Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Dibyarag
Front matter
No text on this page.
কিব্যাগ 1 +
দিব্যৱাগ
শ্রীক্ষেত্রলাল সাহা
প্রাপ্তিস্থান
রঞ্জন পাবলিশিং হাউস
২৫২ মােহনবাগান রে
কলিকাতা
১৩৩৩
নালন্দা কলেজ, বিহার
হইতে
গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত
মূল্য এক টাকা
শনিরঞ্জন প্রেস,
২৫২ মােহনবাগান বাে, কলিকাতা হইতে
শ্রীপ্রবােধ নান কক মুদ্রিত
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
সূচী
১
৭
অনুরঞ্জিত নিয়ত নয়ন করে
মালা
মণিপুর
পূজা
প্রাণসই। মাের পীরিতের কথা
৮৯
১১১
অনুরঞ্জিত নিয়ত নয়ন করে,
রূপসুষমায় চারুতায় মন হরে।
শ্রবণে বহায় অমিয়-প্রশ্রবণ,
সুরঝঙ্কার বীণাবেণুনিকণ ।
স্বরমূচ্ছনা সুধাসুরম্য গীতি,
ললিত ছন্দ রাগতরঙ্গনীতি।
পেলবপুষ্পপরাগপূর্ণত
শােভন শয্যা সুরভিগন্ধযুত।
চামেলি মালিকা। বালিকা রঙ্গময়ী ।
নয়নেঙ্গন মােহনানঙ্গজয়ী।
শীত চন্দন। নন্দনফুলবাস।
প্রমােদমদ্য কুসুমের নির্যাস।
মধুর অম্ন কোমলভ্রাণভরা,
শীতল পানীয় নিদাঘতৃষ্ণাহরা।
ভালবাস এই, অতিশয় প্রতিমান
লভিতে এমনি পুলকলােলুপপ্রাণ।
আর ভালবাস কনক-কবিতা-কথা,
ভাব-ভালবাসা ভালবাস সৰ্ব্বথা।
ভালবাস ধন মণি মাণিক্য চুনি,
মঞ্জুষা ভরি মঙুল মনে গুণি
তুলিতে পারই। আর অই স্বর্ণকোষ
পাও যদি ঘরে-কি পরম পরিতােষ।
ভালবাস যশ, ভালবাস মহামান ;
গৌরব লাগি কি প্রীতি প্রবহমান।
ভাৰ্য্যাটি তব আৰ্য্যা প্রাণের প্রিয়া,
পরমালাদ তনয়তনয়া নিয়া।
ভালবাস তুমি চারু চিকণ দেহ।
স্বার্থ সদাই প্রিয়, নাহি সন্দেহ।
এই তব প্রেম! এই প্রীতি স্নেহরাশি।
এই তব সুখ! রাগ উল্লাস হাসি।
কিন্তু কি জ্বালা! যন্ত্রণা পরিতাপ !
কার মন্ত্রণা ষড়যন্ত্র এ-পাপ ?
ফুলদলগুলি কেবলি যে যায় ঝরি,
সুচারু রুটি শুকাইয়া যায় মরি।
পেলবপুষ্পপরাগশয়নে গাঁথি
. রেখে যায় কেবা কূটকণ্টকপাতি।
সুরঝঙ্কারে কেবা সে অসুর ঘাের
তােলে উত্তাল উৎকট কটু শাের।
ললিত ছন্দে বে-তাল মন্ত্র ভীম,
মরণডঙ্কা শঙ্কা অপরিসীম।
শীতচন্দন অঙ্গারজ্বালা হানে।
প্রমােদম বধ্যভূমিতে টানে।
পীযুষপানীয় হলাহল দেয় আনি,
কালভুজঙ্গ লাল ফুলমালাখানি।
প্রণয়-মন্ত্র কানে কানে কহি নারী
ডাকিনীতন্ত্রবিধানে অন্ত্রনাড়ী
ছিড়ি অন্তকযন্ত্রণা অন্তরে
সঞ্চারি পরিহরি যায় প্রান্তরে।
মণি মাণিক্য প্রবাল পান্না চুনি
সঞ্চিত দেখি অচিরে দস্যু খুনী
বক্ষ তােমার লক্ষ্য করিয়া ছুরি
সন্ধানি আগে প্রাণটি করিয়া চুরি,
পরে ধনরাশি অপহরি নিয়া যায়।
হেন সুধন্য ধনে কি আপদ হায় !
নিরমল যশ পচি যায় অপযশে;
মধুর কান্ত ভাসে বীভৎস রসে।
গৌরবভাতি রৌরবতমসায়
ডােবে। সৌরভে কি পৃতিগন্ধ ভায়।
ভাৰ্যা ব্যাধির বধূ হয়ে শয্যায়,
মরণের দূত লুকাইয়া মজ্জায়।
জ্যেষ্ঠ তনয় অতি লম্পট শঠ।
পশু পাষণ্ড-গতি বিপরীত হঠ।
কন্যা বিধবা প্রাণসমা। হানি প্রাণ
পাপকলঙ্কে লেপিতেছে কুলমান।
যদি জীবনের সব কামনাই পূরে,
আহা সবি ফেলি যেতে হয় যমপুরে।
কত দূরে কোন্ গহন অন্ধকারে,
জ্ঞান-বিজ্ঞান-কল্পনা-পরপারে !
বিজ্ঞানে জানি শতমুখদুখশেষে
গিয়া পুনরায় সংসারে মরি এসে।
ওরে ও অন্ধ ! ওরে হতভাগা! পাপ।
এই সংসার! এই চিরপরিমাপ।
শত অভিশাপ। অনুতাপ শত শত।
কেবলৈতৎ। এতদনুসঙ্গত।
সংসার এই। ইতিসরবসসার।
রজতরঙ্গগত তম পারাবার।
তমােমহামােহ ঘনমিশ্রঘােরে
চিরমজ্জিত রহিলি মত্ত ওরে!
অন্তরে ভাবি দেখ ভালবাসা প্রাণ,
পরম তত্ত্ব তাের। নহে অনুমান।
আত্মা যে তাের, সে ত শুধু অনুরাগ,
জ্ঞান-বিজ্ঞান রাগেরি ভাগের ভাগ।
সহজ বল কৰ্ম্ম নিরন্তর
রাগ-অনুগত। অনুরাগ-কিংকর।
এই রাগ দিয়া সেবিলি কেবলি তম,
কাল কল্মষ, ওরে রে অন্ধতম !
পূজিয়া মজিলি। ভজিলি ঘৃণ্য জড় ।
ছিন্ন ভিন্ন হইয়া ভুগিলি জ্বর।
চিদমুবন্ধী চিন্ময় অনুরাগ,
নির্বাণহীন জ্যোতি জ্বলন্ত আগ।
অমৃতমাধুরী মদিরা মধুর রস ;
হইয়া সতত তামসীবাসনাবশ,
সকলি বিষম ভস্মে আহুতি দিস।
লভিস দিবস যামিনী বাম্পবিষ ।
আছে অনুরাগ, আছে আস্পদ তার;
পরমামৃতরূপ সুষমার সার ;
অমিয়মূরতি সুরতিস্ফুরতিখানি
অমৃতপুলক দেয় যে মৃত্যু হানি।
অনুরাগ তারি। তারি অনুরঞ্জন।
তদনুরশ্মি তমােরজোভঞ্জন।
পরম পাত্র চিরানুরাগের তরে;
অমিয়ানুরাগ প্রতিদান থরে থরে
সঙ্গে সঙ্গে আসিবে জীবন ভরি,
নিখিল দুঃখ পাপ তাপ নিবে হরি।
যত অনুরাগ জাগে তাের অন্তরে
সপি দে না সবি উজ্জ্বল প্রেমভরে
দিব্য দয়িত দেবতার পদতলে।
কেন হাহাকার নৈরাশ পলে পলে।
সপি দে না! হােক এ রাগ অমৃতযােগ,
দূর হোেক দুখ সংসারদুরভােগ।
মালা
বেনেদের মেয়ে গৌভাবিনী নামটি মিঠ।
গৌরবরণা। করুণা ভাসিছে কোমল দিঠে।
হর্ষবিষাদসমতীত এক আভাস মুখে।
সংসার দেখে অসংশয়ে সে অকৌতুকে।
পুণ্য কি পাপ ভাবে না বােঝে না স্নিগ্ধ হিয়া।
মৃদুসুমধুর সুবােধবৃত্তি সুকমনীয়া।
অপরের শিশু বালক বালিকা তুলিয়া কোলে
সমাকুল হয় পরম পুলকে আপনা ভােলে।
প্রতিবাসিনীকে অসুখে সেবিয়া সুখিনী মনে।
দেখে না দ্বিরূপ অপরেরসনে আপন জনে।
বিধবা, আপন ভাতৃবধূর চরণতলে
থাকে চিরকাল জীবন তবুও অবাধে চলে।
কুঞ্চিত মূখে ঝঙ্কার দিয়া নিয়ত বন্ধু
উঠে যে, বিধবা ভাবে না গরল ভাবে না মধু।
.
দিব্যােগ
দাদা গুণধাম গৃহিণীর মুখ চাহিয়া থাকে।
চকোরের মত সুধাপান করি জীবন রাখে।
শিষ্যের মত তিনি যা বােঝন তাহাই বােঝে ।
বিধবা বােনটি বিদায় করিতে উপায় খোঁজে।
নাহি ত শ্বশুর। শাশুড়ীর নাহি জমা কি জমি।
একটি বালক চঞ্চলমতি বেড়ায় ভূমি।
সরিকের হাতে দোকান। তাহারি অংশমত
দয়া করি তারা বৎসরান্তে—সে আর কত ?
দেয় কিছু, তাই জীবনের এক আলম্বন,
নতুবা দারুণ সংসার তার গহন বন।
সেই সংসারে গৌৰভাবিনী যায় না কেন,
গৃহিণী তুলিছে বারবার করি প্রশ্ন হেন!
গঙ্গাগৌর ছাড়ি দূরে যেতে চায় না প্রাণ।
তাই ত বিধবা মানে না দুঃখ মানাপমান।
মাথা গুজি থাকে ভাইয়ের ভাঙা এ ছাতের তলে।
দুঃখ সুখের ঢেউ তুলে নাক, জীবন চলে।
অতি ভােরে উঠি মহাপ্রভুর আঙ্গিনায়
হরষদে অনাগণ সঙ্গে যায়।
মঙ্গলারতি দেখি জীবনের অমঙ্গল
মাদা
দূর হয়ে হয় মধুরায়মান হৃদয়তল।
আলােকে পুলকে উছলিয়া উঠে, নয়ন ভরি
গৌররূপের সুধামধুরিমা ধেয়ান করি।
যাগ যােগ ব্ৰত ধর্মের ধাধা নেইক মনে,
নেই তার জানা ভাবােদ্দীপনা ক্ষণে ক্ষণে।
জানে সে নদীয়া নদীয়াবিনােদ গৌরহরি,
নিতাই সঙ্গে প্রেমসুধারস পড়িছে ঝরি।
জানে সে নদীয়া ভক্তি-নদীর মত্ত ধারা ;
কূল নাহি। ডুবি প্রেমে নর নারী আত্মহারা।
জানে নদীয়ার পবনপরশ পুণ্যভরা।
জীবনের যত পাপপক্লেশশূন্যকরা।
শিখেছে কৃষ্ণপ্রেমসেবা শুধু বাঞ্ছনীয়।
যাহাতে ধন্য হইবে জীবন লাঞ্ছনীয়।
গৌরকৃষ্ণপ্রেমের মূরতি শিখেছে নারী।
শ্রীরাধাভাবের অমৃতমাধুরী, সুমনােহারী।
শিখেছে নারীর কৃষ্ণ ব্যতীত কাম্য নাই।
গৌরভাবিনী হৃদয়ে কৃষ্ণকামিনী তাই!
শিখেছে রমণী রমণীয়তম কৃষ্ণ নাম।
পরমােৎসব সঞ্চারে প্রাণে মনােহভিরাম।
ভ্রাতৃবধূর ভুরুবিভীষিকাভীতা সে বালা।
দিব্যােগ
হাতে তুলি কভু নেয় না শ্রীহরিনামের মালা।
সমুখভঙ্গী কহিবে যে বধূকেষ্টপিয়া !
তেষ্টা মিটাবে কাষ্ঠের মাল টপকাইয়া।
যায় না কেন যে সকাল সন্ধ্যা রাধাথামে।
কেন খায় বসি সংসারে সুখে ভাইয়ের ক্ষ্যামে
ইত্যাদি কথা কত দিন বউ আভাস দিয়া
বলেও ফেলেছে—ভাবি গৌরীর ত্রাসিত হিয়া।
নদীয়ার ভাব-আবহাওয়া মাঝে থাকিয়া সব
শিখেছে গৌরী পাইয়াছে প্রাণে সমনুভব।
শেখে সকলেই। প্রাণে থাকে পাপসংস্কার,
নানা অভিমান বাসনা হিংসা কলহ আর।
তাই অনুভব, অনুভাব কোনাে উঠে না ফুটি।
সব অনুপম অমিয়শিক্ষা যায় সে টুটি।
গৌরীর প্রাণ অমিয়কুন্দফুলের মত।
হয় নি হিংসাসুখকামনায় কলুষাহত।
তাই সাধুমুখে সুধাসুকুমার শাস্ত্রকথা।
যা শশানে তাহাই হয় যে অন্তরঙ্গগতা।
সদা সাধ হয় গৌরীর মনে কৃষ্ণসেবা।
করুণা করিয়া করিবে তাহার উপায় কেবা?
মালা
১১
ভজন কি যে তা জানে না রমণী, কেবল জানে
ফুলচন্দন তুলসীর দল প্রীতির প্রাণে।
অবিরত বালা কুসুম চয়ন করিতে থাকে।
মনে মনে ধূপ দীপ চন্দন সাজিয়ে রাখে।
নবমঞ্জরী দল তুলসীর যতনে তুলে।
পবন পরশে সরসীর মত হৃদয় দুলে।
মনে মনে দুটি আলাে চাল আনি অন্ন রাধে,
পালঙের শাক পটলের রসগােপনে কাঁদে।
এই কি মদনমােহনের ভােগ ?—অবােধ নারী
মনে মনে তুই দেখ না সকল সুখােপচারই
সাজানাে কক্ষে কক্ষে যে তাের-নবনী ছানা
ক্ষীর দধি দুধ মধু সন্দেশভােজ্য নানা।
রূপার রেকাবে সােনার থালায় সাজিয়ে আন।
প্রবালের বাটা ওপ্যাল-গেলাস চমকবান্।
থরে থরে সব পরিপাটি করি তুলসী দিয়া
কর নিবেদন প্রাণের বঁধুরে হৃষ্টহিয়া।
কল্পনাকলা গৌরভাবিনী জানে না মনে।
সকল ভাবনা বাঁধা আছে তার সত্য সনে।
তাই তার মনে শাক পাতা আলু পটল ওল,
ঝিঙে থােড় ডাঁটা, দইটুকু নহে সজল ঘােল ।
১২
দ্যিােগ
তবু নিতি নিতি পীরিতির রীতি রায় তার।
কুমড়া-পাতার বসা এতটুকু-কান্না আর ।
সন্ধ্যাবেলায় সঙ্গোপনে সে শষ্যা পাতে।
আসে যদি কভু হৃদয়দেবতা গভীর রাতে।
বাটনা-বাটা ও এঁটো ঝুটা ঘাটা বাসন মাজা,
গৌরীর হাতে দিয়ে বউদি সে থাকেন তাজা।
অন্য হাতের রান্না তাহার লাগে না ভাল।
তাই প্রায়ই তিনি রান্নাঘরটি করেন আলাে ।
যে কাজেই থাক গৌরী নিয়ত নয়ন রাখে
শ্যামরূপে স্যামরূপসুধাপানে মগ্ন থাকে।
দরশন করি নিতাই গৌর গােবিন্দজী
ফিরে আসি যৰে গৌরী আঙন-কোণায় নােজই
বাসনের গাদা লয়ে বসে যায় মাজিতে বালা
দেখে সে কেবল কৃষ্ণরূপের আলােকমালা।
যা করে তাহাই আলােকপাতে সে উজল হয়।
সবি সুন্দর দেহ মন যবে পুলকময়।
গঙ্গার ঘাটে যায় আসে নিতি। যমুনাজলে
ব্রজবালা নানা ছলে যায় তারি স্বপ্ন চলে।
মালা
বৈশাখ মাস। অতি ভােরে উঠি গোরী একা
স্নানে চলিয়াছে। পূরব গগনে ধূসর রেখা।
বড়ালের ঘাট। বালুচর পথ বিজন এবে।
গৌরভাবিনী ধীরে ধীরে চলে গৌর ভেবে।
ঘাটে ঘড়া রাখি জলে নামি ডুব দিয়াই যেই
উঠিয়াছে কিবা জঞ্জাল শিরে বাজিল এই!
আনমনে দূরে ফেলে দেবে—দেখে জপের মালা !
সুরধুনী জলে ! কার হরিনাম অমিয়ঢালা।
দেবী ভাগীরথী মাের মাথে কেন তুলিয়া দিল ?
কেমনে পুণ্যস্রোতে ভেসে এল কোথায় ছিল ?
তরী ডুবে গেছে হয়ত কোথাও। আমার হাতে
যা হােক পড়িল আসিয়া যখন অকস্মাৎ এ
মানিব তখন প্রভুর প্রেরণা-করুণা-রসে !
মাের শিরে মালা আসিয়া উঠিল দৈববশে,
নিশ্চয় নয়। গৌরহরির কি জানি খেলা ।
আমার সঙ্গে গঙ্গাসলিলে সকালবেলা।
মালাটি তুলিয়া সাবধানে অতি আঁচলে বাঁধি
গৌরী চলিল গৃহপানে অবগাহন সাধি।
মনে হয় যেন সুখঝিরিঝিরি হিয়ার মাঝে।
নাকি ঝিলিমিলি মনের আকাশে আলােক রাজে।
১৪ দিব্যােগ ঘড়া-ভরা জল হালকা যেন সে! চরণ দুটি আপনি আপনি চলে যেন দ্রুত নাচিয়া উঠি। ওরা সব জপে সুধাসম নাম জপি না আমি, তাই জপমালা হাতে তুলি আজ দিল কি স্বামী? বউ যদি দেখে উচ্ছলি উঠি কলস্বরে কত অকথ্য কহিবে কতই ঘৃণার ভরে। তাও কিছু নয়। নানা ছল চালে আভাস দিবে কোনাে বাবাজীর কৃপা ইত্যাদি আন্দোলিবে। গ্রীষ্মের দিন উজলি উঠিল। জীবন- চলিল জীবের ধূলায় ভরিয়া ধূলির পথ ! গৌরভাবিনী দেখিল কি উড়ে সােণার রেণু ! শুনিল কি কানে কলনিকণ কোমল বেণু। গৌরমুখের হাসি ভাসে একি সকল দিকে। শ্রীরাধারাণীর মাধুরী-কিরণ—কি ঝিকমিক ! বনচারিবন উপবন ফুলবিভবভরা, গতাগতি করে বালিকারা কারা সুমনােহরা ! আলােকের ছায়া বার বার করি নয়নে ভাসে, নাসিকায় যেন মদিরমণ গন্ধ আসে। হিয়া মাঝে যেন কলমধুকরগুঞ্জরণ।
মালা
১৫
অভিরাম নাম। হরে রাম হরে রঞ্জি মন।
সুরের যন্ত্র অন্তরে মাের বাজিছে কি এ।
কৃষ্ণগুণের অনুখন অনুরণন দিয়ে।
কার হরিনাম সিদ্ধির মালা লভিনু আজ ।
দুখিনীর পানে করুণ নয়নে হৃদয়রাজ
চাহিল কি আহা! এত সুমধুর! বুঝি না কি যে !
একি পাওয়া যায় সকল জীবন খুঁজিয়া নিজে।
চঞ্চল বায়ু ঝঙ্কার তালে দুপুরবেলা
নবপল্লববল্লীবিতানে করিছে খেলা।
ফুল্লবকুলশাখা দুলাইয়া বর্ষি ফুল
হিল্লোলি যায় পুনঃপুন সে হর্ষাকুল।
শত শত অলি ঝিল্লীর সনে মিলায় সুর
উল্লাসে স্বরমুখরিত করি সমীপ দূর।
অতি মৃদু মৃদু দূরনিক্কণ সমনুকার,
যেন মনে হয়! কলগুঞ্জনবিলাস কার ?
গৌরভাবিনী অভিভূতপ্রাণা। অন্ন মুখে
কচিল না আজ কিবা বিচিত্র বিমল সুখে।
সন্ধ্যাবেলার দর্শন সারি আসিয়া গেহে
বসি মনে হ’ল গৌরী যেন এ নাহিক দেহে।
দিব্যাগ
সখী শ্যামদাসী। তাহাদের অই পাশের বাড়ী।
ধীরে ধীরে গিয়া বসিল গৌরী নিকটে তারি।
কি কহিল নিজে শুনিল কানে কি নাহিক দিশা।
কহিল, চলিল। ঝাঁঝ করে মাখা। ঘনায় নিশা
গৃহে পশিতেই বৌঠাকুরাণী কি কলকলি
তুলি কহে—যান রসদরবারে কি রসকলি ?
দিনরাত নাই। বাড়ী ফিরে আর আসাই কেন ?
গৌরীকে ঘিরি চলিল খানিক-অমেক হেন।
ঘরে হারমনিসুর চলিতেছে, বাহিরে টিন
পিটিছে বালক অবিরত জ্ঞানকাণ্ডহীন,
গৌরভাবিনী ভাবিল এমনি। শুনিল কানে
কিবা কোলাহল। পশিল না প্রাণে কিছুই মানে।
ভাই-পুত দুটি উৎপাত নানা অনেকক্ষণ
করিল তাহাতে ভাঙিল না সুরসুনিষ্কণ ।
অবশেষে যবে সুপ্তিমগন আলয়খানি
গৌরী বসিল আঙিনায় আমি স্বস্তি মানি।
অতি
সুমধুর
সমীর বহিছে। হাহানা
কত ফুটিয়াছে, বাগানে বাগানে কুসুম নানা।
আঁধার রজনী। গৌরীর প্রাণে পূর্ণিমা কি ?
মালা
১৭
জ্যোৎস্নজ্যোতির জাল বিরচিল? কি মায়া তা কি
বুঝিল রমণী ? ভাবিল জপের মালার বশে
উজলি উঠিল জীবন আজিকে অমিয়রসে।
পুটুলি হইতে খুলিয়া আনিয়া দেবের দান
মালাখানি বালা হৃদয়ে লইল পুলকপ্রাণ।
ভাবিল সুযােগ জপ করিবার। নয়নশর
বউদির এবে করিবে না আমা সুজরজর।
কবে গুরুদেব দিয়াছেন নাম। অনভ্যাসে
ভােলে নাই তবু। আজিকে যুবতী অনন্যা সে
জপিতে লাগিল তারকাখচিত গগনতলে।
করতলে মালা খরতালে যেন চপল চলে।
প্রাণবতী মালা, জ্ঞানবতী বুঝি, প্রণয়বতী।
আমারি প্রাণের সঙ্গিনী শুভা সুরভি সতী
জপিতে লাগিল গৌরভাবিনী রসনা সনে।
বসনা ছাড়িয়া মনে পশে নাম আপন মনে।
মন ছাড়ি কোন গহনকাননে হৃদয়মাঝে
ডুবি, রসনায় আসি পুনরায় সুরে সে বাজে।
রসনার ধ্বনি? নাকি জপমালা মুখরা অতি ?
মাের স্বর সনে সুর দিয়া চলে সরস গতি।
দারুময়ী মালা। অঙ্গুলি পরের কিবা !
দিব্যােগ
চলে সুকোমল ! বেলমল্লিকাকোরকনিভা ।
সুকোমলতর ক্রমে যেন আরো রসের দানা
কি সুখপরশে চলে ঝরঝরি ! বিকলপ্রাণ
হইল কি বালা !
মৃদুচ্চাৰিত নামের পাতি-
স্বর নহে যেন রশ্মিলহরী চলে ঝলসিয়া মালিকা গাঁথি।
কিরণের রেখা যেন নানা রঙে রঞ্জিত তা।
জ্বলে মিল, মিল, মিলিয়া মিলিয়া কি সঙ্গত।
সুরে রঙে মিল! মিলিতেছে তায় মনের ঝ।
মনই যেন মালা রসকুসুমের কি মনােহরা।
মন সনে প্রাণ যােগ দেয় আহা লহরী তুলি।
যেন নয়নের গােচর সে বীচিরঙ্গগুলি ।
শােণিতের লাল তরঙ্গিণীও ধমনীধারা
ধরি অই তালে তাল দিয়া চলে! পাগলপারা
গৌরী কি আজ ! কোন রহসিয়া মালার ছল এ।
নামরসে তার দেহ মন প্রাণ সকলি গলে।
জাগিয়াও ছিল স্বপনমগন। ঘুমিয়ে শেষে
গেল চলি বালা কোন অপরূপ স্বপনদেশে !
দেখিল অতি সে উজল অচল চমৎকার !
উপত্যকার শ্যামশােভা নহে বর্ণনার।
মালা
১১
ঝরণা ঝরিছে। ইন্দ্রধনুর উত্তরীয়।
দূরে দেখা যায় সুখিশিখণ্ডিনৃত্য কি ও ?
নবনীলমেঘ মিলিছে আকাশে স্বচ্ছ অতি ।
কচিৎ কনকবিজলী জ্বলিছে চপলগতি।
গৌরভাবিনী ভাবসৌরভগৌরবিণী ।
পুষ্পকাননে একাকিনী সুখসঞ্চরিণী,
করে প্রতীক্ষা । কে আসিবে যেন প্রীতির খনি।
সমুৎসুক সে সমূৎসবা যে অতীব ধনি।
বনরুটির আড়াল হইতে এল কে আহা।
একি রূপ বেশ ! স্বপনেও কভু ভাবেনি যাহা।
তাদেরি গৃহের সমুখে গৃহটি দ্বিতল চারু।
নানা কারুকাজখচিত করিয়া গড়েছে কারু ।
তােরণে ময়ুর পুচ্ছ মেলিয়া নৃত্য ছাদে।
নববসন্তে বাঁধা থাকে লা-ফুলের ফাদে।
বঙ্কুবাবুর বড় ছেলেটি যে কুমারব্রতী
কুমারের মত তনুখানি তার সুঠাম অতি ।
পূজা অর্চনা জপাদি ভক্তিসাধন রত।
স্নিগ্ধ মধুর স্বভাব সুচাৰু বিনয়নত।
কাটোয়া নিবাস। থাকে নদীয়ায়। নদীয়া ছাড়ি
বছর খানেক হ’ল চলে গেছে আপন বাড়ী।
২
দিব্যােগ
নদীয়া-নিলয়ে আর সকলেই বসত করে।
কেহ কদাচিৎ যায় কাটোয়ায় বছর পরে।
৭
.
সেই হৃষীকেশ গুহ ! একি বেশ ! একি ভাবখানি সুমনােরম!
চারুবাসন্তীবাসসুশােভিত সুদিব্য ছবি কি দেবােপম !
গৌরীর পানে অমিয়মধুর দৃষ্টি দান
করি কহে তুমি—প্রিয়তমা মাের প্রাণের প্রাণ।
কহি অতিশয় সঙ্কুচিত সে ত্বরিতগতি।
সরিতে সরিতে পিছনের পানে আকুলমতি।
কি আশ্চর্য্য! দেখি, হৃষীকেশ নহে সে আর ।
যুবতী রমণী ! অঙ্গে নবীন রূপের ভার ।
ঠিক যেন মাের প্রতিচ্ছবিটি মুকুরপটে।
আমি অভিভূতা। কার মায়াবশে এমন ঘটে।
স্বপন ভাঙিল । স্বপনের রেশ নয়ন ভরি।
কি দেখিনু ! এর মর্ম বুঝিব কেমন করি।
জীবনে কখনাে হৃষীকেশ অই আমার সনে,
ভ্রমেও কহেনি কথাটি, চাহেনি নয়নকোণে।
শুনেছি অসুখ। সকলেই গেছে কাটোয়া চলি।
অকারণে কেন প্রাণ উঠে মম সমুচ্ছলি ?
৭
মালা
২১
P
সুখে দুখে নহে। শত আকুলতা হৃদয়মাঝে ;
কত সুরম্য' সুর-ঝঙ্কার ছন্দে বাজে।
দীর্ঘ দিবস গত হয়ে গেল স্বপন দেখি।
সবি স্বপনের স্বপ্নভাবনা সত্য সে কি ?
আজি সন্ধ্যায় গােবিন্দজীর অঙ্গনে সে
রসলীলাগান। গৌরীর কাণে কথাটি এসে
পঁহুছিল। বাল সমুদ্বিগ্না শুনিতে গান।
বউদির কথা ভাবি তার ভয়বিভল প্রাণ।
আজি দেবতা কি সুপ্রসন্ন। সুখানুমতি
লভিল গৌরী। বধূর চরণে ঋণী সে অতি।
সাগ্রহে অতি রমণী সভাৰু সমুখে গিয়া
বসিল গৌরী। অবিরত প্রাণ তরঙ্গিয়া
উঠিতে লালিল। কোকিলকণ্ঠ গণেশ দাস
গৌরচন্দ্র-রাগিণী তুলিল অমিয়ভাস।
রূপানুরাগের বসতরঙ্গ চলিল বয়ে,
গৌরীর হিয়া উঠিল উতল উছল হয়ে।
যে লীলামাধুরী খুলিল গায়ক তাহারি মাঝে
ডুবিল গৌরী—এ কথা কহিবে কেমনে আজ এ।
শ্ৰীমতীর চারুরূপের স্বপন আবরি সব
গত রজনীর স্বপ্নাভিনয় সমূৎসব
২২
দিব্যােগ
দেখিতে লাগিল গৌরভাবিনী মুগ্ধা নারী।
তারি ভাবার্থ ভাবিতে লাগিল ভাবনা তারি।
এ রূপে এ রসে সে রূপ সে রস পরস্পর
মিলিল মিশিল খুলি নানা রং নিরন্তর।
মিলিয়া মিশিয়া আজিকে-“ছি ছি ! সে কৃষ্ণ নয়।
আসীন রহিল অই হৃষীকেশ উজ্জ্বল সুখস্বপ্নময় ।
সাড়ে দশ বাজে। গণেশ গায়ক স্বপ্নদেশে
রাধামাধবের মিলন করিল সমাপি শেষে।
বহু সঙ্গিনী। কলকোলাহলরঙ্গে তারা
আপন আপন গৃহপানে চলে আপনহারা।
গৌরভাবিনী কাহারাে সঙ্গ চাহে না চিতে।
একাকিনী গিয়া দাড়াল ক্ষণেক সুনিভৃতে।
অচিরাৎ হল মন্দিরখানি নীরব অতি।
পথে এল চলি গৌরভাবিনী ভাবনাবতী।
দক্ষিণ মুখে ভাবাবেশে বালা চলিল ভাসি।
তপ্ত ললাট পরশিল শীত সমীর আসি।
বিহ্বলমতি চলিতে চলিতে ভুলিল বালা
বায়ে ঘুরে যেতে। মিটমিটে-মৃদু-আলােক-জ্বালা
বড়াল ঘাটের দিকের গলিটা রহিল পড়ি
মালা
4
গৌরী চলিল ক্রমাগত মনােরথে কি চড়ি?
যে গলি ধরিয়া ঘুরিল ষে বাঁয়ে বৃহৎ গলি।
বাসাঙ্গনপথপানে সােজা গিয়াছে চলি।
সমাজবাড়ীর সমীপে আসিয়া ক্ষণেক নারী
দাড়াল শুনিয়া সঙ্গীত চিতচমৎকারী।
ললিতাসখী অভিসার গাহে অমৃতসুরে।
অপরাস্বর জিনিয়া রাগিণী নিকটে দূরে।
গৌরীর প্রাণে সুস্বরশর বিধিল আসি
উচ্ছল প্রাণ উজ্জ্বল রসে সমুদ্ভাসি।
রাত হয়ে গেছে। শুনিতে সময় নাহিক আর।
কাণে তবু বাজে মঙ্গলসুরে কি ঝঙ্কার।
বাসাঙ্গন বাঁয়ে রাখি এল, দখিণে এৰে
সমাজবাড়ীর বাগান-তােরণ-রুধিয়া দেবে
এখনি ফটক। পুরুষ কে এক বিমলবেশে
আবছায়া পথে সত্বরত দাড়াল এসে।
গৌরভাবিনী আগে একাকিনী। ফিরিবে বামে।
গৌরি ! দাড়াও ! মৃদু আহ্বান। কি অভিরাম এ!
ডাকিল পুরুষ। চমকি পুলকে গৌরী ফিরে
দেখিল পুরুষ পশ্চাতে তার আসিছে ধীরে।
বিচলিত কিছু। সুধাইল কে গা? শুনিল বালা,
২৪
দিব্যােগ
৫
আমি হৃষীকেশ ! সৰ্বশরীরে বিজলীজ্বালা
ছুটিল। গৌরী বিচঞ্চলিত। কহিল তবু,
কখন এলেন ? কাটোয়া হইতে? গৌরী কভু ।
কহে নাই কথা যুবকের সনে জীবনে তার।
এই আসিলাম। চল যাই। হেথা দেরী কি আর ?
?
কহি হৃষীকেশ আগে ধীরে ধীরে চলিল তবে ।
গৌরী পিছনে অনুসরি চলে অসম্ভব এ!
শুধু হিয়া নহে। সকল অঙ্গ পুলকে ভয়ে
কাপে গৌরীর। কি মধুর মায়া ! কি বিস্ময় এ!
কহিল রমণী, শুনেছি অসুখ। গিয়াছে সারি, ,
কহিয়া যুবক চলিল তেমনি !—দেখিল নারী-
নয়ন তাহার ভ্রান্ত আজিকে। দেখিল যেন
পরশি ভূমি চলে সে আবেশে কিসের কেন ?
নিজেরও চরণ মনে হ’ল তার পড়ে না ভূয়ে
কদাচিৎ। পুন চলিতেছে যেন ভূতল চুয়ে।
হৃষীকেশ অতি রূপবান। রূপ আজিকে তার
এত উজ্জল ! নহে উপমেয় জোৎস্না আর।
আধিয়ার পথ আধআলােকিত অব্দে এযে !
সাধু চরিত। তাই জ্বলিতেছে এমন তেজে।
মালা
২৫
+
+
কহিল যুবক, পথে একাকিনী সুনিরজনে
পাইব তােমায় কখনও তাহা ভাবি নি মনে।
গৌরি, তােমায় চিরদিন আমি আকুল চোখে
দেখেছি। কখনাে তুমি দেখ নাই চাহিয়া ও কে!
যুবকের কথা সেতারের মত রণনম্বরে
স্পন্দিয়া যেন বেগে আসি প্রাণে প্রবেশ করে।
গ্রামােফোনে যেন অভিনেতা কোনাে, কহিছে কথা।
তেমনি যুবার বচনভঙ্গী অদূরাগতা।
কহিল সে, আমি দীর্ঘ প্রহর দিবস মাস,
বর্ষ বর্ষ সন্ধ্যাপ্রভাতে দীর্ঘশ্বাস
সহায় করিয়া ছাতে কভু কভু তােরণতলে
বসেছি উঠেছি চঞ্চল প্রাণে কতই ছলে-
কি হেতু গৌরি, জান কি ? দেখ নি ভাব নি কভু।
তােমারি কারণে। জানেন গােপন প্রাণের প্রভু।
নিখিল নারীর রূপমধুরিমা তােমারি মুখে
দেখেছি প্রকাশ লভিতে গৌরি !-কি সুখে দুখে
দেবতা জানেন। কখনাে গােরী এদিক পানে
আসিবে চলিবে এই পথ দিয়া-উছল প্রাণে
তাই প্রতীক্ষা করিতাম বসি যামিনী দিব।
তােমারি সুচারু চরণচঞ্চলনের বিভা।
.
২৬
দিব্যােগ
বিশ্বরমণীপ্রাণের করুণা নয়নে তব
নয়নগােচর হইত আমার নিত্য নব ।
গৌরীর কানে বীণাতানসম প্রণয়বাণী।
কি মােহিনী মায়া মধুর মঞ্জু আঘাত হানি
হৃদয়ে ধীরে কি সঞ্চারি দিল হৃদয় আন,
জীবনে জানে না গৌরী কখনাে--অমৃতপ্রাণ।
বড়াল ঘাটের ছােট গলিটিতে আলয় দুটি
ভুলি উভয়েই ভাবপরভাবে এসেছে উঠি
বড় রাস্তায়। বুঝি হৃষীকেশ কহিল তবে,
চল না গৌরি ঘাটে গিয়া বসি—নিরালা হবে।
দুটি কথা আর। গৌরী ভাবিল জীবন ভরি
শুনিবে সঞ্জীবিয়া খনে খনে অমৃতে মরি।
শানবাঁধা ঘাটে গঙ্গাসমুখে দুজনে আসি
বসিল—আঁধারে উঠিছে কি যেন জ্যোৎস্না ভাসি।
গুরু-উপদেশে, কহে হৃষীকেশ, নিয়ত ধ্যান
করিতাম নিজ গােপন-প্রকৃতি। দিব্যজ্ঞান
লভিনু একদা—গৌরভাবিনী প্রতিমা তার।
প্রতিবিম্বিত পুণ্য ছবিটি সুষমাসার।
অরণ মনন পূজা অর্চনা হরির করি,
মালা
২৭
প্রাণগৌরীর নিরুপমৰূপমাধুরী ধরি।
গৌরীর ভাববেশ পরি ব্রজবনের বীথি
প্রীতিগুঞ্জনগীতি গাহি পরিক্রমণ নিতি
করি পরিহরি কারাগার সম ব্যর্থ দেহ।
মনে মনে সংগােপনে, কখনাে জানে না কেহ।
নিজ কর পদ আনন নয়ন বক্ষখানি
স্বীকার করি না অনুক্ষণি সে আরােপি আনি
মাের গৌরীর অমৃত অঙ্গ মঞ্জরিত।
এই রূপে ভাবে অন্তর মম সঞ্চরিত।
শেষে গৌরীর রূপকামনার শিখার জ্যোতি
উজলিল মাের সকল ভবন সকল গতি।
ক্ৰমে গৌরীর রূপরশ্মিটি ক্ষণেকতরে-
এমনি হইনা দেখি অসহ বেদনা ভরে
বিকলিত প্রাণ। ব্ৰজাভাবনা হত না মাের।
শেষে কি অভাগা ভুলিব কৃষ্ণ বাসনাভাের ।
গৌরীর ভাব এ পরমার্থ ছাড়িয়া যদি
প্রাকৃত বিভাবে পশে-অনুতাপ জীবনাবধি
দহিবে আমায়। অচিরাৎ আমি নবদ্বীপ
ত্যজি। নিভানু নয়নের এই প্রণয়দীপ
উজলতর জ্বালাইতে প্রাণে। কাটোয়াবাসী
২৮
দিব্যােগ
হইনু, ভাবি। ভাবনা কিন্তু চলিল ভাসি।
কারণ কাটোয়া কাটিতে লাগিল মনের ছুরি ।
নূতন নগর রচিল হৃদয় নদীয়ার নিধি করিয়া চুরি।
নদীয়ানাগরী গৌরভাবিনী বিরাজমানা,
হইলা নগরে আমারি গােপনপ্রণয়প্রাণা।
আমি নিরাপদে পরমপ্রমােদে রহিনু সেথা ;
বাহিরের রূপ, মােহিনী লালসা, অনভিপ্রেতা ;
রহিল না আর। চিন্তায়ালােকে আসিল সব।
সবি সুধাভাব। সবি নিৰ্ম্মল সমনুভব।
।
হৃদয়কুনিবাসী দেবতা শ্যামসুন্দর মাের।
ভাবি গৌরভাবিনীকে পেয়ে পরমানন্দভাের ।
কখনাে আমিই গৌরভাবিনী। কখনাে ভগিনী দুটি।
রসসরােবরে যুগলসরােজ আমরা উঠিমু ফুটি।
দুপুরের রােদ। বহ্নিবরষা। নাহিক বােধ।
নগরের পথে চলি ভাবাবেশে নাহিক রােধ।
সুগহনঘনঘটা নভতলে। বর্ষাজল
দেশ বিপ্লাবি পড়িছে ঝরিয়া অনর্গল।
আমি উল্লাসে সমুৎফুল্ল ভ্রমণ করি
স্রোতপ্রবাহিত কাননের দূরত্ম ধরি।
মালা
২৯
ভাবি চলিয়াছি বাদরাভিসারে গৌরী সাথে।
কাতরক্লান্ত নহি ঘনঘাের বর্ষাপাতে।
জ্যোৎস্নারজনী। নবীন ধান্য ধানের ক্ষেতে।
দুলে মৃদু মৃদু। আল পথে পথে হর্ষে মেতে
চলিতেছি ঘুরি ফিরি পুনঃপুন—কেবলি চলি।
শ্যামভাবনার সুখসমাকুল আলােকে অলি।
আকাশে তারকা কোথা হতে কোথা ডুবিল গিয়া।
প্রহর কত যে অতীত খবর রাখে না হিয়া।
শেষে দয়েলের কলকুজনের কোমল রব
প্রভাতের কথা কহে, ভাঙে সুখস্বপন সব।
শরীরে সহে কি? অবশেষে আসি শয্যা 'পরে
শয়ন করিনু প্রপীড়িত অতি প্রবল জ্বরে।
সাত দিন গেল। ছুটি নিল নাকে দারুণ রােগ।
সুখ দুখ ব্যথা কে জানে গৌরি দেহের ভােগ ?
দিবানিশি জপমালা ছাড়ি নাকো। কারণ যত
শােভা সৌরভ জীবনে সকলি জপানুগত।
যত আনন্দভাবসমাহে রসােচ্ছল।
যত রূপরাগ সকলি মালাটি—সকল বল ।
সকলাশয়। তাই ছাড়ি নাকো। একদা মনে
পড়িল নদীয়া। গৌরভাবিনী গৃহের কোণে।
দিব্যােগ
f
প্রাণ দিমু 'আর কোনাে দিনও কিছু দিলাম না যে।
কি দিব ? স্বর্ণমণি অগণিত দুনিয়া মাঝে।
স্বর্ণগৌরবণা গৌরী। যােগ্য তার
সংসারে আমি পাই না খুঁজিয়া কিছুই আর।
মণি কহির জিনি মহার্ঘ জপের মালা।
এই যে আমার। অমৃতানন্দকিরণজ্বালা।
গৌরীর করে সমপিয়া দিয়া এ জপ শেষ
করি যাইতাম। কোথা বিদ্যুৎ-জ্যোতির দেশ।
দাসী গিরিবালা। কৃষ্ণপ্রেমবতী। ডাকিয়া আনি
কহিলাম, দেখ গিরিবালা দিদি, মালিকাখানি
এই যে জপের—দারু নহে ইহা, মনের মণি।
ভাবের পুষ্প-উপহার মাের। ছিলাম ধনী
এই মহাধনে। আজি প্ৰদানিব। হৃদয়মাঝে
যাহার প্রীতির প্রতিমাপ্রতিভা নিয়ত রাজে,
তাহাকে—তাকেই উদ্দেশ করি। এই নে হাতে।
গঙ্গার ঘাটে। যাবি না কিন্তু কাহারাে সাথে
একাকিনী যেয়ে সাতারি মধ্যনদীর নীরে
ভাসাইয়া দিবি পরাণ-পুষ্পমাল্যটিরে।
কামচারিণী এ মালাখানি মাের। করিনু দান
যাহারে এ হার নিশ্চয় তারি সন্নিধান
মালা
ও
।
পঁহুছিবে গিয়া। কহিবে কাহিনী প্রাণের মাের।
আজি সন্ধ্যায়। ভুলিস না যেন। না হ’তে ভাের
ষ্টেশনে যাইব। ব্রজের টিকিট পেয়েছি দিদি।
বড় আশা দেখি মদনমােহন হৃদয়নিধি।
গিরির নয়ন হইতে ঝরিল করুণাবারি।
তারপরে কি কি জানে গােবিন্দ কহিতে নারি।
গৌরি, রজনী গভীর এখন। যা তুই ত্বরা।
বউদির বাণী জানি তরবারি প্রখরতরা।
গােরী চমকি স্বপন হইতে উঠিল যেন।
নাহি ব্যবহারজীবনের যেন বিজ্ঞান ও।
কহিল, যাব না ঘরে ফিরি আমি। তুমিও আর
যেও না। দুজনে চল যাই দুখ-নদীর পার ।
দেখাইলে তুমি ব্ৰজবৈভব এ দুখিনীরে।
জ্যোতি পরিহরি অন্ধকূপে সে কে যাবে ফিরে !
দেখি হাতখানি তােমার অমিয়পরশ লভি।
না—এ চিত্ত ও চরণরেণুকণিকালােভী।
পরশি ধন্য হই আগে আমি। কহিয়া পাণি
বাড়াইয়া বামা পরশিতে গেল চরণখানি।
স্পর্শ নহিল। কি আশ্চর্য ! সরিয়া দূরে
দিব্যােগ
৩২
.
দ্রুত হৃষীকেশ কহিল আমি এ নদীয়াপুরে
নাহি আর। বায়ুমণ্ডলিত এ ধরণীতলে।
অতীতের ছায়া ! কৃষ্ণানুরাগ হৃদয়ে জ্বলে
তােমারি গৌরিতারি দুরন্ত আকর্ষণে
গােরীর দেহ ঘনরােমাঞ্চে পূরিল ক্ষণে।
পদতল হতে সরিল ধরণী । আকাশে তারা
ছুটিতে লাগিল কি বেগে গৌরী আত্মহারা।
শ্রোতােবলে শর-তৃণটির মত কঁপিছে ঘন।
বাজিছে শ্রবণে কিসের বাদ্য, অনুক্ষণ ও !
হৃষীকেশ পিছু সরে যেতে যেতে সুমনােরমা
রমণীয় রূপে স্ফুরিয়া উঠিল কি নিরুপমা !
যেন অবিকল গৌরভাবিনী জ্যোতির্ময়ী।
প্রকাশিল দেহবন্ধবিনিম্মুক্তা হই।
শ্যামশাড়িখানি সােনার সূতার ফুলের পাড়।
আঁচলে মুক্তামণি ঝলকিছে—চমৎকার!
করে কঙ্কণ মাণিকখচিত। রচিত সীথী
হীরক-নিকরে মুখপটে খরে উজল প্রীতি।
কেশে কি কুন্দ পঁথিয়া পরেছে—কি সুন্দর।
গৌরীর প্রাণে মেঘ-বিদ্যুৎ ঝাঝড়।
উত্তালভাবচলতরঙ্গসমুচ্ছাস।
মালা
সুখদুখ-বাধা-ছিন্ন-করা সে সমুল্লাস।
মূচ্ছিত হয়ে পড়িল ভূতলে। অনন্তর
কি ঘটিল সেই গভীর নিশায় গহনতর,
মােরা জানি নাকো। প্রভাতে গৌরী সংজ্ঞা লাভ
করিয়া রহিল নিৰ্বাক অতি—কি অনুভাব !
চুমকি চমকি উঠিতে লাগিল। চকিতে চাহে
চারিদিক পানে। ছল ছল আঁখি কাহারে চাহে !
মুখখানি লাল। সুবিস্ফারিত নয়ন দুটি ;
স্পন্দিতাধরে ভাবচ্ছটা কি উঠিছে ফুটি!
অচিরাৎ মহাকম্প সহিত প্রবল জ্বর।
গৌরভাবিনী ছট ফট করে নিরন্তর।
অবিরাম জ্বর। আঁখি আরক্ত। নাহিক কাপ।
ধান দিলে খই হবে যেন দেহে এমনি তাপ।
মুখে নাহি বাণী।
পরশে না বালা বিন্দুবারি।
হারিয়েছে কি সে সন্ধান করে নিয়ত তারি।
একদা গৌরী নয়ন মেলিয়া দেখিল চেয়ে
আভানিছে তারে কিরণবরণা কিশােরী মেয়ে।
মণিমালা গলে। গৌরী কোমল পরশে তার
নিরাময় হয়ে উঠিল বেয়াধি নাহিক আর ।
ম
৩৪
দিব্যােগ
কর ধরাধরি করি তারি সনে কুসুমবনে
পশিল গৌরী। সুরম্য দেশ। কি সুশােভন এ!
সুন্দর গৃহ। সুনিৰ্মিত কি সুপরিপাটী ।
সােনারেণু নাকি? পদতলে নাহি ধূলা কি মাটী।
বসনভূষণ গৃহে রাশি রাশি—লক্ষ্মীবাঁধা।
পরমহরষ সুখবিলাসের নাহিক বাধা।
ভালবাসা আর আলাে হাসি সবি পুলকভরা।
রমণীরা চারুরমণীয়প্রাণা পীরিতিপরা।
অপরার সাথে এসেছে গৌরী। সমনুমতি
বউদির হায় আনা হয় নি তাে কি হবে গতি।
এ সুখের দেশ তার তরে নয়। ফিরিবে কবে।
কবে বউদিরে প্রসাদি সুনিশ্চিন্ত হবে।
মেয়েটা ছলনা করে নিতি নিতি। দেখায় না যে
নদীয়ার পথ। কহে হেথা সব বিভবি রাজে।
শত অশান্তি সংসারে, কেন ফিরিতে মন ?
পরিহরি চিরপীরিতি-পশরা, প্রাণের ধন।
কহে গৌরী, এ পরঘরে আর ক’দিন থাকি ।
বালিকা কহে'যে তােমারি তত বাড়ী জান না কি ?
গৌরী চাতুরী মনে করে ইহা। নদীয়া যেতে
y
মালা
একদা গৌরী চঞ্চলা অতি উঠিল মেতে।
গৌরীর ভাব দেখি বালিকাটি অন্তৰ্হিতা !
এত সুখে এত একা যে গৌরী ব্যাকুলচিতা।
গৌরী কেবল পথপানে চাহে। কে যেন আসি
পিছন হইতে পরশিল তারে—কি কলহাসি !
গৌরী ফিরিয়া দেখিয়া মােহিল মজিল প্রেমে।
অভিনব কাম! বিমান হইতে এল কি নেমে ?
ফুলমালা গলে। শিখীপাখা শিরে দুলিছে মৃদু।
প্রীতিরসসুধাশােভাসৌরভপূর্ণবিধু।
হাসিতে হাসিতে আসিল বালিকা আসিয়া ওকি ?
ওকি অপূর্ব রূপ প্রকাশিল ? কি অবলােকি ?
কোটিকুসুমের সুষমা মিশিয়া অরুণরাগে
মদনমােহনমােহিনীমূরতি—কে পুরােভাগে।
অমনি দেখিল গৌরী অপরা আসিল-কে সে?
শ্যামশাড়ীপরা! বিকচকুন পরেছে কেশে !
আঁচলে মুক্তা। চমকি চিনিল। ভাঙিল ভুল।
বউদির ভয়ে গৌরী এখন আর কভু নহে ভাবনাকুল !
মণিপুর
নদীয়ার সীমা শেষ হইয়াছে পদ্মাবতী-পুলিনে যেখানে,
রেলের লাইন হ’তে নহে দূরে গ্রামখানি সকলেই জানে।
প্রফুল্ল কল্যাণপুর। কল্যাণীয়া কন্যা সেই গ্রামনিবাসিনী,
দরিদ্রকায়স্থসুতা, চিনিতাম। প্রাণে মনে চিরদিন চিনি।
বহুদিন হইয়াছে। ইতিহাসস্মৃতিখানি মানসফলকে
আছে যা আভাসে আঁকা, নিরমল জ্ঞানগম্য ভাবের আলােকে
ফুটাইয়া তাই আজি ভাবরসপিপাসূকে দিব উপহার।
অবান্তর ব্যাপারের আবরণ পরিহরি সংগ্রহি সার ।
স্বর্ণলতা নাম তার। সুচারুসুবর্ণ-বর্ণ তনুখানি নহে।
শ্যামাচ্ছবি। বসন্তের মঞ্জরিতা মঙুলতা কবি-অভিধানে তবু কহে
বয়স বিবাহযােগ্য। অধিকই বা। সুললিত যােল কি সতর।
নয়নে মনােজদীপ্তি খােলে নি কো তবু কিন্তু, রশ্মি খরতর।
অহেরিবগতিঃ যাহা আলঙ্কারিকেরা কহে, তার লেশাভাস
বালিকার দেহে মনে নাহি, নাহি ছলচ্ছটা বিলােল বিলাস।
মণিপুর
৩৭
প্রতিভাজ্জেল তবু সুমুখমণ্ডলখানি অমল অম্লান।
যেন দিব্য দীপখানি মৃদুদীপ্ত ভাববিভা সদা ভাসমান।
কে দেখে তা লক্ষ্য করি ? রূপ নাই বালিকার বােঝে সকলেই।
রূপ নাই। বিদ্যা নাই। বর্ণপরিচয় মাত্র। জ্ঞানবিদ্যা এই।
গৃহকৰ্ম্ম-নৈপুণ্য বা অনন্যসুলভ কিছু নাহি বলিবার।
সীবনাদি শিল্পকলা হয় নি কো সবিশেষ শেখা বালিকার ।
জনকের ধনবল, কুরূপা কন্যার রূপ খােলে যশে,
এ কন্যার নাহি তাও। আকর্ষণ কি আছে বা কৌলিন্যের যশে ?
তাই কোনো ভাবী বর, বরাভিভাবক কিংবা, কন্যার প্রতি
মনােযােগ করে নি কো। প্রজাপতি যেন অতি উদাসীনমতি।
পিতা পরমেশ বাবু। যৎকিঞ্চিৎ জমিজমা আশ্রয় করি,
অতি অল্প মুনাফা যা, কোনােরূপে টেনে বুনে, ব্যয় সংহরি,
সংসার সমাধান সাবধানে করিছেন। চিন্তা-চঞ্চলিত
কোনাে দিনও কোনো হেতু নহে তিনি। নিরন্তর নিরুদ্বেগচিত।
কৃষ্ণ যাহা করিবেন হবে তাই সুনিশ্চয়। যাহা করি করান যে তিনি
আমার জীবনরথে সুহৃৎসারথি বসি জাগিছেন দিবসমিনী।
শুভাশুভ সুখদুঃখ সুকন্যা পরিবার চরণের তলে
সপিয়া নিশ্চিন্ত আমি। মরিব না শত শঙ্কা ভাবি পলে পলে।
সহস্র ভাবনা মাের করিবে না এক বিন্দু অমঙ্গল রােধ ।
দিব্যােগ
গােবিন্দ-ভাবনা ভুলি নিরানন্দ ধিয়াইব এমনি নির্বোধ ?
এই সুনিভৃত মতি করি ধরি পিতা কন্যার বিবাহ
ভাবিয়া ব্যাকুল নন। কৃষ্ণ-করুণায় সবি হবে নিরবাহ।
দৃঢ়
নিরজন-পল্লীপ্রান্তপ্রবাহিনী স্রোতস্বিনী বিমলসলিলা,
শরৎপ্রভাতে যথা অবলীলাক্রমে বহে নিস্তরঙ্গলীলা।
স্বর্ণর জীবনখানি তেমনি বহিয়া যায় শান্ত স্রোতস্বতী।
জানে না মানে না দুঃখ, সুখস্বভাবের পথে অবিরত গতি।
পিতার প্রাণের মেহসুধাধারা ঝরে সদা দুহিতার শিরে।
জননীর প্রাণমন ঘুরি ঘুরি উড়ে ঘিরি ঘিরি কন্যাটিরে।
বিধবা পিসীমা তারে প্রাণের পুতলি মেয়ে চোখে চোখে রাখে
আনন্দের নিধি যেন দিদিটি এ অনুজেরা অক্ষণি ডাকে।
অকল্যাণ কাকসম বিবাহভাবনা কভু বালিকার মনে
পশি কটু কা-কা করে ; খেদাইয়া দেয় বালা দূর করি ক্ষণে।
কদৰ্য্য আকার ধরে দরিদ্র সংসারগুলি—ধনাভাবে নহে।
মন-অভাবে। প্রাণাভাবে। সে অভাব গৃহলক্ষ্মী কভু নাহি সহে
ভালবাসাশূন্য গৃহে পশে আসি স্বার্থকুটিলতা কাল কলি
কলুষকলহ দ্বন্দ্ব হিংসাবিষ সুখশােভা বিনাশে সকলি।
সুশােনা সুরকন্যা দয়া ক্ষমা গৃহখানি পরিহরি যায়।
ঐহীন শৃগালবাসে পরিণত করি দেয় সংসার, রহে না উপায়।
মণিপুর
*
স্বর্ণর পিতার গৃহে মাহি ধনদৌলত সুখসম্ভার।
আছে পরস্পর প্রীতি স্নেহ ভালবাসা ভাব, তাই সদা সুন্দর সংসার।
আছে ভক্তি। আছে কৃষ্ণসেবাপরতার দিব্য মধুরিমাখানি।
আছে বৃন্দাবনচ্ছায়া সকলেরি মুখে আশা আনন্দের বাণী।
এই ভাবসরসীর সরােজিনী স্বর্ণলতা। দলে দলে প্রতিপরিমল।
সুকুমার সুধামাখা হৃদয়ের ভাববৃত্তি সবি সুনির্মল।
সুমধুর কৃষ্ণকথা জনকের মুখে বালা কত শুনিয়াছে।
অন্তরে তা থরে থরে সঙ্গোপনে সযতনে সুসজ্জিত আছে।
প্রতিসুধামধুভরা পুষ্প যেন প্রতি কথা ফুটি থাকে প্রাণে।
প্রাণ মন কুসুমিত উপবন সে যে বালা অনস্ফুট অনুভবে জানে।
ভিতরে বাহিরে কৃষ্ণ কৃষ্ণময়ী কে গাে আহা! বলিলেন পিতা।
যাহা যাহা নেত্র পড়ে তাহা কৃষ্ণ দূরে আহা! হর্ষচমকিতা
স্বর্ণলতা শুনি তাহা। কি রম্য অমৃতকথা! আমি অনুচরী
তারি চারু চরণের চিরদিন হইব না? ওই কথা স্মরি
মরি যদি তাও সুধা। স্বর্ণলতা একাকিনী চিন্তা করে বসি।
কি যেন প্রতীক্ষা প্রাণে। চেয়ে থাকে পথপানে কে যেন সে
অন্তরে পশি।
অকারণে আনচান, মৃদু চঞ্চলে প্রাণ, চমকিয়া উঠে।
কি জানি কি অনুভব, ঈষৎসৌরভ, জোনাকীর জ্যোতি পুন ফুটে।
3
দিব্যােগ
পুলকে কি চঞ্চলতা? তাও নহে। তবু চিত্ত নহে অনাকুল।
ভাবাবেগবিক্ষোভের লেশ নাহি—ফুলদলে শিশির দোদুল
অতি মৃদু সমীরের পরশন-হরষণে—এমনি কন্যা সে।
সুদূরের কিবা আশা, তারি ভাবপ্রতিভাসা, তারি ধ্যানে সদা
অনন্য সে
ভাবের মদিরাভরা মধুমাস আসিয়াছে। এল পৌর্ণমাসী।
পিতা কহিলেন, প্রাণগৌরাঙ্গের সুমঙ্গল জন্মতিথি সমুদিল আসি।
সংসার পশ্চাতে রাখি দুটি দিন নদীয়ার পুণ্য প্রেমবায়ু।
নিসিয়া আসি যাই। ফুরাইছে অতি পরিমাণ আয়ু।
পিতামাতা পিতৃম্বসা ভ্রাতৃসনে স্বর্ণলতা নদীয়া নগরে
পঁহুছিয়া, প্রবাসের বাস বিরচিয়া নিল আনন্দ-অন্তরে।
পরমউৎসববােল পরিপূরি নবদ্বীপ উপজিল গৌরবগভীর।
হরষতরঙ্গোচ্ছ্বাসে বিক্ষুব্ধ বিমানতল উচ্ছল সমীর।
সহস্র মৃদঙ্গরবে প্রেমসিন্ধুনাদ যেন-আনন্দনিন।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ধ্বনি ঘন ঘন লক্ষকণ্ঠে পাষণ্ডের বিষমভীষণ ।
মুরজ মন্দিরা বাজে করতাল খঞ্জনী শিঙা বেণু সংখ্যা কেবা করে।
নিখিল ভুবনব্যাপী মহাভাবসঙ্গীতিনিনাদের বন্যা সঞ্চরে।
গৌরাঙ্গ নিতাই জয়! জয় কৃষ্ণ গােপীজনজীবনবল্লভ।
জয় বৃষভানুকন্যা প্রেমভক্তিমহারাণী ! জয় দেহ ভক্তজন সব।
মণিপুর
৪১
জয় কৃষ্ণনাম মন্ত্র ! পুরাণাদিবদতন্ত্রসৰ্ব্বশাস্ত্ৰসার ।
মধুর মধুরতর সুমঙ্গল নিরন্তর—স্বর্ণতরী ভব তরিবার।
এমনি অনন্তগীতি অসংখ্যাত কণ্ঠে কণ্ঠে দিকে দিকে চলিল ঝঙ্কারি।
কত সুরতাললয় কত রাগরাগিণীর সমাবেশ বর্ণিতে না পারি ।
আবিরকুঙ্কুমফাগ অন্তহীন অনুরাগ অন্তর বাহির লালে লাল ।
আকাশে আভাস লাগে জলে স্থলে বর্ণ “জাগে, এমনি যে আছে
চিরকাল।
আমরা দুদণ্ড তারি ভাবাভাস অনুকারি আনি স্নান জীবনের মাঝে।
ধন্য হই। দণ্ড দুই ছন্দোহীন প্রাণে মনে প্রেমামৃতগীতছদ বাজে।
স্বর্ণলতা প্রাণভরি উৎসবের রসাসব করি নিল পান,
সুখ-উপক্রমণিকা কোন মহামিলনের এ যে, তাহা বুঝিল না প্রাণ।
উৎসবের স্রোতে প্রাণ মন ভাসাইয়া রসতরঙ্গের সনে
নাচি নাচি প্রবাহিয়া চলি গেল কতদিন নাহি হা মনে।
একদিন অপরাহ্বে বনচারিকাননের পথে স্বর্ণলতা
আনন্দে ভ্রমিল বহু নানা দৃশ্য নিরখিয়া স্বজনসঙ্গতা।
সাধুসন্তকধারী নানাবিধপন্থাচারী আউল বাউল।
কর্তাভজা সহজিয়া নানা ভাব ভান নিয়া নিজ নিজ ভজনামুকুল।
গভীর গভরে কেহ ধরণীগরভে বহে কি আলােকে কেবা তাহা জানে।
অনশনে অস্বপনে যােগী কেহ ধ্যানমগ্ন সন্নিরুদ্ধ প্রাণে।
০২ দিব্যােগ চণ্ডীদাসভাবাবেশে পিঙ্গল আসনে বসি সাধু প্রবয়স। রজকিনী ঠাকুরাণী পাশে মৃদুহাসি হানি বিলাইছে কি রঙ্গিল রস। নানাকৃতিবেশভূষা নানারঙ্গভঙ্গীজুষা বয়স নানান। বিভিন্ন কুটীরে কুঞ্জে ভিন্ন রসরতি ভুঞ্জে ভিন্ন রূপবান্। কেই জালিয়াছে ধুনি, কেহ গাঁথে গুনি গুনি স্ফটিকের মালা। কেহ সুর তাল কথা মিলাইয়া মনােগতা গাহিতেছে খণ্ডিতার পালা। পরমায় এক সাথে খাইতেছে এক পাতে; হাসি হাসি মুখে দেয় তুলি। নরনারী পরস্পরে ব্রজভাব অন্তরে, অনুরাগে আপনারে, ভূলি। কেহ শুকপাখীটিরে শিখাইছে ধীরে ধীরে—কহ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ রাধা। কেহ শুয়ে শুয়ে সুর আলপিছে সুমধুর, কেহ উচ্চ হাসে নাহি বাধা। লাল-আলখেল্লা-পরা কমকান্তি মনােহরা বাবাজীটি রসালের মূলে। একতারা বাজাইয়া নাচিছে তন্ময়হিয়া নৃপুরের ঝঙ্কার তুলে। • স্বর্ণলতা সমুদয় দেখিল সে। দেখিল না কিছুই ইহার। সবি যেন ছায়া ধূ ধূ আঁধারের মায়া শুধু চলিতেছে বহি অনিবার। স্বর্ণর নয়নে সব-এ বর্ণহীন। অনুভবে কিছু পাইল না। প্রীতিহীন গতিহীন রসরূপনীতিহীন। ভাববস্তু কিছু কি ছিল না ? ছিল না তা বলিব না। বালিকার চিত্তপটে একটিও রেখা আঁকিল না কিছু এর। এ ভজনবেদবিদ্যা কভু তার হয়নিক শেখা।
মণিপুর
বনচারিবনপথ পরিহরি মণিপুর-বনে পঁহুছিল।
ওরা সবে কুতূহলে উলসিত তনুমন পরিশ্রান্ত নহে এক তিলও।
চারু উপবনখানি মণিপুরপতির পুণ্যপ্রতিষ্ঠান।
সুচারু শৃঙ্খলা অতি গৃহগুলি নিরখিয়া পরিতৃপ্ত প্রাণ।
পূর্ণপরিপাটী সেবা-সুবিধান চিরদিন গৌরহরির।
নাহি দ্বন্দ্ব কোলাহল ভাবচ্ছন্দে বাঁধা সব নীরব নিবিড়।
মন্দির সুনিরমিত পূজার্চনা নিয়মিত। প্রশান্ত সুন্দর
সে ভাবমণ্ডলমাঝে পশিলেই প্রশমিত অশান্ত অন্তর।
সুরম্য দর্শনখানি শ্রীগৌরাঙ্গসুন্দরের কি দিব্য স্মৃতি।
বিশ্বহৃদাকাশ হ'তে প্রকাশিয়া এল এই আনন্দমূরতি ।
কৌমার পৌগণ্ড আর কৈশােরের মধুরিমা যত সমুদয়
আহরণ করি আনি রচিয়াছে আপনার রূপ রসময়।
কুমার কন্দর্প ছবি! গঠন নটনভঙ্গী চটুল রঙ্গিয়া
নাচিয়া চলেছে একা কি অমিয়ভাবােচ্ছাসে রসে তরঙ্গিয়া।
মণিপুররাজকন্যা কে সে অনুরাগময়ী-তারি পুণ্য হৃৎসরােবরে
এই রসতরঙ্গটি রূপ ধরি ফুটেছিল কিবা স্বপ্নে কোন যুগান্তরে।
স্বর্ণলতা নিরখিয়া রূপব্যাকুলিতমনা পুলকবিহ্বল।
ওকি প্রেমানন্দ ছবি! ওকি ঠাম অনুপম—ওকি নৃত্যকলা!
নাচিতেছে আমারি যে হৃদয়ের রঙ্গমঞ্চে—অনুভব হেন।
এমনি অমিয় ছন্দে নাচিয়াছে কত যুগ কোনাে দিনও দেখি নাই কেন?
৪৪
দিব্যােগ
N
বসন্তের অপরা। সুচঞ্চল সমীরণে ভাসিতেছে কুসুমসৌরভ।
মুকুলিত তরুশীর্ষে কোকিল আকুল হর্ষে গাহিতেছে বসন্ত-উৎসব।
আম্রকাননের শাখাপলবান্তরালপথে রবিরশ্মি আসি
কামিনী করবী কুল কুসুমিত কুঞ্জগুলি তুলিয়াছে উজলি উদ্ভাসি
পিতা কহিলেন, স্বর্ণ, চল যাই ফিরি আজ। সন্ধ্যা হয়ে আসে।
সকলে আবাস পানে চলিতেছে-অকস্মাৎ সসম্রমে সরি এক পাশে
দাড়াইল থামি কেন কৌতূহলবিস্ফারিত নয়নে চাহিয়া ?
কি দেখিছে? কি ও রূপ! স্বর্ণলতা চমকিতা চঞ্চলিক অভিভূত-হিয়া !
দিবালােকে দিব্যস্বপ্ন সুকুমার সুষমার! কিশাের কুমার !
নৃপতিনন্দন কে ও? স্বর্ণমণিবিখচিত পরিধান চারু চমংকার।
সুরঙ্গীণ রত্নহার, সঙ্গে তারি বঙ্গণের ললিত মালিকা।
কপােল কস্তুরীবিবিরচিত পত্ৰলেখা, ভালে ললাটিকা।
অরুণ অধরপুটে ফুটিতে অমিয় হাসি পারে নি ফুটিতে।
প্রণয়সসীনীরে সােহাগের জ্যোৎস্না যেন নয়ন দুটিতে।
ভাবুক ভাস্কর কেহ মৰ্ম্মের মর্মর হ'তে সৌন্দৰ্য-প্রতিমা
কাটিয়া তুলেছে যেন অভিরাম ঠামখানি উপমান-সীমা।
স্বর্ণলতা স্বপ্নস্বর্গে । নিরখিছে স্বপ্নাতীত স্বপ্নপ্ৰহেলিকা।
বহিভুবন মাঝে আবির্ভাবখানি ওই—নাকি প্রাণে, জানে না বালিকা।
অন্তরবিমানপটে ফুল্লরূপসুধাকর সমুদিল—না না! ওরা কারা?
সশস্ত্র সিপাহী শাস্ত্রী ঝলকিছে সন্ধ্যালােকে—স্বর্ণ দিশাহারা।
মণিপুর ৪৫ সবি যেন দীপ্তিময়! চিত্ত উদ্দীপিত হয়! রাজৈশ্বৰ্য্য এই ? কি মধুর মনােরম ! অপরূপ অনুপম ! এ রাজ্যের নহে কিছুতেই। সহসা শুনিল স্বর্ণ, মণিপুর-মহীপতি! এমন তরুণ ! এমন কোমলকান্ত রাজ্যেশ্বর পাক্রান্ত! সুকমকরুণ! নুখানি তরঙ্গিছে অনুরাগরসে যেন। রঙ্গ নব নব উছলিছে, মনে হয় মনে মনে মনােময় কোন রমণীয় মনোেভব ? ইন্দ্রজিনারায়ণ ! সুমনােহরণ নাম! চারুছন্দভরা। প্রাণমনােবুদ্ধীন্দ্রিয় জিনিতেছে রমণীর, কি অমৃতমূৰ্ত্তি মনােহর।। ভাবিতে ভাবিতে বাল ভাসিতে ভাসিতে যেন বনচারিবনপথ দিয়া সায়াহ্নে নিবাসে এল। ক্ষণে যেন আন সবি তনুমনহিয়া। জীবনের রসঙ্গ জগতের রূপজ্যোতি হৃদয়ের মাধুরীবৈভব। সবি আবরিয়া রাখে কি সে তমােযবনিকা তবু তাহা নহে অনুভব। কি সুরম্য ইন্দ্রজাল প্রকটিল ইন্দ্রজিত। মাধবী-প্রভাতে লঘুবাষ্পজালসম মিলাইল নিমেষে তা, কি আলােকপাতে । সে জীবন সে জগৎ, সেই চিত্ত প্রাণ মন সে জ্ঞান সম্বিৎ, সেই ভাব-অবরােধ মিলাইল নভেমাঝে আজি আচম্বিত। কি আশ্চর্য! কি অচিন্ত্য! কি মধুর মঞ্জু-মায়া ! মায়া-আবরণ ছিন্ন করি প্রকাশিল অপরূপ বিশ্বধানি, দিব্যাকাশ সুদিব্যকিরণ। মধু সবি! সবি সুধা! রূপােল্লাস দিগদিগন্তে ! রাগপরবাহ!
(৪৬
দিব্যােগ
।
সুষমাসাগরবারিবীচিমালা সারি সারি অবিরত করি অবগাহ।
অনন্ত অন্তর নভ ব্যাপি বিকশিল আহা শত ইন্দ্রধনু।
সুধাসফলতা ভরা আশা সবি-রঞ্জিতেছে কেবা শিল্পী দেবতা অতনু।
বালিকার স্বভাবজ বাল্যভাব-পটচ্ছদ ভেদ করি দুর্দম যৌবন
রসােচ্ছাসে উৎসারিয়া এল ক্ষণে প্রবাহিয়া দিকে দিকে প্রবল প্লাবন।
রম্য বিভাবনা শত রক্তকুসুমের মত পুলকের তরঙ্গবাহনে
ভাসিয়া চলিল বেগে—কি দুরন্ত দুর্নিবার অনঙ্গাবাহনে।
ইন্দ্রজিত! কোথা কোন পাৰ্বতীয় বনদেশ অনতিবৃহৎ।
তারি অধীশ্বর সে কি ? নাকি ভাববিশ্বরাট ব্যাপি আছে দীপ্ত
নভপথ।
d
আমারি বিশ্বের রাজা। এ নিখিল হৃরাজ্য করিছে শাসন।
প্রমােদপ্রণয়গীতি প্রচারিয়া চিরকাল প্রাণকেন্দ্রে পাতি সিংহাসন।
পরমাবির্ভাব তারি কি মহাসৌভাগ্যে আজি! স্বর্ণলতা জাগি
সারারাতি
বিভাবিল ভাবিল যা আপনারি দীপ্তহৃন্মাধুরীতে মাতি,
ভাষায় আনিলে তাহা এই বর্ণাভাসে রাঙা হইয়া ফুটিত।
সে ভাব ভাষার বন্ধে বঁধা পড়ে না যে কভু জ্ঞানাকাশে নহে
প্রকটিত।
দেশে ফিরে এল সবে। ভাবজাহ্নবীর নীরে স্নান সমাপিয়া।
মণিপুর ৪৭ শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্যচিরচাৰুষসুধাকরজ্যোৎস্নারস প্রাণ ভরি পিয়া ! স্বর্ণলতা স্বপ্নময়ী! রসজ্যোৎস্না চারিদিকে দূরে দূরে ভাসে। উর্দ্ধে বিমানের ভালে পরিপূর্ণরূপবিম্বসুধাকর হাসে। ইন্দ্রজিনারায়ণ উদ্ধে? নাকি অন্তৎপুণ্ডরীকদলে। নাকি অন্তরাজ্যে ? উৰ্ধ অধঃ দশদিক ইন্দ্রজিতসূৰ্যকরে জ্বলে। আপনা হইতে যেন ছিন্ন হয়ে স্বর্ণলতা কোন্ দিব্যরসপরিবেশে অকস্মাৎ পশিয়াছে—পুনরায় আপনাকে আলিঙ্গিতে পারে নাকো এসে। দরিদুহিতা সে যে পল্লীবালা রূপহীনা নাহি গুণলেশ। উত্তঙ্গ রাজাধিরাজ কে সে তার ? কি প্রমত্ত ভাবাভিনিবেশ! বিন্দু জ্ঞানবিবেচনা নাহি স্বর্ণর মনে। নাহি ভাবাগণ বিচারণা। সমুদ্দীপ্ত ভাস্বর্গে বিরাজিছে কিশােরী মে তদিয়িতনুতন্মনা। কাহাকে বা কোন কিছু চাহে নাত, ভাবমগ্না। পরিপূর্ণপ্রাণ। পাইয়াছে সে যে সবি—আশ্চৰ্য্য ঐশ্বৰ্য্য শত! সৌভাগ্যের দান। অযুতাশা প্রাণে তবু। পুলকের বীচিরঙ্গে আশার বিলাস । অমৃতকামনা শুধু। কাম্য কামনারি বুকে। প্রণয়াভিলাষ প্রণয়েরি অভিলাষ নিত্যপ্রণয়েরি তরে। প্রিয় বসি প্রণয়ের বুকে। নাহি কামনার কাম। পুণ্যকাম কমনীয় সুনির্মল সুধা সুখে দুখে। কবে কোন শুভক্ষণে পরাণে পুরােহিত বালিকার জীবন-অঙ্গনে আসি পূজার্চনা করি অঞ্জলি নিবেদিল দেবতার রাতুল চরণে
৪৮
দিব্যােগ
বালিকার জীবনের যত কিছু সমুদয় ! কে দেবতা ? ইন্দ্রজিত রায়
অন্তর ব্যাপিয়া তার বিলসিছে অনিবার পরিপূর্ণ প্রীতিপ্রতিভায়।
স্মৃতির প্রতিমা সেকি ? ভাবনার ভাবমূর্তি ? তা নয় সাক্ষাৎ।
হৃদয়াধিরাজ তার সৰ্বেন্দ্রিয়সুগােচর । আজি অকস্মাৎ
সমাগত নহে তার কুটীরের দ্বারদেশে দুদিনের তরে।
যুগযুগান্তের সখা। বিরাজিছে চিরদিন বাহিরে অন্তরে।
স্বপনে অচেনা হয়ে গিয়াছিল স্বপ্নশেষে পরিপূর্ণ প্রেমপরিচয়ে
পুনরায় এল প্রাণে। অভিনব জাগরণ। অজ্ঞানের শূন্যস্বপ্ন নয় এ।
সহায় সকল কাজে জননীর। স্বর্ণলতা চিরদিনই করে
সংসারের নানা কাজ ফুল্লপ্ৰাণে অবিরাম উৎসাহভরে।
এখনাে তেমনি করে। তেমনি সে নহে তবু। অন্যরূপ অন্যভাব সব।
রসজ্যোতির বিদ্ধ জীবনের সমুদয় । উজ্জলিত আনন্দ উৎসব।
ঘুণাক্ষরে কেহ কথা জানে না ত। জানিবে না। ইন্দ্রজিত রায়
জীবনের কেন্দ্র তার। মনসিজ মহারাজ রাজিছে হিয়ায় ।
তাহারি সাধনা সেবা। তারি প্রতিহেতু সব। আর কিছু নাই।
পরমপুলকানন্দহর্ষোল্লাসগীতচ্ছন্দ এই সেবা-এই শুধু চাই।
স্বর্ণলতা ভাবে যত এই চিন্তাশ্রোতাগত। ক্রিয়া সবি এই
স্রোতে চলে।
জননী দেখেন কন্যা গৃহকাজে কি অনন্যা। জানেন না কোন মন্ত্র বলে।
জনকের পরিধেয়, শেজসজ্জা, পাদুকাদি, নাদির জল,
মণিপুর
৫.
সাময়িক প্রয়ােজন যত তার, স্বর্ণলতা সুবিধান করিবে সকল।
রন্ধনের আয়ােজন জননীর, নিজ করে অথবা রন্ধন,
স্বর্ণ করে ফুঙ্কাননে, সেবামুখ স্বাধীনতা, নহে কৰ্ম্মকঠোর বন্ধন।
জল তােলে কূপ হ’তে, যত পরিত্যক্ত বাস সুখােপ্পাসে ঘােয়।
কামরাঙাতরুতলে বসিয়া বাসন মাজে, দুহিতার কাজ গাই দোয়।
উঠানের ছড়াঝাড় প্রায়ই দেয়, কদাচিৎ মাতা আগে উঠি।
ঘর ধােয়াপোছা-লেপা, খুটিনাটি যথাস্থানে সাজাইয়া রাখা খুটি খুটি।
কি আর করেন মাতা সহােদর দু’জনার ? স্বর্ণলতা করে।
যত আজ্ঞা পালিবে তা, খাওয়াইবে নাওয়াইবে শােয়াইবে নিয়া
শয্যাপরে।
শতবার দিদি কই, এনে দে না, শুনে যা তাে, কালী নাই এতে,
গামছাটা কেচে আন, ঠাণ্ডা দুধ খাব না কো, মাদুরটা দেনা রােদে
পেতে।
সব করে ক্লান্তিহীনা। দেহখানি নিরমাণ যেন সমীরণে।
সমীরণসম বালা প্রবাহিয়া চলি যায়, নহে সঞ্চরণে।
পাশে রহি, পাছে আগে, রহি উর্ধে নভপথে সুস্মিত নয়নে
ইন্দ্রজিত দেখিছে যে। কি করে ও জাগরণে, কিবা স্বপ্নে দেখিছে
শয়নে।
স্বর্ণলতা পানে তার নির্নিমেষ আঁখি দুটি, কেন তাহা জানে কি
কিশােরী।
৪
৫e দিব্যােগ জানে শুধু পরানন্দসুখােৎসব তারি সেবাসন্তোষ সংসাধন করি। জানে তাও ঠিক নহে। একমাত্র অনুভব সমনুভাবনা, প্রাণের প্রেরণা সদা পুলােকোদ্দীপনা ওই নিষ্কাম কামনা। ইন্দ্রজিত সুখী মম। তারি কাজ আমি করি। অনুরাগে তারি। এই চাহে প্রিয়তম। ক্ষণতরে তার কথা পাশরিয়া রহিতে কি পারি ? জনকের যােগ্য সেবা সমাধান নাহি হয় যদি মাের করে, কি ভাবিবে সখা মাের? হয় যদি কি আনন্দ লভিবে অন্তরে। মাতা যদি ক্লেশ পান অলসতা হেতু মাের, মরিব যে লাজে আমি, যবে বঁধু মাের মুখপানে অনাহাদে নিরখিবে, হায় তাও সহিতে কি হবে ? ভালবাসা যত্ন স্নেহ অনুজের যদি আমি না পারি করিতে। প্রাণাধিক ভাবিবে যে প্রীতিলেশ নাহি ওর নিরমমচিতে। এমনি করিয়া বালা ভাবি ভাবি কোনাে কাজই করে না কভু ত ; সমনুপ্রাণনা পুণ্য প্রণয়ের অনুখনি প্রাণে তার পূর্ণ অনুভূত। তবশে ভালবাসে প্রীতিসেবা পরিচৰ্য্যা স্বজনের করে। ইন্দ্রজিত জীবনের দিনমণি মনােহর, কমলিনী শুধু তারি তরে। ভিতরে বাহিরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণময়ী কে সে রাণী, মহারাণী স্বর্ণলতিকার। তারি প্রেমসুধাবি হৃৎপদ্মপুটে যদি লভিত সে, রসস্পর্শ তার। প্রাণ ভরি প্রাণাধিকে তবে সে বাসিত ভাল প্রাণ দিয়া শত লক্ষ বার। হা হা নেত্র পড়ে তাহা তাহা তৎক্ষণাৎ বিকশিত মূর্তি সুষমার।
মণিপুর
৫১
অভাগিনী:পেল কই সে সৌভাগ্য প্রণয়ের। তবু ভাগ্যবতী
প্রিয়ের করুণাদৃষ্টি লভি প্রাণ সপিবার লভিল যে সুনিশ্চয় মতি।
?
প্রজাপতি উদাসীন থাকেন কি চিরদিন? কিঞ্চিৎ ব্যস্ত আপাতত।
যে সম্বন্ধ আসে যায়, প্রকল্পনা গণনায় সবি শেষে হয় অসঙ্গত।
ধনশালী বিপত্নীক সুকন্যাসমন্বিত মাননীয় বর
আসিলেন একজন। ষড়ত্রিংশ বয়ােভাব। গণনীয় ঘর ।
নিতান্ত আচারহীন। মৎস্যমাংসঅণ্ডাদিতে প্রচণ্ড উল্লাস।
দেবজি নাহি মানে। নাহি মানে জন্মান্তর। বিদ্যা বি. এ. পাশ।
রূপখানি সুগঠন। ঘটিল না সুঘটন। পরমেশবাবু রাজি নন।
বয়ােবৃদ্ধ দরিদ্র বা সমুদিয়া বরবিধু ধীরে ধীরে অস্তমিত হন।
অবশেষে—শান্তাহার-সন্নিকটে গ্রামখানি নাম চম্পাপুর।
চম্পকের তরু বহু। জন্ধুবীথী আর নীপকুঞ্জে পরিপুর ।
সেই গ্রামবাসী, নাম, সুপ্রসন্ন বস্তু। শান্ত কোমল প্রকৃতি।
যৎকিঞ্চিৎ কবিরাজী ব্যবসায়। নাহি আয়। অর্থ ব্যর্থ করি
চলে প্রীতি।
ব্ৰহ্মচর্যে ছিল মতি। বৃদ্ধ মাতা, নাহি গতি দানগ্রহ বিনা এবে আর।
ভগিনীরা কেহ কভু এসে থাকে কাজ চলে। চলে যায়। চলে না
সংসার।
এলেন কল্যাণপুরে নানাস্থান ফিরে ঘুরে স্বর্ণলতা করিয়া কামনা।
৫২
দিব্যােগ
কন্যা, পিতামাতা তার, পুণ্যগৃহসংসার হেরি তিনি হরষিতমনা।
পরস্পর অঙ্গীকার দানাদান খান পান বাগদান সব
যথাক্রমে যথারীতি হয়ে হ’ল পরিণীতি শুভ সমুৎসব।
স্বর্ণলতা ভাবিল না। দেখিল না শুনিল না কোনাে কিছু এর ।
গণিল না সুখদুঃখ অন্তরঙ্গে আনিল না চিন্তা বিবাহের।
মৃন্ময়ী নহে তবু ধ্যানময়ী জ্ঞানময়ী সুগভীর ধ্যানের গহনে
নিমগ্ন হইয়া বালা নিরখিল ইন্দ্রজিতে উজ্জ্বলিত মনে।
ইন্দ্রজিত আয় তার ভাবরাজ্য চমৎকার শতবর্ণ শােভা।
অভিনব চিন্তামালা পুলক আলােকালা, চারুচিত্ৰ দূররশ্মিপ্রভা।
চারু পরিণয়রঙ্গ করে মাের ইন্দ্রজিত। পুণ্য অভিনয় মনােহর।
সুপ্রসন্ন হয়ে এল কিংকরীর প্রতি আজ। প্রসন্ন কি এ মুগ্ধ অন্তর ?
দাসীর জীবনে যাহা হবে শুভ শােভমান করিবেন তাই সুনিশ্চয়।
রমণীজীবনব্রত-উদ্যাপন হেতু তঅনুসঙ্গী কৰ্তব্যনিচয়
প্রাণে বসি পাণি ধরি সুসম্পন্ন করাইয়া চিত্তসত্ত্বসংস্কারপথে
ধীরে ধীরে বিকাশিয়া আমা তুলিবেন নিয়া প্রণয়ের দিব্য স্বর্ণরখে,
অনন্ত অমৃতরাজ্যে রম্যরসসংস্থানে, তাই এই পরিণয় ছল
পাতিলেন মাের তরে। বুঝিলাম। এনা তারি নৰ্ম্ম নিরমল ।
নিজস্বার্থসুখদুঃখভাবভূমি পরিহরি পার্থভাবনা
অন্তরে গ্রহণ করি নিত্যনিৰ্ম্মলনীতি আমি শিখিব না ।
মরমের নির্মলতা বিনা নহে সুবিশুদ্ধ প্রীতির প্রকাশ।
মণিপুর প্রতি বিনা রূপামৃতমাধুর্যের পরিপূর্ণ সম্বিতের নাহি কভু আশ। মাধুৰ্যানুভব বিনা সম্ভবে না কভু মমন্মথউদ্ভেদ। মম্মথউদ্ভেদ বিনা নহে দিব্যতম রস—সে কথাটি কহে নাই বেদ। সেই রস শৃঙ্গার যে, পদ্মযােনি বিন্দুলেশ বৃথা বাঞ্ছা করে। প্রণয়ের জ্ঞানবিদ্যা স্বর্ণলতা অধ্যয়ন করে নাই দিনেকের তরে। প্রতিতত্ত্ববিদ্যাশাস্ত্র স্বত উৎসারিত হয়ে স্বর্ণর অন্তরে প্রবাহিয়া চলিয়াছে তবু, পূর্ণ প্ৰেমবশে বিজ্ঞানের স্রোতােবেগ ভরে। প্রণয়রহস্য যত যােগিজনধ্যানগম্য, স্বর্ণর নয়নে কানন কুসুম সম প্রস্ফুটিত হইয়াছে। স্বর্ণ সবি জানে দীপ্ত মনে। স্বামিসেবা শিখি নারী স্বামীদেবতার পদে তনুমনপ্রাণ নিবেদিতে যােগ্য হয়ে সব শেষে আমি-মম ভাবখানি করি দিয়া দান অপূৰ্ব্বঅমৃতরসরাগাধিকারিণী হয় রমণী জীবনে। এই সত্য ক্ষুরিয়াছে স্বর্ণলতিকার চিতে প্রাণে জ্ঞানে মনে। বিবাহব্যাপারখানি তাই বালা নিল বরি শান্ত চিতে অতি । উল্লাস কি অমুল্লাস প্রাণে স্থান পাইল না, সুবিমল মতি। প্রিয়তম ছদ্মবেশে করপদ্মে কর ধরি নবীন সংসারে বরণ করিয়া নিতে এসেছেন—ইব না তারে তুষিবারে। বিবাহবাসরে তবু শুভদৃষ্টিকালে বালা স্বামীমুখপটে মণিপুরনৃপতির মুখাভাস না দেখিয়া পড়িল কি ভাৰনাসঙ্কটে। সে ত নহে! সে নহে যে! অন্যরূপ ভাববেশ! তবে কেন হায় !
৫৪
দিব্যােগ
তবু অন্য নহে কেহ। অন্য আর নাহি বিশ্বে। একচ্ছত্র ইন্দ্রজিত রায়
এই ভাবসিদ্ধান্ত সে শুদ্ধান্তঃকরণে ধরি চম্পাপুর গায়
গেল বাপনে চড়ি। প্রিয়জনবিরহের বাষ্পভরা বেদনা হিয়ায়।
চম্পাপুর চারু পল্লী ফুল্লভাব একখানি স্বর্ণর নয়নে
প্রকাশিল। বায়ু জল সুবিমল। সমুজ্জ্বল নীলিমা গগনে।
লতাত চারিদিকে পল্লবিত কুমিত দেখিল বালিকা।
স্থানে স্থানে রাধালতা বিকশিয়া উঠিয়াছে, রাশি রাশি কুসুম-মালিকা
স্বামীর আলয়খানি ছােট কিন্তু পরিপাটী আছে তারি মাঝে।
পাহাড়িয়া তৃণে ছাওয়া ফিটফাট চালগুলি। সাদা সিধা সাজে
বাঁশ কুচাইয়া বেড়া বাধিয়াছে। গৃহ সংখ্যা খান চার পাঁচ।
সুপরিমার্জিত অতি। সবি যেন প্রীতিকর সুন্দর ছাঁচ।
অশােক জয়ন্তী নিম কূটজ শেফালিকা বকুল চম্পক।
চারিদিকে শাখা মেলি। আরাে বহু কবিরাজী মতে আবশ্যক।
গৃহখানি ঘিরি তরুকুঞ্জশােভা নিরখিয়া স্বর্ণ ফুল্লমনা।
বিবাহব্যাপারে লােক বহু গৃহে। বিশেষত রমণী অগণা।
মুখাবগুণ্ঠন খুলি পুনঃ পুন নিরীক্ষণে গেল কিছু দিন।
ধীরে ধীরে কুটুম্বেরা যার যার গৃহে গেল। গৃহ কলকোলাহলহীন।
স্বামী আর শক্ৰমাতা আর দুটি সুদর্শন ননদতনয়।
ঔষধের ব্যবসায়ে সহকর্মী একজন—গৃহবাসী জন পাচ ছয়।
মণিপুর
৫৫
বাহিরের কাজ করে গরীবের মেয়ে এক। স্বর্ণলতা নিল অচিরাৎ
বুঝিয়া সংসারখানি। গৃহকৰ্ম্ম সমাধানে দিল মন লাগাইল হাত।
মাস দুই যেতে যেতে গৃহখানি নানা দ্রব্য সম্ভারে ভরিয়া
উঠিল—ভাবিল মনে সুপ্রসন্ন, তুলিল কি নববধু প্রসন্ন করিয়া
গৃহলক্ষ্মী জননীকে! গৃহখানি পূর্ণতর সকলেরি মনে।
কিসে পূর্ণ অন্বেষণে বােঝা নাহি যায় কিছু। নহে অম্নে। নহে
ধানে ধনে।
বয়স্য রহস্য করি প্রসন্নকে কহে—স্বর্ণ আনিয়াছ ঘরে।
স্বর্ণ সুদুর্লভ এবে। ধন্য তুমি ধনী তুমি সবার উপরে।
প্রথম সেদিন স্বর্ণ নিজে অব্যঞ্জনাদি করিয়া রন্ধন
জিজ্ঞাসিল শাশুড়ীকে কোন্ ঘরে হবে দেবভােগ নিবেদন।
শ্রীবিগ্রহ কোন্ ঘরে ? প্রশ্ন প্রসন্নর কাণে পশিল দৈবাৎ।
অন্তরে লজ্জিত শুনি। সেবাব্যবস্থান নাহি।' সে ভাবের হয় নি
প্রভাত।
নহে ভক্তিহীন এরা। মৎস্য মাংস গৃহখানি করে না আবিল।
শ্রীকৃষ্ণনৈবেদ্য বােঝে। সাধু সম্মান না জানে। ভক্তদ্বেষ নাহি
এক তিল।
ভজনানুষ্ঠান নাহি। সুপ্রসন্ন তদুন্মুখ জননীও স্নিগ্ধ সুচরিতা।
পরদিন স্বর্ণলতা ভাবান্তর অনুষ্ঠান যৎকিঞ্চিৎ হেরি অতি প্রীতা।
৫৬ দিব্যােগ সুচারু আসনখানি সুমার্জিত গৃহকোণে। সুরঙ্গীণ বসনাবরণ। তদুপরি পটে-আঁকা মনােহর রাধাশ্যাম। অঙ্গে নানা রঙ্গ-আভরণ নৰ্ম্মসহচরীগণ নহে দূরে। দৃশ্যমান কুসুমিত নিকুঞ্জান্তরালে। অমলকমলফুল্ল সরােবরতটদেশে সমুজ্জল সুমধ্যাহ্ন কালে। বাঁশের বেড়ার গায়ে খানকত লীলাচিত্ত। আর ভগবতী। ভাবসামঞ্জস্যহীন একখানি আরাে সেথা লাগানাে সম্প্রতি। দৃষ্টিমাত্র স্বর্ণলতা পুলকিয়া শিহরিয়া উঠিল চমকে। সুন্দর সােনালী ফ্রেমে আঁটা পটে বর্ণে লেখা শােভিতেছে ও কে ? অসম্ভব! ইন্দ্রজিত ? নিঃসন্দেহ। নীচে লেখা মনােম নাম। ইন্দ্রজিতনারায়ণ! রঞ্জে নরনারীমন, কি বিচিত্র ! কিবা অভিরাম। বিস্ময়রােমাঞ্চরাগে স্বর্ণলতা সারাদিন রহিল আকুল । কোন্ দেবতার ছল? কার ষড়যন্ত্র ? কার দিব্য ভুল ? যুবতী বালিকা প্রৌঢ়ী কৃষ্ণকায়া শ্যামা গৌরী দিনকত আসিত অনেকে মিলিতে স্বর্ণর সনে। মিলাইল নিরুদ্দেশে শেষে সব বউ দেখে দেখে। একখানি রূপচ্ছবি মিলাইয়া গেল নাকো। গতাগতি করিতে বহিল। স্বর্ণলতিকার প্রতি তার কৌতূহলরতি ঔদাসীন্যে মলিন নাহিল। নবীনযৌবনবতী বিধবা সে মুক্তমতি চারুফুল্ল ভাবরূপ মুখে। চিন্তাক্লান্তিলেশহীন অবিস্নানা অনধীনা সংসারের শত সুখে দুখে ।
মণিপুর ৫৭ প্রভাতপ্রতিভাখানি নাহি প্রদোষের গ্লানি দিবানিশি ভাসে আলােকে সে। স্থিরহৰ্ষতেজস্বিনী ভাববিবিজয়িনী রহে সদা নিজ ভাবাবেশে। পরিস্ফুট কহে কথা কবিভাবচ্ছন্দোগতা। শশানে যেই অন্তরে তার সুপ্রভাব সঞ্চারে, পাশরিতে নাহি পারে সেই ভাববাণী কভু আর। পিতা বিনয়েন্দ্রবাবু মণিপুররাজষ্টেটে রেভেনুবিভাগে উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত আছিলেন দীর্ঘকাল কিছুদিন আগে। অবসরপ্রাপ্ত হয়ে এসেছেন নিজাবাসে চম্পাপুর গ্রামে। সম্পন্ন সন্ত্রান্ত খ্যাত সমৌদাৰ্য্যশীলতায় নানা অনুষ্ঠানের সুনামে। তারি কন্যা যুবতী এ। আদরের অতিদীর্ঘ নাম রমণীর সুচারুচম্পকলতা। সংক্ষেপ লভি এবে চম্প ও লতাক্ষরে স্থির। স্বর্ণলতিকার প্রতি চম্পকলতার প্রীতি প্রথম দর্শনে। চম্পক জানে যে কেন প্রাণ তার টানে স্বর্ণ কোন্ আকর্ষণে ? শিক্ষিতা দীক্ষিত বালা। ভাগ্যবশে কৃষ্ণভক্তিমন্ত্র পাইয়াছে। স্বর্ণলতা দূরাভাসে বুঝিল যে চিত্ত ওর দূরালােকজালে ছাইয়াছে। প্রসন্নর প্রতিবাসী বিনয়েবাবু। অই সংলগ্ন গৃহখানি তার। সুপ্রসন্ন প্রিয় অতি সুচরিত্র সদগুণে সে। আত্মীয়তা স্নেহ মমতার । চম্প প্রতিদিনই আসে স্বর্ণলতিকার পাশে বসি কহে কথা। বুঝিয়াছে নববধূ বহে বুকে প্রেমমধু যুবতী যে কৃষ্ণ-সঙ্গতা।
৫
দিবরাগ
?
।
ওর মত একজনও সারা গায়ে নাহি আর। অই মতি গতি,
অই সমুন্নত ভাব, অই ভক্তিপ্রবণতা, ঐকান্তিকী রতি।
প্রাকৃতিকসুখাসঙ্গরঙ্গিণী যে রমণীরা, তাহাদের সনে
মেশে না চম্পকলতা। দেখে চাহি অনাদরে অবজ্ঞানয়নে।
সকলে কটাক্ষ তাই করে গরবিণী বলি চম্পকের প্রতি।
নববধূটির সনে ঘনিষ্ঠতা দেখি সবে ঈর্ষাকুলমতি।
অনেকেরি কটুদৃষ্টি স্বর্ণলতা পানে তাই কূট আলােচনা।
কিবা না রূপের ছিরি। স্বর্ণলতা ! হাসি পায়। পচা পাঁকে ছিল
পাকা সােনা।
গাল ভাঙা। দুটি ঠ্যাং-দাড়াইয়া যেন ব্যাং! দাতগুলি ইন্দুর জিনিয়া
গগাবরের গৰ্বহানি করিয়াছে বর্ণখানি। সুপ্রসন্ন এনেছে চিনিয়া।
রমণীর শীর্ষে যবে ঈর্ষাদির সমাগম হয় তার চিত্ত কুৎসিত
কদৰ্য্য মূরতি ধরে। রজমউত্তেজনাবশে তার বৃত্তি বিপরীত।
শুনিয়া চম্পকলতা কোনাে এক কুটিলাকে শুনাইয়া কোপে
কহিল, শৃগালীগুলাে চুপি চুপি ডাকে কেন লুকাইয়া ঝােপে!
স্বর্ণর পা দুখানি থােয়াইতে যােগা নহে হতভাগী যত।
পচা সংসারের পােকা অন্ধকারে কিলিবিলি করে অবিরত।
আলােকের বিহঙ্গিনী দিব্যরসরঙ্গিণী যে উহাদের নিন্দনীয় হবে
তাতে আর কি বিস্ময়? হিংসা দ্বেষ বিষময় সুধা ওরা বােঝে
অনুভবে।
মণিপুর এত কহি সুনির্মল প্রাণে স্বর্ণলতিকার গৃহে গিয়া লইল আসন ; বৈশাখের অপরাহু। নহে অবসান আজো বসন্তের সুরম্য শাসন। প্রীতি সম্ভাষণ করি কহে, বউ, স্বর্ণলতা, মৃদু হাসি হাসি। যেন ব্যঙ্গ রঙ্গ করি কহে, প্রাণসহচরী, তােমা ভালবাসি। স্বর্ণ কহে, সে ত জানি। আজিকে চম্পকরাণী কিবা ভাবতরঙ্গ লইয়া সমাগতা বুঝি না যে! ফুল্লহৃদয়ের মাঝে কিবা রঙ্গ রং লুকাইয়া। চম্প কহে, রক্ত রং। স্বর্ণ কহে, নীলকৃষ্ণ। শ্যাম সে বরং। চম্পক কহিল হাসি, একই রং স্বানুরক্ত ধরে সদা শত শত রং। ভালবাসি এবে স্বর্ণ। অভিনব চারুবর্ণ। আপাতত করতলগত। রঙ্গ রাখি তুমি দিদি, কহ এত বর্ণে কেন উল্লাসিত চিত্ত তব অত। আমি যার রাজ্যে থাকি সে যে লক্ষবর্ণময়ী লােকালােক-আলােকের প্রাণ। আলােকরহস্যরসুরঙ্গীণ তরঙ্গিণী ব্যাপি বিশ্ব বিশাল বিমান। বর্ণরঙ্গময়ী কে সে, শুনি স্বর্ণ শুধাইল, কিবা বর্ণ কহ না বাখানি। চম্পক কহিল ধীরে, মহাভাবম্বরূপিণী, পূর্ণামৃতরসসিন্ধুরাণী। ভাব তার বর্ণজ্যোতি, ঝলকিছে লক্ষ শত, প্রীতির প্রতিমা। বিজলীলতিকা তারা নব নব রঙ্গময়ী—রসসৌন্দর্য্যের শেষ সীমা। অন্তরহৃদয় পানে চাহি বালা নীরবিলা। স্বর্ণলঙ্কা পুলকিতমতি। ভাঙিল না ধ্যানাবেশ। সখীমুখপানে চাহি রহিল সে, কৌতুহলে অতি।
দিব্যােগ
চম্পক নয়ন মেলি পুনরায় ভাবচ্ছন্দে সুকোমল স্বরে
কহিতে লাগিল যেন দেখি চিত্র বর্ণগুলি হৃদাকাশে আঁকা থরে থরে ।
শ্যামশাড়ী দীপ্তাভাস, রাগরক্তবক্ষোবাস, উজ্জ্বল অমল।
তদুপরি কঞ্জুলিকা প্রণয়ের রঙে লিখা করে ঝলমল ।
কুঙ্কুম কপূর অঙ্গে শােভাপ্রভাসয়ে রঙ্গে মঞ্জুল মধুর।
অধরে তাম্বুলরাগে শুদ্ধ অনুরাগ জাগে সুধাস্মিতরসপরিপূর।
কান্তি দীপ্তি হাব হেলা সূক্ষ্ম সুষমার খেলা সদা অবয়বে।
পরস্পর মিলি মিলি মিলাইছে ঝিলিমিলি অন্তরানুভবে।
অনুপম গুণরাশি দিব্য পুষ্প পরকাশি গলে ফুল্লহার।
সােভাগ্যতিলক ভালে স্ফুরিতেছে রশ্মি জালে চারু চমৎকার।
প্রদীপ্তপ্রণয়ানন্দ নিত্যনবরাগচ্ছন্দোময়ী রমণী সে।
বিশ্বরমণীর প্রাণপদ্মদলে শােভমান পাদপদ্ম পরশিব কিসে ?
তারি রাগবিন্দুলেশ লভি অনুরাগিণী কি হব কোনাে কালে ?
প্রাণের বাঞ্ছিতে প্রাণ রূপ যৌবন দান করিব যে, আছে কি তা
ভালে?
বহুক্ষণ দুই সখী মজি নিজ নিজ ভাবে রহিল নীরবে ।
অনেক সঙ্কোচ ঠেলি সঙ্গিণীকে স্বর্ণলতা সম্ভাষিল তবে,
দিদি, শুনি হাসিও না। রজনীর স্বপ্ন কহি। পদ্মাবতীনীরে
নাহিতে গিয়াছি যেন। চাহি স্রোতপানে আছি দাড়াইয়া তীরে।
মণিপুর সহসা শুনিনু কানে সুধাসম কণ্ঠ কার-প্রেম-আবাহন। প্রাণময়ী স্বর্ণলতা। কোনাে দিনাে দুটি কথা কহিবে না? কেন? কি কারণ ? চমকি দেখি চাহি। চিনি অপরিস্ফুট। শিহরিনু সুখে। কিশাের ধরিয়া কর মাের মুখপানে চাহি হাসি কি কৌতুকে, অনামিকা ধরি মাের অঙ্গুরীয় পরাইল। অপূৰ্ব অঙ্গুরী। চম্পক কহিল হাসি, কি জানি কি রঙ্গ মনে, আমি তাহা করিয়াছি চুরি। এত কহি, অঞ্চন্তে গ্রন্থি দিয়া বাঁধা ছিল সুবর্ণাঙ্গুরীয়, কারুকার্য খচিত সে একখানি শােণােপলে, অতি রমণীয়, স্বর্ণলতিকার কর ধরি দিল পরাইয়া, কহি, মাের প্রীতি-উপহার। আমারি মানিয়া লহ। চিরদিন মনে রেখাে স্মৃতিখানি চম্পকলতার। স্বর্ণলতা দেখিল যে ঠিক সেই স্বপ্নে দেখা অঙ্গুরীয়খানি। আঁকা যে মানসপটে! কি আশ্চর্য! কোথা হতে দেয় আমা আনি। যােগসিদ্ধা তুমি দিদি ? সত্যি কহ ? কি রহস্য করিছ গােপন । স্বপ্নে যা দেখি তাই তুমি আমা দিলে আনি, সত্য করি সুখের স্বপন। আমি ত জানি না বউ, চম্প উত্তরিল তবে, স্বপনের তত্ত্ব কিছু তব। রঙ্গ করি, কহিয়াছি। পুরাতন অঙ্গুরীয় দি তােমা মিলাইয়া প্রীতি অভিনব।
২ দিব্যােগ অবিকল একরূপ দুটি অঙ্গুরীয় মাের। দিনু এক। রাখিলাম আন চম্পক তুলিয়া পাণি দেখাইল অঙ্গুলীতে স্বর্ণাঙ্গুরী মণিদ্যুতিমান। স্বর্ণলতা সুবিস্মিতা। সুধাইল কারাে প্রতিদান না কি দিদি ? নাকি এ-চম্পকলতা বাধা দিয়া কহিল যে মিলাইয়া দিয়াছেন বিধি। কি ব্যাপার, দয়া করি—আজ না । যাই বউ, অই দেখ সন্ধ্যা তব দ্বারে। কহিয়া চলিলা ধনী। ভাবভারাক্রান্তা যেন সুমন্থর-চরণ-সঞ্চারে। বৈশাখের শেষ প্রায়। জ্যোৎস্না নিশা। তন্দ্রালস বহে সমীরণ। অশােকের তরুতলে দুই সখী বসিয়াছে। গ্রীষ্মতাপে ক্লান্ত তনুমন। ঘরকন্নার কথা, আরাে অন্য অন্য, করি আদান-প্রদান। স্বর্ণলতা জিজ্ঞাসিল, তুমি দিদি, কোনাে দিন কাহাকেও সপেছিলে প্রাণ। জিজ্ঞাসার অপরাধ ক্ষমি আমা কহিবে না সুগােপন কথা ! তাের কাছে,বউ, মাের কি আছে সঙ্কোচ-ঘাের,তুই মাের অন্তর্গত। সপেছি। কাকে সই ? চিনিবে কি যদি কই? বড়লােক খুব। জ্ঞানবান্ গুণবান্ প্রেমবান মহীয়ান মীনধ্বজ জিনি তার রূপ। কিবা নাম? কে সে বােন? ইন্দ্রজিতনারায়ণ। বিদ্যুৎ-আহতা স্বর্ণলতা নাম শুনি। স্বপ্নসম চমৎকার চম্পকের কথা। সহসা চরণতলে মণিরত্ন শত লক্ষ দেখিলে পতিত
মণিপুর
স্বর্ণলতা চমৎকৃত হইত না, হইল সে যতখানি শুনি চিন্তাতীত।
ইন্দ্রজিতনারায়ণে চম্পকের প্রাণে দেখি স্বর্ণর হৃদয়
পূর্ণচন্দ্ৰসমুদয়ে সিন্ধুবৎ উথলিল, উছলিল তরঙ্গনিচয়।
অযুত আশার রশ্মি ঝলকিল সিন্ধু-বুকে সঙ্গে শত নিরাশার ছায়া।
উষার আলােক-জ্যোতি বিভাসিল তারি সনে বিরহিণী যামিনীর
মায়া।
কোনাে কথা কহিবার রহিল না শক্তি আর। অভিভুত প্রাণ।
চম্পক লখিল সবি। নিজমনে অনুভবি করিল না কোনাে অনুমান।
কেন বউ চমকিতা, কি ভাবিছ বুঝি কি তা, ঘৃণা করিও না।
পরাধীনা নহি কিন্তু। ইন্দ্রজিতে প্রাণে আমি সুধারসে করেছি রচনা।
নব নব রূপে ভাবে পুনঃ পুন নিরমাণ করি যথা মন।
নব নব অলঙ্কারে নানা বনফুলহারে করি সদা সমনুরঞ্জন।
পুলকে পাগল করি যাতনার যন্ত্রে পুন করি নিয়ন্ত্রণ।
অভিমানে অপসারি দেই দূরে পুন অনুরাগ-নিমন্ত্রণ।
বাহুপাশে প্রাণাধিকে বন্দী করি রাখি পুন। প্রােষিতভর্তৃকা
দূর পথপানে চাহি, বিরহের শিখা বুকে, দুরাকাশে স্বপ্ন-প্ৰহেলিকা।
বর্ষাভিসারিকা যাই ঝঙ্কাবারি শিরে বহি বনপথ ধরি।
গহনকদম্বকুঞ্জে কোথা আমা প্রতীক্ষিছে দুখে সুখ-স্মৃতি প্রাণে ভরি।
এই অনুরাগ-রাজ্যে রসসঞ্জীবনী রাণী অধীশ্বরী আমি
আপনার মনে ভাঙি গড়ি পুন তুলি রাঙি নব নব রঙে অবিরামি।
3
দিব্যােগ
স্বর্ণলতা সুধাইল, কে তােমার ইন্দ্রজিত, বাসনা শুনিতে।
কোথায় কিরূপে দিদি এই রাগ সম্ভবিল, কহ, অতি কৌতূহল চিতে।
চম্পক কহিলা, মােরা বহুকাল মণিপুরে করেছি বসতি।
জনকের কর্মস্থান মণিপুররাজধানী গিরিবনাৰণ্যরূপবতী।
সুচারু চঞ্চলা অতি মণিপুরী মেয়েগুলি। ছােট ছােট চোখে
বিদ্যুতের শরভরা ছােটে জ্যোৎস্নালােকে চারুর ঊষালােকে।
শিখেছিনু ভাষা-আশা অই মেয়েদের আমি। উহাদেরি সনে
গিরি-পথে পথে স্নিগ্ধ বনকুঞ্জ তলে তলে উল্লাসিত মনে,
ভমিতাম নাচি ছুটি বনফুল ফল লুটি, নামি উঠি পাষাণের স্তরে,
ক্রমােন্নত গিরিচূড়ে, গভরে বা নিয়ে দূরে, পুন ফুল্ল উপত্যকা পরে ।
এমনি শৈশবরসে রহি কিন্তু শিশু নহি, নহি বালিকা বা,
অন্তর-বিমানে আসি আসিয়াছে বসন্তের আলােকের আভা।
সে এক অনতিদীর্ঘ বনবৃক্ষ ঘনপত্ৰশাখাবিমণ্ডিত।
শাখা হতে পাৰ্বতীয় লতাজাল দুলিতেছে কুসুমরঞ্জিত।
ওরা সৰ আগে, আমি কুঞ্জতলে বসিয়াছি। এ হেন সময়
অকস্মাৎ হেরিলাম—কি সৌন্দৰ্য ছবিখানি! বিষম বিস্ময়।
কিশাের নৃপতি, মুখে মরস-হাসি ভাসে! ধরি মাের কর
পুছিলা, কে তুমি বাল? কিবা নাম ? মুখখানি বিকসিত
কুসুমসুন্দর।
বনফুল-মালা ছিল গলে খুলি দুলাইয়া দিয়া মাের গলে
?
মণিপুর
কহিলা, ললিতগতি অই, তব সঙ্গিণীরা যায় তােমা রাখি কিবা ছলে।
চল না আমার সনে! যাইবে না! তবে যাও। অই ওরা যায় !
চকিতে সে গেল চলি। চমকিত আঁখি ছলি কি মােহমায়ায়।
পরদিন হতে আর বনপথে ছুটি নাই। লুটি নাই ফুল।
পরশে স্বরসে উঠি যৌবন-রসে ফুটি হইনু কি কামনাব্যাকুল ?
তাও নয়। ইন্দ্রজিত গেল যেই পথ ধরি সেই পথ অনুসরি দ্রুত
মুগ্ধ হরিণীর মত হিয়া মাের চঞ্চলিয়া গেল কিবা মন্ত্রে অভিভূত।
কোথা সিংহাসন কোথা অন্তঃপুরােদ্যানে ফোটে পুষ্প নানা জাতি।
কোথায় বিলাসকক্ষে সম্ভাষে প্রিয়জনে, কোথা শয্যা রত্নদীপভাতি!
আমি যদি একাকিনী যাই কাল প্রাতে উঠি সম্ভাষিবে আমায়
কি হাসি ?
h
পরিচয় দেই নি ত। হয় ত করুণা করি দরশন দিত কভু আসি।
মহারাজ রাজেন্দ্র যে !-তবে কেন ভালবাসি ? তাই বা কি জানি ?
যাক আর ভাবিব না। তবু অই ভাবনাই।—কথাগুলি,
হাসি মুখখানি।
এইরূপে কয় মাস গেল বহি। মনে নাই। গৃহে একদিন
ক্ষীর দধি সন্দেশাদি বহুবিধ উপভােগ্য দ্রব্য সুনবীন।
কুসুমস্তবক চারু, গন্ধমাল্য মনােহর এল নানারূপ।
নিমন্ত্রণ করেছেন পিতা রাজ-পরিবার। আসিবেন ইন্দ্রজিত ভূপ।
দিব্যােগ ৮ আমার অন্তরতলে তরঙ্গিল সুখসুধা রঙ্গীণ-কিরণে। অভিনব ফুলগন্ধ বহে দূরে মৃদুমন্দ বেণুগীতি ভাসে সমীরণে। দীপ্তালােকে দ্বিপ্রহরে আসিলেন অতিথি সে। অভিনন্দনাদি পরস্পর সমাপিয়া মহারাজ আবাহন করিলেন আমা, কি সে প্রাণভরা স্বর। • সুচারুচম্পকল, এস দুটি চারু কথা শুনি। আমি পিতার ইঙ্গিতে, চামেলি চম্পককলি মিলাইয়া গেঁথেছিনু মালাখানি বসিয়া নিভৃতে, বিকশিত করে দিয়া, ভূপতির গলে দ্রুত পলাই বেগে। চমকিল চিত্ততলে কি সে তীব্র বিদ্যুতের জালা যেন মেঘে। দিন কত পরে এক নারী গতযৌবনা, আলােহিত তনু, নতনাসা, আসিয়া পিতার পাশে করিলেন মণিপুরী ভাষায় সম্ভাষা। প্রবালখচিত এক সম্পূট খুলি নারী প্রকাশিয়া দুটি অঙ্গুরীয়, - কহিলা, চম্পকলতা পরিবে এ। আর তার হবে যেই প্রাণ হতে প্রিয়। অন্তরাল হতে আমি শুনিলাম কথা অতি ব্যাকুল আগ্রহে। শুনিয়া শেষার্ধ অই বিচলিত হইলাম।-কেহ, কেহ নহে প্রাণসম প্রিয় মাের! কেন অই কথা তিনি দিলেন কহিয়া ? মানে, তিনি নাহি চান মাের প্রাণ-প্রতিদান। প্রাণ-মন-হিয়া আন জনে সমর্পিব-এই তার ইচ্ছা, মাের বিষপানে মরণ মঙ্গল। তবে কেন ভালবাসি, মৃদু হাসি, সুধা ভাষি প্রাণ-মন হরিল-সকল। চম্পক থামিল। স্বর্ণ সুধাইল, কি করিলে দিদি অতঃপর ? - কি করিব ? আত্মহারা খুজিলাম আপনারে দিগদিগন্ত।
মণিপুর ১৭ ইন্দ্রজিত ইন্দ্রসম দূর-নভ-সিংহাসনে সগৌরবে বসিয়া রহিল। আমি চকোরিণী গৃহ-পিঞ্জরে ছটফটি, জ্যোৎস্নালােকপরশ নহিল । বিবাহ-মরণ-জালে জড়াইয়া বেঁধে দিল যথাকালে সবে। বিধি সকরুণ অতি অচিরাৎ জাল ছিড়ি বিধবার ভাবের বৈভবে মুক্তি দিয়া দিল আমা। আমি নিতি নিদারুণ নিরাশার সায়রে সাতারি। উজ্জল আশার কুলে উঠিলাম অবশেষে সে কাহিনী বর্ণিতে না পারি অই যে অঙ্গুরী দুটি, যেন দুটি ভুজঙ্গিনী, প্রতি অঙ্গে মাের দংশন করিত ঘন উগারিয়া কি গরল সঞ্চারিয়া যন্ত্রণা ঘাের । কভু যেন প্রাণসখী সােহগের সমাদরসুধাদানে তুষিত আমায়। কতই আশার বাণী ভাষিত সে কানে কানে বিমােহিয়া মধুর মায়ায়। কভু যেন দুটি তারা দূরাকাশ হতে আমা আভানিত এসে। জ্যোতিহারা গতিহারা পারে নাই পুন যেতে ফিরি নভােদেশে । কখনও পরি নি ক। নিজ করে পরাইয়া দিল না সে কভু। পরি নাই তাই বউ। কি জানি কি খেয়ালে সে অবশেষে পরিলাম তবু। পরিয়াই মনে হল প্রাণিসম প্রিয়জনে অন্য অঙ্গুরীয় পরাইতে হবে, কই প্রাণসম প্রিয় মাের—চিনি নি আজিও। চিনিয়াছি স্বর্ণলতা। প্রাণগােবিন্দের প্রিয়া। মাের প্রিয়জন প্রাণসম সুনিশ্চয়। তাই তােমা পরাই। শুনাইনু রহস্য গােপন ।
দিব্যাগ স্বর্ণলতা নিবেদিল ধীরে ধীরে, তুমি দিদি কৃষ্ণপ্রেমবতী। তবে কেন—আমি অতি জ্ঞানহীন কি বুঝিব চিত্ত তব সুগহন অতি। তবু পুছি—ইন্দ্রজিতে আজো তুমি ভালবাস? কৃষ্ণে নহে প্রাণ? ঈষৎ হাসিল বালা। নাকি আধা একজনে। আধা আনে করিয়াছ দান। চম্পক হাসিল খুব। বীণা ঝঙ্কারিল যেন। পরিমুক্ত হাসি। হভরা। ভাবভরা। দ্বন্দ্বসংশয়হীন। জ্যোৎস্না-স্রোতে গেল যেন ভাসি। কহিল, তা নয় বউ, দুই জন নহে প্রিয়। নহে তত্ত্ব দুটি। ভালবাসি একই জনে। দুই রূপ মিলি গিয়া এক হয়ে উঠিয়াছে ফুটি। ভূপতির প্রতিমা যে রাজে মোর হিয় মাঝে, তারি হিয়াখানি উদঘাটিয়া আসিয়াছে শ্যামরূপখানি মাের কি মন্ত্রে কি জানি ! জানি, জানি, শ্যামমন্ত্রে। লেখা যে লো প্রেমতন্ত্রে। যাহা নে পড়ে তাহা শ্যামরূপ ফুরে। কি বুঝিব দূরে দূরে। দেখিতেছি আপনারি ঘরে। গৌরবরণ মম ইন্দ্রজিত নিরুপম। কি ছলে বা শ্যামরূপ ধরে। শ্যামসুন্দর শ্যাম প্রাণাধিক অভিরাম গৌর-ভূপরূপে মন হরে। স্বর্ণর অন্তরতলে ঝঞ্চা সঞ্চরিতেছিল। এখন বিজলী বিক্ষুরিল ঘন ঘন। কি আনন্দবেদনার জালাজ্যোতি উঠিল উজলি।
মণিপুর
উপজিল কম্প অঙ্গে। কি রােমাঞ্চ তারি সনে। নয়নে নিঝর।
চম্পক প্রণয়ভরে টানি বক্ষামাঝে নিল সঙ্গিনীকে, পুলক অন্তর।
ভাবিল সে ভক্তিমতী, কৃষ্ণপদে রতিমতি চিরদিন ওর।
তাই কৃষ্ণপ্রেমকথা শুনি বালা আকুলিতা বিভলবিভাের।
সত্য কথা। কিন্তু ইহা সবখানি সত্য নহে। অতি সঙ্গোপন
আরাে কিছু আছে তাহা চম্পকের কল্পনারাে সমতীত সুদূর স্বপন।
তটিনী ঝটিকাক্ষুব্ধ চিত্ততলে প্রবাহিল। স্বর্ণলতা অভিভূতা অতি ।
আকুল হইয়া কঁাদে সান্ত্বনা মানে না ত। চম্পলতা বিস্ময়বতী।
স্বর্ণর হৃদয়মাঝে অনাহত ধ্বনি বাজে। কে রােধিবে তাহা।
ভালবাসি। ইন্দ্রজিতে। আমিও যে ভালবাসি। ভালবাসি আহা!
তাের চেয়ে শতগুণে। সে কথা কি বুঝিবি লাে ! আমি অভাগিনী।
ইন্দ্রজিত বিনা আর বিশ্বে কিছু জানি না যে। কৃষ্ণ নাহি চিনি।
পরম ঈশ্বর কৃষ্ণ ভগবান্ সবি মাের ইন্দ্রজিত রায়।
ইন্দ্রজিত বিনা আর কৃষ্ণ ভগবান নাই এ মুগ্ধ হিয়ায়।
স্বর্ণর হৃদয় ব্যাপি ধ্বনিময়ী বেদনার অস্ফুট লহরী
চলিল এমনি সুরে দেহমন সুরসুধাস্রোতােময় করি।
আকাশে জ্যোৎস্নাবান। কচিৎ করুণ তান কণ্ঠে পাপিয়ার।
ফুলগন্ধে মাতােয়ারা সমীরণ দিশাহারা। সবি প্রীতিমাধুরী অপার।
স্বর্ণলতা ধীরে ধীরে উপশান্ত হয়ে ফিরে স্বভাবে আপন
আসিলে চম্পকলতা ভাবশ্রোতঃসতা, নিজ প্রাণমন
দিব্যরাগ সেহে স্বর্ণর সনে মিলাইয়া জিজ্ঞাসিল, লুকাস না বােন, অন্তরের তলে তাের আছে মহামণি কোনাে গহন গােপন। আমায় দেখাবি তাই। তাের কোনাে ভয় নাই। মােরা একপ্রাণ। কিছু যদি স্বতন্তর থাকে আজো পরস্পর হয়ে যাক প্রীতি-প্রতিদান। স্বর্ণ প্রাণসখী তুই। রুদ্ধদ্বার যত প্রাণে তাের কাছে সবি খুলিয়াছি। তুই কি লাে লুকাইবি রসে রূপে গেঁথেছিস যেই মনফুল-মালাগাছি। তবে আর আসিব না। আর ভালবাসিব না। হাসিব না স্নেহে। আছিনু যেমন আগে আপনারি অনুরাগে, নিবসিব নিরজনে গেহে। উন্নমিয়া গ্রীবাখানি স্বর্ণলতা চম্পকের মুখপানে চাহি, কহিল, আমরা দিদি, সত্যি এক মনপ্রাণ। বিভেদ নাহি। প্রাণাধিদেবতা মাের ইন্দ্রজিতনারায়ণ। চম্পকলতা চমকি উঠিল শুনি! কি আশ্চর্য! চিন্তাতীত স্বপ্নাতীত কথা ! নিয়তির একি রঙ্গ! নৰ্ম্মপ্রহেলিকা রম্য ! স্বর্ণ! প্রাণসখি । সত্যি কথা ? ইন্দ্রজিত মমনসিজ তাের? নাকি শুধু স্বপ্ন অবলােকি ? শুধু স্বপ্ন এ জীবনে। স্বর্ণলতা উত্তরিল সত্য হতে সত্য শত তবু। তনুমন এ জীবন হতে সত্য কোটি গুণে-ইন্দ্রজিত প্রিয় প্রাণ প্রভু। অনন্ত ভুবনমাঝে ইন্দ্রজিত বিনা মাের কাম্য নাহি আর। সকল ইন্দ্রিয়মনে সুগােপন হিয়া মাঝে ইন্দ্রজিত করিছে বিহার। চম্পক বিস্মিত অতি মুগ্ধঅভিভূতমতি। কি কহিবে? অবশ অন্তর।
মণিপুর ৭১ অবশে আসিলে চিত্ত চম্প জিজ্ঞাসিল, বউ, শুনি অতি বিস্ময়কর। স্বপনে কি হেরি তাকে—না দিদি, করুণা করি সাক্ষাৎ দর্শন দান করি দুখিনীরে গিয়াছেন এ জীবন প্রাণমন করিয়া হরণ ! কোথায় কিরূপে বউ? নদীয়ায়। মণিপুরে। স্বপ্নসম। আকস্মিক অতি। নিত্য জীবনের মাের সত্যসূৰ্য্য প্রকাশিয়া গিয়াছেন কি নির্মমমতি। নির্মমতা নহে বউ, প্রীতিকরুণার নিধি অতিশয় তিনি। সেই করুণার বশে এই রাগ প্রাণে তাের। আমি তারে চিনি। সমুন্নত সমুজ্জ্বল চিত্তখানি হেরি তাের হেরি অনুরাগ, ধন্য আমি। ভাগ্যবতী সত্য তুই। বাঞ্জি তাের কণাগ্যভাগ । কিন্তু স্বামী ? স্বর্ণলতা চারুদিব্যহাসি হাসি সম্ভাষিল তবে। দিদি তুমি প্রেমময়ী। প্রেমতত্ত্ব জান সব। এইবার পরীক্ষা যে হবে। কিন্তু স্বামী ! এ সমস্যা সরস্বতী তুমি বিনা করে সমাধান ত্রিভুবন হেন সাধ্য জানি আমি নাহি কারাে। জ্ঞানােজ্জল তব মনপ্রাণ। চম্পক কহিল শুনি। অতি সুনিপুণা তুমি। রসকলাবতী। পরকীয়া পীরিতির পথে চলি সতীধৰ্ম্ম রাখিতেছ সতী। কিরূপে? সুধাল স্বর্ণ। চম্প কহে, সুচতুরা তুমি ভিন্ন আর দুনিয়ায় নাহি কেহ ভাবিয়াছ! তথ্য তব সাধ্য নাহি কারাে বুঝিবার। কেহ কেহ জানে কিছু। রসরসায়নযােগযােগিনী তুমি লল।
৭২
দিব্যৱাগ
অখকৈরসরূপে নিমিয়া তুলিয়াছ দ্বিধাদ্বন্দ্ব যত কিছু ছিল।
ইন্দ্রজিতে স্বামিসনে ভিন্ন করি রাখ নাই। অই স্বামিমাঝে
সাক্ষাৎ স্বরূপ তুমি পাইয়াছ। ইন্দ্রজিত সুগােপনে বাজে।
বুঝিনু রহস্য তব। চারুরযাত্রা অই কোন দিব্যরসের ত্রিদিরে
সমুন্নীত করি নিয়া রসস্বপ্ন সত্যরাসমঞ্চে সমাপিবে ?
কিছুই জানি না দিদি। স্বর্ণলতা নিবেদিল, ভূতভবিষ্যৎ
জানে মাের ইন্দ্রজিত। তারি স্মৃতিশাসনের বশে মাের জীবনজগৎ।
মরণ অমৃত মাের, সুখদুঃখশুভাশুভ সবি অই মণিপুরভূপ।
নাহি অন্য চিন্তা চিতে, নিরন্তর সুনিভৃতে ধ্যানদৃষ্টি খুলি দেখি রূপ।
রূপান্তর দেখি আমি, চম্প সম্ভাষিল তবে, আজি উঠি
অর্ধরাতি গতপ্রায়। বিশ্বময়ী জোছনায় ভাসিতেছে তাের প্রেমমধু।
বধূ।
কহিয়া চম্পকল গৃহে গেল। আঁখিপুটে নাহি নিদ্রালেশ।
সমস্ত রজনী প্রাণে অকারণ আকুলতা। অনুভবে প্রমাভিনিবেশ।
কোন পূৰ্বজনমের মনােরমা সহচরী সমপ্রাণমনা।
বন্দিনী কুরঙ্গী দুটি কার প্রেমমায়াজালে ছিনু মােরা--অভিন্ন কামনা।
কেবা ইন্দ্রজিত অই ! কিবা ইন্দ্রজাল জানে? মণিপুরপতি ?
নাকি ছদ্মবেশী কোনাে দেবতা এ? ভাবরঙ্গ সুগহন অতি।
দুটি অঙ্গুরীয় আম দিয়াছিল কি কারণ? স্বর্ণর হৃদয়
মােহিল এমন করি পুনরায় অই স্বপ্ন ! সকলি বিস্ময়।
?
মণিপুর ৭৩ আমারি অঙ্গুরী ওর অঙ্গুলীতে পরাইল! কি মনােজ্ঞ ছল। ওরে আনি মাের সনে মিলাইল এত দুরে সঞ্চারিয়া প্রীতি নিরমল । মায়াবী সকলি জানে। আমরা কি ওরি প্রাণে যুগলকিরণ ? সংসার-বঞ্চনা একি ওরি হাসিরঙ্গ শুধু? নিশ্চয় কি অমৃতমিলন। প্রাণাধিক, তাই যেন সত্য হয় প্রেমে তব! হে প্রেমস্বরূপ ! কিংকরীর আকাঙ্ক্ষা কি পূরিবে না? তুমিই কি নহ এই ইন্দ্রজিত- ভূপ ? ইন্দ্রজিতে আবির্ভূত হয়ে এস। প্রিয়তম, অন্তহীন রূপ তব জানি। তুমি যদি নাহি হও, ইন্দ্রজিত মরীচিকা। শুধু ছায়া। শুধু মিছ ভানই। বাহিরের, অন্তরেরও বায়ুপরিবর্তনহেতু বাবু বিনয়েন্দ্র সেন সিন্ধুতীরে নীলাচলে নিবসিতে কিছুদিন বাঞ্ছা করিলেন। পিতার ভ্রমণে পরবাসে চিরসঙ্গিনী কন্যা কৌতুকিনী। শুধু কৌতুকে নহে। জনকের সেহেতু সমুৎসুকী কন্যা চিরদিনি। শ্রীক্ষেত্রে পরমপুণ্যধামে যদি কিছুদিন নিবাস সম্ভবে জনক-জননী সনে। সে সৌভাগ্য পরিহরি গৃহে চম্প কি আশায় রবে ? অতি বলবতী আশা এবে তার স্বর্ণলতা। সঙ্গসুধা তার চম্প বাঞ্ছা করে সদা। স্বর্ণলতা জীবনের যেন সারাৎসার।
৪
দিব্যােগ
}
কিন্তু নিরুপায় বালা। স্বর্ণ শুনি বিদায়ের আসন্নতা কাদিয়া আকুল ।
চম্পকেরও আঁখি হতে স্নেহ-অশ্রু উৎসারিয়া ভাসাইল সংকল্পের কুল।
হৃদয়বেদনাবন্ধে সংসারের গতিরােধ কভু নাহি ঘটে।
অচিরে চম্পকলতা তীর্থবাস আরভিল নীলসিন্ধুতটে।
স্বর্ণর সুবর্ণ স্বপ্ন চম্প দেখে অনুক্ষণি। জগন্নাথ-সনে
যেন তার রশ্মিগাঁথা। ইন্দ্রজিত-পুনঃপুন ভাসে সেই স্মৃতির কিরণে।
একদা সায়াহ্নকালে সুপ্রসন্ন আষাঢ়ের বারিধারে ভিজি এল ফিরে
কোন দূর গ্রাম হতে। খাইল না। শয্যাশ্রয় নিল গিয়া কেন
ধীরে ধীরে
দাও না কম্বলখানা! উহু! একি ভয়ানক শীত! সহে না যে !
মরিতে যাব না আর! সংসারের ব্যাটে। এ জঞ্জালে কাজে।
ভাের ভয়ানক জ্বর। সান্নিপাত লক্ষণ। বিকারসূচনা।
তাপে বিনিবৃত্তি নাই। ব্যর্থ চিকিৎসার জ্ঞানবুদ্ধিবিবেচনা।
শিরে তুষারের বারি,তপ্ত হয়ে উঠে ক্ষণে। অপূর্ব সুন্দর
তত্ত্বকথা নানারূপ পুনঃপুন মুখ হতে ফোটে নিরন্তর।
সপ্তম দিবসে জ্বর সপ্নোত্তর শতমাত্রা। পরদিন ভােরে
সুপ্রসন্ন কৃষ্ণনাম সঙরিয়া যাত্রা করি গেল চলি। বিভীষিকা ঘােরে
রাখি স্বর্ণলতিকায়। মহাদুঃখস্বপ্ন প্রায় যেন সে ব্যাপার!
মৃত্যু যেন গৃহখানি মগ্ন করি দিল আনি রাশি রাশি সান্দ্র অন্ধকার।
মণিপুর
৭৫
F
পিতা পরমেশবাবু আসিলেন। দুহিতার দুঃখ অনুভবি
অতি 'বিচলিত তিনি। দুরদৃষ্টিশক্তিবশে সম্ভবিল সবি।
কার সাধ্য নিবারিবে ? শ্রাদ্ধাদির আবশ্যক কাজ সমাপিয়া,
জনগণের করে সংসার সমর্পিয়া গৃহপানে দুহিতাকে নিয়া
চলিলেন পরমেশবাবু। শুধু দুহিতার সদ্য শােক সান্ত্বনার তরে।
স্বর্ণলতা দিনকত বহি সেথা ফিরি এল ক্ষুন্নপ্রাণে পুন শূন্যঘরে।
পিতৃগৃহে কিছুতেই চিত্ত বসিল না আর। নাহি.সাত্বনা।
চম্পাপুরে কি আছে ?—তবু যেন শান্তি কি ? স্বর্ণ উন্মনা ।
তবু ত স্বামীর গৃহ! আনন্দের স্মৃতিকিছু—নাকি কোনাে অবিজ্ঞাত
আশা
নারীধৰ্ম্ম ? সতীব্ৰত ? অনিশ্চিত কিবা ভাবপ্রেরণায় দ্রুত ফিরে
আসা।
স্বামীর অভাবমাত্রে স্বামিগৃহ পরিহরি যেতে যেন প্রাণ
কিছুতেই চাহিল না। নির্মমতা নহে কি তা? কি জানি বা কি
ভাবনা আন।
স্বামীর প্রয়াণ এই অকস্মাৎ ঝঙ্কায় স্বর্ণলতিকার
জীবনের তরীখানি ছিন্ন ভিন্ন করি দিল স্রোতপথে চরবালুকার।
সংসার-সংস্কার ছিল না ত কোনাে দিনও বালিকার প্রাণে।
মনােবিমানের পথে দীপ্তভাবনার রথে চলে বালা সুদূরের পানে।
অই স্বামী, আর তারি অনুসঙ্গে সুখশান্তি দরদ্বার বসনভূষণ,
৭৬ দিব্যােগ স্বর্ণর হৃদয়ে কভু ভাবরাজ্য রছে নাই সঞ্চারিয়া কোনাে আকর্ষণ। সত্য কথা যদি কহি স্বামিশােক বলি কিছু স্বৰ্ণর অমল অন্তরে অনুভবে আসিল না। সুবিহ্বলা নহে বালা বিরহের বেদনার ভয়ে। স্বামীর নির্মল মুখচ্ছবিখানি স্মৃতিপটে ফুটি করুণায় বালিকার প্রাণখানি পুনঃপুন ভূরি দেয় কি যেন মায়ায় ! স্নেহমমতার নহে। কোনাে দিন যদি কোনাে কুমারী স্বপনে স্বামিসঙ্গসুখমাঝে আপনাকে প্রতিষ্ঠিতা দেখে প্রীত মনে, প্রভাতে সে স্বপ্নভঙ্গে সেই স্বামিসুখস্মৃতি অনুভব করে যে ভাবভারনা দিয়া, স্বর্ণ কথঞ্চিৎ তাই করে অন্তরে। শতলক্ষ প্রাণ তুচ্ছ যার সনে তুলনায়, প্রাণের বল্লভ, স্বামী দেবতা যে তার। প্রিয়তম নিরুপম। চিত্তে চিরসুখসমুৎসব। তাহারি সন্ধানে বালা বাহিরিয়া আসিয়াছে পিতৃগৃহ হতে। যাইতে পারে না পুন ফিরি সেই গৃহপানে বিপরীত ভাবনার স্রোতে। চম্পাপুরে গৃহখানি পান্থাবাস। কান্ত কৃপা করি তার প্রতি রেখেছেন নিরমিয়া। একান্ত যে প্রিয় তার। প্রবাসের আশ্রয় সম্প্রতি। যদি কোনােদিন সখা এই পথে চলে যেতে দেয় দরশন। ভূপতি অতিথি হয়ে আসে যদি দরিদ্রার পর্ণগৃহে করুণা মন। দুখিনী প্রতীক্ষা করি থাকিবে না চিরদিন ? চাহি পথপানে ? চমকিয়া উঠিবে না প্রতি পথিকের পদধ্বনি শুনি দিবানিশি কানে।
মণিপুর
৭৭
দৃঢ়ব্রতচারিণী সে স্বর্ণলতা অনুক্ষণ শান্ত ধীর মনে
সংসারের কাজ করে শ্রদ্ধা করি অতন্দ্রিতা ভাবের স্বপনে।
পুনঃপুন সম্মার্জিয়া বহিরভ্যন্তর সব পর্ণগৃহখানি
স্বর্ণ সুনির্মল রাখে। সদা সদ্য শুদ্ধভাবে পূতদেবমন্দির মানি।
রাধারমণসেবা স্থাপিয়াছে স্বর্ণলতা স্বামীর সহায়ে।
সেবার সকল দ্রব্য সুসজ্জিত সমুজ্জ্বল রাখে-সেবা আনন্দবহা এ।
স্বর্ণলতা বােঝে প্রাণে। পুষ্প অবচয়ি আনে নিতি নিজ করে।
আসন সলিল শঙ্খ, সুরভিচন্দনপঙ্ক আয়ােজন করে প্রতিভরে।
প্রসঙ্কর সর্বজ্যেষ্ঠা সহােদর পুত্ৰসনে সংসারে এবে
নিবসিছে। সরিকেরা আছে, তবু বধূ একা। নানা কথা ভেবে।
জমিজমা সােনারূপা টাকাকড়ি তামাকাসা যা কিছু ভ্রাতার
আছে বধূ জানে কি ? গুছাইয়া বুঝাইয়া তার অধিকার
তাকে দিতে চান দিদি। পুত্র শ্যামাপদ তারাে বাসনা তাহাই।
স্বর্ণ কহিল সে, দিদি, এ সংসার তােমাদেরি। সঞ্চিত কিছুই ত নাই।
তবু ভিটা বাড়ী জমি যৎকিঞ্চিৎ সােনারূপা কাসা কি পিতল,
যাই হােক মাের নহে। দেখি শুনি বুঝি নিক শ্যামা এ সকল।
আবশ্যক যদি হয়, দলিলাদি লিখাইয়া দিব অচিরাৎ।
আমি কিছু চাহি নাকো কোনােরূপে করিব এ জীবনাতিপাদ্য
একবেলা দুটি অন্ন দিও দিদি দয়া করি পুরাতন বাস।
যখন যা হয় দিও। পরিতুষ্ট রব আমি। এ জীবনে অইটুকু আশ ।
-
দিব্যরাগ
ভাবনাবন্ধন এক শাশুড়ী ও সুদুঃসহ পুত্ৰশােকভার
নামাইয়া পুণ্য লােকে চলিলেন-একা আমি। করণীয় কি আছে
আমার ।
5
.
শ্রীরাধারমণচিত্রপটখানি চারুবর্ণ স্বৰ্ণর নয়নে
রমণীয় বৃন্দাবনরসরাজ্য সমুদভাসে স্বপ্নে জাগরণে।
কুসুমচন্দন ধূপদীপ দিয়া ভক্তিভরে যুগলমূতি
স্বর্ণ সমর্চনা করে হৃদ্পদ্মাসনে সেকি নিবেদিয়া অনুরাগ রতি।
ধ্যানাচিন্তন করে ক্লান্তিহীন। আপনাকে কোন বৃন্দাবনে
সমাসীনা দেখে বালা সুনিশ্চয় হয়ত বা নাহি জানে মনে।
রাধারমণের পাছে দুইখানি চিত্র শােভে বেণ লতা দিয়া
বাধাঁ বেড়া, গায়ে তারি, স্বর্ণ নিজে রাখিয়াছে মনােবিননাদিয়া।
দক্ষিণে শ্রীগুরুদেব। বামে বিরাজিছে ইন্দ্রজিতনারায়ণ।
চম্পকলতার পিতা করিয়াছিলেন দান প্রসন্নকে প্রতিস্নিগ্ধমন
অই রাজমূর্তিখানি মণিপুর হতে আনি প্রবাসের স্মৃতি।
স্বর্ণর স্মরণসুধাসম্পূটিকা এবে উহা সুবিচিত্র ভাবের বিধৃতি।
অই চিত্রে চম্পলতা প্রাণসমা সখী তার আছে সঙ্গোপনে,
মণিপুরসুখস্বৰ্গশ্বতিশােভা প্রভাসিছে অই চিত্ৰসনে।
জীবনমরণমায়া অন্তহীন প্রেমজ্যোতি অনির্বাণ জ্বালা
লেখা অই আলেখ্যে যে, নহে অলক্ষিত আহা অই স্বর্ণাক্ষরবর্ণমালা
প
মণিপুর
৭১
স্বর্ণ কৃষ্ণার্চনা করে। প্রাণবিমানের পটে কৃষ্ণবর্ণ কই!
কোথা শিখিপুচ্ছশােভা বৈজয়ন্তীমনােলােভা সুবঙ্কিমঠাম বিশ্বজয়ী
গৌরকিশােরকান্তি শুধু জ্বালা শান্তি স্বর্ণর নয়নে।
রাজবেশ মনােহর মনােমােদপুষ্পশর মুগ্ধ প্রাণে মনে।
স্বামী, শ্যামসুন্দর, সবি রস-আকর্ষণে অবিরত আপনার মাঝে
ইন্দ্রজিত মিলাইছে। কি কৌশলে বিলাইছে ? আত্মসাৎ করি
পুন রাজে।
শুভসুন্দর যত প্রিয়ফুল্ল রমণীয় মনােরম নয়নরঞ্জন
ইন্দ্রজিতরূপে লীন হইতেছে প্রতিদিন—কি.সে মন্ত্র বিভেদভঞ্জন।
দেশকাল পদার্থের স্থিতি নীতি নিশ্চিতি স্বর্ণর মন
কিছুই মানে না যেন। ভাবশক্তি উল্লজিছে পঞ্চভূতজ্ঞানসংষমন।
তুলসীবেদীর মুলে সন্ধ্যাদীপ দিতে জালি দেখে স্বর্ণলতা,
নিরজন রাজোদ্যান। কুঞ্জগৃহ। জলে দীপ। কে ও কহে কথা ?
যেন সে স্বর্ণর নাম ধরি করি আবাহন গেল চলি দূরে।
কি যেন উৎসবরব গুঞ্জনিয়া উঠে কোথা? যেন দূরে ! নাকি
অন্তঃপুরে
প্রভাতে দুয়ার খুলি আঙিনায় দাড়াতেই মনে হয় যেন
সন্ধ্যা সমতীত তবু আরতির দীপাবলি জালি নাই কেন?
উজ্জল নিশীথ রাতি। চমকিয়া উঠে বালা। দিবাদ্বিপ্রহরে
ঘুমাইয়া পড়িয়াছি! ছি! ছি । অনাহারী মাের অতিথি যে ঘরে!
.
দিব্যােগ
চলে গেছে আহা আহা! হৃদয়ের দ্বারে আসি ফিরে গেল হায়।
চির-আকাক্ষিতে মাের হারাই চিরতরে ! কি করি উপায় ?
ক্লান্তিভরে উপাধানে মাথা রাখি স্বপ্ন দেখে-নদীয়া নগর।
পরমানু রাধি আনি গৌরাঙ্গের ভােগ দিতে, গৌরাঙ্গসুন্দর
বালকের বেশে আসি বসি চারুসুখাসনে হাসি হাসি খান।
পুন দেখে স্বামী তার । রাজবেশ! অন্ন যাচে! সুপ্রসন্ন ! কি
লাবণ্যবান।
স্বর্ণ শতলক্ষবার ভাবে মণিপুর আর কত দূর হবে।
নহে সমুদ্রের পার। কিবা বাধা যাইবার ? যাব। যাব। কবে ?
চম্পকের সনে আমি যাব গিরিদুর্গমাঝে। নিমেষের তরে
দেখিব আননখানি। শুধু দেখা। কি দুরন্ত কামনা অন্তরে।
শুধু দেথা? ক্ষণতরে ? মন প্রবঞ্চনা করে আমা এনিশ্চয়।
ক্ষণতরে? শত শত যুগান্তর অবিরত দেখি তৃপ্ত নহিবে হৃদয়।
শুধু দেখা? মিছা কথা। আলিঙ্গনে বাঁধি তারে কোটিকল্প রাখি
দুরন্ত কামনা এই। শুধু দেখা ক্ষণতরে অন্তরের ফাকি।
মণিপুর যাওয়া বৃথা। মাের প্রাণমনােময় এই ইন্দ্রজিত,
এই দিব্যরূপরশ্মি নাহি আছে মণিপুরে। জানি সুনিশ্চিত।
মণিপুররাজ যদি আভানিয়া নিয়া যায় আমা ভালবাসি।.
প্রেয়সী মহিষী চিরমহীয়সী করি যদি রাখে পিয়াইয়া সুধারাশি,
মণিপুর ৮ প্রাণের পিপাসা মাের মিটিবে কি এক বিন্দু ? যুগান্তব্যাপিনী কামনার কাম্য যাহা, যার লাগি ভ্রাম্যমান দিগদিগন্তে দিবসমিনী এ দুর্দান্ত চিত্ত মাের-সেই নিধি ভূপতি কি দিবে আমা আনি? যেই রসরূপাকাঙ্ক্ষা প্রাণে মাের তুষিবে কি আমা সেই সম্পৎ প্রানি? ইন্দ্রজিতনারায়ণ, এ হৃদয়রাজ্যে মাের যিনি অধীশ্বর, মণিপুরনরপতি তিনি কি নহেন তবে? একি ভাবভ্রান্তি ভয়ঙ্কর। মণিপুর-নভপথে কেন প্রাণবিহঙ্গিনী মাের অনুক্ষণ উড়িয়া বেড়ায় তবু ? ভূতলের পানে নহে। অন্তরীক্ষে করে প্রতীক্ষণ। স্বর্ণলতা করে যাহা আহার সে নামমাত্র। জানে না কি খায়। পিপাসায় পান করে পুনঃপুন শুধু বারি তৃষ্ণা নাহি যায় । রজনীর তিনভাগ যায় তার জাগরণে, স্বপ্নে অবশেষ। জাগরণ স্বপ্নপ্রায়। স্বপ্নে দেখে চিন্তাতীত অপরূপরূপসমাবেশ। প্রাণে যেন অলক্ষিতে সঞ্চরিছে সুখরাশি। মিথ্যাশােকদুঃখবেদনায় নিষ্পেষিত যেন তাহা। দূরসুধাস্বাদ তারি আসে যেন মুগ্ধ চেতনায়। কি যেন কি ভয়ঙ্কর ভ্রমে ভ্রমিতেছে বালা। প্রেমামৃতরাশি, সহস্ৰ সৌন্দৰ্যশােভা, সৌরভ সুমধুর কালস্রোতে যাইতেছে ভাসি। প্রিয়তম আসিবে যে! না কি আসি চলি গেল ! আসিবে না বুঝি ? পথ ভুলি ঘুরিতেছে কোন্ বনে? হায় আমি দেখি গিয়া খুজি। মাথা ধরে। সর্দি হয়। কাশে কভু। ব্যথা অতি নিদারুণ বুকে।
২
দিব্যােগ
কোনাে দিন জ্বর হয়। ছাড়ে কি না ভাবে না তা। বিচলিত নহে
দেহদুখে।
কাজ করে ক্লান্তিহীনা। শ্রান্তিভরে সারাদিন শুয়ে কভু থাকে।
দুটি অন্ন ভােগ দিয়া মুখে দেয়, শ্যামাপদ যদি আসি ডাকে।
ক্ষীণকায়া দিন দিন ছায়া যেন ভাসি চলে সমীরণ পরে।
সুরম্যস্বপনমাঝে রহে অবিরত বালা ভাবাবেশভরে।
পিতা বার দুই তিন আসিলেন নিয়ে যেতে কল্যাণপুরে।
স্বর্ণ কহিল যে, বাবা, ঘর দ্বার ছাড়ি যাওয়া ঘটিবে না আর
অত দূরে।
জননী আপনি আসি দেখিলেন স্বর্ণলতা শীর্ণ তনুখানি।
গেলেন ফিরিয়া গৃহে অশ্রুধারে ভাসি, কন্যা শুনিল না আমন্ত্রণবাণী ।
চম্পকলতার পত্র পুন পুন আসিতেছে। কত স্নেহভরা।
পুরীতে আসিবে বউ, চেয়ে আছি পথপানে আকুল অন্তরা।
তােমাকে দেখিতে ব্যগ্র জগন্নাথ প্রভু মাের। এস ত্বরা করি।
দুঃখ তাপ যাবে দূরে। এ পরমানন্দপুরে। গৌরাঙ্গের লীলাকথা স্মরি।
টাকা এল খরচের। তবু স্বর্ণ গেল নাকো। লিখিল উত্তরে।
আমায় ক্ষমিও দিদি। আপাতত যাইব না। পারি যদি কিছু দিন
পরে।
ইতিমধ্যে যদি তুমি মাের নীলাচলনাথে পায়ে ধরি দাও পাঠাইয়া,
দরশনে পরশনে ধন্য হই হরষণে পূজা করি হৃৎপদ্ম দিয়া।
মণিপুর
নববর্ষা আসিয়াছে। নবনীলঘন মেঘ আকাশে আকাশে।
কামিনীকদম্বকুঞ্জ পুলকিত আলােকিত পুঞ্জ পুঞ্জ কুসুমবিকাশে।
অবিরাম বৃষ্টিবারিঅভিষেকে বনরাজি নবঘনশ্যামলপল্লবে
শােভিতেছে। বন্যা জলে বসুন্ধরা প্লাবিয়াছে। মঙুকেরা
মত্ত কলরবে।
কি মঞ্জু ময়ূর আহা কোথা হতে উড়ি আসি দেবদারুশাখা
বসিল রঞ্জিত করি। রম্যরাগপুচ্ছপুঞ্জ শত শত চারুচন্দ্র-আঁকা!
স্বর্ণলতা দ্বারে বসি দেখিল তা। পুলকিত আকুলিত প্রাণে।
কিবা মনােবিমােহন ইন্দ্রজাল সঞ্চারিল শিখী তা কে জানে!
বরষার রূপভাববিলাসের যত শােভা সৌন্দৰ্য্য মাধুরী,
ঘননীলকণ্ঠ পাখী কি কৌশলে আনিয়াছে করি সব চুরি ।
বরষাবিগ্রহ ও কি ? কি দেখিয়া অকস্মাৎ পুচ্ছরাশি খুলি
পল্লবিত শাখে হর্ষসুখে শিখী নৃত্য করে মৃদু দুলি দুলি !
ও কি মনােরমা মায়া ? স্বর্ণলতা নিরখিয়া হর্ষচঞ্চলিতা।
আনন্দ কি দৃশ্যমান করে মধুমূৰ্ত্তি দান চারু বর্ণে করি উচ্ছলিতা ।
সহসা সুচারু পক্ষ বিস্তারিয়া কোন্ বনে উড়ে গেল পাখী।
স্বর্ণলতিকার মনে বর্ষামাধুরীর মােদমন্ত্রখানি রাখি।
বুঝি ও বিহঙ্গদূত প্রিয়প্রণােদিত হয়ে আমা আবাহন
করি দ্রুত গেল চলি। মােহমায়ারঙ্গে ছলি মাের প্রাণমন।
সুমদিরভাবমমাহে অভিভূতা স্বর্ণলতা। রসহর্ষ একি!
৪
দিব্যােগ
দিকে দিকে মেঘ মালা। মেঘে মেঘে ইন্দ্রধনু! একি দৃশ্য দেখি ?
নীলমেঘবিনিন্দিত নীলতনু ফুল্লারুণ বিজলী রেখায়
স্নিগ্ধমেঘপটে ফুটি উঠি উঠি যায় টুটি অনঙ্গলেখায়।
কি নীল কুঞ্চিত কেশ, তদুপরি সন্নিবেশ করিয়াছে কিবা
ইন্দুলেখাবিলিখিত শিখিপুচ্ছবিনিহিত মেঘস্তরে ইন্দ্রধনু-নিভা!
দিগদিগন্তে ঘুরিতেছে বিশ্ব পরিপূরিতেছে রূপবর্ণরাগে।
চমৎকার স্বপ্নসম ! রসােচ্ছল অনুপম নিরন্তর অন্তরীক্ষে জাগে।
সুনীলাঙ্গ কে গাে অই ! ইন্দ্রজিত! সুকুমার গৌরবরণ
লুকাইল কিবা ছলে ! শিখিপুচ্ছ পরে আহা! কেন কি কারণ?
শ্যামনগরের ছাদে আপনাকে রচিয়াছে নূতন করিয়া
রাজা তুমি। রাখালের রূপরঙ্গে লালায়িত কেন তব হিয়া ?
স্নিগ্ধ অভ্রজাল ধীরে দ্বিপ্রহরে মিলাইল। হাসিল তপন।
স্বর্ণলতা ক্লান্তপ্রাণ। মদালসা। গৃহে পশি করিল শয়ন।
সহসা কে যেন আসি আধস্বপ্ন ভাঙি তার কহিল, এস না!
গাড়ী দাড়াইয়া দ্বারে। উঠে এস। স্বপ্নস্রোতে মিছা এ ভেস না।
মণিপুর হতে দূত আসিয়াছে নিতে তােমা। চল ত্বরা করি।
স্বর্ণলতা কি উল্লাসে যানে আয়ােহিল গিয়া সব শঙ্কায় পরিহরি।
কি সুরম্য রাজপথ। দুই দিকে সারি সারি শিরীষ সুন্দর।
দেবদারু মাঝে মাঝে, অশােকের সাথে রাজে, পুষ্প নিরন্তর।
মখিপুর ৫ প্রতি তরু লতাজালে, প্রতি লতা ফুলমালে, প্রতি ফুল সুবর্ণে মণ্ডিত, বর্ণে বর্ণে অনুরাগে কি রসবিলাস জাগে, ভাবব রাগানুরঞ্জিত। বিহঙ্গ বিলাসরলে উড়ি যায় আসে, সঙ্গে স্বর্ণ প্রজাপতি। রূপের অন্তপথে রাগােজ্জল মনােরথে দিব্যমণিপুর পানে গতি। যেন হিন্দোলায় দুলি চারু মীনধ্বজ তুলি সুমনােজ্ঞ যানে স্বর্ণলতা চলিতেছে। ভাববর্ণে অলিতেছে বিদ্যোতিত প্রণে। নীলগিরিরাজি শেষে বিভাসিল এসেছে সে মণিপুরে তবে? সহসা পাষাণগায়ে রথগতি ভঙ্গ হায় এ! কি সংঘর্ষ হর্ষ অনুভবে। একি! একি ! চম্পাপুর! স্বামিগৃহ। সন্ধ্যাবেলা রবি অস্ত যায়। ননদ ভগিনীসমা। করে দুগ্ধ একবাটী। চোখে অশ্রু। করুণা হিয়ায়। এ বেলা কেমন বউ ? খুব ভাল। চিন্তা নাহি। কেন ভাব দিদি ? সম্ভাষিল স্বর্ণলতা। দেহ মন ফুল্ল সুস্থ করি আমা দিয়াছেন বিধি। রজনী প্রহর প্রায়। স্বর্ণলতা তন্দ্রাহীনা। আনন্দচঞ্চলা । দূরে দূরে কি সঙ্গীত ! নাচে ওকি রূপসীরা উছল-অঞ্চলা। তােরা দিদি ঘুমাবি না? সারা রাতি বেণু বীণা বাজাইবি বসি ? প্রতিবাসিনীরা ঘরে। পুলকিত অন্তরে কহিল সে স্বর্ণ উপহসি। পূর্ণিমাযামিনী আজি। তাের। এসেছিস সাজি নব নব বেশে। আজি কি ঝুলনশেষ ? সরসিয়া সারা দেশ রাধাশ্যাম দ্বায় হেসে হেসে।
৬ দিব্যােগ মামীমা ঘুমাও এবে, শ্যামাপদ সম্ভাষিল। আচ্ছা বাবা, তােমরা এখন শুতে যাও সকলেই। স্বর্ণলতা এত কহি নীরবিল ভাবমগ্ন মন। কত বন উপবন ফুলফুলসুশােভন, শাখে শাখে ফল। লতাবীথী শত শত। গিরিগাত্রে প্রতিহত উৎস সমুচ্ছল। তড়াগে পরাগভরা কমলিনী মনােহরা। আসিছে সৌরভ। তীরে কুরঙ্গিণীগণ চরে করি বিচরণ, শ্যামাশুক করে কলরব। বনকুঞ্জে স্বর্ণলতা নবপর্ণশয্যাগতা করিল শয়ন। স্বপন করিল ভঙ্গ কাহার পরশরঙ্গ? স্বর্ণলতা মেলিল নয়ন। আহা আহা! প্রাণাধিক ইন্দ্রজিত এ যে মাের। মণিপুররাজ । আসিয়াছি মণিপুরে এত দূর ঘুরে ঘুরে ! কি সৌভাগ্য আজ। অরুণ বসন পরি গৃহখানি আলাে করি করুণ আলােকে। চন্দনতিলক ভালে। ঝলকিছে রশ্মিজালে ! মণিপুর- প্রকৃতিপালক এ। মাণিকমুকুট শিরে সমুজ্জ্বল, খুলি ধীরে রাখিল শিয়রে । হৃদয়ে যুথিকাহার সুনির্মল সুকুমার! কঁপে প্রাণস্পন্দনের ভরে। নিবিড়ানুরাগে মাতি স্বর্ণর অলকপাতি চম্পক-অঙ্গুলে গুছাইয়া খেলিছে সে। জীবনের তরী এসে পঁহুছিল প্রেমসিন্ধুকূলে। বিদআহত হিয়া স্বর্ণলতা চমকিয়া উঠিয়া বসিল। হৃদয়ে সহস্র শত পরস্পর সঙ্গত ভাব উচ্ছসিল। প্রকাশ নহিল তার। তরঙ্গিল অনিবার। কুমারের মুখে
মণিপুর
৮৭
করিয়া নয়ন লগ্ন স্বর্ণ রহিল সে মগ্ন দিব্যরসে অনন্ত কৌতুকে।
প্রাণে যত উছলিল ইন্দ্রজিত বুঝি নিল ভুঞ্জিল সে সব।
উজলযুগলরসে মমনসিজবশে উভয়ে নীরব।
অবশেষে স্বর্ণলতা মহাভাবব্যাকুলতা করি সংযমন,
সম্ভাষিল, এ কি স্বপ্ন ? রােমাঞ্চিল তনুখানি। হৃদয়রমণ
কহিলেন, স্বপ্ন ইহা। অন্তহীন সুখস্বপ্ন। সৰ্বসত্যসার।
দেশকালসমতীত। দিব্যরাগমধুরিমা সৌন্দৰ্য্য অপার।
ক্লান্ত হইয়াছ প্রিয়া। দূর পথ অতিবাহি স্বপন-শয়নে
শুইয়া বিশ্রাম কর। অভিনব এ জীবন লহ বুঝি চিন্ময় মনে।
এত কহি ইন্দ্রজিত রাগােজ্জলহৃৎস্বর্গে স্বর্ণকে আনিয়া
অধরে অমৃতরস সঞ্চারিয়া দিল পুষ্পসায়ক হানিয়া।
সমুজ্জ্বলরসাবেশে স্বর্ণলতা ঘুমাইয়া পড়িল শয্যায়।
অপূৰ্ব্বা অরুণা উষা পূৰ্বাকাশে প্রভাসিল প্রেমরসে উজ্জ্বল সজ্জায়।
নীলাচলে সিন্ধুকুলে সুসজ্জিত গৃহখানি। চম্পকলতা
নিশাশেষে স্বপ্নালােকে নিখিল কি সে দৃশ্য? আশ্চর্য্য সে কথা।
সিন্ধুপরপারে রম্য মণিময় অট্টালিকা। মণিপুর নাম।
মাণিক্যহীরকমণিরত্নরাজিবিখচিত জ্যোতির্ময় ধাম।
অমিয়প্রণয়রঙ্গরসময়ী অঙ্গনারা সেথা করে বাস।
জগন্নাথ পুরী ত্যজি গিয়াছেন মণিপুরে। রাস অভিলাষ।
দিব্যােগ স্বর্ণতরী একখানি সিন্ধুকূলে বাঁধা অই। স্বর্ণলতা আসি আবােহিল দিব্যবাসে। তরীখানি স্বভােবেগে সঞ্চলিল ভাসি। অন্তহীন সিন্ধুনীরে মীনবিহঙ্গিনী যেন। দেখিতে দেখিতে তরীখানি পরপার পরশিল। স্বর্ণলতা উজ্জ্বলিত চিতে সমবতরিল তীরে। ইন্দ্রজিত স্মিভমুখে—জগন্নাথ নন, আসি অভিনন্দিল সে, নীলপদ্মদলদ্বন্দ্ব জিনি পানিপদ্মসুশােভন ধরি স্বর্ণলতিকার নিজ পানিপদ্মদলে আলিঙ্গিল পূর্ণ প্রেমভরে । দিগদিগন্ত ঝঙ্কারিল দিগঙ্গনাগণকণ্ঠসঞ্চালিত সঙ্গীতের স্বরে।
পূজা
পেয়েছি তােমার লিপিখানি আমি। অনেক চিন্তা করি
বসেছি লিখিতে উত্তর আজ প্রভাতে লেখনী ধরি।
প্রথমে ভাবিনু লিপিঠে যদি সুখসঞ্চার মনে
ঘটে তবে তাহা ত্বর দিব কি না নিরােধিয়া তৎক্ষণে।
পরে ভাবিলাম ক্ষতি নাই কিছু। স্বার্থ কি আছে আর ?
সবি অর্পিত হয়ে গেছে কবে কিছু নাহি আপনার।
অন্তরে যদি সুখসমুদয়, বুঝিৰ ভাবান্তরে।
প্রতি যদি দেখি উপহার দিব কৃষ্ণচরণ পরে।
পড়িনু পত্রী নিজ সুখদুঃখসম্বিৎ দূরে রাখি।
আমার প্রাণের প্রণয়রাণীর চরণে লগ্ন আঁখি।
আমারি কারণে আকুল পরাণ নয়নে নিয়ত নীর।
আমারি আশায় আকাশের পানে চেয়ে থাকা চাতকীর।
আমা বিনা তব সুখসংসার দুখকারাগার ঘাের।
শয়নে স্বপনে জাগরণে কর কামনা সঙ্গ মাের।
জীবনের বােঝা অসহ এখন। অচিরাৎ যদি আমা
সমীপে না পাও অনশনে প্রাণ বিনাশিবে তবে বামা।
দিব্যােগ
অনুরাগ ইহা। পতিব্রতার মনােরম মনােভাব।
তবু জ্ঞানালােকরঞ্জন বিনা নাহি এতে কোনাে লাভ।
এই প্রেম ঠিক প্রেম নহে জেন। প্রকারান্তর ইহা
আপন স্বার্থসুখকামনার, শুধু সুগােপন স্পৃহা।
জ্ঞানবিশশাধিত করিয়া ভাবের বিমলবত্ম ধরি
প্ৰেমভূমিকায় আন তুমি তুলি মনঃসংযােগ করি।
আমার অস্থিশােনিতমাংসমূরতিখানির প্রতি
এখনাে যে তব ভ্ৰমবিলসিত প্রাণমনােজ্ঞানগতি।
খুব জান যদি প্রাণমন মাের বুদ্ধি অহংকার।
ব্যাকুল হইয়া ভালবাস তাই। আমি উহা নহি আর।
আমি নহি আমি। নহি যে আমার। দেবতার আমি হই।
প্রাণের দেবতা সুন্দর শ্যাম। সুগােপনে তােমা কই।
আমার দেহের আবরণ তলে এই শ্যাম মাের আমি।
তুমি ভাব তাই। ধিয়াও সতত। শ্যামসুন্দর স্বামী।
গৃহে ফিরে যেতে অনুরােধ করি লিখিয়াছ লিপিখানি।
গৃহবন্ধন ছিড়ি আসিয়াছি চিরতরে আমি রাণী ।
আর যাইব না। ভাবিও না তাই ভালবাসি না যে তােমা।
আন রূপ এবে প্রণয় আমার। বুঝিবে কি নিরুপমা।
বাহিরে আমার সঙ্গিনী কভু হইবে না তুমি আর।
অন্তরে আমি চাহি তােমা চিরসঙ্গিনী করিবার।
আমার হৃদয়রঞ্জন শ্যাম কাননকুরুচারী।
সঙ্গিনী তুমি হইবে আমার রঙ্গিণী হয়ে তারি।
মনে মনে তারি বনে বনে পদসঞ্চার অনুসরি
সঞ্চরি সখি সঞ্জীবি উঠ তন্ময় মন করি।
সুন্দর সুখ শুভ সে জীবন রঞ্জিত নবারুণ।
সংসারে কেন মরণ বরণ করিবে সুনিদারুণ ?
সংসারে ফিরি যাইব না আমি। অমৃতজীবনজ্যোতি
দেখিয়াছি আমি বননিকুঞ্জে চারুমঙুল অতি।
তরু তলে তলে চলে অবিরল বিমলানন্দ মেলা।
সখা-সখীগণ হাসে নাচে গাহে রচে নব নব খেলা।
শাখে শাখে পাখী। সুচারুবর্ণপর্ণশােভন সব।
কি সুখহর্ষ বর্ষণ করে করি কলগীতিরব।
পাতায় পাতায় কুসুমে কুসুমে রমিত নয়ন পরে
হেরি প্রকাশিত অতি উজ্জ্বল আলােকের অক্ষরে
লেখা প্রেম সবি। রূপরেখাবলী সমনুপ্রাণিত সব।
আপনার মনে বিচরণ করি করি সব অনুভব।
পরমা প্রীতির চিরকুসুমিত চারু উপবনদেশে
দিগদিগন্তে ঘুরি ফিরি আসি পশিয়াছি অবশেষে।
দেশের বাসনা নিঃশেষে গেছে মুছে অন্তর হতে।
১২
দিব্যােগ
দেশ কোথা? দ্বেষহিংসার জ্বালা! প্রীতিলেশ নাহি ওতে।
বিদেশ বিভূই।
মাের সনে কারাে ঘটে নাই পরিচয়।
আজীবন খুঁজি দেখিলাম মাের আপনার কেহ নয়।
দেশ চিনিয়াছি। লভিয়াছি হেথা কত আপনার জন।
কত সখা সখী স্বজন সুহৃৎ বান্ধব অগণন ।
প্রাণে প্রাণে সদা আদান প্রদান প্রীতির বিধান কত।
প্রাণের পিপাসা ক্ষুধা নিবারিতে সুধাপান অবিরত।
কুসুমসরীনীরে করি স্নান সুখকুসুমিত প্রাণে
সুরভিকুকুল ধরি চলি কাম্যবনের পানে।
চিরহর্ষণ বর্ষাণে ভ্রমি উপবনবীথি দিয়া,
সঙ্কেতপথে নিরমল প্রেমসরােবরে পশি গিয়া ।
শিঙ্গারবটে কখনাে যাবটে স্নিগ্ধ ছায়ায় বসি।
অলিগুঞ্জন মন রঞ্জন করে ঘন কানে পশি।
পরমানন্দে নন্দীশ্বরে বনপথে বিচরণ
করি, করি চিরনববসন্তে চারুফুল আহরণ।
কোকিলাবনের কোকিলকূজন। খেলনৰনের খেলা,
প্রাণের নয়ন শ্রবণের পথে ভুঞ্জি সে সারা বেলা।
খদির বনের মদির পবন মধুর পরশ দিয়া
হিল্লোলি চলে ফুল চুমি চুমি ফুঞ্জ করিয়া হিয়া।
পূজা
ভ্রমি প্রকাণ্ড ভাণ্ডীর বনে, ভাের বেলা বেলবনে ;
মুকুলিত মহাবননিকুঞ্জে অনুরঞ্জিত মনে।
বৃন্দাদেবীর বন সুশােভন। সদা ফুলকিশলয়
বিকশিত রহে। সুরভিগন্ধ মন্দ মারুত বয়।
ধীরসমীরের সমীর সেবিয়া শ্যামসখানে সুখে
হৃদয়ঝুলনে দুলিয়া চলি যে ঝুলনবনাভিমুখে।
এই মাের দেশ। সুখনিকেতন। শুভ সুশােভন অতি।
প্রাণসখাগণ সকলেই হেথা। প্রীতিপ্ৰমুদিতমতি।
বিদেশে যাব না। তুমি বিদেশিনী। এ দেশবাসিনী হবে,
ধরি আশা প্রাণে স্মরি তােমা যবে পূরিবে সে আশা কবে।
দেশে থাক। তবু দেশে থাকিও না। অনুখন মনে মনে
অনুভব যেন বনে বনে সদা ভ্রমিতেছ মাের সনে।
চঞ্চল শ্যামসুন্দর রূপ অন্তর ভরি রাখ।
নিতি নব নব ভাববর্ণারঞ্জনে ছবি আঁক।
মানসচিত্রপটে তব আঁকা ছবি সঞ্চরমান
পূজা অর্চনা কর দিবানিশি অঞ্জলি দিয়া প্রাণ।
সেই শ্যামসেবামন্দির হবে স্বামিদেহখানি তব ।
সতী তুমি। এই সতীর ধর্ম। সত্য এ অভিনব।
স্বামিদেহমনজীবন সকলি মৃত্যুকবলগত।
অতি অসত্য। তারি সাথে সতী পতিব্রতার ব্রত
৪
দিব্যােগ
বাঁধে যে রমণী, সতী এই নামে গৌরব তার কিসে?
অসৎ সাধিয়া সতী কি-অমৃত হয় কি মজিয়া বিযে?
নিত্য সে যাহা চাৰু চিন্ময় চির আনন্দধাম,
তাই আরাধিলে রমণীর হয় মহীয়সী সতী নাম।
তাই আরাধিয়া পুরুষ অমৃত পরমানন্দ লভে।
নতুবা মৃত্যুসেবক সকলি মৃত্যুশাসিত ভবে।
তুমি ভাবিতেছ খেয়ালের বসে অথবা বিরাগভরে
গৃহ পরিহরি চলি আসিয়াছি সুদূর দেশান্তরে।
প্রাণিসম কোনাে প্রাণের বাসনা, কোনাে সুখসন্ধান,
নিষ্ফল দেখি আসিয়াছি—তব মন কি সন্দিহান ?
নহে নৈরাশে, সন্ন্যাসে নহে, অন্যাশা করি নয়,
স্বতঃপ্রবৃত্ত প্রাণের প্রেরণা বিচিত্ৰসুখময় ।
আমা আনন্দদেশে আনিয়াছে আনন্দে ভাসাইয়া।
দিগদিগন্তে সংসারসুখতৃণ ভাসাইয়া দিয়া।
ভালবাসিতাম দেবপূজা আমি। ভালবাসি পূজা আজো।
জীবন ভরিয়া ভালবাসিবই। তুমি কিছু দেখিয়াছ।
অমৃত জীবনে পশিব যখন তখনও পূজা এই
পরমামৃতপরিবেশমাঝে পূজা মাের চলিবেই।
আমি বুঝিয়াছি মানব জীবনে যত কিছু করিবার
পূজা
১৫
কাজ আছে পূজা সকলের মাঝে শুভসাত্ত্বিকসার।
সুধাসুন্দর সৰ্বোত্তম চির-কল্যাণখনি,
নির্মলতম আলােকোল্লাসে উজ্জ্বল অনুখনি।
মানবপাণির পারমার্থিক প্রয়ােজন এর চেয়ে
দেখি না কিছুই অমল নয়নে জীবনাঙ্গনে চেয়ে।
যত কিছু করি সবি অনিত্য, করিবই চিরকাল
ইহা কল্পনা করে না ত মন-সবি যে কৰ্ম্মজাল ।
জঞ্জাল ঘাের। করিতেছি তবু বাসনাতন্ত্রাধীন।
শুধু যন্ত্রণা। উপায়ান্তরে বহিবে কে চিরদিন ?
কামনাকৰ্ম্ম মানবমৰ্ম্মপীড়ন, ধৰ্ম্ম নহে।
কামনাশূন্য মানসে সাধিত হয়ে মঙ্গল বহে।
তখন কৰ্ম্ম কর্ম ত নহে। ধরে যে যজ্ঞ নাম।
গুণাতীত যবে যজ্ঞই পূজা, প্রয়ােজন অভিরাম।
চির-প্রয়ােজন। চির-আনন্দ-আয়ােজন মনােহর।
সুখ স্বাভাবিক, ব্যাপার বিলাস, চাহে যাহা অন্তর
অন্তবিহীন ক্রিয়ামুক্রান্তি বাসনাভ্রান্তিহীন।
মরণানুগামী কৰ্ম্মনিবহ পরশে যাহার ক্ষীণ।
কর্মমুকুটমণি কমনীয়া পূজা কামনার কাম।
প্রাণের পুলকআলােচঞ্চলা জীবনে এ অবিরাম।
কৰ্ম্ম যে পাপ। কেবলি দুঃখ বেদনা নিরন্তর।
দিব্যােগ
মৃত্যুর নাগপাশ সংসারে পাতা এ ভয়ঙ্কর।
প্রতি পদে পদে অজ্ঞানজাল গাঁথিয়া কৰ্ম্ম চলে।
সতত পতন। বিকার বিঘ্ন ক্ষোভ অন্তর তলে।
সতত দ্বন্দ্ব, অন্ধ আঘাত, স্বার্থে স্বার্থ হানে,
কুৎসিত কাড়াকাড়ি তাড়াতাড়ি ব্যাহত ব্যর্থ প্রাণে।
বঞ্চনা সঞ্চাল চালাচালি সঙ্গে প্রচুর চুরি ।
রঙ্গে পরের রুধিরপিপাসা পূরাতে কণ্ঠে ছুরি।
কৰ্ম্মানছবি আঁকিবে যে জানে বীভৎস রস।
সাবধানে সরি আসিয়াছি সখি হই নি কৰ্ম্মবশ।
কৰ্ম্মের বুকে কামনাদৈত্য মনােরম রূপ ধরি
নিবসিছে সুখে। মায়াবী দৈত্য অচিরে হত্যা করি,
যাহারা চলিছে কর্মের পথে তাদেরি কর্ম ক্রমে
পূজার দিব্যদিক পানে চলে পড়ে না মরণমে।
ভূলােকে দ্যুলােকে উদ্দীপনা যে দেবপূজা নিরমল,
তমসংসারে সঞ্চার করে ভাবালােকমণ্ডল।
জীবনমরুভূ কুসুমােদ্যানে পরিণত করে পূজা।
পূজাধিদেবী যে মানবরাজ্যে সদা বরাভয়ভুজা।
সব ক্রন্দন নিরানন্দন দূরান্তরিত করি
ঘর সংসার জীবন তােলে যে বিমলানন্দে ভরি।
শুধু দুখে নয় সুখেও দেখিবে অজ্ঞাত ভীতিভার
পূজা
৭
ব্যাকুলশঙ্কাসম্বিৎছায়া চঞ্চলে অনিবার
অন্তরভাবঝােপেঝাড়ে যেন-প্রেতযােনি আনাগােনা।
তাই জ্ঞানে সুখসম্ভোগ যবে প্রাণ রহে আনমনা।
পূজা অর্চনা নাশে এই পাপপ্রেতচ্ছায়া সমুদয়।
পূজার পুণ্য পরভাব সদা দূরীভূত করে ভয়।
পূজা ভারতের ধর্মসাধনাশক্তি যে সুমহতী।
ভাগবতপ্রেমউপবনশােভাসুষমাবিকাশবতী ।
ভাবের বাষ্প ভেসে ভেসে দুর মানস-আকাশে মেশে।
মেঘবারি বনশ্যামলিমরূপ ধরে না হৃদয়ে এসে।
পূজাপ্রতীক্ষা পশ্চাতে থাকে। অর্চনাকর্ষণে
অস্ফুট ভাব সংহত হয়ে পুষ্পের মত মনে
প্রস্ফুটি উঠে। সেই পুষ্পের অঞ্জলি দিয়া দিয়া
অন্তরপূজা পুন দেবতার অন্তর বিশশাধিয়া।
ক্রিয়াযােগ বিনা ভক্তিভাবনা শক্তি লভিয়া ক্রমে
রসরূপ ধরি লভে না প্রকাশ শূন্যে শুধু সে ভ্রমে।
অর্চনাহীন ভাবে বিভাবিত হয় না হৃদয় মন।
অন্তরে পশি চিৎপরভাবে আনে না সঞ্জীবন।
অর্চনা পূজা সৃজনশক্তিশালিনী জীবনে অতি।
চারুচিন্ময় উপাদান দিয়া রচে উজ্জ্বল মতি।
জ্ঞানবিজ্ঞনভূমি পরে তুলি বৃথাকল্পনারােধে
দিব্যােগ
সুদূরানুভব রশ্মিবিভাস সঞ্চারে অববােধে ।
অমৃতভক্তি লভিতে উপায় পূজাসম নাহি আর।
পূজা আর নামমন্ত্রসাধনা সব সাধনার সার।
পরমানন্দলীলালােকে যবে সাধনার অবসান,
তখনাে যে পূজা প্রণয়া…না পুলকে করিবে প্রাণ ।
আদি ও অন্ত অন্তবিহীন পূজা অনুসন্ততি
পূজাই ভক্তি স্নেহ প্রতি প্রেম পূজা অনুরাগরতি ।
গুরু-উপদেশে এই জ্ঞানালােক পশেছিল মাের প্রাণে।
বুঝেছি আমি অন্তর মাঝে পূজা-অর্চনা মানে।
সংকল্পিত করেছিনু তাই সকল জীবন মাের
পূজা হবে শুধু। পূজাই জীবন। পূজানুধ্যানে ভাের।
তনুমনহিয়া সদা একতানে পূজা হয়ে যাবে বহি।
পূজার প্রবাহে ভাসিয়া চলিব পূজানিমগ্ন রহি ।
শ্রীরাধারমণ দেবতা আমার শ্যামসুন্দররায়।
তাঁহার যােগ্য উপচার কই ? কি দিয়া পূজিব তায়!
যাহা কিছু মাের আপনার আমি সৰ উপচার করি
একে একে দিব পূজানুবন্ধ পূজিতে প্রাণের হরি।
প্রতিদিন প্রাতে তুলিয়াছি ফুল। সুচারু-বর্ণ যত।
মধুরগন্ধ উদ্যানে বনে সুন্দর শত শত।
भूज
দেখিয়াছ তুমি। গাঁথিয়াছ মালা নিতি উল্লাস ভরে।
শ্যামগলে মালা পরিয়ে দিয়েছি অর্চনা করি পরে।
কামিনী কুন্দ কমল চামেলী মল্লিকা ফুথি জাতী।
চম্পক বেলি গােলাপ টগর করবীর নানা জাতি।
রাঙারণ কিংশুককলি অশােকগুচ্ছ আর।
করেছি চয়ন কতই কুসুম সুগন্ধ সুকুমার।
কাননদেবীর প্রাণের প্রণয়অমৃতজাত যে ফুল।
রাধামাধবের হৃদয় আমােদিতে সব চেয়ে অনুকূল।
কৃষ্ণচরণে পুষ্প দিল না প্রাণসংযােগসনে
কারা অভাজন—দেখিব না মুখ আমি কভু দুনয়নে।
শ্যামসুন্দরচরণার্চনাহেতু সুন্দর ফুল ।
ফুটে বনে বনে চিরমনােরম রূপভাবসঙ্কুল।
তুলিব না তাহা ? পূজিব না আহা ? রাতুল চরণ দুটি ?
ফুলসমচারুবরণগন্ধে উঠিব না মােরা ফুটি ?
তাই বহু দিন মনে আছে তব, শুধু ফুল রাশি রাশি
ফুলসুকোমল চরণে দিয়েছি পুলােকোল্লাসে ভাসি।
বনফুলসনে মনফুলকুল বিকশিত শত শত।
মনে হ’ল যেন তনুখানি ফুলসৌরভে পরিণত।
বহিরস্তর ফুলসস্তত রহিত অহর্নিশই।
আকাশে বাতাসে ফুলেরি সুষমা ফুলে রহিম মিশি।
দিব্যােগ
কুসুমােপহার অর্চনা মাের পুর্ণ হইল বুঝি!
ভাবি এখন অন্যোপচারে প্রাণগােবিন্দে পূজি।
দিনু চন্দন অগুরু কেশর কুঙ্কুম সুন্দর।
ধূপসৌরভ দিমু দীপশিখা উজালি অতঃপর।
নিবেদিমু দেবে বিবিধ ভােজ্য ষড়রসসুধাস্বাদ।
ক্ষীর দধি মধু সুপরমানু পূরাইয়া মন-সাধ।
স্বাদু সন্দেশ আদি নব নব বিরচিত ভােগমালা
হইত তােমারি সুনিপুণ করে স্মরণ নাহি কি বালা।
পূতকপূরবাসিত সলিল স্ফটিকগেলাসে ভরি
উল্লাসে নিতি অর্পণ আমি কত আহ্লাদ করি
করিতাম জান-তুলসীর নব মঞ্জরীদাম দিয়া।
তৎ তৎ দান বিভাবনা ক্রমে বিভাসিয়া দিল হিয়া।
প্ৰদানি পাদ্য অর্ঘাচমনী সুমধুপর্ক সনে
দিনু আসনাদি বসনভূষণ স্বাগত স্বগত মনে।
এতদর্পণ তর্পণাদিতে তর্পণহীন প্রাণ।
শাস্ত্রবিধানে ভাবি করিব ভক্তিপীরিতি দান।
সমুবেশন। আচমন সনে স্বস্তৃিবাচন সুখে।
নারায়ণাদির অর্চনা আর, বসিয়া পূৰ্বমুখে।
দিয়া সামান্য-অর্ঘ দ্বারের দেবতা পূজিনু তবে।
জলাদি শুদ্ধি। গুরুপদানতি মনােগত অনুভবে
পূজা
১০১
ভূপসারণ সারি দেহমনােবুদ্ধাদি ভূতচয়
বিশশাধিতে আমি করিনু চিত্ত অতি উৎসাহময়।
বুদ্ধাদি হ’তে আপন স্বরূপ মুক্ত করিয়া দিয়া,
মূলাট হ’তে সুষুম্নাপথে সঞ্চালি নিয়া
পরমকৃষ্ণপদে প্রতিষ্ঠা করিতে করিয়া মন,
লিশরীরশােষণচিন্তা করিনু সংযােজন।
সঙ্কোচদেহ দহিতে প্রণবপুটিতমন্ত্রবীজে।
মনঃ প্রণিধান করিনু বুঝিনু যতটুকু আমি নিজে।
স্মৃতিসন্ধানে সমাকর্ষিয়া কৃষ্ণকিশােরে তবে
সংকল্পনা করিয়া কহিনু অন্তস্ফুট রবে,
উল্লস! জল! জ্বল। প্রজ্বল। সােহহং হংসঃ স্বাহা।
দহি অনাত্ম রহি আমি আর শ্যামসুন্দর আহা!
সােহহং! প্রাণের সুহৃদ সখা হে ! ডুবিনু মজিনু আমি !
তােমারি পীরিতিরসের শায়রে—আমি নহি শুধু স্বামী
প্রাণাদিপঞ্চবায়ুসঞ্চার শাসনে সামঞ্জসে
আনিনু ক্রমশ। চঞ্চল চিত আসিল আত্মবশে।
জ্ঞানবিজ্ঞানলােচর করিতে গভীর তত্ত্বচয়,
প্রয়ােজিয়া ধ্যানধারণাবৃত্তি প্রাণসংযমময়,
প্ৰয়াস করিনু যথাশক্তি সে। আধারশক্তি আর
প্রকৃতি কূৰ্ম্ম ক্ষিতি অনন্ত মহাক্ষীরপারাবার।
দিব্যােগ
কিবা শ্বেতদ্বীপ, মণিমণ্ডপ, কল্পবৃক্ষবীথী,
রত্নবেদিকা বাসুকি পদ্ম কি পরমার্থ নীতি।
চতুর্দলাদি য সরসিজ। ন্যস্ত সুদলে দলে
অকারাদি করি অক্ষরপতি কি জানি কপছলে।
তন্ময় মনে দেখিনু তত্ত্ব অতি সুগহনমূল ।
যতটুকু বুঝি পরমানন্দসন্ধানে অনুকূল।
সবি সার্থক। সত্যানুগত। বৃথা কল্পনা নহে।
কান যদি পাতি প্রতি অক্ষর অমৃতবাণী যে কহে।
করাসাদি ন্যাস অভ্যাস করি অনন্যমনে
দেখিতাম সব জ্যোতির মূরতি স্বপ্নে কি জাগরণে।
বুঝিলাম এই পূজার বিবিধ বিধি মিলি মুনিগণ
সভা করি বসি আইনের মত করে নাই প্রণয়ন।
যােগদর্শনদিব্যআলােকে প্রকাশিত হয়ে আসি
মানবমানসবিমানের পটে উঠিয়াছে সব ভাসি।
পশ্চাতে এর ভাগবতী জ্যোতি অমল অন্তহীন।
আলােকিতে জ্ঞানরাজ্য জ্বলিছে নহে কভু জ্ঞানাধীন।
দেখিনু ধৰ্ম্ম মহাসরােবর। জ্ঞানের মৃণালে তায়
দুলিছে কমল অষ্টদলৈশ্বৰ্য্য সে শশাভা পায়।
সুবৈরাগ্য রচিয়াছে তার সােনার কণিকার।
আমারি হৃদয়কমলখানি সে দেখিনু চমৎকার।
পূজা
হৃদয়াধিপতি দেবতা পুণ্যপরাগশয্যাশায়ী
ছিল যে আমার যুগযুগান্ত সুমকরন্দপায়ী।
অভিনব বাঙমনশ্চক্ষু শ্ৰোত্ৰাণাদি লভি
মনে হ’ল যেন জাগিয়া উঠিল হরষসমুৎসবী।
সকল জীবন উজ্জ্বল অতি উৎসবময় করি
পরশমণির পরভাবে যেন তুলিতে লাগিল গড়ি।
দেহাদি দহিমু যাহা মনে মনে কাঞ্চনরূপ লভি
কি শুভ সঞ্জীবনে যেন ক্রমে প্রকাশিয়া এল সবি
বুঝিলাম পূজা উজ্জ্বলতর ভূমিকায় আরাে হবে।
পূজাপদ্ধতি বিশুদ্ধতর সমিদ্ধ অনুভবে।
চারুচিপ অমৃতে প্রবেশি প্রেমপ্রবৃত্তিপথে
অন্তবিহীন পূজা চলিবে সে চিন্ময়মনােরথে।
|
শত বিকল্প অনুখন মনে সংকল্পিত শত।
মানসসরসে শত তরঙ্গ উঠিতেছে অবিরত।
প্রাণগােবিন্দচরণকমলে অঞ্জলি করি করি
দেই সমপিয়া এই অনুরাগরীতি উল্লাসকরী।
জাহ্নবীজলে যেন অগণিত কুসুম ভাসিয়া আসে।
নব নব জ্ঞান ভাবনা বৃত্তি চিত্তপ্রবাহে ভাসে।
কৃষ্ণার্পণমন্তু সকলি। কি রসবস্তু তায়,
১৪
দিব্যােগ
কি সুখস্বস্তি সুচাৰু শক্তিকিরণ জীবনে ভায়।
সদা চঞ্চল গরবে চলে যে চপল অহংকার।
কত রূপ ধরে কত রং পরে অন্ত নাহিক তার।
কিংকর করি কৃষ্ণচরণে দিনু নিবেদন করি।
দেখিনু গরবী অশুভাশােভন গৌরব পরিহরি
অনুরাগসেবা সেবি গৌরব সবচেয়ে মহীয়ান
গণিল অচিরে হইনু আমিও সুখসার্থকপ্রাণ।
ভাববিশুদ্ধিমতী বুদ্ধি সে সদ্য বিকচ অতি
কনকপদ্ম কুসুমের মত ধরি পূজাপদ্ধতি
অৰ্পণ করি দিলাম অচিরে দৃঢ়নিশ্চয় মতি
প্রস্ফুটি এল—সবি বাসুদেব বান্ধব পরাগতি।
ভাবি এখন সমপি চিত্ত তত্ত্ব যে মৌলিক ।
দেখি বাসুদেবভাবনাআলােকে ঝলকিছে চারিদিক।
উজ্জলতভাববিভাবিত চিত মম সমুদয়।
অর্পিব কি তা দেখি একান্ত কৃষ্ণার্পণময়।
অরুণানন্দতরুণআলােকে উপবনপথে তবে
পুলকান্তরে ভাবমন্থর নবীভূতরূপ ভবে
চলিতে চলিতে পথপাশে দেখি বিকশিয়া আছে কত
সুরভি পুষ্প। সুখে উৎসাহে অবচয়ি অবিরত,
সপি দিয়া দিয়া পূজা করি সদা-বুঝিতেছ কি যে ফুল ?
পূজা
নীতিসাহিত্য গদ্য পদ্য পীরিতির অনুকূল।
কৃষ্ণভাবনাপ্রদীপআলােকে দেখিনু পরখ করি
সকলি কৃষ্ণসন্ধানভরা চলে তৎপথ ধরি।
সকল শিল্পকলা সুকুমার সবি সংঙ্কল্পিয়া
শ্যামসুন্দরচরণে দিনু সে হরষে সমর্পিয়া।
দিনু বিজ্ঞান বিদ্যা সকল পূর্ণ করিতে পূজা
দিনু দর্শন সরস্বতীকে বিজ্ঞানজ্ঞানানুজা।
কণাদতন্ত্র। গােতমবিদ্যা তর্কমুখরানারী।
কৰ্ম্মকামিনী জৈমিনিবন্ধু নিবেদিনু সারি সারি।
আদিবিদ্বান্ কপিলকন্যা উজ্জ্বলজ্ঞানবতী।
সকলতত্ত্বসংখ্যাকারিকা সাংখ্যসূত্ৰসতী।
সংক্ষেপ করি রচিনু মন্ত্র পরমপুরুষ মাের।
শাশ্বত শ্যাম। প্রেমরসসুধাপানে রহি সদা তাের
আমি প্রকৃতি যে শাশ্বতী তার—চমকিলে বুঝি সখি !
সুচিরসত্য গােপন কিন্তু সাবধানে দেথ লখি।
পতঞ্জলির যােগসঙ্গিনী যােগিনীকে ধরি আনি
কৃষ্ণচরণসরােজে সপিনু কানে কানে কহি বাণী ।
ও সখি যােগিনি সমাধি সাধন হতে সমধিক আরো
শত শত গুণে সুপরমার্থ সুখ সমাধিতে পার
শ্যামসুখসেবাযােগসংযােগযােগিনী হও গাে যদি
১৬
দিব্যােগ
অমৃতসায়রে সুখে সস্তরি চলিবে যে নিরবধি।
শ্রীরাধামাধবসমাধি সাধহ প্রেমযােগপথ ধরি,
এ অবিমিশ্র কৃচ্ছ, কেন গাে? চলি এস পরিহরি।
আপন পাশরি বননিকুঞ্জে কুসুমাবচয়নিয়া
অনুরাগরসে মালা গাথ বসি কৃষ্ণ স্মরণ নিয়া।
বাদরায়ণের সাধনারুপিণী বেদবেদান্তদেবী
দেখিনু যাপিছে জীবন গােপনে কৃষ্ণচরণ সেবি।
জ্ঞানবিজ্ঞান বিচার তর্ক হীরক স্বর্ণ মণি
ভূষণ পরিয়া বেদ বিভাবনাবসনশােভন। ধনি।
বাহিরে রাজ্ঞী ঈশ্বরী সাজি অন্তঃপুরে একা
প্রােষিতভর্তৃভাবিনী মূরতি যায় বাতায়নে দেখা।
কহিছে বিশ্বসভায় পরমব্রহ্মানুধ্যান কর।
অন্তরঙ্গ জনে কহে শ্যামসুন্দর অনুসর।
পরমব্রহ্ম পরমরূপ পুরুষােম হরি।
নলীলাতনু নিত্য সত্য দেখিয়াছি ধ্যান করি।
এই বেদান্তবধুর মধুর সুগভীর বাণী শুনি
মুগ্ধ হই। বুঝি আমার প্রাণসঙ্গিনী,উনি।
এমনি নিখিল দর্শনজ্ঞানবিদ্যা কৃষ্ণপদে
সুনৈবেদ্য নিবেদিয়া দিয়া শুধু ভাবসম্পদে
পূজা
সম্প্রতিষ্ঠা প্ৰয়াস করি। ভাববিগ্রহবান্
কৃষ্ণ জানেন কি ফলিল ফল কি রূপ ধরিল প্রাণ।
এইরূপে মাের পূজা উজ্জ্বল চলিল উৎসাহিনী।
ক্রমসমুচ্চ উপচারচয় উদ্ভাবি প্রতিদিনি।
অবিরল পূজা নদীজলস্রোতপ্রবাহের মত চলে।
নব নব রং নবতর নাচি উঠে পলে পলে।
আমার পূজার উপচার যত কিছু কিঞ্চিৎ তার
আভাস আলােকে জানাই তােমা। কিঞ্চিৎ জানিবার
আছে আরাে। তুমি শুনি তাহা সই হাসি কি সম্বরণ
করিতে পারিবে ? তবু কহি শুন। পূজা সুসংগােপন।
রাধামাধবের হৃদয় আমােদিতে উদ্যানে উপবনে
ফুল ফোটে নিতি প্রীতিঅনুকূল রূপসৌরভসনে।
যত ফুল ফোটে সবচেয়ে তার মনােরমতম অতি
রমণীবর্গ কিশােরীকোরক কন্যা কামনাবতী।
ফুটিছে কমল কামিনী
কুন্দ
চামেলী চম্পা বেলা।
দুলিছে ভাবের সমীরপরশে স্বরসে সকল বেলা।
ফুটিছে মালতী মাধবী মধুরা বন্ধুরা বিধুরণা।
ফুটিছে গােলাপ রাগসঙ্গীণ পারুল হাসুহানা।
গৃহ-অঙ্গনে অনাকুল রঙ্গিণীফুলবালা ।
চারুচঞ্চলা সঞ্চরি চলে ফুটি ফুটি ফুলমালা।
১৩৮
দিব্যােগ
যখনি নয়নে চমকে আমার অবচয়নিয়া সুখে
কৃষ্ণায় নমঃ করি আমি দান অঞ্জলি কৌতুকে।
কভু মনসূতে মালা গাঁথি কমকামিনীকুসুম তুলি ।
শ্যামনগরের হৃদয়ে দুলাই পুলকে আপনা ভুলি।
নারীর কামনা কৃষ্ণ কেবল। অন্য কামনা নাহি।
জ্ঞানে অজ্ঞানে রমণীমাত্র পথপানে থাকি চাহি ।
কৃষ্ণ গহনমনােমনােজ্ঞ করুণা করিয়া কবে
আসিবে জীবনে প্রাণমন মম প্রণয়ামৃত হবে ।
রূপের বাসনা। রসের বাসনা। সুখের বাসনাবলী।
পূর্ণ হইবে রূপপূর্ণিমাকিরণে সমুজ্জ্বলি ।
সকলবাসনাসমর্পণের বাসনার পথ দিয়া
আসিবে পূর্ণপ্রণয়মাধুরী অধীর করিয়া হিয়া।
উদিবে শুদ্ধ সেবার বাসনা দেহমনপ্রাণদানে।
শ্যামসেবামুখজোৎস্না জাগিবে সদা দেহমনপ্রাণে।
সেবাসুখবােধ তাও যাবে সরি-শুধু সেবামধুরিমা।
ভরিবে জীবন অমৃতআসবে-চিরমেশেষসীমা।
কামিনীস্বরূপসঙ্গত এই পরম কামনা হয়।
পরমােন্ড্রলা উত্তমা আশা নাহি আর অতিশয় ।
কুৎসিতকামবাসনায় ইহা সমাচ্ছন্ন রহে।
ধনজন সুখদুঃখঝঙ্কা কৃষ্ণস্মরণ নহে।
কামিনীজীবনতত্ত্বকিরণ মানসনয়নে লখি
কামিনীকুসুমে কৃষ্ণার্চনা করিতেছি আমি সখি ।
আমার নয়নে কামিনীকুলে যে তুমি সুললিততমা
তব রূপরাগ সেবানিপুণতা জানিয়াছি অনুপমা।
তুমি সৌরভগৌরববতী পুপকামিনী সতী।
চিরকাণ্যমেহবতী তুমি চিরপ্রেমমধুমতী।
তাই আমি তােম৷ কৃষ্ণচরণে করেছি সমর্পণ।
হইয়াছে সুধাসুবাসিত তাই মম শ্যামসমৰ্চ্চন।
মাের প্রাণমনােবিগ্ৰহমাঝে শ্যামসুকুমার স্বামী
ধ্যান কর ধ্যানময়ী দিবানিশি ধন্য হইব আমি।
বাহিরের দেখা মিলনালাপন হাসরসবিলাস,
অকিঞ্চিৎকর ক্ষণভঙ্গুর। তুচ্ছ সে সুখাভাস!
আশা করি তুমি অমৃতের পথ করিও না কভু রােধ।
সাধ মাধবের চিরপ্রেমসুধামাধুরীর অববােধ।
উন্মত্ত যে তাহারি চিত্ত অনিত্য বাসনা করে।
সুচিরদুঃখশ্রোতােবিভ্রমে ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে।
পরমপ্রণয়কিরণানন্দ নয়নে পড়েছে তব ।
সমাহিত করি প্রাণ মন তুমি সদা তাই অনুভব।
যে দেশে মিলন বিরহবিহীন নিতি নব নব হয়।
দিব্যােগ
যে দেশে মদিরচিরমধুমাসে সুখসমীরণ বয়।
সেই দেশে মােরা মিলিব পুলকে সমপ্রাণময়ী সই।
শ্যামপ্রেমরসরঙ্গিণী তুমি ধ্যান কর সদা অই।
বিষাদ ভেব না। দেশে যাওয়া আর সম্ভব নহে মম।
ব্ৰজে বাঁধিয়াছি কুকুটির সুন্দর নিরুপম।
চলে না চরণ ব্ৰজের বাহিরে মজেছি ব্ৰজের রজে।
প্রীতিসুমধূর পরাণ তােমার শতগুণে যেন মজে।
ব্রজকিশােরের প্রণয়পূজার আয়ােজন অনিবার
করি প্রাণে প্রাণে মনে মনে আমি কিছু নাহি জানি আর।
সহধর্মিণী সঙ্গিণী তুমি এমনি পূজার মাঝে
তন্মনা তন্ময়ী হও সখি প্রীতিপূজারিণী সাজে।
পূজাবিবরণী পত্রী তােমার কদাচিৎ যেন পাই।
লিপি সমাপিয়া আজিকার মত কুঞ্জভ্রমণে যাই।
প্রাণসই! মাের পীরিতের কথা শােন্।
অতি অপূর্ব অনুরাগ সুশােভন।
বিস্মিত আমি । তত্ব বুঝি না কিছু।
আলো-বিহঙ্গ ছুটে। ছুটি পিছু পিছু।
এ মাের জীবন-নীড়-সঞ্চত নয়।
পাই না পুচ্ছপালকের পরিচয়।
অতি বিচিত্র সুরে রাগে করে গান,
হাসায় কাদায় নাচায় পাগল প্রাণ।
আলােক পুলক ঝলক হানিয়া দিয়া
সুদূর বিমানে এ মন হরিয়া নিয়া
লুকায়। বুহে না উদেশ কোনাে তার।
বহি দুরন্ত বেদনার হাহাকার।
এ মম মানস জ্ঞানবিজ্ঞানবােধ,
বিচার যুক্তি তর্কের অবরােধ,
ছিন্ন ভিন্ন করে বিদ্যুদবেগে
জ্যোতিরুদ্ভাস উলি ঘনমেঘে।
১১২
দিব্যােগ
আকাশের পরে উজ্জ্বলতর নভ,
চিন্ময় অতি
অদ্ভুত
অভিনব,
বাঁধি সেইখানে সুন্দর বাসা
অন্তরে মাের করে সই যাওয়া আসা।
কভু স্রোতােধারা শত তরঙ্গে চলে ।
কভু শিখা তুলি রক্তবরণে জলে।
কভু হিল্লোলি বহে সুখসমীরণ।
ঝটিতি ঝাঝটিকামও রণ।
অতি দুরন্ত দুর্দমনীয় এই
রাগপ্রবৃত্তি, বিহিত বত্ম নেই।
আকাশ হইতে আকাশে ছুটিয়া যায়।
শত বিচিত্র বর্ণ বিকাশি ভায়।
আরাে বিচিত্ৰতর চরিত্র সখি,
এ অনুরাগের দেখিয়াছি অবলােকি।
রাগেরি নিভৃত হৃদয়কুসুমবাগে
রাগের পাত্র নিবসে নিবিড় রাগে।
রাগবিদ্যুদবেগে অন্তরে মম
উজ্জিত জ্যোতি রূপ উজ্জলতম
উদ্ভাসি তােলে—মনসিজ মনোেহর
দিব্যােগ
=
কুসুমভূষিত সুম কুসুমশর।
বিদ্যুদবিভা উদ্যান কুসুমিত।
তরুবল্লরীপল্লবসুষমিত।
নিমেষে প্রকাশি তােলে সে পরমা প্রীতি।
নব নব লােকে নিকেতন নিতি নিতি।
বিলােলদৃষ্টিবিলাসে সৃষ্টি জাগে।
অমিয়বৃষ্টি ঝরে জলন্ত রাগে।
আমারি রচনা রাজ্যে বনােপবনে
লুকাইয়া যায় প্রিয়তম ক্ষণে ক্ষণে।
প্রেমােন্মাদিনী ছুটি অন্বেষি আমি।
কোথায় সুহৃৎ সখা সুন্দর স্বামী।
সহসা দেখি যে কুকুটীরতলে।
কুসুম আসনে বসিয়া হাসে কি ছলে।
উচ্ছ্বাসে গিয়া উরসে আবরি ধরি।
উচ্ছল রসে অমৃতে মজিয়া মরি।
পুন সঞ্জীবি আপন স্বভাবে উঠি।
দেখি প্রিয়তম ওকি পলাইছে ছুটি।
তটিনীর কুলে ফুটিল ভবন কি ও!
শােভে শত সুখসামগ্রী রমণীয়।
১১৪
দিব্যােগ
আলােকমালিকা সুললিতা বালিকারা
সেবা সম্ভোগ আয়ােজিছে ওরা কারা ?
সহসা শুনিনু অমিয় আভাস সুর।
বাঁশীতে আমারি নামধেয় সুমধুর।
আমারি বঁধুর প্রেয়সী অন্য কে ও!
সােহাগের শুধা ভুঞ্জিছে আমি হেয়।
অধ্যা ত নহে। ও যে অনন্যা অতি ।
আমারি প্রাণের রসসমুৎসা সতী।
দেখিতে দেখিতে দেখি নাহিক কেহ।
প্রাণবল্লভ একাকী নহে ত সেহ।
আমারি হৃদয়পদলের মধু।
মূর্ত মাধুরী মদনমােহন বঁধু ।
আমার রাগের পরমা প্রকৃতি কি যে।
কি যে সে রাজ্য কিছুই বুঝি না নিজে।
ভাববৈভববিলাসবিভূতি সই
সাধ্য কি মাের তােকে বিবরিয়া কই।
দিদর্শন কিঞ্চিৎ দিমু তােকে।
কি বুঝি বিলাস কোন বিচিত্র লােকে।
No text on this page.