Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Manas-kusum
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মানস-কুসুম।
শ্রীকালিদাস মিত্রবিরচিত।
কলিকাতা
শিমুলিয়া, বলরাম দের ফ্লীট ৬৮ সংখ্যক ভবনে কৃপান যন্ত্রে
শ্রীনফরচন্দ্র সরকার দ্বারা মুদ্রিত।
সন ১:২৯৬ সাল।
No text on this page.
PRESENTED TO The Editor
Aususundlau
s Teomfalive
WITH THE AUTHOR'S BES
32 Maniktollalı Street,
CALCUTTA,
Leer
1889
No text on this page.
বিজ্ঞাপন।
“মানস-কুসুম” যাহার প্রয়ােজন হইবে, তিনি
নিম্নলিখিত ঠিকানায় আমার নিকট তত্ত্ব করিলে
পাইতে পারেন ।
শ্রীকালিদাস মিত্র।
১২ নং মাণিকতলা ষ্ট্রীট, সিমুলিয়া-কলিকাত।
No text on this page.
নির্ঘণ্টপত্র। পৃষ্ঠা * * ১১ ••• ১৪ ১৯ ••• ২৯ ৩৬ বিষয় কিছুই কিছু নয় সুখী কে ? নববিবাহিত বন্ধুর প্রতি অপূৰ্ব্ব মিলন কোন বন্ধুর পুত্রের জন্মােপলক্ষে নিরাশ প্রণয় পতিহীনা নারীর বিলাপ জুবিলি হিন্দুকুলবালার আক্ষেপ বিবাহ ইয়ং বেঙ্গল মাতাল মদের মাহাত্ম্য পল্লিগ্রামে সমাধি দর্শনে সংসার ৪০ ৪৪ ৪৮ ৫৯ এ । । ৬২ ১১
No text on this page.
উপহার। শ্ৰীযুক্ত বাবু কিরণচঁদ মিত্র ! প্রিয়তম মনােমত সুহৃদ কিরণ! শৈশবের সহপাঠী বান্ধব-রতন। নিরমল প্রণয়েতে পরিপূর্ণ মন, কত ভালবাসা তব হৃদে অনুক্ষণ । সেই ভালবাসা-পাশে আবদ্ধ হইয়া, আশাবীজ হৃদিমাঝে রােপণ করিয়া । অঙ্কুরিত করি ক্রমে করিয়া বর্ধন, বৃক্ষরূপে পরিণত করেছি এখন। তাহাতে ফুটেছে এই কুসুম-রতন, মানস-কুসুম মূম আদরের ধন- আনন্দে তাহারে সখা করিয়া চয়ন, ভাবিলাম করে দিলে করিবে গ্রহণ।
০
অন্য কারে দিয়া মন তুষ্ট নাহি হয়,
তব করে এ কুসুম বড় শােভা পায় ।
তব প্রেম ডোরে বদ্ধ আমার হৃদয়,
সে হৃদয়জাত ফুল যাইবে কোথায় ?
বহু কষ্ট করি সখা এ কুসুমভার,
কত যত্নে ফুটায়েছি মানসে আমার ।
সাদরে যুগল ভুজ করিয়া বিস্তার,
দিলাম তােমারে মম স্নেহ উপহার ।
অভিন্নহৃদয়
কালি।
মানস-কুসুম।
০%
কিছুই কিছু নয়।
কে তুমি মানব কি হেতু বল না,
সতত সহিছ সংসার যাতনা ।
কিবা দুঃখে হায় কাঁদিছ বল না,
কি সুখে আবার নাচে হৃদয় ?
কুহকিনী-পাশে জন্মাবধি বদ্ধ,
পার্থিব সুখেতে সততই মুগ্ধ ।
ঘাের মায়াজালে হইয়া আবদ্ধ,
কি হেতু বল না ভ্ৰমিছ হায় ?
ভাই বন্ধুগণে হইয়া বেষ্টিত,
মনােহর বেশে হইয়া সজ্জিত,,
ইন্দ্রিয় বৃত্তিতে হইয়া মােহিত,
কিবা সুখ তাহে লভিতে চাও?
মানস-কুসুম।
সুমিষ্ট আহার করিছ ভােজন,
সুগন্ধ শরীরে করিছ লেপন,
সুন্দর উদ্যানে করিছ ভ্রমণ,
কিন্তু তাহে সুখ কদিন পাও ?
ষড়রিপু-বশে হইয়াছ মত্ত,
নিজ স্বার্থ হেতু সততই ব্যস্ত,
কভু না করিলে পরাৎপর তত্ত্ব,
বৃথা ভাবিতেছ বাতুল প্রায় ।
ভাই বন্ধু সুত দারা পরিবার,
ধন মান রূপ যশ অহঙ্কার,
ভাবিছ এ সব সৰ্ব্ব-সুখ-সার,
কিন্তু কালে সব হইবে লয় ।
তাই একবার ভাব দেখি মনে,
কে তুমি কি হেতু আইলে এখানে,
সবে আপনার কেন ভাব মনে ?
অল্পকাল স্থায়ী তুমি যথায় ।
মানস-কুসুম।
চিরদিন যাহা না রহিবে তব,
তারে কেন সদা আত্ম বলি ভাব ;
ভাই বন্ধু সুত বিষয় বৈভব,
কালেতে ত্যজিবে সবে তােমায়।
•
ঐহিক আমােদ তেজ অহঙ্কার,
মান কুল যশ অর্থ অলঙ্কার
জানিহ এ সব সকলি অসার,
অন্তিমে সঙ্গী না হবে তােমার।
সকলি অনিত্য স্থায়ী কিছু নয়,
ভ্রমিতেছ তবে কেন অন্ধপ্রায় ?
থাকে যদি হৃদি-সুখের আশায়,
বৈরাগ্য অন্তরে করহ সার।
ইন্দ্রিয়-তাড়ন সংসার-ছলন,
মায়া আকিঞ্চন আশা-প্রলােভন,
অন্তর হইতে করহ বর্জন,
নচেৎ না হবে সুখী হৃদয় ।
১ ৪
মানস-কুসুম।
জগত মাঝারে কেহ নয় কার,
অনিত্য সকলি অনিত্য সংসার,
দেহ মনপ্রাণ সকলি অসার
সার জেনাে কিছু কিছুই নয়
সার্থক জনম
.
সুখী কে ?
সার্থক জীবন
সুখের পরাণ তাহার কহে।
জগত মাঝারে দাসত্বের ডােরে
কখন যে জন আবদ্ধ নহে।
সদ্গুণ সকল
একমাত্র বল
আত্মরক্ষা হেতু যাহার হয়।
সতত সত্য
যার নিপুণতা
পরমার্থ যার শ্রেষ্ঠ আশ্রয় ।
ইন্দ্রিয় সকল করিতে বিকল
নিয়ত যাহারে অক্ষম হয়।
যাহার জীবন
সদা ভয়হীন
মৃত্যুতরে যেবা কাতর নয় ।
.
মানস-কুসুম।
পার্থিব সুখ্যাতি
যশ প্রতিপত্তি
লভিতে যে জন নাহিক চায় ।
হিংসা পাপক্রোধ মান উপরােধ
জানে যে জন কাহারে কয় ।
তােষামােদ বলে বিষময় ফলে
জ্বলিছে যতেক মানবপ্রাণ।
যে জন কখন
জানে না কেমন
ছায়া মাত্র তার কত ভীষণ ।
সমাজ-শৃঙ্খল
নিয়ম সকল
অজ্ঞাত সতত নিকটে যার।
বিধাতৃ-নিয়ম
সদা যেই জন
ভাবয়ে সকল নিয়ম সার ।
নাহি কিছু যার
অবনিমাঝার
উদ্বিগ্ন মানব যাহার তরে।
সতত যে জন যাপিছে জীবন
হিতাহিত জ্ঞানে নির্ভর করে।
করিতে আহ্বান । পারিষদগণ
ঐশ্বৰ্য্য সম্পন্ন যে জন নয়।
নাহি শত্রু যার বিপদে তাহার
আনন্দে হৃদয় প্রফুল্ল হয় ।
মানস-কুসুম।
করে না যে জন
ঈশ্বর ভজন
মান রূপ যশ অর্থের তরে ।
নিয়ত যে জন
করয়ে যাচন
ঈশ্বর নিকটে কৃপার তরে ।
নিষ্পপে যে জন করয়ে ক্ষেপণ
বন্ধু বা পুস্তক সহিত কাল ।
যাহার শাশন
ইন্দ্রিয় দমন
রাজত্ব যাহার রিপু সকল ।
সম্পত্তি যাহার সদা সু-আচার
সদ্গুণ যাহার সর্বস্ব ধন ।
সার্থক সে জন
সার্থক জনম
যথার্থই সুখী তার জীবন ।
•
নববিবাহিত বন্ধুর প্রতি।
শুনিয়া তােমার সখা নব পরিণয়,
কত যে সুখেতে মগ্ন হইল হৃদয়
প্রকাশি সে সুখঘাের,
ক্ষমতা নাহিক মাের,
লিখিতে অক্ষম তাহা লিপিবহিভূত,
বচনে না শেষ হয় হৃদয় উন্মত্ত ।
মানস-কুসুম ।
এতকাল একা ছিলে জগতমাঝারে,
হইলে এখন সখা আবদ্ধ সংসারে ।
প্রেমের শৃঙ্খল নব
হৃদয় গ্রন্থিতে তব
ক্রমে ক্রমে দৃঢ়ভাবে করিবে বন্ধন ।
নারিবে জীয়ন্তে তাহা করিতে মােচন ।
উদিত আজি হে তব সৌভাগ্য-তপন
ভাগ্যবলে পাইলে এ রমণী-রতন ।
প্রেমের আধার জ্ঞানে
রাখ এ অমূল্য ধনে
হৃদি সিংহাসনে তব করিয়া যতন,
প্রণয় পীযুষ হ্রদে হও হে মগন ।
যত কিছু এ জগতে আছে সুখময়,
এর সম কেহ কভু তুলনায় নয় ।
ঈশ্বরকৃপার বলে,
এ হেন রতন
পেলে,
এ হেন ধনেতে তুমি ধনী এ জগতে;
হ’য়াে না কখন সখা বিমুখ ইহাতে ।
১৮
মানসকুসুম।
প্রেমের অমিয় মাখা সুন্দরী ললনা,
তেয়াগিয়া আত্মজন সৰ্ব্বস্ব আপনা ;
জীবন যৌবন ধন,
কৈল তােমা সমর্পণ ;
হইল সঙ্গিনী তব জনমের মত।
তুমিই ভরসা তার সহায় সম্পদ।
তুমিও তেমতি সখা নিজ মন প্রাণ,
করহ তাহারে ভাই পরিবর্তে দান ।
চির-সহচর হয়ে,
প্রেমভাষে সম্ভাষয়ে,
সুখেতে কাটাও কাল জগত মাঝেতে ।
প্রণয়দৃষ্টান্ত সবে দেখুক তােমাতে ।
ভবিষ্য ইহার সব অর্পিছে তােমায়,
গুণবতী হইবেন তােমার শিক্ষায় ।
যেমন শিখাবে তুমি,
তেমি শিখিবেন ইনি ;
হইবেন সচ্চরিত্রা তােমার কৌশলে
কে আর শিখাবে বল তুমি না শিখালে ?
মানস-কুসুম।
মনােমত নারীসনে যে আছে সংসারে,
তার সম সুখী কেবা জগত মাঝারে ?
সাংসারিক সুখ যত,
নারী হতে সমুদ্ভুত
দরিদ্রতা হীনতায় যদি কষ্ট পায়,
তথাপি মনের সুখে কাল করে ক্ষয়।
তাই বলি শুন সখা করি নিবেদন,
মনােমত করিবারে করহ যতন ।
সতত প্রণয়ভরে,
নম্র মিষ্ট ব্যবহারে,
সযতনে শিখাইবে সংসার যাপনে ;
নচেৎ দাম্পত্য সুখ জানিবে কেমনে ?
;
অপূর্ব মিলন।
“ওহে বনবাসী ঋষি ধাৰ্মিক সুজন,
কহিল জনেক যাত্রী করিয়া সম্ভাষ ;
“দেখাও আমারে পথ করিতে গমন,
যথায় আলােক ওই দিতেছে আশ্বাস
২০
মানস-কুসুম ।
“শ্রান্ত ক্লান্ত জন আমি হয়ে পথহারা,
ক্ষীণ মৃদু পদক্ষেপে করিয়া গমন,
অরণ্যমাঝেতে ভ্রমি হইতেছি সারা;
তথাপিও না ফুরায় এ বিজন বন।
ক্ষান্ত হও বৎস” ঋষি কহিল ডাকিয়া,--
“উহার মায়ায় ভুলে কোর না গমন ।
আলােক নহে রে উটী জ্বলিছে আলেয়া,
করিবারে সর্বনাশ তােমার সাধন।
“সতত কুটীরে মম অবারিত দ্বার,
নিরাশ্রয় পথভ্রান্ত মানবের তরে।
যদিও প্রচুর মম নাহিক আহার,
তথাপিও দিই আমি আনন্দ অন্তরে।
“অতএব এস বৎস আজিকার তরে,
অতিথি হইয়া মম করহ গ্রহণ,
সামান্য যা কিছু মম আছয়ে কুটীরে,
তৃণশয্যা মিতাহার আশীষ-বচন ।
মানস-কুসুম ।
১১
•
“স্বাধীনেতে ভ্রমিতেছে যত জন্তুগণ,
তাহাদের হিংসা আমি করি না কখন
শিখিয়াছি তাহা হতে দয়া বিতরণ,
মম প্রতি সদা দয়া করেন যে জন ।
“তৃণযুক্ত পৰ্ব্বতের উপত্যকা হতে,
ফলমূল ভূমিজাত নির্দোষ-ভােজন ;
প্রতিদিন আনি আমি ভরিয়া থলিতে,
ঝরণার জলে করি তৃষ্ণা নিবারণ ।
অতএব চিন্তা বৎস করহ বর্জন,
পার্থিব যতেক চিন্তা সব অমূলক।
এ জগতে মনুষ্যের অল্প প্রয়ােজন,
তাহাও মুহূৰ্ত্ত তরে হয় আবশ্যক।
যেমতি শিশিরবিন্দু,আকাশ হইতে
কোমল ভাবেতে পড়ে ধরার উপরে ;
সেইরূপ ঋষিবাক্য যাত্রির কর্ণেতে,
ঢালিয়া মধুরধারা আনিল কুটীরে ।
মানস-কুসুম ।
সুদূরে অরণ্য মাঝে অজানিত স্থানে
নিভৃত কুটীর এই রয়েছে দাড়ায়ে ।
প্রতিবেশী দীনহীন পথভ্রান্তজনে
আশ্রয় পাইবে বলি তথায় আসিয়ে।
কুটীরস্বামির মন করিতে চঞ্চল
ছিল না তাহার মধ্যে কিছু মাত্ৰ ধন ।
মােচন করিয়া তার দ্বারের অর্গল
ভিতরেতে প্রবেশ করিল দুই জন ।
জীবজন্তুগণ যবে নিদ্রিত হইল,
রজনীর আগমনে বিশ্রামের তরে ।
নিজ ক্ষুদ্র অগ্নি ঋষি তখন জ্বালিল,
চিন্তাশীল অতিথির শুশ্রুষার তরে ।
উদ্ভিজ্জ আহার তার সম্মুখে রাখিয়ে,
হাস্য আনন্দের সহ অনুরােধ করে।
জানিত বিবিধ গল্প বিবিধ বিষয়ে,
সেই সব গল্প বলি কালক্ষয় করে।
মানস-কুসুম।
তাহাদের আমােদেতে আমােদিত হয়ে,
তাল ধরি ঝি ঝপােকা ঝি ঝি রব করে।
কাষ্ঠ আঁটিগুলি যেন আমােদে মাতিয়ে,
অধিক জ্বলিল সবে পট পট করে ।
কিন্তু হায় এ সকল যত সুখকর,
অতিথির চিত্ত তুষ্ট করিতে নারিল ।
উথলিল দুঃখ তার হৃদয়ভিতর,
অবশেষে অশ্রুজল পড়িতে লাগিল ।
---
ক্রমশঃ বর্ধিত দুঃখ করিয়া দর্শন,
কহিলেক ঋষি তারে উৎকণ্ঠিত স্বরে;
“কহ রে অভাগা যুবা কিসের কারণ,
হয়েছে দুঃসহ দুঃখ তােমার অন্তরে ?
“হয়েছ কি দূরীভূত রম্য হৰ্য হতে ?
নির্বাসিত হয়ে কি হে করিছু ভ্রমণ ?
প্রতিদান বন্ধু কি হে নাহি চায় দিতে ?
হয়েছ কি প্রণয়েতে হতাশে মগন ?
২৪
মানস কুসুম।
“সম্পত্তি ঐশ্বৰ্য্যধন যাহা কিছু আর,
তুচ্ছ এ সকল হায় অল্পকাল রয় ।
ইহাতে যে জন পূনঃ করে অহঙ্কার,
ইহাদের হতে তুচ্ছ সেই জন হয় ।
“বন্ধুত্ব কাহারে কয় নামমাত্র সার,
নিদ্রা আনিবার তরে সঙ্গীত সমান।
অর্থ যশ আছে যার অনুগামী তার,
হতভাগ্যজনে ফিরি না করে দর্শন।
“তদপেক্ষা ভালবাসা অকিঞ্চিৎকর,
নবীনা যুবতীদের বিদ্রুপ ছলনা!
দাম্পত্য প্রণয়ে মাত্র আছে ঘুঘুদের,
তাহা ভিন্ন এ জগতে আর ত দেখি না
“লজ্জায় নির্বোধ যুবা ত্যজ তব দুঃখ,
পদাঘাত কর এবে স্ত্রীজাতি উপর।”
এ কথা বলিবামাত্র আরক্তিম মুখ,
প্রকাশিল অভ্যাগত হইয়া কাতর ।
মানস-কুসুম।
২।
আশ্চর্য্যের সহ ঋষি করিল দর্শন,
রক্তিম সৌন্দৰ্য্য যাহা হইল উদয় ।
নবীন রবির কর প্রভাতে যেমন,
উজ্জ্বল অথচ তাহা ক্ষণকাল রয় ।
পীনােত পয়ােধর লজ্জিত বদন,
একে একে আশ্চৰ্ষিত করিলেক অতি ।
ক্ৰমে অতিথিরে ঋষি করেন দর্শন,
সমস্ত সৌন্দৰ্য্য সহ রমণী মুরতী।
“হতভাগী আমি ঋষি ক্ষম দেব মােরে,
কহিতে লাগিলা বামা ফেলি দীর্ঘ শ্বাস।
“অপবিত্র করিয়াছি প্রবেশি কুটীরে,
ঈশ্বর সহিত যথা কর তুমি বাস ।
প্রণয়ে পাগল আমি অভাগী রমণী,
ভ্রমিতেছি সততই শান্তি অন্বেষণে ।
শান্তি কোথা পার মাের নিরাশা সঙ্গিনী,
আশ্রয় দাও গাে মােরে তব চরণে।
মানস-কুসুম ।
“যমুনার তীরে মম আবাস পিতার,
জনক আমার ছিল অতি ধনবান।
একমাত্র কন্যা আমি সন্ততি তাহার,
ভাবী অধিকারে মম সে সমস্ত ধন।
“হইয়া আমার প্রার্থী কত শত জন,
আসিত সতত মােরে বিবাহ করিতে ।
যে সকল গুণ মাের নাহিক কখন,
তাহা বলি প্রশংসিত মােরে ভুলাইতে
“এইরূপ প্রতিক্ষণে আসি কত জন,
বহুমূল্য উপহার দিত কত মােরে ।
তাহাদের মধ্যে ছিল সুরেন্দ্রমােহন,
বলেনি প্রণয়কথা বারেকের তরে।
“মমাটামুটি পরিচ্ছদে সজ্জিত যে জন,
ঐশ্বৰ্য প্ৰতাপ তার কিছু নাহি ছিল।
জ্ঞান বুদ্ধি বিদ্যা তার সবে মাত্র ধন,
মম পক্ষে তাহাই যে সৰ্বস্ব আছিল ।
মানস-কুসুম।
“বসিয়া আমার পার্শ্বে উপত্যকা পরি,
প্রণয়সংগীত যবে করিত সে জন ।
প্রত্যেক ফুৎকার তার সৌগন্ধ বিস্তারি,
করিত সুন্দর গান শ্রবণমােহন।
“ফুটন্ত কুসুম কুল রবিকরে নব,
পতিত শিশিরবিন্দু আকাশ হইতে।
যতই বিশুদ্ধ কেন হােক না এ সব,
শুদ্ধতায় কেহ তারে পারে নি হারাতে।
“কিন্তু হায় কি কহিব দুরদৃষ্ট মাের,
তখন মাহাত্ম তার নারিনু বুঝিতে।
দিয়াছি তাচ্ছিল্য করি কত কষ্ট ঘাের,
তাই ত এখন মােরে হতেছে কাদিতে ।
১ :
“তাঁহার প্রণয়ে সদা অগ্রাহ্য করিয়া,
করিতাম সততই মিরাশ হারে ।
এত কষ্ট মাের ভাগ্যে আছিল বলিয়া,
নারিনু তখন আমি চিনিতে তাহারে ।
২৮
মানসকুসুম।
“আমার তাচ্ছিল্যে শেষ বিরক্ত হইয়া,
মম গৰ্ব সহ মােরে পরিত্যাগ করি ।
নির্জনে বিবাগী হয়ে যাইল চলিয়া,
গােপনে যথায় এবে গিয়াছেন মরি ।
“আমিই দুঃখের মূল মাের সর্ব দোষ,
নিজ প্রাণ দিয়া তার দিব প্রতিদান ।
আমিও খুঁজিব সেই নিভৃত আবাস,
শুই যথায় নাথ আছেন শয়ান।
“তথায় গোপনে সেই জনহীন স্থানে,
এ ছার জীবন মাের করিব সংহার ।
মরেছেন প্রাণেশ্বর আমার কারণে,
আমিও ত্যজিব প্রাণ নিমিত্ত তাহার ।
“না কর ঈশ্বর হেন” বলিয়া তখন,
লইলেক ঋষি তারে তুলি বক্ষোপরে ।
ক্রোধে ফিরি আগন্তুক করেন দর্শন,
সুরেন্দ্রমােহন তারে আলিঙ্গন করে ।
মানস-কুসুম।
কহিলেক ঋষিবেশী সুরেন্দ্র তাহারে,
“ফের বিনােদিনী এবে করহ দর্শন।
“হতভাগ্য সুরেন্দ্র যে বহুকাল পরে,
পুনঃ প্রাপ্ত হল তার অমূল্য রতন।
ওরে রে হৃদয়ধন বাঞ্ছিত রতন,
এইরূপে বক্ষোপরে রাখিব তােমারে ।
অবিরত চিন্তা সব করিব বর্জন,
এ জীবনে আর প্রিয়ে ছাড়িব না তোরে ।
“বিভিন্ন হব না দোহে আজ হতে অরি,
পবিত্র প্রণয়ে দেহে বদ্ধ হয়ে রব ।
দুঃখ সুখ যাহা কিছু হইবে তােমার,
আমিও তাহার প্রিয়ে অংশভাগী হব ।
কোন বন্ধুর পুত্রের জন্মোপলক্ষে
নবপুত্র লাভ তব শুনিয়া শ্রবণে,
কত সুখী হই যে কি লিখিব আর ।
৩০
মানস-কুসুম।
লেখনী অক্ষম আজি সে সুখ বর্ণনে,
হৃদয় উন্মত্ত এবে সুখে মাতােয়ার।
এত দিন ছিলে তুমি নিশ্চিন্ত সংসারে,
তরুবর যথা ফলহীন লতাসনে।
সুখে মত্ত হয়ে সদা থাকে প্রেমভরে,
জড়ীভুত লতাপাশে প্রেম আলিঙ্গনে ।
কিন্তু যবে হয় তার সৌভাগ্য উদয়,
কালবশে ক্রমে তাহে মুকুল সঞ্চারে।
ক্রমে ক্রমে পুষ্পরূপে পরিণত হয়,
অবশেষে নমুখী হয় ফলভরে ।
সেইরূপ আজি তব লতিকা সােণার,
প্রণয়ের মােফলে হল ফলবান।
প্রেমের অমিয় ফল মেহের আকর,
ভূমিষ্ঠ হইল তব নবীন নন্দন।
বিধিগুণে আজি তুমি পাইলে এ ধন,
স্বর্গীয় এ মহাদান তুল্য কিছু নাই।
মানস-কুসুম।
৩১
এর সম আদরের নাহি কোন ধন,
যদি সৰ্ব্ব প্রিয় বস্তু করি এক ঠাই।
সুবর্ণালঙ্কার মাঝে হীরক স্থাপনে,
অতিশয় সুশােভন দেখিবারে হয় ।
সেরূপ দাম্পত্য সুখ বৃদ্ধি পায় ক্রমে,
প্রণয়-বৃক্ষেতে ফল হইলে উদয়।
সেই সুখ এবে সখা তােমা দোঁহাকার,
ক্রমে ক্রমে বাড়িবার হৈল আরম্ভন ।
কোলে করে লয়ে যবে প্রেয়সী তােমার,
দিবে হে তােমার অঙ্কে তােমার নন্দন।
তখন হৃদয়ে রাখি হৃদয়নন্দন,
বলিবে হে এ সংসার বড় সুখময়।
তখন না কবে আর অসার জীবন,
তখন না হবে হৃদে বৈরাগ্য উদয়
এবে মম শেষ কথা বলি কায়মনে,
যাহার কৃপায় তুমি পাইলে কুমারে।
মানস-কুসুম।
অক্ষয় নীরােগে সুখে সুদীর্ঘ জীবনে,
রাখুন নিয়ত তিনি তােমা সবাকারে।
আর এক কথা বলি জোরের উপর,
আনন্দের হেতু ভাই আনন্দ ঘটনে।
কবে বল হইবেক আম সবাকার,
মহােল্লাস সমারােহ অরণ্য ভােজনে ।
নিরাশ প্রণয়।
কেন বল মন তাহারি কারণ,
দিবানিশি কেন হও উচাটন ।
সকলেরি ছাড়ি তাহার কারণ,
কেন ওরে মন হও উদাসি ।
ভাবনা কি মন ক্ষণেকের তরে,
কেউ কারু নয় জগত মাঝারে ।
সকলেই পর অনিত্য সংসারে,
তবে কেন ভাব বিরলে বসি
৩3
মান-কুম।
সেই চাঁদ মুখ সুন্দর নয়ন,
সরল মাখা সুমিষ্ট বচন ।
দয়া ভরা যেন দেহের গঠন,
উচাটিত হও যাহারে স্মরি
কেন ওরে মন বসি দিবানিশি,
ভাব তার সেই সুধামাখা হাসি।
ইচ্ছা হয় কেন বিজনেতে পশি,
সেই প্রেমমূৰ্ত্তি হৃদয়ে ধরি ।
কেন ওরে মন তাহারি কারণ,
তেয়াগিয়া এই সংসারের ধন ।
পিতামাতা ভ্রাতা আত্মীয় স্বজন,
ভাবিছ কেবল সে চাঁদমুখ ।
ধীরে ধীরে মন উত্তর করিল,
হৃদয়ের কেন্দ্র কঁপিয়া উঠিল ।
কত দুঃখে আহা বলিতে লাগিল,
তারে ভেবে কেন পাই রে সুখ
৩৪
মানস-কুসুম।
ভেবেছিনু তারে হবেরে আপন,
সপেছি তাই এ পরাণ মন ।
দিয়াছিনু পেতে হৃদয় আসন,
বসিতে তাহারে কত যতনে।
কে জানিত আগে হবেরে এমন,
অকালেতে কাল করিবে হরণ ।
তা হলে কি কভু হৃদয় আসন,
দিতাম তাহারে অত যতনে ।
ভেবেছিনু আগে পবিত্র হৃদয়ে,
বদ্ধ হব দেহে পবিত্র প্রণয়ে ।
পরম সুখেতে থাকিব উভয়ে,
বাঁধিয়া হৃদয়ে প্রেমের ফাস
হায় বিধি তুমি এই কি ঘটালে,
এত কষ্ট তুমি লিখেছিলে ভালে।
এতই যন্ত্রণা আছিল কপালে,
আজন্ম কাদিব হয়ে নিরাশ ।
মানস কুসুম।
অবশ্য কাঁদিব কাঁদিব কেবল,
দিবা নিশি ফেলি শােক অশ্রু জল ।
ধুই প্রাণের সে নিভৃত স্থল,
যথায় প্রেয়সী আছে রে বসি।
ভাবিব কেবল সে চুঁদ বদন,
ভাবিব কেবল সে মৃগনয়ন ।
অন্তরে দেখিব মােহন গঠন,
ভাবিব কেবল সে সুধা হাসি।
সে মোহন মূৰ্ত্তি আর কি নয়ন,
কাল কাল আহা চিকুর চিকণ ।
গাল ঢেকে বুকে পড়িবে যখন,
তখন কি আর দেখিতে পাব ?
আর কি কখন সেই মত করে,
সেই শশীমুখ রাখি উরূপরে ।
সুকোমল হাতু হাতে করে ধরে,
আর কি কখন দেখিতে পাব ?
মানস-কুসুম।
পাব না দেখিতে ? অবশ্য পাইব,
যখনি হৃদের কপাট খুলিব ।
তখনি অমনি তথায় হেরিব,
সে মােহন মূৰ্ত্তি হৃদয়পরে ।
সেই প্রেমমূৰ্ত্তি করিয়া ধারণ,
হৃদয়-দর্পণে কাটাব জীবন।
কভু নাহি দিব হতে অদর্শন,
আকুল পরাণ যাহার তরে ।
পতিহীনা নারীর বিলাপ।
সাধিল বিধাতা বাদ, যত মম সুখ সাধ,
জীবনের মত হায়, গিয়াছে ফুরায়ে রে ।
এ জগত মাঝে আর, নাহিক কেহ আমার,
আপনার ছিল যে, সে ত আর নাই রে।
৩৭
মানস-কুসুম।
পবিত্র প্রণয় ডােরে, রেখেছিনু বেঁধে তারে,
তথাপিও ছিড়ে তাহা, গেছে পলাইয়া রে ।
আদরের আদরিণী, ছিন্ন হয়ে সােহাগিনী,
যাঁহার প্রণয় ভরে, এবে সে কোথায় রে।
কত যে আদর করে রেখেছিল সে আমারে,
স্মরিলে সে সব হায়, বুক ফেটে যায় রে ।
ছিনু সম রাজরাণী, করি মােরে কাঙ্গালিনী,
কেমনে এখন হায়, যাইল চলিয়া রে ।
এখনাে পড়িছে মনে, কলেছিল কত দিনে,
তােমারে কখন প্রিয়ে, নাহিক ছাড়িব রে ।
কেমনে সে সব ভুলি, যাইল এখন চলি,
তেয়াগি আমারে হায়, জনমের মত রে।
হেরিলে যাহার মুখ, দুঃখেতে হইত সুখ,
সে বিধুবদন আর, না পাব দেখিতে রে ।
হেরিলে শুক বদন, সততই যেই জন,
পাইত যাতনা কত, আমার নিমিত্ত রে ।
এখন সে জন হায়, কেঁদে’বুক ফেটে যায়,
তিলেকের তরে তবু, দেখা নাহি দেয় রে।
ওই যে কুসুমগুলি, অলি সহ করে কেলি,
কত সুখে এক দিন, করেছি চয়ন রে ।
মানস-কুসুম।
.
গাঁথিয়া তাহা মালায়, পরায়ে স্বামি গলায়,
এক কালে কত সুখে, ভেসেছি দুজনে রে ।
এবে সেই ফুলকুল, হেরিয়া হই আকুল,
শােকানল কেন পুনঃ, অধিক জ্বলিল রে ।
ওই যে বৃক্ষের ডালে, কালাে পাখি কুহু বলে,
এককালে কত সাধ, ছিল শুনিবারে রে ।
এখন সে রব শুনে, কেন জ্বলে মরি প্রাণে,
কেন বা শােকের স্রোত, হৃদি মাঝে বয় রে ।
এই যে পূর্ণিমা নিশি, শােভিছে গগনে শশী,
বিমল জোছনা তার, চৌদিকে ছড়ায়ে রে ।
এই সুধাংশুর করে, বসিয়া সােহাগভরে,
এক দিন কত সুখে, ছিলাম দুজনে রে ।
এখন ইহারে হেরে, প্রাণেশেরে মনে করে,
অশ্রুর জলেতে হায়, বক্ষঃস্থল ভাসে রে।
এখনাে জাগিছে মনে কত প্রেমসম্ভাষণে ,
তুষিত প্রাণেশ মােরে, সহাস্য বদনে রে ।
এখন সে সব হায়, স্বপ্নপ্রায় বােধ হয়,
এ জন্মের মত সব, গিয়াছে ফুরায়ে রে ।
কত সুখে দুই জনে, ছিলাম আনন্দ মনে,
কপােত কপােতী যেন, দোঁহে এক প্রাণ রে
মানসকুসুম ।
৩৯
ভাবিতমি মনে মনে, এইরূপে চির দিনে,
সুখেতে জীবন মাের, যাইবে কাটিয়া রে ।
ভাবিনি মুহূৰ্ত্ত তরে, হইতে হইবে মােরে
অনার্থিনী কাঙ্গালিনী, পুনঃ এ সংসারে রে ।
কিন্তু গাে মােদের সুখে, বিষম বাজিল বুকে,
নিদয় বিধাতা তায়, ঈর্ষান্বিত হয়ে রে ।
কালের করালধারে, ছেদিয়া প্রণয়ডােরে,
হরিল প্রাণেশে মম, হৃদয় হইতে রে ।
ওরে নিদারুণ বিধি, কি দোষে হইলি বাদী,
সাধিলি বিষম বাদ, কোন্ অপরাধে রে।
রমণীসৰ্বস্ব ধন, দিয়া পতি বিসর্জন,
কি হেতু এখন আমি, রয়েছি জীবিত রে ।
নারীর গৌরব যাহা, একমাত্র পতি তাহা,
হেন পতি শূন্য হয়ে, কি সুখ বাঁচিয়া রে ।
এজন্মের আশা যত, সকলি হয়েছে হত,
তথাপিও কেন প্রাণ, এখনাে না যায় রে ।
যত কিছু দুঃখ আর, আছে গাে বিধি তােমার,
দিও গাে সে সব তাহে, তত ক্ষতি নাই রে ।
কিন্তু গাে কখন যেন, নাহি হয় কোন জন,
পতিহীনা একমাত্র, এই ভিক্ষা চাই রে ।
জুবিলি।
কি কারণে আজ বঙ্গবাসীগণ,
সুখের সাগরে হইয়া মগন ।
মন প্রাণ খুলি করিতেছে গান,
সপ্তমে তুলিয়া সুখের তান।
.
সমগ্র ভারত কিসের লাগিয়ে,
জয়নি করে অম্বর কপায়ে ।
একত্রে সকলে আমােদে মাতিয়ে,
চলিতেছে সবে বিহ্বল হয়ে ।
কি কারণে আজ নগরে নগরে,
পথে ঘাটে মাঠে প্রত্যেক দুয়ারে
আলােক-মালায় নব শােভা ধরে,
দুঃখিনী ভারত যেন হাস্য করে ।
মানস-কুসুম।
কি কারণে অজি হিন্দু-মুসলমান,
ইহুদী পারশী ব্রাহ্ম খুষ্টিয়ান।
সকলে মিলিয়া হয়ে একপ্রাণ,
আনন্দসাগরে তুলিছে তুফান।
•
কি কারণে আজ বঙ্গবাসীগণ,
মুক্তহস্তে ক্ষয় করিতেছে ধন ।
বালবৃদ্ধযুবা সবে কি কারণ,
মহা সমারােহে আনন্দিত মন ।
অভাগী ভারত চির অনাথিনী,
চির পরাধীনা আজন্মদুঃখিনী।
তাহা হতে আজি ঘাের জয়ধ্বনি,
কি কারণে বল পুনঃ পুনঃ শুনি।
চারিদিকে শুনি-জুবিলি জুবিলি,
যে দিকে নেহারি সে দিকেই খালি।
জ্বলন্ত অক্ষরে লেখা যে জুবিলি,
জুবিলি ব্যতীত নাহি অন্য বুলি।
৪ ২
মানস-কুসুম।
মহারাণী কুইন ভিটোরিয়ার,
রাজত্ব হইল পঞ্চাশ বৎসর ।
তাই আজ সবে ভারত মাঝার,
আনন্দসাগরে দিতেছে সাঁতার ।
সেই হেতু আজ প্রতি ঘরে ঘরে,
দীপাবলি তেজে নব শােভা ধরে
সেই হেতু আজ আমােদের তরে,
অকাতরে সবে অর্থব্যয় করে ।
তাই আজ যত নব্য যুবাগণ,
খাল লয়ে চাঁদা করিছে গ্রহণ।
রাণীর রাজত্ব করিতে স্মরণ,
নানা কীৰ্ত্তি কত হতেছে স্থাপন।
",
তাই আজ যত ইংরাজসৈনিক,
রণ-নিপুণ জানাতে অধিক।
গড়ের মাঠেতে ফিরিছে চৌদিক,
অস্ত্রেশস্ত্রে বেশ করিয়া বাহিক।
মানস-কুসুম ।
৪ ।
তাই আজ বহুবিধ অগ্নিবাজি,
আকাশেতে উঠে নানাবর্ণে সাজি ।
তাই আজ কত শত যান বাজী,
চলিছে পথেতে সারবন্দি সাজি।
তাই আজ কত বঙ্গবাসীগণ,
মহারাণী জয় করি উচ্চারণ।
মৃদঙ্গ লইয়া করিয়া কীৰ্ত্তন,
পথে পথে তারা করিছে ভ্রমণ ।
যার তরে আজ বঙ্গবাসীগণ,
এত কাণ্ড করে দিয়া প্রাণ মন ।
পরিবর্তে তিনি কিবা করিলেন,
আমােদের তরে তাদের দান ।
জন কত লােক পেলে ভস্ম ছাই,
রায় বাহাদুর কে সি এস আই।
বাবাকী আর যতেক সবাই,
যেমৃত আছিল রহিল তাহাই।
হিন্দুকুলবালার আক্ষেপ।
কেন বিধি নারী মােরে কৈল হিন্দুকুলে,
জানি কি মহাপাপভরে।
এ হেন দুর্দশা মাের লিখেছিলে ভালে,
চিরবদ্ধ রব কারাগারে।
যাবৎ রব বাঁচিয়ে,
পরের অধীন হয়ে,
পরের সেবায় রব রত।
সহিব পরের কাছে অত্যাচার কত ।
-"
বিবাহ দিবেন পিতামাতা যার সাথে,
তাহারেই হইবেক মােরে
জীবন যৌবন ধন সর্বস্ব অর্পিতে,
বিন্দুমাত্র না জেনেও তারে।
মানস-কুসুম ।
ইহ জনমের তরে,
করিতে হইবে মােরে,
সদা তার তুষ্টি সম্পাদন ।
হােক বা না,হােক মনােমত সেই জন ।
বিভিন্ন হইয়া পিতৃমাতৃস্থান হতে,
হবে মােরে করিতে গমন
অজানিত কোন এক পুরুষের সাথে,
আত্মজনে করিয়া বর্জন ।
বয়স বছর নয়,
প্রণয় কাহারে কয়,
বিন্দুমাত্র জানি না যখন,
প্রণয়িনী হয়ে তবে হবে দিতে মন
বালিকাকালেতে গিয়া শ্বশুরভবনে,
পারিব কহিতে বচন।
এমন কি পুরাতন দাসদাসীসমে,
রব মুখে দিয়া আবরণ।
মানস-কুসুম।
দিবানিশি খাটিব,
স্বামির দেখা না পাব,
নাহি হলে অনুগ্রহ তাঁর
ক্ষমতা নাহিক পতিনাম ধরিবার
অহরহঃ গৃহমধ্যে আবদ্ধ রহিব ।
প্রকৃতির সৌন্দর্য্য কেমন,
দেখিবারে কখনও নাহিক পাইব,
অন্ধকারে কাটাব জীবন।
যদি বা ক্ষণেক তরে;
দাড়াই জানালাধারে,
নিরদয় পুরজনগণ,
আরক্ত লােচন করি করয়ে তাড়ন
শাশুড়ীননদ কাছে গঞ্জনা খাইব,
যে যা বলে শুনিব সকল ।
অন্তরের দুঃখ মম অন্তরে সহিব,
বিরলেতে ফেলি অশ্রুজল।
মানস-কুসুম।
৪৭
করিবারে দরশন,
পিতামাতা আত্মজন,
পারিব নিজ ইচ্ছামতে।
স্বাধীনেতে কোন কাৰ্য্য না পাব করিতে।
বিধবা যদ্যপি হই অদৃষ্টের ফেরে,
সৰ্বসাধ মিটিবে তখন ।
সাধের জীবন মাের এ জন্মের তরে,
দুঃখনলে হইবে দহন ।
ধরি যুগযুগান্তর,
কত শত যােগীবর,
যে ইন্দ্রিয় না পারে শাসিতে ।
তৎক্ষণাৎ মােরে তাহা হবে সংযমীতে
নিজ স্বার্থ সুখ হেতু পুরুষ নির্দয়,
পুনরায় বিবাহ করিছে ।
ধর্মের প্রসঙ্গ তুলি রমণী বেলায়,
অবলায় পরাণে বধিছে।
৪y
মামস-কুসুম ।
নিজে পুনঃ বিভা করে,
রমণী করিলে পরে,
হিন্দুধর্মে স্থান নাহি মিলে।
কেন বিধি নারী মােরে কৈল হিন্দুকুলে
বিবাহ।
একি ঘাের দায়, বঙ্গদেশে হায়,
মূতন আপদ হেরি ।
লয়ে পুত্রকন্যা,
বিবাহ-ছলনা,
গােলযােগ হয় ভারি ।
পুত্রকন্যা দেহে, সমান উভয়ে,
সৰ্বমতে হেন কয়।
কিন্তু কাৰ্যকালে, বিপরীত ফলে,
এ অন্যায় কেন হয় ।
যখন জননী, প্রসবে নন্দিনী,
দুঃখী পিতামাতা তায় ।
আত্মীয় স্বজন, সবে মন,
যেন হল কত দায়।
মানস-ফুসুম।
কিন্তু ভাগ্যবলে,
পুত্র জনমিলে,
আনন্দিত সৰ্ব্বজন ।
আনন্দের ভরে,
সুখের সাগরে,
যেন করে সন্তরণ ।
দিন দিন যত,
বড় হয় সুত,
তত হৃদে সুখী হয় ।
কত আশা করে, কত ভাঙ্গে গড়ে,
ক্রমে লােভ বৃদ্ধি পায় ।
যদি পুত্র তায়,
পাশ করা হয়
সোণায় সােহাগা ধরে।
তা হলে ত আর, কথা নাহি তার,
বুঝি বা অদৃষ্ট ফিরে ।
নানা ঘটকেতে,
নানা দিক হতে,
নানান সম্বন্ধ করে ।
ক্রমে উচ্চতরে,
নিলামের দরে,
বর মূল্য সবে করে।
হইয়া গম্ভীর, করিছেন স্থির,
বরকর্তা একমনা ।
ছাড়িব ছেলে, যতক্ষণ না মিলে,
পরমা সুন্দরী কন্যা।
মানসকুসুম।
সর্বাঙ্গে তাহার, গহনা সোণার,
নিখ ত সকলি চাই ।
সাতনরি মালা, জড়ােয়ার বালা,
যা কিছু সমস্ত চাই ।
তাহার উপর,
নিতে হবে আর,
নগদ দশ হাজার।
কোন কোন জন,
করিছে মনন,
নাহিক বাড়ি আমার ।
করিবারে বাড়ি, নাহি টাকা কড়ি,
পুত্র বিভা দিয়া লই।
কেহ বা ভাবিছে, কেন মরি মিছে,
সুন্দরী বধূর তরে।
অর্থ পাই ভাল, হােক মেয়ে কাল,
যা হবার হবে পরে।
কিন্তু কন্যা যার, নিদ্রাহার তার,
বুঝি বা সকলি গেছে ।
কন্যাগ্রস্ত দায়,
উদ্ধার উপায়,
নিয়তই সে ভাবিছে।
ক্রমে ক্রমে যত,
• দিন হয় গত,
কন্যা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়।
মন-কুশুম ।
পিতা মাতা তত, ভাবে অবিরত,
বিবাহ কিরূপে হয়'।
উত্তীর্ণ দ্বাদশ,
মান কুল যশ,
বুঝি বা সকলি যায় ।
বিবাহ না হয়,
সতত চিন্তায়,
পাত্র কোথা পা’য়া যায়।
ধনি লােক যারা, বহু অর্থ দ্বারা,
করিল কন্যা অর্পণ।
দিয়া বহু ধন,
দুহিতা রতন,
মুখে কৈল সমৰ্পণ ।
গৃহস্থ যে জন; দেয় ভদ্রাসন,
বন্ধক অর্থের তরে ।
তবু তাহে হায়, কুলান না পায়,
কাল কন্যার্থ ভারে।
দরিদ্র যে জন,
যাহা কিছু ধন,
সৰ্বস্ব বিক্রয় কৈল ।
অবশেষে তার, অন্ন মেলা ভার,
ভিক্ষাবৃত্তি আচরিল ।
কোন কোন জন, করিছে শােধন,
বিবাহ দিয়া পুত্রের
মানস কুসুম ।
নিজ ঋণ যত,
কেহ নানা মত
অলঙ্কার করে স্ত্রীর।
কুলীন মৌলিক,
হয়েছে অলীক,
পাশ অর্থ সার এবে ।
জাতি কুল তরে,
লক্ষ্য নাহি করে,
অর্থ হলে সব হবে।
ঈশ্বর নিয়ম, পবিত্র মিলন,
পরিণয় কয় যারে ।
তাহা লয়ে আজ,
বঙ্গীয় সমাজ,
ব্যবসা আরম্ভ করে ।
অনেক অনেক,
সুবিজ্ঞ যতেক,
তারাও এরূপ করে।
এ অপেক্ষা আর, নৃশংশ আচার,
কি বল হইতে পারে ?
এই কি তঁাদের,
উন্নতি দেশের,
সমাজ সংস্কার এই ?
পরের বেলায়,
বক্তৃতা ছড়ায়,
নিজ বেলা যেবা সেই।
ইয়ং বেঙ্গল।
বাঙ্গালির রীতি নীতি সব বুঝি গেল রে,
অদ্ভুত আচারে বঙ্গ পরিপূর্ণ হল রে ।
যত নব্য যুবাগণ,
চলিছে সদর্প মন,
নবীন সভ্যতালােকে জ্ঞান দৃষ্টি পেয়ে রে ।
চাদর ধুতির প্রথা প্রায় উঠে গেছে রে,
কলিওলা পিরিহান কেহ নাহি পরে রে ।
এবেকার সভ্য যত,
করে বেশ অন্য মত,
গলে কুলাে বাঁধা সার্ট চলিত এখন রে ।
d
পেণ্ট লেন পরি আজ যত বঙ্গবাসী রে,
সােজা হয়ে থাকে যেন চাড়া দেয়া আছে রে।
তাহার উপর পুনঃ,
করে কোট পরিধান,
সম্মুখের আদখানা বুঝি তার নাই রে ।
মানস-কুসুম।
টু টু যত ছেড়াখোঁড়া কানি রে,
জোড়া তাড়া দিয়া তাহা গলাতে লাগায় রে
অদ্ভুত সাজিয়া সুখে,
সাগ্নিক চুরুট মুখে,
মড়াপােড়া গন্ধ তার চারি দিকে ধায় রে ।
সেকেলে পাদুকা সব নাহিক এখন রে,
সে সকল জুতা এৰে ঘৃণার ভাজন রে ।
ইংরাজী ডসন বুট,
পরিয়া করিয়া হুট,
চলিছে ভারত বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া রে ।
সমাদর অভ্যর্থনা নমস্কার আদি রে,
সকলি করেছে লােপ এক সোণ্ড রে
আদপ কায়দা শুদ্ধ,
বিদেশী আচারে বৃদ্ধ,
এ অপেক্ষা কত আর উচ্ছন্ন যাইবে রে ।
মানস-কুসুম।
স্ব জাতীয় নাম সব করিয়া বদল রে,
বিজাতীয় ধরণেতে করিবারে চায় রে ।
বাবু নহে মনােমত,
মিষ্টার লিখিবে যত,
ততই তাদের প্রাণ পুলকে ভাসিবে রে
দেশীয় সুস্বাদু খাদ্য পরিত্যাগ করি রে,
ইংরাজী খানার তরে সততই ব্যর্থ রে ।
শুকর গরু খাইয়া,
উদর পূর্ণ করিয়া,
যেন তার কত কাল পরমায়ু বাড়ে রে ।
গ্রীষ্মের উত্তাপে দেহ করিতে শীতল রে,
আমানি এখন আর কেহ নাহি খায় রে।
লিমন বরফ সােডা,
খাইয়া হইছে ঠাণ্ডা,
কাচের বাসন ভিন্ন রুচি নাহি হয় রে ।
মানস-কুসুম।
দেশীয় সংগীত আর ভাল নাহি লাগে রে,
তানপুরা সেতারে মন নাহি আর মাতে রে
যতেক যুবক পাল,
করে কনসার্ট দল,
হারমােনিয়া ফটের ছড়াছড়ি এবে রে ।
মহাভারত রামায়ণ ভাগবত আদি রে,
এ সকল পাঠ গান অন্ত প্রায় এবে রে
এখন যতেক লােকে,
থিয়েটারে গিয়া সুখে,
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর সব তথা পায় রে
চল্লিশ হইলে পার চালুসে ধরিলে রে,
কোন কোন লােক আগে চসমা লইত রে
বিজ্ঞান আলােক তেজে,
যতেক যুব সমাজে,
দিন দিন চক্ষুতেজ ক্রমশঃ কমিছে রে ।
মানস-কুসুম।
এখন যতেক সব যুবকের দল রে,
আই গ্লাস চসমায় মুখ করিছে শোভিত রে ।
এদিকে ওদিকে চায়,
চৌদিকে মুখ ঘুরায়,
অন্তরালে থাকি কপি যেন উকি মারে রে ।
চিঠিপত্ৰ আদি করে যাহা কিছু আছে রে,
জাতীয় ভাষায় আর কেহ নাহি লেখে রে।
এখন যতেক লােকে,
ইংরাজীতে পত্র লেখে,
মৌখিক কথায় তার গােটাকত মিশে রে ।
হিন্দুধৰ্ম্মে বড় গােল বড় বাধাবধি রে,
এড়াইয়া এ সকল জঞ্জাল হইতে রে ।
নর নারী এক হয়ে,
সচ্ছন্দ্বে সভায় গিয়ে,
অপাঙ্গে নেহারি করে ঈশ্বরে ভজন রে
৫৮
মানস-ফুসুম ।
দুই পাতা ইংরাজী শিক্ষা না হইতে রে,
বাপ মার বাক্স ভাঙ্গি বিলাত পালায় রে
দিনকত থাকি সেথা,
শিবিয়া ইংরাজী কেতা,
আইলেন দেশে ফিরি সভ্যতম হয়ে রে ।
মঙ্গল যদ্যপি কিছু করিবারে পারে রে,
যাউক বিলাতে তায় তত ক্ষতি নাই রে
কিন্তু হায় দেশে এসে,
জাতি কুল সব নাশে,
বিকৃত বদল তার দেখিবারে পাই রে ।
পিতা মাতা আত্মজন সকলে তেয়াগি রে,
একেবারে পুরােপুরি সাহেব হয়েন রে ।
যাহাতে ভারৈ সকলে,
বাঙ্গালি নাহিক বলে,
বাঙ্গালি তাহার কাছে ঘণর পদার্থ রে।
মানসকুসুম
।
জানি কি মায়া জাল বিলীতেতে আছে রে,
অল্প দিন তরে লােক যাইয়া তথায় রে ।
পিতা মাতা জন্মস্থান,
মাতৃভাষা ধৰ্ম্মজ্ঞান,
সকলি ভুলিয়া হয় তার সেবা রত রে ।
মাতাল।
বিকৃত বদ-9
অরক্ত নয়ন,
কেবা ঐ জন,
পাগলের বেশ,
ভ্রমণ করে ।
আলুথালু কেশ,
বসন সরে ।
হতে কটিদেশ,
কেঁাচাটি তাহার, ধূলায় ধুসর,
এক খোট তার, কাছাটি পেঁজা ।
কখন বেঁকিছে, কখন হেলিছে,
কখন চলিছে, হইয়া সােজা।
দুই পা চলিছে, হোঁছট লাগিছে,
আছাড় খাইছে, পথের ধারে ।
৬ ৮, মানসকুসুম । আবার উঠিছে, আবার চলিছে, কত কি বলিছে, প্রলাপ ভরে । কাদা মাখা গায়, মরি মরি হায়, ক্ষত অঙ্গে বয়, রুধির ধারা । মান অপমান, হ্রস্ব দীর্ঘ জ্ঞান, কাল দণ্ড স্থান, সকলি হারা । দেখ দেখ হায়, জ্ঞানশূন্য প্রায়, এক মনে ধায়, খানার ধারে । টলিল চরণ, হইল পতন, পঙ্কে নিমগন, হল এবারে । গেঁগো রব করে, উঠিবারে নারে, গুমুরে গুমুরে, বদন গুজে। উঠিতে তাহার, নাহি শক্তি আর, নাক মুখ তার, পকেতে বুজে যত চেষ্টা করে, তত ডুবে মরে, শক্তি উঠিবারে, নাহিক হল । কিছুক্ষণ রয়ে, পঙ্কেতে ডুবিয়ে, শ্বাস রুদ্ধ হয়ে, মরিয়া গেল। তাহা এই জন, করি মদ্যপান, বিপাকে জীবন, করিল নাশ ।
মানস-কুসুম।
৬১
তথাপিও হায়,
কত লোক খায়,
কালকূট প্রায়, এ হেন বিষ।
আঘ্রাণে যাহার, দুর্গন্ধ বিষ্ঠার,
পানেতে যাহার, চৈতন্যহারা ।
পানে যার সুখ, জ্বলে যায় বুক,
তাহা হতে সুখ,
কি পায় তারা।
এই মদ্য তরে,
প্রতি ঘরে ঘরে,
সদা অশ্রুনীরে,
ভাসিছে কত।
এই সুরাপানে, কত শত জনে,
অকালে জীবনে, হতেছে হত।
এই সুরাবলে,
বিষময় ফলে,
ক্রমে রসাতলে, যেতেছে সবে।
তথাপিও হায়, দেখে না দেখ,
হয়ে অন্ধপ্রায়, ইহারে সেবে।
মদের মাহাত্ম
এক দিন দ্বিপ্রহরে নিদাঘ সময়ে,
ধার্মিক ব্রাহ্মণ কোন পথিক সুজন।
প্রখর সূর্যের করে দগ্ধপ্রায় হয়ে,
পিপাসায় শুষ্কতালু কণ্ঠাগত প্রাণ।
এ হেন দশায় পড়ি প্রান্তর মাঝারে,
জল অন্বেষণ হেতু চারি দিকে চায় ।
হেনকালে অকস্মাৎ সম্মুখে অদূরে,
সুন্দর উদ্যান এক অনুভব হয় ।
নিকটেতে গিয়া তার পায় দেখিবারে,
নয়নমােহন এক সুন্দর কানন।
সুশীতল জলাশয় রয়েছে মাঝারে,
শশাভিত চৌদিকে নানাবিধ বৃক্ষগণ ।
মানস কুসুম ।
হেরিয়া এ সব তবে সন্তুষ্ট হইয়া,
উদ্যানমধ্যেতে যেই প্রবেশ করিল।
হেনকালে কোন এক প্রহরী আসিয়া,
রােধিয়া তাহার পথ জিজ্ঞাসা করিল ।
কহ তুমি কোন্ জন কিবা প্রয়ােজন,
কি কারণে করিতেছ উদ্যানে গমন ।
এত শুনি কহিলেক পথিক তখন,
তৃষাতুর আমি এক পথিক ব্রাহ্মণ ।
প্রচণ্ড সূর্যের করে প্রান্তর মাঝারে,
মিয়া তৃষ্ণায় মাের আকুল পরাণ ।
এসেছি হেথায় জল অন্বেষণ তরে,
ছাড়ি দেহ পথ মােরে করি জলপান ।
কহিল পথিকে তবে প্রহরী তখন,
ছাড়ি দিব পথ তােমা জলপান তরে।
যা কিছু কহিব আমি করিবে পালন,
যদি বদ্ধ হও তুমি এই অঙ্গীকারে ।
৬৪
মানস-কুসুম।
কোন আজ্ঞা হবে মােরে করিতে পালন,
কহিল পথিক তবে বল শীঘ্র করি ।
পিপাসায় ফাটে বুক বাহিরায় প্রাণ,
করিবারে কালক্ষয় আর ত না পারি ।
কহিল প্রহরী তবে শুন দিয়া মন,
চারি ঘাট পুর্ণীর আছে চারি ধারে।
দেখিবে প্রত্যেক ঘাটে আছে কোন জন,
যে ঘাটে যাইৰে তুমি জলপান তরে।
প্রথমে যে ঘাটে তুমি করিবে গমন,
সেই ঘাটবাসী তােমা যা কিছু বলিবে ।
অগ্রে তাহা পালি যদি কর তথা পান,
তবে আর অন্য ঘাটে নাহিক যাইবে।
তার বাক্যে যদি তব নাহি লয় মন,
তবে অন্য ঘাটে তুমি পারহ যাইতে।
আজ্ঞা পালি এক ঘাটে করি জলপান,
অন্য ঘাটে আর কিন্তু না পাবে যাইতে।
মানস-কুসুম।
শুনিয়া এ সব কথা তথাস্তু বলিয়া,
উদ্যানে ব্রাহ্মণ তবে প্রবেশ করিল।
ক্রমশঃ প্রথম ঘাটে উপস্থিত হৈয়া,
নবীন যুবক এক দেখিতে পাইল ।
হেরিয়া পথিকে যুবা কহিল তখন,
কে তুমি হেথায় তব কিবা প্রয়ােজন।
কহিল পথিক আমি তৃষ্ণার্ত ব্রাহ্মণ,
জলপান হেতু হেথা মম আগমন।
মদিরা বােতল এক রাখি সম্মুখেতে,
কহিল যুবক অগ্রে কর ইহা পান ।
যদ্যপি এ ঘাটে তুমি চাও জল খেতে,
নচেৎ স্বস্থানে ভাই করহ প্রস্থান ।
শুনিয়া ব্রাহ্মণ তবে বলি রাম রাম,
কহিলেক নরাধম কি বলিলি মােরে ।
তৃষ্ণার্ত ব্রাহ্মণ আমি জল মাগিলাম,
কহিলি আমারে তুই মদ খাইবারে ।
মানন-কুসুম।
এত বলি ক্রোধভরে সে ঘাট ত্যজিয়া,
অন্য ঘট উদ্দেশেতে করিল গমন ।
দেখিল দ্বিতীয় ঘাটে উত্তীর্ণ হইয়া,
করিছে যবন এক গােমাংস রন্ধন।
কহিল ডাকিয়া দ্বিজ শুন হে যবন,
ঘাের পিপাসায় মাের ব্যাকুল পরাণ ।
জল অন্বেষণে মম হেথা আগমন,
দেহ অনুমতি মােরে করি জলপান।
শুনি তার কথা হাসি কহিল যবন,
এ ঘাটে যদ্যপি জল করিবে হে পান ।
তবে অগ্রে কর কিছু গােমাংস ভক্ষণ,
নচেৎ স্বস্থানে তুমি করহ প্রস্থান ।
এত শুনি জিহ্বা কাটি ভাবে দ্বিজ মনে,
পিপাসায় প্রাণ যায় কি করি এখন।
ব্রাহ্মণ হিন্দুর ছেলে করিব কেমনে,
অক্ষ্য যখনপাক গােমাংস ভক্ষণ।
মানস-কুসুম ।
এত ভাবি স্থির কৈল মনে বিচারিয়া,
গােমাংস কখন নাহি করিব ভক্ষণ ।
চলিলে অতঃপর সে ঘাট ত্যজিয়া,
তৃতীয় ঘাটের দিকে করিল গমন।
রয়েছে বসিয়া এক বােড়শী রমণী,
যাইয়া তথায় দ্বিজ করিল দর্শন ।
রূপে অনুপমা জিনি অনঙ্গমােহিনী,
প্রকাশিছে হাব ভাবকটাক্ষ ক্ষেপণ ।
হেরিয়া ব্রাহ্মণে বামা জিজ্ঞাসে তখন,
কে তুমি ঠাকুর হেথা কিবা প্রয়ােজন ।
কহে দ্বিজ আমি কোন পথিক ব্রাহ্মণ,
করিবারে জল পান হেথা আগমন ।
এত শুনি মৃদুভাবে উত্তরিল ধনি,
এ ঘাটেতে পার জল পান করিবারে ।
কুলের কামিনী আমি যুবতী রমণী,
মম ধৰ্ম নষ্ট যদি পার করিবারে ।
মানসকুসুম।
কর্ণেতে অঙ্গুলি দ্বিজ করিয়া প্রদান,
কহিলেক রমণীরে ডাকিয়া তখন।
পিপাসায় যদি মাের যায় আজ প্রাণ,
তবু আমা হতে ইহা না হবে সাধন ।
এতেক কহিয়া দ্বিজ সে ঘাট ত্যজিয়া,
চতুর্থ ঘটেতে শেষ করিল গমন।
করিলেক দরশন তথায় যাইয়া,
শীর্ণকায় অতিবৃদ্ধ জনৈক ব্রাহ্মণ।
হেরিয়া পথিকে বৃদ্ধ জিজ্ঞাসে তখন,
কোন্ কাৰ্য হেতু হেথা তব আগমন ।
কহিল পথিক আমি তৃষ্ণার্ত ব্রাহ্মণ,
আসিয়াছি করিবারে তৃষ্ণা নিবারণ ।
শুনি এ সকল বৃদ্ধ কহিল তাহারে,
এ ঘাটেতে জল তুমি পাইবে খাইতে
যদ্যপি পারহ অগ্রে বৃধিতে আমারে,
নচেৎ প্রস্থান কর এ স্থান হইতে।
মানস-কুসুম।
এতেক শুনিয়া দ্বিজ স্তম্ভিত হইয়া,
ভাবে মনে কিছুই ত না পারি বুঝিতে।
ঠেকিনু বিষম দায়ে হেথায় আসিয়া,
পিপাসায় বুঝি আজ হইল মরিতে।
হতাশ অন্তরে তবে সে ঘাট ত্যজিল,
ক্লান্ত হয়ে তরুতলে যাইয়া বসিল ।
এ দিকে পিপাসা তার বাড়িতে লাগিল,
ক্রমশঃ অসহরূপ হইয়া উঠিল।
ঘাের পিপাসায় শেষ নারি সম্বরিতে,
যন্ত্রণায় দ্বিজ তবে করিল মনন।
যে কোন ঘাটেতে থােক হবে জল খেতে,
প্রাণদায়ে পাপকর্ম করিব সাধন।
এত স্থির করি পুনঃ লাগিল ভাবিতে,
কোন্ ঘাটে গিয়া এবে করি জলপান।
ব্ৰহ্মহত্যা মহাপাপ হইবে করিতে,
করিলে চতুর্থ ঘাটে তৃষ্ণা নিবারণ ।
মানস-কুসুম।
পিপাসায় নিজ প্রাণ রক্ষা করিবারে,
নির্দোষী ব্রাহ্মণে কেন করিব সংহার ।
হেন কাৰ্য্য আমি নাহি পারি করিবারে,
ইহাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হয় মরণ আমার ।
তৃতীয় ঘাটেতে য়দি করি জলপান,
কুলকামিনীর ধর্ম হবে নাশিবারে।
হেন পাপ করি যদি রাখি আজ প্রাণ,
নরকেতে স্থানমাের হবে চিরতরে ।
হবে মােরে করিবারে গোমাংস ভক্ষণ,
যদ্যপি দ্বিতীয় ঘাটে করি জলপান ।
এ কাৰ্য্য বা কেমনেতে করিব সাধন,
ইহাপেক্ষা ভাল যদি যায় মাের প্রাণ।
প্রথম ঘাটেতে যদি করি জলপান,
তা হলে হইবে মােরে মদিরা খাইতে ।
ইহাতেও আছে পাপ কি করি এখন,
জল বিনা বুঝি আজ হইল মরিতে।
৭১
মানস-কুসুম।
চারি ঘাটে চারি কথা করিনু শ্রবণ,
তার মধ্যে মদ্যপানে অল্প দোষ হয় ।
অতএব এই কাৰ্য্য করিব সাধন,
ইহা ভিন্ন আর কিছু না দেখি উপায় ।
ঔষধার্থে সুরাপান আছে ত বিধান।
প্রাণদায়ে আমি আজ করি মদ্যপান ।
কি হবে ভাবিলে আর বিধি বিড়ম্বন,
মদ্যপান আছে মাের অদৃষ্টে লিখন।
এত স্থির করি তবে চলিল ব্রাহ্মণ,
প্রথম ঘাটেতে পুনঃ দিলেন দর্শন।
কহিলেন যুবকের করি সম্ভাষণ,
করিব হে মদ্যপান করেছি মনন ।
এতেক শুনিয়া যুবা উঠিয়া তখন,
হস্ত ধরি ব্রাহ্মণেরে কাছে বসাইল ।
মদিরাবােতলস্তারে করিল অর্পণ,
চক্ষুকর্ণ বুজি দ্বিজ নিঃশেষ করিল ।
१२
মানস-কুসুম।
মদ্যপান করাইয়া যুবক তখন,
বসিয়া বিবিধ গল্প আরম্ভ করিল।
তৃষ্ণা শ্রান্তি ক্লেশ সব ভুলিল ব্রাহ্মণ,
ক্রমশঃ অন্তর তার প্রফুল্ল হইল ।
যতই মদের নেশা ধরিতে লাগিল,
ততই মস্তিষ্ক তার বিকৃতি পাইল।
হিতাহিত বিবেচনা সব হারাইল,
এ দিকে জঠরনিল জ্বলিয়া উঠিল ।
হেথায় দ্বিতীয় ঘাটে যকন তখন,
সৌগন্ধ বিস্তারি করে গােমাংস রন্ধন
নেশার ধমকে দ্বিজ করিল মনন,
সম্মুখেতে খাদ্য কেন না করি ভক্ষণ।
ত্যজিয়া সে ঘাট দ্বিজ টলিতে টলিতে,
দ্বিতীয় ঘাটেতে তবে করিল গমন ।
বসিয়া আমােদভরে, যবনের সাথে,
গােমাংস ভক্ষণে কৈল উদর পূরণ ।
মানস-কুসুম ।
এ দিকে তৃতীয় ঘটে রমণী তখন,
দ্বিজ প্রতি অঙ্গভঙ্গী করিতে লাগিল ।
হেরিয়া ব্রাহ্মণ মনে হল উচাটন,
মদের বিঘােরে হৃদি শিথিল হইল ।
পাপপুণ্য বিবেচনা ভুলিয়া ব্রাহ্মণ,
কামাতুর হয়ে তথা করিল গমন।
লয়ে যুবতীরে বক্ষে করিয়া ধারণ,
কাণ্ডজ্ঞান হারাইয়া দিল আলিঙ্গন ।
অপমাত্র জ্ঞান তার হইল তখন,
ভাবিল করিনু আমি কি কাৰ্য্য সাধন ।
করিলাম মদ্যপান গােমাংস ভক্ষণ,
অবশেষ কুলস্ত্রীর সতীত্ব নিধন ।
পুনশ্চ নেশার ঘােরে ভাবিল ব্রাহ্মণ,
যা হবার হইয়াছে কি হবে এখন ।
মম পাপকর্ম কেহ করেনি দর্শন,
অতএব হেথা হতে করি পলায়ন ।
৭৪
মানস-কুসুম।
এত ভাবি চাহে দ্বিজ করিতে গমন,
হেনকালে অকস্মাৎ করিল দর্শন।
বসিয়া চতুর্থ ঘাটে সে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ,
করিছে তাহার গতিবিধি দরশন।
হেরিয়া তাহারে দ্বিজ লাগিল ভাবিতে,
এ বৃদ্ধ সকলি হেথা করেছে দর্শন ।
কেমনে দেখাব মুখ জনসমাজেতে,
যদ্যপি সবারে করে এ সব বর্ণন।
এতেক ভাবিয়া তথা করিয়া গমন,
বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের প্রাণ করিল সংহার ।
চলিলে অতঃপর ত্যজিয়া সেস্থান,
প্রকাশের সম্ভাবনা না দেখিয়া আর ।
ক্রমে দ্বারদেশে আসি উপস্থিত হৈল,
এ দিকে নেশাও তার কমিয়া আসিল।
এ হেন সময়ে তথা প্রহরী আইল,
সম্ভাষি ব্রাহ্মণে তবে জিজ্ঞাসা করিল।
মানস-কুসুম।
৫
বলহে ধাৰ্মিক দ্বিজ পথিক সুজন,
কোন সত্য এবে তুমি করিলে পালন।
শুনি হেট মুণ্ড তবে হইল ব্রাহ্মণ,
লাজ ভরে মুখে নাহি সরিল বচন।
হেরিয়া ব্রাহ্মণে তবে লাজে ম্রিয়মাণ,
সম্ভাষি প্রহরী তারে কহিল তখন।
অল্প দোষ ভাবি মদ্য করেছিলে পান,
কি ফল হইল তার দেখহ এখন।
পাপভয়ে নাকরিলে গোমাংস ভক্ষণ,
করিলে অবলার সতীত্ব নিধন ।
ব্ৰহ্মহত্যা মহাপাপে না হইল মন,
অল্প পাপ ভাবি মদ্য করিলে ভক্ষণ ।
কিন্তু সর্ব পাপ কৰ্ম্ম করিলে সাধন,
মদ্যপান করি তুমি হারাইয়া জ্ঞান ।
হেন কর্ম নাহি মুদে না হয় সাধন,
সকল দোষের মূল এই মদ্যপান ।
পলিগ্রামে সমাধি দর্শনে
০ ০
দিবা অবসান হেরি সন্ধ্যা আগমনে,
দেবালয় মাঝে হয় শঙ্খ ঘণ্টা রব ।
যত পশুপাল সব মন্থর গমনে,
চলিছে প্রান্তর মাঝে করি কলরব।
নিজ নিজ কৰ্ম্ম করি দিবসের শেষে,
চলিছে কৃষক সব পরিশ্রম ভরে ।
মৃদুমন্দ পদক্ষেপে গৃহের উদ্দেশে,
ক্রমশঃ ঘেরিল ধরা ঘাের অন্ধকারে ।
প্রান্তরের স্বাভাবিক সৌন্দৰ্য্য যে সব,
দিবসেতে ছিল যাহা হয়ে দীপ্তমান।
এখন বিলীন ক্রমে হতেছে সে সব,
স্পষ্ট রূপে নাহি আর হয় দৃশ্যমান।
মানস-কুসুম।
গভীর নিস্তব্ধ হৈল সমস্ত ভুবন,
অন্য কোন শব্দ আর নাহিক এখন ।
মাঝে মাঝে শুধু খালি ঝি ঝি পােকাগণ,
ঝি ঝি রবে অপ শব্দ করে উচ্চারণ ।
সুদূরেতে মেষশালে হতেছে বাজন,
মেষগললগ্ন ঘণ্টা শ্রবণমােহন।
নিদ্রা আনিবার তরে যেন মেষগণ,
বাজাতেছে ধীরে ধীরে করি আন্দোলন ।
লতিকায় আচ্ছাদিত অট্টালিকা হতে,
করিছে কর্কশনি পেচক এখন ।
যেন অভিযােগ করে চন্দ্রেরে জানাতে,
অন্য কেহ করে তারে বড় জ্বালাতন।
বহু দিন হতে যথা করিতেছে বাস,
নিভৃত আবাস তার সঙ্গোপন স্থান ।
অন্য কেহ আসি সদা ভ্ৰমি চারিপাশ,
হতেছে নিয়ত তার বিরক্ত ভাজন।
৭৮.
মানস-কুসুম।
বক্রকায় তরুগণ রয়েছে যথায়,
নিজ নিজ শাখা সব করিয়া বিস্তার।
করিতেছে ছায়া দান নিয়েতে তথায়,
তৃণযুক্ত অসমান ভূমিখণ্ডোপর।
তথায় ভূগর্ভে সেই অপ্রশস্ত স্থান,
কত শত জন তাহে রয়েছে নিহিত।
পল্লিগ্রামবাসী যত পূৰ্ব্ব পিতৃগণ,
অনন্ত নিদ্রার ঘাের হইয়া নিদ্রিত।
উষার সৌরভপূর্ণ সুমন্দ পৰুন,
পক্ষীগণ কলরব হেরিয়া প্রভাতে।
কিম্বা প্রতিধনিকর শিঙ্গার গর্জন,
এ নিদ্রায় তাহাদের নারিবে জাগাতে
ইহাদের তরে আর নাহিক কখন,
জ্বলিবেক অগ্নিকুণ্ড বিশ্রামের তরে ।
ব্যস্ত গৃহকর্তী নাহি করিরে ‘যতন,
দিবা শেষ হেরি সন্ধ্যা আয়ােজন তরে
মানস-কুসুম।
৭৯
দিবসন্তে গৃহে পিতা আসিত যখন,
পূৰ্ব্বমত এবে আর যত শিশুগণ ।
আনন্দে অস্ফুট স্বর করি উচ্চারণ,
ধাইবে না করিবারে পিতৃ সম্ভাষণ।
কিম্বা জনকের জানু করিয়া ধারণ,
এবে আর কেহ নাহি করিবে যতন ।
প্রত্যেকেই সৰ্ব্ব অগ্রে করিতে গ্রহণ,
জনকের স্নেহপূর্ণ সুমিষ্টচুম্বন ।
কত সুখে এককালে এই লােকগণ,
পরিপক্ক শস্য সব করেছে কর্তন ।
করিয়াছে মৃত্তিকায় লাঙ্গল চালন,
করেছে কুঠারাঘাতে বিটপি ছেদন ।
ওহে উচ্চ অভিলাষি মানব যতেক,
কোর না কখন যেন হাস্যাস্পদ জ্ঞান।
ইহাদের পরিশ্রম সাংসারিক সুখ,
দুরদৃষ্টে ইহাদের অজ্ঞাত জীবন ।
মানস-কুসুম।
ঘৃণাযুক্ত হাস্যসহ কোর না শ্রবণ,
ওহে সমারােহ প্রিয় ধনাঢ্য মানব ।
ইহাদের অতি অল্প সামান্য জীবন,
কিছু মাত্র নাহি যাহে করিতে গৌরব
বংশের গৌরব আর ঐশ্বৰ্য প্ৰতাপ,
সৌন্দৰ্য্য সম্পত্তি সাধ্য যত কিছু ধন ।
মৃত্যুকালে সকলেই হইবেক লােপ,
যশস্কর কৰ্ম্ম ফল অকাল মরণ।
দোষারােপ পল্লিগ্রাম জনগণােপর,
গর্বিত মানবগণ কোর না কখন ।
মৃতদের স্মরণার্থ সমাধি উপর,
করেনি বলিয়া এরা মন্দির গঠন।
খচিত বিবিধ চারু চিত্রে মনােহর,
মন্দিরের অভ্যন্তরে বিস্তৃত প্রাঙ্গণ।
যথায় মৃতের যত কৰ্ম্ম যশস্কর,
সগৌরবে উচ্চকণ্ঠে হয় উচ্চারণ।
মানসকুসুম।
মৃতদের ইতিবৃত্ত পূর্ণিত আধার,
কিম্বা প্রতিমূর্তি যেন জীবন্ত প্রতিমা।
পারে কি করিতে কভু জীবন সঞ্চার,
গ্রাসিয়াছে যেই দেহ মৃত্যুর কালিমা ?
মাননীয় উপাধিতে পারে কি কখন,
করিবারে মৃত জনে উৎসাহ বর্ধন ?
পারে কি প্রশংসাবাদ তুষ্টি সম্পাদন,
করিবারে মৃতকর্ণে বধিৰু শ্ৰবণ ?
না জানি এ অজানিত স্থানে কত জন,
সম গুণবান হায় রয়েছে নিহিত।
স্বর্গীয় বিশুদ্ধ প্রেমে উন্মত্ত যে জন,
ধর্মের আগ্রহে যার হৃদয় পূণিত ।
জানি রয়েছে হেথা কত যােগ্য জন,
রাজদণ্ড ধরি রাজ্য পারিত শাসিতে ।
কিম্বা মুগ্ধ করিবারে পারিত ভুবন,
নিজ নিজ সুললিত কবিত্ব শক্তিতে ।
মানস-কুসুম।
কিন্তু হায় এ সকল যত অভাজন,
করেনি কখন হায় বিদ্যা উপজ্জিন ।
বিবিধ ঘটনা পূর্ণ সময় বর্ণন,
ভাগ্য দোষে এরা কভু করেনি পঠন
মহৎ উদ্দেশ্য আর গুণ ভাগ যত,
ইহাদের হৃদয়েতে আছিল গোপন ।
ভীষণ দারিদ্র দুঃখে হইয়া পীড়িত,
কোন কালে পারে নাই হইতে স্মরণ
সমুদ্রের সুগভীর তিমির গহ্বর,
তমূল্য রতন তথা রহিয়াছে কত ।
কতই সৌরভ পূর্ণ কুতুম সুন্দর,
হইতেছে অজানিত স্থানে প্রস্ফুটিত
রয়েছে নিহিত হেথা আহা কত জন,
দোর্দণ্ড সাহসে যারা ইিম্পডেন্ সম
পারিত তাড়াতে অত্যাচারিরাজগণ,
ভীষণ সমরানলে প্রকাশি বিক্রম।
মানস-কুসুম ।
আছে হেথা কত জন মিল্টন্ সম,
পারিত মােহিতে ধরা কবিত্ব শক্তিতে ।
কিম্বা বিনা রক্তপাতে ক্রয়ে সম,
সামান্য অবস্থা হতে রাজ্যপদ পেতে।
ইহাদের অদৃষ্টেতে ঘটেনি কখন,
সমাজে প্রশংসা করি বক্তৃতা লভিতে।
শারীরিক কষ্ট কিম্বা সমূলে নিধন,
এ সকল ভয় হৃদে তাচ্ছিল্য করিতে ।
ইহাদের অদৃষ্টতে ঘটেনি কখন,
স্বদেশের প্রাচুৰ্যতা করিতে বর্ধন ।
কিম্বা হেরি প্রজাবৃন্দ প্রফুল্ল বদন,
জানিবারে স্বদেশের উন্নতি সাধন ।
ইহাদের পুণ্য কৰ্ম্ম পবিত্র পূর্ণিত,
যদ্যপিও অতিশয় আছিল সংক্ষিপ্ত ।
তথাপিও ইহাদের পাপ কৰ্ম্ম যত,
সেই রূপ পরিমাণে ছিল পরিমিত ।
৮৪
মানস-কুসুম।
ইহাদের অদৃষ্টেতে হয়নি কখন,
হত্যকাণ্ড করি শেষ রাজ্যপদ পেতে
মনুষ্য জাতির প্রতি করিতে বর্জন,
দয়া মায়া একেবারে অন্তর হইতে ।
যথার্থ বিষয় হৃদে করিয়া গোপন,
হয়নি এদের কভু যন্ত্রণা পাইতে।
লজ্জার স্বভাবসিদ্ধ রক্তিম বরণ,
হয়নি এদের কভু বদনে ঢাকিতে।
ইহাদের অদৃষ্টেতে ঘটেনি কখন,
যত্নসহ সুমধুর রচনা করিতে ।
অলঙ্কার পরিপূর্ণ তােষামােদ গান,
গর্বিত বিলাস-প্রিয় মানবে তুষিতে।
সহরের উনমত্ত যত লােকগণ,
স্বার্থ হেতু হয় যারা নীচ কর্মে রত ।
ইহাদের হৃদয়ের প্রশান্ত মনন,
হয় নাই নীচ কভু তাহাদের মত।
মানস-কুসুম।
উপত্যকা মধ্যস্থিত ধীর প্রস্রবণ,
নিঃশব্দে প্রান্তর মাঝে হয় প্রবাহিত ।
সেই রূপ ইহাদের অজ্ঞাত জীবন,
নিৰ্বিবাদে কুশলেতে হইয়াছে গত ।
তথাপিও মৃতদের কবর উপরি,
অপমানকর কিছু না হয় ঘটন।
সেই হেতু রাখিয়াছে উত্তােলন করি,
নহে দীর্ঘকাল স্থায়ী সামমি নিশান ।
সামান্য মৃত্তিকান্তপ আকৃতি বর্জিত,
খােদিত সামান্য শ্লোকে কুৎসিত লিখন ।
পথিকদিগের চক্ষে হইয়া পতিত,
দীর্ঘশ্বাস তাহাদের করায় ক্ষেপণ ।
শােকের সঙ্গীত কিম্বা যশঃ গুণ গান,
ইহাদের কিছু মাত্র নাহিক খােদিত ।
এদের কেবল মাত্ৰ বয়ঃক্রম নাম,
অশিক্ষিত কবি দ্বারা হয়েছে লিখিত।
মানস-কুসুম।
ধর্মশাস্ত্র হতে শ্লোক করিয়া উদ্ধৃত,
কবরের চারিধারে করেছে লিখন ।
হেরি পল্লিবাসীগণ হইবে শিক্ষিত,
কেমনে মরিতে হয় নিস্পাপ মরণ।
কে আছে এমন জন কে করে মনন ?
সাধপূর্ণ সুখময় জীবন তাহার ।
মৃত্যুপরে হবে সবে চির-বিস্মরণ,
কোন কালে কেই তারে না ভাবিবে আর ?
জীবনের সুখধাম সখের শরীর,
কেবা আছে হেন জন পারে গো ছাড়িতে ?
অনিচ্ছা প্রকাশি নাহি হেরে একবার,
স্নেহ মায়া মমতায় বিসর্জন দিতে ?
মুমুর্য, জীবন তার হয় রে কাতর,
ত্যজিবারে, চিরতরে ভালবাসা জন।
অন্তিমেও মনে মনে হয় আশা তার,
করিবে তাহার শােকে অপরে রােদন।
মানস-কুসুম।
৮৭
কবরে নিহিত কিম্বা ভস্মে পরিণত,
জীবনান্তে মৃতদেহ হয়রে যখন।
তখনাে তাহারা যেন আশে অবিরত,
করিবে এ সব হেরি তাদের স্মরণ ।
অজানিত মৃতদের সরল জীবন,
মন আমার সযতনে করিছ বর্ণনা।
যদ্যপি আমার মত অন্য কোন জন,
ভবিষ্যতে অকস্মাৎ করয়ে কামনা।
বিরলে বসিয়া যুদি চিন্তার মাঝারে,
বাসনা হৃদয়ে তার হয় হে কখন।
আমার অদৃষ্টলিপি জানিবার তরে,
হয় ত বলিবে কোন কৃষক প্রবীণ ।
“হেরিতাম প্রতিদিন প্রত্যুষে তাহারে,
দ্রুত পদক্ষেপে করি শিশির মর্দন ।
তৃণযুক্ত অষ্পেত ভূমিখণ্ডোপরে,
ধাইতেছে সূর্যোদয় করিতে দর্শন।
৮৮
মানসকুসুম।
“দ্বিপ্রহরে তরুতলে দেখিতাম তারে,
দেহভার বিস্তারিয়া রয়েছে শুইয়া।
চেয়ে আছে একদৃষ্টে স্রোতস্বিনী পরে,
কলস্বরে কাছে যাহা যেতেছে বহিয়া।
“দেখিতাম সম্মুখস্থ অরণ্য সমীপে,
ঘৃণাযুক্ত ভাবে যেন হাসিতেছে ক্ষণে।
চলিছে কখন কভু বকিছে প্রলাপে,
নানাবিধ চিন্তা যাহা জাগিতেছে মনে।
“নিৰ্বাসিত জন প্রায় হতেছে কখন,
চিন্তানলে জর জর অবসন্ন কায় ।
হইতেছে কখন বা বিষাদে মগন,
হইয়াছে যেন তার নিরাশ প্রণয়।
“এক দিন প্রাতঃকালে না দেখিনু তারে,
পর্বতে যথায় সদা করিত গমন।
কিম্বা তরুতলে কিম্বা অরুণ্য মাঝারে,
সতত যথায় তারে করেছি দর্শন।
মানস-কুসুম ।
পর দিন হৈল তবু না দেখিনু তারে,
তটিনীর তীরে যথা থাকিত.সে জন।
কিম্বা যথা তৃণযুক্ত ভূমিখণ্ডোপরে,
হেরিবারে সূৰ্যোদয় করিত গমন।
“হেরি পর দিন তারে যেতেছে লইয়া,
অন্তিম সঙ্গীত গান করি শােকভরে ।
পড়িবারে পার তুমি এ সহ পড়িয়া,
প্রস্তরে খােদিত লেখা সমাধি উপরে ।
সমাধিস্তম্ভ।
রয়েছে শুইয়া হেথা ভূগর্ভ ক্রোড়েতে,
ধন মান বিবর্জিত যুবক জনৈক।
দরিদ্র জনম তার পারেনি বােধিতে,
করিবারে জ্ঞান লাভ স্বভাব অধিক।
মানস-কুসুম।
আজীবন দুর্দশায় করেছে ক্ষেপণ,
দানশীল গুণ তার যথেষ্ট আছিল ।
পর দুঃখে দুঃখী হয়ে করিয়াছে দান,
যা কিছু আছিল ধন খালি অশ্রুজল ।
সরলতা পরিপূর্ণ ছিল তার মন,
সেই হেতু বিধি তারে করেছিল দান ।
এক মাত্র যাহা কিছু করেছে যাচন,
পরম সুহৃদ এক বান্ধব রতন।
কোর না অধিক চেষ্টা জানিবার তরে,
ইহার সদ্গুণ কিম্বা দোষভাগ যত ।
আশাসহ ভয়ে তারা রয়েছে কবরে,
ঈশ্বরের প্রতি সব করিয়া অর্পিত ।
সংসার।
অসার সংসার,
মায়ার আগার,,
শােক দুঃখ নিরন্তর ।
মােহ রূপ যন্ত্রে,
হইয়া চালিত,
ভ্রমিতেছে যত নর।
মনুষ্য জনম,
করিয়া গ্রহণ,
সুখী কেহ কভু নয়।
আশার কুহকে,
হয়ে জড়ীভূত,
মায়া, পাশে বদ্ধ রয়।
শৈশবে মানব, সরল হৃদয়,
সুখ দুঃখ নাহি জানে।
অমৃত গরল,
সম জ্ঞান সবে,
দ্বেষ হিংসা নাহি মনে।
তথাপিও হায়,
নাহিক তাহার,
সতত সন্তুষ্ট মন ।
ইচ্ছা মনে মনে, থাকে অনুক্ষণ,
নিকটেজননী স্তন
৯২
e
মানস-কুসুম।
বাল্যাবস্থা কালে, বিদ্যাভ্যাস তরে,
সতত, চিন্তিত মন ।
দিবানিশি ধরি,
বহু পরিশ্রমে,
করে বিদ্যা উপার্জন ।
ক্রমশঃ যৌবনে, করি পদার্পণ,
কত চিন্তা অবিরত।
ইন্দ্রিয় লালসা, প্রণয় পিপাসা,
প্রেম আশা কত মত।
সংসার সাগরে, হইতে মগন,
রমণীতে ন্সাধ মনে ।
বিবাহ করিয়া, প্রবেশে সংসারে,
লয়ে প্রণয়িনী ধনে।
নিজের ভাবনা,
ছিল এত দিন,
পরের ভাবনা নয়।
দোহার ভাবনা, হইল ভাবিতে,
নব চিন্তা অভ্যুদয় ।
ক্রমশঃ যখন, সন্তানাদিগণ,
হইতে লাগিল তার ।
নানা রূপ চিন্তা, হইল তখন,
ভেবে অস্থিচর্ম সার ।
মানস-কুসুম।
আত্মজন কেহ,
হইলে পীড়িত,
নিদ্রাহার সব যায় ।
ভাবে সদা হায়,
কি করি উপায়,
রােগ মুক্ত কিসে হয়।
কালের কবলে,
হইলে পতিত,
জ্ঞান বুদ্ধি লােপ পায়।
মহা কষ্ট ভরে, হা হুতাশ করে,
শােকানলে দগ্ধ হয়।
বার্ধক্যে মানব,
জরাগ্রস্ত হয়ে,
বিবিধ যাতনা পায়।
নিত্য নিত্য রােগ, নিত্য নব শােক,
অবল অচল কায় ।
দৃষ্টিহীন চক্ষু,
বধির শ্রবণ,
নিজে নিজাধীন নয়।
নিকট মরণ,
শমনের ভয়ে,
ভয়াকুল বড় হয় ।
আজন্ম হইতে, মরণ পৰ্যন্ত,
চিন্তা ছাড়া যেবা নয় ।
সংসার মাঝারে, কেমনে তাহার,
হইবে সুখী হৃদয় ?
৯৪
মানস-কুসুম ।
দারিদ্র্য দশায়,
হইয়া কাতর,
কেহ বহু কষ্ট পায় ।
কেহ ভাবে পুনঃ, কেমনেতে করি,
মৰ্য্যাদায় দিন ক্ষয় ।
ঐশ্বৰ্য্য সম্পত্তি, মান রূপ যশ,
কেমনে হইবে খ্যাত।
বিবিধ আশায়,
হইয়া আবদ্ধ,
হয় নর ব্যতিব্যস্ত ।
কারাে বা আবার,
হয় কুলান,
অর্থ প্রয়ােজন মত।
কাহারাে আবার,
পরিজনগণ,
নাহি হয় মনােমত ।
কেহ ভাবে মনে, কেমনেতে করি,
অর্থ কিছু উপার্জন।
কেহ বা আবার, ভাবিছে কেমনে,
সম্পত্তি করি বর্জন ।
পুত্র নাহি যার, মহা দুঃখে তার,
সতত দুঃখিত মন ।
সংসার মাঝারে, না জানিনু হায়,
সন্তান কেমন ধন ।
মানস-কুসুম
4
বিধি বিড়ম্বনে, সন্তানের মুখ,
হল দর্শন মাের ।
বুঝি বা পরেতে, আছয়ে অদৃষ্টে,
নরক যন্ত্রণা ঘাের।
আছে পুত্র যার,
সেও নয় সুখী,
তাহারাে চিন্তিত মন ।
লালন পালন,
করিবার তরে,
সন্তান সন্ততিগণ ।
কেমনে তাহারা, হবে সুশিক্ষিত,
সৎকর্মে হবে রত।
নানা রূপ চিন্তা, হয় কত মত,
চিন্তাকুল সদা চিত ।
ষড়রিপুগণে,
করিবারে তুষ্ট,
সতত চিন্তিত কেহ।
বাঞ্ছিত রতনে,
পাইবার তরে,
কেহ ভাবে অহরহঃ ।
হয়ে সদা রত,
করে ছিদ্র অন্বেষণ।
বিবিধ উপায়ে, কেহ করে সদা,
নিজ স্বার্থ সম্বর্ধন।
কেহ পাপ কর্মে,
মানলকুসুম ।
ধনবান যেবা,
সেও নয় সুখী,
নির্ধানিও সুখী নয়।
আমির ফকির, রাজা প্রজা আদি,
সকলেই দুঃখ পায় ।
যে যেমন লােক, তার তেমি চিন্তা,
চিন্তায় অকুিল সবে ।
কেমন করিয়া,
বল দেখি তবে,
সংসারেতে সুখ পাবে ?
সংসার জ্বালায়,
হয়ে জ্বালাতন,
বলে মুখে তবে শেষ।
এ ছার সংসারে,
নাহিক কখন,
সুখের পরশ লেশ।
সম্পূর্ণ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.