Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sokuntala Natok Ed.2

Ray,nandalal · 2009/09/12

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মুকুন্তলা নাটক।
শ্ৰীযুত বাবু নন্দলাল রায় প্রণীত
দ্বিতীয়সংর
নৃত্যলাল শীল কর্তৃক প্রকাশিত।
কলিকাতা,
চিৎপুর রােড ১১৭ নং ভবনে সুধার্ণব যন্ত্রে
শ্রী জহরলাল শীল দ্বারা মুভি।
সন ১২।

নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ। নট পুরুষগণ। নাটকরাজ। পুরুবংশীয় একজন রাজা। দুমন্ত কণ দুৰ্বসা} শাবর। মুনিদ্বয়। কমুনির শিষ্যদ্বয় সারত্ব गही অমাত্য। ধীবর । জেলে ৫০ জমাদার চৌকিদার মাতলী পুলীসের কর্মচারী ইন্দ্রের সারথি। স্ত্রীগণ। নটি তাপসী অনুভুয়া প্রিয়ংবদা শকুন্তলা নটের স্ত্রী। মুনিপত্নী। শকুন্তলার বয়স্যাদ্বয় অর্থা প্রিয়সখী । কমুনির পালিতা কন্যা অর্থাৎ মেনকার কন্যা। জেলের কন্যা। জেলেনী

শকুন্তলা নাটক।
(নটের প্রবেশ)।
রাগিণী ললাম-ঝিঝিট। তাল আড়াঠেকা।
কোথায় গো মা বাবাদিনি।
ধবল কমলদল অবিরল বিহারিণী ।।
অকৃতি সন্তানের পানে, চাও মা কৃপা নয়নে,
বাসনা হয়েছে মনে, পূজিব চরণ দুখানি ।।
আপনি আসরে উর, জিহ্বাগ্রে বসতি কর, ভরসা
পদ তােমার, নন্দ বলে সার ঐ বাণী ।।
নট। (চতুর্দিক অবলোকন করিয়া), আহা! আজ কি
মমােহর সভা হয়েছে, এই সভায় অশেষ দেশভাষান্ত
গুণগ্রাহী বিদ্যানুরাগী মহােদয়গণ স্বীয় স্বীয় গুণে
ভুষিত হইয়া একত্রে সমবেত হইয়াছেন, বােধ করি
এই মহােদয়গণ আমার সংগীতাদি শ্রবণ লালসায়
অত্যন্ত ব্যর্থ হয়েছেন ইহাও আমার পরম সৌভা-
গ্যের বিষয়। এখন ওঁদের চিত্ত রঞ্জন কত্তে পাল্লেই
.

৬
শকুন্তলা নাটক।
অভীষ্ট সিদ্ধ হয়, কই ? প্রিয়তমা প্রাণ দয়িতা
যে এখন অচেন না ? তা একবার প্রেয়সীকে ভাবি,
প্রিয়ে যদি তােমার বেশবিন্যাস হয়ে থাকে, তবে
একবার এদিকে শীঘ্র এস দেকিন।
(নটীর প্রবেশ)।
নটী -
রাগিণী ঝিঝিট-খাম্বাজ। তাল মধ্যমান।
কে ভাকিল আমারে এ নিশিতে।
বুঝি আমার প্রাণনাথ কন্দর্প দর্প নাশিতে ।।
যে গ ঢল২, মনরে চঞ্চল চল, যেতে আমায়
হলো হলো, অার না পারি থাকিতে।
এতক্ষণ নিদ্রাবেশে, ছিল মন আপন বশে, ভ'ন.
বাসার পরশে, চল মন ভাল বাসিতে ।
নটী। নাথ! এরি মধ্যে এত উতলা কেন ?
নট। উতলা তােমারি জন্য, আর এই সভারঞ্জন মহাশয়দের
জন্য।
নটী। কেন! সভারঞ্জন মহাশয়দের জন্যেই উতলা কেন,
আর এ অধিনীর জন্যেই বা উতলা কেন ?
নট। এটা অার বুঝতে পাল্লে না ? প্রিয়ে! সভারঞ্জন মহা-
:: শয়দের জন্যে উতলা কেন? ওরা তােমার সঙ্গীতাদি
* শ্রবণ লালসায় অতীব ব্যর্থ হয়েছেন, 'আর তােমার
জন্যে উতলা কেন, তা কি বলতে হবে ?

নটী। (মুখপানে চেয়ে হাস্য করিয়া) নাথ! আমার জন্যে
ত তােমার ঘুম হয় না ?
নট। প্রিয়ে! ঐ তাে তােমার দোষ, তােমাকে যে আমি
কি প্রকার ভালবাসি, তা কি জাননা।
নট।
রাগিণী ভৈরবী। তাল আড়া।
যে ভালবাসি প্রিয়সী তা কি জাননা অন্তরে।
বলে জানাইব কত বলিতে যে বর্ণ হারে ।।
তুমি প্রাণ আমি দেহ, তােমায় ভাবি অহরহ,
না থাকিলে তব সহ, মন প্রাণ উদাস করে ।
পলকে হই জ্ঞানহার, তুমি মাের নয়ন তারা,
এস প্রিয়ে এস ত্বর, শীতল কর শীতল-করে ।।
নট। প্রিয়ে! সে যা হােক্, এখন এই সভ্য মহাশয়দের
মনোরঞ্জন কিসে হয় বল দেখি? যে প্রকারে হােক
তােমাকে এদের মনােরঞ্জন কত্তেই হবে।
নটী । নাথ! এটি তােমার কেমন কথা হল, যে প্রকারে
হােহ্ন এঁদের মনােরঞ্জন কতেই হবে, নাখ! স্ত্রীলোেক
ততা আর পুরুষের মত নয়, যে এতে হলো না ওতে,
ওতে হলো না তাতে, স্ত্রীলােকের ধর্মভয় অাছে।
নট। প্রিয়ে। সে কথা আর বাড়াবাড়ি কায কি, এখনি
বেঁচো খুড়তে শাপ বেরিয়ে পড়বে, এখন এদের
মনােরঞ্জন কিসে হয় বল দেখি ?

নুষ।
নটী। নাথ! যত্নের তত ক্রটি করব না, তবে আমার কপাল
আর আপনার হাতযশ ।
নট। প্রিয়ে। হাত যশের অপরাধ কি বল ? একবার চেয়ে
দে দেকিন, ( উভয়ের ঈষদহাস্য)।
নটী। নাথ ! এক্ষণকার সভ্য মহাশয়েরা অতীব নাটক
প্রিয়, অতএব আমার অভিপ্রায়, যে নাটক হয়, সুমিষ্ট
রস সংযুক্ত কোন নাটকাভিনয় করা যাক।
নট। প্রিয়ে ! তুমি যথার্থ বুদ্ধিমতী, এৰূপ দেশ কালজ্ঞতা
হয়ে আমার যে পত্নীৰূপে অবতীর্ণ হয়েছ, এ আমার
পরম সৌভাগ্য। দেখ দেকিন, আমি এতক্ষণ আকাশ
পাতাল ভাছিনু, তবে এক্ষণে কোন্ বিষয়ে অভিনয়
করা যায় বল দেখি ?
না। নাথ! আমার ইচ্ছে, শকুন্তলা ।
নট। প্রিয়ে। উত্তম বলেছ, তবে সভ্য মহাশয়েদের কি
অভিপ্রায় একবার জিজ্ঞাসা করনা ?
নটী । (ইতস্ততঃ অবলােকন করিয়া)
শুনহ সুশীল সব সভ্য সভাঙ্গন ।
শকুন্তলা যাত্রা ছলে করিব বর্ণন ।।
অনুমতি কর যদি যাই সাজিবারে ।
কিন্তু পঙ্গু হয়ে ইচ্ছা অদ্রি লংঘিবারে ।।
কই, ওরাত কিছুই বল্লেন না।
নট। প্রিয়ে! বুঝতে পাল্লে না ? মৌনই সম্মতি লক্ষণ
তবে চল আমরা সাজ গোজ করে আসিগে।

শকুন্তলা নাটকা
নটী। আচ্ছ। তবে চল (মুখপানে চেয়ে হাস্য) ।
[উভয়ের প্রস্থান
ধুয়া।
শুন শুন সভাজন,
সুধা সম প্রকরণ,
শকুন্তলা অদ্ভুত অখ্যান।
পুরুবংশ অবতংস, বোধহয় দেব অংশ,
কংস মত প্রতাপ সমান ।
দুষ্মন্ত মহারাজ,
বিখ্যাত ধরণী মাঝ,
একদিন মৃগয়া কারণ।
লয়ে নানা অনীকিণী, প্রবেশেন অরণ্যানী,
বনে বনে করে অন্বেষণ |
মৃগ এক নিরক্ষীয়া,
পুলকে মন মােহিয়া,
শরসনে যুড়িলেন বাণ।
হেনকালে দুই যতি, কহেন রাজার প্রতি,
বধ না ভূপতি মৃগপ্রাণ ।।
শুনি যতির বচন, ত্যজি নৃপ শরাসন,
ঋষিদ্বয়ে করেন প্রণতি।
মু-কাশীষ রাজা প্রতি, করিলেন দুই যতি
দুই বাহু করিয়া উন্নতি ।।
তবে নৃপ সযতনে,
জিজ্ঞাসেন হর্ষ মনে,
মহামুনি করে বারতা।
সংক্ষেপে সকল বলি, ঋষিদ্বয় গেলা চলি,
ভাবে রাজা যাইবারে তথ।।

"১০
" ।
শান্তি রশ্রিত স্থান, তপােবনে নৃপ যান,
পদব্রজে করিয়া গমন।
পুণ্য স্থান দরশনে, হরষিত অতি মনে,
ফিরি ফিরি করেন দর্শন।
কামিনী কোমলধ্বনি, শুনিলেন নৃপমণি,
অতঃপর শুন বিবরণ।
দ্বিজ নন্দলাল ভণে, শুনহ সুজনগণে,
যে ৰূপেতে হয় সন্মিলন।।
(শকুন্তল। অনুসূয়া ও প্রিয়ংবদার প্রবেশ)
অনু। প্রিয়সখি ! এদিকে এদিকে।
শকু। সখি ! দাড়াও অগ্রে আমি এই মাধবীলতায় জল
সেচন করি।
অনু। কেন সখি ! এদিকে অন্যান্য এত গাছ বৈল,
অগ্রে মাধবীলতায় জল সেচন কচ্ছ কেন ?
প্রিয়ং। সখি! তা জাননা? ঐ মাধবীলতার যে দিনে
কুসুমােদ্যাম হইবে, সেই দিনে আমাদের প্রিয়-
সখি শকুন্তলার বিবাহ হবে,
আমি কপিতার
মুখে এৰূপ শুনেছি, তাতেই মাধবীলতার প্রতি
প্রিয়সখির এত যত্ন, বুঝেছ ?
(রাজার বৃক্ষের অন্তরাল হইতে দর্শন) ।
রাজা। (স্বগতঃ) এই বিরল অটবী মধ্যে স্ত্রীলােকের
কোলাহল কোথায়! এ কেমন হল! স্বপন দেখছি

শকুন্তলা নাটক।
নাকি? না, সত্যই বটে! যা হােক ইতস্তত
অন্বেষণ করে দেতে হলাে; ( কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া)
এই যে, আহা! কি ৰূপ লাবণ্য। এখানে জন মানবের
. সমাগম নাই, স্ত্রীলোক কেমন করে আবে; বােধ
করি দেবকন্য। অবনীমণ্ডলে অবতীর্ণ হয়ে জনশূন্য
অরণ্যে ক্রীড়া করিতেছেন, মানুষী কোন ক্রমেই সম্ভব
হইতে পারে না, যা হােল্ক আজ আমার কি সৌভাগ্য!
যে রত্ন অদ্য নয়ন গােচর করিলাম, আহা! যতবার
দেখি তততবারই অভিনব বােধ হয়, (অনিমিষেয়
দর্শন)।
শকু। সখি! কণ তাত কি তােমার একথা বলেছিলেন,
যে মাধবীলতার যে দিনে কুসুমােদ্যাম হইবে, সেই
দিনে কি আমার বিবাহ হবে ? সখি ! এটি তােমার
নিতান্ত মনগড়া কথা।
প্রিয়ং। প্রিয়সখি! আমার কথায় কি তােমার বিশ্বাস
হলনা? তােমায় যদি অলীক কথায় প্রতারণা করব,
তবে আমাদের এসংসারে সুখের আস্থা কি? আর
বিশেষ এই ধৰ্মারণ্য, এস্থলে থাকিয়া অধৰ্ম্মাচরণ
করিলে রৌরব নরকে চিরকাল বাস করিতে হয়,
প্রিয়সখি ! তােমাকে, বলতেই কি, ছল চাতুরী কেমন,
আমাদের হৃদয়ে কখন প্রবেশ করে না।
অনু। প্রিয়সখি ! প্রিয়ংবদা যা বলছে, তা মিথ্যা নয়,
ক তাতমুখে আমিও শুনেছি, যে ঐ মাধবীলতার
",

শকুন্তলা নাটক। ১২ কুসুমােদ্যাম হইলেই তােমার উদ্বাহ সম্পন্ন হই- বেক, তা সখি! এতে আর অন্যভাব কি আছে, বল? এ তাে পরম আহলাদের বিষয়, এক্ষণে তােমার শুভ পাণিগ্রহণ হইলে আমাদের মনের সকল বাসনা পূর্ণ হয়। রাগিণী কালাংড়া। তাল আড় খেমটা। এখন এই বাসনা মনে। শুন ওলে। চন্দ্রাননে।। মনের মতন হবে নাগর, রসের সাগর, যেন চকো- রিণী চাঁদ সদনে।। এমন সুদিন কবে হবে, রসের কথা সদা কবে, মনের মতন মন যােব নিশি দিবে, যুড়াব হেরে নয়নে । শকু। সখি ! সে যা হােক্, এই দুরবৃত্ত মধুকর আমায় বার- স্বার বিরক্ত কচ্ছে, উহাকে নিবারণ কর, পুনরায় যেন আমার কাছে না আসে। অনু। প্রিয়সখি ! ও মধুকরের কিছুই দোষ নাই, কমল ভ্রমে তােমার মুখকমলে আসব আশায় উড়িতেছে, আর বিশেষ আমাদের কি এমন ক্ষমাত যে উহাকে আমরা নিবারণ করি, এই ভারতের অধীশ্বর রাজা দুষ্মন্তকে স্মরণ কর, তা হলে তিনি অবিলম্বে আসিয়া উহাকে যথােচিত দণ্ড দিবেন। শকু। সখি! তাকে স্মরণ কল্লেই কি তিনি অসূবেন ?

শকুন্তলা নাটক। অনু। হাঁ সখি! সযতনে মনের সাহিত স্মরণ কল্লেই তিনি জাবেন। (সহষ। রাজার উপস্থিত)। রাজা। (স্বগতঃ) বােধ করি এরা তাপস কন্যা, তার আর কোন সন্দেহ নাই, সে যা হােক্, আমাকেই ডাকছে এমন সময় উপস্থিত না হয়ে আর কোন্ সময় উপস্থিত হব ? কই, কে সুরাচার তােমাদের উৎপীড়ন কচ্ছে, তপােবনের অনিষ্ঠাচরণ ? কৈ কনে গেল, আমি রাজা থাকতে আমার রাজ্যে উৎপীড়ন ? (সকলে নিস্তব্ধ ও বিস্মিত)। অনু। (করযােড়ে) মহাশয় ! আপনার নাম কি ? আর আপনি এখানে কি জন্যই এসেছেন ? রাজা। কেন তোমরা আমাকে এই যে ডাক ছিলে ? তােমরা কি আমায় চেন না? আমার নাম দুষ্মন্ত । ( গললগ্নীকৃত বাসে রাজাকে প্রণাম । ) রাজা। (হস্তধারণ করিয়া) এ কি! তােমরা হলে তাপস- কন্যা, আমি কি না এক জন সামান্য নর, উঠ উঠ । অনু। মহারাজ ! আপনি মহারাজাধিরাজ পৃথিবীপতি, আপনার সঙ্গে কি আমাদের তুলনা? মহারাজ অম কথা বলবেন না । রাজা। সে যাহা হােক, আমি মহামুনি কবৃকে দর্শন করি এলাম, তা তিনি কোথায় ?

১৪ শকুন্তলা নাটক। অনু। মহারাজ! আমাদের কতাত কোন দুর্দৈব শান্তি কারণ সােমতীর্থে গমন করেছেন, (শকুন্তলার দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করিয়া) তার ঐ পালিতা কন্যা শকুন্ত- লার প্রতি অতিথি সৎকারের ভার দিয়া গিয়াছেন, এক্ষণে আপনি উপবেশনপূর্বক শান্তি দূর করুন, মহারাজ! আপনাকে আমরা চিন্তে পারি না, সে জন্য আমাদের অপরাধ মাজ্জনা করবেন। রাজ।। (স্বগতঃ) শকুন্তলার কি চমৎকার ৰূপ! শরৎকালের চন্দ্রমারও কলঙ্ক আছে, কিন্তু ইহার মুখচন্দ্র নির্মল শশধরের ন্যায় শােভা পাইতেছে, (সখিদ্বয়ের প্রতি) আচ্ছা, তােমাদের প্রিয়সখী শকুন্তলার বিবাহ হয়েছে কোথায় ? প্রিয়ং। মহারাজ! ও দুঃখের কথা কেন আর বলেন, সকলি হয়েছে, কিবল প্রিয়সখীর দুই হাতে এক হাত হলেই আমাদের মনবাসনা পূর্ণ হয় । রাজা। বিবাহ কি কোথায় স্থির টির হয়েছে ? প্রিয়ং। মহারাজ! ওর আর স্থির টির কি? ঘুমেতে চক্ষু জড়িয়ে ধরেছে, বিছানা পেলেই জনি শুয়ে পড়েন। রাজা। (ঈদ হাস্য করিয়া) এ তােমাদের কেমন কথা হলো ? প্রিয়ং। মহারাজ! একথাও বুঝতে পারলেন না ? যেমন দিনমণি উদয় হলেই নলিনী প্রস্ফুটিত হয়, এও সেই রকম।

শকুন্তলা নাটক।
১৫
রাগিণী সাহানা। তাল জৎ।
শুন শুন সভাজন।
দুষ্মন্ত শকুন্তলার হল সন্মিলন।
তপারণ্য জনশূন্য, বিলম্ব কারণ জন্য, উভয়েতেই
অবসন্ন, উভয়ের মন ।।
একারণ গন্ধর্ব মতে, বিবাহ হইল ততে, পরস্পর
উভয়েতে, চিত্ত বিনােদন ।
রাজা। (সখীদ্বয়ের প্রতি) দেখ এই আংটিটী তােমা-
দেয় প্রিয়সখীর পাণিপল্লবে পরাইয়া দাও, এখানে
আর অন্যান্য ভুষণ কোথা পাব।
প্রিয়ং। মহারাজ! তা যেন হলো, গন্ধর্ব বিবাহের প্রধান
অঙ্গটাইযে বাকি থাচে, মাল্য বদলটা হলেই,
আমাদের প্রিয়সখী আপনার ধর্ম পত্নী হন, সেটা কেন
আর বাকী থাকে ?
রাজা। সখি! মাল্য বদলের চেয়েও অধিক হয়েছে, অগ্রে
আমরা উভয়ের মনমাল্য বদল করেছি, আর
তােমাদের প্রিয়সখী আজ অবধি আমার ধর্ম
পত্নী হলেন, সে জন্য কিছু চিন্তা করবেন না।
রাগিণী ভৈরবী। তাল আড়াঠেকা।
সে জন্য শুনহ সখি ভেবনা ভেবনা মনে।
বিচ্ছেদ হবে না কভু এ.দেহে জীবন ধারণে।
( ২ )

শকুন্তলা নাটক।
যে অবধি হেরিয়াছি, মন প্রাণ সঁপিয়াছি, অভি-
লাষ করিয়াছি, বঞ্চিব যে একাসনে ।।
দীনেতে পাইলে রত্ন, কে না কোরে থাকে যত্ন, এতে
কি হয় মন অন্য, সুধা ছেড়ে গরল পানে।।
প্রিয়ং। মহারাজ! কথানুযায়ী কাষ হলেই কাষ ভাল হয়,
এখনতো কথায় স্বর্গে তুলছেন, শেষকালে যেন পাতা-
লস্থ না হয়, (সচকিত হইয়া) মহারাজ! আর একটী
বড় কথা মনে পড়েছে, শুনেছি আপনাদিগের অনেক
মহিষী থাকে, তা সকলকার প্রতি তো সমান স্নেহ
থাকে না? তাই বলি, আমাদের প্রিয় সখীকে যেন
কোন কষ্ট পেতে না হয়, তা হলে আমরা অত্যন্ত
মনঃকষ্ট পাব।
রাজা। সখি ! সে জন্য কিছু চিন্তা নাই ; তােমাদের প্রিয়
সখীকে আমার তপ, জপ, মনঃ, প্রাণ সমুদয় সমর্পণ
করেছি, উনিই আমার সর্বস্ব হয়েছেন।
শকু। সখি ! হয়েছে, অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ, যেকালে
প্রথমেই এত ভক্তি, শেষ রৈলে হয় !
রাগিণী কালাংড়া। তাল কাওয়ালী ।
সন্দেহ হতেছে সখি তাই ভাবি মনে।
অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ জগতে বখানে 11,
অতি শব্দ ভাল নয়, শুন তার পরিচয়, অতি দর্পে

শকুন্তলা নাটক।
১৭
হত হলো লঙ্কার রাবণ; অতি দর্পে বলির হলো
পাতালে গমন। অতি লােভে তি নষ্ট ব্যক্ত
ত্রিভুবনে ।।
প্রিয়ং। মহারাজ! প্রথমে যে কালে এত বাড়াবাড়ি, কিন্তু
শেষ থাকলে হয় !
রাজা। তােমরা নাকি স্ত্রীলােক, তাতেই তােমাদের মনে
এত সন্দেহ হচ্ছে, যাকে দর্শন অবধি মন প্রাণ সমুদয়
সমর্পণ করেছি, জীবিত থাকতে কি কখন তাকে ত্যাগ
করতে পারব ?
রাগিণী কালাংড়া। তাল কাওয়ালী ।
যা বল সজনী ধনী শুনে হাসি পায়।
দরিদ্রে পাইলে রত্ন ত্য্য করে কে কোথায় ।।
দেখ দেখি অলিকুলে, সদত থাকে কমলে, কমল
ছেড়ে অন্য ফুলে, দেখ নাহি যায় । স্থলজ জলজ
পুষ্প আর তাে কত রয়। শশী ছেড়ে চকোরিণী,
হয় না কভু প্রমােদিনী, চাতক কি ঘন ছেড়ে অন্য
জল খায় ।
প্রিয়ং। মহারাজ! তা হলেই হলো, যেন আমাদের প্রিয়
সখীকে কখন কোন কষ্ট পেতে না হয়, তা হলেই
আমাদের পরম সুখ, কিন্তু মহারাজ! আপনাকে
একটী কথা না বলে আর থাকতে পারি না, “ স্ত্রীলাে-
কের মন যেমন সরল তেমন পুরুষের নয়”।

১৮
শকুন্তলা নাটক।
রাগিণী কালাংড়া। তাল আড়খেমটা।
জানি জানি নৃপমণি পুরুষকে কে সরল বলে।
রাখে না ভাবেতে ভাব বিঞ্চিৎ অভাব হলে।
নারীর থাকিলে যৌবন, নারীকে করে যতন, থাকে
ন্য তেমন মন, নারীর সে যৌবন গেলে ।।
দেখ দেখ সরােবরে, মনের সুখে হংস চরে, রাখে
হংসে যত্ন করে যায় না ফিরে জল শুকলে ।
রাজা। সখি ! যা বল্লে তা সত্য, কিন্তু নলিনীর প্রতি মধু-
করই আশক্ত হয়, দেখ রুরু নামে এক জন মুনি
ছিলেন, কাল প্রাপ্তে তাহার রমণীর পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয়,
কিন্তু রুরু মহাশয় আপনার অর্ধেক পরমায়ু দিয়া
তাঁহার স্ত্রীকে পুনৰ্বার জীবিত করেন, তা সখি !
পুরুষের শরীরে দয়া আছে, কিন্তু স্ত্রীলােকের মত
নয় ।
রাগিণী কালাংড়া। তাল আড়খেমটা।
জানি জানি সখি জানি নারীর যেমন সরল মন।
নারি বারি দুজনারি সদাই নীপথে গমন।
দিবাকর সহকারে, নলিনী প্রকাশ করে, গােপনেতে
মধুকরে, মধু করে বিতরণ।
নারী অতি অবিশ্বাসী, বিষম অসংসাহসী, ভাবি
মনে দিবা নিশি, কখন নারী হয় কেমন .

শকুন্তলা নাটক।
যা বলিলে গুণমণি প্রাণে নাহি সয়।
নারী মন্দ বল কিসে হইয়ে নিদয়।
পর বশে পরবাসে সদা দেখ থাকে।
স্বামীর মরণে নিজ প্রাণ নাহি রাখে ।।
নির্দয় নিষ্ঠুর হয় পুরুষ সকলে।
নৈলে কৈন নারী মন্দ কথায় কথায় বলে ।।
রাগণী কালাংড়া। তাল কাওয়ালী ।
যা বল হে নৃপমণি শােভা নাহি পায় ।
কথা শুনে মনাগুণে দহিতেছে কায় ।।
মন্দ যদি হত নারী, কেহ হতাে না। সংসারী, ভজিত
কংশারি পদ পড়িয়ে ধরায় ; কটিতটে ধটি পরে
যেতে। কে কোথায়। বিয়ে করে যত হচ্ছে,
যথা মন তথা হচ্ছে, এমন ধারা নারী হলে হতো
হে যায় বেজায় ।।
প্রিয়ং। প্রিয়সখি! ক্ষান্ত হও, এখন আর ভালে কি
হবে বল ? যে ফাঁদে পড়েছ জীবন থাকতে তাে
মােচন হবার নয়, বরং এখন এই কর যে, যাতে
চিরকাল পরস্পরের প্রণয় এক ভাবে থাকে।
সখি! আমাকে ও কথা বলা মিছে, বরং যাকে
বলতে হয় তাকেই ভাল করে বল।
শকু।

২৪
শকুন্তলা নাটক।
রাজা। প্রিয়ে! তােমার মনে কি এখন প্রত্যয় হচ্ছে না?
যে প্রণয় বিতংসে আমায় বন্ধন করেছ, এ জীবন
ধারণে সে কখয় হাতে : পারব? প্রিয়ে।
প্রাণের বিচ্ছেদ না হলে তো আর প্রেমের বিচ্ছেদ
হবে না।
শকু। মহারাজ! তা যস্টি হয়, তা হলে আর কিসের ভাবনা ?
রাগিণী ললাম ঝিঝিট। তাল আড়াঠেকা ।
আমার এই অকিঞ্চন।
চিরদিন এইভাবে হইবে বঞ্চন ।।
একাসনে দিবানিশি, প্রমােদে বঞ্চিব বদি, সদা
তৰ মুখ-শশী, করব দরশন।।
রাজা। বিধুমুখি ! নারীর কি অযত্নের ধন? তা তোমাকে
আমি ভুলে যাব ? দেখ, তােমাকে আমি যে কি
প্রকার ভালবাসি, যদি অন্তর দেখাবার হতো, তা
হলে দেখাতাম, তা সে জন্য চিন্তা কিছু নাই ।
রাগিণী বীরঙ।। তাল ঠুংরী।
নারী কি অযতনের ধন।
যে রত্ন হরের হার সদাসর্বক্ষণ।।
যে অরধি হেরিয়াছি, মন প্রাণ সঁপিয়াছি, নাহি
জন্য আঁচাআঁচি, যদ্দিন থাকিবে জীবন ।।

শকুন্তলা নাটক। আমি দেহ তুমি প্রাণ, কে আছে তব সমান; দেই প্রাণে হলে আন, হইবে বিচ্ছেদ ঘটন 13 রাগিণী সাহানা। ভাল জং। হলে মিলন দোহায়। সিন্দুর মেঘেতে যেন তড়িৎ খেলায় । প্রফুল্ল হেরে কমলে, যেমন ধারা অলিকুলে, ফুতুহলে দলে দলে, বিমোদে বেড়ায় । একাসনে প্রিয়া সনে ফুখে কাল যায়, স্বরাজ্য গমন আশে চাহেন বিদায় । অতি মধুর ভারতি, সযতনে নরপতি, বলে শকুন্তলা প্রতি, কথা সমুদয় । রাজা। (মুখ অবনত করিয়া) দেখ প্রিয়ে। আমি মৃগয়া উপলক্ষে তপোবনে আসিয়া সৌভাগ্যক্রমে তােমাকে লাভ করেছি, ইহা আমার বিপুল সুব্ধ তির ফল বলতে হবে, সে যা হােক এক্ষণে আমাকে প্রফুল্ল চিত্তে বিদায় দিতে হবে, কারণ অনেক দিন- হলো, রাজধানী হতে এসেছি, আমার জন্য সকলেই উদ্বিগ্ন আছে, আর বিশেষ সিংহাসন শূন্য। রাগিণী ললিত। তাল আড়াঠেকা।. আসি লো প্রিয়সি তবে আর থাকব কেমনে। অনেক দিন হলো হেথা এসেছি লো চামনে।

२२ শকুন্তলা নাটক। সিংহাসন আছে শূন্য, প্রজাগণ আছে কুণ, হয়ে সবে অবগম, চেয়ে আছে পথ পানে ।। দেহ যাবে প্রাণ রবে, উভয়ে দুঃখ সম্ভবে, নন্দলাল বলে তবে, কে নাশিবে অঙ্গহীনে।। শকু। (সচকিত হইয়া) সে কি মহারাজ! এই আপনি বলেছিলেন, যে আমাদের উভয়ের কখন বিচ্ছেদ হবে না। এ আবার কেমন কথা; পুরুষের শরীর কি নিতান্তই উপলে নির্মাণ ? শরীরে দয়া মায়ার লেশ নাই ? অধর্মের ভয় নাই ? মহারাজ! আপ- নার মনে যদি এতই ছিল, তবে আমাকে প্রণয়াদে বন্ধন করলেন কেন ? রাগিণী সিন্ধুভৈরবী। তাল জৎ। এত তােমার ছিল মনে স্বপনে না জানি। অকূল প্রেমতরঙ্গে ভাসায়ে দিবে তরুণী। একে ত চিরদুঃখিনী, তাতে হই অনাথিনী, কৃপা করে নৃপমণি, বল আবার এ কি শুনি। আকাশের চাঁদ দিয়ে হাতে, কেন ফেল পাতালেতে, কেমনে বাঁচিব এতে, অস্থির হতেছে প্রাণী।। রাজা। (দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া) প্রিয়ে ! দেখ আমাকে একান্ত বিধির নির্বন্ধানুসারে এমন রমণীয় রত্ন ত্যাগ শকুন্তলা নাটক। २७ করে যেতে হচ্ছে, কি করি, যেহেতু রাজ্যভার গ্রহণ করেছি, রাজ্যভার গ্রহণ করিয়া প্রজাপালন না করিলে অধৰ্ম্মে পতিত হইতে হয়, আর বিশেষ পরিজন সক- লেই উদ্বিগ্ন আছে, এজন্য এক্ষণে আমাকে যেতে অনু- মতি দাও, রাজধানী পৌছিয়। তােমাকে অবিলম্বে লয়ে যাব। শকু। (সজল নয়নে) নাথ! এ অভাগিনীকে তুমি ত্যাগ করে যাবে, আমি স্বপ্নেও জানি নাই, আমি চির- দুঃখিনী বনবাসিনী ঋষিকন্যা, আমাকে যদি অনা- থিনী করে আপনার গেলে ভাল হয়, তবে এখনি যান, নাথ ! আপনার দোষ কিছুমাত্র নাই, সকলি আমার অদৃষ্টের দোষ । রাজা। (স্বহস্তে শকুন্তলার নেত্ৰজল মুছাইয়া) বিধুমুখি ! দেখ সকলি দৈবাধীন কৰ্ম্ম, আমি রাজধানী পৌছিবামাত্র বার্তাবহ পাঠাইয়া দিয়া তােমাকে লয়ে যাব, সে জন্য কোন চিন্তা নাই, এক্ষণে আমাকে সহাস্য বদনে বিদায় দাও। শকু। মুহুহু দীর্ঘ শ্বাসে) নাথ! আপনি যদি নিতান্তই এ অধিনীকে ফেলে চল্লেন, তবে দাসীর একটি নিবেদন আছে। রাগিণী কালাংড়া। তাল আড়াখো। নারীর পতি বিনে বাঁচা। ৰূপ বিনে যেমন নাচা ।।

২৪
শকুন্তলা নাটক।
তরু বিনে লতা যেমন লতিয়ে বেড়ায়,শুকিয়ে যায়
হলে কাঁচা //
শিব বিনে যেমন কাশী, চন্দ্র বিনে যেমন নিশি,
পতি বিনে তেম্‌নি নারী উদাসী, পারা বিনে
আয়না যেমন হয় এক ঢাচা,
রাজা । বিধুমুখি ! সে জন্য ক্ষণকালও চিন্তা করেনা, তুমি
নিশ্চয় মনে জেনাে, যে আমি নিতান্ত তােমারি,
তবে আমি এক্ষণে আসি।
অনু। মহারাজ! এ দাসীর এক নিবেদন আছে, শুনেছি
প্রভঞ্জন সহকারে অনীলের উদ্বীপন হয়ে থাকে, কিন্তু
প্রভঞ্জন স্বৰূপ হয়ে, আমাদিগের তপােবনের সকল
দুঃখ মােচন করেছিলেন, এক্ষণে আপনার অদর্শনে
আমরা কি প্রকারে কালাতিপাত করব ? সে যা হােল্ক
আপনি রাজধানী যাইয়া যেন আমাদের প্রিয়সখীকে
ভুলে না যান, আপনাকে অধিক কি আর বলব।
রাজা। সখি! আমাকে অধিক
অধিক বলা বাহুল্য,কে
এক্ষণে আমি আসি,
[ রাজার প্রস্থান।
সকলের অনিমিষে দর্শন।

শকুন্তলা নাটক। ( বিমর্ষ ভাবে শকুন্তলার উপবেশন) ( দুর্বাসার প্রবেশ)। দুর্বাসা। ( উদ্ধে দৃষ্টিপাত করিয়া) ইত! বেলাটাও অনেক হয়েছে, শুনেছি মহামুনি, কণ ভঁহার পালিত কন্যা শকুন্তলার প্রতি অতিথি সৎকারের ভার দিয়া কোন দুর্দৈব শান্তির কারণ সােম তীর্থে গিয়াছেন, দেখি যদি মধ্যাহ্ন ব্যাপারটা এখানে সারতে পারি, তা হলে ভাল হয়, বৎসে শকুন্তলে কোথায় ? ও শকু- লে! শকুন্তলে ! কি পাপীষ্ঠা ! তুই আমায় অপমান কলি ? তুই জানিনে ? আমি ঋষি শ্রেষ্ঠ দুৰ্ব্বাস ! আমি কটাক্ষপাত কল্লে ত্রিভুবন ভস্ম হয়ে যায়, এত গৰ্ব যে কথার উত্তর দিলিনে? তুই যার চিন্তায় নিমগ্না হয়ে আমায় অপমান কলি, তুই তার কখন স্মৃতিপথাৰূঢ় হবি না, (ক্রোধভরে গমন)। প্রিয়ং। (উৰ্দ্ধশ্বাসে আসিয়া) হায়! হায়! আজ কি সৰ্ব্ব- নাশ উপস্থিত হলো। আমাদের প্রিয়সখীর সুখ-তরুর মূলােচ্ছেদ হলে!! তপােবন শূন্য হলাে! সংসারের সকল সুখই অস্তগত হলাে! হবে কি!-ঠাকুর আমা- দের প্রিয়সখী শকুন্তলাকে শাপ দিয়ে গেলেন ? অনু। (সচকিত হইয়া) সে কি! কি দুর্ঘটন উপস্থিত। সখি! শীঘ্র চল, ওর পায়ে হাতে ধরে যাতে শাপ মােচনের উপায় হয় তা করিগে চল, নতুবা আর •• শকুন্তলা নাটক। উপায় নাই, আ! বিনি মেঘে বজ্রাঘাত! ঐ যাচ্ছেন, চল! চল চল! প্রিয়ং। সখি! শীঘ্র চল, (পশ্চাৎ ধাবমান হইয়া) ও মুনি ঠাকুর! ও মুনি ঠাকুর! ফিরুন, ফিরুন, ঠাকুর আপ- নার পায়ে পড়ি, আপনাকে অপরাধ মার্জনা করতেই হবে, ঠাকুর! অবােধ বালিকা আপনার মহিমা কি জানে ? রাগিণী কালাংড়া। তাল কাওয়ালী । ঋষিরাজ তােমার মহিমা কেবা জানে। অবোধ বালিকা সে যে জ্ঞান বিহীনে ।। তুমি যদি ক্রোধ কর, সৃষ্টি সংহারিতে পার, ক্ষমা কর মুনিবর, ধরি শ্রীচরণে । পতি জন্য দিবা নিশি, শূন্য মনে আছে বসি, সদত মন উদাসী, শুনে না শ্রবণে ।। অনু। ঠাকুর ! এই হৃদি বিদারণ শাপ হইতে আমাদের প্রিয়সখীকে উদ্ধার করুন, আর যদি না করেন, তবে আমাদিগকে একবারে ভস্ম করে যান। দুৰ্ব্বাস।। (ক্রোধভরে ) দেখ, আর তােদর মিষ্ট কথা কইতে হবে না, অতিথি সৎকার করা দূরে থাকুক আমার কথার উত্তর দিলে না, এ রাগ আমার কিছুতেই যাবে না, যা যা যা ছুড়ীরে ! আমাকে আর ত্যক্ত করিনে।

প্রিয়ং। ঠাকুর তা বল্লে কি আমায় শুনি ? আপনার এই
পায়ে ধরে রৈনু, হয় শাপ মােচন করুণ, নয় আমা-
দের সকলকে মেরে রেখে যান।
দুর্বাসা। দেখ ! আমি যা বলেছি, তা তাে কখন অনথা
হবার নয়, তবে আমি এই পর্যন্ত কর্তে পারি যদি
শকুন্তলা তাহার স্বামী প্রদত্ত কোন অভিজ্ঞান দেখা-
ইতে পারে, তাহলে রাজা তাকে চিন্তে পারবে নচেৎ
আর অন্য উপায় নাই।
[ দুর্বাসার প্রস্থান ।
প্রিয়ং। আ! তবু এক রকম রক্ষে হল, আমাদের প্রিয়
সখির পাণি-পল্লবে যে রাজ প্রদত্ত অংটী আছে,
সেই তার শপ মােচনের উপায় হবে এখন।
অনু। সখি ! ঠিক বলেছ, কিন্তু সখি, দেখো যেন এ সব
কথা সে শুন্তে না পায়।
প্রিয়ং। সখি তুমি ক্ষেপেছ, একথা কি তাকে বন্দুতে
আছে ?
রাগিণী যােগিয়া। তাল জৎ।
এ কথা কি সই তাকে বলিতে আছে।
শ্রবণে শ্রবণে সে কি প্রাণেতে বাঁচে।
একেত পতি বিরহে, সদত বিমর্শ রহে, শূন্য মনে
অবসন্ন কায় । নাহি জ্ঞান আছে বাহ, কে দিবে
অনলে অাজ, এৰণে তখনি যাবে শমন কাছে।
৩ )

২৮
শকুন্তলা নাটক।
( ক মনির প্রবেশ)
ক! কোথা! বৎস শকুন্তলে কোথায় ?
পয়ার।
অতঃপর সভাজন করহ শ্রবণ।
পতি জন্য শকুন্তলা ভাবে অনুক্ষণ।
অনশনে কার সনে কথা নাহি কয়।
নির্জন স্থানেতে বসি দিবা নিশি রয় ।
হেথা শুন সমাচার কন্য মুনিবর ।
তপস্যা করিয়া আসে কিছু দিনান্তর ।
পর্ণের কুটীরে আসি হল উপনীত ।
কন্যারে জিজ্ঞাসা করে কুশল বিহীত।
পরিণয় সূসংবাদে আনন্দ অপার ।
আশীষ কন্যা প্রতি করে বারম্বার ।।
শকুন্তলা গৰু চি করিয়া দর্শন।
পাঠাতে পতির পাসে করেন মনন ।
শাবর সারভৃত ডাকি শিষ্যগণ।
শকুন্তলা সঙ্গে যেতে কন বিবরণ।
ক।
। কোথা হে শিষ্যগণ ! দেখো, আমি কয়েক দিন
বৎসে শকুন্তলাকে তাহার পতি গৃহে পাঠাইবার
জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন আছি; অতএব তােমরা দুই জন
শিষ্য বসে শকুন্তলার সমভিব্যহারে যাইয়া রাজার
করে শকুন্তলাকে সমর্পণ করে এ ।

শকুন্তলা নাটক।
২৯
শাঙ্গ। যে আজে প্রভু! শকুন্তলে তবে তুমি অনতি
বিলম্বে প্রস্তুত হও।
শকু। সখি! পিতা আমাকে অদ্য পতিগৃহে পাঠাইবার মান
করেছেন, অতএব তােমরা আমাকে গাঢ় আলিঙ্গন
দিয়ে এ জন্মের মত বিদায় দাও, (সজলনয়নে) তােমা-
দের ছেড়ে কেমন করে থা? দেখ, জন্মাবধি আমরা
তিনজনে বিবিধ কৌতুকে পরম রমণীয় বাল্যকাল অতি
বাহিত করেছি, এ স্নেহ কেমন করে পরিহার করব?
প্রিয়ং। (সজল নয়নে) প্রিয়দখি ! তােমার আজ এ কথা
শুনিয়া আমরা নিতান্ত হর্ষ বিষাদে পতিত হইলাম,
দুঃখ এই যে, জন্মাবধি তিন জনে প্রাণ দায়িনীর
ন্যায় একত্রে কালাতিবাহিত করে, পরে পরস্পরে
বিস সদৃশ বিরহ দুঃখ সহ করা অতীব কঠিনতর।
আর আনন্দ এই যে, তুমি আমাদের প্রিয়সখি, আজ
তুমি পতি সদনে যাবে, এর চেয়ে আমাদের আনন্দ
কি আছে, কিন্তু প্রিয়সখি ! যেন পতিগৃহে গিয়ে
স্বামীসুখে সুখী হয়ে আমাদের ভুলে যেওনা।
শকু। সখি ! এ দেহে জীবন ধারণে কি তোমাদের কখন
ভুতে পারব সে কথা কি আর তােমাদের বন্দুতে হবে?
আমি মধ্যে মধ্যে আসিয়া এই পরম রমণীয় ধৰ্মা-
রণ্য ও তােমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যাব।
প্রিয়ং। প্রিয়সখি! তুমি গেলে আমরা কেমন করে এই
নির্জন তপােবনে থাকব ? তােমা বিনে এই তপােবন
!

৩০
শকুন্তলা নাটক।
অন্ধকারময় হবে, আমাদের আজ পর্যন্ত সকল সুখের
মূলােচ্ছেদ হইল।
শকু। সখি! আমারও তোমাদের ত্যাগ করে যেতে ইচ্ছে
কচ্ছেনা, তবে কি করি, পিতা পতি গৃহে পাঠাচ্ছেন
গেলে ভাল হয় না, আর দেখ আমাদের রমণী-
কুলের নিয়মই এই যে বাল্যকালে পিতৃ গৃহে থাকিয়া
প্রতিপালিত হয়, পরে যৌব-প্রারম্ভেরই পতি গৃহে
যাইয়া কালাতিবাহিত করে, তবে এক্ষণে আমাকে
প্রফুল্ল মনে বিদায় দাও।
িয়ং
রাগিণী ঝিঝিট। তাল মধ্যমান।
কেমনে বিদায় দি বল।
এ যে হৃদি বিদারণ দুখেতে আমার হইল ।
বাল্যাবধি একাসনে, ছিলাম শয়ন বসনে, তব
বিচ্ছেদ হুতাসনে, জীবন হবে বিফল।
ছিলে মােদের নয়ন তারা, তোমাবিনে হেরিব তারা,
নন্দলাল কহিছে ত্বরা, সমান না যায় চিরকাল ।
শকু। সখি ! তােমাদের কাছে বন্দুতেই কি ? ক এক দিন
হলো আমার হৃদয়বল্লভকে দেখিবার জন্য মন প্রাণ
অত্যন্ত ব্যাকুলিত হয়েছে, তা সখি তােমরা এক্ষণে
এই আশীৰ্বাদ কর, যেন আমি স্বামীসুখে সুখী হয়ে
এ বিষম বিরহ যন্ত্রণা হতে পরিত্রাণ পাই ।

নাটক। শকুন্তল। অনু। প্রিয়সখি ! মহারাজ তােমায় যে অঙ্গুরিটী দিয়া- ছিলেন, সেটি কোথায় ? শকু। (সবিস্ময়ে) কেন সখি! এ কথা জিজ্ঞাসা করবার কারণ কি ? অনু। বলি আর কিছু নয়, স্বামী-দত্ত ধনে যত্ন করাই উচিত। কণ । বৎসে শকুন্তলে! বেলা হয় আর বিলম্ব করােনা। শকু। সেজলনয়নে) পিত! প্রণাম করি । ক। এসো এসাে বাছা এসাে, (সুমেহনয়নে) বৎসে তুমি পতি ভবনে গিয়ে রাজার প্রধান মহিষী হয়ে পরম সুখ সম্ভোগে কাল যাপন কর, আর অচিরাৎ ভুবন- বিজয়ী সর্ব লক্ষণাক্রান্ত সুসন্তান প্রসব কর, এই আশীৰ্ব্বাদ করি। শকু। পিতঃ! আবার আমি কত দিনে এই তপােবনে অস্ব? আমার এ তপােবন ত্যাগ করে যেতে প্রাণ কেমন কচ্চে। ক। (ঈষদ সহাস্যে) সে কি বাছা? স্বল্প দিনের মধ্যেই আমি রাজ সন্নিধানে গিয়ে তােমাকে আবার এখানে আন্ব, সে জন্য চিন্তা করোনা। রাগিণী ভৈরবী। তাল আড়াঠেকা। সে জন্য বাছা রে আর ভেবনা ভেবনা মনে। কিছু দিনান্তর পরে আনিব এই তপােবনে।। এখন এই বাসনা মনে, গিয়ে সে রজ সদনে, নানা সুখ অাপনে, থাক সে রাজভবনে শকুন্তলা নাটক। s এ বা কার সে ৰা কার, সকলি বাছা তোমার, রাজারি সব অধিকার, অধিক কি কব এক্ষণে। শকু। (চতুর্দিক অবলােকন করিয়া) হে ভােবন! এক্ষণে প্রফুল্লচিত্তে এ অধিনীকে বিদায় দিল, আবার কত দিনে আসিয়া তােমার এরূপ অলৌকিক পরম রম- ণীয় শােভা দর্শন করব ? তােমার জামে থাকিয়া পরম রমণীয় বাল্যকাল অতিবাহিত করেছি ও প্রতি- পালিত হয়েছি, আহা! তােমার এ চিত্তরঞ্জন বিপুল স্থলের ও পর্ণাবলীর শােভা দর্শনলাভ কেমন করে পরিহার করব ? আজ তােমাকে ত্যাগ করে যেতে আমার অন্তরাত্মা কেঁদে উঠছে। রাগিণী সিন্ধু-ভৈরবী। তাল চৎ। নির্জন কানন শােভা যে হেরেছে নয়নে। সে কি আর পারে ভুলিতে দেহেতে জীবন ধারণে । বিহঙ্গম তরুবরে, সদা বিচরণ করে, মন্দ মন্দ বায়ু ভরে, উড়ে বসে ক্ষণে ক্ষণে। পলে পঙ্কজ শােভা, তাহে অলি রাত্র দিবা, সুর- সুর মনােলােভ, পুজে যতি দেবগণে ।। [সকলের প্রস্থান। ৫

শকুন্তলা নাটক।
(রাজা, মন্ত্রী ও সভাসদগণ আসীন) ।
শকুন্তলা প্রভৃতির প্রবেশ।
সারত্ব। মহারাজের জয় হােক।
রাজা। আনুন! আসুন! আসতে আজ্ঞা হয়, মুনিগণ!
তবে তপােবনের ও মহামুনি করে সমস্ত কুশল
তো?
সারত্ব। হ। মহারাজ, আপনকার ভীষণ বলবীৰ্য্য প্রভাবে
সমুদায় কুশল।
রাজা। তবে কি মনে করে বলুন ?
সারত্ব। মহারাজ! মহর্ষি কশ্য পাঠায়েছেন যে, আপনি
একদা সংবরান্বেষণে তপােবনে গিয়া তাহার পালিতা
কন্যা শকুন্তলাকে গন্ধৰ্ব বিধানে বিবাহ করে এসে
ছিলেন; সে কারণ শকুন্তলা গর্ভবতী হয়েছেন, এক্ষণে
তাহাকে লয়ে এসেছি, গ্রহণ করুন।
রাজা । (বিস্ময়ে) এ কেমন ধারা কথা হলো! কৈ, আমি
তাঁর কন্যাকে তাে বিবাহ করি নাই। আর যদি আমি
তাঁর কন্যাকে বিবাহ কমে, তা হলে কি আর কেউ
জানতাে না ? আচ্ছ', আপনারাও কি জানতে পারি-
তেন না ?
সারত্ব। মহারাজ! আমরা সে কালীন উপস্থিত ছিলাম না,
মহর্ষির সঙ্গে সােমতীর্থে গিয়াছিলাম ।

৩৪
শকুন্তলা নাটক।
রাজা। ভাল, আর কেহই কি জানতে পারতো না ? এ
অতি আশ্চর্য কথা হলাে, আচ্ছা, আমি নিজেও কি
জানতে পারতাম না ?
সারত্ব । (ঈষ হাস্যাননে) মহারাজ! সে অনেক দিন হলো
ভাল করে স্মরণ করুন, তা হলেই মনে পড়বে।
রাজা। এ তােমাদের নিতান্ত অন্যায় কথ', ভাল, আমি
যদি বিবাহ করতাম, তা হলে কি আমার মন্ত্রী কি
প্রজাবর্গ কেহই জানতাে না ?
সারত্ব। মহারাজ! এই অবােধ ঋষিবালিকা কি আপনাকে
প্রতারণা কচ্ছে ?
রাগিণী বাঙা। তাল ঠুংরি ।
এ তােমার কেবন বিচার ।
বিচারপতি হয়ে কেন কর এ ব্যবহার ।।
গিয়ে মৃগ অন্বেষণে, ধৰ্ম্মরণ্য তপােবনে, বিয়ে কর
সঙ্গোপনে, মনে পড়ে না হে আর।।
কত শকুন্তল, এ তােমায় করিছে ছলা, নিব্বেধ
অবােধ বালা, নাহি লেশ খলতার ।।
রাজা। আপনারা কি আমাকে অধাৰ্মিক ঠাওরাচ্ছেন না কি?
সাঙ্গ। মহারাজ! তার আর অন্যথা কি? আপনি ব্রহ্মাণ্ড,
পতি হয়ে যেপ্রকা প্রতারণা কচ্চেন, 'আপনি কি
প্রকারে রাজ্যশাসন ও প্রজাপালন করেন, বলিতে
পারি না।

শকুন্তলা নাটক। রাজা। দেখুন, আপনাদের এ কথা বার্তা নিতান্ত অন্যায় হচ্চে, আপনারা আমার উপর মিথ্যা দোষারােপ কচ্ছেন। সরত্ব। মহারাজ! আমাদের অন্যায় কিছুই হয় নাই, আপনিই অন্যায় কচ্ছেন। সা। ভাই সারত্ব! তার কেন, ঢের হয়েছে, এক্ষণে এক- বার, শকুন্তলার মুখের ঘােমটাটা খুলে দাও, যদি রাজা দেখলে চিনতে পারে, (শকুন্তলার মুখের ঘােমল খুলিয়া, রাজার প্রতি) দেখুন দেখি মহারাজ! চিনতে পারেন কি না ? রাজা। (স্বগত) আহা! এমন মনােহরা সুন্দরী কামিনী তাে কখন দেখি নাই। শশধরের কলঙ্ক আছে, কিন্তু ইহার মুখশশী নিৰ্ম্মল শশাঙ্কের ন্যায় শােভা পাই- তেছে, যা হােক্ কৈ আমি তাে একে বিবাহ করি নাই, (প্রকাশে) দেখুন, আমার একে বিবাহ করা অন্তরে থাকুক, কখন চক্ষে দেখি নাই । সার। না মহারাজ ! আপনি প্রতারণা কচ্চেন তার অর সন্দেহ নাই, এই শিরীষকুসুমের ন্যায় সরলা ঋষিতনয়া কি আপনাকে প্রতারণা কর্চে ? এ কখনই সম্ভব হতে পারে না, এক্ষণে আমার কথা রাখুন, আপনার ধর্মপত্নীকে গ্রহণ করিয়া পরম সুখে সুখসম্ভোগ করুন । রাজ।। দেখুন, আমাদের পুরুবংশীয়ের। এ কৰ্ম্ম কদাচ কর্তে পারবে না, আর বিশেষ এ উপরোধের কায ভয়

শকুন্তলা নাটক।
পরদার গমন করা অপেক্ষা আর কি পাপ আছে,
এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত নাই, চরম কালে পুন্নাম রৌরবে
বাস কৰ্ত্তে হয়, তাকি আপনারা জানেন না।
গুরত্ব। মহারাজ, আপনার সঙ্গে আমরা আর অধিক
বাক বিতণ্ডা কৰ্তে আসি নাই এক্ষণে, আপনার বিবে
চনায় যা ভাল হয় তাই করুণ ।
রাঙ্গা। দেখ আমি বিবাহ করলে অবশ্য গ্রহণ কাম,
অকৃত দারকে কি প্রকারে গ্রহণ করি বলুন।
সদৰ। ভাই সাবর, অকারণ বিরােধের আবশ্যক নাই
( শকুন্তলার প্রতি) দেখ শকুন্তলে ! আমাদের যথ।
সাধ্য রাজাকে বল্যাম, কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না,
এক্ষণে তােমার যদি কিছু কক্তব্য থাকে তা হলে বল ।
রাগিণী খাম্বাজ। তাল। একতালা।
এই ছিল আমার কপালে ।
হাতে দিয়ে নিধি, হরে নিল বিধি, কেন প্রতি
বাদী, আবার হলে।
কি দোষে আমায় করিলে বঞ্চিত, হরে নিলে
আমার সাগর সিঞ্চিত,তােমার দয়া নাহিক কিঞ্চিত
লাঞ্ছিত আমায় করিলে ।।
.
হা নিষ্ঠুর বিধি ! তােমার মনে এই ছিল! তুমি
এই দুঃখিনীর সর্বনাশ করবে তা স্বপ্নেও জানি

শকুন্তলা নাটক। নাই(রাজার প্রতি ) মহারাজ! আপনি কি , সমস্তই ভুলে গেলেন ? আপনি তপােবনে বিলম্ব কারণে গন্ধৰ্ব্ব বিধানে পানি গ্রহণ করে এলেন, এক্ষণে আপনি এ প্রকার চাতুরি কচ্ছেন কেন? হায়! আপনার সত্য, ধর্ম কোথা ? হবেনা কেন, নরাধম কৃতঘ্ন পুরুষের রীতি চরিত্ৰনা জেনে যে অবলা অর্থে মন প্রাণ সমাপন করে, তাহারই এই দশা ঘটে থাকে, অবলা সরলা কি প্রকারে কুটিল ছলনাতে প্রবেশ হবে ? কুরঙ্গিনী যদি সতকতাপুৰ্ব্বক অটবী মধ্যে বিচরণ করে, তা হলে কাল সম কিরাতের বাগুরাতে কদাচ জলবদ্ধ হতাে না; সে যা হোক মহা- রাজ! আপনাকে যদি আমি কোন স্মরণ চিতু দেখাতে পারি, তা হলে আপনি আমাকে গ্রহণ করবেন কি না ? । রাজা। অবশ্য, এ অতি উত্তম কথা, কই, কি অভিজ্ঞান আছে দেখাও, আমার হলে আমি অবশ্যই চিতে . পারব। শকু। (অঞ্চলন্বেষণে) ঐষা ! কি হল! কোথায় পড়ে গেল। কি সর্বনাশ উপস্থিত! (বদমে বসন দিয়া রােদ- নারম্ভ)। সাঙ্গ। সেকি শকুন্তলে ? কোথায় ফেল্যে? বােধ করি শচীতীর্থের ঘাটে স্নান করিবার সময় পড়ে গিয়ে থাকবে, নৈলে আর কি হবে ?

৩৮
শকুন্তলা নাটক।
রাজা। দেখ, তরুণী জাতি অতীব মনভুলনা, ছল চাতুরিতে
পরিপূর্ণ, তা আমি বিশেষৰূপে অবগত আছি, কিন্তু
আমি তেমন অধম বংশজাত নই, যে তােমার মিষ্ট
কথায় মােহিত হয়ে অধর্মে পতিত হব ।
শকু। মহারাজ ! আপনার কিছুমাত্র দোষ নাই, সকলি
আমার অদৃষ্টের দোষ, নতুবা আমি তােমার প্রদও
অঙ্গুরী হারাব কেন ?।
সারত্ব। মহারাজ! আপনার ভ্রম হয়েছে, আর বোধ করি
কোন দুর্দৈব ঘটনাবশতঃ এৰূপ ঘটিয়া থাকিবে, শকু-
লা আপনাকে কখনই চাতুরি করবে না।
রাগিণী খট, ভৈরবী। তাল একতালা।
ভূপ এই কি তােমার উচিত বল ।
অবল। সরলা, ক ঋষিবালা, সে কি করিবে চলা,
সব হয় কি বল ।
অদৃষ্টের ফলে জনম কাননে, জনম অবধি বাস
তপােবনে, সে কি কভু জানে ছল চাতুরি মনে,
কেন তুল অমৃতে হলাহল।
ধৰ্ম্ম একজন দেখ আছেন উপরে, ধর্মপত্নী ত্যজ্য কর
কেমন করে, নন্দ বলে দোষ নাহি নৃপবরে, শাপের
কারণে এরূপ ঘটিল ।।
রাঙ্গা। দেখ, ঋষিতনয়ে! পুরুবংশীয়েরা কখন গোপনে
কোন কায্য করে না, যখন যা করেছি, অ-সমুত্র
পর্যন্ত প্রসিদ্ধ আছে।
.

শকুন্তলা নাটক।
৩৯
শুকুওহে বিশ্বাসঘাতক! নরাধম ! ভস্মাবৃত. অনলের
ন্যায় তোমার হৃদয় কে জানতে পারবে ? যেমন
সলিলের পদপ করিতে হইলে সততপুৰ্ব্বক
পাদ নিক্ষে করিতে হয়, সেইরূপ নিষ্ঠার পুরু-
ষের প্রতি মন প্রান্স ধন যৌবন সমুদয় সমর্পণ
করিতে হইলে অগ্রে তাহার রীতিরিত্র জানিতে
* হয় সে সকল বুঝতে পেরে। মিষ্ট কথায় ভুলে
মন প্রাণ সর্বস্ব সমর্পন করেছি, এখন আমার
অদৃষ্টে যে এরূপ ঘটবে তার আশ্চর্য কি ?।
কি পাষাণ হৃদয়! যেমন উপল শত বর্ষ বরিষণ
হইলে তাহার বিন্দুমাত্রও অত্র হয় না; সেইরূপ
উপল সদৃশ পুরুষের হৃদয়ে দয়াদ্রের লেশমাত্র
নাই। হা ! বিধাতা! তােমার মনে এই ছিল ? এই
জনম দুঃখিনী বনবাসিনী অনাথিনী ঋষি নন্দি-
নীর ভাগ্যে কি এই লিখেছিলে ? হা ভগবান!
আমার সকল দিকই অকূলে ভাসাইয়া দিলে ? এই
অবনীমণ্ডলে অনাধিনীর 'আর কে আছে যে
আমাকে দয়া করিবে ? জন্মাবধি প্রকৃত মাতা
পিতা কে তা তো কিছুই জানিলাম নাই । দীনবন্ধু ।
তুমি যদি এই দীম হীনা আশ্রয় বিহীমা অঙ্গনাকে
স্থান দুনি না দাও, অবে আর কে দিবে? আ! ওরে
কৃতন্ন প্রাণ! তুই তার, কেন অামাকে যাতন।
দিস্ ? (উ দৃষ্টে) দিননাথ! তােমার সমক্ষে অঙ্গী-
( ৪
}

-~- ৪০ শকুন্তলা নাটক। কৃত হয়ে পাষণ্ডের এই কাষ! তুমি কি ইহার কিছুই প্রতিকল দিবে না? মাতঃ বসুন্ধরে! তুমি বিদায় দাও, আমি তােমার গান্তরে প্রবেশ করিয়া এ হৃদ- বিদারণ দুঃখের শান্তিলাভ করি। মাতঃ ! আমি তােমার গভেই বিলীন হই না কেন? তুমি এ পাপীয়সীকে কেন'-গর্ভে ধারণ করেছিলে? হা । নিষ্ঠুর বিধাতঃ ! অকুঞ্জ দুঃখের সাগরে ভাসতে-.. ছিলাম, যদি একটু সানুকুল হয়ে দ্বীপায় প্রদান করলে, তা সে আশালতার মূলােৎপাটন হইল । জগদীশ্বর ! আমাকে এক দুঃখ হইতে অন্য দুঃখ- সাগরে পতিত কর। কি তােমার নিতান্ত মানস ? ভাল, তােমারি মানস পূর্ণ হােল্ক। রাগিণী সিন্ধু-ভৈরবী। তাল জৎ। কি লিখন লিখেছ বিধি এ দুঃখিনীর কপালে । রাজরাণী হব, তা না হয়ে পথেতে বসালে। জননী মেনকা, প্রসবিয়ে রাখি একা,আর না দিলেন : দেখা, ভীষণ কান্তার বিরলে।। বলতে নয়ন জলে ভাসে, জন্মাবধি পরবাসে, নন্দ- লাল কহিছে শেষে, হবে ভাল শেষকালে ।। সার। ভাই সাক্ষর! আমাদের প্রতি গুরুদেবের যে প্রকার আজ্ঞা ছিল, তা তাে কল্লাম, তবে আমরা এক্ষণে তপােবনে ফিরে যাই চল । 1

শকুন্তলা না।
১১
সাঙ্গ। হাঁ ভাই চল, আর মিছামিছি এখানে কাল বিলম্ব
করলে কি হবে বল,আর বিশেষ এই পাপীষ্ঠ রাজার
সভায় আর থাকতে নাই ব্রাজায় প্রতি মহারাজ।
এক্ষণে আমরা চলামানায় মা ভিরুচি হয় করুন।
সারত্ব। শকুন্তলে! তুমি এখন এইখানে থাক, রাজা যদি
যথার্থই তাের পাণিগ্রহণ করেছিলেন, তাহলে তুমি
রাজার বাটীতে ঋকিয়া দাসবৃত্তি করিলে তােমার
তাতে অপমান নাই, তবে আমরা এক্ষণে চল্লাম,
(গমনোদ্যত).
শকু। ভাই সারত্ব। আমার যে প্রকার দুর্ঘটনা উপস্থিত
তা স্বচক্ষে দেলে, তাতে যদি তােমরাও এ অধিনীকে
পরিত্যাগ করে নে, তৰেহ্মার আমি কোথা যাব ?
.
রাগিণী এম্বাজ। ভাল একতালা।
কোথায় গােমহ শল!:
ডাকি কি মা সাধে, রাখ মা, শ্রীপদে, কেলিলে
বিপদে, যাব কোথা !
কি পাপেতে আমায় দিলে মা এ দণ্ড, সকল দিক
আমার করলে লণ্ডভণ্ড, সুস্থির না হতে পারি গো
এক দণ্ড, বিষম যন্ত্রণা দিলে প্রাণে ব্যথা।
বাঁচিতে বাসনা নাহি শবাসন, এই কি জনমের
রহিল ঘােষণা, নন্দ বলে তবু হন ত্রিনয়না, হেরে না
শুনে না শুনিলে কথা ।

শকুন্তলা নাটক।
পয়ারু।
ন
অতঃপন্ন সভাম ন এক মনে।
শকুন্তলা শােকাকুলা সজলগঞ্জনে।।
কৰেন রাজার প্রতি নানা রিক্ষার।
শাপের কারণে গরূপ কি করবে তার।
মহা ধৰ্মশীল রাজা দুষ্মন্ত নৃপতি। •
পর নারী প্রতি কেন হবে তাঁর অতি !!!
দুবিশসার শপ হেতু এরূপ ঘটনা।
উল্লেখ করেছি পূৰ্বে জান সৰ্ব্ব জমা !
শকুন্তলায় আগ্ধ করি মুনি শিষ্যগণ।
* অপবন অভিমুখে করিল গমন।
সভাস্থলে শকুন্তলা-রিক্সা র্শন।
মনদুঃখে উতরায় কবেন ক্রন্দন ।
মন্ত্রীসহ যুক্তি করি ভুপতি, তখন। ,
শকুন্তলায় রাখিরে যাজক ভবন।
পুরােহিত। সঙ্গে যাম ক ঋসিবালা।
দুঃখেতে ভূতলে পড়ে হইয়া বিহবল।।
মানমত বিলাপিক্সে কত যে কহিলা।
শুনিলে শতেক খণ্ড হয়ে যায় শীলা ।।
দুহিতার দুঃখ হরি মেনকা-অপ্সরা।
ভূতলে অমনি জাসি নামিলেন ত্বরা।
তনয়ার কোলে করি অমনি তখন।
অন্তরীক্ষে গেল চলি বিজুলী যেমন ।।

গুলা নাটক।
। রাজ পুরােহিত ইহা ঋগ্নিদর্শন।
হত না হয়ে হবে।
-কাপিতেসিজার ভয়।
বিস্তানিয়া বিবরণ ফলে সমুদায়
শ্রবণে ভুপতি অার সভাসদগণ 'চ
নাম তর্ক করে জানিতে কারণ
রাজা বলে দেবায়ানাফি সহ।
ছলনা ফয়িল মোরে কে কোন গ্রন্থ।
সামান্য। মানৰী নাহি হবে সে রমণী।
অপ্সরী কিন্নরীকিৰণ কোর্স মায়াবিনী।
কেমনে কি হলো এ যে না পাই ভাবিয়া ***
মন্ত্রীবয়ে কন ভুপ দ্বারত ডাকিয়া ।।
সভা ভঙ্গ কর অদ্য ৰিলকি আর।
সভা ভঙ্গে যে যাহার চলিলা আগার ।
বিরল অবাসে কুপ বসিয়া তখন।
কত শত মনে মনে করেন চিন্তন :
দ্বিজ নন্দলাল বলে গুমহে ভূপতি ।
কর্মের অধীন জীব বেদের ভারতি ।।
[সকলের প্রস্থান ।
(জেলেনীর ও প্রতিবাসীর প্রবেশ1)
জেলেনী। (উর্ধে দৃষ্টিপাত করিয়া) ভাইতো! এতখানি বেল।
হল, সকল লােকের খাওয়া দাওয়া চুকে গেল, আমাদের

৪ লা নাটক উনুনে আর ঋড়ি চলে না। পােড়ারমুখো ভােরে উঠে যে গেল, এখনো খো নাই, আমি কোণের বোমুয়ে ফব। পুজে বেড়াই, যে পাতুরিনে "লিতে আসে, মুখ- পােড়াদের কােণমিক্ষি সর্বনাশই করেছি। তাই তাে, কোথায় যাই। পাড়ারমুখাের হাতে প্রাণ গেল। এবার মাই দেখি বিশীদের জিজ্ঞাসা করে জ্ঞাস, ঠাকুরপো ঘরে জাহ্ন কি ? প্রতি। কে উ, বড় বৌ নকি; তকে কি করে, কিছু দরকারটার জগছে নাকি? জেলেনী। রাগিণী কালাংড়া...ভাল খ্যামটা তােমকেতনেৰেছৰল ।. - . কোথায় মাছ ধরে জামার কর্তাটি গেল। বৌ হয়ে জিকালি কাক, ভয়।যৌন বুকে, বােল্লে পরে পাড়ার লােকে, ঘটাবে বিষম জঞ্জাল। হতভাগার ভাগ্যে পড়ে, ক্রিসন্ধ্যা সরি পুড়ে, বৌ হয়ে কে এম্বন করে, দুঃখে ফাটে বক্ষস্থল ।। প্রতি। বন্দু বৌ। তুমি দাদার জন্যে যে পাগল হয়ে পাড়ায় পাড়ায় খুজে বেড়া! দেখ মাচধরা ঝকমারি কায, হয় তো এক টোপেই ময় তো মাথা খুড়লেও নয় । তা তােমার কি তার জন্যে এই দুপুৰৰঙ্গা, রাস্তা যেন আগুণ জুয়েছে, এতেও কি ঘরের বার হতে আছে ?

জেলেনী 1:খে ঠাকুরপো ! ঝরন্তু তাস, কিন্তু আমি
একুলা, ঘরে থাকুজে পারিনে, পুরুষমানুষ না দেখলে
আমার প্রাণ, যেন ছটফট কর বােলি তবু এখন
তােমাক্ষে দেখেও অনেক কুস্থ হয়েছি, কে জানে ভাই
কেমন করে হয়েছে, কিন্তু বুঝতে পারি না।
প্রতি । বড় বৌ বুঝেছি, বারটাফারঃ দোষ আছে, তা
জ্যোক ও বয়েস, দোষে হয়ে থাকে, আর বিশেষ
স্ত্রীলোকেরা ঐ রকমই হয়, এক তরকায়িকি রােজ
রোজ ভাল লাগে। পচ কম করে খেতে ,
(উভয়ের, হা) কে ফু ইকুক বৌ! আজ যেন
দাদগকে শচীতীর্থেরঘাটের দিকে যেতে দেখেছি,
তা একবার না হয় সেই দিকেই গিয়ে দেখ।
জেলেনী । না ভাই! ও ঘাটের শিকে সেবন, ৰাগ টাগ
আছে, যেতে ভয় হয় ।
প্রতি। ভয় কিসের ? আঁখিও হয় তােমার সঙ্গে যাব
চল, জুজনে খুজে অলিগে
জেলেনী। তােমাকেই বিশ্বাস কি ভাই? আলেচাল দে-
লেই ভেড়ার মুখ চুল্ক ওটে, তা তােমাদের জাতকে
কি বিশ্বাস অাছে ?
প্রতি। বড় বেই! এ তােমার তেমন ঠাকুরপো নয়, ঠিক
- যেন লশের মত, কেন তুমি আমার সঙ্গে কখন কিছু
ব্যবহার করমি ?
জেলেনী। হা লক্ষণের মতন হলেইতো বিলক্ষণ হয়েছে।

১৬
শকুন্তলা নাটক।
৫ হা লক্ষণ! ” এই শব্দ, সেই মায়াবী মারীচের মুখে
বৈদেহী শ্রবণ করে,দেবর লক্ষণকে বলেন, দেবয়! বুঝি
অৰ্যপুত্রের কোন অমঙ্গল ঘটেছে, অতএব তুমি শীঘ্র
যাওঁ লক্ষণ বলেন উড়বে তােমাকে ছেড়ে আমি
কেমন করে যাই; এখনি তােমাঁকে কেহ হরণ ক রলয়ে
মাবে,তা সে লক্ষণকেম যায় না বুঝেছ? তুমিও আমার
সেই রকম ঠাকুরপো তো, বুঝেছি, অার বলতে
‘বে নাঁস: +
প্রতি। বৌ! তুমি এমন ধারা কদিন হলে? আগেতো এমন
ছিলে! না; আগেতোদূজনে কত যেমখেলা দেল করেছি,
এখন কি ধর্মে মন দিয়ে? বড় বৌ! গোড়া কেটে
আগায় জল ঢাললে আর কি হবে বল ? (শ্লোক,
( অঙ্গর শত ধৌতেন মলীনত্ব-ন যায়তে)।
( জেলের প্রবেশ)
জেলে। (রাগভরে) বলি পথের মাঝখানোটি দায়ে
কি উকি ঝুকি মাচ্ছ ?
জেলেনী। (স্বগত) ঐ যে মুখপােড়া অচে, পােড়ারমুখখাকে
দেখলে আমার শীষ পর্যন্ত জ্বলে উঠে; (প্রকাশে)
তােমার জন্যেই এই দুপুর রোদে ঘরের বার হওয়া,
নৈলে আর আমার দায় কি বল ? বলি সেই যে সকাল
বেলা চুলােয় গেছেলে, এতখানি বেলা হল কেমন
করে নিশ্চিন্দি থাকি?।

শকুন্তলা নাটক।
৪৭
জলে! আমার জন্যে মা আর কার জন্যে ?
হেলেনী । তুমি থাকতে কি আর হবে ? তুমি প্রশ্নে ঠিকা-
নায় যাও, তার পর যা হয়ে থাকে তাই হবে,
জেলে : ক্ষন থাকতে থাকতে হলেই ভাল হয়না? দেখে
শুনেও যদি মােত্তে পারি, তা হলেও ভাল; মলে তো
• 'অৰ শুনতে অস্ব মা +
জেলেনী । সেটা পুরুষের পক্ষে, স্ত্রীলােকে পারে না: পুৰুৰে
- যেমন : 'ডুবে জল খেতে পারে, তেমম স্ত্রীলোকে
জৈলে। সে যা-হোক্, তুমি রাগ করেছিলে, এই দেখ দেকিন
শচীতীর্থের ঘাট থেকে একটা কত বড় মাচ ধরে
এনেছি।
রাগিণী কালাংড়াতাল কাওয়ালী।
হায় হায় প্রেয়সী ওলো দেখ দেখি চেয়ে।
কত বড় মাচ ধরেছি শচীতীর্থের ঘাটে গিয়ে ।।
খাবার মাচ রেখে ঘরে, বেগে যা হাট বাজারে,
বার যেন দিনে কারে, চলে না কেউ ধৰ্ম্ম ভয়ে ।।
আমি লো শুড়ীর বাড়ী, যাই তবে তাড়াতাড়ি, গ।
গতাের বেদনা ভারি, জাল ঘেঁচে আর মাচটা বেয়ে ।
জেলেনী। তবে দাও দেকিন, মাচটা বুনিয়ে ফেলি।
জেলে। এই ধর খুব সাবধানে কেটো, যেন মাচ কুটতে
কুটতে আর কিছু কেটে ফেলােনা।

৪৮
শকুন্তলা নাটক।
জেলেনী। মিসের ঢং দেখে আর বাচিন, এসেন।
তােমার !
জেলে। দুটি পাস না-৪; তা না হলে পারবে না।
জেলেনী ।মুখপােড়। এখান থেকে সরে মা তো, (মৎস্য
কুটিতে কুটিতে) বা ! এবার কি !দেখ আচটার
পেটের ভিতরে এটা কি দেখ?ঠিক আংটিটা
নয় ? ..
জেলে। আংটিই তো বটে! কি আশ্চর্য! বা! বা! এত
দিনের পর মাকাল ঠাকুর সদয় হয়ে কিছু দিলেন
আর কি, দেখ দেখ এটার গায়ে কি আবার চক্কু
কচ্ছে।
জেলেনী। সত্যিইতো! ও আবার কি! আহ! এমন
পরিস্কার অংটা তো কখন দেখিনে! দাওনা একবার
হাতে পরি ।
জেলে। যখন পেয়েছি, তুই বৈ আর কে পরবে ?
জেলেনী। দেখ নাথ ! এটা বড় সামান্য আংটি নয়, আমি
বলি কি, আংটিটা নিয়ে বাজারে একবার যাচাই
করে এস।
জেলে। আচ্ছা দাও, যদি অনেক টাকার জিনিস হয়, তা
হলে বেচে আস্ব, নৈলে ফিরিয়ে আনব, তুমিই
আমার হাতে দিবে।
উভয়ের প্রস্থান ।

শকুন্তলা টুক।
৪৯
(ধীরকে বন্ধন করিয়া জমাদার ও চৌকীদারের প্রবেশ) ।
জমা। ও জেলীয়া! তােমকে। এ চিজ কেসে মিলা ?
" তােতত চোর হ্যায়; এ হো চৌকীদার।
চৌকী। ক্যায়া হুকুম জমাদার সাহেব ?
জমা দেখে চৌকীদার, এ জেলীয়া ডাকু হ্যায়, এ
এই
আংটী রাজমহলসে চুরি কিয়া, একো পাকড়ে ।
জেলে। বাবা জমাদার সাহেব ! আমি এ অংটী চুরি করি
নাই, বিনা দোষে কেন আমাকে বাঁধ, আগে বিচার
কর তার পর যা হয় তাই করো।
জমা তাে যদি চুরি নেহি কিয়া, তব: আংচী কেতরসে
মিলা বাত বোলাে ?
জেলে। ধর্মঅবতার । আজকে একটা বড় মাচ ধরেছিনু,
সেই মাছের পেটের ভিতর এই আংটীটা ছিল,
দোহাই খােদাব আর আমি কিছুই জানি না।
জমা । দেখো চৌকীদার তােম্ একো হেপাজাত করকে
রাখ, হাম রাজদরবার যাকে ভূপকো 'দোয়ে
য্যাস হুকুম মেলেগ ত্যা করো।
চৌকী । যেহুকুম জমাদার সাহেব।
[জমাদারের প্রস্থান ।
(জনাদারের পুনঃ প্রবেশ)।
জমা। এহে চৌকীদার। দেখাে, ও জেলীয়াকে ছােড়
দেও; হাম বড় তাজব হুয়া, আওর এ হারঠে।

শকুন্তলা নাটক। ওকে বকসিস হুয়া। কায়্যা ভাই। রাজদরবারমে চুরি হুয়া, হামু চোর পাকড়, সাজা নেহি হয়। আওর' বসিস হুয়া, ক্যায়া ভাই কুচ মালুম হােত। নেই। (সকলের প্রস্থান । (রাজা, মন্ত্রী ও সভাসদগণ আসীন)। মন্ত্রী। মহারাজ ! অকস্মাৎ আপনার আজ কি দুর্দৈব উপ- স্থিত হল ! আপনি এ প্রকার শােকাকুল হলেন কেন? নয়ন. যুগল অজশ্রু বারিধারায় ভাসতে লাগলাে, আমরা তাে কিছুই বুঝতে পাচিনে। রাজা। (অপূর্ণ নয়নে) মন্ত্রী! আর সে দুঃখের কথা তােমায় কি বলব, অদ্য এই অঙ্গুরী প্রাপ্ত হইয়া প্রাণাধিকা শকুন্তলাকে মনে হলো দেখ, প্রাণদয়িতাকে বিনা দোষে কত অবক্তব্য দুৰ্ব্বাক বলিয়াছি কতই তির- স্কার করিয়াছি, পরিশেষে বৰ্জন করিয়াছি, সেই সকল স্মৃতিপথাৰূঢ় হওয়াতে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হচ্ছে। ". রাগিণী ভৈরবী। তাল তেতালা। কি করি উপায় মন্ত্রী মরি তার বিরহগুণে। হৃদয় বিদীর্ণ হলো অস্থির হতেছি প্রাণে । বিনা দোষে নানামত, বলেছি দুৰ্বাক্য কত, মনে হলে অবিরত, প্রাণ বাদে ক্ষণে ক্ষণে ।

শকুন্তলা নাটক। ৫২ আর কি পুনঃ ভরে পাব, কি করিব কোথা যাব, নন্দ বলে শুম ভুপ, পাবে পরে কিছু দিনে। মন্ত্রী। মহারাজ! তবে আপনি যথার্থই কসুতা শকুন্ত- লকে বিবাহ করেছিলেন। রাজা। হ। মন্ত্রী আমি যথার্থই তপােবনে গিয়ে গন্ধ বিধানে শকুন্তলাকে বিবাহ করেছিনু, আমার কেমন দুৰ্ম্মতি উপস্থিত হয়েছিল তা কিছুই বলতে পারিনে, হায়! আমি কি নরাধম! পাষাণ হৃদয়! অধর্মাচারী। প্রিয়াকে কতই দুৰ্ব্বাক্য বলেছি, কতই তিরস্কার করেছি, হায় ! আমার তুল্য নৃশংস কে আছে ? (অশ্রু- পাত)। মন্ত্রী। মহারাজ! এক্ষণে আর অকারণ ভালে কি হবে বলুন ? ও সকল দৈবাধীন, দৈব কর্তৃক ঘটেছিল, সে যা হােক, আপাতত ধৈৰ্য্যাবলম্বনপূৰ্ব্বক চিত্ত বিকার দূর করিয়া দি, একটা সামান্যা মানবীর জন্য আত্মাকে কেন কষ্ট দেন ? রাজা। মন্ত্রী। সে আমার সামান্য প্রিয়তমা নয়, মানবীও নয়, আমি জন্মান্তরেও সে বিধুমুখীর মুখচন্দ্র বিস্মৃত হতে পারব না, ভূত জন্মের বিপুল সুকৃতির ফলে তেমন অমূল্য রত্ন লাভ করেছি, কিন্তু বিধি সে বিষয়ে আমাকে বঞ্চিত কল্লেন। ( ৫ )

শকুন্তলা নাটক।
রাগিণী বিভাষ । তাল কাওয়ালী ।
সে বিনে যত দুঃখ জানাইব করে বল ।
জীবন হইলে ছাড়া মীনেতে যেমন চঞ্চল ।
ফণী যেমন মণি বিনে, থাকে সদা ক্ষুন্নমনে, আমি
তেম্‌নি সেই নবীনে, চন্দ্রাননে,বিনে জীবন বিফল ।।
কি জানি কি দৈবযােগে, মন হল সে রত্ন ত্যাগে,
আজ তার অনুরাগে, ধ্বান্ত হেরি জল স্থল ।।
%
মন্ত্রী। মহারাজ ! আপনি যদি অঙ্গনাকে যর্থাই উদ্বাহ করে-
ছিলেন, তবে তাকে ত্যাগ কল্লেন কি জন্যে ? আবার
তার জন্যে এত অনুতাপ কচ্ছেন কেন ?।
রাজা। অমাত্য! আমি সেই তপােবন হইতে রাজ্যে আসিয়া
উপস্থিত হইলে, কি দুর্দৈব কর্তৃক বন্দুতে পারিনের
আমার আর কিছুমাত্র স্মরণ ছিল না।
মন্ত্রী। মহারাজ! বুঝি কোন দৈব কর্তৃক ঘটনা ঘটে থাকবে,
তা না হলে এরূপ ঘটিকার সম্ভাবনা নাই, এক্ষণে
ধৈৰ্য্যাবলম্বন করিয়া চিত বিকার দূর করিয়া দিন,
দেখুন দৈবের অসাধ্য কি আছে ? শকুন্তলার সহিত
আপনার পুনর্মিলনেরও আশ্চৰ্য্য নাই, এক্ষণে দৈব
চিন্তা করিয়া যাহাতে কাৰ্য্য সাধন হয়, তার চেষ্টা
করুন, নৈলে আর উপায় কি আছে ?
বাজ। (বদনে বসন দিয়া কাঁদিতে কাদিতে) মন্ত্রী! আমি
কি আর সেই চন্দ্রানীর মুখচন্দ্র দেখতে পাব ? যখন

শকুন্তলা নাটক। করে প্রাপ্ত হয়ে অকূল অর্ণবে বিসৰ্জন দিয়াছি, তখন আমার সে আশালতার মূলােচ্ছেদ হয়েছে । মন্ত্রী। রাগিণী ভৈরবী। তাল আড়াঠেকা। ভেব না তুমি রাজন, হবে বিধি সুপ্রসন্ন । তব মান্য চরাচরে তুমি নহ সামান্য। তব পণ্য খ্যাত মহী, অসমুদ্র কর গ্রাহী, একাননে কত কহি, বল্‌তে বাণীর বাণী শূন্য। দৈব হলো অনুকূল, আশু পুনঃ পাবেন কূল, কেন অকূলে ভাসাও দুকুল, হয়ে মনে অবসন্ন ।। (মাতুলির প্রবেশ)। মাতুলি। ধর্মের জয় হােক । রাজা। এসাে এসো মাতুলি এসাে, তবে কি মনে করে, সখা ইন্দ্রের এবং সুরপুরীর সমস্ত কুশলতো ?। মাতুলি । আজ্ঞা বড় কুশল নয়, অধুনা কালনেমী প্রভৃতি কত- কগুলি দুর্জয় দানব দেবলােকে আসিয়া নিরন্তর উপ- দ্রব কচ্ছে, তাহার জন্য স্বর্গবাসী এবং সুরেন্দ্র সদা সশঙ্কিত আছেন, একারণ আপনাকে লয়ে যাবার জন্য দেবরাজ আমাকে পাঠাইয়াছেন, এক্ষণে আপনি অগ্রে যাইয়া সেই দুরন্ত দানবগণকে সংহার করুন। রাজা। মাতুলি! আমার এত শাসনেতে দানবগণের উপদ্রব নিবৃত্ত হয় না? আচ্ছা চল, আমি শীঘ্র যাচ্ছি।

৫৮
শকুন্তলা নাটক।
বজুপানি অনুমতি পাইয়া রাজন।
মাতুলির সহ পরে করেন গমন ।
দুর্জয় দানবদলে হইয়া প্রবেশ।
সংগ্রাম করেন সহ করি মহা ক্লেশ।
আছিল অসংখ্য শিক্ষা করিয়া সন্ধান।
একে একে বধিলেন সব দৈত্য প্রাণ
দৈত্য সংহারিয়া চলে সানক্ষিত মতি ।
ইন্দ্রালয়ে গমন করেন শীগ্রগতি ।।
প্রণমেন শচীপতি সুরগণ পদে।
আশীষ করেন নৃপে থাক নিরাপদে।
পুনরায় রথে চড়ি আসেন স্বদেশ।
দেখেন স্বভাব শােভা বণিতে অশেষ ।
(মাতুলি সহ ভূপতির হেমকূট পৰ্ব্বতে উপনীত)।
রাজা। মাতুলি! দেখ ঐ যে হেমময় প্রকাণ্ড একটা পর্বত
দেখা যাচ্ছে, ঐ পৰ্ব্বতের নাম কি জান ?
মাতুলি। মহারাজ ! ও বড় সামান্য পৰ্বত নয়, ও পর্বতের
নাম হেমকুট, কিন্নর, অপ্সর প্রভৃতি ঐ স্থানে বাস
করে, আর মহামুনি কশ্যপ ঐ পর্বতে সমাধি প্রভৃতি
করে থাকেন, ও একটা প্রধান তপস্যার আম্পদ।
রাজা। মাতুলি ! মহর্ষি কশ্যপ ঐ পৰ্বতে সমাধি করে
থাকেন ? তবে আমি অদ্য মহামুনিকে দর্শন করিয়া
নয়নযুগল সফল ও আত্মাকে চরিতার্থ করব।

শকুন্তলা নাটক।
রাগিণী ভৈরবী। তাল পােন্তা।
তবে এইখানে সারথি একবার রাখ হে রথ।
কশ্যপে প্রণমি একবার পূর্ণ করি মনােরথ ।
গিরি নয় যে মহা তীর্থ, হেরিয়ে ব্যাকুল চিত্ত,
দেখাও হে আজ পরমার্থ, পতিতে পবিত্র পথ।
মাতুলি। মহারাজ! মহর্ষি কশ্যপকে আপনার যদি দেখি-
বার একান্ত মানস হয়ে থাকে, তবে আপনি এই স্থানে
ক্ষণে অবস্থিত করুন, আমি অগ্রে যাইয়া আপনার
আগমন বার্তা জানাই, পরে আপনাকে লয়ে যাব।
রাজা। আচ্ছা, তুমি অগ্রে যাইয়া সংবাদ জানাও।
মাতুলি । হ মহারাজ, আমি তবে চল্লাম ।
প্রস্থান।
(তাপসী ও বালকের প্রবেশ)।
তাপসী। বাছা নিবৃত্ত হও, নিবৃত্ত হও, কেন উহাকে উৎ
পীড়ন কর ?
'রাজা। (স্বগত) এ আবার কি! শুনেছি এ অতি পবিত্র
স্থান, এখানে হিংসা, দ্বেষ?—এই যে এদিকে।
তাপসী। বাছা দুরন্ত হৈও না, সিংহশিশুকে ছেড়ে দাও,
ও নির্দোষী, কেন উহাকে যন্ত্রণা দেও, ছেড়ে দেও।
বালক। না, আমি ছেড়ে দিব না।
রাজা। (স্বগত) আহা! তপােধন কি পবিত্ৰাস্পদ! যথায়
হিংসা, দ্বেষ, মদ, মাৎস্যাদি কিছুমাত্র নাই, সকলি

৬০ শকুন্তলা নাটক। মহর্ষির তপস্যার প্রভাব ! সিংহশিশুর প্রতি মানব- শিশু উৎপীড়ন কচ্ছে, তা সিংহশাবক অবলীলা- ক্রমে সহ কচ্ছে, যা হােক, এমন সুন্দর শিশুতো কখন দেখিনে, কি চমৎকার ৰূপ! কথাগুলি যেন মধু অপেক্ষাও মিষ্ট, মুখচন্দ্র দেখলে শরতকালীন চন্দ্রকে মলিন বোধ হয়, এই শিশুটীকে দেখে আমার মন এত চঞ্চল হল কেন ? ইচ্ছা হয় একবার ক্রোড়ে করে অন্তরের তাপ অন্তর করি, পুত্র বিহীন হলেই কি পরের পুত্র দেখলেই স্নেহ হয় ? (দীর্ঘ নিশ্বাস ও অশ্রুপাত) । রাগিণী বাহার। তাল আড়া। কোলে আয়রে যাদুমণি, শুনিরে সুমধুর বাণী । হৃদয়ে রাখিয়ে তােরে, বুড়াইরে তাপিত প্রাণী ।। হেরে তাের সুন্দরাকৃতি, মন আমার চঞ্চল অতি, বরে মােরে সম্প্রতি, কে তাের জনক জননী ।। তাপসী । তাইতো কি করি কাকেই বা ছাড়িয়ে দিতে বলি। এই যে এ দিকে একজন কে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। একেই একবার বলে দেখি, (রাজার প্রতি) মহাভাগ । যদ্যপি আপনি অনুকম্পা প্রকাশ করে এই শিশু- টির পাণিপল্লব হইতে সিংহশিশুটিকে মোচন করে দেন, তা হলে চিরবাধিত হই ।

শকুন্তলা নাটক।
রাজা। আচ্ছা তা দিচ্ছি, বাছ। সিংহশিশুকে ছেড়ে দাও,
ছি, দুরন্ত হৈওন! (স্বগত) দেখেছি, এ শিশুটির
অবয়বে রাজচক্রবর্তীর লক্ষণাবলী আছে, ঋষিকুলে
এ প্রকার কুমার হওয়া অতি অসম্ভব, তাই তো! এ
কেমন হলো !
তাপসী। মহাশয় ! ও সন্তানটি ঋষিপুত্র নয়।
রাজা। হ, আমিতো তাই বলি, তবে এ শিশুটি কোন
বংশাবতংস ?
তাপসী । মহাশয় ! এটী পুরুবংশীয় ।
রাজা। কি বল্লে ! এ শিশুটী পুরুবংশীয় ! ভাল এর পিতার
নাম কি, বলতে পারেন ?
তাপসী। (দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া) মহাশয়! সে অতি
নিষ্ঠুর, তার নাম করলে শরীরে পাপ স্পর্শে, সে বিনা
দোষে আপনার ধর্মপত্নীকে বর্জন করেছে, সে পাষণ্ড
পাষাণ সদৃশ।
রাগিণী কালাংড়া।
তাল কাওয়ালী ।
কথা কেন জিজ্ঞাস আমারে ।
ওহে না হেরি পাপীষ্ঠ তার সমান সংসারে ।।
ধর্মাধর্ম যার একৈ অন্তরে, নারী বধ করিতে ভয়
যে জন না করে ।
তাই বলি মহাশয়, সে যে অতি দুরাশয়, বিনা
অপরাধে সতী পত্নী পরিহারে ।।

শকুন্তলা নাটক।
রাজা। আজ্ঞ। তাই যেন বলেন, এর জননীর নাম কি
বলতে পারেন ?
তাপসী। ইহার জননীর নাম শকুন্তলা।
রাগিণী খাম্বাজ। তাল একতালা।
তােমায় কব কি হে গুণমণি।
জনম দুঃখিনী, চির বিরহিণী, কহিতে তার দুঃখ
বিদরে প্রাণী ।।
নারীর যত সুখ সবে বঞ্চিত হয়ে, বেঁচে আছে
কেবল পুত্রমুখ চেয়ে, সবে ধন ঐ শিশু কোলে
লয়ে, বন মধ্যে বাস করে সেই ধনী ।
পাত হতে সতীর এতেক দুর্গতি, না দেখি না শুনি
কভু হেন রীতি, বিনা দোষে যেমন রাম রঘুপতি,
বনে পাঠাইলেন জনকনন্দিনী ।।
রাজা। (স্বগত) হৃদয়! কিঞ্চিৎ স্থির হও, (দীর্ঘ নিশ্বাস
ত্যাগ) কি বল্লে ! ইহার জননীর নাম শকুন্তলা ! ভাল,
তিনি এখানে কোথায় কি প্রকারে আছেন ?
তাপসী। মহাশয় ! সে দুঃখের কথা আর কেন জিজ্ঞাসা
করেন ? তাঁর দুরাবস্থার কথা কর্ণ-বিবরে স্থান দিলে
হৃদয় বিদীর্ণ হয়, বর্ষাকালের নীরদের ন্যায় নেত্র
হইতে নিরন্তর নীর নির্গত হয় ।

৬৩
শকুন্তলা নাটক।
রাগিণী খটভৈরবী। তাল জলদ একতালা ।
তােমায় কি কব হে সে ভারতি ।
তার দুঃখানল, যেৰূপ প্রবল, বলিলে সকল, দুঃখ
পাবে অতি ।।
মেনকা-নন্দিনী, সে বিধুবদনী, পালিল তাহায় ক
মহামুনি। বরিল সে দুষ্মন্ত নৃপমণি, বিনা দোষে
ত্যজে দলেক দুর্গতি।
পতিব্রতা সতী শুদ্ধাচারিণী, পতিতপাবনে ভজেন
দিন রজনী, সবে মাত্র তার ঐ পুত্র জানি, ভরত এর
আখা দেছে গুণবতী ।
(শকুন্তলার প্রবেশ) ।
শকু। (ইত তঃ অবলােকন করিয়া) তাইতো বাছা আমার
কোথায় গেল ! এতখানি বেলা হলো, বাছা তামার
কিছুমাত্র খায় নাই, এই বিরল কাননে কোথা কার
সঙ্গে খেলা কচ্ছে।
রাগিণী সিন্ধু। তাল আড়খ্যাটা ।
কোথা রে বাপ যাদুমণি কোথা গেছ খেলিবারে।
কপাল মন্দ বোলে সন্ধ, হয় রে সদা অন্তুরে।।
তরুণ অরুণকালে, খেলিবারে কোথা গেলে, আয়রে
যাদু করি কোলে, যুড়াই তাপিত প্রাণ চাঁদবদন
হেরে )

৬৪
শকুন্তলা নাটক।
সবে ধন তুই রতনমণি, ফণীর যেমন মাথার মণি,
তুই রে হােস্ তেমনি, অন্ধের যেমন যষ্টি করে।
রাজা। (শকুন্তলাকে দেখিয়া) হৃদয় ! আর সন্দেহ কচ্ছ
কেন? তুমি যার জন্য এই সংসার অরণ্যময় দেখে-
ছিলে, বিধি সানুকুল হয়ে তােমাকে অদ্য সেই হার।
নিধি দিয়াছেন, (শকুন্তলার প্রতি) দেখ প্রাণদয়িতে!
তােমায় বিনা অপরাধে বৰ্জন করিয়া কিছু দিনান্তরে
সেই অঙ্গুরী আমি পুনৰ্বার প্রাপ্ত হইয়াছি, সেই
অঙ্গুরী প্রাপ্ত হওয়াতে তােমার সমস্ত বিষয় আমার
স্মরণপথাৰূঢ় হয়, সেইপৰ্য্যন্ত আমি যেপ্রকার কষ্টে
কালযাপন কচ্ছি, তাহা একমুখে ব্যক্ত করা যায় না,
(অত্যাগ ও বদনে বসন দিয়া সরােদনে) এই সেই
অঙ্গুরী, লইয়া অঙ্গুলী ভূষণ কর।
রাগিণী বাহার । তাল আড়া।
যে দিন প্রাণ প্রেয়সী তােমায় হইল স্মরণ।
সেই হতে অন্তরে আমার জ্বলে বিচ্ছেদ হুতাশন ।।
ছিল না বিশ্বাস হেন, তােমারে পাইব পুনঃ, ভাগ্যে
হলো সে ঘটন, আমার অপরাধ কর মার্জন ।
শকু। মহারাজ! অমন কথা আর আমাকে বলবেন না,
ঐ অঙ্গুরীই আমার সর্বনাশের মূল ।
রাজা। প্রিয়ে ! সে সব আর কিছু মনে করেন, এক্ষণে
চল আমরা রাজ্যে গমন করি ।

শকুন্তলা নাটক। রাগিণী কালাংড়া। তাল কাওয়ালী । তবে আজ রাজধানী যাই চল চন্দ্রাননে। ওহে মনসুখে অবিলম্বে পুত্ৰ লয়ে শুভক্ষণে । অন্তরের ধন আমার প্রাণের প্রেয়সী, অন্তঃপুরে রবে হবে প্রধান মহিষী, মনটদুঃখ পরিহরি, সুখ- ভােগ কর সুন্দরী, এসো হে সুযাত্রা করি, রথ আরোহণে ।। পয়ার। শকুন্তলা প্রাপ্ত হয়ে দুষ্মন্ত নৃপতি। প্রিয়। সনে সদালাপে অতি হৃষ্টমতি 11 অস্ত হলো মনেদুঃখ সানন্দ উদয় । সম্প্রতি দম্পতী মনে কত ভাবােদয় ।। সস্ত্রীকে মনের সুখে লইয়া কুমারে । আনন্দে আসেন ভূপ আপন আগারে , রাজ্যবাসী প্রজাচয় সবে উল্লাসিত। সকলের মনেদুঃখ হলো তিরোহিত ।। প্রিয় সনে সিংহাসনে বসি অনুক্ষণ । শিষ্টের পালন করে দুষ্টের দমন ।। প্রজাচয় সুখে রয় রামরাজ্য প্রায়। অকালে কালের গ্রাসে কেহ নাহি যায় । নব নব অনুরাগে প্রিয়ার সহিত । বিহার করেন সুখে হইয়া মােহিত ।।

৬৬
শকুন্তলা নাটক।
এইরূপ কিছুকাল করিয়া হরণ ।
উপায় করেন পরকালের কারণ 11
যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া ভরতে
দাঁড়ালেন ভূপ তবে বাণপ্রস্থ পথে ।
দ্বিজ নন্দলাল রায়, তড়ায় নিবাস।
শিব দুর্গা পদ করে সদা অভিলাষ ।।
সম্পূর্ণ

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sokuntala Natok Ed.2

Author
Ray,nandalal
Title
Sokuntala Natok Ed.2
File name
Sokuntala Natok Ed.2
Text
OCR done
Citation
1876
Published
2009/09/12
Publisher
Nityalal Shil,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
66
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Sokuntala Natok
DLI number
513310
Barcode
4990010020300.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
ET6zhYgPs4V
Download PDF

Sokuntala Natok Ed.2