Bally Sadharan Granthagar
Kobir Prem Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কৰিয় প্রেম
শিবপন চক্রবর্তী
ন
প্রাপ্তিস্থানঃ-
ছি, এম্বাইরে
কর্ণওয়ালিশ, কলিকাতা ।
এমনিল কুমার কুখ্যায়।
দাম-বারাে আনা।
[ লেখক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।]
২
মিট
ইইণ্ডিয়া প্রেম হইতে
উৎসর্গ... * : 'আমার শ্রদ্ধাস্পদ রসসাহিত্যিক “মানে মানে,” “শ্যামসুন্দর” প্রভৃতি হাস্যকৌতুক নাটকের রচয়িতা শ্ৰীযুত মৃণাল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়কে আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ্য। স্নেহাস্পদ- ১৩৪৮ সালের প্রথম মাসের শুভ প্রথম দিনে।
কবির প্রেম ( নাটিকা)
৩০০
১
লেটার বক্স (নাটক না)
অন্তর সৃষ্টি
৪৩
জীবনের গতি
.
৫২
রাত্রি বারােটা
৮
জীবনে রবির আলো
২০
কবির প্রেম
(নাটিকা)
প্রথম
ক্লাব রুম (Club Room )
( নরেন, দুর্লভ, শেখর, অতনু, অমর ও সুধা আসীন )
( কয়েকজন তাস খেলিতেছে, একজন খবরের কাগজ
দেখিতেছে, একজন হারমােনিয়াম বাজাইতেছে)
নরেন। ফোর ডায়মণ্ডস্
অপর সকলে। নন-নন-নো
দুল্লভ। বাঃ বাঃ—ওরা ত বেশ ক্লাবে এসে ডায়মণ্ডে মেতে
উঠল হে; সুধা ! তুই ভাই একখানা গানের মধ্য
দিয়ে আমাদের না হয় একটু আনন্দ দে।
শেখর। হু—ঠিক ধরেছি ! ও গাইবে আমাদের এখানে।
বলে—ওর এখন গানের কত প্রশংসা ! রেডিওর
বড় একজন সুগায়ক ; অজই ত সন্ধ্যার সময় ওর
গান আছে দেখছিলাম।
অতনু। তা ছাড়া ওর গুরুর মান—যেখানে সেখানে গাইলে
গানের অপমান হবে। অল ইণ্ডিয়া মিউজিক
কবির প্রেম কম্পিটিশনে ওর কি সুখ্যাতি ! কত মেডেল, কাপ, নরেন। আহাঃ—করলি কি!—বিবি চালনি কেন? বিবিটা। কি তােকে কামড়াচ্ছিল ? জানিস্ সাহেব এখনো যায়নি—বিবি চাললেই মারা যাবে। অমর। বিলাতে ছিলাম অনেকদিন কিনা—তাই ভুল হয়ে গেছে। ও দেশে লেডিজ কাষ্ট, কাজেই বিবি আগেই চেলে দিলাম। বিমল। (খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে) হেয়ার ইউ আর—চালাকি ;- যাদের রাজা সূর্য অস্ত যায় না তাদের সঙ্গে চালাকি । অত। কি হল হে! হঠাৎ চেঁচিয়ে উলি যে বিমল। বিমল। আরে হারতে ত হবেই ! কার সঙ্গে চালাকি ! ! ! নরেন। তার মানে ?-আমার ফোর ডায়মণ্ডস্ ডাকা ভুল হয়েছে :- সবে ত অমরের ভুলে বিবিটা ধরা পড়ে একটা পিঠ আমাদের নষ্ট হয়েছে। এখনও খেলার সব বাকী। এ খেলায় আমাদের Sarcame তুই এসে বােস না-আনি Challenge করছি। কি জানিস্ তুই খেলার। বিমল। আহা হা,–আমি কি তােদের খেলার কথা বলছি। আজ এই কাগজে দিয়েছে যে ৫ খানা বােমরু বিমান বার্লিনের উপর বেপরােয়াভাবে বােমা বর্ষণ —দুই-
কবির প্রেম
করে এসেছে। ফলে জার্মানদের মনে বেশ একটা
ভয়ের সঞ্চার হয়েছে। তারা এখন শান্তির প্রস্তাব
করছে।
সকলে। আরে আরে তাই বল। ( সকলে আবার যে যার
কাজে মন দিল)
দুর্লভ। কি হে সুধা ! মাঝ থেকে একটা হৈ চৈ হয়ে
আমার প্রস্তাবটা কি ভেসে যাবে ?
সুধ।। কি গাইব বল দুল্লভ দা ?
শেখর। আরে ভায়া যা হয় একখানা গাওনা। তবে ভাই
রামপ্রসাদী আর কীৰ্ত্তন বাদ,আর বাণীগুলাে হওয়া
চাই হিন্দী নয়-বাংলা।
দুর্লভ। হুকুম করে গান হয় না। যা ওর প্রাণ চাইবে তাই
গাইবে। গাওহে গাও---একখানা দরদ দিয়ে গাও।
সুধা। বেশ—যখন তােমরা একান্ত ছাড়বে না, তখন
গাইছি। ভাল যদি না লাগে ত আমি দায়ী নই
কিন্তু
(গীত)
বন্ধু, কইবাে কি আর মনের কথা।
নদীর পথে দেখে তারে,
বাড়লাে দ্বিগুণ বুকের ব্যথা।
কেন সে আড়নয়নে দৃষ্টি হেনে।
গেল সে মুচকি হেসে আমার পানে
তার চোখের ভাষায় কয়ে গেল
কি জানি কোন গােপন কথা।
কবির প্রেম
তার রূপ দেখিয়া পাগল হিয়া
মন না মানে মানা।
অঙ্গেতে তার দেখেছিলাম
মিশিয়েছিল চঁাদের কণা।
পিঠের পরে এলিয়ে মাথার চুল
কানে দুলিয়েছিল বনের দুটী ফুল
তার সে রূপের লাগি হই বিবাগী
ঘুরে বেড়াই যথা তথা।
বন্ধু, কইব কি আর মনের কথা।
( গান চলিতেছিল, এমন সময় কবির প্রবেশ)
কবি। বন্ধুগণ, সঙ্গীত কর স্তব্ধ।
সঙ্গীতের এ নহে সময়।
( গান থামিয়া গেল)
সকলে। আরে—আরে কবি যে–এসো-এসাে !
কবি। বাঃ! তােমরা ত সকাল থেকেই বেশ ক্লাব
জমিয়ে বসেছ।
নরেন। তা ত বসেছি। কিন্তু তােমার খবর ভাল ত? বিয়ে
করে সত্যিই তুমি বড় morosc হয়ে পড়েছ।
কবি। হু, ব্যথা--বড় ব্যথা বন্ধু,
আর দিয়ােনাক খোচা—দিয়ােনা খোঁচা ;
বিয়ে যা করেছি বৌ নয় ভাই
মস্ত একটা পেঁচা।
কবির প্রেম
অত। ওপেঁচা ;-আচ্ছা তা হ'লে জিজ্ঞাসা করতে হলাে,
—পেঁচাটা লক্ষ্মীপেঁচা, না কালপেঁচা?
শেখর। লক্ষ্মীপেঁচা নিশ্চয়ই! তা না হলে কি বাছাধনের
বিয়ের পর একমাসের মধ্যেই লটারির টাকা মেলে।
নিশ্চয়ই লক্ষ্মীপেঁচা বলতে হবে।
কবি। টাকা টাকা-ধন দৌলত কি চেয়েছি আমি?
আমি চেয়েছিলাম—
“পৃথিবীর এক কোণে বেঁধে ছােট বাসা
ধন নয়, জন নয়, পেতে এতটুকু ভালবাসা।”
নরেন। আহা তােরা থা—তারা বুঝবি না।-মহৎ যারা
হয়—তারা ধন দৌলতকে ঘৃণা করে। ওঃ সত্যি কবি
—তােমার জন্য ভাই বড় দুঃখ হয়। এরা বুঝবে না
তােমার ব্যথা।
কবি। নরেন! নরেন! বড় ব্যথা ভাই, বড় ব্যথা। যা
চেয়েছিলাম তা যখন পেলাম না—তখন আর এ
জীবনে কি লাভ ভাই ?
নরেন। সত্যি! তা কি করবে এখন ঠিক করেছ ভাই ?
কবি। কি করবাে, কি করব ! জীবনের গতি ওলােট
পালােট করে দেব-“দেবদাস” হব। জীবনে যা
ঘৃণা করতাম তাই হবে—তাই হবে আজ থেকে
কবির প্রেম
আমার কাম্য। তােমরা ত জান কোন দিন পান
খাইনি, বিড়ি খাইনি,—কোন নেশা করিনি।কিন্তু
আজ এই দেখ-(পকেট হইতে এক টিন সিগারেট
বাহির করিয়া একটী ধরাইল এবং একটী বােতল
বাহির করিল) শিবে চাকরটাকে বলে দাও একটা
গেলাস দিয়ে যেতে।
সকলে। বহুৎ আচ্ছা—বহুৎ আচ্ছ।-এইত চাই। দাও ত
একটা— একে একে সবাই একটী একটী করিয়া
সিগারেট ধরাইল)।
নরেন। এটাতে সত্যি তােমাকে তারিফ করতে হলো, কিন্তু
আর একটার কি করলে?—অর্থাৎ কল্পনা সুন্দরীটীকে
কি বাজার থেকেই বেছে নিচ্ছ। এমন সময় শিবে
চাকর গেলাস দিয়া গেল)।
কবি। (পান করিতে করিতে) না,–এখনও সেটার কিছু
ঠিক করিনি।
নরেন। (কানে কানে তাহলে একটা কথা বলি শােন,
আমার একটা শালী আছে-কলেজে পড়ে—you
can try to have a chance-যেমনটী খুঁজছ ঠিক
তেমনটাই পাবে। বেশ ! তা হলে পরে private
কথা কওয়া যাবে’খন। একটা সুবিধা, সে কবিতা
আর কবিদের বড় পছন্দ করে।
কবির প্রেম
কবি। আচ্ছা—তাহলে আজ বিকেলে তােমাদের বাড়ী
যাব'খন।
নরেন। পারত তিন খানা সিনেমার টিকিট কেটে নিয়ে যেও।
কবি। সত্যি!
নরেন। হু।
কবি। আচ্ছা! তাহলে ঠিক!—ঠিক!
অতনু। কবিদা একটা সিগারেট দাও ত ! আর হাঁকি
তােমরা ফিস্ ফিস্ করে কথা কইছ ? তােমার
ব্যথার কথা ত আমাদের কিছু বললে না !
কবি। সে বড় দুঃখের কথা ভাই, সে বড় দুঃখের কথা !
শেখর। আহা শুনিই না! বলই না ছাই।
কবি। শুনবে?--তবে শােন। (দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল)
অতনু। বল।
কব। বিয়ে করলাম আমি! চোখে দেখলাম না, আলাপ
হ’লল না। কোথা থেকে এক পাড়াগাঁয়ের মেয়ে
ধরে এনে বললে--এই তাের বৌ! আমি ত অবাক।
না-হা,–কিছুই বলতে পারলাম না। তার ওপর
বাবার সে রুদ্রমূর্তি দেখে আমি গেলাম ভড়কে !
অগ্নি সাক্ষী করে বললাম,-এগাে! তুমি আমার
স্ত্রী,সহধর্মিনী,-আমি তােমার স্বামী দেবতা।
অতনু। আশ্চর্য! আশ্চর্য-তারপর?
কবির প্রেম কবি। তারপর ভাবলাম—যা হবার তা হয়ে গেল-না হয় শিখিয়ে পড়িয়ে নেব। কিছুদিন গেল—একদিন রাত্রে চাঁদের আলােয় বলতে গেলাম :- “নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধু সুন্দরী রূপসী, হে নন্দনবাসিনী উর্বশী!” সে করলে কি জান? অপমান করলে—অপমান করলে আমার ভাবকে, আমার ভাষাকে, আমার কবিতাকে ! অসহ্ন ! শেখর। সত্যি অসত্য ! কি করে অপমান করলে? কবি। বললে—আমি নাকি তাকে ঠাট্টা করছি, টিটকিরি করছি, সে সুন্দরী নয় বলে।—এই শুনে আমি তার গলা টিপে ধরলাম। সে চীৎকার করে উঠলাে। বাবা, মা ছুটে এলেন। কি বলি,—মাথা নীচু করে -এক কোণে দাড়িয়ে রইলাম। সেই সব বললে। মা সব শুনে উলটো বুঝে রেগে আমায় বকাবকি করে গেলেন। বাবা বললেন—আজকালকার শিক্ষার দোষ। মা বাপের পছন্দসই মেয়ে-ছােকরাবাবুদের পছন্দ হয় না। আমায় চোখ রাঙ্গিয়ে বলে গেলেন, ফে যদি গায়ে হাত তুলেছবাড়ী থেকে দূর করে আট-
কবির প্রেম
ওগাে !
শেখর। তা হলে ত বড় ভয়ানক কথা! তা তিনি কি
করলেন?
কবি। হা—সে কথা আর বল কেন ভাই ! অদ্ভুত!
অদ্ভুত !—সবাই চলে যেতে তিনি এসে আমার পাদুটা
ধরে কাঁদতে আরম্ভ করলেন।
অতনু। আরে—কি বললেন তাই বলনা--
কবি। বলবে আর কি,সেই মামুলী বুলি।
আমার ভুল হয়েছে ক্ষমা কর। পায়ে করে লাথি
মেরে দিলাম ঠেলে। ছিটুকে গিয়ে পড়লে দশ হাত
দূরে। টেবিলের কোটায় লেগে গেল মাথাটা
কেটে রক্ত পড়তে লাগলাে—ভয় হােল
শেখর। আরে ভয় ত হবেই—হবার ত কথাই-তারপর তুমি
কি করলে?
কবি। আমি শুধু বাবার ভয়ে আলমারি থেকে আইওডিন
তুলােয় করে লাগিয়ে দিলাম, রক্ত বন্ধ হলাে।
অতনু। আরে রক্ত না হয় বন্ধ হােল। কিন্তু তােমার বাবা
মাতারা যখন জানতে পারলেন ?
কবি। বাবা মা জানতে পারবেন বলে ভয় হয়েছিল বটে
অত। তা হলে কি হােল?
কবি। সেই ওটা manage করে নিয়েছিল-বলেছিল
জানালার নিচে থেকে কি একটা জিনিষ নিয়ে সােজা
কবির-প্রেম
হ'তে গিয়ে উপরের জানালার পাল্লায় একটা কোন
লেগে গেছে কেটে।
শেখর। বটে | হ'লে আপনার বৌকে ভাল লোক বলতে হবে।
কবি। কি বল যে,-কবিতা বােঝেনা,গান বেঝেনা,
চোখের ভাষা বােঝেনা,--প্রাণের আকুলতা বােঝেনা,
তাকে বাসতে হবে ভাল,-তাকে করতে হবে
আমার কবিতার মানসসুন্দরী! -না, না, তা হয় না।
তার সঙ্গে আমার কোন সম্বন্ধ নেই-নেই-নেই।
তাকে বলেছি যদি তুমি আমায় সুখী করতে চাও
শান্তি দিতে চাও ত আত্মহত্যা করে মর।
নরেন। তা তােমার দুঃখ তােমার বাবা মাকে জানাও না
কেন? তারাও ত একটা উপায় কিছু করতে
পারেন ?
কবি। আরে ভায়া !
সে বােধ হয়
ভৌতিক কিছু
জানে। বাবাকে মাকে এমন হত করেছে যে তারা
ত তার প্রশংসায় একেবারে পঞ্চমুখ। লক্ষ্মী, লক্ষ্মী
করে ত কঁাধে নিয়ে একেবারে নাচবার যােগাড়।
সাধে কি আর বলছি ভাই--“দেবদাস” হয়েছি।
কেউ বুঝবে না আমার ব্যথা। আচ্ছা ভাইসব
আমি চল্লাম। আমাকে একবার “বেয়াড়া পত্রিকা
কবির প্রেম
অফিসে যেতে হবে। উঠি তবে-e! বড় ব্যথা
বড় ব্যথা।
(প্রস্থান)
নরেন। হায় রে বাঙ্গালা দেশ ! হায়রে তার কবি ! এদের
দেখলে সভাই দুঃখ হয়।
এইসব
অকালপক্ক মেরুদণ্ডভাঙ্গ কবির দল, সাহিত্যকের
দল, নাটুকের দল, ভাবুকের দল---এরা জহরত আর
কাচের পার্থক্য বােঝেনা। এরা কাচকে জহর বলে
বুকে রাখতে চায় আর জহরকে কাচ বলে দূরে ফেলে
হা ভগবান! কবে যে এদের চোখ ফুটবে ?
শেষর। ওরে তােরও কি শেষে ভাব এলাে নাকি নরেন ?
নরেন। নারে না,-ভাব আসবে কেন! কিন্তু একটা মতলব
এসেছে মাথায়। এই কবিটাকে বেশ একটু জব্দ
করতে হবে। যতদূর শােনা গেল--তাতে বেশ
বােঝা যাচ্ছে-ঘরে ওর রয়েছে সতী সাধ্বীপতি-
পরায়ণা স্বী,-যে চায় ওর সুখে সুখী হতে--ওর
শান্তির জন্য জীবন দিতে, তাকে পায়ে ঠেলে, লাঞ্ছিত
করে, অপমান করে এসে এই মহাপুরুষটা চান অন্য
আর একজনের সর্বনাশ করতে ; প্রেম আর
ভালবাসার বুলি শুনিয়ে তার কাছ থেকে বাহবা
নিতে
-এগারাে-
!
কবির প্রেম
শেখর। তা তুমি কি করতে চাও শুনি?
নরেন। করব আর কি। শুধাকে ত দেখতে বেশ মেয়েলি
মেয়েলি। ওকেই মেয়ে সাজিয়ে আমার শালী বলে
কবির প্রেমের খােরাক জুগিয়ে দেব।
অতনু। সুধা ! তুই রাজি আছিস্ ত মেয়ে সাজতে ?
সুধা। সাজতে পারি—কিন্তু একটা সর্তে।
নরেন। সৰ্তটা কি শুনি?
সুধা। সৰ্ত্তটা এমন কিছুই নয় ;-যে কোন উপায়ে কবিকে
সােজ। রাস্তায় আনতেই হবে।
নরেন। এই কথা ! বেশ-বেশ ! এতে ত আমরা সবাই
রাজী।
অতনু। যাক্-এবার আমাদের সেই chorus গান খান গেয়ে
শেষ করা যাক আজকের এই আসর।
(গীত)
কোরা।
আজ আমরা সবাই মিলেছি এক ঠাই।
কেন বলতে পার কিসের তরে, কিবা এখন চাই।
এমন কিছু চাই না মােরা চাই কি তাই বলি
যারা ভাবছে বসে জীবনটা হায় বৃথাই গেল চলি
কবির প্রেম
অপর একজন—আর বিয়ের আগে প্রেম না হলে কি ছাই তার
বিয়ে
এটা এমন কিছু নয় শুধুই অভিনয় সেই তাদের
নিয়ে।
এতে হয় যদি দোষ করাে না রােষ চাইছি ক্ষমা
তাই
আজকে তাই আমরা সবাই মিলেছি এক ঠাই।
কেমন করে খুলবে আঁখি চিনবে তারা ভেজাল
যারা জহর ফেলে কাচের লােভে করছে ছুটো
সেই তাদের চিনিয়ে দিতে জহর খাটী মােদের
অভিনয়
একজন মােদের শুধুই অভিনয়,
এটা এমন কিছুই নয়।
একজন এতে হয় যদি দোষ,
অপর একজন—কারাে না রােষ,
সকলে— চাইছি ক্ষমা তাই।
আজকে তাই আমরা সবাই মিলেছি এক ঠাই।
দ্বিভীন্ন দৃশ্য
নরেনের বসিবার ঘর
নরেন ও কবি।
নরেন। এই যে কবি ! এসাে–এসো-বসাে।
কবি। এই যে বসছি।
নরেন। এটা কি হে?
কবি । কবিতার খাতা।--আমার সাধনার ফল।
নরেন। চমৎকার গাধান খাতাটা তাে! এই যে আবার
সােনালি কালি দিয়ে ওপরে নাম ঠিকানাটাও লেখা
রয়েছে।
কবি। হাঁ একটা কথা ;-ইনি কলেজে পড়েন, সিগারেট
খান কি না জানি না—তাই ভাল দেখে একটিন
সিগারেট এনেছি।
নরেন। আজকাল কলেজের মেয়েরা প্রগতিশীল হয়ে
সিগারেট খাচ্ছে বটে—এমন কি শােনা যায় সন্ধ্যার
পর ভাল ভাল হােটেলে গিয়ে মদও একটু আধটু
টেনে আসে নাকি, তবে আমার শালী শীলা ও
সব দিকে নেই। গান বাজনা কবি এই সবে
খুব উৎসাহী। তবে তুমি সিগারেট খাওয়াটাকে
বেশ পছন্দ কর!
কবির প্রেম
( এমন সময় কবিতা পড়িতে পড়িতে
আপন মনে বিভাের শীলার প্রবেশ )
শীলা। “আছে মনে
যে দিন প্রথম তুমি আসিলে হেথায়
কিশাের ব্রাহ্মণ, তরুণ অরুণ প্রায়
গৌরবর্ণ তনুখানি স্নিগ্ধ দীপ্তি ঢালা
চন্দনে চষ্ঠিত ভাল, কঠে পুষ্পমাল৷
পরিহিত পট্টবাস, অধরে নয়নে
প্রসন্ন সরল হাসি হােথা পুষ্পবনে
দাড়াল আসিয়া”-
নরেন। শীলা—Miss. শীলা--এই ইনি হচ্ছেন- ইনিই
সুকবি “চন্দ্রশেখর।”
কবি । ( উঠিয়া দাড়াইয়া) নমস্কার ।
শীলা। হে অজ্ঞাত অপরিচিত কবি! লহ নমস্কার,
হে বন্ধু ! হে পরম আত্মীয়! আত্মার
লহ মাের সশ্রদ্ধ নমস্কার !
আপনি-আপনিই সুকবি চন্দ্রশেখর ।
কবি।
ও নামের একমাত্র অধিকারী আমি,
অন্য কেহ নাহি ধরাধামে।
(পরে নরেনের দিকে চাহিয়া )
কেবা এই বালা?
চকিতে হরিল মনচকোর
আঁধার হলাে আলা!
-পনেরাে-
কবির প্রেম করেন। মুস্কিল করেছে—আমি ত ভাই কবিতা করে বলতে পারবে না—আমি গদ্য করেই বলছি-ইনি হচ্ছেন আমার শা-( জিভ, কাটিয়া) না-না,-শশুরের মেয়ে, আমার গিল্পীর বােন শীল। একজন লেখিকা বলা চলে। একটু আধটু কবিতা লিখে থাকেন। শীলা। লিখি বটে—প্রাণের কথা, গানের ছন্দে দিই তাকে রূপ। কিন্তু কেউ তাে বােঝে না আমার সে প্রাণের কথা! সে অন্ধকারে অপ্রকাশিত হয়ে কেঁদে মরে। বড় তাই ব্যথা পাই প্রাণে। কেউ বােঝে না ববাঝে না কেউ। কবি। শীলাদেবী।আমি–আমি কিন্তু আজ থেকে প্রাণ- পণে চেষ্টা করবে তােমার প্রাণের ভাষা বুঝতে, তাকে আলােয় টেনে আনতে। শীলা। পারবেন—পারবেন?-না না—কেন দেখাইছ মােরে মরীচিকা, কেন মােরে শুনাইছ আশার বাণী । নরেন। ওহাে-আমার বড় ভুল হয়ে গেছে—আমার একটা Appointment আছে ভাই; চললাম আমি, Excuse me. Excuse me শীলা। পারি ত ঘুরে আসব। তােমর কথাবার্তা কও। (প্রস্থান) —যােলাে--
লা। সত্যি আপনার অনেক সুখ্যাতি, অনেক নাম,
শুনেছি। সত্যি আপনি খুব মহং-
কৰি। না-না। ও এমন কিছুই নয়। মাৰ সুখ্যাতি
তা’তে ত আর প্রাণের আশা মেটে না, কবির
ভালবাসা। তা’ আর পাচ্ছি কৈ?
লা। তারই বা আপনার অভাব কি? যে আপনাকে
একবার দেখেছে সেই তো ভালবাসবে আপনাকে।
এই দেখুন না—ফলতে পারছি না, লা করছে।
মলবে নীৰব)
কবি। বল লাে দেবী! কি চাহিছে প্ৰাণ ৰ।
ভাল কি বাসিতে চাই মােরে ।
শীলা। বলিতে চাহিছে এল, কিন্তু হয়। এ আসি বা
দেয়। বুঝে নিও মানে দল রাবি সাের।
কৰি। সত্যি কে কোনদিন আমায় ভালবনি-আর
এই প্রথম তােমার কষ্টের বাণী আমার ছয় সমােবয়ে
প্রেমকমল কোষ্ঠল। আমি-আমি তোমায়
গলাতেই।
। সত্যি এৰি লখি, না ? আপনি আমায়
অঞ্চ আৰ এখনি মিলিন
কৰি। বিকাল ফলন
২
। ও, কি না কি গান। আমার এত আনন
ভাল লাগছে না । হে থাকতে। মুক্ত বাতালে
সূ বেড়িয়ে আসিগে।
কবি। তাই চলুন আমারও প্রাণ ভাই চাইছে।
(উভয়ের এন।
(নরেনের পুনঃপ্রবেশ সঙ্গে মত ও শেখর)
নরেন। সত্যি কবিতা করতে করতে মা শেষে শাখারও
অধষ হয়। এই সব ছটাকে কৰিলের খনে যদি কোন
বলে বিধবা মা যেত ও দেশের মাল হত।
নয়কি অসুই কি বলি।
অঞ্জ। গতি-এ পাগরেও যে। এদের কাছে মেয়ে
পুরবেও পা নেই চলে।
শের। আরে জ’ নইলেকে অমন মেয়ে সাজিয়ে
নয়। এটা কথাটা কিন্তু জেটা
করুন। আরে আমি সব কিছু ভাবছি নাহি গাটা
ত ঠিকই আছে—এখন বেশি তে পারলেই
ৰাৰি। any carstee for Hand-Note
বিয়ে নিয়ে খানকে কবৰৰ।
কা, না হয় আর আ
ক্লাব-কুম। সুধা ও নরেন। সুধা। আজ নিয়ে কুড়ি দিন কি কাণ্ডটাই না হচ্ছে। তােমরা ত দিব্যি মজা লুটছে, কিন্তু আমার যে প্রাণ যায়। কি নরেন দা। চুপ করে কি ভাবছ? সত্যি বলছি—একঘেয়ে প্রেমের বুলি শুনতে শুনতে শেষে সত্যিই না কবির প্রেমে পড়ে যাই। এবার আমায় ছুটা দাও। তুমি ত দিব্যি পঞ্চাশ হাজার টাকার Hand-Note লিখিয়ে নিলে-শেখরকে মহাজন সাজিয়ে আর আমাকে তার উপলক্ষ্য করে। নরেন। তােমাকে উপলক্ষ্য করে মানে?-বল শীলাকে উপলক্ষ্য করে। সুধা। আহা তা না হয় তাই হলাে—কিন্তু কবে এই ধড়া- চুড়ে ছড়িবাে বল ত ? নরেন। আর ত প্রায় শেষ করে এনেছি। এবার একদিন একটা পার্টির আয়ােজন হবে এই ক্লাবে সেইদিন তুমি তােমার স্বরূপ প্রকাশ করবে। একটা শুভদিন দেখে নাও। তারি অপেক্ষায় যা দেরী। -উনিশ-
কবির প্রেম
(অতনু, দুল্লভ ও শেখরের প্রবেশ )
অত। এই যে সুখা-না-না—Miss শীলা! কেমন
আছ ?--কেমন আছেন তােমার কবি বন্ধু?
শেখর। নমস্কার শীলাদেবী! কেমন সিনেমা দেখছেন ?
ইডেন গার্ডেন, বােটানিক্যাল গার্ডেন আর লেকে
কেমন বেড়াচ্ছেন ?—সত্যি সুধা ভােগ আর স্ফুর্তিতে
তুই যেন একটু মােটা হয়েছিস্ রে ?
সুধা। মােটা হব না-কি বলিস? কি ফুর্তিতেই না আছি।
সত্যি বলছি ভাই—এ ক’দিন মেয়ে সেজেই বেশ
বুঝতে পারছি যে-প্রগতি প্রগতি করে মেয়েরা কেন
এত চেঁচায় ;—তাতে যে কত মজা, কত সুধা তা
তারাই জানে।
শেখর। তাই নাকি?
সুধা। নম্মু আবার ! সত্যি শিক্ষিত মেয়েরা যদি একটা
partner জোটাতে পারে ত তাদের আর পায় কে?
মনের মানুষের স্কন্ধে ভর দিয়ে অনেক সময় চাঁদ
ধরবার ও চেষ্টা করে দেখা যায় রে ? এই দেখ না!
আমার মনের মানুষটা আমার মন জোগাতে যা
বলছি তাই করছে। সেদিন যেই কাঁদো কাঁদো
হয়ে গলাটা জড়িয়ে ধরে বললাম—ওগাে! তুমি
আমার সব কেড়ে নিতে বসেছ—কিন্তু যেদিন তােমার
—কুড়ি-
কবির প্রেম
নেশা কেটে যাবে—তুমি চলে গেলে আমি কি নিয়ে
বেঁচে থাকবাে ?
অতনু। তাতে কি বললে কবি ?
সুধা। বললে-না-না—এ আমাদের স্বপ্ন নয়-এটা ধ্রুব
সত্য। তার কি প্রমাণ চাও ?
শেখর। তুই কি প্রমাণ চাইলি?
সুধা। আমি বললাম,-এর পরে ত আর আমি বিয়ে
করতে পারবে না—অথচ মরতেও পারবে না।
তা এক কাজ কর না, আমার নামে পঞ্চাশ হাজার
টাকা জমিয়ে দাও না Bankএ ? আরে!বলা মাত্রই
কাজ-তারপর দিনই পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক্।
অত। তুই তাহ'লে পঞ্চাশ হাজার টাকার মালিক বল ?
নরেন। চেকটা ত বাজে। এই দেখ পঞ্চাশ হাজার টাকার
Hand-Note আমার কাছে। আমি বরঞ্চ মালিক?
এটা ত আর জাল নয়। কবির সত্যিকারের সই।
মনে করলে এখন নালিশের ভয় দেখিয়ে কোর্টের
সাহায্য নিয়ে বাড়ী বিক্রী করে এ টাকা আদায়
দুর্লভ। নরেন তােদের কবি আসছে।
সকলে। আরে তাই নাকি!
নরেন। এই সুধা! তুই পালা পালা। চট করে এদিকের
এই দরজা দিয়ে। দৈখি যেন দেখতে না পায়-
কবির প্রেম ! খুব সাবধানে লুকিয়ে পালা। বােধ হয় এই Club থেকে তাের ঐ খানেই যাবে। এরা না হয় গল্প টল্প করে খানিকক্ষণ ওটাকে আটকে রাখবে। যা-চলে যা। সুধা। তাইত !—আমি তা হলে চল্লাম। নরেন। যা যা--আর কথা কসনে। ( সুধার প্রস্থান) আমিও একটু আড়ালে রইলাম। (নরেনের প্রস্থান) অন্য সকলে বই খুলিয়া অথবা কাগজ লইয়া বসিয়া গেল, এমন সময় ধীরে ধীরে কবির প্রবেশ কবি। কে গাে তুমি এলে মাের হৃয় শ্মশানে, ফুটাইলে ফুল সেথা!-গানে গানে তরে দিলে প্রাণ মন মাের কেগাে, কেগাে মনােচোর দিব সাজা সাজা দিব বাঁধি বাহুর বন্ধনে হে সুন্দরী! তব আত্মা মাের আত্মাসনে মিলিবে আলিঙ্গনে। অতঃ। অদ্ভুত! অদ্ভুত ! দুর্লভ। চমৎকার—চমৎকার কবিদা; নে নে অতনু ওঠ, কবিদাকে বসতে জায়গা দে। নিন্ বসুন কবিদা। অতনু। কবিদা! সত্যি আপনাকে কি সুন্দর দেখাচ্ছে ! -বাইশ-
কবির প্রেম
দুল্লভ। কবিদা! কই একটা সিগারেট দাও।
অতনু। সিগারেট কি হবে?-বােতােল টোতােল আছে কিনা
দেখ; আছে নাকি কবি দা ?
কবি। না ভাই—ও সব নেশা টেশা আমার সহ্য হবে না
বলে আবার ছেড়ে দিয়েছি। আর তা ছাড়া আমার
মানসসুন্দরী চান্না যে আমি নেশা করি। তাঁরই
অনুরােধে ও সব ত্যাগ করেছি।
অতনু। আঁ! মানসসুন্দরী!-বল কি হে!-সে আবার
শেখর। নিশ্চয়ই অপরূপ সুন্দরী তাতে কোন সন্দেহ
নেই।
দুল্লভ। সত্যি,—কি করে জোটালে কবিদা!-ও-তাই
আর তুমি এদিকে আসনা—তা—আমাদের সঙ্গে
আলাপ করিয়ে দেবে না ?—আমরা কি এতই
অসভ্য ?
কবি। নানা—তা'কি আমি বলছি!—তিনি অদ্ভুত-বড়
কবিতার ভক্ত! কবিতার জন্য তিনি পাগল।
শেখর। কবির জন্যও নিশ্চয় আশা করি।
দুর্লভ। আমরা অকবিতা বলে কি তাঁর দর্শন পাবারও
যােগ্য নই ?- বরাত !
কবির প্রেম
কবি। ভুল করছ দুল্লভ ভুল করছ। তিনি চান সকলের
সলেই পরিচিত হতে, বিশ্বের সাথে আত্মীয়তা
করতে।
শেখর। তাহলে এক কাজ করনা—আমাদের সঙ্গ থেকেই
বিশ্বের পরিচয়টা শুরু করিয়ে দাও না কবিদা।
দুল্লভ। দাও না বললেই ত আর হয় না—তা হলে এক কাজ
করতে হয়।
অতনু। হ্যা—একটা পার্টির বন্দোবস্ত করলে কি রকম হয়?
কবিদা বে’তে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ান এখন
ই দিন তাঁর বাড়ীতে।
সকলে। হা-হঁা—সেই বেশ ভাল কথা।
অত। সেখানে বৌদিকেও দেখা যাবে আর আমাদের
দেবীরও সাক্ষাত মিলবে।
শেখর। আর তা ছাড়া একটা বেশ সুবিধেও আছে। কবিদার
বাবাও এখন ছুটীতে পশ্চিমে বেড়াতে গেছেন।
দুল্প । ভালকথা !তাহলে কবিদা! পরশুদিন লাগাও
party. আমরা কিন্তু উপহার নিয়ে যাব—অবশ্য
দুটো দুটো।
অত। সে ত নিশ্চয়ই-একটা বৌদির—আর একটা
একটা party
দেবীর।
-চব্বিশ
কবির প্রেম
কবি। বেশ ; তােমরা যখন ধরেছ, আর তার উপর দেবীও
কদিন ধরে আমাকে ব্যস্ত কচ্ছেন আমার স্ত্রীর সঙ্গে
আলাপ করতে চান—তখন তাই হােক। আর বাবাও
নেই এখানে—এমন একটা সুবিধে।
সকলে। Three cheers for কবিদা। Three cheers for
কবিদা! Three cheers for কবিদা!
(নরেনের পুনঃপ্রবেশ )
নৰেন। কিরে তােরা এত চেঁচাচ্ছি কেনরে?—কি হােল ।
এই যে কবি! তােমার ত আর দেখাই নেই—
অথচ খবরটি পাচ্ছি ঠি।
অতনু। একটা ভােজ। পরশুদিন কবিদার বাড়ীতে আমাদের
ভােজের নিমন্ত্রণ।
নরেন। আরে তাই নাকি? তাহলে ত বড় আনন্দের কথা !
এই, এত বড় একটা সুসংবাদের পর তােমরা কি
করছ শুনি! কবির পকেট থেকে একটা বােতল
বার কর।
শেখর। না-না,-উনি নেশাটেশা সব ছেড়ে দিয়েছেন ওঁর
মানস দেবীর মন জোগাতে।
পঁচিশ
কবির প্রেম
নরেন। তাই নাকি? এ তােত বড় ভাল কথা নয় আমার
কাছে।
কবি। না-ওসব ছেড়ে দিয়েছি। এখন আর নেশার কোন
প্রয়ােজন নেই।
অতনু। যাক ওসব কথা—চল আমরা এখন কবিদাকে সঙ্গে
নিয়ে একটু মুক্ত বাতাসে ঘুরে আসি।
সকলে--বেশ, বেশ, তাই চল কবিদা!
ছাব্বিশ--
চতুর্থ দৃশ্য
কবির বাড়ী-(Party)
কৰি একাকী
কবি ! তাইত এখনাে কেন শীলা আসছে না? ঘরটাতাে
বেশ তার মনের মতন করে সাজান হয়েছে।
তাইত !-এতক্ষণ ত তার আসবার কথা! (নীরব)-
অনেকক্ষণ হয়ে গেল।এদিকে এদেরও আসবার
সময় হল -এই যে শীলাদেবী!
( শীলার প্রবেশ)
শীলা। “আমি চঞ্চল হে
আমি সুদূরের পিয়াসী,
দিন চলে যায় আমি আনমনে
তারি আশা চেয়ে থাকি বাতায়নে
ওগাে প্রাণে মনে আমি যে তাহার প্রয়াসী,
আমি যে সুদূরের পিয়াসী।
সুদূর, বিপুল সুদূর
তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরী
মাের জানা নাই আছি এক ঠাই
সে কথা যে যাই পাশরী।
-সাতাশ
কবির প্রেম কবি। “হায়। গগন নহিলে তােমারে ধরিবে কেবা ওগাে তপন, তােমার স্বপন দেখি যে, করিতে পারিনে সেবা। তাই কহি আমি কঁদিয়া তােমারে রাখি যে বাঁধিয়া” হে দেবী! এমন নাহিক আমার বল। তােমা বিনা মাের ক্ষুদ্র জীবন কেবলি অশ্রুজল। শীলা। মাপ করবেন ! একটু দেরী হয়ে গেল। তা— বৌদি কোথায় ?-পরিচয় করিয়ে দিন। কবি। নানা—দেরী কিছুই হয়নি। আপনিই ত প্রথমে এলেন। এখনও আমার বন্ধুবান্ধবেরা কেউ আসেনি। আরে! এই যে--তােমার বৌদি এইদিকেই আসছেন। পরিচয় করিয়ে দিই এস। শীলা। পরিচয় আমি নিজেই করতে পারি। আসুন বৌদি আন-নমস্কার ? কবি স্ত্রী। নমস্কার। কৰি। ইনি Miss শীলা-লেখিকা, আমার পরম ভক্ত! (দরওয়ানের প্রবেশ) দরােয়ান। বাবুজি ! বাহাসে বহুত বাবু আকে আপকে। সেলাম দিয়া । -আঠাশ-
কবির প্রেম
কবি। বাবুলােক সব আয়া ? আচ্ছা শীলা, তুমি তােমার
বৌদির সঙ্গে ততক্ষণ কথাবার্তা কও আমি আমার
বন্ধুদের নিয়ে এক্ষুনি আসছি।
( দরােয়ান সহ প্রস্থান)
শীলা। বৌদি! ভয় পাবেন না; আমি সত্যি সত্যি শীলা
নই—আমি সুধীর।
কবি স্ত্রী। আঁআঁ-।
শীলা। আঃ চুপ চুপ,—চেঁচাবেন না—তা হলে সব মাটী
হয়ে যাবে।-ব্যাপারটা আপনাকে সব খুলে বলছি,
শুনুন। লজ্জা করবেন না-আমাকে আপনার
ছােট ভাই বলেই মনে করবেন।-আপনাকে বিবাহ
করবার পর থেকেই কবিদা আমাদের ভয়ানক ক্ষেপে
উঠেছিলেন প্রেম করবার জন্য। তাই এই অভিনয়।
এটা শুদ্ধ অভিনয়--সত্যি এতে মােটেই নেই।
কবি স্ত্রী। আঁতাহলে আপনি ব্যাটাছেলে ?—ওমা!
মিসে কি পাগল না কি গাে !
শীলা। সত্যিই উনি একটী পাগল। আর সেই পাগলামি
ছাড়াবার জন্যই এই কাণ্ড। তারপর বলি শুনুন।
বসুন এই চেয়ারে। হঠাৎ একদিন মদ খেতে
নেশা করতে সুরু করলেন।কারণ উনি চান প্রেম
করে বিয়ে করতে।আপনাকে যে বিয়ে করেছেন
উনত্রিশ
কবির প্রেম
সেটা ভুলতে চান। তাই মতলব করে—সবাই মিলে
আমাকে মেয়ে সাজিয়ে এই কাণ্ড!
কবি স্ত্রী। ওমা! কি কেলেঙ্কারী গাে! কি লজ্জা!
শীলা। তারপর শুনুন-আমাকে কত প্রেমের কথা শুনালেন
—কত ব্যথার কথা বললেন--আমার জন্য প্রাণ
দিতে পারেন এও শপথ করলেন। সেই সব দুর্বল
মুহূর্তে কায়দা করে মােটা মােটা টাকা ধারের
হ্যাণ্ডনােট লিখিয়ে-হাতে আনা হয়েছে। এইবার
তাঁর ভুল ভেঙ্গে দিয়ে—এমন করে চোখ ফোটান
হবে--যাতে আর কখনও বাইরে প্রেম করবার
নামটী পৰ্য্যন্ত মুখে না আনেন, যাতে আপনার
উপর আর কোন অত্যাচার বা অবিচার করবার
সাহস পর্যন্ত না পান ;-তারি জন্য এই অভিনয় !
-আর একটুখানি ধৈর্য্য ধরে থাকুন বৌদি।
কবি স্ত্রী। বেশ,—আমি তা হলে চুপ করে গম্ভীর হয়ে বসে
থাকবােঐ উনি আসছেন।
(কবি ও অন্য সকলের প্রবেশ)
কৰি। এসাে-এস বন্ধুসব পরিচয় করিয়ে দিই
তােমাদের সঙ্গে।-ইনি তােমদের বৌদি-মার
ইনি একজন সুলেখিকা-আমার পরম ভক্ত।
—জি-
কবির প্রেম সকলে। নমস্কার । শীলা। নমস্কার ! অতনু। কবিদা! প্রথমে আমাদের উপহার অর্থাৎ দর্শন- দক্ষিণাটা দেওয়া হয়ে যাক্। খাওয়া-দাওয়ার পর বসে গল্প হবে কি বলহে তোমরা? সকলে। হা- হঁসেই ভাল কথা। কবি। বেশ তাই হােক্। অতনু। বেশ—তাহলে আমিই প্রথমে শুরু করি। দেখুন যদিও আমি অকবি, তবু আজ একটা কবিতা এনেছি —আপনাকে শুনতেই হবে আর এই সামান্য ফুল এনেছি—নিজ হাতে সাজিয়ে দি আনুন আপনার কবরী হে দেবী! বহুরূপে বহুবার দাও দেখা মােরে কে বুঝিতে পারে তব ছলনা! হে ছলনাময়ী! এ বিশ্বচরাচরে। চোখ আছে তবু অন্ধ,—মাণিকেরে মাণিক বলিয়া রাখি যতন করে মাটির ঢেলারে। -একত্রিশ
কবির প্রেম
আসুন,এইবার নিজহাতে সাজিয়ে দি আমার
সামান্য ফুলে আপনার কবরীখানি-
(ফুল গুজিতে গিয়া পরচুল সরিয়া মাথার
খানিকটা দেখা গেল )
সকলে। একি! একি! পরচুল যে !
অতনু। তাইত ! তাইত !
( একটানে চুলটা চলে আসে।
কবি। আঁ ! আঁা!—একি হেরি!
কবি স্ত্রী। ওমা এযে পুরুষ মানুষ গাে ! ওমা কি লজ্জা!
( নরেনের প্রবেশ )
নরেন। এত চেঁচামেচি কিসের হে!—এ আবার কি!
শেখর। আরে আরে কবিদা! একটা বেটাছেলেকে মেয়েমানুষ
সাজিয়ে চালাতে চাও আমাদের কাছে! আরে—এরি
তুমি প্রেমে পড়েছ!
দুল্লভ। আরে ছা ছা!
নরেন। এ যে সুধা!
কবি। (স্বগত) ওঃ! কি ভুল করেছি ! কি লজ্জা! কি লজ্জা।
—কে জানত এও বরাতে ছিল। (প্রকাশ্যে) তােমরা
আমায় ক্ষমা কর ভাই ক্ষমা কর। জীবনে বেশ শিক্ষা
পেলাম—সত্যি এতদিন আমি অন্ধ ছিলাম। এবার
চোখ পেয়েছি ভাই।
বত্রিশ
কবির প্রেম কবি স্ত্রী। হা গােএ সব কি ব্যাপার বলত। আমি ত এর কিছুই বুঝতে পারছি না। নরেন। আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি বৌদি! কবিদা আমাদের এতদিন আপনার সঙ্গে সুর মেলাতে না পেরে একজন মেয়েমানুষ সাজা বেটাছেলের সঙ্গে প্রেম করে এসেছিলেন। আজ যে ভুল তিনি এতদিন করেছেন তা বুঝতে পারলেন।—যদি সত্যি তাঁর চোখ ফুটে থাকে বুঝতে পেরে থাকেন, তাহলে আর জীবনে কোনদিন প্রেম করবার কথা মনেও ভাববেন না আর অন্য কোন মেয়ের সৌন্দর্য দেখে কবিতা লেখবার চেষ্টাও করবেন না। কবি। ক্ষমা কর—গাে ক্ষমা কর। তােমার মনে কত কষ্ট দিয়েছি কত অপমান করেছি-তারি ফলে আজ আমার এই সাজা ! সত্যি আজ থেকে জীবনের গতি উলটে দিলাম।এক স্ত্রী ছাড়া অন্য কারও কথা আমার মনের কোণেও ঠাই পাবে না।তুমি -তুমিই আজ থেকে আমার সব। নরেন। আর কোনদিন প্রেমের কথা মনেও এনােনা কবি। যদি এতেও তােমার শিক্ষা না হয় তা হলে মনে আছে এই ৫০ হাজার টাকার Hand Note টার কথা?-শীলা না হয় শেষে সুধীর হলাে; কিন্তু এটা ত আর বাজে নয়,এতে তােমার সই আছে -তেত্রিশ- কবির প্রেম মনে থাকে যেন।যা—এটা আপাততঃ বৌদি, আপনাকেই উপহার দেওয়া যাচ্ছে। কবি। আর দেখ, ভাই নরেন! তােরা এ লজ্জার কথা আর কাহাকেও জানানে; আমার ভুল ভেঙ্গে গেছে আমার প্রেমের মােহ এইখানেই শেষ! জীবনে বিয়ে করেছি যাকে তাকে নিয়েই সুখী হব। সকলে। সত্যি তাহলে. প্রেমের মােহ কেটেছে তােমার? আমাদের বড় আনন্দ হচ্ছে কিন্তু। শীলা। আঁ—তােমার প্রেমের মােহ কেটে গেল,তা হলে আমার কি হবে ? নরেন। তােমার আর কি হবে? অভিনয়ের পালা এইখানে একখানা গান শুনিয়ে শেষ কর। কবি, এবার দাও হে বিদায় মােরে। অভিনয় শেষ করে যাই ঘরে আপন ফিরে। কত মধু আছে প্রেমে হলে ত ভাই এবার জানা। প্রেম-ব্যাধি হায় এলে মনে, হারিয়ে ফেলে বিবেচনা । লােনার হরিণ লােভে মিছে অন্ধ হয়ে ঘুরে মরে। এবার দাও হে বিদায় মােরে । হাতের কাছে আসল ফেলে ধরতে হােট মরীচিকা। তুলিতে ফুল গিয়ে শেষে সার হয় হাতে কাটা ফোটা। তাইতাে বলি বৌ নিয়ে ভাই মনের সুখে থাক ঘরে। এবার দাও হে বিদায় মাের। -চৌত্রিশ-
“Letter box” লেটার বক্স।
( নাটক-নক্সা)
স্থান--লেটার বন্ধু। সময়-clearanceয়ের কয়েক সেকেণ্ড, পরে
।
সাধারণ পত্র—এই যা কয়েক সেকেণ্ডের জন্য ফেল করলাম
গা। না জানি কতক্ষণ আবার—এইভাবে
পড়ে থাকতে হবে। যাক কি আর করা যায়,
এককোণে চুপ করে বসে থাকি।
( এমন সময় দুর্ঘটনা পত্রের প্রবেশ আর প্রবেশের পর)
দুর্ঘটনা পত্র—উহু-বড় ব্যথা, বড় ব্যথা ! হায় এমন বরাত
শেষে আমাকেই এই দারুন দুঃসংবাদটা নিয়ে
যেতে হচ্ছে গা।
সাধারণ পত্র(স্বগত) আহা বড় ব্যথা পেয়েছে হয়ত
বেচারা। দেখি যদি কিছু স্বান্তনা দিতে পারি
(প্রকাশ্যে-নমস্কার ।
দুর্ঘটনা পত্ৰ-(দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করে নমস্কার ।
সাধারণ পত্ৰ-আপনি কি বড় আহত ? আমার দ্বারা কি কিছু
কাজ হতে পারে আপনার ?
দুর্ঘটনা পত্র কাজ। নানা-না, এ দুঃসংবাদ আমাকেই
নিয়ে যেতে হবে। কেউ আমায় সাহায্য করতে
-পয়ত্রিশ
কবির প্রেম
পারবে না।
তা আপনি কে ?
কোথায় যাবেন ?
সাধারণ পত্ৰ --আজ্ঞে ! দেখুন আমি সাধারণ পত্র! বিজন
বাবুর পরিবারের সাধারণ ঘরােয়া সংবাদ নিয়ে
চলেছি বর্ধমানে তার বড় ভাই সুদীন বাবুর
কাছে। আপনি কে? কি আপনার ব্যথা?
দুর্ঘটনা পত্র—দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করে)—উহু-বড় দুঃসংবাদ !
সে বড় দারুন দুঃসংবাদ! ঢাকার জমিদার
সুধীর রায় মহাশয়ের একমাত্র পুত্র দীনবন্ধু
কলকাতায় এসেছিলেন পূজায় বেড়াতে। রােগে
নয়, জ্বালা যন্ত্রনায় নয়—সে দিন বিকালে
বড়বাজারের একটা রাস্তায় এক ষাড়ের গুতত
খেয়ে ছিটকে গিয়ে পড়লেন একটী লরির চাকায়
তারপর যা হয়েছে বুঝতেই পাচ্ছেন, সঙ্গে সঙ্গে
মারা যান। এই দুঃসংবাদটী শেষে আমাকেই
নিয়ে যেতে হচ্ছে তার বাবা মার কাছে—উহু--
বড় ব্যথা ভাই, বড় ব্যথা।
(এমন সময় ডাকাতিপত্রের প্রবেশ। হঠাৎ
ডাকাতিপত্রের প্রবেশে দুর্ঘটনা ও সাধারণ
পত্র উভয়ে চীৎকার করে)
উভয়েকে! কে। কে আপনি
কবির প্রেম
(সাধারণপত্র দুর্ঘটনা পত্রের কাণের
কাছে মুখ নিচুকরে চুপি চুপি)
সাধারণ পত্র—ওকি! কি বিশ্রী চেহারা!
ডাকাতিপত্ৰ-নমস্কার! ভয় পাবেন না! আমি ডাকাতি
পত্ৰ মাত্ৰ ! ডাকাত নই।
( দুর্ঘটনা ও সাধারণ পত্ৰ চমকে উঠে
জড়িত স্বরে।)
উভয়ে—এ্যাঃ এ্যাঃ ডাকাতি পত্র !
ডাকাতিপত্র-ছ—আমি ডাকাতি পত্র ! দেখছেন না বেয়ারিং
হয়ে যাচ্ছি! আমায় যিনি, পাঠাচ্ছেন তিনি
ডাকাতদের সর্দার। জানিনা কেমন করে
জানতে পেরেছেন শান্তিপুরের রায় সন্তোষ
বাগচী বাহাদুর মহাশয় কিছু পয়সা করেছেন,
তাই তার কাছে এই সংবাদ নিয়ে যাচ্ছি, যদি
তিনি তাদের গ্রামের দরিদ্র দুঃখীদের জন্য একটা
ছােট হাসপাতাল আর একটা স্কুল করে না দেন
ত তার বাড়িতে ছ' মাসের মধ্যে ভীষণ
ডাকাতির সম্ভাবনা। তা যা এখনও দেখছি
clearanceয়ের কিছু দেরী আছে। আসুন
ততক্ষণ আপনাদের সঙ্গে আলাপ করা যাক্।
কবির প্রেম
সাধারণ পত্র—তা বেশ! আসুন আসুন, ইনি দুর্ঘটনা পত্র,
যাবেন ঢাকায়। আর আমি সাধারণ পত্র, যাব
বর্ধমানে।
( এমন সময় গানপত্র প্রবেশ করিতেছিল)
ডাকাতিপত্রঐযে আবার কে যেন এদিকে আসছে। বেশ
আনন্দের সঙ্গে তালে তালে পা ফেলে।
( গানপত্র প্রবেশ করে সকলের সম্মুখে এসে)
গানপত্র-নমস্কার—আমি কে ভাবছেন ?—আমি গান !
সাধারণ পত্র—আপনি গান ! তা বেশ বেশ কোথায় যাবেন ?
গানপত্র—(গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে) হুঃযদিও গান
তবে একটুখানি-মুসকিল কি জানেন ?-বিরহ
সঙ্গীত আমি, মিলন গীতি নই। যাব তেমন
বেশী দূর নয়! এই শ্রীরামপুর-কল্যানী
সােমের বাড়ী।
ডাকাতিপত্র-কল্যানী সােমের বাড়ী! বিরহ সঙ্গীত !
ব্যাপারটা একটু রহস্য রহস্য মনে হচ্ছে যে!
গানপত্র-রহস্য তেমন কিছু নয়! তা হলে খুলেই বলি !
যার কাছ থেকে আমি আসছি তিনি সুগায়ক
সুরেশ বাবু। এরি ছাত্রী কল্যানী সােম—
আগে গান শেখাতেন। তারপর মনে মনে
প্রেমে পড়েছিলেন। সাহসের অভাবে মুখ ফুটে
—আটত্রিশ
কবির প্রেম
কিছু বলতে পারেন নি। ফলে কল্যানীর অন্য
জায়গায় বিয়ে হয়। বিয়ের পর ইনি গান লিখে
পাঠান। গান অর্থাৎ এই বিরহ সঙ্গীত অর্থাৎ
যক্ষরাজ দেবদত্তের মেঘদূতের মত আমি চলেছি
সাধারণ পত্র- একঘেয়েমীর মধ্যে তবুত আপনি বেশ
আছেন !
গানপত্র-ছ। তা যা বলেছেন, বেশ আছি বই কি।
মিলনের চেয়ে বিরহের গানই ভাল !!
( এমন সময় প্রেমপত্রের প্রবেশ)
প্রেম পত্র নমস্কার!
সকলে-নমস্কার!
সাধারণ পত্র(স্বগত) কি সুন্দর চেহারা ! কি সুন্দর
সুগন্ধ ওর গা থেকে ভেসে আসছে।
প্রেম পত্র-আশা করি আপনারা বুঝতেই পারছেন
আমি কে! না না–চুপ করে রইলেন যে,
তা হলে খুলেই বলি আমি প্রেম পত্র !
সকলে—সত্যি আপনি বড় সুন্দর।
প্রেম পত্র—এতেই সুন্দর বলছেন—ঞ্চন বলি তবে।
প্রভা বসুর নাম শুনেছেন? রায় সাহেব অতুল
--উনচল্লিশ
কবির প্রেম
বসুর মেয়ে ? বাবুর্চি লেনে বাড়ী। তারি কাছে
যাচ্ছি। প্রথম নয়, পুরাতন প্রেম পত্র।
সাধারণ পত্ৰ-না সত্যি আপনি বেশ জমিয়ে তুলছেন।
তাহলে প্রেমের গল্পটা খুলেই বলুন শুনি।
প্রেম পত্র-গল্প আর কি, খুবই সাধারণ ঘটনা। এরকম
ঘটনা নিয়ে কত লাখ লাখ, গল্প হয়ে গেছে।
ডাকাতিপত্র—আহা হা! তবু আপনি বলুন।
প্রেম পত্র—তবে শুনুন-নির্মল ভট্টাচাজি আর প্রভাদেবী
পড়তেন একই কলেজে! সিঁড়িতে উঠতে
নামতে কতবার হতে ওদের দেখা সাক্ষাৎ। সেই
থেকে হলাে ওদের চোখে চোখে আলাপ।
তারপর হঠাৎ একদিন প্রভাদেবীর প্রয়ােজন
হলাে নিৰ্ম্মল বাবুর হাতের বই খানা। তারপর
চললে একসঙ্গে সিনেমা, লেকে বেড়ান, এমন
কি বালির পুলে হাওয়া খাওয়া পর্যন্ত। বেশ
জমে উঠল প্রেম, আর বেড়ে চলেছে দাদা
পাতার পর পাতা আমার এই চেহারাখানা!
দেখছেন না এক আনায় হয়নি, ছ পয়সায় হয়নি
দুআনার টিকিট রয়েছে কপালে!
ডাকাতিপত্র-যা আপনার সৌজন্যে আমরা যথেষ্ট আনন্দ
পেলাম। ঐযে ও আবার কে আসছে দেখত।
—চল্লিশ
কবির প্রেম
সাধারণ পত্র—আপনি কে?
( শুভ বিবাহ-পত্রের প্রবেশ)
শুভ বিবাহ-পত্র—আপনারা সকলেই ভাবছেন আমি কে। কিন্তু
তার আগে আমি আপনাদের সকলকে নমস্কার
জানাচ্ছি।
সকলে-নমস্কার! কিন্তু আপনি কে?
শুভ বিবাহ-পত্র—আমি ? আমি হচ্ছি-
নমঃ শ্রীপ্রজাপতয়ে নমঃ
সবিনয় নিবেদন !
মহাশয় আগামী ১০ই অগ্রহায়ণ আমার
জ্যেষ্ঠ পুত্ৰ শ্ৰমান বিমান বাবাজীবনের সহিত
রংপুর নিবাসী 'কমলেশ ভাদুড়ী মহাশয়ের
কনিষ্ঠা কন্যা শ্ৰীমতী লেখাদেবীর শুভ বিবাহ।
আপনার উপস্থিতি প্রার্থণীয়। পত্রের দ্বারা
নিমন্ত্রণ করিলাম, ত্রুটী মার্জনা করিবেন।
বিমল দেবশর্মা।
সাধারণ পত্ৰ-ও আপনি তাহলে দারুন সুসংবাদ—শুভবিবাহ !
দুর্ঘটনা পত্র—দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে) হা বরাত ! এখনও বাঙ্গালা
দেশে তাহলে শুভবিবাহ চলছে!
ভগবান !
একচল্লিশ
কবির প্রেম সাধারণ পত্র—এইটুকুনিই তাে আমাদের আনন্দ ভাই, এইটুকুনিই তাে আনন্দ। ভেবে দেখ এরপর আমরা কে কোথায় থাকব। নিজেদের নিজেদের গন্তব্য স্থানে চলে যেতেই হবে। আর হয়ত এমন করে কোন দিনই আমাদের দেখা হবে না- দুর্ঘটনা পত্র—আর কত দেরী clearanceয়ের। সাধারণ পত্র--ঐ যে চাবি খুলছে ! এইবার clearanceয়ের সময় হলাে। এই খানেই আজ আমাদের শেষ !! —বিয়াল্লিশ- অন্তর-দৃষ্টি (ছােট গল্প) চোখের সামনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা তার আগে অতি বিশ্বাসী বন্ধুর মুখে শুনেও বিশ্বাস আসে না। কাজেই আমাদের বিশ্বাসের মূল্য কি! আমি যদি বলি জমিদার দাতারাম রায়ের পরমা সুন্দরী একমাত্র কন্যার বিয়ে হয়েছিল তাঁরি বাড়ীতে পালিত অজ্ঞাত কুলশীল, কুৎসিত, আঁরি দয়ায় উচ্চ শিক্ষিত উৎপল সেনের সঙ্গে, যারা ব্যাপারটা খােলাখুলি ভাবে জানেন না তারা হেসে উঠবেন, আর যারা সিনেমায়, ইডেনগার্ডেনে, লেকের ধারে বালির পুলে দেখেছেন, বিয়ের আগে দাতারাম রায়ের কন্যা কল্পনাকে বিলাত ফেরত বড় ইঞ্জিনিয়ার সাহেব লম্বা চওড়া চেহারা ফুটফুটে রং প্রকাশ বাবুর সঙ্গে নির্জনে বসে প্রেমালাপ করতে, তাঁরাও বলবেন, আমি পাগল—অথচ আমি বলছি, সত্যি কল্পনার বিয়ে হয়েছে—উৎপল সেনের সঙ্গে—আর এটাও জানি বিয়ের পর উভয়েই সুখী। ব্যাপারটা তা হলে খুলেই বলি-কল্পনা রায় আর উৎপল সেন পড়তে একই কলেজে, একই সঙ্গে আইএ, কল্পনা বৃদ্ধ জমিদার দাতারাম বাবুর একমাত্র কন্যা, মা-মরা হলেও আদর তেতাল্লিশ-
কবির প্রেম
যত্নের অভাব ছিল না। আর অন্য কিছুরই যে অভাব ছিল না, এ
কথা বলার কোন প্রয়ােজনই মনে হয় না। উৎপল ভাল ছেলে,
ক্লাসের ফাষ্ট বয়। সংসারে সে ছাড়া দ্বিতীয় ব্যক্তি কেউ নেই
তার আত্মীয় পরিচয় দেবার মত। নিজের খরচ চালিয়ে চলে
তার দিন। মাঝে মাঝে আসে অভাবের ঢেউ। বুঝি বা
ভেসে যায় তার লেখাপড়া, শেষ হয়ে যায় তার সব আশা।
এমন সময় একদিন কল্পনার গাড়ী কলেজের গেটে গিয়ে
মারলে এক ধাক্কা উৎপলকে। আঘাত সামান্য হলেও উৎপল
ছিটকে গিয়ে হয় অজ্ঞান।
হাসপাতালে জ্ঞান ফিরে পাবার পর তাকে যখন জিজ্ঞাসা
করা হয় তার আত্মীয় স্বজনের ঠিকানা। সে বলে আত্মীয় স্বজন
বলতে তার আছে একটা কুকুর। আর তারি সঙ্গে সে থাকে
কোন একটা বস্তির একটী ছােট ঘরে। পড়াশুনা আর টিউসানি
করে তার দিন চলে। আঘাত সে পেয়েছিল অল্পই, কাজেই
অল্পদিনেই সেরে উঠল সে, তবে যে কদিন সে ছিল হাসপাতালে
রােজই সন্ধ্যার সময় তাকে দেখতে আসতেন দাতারাম বাবু
আর তাঁর সঙ্গে তাঁর কন্যা কল্পনা নিয়ে আসতেন সামান্য
ফল আর আপ্যায়িতের একটু হাসি।
কয়দিন হাসপাতালে থেকে আসার ফলে গেল তার
টিউসানিগুলাে। বেচারা করে কি, আবার সময় বুঝে এলাে
চারিদিক থেকে তাকে ঘিরে নানা অভাব। অভাবের
—চোয়াল্লিশ--
কবির প্রেম ঘূর্ণিপাকে অস্থির হয়ে একদিন জমদিার দাতারাম রায়ের দরবারে সাহায্যের আবেদন নিয়ে সে হাজির হলাে। জমিদার বাবুও নামের সার্থকতা বজায় রাখেন। তাকে তঁারি বাড়িতে একটু স্থান দিয়ে তার পড়াশুনার খরচা নিলেন নিজের ঘাড়ে। সুরু হলাে জমিদার বাড়ীতে উৎপলের নূতন জীবন। কল্পনা উৎপলকে অবজ্ঞার চোখে না দেখলেও দয়ার চোখেই দেখতে লাগল, কাজেই দয়ার উপর চলে তাদের উভয়ের একসঙ্গে লেখাপড়া খেলাধূলা, কাজেই অজানিতে হয় তাদের বন্ধুত্ব। অল্প একটু ভালবাসার যে আভাস ছিল না তা নয়। ছিল, তবে মুস্কিল হচ্ছিল উৎপলের ওই বিশ্রী চেহারাটা, কারণ কল্পনার রূপের কথা তুললে অনেক দেশী বিদেশী সুন্দরীর কথা তুলে বােঝাতে হয়, অল্প কথায় তাকে পরমাসুন্দরী রূপসী উর্বশীর মত বললেই যথেষ্ট হবে। দুজনেই এক সঙ্গে পাশ করলে যেদিন, সেদিন কি ধূমধামের না আয়ােজন হয়েছিল জমিদার বাড়ীতে। যদিও কল্পনা কোন রকমে পাশ করেছিল, আর উৎপল হয়েছিল ফাষ্ট। জমিদার বাড়ীর পাশের উৎসব রাত্রে প্রথম আলাপ হলাে বিলাত ফেরত প্রকাশ বাবুর জমিদার কন্যা শিক্ষিতা কল্পনা তারপর চলে তাদের অবাধে মেলামেশা। প্রকাশের গায়ের রং, চেহারার সৌন্দৰ্যই শুধু নয়, তার বিলাতি কায়দার গুণও কাজ করেছিল যথেষ্ট কল্পনার মনে। কল্পনা ত —পঁয়তাল্লিশ-
কবির প্রেম
কত রাত্রি শুধু ভালবাসার স্বপ্ন দেখে জেগে কাটিয়েছে, আর
প্রকাশ! সে জানে বিলাতি কায়দায় অভিনয় করতে। যে দেশে
খুন হয়—অথচ খুনীর হাতে লাগে না রক্তের দাগ। সে চায়
কল্পনাকে একান্ত আপনার করে ছবির বইয়ের পাতার ছবির
মত-যতদিন না পাতা উলটে আর একখানা পাতার ছবি আসে
তার সামনে। মুখে সে বলে, লম্বা বক্তৃতা দিয়ে নারী রত্ন
অমূল, মনে জানে নারীর আবার মূল্য কি! পুতুল খেলার
পুতুল। তাই যেমন খুসি তেমনি করে নাচিয়ে চায় সে ফেলে
দিতে। কল্পনার সম্বন্ধে তার ওই একই মত। কিন্তু বাহিরে
সে বজায় রেখেছে সবই। নির্জনে বসে কল্পনার একটা সুন্দর
হাত নিজের হাতে নিয়ে শুনায় তাকে কত প্রেমের কূজন গুঞ্জন,
এমন ও সে বলে কল্পনাকে—সে তার জীবনের আলাে। সে চলে
গেলে তার জীবন হবে অন্ধকারময়। কল্পনা সরল প্রাণে
বিশ্বাস করে চেয়ে থাকে প্রেমের উদাস চোখে প্রকাশের মুখের
দিকে, প্রাণ তার চায় প্রকাশকে আরও ভালবাসতে আরও, তার
বুকের কাছটিতে টেনে নিতে। এই ভাবে যখন চলেছে তাদের
প্রেমের অভিনয় চরম পর্যায়, সেই সময় এতদিনের সঞ্চিত
ভালবাসা একদিন কোন বাধা আপত্তি না মেনে প্রকাশ পায়।
নির্জনে একাকী কল্পনাকে পেয়ে উৎপল বলে সে তাকে
ভালবাসে, এবং সে জানে কল্পনাও তাকে ভালবাসে। কাজেই
তাদের বিয়ে হলে তারা উভয়ে জীবনে সুখী হবে। কল্পনা তাকে
কবির প্রেম
সহজ সরলভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিল—এটা তার ভুল। সে তাকে
মােটেই ভালবাসে না। বিয়ে তাদের অসম্ভব। সে ভালবাসে
প্রকাশকে। তা ছাড়া উৎপলকে সে নির্জনে দেখলে ভয় পায়।
ভয় পাবার কারণ তার ঐ বিশ্রী চেহারা। আর জিজ্ঞাসা করে—
আচ্ছ। উৎপল বাবু, আমার পিতার স্নেহের প্রতিদানেই কি
আপনি আমায় বিয়ে করতে চান? সে প্রশ্নের উত্তর দিতে
কোথায় যে উৎপল নিরুদ্দেশ হলাে তার আর কোন খোঁজই,
পাওয়া গেল না।
এরপরও চলেছিল আরও কিছুদিন কল্পনা আর প্রকাশের
সিনেমা, থিয়েটার, লেকে বেড়ান, নির্জনে প্রেমের কূজন, কল্পনার
মনে হয়েছিল কি সুন্দর এই জীবন। প্রকাশ ছিল সুযােগ
খুজতে পালাবার। সুযােগ না এলেও ঘটল এক বিপদ
যেদিন কল্পনা জানলে নির্জনে চুপি চুপি শীঘ্রই তাদের বিবাহের
প্রয়ােজন নচেৎ সমাজে আর স্থান নেই। সেই দিনই প্রকাশ
এক চিঠি পায় বিলাত থেকে—শীঘ্রই বম্বাইয়ে আসছে তার
বিলাতে বিবাহিত স্ত্রী Mrs. মেরী গুপ্ত, তিন চারটী ছেলে মেয়ে
নিয়ে। চিঠিখানা পেয়ে সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল। তাই
টেবিলের উপর খােলা অবস্থায় চিঠিখানা রেখে মনের রাগ দূর
করতে বাড়ীর পিছনের বাগানে যায় পায়চারি করতে। সেই
সময় বুঝেই এসে হাজির কল্পনা, সেই টেবিলের ধারে চেয়ারে
বসে চাকরকে সে পাঠায় প্রকাশ বাবুকে ডেকে আনতে।
সাল্লিশ
কবির প্রেম তারপর নজর পড়ে চিঠির তলার নামটার উপর—Mrs মেরী গুপ্ত। সঙ্গে সঙ্গে এক ঝলক উত্তপ্ত রক্ত প্রবাহিত হয় তার প্রত্যেক শিরা উপশিরার মধ্য দিয়ে ; রাগে দুঃখে নিজের ভুলে কেঁপে উঠল তার সমস্ত শরীর, যখন প্রকাশ এসে ঘরে ঢুকেছে তখনও চিঠিখানা ছিল তার হাতে। প্রকাশ কল্পনার হাতে চিঠিখানা দেখে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে চিঠিখানা নিতে যাবে এমন সময় কল্পনা চিঠিখানা মুড়ে নেয় তার হাতের মুঠির মধ্যে। তারপর যা নয় তাই বলে সে অপমান করতে থাকে প্রকাশকে। প্রকাশ তখন জোরে চিঠিখানা ছিনিয়ে নিতে গিয়ে এক ঝটকানি দেয় কল্পনাকে, কল্পনা ছিটকে গিয়ে পড়ে একটা আলমারির উপর আর আলমারির তাকে ছিল এক বােতল এসিড, সেই বােতল উলটে এসিড পড়ে কল্পনার চোখে মুখে। হাসপাতালে দেখা গেল কল্পনাকে অন্ধ। দুটী চোখই তার একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। সারা মুখখানায় পােড়ার কাল দাগ। দাতারামবাবু কন্যার নির্বুদ্ধিতায় বুড়ো বয়সে পেলেন এক দাগ, যখন সব কিছুই জানতে পারলেন। এখন আর উপায় কি দুঃখ করা ছাড়া। প্রকাশ সেই ঘটনার পরে কোথায় যে উধাও হলাে তার খোঁজ কেউ পেলেন। তার এই আকস্মিক অদৃশ্য হওয়ার ফলে বাড়ীওয়ালার তিন মাসের ভাড়া গেল মারা, আর চাকর চাকরাণীদেরও তাই। ঘরের আসবার পত্র যা ছিল ভাড়া করা। তারও ভাড়া মারা গেল। তবে জিনিষগুলো সবিই পেয়েছিল ফেরত। —আটচল্লিশ-
অন্তরদৃষ্টি
বৃদ্ধ জমিদার দাতারাম রায়ের অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল
কল্পনার বিয়ে দিতে উৎপলের সঙ্গে। শেষের দিকে মত বদলে
ছিলেন মেয়ে সুখী হবে জেনে প্রকাশ যদি বিয়ে করে তাকে।
তারপর একেবারে গেল সব উলটে পালটে। কল্পনার আবার
বিয়ের কথা ভাবা ত দূরের কথা, তার অনাগত ভবিষ্যতের
কথা মনে হলে গা ওঠে শিওরে।
এমনসময় একদিন এত ভাবনা দূর করে দিতে, মরণ-বাচন
সমস্যার সমাধান করতে এলে একখানা মােটর গাড়ী সন্ধ্যার
সময় জমিদার বাড়ীর সামনে। গাড়ী থেকে নেমে সােজা এসে
হাজির হলাে কল্পনার ঘরে উৎপল। কল্পনা অন্ধ, কাজেই পায়ের
শব্দ শুনে জিজ্ঞাসা করলে, কে? উৎপল বলে, আমি—তােমার
অনুগৃহীত বন্ধু। আজ কল্পনা, তােমার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি।
যে এই পৃথিবীর বুকে হাসিকান্নার মাঝে আসছে নিঃসহায়,
তা'কে তার পরিচয় দেবার মত অন্ততঃ কিছু আজ আমায় দিতে
দাও। আজ তােমার কোন আপত্তি আমি মানতে রাজি নই
এমনসময় সেথায় আসেন জমিদার দাতারাম রায়। পুত্রস্নেহে
পালিত উৎপলকে আবার ফিরে আসতে দেখে এই এত
আঘাতেও তিনি যেন একটু সান্ত্বনা পেলেন। কল্পনা আজ
দেখতে না পেলেও তার দু’চোখভরে এসেছিল জল, আনন্দে।
দাতারামবাবু
উৎপলের কথা শুনে বললেন-দেখ বাবা, যা
ঊনপঞ্চাশ
কবির প্রেম হবার তা হয়েই গেছে, কেন আর তুমি তােমার নিজের জীবনটা ওর দুখের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে দিতে চাও। উৎপল আজ মরিয়া। সে বলে—যা হবার তা’ত এখনও শেষ হয়নি। আমি চাই তার শেষ করতে। নুতন যে আসছে ধরণীর আলােয় তার নিজের পরিচয়ই যথেষ্ট হবে না, চাই তার পিতার পরিচয়, নচেৎ ব্যর্থ হবে তার আসা। তাই তাকে সেই পরিচয় দেবার সাহায্য থেকে আমায় মিছে বাধা দিয়ে নিরাশ করবেন না। তারপর খুব সামান্য আয়ােজনেই শেষ হয় তাদের বিয়ে। একঝোকে বিমল এতখানি বলে যেন হাঁপিয়ে পড়েছে মনে হলাে। ধূর্জটা তাই বললে—এবার একটু জিরিয়ে নাও—যাক আজ সকালে চায়ের সঙ্গে তােমার এই মজাদার গল্পটা বেশ লাগছে—হাঁ, বলি তারপর তাদের খবর আর কিছু জান ? রমেশ ছিল এতক্ষণ গম্ভীর হয়ে, হঠাৎ যে সেই রকম গম্ভীরভাবেই বলে উঠল—আচ্ছা বিমলবাবু, আপনার গল্পের নায়ক নায়িকার বিবাহ ত হলাে, কিন্তু শুভদৃষ্টি হয়েছিল বিমল আবার সুরু করে-হয়েছিল বৈ কি। তবে বলি শুনুন তার পরের খবর তাদের ভালই, কারণ কিছুদিন আগে হঠাৎ একদিন দেখা হয়েছিল উৎপলের সঙ্গে। জিজ্ঞাসা করলাম- কেমন আছ উৎপল? উত্তরে সে বলেছিল—বেশ ভালই। পরে তার বউ কল্পনার কথা জিজ্ঞাসা করতে সে যা বললে,-ভারি মজার কথা! তার বৌ নাকি দৃষ্টি ফিরে পেয়েছে। আমি ত
অন্তরদৃষ্টি
শুনে প্রথমটা খুব অবাক হয়ে গেলাম, বললাম-বল কি হে!
হঠাৎ বৃষ্টি ফিরে পেলে কেমন করে !
সে তখন বললে—একদিন রাত্রে শুয়ে আছি, হঠাৎ বৌ
বলে উঠল আমার বুকের উপর তার মুখখানা রেখে—আমায়
সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। বলতে সুরু করলে—সত্যি তুমি
কি সুন্দর! তার কথা শুনে আমি অবাক।
গাঢ় অন্ধকারে আমি আমার সহজ ভাল চোখ নিয়ে বুকের উপর -
তার মুখ তাই ভাল করে দেখতে পাচ্ছি না, আর সে বলে কি
আমায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ! ভাবলাম—হায় ভগবান, শুধু
অন্ধ ছিল এবার আবার মাথার দোষ দিলে হরি! এমন সময়
সে আবার বলে উঠল—ওগাে আমায় বিশ্বাস কর। তুমি ভাবছ
আমি অন্ধ, কি করে তােমায় দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু তুমি কি
বুঝবে আজ আমি চোখের দৃষ্টি হারিয়ে অন্তরদৃষ্টি পেয়েছি
যাক, তারপর আমিও মনে মনে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস
ফেলে বাঁচলাম, বললাম—সত্যিই অন্তরদৃষ্টি দিয়ে দেখলে বােঝ
যায় যে তােমার এই বাহিরের রূপটাই সব নয়।
তারপর বিমল আমাদের দিকে চেয়ে বললে—সত্যি ধূর্জটা
বাহিরের দৃষ্টি দিয়ে লােকের রূপ বিচার করে আমরা কতখানি
যে ভুল করি তা আমরাই জানি না। অথচ প্রকৃত রূপ যা,
তা থাকে লােকের অন্তরে, আর সেই রূপ দেখতে গেলে চাই
অন্তরদৃষ্টি।
এই বলে বিমল শেষ করলে তার মন্তব্য।
জীবনের গতি
(ছােট গল্প)
জীবনে কখন কার কি ঘটে তা ভাবতে গেলে ভাবনা
সাগরের অকূলে পড়ে হাবুডুবু খেতে খেতে অস্থির হতে হয়।
জীবনে ভবিষ্যৎটা না ভেবে বর্তমানকেই ভালভাবে কাজে
লাগিয়ে নেবার চেষ্টা করা ভাল, আর তা ছাড়া ভবিষ্যৎকে কাছে
আসতে গেলে এই বর্তমান সদর দরজা দিয়েই আসতে হবে,
এ ছাড়া অন্য কোন পথ তার নেই। তাই সুদূর ভবিষ্যৎকে
পাশে ফেলে রেখে বর্তমানকে ভালভাবে উপভােগ করে নেবার
উদ্দেশ্যে, শ্ৰীমান গােবর্ধন সেদিন নির্জনে একাকিনী পেয়ে
বীণার একখানি হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে আর অপর হাতে
বীণার কপালের অগােছাল চুলগুলি সরিয়ে পাশে গুছিয়ে দিতে
দিতে বললে-বীণা ! এখানে যখন আমাদের বিবাহ একেবারে
অসম্ভব--সমাজ শাস্ত্র নিয়মে যখন আমাদের বিবাহ হতেই
পারে না, অথচ আমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালবাসি, একের
অন্যের বিচ্ছেদে আমাদের জীবন হবে বীড়ম্বনামাত্র—তাই
-চল পালিয়ে যাই কোন দূর দেশে যেখানে আমরা থাকবাে
দুজনে একটা ঘর বেঁধে। সত্যি তুমি আপত্তি করে না।
আর তােমার বাবা যেমন উঠে পড়ে লেগেছেন তােমার বিবাহ
জীবনের গতি
দেবার জন্য, তাতে মনে হয় এই মাসেই বিবাহ দেবেন ঠিক
করেছেন। বীণা প্রশ্নকরে—কোথায় তাহলে পালিয়ে যাবে ?
--সে তখন পথে গিয়ে পথের সন্ধান করে নেওয়া যাবে।
—কিন্তু পথের খরচ কিছু চাই ত, তার কি করবে?
-সে ভাবনা তােমার ভাবতে হবে না বীণা, সে আমি সব
ঠিক করে নেব। তুমি শুধু যাবে আমার পাশে। কোন কিছুর
ভাবনা তােমায় ভাবতে দেব না।
এমন সময় বীণার মা এসে পড়েন সেখানে, বলেন—এই যে
বাবা গােবর্ধন, তুমি কতক্ষণ এসেছ?-কি কিছুই ভাবতে দেবে
’ বীণাকে? আবার বুঝি তােমাদের তর্ক শুরু হয়েছে? না,
তােমাদের নিয়ে আর পারলাম না। কি যে তােমাদের তর্ক
আর তর্ক, মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝি না। কোথায় বিলেতে কবে
কোন সালে কোন মহৎ লােক জন্মেছিল তাই নিয়ে তােমাদের
সেদিন যা তর্ক ! আমি রান্নাঘর থেকে ভাবলাম বুঝি বা
তােমাদের মারামারি না বাধে। তা যাক, জান বাবা গােবর্ধন, মা
বীণার আমার বিয়ের একরকম ঠিকঠাক করে ফেলেছেন তােমার
কাকাবাবু। বীণা বুঝি সে সব কথা তােমায় কিছু বলেনি?
আজ আর একটু পরেই তারা আশীর্বাদ করতে আসবে।
এবার তিনি মেয়ের দিকে ফিরে দেখাদেখি এখনও
পৰ্যন্ত মেয়ের গা থােয়া, সাজবার নামটা নেই। আবার
গগাবর্ধনের দিকে ফিরে—তুমি বাবা যখন এসেছ তখন খুব
—তিল্পায়—
কবির প্রেম
ভালই হয়েছে, খাটা খাটুনির দিকে, তােমার কাকাবাবুর অনেক
উপকার হবে’খন।
গগাবর্ধনকে তখন বলতে শােনা যায়, শুনলাম বীণার
বিয়ে, সেই কথাই ত হচ্ছিল। আমি তাই জিজ্ঞাসা করছি
বীণাকে-কি রঙের শাড়ী ওকে খুব ভাল মানায়, আর কি রঙের
শাড়ী ও পরতে ভালবাসে।-নাও, বল বীণা-তােমায় কিন্তু
ভাবতে মােটেই সময় দেব না। বল, বল চট করে ?
বীণা কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল, তার মুখ দিয়ে এলাে-
, আমি যেতে পারবে না।
বীণার মা তখন বলে উঠলেন—না যাকিনা কি, আর একটু
পরেই ওরা আসবে। নে, নে, তুই গা ধুয়ে এসে সেজেগুজে
নে, তারপর বীণার মা এগিয়ে গেলেন মনে মনে বলতে
বলতে—দেখি ঠাকুররা রান্নাবান্নার কতদূর কি করেছে।
এবার বীণা গােবর্ধনের কাছে এসে বললে-গগাবর্ধনদা,
আমার ভালবাসার বিনিময়ে একটা অনুরােধ রাখবেন ? না, না,
তােমায় আমার এ অনুরােধ রাখতেই হবে। বল, বল রাখবে।
দেখা গেল বীণার দুটী চোখ ভরে এসেছিল জলে। সে
কঁপছে দেখে পাছে পড়ে যায় সেই ভয়ে গােবন তাড়াতাড়ি
তাকে তার বুকের কাছটীতে করে নিয়ে বলে—বল। বীণা
গগাবর্ধনের বুকে মাথাটা রেখে যেন কিছু সাহস পেলে, কিন্তু
চোখের জল তখনও চলেছে বয়ে তার অবাধে। গােবর্ধনেরও
-চুয়ায়
জীবনের গতি
চোখের জলে ভিজছিল বীণার মাথার চুল। এই ভাবে
কিছুক্ষণ উভয়ে নীরব থাকার পর বীণাকে বলতে শােনা গেল
গগাবর্ধনা, তুমি সব ভুলে যাবে বল, তুমি কোন দুঃখ করবে
বলে। তারপর চলে আবার তাদের কান্নার পালা। আবার
বীণা বলে জানি তুমি খুব কষ্ট পাবে। কিন্তু কি করব?
তবু তুমি আমায় ভুলে যাও। তুমি আমার এ বিয়েতে মত
দাও গােবর্ধনা-আবার কান্না। এবার গােবর্ধন, বীণাকে
তার বুকে আরও জোরে চেপে কান্নার সুরে বলে ওঠে,-ভুলতে
আমি কিছুতেই পারবাে না। তবে তুমি বিয়ে করে সুখী হও
বীণা। তুমি জান না তােমার দেওয়া ফটোখানা কত যত্ন করে
রেখে দিয়েছি। তােমার প্রেমের মূর্তি আমি অন্তরে একে
রেখেছি চিরদিনের তরে। তুমি দূরে চলে গেলেও সে মূৰ্ত্তি মুছতে
পারে না। গােৰ্দ্ধন আর কিছু না বলতে পেরে ফুপিয়ে
ওঠে কেঁদে। এবার বীণা বলে—তুমি কাকে বলে না
আমাদের এই প্রেমের কথা, আমরা উভয়ে জাবাে গত
জীবনটা আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম।
গগাবর্ধন কান্নার সুরে বলে-না, না, সে স্বপ্ন হলেও বীণা
আমি ভুলতে পারবে না তা’? বীণা বলে এবার—আমিও কি
ভুলতে পারবে? না, না, পারবাে না। কিন্তু কি করবাে ?
বিবাহ যে না করেও উপায় নেই। মনে আমার রয়েছে কতদিন
নির্জনে বসে কত গল্প করেছি কত গান গেয়েছি, কত ফুল
কবির প্রেম
দিয়ে সাজিয়ে দেছ তুমি আমার কবরী, আমিও
মালা গেঁথে পরিয়ে দেছি তােমার গলায়। আমি তােমায়
প্রাণ ভরে ভালবেসেছি, আরও ভালবাসতে চাই—কিন্তু
তারপর চলে ফুপিয়ে কান্নার মধ্য দিয়ে তাদের সময়ের
মুহূর্তগুলি, এমনসময় আবার ডাক পড়ে রান্নাবাড়ীর ভেতর
থেকে-বীণা, মা আমার, গা ধুয়ে তাড়াতাড়ি সেজে নে।
এই ব্যাপারের তিন দিন পরে বেশ ঘটা করে বিয়ে হয়ে
যায় শ্রীমতী বীণা দেবীর এম এ পাশ বজ্র ভাদুড়ীর সঙ্গে।
বীণাদেবীর বর দেখে অনেক কুমারী মেয়েই ঠিক করেছিল
বিয়ে যদি করতেই হয় ত রকম বর বিয়ে করা উচিৎ।
যেমন চোখ, মুখ, নাক, তেমনি গায়ের রং। ঠোঁটের হাসি
থেকে চলার ভঙ্গিমাটা পর্যন্ত বেশ মন ভােলানাের কৌশলে
পূর্ণ। শুভদৃষ্টির সময় বীণা বর্জ্যের মুখ থেকে পারেনি সরিয়ে নিতে
অন্য দিকে তার চোখের দৃষ্টি। তারপর যতদূর জানা যায়
বীণা বিবাহের পর গােবর্ধনবাবুর সঙ্গে মােটেই দেখা করেনি
আর। আর তার স্বামী দেবতাটাকে কিছুক্ষণ না দেখতে
পেলেই তার মধ্যে আসে এক অস্বস্তির ভাব। কাজেই সময়
তার কাটে স্বামী দেবতাটীকে চোখে চোখে রেখে।
গােবর্ধন এখন রাজনৈতিক জগতের একজন বড় নেতা।
দেশের মুক্তিচিন্তা ছাড়া অন্য কোন চিন্তা তার কাছে মহাপাপ।
সব সময়ই তাকে চিন্তা করতে হয়-জনসভায় বক্তৃতার আরও
জীবনের গতি
অনেক বড় বড় বিষয়ের দেশমাতার মুক্তির জন্য। তার মা তাকে
কতবার বলেছেনবাবা, বিয়েথা কর, একটা টুকটুকে
বৌ এনে সংসারে মন দে। কিযে সুরু করেছিস, তার পরিনাম
ভাবতে গেলে ভয়ে আমার বুক ওঠে কেঁপে। উত্তর আসে-
তুমি বােঝ না মা, পরাধীনের বিয়ে করা মহাপাপ। এরপর
মা কি আর ছেলেকে পাপ করতে বলতে পারেন? কাজেই
চুপ করে চলে যেতে হয় অন্যত্র।
এদিকে বছর চার পরে একদিন বজ্র চলেছে তার স্ত্রীর শরীর
খারাপ হওয়ার দরুণ হাওয়া বদলাতে ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে
পুরীর পথে। গাড়ীখানা যখন হাওড়াষ্টেশন ছাড়ে তখন
ভীড় ছিল গাড়ীতে ভীষণ, পাশের লােকেরই মুখ দেখবার
সময় ছিল না নিজের স্থান নিয়ে ব্যস্ত থাকায়। গাড়ীখানি
চলতে শুরু করে। তিন চারটা ষ্টেশনে একটু একটু থেমে
কিছু যাত্রী নামিয়ে দিয়ে চলতে শুরু করেছিল যখন
তখন দেখা গেল-গাড়ীখানির কামরার একটী কোণে বজ্র
তার বড় ছেলেটাকে কোলে নিয়ে জালার মধ্য দিয়ে দেখছিল
প্রশস্ত মাঠ আর নীল আকাশ,আর বীণাদেবী ঘুমন্ত ছােট
ছেলেটাকে কোলে নিয়ে একদৃষ্টে চেয়েছিল ছেলেটার মুখের
দিকে। হঠাৎ ছেলেটা ওঠে চীৎকার করে কেঁদে, হয়ত কোন
দুঃস্বপ্ন দেখে, তাই তাড়াতাড়ি বীণা দেবী ছেলেটাকে বুকের কাছে
চেপে নিয়ে ভােলাতে বড় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ছেলেটির আকস্মিক
সাভার
কবির প্রেম
চীৎকারে গাড়ীর অন্যান্য যাত্রীদেরও দৃষ্টি পড়ে সেই দিকে।
সেই একই কামরার অপরদিকে বসেছিল রাজবন্দী অবস্থায়
দু’জন সিপাহীর সঙ্গে গােবর্ধন।
সেও চলেছে প্রেসিডেন্সী
জেল থেকে মেদিনীপুর জেলে বদলি হয়ে। ছেলেটীর কান্নায়
তারও দৃষ্টি গিয়েছিল সেইদিকে, তারপরেই তার প্রত্যেক
শিরার মধ্যে প্রবাহ হয়েছিল শিহরণ। সে মনে মনে উঠেছিল
চমকে, মনের মধ্যে এসেছিল ভীষণ চাঞ্চল্য।
তারপর আবার সেই যথা পূৰ্ব্ব তথা পরম্। দিন যায়,
মাস যায়, বছর কেটে গেল। আরও দু’টা বছর পরের কথা।
এখন গােবর্ধন সার বুঝেছে দেশের মুক্তি ফিরে পেতে গেলে
চাই পুরুষ ও নারীর সমবেত সাধনা। তাই তার মায়ের কথামত
আজ সে বিয়ে করতে রাজী হয়েছে পানিহাটীর জমিদার
অমৃতলাল বসু মহাশয়ের কন্যা গৌরীকে। বয়স একটু বেশী
হলেও পরমা সুন্দরী। বিয়ের পর গােবর্ধন যখন বাসরে গিয়ে
বসেছে, তখন পাড়ার অনেক বৌ-ঝিই এসেছে নূতন বরের সঙ্গে
একটু ঠাট্টা তামাসা করবার আশায়। পাশের বাড়ীর ভাদুড়ীদের
বৌ বীণা এতক্ষণ ব্যস্ত ছিল নিজের কচি ছেলেটাকে নিয়ে, এবার
এগিয়ে এসে গৌরীকে বললে—সই, এখনও তাের বর দেখিনি,
কই তাের বর দেখি। তারপর বরের সামনাসামনি হতেই তার
মুখের সমস্ত রক্ত নিমেষে যেন কোথায় চলে গেল। মুখের বর্ণ
সাদা কাগজের মত, তবু সহসা তার মুখ দিয়ে এলো
-গগাবর্ধনদা!
-আটায়-
জীবনের গতি
গগাবর্ধনও কতকটা হতভম্বের মত হয়ে পড়েছিল। তবে
জীবনে তার অনেক কিছুই ঘটে গেছে, তাই সামলে নিয়ে বললে
-বীণা ! তােমার শ্বশুর বাড়ী বুঝি এই কাছেই ? বিয়ের
পর আর মােটেই বাপের বাড়ী গেলে না! সত্যি, কাকাবাবু
কাকীমা কত দুঃখ করেন—তােমার না যাওয়ার জন্য।
তারপর উৎসব রাত্রি শানাইয়ের সুরে আর আনন্দের
কোলাহলে প্রভাত হলো। গােবর্ধন তার নব পরিণীতা বৌ নিয়ে
সুখী, আর বীণা তার ছেলে মেয়েদের নিয়ে ব্যস্ত।
কাজেই কখন কি ঘটবে, আর কার কি ঘটবে তা না ভাবাই
ভাল-কারণ জীবনের গতি বড় অদ্ভুত।
—উনষাট--
“রাত্রি বারােটা
( নক্সা)
বিমল তার ঘরে ঢুকে টেবিলের ওপর থেকে চিঠিখানা তুলে
পড়তে শুরু করে। সে ভেবেছিল হয়ত চিঠিখানা এসেছে
'মলিনার কাছ থেকে। আসলে চিঠিখানা ছিল এক পত্রিকা-
সম্পাদকের, জরুরী হুকুম একটা লেখা দেবার—লেখা আবার
যেমন তেমন নয়—একাঙ্ক নাটিকা।
চিঠিখানা এক পাশে রেখে বিমল তুলে নিলে তার খাতা
আর পেসিল। সুরু করলে ছক কাটতে তার নাটকের, ছক
কাটা যখন শেষ হল তখন মুস্কিল হ’ল তার নায়ক আর
নায়িকার নাম নিয়ে—কিছুতেই আর ভাল নাম তার মনে পড়ে
। বেজায় বিরক্তি, এল তার নিজের ওপর। হঠাৎ সে
দেওয়ালের ওপর বড় ক্লক ঘড়িটার দিকে চেয়ে দেখে—রাত্রি
বারােটা। না আর ত দেরী করা চলে না। নাম সে ঠিক করলে
শেষে ‘সুকুমার।
সুকুমার তাড়াতাড়ি করলে ত আর সময় তাড়াতাড়ি যাবে
না, কি তার বাড়ীটাও এগিয়ে আসবে না। আফিস থেকে
উঠবার সময় সে টেলিগ্রাম পেয়েছে তার ছােট ভাইয়ের কাছ
থেকে যে তার স্ত্রীর বড় বাড়াবাড়ি অসুখ—তাকে এই রাত্রেই
-যাট
।
}
রাত্রি বারােটা
যেতে হবে দেশে ফিরে। অসুখ শুনে ত আর খালি হাতে যাওয়া
যায় না। মাসের শেষের দিকে হাতে পয়সাও নেই। তাই
বন্ধুদের খোঁজে বেরিয়ে কিছু পয়সা ধার করে কিনে নেয়
সামান্য কিছু ফল। ষ্টেশনে এসে দেখলে গাড়ি ছাড়তে অল্প
সময় বাকী আছে। তাই তাড়াতাড়ি একখানা টিকিট কেটে
সে গাড়ীর এক ছােট কামরায় একটা ভদ্রলােকের পাশে
বসল-ভদ্রলােকটী হয়ত এতক্ষণ বসে ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ .
পাশে সুকুমার এসে বসায় চোখ খুলে চাইলেন। পাদুটা
একটু সরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—মশাই, কোথায় যাবেন ?
সুকুমার তাঁকে জানালে—রূপসা ইষ্ট। কিছুক্ষণ উভয়ে নীরব
থাকার পর সুকুমার জিজ্ঞাসা করলে-কখন গাড়ীটা ছাড়বে?
ভদ্রলােকটা বললেন –“বারােটায়। এমন সময় গাড়ী চলতে সুরু
করলে আর দূরে গীর্জার ঘড়িটায় রাত্রি বারােটা জানিয়ে দিলে।
সুকুমার একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে জিজ্ঞাসা করলে
আপনার সঙ্গে ত পরিচয় হলাে, কিন্তু নামটা এখনও ত জানা
হলাে না? ভদ্রলােকটী বললেন—আমার নাম দীপক রায়।
দীপক যে কেন এত মদ খায় তা হােটেলের মালিকের
জানবার দরকার করেনি কোনদিন। সে জানে দীপক বাবু
শিক্ষিত যুবক আর বড়লােকের ছেলে। বােজই সন্ধ্যার সময়
নিজে গাড়ী চালিয়ে আসে, আর এক বােতল মদ শেষ করে
রাত্রে ফিরে যায়। সােজকের রােজ খরচের পয়সা দিয়ে মাঝে
-একটি-
কবির প্রেম
মাঝে বয়কে বকসিস করেও যায়। সেদিন যথানিয়মেই দীপক
মদ খাচ্ছিল, এমন সময় তার সামনের টেবিলটায় একটা
ভদ্রলােক আর একটা ভদ্র মহিলা এসে বসলেন। মহিলাটা হয়ত
তাঁর স্ত্রী হতে পারেন, তবে খুব যে প্রগতিশীলা আর শিক্ষিত
তা বেশ ফুটে উঠেছিল তাঁর বেশভূযায়, আর অল্প কথা শুনতে
পাওয়া গিছলাে তা’তে। ভদ্রলােকটা দীপককে দেখে হঠাৎ চেয়ার
হেড়ে তার কাছে এসে বললেন—কিহে দীপক তুমি! এভাবে
বসে Drink করছ, একা, এতরাতে, এখানে? তা কেমন আছ?
কলেজ ছাড়ার পর ত আর দেখা নেই! সত্যি তােমাকে এই
রাত্রি বানােটার সময় হােটেলে দেখতে পাব তা কোনদিনই
আশা করিনি। যাক যখন দেখা হল তখন এসাে পরিচয়
করিয়ে দি আমার স্ত্রীর সঙ্গে। এর নাম অনিমা।
অনিমা শিকারের আশায় নিজের দেহটাকে বেশ সৌখিন
করে সাজিয়ে সন্ধ্যা থেকে দরজার কাছে আগন্তুকের আশায়
দাড়িয়েছিল, কিন্তু বরাতটা তার খারাপ, তাই এত রাত্রেও
লােক আসেনি। আবার সে ভাবনায় পড়েছে কেমন করে
কাল সকালে ঘর ভাড়া মেটাবে। কি সে বলবে তার বাড়ী-
ওয়ালীকে। না, আজ রাতে তাকে কিছু রােজগার করতেই
• হবে,অন্ততঃ ঘরভাড়াটা। এমন সময় একখানা রিক্সা এসে
দাড়াল তার সামনে। সে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে রিক্সা
থেকে নামিয়ে নিয়ে তার ঘরে ঢুকলাে,—এমনসময় ঘড়িটা
বাষট্টি
রাত্রি বারােটা
নবাগতকে অভ্যর্থনা জানালে বারােটা শব্দ করে। অনিমা
লােটার পকেট থেকে দুটা টাকা নিয়ে কি যেন কিনে আনবার
জন্য ডাকলে তাদের বানােয়ারী ঝি—লক্ষ্মীকে।
লক্ষ্মীকে আর কি দোষ দেওয়া যায়। দিন রাত আপ্রাণ সেবা
করেও তার বাবাকে সে বাঁচাতে পারলে না। মরণ যখন
যার হবে, সেবা, যত্ন, কোন কিছু দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে
পারে না কেউ। সংসারে ছিল তার বুড়াে বাপ আর একটা ছােট,
ভাই। তাও তার বাবা আজ তাদের ফেলে চলে গেলেন।
লক্ষ্মী চীৎকার করে কেঁদে উঠলাে। পাড়ার দু'চারজন মেয়ে
ছেলে এসেছিল এই দুঃখের দিনে তাকে সান্ত্বনা দিতে।
তাদেরই মধ্যে একজন বুড়ি বললে—কেউ সময়টা দেখে রাখ
বাছা কখন মারা গেল। দোষ পায় কি না পরে দেখতে হবে।
একজনের হাতে ঘড়ি ছিল, সে দেখে বললে-রাত্রি বারােটা
দোষ বােধহয় একটু পাবে। এমনসময় বুড়ি হঠাৎ চেঁচিয়ে
উঠে বললে—আহা-হা তুই ওদিকে যাসনে, বামুনের মড়া, এক্ষুনি
ছুঁয়ে ফেলবি কালােবৌ।
কালবৌয়ের যে এমন ঈদের মত ছেলে হবে তা আর কে
ভেবেছে বলে। কেউই আশা করতে পারেনি। কালােবৌয়ের
শাশুড়ী চেঁচিয়ে বলে—ওরে থােকা, তাড়াতাড়ি দেখ, বাবা-ক’টা
বাজলাে। তাের ছেলে হয়েছে যে, চাঁদের মত ছেলে। থােকা
তাড়াতাড়ি তার পকেট ঘড়িটা খুলে দেখে বলে-মাত্ৰি বারােটা।
কবির প্রেম
শােনা যায় পাঁচ শাকের ধ্বনি। তারপর খােকার মা বলে
খােকা, তাের ছেলের কি নাম রাখবি রে? এইবার দেখা
গেল খােকাও মুফিলে পড়েছে বিমলের মত।
সুকুমার নামটাও যখন বিমলের পছন্দ হলােনা তখন
খাতা আর পেনসিলটাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে টেনে নিল তার
চিঠি লেখার প্যাড়টা আর কালি কলম-লিখলে সে সম্পাদকের
উদ্দেশে—মশাই! যদি নাটক চান ত নাটকের নায়ক আর
নায়িকার নাম উল্লেখ করে পাঠিয়ে দেবেন। ইতি—
বিমল বসু।
শেষ
চৌষট্টি-
জীবনে রবির আলাে। (বড় গল্প ) বিদায় নেবার সময় এলে আমার দুটা চক্ষু ভরে এল জল- যদিও সাতটা দিন পরে এলাম মুক্ত বাতাসের মাঝে, মুক্ত আকাশের নীচে মুক্তি পেয়ে, বুও মুক্তির সে আনন্দ যেন কোন সাড়া জাগাতে পারলাে না আমার মনে। মনে হয়েছিল গত সাতটা দিন যদি সাতটা বছর হত কি সারাজীবন যদি ঐখানে থাকতে পেতাম, কিন্তু তা যখন হবার কোন আশাই নেই, তখন মনে আপনা থেকেই সান্তনা আসতে দেহটাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছি নিজের হােটলের দিকে। হঠাৎ আবার থামলাম তার ডাকে, সে এবার দু'পা এগিয়ে এসে আমার সামনে দাড়িয়ে ভারি গলায় বললে-তার চোখ মুখ গলার স্বরে বেশ ধরা পড়ে গেল সেও কাদছে মনে মনে দেখুন আপনি ত আরও কিছুদিন এখানে থাকবেন, মাঝে মাঝে বিকালে এখানে এলে দেখা হবে, কেন চলে গিয়েই ভুলে যাবেন না। -না, না, ভুলে যাব কি বল। তােমার সেবা বা
কৰিয় নে
কোনদিনই ভুলবনা, আর তার ঋণ শােধ করতে পারবোনা।
সত্যি তােমার সেবা যত্ন
—সে য, ওটা ত আমাদের কাজ, ওরি এ মাসের
শেৰে মাইনে দেয়। পেটের জন্য অর্থ, আর সেই অর্থের
বিনিময়ে সেবা যা বিক্রী, আন্তরিকতা এখানে কোথায়
পাবেন।
এগিয়ে চলেছি। আর
কইতে পারলাম না, পাছে বেশী কথা বলতে গেলে ধরা
পড়ে যায় আমার অন্তরের কান্না। বেশ খানিকটা চলে
এসে পিছু ফিরে দেখি-সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারের মধ্যে
সে দাড়িয়ে আছে ঠিক সেইখানটিতেই আমার চলে আসার
পথ চেয়ে। আমি আরও জোরে এগিয়ে চলতে শুরু
হােটলে ফিরে
চাবিটি
নিয়ে শুয়ে পড়লাম। শুয়েই কি আর ঘুম আসে। মনের
মধ্যে ভীড় করে এলাে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে
আমার স্মৃতি, আরও অনেক কথা। তার করুণ দুঃখ-ভরা
জীবনের অতীতের মর্মান্তিক এনালি আমার মনের
মধ্যে ভিড় করে এসে আমাকে দুঃখে অভিভূত করে ফেললে-
ছাপিয়ে
আমার পাশের খয়ের অনিলবাৰু এসে আমার ঘরের
বাতিটা বেলে দিলেন, আমায় বললেন-কি, কাশীবাৰু,
बौन शिबाना কেমন আছেন? দেখুনদিকি। কি ফ্যাসাদ! সবই আছে। কল! বরাত, শাই বরাত । অবাক হলাম, এই মনে করে যে এই সাতটা দিনের মধ্যে ভলােকর কোন বিপদআপদ ঘটলাে নাকি। বিপদের দিনে বিপদটা কি অসন্ধান করাটা কেমন যেন অভজ বলে মনে হয় ও জিজ্ঞাসা করলাম- কি মশাই, আপনি আবার কি ফ্যাসাদে পড়লেন ? বরাতের, দোষে আপনার আবার কি বিপদ ঘটলাে? অনিলবাৰু বললেন এসব বাত, ছাড়া কি বলতে চান্ মশাই ? কোথায় মাসখানেকের জন্য পাটনায় এসেছেন বেড়াতে—দিব্যি ভাল মানুষটা, সেজেগুজে বেরুলেন বেড়াতে, তারপর কোথায় সাদা রাস্তায় এমন হোঁচট খেয়ে পড়লেন যে হাত ভেনে জাত ভেঙ্গে সাতটা দিন হাসপাতাল বাস! এতক্ষণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বুঝলাম কাসাষ্টা অনিলবাবুর নয়-আমারই বিপদে ভদ্রলােক ব্যস্ত ব্যয় পড়েছেন। মনে মনে হাসিও এলাে, মুখে বললাম-সত্যিই ফ্যাসাদ। অনিলবাৰু আবার শুরু করলেন, যা এখন কে সেরে এসেছে? হাতের ব্যাণ্ডে দেখছি এখনও ধাঁধা রয়েছে। হাঁ, একটা কথা, আপনি আজ এসেছেন ৰ ভালই হয়েছে। কাল এনে কাৰবাৰু, ৬ই অগ্রহায়ণ, আমার জীবনের বড় অরগীৰ দিন। যদিও এটা ১৩৪৬
মা, তবুও এই দিনটা আমার বড় ভাল লাগে। কেন জানেন?
ঐ দিনটাতে আমার বিবাহ হয়। আজ প্রায় ছ'টা বৎসর
আগে। তাই আপনাকে আর এখানে দুই একজন বন্ধু
বান্ধবকে নিয়ে একটু আনন্দ করা যাবে। যদিও আপনার
সঙ্গে আলাপ অল্পদিনের তবু কেমন যেন আপনাকে বড়
ভাল লাগছে। যাই হােক আমি এখন উঠি, রাত্রি হলাে,
ঘুমােন। কাল সকালে উঠে ডাক্বাে কিন্তু, একসঙ্গে বাজারে
যাওয়া যাবে।
-ওঃ, সে ত বড় ভাল কথা। নিশ্চয় উঠ বাে কাল সকালে
ভােজর আয়ােজন করতে। কাল তাহলে ৬ই অগ্রহায়ণ,
১৩৪৬ সাল। ঐ তারিখে আপনার বিবাহ হয়েছিল। বেশ।
তাহলে সকালে ডাকবেন।
তারপর অনিলবাবু উঠে গেলেন নিজের ঘরের দিকে,
আমি রইলাম নিদ্রাদেবীর আরাধনায। নানান চিন্তায় মন ছিল
ভবা, জানিনা কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
সকালে ঘুম ভাঙ্গল একটা থাকায়।
-কিহে। খুব আরামে ঘুমােচ্ছ। আজ ৬ই অগ্রহায়ণ, খেয়াল
আছে? ওঠো, ওঠো, বাজার যেতে হবে না সেই তােমার
নেই দেখছি। ওদিকে অন্যান্য বন্ধুবান্ধবদের নিমন্ত্রণ করা হয়ে
গেছে, তারা ত আর একটু পরের থেকেই আসতে শুরু করবে।
चौबल बनिबाणा
আমি বললাম—আরে এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? সকালে চায়ের
যত করা আছে, তার পরেই ত তারা খেতে বসবে না,
যেতে ত সেই বারােটা কি একটা হবে। যথেষ্ট সময় আছে, ব্যস্ত
হবার কোন কারণ দেখি না।
তুমি ত কবেই ব্যস্ত হয় কোন কারণ নেই, কিন্তু কিনে
আনলেই ত আর রান্না হয়ে যাবে না। রান্না করতে আবার সময়
লাগবে।
আচ্ছা, আচ্ছা, যাচ্ছি। একটা সিগারেট দাও তাে। আর
ই, তােমাৰ বােন্ শেফালীর বন্ধু লেখাদেবী আসছেন ত
তােমার জন্ম তিথির নিমন্ত্রণে? --আসছেন মানে ! লেখা ত
এসেছে দেখে এলাম।
-শুধু এসেছে নয়, আমার জন্ম দিনের উপহার পর্যন্তও
দেওয়া হয়ে গেছে। কি উপহার দিয়েছে জানিস কাশী ? তার
হাতেব বােনা চমৎকার একটা দুচের কাজ বাঁধিয়ে, তাতে
লেখা আছে-
“কানুদা’য় জম্মদিনে
দীর্ঘজীবনের প্রার্থনা।”
৬ই অগ্রহায়ণ, ১৩৪৫ সাল—লেখা।
তারপর সারাদিন কেটে গেল হৈ, হৈ করে নানা খাটুনির
মধ্য দিয়ে। রাত্রি তখন হবে না, নিমন্ত্রিতেরা সবাই চলে গেছে।
বিশ্রামের আশায় কাদের বাড়ীর একটা নির্জন ঘরে আছি।
কবি হে
এমনসময় হঠাৎ ঘরের আলাে উঠলে এলে, চোখ খুলে দেখি
সামনেই লেখা, বললাম-কি লেখা, খুব খাটনি হয়েছে,
নয় কি? তা এবার বাড়ী যাচ্ছি বুঝি। হাঁ তােনার উপহারটা
দেখলাম, সত্যি, ভারি চমৎকার দুচের কাজ জান ত!
-কি আর এমন ভাল কাজ দেখলেন। আপনার যেমন
বজাৰ, সব কিছুই ভাল চোখে দেখেন।
বাঃ, এ বড় মুড়িল, ভাল যেটা চোখে লাগবে সেটাকেও
ভাল বলব না, মন্দ বলবে! সে বললে—তা কেন, তাকি আমি
বলছি নাকি। আচ্ছা সে কথা থাক। আপনার সঙ্গে একটা
কথা আছে, গােপনীয় খুব।
এবার সে একটু থামূলে দৃষ্টিটাকে মেঝের ওপর বেখে
মাথা নীচু করে। খুব গােপনীয়', এই কথাটা আমিও হঠাৎ
চমকে উঠলাম। আমার সঙ্গে তার গােপনীয় কথা। অধীর হবে
পড়লাম কি এমন কথা থাকতে পারে খুব গােপনীয়।
না, না, তা থাকতে পারে বই কি। যার জীবন রহন্তে ভর
ভার ত গােপন কথা থাকতেই পারে। এই সেদিনই তার
জীবনের এক গুঢ় রহস্য আমাদের কাছে প্রকাশ পেয়েছে-
বেদিন তাকে বিয়ে করতে এসে বর ফিরে গেল বরণের পিড়ি
থেকে। কিন্তু আমার সঙ্গে কেন? ওকি বুঝতে পেরেছে
আমি কি মনে মনে ভালবাসি। ওর ব্যবহার, ওর কথা,
ওর এই কাজল আমার কত ভাল লাগে। না-না। তা
কেমন করে হবে। আমার মনের কথা আমি দুনিয়ার আর কেউ জানে না। না জানি কি গােপন কথাও বলতে চায়। একি বলতে চায়—চল পালিয়ে যাই তােমাতে নাতে কোন দুর দেশে-না কি ও আমায় মনে মনে ভালবেসেছােই আজ নির্জনে জানাতে চায়। তবু সাহসে ভর করে বলুন- ধু গােপনীয় নয়, খুব গােপনীয়? বেশ বল, আমি প্রত। —না গােনীয় মােটেই নয়, ভুল বলেছি—তবে বড় প্রয়ােজনীয়। জানেন বােধ হয়, বাবার ব্যবসা ফেল করেহে। আর আমাদের এমন সংস্থান নেই যে, কোন রকমে দিন চলে। বাবার ক’দিন থেকে মাথাটা কেমন খারাপ হয়ে গিয়েছিল, তারপৰ কাল তিনি যে কোথায় গেছেন—কেউ কোন খোঁজ দিতে পাচ্ছে না। এই সংসারে আমার নিজের বলতে আমার বাবা ছাড়া ত আর কেউ নেই। সৎ-মা তার ছেলেদের নিয়ে চলে গেছেন তার ভাই-এর বাড়ী। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকবার পর, প্রয়ােজনীয় কথাটা হচ্ছে, একটা কাজ করে দিতে পারেন ? আমি বললাম-তােমার দ্বারা কি এমন কাজ করা হবে। -কেন একটু আগেই ও আমার দুচের কাজের তারিখ করছিলেন, সেই চের কাজ শেখাৰ। অল্প লেখাপড়া বা জানি তা শেখা, গান শেখাতে পারি, কেন ও পরিবারে দুবেলা দুমুঠে খেতে গেলেই রাজি। এখন ৰেণ নিমাইন চাইছি না।
-আচ্ছ, তা হলে চেষ্টা করবাে।
-না-লা চেষ্টা করবাে ও কথা শুনছি না। আমাকে এক
কাজ করে দিতেই হবে।
-বেশ, এখনি কি বাড়ী যাচ্ছ ?
হা—এদিকে ত সব একরকম মিটে গেছে, এবাব গেলেই
-আচ্ছা চল, আমিও উঠি তােমাকে বাড়ী পৌছে দিয়ে
বাড়ী যাব।
-বেশত ; সে খুব ভাল কথা, কিন্তু আমার সঙ্গে এতটা
রাজা যাবেন পথে যদি কেউ দেখে, বদনাম রটাতে পারে।
সে ভয়ত তােমারও হতে পারে-
কিযারা বদনাম রটাবেতাৱাত আপনার নাম নিয়ে আমার
বদনামটাবে না, তারা আমার নাম দিয়ে বদনাম ঘােষনা করবে।
এবার দেখলাম তার চোখ দুটা ভরে এসেছে জলে, কাজেই
কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়লামবাড়ী ফেরার জন্য প্রস্তুত হয়ে।
রাত্রে অন্ধকার পথের বুকে চলেছি আমি আর লেখা
যন তাদের বাড়ীর সামনাসামনি এসেছি, নিজের অজানিতে
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলাে-লেখা! তুমি বুঝি
কোন নামেরই ভয় কর না।
মিথ্যা বদনামের কোন মূল্য আছে কি? সে এত
গৰে কথাটা বলতে, যাতে ৪ বাে৷ গেল—সত্যি সে
।
কোন বদনামের পাত্র নয়। মন তার খুবই পবি-ত্রি তার
নির্মল-সাহস আছে তার বুকভরা। বুঝলাম আর তার
বদনাম রটায় তারা তার কমার পাত্র বললাম-তাহলে লেখা
আল রাত্রিটা তোমার এখানে থেকে গেলে কেমন
-সে ত আমার সৌভাগ্য। আসুন না। সত্যিই
আপনার যথেষ্ট খাটুনি হয়েছে। আর বাড়ী ফিরতে এতটা
পথ হেঁটে যেতে হবে। রাত্রিটা বইত নয়।
—তাই চল।
জলেখা এগিয়ে চলে, তার পিছনে চলেছি আমি। সে
একখানা ঘরে ঢুকে দেওয়ালের গায়ের আলােটা ছেলে একখানা
মাদুর পেতে দিয়ে বসতে বলে তাড়াতাড়ি বিছানাটা পরিষ্কার
করে দিয়ে আমার সামনে এসে বললেনি এবারে শুয়ে পড়ুন।
আমি গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম! সে তখন চলে যাচ্ছিল,
আমি বললাম-লেখা, শােন !
সে তখন ফিরে এসে নীরবে দাঁড়াল আমার সামনে।
বললাম বসাে, আমার বিছানার একটা পাশ দেখিয়ে দিলাম।
সে আমার নির্দিষ্ট স্থানে বসলাে। কিছুক্ষণ উভয়ে নীরব থাকার
পর ধীরে ধীরে তার একখানি হাত আমার হাতের মধ্যে তুলে
নিয়ে বললাম—“ ” তুমি বদনামকে জয় কর না কেন?
তােমার চোখেমুখে ফুটে রয়েছে অতীদিনের আখের রায়
কেল ।
সে বুঝি কেঁদে ফেলেছে আর এক ফোটা চোখের
গড়িয়ে এসে পড়েছিল আমার
হানা ছাড়িয়ে নিয়ে আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলে—এই
পৃথিবীতে বাঁচতে গেলে মুখ, দুঃখ দুই নিয়েই থাকতে হয়।
দুঃখটাকে বড় করে দেখলে চলে নাবা সুখটাকে বড় করে
দেখলেই হয় না। আর বর্তমানে তাকে মনে করে রেখে লাভ কি?
-লেখা যদি আমার জীবনের সব কিছুর বিনিময়ে
তােমার জীবনে এতটুকু মুখ বা শান্তি এনে দিতে পারি, তাতে
তুমি বাধা দেবে না বল?
-আচ্ছা, কাশীৰাৰু! আপনি হঠাৎ আমার জীবনের সুখ,
দুঃখ নিয়ে জীবনের রহস্য জানতে এত চঞ্চল হয়ে উঠলেন কেন?
সময়ে সব রহস্যই জাতে পারবেন। এই ত সেদিন আমার
বিয়ের বর এসে ফিরে গেল বাসর থেকে। পাড়ার লােকের
কাছে--সর্বসাধারণের কাছে আমার জীবনের এক রহস্য প্রকাশ
হয়ে গেল। সে সব খবর বুঝি আপনি কিছুই পাননি? কেশ
লোক যাহােক আপনি! এ পাড়া দিয়ে কতবার যাতায়াত
করছেন অথচ এমন একটা সুন্দর খয়—তাহা পাতার
লােৰুগুলিও বা কেমন বুঝি না। তাদের ওপর চেনা-অচেনা
সৰুকেই জানাবার ভার দেওয়া রয়েছে। আর এইত তাদের
সারাদিনের কাজ। পরের বাড়ীর পরে তারা বড়ই সচেতন।
আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম—কি অকুত এর প্রকৃতি! মা,
যা কোন কিছুই কি ও ওর নেই। ভাৰুলাল।
আমার এই ডাকে সে যেন চমকে উঠল। যম-বে।
সৰুকে ফাঁকি দেওয়া যায়, কিন্তু যায় না এই তাকে নিজেকে
ফাঁকি দেওয়া। আচ্ছা, সত্যি তােমার বিয়েতে এ
গােলমাল হয়েছিল কেন বলত।
সে এবার উদাস চোখে চেয়ে একটা উত্তপ্ত নিল
ছেড়ে ধীরে ধীরে গম্ভীর ভাবে বলতে সুরু করলে
ন তবে-বাস যখন হবে দু বছর, মামীকেই
জানতাম মা বলে, সেই সময় হঠাৎ একদিন এলেন
বাবা, সেই প্রথম পরিচয় হলাে বাবার সঙ্গে জ্ঞান হবার
পরে। মাসীর সংসারে আমি আর মাসী ছাড়া আর কেউ
ছিল না। বাবা চার পাঁচ দিন থেকেই আমায় তাঁর সঞ্চিত
পিতৃস্নেহে একান্ত আপনার করে মাসীর কাছে প্রস্তাব করলেন
আমাকে তার সঙ্গে নিয়ে আসবার। সেই প্রথম এলাম এই
বাড়ীতে। আসবার আগের দিন মাসীর কাছে অনলাম
তিনি আমার মা ন মায়ের বােন-মালী। মা মারা গেছেন
আমায় দু' মাসের রেখে। বাবার সঙ্গে এবাড়ীতে আসা
কিছুদিন পরে বাবা একদিন আমায় নিয়ে গেলেন আর এক
জায়গায়। জায়গাটার নাম আমার মনে নেই। সেখানে নিয়ে
গেলেন আমার বিয়ের জন্য। বিয়ে হয় একটা মাটি এক
কি তারও বেশ বয়সের ভাের সঙ্গে। বিয়ের পর বিয়ে
আলি মাথায় শিমুর, গায়ে গয়না, হাতে নিয়ে ।
আজ হঠাৎ একদিন সকালে মাগী এসে হাজির। অনেক দিকে পর মাসীকে দেখে প্রাণটা আমার নেচে উঠেছিল বের আনলে তা আজও মনে হলে সত্যি আনন্দ হয়। কি তখন বুঝিনি কিসের জন্যে মাসীর সঙ্গে বাবা খুব ঝগঙ্গা হয়ে গেলাে। মাসী আমায় ফিরিয়ে নিয়ে যান তাঁর বাড়ীতে সেখানে নিয়ে গিয়ে মাসী আমার মাথার সি’র মুছিয়ে দিয়ে, গায়ের গয়না খুলে নিয়ে, হাতের শাঁখা দিলেন ভেঙ্গে। আমার মন তখন সত্যি ভরে গিয়েছিল বিষাদে আব দুঃখে। তারপর একটা একটা করে কত বৎসর কেটে গেছে—মালার গলা জড়িয়ে ধরে কতদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম—মাসী! বাবা আর আসেন না কেন? কবে আসবেন? মাসী তখন আমায় তাঁর বুকে চেপে ধরে চোখের জলে কিছুই বলতে পারেন নি। হয়ত তঁার বলবারও কিছু ছিল না। এই ভাবে দিন কেটে যাচ্ছিল। শেষে একদিন আমার বসন্তরােগ দেখা দিল। প্রাণ নিয়ে হলে সমস্যা। মাসী আমায় সারাবাত কোলে করে তাঁর যত্ন ও জয়, আর দিনরাত ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে আমায় বাঁচিয়ে তুলে সেই নােগের বিনিময়ে দিলেন নিজের প্রাণ। পাড়ার লােকেরা বাবাকে খবর দিয়ে নিয়ে এলাে। সেখানে সব চিহ্ন শেষ করে এলাম দ্বিতীয় বায় এ বাড়ী বাবার সঙ্গে। এবার এসে দেখলাম নূতন একাকে। বাবাই বলে দিলেন লেখাতােমার মা, এমি কর। এবাম করলাম। মাকে বলেন এই ভােমাৰ -হিয়ার- মেয়ে লেখা। মাকে প্রণাম করে অপেক্ষায় বিলাল- আশ্বাসের পরিবর্তে পেলাম কি জানেন? মা বললেন- কি বিঞ্জ চেহারা ! চোখ ট্যার, বিশেষ করে মুখের দিকে ছাইলে ভয় করে। বাবা আবু বললেন-বসন্ত হয়েছিল কিছুদিন আগে তাই দাগগুলাে রয়েছে। ও দাগ ক্রমেই মিলিয়ে যাবে। আমিও মনে মনে ভেবেছিলাম হয়ত দাগ মিলিয়ে যাবে। এর পরে নানা লাঞ্ছনার মধ্যে দিন কেটে গেছে। এবার একটু থেমে হঠাৎ সে বলে উঠল—ভাের হয়ে এল। দেখুন ত কি অন্যায়। আমি বললাম—ভালই করেছ, জীবনে কত যে রাত্রি ঘুমিযেছি আর কত যে রাত্রি ঘুমিয়ে কাটাতে হবে তার কোন হিসেবই নেই। তবু একটা হিসেব থাকবে-আব তা ছাড়া কেমন কবেই বা তােমাকে বােঝতাম যে রাত্রের গাঢ় অন্ধকার ভেদ করে রবির আলাে ধরা আসবেই। —আপনি বুঝি বলতে চান, আমার এই আঁধার জীবনে একদিন রবির আলাে আসবেই। তা বেশ এখন আপনি একটু চুপ করে ঘুমােন দেখি। সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গলাে তখন হবে বেলা ন'টা। বিছানায় উঠে বসেছি এমন সময় অনিলবার এসে বললেন—কি মশাই। খুব বেলা পর্যন্ত ঘুমােচ্ছন। এদিকে হাসপাতালের পিওন এসে আপনার একখানা চিঠি দিয়ে গেছে। হাসপাতালের বড় দিদিমণি দিয়েছেন। সত্যি কাৰাৰু, আমাদের এই দিদিমণিটি মানুষ ন হয়ত দেবী। কিৰা কাৰ গৰও গল্প
কিন্তু স্থানে। নেবাই সত্যি তিনি জীবনের এত কয়ে।
হাসপালের এই সবের যে কোন অঞ্চলে যে কোন
লােকে সে গুঞ্জয় মােন জানতে পারলেই তিনি
যান উপমাজ হয়ে সেবা করতে এই সফয়েয় সকলেই তাকে
দেনে। সবাই তাঁকে ভক্তি করে।
-সে ও সাক্ষাৎ প্রমাণ সাত দিন হাসপাতালে থেকেই
পেয়ে এসেছি। কই চিঠিখানা দেখি। এই নি বলে
চিঠিখন অনিলবাৰু আমার হাতে দিয়ে চলে গেলেন। আমি
চিঠিখানা খুলে দেখি—
৬ই অগ্রহায়ণ,
১৩৪৬ সাল
আজ আমি আমার জীবনে রবির আলাে পেয়েছি। মনে
আছে, একদিন আপনি বলেছিলেন রাত্রের গাঢ় অন্ধকার ভেদ
করেও পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে রবির আলাে? আপনি
আমার হাসপাতালে দেখে খুব আশ্চর্য হয়েছেন না? আচ্ছা।
এবারে বলছি—কি করে আজ আমি রবির আলাে পেয়েছি।
মনে আছে যেদিন আপনি সারারাত আমার সঙ্গে গল্পকরে
আমার জীবনের রহস্য জেনে চলে যান। তখন আমাদের
করে ছিলাম আমি একা। আপনি লেছিলেন মাৰে মাৰে
এলে। জানিনা এনেছিলেন কি না আমার খোঁজে।
ৰে আমি চার দিন পেয়েছিম আপনার এক
তি। বাঙ্গীন নীলাম জুয়ে যায় যেথিন বাবার কাণেয় পড়ে,
বু ল এতে গাম এখানে কিন্তু আপনার
কি নিয়ে এলো বিয়ে। কেন জানেন? শনির আর কন্যতম। কই পারলাম না আপনাকে টেনে আনছে আমার জীবনের অন্ধকার পথে। তারপর যেদিন আপনি চিঠিতে জানালেন, আপনার সমাজ সমান সন্তু কিছু বিনিময়ে গান আমাকে জীবনে সুখী করতে, সেদিন আপনার ভালায় এ কেঁদেছি। পারিনি তাকে তুলে নিতে বুক। চাইনি সমাজের সম্মানের পথে পাড়িয়ে আমার জীবনের সুখ শান্তি তাই চলে এসেছিলাম পথে নিরুদ্দেশে। পথে এলে পেলাম এই পথ। এই পথে আজ আমি সুখী। ইতি—অ” চিঠিখানা একনিবাসে শেষ করে বুঝলাম আজ সুখী-তারপর সারাদিন অনিলবাবুর বিবাহ দিবস উপলক্ষে তাঁর বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে হাসি তামাসার মধ্য দিয়ে দিন গেল কেটে। রাত্রে নিজের ঘরটাতে এসে শুয়েছি। কত বে শুয়ে আছি জানি না, কি করছি তাও জানি না, কি ভাষায় তাও জানি না। এই ভাবে কিছুক্ষণ কেটে যাবার পর বিছানায় উঠে বলে কাগজ আর কলম নিয়ে লিখলাম- গেছে , ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৬ আও তােমায় বলেই চিঠি দিলিখদিও খুনি । সপাতালের বড় দিনি, তা হলেও আমি জানি তুমি আমায় কাছ থেকে এই কাকেরই আশা কর। গেম টিটি কে তে পারলাম কি করে তুমি আজ যে কায়ে
এটি পাটায় মেলায় কেন? সে
– িআজ তা খেয়েছি। কিন্ত শেখে নিন
যার্থ বজায় রাতে শিক্ষিতার পরিচয় দিতে মন চায় না
ভাই কাল সকালে যখন ভূমি মিঠ পাবে তখন লেখাৰ এক
থেকে অনেক সুরে। কাজেই দেখা করা আর গ্য নয়।
নি বলেন, যেদিন বাড়ী থেকে সকল কাগজি ব্য, 'মায় সব
ৰে কে তােমার উদ্দেশ্যে এলে শুনলাম—সুমি চলে গেছ
নিজেলের পথে-সেই থেকে শুরু হয়েছে আমার দেশ
বিদেশে ঘােরা তােমায় খুঁজে বার করা। এবার হয়েছে ।
শেষ। কি নিয়ে শেষ হল জান? তােমার স্মৃতি।
সকালে উঠেই চলে এলাম ষ্টেশনে গাভী বাবার উদ্দেতে
বাড়ী কেনার অত। অনিলৰাকে বলে এলাম হাসপাতালের
কঃ জিদিমণিকে চিঠিখানা পেীছে দিতে। অনেক দিন পরে
হঠাৎ একদিন একখানা চিঠি পেলাম পাটনা থেকে। চিই পড়ে
বুঝলাম লেখা আমার চিঠির উত্তরের বিনিময়ে দুই কি
চোখের জল ফেলেছিল। তা ছাড়া ভার আর কিছুই মিল
না দেবার। সে যে তার সব বিলিয়ে দিয়ে একেবারে নি।
আজ সে হাসপাতালের বড় দিদিমণি।
অনিলবাৰুর এই চিঠির উত্তর আজও আমার দেওয়া
হয় নি। দেবার সাহস নেই বলতেও আমি গত নই।
কাম জাজ গামি বিবাহ করে আত্মীয় স্বজনদের নিত্ত জীবনে
সুখতে চাই।
সমাপ্ত
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.