Bally Sadharan Granthagar

Choto Bou

Pal, Sri Phanindranath · 2009/08/5

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

১৫
ছােট বউ
( গল্প )
শ্রীফণীন্দ্রনাথ পাল বি,
প্রণীত
১২
মূল্য ।• ছয় আনা।

প্রকাশক
শ্ৰহৃষীকেশ মিত্র
মিত্র কোং,
কর্ণওয়ালিস্ বিল্ডিং,
কলিকাতা।
কলিকাতা
৫১২ কিয়া ধ্রুট,
মণিকা প্রেসে
শ্রীহরিচরণ দে দ্বারা মুদ্রিত।

মা'র চরণে

No text on this page.

لی
6 0
ভূমিকা
এই বড় গল্পী যমুনা পত্রিকায় প্রকাশিত
হইয়াছিল—সম্প্রতি কয়েকজন বন্ধুর বিশেষ আগ্রহে
গল্পটা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইল।
আখ্যানভাগ সত্যঘটনামূলক।
২৩ রুট লেন
কলিকাতা।
১৩ই আশ্বিন ১৩২২

শ্ৰীযুক্ত ফণীন্দ্রনাথ পাল-প্রণীত
আর একখানি নূতন
গল্পের বই
সই-না
প্রকাশিত হইয়াছে।
ইহাতে সইমা, গৃহলক্ষী, অষ্টমীর সন্ধ্যা
প্রভৃতি নয়টি বড় গল্প আছে।
স্বর্ণাঙ্কিত সিল্কে বাঁধাই, আকারে প্রায়
২০০ শত পৃষ্ঠা।
মূল্য ১০ পাঁচ সিকা।
-
প্রাপ্তিস্থান :-
মিত্ৰ এণ্ড কোং
পুস্তকবিক্রেতা
কর্ণওয়ালিস বিল্ডিং, কলিকাতা

১৩৬ ছােট বউ প্রথম পরিচ্ছেদ ৩গবান দত্তের দুই সংসার। প্রথমটা দুই পুত্র ও এক কন্যা রাখিয়া বহুকাল চিতাবােহণ করিয়াছেন, অপরটি বৃদ্ধ দত্তজাকে শেষ সময়ে সাথী হীন করিয়া অল্পদিন হইল স্বপত্নীর অনুগত হইয়া- ছেন। দ্বিতীয় পক্ষের মাত্র একটা পুত্র-সন্তান। কিন্তু বৃদ্ধ ভগবান দত্তের নিকট এই শােক- সাগর উত্তীর্ণ হইবার উপযােগী প্রকৃষ্ট উপায় ও অবলম্বন ছিল। সেটা অর্থের প্রতি অতিরিক্ত

হােট বউ
অনুরাগ। যেদিন তাঁহার দ্বিতীয় পত্নী মায়া
কাটাইয়া পরপারে চলিয়া গেলেন, তাঁহার দিকে
একবারও ফিরিয়া চাহিলেন না, তাহার পরদিন
বৃদ্ধ তাহার নিভৃত শয়নকক্ষে প্রবেশ করিয়া দ্বার
রুদ্ধ করিয়া দিলেন, ভাল করিয়া চারিদিক দেখিয়া
লইলেন কোন বন্ধ পথ দিয়া ঘরের ভিতরটা দেখা
যায় কি না, শেষে নিশ্চিন্ত হইয়া লৌহসিন্দুক
উন্মােচন করিয়া কোম্পানীর কাগজ গুলি, নােটের
তাড়া, এবং নগদ টাকার থলি বাহির করিলেন,
এবং তাই নাড়াচাড়া করিয়া দিনটা বেশ সুখেই
কাটাইয়া দিলেন।
ইহার পর হইতে প্রতিদিন তিনি পাই পয়সা
হিসাব করিয়া দিনের খরচ তাহার বিধবা কন্যা
প্রমদার হস্তে অৰ্পণ করিতেন এবং সন্ধ্যাকালে কড়া-
ক্রান্তি পৰ্য্যন্ত হিসাব বুঝিয়া লইতেন।
তাহার তিনটি পুত্রেরই বিবাহ হইয়া গিয়াছিল।
প্রথমটীর বিবাহেও টাকা পাইয়াছিলেন, কিন্তু
তেমন কিছু নহে। হাজার দুই টাকার গহনা, নগদ

ছােট বউ
হাজার খানেক, তাহা ছাড়া বয়সজ্জাও ছিল।
আমরা যে সব বিখ্যাত কৃপণের গল্প শুনিয়াছি, এই
বৃদ্ধটি তাহাদেরই অন্যতম। তবে গল্পের কৃপণের
সহিত বৃদ্ধের পার্থক্য যে ছিল না এমন নহে। তিনি
পুত্রদের বিবাহ দিয়া যে নগদ টাকা পাইয়াছিলেন,
তাহার এক কপর্দকও নিজ সিন্দুকে জমা করেন
নাই, বা বাসগৃহ নির্মাণের ইট-কাঠ ক্রয় করিয়া
ফেলেন নাই। পুত্রদের বিবাহে প্রাপ্ত নগদ সমস্ত
টাকাই আয়ুবৃদ্ধনে ও বউভাতে ব্যয় করিয়াছেন।
দ্বিতীয় পুত্রের বিবাহ একজন বড়লোকের
ঘরেইহইয়াছিল। কন্যার পিতা নগদে ও গহনায়
দশ হাজার টাকা দিয়াছিলেন, তাহা ছাড়া মেয়ের
নামে বিশ হাজার টাকার কোম্পানির কাগজও
দান করিয়াছিলেন,এবং তিনি যত দিন বাঁচিয়াছিলেন,
ততদিন মেয়ে জামাইকে এক শত টাকা করিয়া
মাসহারা দিতেন, তাহার মৃত্যুর পরও সে মাসহার।
বন্ধ হয় নাই।
তাই ভগবান
দত্তের দ্বিতীয়
পুত্রবধুটী শ্বশুরের অন্নের কোন ধার ধারিতেন না।

ছােট বউ
কনিষ্ঠ পুত্রবধুটিও ধনীর কন্যা, কিন্তু ঠিক অত
বড় ধনীর নহে। সেও পিতার নিকট হইতে প্রতি
মাসেই হাত-খরচ বাবত কিছু কিছু পাইত। কখন ?
পঁচিশ, কখনও পঞ্চাশ এবং আবশ্যক হইলে সময়ে
এক শত টাকাও পাইত, কিন্তু মধ্যম পুত্রটির
মত অবশ্য তাহার পাকাপাকি একটা ব্যবস্থা ছিল
না। সেই কারণেই হউক, কিম্বা অন্য যে কারণই
থাকুক না কেন, ছােট বউ শ্বশুরের অন্নই পছন্দ
করিত।
জ্যেষ্ঠ পুত্র জগদীশের স্বাস্থ্য তেমন ভাল না
থাকায় প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবার পর সে
পড়া বন্ধ করিতে বাধ্য হয়, এবং পিতার সুপারিসে
সরকারের দপ্তরখানায় একটী কেরাণীর পদ প্রাপ্ত
হয়। পঁচিশ টাকার চাকরীতে বসিয়াছিল, এখন
তাহার পঞ্চাশ টাকা বেতন হইয়াছে।
মধ্যম জ্যোতিষচন্দ্র দুই বার ফেল হইয়া তিন
বারের বার দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায়
উত্তীর্ণ হয়। সে পরম সুন্দর, তাহার উন্নত বলিষ্ঠ

ছােট বউ
দেহ কঁচা সোনার বর্ণে উজ্জ্বল, তাহার এই
অসামান্য অঙ্গসৌষ্ঠব তাহাকে ঐ সময়ে ধনীর জামাতা
করিয়া দিল। সে পড়া বন্ধ করিল না; শ্বশুর,
বাড়ীতে মাষ্টার নিযুক্ত করিয়া দিলেন।
রকমে সে এক ধাক্কা সামলাইয়া দ্বিতীয়বারেই
তৃতীয় বিভাগে আই-এসসি পরীক্ষা পার হইল।
তাহার পর কলিকাতার এক নামজাদা কলেজের
প্রবেশের দ্বারীকে টাকা ও ননটের নৈবেদ্য
সাজাইয়া যােড়শােপচারে পূজা দিয়া দ্বিতীয় বিভাগে
উত্তীর্ণ বহু ছাত্র, এমন কি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ
দুই একটী ছাত্রকেও বিমুখ করিয়া স্ফীতবক্ষে
বিএসসি ক্লাশে প্রবিষ্ট হইল। দুই দুই বার অকৃত
কাৰ্য্য হইয়া এখনও সে সেইখানেই থামা খাইয়া
আছে।
কনিষ্ঠ পুত্র ক্ষিতীশচন্দ্র বয়সে অনেক ছােট
হইলেও, সে নিয়মমত দুইটী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া
তাহার মেজদাদাকে প্রায় ধরার মত করিয়াছে।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
সেদিন দুপুর বেলা বড় ও ছােট জা বাসন্তী ও
প্রমীলা খাইতে বসিয়াছিল, তাহাদের থালাব
সমুখে তিন চারিটি ক্ষুদ্র শিশু এটা খাব মা, ওটা
খাব মা বলিয়া কলরব করিতেছিল, অদূরে বসিয়া
প্রমদা নিজের ভাত বাড়িতেছিল, এমন সময় মেজ
বউ লাবণ্য আসিয়া সেখানে উপস্থিত হইল।
তাহার কোল হইতে দুই বৎসরের একটা শিশু
কেবলই পড়িয়া যাইবার মত হইতেছিল, লাবণ্য
তাহাকে বার বার তুলিতে চেষ্টা করিয়াও বােধ
হয় অনভ্যাসবশতঃ ঠিক মত কোলে করিতে
পারিতেছিল না, এবং অন্য হাতে দুধের বাটি থাকায়
সে একেবারে বিব্রত হইয়া পড়িতেছিল।
ছােট বউ প্রমীলা মেজ বউয়ের দুরবস্থা দেখিয়া
হাসিয়া ফেলিল। লাবণ্য গম্ভীর হইয়া অন্য দিকে
মুখ ফিরাইয়া লইল। প্রমীলা তাহা লক্ষ্য করিয়া

ছােট বউ
তেমনই হাসিয়া কহিল, “মেজদির দেচ আজ
আনদের মত দশা, ছেলে কোলে করতে হয়েছে-
হয়, বেহারা, তারা সব গেল কোথায় ? আবার
দুধের বাট ও হাতে করেছ, আজ ব্যাপারখানা কি ?”
লাবণ্য কোন উত্তর দিল না। স্থির হইয়া
সাইয়া রহিল। যখন-তখন ছােটবউয়ের এমনই
ঠে দেওয়া কথা তাহাকে একেবারে অতিষ্ট করিয়া
তুলিত, সেও সময় সময় কড়া কড়া উত্তর দিতে
ছাড়িত না, কিন্তু ছােটবউয়ের সহিত পারিয়া উঠিত
না বলিয়া অনেক সময় চুপ করিয়া যাইত।
প্রমীলা আবার কি বলিতে যাইতেছিল, বাসন্তী
বাধা দিয়া কহিল, “কি করিস্ প্রমীলা!”
প্রমীলা সে কথায় কান দিল না, তেমনই হাসিয়া
কহিল, “মেজদিদি বুঝি আমাদের সঙ্গে কথা বলবে
? তা বলবেই বা কেন, আমরা গরীবের মেয়ে !”
প্রমদার ততক্ষণে ভাত-বাড়া শেষ হইয়াছিল,
কিন্তু সে খাইতে বসিল না, ভাতকয়টা ঢাকা দিয়া
হাত ধুইয়া মেজ বউয়ের কাছে আসিয়া তাহার

ছােট বউ
কোল হইতে ছেলেটাকে নিজের কোলে তুলিয়া
লইয়া কহিল, “কি চাইগো মেজ বউদি তােমার ?
প্রমীলার হাড়-আলান কথায় লাবণ্য তখন
অন্তরের মধ্যে ফুলিতেছিল, তাই প্রমদার প্রশ্নের
কোন উত্তর না দিয়া কহিল, “তুমি শুনলে ত
ঠাকুরঝি, ছােটবউ কি না আমার বাপ তুলে গাল
দিলে। আমার বাপম ছােটবউয়ের বাপের কিছু
ধারত, যে তার মেয়ে আজ আমায় এমনই করে
শুনিয়ে দেবে। আমার বাবার পয়সা আছে, তাই
পাঁচটা দাসী-চাকর রেখে দিয়েছেন, তাতে আর
পাচ জনের কি, তারা কেন হিংসেয় বুক ফেটে
মরে।
প্রমা কহিল, “সত্যি ছােটবউ তােমার এ
ভারি অন্যায়, ও কি রকম কথা, হাজার হােক
ও বয়সে বড়, মাঝে বড়, তার কি না বাপ মা তুলে
কথা বলা।
প্রমীলার একটা মস্ত গুণ ছিল সে নিজে
কিছুতেই রাগিত না, এবং হাসিটি সব সময় তাহার

ছােট বউ মুখে লাগিয়া থাকিত। সে হাসিয়া কহিল, “আচ্ছ। ঠাকুরঝি, মেজদিদির কাছে না হয় তার জন্যে ঘাট মানচি, তা ছাড়া শােধবােধও ত হয়ে গেছে, মেজ- দিদিও ত আর আমার বাবাকে বাদ দিয়ে কথা বলেন নি, তা বাবাও ত আর ও সব শুনতে আসছেন , আর শুনলেই বা কি, অমন ঢের লােক ঢের কথা বলে থাকে। তা কি বল মেজদি, এতেই হবে, না, ভাত ফেলে উঠে পায় ধরতে হবে ?” লাবণ্য কুপিত হইয়া কহিল, “ঢের হয়েছে, আর অততে কাজ নেই। প্রমীলা কহিল, “আমাদের ভাগ্য ভাল যে মেজদি এতক্ষণে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে। বাসন্তী লাবণ্যকে সম্বােধন করিয়া কহিল, লাবণ্য! তুমি ভাই ওর কথায় কাণ দিও না, ওর কেমন ঐ রকম স্বভাব, ও সবাইকে খুব ভালও বাসে, আবার জ্বালাতনও করে। লাবণ্য উত্তর করিল, “তা আমি খুব জানি, তােমাকে দিদি আর সে জন্যে ওকালতি করতে ১৭

ছােট বউ
'বে না, লােকের মধ্যে দেখতে পাই শুধু ও
আমার পেছনেই লাগে, আর ঠাকুরঝি,-আমার
উপর তার টান আছে বলে, সময়ে সময়ে তাকে
জ্বালায়, কই তােমার পেছনে ত ও একদিনও
লাগে না।”
বাসন্তী চুপ করিয়া গেল। বুঝিল তাহার কথা
বলা ভাল হয় নাই। প্রমীলা কাহারও কোন কথা
কখনও গায়ে মাখিত না, তাই সেই রকম হাসিয়াই
কহিল, “এ মেজদিদি তুমি আর বুঝতে পারলে
, দিদির যে তােমার মত পয়সাকড়ি নেই,
পাঁচটা বেয়ারাও নেই, কি, দশটা ঝিও নেই,
তা ওর ওপর আর হিংসে করে কি করব
বল।”
লাবণ্যের শিশু পুত্ৰটী তখন তাহার পিসিমার
কোল হইতে নামিবার জন্য ছটফট করিতেছিল।
তাহার অনতিদূরেই তাহারই মত তিন চারিটী শিশু
মাছ-ভাজা লইয়া কাড়াকাড়ি করিয়া খাইতেছিল
তাহা দেখিয়া সেও তাহাদের সহিত যােগ দিবার
১৮

ছোট বউ
জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল। বলিতেছিল, আমি
খাব।
প্রমীলা তাড়াতাড়ি উঠিয়া তাহাকে নিজের
কোলে তুলিয়া লইয়া আবার স্বস্থানে ফিরিয়া
গিয়া খানিকটা মাছ-ভাজা ভাঙ্গিয়া তাহার মুখের
মঞ্চে পুরিয়া দিল। শিশু মহানন্দে তাহা খাইতে
লাগিল।
লাবণ্য বিরক্তিভরে কহিল, “অত আদরে কাজ
নেই, ঢের হয়েছে, তােমাদের ছেলেদের মত ওর ত
অমন রাক্ষুসে দশা হয় নি যে, ও যা পাবে, তাই
গিলবে ; হরলিক্স, আর খাটি দুধ ছাড়া ও কিছু খায়
, ওর মুখে ও সব দিয়ো না।”
অন্য কেহ হইলে হয় ত রাগ করিয়া শিশুটিকে
কোল হইতে নামাইয়া দিত, কিন্তু প্রমীলা সে দিক
দিয়া গেল না, সে যেন লাবণ্যের কথা শুনিতেই
পায় নাই এমনই ভাব দেখাইয়া, থােকাকে এটা,
সেটা, আরও পাঁচটা খাওয়াইতে লাগিল, তার পর
লাবণ্যর দিকে সহাস্যদৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া কহিল,
;
৩

ছােট বউ "মেজদি, তােমার কোন ভয় নেই, থােকার আমার কোন অসুখ করবে না। ও যে আমা দের বাড়ীর ছেলে, ওর ওপর ত আমার কোন হিংসে থাকতে পারে না, তাহার পর খােকাবাবু দিকে চাহিয়া কহিল, “কি বলিস রে ফেলু?” ফেলুর তখন মুখের জিনিষ ফুরাইয়া আসিয়াছিল, সে তাহার আধ-ফোটা ভাষায় উত্তর করিল, “মাংক খাব, মাংক। প্রমীলা হাসিয়া কহিল, “মাংস কোথায় পাবরে, বলিয়া আর খানিকটা মাছ ভাঙ্গিয়া তাহাকে খাইতে দিল। তাহার পর লাবণ্যর দিকে ফিরিয়া আবার কহিল, “দেখ মেজদি! তুমিই যে, শুধু হরলিক্স দুধ খাওয়াও তা নয়, দিদির ছেলেরাও- বলিতে বলিতে সহসা সে থামিয়া গেল। তাহার পর একটা নবাগতা মহিলাকে সম্বােধন করিয়া কহিল, “এত দুপুর বন্দরে এসেছেন? ঠাকুরঝি ভাই, আসনখানা ওঁকে টেনে দেবে, আমার কোলে ছেলে রয়েছে।

ছোট বউ প্রমদা আসনখানি আগাইয়া দিল। মহিলাটি বসিয়া অঞ্চল প্রান্তে মুখের ঘাম মুছিয়া উত্তর করিল, “না বেরুলে চলবে কি করে দিদি, পাঁচ- দোরে না ঘুরলে ত আর মেয়েটাকে পার করতে পারব না, তােমাদেরই পাঁচ জনের দয়ায় যদি মেয়েটা উদ্ধার হয়ে যায়।” প্রমীলা তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করিল, পাত্তর ঠিক হয়ে গেছে ত?” মহিলা কহিল, হাঁ দিদি তােমাদের দয়ায় এক রকম ঠিক হয়েছে।” •প্রমীলা প্রীতিপূর্ণ স্বরে কহিল, “ত। বেশ হয়েছে, পাত্রটা কি করে? মহিলাটি কহিল, কোন আপিসে ২০, কুড়ি টাকা মাইনের কি চাকরি করে, কাছেই দেশ-ঘর, জমি- জমাও কিছু আছে, তাতে খাওয়া-পরা এক রকম চলে যায়, আমরা গরীব-মানুষ, আমাদের ঐ ঢের।” প্রমীলা কহিল, “আহা খেয়ে পরে সুখে থাক, কত দিতে হবে?”

ছােট বড়
চলে যায়,
সে কহিল, “ছেলেটী বড় ভাল, সে বলেছে,
এক পয়সাও দিতে হবে না, শুধু শাখা আর সিঁদুর,
তাতেই দিদি হিসেব করে দেখলাম এক শ টাকার
কমে ত কিছুতেই হয় না। ছ’ মাস ধরে ভিক্ষে-
সিক্ষে করে পঁচাত্তর টি টাকা জোগাড় করেচি আর
পঁচিশটা টাকা হলেই এক রকম
তােমাদের এখানে যা পাই, তার পর এ দুদিন
এবাড়ী সেবাড়ী ঘুরে দেখি, যা জোগাড় করতে
পারি।”
প্রমীলা কহিল, “আপনার অনেক কাজ, আর
বসিয়ে রাখব না।” সেদিন সকাল বেলা সে তাহার
পিতার কাছে টাকা চাহিয়া পাঠাইয়াছিল, এই
মাত্র দর ওয়ান আসিয়া সেই টাকাগুলি দিয়া গিয়াছে,
সেগুলি তখন পিড়ির পাশেই ছিল। তাহ।
হইতে পাঁচটা টাকা তুলিয়া রমণীটির হাতে দিয়া
কহিল, “এ কিন্তু আমার বড় দিদিমণি দিলেন।”
রমণী হাত পাতিয়া টাকা কয়টি লইয়া মহাখুসী
হইয়া বলিল, “এই আমার ঢের হয়েছে, সবাই
२२

ছােট বউ দ একটা করেও টাকা দিত, তা হ'লে কৰে আমার এক শ টাকা জোগাড় হয়ে যেত। প্রমীলা তথন লাবণ্যর দিকে চাহিয়া বলিল, 'মেজদি তােমার টাকা? লাবণ্য মুখখানি ভারি করিয়া কহিল, “তােমা- দের টাকা বেশী, তােমর দাও, আমার অমন দান করবার মত টাকা নেই।” গত রমণটি অপ্রস্তুতের মত কহিল, “ওঁকে আবার কেন বিরক্ত করচ দিদ, তােমার দিদি দিয়েছেন ত, ঐ সবারই দেওয়া হল।” প্রমীলা কহিল, “না না তা কি হয়, মেজ- দিদির কথায় আপনি কিছু মনে করবেন না। উনি যা দেবার তা আগেই দিয়ে রেখেছেন, ওঁর নাম করতে বারণ করেছিলেন, তাই নাম করতে অমন চটে গেছেন, বলিয়া একখানি দশ টাকার নােট তুলিয়া লইয়া মহিলাটির হাতে দিয়া কহিল, “এই দশ টাকা কিন্তু মেজদিদির।” রমণী অবাক হইয়া প্রমীলার মুখপানে চাহিয়া

ছােট বউ
রহিল। এত টাকা ! তাহার একবার মনে হইল
গরীব বলিয়া কি ইহারা সব তাহার সহিত উপহাস
করিতেছে। দিয়া হয় ত আবার কাড়িয়া লইবে :
কত বড়লােক আত্মীয়ের বাড়ীতে সে আজ ছয়
মাস ঘুরিতেছে, পাঁচ দিন না ফিরাইয়া ত কেহ
কিছুই দেয় নাই, তা কোথাও এক সঙ্গে দুই
টাকার বেণী সে পায় নাই। তাই পাঁচ টাকা
পাইয়া সে পূর্বে বিস্মিত হইয়াছিল, এখন দশ
টাকার এই নােটখনি কোন্ ভরসায় সে হাতে
তুলিয়া লইবে ।
প্রমীলা আবার দশ টাকার আর একপানি
নােট তাহার হাতে দিয়া কহিল, এর মধ্যে পাঁচ
টাকা আমাদের ঠাকুরঝির বাকি পাঁচটা সম্বন্ধে
প্রমীলা আর কিছু কহিল না।
রমণী আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না,
মুখ ফুটিয়া বলিয়া ফেলিল, “গরীব ব'লে কি
তােমরা আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছ?” লাবণ্যরও
ঠিক এই কথা মনে হইতেছিল,-প্রমীলা যেমন
২৪

ছােট বউ
তাহার পিছনে লাগে এ মহিলাটির সঙ্গেও ঠিক
তেমনই রঙ্গ করিতেছে, না হইলে এক কথায়
অমনই পচিশ টাকা দিয়া ফেলিল।
এমন কি
ও টাকার মানুষ!
রমণীর কথায় প্রমীলার নয়নপল্লব আর্দ্র হইয়া
উঠিল! দরিদ্রের সহিত সে উপহাস করিবে।
পচিশটা টাকা বই ত নয় ! সেই মহিলাটির পানে
অশ্রু-উচ্ছসিত নয়নে চাহিয়া কহিল, “দিদি
আশীৰ্বা করুন, যেন অমন মতি আমার কোন
দিন না হয়।” বলিতে বলিতে তাহার বড় বড়
চোখ দুইটী হইতে কয়েক ফোটা তপ্ত অশ্রু গড়াইয়া
পড়িল । মহিলাটিও সত্যই এবার বিষম লজ্জিত
হইয়া উঠিল।
সে খানিকক্ষণ নিঃশব্দে প্রমীলার
মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। চাহিয়া চাহিয়া গভীর
কৃতজ্ঞতায় তাহারও নয়নযুগল অশ্রু-প্লাবিত হইয়া
অঞ্চল দিয়া অশ্রু মুছিতে মুছিতে সে
কহিল, “ভগবান তােমাদের সুখে রাখুন।” আর
বেশ কিছু সে বলিতে পারিল না।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ
বাড়ীর পাশেই মাঠ। ছেলেরা বৈকাল বেলা
সেই মাঠে বেড়াইত। বড়বউ ছেলেদের এক এক
করিয়া গা মুছাইয়া কাপড় জামা পরাইয়া দিতেছিল,
এমন সময় প্রমীলা তাহার পুত্র গৌরচন্দ্রকে লইয়া
সেখানে উপস্থিত হইল। বড়বউ মুখ তুলিয়া
চাহিয়া দেখিয়া বলিল, “আজ আবার ঐ জামা জুতো
পরিয়ে এনেচি যে? মা (বড়বউ প্রমীলার মাকে
মা বলিয়া ডাকিত) কাল যে নূতন জামা জুতো
পাঠিয়ে দিলেন, তা কই ?”
প্রমীলা কহিল, “সে তুলে রেখে দিয়েচি।”
বড়বউ কহিল, “বেশ করিচি। মার বাকে
জায়গা ছিল না, তাই বুঝি তােকে তুলে রাখতে
দিয়েছেন? তাের সব তাতেই বাড়াবাড়ি, যা বের
করে নিয়ে আয়, তাের পরাতে হবে না।”
প্রমীলা কহিল, “তা হবে না দিদি! তােমার
দুটি পায়ে পড়ি ; বাড়ীর আর পাঁচজন ছেলের

ছােট বউ এই মৌখিক দৃশ্যতঃ ভেতর আমার ছেলেটী যে সঙ সেজে বেড়াবে, তা কিছুতেই হতে পারে না।” বড়বউ হাসিয়া কহিল, “তাের যা খুসী কর্। ততার সঙ্গে ত আর পাব না, তুই যা ধবি, তা করে ত ছাড়বি নি।* এই মৌখিক তিরস্কারের অন্তরালে কতখানি আন্তরিক আশীৰ্বাদ ও আনন্দ প্রচ্ছন্ন ছিল, বড়বউয়ের ঐটুকু মৃদু হাসিতে তাহা সম্যক্ প্রকাশ পাইয়াছিল। একদিন সকালবেলা মেজবউ ছােটবউয়ের সঙ্গে খুব ঝগড়া করিয়াছিল। অবশ্য ঝগড়াটি মেজ- বউ একলাই পাকাইয়া তুলিয়াছিল, ছােটবউ তাহাতে যােগ দেয় নাই। মেজবউ যতই রাগিতে রাগতে কথার উপর কথা বলিতেছিল, প্রমীলা ততই হাসিতেছিল, তাহাতে লাবণ্য আরও চটিয়া যাইতেছিল। প্রমীলা কিন্তু তাহাই চায়। অবশেষে মেজবউ বাধ্য হইয়া ক্ষান্ত দিয়া সশব্দ পদবিক্ষেপে উপরে চলিয়া গেল, যাইবার সময় বলিয়া গেল, “তােদের মত অভদ্র, ছছাটলােকের সঙ্গে আজ

ছােট বউ
থেকে আমি আর কোন সম্বন্ধ রাখব না, আসুক
সে আজ।
প্রমীলা হাসিতে হাসিতে কহিল, “তা দেখা
যাবে’খন মেজদি।”
সেদিন দুপুরবেলা লাবণ্য নিজের ঘরে শুইয়া-
ছিল, পাশে ঝী বসিয়া হাওয়া করিতেছিল, প্রমীলা।
বড়বউয়ের ছােট ছেলেটিকে কোলে করিয়া সেই
কক্ষে প্রবেশ করিল। তাহারই পদশব্দে লাবণ্য
একবার চাহিয়া দেখিয়া আবার মুখ ফিরাইয়া শুইল।
সমস্ত মুখের উপর তাহার বিরক্তির ভাব সম্যক
অভিব্যক্ত হইয়া উঠিয়াছিল। প্রমীলা ডাকিল,
“মেজদি।
লাবণ্য কোন কথা কহিল না, তাহার পরিবর্তে
ঝী তেমনই ভাবে হাওয়া করিতে করিতে মুখ না
তুলিয়াই নিজে নিজেই বলিতে লাগিল, “এই সারা
সকাল জ্বালিয়েও আশা মিটুল না, দুপুরবেলা মানুষ
কোথায় একটু ঠাণ্ডা হয়ে ঘুমুবে, তাও কি না
রেহাই নেই।”

ছােট বউ
প্রমীলা কী-চাকরের এইরূপ স্পর্ধা সহ্য করিতে
পারিত না। সে ধমক দিয়া উঠিল, “তাের ভারি
যে বাড় হয়েছে, আমরা জায়ে জায়ে যাই করিনে
কেন, তাের তাতে কি রে ? মনে করচিস্ এ কথায়
মেজদি তাের ওপর ভারি খুসী হবে,মেজদি আমাদের
সে রকমই নয়।” তাহার পর ঝীর হাত হইতে
পাখাখানি কাড়িয়া লইয়া বলিল, “তুই চলে যা
এ ঘর থেকে, আমি হাওয়া করছি।”
কী হহ করিয়া কক্ষের বাহির হইয়া গেল।
লাবণ্য এবার কথা কহিল, “অত আদিখ্যেতায়
আর কাজ নেই, তােমায় আর হাওয়া করতে হবে
এমনই করে দিনরাত একজনের পেছনে
লাগতে হয় !”
প্রমীলা পাখাখানি শয্যার উপর রক্ষা করিয়া,
ছেলেটীকে সেইখানে বসাইয়া দুই হাতে লাবণ্যের
পা দুখানি ধরিয়া কহিল, “মেজদি ঘাট হয়েছে,
মাপ কর।”
লাবণ্য তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিতে গেল, কিন্তু

ছােট বউ
প্রমীলা পা দুখানি শক্ত করিয়া ধরিয়া থাকায় সে
উঠিতে পারিল না। কহিল, “কি করিস্ ছােট বউ,
আমার লাগচে যে, পা ছেড়ে দে।”
প্রমীলা এবার হাসিয়া কহিল, “তুমি আগে বল
মেজদি, মাপ করে, তবে ছাড়ব, না হলে
ছাড়ব না।”
লাবণ্য অগত্যা বলিতে বাধ্য হইল,“হুঁ করেচি।
৩০

চতুর্থ পরিচ্ছেদ
ইহারই সপ্তাহ দুই পরে মেজবউয়ের ঘরের
সম্মুখের বারান্দায় দাঁড়াইয়া মেজবউয়ের বড় দুইটী
ছেলে মেয়ে দুই হাতে দুইটা বড় আম লইয়া খাইতে
ছিল, এমন সময় জগদীশের তিন বৎসরের ছেলে
শান্তিরাম সেখানে ছুটিয়া আসিয়া কহিল, “মােন।
আমি আম খাব।” বলিয়া হাত বাড়াইল। অদূরে
মেজবউ দাড়াইয়াছিল, মােনা ও মেনী আম দুইটা
লইয়া সেইখানে চলিয়া গিয়া মাতাকে কহিল, “দেখ
না মা, শান্তি আম চাচ্ছে, ওরা বুঝি আম খেতে
পায় না?”
মেনী কহিল, “না হলে বুঝি কেউ চাইতে
আসে।*
শান্তি প্রায় সব সময়ই প্রমীলার কাছেই থাকিত,
তাই তাহাকে দেখিতে না পাইয়া প্রমীলা উপরে
খুজিতে আসিতেছিল, মােনার কথায় স্তব্ধ হইয়া
সিড়ির উপর সে দাড়াইয়া পড়িল।
৩১

ছােট বউ
মেজবউ অনুচ্চস্বরে তাহার ছেলেমেয়েদের বলিল,
“তােরা শীগগির শীগগির খেয়ে ফেল না।”
প্রমীলা তাহাদের অতি নিকটেই ছিল, একথাও
তার কাণে গেল।
সে মুহূর্ত চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল, তাহার
পর দ্রুতপদে বারান্দায় আসিয়া শান্তিরামকে কোলে
তুলিয়া লইয়া সস্নেহে তাহাকে একটী চুম্বন করিয়া
নীচে নামিয়া গেল। বাক্স হইতে দশটী টাকা
বাহির করিয়া তখনই এক শত বড় বড় আম আনা-
ইয়া প্রথমেই শান্তির হাতে দুইটী আম তুলিয়া দিল,
তাহার পর শ্বশুরের জন্য বাছিয়া পাঁচটী আম পৃথক
করিয়া রাখিয়া, মেজভাশুর, মেজবউ তাহার তিন
ছেলে মেয়ে, ঝী চাকর প্রত্যেককে গড়ে দুইটা
করিয়া আম উপরে পাঠাইয়া দিয়া, বাকি কয়টি
বড়জার ছেলে মেয়ে, নিজের ছেলে ও বাটীর
অপরাপর সকলকে ভাগ করিয়া দিল। প্রমীল
যখনই যাহা-কিছু কিনিত, তাহা এমনই করিয়া
সকলকে সমান করিয়া ভাগ করিয়া দিত।

ছােট বউ
বাসন্তী কাপড় কাচিয়া উপরে উঠিতেছিল,
সামনে আমের ঝুড়ি লইয়া ঘােটবউকে বসিয়া
থাকিতে দেখিয়া কহিল, “কোথায় কিছু নেই, এক
ঝুড়ি আম কেনা হ’ল যে! মাঝে মাঝে তাের ঘাড়ে
ভূত চাপে না কি ?
প্রমীলা হাসিয়া কহিল, “ভূত চাপতে যাবে কেন
দিদি ! শান্তিরাম আম খেতে চাইলে যে।”
সকালবেলা বড়বউ নীচে নামিয়া মুখ ধুইতে গিয়া
দেখিল, ঝী আসে নাই। বাসনের কাড়ি উঠানে
জমা হইয়া আছে। সে নিজের মনেই বলিতে
লাগি, “এত বেলা হ’ল এখনও এল না, আর কি
মাগী আবে, এত করে বলে রাখলাম, না আসি
ত আগে বলে যা, তা কিছুতেই হবে না, এত
বেলা হ’ল কখন্ কি যে করব !”
প্রমীলা উপরের বারান্দা হইতে মুখ বাড়াইয়া
বলিল, “কি হয়েচে গো দিদি?”
বড়বউ কহিল, স্ত্রী মাগী এখনও আসে নি,
তাই বলছিলাম, সিষ্টির কাজ পড়ে রয়েছে।”

ছােট বউ
প্রমীলা কহিল, “তার আর কি হয়েচে, তুমি
এখন ওপরে এস ত,তারপর যা হয় দেখা যাবে’খন।*
বড় বউ কহিল, “দেখবি আর কি! মাগী
আজ আর আসচে না, এখন ওপরে গিয়ে মিছে
আর দেরী করে কি হবে, এটোকাটা পেড়ে বাসন
মাজবার যােগাড় করা যাক।”
প্রমীলা তথাপি উপরে আসিবার জন্য জিদ
করিতে লাগিল, অগত্যা বাসন্তীকে উপরে যাইতে
হইল। উপরে যাইতেই প্রমীলা কহিল, “দাড়াও
দিদি, আর একটু দেখা যাক, না আসে তখন
মেজদিদির ঝীকে দিয়ে বাসন মাজাব।”
বাসন্তী হাসিয়া কহিল, “ও আমার কপাল,
এই জন্যে বুঝি আমায় ওপরে ডেকে আনা হ’ল,
এতক্ষণ যে আমার অনেক কাজ হয়ে যেত। মনে
মনে কহিল, “হায়! সকলেই যদি তাের মত হইত
ছােটবউ, তা হইলে সংসারে কোন দুঃখ কষ্ট
থাকিত না।”
প্রমীলা কহিল, “আচ্ছা তুমি দেখ না দিদি।”

আধ ঘণ্টা পরে প্রমীলা মেজ বউয়ের কক্ষে
প্রবেশ করিতে গিয়া সহসা দরজার বাহিরে দাড়াইয়া
পছিল। তার মেজভাশুর কক্ষের মধ্যে বসিয়া-
ছিল, ঝী ছেলেটী কোলে করিয়া ছাদের উপর
ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল, সে গিয়া মেজবউকে ডাকিয়া
মেজবউ আসিতেই প্রমীলা কহিল, “মেজদি
আজ বাসন-মাজার ঝী আসেনি।”
লাবণ্য কহিল, “তা আমি কি করব ?”
প্রমীলা কহিল, “তােমার ঝীকে যদি মেজদি
বলে দাও, বাসন কখানা মেজে দিতে।”
লাবণ্য কহিল, “তা আমি বলতে পারব না, দুই
একখানা হত তাহলে হয়ত ও মরেপিটে মেজে
দিতে পাত,এক কঁাড়ি বাসন মাজা কি ওর কাজ।
প্রমীলার মুখখানি এতটুকু হইয়া গেল। সে
বড়মুখ করিয়া তাহার মেজদিদির কাছে আসিয়া-
ছিল। ঘরের ভিতর হইতে জ্যোতিষচন্দ্ৰ পত্নীকে
সম্বােধন করিয়া বলিয়া উঠিল, "ওগাে দেখ, খােকার

ছােট বউ
বীকে বাসন মাজতে দিয়ােনা, অসুখ করলে ভারি
মুস্কিল হবে।”
খানিক পরে মেজবউ নীচের উঠানে গিয়া
দেখিল,প্রমীলা কলতলায় বসিয়া বাসনগুলি মাজিতে
আরম্ভ করিয়াছে।
মেজবউকে দেখিয়া প্রমীলা হাসিয়া কহিল,
“মেজদি থালখানা ধুয়ে দেবে! আমি বেশ করে
মেজেছি, শুধু কলের নীচে পেতে দিলেই হবে।”
প্রমদা নিকটেই দাঁড়াইয়াছিল, সে কহিল,
“তুমি যে কি বল ছােটবউ তার ঠিক নেই, মেজবউ
দেবে কিনা তােমার বাসন ধুয়ে।”
প্রমীলা তেমনই হাসিয়া কহিল, “মেজদিদিও
ত বাড়ীর একজন, আমরা যদি বাসন মাজতে পারি,
মেজদি শুধু একখানা ধুয়ে
দিতে পারে না।”
অদূরে বাসন্তী রান্না ঘর ‘মুক্ত’ করিতেছিল,
প্রমদার কথা তাহার নিকট অসহ্য বােধ হইল।
সে কহিল, “তুমি ঠাকুরঝি ভারি একচোকো,
ছােটবউ ত আর গরীব দুঃখীর মেয়ে নয়, সেও মস্ত

ছােট বউ
লােকের মেয়ে, বাসনমাজাই কি তার কাজ
তার বেলা ত তুমি বেশ চুপটি করে আছ।
ও আমাদের লক্ষ্মী বােন, তাই সব তাতেই ও ছুটে
এসে পড়ে, ইচ্ছে করলে ও-বলিয়া বড়বউ থামিয়া
ইতিমধ্যে প্রমীলার বাপের বাড়ীর দরওয়ান
তিনটি ঝীকে সেখানে আনিয়া হাজির করিল। এই
দরওয়ানটি প্রত্যহ সকালে আসিয়া প্রমীলার খোঁজ
লইয়া যাইত, আজ আসিবামাত্র প্রমীলা তাহাকে
বলিয়াছিল, “রামদিন্, এখনই দুজন ঝী আতে
হবে, বলল, যা তারা চায় তাই দেব।”
দরওয়ানকে পাঠাইয়া দিয়া ঝীর অপেক্ষা না
করিয়াই প্রমীলা বাসন মাজিতে বসিয়া গিয়াছিল।
এখন সে জেদ করিয়া তিনজন ঝীকেই নিযুক্ত
করিল।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ
নিমন্ত্রণ।
সেদিন ওপাড়ার একজনদের বাড়ী সকলের
ছেলেপুলেরা সাজগােজ করিতেছে,
ছােটবউ প্রমীলা তাহার বড়জার ঘরে বসিয়া
ভাশুরের ছেলেদের কাপড় পরাইতেছিল, তাহার
পুত্রটি বাসন্তী দেবীর কোলের উপর বসিয়া খেলা
করিতেছিল, এমন সময় মেজবউয়ের ছেলে মেয়েদের
হাত ধরিয়া দাসীঠাকরুণ সেখানে আসিয়া উপস্থিত
হইল। ছেলেমেয়ের দুটীর গায়ে সাহেবীধরণের
মূল্যবান্ পােষাক ঝকমক করিতেছিল। বাসন্তী
তাহাদের কাছে বসাইয়া বলিল, “বেশ মানিয়েছে।”
বাসন্তীর ছেলে মেয়ে দুটি তাই দেখিয়া অমনই
বায়না ধরিয়া বসিল, এ জামা আমরা পরব না,
ওদের মত জামা পরব।”
বাসন্তী ধমক দিয়া উঠিল,“অহ আহিঙ্কে ক্যান,
যা দেবি, তাই বুঝি পরতে হবে, অমন যদি শিবি,
তা হলে তােদর আর কোথায় যেতে দেব না।”

ছােট বউ
তাহারা চুপ করিল, কিন্তু ছােটবউ বলিল, “ত
হবে না দিদি, ওদের ও ঐ রকম পােষাক কিনে
দিতে হবে, এক বাড়ীরই ত ছেলে, ওরা কেন
খারাপ পােষাক পরে যাবে।”
বাসন্তী বিরক্ত হইয়া কহিল, “তুই থাম্ প্রমীলা,
ছেলেমেয়েদের অত আস্কারা দিনি, এখন থেকে যা
বায়না ধরবে তাই যদি ওরা পায় তা হলে একেবারে
লোয় যাবে-এক জন পরেচে বলে কি আর
এজনকেও পরতে হবে ?”
প্রমীলা কহিল, “কেন মেজদি তবে ওদের
দেখাতে পাঠালে, ছেলেমানুষ, এরা কি অত শত
বােঝে?*
বাসন্তী কহিল, 'ওরা না বুঝলেও আমাদের
বুঝিয়ে দিতে হবে, তা ছাড়া ছেলেদের সঙ্গে কি
আমাদেরও নাচতে হবে নাকি! আমরা গেরস্ত
মানুষ, আমাদের ছেলেমেয়েদের অত দামী পােষাক
কোথেকে পরাব।”
দাসী এতক্ষণ চুপ করিয়া দাঁড়াইয়াছিল, এবার

ছােট বউ
এক গাল হাসিয়া কহিল, “আমাদের বড়বউদিদিই
ঠিক কথা বলেছেন, গেরস্ত লােকের ছেলেপুলেদের
অত ওপর দিকে নজর কেন, ও কি কম টাকার
কাজ দিদিমণি, এই দুটা পােষাক শুলাম দুকুড়ি
টাকায় কিনে এনেচে, ছােটবউদিদিমণি ত বােঝেন
, তাই বলে ফেল্লেন, ওরাও ঐ পােষাক পবে,
ও পােষাক পরান কি তােমার আমার মত লােকের
প্রমীলার অন্য কোন দোষ না থাকিলেও সে
স্বভাবতঃ ভারি জেদী। একে সে ঝী-চাকরের
বাড়াবাড়ি মােটেই সহ্য করিতে পারিত না, তাহার
উপর মেজবউয়ের ঝী যখন তাহার মুখের উপর এত
বড় কথা বলিল, তখন সেই জেদটা তাহাকে একে-
বারে শক্তভাবে চাপিয়া ধরিল। কিন্তু ভিতরে খুব
কুদ্ধ হইলেও, সে বাহিরে কাহাকেও কটু কথা
বলিতে পারি না। তাই ঝীকে কিছু বলিল না,
শুধু একটু উচু গলায় কহিল, “কি এত বড় কথা!”
ৰলিয়া তখনই ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
৪

ছােট বউ
তাহার পর বাক্স খুলিয়া এক শত টাকা বাহির
ফরয়া তাহার স্বামীর হাতে দিয়া মিনতির সুরে
কহিল, “তােমার দুটি পায়ে পড়ি, আমাকে ঐ রকম
তিনটি পােষাক এখনই কিনে দিতে হবে।”
ক্ষিতীশচন্দ্র তাহার পত্নীকে চিনিত। সে যখন
ধরিয়াছে তথন আনিয়াই দিতে হইবে, না হইলে
রক্ষা নাই ! কান্নাকাটি করিয়া একেবারে অস্থির
করবে ।
।
প্রমীলার বড়ভাশুর তখন বাহিরের বােয়াকে
বসিয়া তামাক খাইতেছিলেন, ক্ষিতীশচন্দ্রকে বাহির
হইয়া যাইতে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোথায়
যাচ্চিস্ রে ?”
ক্ষিতীশচন্দ্র সহসা ঠিক করিয়া উঠিতে পারিল না
তাহার দাদার কথার কি উত্তর দিবে। অনর্থক
এতগুলি টাকা নষ্ট করিতে চলিয়াছে একথা বলিতে
তাহার কেমন লজ্জা বােধ হইতে লাগিল। কিন্তু
উত্তর ত দিতে হইবে। অথচ দাদার কাছে মিথ্যা
কথা বলা ত চলিবে না। তাই একটু চিন্তা করিয়া

ছােট বউ
উত্তর করিল, “ছেলেদের জন্যে দুটো জামা কিতে
হবে।
জগদীশ একটু আশ্চর্য্য হইয়া বলিল, “এমন
সময় হঠাৎ জামার এত দরকার হ’ল যে?”
ক্ষিতীশচন্দ্র সংক্ষেপে উত্তর করিল, “কি জানি।
জগদীশ বুঝিল, নিশ্চয়ই এ ছােটবউমার কাণ্ড।
তিনি কহিলেন, “ছােটবউমার ফরমাজ বুঝি, তিনটে
জামার জন্যে তােকে কতগুলো টাকা দিয়েচেন ?”
ক্ষিতীশচন্দ্রের ভারি লজ্জা বােধ হইতেছিল, সে
অবনতমুখে ধীরে ধীরে কহিল, “এক শ।”
জগদীশ হাসিয়া বলিল, “সেই জন্যেই জিজ্ঞাসা
করছিলাম, ও আমি আগেই এচেছিলাম-আয়
আমার সঙ্গে।
জগদীশের অনুসরণ করিয়া ক্ষিতীশ উপরের
ঘরে গেল।
ঘরের বাহিরে দাড়াইয়া জগদীশ
কহিলেন, “ওগো, বউমাকে বল, টাকা কটা আমি
নিলাম, আমার জামা-কাপড় মােটেই নেই, কিছু
কিনে নিয়ে আসি।”
82

ছােট বউ
বাসন্তী হাসিয়া প্রমীলাকে কহিল, গুলি ত,
বল্ না কি জবাব দিই ?
প্রমীলা চুপি চুপি কহিল, “একথার জবাব কি
দেবে তাও বুঝি দিদি আবার আমাকে বলে দিতে
হবে। উনি চাচ্চেন, এত আমার সৌভাগ্য, এব
ওপর আবার কথা আছে।”
বাসন্তী তেমনই হাসিয়া তাহার স্বামীকে কহিল,
“শুনতে পেলে তােমার ছােটবউমা কি বললেন,
তিনি বলছেন তার নাকি ভারি সৌভাগ্য।”
প্রমীলা তাড়াতাড়ি বাসন্তীর কথায় বাধা দিয়া
কহিল, “ৰজ্ঞ দেরী হয়ে গেছে, ছেলেদের কাপড়-
চোপড়গুলো পরিয়ে দিই।” ছেলেমেয়েদের দিকে
চাহিয়া বলিল, “আজ বাবা তােরা এই পােষাক পরে
যা, তার পর আর এক দিন তােদের ঐ রকম
পোষাক এনে দেব।”
ছেলেমেয়ে কয়টী তাহাদের কাকিমার ভারি
বাধ্য। তাহারা তখনই উত্তর করিল, “হা কাকিমা,
আমাদের এই কাপড়ই পরিয়ে দাও।”

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
একটা ঘটনায় প্রমীলার হাসিভরা মুখখানি
শ্রবণের আকাশের মত সহসা ভারি হইয়া উঠিয়া-
ছিল। এবং বর্ষার মেঘের মতই তাহার হাস্যোজ্জ্বল
মুখের উপরে সেই কালো ছায়া ভাসিয়া বেড়াইতে
লাগিল।
লাবণ্যর ঘরে প্রতিদিনই হারমােনিয়াম ধ্বনিয়া
উঠিত, তাহার সঙ্গে সুর মিলাইয়া লাবণ্য সঙ্গীতের
চৰ্চা করিত। তাহার ভ্রাতারা সদাসর্বদাই ভগ্নীকে
দেখিতে আসিতেন, এবং বৈকালিক জলযােগটা
ভগ্নীর গৃহেই হইত!
সেদিন কি একটা উপলক্ষে, বােধ করি,লাবণ্যর
জন্মদিন উপলক্ষেই খাওয়া-দাওয়ার ধুম পড়িয়া
গিয়াছিল। লাবণ্যর ঘরের সামনের ছাদে রান্না
হইতেছিল। তাহার দুইটা ভাই ও তাহার স্বামীর
তিন চারি জন বন্ধুর নিমন্ত্রণ ছিল।
তখন সহরের সমস্ত বাড়ীতেই সন্ধ্যার দীপ

ছােট বউ
জ্বলিয়া উঠিয়াছে, গৃহলক্ষ্মীর মঙ্গল-শঙ্খ বাজাইয়া
বহুক্ষণ সন্ধ্যা-বন্দনা শেষ করিয়াছেন। উপরের
বাহিরের ঘরে একটা অল্লোজ্জ্বল প্রদীপের সম্মুখে
ভগবান দত্ত বসিয়া লাবণ্যর জ্যেষ্ঠ পুত্র মােনার
সহিত গল্প করিতেছিলেন। বৃদ্ধ কহিলেন, “কি রে
শালা, আজ তােদের ওখানে কি রান্নাবান্না হচ্ছে,
তােরা, একাই থাবি, আমাকে কিছু দিবি নি?”
মােনা কহিল, “মাকে জিজ্ঞেস করে আসি, মা
দৈবে কি না।" বলিয়া বালক চলিয়া যাইতেছিল।
বৃদ্ধ তাহার হাতটি চাপিয়া ধরিয়া বলিলেন,
“দাড়া শালা। আগে শুনিই কি রান্না হচ্ছে, তার
পর যাবি জিজ্ঞেস করতে।”
মােনা বৃদ্ধের পাশে বসিয়া পড়িয়া কহিল,
“বুঝলে দাদাবাবু, মা আজ মস্ত এক কড়া রাজভােগ
তৈরী করেছে।”
বৃদ্ধ ভগবান দত্ত রাজভােগ খাইতে খুব ভাল
বাসিতেন, কিন্তু নিজে পয়সা খরচ করিয়া খাইতে
পারিতেন না,তাহার দ্বিতীয় পক্ষের গৃহিণী বাজারের

ছােট বউ
পয়সা হইতে কিছু কিছু জমাইয়া তাহাকে প্রায়ই
রাজভােগ তৈরী করিয়া খাওয়াইতেন। তাঁহার
মৃত্যুর পর হইতে ভগবান দত্তের রাজভােগ খাওয়া
একেবারেই বন্ধ হইয়া গিয়াছে।
মােনার মুখে রাজভােগের নাম শুনিয়া ভগবান
দত্তের অনেক কথা মনে পড়িয়া গেল। পুরান স্মৃতি
গুলি একে একে তাহার মনের মধ্যে ভাসিয়া উঠিতে
লাগিল। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন।
তাহার পর ধীরে ধীরে মােনাকে কহিলেন, “আচ্ছ।
মােনা,তাের মাকে বগে, আমাকে একটু রাজভােগ
পাঠিয়ে দেয় যেন।”
মােনা চলিয়া গেল। বৃদ্ধ নীরবে বসিয়া কত
কি ভাবিতে লাগিলেন। খানিকক্ষণ পরে কি
শুনিয়া সহসা তিনি চমকিয়া উঠিলেন।
জ্যোতিষচন্দ্র ও লাবণ্য নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদের
প্রতীক্ষা করিয়া তাহাদের ঘরে বসিয়া গল্প করিতে
ছিল, এমন সময় মােনা গিয়া কহিল, “মা, দাদাবাবু
রাজভােগ চাইছেন।

ছােট বউ
লাবণ্য বিরক্তিপূর্ণ স্বরে কহিল, “এর মধ্যে
তার কাছে রাজভােগের খবর গেল কি করে, এ
নিশ্চয়ই ছােটবউয়ের কাজ !”
মােনা কহিল, *ছােট কাকিমা বলে নি ত,আমি
বলেচি যে।”
লাবণ্য ক্রুদ্ধস্বরে বলিল, “খুব ভাল কাজ
করে; এমন বদ্ ছেলে ত কখন দেখি নি, ঘরে যা
কিছু হবে অমনই বাইরে গিয়ে খবর দিয়ে আসবে।
ফের যদি ঘরের কোন কথা বাইরে ববি, মেরে
পিঠের ছালচামড়া তুলে দেব।”
মােনা মুখখানি এতটুকু করিয়া সেইখানে
দাড়াইয়া রহিল।
জ্যোতিষচন্দ্ৰ কহিল, “কি হবে গো ! যা হয়েছে
তাতে কুলবে কি? এ ত আর বাজারে কিনতে
পাওয়া যায় না।”
লাবণ্য কহিল, “কুলবে আমার মাথা আর মুণ্ডু !
প্রথমটা আঁচ পাইনি, পরে বাটীতে ঢেলে দেখলাম,
দাদা ও তােমার বন্ধুদের হােয়ে, তােমার আমার
কুললে হয়, অন্য ত দূরের কথা।
৪৭

ছােট বউ
জ্যোতিষচন্দ্ৰ কহিল, “তা হলে চেপে যাও!”
লাবণ্য উত্তেজিত স্বরে কহিল, “চেপে ত যাবই,
নিমন্ত্রণ করে লােককে আধ-পেটা খাওয়ালে ত আর
চলবে না।”
পুত্র ও পুত্রবধূর এই কথায় নীচে বৃদ্ধ ভগবান
দত্তর চোখ দিয়া দুই ফোটা জল পড়িল ! ঘন ঘন
দীর্ঘনিঃশ্বাস তাহার জীর্ণ বক্ষপঞ্জর গুলি দেলাইতে
লাগিল !
দোতলার বারান্দায় প্রমীলা দাড়াইয়াছিল, সমস্ত
কথা তাহার কানে গেল। পূর্বে কিছুতেই সে রাগ
করিত না, কিন্তু আজ সে সত্যই উদ্দীপ্ত ক্রোধে
কুলিতে লাগিল। শ্বশুর খাইতে চাহিয়াছেন তাহার
উত্তরে এই কথা ! এরা মানুষ। মেজদিদি না হয়
পরের মেয়ে। কিন্তু মেজভাশুর তাহারই ত পুত্র,
পিতারই জন্য ত মেজভাশুরের আজ এই সৌভাগ্য,
আর তাহার মুখে কি না এই কথা ! এও সম্ভব।
প্রমীলার ইচ্ছা হইতে লাগিল একবার উপরে গিয়া
লাবণ্যকে কড়া কড়া দুই চার কথা শুনাইয়া আসে।
s

ছােট বউ
সেদিন সে হয় ত তাহা করিত, কিন্তু মেজভাশুর ঘরে
থাকায় সে ইচ্ছা মনের মধ্যেই রহিয়া গেল।
দিন মেজবউয়ের সমস্ত কথা, সমস্ত ব্যবহারই সে
হাসিয়া উড়াইয়া দিত। কোন কথা লইয়া সে
অন্তরের মধ্যে কখনও কোন আলােচনা করিত না।
কিন্তু আজিকার এই ব্যবহারে তাহার অন্তরটা সত্যই
ব্যথিত হইয়া উঠিল ! তাহার মনে হইল লাবণ্যর
এই ব্যবহার সমস্ত নারীজাতির উপর একটা প্রকাণ্ড
কলঙ্কের ছাপ মারিয়া দিয়াছে।
সে আর বেশীক্ষণ ভাবিতে পারিল না।
তাহার শ্বশুর কোন দিনই কিছু চাহিয়া খাইতেন
না, আজ যখন তিনি মুখ ফুটিয়া একটা জিনিষ
খাইতে চাহিয়াছেন, তখন যেমন করিয়া হউক
তাহা সে তৈয়ারী করিবে। তাড়াতাড়ি নীচে
গিয়া ছেলেদের জন্য যে দুধ ছিল, তাই কড়ায়
ঢালিয়া একটা উনানের উপর চাপাইয়া দিল।
একখানি পাখা লইয়া জোরে জোরে হাওয়া
করিতে লাগিল, এবং উৎসুক নয়নে সেই কড়ার
৪৯

ছােট বউ
দুধের দিকে বার বার চাহিতে লাগিল। উঃ , এত
দেরী।
বড়বউ ছেলেদের ঘুম পাড়াইয়া নীচে আসিয়া
দেখিল, প্রমীলা দুই হাতে পাখা ধরিয়া প্রাণপণে
উনানে হাওয়া করিতেছে।
সে কোন কথাই জানিত না, তাই আশ্চর্য হইয়া
জিজ্ঞাসা করিল, “রাত্তিরে এ আবার কি হ’ক্ষ ?”
বাসন্তীকে পাইয়া প্রমীলা যেন বাঁচিয়া গেল।
সে মহানন্দে কহিল,“দিদিমণি এসে পড়েচ, বাচলাম,
একলা পেরে উঠছিলাম না। বাবা যে রাজভােগ
খেতে চেয়েছেন।”
তখন দুই জায়ে মিলিয়া রাজভােগ তৈয়ারী
করিতে বসিয়া গেল।
খানিক পরে প্রমীলা তাহার শ্বশুরের ঘরে
প্রবেশ করিতেই, তিনি মুখ তুলিয়া দেখিয়া কহিলেন,
“কি চাই মা !”
প্রমীলা ধীরে ধীরে উত্তর করিল, “রাজভােগ
আনবো বাবা?”

ঘােট বউ
বৃদ্ধের বুকটা আবার জ্বালা করিয়া উঠিল
আবার রাজভােগ। তাহার মনে হইল ওপরের
বাবুদের খাওয়ার পর পাতে বােধ হয় কিছু পড়িয়া-
ছিল, তাই তাহার মধ্যম পুত্র ও পুত্রবধূ তাহাকে
থাইতে পাঠাইয়াছেন।
বৃদ্ধকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া প্রমীলা
আবার জিজ্ঞাসা করিল, “বাবা এখনই আনব কি,
, একটু দেরীতে থাবেন ?”
বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করিলেন, “মেজবউমার আসতে
লজ্জা হ'ল বুঝি, তাই তােমায় দিয়ে পাঠিয়েছেন?”
প্রমীলার এতক্ষণ সন্দেহ ছিল হয় ত তাহার
শ্বশুর মেজদিদির সমস্ত কথা শুনিয়াছেন। বৃদ্ধের
এই প্রশ্নে তাহার অন্তরের মেঘটা কাটিয়া গেল।
তাহা ছাড়া কোন দিনই কোন কাজ করিয়া
বাহাদুরী লওয়া তাহার অভ্যাস ছিল না, তাই
বৃদ্ধের প্রশ্নের উত্তরে সে বলিয়া ফেলিল, “হাঁ বাৰা,
মেজদি পাঠিয়েছেন।
বৃদ্ধ তীব্রস্বরে কহিলেন, “সকলে মিলে তােমর।

ছােট বউ
আমায় পাতের এটো খাওয়াবেই, না, ঘােট
বউমা?”
হার কণ্ঠস্বরে প্রমীলা শিহরিয়া উঠিল।
মিথ্যার আশ্রয় লইয়া তাহার মেজদিদির দোষ
ঢাকিতে গিয়া সে এ কি করিয়া বসিল। তােহার
শ্বশুর তাহা হইলে সমস্তই শুনিয়াছেন! এখন সত্য
কথা প্রকাশ করিয়া বলিতে গেলেও,তাহার শ্বশুরের
নিকট সেইটাই মিথ্যা বলিয়া বােধ হইবে। হায়! সে
কি করিবে, কি করিয়া তাহাকে বুঝাইবে সে মিথ্যা
কথা বলিয়াছিল! রুদ্ধ ক্রন্দন বাহিরে আত্মপ্রকাশ
করিবার জন্য তাহার সারা দেহখানি ধরিয়া
সজোরে নাড়া দিতে লাগিল। প্রমীলা স্থির করিল,
সত্য কথাই বলিবে! বাবা বিশ্বাস না করেন, তার
পা ছুইয়া বলিবে। এই স্থির করিয়া সে ডাকিল,
‘বাবা। সেই সঙ্গে সঙ্গে তাহার দুই চোখ দিয়া
অশ্রু গড়াইয়া পড়িল। অঞ্চল প্রান্তে অশ্রু মুছিয়া
সে কহিল, “বাবা, আমি মিথ্যা কথা বলেছি,
মেজদিদির জিনিষ আনি নি, কখনও আনতে যাব

ছােট বউ
না, দিদিমণি আর আমি দুজনে মিলে তৈরী
করেছি।”
বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর তখন ভারি হইয়া উঠিয়াছিল।
তিনি কহিলেন, “তােমরা তৈরী করে, আমি কেন
খাব না না, যাও নিয়ে এস গে।”
প্রমীলার মুখখানি আবার হাসিতে উজ্জ্বল হইয়া
উঠিল।
১),
এই ঘটনার পর হইতে প্রমীলার চরিত্রের কিছু
পরিবর্তন হইল। অন্য সকলের সহিত সে পূৰ্ব্বের
মত হাসিয়া খেলিয়া বেড়াইতে লাগিল,কিন্তু লাবণ্যর
সহিত কোনরূপ হাসি-তামসা সে তার কথিত না।
সে দিনকার অত বড় হৃদয়হীনতার পর লাবণ্যর
প্রতি প্রমীলার ঘৃণা তাহার অন্তরের মধ্যে বদ্ধমূল
হইয়া গিয়াছিল। সে সাধ্যমত লাবণ্যকে এড়াইয়া
চলিতে লাগিল। তজ্জন্য লাবণ্য তাহাকে মাঝে
মাঝে দু চার কথা শুনাইয়া দিতে ছাড়িত না,
কিন্তু সে কোন কথার উত্তর দিত না, কিম্বা
আগেকার মত হাসিয়া উড়াইয়া দিবারও চেষ্টা

ছােট বউ
করিত না—সে তখনই সেই স্থান ত্যাগ করিয়া
চলিয়া যাইত।
একদিন বাসন্তী ও প্রমীলা তাহাদের ঘরের
সম্মুখের বারান্দায় বসিয়া গল্প করিতেছিল, লাবণ্য
আসিয়া সেখানে বসিল। বাসন্তী তাহার সঙ্গে
কথা বলিতে লাগিল, কিন্তু প্রমীলা মুখটী বুজিয়া
বসিয়া রহিল, শেষে একথা সেকথার পর লাবণ্য
যখন বলিল, “দেখ দিদি, আমাদের শ্বর-ঠাকুর
বেশ মজার লােক, এক পয়সা খরচ করতে হলে ত
তিনি একেবারে মারা যান, কিন্তু এদিকে তার
খাওয়ার সটা খুব আছে, এই সেদিন
প্রমীলার চোখ দুটী ধ্বক্ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল,
সে চীৎকার করিয়া বলিল, “থাম মেজদিদি, এ
বাড়ীতে বসে আর ও কথা মুখে এন না, ও কথা
ওলেও পাপ।”
তাহার এই তিরস্কারে লাবণ্য আগুন হইয়া
কহিল, “বেশ করব বল, তুই বারণ করবার কে ?
কেন, এত কিসের দায়, আমি এ বাড়ীর কারু খাই,
৫৪

ছােট বউ
পরি, যে ভয় করে চল্ব। তাের ভাল না লাগে
তুই উঠে চলে যা না।”
প্রমীলাও উত্তেজিত হইয়া কহিল, “বতে হয়
তােমার ঘরে গিয়ে বল গে, এখানে নয়।”
লাবণ্য ক্রোধে অধীর হইয়া উঠিয়াছিল, সে
কহিল, “আচ্ছা।”
৫

সপ্তম পরিচ্ছেদ
বাল্যকাল হইতেই জগদীশের শরীর তেমন ভাল
ছিল না। ডাক্তার খুব সাবধানে থাকিতে বলিতেন,
তাহার কেমন আশঙ্কা হইত, একবার যদি বেশী
জ্বর হইয়া পড়ে,তাহা হইলে তাহাকে বাঁচাই হয় ত
দুরূহ হইবে।
ডাক্তারের পরামর্শমত জগদীশ
বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা সত্বেও একদিন
আপিসের পর মাথায় বিষম বেদনা অনুভব করিয়া
তিনি শয্যাগ্রহণ করিলেন। দেখিতে দেখিতে
তাহার দেহ আগুনের মত উত্তপ্ত হইয়া উঠিল।
রাত্রেই ডাক্তার আসিয়া দেখিয়া গেলেন। ডাক্তার
সেদিন কাহাকে কিছু বলিলেন না বটে, কিন্তু তাহার
তেমন ভাল বােধ হইল না।
বােগ সমানভাবে চলিতে লাগিল। দশ দিন
কাটিয়া গেল, কমিবার কোন লক্ষণ দেখা গেল না,
বরং রােগটা যেন দিন দিন জটিল হইয়া উঠিতে

ছােট বউ
কবিত।
লাগিল। ডাক্তাররা বলিলেন, এ পীড়া শীঘ্র সারিবার
নহে, রােগীর অনেক ভােগ আছে।
প্রমীলা ও বাসন্তী দিন রাত জাগিয়া অক্লান্ত
পশ্চিমে জগদীশের সেবা করিতে লাগিল। প্রমীলার
আর সে হাসি নাই, হাসি যেন এক নিমেষে কোন্
দূরদেশে চলিয়া গিয়াছে।
জগৰণ জীবন-মরণের মধ্যস্থলে পড়িয়া রহিলেন।
প্রমীলা প্রায় সারা রাত্রি জাগিয়া ভাশুরের সেবা
সেদিনও প্রায় রাত্রি একটা অবধি
বসিয়াছিল।
পরদিন বেলা আটটা বাজিয়া গেল, তবুও
প্রমীলাকে আসিতে না দেখিয়া বাসন্তী তাহার
শয়নকক্ষে খোজ লইতে গিয়া দেখিল, প্রমীলা চোখ
বুজিয়া পড়িয়া আছে, তাহার শিয়রের কাছে ক্ষিতীশ
নিঃশব্দে বসিয়া আছে।
বাসন্তী কক্ষে প্রবেশ
করিতেই ক্ষিতীশচন্দ্র উঠিয়া দাঁড়াইল।
প্রমীলার গায়ে হাত দিয়া দেখিল, খুব জ্বর! সে
স্পর্শ করিল, কিন্তু তবুও প্রমীলা চাহিল না। সে

ছােট বউ
তিবিহ্নতকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “ঠাকুরপাে, কখন
মন জ্বর হ'ল, কাল রাত্তিরে যখন উঠে এল,
তখনও কিছু বলে নি ত ?”
ক্ষিতীশ কহিল, জ্বরটা বেড়েচে ভাের ৫ লা
থেকে, তার পর থেকেই এমনই বেহুস হ'য়ে
আছে।”
বাসন্তা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করিল, “ব ত
হলে আগে থেকেই হয়েছিল বুঝি?*
ক্ষিতীশ কহিল, “হ্যা বউদিদি, দিন সাতেক
ওগে থেকেই ওর গা কেমন গরম-গরম বােধ হ'ত,
মাথাও বােধ হয় ধত, তুমি ত জান বউদিদি, ও
ত কাউকে কিছু বলে না, হঠাৎ রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে
গেলে শুনতে পেতাম, ও মাথাটা টিপে ধরে উ:,
কা: করচে।*
বাসন্তী কহিল, “মানুষের শরীরে আর কত
সইতে পারে ঠাকুরপাে, নাওয়া নেই, খাওয়া নেই,
*দন নেই, রাত নেই, সব সময়েই তার সেবা করা,
ও কি কারু কথা শােনে, কত বারণ করেচি, শেষে

ছােট বউ না পেরে ধমকেচি-তবুও সে শুন্ত না-বেশ ম- কাবারও জো নেই, তা হলেই ও যে কেঁদে ফেলে । ঠাকুরপাে ! ওর ভরসাতেই আমি বুক বেঁধে ছিম, ভগবান কি এমনই করে আমাদের মার বেন!” বলিতে বলিতে বাসন্তী কঁদিয়া ফেলিল। দুই হাতে চোখ মুছিয়া বাসন্তী ডাকিল, ছােট- বউ, ও ইছাটবউ।” তবুও কোন সাড়া নাই। সে গবরডাকিল, “প্রমীলা, ও প্রমীলা চোখ চেয়ে দেখ। এবার প্রমীলা চমকিয়া চোখ মেলিল। তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিতে যাইতেছিল, বাসী তাহাকে ধরিয়া ফেলিয়া বলিল, “উঠছিস্ কেন, শো, তাের যে অসুখ করেছে। প্রমীলা ব্যগ্রকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “বঠাকুর কেমন আছেন দিদি ?” বাসন্তী কহিল, “ভাল আছেন, তুই শো।” প্রমীলা জাবার নে ঘুমাইয়া পড়িল ।

অষ্টম পরিচ্ছেদ
এই ঘটনার পর দীর্ঘ ছয় মাস অতিবাহিত
হইয়া গিয়াছে। প্রমীলা তাহার বাপের বাড়ী
রহিয়াছে।
যমদেবের সহিত
যুদ্ধে প্রমীলার পিতা
জয়লাভ করিয়াছেন। অসুখের প্রথম মুখেই সংজ্ঞা
হন। কন্যাকে তাহার পিতা আপন আলয়ে লইয়া
আসিয়া চিকিৎসা করাইয়া, স্বাস্থ্যকর স্থানে হাওয়া
ধাওয়াইয়া, মরণের কঠিন গ্রাস হইতে তাহাকে
ফিরাইয়া আনিয়াছেন। এখন প্রমীলা সম্পূর্ণ সুস্থ।
কিন্তু সে কেমন এক রকম গম্ভীর হইয়া গিয়াছে।
শ্বশুরবাড়ী কি হইতেছে, সে বিষয়ে কেহ কোন
খবর তাহাকে দেয় না। ভাশুরের কথা জিজ্ঞাসা
করিলে, তাহার পিতামাতা বলেন, সে এখন অনেক
ভাল। সে আরও কত কথা জিজ্ঞাসা করে, কিন্তু
কেহই আর বেশী কিছু তাহাকে বলে না। সে
ভাবিত, পনের দিনের উপর হইল, আমরা কলি-
কাতার বাড়ীতে ফিরিয়া আসিয়াছি, এ অবধি

ছােট বউ
C
সে একবারও আমাকে দেখিতে আসিল না ?
আমার ভাশুর যখন ভাল আছেন, তখন সে
কি দুই এক ঘণ্টার জন্য সময় করিয়া আসিতে
পারে না। আমার এত বড় অসুখ গেল,
(म
অসুখ হইতে বাঁচিয়া ফিরিয়া আসিলাম, তবু একবার
সে আমাকে দেখিতে আসিল না । সহসা তাহার
বুকটা 'কমন করিয়া উঠিল। ভাশুরের অসুখ
বাড়েনি ত! এর বেশী সে আব কিছু মনে আনিতে
পারল না !
আরও সপ্তাহ খানেক কাটিয়া গেল। দিন দিন
সে অস্থির হইয়া উঠিতে লাগিল। প্রতিদিনই সে
তাহার পিতামাতাকে বলিত, আমাকে তােমরা
শ্বশুরবাড়ী পাঠাইয়া দাও, একবার দেখিয়া আসি,
তার পর এখানেই থাকিব।
তাের শরীর এখনও ভাল করে সারে নাই,
এখন সেখানে গেলে, তােকে নিয়ে তারা পাঁচজনে
বিব্রত হয়ে পড়বে—একটু সেরে নে।” এই
বলিয়া তাহার জনকজননী তাহাকে থামাইয়া

ছােট বউ
-
রাখতেন। পাচ ছয় দিন প্রমীলা চুপ করিয়াছিল
কিন্তু তাহার পর এক দিন সে জেদ ধরিয়া বসিল,
আমি আজ যাইবই।
তাহার পিতামাতা জানিতেন, তাহার কন্ন্যা
যখন জেদ ধরিয়াছে, তখন তাহাকে আর কিছুতেই
নিরস্ত করা যাইবে না—সে কান্নাকাটি করিবে, কিছু
থে দিবে না, তাহাতে আরও বিপরীত ফল' হইবে।
তাহা ছাড়া পরশু দিন ত তাহাকে যাইতেই।ইবে।
মাঝে মাত্র একটা দিন আছে। এই এক দিনের
জন্য কেন তাহাকে আর যন্ত্রণা দেওয়া।
সেদিন সন্ধ্যার পর প্রমীলা তাহার পিতার সঙ্গে
শ্বশুরালয়ে যাত্রা করিল। সঙ্গে তাহার জননীও
গেলেন। পথে গাড়ীর মধ্যে তাহাকে এ কথা সে
কথা বলিয়া কত রকমে তাহারা বুঝাইয়াছিলেন।
আজ দুদিন প্রমীলা শ্বশুরবাড়ী আসিয়াছে।
সারা দিন সারা রাত অবিশ্রান্ত কঁদিয়াছে, তাহার
ভাশুরের ঘরের মেজের উপর আছড়াছড়ি
করিয়াছে ; তাহার মাতা পাশে বসিয়াছিলেন, তিনি

ছােট বউ
'আজ
কোন রকমে তাহাকে ধরিয়া রাখিতে পারেন নাই ;
এমন কি তাহার সেদিনকার অবস্থা দেখিয়া বাসস্তা
অবধি ক্রন্দন রােধ করিতে বাধ্য হইয়াছিল।
পরদিন সে আর উঠিতে পারে নাই।
আজ সে বারান্দায় আসিয়া বসিয়াছে। পাশে
ময়লা একখানি থান পরিয়া গালে হাত দিয়া বাসন্তাও
বসিয়ালি। বাসন্তীর জ্যেষ্ঠ পুত্রটীও রেলিং ধরিয়া
সেখাগে দাড়াইয়াছিল। দশ বৎসরের বালক, এক
খান। থান ফড়িয়া অর্ধেকটা সে পরিয়াছে, বাকি
অর্ধেকটা তাহার গলায় ঝুলাইয়া দেওয়া হইয়াছে।
তাহার মুখে হাসি ছিল না।
প্রমীলা ডাকিল, “দিদি!” সে আর ও কি
বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু চোখের জলের বন্যায়
বাকি সব কথা ভাসিয়া গেল। অনেকক্ষণ ধরিয়া
সে কঁদিল, বাসন্তী ও কাদিল ।
প্রমীলা চোখ
মুছিতে মুছিতে কহিল, “আমাকে একবার খবর
দিলে না, শেষ সময়ে তার সেবা কতেও পারলাম
। আচ্ছা দিদি শেষটা কি হ'ল?”

ছােট বউ
বাসন্তী কহিল, “শেষটা কেমন বিগারের মত
হল, ভাের বেলা চলে গেলেন, বিকেল থেকে সারা
বাত্রি ভুল বকতে লাগলেন, মাঝে মাঝে দুই একটা
ঠিক কথাও বলছিলেন-মেজ ঠাকুরপাের হাত ধরে
বললেন, তখন প্রায় রাত্রি নটা, জ্যোতিষভাই,
আমার ছেলেরা রইল—দেখি। তার পর বার
দুই ছােটবউ মা এসেছেন, ছােটবউ মা এসেছেন,
এই কথা জিজ্ঞেস করতে করূতে আবার যে ভুল
বকতে আরম্ভ করলেন সে ভুল-বকা আর থাল
না।” এমন সময় লাবণ্য আসিয়া সেখানে বসিল।
তাহার হাতে একখানি রুমাল, সেই রুমালখানি দিয়া
চোখ দুইটী ঢাকিয়া নিঃশব্দে বসিয়া রহিল। প্রমীলা
সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করিল না। সে আবার বাসন্তীকে
জিজ্ঞাসা করিল, “হ্যা দিদি চিকিৎসা ও সেবা-
শুশ্রুষার কমি হয় নি ত ?
বাসন্তী কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল, তাহার পর
ধীরে ধীরে কহিল, “গেরস্ত মানুষের যতদূর সাধ্য
তা হয়েছে বই কি! এক আধ দিন নয় ত, ছ'মাস
৬৪

ছােট বউ
বিছানায় পড়েছিলেন, বাবা আর কত খরচ কতে
পারেন। ছোট্‌ঠাকুরপােকে দেখেছ ত? আহা,
তার একলার ওপর দিয়ে কত কষ্টই না গেছে।
মানুষের যা সাধ্য সে তা কবেচে।
লাবণ্য তখন চোখ হইতে রুমালখানি টানিয়া
লইয়া, বিরক্তিভরে কহিল, “তা বলবে বৈ কি দিদি
এখন'-উনি যে এত করলেন তা একবার নাম ও
কবলে না। আমাদের কথা বলবেই বা কেন দিদি,
আমরা ত আর ছােটবউয়ের মত অমন লােক-দেখান
ও শিখি নি, আবার কারু এমন বিপদের সময়
মিথ্যে অসুখের নাম করে পাঁচ-জায়গায় হাওয়া
খেয়েও বেড়াতে পারি নি, আমাদের নাম করবে
কেন দিদি।
বাসন্তী জানিত, এখন তাহাকে মুখ বুজিয়াই
থাকিতে হইবে! তাহার ত এখন সব গিয়াছে ।
একটা পয়সার দরকার হইলে তাহার যে পরের মুখ
চাহিয়া থাকিতে হইবে।
প্রমীলা আর সে হাস্য-নিরতা, বিবর্জিতক্রোধ

ছােট বউ
প্রমীলা নাই। মেজবউয়ের কথা সে সহ্য করিতে
পারিল না, বােষকম্পিত কণ্ঠে কহিল, “মিথ্যে দোষ
দিলে জিভ খসে যাবে। তােমার মত আমার মন
অত ছােট নয়-তুমি বলে তাই এমন বিপদের
বাড়ীতে হারমােনিয়াম বাজিয়ে আমােদ কতে
পেরেছিলে। থাকতাম যদি সে সময় আমি, দেখতাম
কি করে তুমি এ বাড়ীতে বসে হারমোনিয়াম
বাজাতে ! এ সময় আর আলিয়া না-নিজের ঘরে
চলে যাও, যদি মানুষের চামড়া তােমার গায়ে
থাকতাে তা হলে আমাদের সঙ্গে বসে দুখের ভাগ
নিতে পারতে ?”
প্রমীলা এমনই উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছিল যে,
তাহার মুখ দেখিয়া বাসন্তী অবধি ভীত হইয়া
উঠিল। সে তাড়াতাড়ি উঠিয়া দুই হাত বাড়াইয়া
তাহাকে কোলের মধ্যে টানিয়া লইয়া কহিল, “লক্ষ্মী
বােটি আমার, ঠাণ্ডা হ, তুই ত এমন ছিলি নি।”
প্রমীলা তাহার ক্রোড়ের ভিতর হইতে মুখ তুলিয়া
কহিল, “ছিলাম না, এখন হয়েচি। মেজদি যদি

ছােট বউ
মানুষ হত, তা হলে আমিও সইতাম। এর শাস্তি
একদিন হবেই।”
অপমান ও ক্রোধে লাবণ্য এতক্ষণ ফুলিতেছিল ।
প্রমীলার এই শেষ কথায় সে চীৎকার করিয়া কহিল,
“ওয়ে ও ছোটলােকের মেয়ে, আমি তাের বাবার
খাই, মা পরি,যে তুই আমায় শাসাতে এয়েছিস,ভারি
তেজ হয়েছে, আমায় উনি হারমােনিয়াম বাজাতে
দিতেন। এই এখনি গিয়ে হারমােনিয়াম বাজাব,
দেধি কোন্ নবাবের বেটী কি করতে পারে ?”
এই বলিয়া লাবণ্য সশব্দপদবিক্ষেপে উপরে উঠিয়া
গেল।
প্রমীলা বড় বউয়ের বুকের মধ্যে মুখ
লুকাইয়া কুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতে লাগিল। বাসন্তী
তাহার চোখ মুছিয়া দিতে লাগিল।
এমন সময় উপরে লাবণ্যর ধরে হারমােনিয়াম
রাজিয়া উঠিল। প্রমীলা ধড়মড় করিয়া উঠিয়া
বসিল। তাহার মনে হইল, তাহার মাথার মধ্যে,
বুকের মধ্যে কে যেন তীক্ষ শলাকা বিধিয়া দিল।
উঃ বলিয়া প্রমীলা দুই হাতে বুক চাপিয়া ধরিল।

ছােট বউ
তাহার পর সহসা উপরের ঘরের অভিমুখে ছুটিয়া
বাসন্তী বাধা দিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু
গেল।
পারিল না!
৫৫
লাবণ্যর ঘরের দুয়ারের সম্মুখে গিয়া সে কহিল,
“এ তােমার বাবার বাড়ী নয়, এখানে ও সব চৰে
না, অত সখ যদি থাকে, বাপের বাড়ী গিয়ে বজাও
গে।” বলিয়া ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিতে যাইতে,
ছিল, লাবণ্য ধমূকাইয়া বলিল, “ঝী, খবরদার!
ঢুকতে দিবি নি।
ঝী প্রমীলার পথরোধ করিয়া দাঁড়াইয়া কহিল,
সরে যাও গাে,সরে যাও! এ ঘরের মধ্যে এস
না, আমরা ছােটনােক, কেন অপমান হবে।”
প্রমীলা কাঠ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। সহসা সমস্ত
দেহটা তাহার থথ করিয়া কঁপিয়া উঠিল।
তাহার চোখের সম্মুখ হইতে দিনের আলো ধীরে
ধীরে সরিয়া যাইতে লাগিল। চারিদিক হইতে
আঁধার তাহাকে ঘিরিয়া ধরিল। সেই আঁধারের
মধ্যে দুই হাত বাড়াইয়া সে চৌকাট ধরিতে গেল।
৩৮

ছােট বউ কিন্তু হায়! কোথায় চৌকাট। ছিন্ন তরুর মত ভূমিতলে সে আছড়াইয়া পড়িল। খানিক পরে ভগবান দত্ত তাহার মধ্যম পুত্র জ্যোতিষচন্দ্রকে ডাকিয়া কহিলেন, “ছেলে মরলে বাবে বুকে যে বাজে ! আমি যে বাপ! এখনও এক মাস হয় নি আমার ছেলেটী মরেচে। বউমাকে বল, হারমােনিয়াম বাজান বন্ধ করতে—আমার :কের মধ্যে যে জাল করে উচে।” জ্যোতিষচন্দ্র নীরবে পিতার কথা শুলি, তাহার পর উপরে স্ত্রীর নিকট চলিয়া গেল। হারমােনিয়াম বা থামিল বটে, কিন্তু তাহার ঘরের মধ্যে দ্রব্যাদি তােলা-নামার শক হইতে লাগিল। ঘণ্টাখানেক পরে জ্যোতিষচন্দ্র পিতার নিকট গিয়া কহিল, “বাড়ীর ছােট বড় সবাই মিলে এক- জনকে গালাগালি করলে তার পক্ষে এ বাড়ীতে থাকা চলতে পারে না, দিনরাত ও মিথ্যামিথ্যি চেঁচামেচীর ভেতর সে থাকতে পারবে না।” ভগবান দত্ত পুত্রের মুখের দিকে স্তম্ভিত হইয়া

ছােট বউ
চাহিয়া রহিলেন। তাহার পর ভগ্নকণ্ঠে কহিলেন,
“কাল কামান, এক জায়গায় কামাতে হয়, কালকের
দিষ্টা বাদ দিয়ে গেলে বােধ হয় বউমার বেশ কষ্ট
হবে না।”
জ্যোতিষচন্দ্র কহিল, “এ বাড়ীতে আর রাতে
পারব না। কাল যদি দরকারই হও, তা হয়ে সেই
সময় না হয় একবার আসবে।”
ভগবান দত্ত আর সহ্য করিতে পারিলে না,
কহিলেন, “অমন ছেলে-বউয়ের মুখ দেখলেও পাপ!
যেখানে পার খেয়ে পরে থাক গে, আমার বাড়ীতে
তােমাদের আর কোন দিন জায়গা হবে না।”
জ্যোতিষচন্দ্র আশু পুত্ৰশােকবিধুর পিতাৰ
মুখের উপর বলিয়া গেল, বয়স হলে মানুষের
এমনই ভিরতি হয়। আদালত পড়ে রয়েছে-
বাড়ী নাই পাই, মকদ্দমার খরচে বাড়ীর ইটকাট
বেচয়ে তবে ছাড়ব।”
৭০

নবম পরিচ্ছেদ
মাস দুই পরে বাসন্তীর ছেলে হরিশ সন্ধ্যার
সময় প্রমীলার কাছে বসিয়া কহিল, “কাকিমা,
মোরা কেমন গাড়ী কিনেচে।
মালা জিজ্ঞাসা করিল, “তুই কি করে জালি?”
হরিশ কহিল, “তারা যে গাড়ী চড়ে আমাদের
ঐ মাঠে বেড়াতে এসেছিল, সঙ্গে মেজকাকিমাও
প্রমীলা কহিল, “বটে, মেজদিদিও ছিলেন ।
শুনলে দিদি কাণ্ডটা। ওদের বাপ নেই কি না, তাই
মেজদিদি গাড়ী চড়ে ওদের দেখাতে এসেছিল।”
হরিশ আবার কহিল, “মােনা আমাকে গাড়ী
চড়তে ডাকছিল কাকিমা।”
প্রমীলা তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করিল, “তুই
যান নি ত চড়তে ?
কাকিমার কণ্ঠস্বরে হরিশ ভয় পাইল। সে
ভাবল, কাকিমা হ ত কত বকবেন, কিন্তু সে
৭১

ছােট বউ
মিথ্যা কথা বলিতে শিখে নাই, তাই ভয়ে ভয়ে
উত্তর করিল,“হ্যা কাকিমা আমি চড়তে গেছলাম।”
তাহার কাতর মুখখানি দেখিয়া প্রমীলা অন্তরে
বেদনা অনুভব করিল। হরিশকে কাছে টানিয়া
আনিয়া সস্নেহে কহিল, “বেশ করেছিস, চড়তে
গিয়েছিলি তাতে হয়েছে কি?”
হরিশ ধীরে ধীরে আবার কহিল, “আমি
ছুটে
চড়তে গেলাম, মেজকাকিমা আমায় চড়তে দিলেন
ন—বল্লেন তাের বড়লােক কাকিমা আছে তাকে
বগে না গাড়ী কিনে দিবে। আমার এ গাড়ীতে
চড়তে এসেচি কেন? কাকিমা, তুমি আমাদের
গাড়ী কিনে দেবে কাকিমা?”
প্রমীলার চোখ দিয়া যেন আগুন ঠিক্রাইয়া
বাহির হইতে লাগিল, দৃপ্তকণ্ঠে সে কহিল, “কালই
গাড়ী কিনে দেব তােদের। দিদি, চিরদিনই কি
এমনই যাবে! এত অহঙ্কার।
বাসন্তী বার বার নিষেধ করিল, কত বুঝাইল,
কিন্তু প্রমীলা জেদ ছাড়িল না। পরদিন ভোের
१२

ছােট বউ
হইতে না হইতেই সে বাপের বাড়ী চলিয়া গেল ।
সেখানে তাহার জননী নানারকম মিষ্ট কথায়
তাহাকে বুঝাইবার চেষ্টা করিল, কিন্তু কোন ফল
হইল না। অগত্যা তাহার পিতা সেই দিনই গাড়ী
কিবার সব বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন।
সন্ধ্যার সময় গাড়ী আসিয়া হাজির হইল।
লাবণ্যর গাড়ী ঘােড়া যেরূপ ছিল, প্রমীলার দাদা
খোঁজ, লইয়া সেইরূপ গাড়ী ঘােড়া কিনিয়া আনি-
লেন। প্রমীলা ইতিপূৰ্বেই হরিশ ও তাহার ভাই
বােনদের সাজাইয়া রাখিয়াছিল, গাড়ী আসিতেই
তাহাদের সেই গাড়ী করিয়া লাবণ্যর বাড়ী বেড়াইতে
পাঠাইয়া দিল। যাইবার সময় বলিয়া দিল, “দেখি
সেখানে যেন কিছু খাস্ নি, যাবি, নেমেই অমনি
চলে আবি।”
প্রমীলা ও লাবণ্যর মধ্যে বিষম প্রতিদ্বন্দ্বিতা
চলিতে লাগিল। লাবণ্য যে যে স্কুলে তাহার
ছেলেমেয়েদের ভর্তি করিয়াছিল, প্রমীলাও বাসন্তীর
ছেলেমেয়েদের সেই সেই স্কুলে ভর্তি করিয়া দিল।
৭২

ছােট বউ
লাবণ্যর ছেলেমেয়েরা যে পােষাক পরিয়া স্কুলে
আসিত, ও ৰেড়াইতে বাহির হইত, বাসন্তীর ছেলে-
মেয়েরাও ঠিক সেই পােষাক পরিয়া যাইত।
এমনই করিয়া এক বৎসর কাটিয়া গেল। তখন
ইউরােপে মহাসমব বাধিয়া গিয়াছে । ত:নক
ব্যবসায়ী শঙ্কাৰিত হইয়া অবস্থান করিত্বে ছিল।
৪ একজন ব্যবসায়ী, যাহাদের জৰ্মানীর মাল লইয়া
কাববার, তাহাদের ব্যবসায় যায়-যায় হইয়া উঠিল ।
তাহাদের বুঝি পথের ভিখারী হইতে হয় ?
৪

দশম পরিচ্ছেদ
মাস চারেক পরে হরিশ স্কুল হইতে আসিয়া
প্রমীলাকে কহিল, “কাকিমা, মােনার গাড়ী বিক্রি
থে ফেলেছে।”
এমীলা জিজ্ঞাসা করিল, “কবে রে?”
হাশ কহিল,“তা ; জানি নি কাকিমা,-মােন
আজ বল্লে তাই শুনলাম
প্রমীলা কহিল, “ বচলে রে, মােনা কিছু
বললে না?”
হরিশ কহিল, “আমি তা ত মােনাকে কিছু
জিজ্ঞেস করি নি কাকিমা ;
প্রমীলা কহিল, “বেশ করেচিস। যা কাপড়-
চোপড় ছেড়ে খাবার খেগে যা।
সেদিন রাত্রে প্রমীলা ভাল করিয়া খাইতে
পারিল না। তাহার দেহ কেমন অসুস্থ বােৰ
হইল। দিন দুই পরে প্রমীলা বাসন্তীকে কহিল,
“কি বল দিদি, গাড়ী বেচে ফেলে দি ? মিছে কেন

ছােট বউ
ছােট
অতগুলো টাকা নষ্ট হয়, ওরা আর এটুকু হেঁটে
যেতে পারবে না?
বাসন্তী মহাখুসী হইয়া বলিল, “এত দিন পরে
যে তাের সুবুদ্ধি হ’ল এই ভাগ্যি, আমি ত গাড়ী
কিনতেই বারণ করেছিলাম, তুই ত কারু কথা
শনিবার মেয়ে নস্ ! ওদের চেয়ে কত
ছেলেরা হেঁটে যাচ্চে, ওরা আর পারবে না। কার
কথায় এমন সুবুদ্ধি হ’ল শুনি?”
প্রমীলা কহিল, “কার কথায় আবার!। সব
সময় কি সব কথা বুঝতে পারা যায়। তখন অত
বুঝতে পারি নি। এখন ভেবে দেখলাম অত বড়-
মানুষী ভাল না।”
মাসখানেক পরে
পরে হরিশ স্কুল হইতে বাড়ী
ফিরিয়া তাহার ছােট কাকিকে কহিল, “জান
কাকিমা, মােনার। দুমাস মাইনে দেয় নি বলে মাষ্টার
মশায় তাদের নাম কেটে দিয়েছেন—আজ স্কুলের
ছুটির পর তাদের বলে দিলেন, কাল থেকে তাের।
স্কুলে আসিস নি।”
প্রমীলা আজ কোন কথা কহিল না। দীর্ঘ

ছােট বউ নিঃশাস ফেলিয়া নিজ শয়নকক্ষের অভিমুখে চলিয়া গিয়া বিছানার উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া রহিল। পর দিন দুপুর বেলা ভগবান দত্ত আহার করিয়া নিজের ঘরে বসিয়া তামাক খাইতেছিলেন ; বহুদিন পরে জ্যোতিষচন্দ্র আসিয়া সেই কক্ষে প্রবেশ করিয়, নত হইয়া পিতাকে প্রণাম করিল। ভগবান দও একবার চাহিয়া দেখিয়া মুখ নিচু করিয়াই তামাক টানিতে লাগিলেন। জ্যোতিষ অর্ধ ঘণ্টা একভাবে দাঁড়াইয়া রহিল। ভগবান দত্ত কোন কথা বলিলেন না, বা আর একবার চাহিয়াও দেখি- লেন না। জ্যোতিষের পরিধানে অমলিন বস্ত্র, তৈলহীন কেশ উচ্ছল ভাবে তাহার মাথার উপর পড়িয়াছিল। জ্যোতিষও কোন কথা না বলিয়া কক্ষের বাহির হইয়া যাইতেছিল, প্রমীলা ক্ষিতীশ- চন্দ্রকে ডাকিয়া কহিল, “মেজ ভাশুর চলে যাচ্ছেন, একবার গিয়ে জিজ্ঞেস করে এস না, তার খাওয়া দাওয়া হয়েছে কি না? এত বেলা পর্যন্ত রইলেন, শেষে না খেয়ে যাবেন।

ছােট বউ
সেদিন সন্ধ্যার সময় প্রমদা ঠাকুরঝি আসিয়া
বাসন্তীকে কহিল, “জান বউদিদি, মেজ বউদিদির
দাদাদের ব্যবসা ফেল হয়ে গেছে, তাদের দুরবস্থার
একশেষ হয়েছে, মেজবউদিদিও তার সমস্ত টাকা
সেই ব্যবসায় দিয়েছিল, তারও না কি এখন খুব
কষ্ট। ধৰ্ম্মে কি এত সয়, বল ত বউদিদি
আবার বাবার কাছে এসে পড়তে হবে, না হলে
আর খাবেন কি ছাই।”
প্রমীলাও সেখানে বসিয়াছিল, সে চুপ করিয়া
সমস্ত কথা শুনিল। ভাল মন্দ কিছুই বলিল না।
৭৫

একাদশ পরিচ্ছেদ
দিন দুই পরে বিকাল বেলা প্রমীলা ক্ষিতীশ
চন্দ্রের সহিত একখানা ভাড়া গাড়ী করিয়া বাটীর
বাহির হইয়া গেল। পূর্বে যেখানেই সে যাইত,
বাসন্তীর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে লইয়া যাইত, কিন্তু
আজ আর সে কাহাকে সঙ্গে লইল না। কোথায়
যাইতেছে তাহাও সে বলিল না।
তাহাদের গাছী যখন লাবণ্যর বাড়ীর দুয়ারে
আসিয়া দাড়াইল, তখন সেই বাড়ীর চারিপাশে
ভিড় জমিয়া গিয়াছিল, বাটীর ভিতর প্রবেশের দ্বাবে
দুই জন আদালতের পেয়াদা দ্বার ঠেস্ দিয়া দাড়াইয়া-
ছিল, বাহিরের উঠানেও আর একজন পেয়াদা
দাড়াইয়া জ্যোতিষচন্দ্রকে কটু ভাষায় গালি দিতে
ছিল।
একজন লালপাগড়ী পায়চারি
করিয়া বেড়াইতেছিল।
গাড়ীর ভিতরে প্রমীলার বুকটা ছৎ করিয়া
ক্ষিতীশচন্দ্র ব্যাপার জানিবার জন্য গাড়ী
হইতে নামিয়া ভিতরে প্রবেশ করিতে গিয়া বাধা
পাইয়া ফিরিয়া আসিয়া প্রমীলাকে কহিল, পেয়াদারা
উঠিল।

ছােট বউ
বাহিরের কোন লােককেই ভিতরে প্রবেশ করিতে
দিবে না।
পেয়াদার হাতে দশ টাকার একখানি নােট
দিয়া কেবলমাত্র প্রমীলা ভিতরে প্রবেশ করিবার
অধিকার পাইল। ক্ষিতীশ বাহিরেই দাড়াইয়া রহিল
কম্পিত পদে প্রমীলা উপরে উঠিতে লাগিল।
তাহাকে দেখিয়া জ্যোতিষের মুখখানি ভয়ে এতটুকু
হইয়া গেল! সে প্রমীলার সম্মুখে মেঝের উপর
বসিয়া পড়িয়া কহিল, “বউমা, আমাদের র,ে কর,
আমাকে ধরিয়ে দিয়ে না!”
প্রমীলা কাদিয়া ফেলিল। পাশের ঘরে মেঝেয়
উপর লাবণ্য উপুড় হইয়া পড়িয়াছিল, প্রমীলা সেই
ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া লাবণ্যর পায়ের কাছে
ৰসিয়া পড়িল। দুই হাতে লাবণ্যর পা দুখানি
জড়াইয়া ধরিয়া কঁদিতে কঁদিতে কহিল, “মেজ
দিদি, আমায় মাপ কর । আর কখনও আমি
তােমার মুখের উপর কথা বলব না। তােমরা
বাড়ী ফিরে চল।”
সমাপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Choto Bou

Author
Pal, Sri Phanindranath
Title
Choto Bou
File name
Choto Bou
Text
OCR done
Citation
1915
Published
2009/08/5
Publisher
Mitra And Co. Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
86
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Chote Bou - Story
DLI number
512565
Barcode
4990010019628.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
EhgpqjNasSV
Download PDF

Choto Bou