Mohiary Public Library,andul, Howrah

Tero Nambor Basti

Sanyal, Prabodhkumar · 2009/08/29

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

তেৱাে নম্বৱ বসৃতি
প্রবােধকুমার সান্যাল
বেঙ্গল পাবলিশাস
১৪, বঙ্কিম চাটুটে, কলিকাতা

এ সংর--কান, ১৩
একশ-শচীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়,
বেঙ্গল পাবলিশা
১৫, বঙ্কিম চাটুজে থ্রট,
মুন্নার-পুলিনবিহারী সামন্ত,
দি প্রিন্টিং হাউস
৭৩, আপার সারকুলার রােড,
কলিকাতা।
প্রচ্ছদপট পরিকল্পনা
কাণ্ড বন্দ্যোপাধ্যায়
ক ও প্রচ্ছদপট মুদ্রণ
ভারত ফোটোটাইপ স্টুডিও
বাধাই বেঙ্গল বাইস
দু’ টাকা চার আনা
‘তেরাে নম্বর বতি’--- উপন্যাসে রূপান্তরিত
করেছেন যুক্ত জ্যোতিপ্ৰসাদ বসু

ভূমিকা ‘তেরাে নম্বর বসতি’-উপন্যাসখানি সম্পর্কে একটুখানি সংবাদ পাঠক- মহলকে আমি জানাতে চাই। কিছুকাল আগে বাঙ্গলার পূর্বতন লাট সাহেব মিঃ কেসী কলিকাতার বতি-উন্নয়নের ব্যাপার নিয়ে শহরে একটা হুজুগ তােলেন, যেমন কুখ্যাত লর্ড লিনলিথগো। কয়েক বছর আগে দাগা যাঁড়ের আন্দোলন তুলে জাতীয়তাবাদীর দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরাবার চেষ্টা করেছিলেন। মিঃ কেসীর এই হৈ-চৈ-এর সুযােগ নিয়ে কোনাে একটি সিনেমা- কোম্পানী সরকারী মহলের সুপারিশে প্রয়ােজনীয় ফিমের ‘কোটা’ আদায় করেন, এবং নানা ঘাট ঘুরে আমার কাছে এসে একটি গল্প চা। বসতি উন্নয়ন পরিকল্পনা উৎসাহিত হয়-এমন একটি ফরমাসী গল্প আমি লিখে দিই, এবং উক্ত সিনেমা কোম্পানীর মালিকের সাময়িক অভিভাবক প্রসিদ্ধ আমেরিকা অভিনেতা শ্ৰীযুক্ত মেভি ডগলাস নাকি গল্পটি পছন্দ করেন। কলিকাতার তৎকালীন মেয়র শ্ৰীযুক্ত দেবেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায় যেদিন ছবিধানির মহরৎ সম্পন্ন করেন, তার পরদিন সংবাদপত্র পাঠ করে জানতে পারি, ‘তেরাে নম্বর বসতি’—উপন্যাসের ‘প্লটু’ নাকি স্বয়ং মিঃ মেলভিল ডগলাসের তৈরী! আমার বিশ্বাস এই হাস্যকর সংবাদটি ডগলাস সাহেবের কানে ওঠেনি,-এবং উঠলে সেই ভদ্রলােক অবশ্যই প্রতিবাদ করতেন। সিনেমা জগতে আমি নতুন গল্পলেখক নই, এবং আমাকে প্লট-সরবরাহ করা মানে ঝরিয়ার কয়লাখনিতে কয়লা আমদানী করার মতাে। যাই হােক, এই গল্পের হিন্দি সিনেমা-চিত্রটির নামকরণ করা হয় ‘আমীরি’-এবং ছবিখানির পরিচালনা করেন শ্রীযুক্ত প্রমথেশ বড় । “আমীরি চিলে • প্রদর্শনীর উদ্বােধন করেন শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ও শ্ৰীযুক্ত শরৎচন্দ্র বসু। ছবিখানির প্রযােজনা কালে প্রচারকার্য ব্যাপারে যতখানি গর্জন করা হয়েছিল, ততখানি বর্ষণ হয়েছিল কিনা আমার জানা নেই । তবে সিনেমা- গল্পের সাহিত্যিক ইজ্জৎ কিছু কম, এবং গল্পটি প্রচারকার্য প্রধান বলেই যে প্রথম শ্রেণীর হয়ে ওঠেনি—একথা আমি নিজে এখনও বিশ্বাস করি। ‘আমীরি’ গল্পটিতে উপন্যাসের দানা ছড়ানাে ছিল, এটি লেখার সময় আমি বিচার করে দেখেছি। এতদিন পরে তরুণ লেখক শ্ৰীমান্ জ্যোতিপ্রসাদ বসু বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে এই দানাগুলিকে একত্র করে গল্পটিকে উপন্যাসে পরিণত করেছেন। উপকরণ সমস্তই আমার, কেবল নৈবেদ্যর ডালাটি তঁার হাতে সাজানাে। তাঁর দক্ষতায় আমি খুশী । ইতি প্রবােকুমার সান্যাল টাকুরিয়া ফাগুণ ৭, ১৩৫৩ রায়বাহাদুর শশধর চৌধুরীর নতুন কেনা বাগান বাড়ীটা সহরের পূর্ব- প্রান্তে। রাজপ্রাসাদের মত বিরাট বাড়ীটা আশে পাশে ফুল বাগান আর টেনিস লনের পরিধি নিয়ে সত্যই খুব সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অঞ্চলটা ভাল নয়। আশেপাশে নােংরা বস্তি। চাদের পাশে বেয়াড়া কালাে মেঘের মত বেমানান। কিন্তু জায়গাটা এতই বস্তিবহুল যে অঞ্চলটাকে বস্তি অঞ্চলই বলা হয়। এই জঘন্য পারিপার্শ্বিকের মাঝে রায়বাহাদুরের প্রাসাদখানা অসম্ভব রকম বিচিত্র দেখায়। সুন্দর উন্নত নাসার পাশে যেন একরাশ ব্রণের মত ঐ বস্তিগুলাে। রসভরা ব্রণের ক্ষতগুলাে, এতই কদর্য যে ক্ষতটা সেরে গেলেও দাগটা মিলাতে সময় লাগে। ওদের কদর্যতা এতই স্পষ্ট। 3. জীবনের সমৃদ্ধ রাজপথে এতই গভীর বস্তির খাদ। জমিজমা বেশ আছে শশধর চৌধুরীর মফস্বলে। মফঃস্বলে। এবং সেই কারণে তাকে অনায়াসে জমিদার বলা যেতে পারে। কয়েক বৎসর আগে কি একটা রাজনৈতিক আন্দোলনের যুগে তিনি কি ভাবে যেন সাহায্য করেন গভর্ণমেন্টকে। কি ভাবে, কোন সর্পিল পথে সে সাহায্য সম্ভব হয়েছিল তা অবশ্য কারও জানা নেই কিন্তু পরবর্তী ভাগ্যোন্নতির খবরটা সকলেরই জানা আছে। রায় বাহাদুর পদবীটা তারই একটা জলন্ত স্বাক্ষর। বত মানে তার বাগানবাড়ীর চতুঃসীমানায় যে প্রকাণ্ড বন্তি পল্লী ৫ রয়েছে সেটিও কয়েক বছর হল তার দখলে এসেছে। এই বস্তিতে কারা কারা থাকে, কতকগুলাে চালা ঘর দাড়িয়ে রয়েছে, ওখানকার অলিগলি কতগুলাে, কোন শ্রেণীর লােক ওখানকার গােলক ধাঁধার মধ্যে আনাগােনা করে এ সব খবর রায় বাহাদুরের পরিবারে কোন দিনই পৌছায় না। পৌছবার প্রয়ােজন বােধ হয় না বলে। রায়বাহাদুরের বিরাট সৌধের এক পাশে পড়ে থাকে ১৩নং বস্তি আবর্জনার মত। বস্তির চালাঘরের চতুর্দিকে ভয়াবহ আবর্জনার স্তুপ। পথের বাঁকে ওটানাে একটা ডাস্টবিন। সামনে দুর্গন্ধময় ময়লা জলের নালা বয়ে চলেছে। এধারে মরা বিড়াল ছানা, ছেড়া কঁাথা-মাদুর, ভাঙ্গা হাঁড়ি, তরকারির খােসা, পচা মাছের আঁশ ইত্যাদি স্তুপাকার হয়ে পড়ে আছে। মাছি ভন ভন করছে চারিদিকে। কর্পোরেশনের ময়লার গাড়িটাও সুযােগ বুঝে উল্টে ফেলে রেখে গেছে কে। এই উলঙ্গ কদর্যতার মাঝে উলঙ্গ শিশুরা খেলছে। মারামারি ঝটাপটি করে গড়িয়ে পড়ছে পথের ওপর। ছাই কাদা মেখে হাসছে খিল খিল করে। হাত থেকে ফকে পড়ে যাওয়া রুটির টুকরােটা কুড়িয়ে নিয়ে অম্লানবদনে মুখে দিচ্ছে। এই ছাই কাদার কীভৎসতায় এদের দৈনিক খেলাঘরের পর্ণ৷ এই শিশু ভােলানাথদের। এই আবর্জনার মাঝে যাদের বাঁচতে হয় তাদের অবসর নেই আবর্জনাকে ভিজিয়ে কিছু দেখবার। যারা আছে আবর্জনার পারে তাদেরও প্রবৃত্তি নেই আবর্জনার মাঝে যারা বাঁচে তাদের খোঁজ নেবার। তাই পাঁচীল তােলা রায় বাহাদুরের বাগানবাড়ির মধ্যে আর এক জগতের মেলা বসে। চায়ের টেবিলে বিভিন্ন সুখাদ্য আর পানীয় ঝকঝকে পেয়ালা চে সাজানো। কয়েকজন মানুষ যেমন রুণু সেন, ডাঃ অশােক মিত্ত, নিখিল মাম, ডলি চৌধুরী এবং আরও অন কয়েক তরুণ তরুণীর দল—যারা তা নির্দিষ্ট ভঙ্গীতে চলে, বলে, খায় এবং তাকায় এবং সময়ে সময়ে সাজানাে খাবার নিয়ে টেবিলের ধারে সাজিয়ে বসে। কথা ও হাসির যখন তুফান ওঠে তখন আতিশয্যের ভারে নরম কোচের গর্ভে ঈষৎ গনি এবং খাবারের টুকরাে প্লেট থেকে কাটা চামচের ডগা দিয়ে ভিয়ে নিয়ে মুখে পােরে। মারামারি নেই, ঝটাপটি নেই, তবে কথার স্যাচে আর দৃষ্টির নানারকম তির্যকতায় একটা অপরূপ রণক্ষেত্র গড়ে ওঠে ওদের মাঝে। ডলির প্লেটে একটা মাছি বসাতে নিখিল এই জাতীয় এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে হাঁ-হাঁ করে চেঁচিয়ে ওঠে—মাছি বসেছে তােমার গেটেনা না তুমি ওটা খেয়াে না ডলি...। ডলি চিন্তিত হয়। বলে তাইত ! মাছিটা ওদের বিব্রত করে ক্ষণিকের জন্যে। তারপরই আবার মানুষ মাছিদের রসচক্র জমে উঠতে থাকে। এই মাছিদের মধ্যে বিশেষ করে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বিলেত ফেরত এ অশােক মিত্র, কঁাচা ব্যারিষ্টার নিখিল রায় আর বালীগঞ্জের নতুন প্রজাপতি রুণু সেন। রায় বাহাদুরের মেয়ে ডলি কেবলই যেন অতিথিদের সৌজন্যে বিগলিত হতে থাকে। আর রায় বাহাদুরের স্ত্রী হেমনলিনী চায়ের টেবিলের একধারে বসে যুগপৎ চা ও চা- পায়ীদের তারিফ করতে থাকেন। দেয়াল ঘড়িটায় চারটে বাজার সঙ্গীত শেষ.. হবার সঙ্গে সঙ্গেই অশােক টেনিস ব্যাকেটটা হাতে নিয়ে উঠে দাড়ায়। বলে, চলল এইবার..আর নয়। উঠে পড়ে সকলে। পিছল ডাইনিং রুমকে অতিক্রম করে, একটা ড্রাইভ ঘুরে ওরা মখমলের মত নরম সবুজ লনের মধ্যে এসে নামে। সব তৈরী। ভবল সেটে খেলা শুরু হয়। অশােক-ডলি আর নিখিল আর সকলে আশপাশে বেঞ্চীতে বসে দেখবার অতে। ছােকরা চাকরে -~- জোগায়। আর দর্শকদের জোগায় চায়ের পেয়ালা। দর্শকেরা চায়ের পেয়ালার ধোঁয়ার মতই পাতলাভাবে উপভােগ করে খেলাটা। ওপারের পৃথিবীর খবর উড়ো হাওয়ায় ভেসে আসে। ওদিকে রাস্তার কোণে নাচের আসর বসেছে। একটি তরুণী—পরণে ঘাঘরা, গায়ে কাঁচুলি, মসলিনের বাঁকা ঘােমটা-বাজনার ধূয়ো ধরে গানের কলি গায় আর নাচে। সঙ্গের লােকটি গলায় ঝােলানাে ভাঙ্গা হারমােনিয়ামের ওপর আঙ্গুল চালায় আর মাথা নাড়ে। ওদের ঘিরে বেশ লােক জমে ওঠে। ছােটয় বড়ােয় মেয়ে পুরুষে মিলে বেশ একটি ছােট খাট ভিড়। বড় বড় চোখ দিয়ে উপভােগ করে ওরা। ঘুমুরের আওয়াজ আর গানের কলি হাওয়ায় ভেসে চলে উহু সখি কোথায় যাবাে কোথা গেলে তারে পাবাে প্রাণের পাখী খাচা ছেড়ে পালিয়ে গেল উড়ে গেল...... আর এল না ! এদিকে খেলা বেশ জমে উঠেছে। র্যাকেটের ডগায় ডগায় ঘা খেয়ে খেয়ে উন্মত্তের মত বলটা ছুটেছে এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত। আর যারা খেলছে আর দেখছে তাদের জীবন যৌবনের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত কিসের শিখা যেন জ্বলে উঠেছে উন্মত্তের মত। নাচটাও জমে উঠেছে বেশ। গানের কলির সুরের কাপনের মত নাচওয়ালী তরুণীর দেহটা দুলে দুলে উঠছে আর যারা দেখছে তাদের চোখে চোখে দুলছে পিপাসু মনের উন্মাদনা। হঠাৎ পথের মাঝে হৈ চৈ ওঠায় তাল কেটে যায়। একটা মােটরের হর্ণ আর, তার পরেই বিকট এক সােরগােল। কে যেন চাপা পড়লাে ঐ নাচের ভীড়ের মধ্যে। ৪

চাপা দিয়ে গাড়ীটা উধ্বশ্বাসে পালায় সচকিত ও বিভ্রান্ত জনতাকে ভেদ
করে। লােকগুলাে এলােমেলােভাবে চেঁচায় !
“ধর ধর•••চাপা দিয়ে পালাচ্ছে..”
“মােটরের নম্বর নে...”
“পুলিশ..পুলিশ:••এ পালিয়ে গেল...”
“না পালিয়ে করবে কি ? প্রাণে মরবে...”
“মা শালা ড্রাইভারকে...ধর...”
কিন্তু কার্যগতিকে দেখা যায় গাড়ীখানা পালিয়েছে। অগত্যা, যে চাপা
পড়লে তাকে নিয়ে পড়ে সকলে।
একটি ছেলে। পথের ধারে গড়িয়ে পড়েছে চোট লেগে। সবার ওপরে
যারা বঁাচে তাদের পায়ের চাপে পিষে গেছে নীচের স্তরের মানুষ। অসম্ভব,
কিছু নয় ! তবু রক্ত দেখে এগিয়ে আসে সকলে। চিনতে পায় যায়
ছেলেটাকে। তেরাে নম্বর বস্তির ভূতত পণ্ডিতের বাড়ীর ছেলে মিন্ট।
চোট্টা লেগেছে বেশ। এখানে ওখানে কেটে রক্ত ঝরছে।
পাটাই বেশী ।
কে যেন অভ্যস্তের মত বলে, হাসপাতালে দাও না পাঠিয়ে !
—গরীবের আবার হাসপাতাল ! কে যেন ব্যঙ্গ করে ওঠে।
ব্যাপারটা দেখবার জন্যে টেনিসলন থেকে রামু চাকরটা বেরিয়ে এলছি
সে বলে ডাক্তার ত ওখানেই আছেন...দরকার হলে—
-তাই নাকি ? চল চল দেখিগে। কয়েকজন এগিয়ে যায় ।
খেলাটাও হঠাৎ থেমে গেছে গােলমাল শুনে। উৎকর্ণ হয়ে উঠেছে
সকলে। নিস্তরঙ্গ জলে এতটুকু একটা ঢিল পড়লেও চট করে ঢেউ ওঠে
গােল গােল হয়ে, আবার মিলিয়ে যায় এক নিমিষেই।
লােক দেখে নিখিল র্যাকেট দুলিয়ে এগিয়ে আসে।
৫

ওরা বলে, এখানে ডাক্তার আছেন ? শুনলুম যে-
-ডাক্তার ? কেন হে?
-একটা ছেলে মােটর চাপা পড়েছে।
অশােক ডলি রুণু ইত্যাদি আর সকলেও এগিয়ে আসে।
নিখিল বলে, চাপা গেছে ? Sorry, মারা যায়নি ত ?
আজ্ঞে না, তবে
তবে ঠিক আছে ! চাপা অমন পড়েই থাকে ।
এগিয়ে আসে অশােক। ডাক্তার সে, তাই স্বভাবতই প্রশ্ন করে বসে,
কোথায় লেগেছে ?
-আঁজ্ঞে পায়ে বড় রক্ত পড়ছে।
নিখিল কথাটা যেন লুফে নেয়। র্যাকেটটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলে, হ্যা
পড়বেই ত, রক্ত থাকলেই পড়ে! আচ্ছা thanks for the news•••ও কিছু
common accident.••এসাে হে ডাক্তার খেলা যাক— নিখিল অশােকের
হাত ধরে টানে।
এসব ব্যাপার যাদের চোখে নেহাৎ খেলা ছাড়া আর কিছু নয় তাদের
কাছে এ ব্যবহার অপ্রত্যাশিত নয় । তবু ডাক্তার ডাকটা শুনে ওরা অশােকের
দিকে উৎসুকভাবে তাকায় এবং পিছিয়ে যেতে থাকে।
কে যেন একটু বাঁকা স্বরে বলে, এরাই আবার ডাক্তার !
নিস্তরঙ্গ জলে এতটুকু একটা ঢিলে চট করে ঢেউ ওঠে আবার! অশােক
একবার যেন ফিরে দাড়ায় ওদের দিকে। কিন্তু নিখিল ওর হাত ধরে টান
দেয় আবার। বলে, আরে চলল চলাে•••যত সব nuisance •••
ওদিকে ঘটনাস্থলে কয়েকজন মিলে আহত ছেলেটিকে একটি রিক্সায়
তােল। তারপর নিয়ে চলে বন্তির দিকে। রিক্সা চলতে থাকে ঠুং ঠুং
ঘণ্টা বাজিয়ে।•••

আর এদিকে টেনিসলনে চায়ের পেয়ালায় চামচের আঘাতে জলতরঙ্গ বাজতে থাকে সমান তালেটুং ঠুং ঠুং ঠুং••• খেলা সুরু হয় আবার নতুন করে। কিন্তু জমে না। অশােক কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। বল মিস্ করে দুবার। ডলি বলে, হােল কি তােমার? বার বার বল মিস্ করছে! অশােক বলে, হ্যা, লােকটা মন খারাপ করে দিয়ে গেল। ভাল লাগছে খেলতে। ডলি বলে, তুমি ভারী sensitive। অশােক বলে, yes, it happens 40. তারপর বলতে বলতে এগিয়ে আসে কোর্ট ছেড়ে। তারপর স্পাের্টিং কোটটা কাধে ফেলে এগিয়ে যায়। নিখিল ও পাশ থেকে চেঁচায়, কি ডাক্তার, চললে না কি -হ্যা। অশােকের গলার স্বর কেমন যেন নিষ্প্রভ। ডলি এগিয়ে এসে প্রশ্ন করে, রাত্রে এখানে খাবে ত ? মনে আছে? কথা বলবার ইচ্ছে পর্যন্ত নেই অশােকের। তাই ঘাড় নাড়িয়ে বলে, হা। তারপর সােজা গিয়ে স্টার্ট দেয় তার দাড়ানাে গাড়ীটায়। চাকরটাকে শুধায়, হারে ছেলেটাকে কোন দিকে নিয়ে গেল দেখেছি? অশােকের দিক ভুল হয়ে যাচ্ছে যেন! চাকরটা বলে, আজ্ঞে হ্যা,•••ওই আমাদের তেরাে নম্বর বস্তির দিকে।••• ছােট্ট এতটুকু একটা ঢিলে যে ঢেউ উঠেছে, সে ঢেউ চক্রাকারে বাড়তে বাড়তে ওপারে গিয়ে ঠেকবেই। তা না হলে সে যেন থামবে না । অতবড় টেনিসলনটা মুছে গিয়ে একটিমাত্র মুখ ভেসে উঠছে অশােকের সামনে। যে মুখ দিয়ে এই কয়টা কথা বেরিয়ে এলাে, এরাই নাকি ডাক্তার! সবুজ মখমলের মত - মাঠে কোথায় এক চোরা পাথরে হোঁচট খেয়ে মরছে সে। ৭ আসছে যেন। অশাে স্টিয়ারিংটায় চাপ দেয় তেরাে নম্বরের দিকে। বস্তির মুখে রিক্সা তখনও দাড়িয়ে। দুটি লােক মিন্ট কে নিয়ে তখন ধরাধরি করে ভিতরে নিয়ে চলেছে। দুপাশে এসে জড় হয়েছে দরিদ্র, কুরূপ ও অর্ধনগ্ন স্ত্রী-পুরুষ ও বালকবালিকার দল। সােরগেল তােলে ওরা চারদিক থেকে। অশােক একবার থমকে দাঁড়ায় তারপর গাড়ীর ভিতর থেকে First Aid Boxটা নিয়ে বস্তির ভিতর অগ্রসর হয় । আলােয় উজ্জ্বল সুউচ্চ পাহাড়ের শিখর থেকে সে যেন নেমে চলেছে গভীর কালে খাদের দিকে। একদিকে উন্মুক্ত নালা আর অপরদিকে ওন্টানাে ডাষ্টবিনের মাঝ দিয়ে সঙ্কীর্ণ পথ। অশােক সন্তর্পণে পা ফেলে এগােয়, নিশ্বাস তার বন্ধ হয়ে আশেপাশে খাপরার ঘরগুলো মাটির দিকে ঝুকে বুকে ঝুলে পড়েছে, মাটির মধ্যে তারা যেন মুখ লুকোতে চায়। আজন্ম ঐশ্বর্যের আওতায় মানুষ সে। তবু সদ্য সদ্য ডাক্তারী পাশ করে আরও উচ্চশিক্ষার জন্যে সে যখন বিলেত যায় তখন পিকাডেলীর উত্তপ্ত বিলাসের স্রোতের মধ্যে সে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্যে। তারপর সে খাপ খাইয়ে নিয়েছে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে অতি সহজে। কিন্তু, আজকের অবস্থা যেন আরও সঙ্গীন। যে ডলির রাজপ্রাসাদে তার নিত্য আনাগােনা—শুধু আনাগােনা নয়, তারই নিত্য নতুন কায়দায় অতবড় বাড়ীখানা যেন চমকে চমকে উঠেছে বােজই, সেই বাড়ীরই এত কাছে এমনি একটা জগত আছে, এত নীচে, এত অকিঞ্চিৎকর, অথচ এত ভয়ানক এত বিস্ময়...! তবু, পিছিয়ে গেলে চলবে না। বিদ্রুপের সেই চাবুকের তাড়না তার সর্বশরীরে যেন আলা ধরিয়ে দিয়েছে। অশােক ধীর পায়ে এগিয়ে যায়।

ch ওরা ধরাধরি করে মিণ্টকে নিয়ে নামায় একটা চালাঘরে। এদিকে রিক্সাওয়ালাটা চেঁচাচ্ছিল ভাড়া না পেয়ে। অশােক একটা টাকা রিক্সাওয়ালাটার দিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে এগিয়ে যায় চালাঘরটার দিকে। কোলাহল তখনও চলেছে। এমন সময়ে হঠাৎ চালাঘরের ভেতর থেকে এক তরুণী বেরিয়ে আসে উদ্বিগ্ন দৃষ্টি নিয়ে। বলে, এ কি ? কি হােল ? মিন্ট ...মিন্ট •••কে এমন করলে? ভীড়ের মধ্য থেকে কে যেন বলে, মােটর চাপা গেছে। কেউ আবার অতিবিজ্ঞের মত মন্তব্য করে, যেমন ছােট ছােট ছেলেদের রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া। প্রাণে যে মরে নি এই ঢের ! তরুণীটি বসে পড়ে মিন্টর পাশে। মুখ তার অব্যক্ত বেদনায় ভরে উঠেছে। মুখ তুলে তাকাতেই নজর পড়ে অশােকের দিকে। এই নােংরা বস্তির মধ্যে এই শ্রেণীর লােকের আবির্ভাব বােধ হয় এই প্রথম। মেয়েটি অবাক হয়ে বলে, আপনি আপনি। পরক্ষণেই হঠাৎ ও আন্দাজ করে নেয় ব্যাপারটা, তাই একটু রুক্ষ স্বরেই শেষ করে কথাটা ও, আপনার গাড়ীর ধাক্কাতে বােধ হয় এই ব্যাপার। অশোক বাধা দেয় না ওর মন্তব্যে। স্পষ্ট করে বােধ হয় শােনেই না ওর কথা। আপনার মনেই বলে চলে যে কথাগুলাে বলবার জন্যে ও তৈরী হয়ে এসেছিল। বলে, সরে যাও দেখি, একটু সরে তােমরা:••আমি দেখছি। একটু গরম জল আনাে ত’ কেউ। তারপর সেই মেয়েটির দিকে নিজের কোটটা খুলে বাড়িয়ে ধরে বলে, ধররা এটা। মেয়েটি অনায়াসে হাত বাড়িয়ে কোটটা ধরে । আশপাশের ভীড় করা স্ত্রীলােকেরা পরস্পরে কটাক্ষ করে, একটা ইঙ্গিত করে ব্যাপারটা নিয়ে। কোটটা ধরলেও মুখের বিদ্রুপ সে ছাড়েনি। তাই ও বলে, আপনারা গাড়ী চড়েন আর আমরা চাপা পড়ি এই বােধ নয় নিয়ম।

অশােক তবু সাড়া দেয় না। First Aid Boxটা খুলে ব্যাণ্ডেজ ও
যন্ত্রপাতি বের করতে থাকে।
যন্ত্র দেখে ভয় পায় মেয়েটি। বলে, কি করবেন ?
—কিছু না। অশােক কিছুতেই যেন বেশী কথা বলবে না আজ।
তাড়াতাড়ি ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগাতেই সে ব্যস্ত।
ওষুধটা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিণ্ট, আর্তনাদ করে ওঠে।
মেয়েটির উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শােনা যায়, কি দিলেন ? ওর লাগলাে যে?
অমন একটু লাগেই। অশােকের কণ্ঠে এতটুকু আন্তরিকতা নেই।
মেয়েটি উত্তেজিত হয়ে ওঠে। বলে, লাগলে আপনাদের কিছু হয় না:••
কিন্তু আমাদের লাগে বেশী।•••কে ডেকেছে আপনাকে? আমরা ত কেউ
ডাকি নি ?
এলােমেলাে ভাবে বলে ওঠে ও। কি করে যে ওর বিরক্তি প্রকাশ করবে
ও ঠিক বুঝতে পারে না যেন।
না ডাকলেও আমাদের আসতে হয় অনেক সময়ে। একই ভাবে জবাব
দেয় অশােক।
নিশ্চয়ই! দয়া করে উপকার করতে এসেছেন আপনারা ভাললােক
গাড়ী চাপা দিয়েছেন এই খুব, আর কিছু দরকার নেই...মিণ্ট, নিজের থেকেই
ভালাে হয়ে যাবে। কথাগুলাে শোনাতে পেয়ে একটা পরম তৃপ্তির ছাপ ফুটে
A
ওঠে পর মুখে।
অশােক ওর মুখের দিকে তাকায়। এতক্ষণে ওর কথা সত্যি সত্যিই
শুনতে পেয়েছে সে। আঃ কেন গােলমাল করছে...আমার গাড়ী নয়
বলছি !
নয়? তবে?
-দেখতে এসেছি ওকে। আমি ডাক্তার।

অশােক ব্যাণ্ডেজ বাঁধতে থাকে। —ডাক্তার! মেয়েটি বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যায় একেবারে । এমন সময়ে খক্‌ খক্ করে কাশতে কাশতে বেরিয়ে আসে বৃদ্ধ ভূতনাথ পণ্ডিত। ডাক্তার কথাটা তার কানে গিয়েছিল। তাই সে সােজাসুজি বলতে থাকে, ডাক্তার! তা বেশ বাবা:••এ ভালই হােল! আচ্ছা ডাক্তার সায়েব, আমার নাড়িটে একবার দেখােত বাবা- বলতে বলতে ভূতনাথ তার শীর্ণ হাতখানা বাড়িয়ে ধরে। অশােক ওর মুখের দিকে তাকায়। বহু দুর্যোগে ভরা কোন অতীতের আকাশের মুখ দেখছে যেন সে। ভূতনাথ আবার বলতে থাকে দম্ নিয়ে, হ্যা বাবা আমাকে কি আর চিনতে পারবে? আমি সেই পুরনাে ভূতনাথ। সবাই বলে ভূতত পণ্ডিত। হেঁ হেঁ, গাঁয়ের পাঠশালার আমি হেড পণ্ডিত ছিলাম কি না। ওই ত’ অনুই বলুক না। বৃদ্ধ ঐ মেয়েটির দিকে ইঙ্গিত করে। সেই অতীত দিনের স্মৃতির আলাে পড়ে বৃদ্ধের চোখ দুটো যেন জ্বলছে। অশােক কিছু বলবার আগেই অনু বলে ওঠে, আঃ বাবা, কেন তুমি আবার চেঁচামিচি করছে। কতবার বলেছি তুমি যখন তখন বাইরে এসাে না ! অনুর বিকৃতি কণ্ঠস্বরে অশােক যেন চমকে ওঠে কেমন যেন বিব্রত হয়ে তাকায় ওদের দিকে। মিন্ট, এদিকে বেশ একটু সুস্থ বােধ করছে। খুব বেশী যে তার লেগেছিল তা নয়। তবে অজ্ঞানের মত হয়ে গিয়ে ছিল ধাক্কা লেগে, আর আঘাতটা লেগেছিল পায়ে। এদিক ওদিক তাকাতেই মিণ্টর নজর পড়ে অনুর হাতে অশােকের কোটটার দিকে। কোটের পকেটে দামী ফাউনটেন পেন আঁটা। বস্তির অল্প আলাের মধ্যেও চক্ চক্ করছে। মিন্টর চোখদুটো চক্‌চক্‌ করে ওঠে। বস্তির ছেলে সে। নিম্নস্তরের d জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা তার এই বয়সেই। এও সে শিখেছে বাঁচতে গেলে তাকে এমনি ধরণেরই হতে হবে। উপায় নেই, নগ্ন দারিদ্র মানুষের মনের সব হীনতাকে নগ্নরূপে মেলে ধরেছে চোখের সামনে। সেই হীনতার প্রলােভন বড় ভয়ানক । আঘাতের ব্যথা ভুলে যাচ্ছে মিণ্ট। চোখের সামনে শুধু ফাউনটেন পেনটা। সকলেই এখন অন্যমনস্ক। মিন্ট, সে সুযােগ হারাতে চায় না। চোখের পলকে কোটের পকেট থেকে সরিয়ে ফেলে কলমটা ! কোন অতলের মাছ এক নিমিষে ওপরে ভেসে ওঠে, তারপর একটুখানি হাওয়া যেন চুরি করে টেনে নেয় ওপরের স্তর থেকে, এবং পর মুহূর্তেই তলিয়ে যায় টুপ করে । জলের নীচে যেটুকু নিশ্বাস নেওয়া যায় তাতে প্রাণ বাঁচে না। তাই মাঝে মাঝে উপরের স্তরে আসতে হয় বৈকি! এদিকে ভূতনাথ থামে নি তখনও। আপন ঝোকে বলে চলেছে, ও, বাইরে আসবাে না কেন আসবাে না শুনি! ডাক্তার কি তাের মিন্টর একার? দেখাে ত’ বাবা, আমি গাঁয়ের হেড পণ্ডিত...আমার কোনো দোষ ছিল না বাবা..বুড়াে বয়সে••এই দ্যাখাে বুকে কেমন যেন হাঁপ লাগে: •• অনু আবার বাধা দিয়ে ওঠে। বলে, কেন তুমি বাজে বকছাে বাবা ! অশােক বলে, আচ্ছা দেখছি আপনাকে—একটু সবুর করুন। অদূরে কয়েকজন কৌতূহলী স্ত্রীলােক সমস্ত ব্যাপারটা সকৌতুকে উপভােগ করছিল। ওদের মধ্যে একজন ফিসফিস্ করে বলে, ছুড়ির আক্কেলটা দেখছাে গা! বুড়াে বাপের রােগ হয়েছে, আমল দেয় না। আর ইদিকে কোন ইত্তিজাতের ছেলে কুড়িয়ে এনেছে, তাকে নিয়ে কি আদিখ্যেতা। আর একজন চাপাকণ্ঠে জবাব দেয়, গা জ্বলে যায় । এদিকে অশােক ভূতনাথকে পরীক্ষা করতে থাকে। ভালাে করে দেখতে ১২ সময় লাগে অনেক। দেখা শেষ করে বলে, অমুখ আপনার ভাল নয়। কিছুদিন ভােগাবে ! ভূতনাথের যেন কান্না পায়। ক্ষীণকণ্ঠে বলে, বাবা ভুগলুম ত’ কম নয়। আরও ভুগবাে? সারবে ত’ ডাক্তার বাবু? ওর ভিজে চোখে জীবনের আগ্রহ যেন জ্বল জ্বল করে ওঠে। অশােক চিন্তিতস্বরে বলে, বােগ কি আর সারে না, তবে চেষ্টা করতে হবে।•••তারপর অনুর দিকে ফিরে বলে, হাত পােব একটু সাবান দাও। অনুর বৌদি তারিণী এতক্ষণ আড়ালে দাড়িয়ে সব শুনছিল। সাবানের কথা শুনে ছিটকে বেরিয়ে আসে। ওদের শুনিয়ে শুনিয়ে আর একজন স্ত্রীলােককে বলে ওঠে, শুনলে দিদি ! আবার সাবান ! পেটে ভাত জোটে না, বলে সাবান ! কোন বেজাতের ছেলে কুড়িয়ে এনে আমার সােয়ামীর ঘাড়ে চেপেছে। ভাত দিচ্ছি, কাপড় দিচ্ছি, মাথা ছাপিয়ে উঠলাে খরচ! কেন, অতবড় ধাড়ী মাগী রােজগার করে পেট চালাতে পারে না? ব্যাপারটা কদর্য হয়ে উঠছে দেখে ভূতনাথ একটু যেন ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ভদ্র অভদ্র বােধটা এখনও আছে। গলা বাড়িয়ে বলে, আঃ, বৌমা! তুমি চুপ কর। পেটের কথা সব মুখে আনতে নেই, চুপ কর তুমি ! অনু যেন বিস্ময়ে লজ্জায় একেবারে আড়ষ্ট হয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য। তারপর ধীরে ধীরে ঘটির জল অশােকের হাতে ঢেলে দেয়। তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে ফেলে অশােক। যত শীগগির ব্যাপারটা চুকিয়ে দিতে পারা যায় ততই ভাল। ধােয়া মােছা শেষ করে অনুর হাত থেকে কোটটা নিয়ে গায়ে পরতে পরতে ভূতনাথকে বলে, আপনার জন্যে একটা ওষুধ লিখে দিয়ে যাচ্ছি। বলার সঙ্গে সঙ্গে অশােক পকেটের মধ্যে হাত ঢঢাকায় কলমটার জন্য। কিন্তু কলমটা নেই সেখানে! এক মুহূর্তের জন্যে অশােক বিচলিত হয়ে পড়ে।

কিন্তু পরক্ষণেই বলে, আচ্ছা আপনার ওষুধটা পরে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু একটা কথা, মিন্ট কে এখনই একবার হাসপাতালে পাঠানাে দরকার। অনু যেন চমকে ওঠে। বলে, হাসপাতালে কেন? -পায়ের চিকিৎসা হওয়া চাই। ঘাটা বিষিয়ে যেতে পারে। অশােক চটপট জবাব দেয়। ওর স্বরের মধ্যে যথেষ্ট উদ্বেগ ধ্বনিত হয়ে ওঠে। —কিন্তু আমরা যে কিছুই চিনি না। -চেনো না কি ? এই ত’ কাছেই হাসপাতাল। কিছু অসুবিধে হবে না। সােজা মিণ্ট কে নিয়ে ঢুকবে, সেখানে তারা সব ব্যবস্থা করে দেবে। এখনই নিয়ে যাও। বলতে বলতে অশােক নিজেই এগিয়ে যায় তার চামড়ার ব্যাগটা হাতে নিয়ে। বেশীক্ষণ ওখানে থাকলে হাওয়াটা বিষিয়ে যেতে পারে। আবহাওয়ার কতটা এতই ক্লেদময়। এগিয়ে যেতে যেতে অশােকের কানে আসে-ঢের ঢের বেহায়া দেখেছি, ঘুড়িটা কিন্তু সবাইকে ছাড়িয়ে উঠলাে•••মুখ ফিরিয়ে অশােক দেখলাে- তারিণী। তারিণী তখনও অনুর উদ্দেশ্যে বলে চলে, তুই না হয় লজ্জা সরমের মাথা খেয়েছিল, তাই বলে এটাও ত’ ভদ্দর লােকের ঘর? ওপাশ থেকে আর একজন স্ত্রীলােক যােগ দেয়। বলে, ডাক্তারকে নিয়ে কি কাণ্ডটাই দেখলুম দেখলুম দিদি ! ছেলে চাপা দিয়ে দেখছি শাপে বর হল। ধীর অথচ কঠিন ভাবে এগিয়ে আসে অনু। তার স্বর অসম্ভব রকমের জোরালাে। বলে, তােমরা চুপ কর, এটা নােংরা কথার জায়গা নয় ! একটু সময় নেয় তারিণী। তারপরেই মুখ ঝামটা দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, চুপ করবে কেন লা? আমার সােয়ামীর পয়সায় তাের এত বড়মানষী ফলানাে ! ডাক্তার ডাকলি ওষুধপত্তর জোটাবি কোখেকে ? তােমার একথার জবাব আমি দিতে চাইনে বৌদি । । । ১৪ ভূতনাথ এগিয়ে আসে ঝগড়া মেটাতে। অনুর দিকে তাকিয়ে বলে, ওইজন্যেই তােকে বলি, ছেলেটাকে আর কোথাও দিয়ে আয়.•• ওকে নিয়েই যত ঝগড়া: -সে আমি বুঝবাে বাবা। পাঁচজনের গায়ে পড়া উপদেশ আমি চাইনে। •• আমার অনেক কাজ•• | কথাটা ভাল করে শেষ না করেই অনু ঘরের দিকে এগিয়ে গেল । কথার শেষ দিকটায় মনে হল তার গলার স্বরটা বােধ হয় কঁপছে। এ কাপা শুধু দুর্বলতার জন্যে নয়। এক এক সময়ে এমন হয় গলাটা একই সঙ্গে দৃঢ়তা ও দুর্বলতার জন্য কাপে। এ কঁপা সেইজন্যেই। যারা ঝগড়া করবার সমস্ত আয়ােজন সম্পূর্ণ করে এনেছিল তারা ঐ স্ত্রীলােকের দল এই হঠাৎ পরিণতি দেখে বলে, চল ভাই চল! বিষ নেই, কুলােপানা চক্কর! বলতে বলতে ওরা বস্তির আঁকাবাঁকা পথে অদৃশ্য হয়ে যায়। অশােক এগিয়ে যায় আরও। রাস্তার ধারে তার গাড়ী অপেক্ষা করছে। কোনমতে বস্তির গলিটা পার হতে পারলেই হল। কিন্তু রাস্তায় পৌছবার আগে কলতলায় কয়েকজন স্ত্রীপুরুষের কলরব শুনে সে আর একবার থমকে দাড়ায়। একজন স্ত্রীলােক অপর একজন স্ত্রীলােককে বলছে, ভারী চ্যাটাং চ্যাটাং কথা! অত গরম কেন লা? কল কি তাের একার ? অপরটি জবাব দেয়, আমার একার কেন হবে গাে? তােমার সােয়ামীর পয়সার কল, তােমারই একচেটে। তৃতীয় স্ত্রীলোেক বলে, তুই কেন থাম না বাছা ! ওই যাঃ আমার ভাত বুঝি পুড়ে গেল মা। একই সঙ্গে দুটি অসঙ্গত কথা একই ভাবে আশ্চর্যরকম বলতে পারে ওরা !••• প্রথম স্ত্রীলোেকটি বলে, অমন যদি করিস, হাটে হাড়ি ভাের ভাঙ্গবাে আমি। দ্বিতীয় স্ত্রীলােকটি আগুণ হয়ে বলে, ক্ষুদি মাসী, সাবধান বলে রাখছি কিন্তু স্ত্রীলােকেরা পরস্পর মারমুখী হয়ে ওঠে। জীবনে যাদের উত্তাপ নেই তাদের এই নিত্য গরম হয়ে ওঠা। অশােকের দৃষ্টির মত পা দুটোও যেন স্থির হয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেছে । পাহাড়ের উচু মাথা থেকে সে দেখেছে নীচেকার সমতল জমিকে অনেকবার। কিন্তু সে দেখায় কোন বিশেষত্ব নেই। শুধু শ্যামল সবুজ বিস্তার সে শ্যামলিমা বড় সুন্দর। কিন্তু আজ সে সমতলে নেমে দেখছে শ্যামল সবুজ মাটির বুকে মাঝে মাঝে গভীর পাক। সে পাকের দুর্গন্ধ অত উচু পাহাড় থেকে কোনদিন পাওয়া যায় না । সকলের চেয়ে বিস্ময়ের কথা যারা এখানকার নােংরার কাছাকাছি থাকে, জঞ্জালের মধ্যে যাদের জীবনযাত্রা, নালানর্দমার দিকে মুখ রেখে যারা পড়ে থাকে তারা আর ওরা—ঐ পাহাড়ের উচু দেশের লােকেরা—এই দুই জগতের লােকেরাই মানুষ! শশধর চৌধুরীর প্রাসাদ থেকে শশধর চৌধুরীর বস্তিতে নেমে এসে অশােক আজ নতুন করে জীবনকে চিনেছে। জড়িত পায়ে এগিয়ে যায় ও রাস্তার দিকে। হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে একখানা পা খানায় পড়ে যায়। এবং সঙ্গে সঙ্গে তার প্যান্টে ও জুয়ে নােংরা মাখামাখি হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি সামলে নেয় অশােক। কিন্তু তার আগেই একজন তােক সকৌতুকে বলে ওঠে, আঃ হা হা! একেবারে কাদা মাখামাখি ! সামলে না চললে এখানে পা ত পিছলােবেই! বন্তি যে ! অপর একটি লােক যােগ দেয়, যা বলেছে, বড়লােকের পা কথায় কথা পিছলােয় । ১৬ ছােট পুকুরে আবার ঢিল পড়ছে। তাড়াতাড়ি পা ফেলে অশােক এগিয়ে যায় গাড়ীর দিকে। মিন্টকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য অনু তার ফল। শাড়ীখানা বার করেছে। হা, শাড়ীখানা কথাটা ভুল নয়। শাড়ী তার একখানাই। একমাত্র সন্তানের মত বহু যত্নে ও বহুদিন ধরে অনু ওখানি গুছিয়ে রেখেছে। প্রয়ােজন অল্পই আসে কিন্তু তবু জীবনের খাদ থেকে রাজপথের আলােয় কদাচিৎ যখন ভেসে ওঠবার প্রয়ােজন আসে তখন বের করতে হয় শাড়ীখানা। নিজের শাড়ীখানার সঙ্গে সঙ্গে মিন্টরও একখানা, জামা বের করতে হয়। অনেকদিন আগে ছােট ঘােট কয়েক টুকরাে কাপড় জোগাড় করে নিজের হাতে সে মিন্টর জন্যে একখানা জামা সেলাই করে রেখেছিল। সেটি বের করে মুখে হাসির রেখা টেনে এনে অনু বললে, দেখেছি কেমন নতুন জামা ? আয় পরিয়ে দিই তােকে। মিন্টর দিকে হাসিভরা মুখে চাইতে গিয়ে অনু দেখলে মিন্টর মুখ হাসিতে উপছে পড়ছে। সে হাসি জামার আনন্দে নয়। মিন্ট পরম আহলাদে বালিশের তলা থেকে কি যেন একটা বের করে বলে, এই দেখ দিদি। অনু যেন সাপ দেখেছে এমন চমকে উঠলাে। বললে, কোথায় পেলি এই কলম ? মিন্ট হেসে নিল খানিকটা। বললে, কেন, ওই ত ডাক্তারবাবুর পকেটে ছিল ! ছিঃ ছিঃ ছিঃ-অনুর কম্পিত আতর, যেন কেঁদে উঠলাে। তােৰ সােল ছিল মিন্ট। তুই একেৰারে, কেন চাপা গেলি না হতভাগা। মেয়ে কলের কাছে আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল।

শুধু স্বর নয় সমস্ত দেহটাই যেন অনুৰ কঁপছে। কম্পমান চোখের
পাতা দুটো ভিজে আসে কায়ায়।
চলে যাওয়া অশােকের গাড়ীর চাকার শব্দের শেষ রেশটুকু তখনও হাওয়ায়
কাপছে।
শুধু, জীবনের রাজপথে যে খাদ, সে খাদে অন্ধকার এতই ঘন হয়ে আসছে
যে, ওপরের আলাের স্পর্শ পেয়ে সে এতটুকু টললাে না।
কাপলাে না পর্যন্ত ।
রাত্তিরে অশােকের খাবার কথা ভলিদের বাড়ী। সেই যে খেলতে
খেলতে চলে এসেছে অশােক তখনও ফেরে নি। ভলি একটা ফোন করে
খৰ নেয় অশােকের বাড়ীতে, অশােকের দিদি শােভার কাছে। কিন্তু শােভা
খবর দেয় অশােক বাড়ীতে ফেরে নি তখনও পর্যন্ত। এলেই পাঠিয়ে দেবে।
পাশের ঘর থেকে হরিচরণ ডাক দেন শােভাকে। বলেন, কে ফোন
করছিল রে ?
হরিচরণ ওদের বাবা। মা মারা গেছেন অনেকদিন।
বিধবা হবার পর থেকে বাপের বাড়ীতেই ফিরে এসেছে। শােভা হরিচরণ
আর অশােক এই তিনটি নিয়েই সংসার।
শােভা জবাব দেয়, ডলি ফোন করছিল বাবা...
-কিছু বলছিল?
হ্যা, কি যেন একটা accident দেখে অশােক গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে
গেছে•••ওদের খেলা আজ মােটেই জমে নি-
Accident এর কথা শুনে হরিচরণ অনাবশ্যক ভাবেই যেন চমকে
ব্যস্ত হয়ে বলেন, অশােকের গাড়ীর কোন accident. নয়

না বাবা, ও-রাস্তায় কি যেন হয়েছিল ••• •••অশােককে ওমী
--ই, অশােক রাত্তিরে ওদের বাড়ী খাবে শুনেছিলুম, না?
হ্যা, ওখানেই থাবে ।
ওদের কথার মধ্যেই অশােকের গাড়ীর গুঞ্জন ধ্বনিত হয়ে ওঠে।
শােভা বলে, ঐ অশােক এল বােধ হয়। বলতে বলতে এগিয়ে যায়
বাইরের দিকে। অশােককে দেখে শােভা একচোট হেসে ওঠে গাময়
কাদা লেপ্টে আছে—অশােকের সে কি বিচিত্র মূর্তি! শােভা বলে, এ
কি রে? এত কাদা।•••এমন পদস্থলন কোথায় হল ।
-সে আর বােল না দিদি। অপরাধীর মত মাথা নীচু করে অশােক
বলতে থাকে। গিয়েছিলুম এক বস্তিতে
—বস্তিতে? কেন ? রুগী ছিল বুঝি ?
—না রুগী ঠিক নয়। বস্তির একটা ছেলে accidentএ পড়ে
—আহা"কত বড় ছেলে ? বেঁচে গেছে ত? এক নিমিষে শােভার
মুখের হাসি যায় মিলিয়ে ।
-হ্যা, বেঁচে গেছে। তবে পায়ে লেগেছে বেশ হাসপাতালে পাঠিয়েছি।
নেহাৎ অনাসক্ত স্বরেই অশােক বলে যায় কথাগুলাে ।
শােভা বলে, ডলি ফোন করছিল। তাকে এখনই ওদের বাড়ীতে যেতে
হবে... 1. তাের নাকি যাবার কথা এখুনিনে কাপড় চোপড় বদলে নে।
হরিচরণ এতক্ষণ কোন কথা বলেন নি। অশােক এগিয়ে যাচ্ছিল দেখে
বলেন, তােমাকে আবার কি সেই বস্তিতে যেতে হবে ?
-না, ওসব নােংরা লােকজনের ভেতর আর আমি যাচ্ছি নে। বি
সয়াগ। অশােকের মুখটা কুঁচকে বায় বিরক্তিতে।
শিবদলে গাড়ী নিয়ে বেরােতে দেরী হয় ল বেণ। সােজা ভলির
বাড়ীতে গিয়ে উঠলে এমন কিছু আর দেরী হয়ে যাবে না।

কি খানিকদূর এগিয়ে এসে কেমন অস্বস্তি বােধ করতে থাকে ও। একবার করে ঘড়ির দিকে তাকায় আর গাড়ীটা থামিয়ে কি যেন ভাবতে থাকে। এবং শেষ পর্যন্ত ডলিদের বাড়ীর রাস্তা থেকে গাড়ী ঘুরিয়ে সােজা চালিয়ে দেয় হাসপাতালের দিকে। ঘূর্ণি হাওয়ার বেগে বৃষ্টির ছাট একদিক থেকে বদলে যায় অন্যদিকে । হাসপাতালে পৌছে অশােক দেখে অনু মিন্টকে নিয়ে অপেক্ষা করছে। ব্যস্ত হয়ে অশােক বলে, এই যে কতক্ষণ? ঘণ্টা দুই হােল বই কি? শান্ত স্বরে বলে অনু চোখ নামিয়ে । -দু ঘণ্টা! সে কি ? অশােক চীৎকার করে ওঠে। —আমরা গরীব দুঘন্টা কেন, সমস্ত রাত বসে থাকতে হলেও নালিশ নেই। ভেতরে ঢুকতে দিয়েছে এই যথেষ্ট। অতি নীচু স্বরে কথাগুলাে বললে কি হবে, অশােকের মনে হয় তার ঐ উচস্বরকে সে যেন গ্রাস করে ফেলছে। অপ্রস্তুত হয়ে অশােক বলে, আচ্ছা দেখছি। বলেই বেরিয়ে যায় ওখান থেকে। তাড়াতাড়ি একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। ওখান থেকে সােজা emergency wardএ গিয়ে ঢুকে চেঁচামেচি শুরু করে দেয় অশােক। কেন patientকে ফেলে রাখা হয়েছে বাইরে? অচেনা লােকেদের অবস্থা ঐরকমই হয়ে থাকে হাসপাতালে বিশেষ করে স্তরের লােকেদের। তাই অশােকের বিরক্তি দেখে মেডিকেল ছাত্ররা একটু যেন শশব্যস্ত হয়ে ওঠে। বলে, আপনি পাঠিয়েছেন, আমরা জানতে পারি নি শুর:: জানাজানির প্রশ্ন নয়••যে কোন case যখনই : আৱক তোমাদের attend **| motaj Compound fracture et le sitatius Bar নেতােমাদের দায়িত্বজ্ঞান থাকা উচিত, হাসপাতাল প্রধানত গরীবের এ কথানে রাখা দরকার••• অশােক যেন আপনার ঝোঁকের মধ্যেই বলে চলেছে কথাগুলাে। ওর গলা শুনে আরও অনেকে বেরিয়ে আসে। দুজনে তাড়াতাড়ি গিয়ে Stretcherএ করে মিন্টকে নিয়ে আসে ভেতরে। পেছনে পেছনে আসে অনু । অশােক ওদের দিকে লক্ষ্যই করে না। যেমন বলে যাচ্ছিল তারই সঙ্গে জোর দিয়ে দিয়ে বলে, ওকে একটু carefully দেখাে তােমরা। বলতে বলতে ঘড়ির দিকে একবার তাকায়। তারপর যেমন ঝড়ের মতন এসেছিল তেমন ঝড়ের মত বেরিয়ে যায় হয় থেকে। ঘূর্ণি হাওয়ায় বৃষ্টির ছাট ক্ষণে ক্ষণে বদলায় । অশােক স্টার্ট দেয় গাড়ীতে। রায় বাহাদুরের বাড়ীর মজলিস জমে উঠেছে। অশােকের জন্যে , অপেক্ষা! নাচ, গান, হাসি, গল্প একই সঙ্গে চলেছে। আজ আসর বেশ পরিপূর্ণ। সকলেই এসে পড়েছে যথাসময়ে—নিখিল, রুণ, সুশােভন, মিলি চাটুজ্যে, অণিমা এবং আরও অনেকে। ড্রয়িং রুমে চারদিকে ছড়িয়ে আর বিছিয়ে বসেছে ওরা। ওরা যেন কোন মহাসমুদ্রের বিস্তৃত বালুতট তটভূমিকে ঘিরে ঢেউয়ের চঞ্চলতা। ঢেউ ওদের অঙ্গে অঙ্গে, হাসিতে হাসিতে, কঠে কঠে। বড়িতে টং টং করে ন'টা বাজার সঙ্গীত শােনা গেল। বহু দাম দিয়ে বহু কষ্টে সংগ্রহ করা এই ঘড়ি। অদ্ভুত এর ধ্বনি। যে সময় পার হয়ে চলে গেল সেটা খোঁচা দিয়ে না বেজে সঙ্গীতের মতই করে ছন্দে মর্মরিত হয়ে ওঠে। সককে জানাবার সঙ্গে সঙ্গে ভােলাবার এই অপূৰ কৌশল!

সুশােভন বলে, অশােকের আসতে দেরী হচ্ছে
নিখিল বলে, আরে দেরী না করলে importance বাড়ে না
-কি রকম? প্রশ্নটা তেলে মিলি চাটুজ্যে! প্রশ্নের চাপে ভুরু-দুটো
বেঁকে যায় জিজ্ঞাসার চিহ্নের মত।
খুব সােজা কথা। সিগারেটে একটা ring করতে করতে নিখিল জবাব
আমি কখনও দেরী করি না ( আড়চোখে একবার ভলির দিকে
তাকিয়ে শেষ করে) তাইতাে আমার আদর কম।
যাই বল, আমাকে কিন্তু যেতে হবে অনেক দূর। হাত ঘড়িটার দিকে
দুবার তাকিয়ে নিয়ে কোচের গর্ভ থেকে সুশােভন একটু সােজা হয়ে বসে।
-অসুবিধে কিছু নেই, আজকাল রাত্তিরে পথে আলাে জলেও কোণ
থেকে অণিমার কণ্ঠ শােনা মায় ।
कृषि যােব না পিমা। আলাে জ্বলে সুবিধে হয়েছে বটে, তবে
বিধেও হয়েছে অনেকের। নিখিল কথাটা যেন লুফে নিয়েই হেঁয়ালী
কী করবার চেষ্টা করে।
আবার কেন? আজকাল বন্ধুবান্ধবীরা একটু নিরিবিলি
গেলেই খুশী থাকে..মানে অনেকেরই প্রাণের কথা বলছি
সকলের মুখে মুখে টুকরাে হাসির গুঞ্জন শােনা যায়। চাদের আলােয়
ছড়ানাে চকমকি পাথরের টুকরাে যেন জ্বলছে।
খানিক পৰে ডলি গান জুড়ে দেয়। ডলি বরাবরই গায় ভাল। মিষ্টি
রিণরিণে গলা মীড়ে মীড়ে কঁপতে থাকে।
,
আর সকলের কলরব মিত
হয়ে আসে গান শােনবার জন্যে। ওদিকে রুপু গানের তালে
দেয় স্কুলের কোণে পাতা কাশ্মীরী গালিচাটার পর
কে যে সুরের ঝর্ণা পারে সেই জ দোলায়িত হয়ে এই

সেহলায়। রুনু আজ পরেছে একখানা দুধের মত শাদা মাইশাের সিকের শাড়ী। পাতলা নরম শাড়ীখানা তার শরীরের প্রতিটি দেহরেখাকে পরিস্ফুট করে তুলেছে। ঘষা কঁাচের শেভ লাগানাে আলােয় তার নৃত্যবিহ্বল দেহখানাকে দেখাচ্ছে চাঁদের আলােয় হাওয়ায় দোল-খাওয়া রজনীগন্ধার ভালটার মত। প্ন জমে আছে বেশ। ঠিক এমনি সময়েই রায় বাহাদুরের স্ত্রী হেমনলিনী একটি ছােট চার চাকার গাড়ীতে চড়ে আসরের মধ্যে এসে হাজির হলেন। হেমনলিনীর দুই পায়ে বাত। এবং যবে থেকে তার মনে হয়েছে তিনি বাতে পঙ্গু হয়ে এসেছেন তবে থেকেই এই চার চাকার গাড়ীর ব্যবস্থা। এসেই চীৎকার করে উঠলেন তিনি। -কই অশােক আসে নি এখনও ? নটা যে কখন বেজে গেল। পায়ের ব্যথা বেড়েছে আর এদিকে এত দেরী অশােকর ?আঃ রুণু নাচ এ বন্ধ কর না মা!•••আমার পায়ে এত লাগে ! নাচ একটু বন্ধ কর: কখন যে অর্ধেক আসবে। অগত্যা মাচ. থামাতে হয় রুণুকে। সকলের দিকে ও অর্থপূর্ণভাবে তাকায় একবার হেমনলিনীর কাণ্ড দেখে মুখ টিপে একটু হাসে। কি নাচটা এন হঠাৎ ভেঙ্গে যাওয়ায় সকলেই যেন একটু বিষ। যে অঞ্চ দেখ ভাল লাগে তার মাঝে হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গলে যে অবস্থা হয়, মনের সেই অম ওদের! বজনীগন্ধার ডাল থেকে হঠাৎ ফুলগুলাে যেন ঝরে গেল! বায় ব্যারিষ্টার নিখিল রায় আর কিছু না হােক খােচা দিয়ে কথা বলতে কি মিষ্টি করে। হঠাৎ ভাঙ্গা ফুমের পর জড়ানাে চোখে তাকানাের ভাবে হেমনলিনীর দিকে তাকিয়ে তাড়ি বলে, সামান্য খাজা st:

••এ কি অার অশােকের মনে থাকে। ওদিকে পৃথিবীসুদ্ধ রুগী তার জন্যে
হ করে রয়েছে।
হেমনলিনীর মনটা বিষিয়ে ছিল তাই খোঁচাটা বুঝতে দেরী হয় না।
চাকার স্পীংগুলাে একটু দুলিয়ে বলেন, তুমি ত সুবিধে পেলেই অশােককে
খোঁচা দাও বাবা!..উঃ পা দুখানা আবার ঝিনঝিনিয়ে উঠলাে ফল
বলতে মেহ ও বিরক্তির মিশ্রণ করে এক অপূর্ব দৃষ্টিতে তাকান নিজের পা
দুখানার দিকে।
নিখিল জবাব দেয় না। জবাব একেবারে দিত না কি না জানা যায় না,
কারণ, সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের মধ্যে এসে প্রবেশ করে অশােক। ঘড়ির দিকে
একবার নজর
নজর দেয় সকলে। ঘড়িতে নটা বেজে
বেজে তেরাে
মিনিট।
হেমনলিনী যেন চেয়ারের মধ্যেই নেচে ওঠেন তাঁর অতখানি শরীর
নিয়ে। বলেন, এই যে, এলে বাবা অশােক। এত দেরী••একেবারে যে
মিনিট যাবা বেঁচে আছি কিনা দেখাে আগে। বলতে বলতে
খখন অদ্ভুতরকম স্নান করবার চেষ্টা করেন তিনি।
অপার দেখে অশােক সকলের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে টিপে হাসে।
বলে, আজ আর রক্ষে নেই তােমার ।
গুলি বলে, তেরাে মিনিট দেরী. মায়ের কী না হতে পারতো এই তেরাে
মিনিটে! এত জোর দিয়ে বলে ও কথাগুলাে তাতে বেশ বােঝা যায় যে
তেরাে মিনিটে কিছুই হতে পারতো না আসলে।
হেমনলিনী বলেন, দ্যাখাে বাবা.. শিগগর দ্যাখাে পা দুখানা,
এখনও কি বাচবে কি না তাই, বলল।
এধন করে বলেন কথাগুলাে তাতে বােঝা যায় গলাটার ভিতে
আলােক এগিয়ে যায় ওর দিকে। ধীরে ধীরে তার শা

কয়ে। খাং পরীক্ষা করার ভান করে মাত্র। তারপর একটু নক গাভী টেনে এনে বলে, এ যে নতুন উপসর্গ দেখতে পাচ্ছি। সে কি বাবা। হেমনলিনী আর নাচেন না, একেবারে স্থির হয়ে যান। উলি ওধার থেকে বলে, তােমার এই তেরাে মিনিট দেরীর জন্যে আমরা সবাই তটস্থ। অশােক ভলির কথার কোন জবাব দেয় না, ও জানে ওটা বলার কথা নয়, নেহাৎ কথা বলা মাত্র। হেমনলিনীর দিকে চেয়ে হাসতে হাসতে বলে, উপসর্গটা, বেশ দেখা যাচ্ছে...লক্ষণ ভালাে নয়...অপনার এমন চমৎকার একটা অসুখ বড় তাড়াতাড়ি ভালাে হয়ে যাচ্ছে: আহা তাই বলল বাবা। মাথাটা দুদিকে দুবার দুলিয়ে হেমনলিনী উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন।-বাতের ব্যামো যে কী কঠিন। -হু, বেশ আছেন: খুব ভালাে আছেন আপনি, এত ভালাে থাৰ এ বাড়ীতে হয়ত আমার দৈনিক চাকরিটে থাকবে না: অশােক কথাটা শেষ করে গুলির দিকে তাকায়। জবাবও আসে। অন্যদিকে চেয়ে ডলি বলে, ভয়ের কথা সন্দেহ নেই অশােক কি যেন বলতে যাচ্ছিল কি রায় বাহাদুরের চটির আওয়াজে থেমে যায়, বলা আর হয় না। সুতরাং আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গেই দরজা কাছে এসে হাজির হন তিনি। এঁকে দেখেই হেমনলিনী বলে ওঠেন, ওগাে শুনছে, অশােক বলছে, আমি নাকি বেশ ভালাে আছি? -তুমি ভালাে থাকলেই আমরা বাধিত ! টেনে টেনে বলতে থাকেন রায়হাদুর। অশােকের দেরীর জন্যে তুমি ত প্রায় আমাদের রসাতলে পারবস্থা করছিলে! বাতের জন্ধুখের কত সুবিধে•••কত হবিধে

হেমনলিনী হঠাৎ আবার নেচে ওঠেন চেয়ারের মধ্যে। বলেন, ওরে
ওমা ৰুণু আমি আজ বেশ ভালাে আছি অশােক বলেছে...তৰ তাই,
নাচটুকু নেচে নে মা!
ওঁর কথায় এবার সকলেই উচ্চৈস্বরেই হেসে ওঠে।
রজনীগন্ধার ডালে আবার দোল জেগেছে।
রুণু সেনের পায়ে ঘুমুরের ছন্দময় ধ্বনি।
ঠুং-ঠুং ঠুং...!
রিক্সার ঘণ্টা বাজছে একঘেয়ে তালে। বন্তির এক নিস্তব্ধ গলি দিয়ে
রিক্সা করে ফিরছে রমানাথ। পুরাে এক বােতল ধেনাে মদ গিলে টঙ, হয়ে
বাড়ী ফিরছে। উজ বস্তি জীবনের উলঙ্গ অভিসার । রমানাথ গান
‘এত রঙ্গ শিখেছ কোথা মুণ্ডমালিনী
তাের) নৃত্য দেখে চিত কাপে চমকে ধরণী ।
তেরো নম্বর বস্তির রাস্তা ত’ নয় যেন রসাতলে যাবার রাস্তা। বোে
বোলা গান গাইতে গাইতে আর রিক্সাওয়ালার সঙ্গে ইয়ারকি দিতে দিতে
নাথ এগিয়ে চলে।
ওপাশে বিনােদিনীর ঘরে আড্ডা জমেছে। আলুথালু বেশে নাচ
ধেনাে মদের বােতল এদিক ওদিক গড়াচ্ছে কয়েকটা।
এটা বাইরে থেকে পর্যন্ত পাওয়া যায়।
কে যেন বলে, আয় পাগলি...আজ আর এক পা-ও এখান
নে বাবা।
বিনােদিনী খু চোখ নয়, সমস্ত দেহটাকে অদ্ভুতভাৰে ৰানি না

রাত্তিরে এখানে থাকলে লােকে বলবে কি? আমি বুঝি তােমায় খােবাে? -পাগল আর কি! তুই যে আমার মানিনী, মান, খােয়াবি কেন? আয়...আয় আজ দুজনে মথুরা থেকে বৃন্দাবন দেখে নেবাে..আর দেরী করিস নে, বুকের মধ্যে কেমন করে যে••• রিক্সা এগিয়ে চলে! --এই নােখাে নােখাে• হঠাৎ চীৎকার করে ওঠে রমানাথ। ব্যাটা, তুমি আমাকে অসৎ পথে নিয়ে যেতে চাও! জানিস ঘরে আমার ধর্মপত্নী এই যে...এইখানে। রিক্সাভাড়া মিটিয়ে দিয়ে খানিকটা এগিয়ে এসে রমানাথ ডাকে--কোথায় বাবা? বলি কই গাে•••তারিণীচরণ ?••• রমানাথের জড়িত কণ্ঠস্বর শুনে বেরিয়ে আসে তারিণী। ভাল করে লক্ষ্য করে দেখে রমানাথকে। এ তার বােজের অভ্যাস!: রােজের দৃষ্টি! গলার মধ্যে একটা কৃত্ৰিম কর্কশতা এনে বলে, পিণ্ডি গিলে আসা হয়েছে, বুঝি? -আরে ও কিছু না..পেট জ্বলছে...রায়া কতদূর? টলতে টলতে, রমানাথ দরজার খুটিটা খপ করে ধরে ফেলে। উৎকট একটা গন্ধ বেলােয় মুখ দিয়ে । রান্ন? রান্না কোখেকে হবে শুনি? মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠে তারিণী -শােন কথা। চাল আছে, ভাল আছে, উনুন আছে, তােমার এই হাতীর গতর আছে রান্না হবে না কেন? গলার মধ্যে বাজি দেখালেও রানাথ ছোপ-পড়া দাত বের করে হি হি করে হাসে। তা চোখের মাথা খাও! আমি কেন গতর খাটিয়ে রাখতে যাবে . তােমার বােন পারে না?

ছো, তাত বটেই:::নিশ্চয়। তাকে অনুকে একটু ধমকে দিই.••অনু
অনু কোথায় ? অনাবশ্যক রকমের চীৎকার করে ওঠে রমানাথ।
5
চুলােয়।
-চুলােয় ! তুমি জানলে কেমন করে? গিয়েছিলে সেখানে ?
আ মর! তারিণী মুখ বাঁকিয়ে হাসি আর বিরক্তির একটা মিশ্রিত
ইঙ্গিত দেয়।•••দেখণে কোন ডাক্তারের হাত ধরে গেছে হাসপাতালে।
হাসপাতালে ? কেন ?
-ছেলেটার পায়ে লেগেছে মোটরের খোঁচা ডাক্তারের সঙ্গে
গলাগলি তাই নিয়ে আমি ওদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবাে। সােমত্ত
বয়েস হয়েছে•••পেরাণে সখ আছে:: গা-গতর খাটিয়ে পয়সা আনে না কেন ?
ঘরভাড়া দেয় কে ? ভাত কাপড় জোগায় কে ?
-ই, কথাটা পঁড়ালাে•••রান্নাবান্ন হয়নি:••
রমানাথ আর দাড়ায় না। চুলােয় যাক সব ! এমন নেশাটা ছুটিয়ে
দেওয়া যায় না। পুরনাে গানের কলিটা আবার ধরে গলা ছেড়ে,-“তাের
নৃত্য দেখে চিত্ত কাপে চমকে ধরণী ! তনয়ে তারকা তারিণী। গাইতে
গাইতে এগিয়ে চলে রমানাথ গলি ধরে ।
তারিণী, বলে আ মর। বলেই
মুখ
একটু এগিয়ে আসতেই মুটুর সঙ্গে দেখা। রমানাথের নেশাটা চকরে ওঠে।
টু বলে, এসাে কাপ্তেন..আজ আর তােকে ছাড়ছি নে••আজ তুই
ইনে পেয়েছিল পাঁচ সিকে পয়সা দে
রমানাথ বলে, দোকান যে বন্ধ।
দে না তুই...একেবারে স্বদেশী খন্দর মার্কা এনে হাজির কৰে।
দোকান বন্ধ হলেও কি আর মাল কেনা আটকায় রে! মুরুব্বির মুক্তি বলে।
এগিয়ে যায় দুজনে।
টিপে হাসে।

= d.
,
ভূতনাথ চেঁচিয়ে চলেছে বস্তির ঘরের জানালায় বসে বসে। ছেলেমেয়েদে
যাকে দেখছে ডাকছে পড়বার জন্যে। চিরকাল পণ্ডিতি করে এসেছে
গ্রামের পাঠশালায়। আর আজ এই জঘন্য বস্তির মধ্যে বসে, বসে প্রাণ
হাঁপিয়ে ওঠে। পড়াতেই হবে, লেখাপড়া শেখাতেই হবে এই ছেলেমূেঙ্গে
গুলােকে। ভূতনাথ চেঁচায়, ওরে এই.••এই ছেলেটা...আয় হতভাগা
পড়া করবি আয়
ছেলেরা বক দেখিয়ে পালায়।
—আবাগের বেটা, আমায় ঠাট্টা! রাগে ঠক ঠক করে কাঁপতে থাকে
ভূতনাথ-ভূতত পণ্ডিত! আপন মনে চেঁচিয়ে চলে, আমি পুরণ পণ্ডিত...
চিরকাল গাঁয়ের পাঠশালায় পণ্ডিতি করে এলাম...আর আমায় কি না ঠা,
এ্যা!
ছেলেরা কখন পালা। কথার ফাকে একটি মেয়ে এসে পড়ে।
দেখে লাফিয়ে ওঠে ভূতনাথ, ওরে এই দুড়ি-
কেন? মেয়েটি চোখ কুঁচকে তাকায় ভূতনাথের দিকে।
আয় শিগগীর..পড়া করবি আয়।
-ই তােমার ভারি বি•ে••বিতের বেম্পতি
মেয়েটি আর পাড়ায় না। এগিয়ে চলে যায় নিজের কাজে।
+মবি ছােরা চিরকাল দুখু পেয়ে মরবি।.••একবার যদি ভালাে হয়ে
বতে পারি
রিকান ধরে সবাইকে লেখাপড়া শিখিয়ে ছাড়বাে। আমাকে
ষ্টা-তাের বাপকে...তাের চোদ্দ পুরুষকে শেখাতে পারি তা জানিস?•••

।
এতটুকু।
খক খক : ঝাঝিয়ে ওঠে, যা যা...যেখানে যাচ্ছিস যা...ওরে আমার
শক্ষিতা রে
অনু তবু কিছু বলে না, এগিয়ে যায়। কিন্তু কিছু শুনতে না পেলে
প্রাণ ছটফট করে তারিণীর। অগত্যা এক তরফাই বলে চলে ও,ডাক্তার
ডাক্তার...ডাক্তার বলি আনাগােনা ত’ করলি অনেকবার, সুবিধে কিছু
হল?•••
এই ইঙ্গিত অসহ। অনু ফিরে দাড়ায়। বড় ঝরণার মুখে
একটা পাথরের চাই। জলে ঘূর্ণি ওঠে।
অনু বলে, আমার মাথা হেঁট হলে তােমার কিছু সুবিধে হয় বৌদি?
-মাথা উচু আর রইলাে কোথায় তাের?
ডুবে ডুবে জল খেতে
সবাই পারে। কই সকলের সামনে দাড়িয়ে দিব্যি করে বল্ দিকি ?
অনু সাড়া দেয় না এ কথার। দৃষ্টিহীন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে |
তারিণীর মুখের দিকে।
রিণী বলে চলে, তার চেয়ে স্বীকার পেলেই
চেয়ে স্বীকার পেলেই হয়.. বড় লােকের
সুনজরে কেউ পড়ে, কেউ পড়ে না...! কারু যদি ভাল হয় আমার ত’
কই হিংসে হয় না! বেশ ত ভায়ের ভাত কাপড়ে রয়েছিস, ডাক্তারের
তপিল থেকে দু’পাঁচ টাকা সাহায্য ত করতে পারি? আমরা কি আর
তের পর!
ওদের কথা শুনতে আর দুটি স্ত্রীলােক কোথা থেকে এসে দাড়িয়ে
গিয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন বলে, এ ত’ ঠিক কথাই ভাই! তাের
ত পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা••
সমর্থন পেয়ে তারিণী একেবারে বিগলিত হয়ে ওঠে। হাত ঘুরিয়ে
বলে, বল ত দিদি, আমি বললেই যত দোষ ?
অপর শ্রীলােকটি বলে, তাইতাে বলি হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলছে নেই।

ওরা বেনােজল এক জায়গায় দাড়াবে না•••তুই তাের খাল বিল ভরে নে না কেন ? অসহ। অনুর মাথার মধ্যে রক্ত চনচন করে। বৃক্ত চনচন করে। বলে, মেয়েদের সম্মান মেয়েরাই খােয়ায়, কিন্তু সব মেয়ে সমান নয়। কথাটা শেষ করে আর এক মূহুত ও ঈড়ায় না ওখানে। বেরিয়ে চলে যায়। ছােট হলেও পাথর! জলের ঘূর্ণিবেগে দাড়ানাে যায় না। কথা জোগায় না আর ওদের তিনজনের মুখে। হাসপাতালে এসে অনু দেখলে মিন্টর সমস্ত ব্যাণ্ডেজ ব্যাণ্ডেজ খােলা। একরাশ খেলনা নিয়ে বিছানার ওপর বসে বসে মিন্ট নাসের সঙ্গে গল্প করছে। অনুকে দেখেই মিন্ট, চঞ্চল হয়ে উঠলাে। বললে, দিদি দিদি...এই দেখাে কি সুন্দর খেলনা:.. অনু একটু বিস্মিত হয়ে যায়। বিস্মিত হবারই কথা। বস্তির ছেলে মিন্ট। যে কোনদিন একটার বেশী দুটো জামা গায় দেয় নি একসঙ্গে, জীবনে এরকম চকচকে নতুন দামী খেলনা দেখেছে কি না সন্দেহ সেই মিন্টর কোলে এতগুলাে খেলনা:•••••সচকিত আগ্রহে প্রশ্ন করে অনু, কোথায় পেলি এসব ? মিন্ট, বলে ডাক্তার সাহেব—বলতে গিয়েই থেমে যায় দরজার দিকে চেয়ে। অনু ঘাড়টা কাৎ করে দৰজার দিকে চেয়ে দেখলে অনেক ঢুকছে। অঙ্গকে দেখে আশােক তাড়াতাড়ি মিন্টর বিছানার দিকে এগিয়ে এল। মুখখানা তার হাসিতে জলজল করছে। অশােক বললে, আর কি, মিন্ট ভালাে হয়ে গেছে...আজকেই ছাড়া পাবে...তােমরা নিয়ে যেময়।

অনুর মুখে হাসি নেই কিন্তু। অশােকের চোখের ওপর তার দৃঢ় দৃষ্টি তুলে বলে, নিয়ে যাবে, কিন্তু খেলনাগুলাে আপনি ফিরিয়ে নিন্•• —তার মানে? ভুরু দুটো কুঁচকে অশােক প্রশ্ন করে। প্রশ্ন করে অর্থাৎ প্রশ্ন দিয়ে এড়িয়ে যেতে চায় অনুর দৃষ্টিকে। আপনার এই বাজে খরচে হয়ত অনেকের প্রাণরক্ষা হত। মিন্ট, যেখানে থাকে সেখানে কেউ না খেয়ে মরে, কেউ বােগে ভুগে মরে— -ও, তােমার বাবার কথা ? তার খরচ আমি দেবাে । অপােকের স্বর গম্ভীর হলেও, সেখানে যথেষ্ট অস্বস্তি আছে। হয়ত আপনি দেবেন। শান্ত দৃষ্টিতে আর শান্ত স্বরে বলতে থাকে অনু, ••আপনার এই ছিটে ফোটা দয়া আপনার বিলাস। —তােমার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না। -গরীবের কথা আপনারা কোনদিন বুঝতে চান না। এতটুকুও দ্বিধা করে না অনু, ক্রমাগতই বলে চলে,আপনারা খেয়াল খুশীতে তাদের দুটাকা পাঁচ টাকা দেন আর তারা আপনাদের বাহবা দিয়ে বলে আপনারা কত মহৎ, কত দয়ালু। —দেখছি তুমি অনেক কথাই জাননা। কিন্তু নিজেদের অবস্থার প্রতিকার করতে নিজেরা জানাে না। জানি, মানুষকে খাওয়াতে পরাতে, জানি, বাঁচাতে জানি, মানুষের মত করে বাঁচবার শিক্ষাও দিতে জানি কিন্তু অধিকার যাদের হাতে.••তারা বড়লােক তারা ক্ষমতাবান•••তাদের হাত থেকে শুধু সেই ক্ষমতা কেড়ে নিতে জানি নে। নিজে যেন লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অশােক। অনু যদি কথাগুলাে উত্তেজিত হয়ে বলতাে তাহলে উত্তেজনার মুখে কিছু একটা বলা যেতে চড়া গলায়। কিন্তু আশ্চর্য, এমন শান্তভাবে এত চড়া পর্দার কথাগুলাে বলে ঐ মেয়েটা যে জবাব খুজে পাওয়া যায় না। এক মিমিট সময় নেয় অশােক। তারপর বলে, তাহলে শােননা, আমিও বলি ! এও তােমার ভুল ••আজ সব দেশে ক্ষমতাবানদের হাত থেকে গরীবরাই ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে...আমরা যদি নিতে পারি...সে দোষ আমাদেরই। —হ্যা আমাদের অনেক দোষ..! যাই হােক, মিন্টর জন্যে আপনি অনেক করলেন...আমি সে কথা মনে রাখবে। শুধু কথা নয় ওর স্বর শুনেও বােঝা যায় যে কথাটা ও শেষ করে দিতে চায়। অশােক বললে, আমি যেটুকু করেছি সে আমার কর্তব্য। তার বেশী কিছু নয় ! কথা শেষ করে অশােক এগিয়ে চলে যায়। অনু ওর চলে যাওয়ার দিকে প্রশংসমান কৃতজ্ঞতায় তাকিয়ে থাকে।

-তিন- জলপরীদের জনৃত্য চলেছে। শুভ, নরম, নগ্ন দেহ জলের সঙ্গে কেন গলে এক হয়ে যাচ্ছে। ফেনা উঠছে জলে। বিন্দু বিন্দু জল চকচক করছে চুলের গােড়ায় গােড়ায়।••• নৃত্যের ঢেউয়ে যেন জলতরলের সঙ্গীত। স্বপ্ন দেখছে ডলি জল পরীদের! স্বপ্ন নয় জাগ্রত কল্পনার নীল মােহ ! মােজাইক করা বাথরুমে বাথটবের মধ্যে ডুব দিয়ে আছে ডলি চৌধুরীর নয় ‘দেহখানা। টবের এক কোণের কল থেকে সদ্য ঝরা জলে ফেনা উঠছে আর ঐ ফেনার মত হালকা লাগছে নিজেকে ডলির। দেহটা যেন আর নিজের আয়ত্তের মধ্যে নেই। নগ্ন স্বচ্ছ জলের আলিঙ্গনে তার নগ্ন কোমল দেহটা আলগােছে ডুব দিয়ে আছে। ভাবতে ভাবতে কেমন শির শির করে ওঠে দেহটা। জলের ঘােট ঘােট ঢেউয়ের সঙ্গে তার বুকের মধ্যেওন ঢেউ ওঠে, ঢেউ দোলে দেহে মনে। নার্সিসাসের মত আপনার দেহ বিভাের হয়ে যায় ভলি। গুন গুন করে গান গেয়ে ওঠে। জলতর বেন। নিজের নগ্ন শুভ্র দেহ আর বাথটবের নগ্ন স্বচ্ছ জল এর মধ্যে কোনও আবিলতা নেই। কেবল আনের আগে যে হেজলিনটুকু পায়ে ছিল ও সে হেজলিনটুকু গলে গলে পড়ে জলের মধ্যে। আর শান্ত নীল জাল বােনে। জালগুলাে পাক খায়। আমেয় লিন মাখা, তার অভ্যাস হয়ে গেছে।' ই সেনের কাছে জেলেছিল ও হেজলিন মেখে গান করলে গানের পর দেহা যায় আলে-পড়া জমাট বরফের মত। খানিক পর 1.

ফেনার জলটা বুলিয়ে ওঠে। দেহটা অদৃশ্য হয়ে যায়। হয়ে যায়। জলের আকাশে দেহটা নিয়ে মেঘ ও রৌত্রের খেলা চলে যেন। আন শেষ করে উঠে আসে ভলি জলের আলিঙ্গন থেকে। গাটা ঝপ ঝপ করে মুছে নেয় নরম তােয়ালে দিয়ে। তারপর তােয়ালেটা আলগােছে দেহলতার ওপর জড়িয়ে নিয়ে বড় আয়নার সামনে এসে দাড়ায়। কী সুন্দর যে দেখাচ্ছে ওকে, এই অসহ্ত অধাবৃত দেহে! দেহটা যেন খালি হয়ে হালকা হয়ে গেছে। জলের সঙ্গে মিশে মিশে অনেক কিছু যেন হারিয়ে এল সে। এমনি মনে হয় ওর। আর কষ্ট থেকে সুর ঝঙ্কার উঠতে থাকে খুশির হাওয়ায় গা ভাসিয়ে । বাইরে দরজার কাছ থেকে ঝি এসে জানিয়ে যায় যে নিখিল আর রুনু এসে অপেক্ষা করছে। তাড়াতাড়ি সাত পােক সেরে ডলি বেরিয়ে এসে দাড়ায় ড্রয়িংরুমে। ওকে দেখেই নিখিল একেবারে যেন লাফিয়ে ওঠে। বলে, এখনি পৌনে ছ’টা এর পর মেট্রোর টিকিট পাবাে না ডলি। -অপানি যে ঝড়ের আগে দৌড়ন। ডলি তার উজ্জ্বল দেহখানা ঈষৎ দুলিয়ে জবাব দেয়। দিকে চোখ ভরে দেখতে দেখতে বলে নিখিল, উপায় নেই। কি জাননা কথা দিয়ে কথা না রাখা আমার আসে না।•••আমি কাঁটায় কাঁটায় appointment রাখি। ক বলে, কই, অশােকবাবু এলেন না যে? ভলি তাড়াতাড়ি জবাব দেয়। বলে, 'আশােক সিনেমায় যেতে পারবে না: ওর সময় নেই: কাজের নেই: কাজের লােক•• এইমাত্র আমি ফোন করেছিলাম। শােভাদি সেই কথাই বছেন। নিখিলবাই খোঁচা মারতে পারলে সুযােগ ছাড়ে না।

সুযােগে ডলির দিকে একটু বাঁকা ভাবে তাকিয়ে বললে, strange! কোন একটা আনন্দের ব্যাপারে অশােক কোনদিন সাড়া দেয় না। -আমারও তাই মনে হয় । ডলিকে শুনিয়ে রুনু কথাটা বলে নিখিলের দিকে চেয়ে। এবং সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা একটু সহজ করে দেবার চেষ্টা করে। বলে, of course I don't mean anything! তবু ডলি উত্তেজিত হয়ে ওঠে। একটু শুখনাে গলাতেই বলে, নিখিল বাবু'আপনার এ কথা সত্যি নয়। নিখিল একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়। একটু সময় নিয়ে বলে, মানে তা নয় আমি ঠিক তা বলি নি...! 06 for straty appointment is appointment! কথার দামই সব চেয়ে বেশী। ঠিক যা বলেছি বুঝে নাও। অর্থাৎ ভদ্রলােকদের বিচার করি তাদের মুখের কথার উপর...মানে কথা দিয়ে কথা না রাখা..যখন তখন বাজে কথা বলা...আর বাজে কথার মানেই ত মিছে কথা ডলি ! -সে কথা ঠিকই বলেছেন বটে। -তা হলেই দেখাে। নিখিল উৎসাহিত হয়ে ওঠে। হেসে নেয় খানিকটা হােহাে করা অবান্তর ভাবে। ইচ্ছেটা তার হালকা হাসি দিয়ে ব্যাপারটা হালকা করে নেয়। এদিকে কান্নার বােল উঠতে লেগেছে বস্তিতে, ভূতনাথের ঘরে। হঠাৎ ভূতনাথের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে ভীষণ। মরতে বসেছে প্রায়। তারিণী, স, মিন্ট এবং আরও অনেকে এসে জড় হয়েছে ঘরের মধ্যে। তারিণী বলে, ওরে এই ছোড়া। মিন্ট সাড়া দেয় তাড়াতাড়ি, কি মামী? —এ মামী ! কলির কেষ্ট এলেন মামী বলে ডাকতে। এরােজনের সময়েও:জারিণী মুখ ঝামটা না দিয়ে কথা বলে না। হঠাৎ আবার বলে, ", হাঁ করে দাড়িয়ে দেখছিস কি? বলে পর লাগে না পরে তেঁতুল লাগে না মিণ্ট, ঠিক বুঝতে পারে না ব্যাপারটা। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শুধু। তারিণী হাত নেড়ে বলে, যা না তােদর সেই ডাক্তারের কাছে পারিনে যেতে? এত ভালােবাসা-ডেকে নিয়ে আয় না কেন একবার... বুড়াে যে মরতে বসলাে•••চোখের মাথা খেয়ে দেখতে পাসনে ? মিন্ট অনুর দিকে তাকায়। অনুমতি পাবার জন্যে। বলে, বাবাে দিদি ? অনু যেমন তাকিয়ে ছিল ভূতনাথের মাথার দিকে আর মাথা টিপছিল তেমনি অবস্থায়ই বলে, ডাক্তার এলে টাকা দিতে পারবাে না মিণ্ট ! তারিণী খোঁটা দিতে ছাড়ে না। বিকৃত স্বরে বলে, এর পরেও বুঝি তাের ডাক্তার টাকা চাইবে? এত মাখামাখি.••এত দেখাদেখি...ভেতরে : ভেতরে কত জিলিপির প্যাচ দেখলুম মিন্ট ব্যস্ত হয়ে ওঠে। বাঁকা কথার অর্থ সব না বুঝলেও অপুর চোখের জলটা মিন্ট বােঝে। বলে, আমি যাই দিদি। এক দৌড়ে বেড়িয়ে আসে মিণ্ট রাস্তায়। অশােকের চেম্বারে পৌছতে বেশী দেরী হয় না মিণ্ট র!এসে দেখে লােকের ভীড়! অশােক ভীষণ ব্যস্ত হয়ে একের পর এক রােগী পরীক্ষা করে যাচ্ছে আর ওষুধ লিখে যাচ্ছে। মিন্ট, শুনছে এক ভদ্রলােকের সঙ্গে কথা হচ্ছে অশােকের। ভদ্রলােক বলছেন, ডাক্তারবাবু এই ওষুধটা পাওয়া যাচ্ছে না। অশােক একটু যেন বিরক্ত হয়। বলে, কেন? এটাত বাজারে আছে। d.

" -আছে, তবে আমাদের দেবে না। বলে পঁচিশ টাকা,দাম! পঁচিশ টাকা! অশােক বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকায়। চার টাকার বেশ কিছুতেই হতে পারে না। বার বার দেখতে দেখতে কনট্রোলড রেট সব মুখস্থ হয়ে গেছে ওর ! ভদ্রলােক একই ভাবে বলে চলেন, দোকানে গিয়ে দাড়ালুম প্রথমে বললে নেই ! বললুম কোথায় পাওয়া যাবে বলতে পারেন বলে অন্য জায়গা থেকে আনিয়ে দিতে পারি তবে দাম বেশী পড়বে। পঁচিশ টাকার কম নয়। জিজ্ঞেস করলুম রসিদ দেবেন ত ? পাশের লােকটি বােধ হয় মনে করলে আমার কোন মতলব আছে, তক্ষুনি বললে না স্যর এ ওষুধ পাওয়া যাবে না•••বিলেত থেকে এখনও মাল এসে পৌছায় নি। অশােক চুপ করে থাকে সাড়া দেয় না কোন রকম। এরকম কথা, নে এনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে আজকাল। প্রথম প্রথম রাগ করতে .এখন করে না। এ ধরণের কারবার যারা বন্ধ করতে পারে তারাই আছে এর মূলে। এ সত্যটা আবিষ্কারের পর থেকে এর প্রতিকার সম্বন্ধে সব আশা ছেড়ে দিয়ে অশােক নীলকণ্ঠ হয়ে বসে আছে। ভলােক হয়ত আরও কিছু বলতেন এবং শেষ পর্যন্ত কিছু বলাতেন অশােককে দিয়ে। কিন্তু হঠাৎ সবাইকে ঠেলেঠুলে মিন্ট এসে দাঁড়ায় শাকের সামনে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ডাক্তার সাহেব আমি মিন্টর কষ্ট থেকে খুব খানিকটা আত্মীয়তা আর খুব খানিকটা নির্ভরতা যেন ঝরে ঝরে পড়ছে। এই ছেড়া-ময়লা জামা পরা ছােট-লোকের ছেলেটার হাবভাব দেখে আর সকলে একটু যেন হকচকিয়ে যায়। অবাক হয়ে একবার মিন্টর আয় একবার অশােকের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে। অশােক কাজ করছিল। বলে, বাধিত হয়েছি, কি চাই বল ।

মিট, ঘটা করে ডাক্তার সাহেবকে নমস্কার জানায়। অশােক
করেছিল সেটা। একটুখানি হেসে বলে, হঠাৎ তা শিখলি কোখেকে রে ?
—দিদি বলে দিয়েছে । ডাক্তার সাহেব একবার এক্ষুনি চলুন
জ্যেঠামশায়ের
-চুপ চুপ। এখানে চেঁচাতে নেই। আমি কোথাও যেতে পারবে
না। এখন সময় নেই রে।...
-কিন্তু জ্যেঠামশায়ের খুব অসুখ যে।
বেশ ত, অন্য ডাক্তার আছে ডেকে নিয়ে যা।
অন্য একজন ভদ্রলােক তাড়াতাড়ি উপদেষ্টার মত বলে ওঠেন, উনি
অনেক বড় ডাক্তার-যেখানে সেখানে উনি যান না••তা ছাড়া ওর অনেক
টাকা ফী তােরা দিতে পারবি নে।
মিন্ট, যেন গুটিয়ে যায় দেহে মনে। আমতা আমতা করে বলে জড়িত
স্বরে, আপনি যাবেন না? বড় ডাক্তাররা বুঝি গরীবের ঘরে যায় না?
কী স্পর্ধা! ধানি লঙ্কার ঝাল ত! সকলে পৰম্পর মুখ চাওয়া চাওয়ি,
করতে থাকে। ছােট-লােকের এত বড় হয়েছে আজকাল। আশােককে
কি বলে একটু তুষ্ট করতে পারবে তাই ভাবতে থাকে আসলে।
বিস্ময়ের ধাক্কায় কিছুই জোগায় না !
অশােক অম্লান মুখে বলে, এসব কথা তােকে শিখিয়ে দিয়েছে না,
মিন্ট?
মিন্ট, অশােকের সহজ কথায় ভরসা পায়। এই রকম সহজ অরে,
অশােক অনেক কথা বলেছে মিন্টর সঙ্গে হাসপাতালে, তাদের বস্তিতে।
মিন্ট, বলে, আপনি চলুন এক্ষুণি আপনাকে যেতেই হবে।
অলােক বলে, তাের জ্যাঠা বাঁচবে না রে.আমি গিয়ে আর কি করবে
০১

মিন্ট বলে, বা রে, বেশ ডাক্তার আপনি ত••রুগী না দেখেই অমনি বলে
দিলেন বাঁচবে না?
–আঃ ভালল বিপদে ফেললি তুই, মিন্ট •••আবার সেই তােদর বস্তির
হট্টগােল যা দাড়া একটু।•••
অশােক তাড়াতাড়ি করে কয়েকটা কাজ সেরে নেয়। তারপর সকলের
বিস্মিত দৃষ্টির অরণ্যের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসে গাড়ীতে গিয়ে চাপে। মিন্ট ও
গাড়ীর মধ্যে একপাশে গিয়ে বসে। স্টার্ট দেয় অশােক গাড়ীতে।
পথের মধ্যে অশােক মিন্টর সঙ্গে আলাপ করতে থাকে। এতদিন সে
দেখছে মিন্টকে, তার পরিচয় পাবার কৌতুহল হওয়া তার স্বাভাবিক।
তাছাড়া সে এ কথাও শুনেছে যে মিন্ট, নাকি অনুর আপন ভাই নয়।
অশােক বলে, তাের মা বাপ কোথা রে মিণ্ট। প্রশ্নটা করে একটু
যেন অপ্রস্তুত বােধ করে অশােক। ছােট ছেলে হয়ত কি মনে করে
d.
মিন্ট কিন্তু বিচলিত হয় না। সহজ ভাবেই বলে, বাপ নেই মা আছে।
-মা কোথায় ?
-সেই যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল মা আমাকে ওই বস্তির ধারে ঘুম পাড়িয়ে
কোথায় চলে গেছে।
তাের দিদি?
-ওরা আমার কেউ না। দিদি শুধু আমাকে লুকিয়ে ভাত দিত।
দিদির জন্যেই ত থাকি-নৈলে এদিন পালিয়ে যেতুম।
অশােক দেখে মিন্টর চোখ দুটো জলে ভরে আসছে। অশােক আর
কিছু বলে না।
খানিক পরে মিন্ট, ডাকে, ডাক্তার বাবু?
-কেন রে? বল না কি বলবি ?
১২.

মিন্ট চুপ করে থাকে। কি যেন বলতে চায় পারে না। চোখে তার
তখনও জল। সজল মেঘ থম থম করে আকাশে। ঝরে না।
মিন্ট, আবার ডাকে, ডাক্তার বাবু!
-বল্ না। ভয় পাচ্ছিস কেন? কিছু চাস ? -
-না।
-তবে?
মিন্ট, তার ছেড়া জামাটার পকেটের মধ্যে হাত ঢঢাকায়। তারপর
সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসে ঝকঝকে একটা কি!
অশােক অবাক হয়ে দেখে তার সেই ফাউনটেন পেনটা।
মিন্ট, মাথাটা নীচু করে বলে, এটা আমিই নিয়েছিলুম আপনার পকেট
থেকে•••আমি আর এমন কাজ করবাে না ডাক্তার বাবু !•••
সােণার ক্লিপ আঁটা ফাউনটেন পেনটা থেকে আলাে ঠিকরে পড়ে। আলাে
ত নয় যেন খোঁচা দিচ্ছে চোখে বিদ্যুতের মত!
বিদ্যুতের চাবুক পড়ে মেঘের গায়ে। মেষ ঝরে জল হয়ে।
মিণ্ট, কঁদছে!
রীতিমত একটা বড় বিস্ময় অশােকের জীবনে।
ঢিল পড়লে ঢেউ ওঠে পুকুরের জলে আবার বৃষ্টির ফোটাতেও ঢেউ ওঠে।
অশােক বলে, চুপ কর মিন্ট, কঁদিস নে। এ দোষ তাের নয় মিন্ট :
তােদের যারা নীচে নামিয়ে রেখেছে এ দোষ তাদের•••
অশােক বাঁ হাত দিয়ে মিন্টর পিঠটা চাপড়ে দেয়।
মিন্ট কাদছে তখনও। একবার বর্ষা শুরু হলে মেঘের পর মেঘ কোথা
থেকে যে এসে জোটে তার ঠিক নেই। মিণ্ট, তাই কঁদে, কলমটা নেবার
দিন যত হেসেছিল তার থেকেও বেশীক্ষণ ধরে কাদে ও।••
বৃদ্ধ ভূতনাথ শেষ বারের মত নিশ্বাস টানছে। হাঁ করে হাঁপাচ্ছে সে।
৪৩

শুধু নাক দিয়ে নয় মুখ দিয়েও যতটা পারে হাওয়া টানবার চেষ্টা করে ও। বিষাক্ত হলেও হাওয়া ত বটে। ঘরের মধ্যে অনু আছে, তারিণী আছে, আর কয়েকজন স্ত্রীলােকও এসে জুটেছে। একধারে বসে বসে বিড়ি টানছে রমানাথ, নিতান্ত বুড় বাপের দিকে চেয়ে বসে থাকবার ধৈর্য তার নেই। তাই আপন মনে ধোঁয়া ছাড়ছে আর তার দিকে বােকার মত দৃষ্টি মেলে দেখছে। একজন স্ত্রীলােক তারিণীকে বলে, ক্রমশই ত খারাপ হয়ে আসছে দেখছি। তারিণী তাড়াতাড়ি জবাব দেয়। বলে, আমরা ত’ অনেক করলুম-তুমিই বলাে দিদি পাকা ফল খসে পড়বে:••তার জন্যে কেঁদে কেটে লাভ কি ? তুমিই বলাে ভাই! -সে ত বটেই দিদি। মাথাটা ঈষৎ কাৎ করে জবাব দেয় স্ত্রীলােকটি।••• তবু কুকুরটা বেড়ালটা•••তার জন্যেও লােকে হা হুতােশ করে বই কি? সকলে চুপ করে থাকে, কোন কথা কয় না। বুড়াে হয়েছে ভূতনাথ। শুধু গিলতে পারে আর খ্যাক খ্যাক করে কাশে। মরলেই বা কি আৰু বাঁচলেই বা কি! তবু নিতান্ত কুকুর বেড়ালের সঙ্গে তার তুলনা করাটা কিন্তু তবু অনু কিছু বলে না। চুপ করে বসে থাকে মাথার কাছে। আর রমানাথের বিড়ির আগুনটার দিকে আলগােছে তাকায় । মাঝে মাঝে ভূতনাথ ভুল বুকে। কিছুক্ষণ পরে পরে প্রলাপ বকুনী চলে। মােগের বিকারের মধ্যেও ভূতনাথের পাঠশালার স্মৃতি জাগ্রত হয়ে উঠেছে। মুখে মুখে ভূতনাথ ছেলে পড়িয়ে চলেছে।•••আয় আয় পড়া করবি আয় পালাচ্ছিল যে? কিচ্ছু হবে না তােদর চিরকাল, দুঃখ পাবি।•••আরে পাঠশালা পালিয়ে পেয়ারা বাগানে ঢুকেছে হতভাগা!•••জানিস আমি এ গাঁয়ের হেডপণ্ডিত জানিস আমি সর্ব বেচে এই পাঠশালা করেছি ••• আয় হবি••লেখা পড়া শিখবি: হতভাগ: বদমায়েস•• 3:

অনু থামাতে চেষ্টা করে ভূতনাথকে। বলে, বাবা-একটু চুপ করাে আমি আর পারি নে••• এরই মধ্যে অশােককে সঙ্গে করে মিন্ট এসে হাজির হয়। কাউকে কিছুই বলতে হয় না, অশােক নিজেই এগিয়ে এসে পরীক্ষা করে ভূতনাথকে। রমানাথ এইবার মাতব্বরী করতে আসে। বিড়িটা তার শেষ হয় নি তখনও। সেটা টানতে টানতেই কথা বলে অশােকের সঙ্গে। সমীহ করে একটুও। বলে, দু’দিন থেকে অবস্থাটা খারাপ মনে হচ্ছে। সম্পূর্ণ-ই অবান্তর কথা। অশােক শুধু বলে, ই। অনু বলে, দুদিন থেকে খালি ভুল বকছেন। আগে ত’ এমন ছিল না? অনুর কথা শুনে বক্তবর্ণ চোখ করে ভূতনাথ তাকায় অসুর দিকে। চীৎকার করে বলে, শােনাে কথা, হেডপণ্ডিত আমি•••আমার ভুল ধরতে এসেছে•••তাের চোদ্দ পুরুষকে আমি শেখাতে পারি জানি?" বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে ওঠে ভূতনাথ। কনুয়ের ভর দিয়ে উঠে বসতে চেষ্টা করে। অনু ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে নামিয়ে দেয় মাথাটা। ডাক্তারের কথা শুনে বহু লােক এসে ভীড় করেছে ঘরটার মধ্যে। নােকা ময়লা কাপড় পরা লােকগুলাে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায় অশােকের দিকে। সে যেন কোন অন্য রাজ্যের জীব। তাদের নােংরা গা আর নােংরা কাপড় থেকে একটা ভ্যাপসা গন্ধ বেবােয়। সমস্ত জড়িয়ে হাওয়াটা কেমন অস্বচ্ছ আর ভারী হয়ে ওঠে। অস্বস্তি বােধ করে অশােক। অনুর দিকে ফিরে বলে, এর পর ওষুধ ধরবে কি না বলা কঠিন অবশ্য ওষুধ আমি পাঠাৰাে•• আই বিশ্বিত হয়। কৃতজ্ঞতায় ভার ওঠে বুকখানা। ধরা গলায় বলে আপনি বলছেন— বলতে গিয়ে সময় নেয় ও। অশােক ওকে করবার সুযােগ না নিয়েই বলে ওঠে, হ্যা বহুদিন আগে থেকে চিকিৎসা করালে হয়ত এ অসুখ এতদিনে সারতে পারতাে। অনুর চোখের তারা আর গলার স্বর একই সঙ্গে কাঁপতে থাকে। কোনও রকমে বলে, তবে কি বাবা বাঁচবেন না ?••• অশােক কি বলবে ? সত্যি জীনের আশা নেই ভূতনাথের। তবু মুখ ফুটে সে কথা বলা যায় না। সে দেখেছে বাড়ীর মধ্যে একমাত্র অনুই যথার্থ চিন্তিত ভূতনাথের জন্যে। তারই মুখের ওপর এই শক্ত কথাটা কিভাবে উচ্চারণ করবে সে। তার থেকে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া ভাল। অশোেক ইতস্তত করে। হঠাৎ বস্তির অপর এক দিক থেকে একটা কান্নার রােল ওঠে। মড়াকান্না শুনে চমকে ওঠে অশােক। মৃত্যুর ছায়ার মধ্যে বসে বসে সেই মড়াকান্নার বােল আরও যেন বীভৎস হয়ে ওঠে। ব্যস্ত হয়ে অশােক বলে, কাদছে কোথায় ? কি হল কি ? —ও কিছু না-ওপাশ থেকে নিতান্ত উদাসীনের মত জবাব দেয় রমানাথ-কদিন থেকে এখানে মড়ক লেগেছে কি না। মড়ক। অশােক সচকিত দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকায়। অদূরে দেয়ালের গায়ে প্রকাণ্ড এক প্রাচীর পত্ৰ জ্বল জ্বল করছে। তাতে বড় বড় অক্ষরে নানা রকমের রঙ, দিয়ে লেখা “কলিকাতায় বসন্তের মহামারী- অবিলম্বে টিকা লউন।” অশােকের হাসি পায় এত দুঃখের মধ্যেও। যারা বেঁচে মরে আছে, যাদের বেঁচে থাকা মানে শুধুই মরে না যাওয়া তাদের আবার সাবধান করে দেওয়া মড়কের বিরুদ্ধে! আগে হলে এই প্রাচীর পত্রে সে যথেষ্ট উৎসাহিত বােধ করতে। আস্থা রাখতে এ ধরণের প্রচার কার্যে। কিন্তু আজকাল ওদের জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবার পর থেকে তার মত বদলাতে তবু ডাক্তার সে। মড়কের বীভৎসতা সম্বন্ধে ধারণা আছে তার। তাই হাজার হলেও মড়কের কথা শুনে চমকে ওঠে। অনু বলে, মড়ক ওদের বন্ধু ! ওরা বেঁচে মরে থাকে:মড়কে ওরা মরে $ বঁচে ! আশ্চর্য, এত দুঃখের দিনেও অনু খেচা না দিয়ে ছাড়ে না। অশােক কিন্তু বিরক্ত হয় না একটুও। মিথ্যে বলে নি অনু। এমনি সময়ে দরজার কাছে কাকে যেন দেখা যায়। বস্তির মালিক রায়বাহাদুর শশধর চৌধুরীর গােমস্তা হরিপদ এসে দাড়িয়েছে। অনেক মাসের ভাড়া বাকী পড়ে গেছে ভূতনাথের। তাই সময়ে, অসময়ে তাগাদা দিলে চলে না। সময় হলেই একবার করে এসে দাড়ায় হরিপদ। চেঁচামিচি করে, অপমান করে। যার যা কাজ। ঘরের মধ্যে ভীড় দেখে হরিপদ আর বেশী দূর এগােয় না। দরজার কাছ থেকেই চেঁচায়কই গাে হেড পণ্ডিতের মেয়ে আজ আর ফিরিয়ে দিয়াে না বাছা। দু’মাসের বাড়ী ভাড়া বাকী ফেলেছে..টাকাটা এইবার চুকিয়ে দাও। গড় গড় করে বলে যায় হরিপদ । এবং আরও যে বলবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। রমানাথ উঠে আসে ঘরের ভেতর থেকে। ভাড়াটা তাকেই গুণতে হবে, অনুকে নয়। তাই উঠে গিয়ে বলে, দুমাসের ঘরভাড়া বাবা কখন মারা যায় তার ঠিক নেই এই সময়ে ঘরভাড়ার দাবি করতে এলে হরিপদ ? রমানাথের লাল লাল চোখ যেন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বাবা মারা যাবার চিন্তা তার নয়। মারা গেলে যে খরচাটা বের করতে হবে সেই ভেবেই তার মাথা গরম হয়ে উঠেছে। তার ওপর আবার এই ঘরভাড়ার তাগিদ !••• হরিপদ ছাড়বার পাত্র নয়। কদিন ধরেই সে ঘুরে যাচ্ছে। আজ রমানাথকে সামনা সামনি যখন পাওয়া গেছে তখন দু'চার কথা না শুনিয়ে ৪৭ দিলে নয়। একটু গলা চড়িয়ে হরিপদ বলে, তাের বাৰা মৰছে আৰ দুমাস ধরে...যে ঘরে মরবে সেই ঘরের ভাড়াটা ঢুকিয়ে না দিলে চলবে কেন? আমি রায়বাহাদুরের কাছে কি জবাবদিহি করি বল দেখি? কথাটা মিথ্যে নয়। আজ দুমাস ধরে ভূতনাথের মর মর অবস্থার দোহাই দিয়ে হরিপদকে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। তাই রমানাথ একটু থতমত খেয়ে যায়। কে যেন পেছন থেকে বলে, ওমা দেখাে একবার রকমখানা চোখের চামড়া নেই গা এ্যা? স্ত্রীলােকের কণ্ঠ বটে তবে তারিণী নয়। অনু এবার উঠে আসে। নিজের হাতের চুড়ি দুগাছা নাড়াচাড়া করতে করতে বলে, আজ আপনি দয়া করে যা কাল যেমন করেই হােক আপনি টাকা পাবেন। শান্ত ভাবেই বলেও কথাগুলাে। অপমানে ক্ষোভে আর লজ্জায় বস্তির আলােতেও তার মুখখানা লাল দেখায়। হরিপদকেও স্বর নামাতে হয় অনুকে দেখে। কিন্তু তাহলেও তধি করতে ছাড়ে না। বলে, যখনই আসি তখনই বল কাল দেবাে•••কাল আর আসে না! তােমরা ভদ্দরলােক তাই কথা কাল দেবাে। ‘ভদ্দরলােক কথাটা এমনভাবে উচ্চারণ করে যে তার থেকে সহজভাবে ছােটলােক বলা ছিল ভাল। রমানাথ খেকিয়ে ওঠে, এই হরিপদ, যা মুখে আসে তাই বলিস? —তুই থাম্ তাের বােনের সঙ্গে কথা বলছি:••ভারি মুবােদ তাের ! —মুখ সামলে কথা বলিস হরিপদ • সাবধান! রমানাথ খালি গায়েই আন্তিন গােটানাের ভান করে। মারামারির পূর্ব লক্ষণ ওটা। হয়ত কিছু একটা ও করে বসবেই আজকে। ওধার থেকে তারিণী গজ গজ করতে থাকে রমানাথকে উদ্দেশ করে বলে, সাউখুড়ি করে তুমি কেন যাও হাত উচিয়ে থানা পুলিশ ফলে।

বােন তােমার রক্ষে করবে ? গায়ে পড়ে যারা ভালােই করতে আসে, তাদের বলল না কেন দশ বিশ টাকা মুঠো আলগা করতে। ওঃ অমন ঢের দেখেছি। কটাক্ষটা যে কাকে উদ্দেশ করে তা বুঝতে কষ্ট হয় না কারও। অশােক এগিয়ে আসে এবার দরজার দিকে। এগিয়ে এসে গম্ভীর ভাবে বলে, রায়বাহাদুরকে তুমি বলাে••এ বাড়ীর যিনি কর্তা তিনি মারা গেলেও ঘর ভাড়ার টাকা মারা যাবে না। কিন্তু এখানে দাড়িয়ে থেকে আর তুমি এদের অপমান করাে না হরিপদ।••• অশােককে দেখে চমকে ওঠে হরিপদ মনে মনে। নরম হয়ে বলে, আজ্ঞে ডাক্তারবাবু আপনি ? আচ্ছা আমি চলে যাচ্ছি...আমি সামান্য গােমস্তা বৈ ত নয় ! হরিপদ তাড়াতাড়ি সরে পড়ে। যেন কিছুই হয় নি বমানাথও সরে পড়ে। ঘরের মধ্যে বসে থাকবার ধৈর্য আর তার নেই। অনু ঘরে এসে ঢােকে। তার চোখে জল তখনও চক চক করছে। অশােকের দৃষ্টি তা এড়ায় না। মনটায় কোথায় যেন মােচড় দিয়ে ওঠে। অনুর দিকে ফিরে আস্তে আস্তে বলে, তােমরা কেমন করে সহ্য করে ? মনুষত্বের এই অপমান ? অনেক বড় বড় কথা মনে আসে অশােকের। অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করে। কেন জানি না ঐ বস্তির মেয়েটার চোখের জল কেমন যেন নেহাৎ অনিচ্ছাসত্বেও কিছু বলতে ইচ্ছে করে অশােকের। অনু চুপ করে শশানে। পাহাড়ের ওপর থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া নামছে সমতল মাটিতে। মাটি ঠাণ্ডা হচ্ছে। আর সঙ্গে সঙ্গে বিকীর্ণ করছে তার পীড়া দেয়। বুকের উত্তাপ। ৪৯ রাে-(৩) অনু বলে, প্রতিবাদ জানাবার জায়গা আজো খুঁজে পাই নি, তাই সহ হয়ে যায়।•••বলতে কষ্ট হয় অনুর তবু বলে যায় কথাগুলাে। অশােক কথা বলবার সুযােগ খুজছিল। অনুর উত্তর পেয়ে উৎসাহিত হয়ে ওঠে। বলে, জীবনটাকে ভেঙ্গে নতুন করে গড়তে পারে না? অন্তত আর কিছু না হােক এই বস্তিটারও ত কিছু উন্নতি করতে পারাে ? অনু অল্প অল্প হাসে। মেঘের ও রৌদ্রের খেলা চলছে আকাশে। সমতলমাটির বাধামুক্ত বিস্তীর্ণ আকাশ ! অনু বলে, আপনারা থাকেন ওপর তলায়-••দুটো মুখের কথা বলে যেতে পারেন সহজে ! যারা নীচে পড়ে গিয়েছে তারা জানে তাদের মাথায় কত বােঝা কত দুঃখের গুরুভার । অশােক বিব্রত হয়ে পড়ে। নিজের কথাগুলাে নিজের কাছে আগুনের মত শশানাচ্ছিল অথচ এই মেয়েটা এক কথায় উড়িয়ে দিল !... সমতলভূমি থেকে দূরের পাহাড়কে কত ছােট দেখায় !••• অশোক আরও জোর দিয়ে বলতে চেষ্টা করে—কিন্তু মানুষ এত নােংরায় ডুবে থাকতে পারে •আগে আমি জানতুম না! অনু এবার জোর করেই হাসে। বলে, আপনি বড় লোেক, বিলেত ফেরৎ•••মােটর ছাড়া পথে চলেন না•••আপনি আর কি করে জানবেন ? মানুষ আরও অনেক নােংরায় ডুবে আছে•••মাঝে মাঝে মােটর থেকে নেমে তাদের দেখে যাবেন:••নইলে কোন দিনই চোখে পড়বে না। সমতল থেকে পাহাড়ের দিকে যখন হাওয়া বয় সে হাওয়া বড় গরম লাগে । অশােক বােঝে এর থেকে মােটর নিয়ে বেরিয়ে পড়া ভাল। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ে ও ঘর থেকে। অনু তখনও হাসছে কি না কে জানে ? পুকুরে ঢেউ জেগেছে আবার! অবিশ্রান্ত ঢেউ * * চার- রায়বাহাদুরের বাড়ীর ড্রয়িং রুমে আসর বসেছে। জানলার ধারে বড় ইজি চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিয়ে রায় বাহাদুর ধূমপান করছেন। তার পাশে দু’খানা কোচে নিখিল আর ডলি। রায় বাহাদুরের মুখে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। আর সেই ধোঁয়ার মতই হালকা আলােচনা চলছে ওদের মধ্যে। এটা-ওটা ! কথায় কথায় অশােকের কথা ওঠে। আগে হলে, অশােকের অনুপস্থিতি কল্পনা করা যেতাে না। অর এখন অশােক নিয়মিতই অনুপস্থিত থাকে । সকলে সেটা বােধ করলেও বিশেষ কিছু বলে না। সব বদলে যাচ্ছে। যে অশােক ছিল ওদের মধ্যে সব চেয়ে বেশী দুরন্ত আদবকায়দায় হাবভাবে, সাজপােষাকে সকল বিষয়েই যে নিখিল রায়ের মত কাচা ব্যারিষ্টারকেও চমক লাগিয়ে দিতাে সেই অশােক নাকি আজকাল ননাংরা বস্তির মধ্যে আনাগােনা করছে। কি যে সে পেয়েছে তার মধ্যে সেই জানে। যত সব নােংরা ঘােটলােকদের আড়া! ভাবতে গেলেই শিউরে ওঠে গাটা। তবু নিখিল অশােককে সমর্থন করেই কথা বলে। এভাবে বলার উদ্দেশ্য ডলিকে শােনানাে ছাড়া কিছুই নয় । বেশ সহজ সুরেই বলে নিখিল রায়বাহাদুরকে, ধরুন অশােক যদি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে চায়, আপনি বাধা দিতে গেলে সে মানবে কেন ? তা ছাড়া কি জানেন মিঃ চৌড়ি, সে ডাক্তার, তার নিজেরও একটা রুচি বােধ আছে।

== -কী বলছেন আপনি? ডলির কণ্ঠ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বাবা কি তার কোন কাজে বাধা দেন ? -না ঠিক তা নয়, তবে পরে অশােকের ডাক পড়েছে খুব খারাপ জায়গায়...তাকে যেতেই হবে it's a doctor's duty.••তাকে ধরে রাখা চলবে না ! রায়বাহাদুর এতক্ষণে জবাব দেন। বলেন, আমরা তাকে ধরে রাখতে চাই কে বললে তােমাকে ? —Sorry, বােধ হয় আমিই ঠিক বােঝাতে পারি নি..মানে, আমি বলতে চাই আপনি চান যে আপনার পছন্দসই জায়গা ছাড়া সে আর কোথাও যাবে না।••• ডলি নিজের থেকেই জবাব দেয়। বলে, বাবা তার ভালাের জন্যেই বলেন নইলে কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই ডলি চুপ করে। —এমন হতে পারে, আপনাদের পরামর্শ সে পছন্দ করে না- মানে বুঝলেন মিষ্টার চৌড্রি, এটা হল এযুগের individualism••• রায়বাহাদুর অত সহজে স্বীকার করতে প্রস্তুত নন। তিনি তার যুক্তি দিয়ে চলেন, শােনো নিখিল, তুমি ঠিক বুঝতে পারে নি। অশােক বড় ডাক্তার, তার আত্মসম্মান অনেক বড় বস্তিতে তার আনাগােনা কেউই পছন্দ করবে না: ওতে আমাদের মান থাকে না। -কিন্তু সে যদি আপনার অবাধ্য হয় ? —তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে । কথাটা হয়ত আরও গড়াতে। কিন্তু মাঝে পথে বাধা পড়ে যায় । ওদিক দিয়ে হরিপদ এসে ঢােকে। হরিপদর মুখ বিষন্ন। এইমাত্র সে বস্তি থেকে ঝগড়া করে ফিরছে। ঘরে ঢুকেই হরিপদ সুরু করে দেয় তার বক্তব্য। বলবার জন্যই সে তৈরী হয়ে এসেছিল। নেহাৎ অশােকের খাতিরে সে বমানাথের চোখ রাঙ্গানী মুখ বুজে সহ্য করে চলে এসেছে। তা না হলে কি হত বলা যায় । ব্যাপারটা রায়বাহাদুরকে জানিয়ে রাখা ভাল । হরিপদ বলে, বড়বাবু আপনার বস্তির ভাড়া যদি ঠিক মত আদায় করতে পারি তাহলে আপনি আর আমায় রাখবেন কেন? —ব্যাপারখানা কি? ব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন করেন রায়বাহাদুর। --ভাড়া আদায় করতে গেলেই দেখি, হয় মরেছে আর না হয় মরতে বসেছে..নয়ত রাতারাতি পালিয়েছে। আপনাকে বলে দিচ্ছি বড়বাবু••• আপনার কথাই ঠিক...বস্তির কখনও উন্নতি করতে নেই। ওরা ওই যে নর্দমায় মুখ গুজে পড়ে থাকে •••ওইতেই ওরা বেশ থাকে। আস্কারা দিলেই বুঝলেন বড়বাবু-ফোস করে ওঠে। —কোন বস্তিটার কথা বলছ তুমি? এতক্ষণ শােনবার পর প্রশ্ন করেন রায়বাহাদুর। এতক্ষণ বকবার পর এই প্রশ্ন শুনে হরিপদ মনে মনে বিরক্ত হয়ে ওঠে। একটু গলা উচিয়েই বলে, আঁজ্ঞে আপনার ঐ ১৩ নং বস্তিটা! ওখানে যেন দল বেঁধে সব বেয়াড়া লােকগুলাে বাসা নিয়েছে। সেই-যে বুড়াে হেড পণ্ডিত...আপনার মনে আছে বড়বাবু ? -সে আবার কি করলে? -সেই একই কথা। হাতমুখ নেড়ে ভঙ্গিমা করে বলতে থাকে হরিপদ ।•••ভাড়া চাইতে গেলেই তার হাঁপানি ওঠে••দম্ আটকায়। আজ এক মাস ঘােরাচ্ছে বড়বাবু। ওর সেই মেয়েটা কি আর ভাড়া দেবে? সে ত কেউটে সাপ ! কাছে গেলেই ফোস করে ওঠে। রমানাথটা শুদ্ধ, আমায় তেড়ে আসে মারতে। আপনি যদি বলেন বড়বাবু সেপাইদের কিছু খাইয়ে কালই ওদের উৎখাত করে দিই -আগে একটা নােটিশ দাও। নিতান্ত গম্ভীরভাবেই বলেন রায়বাহাদুর। উত্তেজনার লেশটুকুও প্রকাশ পায় না তার স্বরে। —নােটিশ ! ওদের আপনি বেশ ভাল করেই জানেন! সেই মেয়েটা নাকি আবার শুনছি বস্তির লােক জড় করছে আপনার বিরুদ্ধে। ডলি একটু উৎসাহ বােধ করে মেয়েটার সম্বন্ধে। বলে, কে মেয়েটা? নাম কি ? অনু বলেই ত ডাকে...অনুপমা-টমা হবে। নিখিল একটু শ্লেষ করে নামটা নিয়ে। বলে, ওই হােল•••্যর উপমা নেই—অর্থাৎ viciousness without example ! হরিপদ নিখিলের কথায় কান দেয় বলে মনে হয় না। ডলিও না, নিখিল নিজেই হাসে বলতে বলতে। হরিপদ দু’পা এগিয়ে যায় রায়বাহাদুরের দিকে। তারপর একটু নীচু সুরে সকলের দৃষ্টি ভাল করে আকর্ষণ করে বলে, মেয়েটা কেন জোর পাবে না বলুন বড়বাবু: আপনার এ বাড়ীর ছোয়াচ থেকেই চুড়িটা আজকাল আস্কারা পাচ্ছে যে- -তার মানে ? ভারী গলায় প্রশ্ন করেন রায়বাহাদুর। -মানেহাত কচলাতে কচলাতে বলে হরিপদ—যদি সাহস দেন ত বলি। ছুড়িটা বশীকরণ জানে বড়বাবু। আমাদের ডাক্তারবাবুকে অশােকবাবুকে মেয়েটা হাত করেছে স্বচক্ষে দেখে এলুম বড়বাবু- চেয়ারের মধ্যেই চমকে দুলে ওঠেন রায়বাহাদুর ! তঁার চুরুটের আগুনটা নিভে আসছে। কথাটা বিশ্বাস করা অসম্ভব না হলেও বিশ্বাস করতে প্রবৃত্তি হয় না আর সকলের। চট করে বাধা দিয়েও কিছু বলা যায় না। এমনি একটা অস্বস্তিকর অবস্থা । ৫৪ নিখিল কথায় হঠবার নয়। বলে, খুব স্বাভাবিক মিষ্টার চৌড়ি, আলাের ঠিক নীচেই অন্ধকার। ডলির সহ্যের সীমা হারিয়ে যাচ্ছে। ক্ষুব্ধ ভাবে বলে ওঠে ও,-আপনি একটু চুপ করুন দয়া করে নিখিল শুধু ‘Sorry বলে চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিয়ে ডলির চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নেয় নিজেকে। এমন সময়ে চার চাকার ঠেলাগাড়ীতে চড়ে হেমনলিনী এসে আসরে অবতীর্ণ হন। ঠেলাদারকে ধমকে বলেন, আঃ তােকে বলি অত হেঁচকে ঠেলা দিসনে ! বুকে হাঁপ লাগে। হেমনলিনী এসে পড়াতে ব্যাপারটা থামা পড়ে যায়। হরিপদ বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। হেমনলিনী দেখতে পেয়েছিলেন হৃত্বিকে। তাই বলেন, ওই দুমুখটা এসে কী লাগাচ্ছিল বলে ত ? ওকে দেখলেই আমার পায়ের ব্যথা বাড়ে। নিখিল জবাব দেয়। বলে, কিন্তু ভাগবৎ গীতায় আছে- Sorry মহাভারতে আছে দুমুখরাই সত্যি খবর দেয়। ডলি এ সুযােগ ছাড়ে না। চট করে নিখিলকে আক্রমণ করে বসে। বলে, মহাভারতের কোন পর্বে আছে নিখিলবাবু? -কেন দণ্ডকবনের পর্বটায়। অম্লান বদনে বলে দেয় নিখিল। সকলে হেসে ওঠে কোলাহল তুলে। আর তারই মাঝে হেমনলিনীর বিরক্তি ধ্বনিত হয়ে ওঠে—আঃ তােমরা চেঁচিয়াে না...আমার পায়ে লাগে। আমি দেখতে পাচ্ছি আমার কথা তোমরা কেউ শুনছাে না! সব গণ্ডগােল পাকিয়ে তুলেছে।•••বলছি যে ডলি অশােকের বিয়েটা আগেভাগে সেরে দাও— মেয়ে জামাই নিয়ে কিছু দিন আমােদ আহলাদ না করলে আমার পা কিছুতেই সারবে না!

নতুন প্রসঙ্গ ওঠায় সকলেই চুপ করে যায়। ঘরের মধ্যে কোথা থেকে একটা চড়াই পাখী এসে ঢুকে কিচিরমিচির করছিল ডলি সেইদিকে একমনে কি যেন দেখতে থাকে। নিখিল প্যান্টের ক্রীজ ধরে অকারণে টানাটানি সুরু করে দেয়। জবাব দেন রায় বাহাদুর । বলেন, কিন্তু অশােক যদি তাড়াতাড়ি একাজে রাজি না হয় ? —শােন কথা। গালে হাত দিয়ে বলেন হেমনলিনী।—তার চেয়ে তাড়াতাড়ি হরিচরণ বাবুর কাছে একবার যাচ্ছ না কেন? অনেক দিনের ত পুরানাে বন্ধু !...যত সব গণ্ডগােল, আমার পা আর সারবে না... —বেশ তাই যাবাে। বলতে বলতে উঠে পড়েন রায়বাহাদুর ! এখুনিই যেন যাচ্ছেন। নিখিলও উঠেপড়ে। তারপর good bye বলে এগিয়ে যায় দরজার দিকে। এগােতে গিয়ে ম্যাটিংয়ের দড়ি লেগে হোঁচট খায় একবার, তারপর বেরিয়ে যায় ঘর থেকে ।

-পাঁচ- নদীর চলার পথে মরুভূমির মত ধূ-ধূ করা শুখনো মাটির মাঠ। সেই মৃত্যুর মত শূন্য মাঠ পেরিয়ে নদী এসে সাগরের সামনে দাঁড়ায়। ভূতনাথের মৃত্যুর মধ্যস্থতায় অনু আর অশােক অনেকখানি কাছাকাছি সরে এসেছে। ওদের বস্তির ঘরের অদূরে দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে ওরা কথা কয়। অনু আর অশােক। পিছনে ভূতনাথের শূন্য ঘরটা খাঁ খাঁ করছে। সেখানে ভূতনাথ নেই আরও অনেকেই নেই। বস্তির ভেতরকার হাওয়া যেন বিষ • ছড়াচ্ছে। সে হাওয়া যে টানবে মরবে সে-ই। সে-হাওয়ার মধ্য হতে একটু সরে দাড়িয়েছে ওরা। অশােক আর অনু। অশােক বলছে, তােমার বাবার মৃত্যু হঠাৎ হয় নি। তিনি মারা যাবেন একথা তােমরাও জানতে আমিও জানতুম ! অনু ও কথাটার সােজাসুজি জবাব দেয় না, দিতে পারে না বলে। শুধু বলে, আমি আর মিন্ট, যেখানেই খাই আপনার উপকার মনে রাখবাে। অশােকও কথার সুর বদলায়। অনুকে একটু শােনাবার জন্যেই বলে, অবস্থার কাছে যারা হার মানে, তারাই সব ফেলে পালায় অনু বিচলিত হয় না একটুও। সাহস করেই মুখের ওপর বলে, দেখুন আপনার কথায় আমি জোর পাইনে। আপনারা বাইরের লােক, আপনাদের উপদেশ ফাকা কথায় ভরা... আপনারা বস্তিতে মানুষ হন নি, বস্তির অপমান মাথায় তােলেন নি... কথা ত নয় যেন ধারালাে ছুরি। অশােকের মনে হয় তার সমস্ত যুক্তি ক o কেট ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ও বলে ওঠে, আচ্ছা ধরা, তােমাদের কাজে আমি যদি কিছু সাহায্য করি । অনু হাসে। অনুর সেই বিচিত্র অনুচ্চারিত, অস্পষ্ট হাসি। হাসির মধ্যে অনেক খানি কান্না আবার অনেকখানি উত্তাপ যেন লুকানাে। হাসতে হাসতে বলে অনু, বাইরের সাহায্য ! এখানে সেই সাহায্য কোন কাজে লাগবে আপনি মনে করেন ? -কেন? একটু বিরক্ত হয়েই প্রশ্ন করে অশােক। তার টাকা আছে নাম আছে, ডাক্তার হিসেবে হাতযশ আছে। সে নিজের থেকে সাহায্য করবে বলে এগিয়ে গেল অথচ ঐ মেয়েটা তা গ্রহণ করলাে না, উড়িয়ে দিলে একটুকরাে হাসি দিয়ে ! অনু বলে, যা আমরা পাইনি কোনদিন...পাবার আশা করিনে তেমন সাহায্য হঠাৎ এসে পৌছলে লােকে সন্দেহ করবে, ভাববে এর মধ্যে আর কোনও মতলব আছে। কথাটা শেষ করে এক বিচিত্র দৃষ্টিতে তাকায় অনু অশােকের দিকে। অশােকের মনটা যেন হালকা হয়ে আসছে। বলে, তুমিও কি সন্দেহ করবে ? -হ্যা, আমিও সন্দেহ করবে । যা পাবার নয় তা যদি না চাইতেই আসে••• তবে আমি কেন, সবাই সন্দেহ করবে । অনুর স্বর অন্যরকম! এ যেন অ নয়, অন্য কেউ কথা বলছে। --কিন্তু আমি যদি নিঃস্বার্থভাবে সকলের মাঝখানে এসে দাড়াই ? আবেগের মুখে বলে ফেলে অশোক। অনু আবার হাসে। বলে, তার জন্যে আমার অনুমতি চাইছেন কেন ? বেশ ত’ লােকজন জড়াে করে ঢাক পিটিয়ে বলুন, আমি বন্তি উদ্ধার করতে এসেছি! শুনহ মানুষ ভাই বলুন না কেন? ৫৮ -ই, দরকার হলে বােকাদের মাঝখানে গিয়ে সে রকম কথাও বটাবাে ! যাদের কাজ করতে যাবাে তারাই ত’ সকলের বড় বাধা। অবাক হয় অশােক মনে মনে। রাগও হয়। আশ্চর্য এই মেয়েটা, জোর করে মনের ভেতর থেকে গরম গরম কথাগুলাে বের করে নিয়ে ছাড়বে। দরকারী কথায় এমন ভাবে হাসে যে রাগ হয়ে যায়! অনু অশােকের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ জোরে জোরে হেসে ওঠে। বলে, আপনাকে এমন ভূতে পেলাে কেন ? কাজ নেই কর্ম নেই হঠাৎ গরীবদের উপকার করার সখ ! এ সখ, আপনার কতদিন থাকবে ? আপনার ঐ মােজ জুতত, কোট প্যান্ট, টুপি, কথায় কথায় মােটর গাড়ী এখানকার লােকে এসব ঘন ঘন দেখলে আপনাকে দাননা দত্যি মনে করে ভয়ে পালাবে। —অর্থাৎ তােমার সাহায্য একেবারেই পাবদা না, এই বলছ ? অশােক সত্যি সত্যিই এবার রাগ করেছে। সব সময়েই তার এই সাজ পােষাকে আর মােটরগাড়ী নিয়ে খোটা দেওয়া।•••রাগ করলেও অশােকের কণ্ঠে কোথায় যেন দুর্বলতার সুর।••• —আমার সাহায্য ! প্রথমতঃ আপনি বস্তিতে ঢুকলেই ত’ একদল কুকুর ডাকাডাকি আরম্ভ করবে তারা দেখবে আপনি ভয়ানক নতুন লােক, আপনি কিভূত কিমাকার—আমি ত ঘরে খিল দিয়ে ত্রাহি মধুসূদন করবাে- বলতে বলতে অনু তার হাতের মুঠো দুটো বুকের কাছে জড় করে তার সেই ‘ত্রাহি মধুসূদন’ ভাবটা ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করে আর হাসে। বেশ ত, তােমাদের এখানে অন্তত একটা নতুন কিছু হবে। রাগের ভাব দেখিয়ে বলে অশােক। রাগ করতে ভাল লাগছে তার।—সে নাই হােক তােমাকেও কিছু কিছু কাজের ভার নিতে হবে, আমি দরখাস্ত পাঠিয়েছি:••লােকজন শিগগীরই এসে পড়বে...আমার এ্যাসিসট্যান্ট এসে এখানে একটা ওষুধের দোকান খুলবে।

—দেশশুদ্ধ লােক ওষুধ আর অসুখের কথাই বলছে..কিন্তু খেতে না পেলে যে অসুখও সারে না, ওষুধও ধরে না একথা বলছে না কেন? —খেতে যদি না পাও, কেড়ে খেতে পারাে না কেন? বিলেতে দুর্ভিক্ষ হয় , কেন জানাে ?—সেখানকার লােক খাবার না পেলে লুটপাঠ করে খেতে জানে। তারা শুধু মার খেয়ে মরে না। তারা মরবার আগে মেরে মরে। বলতে বলতে অশােকের ঠোঁট দুটো বীরত্বের গর্বে কাঁপতে থাকে। দুবছর আগেকার সব স্মৃতি জ্বল জ্বল করে ওঠে মনে। কেড়ে খেতে দেখে নি ও ওদেরকে...কিন্তু চোখ ভরে দেখে এসেছে ঐশ্বর্যের সমারােহ। পিকাডেলি... ব্রিষ্টল সব যেন ভীড় করে আসে চোখের সামনে।••• অনু আরও বেশি করে হাসে। হাসি ত নয় হাসির আগুন! অনু বলে, আপনার কথা শুনলে হাসি পায়। একটা জাতের শরীর থেকে আড়াই শশা বছর ধরে রক্ত শুষে নিয়েছে তারা বরং ফুটপাথে খাবারের দোকানের তলায় পড়ে না খেয়ে মরে তবু হাত বাড়িয়ে লুঠ করে খাবার শক্তি খুঁজে পায় না। -তাই বলে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবাে তুমি বলতে চাও? বাড়ের মত বলে অশােক কথাগুলো ! মনে মনে সেও হাসে এইবার। অশিক্ষিত বস্তির মেয়ে revolution এর তাৎপর্য বুঝবে কি করে ! অথচ ডলি কত সহজে বােঝে ওর কথাগুলাে। কি ও বলতে চায়। অনু যে ওকে বােঝে নি তা নয়। অন্ততঃ ওর শেষের কথায় তাই মনে হয়। ব্যাপারটাকে এড়িয়ে যাবার জন্যে চট করে ও বলে, না তা বলিনে, তার চেয়ে বরং দু’শিশি ওষুধ এখানে খেতে দিয়ে যান...দুটো টাকা দান করে যা কিছু কাজ হবে। তারপর গরীবের লােভ বেড়ে ওঠবার আগেই সুখ্যাতি আদায় করে গা-ঢাকা দেবেন, পথ খােলাই আছে। দেখতে দেখতে খবরের কাগজে বড় বড় হরপে নাম উঠবে ! বলবে মস্ত বড় দেশ নেতা—বলবে দেশের প্রাণের বন্ধু

আশ্চর্য, অনু এবার হাসছে না একটুও। মুখটা তার অদ্ভুত রকমের শুখনাে ।
অশােকের ভাল লাগছে। হাসির মধ্য দিয়ে অনেক দূরে সরে যাচ্ছিল সে।
বিষণ্ণতার মাঝ দিয়ে এগিয়ে আসছে।
মৃত্যুর মধ্যস্থতা দিয়ে তাদের ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছে।
তাই এ বিষন্নতারও মূল্য আছে অনেক !
অশােক বলে, তুমি ঘা দিয়ে দিয়ে যদি আমাকে ভেঙ্গে তৈরী করে আমার
আপত্তি নেই।
অশােক আর দাড়ালো না সেখানে।
পাহাড়ের উচ্চতা থেকে নীচের সমতল মাটিকে বড় সবুজ দেখায়।
ঢেউ-খেলানাে সবুজের রােমাঞ্চ।
৩১

রায়বাহাদুর সেদিনই এসে হাজির হয়েছেন হরিচরণবাবুর বাড়ীতে। হেমনলিনী বলেছে ঠিক। ঠিক। ডলি অশােকের ব্যাপারটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলা ভাল। হরিচরণবাবু অনেকদিনের বন্ধু তার। কথাটা একবার পড়তে পারলে অন্যথা হবে না। হরিচরণবাবু আপন মনেই বসেছিলেন। হাতে একখানা বই ছিল বটে কিন্তু পড়ায় মন ছিল না। রায়বাহাদুরকে আসতে দেখে বর্তে গেলেন। -আরে শশধর যে এসসা এসো...মেঘ না চাইতেই জল !... -তা বটে, তবে জলটা প্রায় চোখের জলে এসে ঠেকলাে•••তারপর কেমন আছে? রায়বাহাদুর আর একখানা চেযারে গা এলিয়ে দেন। -যেমন তােমরা রেখেছে। পাঁচজনে। হাসিতে মুখটা ভরিয়ে বলেন হরিচরণ। ভাবটা এই যে মন্দ আর কি ? শাঁসে জলে আছি বেশ । -পাঁচজনে তােমাকে ভালই রেখেছে ভায়া..তবে আমার ঝামেলা পাঁচ রকমের ‘তুমি বিপত্নীক হয়ে বসে দিব্যি বয়েসটা একরকম কাটিয়ে দিলে । কিন্তু আমি যে ভায়া আমার বেতালা গিন্নীকে নিয়ে নাজেহাল হচ্ছি, তার কি করি বল দেখি ? চিন্তায় মুহ্যমান হয়ে বলেন রায় বাহাদুর। আসল কথাটা একেবারেই পাড়া যায় না। খানিকটা ভনিতার দরকার বই কি! গােড়ার থেকে ভেবে চিন্তেই এসেছেন তিনি আজকে। হরিচরণও একটু চিন্তিত হয়ে বলেন, বৌঠান আজকাল আছেন কেমন ? বেশ দিব্যি আছেন ! একটা সুবিধাজনক বাতের ব্যামাে নিয়ে বহাল তবিয়তেই আছেন••চারচাকার ঠেলাগাড়িতে চড়ে বাড়ীময় বো বো করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রায়বাহাদুরের কথার রকম দেখে হরিচরণ হাসেন। বলেন, তা ঠেলা- গাড়ীখানা তুমি নিজে ঠেললেই পারাে! বলে নিজের কথায় নিজেই হেসে উপভােগ করতে থাকেন। —তা হলেও ত বাঁচতুম ! কিন্তু তিনিই যে আমাকে ঠেলাঠেলি করছেন। হাসলেও রায়বাহাদুরের গলা বেশ নরম হয়ে আসে।—এই দ্যাখাে না ঠেলে পাঠালেন তােমার এখানে তার সখ হয়েছে মেয়ে-জামাই নিয়ে ঘর না করলে আর র দিন কাটছে না।••• দপ করে মুখের হাসি মিলিয়ে যায় হরিচরণের। গম্ভীর হয়ে তিনি বলেন, জামাই যে হবে, সে ত’ আজকাল কোমর বেঁধে তােমারই বস্তিতে ফিনাইল আর ব্লিচিং পাউডার ছড়িয়ে বেড়ায়। তােমার বস্তির ফাদে পড়ে গেছে হে- -তা হলেও ত বাঁচতুম ! না হয় গােটা দুই চাকর রেখে দিতুম তারা ফিনাইল পাউডার ছড়িয়ে বেড়াতাে!..কিন্তু আমার গােমস্তা হরিপদ যে অন্য কথা বলে!::: —কি বলে হরিপদ ? হরিচরণের মুখে ঔৎসুক্যের উত্তেজনা ! —আমার মুখ থেকে তুমি এ কথা শুনবে? এ আমারই লজ্জা! মাথা নীচু করে বলেন রায়বাহাদুর-বন্তির একটা মেয়েই নাকি অশােককে দিয়ে এই সব ভূতের ব্যাগার খাটাচ্ছে। —মেয়ে ! হাত থেকে ধপ করে বইখানা পড়ে গেল হরিচরণের । -হ্যা। এক আধ-পাগলা পণ্ডিত ছিল ওখানে আমার ভাড়াটে...তারই মেয়ে! মেয়েটা নাকি খুব চটকদার কথা বলে । —ই। তাহলে এর পেছনে ..আসলে এই ব্যাপার ! রীতিমত গম্ভীর হয়ে পড়েন হরিচরণ।

ইতিমধ্যে শােভা এসে ঘরে ঢােকে। এবং রায়বাহাদুরকে দেখেই বলে, এই যে মেসােমশাই...কি ভাগ্যি যে পুরণাে বন্ধুকে মনে পড়লাে! -সে কি মা? হাসির রেখা টেনে এনে বলেন রায়বাহাদুর!—আমি এলুম কন্যেদয় গলায় বেঁধে.••তােমাদের পাঁচজনের চেষ্টায় এখন ডলি অশােকের হাত দুখানা মেলাতে পারলেই বাঁচি। রায়বাহাদুরের কথায় শােভা উৎসাহিত হয়ে ওঠে। বলে, কাল অনেক রাত পর্যন্ত আমি আর বাবা অশােকের সঙ্গে অনেক বিতণ্ডা করেছি মেলােমশাই কিন্তু আমার ভাইটিকে জানেন ত ? আমরাই তর্কে হার মেনে চুপ করে গেলুম। আর বাবার কথা:::লবকুশের কাছে হার মেনেও ত রামচন্দ্রের আনন্দ! রায়বাহাদুর কিছু বলেন না। হাসি থামিয়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে পড়েন। হরিচরণ বলেন, কি জানাে ভায়া বড় লােকদের ধরে দুটো সস্তা গালাগাল দিতে পারলে এযুগে তার খুব কাটতি মেয়েটা বােধ হয় সেই বাজি খেলতে বসেছে... আর সেই ফাঁদে পা দিয়েছে তােমার ঐ ভাবী জামাতা বাবাজী। রায়বাহাদুর মুখ তােলেন না। মুখ নীচু করে কি যেন ভাবতে থাকেন আপন মনে। শােভা বােঝে ওঁর মনের অবস্থাটা। তাই বলে, আপনি বিশ্বাস হারাবেন না...বাবার শিক্ষায় অশােক মানুষ হয়ে উঠেছে: কোনদিন সে ছােট হবে না...ছােট কাজে কোনদিন সে নামবে না। -সে বিশ্বাস আমারও আছে মা!•••যাই হােক ভায়া আজ আমি উঠলুম•••তােমার আমার বহুদিনের ইচ্ছে ডলির সঙ্গে অশােকের কাজটা হয়ে যায়•••হয়ে গেলে আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।•••আচ্ছা আজ তবে আসি••• উঠে পড়েন রায়বাহাদুর। পায়ের তলার মাটিটা কঁপছে। বরাবর পায়ের নীচে শাসন করে আসা গেল যাদের তারা আজ বুকের মধ্যে কাপন ধরায়। ৬৪ অনেক দিনের ঘুমিয়ে থাকা বাসুকী ফণা ধরে মাথা তুলছে। পৃথিবীটা কঁপতে কাঁপতে চৌচির না হয়ে যায় ! } সেদিনই অশােককে পেয়ে গেলেন হরিচরণ তার পড়ার ঘরে। অশােক বসে বসে তার ডাক্তারী বইগুলাে নাড়াচাড়া করছিল। হরিচরণকে ঢুকতে দেখে তাড়াতাড়ি উঠে দাড়ালাে। হরিচরণ কাজের কথাই বলতে এসেছিলেন। তাই একেবারেই কাজের কথা পড়লেন। বললেন, এ আবার তুমি কি গণ্ডগােল পাকিয়ে তুললে অশোেক। অশােক জানত এই বস্তির ব্যাপার নিয়ে একদিন না একদিন তার বাবার সঙ্গে আলােচনা ও কথা কাটাকাটি হবেই। কাল রাত্রেই যে সব আললাচনা হয়েছে তাতেই খানিকটা ইঙ্গিত রয়ে গেছে, খােলাখুলি ভাবে কথাটা এগােয় নি এইমাত্র ! তাই হরিচরণের এই অস্পষ্ট প্রশ্নের অর্থ আন্দাজ করতে একটুও দেরী হল না অশােকের। তবু নিতান্ত সহজ ভাবে প্রশ্ন করলে, কি বাবা? -ওই যে শশধর কি সব বলছিল••তুমি যেন কোথায় নিজের হাতে ফিনাইল ছড়াতে যাও•••এ কি কথা? -ও সেই কথা। ছেলেমানুষের মত হেসে নেয় অশােক বিষয়টা হালকা করে ফেলবার জন্যে। আপনার বন্ধু যদি তার বস্তিটি একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখেন তাহলে আর আমাদের ব্যাগার খাটতে হয় না বাবা। হেসে বললেও, কথাটা ঠিক একেবারে হেসে উড়িয়ে দেবার মত নয়। হরিচরণ বাধা দিতে পারেন না। অন্য দিকে চেয়ে বলেন, তা তুমি ঠিক বলেছাে•••এ ত খুব সহজ কাজ! তার নিজের নােংরা নিজেই সাফ করুক কেন! আচ্ছা আমি বলে দেবে শশধরকে•• তুমি আর সেখানে নাই বা গেলে! —আমি ডাক্তার! বস্তিতে যদি ডাক পড়ে আমি কি যাবে না আপনি বলতে চান? অশােক খুব নরম অথচ দৃঢ় স্বরে প্রশ্ন করে বসে সােজাসুজি। প্রশ্ন এ নয়, উত্তরের নামান্তর মাত্র। হরিচরণ একরকম বাধ্য হয়েই মাথা নাড়েন। বলেন, হ্যা তাও ত বটে না গেলেই বা চলবে কেন? তবে কি জানাে নােংরা জায়গা নােংরা লােক..মানে তুমি বড় একজন ডাক্তার তােমার মান সম••• অশােক হঠাৎ ডাকে, বাবা । হরিচরণ বাবু মুখ তুলে তাকান অশােকের মুখের দিকে। অশােক কি বলতে চায় তার মুখের আলােতেই বুঝি ধরা পড়বে। অশােক বলতে থাকে, গরীব বেচারাদের বুন্তিতে ঢুকে যদি একটু আধটু উপকার করা যায় তাতে কি মান সম্রম নষ্ট হয়? -না মােটেই না। ইতস্তত না করেই বলে ফেলেন হরিচরণ। ছেলেকে একেবারে চটিয়ে দিয়ে লাভ নেই। এখুনি হয়ত যুক্তি দিয়ে বক্তৃতা দিয়ে একেবারে কোসঠাসা করে দেবে তাঁকে। নতুন হাওয়া বইছে আজকাল। সে হাওয়ায় পুরণাে জীর্ণ দেহ সব শিরশির করে ওঠে।•••তাই হরিচরণ বলেন, মােটেই না—এ ত ঠিক কথা..আমি শশধরকে বুঝিয়ে বলবাে•••তার সঙ্গে যদি দেখা হয়— একশােবার ঠিক কথা!... উনি বস্তির মালিক••বন্তির ভাড়া নিয়মিত পেলেই খুসী, বস্তির চেহারা একটু ভালাে হক এ গরজ ওঁর নেই। অশােক আপনমনে তন্ময় হয়েই যেন বলে চলে। সমস্ত পারিপার্শ্বিকের উজল পরিবেশকে অতিক্রম করে সে বস্তির অন্ধকার গর্ভের ছবি দেখছে যেন ••• হরিচরণ একটু ব্যস্ত হয়ে বলেন, না না তা আছে•••গরজ ওর খুব আছে ও যে বললে লােক রেখে ফিনাইল ছড়াবার ব্যবস্থা করে দেবে। তবে সবার আগে শশধর ডলির বিয়েটা সেরে ফেলতে চায়... আমি ওকে খানিকটা কথাও দিলুম...। আমি শশধরকে সব কথাই বলে পাঠাবো। আরে এই 'যে শােভা এসাে মা এসাে•••ভালই হল তুমি এসে পড়লে.••ভাইয়ের সঙ্গে বােঝা পড়া করে ফেললা:•• শােভা এদিকে আসছে দেখে অশােককে শােভার সামনে ঠেকিয়ে দিয়ে হরিচরণ বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। ? প্রথমটা এক চোট হেসে নিল শোভা আপন মনে। অশোক কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল, শােভার এই হঠাৎ হাসিতে কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেল। শােভা বললে, হঁারে আড়াল থেকে মেসােমশায়ের কথা কিছু শুনেছিলি? বলতে গিয়ে শােভা হাসে। অশােক ঘাড় নাড়ে সম্মতির দিকে। সঙ্কোচ করে না একটুও। -কি বল দেখি -কি আবার ? হাসতে হাসতে বলে অশোক। কাক উড়ে এসে আমার কান দুটো টেনে নিয়ে গেল.••আর তােমরা দৌড়চ্ছ কাকের পিছনে। বটে! শােভা কৃত্রিম রাগের ভঙ্গীতে বলতে থাকে—সত্যি বল্ , বস্তিতে একটি মেয়ে আছে কি না ? অদ্ভুত প্রশ্ন। বস্তিতে মেয়ে থাকবে সে আর নতুন কথা কি। গণ্ডা গণ্ডা মেয়ে আছে ওখানে। তবু অশােকের একটি মেয়ের কথাই মনে পড়ে যায়। অনেক তারায় ভরা আকাশে একটি চাঁদের মত উজল । তবু অশােক উপহাস করতে ছাড়ে না। সােজাসুজি উত্তর এখানে দেওয়া চলে না। বলে, পৃথিবীর কোন বস্তিতে মেয়ে নেই? অশােক প্রশ্নটা ঘােরাতে চেষ্টা করলে কি হবে, শােভা সােজাসুজি প্রশ্ন করে বসলাে। চাপা হাসির সঙ্গে বললে, হ্যা রে তুই তার ফাদে পড়িল নি ত ? অশােক কথায় হারবার নয়। বলে, মেয়েরা ফাদ পাতে একথা তােমরাই বল দিদি আমরা বলি না... -যাক্ শােন বলি..বাবা আর মেসােমশাই দুজনেই তাড়া করছেন ওরা একটা দিন ঠিক করুন•••তাের মত আছে ত? শােভা শুধু হাসির ছলেই বলছে না এবার, ওর স্বরে খানিকটা গাম্ভীর্যের আভাষ । অশােক কিন্তু তবু হাসে। বলে, পাত্র পাত্রী কেউ পালাচ্ছে না মতও কারাে বদলায়নি...শাঁখ টোপর ধুতি শাড়ী সবুই পাওয়া যাবে ব্ল্যাকমার্কেটে। দুদিন দেরী করলেও পাজীতে আরাে অনেক তারিখ আছে••• শােভা এবার হাসে। না হেসে পারে না অশােকের কথা শুনে। বলে, তাের সঙ্গে কিছুতেই কথায় পেরে উঠব না।••• ৮ রায়বাহাদুরের বাড়ীর উপরতলায় বৈঠক বসেছে রােজের মত। আজকের আসরটা ঘােয় । তাই উপস্থিত লােকের সংখ্যা অল্প। কেবলমাত্র নিখিল ভলি আর হেমনলিনী। নিখিল সবেমাত্র এসেছে। এসে প্রথম নজরেই হেমনলিনীকে বলে উঠলাে, আজ আপনাকে খুব সুস্থ দেখাচ্ছে, মানে খুব bright মিসেস চৌড়ি । হেমনলিনী কিন্তু মােটেই প্রসন্ন হন না কথাটা শুনে। ব্যারিষ্টারের ছ থেকে স্বাস্থ্য সম্বন্ধে সার্টিফিকেট পাওয়ার কোন মূল্য নেই তার কাছে। বলেন, তুমি ত বাবা ডাক্তার নও, তােমার কথায় ভরসা পাই নে।

নিখিল মনে মনে একটু ক্ষুন্ন হচ্ছে দেখে ডলি হঠাৎ মুখের ওপরই প্রশ্ন করে বসে, আমাকে দেখাচ্ছে যেমন নিখিলবাবু? ও কোণের কোচের গর্ভ থেকে শরীরটাকে তির্যকভাবে বাঁকিয়ে এক বিচিত্র ভঙ্গীতে লক্ষ্য করছে ডলি নিখিলকে ! প্রশ্নের খোঁচাটা শুধু ওর মুখে নয়, ওর ভঙ্গীর মধ্যেও। নিখিল ডলিকে ভাল করে দেখতে কেমন একটু লজ্জা পায়। তবু জোর করে বলে, Oh, God, মায়ের সামনে আমাকে লজ্জায় ফেলতে চাও তুমি- ভলি হাে হাে করে হেসে ওঠে। তার নিজের দেহভঙ্গী সম্বন্ধে নিজেই সে যথেষ্ট সচেতন হয়ে উঠেছে! নিখিলকে লজ্জা দেবার জন্যেই বােধ হয় ডলি বেশী করে হাসে। এমনি সময়েই অশােক এসে ঢােকে দরজা দিয়ে। অশোকের সাজগােজ ফিটফাট! সেজেগুজে আসর জমাতেই এসেছে সে আজকে। নিখিল ওকে প্রথম receive করে। সকল সময়েই ওর সপ্রতিভ ভাবটা লক্ষ্য করবার মত! এগিয়ে গিয়ে নিখিল বলে, এসাে ডাক্তার-good evening! হেমনলিনী কোচের মধ্যে নেচে ওঠেন আনন্দের আতিশয্যে। বলেন, এই যে অশােক••এসসা বাবা তােমার জন্যেই বসে আছি অশােক হাসতে হাসতে বলে, আজ কিন্তু এসেছি ঠিক কাঁটায় কাঁটায়- —আজ তেরাে মিনিট দেরী হলে মা কি আর বাঁচতেন ? ডলি, ওপাশ থেকে বলে ওঠে হাজাি ফাকে ফাকে। খুব তাড়াতাড়ি কথা বলা অভ্যেস, ডলির। তাই হাসির সঙ্গে সঙ্গে ও যখন কথা বলে ঝরণার ফেনিল জলের মত মনে হয় ওকে অশােকের। কী যে ভালাে লাগে তখন ওকে দেখতে। অলােক তাই ডলির দিকে একবার না তাকিয়ে পারে না। ভরা সে দৃষ্টি। অনেক অর্থে চকিত হলেও নিখিলের দৃষ্টি এড়ায় না অশােকের এই ভাব পরিবর্তন। নিখিল বলে, মানে উল্টো কথাটাও আছে। শশাকের দিক থেকে বলছি... এক মিনিও দেরী করতে পারে না অশােক—বলতে বলতে আড়চোখে লক্ষ্য করে নেয় ও ডলিকে, অশােককে। অশােক বিচলিত হয়। ডলির কি হয় বােঝা যায় না। অশােক বলে, কী বকছে। নিখিল পাগলের মতন...| এগিয়ে যায় ও হেমনলিনীর দিকে। পরীক্ষা করবার জন্যে। নিখিল বলে, বকছি নে ডাক্তার:••a stock of. laugh হেসে নিচ্ছি দুদিন বৈ ত নয়। তােমরা যেদিন হাসবে না•••আমি সেদিনও হাসবাে••• সেদিনও হাসবাে—বলতে বলতে নিখিল উঠে দাড়ায়•••টুপিটা তুলে নেয় স্ট্যাণ্ডটা থেকে। অশােক বলে, বেশ কাজ বেছে নিয়েছাে ত ? —হ্যা কাজটা মন্দ নয়...লােক হাসাবার কাজ। এতে পুরস্কার নেই... মজুরিও পােয় না•••শুধু লােকে হাসে। নিজেকে সঙ সাজিয়ে লােক হাসানােও ভাল কিন্তু মিছিমিছি তাদের কাঁদিয়ে কোন লাভ নেই ডাক্তার। নিখিল চলে যায় ঘর থেকে। অদ্ভুত আজ তার কথা বলার ধরণ। অদ্ভুত চলে যাবার ভঙ্গী। কেউ একটা কথা পর্যন্ত বলে না। নিখিলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে এক মিনিটের মধ্যে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে অশােক।•••ডলি তার কিউটেক মাখানো পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটা ম্যাটিংয়ের নক্সার ওপর দিয়ে বুলােতে থাকে। মুষলধারায় বৃষ্টি হতে হতে হঠাৎ থেমে গেলে কেমন যেন থমকে পড়ে আকাশটা ! হেমনলিনী স্তব্ধতা ভঙ্গ করেন। বলেন, বাবা অশােক•••তােমার মনের কথা না পেলে আমার পায়ের ব্যথা কিছুতেই সারবে না। *৭০ ডলির হাসির অস্পষ্ট আওয়াজ শােনা যায়। সেই সঙ্গে সঙ্গে কথা। দেখেছো, মা তােমাকে বিশ্বাস করেন না। ফেনিল ঝর্ণাজলের দিকে তাকায় অশােক। হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার মুখখানা। বলে, এ যুগের ছেলেমেয়েরা অনেক সময় যে অবিশ্বাসের কাজ করে মায়ের দোষ কি? অশােক আবার হেঁট হয়ে পরীক্ষা করতে থাকে হেমনলিনীকে। ডলি বলে, তুমি কোন যুগের ? -আমি? চিনতে পারা কঠিন। -তাহলে এটা তােমার ছদ্মবেশ বলে । অশােকের ঘনে হয় একবার মুখ তুলে ডলির মুখখানা দেখে, আবার কি মনে করে মুখ তােলে না। হেঁট হয়েই জবাব দেয় ডলির কথায়। বলে, ছদ্মবেশটা খুলে ফেলেছি...তাই তােমরা চিনতে পারছে না-এমনও ত’ হতে পারে। —পুরুষের পােষাকটা বড় তাড়াতাড়ি বদলায় ! ডলি না থেমেই জবাব দেয়। বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ম্যাটিং ঘষার একটা অস্পষ্ট আওয়াজ শােনা যাচ্ছে। অশােক ইচ্ছে করেই এ কথার জবাব দেয় না। বরং হেমনলিনীর দিকে চেয়ে আগ্রহের সঙ্গে বলে, বেশ আছেন আপনি কোন ভাবনা নেই...। হেমনলিনী সুযােগ ছাড়েন না। বলেন, বাবা, অশােক...আমার যে বড় সাধ তুমি ত জানাে সব...তেরাে মিনিট দেরী হলে যদি বা বাঁচি তেরাে বছর দেরী হলে যে একেবারে অক্কা পেয়ে যাবাে বাবা... বয়েস হলে কি হয় হেমনলিনী বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারেন এখনও। অশােক ওঁর কথায় শুধু হেসে নেয় খানিকটা কোন জবাব দেয় না। তারপর ব্যাগটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে ধীরে ধীরে। ঘন অন্ধকার রাত্তিরে ঝর্ণার ধারে বসে থাকলে জলশকে বুকের ভেতর ৭১ কেমন একটা অজানা ভয় থমথম করতে থাকে। ডলির মুখে তেমনি ধরণের একটা থমথমে ছায়া। আহত মুখে বসে থাকে ও চুপ করে। বরাবর লাইব্রেরী ঘরের সামনে দিয়ে সিড়ির দিকে চলে আসছিল অশােক। লাইব্রেরী ঘরে রায়বাহাদুর বসে কি যেন পড়াশুনাে করছিলেন। অশােককে দেখে ডাক দেন, তােমাকেই খুঁজছিলুম অশােক ! : দাঁড়াতে হয় অশােককে। ইচ্ছে না থাকলেও। ইচ্ছে না থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ অশােকের আন্দাজ করতে দেরী হয় না একটুও যে কী ধরণের কথাবার্তা তাদের মধ্যে হতে পারে। তবু অশােক দাড়ায়। বলে, বলুন! রায়বাহাদুর কাজের লােক। হরিচরণের সঙ্গে ভনিতা করলেও অশােকের সঙ্গে কোনরকম ভনিতা না করেই সােজাসুজি বলে বসেন, নানা লোকে নানা কথা বলে, তুমি আর ঐ বস্তিটায় যেয়াে না বাবা! অশােক না হেসে পারে না। সহাস্যে বলে, আমাকে নাবালক মনে করেছেন আপনারা ! এটা ভুলে যান যে আমি ডাক্তার ডাক পড়লে যে কোন জায়গায় যেতে হবে। দরজার পর্দার আড়ালে বাইরে থেকে আর একটা ছায়া নড়ে ওঠে ডলি। ওরা কেউ লক্ষ্য করে না ডলিকে। অন্যায় হলেও, কৌতুহল দমন করতে না পেরে ডলি উঠে এসে দাড়িয়েছে। রায়বাহাদুর বলেন, কিন্তু ওখানে তুমি আনাগােনা করলে কত লােক কত কথা রটায়—মানে এ বাড়ীতে তােমার যাতায়াত আছে কিনা —এ বাড়ীতে যাতায়াত থাকলে যে বস্তিতে গিয়ে কোন কাজ করা যায় :••এ আমি জানতুম না। দৃঢ় অথচ সাবলীলভাবেই বলে চলে অশােক। ডলির ছায়াটা নেপথ্যে আবার দুলে ওঠে। ডলি দাড়ায় না আর ওখানে। সরে যায় অন্য দিকে। ক ৭২ ওঠে। -রাগ কোঁর না অশােক। একটু স্নেহভরে বলেন রায়বাহাদুর-রাগ কোর না তুমি। ডলির কানে এ সব কথা উঠলে সে দুঃখ পাবে।••• -ডলির দুঃখ বাঁচিয়ে চলতে গেলে আমাকে অনেক কাজ বাদ দিয়ে চলতে হয়। আপনারা সবাই মিলে আমাকে আগলে না রাখলেই আমি খুশী থাকবে: ধৈর্যের সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে রায়বাহাদুরের ! দেহ মন উষ্ণ হয়ে গলার স্বরেও সে ঝাঁঝ ফুটে ওঠে। একটু গলা চড়িয়েই বলেন তিনি—কিন্তু তুমি ডলির সমাজের যােগ্য হবে এও ত’ আশা করি এই মুহূর্তেও অশােক হাসে। বহু দুঃখ আর মৃত্যুর শূন্যতার মাঝে সে হাসির উৎস খুঁজে পেয়েছে। তাই এই অনুচ্চারিত হাসি বড় সহজ। একটুখানি হাসির রেশ বজায় রেখেই অশােক বলে, ডলির সমাজের কিসে যােগ্য হওয়া যায় আমি জানি নে, জানবার চেষ্টাও করি নে•••সময়ও কম!••• আচ্ছা আসি.'নমস্কার !••• রায়বাহাদুর ঠক ঠক করে কাপেন। রাগে নয় দুর্বলতায়ও বটে। সমস্ত পৃথিবীটা বুঝি সুর্যের কক্ষচ্যুত হয়ে যাচ্ছে ! অশােক বেরিয়ে আসে বাড়ী থেকে। সামনে মখমলের মত চকচকে নরম লন। অদূরে টেনিস কোর্ট! আশেপাশে ফুলের স্তবক ! অশােক দেখছে কিছুই। বস্তির অন্ধকার কী ভীষণ। আর সেখানকার সেই বিষাক্ত হাওয়া মানুষের নােংরা গা আর নােংরা কাপড়জামার ভ্যাপসা গন্ধ আর নর্দমার পচা জল...অশােকের দম আটকে ' সিছে !... ওদিকে একটা ক্রিসেস্থিমামের ঝােপ। এই লালচে ক্রিসেন্থিমাম ডলির খুব প্রিয়। লালচে ক্রিসেস্থিমাম বড় একটা দেখা দেখা যায় না। ডলির পছন্দ - বলে অনেক কষ্টে সংগ্রহ করে লাগানাে হয়েছে। কতদিন এই ঝােপের ধারে ডলিকে দাড়িয়ে থাকতে দেখেছে সে। তাই আসতে যেতে ক্রিসেন্থিমামের ঝােপের দিকে নজরটা তার আপনার থেকেই পড়ে। তার মাঝে ভলিকে ত সে দেখে না। দেখে সেই ঝর্ণার ফেনিল জল আর তার ধারে ধারে ছোেট ছােট লাল ক্রিসেন্থিমামের চুমকি ডলি আজ নেই সেখানে। অশােক এগিয়ে আসে। ড্রাইভটা ঘুরলেই গ্যেটের মুখে এসে পড়বে।••• ড্রাইভের বাঁকেই ডলি দাড়িয়ে। ওকে দেখে এগিয়ে আসে সাজাসুজি। অন্যদিন ক্রিসেন্থিমামের বােপ ঠেলে ডলি আসতাে। ফুলের ডাল গুলাে দুলতে কিছুক্ষণ। আর আজ নেহাৎ ফাকা ফাকা ঠেকে অশােকের। ডলি তাড়াতাড়িই এগিয়ে আসছে। শান্তিনিকেতনী চটিটার ফাক দিয়ে কিউটেক্স লাগানাে বুড়াে আঙ্গুলটায় কখন যে হঠাৎ এক ফালি সূর্যের আলাে এসে পড়ে চকচক করে উঠলাে অশােকের দৃষ্টি আলগােছে তার ওপরই গিয়ে পড়ে।•••সবই নতুন লাগছে আজ। ডলি বলে, কি যেন বড় বড় কথা হচ্ছিল তােমাদের? -ওঃ মস্ত মস্ত কথা। অশােক হাসে।আমি আজকাল খুব মস্ত পণ্ডিত হয়ে উঠেছি জানাে ডলি ?••• -খুব জানি। পণ্ডিত বলেই ত’ এত ঝগড়াটে। 'এত ঝগড়া শিখলে কোখেকে ? ছেলেমানুষের মত আবদারে সুরে বলে ডলি। -আমার নামে এত গুজব-আর ঝগড়া কোখেকে শিখলুম শােন নি ? ইচ্ছে করেই খােচা দিয়ে বলে অশােক। -তুমি আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছ অশােক।•••ঝর্ণা নয়, খুব শীতল শান্ত হ্রদের মত ডলির স্বর। সম্ভব! মানুষ বদলায় তার পথও বদলায়। —তােমার এ কথার মানে কি অশােক ? ডলি একটু ব্যাকুল, একটু উষ্ণ! ৭৪

-বুঝতে চাইলে মানে খুব সােজা !
অশােক যেন আজ শুধু ঝগড়া করবেই।
—কিন্তু তােমার বস্তিতে যাওয়া আমার পছন্দ নয়। আমারও
কথাটার ওপর ডলি তার সমস্ত অন্তর দিয়ে চাপ দেয়।
—তােমাকে পছন্দ করতেই হবে, এমন কথা বলি নি।
-তার মানে তুমি আমার কথা শুনবে না!
-বাবার কথাও শুনি নি।
অল্প হাওয়া লেগে ক্রিসেন্থিমাম অল্প অল্প দুলছে। অশােক সেইদিকে
চেয়েই বলে।
তবু আমার কথা তােমাকে বলে দিচ্ছি...তােমার বস্তিতে যাওয়া:
সেখানে মেয়েছেলের সঙ্গে মেলামেশা আমার একেবারেই মত নেই।
সম্পূর্ণভাবে চেয়ে আছে ডলি অশােকের চোখের দিকে।
ক্রিসেন্থিমামের এত আলাে আছে কি যে অতদুর থেকে অশােকের চোখে
পড়বে?
-আর কিছু বলবে?
-আর তুমি আমার মান খােয়াবে•••এ আমি সইবাে না !
ডলি মুখ তুলে দেখলাে অশােক নেই। গ্যেটের দিকে এগিয়ে গেছে ।
দমকা হাওয়ায় ভেজানাে দরজা হঠাৎ খুলেই আবার দুম্ করে বন্ধ হয়ে
যায়। সেটা হাওয়ার গুণেই।

অনু কিছুতেই বুঝবে না। ওর ধারণা অশােকের এই পরিকল্পনা কার্যকরী
হবার নয় !
অশােক বােঝাচ্ছে অনুকে। এক গাদা কাগজপত্র বের করে বলে, এই
দেখাে আমাদের কাজের মােটামুটি খসড়া.••আর দরখাস্তের কপিগুলাে সব
দেখাে। দরখাস্তগুলাে সব কর্পোরেশনে পাঠিয়ে দিয়েছি।
-এসব কাজের বিপদ কি জানেন? বিজ্ঞের মত প্রশ্ন করে অনু।
বিপদ কিসের?
এদের লােভ আপনি বাড়িয়ে তুলছেন•••এরপর এদের ক্ষিধে মেটাতে
পারবেন ?
তাই বলে এই নােংরামির মধ্যে চুপচাপ তােমরা সবাই বসে থাকতে
চাও কেমন? অনেককাল মুখ বুজে পাকে পড়ে আছে, এবার একটু চেষ্টা
করেই দেখে না। কৃত্রিম রাগের সঙ্গে বলে অশােক।
বাইরে থেকে লােকের কোলাহল শােনা যায়।
—গােলমাল কিসের? প্রশ্ন করে অশােক।
-আপনার ওষুধের দোকানে ভীড় লেগেছে মালপত্র এসে গেছে
বােধ হয়।
-তাই নাকি? এসাে দেখি ত একবার!
ওরা দুজনে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে।
কিছু কিছু জিনিসপত্র এসে গেছে এর মধ্যেই বড় বড় ফিনাইলের টিন।
ব্লিচিং পাউডারের প্যাকেট।

একটি লােক অনভ্যস্ত হাতে ফিনাইলের টিন নিয়ে উপুড় করে দেয় এক জায়গায়। উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে ফিনাইল গড়িয়ে যায় খানিকটা। সামান্য একটু গলে, বাকিটা তেলের মত গড়ায়। অশােক চেঁচিয়ে ওঠে। আরে না না না অমন করে ফিনাইল দেয় ? -আজ্ঞে বাবু থতমত খেয়ে যায় লােকটা। অশােক এগিয়ে এসে টিনটা তুলে ধরে। বলে, আগে জলে খানিকটা ঢেলে গুলে নিয়ে তারপর ছিটিয়ে দিতে হয়। আরে আরে তুমি আবার পাউডার নষ্ট করছে কেন এমন করে ? জাননা আজকাল ব্লিচিং পাউডার পাওয়া যায় না ? একটা লােক মুঠো মুঠো করে ছড়াচ্ছিল সে-ও দাড়িয়ে পড়ে বােকার মত। অশােক এগিয়ে গিয়ে তার হাত থেকে পাউডারগুলাে কেড়ে নিয়ে নিজে ছড়িয়ে দেখিয়ে দেয়। ছড়াতে ছড়াতে বলে, তােমাকে একবার দেখিয়ে দিয়েছি না..মনে থাকে না কেন? -আজ্ঞে ডাক্তারবাবু সাত জন্মে চোখেও দেখি নি...মনে থাকবে কেমন অনু এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছিল। কোন কথা বলে নি। লােকটার বলার ধরণ দেখে বলে, দেখাে খেয়ে ফেললা না যেন! সকলে হেসে ওঠে চারিদিক থেকে। এমন সুস্থ হাসি হাসে নি অনেকদিন ওরা। অশােক হাসে। হাে হাে করে হেসে ওঠে ধমক দিয়ে। ক্রিসেস্থিমামের মত লালচে সে হাসি ! ওদিকে দুটি নীচু স্তরের স্ত্রীলােক কি যেন বলাবলি করে! একজন বলে, আ ম বলছি যে ওগুলাে পাউডার••• আর একজন বলে, একটু মেখে দ্যাখ না কেন লা !

-দাড়া দেখি । এদিক ওদিক তাকিয়ে পা টিপে টিপে এগিয়ে আসে ও তারপর এক খাবলা পাউডার তুলে নিয়ে গা ঢাকা দেয়। কেউ লক্ষ্য করে না ওকে। করবার ফুরসৎ নেই কারও। সকলে তখন এক অজানা আনন্দে মেতে উঠেছে । ঐ শাদা পাউডার শাদা ফিনাইল গােল জলের মত শাদা হয়ে আসছে যত কিছু কালাে !•••••• অশােক ওদিকে হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি জুড়ে দিয়েছে। কে একজন নর্দমা মাড়িয়ে ঘরে ঢুকছিল। তাকে দেখে চীৎকার করে ওঠে অশােক—বলি ওহে কর্তা নর্দমা মাড়িয়ে ঘরে ঢুকছে যে.. পা ধােও! -এই যে ধুই। লােকটা বাধ্য হয়েই পঁড়ায়। অনিচ্ছা থাকলেও অশােকের হুকুম অমান্য করতে সাহস করে না কেউ আজকাল ! লােকটা এগিয়ে আসে অশােকের দিকে। বলে, আচ্ছা ডাক্তার বাবু চারটি বড় আমাকে দিতে পারেন ঘরের চালটা ছেয়ে নেবব... -খড় দেবাে চাল দেবাে••কাপড় দেবাে••• ওষুধ দেবো...সবই চাও বুঝি ? কাজ করতে পার না? অশােক রীতিমত ধমকে ওঠে। মানুষগুলাে তার হাতের মুঠোর মধ্যে•••এমনি মনে হয় আজকাল ? -আঁজ্ঞে কাজ করলে ত সবাই পায়...না করে পেলেই ত লাভ! লােকটা নেহাৎ বেয়াড়া। অনু হাসতে থাকে ওর কথা শুনে। আড় চোখে অশশাকের দিকে তাকায়। হাসিটা অশোেককে উপলক্ষ্য করেই। অশােক বােঝে কেন অনু হাসছে। আজকাল অনু এত সহজ হয়ে এসেছে ওর কাছে। রেগে ওঠে ও ভয়ানক রকম। চীৎকার করে বলে, বটে, আমি এসে তােমাদের নােংরা ঘটবাে আর তােমরা চুপ করে বসে থাকবে? কাজ করলে বকশিস পাবে বুঝলে? ৭৮

লােকটা আর জবাব দেয় না। ঘাড় নেড়ে চলে যায় আপনার ঘরের
দিকে।
আর একটা লােক চট করে এগিয়ে আসে কোখেকে। চুপি চুপি বলে
ডাক্তারবাবু ও বেটা নাপতে ভারি চালাক...পয়সা কড়ি ওর হাতে যেন দেবেন
...মেরে দিয়ে চম্পট দেবে...
-তাই নাকি? অন্যমনস্ক হয়ে বলে অশােক।
তার চেয়ে আমাকে দিন দুটো টাকা•••দেখবেন আপনার এই বস্তিকে
একেবারে ঠাকুর ঘর বানিয়ে ছেড়ে দেবাে-
লােকটা যেন বিগলিত হয়ে ওঠে। নিজের কথায় নিজেই যেন উৎসাহিত
হয়ে ওঠে।
অশােক বলে, বেশ দেবে আগে নর্দমটায় বুরুশ লাগাও দেখি ?
-যে আজ্ঞে ।
বুরুশ ঘাড়ে করে দৌড়য় লােকটা। কিছু একটা সে যেন করে বসবেই,
আর একটা লােক ছুটে আসে অন্য দিক থেকে দেখলেন ত ডাক্তারবাবু
দেখলেন—আমি বলেছিলুম••• ওই যে হলধর চমপটি ওকে বিশ্বাস করবেন
•••আপনার ওষুধের দোকান থেকে এক শিশি কুইনাইন নিয়ে স্রেফ চম্পট:..
অশােক যেন হকচকিয়ে যায়। এর থেকে নিখিল রায়কে tackle করা
সহজ! রেগে মেগে বলে, আমরা
আমরা কতদিক সামলাবাে•••তােমরা চোখ
রাখতে পারাে না ?
লােকটা আপনার ঝোঁকেই বলে চলে, ওকে ধরলে কি আর স্বীকার
পাবে ? ও ভারি ধূর্ত বেচে মেরে দিয়েছে-
অনু ওদের চেনে। তাই মােটেই বিব্রত হয় না ওর কথায়। বরং উল্টে
ওকেই চাপ দেয়। বলে,
তুমিও যে সেদিন দুটো নতুন ঝুড়ি নিয়ে গেলে•••
কি করলে?

অনুর দেহ ঘিরে এক অপূর্ব দৃপ্ত ভঙ্গী। লােকটা এবার থতমত খেয়ে যায়।••• আজ্ঞে আমি চুরি ত করি নি•• শুধু না বলে নিয়ে গেছি। চাইবার আগেই আবার ফিরিয়ে এনে দেবে। বতে বলতে পিছু হটতে থাকে লােকটা। তারপর কখন নিঃশেষে মিলিয়ে যায় ভীড়ের মাঝখানে। অশােক হাসে হাে হাে করে। একমাত্র হাসি দিয়েই জয় করতে হবে এদেরকে। তবু মৃত্যুর মধ্যস্থতায় ওদের সঙ্গে সম্পর্ক। অশােক চেয়ে দেখে অনু অবাক হয়ে তার হাসির দিকে চেয়ে আছে। বস্তির মাঝখানে ক্রিসেন্থিমাম ফোটানাে যায় না কি ? হরিচরণবাবুর শেষ চেষ্টা চলেছে। যে করে হােক অশােককে ফেরাতেই হবে। তা না হলে সমাজে তার মান থাকে না। তাই ছেলে অশােক। তারই শিক্ষায় তারই নিজের বাড়ীর আবহাওয়ার মধ্যে তারই সমাজে কেন্দ্রীভূত হয়ে সে মানুষ—সে অশােকই আজ, নেমে যেতে বসেছে। ভাবতে গিয়ে অস্থির হয়ে ওঠেন হরিচরণ। ভাবাও যায় না ঠিকমত। কেবল একটা বেদনাদায়ক অনুভূতি মনটাকে খুচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে যেন। শােভাই একমাত্র অবলম্বন হরিচরণের। অশােকের মা নেই। মা থাকলে হয়ত অশােক এমনটা হয়ে যেতাে না। নিজেকে অত্যন্ত দুর্বল মনে হয় হরিচরণের।•••শােভার ওপর ভরসা করেই চেষ্টা করতে হবে তাকে।••• সকলেই আছে ঘরের মধ্যে। হরিচরণ আছেন, শােভা আছে, অশােকও আছে।•••আজকাল কেমন যেন যেন হয়ে গেছে ওদের সম্বন্ধটা। পরস্পর পরম্পরকে সন্দেহের চোখে দেখে মনে মনে। খুব উচু পর্দায় ঝঙ্কার দিয়ে বেজে উঠেছিল তারের যন্ত্রটা—তারই মাঝে হঠাৎ কোন একটা তার ছিড়ে গেছে। এত সূক্ষ্ম সে তার যাকে চট করে ধরা যাচ্ছে না ঝঙ্কারের মধ্যে... কিন্তু অনুভূতিটা আছে।••• ঐ একই সম্বন্ধে আলােচনা চলছে। আজকাল ঐ বস্তির ব্যাপারটাই তাদের আলােচনার একমাত্র বিষয় হয়ে উঠেছে।••• হরিচরণ একটু গভীর ভাবেই বলছেন, আমি খোঁজ নিয়ে দেখলুমও সব ঘােটলােকের জায়গা তুমি ওখানে গেলে তােমার মান থাকবে কেন? লােকে আমাকে নানা কথা বলছে- অশােক আজ আর হাসে না। হাসবার সময় নেই আর। বলে, একদিন আপনিও ত’ ডাক্তার ছিলেন বাবা । -হ্যা তা ছিলুম ! তবে ওসব নােংরা জায়গায় কখনও যাই নি। অতীতের আভিজাত্য-গর্বে হরিচরণের মুখ কেমন স্ফীত হয়ে ওঠে—তুমি বিলেত ফেরত ডাক্তার তােমার কত নাম•••কত বড় বড় লােক আসে তােমার এখানে তুমি যাবে কেন ওখানে অশােক ! হরিচরণের আভিজাত্য যেন আর্তনাদ করে উঠছে অলক্ষ্যে। বর্তমান রূপ নিচ্ছে। উচ্ছ্বসিত বন্যার মত প্রগলভ সে রূপ। অশােক অনমনীয় কণ্ঠে বলে, কিন্তু এ দেশটা গরীবের আপনি ত জানেন। এত নােংরায় ওরা পড়ে থাকে দেখলে লজ্জা করে। যদি ওদের জন্যে কিছু করা যায়- শােভা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। অশােক উত্তেজিত হয়ে উঠছে দেখে একটু স্নেহভরে বলে, তুই কেন যাবি ভাই ওদের মধ্যে...অন্য ডাক্তারও ত’ আছে। সকলের চোখে সব জিনিষ পড়ে না দিদি ! তােমাদের টাকা আছে, সুবিধে আছে তােমরা বেশ ভালাে করে বাঁচতে জানাে:..কিন্তু ওরা না বাঁচলে আমরা দাড়াবাে কোথায় বলতে পারে ? ৮১ হরিচরণ চমকে ওঠেন! এ যেন অশােক নয়, অন্য কেউ কথা বলছে কে ঠকিয়ে। হরিচরণ চীৎকার করে ওঠেন—এ আমি দেখছি তােমরা সবাই মিলে একটা হৈ চৈ বাধিয়ে তুললে ! তুমি বস্তিতে ঢুকে নিজের হাতে ঝটা আর বালতি নেবে...আর ঐ ঘােটলােকের দল তােমার মাথায় হাত বুলিয়ে হরিচরণ শেষ করতে সময় নেন •••••• অশােক বলে, বাবা আপনি ঠিক বুঝতে পাচ্ছেন না ! হরিচরণ মনে মনে উষ্ণ হয়ে উঠলেও মুখে অনেকটা সহজ ভাব দেখাতে চেষ্টা করেন। মাথা নীচু করে বলেন, কেমন করে বুঝবাে বলল বিলেত ফেরৎ বড় ডাক্তার...ফিনাইলের বােতল নিয়ে বস্তিতে ঘুরে বেড়ায়•••এটা বুঝতে আমার দেরী হবে কেন বললা?••• কথাটা কতদুর গড়াতে বলা যায় না। হঠাৎ ভলি আর রুনু এসে ঢুকলাে ঘরে। হাওয়াটা বদলে যায় হঠাৎ ! -এসাে মা এসাে। হরিচরণ আদর করে ডাকেন ওদেরকে। শােভা একটু অবাক হয়েছে, বলে, হঠাৎ যে? পথ ভুলে ? -হঠাৎ নয় দিদি। ডলি তার স্বাভাবিক চাপল্যের সঙ্গে বলতে থাকে। —মেলােমশাইকে একটা খবর দিতে এলুম। -কি মা? ব্যস্ত হয়ে ওঠেন হরিচরণ ? একটি জিনিষ আবিষ্কার করেছি। আপনারা সবাই ভীষণ রাগ লােক। -এই কথাটি বলতে এতদূর ছুটে এলে ? শােভা অপ্রস্তুতের মত বলে বসে। ঠাট্টা করেই বলে হয়ত! সকলেই হেসে ওঠে ওর কথায়। হঠাৎ অশােক মুখ ফিরিয়ে বলে, ছুটে আসা খুব সহজ দিদি•••বড়লােকের মেয়ে নিজের মােটর, ব্ল্যাকমার্কেটের পেট্রোল অলােক এমনভাবে কথাগুলাে বলে যে মনে হয় তার কথা সবাই অমুক - এইটাই সে চায়। ওর কথার মধ্যে বিপ থাকলেও এই ব্যাকুলতাটুকুও যেন প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকে। সকলেই আবার হেসে ওঠে। হাসতে হাসতেই খানিকটা গাম্ভীর্যের ভান করে ডলি বলে, মেলােমশাই আমি বলি ওঁকে আপনারা কেউ কিছু বলবেন না। ওঁর সখ হয়েছে বস্তি উদ্ধারের-উনি করুন। বেশ লাগে নতুন কাজ ত’ বট- ঝর্ণার জলে আবার স্রোত লেগেছে। ফেনীল জল ছিটিয়ে পড়ছে চারদিকে। অশােক শুধু শশানে না, চেয়ে চেয়ে দেখেও। রুনু এতক্ষণ কোন কথা বলে নি। ডলি যেভাবে অশােককে কথা শশানাচ্ছে আর অশােক না বাধা দিয়ে শুনছে রুণু তাতে আরও কিছু বলার জন্যে উৎসাহিত হয়ে ওঠে। কণু বলে, এই ধরুন লােকে সখ করে চিড়িয়াখানায় যায় —হ্যা রুণু ঠিক বলেছে। আমােদ পেলেই ত হল ! এমনভাবে সায় দেয় ভলি, রুণুর কথায় যে মনে হয় যাই বলুক রুণুর কথায় যে কোন ভাবেই সায় সে আজকে দেবেই। হাসির হট্টগােলের মধ্যেও সকলেই কেমন যেন অস্বস্তি বােধ করে। হরিচরণ সবার মাঝে হঠাৎ উঠে পড়েন। তার উপস্থিতির আর প্রয়ােজন নেই। যাবার সময় শােভাকে ডেকে বলেন, এদের একটু চা দাও মা। হরিচরণের পিছন পিছন শােভাও বেরিয়ে যায়। যাবার আগে বলে, তােমরা বসাে ভাই.••এই চিড়িয়াখানা থেকে যেন পালিয়ে না আবার। একলা পড়ে গেছে অশােক। আগে আগে হলে সেটা মােটেই নতুন ঠেকতাে না, বিচিত্রও লাগতাে না। কিন্তু আজকাল সব বদলাচ্ছে। অতি নিকট অতি পরিচিত মানুষগুলাের মধ্যেও কেমন যেন অস্বস্তি লাগে। ৮৩ বনে বনে যখন বসন্ত জাগে তখন সে কি নতুন জাগরণ আর শিহরণের পালা••• তারপর সেই বসন্তই পুরাণাে হয়ে আসে। গাছে গাছে আঝােরে ফুল ঝরায়! যে গাছে ফুল জেগেছিল !.."রুণু বলে, দয়া করে এবার একটু মুখ ফেরান মশাই! অশােক হাসিমুখেই ওদের দিকে চেয়ে দেখে। বলতেও চায় কিছু। কিন্তু তুলি অদ্ভুতভাবে কথা বলছে আজ। তাড়াতাড়ি ও বলে ওঠে, না রুণু ওঁকে একটু গম্ভীর থাকতে দাও..উনি ত’ আর তােমাদের মতন ছেলেমানুষ নন•••উনি বড় ডাক্তার...বিলেত ফেরং••• নিতান্ত ছেলেমানুষের মতই কিন্তু আবােলতাবােল কথা বলছে ডলি। বর্ষাস্নাত আকাশটার মত দেখায় ডলিকে। যেখানে যেখানে মেঘ ঘুচেছে সেখানে সেখানে নির্মল নীলের হাতছানি। অশােক হঠাৎ বলে বসে, কথাবার্তাগুলো মন্দ নয়। তবে কে কার জন্যে ঘটকালি করছে বুঝতে পারছি নে- ঝর্ণার স্রোতমুখে একটুকরাে পাথর। পাথরকে ঘিরে ঝর্ণার জল আরও চঞ্চল আরও উচ্ছসিত হয়ে ওঠে । হয়েছে। এবার দয়া করে একটু মুখ খুলে হাসােসকলের গােমড়া মুখ দেখে দম আটকে এলাে•••বাবারে বাবা:::বন্তি বস্তি বন্তি ! পৃথিবীতে যত বস্তি আছে সব ঠিকানা তােমাকে এনে দেবাে ডলির কথা শুনে অশােক আর রুণু হেসে ওঠে। ডলি থামে নি তখনও। অশোকের হাসি দেখে আরও জোর গলায় বলে, মানুষ পরােপকার করতে গিয়ে যে এত চেঁচামিচি করে, এ আমি জানতুম না। -তুই একটা ঢাকঢোল নে ডলি অশােকবাবুর পিছু পিছু বাজাবি—রুণ, যে কাকে ঠাট্টা করছে বােঝা যায় না। ৮ঃ

-তার চেয়ে নিজের ঢাক নিজেই পেটাবাে মন্দ কি ? অশােক ভলির
দিকে চেয়ে রুণুর কথায় জবাব দেয় ।
-হ্যা সেই ভাল.••মানাবেও! বাপরে বাপ:::তােমার হাত থেকে ছাড়া,
পেলে বস্তির লােকেরাও হাঁপ ছেড়ে বাঁচে।
বর্ষার আকাশ বেশী নীল দেখাচ্ছে।
দোল লেগেছে ক্রিসেন্থিমামের ডালে।•••
সকলের উচ্চহাসিতে ঘরটা গমগম করে ওঠে।

নতুন একটা সুর্যের আমদানী হয়েছে। তার আলাে পৌছয় খাদের গভীর আকারেও। অন্ধকারে যারা ছিল, আলাে পেয়ে তারা ডানা ঝাপটায়। চোখ ধাঁধিয়ে পরস্পর পরস্পরকে খােচা দেয়। ঝগড়া করে মরে। আবার উল্লাসে নৃত্য করে ওঠে। সূর্য আলাে দেয় । রমানাথের সঙ্গে কার যেন ঝগড়া বেঁধেছে। রমানাথ রেগে উঠে বলে, একটা লােকের মাথায় পাঁচজনে মিলে কাঁঠাল ভাঙচিস কেমন? -যা বালােকটা মুখ ভেঙ্গিয়ে উড়িয়ে দেয় রমানাথকে—তারি তাের মুরােদ-খালি ফিনাইলের বােতলগুলাে নিয়ে তুই না বাজারে বেচে এলি ? -এবার আমার নামে দোষ না? দোষটা অস্বীকার করতে না পেরে বমানাথ অন্য পথ নেয়। বলে, ওই যে বােতল বেচে এক পাট ইয়ে কিনে আনলুম"তুই ভাগ বসালি নে?.. —আমি কাজ দেখিয়েছি ডাক্তারকে বুঝলি.••তাের মত নয়! লােকটা না হাসলেও রেগে মেগেই দাত বার করে। ছােপ ধরা কালাে কালাে দাত ! কাজ ত খুব ••আগে লুকিয়ে কোকেন বেচতিস•••আর এখন কুইনাইন বেচে আসিস লুকিয়ে অমন করলে আমিও কিন্তু হাটে হাঁড়ি ভাঙ্গবাে রমানাথ- সত্যি সত্যিই রেগে উঠেছে এবার।

যা যা নাপতের ডিম ! রমানাথ জাত তুলে বসে। অশােক ওদিক থেকে আসছিল। ওকে দেখে লােকটা সরে পড়ে। বমানাখকে বিশ্বাস নেই সব হয়ত ফাস করে দেবে, রমানাথ কিন্তু সরে না। হাজার হলেও অনুর সঙ্গে ডাক্তারের অত মাখামাখি•••ভয় কি তার ? রমানাথ বরং ঝগড়ার কথাটাই ঘুরিয়ে তােলে।—দেখলেন ডাক্তারবাবু বলেছিলুম ও লােকটাকে বিশ্বাস করবেন না! ওই দেখুন.. টাকা দিলেন কেনােসিন কিনতে সেই কেটে পড়েছে আর চুলের টিকি দেখা যায় না... অশােক কি আর করবে, রমানাথের কথা বলার ভঙ্গী দেখে হাসতে থাকে। বলে, আচ্ছা বলতে পারাে কাকে বিশ্বাস করবাে•••আর কাকে করবে না ! রমানাথ একেবারে বিগলিত হয়ে পড়ে। হাত দুটো কচলাতে কচলাতে বলে, স্যর আমি ছাপাখানায় চাকরি করি আমায় আপনি বিশ্বাস করতে পারেন !••• —তুমি নেশা কর ? অশােকের অনুমান মিথ্যে নয়। রমানাথ এক মিনিট ইতস্তত করে। তারপর বলে, আজ্ঞে তা একটু আধটু এমন কিছু নয়—যদি কিছু বাজার থেকে কিনতে হয় টাকা কড়ি আমার কাছেই দেবেন হরিপদ ওদিক থেকে এদিকে আসছিল। রমানাথ ওকে আসতে দেখে আর বেশীক্ষণ দাড়ায় না। নমস্কার’ বলে সরে পড়ে। দুজনের সম্বন্ধ যেন সাপ আর নেউল ! দেখলেই আস্তিন গােটায়। নেহাৎ অশােকের সামনে বলেই রমানাথ মানে মানে সরে পড়ে। অনেক কষ্টে সবে একটু হাত করে এনেছে ডাক্তারকে এমন সময়ে নৈহাৎ অনিচ্ছার সঙ্গেই সরে পড়তে হয় রমানাথকে। হস্ত দন্ত হয়ে ছুটে আসে হরিপদ । -এই যে ডাক্তারবাবু!

কী খবর! -এই শুনছিলুম রমানাথটা আপনাকে কেমন ধাপ্পা দিলে—লােকটা কিন্তু একেবারে শয়তান অশােক বিরক্ত হয়ে উঠেছে ওদের এই রকম কথাবার্তায় বলে, তাই নাকি ? প্রশ্ন করলে কি হবে ওর গলার স্বরে এতটুকুও আগ্রহ নেই। হরিপদ কিন্তু উৎসাহিত হয়ে ওঠে। বলে, এই দেখুন না আপনার ব্লিচিং পাউডারের বস্তাটা বেচে এক জোড়া বঁায়া তবলা কিনে নিয়ে এলাে সেদিন: গৌরীসেনের পয়সা দেখেছে হরিপদ হয়ত আরও কিছু বলতাে, কিন্তু অনুকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে সরে যায় ওখান থেকে। আর যাই হােক এ মেয়েটার মুখের সামনে দাড়ানাে যায় না। ও সামনে এসে দাড়ালে সব যেন গােলমাল হয়ে যায় । হরিপদ অস্বস্তি বােধ করে। অনু অশােকের বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে খানিকটা হেসে নেয়। বলে দশচক্রে ভগবান এবার ভূত হবে দেখছি অশােকের চিন্তার মেঘ তখনও কাটে নি। ভারী গলায় ও জবাব দেয়, এখানে কাজ করতে গেলে এখানকার লােকদের আগে মানুষ করেতুলতে হবে। এদের কাজে না নামালে এদের অভাব ঘুচবে না: নিজেদের ভালােও যে এরা বােঝে না। শােন অনু। অশােক দরকারী কথা বলার জন্যে অনুকে প্রস্তুত করে নেয়।—আমাদের দরখাস্তের জবাব এসেছে••আরাে জিনিষপত্র শীগগীরই সব এসে পড়বে•• বলতে বলতে অশােক তার মানিব্যাগটা খুলে এক তাড়া নােট বের করে। বলে, এই টাকাটা ধরাে তুমি রেখে দিও তােমার কাছে এখানকাৱই কাজে লাগবে।••• ৮৮ অনু যেন চমকে ওঠে। বলে, ক্ষমা করবেন... আমি সামান্য ঘরে থাকি টাকা রাখার জায়গা আমার নেই। আপনি নিজের কাছেই রাখুন। অশােক আর কিছু বলতে পারে না। নিজের দুর্বলতা সে মনে মনে মেনে নিয়েছে। যত বড় বিলেত ফেরং ডাক্তার সে হােক না কেন, বস্তির এই মেয়েটার মুখের ওপর কথা বলতে কোথায় যেন তার আটকায়। মেয়েটা বড় বেশী কম কথা বলে, বােধ হয় সেই জন্যেই। শ্রোতটা ধীর, কিন্তু তলায় তলায় টান আছে । অশােক টাকাটা ফিরিয়ে নেয়। অলক্ষ্যে কয়েকটি স্ত্রীলোেক ওদের লক্ষ্য করছিল। তারিণীও ছিল ওদের মধ্যে। এটা আজকাল ওদের নিয়মিত কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টাকা দেখে ওরা নানারকম কুৎসিত ইঙ্গিত করে। --মেয়েটা কি বােক দেখেছাে লা...হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেললে । টাকায় কি হবে? গয়না চায় গয়না! বুঝেছিস ? তারিণী ছড়া কাটে ; রাখালী গাে রাখালী, কত রঙ্গ দেখালি ! টাকা নিলে না হাত পেতে গয়না গাটিই বােধ হয় চায়— একজন বলে, বেশ ত’ তাই নে না কেন? আর কিছু না পারিস কানে এক জোড়া মাকড়িই গড়িয়ে নে...কি বলল ভাই ? ঈর্ষায় হেসে ওঠে সকলে। সে হাসি বড় ভয়ানক। আর এক কোনে হরিপদ এসে দাড়িয়েছে একটি স্ত্রীলােকের গা ঘেষে। মেয়েটি আবদারে ন্যাকা গলায় বলে, কই আমাদের এক জোড়া মাকড়িও , জোটে না।••• —মাকড়ি। সামান্য মাকড়ি হাঃ-আয় পাগলি আমার সঙ্গে মাকড়ি ত মাকড়ি তাের কানে আমি তাজমহল ঝুলিয়ে ছেড়ে দেবাে• আয়। হরিপদ আকর্ষণ করে ওকে। ৮৯

হেমনলিনীও বুড়াে বয়সে আবদার ধরেছেন
রায়বাহাদুর নিরুপায় ।
হেমনলিনী অশােকের হয়ে বলেন-একটা মিথ্যে হৈ চৈ বাধিয়ে তুললে
তােমরা! অশােককে আমি জানি সে ছেলে মানুষ••তার দুদিনের খেয়াল ।
আমি বলি ঠাকুর মশায়কে ডেকে একটা দিন ঠিক করে ফেললাডলির সঙ্গে
কাজটা আগে হয়ে যাক যত শীগগীর হয়...তারপর অশােকের মন ফেরাতে
কণ?
তার আগেও অশােককে বােঝাবার চেষ্টা চলে।
কিন্তু অশােকের এক কথা,-আমি যে ডাক্তার বাবা!
হেমনলিনী বলেন, দেরী করলে আর আমি বাঁচবাে না বাবা।
অশােক আহত হয় যেন। বলে, ও সেই একই কথা !
শােভা বােঝে খানিকটা অশােকের কাজকে শুধু নয়, অশােককেও। বলে,
তাের যা ভাল লাগে তুই যাতে আনন্দ পাস সে কাজ তােকে ছাড়তে বলতে
পারি নে...কিত শােভা ইতস্ততঃ করে-
অশােকের মুখে বিষন্ন হাসি। পাতলা মেঘে জ্যোৎস্না অস্পষ্ট হয়ে
আসছে। অশােক বলে,•••া কিন্তু...কিন্তু একটা আছে বৈ কি! বলে
ফেললা দিদি...
—কিন্তু কিছু নয় ভাই। তুই যা করছিল তাই করে যাতাের যা ভাল
লাগে তাতেই আমার আনন্দ। তবে আমার কি মনে হয় জানিস?
কিছুদিনের জন্যে ঘুরে আয় বাইরে থেকে••
—আমাকে ভােলাচ্ছ দিদি ?
তবে কি ভুল হয়ে গেছে অশােকেরই।
ভুল বােঝার ভুল?
ক
৯০

ভলি আর গােক।
যেমন ভালাে লাগছে তেমন আবার অস্বস্তি বােধ হচ্ছে অশােকের।
ক্রিসেস্থিমাম বড় বেশী লাল।
ঝর্ণার জলস্রোত বড় বেশী প্রবল হয়ে উঠেছে।
ডলি আজ নতুন সুরে কথা বলছে। নতুন করে সেই পুরণাে সুর ! সেদিন
রুনু ছিল সঙ্গে। আজ কমু নেই। তারপরে ত’ ডলির সঙ্গে এই লেখা।
ভলির আজকের উপস্থিতিটা সেই কথাটাই শুধু জানিয়ে দেয় আজ আর
রুনু নেই সঙ্গে।
ডলি বলে, তােমার কাজে বাধা দেবাে না:••আমাদের বাধা কেনই বা
তুমি মানবে?
আসল কথাটা বলে ফেললা ডলি কি তুমি বলতে চাও!•••
—সমস্ত ব্যাপারটা কেমন যেন ঘুলিয়ে উঠেছে !•••আমাকে তুমি এমন
শান্তি দিচ্ছ কেন? আমি কি করেছি তােমার ?
ওর গায়ে জড়ানাে মিহি-কোমল ক্রেপ শাড়ীটার মত নরম পাতলা আয়
কোমল দেখাচ্ছে ভলিকে। ওকে ভেদ করে অন্তরটা দেখা যায় যেন।
ঝর্ণার জল সমতল মাটিতে এসে নামছে।
ডলি কি আজ কাদবে?
—কি আর করবে। কিছু না ! মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে অশােক।
-মানুষ কাজও করে বিশ্রামও নেয়...দিদি যা বলছেন তুমি কিছুদিনের
জন্যে ঘুরেও ত’ আসতে পারাে।
ভলি বড় বেশী ঘনিষ্ঠ হয়ে আসছে।
‘া পারি! কোথায় যাবে বলাে? সমুদ্রের ধারে? ম কি
বেশ-চলাে !
রাজি আছি...। ছােট ছেলেকে বেড়িয়ে আনলেও তার
আবদার সেরে যায়••তাই চলাে•••সমুদ্রের ধারে•••

—তুমি ফিরে এসে আবার কাজ করতে পারবে।
শান্তভাবে তাকাচ্ছে ডলি ওর দিকে।
-মানে বস্তির কাজ? থাক্••ও কাজ না করলেও চলবে.••তা ছাড়া
এত লােকের অনুরােধ ও আমি ছেড়েই দেবাে: সেই ভালো•••চলল, সমুদ্রের
ধারেই যাওয়া যাক:
অশােক এক হাতের আঙ্গুলের মাঝে মাঝে অন্য হাতের আঙ্গুলগুলাে
ঢুকিয়ে চাপ দেয় জোর করে । চাপ পেয়ে আঙ্গুলের মাথাগুলাে রক্ত-লাল
হয়ে ওঠে।
ঐ রক্ত নিয়েই ত যত গণ্ডগােল। ঐ রক্তেই নাচানাচি!
অশােক রক্ত-মুখর ডগাগুলাে দেখে।
একি তুমি সত্যি বলেছে? বিশ্বাস করতে পারে না ডলি !
-ভয় পাচ্ছাে কেন ডলি ? বস্তির কাজ ছেড়ে দিচ্ছি। অশােক জোর
দিয়ে দিয়ে হাসে। হাসতে হাসতে ডলির নগ্ন বাহুতে আলগােছে চাপড় দেয়
একটা। ডলির দেহ ত’ নয়, নরম আগুন! অশােক বলে চলে, বস্তির কাজ
ছেড়েই দিচ্ছি। চোর ছ্যাচড়...ছােট লােক..ননাংরা...ওসব যেমন আছে
থা•••আমার কি! তার চেয়ে চলল বেড়িয়ে আসি সমুদ্রের ধারে...
বালুতটের মতই নিজেকে বিছিয়ে দিচ্ছে অশােক তরঙ্গ ক্ষুব্ধ ডলির
চার পাশে।
অশােক আর ডলি ।
৯২

সমুদ্রের ধারে ধারে ছড়িয়ে পড়েছে ওরা। দলটা নেহাৎ ছােট নয়।
অশােক, ডলি, রুণু, নিখিল, মিলি আর সুশােভন।
नौन
সমুদ্রের
তীরে তীরে নীল স্বপ্নের মন নিয়ে বসে আছে ওরা। আন
করবার জন্যে কসটিউম পরে নিয়েছে সকলে। দেহের সকল বাঁকে বাঁকে চাপ
জামা এটে গেছে।
প্রচণ্ড তরঙ্গে ফেনীল হয়ে ভেঙ্গে ভেঙ্গে আছড়ে আছড়ে পড়ছে সমুদ্র।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢেউয়ের ভীষণতা বাড়ছে। মনে মনে ভয় করছে
অনেকের। বিশেষ করে সমুদ্রস্নানে অভ্যাস নাই যাদের!
নিখিল এগােতে গেছলাে ঢেউয়ের সঙ্গে। তারপর তলিয়ে গিয়ে আছাড়
খেয়ে খুব নাস্তানাবুদ হচ্ছে দেখে রুণু খিল খিল করে হেসে ওঠে ওদিক থেকে।
রুণুর সমুদ্রমানে খুব অভ্যেস আছে তাই তার
তাই তার হাসিটা
হাসিটা অশােভন
নয়।
ডলি বেশীদূর এগােয় না। অল্প দূর থেকেই সাবধানে ঢেউ কাটাতে
থাকে। অশােক তীরে বসে বসে অন্যমনস্ক হয়ে যায় ।
মিলি বলে, বসে আছেন যে? ঢেউ দেখে ভয় পেলেন বুঝি ?
অশােক একটু হেসে জবাব দেয়, তােমরা খুব সাহসী!
মিলি জলে দাঁড়িয়েই কথা বলছিল। হঠাৎ এক ঢেউয়ের ধাক্কায় উন্টে
পড়ে। মিলি চীৎকার করে ওঠে। ওদিকে নিখিল আছাড় খেয়ে পড়ে
ফপুর ঘাড়ের ওপর।
হুটোপাটি চলে।

উন্মুক্ত আকাশ আর উন্মত্ত জল,তার মাঝে এদের উন্মুক্ত ও উন্মত ন চলে। অশােক ধীরে ধীরে এগােচ্ছিল জলের মধ্য দিয়ে। ডলি বেশ এগিয়ে গেছে এমন সময় ডলি উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে, না, না, তদূরে যেয়াে না- বা রে চান করবাে না। ছােট ঢেউয়ের স্তরটা পার হয়ে বড় ঢেউয়ের স্তরে পৌছে গেছে অশােক গুণ। ভলির মনে হয় অশােককে দেখে সমুদ্র বেশী করে উত্তাল হয়ে উঠেছে। | ০ ০ ঢেউ যদি ভাসিয়ে নিয়ে যায়? —যদি নিয়ে যায় ফেরাতে পারবে না। ঢেউয়ের সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে অশােকের দম ফুরিয়ে আসছে, তবু সে হাসে। -না না: শােনাে••অত দূরে যেয়াে না:ভয় করে•• হলি নিজেই এগােতে থাকে অশােকের পেছনে। এক ত ছাড়া যায় না অশােককে। এমনি ভাবেই আকাশ-সমুদ্রের মিলন-লীলার দূর-পটভূমিকায় ওদের গান- যত্র চলে। শুক্লপক্ষের ঘন জ্যোৎস্নায় সাগরের বিশাল বেলাভূমি মােহমধুর সৌন্দর্ষে ত। কিছু অস্পষ্টতা...কিছু বা স্বপ্নের মায়ালােক ওরা সমুদ্র, সমুদ্রের হাওয়া, জ্যোৎসা ও পরস্পরকে একই সঙ্গে উপভােগ করবার জন্যে জড় হয়েছে। এক জায়গায় বসলেও ওরই মধ্যে একটু একটু ১৪ ছাড়া ছাড়া হয়ে বসেছে ওরা ইচ্ছে মত। মিলি-সুশােভন, নিখিল- অশােক-ডলি ! মিলি বলে, এতদিন পরে ডলির মুখে হাসি ফুটেছে। সুশােভন জবাব দেয়, ওদের বিয়েতে দামী উপহার দিতে হবে। নিখিল বলছে, এ আমি বিশ্বাস করিনে মিস সেন্ রুণু অবাক হয়। কিংবা অবাক হবার ভান করে মাত্র। বলে, কেন ? -অশােক এক কথায় বস্তির সেই মেয়েটাকে ছেড়ে এলাে, একদিন ডলিকেও সে অকূলে ভাসাবে না একথা বিশ্বাস করাে? —আপনি বড় লােকের নিন্দে করেন মিষ্টার রায়। চলুন•••ভলির গান শুনি গে!••• ভলি গান গাইছিল ওপাশ থেকে। বােধ হয় অশােককে শােনাবার জন্যেই। হাওয়ায় উড়ে আসে সে গান। আসে সে গান। ভেসে চলে ওদের সকলকে অতিক্রম করে। পর্বতগামী মেঘ টুকরাে হয়ে আকাশে ওড়ে! গান থামলে পরে নিখিল গলাটা বাড়িয়ে শুধােয়—গান কেমন লাগলাে ডাক্তার ? অশােক যেন সচকিত হয়ে ওঠে। বলে, গান? হ্যা বেশ লাগছে?••• ও! গান থেমে গেছে নাকি? বেশ ত গাইছিলে•••গাও। ভলি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বলে, গান কি তুমি শুনছিলে না? -না। -কেন ? কোনদিকে মন ছিল ? -আমার ভালাে লাগে না।

-ও, এভাবে আমাকে অপমান না করলেই পারতে।
পর্বত অনেক দূরে।
মেঘ ফিরে আসে।
জলপূর্ণ মেঘ !
বােতল গড়াচ্ছে। শূন্য ফিনাইলের বােতল। সাপ্লাই বন্ধ। বস্তিতে
আবার আবর্জনার স্তুপ। যে বুরুশগুলাে আবর্জনা পরিষ্কার করবার জন্যে
এসেছিল সেগুলাে আবর্জনার সঙ্গে এক হয়ে জমে আছে রাস্তার ধারে।
নমা আবার নােংরায় ভরে উঠেছে। চারদিকে আবার দুর্গন্ধ। ব্লিচিং
পাউডার নেই।•••আবার সেই বীভৎস দৃশ্য।
নতুন সূর্যটা কি অস্ত গেল ?
দাতব্য চিকিৎসালয়ের দরজা বন্ধ। বদ্ধ দরজার সামনে পথের ওপর
বােগীরা ধুকছে!
একটি মেয়ে বলে, বাবা ওষুধ কি আর দেবে না ?
বাবা বলে, না মা, দোকান বন্ধ, বড়লােকের খেয়াল মিটে গেছে মা...
চল:'চল্ মাচল
আর একজন বলে, গরীবের কপালে সুখ সইলাে না...
অপর জন বলে, দুদিন ওষুধ পথ্যি জুটেছিল...তাই আমাদের লাভ রে
ভাই
অনুর অবস্থা অবর্ণনীয়। চারদিক থেকে বিদ্রুপ আর খােটা দিয়ে সকলে
মিলে ওকে ব্যতিব্যস্ত করে তােলে।
তারিণী বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলে, কেমন? বলেছিলুম না তখন।

বামন হয়ে দে হাত দিতে গিয়েছিলি:'এবার গাছে তুলে মই কেড়ে নিয়ে
গেছে ত?
আর একটি স্ত্রীলােক বসান দেয়। গালে হাত রেখে ভঙ্গিমা করে বলে,
তা যা বলেছ ভাই...জাতও গেল পেটও ভরলাে না:••সখ মিটিয়ে পাখী যে
উড়ে পালাবে সবাই জানতাে•••
তারিণী চাপ দেয় অন্যকে বাগে পেয়ে,-ব? জবাব দে?•••বেড়া বেঁধে
কি বেনাে জল ধরে রাখতে পারলি ?•••
—আমি তাকে ধরে রাখতে চাইনি বৌদি! অতিষ্ঠ হয়ে অনু শেষে জবাব
দেয় ভাঙ্গা গলায়। মনটা তার পাক খেয়ে ওঠে।
-বাঁধতে জানলে বেনো জলকেও বাঁধা যায় । গলার মধ্যে কৃত্রিম
সহানুভূতির মিশেল এনে বলে তারিণী--তাের খ্যামােতা কোথায়? এখন সরে
পড়েছে কি না, তাই উড়াে খৈ গােবিন্দায় নমো কেমন ? ওঃ তখন মেজাজ
যেন সেপাইয়ের ঘােড়া!...যত পারে শুনিয়ে দেয় তারিণী, ছাড়ে না।
অপর স্ত্রীলােকটি বলে, থাক ভাই থাক কাটা ঘায়ে আর নুনের ছিটে
দিস নে, আয়—চলে আয়••••
কথাটা স্মরণ করিয়ে দিয়েই আনন্দ পায় ওরা।
অন্য কিছু বলে না। কাঠ হয়ে দাড়িয়ে থাকে, যেখানে ছিল।
রমানাথ এদিকে আসছিল। স্ত্রীলােকটি সরে যায় রমানাথকে আসতে
দেখে! রমানাথও অনুকে শোনায় ।
অবশ্য ওর বলার ভঙ্গীটা অন্যরকম,
বলে, ওরা বড়লােক,-বুঝলি চোখের চামড়া নেই ওদের, তুই
আবার ওদের বিশ্বাস করতে গিয়েছিলি!
অনু দাদার ওপর খুব রাগ করে না। তবু দাদাই সময়ে সময়ে ওর সঙ্গে
ভাল ব্যবহার করে আজকাল।
অনু শান্তস্বরে বলে, তিনি ত’ নিজেই কাজ
করতে এসেছিলেন দাদা.. আমি বলি নি••
এই যা।
৩

এবার ঠেলা সামলায় কে? দুটো লােক মাইনের জন্যে হাঁটাহাঁটি
করছে•••আমি পাবাে কোখেকে শুনি?
রমানাথের কালকের রাত্তিরের নেশায় চোখ দুটো অল্প অল্প লাল হয়ে ওঠে।
তারিণী মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠে।—তােমার গলাতেই গামছা দিয়ে আদায়
করবে ! এবার বােনের জন্যে জেল খাটো ।
-না না বৌদি...সে কথা বােল না...দাদার কোনাে দোষ নেই।...
অনু দাদার জন্যে সত্যি সত্যিই ব্যস্ত হয়ে ওঠে ।
আঘাতে আঘাতে ভেঙ্গে পড়বে ও!
রমনাথ চুপ করে যায়। কিন্তু তারিণী চুপ করে না। বলে, দোষ নেই
বললে ত’ আর পাওনাদারে ছাড়বে না:••তার চেয়ে যা না কেন:••সেই
ডাক্তারকে খুঁজে নিয়ে আয়...দশ বিশ টাকা আদায় কর...পারিস নে ?
মরণ দশা।••••••
বলতে বলতে দুম দুম করে পা ফেলে গা দুলিয়ে দুলিয়ে চলে যায় তারিণী ।
রমানাথ বলে, তাের কপাল••তাের কপালই মন্দ রে হতভাগি !–
চওড়া কপালের মত সমুদ্রতীরের বালুতট ।
ব্যর্থতার ঢেউ আছড়ে আছড়ে ভেঙ্গে পড়ছে !
।
বহু তরঙ্গের মাঝে এক ফালি খবর ।
কোলকাতায় নাকি মহামারী সুরু হয়েছে বসন্তের ?
সমুদ্রতীরের বাংলাে সরগরম হয়ে ওঠে।
রুণু প্রথম কাগজটা হাতে পেয়েছিল। সে-ই ছুটতে ছুটতে এসে খবর
দেয়,—ডলি, কোলকাতার খবর শুনেছিস? বসন্তের মহামারী, লেগেছে
সেখানে
১৮

-কোলকাতায় বছরে দুটা মহামারী লেগেই থাকে। নতুন কি? ডলি
উদাসীনভাবে জবাব দেয়।
সিগারেটের শেষ চিহ্নটুকু এ্যাস-ট্রের মধ্যে মুছে দিয়ে নিখিল বলে,
After all we are safe !
সুশােভন বলে, বস্তিগুলােতেই বেশী মড়ক লেগেছে।
-আগে ওরাই মার খায়! হাতের চুড়িগুলাে পরপর সাজাতে সাজাতে
মিলি বলে।
অশােক এতক্ষণ রুণুর হাত থেকে কাগজখানা টেনে নিয়ে পড়ছিল, হঠাৎ
কাগজটা নামিয়ে রেখে উঠে দাড়ায়।
কি ব্যাপার ! সকলে উৎসুক হয়ে চেয়ে দেখে অশােকের দিকে।
দৃষ্টি কেমন যেন অস্পষ্ট হয়ে আসছে।
—আমাকে যেতে হবে।
এমনভাবে বলে ও কথা গুলো যেন সত্যিই তার ডাক এসেছে ।
--কোথায় ? ডলি প্রশ্ন করে।
-কোলকাতায় ।
—কোলকাতায় ! মহামারীর মাঝখানে ! ডলি অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে।
-হ্যা এখবর আমাকে স্থির থাকতে দেবে না।
অশােক যেন আরও বেশী অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে।
রুণু বলে, কিন্তু আপনার নিজের বিপদ ?
আত্মীয়তার প্রশ্ন হলেও অশােকের কাছে মুর্থ বলে মনে হয়।
অশােক বলে, ওটা আমার ভাবনা
—কিন্তু তােমার যাওয়াটা এমন কিছু urgent নয় ডাক্তার-ঠাস্ করে
দেশলাইটা জেলে নিখিল আর একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলে।
-That I will consider Nikhil...

ডলি কথার মােড় ঘােরায়। বলে, এত তাড়াতাড়ি যেতে চাও, তার
চেয়ে না এলেই পারতে ।
-এখন সেই কথাই ভাবছি।
—এলে কেন? তােমার পায়ে ধরে আমি ত সাধতে যাই নি ? তুমি
যে কেন সেইখানে যেতে চাও সেকথা বেশ ভাল করেই জানি-
এলোমেলাে কথা বলতে সুরু করেছে ডলি ।
—কি বলছাে তুমি ?
অশােক একটু তীক্ষ্ণ গলাতেই বলে।
বাগানে ক্রিসেন্থিমামই একমাত্র ফুল নয়।
-থা, তােমার চমকে ওঠায় আমি আর ভুলবাে না...আমি জানি বেশ
জানি..তবুও বলে দিচ্ছি তুমি সেখানে যাবে আমার একটুও মত নেই ।
অশােক বসেই থাকে ।
ডলি হনহন করে বেরিয়ে যায় ওখান থেকে।
অনু জায়গা ছেড়ে এতটুকু নড়ে না। ঠায় চুপ করে বসে থাকে মিন্টর
মাথার কাছে। মিণ্ট র মাথায় হাত বুলােয় । বাতাস করে। এর দেখে!
মিন্ট র বসন্ত হয়েছে । শয্যাগত হয়ে পড়ে আছে কদিন ধরে। তার পাশে
ডাক্তারের দেওয়া খেলনা গুলো।
মিণ্ট, আস্তে আস্তে ডাকে, দিদি,
–কি রে মিন্ট ? মেহভরে বলে অনু।
-দিদি, ডাক্তারবাবু কোথায় ?•••কখন আসবে ডাক্তারবাবু?...
বাইরের পথে মােটরের হর্ণ শােনা যায়। সহরের রাজপথে গাড়ী চলাচলের
বিচিত্র শব্দ কোলাহল সব ভেসে আসে।
১০০

ওরা উৎকর্ণ হয়ে ওঠে। —দিদি দিদি...ওই যে...ওই যে ডাক্তারবাবুর গাড়ী গাড়ীর শব্দ মিলিয়ে যায় । হাসির রেখা মিলিয়ে যায় আগে এমন দিন ছিল ঐ পথ বেয়ে অনেক কিছু আসতো আর এখন সব কিছুই চলে যাচ্ছে ঐ পথ দিয়েই। কিছুই দাড়ায় না। বস্তির চারদিকে রােগের কাতরানি...মৃত্যর পদশব্দ...আর্তনাদ.. কান্না।••• বল হরি হরিবােল- বস্তির দক্ষিণ কোন থেকে এইমাত্র একটা মড়া বেরিয়ে গেল। আগে আগে হরিধ্বনি শুনলে বুক কাপতে। আজকাল সহজ হয়ে এসেছে -মৃত্যু সহজ হয়ে এসেছে। ছােট ছেলেরা ভাংচায়। তাড়া করে পেছন পেছন খানিকটা। সামনে প্রাচীর পত্রের জ্বলজলে লেখাট! এখনও দেখা যাচ্ছে ।বসন্তের মহামারী অবিলম্বে টিকা লউন! আশ্চর্য, বহু দিনের লেখা ওটা কিন্তু এতটুকুও ম্লান হয় নি। এতটুকুও কাজ হচ্ছে না লেখাটা দিয়ে । ডাক্তার নেই । ডাক্তারখানা বন্ধ! লােকে মাথা চাপড়ায়। তারিণী বাইরে থেকে মিন্ট কে দেখে । ঘরে ঢােকে না। স্ত্রীলােকদের বলার নাম করে অন্যকে শােনায়—ছেলেটাকে পথ থেকে কুড়িয়ে এনেছিল • •এত মড়ক লেগেছে এইবার পথে ছেড়ে দিয়ে আয় না কেন?...কি বলল ভাই। কেউ বলে, হ্যা তা ত বটেই বনের বেড়াল বনেই থাক... -আমরা ভাই থাকবে না এখানে। বিজ্ঞের মত বলে তারিণী—উনি বেরিয়েছেন বাসা খুঁজতে। আমরা ত’ আর মরতে পারি নে...

,
মিন্ট যন্ত্রণায় ছটফট করে আর বলে, দিদি ডাক্তারবাবু, কখন আসবে
ডাক্তারবাবু এলে আমার অসুখ সারবে দিদি
-চুপ কর মিণ্ট । অনু অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে।
দিদি, তুমি কেন ডেকে আনছো না ডাক্তার বাবুকে...দিদি আমি
নিশ্বেস নিতে পারছি নে•• ডাক্তারবাবু ডাক্তারবাবু তুমি ডেকে আনে
দিদি...মিণ্ট র স্বর এলােমেলাে হয়ে আসছে:
—মিণ্ট, মিন্ট,।
অনু ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
অনু সােজা হরিচরণবাবুর বাড়ীতে এসে প্রবেশ করে। এসেই প্রথমে
শােভাকে দেখতে পেলাে
শােভাকে প্রথম দেখলেও চিনতে
কষ্ট হল না। অনুর । অশােকের মুখে তার দিদির কথা সে অনেক
নেছে।
অনু একেবারেই ঈশ্ন করে বসে, ডাক্তারবাবু কোথায় ?
-কে তুমি? কোখেকে এসেছো? চিন্তিত মুখে বলে শােভা।
বস্তির ওখান থেকে এসেছি: ডাক্তারবাবু কি নেই? অনু তখনও
হাঁপাচ্ছে।
কথাগুলো বলছে অতি কষ্টে।
- কি দরকার ? শােভার স্বর কঠিন হয়ে আসছে।
--আমার ভাই মিন্টর বড় অসুখ—
- কিন্তু অশােক আর তােমাদের ওখানে যাব না•••[ শােভা দু পা
এগিয়ে যায়।
- যাবেন না? মিণ্ট র জন্যেও না?-অনুর বিস্ময় বাড়ছে ক্রমশঃ।
-তুমি ভাই অন্য ডাক্তার নিয়ে যাও।
১০২

অন্য ডাক্তারের টাকা লাগে: অশােকবাবু আমাদের কাছে টাকা নেন না
তাই এসেছিলুম•••যদি দয়া করে যেতেন•••
—তােমাদের ওখানে যেতে অশােককে আমরা মানা করেছি.••বস্তিতে
আনাগােনা করে অশােকের নামে অনেক কথা রটেছে—শােভা ধীরে ধীরে
বলতে থাকে কথাগুলাে। বােধ হয় অনিচ্ছার সঙ্গেই।
-ও, তা জানতুম না। অনু ব্যথিত স্বরে বলে।
তাছাড়া, তােমার এ বাড়ীতে ছুটে আসাও ভালাে হয় নি।
-আমার ভাই হয়ত বাঁচবে না তাই এসেছিলুম। আপনার ভাই হলে
আপনি ও কি ছুটে বেরােতেন না?••• যদি আর কেউ না থাকতাে ?...
ঝোঁকের মাথায় বলে চলে অনু। চোখে মুখে তার অদ্ভুত চঞ্চলতা।
—কিন্তু সে ছেলেটা শুনেছি তােমার নিজের ভাই নয় ?
—তাকে পথ থেকে পেয়েছি: মানুষ করেছি•••আমারই ভাই সে•••
আচ্ছা আমি যাই...
অনু যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে অমনি অশােকের গাড়ীর হর্ণ বেজে ওঠে
বাইরে থেকে। চমকে ওঠে ওরা সকলে।
এতদিনের শােনা হর্ণ ভুল হবার নয়।
অনু উজ্জ্বল মুখে বলে ওঠে, ডাক্তারবাবু আসছেন !
অনুর অনুমানই সত্যি! অশােকের গাড়ীই বটে। গাড়ীর মধ্যে
অশােক, ডলি আর রুনু।
অনুকে দেখে সকলেই স্তম্ভিত হয়ে যায় ।
অশােক অনুকে দেখে এগিয়ে যায় ওর দিকে। বলে, কি হয়েছে?
মিন্ট বােধ হয় বাঁচবে না ডাক্তারবাবু!
-সে কি ? তাকে রেখে এলে কার কাছে ? অশােকের স্বরে অদ্ভুত
এক ব্যাকুলতা!
১০৩

সকলে নির্বাক হয়ে যায়। অশােকের একি বিসদৃশ আচরণ ! সবাইকে ছেড়ে একটা বস্তির মেয়েকে নিয়ে অনু কোন দিকে তাকায় না। অশােকের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে চলে, ডাক্তারবাবু আপনি আমাদের সবাইকে...বস্তির সমস্ত লােককে ঠকিয়ে••• অপমান করে চলে এসেছেন মনে করেছিলুম আর কোন দিন আপনার সঙ্গে আমার যেন দেখা না হয়, কিন্তু –কি বলছাে তুমি এ সব ? শােভা পিছন থেকে প্রশ্ন করে । অন্য শােভার কথা শােনে কি না বলা যায় না। অশােকের দিকে চেয়ে আগের মতই বলতে থাকে, কিন্তু মিণ্টর জন্যে আর থাকতে পারলুম না এত লােকের সামনে অপমানের ভয় মনে রেখেও লজ্জা সরম ভুলে ছুটে এসেছি••• কি অসম্ভব করুণ দেখাচ্ছে অনুর ছিপছিপে লম্বা দেহখানা ! পাতা ঝরা বিসর্পিল শীর্ণ ডালের মত! ডলি এগােয় এবার। আগে থেকেই উত্তপ্ত হয়ে আছে সে। এই প্রথম দেখলো সে। এবং দেখেই দ্বিগুণভাবে জ্বলে উঠলাে। বললে অশােক যাবে না:••যেতে পারবে না••• কি সে বলার ভঙ্গী ডলির। বিশেষ করে অশােক কথাটা এমনভাবে উচ্চারণ করলাে যে শােভাকে উপেক্ষা করলেও অনু ডলির দিকে একবার তাকিয়ে পারলাে না। কিন্তু মুখে কিছু বললাে না। মুখটা তার আরও করুণ হয়ে উঠলাে। রুনুর বরাবরই পিছন থেকে কথা বলার অভ্যাস। রুনু বললে বস্তিতে এখন মহামারী...অশোকবাবুর যাওয়া উচিত হবে না।••• আর চুপ করে সময় নষ্ট করা যায় না। অশােক, বাড়ীর ভেতরের দিকে চলে যায়। অনুরও সময় নেই ঈড়াবার। ডলি, রুনু আর শােভার মাঝামাঝি ১০৪ তাকিয়ে সকলকে লক্ষ্য করেই বলে, আমার দাড়াবার সময় নেই.. হয়ত মিন্ট, ডাকছে। যদি ডাক্তারবাবু না যান বলবার কিছু নেই...আপনাদের বিবেচনার ওপরেই ছেড়ে দিয়ে গেলুম•••। তাছাড়া মিণ্ট র জীবনের দাম আপনাদের কাছে সামান্যই একথা জেনেই আমি এসেছিলুম- অনু আর কি বলবে খুজে পায় না যেন! শুধু হাপাতে থাকে উত্তেজনায় । তারপর চলে যাবার জন্য পিছন ফেরে। ফিরেই দেখে অশােক দাড়িয়ে। ইতি মধ্যেই বাড়ীর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। হাতে তার ডাক্তারী ব্যাগ ! রুনু চমকে উঠে প্রশ্ন করে, কোথা যান অশােক বাবু ? -আমাকে যেতে হবে ওখানে । যেন কিছুই হয় নি, এমনভাবে বলে অশোক। ডলি যেন আঁতকে ওঠে,-বস্তিতে !..দিদি.. মেসােমশাই...আপনারা কি বারণ করবেন না? সেখানে যে ভয়ানক বিপদ!... কি বলবে, কাকে ডাকবে ডলি খুজে পায় না যেন। উত্তেজনায় থর থর করে কঁপে। হরিচরণ ঘর থেকে সব শুনছিলেন। ডলির ডাক শুনে বেরিয়ে আসেন। কি জানি কি হয়ে যায় মেয়েটার । অশােক চলে যাচ্ছিল। ডলির চেঁচামিচি শুনে, একবার পিছন ফিরে দাড়ালাে। বললে, ছেলে ভােলাতে চেয়েছিলে•••মন্দ লাগে নি সমুদ্রের ধারে... কিন্তু কাজ ভােলাতে চেয়াে না... ওটা মনুষত্বে বড় লাগে... বনে বনে আগুন লেগেছে। ক্রিসেস্থিমামের লাল আগুন ! হরিচরণ বলেন, তােমরাই ভুল করেছিলে মা...অশােক আমারও ভুল ভঙ্গে দিয়ে গেল।••• হাতের লাঠির বাটটা খুব জোর মুঠোয় চেপে ধরেন তিনি। তবু লাঠিটা কঁপিছে ! মানাথ বাসার ঠিক করে এসেছে। বাহাদুরী আছে রমানাথের। তারিণী হঠাৎ আজ রমানাথের. কর্মতৎপরতার খ্যাতি করতে থাকে। বমানাথের ভালাে লাগে না। এ আবার কি আপদ! এ আবার কি আপদ ! ন্যাকামী দেখলে গা জলে !•••বস্তির রাস্তার মুখে দাঁড়ানাে ঠেলা গাড়ীটার ওপর মালপত্র তুলতে থাকে। এই ককুণ্ড থেকে পালাতে পারলে হয় একবার প্রাণ নিয়ে। মালপত্রের মধ্যে একটি ভাঙ্গা তােরঙ্গ, একটি বস্তা, ছেড়া কথা আর বালিশ, ভাঙ্গা হাড়ি বালতি ঝাঁটা...কাঠ-কাটরা আর গলার দড়ি বাধা একটা বেড়াল। তারিণী আজ সারাদিনই বকে চলেছে। রমানাথকে মালপত্র গােছাতে দেখে বলে, ওগাে চল আর দেরী করাে না...আমার কাহিল শরীরে যদি ছোয়া লাগে তবে আর বাঁচবাে না। নেশার ঘাের না থাকলে শুখনাে শুখনাে মস্করা ভাল লাগে না রমানাথের মুখের ওপরই বলে দেয়, তোমার শরীর কাহিল•••হা ভগবান! তারিণীর শরীরের মেদবহুল অংশগুলাের দিকে কটাক্ষ করে রমানাথ। কটাক্ষ নয় নিলজ্জ দৃষ্টি। তারিণী কথার মােড় ঘােরায়। বলে, গাড়ােয়ানটা কোন চুলােয় গেল? -বােধ হয় খৈনী টিপতে গেছে । রমানাথ গাড়ীর পিছনটা ধরে ঠেলা দিতে বলে, তুমি সামনের দিক থেকে টানাে আর আমি পেছন থেকে ঠেলি... পালাতে পারলে বাঁচি বাবা!...দুর্গ। দুর্গা! ১০৬ ওধার দিয়ে অশােক এসে দাঁড়ায়। আর একটু তফাতে অনু। অশােককে দেখে তারিণী ব্যস্ত হয়ে মাথার কাপড়টা টেনে দেয়। -কোথা চললে রমানাথ । পরমাত্মীয়ের মত বিস্মিত কণ্ঠে অশােক প্রশ্ন আপনি বাঁচলে বাপের নাম ডাক্তার সাহেব হাড় কখানা থাকতে থাকতে সরে পড়ছি। তারিণী চাপা গলায় পরামর্শ দেয় রমানাথকে। উদ্দেশ্য অশােকও কথা- গুলাে যেন শুনতে পায়। বলে, দু’কথা শুনিয়ে দাও না কেন?•••বলল যে আপনার আক্কেলটাও দেখে গেলুম- অশােক আর দাঁড়ায় না, বাজে কথায় সময় নষ্ট করবার অবসর নেই তার। মিণ্ট, তাকে ডাকছে। রমানাথ শুধােয়, ছেড়ে দিয়ে আবার তেড়ে ধরলো কেন বলল ত ? —তােমার বােন যে পায়ে ধরতে গিয়েছিল—পুরুষ মানুষের মন ত’! তারিণী রঙ্গে রসে একেবারে যেন গলে পড়ে। অশােক সােজাসুজি মিন্টর ঘরে এসে দাঁড়ায়। অনু মুখ তুলে তাকায় অশােকের দিকে, অশােকও দেখে অনুর দিকে। বর্ষার মেঘের মত কালাে আর সজল হয়ে উঠেছে অনুর চোখদুটো। অশােক পাগলের মত ডাকে, মিন্ট •••মিন্ট ••• মিন্ট র পৃথিবীটা মুছে গেছে মহাশূন্য থেকে। সূর্যের ডাকে পৃথিবী সাড়া দেয় না। অনু হঠাৎ ফঁপিয়ে কেঁদে ওঠে...নেই...মিন্ট, নেই ডাক্তারবাবু, অশােক অপরাধীর মত তাকায় অনুর দিকে। অনুর বােবা অশ্রু যেন কথা বলছে—মিন্টকে বাঁচাতে পারলুম না... আমাদের দারিদ্র..আমাদের অশিক্ষা নিয়ে সে চলে গেল...কিন্তু, যারা বেঁচে রইলাে..যাদের কেউ নেই ০ ১০৭ যারা পথে পড়ে মরে.: রােগে ভুগে মরে•••তাদের যেন বাঁচিয়ে তুলতে পারি তাদের কাছে থেকে যেন সেবা করতে পারি তবেই নিজের মনকে সার্থক মনে করবাে।••• আর এক মৃত্যুর মরুভূমি পার হয়ে নদী এগিয়ে আসছে সাগরের দিকে। বিশাল নীল সমুদ্রের চোখে পথক্লিষ্ট নদী ঝলমল করে ওঠে...বড় সুন্দর sob

অনেক কিছু বদলেছে। আরও অনেক আলো। আলােয় ঝলমল করছে
চারদিক।
খদের অন্ধকার আলাের তাড়া খেয়ে পালাচ্ছে।
অনু আরও কাছে সরে এসেছে। অশােক তাকে ভালো করে দেখছে।
ভালো করে দেখবার সুযােগ মিলছে আজকাল।
বিরাট হাসপাতাল গড়ে তুলেছে অশােক বিগত প্রাণ মিণ্টর নামে,
শুধু দরিদ্রদের সর্বহারাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা সেখানে।
অশােক সেই শ্রেণীর যাদের সব আছে, সবের বেশী আরও অনেক কিছু
আর অনু সেই স্তরের যাদের বাঁচবার অবলম্বনটুকু নেই। এই
দুটি পরস্পর বিমুখ মন এসে জড় হয়েছে একমুখী হয়ে।
শক্তির বিদ্যুৎ ঝলসাচ্ছে বহু দিনের পুঞ্জীভূত বেদনার কালাে
মেঘে !
অনু না হলে অশােকের চলে না। হাসপাতাল অনুর অভাবে একরকম
অচল।
আর অশোেকও ত’ হাসপাতালকে ছেড়ে নিজেকে কল্পনা করতে
পারে না আজকাল ! সারা দিনই সে ব্যস্ত। সময় নেই একটুও।
বাড়ীতে সকলে ঠাট্টা করে। শােভা বলে, হ্যারে হাসপাতালে তাের কাজ
আর ফুরােয় না না রে ? ওর কথার মধ্যে প্রচ্ছন্ন হয়ে কোন বক্র উল্লেখ থাকে
কি না অশােক তা ক্ষেপও করে না।
সত্যিই আর দাড়ায় না অশােক।

অনু নাস হয়েছে হাসপাতালে। একাধারে সে মেট্রন আবার অশােকের
সহকারী।
অসম্ভব পরিশ্রম করতে পারে অনু । অশােক বিস্মিত হয়ে দেখে । অনুর
ছিপছিপে লম্বা দেহটা সাবলীলভাবে নড়া চড়া করে, কাজের বন্যায় ফেনীল
4
এ আর এক ফেনীল জলস্রোত।
বড় ভালো লাগছে অশােকের !
অনুর বড় বড় চোখে জল নেমে আসে।
ঐ জলের মধ্যেই ত’ মিন্ট অমর হয়ে আছে । অশােকের অতবড়
হাসপাতালের সমারােহের মধ্যে সে স্মৃতি কত ম্লান !
অনুকে যতই দেখে কতরকম বিচিত্র ভাবনা সব ঝাঁক বেঁধে আসে
অশােকের মনে।
শুধু লাল নয়, চারিদিকে থরে থরে নানা রঙ্গের ফুল ফুটে উঠছে।
বহুক্ষণ ধরে অশােক মুগ্ধ হয়ে দেখে অনুর কাজকর্ম। এটা ওটা নিয়ে
আলােচনা করে, তদারক করে। শেষে একসময় উঠে পঁাড়ায়।
অনু বলে, চললেন ?
অশােক হাসে। বলে, আর কোন ছুতােয় এখানে থাকা চলে না-
অনু অশােকের দিকে তাকায় না। কি জানি অশােক হয়ত হাসছে।
ওর দিকে চাইলে হয়ত লজ্জা পেয়ে যেতে হবে।
খানিক পরে বলে, সত্যি কোথা থেকে কি যেন হয়ে গেল.•• আপনি
রাতারাতিই তৈরী করে ফেললেন হাসপাতাল মিন্টর নামে...আমি এলুম
আপনার সহকারী হয়ে...
অশােক তাড়াতাড়ি সংশােধন করে,—সহকারী নয় সঙ্গী হয়ে
অনু লাল হয়ে উঠে। অজান্তেই। বলে, সমস্তটাই যেন স্বপ্ন
*

-আগে স্বপ্ন ছিল.••এখন সত্যি হয়েছে !...কই কিছু খাওয়াবে নাকি ?
. ভারি ক্ষিধে পেয়েছে:::
অশােক কত সহজ হয়ে এসেছে। অনুর মনটা যেন ফুলে ওঠে। বাইরে
থেকে । প্রচুর ঠাণ্ডা মুক্ত বায়ু এসে যেন ঢুকছে । পাহাড়ের শীতল হাওয়া
সমতলে এসে নামছে••••••
অনু বলে, বেশ ত, গঙ্গাজলেই গঙ্গাপূজো করবাে।
বস্তির মেয়ে হলে কি হয় অনু কথা বলতে পারে বেশ। অশােক তার
দৃষ্টির মধ্যে অর্থ এনে বলে, মাইনে পেয়েছে মনে হচ্ছে•••আচ্ছা, আর এক
দিন খাবাে খুব করে
অশোক যখন বেরিয়ে আসে হাসপাতাল থেকে তখন বেশ রাত হয়েছে।
কম্পাউণ্ডের রাস্তার দুধারে ওয়ার্ডের স্তিমিত আলাে এসে পড়ছে জ্যোৎস্নার
মত। অন্ধকারে গা-ছােবানাে বাড়ীগুলাের কোলে কোলে আলাে পড়েছে।
বাড়ীগুলােকে দেখাচ্ছে ফুলঝরাণাে শিউলিগাছের মত।
অশােকের বুকটা গর্বে ফুলে ওঠে। তার স্বপ্ন সফল হয়েছে এতদিনে ।
মিন্ট ঘুমিয়ে আছে এই স্বপ্নের মধ্যে।
মিন্টর সেই অসহায় কাতর দৃষ্টিটা আজও মনে পড়ে,–এই কলমটা
আমিই নিয়েছিলুম ডাক্তারবাবু
অশােক অন্যমনস্কের মতই তাকায় পকেটের দিকে। সােণার ক্লীব লাগানাে
কলমটা অন্ধকারের মধ্যেও জ্বলছে।
আর জ্বলছে না-দেখা রাজ্যের ওপার থেকে দুটি আলো।
অনুর উজল দুটি চোখ !
অশােক আলাে-দেখানো অন্ধকারের মাঝ দিয়ে এগিয়ে আসে।

অনু সারাদিনই কাজ করে চলে হাসপাতালের মধ্যে, এ ওয়ার্ড থেকে ও ওয়ার্ড ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। কোন রােগীর গায়ে হাত বুলােয়, কেউ যন্ত্রণায় চেঁচাচ্ছে তাকে আশ্বাস দেয়, কারও ওষুধটা ঢেলে দেয় মেজার গ্লাসে। এমনি করে সকলের তদারক করে বেড়ায়। ইমারজেন্সী কেসগুলাে বেশী করে খোজখবর করে। তারপর প্যাথলজি বিভাগে আসে। অশােকের অনেক কাজ নিজের থেকেই শেষ করে দেয়। অনেক অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করে রাখে। অবাক হয়ে যায় অশােক। ছােটখাটো experiment গুলো কি সহজে আয়ত্ত করে নিয়েছে ও । যখন খুব ব্যস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি কাজ করে অনু তখন অশােকের খুব ভালো লাগে দেখতে। অশােক দেখতে আসে ওকে। অশােক এসে যন্ত্র নিয়ে নিজেই বসে যায়। টেষ্টটিউব নিয়ে ঢালাঢালি সুরু করে দেয় । অনু এতক্ষণ কাজ করছিল। অশােক এসে বাধা দেওয়ায় অনু যেন রেগে ওঠে। বলে, আমাকে ফাকি দিচ্ছেন আপনি? —ফঁাকি ? মানে ?••• অশোক অণুকে রাগতে দেখে হাসে। -এসব বাজে কাজ এখন আপনার না করলেও চলতাে- -বলাে কি? এসব অত্যন্ত জরুরী কাজ !•••অশােক মুখটা গম্ভীর করে কাজের গুরুত্বটা প্রকাশ করবার চেষ্টা করে। অনু এইবার হাসে। বলে, নাসের কোয়াটারে ঢুকে আপনার এত জরুরী কাজ••লােকে বিশ্বাস করবে ? -সে কি ? অশােক যেন হতাশ হয়ে বলতে থাকে—তােমার কথা শুনে প্রায় লজ্জা পাচ্ছি... অনু হাসি চেপে নিয়ে মিশ্রিতস্বরে বলে, একটা ছুতাে পেলেই আপনি ছুটে আসেন...! বলুন, সত্যি নয় ? ১১২ অশােক হেসে ওঠে অনুর বলার ভঙ্গী দেখে। বলে, খানিকটা সত্যি তবে অনেকটা মিথ্যে !... এবার অনুর হাসির পালা। অনু হাসে। সহজ সরল কিন্তু অনুচ্চারিত হাসি। অশােক কি বলবে? চেয়ে চেয়ে দেখে অনুর দিকে। আলােচ্ছাস যেমন সুন্দর। জলােচ্ছাসের আবেগও তেমন সুন্দর। হঠাৎ ওয়ার্ড থেকে ডাক আসে অন্তর । অনুকে না পেয়ে কোন রােগী যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। খেতে চাইছে না একটুও। অনুকে উঠতে হয় তাড়াতাড়ি। ছুটে যায় ও ওয়ার্ডের দিকে। অশােক ওর যাওয়ার দিকে দেখে। বিলীয়মান ছায়াটাও যেন আকর্ষণ করে ছায়া নয় একটুকরাে আলাে যেন সরে যাচ্ছে। হাসপাতালের বারান্দায় জ্যোৎস্না এসে পড়েছে । চাদে ভরা রাত্তির । জ্যোৎস্নার মতই পুলকে আবেগে সমস্ত হৃদয়টা যেন ভরে আসছে। যেখানে যেখানে অস্পষ্ট অন্ধকার সেখানে সেখানে কিছু বেদনার ইঙ্গিত।••• জাহাজের ডেকের মত মােটা কালাে রেলিঙ দেওয়া বারান্দার ধারে গা এলিয়ে দিয়ে দাড়ায় অনু। সমস্ত দেহ-মন জ্যোৎস্নার আবেগের মধ্যে ডুব দিয়ে থাকে। কেমন একটা স্নিগ্ধ শীতল উত্তেজনা:••••• ঢেউ উঠছে চারদিকে। জ্যোৎস্নার বন্যা বড় প্রবল। অনুর মনে হয় শুধু ডুব দিতে। এককালে অনু ভাল গান গাইতো। সত্যি তার গলাটা শােনবার মত মিষ্টি ছিল। তাই বস্তির মধ্যে থাকতে হলেও গান সে কিছু কিছু শিখেছিল। কিন্তু সে-সব গান দারিদ্র্যের ঝড়ে কথন কবে চতুর্দিকে ঝরে ঝরে লুটিয়ে পড়েছে। ১১ হের-(৮) অনেকদিন পর তাদের আবার কুড়িয়ে নিচ্ছে অনু। ওর তরল কল্প- সঙ্গীত জ্যোৎস্নার সমুদ্রের ওপর দিয়ে ভেসে চলেছে। গান ত নয় হৃদয় হতে উৎসারিত জ্যোৎস্নাধারা। অনেকদিন পর হৃদয়কে উন্মুক্ত করে দিয়েছে ও। অশােক যে কখন এসে দাড়িয়েছিল বারান্দার একপাশে অনু তা একেবারেই খেয়াল করে নি। অশােক তাই চুপ করে শশানে। চাদে-ভরা আকাশে একপাল শুত্বশ্বেত বলাকা যেন উড়ছে। জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ সমুদ্রে উত্তাল ঢেউ । অনেকক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে থাকবার পর হঠাৎ অনু লক্ষ্য করে অশােককে। মনে হয় ওর ছায়াম্লান মূর্তিটা ত’ বহুক্ষণই ছিল। তবে চমক লাগলাে কেন ? অশােক কিছু বলে না, চুপ করে দেখে, আর স্থির হয়ে শােনে। গান শেষ করে অনু বলে, কি ভাবছিলেন ? অশােক এতটুকুও সচকিত হয়ে ওঠে না। বহুদূর থেকে নদীকে দেখা গিয়েছিল সাগরের পানে ছুটে আসতে। গভীর সাগরের বুকে নতুন করে ত’ কোন আলােড়ন নেই। শুধু ঘনতর শান্ত শীতল আহ্বান আছে নদীর পানে। অশােক বলে, বলাে ত কি ভাবছিলুম ? -ভাব ছিলেন মেয়েটার মতলব ভালাে নয়। —না ধরতে পারে নি !"ভাবছিলুম, কী সুখ- অনু হঠাৎ পূরােপূরিভাবে তাকায় অশােকের দিকে অশােক বলে চলে,ভাবতেই সুখ•••ওরা বেঁচে ওঠে আমাদের হাতে আমাদের সেবায়••• হা•••সত্যি। অনু চোখ নামিয়ে নেয়। ১১৪ .

-আর কি ভাবছিলুম শুনবে?যদি রােজ কাজকর্মের পরে এমন একটা
গান শুনতে পেতুম
-ঠাট্টা করছেন বুঝি ? অনু যেন আহত হয়ে প্রশ্ন করে ।
-তােমার এত কাজ করে দিচ্ছি একটু ঠাট্টা না হয় করলুম...মন্দ কি?
খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে অনু।
জ্যোৎস্নার মত অশােককে যেন অনুভব
করা যায়। খানিকক্ষণ পরে অনু বলে, কই আপনার সেই ভীষণ দরকারী
কথাটা বললেন না ত ?•••
অশােক এইবার একটু যেন সচকিত হয়ে ওঠে। বলে, হ্যা:বলি-
অশােক হেসে নেয় একটু বলছিলুম কি সবাই বাচবে তােমার হাতে একজন
কিন্তু আধমরা হয়ে রইলাে--
-কার কথা বলছেন ? অনু বিস্মিত প্রশ্ন তােলে ।
—তােমার সামনে যে হতভাগ্য সশরীরে দণ্ডায়মান। অতি সহজেই
বলে ফেলে অশােক।
অনু বিচলিত হয় একটু। বলে, ও ভারী ঠাট্টা করেন আপনি।
এগিয়ে যেতে চায় অনু। অশােকের কাছে বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়:
আজ!
অশোক ডাকে, শােনাে।
-কি?
-না কিছু না।
-তবে ডাকলেন কেন ?
-তুমি সাড়া দিলে কেন ?
হহ হহা করে হেসে ওঠে দুজনে।
জ্যোৎস্নায় ডুবে চঁদ আর পৃথিবী দুজনেই হাসে।
আকাশ ও মাটি ঝলমল করে ওঠে

-এগারো- পাগল হয়ে উঠেছেন রায়বাহাদুর কাগজখানা পড়তে গিয়ে। ক্ষোভে, উত্তেজনায় ঠক ঠক করে কাপছেন তিনি। এ-যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করা যায় না। এতবড় জমিদার রায়বাহাদুর শশধর চৌধুরী তার বিরুদ্ধে কাগজে এমনইভাবে বেনামী চিঠি লেখার সাহস কার ? হাতের পাশের লাঠিটা তুলে নিয়ে মেঝেতে দুবার দুম দুম করে ঠুকে রায়বাহাদুর দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে বসেন!...কালো কালাে অক্ষরগুলাে যেন কালো কালাে বিষধর সাপ...চোখের সামনে সব কিলবিল করছে।... কোন যাদুকর এই বিষধর সাপদের খেলাচ্ছে অন্তরীক্ষ থেকে ? মাথার ভেতরটা চন করে ওঠে। রায়বাহাদুর ছুটে আসেন কাগজখানা নিয়ে হেমনলিনীর কাছে। এই কাজ বুঝতে তার আর বাকী নেই । খবরটা হেমনলিনীর মুখের ওপর করে দেওয়া দরকার । হেমনলিনী তার বাতের ব্যথায় আত্মস্থ হয়ে বসেছিলেন। রায় বাহাদুর ঘরের মধ্যে ঢুকেই একেবারে যেন ফেটে পড়েন। “দেখেছে, দেখেছাে.•• এই দেখো আজকের কাগজ...বেনামী চিঠি আমার বিরুদ্ধে...১৩ নম্বর বস্তির যত নােংরা তার জন্যে নাকি দায় আমি ? —রাম বলে। হেমনলিনী এক ফুয়ে উড়িয়ে দিতে চান কথাটা। রায় বাহাদুর আগের মতই জলছেন তখনও!-এ কার কীর্তি জানো? -তােমার ঐ ভাবী জামাইয়ের! আমি নাকি খারাপ লােক, আমি নাকি চামারের মতন বস্তির ভাড়া আদায় করে থাকি...মড়কের জন্যে নাকি আমিই দায়ী..বুঝলে? বুঝতে পাচ্ছে কিছু? —আর একটু চেঁচিয়ে বলাে..শুনতে পাই নে...। বােকার মত বলেন। হেমনলিনী। কথা শুনে আরও চটে ওঠেন রায় বাহাদুর। গলা চড়িয়ে বলেন, এই সময় তোমার তামাসা ?...স্বামীর বিপদে তামাসা ?... আরও অনেক কিছু বলতে গিয়ে রাগের মাথায় এমন আটকে যায় যে অসম্ভবরকম চুপ করে যান তিনি। —রাম বলাে•••আমি ভুগছি আমার বাতের ব্যথায়- -চুলােয় যাক তোমার বাত.. তোমার বাত নিয়ে মর তুমি বলি এর পেছনে আসল কথাটা বুঝতে পাচ্ছাে?—কাগজটা নাড়তে নাড়তে তিনি বলেন—সামনে কর্পোরেশনের ইলেকশান..মানে আমাকে এবার কিছুতেই দাড়াতে দেবে না...আমার সঙ্গে শত্রুতা...তােমার ঐ ভাবী জামাতা বাবাজীর ভেতরে ভেতরে এই সব অভিসন্ধি... দরজার বাইরে কার ছয় নড়ে। হরিপদ এসে কখন দাড়িয়েছে। বাইরে থেকে হরিপদ বলে, আমাকে ডাকছিলেন বড়বাবু ? রায়বাহাদুর ওর কথার জবাব দেন না। ওকে দেখেই বলতে থাকেন, তােমাকে বলে দিচ্ছি হরিপদ...যত টাকা লাগে..ভূতে পণ্ডিতের ঐ মেয়েটাকে উৎখাত করতে হবে বস্তি থেকে যদি দরকার হয় ঘর দোর আলিয়ে দেবে... রায় বাহাদুরের চোখে আগাম অগ্নি লাগে। চোখ দুটো জ্বলছে। হরিপদ মিষ্ট হাস্তে হাত কচলায়। বলে, বড়বাবু মনে করেছিলুম তাই করবে...কিন্তু পাখী যে পালিয়েছে। -পালিয়েছে ? কোথায় ? ১১৭

-আমাদের অশােকবাবু ছুড়িটাকে মােটা মাইনের চাকরি দিয়েছেন
হাসপাতালে...
-বটে ! হুরায় বাহাদুর চিন্তিত মুখে লাঠির বাটের রূপাের মকরের
মুখটা চেপে ধরেন !
- আবার শুনেছেন...বস্তির সবাইকে শেখানাে হয়েছে কেউ ঘরভাড়া
দিয়াে না
-কেন ? কেন? ভাড়া দেবে না কেন শুনি ?—উত্তরট। যেন হরিপদর
কাছ থেকেই পাওয়া যাবে এমন ভাবে প্রশ্ন করেন উনি ওকে।
–ওই ত•••বলে কে•••শুনতে পেলুম...ছুড়ি নাকি ম্যানেজার...
অশােকবাবুর হাসপাতালের ম্যানেজার...
হেমনলিনীও বাতের ব্যথা ভুলে চমকে ওঠেন—ম্যানেজার ।
“আজ্ঞে হ্যা মা.. মেয়েছেলে ম্যানেজার ! ডাক্তারবাবু ওর কথায় ওঠেন
আর বসেন...ছুড়িটাই ত সব মা...
হঠাৎ ডলি এসে ঢােকে ঘরের মধ্যে। হরিপদ চুপ করে যায় ওকে দেখে ।
ঝড়-খাওয়া গাছের মত এলােমেলাে দেখাচ্ছে ডলিকে। ডলি হরিপদর
দিকে তাকিয়ে ডাকে, হরিপদ!
-আজ্ঞে দিদিমণি! একেবারে কেঁচো হয়ে গেছে ও। ডলির রাগ
সম্বন্ধে যথেষ্ট পরিচয় আছে ওর অনেকদিন।
-তােমাকে কি কানাকানি আর গােয়েন্দাগিরির জন্যে রাখ"
হয়েছে ?
স্থিরলক্ষ্য তীক্ষ্ণ-তীরের মত প্রশ্ন।
হরিপদ আমতা-আমতা করে—আজ্ঞে••আজ্ঞে, ••
—যত রাজ্যের নােংরা গুজব এনে কেন তুমি বাবার কানে ভােলাে?
-আমি মিথ্যে বলিনি দিদিমণি। হরিপদ হঠাৎ বলে ফেলে ।
১১৮

-তােমার কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে আমি জানি। তােমাকে
মানা করে দিচ্ছি এই শেষবার...যাও বেরিয়ে যাও
হরিপদ দ্বিরুক্তি করে না। বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
এক ঝড়ে বহু কালাে মেঘ উধ্বশ্বাসে পালাচ্ছে।
ডলি বাবার দিকে ফেরে এইবার—বাবা, আপনি কেন হরিপদকে আস্কার।
দেন ? পায়ের জুতো মাথায় ওঠে দেখতে পান না !
—সমস্ত লণ্ডভণ্ড হতে চললো...কিছু দেখতে পাচ্ছে না মা? রায়
বাহাদুর অদ্ভুতভাবে বলেন।
অগ্ন্যুৎপাতের পর আগ্নেয়গিরি থেকে শুধু দোয়া ওঠে।
লণ্ডভণ্ড আপনি নিজেই করেছেন বাবা! মাথা নীচু করে কঠিন
স্বরে বলে ডলি।
-আমি —হাতের মধ্যে লাঠির মুঠো আবার দৃঢ় হয়ে আসে রায়
বাহাদুরের!
-আপনি পরের কথায় নাচেন...ইতরলােক গুলাের কানাকানি বিশ্বাস
করেন:
—আর এই যে খবরের কাগজপান।...কাগজখানা বাড়িয়ে ধরেন তিনি
অধৈর্যের মত !
—হ্যা আমি দেখেছি ! আপনার লােক গিয়ে বস্তি থেকে ভাড়া আদায়
করে তাদের অবস্থার দিকে আপনার চোখ নেই...কাগজে মিথ্যে কথা
লেখে নি বাবা !
আশ্চর্য ! আকাশেরও নীল রঙ, ফিকে হয়ে আসছে।
“তুমি কি বলতে চাও অশােকের এ কাজটা ভালো !...
-আপনি আগে থেকে সাবধান হলে এ কাজ সে করতাে না বাবা।
ডলির স্বরে কান্না নেমে আসছে। ভারী কান্নার পদধ্বনি শােনা যাচ্ছে ওর

কম্পিত স্বরে—কিন্তু আপনারা জানেন না-এ বিরােধের শেষ ফলাফল আমাকেই ভুগতে হবে...সমস্ত অপমানটা আমাকেই বয়ে বেড়াতে হবে: ঝড়-লাগা গাছে ডাল-পালা ফুল-পাতা অসহায়ভাবে ঝরে পড়ছে। ঝড়ের ধূলােয় আকাশ ফিকে হবে না কেন? এদিকে হরিচরণও চিন্তিত হয়ে পড়েন। হাজার হলেও শশধর চৌধুরী তার অনেকদিনের বন্ধু। বিশেষ করে তার মেয়ের সঙ্গে নিজের ছেলের একটা ব্যবস্থা করবার চেষ্টা চলছে দু’তরফ থেকে। সেই শশধরের বিরুদ্ধে অশােকের এমন অভিযানটা বরদাস্ত করা যায় না। শশধর আবার সামনের ইলেকশনে দাড়াচ্ছেন। এখন যদি অশােকের চেষ্টায় কাগজে এরকম সব নিন্দ। বার হয় তাহলে ভাববার কথাই বটে। অশােক এতদিন বস্তির উন্নতি নিয়ে মেতে ছিল, সে হল এক কথা। আর এ হল অন্য ব্যাপার। এ ব্যাপারকে অত সহজে স্বীকার করে নেওয়া যায় না। তার নিজের দিকে থেকে এবং অশােকের দিক থেকেও ব্যাপারটা সঙ্গত নয়। কাগজে বেনামী চিঠি বার হলেও, খবরটা ত’ আর চাপা নেই যে এর মূলে আছে অশােক নিজে। এর আগে অশােককে অন্য দিক দিয়ে অনেক বােঝাতে চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু পারেন নি। তবে তা নিয়ে বিশেষ চিন্তিত হন নি তিনি। কিন্তু এবারের কথা অন্য । শােভাকে ডেকে হরিচরণ পরামর্শ করেন। শোভা ছাড়া আর কে-ই বা আছে আলােচনা করবার। বলেন, অশােক আবার একটা হৈ-চৈ বাধিয়ে তুললাে মা..কাগজে আবার কি সব বের করে বসেছে... লােকের দুঃখদুর্দশার কথা কাগজেই ত বেরােয় বাবা—শােভা ধীরে ধীরে বলে। —কিন্তু শশধর আবার সামনের ইলেকশানে দাড়াবে. অশােকের এ কাজটা কি ভাল হল মা?•••আর যাই হােক শশধর আমার বাল্যবন্ধু!

-অশােকের অন্যায় কোথায় হল বাবা?
-হল বই কি মা! শশধরকে সে মুখে মুখে বুঝিয়ে দিতে পারতো...কিন্তু
কাগজে ছেপে দেওয়া •••
-সত্যি কথার জন্যে খবরের কাগজ। অশােক সত্যি কথাই বলেছে
বাবা।
চারিদিকেই এমনি টুকরো আলােচনা চলে।
অশােককে নিয়ে বড় একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে আজকাল।
এদিককার আলােচনাটা হেমনলিনী আর অশােকের মধ্যে।
অশােক এসেছে পরীক্ষা করতে হেমনলিনীকে।
করে পরীক্ষা করছে অশােক হেমনলিনীকে।
আগে আগে অশােককে দেখলেই
দেখলেই হেমনলিনী অনেকটা সুস্থ বােধ
করতেন। তাই চিকিৎসা হােক আর না হােক নিয়মমত আসাটাই অশােকের
একটা রীতি হয়ে দাড়িয়েছে। কিন্তু কিছুদিন হল সে মন হেমনলিনীর
বদলেছে।
আজকাল রীতিমত চিকিৎসার কথা হয় অশোকের সঙ্গে।
হেমনলিনী মনে মনে হাঁপিয়ে ওঠেন। অশােক আসল চিকিৎসার কথাটাই
এড়িয়ে যাচ্ছে ।
ব্যাপারটা যখন এতদূর ঘােরালাে হয়ে দাড়ালো তখন হেমনলিনী সেদিন
কথাটা একেবারে প্রকাশ না করে আর পারলেন না। সােজাসুজিই প্রশ্ন করে
বসলেন অশােককে,—বাবা অশােক তবে কি আমার ষােল কড়াই কাণ?
অশােক একমনে পরীক্ষা করে যাচ্ছিল ওঁকে। আজকাল ওঁকে দেখতে
হয় মন দিয়ে। চিকিৎসা যখন চলছে।•••
অশােক বলে, কেন বলুন ত !
“তুমি আজ পর্যন্ত আমার আসল কথাটার কোনাে জবাব দিচ্ছ না কেন?
-কোন আসল কথাটা? অশােক সহজে সােজা জবাব দেবে না।
১২১

তুমি বিয়ে করবে কি না?—হেমনলিনী কি বলবেন ঠিক করতে
পারেন না।
--অনিচ্ছে নেই।
—ডলি কি তােমার অযােগ্য? হেমনলিনী আজ এমনভাবে কথা
বলছেন যে মনে হয়, হয় তার পায়ের বাত কোনদিনই তেমন ছিল না কিংবা
হঠাং সব সেরে গেছে ।
অশােক হাসি দিয়ে ঢাকা দেয় জবাবটা। বলে, আমি কি ডলির
যােগ্য ?•••
হেমনলিনী হঠাৎ যেন উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। চেয়ারের মধ্যে দুলে ওঠা
তার থেমে গেছে। কাঠ হয়ে বলেন, বাবা, তােমাদের একালের কথার ফাঁদ
আমি বুঝি নে !..তুমি না হয় অনেক কাজের লােক..ডলিকে এবার তুমি
পাশে টেনে নাও না কেন ?...সে তােমার সঙ্গে কাজ করবে।
অশােক এতক্ষণ পরীক্ষা করছিল ওঁকে। এবার হাত গুটিয়ে সরে দাড়ায়।
বলে, খুব আনন্দের কথা ! তবে কি জানেন... আমার সঙ্গে দেশের কাজ যে
করবে...কিংবা করতে চায়...সে নিজেই আমার পাশে এসে দাঁড়াবে... আমাকে
টেনে নিতে হবে না—
অশােক মুখে হাসলেও মনে সে যে হাসছে না তা ওর মুখ দেখেই বােঝা
বায়।
এর থেকে পায়ের বাত অনেক ভালাে। অশােকের কথা শুনে চুপ হয়ে
খান হেমনলিনী।
অশােক দাড়ায় না। স্ট্যাণ্ড থেকে হাত বাড়িয়ে টুপিটা তুলে নিয়ে
বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
এদিকে নিখিল আর রুণু নির্জন বাইরের ঘরটা বেছে নিয়েছে। তাদের
আলাপের বিষয় আলাদা, কিন্তু অত্যন্ত প্রয়ােজনীয়।
১২২

তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা সেরে নিতে চায় নিখিল । ছােট ভূমিকা, ছােট
বক্তব্য, অল্প সময়েই কাজ ।
এদিক ওদিক তাকিয়ে নিখিল বলে, ডলি এসে পড়বে না ত !
ভলিদের বাড়ীতেই ব্যাপার। ডলির এসে পড়টা বিচিত্র নয়। তবু,
রুণু বলে, কেন? বলতে গিয়ে হেসে ফেলে ও অলসভাবে ।
নিপিল পকেট থেকে একটা নেকলেস বের করে রুণুকে দেয়। বলে,
Excuse me কদিন থেকে তােমাকে একলা পাবার চেষ্টা করছিলুম...এটা
তােমায় চমৎকার মানাবে রুনু:
বলতে গিয়ে নিখিল এমনভাবে তাকায় রুণুর দিকে যেন ও সেই অপরূপ
রূপ তার দেখছে।
আলগােছে হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করে রুণু ওটা।
নিখিলের দেওয়ায় যেন লতিয়ে পড়ছে ও।
একটু থেমে রুণু বলে, সুদটা বুকে পেলুম...এবার আসলটা চাই যে !
Of course ! আজ মেট্রোয় গিয়ে কথা হবে-
অল্প কথা অল্প কাজ । কাজ শেষ হলে রুণু নতুন প্রশ্ন তােলে-ফুলের
তােড়াটা কার ?
—শ শ, শচুপ!
দরজার দিকে ইশারা করে থেমে যায় নিখিল ! দরজা দিয়ে ডলিই
আসছে !
নিখিল হঠাৎ উচ্ছান্সের সঙ্গে বলে ওঠে, How glorious ! এই নাও•••
তােমার জন্যেই এনেছি ডলি !
—আমার জন্যে'? ধন্যবাদ ! কিন্তু ওটা রুণুকে দাও!
-রুনুকে ••my God! নিখিল ভণিতা করে প্রাণভরে ।
রুণুও চুপ করে থাকে না। ডলিকে বলে, রাগ করছে কেন ডলি ?

= -রাগ ? তােমাদের ওপর ! রাগ করি নি ভাই।•••আমি বলি আড়ালে আবডালে আপনি ত রুণুকে এটা ওটা দিয়েই থাকেন- My God ! তােমার কথা শুনে প্রায় চমকে উঠছি ডলি। নিখিল চমকের ভান করতে গিয়ে ঠকে যায় ডলির কাছে। —আমার কথা খুব সাধারণ। দু নৌকায় পা দেবেন না মিষ্টার রায় -What do you mean ? —আপনার দুবুদ্ধি অনেক দেখেছি, কিন্তু আপনার চাতুরী অসহ্য। ডলির স্বর হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠছে।••• -I see—নিখিল তার স্বরূপে ফিরে আসছে—তুমি আগে বলতে আমি বােকা, এখন বলছে চতুর...I am possibly both••• but I will be a little fra:)k to you to-day.তুমি শুধু বােকা—চতুর নয়, তাই তােমার এই দুর্গতি -আপনার মন্তব্যের জন্যে আমি অপেক্ষা করে নেই মিষ্টার রায়- - জানি। এও জানি অশােক তােমাকে বিয়ে করবে না:::কেন না অনুকে আমরা দেখেছি তুমি তার এক তিল ও ষােগ্য নও। অনেক মেয়ে। আমার দেখ আছে:••but Alu is the noblest of the lot • • আচ্ছা good bye. Good bye. চাপা গলায় বিদায় দেয় ডলি নিখিলকে । ক্রিসেন্থিমাম যেমন লাল হয়ে ফুটে উঠেছে, দমকা হাওয়া তাকে তেমন ভাবেই ঝরিয়ে দেয়। দিকে দিকে । লাল হয়ে বিছিয়ে থাকে ধূলিধূসর ভূমির 'পরে। ক্রিসেন্থিমাম । ফোটা ফুল আর ঝরা ফুল। এ দুয়ের বিভিন্ন স্থান আছে। ১২৪ কোথায় আবার মড়ক সুরু হয়েছে। কোলকাতারই উপকণ্ঠে কোন বস্তি অঞ্চলে দেখা দিয়েছে কলেরার মারাত্মক অভিযান। নিরীহ অসহায় মানুষের দল বিনা চিকিৎসায় বিনা ব্যবস্থায় দলে দলে মরছে। অশােককে যেতে হবে সেখানে। অশােক তার কর্মপন্থা ঠিক করে ফেলেছে। তার হাসপাতালের তরফ থেকে একটা ইউনিট নিয়ে যেতে হবে সেখানে। সঙ্গে যাবে সে নিজে আর অনু। মানুষের সেবা করার ব্রত তারা নিয়েছে। সেই ব্রত রক্ষা করতে হবে। দেরী করবার সময় নেই। মড়কের চেয়েও আরও বেশী কালে আতঙ্ক সবার মুখে। সবার অর্থে হরিচরণ, শােভা, রায়বাহাদুর, হেমনলিনী আর ডলি। অশােককে কি কোনমতেই ফেরানাে যায় না। কোথায় কোন নােংরা বস্তির মধ্যে গিয়ে পড়বে। শেষটা জীবনই বিপন্ন হবে না কি ? এ ত আর শুধু বস্তি সংস্কার নয়, রীতিমত মরণের সঙ্গে যুদ্ধ।•••সকলে তাদের নিজ নিজ শক্তি প্রয়ােগ করে অশােককে রাজী করাবার জন্যে। কিন্তু রাজী করা যাবে না অশােককে। তার আদর্শ তার কর্তব্য অনেক আগেই সে স্থির করে বসে আছে। সেখান থেকে তাকে টলানাে যাবে না। শােভা এসেছিল অনুর কাছে। এসে বলেছিল, একদিন এসে বলেছিল, একদিন তুমি এসেছিলে আমার কাছে তােমার ভাইয়ের জন্যে আর আজ আমি এসেছি আমার ভাইয়ের জন্যে তােমার কাছে। ওকে এই সিদ্ধান্ত থেকে ফেরাও ভাই। কিন্তু অনুরও সাধ্যে নেই অশােককে ফেরায়। ১২৫

অনুরও বুকটা কাপে। এতখানি বিপদের মধ্যে নিজের জীবনকে তুচ্ছ
করে ঝাঁপিয়ে পড়া
অন্ত মিনতি করেই বলে, তােমার গিয়ে কাজ নেই।
অসাধারণ দৃষ্টি দিয়ে দেখে অনু অশশাকের দিকে। আর কিছু দিয়ে
বাঁধতে না পারলেও শেষে দৃষ্টি দিয়েই আচ্ছন্ন করে ফেলবে নাকি অন্য
==
অশােক দৃঢ় হয়ে হাসে। বলে, ওঃ তুমিও কি ভয় পেলে ?
—আমি ? একটুও নয় ! অনুর জলভরা চোখে সাহসের আলাে চকচক
করে—আমি ত বলেছি যে আমিই যাবাে
—মত বদলায় নি ত ?
না। কিন্তু তােমার যাওয়া হবে না।
শুধু লাল নয় অনেক রঙ্গের অনেক ফুল ঝরছে পথে-পথপ্রান্তে।
-তুমি যাবে, অথচ আমি যাবাে না: মানে?
-তােমাকে বিপদের মুখে পাঠাতে সাহস হয় না:
নদী বড় বেশী কাছে এসে গেছে সাগরের ।
অশােক গভীরভাবে হাসে। বলে, বাঃ তুমি নাস থেকে একদম নারী
হয়ে উঠলে দেখছি:••একদিন তুমিই আমায় এ কাজে নামিয়েছিলে...পথ
দেখিয়েছিলে...মনে পড়ে অনু ?
-কিন্তু তােমার জীবনের যে অনেক দাম।
দাম যদি কিছু থাকে শােধ করতে হবে, এ কথা ভুলো না
অনু চুপ করে থাকে। কথা বাড়িয়ে আর ভুল বুঝতে চায় না অশােককে।
ভুল বােঝার ভুল আর সে করবে না।

ভুল করে বসলো অশােক নিজে। ভুল বােঝার ভুল নয়, ভুলের বােঝায় , আপনাকে হারিয়ে ফেলার মারাত্মক ভুল।••• হাসপাতালের ইউনিট নিয়ে অশােক এসে কাজ জুড়ে দিয়েছে সেই বস্তির মধ্যে। কলেরার মহামারীতে বস্তি প্রায় উজাড় হতে চললো। চারিদিকে নােংরা ময়লা আর বােগ। কেবলই রােগীর কাতরানি আর কান্নার কলরব ভেসে আসে। এদিকে ওদিকে মড়া কান্না...দুর্গন্ধ আসছে বীভৎস রকমের।••• অম্লানবদনে নােংরা ঘেটে চলেছে ওরা। সেবা করছে। ওষুধ দিচ্ছে। একটার পর একটা ইনজেকশন দিয়ে চলেছে অশােক। যাদের এখন রােগে ধরে নি তাদের টীকা দেওয়া হচ্ছে। চারদিকে শুধু কর্মব্যস্ততা আর তৎপরতা। তবুও তারই মধ্যে অসাধারণ সাবধানতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে ওদের। মৃত্যু নিয়ে খেলা নয়, খেলা জীবন নিয়েও। একটু অসাবধান হলে তার মূল্য দিতে হবে হয়ত। সেই ভুল, সেই অসাবধানতা করে বসলাে অশােক । বরাবরই ওখানে জল ফুটিয়ে নিয়ে খাচ্ছিল ওরা। সেদিন হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে অশােক বীজাণু- দূষিত অফোটানাে জল খেয়ে বসলাে। ঠাণ্ডা স্বচ্ছ পরিষ্কার জল। কিন্তু কি ভীষণ মৃত্যুবীজ লুকিয়ে আছে তার মধ্যে। অনুর লক্ষ্য এড়ায় না। অশােকের কথা তার মনে আছে—তুমিই আমায় এ পথে নামিয়ে এনেছে অনু।—সে পথে একা ত’ যেতে দেবে না অনু। অনুর কণ্ঠ আর্তনাদ করে ওঠে, কি করলেন ?... অশােক স্নানভাবে হাসে। বলে, ও কিছু না...ঠিক আছে।••• —কিন্তু তুমি যে এ ভুল করতে আমাদের সবাইকে মানা করেছিলে... আর তুমি নিজে-ভয়ে উৎকণ্ঠায় আর কান্নায় অনুর স্বর বােবা হয়ে আসে। ১২৭ -হ্যা অনু আমি ভুল করেছি। অশােক বিবর্ণমুখে স্বীকার করে অনুর সামনে। অনুর কাছে ছাড়া তার ত স্বীকার করবার আর কেউ নেই। অশােকের মুখের ওপর ছায় নামছে। মৃত্যুর সংগ্রাম চলেছে অশােকের রক্তে। কেবিনের মধ্যে চিকিৎসা চলেছে তার। ডাক্তাররা ঘিরে রয়েছে। ইনজেকশন...হট-ওয়াটার ব্যাগ... | কিন্তু তবু সমস্ত চেষ্টাকে অতিক্রম করে মৃত্যুর বিজয় রথ এগিয়ে চলে। অনু রয়েছে অশােকের মাথার কাছে। মাথার কাছে থাকলেও অনু ঘিরে রয়েছে অশােককে চারদিক থেকে। তার দৃষ্টি তার আগ্রহ.. অশােককে রক্ষা করছে। ডাক্তারবাবু, পরীক্ষা করে ছেড়ে দেন ? অনু ডাকে ডাক্তারবাবু ডাক্তার কুঞ্চন করে ঘাড় নাড়েন। সদুত্তর কিছু দেন না। দেবার মত কিছু নেই ! অনু স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকায় অশােকের দিকে। সব দিয়েও কিছু হল না। অতি মৃদুকণ্ঠে ডাকে—অশােক । এত আস্তে ডাকে মনে হয় নিজের ভেতরই কাকে যেন সে ডাকছে, খুজছে। অশােক সাড়া দেয় না। ভলিব। সব এসে গেছে খবর পেয়ে। শােভা হরিচরণ সকলেই। সব ঘিরে থাকে অশােককে ! কিন্তু অশােক কোন কথা বলতে পারে না। ওদের সঙ্গে। অনেক রাতে অশােক একটু একটু সাড়া দেয়। তখন অনুই একা। রয়েছে মাথার দিকে। চারদিকে মৃত্যুর কালাে ছায়ায় ভীষণতার মাঝখানে অশােকের স্নানদীপের শেষ রশ্মিটুকুর দিকে তাকিয়ে অনু রাত জাগে। ওরা ১২৮

গরম জলে সেঁক দিতে দিতে অবশেষে একটুখানি ভালো বােধ করছে।
প্রদীপ নিভার আগে শেষ আলাে ।
অনু কোমল গলায় বলে, এখন একটু ভালাে আছ তুমি!...
-হ্যা অনেক দূরে যেতে হবে.••তাই ভালাে আছি।
অশােক আজ কত কাছে। অনুর সমস্ত হৃদয়টা যেন নিংড়ােতে থাকে
মােচড় দিয়ে দিয়ে । সমস্ত রস তার ঝরে যাবে যেন।•••
অনু বলে, বলতে নেই অশােকও কথা বলতে নেই।-এ কি চোখে
জল কেন তােমার ? নিজের চোখের জলকে আড়াল করে অ অ
করে।
—নিজের জন্যে কাদিনে অনু। কিন্তু যাদের জন্যে কাজে নামলুম.••
তাদের সেবা করে যেতে পারলুম না:::
-তুমি চুপ করে অশােক...
অশােক থামে না। শেষ কথা তাকে বলে যেতে হবেই। আর ত সময়
নেই। যে অসাবধানতার যে ভুলের মূল্য সে দিতে চলেছে তার চরম ক্ষণে
আর এক ভুল সে করবে না।
জীবনের ওপার থেকে অশােক বলে চলে, গােধূলির শেষ রাঙ্গা
আলােকটুকুর মত—তুমি তাদের দেখাে অনু...যাদের কেউ দেখে না কোনদিন
••• যারা মুখ বুজে মরে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে...
-তুমি না থাকলে আমায় শক্তি জোগাবে কে অশােক?..
যে পথে অনু নামিয়ে এনেছিল অশােককে সে পথের এক প্রান্তে এসে
জিজ্ঞাসার বিঘ্ন ওঠে।
--তারাই তােমার শক্তি অনু! যাদের কেউ চেনে না কেউ জানে না
সেই তারা সবাই
গােধূলির শেষ আলাে আগামী প্রভাতের খবরটুকু দিয়ে যায়।

—এ মৃত্যু আমার নয় অনু•••এ তাদেরও অপমৃত্যু যারা অপমানের ভারে
মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে। তাদের কথা কি কেউ ভাববে না...।
শ্রান্ত হয়ে পড়ছে অশােক। তার জীবনের শেষ সম্বল শেষ পরমায়ু দিয়ে
কথা বলছে।
-এবার একটু ঘুমােও তুমি। অনু অশােকের চুলের মধ্য দিয়ে হাত
বুলিয়ে দেয় ধীরে ধীরে।•••
-হ্যা, শান্ত হয়ে ঘুমােবাে এবার অনু•••
জীবনকে অস্বীকার করে ঘুম আসে অশােকের।
গােধূলির শেষ আলােয় এত বেশী আর এতক্ষণ ধরে রাঙ্গিয়ে রাখে
আকাশখানা যে মনে হয় আকাশের রঙ বুঝি বদলালাে।
নদী এসে পড়ে সাগরের বুকে। বিস্তীর্ণ হয়ে বিরাট রূপ নেয় নদীর
শেষ প্রান্ত।
সাগরের মৃত্যু কি সেখানে ?

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Tero Nambor Basti

Author
Sanyal, Prabodhkumar
Title
Tero Nambor Basti
File name
Tero Nambor Basti
Text
OCR done
Citation
1946
Published
2009/08/29
Publisher
Bengal Publishers, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
142
Library
Mohiary Public Library,andul, Howrah
Classification
Bengali Novel
Keywords
Uponyas
DLI number
511517
Barcode
4990010018655.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
ELQ7zZbjKCu
Download PDF

Tero Nambor Basti