবালা আড়চোখে বার বার শূন্যপানে চায় ; গুঞ্জরি’ ভ্রময় অলি, বিহগ শাখায় ঢুলি সুমধুর আগমনী গায়। উষার কনক-পটে আজি কি মাধুরী ফুটে। কি মধুর সুস্নিগ্ধ কিরণ ! মরা নদী বেঁচে উঠে পিঠাপিঠি খেলে, ছুটে পােনা-পুটি প্রিয়-দরশন। মা আনন্দময়ী আসে, কি আনন্দ সুখােচ্ছাসে আসে বাসে সুদূর প্রবাসী ; রোগ-শােক-অনশনে ক্ষীণ হতভাগ্য-প্রাণে জাগে শক্তি, মুখে ফুটে হাসি। (২) ঐ মৃদু নূপুরের ধ্বনি। মা ত্যজি’ কনক-রথে, নেমে বুঝি ধরা-পথে ফেলে রাঙা চরণ দুখানি । ঐ মৃদু নূপুরের ধ্বনি। ৩৫ উচ্ছাস ধা-শীষ সারি গাথা প্রণমে মােয়ায়ে মাথা, কাশ-গুচ্ছ বায়ু-ভরে দুলি’ ব্যঙ্গম, নীলাঙ্গ তুলে সাগর উথল কূলে মাখিতে মায়ের পদধূলি। সুধা গন্ধে ভুর ভুর সেফালিকা ঝু ঝুর ঝ'রে পেতে দেয় ক্ষুদ্র বুক ; জাগে আশা ক্ষীণ প্রাণে মার পদ পরশনে পাবে প্রীতি, পাবে স্বর্গসুখ। সুন্দর কোঁকড়া চুল শিরে পিঠে দু দুল, রাঙা ঠোঁটে হাসির লহর থােকা খুকী রাঙা হাতে রাঙা ফুল ছুড়ে পথে “মা-“আ” “মা-আ” ঢালি’ সুধাস্বর। (৩) ঐ এল জগত-জননী। ওরে ভাই! দ্যাখ, চেয়ে, দ্যাখ, দিব্য আঁখি নিয়ে কি সুষমা ধরিল ধরণী। ঐ এল জগত জননী। জ্যোতির্ময়ী-জ্যোতি-ভার প্রতি অঙ্গে প্রতিমার, দ্যাখ, বরাননে মেহ-হাসি ; শীর্ণ অঙ্গ করে,খাড়া বাদ্যকর দেরে সাড়া, বাজাওরে ঢাক ঢােল কঁশি। আয় আয় ছেলে মেয়ে ভাসা ভাসা আঁখি নিয়ে, এস এস যুবক-যুবতী ;

উচ্ছাস
এস বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ধেয়ে
যষ্টি’পরে ভর দিয়ে
দীপ্ত করি ক্ষীণ আশাবাতি।
এস হে সাধক, যােগী,
এস মৃতকল্প রােগী,
এস অক্লিষ্ট নর-নারী ;
সংসারে মরমাহত
এস হে পিত, ভীত,
নিয়ে দীর্ণ মৰ্ম্ম-আঁখিবারি।
এস ধনি। এস মানি। ভুলে দ্বেষ, হানাহানি
ভুলে জাতিভেদ, প্রতারণা ;
দেশ দুঃখ-দৈন্তাধারে,
নিত্য কত জন মরে,
মনান্তর একালে সাজে না।
মা মােদের দুঃখহরা
ত্রিতাপনাশিনী তারা,
অন্নপূর্ণা রাজরাজেশ্বরী ;
কি অভাব ? কিবা দুখ? হলে তার একটুক
কৃপা, দূরে যায় বিভাবরী।
বহু বরষের পর
মার দৃষ্টি শুভকর
পড়েছে এ দুস্থ দেশ-প্রতি ;
মিথ্যা নয়, মিথ্যা নয়,
দুর্দিন না চির রয় ;
এস করি মার পদে নতি।
;
৩৭

সন্ন্যাসী।
(১)
}
নদীতটে রয়
বটত এক
দীর্ঘকায় সুবিশাল
তার নিয়ে রয়
একটি সন্ন্যাসী
নাহি জানি কত কাল।
চঁচর চিকুর বাঁধিয়াছে জটা,
ছাই-ভস্মে হীনপ্রভ অঙ্গ-চ্ছটা,
নিৰ্বাক, মুদিত নয়ন-যুগল,
সম্মুখেতে ধুনি জ্বলে জ্ব জ্বল,
কল্ ক ক নদী বয়ে যায়,
নর-কোলাহল নাহিক তথায়,
নাহি কোন মায়া-ছ।
(২)
কোথা হতে এসে
তথা ক্রমে ক্রমে
এক পর্যটক জাতি
বঁধে সারি সারি
পর্ণের কুটীর,
সন্ন্যাসী উদ্বিগ্ন অতি।
কেউ এসে চায় চরণের ধূলা,
কেউ দীক্ষা হেতু ঘুরে দুই বেলা,

উচ্ছাস - '.. E কেউ রােগ-মুক্তি ঔষধিটী চায়, কেউ চেলা হ’তে লুটায় দু’পায়, কেহ নাহি পায় কোনও উত্তর, কেঁদে চলে যায় নিরাশ অন্তর, চঞ্চল সন্ন্যাসী-মতি। (৩) টলিল সন্ন্যাসী- যােগের আসন, বিচলিত মৌন ব্ৰত ; পেয়ে জনশ্রুতি দূর পল্লী হ'তে আসে লােক শত শত। কেউ ভেবে সাধু ভকতি জানায়, কেউ ভেবে ভণ্ড উপহাসি’ যায় ; হইল সন্ন্যাসী নিতান্ত অস্থির, একদা নিশীথে ত্যজি’ নদী-তীর চলে গেল দ্রুত, দেখে লােক প্রাতে, নাহিক সন্ন্যাসী, কারাে খেদ চিতে, কারাে মুখে ঠাট্টা কত। (৪) নীরব বিশাল নিবিড় অরণ্য, বিস্তারিয়া শাখা ডাল রয় উচ্চ শিরে করি ঘেঁষাঘেসি তমাল, পিয়াল, শাল। নদী ঋজু হয়ে তার মধ্য দিয়া দূর দূরান্তরে গিয়াছে বহিয়া,

উ চ্ছ সি
তথায় সন্ন্যাসী লইল আশ্রয়,
পূৰ্বাশ্রম হ’তে সে যে দূর হয়,
দিব্য বাঘ-ছাল পাতিয়া বসিল,
বিপুল আনন্দ মনেতে আসিল,
আর নাহি সে জঞ্জাল।
(৫)
যায় কিছু দিন
ধ্যানে, নিরাপদে,
একদা দিবার শেষে
যবে আসে সন্ধ্যা,
কি একটী স্বর
তার সনে আসে ভেসে।
অতি মৰ্ম্মভেদী করুণ সে স্বর
কঁদাইয়া তুলে পশুর(ও) অন্তর,
বৃক্ষ-লতিকার ঝরে অশ্রনীর,
ব’য়ে যায় হা হা করিয়া সমীর,
ভাঙি যােগ স্বর তুলে আকুলিয়া ;
তীর বেগে যায় সন্ন্যাসী ধাইয়া
স্বর লক্ষি’ উদ্ধশ্বাসে।
কিছু দূরে গিয়া
দেখে বহু গাছে
নাহিক একটী পাতা ;
নগ্ন জীর্ণ শীর্ণ
প্রেত-মূৰ্ত্তি মত
কত নর-নারী তথা
পড়িয়া রয়েছে ভূতল-শয়নে,
আসে মৃত্যুচ্ছায়া পাণ্ডুর বদনে,
৪০

উচ্ছাস
তাহাদের কণ্ঠে
আসে কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে অতি,
নিভে আসে ক্রমে নয়নের জ্যোতি,
পেট কুক্ষিগত, কয়টি দশন
বাহিরিয়া আছে, ভীষণ-দর্শন,
হইল ব্যথিত অতি।
(৭)
উত্তরী ভিজায়ে
আনি নদী-জল
সন্ন্যাসী কাতর প্রাণে
বিন্দু বিন্দু করি’
ঢালে বৃথা সযতনে।
অন্নাভাবে প্রাণ মরণের কোলে,
কি হইবে তায় ? কোথা অন্ন মিলে
ভাবিয়া সন্ন্যাসী দূর পল্লী-পানে
ছুটে, মৃত দেহ হেরে স্থানে স্থানে।
পল্লী-মাঝে গিয়ে আকুল কাদিয়া,
উঠে হাহা-ধ্বনি চৌদিক ব্যাপিয়া
দুর্ভিক্ষের পদার্পণে।
(৮)
তথা শত শত
কঙ্কাল মুরতি
তাহায় ফেলিল ঘিরি’
নাহি ফুটে বাক্
অঙ্গুলি হেলায়ে
দেখায় উদর মরি!
জঠরের জালা ভীষণ এমন
একে অন্যে মারি করিছে ভােজন,
;

উচ্ছসি
সন্ন্যাসী ডাকিল, "কোথা ভগবান।
বাঁচাও বিপন্ন নর-নারী-প্রাণ,
হও হে সদয়, দাও হৃদে বল,
হতভাগ্যদের মােছ আঁখি-জল
রক্ষ দেশ কৃপা করি।”
(৯)
উন্মাদের প্রায়
গিয়ে দেশান্তরে
অতীব করুণ স্বরে
গাহিল দেশের
সে দুথ-বারত
প্রতি দ্বারে ঘুরে ঘুরে।
গ'লে গেল শুনে নিম পাষাণ,
কেমনে রহিবে স্থির নর-প্রাণ?
কেউ দিল চাল, কেউ দিল ধন,
কেউ হ’ল সাথী, খাটে প্রাণপণ,
এরূপে ছ'মাস অন্ন যােগাইল,
দেশের দুর্ভিক্ষ-অনল নিভিল
হাহাকার গেল দুরে।
(১০)
আসিল বরষা,
তরু-লতিকার
আসিল শ্যামল শােভা ;
বীজ ধান্ত বােনে
চাষা ক্ষেতে গেয়ে
সন্ন্যাসীর গুণ কিবা ।
গৃহে, পথে, মাঠে, ঘাটে সেই গান,
তা’ শুনি’ সন্ন্যাসী বিহ্বল-পরাণ,
৪২

উচ্ছাস
বলে, “প্রভাে! এ কি আলােভরা দেশে
করুণা প্রকাশি’ লইলে এ দাসে?
সন্ন্যাসী সাজিনু এক পুত্র-শশাকে
এবে কত জন বাবা বলে ডাকে।
এ দৃশ্য কি মনলােভা”।
(১১)
আর নাহি গেল
অরণ্যে সন্ন্যাসী,
রাখি ঈশে দৃঢ় মতি
যথা দৈন্য দুখ,
যথা হাহাকার
ঘুরে তথা নিতি নিতি।
তথা দিবানিশি খাটে প্রাণপণ,
নিবারে কতই প্রাণের বােদন,
দেখে তাহাদের হাসিমাখা মুখ
মর্তে থাকি লভে স্বরগের সুখ,
সবে সাধু ভেবে করে নতি তায়,
দেব-জ্ঞানে পদে গড়াগড়ি যায়,
ভক্তিভরা প্রাণে অতি।

পল্লী-চিত্র। ম:-আবরণ ধীরে সরে যায়, জেগে উঠে গাছগুলি ; কুলায় বায়স করে ঝন্টু পষ্ট আধ *কা! কা!” রব তুলি। কৃষক-বধূরা উঠি ভাের ভাের দেয় ঘরে ঝটি, ছড়া ; মাজয় বাসন, কর-শাখা-চুড়ি মিঠে বােলে দেয় সাড়া। শীতের সঞ্চার সবে ধরা-বুকে, গায়েতে চাদর মুড়ি চাষা যায় ক্ষেতে দড়ি-কাস্তে হাতে, হাতে আগুণের বিড়ি। দেখিতে দেখিতে পূব আকাশে হেসে উঠে রাঙা রবি, সােণার কিরণ তরু-শিরে, নীরে ফলায় সুন্দর ছবি। বগলেতে পুথি পাততাড়ি হাতে, পাঠশালে যায় ছেলে ; ধা-ধা” বােলে গােধনে সামালি’ গােপাল মাঠেতে চলে । ৪ঃ উচ্ছাস । আনাজের ঝকি মাথায়, হেটোরা হাটে যায় পথ দিয়ে, হাতে মুড়ি-খুবি দাড়াইয়ে শিশু ফ্যা ফ্যা দেখে চেয়ে। দাড়াইয়া রয় ছােট ঘরগুলি মাথাটীকে উচু করি, আছে শাক, লাউ বেগুণের গাছ চারিভিত প্রায় ঘিরি। ঘরের সাম্নে পিছনে পুকুর স্বচ্ছ নীল বারি ধরে, তায় পােনা-পুটি নানাবিধ মাছ আর হংস-হংসী চরে। পুকুরের পাড়ে আম্র, নারিকেল, খর্জুর, গুবাক, তাল ; জলে দুলে ছায়া রয়েছে দাঁড়ায়ে বিস্তারিয়া শাখা, ডাল। শােভে তার পাশে বিস্তৃত শ্যামল সর্ষপের ক্ষেত মরি। আঁখি-প্রীতিকর হরিৎ বরণ ফুলগুলি বুকে ধরি। বাঁশ-ঝাড় হেথা হােথা ভােবা-তীরে ঈষৎ ঝুকিয়া পড়ে ; বায়ুর পরশে করে খট্ খট পাতা ঝরে নীচে পড়ে।

উচ্ছাস দূরে দেখা যায় বহিয়া এসেছে আধেক হয়েছে ধান কাটা ক্ষেতে, আধেক এখনাে আছে, সােণার বরণ ধান্তক্ষেত্রগুলি কি সুন্দর দেখা’তেছে! ক্ষুদ্রা নদী এক রজত-রেখার মত পল্লী-বুকমাঝে তার শাখা খাল কত। “ঝুপ ঝুপ” জেলে জাল ফেলে তায়, জাল ভ'রে মাছ আসে ; পেটে লাগে ধোকা, চমকিয়া দেখে রবি অলে মধ্যাকাশে। জাল গুটাইয়া মৃদুগতি জেলে চলিল ঘরের পানে ; ধান্য-বােঝ ফেলি’ তৈল মাখি’ যায় আনে। করে স্নান, দ্রুত দুটি অন্ন পেটে দিয়ে মুখে গুজে পান চলে তামাকুর ধোয়া পথে উড়াইয়ে। এদিকে সরলা কৃষক-ঘরণী খাওয়ায়ে ঘরের সৰে, খাওয়ায়ে অতিথি, পতি-এঁটো পাতে খায় অন্ন সুধা ভেবে, উঠানে কৃষক চক্ষু পালটিতে ৪৬ উচ্ছাস তাম্বুল-রঞ্জিত কুলায় উড়ায়ে কেউ কুটে ধান, তার মাঝে চলে গলপ-গুজব হাসি-খুসী জায় জায়, খাওয়া শেষ হলে রাঙা মুখে কাজে যায়। ঝাড়ান ধানেরে কেউ রাখে রাশি করে, এমন দিনেও অঙ্গে শ্রম-ঘৰ্ম্ম ঝরে। খােকা কেঁদে খুন, ঠাকুর-মা সামলে আর না রাখিতে পারে, দিবা-কাজ ত্বরা সেরে মা! খাওয়ায়ে স্তন্য-সুধা শিশুটীরে কলসী লইয়া যায় সরােবরে, ভরিয়া তাহাতে জল কঁখেতে লইয়া আসে ধীর পায়, রুনুঝুনু বাজে মল, পশ্চিম আকাশে শেষ রশ্মিটুকু তার পায় পড়ে ঢ'লে দেখে চেয়ে নারী মােটে বেলা নাহি আর। নীড়-অভিমুখে উড়ে যায় পাখী মাথার উপর দিয়ে, মাঠ হতে আসে ঘরে গােপালেরা পথে ধুলি উড়াইয়ে। ডুবে যায় রবি, ১৭ উচ্ছাস হয় দেব-স্থানে, আশে পাশে গাছে দু’পাঁচটী ফুল ফুটিয়া সৌরভ ঢালে, হাসিমুখে নারী ঘরে আসে, সন্ধ্যা ধীরে নামে ধরা-কোলে। দীপ্ত তারা মত সন্ধ্যার প্রদীপ গৃহে গৃহে উঠে ফুটে ; ঋজ-শঙ্খ-রব চাষা ঘরে আসে হেঁটে। বৈঠকে সাজান মেচে, পা ধাের জল-ঘটী তার পাশে ; কৃষক তাহাতে হাত মুখ ধুয়ে বসে, ছেলে মেয়ে আসে। “বাবা” বলে কোলে, সহস্র চুম্বন লভে গালে স্নেহভরা, পতির সতী হাসিমুখে আনে গুড়-মুড়ী-জল ত্বরা। চাষা শিশু সবে খাওয়ায়ে, তা খেয়ে প্রাণে পায় নব বল; দিবা-শ্রম-ব্যথা কোথা চলে যায় ? আঁখিদুটী ছল্ ছল্। “ভগবান! যেন থাকে এ সুদিন”, বলে কিবা প্রীতি-ভাবে ! হে বিলাসী ধনি। এ তৃপ্তি, এ সুখ পাও কি কখন ভবে ? ৪৮

প্রণাম।
-~-~-
আমার প্রিয় জন্মভূমি !
মায়ের মত বুকে নিয়ে স্তন্য দিয়ে পাল তুমি।
তােমার বায়ু, তােমার জল,
তােমার শস্য, তােমার ফল
করে তুষ্ট, শরীর পুষ্ট,
তাইত ধরায় বেঁচে আমি।
তােমার পাট, রেশম, তুলা
যােগায় বসন, দিন দু’বেলা
তােমার মাঠে ক্ষেতে খাটি,
তােমার বুকে ঘুমাই, ভ্ৰমি।
ভাল তােমার মা। স্নিগ্ধ বাতাস,
ষড় ঋতু, আর নীলাকাশ,
ভাল শ্যামল তরুর সারি
হেথাহােথা আকাশ চুমি।
গিরি, নিঝর, নদী, কানন
মা বাঙলা ! আর কোথায় এমন ?
কোথায় এমন ধন্যভরা
সােণার ক্ষেত, মা ! তােমায় নমি।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

দশরথ। তুমি রূপেশ্বৰ্য্য-বীর্যবান্ নরপতি, কিন্তু ভৰে অতি দুঃখী নিজকৰ্ম্মদোষে ; গৃহে বহু অঙ্কলক্ষ্মী আনিলে সুন্দরী, সত্য বন্দী পাঠাইলে পুত্রে বনবাসে। নিজের কুঠার নিজ চরণে আঘাত করিলে, লভিলে তার বিষময় ফল ; কিন্তু নিজ বিস্মৃতির মাঝে রেখে গেলে ধরায় দৃষ্টান্ত এই অতীব উজ্জ্বল বহু পরিণয়ে দোষ, অতি দোষ আর ভবিষ্যৎ অজ্ঞাত বিষয়ে অঙ্গীকার।

কৈকেয়ী। পরমা সুন্দরী তুমি রাজেন্দ্ৰ-ঘরণী কিন্তু অতি দুর্ভাগিনী স্থূলবুদ্ধি অতি ; পরিণীত পুরুষে করিলে পরিণয়, কুসঙ্গিনী-সঙ্গ নিলে, হইল দুৰ্ম্মতি। বিসর্জিয়া দয়া, ধৰ্ম্ম, নারী-কোমলতা, তুচ্ছ ধনৈশ্বর্যে মুগ্ধা, হলে পিশাচিনী, সতীনের পুত্রে হেরি বিষের নয়নে, পতি-মৃত্যু ঘটাইয়ে হলে কলঙ্কিনী ; কিন্তু উপলক্ষ হয়ে দেখালে সুন্দর নারীর অনর্থ-মূল সতীনের ঘর। - ৫ ৪ মন্থরা। মন তব বিষ-কুম্ভ, বাক্য ক্ষুরধার, পিঠেতে ভরন্ত কুঁজ, তাই মন্দ গতি ; কিন্তু প্রতি পদক্ষেপে শব্দ দুপ দাপ, ঘন হাত নড়ে, কাঁপে ডরে বসুমতী। বড়ই হিংসুটে তুমি, যেন ভুজঙ্গিনী, তুমি কোন্দলের গুরু, কুমন্ত্রণা-ফাস ; অবলা সরলা বালা কিছুই না জানে, তারে ভুলাইয়া ঘটাইলে সর্বনাশ। কুটিলা রমণী তাের সম গৃহে যার, সােণার সংসার তার হয় ছারখার।

রামচন্দ্র ত্যজি’ রাজপুরী, পরি’ বাকল-বসন, হ'লে বনবাসী, হলে বন্যফলারী রাজপুত্র তুমি, শুধু এ কঠোর ব্রত পিতৃ-অঙ্গীকার-ঋণ শােধিবারে মরি। করিলে চণ্ডাল-সনে মিত্ৰতা-স্থাপন, গ্রথিলে একতা-সুত্রে নরে ও বানরে ; কি মহতী উচ্চশিক্ষা দিলে এ ধরা। আত্মােৎসর্গি যুঝিলে কি বনিতা-উদ্ধারে ! রাজা সমাজের প্রাণ, সন্দিগ্ধ প্রজার এইহেতু ঘুচাইতে ভ্ৰম-অন্ধকার নিলে প্রাণ-প্রেয়সীরে পরীক্ষা-মাঝারে, এ রাজ্য-গঠন-নীতি অতি প্রশংসার। তুমি সুনীতিজ্ঞ, পিতৃভক্ত, বীর, জ্ঞানী ; ধরার আদর্শ তুমি, তুমি অতি গুণী। ;

সীতা শিরীষ-কুসুম-সম সুকোমল তনু, অন্তঃপুর-নিবাসিনী রাজবধূ তুমি; দুগ্ধ-ফেন-নিভ শয্যা তােমার শয়ন, রাজভােগে পুষ্টা, ত্যজি’ সুখময়ী ভূমি পতিপ্রাণা! পতি-সনে হ'লে স্ব-ইচ্ছায় শ্বাপদসঙ্কুল ঘাের কাননবাসিনী ; চতুর্দশ বর্ষ র’লে খেয়ে ফল, মূল, অরি-গৃহে কত ক্লেশ পেলে না দুখিনি। তারপর স্বামীকৃত পরীক্ষা বিষম কি ভীষণ! কি কঠোর ! তবু ব্যবহার অতি নম্র, আজীবন দেখাইলে দেবি । স্বামী প্রতি কি গভীর প্রেম, শিষ্টাচার ! তুমি নারী-শিরােমণি, পতিব্রতা, সতী, আদর্শস্থানীয়া তুমি, অতি গুণবতী।

লক্ষ্মণ। ; সবেমাত্র বিলাসের প্রথম বয়স, সুকুমার অঙ্গে সবে যৌবন-উন্মেষ যুবতী বনিতা, চারু পৰ্য-শয়ন ত্যজি’ এ সময়ে নিলে সন্ন্যাসীর বেশ। জ্যেষ্ঠ-দুখে দুখী তুমি, হলে বনচারী, কুটীর-দুয়ারে র’লে প্রহরী নিশায় ; জ্যেষ্ঠ-অশ্রু নিবারিতে রক্ষঃকুল-সনে যুঝিলে বিষম, ত্যজি’ জীবন-মায়ায়। তুমি ভ্রাতৃভক্ত, বীরশ্রেষ্ঠ, গুণধাম, সারা ধরা ব্যাপি’ তাই তােমার সুনাম ৫৮ ভরত। প্রলােভনময় রাজ্য, অতুল সম্পদ মুহুৰ্ত্ত না বিমােহিতে পারিল তােমায় ; জ্যেষ্ঠের বিরহ-শােকে হলে মুহমান, কঁদাইল ভ্রাতৃপ্রেম জাগিয়ে হিয়ায়। আনিবনবাসী জ্যেষ্ঠ-পাদুকা-দুখানি স্থাপিলে আপন লব্ধ রাজ-সিংহাসনে, ধরিলে আপনি স্বর্ণ রাজছত্র করে বসি' ভক্তদাস-ভাবে নিম্নে চৰ্মাসনে। কি নিঃস্বার্থ ভ্রাতৃপ্রেম! কি ত্যাগস্বীকার ! এ সংসারে দিব্য শিক্ষা চরিত্রে তােমায়।

গর্বিত। প্রজ্জ্বলিত বক্সিম তব রূপরাশি অঙ্গে অঙ্গে বিচ্ছুরিত, মনােমােহর ; অলক্তক-রাগ-রক্ত নূপূর-গুঞ্জিত রাঙা পদ-ভরে কাপে ধরা থর থর। শত তীক্ষ্ণ শর প্রতি অপাঙ্গ-ঈক্ষণে বিষের কলস হাসিভরা রাঙা ঠোট্রে; তুমি ধনি! গরবিনী, মানিনী, সাপিনী, ভর্তার দ্বিতীয়া রাণী তুমি হৃদি-পটে, শান্তির সংসারে তুমি অশান্তি বাঘিনী, হাস্য-মুখরিত গৃহে আন হাহাকার ; আপনার পদে বিঁধ আপনি কন্টক, পিশাচীর সম তব রুক্ষ ব্যবহার। নির্বোধ সে গৃহে তােম’ যে আনে মােহিনি। থাকিতে প্রথমা অনুগত প্ৰেমাধিনী।

রমণী। অয়ি প্রাণারাধ্যা মােহিনী প্রতিমা! অয়ি হৃদি-বিলাসিনি। কি তব সৌন্দৰ্য, কি গুণ-গরিমা, কি দিব্য মূরতিথানি! কি তব চরণ-চুম্বিত কুন্তল, ললাটে সিন্দুর-ফোঁটা জলে জ্বল জ্বল, বঙ্কিম নয়নে অরুণ-কিরণছটা। রাঙা ঠোঁটে কিবা বিজলীর হাসি-আঁধারে আলােকরাশি; কোমল মৃণাল-বাহুযুগে কিবা অমিত শক্তি, আসি’ বীর-হৃদি লুটে রাঙা পদে তব, তােমার মধুর বাণী সুপ্ত হৃদয় তুলে জাগাইয়া, অয়ি গাে হৃদয়-রাণি ! যদি আসি, হৃদে বিজয়-শঙ্খ বাজাও, তবে কি ভয়? কি ভয় মরূণে? সে মরণে সুখ, অমরত্ব শুভময়। হে দেবি! তােমর মঙ্গল-পরশে পুরুষে দেবত্ব আসে, রুগ্ন ভগ্ন দেহে আসে বল-বীর্য, অসুর পলায় ত্রাসে। সুমতিদায়িনী বীনাপাণি তুমি, ত্রিশূলধারিণী ভীমা সংসার-আলয়ে গৃহলক্ষ্মী তুমি, গুণের নাহিক সীমা। বিপদে সম্পদে জীবন-সঙ্গিনী, কায়ার ছায়ার পারা, তুমি শুভময়ী, আঁধার-সংসার-আকাশের ধ্রুবতারা। তুমি নাই যথা তথায় শ্মশান, তথায় গাে হাহাকার ; তােমার বিরাগে রণে পরাজয়, স্বর্ণালয় কারাগার। তব মানামানে জীবন মরণ, এ সারা সংসার জুড়ে রহিয়াছ তুমি অয়ি মনােময়ি! এ দগ্ধ জীবন পড়ে এক বিন্দু তব লভিতে প্রসাদ, কৃপা কি হবে না হায়! এস হৃদে এস, দীন হীনে দেবি! লও গাে করুণা-ছায়। ;

জীবন-সঙ্গীত। তুচ্ছ চ্ছ হীন অপদার্থ মত যেতেছি এ কোথা তলাইয়া ? নীচমতি কোথা নিয়ে যায় জীবনের সামর্থ্য টুটিয়া ? এই সবে আরম্ভ সংগ্রাম—এই সবে প্রথম সময় ; আগে হ’তে বিভীষিকা হেরে হীন প্রাণ কেন পাও ভয় ? চলিতে দুর্গম বন-পথে পথ-ভ্রম যদি ঘটে যায়, বিবেকে ধিক্কারি’ পুনঃ ফিরে চল, কেন অধীরতা হায় ? কেন এ হীন? বাঁধ বুক, সহিষ্ণুতা -মনুষ্যত্ব-বল, নিন্দুকের নিন্দাবাদ—সে ত আবর্জনা, নরকের মল। মূঢ় মন ! কেন অধীরতা? মুছে ফেল নয়নের জল ; তােষামদ-নীচত্ব আত্মার, তােষামদে প্রেতাত্মা সকল যাক তারা ঐশ্বর্যের দেশে, ক’দিন অনিত্য তুচ্ছ ধন? কয় দিন বিষয়-মত্তত, লােকত সম্মান উচ্চাসন ? সূক্ষ্মদশী বিধাতার চক্ষু এড়াবার সাধ্য আছে কার ? তারি পায় মান, অপমান, সুখ, দুঃখ জীবনের ভার রেখে সাধু-পদাঙ্কিত পথে ধীরে ধীরে হও আগুয়ান ; জীবনের আরম্ভ সংগ্রাম এই সবে, কেন ম্রিয়মাণ?

ময়ুরভঞ্জাধিপতি মহারাজ শ্রীরামচন্দ্র ভঞ্জ দেব বাহাদুর ; মহারাজ! কি উজ্জ্বল গৌরব-মুকুট সুশােভিত তব শিরােপর ; সৃষ্টির প্রভাত হতে আজিও ধরায় সৰ্ব্বত্রই গুণীর আদর। গুণে মানে যেই পূজ্য, স্মৃতির মন্দিরে উচ্চাসনে, অমর সে জন ; লভুক সাম্রাজ্য শত ঐশ্বৰ্য্যাভিমানী তুচ্ছ সব, নিশার স্বপন। মােহান্ধ বিলাসী নিত্য বিলাস-আলসে • গড়ে শত স্বর্গ কল্পনার ; দেশ-হিত-তে পূত উৎসৃষ্ট জীবন প্রকাশে মহত্ত আপনার। মহারাজ! তব গুণে ইহা কম গৌরবের নয় ; কি সভা, সদনুষ্ঠানে, সাহিত্য-আগারে তুমি যে রয়েছ গুণময় ! তুমি যে বিপন্ন-পাশে দরিদ্র-কুটীরে করুণ হৃদয়খানি নিয়ে ; দুখিনী ভারত মার সুযােগ্য সন্তান, ভাই-বােনে যাওনি ভুলিয়ে। দীর্ঘজীবী হও নৃপ । দরিদ্রের আশা ; তাই সবে চাহিয়া বদন ; ঘুচিবে মায়ের অশ্রু, তুমি যে মায়ের অন্যতম উজ্জ্বল রতন। মুগ্ধ দেশবাসী স্বগীয় কবিবর রাজকৃষ্ণ রায়। • অর্থাভাব, দৈন্য তব প্রথম জীবনে দিয়াছে না দুঃখ, ব্যথা কত? উন্নতির পথে বটে সে এক বিষম মহা অরি কণ্টকের মত। কিন্তু কি কুয়াসা পারে রাখিবারে ঢেকে দিনকরে ? সে যে জ্যোতির্ময় জ্যোতিঃ তার নীলাম্বরে যবে ফুটে উঠে, সরে যায় শঙ্কিত হৃদয়। ভক্তিময় প্রেমময় প্রহলাদ-চরিত আহা মরি ! তব সৌভাগ্যের প্রতিভা-স্বর্গীয় বিভা, করি মুখােজ্জল কিবা প্রীতি দিল এ বঙ্গের । কত কাব্য, কত নাট্য, গ্রন্থ-রত্ন কবি। তার পর বঙ্গমাতা-পায় উৎসর্গিয়া পেলে মার স্নেহাদর কত, উচ্চাসন লভিলে ধরায়। কে বলে গাে রেখে যেতে পার নাই কিছু ? সে মূঢ়!—কি অমূল্য রতন রেখে গেছ এ ধরায়, কেমনে চিনিবে, তুচ্ছ সে সম্পদে যার মন ?

উচ্ছাস আহা কবি। রেখে গেছ কি গ্রন্থ-সম্পদ ! চিরদিন রবে এ অক্ষয় ; এ হেন ঐশ্বৰ্য্য যার, যথার্থ সে ধনী, ম’রেও সে অমরত্ব লয়। তাই আজো বঙ্গা- স্মৃতি-নীলাকাশে দীপ্ত তুমি, রয়েছ বসিয়া ; কবি তুমি, জ্ঞানী তুমি, অতি প্রীত মাের। তব পদে ভক্তি-পুষ্প দিয়া।

ডাক্তার ললিতমােহন বন্দ্যোপাধ্যায়। ? কেগাে তুমি এ অভাগা-মরুভূ-পরালে স্নিগ্ধ বারি দাও ছড়াইয়া যশের দুন্দুভি-নাদে নাহি স্পৃহা, সুখী সন্তর্পণে দীনে হৃদি দিয়া। নিঃসম্বল নিরুপায় রােগ-রুগ্ন যথা, তথা তুমি জলভরা চোখে , (সময়াসময় নাহি আহার-নিদ্রার, ) নিশিদিন ঘুর ম্লানমুখে। এ ধরায় আসিয়াছে কয়জন হেন উদার করুণ প্রাণ নিয়ে ? হে আমার—দরিদ্রের মিত্র ! পূজ্য দেব! রও ভবে দীর্ঘজীবী হয়ে। * ইহার বাড়ী ফরিদপুর জেলার আমগ্রামে। ইনি এখন মহিষাদলের রাজাবাহাদুরের গৃহ-চিকিৎসক।

শুভাশীৰ্বাদ। সৌন্দৰ্য-সঙ্গীত ভরা ৬. অনন্ত সুখের ধরা, বাসন্তী উষার হাসি মত- তুই মা আসিলি যবে, নিদাঘ-সন্তপ্ত প্রাণে শত ফুল হ’ল বিকশিত। শত বিহগের গান জাগিয়া উঠিল, হৃদি- মন হ’ল সৌরভে আকুল ; সুবৰ্ণকিরণ মাখি ব’য়ে গেল আশা-ঢেউ কি সুখের কুল কুল কুল ! মা! তুই আসিলি যবে অলস এ বাহুযুগে শূর-শক্তি উঠিল জাগিয়া ; চম্পক-অঙ্গু লি-দামে দেখাইয়া কৰ্ম্মক্ষেত্র, পর্ণে গৃহ দিলি মা ছাইয়া। যেন দীন গিরি-গৃহে আপন মহত্ব নিজে লুকাইয়ে ভিখারিণী সমা ছিলি তুই এত দিন মা অন্নদে! মা শুভদে। প্রহ্লাদিনী সুবর্ণ-প্রতিমা ! আজ যাস্ নিজ গৃহে, কি শক্তি রাখিব ধ'রে, এযে শিবে শকতি-মিলন পুরুষ-প্রকৃতি বিনা সােণার সংসার কোথা কোন্ যুগে হয়েছে গঠন? • উচ্ছাস মাের বুক-চেরা ধন । তার অঞ্চলের নিধি। সােহাগের সােণার প্রদীপ যা তুই, লক্ষ্মীর মত আলাে কর গিয়ে ঘরে নিয়ে ভার সিন্দুরের টিপ। “পতি ধৰ্ম্ম “পতি স্বর্গ জানিও মা! বাছা তুমি জেনাে লক্ষ্মী রমণী সুশীলা ; প্রেম দিয়ে, প্রতি দিয়ে এরে নিও গড়ে বাছা ! ক্ষমি দোষ, করিও না হেলা। সংসারে মানুষ হ'তে চাই গিরিসহিষ্ণুতা, চাই জলদের কৃপাবারি ; চাই ধরিত্রীর ক্ষমা, তবে যশঃ-কুতি মিলে, তােমাদের মাঝে যেন হেরি। উঠে কিবা হুলুধ্বনি, মাঙ্গলিক শঙ্খরব! আশীষি স্নেহা ঢালি শিরে,- ধা কৃপা পেয়ে দুটি দীর্ঘায়ু হইয়ে ফুট শশাঙ্ক-জোছনা মত ধীরে।

শুভ পরিণয়। সামন্ত (১) দাক্ষিণাত্য দেশে ভীমা-নীর নদী কল্লোলি মিশিছে যথা, পররাজ্যলিপ্স, রাজা দ্রোণায়ন রাজত্ব করয় তথা। সামন্ত রাজারা প্রতাপে তাহার ভয়ে নত, অনুগত ; কিন্তু হৃদি-মাঝে অশ্রদ্ধা, বিদ্বেষ দিনে দিনে পুঞ্জীভূত। কেবল নৃপতি রাজেন্দ্রগড়ের মল্লশূর শক্তি-বলে প্রতিহত করে রেখেছিল তায় ; তার পরলােক হলে তার শিশু পুত্র পুষ্পহাস-স্থলে ঝলক মন্ত্রীবর রাজকাৰ্য্য ভার লইল তুলিয়া বাধ্য হয়ে শিরােপর। এ এক সুযােগ দেখিল দুর্ব দ্ধি ধূৰ্ত্ত রাজা দ্রোণায়ন, উচ্ছাস গজেন্দ্রগড়েরে আক্রমিল আসি, ঝল্পকণ্ঠ করে রণ। শত্রু পরাজয়ি’ ঝল্লকণ্ঠ যবে সগৌরবে ফিরে পুরে, চকিতে বিধিল ভদ্রর্সোমা-আঁখি মরমে কটাক্ষ-শরে। (২) জ্যোৎস্না-প্লাবিত চারু সৌধালয়, কুসুমিত উপবন ; ফুল-বাস হরি’ ঢালিয়া সৌরভ ঢুলি' বয় সমীরণ। থাকিয়া থাকিয়া “পিউ পিউ পিউ” পাপিয়ায় তুলে তান, ত্যজি’ বীর-বেশ মন্ত্রী ঝল্লকণ্ঠ কি ভাবে বিভাের প্রাণ। এমত সময়ে লিপি একখানি দূত আসি দিল করে ; আনন্দে ত’ মন্ত্রী পড়ি বারবার চুম্বিল পুলকভরে। (৩) ঝল্লকণ্ঠের হ’ল সন্ধি এক রাজা দ্রোণায়ন-সনে, বিন্দুবিসর্গ কেউ না জানিল, হ’ল অতি সঙ্গোপনে।

উচ্ছাস . উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা র’ল ’তে দ্রোণায়ন-অঙ্গীকার “মন্ত্রী ঝল্লকণ্ঠে দিবে পরিণয় ভদ্রসেমা কন্যা তার”, সেই হ’তে মন্ত্রী সংগ্রামেতে শুধু বাধা মাত্র করি ভাণ গজেন্দ্রগড়ের বহুলাংশ ক্রমে দ্রোণায়নে করে দান। ( ৪ ) ; তথা ষড় ঋতু নীরা ও ভীমার সঙ্গম-সম্মুখে ভদ্রসােমার মরি পুষ্প-বাটিকা ; সুরম্য শৈলের নিঝরিণী ধরি ধরি পুষ্প-বাটিকা- পদ ধৌত করে মিশে গিয়া নীরা-নীরে ; ধরে মূৰ্ত্তি যেন সতত বিরাজ করে। তথা শিলা-পট্টে ফুল-সাজে বসি ভদ্রসােমা করলে নাচায় ময়ূরে, হীরক-বলয় বাজে রুনু রুণু বােলে। আশে পাশে উড়ে মধুপ-নিকর গুণ, গুণ, গুণ, স্বরে, D ৭১ উচ্ছাস ভদ্রসােমার হাসিমাখা মুখে ফোটা ফুল মনে করে। এ হেন সময়ে ধীর পায় আসি ঝল্লকণ্ঠ মৃদু হাসি’ ধরিল মৃণাল কর দু’টি চাপি ; আরক্ত নয়নে কৃষি ফণিনীর সমা গর্জিয়া কহিল ভদ্রসােমা ঘৃণা-স্বরে- “মন্ত্রি! বীরের নহে রণক্ষেত্র কেলি-কুঞ্জ, যাও দূরে।” ঝল্লকণ্ঠ সরি দুই পদ পিছে, . বিস্ময়-বিমুগ্ধ চিত বলিল, “প্রেয়সি । দেছ অধিকার, তাই এল অনুগত।” তীব্র কণ্ঠে বালা বলিল, “মন্ত্রি! বীরত্ব-বিমুগ্ধা নারী যদি করে শ্রদ্ধা, বীরত্ব-সম্মান ? অন্য ভাবে তায় ধরি’ কেমনে আসিলে নারী-অন্তঃপুরে ? কি সভ্য, কি শিষ্টতা সম্পূর্ণ তােমার অযােগ্যা এ নারী, ক্ষম মন্ত্রী প্রগল্‌ভতা।” বাক্‌-হত মন্ত্রী নিয়ে ভগ্ন প্রাণ, নিয়ে বড় ব্যথা বুকে ৭২ উচ্ছাস চ'লে গেল ফেলি দীর্ঘ তপ্ত শ্বাস, শিলাপট্টে মাথা ঠুকে বলে ভদ্রসােমা সজল নয়নে “ওগাে, প্রেম যদি আসে যােগ্যতা-গৌরব নাহি লয়ে কেন আসে, ব্যথা দেয় শেষে ?” ( ৫ ) কতই বুঝাল, প্রেম-প্রত্যাখ্যাত ব্যথিত লজ্জিত ঝল্লকণ্ঠ দ্রোণায়নে দত্ত প্রভু-রাজ্য চাহিল ফিরিয়া ; দ্রোণায়ন ক্ষুব্ধ মনে প্রিয় তনয়ারে কিছুই না হ’ল ফল ; প্রাপ্ত রাজ্য লুব্ধ দিল ফিরিয়া, মন্ত্রী শত যূথ-বল ধরি’ বাহু-যুগে, রােষে মনস্তাপে বাধাল তুমুল রণ; নষ্ট প্রভু-রাজ্য করিল উদ্ধার, কিন্তু ক্ষয় বহু ধন। প্রায়শ্চিত্ত হেতু এই অতি ব্যয় নিজ-কোষ হতে দিয়ে নিজ দরিদ্রতা ইল বরিয়া, প্রতিহিংসা-দীপ্ত হয়ে উচ্ছাস দ্রোণায়ন-রাজ্য তীৰ্যক গতিতে করিলেক আক্রমণ ; দ্রোণায়ন রাজা সে বীর বিক্রমে ভ্রাম্যমান ত্রিভুবন। স্ব-শিবিরে বসি ঝল্লকণ্ঠ, চক্ষে জয়শ্রী প্রফুল্ল জ্যোতি ; সন্ধি-পত্র দিয়ে দ্রোণায়ন-পুত্র- ভদ্র করিল নতি। হবে না এ সন্ধি, বহু ক্ষতিগ্রস্ত, রণে বহু প্রতারিত ; চাই প্রতিশােধ” বলিলেন মন্ত্রী- চাই শিক্ষা বিধিমত”। এই প্রতিশােধ বলি ভদ্রমুখ, গুপ্ত ছুরি বুকে হানি এ হেন সময়ে বলে দ্বারি যুড়ি পানি “ভদ্রসােমার আসিয়াছে দূত; মৰ্ম্মন্তুদ যাতনায় মুহূর্ত ভুলিয়া ডেকে আন ত্বরা তায়”। কেউ না বুঝিল কি দশা তখন, দূত আসি রোপ্যাধারে পলাইল দ্রুত, বলে ঝল্লক ৭৪ উচ্ছাস কুকুম-চৰ্চিত স্খলিত চরণে দিল লিপি এক, আদেশে পড়িল ধীরে কর্মচারী এক, “হে মম বাঞ্ছিত! পূজ্য! এস সগৌরবে ; "স্বার্থ-মােহ ত্যজি’ কৰ্তব্য-সাধনে বরশ্রী ধরেছ এবে। যবে এসেছিলে লইয়া বিলাস-বেশ ; “লজ্জায় ঘৃণায় ফিরায়েছি মুখ, এস এবে হৃদয়েশ।” পড়া শেষ হ’ল, লয়ে লিপিখানি ঝল্লকণ্ঠ প্রীতিভরে বলিল, “হে দেবি ! মূঢ় আমি, তােমা তরে করেছিনু পাপ, পেয়েছি সান্ত্বনা, মেছ মােহান্ধে তুমি ; এ মরণে সুখ ; সৰ্ব্ব গ্লানিহর তব লিপি পেছি আমি। ধন্য আমি ধন্য, হে দূত জঘিল! পূত প্রেম-নিদর্শন কিবা দিব আমি, এ মৃত্যু-মুহূর্তে ? তার প্রীতি-নিদর্শন প্রথমের লিপি এই ভিক্ষা, দিও তারে, করিল চুম্বন ; রাখিয়াছি বুকে, ৭৫ উচ্ছস এই ব'লে মন্ত্রী অঙ্গ-পরিচ্ছদ খুলিলেক ধীরে ধীরে। কৃপাণ-সূক্ষ্মাগ্র বক্ষ ভেদ করি’ পত্রের একাংশ নিয়ে হয়েছে প্রবিষ্ট, অবশিষ্ট ছিড়ি দিল দূতে চুম্বনিয়ে। তার পর জোরে বিদ্ধ কৃপাণিকা সবলে উন্মুক্ত করি’ বলিল জঙ্েিল নেও শত্রুরূপী মিত্রে মম যত্ন করি। “দেছে কৰ্ম্ম-ফল, প্রিয়া-প্রেমলিপি এ দেছে হৃদয়ে পুরে, সুখ-স্মৃতি নিয়ে মরিতে পারি, হে দূত! এ দিও রে।” বক্ষঃক্ষত হতে হ’ল রক্তোচ্ছাস, ক্ষীণ কণ্ঠ আর তার না পারিল কোন বাক্য উচ্চারিতে ; নিয়ে অশ্রু, হাহাকার গেল দূত চলি, ভদ্রসােমারে নিবেদিল সব গিয়ে রক্ত-প্ল ত ছিঃ পত্র, কৃপাণিক। দিল অশ্রু তেয়াগিয়ে। ভদ্রসােনার আঁখি-কোণ হতে দুটী মুক্তা-বিন্দু মত উচ্ছাস শুধু দুই বিন্দু অশ্রু ঝরি’ ধীরে হ’ল ভূমে নিপতিত। নিয়ে রক্ত-লিপ্ত প্রেম-উপহার, চুম্বি প্রেমে ভক্তি ভরে রাখিল পত্রিকা কবরীর মাঝে, কৃপাণিকা ধীরে ধীরে করাইল স্পর্শ, সিথির সিন্দুর সার হইল উজ্জ্বল, “শুভ পরিণয়” উচ্চারিল কণ্ঠ তার। ললাটে মস্তকে ৭৭

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

হতভাগ্যের মৰ্ম্ম-কথা। শীতের পরে মিষ্টি ফুলের রাঙা চোখে চাওয়া ; ফুলের বাস লুফিয়ে নিয়ে ছড়ায় ফাগুণ-হাওয়া। লতায় পাতায় ফুলের হাসি অনেক দিনের পর ; কোথা হতে গুঞ্জি আসে এতই মধুকর ? রঙ বেরঙের এত পাখী কোথা হতে এসে উঠ ল গেয়ে ? গানের লহর আছে কানে ভেসে। আসছে ভেসে কতই স্মৃতি আজকে হিয়ার পর ছেলেবেলার সেই সে মধুর—অতি সুখকর। ছেলেবেলায় এমি দিনে ভাই-বােন-সাথে মিলে খেলতাম কত সুখের খেলা বকুলগাছের তলে। মাথার উপর বকুল ফুল পড় ত ঝু ঝু ঝরে সাজিয়ে দিতাম তাদের সেই সে ফুলের ভূষণ ক'রে। গড়ে দিতাম ফুলের ভেলা, ভাসিয়ে দীঘির জলে তাই বাজাত, আর নাচ ত কতই কুতূহলে ! কতই বায়না কন্ত তার, কুলের গাছে উঠে কোচড় ভ'রে কুল পেড়ে যে দিতুম রাঙা ঠোটে। খেলতাম কত ছুটোছুটি নদীর তটে গিয়ে ঝােপের আড়ে হরিণ-শিশু দেখত দেখতাম—নদীর ঢেউয়ের উপর দুলত পাখীর সারি, ভেসে ভেসে আত যেত কতই দেশের তরী। উকি দিয়ে। ১১ উচ্ছাস সে সুখের দিন গেল কোথা ? দীৰ্ণ আঁখি দিয়ে এখন কেন মৰ্ম্ম-অশ্রু বেরােয় দরিয়ে ? সত্যি বটে, রাশি রাশি আজিও কুসুম ফুটে, সত্যি বটে, আজিও যাই সেই সে নদীর তটে। সত্যি বটে, আজিও গাছে পাকে কতই কুল, সত্যি বটে, আজিও ভাই-বােন আছে, নহে ভুল। কিন্তু এখন আগের মত ছােট্ট কিগাে তারা? এখন তাদের তেমি কি মন ? দেয় কি এখন ধরা ? এখন তাদের ছেলেপিলে ; ব্যস্ত তারা কাজে, অদৃষ্টের ফের-শুষ্ক মুখে এ ম্লান ছিন্ন সাজে কখনাে যদি সামনে পড়ি, নীচু করি’ মাথা দ্রুতপদে পাশ কেটে যায়, মৰ্ম্মে লাগে ব্যথা। রঙ্গালয়ের পটের মত অদৃষ্টের কি হায় পরিবর্তন। সেদিন কোথায় ? বুক যে ফেটে যায়। ; ** ৮২ আক্ষেপ জল-বিম্ব এ জীবন কাল-সিন্ধু-বুকে যাকে মিশে কোন্ দিন। কে বলিতে পারে হায়! রােগে শােকে, চিন্তা-বিষে ক্রমে তনু ক্ষীণ। থাকিয়া থাকিয়া যেন মৃত্যু-ঘণ্টা-ধ্বনি আসে পরাণের কাণে ; চমকিয়া উঠে, প্রাণ, কি ব্যথা মরমে জাগে বিধাতাই জানে। এ বিশাল বিশ্ব-বুকে পড়িয়া রয়েছি কোথা বালুকণা-মত, কি হেতু সৃজন মাের, লেগেছি কি ধরা-কাজে আজো বুঝিনা ত। হেন অকর্মণ্য জীব কেন ধাত-সৃষ্টি-মাঝে, যাহার মরণে এক বিন্দু অশ্রু কেউ ফেলিবে না, দাগ কারাে পড়িবে না প্রাণে ? স্ত্রী-পুত্র-বেষ্টিত ক্ষুদ্র সংসার-কারায় রুদ্ধ যার ক্ষুদ্র মন, আসিয়া বাহিরে কভু বিলাতে যে পারিল না একটু জীবন, উচছু সি দীন-দুঃখী-আর্ত-হৃদে একটুও আসন যে পারিল না নিতে, ব্যথিতের হিয়া’পরে যে না স্নিগ্ধ হিয়াখানি গারিল মিশা’তে, অতি হতভাগ্য সেই, নিষ্ফল জীবন তার শুধু অশ্রুময় ; বৃথাই জনম তা’র ; হেন জন্ম যেন আর কাহারাে না হয়। ৮৪ তুমি ও আমি । তুমি আমি মুখখামুখী, অতি কাছে—অতি দূরে ; ভালবাসি-নাই বাসি, তুমি কিন্তু বাস মােরে। যদিও তােমায় ভুলি, তুমি না ভুলিতে জান ; শত উপেক্ষিত হয়ে বুকের উপর টান। প্রেমের হৃদয় তব জানে শুধু প্রেমদান ; একবিন্দু প্রেম সিন্ধু তরঙ্গে ভাসায় প্রাণ। যে প্রেমিক, সেই চায় তব প্রেম প্রেমময় । তব প্রেন মরুভূর মায়া-মরীচিকা নয়।

উচ্ছাস প্রেমে নাই প্রতারণা, নাই বিচ্ছেদের ভয় ; তব প্রেম অনাবিল, সুখময়, শান্তিময়। তবু কেন তবু কেন তব প্রেম ভুলে মন, কি প্রেম-মদিরা পানে উন্মত্ত গাে অনুক্ষণ? তবু কেন তােমা’ ভুলে ভেসে যায়—কোথা যায় ? চৈতন্য হ’লনা অহহ! শত ব্যথা, যন্ত্রণায়। একি দিশা? একি তৃষা ? একি আকাঙ্ক্ষার দাস ? কবে যাবে মােহ-ঘাের, হবে দীপ্ত চিদাকাশ ?

মায়া। ঝিকিমিকি ঝিকিমিকি গগনে বেলা ঝিকিমিকি তরুশিরে কিরণমালা। পা দুটী ছড়াইয়ে বালির রাশ নিয়ে নদীর তটে ঘর গড়িছে বালা। কিরণমাখা ঘােট ঢেউগুলি আসিয়ে তট চুমি’ পড়িছে ঢলি। মধুর গান নিয়ে তরণী আসে ধেয়ে, বালিকা দেখেনা তা নয়ন তুলি। বিহগ নীড়ে যায় আকাশ ছেয়ে ; গােপাল ঘরে যায় গােধন নিয়ে। খেলার সাথী ক’টি হরিণ-শিশু ছুটি মায়েয় পাশে যায়, দেখেনা চেয়ে । “বেলা যে গেল বাছা!” শুনি এ স্বরে চমকি উঠে বালা ; আনত শিরে উঠায়ে দেখে-দূরে তপন ডুবে ধীরে আলােটী নিয়ে সব গভীর নীরে।

উচ্ছাস বেলা যে গেল বাছা! ঘরে গাে আয়” মা ডাকে, ধীরে ধীরে আঁধার ছায়। সাধের ঘর ফেলে যেতে পা নাহি চলে, কি করে ভেবে বালা আকুল হায় ! ماط নিবেদন। কে আমি? কোথায় আমি ? —ভব-মায়া-পান্থ-বাসে- একি বল হায় ! —ঢলে পড়ে আয়ু-রবি, কাল-নিশা ঘনাইয়ে আসে পায় পায়। যেতে হবে ? অহহা কোথা? কোন্ দূর পর পারে ? কি আছে সম্বল ? সংসার-মমতা ঠেলি কেমনে যাইব ? ও গাে! প্রাণে কোথা বল ? বড় সাধে সাজায়েছি সংসার-কানন, বিন্দু মিটেনি পিয়াস ; জেলল না হৃদয়ে বহ্নি, সরে যাও, টুটাও না প্রাণের বিশ্বাস। ভুলে আছি? বেশ আছি, কেন ভাঙ্গ ভুল ? তুমি কে গাে! পায় পড়ি ; বাসনা-তরঙ্গে রঙ্গে এখনাে জীবন-তরী দিতেছে যে পাড়ি। হে বিধাতঃ! এ কি লীলা ? এ লীলা-রহস্য তব বুঝিতে না পারি । কেন গড়? কেন ভাঙ্গ? মরমে লাগে না ব্যথা হেরি আঁখি-বারি ?

উচ্ছাস সৃষ্টির প্রভাত হতে আসে জীব-কেঁদে আসে, কেঁদে চলে যায় ; হতভাগ্য জীব-জন্ম কঁদিবারে শুধু ভবে কোন্ পাপে হায় ? কৰ্ম্মফল-ভােগ-হেতু যদি এ সংসার-কারা, কেন হেথা মায়া ? সংসারের মােহ-ফাসে জীবে যে জড়ায় মায়া কঠিনহৃদয়া। দিয়েছ বিবেক-অস্ত্র ? দেছ বটে দয়াময় । মঙ্গল-কারণ। মায়ার শৃঙ্খল ভবে কৃ’জন ছেদিয়ে যায় বীরের মতন ? অধম জীবের যে গাে জন্ম-মৃত্যু অনিবাৰ্য্য, যন্ত্রণা অপার ; তােমার করুণা বিনা হে করুণাময়। কোথা তাদের নিস্তার ? চিন্তানলে জ্বলে প্রাণ, চাও গাে ফিরিয়া চাও, বড় ব্যথা পাই ; বারস্থার জন্ম-মৃত্যু অহহ কি কঠোর দণ্ড! মুক্তি কি গাে নাই ? দাও মুক্তি মুক্তিদা! প্রাণের দেবতা! প্রভাে ! পতিত-তারণ! আর এ সংসারে এসে । যেন না লইতে হয় মায়ার বাঁধন।

উচ্ছাস মায়ার বাধন যে গাে অধম মানব আমি বড়ই মমতাময়, দুৰ্বলহৃদয় কেমনে ছেদিব? প্রাণে বড় ব্যথা হয়। ঐ চরণের ছায় দয়াময়। তাই চাই জুড়া’তে জীবন ; যেন না লইতে হয় আর এ সংসারে এসে মায়ার বাঁধন। ৯১ বিষাদ-কাহিনী। (১) ক্ষিপ্ত হইয়াছে পিতা, পুত্রে তা’র যত পরিজন প্রদানিল যুক্তি, করাইতে ক্ষেপাকালী-বলয়-ধারণ। কালীর মন্দির—দূর পথ, বিষম দুর্গম সেই স্থান, তারকেশ্বর হইতে পশ্চিমে প্রায় দশ ক্রোশ, নহে আন। শীত-পদক্ষেপ ধরা-বক্ষে, হিমবায়ু হয় সঞ্চারিত ; অগ্রহায়ণের আট দিন সবে মাত্র হইয়াছে গত।. বৃহস্পতি বার, প্রাতঃকাল, দেছে দেখা পূরণিমাতিথি ; স্বজন উন্মাদে ল’য়ে সাথে বাহিরিল করিয়া প্রণতি কালীর চরণে ভক্তিভরে, কালী-নাম করি’ উচ্চারণ অভাগিনী উন্মাদ-ঘরণী ঢালি’ অশ্রু, ব্যাকুলিত মন ভূমিতলে বিলুষ্টিয়া কায়, পতি-পাদোদক ল’য়ে শিরে বারম্বার করুণভাষায় প্রার্থনা করিল সকাতরে- “মা কালি। আমার প্রাণেশ্বরে সপে দিনু চরণে তােমার ; নীরােগ করিয়ে ফিরে দিও, শুভঙ্করি! স্নেহ-করুণার রেখাে দৃষ্টি যাত্রাপথে যেন, নাহি ঘটে কোন অমঙ্গল ; কে জানে তা পাষাণীর কাণে গেল কি না? আঁখি ছল্ ছল পুরবাসী করিল মানস—দিবে পূজা হলে পূর্ণ কাম, কি জানি পাগল কেঁদে কেন করি গেল অগ্রজে প্রণাম। = এই কবিতাটি ১৩১৫ সালের ২৫শে চৈত্রে লিখিত হইয়াছে।

উচ্ছাস গৃহ ছাড়া ক্রোশ পরিমিত, শিয়ােপরি উড়িছে গৃধিনী পশ্চাতে দেখিল তার এক রুগ্ন পুত্র, পরমাদ গণি ভগবানে প্রার্থিল মঙ্গল, আসে প্রাণে আশঙ্কার ছায়া ; মন চায় করিয়া আহ্বান পঞ্চ হতে আনে ফিরাইয়া। ইঙ্গিতে ঘূর্ণিত কালচক্র ; হতভাগ্য উদ্বিগ্ন হিয়ায় “যাত্রা-পথে বাধা অনুচিত’ ভাবি এল গৃহে ফিরে হায় । (২) গুটাইয়া কনক-কিরণ পশ্চিম আকাশে ডুবে রবি ; মৌনসন্ধ্যা আসে ধীর পায়, কি একটী বিষাদের ছবি নয়ন-সমুখে ফুটে উঠে, করি’ উঠে পেচক ফুৎকার, “টিক্ টিক্‌” করে টিটিকি গৃহে-হেথা হােথা চারিধার। চিন্তিত পাগল-পুরবাসী, আশ্চান্ করে প্রাণ-মন ; হেন কালে সহযাত্রী তার এল ল’য়ে বিরস বদন। “ওগাে! কোথা পাগল মােদের”? আকুলি’ জিজ্ঞাসে আহা সকে প্রত্যুত্তর-ঘাের মর্মভেদী, শত বজ্রাঘাত শিরে, ভবে এত ব্যথা না জানিত আগে, মাথা কুটি করে হাহাকার ; অনীরে সিক্ত হয় ধরা, ঘনাইয়ে আসে অন্ধকার। (৩) অপসৃত তমঃ-জাল, উষা দিল দেখা রক্তিম আভায় ; শােকান্বিত গেল কত জন পাগলের অন্বেষণে হায় ! অগ্রে গেল সে তারকেশ্বরে--নিশীথে সে যথা অদর্শন নিরমম দেবতার মত ছিন্ন করি মমতা-বন্ধন। হাট মাঠ যাত্রী-দল-মাঝে পাতি পাতি খুজে চারিধার ; নাই-নাই—আছে পুলিশের ডায়েরীতে নাম-ধাম তার।

উচ্ছাস জানি কি সন্দেহে তথায় ছিল বন্দী অর্ধ রাত্রি-দিন । পরীক্ষায় উন্মাদ জানিয়া পুলিস কর্তব্যজ্ঞানহীন দেছে ছাড়ি’ অকুণ্ঠিত চিতে, গৃহে তার না দিয়ে বারতা ; দুঃসময়ে কেন নিরদয় এ ধরার মানুষ, দেবতা ? তাই হেথা এত শােক, তাপ, এত দুঃখ, এত হাহাকার ; ভাগ্যদোষে বৃথা অন্বেষণ, পণ্ডশ্রম, সার অশ্রুধার। গেল দিন, গেল মাস, বর্ষ, না মিলিল কোথাও তাহায় ; সেই গেল—আর না ফিরিল, পােড়াস্মৃতি জাগিয়ে কঁদায়। স্বপনের ছায়াময় পটে দেখা দেয় কত নিশি আসি ; নিদ্রাভঙ্গে তপ্ত অনীরে উপাধান-শয্যা যায় ভাসি। কোথা কোন্ এসেছে উন্মাদ, কিংবা কোন্ এসেছে উদাসী ; আজো যায় আশার আশায় তথায় নির্বোধ পুরবাসী। আজো তার শীর্ণা-কাঙ্গালিনী জায়া চেয়ে আশা-পথ-পানে পৃথিবীর দেবতায় সাধে রাতদিন কাতররােদনে। হতভাগ্যছেলেগুলি তা’র আজো ডাকে—“কোথায় দেবতা! আমাদের ধরার ঠাকুর,-কোথা ওগাে স্নেহময় পিতা” কে দিবে উত্তর ? বহে বায়ু শুধুই সে সকরুণ স্বর । ধরা-বক্ষে হয় ত’ ধ্বনিত আজ পাঁচ বৰ্ষ নিরন্তর। .

কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? বল না দেবতা কোথা? ঘুচে না ত মৰ্ম্ম-ব্যথা, দেবতা ভাবিয়া অশ্রু ফেলি যার পায়, পূজি যার পদ-মূল ঢালি অশ্রুসিক্তফুল, সে ত গাে পাষাণ-সম, ফিরে নাহি চায় ? 'কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? কাহারে দেবতা বল তােমর সবায় ? মমতার খােলাপ্রাণে সে কি কভু নেয় কানে ব্যথাময় মরমের দুটো কথা হয়। উষ্ণ তপ্ত অশ্রুজলে তার কি পরাণ গলে ? দগ্ধপ্রাণ-ভস্ম হেরি’ সে কি ব্যথা পায় ? কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? সে কি গাে দুখের কালে নেয় টেনে হে-কোলে ? দেয় ধীরে স্নেহ-হস্ত বুলাইয়ে গায় ?

উচ্ছ সি এ বুকে বিষম চিতা, বল সে দেবতা কোথা ? এ সারা সংসার খুজে আমি মৃতপ্রায়, কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? কত গুণবান্ তিনি নাহি জানি, নাহি চিনি, আমার দেবতা এক ছিল গাে ধরায় ; সে যে বড় স্নেহময়, কৃপাময়, গুণময়, তাহার গুণের কথা না আসে ভাষায় ; কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? ; কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? আমার দেবতা যেই প্রত্যক্ষ দেবতা সেই, গড়া তার মন-প্রাণ স্নেহ-মমতায় ডাকিতে নেয় বুকে, রাখে সদা চোখে চোখে, একটু মলিন মুখ হেরি’ ব্যথা পায়, কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? কাহারে দেব বল তােমরা সবায় ? আমার দেবতা চোখ শত শেল, অগ্নি-শিখা ১৬ উচ্ছাস নেয় বুকে, সম শুভ যদি থাকে তায় ; কুশাঙ্কুর মাের পায় বিধিলে মূছা যায় ; কারে শান্তি-স্বস্ত্যয়ন মঙ্গল-আশায় কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? কাহারে দেবতা বল তােমরা সবার ? আমার-আমার তিনি বিপদে বান্ধব, জ্ঞানী, রােগে বৈদ্য, অন্নদাতা ক্ষুধায় তৃষ্ণায় ; মন্ত্রণায় মন্ত্রী, গুরু, জ্ঞানশিক্ষা-কল্পতরু ; মুখে মুখী, দুঃখে দুঃখী, সম্পদ, সহায় ; কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? মাের সে দেবতা সৰ্ব্ব, চতুৰ্বর্গ, সুখ-স্বর্গ, মাের সে দেবতা পিত, প্রণমি তাহার ; হতভাগ্য আমি হায় ! হারায়ে সে দেবতায় * কত কঁাদি দিবা-যামী উন্মাদের প্রায়। কাহারে দেবতা বল তােমরা সবায় ? * ১৩১১ সাল ৯ই অগ্রহায়ণ বৃহস্পতিবার ভক্তিভাজন পরম দেবতা পিতা ঠাকুর শ্রীযুক্ত কৈলাসচন্দ্র দাস মহাশয় উন্মাদনােগস্তাবস্থায় নিরুদ্দেশ হইয়াছেন।

সুদূরে। এ স্থান কি সুখকর। হেথা শুধু গীতি, সৌরভ বিমল, নাহি হিংসা, দ্বেষ, পাপের অনল, পশিতে না পারে জন-কোলাহল হেথায় অপ্রীতিকর নীলা স্বচ্ছতােয়া ক্ষুদ্রা কল্লোলিনী বহিছে সম্মুখে তুলি’ কুলু-ধ্বনি, শােভে সুবিস্তৃত চিত্রলেখা মত নীলাকাশ-শিলােপর। পিছনে পড়িয়া দূরে পল্লীবাস, তথাকার নর-দূষিত নিশ্বাস এসে না দূষিতে পারে এ বাতাস, এ বাতাস স্নিগ্ধতর ; হেথাকার পাখী উন্মুক্ত আকাশে ঢেলে গীতি, যায় নীলাকাশে ভেসে, নাহি মানবের কুটিল দৃষ্টির তীক্ষ্ণ বিষাক্ত শর। ৯ উচ্ছাস হেথা অর্থ নিয়ে, তুচ্ছ স্বার্থ নিয়ে, শৈশবের ধূলা-খেলা ভুলে গিয়ে, মমতার ডাের নিমিষে কাটিয়ে, ভাই নাহি হয় পর ; মার স্তন্য-সুধা, পিতার যতন যায় নাহি ভুলে পুত্র পেয়ে ধন, নিশীথে রমণী পতি-বুকে নাহি হানে ছােরা তীক্ষ্ণতর। নাহি হেথা অর্থ-প্রাধান্য, গৌরব, নাহিক মামলা, খুনােখুনি-রব, শামলা মাথায় আইনজ্ঞ হেথা রয়নি প্রসারি’ কর ; নিয়ে রাজ্য কিংবা নিয়ে কোন কর রাজায় প্রজায় বাধেনি সমর, ব’য়ে যায় নাই রক্ত-শ্রোত হেথা, উঠেনি কাতর স্বর। হেথা নাহি পাপ-প্রলােভন-ভয়, নাহিক স্বার্থের জয়-পরাজয়, এ যে গীতি-গন্ধ স্নিগ্ধ আলােময় পূত স্থান সুখকর ; হেথা নাহি বিধুমুখে বিষ-রাশি, প্রেম নিয়ে লুকোচুরি, গলে ফাঁসি, হেথা নাহি ছল, নকে রূপসী রঙ্গালয়ে নৃত্যপর।

উচ্ছসি পূত স্বর্ণচ্ছটা নিয়ে আসে উষা, কুরঙ্গ জাগায় প্রাণে ভালবাসা, শাখায় শাখায় সুধাকণ্ঠে তুলে বিহগ মধুর স্বর ; বরষা-নিদাঘে বৃক্ষ ছত্র ধরে জানায় সখ্যতা সরল অন্তরে, ঢালি’ ফুল-বাস সমীর সঞ্চরে, সৌরভিল এ অন্তর। এ স্থান কি সুখকর।

শ্মশানে। ধূধূ ধুধু ধূধু জলে চিতা। অহাে ! -ঐ যেরে জ্বলে বহ্নি জ্বলে জোরে আবেষ্টিয়া মেহময়ী লতা। শারদ জ্যোৎআ-মত নদীর ঢেউয়ের মত ফুলের হাসিটী মত যেই আমাদিগে দিয়ে, প্রাণের মমতা দিয়ে রেখেছিল, তুল্য যার নেই । করুণা-নিঝরমন্ত্রী স্বর্গাদপী গরীয়সী মায় মূঢ় আমি চিতানলে হাহাকারে দিছি তুলে প্রাণে নিয়ে সহস্র চিতায়। স্নেহ সে স্নেহ-মমতাময়ী ওরে, কি নিষ্ঠুর এই দেশাচার। যেই পিতা, যেই মা আজীবন স’য়ে ব্যথা পালে পুত্ৰে প্ৰদানি’ খাবার ; তাদেরে মৃত্যুর পরে ঘরের বাহির করে, ঘরে দেয় গােবরের ছড়া ; * বিগত ১৩১৬ সাল ১৬ই কার্ত্তিক বুধবার প্রাতঃকালে পরমারাধ্যা মাতা- ঠাকুরাণী দেবী পরলােক গমন করিয়াছেন। ১০১ উচ্ছাস ( কি নির্মম এ বিধি রে !) লইয়া চিতার পরে দেয় পুত্র মুখে অগ্নি-নুড়া। অহহ! ধূধূ পুড়ে যায় সব! কত মেহ, কত মায়া, কতই করুণা, দয়া চলে যায় রেখে হাহারব। হয় ভস্ম স্বর্ণকায়, এ চোখে কি দেখা যায় ? নিমিষে ফুরায় সব খেলা ; কতই দিনের হায়! বন্ধন টুটিয়া যায় ওরে, এদেশ ছাড়িয়ে সবে পালা। ওরে, দয়া মায়া নাই হেথা । হেথায় পাষাণ সবে, হলে কেমনে রবে সৰ্বস্ব খােয়ায়ে সয়ে ব্যথা ? যদি মমতার প্রাণ র’ত হৃদে বিদ্যমান, তা হলে চিতায় তুলে মায় এখনাে আছি কি সুখে ? ছেড়ে দে আঁকড়ি রেখে কেন তােরা কাদা আমায়? অহহ! পুড়ে যায়--সব পুড়ে যায় ! সােণার সংসারখানি পুড়ে, ঐ হা-হা-ধ্বনি ; শশান কে দেখিবি রে আয়, চিতা’পরে ঢাল, জল, ঢাল, জল, ঢাল, জল, হেথায় কি নাই নদী-বারি ? শত শত প্রাণ মিলি’ এ চিতা নিয়ে ফেলি শান্তিময়ী দেবী রে দে ফিরি।

উচ্ছাস বিষাদ-আঁধার দূরে মা, মা, মা, মা, ওমা! আয়, আয়। চিতা-ন-ধােয়া-রাশি ফেলিছে আকাশ গ্রাসি, সৌরকর আঁধারে নিভায়। চিত-বক্ষ বিদারিয়ে এস জ্যোতির্ময়ী হয়ে, পুনঃ হক দীপ্ত এ ধরণী ; যা সরে, পুনঃ ফিরে তুল গৃহে আনন্দের ধ্বনি। ওমা! আয়, হনে নিদয়া । তাের নাড়ি-ছেড়া ধন, তাের আপনার জন কেঁদে ডাকে, হয়না কি দয়া ? তাের যে দয়ার প্রাণ, হৃদে করুণার বান, প্রতিটি সরলতা-মাখা ; বিরূপ হইতে এত কখনও দেখি না ত? হাসিমুখে এসে দেমা দেখা। দেখা দেমা! পুড়ে যায় প্রাণ! শুষ্ক হয়ে যায় গলা, বড় তৃষা, এই বেলা স্তন্য-সুধা কর মুখে দান। তেম্নি স্নেহময়ী বেশে তেম্নি মধুর হেসে চুমাে খা মােদের বার বার ; তেম্নি পীড়ার কালে খেয়ে, হাতটী গালে ব’স নিয়ে ম্লান মুখ-ভার। কৈ, কৈ, কৈ মা ! এলি না ? এত কাঁদি, এত ডাকি, তবু দিয়ে গেলি ফাকি ? এ সংসারে সবি কি ছলনা!

উচ্ছাস মিছা স্নেহ ? মিছা মায়া ? মিছা স্নিগ্ধতর ছায়া ? দু’দণ্ডের-সবি কি স্বপন? মাথা যে ঘুরিয়ে যায়, ভাবিতে না পারি হায়! হয়ে গেছি, কি যেন কেমন। । ধূধূ ধূধূ ধূধূ জ্বলে চিতা। ওরে, আয় সবে মিলি নিভাই সলিল ঢালি’, মােরা র’তে মা যাইবে কোথা ? আয়, করি চূরমার শ্মশান-কলসী ছার, মৃত্যুরে খেদাই দূর পথ ; মাগাে ! বুক ফেটে যায়, ফেটে যায় -ফেটে যায়, আয়, আয়, মাথার শপথ। ওরে, কেন তােরা দিস্ হরিবােল ? নাই, নাই, কিছু নাই ? একটু অস্তিত্ব নাই ? নাই স্নেহময়ী-শান্তি-কোল ? কোথা শত বর্জ! এসে পড়ে শিরে, অট্ট হেসে লও গ্রাসি চিতার অনল! উহু! প্রাণ যায় জ্বলে, হে সিন্ধো! অতল তলে নেও এসে, ফুরা সকল। ১০৪ সন্ধ্যায়। ডুবে যার রবি যদি, নিয়ে আলাে-ছবি । আকাশে, যদি, মিশে ফুল-হাসি আঁধারের ছায় হতাশে, নিয়ে বিহগেরা যায় চলিয়া, তবে, কি সুখে রহিব বাপী-তীরে একা যদি, মধু গান বসিয়া ? যায়, অদূরে তটিনী কি বিষাদ-গীতি ঢালিয়ে ? যায়, ব’য়ে সমীরণ কি মরম-শ্বাস ফেলিয়ে ? ওগাে, এইত বিষাদ- আকুলত-মাঝে আমি, কেমনে রহিব ? পরাণ যে কেঁদে উথলা! এবে, কেউ কিরে নাই ? কত সখা সাথী ছিল যে? গেল, কোথা একে একে, পাইনা, এতই খুঁজি যে? ১৪ উচ্ছাস সবে, সন্ধ্যা, এখনাে নিবিড় আঁধার আসে না ; গেল, এরি মধ্যে স’রে নিয়ে শত আশা, বাসনা? গেল, এতই দিনের ভালবাসাবাসি কোথা রে? এবে, নিলেনা ত কেউ একটু যাতনা ব্যথা রে ? ওগাে, এতই ছলনা নিরাশার মাঝে একাটী আর, র’ব কি আশায় করে নিয়ে ভাঙা বীণাটী ?

অনুতাপ। দূর—না ভাবিতে পারি সংসারের কথা আর, ভেবে ভেবে তনু ক্ষীণ, প্রাণ পুড়ে ছারখার। শুধু আশা-শুধু তৃষা, একটু মিটেনা কিছু, আজন্ম ধরিয়া শুধু ছুটি মায়া-মােহ-পিছু। ধন-লিপ্সা-এযে মুগ্ধ অলি-গড়া মধুক্রম, সৌন্দর্যের তৃষা—মৃগ-মায়া-মরীচিকা-ভ্রম। ফুটে ফুল, ঝরে পড়ে, দু’দণ্ডে ফুরায় লীলা, তুমি কার ? কে তােমার ? মিছে ভাই খেলা-দোলা। একি খেলা ? বুঝিনা ত কত ঢেউ-সম এসে মায়ায় মজিয়ে গেল কঁাদা’য়ে কোথায় মিশে। যারা গেল ফিরিল না—চাহিল না ফিরে আর ; ছিড়ে গেল এক একটী এই হৃদপিণ্ড-তার। অনুদিন কি যন্ত্রণা, শােক-ব্যথা তীব্রতর, আর নাহি সহ যায়, কাপে শীর্ণ কলেবর। এদিকে নীরবে-প্রতি প্রশ্বাসে চলিয়া যায় আয়ুকাল, কাল-নিশা আসে ঘেসে পায় পায়। বহে হিম প্রভঞ্জন মরণ-সঙ্গীত গেয়ে, মৃত্যু-কুহেলিকা-ধূমে শূন্য বব্যাহ্ যায় ছেয়ে। উঠে কি কর্কশ কণ্ঠ শিবাদের কোলাহল, তাথৈ শ্মশান-বুকে নেচে উঠে প্রেত-দল। ১০৭ উচ্ছাস অহহ সখা! প্রাণ-সখা ! ভয়ে দুরু দুরু হিয়া, মৃত্যুঞ্জয় ! নেও বুকে দুর্দিনে অভয় দিয়া। সংসারের প্রলােভনে কতবার মত্ত হয়ে, তােমা ভুলে প্রেমময় ! কুপথে গিয়েছি ধেয়ে। তখন ডেকেছ কত, নিতান্তই অনিচ্ছায় নিমেষ পিছনে চেয়ে পুনঃ ফিরে গেছি হায়! এখন কেটেছে নেশা, আপন দীনতা-মাঝে আপনা কুড়ায়ে পেছি, স্মরিয়া তা মরি লাজে। হে অনন্ত ! হে প্রাণেশ! আমি মূঢ়, ক্ষুদ্র কণা পাপ-মলা-বিজড়িত, ধূয়ে মুছে কি নেবে না ? মায়াময় ! জন্ম-মৃত্যু এ সৃষ্টি-রহস্য তৰ বুঝিতে না পারি, এতে কি যে জ্ঞান অভিনব। জ্ঞানময় ! থাক তুমি সৃষ্টির গূঢ়ত্ব নিয়ে, ক্ষমাগুণে কৃপাগুণে করুণার চোখে চেয়ে এ বিন্দুটুকুরে নেও অঙ্গে তব মিশাইয়া, নেও স্নিগ্ধ শান্তিলােকে মহাসিন্ধু, কল্লোলিয়া।

“গাথা সম্বন্ধে বিজ্ঞ লেখক ও সংবাদপত্রের অভিমত। “গাথা” লেখকের * * * জ্ঞান ও ভাব যে পূর্ব হইতেই পরিস্ফুট তাহা “সংসারের ছবি,” “বাঙ্গালীর দেশ,” ও “লুৎফউন্নিসা’তে বেশ টের পাওয়া যায়। প্রথম লেখা, অথচ লেখাতে কোন দোষ দেখিতে পাইলাম না। ইহাই পূৰ্ব্ব সংস্কারের প্রমাণ। অধিক কি লিখিব, “গাথা পাঠ করিতে করিতে স্থানে স্থানে লােঞ্চ হইয়াছে। ভগবানের শ্রীচরণে প্রার্থনা করি, এইরূপ সহৃদয় লেখকের কলমের উপর তিনি পুষ্প বৃষ্টি করুন। ** “ভূপ্রদক্ষিণ” প্রণেতা শ্রীচন্দ্রশেখর সেন Bar-at-law. This is a book of poems in Bengali and we have gone through the pieces with the greatest pleasure. We have no hesitation in saying that the author has successfully wooed the Muse and that his verses bear the stamp of a poet. The conceptions are really poetic and in some instances the author has taken a lofty flight. We congratulate him on his production and hope and trust his future attempts will be equally successful. -Bengalee. এই পুস্তকখানি পাঠ করিয়া আমরা পরম প্রীতিলাভ করিয়াছি। স্থানে স্থানে কবিতার সৌন্দৰ্য্য বেশ ফুটিয়া উঠিয়াছে। ভাব ও ভাষা বসুমতী। অতি সুন্দর! যে গুলি সামাজিক, যে গুলি সংসারের ছায়া লইয়া লিখিত, সে গুলিতে কবিত্ব আছে *** সে গুলির ভাষা সহজ, ভাব সৌন্দর্যময় so -সময়। এবং সে গুলিতে শিখিবার অনেক কথা আছে। বাঙ্গালীর দেশ” নামক এ ধরণের একটা কবিতা আমরা নিম্নে উদ্ধৃত করিয়া দিলাম। —বঙ্গবাসী। এই পুস্তকখানি পাঠ করিয়া আমরা বিশেষ প্রীতিলাভ করিয়াছি। অধিকাংশ কবিতাই মিষ্ট লাগিল। নূতন লেখকের এরূপ রচনা সবিশেষ প্রশংসাৰ্হ। লেখককে পুনরায় লেখনী ধারণ করিতে দেখিলে আমরা সুখী হইব। আমরা এই পুস্তকখানির অধিকাংশ কবিতাই পাঠ করিয়াছি ও স্থানে স্থানে গ্রন্থকারের লেখনী-চাতুর্যের পরিচয় পাইয়াছি। * * * “লুৎফ উন্নিসা” শীর্ষক কবিতাতে নবীন কবি চরিত্র-চিত্রনের যে আদর্শ দেখাইয়াছেন, তাহা প্রকৃতই প্রশংসনীয়। “বাঙ্গাণীর দেশ” কবিতায় বাঙ্গালীর যে চিত্র দেখাইয়াছেন, তাহার কয়েক পংক্তি উদ্ধত করিয়া পাঠকগণকে উপহার দিলাম । -মেদিনী-বান্ধব। কাগজ ও ছাপা উত্তম। ভাষার বেশ লালিত্য আছে। “বাঙ্গালীর দেশ” কবিতায় বাঙ্গালী-চরিত্র সুন্দর অঙ্কিত করিয়াছেন। নীহার। পূর্ণচন্দ্রের কবিতা পাঠ করিয়া বুঝিয়াছি, যদি চেষ্টা থাকে, ইনি কালে * * * সুকবির উচ্চাসন লাভ করিতে সমর্থ হই- * পুস্তকে ৩৫টা কবিতার সমাবেশ দেখিলাম। তন্মধ্যে “হায় ! বঙ্গে বক্রদৃষ্টি কোন্ দেবতার”, “উচ্ছাস”, “আমার সরলা”, “শ্মশান”, “নিশীথ সঙ্গীত”, “মুমূষু সুলতান মামুদের প্রতি” এই কবিতা- গুলি বেশ হইয়াছে। —সেবিকা। “গাথা” কলিকাতা ১১৫৪,গ্রে স্ট্রীট “বসুমতী”-পুস্তক বিভাগে ও ২০ নং কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট মজুমদার লাইব্রেরীতে প্রাপ্তব্য। সুন্দর, কাগজ ও ছাপা, মূল্য। ছয় আনা মাত্র। শ্রীমান্ বেন।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Uchchwas

Author
Das,purnachandra
Title
Uchchwas
File name
Uchchwas
Text
OCR done
Citation
1911
Published
2009/11/28
Publisher
Surendranath Bandopadhyay,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
126
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Das,Purnachandra
DLI number
513430
Barcode
4990010020408.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
E4FmGbTy3nv
Download PDF

Uchchwas