Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Mrinmoyi
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
স্বল্পী
( সামাজিক নাট্যরঙ্গ)
শ্রীদুর্গাদাস রায় চৌধুরী প্রণীত
কলিকাতা
৫ নং রামধন মিত্রের লেন, শ্যামপুকুর
“বিশ্বকোষ-প্রেসে
এ, এ বসু এণ্ড কোম্পানি কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
সন ১৩১০ সাল।
মূল্য • আনা
No text on this page.
উৎসর্গ পত্র। মা । তােমার স্নেহ ও ভালবাসায় সংসার যে বিষময়, তাহা কখনও জানিতে পারি নাই। সুতিবলে তােমার ন্যায় করুণাময়ী জননীকে পাইয়া কত আবদার, কত উৎ- পাত করিয়াছি, কিন্তু একদিনের জন্য তােমার স্নেহের হ্রাস হয় নাই। শােকতাপে মন যখন দগ্ধীভূত হইয়াছে, বিপদা- গমে মন যখন বিচঞ্চল হইয়াছে, আত্মীয়স্বজন দ্বারা প্রপী- ড়িত হইয়া মনে যখন সংসার-বৈরাগ্য উদিত হইয়াছে, মা ! তােমার চৈতন্যরূপিণী প্রাণতােষিণী স্নেহময়ী মূৰ্ত্তি হৃদয়দর্পণে উদিত হইয়া নিস্তেজ হৃদয়মাঝে বল ও সাহস সঞ্চার সহ সংসারের কর্তব্য পথে অগ্রসর করিয়া দিয়াছে। অকৰ্ম্মণ্য পুত্রের মা ভিন্ন ভালবাসিবার আর কেহ নাই। মৃন্ময়ী আমার নব উদ্যমের ফুল, সম্যকরূপে প্রস্ফুটিত করা আমার ক্ষমতার অতিরিক্ত! এই মৃন্ময়ী সাধারণ সমীপে আদরণীয়, হইলে ও তােমার স্নেহক্রোড়ে অকর্মণ্য পুত্রের ন্যায় স্থান পাইবে, এই আশায় আশ্বস্ত হইয়া মা! তােমার চরণকমলে আমার এই সাধের মৃন্ময়ীকে ভক্তিসহকারে অর্পণ করিলাম। সেবক—শ্রীদুর্গাদাস রায়চৌধুরি
No text on this page.
নাট্যোলিখিত ব্যক্তিগণ। পুরুষগণ কিরণ (ঘাষ বিক্রমপুরের জমীদার নরেন কিরণের কনিষ্ঠ পরেশ জমিদার ও খুল্লতাত শৈলেন্দ্র ঐ দাধর ঐ কেবলরাম শৈলেরে বন্ধু নশীরাম নরেনের শ্যালক জ্ঞানানন্দস্বামী যােগীপুরুষ গােলক ও নরি ঘােষবংশের জ্ঞাতি-দৌহিত্র ম্যাজিষ্ট্রেট, কনষ্টেবল, জমাদার, শিষ্যগণ ও ভৃত্য খ্রীগণ মনােরমা মৃন্ময়ী তরুবালা। হেমাঙ্গিনী গিরিবালা ক্ষীরোদা কিরণের স্ত্রী কিরণের মধ্যম ভ্রাতার স্ত্রী নরেনের স্ত্রী পরেশের স্ত্রী। প্রতিবেশিনী
No text on this page.
স্বল্মী।
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
( শৈলবাবুর বৈটকখানা )
শৈল, গদাধর ও কেবলরাম আসীন।
কেবলরাম। শৈলবাবু! আজ এত ভাবিত হ’বার
কারণ কি ? বাটীর ত সব কুশল।
শৈল। দেখ, ভাববার কোন কারণ নাই, তবে যার
জন্য যত করি, সেই বেশী অকৃতজ্ঞ হয়।
পরেশের জন্য কি না ক’চি, রাত নেই, দিন
নেই, যখন টাকার দায়ে পড়েছে, তখন টাকা,
মৃন্ময়।
দিয়ে দায় উদ্ধার করেছি, এখন কি তা আর
মনে থাকবে।
গদা। মনে কি সহজে রাখবে।
সহজে রাখুবে। যেমন কুকুর,
তাহার তেমনি মুগুর চাই। পরেশ ভায়া এখন
মনে করেন যে, তিনি একটা কেষ্ট বিষ্ট হয়ে
প’ড়েচেন।
শৈল। তাত করবেই। বাছাধনকে যখন সরের নাড়
বানিয়ে ছেড়ে দেবাে, তখন বুঝবে যে কার
সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিলুম্।
গদা। বুঝতে আর বেশী দিন লাগবে না। যে ফাঁদ
পপতিছি, বাছাকে আর রাধাকৃষ্ণ বলতে
হবে না।
কেবলরাম।. এ রকম দু’চারিটী মন্ত্রী জুটলে দেশে
আর মানুষ থাকবে না।
পদা। থাম্ বেটা থাম্, আর চালাকি করে না। বেটার
পেটে ভাত নেই, কোচার বহর দেখলে হাড়
জ্বলে যায়। তুই আদার বেপারি, তাের
জাহাজের খবরে দরকার কি?
শৈল। কেবলরাম! আপনা আপনি কি ঝগড়া করা
ভাল। তুমি আমার বন্ধু হয়ে আমার আত্মীয়
মৃন্ময়ী।
সুহৃৎ সকলকে চটালে। আমার তাতে
মঙ্গল হবে !
কেবল। তােমার বন্ধু হয়ে এখনও আছি, পরেও
থাবােতবে গদাধরের মতন বাঁধা হতে
পার্বাে না। [ কেবলরামের প্রস্থান।
গদা। কেবলার মােক দেখলে ত! ওর জন্য তােমায়
ভাতে হবে না। এখন এস, একটা যুক্তি
করা যাক।
শৈল। কুমুদিনীকে হাত কর। কুমুদিনীর জন্য পরেশ
এক রকম পাগল হয়েছে। কুমুদিনীকে আমার
সূদ আসল ফেলে দাও আর পরেশকে দিয়ে তার
বিষয় সমস্ত কুমুদিনীর নামে কবাল করিয়ে
দাও, তার পর দেখা যাবে।
গদা। এত সহজেই হবে। আরাে কণ্টক আছে, তা
ঘুচুতে হবে।
শৈল। তুমিই আমার সহায়। তােমাকে অধিক আর
কি বলবাে।
গদা। আমায় বেশী কিছু ব’তে হবে না, এখন ত
আসি, দেখিগে কতদূর কি করতে পারি।
[ গদাধরের প্রস্থান।
মৃন্ময়। t কিরণ। সাধু সন্ন্যাসিগণ নিবিড় অরণ্য কিংবা পর্বত গুহায় বসে ঈশ্বর আরাধনা করেন, আমি আত্মীয়-স্বজন-পরিবেষ্টিত স্থানে তা হলে রকমে ঈশ্বর আরাধনা করতে পারব। জ্ঞানা। (সহাস্যবদনে) বৎস্য ! তােমায় ত প্রথমেই বলেচি যে তুমি বাসনাবর্জিত হয়ে নির্লিপ্তভাবে কাজ কর। গৃহে বসে যদি মন প্রাণ ঈশ্বরে সম- পণ করতে পার, যদি সংসারে সুখ দুঃখ তােমায় মােহিত ক’ত্তে না পারে, তা হলে মুক্তিলাভে সমর্থ হবে। প্রথম কৰ্ম্ম কর, বাসনা ছেদ কর, শােক চিন্তা মন হইতে দূর কর। [ কিরণের প্রস্থান। ( পটপরিবর্তন। গৃহাভ্যন্তরে মৃন্ময়ী প্রভৃতি আসীন। মৃন্ময়ী। (সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া) বাবা । আপনার চরণ দর্শন করবে বলে আমরা এখানে বসে আছি। আপনার পা পূজা করতে পারবাে ত। মা কাত্যায়নীর কৃপায় আমাদের আশা সফল হলাে।
মৃন্ময়। ০ ০ জ্ঞানা। তােমার ধৰ্ম্মে মতি দেখে বড় সন্তুষ্ট হলেম, জগদম্বা তােমার মঙ্গল করুন। মৃন্ময়ী। সুখ-ভােগ পতির সঙ্গেই বিসর্জন দিয়েছি। সুখ জীবনে ভােগ করি নাই, পাইবারও আশা করি না, তবে পতিকেই যেন জীবনের পরম আরাধ্য দেবতা-জ্ঞানে এ ছার প্রাণকে তাঁর চরণ উদ্দেশে উৎসর্গ করতে পারি, এই মাত্র প্রার্থনা। জ্ঞানা। মা ! তােমার নিৰ্ম্মল হৃদয়ে কুচিন্তা কখনই স্থান পাবে না। তােমার হৃদয় পতিরূপ পরমদেব- তার ধ্যানে মগ্ন থাকবে। তাতেই তােমার সৰ্বার্থ সিদ্ধি হবে। ঈশ্বর-প্রেমে মগ্ন হও, প্রেম বারি সিঞ্চনে তার কৃপা যাচিঞা কর, সে প্রেমে অপার অতুল আনন্দ পাবে। তাতে কুটিলতা নাই, সে নিৰ্ম্মল প্রেমে লজ্জা পাবার আশঙ্কা নাই, তাতে বিরহযন্ত্রণার ভয় নাই। মৃন্ময়ী। ভক্তিতেই কি তাকে পাওয়া যায় ? জ্ঞানা। তিনি ভক্তিহীন হৃদয়ে কখনও থাকেন না। জলশূন্য মরুভূমি আর ভক্তিহীন হৃদয়ে কোন প্রভেদ নাই। তিনি ভক্তের নিকট সর্বক্ষণ মৃন্ময়ী। থাকেন। ভক্তই তার বিভূতি দর্শনে সমর্থ । ভক্তি, প্রেম আর বিশ্বাস ভব-যন্ত্রণা দূর করবার একমাত্র উপায়। ভক্তি-সােপানে উঠে জ্ঞান- চক্ষুতে দেখতে পাবে যে, যা হতে তুমি প্রীতি অনুভব করেছ, তা দুঃখময়, যাকে তুমি আপন ভেবেছ, যার দুঃখে তুমি অধীরা হয়েছ, সে সমস্তই মিথ্যা; সে সমস্তই অনিত্য, সেই চিন্ময় ব্রহ্মস্বরূপই সত্য নিত্য। মৃন্ময়ী। বাবা ! আশীর্বাদ করুন, যেন জগদম্বার চরণে মন প্রাণ অর্পণ কর্তে পারি । জ্ঞানা। তথাস্তু, মা তােমা হতেই ঘােষবংশ উজ্জ্বল হবে। মৃন্ময়ী। বাবা! তবে এখন বিদায় হই। যদি আপনার আজ্ঞা মত কাজ করতে পারি, তাহলে দয়া ক'রে অবশ্যই আবার দেখা দিবেন। গিরি। ( প্রণামকরতঃ ) বাবা ! আশীর্বাদ করুন, যেন স্বামীকেই ইষ্টদেবতাজ্ঞানে তার চরণে জীবন উৎসর্গ করতে পারি। জ্ঞানা। মা তােমার অভিলাষ অবশ্যই পূর্ণ হবে। [ প্রস্থান। =
মৃন্ময়ী।
তৃতীয় দৃশ্য ।
( কক্ষ )
তরুবালা ও ক্ষীরদা আমীন।
ক্ষীরােদা। আজ কালকার ধর ধার দেখলে
সংসারে আর একদণ্ড থাক্তে ইচ্ছা হয় না।
আহা !
অমন দুদের ছেলে দেখলে অতি বড়
শত্রুও ফিরে চেয়ে দেখে, আর তুই বুড়াে মাগী
জেঠাই হয়ে অমন সােণার চাদকে দূর দূর
করে তাড়িয়ে দিলি ।
তরু। এতদিন কিছু বলিনি বলে দিদির বড় বড়
বেড়েছে, অনেক সহিচি, এবার একটা হেস্তনেস্ত
করে জল গ্রহণ করবে না ।
ক্ষীরােদা। অনেক বার ত তাের মুখে ওকথা শুনলুম,
কিন্তু তার ফল তাে কিছু দেখতে পেলেম না ।
তরু। করবাে কি বল। যার হাতে পড়েচি, বল্লেই
বলে, থানা ! আগে সব পথ ঘাট আঁটা আটী
করে বাঁধি, তার পর দাদার ঘাড় ভাঙ্গবে ।
মৃন্ময়ী।
ক্ষীরােদা। ওরে ছুড়ী বুঝিনি, দাদার মায়া কি
ভুলতে পারে? তুই যেমন নেকী ঐ বলে
তােকে ভুলিয়ে রাখ চে।
তরু। বুঝিছি, আর বােকা বানাতে পাচ্ছে না, আজি
একটা রক্তগঙ্গা করবাে।
ক্ষীরােদা। তুমি ত একজন। তুমিই বা কেন হাত
তােলায় থাকবে। বুঝতুম্ বাপের বাড়ী থেকে
তােদের খাওয়াচ্ছে, তা হলে নয় কিল খেয়ে
কিল হজম কল্লে কষ্ট হত না।
তরু। ওর বাপকুলের টাকা খাব! আর বাপের ভাত
জোটে না তার মেয়ের নাক মুখ নাড়া কি সয়।
ক্ষীরােদা। স’স বলে ত অত কুকুরতাড়া করে।
পরে ব’ল্পে নয় সইতুম, জা ভাসুর এদের
কথা কি প্রাণে বরদস্ত হয় ?
ক্ষীর। দেখি কি করি। তাের আস্ফালন শুনে
শুনে ত কাণে পােক ধরেচে, তাই তােকে আর
কিছু বলিনি।
তরু। দিদি ! তুমি অবধি আমায় পর কল্লে দেখ চি।
তা হলে তােকে মনের কথা বলবাে কেন!
তােকে কত ভালবাসি, তুই গিন্নী হ’বি, দেখে
ক্ষীর।
মৃন্ময়ী।
যদি যেতে পারি, তা হলেও জীবন সার্থক
হবে।
তরু। তােমার কাছে মনের কথা কই বলে আমার
জাএরা কত ঠাট্টা তামাসা করে। আমি কি তাতে
ভুলি ?
ক্ষীর। দেখিস্ বােন্! আমার যেন নাম গন্ধ না হয়,
আমার মাথার দিব্বি, রেগেও আমার নাম
করিনি যেন।
তরু। আমি কি কচি খুকি। আমার কি চোক নেই,
না। আমি কাণে শুনতে পাইনে।
ক্ষীর। কৰ্ত্তা আসবার কথা আছে, এসে দেখতে না
পেলেই ত্রিভুবন অন্ধকার দেখবে। এখন তবে
চলুম।
[ প্রস্থান।
তরু। কৰ্ত্তা এখনি আসূবেন ; ঠাণ্ডা কথায় আর
ভিজবাে না। একটা বিহিত না করে আজ
ছাড়চিনে। না হয় বাপের বাড়ী চলে যাব। আর
আস্বাে না।
[ ভূমিতে শয়ন।]
মৃন্ময়ী।
( নরেন বাবুর প্রবেশ )
নরেন। বলি, ঘর যে খাঁ খাঁ কচ্চে। গৃহলক্ষী আমার
গেলে কোথায় ? ( চারিদিক্ দেখিয়া ) সারাদিন
পরে ঘরে শান্তি পেতে এলুম, তা পােড়কপালে
কি শান্তি আছে ? গিন্নীত বেড়াতে বেরিয়েছেন,
“কা কস্য পরিদেবনা।”
(দরজার ধারে তরুবালাকে শয়নাবস্থায় দেখিয়া
চমকিত ভাবে ) একি! তরুর আজ এ অবস্থা
কেন? বুকের কাপড় জলে ভেসে গেছে। তরু!
মাথা খাও,বল কি হয়েছে। তােমার মুখ মলিন
দেখলে যে জগৎ অন্ধকার দেখে, যার জীবনের
ধনসম্পৎ একমাত্র তরু, যে তরু বৈ জানে না,
তাকে আর কষ্ট দিও না -একবার বল কি
হয়েছে।
দেখ, আমা হতে তার প্রতীকার
হয় কি না ?
তরু। অনেক ব’লেচি। যদি ভাল বাসতে ত অনেক
দিন তার উপায় কত্তে। আর কেন, আমায়
বাপের বাড়ী পাঠিয়ে দাও, কপালে যা আছে
তাই হবে।
নরেন। তরু! আজ তোমার মনের ভাব এমন হ’ল
১২
মৃন্ময়ী। কেন? তুমি কি আমায় অবিশ্বাস কর ! তুমি কি জান না যে, আমি একদণ্ড যাকে চোকের আড়াল ক’ত্তে পারিনি, তাকে বাপের বাড়ী পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারবাে? তরু। জায়ের নাতী খাওয়াবার জন্যেই রাখা। নরেন। তরু! কি বল্লে “জায়ের নাতী” কি হয়েছে খুলে বল। যে তরু চলে গেলে নরেনের কষ্ট হয়, যার মলিন মুখ দেখলে সংসার শূন্য বােধ হয়, আজ কি না তার অপমান শুতে হল। আমায় ধিক, আমার জীবনেও ধিক, মনুষ্য নামেও শতবার ধিক্। তরু। তুমি রাজা হও, আমার জন্য আর কষ্ট কত্তে হবে না। গােপালকে না হয় তার মামার বাড়ীতে ভিক্ষা করে মানুষ করবাে। নরেন। তরু! আজ কেন তুমি আমায় মর্মান্তিক কথা বলছো ? তুমি যদি আমায় যথার্থ ভাল- বাস, তবে বল, কি হয়েছে। আমি যদি তার প্রতীকার এখনই ক’ত্তে না পারি, তা হলে : মুখ আর দেখাবাে না। আমি বেঁচে থাকতে গােপাল মামার বাড়ী মানুষ ১৩
মৃন্ময়ী।
হবে, তা কখনই হবে না। তরু, কোন্
প্রাণে বল্লে ?
তরু। বলবাে আর কি, তােমায় কতবার বলেচি যে,
কেন আর আমায় তােমার ভাজের কাছে নাতী
খাওয়াও, তাও সহিচি; কিন্তু যখন দেখলুম যে
আমার গােপালকে দূর ছ্যা করছে, ঘরে গেলে
তাড়িয়ে দেয়, তখন বিষ খাইয়ে যে মারবে না,
তাই বা কে বলতে পারে ?
নরেন। বুঝেছি,আমার ছেলেটার হিংসায় দম
ফেটে সব মলাে। বড় বউ এর বড় স্পর্ধা
হয়েছে, আজ সব আপদ বিদায় করবাে।
[ বেগে নরেনের প্রস্থান
তরু। দেখি, আজ বীরপুরুষ কি করেন। আলাদা
হাঁড়ি না কেড়ে আর এবার ছাড়ছি না।
[ প্রস্থান।
১৪c
মৃন্ময়ী)
চতুর্থ দৃশ্য।
(বৈঠকখানা)
পরেশবাবু ও কুমুদিনী আসীন। ১০
পরেশ। আজ যেন তােমায় টুকটুকে ডালিমটীর মত
দেখাচ্ছে।
কুমু। অত ঠাট্টা কেন? আমায় মনে ধরে না, তাই
আমার চেহারা দেখে হাসূচো।
পরেশ। কুমুদিনি ! তুমি কি আমায় অবিশ্বাস কর।
তােমার জন্য কত লাঞ্ছনা ভোগ করেছি,
তােমার জন্য মাগ-ছেলেকে ত্যাগ করেছি,
তােমার জন্য ছার প্রাণ বিসর্জন দিতে পারি।
কুমু। বালাই, তুমি একশাে বছর বেঁচে থাক, আমি
কি জানিনি যে তুমি আমায় কত ভালবাস।
তুমিও ত ভাই দেখছ, আমি যদি তােমার
প্রেমের ভিখারী না হতুম, তা হলে কত বাবু,
কত বাড়ী, জড়ােয়া গহনা লােভ দেখিয়েছে,
আমি তাদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতুম না।
পরেশ। আমার মান, যশ, সম্পদ সমস্তই তুমি,
মৃন্ময়ী।
তুমিই আমার আধার-হৃদয়ের একমাত্র মাণিক।
তুমি কি আমায় ভাল না বেসে থাকতে পার,
পৃথিবী রসাতলে যাক্, চন্দ্র সূৰ্য্য কক্ষচ্যুত
হক,উল্কাপাতে ধরা ভস্ম হক, তথাপি
পরেশের প্রাণ-মন কুমুদিনী বই জাবে না।
পরেশের দগ্ধহৃদয় শীতল করবার কুমুদিনীই
একমাত্র ঔষধ। কুমুদিনীই পরেশের ইষ্ট মন্ত্র,
পরেশের প্রাণ। কুমুদিনি! নিশ্চয় জেন, আমি
তােমারই।
(গীত )
কুমু। জেনে শুনে প্রাণ মন সঁপেছি তােমারে।
তােমা ছাড়া অন্য কারে না ভাবি অন্তরে
বাঁধিয়াছি প্রেম-ভােরে, রেখিছি হৃদিপিঞ্জরে,
কভু কি পারিবে তুমি ভুলিতে আমারে।
পরেশ। চল, চল, কাল গঙ্গা নাইতে যাওয়া যাক।
কুমু। বেশ তো। যেখানে গেলে তুমি সুখী হও,
সেখানে যাব। তুমিই আমার গঙ্গা।
( লছমন সিংয়ের প্রবেশ )
লছ। খােদাবন্দ! গদাধর বাবু গেটমে খাড়া হায়,
মৃন্ময়।
কৈ জরুরি কাকা ওয়াস্তে মুলাকাত কমে
আয়।।
পরেশ। ( স্বগতঃ ). ঘরে গদাধর-বাহিরে গদাধর,
একদণ্ড সুস্থির হবার জো নেই বাবা।
( প্রকাশ্যে ) আচ্ছা সেলাম দেও।
[ লছমন সিংহের প্রস্থান।
তুমি কি গদাধরকে জান?
কুমুদিনী। তােমার দেই জানা শুনাে। লােকটা
বড় ধড়িবাজ, নয় ?
পরেশ । তবে তুমি ওকে চিনেচ। ও আবার এমনি
মন্ত্র জানে যে, যার সর্বনাশ করে, সেই আবার
বন্ধু বলে ডাকে, কিন্তু যদি কার উপর সদয়
হয়, তার জন্য মরতে পারে।
( গদাধরবাবুর প্রবেশ )
গদাধর। এই যে পরেশভায়া! তুমিই ভাই
জগতে একমাত্র সুখী।
সুখী। দেখনা,কেমন
নির্ভাবনায় দিন কাটাচ্ছ।
পরেশ। এত ঠাট্টা কেন? জ্বালার শরীর দু’দণ্ড না
আরাম পেলে কি বাঁচতে পারি।
১৭
মৃন্ময়ী।
গদাধর। মনে করােনা যে আমি হিংসে কচ্ছি।
থাক, আমার এটা দরকারি কথা ছিল ;
কথাটা—(মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে )
পরেশ। বেশ ত বলনা। এখানে ত অার কেউ
নেই, যে তোমার কথা ফাস করবে।
গদাধর। বলি, ছয়কাণ হওয়া কি ভাল ?
পরেশ। তুমি কি জাননা যে কুমুদিনী আমার
প্রাণ। জগতে এমন কি মূল্যবান্ বস্তু আছে,
যা পরেশ কুমুদিনীকে না দিয়ে নিশ্চিন্ত
থাকতে পারে! তুমি কি
তুমি কি কুমুদিনীকে
অবিশ্বাস কর ?
গদাধর। অবিশ্বাসের কোন কারণ নেই। তবে
দুজনে থাকলে প্রাণ খুলে পরামর্শটা হবে।
কুমদিনি! তুমি কিছু মনে করােনা। আমি
পরেশের ভাল'র জন্যই বলছি।
কুমুদিনী। ওর ভাল হলেই আমার ভাল ।
আচ্ছা, আপনারা কথা কন, আমি বাবুর
পাওয়ার জোগাড় করিগে।
[ কুমুদিনীর প্রস্থান।
মৃন্ময়ী।
গদ। দেখ ভাই, তুমিও যে বস্তু, আর শৈলও
সেই বস্তু ; শৈলের ভাল হক, আর তােমার
সর্বনাশ হ’ক, তা আমি দেখতে পারবাে না।
শৈল যে প্রকৃতির লােক, তা ত আর কারু
জাতে বাকী নেই। মা-ভাইকে পথে বসিয়েছে,
এখন জ্ঞাতিদের সর্বনাশের চেষ্টায় ঘুরূচে।
পরেশ। তুমি যে শৈলকে চিনতে পেরেচ,এই ঢের।
গদাধরের আর লােক চিনতে বাকী নেই,
তবে কি করি বল, মরে আছি।
পরেশ। এখন ভাই, আমার একটা গতি কর।
গদা। আমি সেই জন্যেই এসেছি, এখন তােমার
মত-সাপেক্ষ।
পরেশ। তুমি যা ক’রূবে তাই। আমার আর
মতামত কি ? শৈলর কাছ থেকে কাটান
ছিড়েন হয়ে বেরুতে না পালে আর স্বস্তি
নেই।
গদা। এখন কাজের কথা বলি—কুমুদিনীর অনেক
টাকা আছে,তার কাছ থেকে নিয়ে শৈলের খত
খালাস করলে হয় না?
পরেশ। গদাধরের দেখছি মতিভ্রম হয়েছে। কুমু
।
মৃন্ময়
দিনীর কাছে মহামহিম লিখলে কি ঘােষ
বংশের মান হবে? ছি ! ও কথা আর মুখে
এনাে না।
গদা। আমার যুক্তিটা আগে শােন, তার পর যা
ববার বলো। কুমুদিনীর টান তােমার উপর
আঠার আনা, তুমিই খাতক হচ্ছ, আবার এক
রকম তুমিই মহাজন। কুমুদিনী কি কখন
তােমার টাকার তাগাদা ক’তে পারবে।
পরেশ। তবে যাতে ভাল হয় কর, আমার আর
মত দেবার দরকার নেই।
গঙ্গা। একবার তামাক ডাক, বুদ্ধিটায় ধে। দিয়ে
পাকিয়ে নি। আজই সব ঠিক করে তােমায়
নিতি দেবাে।
পরেশ। তবে তুমি বস, আমি তামাক পাঠিয়ে
দিচ্চি।
গদা। তােমার সানে সব কথা শেষ হলেই ভাল
হয় না ?
পরেশ। তুমি যখম আছ, আমার আর দরকার কি?
আমায় যা কত্তে বলবে তাই করবো। কুমুদকে
তবে ডেকে দি। [ পরেশের প্রস্থান।
।
মৃন্ময়ী। গদা। অনেক করে ত বাগান গেল, এখন কাজটা শেষ করে নিতে পারলেই সব ফরসা। ( কুমুদিনীর প্রবেশ ) এই যে কুমুদ, তােমার কুমুদিনী নাম না হয়ে কমলিনী নাম হ'লেই ঠিক্ হত। বলি আম- দের ভাগ্যে এক কলকে তামাকও জুটবে না। কুমু। কেন ভাই! তােমার বাড়ী, তুমি হুকুম কল্লেই ত হত। গা। তােমায় দেখলে কি খিদে তেষ্টা থাকে। তামাকের সাধ তােমায় দেখেই মিটে যায়। তবে আমি গরীব, তােমার মধু কি আমরা খেতে পারি ? পাবার আশা-আশা করাও পাগলামি। কুমু। প্রেমের কাছে রাজা ফকির নেই। আমরা টাকার কাঙ্গাল নই। গদা। এখন একটা কাজের কথা কই, তারপর আমােদ করা যাবে। পরেশ ত শৈলের টাকা ধারে, এক সেই টাকার জন্য খুব বেঁধেছে। কুমু। কত টাকা ধারে, শুনেচি ত অনেক টাকার বিষয়।
মৃন্ময়ী। যার অত, গদা। বিষয় অনেক টাকার তার আর সন্দেহ নাই, তবে পরেশ ত মানুষ নয়। শৈলের টাকা ফেলে দেবার জন্যে বড় ব্যস্ত হয়েছে। কুমু। ফেলে দিলেই ত হয়। টাকার, বিষয়, সে দু-দশ হাজারের জন্য এত মাথা ঘামায় কেন ? গদা। কেন পরের হাতে বিষয়টা যাবে বল ? তােমার হাতে থাকলে পরেশের টিকী বাঁধা থাকবে, আর আমরাও তােমার কাছে মাঝে মাঝে সন্দেশ মােণ্ডা খেতে পাব। কুমু ? ওকে টাকা দিলে ত ক্ষতি নেই- তবে লেখা পড়াটা বাধাবধি হ'লে ভাল হয়। গদা। তাই হবে। আমি সব ঠিক করে তোমায় বল্বাে। এই মার্সেই টাকা নেবে, আজ আমি চলুন; পরেশকে বলাে, কাল দেখা করে যা ক’ত্তে হয় ব’বাে। তােমায় একটা কথা বলি, ভাই করাে—খুব দরদূ। দেখাে, যেন রসবড়া খেয়ে ভুলে থেকো না । ( গমনােছত ) -
মৃন্ময়ী।
কুমুদ। শীগগির আসবে ত ?
গদা। বড় টান্ দেখছি! ছিড়ে না যায় ।
কুমুদ।
ভয় করােনা, সবুরে মেওয়া ফলবে।
[ উভয়ের প্রস্থান।
২৩,
৪
সে
। । । '
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
( শয়নাগার )
কিরণ ও মনােরমা আসীন।
কিরণ। মেজ বউ-মা চন্দ্রনাথ দেখতে যাবে বলে
ছিলো, যাবার কি দিন স্থির হয়েছে ?
মনােরমা। দিন ঠিক হ'লে—তুমি কি জানতে না?
পুরুতঠাকুর এ মাসে যেতে নিষেধ করেছেন।
কিরণ। কে কে যাচ্ছে?
মনােরমা। মেজবউ, আমি আর ছােট-ঠাকুরপাে।
তাকে ত একলা পাঠান যেতে পারে না।
কিরণ। আমি বেঁচে থাকতে আমার যতেনের স্ত্রী
একলা যাবে, তাও কি সম্ভবে। আমার হৃদয়ের
২৫
মৃন্ময়ী।
অমূল্যনিধিকে হারিয়েছি, কিন্তু বউমার
গুণে-একদিনও জাতে পারিনি যে, বাছা
আমাদের ছেড়ে গেছে।
মনোরমা। অামাদের কপাল মন্দ যদি না হবে,
তা হলে এমন জিনিস খাব কেন। মেজবৌ-
এর গুণ কি জীবনে ভুলতে পারবাে ? অমন
জা যেন জন্মজন্মান্তরে পাই।
( নরেনের প্রবেশ )
কিরণ। এই যে, নরেন এসেছে।
তােমার বউ
দিদিকে নিয়ে একবার চন্দ্রনাথটা বেড়িয়ে
এস না।
ঘনোরমা। ছােটবউও চলুক, পােপাল আর
কামাই দুজনে বড়বাবুর কাছে থাকুক। কেমন
ঠাকুরপাে! চল, তােমার কল্যাণে চন্দ্রনাথতীর্থ
ক'রে আসি।
নরেন। আর তীর্থে যেতে হবে না। দাদা বলে
ঢের সয়েচি, আর বােকা বানিয়ে একত্র রাখতে
পারূচেন না। এখন আপনি আপনার পথ চিন্তা
করুন, আমি আমার ভাবনা ভাবি।
ফিরণ। কেন ভাই। কি হয়েছে বল। তােমায়
গ
.
মৃন্ময়ী। দাদা? ছেলেবেলা থেকে মানুষ করেচি। ভাই কি পর হয় ? তােমায় ত আমি জীবনে কখনও অযত্ন করিনি। যখন যা পেয়েছি, আগে তােমা- দের দিয়েচি; আমি কি তােমাদের তেমনি , কেন ভাই এমন মর্মভেদী কথা ব’চো! নরেন। কথা বাড়ালেই বাড়ে। বৌঠাকুরাণীর গুণের কথা আর বলবার নয়, আপনি সে সব ত দেখবেন না। কেবল ভাই ভাই ক'লে কি সব বজায় থাকে । তাও যা করেন, তা লােক- দেখান। কিরণ। তােমার বৌদিদি তােমায় মাইয়ের দুধ খাইয়ে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। সে কি কখনও তােমাদের অযত্ন করূতে পারে ? কোথাও কোন ভাল খাবার পেলে-কানাইকে দিয়েও তােমাদের জন্য রাখে, আর তার নামে—পরের কথা শুনে কেন দোষ দাও ভাই? নরেন। স্ত্রীর দোষ কি স্বামীতে দেখতে পায়, বিশেষতঃ আপনার চোখে তার গুণ বই কি দোষ দেখা সম্ভব ? সে বিষয় আর তর্ক করে
মৃন্ময়ী।
কিরণ।
কি হবে। যখন মনের মিল হচ্ছেনা, আপনি
দোসরা জায়গায় গিয়ে থাকুন্ না? একটা
হট্টিচট্টি করে যাওয়া কি আপনার পক্ষে
মঙ্গলজনক হবে ?
নরেন! তােকে মানুষ করেছি, তুই
ছােট ভাই। পরের কুমন্ত্রণায় ঘরটা ভেঙ্গে
দিলি। একবার একটা জিনিস ভাঙ্গলে তা কি
সহজে গড়া যায় ? শত্রুপক্ষরা হাসূবে,-এ
সময় তাের অনেক মিত্র জুটবে। কিন্তু ভাই।
একবার ঠাণ্ডা মেজাজে ভাব দেখি, যে আমা-
দের পরিণাম কি হবে। বাবার আশীর্বাদে
মানসম্রম যা হয়েছিল—তা যাবে, বিষয়াদি
নষ্ট হবে, পাঁচ ভূতের সুখ বাড়বে।
নরেন। আমায় আর বেশী বুঝাতে হবে না, এখন
বড় হয়েচি। মাগ ছেলেকে কি পথে বসাতে
বলেন ? আমার ইচ্ছামত কাজ করবে, তাতে
কপালে যা থাকে, তাই হবে।
[ নরেনের বেগে প্রস্থান।
কিরণ। বিশবৎসরের চেষ্টা পরিশ্রম একদিনেই
প হ'লাে। সংসার যে গরলে পরিপূর্ণ, তা
মৃন্ময়ী। এতদিন জানতে পারিনি। যতেনের বিয়ােগ- জনিত শােক দুঃখ নরেনের মুখ দেখে ভুলে- ছিলুম। নরেন আমার একমাত্র বল, বুদ্ধি, ভরসা, আজ হতে সে ভাইও আমায় ত্যাগ ক’রূলে। আমার ভগ্ন-হৃদয়ের ক্ষুদ্র আশা সমুলে নিৰ্ম্মল হ'লাে। মনােরমে! তােমর দোষ কি বল, তুমি কেঁদোনা। আমার অদৃষ্টে যা লেখা আছে, তা অবশ্যই ঘটবে। আর কেঁদো , আমার হাতে পড়ে অনেক কান্না কাঁদতে হবে। এস, মানে মানে এখন বিদায় হই। মনােরমা। তুমিই জীবনের আরাধ্য দেবতা। তােমার আমার সুখ। তােমার হাতে মা বাপ দিয়েছেন ; তুমি যেখানে যাবে, তােমার সঙ্গে যাব। ত্রিশ বছর শ্বশুর ঘর ক’চ্চি, একদিনও ভাবিনি যে, সােনার সংসার ছারেখারে যাবে। আমা হতে এ সংসার ছাড়লে, আমা হতে তোমার ভাই, ভায়ের বৌ জ্বালাতন হলাে ; এ অপযশ এমন কষ্ট কি আমার মলেও যাবে। মা কাত্যায়নি। তোমার কাছে আগে নরেন-গােপালের মঙ্গল সুখেই .
সী।
;
প্রার্থনা করেছি ; তারপর আমার কানাইয়ের
জন্য মেনেছি ; মা! তার পরিণাম কি এই
হলাে? নরেন! তুমি যে তােমার দাদাকে বাড়ী
থেকে চলে যেতে বলে, তােমার বৌদিদিকে
কড়া কথা শুনালে, তার জন্য আমি দুঃখিত
নই; কিন্তু ভাই! মনে বুঝে দেখ যে, তােমার
বৌদিদি কত কষ্ট করে তােমায় মানুষ
করেছে। তােমার কোন কষ্ট হয়, ছােটবৌ
পাছে কিছু মনে করে, তার জন্য নিজের শরীরের
পানে একবার চাইনি ; যেখানে যা পেয়েছি,
তােমাকে—এমন কি নিজের ছেলের হাতে না
দিয়ে তাদের দিয়েছি। এখন কিনা আমি
তাদের পর হলুম,—তােমাদের ঘর ভাঙ্গলুম !
কিরণ। এখন তা বলে , আর কি হবে বল ।
স্বল্বার আর দরকারও করে না। গােছগাছ
করে নাও, সকাল বেলাই বিদেয় হব।
মনােরমা। ঘর ছাড়বে, বিষয় ছাড়বে, আর দুটো
চারূটে পেটরা, আর দু দশখানা কাপড়ের
মায়া কি ছাড়তে পার না ?
কিরণ। মনো! আমি কে, আর আমারই বা
মৃন্ময়।
কে ? ধর দজা আমি সঙ্গে করে আনি নাই,
সঙ্গে নিয়ে যাবার আশাও রাখি না।
ঈশ্বরের যা ইচ্ছা, তাই হবে; আমি উপলক্ষ
মাত্র। তােমার কি বাড়ী ঘর ছেড়ে যেতে মন
সরছে না ?
মনােরমা। যাকে দেবতাজ্ঞানে সর্বদা পূজা করি,
যার হাতে হাতে আমায় মা বাপ সঁপে দিয়ে-
ছেন, তঁার অপেক্ষা কি ঘরবাড়ী টাকাকড়ি ?
স্বামীর সুখেই স্ত্রীর সুখ। তুমি বনে কি
পর্বতে যেখানে যাবে, এ চিরদাসী তোমার
সঙ্গের সাথী হবে। তুমি যাবে, আর আমি
कि
সুখে এখানে থাকব।
কিরণ। তবে শীঘ্র গােছগাছ করে নাওগে, ভায়ের
সঙ্গে যেন হাড়ী-ছোমাই ক’ত্তে না হয় ।
মনােরমা। মা কাত্যায়নীকে ছেড়ে যেতে কি মনে
কষ্ট হচ্ছেনা।
কিরণ। অর্থ নাই যে ঐমী খরিদ করে মার্কে
বসাই, তার নিত্য সেবাদি করি। নরেন আমার
ভাই, সে মার পূজা করবে, তার কাছে মা
থাকবে, তাতে আবার কষ্ট কি ?
মৃন্ময়ী।
মমো। আমি মাকে সঙ্গে নিয়ে যাব ।
কিরণ। মমােয়মে! তুমি কি নরেনের সঙ্গে ঝগড়া
কর্তে বল।
মনো। এ সমস্ত অপবাদের ভাগী আমিত হবুই।
যে জায়ে জায়ে ঝগড়া করে সংসারের সুখ
শান্তি নষ্ট করে, তাকে ত আমি পশু বলি।
স্বামী স্ত্রীয় গুরু ইষ্টদেবতা। তুমি যদি ঝগড়া
করতে, তাহলে আমি জলে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ
বার করতুম। মাকে নিয়ে যাব, তাতে .
ঝগড়া কিসের ?
কিরণ।
দেখে নিও।
মননা। স্বামীর পদে যদি মতি থাকে, তার চরণ যদি
এক মনে পূজা করে থাকি, তাহলে বিনা কলহে
কাজ হাসিল কব।
কেমন করে ?
মননা। যেখানে যাব, মার চরণকম হৃদয়ে একে
রেখে দেব। যেখান ই’তে চোর চুরি করে
আতে পাবে না। রাজার যেখানে অধিকার
মাই, নরেনের সঙ্গেও বিবাদের আশঙ্কা নাই,
ভয়ে ভয়ে ঝগড়ার যেখানে সাবনা নাই।
কিরণ।
স্ময়ী।
কিরণ। তােমার মত স্ত্রী সঙ্গে থাকলে বিপদ সম্পদ
বঁলৈ বােধ হবে। মনােরমে, আর দেরি কর
না। মেজ বৌমা এ দিকে আসছে। আমি
নৌকার ঠিক হল কি না জেনে আসি।"
[ কিরণের প্রস্থান।
( মৃন্ময়ীর প্রবেশ।)
মৃন্ময়ী। দিদি ! একি সর্বনাশ হলাে। তরুর মনে
কি এই ছিল ? ( ক্রন্দন )
মনোরম। দেখ, বােন্! আমিই ত এই সমাশের
এ রাক্ষসী কেন মার পেটেই মরেনি।
আমার জন্যে স্বামীকে স্বর বাড়ী ছাড়তে হলো,
দৈওর জা অসুখী হলাে, শেষে সােনার-সংসারে
আমা হতেই আগুন লাগলো। ঘর-ভাঙ্গা ঘরের
মেয়ে, এ অপযশ-এ কলঙ্ক কি রাখবার
জায়গা আছে। যম কি আমায় ভুলেছে ।
মৃন্ময়ী। দিদি কেঁদে আঘ্ন কি করবে বল। বেটা-
ছেলে মেয়েমানুষের বাধ্য হলেই ঘর সংসারে দ
পড়ে। একটা ছুতাে করে ত গিন্নি হতে হবে।
তুমি যে রকম আমাদের মার মত কর, তাত
একবার তরু ভাবলে না।
মূল।
ও
মৃন্ময়ী।
মনােরমা। আমি আর কি কত্তে পালুম বল।
মৃন্ময়ী। দিদি মাথা খাও আর কেঁদোনা, আমি
একবার ঠাকুর-পাের কাছে যাচ্চি, দেখি কি
কতে পারি।
মনােরমা। তোমার ভাসুর আর এক দণ্ড থাকবেন
না বম্নেন।
মৃন্ময়ী।
তােমরা যেথায় যাবে আমিও যাব, যদি
বাঁচি ত গােপালের বের:সময় আসা যাবে।
মনোরম। তুই কার জিনিস! আজ কোথায় রাজার
রাণী হয়ে ঘরে থাকবি, না একজন বিহনে
ততাকেও আমার জন্য ঘর বাড়ী ছাড়তে হবে !
( ক্রন্দন )
মৃন্ময়ী। একবার দেওরকে বলিগে। যদি তার মন
নরম কত্তে না পারি, তা হলে আমার কাপড়
নিয়ে প্রস্তুত হই। ভাসুর যা বলেন, তুমি তাই
করছে।
[ মৃন্ময়ীর প্রস্থান।
মনোরমা। গােছ গাছ আর কি করবাে, ঘরবাড়ী
যখন ছেড়ে যাচ্ছি, তখন কেবল পরবার গুলাে
নিয়ে মা-কাত্যায়নীর চরণ দর্শন করে আসিগে।
মৃন্ময়ী।
যাবার সময় নরেন আর ছােট বউকে আশীর্বাদ
করে চলে যাব। চখের জল ফেলব না,
তাদের অমঙ্গল হবে।
[ প্রান।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
উদ্যান
শৈল ও গদাধর আসীন।
গদা। যে কল খাটিয়েছি, আপদ বালাই সব বিদায়
করবাে। পথে কাঁটা বেধবার ভয় ঘুচাব।
এখন চার ধল্লেই কেল্লা ফতে।
শৈল। তােমার মতন বন্ধু পেয়েছিলুম, তাই সব
দিকেই জয়জয়কার। তােমার ঋণ কি এ জীবনে,
পরিশােধ করতে পারবে। পরেশ কিরণ দুটো
আপদ বিদায় হলেই আমার মওড়া রাখে কে।
গৃহশত্ৰু মা ভাই এদের বিদায় করেছি, এখন
পাপকে দূর করে দিতে পারলেই লেটা চোকে।
গদা
। আমায় অধিক বলা বেশীর
আমি যখন তোমায় কথা দিয়েচি, তখন তােমার
জন্য এই প্রাণ পৰ্যন্ত পণ। এখন কাজের
।
ভাগ।
১১
মৃন্ময়ী।
কথা বলি শােন, আমি নরেনকে রাজি কচি।
তুমি পরশু খত নিয়ে কুমদিনীর বাটীতে ১২টার
মধ্যে তােমার যাওয়া চাই। এ কথা ভুলাে না।
শৈল। নিশ্চয় যাব। তুমি কখন যাবে ?
গদা। আমি সেখানে সকাল বেলা যাব। আমি
দলীলপত্র লিখিয়ে সব ঠিক করে রাখবাে, তুমি
গেলেই টাকা পাবে।
[ গদাধরের প্রস্থান।
শৈল। লােকে বলে—পাপ করলেই ভুগতে হয়,
কিন্তু ঠিক তার বিপরীত দেখচি। পাপ পুণ্যে ত
তফাৎ কিছুই নেই। আমার কাজ তােমার কাছে
পাপ বলে বােধ হতে পারে, কিন্তু আমি পাপ
কাজ ক’চ্চি কি পুণ্য কাজ ক’চ্চি, তা পরে কি
কিরণ ভায়া পুণ্য করে ত ধৰ্ম্মের
ঝুড়ি ঘরে বােজাই ক'ল্লে এখন তাকে ঘরবাড়ী
ছাড়তে হ’ল। আজকাল ধৰ্ম্মকর্মের
মুখে
আগুন।
(নরেনের প্রবেশ)
নরেন। শৈলদা! তুমি ত দাদা সব শুনে ?
বুঝবে ?
মৃন্ময়ী
৯
শৈল।
শৈল। তুমি যে এতদিনের পর বুঝতে পেরেট,
তাই তােমার পক্ষে মঙ্গল। আমি তােমায়
জ্ঞাতি ; আমি এতদিন বলিনি, পাছে তুমি অন্য
রকম ভাব।
নরেন। আমি সব লােক চিনিচি! তাই বুঝি
দাদা ! তােমার কাছে আসতে বারণ কৰ্ত্তেন।
তা তরবারি কথা। এখন কি বলেন ?
নরেন। ব’বেন আর কি ? এখন যদি সহজে না
বিদায় হন, আপনাকে একটু প্রকাশ্যে সাহায্য
করতে হবে।
শৈল। না যায়, ঘাড় ধরে বার করে দেবে, ঘর
বাগান তােমার নামে ; বিষয় তিনভাগ তােমার
নামে। যদি আক্কেল থাকে ত ঘাড় হেঁট করে
চলে যাবে।
নরেন। যদি জোর করে, তা হলে কি করবাে ?
শৈল। জুতাে মেরে বিদায় করবে। শেষ রক্ষা
আমি করবাে।
শরেন। কাল সকাল বেলা একবার যদি বেড়াতে
বেড়াতে যাও তাহলে আর আমার ভয় থাকে না।
শৈল। ভয় কি! তুমি ছেলে মানুষ তাই ভয় খাচ্চ
ক্ষী।
আচ্ছা, আমার ডাক’তে পাঠিয়ে, আমি যাব।
আজ বড় রাত হয়েছে, চল সােয়া জাগে।
[ উভয়ের প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য।
(অন্দরমহলস্থিত দালান )
মৃন্ময়ী ও তরুবালা আসীনা।
উরু। মেজদি! তােমার কি আজ অসুখ করেছে ?
মৃন্ম। আমাদের আবার অসুখ। যম কি আমাদের
কখন ডাকবে, না, আমরা মবাে। যে জিনিস
পেটে পূরিচি, আগে তাই হজম করি, তার পর
মবার ভাবনা করবো।
তরু। কি ক’রূবে বল, আমাদের কপাল মন্দ, তা
হলে এ সর্বনাশ ঘ’বে কেন।
মৃন্ম। কপালে যা ঘটবার তা ত ঘটেছে, মনে করে
ছিলুম, যে ক’দিন বাঁচবাে, তােমাদের দুজনের
আশ্রয়ে থাকবে। তা এনি পােড়াকপাল,
তাতেও বিধি বাদ সেধেছে। এখন কপালে যে
কি হবে তাই ভাবচি।
তরু। চিরদিন ত ভাই ভাই এক থাকে না, তার
জন্যে তােমার দুঃখ কি বল। তুমি যখন যার
কাছে থাকবে, সে তখন তােমায় মাথায় করে
রাখবে।
মৃন্ম। আমি যখন অমন জিনিস খেয়েছি, তখন এ
পােড়া পেটের ভাবনা ভাবিনি। ঈশ্বর যখন
সংসারে পাঠিয়েছেন, দিনান্তে এক মুটো ভাত
কি আর জুটবে না। তােকে ছােট বােনের মতন
ভাল বাসি, তাই তােদের সর্বনাশের রকম দেখে
কত কি ভাবছি, আর মনে মনে কাঁদূচি।
এতে আমাদের সুখ বই ত দুঃখ হ’বার কোন
কারণ দেখি না। নিজেদের ইচ্ছামত কাজ
করতে পারবাে। পরের ভাবনা আর ভাবতে
হবে না, ছেলেটাকে মনের মতন খাওয়াতে
পরাতে পারবে। এ সব চেয়ে সুখ আর কি
আছে ?
মৃন্ম। মার পেটের ভাই, যার চেয়ে বন্ধু জগতে আর
নাই, সে ভাইকে পর করালি। তাের বে দিয়ে,
এনে, মেয়ের মতন যত্ন করে তােকে মানুষ
কল্লে? এখন সেই দিদি তাের চক্ষুশূল হলাে ?
:(
रो কালের স্বধৰ্ম্মই বটে! সুখ দুঃখ এখন কি বুঝবি, দুদিন যাক, তখন বুঝতে পারবি। এখন যা ভাব’চ, তখন কিন্তু বলতে হবে, “যে তরু বেশ সুখে আছি”? মৃন্ম। দেখ চি তাের মতিভ্রম হয়েছে। তা নইলে অমন দেবতুল্য ভাসুরের মনকষ্ট দিবি কেন। ভদ্রলােক বড় মানুষের মেয়ে হয়ে এত নীচ- তার পরিচয়। এতে কি তাের ভাল হবে ! (নরেনের প্রবেশ।) নরেন। মেজ বউদি, তােমার সঙ্গে এখন দেখা হয়ে ভালই হল। আপনি ত সব নেচেন। মৃন্ম। আমার মাথামুণ্ডু আর শুনবাে কি। তােমা- দের অমঙ্গলের কথা শুনলে প্রাণ কাঁদে, তাই ভাল মন্দ শুলে ছুটে বলতে আসি। এখন তােমরা বড় হয়ে’চ, এখন কি আমার মতন সামান্য স্ত্রীলােকের কথা আর থাই পায়। নরেন। কথার মতন কথা হলে কেন শুনব না ? তবে আমরা বেটাছেলে, আপনাদের চেয়ে অনেক
মৃন্ময়ী।
বুঝতে পারি
এখন একটা কথা বলি, যদি
ভাল লাগে ত কর। আমাদের পৈত্রিক বিষয়
সব আমার আর মেজদার নামে বেনাম করা
আছে। দাদার কারবার শেষ হলে, মেজদা
দু-চারবার দাদার নামে লিখে দেবার কথা বলে
ছিলেন; কিন্তু মেজদা তার পর ব্যায়ামে পড়ায়
লেখাপড়ার কথা আর ওঠেনি। এখন দাদা,
তােমার ও আমার অনুগ্রহ ভিন্ন কিছু পেতে
পারেন না। আমি তার ব্যবহার দেখে এক
কপর্দক দিব না স্থির করিচি। এখন আপনার
সম্বন্ধে কি কবেন।
মৃন্ম। নরেন! তুমি কি পাও, তােমার শরীরে
কি মায়া মমতা নাই। ছেলে বুড়ো সকলে
তােমার এই কুৎসিত ব্যবহার শুনূলে একমনে
তােমার অমঙ্গল ' প্রার্থনা করবে। নৃশংস
চণ্ডালও তােমার আচরণে ব্যথিত হবে। মৃত্যু-
কালে তােমার মেজদা যা বলে গেছলেন, তা
কি সমস্ত ভুলে গেলে ! সামান্য অর্থলােভে
অন্ধ হয়ে, পরের কুমন্ত্রণায় এই জঘন্য অমানুষিক
ঘৃণিত কাৰ্য ক’ত্তে উদ্যত হয়েচ। তােমার জ্ঞাতি
उनो। দের দেখে কি তােমার চোখ ফোটেনি। আমায় কত উসূকেচে,যাতে তােমাদের সঙ্গে মনান্তর হয়, তাও কি তুমি জান না ! নরেন, এখন তুমি বুঝতে পাচ না, এজন্য পরে কষ্ট পেতে হবে। তুমি যে পাপ কাজ কলে তার ফলভােগ ক- তেই হবে। লােকে তােমার নাম মুখে আতে সাহস করবে না। জনসমাজে তােমায় সকলেই ঘৃণা করবে। নরেন। বাঁচতে গেলেই টাকার দরকার, বিশেষতঃ আপনি স্ত্রীলােক বুঝতে পাচ্ছেন না। মৃন্ম। আর তােমায় অধিক ব’তে চাইনি, তােমা- দের হাড়ির হাল হবে। [ মৃন্ময়ীর বেগে প্রস্থান। মেজ বউ বড় গরম হয়েছে। বড় বউএর হয়ে ওকালতী ক’রুতে এসেছিলেন। আমাদের অভিসম্পাত দিতে কষ্ট হলাে না, উনি কি না আমাদের হিত করতে এসেছিলেন ? ও সব ঢের বুঝি। নরেন। ও সব ওকালতীতে কি নরেন ভেজে। ০)
মৃন্ময়।
এখন চল শুইগে। কাল যদি দাদা না যান,
তবে তার ব্যবস্থা করবাে। রাত ৪টার সময়
কিন্তু উঠতে হবে।
[ উভয়ে গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ।
চতুর্থ দৃশ্য।
( দেবালয় )
মনােরমা, মৃন্ময়ী ও কানাই আসীন।
মননা। (সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত) মাকে জম্মের মত
দেখে নিই। মার যদি দয়া থাকে,আর মাকে যদি
মা বলে ডেকে থাকি, তাহলে কি মা তুমি
আমাদের ফেলে থাকতে পারবে। ( ক্রন্দন )
মৃন্ম। মা ! জীবনটা কেঁদে কেঁদেই কেটে গেল।
প্রাণ যখন অধীর হয়, তােমায় মা মা বলে ডেকে
এ পোড়া মন্কে কত প্রবােধ দিই। কিন্তু মা !
যদি হতভাগিনীর চোকের জলে তােমার মনে কষ্ট
হত, তাহলে আমার জীবনের কান্না শেষ হয়ে
যেতো। তুমি জগতের মা,কত লােক বিপদে পড়ে
তােমায় বিপদবারিণী ত্ৰিতাপহারিণী বলে ডা’চে,
তুমি যদি একলা আমার মা হ’তে, তাহলে কি
মৃন্ময়।
জায় আমায় কঁাদতে হত। আর আমি কঁাবে।
মা। কেঁদে ত তােমার সাড়া পেলুম না। মা
মা বলে হেসে তোমায় ডাক্বাে ; তুমি তাহলে
অবশ্যই আমার হাসিমাখা মা-বুলিতে দয়া করবে।
আমি আমার মার কোলে যেতে কষ্ট পাব না।
মা মরবার সময় আমার হৃদয়ে সংসার চিন্তার
পথ অবরােধ করে দাড়িও, তােমায় দেখতে
দেখতে তােমাতেই যেন আত্মসমর্পণ ক’ত্তে
পারি।
মননা। কানাই। অামরা মাকে প্রাণ ভরে দেখে নিই।
তাের কাকা ও কাকীমাকে একবার ডেকে আন।
যাবার সময় তাদের দেখে যাই।
[ কানাইয়ের প্রস্থান।
মৃন্ম। পুরুতঠাকুর! দিদিকে অর্ঘ্য দিন।
(পুরােহিত কর্তৃক অর্ঘ্য-প্রদান )
(যশােদার প্রবেশ)
যশাে। ঘোষ-বংশের গৃহলক্ষী এত দিনের পর
ছাড়লো। কেউ যদি অভুক্ত হয়ে বাড়ীতে
.
सो
আসতো,মা আমার না খেয়ে তাকে পেট ভােরে
খাওয়াত, কেউ কোন দায় জানালে লুকিয়ে
তার দুঃখ দূর কত্তেন। মা তুমি চল্লে আমাদের
দশা কি হবে ।
মনে। আশীর্বাদ করুন। তরু যেন হাতে নাে
রেখে একা এক্স হয়ে সব বজায় রাখে।
তােমাদের মা ভাবনা কি, তােমরা যেমন
আসতে তেমনি এসাে, তরুকে দেখাে।
( তরুর প্রবেশ)
তরু। তােমরা আজই চল্লে ।
মনাে। তােমর ভাসুর যখন যেখানে যাবেন,
আমায় তখনি সেখানে যেতে হবে। তােমাদের
সঙ্গে দেখা করে তােমাদের আশীর্বাদ করেই
নৌকায় উঠবে।
তরু। বজরা করে কোথায় যাবে।
মনন। তাঁর যেথা মন যাবে, আমি তা কি করে
জাবাে। তরু, অনেক দিন এক সঙ্গে কাটিয়েছি,
আমি মনে নে তোদের যাতে অকল্যাণ হয়,
তা করিনি; যদি কখন ভুলেও কোন কিছু
মুম্বী।
বলে থাকি, তা বড়দি বলে কিছু মনে করিনি।
মৃন্ম। আজ তােদের কত কড়া কথা বলিচি।
আপনার ব’লে বলিছিলুম, তার জন্যে নাগ
করিসনি ত ?
তরু। বলতে ত আর কসুর করনি! সে সব আর
তুলে কি দরকার ?
মনো। আমি নয় দুষ্ট বজ্জাত, মৃন্ময়ী বজ্জাত
হলেও আমরা কেউ ওকে ফেলতে পারুবাে
কি ? ওর কথায় বােন কিছু মনে করিনি।
তরু। তােমরা কি ঝিটাকে অবধি নিয়ে চল্লে ।
মননা। দেশ ছেড়ে যখন যাচ্চি, তখন আর ঝি-
চাকর আমার দরকার কি ? ঝি গেলে যদি সং-
সারে কষ্ট হয় , তা নয় ঝি থাক।
ঝি। না মা আমি থাক্বাে না। কানাইকে মানুষ
করিচি, কেমন করে কামাইকে ফেলে থাকবাে।
মার চেয়ে পাড়া পরশীর দরদ বেশী হবার ত
কথাই। তুই যা দেখি, বাবুকে বলে তাের জায়গা
জমী সব কেড়ে নেয়াবাে। বেটীর দরদ যেন
গড়িয়ে পড়ছে, দেখে হাড় জ্বলে যায়।
ঝি। আমার তিনকুলে বাতী দিতে কেউ নেই,
उसो
স্ট।
জায়গা জমীতে দরকার কি? কানাই বেঁচে
থাক,রাজা হোক, আমি একমুটোর জন্য ভাবিনা !
( নরেনের প্রবেশ )
নরেন। এখানে এত গােলমাল কিসের?
তরু। ঝি বেটীর আস্পর্ধা দেখ না! বেটী এখন
লােক চেনেনি।
নরেন । কি হয়েছে ।
মৃন্ম। ঠাকুর-পাে কিছু ত হয়নি ভাই, তবে তরু
ঝিকে যেতে বারণ করছিল। ঝি বল্লে কানাইকে
ছেড়ে থাকতে পারবো না।
মনন। ঝি তুই মা থাক, তরুর কষ্ট হবে।
কত দরদের দরদী গা। নিজের কষ্ট হবে
বলে, তরুর ভাবনা ভেবে ভেবে সারা হলেন।
মননা। তরু সােজা কথায় কেন বােন মন গরম
করি। আমরা চলে যাচ্চি; আর হয়ত দেখা
হবে না। যাবার সময় কি দুটো হেসে কথা
বলতেও নেই ?
হেসে কথা কইবার কি পথ রেখেচ।
মৃন্ময়ী। দিদি কথা যত বাড়াবে তত বাড়বে।
L
L
अभयो
তরু কি তােমার ভালটা দেখবে। তােমরা
বিদায় হয়ে গেলেই প্রাণের হাসী হাসবে।
মনন। ঠাকুর-পাে তবে ভাই
চলুম,
দীর্ঘজীবী হও,
গােপাল রাজা হােক, বেঁচে থাকি ত গােপালের
বের সময় আসবে। ভাই তােমদের ঢের কষ্ট
দিয়েছি, বােন বলে কিছু মনে করাে না।
(কিরণের প্রবেশ)
কিরণ। ( প্রণাম করতঃ ) মা কাত্যায়ণী ! মা
তারা! মা তােমায় মন খুলে মা বলে ডাকূলে
তার কি ভযন্ত্রণার ভয় থাকে। মা যেখানেই
যে অবস্থায় থাকি, যেন এ জীবনে মা বুলি
ভুলতে না হয়। (নরেনের প্রতি) ভ ই নরেন!
দেশে সকলেই বাবাকে খাতির ও মান্য কতাে,
যাতে বংশের সম্মান ও গৌরব নষ্ট না হয়,
লােকে তােমার নিন্দা নাকরে তা করাে। পরের
কুমন্ত্রণায় যেও না। সম্পদে অনেক বন্ধু হবে,
কিন্তু ভাইএর ভাই কেউ নাই। বউমার যেন
কোন কষ্ট না হয়। দেখাে, গােপালের লেখা-
পড়ার উপর নজর রেখাে। মা কাত্যায়নীর
পূজাদি নিয়মমত যাতে হয়, তা দেখাে ; তার
.
মৃন্ময়ী
উপর প্রগাঢ় ভক্তি রেখাে, তা হলে তােমার
আর কোন অমঙ্গল ঘটবে না।
কত দিনের
জন্যে যাচ্চি, একবার দাদা বলে হেসে কথা
ক, যদি বাঁচি ত দেখা হবে, নয়ত এই জীবনের
শেষ আলিঙ্গন।
মনো। ভাই নরেন, তরু, তােমরা কিছু মনে করাে
না। মানবের যদি সব গুণ থাক্তাে ত তাহলে
দেবতা আর মানুষে তফাত থাকতো না। যদি
কখন আমরা তােমাদের অযত্ন করে থাকি, সেটা
ধরেনি। ঘৃণা হিংসা বা তাচ্ছিল্য করে কখন
অযত্ন করিনি; তােমাদের ভালবাসতুম, মানুষ
করিছিলুম, তাই কানাইকে যেমন তাড়না করি,
যেমন বকি, যেমন গালাগাল দিই, সেই রকম
করিচি। মনে বুঝলে সে অযত্নেও সুখ ছিল ।
সে গালে মঙ্গল বই অমঙ্গল হত না।
তাড়না ভালবাসার তাড়না। যাহােক যদি
কোন দোষে দুষী হই, দিদি বলে সে সব ভুলে
যেও। তরু স্বামীকে যত্ন আত্তি করি।
গােপালকে মারিস ধরিসনি। সংসারের চার
দিকে চোক রেখে কাজ করি।
,
৪
মৃন্ময়ী।
মৃন্ম। তরু, সাধের ছােট বউ-আমার কথা ধরিস
নি, তােদর মেজো ভাসুর যে পথে গেছে,
আমিও যেন সে পথে শীঘ্র যেতে পারি।
[ সকলের প্রস্থান।
তৃতীয় অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। কুমুদিনী ও গদাধর আসীন। গদা। দিন নেই, রাত নেই, ঘুরে ঘুরে নাকাল হলুম, এর ফল যা হবে তা বুঝছি, কলা দেখিয়ে গলায় না হাত দিয়ে তাড়ায়। কুমু। আমি বেশ্যা বলে কি এত অবিশ্বাসের পাত্রী। মন ত দেখাবার নয়, কিম্বা ইচ্ছা করলেই খব- রের কাগজে ছাপিয়ে দেওয়া যায় না। মনে যা আছে তা ঈশ্বর জানেন, ঢাক বাজিয়ে কি করব বল? গীত। সইতে পারি না, মনেরি যাতনা, মনাগুনে আমি জ্বলি দিবানিশি। প্রেম-আলাপন, • প্রাণেরি রতন, পাইব কি কভু তারে ভালবাসি। t
গদা।
দেখ ভাই! যেন গায়ে গায়ে শােধ দিও না।
কুমু। কেন আমায় কি তােমার মনে ধরে না ?
গদা। আমার মাথা খাও, বল রাগ করবে না ?
কুমু। তােমার উপর কি রাগ করতে পারি।
তােমায় দেখলেই যখন প্রাণ ঠাণ্ডা হয়ে যায়,তখন
অত গৌরচন্দ্রিকা কেন, যা বলবার বলে নাও।
গীত।
এ জীবনে তব দাসী হয়ে রব।
শয়নে স্বপনে, সদা জাগরণে
তােমারই চরণ পূজিব ।
স্বদেশে বিদেশে,
তার আসার আসে,
পথ পানে চাহি রূহিব।
গদা। পরেশ কি আর কিছু রেখেছে,
আঁটি সার
করে ছেড়ে দিয়েছে। তবু ঠিক কথা বলতে কি
তােমায় দেখলে অনেক বেটার মাথা ঘুরে পড়ে।
কুমু। এটা ভাই হয়ে থাকে, তার পর চল দুজনে
কাশীতে ভেসে পড়া যাক, দু-মুটো অন্নের সং-
স্থান ত আছে, আর কিসের ভাবনা।
গদা।
এত অনুগ্রহ, বিধুমুখি ! কি প্রাণের কথা
কইছ? একটা. প্রাণ ক’জনে ভাগবাঁটরা
মৃন্ময়ী।
করবে, বল! তোমাদের মায়া ত বুঝবার
যাে নেই।
কুমু। দুদিন বাদে বুঝতে পারবে। তখন ভাল
করে পরীক্ষা নিও
গদা। পরীক্ষা!—এক আঁচড়ে টের পেয়েছি,কাশীর
কথা তুলতেই আমার পিলে চমকে গেছে।
কুমু। কেন কাশীতে ম'লে শিব হবার ভয় কর
নাকি ?
গদা। মার ভয় করিনি, কাশীতে তিলকমাটি
গঙ্গামৃত্তিকার ত অভাব নাই, যাঁড়েরও ছড়া-
ছড়ি। বেঁচে থেকে দুজনায় বিশ্বেশ্বর অন্নপূর্ণা
হয়ে যাঁড়ে চড়তে না হয়।
(পরেশের প্রবেশ)
পরে। বলি, গদাধর কতক্ষণ এয়েছ ?
গদা। (মাথা চুলকাইতে ২) এই আছি, তােমায়
দেখতে না পেয়ে চলে যাচ্ছিলুম। কুমদিনীর
জেদে তােমার জন্য অপেক্ষা কচি।
কুমু। আমি এখন খাবার যােগাড়ে চড়ুম।
[ প্রস্থান।
গদা। দেখ পরেশ । আমি সব যােগাড় করেছি,
বলব কি কুমুদিনী তােমার নাম শুনেই অমনি
টাকা দিতে প্রস্তুত, আমি বল্লম, পরেশ বাবু
তেমায় অবিশ্বাস করে না; বিশেষতঃ টাকা-
কড়ি তিনি অমনি কেন নেবেন।
পরে। ঠিক বলেছ। তুমি বুদ্ধিমান, তােমায় ত
আর শেখাতে হবে না, আমি আজ শুধু কথায়
টাকা ল’ব, কাল মরে যাই ত বেচারির টাকা
ডুবে যাবে।
গদা। কুমুদিনী তােমা বই জানে না। সে বলে
ওর জন্য সব যাক্ তাতে ক্ষতি নাই
পরে। কুমুদিনীর উচ্চ অন্তঃকরণ,তাই অমন বলে।
গদ।। টাকাটা ফেলে দাও, তার পর শেলের সঙ্গে
বােঝাপড়া হবে। বিষয়টা কুমুদিনীর নামে
কেবল রহিল। লেখাপড়াটা নাম মাত্র। কুমু-
দিনী আর টাকা চেয়েছে। এ লেখাপড়া
তােমার জেদেই হচ্চে।
( শৈলেন্দ্রের প্রবেশ।)
এই যে শৈলবাবু এসেছেন। ভায়া অামার খুব
হুসিয়ার, খতপত্রগুলাে এনেচে ত।
*।
মৃন্ম।
শৈল। 'খত আনি—আর নাই আনি, সে খবরে
দরকার কি ? টাকা দিলেই খত পাবে।
পরে। ভয় নেই কেউ কেড়ে নেবে না। টাকা
মজুত না করে কি খত আবার কথা গদাধর
ব’চে।
শৈল। মেজাজটা বড় গরম দেখ চি। টাকা না
দিয়ে এত, টাকা দিয়ে না জানি হাতে মাথা
কাটবে।
পরে। টাকাটা ত অমনি দাও নি, ভিক্ষেও চাই
নাই, টাকা ধার নিয়েচি, সুদ শুদ্ধ ধ'রে দেবাে।
গদা। তর্কের দরকার কি ?
কুমুদিনীকে ডাক,
কাজটা শীঘ্র চুকিয়ে ফেলা বাক্।
পরে। টাকা ফেলে দিতে পারলে আমি ত কোন্
ছার, আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার পায়।
[ পরেশের প্রস্থান।
গদা। দেখ শৈল, ভায়াকে নীলবানরটী সাজিয়ে
যখন ছাড়ব, তখন ভাই বুঝবে যে, কেমন
লােকের পাল্লায় পড়েছিলেন। এখন টাকাটা
বেরুলে আমার হাড়ে বাতাস লাগে।
মৃন্ময়ী।
( পরেশ ও কুমুদিনীর প্রবেশ ।)
কুমু। টাকা ত এনেচি। • বাবু একবার হিসাবটা
দেখুন।
শৈল।' এই নাও হিসাব।
গদাধর ভাই, হিসাব মত কড়াক্রান্তি ফেলে
পরে।
দাও।
( শৈলর হস্তে টাকা প্রদান, পরেশকর্তৃক
কুমুদিনীর নামে কবলা লিখন, শৈলর নামীয়
খতখানি কুমুদিনীকে প্রত্যর্পণ । )
পরে। বাঁচলুম বাবা! হাড়ে বাতাস লাগলাে,
পূৰ্বপুরুষ উদ্ধার হ’লল।
কুমু। এতদিন আমায় বল্লে ত ও সমস্ত লেটা
কবে চুকে যেত।
পরে। সেটা আমার আম্মুকী। যাক! এখন
একবার গঙ্গায় নেয়ে যাচি।
[ পরেশের প্রস্থান।
গদা। কুমুদিনা, এখন ত কাজ ফতে কলুম
এখন দুদশ দিন খুব যত্ন করে পরেশকে রেখে
দিও, তােমার নামজারির দরখাস্তটা পাঠিয়ে
তার পর পরেশের মাথা খাওয়া যাবে।
'৫
।
মৃন্ময়ী
শৈল। খারিজের জন্য ভাবতে হবে না।
একটা গােড়া-বাধা দরকার। কাল হতে একটা
দুরওয়ান পরগণার কাছারীতে বসুক,আর নায়ে-
বের উপর হুকুমজারি কর, যাতে ফুমুদিনীর
নাম সেরস্তায় পত্তন হয়ে প্রজার কবচে জমি-
দার মালিক বলে ওঠে। কি বল ফুমুদিনি, এ
সব ত ক’ত্তে পাবে !
কুমু। আমরা বেশ্যা,আমাদের আর দয়ামায়া কল্লে
চলে না। যে যতক্ষণ দিতে পারবে, তাকে
সােণার চাঁদ হাতে দেবো ; পয়সা ফুরিয়ে এলে
সম্বন্ধ ফুরুবে। যে রকম ব্যবস্থা কল্লে, ভবি-
ষ্যৎ মালা মােকদ্দামা না হয়, তাই কর।
গদা। আমাদের সঙ্গেও সেই রকম ব্যবহার
করবে নাকি ?
কুমু। সকলের সঙ্গে এক রকম ব্যবহার সম্ভব না।
শৈল। তিন চার দিন বাড়ী ছাড়া, আজ বাড়ী
* যেতেই হবে, এখন তবে আসি।
গদা। আমিও এখন চল্লেম।
[ সকলের প্রস্থান।
মৃন্ময়ী।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
ম্যাজিষ্ট্রেটসাহেব, ইনস্পেক্টর, দারােগা,
কিরণ ও দস্য-সদ্দার।
ইম্পে। খােদাব! দর উপদ্রবে প্রজাগণ
সদাই সশঙ্কিত। অনেক চেষ্টা করে এই
বদমায়েসকে ধরতে পেরেছি—হুজুরের কাছে
হাজির করেছি।
ম্যাজি। বড় তারিফ কো বাত হায় ! তাোেেগ
ঘুম জাতা, কুছ দেখতা নাই ? হা সব,
আমিকো সসপেগু করেগা।
ইন্স্প। হুজুর !
গােস্তাগী মাফ করবেন।
( কিরণকে দেখাইয়া) এই ব্যক্তি অল্পদিন
হইল পূর্বদেশ হইতে এসে এখানে বাস
ক’ছেন। ইহার বাটীতে কাল রাতে ডাকাতি
হয়। ইনি অসীমসাহসে একাকী দশজন
ডাকাতের সঙ্গে যুদ্ধ করেন, তারপর দু-
সর্দার করমচঁাদকে গ্রেপ্তার করেছেন।
ম্যাজি। বাঙ্গালা মুলুমে অ্যায়সা লােক হয় !
হামলােগ, বহুত খুসী হুয়া। দারােগা লােগ,
মৃন্ময়ী। কুচ, কাকা নেহি। সব আমীকে জরিমানা হোগা। দায়রা। দোহাই সাহেব, কসুর মাফ করবেন। আমাদের চেষ্টার ত্রুটি নাই। গরীবদের মার বেন না। ম্যাজি । চুপ, রও। ( কিরণের প্রতি) বাবু, হা তুমকো reward দেগা, কোম্পানীকে অ্যায়সা হুকুম হায়। কিরণ। হুজুর সাহেব! বহু বহু সেলাম। আমি রাজ-সরকার হতে কোন রকম পারিতােষিকের আশা করি না। হুজুরের অনুগ্রহ থাকিলেই যথেষ্ট মনে করব। পিতা আমায় বহুদিন অস্ত্র- শিক্ষা আর রাজনীতি সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়ান। তিনি আমার এই শিখিয়েছেন যে, উপকারের প্রত্যাশা না করে প্রাণপণে পরের উপকার করবে। আমি তাহারই আদেশ পালন করেছি। ম্যাজি। তুমার বাপকে নাম? কিরণ। ৩ নিত্যানন্দ ঘােষ, যিনি প্রায় ত্রিশ বৎ- সর কোম্পানীর সরকারে সেরেস্তাদার ছিলেন।
মৃগয়া ।
থা।
নগদ টাকা
ম্যাজি। নিত্যানন্দকো হা বহুত দিনসে জান্তা
ঘােষজা কোম্পানী বাহাদুরকা নিমকা
নৌকর থাউস মাফিক আদৃমি ঔর নাহি মিতা।
তুমরা বাপকো যাে post থা, হাম তুমকো
ওই post দেগা। দেখাে, তুম্ হারা কাছারী
যাও, তুম সেরেস্তাদারকো কা করেগা, ঔ
১০ হাজার রূপেয়া বকসিস মিলেগা।
কিরণ। হুজুর! আমি আমার কর্তব্য পালন
করেছি। আপনি অনুগ্রহ ক'রে কাজ
দিলেন, তাই আমার যথেষ্ট।
নেবার ইচ্ছা করি না। আমি, আমার বাবাও
সকলেই সরকারের খেয়ে মানুষ হয়েছি। আমি
নগদ টাকা চাই না, সে জন্য আমার কসুর
মাপ ক’রূতে আজ্ঞা হয় ।
ম্যাজি। বাবুজি, ‘তুম্ খুব জবর আমী হায়, হাম্
সরকার বাহাদুরকো বােলকে তুমকো হাকিম
কর দেগা । চল বাবু, হা সাথ চল।
ইম্পে। খােদাবন্দ! এ দস্যুদের উপর কি হুকুম।
ম্যাজি। পায়ে জিঞ্জির দেকে সাত বর ফাটক দেও।
[ সকলের প্রস্থান।
মমন্ত্রী।
তৃতীয় দৃশ্য।
আমি একা,
তরুবালা, নরেন ও নশীরামবাবু।
তরু। টাকাকড়ি আদায় আমদানী ত এক রকম
বন্ধ হয়েছে। আমরা যা ইচ্ছা তাই করচে।
সামনে লাটবন্দীর কিস্তি মলগ টাকা দিতে
হবে। তুমি কি নাকে সরূষের তেল দিয়ে
ঘুমুচ্চো।
নরেন। এক রকম তাই বটে।
চারটে চোখ ত করতে পারিনি। শুধু ত বিষয়
কৰ্ম্ম দেখা নয়। সংসারের
সংসারের কুটনােকোটা
থেকে চণ্ডীপাঠ অবধি করতে হচ্ছে। তুমি ত
রােগা এখনাে গায়ে জোর পাওনি, তােমায়
কেমন করে সংসার দেখতে বলি বল।
তরুর কি হয়েছে।
নরেন। অরুচি, খেতে পারে না, নড়লে চড়লে
হাঁপায়।
তরু। ওঁর যেমন কথা। আমাকে উনি নড়তে
দেবেন না, তা আমি কি করবো বল।
নরেন। ভাইকে দেখে বুঝি রােগ মুকুনাে হচ্চে।
নন্দী।
t
নশী ।
তােমায় ত একদিনও অসুখ ছাড়া দেখলুম না।
আমার যেমন পােড়া কপাল !
তরু। বােকার মতন কি যে বল, তার মাথা মুণ্ডু
নেই। এখন কাজের কথা শোেন, দাদা এসে-
ছেন , ওর হাতে সব বিষয় ফেলে দাও, তা না
হলে সব মাট হয়ে যাবে।
নরেন। আমিও তাই ভাবছিলুম। এর মধ্যে ও
প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা দেনা ঘাড়ে চেপেচে।
এখন দাদাই যা করেন।
দেনার জন্যে ভয় কি ? বিষয় আছে, দুদিনে
না হয় দুবৎসরে ঋণ শােধ হবে। তবে একটা
কথা এই যে, টাকাকড়ির ব্যাপারে আপনার
লোক হাজার কল্লেও কি, নরেন ভায়া তােমার
মন উটবে।
তরু। দাদা তুমি ও কি ব’লচ। ওর মন না উঠে
ত ব’য়ে গেল,তা বলে তুমি কি তােমার বােকে
পথে বসতে দেখৰে।
নশী । আমি কি তাই ব’চি ? আমি থাকতে
তােদের টাকা বাদি হতে পাবে।
নরেন । তুমি আমার বড় দাদা, আমি কি তােমার
মৃন্ময়ী।
উপর কামি করতে পারবাে ! তুমি যা করবে
তাই হবে, আমাতে তোমাতে কি কোন তফাৎ
আছে।
নশী। আমি দেখলে শুলে তােমার জ্ঞাতিদের
চোক টাটাবে। তােমার দাদা শুনলেই বা
কি বলবে।
নরেন। তাদের কথা কি গ্রাহ্য করি। তুমি হলে
মাগের দাদা, তারা হ’ল কেউ সুবাদে দাদা,
কেউ বা মার পেটের ভাই। মার পেটের ভাই
কি ভায়ের মধ্যে ধস্তুকি ?
নশী। তােমার দাদা এখন কোথায় ? তার কি
খবর পেয়ে ?
নরেন। ?
নশী। তিনি কি শীঘ্র দেশে ফিরবেন।
নরেন। দেশে ফিরেও তার যে ফল, না এলেও
তাই।
এ সব ভাবার দরকার কি ?
নশী। কথার কথা তাই জিজ্ঞাসা কচ্চি।
দাদা, ও সব কথা এখন রাখ, আজ থেকে
যাতে বিষয় কাজ দেখা শুনাে ভাল রকম হয়,
তাই কর। ওর কি মাথার ঠিক আছে ?
মৃন্ময়ী।
?
নরেন। মা ঠাকুণকে আনালেও হয়।
নশী। ঘরবাড়ী ছেড়ে মা কি করে আবে বল!
তরু। এ বাড়ী কি মার বাড়ী নয়। মার কাছে
মেয়ে আর ব্যাটা কি ভিন্ন
নরেন।
তােমার বােনের কষ্ট হচ্চে শুনলে তিনি
কি চুপ করে থাকতে পারবেন।
তরু। তবে তুমি একদিন গিয়ে যত্ন কল্লেই তিনি
আসবেন।
নশী। চল, এখন বাহিরে গিয়ে কিস্তির বন্দেজ
করা যাক। তরু আমাদের খাবার হ'লে ঘরে
চাপা দিয়ে রাখতে বলে দিও।
তরু। উনি বামনকে বলে যান, আমি শুইগে।
[ সকলের প্রস্থান।
৬৩
ইন্মরা।
চতুর্থ দৃশ্য।'
(সদর রাস্তা )
পরেশ ও দ্বারবান্ আসীন।
পরেশ। আমার অন্নে এতদিন মানুষ হলি, এখন
বেটা সব ভুলে গেলি।
হাম জিকা জব, নিমক খাগা ও বক্ত
উকা কাম বাজায় গা, হামরা কর মাপ
কিজিয়ে ?
পরেশ । আমার বাড়ী, আমার টাকায় সব আছি,
আবার কোন্ শালা দেবে।
[ দ্বারবানের প্রস্থান।
(পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিয়া) দ্বারবাৰ্জী ! একটা
কথা রাখ, একবার দেখা করে দুটো মনের কথা
ব’লে আসি। আমি এতদিনের পর গদাধরের
ষড়যন্ত্র বুঝতে পারলুম। বেটা ছুচ হয়ে ঢুকে
ফাল হয়ে বেরুলো। ঈশ্বর থাকেন ত বেটা
হাতে হাতে এর ফল পাবে। আমি নয় মাগ
ছেলে নিয়ে পথে পথে ভিক্ষা করে দিন
ব্যয়ী।
কাটাবাে। কুমুদিনী বিশ্বাসঘাতিনী-তােমার
কি নরক-যন্ত্রণার ভয় নেই, তােমাকে কি মরুতে
হবে না? তােমার হৃদয় কি নরক অপেক্ষাও
ভীষণ ! দোষ কাকে দেবো, সব আমার কপা-
লের দোষ ; পরিবারকে অনেক কষ্ট দিয়িচি,
তার শুক এক বিন্দু অশ্রুপাত
( মূচ্ছ। ও পতন )
কেবলরাম আসীন।
কেবল। আজ বাড়ীতে যেতেই হবে, তিন দিন
বাড়ী ছাড়া। দেশেও একটা মানুষ নেই, মাগ
ছেলেকে একলা রাখতেও আর মন সরে না।
গদাধর সেই আজকাল গাএর মোড়ােল হয়েছে।
শৈল--তার ত ব্যবহার শুনে শুনে আর তার
ছায়া মাড়াতে ইচ্ছা হয় না। ( রাস্তার উপর
পরেশ শয়ান , রাস্তার উপর কে একটা পােড়
গোঁ গোঁ কচ্চে দেখি দিকি। এ কি সর্বনাশ।
পরেশ বাবু যে, আমি না দেখলেই ত রেচারী
অকা পেত ! ( নিকটে গিয়া শুশ্রুষা) বেচারী
দেখচি অনেকক্ষণ
অনেকক্ষণ পড়ে আছে। বােধ হয়
হাতে মাথায় চোট লেগেছে।
মৃন্ময়ী।
পরেশ। (চেতনা পাইয়া) আমি কোথায় ?
আমার হিমু কৈ ?,
কেবল। পরেশ বাবু, কোন ভয় নেই, আমি
কেবলম।
পরেশ। আঁ—গদা তুই এখনাে এখানে, তাের
মনস্কামনা কি সিদ্ধি হয় নি ? ( মূচ্ছ।)
কেবল। গদাধর ত মেরে রাস্তায় ফেলে পালাইনি ?
অবশ্য ! ও সেই গদাধরের নাম করে মূচ্ছ।
যায় কেন ? (বাতাস করণ ও একজন পথিককে
জল আনিতে বলা) বেগতিক দেখি ত কোতো-
য়ালকে খবর দেবে। (মাথায় জলপ্রয়ােগ )
পরেশ। গদা-জোচ্চোর, হারামজাদা বেটা
আমায় ফতুর করে আমায় বেশ্যার সেবাদাস
বানিয়ে এখন আমায় বাঁচাতে এলি, দূর হ বেটা!
কেবল। পরেশ বাবু! আমি গদাধর নই। আপনি
রাস্তায় পড়ে গোঁ গোঁ ক’চ্ছিলেন, আমি দেখতে
পেয়ে এসেছি। আপনি চুপ করুন, বেশী
বলে মাথা আরও গরম হবে।
পরেশ। বেটা, আমার মাথা খেয়ে—এখন মাথা
ঠাণ্ডা ক’রুতে এসেছি। (মারিতে উদ্যত )
মৃন্ময়। কেবল। দেখছি, পরেশ ক্ষিপ্ত হয়েছে। এখন কি করি (পরেশের হাত জোরে ধরিয়া ভূমিতে শােয়ান ও পথিকের প্রতি ) আয় ত ভাই, এ লােকটার বায়ের ব্যানাে হয়েছে, একবার ধর। পথিক। এ লােক কি আপনার সঙ্গে যাচ্ছেলেন ? কেবল। আমার পরিচিত লােক, রাস্তার উপর গোঁ গোঁ আওয়াজ পেয়ে—দেখি যে ইনি পড়ে আছেন। পরেশ। আমার হিমু কি ব’বে ! আমার কুৎ- সিত ব্যবহার শুলে—আমার মুখে যে লােকে থু থু দেবে । কেবল। পরেশ বাবু । তােমার কোন চিন্তা নাই, তােমার বাটীর সব মঙ্গল। তুমি বেশী ব’কো না, আমি তােমায় সঙ্গে নিয়ে যাব, গদা এখানে নেই। পরেশ। আঁ—গদা ব্যাটার হাত এড়িয়েছি ত! আমায় বাড়ী নিয়ে যাবে ত? হিমুকে আমায় ক্ষমা করতে বলবে? আমার মাথার দিব্বি, ঠিক্ বলবে? বল, ব’বাে। কেবল। তুমি ভেবােনা, আমি সব ঠিক ক’বাে। চল, এখন বাড়ী যাই।
মৃন্ময়ী।
পরেশ। আমি একটা হেস্তনেস্ত না করে—আর
বাড়ী ফিরবাে না। •
কেবল। এখন চল, আরাম হয়ে--তার পর যা হয়
করাে।
পরেশ।
আর আমি কাকেও বিশ্বাস ক’চ্চি না।
রােগের মতন ওষুধ হয়েছে। বিশ্বাস করে—
যথাসর্বস্ব নষ্ট ক’রিচি।
কেবল। কোথায় যাবে?
পরেশ। আচ্ছা, তবে বাড়ী চল। হিমু কি আর
আমায় ভালবাসবে ?
টাকা নেই যে যত্ন
করবে। কুমুদিনীর মতন ত করবে না ?
কেবল। আর ব’কোনা, চল।
[ প্রস্থান।
H চতুর্থ অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। (কক্ষ) হেমাঙ্গিনী ও ক্ষীরােদা। ক্ষীরােদা। যখন বলেছিলাম যে, শেলর কাছে গড়িয়ে পড়, তখন যে নাক সিটকে ছিলে ? এখন আমার কথা গুলাে ত ? হেমা। হবে আর কি ! কপাল ত আর কেউ কারু কেড়ে নিতে পাবে না। স্বামীর বিষয়, তিনি যদি জলে টেনে ফেলে দেন, তার আর আমি কি করূবাে। ক্ষীর। ভুগতে হবে। না খেয়ে মারা যাবি। মো। যায় হাতে পড়িচি, তিনি যেমন করে রাখ-
মৃন্ময়ী।
ক্ষীর।
বেন, তেমনি থাকবে। দুঃখের ভাত নয় সুখ
করে খাব। স্ত্রীলােকের অর্থের দরকার কি ?
এখন তাই বলে মনকে প্রবােধ দে, উড়তে
পারুলেই পােষ মানে। এখন হালে পানি
পেলে না, তাই ভাতার-সােহাগী হ’চ্ছি না কি ?
হেমা। তােমার মতন উড়তেও শিখিনি, শিখতেও
যেন না হয়। স্ত্রী সচ্চরিত্রা হ'লে—আবার
কোন্ কালে কার ভাতার তাকে ত্যাগ করে
থাকে ?
ক্ষীর। আর মুখ নাড়িনি, থাম্। ছােট মুখে-
বড় কথা ভাল লাগে না।
হেমা। কেন, তুমি কি মারবে ? আমি কষ্ট পাই,
আর খেতে না পাই, তােমার ভাবনায় দেখচি
ঘুম নেই, আর রােগও হয়েচ।
ক্ষীর। বিষদাত ভাঙ্গলাে, তবু, ফেসূর্ফোসানিও
ঘােচনি ? কুমুদিনীর হাততােলায় যাকে থাকতে
হবে, তার আবার কথা কি—বিষ নেই কুলাে-
পানা চক্কোর। সতী-সাবিত্রীগিরি ফলাচ্ছেন।
সতী দেখে আবার আধকপালে ধরে গেল।
হেমা। আমি অসতী, আমায় নয় স্বামী ত্যাগ
মৃন্ময়ী।
নিজের দুঃখ
করবে ; যে কষ্ট ত আর তােমায় ভুগতে
হবে না? কুমুদিনীর দাসী হলে—আমার মান
বই পাড়া-পড়সৗর মান যাবে না, যা কপালে
আছে তাই হবে। এখন কাটা ঘায়ে নুনের
ছিটের দেবার দরকার কি ?
নিজে ভুগবাে, তুমি নিজের চরকায় তেল
দাও গে না।
ক্ষীর। চর্কা একেবারেই ঘুরিয়ে দেবাে। আমি
যাচ্চি, এর পর শুবাে, কার চা কত তেল
খায়, আর কত শক্ত।
[ ক্ষীরােদার প্রস্থান।
হেমা। অল্প বয়সে বে হয়েছিল। শ্বশুরের কত
আদরের বৌ ছিলুম, একদণ্ড নড়ে বসতে
হত না, কারুর একটা কথা গায়ে সইত
; এখন কুকুর বিড়ালেও নাতী মেরে
যাচ্চে ! স্বামি! আমি তােমার চরণে কি
দোষ ক’রিচি, যে তুমি আমায় ভুলে—একটা
রাক্ষসীর মায়ায় মােহিত হয়েচ! শুচি,
সে রাক্ষসী নাকি তােমায় পথের ভিখারি করে
তাড়িয়ে দিয়েছে, তবুও তুমি স্ত্রী ব’লে একবার
৭১
মৃন্ময়ী।
ভাব না? স্ত্রী ছাড়া কি কেউ স্বামীর দগ্ধহৃদয়
শীতল করতে পারে ! তােমর অপমান শুনলে
—আমি কি সুখী হই ? তােমার ঘর বাড়ী
বিষয় সব গেছে, তাতে ক্ষতি কি,আমার ভাগ্যে
ভগবান টাকা কড়ী বাড়ী লেখে নি,তাই অপরের
হাতে গেছে, তা ভাবলে আর কি হবে ; আমি
চিরদিন ত তােমার শ্রীচরণে দাসী হয়ে আছি।
(কেবলরাম ও পরেশের প্রবেশ )
কেবল ! বউঠাকুরাণি ! পরেশ বাবু অসুস্থ হয়ে
ছেন, দেখবেন, যাতে ভাল করে সেবা-শুশ্রুষ
হয়। বেশী কথা যেন না কন।
[ কেবলরামের প্রস্থান।
হেমা। (পাকা লইয়া বাতাস দিতে দিতে) তোমায়
বড় কাহিল দেখচি, কোথায় পড়ে গেছলে ?
খানিক জিরিয়ে একটু গরম দুধ খাও।
পরেশ। হিমু-প্রাণের হিমু! তুমি কোন্ প্রাণে
এ কালসাপকে দুধ খাইয়ে বাতাস দিয়ে
শুশ্রুষা ক’?
হেমা। ছি ! ও কথা মুখে এন না। তুমি আমার
ঈশ্বর, তুমি আমার জীবন। স্বামীর সেবা
মৃন্ময়। ; করা অপেক্ষা,স্ত্রীর গৌরবের বিষয় কি আছে ? তুমি একটু জিরােও, সেরে ওঠ, দুজনে বসে ঢের কথা কইবাে। পরেশ। হিমু! আমি তােমার নিকট শত দোষে দোষী, তােমায় কত কষ্ট দিয়েছি। তুমি কি আমার দোষ মার্জনা ক’রূবে না। হেমা। স্বামী কি কখন স্ত্রীর নিকট অপরাধী হয় ? টাকা হাতের ময়লা আজ আছে, কাল নেই। আবার দুদিন বাদে আসতেও পারে টাক টাকা করে ভেবে ফুলকি। স্বামীর আদর, স্বামিভক্তি কি টাকাতেই হয় ? তােমার মুখে হাসি দেখলেই আমার জীবনের সব কষ্ট হবে, আকাশের চাঁদ হাতে পাব। তুমি তাড়িয়েই দাও আর মার, আমি তােমার। যত দিন বাঁচবো তােমার চরণে পড়ে থাকবে। তুমি কি আমায় পায়ে ঠেলতে পারবে? পরেশ। উঃ ! ( দীর্ঘনিশাস ) এতদিনের পর প্রাণ ঠাণ্ডা হলাে। যার ঘরে হিমুর ন্যায় গুণ- বতী স্ত্রী আছে, তাকে কি কোন কষ্ট পেতে জগৎ আমায় ঘৃণা করুক, আত্মীয়-
দূর হ’লল
;
মৃন্ময়ী।
স্বজনে আমায় স্থান নাই দিক, তাতে আমার
ক্ষতি নাই। আমি যখন হৈমের নির্মল পবিত্র
হৃদয়ে স্থান পেয়েছি, তখন আমি দুৰ্বল-মনে বল
পেলুম; ধনহীন পরেশের অর্থকষ্ট
ভগ্নহৃদয়ে সাহস ও শক্তির সঞ্চার হলাে।
হিমু! ( চুম্বন ) আমায় দিন দশেকের জন্য
বিদায় দাও। বল, পূৰ্বস্মৃতি ভুলে গেলে?
হেমা। তুমি সেরে ওঠ, তার পর দশদিনের জায়গায়
বিশদিন গেলেও—চিন্তিত হবার কারণ থাকবে
এখন যেও না, আর যাবার দরকার
কি? দুজনে প্রাণের কথা কয়ে দিন কাটাব,
আর দুঃখের ভাত সুখ করে খাব। তুমি কাছ
থেকে যেতে পারবেনা। যতদিন বাঁচবাে,
তােমায় কি ভুলতে পার্বাে ?
পরেশ। আমার সব অসুখ দূর হয়েছে। আমি
একবার চক্রান্তকারীদের দেখে ছেড়ে দেবাে।
হেমা। তারা বদলােক, তুমি ভালমানুষ, তােমার
যা যাবার গেছে; সে জন্য কষ্ট করে কি হবে?
পরেশ। আচ্ছা, তুমি যা ব’লচ তাই হবে; কিন্তু
দুদিন বাদে যেতে বারণ কবে না, বল।
।
৭৪
মৃন্ময়ী।
হেমা। তুমি যা করে সুখী হও—তাই করাে,
আমি বারণ করবে না। এখন আর কোনা,
শােবে চল।
[ প্রস্থান।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
(কক্ষ)
নরেন ও তরুবালা আসীন।
নরেন। তরু শুনেচ, দাদা এতদিনের পর ভাই
বলে এক পত্র লিখেছেন।
তরু। ভাসুরকে আমি দোষ দিতে পারি না, তিনি
আমায় বউমা ব’লতে অজ্ঞান হ’তেন। দিদির
জন্যেই ত আমরা তার চক্ষুশূল হয়েছি।
নরেন। আমার অসুখের খবর কি করে পেলে
বল দেখি?
তরু। আমি কেমন করে ব’লবাে। এদেশে তার ত
মৃন্ময়ী।
t
অনেক বন্ধুবান্ধব আছে, তারা লিখে থাকবে।
নরেন। ঢাকার জলহাওয়া বড় ভাল, আমায় যাবার
জন্য লিখেছেন।
তর। ইচ্ছা থাকে ত যাও না?
নরেন। আর কি ভাল যায়গা কোথাও নেই, যে
আমায় বড়-কত্তার অ-ধ্বংসাতে যেতে হবে।
তর। এ সব তােমার বউদিদির চাল, বুঝতে কি
পার না?
নরেন। চিঠি পড়েই বুঝিচি।
তরু। তাঁর ভাতার অনেক টাকা রােজকার কচ্চে,
আর কাকে দেখিয়ে প্রাণ ঠাণ্ডা ক’বুবে বল ।
নরেন। চাকরি করে আর কে কোথায় বড় মানুষ
হয়েছে।
( নশীবাবুর প্রবেশ )
নশী। দেখ নরেন, ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট হতে ২ জন
পাইক ও খানি তলবী পরওয়ানা নিয়ে এসেছে।
নরেন। দাদা ত ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে আমার নামে
কোন অভিযােগ করেনি।
নশী। ভায়া, সে সব কিছু ভেবােনা। তােমার
দাদার মুরদ জানতে ত আর বাকী নেই।
স্থায়ী।
নছেন। জানি সব, তবে রাজা মেঘ দেখলে-কার
ভয় হয় ?
নশী। শৈল, গদাধর ও কুমুদিনী নামে এক বেশ্যা,
এই তিনজনকে খাড়া খাড়া হাজীর করবার
হুকুম জারি হয়েছে।
নরেন। তাহলে বুঝি পরেশ বাবু নালিশ ক'রে
থাকবেন।
নশী। শৈল বাবু বােধ হয়, তােমায় সঙ্গে যাবার
জন্য অনুরােধ করে পাঠাবেন।
নরেন। তুমি কি করে জানতে পারলে।
নী। নৈবিছির আয়ােজন দেখেই বুঝলুম, পরেশ
বাবু মহাষ্টমীর আয়ােজন করেছে। ব্যাপারটা
খুব গড়াবে দেখছি।
যেতে বল্লে কেমন করে না গিয়ে থাকতে
পারূবে বল।
নরেন। আমার শরীরটা বড় খারাপ হয়েছে।
আবার যেখানে যাব, সেখানে ত দাদা-দিদির দৃশ্য।
নণী। তােমার শরীর দেখচি একাবারে ভেঙ্গে
গেচে !
দিন কতক হাওয়া বধূলালে
ভাল হয়।
মৃন্ময়ী।
।
,
;
নরেন। হাওয়া বদলালে কি কিছু হবে। মনে
বদ হাওয়া কাটবে না ।
তরু। দাদা ত এখন সব দেখছেন। তােমার
বিষয়ের ভাবনা ত ভাবতে হয় না।
নরেন।
কত কি যে ভাবচি, তা বলবাে কি।
দিকে দেনার দায় মাথার চুল বিকোলাে ;
ওদিকে দাদা যে কি ষড়যন্ত্র ক'চেন, তাও
বুঝতে পালুম না।
নশী। মিছে ভাবলে আর আমরা কি করবো বল ?
চিন্তার সব ব্যয়ামের চেয়ে কঠিন।
উপশম তুমি ভিন্ন কেউ কত্তে পাবে না।
( পরেশের প্রবেশ)
[ তরুবালার প্রস্থান।
পরেশ।
তােমরা থাকতে কি আমি দেশত্যাগী হব।
নরেন। আমরা কি ক’বাে তাই বল ? আমাদের
ত কোন হাত নেই।
তােমরা আমার ফিরে না আসাৰধি আমার
স্ত্রীকে দেখাে, যেন কেহ কোন অত্যাচার ক’ত্তে
না পারে।
নী। তার জন্যে ভাবতে হবে না।
..
মৃন্ময়ী
নরেন! তুমি কি টাকায় আজই যাচ্ছ।
পরেশ। হাঁ ভাই।
নরেন। ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে গিয়েকি জানিয়েছিলে?
পরেশ। দরখাস্ত পাঠিয়ে দিয়ে ছিলুম, আমি ভাবিনি
যে এত শীঘ্র ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে দরখাস্ত পাস
হয়ে পুলিস বেরুবে। যদি ধৰ্ম্ম থাকে, আমায়
যেমন পথে বসিয়েছে,তার প্রতিফল পেতেহবে।
নরেন। কতদিনে ফিচ
পরেশ। কতদিন লাগে তাও বলতে পারিনি।
তােমার দাদাকে কিছু কি বলবার আছে ? চুপ
করে বলে যে !
নরেন। ব’লব আর কি। শরীর গতিক আমার
যে রকম দেখ, আমি ভাল বুঝিনি।
তােমার যে কি অসুখ, তা ডাক্তারের বাবাও
ধত্তে পারবে না। তােমায় বল্লেও ত শুনবে না।
মাথা মুণ্ডু কি শুনবাে বল।
তবে ভাই এখন চলুম সব দেখাে শুননা।
[ প্রস্থান।
নশী। শৈলরাও বুঝি যাচ্ছে, চল দেখিগে ব্যাপারটা
কি হয়।
( সকলের প্রস্থান।
নশী।
নরেন।
পরেশ।
মৃন্ময়ী।
*
।
তৃতীয় দৃশ্য।'
•)-
মনােরমা ও মৃন্ময়ী আসীন।
মননা। দেখ মেজবউ, আজ আমার ডান্ চো
এত নাচ্চে কেন বল, দেখি ?
মৃন্ম। দিদি আমার পাজী দেখে পা বাড়ান্ কি না,
তাই একটুতেই মনে কত ভােলাপাড়া করেন।
মনাে। না বো, তা হলে কি আমি অত উতলা
হ'তুম।
বােধ হয়, তােমার গরম ধাত- তাই চোক
নাচ্চে। অশুভ থেকেও শুভ হয়, তা কি
জান না।
মনে। মৃন্ময় ! তুমি কি আমায় ঠাট্টা ক’রচ ?
আমি তিন চারদিন থেকে দুঃস্বপ্ন দেখচি, রাত্রে
আমার ঘুম হয় না। কে যেন মাথার শেওরে
দাড়ায়ে ব’লচে যে “আর তাের শ্বশুর ঘরে
টিকতে পাল্লম না, কাজে কাজেই তােদের
এখন ছেড়ে যেতে হবে।”
মৃন্ম। স্বপ্ন যদি ঠিক হতো, তা হলে কারু ভাবনা
মৃন্ম।
মৃন্ময়ী।
মনা।
থাকতাে না। কেউ স্বপ্নে রাজা হচ্ছে, কেউ বা
বড়ী চিবুতে চিবুতে ভাবছে, রাতাবী সন্দেশ
খাচ্চি। তুমি কোথায় আর তােমার শ্বশুর-ঘর
কত তফাতে রয়েছে বল?
তরুদের কোন খবর পেয়ে কি ?
মৃন্ম। গিরিবালা দুদিন হ’লাে কাশী গিয়েছে,
যাবার আগে পত্র দিয়েছেল।
সে আজ আট
দিন হবে, তার পর কোন খবর পাইনি।
মনে। বাবুকেও সকালে জিজ্ঞাসা করেছিলুম,
তিনি কিছু বল্লেন না। মনটাও দেখলুম,বড় চঞ্চল।
মৃন্ম। বড়বাবু এখন ছুটী বােধ হয় পাবেন না।
চল, আমরা একবার গিয়ে গােপালদের দেখে
আসি। মনটা বড় চঞ্চল হয়েছে, পাছে তুমি
আরও আশ্চর্য হও, তাই কিছু বলিনি।
মনন। মৃন্ময়ি ! তুমি আমায় ঠাট্টা করছেলে।
কিন্তু বােন্, তােমার মন আমার চেয়ে আরও
কত ভাবিত হয়েছিল, তা দেখ দেখি।
কত রকম কুচিন্তা মনে উঠছেলে, আর
মা কাত্যায়নীকে মনে মনে ডাকছিলুম যে, ‘মা
গােপালরা যেন ভাল থাকে।
মৃন্ম।
৮১
স্ময়ী। মনো। রক্তের টান আলাদা জিনিস। আজ নয় নরেন বুঝতে না পেরে তার মার পেটের ভাইকে দূর করে দেছে। কিন্তু ভেবে দেখ দেখি যে বড়র কাছে ছােট শত অপরাধে অপরাধী হলেও সে মার্জনীয়। যে ছেলেটি মূখ, দুষ্ট ও বদ- স্বভাবের হয়, তার প্রতি মার অধিক স্নেহ পড়ে, তার ভাবনাই মা অহরহ করে। যার নরেনান্ত প্রাণ, যে ভাল জিনিসটী আলে নরেনকে না দিয়ে খেতাে না। সে কি সুখৈশ্বৰ্য্য মত্ত হয়ে অথবা পতনাবস্থায় কষ্টে পড়েও কখন নরেনকে মন থেকে দূর কতে পারে? তরু তখন আমাদের আদরের ছােট বউ ছিল। এখনাে সেই আদরের আছে। মা কাত্যায়নীর কৃপায় ইনি অনেক অর্থ উপার্জন করছেন, কিন্তু তাতেও তিনি সুখী হতে পাচ্ছেন না। বাড়ী ছাড়া থেকে আজ অবধি তাঁর আর হাস্যবদন দেখতে পেলুম না। ( কিরণের প্রবেশ) কিরণ। নরেনের অসুখ, সে দিন দিন মলিন শীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আমায় শীঘ্র যেতে হবে।
মৃন্মরী।
.
মনাে
মননা। আমরাও যাব।
কিরণ। সাহেবের কাছ থেকে ১০ দিনের ছুটী
নিয়ে যাব।
১০ দিনের জন্য, আবার তােমরা
কেন যাবে ?
মননা। আমরা নরেন গােপালকে অনেক দিন
দেখিনি, আমাদের নিয়ে যেতে হবে।
কিরণ। একে নরেনের অসুখ, আবার তােমরা
গেলে পাছে সে মন্দটা ভাবে। রােগ কম।
দূরে থাকুক আরাে না বেড়ে যায়।
মননা। আমরা দেখে নয় চলে আসবাে, একদণ্ড
থাকূববা না। তুমি নয় ৫৬ দিন থেকো।
কিরণ। পরেশ ভায়া এইমাত্র এসেছে, তার খাবার
যােগাড় করে দাওগে।
মননা। আমরা যাচ্চি, পরেশ ঠাকুরপােকে এক
বার নীচে পাঠিয়ে দাওগে; গােপালরা কেমন
আছে সব খবর নি।
[ সকলের প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য। ( ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছারী) ম্যাজিস্ট্রেট, ইনস্পেক্টর, জুরীগণ ও কিরণ আসীন। খােদাবন্দ ! আসামীগণ সকলেই হাজীর হয়েচে। হুজুরের হুকুমমত তাদের কয়েদ রাখা হয়েছে। ম্যাজি। এ মুলুমে সব বেটা বজ্জাত হুয়া। Robbery, forgery, debauchery, Chicanery prevail throughout the land. 32 punishment চাই। কিরণ। এ দাসের গােস্তাকী যদি মাপ করেন, তা হলে আমি দু একটী কথা বলি । ম্যাজি। কুচ পরােয়া নাহি, খুসিসে সব খােলদা বল। বাবু! তু 6pinion কেয়? I always want your good and valuable openion. কিরণ। হুজুর! আপনি আমাকে সন্তানবৎ স্নেহ করেন,আমিও যথাসাধ্য পরিশ্রম করে রাজ্যের ৬৪। ।
মৃন্ময়ী। হিজসাধনে ক্ৰী করি না। খােদাবন। বাপের সব ছেলেগুলি ভাল কখনই হয় না। যে ছেলেটী মন্দ হয়, তাকে প্রথমে ভয় ও মিত্রতা দেখিয়ে ধর্মপথে আনা পিতার কর্তব্য। তাতে যদি ফল না হয়, তবে তাড়না করা, তারপর অন্য উপায় দেখা কর্তব্য। ম্যাজি। বাবু! I understand your good opinion. টুমরা মতলব হাম বুঝা যায়। আসামী- তরফ, আপসে সওয়াল-জবাব করত। বাবু, হাম ঠিক ক দেগা। (ইনস্পেক্টরকে) আসামীকে। জদী হাজির করাে। [ প্রহরীর প্রস্থান। কিরণ। খােদাব। অধীনের নিবেদন এই যে, বিচারকালে এই মােকর্দমা সম্বন্ধে সরকার বাহাদুর হতে আমাকে যেন কোন প্রশ্ন করা না হয়। ( প্রহরীর সঙ্গে শৈল, গদাধর, হেমাঙ্গিনী, আসামীগণ ও পরেশের প্রবেশ ) • কিরণ। আসামীগণ! হাকিমের কাছে পরেশচন্দ্র ঘােষ কতিপয় বিষয়ে এক দরখাস্ত দিয়ে জানান
মৃন্ময়ী
f
যে, তােমাদিগকে হাজির হবার জন্য পরওয়ানা
জারী হয়, সে সমস্ত তােমরা অবগত আছ,
এখন কি কি বিষয়ে দরখাস্ত করেছে, তা
শােন দরখাস্ত পাঠ )। তােমাদের মধ্যে কার
কি বলবার আছে, তাহা বল ।
শৈল। আমি পরেশ ঘােষকে টাকা কর্জ দিই,
সেই টাকা চাওয়ায়, ৩ নং অসামী কুমুদিনী
আমার টাকা দিয়ে খত খালাস ল'য়েছে, আমি
কোন দোষে দোষী নহি। আমার জ্ঞাতি শত্রুতা
করে মিথ্যা অভিযোগ করেছে।
গদা। পরেশ যে যে বিষয় জানিয়েছে, তা বুঝে
দেখলে, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষী। আমি নিজ
হিতের জন্য অথবা স্বার্থপর হয়েও কোন কাৰ্য্য
করি নাই। (জবাব দাখিল করণ )
কুমুদিনী। আমি বেশ্যা। পরেশ বাবুর বিষয়
তঞ্চক করে লওয়া আমার বুদ্ধির অগম্য ; আমি
এমন কাজ জেনে শুনে করি নাই, সে কারণ
আমি যতদূর দোষী, তা ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব
দয়া করে দেখবেন।
ম্যাজি। তােম সয়তান হয়। তাে পরেশ
মৃন্ময়ী।
ঘোষকা যে হাল কিয়া, তােমকোভি উসি
হােনা চাহিয়ে।
কুমু। হুজুর মালিক, ধৰ্ম্মবিচারে আমার যা দণ্ড হয়
দিৱেন, তাতে দুঃখ নাই।
ম্যাজি। punishment এস হােনা চাহি যাে, জগৎমে
কৈ এস নেমকহারামী কাম কৰি নেহি
করেগা। এ রেণ্ডীকে তিন মাস ফাটক।
গদাধর এ সবকা মূল হ্যায়, উসকা দো মাস
ফাটক, পনর রােজ solitary confinement।
আর শৈলেন ঘােষ ত Shylock হ্যায়,
উসকা দো হাজার রূপপয়া জরিমানা, নেই দেগা
ত ছ মাহিনা ফাটক। আউর এক মাহিনাকা
ভিতর পরেশ ঘােষ এ রেণ্ডীকা আসল রূপেয়া
সব দেনেসে উস্কা জমিদারী ফেরত মিলেগা ।
[ ম্যাজিষ্ট্রেট, কিরণ প্রভৃতির প্রস্থান।
পরেশ। ধৰ্ম্মস্য সূক্ষা গতিঃ হকের ধন অবশ্যই
পাব। ফাঁকী দিয়ে কে ক’দিন সুখে দিন
কাটাতে পেরেছে ?
কনষ্টেবল। শৈল বাবু! চলুন আর ভাবলে কি
মৃন্ময়ী। হবে, আস্তে আস্তে টাকাগুলি দিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে যান। গদা। না খেয়ে না ছুয়ে এই। খেলে ছুলে না জানি ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দিত। শৈল। জমাদার সাহেব! যদি কোনগতিকে অর্থ- দণ্ডটা রেহাই করে দিতে পারেন, আমি আপনাকে ভাল করে খুসী কযে। জমা। এ গরীবের উপর দয়া করে টাকাগুলো ফেলে দিন, আমি আপনার অনু গ্রহের পাত্র হ’তে চাই না, কৰ্ত্তব্যকর্মে গাফিলি ক'রে এত দিনের চাকরিটা কি খোয়াব ? শৈল। তবে মেয়াদ থাটাই শ্রেয়। টাকার বদলে গাএর মাংস কেটে দেবার হুকুম শতগুণে ভাল ছিল, টাকা দিলে ত আর বাঁচবাে না। গদা। তবে এক যাত্রায় পৃথক ফল কেন। কয়েদখানায় ঘানী টানা যাক। | কনষ্টেবল ব্যতীত সকলের প্রস্থান। কনষ্টেবল। অতি লোভে তাঁতী নষ্ট। কথায় বলে “লােভে পাপ, পাপে মৃত্যু” অধৰ্ম্ম করে অনেক চল ৮ ।
মৃন্ময়ী।
পয়সা রােজগার করেচি। পেটের দায়ে
অনেক মিথ্যা মকদ্দমা সাজিয়ে কত নির্দো
যীকে সাজা দেওয়াইছি, এ সব দেখে শুনে
নাকে কাণে খত, আর কোন্ শালা কখনও
অধৰ্ম্ম ক’রূবে।
[ প্রস্থান।
= পঞ্চম অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য ( নরেনের শয্যাগৃহ) নরেন শয্যাশায়ী ; পার্শ্বে পাখা-হস্তে তরু আসীনা । নরেন। তরু! আমার আশা ছাড়, আমার অবৰ্ত্ত- মানে তােমাদের যে কে দেখবে, আমি তাই ভাবছি। তরু। ( ক্রন্দন) মা কাত্যায়নী কি মুখ তুলে চাইবেন না ? তুমি ভেবােনা, কবিরাজ বল্লে- তােমার ব্যারা ত শক্ত নয়।
মৃন্ময়ী। নরেন। আমার দাদা কি খবর পানি। খবর দিয়ে বা কি করবাে ? আমি যে সদ্ব্যবহার তার সঙ্গে করেচি, তাকে এ পােড়ামুখ সেন আর দেখাতে না হয়। তরু। তিনি শুনে কি চুপ করে আছেন। পরের চাকুৱীর কারণ বিদেশে পড়ে আছেন,তাকে ত আবার সেখানকার ঘর-কন্যার গোচি করে আসতে হবে। নরেন । তরু! মনে আর কোন দুঃখ নাই, তবে দাদার সঙ্গে দেখা হবে না, সেই ভাবনাই ভাবচি। তরু। তুমি একটু ঘুমােও দেখি। সব সেরে যাবে। আমার মাথা খাও, ভেবােনা। তুমি ছাড়া আর আমাদের কে আছে বল ? নরেন। তােমার দিদিরা যদি আসে, খুব যত্ন- আয়িত্তী করাে। তাদের সঙ্গে আমি কখন ভাল করে কথা কইনি। তরু। তুমি সেরে ওট, তখন যা বলবে বলল। আমি ভালমন্দ বলতে চাইনি। বাড়ীতে ব্যাম, এখন কি তাদের জন্যে যজ্ঞী ক’রুতে বসবাে !
মৃন্ময়ী।
নশী ও কিরণের প্রবেশ
কিরণ।
নরেন। ভাই কেমন আছ ?
নরেন। দাদা-দাদা! ( নিস্তব্ধ )
কিরণ।
নরেন! দাদা বলে থামলি কেন ভাই?
ব্যাম এখনি সেরে যাবে, কোন চিন্তা নাই।
মা জগদম্বা আরােগ্য করবেন।
নারেন। দাদা! তুমি কি একলা এসেছ ?
কিরণ। তােমার বউদিরা তােমায় দেখবার জন্য
বড় ব্যাকুল হয়েছিল, তাই সকলকে এনেছি।
কিরণ বাবু! আপনি বাহিরে মুখ হাত পা
ধােবেন আসুন, নরেন একটু ঘুমুক।
অনেক দিন বাদে
দিন বাদে এসেছি, বিশেষতঃ
নরেন পীড়িত, তার কাছে একটু বসি । খানিক
বাদে যাচ্ছি।
নশী।
কিরণ।
(মনােরম, মৃণায়ী ও কানাইয়ের প্রবেশ)
কিরণ। তােমরা নরেনের মাথায় বাতাস ও গাএ
হাত বুলিয়ে দাও, বেশী কথা কও না।
[ কিরণের প্রস্থান।
মৃন্ময়ী।
মনাে। আহা! বাছার সােণার অঙ্গে যেন কালি
ঢেলে দিয়েছে! ভাই, এত দিন খবর দাওনি
কেন ? আমরা যে কিছু জাতে পারিনি ?
মৃন্ময়ী। • এখন কি কোন অসুখ বােধ কচ্ছ ?
নরেন।
བ། །
মৃন্ময়ী। ছােট বউ ! এই রােগটা ত একদিনে
বাড়েনি, এদ্দিন কি করে নিশ্চিন্ত হয়েছিলে ।
মননা। তরু ছেলে মানুষ, ও কি করবে বা ?
আর এখন ব'লেই বা কি ফল হবে। যেমন
করে হক, মা কাত্যায়নী নরেনকে রােগমুক্ত
করে দিন, তা হলেই আমাদের সকলের চিন্তা
দূর হয়।
মৃন্ময়ী। মাকে ত একমনে ডাচি, মা কি দয়া
করবেন না ?
মনে। তরু।
নরেনকে কিছু খেতে দাও, মুখ
শুখিয়ে উঠেছে।
তরু। খাবার সময় হলে দেবো, তােমরা কাছে বসে
কথা কইচ, তাতে বােধ হয়, ওর কষ্ট হচ্ছে।
মননা। মৃন্ময় ! তুই মুখ হাত পা ধুয়ে আয়, আমি
ততক্ষণ বাতাস দি ।
মৃন্ময়ী।
!
নরেন। ছােট বউ ! তুমি দিদিকে নিয়ে নীচে যাও,
মেজবউ খানিক বাতাস দিক।
[ মনােরমা ও তরুর প্রস্থান।
নরেন। দেখ মেদিদি ! আমার যে রকম কঠিন
ব্যাম, তাতে এ যাত্রা রক্ষা পাচ্চিনি।
মৃন্ম। তুমি ছেলে মানুষ, তাই সামান্যতে এত উতলা
হয়েচ। ভয় কি, জগদম্বা রক্ষা করবেন।
তােমার দাদা এসেছেন, যে রকম চিকিৎসা
দরকার, তা করাবেন, তােমায় কিছু ভাবতে
হবে না।
নরেন। আমি আমার জন্যে ভাব চিনি। আমি
মরে গেলে আমার স্ত্রী-পুত্রের কি দশা ঘটবে,
তাই ভেবে ভেবে খিদে তেষ্টা গেছে।
মৃন্ম। বালাই। তুমি সেরে উঠবে, তুমি পাগলের
মত ব’চো কেন ?
নরেন। মেজবউদি !, আমি পাগল হইনি! আমার
নিজের বুদ্ধির দোষে, আমি আমার দেবতুল্য
দাদার উপর কত রকম অত্যাচার করেচি,
অপমান করেছি, তার বিষয় আত্মসাৎ
করেচি, বাড়া থেকে তাড়িয়ে দিয়েছি।
মৃন্ময়ী। আমার মতন নরাধম এ মরজগতে আর কি দুটী আছে ? মুন্ম। যা হয়ে গেছে, তা ভুলে যাও। তােমার দাদা, ত সে রকম নন, তােমার ব্যামর খবর পেয়েই এসেছেন। তােমার দাদা কিছু ত আর তােমায় বলেনি, যে তাই নিয়ে মন খারাপ, ক’রচ। দাদা না বলতে পারেন; দাদা নয় ছােট ভাই বলে আমার দোষ ধরলেন না, কিন্তু আমার মন ত আর বুঝবে না, কি বলেই বা মনকে সান্ত্বনা করি। মৃন্ম। সেরে ওঠ, তার পর সব হবে। বেশী ভেবােনা। নরেন। মাথা মুণ্ড আর কি ভাববে বল, দেনার দায়ে চুল বিকিয়ে গেছে। মৃন্ম। ( সবিস্ময়ে ) এ- নরেন। তুমি যে চমকে উঠলে, আরাে যত শুনুবে, তােমার রক্ত অবধি শুকিয়ে যাবে। মৃন্ম। তুমি সেরে ওঠ, ভাবনা কি। তােমার মুখ শুকিয়ে উঠেচে, একট দুধ খাও ( দুগ্ধপ্ৰদাম) মৃন্ময়ী নরেন। মেজদিদি ! দাদাকে কি বলবার মুখ আছে। আমি চামারের ন্যায় ব্যবহার করেছি। ভ্রাতৃ-প্রেমের বিনিময়ে গরল পান করেছি । শান্তি-সুখ পাবার আশায় শান্তি দূর করে অশান্তি এনেচি! আমি কি মানুষ ! মানুষ হলে শরীরে দয়া থাকত, পরের কষ্ট দেখলে প্রাণ কাঁদূতাে, যার সঙ্গে একত্র লালিত পালিত হয়েচি, এক মাতৃস্তনদুগ্ধে যাদের দেহ বর্ধিত হয়েছে, আজ কি না সে সব ভুলে গিয়ে স্বার্থ- পরতার দাস হয়ে ভ্রাতৃস্নেহে জলাঞ্জলি দিলুম। মেজদি! তােমায় কত কুবাক্য বলেছি, তুমি তা মনে রাখনি। তা হলে কি এ হতভাগার মরণ সময়ে দেখতে আসতে। ( ক্রন্দন ) মৃন্ময়ী। নরেন! আমি তােমার অসুখ দেখতে এসে তােমায় আৱে অসুখী কল্লেম। চুপ কর ভাই। এতে কি ব্যাম কমবে ? চুপ কর, ভেবােনা। নরেন। তুমি আমায় ছােটভায়ের মতন যত্ন কত্তে, ছােটভাইয়ের ন্যায় ভালবাসতে ; বল, আমার সব দোষ ক্ষমা করলে ? }
মৃন্ময়ী।
মৃন্ময়ী। তুমি ছোট ভাই, তোমার কথা কি মনে
করে মন গরম করা আমার উচিত ? ঘর
ক’ত্তে গেলেই দুটো কথা শুতে হয়, সে শুনে
সয়ে, থাকলেও পরিণামে সুখ আছে। আমি
কি ছােটভায়ের উপর রাগ করতে পারি ?
তুমি সেরে ওঠ, তােমার ছেলে ও তােমার,
দাদার ছেলে বই আর আমার মুখে আগুন
দেবর কে আছে বল ? তাদের ওপর রাগ
কল্লে-তাদের অশুভ কামনা কল্লে, আমার কি
মরকেও স্থান হবে ? তুমি একটু ঘুমােও
দেখি ।
নরেন। আচ্ছা, আমি একটু ঘুমুই ; তুমি মুখটুক
থােওগে। বউঠাকুরুণকে নীচে যেতে বল্লম,
তিনি ত রাগ করেনি।
মৃন্ময়ী। তােমার বউদি তােমায় দেখতে এসেছে,
রাগ থাকলে, প্রাণ কাঁদলেও—মন গরম করে
লােক দুদণ্ড আসতে দেরী করে । তুমি মিছে
ভাবনায় কেন রােগ বাড়াও বল ?
নরেন। মেজদি। বল, আমায় ছেড়ে আর কোথাও
যাবে না ।
মৃন্ময়ী।
মৃন্ময়ী। আমি পাগলের সঙ্গে পাগল সাজ তৈ আর
পারিনি। তুমি ঘুমােও, আমি মুখ হাত ধুইগে।
নরেন। অনেকদিন পর দেখা হ'লল, দুটো মনের
কথা কই। যা করেছি, তার জন্য যদি অনু-
তাপ হয় ; তা হলে পাপ অনেক কেটে যাবে।
মৃন্ময়ী। তুমি ত কিছু করনি। তােমায় ত তােমার
দাদা কোন দোষ দেন না। তবে তুমি মিছে
ভেবে কেন শরীর নষ্ট কর ?
নরেন। তােমাদের দেখে আমার অসুখ অনেক
কমে গেছে। বােধ হয়, হাওয়া বদলালেই
শরীরে বল পাব।
মৃন্ময়ী। যাবে, তুমি ভাল হও, তাই হবে। দুদিন
ভাত খাও, তার পর হাওয়া খাওয়ার কথা।
আমি শীঘ্র আসূচি।
[ ঘরের দ্বার রুদ্ধ করিয়া প্রস্থান।
(কিরুণের প্রবেশ )
কিরণ। কাল চল ভাই, তােমায় নিয়ে হাওয়া
খাইয়ে আনি।
হাওয়া খেলে যদি ভাল হই, তবে চলুন।
নরেন ।
মৃন্ময়ী।
কিরণ। তোমার ব্যাম ত শক্ত নয়, তুমি অত
ভাবলে--সারতে দেরী লাগবে।
নরেন। দাদা! ভাববে। আর কি ? মা কাত্যায়নী
যে ভীষণ স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তাতেই আমার
জীবনের অর্ধেক রক্ত শুখিয়ে গেছে। দাদা !
আমি তােমার নিকট কত দোষী।
কিরণ। তােমার ত কোন দোষ নাই, আমার
অদৃষ্টের ফল।
নরেন। আপনার মতন দাদা পেয়েছিলুম বলে—
বেঁচে গেলুম। তা না হলে---আমার দশা
কি হ’ত, বলুন দেখি ?
কিরণ। তুমি আমি এক রক্তে গঠিত, এক মাতৃ
স্তন পান করে—এই দেহ বর্ধিত। ভাই কি
কখন পর হতে পারে।
নরেন। দাদা! কাল যদি যেতে হয়, তবে বিষয়ের
একটা বন্দেজ করে চলুন।
কিরণ। তুমি সেরে ওঠ, তারপর যা হয় করা
যাবে। আগে তুমি, না আগে বিষয়।
নরেন। একটা বন্দেজ করে গেলে ভাল হয় না?
আর যাবার খরচ পত্র ত টের হবে।
মৃন্ময়া।
!
কিরণ। নরেম! তাের দাদা থাকতে—তাের ব্যামর
সময় টাকার জন্য তােকে মাথা ঘামাতে হবে ?
আমি যখন এসেচি, সে সব আমি ভাবো।
নরেন। 'না দাদা, তা ব'চিনি। তবে বিষয়টার
একটা গােচ কল্লে ভাল হয় না ?
কিরণ। দেখ নরেন! এই বিষয় হতেই যত
অনর্থ ঘটেছে। বিষয় যদি না থাকতো, তা
হলে আমরা দুঃখের ভাত সুখ করে খেয়ে
দিন কাটাতুম। এই বিষয় হতে তুমিও সুখী
হলে না। তােমার এখন অসুখ, আমি যদি এ
সময় কোন বন্দেজ ক’ত্তে যাই, তুমি না ভাবতে
পর, কিন্তু কুলােকে বলবে—দাদা সময় বুঝে
এসে ভাগ বসাবার জোগাড়ে আছেন। ঈশ্বরে-
চ্ছায় তুমি সেরে ওঠ, তার পর যা হয় করাে।
নরেন। দাদা! তােমার মনে আমি কত কষ্ট
দিয়েছি, তােমার বিষয় আত্মসাৎ করিচি, সেই
পাপে আমার এ অবস্থা ঘটেছে, বিষয়ও
যেতে বসেছে। মা কাত্যায়নীরও কোপে
পড়েচি।
আমার কি আর রক্ষা আছে।
কিরণ।
বাপের বিষয়, তার এক ছেলে ত খাচ্চে।
---
মৃন্ময়ী।
নরেন।
দাদা।
পরে খেলেই কষ্ট হত। আমি শপথ করে
ব’চি, আমার কোন কষ্ট হয়নি ; তুমি মিছে
কেন কষ্ট কর ?
এখন আর কিছু বলবাে না,
আগে সেরে আসি
কিরণ। আমি যাবার যােগাড় যন্ত্র করিগে, তুমি
একটু ঘুমােও।
[ প্রস্থান।
দ্বিতীয় গড়াঙ্ক।
(গােলকের আস্তানা )
গােলকের গীত।
গাজা গুলি চরসে ভাই, কি মজা দেয়।
রাজায় আমায় তফাৎ কিসে, ভাবি সে সময় ।
খানায় পড়বার ভয় রাখি না, পুলিশের ত ধার ধারি না,
দম টেনে ঘরে গেলে মাগ মন জোগায় ।
রাঙ্গা পানির মুখে আগুন, যে খায় তার জ্বালা দ্বিগুণ,
নেশার জন্যে পয়সার ভাবনা ভেবে দিন কাটায়।
নেশা করে বিকোয় বাড়ী,
বেটাদের গলায় দড়ি,
বেটারা মাগের নাতী খেয়ে নেশা ছাড়ায় ।
মৃন্ময়ী।
( নরির প্রবেশ
নরি।
নরি। বা রকে! তুই 'যে একজন মহা বাঁধনদার
হ'য়ে উঠলি ? বলি,আজ এত রগড়ের দৌড়
কেন ?
গােলক। আমার বাবা সময় অসময় নেই ; ভােলা-
নাথের কৃপায় বেশ সুখে আছি,—কোন ব্যাটার
তােয়াক্কা রাখি না; খাই দাই, আর ফুৰ্ত্তি করে
করে বেড়াই। কারুর কাছে ত আর টিকি
বঁধা নেই।
আজ ভাই,-এক বড় রগুড়ে-গল্প শুনলুম;
তােমায় যতক্ষণ না শশানাব, পেটের ভেতর
টগবগ টগবগ করে ফুটবে।
গোলক। তােমার গল্প আর ছেলেবেলার ঠান.
ঠিক যেন—একি ভাবের।
তা হতে পারে! বােধ হয় একই লােকের
বাঁধুনি।
গােলক। বাবু ভায়াদের কাণ্ডকারখানা
হতভম্বর ন্যায় হয়ে পড়িচি, আর দেশে
থাকতে ইচ্ছা যায় ন।
দিদির গল্প,
নরি।
মৃম্ময়া। নরি। আমারও ঠিক ভাই তাই। ঠাকুর কাটার ব্যাপার দেখে—পিলে চমকে গেচে ! গােলক। দিন দিন কত রগড় দেখবে, তখন বলবে যে গােলকই সুখী। নরি। কুলাঙ্গারের হিদুর ছেলে হয়ে—একবার ভয় খেলে না ? ধন্য সাহস!-বুকের পাটাও খুব!' ছেলেপুলে নিয়ে—ঘর করে, তাও ভাবলে না ? গােলক। আমিও কতক শুনিচি; যখন শুনি, মনে হয়—যে পাষণ্ডরা কি মরবার ভয় করে না। মরবার ভয় করলে, আর কেউ কি এ কাজ করে ? বামুনগুলােও তেমনি ভক্তবিটেল, পয়সার লোভে টিকিদার মশায়রা—যা বেদে পুরাণে নাই, তাই ক’ত্তে পারেন । সহকারী সভাপতি হলেন, ধার্মিকপ্রর লশ্ৰীযুক্ত...•••••• গােলােক। ঠিক হয়েছে ঠিক হয়েছে। ত্র্যহস্পর্শ- যােগ! বিধিলিপি কে খণ্ডাবে? নরি। ধার্মিকের ছেলে-সন্ধ্যা আহ্নিক না করে জল খায় না, তার উপর কথায় বলে—গােদের নরি। এদের মৃন্ময়ী। . উপর বিষফোড়া! ২৪ ঘণ্টা দেশের বড় বড় নৈয়ায়িক ভটচাজ নিয়ে ধর্মশাস্ত্রালােচনা। চক্ষুলজ্জা ত আছে, তাই সভাপতির পদ স্বদেশ- হিতৈষী স্বধৰ্ম্মানুরাগী হরিপরায়ণ কুলধ্বজের উপর দিয়ে—আড়াল থেকে উকাবুক মাচ্চেন। গোলক। কত লােকে কত রকম বলে, ঠিক মদ্দাটা জানা গেল না। নরি। শৈলবাবুর টাকা কড়ি জমিজায়গা দিয়ে বড় খাঁতির মহল, ঠাকুরসেবা-ওটা গলগ্রহ ভেবে যেবা ত তুললেন, পাছে এর পর কেউ ঠাকুরের বিষয় নিয়ে মালি মকদ্দমা জোড়ে, সেই ভেবে, তারপর কেউ বলন-- মালী মকদ্দমার হাত এড়াবার জন্যে, আবার কেউ কেউ বলে—যে প্রবাদ আছে, ঠাকুরের শরীরে অনেক মণিমুক্তা আছে, সেইগুলো পাবার লােভে-বিধিপূর্বক ছুরীর আঘাত দেওয়াতে পেছপা হন নি। গােলক। আমর! চুরি করবি, ঘর জ্বালাবি, দেবদ্বেষী হয়ে কুলদেবতার অস্তিত্ব নষ্ট কবি, আবার তাতেও শাস্ত্র। ১০
মৃন্ময়ী
নরি। ঠাকুরের গায়ে আঘাত নিজে করেনি,
পাছে ধৰ্ম্ম হয় ! তাই পৈতেওয়ালা টিকি-
দার নিয়ে ঠাকুরের পেট হাঁসাতে এসেছিল।
গােলক ব্রাহ্মণ হয়ে–কি এমন নৃশংস চণ্ডালের
ন্যায় ব্যবহার কত্তে পারে ?
নরি। রূপিয়া পেলে সব পারে, বিশেষতঃ এ
ঠাকুর ভুলেও সন্ধ্যাক্কি করে না, সব রকম
দালালি ব্যবসা করা আছে, আচার ব্যবহার
পিরু শেখের মতন—বলি ও গােলােক! বষ্টমী
ঠাকরুণ আসছে, দুই একটা গান টান শুনলে
হয় না।
গােলক। তােমায় দেখলেই চটে যায়, তুমি চুপ
কর দেখি, আমি ডাচি।
( জনৈক বৈষ্ণকীর প্রবেশ )
বলি ও ঠাদিদি! আজ এত সকালবেলা
এদিকে কি মনে করে ?
বৈষ্ণবী। তােমাদেব চাঁদবদন দেখতে।
নরি । আমাদের তবে কপাল ফিরেচে।
গােলক। ঠাদিদি না হলে নাতীদের দরদ আর
মৃন্ময়ী
কে জাবে বল। ঠান্দিদি" দেখচি অনেক
পথ হেটে ক্লান্ত হয়েচু, একটু ব’সাে।
বৈষ্ণবী। আর ভাই এক রকম করে দিন ত কাটা,
লেম, যদিও গরীব দুঃখী ভিক্ষা করে এক মুটো
জুটলে দিন কাটে, তবুও “হাতে কালি মুখে
কালি বাছা আমার লিখে এলি,” এটা আজ
আবার খাটনি। গরীব স্বামী গরীবের মতন
ভালবাসে, বড়মানুষদের মগের মতন পাএর
ওপর পা দিয়ে সােহাগ করতে ত শিখলুম না।
নরি । আজ ঠানদিদিকে বড় গরম দেখ চি, কি
হয়েছে ?
বৈষ্ণবী। হবে আর কি মাথা আর মুণ্ড !
শুনে অবাক হয়েচি। আজকালকার ছােড়া-
গুলাের বাপের পয়সা অ'র সমত্ত পরিবার থাক্-
লেই, তারাই বা কে—আর দিল্লীশ্বরই বা কে ।
গােলক। ঠানদিদি ! যা বলছ তা সবই সত্য,
বউদের দোষ কি বল।
বৈষ্ণবী.। বউদের হয়ে সালিষী? বউদের নাক
মুখ হাত নাড়া দেখলে আগা পাশতলা ঝেটিয়ে
বিষদাত ভেঙ্গে দিতে ইচ্ছা যায়। ছোড়া--
।
মৃন্ময়ী।
।
গুলােও তেমনি, যেন বাপের জন্মে বৈ হয়নি।
মেড়ার মতম আলমীদের পাছু পাছু আছেন,
আলমীরা হাই তুললে বাবুরা ভিরুমী যান।
মরি । আজ যদি দয়া করে এ দিকে এলে, দুএকটা
গান
গান শোনাতে হবে।
বৈষ্ণবী।
গান শিকেয় তুলে রাখগে ।
দিন নেই,
ক্ষণ নেই, দেখা হলেই গান—গান—গান।
মেজাজ ঠিক্ না থাকলে গান কি ভাল লাগে ?
তােমার গান শুনূলে প্রাণ রু হয়ে যায়।
তােমার পায়ে ধরি, আমার মাথা খাও, একটা
গান শুনাতেই হবে।
নরি।
০
(বৈষ্ণবীর গীত)
সাধিলে ত ভালবাসা পাওয়া নাহি যায় ।
মন যে চাহে না ভালবাসিতে তােমায় ।
প্রাণ কাঁদে যারি তরে,
সেই ত জানে অন্তরে,
সে চাদ চকোর বিনে আঁধার হৃদয়।
চেংড়া ছাঁবালের হাতে পড়ে অস্থির হয়েচি,
এখন বাপু ছাড়, ঘরের কাজ-কর্ম কিছু হয়নি।
গােলক। কাজ ত ফি দিন কর।
কর। আমরা ত
তােমার দেখা ফি দিন পাইনি।
বৃন্ময়ী।
বৈষ্ণবী। এমন ত হতচ্ছাড়া জন্মে দেখেনি।
গােলক। ঠান্দিদি! তোমায় কত ভালবাসি, তাই
তােমায় কাছ থেকে যেতে দিতে মন কাঁদে।
বৈষ্ণবী। পােড়ারমুখেরা খায় মাগের নাতী,
আমার গায়ে সয় না, কি করি, বসে কঁদি, যদি
সে বাপের বেটা, ঝাড়ি বিষ মেরে ঝেটা।
[ বৈষ্ণবীর প্রস্থান।
গােলক।
ঠানদিদি আজ বড় গরম,
গরম, কেউটে
সাপের মত ফোঁস ফোঁস কচ্চে।
নরি । চল চল বাড়ী যাওয়া যাক, কিরণবাবুর
বাড়ী এসেছেন, একজন সাধুপুরুষ সঙ্গে এসে
ছেন, মাএর মন্দিরে আজ খুব ধূম ।
[ সকলের প্রস্থান।
মৃন্ময়ী। তৃতীয় গর্ভাঙ্ক। ( যমুনার সম্মুখস্থ বাঁধ ) শৈল, গদা প্রভৃতি। শৈল। মলেই হাড় জুড়ােয়। আর ত এ কষ্ট সওয়া যায় না; পেটে না খেয়ে কদ্দিন কাটা- লেম, কিন্তু এ দুঃসহ ব্যাধিযন্ত্রণা নরকযন্ত্রণা বলে বােধ হচ্ছে। যৌবনে কামােন্মত্ত পশুর ন্যায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে কত শত রমণীর অতি আদরের ধন সতীত্বরত্ব নষ্ট করেছি। উঃ! কণ্ঠাগত প্রাণ। ভগবন্! নরকের ভীষণ ছবি আর দেখিও না, অনুতাপানলে আমার হৃদয় দগ্ধ হ’তেছে। এ আবার কি! রমণীর অশ্রু- কণা, পতিব্রতা রমণীর অভিসম্পাত, কি আমার চিতাবধি অনুসরণ করবে, এ হতভাগ্য জীব- নের প্রতিমুহূর্তেই অমানুষিক লােমহর্ষণকর ভীষণ কৰ্ম্ম সাধিত হচ্ছে। জ্ঞাতি-বন্ধু-উচ্ছেদ- সাধন-ব্রতে জীবন উৎসর্গ করেছি। স্বার্থের মৃন্ময়ী দাস হ'য়ে--সামান্য অর্থের জন্য, অসংখ্য-জন- সমাদৃত ঘােষবংশের জীবনের জীবন দেবমুর্তি নষ্ট করে, দেবােত্তর-সম্পত্তি আত্মসাৎ করতেও কুষ্ঠিত হই নাই। যা হ’তে—এ দুর্লভ মানব জন্ম পেলেম, সেই স্বর্গাদপি গরীয়সী সাকার- করুণাময়ী স্নেহপ্রতিমা জননীর তলঙ্কারাদি অপহরণ করতেও ভীত হই নাই। এ নীচাশয় দুৰ্ম্মতির কি নরকেও স্থান আছে। ঐ-ঐ শােন, মৃদুমন্দ সমীরণ আমায় দেখে-ঠাট্টা-বিদ্রুপ ক'চ্চে, শ্মশানার্সী নরমাংসপেশী শৃগাল কুকুর আমার আগমনে ভীত হয়ে তীব্রস্বরে কাছে। হা অদৃষ্ট! এ. নিত্য মধুর শান্তিপূর্ণ স্থানেও আমি কি দুদণ্ড আরাম পাব না? ( গদাধরের প্রবেশ) গদা। বিচারটা জবর, এক পয়সা পেটে পূরলুম না, সিন্দুকে ফেলুম না, কিন্তু শাস্তির বেলা দেড়- গুণ আমি, আর বার আনা যিনি মারুলেন। বলবো আর কাকে-রাজা আর খােদা যেন নিক্তি ধরে চুল চিরে দণ্ড ভাগ করে দিয়েছেন, মৃন্ময়ী। আহা কি; বিচার গা! যেমন কাজ করিচি, তেমনি ফল পাচ্চি ! বলি এই যে শৈল ভায়া ! তুমিও দেখচি, দণ্ডের ভাগটা ভােগ করচ ভাল করে। শৈল। মড়ার উপর আর খাড়ার ঘা কেন ? গদা। “পেটে খেলে পীটে সয়।” শৈল। গদাধর ! একি ঠাট্টা-বিদ্রুপের সময় ? গন। তােমায় খুন করিনি---এই ঢের। তাের জন্যে ভিটে গেল, দেশ ছাড়লুম, জেল খাট- লুম। আর আমার কি সর্বনাশ তুই করেছিস, স্মরণ কর। শৈল। যা করিছি, তার জন্য অনুতাপ ক'চ্চি; আর সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত হচ্ছে !–এই শরীর শত বৃশ্চিকের দংশনযন্ত্রণায় অধীর হয়েছে। গা। আজ তু বেঁচে গেলি। যদি ভগবান চলৎশক্তি-রহিত না করতেন, তা হলে এখানেই তােকে গাের দিতাম। (মৃন্ময়ী, গিরিবালা ও যশোদার প্রবেশ) মৃন্ময়ী। তােমরা তীর্থস্থানেও কি ঝগড়া বিবাদ ১১১ স্থায়ী। ভুলবে না ? ; গুরুদেবের নিকট, শরণাপন্ন হও। তিনি অবশ্যই তােমাদের দয়া কবেন। শৈল। বউ ঠাকরুণ! তুমি আমাদের মা, ঘােষ- বংশের লক্ষী ; আমাদের দয়া করে তুমি যদি নিয়ে যাও। মৃন্ময়ী। • (স্বগত) আহা! অমন সােণার সংসারটা ছারখার হয়ে গেল। (প্রকাশ্যে) কেন ভাই যাব না? তবেগুরুকে ঈশ্বরস্বরূপ যদি পূজা করূতে পার, তবে চল। তােমার উপ যাতে তাঁর দয়া হয়, তা করবো। [ সকলের প্রস্থান।
असो।। চতুর্থ গর্ভাঙ্ক। { কালীমন্দির) নানন্দ স্বামী, শিষ্যগণ ও কিরণ। গীত। ভূভার হরিতে ও মা, এ বেশে কেন দেখা দিলি । ত্রিতাপ নাশিতে সহাস্যবদনে কেন না,অইলি । কুলনারী হয়ে লজ্জা তেয়াগিয়ে উলঙ্গিনী হয়ে রণে প্রবেশিলি। বিপদ নাশিতে অসি ল'য়ে হাতে স্বামি-হৃবিপরি কেন বা দাড়ালি। ছি মা,এ বেশে কেন দেখা দিলি । জ্ঞানা। (পূজাকরণ ও স্তোত্রপাঠান্তে সকলের ভূমিষ্ঠ হইয়া মাকে প্রণাম ) বৎসগণ ! আজ তােমাদিগকে এত বিপ্ন দেখছি কেন ? ১ম শিষ্য। পিতঃ! বাল্যকাল হ’তে-পর্বত, অরণ্য ও নদীতটে বাস। সংসার-রহস্য জান- যুন্ময়ী ; . বার কোন দরকার কখনও হয় নাই, অথবা জানতে মন কখনও ব্যাকুল হয় নাই; কিন্তু আজ সংসার-চিত্র দেখে—মন ' বড় চঞ্চল হয়েচে।—পরমপিতা পরমেশ্বরের এ কি মহিম! সংসারজালে মনুষ্য বদ্ধ হয়ে কেন এত কষ্ট ভােগ করে ? জ্ঞানা। আজ অবধি সংসারস্রোত কি ভয়াবহ ও কি ভীষণ তা হৃদয়ঙ্গম করবার তােমাদের ক্ষমতা হয় নাই। সংসার পাপ-পুণ্যের স্থান, ইহা কৰ্ম্ম- ক্ষেত্র নামে অভিহিত। সংসারপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেই মনকে শীঘ্রই পরম-পথ-প্রাপ্তি- পথে নিয়ােজিত করতে বিলম্ব হয় না। যে ভয়াবহ সংসারচিত্রে তােমার মন ভীত ও চিন্তিত হয়েছে, তা পাপের আধার। কৰ্ম্মফলে জীব- গণ তা ভােগ করে থাকে। ১ম শি। এ সকল ভয়াবহ-চিত্র দেখে লােক পাপ- কৰ্ম্ম হতে বিরত হয় না কেন? জ্ঞান। স্বয়ং ভগবাও নিয়তির বাধ্য। “ন কর্তৃত্বং ন কৰ্ম্মাণি লােকস্য সৃজতি প্রভু। ন কৰ্ম্মফলসংযােগং স্বভাৰস্তু প্ৰবৰ্ত্ততে।” . ১১৪ :
মৃন্মরা। কিরণ। স্বয়ং রামচন্দ্র যখন সংসারচক্রে পতিত হয়ে শােকে তাপে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন, তখন মনুষ্য ত ছার। মনুষকে পূর্বজন্মের কৰ্ম্মফল অবশ্যই ভােগ করতে হবে। “পূৰ্বানুভূতঃ সংস্কারাৎ কালধৰ্ম্মবিপাকতঃ।” দেহ পঞ্চভূতে লীন হয়, চিতাবহ্নি কৰ্ম্মসমষ্টিকে দগ্ধ করতে পারে না, ইহা আত্মার অনুসরণ করে। দেব ! জীবনের তৃতীয়াংশ স্ত্রীপুত্ৰপরিজন সহিত অতিবাহিত কল্লেম, কিন্তু আর ত সংসারে এক দণ্ড থাকতে ইচ্ছা হয় না। আপনার অনুমতি পেলেই সংসারধর্ম ত্যাগ করে পবিত্র তীর্থস্থানে গিয়ে বাস করি।' জ্ঞানা। বৎস! সংসার সর্বাপেক্ষা কঠিন অাশ্রম, যিনি এই স্বার্থময় প্রতারণাপূর্ণ সংসারগৃহে নির্লিপ্তভাবে আশাপাশ ভেদ করে কর্ত্তব্য- বােধে লােকহিতার্থে কৰ্য করতে সক্ষম, তার পক্ষে জীবাত্মা-পরমাত্মার মিলন শীঘ্রই সম্ভবে। “ ভিতে হৃদয়গ্রন্থিচ্ছিদ্যন্তে সৰ্বসংশয়া। ক্ষীয়ন্তে চাস্য কৰ্ম্মাণি তস্মিন্ দৃষ্টে পরাবরে।” ১১৫ স্মৃন্ময়ী। ( সংসার-আশ্রম ঈশ্বর আরাধনায় সৰ্ব্বাপেক্ষা সুগম পথ। তুমি নির্লিপ্তভাবে আশা-মায়া-মমতা- শূন্য হয়ে আমার উপদেশ মত যে ভাবে কৰ্ম্ম করে আছ, সেই ভাবেই জীবন অতিবাহিত কর। তুমি এই স্বার্থময় সংসারে যে জ্বলন্ত পবিত্র দৃষ্টান্ত দেখিয়েছ, তাতে তোমার তীর্থ- পৰ্যটন অনাবশ্যক। ( মৃন্ময়ীর প্রবেশ ) মৃন্ম। ( জ্ঞানানন্দ স্বামীর পদধারণ করিয়া } পিতঃ ! জ তামার কি সুখের দিন। আপনার চরণ দর্শন যে আবার ভাগ্যে ঘটবে, তা কখন মনে হয়নি। বাবা! তােমার দয়াতেই ঘোষবংশ আবার পুনর্জীবন লাভ করবে। শৈলর পাষাণ-হৃদয়ে তােমার কৃপায় আবার ধৰ্ম্ম- বীজ ঝঙ্কুরিত হয়েছে, পাষণ্ড গদাধরেরও কুমতি দূর হয়েছে। দয়া করে ওদের ব্যাধিযন্ত্রণা দূর ‘করুন। সুধাময়ী শক্তিসঞ্চারিণী মা নামের অার মহিমা তাদের হৃদয়কে এই ত্ৰিতাপ- দূষিত সংসারে যেন আর কলুষিত করতে পারে।
মৃন্ময়ী জ্ঞান। • মা তােমার ন্যায় নির্মলচরিত্রা স্ত্রীলােক ক জন আছে ? তােমার নির্মল স্বচ্ছ ঈশ্বর- প্রেম-জ্যোতি সুবিমল চাঁদের হাসিকে পরাস্ত করেছে। সে স্বচ্ছ কিরণেও কলঙ্করেখা আছে, তার রাহুগ্রাসেরও ভয় আছে, কিন্তু মা ! তােমার চরিত্রে কোন কলঙ্ক-রেখা নাই। রাহু- রূপী ষড়রিপু তােমার নিকট পরাজিত। নারীকুলে তুমি ধন্য। শৈল। বাবা ! আর কষ্ট সইতে পারিনা; এই দেখ, এই পাপদেহ হতে কত মাংস রক্ত পূষ নির্গত হচ্ছে, শত শত বৃশ্চিকের জ্বালায় হৃদয় যেন ০ দগ্ধ হচ্চে। জ্ঞানা। মাকে প্রাণ ভরে ডাক, তিনি অবশ্যই তােমার যন্ত্রণার প্রতীকার করবেন। মৃন্ম। বাবা! তােমার গুাই দেশে দেশে ঘরে ঘরে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা তারা তারা বলে তারা নামের মহিমা কীৰ্ত্তন কচ্চে। আহা মায়ের কি সুন্দর প্রাণমুগ্ধকর স্নিগ্ধ স্নেহভরা অট্ট অট্ট হাসি-মুখখানি, লল, লােলজি, কোটি কোটি চন্দ্রকিরণ-বিস্ফারিত জ্যোতির্ময় নেত্ৰত্রয়, মৃন্ময়ী। একবার প্রাণ ভরে এস মা মা বলে ডাকি, মা বুলিতে মাতোয়ারা হয়ে রােগ শােক তাপ দূর ‘করি। ষড় রিপুকে আহুতি দিয়ে জীবনের মহৎ ব্রত উদযাপন করি। ( সকলেই সমস্বরে জয় মা কালী ১ গীত আমরা) হৃদয়মন্দিরে তার মায়েরে বসাব। প্রেমমালা গেঁথে মায়ের গলে পরাব। ভক্তিবারি দিয়ে মার চরণ ধােয়াব, ষড়রিপুরক্তে মাকে পূজা করিব। আমরা ) তারা তারা। তারা বলে ভবপারে যাব। ( আমরা তারা তারা তারা বলে মার মুখ চুমি, ( আমরা) তারা বলে মার কোলে বসিব। । নন- জ্ঞানা। আজ আমার এত দিনের চেষ্টা সফল হ'ল। কালী-না-স্রোতে দেশ প্লাবিত হ’ল । মানব-হৃদয় দেব-ভাবে পরিল্পত হল। পারিজাত এই মর্ত্যলােকে মুকুলিত হল । কালী মায়িকি জয় । এ সুধামাখা মা বুলি ভুল । এই জগৎ যা হতে দেখলে, সেই সাকার- স্নেহময়ী গর্ভধারিণীকে ভক্তি ভরে অন্তরে ১১৮।
মৃন্ময়ী।
অন্তরে পুজা কর, তাহলে এ ভব-যন্ত্রণা
ঘুচে যাবে। জগতের মা আনন্দময়ী সাক্ষাৎ
পূর্ণব্রহ্মস্বরূপিণীর চরণ-দর্শনে সমর্থ হবে।
প্রাণভরে জয়কালী মা করুণাময়ী বুল।
সকলে সমস্বরে
গীত
গুরুর কৃপায় মনের আঁধার ঘুচলল এতদিনে।
অসার সংসার জেনে, সার কর সেই নিত্যধনে ॥
(আমরা) আবারে ছেলের মত, মােহে সদাই পাপে মৃত
রােগ তাপ পেলেম কত নিজ কর্মলে।
যবনিকা পতন।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.