Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Prakritik Bhugal Bisayak Katipai Path
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
EXTRACTED CHAPTERS
FROM THE
RUDIMENTS OF PHYSICAL GEOGRAPHY
FOR INDIAN SCHOOLS.
By H. F. BLANFORD,
TRANSLATED BY
BABOO PURNA CHANDRA DAYPA
FOR THE AUTHOR.
Price, Ten Annas.
প্রাকৃতিক ভূগােল বিষয়ক কতিপয় পাঠ।
এচ এ ব্রানফোর্ড সাহেবের কৃত
ইংরাজি প্রাকৃতিক ভূগােল হইতে
পূর্ণ চন্দ্র দত্ত কর্তৃক অনুবাদিত।
মূল্য দশ অনা।
CALCUTTA:
THACKER, SPINK AND CO.,
Publishers to the Calcutta University.
1876.
(.41.CITTA: PAINTEL, BY THACKER, SPINK & co.
PREFACE. Tue following pages are a translation of those Chapters of the little English work which have been selected by the University for School Examinations. The translation was undertaken at the request of the Director of Public Instruction ; and it was intended that it should appear in the latter part of 1875. The publication bas, however, been impeded by various causes of delay, partly arising out of the necessity uuder which I found myself of going through the whole carefully with the translator to ensure, as far as possible, the accurate rendering of the meaning. If there be any literary merit in the translatiou, it is to be credited exclusively to the translator. H F. B. April, 1876.
No text on this page.
প্রাকৃতিক ভূগোল। উপক্রমণিকা। প্রাকৃতিক ভূগােল কাহাকে বলে ? প্রাকৃতিক ভূগােল কাহাকে বলে, ইহার উদ্দেশ্য কি, অর্থে এ বিষয়ের নিরূপণ করিতে হয়। জনসাধারণের চির-পরিচিত কোন দৃশ্যসম্বন্ধে ইহার বিশেষ উপলব্ধি হইবে সন্দেহ নাই; অতত্রব পাঠক আষাঢ় কি শ্রাবণের প্রারম্ভে বৃষ্টির অব্যবহিত পরেই একবার সন্নিকটস্থ নদীতটে গমন করিয়া তাহার কর্দমময় স্রোতের প্রতি দৃষ্টিপাত কর। কোথাও শ্যামল নীলিক্ষেত্র,কোথাও পীত শস্যক্ষেত্র দ্বারা যে চর সমাচ্ছাদিত ছিল অত তাহার অধি- কাংশই স্রোতােপ্রভাবে ভগ্ন হইয়া জল-গর্ভে প্রােথিত হই- য়াছে। যে অংশ অদ্যাপি জলসাৎ হয় নাই তাহাও ক্রমে ক্রমে অদৃশ্য হইতেছে। এবং প্রাসাদপরম্পরা হইতেও বৃহদাকার মৃৎপিণ্ড সমুহ সময়ে সময়ে স্থানচ্যুত হইয়া স্রোতে বিলীন হইতেছে । হয়ত অনেকশঃ তুমি এরূপ প্রত্যক্ষ করিয়াছ কিন্তু কেন যে এরূপ সং দৃষ্ট হয় ইহা কি কখন আপনাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে? নদীসমূহ কখন জলপূর্ণ এবং কখন শুষ্কপ্রায় হইয়া যে একদিকেই প্রবাহিত হয় এক বার চর বন্ধন করিয়া আবার যে ভঙ্গ করিয়া দেয় ইহা কি কৌতুকাবহ নহে? প্রতিবৎসরই এরূপ সংঘটিত হইয়া আসিতেছে এবং হয়ত অর্ধ শতাব্দী পরেও এরূপ দৃশ্য দেখিতে পাইবে । এক্ষণে কিঞ্চিৎ । ক ২ প্রাকৃতিক ভূগোল। অনুধাবন করিয়া দেখিলে অবশ্যই স্মরণ হইবে, যে চর অদ্য ক্রমে অদৃশ্য হইতেছে দুই বৎসর পূর্বে উহা সেই স্থানে কিম্বা সেই রূপ প্রশস্ত ছিল না। যে নদীতটে দণ্ডায়মান হই, য়াছ শীতকালে তাহাও, তাদৃশ গভীর ছিল না। জনৈক বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা কর, বলিয়া দিবে ত্রিশ কি চল্লিশ বৎসর পূর্বে এই নদীই ক্ষুদ্র খাল মাত্র ছিল । পুরাতন যে প্রণালী এক্ষণ কতিপয় পুষ্করিণীপরম্পরা বলিয়া বােধ হয় তাহা এককালে এতাদৃশ গভীর ছিল যে নিদাষ সময়েও পােতের সহায়তা ব্যতিরেকে পার হওয়া যাইত না। ঈদৃশ পরি- বৰ্ত্তন বঙ্গদেশে নিয়তই সংঘটিত হইতেছে। কেবল এ অংশে এমন নয়, অন্যান্য অংশেও এরূপ পরিবর্তনের বিষয় শুনিতে পাওয়া যায়। যাহার কিছুকাল ঢাকা, বগুড়া, কিম্বা ময়মনসিংহে বসতি করিয়াছেন, তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলে জানা যাইবে, পুরাকালে ব্ৰহ্মপুত্র, ময়মনসিংহ হইয়া ঢাকা এবং তদুত্তরস্থিত মাধপুর জঙ্গলের পূর্বদিকে প্রবাহিত হইত। কিন্তু ৬০/৭০ বৎসর হইতে, উহা সেই দিকে প্রবাহিত না হইয়া মাধাপুর এবং ঢাকার পশ্চিম দিয়া গােয়ালন্দ ষ্টেশনে গঙ্গার সহিত সম্মিলিত হইতেছে। রঙ্গপুরের কাহাকেও জিজ্ঞাসা করিলে জানা যাইবে তিস্তা নদী হিমালয় হইতে উদ্ভূত হইয়া পূর্বে দক্ষিণাভিমুখে প্রবাহিত হইত এবং জাফরগঞ্জে গঙ্গার সহিত সম্মিলিত ছিল। কিন্তু ১৭৮৭ খৃষ্টাব্দ হইতে পূৰ্বাভিমুখে প্রবাহিত হইয়া দেওয়ানগঞ্জে ব্ৰহ্মপুত্রের সহিত সম্মিলিত হই- তেছে। অনেকেই ইহাদিগকে জনশ্রুতি বলিয়া উপেক্ষা করিতে পারেন। কিন্তু ইহারা বাস্তবিক পুরাবৃত্ত ঘটিত কথা, অলীক প্রসঙ্গ নহে। পূর্বে যে মানচিত্র অঙ্কিত হইয়াছিল তাহাও ইহাদের পক্ষ সমর্থন করিতেছে। অতএব নিয়তই যে সকল গুৰুতর পরিবর্তন পরম্পরা সংঘটিত হইতেছে তাহার অত্যল্প অংশ মাত্র এই নদীতে সংলক্ষিত হইয়া থাকে।
উপক্রমণিকা। ৩ আর একটা এরূপে কেবল যে নদীর পরিবর্তন হইতেছে এমন নয়, নদী দ্বারাও অন্যান্য পরিবর্তন সাধিত হইতেছে। একবার স্রোতের প্রতি নিরীক্ষণ করিলে দেখিতে পাইবে জল বহুল কর্দমে মিশ্রিত হইয়া এরূপ কলুষিত হইয়াছে যে কিছু কাল না রাখিয়া পান করা যায় না। কিন্তু পাঁচ ছয় দণ্ড কাল কোন পরিচ্ছন্ন পাত্রে রাখিয়া দেও, নিম্নে একটা কর্দমময় স্তর পড়িয়া উহা ক্রমশঃ স্বচ্ছ হইতে থাকিবে এবং এরূপে কিয়দিবস অতীত হইলে সম্পূর্ণ নিৰ্ম্মল হইয়া যাইবে।* পরন্তু এক্ষণে প্রথমের স্থূল স্তরের উপর সূক্ষম ওর দেখিতে পাইবে। ইহাই মিশ্রিত থাকাতে এ অংশের এবং অন্যান্য অংশের জল তাদৃশ কলুষিত হইয়াছে। কিন্তু এক্ষণে বলা যাইতে পারে কিছু দিন স্থিরভাবে থাকিলে নদীর জলও পাত্রন্থিত জলের ন্যায় স্বচ্ছ ও নির্মল হইয়া যাইবে। নদী স্থিরভাবে থাকিলে তাহার অবশ্য সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আমরা সকলেই অবগত আছি নদী এক মুহূর্তের জন্যও স্থির থাকে না। নিয়তই সাগর- ভিমুখে প্রবাহিত হয়। এবং কর্দম মিশ্ৰিতাবস্থায় শ্রোত- প্রভাবে সাগরে নীত হওয়াতে নদীর জল তাদৃশ নির্মল হইতে পারে না। সাগরে নীত হইলে কর্দমের যে কীদৃশ পরিবর্তন হয় ইহা পরে জ্ঞাতব্য। কিন্তু এক্ষণে জিজ্ঞাসা করা যাইতে পারে নদীর সকল অংশই কলুষিত, বহুল কর্দম মিশ্রিত না থাকিলে ইহার সম্ভাবনা ছিল না। তবে এই কর্দম এত বহুল পরিমাণে কোথা হইতে আসিতেছে? এবং প্রতি- বৎসরই এরূপ আসিতেছে তবুও কি তাহাতে কোন পরিবর্তন সাধিত হয় না? অবশ্য ইহা জানিবার জন্য কুতুহল হইতে পারে। অতএর পাঠক একবার নয়ন ফিরাইয়া ঐ পয়াে- নালার প্রতি দৃষ্টি-নিক্ষেপ কর। উহা এক্ষণ পর্যন্ত প্রাতঃ- * ইহাকেই পরীক্ষণ কহে। এবং সতর্কতার সহিত যাহা দর্শন করিতেছ তাহাকে পরিদর্শন কহে । প্রকৃতির বিষয় অামরা যাহা জানিতে পারিয়াছি তাই। এই দুই উপায়েই অবধারিত হইয়াছে।
৪ প্রাকৃতিক ভূগোল। কালের বৃষ্টি জল বহন করিয়া শ্রান্ত হয় নাই। অদ্যাপি কল কল রবে প্রবাহিত হইতেছে। উহার জল যে কি কর্দমময় অবশ্যই অনুভব করিতেছ। কিন্তু আকাশ হইতে পড়িবার সময় উহা তাদৃশ কলুষিত ছিল না। উহাতে আমাদের অনেকেরই পরিধেয় আর্দ্র হইয়াছিল কিন্তু তাহার একটীও মলিন হয় নাই। ভূমিতে পতিত হইয়াই উহা চতুষ্পার্শ্বের মল ও কর্দমে ঈদৃশ কলুষিত হইয়াছে। নদীর পক্ষেও তাহাই ঘটিয়া থাকে। যে বিশাল জলরাশি তৎকর্তৃক সাগরে নীত হইতেছে ইহাও কিছুদিন পূর্বে আকাশ হইতে বৃষ্ট হইয়াছে, এবং পয়ােনাদিতে সঞ্চিত হইয়া ক্রমে শ্রোতােরূপে এবং শ্রোতােপরম্পরাযােগে নদীরূপে পরিণত হইয়াছে। যে কর্দম উহার নির্মল জলের বিবর্ণতা সম্পাদন করিয়াছে উহা ভূভাগ হইতেই সমাহৃত হইয়াছে। কিন্তু নদী সাগরে গমন করে, তথা হইতে প্রত্যাগমন করে না। এবং নদীপ্রভাবে যে কর্দম সাগরে নীত হয় তাহাও সুতরাং প্রত্যানীত হয় না। তবে কি এরূপে ধৌত হইয়া সমুদয় ভূভাগই. ক্ষীণ হইতেছে ? সত্য বটে নিয়তই এরূপ ঘটিয়া থাকে, কিন্তু তন্নিবন্ধন সৰ্ব্বদাই যে ভূভাগের হ্রাস হইতেছে এমন নয়। পার্শ্বের কৃষকমণ্ডলীকে জিজ্ঞাসা কর জানিতে পারিবে বন্যার সময় নদী হইতে যে জল পরীবাহিত হয় তদ্বারা পূৰ্বে গভীর বলিয়া যে জল। কর্ষণের অযােগ্য ছিল তাহা ক্রমেই পূর্ণ হইয়া শস্যক্ষেত্রের আয়তন বৃদ্ধি হইতেছে। বঙ্গদেশের সমুদয় ক্ষেত্ৰই এরূপে সমুৎপন্ন। উহা উৎপন্ন হইতে অনেক সহস্র বৎসরের প্রয়ােজন হইয়াছে সন্দেহ নাই। কিন্তু তদীয় মৃত্তিকাতেই তাহার ইতিবৃত্ত রহিয়াছে। পরীক্ষণ ও অনুশীলনসহকারে অধ্যয়ন করিলে তাহা অনায়াসেই জানা যায়। বঙ্গদেশ যে এককালে সাগরাংশ ছিল এবং উহার সমুদয় ক্ষেত্র যে নদীর পলি হইতে সমুৎপন্ন এক্ষণে এ বিষয়ের আর সন্দেহ নাই।
উপক্রমণিকা। অতএব নদীদ্বারা ভূভাগের যে কীদৃশ পরিবর্তন হইতেছে, পাঠক- বর্গ এক্ষণে তাহার কিঞ্চিৎ অনুভব করিতে পারিয়াছেন। কিন্তু নদীর সম্বন্ধে অনুধাবনের এখনও অনেক বিষয় অবশিষ্ট আছে। নদী সমুহ উচ্চ অঞ্চলে উদ্ভূত হইয়া কেন যে নিম্ন- ভিমুখেই গমন করে, এবং কখনং কেন যে তাদৃশ উচ্ছসিত হয় এবিষয় কাহার না জানিতে ইচ্ছা হয় ? পাঠক সমীপস্থ কূপ হইতে কৃষকেরা যে কি উপায়ে শস্যক্ষেত্রে জল সেচন করিতেছে একবার তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত কর। তাহাদের অগ্রে একটী প্রণালী প্রস্তুত করিতে হইয়াছে। ঐ প্রণালীর শস্য-ক্ষেত্ৰ সন্নিহিত প্রান্ত অপর প্রান্ত হইতে কিঞ্চিৎ নিম। সিঞ্চনীদ্বারা এক্ষণেউচ্চ প্রান্তে জল-সেচন করিতেছে এবং সেই জল নিম্নভিমুখে ধাবিত হইয়া শস্যক্ষেত্রের উর্বরতা বৃদ্ধি করিতেছে। নিমগা নদীও এ প্রণালীর অনুক্রম মাত্র। উহাও উচ্চ অঞ্চল হইতে নিম্নদিগে প্রবাহিত হইয়া স্বীয় নিম্নগা নামের অর্থ প্রতিপাদন করিতেছে। কিন্তু এবিষয় আমরা অনুভব করিতে পারি না। উহা এরূপ ক্রমনিম্ন হইয়া আসি- য়াছে যে বাস্তবিক জলদি হইতে অবনত হইলেও দৃষ্টিমাত্রে কেহ তাহা মনে করিতে পারেন না। বহরমপুর অথবা মুরশিদাবাদ হইতে যদি গঙ্গাপ্রবাহে সাগর বিন্দু পৰ্যন্ত গমন করা যায় তাহা হইলেও কোন নিম্নতার অনুভব হয় না। সমুদয় অংশই সমান উচ্চ বলিয়া বােধ হয়। কিন্তু বাস্তবিক অবধারিত হইয়াছে যে এরূপে আমরা ক্রমশঃ ৬০ ফুট অবতরণ করিয়া থাকি। সেরূপ কাশীধাম হইতে কেহ যদি জল-পথে ঢাকায় যাত্রা করেন তাহার প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত সর্বত্র সমান বােধ হইবে। কিন্তু অজ্ঞাতসারে তিনি বাস্তবিক ২৪০ ফুট অবতরণ করিবেন। ঢাকায় না গিয়া যদি মুঙ্গিরেই পৰ্য্যটনের শেষ হইত তাহা হইলেও তিনি কিঞ্চিত্র অবগত না হইয়া ১০০ ফুট অবতরণ করিতেন।
প্রাকৃতিক ভূগােল। অতএব দেখা যাইতেছে নিম্নগা নদী ক্রমনিম্ন ভূমির উর্ধ হইতে নিয়েই গমন করে। কিন্তু নিম হইতে উর্দ্ধে গমন করে না। এজন্যই উহা সৰ্ব্বদা একদিকে প্রবাহিত হইয়া থাকে। পরন্তু পূর্বেই বলা হইয়াছে ইহা সহজে অনুভূত হয় না। ক্রমনিম্নতার এত অল্পে অষ্পে বৃদ্ধি হইয়া থাকে যে সমােজ্ঞায় পরিজ্ঞাপক লেভেল যন্ত্রের সহায়তা ব্যতিরেকে তাহা কোন মতেই স্থির করা যায় না। যে শক্তি প্রভাবে নদী নিমাভিমুখে প্রবাহিত হয় সেই শক্তি প্রভাবেই উৎক্ষিপ্ত প্রস্তরখণ্ড ভূতলে প্রত্যাবর্তন করে। এই শক্তিকে মাধ্যাকর্ষণ কহে এবং ইহার বিষয় পরে জ্ঞাতব্য। এক্ষণে পাঠকবর্গ আবার জিজ্ঞাসা করিতে পারেন নদী নিয়তই স্রোতােজল বহন করে, এক মুহূর্তের জন্যও শ্রান্ত হয় না। নদীর উৎপত্তি স্থানে জল কোন উপায়ে নীত হইলে ইহা কিরূপে সম্ভব হইতে পারে ? বস্তুতঃ জল তথায় নিয়তই নীত হইতেছে। এবং কি উপায়ে যে উহা নীত হইতেছে নিম্নলিখিত পরীক্ষা সম্বন্ধে ইহাও বিশেষ উপলব্ধি হইবে। যাহাতে জল প্রবেশ করিতে পারে না এরূপ কোন মসৃণপাত্রে উহার কিঞ্চিৎ রাখিয়া দেও, ক্রমে ক্রমে উহা উডীন হইয়া অদৃশ্য হইবে। এবং কিছু দিন পরে পরিশুদ্ধ পাটী মাত্ৰ পড়িয়া থাকিবে ও সমস্ত জল অদৃশ্য বাষ্পরূপে ভূবায়ুতে বিলীন হইবে। কেবল অনাচ্ছাদিত পাত্র হইতেই যে এরূপ বাষ্প উত্থিত হয় এমন নয় উহা জলাশয় মাত্র হইতেই উত্থিত হইয়া বায়ুকে সিক্ত ও আর্দ্র করে। কিন্তু জল বাষ্প হয় কেন? সূৰ্য্যই তাহার কারণ। তাঁহারই সুতীক্ষ্ণ কিরণজালে উত্তপ্ত হইয়া জলকণা বাষ্পরূপে পরিণত হয়। জল-নিধি সমুদ্র হইতেই অধিকাংশ বাষ্প উথিত হয়। নিদাষ ঋতু হইতে শরতের প্রারম্ভাবধি এই বাষ্প কখন সুমন্দ সমীরণ হিল্লোলে কখন বা প্রবল ঝঞ্চাবাতে ভূমধ্যে নীত হইয়া থাকে। বাষ্প স্বভাবতঃ
উপক্রমণিকা।
৭
বর্ণহীন ও অদৃশ্য, কিন্তু এখানে প্রায়ই সেরূপ থাকে না। সূৰ্যো-
দয়ের কিছুকাল পরে আকাশের প্রতি নিরীক্ষণ করিলে এক
প্রকার অর্থ মণ্ডলাকৃতি মেঘের সঞ্চার দেখিতে পাওয়া যায়।
উদ্ধা প্রদেশে শৈত্যনিবন্ধন বাষ্প ঘনীভূত হইয়াই এই মেষের
সঞ্চার হয়। ফলতঃ বারিবিন্দু সংহতি ব্যতীত মেষ কিছুই নহে।
কখনং রৌদ্রাতপে উহা অদৃশ্য হয় বটে, কিন্তু কোন কোন সময়ে
আবার গাঢ় অন্ধতামিশ হইয়া বর্ষণ করিতে থাকে। এই বর্ষণ
জলই ক্রমশঃ সঞ্চিত হইয়া নদীপ্রবাহে সাগরে নীত হয়।
এক্ষণে আমরা জানিতে পারিলাম অনাচ্ছাদিত পাত্র
হইতে যেরূপ জলীয় বাষ্প উথিত হইয়া থাকে, সমুদ্র হইতেও
বহুল পরিমাণে তাদৃশ বাষ্প উথিত হইতেছে। এই বাষ্পই
ঘনীভূত হইয়া মেঘের সঞ্চার হইতেছে এবং এই মেঘ হইতেই
বর্ষণ হইতেছে। বৃষ্টিরূপে প্রত্যাবর্তিত বাষ্পই কর্দম ও বালুকা-
রাশির সহিত মিশ্রিত হইয়া শ্রোতােরূপে এবং নদীরূপে
প্রবাহিত হইতেছে। নদী কঠিন ভূভাগ সহকারে ক্রমে
নিম্নদিগে অববাহিত হইয়া সাগরে লীন হইতেছে। তদীয়
জল আবার বাষ্পরূপে ভূভাগে প্রত্যাবর্তন করিতেছে, কিন্তু
তৎসহকারে নীত কর্দমাদি আর প্রত্যানীত হইতেছে না।
সুতরাং ভূভাগ এরূপে ধৌত হইয়া ক্রমশঃ ক্ষীণ হইতেছে, কিন্তু
মধ্যে মধ্যে পরিবর্ধিতও হইতেছে। নদী হইতে পরীবাহিত
জলের দ্বারা জলাশয়াদি ক্রমে পূর্ণ হইয়া শস্য-ক্ষেত্রের আয়তন
বৃদ্ধি করিতেছে। নদী কর্তৃক সাগর-সদনে নীতু পঙ্কদিও পলি-
রূপে স্তরীভূত হইয়া নূতন ভূভাগের সঞ্চার হইতেছে। এইরূপে
নূতন ভূভাগের সৃষ্টি না হইলে প্রথমেত সমান মালভূমি
এবং পরে সমভূমি উভয়ই এত দিনে কোথায় বিলুপ্ত হইয়া
যাইত। পরন্তু এরূপে সর্বদা নূতৰ ভূভাগের সৃষ্টি হইলেও
নদীপ্রভৃতিকর্তৃক পরিসাধিত পরিবর্তনের ন্যায় উহা সহজে
অনুভূত হয় না।
প্রাকৃিতক ভূগােল। এক্ষণে নদীসমুহ কেন যে ঋতু বিশেযেই স্ফীত হইয়া থাকে ইহা অনায়াসেই উপলব্ধি হইবে। বৃষ্টিই এই জলােচ্ছাসের কারণ। গ্রীষ্মকাল হইতে শরতের প্রারম্ভাবধি বৃষ্টির সমধিক প্রাদুর্ভাব হয়। এ সময়েই নদী অধিক স্ফীত হইয়া থাকে। কিন্তু সময়বিশেষেই বা বর্ষার প্রাদুর্ভাব হইবে কেন? ভূভাগ অপেক্ষা জল ভাগেই অধিক বাষ্প উথিত হয়। সুতরাং যখন জল হইতে স্থলাভিমুখে বায়ু প্রবাহিত হইবে তখনই বর্ষার প্রাদুর্ভাব হইতে পারে। ইহার অন্যথা হইলে জলবায়ু অপেক্ষাকৃত নির্জল হইবে। এজন্য শীতকালে প্রায়ই বর্ষণ হয় না। কিন্তু আবার জিজ্ঞাসা করা যাইতে পারে সময় বিশেষেই বা বায়ু বিশেষ দিগ হইতে প্রবাহিত হইবে কেন ? ইহারও কারণ আছে কিন্তু ইহা সংক্ষেপে বর্ণন করা যায় না। পরে বর্নিত হইবে । এক্ষণে দেখ, আমরা যাহা নিয়তই সন্দর্শন করি এরূপ জন- সাধারণের চির-পরিচিত দৃশ্যের বিষয় পৰ্যালােচনা করাতেই কত কৌতুকাবহ তত্ব উদ্ভাবিত হইয়াছে। ফলতঃ যাহাদিগকে আমরা ভ্রমেও কৌতুকাবহ বলিয়া মনে করি না তাহাদেরই পৰ্যালােচনা করিলে আমরা অশেষ জ্ঞানী হইতে পারি । তদনুশীলনে আমরা এক্ষণে যে সকল অশ্রুতপুৰ্ব্ব ব্যাপার অবগত হইয়াছি তাহা চিন্তা করিলে কাহার না বিস্ময় হয়। আমরা এই মাত্র জানিতে পারিয়াছি যে আমাদের আবাস ভূমি বসুন্ধরা ক্রমেই ক্ষীণ হইতেছে। কিন্তু শক্তি বিশেষ প্রভাবে আবার নূতন ভূভাগেরও সৃষ্টি হইতেছে। আমরা এইমাত্র জানিতে পারিয়াছি যে বায়ু সতত অস্থির নহে ইহার কিয়ৎপরিমাণ স্থিরতাও আছে। উহা বৎসরের এক ভাগে একদিগ হইতে এবং অপর ভাগে অন্যদিগ হইতে প্রবাহিত হয়। আমরা আরাে এই মাত্র ভানিতে পারিয়াছি মে অদৃশ্য বর্ণহীন বাষ্প হইতেই মেঘের সঞ্চার হইয়া থাকে । এ সকল ব্যাপার কি বিস্ময়কর নহে।
উপক্রমণিকা। পাঠক এক্ষণে অবশ্যই জানিতে পারিয়াছ যে একমাত্র পুস্তক পাঠে বিদ্যালাভ হয় না। চতুর্দিগে যে সকল পরি- বৰ্ত্তন হইতেছে অভিনিবেশ পূর্বক তাহার বিষয় অনুশীলন করিলে এবং সময়ে সময়ে পরীক্ষা দ্বারা অধীত বিষয়ের সত্য নিরূপণ করিতে চেষ্টা করিলে বিশেষ জ্ঞানলাভ হইতে পারে। পুস্তকাদির উপযােগিতা এই যে যখন কোন তথ্যানুসন্ধানে আমরা স্বয়ং প্রবৃত্ত হইতে পারি না কিম্বা কিরূপে প্রবৃত্ত হইতে হইবে তাহা জানি না, তখন অপরের রীতি জানিতে পারিলে আহার অনুসরণ করিয়া আমরাও জ্ঞানী হইতে পারি। প্রাকৃতিক ভূগোেল কাহাকে বলে পাঠকবর্গ এক্ষণে তাহা বুঝিতে পারিবেন। এই ভূমণ্ডলে নিয়তই যে সকল পরিবর্তন হই- তেছে প্রাকৃতিক ভূগােল তাহাদিগের ইতিবৃত্ত স্বরূপ। পৃথিবীকে আমরা কেন যে এ অবস্থায় একখিতে পাই প্রাকৃতিক ভূগােল তাহা বলিয়া দিবে। কিন্তু কেন যে পৃথিবী সৃষ্ট হইয়াছে তাহা বলিতে পারে না। মানব-জাতির সৃষ্টি সম্বন্ধে যেরূপ অদ্যাপিও কোন তত্ত্ব উদ্ভাবিত হয় নাই সেরূপ পৃথিবীর সম্বন্ধেও অদ্যাপি কেহ কিছু নিরূপণ করিতে পারেন নাই। বস্তুত বিজ্ঞানের দ্বারা কখন এরূপ প্রশ্নের মীমাংসা হইতে পারে না। আবার প্রাকৃতিক ভূগােল বলিয়া দিবে সমুদয় পরিবর্তনই কোন বিশেষ কারণের অনুযায়ী হইয়া সংঘটিত হইতেছে। ফলতঃ এ সংসারে কারণ ভিন্ন কিছুই সম্ভব নহে। পরীক্ষার দ্বারা কোন সত্য কিম্বা কারণ স্থিরীকৃত হইলে উহাকে নৈসর্গিক নিয়ম কহে। নিম্নগানদী বৃষ্টি জলে পরিপােষিত হইয়া নিমাভিমুখে গমন করে, ভূভাগ ক্রমশ ক্ষীণ হইয়া শক্তিবিশেষ প্রভাবে পুনরাবির্ভূত হয় ; ইহাদের প্রত্যেকটীকে নৈসর্গিক নিয়ম বলা যায়। অতএব নৈস- গিক নিয়মের অধীন হইয়া যে সকল পরিবর্তন সংঘটিত হই- তেছে তাহা নিরূপণ করাই প্রাকৃতিক ভূগােলের প্রধান উদ্দেশ্য । খ
[ ১ ]
প্রথম অধ্যায়।
পৃথী-গুহ।
আঁহারা মালদহ, পূর্ণিয়া কিম্বা ভগলপুরের উত্তরাঞ্চলে
বসতি করেন, তাহাদের অনেকেই দেখিয়া থাকিবেন কোন
শারদীয় প্রাতঃকালে উত্তরাভিমুখে অবলােকন করিলে চক্রবাল
প্রান্তে প্রভাকরের সুবর্ণকিরণজাল-মণ্ডিত, কতিপয় শ্বেতবর্ণ
শ্রেণীবদ্ধ পর্বতশৃঙ্গ নয়ন-গগাচর হইয়া থাকে। উহারা হিমা-
লয়েরই তুষার-মণ্ডিত শিখরাংশ; কিন্তু দুর হইতে উহাদিগকে
ঈদৃশ খর্বাকৃতি দেখায় যে তদৃষ্টে কেহই হিমালয়কে তাদৃশ
অভ্রভেদী বলিয়া মনে করিতে পারেন না।
১৬০০০ ফুট
অর্থাৎ শস্যক্ষেত্র হইতে তিন মাইল উর্দ্ধে তুষারের সঞ্চার
হয়। এই তুষার রেখার নিম-ভাগের অধিকাংশই দৃষ্টতঃ
সমতল ক্ষেত্রের দ্বারা প্রােথিত হইয়া থাকে। হয়ত প্রথমে ইহা
অতীব বিস্ময়কর বোধ হইবে। কিন্তু আমরা প্রত্যহ যাহা
পরিদর্শন করি উহা তাহারই এক ক্ষুদ্র উদাহরণ-স্থল।
এরূপ উদাহরণপরম্পরা হইতেই অবধারিত হইয়াছে যে
এ পৃথিবী বাস্তবিক সমতলক্ষেত্র নহে। উহার পৃষ্ঠদেশ
কন্দুকবৎ গােলাকার, কিন্তু তাদৃশ বিস্তীর্ণ বলিয়া ইহা অনু-
ভূত হয় না।
স্থির থাকিলে সমুদ্রের উপরিভাগ বঙ্গের
শস্য-ক্ষেত্র অপেক্ষাও মসৃণ এবং সমতল দেখায়, কিন্তু তথাপি
উহার উপরিভাগের মগুলাকৃতি দ্বারা অর্ণবপােতাদি আংশিক
রূপে প্রােথিত হইতে কে না দর্শন করিয়াছেন? প্রহরিকতায়
নিযুক্ত কোন নাবিক যখন মাস্তুলা হইতে প্রথমে দূরে বাষ্পীয়
পােত সন্দর্শন করে তৎকালে নিঃসৃত ধূমজ্যোতি ভিন্ন কিছুই
সংদৃষ্ট হয় না। কিন্তু যেমন উহা অগ্রসর হইতে থাকে
৫
পৃথিবীর আকৃতি ১১ মাস্তুলাগ্ৰসমূহ সহসা উন্মজ্জিত হইয়া চক্রবাল প্রান্তে নয়ন- পথে পতিত হয়। এবং ক্রমে উহারা যত উচ্চ হইয়া উঠে কক্ষ ও তল দৃষ্টিগোচর হইতে থাকে। উত্তর, দক্ষিণ, পূৰ্ব্ব, পশ্চিম যে দিগ হইতেই আসুক না কেন, বাষ্পীয় পােতের অঙ্গ প্রত্যঙ্গসমুহ উপরােক্ত পৰ্য্যায়ক্রমে সর্বোচ্চভাগ সর্বাগ্রে, এবং সর্বনিম্ন ভাগ সর্বপশ্চাৎ নয়নালোকে আনীত হয়। পৃথিবীর উপরি- ভাগ সৰ্ব্বত্র সমতল হইলে এরূপ হই- বার কোন সম্ভাবনা ছিল না। দূর হইতে পােতখানিকে প্রথমে ক্ষুদ্র বিন্দুর ন্যায় দেখাইত; কিন্তু যে উহার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সমূহ ইন্দ্রিয় খােচর হইত, মাস্তুল এবং কক্ষ ও তল সমুদয়ই যুগপৎ অনুভূত হইত। পােতাদির, এরূপ পরিদর্শন হইতে পৃথিৱীর মণ্ডলাকৃতি যে কিরূপে প্রতি পাদিত হয়, পার্শ্বস্থ চিত্র দৃষ্টে তাহা অনায়াসে উপলব্ধ হইবে । ০ পরিদর্শক মাস্তুলা হইতে st বাষ্পীয়-পােত দর্শন করিতেছে। h চক্র বালের দ্বারা অসীম জলরাশি ৪ সীমাবদ্ধ হইয়াছে। কিন্তু চিত্ৰসম্বন্ধে এস্থলে ইহা বলা কৰ্ত্তব্য, যে পৃথিবীর মণ্ডলাকৃতির সহিত তুল- নায় পপাতদ্বয় অপেক্ষাকৃত বৃহৎ এবং উহা- দের অন্তর্গত দূরত্ব অপেক্ষাকৃন্ত হ্র হইয়াছে। ফলতঃ পরিদর্শক মাস্তুলা মাত্র দেখিতে পাইলে পােতাদি পরস্পর হইতে অনেক মাইল অন্তরে অবস্থিতি করে। চন্দ্রও পৃথিবীর ন্যায় গােলাকার, কিন্তু তাদৃশ বৃহৎ নহে। ফলতঃ দূরবীক্ষণ সহকারে দর্শন করিলে উহাকে একটা ক্ষুদ্র কন্দুকের ন্যায় দেখাইয়া থাকে। চন্দ্রের বাহিক ০ ১২ পৃথিবীর আকৃতি পরিবর্তনের বিষয় সকলেই অবগত আছেন। দ্বিতীয়ার চন্দ্র ক্রমশঃ পরিবর্ধিত হইয়া যে কিরূপে অর্ধ ও পূর্ণ মণ্ডলাকৃতি ধারণ করে ইহা সকলেই প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। প্রদীপ-শিখায় যাহার একভাগ মাত্ৰ : আলােকিত হইয়াছে, এরূপ কোন শ্বেত কন্দুকের চতুর্দিকে পর্যায়ক্রমে অবলােকন করিলে উহাতেও চন্দ্রকলার ন্যায় পরিবর্তন সংলক্ষিত হয়। চন্দ্রলােকে গমন করিয়া পৃথিবীর প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে উহাকেও চন্দ্রের ন্যায় কিন্তু তদপেক্ষায় বৃহত্তর কন্দুকবৎ প্রতীয়- মান হইবে; এবং উহাতেও চান্দ্রমসী লেখার ন্যায় বাহিক পরিবর্তন পরম্পরা সংদষ্ট হইবে। কারণ সূর্যের আলোেক চন্দ্র ও পৃথিবী উভয়ের উপরই সমভাবে পতিত হইয়া থাকে। এক্ষণে আলােকিত কন্দুক এবং প্রদীপের মধ্যে অপর একটা কন্দুক ধৃত হইলে উহার ছায়া যেরূপ আলােকিত কন্দুকে পতিত হয় সেরূপ পৃথিবী ও, সূৰ্য্য এবং চন্দ্রমণ্ডলের মধ্যবর্তী হইলে পৃথিবীর ছায়া চন্দ্রলােকে পতিত হয়। দেওয়ালে প্রতিবিম্বিত কন্দুকের ছায়ার ন্যায় উহাও দেখিতে গােলাকার। যেই দিক হইতেই পতিত হউক না কেন এই ছায়া সৰ্ব্বদাই মণ্ডলাকৃতি হইয়া থাকে। কিন্তু গােলাকার ভিন্ন অন্য কোন পদার্থের ছায়া সকল অবস্থায় গােলাকার হইতে পারে না। সুতরাং পৃথিবীও যে গােলাকার এবং একটি বৃহৎ কন্দুকস্বরূপ ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে। পৃথিবী যে কন্দুকবৎ গােলাকার ইহা বহুল প্রমাণা- ধীন। কিন্তু ছায়া দেখিয়াই যেস্থলে সম্পূর্ণ প্রতীতি হই- তেছে সে স্থলে প্রমাণান্তরের প্রয়ােজন কি ? পৃথিবীর মণ্ডলাকৃতির সম্বন্ধে অনেক দুরূহ তত্ত্ব রহিয়াছে, অধুনা তাহারই পৰ্যালােচনা করিতে কৃতােদম হওয়া উচিত। পাঠকবর্গ জিজ্ঞাসা করিতে পারেন পৃথিবী কন্দুকবৎ গােলাকার ; সুতরাং উহার উৰ্দ্ধভাগমাত্রে লােকের সংস্থান হইতে পারে । বিপ- .
উৰ্দ্ধ ও অধঃ কাহাকে বলে। ৮ রীতদিকে কি করিয়া লোকের সংস্থান হইবে ? নিঃসন্দেহ সকলেই পড়িয়া যাইবে । কিন্তু অপরদিগে যে লােকের সংস্থান আছে ইহার কোন সন্দেহ নাই। রাত্রি দুই প্রহর কালে যখন আমাদের সম্বন্ধে সমস্ত অবনীমণ্ডল নিবিড় অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন হয় তখন দক্ষিণ আমেরিকায় চিলি ও পিপ্রদেশে মাধ্যাকালীন দিবাকর মস্তকোপরি স্থিত হইয়া খরতর কিরণ- জাল বর্ষণ করিতে থাকে। তারযােগে কলিকাতা হইতে আমেরিকায় কোন বার্তা প্রেরিত হইলে পরমুহূর্তেই তথায় উপনীত হয়। কিন্তু ইঙ্গিতকারীর পক্ষে মূৰ্যাস্ত হইলে গ্রাহ- কের পক্ষে সূর্যোদয় হইয়া থাকে। আবার পােতাদি সৰ্ব্বদা পূৰ্ব্বদিগে গমন করিয়া পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতঃ যে স্থান হইতে যাত্রা করিয়াছিল করিয়াছিল সেই স্থানে আসিয়া উপনীত হইতে দেখা যায়। কিন্তু মার্কিন ও নাবিক উভয়ই আমাদের ন্যায় পৃথিবীকে সৰ্ব্বদা পদানত এবং গগনমণ্ডলকে সর্বদা মস্তকোপরি দেখিয়া থাকে। আমরা যেরূপ সচ্ছদ ও নির্ভীকতা সহকারে পৃথিবীতে বিচরণ করিতেছি তাহারাও সেরূপ করিতেছে। এবং তাহাদের অন্যতর কোন কন্দুক উৎক্ষেপ করিলে উহাও তৎক্ষণাৎ ভূতলে আসিয়া পতিত হইতেছে। হয়ত অধিকাংশই ইহার মর্মানুভব করিতে সমর্থ নহেন। কিন্তু কন্দুকের উর্ধ্ব-নিক্ষেপ এবং অধঃ- পতনের দ্বারা যে কি প্রতিপাদিত হয় তাহার বিষয় অনুধাবন করিয়া দেখিলে উহা স্পষ্ট অনুভূত হইবে। আমরা শরীরের অবস্থান সম্বন্ধেই উৰ্দ্ধ এবং অধঃ শব্দ ব্যবহার করিয়া থাকি। গাত্রোত্থান করিলে আমাদের শিরের দ্বারা যে দিক্ সূচিত হয় তাহাকে উদ্ধা এবং পাদের দ্বারা যে দিক্ সূচিত হয় তাহা কেই অধঃ বলিয়া নির্দেশ করি। সুতরাং মার্কিনের গাত্রোত্থান করিয়া যে দিগকে উৰ্দ্ধ বলিয়া নির্দেশ করে আমরা তাহাকেই অধঃ বলিয়া থাকি। এবং পিৰুদেশে পদার্থ উৎক্ষিপ্ত হইলে ১৪ মাধ্যাকর্ষণ। যেদিকে গমন করে বঙ্গদেশে পতিত হইতে সেইদিকে গমন করিয়া থাকে। মােলকের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে পাঠকবর্গ ইহা অনায়াসেই উপলব্ধি করিতে পারিবেন। গােলকের অভাবে কুষ্মাণ্ডসদৃশ কোন কন্দুকের প্রতি কিম্বা গ্রীবংশ ভাঙ্গিয়া দিয়া এবং নিম্নভাগ গােলাকৃতি করিয়া কোন কর্দম- পূর্ণ কুজের প্রতি দর্শন করিলেও, উহা প্রতীয়মান হইবে। অত- এব পাঠকবর্গ এক্ষণে স্পষ্ট উপলব্ধি করিতে পারিবেন যে শরীরের অবস্থান সম্বন্ধেই অধঃ এবং ঊর্ধের নির্দেশ করা হইয়া থাকে । কোন উৎক্ষিপ্ত কন্দুক কেন যে ভূতলে পতিত হয়, পৈরব- দিগের এবং আমাদিগের শিয়ােবিন্দু পরস্পর বিপরীতাভিমুখ সত্বেও আমরা কিরূপে যে পৃথিবীর উপর সংস্থিত আছি এক্ষণে ইহাও অনুধাবন করিতে হয়। পৃথিবীর আকর্ষণই ইহার কারণ। পদার্থমাত্রই পৃথিবী কর্তৃক তদভিমুখে আকৃষ্ট হইয়া থাকে। কিন্তু পৃথিবীই যে কেবল আকর্ষণ করে এমন নয় ; ইহা গুৰুত্ব সম্পন্ন দ্রব্যমাত্রেরই সাধারণ ধৰ্ম । পৃথিবী যেরূপ কককে আকর্ষণ করে কন্দুকও সেরূপ পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। কিন্তু আয়তন এবং ঘনত্বের তারতম্য অনুসারে এই আকর্ষণের ন্যূনাধিক্য হইয়া থাকে । সম-আয়তন তুলা এবং শীশকের মধ্যে শীশকের আকর্ষণই অধিক। সেরূপ পৃথিবীর সহিত তুলনায় কন্দুক যে কত ক্ষুদ্র তাহা বলা যায় না। এজন্য আমাদের নিকট ককই একমাত্র আকৃষ্ট পদার্থ বলিয়া বােধ হয়। আমরা পৃথিবীর উপর সংস্থিত আছি কারণ পৃথিবী আমাদিগকে আকর্ষণ করিতেছে। কিন্তু আমাদের শরীরও পৃথিবীকে আক- ষণ করিতেছে। যখন আমরা পরস্পরের এই আকর্ষণ বিৰুদ্ধে উল্লম্ফন করি আমরা তৎক্ষণাৎ ভূতলে আনীত হই। পদা- থের এবং পৃথিবীর এই পরস্পর আকর্ষণকেই পদার্থের ভার বলিয়া থাকে। যখন আমরা পদার্থকে এই আকর্ষণের মাধ্যাকর্ষণ। ; বিৰুদ্ধে উঠাইতে চেষ্টা করি তখন আমরা গুৰুত্বরূপে উহার প্রভাব অনুভব করি। এই আকর্ষণ পৃথিবীর সর্বত্রই অনুভূত হয় এবং সর্বাংশেই প্রায় সমান *। গুৰুত্বসম্পন্ন দ্রব্য পরম্পরার এই আকর্ষণকে মাধ্যাকর্ষণ কহে। এই আকর্ষণ শক্তি যে শুদ্ধ পৃথিবী ও পৃথিবীস্থ দ্রব্যের ধর্ম এমন নয়। চন্দ্র যাহার বাস্তবিক ব্যাস-পরিসর ২,১৫৩ মাইল, যাহার আয়তন পৃথিবীর ৫ অংশ, এবং যাহা এতাদৃশ দূরে সংস্থিত যে উহাকে একটা ক্ষুদ্র কন্দুকের ন্যায় প্রতীয়মান হয়, তাহাও পৃথিবীর দ্বারা আকৃষ্ট হইতেছে ; এবং তন্নিবন্ধন তাহার চতুর্দিকে নিয়ত পরিভ্রমণ করিতেছে। চন্দ্র পরিভ্রমণ করিতে করিতে পৃথিবীকেও আকর্ষণ করে। পৃথিবী ও চন্দ্র পরস্পরকে আকর্ষণ করে বলিয়াই চন্দ্র প্রায় পৃথিবীর সম- দূরে সংস্থিত থাকে। এরূপ আকর্ষণ না থাকিলে উহা এত- কালে কোথায় চলিয়া যাইত। নিম্নলিখিত পরীক্ষণের দ্বারা পাঠকবর্গ ইহা বিশেষ উলপব্ধি করিতে পারিবেন। এক খণ্ড প্রস্তর কিম্বা কর্দমে একখানি জীর্ণ বস্ত্র জড়াইয়া উহারে দুই তিন হস্ত পরিমিত একগাছি সূত্রে সংবদ্ধ কর। এবং অপর প্রান্ত ধারণ করিয়া উহাকে চতুর্দিকে ঘুরাইতে থাক। সূত্রগাছি প্রস্তরের দ্বারা বলে টানিত হইবে এবং অতি সূক্ষম হইলে ছিন্ন হইয়া যাইবে ; আর প্রস্তর খণ্ড দূরে পলায়ন করিবে। পৃথি- বীর দ্বারা আকৃষ্ট না হইলে চন্দ্রও এই প্রস্তর-খণ্ডের ন্যায় দূরে পলায়ন করিত। কিন্তু পাঠকবর্গ জিজ্ঞাসা করতে পারেন চন্দ্র ও পৃথিবী পরম্পরকে আকর্ষণ করিলে উহাদের মধ্যে কোন আকর্ষণ সূত্র দৃষ্ট হয় না কেন? পরন্তু পতনশীল কন্দুক ও পৃথিবীর মধ্যে কোন আকর্ষণ দৃষ্ট না হইলেও উভয় যেরূপ পরস্পরকে আকর্ষণ করে, চন্দ্রের ও পৃথিবীর পক্ষেও সেই- * গ্রীনলণ্ড অপেক্ষা ইংলণ্ডে এবং ইংলণ্ড অপেক্ষ। ভারতবর্ষে ইহাকিঞ্চিৎ নূন। কিন্তু হিমালয়ের শিখরাগ্রে ইহা বঙ্গদেশ অপেক্ষাও অনেক নূন।
সূৰ্য্য। রূপ। কিন্তু একমাত্র চন্দ্রেতেই যে এই আকর্ষণ সংবদ্ধ এমন নয়। সূৰ্য্য যাহার আয়তন পৃথিবী অপেক্ষাও ১২৫০০০০ দ্বাদশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার গুণ বৃহৎ, উহা চন্দ্র হইতে দূরে সংস্থিত হইয়াও উভয় চন্দ্র এবং পৃথিবীকে আকর্ষণ করিতেছে। এবং উহার আকর্ষণশক্তি এরূপ প্রবল যে চন্দ্র ও পৃথিবী উহার চতুর্দিকে বেগে ঘূর্ণায়মান না হইলে উভয়ই সূৰ্য্যলােকে পতিত হইয়া তত্ৰত্য দাবাগ্নি বিনিন্দিত তেজে দ্রবীভূত ও ভস্মীভূত হইয়া যাইত। অতএব যে সূৰ্য্য জগতের নেত্রস্বরূপ ও প্রাণী বর্গের প্রাণ স্বরূপ এবং যে সূৰ্যবিহনে দু দিনও জীবনধারণ করা সুকঠিন হইত, সেই সূৰ্য্য যে কি পদার্থ ইহা একবার অনু- সন্ধান করিতে হয়। সূৰ্য্য কি পদার্থ কতিপয় বৎসর পূর্বে ইহা আমরা ভাল- রূপে অবগত ছিলাম না। কিন্তু এক্ষণে উহা কিয়ৎপরিমাণে প্রতিপাদিত হইয়াছে। সূৰ্য্য এই পৃথিবী হইতে এতাদৃশ দূরে সংস্থিত যে বাষ্পীয় শকটের পূর্ণ বেগে প্রতিঘণ্টায় ত্রিশ মাইল করিয়া গমন করিলেও ৩৩৮ বৎসরের নৃনে মূৰ্য্যলােকে উপ- নীত হওয়া যায় না। উহার আয়তনও এতাদৃশ বৃহৎ যে সেই বেগে উহারে ৯ বৎসরের ননে একবার প্রদক্ষিণ করা যায় না। পরন্তু তাদৃশ বেগে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করিতে মাত্র একমাসের প্রয়ােজন হইবে । সূর্যের উত্তাপ যে কীদৃশ হইবে ইহা অনায়াসেই অনুভব করা যায় যখন এতাদৃশ দূরে সংস্থিত হইলেও কখনং উহার মাধ্যাহ্নকালীন কিরণজাল আমাদের সম্পূর্ণ অসহ হইয়া উঠে! এবং অতি প্রকাণ্ড অগ্নিকুণ্ডের প্রতাপও ২০/২৫ হাত দুরে অনুভূত হয় । কতিপয় বৎসর অতীত হইল সূর্যের কিরণ. পরীক্ষণের নবাবিষ্কৃত উপায়ের দ্বারা প্রতিপাদিত হইয়াছে ভূলােকে যে সমুদয় পদার্থ পাওয়া যায়, সূৰ্য্যলােকেও প্রায় তাহাই দেখা যাইয়া থাকে। ভূলােকের ন্যায় সূৰ্য্যলােকেও লৌহ দৃষ্টি- পৃথিবীর গতি। গোচর হয়। কিন্তু তরল কিম্বা কঠিনাবস্থায় নহে। উহাকে ভূবায়ুর আকারেই দেখিতে পাওয়া যায়। সূর্যের উত্তাপে উহ' বাষ্পীভূত হইয়া গিয়াছে। লৌহের ন্যায় ধাতু ইত্যাদি অন্যান্য পদার্থও দেখিতে পাওয়া যায় কিন্তু সকলই বায়বীয় অবস্থাতে। এ সকলের নিয়ে তরল পদার্থ আছে বলিয়া বােধ হয়, কিন্তু ইহাদের মেঘের ন্যায় হইবারই অধিক সম্ভাবনা। যাহা হউক উহাদের বিষয় অদ্যাপি কেহ নির্ণয় করিতে পারেন নাই। আমরা পূর্বেই দেখিয়াছি এই সূৰ্যাতপ নিবন্ধনই সমুদ্র হইতে বাষ্প উখিত হইতেছে। নিমেও দেখিতে পাইব এই সূৰ্যাতপ নিবন্ধনই বায়ু প্রবাহিত হইয়া আমাদিগকে সুশীতল মেঘ-বারি প্রদান করিতেছে। সূৰ্যালােক ব্যতীত উদ্ভিজ্জাদি এক মুহূর্তের জন্যও জীবিত থাকিতে পারি না। এবং সূর্যের উপযােগী তাপ হইতে বঞ্চিত হইলে দারুণ শীতপ্রভাবে আমরাও কোকালে উচ্ছন্ন হইয়া যাইতাম। এক্ষণে সূৰ্য্য হইতে যে কিরূপে দিবা ও রাত্রির আবর্তন হয় এ বিষয়ে কিঞ্চিৎ অনুসন্ধান করা যাইতেছে। প্রত্যুষে উদয়াচলে অবিভূত হইয়া দিনমণি যখন শিরাে- পরি সংস্থিত হয়েন, এবং ক্রমশঃ নিম্ন হইয়া পশ্চিমাচলে অস্তমিত হয়েন, তৎকালে আমাদের বােধ হয় যেন আমরাই বাস্তবিক স্থির হইয়া আছি এবং সুৰ্য্যই আমাদিগকে প্রদক্ষিণ করিতেছে। কিন্তু এতাদৃশ বিশ্বাসের উপর যে নির্ভর করিতে হয় না পৃথিবীর আকৃতি সম্বন্ধে পাঠকবর্গ ইস্থা স্পষ্ট অনুভব করিয়াছেন। অন্যান্য পরীক্ষণের দ্বারা সত্যতা প্রতিপাদিত না হইলে ঈদৃশ বিশ্বাসকে কখন মনে স্থান দেওয়া উচিত নহে। অধুনা আমাদের জিজ্ঞাস্য এই আমাদের অজ্ঞাতসারে বাস্ত বিক কি কোন গতি সম্পন্ন হইতে পারে ? এবং দ্বিতীয়ত, যদি এরূপ সম্পন্ন হয় এবং যদি আমরাই কোন নিশ্চল পদার্থকে ছাড়াইয়া গমন করি, তবে কি বাস্তবিক নিশ্চল পদার্থকেই ग ১ পৃথিবীর গতি। সচল দেখাইবে এবং আমাদিগকে নিশ্চল দেখাইবে ? অতি সামান্য পরিদর্শনের দ্বারাই উভয়কে সত্য বলিয়া বােধ হইবে। নদীর মধ্যদেশে নঙ্গরস্থিত স্বীয় নৌকা হইতে যদি কোন ব্যক্তি অন্য একখানি নৌকাকে স্রোতাভিমুখে যাইতে দেখেন এবং যদি আপনার অবস্থার বিষয় তাঁহার স্মরণ থাকে না তাহা হইলে কোন্ নৌকাখানি প্রকৃত সচল ইহা অবধারণ করা উঁইর পক্ষে সুকঠিন হইয়া উঠে। তিনি এইমাত্র বলিতে পারেন যে একখানি নৌকা অন্য খানিকে ছাড়াইয়া যাইতেছে। কিন্তু যে রঞ্জু দ্বারা তাঁহার নৌকা নগরের সহিত সংবদ্ধ উহার প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া কোন্ খানি যে বাস্তবিক সচল, অথবা উভয় খানিই যে বিপরীতাভিমুখে যাইতেছে না, ইহা বলিতে পারেন না। তদ্রুপ কোন স্টেশনে দুইখানি গাড়ির একখানি চলিতে আরম্ভ করিলেও এরূপ ঘটিয়া থাকে। মাত্র শকটের গতির প্রতি দর্শন করিয়া কোন্ গাড়িখানি যে চলিতেছে দর্শক ইহা অবধারণ করিতে পারেন না। যদবধি তিনি ঘড় ঘড় শব্দের প্রতি মনােযােগ করেন না, কিম্বা যে স্টেসকে নিশ্চল মনে করেন তাহার প্রতি দর্শন করেন না, তদবধি তাঁহার নিজের খানি কি অন্যখানি চলিতেছে ইহা বলিতে পারেন না। কিন্তু পৃথিবীর বিচলনের সময় কোন ঘর্ঘর শব্দ বা প্রতিঘাত অনুভূত হয় না। সুতরাং পৃথিবী কি সূৰ্য্য ঘুরিতেছে ইহা নির্ণয় করিতে হইলে নক্ষত্র মণ্ডলীর প্রতি নিরীক্ষণ করা ইহার একমাত্র উপায়। কিন্তু যদি নক্ষত্রমণ্ডলকে স্টেসনের ন্যায় নিশ্চল মনে করা যায় না ইহা দ্বারাও কিছু প্রতিপাদিত ইইতে পারে না। এক্ষণে সূৰ্য্যই যদি বাস্তবিক বিচলিত হয় তারকামণ্ডলীও সমবেগে বিচলিত হইবে, যেহেতু উভয়কেই একদিকে গমন করিতে দেখাইয়া থাকে। অত- এৰ'হয় পৃথিবীই পশ্চিম হইতে পূৰ্বাভিমুখে আবর্তন করিতেছে, নতুবা পৃথিবী নিশ্চল রহিয়াছে এবং সমস্ত গ্রহ তারকামণ্ডলী দিবা ও রাত্রি। পুৰ্ব্ব হইতে পশ্চিমদিকে উহাকে প্রদক্ষিণ করিতেছে। এ দুটীর অন্যতরনী অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে। সুতরাং দেখা যাই- তেছে বহু পরিদর্শন ব্যতীত এতাদৃশ প্রশ্নের মীমাংসা করা যায় না; কিন্তু জ্যোতির্বিদেরা ইহা আমাদের জন্য মীমাংসা করিয়া গিয়াছেন। তাঁহারা প্রতিপাদন করিয়াছেন যে পৃথি- বীই বাস্তবিক চরখার ন্যায় আবৰ্ত্তন করিতেছে এবং আমাদের সম্বন্ধে সূৰ্য্য অপেক্ষাকৃত নিশ্চলভাবে আছে।* পৃথিবীর সকল অংশই পৰ্য্যায়ক্রমে আলােকিত হয় এবং যে অংশ যখন আলােকিত হয় তখন সেই অংশে দিবা ও অপর অংশে রাত্রি হইয়া থাকে। যেই শ্বেতককের দ্বারা কিছুকাল পূর্বে প্রতিরূপ প্রকাশিত হইয়াছিল এক্ষণে তদ্বারা পৃথিবীর প্রতিরূপ প্রকাশ করা যাইতে পারে। উহার মধ্যদিয়া একগাছি সূক্ষন তার প্রবেশ করাইয়া দিলে তারা পৃথিবীর মেৰুদণ্ড এবং প্রান্ত দ্বারা মেৰুৱয় সূচিত হইবে। প্রান্তদ্বয় হইতে সমদূরে একটি রেখাটানিলে তারা নিরক্ষবৃত্ত সূচিত হইবে। এবং এই রেখার কিঞ্চিৎ উর্ধে একী বিন্দুমাত্র চিন্নিত করিলে তারা ভারতবর্ষ সূচিত হইবে । এক্ষণে তারগাছিকে কিঞ্চিৎ অবনত করিয়া ধীরে ধীরে কন্দুকটা ঘুরাইলে বিন্দুটী যখন প্রদীপের সম্মুখবর্তী হইবে তৎকালে আলােকিত হইয়া দিবাভাগের সূচনা করিবে। এবং বিপরীত দিগে হইলে অন্ধকারাচ্ছন্ন হইয়া রাত্ৰিভাগের সূচনা করিবে। e (Gyrocope) ঘূণিবীক্ষণ নামে লাটিম সদৃশ এক প্রকার ক্ষুদ্র যন্ত্র আছে ইহা দ্বারা সূৰ্য্য এবং নক্ষত্রমণ্ডল যে নিশ্চলভাবে আছে এবং পৃথিবীই যে বাস্তবিক ঘুরিতেছে তাহা প্রদর্শন করা যাইতে পারে। উহাকে কোন চলনীয় অবলম্বনের উপর সংস্থাপন করিয়া দ্রুতবেগে ঘুরাইলে অবলম্বন যদি চালিত ও হয় ঘূর্ণিবীক্ষণেরদ্বারা এক দিগই সূচিত হইতে থাকে। সুতরাং উহাকে কোন নক্ষত্র বিশেষের সহিত সমসুত্রে রাখিয়া বেগে ঘুরাইলে নক্ষত্রটী যদি কিয়দ্দদূরে সরিয়াও যায় উদ্বারা সেই দিগই মুচিত হইতে থাকে। অতএব পৃথিবীই বাস্তবিক বিচলিত হইতেছে এবং নক্ষত্রটা অপেক্ষাকৃত নিশ্চলভাবে অাছে।
২০ সৌরজগৎ হয়। পৃথিবী ২৪ ঘণ্টায় উহার মেরুদণ্ডের উপর একবার আবর্তন করিয়া থাকে। কন্দুকের সম্বন্ধে তারের দ্বারাই মেৰুদণ্ড সূচিত হই- তেছে কিন্তু পৃথিবীর সম্বন্ধে এই রেখা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। পৃথিবীর কোন অবলম্বনেরও প্রয়ােজন করে না। কারণ শুদ্ধ মাধ্যাকর্ষণ এবং পূর্বের গতি প্রভাবেই উহা এক দিগে না যাইয়া অন্যদিগে যাইতেছে। এবং উহাদেরই প্রভাবে চন্দ্র যেরূপ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীও সেইরূপ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতেছে । চন্দ্র মাত্র চান্দ্রমাসে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করে ; কিন্তু সূৰ্য্যকে প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর এক বৎসরের প্রয়ােজন চন্দ্র ও পৃথিবী যে দিগে গমন করিতেছে কোন আলােক রশ্মি তথা হইতে নিগত হইয়া যদি উহারে অঙ্কিত করিত দুরস্থ নক্ষত্র হইতে উহাকে একটী অঙ্গুরীয়ের ন্যায় প্রতীয়মান হইত। কিন্তু পৃথিবীর অঙ্গুরীয় চন্দ্রের অঙ্গুরীয় অপেক্ষা বৃহত্তর দেখা- ইত। সূৰ্য্য পৃথিবীর অঙ্গুরীয়ের মধ্যদেশে বিরাজ করিত এবং পৃথিবী চন্দ্রের অঙ্গুরীয়ের মধ্যদেশে বিরাজ করিত। আরও চন্দ্র এবং উহার অঙ্গুরীয়কে পৃথিবীর সমভিব্যাহারে সূর্যের চতুর্দিগে ভ্রমণ করিতে দেখাইত। চন্দ্র প্রায়ই পৃথিবী হইতে সমদূরে থাকিত এবং পৃথিবী সূৰ্য্য হইতে প্রায় সমদূরে থাকিত ; কিন্তু কদাচিৎ ইহার ইতর বিশেষও হইত। অন্যান্য কক একদী পৃথিবী অপেক্ষা ১৩০০ গুণ বৃহৎ ও ৪টী চন্দ্রোপেত আর একটা এক প্রকার অঙ্গুরীয়সহ ও ৮টী চন্দ্র সমভিব্যাহারে সূৰ্য্য হইতে ভিন্ন ভিন্ন দূরে পৃথিবীর ন্যায় পরিভ্রমণ করিতে দেখাইত। এ সকল কন্দুককে পৃথিবী হইতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তারার ন্যায় দেখাইয়া থাকে; কেবল নিশ্চল তারকা- মগুলের মধ্যে ইহাদিগকে সচল বলিয়া বােধ হয়। বাস্তবিক তারা হইতে উহারা সম্পূর্ণ বিভিন্ন এবং উহাদিগকে গ্রহ কহে। ইহাদের মধ্যে একটাই সর্বাপেক্ষা জ্যোতিষ্ম। বৎসরের এক ভাগে সূর্যাস্তের অব্যবহিত পরেই উহা পশ্চিম গগনে সৌরজগৎ। . এই জন্য উদিত হইয়া থাকে। কিন্তু অপর ভাগে সূর্যোদয়ের অব্য- বহিত পূৰ্বে উহা পূৰ্ব্ব গগনে দৃষ্টিগােচর হয়। উহাকে কখন কখন সান্ধ্যতার এবং কখন শুকতারা বলা হইয়া থাকে। জ্যোতির্বিদেরা এই গ্রহকে শুক্র বলিয়া থাকেন। পৃথিবী, অপরাপর গ্রহ, উপগ্রহ, এবং ঈদৃশ বহুল সংখ্যক জ্যোতির্ময় পদার্থ নিয়তই সূর্যের চতুর্দিগে পরিভ্রমণ করে। এই হেতু ইহাদিগকে সৌর-জগৎ কহে। কোন সৌর নক্ষত্র হইতে অবলােকন করিলে ইহাদিগকে প্রতি সেকেণ্ডে ৪ মাইল অর্থাৎ এক দিনে তিন লক্ষ মাইলের ও অধিক করিয়া শূন্যে ভ্রমণ করিতে দেখা যায়; কিন্তু প্রকৃত তারকামণ্ডল এতাদৃশ দূরে সংস্থিতযে এই কল্পনাতীত বেগে ভ্রমণ করিলেও বহুকাল পরেও সৌর জগতকে তাহার কিঞ্চিৎমাত্ৰ সমীপবর্তী হইতে দেখা যায় না। সূৰ্য্য এবং নক্ষত্র প্রভৃতির তুলনায় পৃথি পৃথিবী যে যে কত ক্ষুদ্র, কত সামান্য, পাঠকবর্গ এক্ষণে তাহা স্পষ্ট উপলব্ধি করিতে পারি- ধেন। প্রকৃত নক্ষত্রগুলি এক একটা প্রকাণ্ড সূৰ্য্যস্বরূপ; এবং কোন কোনটা তদপেক্ষাও বৃহত্তর, কিন্তু এতাদৃশ দূরে সংস্থিত যে তাহাদিগকে ক্ষুদ্র বিন্দুমাত্রের ন্যায় প্রতীয়মান হয় । দূরবীক্ষণ ব্যতীত হইদের অধিকাংশই দৃষ্টিগােচর হয় না। অতএব আমরা জানিতে পারিলাম আমাদের পৃথিবী একটা কন্দুক সদৃশ। উহা নিয়তই সূর্যের চতুর্দিগে পরিভ্রমণ করি- তেছে; ও মেৰুদণ্ডনামে উহার মধ্যগত কাল্পনিক রেখার উপর আবৰ্ত্তন করিতেছে। এই আবর্তন দিনে একবার করিয়া সম্পন্ন হয় এবং এই আবর্তনসময়ে যে ভাগে সূর্যালােক পতিত হয় সে ভাগে দিবা এবং অপরভাগে রাত্রি হয়। পৃথিবী সুৰ্য্যকে প্রদক্ষিণ করিতে এক বৎসরের প্রয়ােজন হয়, কিন্তু চন্দ্র মাত্র একমাসে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। প্রদক্ষিণ করি- বার সময় চন্দ্র ও একবার করিয়া উহার মেৰুদণ্ডের উপর ফলত
সংক্ষিপ্তার্থ ।
আবর্তন করে। সুতরাং চন্দ্রের এক ভাগ মাত্র পৃথিবী
হইতে সংদৃষ্ট হয়; কিন্তু পৰ্য্যায় ক্রমে সকল ভাগেই সূর্যকিরণ
পতিত হয়। যে ভাগে যখন সূৰ্য্যালােক পতিত হয় সে
ভাগে তখন দিবা এবং অপরভাগে রাত্রি হয়। অতএব
চন্দ্রলােকে গিয়া বসতি করিলে আমাদের ও দিবা এবং
রাত্রি ভেদ হইত; কিন্তু অর্ধমাস দিব এবং অর্ধমাস রাত্রি
হইত। অন্যান্য পদার্থও সূর্যের চতুর্দিগে পরিভ্রমণ করি-
তেছে ; ইহাদিগকে গ্রহ কহে, এবং ইহাদের কোন কোনটীর
সঙ্গে অনেক উপগ্রহও পরিভ্রমণ করিতেছে। জ্যোতির্বিদ্যা
বিষয়ক গ্রন্থ হইলে ইহাদের সবিস্তারে বর্ণন করা যাইত।
কিন্তু আমাদের ভূলােকের বিষয়ই অনুসন্ধান করিতে হইবে
এবং ইহাতেই যে নানাবিধ কৌতুকাবহ পদার্থ রহিয়াছে
তাহারই অনুশীলনে প্রবৃত্ত হইতে হইবে। আমরা আরাে
জানিতে পারিয়াছি যে সৌর-জণৎ নিয়তই শূন্যে পরিভ্রমণ
করিতেছে" এবং দূরে সংস্থিত হইলেও পরস্পর পরস্পরের
আকর্ষণ সূত্রে সংবদ্ধ। এই মাধ্যাকর্ষণ প্রভাবেই উহারা স্ব স্ব
স্থানে অবস্থিতি করিতেছে এবং এই মাধ্যাকর্ষণ প্রভাবেই
আমরা পৃথিবীতে সংস্থিত রহিয়াছি এবং ইহারই প্রভাবে
উৎক্ষিপ্ত কক ভূতলে পতিত হইতেছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়।
বায়ু-বিতান।
আমাদিগের আবাস ভূমি বসুন্ধরা বিশাল বায়ুরাশি দ্বারা
সমাচ্ছন্ন। যদিও উহা দৃষ্টিগোচর হয় না তথাপি যখন প্রতি
হিল্লোলেই আমরা উহার প্রভাব অনুভব করি তখন উহাকে
অবশ্যই পদার্থ বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে। মৌশুমের
ভুবায়ুর সীমা। পরিবর্তন সময়ে বঙ্গদেশে কখন কখন যে সকল ঝটিকা প্রবা- হিত হয় তাদৃশ প্রবল ঝঞ্চাবাতে যখন তৰুলতাদি উমূলিত হয়, অর্ণবপােতাদি সাগরগর্ভে নিহিত হয় এবং গৃহাদি ভগ্ন হইয়া ভূতলে পাতিত হয়, যখন এই ঝটিকা প্রভাবেই উভন উর্মিমালা উথিত হইয়া ভূভাগ জলপ্লাবিত ও সমুচ্ছন্ন হয়, তখন বায়ু রাশিকে কে না পদার্থ বলিয়া স্বীকার করিবে ? যদিও ভূভাগের সর্বত্র এমন কি অত্যুচ্চ পর্বত শিখরেও বায়ুর সঞ্চার লক্ষিত হয়, তথাপি উহা যে অনেক ঊর্ধে কিম্বা ভূলােক এবং চন্দ্রলােকের মধ্যে সর্ব স্থানে ব্যাপ্ত এরূপ বােধ হয় না। বাস্তবিক হিমালয়ের তুঙ্গ-তম শিখর প্রদেশেই ইহার ঘনত্ব এতাদৃশ নূন যে তুত্ৰত্য এক ঘন ইঞ্চি বায়ু এখানকার বায়ু অপেক্ষা অনেক লঘু হইবে। অত্যুচ্চ শিখরােপরি আরােহণ করা যে এতাদৃশ সুকঠিন বায়ুর বিরলসঞ্চারই তাহার প্রধান কারণ। তত্ৰত্য বায়ু এরূপ লঘু যে তদ্বারা কোন মতেই সেবন ক্রিয়া সম্পন্ন হয় না এবং সুতরাং অতি অল্পেই শ্রান্ত হইতে হয়। ভূয়ুর সীমা অতিক্রম করিতে হইলে কত দুর উর্ধে উঠিতে হইবে ইহা আমরা সম্পূর্ণ বলিতে পারি না। কিন্তু ৫০ মাইল অর্থাৎ হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের দশ গুণ উর্ধে বােধ হয় ইহার সঞ্চার এতাদৃশ বিরল হইবে যে প্রবল ঝটিকা রূপে প্রবা- হিত হইলেও আমরা উহা অনুভব করিতে পারিব না। সুতরাং পৃথিবীর আয়তনের সহিত তুলনায় বায়ু-বিতান যৈ অতি সূক্ষ আবেষ্টন ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে। যদি এক ফুট ব্যাস পরিমিত কোন কন্দুকের দ্বারা পৃথিবীর প্রতিরূপ প্রকাশিত হয় তদুপরি দুই তক্তা কাগজ স্থাপন করিলে তারা ভূয়ুর গভীরতা সূচিত হইবে। ভূবায়ু দ্বারা কি কি উদ্দেশ্য সাধিত হইতেছে ইহার অনুধাবন করিতে হইলে অর্থে তাহার সমাস নিরূপণ ২৪ ভূবায়ুর সমাস। করিতে হয়। ভূবায়ু কতিপয় বায়বীয় পদার্থ প্রধানতঃ অম্লান এবং যৰক্ষারজান সংযােগে সমুৎপন্ন । এই উপাদান পদার্থের কোনটাকেই দেখা যায় না, উহারা সম্পূর্ণ বর্ণহীন। উহাদের কোন গন্ধ বা আস্বাদ ও নাই। কিন্তু আমরা উহা- দিগকে বায়ুপ্রবাহ রূপে অতুভব করিতে পারি ; এবং উপযুক্ত উপায়ের দ্বারা পৃথকৃভূত করিয়া উহাদের গুৰুত্ব নিরূপণ করিতে পারি । এই বায়বীয় পদার্থদ্বয়কে নিত্য বায়ু কহে। কারণ অদ্যাপিও কেহ ইহাদিগকে জলের ন্যায় তরল কিম্বা বরফের ন্যায় কঠিন করিতে সক্ষম হন নাই। এতদ্ভিন্ন ভূবায়ুতে সর্বদাই বায়বীয় আকারে জলকণা মিশ্রিত থাকে। কিন্তু উহা অম্লজান কিম্বা যবক্ষারজানের ন্যায় নহে। সমধিক শীতল হইলে উহা পুনর্বার জলেতে পরিণত হয়। এই বায়বীয় অবস্থায় জলকে জলীয় বাষ্প কিম্বা শুদ্ধ বাষ্প বলা যায়। কোন অনাচ্ছাদিত পাত্রে জল রাখিলে উহা যে বাষ্প হইয়া যায় ইহা পূৰ্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। বায়ু প্রবাহে ধৃত হইলে আর্দ্র বস্ত্র ও ভদ্রুপ শুষ্ক হইয়া যায়; অর্থাৎ যে জলকণা দ্বারা উহা সিক্ত হইয়াছিল সে জলকণা বাষ্পরূপে উন্মুক্ত হয়। কিন্তু রৌদ্রে কিবা অল্পপে ধৃত হইলে ইহা অপেক্ষাকৃত অল্প সময়েই সম্পন্ন হয়। অতএব তাপের দ্বারাই যে জল বাষ্পে পরিণত হয় ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে। কিন্তু নিম্ন পরীক্ষা সম্বন্ধে ইহাও স্বীকার করিতে হইবে, যে শৈত্য হইলে এই বাষ্প আবার ঘনীভূত হইয়া জল হয় এবং কখন কখন এমন কি বরফ রূপে কঠিনাবস্থায় পরিণত হয় । এক খণ্ড বরফ চূর্ণ করিয়া কোন কঁাচ পাত্রে এরূপে রাখিয়া দেও যেন চূর্ণমাত্রও তাহার কিনারায় লাগিয়া থাকিতে পারে না। পরে বহির্ভাগকে উত্তমরূপ' শুষ্ক করিয়া উহাকে ছায়াতে স্থাপন করিলে পাত্রটা শীঘ্রই শীতল হইয়া উঠিবে; পরন্তু প্রায় এক মিনিট কাল বহির্ভাগ শুষ্ক থাকিবে । ইহার পরে মসৃণ কুজঝটিকা ও মেঘ। ২৫ ও স্বচ্ছ উপরিভাগ ক্রমশ ঘাের হইবে এবং অঙ্গুলি দ্বারা স্পর্শ করিলে আর্জ বােধ হইবে। হয়ত প্রথমে মনে হইতে পারে যে পাত্র হইতেই জল নিঃসৃত হইয়া উহার উপরিভাগকে আর্দ্র করিয়াছে, কিন্তু বাস্তবিক তাহা নহে। অদৃশ্য বাষ্পরূপে যে জলকণা ভূয়ুতে মিশ্রিত ছিল তাহাই এক্ষণে পাত্রের শৈত্য দ্বারা ঘনীভূত হইয়া জলরূপে পাত্র পার্শ্বে বিন্যস্ত হই- য়াছে। বরফ চূর্ণের সহিত কিঞ্চিৎ লবণ মিশ্রিত করিয়া দিলে পাত্র আরও শীতল হইয়া যায় এবং তদীয় পার্শ্বে বিন্যস্ত বাষ্প ঘনীভূত হইয়া তুষারচিকাকার ধারণ করে। হিমালয় পৰ্ব্বতের শিখরদেশে নিয়ত যে তুষার বিরাজ করাতে উহার হিমালয় নাম অর্থ হইয়াছে, উহাও এই পদার্থের অনুক্রমমাত্র। এইক্ষণে কিরূপে কুজঝটিকা, মেষ, বৃষ্টি, তুষার ও শিলার সঞ্চার হয় এবং রাত্রে বৃষ্টি না হইলেও শীতকালে কখন কখন কেন যে তৃণ পত্রাদিকে আর্দ্র দৈখা যায় পাঠকবর্গ ইহার কারণ উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইবেন। শৈত্যের দ্বারা বাষ্পের ঘনী- ভবনই ইহাদের প্রত্যেকটীর কারণ। ভূভাগের সন্নিকটস্থ বায়ুরাশি অতিশয় শীতল হইলেই কুজঝটিকার সঞ্চার হয়। শীতকালে প্রায় সূর্যাস্তের অব্যবহিত পরেই কুজ্ঝটিকা দৃষ্টিগােচর হইয়া থাকে ।* শৈত্য নিবন্ধন ভূয়ুর বাষ্প ঘনীভূত হইয়া এতাদৃশ সূক্ষম সূক্ষম জলকণায় পরিণত হয় যে উহা অনায়াসেই বায়ুতে ভাসমান থাকিতে পারে। এই জলকণাসমূহ পরস্পর হইতে পৃথক অনুভূত হয় কিন্তু তদ্বারা শুষ্ক বস্ত্রাদি শীঘ্রই আর্জ হইয়া যায়। মেঘও কুজঝটিকা হইতে বিভিন্ন নহে। উর্ধে হইলে মেঘ এবং নিম্নে হইলে, কুজঝটিকা বলা যায়। কিন্তু মেঘের আকার * গ্রামে ও ঘরের চতুষ্পার্শ্বে কুজঝটিকার সহিত অনেক ধূম মিশ্রিত থাকে। কিন্তু কলিকাতার ময়দানের ন্যায় খোলা জায়গা পুষ্করিণী, কিংবা জলাশয়ের উপরের কুজঝটিকাতে সেরূপ থাকে না।
বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি। সৰ্ব্বদাই পরিবর্তনাধীন। সামগ্রীর তারতম্য অনুসারে আকারের ও পরিবর্তন হয়। স্থানে স্থানে নির্মল আকাশে কখন কখন মধ্যাহ্ন কালে যে সমুদায় অর্ধ মণ্ডলাকৃতি শ্বেতবর্ণ মেঘমালা শােভা পাইয়া থাকে তাহাদের উপরিভাগ নিয়তই সূৰ্যোপে বাষ্পীভূত হইয়া ক্ষীণ হয় কিন্তু নিম্নভাগ নব ঘনীভূত বাষ্পের দ্বারা পরিবর্ধিত হয়। এক স্থানে থাকে বলিয়া মেয়ের কোন পরিবর্তন প্রতীয়মান হয় না বটে কিন্তু বাস্তবিক উহার উপদানীভূত জল-কণার নিয়তই পরি- বৰ্ত্তন হয়। বায়ুর ঘনীভূত বাষ্পযােগে যদি এই মেঘ- মালা ক্রমশঃ গাঢ় হয় এবং চতুষ্পর্শ্বের অন্যান্য মেষের সহিত মিলিত হইয়া বৃহৎ হইয়া উঠে, তাহা হইলে বৃষ্টি-মেঘের উৎপত্তি হয়। যে জলবিন্দু সন্নিপাতে মেষ সমুৎপন্ন এইক্ষণে তাহা বৃহৎ ও পরস্পরের সহিত মিলিত হইয়া বৃষ্টি রূপে পৃথিবীতে পতিত হয় । মেষ বর্ষণে এরূপে যে জল পৃথিবীতে প্রত্যানীত হয় তাহা অব্যবহিত পূৰ্বেই যে ভূবায়ুতে অদৃশ্য অবস্থায় ছিল হয়ত ইহা প্রথমে বিশ্বাসের অযােগ্য বলিয়া বােধ হইবে। কিন্তু বাস্তবিক এ বিষয়ের কোন সন্দেহ নাই। এক ঘণ্টা কি দুই ঘণ্টা কাল মেষের প্রতি নিরীক্ষণ করিয়া তাহার আকারের এবং আয়তনের পরিবর্তন সমূহ অভিনিবেশ পূৰ্ব্বক সন্দর্শন করিলে ইহা কিয়ৎপরিমাণে উপলব্ধি করিতে পারা যায়। চৈত্র ও বৈশাখ মাসে প্রবল ঝটিকারম্ভের অব্য- বহিত পূৰ্বে এত দ্রুতবেগে মেঘের সঞ্চার হইয়া থাকে, যে দেখিতে দেখিতে অর্ধ ঘণ্টার মধ্যেই সমস্ত গগণমণ্ডল তমসা- চ্ছন্ন হইয়া যায়। ফাল্গুন ও চৈত্র মাসে, ইহা কখন কখন এরূপ ঘটিয়া থাকে, যে বৃষ্টির সহিত কঠিন বরফ খণ্ড পতিত হইয়া পৃথিবীকে সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলে। ইহাকে শিলাবৃষ্টি, কহে। ইহারা যে বাস্তবিক প্রস্তর এমন নয়। কঠিন বলিয়া এবং তাদৃশ উৰ্দ্ধদেশ হইতে পতিত হওয়াতে প্রস্তরের ন্যায় ৮ তুষার ও শিশির। ২৭ শস্য ও তৰুলতাদির ধ্বংস করে বলিয়াই উহাদিগকে শিলা বলা যায়। উহারা বাস্তবিক বৃহৎ বৃহৎ সলিলবিন্দু কিন্তু এরূপ উৰ্দ্ধ প্রদেশ হইতে আগত যে তত্ৰত্য শৈত্য নিবন্ধন ঘনীভূত হইয়া বরফে পরিণত হইয়াছে। তুষার ও এক প্রকারের ঘনীভূত বাম্প। কিন্তু উহা অতিশয় লঘু এবং উহা অদৃশ্য বাষ্প হইতে একেবারেই কঠিন সূচিকাকার ধারণ করে। বরফের সহিত লবণ মিশ্রিত করিয়া দিলে ঘনী- ভূত বাষ্প তরল না হইয়া যে একেবারেই কঠিন তুষারে পরিণত হয়, ইহা পূর্বেই উল্লেখ করা গিয়াছে। তাদৃশ শীতল হয় বলিয়াই পাঞ্জাবের উত্তরাংশ ভিন্ন ভারতবর্ষের সমভূমিতে এমন কি হিমালয়ের দক্ষিণবর্তী পর্বতসমূহেও তুষারের সঞ্চার হয় না। কিন্তু হিমালয়ের উচ্চতর শৃঙ্গসমুহ সৰ্ব্বদাই তুষারমণ্ডিত থাকে। তুষার অতিশয় লঘু, পতিত হইবার সময় উহাকে তুলারাশির ন্যায় প্রতীয়মান হয়। দ্রবী- ভূত, কিম্বা বাতাস কর্তৃক ইতস্ততঃ চালিত হইয়া রাশীকৃত হইলে উহা যেখানে পতিত হয় সেইখানেই থাকে। শীতকালে ইউরােপে কখন কখন ভূমির উপর উহা অনেক গভীর হইয়া সঞ্চিত হইয়া থাকে, এবং দারুণ শৈত্য হইলে কখন কখন তুষাররাশিতে গৃহাদি প্রােথিত হইয়া যায়। উন্নত পর্বতগহ্বরে উহা এরূপে অনেক সহস্র ফুট গভীর হইয়া সঞ্চিত হয় এবং ক্রমশঃ কঠিন বরফ-রাশিতে সম্পক্ত হইয়া উপত্যকা দিয়া নদীর ন্যায় প্রবাহিত হইতে থাকে; তখন উহাদিগকে চিরনীহারবাহু কহে। অপর অন্য এক উপায়েও বাষ্প ঘনীভূত হইয়া থাকে। শীত- কালে গগণমণ্ডল সম্পূর্ণ নির্মল থাকিলেও প্রাতঃকালে কখন কখন তৃণাদিকে আর্জ দেখা যায় এবং পত্রাদি হইতে টস টস করিয়া বারি-বিন্দু ঝরিতে থাকে। ইহাকে শিশির কহে; এবং উন্নাও ঘনীভূত বাষ্পেরঅনুক্রম মাত্র । এই শিশিরভাবে তৃণপত্রাদি ২৮ শ্বেতশিশির। যেরূপ আর্জ হয় বস্ত্রাদিও জলসিক্তপ্রায় হইয়া যায়। তাদৃশ শৈত্য হইলে শিশির জমিয়া যায় এবং তখন উহাকে শ্বেত শিশির বলা যাইতে পারে। গগণমগুল নির্মল থাকিলে এবং তাদৃশ শীতের আতিশয্য হইলে পৌষমাসে কখন কখন আৰ্যাবর্ত, নীলগিরি এবং হাজারিবাগে এরূপ শিশির লক্ষিত হইয়া থাকে। অতএব কুজঝটিকা, মেষ, বৃষ্টি, শিলা, তুষার, শিশির এবং শ্বেত-শিশির একই পদার্থের ভিন্ন ভিন্ন ক্রমমাত্র। ভূবায়ু। শীতল হইলে তদীয় বাষ্প তরল কিম্বা কঠিনাবস্থায় পরিণত হইয়াই ইহাদের সঞ্চার হয়। এই বাষ্প নিয়তই নদী, হ্রদ, সমুদ্র, ও আর্দ্রভূমি হইতে উথিত হয় ; এবং সূৰ্য্য- কিরণই এই বাষ্পীভবনের কারণ। সুতরাং প্রচণ্ড মার্তণ্ডপে সন্তাপিত হইলে যে মেঘবর্ষণ হইতে আমরা পুনৰুজ্জীবিত হই এবং যেই মেঘবর্ষণ হইতে বসুন্ধরা ফল-শস্যাদি সুশাে- ভিত হইয়া আমাদিগকে জননীর ন্যায় প্রতিপালন করে, গ্রহ- রাজ মূৰ্য্যই তাহার আদিকারণ বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে। কিন্তু সূৰ্যাতপে বায়ুরাশিতে তদ্ভিন্ন আরো অন্যান্য পরি- বৰ্ত্তন সাধিত হইয়া থাকে। যেই বাষ্পরাশি বৃষ্টিরূপে প্রান্তর প্রদেশে ও গহন বনে প্রত্যাবর্তন করিয়া বসুন্ধরাকে শ্যামলতা পরিপূর্ণ ও অপূৰ্বশ্রী সম্পন্ন করিতেছে, সূৰ্য্য হইতেই বায়ু প্রবাহিত হইয়া সে বাষ্পরাশি সমুদ্র-পৃষ্ঠ হইতে উর্ধে নীত হইতেছে। প্রত্যহ যাহা আমরা প্রত্যক্ষ করি তাহার বিষয় কিঞ্চিৎ অনুসন্ধান করিয়া দেখিলেই ইহা স্পষ্ট উপলব্ধি হইবে। উত্তাপের দ্বারা বায়ুর কিরূপ পরিবর্তন হয় ইহা সাধারণতঃ অগ্নির প্রতি দর্শন করিলেই অনুভূত হইবে। যদি কাষ্ঠভৃণ পল্ল- বাদি সংযােগে কোন অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত করা যায় তাহা হইলে তদুথিত ধূম বাতভাবে স্থানান্তরে নীত না হইলে উর্ধদিগেই গমন করে। কিন্তু যদি কোন দহমান পল্লব বা কাষ্ঠ কিঞ্চিৎ এক পার্শ্বে অবস্থিত থাকে তদুত ধূম ও শিখা অগ্নিরাশির দিগেই যে বায়ুপ্রবাহের কারণ। আকৃষ্ট হয়। অতএব চতুষ্পর্শ্বের বায়ু অগ্নির অভিমুখে আকৃষ্ট হয় ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে। এই বায়ু অগ্নিশিখা দ্বারা উত্তপ্ত হইলে ধূম ও ভস্মসহকারে উর্ধ্বগামী হয়। কারণে বাঁশ প্রভৃতি জলে নিমজ্জিত হইলে ভাসিয়া উঠে ইহাও সে কারণে ঊর্ধ্বগামী হয়। বাঁশ যেরূপ জল হইতে লঘু উত্তপ্ত বায়ুও সেরূপ চতুষ্পর্শ্বস্থ শীতল বায়ু অপেক্ষা লঘু। শীতল ধূম লঘু নহে এবং উহা উৰ্দ্ধগামীও হয় না। এই হেতু শীতকালে পাক করিবার সময় সন্ধ্যাকালে যে ধূম উত্থিত হয় উহা উৰ্দ্ধগামী না হইয়া গৃহের চতুষ্পর্শ্বে ঝুলিয়া পড়ে এবং অবশেষে ভূতলে অবতরণ করে। গ্রামাদি দগ্ধ হইবার সময় যখন প্রবল অনলরাশি প্রজ্জ্বলিত হয় চতুর্দিগ হইতে বায়ু বেগে তদভিমুখে ধাবমান হয়। এবং যখন আমেরিকার বনাদি, কিম্বা ১৬৬৬ খৃষ্টাব্দেতে লণ্ডন এবং কতিপয় বৎসর পূর্বে চিকাগার ন্যায় নগরাদি দগ্ধ হয় তৎকালে চতুর্দিা হইতে বায়, ঝটিকারূপে প্রবাহিত হইতে থাকে। সূর্যের উত্তাপের দ্বারাও তাদৃশ পরিবর্তন হইয়া থাকে। ব্যাপকাগ্নির ন্যায় রৌভ্রাতপে ভূবায়ু তাদৃশ উত্তপ্ত হয় না বটে কিন্তু সূৰ্য্যকিরণের পরিসর অনেক বিস্তৃত। সুতরাং দহমান নগরাদির চতুষ্পর্শ্বের ন্যায় বায়ুপ্রবাহ তাদৃশ প্রবল না হইলেও উহা অনেক স্থানে অনুভূত হয়। কিন্তু এক্ষণে জিজ্ঞাসা করা যাইতে পারে সূৰ্য- রশ্মি এককালে গােলােকার্ধের উপর পতিত হয় তবে সকল স্থান সমভাবে উত্তপ্ত হয় না কেন? ইহার কারণ দ্বিবিধ। প্রথমতঃ সূৰ্য্য যখন মধ্যাকালে আকাশের উচ্চতম স্থান অধিকার করে তখন যেরূপ সায়ংকাল অপেক্ষা অধিক তাপ অনুভূত হয়, সেরূপ সূৰ্য্যমণ্ডল যখন যে সকল প্রদেশের শিরােভাগে সংস্থিত থাকে তখন সে সকল প্রদেশেই অধিক উষ্ণানুভব হয়। অন্যান্য প্রদেশে যেখানে উহা তাদৃশ উচ্চতম প্রবল উষ্ণতা ও শৈত্য। স্থান অধিকার করে না সেখানে তাপভাগ অনেক নূন হইয়া থাকে। দ্বিতীয়তঃ জলভাগ অপেক্ষা স্থলভাগ অতি অল্প সময়েই উত্তপ্ত হয়। এজন্য গ্রীষ্মকালে বঙ্গদেশের মধ্যভাগ অপেক্ষা সমুদ্র, এবং এমন কি উপকূলভাগও মধ্যাহ্নকালে অধিক শীতল থাকে। এজন্যই আর্যাবর্ত ও পাঞ্জাবাদির ন্যায় সমুদ্র হইতে দূরবর্তী প্রদেশসমুহ গ্রীষ্মকালে তাদৃশ উত্তপ্ত হইয়া থাকে। কিন্তু সূৰ্য্য অস্তমিত হইলে যখন জল ও স্থল এবং তদুপরিস্থ বায়ু তেজ বিকীরণে শীতল হইতে থাকে তখন স্থলভাগ জলভাগ অপেক্ষা অধিক শীতল হয়। এজন্য শীতকালে যখন পরিশােধিত তেজ অপেক্ষা ভূভাগ হইতে অধিক তেজ বিকীর্ণ হয় মূলভাগ জলভাগ হইতে অধিক শীতল হয় ও আসাম পঞ্জাবাদির ন্যায় দূরবর্তী প্রদেশসমূহ বঙ্গদেশ প্রভৃতি সমুদ্রের নিকটবর্তী প্রদেশ অপেক্ষা অধিক শীতল হয়। এক্ষণে বৈশাখ এবং জ্যৈষ্ঠ মাসে গ্রীষ্মের তাদৃশ প্রাদুর্ভাব হইলে কেন যে সমুদ্র হইতে বায়ু বহিতে থাকে এবং এই বায়ু প্রবাহ হইতেই কেন যে আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে বর্ষার প্রাদুর্ভাব হয় ইহা পাঠকবর্গ উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইবেন। বর্ষার প্রারম্ভাবধি ভারতবর্ষ দক্ষিণবর্তী সাগরসমুহ হইতে অপেক্ষাকৃত উত্তপ্ত থাকে। বঙ্গদেশে বর্ষারম্ভের অনেক পূর্বেই দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমদিগ হইতে বায়ু বহিতে থাকে । কিন্তু আষাঢ় এবং শ্রাবণ মাসে যখন আৰ্য্যাবৰ্ত্ত, উত্তরপশ্চিমাঞ্চল, ও পাঞ্জাব সাতিশয় উত্তপ্ত হইয়া উঠে তখন নিরক্ষবৃত্তের সমীপন্থ সমস্ত বায়ুরাশি সমুদ্রের বাষ্পসহকারে ভারতবর্ষাতি- মুখে ধাবমান হয়। ইহাকেই দক্ষিণ পশ্চিম মৌশুম কহে। আমরা এক্ষণে জানিতে পারিয়াছি বাষ্প ঘনীভূত হইলেই বৃষ্টির উৎপাদন হয় এবং বায়ুপ্রভাবেই সে বাষ্প আনীত হয় । কিন্তু বায়ু শীতল না হইলে বাষ্প ঘনীভূত হইতে পারে না।
আরােহণ নিবন্ধন বায়ুর শৈত্য। ও ভারতবর্ষে তাপের আধিক্য না হইলে বায়ুপ্রবাহ উৎপন্ন হয় না। তবে যে বায়ুপ্রবাহ তাপের আধিক্যবশতঃ উৎ- পাদিত হয় উহা কি আবার অনতিবিলম্বেই এতাদৃশ শীতল হইতে পারে যে উহার বাষ্প ঘনীভূত হইয়া মেঘে এবং বৃষ্টিতে পরিণত হইবে। ইহা কি কখন সম্ভব হইতে পারে ? কিন্তু বাস্তবিক যে এরূপ ঘটিয়া থাকে পাঠকবর্গ অগ্নির সম্বন্ধে যাহা চিরকাল প্রত্যক্ষ করেন তাহা একবার অনুধাবন করিয়া দেখিলেই স্পষ্ট উপলব্ধি করিতে পারিবেন। যখন অগ্নি প্রজ্জ্বলনাতিশয়ের সহিত জ্বলিতে থাকে তদীয় ধূমস্রোত উত্তপ্ত বায়ুসহকারে উর্ধে উঠিতে থাকে। কিন্তু উহা অধিক উর্ধে উঠিতে পারে না। এমন কি তাল তৰুর অগ্রভাগ পর্যন্ত উঠিয়াই চতুর্দিগে বিস্তীর্ণ হইয়া যায় এবং কিয়ৎকালের জন্য তথায় ঝুলিতে থাকে। উহা আর উর্ধে-উঠিতে পারে না কারণ যে তাপসমাগমে উহা উদ্ধগামী হইয়াছিল এক্ষণে তাহার অধিকাংশ নিঃসৃত হইয়াছে এবং, তন্নিবন্ধন উহা অপেক্ষাকৃত গুৰু হইয়াছে। অগ্নত্তাপেই হউক আর মূৰ্য্যো- ভাপেই হউক যে কারণবশতই বায়ু, উৰ্দ্ধগামী হউক না কেন উদ্ধে উঠিবার সময় উহা শীতল হইয়া যায়। কত পরিমাণে যে উহা শীতল হয় তাহাও জুল সাহেবকৃত পরীক্ষা দ্বারা স্থিরীকৃত হইয়াছে। বৈশাখ মাসে প্রাতে ৯ টার সময় কলি- কাতার বায়ু যত উষ্ণ হয় সেই পরিমাণে উত্তপ্ত কোন বায়ু- প্রবাহ ১১০০ ফুট অর্থাৎ দার্জিলিং হইতে ২০০০ ফুট উর্ধে উঠিলে উহা তুষারের দ্রবণবিন্দু অর্থাৎ ৩২° ফা পৰ্যন্ত শীতল হইয়া যাইবে। পৰ্বতে আরােহণ করিবার সময় যতই উর্দ্ধে গমন করা যায় ততই বায়ু শীতল হইতে থাকে কিন্তু উৰ্দ্ধগামী বায়ু তদপেক্ষাও অধিক শীতল হইয়া থাকে। দার্জিলিঙ্গের উষ্ণতা সমভূমি এবং দ্রমাণ তুষারের উষ্ণতার মধ্যবর্তী। দার্জিলিঙ্গের * ফারেনহীট তাপমান যন্ত্রের ৮৩ অংশ।
৩২ মৌশুম বায়ু। এবং দ্বিগুণ উর্দ্ধে না উঠিলে চিরনীহার দৃষ্ট হয় না। কিন্তু উৰ্দ্ধগামী বায়ুপ্রবাহ দার্জিলিং হইতে মাত্র দুই হাজার ফুট উর্ধে উঠিলে এতাদৃশ শীতল হইয়া যায় যে উহার বাষ্প ঘনীভূত হইয়া তুষারে পরিণত হয়। বায়ুপ্রবাহ উৰ্দ্ধগামী হইলে অতিশয় প্রসারিত হয় এবং প্রসারিত হইতে সমধিক চাপ অতিক্রম করিতে হয়। ঊর্ধ্বে উঠিবার সময় বায় যে তাদৃশ শীতল হয় এই প্রসারণ এবং চাপ অতিক্রমই তাহার প্রধান কারণ। ভারতবর্ষের বায়ু সমধিক উত্তপ্ত হইলে উহ উৰ্দ্ধগামী হয় এবং উর্দ্ধে উঠিবার সময় শীতল হইতে থাকে। দক্ষিণী সাগরসমূহ হইতে বাষ্প-সিক্ত বায়ু আসিয়া উহার স্থান অধিকার করে কিন্তু উহাও উত্তপ্ত হইয়া উৰ্দ্ধগামী হয়; ক্রমশঃ শীতল হইয়া মেঘ ও বৃষ্টির উৎপাদন করে। অধিক উর্ধে উঠিলে উহা প্রায় বাষ্পহীন হইয়া যায় এবং পরে দক্ষিণাভিমুখে গমন করে। তথায় ক্রমশঃ সমুদ্রপৃষ্ঠে অবতীর্ণ হইয়া অধিক বাষ্প আকর্ষণ করত পূর্বোক্ত মণ্ডলাবৃত্তির পুনরাৰ্ত্তন করে। কিন্তু শীতকালে যখন সূৰ্য্য আকাশের তাদৃশ উচ্চ স্থান অধিকার করে না এবং ভূভাগ জলভাগ অপেক্ষা অধিক শীতল হয় অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি নিরক্ষবৃত্তের দক্ষিণবর্তী প্রদেশ সমূহ সমধিক উত্তপ্ত হইয়া উঠে; এবং বায়ুরাশি নিমে ভারতবর্ষ হইতে এই উত্তপ্ত প্রদেশাভিমুখে, ও উর্দ্ধে তথা হইতে ভারতবর্ষের অভিমুখে ধাবমান হইতে থাকে। নিম্নতর বায়ুপ্রবাহই আমাদের উত্তর-পূৰ্ব্ব মৌশুম। উহাকে উত্তর-পূৰ্ব্ব বলিবার তাৎপৰ্য এই যে সমুদ্রে উহা বাস্তবিক উত্তর-পূৰ্ব্ব হইতেই প্রবাহিত হয় কিন্তু বঙ্গদেশে এবং উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে উহা প্রধানতঃ উত্তরপশ্চিম কি উত্তর হইতে প্রবাহিত হইয়া থাকে। উৰ্দ্ধ বায়ুপ্রবাহ হিমালয়ে অনুভূত হইয়া থাকে এবং উহাকে প্রতিমৌশুম বলা যাইতে পারে। উহা ০ ট্রেড়বায়ু। উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে এবং পাঞ্জাবে অবতীর্ণ হইয়া প্রভূত বর্ষণ করে এবং এই বর্ষণ হইতেই রাবির শস্য উপাদিত হয়। অতএব ভারতবর্ষে বৎসরের পাঁচ ছয় মাস এক দিগ হইতে এবং অবশিষ্ট সময়ে অন্যদিগ হইতে বায়ু প্রবাহিত হয়। এ সকল বায়ুপ্রবাহকে মৌশুম কহে। চিন সাগর, অস্ট্রেলিয়া, এবং উষ্ণ মণ্ডলের অপর কতিপয় প্রদেশেও মৌশুম অনুভূত হয়। কিন্তু ভারতবর্ষে যে দিগ হইতে প্রবাহিত হয় তথায় সে দিগ হইতে প্রবাহিত হয় না। কাৰণ ভূমির গঠনভেদে, উপকূলের দিগভেদে, এবং নিরক্ষ- বৃত্ত সম্বন্ধে স্থানের অবস্থানভেদে মৌশুমের দিগের পরিবর্তন হইয়া থাকে। যে উষ্ণ মণ্ডল সমুদ্র হইতে চীনের এবং ভারত- বর্ষের গ্রীষ্ম মৌশুম প্রবাহিত হয় উহা তাহাদের যথাক্রমে দক্ষিণপশ্চিম ও দক্ষিণদিগে অবস্থিত। কিন্তু উহা অস্ট্রেলিয়ার উত্তর এবং উত্তরপশ্চিমে অবস্থিত। সুতরাং আমাদের, দক্ষিণ পশ্চিম মৌশুম বৰ্ষণশীল এবং উত্তর-পূর্ব মৌশুম শুষ্ক ও নির্জল ; কিন্তু উত্তরপশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার উত্তরপশ্চিম মৌশুম বর্ষণশীল এবং দক্ষিণ-পূৰ্ব্ব মৌশুম শুষ্ক ও নির্জল। অতলান্ত মহাসাগরের মধ্যদেশে, প্রশান্ত মহাসাগরে, এবং ভারতবর্ষের দক্ষিণবর্তী সাগরসমূহে বায়ু বৎসরের সকল সময়েই অয়নান্তবৃত্ত হইতে নিরক্ষ বৃত্তাভিমুখে প্রবাহিত হইয়া থাকে। এই নিত্য বায়ুপ্রবাহকে ট্রেড় বায়ু, কহে। ট্রে বায়ুগােলােকের উত্তরাদ্ধে উত্তরপূর্ব হইতে এবং দক্ষিণার্ধে দক্ষিণপূর্ব হইতে প্রবাহিত হয়। কিন্তু এই উভয়ের মধ্যে নিরক্ষবৃত্তের দুই পার্শ্বে কোন বায়ুপ্রবাহ অনুভূত হয় না। এই জন্য এই বৃত্তকে সাধারণত নিৰ্বাতমণ্ডল কহে, কিন্তু অতলান্ত মহাসাগরে উহাকে “ভােলা” ও কহে। এই বৃত্তের উপরিভাগে বায়ু প্রবাহদ্বয় সম্মিলিত হইয়া উৰ্দ্ধগামী হয় এবং পরে উৰ্দ্ধদেশে দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া বিপরীত দিকে অর্থাৎ ও । ৩৪ ঋতু পরিবর্তনের কারণ । তীর্ণ হয়। গােলােকের উত্তরার্ধে উত্তরপূর্বদিকে এবং দক্ষিণার্ধে দক্ষিণ পূর্বদিগে ধাবমান হয় এবং পরে শীতল হইয়া মেৰুতে অৰ- এরূপে প্রত্যাবর্তিত উৰ্দ্ধবায়ুপ্রবাহকে প্রতিবায়ু বলা যাইতে পারে। নিৰ্বাতমণ্ডলের উপরিভাগে যেখানে উহাদের উৎপত্তি হয় তাহা অত্যুচ্চ পৰ্বত হইতেও উচ্চ। কিন্তু উহারা ক্রমশঃ পাশ্চাত্য প্রবাহরূপে ভূতলে অবতরণ করে এবং ইউরােপ, উত্তর আসিয়া, উত্তর আমেরিকা, ও দক্ষিণ মহাসাগরে প্রায় পশ্চিম হইতেই প্রবাহিত হইয়া থাকে। গাে- লােকের উদ্ধার্ধে উহারা কখন কোন দিগ হইতে প্রবাহিত হয় ইহার কোন স্থিরতা নাই; উহারা সতত উত্তর ও উত্তর-পূর্ব বায়ুর সহিত পরিবর্তিত হয়। এজন্য অস্থিরতার দৃষ্টান্ত দিতে হইলে ইউরােপে “বায়ুর ন্যায় অস্থির ” এ কথা বলা হইয়া থাকে। কিন্তু এই অস্থিরতা কেবল বাহিক। ভারতবর্ষের ন্যায় ইউরােপেও দুটি প্রধান বায়ুপ্রবাহ আছে। একটা উত্তরের শীত- প্রধান দেশ হইতে নিরক্ষতাভিমুখে এবং অপরটি নিরক্ষবৃত্ত হইতে উত্তর ও উত্তর-পূৰ্বাভিমুখে প্রবাহিত হইয়া থাকে। পাঞ্জাবে যেরূপ প্রতিমৌশুমের সময় বৃষ্টি হয় ইউরােপেও সেই- রূপ প্রতিবাযু হইতে প্রভূত বর্ষণ হইয়া থাকে। মৌশুমের পরিবর্তন,শীত ও গ্রীষ্ম অর্থাৎ নির্জল ও সজল ঋতুর আবর্তন, ইহাদের প্রত্যেকটাই সূৰ্য্য সম্বন্ধে পৃথিবীর অবস্থানের উপর নির্ভর করে। আষাঢ় এবং পৌষ মাসে মূৰ্য্য ও পৃথিবী পরস্পর যেখানে অবস্থিত থাকে প্রথম ও দ্বিতীয় চিত্রে ইহ! যথাক্রমে সূচিত হইতেছে। এই দুই অবস্থাভেদে কি কি পরি- বৰ্ত্তন হয় গােলােকের উত্তরার্ধে এ এবং দক্ষিণার্ধে বি নামে দুটী বিন্দুর উপর পৌষ মাসে ও আষাঢ় মাসে কিরূপে সূর্যের কিরণ পতিত হয়, চিত্রে ইহার বিষয় দর্শন করিলে স্পষ্ট উপলব্ধি হইবে। চিত্রের আচ্ছাদিত ভাগ রাত্রিচক এবং অনাচ্ছাদিত ভাগ দিক।
ঋতু পরিবর্তনের কারণ।
চিত্র।
মেরুদণ্ড
সৌরকরের গতি
সূর্যের অবস্থানের
দিক্
গ
Abd
A
সূর্যের অবস্থানের
দিক
সৌরকরের গতি
পৃথিবী যখন ঘুরিতে থাকে এ ও বি দ্বারা যথাক্রমে এএ
ও বিবি’ রেখা অঙ্কিত হয়। এক্ষণে আষাঢ় মাসের অবস্থান
সূচক প্রথম চিত্রে এএ’ রেখার অধিকাংশ দিবা এবং অল্প
অংশ মাত্র রাত্রি। সুতরাং প্রতীয়মান হইতেছে যে স্থান
নিরক্ষবৃত্তের যত উত্তরে অবস্থিত, আষাঢ় মাসে তাহার দিবা-
ভাগও তত অধিক হইয়া থাকে। কিন্তু বিবি রেখার অধিক
ভাগই রাত্রি এবং অত্যল্প অংশ মাত্র দিবা। অতএব এক
স্থান ১২ঘণ্টা হইতেও অধিক কাল উত্তপ্ত হইতেছে এবং অত্যপ
কাল মাত্ৰ শীতল হইতেছে। অন্য স্থান অতি অল্প পরিমাণে
উত্তপ্ত হইতেছে, কিন্তু অধিক পরিমাণে শীতল হইতেছে। এ
কারণেও এ বিন্দু বি হইতে অধিক উষ্ণ হইবে এবং বি এর দারুণ
শীতের সময় এ এর গ্রীষ্মকাল হইবে সন্দেহ কি ? কিন্তু
শীত গ্রীষ্ম ভেদেয় অন্যান্য কারণ ও আছে। মধ্যাহ্ন সময়ে
এ এর উপর সূৰ্য্য কিরণ ঠিক লম্ব ভাবে পতিত হয়, কিন্তু
বি এর উপর বক্রভাবে পতিত হয়। গ্রীষ্মকালে মধ্যায় সময়ে
* -
ঋতু পরিবর্তনের কারণ।
সূৰ্য্য যে আকাশের তাদৃশ উচ্চ স্থান অধিকার করে এবং
কলিকাতার ঠিক শিরােপরি দেখায়, আর শীতকালে যে
উহাকে তাদৃশ নিম্ন প্রতীয়মান হয়, উপরােক্ত সূৰ্য্য কিরণের
ঋজুতা ও বক্রতাই তাহার কারণ সূৰ্য্য আকাশের যত উচ্চতর
স্থান অধিকার করে, ততই যে উত্তাপের আধিক্য হয় ইহা
সকলেরই চিরপরিচিত এবং তাদৃশ ব্যাখ্যার প্রয়ােজন করে না।
কিন্তু চিত্রে ইহাও সূচিত হইতেছে। প্রথম চিত্রে এ ও এম এর
মধ্যবর্তী কটিবন্ধ এবং বি ও এন এর মধ্যবর্তী কটিবন্ধ উভয়ই
সমান। এ ও এম এর মধ্যবর্তী কটিবন্ধের উপর ক ও খ এর
মধ্যগত ক্ষেত্ৰ পরিমিত কিরণ পতিত হয়। কিন্তু বি ও এন এর
মধ্যবর্তী কটিবন্ধের উপর গ ও ঘ এর মধ্যগত ক্ষেত্র পরি-
মিত কিরণ মাত্র পতিত হয়, এবং উহার পরিমাণ পূৰ্ব্ব ক্ষেত্রের
চতুর্থাংশ অপেক্ষাও ক্ষুদ্র। সুতরাং যখন এ এবং উত্তর
গােলােকার্ধের অন্যান্য স্থানে গ্রীষ্মের প্রাদুর্ভাব হয়, তখন
বি এবং দক্ষিণ গােলােকার্ধের অন্যান্য স্থানে শীতের প্রাদুর্ভাব
হইবে ইহা স্পষ্টই প্রতীয়মান হইতেছে।
পৌষমাসের অবস্থানসূচক দ্বিতীয় চিত্রে এ ও বি এর
অবস্থানের বিপৰ্যয় হইয়াছে। এ এর দিনমান অল্প কিন্তু
রাত্ৰিমান অধিক; এবং উহার উপর সূর্যের কিরণ বক্রভাবে
পতিত হওয়াতে মধ্যাহ্নকালেও তাদৃশ তেজ হয় না। পরন্তু
বি এর দিনমান অধিক এবং তদুপরি সূর্যরশ্মি লম্বভাবে
পতিত হইতেছে।
এ এবং উত্তর গােলােকার্ধের অন্যান্য
স্থানে দাৰুণ শীতের প্রাদুর্ভাব হইয়াছে কিন্তু বি এবং দক্ষিণ
গােলােকার্ধের অন্যান্য স্থানে খরতর গ্রীষ্ম হইয়াছে।
চিত্র হইতেই অনুভূত হইবে যে নিরক্ষতে অর্থাৎ দুই
গােলােকার্ধের মধ্যবর্তী রেখাতে পোষ ও আষাঢ় মাসে এবং
সকল সময়েই দিনমান ও রাত্ৰিমান সমান। কিন্তু মেৰুতে
বৎসরের মধ্যে মাত্র একবার দিবা ও একবার রাত্রি হইয়া
সংক্ষিপ্তার্থ। থাকে। * উত্তরায়ণ হইতে দক্ষিণায়ণ পৰ্য্যন্ত সুমেৰুতে সূৰ্য্য অস্তমিত হয় না, কিন্তু অবশিষ্ট সময়ে উদিতও হয় না। কুমেৰুতে ইহার ঠিক বিপর্যয় ঘটিয়া থাকে। উভয় মেৰুতেই দিবাভাগে গ্রীষ্ম এবং রাত্রিভাগে শীতের প্রাদুর্ভাব হয়। উত্তরায়ণ সংক্রান্তি অর্থাৎ ২০শে মার্চ তারিখে সূৰ্য্য সুমে ৰুতে উদিত হয় এবং কুমেৰুতে অস্তমিত হয়। আর দক্ষিণায়ণ সংক্রান্তি অর্থাৎ ২২শে সেপ্টেম্বরে সুমেৰুতে অস্তমিত হয় এবং কুমেতে উদিত হয়। এই দুই দিন পৃথিবীর অন্যান্য সকল অংশেই সমান দিবা ও সমান রাত্রি, অর্থাৎ উভয়ের পরিমাণ ১২ ঘণ্টা হইয়া থাকে। নিরক্ষবৃত্ত হইতে দূরবর্তী প্রদেশে ঋতুর পরিবর্তন এবং দিবা ও রাত্ৰিভাগের হ্রাসবৃদ্ধি এরূপেই ঘটিয়া থাকে। শীতকালের দাৰুণ শীত এবং গ্রীষ্মকালের খরতর উত্তাপও ঐরূপে উৎপন্ন হয়। ঋতুর পরিবর্তন এবং দিবা ও রাত্ৰিভাগের হ্রাসবৃদ্ধি শুদ্ধ নিরক্ষবৃত্ত সম্বন্ধে স্থানসমূহের অবস্থানের উপরই নির্ভর করে। কিন্তু ভূভাগ কিম্বা জলভাগের আতিশয্য ও অন্যান্য কারণের দ্বারা তাপভেদের অনেক পরিবর্তন হইয়া থাকে। অতএব এক্ষণে আমরা জানিতে পারিয়াছি আমাদের আবাস-ভূমি বসুন্ধরা যে বিশাল বায়ুদ্বারা সমাচ্ছন্ন তাহা ৫০ মাইলের অপেক্ষা অধিক গভীর নহে। উহা প্রধানত দুইটা বায়বীয় পদার্থ যােগে সমুৎপন্ন। এই বায়বীয় পদার্থদ্বয় উত্তপ্ত হইলে প্রসারিত ও লঘু হয় এবং শীতল হইলে সঙ্কুচিত ও গুৰু * দিবীদ্বারা সুৰ্যোদয় হইতে সূৰ্যাস্ত পরিমিত কাল এবং রাত্রি দ্বারা ত- বিপরীত কাল সূচিত হইয়াছে। ইহা আমরা সকলেই অবগত আছি সূৰ্য্য অন্ত হইলেই সম্পূর্ণ অন্ধকার হয় না এবং সূর্যের উদয়াবধিও সম্পূর্ণ অন্ধকার থাকে না। মেরুতে সূৰ্য উদয় হইবার অনেক দিন (দিন অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা পরিমিত কাল) পূৰ্বেই প্রদোষ হইয়া থাকে। এবং সূর্য অস্তমিত হইলেও অনেক দিন পৰ্যন্ত গোধূলি থাকে।
৩৮ সংক্ষিপ্তার্থ। হয়। কিন্তু তাহারা সর্বদা নির্দিষ্ট পরিমাণে মিশ্রিত হইয়া বায়বীয় অবস্থাতেই অবস্থিতি করে। ভূবায়ুতে জলীয় বাষ্পও আছে কিন্তু উহার পরিমাণ নিয়তই পরিবর্তনাধীন। এই বাষ্প প্রধানত সাগর হইতেই উথিত হইয়া থাকে। শৈত্য- নিবন্ধন উহা পুনর্বার মেঘ বৃষ্টি তুষার এবং শিলাতে পরিণত হইয়া ভূতলে প্রত্যাবর্তন করে । যখন এই বাষ্প শীতল হইয়া তৃণপত্রাদির উপর বিন্যস্ত হয় তখন উহাকে শিশির এবং শ্বেত-শিশির কহে। সূৰ্য্যোত্তাপে সকল ভাগ সমভাবে উত্তপ্ত না হওয়াতে বায়ুপ্রবাহ উৎপন্ন হয়। এ বায়ু, আবার উত্তপ্ত হইয়া উৰ্দ্ধগামী হয় এবং অপেক্ষাকৃত শীতল বায়ু আসিয়া উহার স্থান অধিকার ক্লরে। বায়, উর্ধে উঠি- বার সময় শীতল হইতে থাকে, এবং তন্নিবন্ধন উৰ্দ্ধদেশে একটী বিপরীত বায়ুপ্রবাহ উৎপন্ন হয়। এই বায়ুপ্রবাহ ক্রমশঃ পৃথিবীতে অবতীর্ণ হইয়া যে বায়ু উত্তপ্ত প্রদেশাভিমুখে আকৃষ্ট হইয়াছে তাহার স্থান অধিকার করে। ভারতবর্ষে এককালে স্থানানুসারে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম কিম্বা দক্ষিণ- পূৰ্ব হইতে বায়, বহিয়া থাকে এবং অন্য সময়ে উত্তরপশ্চিম ও উত্তরপূর্ব হইতে প্রবাহিত হয়। এ সকল বায়ুপ্রবাহকে মৌশুম কহে। প্রথম প্রকারের মৌশুম সমুদ্রের উপর দিয়া প্রবাহিত হওয়াতে বৃষ্টির উৎপাদন হয়। দ্বিতীয় প্রকারের মৌশুম স্থল হইতে জলাভিমুখে প্রবাহিত হওয়াতে উহাতে জলীয় বাষ্প থাকিতে পারে না এবং সুতরাং তৎকালে আকাশ সম্পূর্ণ নির্মল থাকে। চীন ও উত্তর অস্ত্রেলিয়ার উপকূলে এবং আফ্রিকায়ও মৌশুম বায়ু অনুভূত হয়, কিন্তু তথায় উহাদের দিকের পরিবর্তন হইয়া থাকে। অতলান্ত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর, এবং ভারত মহাসাগরে সমস্ত বৎসরই একদিগ হইতে বায়ু বহিয়া থাকে। ইহাকে ট্রেড বায়ু কহে। ইউরােপে উহারা অতিশয় চঞ্চল, কখন কোন
সমুদ্র
দিগ হইতে প্রবাহিত হয় কিছুই ঠিক থাকে না। এই
অস্থিরতার কারণ এই যে, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম
দুটী বায়বীয় প্রবাহ সৰ্ব্বদাই পরস্পর স্থান পরিবর্তন
এবং ট্রেড, বায়ুমণ্ডলের ন্যায় একটা নিয়ে ও
একটা উর্দ্ধে প্রবাহিত হয় না। বায়ুরাশির এ সমুদয় চালন ও
পরিবর্তন মূৰ্য্য হইতেই সম্পন্ন হইয়া থাকে। জলভাগ অপেক্ষা
স্থলভাগ অধিক উত্তপ্ত ও শীতল হয়। এবং সূৰ্য্য যে স্থানের
মন্তকোপরি সংস্থিত থাকে সেখানেই তাপভাগ অধিক
হইয়া থাকে। এরূপ তাপভাগের ন্যূনাধিক্য দ্বারাও বায়ু-
প্রবাহের পরিবর্তন হয়। শীত গ্রীষ্মদি ঋতুর আবর্তন
পৃথিবীর মেরুদণ্ডের অবনতির
উপর নির্ভর করে। এজন্য
পৃথিবী যখন কক্ষে পরিভ্রমণ করে গােলােকের উত্তরাদ্ধে ও
দক্ষিণার্ধে তাপভাগের তারতম্য হইয়া থাকে। উত্তরার্ধে
অধিক হইলে দক্ষিণার্ধে অল্প এবং দক্ষিণার্ধে অধিক হইলে
উত্তরার্ধে অল্প হয় ।
তৃতীয় অধ্যায় ।
সমুদ্র।
সমুদ্র কিরূপ হয়ত পাঠকবর্গের অনেকেই ইহা প্রত্যক্ষ করেন
নাই। কিন্তু প্রত্যক্ষ না করিলেও বিশাল জলরাশি দ্বারা
সমাচ্ছাদিত কন্দর পরম্পরা অনুমান করা তাদৃশ সুকঠিন নহে।
পৃথিবীর মানচিত্র কিম্বা গােললাকের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ করিলে
তাহার তৃতীয় চতুর্থাংশই ঈদৃশ বলিয়া অনুভূত হইবে ।
কতিপয় বৎসর মাত্ৰ অতীত হইল সমুদ্রের গভীরতা
কিয়ৎ পরিমাণে নিরূপিত হইয়াছে। কিন্তু অদ্যাপি প্রশান্ত
এবং ভারত মহাসাগরে এরূপ বৃহৎ বৃহৎ অঞ্চল আছে যাহার
গভীরতার বিষয় আমরা কিঞ্চিত্র অবগত নহি। অতলান্ত
৪০ সমুদ্রের গভীরতা । মহাসাগরের গভীরতা সর্বাপেক্ষা অনেক সর্বাপেক্ষা অনেক দূর স্থিরীকৃত হইয়াছে। এমন কি উহার যে অংশ ইউরােপ, উত্তর আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকার মধ্যবর্তী, তাহার প্রায় ২৪০০০ ফুট নিয়ে যে যে জলচর জীব বসতি করে তাহার এবং তত্রত্য মৃত্তিকার আদর্শও সংগৃহীত হইয়াছে ।* হইয়াছে।* অতলান্ত মহাসা- গরের তলভাগ মহাদেশের ন্যায় ভঙ্গিমান। উহাতেও মগ্ন- গিরি, মালভূমি এবং উপত্যকা আছে। কিন্তু যখন ভূতত্বই বলিয়া দিতেছে অধুনা যাহা সাগরাংশ বলিয়া পরিচিত তাহার অধিকাংশই পূৰ্বে শুষ্ক ভূভাগ ছিল তখন ইহাতে বিচিত্র কি ? হিমালয়ের প্রস্তরের উপর যখন শম্বুকাদি জলচর জীবের অস্থি পঞ্জর দেখা যায় তখন উহা যে এককালে সাগর- তলের অংশ ছিল ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে। অতলান্ত মহাসাগরের অংশবিশেষের গভীরতা উপকূলবর্তী অত্যুচ্চ পৰ্বত হইতেও অধিক। উহার এক ভাগের গভীরতা ৩০,০০০ ফুট হইতেও অধিক। সুতরাং ইহাতে হিমালয়ের উচ্চতম শৃঙ্গয় নিমজ্জিত হইলেও উহার ঊর্ধে ৯০০ হইতে ১৮০০ ফুট জল থাকিবে। দক্ষিণ মহাসাগরে ইহা অপেক্ষাও অধিক গভীরতা থাকিবার সম্ভাবনা। কিন্তু পরিমিতি ভিন্ন এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় না। যাহা হউক সাগরের গড় গভীরতা যে ভূভাগের গড় উচ্চতা অপেক্ষা অধিক এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। বঙ্গোপসাগরও কোন কোন অংশে অতিশয় গভীর। ভারতবর্ষ সন্নিহিত অংশে অতি অস্পে অস্পেই গভীরতার বৃদ্ধি হইয়াছে। এবং মধ্যভাগ হইতে পঞ্চাশ মাইল পূর্বেই ইহার গভীরতা সর্বাপেক্ষা অধিক। বঙ্গোপকুল * চেলেন্জার নামক জাহাজের প্রাণীবিদেরা ২১,৩৫০ ফুট অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চারি মাইল নিম হইতে সমুদ্রতলের মৃত্তিকা এবং তাহার উপর যে যে জলচর জীব বসতি করে তাহার অাদর্শ সংগ্রহ করিয়াছেন। + পিনাং এবং মান্দ্রাজের মধ্যে তাড়িৎবার্তাবহের রজ্জ্বসংস্থাপনের সময় গতিমনি যন্ত্রের দ্বারা ১০,৭১০ ফুটই সর্বাধিক গভীরতা কুচিত হইয়াছিল।
সুমুদ্রের লবণাক্ততা।
৪১
হইতেও উহ তাদৃশ ক্ৰমনিম্ন হইয়া গিয়াছে। কিন্তু এক
অংশে মেষনা এবং হুগলীর মধ্যে সাগরতলে একটী গভীর
সমনত খাত আছে, ইহাকে সােয়চ কহে। কথিত আছে ইহার
গভীরতা ১২০০০ ফুট অর্থাৎ দুই মাইল হইতেও অধিক। কিন্তু
ইহা কতদূর সত্য অদ্যাপি প্রতিপাদিত হয় নাই।
অধিকাংশ নদী ও হ্রদের জল সুস্বাদু। কিন্তু সমুদ্র-জল
এরূপ লবণাক্ত যে মাদ্রাজের উপাদেয় লবণের অধিক ভাগই
তাহা হইতে প্রস্তুত হইয়া থাকে। কোন অগভীর পাত্রে
সমুদ্র-জল স্থাপন করিয়া তাপ প্রয়োেগ করিলে উহা বাষ্প হইয়া
যায়, কিন্তু উহাতে যে লবণ মিশ্রিত থাকে তাহা কঠিনাবস্থায়
পড়িয়া থাকে। এরূপে যে লবণ প্রস্তুত হয় উহা তাদৃশ
বিশুদ্ধ নহে এবং উহার আস্বাদ বিশুদ্ধ লবণ হইতে অপেক্ষা-
কৃত কটু। চূর্ণক্ষার মেগনিসিয়া ক্ষার প্রভৃতি মিশ্রিত থাকে
বলিয়াই উহা এরূপ হইয়া থাকে, কিন্তু এই ক্ষার সমুহ. যে
কি পদার্থ ইহা রসায়নশাস্ত্রের সহায়তা ব্যতিরেকে জানা
যায় না।
লবণাক্ততার পরিমাণ প্রায় সকল অংশেই সমান। কিন্তু
উপকূল সমীপে নদীর মােহনায় সুস্বাদু জল মিশ্রিত হইয়া
লবণাক্ততার কিঞ্চিৎ খর্বতা প্রতিপাদন করে। স্থলোপবেষ্টিত
সাগরাংশে স্রোতাগত জল অপেক্ষা যে পরিমাণে অধিক
জল বাষ্পীভূত হয় সে পরিমাণে উহা লবণাক্ত কিম্বা সুস্বাদু
হইয়া থাকে। যথা লােহিত সাগরে কোন নদী প্রবাহিত
হয় না, এবং তাহা হইতে নিয়তই বহুল পরিমাণে বাষ্প উস্থিত
হয়, এজন্য উহা সমুদ্র হইতেও অপেক্ষাকৃত লবণাক্ত। কিন্তু
বলটিক সাগরে উত্তর ইউরােপের কতিপয় বৃহৎ বৃহৎ নদীই
প্রবাহিত হয় এবং প্রবল শীত হওয়াতে তাহা হইতে অতি
অল্প পরিমাণেই বাষ্প উথিত হয়, সুতরাং উহা সৰ্ব্বদাই
অতিশয় সুস্বাদু থাকে।
৪২. সমুদ্রজলের ক্ষার। সমুদ্র-জল কেন যে লবণাক্ত ইহা আমরা বলিতে পারি না । আবহমান কাল হইতেই উহা এরূপ, এপর্যন্ত বলিতে পারি। কত সময়ে কত অংশ সমুদ্র হইতে বিচ্ছিন্ন ও শুষ্ক হইয়া কঠিন ভূভাগে পরিণত হইতেছে এবং উহার লবণরাশি কঠিনাবস্থায় ভূপরি ন্যস্ত হইয়া সৈন্ধব নামে অভিহিত হইতেছে। কিন্তু এরূপে লবণের হ্রাস হইলেও সমুদ্রের লবণাক্ততার হ্রাস উপলব্ধি হয় না। নদী কর্তৃক আনীত এবং স্বয়ং সমুদ্র কর্তৃক ভূভাগ হইতে ধৌত লবণের দ্বারা উহা পুনৰ্ব্বার পূর্ণ হইয়া যায়। সমুদ্র-জলে যে চূণ মিশ্রিত খাকে ইহা পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। জলচর জীবগণ কর্তৃক সমাহত হওয়াতে এই চূণের পরিমাণ তাদৃশ অধিক হইতে পারে না। শম্বুকাদি কতিপয় জন্ধ হইতে এক প্রকারের কঠিন ত্বক প্রস্তুত হয়, উহা চুণ যটিত এক প্রকারের যৌগিক পদার্থ ভিন্ন কিছুই নহে। প্রবালকীট নামে আর এক প্রকারের জন্তু আছে উহার অন্থি পঞ্জরাদি অধিকাংশই চূণের দ্বারা নির্মিত। উহারা কোন দিগে গমনাগমন করিতে পারে না, উদ্ভিদাদির ন্যায় এক স্থানেই স্থিত থাকে। উহাদের মৃতদেহ তরঙ্গ প্রভাবে চূর্নিত ও সংহিত হইয়া কঠিনীময় শু,প প্রস্তুত হইয়া থাকে। এই শুপের উপর আবার নূতন কীটের মৃতদেহ সঞ্চিত হইয়া উহারা ক্রমশঃ মগ্নগিরি ও দ্বীপেতে পরিণত হয়। ভারত- বর্ষের দক্ষিণপশ্চিমবর্তী মালদ্বীপ ও লাক্ষাদ্বীপ এরূপেই সমুৎপন্ন। উপকূল সমীপে সমুদ্রের জল হরিৎবর্ণ। কিন্তু উহা সমুদ্র- জলের স্বাভাবিক বর্ণ নহে। উপকূল হইতে ধৌত ও শ্রোতাে- * বাঙ্গালার স্থানে স্থানে পানের সহিত যে চুণ ব্যবহৃত হয়, উহা সুন্দরবনের লবণাম্বু হদের শম্বুক দগ্ধ করিয়াই প্রস্তুত হইয়া থাকে। মাজে ঘরের ভিতর চুণকাম করিবার জন্য যে চুণ ব্যবহৃত হয় তাহাও এরূপে শম্বুকাদি হইতেই প্রস্তুত হইয়া থাকে ।
সমুদ্রজলের বর্ণ ও তরঙ্গ। ৪৩ । সহকারে আনীত কর্দমের দ্বারাই উহার ঈদৃশ বিবর্ণতা সম্পাদিত হইয়া থাকে। মধ্যভাগে উহা গাঢ় নীলবর্ণ এবং এরূপ স্বচ্ছ যে শত সহস্র হস্ত পরিমিত গভীরতায়ও মগ্নশীল শ্বেতবর্ণ পদার্থ নয়নের অগােচর হয় না। স্থললাপবেষ্টিত সাগ- রের জলে কখন কখন এক প্রকারের কর্দম কিংবা সূক্ষম সূক্ষম ভাসমান পদার্থ মিশ্রিত হইয়া উহার বিবর্ণতা প্রতিপাদন করে। এক প্রকার রক্তাভ (সাধারণত কটাভ) কীটাণুদ্বারা লােহিত সাগরের এবং হােয়েংহো নদী কর্তৃক আনীত হরিদ্রাভ কমের দ্বারা পীত সাগরের জলের এরূপে বিবর্ণতা প্রতিপাদিত হওয়াতেই উহারা তাদৃশ নামে অভিহিত হইয়াছে। কিন্তু উহাদের সংখ্যা অতি অল্প এবং সমুদ্রের জলকে সাধারণত হরিৎ কিংবা নীল বলা যাইতে পারে। সমুদ্রের উপরিভাগ প্রায়ই মসৃণ থাকে না। দুই এক দিন সন্নিকটে বাত্যা প্রবাহিত না হইলেই কেবল এরূপ দৃষ্ট হইয়া থাকে। সচরাচর উহা তরঙ্গরূপে উচ্ছসিত হইয়া বাত্যাভি- মুখে নীত হয়। কিন্তু এই তরঙ্গ দূরবর্তী ঝটিকা প্রভাবে আনীত জলের দ্বারা উৎপাদিত হইলে উহাকে সমুদ্রের কহে। তকালে গমন করিবার সময় অর্ণব পােতাদি এরূপ আন্দোলিত হয় যে আরােহীগণ বিশেষতঃ অনভ্যস্ত হইলে শীঘ্রই সামুদ্রিক পীড়ায় কাতর হইয়া অশেষ যন্ত্রণা পাইতে থাকে। এরূপ দীর্ঘ তরঙ্গপ্রবাহ সুন্দরবনের সম্মুখবৰ্ত্তি তট কি উড়িষ্যা ও মাদ্রাজের উপকূল প্রভৃতি তীরে নীত হইলে উহারা অধিক উচ্চ হইয়া উঠে, এবং অগ্রভাগ হইতে পুনঃ পুনঃ ফেনপুঞ্জ স্খলিত হইতে থাকে, ইহাকেই ভগ্নোর্মি কহে। নৌকাদি মাদ্রাজের মশুলার ন্যায় কাষ্ঠলকপরম্পরাযােগে নির্মিত না হইলে ইহা দ্বারা প্রায়ই ভয় হইয়া যায়। কিন্তু প্রবল ঝঞ্জাবাতের সময় উহা- দের প্রভাব এরূপ বৃদ্ধি হইয়া থাকে যে বৃহৎ বৃহৎ অর্ণব উচ্ছাস 83 সমুদ্র-শৈল পােতাদিপৰ্য্যন্তও চূর্ণ হইয়া ভাঙ্গিয়া যায় । ভারতবর্ষের বঙ্গোপসাগর সন্নিহিত উপকূলের ন্যায় ভূভাগ তাদৃশ নিম্ন হইলে তরঙ্গ প্রভাবে অধিক ক্ষীণ হয় না। কিন্তু শিলাময় উপকুলে ভূভাগের কিনারা সমুদ্রতট হইতে অধিক উচ্চ হইলে তরঙ্গভাবে শৈলাদি ক্রমশঃ ভয় ও ধৌত হইয়া উপকূল ক্ষীণ হইতে থাকে এবং অবশেষে নিম্নস্থ চিত্রের ন্যায় ভগ্ন- শৈল মাত্ৰ পড়িয়া থাকে। -ল। ইংলণ্ডের দক্ষিণ উপকূলে ব্রাইটনের নিকটে যে কঠিনীময় শৈল আছে চিত্রে তাহারই প্রতিরূপ প্রদত্ত হইয়াছে। ১৮৩৬ খৃষ্টাব্দে অর্থাৎ প্রায় ৪০ চল্লিশ বৎসর পূৰ্ব্বে উহাদিগকে এরূপই দেখাইত। কিন্তু অধুনা বহু দিবস অতীত হইল মধ্য- দেশের স্থূপ এবং সন্নিকটস্থ প্রত্যন্ত পৰ্বত সমূহ ধৌত হইয়া গিয়াছে। এইরূপ ভগ্ন শৈল সমূহের সাস্থিত সমভূমিতে যেখানে নৌকাখানি বদ্ধ রহিয়াছে তাহাকে বেলাভূমি কহে। কঠিনীময় শৈলে কখন কখন যে আগ্নেয় প্রস্তর মিশ্রিত থাকে বেলাভূমি তাহা দ্বারাই নির্মিত। এই নিমিত্ত বেলাভূমি অতি- ।
সামুদ্রিক পলি। ৪৫ ০ শয় কঠিন বলিয়া তরঙ্গের দ্বারা শীঘ্র ক্ষীণ হয় না। কিন্তু অবশেষে চূর্ণ হইয়া উহাও বালুকারাশিতে পরিণত হয় এবং দূরে নীত হইয়া ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হয়। সমুদ্রের তরঙ্গের দ্বারা একটী প্রধান উদ্দেশ্য সাধিত হয়। এই তরঙ্গ-প্রভাবে বায়ু জলে দ্রব হয় বলিয়াই মৎস্যাদি অধিকাংশ জলচর প্রাণী বায়ু সেবনে সমর্থ হয়।* এরূপে বায়ু দ্রব না হইলে উহারা এক মুহূর্তের জন্যও জীবিত থাকিতে পারিত না । এক্ষণে, তরঙ্গের দ্বারা উপকূলাদি নিয়তই ঘৃষ্ট ও ভগ্ন হইতেছে, এবং আমরা পূর্বেই দেখিয়াছি নদীপ্রভাবেও বহুল কর্দম সাগরে নীত হইতেছে। তবে কি ভূভাগ এরূপে কেবল ক্ষীণই হইতেছে? কিন্তু বাস্তবিক তাহা নহে। এই কর্দম ও স্খলিত ভূভাগ বেলাদি প্রভাকে “বহু সহস্র মাইল দূরে নীত হইয়া ক্রমশঃ তলায় পতিত হয় এবং মূতন কর্দমময় ও বালুকাময় স্তরের উৎপাদন করে। গভীর সমুদ্রে এরূপ স্তর সঞ্চিত হইতে বহুকালের প্রয়ােজন হয় বটে, কিন্তু বৃহৎ বৃহৎ নদীর মােহানায় এবং সমান উপকূল সমীপে উহা শীঘ্রই উচ্চ হইয়া নুতন ভূভাগে পরিণত হয়। কখন কখন মৎস্য এবং অন্যান্য সামুদ্রিক জন্তুর মৃতদেহ তলায় পতিত হইয়া এই কর্দমে এবং বালুকায় স্তরে প্রােথিত হয় এবং তাহাতে উহার ত্বক অস্থি প্রভৃতি কঠিন অংশ সচরাচর সংরক্ষিত হইয়া থাকে। যুগ যুগান্তরে এ সমুদায় স্তর উৎক্ষিপ্ত হইয়া আবার ভূভাগের অংশরূপে পরিণত হয়, এবং তৎকালে ভূতত্ত্ববেত্তারা তাদৃশ প্রস্তরীভূত অস্থি পরীক্ষা করিয়া সমুদ্রে কতকাল পূর্বে * অধিকাংশ কিন্তু এরূপে সমুদয় প্রাণ ধারণ করে না। তিমি, পরপােমী, মকর, দুর্গাও প্রভৃতি স্তন্যপায়ী জন্তু এবং কূৰ্ম ও সমুদ্র-সরিপাদি উপরিভাগে অাসিয়া বায় সেবন করতে সমর্থ ।
৪৬ বেলা। কতপ্রকার প্রাণী বসতি করিত তাহা নিরূপণ করিতে সমর্থ হন। কখন কখন স্থলচর প্রাণি বর্গের মৃতদেহ এবং লতাদির শাখাপল্ল বদিও এরূপে সংরক্ষিত হইয়া থাকে। কিন্তু উহাদিগকে হ্রদে কিম্বা বৃহৎ বৃহৎ নদীর বা দ্বীপের স্তরেই অধিক দেখিতে পাওয়া যায়। এরূপ মৃত দেহাদির সংগ্রহ ও পরীক্ষা হইতেই প্রতিপাদিত হইয়াছে যে, ভূমণ্ডলে পুরাকালে যে সমুদয় জীবজন্তু বসতি করিত উহারা আধুনিক জীবজন্তু হইতে সম্পূর্ণ বিভিন্ন । প্রত্যেকটীরই পরিবর্তন হইয়াছে, এমন কি অনেকবার করিয়া পরিবৰ্ত্তন হইয়াছে। সমুদ্র এক মুহূর্তের জন্যও স্থির থাকে না। কেবল উপরি- ভাগমাৰ বায়ুতে আন্দোলিত হইতেছে এমন নয়,সমস্ত জল, রাশিই বেলাপ্রবাহ এবং স্থানীয় স্রোতের দ্বারা বিলােড়িত হইতেছে। বেলপ্রবাহ প্রথমে একদিগে প্রবাহিত হইয়া পরে বিপরীতদিগে প্রবাহিত হয়। পচিশ ঘণ্টায় উহা এরূপে দুইবার পরিবর্তিত হইয়া থাকে, সুতরাং উক্ত সময়ে দুইবার জোয়ার এবং দুইবার ভাটা সং দৃষ্ট হয়। দ্বিতীয়তঃ স্থানীয় স্রোত সমুদ্রের কোন কোন অংশে সমস্ত বৎসরই প্রায় একদিগে প্রবাহিত হয়, এবং সুতরাং তৎপ্রভাবে সমস্ত জল- রাশিই এক অংশ হইতে নিয়ত অন্য অংশে নীত হয়। এ সকল বেলাবাহ এবং স্রোত কি কি কারণে উৎপাদিত হইতেছে, অভিনিবেশ পূৰ্ব্বক কিঞ্চিৎ অনুধাবন কুরিয়া দেখিলেই স্পষ্ট উপলব্ধি হইবে। পঁচিশ ঘণ্টায় বেলা যে দুইবার উৎপাদিত হইয়া থাকে ইহা হুগলী মেঘনা কি সুন্দরবনের উপকুল নদীতীরবাসী ব্যক্তিমাত্রই আজীবন প্রত্যক্ষ করিয়া থাকিবেন। পরন্তু এই পঁচিশ ঘণ্টা কিংবা ২৪ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট পরিমিত কালের পরেই চন্দ্রমণ্ডলকে একাদিক্রমে দুই দিন এক স্থানে দৃষ্ট হইয়া থাকে। তবে কি চন্দ্র কোন প্রকারে বেলার সহিত সম্পৃক্ত হইবে?
০ বেলার কারণ। ৪৭ বাস্তবিক এই চন্দ্রের দ্বারাই বেলা প্রধানত উৎপাদিত হই- তেছে। এবং কিরূপে যে উৎপাদিত হইতেছে পাঠকবর্গ কিছুকাল পূর্বে মাধ্যাকর্ষণ সম্বন্ধে যাহা জানিতে পারিয়াছেন এক্ষণে তাহা স্মরণ করিয়া দেখিলে উহাও অনায়াসে বুঝিতে পারিবেন। তবে প্রথমে দুরূহ হইবে এই আশঙ্কায় যাহা পূর্বে উল্লেখ করা হয় নাই, এস্থলে অগ্রে তাহারই উল্লেখ করিতে হইতেছে। পদার্থ সমুহ পরস্পর হইতে যত দূরে অবস্থিত হয় ততই তাহাদের আকর্ষণ নূন হইতে থাকে। এবং এই পরিমাণে নন হইতে থাকে যে চন্দ্র ও পৃথিবী পর- স্পর হইতে দ্বিগুণ অন্তরে অবস্থিত হইলে উহাদের আকর্ষণ মাত্র এক চতুর্থাংশ হইবে। তিন গুণ অন্তরে হইলে আকর্ষণ এক নবমাংশ হইবে, এবং ৪ গুণ অন্তরে হইলে আকর্ষণ এক ষােড়শাংশ হইবে ইত্যাদি। * এই পৃথিবী একটা দৃঢ় কক স্বরূপ। যে প্রকারেই উহাকে আকর্ষণ করা যাউক না কেন, উহার আকারের কোন পরিবর্তন হয় না। পরন্তু যে জলরাশি দ্বারা উহা সমাচ্ছন্ন, সে জলরাশি যে কোন দিগেই অনায়াসে চালিত হইতে পারে। এক্ষণে ইহা হইতে যে কিরূপে বেলার উৎপাদন হইতেছে এ বিষয় যাহাতে পাঠকবর্গ অনায়াসে বুঝিতে পারেন তজ্জন্য আমরা পৃথিবীকে ১ম প্লেটের প্রথম চিত্রের ন্যায় সম্পূর্ণ জল পরিবেষ্টিত বলিয়া মনে করিব। যখন চন্দ্রমণ্ডল দ্বিতীয় চিত্রের ন্যায় সংস্থিত থাকে উহার সমীপন্থ স্থানের জল দৃঢ় অবনীমণ্ডল ও অপেক্ষা অধিক তেজে আকৃষ্ট হইবে। এবং d ও e হইতে আসিয়া সমুদয় জল ৫ স্থানে স্ফীত হইয়া উঠিবে ও @ স্থানে জোয়া- রের প্রাদুর্ভাব হইবে। কিন্তু যেকারণ বশতঃ a স্থানের জল এই সকল ভগ্নাংশের হরগুলি যে দূরত্বের বর্গসুচক ইহা সামান্য গণিতনু- শীলনেই বলিয়া দিবে। সুতরাং দূরত্বের বর্গানুসারেই মাধ্যাকর্ষণের হ্রাস হইয়া থাকে।
৪৮ বেলা। দৃঢ় অবনীমণ্ডল ৫ অপেক্ষা অধিক আকৃষ্ট হইবে, সে কারণ বশতই দৃঢ় অবনীমণ্ডল , অবনীমণ্ডল , b স্থানের জলাপেক্ষা অধিক আকৃষ্ট হইয়া তাহা হইতে দূরে নীত হইবে। সুতরাং b স্থানের জলও বুলিয়া পড়িয়া আর একটা জোয়ারের প্রাদুর্ভাব হইবে। কিন্তু d ও ৫ তে এতন্নিবন্ধন ভাটার প্রাদুর্ভাব হইবে। অতএব এক সময়ে দুইবার জোয়ার ও দুইবার ভাটা উৎপন্ন হইয়া থাকে। এক্ষণে পৃথিবীর মেৰুদণ্ডকে কাগজের সহিত লম্বভাবে অবস্থিত মনে করিলে যখন পৃথিবী এই মেৰুদণ্ডের উপর আব- ৰ্তন করিবে, পৃথিবীর উপরিস্থ প্রত্যেক বিন্দুই পৰ্যায়ক্রমে a db e a এই অবস্থায় আনীত হইবে। সুতরাং চন্দ্রমণ্ডল যদি m স্থানেই সৰ্ব্বদা অবস্থিত থাকিত পৃথিবীর প্রত্যেক স্থানেই ২৪ ঘণ্টায় দুইবার জোয়ার ও দুইবার ভাটা হইত। কিন্তু ২৪ ঘণ্টায় চন্দ্র স্বীয় কক্ষে অগ্রসর হইয়া ml স্থানে গমন করে ; এবং দ্বিতীয় দিবস চন্দ্রমণ্ডলের নিম্নস্থ হইতে a. স্থানের হইতে mm অধিক ভ্রমণ করিতে হয়। m হইতে m1 পৰ্য্যন্ত গমন করিতে ৫৪ মিনিটের প্রয়ােজন হইয়া থাকে। অতএব চন্দ্র, মণ্ডলের নিম্নস্থ হইয়া কোন স্থানে জোয়ার হইতে পূর্ব দিবস অপেক্ষা ৫৪ মিনিট বিলম্ব হইয়া থাকে। কিন্তু দিন দিন জোয়ার ভাটার প্রভাব সমান হয় না। চান্দ্রমাসে মাত্র দুইবার জোয়ারের সময় জল অতিশয় উচ্চ হইয়া ভাটার সময় অতিশয় নিম্ন হইয়া থাকে। উহাকে তেজ কটাল কহে, এবং উহা অমাবস্যা, পূর্ণিমা কিংবা তাহার অব্যবহিত পরেই ঘটিয়া থাকে। কটালদ্বয়ের মধ্যে জোয়ার ও ভাটার তেজ অপেক্ষাকৃত অল্প হইয়া থাকে ইহাদিগকে মরা কটাল কহে। কলিকাতায় কটালের সময় জোয়ার ইহলে জল প্রায় ১৫ ফুট উচ্চ হইয়া থাকে এবং ভাটা হইলে প্রায় ১৫ ফুট নিম্ন হইয়া থাকে। মরা কটালের সময় জোয়ার ও ভাটার মাত্র ৬ ফুট প্রভেদ
[ ৪৯ ]
প্রথম প্লেট ,
প্রথম চিত্র।
দ্বিতীয় চিত্র।
d
তৃতীয় চিত্র।
d
al
চতুর্থ চিত্র।
পঞ্চম চিত্র।
কটাল। t হইয়া থাকে। এইরূপ তারতম্য হইবার কারণ এই যে চন্দ্রের ন্যায় সূর্যের দ্বারাও একটী স্বতন্ত্র বেলা উৎপাদিত হইয়া থাকে । কিন্তু সৌরবেলা চান্দ্রবেলা অপেক্ষা অনেক দুর্বল। কারণ সূৰ্য্য এরূপ দূরে সংস্থিত যে তাহার সহিত তুলনায় পৃথিবীর ব্যাস রেখা কত ক্ষুদ্র বলা যায় না। এবং তাদৃশ দূরে সংস্থিত হওয়াতে সূর্যের আয়তন অতিশয় বৃহৎ হইলেও উহার আক- ষণ চন্দ্রের অপেক্ষা অনেক নূন। অমাবস্যায় যখন চন্দ্র ও সূৰ্য্য উভয়ই পৃথিবীর একদিগে কিংবা পূর্নিমায় যখন উভয়ই বিপরীত দিগে অবস্থিত থাকে অর্থাৎ যখন চান্দ্র ও সৌর বেলা উভয়ই মিলিত হইয়া হইয়া যায়, তখনই তেজকটাল হইয়া থাকে। দ্বিতীয় চিত্রের ন্যায় চন্দ্র ও সূৰ্য্য যদি সমসূত্রে অবস্থিতি করে উভয়ই ৫ ও ১ স্থানে জোয়ার উৎপাদন করিবে। সূৰ্য্য চন্দ্রের বিপরীতদিগে অব- স্থিত হইলেও তাহাই হইবে। কিন্তু তৃতীয় চিত্রের ন্যায় যদি চন্দ্র m এ এবং সূৰ্য্য ৪ এ অথবা যথাক্রমে উহাদের বিপরীত- দিগে সংস্থিত হয় চন্দ্রের দ্বারা a ও bতে এবং সূর্যের দ্বারা d ও e তে জোয়ার উৎপাদিত হইবে। সুতরাং তৎকালে যে জোয়ার অনুভূত হইবে উহা চান্দ্র ও সৌরবেলার যােগফল না হইয়া তাহাদের বিয়ােগফল হইবে। পাঠকবর্গ সহজে বুঝিতে পারিবেন এই অনুরােধে আমরা পৃথিবীকে সম্পূর্ণ জলপরিবেষ্টিত বলিয়া মনে করিয়াছি। কিন্তু আমরা সকলেই অবগত আছি কেবল ভূভাগের দক্ষিণবর্তী জলরাশিই অবিচ্ছিন্ন। উত্তর গােলােকার্ধে তিনটী স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র সমুদ্র রহিয়াছে। ইহার একটীতে যে বেলা উৎপাদিত হয় উহা অন্যটাতে নীত হইতে পারে না। প্রত্যেকটীতেই স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র বেলা উৎপাদিত হইয়া থাকে। পরন্তু দক্ষিণ মহাসাগরে যে বেলাবাহ উৎপাদিত হয় উহা উত্তরগােল- কার্ধেও নীত হইয়া থাকে। লােষ্ট্র নিক্ষেপ করিলে যেরূপে :
বেলাের্মি। পুষ্করিণীতে তরঙ্গ উৎপাদিত হইয়া সমুদয় উপরি ভাগে ব্যাপ্ত হয়, দক্ষিণ মহাসাগরের বেলাপ্রবাহও উত্তরাদ্ধে সেইরূপ ব্যাপ্ত হইয়া থাকে। সমুদ্র যতই গভীর হয় এ সমুদয় স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র তরঙ্গও তত বেগে ভ্ৰমণ করিতে থাকে। জলভাগ এবং স্থলভাগের তারতম্যানুসারে কখন কখন ব্যতিক্রম হইলেও কতিপয় স্থান ভিন্ন উপকূলসমীপে সমুদয় নদীতেই দুইবার বেলা উৎপাদিত হইয়া থাকে। অতলান্ত মহাসাগরের চতুষ্পার্শ্বে বেলাদ্বয়ের প্রভাব প্রায়ই সমান দেখা যায়, কিন্তু ভারতবর্ষে সাধারণতঃ একটীর প্রভাব অন্যটা অপেক্ষা অধিক হইয়া থাকে। বেলােৰ্ম্মিরবিষয় পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। রবারের পাতের ন্যায় কোন নমনীয় পদার্থ হইতে যদি প্রথম প্লেটের দ্বিতীয় চিত্রের ছায়াশূন্য ভাগের ন্যায় উদ্ধা এবং অধােভাগে কিঞ্চিৎ চাপ একটী অঙ্গুরীয় ছেদ করিয়া d ও e তে কৰ্ত্তন করা যায়, এবং যদি উহাকে টানিয়া ঋজু করা যায়, উহা চতুর্থ চিত্রের আকার ধারণ করিবে। এবং ত দ্বারা গোলেকাৰ্ব্বব্যাপী দুটী তরঙ্গ সূচিত হইবে। বেলাের্মি ও ইহার অনুক্রমমাত্র। যদি উহা পৃথি- বীর চতুর্দিগে নির্বাধে ভ্রমণ করিতে পারিত তাহা হইলে এক সময়ে মাত্র দুটী বেলাের্মি উৎপাদিত হইত। কিন্তু যে বেলােৰ্মি দক্ষিণ মহাসাগরে উৎপন্ন হইয়া উত্তরাভিমুখে গমন করে তাহা সমুদ্রতলে ঘর্ষণের দ্বারা এরূপ প্রতি হয়, যে উত্তর- প্রান্তবর্তী উপসাগরসমূহে কিংবা নদীর মােহনায় নীত না হইতেই দক্ষিণ মহাসাগরে দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থবার বেলােৰ্ম্মি উথিত হইয়া উত্তরদিগে অগ্রসর হইতে থাকে। সমুদ্র যতই অগভীর হয় ততই এ সমুদয় তরঙ্গ উচ্চ হইয়া থাকে। এবং অবশেষে উহার যখন হুগলী মেঘনা কিম্বা অন্য কোন নদীর অগভীর মােহানায় নীত হয় তখন উহারা এরূপে প্রতিজ ও স্ফীত হইয়া থাকে যে উহাকে পঞ্চম চিত্রের
বান ও দ্রুতস্রোত।
।
ন্যায় একটী স্বতন্ত্র তরঙ্গ বলিয়া অনুমিত হয়। উহাকেই বান
কহে। মেঘনার যে অংশ অতিশয় চড়া তথায় এই বানের
দ্বারা প্রায়ই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরণীসমুহ জলমগ্ন হইয়া থাকে। এবং
জল সহসা প্রাচীর বৎ উচ্চ হইয়া সতেজে নদীমধ্যে প্রবিষ্ট
হয়।
বেলাভাবে সমুদ্র নিয়তই আন্দোলিত হইতেছে। উহার
জলরাশি জোয়ারের সময় একস্থানে নীত হইয়া ভাটার সময়
আবার স্থানান্তরে নীত হইতেছে। পরন্তু এরূপে যে কেবল
উপরিভাগমাত্র আন্দোলিত হইতেছে এমন নয়, তলপর্যন্ত
সমস্ত জলরাশিই আলােড়িত হইতেছে। যেখানে সমুদ্র
তাদৃশ গভীর নহে, তথায় এসমুদয়, স্রোত অতি দ্রুত হইয়া !
থাকে। ইহাকেই দ্রুতস্রোত কহে। নদীপ্রভাবে আনীত হইয়া
যে কর্দমরাশি 'পলিরূপে মােহানায় ন্যস্ত হয়, উহা এই স্রোত
প্রভাবে দূরে নীত হইয়া অগাধ জলে ক্রমশঃ স্তরীভূত হইতে
থাকে। বঙ্গোপসাগরের তলায় দােয়া নামে যে সমনত খাত
মহিয়াছে বােধ হয় যেন তথা হইতে এরূপে মৃত্তিকা ধৌত হইয়া
দূরে নীত হয় বলিয়াই উহা এতকাল পূর্ণ হয় নাই। কিন্তু এ
বিষয়ে অদ্যাপি নিশ্চিত হওয়া যায় না।
বারি-নিধি সমুদ্র শুৰ বেলাপ্রবাহে আন্দোলিত হইতেছে
এমন নয়। বায়ু কিয়দিবস স্থিরভাবে প্রবাহিত হইলে উপরিস্থ
জলভাগ-তুদভিমুখে নীত হয়। নিরক্ষবৃত্তের চতুষ্পার্শ্বে ট্রড
বায়ু নিয়ত এক দিগ হইতে প্রবাহিত হইয়া এরূপে একটা
স্রোতের উৎপাদন করিয়া থাকে। উহা প্রথমতঃ উপরিভাগেই
আবদ্ধ থাকে, কিন্তু ক্রমশঃ প্রবল হইয়া উৰ্দ্ধভাগের সমস্ত জল
সহকারে পশ্চিমাভিমুখে প্রবাহিত হয়। অতলান্ত মহাসাগরের
নিরক্ষবৃত্তসন্নিহিত প্রদেশের জল এরূপে কারী সাগর দিয়া
ফ্লোরিডা উপসাগরে নীত হয়। তথায় গতিরােধ হওয়াতে উহা
আর পশ্চিমাভিমুখে গমন করিতে না পারিয়া উপসাগরকে
উপসাগরীয় স্রোত। প্রদক্ষিণ করে, এবং ফোরিডা উপদ্বীপ ও কিউবা দ্বীপের মধ্য দিয়া নিঃসৃত হইয়া প্রবলবেগে প্রতি ঘণ্টায় ৪ মাইল করিয়া ইউনাইটে প্রদেশের উপকুলের সহিত সমান্তর ভাবে উত্তরা- ভিমুখে প্রবাহিত হয়। ইহাকেই উপসাগরীয় স্রোত কহে। হেটারস অন্তরীপে উপনীত হইলে উহার গতির পরিবর্তন হয় এবং উহা পূৰ্বাভিমুখে প্রবাহিত হইয়া, দক্ষিণ-পশ্চিম বায়ু দ্বারা অতলান্ত মহাসাগরের উত্তরাংশে উত্তর-পূৰ্বাভিমুখে যে স্রোত জনিত হয় তাহার সহিত সম্মিলিত হইয়া অভিন্ন হইয়া যায় । এরূপে কারীব সাগরের এবং ফ্লোরিডা উপসাগরের উষ্ণ জল ইউরােপের পশ্চিম-উপকূলে নীত হওয়াতে তদীয় উষ্ণতার ব্রিট, ফান, ডেন্মার্ক এবং নরওয়ের জলবায়ু সমাক্ষবৃত্ত স্থিত প্রদেশাপেক্ষ। সমধিক উষ্ণ ও উপযােগী হইয়া থাকে। সমুদ্রে এরূপ স্রোত প্রবাহিত হইবার আরাে একটা কারণ আছে। শীতল বায়ু যেমন উষ্ণ বায়ু অপেক্ষা ভারী, শীতল জলও তাদৃশ। নির্মল জলের সম্বন্ধে উহা সৰ্ব্বদ! সত্য হয় না বটে কিন্তু সমুদ্র জলের সম্বন্ধে উহা সর্বদাই সত্য। মেৰু প্রদেশের লবণাক্ত জল অতিশয় শীতল হওয়াতে ডুবিয়া যায় এবং নিম্নাক্ষবৃতস্থিত উষ্ণ জল তাহার স্থান পূরণার্থ তদভিমুখে ধাবমান হয় কিন্তু ইহাও আবার শীতল হইয়া ডুবিয়া যায়। এরূপে যে শীতল জল ডুবিয়া যায় উহা ধীরে ধীরে নিরক্ষ- বৃতাভিমুখে প্রবাহিত হইতে থাকে এবং ক্রমশঃ তাপসঞ্চয় করিয়া উপরিভাগে উঠে। উপরিভাগে উঠিয়া উষ্ণমণ্ডলে সমধিক উত্তপ্ত হয় এবং উত্তপ্ত হইয়া অতলান্ত মহাসাগরের উত্তরাংশের জলের ন্যায় উত্তর ও দক্ষিণ মহাসাগরে প্রত্যাবর্তন করে। অন্যান্য সমুদ্রেও এরূপ স্রোত আছে কিন্তু উপসাগরীয় স্রোতের ন্যায় কোনটাই প্রসিদ্ধ নহে। বঙ্গোপসাগরে মৌশুমের পরিবর্তন সহ স্রোতেরও, পরি- বৰ্ত্তন হইয়া থাকে। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌশুমের সময় যত দিন ৫৪ সামুদ্রিক জন্তু। । দক্ষিণ-পশ্চিম হইতে বায়ু প্রবাহিত হয় ( বৎসরের মধ্যে প্রায় ৮ মাসই এরূপে প্রবাহিত হইয়া থাকে) তত দিবস একটী স্রোত দক্ষিণ হইতে উত্তরাভিমুখে প্রবাহিত হয়। কিন্তু শীতকালে যখন বায়ু উত্তর-পূর্ব হইতে প্রবাহিত হয় তৎকালে আর একটী স্রোত উত্তর হইতে দক্ষিণাভিমুখে প্রবাহিত হয়। এই সকল স্রোত হইতেই উপকূলের গঠন তাদৃশ হইয়াছে। ভারত- বর্ষের পূর্ব উপকূল যে এতাদৃশ ঋজু এবং তাহাতে অর্ণব- পােতাদির যে উৎকৃষ্ট বন্দর হয় না, এই সকল শ্রোতই তাহার কারণ। সমুদ্র অসংখ্য জীব জন্তুর আবাসভূমি। ইহাদের কতিপয়, যথা—মৎস্য, স্বাধীনভাবে সন্তরণ করিয়া বিচরণ করে। অপর কতিপয় যথা--কর্কট, চিড়ি এবং যাহাদিগ হইতে কঠিন ত্বক প্রস্তুত হয় (অর্থাৎ কড়ি প্রভৃতি), কেবল তলায় হামাগুড়ি দিতেই সমর্থ। কিন্তু অপর কতিপয় যথা—প্রবাল কীট, তৰু- লতাদির ন্যায় এক স্থানেই স্থিত থাকে। পরন্তু ইহাদিগকে প্রথমে উদ্ভিদের ন্যায় বােধ হইলেও ইহারা সামুদ্রিক জন্তু- বিশেষ, তাহার কোন সন্দেহ নাই। তরঙ্গের দ্বারা যে বায়ু দ্রব হয় তাহ? সেবন করিয়াই ইহারা প্রাণধারণ করে। সমুদ্রে অনেক উদ্ভিদও দৃষ্ট হয়। কতকগুলি স্থলের ন্যায় তলায় জন্মিয়া থাকে, আর কতকগুলি জলে স্বাধীনভাবে ভাসিতে থাকে। পরন্তু স্থলের উদ্ভিদ হইতে উহারা এ বিষয়ে বিভিন্ন, ভূলের উদ্ভিদাদি উহাদের শিকড়ের দ্বারাই কিয়দংশে পরিপােষিত হয় তজ্জন্য উহাদিগকে পাদপ কহে। কিন্তু যে সমুদয় সমুদ্র-তলে জন্মিয়া থাকে তাহার শিকড়ের দ্বারা পান করে না। উহারা চতুস্পার্শ্বস্থ জলের, দ্বারাই পরি- পােষিত হয়। সামুদ্রিক উদ্ভিদের মধ্যে বর্ণের এবং গঠনের অনেক প্রভেদ দৃষ্ট হয়। কিন্তু ইহাদিগকে সাধারণতঃ কটাৰণ বলা যাইতে পারে। আজোরপুঞ্জের দক্ষিণে উত্তর সংক্ষিপ্তার্থ। অতলান্ত মহাসাগরের ন্যায় সমুদ্রের কোন কোন অংশ নিবিড় তলতা দ্বারা সমাচ্ছন্ন এবং অসংখ্য মৎস্য ও অন্যান্য জীব- জন্ধু কর্তৃক অধূষিত। এ সকলকে সরগাছা কহে। সমুদ্রের যে অংশে স্রোত নাই ইহারা সেখানেই দৃষ্ট হইয়া থাকে। আমরা এক্ষণে জানিতে পারিয়াছি, যেই বিশাল জলরাশি দ্বারা ভূভাগ পরিবেষ্টিত তাহাকেই সমুদ্র কহে। উহার জল অতিশয় লবণাক্ত এবং উহা কোন কোন অংশে অত্যুচ্চ পর্বত হইতেও গভীর। বেলা ও বায়ুপ্রভাবে এবং তাপের ও শৈত্যের আতিশয্যানুসারে উহা নিয়তই চালিত হইতেছে। আমরা আরো জানিতে পারিয়াছি চন্দ্র ও সূর্যের আকর্ষণের দ্বারা যে তরঙ্গ উৎপাদিত হয় তাহাকেই বেলা কহে। তবে এই তরঙ্গ দৃশ উচ্চ নহে কিন্তু যুগপৎ গােলােকাৰ্দ্ধব্যাপী। অমাবস্যায় কিংবা পুর্নিমায় যখন চান্দ্র ও সৌরবেলা উভয়ই সর্বতােভাবে মিলিত হয় তৎকালে জোয়ারের উন্নতি এবং ভাটার অবনতি সৰ্ব্ব। পেক্ষা অধিক হইয়া থাকে। ইহাদিগকে তেজকটাল কহে। ৭মী, কিম্বা ৮মী তিথিতে যখন চাবেলার জোয়ার সৌরবেলারভাটার সহিত এবং চান্দ্রবেলার ভাটা সৌরবেলার জোয়ারের সহিত সৰ্ব্বতভাবে মিলিত হয়, জোয়ার এবং ভাটার প্রভাব অতি অল্প হইয়া থাকে। ইহাদিগকে মরাকটাল কহে। জোয়ারের উন্নতি এবং ভাটার অবনতি, সমুদ্রের যে অংশ অতিশয় চড়া সে অংশেই অধিক হইয়া থাকে। কিন্তু অগভীর উপসাগরে কিম্বা বৃহৎ বৃহৎ নদীর মােহানায় তদপেক্ষাও অধিক' হয় এবং তথায় কখন কখন জল প্রাচীরবৎ উচ্চ হইয়া খানের উৎপাদন করে। উষ্ণ মণ্ডলে জল অতিশয় উত্তপ্ত ও মেৰুপ্রদেশে অতিশয় শীতল এইহেতু এবং বায়ুপ্রভাবে, নিত্যস্রোতসমূহ উৎপাদিত হইয়া থাকে। এই স্রোতসমূহের দ্বারা মেৰুপ্রদেশে উষ্ণ জল এবং উষ্ণ মণ্ডলে শীতল জল আনীত হওয়াতে তথাকার ভূভাগের জল বায়ু তাদৃশ শীতল কিম্বা উষ্ণ হইতে পারে না।
সংক্ষিপ্তার্থ। আমরা আরো জানিতে পারিয়াছি ভূভাগ নিয়তই সমুদ্র কর্তৃক ভগ্ন হইতেছে এবং স্থলিত ভাগ সমুদ্রতলে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইতেছে। কিন্তু প্রবাল কীটের দ্বারা নির্মিত দ্বীপ ভিন্ন আর কোন নূতন ভূভাগের সৃষ্টি হইতেছে না। অবশেষে আমরা আরাে জানিতে পারিয়াছি সমুদ্র জীবন- সম্বন্ধে মৰুভূমি নহে। উহাও অসংখ্য প্রাণীবগের আবাস- ভূমি। জলচর জন্তু ভূচর জন্ত অপেক্ষা অনেক অংশে বিভিন্ন হইলেও উহাদের সংখ্যা কিম্বা জাতি তদপেক্ষা নূন নহে। সমুদ্র যে তিমিমৎস্যের আবাসভূমি উহা পৃথিবীর সকল জন্তু অপেক্ষাই স্কুল এবং উহার গঠনপ্রণালী হস্তী কিম্বা উষ্ট্রের গঠনপ্রণালী অপেক্ষা সরল নহে। পক্ষান্তরে সমুদ্রে যে সূক্ষম ক্ষম অসংখ্য কীট আছে অণুবীক্ষণ ব্যতীত উহাদিগকে দৃষ্টিগােচরও করা যায় না। অপর কতিপয়ের গঠনপ্রণালী এতাদৃশ সরল যে উহাদের ভিন্ন ভিন্ন অংশের কোন প্রভেদ করা যায় না, এবং আহার করিতে ও ইতস্ততঃ বিচরণ করিতে সমর্থ হইলে ও উহাদিগকে গমনশীল জেলীরন্যায় প্রতীয়মান হয়। সমুদ্রে অসংখ্য উদ্ভিদ ও জন্মিয়া থাকে। কিন্তু উহাদের প্রাকৃতিক ধৰ্ম পরস্পর হইতে তাদৃশ বিভিন্ন নহে। দুই একটা ভিন্ন সামুদ্রিক উদ্ভিদের কোনটাতেই পুষ্প হয় না। সুতরাং উহারা সমুদয়ই উদ্ভিজ্জের অধস্তন শ্রেণীর অন্তর্গত। পূৰ্ব্ব -মৃধ্যায়ে আমার জানিতে পারিয়াছি সৌর-কর, প্রভাবে সমুদ্র হইতে নিয়তই বাষ্প উথিত হইতেছে, এবং এই বাষ্প আবার ভূবায়ু দ্বারা উর্ধে নীত হইয়া মেঘ এবং বৃষ্টিতে পরিণত হইতেছে। সাগর-বারি শীঘ্র উত্তপ্ত কিম্বা শীতল হয় না বলিয়া দিবা কিম্বা রাত্রিভাগে, গ্রীষ্ম কিম্বা শীতকালে ভূভাগের উষ্ণতার ন্যায় জলভাগের উষ্ণতার তাদৃশ প্রভেদ হয় না। এই জন্যই দ্বীপসমূহের এবং উপকূলবর্তী প্রদেশসমুহের জলবায়ু, অপেক্ষাকৃত মৃদু ; সমাক্ষবৃত্তস্থিত প্রদেশের ন্যায় উহা নদী। ৫৭ তাদৃশ উষ্ণ কিম্বা শীতল হয় না। যেখানে উত্তর অতলান্ত মহাসাগরের উপসাগরীয় স্রোতের ন্যায় স্রোত প্রবাহিত হয় তথায় হিমপ্রধান প্রদেশে উষ্ণ জল নীত হইয়া তত্ৰত্য জল- বায়ু অপেক্ষাকৃত উষ্ণ ও উপযােগী হয়। আর যদি নিরক্ষ- বৃত্তাভিমুখে শীতল স্রোত প্রবাহিত হয় তাহা হইলে বায়ু শীতল হইয়া তথাকার তীক্ষ তাপের খর্বতা প্রতিপাদিত হয়। উত্তর আমেরিকার লাডারে এরূপই হইয়া থাকে। চতুর্থ অধ্যায় । নদীর বিবরণ। নদীসমূহ বৃষ্টিজল হইতেই পরিপােষিত হইয়া থাকে, ইহা আমরা পূৰ্বেই অবগত হইয়াছি। অধুনা যে প্রত্যক্ষ কিম্বা অপ্রত্যক্ষ উপায়ে, এই বৃষ্টি-জল নদীগর্ভে সঞ্চিত হয় এবং যে উপায়ে নদী দ্বারা উহার প্রণালী খনন ও ভূভাগের হ্রাস বৃদ্ধি হয়, তাহারই অনুসন্ধান করা যাইতেছে। এই সকল যে কিরূপে সম্পন্ন হইতেছে (উপদ্বীপভাগের অন্য কোন নদী কিম্বা) মহানদীর বিষয় অনুসন্ধান করিয়া দেখিলে অনায়াসেই উপলব্ধি হইবে। মহানদীবে সমুদয় করপ্রদায়িনী কর্তৃক পরিপােষিত তাহার একটীও তুষারময় কিম্বা হিমপ্রধান অঞ্চল হইতে উদ্ভূত হয় নাই। যে জল বৃষ্টি- রূপে ভূতলে পতিত হয় এবং যে জল প্রস্রবণরূপে অভ্যন্তর ভাগ হইতে উত্থিত হয় উহারা তাহা দ্বারাই পরিপােষিত। কোন উৎকৃষ্ট মানচিত্রে (কলিকাতার জরিপ-বিভাগ হইতে যে মানচিত্র প্রকাশিত হয় তাহাই সৰ্ব্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। স্থান- সমুহের নাম ভারাক্রান্ত না হওয়াতে উহাতে নদী প্রণালী জ, নদীপ্রদেশ ও পলিপ্রদেশ । বিশদরূপে প্রতীয়মান হয়। মহানদীর এই সকল করপ্রদায়িনী এবং শাখানদীর প্রতি সন্দর্শন করিলে আমাদের আপাততঃ পল্লবশূন্য এবং শিকড়ের কিয়দংশ ভূমি হইতে উর্ধে অবস্থিত এরূপ কোন তৰু কিম্বা গুল্মের বিষয় স্মরণ হইয়া থাকে। কটকের পশ্চিমে যেখানে নদী পাৰ্বতীয় অঞ্চল হইতে নিঃসৃত হইয়াছে সেখানে কিয়দ্দর পর্যন্ত সমস্ত জলরাশি একই প্রণালীক্রমে প্রবাহিত হইতেছে। ইহাই আমাদের কাল্পনিক তৰুর স্কন্ধ। ইহার পশ্চিমে যতই নদীর অনুসরণ করিবে ততই দেখিতে পাইবে উহা ক্রমশ মধ্যদেশে ক্ষীণ হইয়াছে ; পরন্তু চতুর্দিশ হইতে বহুতর করপ্রদায়িনী আসিয়া উহার উভয়পার্শ্বে সম্মিলিত হইতেছে। আবার এই সকল করপ্রদায়িনীর অন্য- তম টিলের অনুসরণ করিলে দেখিতে পাইবে উহাতেও বহুতর উপনদী আসিয়া মিলিত হইতেছে। আরাে দেখিতে পাইবে যখন এ সকল একবার সম্মিলিত হইয়া এক হইয়াছে উহারা পুনরায় আর পৃথক্হয় নাই; সেইভাবে কটকের কিঞ্চিৎ পশ্চিম পৰ্য্যন্ত গমন করিয়া প্রধান নদীতে মিলিত হইয়াছে। এই সমুদয়ই তৰুর পল্লব এবং শাখা প্রশাখা। এক্ষণে নিম্নদিগে কিঞ্চিৎ অনুসরণ করিলে আবার দেখিতে পাইবে কটকের নিকট নদী দুই টী প্রধান প্রধান শাখাতে বিভক্ত হইয়াছে। এবং সমুদ্রের অনতি- দূরে এই সকল শাখা ক্রমশঃ ক্ষুদ্র হইয়া উহাদিগ হইতে আবার অন্যান্য প্রশাখা বাহির হইয়াছে। সুতরাং উহা কিয়দংশে পূর্ব প্রতিরূপের বিপর্যয় স্বরূপ, কিন্তু সম্পূর্ণ নহে। যেহেতু প্রধান নদী যে সমুদয় শাখানদীতে বিভক্ত উহাদের সংখ্যা অধিক হইলেও সাগরসঙ্গমে উহাদের সংখ্যা অপেক্ষা- কৃত ন্যূন। এবং উহারা সকল সময়ে স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র প্রণালী ক্রমে প্রবাহিত না হইয়া অনেকগুলিই পুনরায় সম্মিলিত হইয়া যায়। সুতরাং উহাদিগকে বৃক্ষের শাখা প্রশাখার সহিত তুলনা না করিয়া জালের ছিদ্রের সহিত তুলনা করাই বিধেয়।
অববাহিকা। এরূপে নদীর উদ্ধ এবং নিম্নভাগের মধ্যে অনেক প্রভেদ উপলক্ষিত হইয়া থাকে। একভাগে শ্রোতােসমুহ চতুর্দিগ হইতে আসিয়া একস্থানে সম্মিলিত হয় ; এবং তদ্বারা দেশের সমুদয় অংশ হইতে জল আনীত হইয়া ক্রমশঃ প্রধান নদীতে সঞ্চিত হয়। অপরভাগে স্রোতােসমুহ পরস্পর হইতে পৃথক হইয়া যায় এবং নদীর জল তন্মধ্যে বিভক্ত হয়। আর যখন নদী অতিশয় ফীত হয় এই সকল প্রণালী হইতে কিয়ৎপরিমাণ জল পরিবাহিত হইয়া বহুদূর পর্যন্ত ব্যাপ্ত হয়। এই দুই ভাগকে নদীপ্রদেশ অর্থাৎ সঞ্চয়স্থান এবং পলি প্রদেশ অর্থাৎ প্রদেশ বলা হইয়া থাকে। এই উভয়ের মধ্যে প্রথমটাই অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর। নদীর এ রূপ অবস্থাভেদ ভূভাগের আকারের উপরই নির্ভর করে। কিন্তু ত দ্বারাও ভূভাগের পরিবর্তন হইয়া থাকে। কটকের পশ্চিমে দেশ প্রায়ই নিবিড় পাহাড়ময়। এবং ছত্রিশগড় প্রভৃতি স্থানে যেখানে কোন পাহাড় নাই সেখানে ও ভূভাগ মৃদু মৃদু তরঙ্গায়িত সম্পূর্ণ সমতল নহে। প্রত্যেক নদীই কোন নিম্নভূমির তলায় প্রবাহিত হইয়া থাকে। উহাকে নদীর অব- বাহিকা কহে। পাহাড়ের মধ্যে উহা সাধারণতঃ অতিশয় সংকীর্ণ, এবং সমােন্নত ও শিলাময় ভূভাগের দ্বারা পরিবেষ্টিত। কটকের কতিপয় মাইল পশ্চিমে নিউরাজের অববাহিকা ঠিক এরূপ। অন্যান্য যেইস্থানে পাহাড় উভয় পার্শ্বেই দূঃসং স্থিত তথায় ভূভাগ প্রায়ই নদীগর্ভাভিমুখে মৃদু মৃদু ক্ৰমনি। পরন্তু কতিপয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তৃণাচ্ছন্ন অংশ ব্যতীত বানের সময়ও কুলের ভূভাগ জলপ্লাবিত হয় না। উভয় কূলের ভূভাগই জলসীমা হইতে উর্ধে অবস্থিত। বৃষ্টিরূপে যে জল ভূতলে পতিত হয় তাহার কিয়দংশ মৃত্তিকা দ্বারা পরিশােষিত ও বায়ুদ্বারা ৰাষ্পীভূত হয়। অপর অবশিষ্ট অংশ সনিকটস্থ স্রোতে- প্রভাবে নীত হইয়া নদীর পরিপােষণ করে। ।
৬০ জলবিভাগ। নদী স্বয়ংই ইঞ্জিনিয়র। যে প্রণালী অর্থাৎ নিম্নভূমি- দিয়া উহা প্রবাহিত হয় তাহা তদীয় জলের দ্বারাই খাত। খাল খলন করিবার সময় ইঞ্জিনিয়র যখন পলল ভূমিতে উভয় পার্শ্ব ক্রমনিম্ন এবং পাৰ্বতীয় অঞ্চলে সমােন্নত করেন তখন তিনিও অজ্ঞাতসারে এই নৈসর্গিক দৃষ্টান্তের অনুবর্তী হন। তবে তিনি পরিণামের বিষয় চিন্তা করিয়া বুদ্ধির সহিত কাৰ্য্য করিতে থাকেন। যে উপায় সর্বাপেক্ষা সহজ ও অােয়াসসাধ্য বলিয়া বােধ হয় তিনি তাহাই মনােনীত করেন। এবং দূরত্বের হ্রস্বতা ও অপরদিগে কোন সুবিধার জন্য তিনি কখন কখন কঠিন অন্তরায়ও ছেদ করিয়া থাকেন। কিন্তু নদী একমাত্র মাধ্যাকর্ষণের দ্বারা চালিত হওয়াতে তমুহূর্তের জন্য যে উপায় সহজ অর্থাৎ যে উপায়ে উহা অবিলম্বে কোন নিম্ন- ভূমিতে গমন করিতে পারে তাহাই অবলম্বন করিয়া থাকে। এজন্য কোন দূরস্থ নিম্নভূমি দিয়া সহজে নিঃসৃত হইবার জন্য উহাকে কখন কখন সামান্য পাহাড় কিম্বা ক্ষুদ্র সেতুর চতুর্দিগে পরিভ্রমণ করিতে হয়। এবং এই জন্যই নদীর গতি প্রায়ই অহি- লালবৎ বক্র হইয়া থাকে। ক্ষুদ্ৰনদীর মধ্যে কাচারস্থ বরাক নদী এবং বৃহন্নদীর মধ্যে সিন্ধু ও ব্ৰহ্মপুত্ৰই ইহার উত্তম উদাহরণ স্বরূপ। নদীপ্রদেশ সমূহ যে রেখাদ্বারা সীমাবদ্ধ ও পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন তাহাকে জলবিভাগ কহে। এই জলবিভাগ সচরা- চর পাহাৰু কিম্বা পৰ্ব্বতশ্রেণীর উচ্চতম রেখায়ই পরিণত হইয়া থাকে। কিন্তু সর্বদা তাহা হয় না। কখন কখন উহা বৃহৎ সম- ভূমির উর্দ্ধ প্রান্ত ও হইয়া থাকে। শতদ্রু এবং যমুনার প্রদেশ এইরূপেই পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন। পরন্তু এরূপ প্রায়ই দৃষ্ট হয় ; উহা বিশেষবিধি স্বরূপ, সাধারণ নহে। মহানদীর জল- বিভাগ নিরূপণ করিলে উহা বিশেষ প্রতিপন্ন হইবে। ব্রাহ্মণী এবং মহানদী প্রদেশের মধ্যবর্তী রেখা কটকের বিপরীতদিগে পশ্চিম তট হইতে আরম্ভ করিয়া অতগড় অঙ্গোল এবং বকেল মহানদীর জলবিভাগ। ; নামক পাৰ্বতীয় মহালের মধ্যদিয়া পশ্চিমাভিমুখে গমন করিয়াছে। পরে প্রায় একই প্রকার ভূমিক্রমে উত্তরাভিমুখে গমন করিয়া ঘােট নাগপুরের মালভূমিতে উপনীত হইয়াছে। এই মালভূমির দক্ষিণদিগ হইতে মহানদীর করপ্রদায়িনী ঈব ও ব্রাহ্মণী উদ্ভূত হইয়াছে ; এবং উহার উত্তরদিগের জল সোন- নদী ক্রমে প্রবাহিত হইতেছে। মালভূমিতে উপনীত হইয়া উহার উচ্চতম রেখাক্রমে জলবিভাগ অবিচ্ছিন্নভাবে পশ্চি- মাভিমুখে গমন করিয়াছে। কিন্তু সরগুজার নিম্নভূমিতে অব- তরণ করিয়া দক্ষিণ রেওয়ারের সমভূমিতে হেক্টো নদীর উৎপত্তি স্থানের পার্শ্ব দিয়া উত্তরাভিমুখে গমন করিয়াছে এবং পরে দক্ষিণ দিয়ে প্রত্যাবর্তন করিয়া অমরকন্টকের পৰ্বতােঙ্গরি আরােহণ করিয়াছে। এইখানে গঙ্গাবাহী সােন, নর্মদা, এবং মহানদী এই তিনটীর নদী প্রদেশ মিলিত হইয়াছে। এই স্থান হইতে মান্দাল পৰ্বতের পার্শ্ব দিয়া জলবিভাগ ক্রমশঃ দক্ষিণাভিমুখে গমন করিয়াছে। এবং পরে নাগপুর এবং ছত্রিশগড়ের মধ্যবর্তী সমভূমি পার হইয়া দক্ষিণ পূর্ব- দিগে বস্তারের সমীপবৰ্ত্তি পাৰ্বতীয় অঞ্চলে প্রবেশ করি- আছে। এই পাৰ্বতীয় অঞ্চল হইতেই প্রধান মহানদী উদ্ভূত হইয়াছে। এই সকল অঞ্চল হইতে, টিলের দ্বারা পরিশােষিত পৰ্বতসমূহের মধ্যদিয়া জলবিভাগ আরাে দক্ষিণ পূর্বদিগে অগ্রসর হইয়াছে। এবং পরে টিলের ও অপর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নদী প্রদেশের মধ্যদিয়া উত্তর-পূৰ্বদিগে ও অবশেষে পূৰ্বদিগে গমন করিয়া প্রধান নদীর সহিত সমান্তরালভাবে কটকে প্রত্যাবর্তন করিয়াছে। এই পরিধির, অন্তর্গত ভূভাগের পরিমাণ ৪৫,০০০ বর্গ- মাইল। উহার তৃতীয় চতুর্থাংশই শিলা ও অরণ্যময় পাহা- ডের দ্বারা সমাচ্ছন্ন। এবং ছত্রিশগড়ের সমভূমিই উহার মধ্যে একমাত্র বৃহদায়ত শস্যক্ষেত্র। এই নদীপ্রদেশ গােলাকার ও নদীজলের গড় গভীরতা। দৃঢ়সংহিত কিন্তু উহার গ্রীবাভাগ অতিশয় সংকীর্ণ। নদী প্রদেশের এরূপ অবস্থা ও আকারভেদের উপরই বন্যা প্রভৃতি নির্ভর করে। কিন্তু ইহার বিষয় আলোচনা করিবার পূর্বে যে বৃষ্টি জলের দ্বারা নদী পরিপােষিত তাহার বিষয় কিঞ্চিৎ উল্লেখ করা কর্তব্য। মহানদীপ্রদেশে যে জল বৃষ্টিরূপে পতিত হয় তাহার অধিকাংশই আরবসাগরের পশ্চিমবায়ু দ্বারা আনীত। এই বায়ু জ্যৈষ্ঠ হইতে ভাদ্র পর্যন্ত প্রবাহিত হইয়া থাকে। পরন্তু গ্রীষ্মকালে বঙ্গোপসাগরের পূর্ববায়ু হইতেও দুই একবার বর্ষণ হয়। এবং আশ্বিনমাসে এই বায়ুর প্রারম্ভে কখন কখন বহুদূর ব্যাপিয়া বর্ষণ হইয়া থাকে। কিন্তু পশ্চিমবায়ুদ্বারা যে জল আনীত হয় তাহাই সৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক। এই জয়ের সমু- দায় ভাগ কোন ৪৫,০০০ বর্গমাইল পরিমিত সম্পূর্ণ সমতল ক্ষেত্রে একত্র করিলে উহার গভীরতা ৪ ফুট কিংবা ৫০ ইঞ্চি হইবে । এই ৫০ ইঞ্চিকে সাধারণতঃ বাৎসরিক বৃষ্টিজলের গড় গভীরতা কহে। কিন্তু এই সমস্ত জল নদীর দ্বারা নীত হয় না। ইহার কিয়দংশ (যাহার নির্দিষ্ট পরিমাণ আমরা অবগত নহি) বাষ্পীভূত হইয়া পুনরায় ভূবায়ুর দ্বারা শােষিত হয়। অপর কিয়দংশ মৃত্তিকায় প্রবৃষ্ট হইয়া উন্নত তৰুশিকড় কিংবা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাদপের দ্বারা পরিশােষিত হয়। আবার তাহার কিয়দংশ তৃণ পত্রাদি উপরিভাগ হইতে বাষ্পীভূত হয় এবং অবশিষ্ট অংশমাত্ৰ কাষ্ঠ এবং পল্লবে পরিণত হয়। বােধ হয় অর্ধেক বৃষ্টিই এরূপে বাষ্পীভূত ও উদ্ভিদাদি কর্তৃক পরিশােষিত হয়। এইরূপে পরিশােষিত হইয়া যে ভাগ অবশিষ্ট থাকে তাহা দুই উপায়ে নদীতে, নীত হয়। নদীতে, নীত হয়। যদি প্রভূত বৃষ্টি হয় এবং ভূমি পূর্বেই জলসিক্ত থাকে তাহা হইলে অধিকাংশ জলই কর্দম ও বালুকা, শুষ্ক পল্লব ও অন্য লঘু পদার্থ সহকারে সন্নিকটস্থ স্রোতের প্রতি ধাবমান হয়।
বন্যা। এবং তদ্বারা প্রণালী সমূহ পূর্ণ ও কখন কখন উভয় কূল প্লাবিত হইয়া বন্যার উৎপাদন হয়। এরূপ বন্যার সময় কুলাদি , ভগ্ন, বৃক্ষাদি উমূলিত, এবং জীবিত প্রাণীবর্গ * সহকারে গৃহাদি উৎপাটিত হইয়া পরিবাহিত জলের দ্বারা দূরে নীত হয়। মহানদী এরূপ বিশাল ও ভয়াবহ বন্যার জন্যই প্রসিদ্ধ। উহার প্রদেশের অধিকাংশ শিলা ও পাহাড়ময় হওয়াতে প্রভূত বৃষ্টি হইলে সমস্ত বৃষ্টিজল অবিলম্বেই সমােন্নত পৰ্ব্ব- তােৎসঙ্গক্রমে নদীগর্ভে নীত হয়। এবং তারা ভীষণ বন্যার উৎপাদন উইয়া থাকে। ১৮৫৫ খৃষ্টাব্দের জুলাইমাসে যে বন্যা উৎপাদিত হইয়া সপ্ত দিবস পর্যন্ত ছিল তাহাতে নদী দ্বারা ৭৬,১৭৭ কোটী ঘনফুট অর্থাৎ প্রায় ৫ ঘনমাইল অপেক্ষাও অধিক জল সাগরে নীত হইয়াছিল। এই জল যদি নদী- প্রদেশের ৪৫,০০০ বর্গমাইলের উপরি ব্যাপ্ত হইত তাহা হইলে উহার গভীরতা ৬ ইঞ্চি হইত। কিন্তু প্রকৃত বৃষ্টিজল অবশ্য ইহা অপেক্ষাও অধিক ছিল। কাপ্তান হারিস সাহেবের অনুমানানুসারে বাৎসরিক বৃষ্টিজলের গড় গভীরতা অপেক্ষা ৯ ইঞ্চি অধিক জল হইলে এরূপ বন্যা উৎপাদিত হইতে পারে। কিন্তু বােধ হয় ইহা হইতে অল্প পরিমাণ জলেও এরূপ হইতে পারে। এইরূপ ভীষণবন্যা তিন চারি বৎসর অন্তেই একবার উৎ- পাদিত হইয়া থাকে। কিন্তু প্রতি বর্ষাকালেও মহানদী কিম্বা তদবস্থাপন্ন অন্যান্য নদীদ্বারা প্রভূত জল সাগরে নীত হইয়া * ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দের জুলাই মাসে যে বন্যা হয় তদ্বারা অসংখ্য গ্রাম্য পশু, নরদেহ এমন কি অনেক হস্তীও কটকের নিকট দিয়া নিম্নভিমুখে নীত হইয়াছিল । । অসীয়িক সমাজ (Asiatic Society) হইতে যে পত্রিকা প্রকাশিত হয় তাহারু৩০ বালামে কাপ্তান হারিস সাহেব কর্তৃক লিখিত প্রস্তাব হইতে, নদী- প্রদেশের ক্ষেত্রফল এবং এ সকল তত্ত্ব গৃহীত হইয়াছে।
৬৪
প্রবণ।
থাকে। শীতকালে বিশেষতঃ মাঘ হইতে বৈশাখ পর্যন্ত স্রোত
অতিশয় দুর্বল থাকে কিন্তু তথাপিও প্রতিদিন ৫০ কোটী ঘন
ফুটের অধিক জল সাগরে নীত হয়। এই সময় কোথাও
বৃষ্টি হয় না। এমন কি পাহাড়েও বৃষ্টি হইলে অতি অল্প
পরিমাণেই হইয়া থাকে। তবে এই বিশাল জলরাশি কোথা-
হইতে আনীত হয় ? মধ্যে যে যে অশনিবর্ষণ হয় একমাত্র তাহা
হইতে কি এত জল আসিতে পারে? সম্বলপুরে এরূপে এক
মাসেও এক ইঞ্চি জল হয় না। আবার শুভূমিতে পতিত
হইয়া উহারও অধিকাংশ শোষিত হইয়া যায়। কিন্তু এরূপে
শােষিত হইবার উপরই এই জলাগম নির্ভর করে। ভূমির
উপরিভাগ যতই শুষ্ক হউক না কেন, কিয়দ্দর নিয়ে সর্বদাই
জল খাকে। কঠিন প্রস্তরখনি খনন করিলেও তাহাতে জল
পাওয়া যাইয়া থাকে। এবং মহানদীর প্রদেশের ন্যায় কোন
দেশে আকর কিম্বা কুপের ৩০/৪০ ফুট খনন করিলে উহার
কিয়দংশ সৰ্ব্বদাই জলপূর্ণ হইয়া যায়। ভূভাগের দ্বারা
পরিশােষিত হইলে বৃষ্টিজল বিবরের মধ্যদিয়া ক্রমশঃ নিম্নে
প্রবেশ করে। সচ্ছিদ্র ও জলের প্রবেশনীয় হইলে প্রস্তরের
মধ্যদিয়াও প্রবেশ করিয়া থাকে। এরূপে কিয়দ্দর গভীরতায়
সমস্ত বিবর ও প্রস্তরের নিম্নভাগেই সৰ্ব্বদা জলপ্লাবিত থাকে।
যত দিন এই জলের উপরিভাগ উপত্যকার তলা হইতে উচ্চ
থাকে তদিন উহা ক্রমশঃ শৈল হইতে তাহার কোন নিম্নভাগ
দিয়া ক্ষরিত হইতে থাকে। এবং কোন কোন স্থানে নির্গম
প্রণালী বৃহৎ ও জলভাগ অধিক হইলে উহা প্রস্রবণে পরিণত
হয়। কিন্তু অন্যান্য স্থানে কেবল বিন্দু বিন্দু করিয়া ক্ষরিত
হইতে থাকে। আনুষঙ্গিক চিত্রের প্রতি সন্দর্শন করিলে ইহা
কিয়দংশে সহজেই বােধগম্য হইবে।
কোন উপত্যকার আড়ে ছেদ করিলে তদীয় ভূভাগ যেরূপ
সংদৃষ্ট হয় চিত্ৰক্ষেত্রে তাহারই কাল্পনিক প্রতিরূপ প্রকাশিত
উৎস হইয়াছে। ক্ষেত্রে ৪ স্রোত উপত্যকার তলায় প্রবাহিত হইয়া তদীয় জল বহন করিতেছে। উহার উভয় পাই পাহাড়ময়। কিন্তু a পার্শ্বস্থ পাহাড় সমুহ অপেক্ষাকৃত কঠিন প্রস্তর নির্মিত ও স্বয়ং জলের প্রবেশাতীত; কিন্তু স্থানে স্থানে বিদীর্ণ ও 3 ; ভগ্ন হওয়াতে উহার মধ্যে জল ক্রমশঃ প্রবিষ্ট হইয়া থাকে। এরূপে পরিশােষিত জল আবার কালক্রমে স্রোতের সহিত সমােচ্চ ০ স্থানে ক্ষরিত থাকে। কিন্তু এরূপ, অষ্পে অষ্পে ক্ষরিতে থাকে যে বহুদিবস অনাবৃষ্টি না হইলে পাহাড়ে এই উজ্জয়ের উদ্ধে সর্বদাই জল থাকে। মনে কর প্রভূত বৃষ্টি হইলে বিন্দু সংহতি? রেখাই যেন জলের উৰ্দ্ধসীমা; উহার নীচে সমস্তই জলসিক্ত। সুতরাং কিয়দিবস অনাবৃষ্টি হইলে জলের উজ্জ্বায় d রেখায় নামিয়া পড়িবে এরূপ মনে করা যাইতে পারে। উপত্যকার অপর পার্শ্বের পর্বতসমুহ সম্পূর্ণ বিভিন্ন প্রকৃতি। উহার উপরিভাগ কঙ্করের দ্বারা এবং নিম্নভাগ কর্দমের দ্বারা নির্মিত। কঙ্করন্তর সছিদ্র হওয়াতে বহুল পরিমাণ জলধারণ করিতে পারে। কিন্তু নিম্নের কর্দমন্তরে জল প্রবেশ করিতে পারে না; উহা সম্পূর্ণরূপে জলের প্রবেশাতীত। এই বহুল জল ক্রমশঃ কর্দমস্তরের উপর সঞ্চিত হইয়া অবশেষে sp স্থানে বেগে উচ্ছাসিত হইতে থাকে। কঙ্কর- স্তর যদি অধিক প্রশস্ত হয় এই জলােৎক্ষেপ চির প্রণে পরিণত হয়। কিন্তু অতিশয় ক্ষুদ্র হইলে জল শীঘ্র নিঃশে- য অরণ্যের প্রয়ােজনীয়তা। ষিত হয়; এবং উহা ক্ষণকাল সজীৰ থাকিয়া নিবৃত্ত হইয়া যায়। ভারতবর্ষের ন্যায় যে সকল দেশে বৎসরের কোন কোন অংশে অতিবৃষ্টি, এবং কোন কোন অংশে অল্পবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি হয়, সে সকল দেশের পক্ষে এরূপ অন্তর্জলােৎক্ষেপ অতিশয় প্রয়ােজনীয়। উহার হ্রাস কিম্বা অপচয়ের নিবারণের জন্য সকলেরই মনােযােগী হওয়া কর্তব্য। কতিপয় বৎসর হইতে ভারতবর্ষের ভিন্ন ভিন্ন অংশে অরণ্যসমুহের যে উচ্ছেদ হইতেছে, দুর্ভাগ্যক্রমে তাহাতে এই দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। তৰু- সমুহের দ্বারা ভূভাগ ছায়াবিশিষ্ট হয় এবং দিবাকরের সুতীক্ষ্ণ কিরণজাল হইতে সংরক্ষিত হয়। আবার উহাদের ও অন্যান্য ক্ষুদ্র পাদপের শিকড়ের দ্বারা ভূভাগ সংবদ্ধ থাকে। সুতরাং এরূপে সংবদ্ধ ও ছায়াবিশিষ্ট হওয়াতে ভূভাগ বৃষ্টিজল পরি- শােষণ করিয়া নিম্নস্থ প্রস্তরসমূহে সঞ্চালন করিতে সমর্থ হয়। অরণ্যসমুহ উনূলিত হইলে ভূভাগ প্রখর রৌদ্রাতপে উত্তপ্ত হয় ও বৃষ্টিজলের দ্বারা ধৌত হইয়া ক্ষীণ হয়। সমুন্নত শিলা- ময় ভূভাগে মৃত্তিকার ভাগ অতি অল্প; সুতরাং তথায় শীঘ্রই এরূপ ঘটিয়া থাকে, এবং পুনরায় অরণ্য উৎপন্ন হওয়া অসম্ভব হইয়া পড়ে। আবার প্রস্তরসমূহের জলশােষক আবেষ্টনের ধ্বংস হওয়াতে প্রত্যেক ধারাসারই কঠিন শৈলােৎসঙ্গ দিয়া একেবারে নদীতে নীত হইয়া বন্যার উৎপাদন করে। তৰু- লভামণ্ডিত পাৰ্বতীয় অঞ্চলে অন্তৰ্জলােৎক্ষেপ হইতে শীতকালে নদীসমূহ যেরূপ নিরন্তর পরিপােষিত হয়, এস্থলে আর তাহা হইতে পারে না। অজ্ঞতানিবন্ধন এরূপে অরণ্যসমূহ উনূলিত করাতে ফরাশিস দেশের কোন কোন অংশ বিশেষতঃ কোটী- ডাের অঞ্চল একেবারে মৰু হইয়া বাসের অযােগ্য হইয়াছে। ভারতবর্ষেও এরূপ অঞ্চল অতি অল্প আছে যাহার এই কারণ বশতঃ কিছু না কিছু ক্ষতি হয় নাই। অতএব অরণ্যের বপ্রদেশ। হ্রাসনিবারণ পক্ষে সকল জাতিরই মনোেযােগী হওয়া কর্তব্য। একবার উন্মুলিত হইলে পুনরায় উৎপন্ন হইতে অনেক পুৰুষ গত হইয়া থাকে। এক্ষণে নদীর নিম্নভাগ, বপ্রদেশ * এবং প্রণালীসমুহের বিষয় কিঞ্চিৎ অনুসন্ধান করা কর্তব্য। পূর্বে যে অংশের বিষয় বিবৃত হইয়াছে তাহাহইতে নদীর এ অংশ এবং তৎপ্রদেশ সম্পূর্ণ বিভিন্ন। নদী সমভূমিতে অবতরণ না করিতে করিতেই তদীয় স্রোত প্রতিৰুদ্ধ হইতে থাকে। এবং উহা যে ক্রমনি ভূমি দিয়া প্রবাহিত হয় তাহার নিম্নতা এরূপ অষ্পে অল্পে বৃদ্ধি পাইতে থাকে যে তাহা প্রায়ই প্রত্যক্ষ করা যায় না। সুতরাং উর্ধপ্রদেশে, পর্বতােৎসঙ্গ হইতে নদীদ্বার যে বালুকা ও অন্যন্য পলল আনীত হয় তাহার সমুদয় আর সাগরে নীত হইতে পারে না। এবং কিঞ্চিৎ তদীয় গর্ভে বিন্যস্ত হইতে আরম্ভ হয়। আবার চতুষ্পার্শ্বস্থ ভূভাগ প্রায়ই সমােচ্ছায় হওয়াতে নদী আর এক প্রণালীতে আবদ্ধ থাকে না; উহা ভিন্ন ভিন্ন শাখা প্রশাখাতে বিভক্ত হইয়া যায়। কিন্তু বন্যা হইলে এই সমুদয় প্রণালীতেও জল ধৃত হয় না; এবং কিঞ্চিৎ পরিবাহিত হইয়া চতুষ্পার্শ্বস্থ নিম্নভূমিতে নীত হয় । প্রণালী পরিত্যাগ করিবামাত্রই জলের বেগ হ্রাস হইতে থাকে; এবং নদীর উভয় কিনারায় বালুকা ও পলি বিন্যস্ত হইয়া উহাদিগকে চতুষ্পর্শ্বস্থ ভূভাগ অপেক্ষা উক্ত করিয়া তােলে। অতএব নদীর প্রদেশের আড়ে ছেদ করিলে * নীল নদের নিম্নদেশই প্রথমতঃ এই নামে অভিহিত হয়। কেইরোর নিয়ে নীলনদ দুটী প্রধান শাখাতে বিভক্ত হইয়াছে। এই শখিদ্বিয়কে এইক্ষণ ডেমিয়েটা এবং রোসেটা কহে। উহাদিগের এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যে যে ত্রিকোণ ভূভাগ আছে উহার আকার গ্রীক A এবং বাঙ্গালা ব অক্ষরের সদৃশ। এই জন্যই উহার ডেলটা বা ৰপ্ৰদেশ নাম হইয়াছে। + উপক্রমণিকা দেখ।
নদীর প্রদেশ। *. আনুষঙ্গিক চিত্রময় প্রতিরূপের ন্যায় প্রতীয়মান হইবে। স্রোত ও অববাহিকার যে প্রতিরূপ পূৰ্ব্বচিত্রে প্রকাশিত হইয়াছে বপ্রদেশের চ্ছেদ। তাহা অপেক্ষা এই ক্ষেত্ৰ সৰ্ব্বতােভাবে বিভিন্ন । যাহাতে চতুষ্পার্শ্বস্থ ভূভাগ জলপ্লাবিত হইতে পারে না এই নিমিত্ত কটকে নদীর দুই ধার আরাে উন্নত করিয়া দেওয়া হইয়া থাকে। কিন্তু যেখানে এরূপ উন্নত কৃরিয়া দেওয়া হয় নাই সেখানেও নদীর দুই ধার চতুষ্পর্শস্থ ভূভাগ অপেক্ষা উন্নত। যথা-কলিকাতার মলবাহী জল হুগলীতে নীত হইয়া ভূমির স্বাভাবিক ক্ৰমনিম্নতা অনুসারে তথা হইতে লবণাস্তুদে নীত হইয়া থাকে। পূর্ব বাঙ্গালায়ও যেখানে নদীর কিনারা কৃত্রিম বাঁধের দ্বারা সংরক্ষিত নহে, তথায় চতুষ্পর্শ্বস্থ ভূভাগ জলপ্লাবিত হইলেও নদীর দুই ধার সাধা- রণতঃ জল হইতে কিঞ্চিৎ উন্নত থাকে । গঙ্গার ন্যায় মহানদীর প্রদেশে, ফলতঃ সমুদয় বৃহৎ বৃহৎ নদীর বপ্রদেশেই, প্রণালীস্থ জলের উজ্জ্বায় চতুস্পার্শ্বস্থ ভূভা- গের উচ্ছ্বায়ের প্রায় সমান। বন্যার সময় উহা তদপেক্ষা অনেক অধিকহইয়া থাকে। পূৰ্বেই উল্লিখিত হইয়াছে বন্যার জল চতুষ্পর্শ্বস্থ ভূমিতে পরিবাহিত হয় এবং উহার পলিনিক্ষেপের দ্বারা ভূমিমমূহ ক্রমশঃ উন্নত হইতে থাকে। উড়িষ্যা, মেদিনী- পুর প্রভৃতি লােকারণ্যময় প্রদেশের ন্যায় যেখানে সমস্ত ভূমিতে কৃষিকৰ্ম্ম হইয়া থাকে তথায় সচরাচর নদীকে কৃত্রিম বাঁধের দ্বারা উহার প্রণালী মধ্যে আবদ্ধ " করিয়া রাখে। সাধারণতঃ এই সকল বাঁধের দ্বারা জল আবদ্ধ থাকে 'বটে, কিন্তু উহাদের দ্বারা তাদৃশ উপকার হয় না। জল পরিবাহিত বন্যা। হইতে না পারিয়া প্রণালী মধ্যে অধিক স্ফীত হইয়া উঠে, এবং বিন্যস্ত পলিদ্বারা নদীগর্ভও উন্নত হইতে থাকে। সুতরাং বাঁধসমুহকে ফলােপধায়ক করিতে হইলে উহাদিগকে আরো উন্নত করিতে হয়। এবং এরূপে কতিপয় বৎসরের মধ্যে নদীকে ঈদৃশ উন্নত করা যায় যে উহা বপ্রদেশের, এমন কি গ্রামস্থ গৃহাদির অপেক্ষাও উন্নত স্থান দিয়া প্রবাহিত হইতে থাকে। ইটালীর পাে নদীই ইহার বিশেষ উদাহরণস্থল। কোন বৃহৎ বন্যাদ্বারা ঈদৃশ নদীর বাঁধ ভগ্ন হইলে তদ্বারা যে অনিষ্ট হয় অহা অবদ্ধ নদীর অপেক্ষা অনেক অধিক হইয়া থাকে । মহানদী উহার বন্যার জন্যই প্রসিদ্ধ। উহার উদ্ধ প্রদেশের আকার ও অবস্থাভেদে যে কিরূপে বৃষ্টিজল দ্রুত পরিবাহিত হইয়া শ্যার উৎপাদন করে তাহা পূৰ্বেই প্রদর্শিত হইয়াছে। এই বন্যার জলের দ্বারা কটক ও পুরীর শস্যক্ষেত্রসমূহ একবারে প্লাবিত হইয়া যায়। কতিপয় বৎসর হইল কাপ্তান হারি সাহেব এই প্রদেশের সমুদয় প্রণালী, পরীক্ষা করিয়া স্থির করিয়াছেন যে বৃহৎ বন্যার সময় যে জল আনীত হয় তাহার অর্ধেক মাত্র এই সকল প্রণালী দ্বারা নীত হইতে পারে । সুতরাং অপরার্ধেক বাঁধ সত্ত্বেও চতুর্দিকে বিস্তৃত হইয়া পড়িবে ইহা অনায়াসেই অনুমেয়। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের প্রদেশের ভূভাগ সমুদ্র হইতে অনেক মাইল পর্যন্ত জলমগ্ন। উহা প্রতি, কটালের সময় সমুদ্র- জলের দ্বারা ধৌত হইয়া থাকে। উহাতে তত্তপ্রদেশের উপ- যােগী অনেক উদ্ভিদ জন্মিয়া থাকে। এই উদ্ভিদের মধ্যে সুন্দরীই প্রধান। ভূভাগের কিনারার বাহিরে এখানে সমুদ্র কিয়দ্র পর্যন্ত পুলিনাবৃত। এই, সকল পুলিন ভাটার সময়ে কিয়দংশে শুষ্ক হয় ও জোয়ারের সময় জলমগ্ন হয় ফলতঃ উহাদিগকে প্রদেশের অন্তর্জলীয় অংশ বলা যাইতে পারে। ভবিষ্যতে অধিক জলমগ্ন না হইলে উহারা জলাদ্বীপে পরিণত ক বপ্রদেশের উৎপত্তি। ; হইবে; আধুনিক সুন্দরবন ক্রমশঃ উন্নত হইয়া বাসােপযােগী হইবে। সমুদয় বঙ্গক্ষেত্র এরূপেই সমুৎপন্ন হইয়াছে। এককালে কলিকাতা, ঢাকা ও যশােহর প্রভৃতি স্থানও পুলিনরূপে সমুদ্র- গর্ভে নিহিত ছিল। পরে পুর্বোক্ত প্রকারে বিন্যস্ত পলির দ্বারা ক্রমশঃ উন্নত হইয়া এক্ষণে এতাদৃশ বাসােপযােগী হইয়াছে। মহানদী ও উপদ্বীপভাগের পূর্বউপকূলস্থ নদীসমূহের ব- প্রদেশ ব্ৰহ্মপুত্রের প্রদেশের ন্যায় বাহিরের দিগে বিস্তৃত নহে। কিন্তু মহানদীর বপ্রদেশ অদ্যাবধিও সম্পূর্ণ হয় নাই। উহার উপরিভাগ অদ্যাপি যে কেবল উন্নত হইতেছে এমন নয় তদ্বারা চিলকা হ্রদও ক্রমশঃ পরিপূর্ণ হইতেছে। চিলাহ্রদ বাস্তবিক সমুদ্রেরই অংশ বিশেষ। বালুকারাশির নিষ্ঠীবনের দ্বারাই উহা সমুদ্র হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়াছে। সুন্দরবনের সমীপে যেরূপ পুলিন আছে মহানদীর মােহনায় তাদৃশ কোন পুলিন দৃষ্ট হয় না। ত্রিচিনপলি ও জোরে কাবেরীর প্রদেশ যেরূপ, মহানদীর বপ্রদেশও অবশেষে তদবস্থাপন্ন হইবে। কাবেরীর প্রদেশের অত্যম্প অংশমাত্রই তদীয় জলের দ্বারা প্লাবিত হইয়া থাকে। উহা এক্ষণে এরূপ উচ্চ হইয়াছে যে উহা নিরবচ্ছিন্নই জল- সীমার উর্ধে অবস্থিত থাকে। এবং কৃষিকর্মের জন্য ভূভাগে কৃত্রিম উপায়ে জলসেচন করিতে হইয়া থাকে। উহার সম্মুখীন সমুদ্রে বিন্দুমাত্রও নূতন ভূভাগের সৃষ্টি হইতেছে না। কাবেরী দ্বারা যে গলি আনীত হয় তাহার সমস্তই স্রোতভাবে দূরে নীত হইয়া উপসাগরের তলায় ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হয়। উহার বপ্রদেশের কোন প্রকার বৃদ্ধি হয় না। ফলতঃ উহ এক্ষণে সম্পূর্ণ হইয়াছে। ভূভাগ ও জলভাগের বিরােধ হইতেই প্রদেশের উৎ- পত্তি হয়। স্থললাপবেষ্টিত অপেক্ষাকৃত শান্ত উপসাগরেই বপ্রদেশ শী উৎপন্ন হয়। বর্ধমান তৰুর শিকড়ের ন্যায় উহার চতুর্দিকেই উন্মজ্জনশীল পুলিনসমুহ দৃষ্টিগােচর হইতে সৈকত। ৭১ থাকে। ফ্লোরিডা উপসাগরের মিশিশিপির প্রদেশের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে ইহা স্পষ্ট উপলদ্ধ হইবে। ভারতােপকূলে কৃষ্ণা ও গোদাবরীর ৰপ্ৰদেশও কিয়দংশে সেইরূপ। কাবেরী এবং মহানদীর ব প্রদেশও উপকূলরেখ হইতে কিঞ্চিৎ বাহিরে বিস্তৃত। নদীদ্বারা নিয়তই পলিরূপে যে পঙ্কাদি আনীত হয় নদীর বেগ যেখানে কিঞ্চিৎ মন্দীভূত উহা সেখানেই বিন্যস্ত হইয়া থাকে। সাগরসঙ্গমে নদীর বেগ অতিশয় প্রতিরুদ্ধ হইয়া থাকে সুতরাং তথায়ই অধিক পলি বিন্যস্ত হইতে থাকে। সমুদ্রের অৱস্থাভেদে এই পলি কখন কখন প্রশস্ত ক্ষেত্রোপরি বিস্তৃত হইয়া বহুল স্রোত সমাকীর্ণ পুলীনের উৎপাদন করে ; আবার কখন কখন নদীর মােহানার আড়ে একটি মাত্র পুলিনে বিন্যস্ত হইয়া সৈকত প্রস্তুত করে। গাঙ্গেয় বপ্রদেশে পূর্বপ্রকার ঘটনা দেখা যায় এবং মহানদী কিম্বা পূৰ্বোপকূলস্থ অন্য কোন নদীর বপ্রদেশে শেষােক্ত ঘটনা দেখতে পাওয়া যায়। এরূপ সৈকত থাকাতে সমুদ্রগামী বৃহৎ বৃহৎ অর্ণবপােতসমুহ প্রায় অধিকাংশ নদীর মােহানায় প্রবেশ করিতে পারে না। সমুদ্রের নিত্য শ্রোতসমূহ যদি অতিশয় প্রবল হয় এবং যদি তারা নদী- বাহিত সমস্ত পলি ধৌত হইয়া দূরে নীত হয় তাহাহইলে বপ্রদেশ আর বাহিরের দিগে বিস্তৃত হয় না। যেলাপ্রবাহের দ্বারাও নদীর মুখ উন্মুক্ত থাকে। মােহানার সম্মুখীন সমুদ্র যতই চড়া হয় ততই বেলা প্রবাহের প্রভাব বৃদ্ধি হইয়া থাকে। বেলােৰ্মি এই চড়ার উপর প্রাচীরবৎ স্ফীত * হইয়া বেগে নদী মধ্যে প্রবিষ্ট হয়। এরূপে প্রতিদিন দুইবার বহুল জল নদীমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া ভাটার সময় নদীকর্তৃক আনীত পলিসহকারে বাহির হইয়া যায়। এবং প্রতিনিয়ত এরূপে পরস্পর বিপরীতাভিমুখে দুটী প্রবল স্রোত প্রবাহিত হওয়াতে সমস্ত পলি অপসারিত হইয়া যায় ও নদীর মুখ উন্মুক্ত থাকে। * তৃতীয় অধ্যায় দেখ।
৭২ নদী ও হ্রদ। এরূপে পলি অপসারিত হওয়াতেই হুগলী অদ্যাবধি নাব্য রহিয়াছে। মূলতা প্রভৃতি মােহানা পূর্বে কোন প্রদেশশালী নদীর মােহানা ছিল সন্দেহ নাই। ঈদৃশ মােহানাতে ভূমধ্য হইতে অতি অল্প জল আনীত হইয়া থাকে। এবং সুতরাং অতি অল্প পলি আনীত হওয়াতে বেলাভাবে এরূপ মােহ- নাকে অনন্তকাল পর্যন্ত উন্মুক্ত রাখা যাইতে পারে। আমরা এক্ষণে আমাদের নদীর বিবরণ অবগত হইয়াছি। উহার সহিত অন্যান্য বৃহৎ বৃহৎ নদীর অংশবিশেষের যে প্রভেদ তাহাও কিয়দংশে জ্ঞাত হইয়াছি। কিন্তু নদীও উহার কাৰ্যকারিত্বের বিষয় এরূপ প্রশস্ত যে এক অধ্যায়ে তাহার শেষ করা যায় না। নদীর ন্যায় কতিপয় অন্যান্য সুস্বাদু ও লবণাক্ত জলাশয়েরও উল্লেখ করিতে বাকি রহিল। অতএব" আমরা ইহাদিগের বিষয় আবার পর অধ্যায়ে উল্লেখ করিব। পঞ্চম অধ্যায়। নদী ও হ্রদ। আমরা পূর্ব অধ্যায়ে জানিতে পারিয়াছি, মহানদীপ্রভৃতি গ্রীষ্মপ্রধান্ দেশস্থ নদীসমূহ সাময়িক বৃষ্টিপতন ও প্রস্রবণের জল হইতেই পােষিত হয়। মহানদী যে বর্ষার তিন চারি মাস তাদৃশ পূর্ণ থাকে, এবং কখন কখন প্রভূত বৃষ্টি হইলে যে ভীষণ বন্যারদ্বারা উৎপীড়িত হয়, আবার বৎসরের অবশিষ্ট ভাগে যে শুষ্কপ্রায় হইয়া ক্ষুদ্র তরণীর পক্ষেও নাব্যা হয় উপ- রােক্ত সাময়িক বৃষ্টিপতন এবং তদীয় প্রদেশ পাহাড় ও শিলাময় হওয়াই তাহার কারণ। কিন্তু সিন্ধুনদের সম্বন্ধে ইহা সম্পূর্ণ বিভিন্ন। উহার প্রধান স্রোত তিব্বতীয় হিমালয়ের নদী ও হ্রদ। .৭৩ ০ ট্রমাণ তুষার হইতে এবং উহার উপসরিৎসমুহ উক্ত তুষার ও হিমালয়ের বহির্দেশের গ্রীষ্মকালীয় বৃষ্টিজল হইতেই পরিপােষিত। পৰ্বত হইতে অবতরণ করিয়া উহাকে ৭০০ মাইল পর্যন্ত শুষ্ক ভূমি দিয়া ভ্রমণ করিতে হয়। এই ভুমির অধিকাংশই মৰু, এবং কোন অংশেই বৎসরে ২০ ইঞ্চি অপেক্ষা অধিক বৃষ্টি হয় না। মহানদীর ন্যায় সিন্ধুনদও সমধিক স্ফীতি ও অবনতি এবং আকস্মিক বন্যার অধীন। কিন্তু কারণ বিভিন্ন হওয়াতে উহাদের ঘটনার কালও পরস্পর বিভিন্ন। ইহা পূৰ্বেই * প্রতিপাদিত হইয়াছে যে, হিম ঋতুতে আৰ্য্যা- বত্তের সমভূমি ও পৰ্বতােৎসঙ্গস্থ শীতল বায়ু উত্তরপুৰ্ব্ব অর্থাৎ শীতকালীয় মৌশুমরূপে, দক্ষিণদিকে প্রবাহিত হয়; এবং এক সজল বায়ু আসিয়া তদীয় স্থান পূরণ করে। এই সজল বায়ু ঊর্জ প্রদেশে দক্ষিণদিক হইতে প্রবাহিত হয়। এবং পাঞ্জাব ও উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের উচ্চ প্রদেশে অবতরণ করিয়া বর্ষণ করিতে থাকে। হিমালয়ের উর্দ্ধ প্রদেশের পাংশ দ্রবণ-বিন্দু অপেক্ষা অনেক নূন। এই সজল বায়ু দ্বারা যে বাষ্প আনীত হয় উহা তথায় ঘনীভূত হইয়া তুষারে পরিণত হয়। এবং এই তুষার শীতকালে গিরিশৃঙ্গে ও উচ্চ উপত্যকাসমূহে ক্রমশঃ সঞ্চিত হইতে থাকে। বসন্ত ঋতুর বর্ধিষ্ণু উপ সহ এই তুষার ক্রমশঃ দ্রব হইতে আরম্ভ হয়। এবং যে সমুদয় নদী এই সকল উচ্চ প্রদেশে দাৰুণ শৈত্যপ্রভাবে ইতিপূৰ্ব্বে নীরব ও নিবিড় তুষারাচ্ছন্ন ছিল, তাহারা পুনরায় হিমনিমুক্ত হইয়া প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড তুষার ও প্রস্তরখণ্ড এবং বিশাল কর্দমরাশিসহ- কারে প্রচণ্ডবেগে প্রবাহিত হইতে থাকে। এই উৎসপি জল, বৃহৎ বৃহঃ উপসরিতে ও তৎপরে প্রধান নদীতে ক্রমশঃ উপচিত হইয়া ফাল্লুণমাসে পাঞ্জাবের সমভূমিতে নীত এবং যে নদী পূর্ব শ্রাবণ হইতে শুষ্কপ্রায় হইয়া শীত- * দ্বিতীয় অধ্যাক্স দেখ। হয়।
৭৪ সিন্ধুনদের বন্যা। } কালে কতিপয় অগভীর ও অনাব্যা প্রণালীতে পরিণত হইয়া- ছিল ; এবং যে নদীর প্রশস্ত অববাহিকায় বৃহৎ বৃহৎ চর উৎপন্ন হইয়া ক্ৰমশঃ তৃণ শৈবালাদি দ্বারা সমাচ্ছন্ন হইয়া- ছিল ; এক্ষণে সেই নদী স্ফীত হইয়া চরসমুহকে দূরে অপনয়ন করিতে আরম্ভ করে। কতিপয় মাসানুক্রমে যতই অধিক তুষার দ্রব হইতে থাকে ততই নদীর আয়তন বাড়িতে থাকে। শ্রাবণ- মাসে যখন পাঞ্জাব ও নদের উৎপত্তিস্থানীয় পৰ্বতাংশ অতিশয় উত্তপ্ত হয়, আর কাঙ্গরা ও হজার পর্বতে বৃষ্টি হইতে খাকে তৎকালে সিন্ধু নদ ও উহার উপসরিৎসমূহ সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়। ইহার পরেই জল ক্রমশঃ হ্রাস হইতে থাকে, এবং কার্ত্তিকমাসে উহার সনিম্নসীমা প্রাপ্ত হয়। সিন্ধুনদের অসাধারণ বন্যাসমূহ বৃষ্টিজল কিম্বা দ্ৰবমান,তুষার- জলের আতিশয্য হইতে উৎপন্ন হয় না। উহার উপসরিৎসমুহের অন্যতমটী চিরনীহার-বাহু কিম্বা শিলাভঙ্গের দ্বারা ক্ষণকালের জন্য প্রতিরুদ্ধ হইলেই তাদৃশ বন্যার উৎপাদন হয়। এরূপে অববাহিকার আড়ে বাধের ন্যায় হইয়া যায় এবং বাঁধের পশ্চাদ্ভাগে জল অবরুদ্ধ হইয়া হ্রদে পরিণত হয়। কিন্তু জল যতই সঞ্চিত হয় ততই ক্রমশঃ স্ফীত হইয়া উঠে এবং অবশেষে বাঁধের উপর কিম্বা নিম্ন দিয়া সহসা বাহির হইয়া প্রচণ্ডবেগে ও সতেজে নিম্নভিমুখে ধাবমান হইতে থাকে। ১৮৪১ খৃষ্টাব্দের জুনের প্রারম্ভে সিন্ধু প্রদেশে যে ভয়াবহ বন্যার প্রাদুর্ভাব হইয়াছিল, টরবেলার আশরফ দা নামক ব্যক্তি তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া মেজর এবট সাহেবের নিকট এরূপে তাহার ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন। অপরাঃ দুই ঘটিকার সময় উত্তর-পূর্ব দিগ হইতে পৰ্বতে প্রথমে এক- প্রকার মর্মর ধনি শ্রুতিগােচর হয়। এই ধর্নি ক্রমশঃ প্রবল হইয়া সকলকার চিত্তাকর্ষণ করিল; এবং সকলই উচ্চৈঃসুরে কহিতে লাগিল “ ইহা কিসের শব্দ ” “ ইহা কি দূরদেশাগত :
সিন্ধুনদের বন্যা। ৭৫ • কামানের শব্দ” * না গণ্ডাররব না বজ্রধ্বনি”। এসময়ে সহসা এক জন বলিয়া উঠিল “নদী আগত”। এতবণে আমি বাহিরে গিয়া দেখিলাম যে শুষ্ক প্রণালীসমূহ তখনই পরিপূর্ণ হইয়াছে। কিন্তু জল এতাদৃশ বিবর্ণ যে তাহাতে জলের বর্ণ কিম্বা আকৃতি কিছুই নাই; এবং বোধ হইতে লাগিল যেন নদী একটী মৃত্তিকাময় প্রাচীর বহন করিতেছে। বাহার সময়ে ইহা দর্শন করিয়াছিল তাহারা সহজে পরিত্রাণ পাইয়াছিল ; কিন্তু যাহারা সময়ে দেখিতে পায় নাই তাহারা প্রায়ই বিনষ্ট হইয়াছিল। জলরাশি কি ভয়ানকরূপেই কলুষিত হইয়াছিল। সৈনিক পুৰুষ, কৃষক, যুদ্ধঘােটক, উষ্ট্র, তাম্বু, গবাদি, গর্দভ, গৃহসজ্জা, ফলতঃ প্রত্যেক প্রকারের সজীব পদার্থই সেই ভয়াবহ জলে মিশ্রিত ছিল। কারণ তৎকালে রাজা গােলাপসিংহের সৈন্য পৈখার অনুসরণে টরবেলা হইতে তিনক্রোশ উত্তরে কুনৈতে সিন্ধুগর্ভে তাম্বুনিবিষ্ট ছিল। সৈন্যের কিয়দংশ সেই সময়ে অনুসরণে প্রবৃত্ত ছিল এই জন্য তাদৃশ অধিক সংস্থার হইতে পারে নাই। অবশিষ্ট অংশ পলায়ন করিয়া কেহ কেহ উন্নত বৃক্ষোপরি আরােহণ করিয়াছিল; কিন্তু তাহাও শীঘ্র উনূলিত হইয়া ভাসিয়া গেল। অপর কেহ বা শৈলে আশ্রয় লইয়াছিল কিন্তু তাহাও অচিরে জলগর্ভে প্রােথিত হইল। কেবল যাহারা একবারেই পৰ্বতােৎসঙ্গে আরােহণ করিয়াছিল তাহারাই পরিত্রাণ পাইয়াছিল। এরূপে প্রায় পাঁচ শত সৈনিক পুৰুষ একেবারে বিনষ্ট হয়। কি ভয়ানক অনিষ্ট হইয়াছিল। এরূপে কত সহস্র বিষা ফলবতী ভূমিই জলের দ্বারা একেবারে ধৌত হইয়া যায়! যে সমুদয় সুরম্য শিশুবৃক্ষের দ্বারা নদের দুই পার্শ্ব সুশােভিত ছিল এবং যে বহুতুর স্কন্ধশালী প্রসিদ্ধ বর গাবৃক্ষ স্মরণাতীতকাল হইতে পরিব্রাজকগণের বীরাসন ছিল তাহাদের সমস্তই এক মুৰ্ত্তে বিনষ্ট হইয়া যায়।” মেজর মন্টগােমারি সাহেব নিরূপণ করিয়াছেন, “শিলা- •০ অববাহিকা খনন। ভঙ্গের দ্বারা গিলাষট অববাহিকা অবরুদ্ধ হওয়াতেই এই বন্যার উৎপাদন হয়। পৰ্ব্বতােৎসঙ্গ হইতে শিল ও বৃহৎ মৃৎপিণ্ডসমূহ চ্যুত হইয়া অববাহিকা একেবারে অবরুদ্ধ হইয়া যায়। এবং উহার পশ্চাদভাগে ৮০০ ৯০০ ফুট গভীর একটা হ্রদ উৎপন্ন হয়। অবশেষে উক্ত বাঁধ ভগ্ন হইয়া যায় ও সমস্ত অবৰুদ্ধ জলরাশি সহসা অববাহিকা দিয়া নিমাভিমুখে ধাবমান হয়। ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দির আগষ্ট মাসে একই কারণবশতঃ এরূপ অপর একটী বন্যা উৎপাদিত হইয়াছিল। পূর্ব অধ্যায়ে মহানদীর সম্বন্ধে উল্লিখিত হইয়াছে, শ্রোতঃ সমূহ যে অববাহিকাক্রমে প্রবাহিত হয় তাহা তদীয় জলের দ্বারাই খাত হইয়া থাকে। হিমালয়ে এরূপ নদীপ্রভাবের ভূরি ভূরি নিদর্শন পাওয়া যায়। উপযুক্ত স্থলববাধে উহার এস্থলেই সবিশেষ বিবরণ লিখিত হইল। চিরনীহারবাহুর সমীপ- বর্তী উচ্চতর অববাহিকাসমূহে নীহারস্রোতসমুদয় যে শৈল- রাজীর উপর দিয়া গমন করে তাহার উৎখননে বিশেষ আনুকূল্য করিয়া থাকে। তারা যে প্রস্তর খণ্ড আনীত হয় তাহ দারুণ শৈত্যনিবন্ধন তদীয় নীহারের সহিত দৃঢ়রূপে সংবদ্ধ হয় এবং ভেতগর্ভের ও পার্শ্বের প্রস্তরের উপর দিয়া নীত হওয়াতে উহা তাহাদিগকে সহজে উৎখাত ও চূর্ণ করিয়া ফেলে। এরূপে যে পঙ্ক ও বালুকা উৎপন্ন হয় তাহা চিনীহারবাহুর শেষ প্রান্তস্থ তুষারাচ্ছন্ন গরবিশেষ হইতে উদ্ভূত স্রোতের দ্বারা দুরে অপনীত হয়। পুরাকালে হিমালয়ের চিরনীহারবাহুসমুহ ইদানীন্তন সীমার অনেক বাহিরে পর্যন্ত ব্যাপ্ত থাকিয়া বৃহৎ বৃহৎ অববাহিকা মনে বিশেষ আনুকুল্য করিয়াছে। সিকিমের তিস্তানদীর অব বাহিকায় অধুনা চিরনীহারবায়ু ১৪,০০০ ফুটের নিয়ে ব্যাপ্ত নহে; কিন্তু পুরাকালে সমুদ্র হইতে ৬০০০ ফুট উর্ধে ও উহার অববাহিকার আকৃতি। ৭৭ ') প্রভাব লক্ষিত হইত। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কাঙ্গরা অব- বাহিকায় সমুদ্র হইতে ৩০০০ ফুট উর্ধেও তাদৃশ প্রভাবের নিদর্শন পাওয়া যায়। কিন্তু নদী স্বয়ং ও এক প্রধান খননকারী। উহা ক্রমনিয় পর্বতােৎসঙ্গক্রমে বেগে ধাবমান হইয়া কঙ্কর ও বৃহৎ বৃহৎ প্রস্তরখণ্ডসমুহকে পরস্পর তদীয় শিলাময় গর্ভে ঘর্ষণ করিয়া চূর্ণ করিয়া ফেলে। বস্তুতঃ নদীগর্ভ যত কঠিন প্রস্তরের দ্বারা নির্মিত হউক না কেন উহা এরূপে অবশেষে ক্ষীণ হইয়া যায়। কঠীন শিলাময় প্রদেশে নদী যে কখন কখন সংকীর্ণ ও সমােয়ত পার্শ্বযুত অতিশয় গভীর পথ খনন করে উহাকে সংকট কহে। শত ও স্পিতী নদীর সঙ্গমস্থানও এইরূপ একটা প্রসিদ্ধ সঙ্কট। যেখানের মৃত্তিকা তাদৃশ কঠিন নহে সেখানে অববাহি- কার পার্শ্বদ্বয়, নীহার ও বায়ুপ্রভাবে, অপেক্ষাকৃত ক্ৰমনিম্ন হইয়া থাকে। উপরিভাগের শিলাখণ্ডসমূহ বিদীর্ণ হইয়া উৎপাটিত হয় এবং ক্রমশঃ চূর্ণ হইয়া স্রোতের দ্বারা দূরে অপনীত হয়। সমুদয় প্রস্তরের বিসমাসররাধিকা শক্তি সমান নহে। কোন কোন স্থলে প্রস্তরসমূহ'বহুশতাব্দীতেও নীহার কিম্বা বৃষ্টির দ্বারা ক্ষয় হয় না। এবং উহার গঠনেরও কোন পরিবর্তন হয় না। আবার কোন কোন স্থলে নীহার, বৃষ্টিজল, এবং অঙ্গাৰ্যান্ন ও অম্লজান নামক ভূয়ুর রাসায়নিক উপাদানের দ্বারা কেবল উপরিভাগের কঠিন প্রস্তরসহ ৰিসমাসিত হইয়া কর্দম ও কঙ্করে পরিণত হয় এমন নয় পর্বতের অভ্যন্তর- ভাগেও উহার প্রভাব লক্ষিত হয়। এরূপ অবস্থায় অববাহিকা শীঘ্রই খাত হইয়া থাকে। সময়ে সময়ে প্রভূত বৃষ্টি হইবার পরে বৃহৎ বৃহৎ মৃত্তিকা ও প্রস্তরখণ্ড জলসিক্ত হইয়া সম্মুখীন পদা- খাদি সমভিব্যাহারে পৰ্বত হইতে স্খলিত হয়। এবং কিয়ৎ- ক্ষণের জন্য অববাহিকাকে অবরুদ্ধ করিয়া ক্ৰমে শ্রোতঃ প্রভাবে দূরে অপনীত হয়। পূর্বে যে ভয়াবহ বন্যার স্থলিত ভূভাগ। ৭৮ ক্ষেত্ৰভূমি । দুইটি উদাহরণ প্রদত্ত হইয়াছে, তাহার অধিকাংশই এইরূপে উৎপাদিত হইয়া থাকে। ইংরেজদিগের অধিকৃত সিকিম রাজ্যের ন্যায় যে সকল দেশে প্রভূত বৃষ্টি হয়, এবং যে সকল দেশে প্রস্তরসমূহ সহজে বিসমাসিত হয় ও বহুল পরিমাণে উদ্ভিদাদি জন্মে তত্ৰত্য পৰ্ব্বতােৎসঙ্গের আকার শিলাভঙ্গের উপরই নির্ভর করে। এরূপ চ্যুতভূভাগের দ্বারা দার্জিলিঙ্গে বৃষ্টির পর পাৰ্বতীয় পথাদি প্রায়ই অবরুদ্ধ হইয়া যায়। কখন কখন ৩০০০/৪০০০ ফুট উৰ্দ্ধ হইতেও সমুদয় তরাজিসহকারে উপরিস্থ ভূভাগ নিম্নস্থ উপত্যকায় স্খলিত হইয়া থাকে, এবং নূতন ভূভাগ উপরােক্ত বিসমাসক শক্তিসমূহের প্রভাবাধীনে আনীত হয়। নীহার, বৃষ্টি, অঙ্গাৰ্যাম্ল ও মাধ্যাকর্ষণ এই সকল সাধনের দ্বারা পৰ্বতগহ্বরাদি ক্রমশঃ উৎখাত হইয়া অববাহিকা পর- স্পরায় পরিণত হয়। এই খনন সময়ে যে পদার্থসমূহ দূরে নীত হয় তাহার কিয়দংশ গহ্বরাদিতে কঙ্করস্তররূপে বিন্যস্ত হয়। এইরূপ শুর লডাকের অববাহিকায় ও তিব্বতে গুজ প্রদেশে শতদ্রুর অববাহিকায় বহুলপরিমাণে দৃষ্ট হয়। কিন্তু অধিকাংশ পদার্থই চূর্ণিত হইয়া সমভূমিতে নীত হইয়া থাকে, এবং ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইয়া ক্ষেত্ৰভূমির উৎপাদন করে। গাঙ্গ প্রদেশের ক্ষেত্রসমূহ এরূপে হিমালয়ের পর্বতের হ্রাস হইতেই সমুৎপন্ন। যদিও এই সকল ক্ষেত্ৰসমুহের আবার হ্রাস হইতেছে এবং উহাদের মৃত্তিকারাশি দূরে অপ- নীত হইয়া সমুদ্রে বিন্যস্ত হইতেছে ; তথাপি গড়ে উহাদের । যত হ্রাস হইতেছে তদপেক্ষা অধিক বৃদ্ধি হইতেছে। ভারত- বর্ষীয় সমুদয় পাৰ্বতীয় অঞ্চলই এরূপে নিম হইতেছে। পৰ্বত- সমূহও এই শক্তির অধীন' হইয়া ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণে হ্রাস হইতেছে। নদীসমুহ যখন পাৰ্বতীয় অঞ্চল দিয়া গমন করে তৎকালে • জলপ্রপাত। যে সমুদয় অপরূপ অবয়র ধারণ করে তন্মধ্যে উহাদের প্রপাতই সৰ্ব্বাপেক্ষা কৌতুকাবহ ও বিস্ময়জনক। দেশের ভৌতিক গঠনভেদে নদীসমুহ কখন কখন সহসা কোন উচ্চ অঞ্চল হইতে ঋজুভাবে নিম্নে অবতরণ করে ; এবং সমস্ত জলরাশি যুগপৎ নিম্নে অধঃক্ষিপ্ত হয়। ভারতবর্ষের উপদ্বীপভাগে যে সমুদয় প্রপাত আছে তন্মধ্যে কিনারায় সৰ্ব্বতী নদীর, মহা- বালেশ্বরে ইয়েনা নদীর, মহিসুরে কাবেরী নদীর, নীলগিরিতে পেকারা নদীর প্রপাতই প্রসিদ্ধ। প্রথমটী পশ্চিম ঘাটগিরিতে গৈরাপা নগরীর সমীপে একেবারে ৮৮৮ ফুট নিয়ে পতিত হয়। কাপ্তান নিউবােড়, সাহেব স্থির করিয়াছেন যে, বৃষ্টির দ্বারা কিঞ্চিৎ স্ফীত হইলে এই প্রপাতে প্রতি সেকেণ্ডে ৪৬,০০০ ঘনফুট জল পতুিত হয়। তিনি উহার বর্ণনা করিতে করিতে আরাে বলিয়াছেন যে “গৈরসপার জলপ্রপাত ভূবনে মধ্যে যথার্থই এক অদ্ভুত ব্যাপার। আল্পপৰ্বতে চিরসােল * ও ইভেন- সনের এবং সেভয়েব অৰ্ব্ব প্রপাতের উজ্জ্বায় অধিক হইলেও গৈরসপার প্রপাতে যে জল পতিত হয় তাহার আয়তন অনেক বৃহৎ। পক্ষান্তরে আয়তনে নায়ারা অপেক্ষা ক্ষুদ্র হইলেও উয়ে উহা নূতন মহাদ্বীপের সমুদয় প্রপাতকেই অতিশায়িত করিয়াছে।” কাপ্তান নিউবাের্ড সাহেবের গণনানুসারে মহাবালেশ্বরের ইয়েনার প্রপাত ৬০০ ফুট উচ্চ। এবং দক্ষিণ মহারাষ্ট্রীয় গােকাক নদের প্রপাত ১৭৮ ফুট উচ্চ। গোকাক প্রপাতের কিঞ্চিৎ ঊর্দ্ধে নদের পরিসর ২৫০ গজ ; কিন্তু প্রপাতের নিকটে উহা সংকুচিত হইয়া ৮০ গজ মাত্র হইয়াছে। বর্ষাকালে উহা দ্বারা প্রতিসেকেণ্ডে ১৬,০০০ ঘনফুট জল বাহিত হইয়া থাকে। ; *চিরাসোল প্রপাতের উচ্ছায় ২,৪০০ ফুট ; ইভেন্সলের উচ্ছ য়ি ১,২০০ ফুট ; অৰ্বর উচ্ছায় ১,১০০ ফুট। ।
গৈরসপার প্রপাত অপেক্ষা কাবেরীর প্রপাত উজ্জ্বয়ে নূন।
উহার উচ্ছায় ৩০০ ফুটের অধিক নহে। কিন্তু তারা যে জল
বাহিত হয় তাহার আয়তন অপেক্ষাকৃত বৃহৎ। বুন্দেলকাণ্ডেও
কতিপয় প্রসিদ্ধ জলপ্রপাত আছে। উহাদের মধ্যে চাচৈর
সমীপন্থ তংস নদীর প্রপাতই (উজ্জ্বায় ২০০ ফুট) সৰ্ব্বাপেক্ষা
বৃহৎ। কাত্রা সঙ্কট হইতে ১২ মাইল পশ্চিমে বিলােহীর প্রপাত
৩৯৮ ফুট উচ্চ। তথা হইতে আবার ১০ মাইল পশ্চিমে
বোটীর প্রপাত ৪০০ ফুট উচ্চ। কিন্তু খসিয়া পৰ্বতে চিরাপুঞ্জীতে
ময়স্মৈ নামে যে জলপ্রপাত আছে উহা পুর্বোক্ত সমুদয় প্রপাত
হইতেই উচ্চ। ডাক্তার ওলহেম সাহেবের গণনানুসারে
উহা প্রথমে ১৮০০ ফুট নিয়ে পতিত হইয়া তথা হইতে পুনরায়
১০০০ ফুট তির্যকভাবে পতিত হইয়াছে। প্রভূত বৃষ্টি না হইলে
এই বৃহৎ জলপ্রপাতের তাদৃশ প্রভাব লক্ষিত হয় না।
হ্রদসমুহ স্বাভাবিক অবনত স্থান ভিন্ন কিছুই নহে। চতু
পার্শ্বের মলবাহী জল তথায় সঞ্চিত হইয়া উহা ক্রমশঃ পূর্ণ
হইতে থাকে। কিন্তু অবশেষে উহা যেই প্রকারের দ্বারা পরি-
বেষ্টিত তাহার নিম্ন প্রান্ত পর্যন্ত পূর্ণ হইলে অধিক ভাগ কোন
প্রণালীক্রমে পরীবাহিত হয়। নতুবা যাহাতে আগত
জলের সমতুল্য জল সৌর করে বাষ্পীভূত হইতে পারে
উহা সেইরূপ প্রশস্ত হইয়া যায়। পরিশুদ্ধ ভূভাগ ভিন্ন
শেষােক্ত প্রকার অবস্থা সম্ভবপর নহে। অতি অল্প পরি-
মাণে বৃষ্টি হইলে তত্ৰত্য বায়ু অপেক্ষাকৃত নির্জল হয় ;
সুতরাং সময়ে অধিক বাষ্প উত্থিত হইতে থাকে।
হ্রদের জল পরীবাহিত না হইয়া এরূপে বাষ্পীভূত হইলে
উহা লবণাক্ত হইয়া যায়। কারণ, সমুদায় মলবাহী জলেই
কিয়ৎপরিমাণে লবণমিশ্রিত থাকে; এবং জল বাষ্পভুত হইলে
লবণাদি অনুৎপতনশীল পদার্থসমুহ পশ্চাৎ পড়িয়া থাকে ও
হদে ক্রমশঃ সঞ্চিত হইতে আরম্ভ হয়। হিমালয়ের উতরে
এক
লবণাস্তু হ্রদ। মধ্য আসিয়াতে, এমন কি তিব্বতীয় হিমালয়েও এরূপ অনেক হ্রদ দৃষ্টিগােচর হয়। সিন্ধুনদের অববাহিকার উচ্চপ্রান্ত সমী- পস্থ লডাকের পনগাঁও হ্রদও এইরূপ। মেজর গড়ন অষ্টিন সাহেবের লিপি পাঠে বােধ হয় উহা পূৰ্ব্বে সুস্বাদু জলশালী ছিল ; এবং তথা হইতে একটী স্রোত নির্গত হইয়া সিন্ধুনদের উপসরিৎ শায়কে পতিত হইত। তত্ৰত্য ভূ ভাগের শুষ্কতার বৃদ্ধি সহকারে (তথাকার ভূভাগ যে ক্রমশঃ শুষ্ক হইয়াছে উহার ভূরি ভূরি প্রমাণ পাওয়া যায়; কিন্তু তাহার কারণ অদ্যাপি নিরূপিত হয় নাই) উহা এক্ষণে বিছিন্ন হইয়া অতিশয় সংকীর্ণ হইয়াছে, এবং উহার নিম্ন প্রান্তের জল অতিশয় লবণাক্ত হইয়াছে। কাস্পিয়ান সাগর এবং আরাল সাগর লবণাম্বু হুদের অপর দুইটী প্রধান দৃষ্টান্তস্বরূপ। উহারা সমুদ্র হইতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং এরূপ বৃহৎ যে উহাদিগকে প্রকৃত ভূমধ্যগত সাগর বলিলেও বলা যায়। পেলেস্টাইনের মসাগর লবণাম্বু হ্রদের আর একটা ক্ষুদ্র উদাহরণ। এই হ্রদ একটি বৃহৎ গহ্বরের তলায় অবস্থিত; এবং উহা সমুদ্র হইতে ১,৩১২ ফুট নিম। বােধ হয়, পুরাকালে কোন সময়ে মৰু সাগরের জল জর্ডান নদী- দিয়া আকে বা উপসাগরে ও লােহিত সাগরে গমনাগমন করত। কিন্তু পিট্রিয়া মৰুভূমি উন্নত হওয়াতে উহা পৃথক ও শুষ্ক হইয়া গিয়াছে। মৰুসাগরের জল এরূপ লবণাক্ত যে তাহাতে আর অধিক লবণ দ্রব হওয়া সুকঠিন। কেবল জর্ডা- নের সঙ্গমস্থানে কিঞ্চিত্র দ্রব হইলেও হইতে পারে। মৰু- সাগর সম্পূর্ণ প্রাণী-বিবর্জিত। মৎস্য কিম্বা কোন প্রকার জন্তুই উহাতে জীবনধারণ করিতে পারে না। এই জন্যই উহা উক্ত নামে অভিহিত হইয়াছে। রাজপুতানায় বিকেনীর মৰুভূমির সমীপেও কতিপয় লব- শাম্বুহ্রদ আছে। উহাদিগের মধ্যে শাবর হ্রদই সর্বাপেক্ষ। বৃহৎ • এই হ্রদটী বস্তুতঃ একটা চড়া অবনত স্থান। সাময়িক ট • সুস্বাদু সলিলশালী হ্রদ। । বৃষ্টিজলের দ্বারাই (এখানে ২০ ইঞ্চি অপেক্ষ। প্রায়ই অধিক বৃষ্টি হয় না) উহা পূর্ণ হইয়া থাকে। বর্ষাপগমে উহা আবার শুষ্ক হইয়া যায়। উহা হইতে যে লবণ পাওয়া যায় তাহা রাজ- পুতানার এক প্রধান পণ্য দ্রব্য। বেরার প্রদেশের লুনার হ্রদ আর একটা লবণাস্তু হ্রদের উদাহরণ। উহা হইতে একপ্রকার ভিন্ন জাতীয় লবণ পাওয়া যাইয়া থাকে। লুনার হ্রদ আগ্নেয় গিরির গরের ন্যায় অবনত ; ইহাতে উহাকে আগ্নেয়গিরি- সভূত বলিয়া বােধ হইয়া থাকে। যে সমুদয় হ্রদ হইতে স্রোত নির্গত হয় তাহাদের জল প্রায়ই সুস্বাদু। কিন্তু চিলকা প্রভৃতি উপকূলস্থিত হ্রদের সমুদ্রের সহিত সংযােগ থাকা নিবন্ধন তথায় সমুদ্রের লবণাক্ত জল প্রবেশ করিয়া থাকে। ভারতবর্ষে সুস্বাদুজলশালী হ্রদের দৃষ্টান্ত অতি বিরল। নৈনিতালের হ্রদ ডবলিউ টি ব্লাকফোর্ড সাহেবের দ্বারা আবিষ্কৃত যকলা ও চোলা সঙ্কটের নিমস্থ হ্রদের ন্যায় কতিপয় পাৰ্বতীয় হ্রদই সুস্বাদুজলশালী হ্রদের একমাত্র উদাহরণ। কলিকাতার পূর্বদিগে যে লবণাস্তু হ্রদ আছে তাহার ন্যায় চড়া হ্রদসমূহকে কচ্ছু বলা যাইতে পারে। ইংরাজি ভাষায় উহাদিগকে এবং উপকূলস্থ লবণাক্ত জলাশয়কে লগুন কহে। উড়িষ্যার চিলকা ও মান্দ্রাজের পুলিকট হ্রদ ইহার প্রধান উদা- হরণ। কলিকাতার পূর্বদিগের লবণাস্তু হ্রদ বস্তুতঃ বপ্রদেশেরই অংশ। তবে বৎসর বৎসর প্রদেশে যে পলি বিন্যস্ত হয় তদ্বারা উহা অদ্যাপিও গ্রীষ্মকালের জল সীমা পর্যন্ত পূর্ণ হয় নাই। উক্ত হ্রদের ন্যায় লগুনের জল কখন কখন লবণাক্ত হয়। কারণ স্রোতের দ্বারা উহাদের জল সমুদ্রে যাতায়াত করিতে সমর্থ হওয়াতে প্রতি জোয়ারের সময়ই তথায় সমুদ্রের লবণাক্ত জল প্রবিষ্ট হয়। চিলকা ও পুলিকাট হ্রদ সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকারে উৎপন্ন হইয়াছে। উহার পুরাকালে সমুদ্রেরই অংশ লগুন। ; ছিল; কিন্তু পরে সৈকত অর্থাৎ বালুকাময় সেতুর দ্বারা তাহা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়াছে। স্রোতের দ্বারা যে বালুকা তটো- পরি নীত হয় তাহা হইতেই এই সেতু প্রস্তুত হইয়া থাকে। গাঞ্জাম এবং উপকূলভাগের দক্ষিণবর্তী অপরাপর প্রদেশে যে বালুকারাশি উপচিত হয় উহা ক্রমশঃ শ্রোতভাবে উত্তরদিগে নীত হইয়া নদীবাহিত পলির দ্বারা বিবৃদ্ধ হয়। চিলকা হ্রদের পশ্চিমে যে পৰ্বত আছে, বােধ হয় পুরাকালে সমুদ্র তাহার তলা পর্যন্ত ব্যাপ্ত ছিল। কিন্তু মহানদী ও অপরাপর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নদীবাহিত পলির দ্বারা সমুদ্রের এই ভাগ চড়া হওয়াতে, উপকুল সন্নিহিত স্রোতের দ্বারা হ্রদের দক্ষিণ- দিগে প্রথমে একটা বালুকাময় প্রকার নির্মিত হয়। এবং পরে ক্রমে এই প্রকারের দ্বারা পশ্চাদবর্তী গুন সম্পূর্ণ রূপে পরিবেষ্টিত হয়। ভগ্নেৰ্মিসমুহ কুলের তদূর উথিত হয় সমুদ্রের দ্বারা এই প্রাকার তদূর্ভে উত্থিত হইতে পারে না। কিন্তু প্রতি ভাটাতেই জল নামিয়া গিয়া উহার কিয়দংশ সূৰ্য্যাতপে শুষ্ক হয়। এবং বালুকারাশি শুষ্ক হইলে সামুদ্রিক বাতাপ্রভাবে উহা ২০/৩০ ফুট উচ্চ হইয়া দীর্ঘ সেতু কি বালুকাময় প্রাচীরে পরিণত হয়। কালক্রমে তথায় উদ্ভিদের বীজ নীত হইয়া থাকে এবং নানাবিধ লতাগুল্মদি জন্মিতে আরম্ভ করে। এই লতাসমুহের দ্বারা বালুকা ক্ৰমশঃ সংবদ্ধ হয়। উহারা শুষ্ক হইয়া গেলেও ভূমিতে সার হয় এবং তাহাতে ঘাস, কেওরা স্কন্ধহীন খর্জুরতমালাদি জন্মিতে সমর্থ হয়। এরূপে আরাে অধিক বালুকা সঞ্চিত হইয়া সমুদ্রদিগে পুলিনের বৃদ্ধি হইতে থাকে। এবং অপেক্ষাকৃত পুরাতন ভূভাগ কৃষিকর্মের উপযুক্ত হইয়া ক্ষেত্রে পরিণত হয়। কিন্তু উহারু মধ্য দিয়া এরূপ একটী প্রণালী থাকে যে তদ্বারা সমুদ্র ও হ্রদের জল পরস্পর গমনাগমন করিতে পারে। লগুনে যে সমুদয় নদী পতিত হয় বর্ষাকালে তৎকর্তৃক আনীত জলের
৮৪
দ্বারা লগুনের উচ্ছাস হইলে জলের অধিক ভাগ সেই প্রণালী
দ্বারা পরীবাহিত হইয়া থাকে। এই সময় লগুনের জল অতি
সুস্বাদু থাকে। কিন্তু ইহার পরেই সমুদ্ৰজল মিশ্রিত হইয়া
উহার নির্গম প্রণালীর সমীপবর্তী অংশকে লবণাক্ত করিয়া
তােলে। লগুনের তলায় নদীবাহিত মৃত্তিকা বিন্যস্ত হইয়া
প্রতিবৎসরই উহারা চড়া হইতে থাকে । এবং কালক্রমে
পূর্ণ হইয়া তৃণাচ্ছন্ন ক্ষেত্রে পরিণত হয়। পণ্ডি সারির কতিপয়
মাইল উত্তরে মার্কানাং গ্রামে এরূপ একটি লগুন আছে ;
উহা এক্ষণে প্রায়ই পূর্ণ হইয়া গিয়াছে। মান্দ্রাজ উপকূলে
যে সমুদয় নিম্ন প্রান্তর দৃষ্ট হয় উহারাও নিঃসন্দেহ এইরূপে
উৎপন্ন হইয়া পরে উন্নত হইয়াছে।
সমাপ্ত।
Printed by Thacker, Spink & Co., Calcutta.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.