Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Tiyanaki
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
长长长长长长
ভিীমানাকী
( উপকথা)
《《
শ্রীআশুতােষ দাশ গুপ্ত, মহলানবীশ প্রণীত
k
শিবপূর (হাওড়া)।
চৈত্র, ১৩২১। .
মূল্য আট আনা।
উৎকৃষ্ট বাঁধান বার আ।
BkkZ৯১৯১৯১৯১৯
হাওড়, ৪নং তেলকলঘাট রোড, কৰ্ম্মযোগ প্রেস হইতে শ্ৰীযুগলকৃষ্ণ সিংহ দ্বারা মুদ্রিত।
ভীয়ানাকী
উসর্গ পত্র
আমার স্বর্গীয় পিতৃদের বদনচন্দ্র দাশ গুপ্ত,
মহলানবীশ মহাশয়ের---
পবিত্র চরণােদ্দেশ্যে
এই দরিদ্র গ্রন্থ ভক্তি-স্মৃতি-স্বরূপ
উৎসর্গ করিলাম।
শৈশবে পিতৃহীন হইয়া
অনাথ অবস্থায়
কোনও সুগন্ধী কুসুমই চয়ন
করিয়া উঠিতে পারি নাই ।
দরিদ্র-সন্তান-প্রদড় গুন্ধহীন কুসুম ও
জন্মদাতার উপেক্ষনীয়
হয় না,
ইহাই আমার একমাত্র ভরসা।
চত্র, ১৩১৬
কানপুর ।
আশুতােষ ।
No text on this page.
ভূমিকা সাধারণের ধারণা “উপকথা” গুলি মিথ্যা কথা আমিও আংশিক স্বীকার করি ; কিন্তু এই অতিরঞ্জিত অতীতের গল্পের অন্তরে অনেক সময়ে যে অমৃতস্রোত প্রবাহিত হয়—তুচ্ছ ও ঘৃণা করিয়া তাহার রসাস্বাদনে বঞ্চিত হওয়া কর্তব্য নহে। গল্পচ্ছলে মন ভুলাইয়া আমাদের দেশে আবহমানকাল যে উপ- দেশামৃত প্রবাহিত হইয়া আসিতেছে তাহাই মৃতসঞ্জীবনীর কাৰ্য্য করিয়া এই ধৰ্ম্ম ও নীতির রাজ্যকে এখনও আপন পথে সঞ্জীবিত রাখিয়াছে। সুতরাং “উপকথা” বাজে-কথা হইলেও আমাদের জাতীয়-জীবনের অন্তরে-বাহিরে সুদৃঢ় শক্তি দান করিয়াছে ও করিতেছে বলিয়া আমরা, তাহাকে অবশ্য চিরদিন আদর করিব। বর্তমান উপকথা”টী পড়িলে ব্রিস্মিত-প্রাণে বুঝিতে পারিবেন শ্রীভগবানের আশীৰ্বাদ মস্তকে গ্রহণ করতঃ সাধুসংসর্গে শক্তি সঞ্চয় করিয়া অনতীতু ষােড়শবর্ষীয় একটী বালক কিরূপে আপন পিতৃরাজ্য উদ্ধার করতঃ মাতৃ-দুঃখ দূর করিতে সমর্থ হইয়াছিল। বাজে উপন্যাস লিখিয়া সময় নষ্ট না করিয়া আমাদের ঔপন্যাসিক- গণ যদি প্রাচীন গল্প ও উপকথাগুলিকে সাজাইয়া গােছাইয়া নবজীবন দান করতঃ উপন্যাসে পরিণত করিতে চেষ্টা করেন, তাহা হইলে নায়ক নায়িকার রঙ্গ-ভঙ্গ অপেক্ষা তাহা জাতীয়-সাহিত্যে অনেক অধিক মূল্য বহন করিবে, ইহাই আমার বিশ্বাস। পক্ষান্তরে এই অতীত-বিস্মৃত অবিশ্বাসের যুগে উপন্যাসচ্ছলে আমাদের পুরাতন কথাগুলিও জীবিত থাকিবে।
এই উপকথা”টী আমি আমাৰু বৰ্তমান সহধর্শিণী: শ্ৰীমতী নির্মল
হাসিনী দেবীর নিকট, শুনিয়া তাহারই অনুরােধে সাজাইয়া গােছাইয়া
গ্রন্থাকারে প্রকাশিত করিলাম। এজন্য আমি তাহার নিকট কৃজ্ঞতা
স্বীকার করিক্তে লজ্জা বােধ করি না। ইত্তি-
চৈত্র, ১৩১৬
'তােষ দাশ গুপ্ত, মহলানবীশ !
কানপুর (ইউ,পি,)
-
ক
tax"
ন +
++
টীয়ানাকী
( উপকথা।
এক ভিক্ষুক ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণী ছাড়া সংসারে আর কিছুই নাই ।
ব্রাহ্মণ মাগেন যাচেন, দুইজনে খান 'দান; এইভাবে দিন কাটে।
ব্রাহ্মণ যখন ভিক্ষায় যান, তখন ব্রাহ্মণী কঁথা সেলাই করেন, পৈতা
কাটেন। এক দিন ব্রাহ্মণ ভিক্ষা করিতে যাবেন এমন সময়ে ব্রাহ্মণী
হাসিতে হাসিতে কাছে পঁড়াইলেন। ব্রাহ্মণ দেখিলেন এ ভাব নূতন
রকমের। পেটে ভাত নাই, মুখে হাসি ! দুঃখকে দুঃখ জ্ঞান মা
করিলে আনন্দ আপনি আসে। ব্রাহ্মণ মুখের দিকে চাহিত না
চাহিতেই ব্রাহ্মণী বলিলেন-“আমায় একটা ছাগল কিনে দেবে ?”
ছাগল কেনার কথা শুনিয়া ব্রাহ্মণ ভিক্ষার ঝুলির ভিতর হইতে রাশি
রাশি হাসি বাহির কৱিয়া চারি দিকে ছড়াইয়া দিয়া বলিলেন--খেতে
পাওনা, ছাগল কিনবে কি দিয়ে ?”
ব্রাহ্মণী-দাম আমি দেবাে।
২
টীয়ানাকী ।
^^^
5A /
ব্রাহ্মণ-কোথায় পাবে ?
ব্রাহ্মণী তাড়াতাড়ি ঘরের কোণ হইতে দুই কলসি চাউল বাহির
করিয়া আনিয়া বলিলেন-“এই নেও; এই চাল বেচে ছাগল কিনে
দেও।”
ব্রাহ্মণ-এ চালা কার ?
ব্রাহ্মণী তােমার।
ব্রাহ্মণ –আমার কি ? যে চাল পাই-তাতেতাে পেটভরা
ভাতও জোটে না! এত চাল কোথায় পেলে, সত্যি বল না।
ব্রাহ্মণী রােজ যে চাল রাঁধতে নেই, তাথেকে একমুঠো এই
কসিতে রেখে দেই; তাতেই এত চা’ জমেছে।
ব্রাহ্মণ –আমিত কিছুই জানি না।
ব্রাহ্মণী—ঘরের কাজ মেয়েদের হাতে, পুরুষকে সব জাতে দিলে
চলে না। তুমি জানলে কি আর এদ্দিন থাকতাে ?
ব্রাহ্মণ -ব্রাহ্মণী, তুমি বরাবরই একমুঠো করে চাল রাখ ?
ব্রাহ্মণী -হ্যা, গরীবের ঘরে এ সব না হলে চলে না। দু'দিন
যদি পড়ে থাক, ভিক্ষা কতে না যেতে পার,-তখন কি উপায় হবে ?
রাঁধতে যে চাল নেওয়া যায়—তাখেকে একমুঠো চাল রেখে দিলে
ভাত কম হয় না, অথচ দশদিন রাখলে একদিনের খাবার জমে।
ব্রাহ্মণ ভারী খুসি। সেইদিনই চাউল বেচিয়া ব্রাহ্মণীকে এক
ছাগল কিনিয়া দিলেন । এক কলসীর চাউলেই ছাগল কেনা হইল,
আর এক কলসী ঘরে রহিল। ছাগলটী অতি সুন্দর ; ব্ৰহ্মণী
ছাগলের রূপ দেখিয়া ভারী সন্তুষ্ট হইলেন; রীতিমত ঘাস জল দিয়া
তাহাকে কত যত্নে প্রতিপালন করিতে লাগিলেন। কিন্তু, এত কষ্টের
কেনা ছাগল, তাহাও অশুভক্ষণে ব্রাহ্মণের ঘরে আসিল। ছাগলও
টীয়ানাকী ঘরে আসিল-ব্রাহ্মণী ও দিন দিন শুকাইয়া যাইতে লাগিলেন। এই ভাবে কিছুদিন যায়। ব্রাহ্মণের বড় দুঃখ হইল। ব্রাহ্মণীর আর সে রূপ-লাবণ্য কিছুই নাই; এমন কি উঠিতে বসিতেও যেন তঁাহার কত কষ্ট বােধ হয়। ভিক্ষুক ব্রাহ্মণের মনে কত রকমের সন্দেহ হইল। বৈদ্যের বাড়ী গিয়া ব্রাহ্মণীকে দেখাইলেন, বৈদ্য বলিলেন – “খেতে না পেয়ে এমন হয়েছে।” ব্রাহ্মণ বাড়ী ফিরিয়া আসিলেন, মনে ভাবিলেন-দেখিতে হইবে ব্রাহ্মণী কি খান । অন্যদিনের ন্যায় এ দিনও ব্রাহ্মণী ব্রাহ্মণকে খাওয়াইয়া ভিক্ষা করিবার নিমিত্ত বিদায় দিলেন ; পরে নিজের ভাত ঢাকিয়া রাখিয়া পূজা করিতে গেলেন। ব্রাহ্মণ চুপে চুপে ফিরিয়া আসিয়া ঘরে লুকাইয়া রহিলেন। কিছুক্ষণ পরে ব্রাহ্মণ দেখিলেন কি, যেমন ব্রাহ্মণী পূজায় মন দিয়াছেন, অমনি ছাগলটা আসিয়া তাহার ভাত খাইতে বসিয়াছে। ব্রাহ্মণী, রোজ যেমন হয়, পূজা সারিয়া আসিয়া দেখিলেন ভাত নাই ; কাজেই না খাইয়া পড়িয়া থাকিলেন। ব্রাহ্মণ ব্যাপার দেখিয়া ঠিক করিলেন, এই ছাগলটাই রােজ ব্রাহ্মণীর ভাত খাইয়া যায়; তাই না খাইতে পাইয়া এমন রােগ হইয়াছে ; কাজেই যেমন করি- যাই হউক ছাগলটাকে বিদায় করিতে হইবে। ব্যাপারটা আরও একটু ভালমত বুঝিবার জন্য আরও দুই এক দিন লুকাইয়া থাকিয়া দেখিলেন--রােজই ছাগলটা ব্রাহ্মণীর ভাত খাইয়া যায়, ব্রাহ্মণী না খাইয়া থাকেন। একদিন ব্রাহ্মণ বলিলেন—“ব্রাহ্মণী, তাের ছাগলটাকে বেচে ফেলবাে।” ব্রাহ্মণী।-কেন ঠাকুর, তােমার কি ক্ষতি করেছে ? ব্রাহ্মণবােজ ছাগল ব্যাটা তাের ভাত খেয়ে যায়, আর তুই টীয়ানাকী। ব্রাহ্মণী না খেয়ে থাকি। আর কিছু দিন এভাবে থাকলে যে মরে যাবি ! অনেক দিন ছাগলটাকে পুষিয়াছেন; ব্রাহ্মণীর মনে বড় মায়া হইল-দুঃখ হইল। ব্রাহ্মণী বলিলেন—“কৈ ঠাকুর, আমি ত কিছুই জানি না।” ব্রাহ্মণ তখন আগাগোড়া সব ব্রাহ্মণীকে বলিলেন ; বলিলেন—“আমি পূজো করে গিয়ে দেখি ভাত থাকে না. কাজেই না খেয়ে থাকি।” ব্রাহ্মণ --আমায় বলনি কেন ? ব্রাহ্মণী।--সব কথা কি পুরুষের কাগৈ নিতে আছে ? গৃহস্থের ঘরের বউ, কত রকমের কষ্ট সহ্য করূতে হয়। সব কথা পুরুষকে বলতে গেলে কাজ চলে না। ব্রাহ্মণ - না খেয়ে মরবে--তা'ও বলতে দোষ হয় ? ব্রাহ্মণী – বলে তােমার আরও কত কষ্ট হবে, তাই বলিনি'। ত যা হবার হয়েঁছে ; তুমি ছাপলটী বেচো না। আমি এখন থেকে ভাত উপরে তুলে রাখবো। ব্রাহ্মণ --না, তা হবে না। যে দিন থেকে ছাগলটা এসেছে সেই দিন থেকে তাের এ দশা। এ অশুভক্ষণে জানােয়ার আমি ঘরে কখতে দেবো না। ব্রাহ্মণীর কথা না শুনিয়া, ব্রাহ্মণ টানিতে টানিতে ছাগলটীকে বাড়ীর বাহির করিয়া লইয়া পেলেন ; ব্রাহ্মণী ঘরে বসিয়া কঁদিতে লাগিলেন। কিছু দূর গিয়া ব্রাহ্মণ দেখিলেন- ছাগলটী এক পরমাসুন্দরী যুবতীর রূপ ধরিয়া তাহার সঙ্গে চলিয়াছে। ব্রাহ্মণের মনে বড়ই ভয় হইল ; পলাইয়া যাইবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু যুবতী আর তাঁহার পিছু টীয়ানা। ৫ ছাড়ে না। মহা বিপদ! গরীব ব্রাহ্মণ, ভিক্ষা করিয়া খান, এ উৎপাৎ কি তাহার সাজে ? বহু দূর গিয়া ব্রাহ্মণ.একেবারে রাজার বাড়ীতে উপস্থিত হইলেন। রাজা তখন দরবারে। ব্রাহ্মণ ইতস্ততঃ না করিয়া তাহার সম্মুখে গিয়া চীৎকার করিয়া বলিলেন--“মহারাজ রক্ষা করুন।” যুবতী ততােধিক উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। রাজা ত অবাক্ ! বৃদ্ধ গরীব ব্রাহ্মণ, তাহার সঙ্গে এমন অপূৰ্ব্বসুন্দরী যুবতী! রাজা সভার আর সব কাজ বন্ধ করিয়া যুবতীকে জিজ্ঞাসা করিলেন—“তুমি কঁদছে। কেন ? তােমার কি হয়েছে ? নির্ভয়ে বল, তুমি যা চাও আমার কাছে তাই পাবে।” যুবতী রাজার পা জড়াইয়া ধরিয়া বলিল— “মহারাজ, আমায় বে করে এখন খাের-পােষ দিতে চাচ্ছে না, বলে তােকে বনবাস দেবে। আমি গৃহস্থ ঘরের বউ, এখন কোথায় যাই।” ব্রাহ্মণ শুনিয়া অবাক। তেলে কাজ নাই-থালি পাইলে বাচেন। ব্রাহ্মণ তাড়াতাড়ি বলিলেন-“ নানা মহারাজ, ওসব মিথ্যে কথা; আমি ওকে বিয়ে করিনি। জবরদস্তি আমার ঘাড়ে চাপতে চায়। আমি বুড়ো গরীব ব্রাহ্মণ—ভিক্ষে ক'রে খাই। আমার অমন রূপসীতে দরকার কি মহারাজ ?” রাজা দেখিলেন--বেশ মজার কারবার। যুবতীকে জিজ্ঞাসা করিলেন—“তােমার আর কে আছে ? যুবতী।--“মহারাজ, আমার আর কেউ নেই।” রাজা।“আচ্ছা, ব্রাহ্মণ যদি তােমায় না রাখেন, তবে অামার আশ্রয়ে থাক্তে তুমি রাজী আছ ?” যুবতী।~-“তা যদি আমায় ত্যাগই করে, আর আপনি অতটা দয়া করেন, তবে সে আমার সৌভাগ্যের কথা।” রাজা ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞাসা করিলেন—“তুমি কি বহুতে চাও ?”
টীয়ানাকী । । ব্রাহ্মণ তখন সুবিধা পাইয়া বলিলেন—“মহারাজ, আমার কোন আপত্তি নেই। তবে দয়া করে আমি খেয়ে পরে থাকতে পারি, তার বন্দোবস্ত করে দিন। ও এক ব্রাহ্মণের মেয়ে--আমার স্ত্রী, ওকে ছেলেবেলা থেকে পালন করেছে। এখন খেতে না পেয়ে বেচতে যাচ্ছিলাম ; কিন্তু ও ছাড়তে চায় না-মায়ায় ধরেছে কিনা তাই। যাবার ইচ্ছে নেই বলে বছিল--আমি ওকে বিয়ে করেছি। তা এখন যখন ও নিজে আপনার আশ্রয়ে থাকতে রাজী আছে, তখম আমাকে খােরপােষের বাবদ কিছু দিলেই আমি চলে যেতে পারি।”রাজা দরবার ভাঙ্গিলেন এবং ব্রাহ্মণকে দুই সহস্র স্বর্ণমুদ্রা দিয়া বিদায় করিলেন। রাজারও আনন্দ ; যুবতীরও আনন্দ ; ব্রাহ্মণের তাে কথাই নাই ! ব্রাহ্মণ ভারী খুসী হইয়া রাজাকে আশীৰ্ব্বাদ করিয়া বলিলেন—“মহা- রাজ, সুখে থাকুন । আপনার জয় হােক্।” রাজা লােক সঙ্গে দিলেন ; ব্রাহ্মণ স্বর্ণমুদ্রা লইয়া বাড়া ফিরিয়া গেলেন। যুবতী-রাজার অন্তঃপুরে রহিল। অনেক পথ দৌড়িয়া আসিয়াছে ; রাস্তা ছাড়িয়া ঘরে আসিয়া আজকালকার কলকাতার পার্শ্ববর্তী বাবু-গিন্নীদের মত তাহারও লজ্জা হইল, ঘোমটা হইল; আর কি চন্দ্র-সূর্যের মুখ দেখে ? ব্রাহ্মণ বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া দেখেন—ব্রাহ্মণী রামায়ণ পড়িতে, ছেন। আজকালকার বাবু-গিন্নিদের মত “মডেল ভগিনী” পড়িতেছেন বলিয়া কাহারও মনে আপশোষ হইবে না তাে? ব্রাহ্মণ তাহার সম্মুখে মােহরের তােড়া গুলি রাখিয়া বলিলেন-“ব্রাহ্মণী, ছাগলের শােক এত অল্পেই দুর হ’ল ?” ব্রাহ্মণী বলিয়া উঠিলেন—“যাও ঠাকুর, তুমি ভারী নিষ্ঠুর ! তােড়র দিকে চাহিয়া বলিলেন-“এ-এ কি ?” ব্রাহ্মণ।-ছাগলের দাম। ছাগল বেচে পেয়েছি।
টীয়ানাকী । ৭ - ব্রাহ্মণী।—পেটে ভাত জোটে না-কথায় কথায় ঠাট্টা! ছাগল বেচে কি পেয়েছ দেখি। ব্রাহ্মণী একে একে সব তোড়াগুলি খুলিয়া দেখিলেন—সবই মােহর। অবাক্ হইয়া ব্রাহ্মণের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন ; কিছুক্ষণ পরে বলিলেন-“বল না এ কার ?” ব্রাহ্মণ “এইটে তােমার, এইটে আমার” “এইটে তােমার, এইটে আমার” বলিয়া সব তোেড়াগুলিকে দুই ভাগ করিয়া ফেলিলেন। ব্রাহ্মণী বিরক্ত হইয়া ঘােটা টানিয়া দিয়া সরিয়া দাড়াইয়া বলিলেন- “কোন একটা কথারই তাে তুমি ঠিক জবাব দেও না। যাও, তোমার টাকা নিয়ে তুমি থাক, আমি চল্পম। আমার ঢের কাজ আছে।” ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণীর অভিমান দেখিয়া তাহার নিকট একঘটী জল চাহিলেন । তৎক্ষণাৎ অভিমান দূর হইল ; ব্রাহ্মণী জল আনিয়া দিলেন। পূর্বে আমাদের দেশে পতিসেবার নিকট সব অভিমান, সব ক্রোধ, সব জ্বালা যন্ত্রণা মুহূর্তে উড়িয়া যাইত। হায়,সে প্রাণ ও ভাব এখন কোথায় গেল? ব্রাহ্মণ পা ধুইয়া সুস্থ হইয়া বসিয়া ব্রাহ্মণীকে সব কথা বলিলেন। কর্তব্যের অন্তরালে অভিমান লুকাইয়া রাখিয়া ব্রাহ্মণী ব্রাহ্মণের নিকট সব শুনিলেন। দুই জনের আনন্দ আর সে ভাঙ্গা ঘরে ধরে । ভাঙ্গা ঘর ভাঙ্গিয়া ফেলিয়া তাহারা বড় ঘর তৈয়ার করিলেন । সুখে স্বচ্ছন্দে খাইয়া পরিয়া তাহাদের দিন যাইতে লাগিল। এখন আর ব্রাহ্মণ ভিক্ষা করেন না। ভগবানের ব্যবস্থা। কষ্ট স্বীকার করিয়া ধৰ্ম্মপথে থাকিতে পারিলে পরিণামে ভগবান এইরূপেই কর্তব্য। পরায়ণ ধার্মিকের দুঃখ দূর করেন। রাজারও পরম আনন্দ। পরমানন্দরূপিণীকে পাইয়া তিনি আর টীয়ানকী। • • • • • • • • • • • • • • • • • Vv v v v vvv vvvvvv//yvv''.yJvyjv\:* ঘরের বাহির হন না। দরবারে বসা প্রায় বন্ধ। প্রেম যতই ঘনীভূত হইতে লাগিল—রাজা ততই নবযুবতীর পদাঙ্গুষ্ঠে কেশবন্ধন করিতে লাগিলেন। রাজার আর দুই রাণী ছিলেন—তাহারা প্রায় দাসীর মত হইয়া দাঁড়াইলেন। তাহাদের কাছে যাওয়া তাে একেবারেই বন্ধ, বরঞ্চ সময় সময় তঁাহার কাছে আসিলে রুক্ষ-ভাষে বিদায় করিয়া দেন। রাজা মহাশয় বেশ সুখে আছেন। রাজ্য উৎসন্ন যাইতেছে যাউক, তাহাতে আমার কি ? আমার এই “ইমাছের ঝােল, আর নবযুবতীর কোল” এই দুইটী থাকিলেই সব থাকিবে। জীতা রহে। বাবা মহারাজ, আমরাও তােমারই দলের চেলা । তুমি যদি এই বিংশ শতাব্দীতে নামিয়া আসিতে পারিতে, তাহা হইলে আমরা তােমাকে লইয়া একটা সমিতি গঠন করিয়া ফেলিতাম । কিছুদিন যায়। রাজার হাতীশালে হাতী মরে-ঘােড়াশালে ঘােড়া মরে। রােজ সকালবেলা লােক-লস্করের খবর দিয়া যায়—“এতটা হাতী নেই” “অতটা ঘােড়া নেই।” রাজারও তাতে তাপ-উত্তাপ নাই। হাতীঘোড়া নাইবা থাকিল--আমার শীতের লেপখানা জলে না তিজিয়া গেলেই আমি বেশ সুখে থাকিতে পারিব ! হাতীঘোড়ার রক্ষকেরা রাজার ভাবগতিক দেখিয়া মন্ত্রী মহাশয়কে রােজই এক একবার খবর দিতে লাগিল। মন্ত্রী মহাশয় অনেক চেষ্টা কর্নিয়াও কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না। কি জানি কি হয় ; কেহ কিছু বুঝাইতে বুঝিতে পারে না। যে রাণীদের রাজা মহাশয় জীর্ণ বসলের ন্যায় ফেলিয়া রাখিয়া দিয়াছেন,তাদের কাণে এ সব কথা গেল। রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট হইতেছে—এই ভাবনা- রাজা তাঁহাদের কাছে আসেন না এ ভাবনা অপেক্ষা অধিক মর্মস্পর্শী হইল; তাহারা রাজার এইরূপ ঔদান্তের দিনে,উচ্ছলতার সময়ে,ভঁহার স্থানে কাজ করিবার * টীয়ানাকী । ৫ নিমিত্ত প্রতিজ্ঞা করিয়া দুই সতীনে সকল দিকে দৃষ্টি দিতে লাগিলেন । যখন যেমন দরকার মন্ত্রীকে বলিয়া পাঠাইতে আরম্ভ করিলেন । একে রাজার বিরহ, তাহাতে রাজ্যের এই দুর্দশা। রাণীদের আহার নিদ্রা বন্ধ হইয়া আসিল। দিনরাত্রি চিন্তা করেন, কি উপায়ে এই পাপিয়সীর প্রেম বা মােহের হাত হইতে রাজাকে বঁাচান যায় । তাহাদের মনে নানাপ্রকার সন্দেহ হইতে লাগিল। যেদিন হইতে এ কেটিকে ঘরে আনিয়াছেন, সেই দিন হইতেই রাজা যেন আর সে মানুষ নহেন ; আর তাহার পর অল্প দিন যাইতে না যাইতেই হাতী ঘােড়া মরিতে আরম্ভ,রাজ্যে অমঙ্গলের লক্ষণ ; নিশ্চয়ই ইহার ভিতরে কিছু আছে—রাণীদের চিত্তে এইরূপ সন্দেহ দৃঢ়বদ্ধ হইল । এবং তাঁহারা রাজা ও তাঁহার মােহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। রাত্রে উভয়ে একত্র হইয়া রাজার শয়নঘরের চারিদিকে পাহারা দিতে লাগিলেন ; উহারা কি করেন ও কি বলেন, দেখিবার শুনিবার উপায় করিয়া লইলেন। একদিন দেখিলেন কি, রাজা, যেমনি ঘুমাইয়াছেন, মােহিনী হার মাথায় হাত দিয়া দুই একবার কি মন্ত্র পড়িয়া, কাপড় ছাড়িয়া ঘর হইতে কাহির হইয়া পড়িল; এবং ঘরের বাহির হইয়া দুই তিনবার জোরে শ্বাস গ্রহণ করিতে না করিতেই এক ভীষণ আকার ধারণ করিল। তখন সে ধীরে ধীরে হাতী ও ঘোড়াশালের দিকে গিয়া কি মন্ত্র পড়িয়া দুই একবার, জলের ছিটা দিতেই পাহারাওয়ালার সকল ঘুমাইয়া পড়িল। সে তখন নির্ভয়ে আস্তাবলে প্রবেশ করিয়া ইচ্ছামত ভােজন করিয়া বাহির হইয়া আসিল। আবার মন্ত্র পড়িয়। জল ছড়াইয়া সকলকে জাগাইয়া দিয়া গােপনে ঘরে ফিরিয়া আসিল। ঘরে আসিয়া কাপড় ছাড়িয়া আবার রূপসী সাজিয়া রাজার বুকে শুইয়া থাকিল।
টীয়ানাকী। '৯১;•• দেখিয়া শুনিয়া রাণীদের চমক ভাঙ্গিয়া গেল—আর সন্দেহ থাকিল কাহাকেও কিছু না বলিয়া রাণীর। পরামর্শ করিলেন—একদিন যখন বিটী খাইয়া বাহির হইবে, তখন তাহার সম্মুখ দিয়া আমরা চলিয়া যাইব— যাহাতে টের পায়, আমরা দেখিয়াছি। তাহার পর দুই একদিন দেখিয়া আমরা রাজার কাছে সব বলিব। বিশ্বাস করেন করিবেন, না করেন না করিবেন। রাণীরা এইরূপ স্থির করিয়া এক- দিন তাহার সম্মুখ দিয়া দৌড়িয়া চলিয়া গেলেন ! রূপসী তাহাদের দেখিতে পাইয়াও কিছুমাত্র ইতস্ততঃ না করিয়া নিত্যকার মত কাজ সারিয়া চলিয়া গেল। কিন্তু রাণীরা জানিতে পারিয়াছে বুঝিয়া তাহার মনে একটু ভয় ও সন্দেহ হইল। পরদিন ভােরবেলা উঠিয়া রূপসী বলিলেন-“মহারাজ, তােমার কাছে আমার একটা নালিশ আছে।” রাজা।- কি ? রূপসী।-তুমি যে আমাকে নিয়ে থাক, তা তােমার রাণীদের সহ হয় না। তারা আমার উপর বড়ই অত্যাচার শুরু করেছে। রাজা।-তারা তােমার কি করেছে বল, আমি এখনই তার প্রতী- কার কচ্ছি। রূপসী।-কাল রাত্রে তুমি ঘুমিয়ে পড়বার পর আমার বড় গরম বােধ হচ্ছিল, আমি বাইরে বেরিয়েছিলুম ; এমন সময়ে দেখি কি তােমার রাণীরা দু’জনে ঘরের কোণে জানালার কাছে দাড়িয়ে আছে। আমি বেরােতে না বেরােতেই তারা আমার কাপড়ে খানিকটে রক্ত ঢেলে দিয়ে হাসতে হাসতে পালিয়ে গেল। এই দেখ সে কাপড়খানা ছেড়ে রেখে দিয়েছি। রাজা দেখিতে পাইলেন সত্য সত্যই কাপড়ে রক্ত। রূপসী তখন তাহার পা জড়াইয়া ধরিয়া দিতে দিতে বলিতে লাগিল- টীয়ানাকী ১১ “মহারাজ, দয়া করে ভালবেসেছেন বলেই আপনার কাছে আছি। তা যদি তাদের সহ্য না হয়, তবে আমাকে বিদায় দিন, আমি ভিক্ষে করে খাব তাও ভাল, তবু কাহারও সুখে বাধা দিতে চাইনা।” রাজা —রূপসী-ভক্ত ; রূপসীর চক্ষের জল কি আর তাহার সহ্য হয় ! তিনি তাহাকে আদর করিয়া বুকে টানিয়া আনিয়া বলিলেন--“তােমার কোন ভয় নাই। আমার সর্বস্ব তােমার। আমি তােমার সুখের পথ পরিষ্কার করে দিচ্ছি।” রূপসীর চক্ষের জল মাটিতে পড়িলে পাছে রাজার চৌদ্দপুরুষ নরকে যায়, ইহজীবনের সর্বকৰ্ম্ম নষ্ট হয়, এই ভয়ে রাজা অতি যত্নে আপন বসনাঞ্চলে তাহার চক্ষু মুছাইয়া দিয়া অতি কষ্টে তাহার চক্ষের জল দুর করতঃ তাহাকে আদরে বুকে রাখিয়া মুখচুম্বন করিয়া ভাবিলেন—এই আমার ইহকাল, পরকাল। ইহার জন্য সব পরিত্যাগ করিতে পারি—রাজত্ব তো তুচ্ছ কথা। দিনের আলো চারিদিকে ছড়াইয়া দিব্য সূৰ্য্যদেব উপরে উঠিলেন। রাজা রাণীদের ডাকিয়া পাঠাইলেন। রাণীরা আসিয়া তাহাকে প্রণাম করিয়া দাড়াইলেন। রাজা রূপসীকে কি হইয়াছে বলিতে বলিলেন। রাণীদের মুখ শুকাইয়া গেল। রূপসী পূৰ্ব্বে যেমন রাজার কাছে বলিয়াছিল, এখনও সেইরূপ বলিতে বলিতে চক্ষের জল ছাড়িয়া দিল। রাণীরা উভয়ে বাধা দিয়া বলিলেন-“না মহারাজ, এ সব মিথ্যে কথা। আমরা যা জানি আপনাকে বলছি। আমাদের ছেড়ে দিয়েছেন সে আমাদেরই কৰ্ম্মফল, তার জন্যে কিছু বলছি না; আপনার রাজ্য উচ্ছন্ন যাচ্ছে, দেশ উচ্ছন্ন যাচ্ছে, প্রজা উচ্ছন্ন যাচ্ছে। আজ না হয় আমরা তুচ্ছ হয়ে পড়ে আছি; কিন্তু এ রাজ্যের আমরাই রাণী—অন্ততঃ এক সময়ে ছিলাম। এই ছয়মাস কাল আপনার চরণ দর্শন পাই না বটে, কিন্তু এখনও আপনার সন্তান আমাদের একজনের গর্ভে আছে।” এই টীয়ানাকী । বলিয়া তাঁহার যাহা কিছু দেখিয়াছেন, অবিকল রাজার নিকটে বলিলেন। কিন্তু রূপসীর চক্ষের জলের নিকট সব ভাসিয়া গেল। রাজা সবােষে বলিয়া উঠিলেন—“তােরা ভয়ঙ্কর মিথ্যাবাদী। আমার রাজ্যে তােদের স্থান হবে না। তােরা আমাকে বশ করূবার জন্য ভাণ করূতে এসেছি। আমি তােদর চোখ তুলে রেখে রাজ্যের বের করে দেবাে।”রাণীরা যেমনই আবার প্রতিবাদ করিতে উদ্যত হইলেন, রাজা ছুটিয়া আসিয়া আপাদমস্তক বেত্রাঘাতে রক্তাক্ত করিয়া দিলেন এবং হুকুম দিলেন-“আমার সামনে এদের চোখ তুলে নিয়ে যে চোখে দেখতে এসেছিল, সে চোখ, এই আমার রাণীকে (রূপসী) দে ; আর এদের রাজ্যের বাইরে বনে রেখে আয়।” রাজার অনুচরগণ তাহাই করিতে বাধ্য হইল। আপদ দূর হইল। রাজা রূপসীকে নিয়। আনন্দে ঘর করিতে লাগিলেন। এই আনন্দোৎসবের অপর পার্শ্বের সমগ্র-রাজ্যময় হাহাকারও তঁাহার একাগ্রচিত্ততায় কোন বাধা দিতে সমর্থ হইল না। রাজার অনুচরেরা রাণীদিগকে রাজ্যের বাহিরে একটী সাধুর আশ্র, মের নিকটে রাখিয়া আসিল। ইহাও তাহাদের দয়া। তাহাদের আর অপরাধ কি ? চাকুরী করে যমের ; প্রাণের ভয় তাে আছে । তাহা ছাড়া চাকরের আবার ভালমন্দ সুখ-দুঃখ বিচার করার অধিকার কি ? তাহাদের বিবেকও থাকিতে নাই-বুদ্ধিও থাকিতে নাই- কথা বলিবার শক্তিও থাকিতে নাই। থাকিলে আবার চাকর কিসের ? সাধু ধ্যানযোগে সমস্ত ঘটনা জানিতে পারিয়া, রাণীদ্বয়কে আদর করিয়া নিজের কুটীরে লইয়া গেলেন। গাছের ফল ও সাধুদিগের ভিক্ষালব্ধ আহারীয় জিনিষের অংশ ভক্তিভরে প্রসাদ স্বরূপ গ্রহণ করতঃ তাহারা কোন মতে দিন কাটাইতে লাগিলেন।
টীয়ানাকী। সময়ে বড় রাণর একটী পুত্র হইল। পুত্ৰটী বড়ই সুন্দর ও সুলক্ষণযুক্ত হইল ;-হাজার হইলেও তাে রাজপুত্তর। শিশু ক্রমে বড় হইতে লাগিল। সাধু-মহাত্মা তাহাকে লেখাপড়া ও নানারকমের বিদ্যা শিক্ষা দিতে লাগিলেন। তাহার বয়স যখন ১৪ বৎসর হইল, তখন সে রীতিমত শক্তিমান্, বুদ্ধিমান্ ও বিদ্বান্ হইয়া উঠিল। দৈবাৎ একদিন সাধুর আশ্রমে এক অপরিচিত ব্যক্তি আসিলেন, তখন সাধু আশ্রমে ছিলেন না। রাজপুত্র তাহাকে রীতিমত অভ্যর্থনা করিয়া বসিতে দিলেন। অগিন্তুক তাহার শিষ্টাচারে সন্তুষ্ট হইলেন এবং আশীৰ্বাদ করিয়া, তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। বালক তাহার নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় দিতে পারিল না। সে এই মাত্র জানে, সে এক সাধুর পুত্র। সে সাধু কে, তাহার নাম কি, এ সকল কথা কেহ কোন দিন তাহাকে জিজ্ঞাসাও করে নাই, আর তাহার মনেও আসে নাই। আজ আপন পরিচয় না দিতে পারিয়া তাহার মনে বড়ই দুঃখ বােধ হইল, পিতার নাম বলিতে না পারিয়া বড়ই লজ্জা বােধ হইল। সময়ে সাধু অশ্রমে ফিরিয়া আসিলে বালক তাহার অনুমতি লইয়া মায়ের নিকটে আসিল। সাধু বালকটীর নাম রাখিয়াছিলেন—“শৃশাঙ্কশেখর।” শশাঙ্ক মায়ের নিকট ফিরিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল-“মা, আমার বাবার নাম কি ?” মা।-কেন বাবা ? এতদিন তাে এ কথা জিজ্ঞাসা কর নাই। শশাঙ্ক ।-না, মা, বল কোন্ সাধু আমার বাবা ছিলেন। মা কেন, কি হইয়াছে ? শশাঙ্ক। না, কিছুই হয় নাই, তবে আজ গুরুর আশ্রমে এক ব্যক্তি আসিয়াছিলেন—তিনি আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে, আমি { ১৪ টীয়ানাকী। AAAA, An AAA + } বলিলাম—“আমি এক সাধুর পুত্র।” নাম বলিতে পারিলাম না। নিজের বাপের নাম বলিতে না পারিয়া আমার বড় লজ্জ। ও অপমান বােধ হইল। তিনি বলিলেন--“তােমার শরীরে সাধু-লক্ষণ ভিন্ন আরও এমন লক্ষণ দেখিতে পাইতেছি, যাহাতে তােমাকে সাধুপুত্র বলিয়া বােধ হয় না।” মা, কে আমার জন্মদাতা ?-তাহার নাম কি ? এবারে মায়ের চক্ষে জল আসিল। এতদিন যে আগুন বুকে চাপিয়া রাখিয়াছিলেন, আজ তাহা ফাটিয়া বাহির হইল! মা কঁদিয়ে কাদিতে শশাঙ্ককে কোলে লইয়া বলিলেন-“বাবা, সত্যসত্যই তুমি সাধুপুত্র নও। যে পূজনীয় দেবতার বীর্যে তােমার জন্ম হইয়াছে- তিনি এই রাজ্যের রাজা! বাবা, তুমি রাজপুত্র।” শশাঙ্ক।—রাজার পুত্র কোথায় ভিখারী সাজিয়া জঙ্গলে থাকে মা? মা-কপাল ভাঙ্গিলে রাণীকেও জঙ্গলে থাকিতে হয়। বুদ্ধিমান বালক, সে বুঝিতে পারিল ইহার ভিতরে আরও কিছু আছে। তখন মাকে পেড়াপিড়ি করিয়া ধরিতে ও আবদার করিতে আরম্ভ করিল। মা পূর্বাপর সকল কথা তাহাকে বলিলেন। শশাঙ্কশেখর শুনিতে শুনিতে উঠিয়া দাঁড়াইল। ক্রোধে চক্ষু রক্ত- বর্ণ হইয়া উঠিল ; বৈর-নিৰ্যাতনস্পৃহায় ধমনীস্থ পিতৃ-বীৰ্য আস্ফালন করিতে লাগিল। শশাঙ্ক মাকে বলিল—“মা, আমি বাবার সহিত দেখা করিতে যাইব।” মা।-বাছা, শান্ত হও। সকল কাজেরই একটা সময় আছে। শশাঙ্ক।সময় হইতে আর বাকী নাই। আমি বড় হইয়াছি। যদি পিগ আমার কথা না শোনেন তবে যেমন করিয়াই হউক, যে পাপিয়সীর কুমন্ত্রণায় তােমাদের চক্ষু নষ্ট হইয়াছে—তোমরা যাহার টীয়ানাকী। পাশবিক অত্যাচারে প্রতাড়িতা, ভিখারিণী অপেক্ষাও হীনাবস্থায় বহিষ্কৃত হইয়াছ, তাহার চক্ষু উৎপাটন করিয়া আনিব। মা।-তুমি এখনও বালক ; তােমার কি সাধ্য এই ব্যুহ তো করিতে পার ? শশাঙ্ক।-মা, আমাকে বালক বলিয়া তুচ্ছ করিও না ; আমি যে রাজপুত্র ! এ আমার পিতৃরাজ্য, এ রাজ্য আমার। আমি রাজা পুত্র হইয়া কেন ভিখারী সাজিয়া বনে বনে ভিক্ষা করিয়া বেড়াইব ? এতদিন জানিতে বুঝিতে পারি নাই, সে পৃথক্ কথা ছিল। মা।—আরও কিছুদিন বিলম্ব কর। তুমি এখনও অতি বালক। শশাঙ্ক।-মা পূৰ্বেই বলিয়াছি, আমি বালক হইলেও রাজপুত্র। এ আমার পিতৃরাজ্য—এ রাজ্য আমার। আমার পিতৃরাজ্য রাক্ষসের শাসনে থাকবে, পাপিয়সী রাক্ষসী আমার পিতার বক্ষে পদার্পণ করে রক্তশােষণ করবে, জীবন থাকতে তা আমি সহ্য করে থাকতে পার্বাে না। মা-বাবা, তুমি আমার একমাত্র অবলম্বন। তাই তােমাকে যমের হাতে দিতে ইচ্ছা করে না। হলে তােমার পবিত্র বাসনায় বাধা দিবার প্রয়ােজন কি ? শশাঙ্ক।—সত্যি মা আমি তােমার একমাত্র সন্তান। কিন্তু মা, আমি তাে এ রাজ্যের একমাত্র ভবিষ্যৎ রাজা। অত্যাচারে আমার রাজ্য উৎসন্ন হয়ে যাচ্ছে, রাজ-শ্ৰী—সুদুর কাননে লাঞ্ছিতা প্রতাড়িত হয়ে পড়ে আছে, আর আমি কোন্ বীৰ্য্য ধমনীতে ধারণ করে, নিশ্চিন্তু প্রাণে ভিক্ষার অন্নে উদর পূর্ণ করে তা দেখতে থাকূবব মা? গুরু আমাকে এ শিক্ষা দেন নাই। রাণী বুঝিতে পারিলেন—শশাঙ্কশেখর আর বালক নহে। তিনি টীয়ানাকী। Abল'। তাহার কণ্ঠস্বরে এক স্বর্গীয় ভাব-তরঙ্গ অনুভব করিতে লাগিলেন ; ভাহার তেজস্বীতার অভ্যন্তরে এক অমানুষিক প্রতিভা, ধৰ্ম্ম, সাহস ও অদম্য প্রতিজ্ঞার ছবি সূর্যের ন্যায় প্রদীপ্ত তেজে ধ্বক্ ধ্বক করিয়া জ্বলিতেছে, স্পষ্ট অনুভব করিতে পারিয়া মনকে বলিলেন-মন,তােমার শশাঙ্ক এখন আর বালক নহে, সে কুমার বয়সে তেজস্বী যৌবনের অধিকারী হইয়াছে ; দেও তাহাকে তাহার কর্তব্যপথে যাইতে, ভগবান তাহার মঙ্গল করিবেন, পবিত্র উদ্দেশ্যে সাহায্য করিবেন। পুত্রকে বলি- লেন—“একান্তই যদি যাবি, গুরুর অনুমতি নিয়ে আয়।” শশাঙ্ক গুরুর অনুমতি নিতে গেল ; অনেক আলােচনার পর গুরু তাহাকে অনুমতি দিলেন ও আবশ্যকীয় সমস্ত উপদেশ ও মন্ত্র শিক্ষা দ্বারা প্রাণে নূতন শক্তির সঞ্চার করিয়া দিলেন। শশাঙ্ক ফিরিয়া আসিয়া বড়-মা ছােট-মার চরণে বিদায় মাগিল। দুইজনে তাহাকে কোলে লইয়া কত অনিচ্ছায়, কত দুঃখে পাষাণে বুক বাঁধিয়া বিদায় দিলেন। মা আশীৰ্বাদ করিলেন- “যাও আমার হৃদয়ের ধন, অন্ধের নয়ন ; সৰ্ব্বদুঃখবিনাশন দয়াল ঈশ্বর আমার প্রহলাদকে দুরন্ত হিরণ্যকশিপুর হাত হতে উদ্ধার করবেন। মায়ের আশীর্বাদে সৰ্ব্বজয়ী হবে, তােমার কোন বিপদ হবে না।” “সাত দিন পরে ফিরে আসবাে” বলিয়া মাতৃদ্বয়ের চরণে বিদায় লইয়া শশাঙ্কশেখর পিতৃরাজ্য উদ্দেশ্যে চলিল ; রাণীরা শশাঙ্ককে বিদায় দিয়া শেলবিদ্ধ পক্ষিনীর ন্যায় ছটফট করিতে লাগিলেন। দীর্ঘ সাত দিন সাত রাত্রি মাথার উপর দিয়া চলিয়া গেল ; শশাঙ্ক ফিরিয়া আসিল না। রাণীদিগের আহার-নিদ্রা বন্ধ হইল। এ দিকে বহু কষ্টে শশাঙ্কশেখর রাজবাড়ী উপস্থিত হইল, ও সেদিন কোন রাজ-অনুচরের ঘরে অতিথি হইয়া আবশ্যকীয় খবর অনেক শুনিতে পাইল। পরদিন রাজার সহিত দেখা করিবার ইচ্ছায় প্রকাণ্ড দরবার টীয়ানাকী। ১৭ গৃহের দ্বারদেশে উপস্থিত হইল। রাজার দরােয়ান বাধা দিল। বালক স্তোক-বাক্যে তাহাকে তুষ্ট করিয়া দরবার-গৃহে প্রবেশ করিল, এবং রাজার সম্মুখে সারাদিন দাড়াইয়া রহিল ; কিন্তু কেহ তাহাকে লক্ষ্য করিল না। সেদিন শশাঙ্ক ফিরিয়া আসিয়া প্রধান অশ্বপালকের গৃহে অতিথি হইল। পরদিনও সেইভাবে কাটিয়া গেল ; এ দিন বালক হস্তী-রক্ষকের ঘরে অতিথি হইল। তিন দিনের দিন রাজা দরবার ভাঙ্গিয়া ফিরিবার সময়ে শশাঙ্ক সাহসে ভর করিয়া তাহার সম্মুখে দাড়াইয়া প্রণাম করিল। প্রথম দর্শনেই রাজার প্রাণে স্নেহ জন্মিল ; তিনি মনে ভাবিলেন – নিশ্চয়ই বালকের কিছু বলিবার আছে। রাজ। অধিকতর নিকটে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন--“তুমি কে ?” বালক।-ভিক্ষুক। রাজা।~-এখানে কি জন্যে এসেছ ? বালক।-- ভিক্ষায় পেট ভরে না, মহারাজ! যদি দয়া করে কোন চাকরী দিতে পারেন, এই আশায় তিন দিন পড়ে আছি । রাজা।--তােমার কে আছেন ? বালক।-মা আছেন, বিমাতা আছেন। রাজা।-তুমি বালক, তুমি কি চাকরী কবে ? বালক।-আপনি যে কাজ বলুন,সাধ্যমত আমি সবই করতে পারি। রাজা-এমন কি কাজ তােমাকে দিতে পারি--যাতে তিন জনের পেট ভরে ? তােমার মা ও বিমাতা কোন কাজই করূতে পারেন না? বালক।--মহারাজ, তাহারা অন্ধ। আমার অন্ধ মা-অন্ধ বিমাত আপনারই রাজ্যের নিকটে বাস করেন ; আপনার অতুল ঐশ্বৰ্য্য- আপনি রাজ্যেশ্বর ; তাহাদের প্রতিপালন করা কি আমার একারই কৰ্তব্য ? দরিদ্র-প্রতিপালন কি রাজেশ্বরের কর্তব্যের অংশ নয় ?
টীয়ানাকী। রাজা।-তুমি ছেলেমানুষ, আমার এমন কি কাজ আছে যে তোমাকে কতে দিতে পারি ? বালক।-না থাকলে অনিও, মহারাজ, খেতে পকূতে দিতে হয়। প্রজা না খেয়ে মরূবে, রাজা দেখেও দেখবেন না—এই কি রাজার কাজ ? প্রজা সন্তান ; আগে সন্তানকে খেতে দিয়ে পরে নিজে খেতে যে রাজা প্রজাকে খেতে না দিয়ে নিজে খেতে চায়, তাহার সে আহার হজম হয় না, তাহার পাপের রাজ্যে শান্তি থাকে না। বালকের নয়ন-জলে বসন ভিজিতে লাগিল। ধীর গম্ভীরে রাজা বালকের মুখে সুন্দর রাজনীতি শ্রবণ করিয়া স্নেহ-বিগলিত-হৃদয়ে বলিলেন-“আমি তােমাকে আশ্রয় দিতে অনিচ্ছুক নই ; তুমি আজ ও-কাল দরবারে আমার সাথে দেখা করাে। যে কাজ তুমি সাধ্য- মত কতে প:বে, তাই তােমাকে দেবাে।” বাজাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করতঃ শশাঙ্ক সন্তুষ্ট হইয়া ফিরিয়া অসিল; এবং সেদিন দ্বারবানের বাড়ীতে অতিথি হইয়া থাকিল। পরদিন দরবারে রাজা শশাঙ্কশেখরকে তাহারই প্রার্থিতমত হাতী ও অশ্বশালায় পাহারাওয়ালা করিয়া দিলেন। শশাঙ্কের চাকরী হইল ; দুই হাত তুলিয়া রাজার জয়ধ্বনি করিয়া তাঁহার অনুমতি লইয়া সে মাদের সাথে দেখা করিতে চলিল। সময়ে শশাঙ্ক মাদের কাছে উপস্থিত হইয়া সব কথা খুলিয়া বলিল ; তাহাদের পোড়ামুখেও আনন্দ-হাসি দেখা দিল। তাহারা উপযুক্ত পুত্রকে কোলে তুলিয়। কত আশীর্বাদ করিলেন ! শশা গুরুর নিকট গিয়াস ৰলিল ; পর সকলের বিদায়-আশীর্বাদ গ্রহণ করতঃ রাজার চাকরীতে ফিরিয়া আসিল। শশাঙ্কের চাকরী হইবার পূর্বে রােজ রাজাৱ হাতীশালে হাজী টীয়ানাকী মরিত, ঘােড়াশালে ঘােড়া মরিত; বহুদিন হইতে এইভাব চলিয়া আসিতেছিল সে কিছুদিন দেখিয়া একদিন রাজাকে বলিল- “মহারাজ, আমাকে আমার পছন্দ মত ৭৮ জন লােক দিন ; আমি হাতী-ঘােড়া মরা বন্ধ করে দেবাে।” রাজা শুনিয়া হাসিলেন। শশাঙ্ককে বলিলেন—“তুমি কি চিকিৎ- সক ? ৭৮ জন লােক হলে যদি চিকিৎসা করূতে পারা যেতাে, তা হলে এতদিনে এ রােগও বন্ধ হ'ত। তুমি বালক ; অনেক বড় বড় চিকিৎসক ডাকান হয়েছে হচ্ছে ;--কিন্তু কেউ ঠিক করুতে পারে না এতকাল ধরে কি সংক্রামক রােগে রােজ আমার হাতীশালে এত হাতী, ঘোড়াশালে এত ঘােড় মরে।” শশাঙ্ক।-মহারাজ, আমি চিকিৎসকও নই, আর বালকও বটে। কিন্তু, আমি আপনার অনুমতি হলে ও সাহায্য পেলে হাতী-ঘােড়া মরা বন্ধ করে দিতে পারবো। না পারি, আমাকে তাড়িয়ে দেবেন ; বা শাস্তি দিতে হয় দিতে পাবেন।” রাজা শশাঙ্ককে নিজের পছন্দমত ৭৭৮ জন লােক দেখিয়া নিতে বলিলেন ;-শশাঙ্ক আপনার পছন্দমত লােক ইয়া রােজ সারারাত পাহারা দিতে লাগিল। শশাঙ্কের গুরুবলের নিকট আর জলের ছিটায় কাজ চলিল না। কিছুদিন যায়। এখন আর হাতী ঘােড় মরে না। এখন আর রোজ সকালবেলা রাজার কাছে কু-খবর যায় না। এখন আর চিকিৎসক ডাকিতে হয় না;-রােজা ডাকিয়া হাতী-ঘােড়াশালের ভূত ছাড়াবার দরকার হয় না। রাজা শশাঙ্কের কাজে খুব সন্তুষ্ট হইয়া তাহার বেতন বাড়াইয়া দিলেন, ও শীঘ্রই তাহাকে সকল পাহারাওয়ালার উপরওয়ালা করিয়া দিলেন। কিন্তু কি ঔষধে কি রােগ সারিল, রাজা বা তাঁহার Wh\"/" ত • টীয়ানাকী। ~~~~ অপর কেহ অনেক প্রশ্ন করিয়াও তাহার সত্য জবাব পাইলেন না। দিকে শ্যাম রাখি কি কুল রাখি। সােহাগের ললিত-লবঙ্গ- লতিকা নব-রাণীর শরীর দিন দিনই শুকাইয়া যাইতেছে ; বােজই তাহার একটা না একটা নূতন রােগ জন্মিতেছে। এ দিন রাজা দরবার হইতে ফিরিয়া আসিয়া দেখেন—তাহার “হাড়মুড় মুড়ি” ব্যথা হইয়াছে। রাণীর শরীর শুকাইয়া খাগ, হইয়া গিয়াছে ; আর সে লাবণ্য নাই। আর ঘূৰ্ত্তি নাই। রাজা ভাবিয়া আকুল। ডাক্তার, কবিরাজ, হাকিম, রােজা, আসিল—গেল ; রাণীর আর অসুখ সারে না। রাণী দিনদিনই অবসন্ন হইয়া আসিতেছেন। এইভাবে বংসরাধিক কাল কাটিয়া গেল,রাণীর আর জীবনের আশা নাই। আদরের মােমের পুতুলটী পাছে গলিয়া যায়, এই দুঃখ-ভাবনায় রাজারও আহার-নিদ্রা বন্ধ। দরবারে আর রীতিমত যান না। একদিন ভােরবেলা রাণী বলিলেন—“মহারাজ, আমি স্বপ্নে আমার এ রােগের ঔষধ জানতে পেরেছি ; যদি কেউ এনে দিতে পারে, তবে আমার এ রোগ সারে।” রাজা শুনিয়া আকাশ হাতে পাইলেন ; বলিলেন—“কোথায় আছে বল ; আমি এখনি এনে দিচ্ছি। যদি আমার রাজ্য দিয়েও তােমার প্রাণটা বাঁচাতে পারি, সেও মঙ্গল।” রাণী।-মহারাজ, সে বড় শক্ত কাজ। সে দেশে বড় রাক্ষসের বড়ায়। মানুষ গেলেই খেয়ে ফেলে। রাজা।—হােক্ না রাক্ষসের ভয়। একবার চেষ্টা করা তাে যাবে। রাষ্ট্র-দক্ষিণ সমুদ্রের গর্ভে ইলাছিন্ সহর নামে এক দ্বীপ আছে। ঐ দ্বীপে সুবর্ণপুর নামে একটী গ্রাম আছে। ঐ সুবর্ণপুর প্রাচীর বেষ্টিত; রাক্ষসেরা তথায় বাস করে। সুবর্ণপুর গ্রামের এক বৃদ্ধা টীয়ানাকী। রাক্ষসীর বাড়ীতে একটিী ডালিমের গাছ আছে। যদি কেউ সেই গাছের একটী ডালিম এনে দিতে পারে, তবে এ অসুখ সাবে। রাজা রাণীর কথা শুনিয়া রাজ্যে ঢােল পিটাইয়া দিলেন,—“যে সুবৰ্ণপুরের ডালিমগাছের একটী ডালিম এনে দিতে পাবে, তাকে লক্ষ টাকা পুরস্কার দিব।” লক্ষ টাকার জন্য কেউ প্রাণ দিতে স্বীকার করে কি ? কেহই স্বীকার করিল না। মহা অনুপায় ; রাণী ঠাকুরাণীর প্রাণটা ত বঁাচ। চাই। কিছুদিন পরে শুভক্ষণে রাণী বলিলেন-“মহারাজ, যে ছেলেটা তােমার হাতী ঘােড়ার পাহারা দেয়, তাকে পাঠিয়ে দেও; সে খুব উপযুক্ত লােক। তুমি তাকে হুকুম দেও; সে রাজার হুকুম মাতে বাধ্য হবে। আর যে তােমার এই বিপদে হুকুম না মানবে, তার প্রাণ বধ করলেও পাপ হবে না।” রাজা শশাঙ্ককে ডাকিয়া রাণীর উপদেশমত হুকুম দিলেন। শশাঙ্ক অম্লানবদনে অবনত মস্তকে হুকুম গ্রহণের পর সাত দিনের সময় ভিক্ষা করিল। রাজা সাত দিন সময় দিলেন। এই সাত দিন পরে বালক রাজার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করতঃ মাদের ও গুরুর নিকট অসিল। গুরু আনুপূৰ্ব্বিক শুনিয়া প্রসন্নবদনে অনুমতি দিলেন এবং নানাপ্রকার উপদেশ দ্বারা তাহার কর্তব্যপথ সুস্পষ্টরূপে অক্ষির সন্মুখে প্রদর্শন করতঃ বক্ষামন্ত্র তাহার শরীর সুরক্ষিত করিয়া দিয়া মুক্তকণ্ঠে বলিলেন –“যাও বৎস, তােমার সৌভাগ্যের কঠোর- পথে অগ্রসর হও। তুচ্ছ প্রাণের মমতায় যে কর্তব্যের কঠোরতাও বিভীষিকা দেখিয়া হৃদয়কে দুর্বল জ্ঞান করে, সৌভাগ্যলক্ষ্মী কখনও তাহার নিকট আগমন করেন না। মানুষের ক্ষুদ্র শক্তির কোনও মুল্যই টীয়ানাকী। AAA AAA AAA AAAA%। নাই; কর্তব্যের সুপথে সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর তঁাহার ক্ষুদ্র সন্তানকে সতত সমস্ত বিপদ হইতে রক্ষা করেন এবং প্রতি পদক্ষেপে অঙ্গুলি সঞ্চালনে গন্তব্যস্থান ও পথ দেখাইয়া দেন। তুমি যখনই কোন বিপদে পড়িবে, তখনই তাহাকে ও আমাকে স্মরণ করিও, আমি সাধ্যমত তােমার সাহায্য করিতে ক্ৰটী করিব না।” শশাঙ্ক গুরুর চরণে প্রণিপাত করিয়া, মাদিগের নিকট বিদায় নিতে আসিলে তাহারা কাদিয়া উঠিলেন। এত দুঃখের ধন, অন্ধের একমাত্র অবলম্বন, সাধ করিয়া যমের মুখে ছাড়িয়া দিতে কি মায়ের প্রাণ সহজে পারে ? তথাপি নানাপ্রকারে তাহাদিগকে প্রবােধ দিয়া শশাঙ্ক তঁাহাদের পদধূলি অঙ্গে বিলেপন করিল, এবং আশীৰ্বাদ গ্রহণ করতঃ শ্রী গুরুর চরণ স্মরণ করিয়া অভাগিনী জননীদিগের আর্তনাদ নিতে শুনিতে পাষাণে বুক বঁধিয়া গন্তব্যপথে অগ্রসর হইতে লাগিল। শশাঙ্ক বহুদিন পরে সমুদ্র-তীরে পৌছিল। তখন বর্ষাকাল,- সমুদ্র ভীষণ মূর্তিতে উন্মাদ উত্তালে গর্জন করিয়া তাহাকে গ্রাস করিতে আসিল; বালক নির্ভয়ে গম্ভীর ভাবে অদুরে দাড়াইয়া সেই ভীষণ অথচ অতি সুন্দর দৃশ্য দেখিতে লাগিল। এই গর্বিত সমুদ্রের বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া তাহাকে গন্তব্য দ্বীপে যাইতে হইবে। অজানা সে স্থান--শশাঙ্ক সেই অজ্ঞাত দেশের সন্ধান করিবার নিমিতু ব্যস্ত হইয়া উঠিল । কতকগুলি লােক নৌকা বাহিয়া যাইতেছিল—তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিল—“এলাসিন্ সহর কোথায় তােমৱা জান?” তাহারা উত্তর করিল-“এসি সহ রাক্ষসের দেশ! সাত দিনের পথ। নৌকায় যেতে হয়।” অনুসন্ধান করিয়া বালক নৌকা ঠিক করিল। ঝড় তুফান মাথায় করিয়া সময়ে শশাঙ্কশেখর নির্ভয়ে সমুদ্রে ভাসি। সাত আট দিন --- টীয়ানাকী। * y পরে নৌকা এলাসিন্ সহরের নিকটে পৌছিল ; মাঝির তাহাকে সেই নির্জন প্রদেশে সমুদ্রতীরে নামাইয়া দিয়া বিদায় গ্রহণ করিল। এই- বার শশাঙ্ক স্থানীয় দৃশ্য দেখিয়া শিহরিয়া উঠিল। সে স্থান সহরে মতন ত নয় ! মানুষ, রাক্ষস অথবা কোনও জীবজন্তুর সাড়া শৰ নাই ; এক দিকে সমুদ্র ভীষণ গর্জনে গ্রাস করিতে আসিতেছে- অপর তিন দিকে ভীষণ বন। শশাঙ্কের মনে ভয় হইল ; একবার- একবার যেন কৰ্ত্তব্যের কঠোর আবরণ ভেদ করতঃ জননীর বিদায়- কালীন আর্তনাদ তাহার বক্ষে সজোরে আঘাত করতঃ কোমল বুক- খানি ভাঙ্গিয়া ফেলিল। বালকের চক্ষু হইতে অবিরল ধারে উষ্ণ অঙ্গ বিনির্গত হইয়া বক্ষের বসন ভিজাইয়া দিল ! কিছুক্ষণ সেই অবস্থায় বসিয়া থাকিয়া সমুদ্রের প্রতিআক্রমণ-প্রয়াসে বিক্ষোভিত চিত্তে শশাঙ্কশেখর উঠিয়া দাঁড়াইল। কে যেন অস্পষ্ট স্বরে তাহার কাণের কাছে বলিয়া গেল—“শশাঙ্ক, গুরুর নিকট কি প্রতিজ্ঞা করিয়া আসি- য়াছ মনে আছে কি ? তােমার পিতার রাজ্য নিষ্কণ্টক করিবার নিমিত্ত, বনবাসিনী ভিধারিণী অন্ধ জননীদিগের চক্ষের জল মুছাইবার নিমিত্ত, তােমার কঠোর ব্রত-এই প্রথম পদক্ষেপেই সমুদ্রে বিসর্জন করিলে ?” সেই অস্পষ্ট স্বর কর্ণে প্রবেশ করিবামাত্র শশাঙ্ক শিহরিয়া উঠিল—মুহুর্তে বক্ষের আর্দ্র বসন শুকাইয়া গেল—অদম্য প্রতিজ্ঞা স্মৃতি তাহার জীবনের ভয় তৃণের ন্যায় উড়াইয়া দিল। বনের ভিতর দিয়া না গিয়া বালক অনন্যমনে সমুদ্রতীর দিয়া চলিতে লাগিল, এবং বহু দুর অতিক্রম করিবার পর এক সন্ন্যাসীর আশ্রমে উপস্থিত হইল। সন্ন্যাসী তাহাকে দেখিয়া বড়ই সন্তুষ্ট হইলেন, এবং আশীৰ্বাদ করিয়া বসিতে বলিলেন। শশাঙ্ক সন্ন্যাসীঠাকুরকে প্রণিপাত করিয়া পদধূলি গ্রহণ করিল, ও আসনে বসিয়া জিজ্ঞাসা করিল-“ঠাকুর, এ স্থানের নাম কি?”
২৪ টীয়ানাকী। viron \\/ \\\/ hM w.s, ঠাকুর।-এলাসিন্ সহর। শশাঙ্ক।-সহরের মতন ত কিছুই দেখি না! ঠাকুর-এটী সহর বলতে তােমরা যাহা জান তাহা নহে; এই দ্বীপটীর নাম এলাসিন্ সহর। এখানে মানুষ নাই; স্থানে স্থানে রাক্ষসেরা বাস করে, তাহাদের অত্যাচারে এখানে মানুষ থাকতে পারে না। শশাঙ্ক।-সুবর্ণপুর নামে এখানে কোন পুরী আছে ? ঠাকুর।-আছে; সেখানে ভীষণ রাক্ষসীরা বাস করে। তুমি কি জন্য এসেছ, তাহা আমি জানি। কিন্তু এরূপভাবে সেখানে যেতে পাবে না। শশাঙ্ক।--আপনি কি করে জানলেন আমি কি জন্য এসেছি ? সন্ন্যাসী শুনিয়া হাসিলেন মাত্র ; বলিলেন-“সে কথা পরে হবে। এখন যে কাজের জন্য এসেছ সে কাজ কর।” সন্ন্যাসী মন্ত্র দ্বারা শশাঙ্ককে একটি বানর প্রস্তুত করিলেন, এবং বলিলেন—“চল, আমি সুবর্ণপুর দেখিয়ে দিচ্ছি।” বানর শশাঙ্ক লাফাইতে লাফাইতে সন্ন্যাসীর সঙ্গে চলিল। বানর সাজিয়াছে বলিয়া তাহার দুঃখ লজ্জা কিছুই নাই। কর্তব্যপালন করিতে গিয়া স্বকাৰ্য্য- সাধন-প্রয়াসী যদি বানর সাজিতে লজ্জাবােধ করে—তবে তাহার সে কৰ্ত্তব্য সাধন করিবার শক্তি নাই—ইহাই বুঝিতে হইবে। এইরূপ বানর সাজায় প্রতিজ্ঞার দৃঢ়তা পরীক্ষিত হয়,-মনের ঐকান্তিকতা প্রকাশ পায়, এবং মহত্ব বৃদ্ধি পায় ভিন্ন কমে না। সময়ে উভয়ে সুবর্ণপুর পৌছিলে সন্ন্যাসীঠাকুর সুবর্ণপুর দেখাইয়া দিয়া বলিলেন—“ঐ যে সােণার ন্যায় পুরী দেখছে উহারই নাম সুবর্ণ- পুর। 'ওখানে রাক্ষসের বাস ; মানুষের যাওয়ার সাধ্য নাই। তুমি ..." টীয়ানাকী । ~~~~ যে ডালিম নিতে এসেছ তাহা ঐ বাড়ীর অন্দরমহলে প্রাঙ্গণের একটা গাছে আছে। বানর দেখলে রাক্ষসের বড় আনন্দ হয়। বান- রকে তারা কিছু বলে না। তাই তােমাকে বানর সাজিয়ে দিয়েছি। তুমি অন্দরমহলে গিয়েই একটা ডালিম ছিড়ে নিয়ে পালাবে। সীরা তােমায় ফিরাবার জন্য অনেক চেষ্টা করবে। কিন্তু তুমি ফিরেও চাইবে না। পুরীর বাহির হতে পারুলে আর কোন ভয় নাই। দিনের বেলায় রাক্ষসীরা পুরীর বাহির হতে সাহস পাবে না। বানর সন্ন্যাসীকে প্রণাম করিয়া একলাফে গাছে উঠিল। তারপর ক্ৰমে রাক্ষসের পুরীতে পৌছিল। আস্তে আস্তে পুরীর চারিদিকে মুরিয়া যখন অন্দর মহলে গেল তখন রাক্ষসীরা দেখিতে পাইয়া হাউ মাউ কাউ করিয়া সকলে হাতে তালি দিতে লাগিল ও ঠাট্টা তামাসা করিতে আরম্ভ করি।। বানরের সেদিকে দৃষ্টি নাই ; সে একটি ডালিম ছিড়িয়া একলাফে ছাতে গিয়া বসিল। তারপর ছাত হইতে গাছে ক্রমে এক গাছ হইতে অন্য গাছে লাফাইতে লাফাইতে সন্ন্যাসী ঠাকু- রের কাছে আসিয়া উপস্থিত হইল। রাক্ষসীরা তাহাকে ফিরাইবার নিমিত্ত বৃথা চেষ্টা করিয়া আপন কার্যে ফিরিয়া গেল। সন্ন্যাসী শশাঙ্কের কাৰ্য্যশক্তি দেখিয়া সন্তুষ্ট হইয়া আশীৰ্বাদ করতঃ তাহাকে আবার মানুষ করিয়া দিলেন। মানুষ শশাঙ্কশেখর সন্ন্যাসী ঠাকুরকে প্রণিপাত করিয়া কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিল এবং তাহার অনুমতি লইয়া সময়ে মাদের সহিত ও গুরুদেবের সহিত দেখা করিয়া তাহাদের আশীৰ্বাদ সহ পদধূলি গ্রহণ করতঃ রাজার নিকট উপস্থিত হইল। রাণী ডালিম পাইল, তাহার সকল অসুখ সারিয়া গেল। খাওয়া দাওয়াটা তাহার এতদিন খুব জোরে চলিতেছিল—তাই শরীরের অবস্থা শীই বেশ পরিবর্তিত হইল। রাজা শশাঙ্ককে ১০০০০ •একলক্ষ মুদ্রা পুরস্কার • টীয়ানাকী। ; দিলেন। শশাঙ্ক মাতৃদ্বয়ের প্রণামী স্বরূপ ১০০, নিজে গ্রহণ করিয়া ৰাকী টাকা রাজাকে প্রত্যর্পণ করিয়া বলিল-“মহারাজ আমি গরী, এত টাকা কোথায় রাখবাে ? আপনি এখন রেখে দিন ; দরকার হলে আমি তখন নেবাে।” রাজা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাহাতেই সম্মত হইলেন। শশাঙ্কের মাতৃদ্বয় তাহার বুদ্ধি ও শক্তির পরিচয় পাইয়া সহস্র দুঃখের মধ্যেও অপেক্ষাকৃত আনন্দে দিন কাটাইতে লাগিলেন। শশাঙ্ক আবার পূর্বের মত পাহারা দিতে আরম্ভ করিল ; ক্রমে আবার হাতী ঘােড়া মরা বন্ধ হইল । এই ভাবে কিছুদিন যায়। রাণীর আবার অসুখ বেশী হইয়া পড়িল। এবারে পূর্বাপেক্ষাও বেশী হইল। আবার রাণী স্বপ্নে ঔষধ পাইলেন, আবার পুরস্কারের বিজ্ঞাপন বাহির হইল। এবারও শশাঙ্কশেখরকে পাহারা ছাড়িয়া ঔষধ আনিতে যাইতে হইল। এবারে কপিলেশ্বরী পাইয়ের দুধ আনিতে হইবে। শশাঙ্ক পূৰ্ব্বকার মত গুরুর চরণ বন্দনা করিয়া মঙ্গলাশীষ গ্রহণ করতঃ জননীদের পদধুলি মস্তকে মাখিয়া এলাসিন্ সহরে সেই সুবর্ণপুরীর নিকটবর্তী সন্ন্যাসীর নিকটে উপস্থিত হইয়া তাহাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিল। সন্ন্যাসীঠাকুর আশীর্বাদ করিয়া বসিতে বলিলেন। শশাঙ্কশেখর তাহাকে সকল কথা বলি। এবারে সন্ন্যাসীঠাকুর শশাঙ্ককে পরমসুন্দর রাজপুত্রের বেশে সাজাইয়া দিয়া বলিলেন- “যে অন্দর মহল হ’তে ডালিম এনেছিলে, তার বাইরের দিকের দরজার কাছে রাক্ষসীরা তাদের অতিপ্রিয় কপিলেশ্বরী গাঁইটীকে বাছুর সমেত ছেড়ে দেয়। কিন্তু তার কাছেই অনেক যুবতী রাক্ষসী বসে থাকে, তারা তােমাকে ভুলাবার জন্য অনেক চেষ্টা করবে। তাদের প্রলােভনে ও কথায় ভুলে আপন কর্তব্য ভুলে যেও না। তা হলে সব নষ্ট টীয়ানাকী। হবে, প্রাণও যাবে। চক্রান্ত করে তােমাকে কপিলেশ্বরী গাইয়ের ৰাছুরটী নিয়ে পালাতে হবে; বাছুর নিয়ে পালালেই গাঁইটীও তােমাৰ সঙ্গে আসবে। পুরীর বের হতে পালে আর ভয় নাই। খুব সাহসের ও কৌশলের সহিত কাজ কতে হবে। যখন চলে আসবে, তখন ৰাক্ষসীরা তােমাকে ফিরাবার জন্যে অনেক চেষ্টা করূবে। কিন্তু, সাবধান; পিছু ফিরে চাইলেই ভস্ম হয়ে যাবে। বিপদে পড়লে আমাকে মনে করাে। আমি সাধ্যমত বাচাবার চেষ্টা কবাে।” রাজপুত্র শশাঙ্ক সাহসে বুক বাঁধিয়া রাক্ষসের পুরীতে চলিল। পুরীর ভিতর প্রবেশ করিবা মাত্রই তাহার বুক কাপিয়া উঠিল ; হৃদয় দুর্বল হইল। কিন্তু তখনই জননী ও জন্মভূমির দুঃখ মনে জাগিয়া তাহাকে অদম্য সাহসে উত্তেজিত করিয়া তুলিল ; সহসা তাহার চক্ষু আরক্ত ও ৰদনমণ্ডল প্রতিজ্ঞার উজ্জ্বল প্রতিভায় উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। রাজ- পুত্রকে দেখিতে পাইয়া যুবতী রাক্ষসীরা ছুটীয়া আসিল। রাজপুত্র ইষ্টদেবের নাম স্মরণ করিয়া নির্ভয়ে দাড়াইলেন। তখন ১০/১২টা যুবতী কাছে আসিয়া এ বলে—“রাজপুর আমার ঘরে চল ;” বলে “রাজপুর আমার ঘরে চল।” রাজপুত্তুর অচল। কিছুক্ষণ পরে আর একটি পরমা সুন্দরী নব-যুবতী ধীরে ধীরে তথায় আসিল ; এবং অনেক্ষণ ধরিয়া রাজপুত্রকে দেখিয়া দেখিয়া সহসা তাহার নিকটে আসিয়া আদরের সহিত হাত ধরিয়া বলিল- কোন্বা দেশের রাজার ছেলে, কোন্বা দেশে ঘর ? আমার সঙ্গে চল তুমি, হবে আমার বন্ধু।” বিরক্তির সহিত আর এক যুবতী তাহাকে সরাইয়া দিয়া বলিল- -
২৮
টীয়ানাকী ।
“নূতন দেশের নূতন রাজা,
নূতন রাজার ছেলে।
দই সন্দেশ খেতে দেবাে
সঙ্গে আমার গেলে।”
আর এক যুবতী আসিয়া বলিল—
“সােনার খাটে বসে থাকবে,
রূপার খাটে পা।
কাছে বসে পান খাওয়াব
ঠাণ্ডা হবে গা।”
যে নব-যুবতীটী প্রথমে আসিয়া তাহার হাত ধরিয়াছিল সে আবার
আসিয়া একহাতে রাজপুত্রের হাত আর একহাতে চিবুকখানি ধরিয়া
আদরে বলিল--
“রাজার ছেলে রাজার ছেলে,
মুখ ফিরিয়ে চাও।
আমার সঙ্গে এস যদি
ক্ষীর সন্দেশ খাও।
তেল মাখিয়ে স্নান করাব
আপন হাতে আনি,
গা মুছিয়ে পরিয়ে দেবে।
সােণার কাপড় খানি।
আপনা হাতে সেজে পান,
বাটা ভরে দেবাে,
আপনা হাতে বিছানা পেতে
কাছে বসে রবো।”
টীয়ানাকী। ২৯ honungannnnnnnnnnnnnnnnn রাজপুত্র দেখিল এই যুবতীটীর আকার ও চালচলন অন্যান্য যুবতীদের অপেক্ষা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ; এবং ইনি দেখিতেও অন্য যুবতীদের তুলনায় অনেক অধিক সুন্দরী। এরূপ সুন্দরী সে মানুষের মধ্যেও কম দেখিতে পাইয়াছে। যুবতীর কোমল কর-পরশনে শশাঙ্কের মন একটু গলিত হইল; অথবা মানরের মনে এমন এক বিশেষত্ব আছে যে, যেখানে একটু আদর পায়, সেইখানেই নত হয়। শশাঙ্ক এতক্ষণ পরে উত্তর করিল-- চোরে করে রাজ্যভোগ, সাধুর গলায় ফাস, আমি-সেই রাজ্যের রাজার ছেলে, রাজা রাণীর দাস। সােণার পূরীর রাণীর দেশে- কপিশরী গাই, রাজা রাণীর সাধ হয়েছে, দেখতে তারে চাই। যে আমারে দেখিয়ে দেবে তারি আমি হবো, আমার রাজার রাজ্য ছেড়ে তার কাছেতে রবে।” রাজপুত্রকে এই যুবতীর কথার উত্তর দিতে দেখিয়া এবং তাহার উদ্দেশ্য শুনিয়া অপর যুবতীরা সকলেই বিরক্তির সহিত গালাগালি দিতে দিতে ফিরিয়া গেল—কেবল যে যুবতীটী রাজপুত্রের হাত ধরিয়া ঈড়াইয়াছিল, সে গেল না। সকলে, চলিয়া গেলে সে শশাঙ্কের, গলা ধরিয়া অাদরে বলিল- , *, *এস, সঙ্গে নিয়ে যাব থাকবে আমার ঠাঁই। প্রাণ ভরিয়ে দুদ খাওয়াব, দিব কপিল গাই।” যুবতী শশাঙ্কের হাত ধরিয়া লইয়া গেল-শশাঙ্ক মুগ্ধচিত্তে তাহারই সঙ্গে চলিল। রাজপুত্রের প্রায় এখন উদ্যম বয়স ; তাহাতে দেখিতে অতি সুন্দর ; সর্বোপরি সন্ন্যাসী প্রদত্ত সৌন্দৰ্য্য তাহাকে ভুবনমােহন করিয়া তুলিয়াছে। যুবতী তাহার রূপে মুগ্ধ হইল। যুবতী নিজে স্বর্ণপুরীর রাজকন্যা; পরমাসুন্দরী। সে রাক্ষসের পূরী এক বিচিত্র ভবন। কোথাও আলো কোথাও আঁধার। স্থানে স্থানে সােণা রূপার মন্দির, মুক্তার ঝালর, মার্বেল পাথরের ময়দান। কোথাও কোন যুবতী চুল বাঁধিতেছে—কেহবা গান গাহিতেছে, কেহ নাচিতেছে। কোথাও পুরুষের সাড়া শব্দ নাই। সবই যুবতী, সবই সুন্দরী, সবই বিলাসবতী। রাজপুত্র মুগ্ধের ন্যায় চলিতে লাগিল, যেন স্বপ্ন দেখিতেছে। কিছুক্ষণ পরে তাহারা ২/৩টী মহল পার হইয়া একটী নূতন ধরণের সুজ্জিত মহলের একটী সজ্জিত কক্ষে প্রবেশ করিল। যুবতী রাজ- পুত্রকে সােণার খাটে বসাইয়া রাখিয়া চলিয়া গেল। শশাঙ্ক তন্ন তন্ন করিয়া ঘরখানি দেখিয়া লইল। এত ঐশ্বৰ্য, এত সৌন্দৰ্য্য, তাহার নিকট যেন স্বপ্নেরও অগােচর বলিয়া বােধ হইল। শশাঙ্ক মায়ের কাছে রাক্ষসীর মায়ার কথা শুনিয়াছিল ; শুনিয়াছিল-রাক্ষসীরা মায়া- মুগ্ধ করিয়া রাখিয়া দেয় ও শেষে প্রাণে মারে। শশাঙ্কের রূপমােহ সহসা দূর হইল এবং এক অনাহুত ভয় আসিয়া তাহার স্থান অধিকার করিল । কিন্তু কি করিবে ? পলাইবার উপায় নাই। আর পাইলেই বা কাৰ্য সিদ্ধ হইবে কেন ? এই বিপদ মাথার উপর রাখিয়া প্রতি } টীয়ানাকী। ৩১ মুহূর্তে মরণের ভীষণ স্মৃতি হৃদয়ে অঙ্কিত করিয়া তাহাকে সিদ্ধব্রত হইতে হইবে। সকল প্রলােভনের মধ্যেও শশাঙ্ক সতত এই উদ্দেশ্যটী হৃদয়ে সতেজ কমিয়া দাখিল ; ফকল সম্মােহনের মধ্য হইতেও এই প্রার্থিত রত্ন উদ্ধারের উপায় উদ্ভাবন তাহার প্রধান চিন্তার বিষয় হইয়া পড়িল। যদি প্রাণ যায়ই—কি করিব ? শরীর ত দুই দিনের জন্য । যাহা দুই দিন পরে ধ্বংস হইয়া যাইবে, তাহার আপাতবিনাশে যদি চিরস্থায়ী কোনও সৎকার্য্যের ভিত্তি স্থাপন করা যায়, যদি কোনও নির্মল পবিত্র সত্যের ভিত্তিভূমি স্পর্শ করিতে পারা যায়, তবে ব্যক্তিমাত্রেরই হাতে অকাতরে অগ্রসর হওয়া কর্তব্য। শশাঙ্ক আবার ধীরে ধীরে সৎসাহসে হৃদয়কে অপেক্ষাকৃত উৎসাহিত করিযা তুলিল। রাজকন্যা ফিরিয়া আসিয়া দেখিল-রাজপুত্র সেই একভাবেই বসিয়া আছে। রাজকন্যা রাজপুত্রের পার্শ্বে বসিয়া সােহগে তাহার বদন চুম্বন করিয়া আপন বহুমূল্য হীরকারীয় তাহার হাতে পরাইয়া দিল। বিনি- ময়ে রাজপুত্র প্রাণের সম্মতি প্রদান করিয়া তাহার মুগ্ধ অঙ্গে মুগ্ধ অঙ্গ অলস অবশে ঢালিয়া দিল। রাজকন্যার যত্নে তৃপ্ত হইয়া শশাঙ্ক কয়েক দিন তথায় বাস করিল ; এবং তন্ন তন্ন করিয়া সকল দেখিয়া শুনিয়া আপন অভিষ্ট সিদ্ধির সুযােগ অনুসন্ধান করিতে লাগিল। একদিন শশাঙ্ক রাজকন্যাকে বলিল—“আমি কি জন্য এখানে এসেছি তা তুমি জান ?” রাজকন্যা। জানি না। শশাঙ্ক।বলেছিত আমি কপিলেশ্বরী গাই দেখতে চাই। যে দেখিয়ে দিতে পারবে আমি তার হব। তুমি স্বীকার করেছিলে বলে তােমার সঙ্গে এসেছিলাম, আর এখন বলছে “জানি না?” রাজকন্যা–দেখ কপিলেশ্বরীর দুধে আমাদের প্রাণ। তাই আমরা
. ৩২
টীয়ানাকী।
উহাকে লুকিয়ে রাখি। মাত্র সকালে ছেড়ে দেই, তখন দেখাতে পারি।
তখনও ২৩টী রাক্ষসী অনবরত উহার পাহারা দেয়। তুমি যে আমার
ঘরে আছ, তাহা সকলে জানে না; জালে তােমার বিপদ হওয়াব
সম্ভব, তাই তােমাকে বাইরে নিয়ে যেতে চাই না।
শশাঙ্ক।—এমনভাবে কতদিন রাখবে ?
রাজকন্যা।-বরাবর, চিবদিন।
রাজপুত্র।-আমায় দেখলে যে মেবে ফেলবে।
রাজকন্যা একটু হাসিয়া অন্যদিকে মুখ ফিরাইল। রাজপুত্র বলিল
-“আমার ভয় হয় ; তুমি আমাকে ফিরে যেতে দেও।” বাজকন্যা
তখন আদরে বলিল—“ভয় কি তােমার ? তােমার হাতে যে ঐ আংটীটা
পরিয়ে দিয়েছি, ঐ আংটীই তােমাকে এ পুরীতে রক্ষা করূবে।”
রাজপুত্র।-“এ আংটীর কি গুণ ?”
রাজকন্যা তোমাকে সকল কথাই বলতে হবে ? বলতে নিষেধ
আছে, তথাপি বলি শুন,-“এই আংটী আমার পিতার।
আংটীর এই গুণ যে, যাহারই চোখের সামনে ইহা ধরবে সে-ই ভবে
পালিয়ে যাবে। তাই তােমাকে প্রথমেই এই অংটী পবিয়ে দিয়েছি।
রাজপুত্র।—এমন কয়টী আংটী তােমার আছে ?
রাজকন্যা।—দুইটী। এ রাজ্যে এমন আংটী আর কাহারও নাই
এবং ইহার কি গুণ, তাহাও কেহ জানে না।
রাজপুত্র যদি এই আংটীটী তােমারই চোখের সামনে ধরি ?
রাজকন্যা।-আচ্ছা ধরেই দেখ না কেন?
রাজপুত্র।-না, তুমি ভয়ে পালিয়ে যাবে। তারপর আমার উপায় ?
রাজকন্যা হাসিয়া বলিল -“তােমর একবার পরীক্ষা করতেই
•
টীয়ানাকী এই বলিয়া রাজকন্যা কোনও স্থান হইতে আর ও তিনটী আংটা লইযা আসিল। রাজপুত্র পরীক্ষা কবিতে সম্মত হইল না। রাজকন্যা বাজপুএকে সকলগুলি আংটী দেখাইয়া বলিল-“যে আংটী তােমাকে দিয়েছি -- এই উহারই আৰ একটী।” এই বলিযা শশাঙ্কে চক্ষে সম্মুখে আংটাটী ধরিতেই শশাঙ্ক ভয়ে চীৎকার করিয়া উঠিল ; রাজকন্যা ব্যস্ত সমস্ত হইয়া আর দুইটা আংটীব একটা দেখাইতেই সে আবার সহসা পূব্বাবস্থা প্রাপ্ত হইল। রাজকন্য। বলিল—“দেখলে এই আংটা- গুলির কি গুণ ? তুমি আমার চক্ষের সামনে ঐ অংটী ধরলেই আমি এই দ্বিতীয় অংটীর দ্বারা ভয় দূধ কবৃব। এ অমার পিতৃ ধন। এই চটী অংটাব জোবেই আমার এত সম্পদ ও এ পুরীতে আমিই সকলেৱ “রাজকন্যা।” শশাঙ্ক স্বপ্নেব মতন সকল দেখিয়া শুনিয়া জিজ্ঞাসা করিল-~-“এমন জিনিষের একটী তুমি আমাকে দিলে কেন ?” শশাঙ্কের কথা শুনিয়। ধীরে ধীরে রাজকন্যার চক্ষু হইতে দর দৰ ধারায অশ্রু বিনির্গত হইয়া শশাঙ্কের মনে দুঃখ প্রদান করিল। রাজকন্যা কাদিতে দিতে বলিল---“জন্মাবধি কোনও পুরুষ দেখিতে না পাইয়া আমার এই বিলাসময় জীবনের সকল ঐশ্বৰ্য্যই মকময় বােধ হইতেছিল; তাহাব মাঝারে স্রোতস্বতীর ন্যায় রাজকুমাৰ তোমাকে পাইছি। তাই জীবনের সুখ-সাধের শ্রেষ্ঠ চিহ্নটী তােমাকে পবাইয়া দিয়। মনে কত আনন্দ বােধ করিতেছি। তুমি কি তাহাকে আদরে গ্রহণ করিবে না ? রাজপুত্র আমি মানুষ, তুমি রাক্ষসী ; আমি খাদ্য তুমি খাদক ; এ মিলন অসম্ভব ! রাজকন্যা একদৃষ্টে রাজপুত্রের মুখখানি দেখিতে দেখিতে খলিল ৩৪, টয়ানাকী “সম্ভব হউক, অসম্ভব হউক, জানি না। আমি তােমাকে সকলই বলি- যাছি। সরলপ্রাণে ভালবাসিয়া বঞ্চিত হইব কি না, তাহা জানি না! উভয়ে উভয়ের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। শশাঙ্কের নিকট ও চিত্র অতীব নূতন, কারণ সে এখনও অতীতপ্রায় কৈশােরের পবিত্র সরলতা ও কোমলতায় ধৱাখানিকে দেখে ; ভালবাসার অভ্যন্তরে তদ্ভিন্ন আরও বেশী কিছু আছে বলিয়া ভালরূপে বুঝিতে পারে না। আর রাজকন্যার নিকটও এ চিত্র অতীব জ্বালারহস্যময়। সে কোনও দিন পুরুষের সহিত হৃদয় বিনিময় করিবার চেষ্টা করে নাই বা অবসর পায় নাই। তাহার মনে হইল—বুঝি এ বাজারে এই দরেই ক্রয় বিক্রয় হয়। শশাঙ্ক বিস্মিত চিত্তে চিন্তা করিতে লাগি এক রাক্ষসীন। দেবী ? রাক্ষসের স্বভাব ও চালচলন কি এমন হয় ? রাক্ষস কি মানুষকে এত ভালবাসে ! না এ রাক্ষসী মায়া, আমি মায়ায় মুগ্ধ ? আরও কিছুদিন গেল ; কৰ্তব্যজ্ঞান শশাঙ্কের প্রাণে. সতত জাগ্রত রহিয়াছে, তাই এই প্রলােভনেও সে অনাশক্ত। একদিন সকালবেলা কোনও গুপ্তঅবসরে শশাঙ্ক রাজকন্যার গৃহ হইতে বাহির হইয়া পড়িল। যে স্থানে সকাল বেলা কপিলেশ্বরী গাইটিকে ছাড়িয়া দিত, সে স্থানটা সে দেখিয়া লইয়াছিল। ক্রমে, অনেক বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করিয়া সে তথায় উপস্থিত হইল। শশাঙ্ক দেখিল, যে স্থানে বাছুরটী আছে, সে স্থান হইতে প্রাচিরের বাহিরের দরজা অতি নিকটে ।.. প্রাণের মমতা ছাড়িয়া দিয়া শশাঙ্ক দৌড়িয়া গিয়া বাছুরটীকে কোলে করিয়া প্রাচীরের বাহিরে পৌছিল। তখন গাঁইটীও উৰ্দ্ধশ্বাসে তাহার সহিত ছুটিল। যে রাক্ষসীরা কপিলেশ্বরীকে পাহারা দিতেছিল তাহারা চীংকার করিয়া রাজপুত্রকে ফিরাইতে চেষ্টা করিল; রাজপুত্র আর রাজপুত্র আর ফিরিয়াও কাহিল না। যে রাজকন্যার স্বল্পে শশাঙ্ক এতদিন ছিল, সে সহসা সকল *
টীয়ানাকী।
শুনিয়া ব্যাপার বুঝিতে পারিয়া উন্মাদিনীর ন্যায় - ছুটিয়া আসিল।
তখনও রাজপুত্র অধিকদূর যায় নাই। রাজকন্যা চীৎকার করিয়া
কঁদিয়া বলিল--
বাজপুত্তুর, রাজপুর,
পিছু ফিরে চাও।
আমি তােমার সঙ্গে যাব,
আমায় নিয়ে যাও।”
নিষ্ঠুর শশাঙ্ক উত্তর করিল--
“রাজকন্যে, আর কেন ভাই,
আমার মাথা খাও ?
রাজা রাণী ব্যস্ত আছেন,
আমায় যেতে দাও।”
রাজকন্যা-রাজপুত্তুর ফিরে চাও;
সঙ্গে নে যাও ঘর ।
তুমি আমায় বিয়ে করেছ
তুমি আমার বর ।”
শশাঙ্ক “অচিন্ত্যপুর রাজ্য মােদের,
যেও "আমার ঘরে।
ফুল চন্দনে সাজায়ে তােমা - ::
রাখবাে আদর করে।”
শশাঙ্ক ফিরিয়াও চাহিল না--রাজকন্যা কাদিতে কাদিতে ঘরে
ফিরিয়া যাইবার সময়ে বলিয়া গেল--
*চিহ্ন আমার যত্নে রেখাে,
প্রাণ দিয়েছি আমি।
টীয়ানাকী। N4 *111*4, মনে রেখো-প্রাণনাথ-- তুমিই আমার স্বামী। অন্ধ বধির একলক্ষ্য শশাঙ্ক নিৰ্বাক্ নিরুত্তরে পাষাণে বুক বাঁধিয়া কপিলেশ্বরীর বাছুর লইয়া সন্ন্যাসীঠাকুরের নিকট হাজির হইল। কপিলেশ্বরীও তাহার পিছনে পিছনে আসিয়া পৌছিল। সন্ন্যাসী “ধন্য ধন্য করিয়া দুই হাত তুলিয়া আশীৰ্বাদ করিয়া শশাঙ্ককে বসিতে, বলিলেন। শশাঙ্ক একটু সুস্থ হইয়া সকল বৃত্তান্ত তাহাকে বলিল । সন্ন্যাসীঠাকুর শুনিয়া হাসিলেন; এবং গাই ও বাছুরের সহিত শশাঙ্ককে পিতার রাজ্যে পাঠাইয়া দিলেন। শশাঙ্ক রাজকন্যাপ্রদত্ত আংটীর সাহায্যে সকল বিপদ লাঘব করিয়া একাকী সে স্থান হইতে নিরাপদে কপিলেশ্বরীকে লইয়া পিতৃরাজ্যে উপস্থিত হইল। রাণীর নিকট কপিলেশ্বরী গাই পেীছিল। রাণী দেখিয়া শুনিয়া, স্তম্ভিত হইয়া গেলেন ; এবং কপিলেশ্বরীর দুধ পান করিয়া সুস্থ হই- লেন। শশাঙ্ক আর পূৰ্ব্বের ন্যায় আপন কাৰ্যে মন দিল। এবারেও রাজা তাহাকে লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দিলেন, ও গাইটী তাহারই নিজস্ব করিয়া দিলেন। শশাঙ্ক এবারেও টাকা নিজে গ্রহণ না করিয়া রাজার নিকট জমা. রাখিল । এইভাবে আরও এক বৎসর গেল। রাণী শশাঙ্ককে বিপদে ফেলিবাৰু নিমিত্ত অনেক প্রকারে চেষ্টা করিয়াও অকৃতকার্য হইলেন। এখন রাণীর অত্যাচার আস্তাবল ছাড়িয়া গ্রামের দিকে প্রসারিত হইয়াছে। আজ অমুক গ্রাম রাক্ষসে ধ্বংস করিয়াছে ; কাল অমুক গ্রামে এতজন লােককে রাক্ষসে খাইয়াছে ; এইরূপ সংবাদ রােজই রাজার কাছে আসিতে লাগিল। শশাঙ্ক সকল শুনিয়া রাজার অনুমতি লইয়া প্রী- কারের নিমিত্ত গ্রামে গ্রামে পাহারার বন্দোবস্ত করিয়া দিল। কিন্তু, টীয়ানাকী । ৩৭. ht a ।। লাগিল। কিছুতেই সুবিধা হয় না। কপিলেশ্বরীর দুধ খাইয়া রাণীর রাক্ষসী- বৃত্তি আরও বাড়িয়া উঠিল ; তাহার শক্তি ও দিন দিনই বৃদ্ধি পাইতে | শশাঙ্ক, ব্যাপার বুঝিতে পারিয়া কপিলেশ্বরীকে আপন গুরুদেবের আশ্রমে পাঠাইয়া দিল। এদিকে প্রচার করিয়া দিল- গাইটী হারাইয়া গিয়াছে। রাণীর দুধের জোর কমিয়া আসিল। শশাঙ্ক এখন প্রতিদিন রাত্রে অন্যের অজ্ঞাতসারে রাজার শয়ন-মন্দিরের চারিদিকে পাহারা দেয় এবং যখন রাণী গ্রামে বাহির হয়, তখন তাহার অজ্ঞাতে তাহার অনুসরণ করে। শশাঙ্কের এমন গুরুবল ছিল যে, রাক্ষসী তাহার শরীর স্পর্শ করিতে সমর্থ হইত না। তাহার গুরুদেব- প্রদত্ত ইষ্টকবচ ধারণ করিয়া থাকিত বলিয়া তাহার সাহস অদম্য ছিল, তাই তাহার এত ক্ষমতা, এত প্রতিপত্তি। শশাঙ্ক আপন অধীনস্থ সকল পাহারাওয়ালাকেই এই গুরুমন্ত্রে বলীয়ান্ করিয়া রাখিয়াছিল। রাজ্য জুড়িয়া এখন গ্রামে গ্রামে শশাঙ্কের প্রতিপত্তি ও প্রতিষ্ঠা বিস্তৃত হইয়া পড়িল। সমগ্র রাজ্যের, আবালবৃদ্ধবনিতা এই অদ্ভুত বালকের অসীম সাহস, অদম্য প্রতিজ্ঞা, অক্ষয় কাৰ্য্যশক্তি, এবং প্রেম-প্রীতি- ভালবাসা-বিনয়-মিষ্টভাষে পরিতুষ্ট হইয়া তাহাকে আপন বলিয়া জানিত, তাহাকে শ্রেষ্ঠ বলিয়া জ্ঞান করিত, তাহাকে নমস্য বলিয়াভক্তি করিত। এইরূপে এক পাহারাওয়ালা বালক অতবড় রাজ্যে রাজার অপেক্ষাও অধিক সম্মান লাভ করিল, অধিক প্রতিপত্তি অর্জন করিল। কিন্তু এত প্রতিপত্তি সত্বেও শশাঙ্ক সামান্য পাহারাওয়ালার ভাবে বাস করিত, সামান্য পাহারাওয়ালার ন্যায় সকলকে ভয় করিয়া,ভক্তি করিয়া, . সকলের পাদুকা মস্তকে গ্রহণ করিয়া তৃপ্ত ও পরিতুষ্ট থাকিত। রাজ্যের এতবড় একটা বিশৃঙ্খল ভাব--যাহার আদি হইতে সকল কার্যকারণই তাহার নিকট বিদিত ছিল, যাহার প্রতীকারের শক্তি তাহার সম্পূর্ণ টীয়কী। করায়ত্ব ছিল, তাহার একটী বিন্দুবিসর্গও সে প্রমেও কখনও কাহারও নিকট ব্যক্ত করে নাই। ইচ্ছা করিলেই শশাঙ্ক সকল ব্যাপার ব্যক্ত করিয়া দিয়া প্রকাশ্যে তাহার প্রতীকার করিতে পারি, কিন্তু সে সেরূপ কিছুই করে নাই । পরন্তু ধীরে ধীরে রাজ্যের সর্ব- ব্যাপারে রাজার উদাসীনতায় রাজ্যের যত অমঙ্গল সম্ভব তাহার প্রত্যেকটীর প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া প্রতীকার করিয়া আসিতেছে, এবং রাজার উদাসীনতা প্রজাগণ প্রাণে প্রাণে না বুঝিতে পারে, তাহার বন্দোবস্ত করিয়া রাখিতেছে। এক কথায় শশাঙ্ক অতি তীক্ষ্ণতার সহিত ঘরে-বাহিরে শান্তি-সামঞ্জস্য রক্ষা করিয়া একাকী, এই বিশাল রাজ্যটি শাসন করিতেছে; অথচ আজ পর্যন্ত কেহই জানিতে বুঝিতে পারে নাই শশাঙ্ক কে, কোথা হইতে আসিয়াছে, কোথায় তাহার জন্ম। একদিন গভীর রাত্রে রাণী ঘরের বাহির হইয়া গ্রামের দিকে চলিয়াছে, শশাঙ্ক তাহার অনুসরণ করিয়া ক্রমে তাহার গতির বাধা দিল। রাণী তখন ভীষণ রাক্ষসী-মূর্তি ধারণ করিয়া তাহাকে গ্রাস করিতে উদ্যত হইলে—শশাঙ্ক হাসিয়া ফেলিল। রাক্ষসী আরও ভীষণতর মূর্তি ধারণ করিলে, শশাঙ্ক আরও উচ্চৈঃস্বরে হাসিয়া উঠিল। রাক্ষসী ক্রোধে তাহার অঙ্গ স্পর্শ করিতে হস্ত প্রসারণ করিবামাত্র শশাঙ্ক ভয়ে শিহরিয়া উঠিয়া দেখিতে পাইল, তাহার ইষ্ট কবচ হাতে নাই। সহসা সে তখন সেই রাজকন্যা-প্রদত্ত অঙ্গুরীয় রাক্ষসীর চক্ষের সম্মুখে ধরিল। পরিবামাত্র রাক্ষসী ভয়ে চীৎকার করিয়া বহুদুরে পলায়ন করিল। শশাঙ্ক মুহূর্তে প্রকৃতিস্থ হইয়া ব্যাপার বুঝিতে পারিয়া ভগবানের নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিল ও ইষ্টদেবের নাম স্মরণ করিয়া রাক্ষসীর সন্মুখীন হইল। রাক্ষসী পলাইয়া ঘরে ফিরিয়া আসিল। সেদিন অনাহারে গেল।' ••• টীয়ামী -- * আজ সহসা শশাঙ্কের মনে রাজকন্যার উপর আকর্ষণ জন্মিল। আজ শশাঙ্ক বুঝিতে পারিলআজকন্যার ভালবাসা কেমন কৌশলে তাহার প্রাণ রক্ষা করিয়াছে। কিন্তু, “বিদায় করেছু যারে নয়ন জলে, এখন ফিরাবে তারে কিসের ছলে ?” সরল অকৃত্রিম ভালবাসা, নিঃস্বার্থে প্রাণে প্রাণ দান, এইরূপেই তাহার প্রতিদান প্রাপ্ত হয়। আজ শশাঙ্কের তরুণ জীবনে সর্বপ্রথমে ভালবাসার মাধুৰ্য-পরিপূর্ণ দাহিকাশক্তি পিপীলিকা দংশন করিল। রাণী ঘরে ফিরিয়া আসিয়া অনেক চিন্তার পর স্থির করিলেন, নিশ্চয়ই এই অঙ্গুরীয় সুবর্ণপুর হইতে আনিয়াছে। শুনিয়াছিলাম—রাজকন্যার নিকট কয়েকটী অঙ্গুরীয় আছে ; তাহার গুণ অপর কেহ জানে না। তবে কি এ তাহারই একটা ? রাণী অনেক চিন্তার পর সিদ্ধান্ত করি- লেন—শশাঙ্কের পক্ষে সে অঙ্গুরীয় লাভ, অসম্ভব । যখন কাল পরিপূর্ণ হয় তখন লােকের বুদ্ধি ও সেই পথেই চালিত হয়। রাণী আবার পূর্বাপেক্ষা গুরুতর রােগগ্রস্থ হইলেন। এবারে আর প্রাণের আশা নাই। সকল চিকিৎসকেরাই 'আশা পরিত্যাগ করিলেন। রাণী আবার এক চাল চালিপেন; প্রত্যুষে রাজাকে বলি লেন,- “রাত্রে স্বপ্ন দেখেছি, এখনও আমার জীবনের আশা আছে। সেই সুবর্ণপুর দ্বীপে “চাউলে হাসে জলে কথা কয়” নামে একটা জিনিষ আছে, সেই জিনিষটী আনাইয়া দিতে পারিলে আমার প্রাণ বাচিতে পারে । রাজা আবারও রাজ্যে প্রচার করিয়া দিলেন। কিন্তু কেহই সন্মত না হইলে এবারেও শশাঙ্ককে পাঠাইবার প্রস্তাব হইল। রাজা তাহাকে ঢাকাইয়া পাঠাইলেন। শশাঙ্ক করযােড়ে বলিল-“মহারাজ, জারি '। 4 A,. ৪৭ টীয়ানাকী। ~~~~~~~~~~~ আপনার আদেশ প্রতিপালন করূতে যেমন বাধ্য, তেমনি আমার জননীর অনুমতি না নিয়েও কোনও কাজে অগ্রসর হতে পারি না। আমি দুই বার গিয়েছি বটে, কিন্তু স্থান অতি বিপদসঙ্কুল ; হয়ত আমি ফিরে না আসতেও পারি।” রাজা শশাঙ্ককে আশীৰ্বাদ করিয়া মায়ের অনুমতি লইয়া আসিতে বলিলেন। শশাঙ্ক যথাসময়ে জননীদ্বয়ের সমীপে উপস্থিত হইয়া বিস্তারিত বলিলে, মা কঁদিয়া বলিলেন—“দুইবার তােমাকে, বাছা, যমের মুখে বিদায় দিয়াছিলাম, আবার তােমাকে যেতে দিতে মন সরে না।” শশাঙ্ক--মা, তােমাদের কোন ভয় নেই। তােমাদের আশীর্বাদে আমি নিরাপদে ফিরে আসবে; এবং আমার রাজ্য নিষ্কণ্টক করুতে সমর্থ হব। আর যদি তা-ই না পারি, তবে না হয় প্রাণ গেলই। মতে ত হবেই, না হয় সৎকার্যেই প্রাণটা যাবে। : মা-রাজ্যে আর তােমার কি ? শশাঙ্ক—আমার কি ? এ রাজ্য আমার। আমার পিতার রাজ্য আমার নয়তাে কার ? রাজার দুর্ব দ্ধির জন্য রাজ্য উৎস যাচ্ছে । এক দিকে আমার প্রাণ, অন্য দিকে রাজ্যশুদ্ধ লােকের সুখশান্তি সংস্থাপন,ইহার কোটী ভাল, মা ? মা-আমি জানি এ রাজ্যের মঙ্গলের নিমিত্ত, ভিখারিণী হইলেও, আমি অনেকাংশে দায়ী। আমি জানি, এই রাজ্যের শান্তির নিমিত্ত আমার প্রাণাধিক পুত্রকে বিপদ-সমুদ্রে নিক্ষেপ করিতেও আমি বাধ্য। কিন্তু মায়ের প্রাণ ! বিমাতা-দিদি, আমাদের দুঃখের ত অন্ত নাই-ই। কিন্তু যা কর্তব্য তা করতেই হবে। সন্তান যখন বড় হয়েছে, আপন কর্তব্য- টীয়ানাকী। পথ দেখতে পেয়েছে—নিজের ব্যক্তিগত দুঃখের জন্য এখন উহার কৰ্তব্যপথে বাধা দেওয়া উচিত নয়। যখন দু’বার ফিরে এসেছে, তখন আমাদের আশীর্বাদে আবারও জয়লাভ করে আসতে পারবে। মা-এখনও ছেলেমানুষ! বিমাতা—ছেলেমানুষ কি ? আর যদি ছেলেমানুষই হয়, তা হলেই বা কি ? রাজার ছেলে ত ! তুমি আমি ত মরবই, না হয় পুত্রশােকেই মরুব। তাই বলে ছেলেটাকে আজীবন পাহারাওয়ালা করে রাখতে হবে ? হাজার হলেও রাজার ছেলে-ওর অনেক দায়িত্ব আছে অনেক কৰ্ত্তব্য আছে। রাজাই যেন অন্ধ বধির অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন, রাজপুত্র ত আছে! সে যদি দেশের দুঃখ দূর কতে পারে তবে তার জন্ম বৃথা। তােমার আমার দুঃখের দিকে লক্ষ্য করিয়া রাজপুত্রকে রাজ্য চিন্তা হইতে বিরত করিও না। দেও উহাকে উহার কর্তব্যপথে যাইতে। তার পর যদি প্রয়ােজন হয়দুই ভগ্নীতে গলাগলি বাধিয়া পুত্রশােকে প্রাণত্যাগ করিব। তবুও বুঝিয়া যাইতে পারিব সন্তান আমাদের কর্তব্য-সাধন করিবার নিমিত্ত, রাজ্যের মঙ্গল সাধন করিবার নিমিত্ত প্রাণ দিয়াছে। তাহাতেও অনন্ত সুখ আছে। কিছুক্ষণ সকলেই নিস্তব্ধ রহিল, পরে শশাঙ্কের মাতৃদ্বয় আশীর্বাদ করিয়া শশাঙ্ককে বিদায় দিলেন । শশাঙ্ক গুরুর নিকট বিদায় গ্রহণ করিতে গেল। গুরু সকল শুনিয়া একটু চিন্তা করিয়া-পরে হাসিয়া পদধূলি দান করতঃ বিদায় দিয়া বলিলেন--শুভমস্তু। শশাঙ্ক রাজার নিকট ফিরিয়া আসিয়া তাহাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করতঃ পদধূলি গ্রহণ করিয়া কৰ্তব্য উদ্দেশ্যে ধাবিত হইল। “আপদ দূর হইল-রাণীর“প বার।” রাণী: স্থির করিলেন-“এবারে আর ফিরে আসতে পাবে না।”
*১৪২ ঈয়ানকী। যে দিন শশাঙ্ক সুবর্ণপুর যাত্রা করিল, সেই দিন রাত্রে রাজা স্বপ্ন দেখিলেন—এক প্রাচীনা তাহার সম্মুখে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিতেছে- “হুঁ বাছা, রাণীর এমন অসুখ। মনে কর যদি রাণী মরে যায়, তবে তােমার রাজ্যের পরিণাম কি হবে ?” সহসা রাজার স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গেল ;-রাজা জাগ্রতেও যেন সেই প্রশ্ন শুনিতে লাগিলেন। তাঁহার তখন চিন্তা হই—“সত্য সত্যই এ রাজ্যের পরিণাম কি হইবে? আমার ত পুত্রসন্তান নাই !” রাজা চিন্তায় অধীর হইয়া পড়িবেন—কাহার জন্য এত করিতেছেন ? এই অবসুরে গ্রীৱে স্ত্রীরে তাহার মনে হইল—গর্ভবতী স্ত্রীকে অন্ধ করিয়া রাজ্যের বাহির করিয়া দিয়াছিলেন। তাহার গর্ভেও রাজপুত্র জন্মিতে পারে। ধীরে ধীরে নীরব রাজার চক্ষুজলে বক্ষ ভাসিয়া গেল । তাহার মনে ভাবান্তর উপস্থিত হইল। তিনি স্পষ্ট বুঝিতে পারিলেন যে, দুঃখের বিনিময়ে অধিকতর দুঃখ স্থাপন" ভিন্ন তিনি আর কিছুই করেন নাই ! যিনি যে অবস্থায়ই থাকুন, আত্মকৃত অপরাধের নিমিত্ত কোনও না কোনও সময়ে প্রত্যেককেই অনুতাপ-যন্ত্রণা সহ করিতে হইবে। আর এই অনুতাপের কঠোর দাবদাহনই পাপের প্রায়শ্চিত্ত। সময়ে শশাঙ্ক তৃতীয় বারের নিমিত্ত এলাছিন সহরে সুবর্ণপুরের নিকটবর্তী সন্ন্যাসীর আশ্রমে উপস্থিত হইল; এবং যথাবিধি প্ৰণিপাত করিয়া বলিল—“ঠাকুর! আবার আপনাকে যন্ত্রণা দিতে এসেছি।” ঠাকুর শুনিয়া হাসিয়া বলিলেন-“এই জনমানবহীন সমুদ্র-কানন- বেষ্টিত প্রদেশে বড়ই আনন্দে বাস করি। কিন্তু তথাপি মানুষের মুখ দেখলে প্রাণে যেন কেমন এক বিমল আনন্দ উপস্থিত হয়। মায়ার বন্ধন এমনই কঠোর অথচ মধুর যে—বাল্যাবধি বনে বনে সংসারের সংশ্রব-শূন্য অবস্থায় হিংস্র জন্তুদের সহিত বাস করে আসছি, তথাপি যে টীয়ানাকী। ৪৩ সেই কেমন একটা প্রাণের আকর্ষণ-মানুষ দেখলেই অন্য জীবজন্তু অপেক্ষা অধিক ভালবাসতে ইচ্ছা হয়-তা আর গেল না! এই আকর্ষণের বিশেষত্বের একমাত্র কারণ জাতীয়তা, ইহার একমাত্র কারণ আমিও মানুষ। আমি মানুষ বলে জগতের আর সব জীবজন্তু অপেক্ষা মানুষকেই অধিক ভালবাসতে হবে, মানুষের সহায়তায় প্রাণ দিতে হবে, মানুষের মঙ্গলের জন্য জীবন-মন উৎসর্গ করতে হবে, এই ঘাের স্বার্থের ভাব এত করেও হৃদয় হতে দূর করতে পারুম না ; আর যে প্রায়ূব এমনও বােধ হয় না। তােমাকে যতবার দেখেছি, ততবারই দেখতে ইচ্ছা হয়েছে। এখনও তােমার প্রতি একটী স্থায়ী স্নেহ তেমনই আছে। বিরক্ত হয় কেন ? . তুমি যে কাজে এসেছ, এবারেও তােমার ইচ্ছা পূর্ণ হবে-চিন্তা করাে না।” শশাঙ্ক -আপনি কি সকল মানুষকেই সমান ভালবাসেন? সন্ন্যাসী--কতকটা তাই বটে; তবে যারা মানুষের ভিতরে পর- স্পর বিরােধ জন্মায় তারা আমার চক্ষুশূল। আমি সব মানুষকে এক- ধর্মাবলম্বী একমনপ্রাণে, একীকরণের পথে অগ্রম্বর হ'তে দেখতে ভালবাসি। . যেখানে দুর্বলের প্রতি সরলের অত্যাচার, সেখানে আমার দুর্বলের প্রতি আকর্ষণ অধিক। যেখানে সাধুর প্রতি অসাধুর অত্যাচার, সেখানে আমি সাধুর প্রতি অধিকতর আকৃষ্ট। আর যেস্থানে স্বার্থপরতার অন্ধ আবরণ ভাইয়ে ভাইয়ে বাদ-বিসম্বাদ, আনয়ন করে, চক্ষে কাপড় বেঁধে সেস্থান হ'তে আমি চলে আসি, অথবা ইচ্ছা হয়, উভয়ের পায়ে পড়ে সদ্ভাব সংস্থাপন করে দেই। শশাঙ্ক -আমি ও আমার পিতা এ দুইয়ের মধ্যে কার প্রতি আপ- নার আকর্ষণ বেশী? ঠাকুর -তােমার। ; = ৪8 টীয়ানাকী $-কেন ? ঠাকুর -মানবের ন্যয্যস্বত্বে যে হস্তক্ষেপ করে, সে ভগবানের নিকট গুরুতর অপরাধী। তােমার পিতা এই অপরাধে গুরুতর অপরাধী। আর যে অত্যাচার-প্রপীড়িত, যাহাকে সৰ্ব্ব অধিকারে বঞ্চিত হইয়া নিজের মুখের গ্রাস পরকে দিয়াও কাদিয়া দিন কাটাইতে হইতেছে, তাহাকে বুকে টানিয়া আনিয়া তাহার দুঃখ দূর করিবার নিমিত্ত আমার প্রাণ সতত ব্যাকুল হয়। তুমি এই অত্যাচার-প্রপীড়িত, তাই তােমার পিতা অপেক্ষা আমি তােমাকেই অধিক ভালবাসি। শশাঙ্ক-ঠাকুর, আপনি লােকালয়ের বাহিরে এই জঙ্গলে বাস করিয়াও মানবের কার্যকলাপে এত সংশ্লিষ্ট থাকেন কেন ? আর আপনি মানব-সমাজের ছােটখাট খবরটী পর্যন্ত কিরূপে জাতে পারেন ? আপনি সংসার-ত্যাগী-আপনি সংসারের কাজে এত মাথা ধামান কেন ? ঠাকুর শুনিয়া হাসিয়া কহিলেন—“বাছা শশাঙ্ক, তুমি মনে ভাবিও . আমরা জগতের জন্য কোনও কাজ করি না, বা চিন্তা করি না। মনে ভারিও না, জগতের কাৰ্যকলাপ হইতে চাক্ষুষ দূরে থাকিলেও আমরা তাহা জানিতে পারি না। আমরা যেখানেই থাকি, যত দূরেই থাকি, কোথায় কি ছােঠখাট কাজটী হইয়া গেল বা হইবে তাহাও জানিতে পারি, এবং তােমাদের জানিবার পূর্বেই জানিয়া বসি। আমা- দের কাৰ্য্য তােমাদের কাৰ্য্যের সহিত সম্পূর্ণ সংশ্লিষ্ট। আমাদের কার্য্য ভগবানের ইচ্ছানুবর্তী হইয়া তাহারই অনুমােদিত কাৰ্য্য সম্পাদন করা। পায়ে পায়ে এইরূপ কার্যে বিঘ্ন আছে বলিয়া আমরা সংসারের কোলাহল হইতে দূরে বাস করি। সাধারণতঃ আমরা তােমাদের মঙ্গল-কামনা করি —ইহাই তোমাদের পক্ষে বিশেষ মঙ্গলকর। তােমা- টীয়ানাকী। ৪৫ দের মধ্যে কোনও ন্যায়বান সাধুব্যক্তি কোনও বিপদে বা উৎপীড়নে পতিত হইলে, আমাদের মঙ্গল-কামনা তাহাকে সেই বিপদ ও উৎ- পীড়নের হস্ত হইতে উদ্ধারকল্পে সম্পূর্ণ সাহায্য করে। তা ছাড়া কখনও প্রত্যক্ষে কোন কার্য সম্পাদনের প্রয়োজন হইয়া পড়িলে তাহাও আমরা করিয়া থাকি। সত্যের উন্নতি বৃদ্ধি করা, ন্যায়ের সহায়তা করা, ইহাই আমাদের সদাব্রত। সমগ্র জগৎকে এক নিত্য- সত্যময় আনন্দ-সাগরে ডুবাইয়া রাখিয়া-সেই সুধা-সমুদ্রে স্নান করিতে পারিলেই আমরা সমস্ত সাধনার সার্থকতা অনুভব করি। সাধুদিগের পরিত্রাণ করা, দুষ্কতদিগের বিনাশ সাধন করা, ও ধৰ্ম্ম- সংস্থাপনের ব্যবস্থা করা—ইহাই সেই আনন্দ-সাগরের তরঙ্গের উপর শশাঙ্ক-বিনাশ সাধনে কি মঙ্গল হয় ? ঠাকুর—তাহা হয়। অথবা যদি বিনাশ সাধন না করিয়া কাজ হয়, তবে তাহা সর্বোৎকৃষ্ট। প্রথমে তাহারই চেষ্টা করা উচিত, পরে যদি একান্তপক্ষে তাহাতে কোনও ফল না হওয়ার আশা থাকে তবে বিনাশ অবশ্য কর্তব্য। প্রথমে বিষবৃক্ষের বিষ সংশােধন করিবার চেষ্টা করিতে হইবে; কারণ সেই একটী বৃক্ষ বাগানের সকল বৃক্ষকে বিষাক্ত করিয়া নষ্ট করিতে পারে। কিন্তু সেরূপ চেষ্টায় সুফল না হইলে বাধ্য হইয়া সকল বৃক্ষের মঙ্গল-সাধনের নিমিত্ত উহাকে বিনষ্ট করিতেই হইবে। এরূপ বিনাশে নিশ্চয়ই মঙ্গল হয়। শশাঙ্ক স্থির ধীর চিত্তে সাধুর সাধুবাক্য শ্রবণ করিয়া তাহার চরণে অভিবাদন করতঃ পদধূলি লইয়া আপন কর্তব্যপথে অগ্রসর হইবার নিমিত্ত অনুমতি ও উপদেশ প্রার্থনা করিল। সন্ন্যাসী ঠাকুর আশীর্বাদ করিয়া বলিলেন—“তােমার এবারকার কাৰ্য বড়ই বিপদসঙ্কুল। কিন্তু ৪৬ টীয়ানাকী। nor ভয় করিবার কোনও কারণ নাই। তীক্ষ্ণতার সহিত, সহিষ্ণুতার সহিত, নির্ভীকচিত্তে কাজ করিতে পারিলে বরং এই বিপদ হইতে তােমার সম্পদ লাভও হইতে পারে।” শশাঙ্ক—আপনার চরণের আশীর্বাদে আমি কৰ্তব্য-পথে যমকেও ভয় করি না। যে পদরেণু মস্তকে লইয়া দুইবার জয়লাভ করিয়াছি, সেই পদরেণু অামার এবারেও প্রার্থিত দান করিবে। ঠাকুর-“দেখ, যে রাক্ষসী তােমার বাপের রাজ্যের রাণী তার নাম জান ?” শশাঙ্ক বলিল—“না।” ঠাকুর—তার নাম “টীয়ানাকী।” সুবর্ণপুর তার বাপের বাড়ী। এখানে তার এক মা আছে, তার কাছে তােমাকে যাইতে হইবে। তুমি সমুদ্রে স্নান করিয়া আইস, আমি তােমার কর্ণে রক্ষা দান করিয়া তােমাকে দীক্ষিত করিয়া দিব। শশাঙ্ক আনান্তে ফিরিয়া আসিয়া দেখিল ঠাকুর ধ্যানস্থ। ধ্যানস্থ যােগীর ধ্যান ভাঙ্গিতে নাই ; শশাঙ্ক করযােড়ে তাহার সম্মুখে বসিয়া রহিল। কিছুক্ষণ পরে ঠাকুরের ধ্যান ভাঙ্গিল—তিনি হাসিয়া চক্ষু মেলিলেন ; অতঃপর শশাঙ্ককে দীক্ষিত করিয়া বলিলেন—“বৎস, তােমার ভয় নাই,' ভগবান তােমার সহায় আছেন। যাহার অন্য কোনও অবলম্বন নাই—তিনিই তাহার সর্বাবলম্বন। যাহার শক্তি নাই—তিনিই তাহার শক্তি। যাহার বিপদ ও অত্যাচারের হস্ত হইতে আত্মদ্ধার করিবার অন্য কোনও উপায় নাই—তিনিই তাহার অদম্য বাহুবল। যাও, বৎস, তােমার গন্তব্য পথে যাও। পদে পদে তােমার জীবন নাশের ভয় রহিয়াছে, কিন্তু অটল অচল নির্ভিক চিত্তে ভগবানের নাম স্মরণ করিয়া চলিও। বিপদে কর্তব্য স্থির করিতে না পারিলে আমাকে স্মরণ করিও।”
টীয়ানাকী। ৪৭; অতঃপর সন্ন্যাসী ঠাকুর শশাঙ্ককে আবশ্যকীয় উপদেশ প্রদান করতঃ কর্তব্যপথে বিদায় দিবার পূর্বে বলিয়া দিলেন—“যে রাজ- কন্যার গৃহে তুমি পূৰ্ববারে বাস করিয়াছিলে, কাৰ্যসিদ্ধি হওয়ার পূর্বে তাহার সহিত দেখা করিও না। তােমার অনেক কার্যের সাহায্য তাহার দ্বারা হইতে পারে এই লুব্ধ আশায় তাহার দিকে অগ্রসর হইলে সকলই নষ্ট হইবে।” শশাঙ্ক ঠাকুরকে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিল এবং উপদেশ শিরােধার্য করিয়া পিতামাতা ও ইষ্টদেবের চরণ স্মরণ করতঃ বীরের ন্যায় কর্তব্য- যাত্ৰা করিল। অন্ধ অনাথিনীর অঞ্চলের নিধি ভীষণ অরণ্যবেষ্টিত উত্তালতরঙ্গকল্লোল শ্রবণ করিতে করিতে নির্ভীক-চিত্তে কাঙ্গালিনী মায়ের দুঃখ এবং ধ্বংসােখ পিতৃরাজ্যের কলঙ্ক মােচন করিবার নিমিত্ত অগ্রসর হইল। ক্রমে শশাঙ্ক সুবর্ণপুরের রাক্ষস-পুরীর মধ্যে প্রবেশ করিয়া——“দিদিমা, দিদিমা” বলিয়া চীৎকার করিয়া ডাকিতে লাগিল। তাহার চীৎকার শুনিয়া কতকগুলি বিকটমূর্তি রাক্ষসী ছুটিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল—“কে রে?” শশাঙ্ক উত্তর করিল—“আমি টীয়ানাকীর পুত্র। দিদিমার সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছি।” রাক্ষসীর। ছুটিয়া গিয়া বুড়ী রাক্ষসীকে খবর দিতেই বুড়ী গুড়ি গুড়ি আসিয়া বাহির হইল এবং বিশেষ পরিচয় লইয়া শশাঙ্ককে বাড়ীর ভিতরে লইয়া গেল। বহুদিন টীয়ানাকীর খবর পায় না-বুঢ়ী আজ শশাঙ্কের মুখে টীয়ানাকীর খবর পাইয়া বড়ই সন্তুষ্ট হইল। তথাপি পরীক্ষা না করিয়া ঘরে নেওয়া উচিত নয় বলিয়া সে প্রকৃত টীয়ানাকীর পুত্র কিনা পরীক্ষা করিবার নিমিত্ত তাহাকে লােহার কলাই ও মূলা খাইতে দিল। এই পরীক্ষার কথাটী সন্ন্যাসীঠাকুর জানিয়া পূৰ্বেই শশাঙ্ককে সতর্ক করিয়া দিয়াছিলেন ও তাহার সঙ্গে কলাই দিয়াছিলেন। শশাঙ্ক নিঃসন্দিগ্ধ
৪৮
“টীয়ানাকী
ভাবে বুড়ীর কলাই ও মূল গ্রহণ করিল, এবং নিজের কলাই খাইতে
আরম্ভ করিল। 'তাহাতে সকলেই তাহাকে টীয়ানাকীর পুত্র বলিয়া
বিশ্বাস করিয়া-ঘরে লইয়া গেল। শশাঙ্ক বিশ্রামান্তে বুড়ী রাক্ষসীকে
বলিল-“মার শরীর বড়ই খারাপ ; জীবনের আশা কম। তিনি
স্বপ্নে দেখিয়াছেন—“চাউলে হাসে, জলে কথা কয়” পাইলে তাঁহার
জীবন রক্ষা হয়। তাই আমি আসিয়াছি। হঁ৷ দিদিমা, “চাউলে হাসে
জলে কথা কয়” টা কি ?
বুড়ী।-২৪ দিন থাক, তারপর তােকে দেখাব।
শশাঙ্ক ২/৩ দিন পরম আদরে তথায় বাস করিয়া এ দিন বুড়ীকে
বলিল—“দিদিমা, মার অসুখ বেশী, যদি মরিয়া যান তবে দেখা হবে
। যত সত্বর পারি ঔষধ লইয়া যাওয়ার দরকার। আমার এখানে
আর একদিও থাকা উচিত নয়।”
বুড়ী।—তুই কোনও দিন আসি নাই। আমার আর কেহ নাই ।
তুই আর ২৪ দিন না থাকিলে আমার মনে বড় কষ্ট হবে। তাের
মায়ের জন্যে তাের কোন চিন্তা নাই, সে মরিবে না।
শশাঙ্ক।—তুমি যদি দেখিতে তাহা হইলে বলিতে না যে তিনি
মরিবেন না। তাহার শরীরে কিছুই নাই।
বুড়ী হাসিয়া বলিল-“তাের ভয় নাই, কেন সে মরিবে না তা
তােকে পরে বলিব। পরদিন বুড়ী শশাঙ্ককে “চাউলে হাসে জলে কথা
কয়” দেখাইল এবং বলিল-“দেখ, ঐ যে টীয়াপাখীটী দেখিতেছিস,
ঐটা তাের মায়ের প্রাণ। ঐটী না মরিলে তাের মা মরিতে পারে না।”
শশাঙ্ক।-পাখী আবার প্রাণ হয় কিরূপে ?
বুড়ী।রাক্ষসীদের হয়। তাহারা সব সময়ে এদিকে সেদিকে
চলে। তাই বিপদের ভয়ে এইরূপ কোন একটা জিনিষের মধ্যে
'
টীয়ানাকী।
৪৯
nanananananana
তাহাদের প্রাণ রাখে। ঐ পাখীটার ডান ছিড়িলে তাের মার হাত
ছিড়িবে, ছি ড়িলে তাের মায়ের পা ছিড়িবে। গলা ছিড়িলে
তাের মায়ের গলাটী ছিড়িবে ।
শশাঙ্ক।-আচ্ছা, দিদিমা, তােমাদেরও এমনই আছে ?
বুড়ী।—আছে ; তবে তা তােকে বলিব না; বলিতে নিষেধ
আছে। যদি আর রাক্ষসীরা টের পায় যে আমি তােকে বলিয়াছি,
তাহা হইলে আমার আর রক্ষা নাই।
শশাঙ্ক।-তােমরা ছাড়া এ সব আর কেহ জানে না ?
বুড়ী।তাের মার প্রাণ যে ঐ টীয়াপাখীটী তা তাের মা জানে,
আর আমি জানি---আর এখানে কেহ জানে না। এই পুরীতে সাতটা
মহল্লা আছে। এই সাতটা মহল্লায় যত রাক্ষসী সর্বদা বাস করে,
তাহাদের প্রাণ পৃথক পৃথক্ জিনিষের মধ্যে আছে ; যেমন তাের
মায়ের প্রাণ ঐ পাখীটীতে।
শশাঙ্ক । -দিদিমা, তােমরা ত বাহিরে যাও না, তবে খাও কি ?
বুড়ী-বাহিরে যাবনা কেন? সাত দিন অন্তর যাই। পরশু যাব।
সমস্ত রাত্রি বাহিরে থাকিব,যাহা আনিব তাহা ৭ দিন বসিয়া খাব।
শশাঙ্ক।-পরশু কি আমাকে এই রাক্ষসের পুরীতে একা থাকিতে
হবে ?
বুড়ী।-তয় কি ? এখানে ধমও আসিবে না ।
শশাঙ্ক।-না দিদিমা, আমার ভয় হয়। যদি তােমাদের কেহ
মারিয়া ফেলে, তবে আমার উপায় কি হবে ?
বুড়ী।—পাগল নাকি ? আমাদের প্রাণ যেখানে আছে—তাহা
কেহ জানিতে বুঝিতে পারে এমন সাধ্য নাই।
nir
শশাঙ্ক।—কোথায় তাহা বলিতে হইবে।
টীয়ানাকী। কিছুতেই সম্মত হয় না, শশাঙ্কও ছাড়ে না। শশাঙ্ক বলিল- “বুড়ী, যদি তুই না বলিবি, তাহা হইলে তােকে যাইতেই দিব না। তােরা যাবি, আমি তােদের প্রাণপাহারা দিব।” অনেক পেড়াপিড়ি করাতে বুড়ী ভাবিল-এ ত আপন জন, একে বুলিতে দোষ কি ? সাত পাঁচ ভাবিয়া বুড়ী বলিল-“যদি কাহাকেও না বলিস তবে বলিতে পারি। যদি আর কেহ টের পায় তবে আমাকে বড়ই বিপদে পড়িতে হইবে।” ধূর্ত মায়াবী শশাঙ্ক বলিল—“কাহাকেও বলিব না দিদিমা, তােমাপেক্ষা আমার বেশী কে আছে ?” তখন বুড়ী রলিল—“আমাদের এই মহলের পরের মহলটীতে একটা বড় পুকুর আছে। ঐ পুকুরের মাঝখানে সাত হাত জলের নীচে একটী স্তম্ভ আছে। ঐ স্তম্ভের উপর একখানি তরােয়াল আছে। ঐ তরােয়াল দিয়া স্তম্ভের উপর আঘাত করিলেই স্তম্ভটী ভাঙ্গিয়া ছয়টী বাঁশের চুঙ্গা বাহির হয়। (১) একটী বালির চুঙ্গা (২) একটী জোঁকের চুঙ্গা (৩) একটী সূচের চুঙ্গা (৪) একটী দড়ির চুঙ্গা (৫) একটী চুঙ্গায় একটা “তিত লাউ” (৬) ষষ্ঠ চুঙ্গাটীতে একটী “পরাণ লাউ” আছে। বালির চুঙ্গা ছুঁড়িয়া মারিলে আমাদের সকলের চক্ষু অন্ধ হইয়া যায়। জোঁকের চুঙ্গা ছুঁড়িয়া মারিলে বড় বড় জোঁক আমাদের সকল শরীর ছাইয়া ফেলে। সূচের চুঙ্গা মারিলে আমাদের সকলের সারা গায় উঁচ বিধিয়া যায়। দড়ির চুঙ্গা ছুঁড়িয়া মারিলে আমাদের সকলকে হাতে পায়ে বঁধিয়া ফেলে। তিতলাউটীকে খণ্ড খণ্ড করিয়া কাটিলে আমাদের হাত পা খণ্ড খণ্ড হইয়া যায়। “পরাণ লাউ’’টীকে কাটিলেআমাদের প্রাণ বাহির হইয়া যায়। সাবধান তাের মা ছাড়া আর কাহাকেও এ সব কথা বলিস না, য়ানাকী। শশাঙ্ক।-না দিদিমা, আমি কাহাকেও বলিব না। আর তােমাদের মারাও কাহারও পক্ষে সহজ নহে। সে দিন সেই ভাবেই গেল। বুড়ীর ঘরের দেয়ালে ৪টী বড় বড় চক্ষু ছিল। পরদিন সকাল বেলা শশাঙ্ক জিজ্ঞাসা করিল—“দিদিমা, তােমার ঘরের দেয়ালে ৪টী বড় বড় চক্ষু কিসের ?” বুড়ী।-পূর্বে এখানে মানুষের বাস ছিল। এই ঘর রাজার শােবার ঘর ছিল। রাজার দুই রাণী ছিল। প্রাচীন বয়সে রাজা আবার বিবাহ করেন, এবং পূৰ্বরাণীদের চরিত্রের বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়া তাহাদের চক্ষু তুলিয়া রাখিয়া রাজ্যের বাহির করিয়া-দেন। নূতন রাণী সেই চারিটী চক্ষু দেয়ালে পুতিয়া রাখিয়াছিলেন, এখনও তেমনই আছে। শশাঙ্ক।-ও চক্ষু দিয়া কি হবে ? বুড়ী।—আমাদের ঠাকুর মন্দিরে “অমৃত-কুগু” আছে। “অমৃত- কুণ্ডের” জলের এমন গুণ যে যদি কাহারও হাত একেবারে কাটিয়া ফেলে, তবে জোড়া দিয়া অমৃত-কুণ্ডের জল ছড়াইয়া দিলে আবার যেমন ছিল তেমনই হয়। যদি কাহারও চক্ষু তুলিয়া নেয়, তবে এই চক্ষু বসাইয়া অমৃত-কুণ্ডের জল দিলে আবার যেমন ছিল তেমন চক্ষু হইবে। শশাঙ্ক সব শুনিয়া ইষ্টদেবের ও সন্ন্যাসী ঠাকুরের চরণ স্মরণ করিয়া উদ্দেশে তাঁহাদের চরণ বন্দনা করিয়া কর্তব্যের জন্য মনকে বাঁধিতে লাগিল। এইভাবে আরও একদিন কাটিল, এ দিন সব রাক্ষসীর। বাহিরে যাইবে; সন্ধ্যায় বাহির হইবেভােরবেলা ফিরিয়া আসিবে। রাক্ষসীরা সব চলিয়া গেল ; শশাঙ্ক ছাতে, উঠিয়া দেখিল- হারা দৃষ্টির অগােচর হইয়াছে; তখন ধীরে ধীরে নামিয়া আসি। । ..' * * ৫২ টীয়ানাকী । ২৩ ; যে প্রবল প্রতিহিংসা, বৈর-নির্যাতন-স্পৃহা এতদিন এই বালক-হৃদয়কে দগ্ধ করিয়া আসিতেছিল, আজ তাহা আশা-সলিলে অভিষিক্ত হইয়া প্রবল বীৰ্য্য ধারণ করিল। তথাপি তাহাতে বিন্দুমাত্র উৎফুল্ল। বা অধীর না হইয়া অষ্টাদশ বৎসরের বালক শশাঙ্ক অশীতি বর্ষীয়, বৃদ্ধের ন্যায় গম্ভীর বুদ্ধিতে কাৰ্য্যক্ষেত্রে অগ্রসর হইল। আপন ইষ্টমন্ত্র জপ করিয়া-ইষ্টদেবতার চরণ স্মরণ করিয়া- শশাঙ্ক সময়ে পুকুরে সাঁতার দিল, এবং ঠিক মধ্যস্থলে উপস্থিত হইয়া ডুব দিল, কিন্তু কিছুই কুল কিনারা করিয়া উঠিতে পারিল না। বার ডুব দেওয়ার পর স্তম্ভটীর সন্ধান হইল; কিন্তু তখন সে এত ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে যে বাধ্য হইয়া তাহাকে তীরে ফিরিয়া আসিতে হইল। এইরূপে বহুক্ষণ চেষ্টা ও অনেক কষ্ট করিয়া একবার শশাঙ্ক স্তম্ভের উপর দাড়াইল,এবং ধীরে ধীরে জলের মধ্যে থাকিয়াই একখানি তৰােয়ালের সন্ধান পাইল। তরােয়ালখানি হাতে করিয়া শশাঙ্ক অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়া অতিকষ্টে আবার তীরে ফিরিয়া আসিল, এবং অল্পক্ষণ বিশ্রাম করিয়া পুনরায় আশার বীর্যে উৎসাহিত হইয়া জলে সাঁতার দিল এবং জলের নীচে গিয়া অতি কষ্টে স্তম্ভের উপর সজোরে তরবারির আঘাত করিল, আঘাত করিতেই স্তম্ভটা ফাটিয়া গেল। স্তম্ভ ফাটিয়া যাওয়া মাত্র তাহার অভ্যন্তর হইতে এক ভীষণ বিরাটকায় দৈত্য হুঙ্কার করিয়া শশাঙ্কের প্রাণবধ করিতে উদ্যত হইল ; শশাঙ্ক ভয়ে চীৎকার করিয়া অজ্ঞানের মত অতি কষ্টে তীরে ফিরিয়া আসিল। বুড়ী রাক্ষসী এই দৈত্যের কথা তাহাকে বলে নাই। শশাঙ্ক তীরে বসিয়া কাদিতে: লাগিল—আর বুঝি কার্যোদ্ধার হয় না, অধিকন্তু সকলের অজ্ঞাতে বুঝি প্রাণটীও যায়। ধীরে ধীরে শশাঙ্কের মনে মায়ের বিদায়কালীন অশ্রুজল ও পিতৃরাজ্যের দুর্দশার কথা জাগিয়া উঠিল ; ধীরে ধীরে ;
nnnnnnnnnnnnnnnnn টীয়ানাকী ০০০০০০০০০০ mennin anno ইষ্টদেবের চরণযুগল ও সন্ন্যাসীঠাকুরের আশীর্বাদের কথা তাহার মনে আসিয়া যেন একটী তমােময় আবরণ সরাইয়া দিল। শশাঙ্ক বিদ্যুৎ- বেগে উঠিয়া দাড়াইল, যেন নবীন-জীবনে নবীন বীৰ্য লাভ করিয়াছে। সেই নববীৰ্যে বীৰ্য্যবান্ শশাঙ্কশেখর সেই নির্জন প্রদেশে একাকী, অসহায়, দক্ষিণ হস্তে দৃঢ়মুষ্টিতে তরবারি ধারণ করিয়া উদ্ধে দৃষ্টিনিক্ষেপ করতঃ বলিতে লাগিল - “শশাঙ্ক, কাহার ভয়ে ভীত হইতেছ ? প্রাণের ভয়ে? তােমার উপর যে গুরুতর কর্তব্যভার ন্যস্ত রহিয়াছে তাহার মুল্য তােমার প্রাণের মূল্য অপেক্ষা অনেক অধিক। কৰ্ত্তব্যে প্রাণ দেও—বিন্দুমাত্র বিচলিত হইও না। সদুদ্দেশ্যে যে প্রাণ দিতে প্রস্তুত হয় বিধাতা তাহার সাহায্য করেন।” শশাঙ্ক আবার জানু পাতিয়া বসিয়া করযােড়ে বলিতে লাগিল—“জননী, বিদায় দাও। যদি এই অজ্ঞাত প্রদেশে প্রাণ যায়- তবে তুমি, মা, কঁদিতে কাদিতে প্রাণত্যাগ করিও, পরলােকে আবার, পবিত্ৰতর মূর্তিতে তােমার চরণে স্থান পাইব। অনাথিনী, তােমার একমাত্র পুত্র তােমার দুঃখ দূর করিবার নিমিত্ত, পিতৃরাজ্যের কলঙ্ক মােচন করিবার আশায় প্রাণ দিয়াছে—ইহা ভাবিতেও তােমার মনে মরণের সময়ে শান্তি আসিবে। ইষ্টদেব, ঠাকুর, আপনাদের অনুজ্ঞায় প্রচণ্ড দৈত্যের হস্তে প্রাণ দিবার নিমিত্ত আমার কর্তব্যে আমি ব্রতী হইলাম।” বলিতে বলিতে শশাঙ্ক দ্বিগুণ বীর্যে বীৰ্যবস্ত হইয়া সলিলে লম্ফ প্রদান পূৰ্ব্বক সজোরে সাঁতার কাটিয়া মধ্যস্থলে উপস্থিত হইবামাত্র আবার দৈত্য গৰ্জন করিয়া উঠিল। দৈত্য বলিল—আমি এই স্তম্ভের রক্ষক, আমাকে পরাস্ত না করিয়া তুমি স্তম্ভ স্পর্শ করিতেও পারিবে না। যদি শক্তি থাকে অগ্রসর হও, নতুবা ফিরিয়া যাও, প্রাণ দিতে আসিও না।”: শশাঙ্ক উত্তর করিল—“প্রাণের মমতা ছাড়িয়া ৫৪ টীয়ানাকী। ৮। দিয়াই আসিয়াছি। . জননীর দুঃখ দূর করিবার নিমিত্ত ক্ষুদ্র মানব । সুদূর প্রদেশ হইতে এই ভীষণ রাক্ষসের রাজ্যে একাকী আসিয়াছি ; একাকী নিজ-শক্তিবলে রাক্ষসীগণের প্রাণবধের সন্ধান করিয়াছি। তুমি যদি আমার উদ্দেশ্যে বাধা দিতে ইচ্ছা কর—যে হও তুমি-আমি তােমাকে তৃণের ন্যায় উড়াইয়া দিতে চেষ্টা করিব। প্রাণের মমতা প্রাণে বহন করিয়া তােমার সম্মুখীন হই নাই। আমি রাজপুত্র,বীরের ন্যায় প্রাণ দিতে আমরা কাতর নহি।” দৈত্য-তবে তীরে চল, আপন শক্তির পরিচয় দেও। আমি তােমার শত্রু নহি, তবে তুমিও যেমন কর্তব্যে প্রাণ দিতে আসিয়াছ ; আমারও সেইরূপ কৰ্ত্তব্য রহিয়াছে, তাহা প্রাণ দিয়াও পালন করিতেই হইবে। দৈত্য তরবারি লইয়া তীরে উঠিল, শশাঙ্কও নির্ভীক-হৃদয়ে তরবারি হস্তে তীরে ফিরিয়া আসিল। তখন উভয়ে শক্তি পরীক্ষা হইতে লাগিল। ক্রমে উভয়ে ভীষণ সমরে প্রবৃত্ত হইল। দৈত্যের অপরিমিত শক্তির নিকট শশাঙ্কের শক্তি তুচ্ছ হইলেও শশাঙ্ক যে গুরুর নিকট শিক্ষা করিয়াছে তাহার শিক্ষা কৌশলের-গুণেই, এতক্ষণ সমানভাবে চলিয়া আসিয়াছে; কিন্তু আর , না পারিয়া শশাঙ্ক পশ্চাৎপদ হইতে লাগিল; পরমুহূর্তেই দৈত্যের অসিতে তাহার দেহ শিরহীন হইবে। এমন সময়ে কে যেন শশাঙ্কের কর্ণেমৃদু স্বরে জিজ্ঞাসা করিল—“শশাঙ্ক, তােমার আংটীটী কোথায় ?? শশাঙ্কের সৰ্বাবয়বের ভিতর দিয়া যেন সহসা এক বৈদ্যুতিক তেজ চমকিয়া গেল ; শশাঙ্ক দেখিল তাহার দক্ষিণকরে অঙ্গুরীয়কটী তেমনই রহিয়াছে, সম্মুখে চাহিয়া দেখিল দৈত্যের অসি তীব্ৰতেজে তাহার মস্তকের উপর আসিতেছে। শশাঙ্ক তখন বিদ্যুৎবেগে বহুদুর পশ্চাৎপদ হইয়া সহসা দৈত্যের অক্ষির সম্মুখে টীয়ানাকী অঙ্গুরীয়কটা ধারণ করিল। দৈত্য ভীষণ চীৎকার করিয়া বহুদূর গিয়া সংজ্ঞাহীন হইয়। পড়িল; কিন্তু বিপদস্থ শত্রুর অঙ্গে অস্ত্র চালনা করা। ধৰ্ম্মবিরুদ্ধ জ্ঞান করিয়া শশাঙ্ক তাহাকে স্পর্শও করিল না। ক্ষণকাল পরে একটু প্রকৃতিস্থ হইয়া শশাঙ্ক অবির জলে সাঁতার দিল ; এবং রাক্ষসী-কথিত ৬টী চুঙ্গা জল হইতে উঠাইয়া আনিয়া পরীক্ষা করিয়া দেখিল রাক্ষসীর কথামত সবই ঠিক আছে। এখন রাত্রি প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে। শশাঙ্ক অতি দুরে রাক্ষসীদিগের কোলাহল শুনিতে পাইয়া উন্মাদের ন্যায় প্রাপ্ত পদার্থ- গুলি লইয়া পুকুরের মহল ত্যাগ করিয়া যে মহলে বুড়ীর বাড়ী সেই মহলে প্রবেশ করিল; এবং তাড়াতাড়ি ছাদে উঠিয়া-বালির চুঙ্গা ছুঁড়িয়া মারিল; সহসা সব রাক্ষসীর চক্ষু অন্ধ হইয়া গেল। তখন তাহারা সকলই বুঝিতে পারিয়া বুড়ীকে সকলে মিলিয়া গালাগালি দিতে লাগিল, মারিতে দৌড়িল। বুড়ীও নিজের নির্বুদ্ধিতার পরিণাম বুঝিতে পারিয়া কাঁদিতে কঁদিতে ছুটি। অবিলম্বে শশাঙ্ক সূচের চুঙ্গা ও জোঁকের চুঙ্গা ছুঁড়িয়া মারিল এবং রাক্ষসীরা আরও নিকটবর্তী হইলে দড়ির চুঙ্গা হুঁড়িয়া মারিয়া সকলকে বাঁধিয়া ফেলিল। রাক্ষসীর তখনও বুকে পিঠে ভর করিয়া শশাঙ্ককে আক্রমণ করিল। শশাঙ্ক তখন তিত লাউটী খণ্ড খণ্ড করিয়া কাটিয়া ফেলিলে রাক্ষসীদের হাত পা সব কাটিয়া গেল। বুড়ী রাক্ষসী তখন চীৎকার করিয়া বলিল—“রে প্রতাড়ক, রে বিশ্বাসঘাতক, আমি এই জন্যই আদর করিয়া তােকে সব বলিয়াছিলাম, অত যত্ন করিয়া কোলে রাখিয়াছিলাম!!” শশাঙ্ক নির্ভীক- চিতে গভীর ভাবে উত্তর করিল—“আমি বিশ্বাসঘাতকের কাৰ্য করি- আছি বটে, কিন্তু আমার বিশ্বাস, বিশ্বাসঘাতকের হস্ত হইতে বিশ্বাস- ঘাতকতা করিয়া আত্মরক্ষা করায় কোনও পাপ নাই। তােমার ৫৬ টীয়ানাকী। নাকী আমার বাপের রাজ্য ধ্বংস করিয়াছে ওঁ করিতেছে- সাধারণের উপকারের জন্য এই বিশ্বাসঘাতকতায়ও পুণ্য আছে।” এই বলিয়া পরাণ-লাউ বাহির করিয়া খণ্ড খণ্ড করিয়া কার্টিয়া ফেলিবামাত্র এক সঙ্গে বর্জনাদের ন্যায় চীৎকার করিয়া সকল রাক্ষসীরা প্রাণত্যাগ করিল। এইবার শশাঙ্ক বড়ই ক্লান্ত হইয়া পড়িল; এবং অনেকক্ষণ বিশ্রামের পর আবশ্যকীয় দ্রব্য লইয়া সেস্থান পরিত্যাগ করা যুক্তিসঙ্গত বিবেচনা করিল। সহসা তখন তাহার মনে রাজ-কন্যার স্মৃতি জাগিয়া উঠিল। একদিন রাক্ষসীর গ্রাস হইতে এই অঙ্গুরীয়ক আমার প্রাণ বাঁচাইয়া ছিল, আর আজ রাজকন্যার সেই প্রেমবন্ধন-চিহ্নই ভীষণ দৈত্যের হস্তে আমাকে বাচাইল। “আমার সে জীবনদায়িনীকেও আমি সকল রাক্ষসীর সহিত মারিয়া ফেলিয়াছি!” এই অকৃতজ্ঞতার স্মৃতি হৃদয়ে জাগিবামাত্র শশাঙ্কের মাথা ঘুরিয়া গেল ; এত প্রাণভরা ভালবাসার বিনিময়ে এমন নৃশংসভাবে তাহাকে ধ্বংস করিলাম আর দেখা হইবে না! এই চিহ্ন আমার জীবনদায়িনীর স্মৃতি চিরদিন আমার অকৃতজ্ঞ হৃদয়কে দাহন করিবে !! ভাবিতে ভাবিতে শশাঙ্ক হস্ত হইতে অঙ্গুরীয়ক খুলিয়া রাখিতে রাখিতে কঁদিতে কঁদিতে লুপ্তচৈতন্য হইয়া ঢলিয়া পড়িয়া গেল। কেহ দেখিল না--কেহ শুনিল না—কেহ কাছেও আসিল না.। বহুক্ষণ পরে চৈতন্য লাভ করিয়া শশাঙ্ক দেখিল সে একটী সুসজ্জিত মণিমুক্তাশােভিত কক্ষে সুকোমল শয্যায় এক পরমাসুন্দরী রমণীর অঙ্কে মাথা রাখিয়া তাহারই শুশ্রুষায় সুস্থবােধ করিতেছে। মিলন মাত্রই রমণী হাসিল, শশাঙ্ক হাসিবার অবসর না পাইয়া ব্যস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল-দেবি, আপনি কে? আমি কোথায় আছি ?” চারি, চক্ষুর টীয়ানাকী। ৫৭ hannnnnnn রমণী।—ব্যস্ত হবেন না, আপনি নিরাপদে আছেন। একটু কাল চুপ করিয়া থাকুন। রমণীর শুশ্রুষায় প্রায় সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়া শশাঙ্ক জিজ্ঞাসা করিল – “আমি কোথায় আsি ?” রমণী।—আপনার কি বিশ্বাস ? শশাঙ্ক।—শেষটা মনে পড়ে-রাক্ষসীদের ধ্বংস করিয়া আমি ফিরিয়া যাইবার সময়ে আমার জীবনদায়িনী রাজকুমারীকেও ধ্বংস করিয়াছি, এই অকৃজ্ঞতার আঘাতে আমার হৃদয় অবশ হইয়া পড়িয়াছিল-তারপর জাগিয়া দেখিতেছি এই কক্ষে আপনার অঙ্কে মাথা রাখিয়া পড়িয়া আছি। রমণী।-সত্য; আমাকে আপনি কোথায় দেখিয়াছেন কি ? শশাঙ্ক।-স্বপনের মতন মনে আসে যেন কোনও দিন দেখিয়াছি, কিন্তু ঠিক বুঝিতে পারি না। দেবি, আপনি কে ? আপনার কক্ষ- শোভা ও আপনার নিজের রূপ দেখিয়া আমার নানারূপ সন্দেহ হইতেছে। রমণ।—আপনার ভয় নাই, আপনার জীবনদায়িনী কে? তার বিষয়ে আপত্তি না থাকিলে আমাকে বলুন, তার পরে আমি আপন পরিচয় দিব। শশাঙ্ক ভয়ে সন্দেহে সমস্ত বিবরণ বলিতে বলিতে চক্ষের জলে বক্ষ ভাসাইয়া দিয়া বলিল-“দেবি, আমি বড়ই অকৃতজ্ঞতার কাজ করিয়াছি, এ পাপের আমার প্রায়শ্চিত্ত নাই।” রমণী শশাঙ্কের চক্ষের জলে অভিষিক্ত আপন উরু-প্রদেশের বসনখানি ঈষৎ সঞ্চালিত করিয়া মুখ ফিরাইয়া লজ্জায় মৃদু হাসিয়া বলিল -“আপনার সেই আংটীটী যদি আপনি পান তবে কি পুরস্কার দিতে পারেন ?”
৫৮ টীয়ানাকী শশাঙ্ক।-আমি আর কি দিব? আমার ত কিছুই নাই। কিন্তু আমি এখন আংটাটীর জন্য তেমন ব্যস্ত নই ; যিনি আমাকে আংটীটী দিয়াছিলেন তাঁহাকে পাইলে আমি তাহারই রক্ষিত এ প্রাণ তাহাকে দান করিয়া ঋণ পরিশােধ করি। রমণী। আর আপনি যে কাজের জন্য আসিয়াছিলেন তাহার কি হইবে? সহসা যেন শশাঙ্কের স্বপ্ন ভঙ্গ হইল—তীব্র বেগে উঠিয়া শশাঙ্ক “সকল হারাইয়াছি” বলিয়া চীৎকার করিয়া মুচ্ছিত হইয়া পড়িল। রমণী বহু যত্নে আবার তাহার মূচ্ছ। ভাঙ্গিলেন ;-শশাঙ্ক আবার চমকিয়া উঠিয়া পাগলের ন্যায় বলিল—“সকলই গিয়াছে।” রমণী আপন বক্ষে সযতনে তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিল-“ভয় নাই, তােমার সকলই আছে। আমিই তোমার সেই ধন, যাহাকে পাইলে তুমি প্রাণদান করিয়া ঋণ পরিশােধ করিতে।” শশাঙ্কের যেন একটা ভ্রান্তির মােহ কাটিয়া গেল। সে দিব্যচক্ষে ধীরে ধীরে দেখিয়া ধীরে ধীরে চিনিতে পারিল-“সেই মুখখানি।” তখন বিস্ময়-বিল-কণ্ঠে ভীত অস্পষ্ট স্বরে বলিয়া উঠিল—“তাই তাে! তুমি মর নাই ?” রাজকুমারী।--কেন, আমার মরণটা কি তােমার প্রার্থিত ছিল রাজকুমার ? শশাঙ্ক।-না রাজকন্যা, আমি তা বলি নাই। তুমি মরিয়াছ সন্দেহে অধীর হইয়া সর্বস্বহারা জ্ঞানে অজ্ঞান হইয়া পড়িয়াছিলাম। কি জানি কি মােহিনী-শক্তিবলে তুমি আবার আমাকে সেই পুরাতন মিলন-কক্ষে টানিয়া আনিয়াছ -তাই ভাবিয়া আমার বিস্ময় জন্মিতেছে। রাজকুমারী।-আমি মরিয়াছি এ সন্দেহ তােমার হয় কেন? * টীয়ানাকী শশাঙ্ক।—যে সন্ধানে সকল রাক্ষসী একসঙ্গে মরে তুমি যে তাহার অতীত সেরূপ বিশ্বাস আমার মনে আসে নাই। রাজকুমারী। আমি যদি রাক্ষসী না হই ? শশাঙ্ক। না হইতে পার, তাই হয়ত তুমি জীবিত আছ ; অথবা তােমার এমন কোনও বিশেষ শক্তি আছে যাহার দ্বারা তুমি ঐরূপ মৃত্যু হইতে আহােদ্ধার করিতে সমর্থ ; তাই তুমি স্বর্ণ-পুরীর রাজকন্যা। রাজকুমারী। রাজকুমার, তুমি সব ভুল করিতেছ। আমি রাক্ষসী নহি। আমার পিতামহ এই স্বর্ণ-পুরের রাজা ছিলেন। রাক্ষসীর তাহাকে ধ্বংস করিয়া এই রাজ্য দখল করে। আমার পিতার বয়স তখন ১০ বৎসর আমার মাতার বয়স ৮ বৎসর। রাক্ষসীরা এই দুইজন ব্যতীত সকলকেই মারিয়া ফেলে। তারপর আমার পিতাকে রাজা, করিয়া প্রতিপালন করিতে থাকে। আমার ৮৯ বৎসর বয়সে আমার পিতা-মাতার মৃত্যু হয়। পিতা আমাকে সেই বয়সেই তাহার সাধ্যমত শিক্ষাদান করেন ও জীবন মরণের আবশ্যকীয় দ্রব্যগুলির সহিত পরিচিত করিয়া দিয়া এই অতুল-ঐশ্বৰ্য্য দান করিয়া প্রাণত্যাগ করেন। মা সহমরণ গমন করেন। তারপর রাক্ষসীরা আমাকে রাণী করিয়া নানা শাস্ত, নানা বিদ্যা শিক্ষা দেয়। সেই অবস্থা হইতে আমি এই অবস্থায় উপনীত হইয়াছি। শশাঙ্ক অনিমেষ-নয়নে রাজকুমারীর মুখের পানে চাহিয়া চাহিয়া অপ্রত্যাশিত-সুখে অত্মসমর্পণ করিয়া ফেলিল। দুই তিন দিন পরে শশাঙ্ক বিদায় প্রার্থনা করিল। রাজকুমারীও তাহার সঙ্গে যাইবার নিমিত্ত প্রস্তুত হইলে শশাঙ্ক চিন্তা করিয়া বলিল— “গুরুর অনুমতি ব্যতীত তােমাকে সঙ্গে লইয়া যাইতে পারি না।”রাজ- কুমারী অপূর্ণ-লােচনে শশাঙ্ককে একখানি সুবৃহৎ আয়নার সম্মুখে লইয়া গিয়া তাহাকে একখানি বস্ত্রাবৃত বৃহৎ তৈচিত্র বিদায়-উপহার- টীয়ানাকী। স্বরূপ প্রদান করিয়া কহিল আমার সহিত আর তােমার দেখা হইবে কি না জানি না, কারণ এই জনহীন প্রদেশে আমি একাকিনী থাকিতে পারিব না ও থাকিব না। তুমি কর্তব্যে বাধা জন্মিবার ভয়ে আমাকে প্রত্যাহার করিয়া প্রাণে মারিয়া ফেলিয়া যাইতে ইচ্ছা করিয়াছ—যাও; আর আমি তাহাতে কোনও আপত্তি করিব না। কিন্তু রাজপুত্র, তুমি দুইবার ঠেকিয়া শিখিয়াছ,আবারও তোমাকে ঠেকিয়া বুঝিতে হইবে, আমিই তােমার কর্তব্যসাধনে জীবন রক্ষণের মূল। আমি চলিলাম । যদি কোনও অপরাধ করিয়া থাকি, ক্ষমা করিবে। বিদায় কালে আমার এই শেষ উপহার তােমাকে প্রদান করিয়া চলিলাম ; শেষ অনুরােধ, ইহাকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করিও। তােমার আবশ্যকীয় সমস্ত জিনিষ আমি সাজাইয়া রাখিয়াছি। আমি চলিলাম। বলিতে বলিতে রাজ- কুমারী প্রস্থান করিল। শশাঙ্ক কিছুক্ষণ জ্ঞানহীনের ন্যায় নিস্তব্ধ দাড়াইয়া থাকিয়া ধীরে ধীরে প্রকৃতিস্থ হইয়া আয়নায় নিজের অবয়ব দর্শন করিতে করিতে রাজকুমারী-প্রদত্ত ছবিখানির আবরণ উন্মােচিত করিয়া অপূৰ্ব চিত্র-বৈচিত্ৰ সন্দর্শনে বিমুগ্ধ হইয়া পড়িয়া যখন স্থির করিতে সমর্থ হইল যে আয়নার অভ্যন্তরের মূর্তি ও ঐ ছবি সম্পূর্ণ এক, অধিকন্তু হস্তস্থিত ছবির পদপার্শ্বে রাজকুমারী তৃষিত-নয়নে মুর্তির বদন পানে একদৃষ্টে চাহিয়া রহিয়া তাহারই ধ্যানে নিমগ্ন। রহিয়াছে, তখন শশাঙ্কের হৃদয় উদ্বেলিত হইয়া নয়ন ভরিয়া বক্ষবাহিয়া প্রবাহিত হইতে লাগিল। শশাঙ্ক ছবি খানি বক্ষে ধারণ করিয়া বিগলিত কণ্ঠে চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল—“রাজকুমারী, এস আমরা একসঙ্গে স্বর্ণপূর পরিত্যাগ করি।” সে চীৎকারের প্রতিঘাতে শশাঙ্ক মূৰ্ছিত হইয়া পড়িল; কিন্তু কেহই তাহার সান্ত্বনা করিতে তথায় উপস্থিত হইল না। সময়ে শশাঙ্ক চেতনা পাইল; এবং কর্তব্যের সাধন-মন্ত্রে হৃদয়ের টীয়ানাকী। দুর্বলতাকে আবদ্ধ করিয়া ধীরে ধীরে রাজকুমারীর কোমল-করে সুসজ্জিত ও প্রদত্ত রত্নাদি দ্রব্যজাত সঙ্গে করিয়া সুবর্ণপূর পরিত্যাগ করতঃ স্বদেশাভিমুখে যাত্রা করিল। শশাঙ্ক পরীক্ষা করিয়া দেখিল সকলই তাহার আছে; রাজকুমারী আংটীটী তাহার হাতে পরাইয়া দিয়া গিয়াছে; কিন্তু, সর্বাপেক্ষা প্রয়ােজনীয় জিনিষ সেই টীয়াপাখীটী —যাহার অভ্যন্তরে টীয়ানাকীর প্রাণ নিহিত আছে—সেটী নাই। সেটা কি রাজকুমারী লইয়া গেল অথবা উড়িয়া গেল শশাঙ্ক বহু চিন্তা ও অনুতাপেও তাহার কোনও সিদ্ধান্তে উপস্থিত হইতে না পারিয়া বহুক্ষণ মাথায় হাত দিয়া নিস্তব্ধ রহিয়া অবশেষে অনন্যোপায় হইয়া অন্য সঙ্কল লইয়া সময়ে সন্ন্যাসী-ঠাকুরের নিকট উপস্থিত হইল। সন্ন্যাসী ঠাকুর শশাঙ্কের ক্ষমতার বহু প্রশংসা করতঃ আশীৰ্বাদ করিয়া বিদায় দিলেন। টীয়াপাখীটীর কথা বলিলেন-“তােমার চিন্তা নাই। প্রয়ােজনের সময়ে উহা তুমি পাইবে। শশাঙ্ক শুনিয়া কিছু আশ্বস্ত হইল, এবং একখানি নৌকা সাজাইয়া সকল লইয়া সন্ন্যাসী ঠাকুরের আশীর্বাদ মস্তকে ধারণ করতঃ স্বদেশ যাত্রা করিল। অসীম সমুদ্র-নদীর বক্ষ ভেদ করিয়া বহুদিন পরে শশাঙ্কের নৌকা অচিন্ত্যপুর রাজ্যপ্রান্তে--যেখানে তাহার দুঃখিনী জননীর আশ্রম প্রস্তুত হইয়াছে—তাহার নিকটে লাগিল। সময়ে শশাঙ্ক সকল গইয়া মায়ের কুটীরে আগমন করতঃ ডাকিল—“মা।” তাহার অন্ধ জননীরা তাহার শােকে আরও কাতর হইয়া পড়িয়াছিলেন। শশাঙ্ক তাহাদিগকে প্রণিপাত করিব মাত্র উভয়ে কাড়াকাড়ি করিয়া শশাঙ্ককে কোলে ইয়া বলিলেন—“বাবা, তাের ভাবনায় আমরা যে আহার নি। ত্যাগ করিয়া বসিয়া আছি বাপধন!” শশাঙ্ক প্রথমে চক্ষু চারিটা বাহির করিয়া জননীদ্বয়ের চক্ষে বসাইয়া টীয়ানাকী। অমৃত-কুণ্ডের জল দিয়া ধুইয়া দিতেই শশাঙ্কের জননীরা আবার স্বাভাবিক চক্ষু প্রাপ্ত হইলেন। প্রথমে পুত্রকে দেখিয়া তাহাদের আর আনন্দের সীমা রহিল না। শশাঙ্ক একটু বিশ্রাম করিয়া জননীদ্বয়কে সমস্ত বৃত্তান্ত বলিতে লাগিল। তাহারা উপকথার মত শুনিতে শুনিতে স্তম্ভিত হইয়া বলিলেন—“বাছা, তাের মতন পুত্র না জানি কত তপস্যর ফলে পাইয়াছি। ভগবান তােকে চিরজীবী করুন।” শশাঙ্ক অতঃপর গুরুদেবের আশ্রমে গেল ; গুরুদেব সমস্ত শুনিয়া আনন্দ-আবেগে শিষ্যকে আলিঙ্গন করতঃ পিতৃরাজ্যে গমনের অনুমতি প্রদান করিয়া কহিলেন—“আমার বিনা অনুমতিতে রাজকুমারীকে গ্রহণ না করিয়া তুমি গুরু-ভক্তির পরিচয় দিয়াছ বটে; কি অকৃতজ্ঞতার ফল তােমাকে স্পর্শ করিবে। চিন্তা করিও না শশাঙ্ক, আমি দিব্যচক্ষে দেখিতেছি প্রকৃত প্রয়ােজনের সময়ে তুমি তাহাকে পাইবে। সাৱধান,রাজকুমারীর কথা কাহারও নিকট ব্যক্ত করিও না। “গুরুবাক্য যেন মিথ্যা না হয়” বলিয়া শশাঙ্ক দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক ঐ গুরুর পদধূলি অঙ্গে বিলেপন করতঃ বিদায় গ্রহণ করিল। এদিকে রাজার রাজ্যের অবস্থা কিন্তু অতি শােচনীয়। বহু লােক রাক্ষসীর অত্যাচারে বিনষ্ট হইয়াছে, অধিকাংশ ভয়ে রাজ্য ছাড়িয়া পলায়ন করিয়াছে। রাজ্যের যে দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা যাউক না কেন—যেন অলক্ষ্মী রাক্ষসী সৰ্বস্ব প্ৰাস করিতে লালজিহ্বা প্রসারিত করিয়া সতত অট্টহাসি হাসিতেছে! শশাঙ্ক সেই শ্মশানসম পিতৃরাজ্যে দীনবেশে ধীরে ধীরে প্রবেশ করিল, এবং সময়ে রাজসমীপে উপস্থিত হইয়া তাহাকে যুথােচিত অভিবাদন করতঃ বলিল—“মহারাজ, আমি আপনার আদেশ প্রতিপালন করিয়া আসিয়াছি।” রাজা আশীর্বাদ করিয়া তাহাকে লইয়া রাণীর কক্ষে গেলেন। ব্রণী শশাঙ্ককে ফিরিয়া • টীয়ানাকী ~~~~ ~~~~~~~~ আসিতে দেখিয়া ক্রোধে অধীর হইলেও তাহা অব্যক্ত রাখিয়া ঔষধ গ্রহণ করিলেন; এবং ক্রমে রাজ্যে প্রচারিত হইল রাণী সুস্থ হইয়া- ছেন। শশাঙ্ক রাণীর নিকট হইতে প্রত্যাগমন করতঃ বিদায় প্রার্থনা করিলে রাজা অত্যন্ত আদরের সহিত তাহাকে বক্ষে ধারণ করতঃ বলিলেন—“বৎস, আমার কোনও সন্তান নাই, তুমিই আমার সন্তানের কাৰ্য্য করিতেছ। জানি না আমার মৃত্যুর পর এ রাজ্যের পরিণাম কি হইবে। আমার দিন ফুরাইয়া আসিতেছে, আমার রাজ্যের অবস্থাও ক্রমেই শােচনীয় হইয়া পড়িতেছে। তােমার অনুপস্থিতিকালে রাজ্যের কি দশা হইয়াছে তুমি নিজেই বুঝিতে পারিবে। তুমি ভিন্ন অপর কেহ এ রাজ্য রক্ষা করিতে পারিবে না। আমি তােমার এই অমা- ষিক কাৰ্য সাধনের পুরস্কার স্বরূপ তােমাকে অর্ধরাজ্য দান করিব। আমি সত্বর দরবারে ইহার বন্দোবস্ত করিয়া এ সংবাদ রাজ্যে ঘােষণা করিয়া দিব। রাজার চক্ষু হইতে অবিরল-ধারে সলিল প্রবাহিত হইতে লাগিল। যেদিন হইতে তিনি শশাঙ্ককে দেখিয়াছেন, সেই দিন হইতে তাহার প্রতি তাহার এক স্বাভাবিক স্নেহ জন্মিয়াছে। যেদিন হইতে রাজা রজনীতে স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন সেই দিন হইতেই রাজার মনে বিষময় অনুতাপ প্রবেশ করিয়াছে; কিন্তু নিজকৰ্ম্মফলে বাধ্য হইয়া তাহাকে তাহা গােপন রাখিয়া জীবন-যাপন করিতে হইতেছে। শশাঙ্ক এক দৃষ্টে রাজার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল ; রাজার অবস্থা দর্শনে তাহার চক্ষু হইতে প্রবল বেগে অশ্রু বিনির্গত হইতে লাগিল। শশাঙ্ক তদবস্থায় রাজার পদদ্বয় ধারণ করতঃ তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। শশাঙ্কের প্রাণ তাহাকে বলিতে লাগিল। পিতা ধৰ্ম্মঃ পিতা স্বর্গঃ পিতাহি পরমং তপঃ। পিতরি প্রতিমাপনে প্ৰীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ । ;
টীয়ানাকী শশাঙ্ক, এই তােমার মরজগতের আরাধ্য পিতৃদেবতা।” শশাঙ্ক সহসা শিহরিয়া উঠিয়া আত্মসংবরণ করতঃ রাজাকে বলিল—“মহারাজ, আমি ভিখারিণীর সন্তান, ভিক্ষাই আমার উপযুক্ত সম্পদ ;-আমি রাজ্য চাই না। তবে যদি একান্তই আপনি আপনার বাসনা চরিতার্থ করিতে চান, তাহা হইলে অর্ধরাজ্য আমার নামে ও অর্ধরাজ্য আপ- নার নামে আপনি নিজেই ভােগদখল করিতে থাকুন।” রাজা।-তােমর নামে রাজ্যপালন করিতে পারি তাহাতে আমার কোনও আপত্তি নাই; কিন্তু আমি পরস্থ গ্রহণ করিতে পারি না। তােমার অর্ধরাজ্যের আয় তােমার—তাহা আমি তােমাকে দান করিব, তােমার যেরূপে ইচ্ছা তাহা ব্যয় করিও; অথবা তােমার ইচ্ছানুসারে আমিও তাহার ব্যবহারের বন্দোবস্ত করিতে পারিব। শশাঙ্ক।-মহারাজ, আমি পূৰ্বেই বলিয়াছি আমি বননিবাসিনীর সন্তান, রাজ্যে আমার প্রয়ােজন নাই। তবে যদি একান্তই আপনি দত্তধনে হস্তক্ষেপ করিতে ইচ্ছা না করেন তবে আমার অর্ধরাজ্যের আয় রাজ্যবাসী দরিদ্র প্রজাদের দুঃখ দূর করিবার নিমিত্ত, রাজ্যে শিক্ষা ও ধর্ম বিস্তারের নিমিত্ত ও দেবসেবায় ব্যয় করিতে পারেন। রাজা।আর তােমার নিজের নিমিত্ত ? শশাঙ্ক।-কায়িক পরিশ্রম ও ভিক্ষা । রাজা।-বৎস, তােমার এই আশ্চর্য্য আত্মত্যাগ ও উদার-ব্ৰত দর্শনে আমি বড়ই আনন্দ বােধ করিতেছি। এই বয়সে তুমি এত শিক্ষা এত শক্তি এত বুদ্ধি কোথায় অর্জন করিলে ? নিশ্চয়ই তুমি কোনও সম্মানিত ও উচ্চশিক্ষিত বীৰ্যে জন্মগ্রহণ করিয়াছ। তুমি বলিয়াছিলে তােমার মা আছেন। তুমি তাহাকে এই রাজপুরে লইয়া টীয়ানাকী। আইস; তিনিই তােমার অভিভাবিকা স্বরূপ তােতমার প্রার্থিতরূপে তােমার অর্ধরাজ্যের ব্যবহার করিতে পারিবেন। শশাঙ্ক।--মহারাজ, আমি জানি আমার মা বড় দুঃখিনী-বড় দুঃখে আছেন। আমি অবশ্য আপনার অনুমতি মত তাহাকে রাজপুরে আনিতে পারি। কিন্তু মহারাজ, কয়েক বৎসর আপনার অধীনে কাৰ্য্য করিয়া আমার প্রজাদের উপর বড়ই আকর্ষণ জন্মিয়াছে। আর এবারে আসিয়া শুনিলাম দেশ উৎসন্ন যাইবার পথে চলিয়াছে ; অত্যাচারে অবিচারে রাক্ষসের ভয়ে দেশের অধিকাংশ লােক দেশ ছাড়িয়া পলায়ন করিয়াছে। এক দিকে দেশমাতার এই দারুণ কলঙ্ক, অন্যদিকে আমার গর্ভধারিণীর বননিবাস-দুঃখ - এতদুভয়ের তুলনা করিলে দেশের দিকেই প্রাণ ক্ষিপ্রতর বেগে আকৃষ্ট হয়। মা এক পুত্রের মা-রাজা লক্ষ লক্ষ প্রজার পিতা। মা এক সন্তানের জন্য বিব্রত,-রাজার লক্ষ লক্ষ সন্তানের নিমিত্ত সমপ্রেমে অপত্য স্নেহ ঢালিয়া দিতে হয়। মাতৃহীন সন্তানের অপেক্ষা পিতৃহীন অরাজক রাজ্যের হাহাকার কত অধিক যন্ত্রণাপ্রদ তাহা চিন্তা করিলে আপনি নিজেই বুঝিতে পারিবেন। রাজা নিৰ্বাক-নিস্তব্ধ প্রস্তর মূর্তির ন্যায় দাড়াইয়া রহিয়া বালকের ক্ষুদ্র অবয়বে এক অপার্থিব দেবভাব দর্শন করিতে করিতে বিমুগ্ধ হইয়া রহিলেন। শশাঙ্ক রাজার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করতঃ চলিয়া গেল। রাজা স্থির করিলেন,-শশাঙ্ককে অর্ধরাজ্য দান করিবেন। যতদিন তিনি জীবিত থাকিবেন, ততদিন তিনিই শশাঙ্কের নামে তাহা শাসন করিবেন। তাঁহার মৃত্যুর পর শশাঙ্ক স্বাধীনভাবে উহা শাসন করিবে। এ প্রতিজ্ঞা-বাণী রাণীর কর্ণে পৌছিল; এ প্রতিজ্ঞা রাজ্যে টীয়ানাকী। প্রচারিত হইল। শশাঙ্ক এবারে পাহারাওয়ালার কাৰ্য্য হইতে প্রমােশন পাইয়া পরিদর্শকের পদে উন্নীত হইল। রাণী বুঝিল—আর তাহার নিশ্চিন্ত রহিবার সময় নাই; এখন যে কোনও প্রকারেই হউক, শশাঙ্ককে প্রাণে মারিতে বা রাজ্য হইতে দূর করিবার চেষ্টা করিতে হইবে। বড় শক্ত কাজ, কাজেই বড় শক্ত পথ অবলম্বন করিতে হইবে। রাত্রি তখন এক প্রহর, রাজা স্থানান্তরে গিয়াছেন, রাণী অন্তঃপুরের একটী বিলাস বহুবিধ বিলাস-আসবে সজ্জিত করিয়া আপন সহচরীর সহিত, অনেকক্ষণ পরামর্শ করিবার পর, তাহাকে শশাঙ্কের নিকট পাঠাইয়া দিলেন। শশাঙ্ক বাহিরে যাইতে উদ্যত হইয়াছে এমন সময়ে রাণীর পরিচারিকা আসিয়া সংবাদ দিল—“রাণী-মা বিশেষ প্রয়ােজনে এখনই আপনাকে ডাকিয়াছেন, রাজার সম্বন্ধে কোনও অশুভ সংবাদ আসিয়াছে।” শশাঙ্ক একটু চিন্তা করিয়া বলিল—“তুমি যাও, আমি যাচ্ছি।” শশাঙ্ক আপন অশ্বে আরােহণ করিয়া অন্তঃপুর প্রান্তে তাহাকে বন্ধন করতঃ ব্যস্তচিত্তে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিবার সময়েই দ্বারদেশে রাণীকে দেখিতে পাইল। রাণী পরম আদরে শশাঙ্কের হাত ধরিয়া বলিলেন-“এস শশাঙ্ক, বিশেষ প্রয়ােজনে তােমায় ডাকিয়াছি।” শশাঙ্ক জিজ্ঞাসা করিল-“মহারাজের সংবাদ কি ?” রাণী বলিলেন- -“আমার সঙ্গে এস, সব জাতে পাবে।” শশাঙ্ক রাণীর এই আকস্মিক আদরে সন্দিগ্ধ ও চঞ্চল হইয়া উঠিল সত্য বটে; তথাপি কাৰ্যকারণে তাঁহার অনুসরণ করিতে বাধ্য হইল। রাণী শশাঙ্ককে সঙ্গে করিয়। সেই সজ্জিত কক্ষে প্রবেশ করিবামাত্র তাহার চিত্তচাঞ্চল্য উপস্থিত হইল। সে বিস্মিত চিত্তে ইতস্ততঃ দৃষ্টিনিক্ষেপ করিতেছে, ইত্যবসরে রাণী ধীরে ধীরে কক্ষ হইতে টীয়ানাকী। ৬৭ নিষ্ক্রান্ত হইয়া দরজায় তালা বন্ধ করিয়া দিয়া সরিয়া পড়িল। শশাঙ্ক ফিরিয়া দেখিল-রাণী নাই, অথচ দরজা বন্ধ। তখন তাহার মনে নানাপ্রকার সন্দেহ হইতে লাগিল। সে প্রথমে গৃহের অভ্যন্তরস্থ প্রতি পদার্থ তন্ন তন্ন করিয়া দেখিতেছে, এমন সময়ে সহসা পালকে দৃষ্টি পড়িবামাত্র দেখিতে পাইল -একটী পরমাসুন্দরী সুসজ্জিতা রূপসী, পালঙ্কে শয়ন করিয়া নিদ্রা যাইতেছে। কৌতুহল বশতঃ শশাঙ্ক পালঙ্কে উপবেশন করতঃ তাহার ললাট স্পর্শ করিবামাত্র রমণী চমকিয়া উঠিয়া চক্ষু মেলিয়া শশাঙ্ককে দর্শন করিয়া ব্যস্ত চিত্তে জিজ্ঞাসা করিল-“তুমি কে? কি নিমিত্ত এখানে আসিয়াছ ? আমাকে এখানে কে আনিল ?” শশাঙ্ক চমকিত হইয়া ইহার একটী প্রশ্নেরও উত্তর না দিয়া ধীরে ধীরে পালঙ্ক হইতে উঠিয়া দাঁড়াইল। রমণী এবার তীব্ৰস্বরে বলিয়া উঠিল-“আমার প্রশ্নের উত্তর দেও, নতুবা তােমার বিপদ হইবে।” শশাঙ্ক ভয়ে দুঃখে অপমানে সহসা রমণীর পদযুগল ধারণ করিয়া অতি বিনীতকষ্ঠে বলিল-“মা, আমার প্রতি রাগ না করিয়া শান্ত হইয়া যেরূপ চক্রান্তে পড়িয়া আমি এখানে আসিয়াছি, তাহা শ্রবণ করুন। আমি বড় বিপদে পড়িয়াছি, আপনি আমার সাহায্য করুন।” রমণী শান্ত ও আশ্বস্ত হইয়া স্থিরচিত্তে শশাঙ্কের নিকট তাহার পরিচয় ও কিরূপে সে তথায় আসিয়াছে, তাহা শুনিয়া ধীরে ধীরে শয্যা ত্যাগ করিয়া দরজার কাছে গিয়া চীৎকার করিয়া সুরমাকে ডাকিতে লাগিল। সে ডাক বহুক্ষণ পরে সুরমার কাণে গেলে সুরমা দৌড়িয়া আসিতে আসিতে সহসা তাহার চরণ থামিয়া গেল। সুরমা রমণীর সহচরী। এ দিকে রাণী দরজা বন্ধ করিয়া আপন শয়ন মন্দিরে শয়ন করিয়া * L টীয়ানাকী। muriruuruur. আছেন, এমন সময়ে পরিচারিকার সহিত রাজা সেই কক্ষে প্রবেশ করিয়া তাহাকে আহ্বান করিবামাত্র রাণী উঠিয়া বসিলে রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন—“কি বিপদ উপস্থিত, যাহার জন্য তুমি অসময়ে লােক পাঠাইয়া আমাকে আনাইয়াছ ?” রাণী কোনও উত্তর না দিয়া গম্ভীর ভাবে শয্যা ত্যাগ করিয়া দরজার কাছে গিয়া বলিলেন-“এস, কি বিপদ দেখিতে পাইবে।” রাজা, রাণীর অনুসরণ করিলেন। রাণী, যে কক্ষে শশাঙ্ক আবদ্ধ আছে, সেই কক্ষের নিকটে গিয়া পরিচারিকার হস্তে চাবি দিয়া ফিরিয়া যাইতে উদ্যত হইলে, রাজা তাহার অঞ্চল ধরিয়া বলিলেন—“থাম।” রাণী ভ্রুক্ষেপ না করিয়া চলিয়া গেলেন। পরিচারিকা কক্ষের অভ্যন্তর হইতে “সুরমা” “সুরমা” বলিয়া চীৎকার শুনিতে শুনিতে তালা খুলিয়া দিয়া রাণীর অনুমতি অনুসারে সেস্থান হইতে চলিয়া আসিল। রাজা দেবমনােহর সুসজ্জিত কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিবামাত্র চমকিত চিতে প্রথমে মনােরমাকে দেখিতে পাইয়া উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন—“মনােরমা, তুমি এখানে কেন ? আর এ কক্ষ এমন যােগীমনমােহন রূপে কেন কে সজ্জিত করিয়াছে ?” মনােরমার ঘর্মাক্ত সৰ্বাবয়ব তখন কম্পিত হইতে ছিল, নয়নের জল অঞ্চলে মুছিতে মুছিতে সে ছুটিয়া গিয়া রাজার পদযুগল ধারণ করতঃ “দাদা” বলিয়া মূর্হিত হইয়া পড়িল। রাজা অনতিদুরে শশাঙ্ককে দেখিতে পাইয়া সন্দিগ্ধ ক্রোধের স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন--“শশাঙ্ক, এ সব কি ? তুমি এখানে কেন ?” শশাঙ্ক।-মহারাজ, রাগ করিবেন না; আমি নিরপরাধী। পূর্বে আপনি ইহাকে ( মনােরমাকে সুস্থ করিবার ব্যবস্থা করুন। ঘঁহারই নিকট সকল সত্য অবগত হইতে পারিবেন। ইত্যবসরে রাণী তথায় উপস্থিত হইয়া বলিলেন-“মহারাজ, আপ- '?
টীয়ানাকী। www নার শশাঙ্কের গুণপণ দেখিলেন ত ? এখন যা আপনার উচিত বােধ হয়, করিতে পারেন।” রাজা।—এ কক্ষ এমন সুসজ্জিত কে করিয়াছে ? রাণী।-সে কথা আপনার গুণবতী ভগ্নীটীকে জিজ্ঞাসা করিবেন। আমি নিজে যাহা দেখিয়াছি, আপনাকে দেখাইবার জন্য সংবাদ দিয়া- ছিলাম; এখন যাহা আপনার কর্তব্য হয় করিবেন। রাজ-অন্তঃপুর যদি বেশ্যালয়ে পরিণত করিতে হয় করুন ; কিন্তু আমি ইহার সংস্পর্শে থাকিতে পারিব না। আমার জন্য অন্য ব্যবস্থা করিতে হইবে। রাজা। শশাঙ্ক, শুনিলে ত ? আমি তােমাকে বড় ভালবাসি, তােমারবুদ্ধি, শক্তি ও কৌশলে রাণী এখনও জীবিত আছে—রাজ্যের অশান্তি ক্রমে বিদূরিত হইতেছে, এ নিমিত্ত আমি তােমাকে অর্ধরাজ্য দান করিয়াছি। এ রাজ্যের অর্ধেক এখন তােমার। তাই এতক্ষণ এ দৃশ্যের মধ্যেও তুমি জীবিত আছি ; অন্যলােক হইলে এইদণ্ডে আমি তাহার প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা করিতাম। তুমি অতি হেয় অবস্থা হইতে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হইয়াছ; কিন্তু তােমার কি স্পর্ধা! আমার অন্তঃপুরে, আমার ভগ্নীর সহিত-- শশাঙ্ক।আর বলিতে হইবে না, মহারাজ। আমাকে আজ বিদায় দিন। আপনি আমার পিতা; আপনার ভগ্নী আমার পিসি- মা ; একথা সর্বদা মনে রাখিয়া কথা বলিবেন। আমি এমন মায়ের গর্ভে জন্মিনাই যে, এহেন ঘৃণিত কাৰ্য্য করিতে প্রবৃত্তি হইবে। অন্তঃ- করণ ততটা দুর্বল হইলে বােধ হয়, আপনার রাণীর রােগের ঔষধ আনয়ন করা আমার পক্ষে সম্ভবপর হইত না। আমি এ বিষয়ে কিছুই বলিতে চাই না। আপনার ভগ্নীকে সুস্থ করুন, তিনিই সত্যকথা বলিবেন।
৭ টীয়ানাকী । sy, . রাণী।—তিনি সত্য বলিবেন বৈকি ? তিনি সাধু ও নিরপেক্ষ কিনা তাই তিনি সত্য বলিবেন !! রাজা।-শশাঙ্ক, অামি তােমাকে আজ যাইতে দিতে পারিব না। দরবারে যতক্ষণে ইহার বিচার না হইবে, ততক্ষণে তােমাকে রাজের অন্যান্য অপরাধীর ন্যায় বন্দী থাকিতে হইবে। অপরাধ ; প্রমাণ হইলে এ অপরাধে আমি প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা করিতেও ইতস্ততঃ করিব না। শশাঙ্ক।—যদি ভাল বােঝেন, তাহাই করুন। অদৃষ্টে মরণ থাকিলে মরিব, তাহাতে দুঃখ কি ? এমন সময়ে মনােরমা সহসা চৈতন্য লাভ করিয়া বলিয়া উঠিল— “দাদা।” রাজা এক পদাঘাতে তাহাকে দূরে নিক্ষেপ করিয়া শশাঙ্ককে কহিলেন – “শশাঙ্ক, কক্ষ হইতে বাহির হও।” শশাঙ্ক কক্ষ হইতে বাহির হইলে রাজা তাহাকে কক্ষান্তরে বন্দী করিলেন এবং মনাে- রমাকে সেই কক্ষেই তালা বন্ধ করিয়া তদবস্থায় ফেলিয়া রাখিয়া রাণীর সহিত স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। সেই রাত্রে যে কোনও উপায়েই হউক, মােহিনী-রাণী রাজাকে বাধ্য করিয়া প্রতিজ্ঞা করাইলেন যে, পরদিন বিচারে শশাঙ্কের প্রাণদণ্ডের আদেশ হইবে। বৃদ্ধ স্ত্রৈণ রাজা রমণীর কুহকে কর্তব্য- জ্ঞানশূন্য না হইলে রাজ্যের এরূপ পরিণাম হইবে কেন? আজ রাজসভায় শশাঙ্কের ও মনােরমার বিচার হইবে। রাজ্যেশ্বরী তাহাদের বিরুদ্ধে বাদিনী। পর্দার অন্তরালে রাণী “উপবিষ্টা। পর্দার অন্তরালে অন্যত্র মনােরমা আছে। সভার মধ্যস্থলে প্রহরী পরিবেষ্টিত শশাঙ্ক দাড়াইয়া আছে । রাজা প্রথমে পারিষদ- বর্গকে শশাঙ্কের অপরাধ বুঝাইয়া দিয়া রাণীর কি বলিবার আছে টীয়ানাকী । ৭১ # 1 # জিজ্ঞাসা করিলেন। রাণী যবনিকান্তরাল হইতে মােহন স্বরে বলিতে লাগিলেন—এই শশাঙ্ককে রাজা ভালবাসেন বলিয়া এবং এই বালক আমার জীবন রক্ষা করিয়াছে বলিয়া ইহাকে সকলেই আমরা ভাল- বাসিতাম ও আদর করিতাম । শশাঙ্ক অন্তঃপুরে প্রায়ই যাতায়াত করিত। অনেক দিন হইতে মনােরমার সহিত শশাঙ্কের নির্জনে বিশ্রাম ও আমােদ-প্রমােদ লক্ষ্য করিয়াছি। তার পর গত কল্য : মহারাজ দূরে গিয়াছেন এই অবসরে ইহারা এক কক্ষ সুসজ্জিত করিয়া প্রকাশ্যভাবে আমােদ-প্রমােদে রত হইবার বন্দোবস্ত করে। আমার আর সহ্য না হওয়ায় আমি রাজাকে আনিবার জন্য লােক পাঠাই। তারপর মহারাজ আসিয়া যাহা দেখিয়াছেন, তাহা তিনি বলিয়াছেন।” রাজা।-মনােরমার এ বিষয়ে কিছু বলিবার আছে ? মনােরমা।দাদা, রাজা।--আমাকে “দাদা” বলিয়া সম্বােধন করিবার দরকার নাই। তাের যদি কিছু বলিবার থাকে বলু। মনােরমা। সন্ধ্যার পরে রাণী আমাকে একটী সুসজ্জিত কক্ষে লইয়া যান। আমি জিজ্ঞাসা করি “আজ, ব্যাপার কি ?” রাণী উত্তরে বলেন—“আমার একটী ব্রত আছে,তাই তােমাকে ডাকিয়াছি, দিদি।” তারপর আমরা একখানি পালঙ্কে বসি। পরে কি হইয়াছিল আমি তার কিছুই জানি না। সর্বশেষে হঠাৎ নিদ্রাভঙ্গে জাগিয়া শশাঙ্ককে আমার সম্মুখে দেখিতে পাই। আমি পূর্বে অন্তঃপুরে বা বাহিরে কোথাও তাহাকে দেখি নাই। তাই না চিনিতে পারিয়া পরিচয় । জিজ্ঞাসা করি। শশাঙ্ক তখন মাতৃসম্বােধন করিয়া আমার চরণ ধমিয়া যাহা বলে তাহা তাহার নিকট শুনিবার পূর্বে আমি বলিব না। আমি তখন দরজার কাছে গিয়া “সুরমা”কে চীৎকার করিয়া ডাকি—এমন ৭২ টীয়ানাকী সময়ে রাজা ও রাণী দরজার বাহিরের তালা খুলিয়া কক্ষে প্রবেশ করেন। রাজা।—মিথ্যা কথা, আমার বংশে এমন স্ত্রীলােক জন্মে নাই। শশাঙ্ক , তােমার কি বলিবার আছে ? শশাঙ্ক এবারে গর্বিত গ্রীবা উন্নত করিয়া নির্ভীক চিত্তে বলিয়া উঠিল। “মহারাজ, ও সমবেত পারিষদবর্গ, রাণী যাহা বলিয়াছেন- তাহা সম্পূর্ণ মিথ্যা।” রাণী।সাবধান শশাঙ্ক ; রাজদরবারে কথা বলিতেছ যেন মনে থাকে। শশাঙ্ক রাণীর কথা অগ্রাহ্য করিয়া দ্বিগুণ গর্বে বলিয়া উঠিল— “এই রাণী এই রাজ্যের সর্বনাশের মূল ; সে বিষয়ে আমি এখন বিস্তারিত বলিব না। আমি তাহার সেই সৰ্ব্বনাশ সাধনের অন্তরায় ; তাই অনেক চেষ্টার পর আমাকে ধ্বংস করিবার নিমিত্ত আমার বিরুদ্ধে এখন এই চক্রান্ত প্রস্তুত হইয়াছে। আমি আমার জন্য দুঃখিত নহি। কিন্তু, মহারাজের ভগ্নীকে এই উপলক্ষে কলঙ্কিতা বলিয়া প্রমাণ করিবার বন্দোবস্ত হইয়াছে—ইহাতে মহারাজ দুঃখিত না হইলেও আমি দুঃখিত। রাণী।-কেন হবে না,সে যে মহারাজের অপেক্ষা তােমারই বেশী। বৃদ্ধ মন্ত্রী।-মহারাজ, এ মােকদ্দমার বিচার আপনি করিবেন, না রাণী স্বয়ং করিবেন ? রাজা।--মন্ত্রী, সংযত হইয়া কথা বল। রাণীর কথা অসহ বােধ হয় তুমি সভা ত্যাগ করিতে পার। বন্ধ মন্ত্রী, ভাবগতিক দেখিয়ী ধীরে ধীরে সভাপৱিত্যাগ করিতে উদ্যত হইলে শশাঙ্ক বলিল—মন্ত্রী, মহাশয়, বন্দীর অনুরােধ রক্ষা ।
টীয়ানাকী। ৭৩ করুন ; আপনি শান্তভাব ধারণ করিয়া যথাস্থানে বসুন।” মন্ত্রী স্বস্থান গ্রহণ করিলে শশাঙ্ক আবার বলিতেগিল পারিষদগণ, গত কল্য সন্ধ্যার পর আমি সজ্জিত হইয়া নগর পরিদর্শনে বাহির হইব, এমন সময়ে রাণীর পরিচারিকা আসিয়া সংবাদ দিল—“রাণী মা এখনই ডাকিতেছেন। রাজার সম্বন্ধে অশুভ সংবাদ আসিয়াছে।” আমি ব্যস্ত হইয়া গিয়া দেখি রাণী স্বয়ং দ্বারদেশে সঁড়াইয়া আছেন। আমি তথায় যাইবামাত্র রাণী আমার হাত ধরিয়া আমাকে একটা সুসজ্জিত কক্ষে লইয়া গেলেন। আমি কক্ষটীর শােভা দর্শন করিতেছি, ইত্যবসরে তিনি বাহির হইতে তালাবন্ধ করিয়া দিয়া চলিয়া গেলেন। ইতস্ততঃ নিরীক্ষণ করিয়া আমি তখন কমধ্যে, পালস্কোপরি শায়িতা একটী রমণীকে দেখিতে পাইয়া বিস্মিত, লজ্জিত ও কৌতুহল-পরবশ- চিত্তে তাঁহার নিকটে গিয়া বিশেষ লক্ষ্য করতঃ তাঁহার ললাটে হস্তাৰ্পণ করিলাম। শরীর স্পর্শ করিবামাত্র রমণী জাগ্রত হইয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন-“তুমি কে ? কি নিমিত্ত এখানে আসি- আছ ? আমাকে কে এখানে আনিল ?” আমি তাঁহার প্রশ্নের উত্তর না দিয়া ভীত প্রাণে উঠিয়া সরিয়া দাড়াইলাম। তখন তিনি তীব্রস্বরে তাঁহার প্রশ্নের উত্তর প্রার্থনা করিলে আমি তাহার চরণ ধরিয়া মাতৃ- সম্বােধন করতঃ কিরূপ চক্রান্তে পড়িয়া আমি তথায় গিয়াছিলাম- বলিলাম। তাহার পর যাহা হইয়াছে তাহা আপনার সেই রমণী মহারাজের ভগ্নী--দেবী মনােৱমার নিকট শুনিয়াছেন। এখন যাহা হয় আপনারা বিচার করিতে পারেন ত হাতে আমার আপত্তি নাই।” রাজা।-তুমি জান এই রাজ্যের রাণী তোমার বিরুদ্ধে অভিযােগ আনিয়াছেন, শশাঙ্ক জানি, মহারাজ।
•• ৭৪ টীয়ানাকী । . wwwwww জা।-তুমি রাণীকে মিথ্যাবাদিনী বলিতে চাও ? শশাঙ্ক।—শুধু মিথ্যাবাদিনী বলিয়াই আমি সন্তুষ্ট হইতে পারি কই ? তিনি বিশ্বাসঘাতকতা, প্রবঞ্চনা প্রভৃতি বহু অপরাধে অপ- রাধিনী। রাণী।—মহারাজ, এই ধূর্ত লম্পটকে নিরস্ত করুন, নতুবা আমি স্বয়ং বামপদাঘাতে এখনই ইহার উদ্ধত মস্তক অবনত করিয়া দিব। শশাঙ্ক ।সে শক্তি থাকিলে এতদিনে তাহা করিতে এবং আমাকে বা এই রাজ্যকে কেহ এ অবস্থায় দেখিতে পাইত না। রাজা শশাঙ্ক, সাবধান হইয়া কথা বল। রাণী, শান্ত হও। শশাঙ্ক।-মহারাজ, বহুদিন হইতেই সাবধান হইয়া আছি ; ও সাবধান হইয়া কথা বলিতেছি। যাহা এতদিন বলি নাই, আজও তাহা বলিব না। কিন্তু, মহারাজ, এই রাজ্যের প্রতি ধূলি-কণিকায়, প্রতি বৃক্ষপত্রে, প্রতি অন্দরে- করে আমার প্রাণের চিহ্ন চিহ্নিত করিয়া রাখিয়াছি। এই পিতৃভূমির আবালবৃদ্ধবনিতার অশ্রু, প্রতি মরুভূমির উষ্ণ বালুকার তাড়না, প্রতি হতাশ দুৰ্বল অনাথ জীবনের দীর্ঘশ্বাস এই ক্ষুদ্র বক্ষ পাতিয়া গ্রহণ করিয়া তদত হইয়া আছি । প্রাণ থাকিতে ইহার অমঙ্গল-সূচনা দর্শন করিয়া নিশ্চিন্ত, নিরস্ত অথবা বিদুরিত হইতে পারিব না। আমি প্রাণপণে চেষ্টা না করিলে আপনার এই রাজ্য রাক্ষসীর অত্যাচারে এতদিনে জনশূন্য হইয়া পড়িত। দরিদ্র প্রজাদের দুঃখ নিবারণ করতঃ শান্তি সংস্থাপন করা রাজার এক প্রধান কৰ্তব্য। আপনাকে সেই কর্তব্যে সম্পূর্ণ উদাসীন দেখিয়া আমি প্রতি প্রজার ঘরে ঘরে গমন করিয়া সাধ্যমত তাহাদিগকে শান্তিতে রাখিবার চেষ্টা করিয়াছি, তাই আপনার রাজ্যে এখনও প্রজা আছে ; নতুবা অত্যাচারপীড়িত রাজ্য হইতে বহুদিন পূর্বে তাহারা অন্য রাজত্বে চলিয়া * '
টীয়ানাকী:
৭৫
~~~~~~~~~~~~~~~~
~~~~~~~~~~ ~~~~~~~~~
যাইত | সমস্ত দিন রাত্রে আমি এই কয়েক বৎসর এক প্রহরের অধিক
নিদ্রা যাই নাই। যদি আমার চরিত্র কলুষিত হইত তাহা হইলে
আপনার রাজ্যের জন্য অথবা আপনার রাণীর জন্য এই ক্ষুদ্র তুচ্ছ
জীবনের মমতা পরিত্যাগ করিয়া যাহা করিয়াছি—কখনও তাহা
করিতে পারিতাম না! বিচারের ফলাফলের জন্য আমি বিন্দুমাত্র
বিচলিত নহি। আপনি আমার পিতা; আপনার যে কোনও আদেশ
আমি অবনত মস্তকে গ্রহণ করিতে প্রস্তুত আছি।
রাজা।—তােমার আর কিছু বলিবার আছে, শশাঙ্ক ?
শশাঙ্ক।-আমি বন্দী; বর্তমানে আমার আর কি বলিবার থাকিতে
পারে? তবে যদি কিছু বলিবার থাকে, বিচারের ফল শনিবার
পূর্বে
তাহা বলা সঙ্গত মনে করি না।
রাজা।মনােরমা, তুমি তােমার সাপক্ষে কিছু বলিতে চাও ?
মনােরমা।—রাণী যাহা বলিলেন তাহার সাপক্ষে কিছু প্রমাণ
আছে ?
রাজা।—তিনি এ রাজ্যের রাণী ; আমি তাহার নিজমুখের কথাই
সত্য বলিয়া মানিতে বাধ্য।
মনােরমা।—তাহা হইলে আমার কিছুই বলিবার নাই। আপনি
ও আমি এক মাতৃগর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছি ভাবিতেও আজ আমার
বুক ফাটিয়া যাইতেছে ! লজ্জাবােধ হইতেছে !!
এই পৰ্যন্ত বলিয়া সহসা মনােরমা অবসন্ন হইয়া পড়িল। পরি
চারিকারা সাবধানে তাহার শুশ্রুষায় প্রবৃত্ত হইল ।
রাজা-পারিষদবর্গ, আমি গােপনে রাণীর নিকট শশাঙ্ক ও
মনােরমার বিরুদ্ধে যে সকল প্রমাণ সংগ্রহ করিয়াছি—তাহা আমি
আপনাদের নিকট ব্যক্ত করিতে ইচ্ছা করি না। আমি বড়ই দুঃখের
টায়ানাকী। সহিত আদেশ করিতেছি যে, ইহারা যেরূপ গুরুতর অপরাধ করিয়াছে তাহাতে অন্য হইতে এক সপ্তাহ পরেইহাদের উভয়কে প্রকাশ্য বধ্যভূমিতে প্রজাসাধারণের সম্মুখে তুষানলে দগ্ধ করিতে হইবে। শশাঙ্ক।—আমি মহারাজের এই আদেশ অবনত মস্তকে গ্রহণ করিলাম। যে রাজা সংগৃহীতা মায়াবিনী যুবতী স্ত্রীর প্রতাড়নায় মুগ্ধ হইয়া আপন আবাল্য জীবনের সঙ্গিনী চরিত্রবতী স্ত্রীদিগকে অকর্মণ্য করিয়া গর্ভাবস্থায় বনবাস দিতে পারে—তাহার পক্ষে সেই মায়াবিনী রাক্ষসীর প্রেমবদ্ধ প্ররােচনায় হতজ্ঞান হইয়া, নিরপরাধী ভৃত্যের অথবা সতীলক্ষ্মী ভগ্নীর প্রাণবধের আদেশ দেওয়া একটা বেশী কিছু নয়! মহারাজ, অাপনি অামার পিতা ; সন্তানের এই ঔদ্ধত্য ক্ষমা করিবেন। আপনার এই আদেশের পরিণাম অতি ভয়াবহ। আপনি রাজ্যেশ্বর, আমি আপনার রাজ্যের ভৃত্য হইলেও আপনি আমাকে অর্ধরাজ্য দান করিয়াছেন বলিয়া আমিও অর্ধ-রাজ্যেশ্বর। পারিষদ্ধর্গ । অন্ধরাজ্যের অধীশ্বরভাবে আমি আদেশ করিতেছি—“আমার রাজ্যে স্ত্রীবধ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মনােরমা সম্পূর্ণ নিরপরাধিনী। তাহাকে আপনার সসম্রমে মুক্তিদান করুন। রাণীর অপরাধের বিচার সময়ে ভগবান স্বয়ং করিবেন। আমি মহারাজের আদেশে অদ্য হইতে একসপ্তাহ পরে তুষানলে দগ্ধ হইয়া মরিব। রাণী।-কে তােমাকে অন্ধরাজ্যের অধীশ্বর করিয়াছে শশাঙ্ক ? মহারাজা? এ রাজ্যের একটী কণিকাও কাহাকেও দান করিবার তাঁহার অধিকার নাই। আমাকে বিবাহ করিবার সময়েই তিনি এ রাজ্য আমাকে লিখিয়া দিয়াছিগেন ; আমি অনুগ্ৰহ করিয়া এতদিন তাঁহাকে নিজ নামে রাজ্যশাসন করিতে দিয়াছি বলিয়া দান করিবার অধিকার দেই নাই। ';
টীয়ানাকী । ৭৭ রাণী রাজার স্বহস্তে লিখিত বিবাহ সময়ের দানপত্র পারিষদ্বর্গের নিকট প্রেরণ করিলেন; রাজাও অবনত বদনে স্বীকার করিলেন তিনিই উহা লিখিয়া দিয়াছিলেন; এবং শশাঙ্ককে দান করিবার সময়ে তাহার উহা স্মরণ ছিল না। শশাঙ্ক।যদি তাহাই হয় তাহা হইলে রাণীর অনুমােদিত রাজার আদেশই আমাদিগকে শিরােধার্য্য করিতে হইবে। কিন্তু, রাজার ভগ্নী ? বলিয়াই শশাঙ্ক সহসা কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হইয়া বসিয়া থাকিয়া চমকিত হইয়া হাসিমুখে বলিয়া উঠিল—“আপনি রাজার ভগ্নী, আমার পিসিমা। ভয় নাই পিসিমা; গুরুর আশ্বাস-বাণী পাইয়াছি। অত্যাচার-পীড়িত অসহায় জীবকে পাশবিক অত্যাচার হইতে উদ্ধার করিবার নিমিত্ত ভগবান সহায় আছেন। যাহার কেহ নাই—তিনিই তাহার বল। চল পিসিমা, আমরা একসঙ্গে কারাগারে গমন করি। আজ হইতে ৭ দিন পরে বিশ্বরাজ্যেশ্বরের বিচারের দিন নির্ধারিত হইয়াছে। মহারাজ, সে বিচারের ফল দেখিবার নিমিত্ত রাজ্যবাসীগণকে আবাহন করুন।” শশাঙ্কের করুণ উক্তি নিস্তব্ধ রাজার মর্মস্থল ভেদ করিল। সহসা তাঁহার চিত্তে ভাবান্তর উপস্থিত হইল ; তাহার নয়ন হইতে অশ্রু বিনির্গত হইতে লাগিল। পারিষদুবর্গ বিষন্ন বদনে বসিয়া রহিলেন। কিছুক্ষণ পরে বৃদ্ধ মন্ত্রী ধীরে ধীরে উঠিয়া বিনীতভাবে বলিলেন—“মহারাজ, বৃদ্ধ-মন্ত্রীর অপরাধ ক্ষমা করিবেন। শশাঙ্কের বিরুদ্ধে এরূপ আদেশে রাজদ্রোহ উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা। শশাঙ্ক আপনার রাজ্যের প্রতি-প্রজার প্রাণস্বরূপ।” রাজা।-মন্ত্রী, আর তােমাদের রাজা নাই। আমি রাণীর প্রতি- নিধি। আজ হইতে আমাকে আর তােমরা “মহারাজ” বলিয়া সম্বােধন করিও না।” বলিতে বলিতে সভাভঙ্গ করিয়া ধীরে ধীরে সেস্থান ;
টীয়ানাকী। পরিত্যাগ করিলেন। শশাঙ্ক ও মনােরমাকে কারাগারে রক্ষা করা হইল। শশাঙ্ক ও মনােরমার বিচারের পর আজ সপ্তম দিন। আজ সৰ্ব্ব- সাধারণের সম্মুখে তাহাদের দেহ তুষানলে দগ্ধ করা হইবে। রাজা ও পারিষদৰ্গ নির্দিষ্ট স্থানে ম্লান মুখে বসিয়াছেন। পর্দার ভিতরে রাণী ও অন্যান্য স্ত্রীলােকগণ উপবেশন করিয়াছেন। অপর তিনদিকে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ প্রজা উত্তেজিত হইয়া মহা-কোলাহলে সমবেত হইয়াছে। শশাঙ্ক ও মনােরমাকে সেই অনন্ত জনতার সম্মুখে আনয়ন করতঃ একস্থানে স্থাপন করা হইল। মনােরমার সৰ্বাবয়ব কম্পিত হইতেছে ; শশাঙ্ক হাসিমুখে উপবেশন করিয়া আছে। যে দিন শশাঙ্কের বিচার হয় সেই দিন গভীর নিশিতে শশাঙ্ক ইষ্ট- দেবতার ধ্যান করিতেছিল। সেবকের স্মরণে সহসা সন্ন্যাসী-ঠাকুরের ধ্যান ভঙ্গ হইল। তিনি সমস্ত জানিতে পারিয়া শশাঙ্ককে আশ্বাস প্রদান করিলেন। শশাঙ্ক স্পষ্ট শুনিতে পাইল কেহ যেন তাহার কাণের কাছে বলিয়া গেল—“তােমার জীবনের কোনও ভয় নাই—নিশ্চিন্ত থাক। আমি সমস্ত আয়ােজনের ভার গ্রহণ করিলাম।” ধার্মিক বিশ্বস্ত শশাঙ্ক এই অদৃশ্য দেবতার উক্তি গুরুদেবের দৈববাণ বলিয়া গ্রহণ করিল। গুরু-বাক্য কখনও মিথ্যা হয় না শশাঙ্ক নিঃসন্দিগ্ধ-চিত্তে তাহা জানিত ; তাই আজি তাহার চিত্ত মরণের অঙ্কে অবস্থান করিয়াও সম্পূর্ণ প্রফুল্ল। ক্রমে জনতার কোলাহল প্রজাবৃন্দের উত্তেজনাময় চীৎকারের সহিত মিলিত হইয়া ভীষণতর হইয়া উঠিল। রাজার প্রহরীগণের পক্ষে সেই গােলযােগ শান্ত করা অসম্ভব হইয়া পড়িল। তখন রাজা স্বয়ং আপন উচ্চ আসনে দণ্ডায়মান হইয়া প্রজাবৃন্দকে সম্বােধন করতঃ শান্ত করিবার টীয়ানাকী । চেষ্টা করিলেন, কিন্তু তাহাতে তাহারা অধিকতর উত্তেজিত হইয়া সমস্বরে বলিয়া উঠিল—“আমরা আর তােমার নিকট কিছু শুনিতে চাই, । তুমি সিংহাসন হইতে অবতরণ কর ; আজ আমরা আমাদের নব যুবরাজ শশাঙ্ককে সিংহাসন দান করিব।” রাজা ইহার পর যত কিছু বলিতে চেষ্টা করিলেন তাহার উত্তরে ঐ এক কথা ভিন্ন কিছুই শুনিতে পাইলেন না। রাজা তখন নিতান্ত বিব্রত হইয়া সেনাপতি ও সৈন্যাধ্যক্ষগণকে সেই বিদ্রোহ নিবারণ করিবার অনুমতি দিলেন। কিন্তু তাহারা যােড়করে একবাক্যে ক্ষমা ভিক্ষা করিয়া বলিলেন-- “মহারাজ, ক্ষমা করিবেন। প্রজা-শক্তিই রাজ-শক্তি। প্রজাসাধারণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা অবৈধ। এই রাজনীতিবিরুদ্ধ কাৰ্য করিতে আমরা অসমর্থ। আমরাও আপনার প্রজা। প্রজাগণ যাহা চায়, তাহার বৈধ ব্যবস্থা করিয়া শান্তি সংস্থাপনের চেষ্টা করুন।” রাজা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া বসিয়া পড়িলেন। রাণী এই ভীষণ সমস্যায় হৃদয়ের যাতনায় অধীর হইয়া চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। বিদ্রোহী প্রজা- গণ ক্রমেই নিকটবর্তী হইতে লাগিল। একদিকে এই ভীষণ ব্যাপার । অন্য দিকে বন্দী শশাঙ্ক হাসিমুখে ভীত-চকিতা মনােরমাকে নানা প্রকারে শান্ত করিবার চেষ্টা করিয়া তাহাকে সম্বােধন করিয়া বলিল—“পিসিমা, তুমি অত কাতর হইতেছ কেন ? মরণকে সতীস্ত্রী অত ভয় করে কি ? তুমি শান্ত হও। আমি তােমার বননিবাসিনী ভ্রাতৃবধূর গর্ভজাত একমাত্র সন্তান। আমার এমন শক্তি আছে যে আমাকে কেহ সহজে প্রাণে বধ করিতে পারিবে ।” এই শেষ কথাগুলি মনােরমার মর্মস্পর্শ করিবা মাত্র সে বিচলিত হইয়া শশাঙ্কের দিকে ফিরিয়া চাহিবামাত্র শশাঙ্ক আবার হাসিমুখে লিল “সত্যই তুমি আমার পিসিমা। ভয় নাই পিসিমা; ইহাৱা টীয়ানাকী -- আমাকে ধ্বংস করিতে পারিবে না। আমি : গুরুর আশ্বাস পাইয়াছি ; তিনি আমাদিগকে উদ্ধার করিবেন এই প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন।” মনােরমা একটু আশ্বস্ত হইয়া শশাঙ্কের হাসিমাখা মুখের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—“শশাঙ্ক, তুমি আমার এ কলঙ্ক মােচন করিতে পারিবে কি ?” শশাঙ্ক।-পারিব বৈকি ? ঐ শুন পিসিমা প্রজাগণ কি বলিতেছে। এ রাজ্যের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা আমার প্রাণস্বরূপ, আমিও তাহাদের প্রাণপ্রিয়। মনােরমা স্থিরচিত্তে শুনিলেন প্রজাগণ একবাক্যে বলিতেছে---“আজ আমরা আমাদের নব-যুবরাজ শশাঙ্ককে সিংহাসন দান করিব।” মনােরমা আবার ভীত-কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন- “শশাঙ্ক, আমার দাদার ত কোনও বিপদ হবে না ? তাহাকে রক্ষা করিতে পারিবে ত? দাদা আমার না বুঝিয়া অন্যায় করিতেছেন। তাহার যেন বিপদ না হয়। শশাঙ্ক-সতী স্ত্রীর আদর্শ প্রার্থনা সৰ্ব্বদাই ভগবানের অনুমােদিত। ভগবান, এমন হৃদয় দিয়া তুমি ইহাদিগকে গঠিত করিয়াছ যে মৃত্যুর অঙ্কে অবস্থান করিয়াও যে মারিতে উদ্যত তাহার মঙ্গল প্রার্থনা ইহারা করেন। এ শিক্ষার তুলনায় বিশ্ব পরাজিত। ও শিক্ষা যুগযুগান্তরের যােগ-ঋষিগণের সাধনার ভস্মাবশেষ। পিসিমা, আমি তাহার একমাত্র সন্তান। পিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য পালন করিবার নিমিত্ত প্রাণ দিয়াও তাঁহাকে নিরাপদে রক্ষা করিব। বিদ্রোহী প্রজাগণকে নিরস্ত করিতে অসমর্থ হইয়া রাজা কি করি- বেন স্থির করিতে না পারিয়া অস্থির হইয়া উঠিলেন। রাণী তখন যৎনিকার অন্তরাল হইতে বলিয়া উঠিলেন—“মহারাজ, ভয় নাই।
টীয়ানাকী। ৮১ আপনি শীঘ্ৰ কাৰ্য্য সমাধা করুন ; আমি আপনাকে এই বিপদ হইতে উদ্ধার করিব।” রাজার প্রাণ কঁদিয়া উঠিল। দুই দিকেই তঁাহার সমান বিপদ বলিয়া বােধ হইতে লাগিল। তিনি উন্মতের ন্যায় শশাঙ্ক ও মনােরমার দিকে চাহিয়া অশ্রুপ্লাবিত-বদনে বলিয়া উঠিলেন—“শশাঙ্ক, ভগ্নী মনােরমা, তােমাদের শরীর এখনই ভস্মে পরিণত হইবে। তােমরা ইষ্টদেবতার নাম স্মরণ কর।” ভীত চকিত মনােরমা শশাঙ্কের প্রফুল্ল বদনের দিকে চাহিয়া রহিলেন। শশাঙ্ক মুক্তকরে স্থিরনেত্রে বাজার মুখের দিকে চাহিয়া উচ্চকণ্ঠে সাধারণের প্রাণমন মােহিত করিয়া ভক্তিভরে গাহিতে লাগিল- “অখণ্ড মণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম্ । তৎপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ। গুরু বিশ্বেশ্বরঃ সাক্ষ্যাৎ তারকং ব্ৰহ্ম নিশ্চিত। মুনিভিঃ পন্নগৈবাপি সুরৈবাশাপিতাে যদি । কালমৃত্যুভয়াদ্বাপি গুরু রক্ষতি পাৰ্বতি। অশক্তা হি সুরাঃ সর্বে অশক্তা মুনয়স্তথা। গুরুশাপহঃ ক্ষীণঃ ক্ষয়ং যান্তি ন সংশয়ঃ # পিতা ধর্মঃ পিতা স্বর্গঃ পিতাহি পরমংতপঃ। পিতরি ঐতিমাপন্নে প্ৰীয়ন্তে সৰ্ব্বদেবতাঃ।” পরিচিত কণ্ঠের মধুর সঙ্গীত শ্রবণ করিয়া সেই উদ্বেলিত জনতা কঞ্চিৎ শান্ত হইল। রাজা এক দৃষ্টে শশাঙ্কের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। শশাঙ্ক ভক্তি-বিগলিত-কষ্ঠে আবার গাহিয়া উঠিল— “পিতা ধর্মঃ পিতা স্বর্গঃ পিতা হি পরমং তপঃ। পিতরি প্রতিপন্ন প্রান্তে দেবতাঃ সঙ্গীত শেষে সমবেত জনতা উচ্চকণ্ঠে বলিয়া উঠিল—“সাধু- সাধু-সাধু।” তাহাদের কণ্ঠধ্বনি শেষ হইতে না হইতেই উচ্চতর কণ্ঠে কে এক বিরাট পুরুষ জনতার মধ্য হইতে বলিয়া উঠিলেন— “সাধু-সাধু সাধু। শশাঙ্ক, আমি আসিয়াছি।” গুরুদেবের পবিত্র কণ্ঠস্বর মরমে প্রবেশ করায় শশাঙ্ক আবার ভক্তি-বিহ্বল-কণ্ঠে গাহিয়া উঠিল—“গুরু বিশ্বেশ্বরঃ সাক্ষ্যাৎ তারকং ব্ৰহ্ম নিশ্চিত।” দেখিতে দেখিতে সেই ভীষণ জনতা ভেদ করিয়া এক গৌরকান্তি ঋষিপ্রবর সভাস্থলে উপস্থিত হইলেন। তাহার পশ্চাতে দুইটী অবগুণ্ঠনবতী স্ত্রীলােক। রাজ। সসম্ভ্রমে দণ্ডায়মান হইয়া ঋষিবরকে বসিতে আসন দিলেন ও স্ত্রীলােকদ্বয়কে যবনিকার অন্তরালে প্রেরণ করিলেন। ঋষিপ্রবর মুহূর্তে অন্যের অজ্ঞাতে শশাঙ্ক ও মনােরমার দেহ রক্ষামন্ত্রে সুরক্ষিত করিয়া রাখিলেন। শশাঙ্ক স্পষ্ট শুনিতে পাইল কে যেন তাহার কর্ণে বিশ্বস্তকণ্ঠে বলিতেছে—“শশাঙ্ক, ভয় নাই। আমার সম্মুখে তােমাদের কোনও বিপদ হইতে পারিবে না।” এই অবস্থায় শশাঙ্ক ও মনােরমার অঙ্গে তৈলসিক্ত তুষ বিলেপিত করা এবার ধীরে ধীরে শশাঙ্কের চিত্তে রাজকুমারীর গুপ্ত ছবি উদ্ভাসিত হইয়া তাহাকে উদ্ব্যস্ত করিয়া তুলিল। তাহার বক্ষ বাহিয়া অবিরল ধারে অকৃতজ্ঞতার অনুতাপানল তরলিত হইয়া প্রবাহিত হইতে আরম্ভ করিল। তখন রাজ্যের প্রজাগণ উন্মাদের ন্যায় চীৎকার করিতে করিতে শশাঙ্ককে মুক্ত করিবার নিমিত্ত ধাবিত হইল। সেই উন্মত্ততা নিবারণ করিতে রাজার শান্তিরক্ষকগণ, সৈন্যগণ, রাজানুচরগণ, এমন কি রাজা পৰ্যন্ত অসমর্থ হইলেন। তখন রাণী উন্মাদিনীর ন্যায় যবনিকার অন্তরাল হইতে বাহির হইয়া অতি ত্ৰস্তে শশাঙ্কের হস্ত হইতে অপহৃত আংটী দুইটীর একটী হইল ।
চীয়ানাকী। হউন। সেই জনতার সম্মুখে ধারণ করিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ জনসাধারণের দৃষ্টি রাণীর দিকে নহে; কাজেই সে অঙ্গুরীয়কের গুণ সে ক্ষেত্রে কাৰ্য্য করিল না। অপাত্রে পড়িলে এইরূপেই জিনিষের গুণ লুপ্ত হইয়া থাকে। ক্রোধে অধীর হইয়া রাণী তখন নিজ মূর্তি ধারণ করিবার সঙ্কল্প করিতেছেন-ইত্যবসরে ঠাকুর ব্রহ্মানন্দগিরি ধীরে ধীরে গৌরদীর্ঘদেহে দীর্ঘজটা আগুফলম্বিত করিয়া দিয়া সেই উত্তাল তরঙ্গায়িত সম্মুখস্থ জন-সমুদ্রের সম্মুখে হাসিমুখে দণ্ডায়মান হইয়া তারস্বরে বলিতে লাগিলেন—“প্রজাবৃন্দ, আপনারা প্রতিনিবৃত্ত আমি শশাঙ্কের গুরু ব্রহ্মানন্দগিরি আপনাদিগকে শান্ত হইতে অনুরােধ করিতেছি। আপনারা নির্ভয়ে স্থিরচিত্তে এই দৃশ্য অবলোকন করুন। যে আশঙ্কায় আপনারা উন্মত্ত হইয়াছেন—এ ক্ষেত্রে সে আশঙ্কার কোনও কারণ নাই। অচীরে আপনাদের মনাে- বাঞ্ছাপূর্ণ হইবে।” সেই গগনভেদী মােহন, কণ্ঠস্বর তরঙ্গে তরঙ্গে বিপুল জনসংঘের প্রাণের উপর দিয়া হেলিয়া দুলিয়া চলিয়া গেল ; মুহূর্তে উত্তাল তরঙ্গিত জনসংঘ নিবাতনিষ্কম্প স্থিরতায় একদৃষ্টে সাধূর সৰ্বাবয়বে দৃষ্টিপাত করিয়া ভুবনবিখ্যাত সিদ্ধ-ঋষি ব্ৰহ্মানন্দগিরির দর্শন লাতে আপনাদিগকে কৃতাৰ্থ বিবেচনা করিয়া যুক্তকরে তাহাকে প্রণি- পাত করিতে আরম্ভ করিল। অপমানিতা রাণী সহসা সেই কণ্ঠস্বরে ভীতা বিচলিত স্তম্ভিত হইয়া দলিতা ফণিনীর ন্যায় সভাস্থলে দাঁড়াইয়া রহিলেন। শােকদুঃখচিন্তানুতাপদগ্ধ বিমর্ষ বৃদ্ধ রাজা সহসা “ব্রহ্মানন্দ- গিরি” নাম শুনিয়া চমকিয়া উঠিলেন এবং সিংহাসন পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক সাধুর পদতলে পতিত হইয়া এতক্ষণ তাহাকে চিনিতে পারেন নাই বলিয়া ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। শশাঙ্ক ব্রহ্মানন্দের শিষ্য—জানিয়া রাজা এতদিন পরে এই বালকের অন্তর্নিহিত শক্তির কারণ স্থির ৮৪ টীয়ানাকী করিতে সমর্থ হইলেন এবং মহর্ষির নিকট শশাঙ্কের অপরাধের বিষয় বিস্তারিত বর্ণনা করিলেন। মহর্ষি হাসিয়া বলিলেন—“যদি তাহাই সত্য হয়, তাহা হইলে আপনারা যেরূপ বিচার হয় করিবেন, তাহাতে আমার কি ? আমি শশাঙ্ককে দেখিতে আসিয়াছি, তাহাকে মুক্ত করিতে আসি নাই। কিন্তু এক কথা, মহারাজ, যদি আমার শিষ্য নির্দোষী হয় তাহা হইলে আমার আশীর্বাদে অগ্নি তাহার অথবা মনােরমার দেহ স্পর্শ করিতে সমর্থ হইবে না।” এই কথা শুনিয়া রাণীর প্রাণ দুরু দুরু করিয়া কঁপিয়া উঠিল। পাপীর মন সত্যের নির্ভিক শব্দে এইরূপেই বিচলিত হইয়া থাকে। এস্থলে আসু- রিক অথবা রাক্ষসী বৃত্তি পরাজয় স্বীকার করিতে বাধ্য হয়। অনতিবিলম্বে শশাঙ্ক ও মনােরমার শরীরে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিয়া দিতে চেষ্টা করা হইল ; কিন্তু কিছুতেই অগ্নি ধরিল না। একবার দুইবার করিয়া সাতবার চেষ্টাও নিস্ফল হইল দেখিয়া রাণী অধিকতর অস্থির হইয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িলেন। তখন চারিদিক হইতে জনসংঘ আনন্দে চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল—“সাধু-সাধু শশাঙ্ক। এইরূপে দারুণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হইতে পারিলে মানুষ কখনও দেশের চিত্তের উপর রাজত্ব করিতে সমর্থ হয় না।”. মহর্ষি ব্ৰহ্মানন্দ তখন শশাঙ্ককে আশীর্বাদ করতঃ রাজা ও পারিষদৰ্গকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন—“এখন আপনারা বুঝিলেন ত শশাঙ্ক দোষী কি নির্দোষী।” রাজা তখন সিংহাসন হইতে উঠিয়া আসিয়া নিজ হস্তে শশাঙ্ক ও মনােরমার বন্ধন মােচন পূর্বক তাহাদের নিকট ক্ষমা চাহিলেন। মনােরমা দাদাকে প্রণাম করিয়া দূরে সরিয়া গেল। শশাঙ্ক গর্বিত বদনে বলিল—“এইবার যিনি বিনা অপরাধে আমা- দিগকে এত লাঞ্ছনা দিলেন তাহার বিচার হউক।”
টীয়ানাকী । ৮৫ এমন সময়ে কে যেন সেই অসীম জনতার কোলাহল ভেদ করিয়া ধীর গম্ভীর প্রাণ-মনােহর কণ্ঠে গান করিতে করিতে সভাস্থল লক্ষ্য করিয়া অগ্রসর হইতে লাগিল। এমন মধুর কণ্ঠস্বর, এমন ভাব- তরঙ্গিত সঙ্গীত-লহরী উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের কেহ কখনও শ্রবণ করেন নাই। দূর হইতে যখন সঙ্গীত-তরঙ্গের ভুবনমােহন নৃত্যধ্বনি পবনে ভর করিয়া ভাসিয়া আসিতেছিল তখন সকল কোলাহল, সকল ক্রোধ বিদ্বেষ, দুঃখ কাঠিন্য, সকল মরণামরণ চিন্তা ভুলিয়া গিয়া ব্যক্তিমাত্রেই যেদিক হইতে সেই সঙ্গীত লহরী প্রবাহিত হইতেছিল নিস্তব্ধপ্রাণে, আকৃষ্টচিত্তে উৎগ্রীব সেই দিকেই লক্ষ্য করিয়া রহিল। . শশাঙ্ক প্রফুল্ল অন্তরে একমনে শুনিতে লাগিল অপ্সরাবিনিন্দিত কণ্ঠে কে যেন গাহিতে গাহিতে আসিতেছে :- তুমি নারায়ণ শ্রীমধুসূদন বিপদভঞ্জন অনাথ-শরণ। তােমারে স্মরণ করি চলেছি তােমারি তরে ; দীন কাঙ্গাল বলি ঠেলনা হে অন্তরে। বিপদ-সাগরে হরি ভব-কাণ্ডারী স্মরি তােমারি চরণ। অপরাধী ধরি করে অপরাধী তাহারে, যে যায় বলিতে, নাথ, অপরাধী তাহারে। সত্য-সাক্ষী তুমি প্রভু, সৰ্ব্বময় সৰ্ব্ব কর দরশন। রাজ্য-রাজত্ব সব তােমারি করুণা-ফুল, পলে জন্মে পলে লয় লক্ষ রাজা রাজবল। সত্যসনাতন, রক্ষ বিপদে তােমারি আশ্রিত নির্ভয় জীবন । হিরণ্যকশিপুবপু বিদারণ করিলে, রক্ষিতে প্রহলাদে তব অপরূপ রূপ ধরিলে। সত্যমেব জয়তে, কাশি সত্য, রক্ষ বিপদে বিপদবারণ ।
টীয়ানাকী । 'vvAvvvW ' যে গান করিতেছিল সে ক্রমে জনতা ভেদ করিয়া অগ্রসর হইতে লাগিল এবং গান করিতে করিতে সভাস্থলে উপস্থিত হইল। উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ বিস্ময়-বিধ্বস্ত-চক্ষে দেখিতে পাইল-গায়িকা এক আগুফ- লম্বিতালুলায়িতকেশা, উন্মুক্ত-শীর্ষা, বহুমূল্যালঙ্কার-ভূষিতা ভুবন- মন-মােহিনী নব-যুবতী। তাহার পরিধানে রত্নখচিত বহুমূল্য বসন- কুটিদেশে কটিবন্ধে আলম্বিত দীর্ঘ তরবারি, পৃষ্ঠোপরি লম্বমান দীর্ঘ তীর-তুণীর-ধনুক, মস্তকে হীরকখচিত একটী ঝাঁপি, বামকরে বীণা। এমন রূপের মাধুরী কেহ কখনও স্বপ্নেও দেখে নাই। যেমন কণ্ঠে সুধার প্রস্রবণ—তেমনি নবযৌবনবিমােহন, প্রাণ-মনােন্মাদক রূপ লাবণ্য। যুবতী গান শেষ করিয়া ঝাঁপিটী সম্মুখে রাখিয়া ধনুকে বাণ যােজনা করিয়া বাণদ্বারা পূজনীয়গণকে প্রণাম করতঃ তৃষিত-নয়নে শশাঙ্কের মুখের দিকে চাহিয়া ঈষৎ হাসিয়া গাম্ভীর্য ধারণ করিল। অনুতপ্ত শশাঙ্ক লাজে বিস্ময়ে অতৃপ্ত-নয়নে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। ব্রহ্মানন্দগিরি ব্যতীত অপর কেহই যুবতী ও শশাঙ্কের এই ভাব-বিনিময় লক্ষ্য করিলেন না। মহর্ষির মনে সন্দেহ হওয়ায় তিনি ধ্যানস্থ হইলেন। কিছুক্ষণ সকলে বিস্ময়-বিমুগ্ধ রহিবার পর রাজা রমণীকে জিজ্ঞাসা করিলেন--“আপনি কে এবং কোথা হইতে কি জন্য এখানে আসিয়া- ছেন ? আপনার অলােকসামান্য রূপ, অপ্সরানিন্দিত-কষ্ঠে জগন্মােহন সঙ্গীত ও অদ্ভুত ত বাণশিক্ষা দেখিয়া আমরা আপনাকে মানবী বলিয়া বিশ্বাস করিতে পারিতেছি না। আমার বােধ হইতেছে—আমা- দিগকে এই ক্ষেত্রে শিক্ষা দিবার জন্য আপনি ছলনা করিয়া এইরূপ রূপধারণ করিয়া আসিয়াছেন।” যুবতী।-মহারাজ, আমি যাদুকর; বহুদুর হইতে আসিয়াছি।
টীয়ানাকী । ৮৭ রাজা।-এ কথা বিশ্বাস করিতে সাহস হয় না। আপনার সঙ্গীত ও রূপলাবণ্য এবং বাণপ্রয়ােগশক্তি সাধারণ মানুষে সম্ভব না। যুবতী।-মহারাজ, অনর্থক আপনি আমার প্রশংসা করিতেছেন। মানুষে যাহা সম্ভবে না এরূপ অনেক কাজ অনেক মানুষ সাধারণের সম্মুখে করিয়া থাকে। রাজা.।-আপনি কোথা হইতে আসিয়াছেন ? যুবতী।-যাদুকরেরা নিজেদের বাড়ীর কথা বলে না। রাজা-আপনি কি চান ? যুবতী।আপনাদের সম্মুখে যাদুবিদ্যা দেখাইব। রাজা। আপনি বড় অসময়ে আসিয়াছেন। যুবতী।-অসময় কি মহারাজ ? আমার পক্ষে এর চেয়ে বেশী সুসময় আর হইবে না। এক সভায় সমস্ত প্রজাগণ ও রাজাগণ উপ- স্থিত ; এবং যিনি এইস্থানে আজ এই সভানিবেশের মূল, তিনিও যাদুবিদ্যায় সিদ্ধহস্ত। যাদুর পরিণামে যে সভার উৎপত্তি, সে সভা কি যাদুবিদ্যা প্রদর্শনের উপযুক্ত ক্ষেত্র নয় ? রাজা।--আপনার কথার অর্থ বুঝিতেছি না। কোন্ যাদুকর এই সভার উৎপত্তির মূল ? যুবতী।-আমি যাদুবিদ্যা দেখাইতে আরম্ভ করিলে তিনি আপনা হইতেই আপনাদিগকে দর্শন দিবেন। মহর্ষি ব্ৰহ্মানন্দ কিছুক্ষণ পরেই ঈষৎ হাস্য করিয়া চক্ষু মেলিয়া গাম্ভীৰ্য্য ধারণ করিলেন অতঃপর সভাস্থ সকলের অনুরােধে রাজা রমণীকে তাহার যাদু- বিদ্যা দেখাইতে বলিলেন। রমণী প্রথমে বলিতে আরম্ভ করিল— “কোন এক দ্বীপে এক রাজা বাস করিতেন। কিছুদিন পরে টীয়ানাকী। দৈবক্রমে তাহার রাজ্য রাক্ষসের হাতে যায়। রাক্ষসেরা রাজ্য দখল করার পর রাজাকে বধ করিয়া রাজকুমারকে রাজত্ব দান করতঃ তথায় বাস করিতে থাকে। রাজকুমার তখন বিবাহিত ছিল। কালক্রমে রাজকুমারের একটী কন্যা জন্মে। কন্যার বয়স যখন ৮৯ বৎসর তখন নব রাজার মৃত্যু হয়। রাণী সহমরণ গমন করেন। রাক্ষসেরা তখন রাজকুমারীকে রাজত্ব দান করিয়া লালন পালন করিতে থাকে। রাজ- কুমারী এই অল্প বয়সেই পিতার নিকট অনেক প্রকার বিদ্যা শিক্ষা করে, রাক্ষসদের কাছেও নানাপ্রকার রাক্ষসী বিদ্যা শিখিয়া লয় এবং পরম আদরে ও সম্মানে তথায় বাস করিয়া পিতার অমূল্য সম্পত্তি ভােগ করিতে থাকে। ঐ রাজ্যের সর্বাপেক্ষা প্রাচীনা বুড়ী রাক্ষসীকে অন্য সকল রাক্ষ- সীরা ভয় ও সম্মান করিত। বুড়ীর এক কন্যা ছিল তাহার নাম “টীয়ানাকী”। ঘটনাক্রমে টীয়ানাকী রাজ্য হইতে বাহির হইয়া বহু স্থানে বহু অত্যাচার করিয়া পরিশেষে এক পরমা সুন্দরী যুবতীরূপে এক মনুষ্য রাজার পত্নীরূপে গৃহীত হইয়া রাজ্যের রাণী হইয়া 'অসহ অত্যাচার করিতে আরম্ভ করে।” এই পর্যন্ত বলা হইলে রাণী যবনিকার অন্তরাল হইতে বাহিরে আসিয়া রাজাকে অনুনয় করিয়া বলিলেন-“মহারাজ, এ যাদুবিদ্যা দেখাইবার স্থান নয়। ইহাকে আপনি বিদায় করিয়া দিয়া যে কাজের জন্য সভা করিয়াছেন তাহা শেষ করুন।” রাজা এবারে একটু বিরক্তির সহিত বলিলেন—“রাণী, এ রাজ- সভা। তুমি যবনিকার অন্তরালে গমন কর। তােমার নিমিত্ত আমি পদে পদে লােকের নিকট অপদস্থ হইতেছি।” রাণী।--দি আমি বাস্তবিকই আপনার বিরক্তির কারণ হইয়া টীয়ানাকী। •• থাকি, তাহা হইলে আমাকে দূর করিয়া দিন। আপনি আমাকে অনুগ্রহপূর্বক এই রাজ্য দান করিয়াছিলেন । কিন্তু, আমি আপনার রাজ্য চাই না। আমি আপনার নিকট বিদায় চাই। শশাঙ্ক। আমি চাই বিচার। আমার নামে মিথ্যা কথা প্রচার করিয়া যিনি এত গােলযােগ করিলেন তাঁহাকে বিদায় দেওয়ার পূর্বে তাঁহার অপরাধের বিচার হওয়ার দরকার। : যাদুকর-রমণী তখন রাজাকে সম্বােধন করিয়া বলিল—“মহা- রাজ, যদি আপনাদের শুনিবার ইচ্ছা না থাকে, তবে আমাকে বিদায় দিন। রাণী যাহা চাহিতেছেন ও ইনি যাহা চাহিতেছেন আমার যাদু দেখান শেষ হইলে ইহার উভয়েরই বিচার হইতে পারিবে। কিন্তু আমি যতক্ষণে কথা শেষ না করিব ততক্ষণে আপনি ব্যতীত কেহ কোনও কথা বলিলে আমি তৎক্ষণাৎ চলিয়া যাইব।” রাজা সকলকে সাবধান করিয়া দিলেন; এবং তাহার অনুমতি ক্রমে রমণী আবার বলিতে লাগিল :- “রাজা এই যুবতীর মােহে গর্ভবতী স্ত্রী ও অপর রাণীর চক্ষু উৎ- পাটন করিয়া তাহাদিগকে রাজ্য হইতে দূর করিয়া দেন।” রাজা বিস্ফারিতনেত্রে রমণীর মুখের দিকে চাহিয়া অাবেগকম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিয়া ফেলিলেন—“তারপর ? তাহারা কোথায় গেল ? ” রমণী।—“তাহারা রাজ্যের বাহিরে বহুদূরে এক সাধুর আশ্রয়ে বাস করিতে থাকেন। সময়ে গর্ভবতী রাণীর একটী পুত্র জন্মে। পুত্র বড় হইয়া পিতার রাজ্যে দীনবেশে ছােট চাকরীতে প্রবেশ করে, এবং রাজ্যের অনেক মঙ্গলসাধন করিয়া এবং রাণীর মিথ্যা অসাধ্য ব্যাধির ঔষধ আনিতে প্রাণান্ত পরিশ্রম করতঃ রাণীর টীয়ানাকী । প্রাণ রক্ষা করিয়া পুরস্কারস্বরূপ অর্ধরাজ্য প্রাপ্ত হইয়াও পরিশেষে রাণীর প্রতারণায় বঞ্চিত হইয়া মিথ্যা অপবাদচক্রান্তে রাজার নিকট বিচারে প্রাণদণ্ডের আদেশ প্রাপ্ত হয়। রাক্ষস-রাণীর অবাধ অত্যা- চারের প্রবল বাধা বলিয়া তাহাকে মারিবার জন্যই রাক্ষসী বারম্বার ব্যারামের ভান করিয়া পিত্রালর সুবর্ণপুরী হইতে নানা অসাধ্য পদার্থ আনিতে প্রেরণ করে ; কিন্তু দৈববলে সে প্রতি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। পরিশেষে রাক্ষসী আর উপায় না দেখিয়া চক্রান্ত করিয়া রাজার ভগ্নীর সহিত তাহাকে একগৃহে আবদ্ধ করিয়া রাজাকে ডাকিয়া দেখাইয়া অপরাধী বলিয়া প্রাণদণ্ডের আদেশ প্রদান করায়। যখন ঐ বালক শেষবার সুবর্ণপুর গমন করে, তখন সন্ধান পাইয়া অমানুষিক শক্তি- বলে সকল রাক্ষসগণকে বধ করিয়া তত্রস্থ পূর্বোক্ত রাজকুমারীর পাণি গ্রহণ করে। যে কোনও কারণেই হউক যুবক ফিরিবার সময়ে রাজ কুমারীকে সঙ্গে আনিতে অস্বীকৃত হয়। রাজকুমারী আপন যথাসর্বস্ব তাহার সহিত পাঠাইয়া দিয়া শুদ্ধ একটী জিনিষ লইয়া যুবকের নিকট হইতে বিদায় নেয়। যে কোনও প্রকারেই হউক সেই অদ্ভুত জিনিষটী আমি রাজকুমারীর নিকট হইতে আনিয়াছি ; এবং এখন তাহার সাহায্যে অদ্ভুত যাদু প্রদর্শন করিব। কিন্তু, আমার প্রার্থনা আপনারা আমার ক্রীড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপন আসন পরিত্যাগ করিতে পারিবেন না এবং এই জনতা সরাইয়া দিয়া আমার নিমিত্ত প্রশস্ততর স্থান করিয়া দিতে হইবে।” রাজা রমণীর উক্তি কিছুক্ষণ শুনিয়াই সিংহাসন হইতে উঠিয়া তদবধি ইতস্ততঃ পদচারণা করিতেছিলেন, আর তাহার কপােল বাহিয়া অজস্র ধারায় অশ্রু বিনির্গত হইতেছিল। তিনি কাতর সন্দিগ্ধ নয়নে বারদার শশাঙ্ক ও ব্ৰহ্মানন্দগিরির দিকে দৃষ্টিপাত করিতেছিলেন টীয়ানাকী তত্রস্থ অন্য সকলে চিত্ৰপুত্তিলিকার ন্যায় অবস্থান করিয়া রমণীর গল্প শুনিতেছিল। রমণীর উক্তি শেষ হওয়া মাত্রই রাজা অন্যমনস্কভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন—“মা, তুমি বলিতে পার তাহারা এখন কোথায় ?” রাজার কথা শেষ হইতে না হইতেই রাণী বেগে ছুটিয়া আসিয়া রমণীকে বলিলেন—“তােমার যাদু দেখাইতে হইবে না। তুমি এখনই এ স্থান পরিত্যাগ কর। নতুবা আমি নিজ হস্তে তােমার কণ্ঠচ্ছেদন করিব।” রমণী হাসিয়া বলিল—“মহারাজ, আপনার রাণী অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়াছেন। সভায় এত লোেক থাকিতে আমার শিরচ্ছেদন করিবার নিমিত্ত তিনি এত উন্মত্ত কেন একবার জিজ্ঞাসা করুন ত ?” রাজা।আর জিজ্ঞাসা করিবার প্রয়োজন নাই। তুমি তােমার কাজ কর। রাণী, আমাকে কর্তব্য সাধন করিতে দেও। রাণী।—তােমার কর্তব্যে আমি পদাঘাত করি। আমি এখনই এই ডাকিনীকে এস্থান হইতে দূর করিয়া দিয়া তবে শান্ত হইব। রমণী।—ত পারিবে ত ? মহারাজ ও সভাসদগণ, আপনার সতর্ক হইয়া নিজ নিজ আসনে উপবেশন করুন ; আর আমার নিকটবর্তী স্থানে কেহ আসিবেন না। আমি যে অদ্ভুত যাদুবিদ্যা দেখাইব—তাহাতে আমাকেও সতর্ক হইতে হইবে। রাণী।—পিশাচী, আমার আজ্ঞায় অবহেলা ? রমণী আবার হাসিয়া রাণীর মুখের দিকে চাহিবামাত্র রাণী হস্তস্থিত অঙ্গুরীয়কটী তাহার চক্ষের সম্মুখে ধরিতেই-রমণী বিন্দুমাত্র বিচলিত হইয়াই বামহস্তের অঙ্গুরীয়কটী রাণীর চক্ষের সম্মুখে ধরিবামাত্র রাণী চীৎকার করিয়া দূরে সরিয়া গেলেন। রমণী হাসিয়া বলিল-- “মহারাজ, এই. আমার যাদু আরম্ভ। আপনার রাণীর আর এখন ৯২ ক টীয়ানাকী। im যবনিকার অন্তরালে ফিরিয়া যাইবার প্রয়ােজন হইবে না। উহাকে এই প্রকাশ্য সভায় এক মুহূর্ত অবস্থান করিতে দিন। কারণ, আমার যাদুর ক্রিয়া উপস্থিত তাহারই উপর চলিবে। আপনারা সকলে সাবধান হউন।” এই বলিয়া রমণী সহসা বাপিটীর মুখ খুলিয়া একটী টীয়াপাখী বাহির করিয়া সকলের সম্মুখে ধরিয়া বলিল—“যে জিনিষটী লইয়া সুবর্ণপুরের রাজকুমারী যুবকের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করে, এই সেই অদ্ভুত জিনিষ।” পাখীটীকে দেখিবামাত্র রাণীর প্রাণ পাগল হইয়া উঠিল। তিনি উন্মাদিনীর ন্যায় বলিয়া উঠিলেন— “মহারাজ, ঐ পাখীটীকে এখনই আমি চাই ; নতুবা আমার প্রাণ যাইবে।” পাখী দেখিয়া শশাঙ্কের আর আনন্দের সীমা রহিল না। সহসা সন্ন্যাসী ঠাকুরের সেই “প্রয়ােজনের সময়ে পাইবে” কথাটী তাহার মনে পড়িল। এতদিন পরে তাহার চিত্ত হইতে এক দারুণ হতাশ ও সন্দেহ দূর হইল। শশাঙ্ক সহসা রাণীর কথার উত্তরে বলিয়া ফেলিল- “আর রাজাকে বিরক্ত কর কেন ? এতদিনে রাজার ও রাজ্যের যথেষ্ট উপকার করিয়াছ ; কিন্তু এই শেষ। রাণী তখন ভীষণ রাক্ষসী মূর্তি ধারণ করিয়া রমণীকে গ্রাস করিতে উদ্যত হইলে, রাজা ও অনুচরবর্গ প্রভৃতি অস্ত্রশস্ত্র লইয়া আত্মরক্ষায় প্রস্তুত হইলেন। রাজা চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন—“সকলে রমণীকে রাক্ষসীর গ্রাস হইতে বঁাচাও।” রমণী বিকট হাস্য করিয়া বলিয়া উঠিল-“মহারাজ, স্থির হউন, রাক্ষসী আমার কোনও অনিষ্ট করিতে পারিবে না ।” এই বলিয়া পাখীটীর পা দুইখানি ছিড়িয়া ফেলিবামাত্রই রাক্ষসীর দুইখানি পা ছিড়িয়া গেল। তখন সে হাতে ভর করিয়া রমণীর দিকে অগ্রসর minn ? টীয়ানাকী। ৯৩ nnnnnnnnnnnnnn হইতে লাগিলে-রমণী পাখীটীর দুইখানি ডানা ছিড়িয়া ফেলিবামাত্র রাক্ষসীর হাত দুইখানি ছিড়িয়া গেল। তথাপি রাক্ষসী বুকে ভর দিয়া অগ্রসর হইতে লাগিল। তখন রমণী সত্বর পাখীটীর গলা ছিড়িয়া ফেলিবামাত্র রাক্ষসী ভীষণ চীৎকার করিয়া প্রাণত্যাগ করিল। রাজা ভয়ে বিস্ময়ে “হায়, হায়, কি হইল ! কি হইল !” বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিলেন। রাক্ষসীই হউক, আর যাহাই হউক, এতদিন যাহাকে লইয়া সংসার করা হইয়াছে তাহার প্রতি মায়া না জন্মিষ। পারে না। সকলের চেষ্টায় রাজা একটু প্রকৃতিস্থ হইয়া বলিয়া উঠিলেন-“বাস্তবিকই আমি এতদিন রাক্ষসীর মােহে মুগ্ধ ছিলাম রমণী, তুমি যে ইতিহাসের অবতারণা করিয়া রাক্ষস-রাণীর প্রাণ বধ করিলে সেই ইতিহাস আবার আমাকে বল ! সেত আমারই জীবনের অভিনয় বলিয়া বােধ হইতেছে !! আমিই ত নিষ্ঠুরের মতন রাক্ষসীর মােহে মুগ্ধ হইয়া প্রাণপ্রিয় পত্নীদ্বয়ের চক্ষু উৎপাটন করিয়া তাহাদিগকে রাজ্যের বাহির করিয়া দিয়াছিলাম !!! শশাঙ্ক, তুমিই কি সেই দুঃখি- নীর সন্তান ?” শশাঙ্ক ছুটিয়া আসিয়া পিতার পদতলে পতিত হইয়া বলিল—“বাবা, এতদিন আত্মগােপন করিয়া আপনার রাজ্যের নিমিত্ত প্রাণ সমর্পণ করিয়া দিয়া সমগ্র প্রজার প্রাণ-স্বরূপ হইয়া রাক্ষসীর অত্যাচার হইতে দেশ রক্ষা করিয়া যে হতভাগ্য আপনার আদেশে তুষানলে দগ্ধ হইতে গিয়াও গুরুবলে ও ধৰ্ম্মবলে পাপের বিনাশ ও ধৰ্ম্মের পবিত্রতার আধিপত্য দর্শন করিতে সমর্থ হইয়াছে—এই আপনার সেই হতভাগ্য বন-বাসিনীর গর্ভজাত একমাত্র সন্তান !” শশাঙ্ককে বুকে করিয়া অশ্রুবিসৰ্জন করিতেছেন-এমন সময়ে তাঁহার বন-নিবাসিনী পত্নীয় আসিয়া তাহাকে প্রণিপাত করতঃ অবগুণ্ঠন উন্মোচন করিয়া বলিলেন-“মহারাজ, এই আপনার প্রতাভিতা পত্নী- ৯৪ টীয়ানাকী । দ্বয় ! আপনার ঔরসজাত পুত্রের কৰ্ম্মবলে আমরা আবার আমাদের বিনষ্ট চক্ষু ফিরাইয়া পাইয়াছি, তাই আজ আপনার চরণ দর্শনে সমর্থ হইলাম। মহারাজ, এই আপনার পুত্র আপনাকে সমর্পণ করিলাম ; এখন আমাদিগকে বিদায় দান করুন। যে রাজ্য হইতে বিতাড়িত হইয়াছি, সে রাজ্যে আর বাস করিব না। যে প্রণয়িণীর মােহে মুগ্ধ হইয়া আপনি একমাত্র পুত্রকেও বিনাশ করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন-- যদি আপনি তাহাকে ফিরাইয়া চান, আপনার পুত্র এখনই তাহাকে বাঁচাইয়া দিতে পারে। এমন পুত্রের মা হইয়া আজ আমরা ধন্য হইয়াছি। মহারাজ, এই আপনার রত্ন আপনি গ্রহণ করুন ; আমরা বিদায় গ্রহণ করিলাম ” রাজা শশাঙ্ককে ছাড়িয়া দ্রুত গমনে দুই হাতে দুই পত্নীর দুই কর ধারণ করতঃ বলিলেন—“তােমরা আমার অপরাধ ক্ষমা কর।” যে রমণী যাদুবিদ্যা দেখাইতে ছিল, সে ইত্যবসরে শশাঙ্কের সহিত দুই একটী কথা বিনিময় করিয়াই রাজা পত্নীদ্বয়কে লইয়া ফিরিবামাত্র তাহাদের তিন জনকে প্রণাম করতঃ সলজ্জ ভাবে রাজাকে বলিল—“মহারাজ, আমাকে পুরস্কার দান করিয়া বিদায় করুন ; আমার অন্যত্র যাইতে হইবে।” রাজা।—আপনি আজ আমাকে যাহা দান করিলেন তাহার বিনি- ময়ে আপনাকে কি দিয়া পরিতৃপ্ত হইব ভাবিয়া পাইতেছি না। আপনাকে আমার কিছুই অদেয় নাই। কিন্তু, আপনার কাৰ্য্য এখনও শেষ হয় নাই। যে সুবর্ণপূর রাজকুমারীর নিকট হইতে আপনি টীয়পাথীটী” আনিয়াছেন--তাহাকে আনিয়া দিতে হইবে। আর আপনার পরিচয় না পাইলে আমরা তৃপ্ত হইতে পারিতেছি না। রূপ ও এত শক্তি মানুষে অসম্ভব। আমাদের নানা প্রকার সন্দেহ হইতেছে।
টীয়ানাকী । N ~~~~ রমণী।-মহারাজ, ক্ষমা করুন ; আমি তাহা পারিব না। আপনারা তাহার অন্য বন্দোবস্ত করুন। না হয় যিনি একবার তাহার সন্ধান করিয়াছিলেন তাঁহাকেই অনুমতি করুন। আমার পরিচয় আমি বিদায় পাইলে দিতে সম্মত নহি। রাজা কঠিন সমস্যায় পতিত হইয়া রাণীদের মুখের দিকে চাহিলেন ; তাহারাও কোন উত্তর দিলেন না। শশাঙ্ক দুরে গম্ভীরভাবে দাঁড়াইয়া রহস্য দেখিতে লাগিল। মহর্ষি ব্রহ্মানন্দ তখন ধীরে ধীরে গাত্রোত্থান করিয়া শশাঙ্কের দক্ষিণ হস্ত ধারণ করতঃ রাজা ও রাণীদ্বয়ের সম্মুখে গমন করিয়া হাসিতে হাসিতে অপর হস্তে রমণীর হস্ত ধারণ করিয়া বলিলেন-“এই নেও, মা, তােমার পুরস্কার। যে পুরস্কারের জন্য এতদিন এত কষ্ট করিয়া সময়ে এস্থানে উপস্থিত হইয়াছ আজ ব্রহ্মানন্দ তােমাকে সেই পুরস্কার দান করিবার জন্যই এখানে আসিয়াছে। মহারাজ, আজ আমার বড় আনন্দের দিন। যে সুবর্ণপুর রাজকুমারীর সন্ধান করিতে- ছিলেন—এই সেই সুবর্ণপুর রাজকুমারী। আমার যতদূর জানা আছে তাহাতে একাধারে এত রূপ, গুণ, শক্তি, বুদ্ধি ও বীৰ্য্য বর্তমানে কোনও পুরুষ বা রমণীর নাই। আপনার শশাঙ্ক ব্যতীত ইহার উপযুক্ত পাত্র জগতে আর নাই। শশাঙ্ক, এই নেও তােমার জীবনের সম্বল।” শশাঙ্ক দক্ষিণকরে “সুরমার” কর ধারণ করিয়া প্রথমে গুরুদেবকে পরে পিতা ও মাতৃদ্বয়কে প্রণাম করিয়া দাঁড়াইল। যবনিকার অন্তরাল হইতে পুরনারীগণ আনন্দে হুলুধ্বনি দিয়া উঠিল। সভাস্থ ব্যক্তিবর্গ ও রাজ্যের সমবেত প্রজাগণের জয়ধ্বনি গগন মার্গ স্পর্শ করিল। আজ আর কাহারও মুখে আনন্দ ধরে না! আজ অচিন্ত্যপূর রাজ্য রাহুমুক্ত শশধরের ন্যায় হাসিতে লাগিল। রাজা সভা ভঙ্গ করিয়া পুত্র, পুত্রবধু ও পত্নীদ্বয়কে লইয়া গমন করিতে উদ্যত হইলে সুরমা করফোচ্ছে বিনীত ৯৬ টীয়ানাকী। inn ভাবে বলিল-“বাবা, সভাভঙ্গের পূর্বে সকলের সম্মুখে আমার মুখ দর্শনী দান করুন।” রাজা।—কি চাও, মা, বল ; এ রাজ্যের সবইতাে তােমার। শশাঙ্ক।-বাবা, আজ সকলের মুখেই হাসি ; কেবল পিসিমা নীরবে অশ্রুবর্ষণ করিতেছেন তাহা কি আপনার দেখা উচিত নয় ? তিনিআমার হাত ধরিয়া না নিয়া গেলে আমি ঘরে যাব না।” এতক্ষণ পরে অভাগিনী মনােরমার কথা রাজার মনে হইবামাত্র সহসা তাহার বদন বিবর্ণ হইল। তিনি ছুটিয়া গিয়া সভার এক প্রান্তে অবস্থিত রােরুদ্যমানা মনােরমাকে তুলিয়া বক্ষে ধারণ করতঃ কাদিতে দিতে বলিলেন—“প্রাণের ভগ্নী, আমায় ক্ষমা কর। আমি না বুঝিয়া তােকে যথেষ্ট কষ্ট দিয়াছি ও অপমান করিয়াছি! তুই আমার একমাত্র সহােদরা !” মনােরমা।-( চক্ষু মুছিতে মুছিতে) দাদা, তােমার দোষ কি ? দোষ আমার অদৃষ্টের !” রাজা অনেক অনুনয় বিনয় করিয়া মনাে- রমাকে লইয়া আসিলেন। রাণীরাও তাহাকে অনেক আদর যত্ন করিলেন। শশাঙ্ক ও সুরমা ভঁহাকে প্রণাম করিয়া পদধূলি গ্রহণ করিল। অতঃপর মনােরমা সুরমা শশাঙ্ক ও ভ্রাতৃবধুদ্বয়কে লইয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিল। রাজা সভাভঙ্গ করিলেন। ইহার কিছুদিন পরে রাজা শশাঙ্ককে রাজ্যাভিষিক্ত করিয়া সুখে সংসার করিতে লাগিলেন। মহর্ষি ব্রহ্মানন্দ শশাঙ্ককে রাজপদে সমাসীন দেখিয়া সকলকে আশীর্বাদ করতঃ স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। অল্পদিন পরেই অচিন্ত্যপূর রাজ্য ধৰ্ম্ম-রাজ্যে পরিণত হইয়া সকলের শীর্ষস্থান অধিকার করিল। সমাপ্ত। "
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.