Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sakuntala Gitavinay

Biswas,promothnath Ed. · 2009/09/11

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

শকুন্তলা গীতাভিনয়।
শ্রীসীতানাথ বস্ত্র ও প্রমথনাথ বিশ্বাস
সম্পাদিত।
পণ্ডিতবর শ্ৰীযুত তারাকুমার কবির লিখিত
ভূমিকা সম্বলিত।
“হংসাে হি ক্ষীরমাদতে তশ্রি বক্রয়তপয়
কলিকাতা,
২০ নং হরীতকীবাগান লেন, কলিকাতা কমার্শিয়াল প্রেসে,
কৃষ্ণচন্দ্র আইচ দ্বারা মুদ্রিত।
সন১৩২২ সাল।
৩৪ নং বীড়ন জীট হইতে
প্রবােধচন্দ্র বসু বি, এল, ফক
প্রকাশিত।
মূল • আনা।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

বিনীত নিবেদন। ভারতবর্ষের অনুপম ও অদ্বিতীয় মহাকবি কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুল কাব্যজগতে এক অলৌকিক সৃষ্টিবৈচিত্র্য! এ কথা সকল স্থানের কাব্যৱসজ সহৃদয় ব্যক্তিমাত্রেই মুক্তকষ্টে স্বীকার করিয়াছেন। অভিজ্ঞানশকুন্তল কালি- দাসের অমৃতময়ী লেখনী-মুখ-বিনিঃসৃত সর্বোৎকৃষ্ট নাটক। ইহার আদি অবধি অন্ত পৰ্য্যন্ত সৰ্বাংশই সর্বাঙ্গসুন্দর। এই কাব্যের বর্ণনাচাতুৰ্য্য ও রচনা- মাধুৰ্য পাঠে সহৃদয় ব্যক্তিমাত্রেরই হৃদয়কর অনির্বচনীয় আনন্দবসে উচ্ছলিত হইয়া উঠে। এই নাটকখানির মূলনীতিতটী অক্ষুন্ন রাখিয়া সর্বসাধারণের উপভােগ্য করা আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। ভগবদিচ্ছায় মাদৃশজনের ক্ষুদ্র শক্তি যারা সে মহদুদ্দেশ্য কতদূর সিদ্ধ হইয়াছে বলিতে পারি না। বহু বৎসর পূর্বে এ মহা- নগরীতে শকুন্তলা-গীতাভিনয় কয়েকবার মহাসমারোহে সম্পন্ন হইয়াছিল। তদবধি এই অপূর্ব নাটকের গীতাভিনয় একেবারে স্থগিত আছে। সংপ্রতি কতিপয় সহৃদয় বান্ধবের নির্বন্ধ।তিশয়ে নিজ অক্ষমতা সত্বেও আমরা এ কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হইয়াছি। “প্রতিপাদ্যমহি হি এবন্ধে খবরঃ।” প্রতিপাদ্য, অর্থাৎ বর্ণনীয় বিষয়ের গৌরবেই প্রবন্ধ অধিকতর উৎকণা করে। অঃ সে কারণে যদি ইহার বকফি উৎকর্ষ সাধিত হইয়া থাকে, তাহাতেই আমরা সালাত করি। * ( ২ ) ইহার প্রথম ও দ্বিতীয় অভিনয় আমাদের ছােটজাগুলীয়া গ্রামে স্থানীয় “বান্ধবনাট্যসমিতি” কর্তৃক মহাসমারােহে অভিনীত হইয়াছিল। আশা করি, অন্য স্থানের নাট্যামােদী সুরসজ্ঞ মহাত্মারাও এই গ্রন্থখানি আদমের সহিত গ্রহণ করিয়া, ইহার অভিনয় দ্বারা সকলেব আনন্দবান ও আমাদিগকে উৎসাহ দান করিবেন। পরিশেষে বক্তব্য যে, ইহার প্রণয়নকালে আমরা গ্রামবাসী খ্যাতনাম কবিবর মনােমােহন বসু এবং নাট্যবাণীর সেবক, প্রবীণ শ্ৰীযুক্ত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর মহােয়য়ের গ্রন্থ হইতে বিশেষ আনুকুল্যলাভ করিয়াছি। এস্থলে আর এক কথা বিশেষ উল্লেখযােগ্য। পূজ্যপাদ পণ্ডিতবর সুকবি শ্রীযুক্ত তাকুমার কবিরত্ন মহাশয় অনুগ্রহ করিয়া এই গ্রন্থখানির ভূমিকা লিখিয়া-হলবিশেষে সংশােধন এবং তাঁহার স্বরচিত একটি গীত ও স্তোত্র সন্নিবেশিত করিয়া—ইহার বিশেষ গৌরববন্ধন করিয়াছেন। উক্ত মহাত্মাদিগের নিকট আমরা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও অচ্ছেদ্য ঋণ পাশে আবদ্ধ রহিলাম। তি। হিয়া, ১৩২২ সাল। সম্পাদক।

তারা-মা - সর্বমঙ্গলা। ভূমিকা। “কালিদাসস্য সৰ্ব্বস্বমভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌”। দেশ, কাল, জাতি, শিক্ষা, ধৰ্ম প্রভৃতির বৈচিত্র্য সত্ত্বেও, যে বস্তুটী সর্বকালেই যুগপৎ সকলেরই হৃদয়কে সমভাবে বিমুগ্ধ করে সকলেরই প্রাণে সমস্বরে প্রতি ধ্বনিত হয়, সে পা টী বার্থই অন্তর্জগতের অমূল্য নিধি ! অভিজ্ঞানশকুন্তল শুধু অন্তর্জগতের নহে—অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎকে সমসূত্রে বন্ধ করিয়া, মহাকবি ইহাকে সহৃদয়মণ্ডলীর মানসচক্ষে আবিভূত করিয়াছেন। অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎ যেন সমপ্রাণ সখার ন্যায় পরস্পর পরস্পরকে গাঢ় ভাবে আলিঙ্গন করিয়াছে ;—সে আলিঙ্গন মত্ত হইতে স্বর্গ পর্যন্ত প্রসারিত হইয়া, অনন্ত বৈচিত্র্যময়ী বিশ্বমণ্ডলীকে এক অনির্বচনীয় মহাপ্রেমে অনুপ্রাণিত করিয়াছে। এই জন্য বিশ্ববিখ্যাত জার্মান কবি গেটে (Goethe) বনদে বলিয়াছেন। "Wouldst thou the young year's blossoms and the fruits of its dcclinc, And all by which the soul is charmed, enraptured, feasted, fed. Wouldst thou the earth and heaven itseif in one sole name combine 1 name thee, Oh SAKUNTALA ! and all at once is said." মুল-নাৰায় রচিত। , বি, ইউই কর্তৃক ইংরাজীতে অনুবাদিত।

। বাসন্তং মুকুলং ফলঞ্চ বুগপত্ মল্য সর্বং চত যৎ কিঞ্চিষ্মনসাে রসায়নমথাে সন্তর্পণং মােহন। একীভূতমভূতপূৰ্বনথবা স্বলোকভূলােকয়াের ঐশ্বৰ্যং যদি কোহপি কাকতি তদা শাকুলং সেতাম। * বাসন্ত মুলদল গ্রীষ্মের দুপৰু ফল, এককালে এ সকল চাও কি মানব? অথবা হৃদয় যায় পরিপূর্ণ তৃপ্তি পায়, পুলকিত, মুগ্ধ হয়, চাও কি সে সব ? বিঘা যদি এক নামে, স্বর্গ আর মর্ত্যধামে, মিলিত দেখিতে চাও, তবে আমি বলি অভিজ্ঞানশকুন্তল অভিজ্ঞানশকুন্তল। তােমারি নামেতে বলা হইল সকলি। দীর্ঘকাল বৈদেশিক জাতির অধীনতায় দুর্বলজাতির যে দুর্গতি ঘটে, আমাদেরও তাহাই ঘটিয়াছে। পাশ্চাত্য দেশের ও দেশবাসীর সহিত ভারতের, এবং ভারতবাসীর জীবনপ্রণালীগত, ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম-আচার প্রণালীগত ও অন্যান্য বিষয়গত অসংখ্য পার্থক্য। যদ্রপ শীতপ্রধান দেশের তরুলতা গ্রীম প্রধান দেশে রােপিত হইলে বিনষ্ট হয়, বা গ্রীষ্ম প্রধান দেশের তরুলতা শীতপ্রধান দেশে প্রণষ্ট হয়, তদ্রুপ আমরাও সেই বৈদেশিক জীবনপ্রণালীর অনুকরণ করিতে গিয়া নিৰ্ম্মল হইতে বসিয়াছি। নিজেদের উপযোগী একটা কিছু আদর্শ ঠিক করিয়া লইতে পারিতেছি না। এস্থলে প্রাচীন আদর্শ ই আধুনিক দেশকাল- পাৱানুকুল প্রণালীতে পুনর্গঠন করিয়া লওয়া ভিন্ন গত্যন্তর নাই এবং তাহাই সর্বতােভাবে বানায়। ভারতের সেই পুণ্যময়ী অশ-জীবনপ্রণালী আমরা বিবিধ উপায়ে শিক্ষা করিতে পারি। এক উপায়,-কঠোর তপসাধন যাহা প্রাচীন কালের নৈতিক ব্ৰচৰ্য্য। সংস্কৃত ও বাঙ্গল' অনুদ-সংকক চিত। কলনয়ন তোলপৰ্য্য অশিত ভাবে ব্ৰহ্মপাল।

জ উপায়,-ভারতের সরল ও সুমধুর উপদেশপূর্ণ আদর্শীনচরিত। সে অমূল্য জীবনচরিত ভারতীয় আর্য মহাকবিগণের মধুর রসভাবময় কাব্যজগতে যেরূপ সুন্দরভাবে পরিস্ফুট, সেরুপ আয় কুত্রাপি সুলভ নহে। অভিজ্ঞানশকুন্তলে মহাকবি, পূণ্যশ্লোক রজা দুষ্মতের বিবরণ যে কি অদ্ভুত কৌশলে ফুটাইয়াছেন, তাহা ভাবিলে অবাক্ হইতে, হয়! এই মাত্র দেখিছে,-তে অজ্ঞানকৃত অপরাধে, অনুতাপানলে ।হমান ;- বার সেই হাৰ্ত্ত সেই মতই সুর- সংহারার্থ মহাতেজে দেদীপ্যমান। দুষ্মন্ত যেন বিধাতার কৃপায় নিজ প্রকৃতিকে নিজ কর্তব্যনিষ্ঠার হস্তে ক্রীড়াপুত্তলী করিয়াছেন। যুগপৎ এইরূপ অশেষ ঘাত- প্রতিঘাতেও মন্ত-প্রকৃতি ত চলা, অধৃষ্যা, অপরাজেয়া। মহাকবি কালিদাস সেই বিশ্বজনীন মহাশক্তিকে যে কি এক প্রাণায়াম মধুময় ভাবে লােকচক্ষে প্রকটিত করিয়াছেন, তাহা ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয়। এই দেখিতেছ,-মহর্ষি কং স্নেহপালিত প্রাণপ্রতিমা কন্যাকে চিরদিনের জন্য বিদায় দিবার সময় অপরাজেয়া স্নেহশক্তির প্রভাবে বিচলিত, আবার সেই মুহূর্তেই তিনি তৎকালােচিত কর্তব্য পালনা স্থির, ধীর, নিস্তরঙ্গ, প্রশান্ত সাগর। তৎকালিক কর্তব্যের একটা অণু পরমাণুও তাহার দৃষ্টিকে এড়াইতেছে না। যুগপৎ বিরহাবর্ষণ ও কর্তব্যপালন পরস্পর অবিরােধে তাহার হৃদয় ও নেত্ৰয় হইতে নিষ্ঠু ত হইতেছে। এরূপ বৈষম্যময় জগতে এ অপূৰ্ব্ব সাম্যভাবের অভিনয়ই অভিজ্ঞানশকুন্তল নাটকের যথার্থ অভিনয়। এ অভিনেতাকে যিনি চিনিবেন, তঁাহারই অভিজ্ঞানশকুন্তল-পাঠ সার্থক। সতীত্বময় পুণ্যের মূর্তি শকুন্তলা তাহার সৰ্বেশ্বর-জীবন-মরণের সহায়-আত্মার আত্মা,-প্রাণময় পতিদেবের সাংঘাতিক প্রত্যাখ্যানরূপ বজ্রাঘাতে বিচূর্ণিতা। তথাপি সেই অবধূতা সরলা বালার রসনা হইতে একটাও কঠোর বাক্য নির্গত হইল না। তিনি কাহাকে কটু বলিবেন?-পতিকে?-সে যে তাহার আত্মা। সতী নারী আর সকলই ত্যাগ করিতে পারেন, কেবল আত্মার অপলাপ করিতে অক্ষম। সতীর আত্মা ও সতীর পতি অবৈত, অধিকারী। এই অপূর্ব রসভাবময় নাটক সর্ব প্রথমে উজ্জয়িনী নগরীতে প্রথিতযশা, নিরতিশয় বিদ্যোৎসাহী, গুণগ্রাহী, মহারাজ বিক্রমাদিত্যের রঙ্গভূমিতে অভিনীত হয়। তদবধি বহু বিদ্বৎসমাজে মহােৎসাহে ইহার অভিনয় হইয়াছে। অধিক কি-- ইহার গুণে মুগ্ধ হইয়া পাশ্চাত্য মনীষিগণও অতি সমাদরে পা দেশে ইয়ার অভিনয় করিয়াছেন। সংপ্রতি ১৩১৯ সালে বা ইরালী ১৯১২ বারে * কেমব্রিজ ইউনিভারসিটি হলে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ কর্তৃক মহাসমারােহে ইহার অভিনয় হইয়া গিয়াছে। সে সময়ে কতিপয় বঙ্গমহিলা সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং অভিনয়ের সাজসজ্জা বিষয়ে সাহায্য করিয়াছিলেন। ইহা আমাদের সামান্য গৌরবের কথা নহে। কিন্তু দুঃখের বিষয়,আমাদের বঙ্গদেশে ইহার সম্যক্ আদর ও অভিনয় বিরল। এরূপ অপূর্ব নাটকের অনুবাদ ও অভিনয় দ্বারা বহুল প্রচার সহৃদয়মাত্রেরই প্রার্থনীয় । সংপ্রতি মদীয় প্রাণাধিক শিষ্য শ্রীমান্ প্রমথনাথ বিশ্বাস ও তদীয় স্বগ্রামবাসী, পরমাত্মীয় শ্রীযুক্ত সীতানাথ বসু এই নাটকের অভিনব গীতাভিনয় রচনা করিয়াছেন। তাঁহারা উভয়ে স্বয়ং সংস্কৃত ব্যবসায়ী না হইয়াও, সংস্কৃত কাব্যরসে এরূপ অনুরাগী,-ভাবসৌন্দর্য্যে এরূপ মুগ্ধ,-প্রাচীন রসভাময়ী কবিগাথার এরূপ পক্ষপাতী,-যে তাহাদিগকে প্রশংসা না করিয়া থাকা যায় না। ইহারা শুধু ইহার গীতাভিনয় রচনা করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই। শ্রীমান্ প্রমথনাথ ছােট জাগুলীয়াস্থ নিজ পৈতৃক বাসভবনে বহুব.য় ও আয়াস স্বীকারপূর্বক গ্রামস্থ সুহৃদ বর্গ কর্তৃক ইহার সুন্দর অভিনয়কাৰ্য্য সুসম্পন্ন করিয়া বহু গণ্যমান্য সভ্যমণ্ডলীর প্রশংসাভাজন হইয়াছেন। কলিকাতা হইতে আহূত হইয়া বহু সহৃদয় মহাত্মারা সে অভিনয়সভায় উপস্থিত ছিলেন। সকলেই মুক্তকণ্ঠে অভিনেতৃৰ্গকে ভূরি ভূরি সাধুবাদপ্রদান করিয়াছেন। ইহাদের এই প্রথম উদ্যম বিশেষ শ্লাঘা ও প্রশংসার কথা। শ্ৰীশ্ৰীতারামার চরণে আমি সর্বান্তঃকরণে ইহাদের মঙ্গলকামনা ও সনেহাশীৰ্বাদ প্রদান করিতেছি। স্বস্তি ও তৎসৎ। কলিকাতা। জমী, ১৩২২ সাল। শ্রীতারাকুমার শর্মা।

অভিনেতা। পুরুষগণ। এম ০ ০ ০ হস্তিনাপুরের রাজা। রাজার বয়স্য (বিক)। মাধব্য মহর্ষি । দুর্বাসা ০ ০ ০ ৪০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ••• কমুনির শিষ্যগণ । হারীত মারীচ প্রজাপতি ঋষি। মাতলি ইন্দ্রের সারথি। সর্বদমন দুমন্তের পুত্র। কখুকী রাজাপুরের বয়ােব রক্ষক। নগরপাল শান্তিরক্ষক। ধীবর, রাজপুরােহিত, নগর-রক্ষক, প্রতীহারী, সেনাপতি, সারথী, মুনি-বালক, প্রভৃতি। ০ ০ ০ স্ত্রীগণ। কমুনি-পালিতা কন্যা এ এ এ শকুন্তলার সখী। অনসূয়া ? প্রিয়ংবদা । গৌতমী বৃদ্ধা তাপসী। তাপস-কায়।

No text on this page.

বিশেষ দ্রষ্টব্য। হসন্ত চিহুপ্রকাশ ব্যতীত, এই গীতাভিনয়ের তাবৎ গীতশব্দই অজন্ত উচ্চারিত হইবে।

No text on this page.

শকুন্তলা গীতাভিনয়। প্রথম তাঙ্ক। ০৪. প্রথম গর্ভাঙ্ক। অরণ্য স্থান। রাজা দুষ্মন্ত ও সারথির প্রবেশ । দুষ্মন্ত। দেখতে দেখতে বন বনান্তর অতিক্রম করে এলেম। প্রকৃতির বিচিত্র সৌন্দৰ্য্য সন্দর্শন করে অপরিসীম আনন্দলাভ হলাে। অদুরে স্রোতস্বিনী উর্মিমালা বক্ষে করে কলকলনাদে প্রবাহিত হচ্ছে। ধারে ধারে মরাল-কুল কেমন আনন্দে কেলি করে বেড়াচ্ছে। সবােবরের স্বচ্ছ সলিলে কমলদল প্রস্ফুটিত হয়ে মনােলােভ শােভ ধারণ করেছে। তীরস্কিত বিটপিশাখায় কল-কও বিহঙ্গমকুল সুমধুর তানে বিশ্বপতির মহিমা কীর্তন করছে। কিন্তু কি আশ্চর্য্য। এতখানি পথ অতিক্রম করে এলেম, একটা মৃগও দেখতে পেলেম না। শরাসনে জানােপণ,—শরপূর্ণ তূণীর পৃষ্ঠে ধারণ,—এ সকলই কি, বিফল হ’লল সত্য সত্যই কি আজিকার দিনটা বৃথা গেল ?—এত আয়ােজন সব বিফল হলাে? [ ক্ষণকাল ইতস্ততঃ দৃষ্টি নিক্ষেপ।

রাজা। ( সচকিতে ) ঐ না!ঐ না!—একটা মৃগ পলাচ্ছে ? সারথি। আজ্ঞে হ,—মহারাজ! মৃগটা নক্ষত্ৰবেগে উৰ্দ্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছে। রাজা। না ;-ওকে কিছুতেই পরিত্যাগ করা হবে না। [ শরসন্ধানে উদ্যত [ নেপথ্যে ] মহারাজ! আশ্রম-মৃগ-বধ করবেন না--বধ করবেন না। রাজা। (শব্দানুসারে দৃষ্টি করিয়া) না-হলাে না। এতেও ব্যাঘাত পড়লাে গীত গাহিতে গাহিতে ঋষিকুমারদ্বয়ের প্রবেশ! গীত। ও শর প্রতিসংহর, বখােনা মৃগজীবন। করােনা এই শান্তি-রাজ্যে অশান্তির সংঘটন। নবনীত-কলেবর, কুরঙ্গ কি মনােহর ! তব তীক্ষ্ণ শর তার, যােগ্য নহে কদাচন। শ হিংসা-দ্বেষ পরিহরি, হরিণ সনে খেলে হরি, নকুল ফণীকে ধরি, না করে কভু হনন। শান্তিময় তপােবনে, শান্তিনুধামৃত পানে, পশুপক্ষী হৃষ্টমনে করে সদা বিচরণ। ঋ-কুমার। মহারাজ! অপরাধ গ্রহণ করবেন না। ওটি আশ্রমপালিত মৃগ,তাই নিষেধ করেছি। আশ্রম-মৃগ বলেই শকারে বাধা দিয়েছি। বিশেষত ভবাদৃশ বীরপুরুষের বজ্র-সদৃশ তীক্ষ্ণ শর ঈদৃশ ক্ষীণপ্রাণ কোমলা হরিণশিশুর উপর নিক্ষেপের উপযােগী নহে। আপনার অস্ত্র-শস্ত্র শত্রু-সংহারও আর্তের পরিত্রাণের জন্য-নিরপরাধীকে প্রহারের জন্য নহে।

শকুন্তলা। রাজা। বাধা দিয়েছেন,-উত্তম কাৰ্যেই করেছেন। আমি বিশেষ অনুগৃহীত হলেম। রাজার প্রণামকরণ। ঋ-কুমার। দীর্ঘায়ুরন্তু। জয় হ’, ধর্মে মতি থাকুক। পুত্রনিৰ্বিশেষে প্রজাপালন করুন।-তপােৰনের শান্তি রক্ষা করুন। রাজা। জালেম,দৈব আজ নিতান্তই আমার প্রতি অনুকুল। নচেং রাজা দুষ্মন্ত আজ সামান্য একটা মৃগ বধ ক'রে–পূজ্যপাদ মহর্ষিগণের মাের অসন্তোষ উৎপাদন করে,—নিষ্কলঙ্ক রাজকুলে কলঙ্ক লেপন করতে। ঋ-কুমার। সে কি মহারাজ! আপনি যে প্রসিদ্ধ পুরুবংশ উজ্জ্বল করেছেন আপনার বিনীত বাক্যে ও সৌজন্যে তাহার যথেষ্ট পরিচয় পেলেম। আশীর্বাদ করি, অনুরূপ পুত্ররত্ন লাভ হউক ;-আর সেই পুত্র সসাগরা ধরিত্রীর অধিপতি হউক। রাজা। ব্রাহ্মণের আশীর্বাদ শিরােধার্য। আপনাদের প্রসাদেই এই অরণ্য স্থান পরম শান্তরসম্পদ তপােবন। ঋ-কুমার। মহারাজ! আপনাব সুশাসনগুণে, এই তপােবনে চিরশান্তি বিরাজমান।—আপনি পথ পৰ্যটনক্লেশে শান্ত হয়েছেন। অদূরে মালিনী-নদী- তীরে আমাদের গুরু মহর্ষি কন্বমুনির আশ্রম। যদি কার্যের ক্ষতি না হয়, তবে সে স্থানে গিয়ে, আতিথ্য গ্রহণ করে শ্রান্তি দূর করুন । রাজা। মহর্ষি কি এ সময় আশ্রমে আছেন ? ঋকুমার। আজ্ঞে না। সম্প্রতি তিনি স্বীয় দুহিতা শকুন্তলার উপর অতিথি সৎকারের ভার প্রদান করে, কোনও দৈব কার্যের উদ্দেশে সােমতীর্থে গমন করেছেন। রাজা। মহর্ষি আশ্রমে নাই,-তাহাতে ক্ষতি নাই। আমি তপােবন দর্শন করে, আত্মাকে পবিত্র করি। আপনারা অগ্রগামী হউন, আমি পশ্চাতে আশ্রমে গমন কছি। খ-কুমার। এক্ষণে তবে আমরা চলিলাম। স্বস্তি। [ রাজার প্রণাম ও ঋষিকুমারয়ের প্রস্থান ।

কুলা। রাজা। সারথি ! দেখ কি সুন্দর শােভা। যেদিকে নয়ন ফিরাই, সেই দিকেই প্রকৃতির মােহন সাজ। তমােময়ী রজনীর অন্তর্ধানে, প্রভাতে তরুণ অরুণের মুখাবলােকনে জীবকুলের হৃদয়ে যেমন আনন্দসঞ্চার হয়—মেঘমুক্ত সুধাংশুর সুশীতল করজাল বিকাশে চকোর যেমন পুলকে পূর্ণ হয়—আজ আমি এই বিপিনে এসে, সেইরূপ অসীম আনন্দ অনুভব করলেম। কোনও স্থানে বেদ পাঠের বেদী ;-কোথাও বা মােবশেষ ভষ্মরাশি পতিত;-আবার কোথাও তপস্বীরা ইহুদীফল চুর্ণ করাতে, উপলখণ্ড সকল তৈলাক্ত হয়ে রয়েছে। যজ্ঞীয় ধূমে কোনও কোনও বৃক্ষের নব পল্লব সকল মলিন হয়ে গেছে। আর দেখ’- কুশভূমিতে হরিণশিশুগণ নির্ভয়ে বিচরণ করছে। দেখ’-কেহ বলে দিচ্ছে না, তথাপি তপােবন বলে 'বােধ হচ্চে। আহা! আজ যেন আমি এক নূতন জগতে এসে উপস্থিত হ'লেম। গীত। নয়ন জুড়াল হেরে সুরম্য এ পােবন। ভাগ্যবলে হেথা মম, হ'লে আজি আগমন। নিষ্কাম নিস্পাপ-চিত, মুনি ঋষি যােগী যত, সদা যজ্ঞৰ্বতে রত, বেদপাঠে নিমগন । সুপবিত্র শান্তিসুধা, নাশ করে ভব-ক্ষুধা, বিষয় বিভব, নাহি হেথা, সব শান্তি নিকেতন। শােকতাপপাপহারী, কি মধুর ভাব হেরি! ইচ্ছ,হই বনচারী, ত্যজিয়ে সে রাজ্যধন। সারথি। মহারাজ। যথার্থ আজ্ঞা করেছেন । রাজ। দেখ’ সারথি। এ যে সে স্থান নয়। আশ্রমের পড়া হওয়া উচিত নহে। তুমি এই স্থানে রথস্থাপন কর। আমার বােন্ধবেশে যাওয়া একান্ত অনুচিত। তপােবনে বিনীত বেশেই প্রবেশ করা কর্তব্য। অতএব শরাসন ও বেশভূষা রাখ। আর সমভিব্যাহারী সকলেই বিশেষ ক্লান্ত হয়েছে। তুমি যাও, উহাদের সকলকে ল'য়ে বিশ্রাম লাভ কর’গে। আমিও পােবন দর্শন করে, আত্মাকে পবিত্র করি। সারথি। যে আজ্ঞা মহারাজ! [ সারথির প্রস্থান। রাজা। এ কি! অকস্মাৎ আমার দক্ষিণ বাহু স্পন্দিত হচ্ছে কেন? এ শান্তরসম্পদ তপােবন। ঈদৃশ স্থানে মাদৃশজনের, এতদনুযায়ী ফললাভের সম্ভাবনা কোথায় ?-অথবা হতেও পারে। ভবিতব্যের দ্বার সর্বত্রই উদঘাটিত। যাই হক,-এই তাে অাশ্রমের পথ ;- এই দিকে প্রবেশ করি। [ পরিক্রমণ। [ নেপথ্যে ] সখি ! এদিকে,—এদিকে । রাজা। একি? বৃক্ষবাটিকার দক্ষিণ দিকে যেন বামাক শ্রবণগগাচর হচ্ছে। [ নেপথ্যে পুনরায় ] সখি! এদিকে,-এদিকে। রাজা। সত্যই যে স্ত্রীলােকের কণ্ঠস্বর ! ব্যাপার অন্বেষণ করতে হলো। তবে ঐ দিকেই যাই। [ অন্তরালে গমন।

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। অপােকন কামন। গীত গাহিতে গাহিতে শকুন্তলা, অনসূয়া, ও প্রিয়ম্বদার প্রবেশ । গীত। চল চল সখি ! প্রফুল্ল মনে , সবে মিলি চল সলিল সেচনে। অস্তমিত রবি গগন প্রাঙ্গনে, বেলা নাই আর নেহার নয়নে। তপন পেতে তাপিতা হয়েছে, তরুলতা সব পথ চেয়ে আছে; সুশীতল বারি ঢালি ধরি ধরি, সরস করিব নীর’ জীবনে ॥ প্রাণের অধিকা ঐ নবমালিকা, সহকার’পরে মাধবীলতিকা ; হাস্যমুখী কিবা সুন্দরী যুথিকা. ধরেছে কলিকা নবীন যৌবনে। রাজা। (অন্তরাল হইতে) এই যে -তিনটী তপস্তিকা আপনাদের বয়সের অনুরূপ তিনটা কলস ল'য়ে তরুমূলে জলসেচন করতে করতে এদিকেই আসছে। ইহারা আশ্রমবাসিনী—কিন্তু ইহারা যেরূপ, এরূপ রূপবতী রমণী রাজ অন্তঃপুরেও নাই। আজ উদ্যানল বনলতার নিকট পরাজিত । [ অন্তরালে অবন।

প্রিয়ংবদা। সখি শকুন্তলা ! তাত কগ্নের কি বিচার ভাই ! বােধ করি এই আমবৃক্ষদের তােমাপেক্ষাও ভালবাসেন। দেখ’--তুমি নবমালিকার মত কোমলাঙ্গী তােমাকে কিনা তরুমূলে জলসেচনের ভার দিয়েছেন। শকুন্তলা। না সখি । তা বলেও শুধু নয়। পিতা আদেশ করেছেন বলেই জলসেচন করতে এসেছি তা নয়। আমি ওদের ভাই বােনের অধিক ভালবাসি, তা কি তুমি জান না? প্রিয়ংবদা। সখি! গ্রীষ্মকালে যাদের মুকুল হয়, তাদের তাে সেচন করা হলাে। এখন যাদের কুসুমের সময় অতীত হয়েছে, চ'লাে—তাদেরও সেচন করিগে। তা হলে বড় ধর্মসঙ্গও কাজ হয়। রাজা। (স্বগত) এই কি সেই কতনয়া শকুন্তলা! মহর্ষি অতি অবিবেচক ; এমন নবনীত কোমলাঙ্গে কেমন করে বল্কল পরিয়েছেন। যেমন পূর্ণ শশধর কলঙ্ক সম্পর্কেও শােভাহীন হয় না,-যেমন প্রফুল্ল কমল শৈবালযােগেও বিলক্ষণ শশাভা পায়, সেইরূপ এই সৰ্বাঙ্গসুন্দরী বল্কল পরিধান করেও যারপরনাই মনােহারিণী হয়েছে। যারা স্বভাবতঃ সুন্দর, তাদের কিনা অলঙ্কারের কাৰ্য্য করে। একাধারে ঈদৃশ অতুলনীয় রূপের পূর্ণ সমাবেশ নিতান্ত দুর্লভ। শকুন্তলা। উহহ! খুলে দাও ভাই,—খুলে দাও। দেখ’ ভাই, বঙ্কলটা প্রিয়ংবদা বড় এটে বেঁধেছে। একটু আলগা করে দাও না সখি । ( কলসী ভুমিতে রক্ষণ। অনসূয়া। আহা-হা ! এমন করেও বাঁধতে হয় ! একটু কি বিবেচনা নাই। এস, আমি খুলে দিচ্ছি। একে ননীর অঙ্গ, তাতে গাছের কঠিন বল । গায়ে এমনি এটে বসেছে, যেন ফেটে রক্ত পড়ছে। এমন কাজও করে। [ বন্ধন শিথিলকরণ। প্রিয়ংবদা। আমাকে দোষ দাও কেন ? আপনার নবৃষৌবনকে তিরস্কার কর। রাজা। (গত) কি রমনীয়—কি সুন্দর অঙ্গ সৌষ্ঠব । শকুলা। আঃ! বাঁচলেম,-চলল এইবার জল দিইগে। ঐ-যাঃ । আমার কলসীর অল যে সব শেষ হয়ে গেছে। কি করি?—তােমরা ভাই, আমায় এক কলসী পল থার দাও না।

শকুন্তলা। প্রিয়ংবদা। ধার তাে নেবে। যদি শােধ দাও, তবে ভাই।-আমি জল ধার দি। শকুন্তলা। তা দেব’ বৈ কি। ধার করলেই শােধ দিতে হয়। [ কলসী লইয়া জলসেচন। অনসূয়া। দেখ' সখি ! চেয়ে দেখ’—কি সব সুন্দর ফুলই ফুটেছে। বনটি যেন আলাে ক'রে রহেছে। প্রিয়ংবদা। এই যে, সূর্যমুখী ফুটেছে। দেখ’-কেমন এক দৃষ্টিতে সূর্য্যের দিকেই চেয়ে রহেছে। অনসূয়া। তাই তাে ভাই। সে দিনকার সূৰ্য্যমুখী-যেন গরবে ফেটে মছে। গীত। কাননে কি শােভা, অতি মনােলােভ, কুঞ্জে কুঞ্জে দেখ’ ফুটেছে ফুল। মন্দগমন, সুরভিপবন, আশ্রম কানন,—সমাকুল। জাতি-যুথী বিকশিত, পলাশ কাঞ্চন, ভ্রমরা গুণ গুণ স্বরে করিছে গুঞ্জন ;- কুহু কুহু কুহু রবে, কোকিলে করে আকুল। চল, চল, চল, সখি ! যতন করিয়ে, মালতী মল্লিকা চাপা সেউতী তুলিয়ে; গাঁথিব মােহন মালা, মত্ত যাহে অলিকুল। শকুন্তলা। প্রিয়ংবদা! এদিকে চেয়ে দেখ’, এই সহকারটিতে কচি কচি নূতন পাতা হওয়াতে কেমন সুন্দর শোভা হয়েছে। বাতাসভরে হেলে দুলে,বােধ হচ্ছে—বেন আমাকে ঈঙ্গিত করে ডাকছে। আবার দেখ’, নবমল্লিকা কেমন তারে জড়িয়ে জড়িয়ে উঠেছে।

শকুন্তলা। অনসূয়া। দেখ সখি ! নবমল্লিক। ঠিক যেন স্বয়ম্বরা হয়ে সহকারকে আশ্রয় করেছে। মমন্দ বাতাসে কেমন হেলছে দুলছে। যেন স্বামীর সৎ পেয়ে, আহ্লাদে সােহাগ দেখাচ্ছে। আ মরি !-বিধাতার কি সৃষ্টি ভাই। প্রিয়ংবদা। দেখ’ অনসূয়া! নবমল্লিকাকে সখী অত আদরের সহিত দেখে কেন, তা জান’। শকুন্তলা মনে করে, -ও যেমন সহকারের সঙ্গে মিলেছে, আমিও যেন ঐরূপ মনের মত বর পাই। শকুন্তলা। নাও ভাই! আর জালিও না। ঐটি তােমার আপনার মনের কথা। তুমি নিজে ঐরূপ ভাব কিনা তাই বলছে। এখন যাবে তাে চল’-গাছে জল দিইগে। এস,আগে কোন্ গাছে দেবে? আমি বলি,-এই সহকারে দাও। প্রিয়ংবদা। তবেই বলতে হয় ;-“যার মন যার কাছে, টান ধরে তার পাছে।” শকুন্তলা। দোষই বা কি ? এই সহকারকে আমি ভাইএর মত ভাবি-তা কি তুমি জান না। আমার ভাজ হবে বলেই, নবমল্লিকাকে তার কাছে রােপন করেছি। আমি সত্যই ভাই, শীগগির বিয়ে দিয়ে এদের যুগলরূপ দেখে নয় জুড়াব। অনসূয়া। ভাল!--“বিয়ে!”—এ কথাটা শুনলেও মনে বড় আহলাদ হয়। আমাদের প্রিয়সখীর ফুল ফোটবার সময় কবে হবে, তা প্রজাপতিই জানেন। প্রিয়ংবদা। দেখ’ অনসূয়া ! যে সময়ের যা, তা কেহ আটকে রাখতে পারে না। সময় হয়েছে, সব গাছেই ফুল ধরেছে। সখীরও ফুল ফোটবার সময় হয়েছে। (উল্লাসের সহিত) ঐ দেখ, তার প্রমাণ -ঐ দেখ’, মাধবীলতার গাঁটে গাঁটে ফুল ধরেছে-সখীরও বিবাহ নিকট হয়েছে। অনসূয়া। তাই বটে ভাই।তাই বটে। শকুন্তলা। (কৃত্রিম কোপ প্রদর্শন পূৰ্ব্বক) এ সব তােমাদের নিজের মন- গড়া কথা। আমি শুনতে চাই না। সকল কথাতেই ঐ কথা—ভাল লাগে না। প্রিয়ংবদা । না সখি! আমি ঠাট্টা করছি না। পিতা কথের মুখে শুনেছি,-তাই বলছি। স্মরণ নেই?-তিনি একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, মাধবীলতার যখন মুকুল দেখা যাবে, জাবে আমার শকুন্তলারও বিবাহকাল উপস্থিত হবে। (হাস্য করিয়া) হাঃ হাঃ—ঠিক হয়েছে, আমাদের বিরসখীর বিবাহের ফুল ফুটেছে।

শকুল'। সয়া। ঠিক বলেছ' ভাই। এই জন্যই শকুন্তলা মাধবীলতাকে এত আরের সহিত জলসেচন করে। শকুন্তলা। দুর হক। কোনও কথাটি কবার জো নাই। তােমাদের কথায় কথায় ছল বৈ তাে নয়। এখন এস’,জলসেচন করি। প্রায় সকল গাছের গােড়ায় জল তাে দেওয়া হল। এখন নবমল্লিকা ও বনতােবিণীকে শান্ত ক'রে, বাকি জলটুকু মাধবীর মূলে ঢেলে দিয়ে, চল আমরা আশ্রমে যাই। রাজা। (স্বগত) আ মরি মরি! কি সুন্দর, কি মিষ্ট কথা কি মধুর হাসি! আজ নিতান্তই সুপ্রভাত। তাই মৃগয়া উপলক্ষে, এই বনে এসে উপস্থিত হয়েছি। যা হ’, আর কিছুক্ষণ এই অপূৰ্ব ভাব নয়ন ভরে দেখি। কর্ণও বচননুধা পান করুক। হৃদয়!-শান্ত হও। এত অস্থির হ’চ্চ কেন? (ক্ষণিক নিস্তব্ধ থাকিয়া) -এই যে! জলসেচন করতে করতে এই দিকেই আসছে। [ অন্তরালে অবস্থান। সখীগণের জলসেচন এবং শকুন্তলা কর্তৃক হস্ত ও বনাঞ্চল দ্বারা ভ্রমরবাধা অভিনয়। শকুন্তলা। দুর হ'। আ ম’লাে! নবমল্লিকায় জল দিতে দিতে একটা ভােমর নবমল্লিকা ছেড়ে আমার মুখের দিকে আসছে। সখি ! বড় জালাতন করে মা'লে। এত তাড়াচ্চি তবু যে যায় না। (কিঞ্চিৎ উচ্চেঃস্বরে) তাড়াও না চাই। তােমরা বেশ রঙ্গ দেখছ। (বিরক্তভাবে ইতস্ততঃ পরিক্রমণ)-আ ম'লাে, এ যে কিছুতেই যায় না। যতই তাড়াই, ততই আরও আসে যে! ! গীত। তােরা দেখলো দেখ, ওলো সখি! একি বিষম যায়। ভ্রমর কেন এমন করে অবলা জ্বালায় । যায় না কেন অন্য ফুলে, কেতকাদি বকুলে, ভর করে ওর তী হুলে, পাছে বসে গায় । সােবর শােভিনী, প্রফুল্লা নলিনী, কি সুখে নাহি জানি, হৃদয়ে বসায়।

শকুন্তলা। আমি কি ফুল? কি রঙ্গ গো! যে ফুলে মধু আছে, সেখানে যা না। আঃ—কি আপদই জুটলাে ! অনসূয়। ও যাবে কেন? ও যে মধুলােভে ঘুরছে। অমন সময় মুখ খানিকে যে পদ্ম ভাববে তার আর আশ্চর্য্য কি? মানুষেরই ভ্রম হয়-- ও অজ্ঞান ভােমর যে ফুল মনে করে বসতে চেষ্টা করবে, তার আর আশ্চর্য কি? শকুন্তলা। তােমরা ভাই, কেবল সর্বদাই আমােদ ভালবাস। এ দিকে আমি জ্বলে মরছি। দূর হ’ গে;-বড় আপদেই পড়লুম। এ কোন মতেই যাচ্ছে না। (কিঞ্চিৎ পশ্চাৎ দিকে গমন)-এখানেও যে আমার সঙ্গে সঙ্গে আসছে। আমি এখান থেকে যাই। এ দুষ্টের কি কেহ শাসনকর্তা নাই ? প্রিয়ংবদা। শাসনকর্তা থাকবে না কেন? দুষ্টের দমন,-শিষ্টের পালন- কর্তা রাজা ;-তপােবনের রক্ষাকর্তাও রাজা। রাজা দুষ্মন্তকে স্মরণ কর- তিনি তােমাকে পরিত্রণ করবেন। আমাদের রক্ষা করবার ক্ষমতা কি? রাজা। (স্বগত), ইহাদের সম্মুখে উপস্থিত হবার এই বিলক্ষণ সুযােগ। কিন্তু রাজা বলে পরিচয় দেওয়া হবে না। অতিথিভাবে উপস্থিত হয়ে অভৰ প্রদান করি। (প্রকাশ্যে) ভয় নাই,-ভয় নাই। পুরুবংশােদ্ভব দুষ্মন্ত শাসনকর্তা খাতে কার সাধ্য নিরাশ্রয়া তপস্বিকন্যাদের অনিষ্ট করে ? কে আপনাদের কি উৎপাদন করছে? বলুন এখনই তার সমুচিত শাস্তিবিধান করি। সখীয়। (সচকিতে) একি!একি অনসূয়া। না মহাশয় ! অত্যাচার এমন কিছুই নয়। তবে একটা দুই অমর আমাদের প্রিয়সখীকে বড় ব্যাকুল করে তুলেছিল—তাই রাজা। তপােবনের সব কুশল ? আপনারা সকলে মুখে ছ আছেন? প্রিয়ংবদা। হাঁ মহাশয়। তপস্যার বৃদ্ধি হচ্ছে। এখন আপনার জয় অতিথি আসাতে আরও বৃদ্ধি হলো। অনসূয়া। সখি! যাও, যাও। শকুন্তলা !-তুমি শীঘ্ৰ কুটীরে গিয়ে পদ্ধ অৰ্য লয়ে এস। জল আর আনতে হবে না। এই কলসীতে যে জল আছে তাতেই হাত পা ঘােয় হবে।

১২ রাজা। না না, এত ব্যস্ত হবার প্রয়োজন নাই। আপনাদের মিষ্টালাপেই যথেষ্ট আতিথ্য হয়েছে। প্রিয়ংবদা। মহাশয়। যদি কোনও আপত্তি না থাকে, তবে এই সাতিম গাছের শীতল ছায়ায়, বেদীতে ব'সে শান্তি দূর করুন । রাজ। আপনারাও জলসেচনে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়েছেন, এইস্থানে ব'সে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুন। প্রিয়ংবদা। সখি শকুন্তলা! অতিথির অনুরােধ রক্ষা করা উচিত। এস’, আমরাও বসি। ( স্বগত) একে দেখে আমার মনে তপােবনবিরুদ্ধ ভাবের উদয় হচ্ছে কেন? এমন চিত্তচাঞ্চল্য ঘটছে কেন? রা। আপনাদের সমান রূপ, সমান বয়স , সমান কাৰ্য,-আর আপনাদের সুন্দর সখীভাব দেখে আমার মনে বড় প্রতি হল। প্রিয়ংবদা। (অনসূয়ার প্রতি জনান্তিকে) সখি, ইনি কে? দেখেছ- কেমন সুন্দর মূর্তি, কেমন গম্ভীর আকৃতি ! একান্ত অপরিচিত হয়েও মিষ্টালাপে যেন কত পরিচিত মত বােধ হচ্চে। অনসূয়া। সখি! আমারও ভাই এ বিষয়ে কৌতুহল জন্মেছে। ভাল- উকেই জিজ্ঞাসা করা যাক না কেন? প্রিয়ংবদা। (রাজার প্রতি) মহাশয় ! আপনার মধুরালাপে সাহস পেয়ে, একটা কথা জিজাসা করতে ইচ্ছা হয়েছে। কিন্তু আমরা অবলা—তাতে আপনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় নাই। যদি আপনি নির্লজ্জা না মনে করেন, তবে জিজ্ঞাসা করি। রাজা। সে কি। পচ্ছলে বলুন। কুষ্টিত হবার কোন কারণ নাই। প্রিয়ংবদা। মহাশয় ! না জানি—আপনি কোন্ রাজকুলের অলঙ্কার! না নি—কোন দেশকেই বা সংপ্রতি আপনার বিরহে কাতর করে এই সুকুমার বয়সে সুদূর পােবনদর্শনের কষ্টস্বীকার করেছেন। পরিচয় পেলে সুখী হই। মালা। (পগত) এখন কিরূপে আত্মপরিচয় দি। যথার্থ পরিচয় দিলে সফলই তো প্রকাশ হয়ে পড়ে। (প্রকাশ্যে )—ঋষিকুমারী! আমি পৌরব কাজের কর্মচারী। পূণ্যাম তপােবনদর্শন মানসে, এইস্থানে উপস্থিত হয়েছি।

১১: অনয়। আজ তপস্বীদের পরম সৌভাগ্য। মহাশয়ের শুভাগমনে তারা অত্যন্ত সৰােব লাভ করবেন। শকুন্তলা। (স্বগত) হৃদয় ! এত উতলা হও কেন? তুমি যার জন্য ব্যাকুল হয়েছ, অনসূয়া তাই জিজ্ঞাসা করছে। প্রিয়ংবদা। (শকুন্তলার প্রতি) প্রিয়সখি ! আজ যদি মহর্ষি আশ্রমে থাকতেন, তা হলে দেখতে কেমন করে অতিথিসৎকার করতেন। জীবন সর্বস্ব দিয়েও অতিথিকে সুখী করতেন। শকুন্তলা। (কৃত্রিম কোপ প্রকাশ পূৰ্বক) তােমরা যেন কি মনে করে এ কথা বলছ, আমি তােমাদের কথা শুনতে চাই না। রাজা। আপনাদের অভ্যর্থনায় বড় সন্তুষ্ট হলেম। এখন আমার একটি কৌতুহল চরিতার্থ করলে সুখী হই। আপনাদের প্রিয়সখীর সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করি। প্রিয়ংবদা। সে তাে আপনার অনুগ্রহ। স্বচ্ছন্দে জিজ্ঞাসা করুন। রাজা। ভাল,—শুনেছি মহর্ষি কশ্ব কৌমার ব্রহ্মচারী। সদাই ধৰ্ম্ম-চিন্তায় রত, জন্মাবচ্ছিন্নে দারপরিগ্রহ করেন নাই। অথচ,-তােমাদের সখী তাহার কন্যা–ইহা কিরূপে সম্ভব ? অনসূয়া। আমাদের প্রিয়সখীর জন্মবৃত্তান্ত অতি চমৎকার। আমরা যেরূপ শুনেছি, সেইরূপই বলছি—শুনুন। এক সময়ে রাজর্ষি বিশ্বামিত্র গৌতমী নদী তীরে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। তাহাতে সমস্ত দেবতারা অত্যন্ত ক্ষ্ম পেয়ে তাঁর যােগভঙ্গের জন্য অপ্সরা মেনকাকে সে স্থানে পাঠান। রাজা। দেবতারা অন্যের ঐরূপ তপস্যায় ভয় পান বটে। অনসূয়া। এই বিশ্বামিত্র ও মেনকা আমাদের প্রিয়সখীর জনক জননী। রাজা। (স্বগত) এখন তবে আমার আশার পথ মুক্ত হলাে। (প্রকাশে) ইনি তবে অঙ্গরাগর্ভজাত কল্পা।তার পর? অনসূয়া। নির্দয়া মেনকা সেই কন্যার প্রসব করেই স্বস্থানে চলে গেল। কন্যাটি বন মধ্যে অনাথা পড়ে রইলো। আশ্চর্য্য!-সেই অবস্থায়, একটি পঙ্গী মেহবশে আপনার পক্ষ দিয়ে তাকে ঢেকে রক্ষা করতে লাগলো। পিতা কম দৈবযােগে সে সময়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে ঐ অদ্ভুত ব্যাপার দেখলেন। তাঁর মনে দয়ার সঞ্চার হওয়াতে, তিনি কন্যাটিকে তুলে লয়ে আশ্রমে এলেন। আর নিজের মেয়ের মত লালনপালন করতে লাগলেন। সেই অবধি ইনি পােবন- পালিতা। রাজা। জন্মবৃত্তান্ত শুনে মনে হচ্ছে, যে যথার্থই বটে। নতুবা মানবীতে কি এরূপ অসামান্য রূপলাবণ্য সম্ভব হতে পারে?-না—ভূতল হ’তে কখনও জ্যোতির্ময়ী বিদ্যুতের উৎপত্তি হয় ? ভাল, আর একটি কথা জিজ্ঞাসা করি। তােমাদের সখী কি ব্রত অবলম্বন করেছেন? উনি কি চিরকুমারী হয়ে এই তপােবনে হরিণী সহবাসেই জীবনযাপন করবেন। মহর্ষিরই বা এ সম্বন্ধে অভিপ্রায় কি? প্রিয়ংবদা। পিতা কন্থ সংকল্প কয়েছেন, অনুরূপ পাত্র পেলে তার প্রাণাধিকা কাকে তঁার হস্তে সম্প্রদান করবেন। ' তা হলেই তার মনের শান্তিলাভ হয়। রাজা। (স্বগত) তবে আমার শকুন্তলালাভ নিতান্ত অসম্ভব নয়। হৃদয় আশ্বস্ত হও, এখন সন্দেহ ভঞ্জন হয়েছে। যাহাকে অগ্নি বলে জ্ঞান করছিলে, তাহ এখন সুখস্পর্শ শীতল রত্ন হ’লল । শকুন্তলা। অনসূয়া ! আমি আশ্রমে যাই। আর আমি এখানে থাকব না। প্রিয়ংবদা যা মুখে আসছে, তাই বলছে আমি কুটীরে গিয়ে গৌতমী পিসিকে সব বলে দেব। অনসূয়া। না সখি, তাও কি হয় ? এখনও পর্যন্ত অতিথির সেবা হয় নি। বিশেষতঃ পিতা আশ্রমে নাই। আজ তােমার উপর অতিথিসংকারের ভার আছে। তোমার চলে যাওয়া কি ভাল দেখায় । শকুন্তলা। না সখি, আমি আর থাকব না। প্রিয়ংবদা । (শকুন্তলার হস্তধারণ করিয়া) যাবে কোথা সখি? জান না, আমার এক কলসী জল ধার করেছ। সেই ধার আগে শােধ', তারপর যেখানে ইচ্ছা যেও। শকুল। আচ্ছা দাও,-কলসী দাও। আমি জল এনে ধার শােধ দিচ্ছি। { কলগী লইতে উদ্যত।

শমুলা। রাজা। আপনাদের সখী জলসেচনে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়েছেন। আর উহাকে জলবহনের কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। আমি ওঁকে ঋনমুক্ত করছি। ( অঙ্গুরীয় উন্মোচন)—এই অঙ্গুরীয়টি জলকলসীর মূল্য স্বরূপ গ্রহণ করুন। [ অঙ্গুরীয়টীতে অঙ্কিত নাম দেখিয়া সখী দ্বয়ের বিস্মিতভাবে পরম্পর মুখাবলােকন । রাজা। মুদ্রিত নাম দেখে আপনারা সন্দেহ করবেন না। মহারাজ তাহার প্রসাদচিহ্নস্বরূপ আমাকে অঙ্গুরীয়টি দান করেছেন। প্রিয়ংবদা। তবে, এ অঙ্গুরীয় আপনার আঙ্গুল হতে মােচন করা উচিত নয়। আপনি রাখুন ;-আপনার কথাতেই আমরা জলপরিশােধ স্বীকার কলেম। দেখ’, শকুন্তলা ! এই মহাশয়ের বা মহারাজের প্রসাদে, তুমি ঋণ- মুক্ত হ'লে। এখন তােমার যেখানে ইচ্ছা যেতে পার। শকুন্তলা। আমি যাই আর না যাই—তাতে তােমাদের কি ? (স্বগত) যাই- যাই,মনে করছি, কিন্তু কোনমতে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে না। পা যেন উঠছে না। রাজা। (স্বগত) আমার ইহার প্রতি যেরূপ, ওঁর আমার প্রতি সেইরূপ অনুরাগ কি না বুঝতে পারছি না। অথবা-সন্দেহের বিষয়ই বা কি? অামার সহিত কথা কচ্চে না, অথচ আমি কথা কহিলেই অনন্তচিত্তে স্থিরভাবে শ্রবণ করছে। নয়নে নয়নে মিলন হলে, তথনই মুখ ফিরিয়ে ল’তেছে, অথচ অন্য দিকেও অধিকক্ষণ চেয়ে থাকছে না। অন্তঃকরণে অনুরাগ সঞ্চার না হলে এপ ভাব হয় না। [ নেপথ্যে ) ওহে বনবাসী তপস্বীগণ ! সবে সাবধান হও। মৃগয়া- বিহারী রাজা দুষ্মন্ত পােবন সন্নিকটে উপস্থিত হয়েছেন। তােমরা আশ্রমস্থিত প্রাণী সমুহের রক্ষণার্থ যত্নবান্ হও। রা। কি বিপদ! নিশ্চয়ই আমার অনুচরগণ আমার অথেষণে এসে তপােবনে পীড়া জন্মাচ্ছে। আমি গিয়া নিবারণ করিগে।

অনসূয়া। আৰ্য । অনুমতি হয় তাে আমরা আমে যাই। আপনার সমুচিত অতিথিসৎকার হ'লাে না বলে আমরা বড় লজ্জিত হয়েছি। পুনরায় যেন আপনার দর্শন পাই। রাজা। তজ্জন্য আপনারা কিছুমাত্র কুষ্ঠিত হবেন না। আপনাদের সৌজন্তে ও সদালাপেই যথেষ্ট আতিথ্য হয়েছে। শকুন্তলা। অনসূয়া ! দাড়াও, দাঁড়াও!-আমার পায়ে কুশের কাঁটা বিঁধে গেছে—আমি শীগগির চলতে পারছি না। আমার বলটাও কুরুবকের ডালে আটকে গেছে। তােমরা একটু দাঁড়াও না, ভাই!-আমি ছাড়িয়ে নি। [ পশ্চাৎ দিকে রাজাকে অবলােকন করিতে ২ শকুন্তলা ও সখীদ্বয়ের প্রস্থান। রাজা। সকলেই চলে গেল, এখন আমিও যাই। কিন্তু মুনিকন্যাকে দেখে অবধি আমার নগরে ফিরে যেতে মন সরূছে না। এই তপােবনের নিকট কোনও স্থানে শিবির সংস্থাপন করে অবস্থান করি। আমি কোন মতেই আমার চঞ্চল চিত্তকে শকুন্তলার চিন্তা হ’তে নিবৃত্ত করতে পারছি না। পুনর্দর্শনলাভ ও তদুপায়চিন্তাই এখন আমার জপমালা হয়ে উঠলাে। যাই,-এখন শিবিরে * যাই। { রাজার প্রস্থান।

দ্বিতীয় অঙ্ক। - ০ বন পার্শ্বস্থ শিবির। রাজবয়স্য মাধব্যের প্রবেশ ! মাধব্য। আঃ! কি উৎপাতেই পড়া গেছে। এই শিকারী রাজার বয়স্ক হয়ে মারা গেলুম। ঐ মৃগ, ঐ বাঘ, ঐ বরাহ—ক্রমাগত চীৎকার করছেন, আর সারা দিনটা টো টো ক'রে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রভাত হতে না হতেই মৃগয়ায় যাবার জন্য ব্যস্ত। জেলের হাঁড়ির মত সারা দিনটা তার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরতে ফিরতে হয় । মস্তকের উপর মার্তণ্ডের প্রচণ্ড উত্তাপ,-না আছে ছায়া, না আছে কিছু। সৰ্ব্বাঙ্গে দর দর করে ঘাম, যেন খেজুর গাছ টোপাতে থাকে। পিপাসায় কণ্ঠ তালু শুষ্ক হয়ে যায়। ভাল জলটুকু পান ক'রে তৃষ্ণা নিবারণ করবে, তারও উপায় নেই। যে দুই একটা নদ নদী আছে, তাতে নানাজাতীয় বৃক্ষলতার গলিতপত্র পড়ে কৃষ্ণকালিন্দীর কাল জল হয়ে আছে। খাবার সুখ তে বিস্তর। এক,—শূলে-বেঁধা সেঁকা মাংস; আর না হয়,—কটু, কষা, তিক্ত ফলমুলাদি আহার। মধুরও কিছু আছে—প্রায় সকল রসেরই সমাবেশ আছে। তাতেই বুঝি, পােড়াকপালে মুনিঋষিরা এত ভক্ত। রাত্তির আসে, যেন কাল আসে- বলে মনে হয়। তবু না হয়—রাত্ত্বিরে নিদ্রাসুখটা ভােগ করি, তারও নানা প্রতিবন্ধক। শয্যায় গেলেই ব্রাহ্মণীর কথা মনে পড়ে। দুর্ভাবনায় চক্ষু মুদিত হয় না। আর যদি বা ভােরের বেলা একটু তন্দ্র। আসে, অমনি ব্যাধ বেটার বনে প্রবেশ করে কোলাহল করতে থাকে, তাতেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। এইতাে গেল খাওয়া শােয়র সুখ। আমরা ঘ’রােলােক ;-আমরা কি বাবা, স্ত্রী, পুত্র আত্মীয় স্বজন ছেড়ে, বনে বনে বনচরের মত ফিরুতে পারি ! ব্রাহ্মণের মুখে আগুণ :- দুর্ণামটা তাে চিরকালই আছে। সেত’ বরং ভাল, এ যে জঠরানল;-পেটে আগুণ লেগে সমস্ত অন্ত্রভাগটা যেন পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। প্রাণটা ওষ্ঠাগত-যেন ।

১৮ শকুন্তলা। ; বের’য় বেরয় হয়। তার উপর গােদের উপর বিষফোড়া!—কটা গাছে আর কুশাঙ্কুরে গা হাত পা ছিড়ে খুড়ে—একাকার। নানা জ্বালা বাবা! রাজা রাজড়ার যদি ভাল মেয়ে চখে পড়েছে, তা হলে আর রক্ষা নাই। একেবারে মাথা ঘুরে গেল। তাকে পাবার জন্য, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ! কাল মৃগ তাড়া করতে করতে এক আশ্রমের মধ্যে গিয়ে পড়েন। সেখানে একটা বুনো মেয়ে দেখে, একেবারে মাথা ঘুরে গেছে। দেখছি, -দেখছি কেন,-ভাবে বেশ বুঝতেও পাচ্ছি; তাকে দেখে অবধি যেন উন্মত্ত হয়ে পড়েছেন। রাজধানীতে ফিরে যাবার নামটি পৰ্যন্তও শুনতে পাই না। এ দিকে যে ব্রাহ্মণের ছেলে মারা যায়। যা হ’ক, প্রাণটা নিয়ে ঘরের ছেলে এখন ঘরে ফিরতে পারলেই বাঁচি। সধবা দেখে এসেছি, ফিরে গিয়ে বিধবা না দেখলেই সৌভাগ্য। যদি মুখের ছিপি খুলে, কখনও কিছু বলে ফেলি তাে,—“ঘরাে”–‘অচলধারী”—বলে কতই উপহাস! এই সব তিরস্কারই এখন পুরস্কার ! না বাবা,আর কাজ নেই ইয়ারকিতে। ইয়ারকির চূড়ান্ত,সখের চূড়ান্ত,—সবারই সীমান্ত হয়েছে। এখন প্রাণান্ত বাকি কেবল ! আর কখনই নয়—এই নাকে খত! কতই বা ভাববাে,কতই বা ব’লবাে ! (নেপথ্যে দৃষ্টি করিয়া)-মজিয়েছে, মজিয়েছে! এই যে দেখছি—আজ আবার বেশ আড়ম্বর। স্বয়ং মহারাজ ধনুর্বাণ হস্তে সেজে গুজে আসছেন। বুঝি বা-গরিব বামুণের ছেলের মাথাটা মৃগয়াযজ্ঞে আহুতি হয়। দুটো মনভুলান কথা ক'য়ে, গরিবের মাথা খাবেন আর কি। যা হক বাবা,-আজ এ শৰ্মা আর সে শৰ্ম্মা থাকছেন না। ছলে, কলে, কৌশলে,-অজ হাত এড়াতে চেষ্টা করতে হবে। দেখা যাক কি হয়। রাজার প্রবেশ। রাজা। এই যে বয়স্য ! আজ যে বড় আঠা দেখছি। আগেই প্রস্তুত হয়ে আছ। আবার বল, আমিই আগে এসে তােমাকে জ্বালাতন করি। এইবার ধরা পড়েছ তাে। মাধব্য। আঃ! বাপুরে গেলুম! আর বাচিনে—বড় কষ্ট, বড় ব্যথা- আঃ- [ বিকলাঙ্গের ন্যায় অবস্থান।

শকুন্তলা। রাজা। একি বয়স্য !-এ ভাব কেন ? বড়ই কাতর দেখছি যে , ব্যাপার কি ? (হাস্য করিয়া ) ভাবভঙ্গি যেমন দেখছি, মুখখানি তাে সেরূপ সাক্ষ্য দিচ্ছে না। মাধব্য। মহারাজ! হাত বাড়াই,--আমার সে ক্ষমতা নাই। কেবল মুখের কথাতে আশীৰ্বাদ করছি। জয় হক !—মাথা মুণ্ডু কি বলবাে ? কোমর ভেঙ্গে গেছে,—মহারাজ! কোমর ভেঙ্গে গেছে।-বড় কষ্ট। রাজা। বলি বয়স্য ! গোপনে আর ফল কি ? কিসে এমন অবস্থা ঘটলাে ? মাধব্য। প্রশ্ন মন্দ নয়। চ’খে আঙ্গুল দিয়ে তারপর তাকে জিজ্ঞাসা ক’রছেন—কেনরে তাের চ’খ দিয়ে জল পড়ছে ? নদীর ধারে বেতগাছগুলো যে নুয়ে পড়ে, তারা কি আপনি নােয়?-না—নদীর বেগে নুয়ে পড়ে ? রাজা। নদীর বেগে বাধ্য হয়ে তাকে নুইতে হয়। মাধব্য। তবে আমারও তাই-মহারাজ! রাজ।। সে কিরূপ হলাে ? মাধব্য। আরও কি খুলে বলতে হবে ? অপিনিই তাে আমার যত অনর্থের মূল ! রাজপ্রাসাদ,-রাজভােগ সব ত্যাগ করে কি না—বুনােদের মত এই বনে বনে ঘুরিয়ে নাকাল করে মেরেছেন। ত্বরায় যে এসব ক্লিপ নিবারণ হবে, তারও তো সম্ভাবনা দেখছি না। এত কষ্ট স’য়ে আর কিরীরে বল আছে ? না,মনে ধৈৰ্য আছে ? তা মহারাজ,—নিতান্ত পক্ষে আজিকারী দিনটা যদি ছুটি দেন—তাে-একটু বিশ্রাম করে বাঁচি। রাজা। (স্বগত) এ তত এই রূপ ব’লছে। ও দিকে আবার সেই তাপসকন্যার কথা মনে পড়ে, মৃগয়ায় যেতে আমার আর প্রবৃত্তি হচ্ছে না। শরাসনে শরসন্ধান করি, কিন্তু মৃগের উপর নিক্ষেপ করতে পারি না। তাদের মুগ্ধ নয়ন দেখলে, শকুন্তলার বিলাসযুক্ত নয়নযুগল মনে পড়ে। মাধব্য। মহারাজ! মনে মনে কি ভাবছেন। আমি কি তবে এতক্ষক অরণ্যে রােদন করলেম । | e (E রাজা। না—হে—না। আমি অন্য কিছু ভাবি নাই ।। তাতে ব্রাহ্মণের কথা !—শিরােধার্য্য করতে হয়। যখন তুমি স’য়েছ অধী শকুন্তলা। শুনতেই হবে। ভালই হ’ক, বা মন্দই হক, লঙ্ঘন করা উচিত নয়। আজ মৃগয়ায় না যাওয়াই স্থির করলেম। মাধব্য। চিরজীবী হােন মহারাজ ! আঃ—আজ বিশ্রাম করে বাঁচবাে। [ গমনােদ্যত। রাজা। আরে যাও কোথা ? ভাল,—দুদণ্ড না হয় মিষ্টালাপই করা যাক। বনে এসে দেখছি, একেবারে বুনাে হয়ে গেলে যে। মাধব্য । মিষ্টালাপ না বলে, যদি কিছু মিষ্ট ফলারের কথাটা বলতে তা হ'লে কতক ভাল লাগত। হায়রে ফলার !তুই বা কোথা, আর আমিই বা কোথা ? রাজা। বয়স্য ! তামাসা ছাড়। শােন, একটা বিশেষ পরামর্শ আছে। সংপ্রতি এক গুরুতর কাৰ্য্য উপস্থিত। তােমার সহায়তা ভিন্ন সুসিদ্ধ হওয়ার পক্ষে বিশেষ অন্তরায়। সেনাপতির প্রবেশ। সেনা। জয় হক মহারাজ ! সব উদ্যোগ হয়েছে ; শিকারের অন্বেষণ পাওয়া গেছে। অনর্থক কালহরণ করায় ফল কি? মৃগয়ায় যাত্রা করুন। রাজা। দেখ রৈবতক! আজ মাধব্য মৃগয়ার দোষ কীৰ্ত্তন করে, বড়ই নিরুৎসাহ করেছে। সেনা। (মাধব্যের প্রতি জনান্তিকে)। সখা, তুমি স্থিরপ্রতিজ্ঞ হয়ে থাক। আমি মহারাজের মনস্তুষ্টির মত, শিকারের পক্ষে একটু বলি। ( প্রকাশ্যে) মহারাজ! ও পাগলের কথা শুনেন কেন ? ও মূখ, মৃগয়ার ভাল মন্দ কি বুঝবে ? মৃগয়া উপকারী কি অপকারী, তা মহারাজই বিবেচনা করুন। দেখুন, প্রথমতঃ জড়তা নষ্ট করে শরীরকে বিলক্ষণ পটু ও কর্মক্ষম করে। ভয় বা ক্রোধের উদয় হ'লে, জন্তুদের মনের ভাব কিরূপ হয় তাহা বারংবার প্রত্যক্ষ হয়) আর’ চল-লক্ষ্যে শরক্ষেপ অভ্যাস হয়ে আসে। মহারাজ ! চল-লক্ষ্যের উপর শরক্ষেপ অব্যর্থ হয়, ধনুর্দ্ধরের পক্ষে তাহা অপেক্ষা শ্লাঘার বিষয় আর কি হতে পারে ? যাহারা মৃগয়াকে ক্লেশদায়ক মনে করে, তাহারা যদি শকুন্তলা। ২১ নিতান্ত অর্বাচীন। এরূপ আমেদ,-এরূপ শরীরের উপকার আর কিসে আছে, মহারাজ। মাধব্য। (কৃত্রিম কোপ প্রদর্শন পূৰ্ব্বক) ওরে নরাধম ! ক্ষান্ত হ’। আর তাের প্রবৃত্তি জন্মাতে হবে না। আজ উনি আপনার প্রকৃতি প্রাপ্ত হয়েছেন। তুই জঙ্গলে জঙ্গলে টো টো করে বেড়ানা কেন,-কে তােক বারণ করূছে ? আমি দিব্য চক্ষে দেখছি—তুই বনে বনে এমনই ক'রে কোন্ দিন্ নরমাংসললালুপ বাঘ ভালুকের মুখে গিয়ে পড়বি। রাজা। দেখ’, আমরা আশ্রমের অতি নিকটে আছি। এস্থানে তােমাদের এরূপ বিবাদ করা ভাল নয়। আজ হরিণগণ দলবদ্ধ হয়ে রােমন্থ করুক ;- মহিষেরা জলক্রীড়া করুক ;-বরাহেরা নিরুদ্বেগে ইতস্ততঃ বিচরণ করুক ;- আর আমার শরাসনও বিশ্রাম লাভ করুক। যে সমস্ত লােক ইতিমধ্যে বনমধ্যে অগ্রগামী হয়েছে, তাহাদের প্রতিনিবৃত্ত কর । যেন তাহারা তপাে- বনের উৎপীড়ন না জন্মায়। মাধব্য। কি হে সেনাপতি মহাশয় ! শিকারে যে ভারি উৎসাহ দেখাচ্ছিলে। এখন শুলে তো। রাজা। (সেনাপতির প্রতি) রৈবতক! যাও, তুমি শিকারের বেশ- ভূষা ত্যাগ করে বিশ্রাম লাভ করগে। সেনা। মহারাজের যেরূপ অভিরুচি। [ অভিবাদন পূর্বক নিষ্ক্রামন। মাধব্য। মহারাজ! ঐ মাছিগুলােকে তাড়িয়েছেন, ভাল করেছেন। বাঁচা গেল। চলুন, ঐ লতামণ্ডপের ছায়ায় বসে এইবার একটু বিশ্রাম করা যাক্। রাজা। যাহা বলছিলাম, তাহা এখন মন দিয়া শােন। তুমি আমার বাল্য-সহচর। তুমি অনেক দেখেছ, কিন্তু একটি দ্রষ্টব্য কস্তু দেখ নাই। তােমার চক্ষুর ফল পাওনি। মাধব্য। কেন ?—ও কথা কি করে বলছেন ? যখন আপনিই আমার চ'খের সামনে রয়েছেন ?

শকুন্তলা। । তা নয়, আপনার লােককে কে না সুন্দর দেখে' ? এই তপােবন মাঝে, এক অদৃষ্টপূৰ্ব্ব বস্তু আছে তাতে দেখ’নি। রাত্রিকালে সুনীল গগনে তারকা-বেষ্টিত চন্দ্রের উদয় দেখেছ';—আমি ভূতলে এই বনমাঝে তােমাকে তারা-ঘেরা চাঁদের উদয় দেখাব। নীরদের কোলে সৌদামিনীকে খেলতে দেখেছ ; কিন্তু সে সৌদামিনী বড় চঞ্চলা,আমি তােমাকে এই তপােবনে ধীরা স্থিরা সৌদামিনী দেখাব। গীত। কি দিব রূপ তুলনা, সে যে অতুলা ললনা! আহা মরি মরি, কি রূপমাধুরী, ধরাধামে হেন কভু না নেহারি, স্বর্গের অপ্সরী, কিংবা স্বরীশ্বরী -হেন মনে করি, করিছে ছলনা । এ কানন মাঝে অপরূপ সাজে, কেব। সাজিয়ে হেথ। বিরাজে । মুনিঋষিমন হয় উচাটন, নেহারিলে সে বাকলবসনা । সৌদামিনী লাজে, কাদম্বিনী মাঝে, লুকায়ে লুকায়ে ক্ষণিক প্রকাশে, আঁখি হেরি মৃগ রহে বনবাসে ,অকলঙ্কী দেখি এ বিধূবদনা। মাধব্য। মহারাজ! একেবারে খুলে বলুন না । এত আড়ম্বর, এত গৌর- চন্দ্রিকার প্রয়ােজন কি ? রাজা। সখা! তুমি চতুরচূড়ামণি—তুমি নিশ্চয়ই বুঝেছ’, তবে আমার মুখ দিয়ে ব্যক্ত করাবে দেখছি।—আর কি—সেই কদুহিতা শকুন্তলা। মাধব্য। আমি অনেক আগেই বুঝেছি। কিন্তু সে যে তাপসকন্যা, মহারাজ। রাজা। তুমি বেশ জেন’, পরিহার্য বস্তুতে পুরুবংশীয়দের কখনও প্রবৃত্তি হয় না। তুমি জাননা-সে অঙ্গরা মেনকাগৰ্ভস্যুতা। রাজর্ষি বিশ্বামিত্রের ঔরসজাত ।-বস্তুতঃ তপস্বিকন্যা নয়। একটি অমূল্য-রত্ন । মাধব্য। এখন ব্যাপারখানা কি,-সব বুঝতে পারলে। কি আশ্চর্য্য। রাজা রাজড়াদের কি কিছুতেই তৃপ্তি হয় না। যেমন পিণ্ডিখেজুর খেয়ে খেয়ে মিষ্টরসে রসনা এড়িয়ে এলে তেঁতুল খেতে ইচ্ছা হয়, তেমনি ঘরের স্ত্রীরত্নে শকুন্তলা ২৩ অরুচি ধরে, আপনার দেখছি এখন সেই তাপসকন্যার উপর মন গেছে। আপনার কি স্ত্রীর উপভােগে পরিতৃপ্তি হয়নি—মহারাজ! রাজা। না সখা ! তােমাকে অধিক আর কি বলব ? তুমি তাকে দেখনি—সেই জন্যই এরূপ বলছো। সে এক অভূতপূর্ব স্ত্রীর। যেখানে যেটি মানায়, তাহা অগ্রে মনে মনে কল্পনা করে, সমস্ত সৌন্দর্য্যের সারপদার্থেই বুঝি বিধাতা এ অপরূপ রূপরাশির সৃষ্টি করেছেন। না জানি, কোন ভাগ্য- বানের ভাগ্যে সে রমণীয় রূপের ভােগ আছে। মাধব্য। আপনি যখন তাকে দেখে ভুলে গেছেন, তখন সে নিতান্ত সামান্য নয়। আপনি তা হলে শীঘ্ৰ কন্যাটিকে হস্তগত করুন। দেখবেন,—যেন আপনার ভাবতে চিন্তিতে, এমন রমণীরতন কোনও জটাশ্মশ্রুধারী বুনাে তপস্বীর হাতে পড়ে। রাজা। তুমি যা ব’লছ’ সব সত্য, কিন্তু শীঘ্র হবার তাে কোন উপায় দেখি না। প্রথমতঃ-কন্যাটি পরাধীনা; তার পর—মহর্ষি কথও এখন আশ্রমে নাই। •০ মাধব্য। সব তো শুনলেম্। ভাল,বলুন দেখি, আপনার উপর তার অনুরাগ কিরূপ বােধ করছেন। রাজা। দেখ’, তাপসকন্যারা স্বভাবতঃই প্রগলভ নয় ; তাহাদের মনের কথা স্পষ্টরূপে জানা যায় না। কিন্তু আকার ঈঙ্গিতে যতদুর বুঝেছি, তাতে আমার প্রতি তার অনুরাগের লক্ষণ বিশেষ প্রকাশ পেয়েছে। যতক্ষণ আমার সম্মুখে ছিল, আমার সহিত কোন কথা কয় নাই; কিন্তু আমি কথা কহিতে আরম্ভ করলেই অনন্যমনা হয়ে স্থিরচিত্তে শ্রবণ করেছিল। নয়নে নয়ন মিলিত হলেই তৎক্ষণাৎ মুখ ফিরিয়ে লয়েছিল; কিন্তু অন্য দিকেও অধিকক্ষণ চেয়ে থাকে নাই। প্রস্থানকালে কুশাঙ্কুরে পা বিঁধে যাবার ছল ক'রে—চলতে পারি না ব'লে,-দাড়িয়ে রহিল। আবার তরুশাখা হ'তে বল্কল মােচনচ্ছলে আমার দিকে মুখ ফিরায়ে বারংবার দেখতে লাগল। এ সকল অনুরাগের লক্ষণ ভিন্ন আর কি হতে পারে। মাধব্য। তবে তো ফলার প্রস্তুত। মনােরথ সিদ্ধির অধিক বিলম্ব নাই দেখছি। ভাগ্যক্রমে পােবন আপনার উপবন হয়ে উঠলাে।

২৪ শকুন্তলা। রাজা। মহর্ষি আশ্রমে না থাকাতে, তাহার অনুপস্থিতিতে বা অসম্মতিতে স্বেচ্ছাচারের বশবর্তী হয়ে, কোন কাৰ্যই হতে পারে না। হওয়া সম্ভবও নয়। তাপসেরাও কেহ কেহ আমাকে চিন্তে পেরেছেন। কি ছলেই বা আর অধিক দিন এখানে থাকা যায়। মাধব্য। আপনার মত রাজা রাজড়াদের আবার ছলের প্রয়ােজন কি ? [ নেপথ্যে ] এইবার আমাদের মনস্কামনা সিদ্ধ হবে,—মনস্কামনা সিদ্ধ হবে। দৌবারিকের প্রবেশ। দৌবা। মহারাজ! তপােবন হ’তে দুটি ঋযিকুমার আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন। কি আজ্ঞা হয়। রাজা। ঋষিকুমার !—তাঁদের এখনি সঙ্গে ল'য়ে এসাে। যে আজ্ঞা মহারাজ ! দৌবা। দৌবারিকের প্রস্থান ও ঋযিকুমারদ্বয়ের সহিত পুনঃ প্রবেশ । ------- ঋ-কুমার। (হস্ত তুলিয়া) মহারাজের জয় হ'ক । রাজা। (প্রণামপূৰ্ব্বক) আমার প্রণাম প্রহণ করুন। ঋ-কুমার। কল্যাণ হ’ক। মনােভিলাষ পূর্ণ হক। রাজা। পূজ্যপাদ তপস্বীরা কি আদেশ করে পাঠিয়েছেন ব্যক্ত করে কৃতার্থ করুন । ঋ-কুমার। আমাদের গুরুদেব মহর্ষি আশ্রমে উপস্থিত না থাকায় দুবৃত্ত নিশাচরেরা যজ্ঞের বিঘ্ন উৎপাদন করছে। আপনি এখানে আছেন অবগত হ'য়ে, তপস্বীরা এই অনুরােধ করেছেন যে, গুরুদেবের প্রত্যাগমনকাল পর্যন্ত, আপনি এস্থানে অবস্থান ক'রে, তপােবনের শান্তিরক্ষা করুন। রাজা। এই অনুরোধ ;-এ তত তাদের অনুগ্রহ। এ দাসের প্রতি তাদের আদেশ শিরােধার্য।

শকুন্তলা। ঋ-কুমার। বটেই তাে। আপনি যে বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন, আপনার এই ব্যবহার তাহার উপযুক্তই বটে। বিপন্ন জনকে অভয়দান করা পুরুবংশীয়দের চিরন্তন কুলব্রত। এক্ষণে আমরা আসি। মঙ্গল হক। [ ঋষিকুমারদ্বয়ের প্রস্থান। মাধব্য। মহারাজ! মন্দ নয়। এ আপনার বড় অনুকূল গলহস্ত। লগ্ন মাপিক নিমন্ত্রণটা জুটে গেল। রাজা। (দৌবারিকের প্রতি)-রৈবতক ! সারথিকে শীঘ্র রথ প্রস্তুত করে, অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জীভূত হয়ে, এখানে আসতে আমার আদেশ জানাও। দৌবা। যে আজ্ঞা মহারাজ! [ দৌবারিকের প্রস্থান। রাজা। বিধাতার কি বিচিত্র বিধান ! নচেৎ এমন অশাতীত ঘটনা ঘটবে কেন বল। তবে বয়স! যদি শকুন্তলাকে দেখবার কৌতুহল থাকে, আমার সঙ্গে চল। মাধব্য। না বাবা! আপনার মুখে বর্ণনা শুনে দেখবার ইচ্ছাটা খুব প্রবল হয়েছিল বটে, কিন্তু নিশাচরের নাম শুনে আমি একেবারে দমে গিছি। আর কাজ নাই। রাজা। (হাস্য করিয়া) তােমার ভয় কি ? তুমি আমার নিকটে থাকবে । মাধব্য। তা সত্য। আপনার কাছে থাকলে নিশাচরেরা আমার কি করবে। দৌবারিকের পুনঃপ্রবেশ। দৌবা। মহারাজ! রথ প্রস্তুত। কিন্তু এদিকে আবার রাজধানী হ'তে সংবাদ লয়ে করভক এসেছে। রাজা। এ কি! অকস্মাৎ করভক এসে উপস্থিত কেন? সব কুশল তত ? যাও, শীঘ্র তাকে সঙ্গে লয়ে এস। যে আজ্ঞা, মহারাজ। [ দৌবারিকের প্রস্থান। দৌবা।

শকুন্তলা। করভকের সহিত দৌবারিকের পুনঃপ্রবেশ । করভক। (প্রণাম করিয়া) মহারাজের জয় হক। রাজধানীর সমস্ত কুশল। সম্প্রতি আগামী চতুর্থ দিবসে মাতৃদেবীর এক ব্রত উদ্যাপন আছে । আপনাকে সেই দিন রাজধানীতে উপস্থিত হতে আদেশ করে পাঠিয়েছেন। রাজা। বয়স্য, দেখলে—শুভ কাৰ্যে কত বিঘ্ন! একদিকে হর্ষ, অন্য দিকে বিষাদ। এদিকে ঋষিদের কাৰ্য্য, অপর দিকে গুরুজনের আজ্ঞা,—উভয়ই অলঙ্ঘনীয়। তার উপর আবার প্রাণের বস্তুর আকর্ষণ। এ যে বিষম সঙ্কটে পড়লুম। কি করি, কিছুই বুঝতে পাছি না। এখন কোন্ দিক রক্ষা করি। গীত। এ ঘাের সঙ্কটে সখা! কি করি এখন। একান্ত ব্যাকুল হৃদি, মন প্রাণ উচাটন। ভয়ঙ্কর নিশাচরে, যজ্ঞভূমি বিঘ্ন করে, নাশিবারে সে অসুরে, মম প্রতি ভারার্পণ। প্রিয় বস্তু আকর্ষণে, হৃদি বদ্ধ পােবনে, সে আশে নিরাশ হয়ে, কেমনে ধরি জীবন। জননীর আজ্ঞা শুনি, পশিতে সে রাজধানী, তেতে দীক্ষিতা তিনি, হবে ব্রত উদযাপন । মাধব্য। (হাস্য করিয়া) মহারাজ! এখন তবে ত্রিশঙ্কুর মত মধ্যপথে ঝুলতে থাকুন। আর কি করবেন বলুন। বড় আশায় নিরাশা! রাজা। সখা! এ পরিহাসের সময় নয়। সত্য সত্যই বড় ব্যাকুল হ'লেম। এখন এমন একটি উপায় চাই, যাতে উভয় দিকই রক্ষা হয়। দেখ’— রাজধানীতে ফিরে যাও। মাতৃদেবী তােমাকে তাে পুত্র বলেই গ্রহণ করেছেন। -তুমি শকুন্তলা। ২৭ আমার হ'য়ে, তুমি তাহার পুত্ৰকাৰ্য সম্পাদন কর’গে। আর তাকে বলল- তাপসদের কাৰ্যে ব্যস্ত থাকায়, আমি নির্দিষ্ট দিনে উপস্থিত হতে পারলেম না । মাধব্য। (স্বগত) এত দিন কঁাচা ছিল, এইবার পাকাপাকি হবে দেখছি। ( প্রকাশে) এ বিলক্ষণ সুপরামর্শ মহারাজ ! ভাল—আমিই যাব এবং গিয়ে আপনার কাৰ্য্য করবে। কিন্তু তা বলে মনে করবেন না, আমি নিশাচরের ভয়ে পালাচ্ছি। এখন আমি রাজার ছােট ভাই হলেম। আমি সেই ভাবে যেতে ইচ্ছা করি। রাজা। তাই হবে। আমার সঙ্গে অধিক লােকজন থাকার আবশ্যক নাই। উহারা সকলেই তােমার সঙ্গে যা। মাধব্য। আমি তবে যথার্থই যুবরাজ হ'লেম। আমি যুবরাজের মত মহা সমারােহে রাজধানীতে প্রবেশ করবাে। রাজা। ভাল—তাই করাে; তুমি আমি কি ভিন্ন? (স্বগত) ব্রাহ্মণটা বড় বাচাল। শকুন্তলা ব্যাপারটা অন্তঃপুরে প্রকাশ করলে, অনর্থক একটা হুলস্থুল বাধবে। ওকে এইরূপ বুঝিয়ে দেওয়া যাক। ( প্রকাশ্যে) বয়স্য। ঋষিরা কয়েক দিনের জন্য পােবনের শান্তিরক্ষা করতে অনুরােধ করেছেন, সেই জন্যই রহিলেম। শকুন্তলালাভের আশায় নহে। পরিহাসচ্ছলে তােমাকে একটা গল্প বলছিলাম। তুমি যেন সত্য ভেবে একে আর ক'রাে না। মাধব্য। আরে না মহারাজ! আমি কি এমনই মুখ,-কাণ্ডজ্ঞানহীন! আমি একবারও ওসকল কথা সত্য মনে করিনি। রাজা। তবে এখন তুমি শুভযাত্রা কর। আমিও যজ্ঞবি নিবারণের জন্য তপােবনে যাই। [ রাজা, মাধব্য ও করভকের প্রস্থান। ।

তৃতীয় অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। মালিনী নদীতীরস্থ লতাকুঞ্জ । রাজার প্রবেশ। রাজা। বর্তমান আমােদমােদ ও রাজকার্য্যে জলাঞ্জলি দিয়ে এক বৃথা আশার ছলনায়, মরুভূমিতে মৃগতৃষ্ণিকার ন্যায় বা আমার অবস্থা ঘটে। দিবাভাগ ভেবে ভেবেই অতিবাহিত হয়-কোনও বিষয়ে মনসংযােগ হয় না। কেবল সর্বক্ষণ শকুন্তলদর্শনাভিলাষ । তপস্বীগণের প্রয়ােজন সিদ্ধ হলে আমাকে রাজধানী যেতে হবে, তখন আমার দশা কি হবে ? কিরূপে তাপিত প্রাণ শীতল করবাে ? যাহা হক, আজ এখন কোথায় গেলে শকুন্তলার দর্শন পাই। হয় ততা মালিনীনদীতীরে শীতল লতামণ্ডপে এই আতপকালে শ্রান্তি দুর করছে। সেই খানেই যাই, তাহারে দেখতে পাব। [ পরিক্রমণ করিয়া অবলােকন। এই যে জলধর,না চাহিতেই জল ! আমার নয়ন সার্থক হ'লো। এখন এই লতামণ্ডপের অন্তরালে অবস্থান করে, তিন সখীতে কি কথােপকথন হচ্চে কিছুক্ষণ শ্রবণ করি ও নয়ন ভরে দেখি। [ অন্তরালে অবস্থান। শকুন্তলা কুসুমশয্যায় শয়ানা ও সখীদ্বয় পাশ্বে উপবিষ্টা। প্রিয়ংবদা। (ব্যজন করিতে ২) সখি! পদ্মপাতার বাতাসে কি তােমার স্বস্তি বােধ হচ্চে? শরীর কি একটু সুস্থ হ'লে ? শকুন্তলা। এ!তােমরা কি আমায় বাতাস করছো ?

শকুন্তলা। রাজা। (স্বগত) শকুন্তলাকে অত্যন্ত অসুস্থ দেখছি। গ্রীষ্মেয় আতিশয্য বশতঃ কি ইহার এমন অসুখ ?-না,-যে কারণে আমার এই দশা ঘটেছে, ইহারও তাই। গ্রীষ্মতাপে কামিনীদের এরূপ অবস্থা তাে কখনই সম্ভব নয়। অনসূয়া। দেখ’ প্রিয়ংবদা! তুমি কি কিছু বুঝতে পেরেছ। তুমি হয়ত ততটা মনে আননি। প্রিয়ংবদা। কি আর মনে আনব’? দিন দিন দেখে দেখে আর কিছুই ভাল লাগে না। সােণার অঙ্গে যেন কালী ঢেলে দিয়েছে। পূর্ণিমার চাঁদ যেন রাহুতে গ্রাস করতে বসেছে। অনসূয়া। তাই তাে ভাই ! দেখেছ’, পাগলের মত কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। ডালে উত্তর দেয় না। হাসে, কিন্তু যেন শুষ্ক হাসি-হাসিতে সে মধুর ভাব নেই। এমনি বােধ হয়, যেন ওর মন ওর কাছে নেই। প্রিয়ংবদা। সত্যই কিছু ভেবে ঠিক করতে পারিনি। আমার বেশ জ্ঞান হচ্চে, মহারাজের সঙ্গে দেখা হয়ে অবধি শকুন্তলার মন বড়ই ব্যাকুল হয়েছে। ঐ কারণে তো ইহার এই অবস্থা ঘটেনি ? একটা যদি কিছু জানতেও পারতেন, তা হ'লেও নয়, একটা প্রতীকারের চেষ্টা করতেন। অনসূয়া। আমারও তাই আশঙ্কা হচ্চে। যাই কেন হ’ক না, যখন প্রিয় সখীই আমাদের ধ্যান জ্ঞান,ওর ভালমন্দয় আমাদের জীবন মরণ, তখন একবার ওকেই জিজ্ঞাসা ক'রে দেখিনা কেন ? প্রিয়ংবদা। ( শকুন্তলার প্রতি। সখি, যদি মনের কথা গােপন না কর, তবে আমরা একটা কথা তােমাকে জিজ্ঞাসা করি। তােমার তাে কষ্টের কোন কারণ দেখি না, তবে কেন তােমার শরীর এমন অসুস্থ হচ্চে। শকুন্তলা। (দীর্ঘ নিশ্বাসের সহিত) কি বলব বল। বুঝি বিধাতা আর অধিক দিন তােমাদের সঙ্গে সুখভােগ করতে দেবেন না। অনসূয়া। সে কি সখি! অমন কথা কি বলতে আছে ? তােমার কি এমন অসুখ হ'য়েছে। যদি প্রাণ দিলেও তােমার অসুধের উপশম হয়, তাতেও আমরা প্রস্তুত আছি। বিরহীজনের যে অবস্থার কথা শুনতে পাই, তােমার ঠিক যেন সেই অবস্থা ঘটেছে। যাই হােক, তােমার অসুখের কারণটা কি বল দেখি। প্রকৃত রােগ ঠিক না হ'লে প্ৰতীকারের চেষ্টা করা যায় না।

শকুন্তলা। প্রিয়ংবদা। অনসূয়া ভালই বলেছে। মনের বেদনা কেন গােপন করে রাখ, সখি! দিন দিন শরীর দুর্বল হচ্ছে-বর্ণও মলিন হয়ে যাচ্ছে, শরীরে আর কি আছে ? মনের কথা খুলে বল। ভরা নৌকা কি জলডুবি হবে!-না, পূর্ণিমার চাঁদ অকালে অস্ত যাবে। শকুন্তলা। দেখ’ সখি ! আমার কোন কথাই তােমাদের কাছে গােপন নেই। মনের কথা, প্রাণের ব্যথা যদি তােমাদের কাছে না ব’লবাে, তবে আর কার কাছেই বা ব’লবাে? কিন্তু মনােবেদনা প্রকাশ করে তােমাদের কেবল দুঃখভাগিনী করবে। তাই,না বলাই ভাল। অনসূয়া। সখি! তুমি জাননা। মনের দুঃখ আত্মীয়স্বজনের নিকট প্রকাশ করলে দুঃখের অনেক লাঘব হয়। শকুন্তলা। বলতে লজ্জা করে। যে অবধি সেই ভুবনমােহন রূপ নয়নপথে পড়েছে সেই অবধি আমার প্রিয়ংবদা। বল, বল, আমাদের নিকট লজ্জা কি ? গীত। যে অবধি প্রিয়সখী! করেছি দরশন, সে অপরূপ রূপ, রমনীরঞ্জন। সেই মুখ, সেই হাসি, হৃদয়ে রয়েছে পশি, সাধ হয় দিবানিশি, হেরিতে সে প্রিয়জন। শুনেছি নিদাঘে সখি, চাতকী নীরদমুখী ; তথাপি নীরদ নাকি, নাহি করে বরিষণ ! আমার সে নবঘন, কভু কি হবে তেমন ? নাহি পাই তবে কেন, শীতল বারিমিলন !

শকুন্তলা। প্রিয়ংবদা। মনের কথা খুলে বললে,-না—আমাদের দেহে প্রাণ দিলে। অনসূয়া। ( শকুন্তলার প্রতি) সখি !—তা সুযােগ্য পাত্রেই মন সমর্পন ক'রেছ। . তা ঠিকই হয়েছে। কমলিনী দিনকরের করেই আত্মসমর্পন করেছে। মাধবীলতা সহকারকেই পতিত্বে বরণ করেছে। মহানদী সাগর ছেড়ে আর কোন্ জলাশয়ে গিয়ে পড়ে বল। প্রিয়ংবদা । (জনান্তিকে) অনসূয়া! এ ত’ আকার ঈঙ্গিতে আমরা এক প্রকার জানতে পেরেছি। আর একে সান্তনা দিয়ে ক্ষান্ত রাখবার সময় নাই। যার উপর ওর মনে গেছে, তিনি যে সে লােক নন। পুরুবংশের অলঙ্কার। এতে আমাদের মত দেওয়া উচিত । শকুন্তলা। সখি, তােমাদের যদি মত হয় তবে যাতে আমি সেই রাজর্ষির অনুগ্রহের পাত্রী হই, তার চেষ্টা কর। না হলে, আমার প্রাণ আর বাঁচে না। অমসূয়া। প্রিয়ংবদা ! এখন কি উপায়ে শীগগির অথচ গােপনে সখীর মনস্কামনা সিদ্ধ হয় বল দেখি। প্রিয়ংবদা। শীগগির হওয়া কঠিন নয়, কিন্তু গােপনের জন্যই ভাবনা। পরে যে গােপন থাকবে, তাও মনে করাে না—সেই রাজর্ষিরও সখীর প্রতি অনুরাগের লক্ষণ বিলক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। দেখনি—তিনিও কেমন মলিন ও দুর্বল হয়ে গেছেন। অনসূয়া। তা যেন বুঝলেম। কিন্তু তাকে কি করে মুখ ফুটে বলা যায়। হঠাৎ তাকে কোন কথা বলা, যুক্তিসিদ্ধ নয়। পাছে তিনি আমাদের নির্লজ্জা মনে করেন। প্রিয়ংবদা। দেখ’ অনসূয়া, একটা উপায় আমার মনে হয়েছে।-শকুন্তলাকে দিয়ে একটা প্রেমপত্র লেখান যাক্। সেই পত্রখানি নির্মাল্যচ্ছলে ফুলের মধ্যে দিয়ে রাজার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে। অনসূয়া। এ ভাই, অতি উত্তম উপায় ঠাউরেছ। দেখ’—শকুন্তলা কি বলে । শকুন্তলা। আমাকে সখি, আর কি জিজ্ঞাসা ক’বছছ ? তােমাদের যাহা ভাল হয়, তাই কর। আমার তাতেই মত। প্রিয়ংবদা। আর বিলম্বে কাজ নাই। তুমি তবে সখি, একখানি মনােমত পত্র রচনা কর।

••• শকুন্তলা। শকুন্তলা। রচনা করছি। কিন্তু ভয় হয় পাছে তিনি উপেক্ষা করেন। অনসূয়া। মান অভিমান ত্যাগ কর। শরতের জ্যোৎস্না - দেখতে কে অনিচ্ছা করে ? লক্ষ্মী আনতে কে দরজা বন্ধ করে ? মলয়বাতাস গায়ে লাগাতে কে গা ঢাকা দেয় । শকুন্তলা। কি লিখবােভেবে ঠিক করেছি। কিন্তু লেখবার সামগ্রী তাে কিছুই কাছে নাই। প্রিয়ংবদা। দেখ’—এই পদ্মপাতায় নখ দিয়ে লিখে দাও। শকুন্তলা। (ক্ষণকাল মৌনভাবে পত্র লিখিয়া) ভাল —শােন’ দেখি। লেখাটা সঙ্গত হয়েছে কি না ? ( লিপিপাঠ) হে নির্দয় ! তােমার মন আমি জানতে পারি নাই। কিন্তু আমি তােমাতে অনুরাগিনী হয়ে দিবারাত্র সস্তাপিত হচ্ছি। “মানসমােহন! প্রথম দরশন, হরিলে অবলা মন ; শূন্য দেহ ধরি, কাননে বিচরি, দুঃখ সহি অনুক্ষণ। যেমন চকোর সতত কাতর, সুধাকর তরে ; চাতক যেমতি, সকরুণ অতি, যাচে সদা জলধরে। লজ্জা সরম, রমণী ধবম, সপিনু তব চরণে ; অকুলে পড়িয়ে, কুল না হেরিয়ে, ভাসি ধ্যাল পরাণে। এ হেন দুস্তরে, কেবা নিস্তারে, বিনা তুমি কর্ণধার ? দিয়ে দরশন, বাঁচাও জীবন, মিনতি পদে তােমার। রাজা। (স্বগত) সুন্দরি ! তুমি যার অবজ্ঞাভয়ে ভীতা হচ্ছে, সে এই তােমার সন্মিলনের জন্য উৎসুক হয়ে রহেছে। তুমি কি জান না, রতু কাহারও অন্বেষণ করে না-রত্নেরই অন্বেষণ সকলে করে থাকে। আহা! কি শুভদৃষ্ট! দেখা দিবার এই উপযুক্ত অবসর। লতামণ্ডপ হইতে নিষ্ক্রমণ) সুন্দরি। তুমি তাপিত হ'য়েছ যথার্থ বটে, কিন্তু বলে বিশ্বাস করবে না, আমি একেবারে দগ্ধ হচ্ছি। ..বিচ্ছেদানলে আমার হৃদয় পুড়ে ছারখার হচ্ছে। অনসূয়া। আসুন—আসুন! আপনার কুশল তাে। আজ আমাদের বড় শুভ অদৃষ্ট। বড় উপযুক্ত সময়েই এসেছেন।

শকুন্তলা। প্রিয়ংবদা । না চাইতেই জল!—সেই দেখা, আর এই দেখা। শকুন্তলা। (গাত্রোত্থানের চেষ্টা ) (স্বগত) হৃদয়! যার জন্য এত উতলা হয়েছিলে, এখন তাকে দেখেই কাতর হচ্ছে কেন। রাজা। না, না—ওঠবার প্রয়ােজন নাই। তােমার দর্শনই আমার যথেষ্ট সংবর্ধনা। বিশেষতঃ তােমার যেরূপ গ্লানি, তাহাতে এখন কোনমতে শয্যা- ত্যাগ করা উচিত নয়। অনসূয়া। এই শিলাতলে বসুন। [ রাজার উপবেশন। রাজা। আজ তােমাদের সখীকে বড় অসুস্থা দেখছি। প্রিয়ংবদা। অসুখের উপযুক্ত ঔষধ পাওয়া গেছে—এখনই সুস্থ হবেন। শকুন্তলা। সখি ! আমি কুটীরে যাই। প্রিয়ংবদা। না সখি ! তাও কি হয় ? তােমাকে একাকিনী ছেড়ে দিতে পারি না। আর এখন কি যাওয়া ভাল দেখায় ! এখানে একটু বসাে না। সকলেই একত্র যাব’খন। অনসূয়া। (রাজার প্রতি) বিপন্ন জনকে রক্ষা করাই রাজার ধর্ম। রাজা। তাহা অপেক্ষা পরম ধৰ্ম্ম আমাদের আর কি আছে ? অনসূয়া। দেখুন, আমাদের প্রিয়সখী আপনাতে অনুরাগিণী হওয়া অবধি মদনদেব ওঁর এই অবস্থা করেছেন। অনুগ্রহ করে আশ্রয় দিয়ে এর জীবন রক্ষা করা আপনার কর্তব্য। রাজা। ভদ্রে। এ প্রার্থনা উভয়তই সমান। আমারও জীবন উহারই এত দিনের পর আমার তাপিত প্রাণ শীতল হলাে। অনসূয়া। মহারাজ ! শুনেছি রাজাদের অনেক পত্নী থাকে—সকলেই প্রেয়সী হয় না। আমাদের প্রিয়সখীর প্রতি দৃষ্টি রাখবে। অবশেষে যেন আমাদের মনটদুঃখ পেতে হয় না। রাজা। সত্য বটে।—কিন্তু আমি হৃদয় খুলে বলছি, তােমাদের প্রিয়সখীই আমার জীবনসৰ্বস্ব রাজমহিষী হবেন। প্রিয়ংবদা। শুনে, আমরা আন্তরিক সুখী হ'লেম।

৩৪ শকুন্তলা। ; শকুন্তলা। ( প্রিয়ংবদার প্রতি জনান্তিকে)—সখি ! নির্জন বলে আমরা মহারাজকে লক্ষ্য করে, কত কথা বলেছি। উনি যদি শুনে থাকেন, যেন কিছু মনে না করেন। ওঁর কাছে ক্ষমা চাও। প্রিয়ংবদা। (হাস্য করিয়া) যে বলেছে, সেই ক্ষমা চাবে, অন্যের কি দায়! শকুন্তলা। মহারাজ! যদি কিছু বলে থাকি, ক্ষমা করবেন। অন্তরালে কে কি না বলে ? রাজা। আজ্ঞাবহ পদে পদে অপরাধী ;-আমিই তোমার ক্ষমার পাত্র । অনসূয়া। (বহির্দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করিয়া )—প্রিয়ংবদা! ঐ হরিণশিশুটি বােধ হয়, মা-হারা হয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি ওকে ওর মার কাছে দিয়ে আসি। প্রিয়ংবদা। ও বড় চঞ্চল,-তুমি একা ধরতে পারবে না। চল আমিও ধরিগে। শকুন্তলা। তােমরা দুজনেই আমাকে ফেলে চলে। আমি একাকিনী রইলেম। প্রিয়ংবদা। (হাস্য করিয়া) একাকিনী কেন ? স্বয়ং পৃথীনাথ তােমার কাছে রইলেন। [ সখীদ্বয়ের প্রস্থান। ০ শকুন্তলা। একি! সত্য সত্যই এরা দুজনেই চলে গেলাে। রাজা। সখীদের জন্য উৎকণ্ঠিত হচ্চো কেন? তারা গেছে তাতে ক্ষতি কি ? এই অনুগত জন তত তােমার নিকটে আছে। আমি না হয় সঙ্গে করে কুটীরে দিয়ে আসবে। শকুন্তলা। আপনি মাননীয় ব্যক্তি ;-অকারণ এই দাসীকে অপরাধিনী করেন কেন ? [ গমূনােদ্যতা। রাজা। সুন্দরি ! একে তােমার এই অবস্থা, তাতে মধ্যাহুকাল অত্যন্ত উত্তাপের সময়। এ সময় এই সুশীতল লতামণ্ডপ ছেড়ে বাহিরে যাওয়া উচিত নয় । [ হস্তধারণ পূর্বক নিবারণ।

শকুন্তলা। শকুন্তলা। ( সলজ্জভাবে ) মহারাজ! কি করেন কি করেন ! ছেড়ে দিন। আমি সখীদের কাছে যাই। আমি পরাধীনা—বিশেষতঃ কেহ এখানে নাই ; ছেড়ে দিন। [ লজ্জিত ভাবে রাজার হস্তত্যাগ। শকুন্তলা। আপনি লজ্জিত হচ্ছেন কেন। আমিতাে আপনাকে কিছু বলছি না। আমার অদৃষ্টকে তিরস্কার করছি। রাজা। দৈবের অপরাধ কি! দৈবতত তােমার অনুকূল। দৈবকে তিরস্কার করছো কেন ? শকুন্তলা। দৈবকে শতবার তিরস্কার ক’রবাে। সে আমাকে পরাধীনা করে, পরের গুণে মােহিত করে কেন ? [ গমনােদ্যতা ও রাজার পুনরায় হস্তধারণ। শকুন্তলা। আমি অবলা শিষ্টাচার রাখ। ঋষির এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াচ্চেন। হাত ছেড়ে দাও। রাজা। সুন্দরি ! ! তুমি গুরুজনের ভয় করছে কেন ? মহর্ষি কম্ব আমাদের পরিণয়ে কখনই রুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হবেন না। শত শত রাজর্ষিকন্যার। আপনাদের অনুরূপ পাত্রে আত্মসমর্পণ করে গান্ধৰ্ববিধানে পরিণীতা হয়ে ধন্যা মান্যা হয়েছেন। তাদের গুরুজনেরাও তাহাতে সম্পূর্ণ অনুমােদন করে- ছেন। এরূপ পদ্ধতি তাে চিরকাল বিদ্যমান। শকুন্তলা। যাই হক, এখন আমি যাই। আমি তােমার বাসনা পূর্ণ করতে পারলেম না বলে কিছু মনে করাে না। চরণে প্রার্থনা—এই দাসীকে যেন ভুলে যেয়াে না। [ কিয়দ্র গমন। রাজা। প্রিয়ে। তুমি নিতান্ত নির্দয় হয়ে এই অনুগত জনকে পরিত্যাগ ক'রে গেলে। তুমি আমার হাত ছাড়িয়ে চলে গেলে, কিন্তু আমার চিত্ত হতে যেতে পারবে না। কামিনীহৃদয় স্বভাবতঃ কোমল এবং পাষাণই কঠিন হয় ;- এ যে তার সম্পূর্ণ বিপরীত দেখছি। প্রিয়ে ! তুমি কি সত্যই চলে গেলে, তুমি কি কঠিন! ( ক্ষণকাল পরে)-আর এই প্রিয়াশূন্য লতামণ্ডপে থেকে শকুন্তলা। ! ফল কি ? প্রিয়া বিনা সবই যেন শ্রীহীন বােধ হচ্চে। (কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া ) যাবার পথে আবার ব্যাঘাত ঘটলাে। এই যে,-প্রিয়ার হস্তের মৃণাল বলয় এখানে পড়ে রহেছে। (তুলিয়া লইয়া) রে শীতল মৃণাল ! তাের কি সৌভগ্য!—তুই প্রিয়ার কমনীয় করপল্লবে বলয়রূপে শােভা পাচ্ছিলি। আয়, তােকে বক্ষে ধারণ করে, তাপিত প্রাণ শীতল করি। প্রিয়ে। তােমার মৃণাল বলয় অচেতন পদার্থ হয়েও এই তাপিতজনকে আশ্বাসিত করছে, কিন্তু তুমি তাহ। ক'রলে না। শকুন্তলা। (স্বগত) আর আমার বিলম্ব সহ্য হচ্ছে না। আমার মৃণাল বলয় আলগা হয়ে হাত থেকে পড়ে গেছে। বলয় আনবার ছলে আবার দেখা দি।-(রাজার সম্মুখীন হইয়া )—আৰ্যপুত্র! কুটীরের অর্ধেক পথে গিয়ে মনে পড়াতে, আমি মৃণালবলয় ল'তে ফিরে এসেছি। আমার মন বলছে, তুমিই আমার বলয় পেয়েছ। আমার বলয় দাও। রাজা। (হর্ষের সহিত) এই যে, প্রিয়া আবার দেখা দিলেন। বুঝলেম, দেবতারা আমার দুঃখে সদয় হলেন—চাতক পিপাসায় শুষ্ককণ্ঠ হয়ে জল প্রার্থনা করছে, অমনি নব জলধর শীতল জল তাহার মুখে ঢেলে দিলেন। প্রিয়ে ! যদি তুমি আমাকে যথাস্থানে পরাতে দাও, তা হলে তােমার বলয় ফিরিয়ে দি,নচেৎ দিব না। শকুন্তলা। তাতেই যদি তােমার সন্তোষ হয়, তবে দাও। কিন্তু আৰ্যপুত্র । শীঘ্র দাও—বিলম্ব করে না। মুনিগণেরা পাছে জাতে পারেন। রাজা। (স্বগতঃ) আৰ্যপুত্র সম্ভাষণে বােধ হচ্চে, আমার মনােরথ পূর্ণ হ’লল। (প্রকাশ্যে) এস,—এই শিলাতলে বসাে। ( বলয় পরাইয়া দিয়া) দেখ, কি সুন্দর দেখাচ্ছে। বলয় প'রে তােমার করপল্লবের কি সুন্দর শােভাই হ'লাে। শকুন্তলা। (হাস্য করিয়া) তােমার সন্তোষেই আমার সুখ,—কিন্তু আর নয়। এখানে আর অধিকক্ষণ থাকা হবে না। বিলম্ব দেখে সখীরাই বা কি মনে করছে। [ নেপথ্যে ] ওরে চক্রবাকবধূ! রাত্রি উপস্থিত -এইবেলা তাের চক্ৰবাকের নিকট বিদায় নে।

রাজা । বলয় রে তােমার করপল্লবের কি সুন্দর শােভাই হ'লাে । * * ৩৬ পৃ।

No text on this page.

শকুন্তলা ৩৭ শকুন্তলা । আৰ্যপুত্র! আমার অসুস্থতার কথা শুনে গৌতমী পিসি—আমি কেমন আছি—জানতে আছেন। তাই সখীরা চক্রবাকলে আমাদের সাবধান করছে। তুমি এই বেলা লতামণ্ডপের আড়ালে যাও। রাজা। তা আমি বুঝতে পেরেছি। আমি চললম ; যেন পুনরায় দেখা হয়। কমণ্ডলু হস্তে গৌতমীর প্রবেশ । গৌতমী। বাছা ! শুনলেম, আজ তােমার বড় অসুখ হয়েছিল। এখন কেমন আছ ? এস, এই শান্তিজল মাথায় দি, এখনই উপশম হবে। শকুন্তলা। আজ বড় অসুখ হয়েছিল। এখন অনেক ভাল আছি। গৌতমী। সুস্থশরীরে চিরজীবিনী হয়ে থাক। তুমি একা কেন মা? সখীরা কি কেউ কাছে নাই ? শকুন্তলা। না পিসিমা—আমি একা ছিলাম না। সখীরা এখানেই ছিল । এইমাত্র মালিনীতে জল আনতে গিয়েছে। গৌতমী। আর বােদ নাই। অপরাহ্ন হয়েছে,-চল’ বাছা! আমরা কুটীরে যাই। [ উভয়ের প্রস্থান । রাজা। (লতামণ্ডপ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া )—মনােরথসিদ্ধির পথে কতই বিঘ্ন! আর এই প্রিয়াশূন্য লতামণ্ডপে থেকে লাভ কি ? এখন কোথায় যাই ? প্রিয়ার এই পুষ্পময়ী শয্যা,-নলিনীপত্রে লিখিত এই প্রেমপত্র,—তাহার হস্ত-ভ্রষ্ট মৃণালবলয়,–এই সকল চিছু ছেড়ে প্রিয়াবিরহিত এই লতাকুঞ্জ হতে চলে যেতে মন সরছে না। হায় ! আমাকে ধিক্‌ প্রিয়া নিকটে থাকতেও আমি বিফল-মনােরথ হয়ে বৃথা কালহরণ করেছি। হৃদয় বাধা প্রাপ্ত হয়ে, যে কি পৰ্যন্ত অধীর হয়েছে, তাহা বলা যায় না। [ নেপথ্যে ] মহারাজ! সন্ধ্যাকালীন যজ্ঞকর্মে বিঘ্ন উৎপাদন করে রাক্ষসগণের ছায়া ইতস্ততঃ বিচরণ করছে। রাজা। তপস্বীগণ! ভয় নাই—ভয় নাই। আমি এখনই গিয়া শান্তিরক্ষা করছি। [ রাজার প্রস্থান।

তৃতীয় অঙ্ক দ্বিতীয় গভঙ্কি । আশ্রমের উদ্যান। ফুলের সাজি হস্তে অনসূয়া ও প্রিয়ংবদার প্রবেশ । অনসূয়া। দেখ, প্রিয়ংবদা! যে যা একান্তভাবে কামনা করে, তা প্রায়ই বৃথা হয় না। শকুন্তলা তাে গান্ধৰ্ব্ববিধানে বিবাহ করে মনােমত পতিলাভ ক’রলে। কিন্তু আমার এক ভাবনা হচ্চে-পাছে হরিষে বিষাদ হয়। রাজ ধানীতে গিয়ে অন্যান্য পত্নীদের সঙ্গ পেয়ে, রাজা পাছে প্রিয়সখীকে ভুলে যান। প্রিয়ংবদা। না সখি, সে আশঙ্কা করাে না। তেমন আকৃতি কখনও গুণশূন্য হয় না। কিন্তু আমার আর এক ভাবনা হচ্চে। না জানি, পিতা কথ তীর্থ হ'তে ফিরে এসে, এই ঘটনা শুনে কি বলবেন। পাছে রুষ্ট হয়ে কোপানলে আমাদের ভস্ম করে ফেলেন। অনসূয়া। সখি, তা সম্ভব বােধ হয় না। আমার মনে হচ্ছে, তিনি কখনই রুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হবেন না। তিনি প্রথম থেকেই অনুরূপ পাত্রের হস্তে, শকুন্তলাকে সম্প্রদান করবার সংকল্প করে রেখেছিলেন। তাকে কোন চেষ্টা করতে হলাে না। দৈবই তাহা সম্পন্ন করে দিলে। বিনা আয়াসেই তার মনােরথ সিদ্ধ হলাে। প্রিয়ংবদা। যা বল্লে সখি, তা যথার্থই বটে। শকুন্তলার মত ভাগ্যবতী আর কে আছে ? মৃগয়া ঘটক হয়ে আনিল রাজন। বরযাত্রীসহচর তরুলতাগণ | চফ্রাতপ-নীলাম্বর ; আলােক—তপন। পুরােহিত উপস্থিত আপনি মদন ।

শকুন্তলা। E লতাপত্র শয্যা হল’ রম্য সুকোমল। কলকণ্ঠ পিককুল গাহিল মঙ্গল। পুষ্পহার মনােহর, তরুলতা দিল। মলয়-অনিল নিজে ব্যজন করিল। দেবগণ স্বর্গ হতে আশীর্বাদ করে। নবীন দম্পতি ভাসে সুখের সাগরে। শকুন্তলা পূণ্যফলে পেলে কিবা বর। গৌরী যথা পঞ্চতপ পূণ্যে পেলে হর ৷ এর চেয়ে আর ভাগ্য করে বলে? এখন এস ভাই, আমরা আর চারটি ফুল তুলি । অনসূয়া। হাঁ,—আজ ভাগ্যদেবতার পূজার জন্য আরও অনেক ফুল চাই। [ পুষ্পচয়ন । [ নেপথ্যে ] অয়মহং ভােঃ ! কে আছ গাে ?--আমি অতিথি। অনসূয়া। সখি ! যেন কোনও অতিথির কণ্ঠস্বর শােনা গেল । প্রিয়ংবদা। তা কুটীরে শকুন্তলা আছে, তার জন্য ভাবনা কি? তবে তার মনখানি এখন কোথায় আছে কে জানে। [ নেপথ্যে ] কে এখানে উপস্থিত আছ? দ্বারে অতিথি দণ্ডায়মান। কৈ—কেহই উত্তর দেয় না ! ( শকুন্তলাকে উপবিষ্টা দেখিয়া উচ্চৈঃস্বরে) কি! উত্তর পর্যন্ত নাই। রে গৰ্বিতে! তুই অতিথির অবমাননা করলি। তুই যার চিন্তায় মগ্ন হয়ে অতিথির অবজ্ঞা ক’রলি—আমি অভিসম্পাত করছি- স্মরণ করায়ে দিলেও, সে তােরে কোনমতে স্মরণ করবে না!' [ দ্রুতবেগে প্রস্থান।

৪৫ শকুন্তলা প্রিয়ংবদা। হায়! হায়! কি সর্বনাশ হলাে। যা মনে করেছিলাম তাই হ’লল। শূন্যমনা শকুন্তলা কোনও পূজনীয় ব্যক্তির নিকট অপরাধিনী হ’লল। হায়, কি হলাে ? অনসূয়া। (নেপথ্যে দৃষ্টি করিয়া ) তাই ত ! যে সে নন—উনি যে সেই সাক্ষাৎ অগ্নিমূৰ্ত্তি দুর্বাসা মুনি। ওর কুথায় কথায় রােষ। ঐ দেখ, শাপ দিয়ে ক্রোধভরে হন্ হন্ করে চলে যাচ্ছেন। প্রিয়ংবদা। সখি ! আর বৃথা আক্ষেপ করলে কি হবে ? শীগগির গিয়ে পায়ে ধরে ফিরিয়ে আন’। আমিও এই অবসরে কুটীর থেকে পাদ্য অর্ঘ্য ল’য়ে আসি। [ উভয়ের প্রস্থান। গীত। কি হলে কি হলাে! এ কি পরমাদ হলো ; শকুন্তলার সুখরবি, বুঝি আজি অস্তে গেলাে! হায় এ কি অকস্মত, বিনামেঘে বজ্রাঘাত, কুক্ষণে নিশিপ্রভাত, সখীভাগ্যে হয়েছিল। বদনে সরেনা স্বর, কঁপে হৃদি থর থর, ত্বরা করি ধর ধর, ঋষির পদযুগল। চল সখি, চল চল, বিলম্বে কি আছে ফল, করি গিয়ে সুশীতল, ঋষির সে রােষানল । ৩ সত্বর নেপথ্য হইতে দুর্বাসা, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদার প্রবেশ। অনসূয়া। ঋষি-রাজ ! করলেন কি ? একেবারে সর্বনাশ কবুলেন ! নির- পরাধ কদুহিতার পরিণাম কি হবে ? অকস্মাৎ বিনা মেঘে বজ্রাঘাত! এর চেয়ে কোপানলে ভস্ম করা তত ভাল ছিল। [ পদদ্বয় ধারণ।

শকুন্তলা। ৪১ দুর্বাসা। আরে—তােরা করিস, কি ! করিস কি! আমার পা ছেড়ে দে। যাহা ঘটবার তাহা ঘটেছে। প্রিয়ংবদা। ঋষিরাজ ! আমরা কিছুতেই ছাড়বে না। এই সঙ্গে আমাদেরও ভস্ম করে যা। অনসূয়া। শকুন্তলা সম্পূর্ণ নিরপরাধ—সে সে আপনার কন্যাস্বরূপ। অভিসম্পাতের কথা শুনলে, সখি কি আর প্রাণে বাঁচবে? ক্ষমা করুন—ক্ষমা করুন। দুর্বাসা। না—তা কখনই হবে না। মুখ দিয়ে যাহা একবার ব্যক্ত করেছি তাহা অন্যথা হবার নয়। প্রিয়ংবদা । ঋষিরাজ। সখী আমাদের অতিথিগতপ্রাণা। আপনি অতিথ্য গ্রহণ করে, কৃতার্থ করুন। চরণ ধরে ক্ষমা ভিক্ষা করছি। সখী আপনার প্রভাব কি জানে ? আপনি শাপ হতে সখীকে মােচন করুন। দুর্বাসা। ভাল বিপদে পড়লেম। (ক্ষণকাল নিস্তব্ধ থাকিয়া) যাহা হয়েছে তাহার আর কোন উপায় নাই। তবে তােমাদের সখী কোনও রূপ অভিজ্ঞান দেখাতে পারুলে সকল কথা তাহার প্রিয়জনের স্মরণ পথে আসবে। [ দ্রুত প্রস্থান। প্রিয়ংবদা। ভাল,এখন আশ্বাসের পথ হলাে। অভিজ্ঞান সম্বন্ধে আমার একটা কথা মনে হয়েছে। অনসূয়া। কি বল দেখি । প্রিয়ংবদা। রাজা এখান থেকে যাবার সময় শকুন্তলার অঙ্গুলীতে নিজ নাম লেখা একটি আংটী পরাইয়ে দিয়ে গেছেন। পতিগৃহে যাবার সময় সখীকে ঈঙ্গিত করে সেইটির কথা বলে দিতে হবে। সখীর হাতেই তাে সখীর শাপ- মােচনের উপায় রহেছে। কেমন, এ পরামর্শ ভাল নয় ? অনসূয়া। যা ভাল হবার তাতে এই হ’লল! দেখ, প্রিয়সখী পতি- চিন্তায় মগ্ন হয়ে, একেবারে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে রহেছে । ওকি অতিথির তত্ব নিতে পারে ? অতিথির কথা দূরে থাক, মনে হয় যেন আপনাকেই আপনি ভূলে গেছে।

২ শকুন্তলা। প্রিয়ংবদা। দেখ অনসূয়া! এ ঘটনা আমাদের দুজনের মনে মনেই থাক। আর কেহ না জানতে পারে। শকুন্তলা একথা শুনলে কি আর প্রাণে বাঁচবে ? অনসূয়া। সখি! তুমি কি পাগল হয়েছ। উষ্ণ জলে কে আর নবমল্লিকা সেচন করে বল দেখি। চল, এখন ফুল নিয়ে আমরা কুটীরে যাই। [ উভয়ের প্রস্থান।

চতুর্থ অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। আশ্রমের অভ্যন্তর প্রদেশ। কমণ্ডলু হস্তে কমুণির প্রবেশ। কথ। আশ্চৰ্য্য !-আশ্চৰ্য্য !-কি শুভ দৈববাণীই শুলেম! হৃদয় আনন্দে উচ্ছলিত হয়ে উঠছে। সময়ে সময়ে শকুন্তলার জন্য মন বড় ব্যাকুল হতাে। কিরূপে তাহাকে অনুরূপ পাত্রে অর্পণ করবে এই চিন্তাতেই মন বড় অস্থির হতাে। এখন জানলে, দৈব আমার প্রতি অনুকুল। বিধিলিপি অখণ্ডনীয় । তাহা না হলে, অসম্ভাবিতরূপে রাজর্ষি দুষ্মন্ত কেনই বা এখানে এসে উপস্থিত হবেন। আর,-শকুন্তলা আমার অনুপস্থিতিতে ও বিনানুমতিতে কেনই বা তাকে পতিত্বে বরণ করবে। যাহা হােক, আজ আমি ধন্য হলেম। ইষ্টদেব। তােমাকে নমস্কার। (প্রণামকরণ) অধ্যই শকুন্তলাকে পতিগৃহে পাঠাবার ব্যবস্থা করি। গৌতমী ও শিষ্যত্বয়কে সমভিব্যাহারে দিয়ে তাহাকে রাজধানীতে পাঠিয়ে দি। যাই,পাঠাবার উদ্যোগ করতে সকলকে আদেশ দিইগে। [ প্রস্থান । জনৈক শিষ্যের প্রবেশ। শিষ্য। প্রবাস হ’তে ফিরে এসে মহর্ষি প্রাতঃকালের হােমের বেলা নির্ধারণ করতে আমাকে আদেশ করেছেন। এখন তবে কুটীরের বাহিরে গিয়ে দেখা যাক,-রাত্রি প্রভাত হ'তে আর কত বিলম্ব আছে। (পরিক্রমণ ও অবলােকন)—একি! আর তাে রাত্রি নাই, একেবারে প্রভাত হয়ে গেছে যে।

৪৪ শকুন্তলা। গীত। ব্লানবেশে নিশানাথ, চলিল চরমাচলে ; নব রাগ ধরি হরি, উদিল গগনতলে। শশাঙ্কের তেজঃক্ষয়, তপনের অভূদয়, সমকালে দেখ হয়, অদৃষ্টচক্রের ফলে। সুখে তব মত্ত কেন, দুঃখে বা মলিন হেন? নহে কিছু চিরদিন, স্থির এ মহীমণ্ডলে। তবে যাই,হােমের সময় হয়েছে । গুরুদেবকে জানিয়ে আসি। [ প্রস্থান। অনসূয়ার প্রবেশ । । অনসূয়া। এখন কি করি? আমার নিজের যে সব নিত্যকর্ম, তাতেও যেন আজ হাত পা স’রূছে না। সরলা বালা একজন কপটকে বিশ্বাস করে কি কষ্টই না পাচ্ছে—এ কেবল দুষ্ট মদনেরই কাজ! কিম্বা দুর্বাসার শাপ এরই মধ্যে ফ’লতে আরম্ভ হয়েছে—তাই বা কে জানে? নহিলে, বিদায়ের সময় অমন ক'রে ব'লে গিয়ে--শেষে কি না,রাজা একখানা পত্র পাঠাবারও নাম করেন না। আচ্ছা,—সেই আংটীটি তার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া যাক না কেন ? পিতা কথ প্রবাস হ'তে ফিরে এসেছেন। তাকেই বা এ বিবাহের কথা কি করে বলি। এখন কি করা যায় ? প্রিয়ংবদার প্রবেশ। প্রিয়ংবদা। (সহর্ষে)-সখি ! কি প্রিয়সংবাদই শুনে এলেম । পিত ক শকুন্তলাকে পতিগৃহে পাঠাবার উদ্যোগ করছেন। কথাটা শুনে অবধি যেমন আনন্দ হচ্ছে, আবার সখী আমাদের ছেড়ে যাবে ব'লে, তেমনই দুঃখও হজে।

শকুন্তলা। অনসূয়া। বল কি সখি! সত্য নাকি ? —আমাদের দুঃখ ক্রমে দূর হবে। আমাদের প্রিয়সখী সুখী হক। প্রিয়ংবদা ! ঐ দেখ,—প্রাতঃস্নান করে, গৌতমী পিসি প্রিয়সখীকে সঙ্গে ল’য়ে এদিকে আসছেন। অনসূয়া। এস’, আমরা এইবেলা মঙ্গলাচারের দ্রব্যগুলি সব প্রস্তুত করে রাখি। শকুন্তলা ও গৌতমীর প্রবেশ । প্রিয়ংবদা। (শকুন্তলার প্রতি) এস সখি,-আমাদের কাছে ব’স। আমরা তােমার মঙ্গল বেশভূষা রচনা করে দি। শকুন্তলা। তােমরা সাজিয়ে দেবে—আমার পরম ভাগ্য। তােমাদের হাতের সাজসজ্জায় আমি চিরদিনই সুখী। কিন্তু এর পরে আমার আর এ সৌভাগ্য ঘটবে না। [ অশ্রুমােচন। অনসূয়া। সখি ! শুভকাৰ্যের সময় কাঁদতে নাই। স্থির হও । প্রিয়ংবদা। সখি ! তােমার এই সুন্দর অঙ্গে রত্নালঙ্কারই শােভা পায়। বনজাত এই সাজসজ্জা তােমাতে মানায় না। অলঙ্কার হস্তে এক ঋষি-বালকের প্রবেশ। খ-বালক। এই অলঙ্কারগুলি তােমরা শকুন্তলার অঙ্গে সাজাইয়ে দাও। গৌতমী। (বিস্মিতভাবে ) হারীত! এগুলি তুমি কোথা হতে পেলে বাহা? ঋ-বালক। তাতকশ্বের আদেশে বনষ্পতিগণ এই অলঙ্কারগুলি দিয়েছেন। তােমরা শকুন্তলার অঙ্গে যথাস্থানে পরায়ে দাও। আমি মহর্ষিকে সংবাদ জানাইগে। [ প্রস্থান। প্রিয়ংবদা । ( শকুন্তলার প্রতি) সখি! বনদেবতাদের এই সকল অনুগ্রহ দেখে মনে হয়, পতিগৃহে গিয়ে তুমি রাজলক্ষ্মীর মত সুখস্বচ্ছন্দে থাকবে।

শকুন্তলা। অনসূয়া। তুমি পতির আদরিণী হয়ে রাজমহিষী হবে। গৌতমী । তুমি চিরজীবিনী হয়ে অচিরে বিশ্ববিজয়ী পুত্ররত্ন লাভ করবে। অনসূয়া। আমরা জন্মেও কখন অলঙ্কার পরি নাই। কি করে কোথায় কোটি পরাতে হয়, তাও জানি না। প্রিয়ংবদা। চিত্রপটে যে রকম দেখতে পাই, এস আমরা সেই রকম করে পরায়ে দি। [ অলঙ্কার সাজান। স্নানান্তে কমণ্ডলু হস্তে কমুনির স্তব করিতে ২ পুনঃ প্রবেশ । শিবময় সুন্দর স্তোত্র গীতি। জয় জগদীশ্বর দেব পরাৎপর সৰ্বগুণাকর বিশ্ববিধে প্রেমসুধাকর কলুষগরলহর শান্তিনিধে। জয় ভয়ভঞ্জন ধাৰ্মিকরঞ্জন নিত্য নিরঞ্জন বিশ্বপতে। পাতকিরণ পাপনিবারণ নিবৃত্তিকারণ জীবগতে। জয় নারায়ণ পরম পরায়ণ শােকমহার্ণবপারতরে। সত্য সনাতন পুরুষ পুরাতন মুক্তিনিকেতন দেব হরে । জয় মহিমােজ্জল নিষ্কল নির্মল সকলসুমঙ্গলকল্পতরাে। ভবপথসম্বল সর্বপঃফল দুৰ্বলবল জগদেকগুলাে। জয় মুরমর্দন নাথ জনার্দন দুঃখহরণ মধুসূদন হে। ত্ৰিপনশন ত্রিলােকারণ দুর্গতজনগণপালন হে।

৪৭ শকুন্তলা। কথ। আজ শকুন্তলা পতিগৃহে যাবে বলে, আমার মন উৎকণ্ঠিত হচ্ছে। নয়ন অবিরত বাষ্পবারিতে পূর্ণ হচ্ছে—কণ্ঠবােধ হ'য়ে আসছে—মােহে নিতান্ত অভিভূত হচ্ছি। কি আশ্চৰ্য্য—আমি বনবাসী ঋষি ; স্নেহবশতঃ আমারই যখন ঈদৃশ বিপর্যয় ঘটছে-না জানিগৃহবাসী সংসারীজনের এরূপ অবস্থায় কি দুঃসহ ক্লেশই হয়। বুঝলেম-স্নেহ অতি বিষম বস্তু। গৌতমী। (শকুন্তলার প্রতি ) বাছা! তােমাকে মঙ্গল বিদায় দিবার জন্য তােমার পিতা উপস্থিত হয়েছেন। যথাবিধি উহার পদবন্দনা কর। শকুন্তলা। ( সলজ্জভাবে) পিতা! আমার প্রণাম গ্রহণ করুন। [ প্রণামকরণ। কথ। বৎসে! পতির আদরিণী হয়ে সুখে. রাজ্যেশ্বরী হ'য়ে থাক। রাজচক্রবর্ত্তী পুত্র লাভ কর। (ক্ষণকাল নিস্তব্ধ থাকিয়া) কৈ ?-শাঙ্গ রব, শারদ্বত কোথায় ? শাঙ্গ রব ও শারদ্বতের প্রবেশ। শাঙ্গ রব ও শারদ্বত। ভগব ।আমরা এখানেই উপস্থিত আছি। ক। তােমরা প্রস্তুত হও। গৌতমী ও তােমরা উভয়ে তােমাদের ভগিনীকে পথ প্রদর্শন করে রাজধানীতে উহার পতিগৃহে ল'য়ে যাও। শাঙ্গ রব। আপনার যেরূপ অনুমতি। আমরা যাত্রার উদ্যোগ করিগে। [ সকলের প্রস্থান। দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। বনপথ। কথ, প্রিয়ংবদা, শকুন্তলা, গৌতমী, শাঙ্গ রব ও শারদ্বতের প্রবেশ। কথ। আর অনর্থক কালবিলম্বের প্রয়ােজন কি? যাত্রার উদ্যোগ কর। ক্রমে বেলা অধিক হ'চ্ছে। হে তরুগণ ! যিনি তােমাদিগকে জলসেচন না করে, কখন জলপান করতেন না—যিনি স্নেহবশতঃ তােমাদের একটী পল্লবও ৪৮ শকুন্তলা। ভাঙ্গতেন না—তােমাদের কুসুম গ্রস্ফুটিত হ'লে, যার আনন্দের সীমা থাকতে —আজ সেই শকুন্তলা তােমাদের ছেড়ে পতিগৃহে যাচ্চে-তােমরা সকলে অনুমতি কর’ ।—অনসূয়া ! প্রিয়ংবদা!—আজ তােমাদের প্রিয়সখী পতিগৃহে চ’ললাে। আর কেন বিলম্ব কর’ ? বেলা হয়—সকলে স্নেহসম্ভাষণ করে বিদায় লও। শকুন্তলা। ( প্রিয়ংবদার প্রতি ) সখি ! আৰ্যপুত্রকে দেখবার জন্য আমার মন অত্যন্ত ব্যাকুল হয়েছে বটে, কিন্তু তপােবন ছেড়ে যেতে আমার পা উঠছে না। প্রিয়ংবদা সখি ! তুমি যে কেবল তপােবনবিরহে কাতর হচ্ছে, তা নয়। তােমার বিরহে তপােবনের কি অবস্থা হচ্ছে দেখ। হরিণগণ আহার বিহার ত্যাগ করে সজলনয়নে স্থির হয়ে দাড়িয়ে রহেছে ;-মুখের গ্রাস মুখ থেকে পড়ে যাচ্ছে ;-ময়ুরময়ুরী নৃত্য ত্যাগ ক'রে উৰ্দ্ধমুখ হয়ে আছে ;- কোকিলগণ নীরব হ'য়ে রহেছে। সকলেই নিরানন্দ। কথ। ( শকুন্তলার প্রতি) বৎসে! আর কেন বিলম্ব করবেলা হয় ? শকুন্তলা। পিতা! একবার বনলতাষিণীকে সম্ভাষণ ক'রে যাই। (সখীদের প্রতি) এই বনততষিণীকে তােমাদের দুজনের হাতে সমর্পণ ক'রে গেলেম। অনসূয়া। সখি! আমাদের কার হাতে সমর্পণ ক'রে গেলে ? [ রােদন। কথ। অনসূয়া ! প্রিয়ংবদা! রােদন করাে না। তােমরা কি পাগল হ'লে ? তােমরা কোথায় শকুন্তলাকে সান্ত্বনা কবে-না,-তােমরাই বােদন করতে আরম্ভ করলে। শকুন্তলা। (পশ্চাতে মুখ ফিরাইয়া) পিতা! আমার অঞ্চল ধ'রে কে টাচে ? কথ। বৎসে! যার মাতৃবিয়ােগ হলে তুমি জননীর ন্যায় প্রতিপালন করেছিলে—যার আহারের জন্য তুমি সর্বদা ধান্যমুষ্টি সংগ্রহ করতে—যার মুখে কুশ বিদ্ধ হয়ে ক্ষত হ'লে, তুমি ইদী তৈল দিয়ে আরাম করতে—সেই মাতৃহীন হরিণশিশু তােমার গমনে বাধা দিচ্ছে।

শকুন্তলা। ৪৯ শকুন্তলা। বাছা ! আর আমার সঙ্গে আসছি কেন'—ফিরে যা। তুই মাতৃহীন হলে আমি তােকে পালন করেছিলেম—এখন আমি চললে, পিতা তােক দেখবে। পিতা! হরিণশিশুটীর জন্য মন বড় ব্যাকুল হচ্ছে । [ বােদন। কম্ব। বৎসে ! শান্ত হও—অবেগ সম্বরণ কর। আর যােদন করে আমার প্রাণে ব্যথা দিও না। অনসূয়া। প্রিয়ংবদা ! তােরাও বাছা কঁাদবি আর শকুন্তলাকে কঁদাবি। তােরা স্থির হ’ বাছা; আর শকুন্তলাকে শান্ত কর। ( শকুন্তলার প্রতি) বৎসে ! পথ দেখে চলল। অসাবধানতায় পায়ে আঘাত লাগবার সম্ভাবনা। শাঙ্গ রব। ভগবন্! আর অধিক দূর আপনার যাবার প্রয়ােজন নাই। যাহা বক্তব্য আছে, তাহা এই স্থানে ব'লে বিদায় দিন। কম্ব। ভাল,তবে এস, এই বটবৃক্ষচ্ছায়ায় দাড়ান যাক্। [ সকলের পরিক্রমণ পূৰ্ব্বক দণ্ডায়মান। ক। দেখ’, শাঙ্গ রব! শকুন্তলাকে সঙ্গে ল'য়ে রাজসমীপে উপস্থিত হ'লে তুমি তাহাকে আমার আশীৰ্বাদ জানিয়ে, এই কথাগুলি বলবে।আমরা বনবাসী ঋষি ;—সাংসারিক রীতিনীতি, আচারব্যবহার বিশেষ জ্ঞাত নহি। শকুন্তলা আত্মীয়স্বজনের অজ্ঞাতসারে স্বেচ্ছাপূৰ্ব্বক তােমাতে অনুরাগিণী হ'য়েছে— ইহা বিবেচনা করে, তুমি ইহাকে ভাৰ্যারূপে গ্রহণ কর। তবে অদৃষ্টফল কাহারও আয়ত্ত নহে। সুখ দুঃখ অদৃষ্টেরই অধীন। পরে তাহার ভাগ্যে কি হবে, সে চিন্তা নিষ্পয়ােজন। শকুন্তলার প্রতি)-বৎসে! তুমি পতিগৃহে গিয়ে পূজ্যপাদ গুরুজনদের সেবা শুশ্রুষা করবে। সপত্নীগণের সহিত প্রিয়সখী ব্যবহার করবে। দাসদাসীদের প্রতি দয়াদাক্ষিণ্য প্রকাশ করবে—সৌভাগ্য গর্বে গর্বিতা হবে না। স্বামী কর্কশ ভাব প্রকাশ করলে তাহার প্রতি রুষ্টা হবে না। এইরূপ করলেই স্ত্রীলােকেরা গৃহিণীপদে প্রতিষ্ঠিত হয় । ইহার বিপরীত আচরণ ক’বুলে কুলের কণ্টকস্বরূপ হয়ে দাড়ায় গৌতমী। বধূদের ইহা ভিন্ন আর কি বলে দেওয়া যাবে ? ( শকুন্তলার অতি) দেখ বাছা ! উনি যে কথাগুলি বললে—সব ভাল করে মনে রেখাে ।

শকুন্তলা। শকুন্তলা। কন্ন। আমরা তবে আর অধিক দুর যাব না। আমি ও তােমার সখীরা এই স্থান হ'তেই বিদায় লই। সখীরাও কি এ স্থান হতে ফিরে যাবে ? এরা কেন সেই পর্যন্ত আমার সঙ্গে যা না। ক। না বৎসে ! উহাদের বিবাহ হয় নাই। উহাদের সে পর্যন্ত যাওয়া কি ভাল দেখায়। তােমার গৌতমী পিসি তােমার সঙ্গে যাবেন। শকুন্তলা। পিতা, তােমাদের না দেখে সেখানে কেমন করে প্রাণধারণ ক’ববাে ? প্রিয়সখীদের ছেড়ে কেমন করে থাকবাে ? গীত। যেন ভুলনা আমায় ! ভুলাতে ফিরাতে মন পারিনে যে হায়। কত কি যে মনে করি, বলিতে যে নাহি পারি, নয়নে বহিছে বারি, মাগিতে বিদায়। করে ধরে বিনয় করি, ভুলনা লাে সহচরি! ছাড়িতে যে প্রাণে মরি, কি করি উপায় । ক। ( অপূর্ণ লােচনে) এত কাতর হয় না। তুমি পতিগৃহে গিয়ে গৃহিণীপদে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, সংসারিক কাৰ্যে এত ব্যস্ত থাকবে, যে আমাদের বিচ্ছেদ দুঃখ আর অনুভব করতে পারবে না। শকুন্তলা। পিতা! কতদিনে আবার এই তপােবনে আসতে পাবাে ? কথ। বৎসে !সসাগরা পৃথীশ্বরের মহিষী হয়ে, নিজ সন্তানকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করে, পুনরায় গতি সমভিব্যাহারে এই শান্তরসাস্পদ তপােবনে আসবে। গৌতমী। বাছা! যাবার বেলা বহে যায় । ক্ষান্ত হও—সখীদের যা বলবার বলে দাও। (কঙ্গের প্রতি) আপনি যতক্ষণ থাকবে শকুন্তলা ঐ রূপই করবে। আপনি এইবার আশ্রমে ফিরে যান।

শকুন্তলা। শাঙ্গরব। বেলা প্রায় দ্বিতীয় প্রহর হয়েছে। আপনি আর বিল করবেন না। ক। তবে যাও বৎসে! ভগবান তােমার মঙ্গল করুন। সমস্ত পথ তােমার নিরাপদ হক। [ কথপদে শকুন্তলার প্রণাম। শকুন্তলা। ( সখীদের প্রতি) এস সখি ! তােমাদের একবার প্রাণ ভ'রে আলিঙ্গন করি। [ আলিঙ্গন ও রােদন। প্রিয়ংবদা। সখি! অমন করে বিদায় চেয়াে না। তােমাকে ছেড়ে দিতে আমাদের প্রাণ ফেটে যাচ্ছে। শান্ত হও—আর রােদন ক'রাে না। গীত। অমন করে নিদয় হয়ে সখীরে ! বিদায় চেয়াে না; বিরহকাতর প্রাণে যাতনা আর দিও না। বিজন এ বনবাসে, রব’ কিবা সুখ. আশে, যাও সখী পতিপাশে, পূর্ণ হাে মনােবাসনা। আশ্রমসরসীজলে, বিকচ নলিনী ছিলে, ভানুসম পতি পেলে, ধন্য তুমি চন্দ্রাননা। অনসূয়া। দেখ’ সখি ! যদি রাজর্ষির চিনতে বিলম্ব হয়, তবে তার নিজ নাম-লেখা এই অঙ্গুরীটি তাকে দেখাইও। শকুন্তলা। তােমরা এমন কথা বলে কেন ? এ কথা শুনে আমার হৃদয় কেঁপে উঠছে। প্রিয়ংবদা ! না সখি ! তেমন কিছুই নয়। ভয় করাে না। কোনও কারণ থাকলেও আত্মীয়স্বজনের মনে সৰ্ব্বদা অমঙ্গলের আশঙ্কা হয়। [ শকুন্তলা, গৌতমী ও শিষ্যদ্বয়ের প্রস্থান।

শকুন্তলা। ক। অনসূয়া ! প্রিয়ংবদা ! তােমাদের সখী চলে গেলাে। শােক সংবরণ করে, আমার সঙ্গে আশ্রমে ফিরে চলাে। প্রিয়ংবদা ও অনসূয়া । কি হ’লল! সখীকে যে আর দেখা যায় না। বনের আড়ালে একেবারে অদৃশ্য হয়ে পড়েছে। পিতা! কেমন করে শূন্য- প্রাণে সখী-শূন্য তপােবনে ফিরে যাই। [ রােদন। গীত। আ মরি! কি করি, প্রাণ ধরি কেমনে! বিনা শশীমুখ আর’, কি সুখ এ বিপিনে ? তিলেক যার বিচ্ছেদে, প্রাণ সদা উঠে কেঁদে, তাহারে বিদায় দিতে পারি কোন্ প্রাণে ? যার সেবাভক্তিগুণে, তুষ্ট মুনিঋষিগণে—এ কাননে। সাধের মাধবীলতা, সঙ্কেতে না কবে কথা, মর্মে মর্মে পেয়ে ব্যথা, প্রাণ ত্যজিবে তােমা বিনে । কথ। স্নেহ প্রযুক্ত এইরূপ মনে হয় বটে। বিবাহিতা কন্যা পরকীয়া ধন। শকুন্তলাকে আজ তার পতিগৃহে পাঠিয়ে দিয়ে, শান্তি লাভ করলুম। এখন আশ্রমে ফিরে যাই। [ সকলের প্রস্থান।

পঞ্চম অঙ্ক। রাজপ্রাসাদ। কধুকীর প্রবেশ । কধুকী। বৃদ্ধবয়সে ক্রমশঃ কি দশাই হচ্ছে। হায় ! যে ৰেত্র যষ্টি আমাকে রাজ অন্তঃপুরের রীতি অনুসারে ধারণ করতে হতাে, এখন এ বৃদ্ধবয়সে তাহাই আমার দেহের অবলম্বন হয়ে পড়েছে। মহারাজ তাে এই মাত্র বিচারাসন হতে অন্তঃপুরে বিশ্রাম করতে গিয়েছেন। এসময় আর তাকে বিরক্ত করতে ইচ্ছা হচ্ছে । (কিঞ্চিৎ পরিক্রমণ ) কি কৰ্তব্য ?—আর কাজটাই বা কি ? স্মরণও তাে হচ্ছে না। ( চিন্তা করিয়া) আঃ—মনে পড়েছে! কি ভ্ৰম !—মহর্ষি কণের শিষ্যগণ মহারাজের সহিত সাক্ষাত করতে ইচ্ছা করেন। কি আশ্চর্য ভ্রম!-বৃদ্ধবয়সে বুদ্ধির এইরূপ ভ্রংশ হয়। স্মরণ শক্তিও ঠিক থাকে না। [ নেপথ্যে ] মহারাজের জয় হক -মহারাজের জয় হক। কধুকী। এই যে রাজা নিকটেই আছেন। রাজাদের আবার বিশ্রাম কোথায় ?-সূৰ্য্যদেব অবিরাম বিশ্ব ভ্রমন করছেন—পবন দিবারাত্রই সঞ্চরণ করছেন—নাগরাজ অনন্তদেব অনন্তকালই মস্তকে ভূভার ধারণ করে আছেন। রাজাদেরও লােকহিতের জন্য অবিশ্রান্ত শ্রম করাই ধৰ্ম্ম। ভােগ সুখে জলাঞ্জলি দিয়ে, লােকসুখের জন্য প্রতিদিন অবিরত পরিশ্রয় ক’রুতেই রাজাদের সৃষ্টি হয়েছে। বৃক্ষগণ মস্তকে তীব্র রবিকিরণ সহ্য করেও আশ্রিতজনের সন্তাপ দূর করে। রাজারাও দণ্ডধারী হয়ে বিশাল রাজ্যের শান্তিরক্ষা করেন—যাই হক, এখন আমার কর্তব্য তত করি। [ পাশে অবস্থান।

শকুন্তলা রাজা ও মাধব্যের প্রবেশ। রাজা। রাজকাৰ্য পৰ্যালােচনায় পরিশ্রান্ত হলেও, ক্ষণিক বিশ্রামের পর আবার সুস্থ হ'লেম। বয়স্য ! আসন গ্রহণ কর, কিঞ্চিৎ আমােদ উপভােগ করা যাক। নর্তকীদ্বয়ের প্রবেশ এবং নৃত্য ও গীত। [ প্রস্থান। [ নেপথ্যে ] গীত। ছি ছি মধুকর তব, এ রীতি কেমন ? নব নব মধুলােভে মত্ত অনুক্ষণ । আশাদানে ভুলাইয়ে, বিরহে দহিয়ে হিয়ে, সে কমল তেয়াগিয়ে, সুধার সদন ;- কেতকী পরাগ প'রে, নব অনুরাগ ভরে, অভিনব সুখ তরে, হও নিমগন । রাজা। গীত শ্রবণ করে, অকস্মাৎ মন এত ব্যাকুল হলাে কেন? প্রিয়জন বিরহ ব্যতিরেকে এরূপ উৎকণ্ঠা হয় না। কিন্তু প্রিয়বিরহও তাে উপস্থিত দেখছি না। মাধব্য। মহারাজ! গীতের শব্দার্থ কিছু বুঝতে পারুলেন কি ? বহুদিন রাজমহিষীর সহিত সাক্ষাৎ করেন নি, তাই ছল করে এ তিরস্কার। রাজা। সথা, দিকতা রাখ।-তুমি যাও। আমার হ'য়ে তঁাহাকে সান্তনা কর’গে। ব’লাে আমি, যথেষ্ট লজ্জিত হয়েছি। মাধব্য। বুঝেছি, আমার উপর দিয়েই ঝাল ঝাড়িয়ে নেবেন। যা শত্রু পরে পরে। আজ আর নিষ্কৃতি নাই—উপায়ই বা কি ? তবে যাই । [ প্রস্থান।

শকুন্তলা। কধুকী। ( অগ্রসর হইয়া) মহারাজের জয় হ'ক ! ধৰ্ম্মারণ্যবাসী তপস্বীরা মহর্ষি কন্বের আদেশ লয়ে কয়েকটি স্ত্রীলােক সঙ্গে করে এখানে উপস্থিত হয়েছেন। মহারাজের যেরূপ আজ্ঞা হয়। রাজা। ( বিস্মিত হইয়া ) কি!---ভগবান্ কন্বের নিকট হতে সংবাদ স’য়ে এসেছেন। কধুকী। আজ্ঞা, হুঁ মহারাজ । তারই নিকট হ'তে। রাজা। তুমি শীঘ্র পুরােহিত উপাধ্যায়কে গিয়ে বল’- তিনি যথাবিধি অভ্যর্থনা করে, আমার নিকট তঁাদের লয়ে আসেন। আমি এই স্থানে তাদের জন্য অপেক্ষা করে রহিলেম। কধুকী। যে আজ্ঞা মহারাজ ! [ প্রস্থান। রাজা। (পরিক্রমণ করিতে ২) ভগবান্ কথ কি নিমিত্ত আমার নিকট ঋষিদের প্রেরণ করেছেন ? তাদের তপস্যার কি কোনও বিঘ্ন উপস্থিত ? অথবা কোনও দুরাত্মা তাদের উপর কোনরূপ অত্যাচার করেছে ?—কিছুই স্থির করূতে না পেরে, বড় ব্যাকুল হচ্ছি । যাই হক, এখনই জানা যাবে। পুরােহিত ও কপুকী এবং পশ্চাতে শকুন্তলা, গৌতমী ও শিষ্যদ্বয়ের প্রবেশ । কধুকী। আপনারা এইদিক দিয়ে আসুন। মহারাজ আপনাদের জন্য অপেক্ষা করে রহেছেন। [ কধুকীর প্রস্থান। পুরােহিত। স্বস্তি ! স্বস্তি ! ঐ দেখুন, পৃথ্বিীনথ আপনাদের শুভাগমনের সংবাদ পেয়ে, অভিবাদনের জন্য কৃতাঞ্জলিপুটে স্বয়ং দণ্ডায়মান। শারব। এতাদৃশ বিনয় ও সৌজন্য দর্শনে সাতিশয়, মন্দ লাভ করলেন। অথবা, বিচিত্র কি !-তরুগণ ফলিত হ'লে ফলভরে অবনত ভাবই ধারণ করে— বর্ষাকালে জলধর বারিভরে নম্রভাবই অবলম্বন করে- সৎপুরুষদের স্বভাবই এই-সমৃদ্ধিশালী হ'লেও উদ্ধত হন না। [ সকলের পরিক্রমণ।

শকুন্তলা। শকুন্তলা। (গৌতমীর প্রতি) ৭ি শিমা! আমার ডান চোখ, নাচছে কেন ? গৌতমী। ভয় কি বাছা!-বৃথা আশঙ্কা করাে না। দেবতারা তােমার মল করুন। রাজা। (অনাস্তিকে) ঐ কামিনী কে ?—কি নিমিত্তই বা ইনি তপস্বী- দের সঙ্গে এসেছেন। পুরােহিত। ( রাজার প্রতি) মহারাজ ! আমরও এ বিষয়ে কুতূহল জন্মেছে, কিন্তু কিছুই বুঝতে পাছি না। এই কামিনীর রূপলাবণ্য দর্শনীয় বটে। রাজা। ও কথা ছেড়ে দিন। পরস্ত্রীতে দৃষ্টিপাত বা পরস্ত্রীর কথা লয়ে আন্দোলন করা কর্তব্য নয়। শারত। ( অগ্রসর হইয়া) মহারাজের জয় হক। [ হস্ত তুলিয়া আশীৰ্বাদ । রাজা। আপনাদের সকলকে প্রণাম । তপস্যার কুশল তাে ? [ প্রণামকরণ । শাঙ্গ রব। আপনি শাসনকর্তা বিদ্যমান থাকতে, ধৰ্ম্মকাৰ্য্যের বিঘ্ন সম্ভাবনা কোথায় ? সূৰ্য্যদেব উদিত থাকতে কি অন্ধকারের প্রাদুর্ভাব হতে পারে ? রাজা। (স্বগত) আজ আমার “রাজ” নাম সার্থক হলাে। (প্রকাশ্যে ) ভগবান্ কথ কুশলে আছেন তো ? আপনারা কি প্রয়ােজনে কষ্টস্বীকার করে এতদূর এসেছেন ? শারত। হ মহারাজ! মহর্ষির সর্বাঙ্গীন কুশল। শহরব। ধৰ্ম্মরণ্যবাসী, পূণরাশি তপােধন, মহর্ষি কগ্নের শিষ্য আমরা দুজন। ইবধান,-মহারাজ তাহার আরতি- শকুন্তলা কন্যা ধন্যা, রূপগুণবতী তারে না জানায়ে তােমা করেছে বরণ, তথাপি হয়েছে তার প্রতির কারণ। ! • শকুন্তলা। চন্দ্র বিনা কুমুদীর অন্য কেবা পতি? সিন্ধু ছেড়ে তটিনী কি করে অন্যে গতি? রাজকুলরবি তুমি ধন্য ধরামাঝে ; ভানু বিনা কমলিনী অন্য কারে সাজে। মহর্ষি: সাদাশীৰ্বাদের সহিত বলে দিয়েছেন, আপনি তাহার অনুপস্থিতিকালে তদীয় দুহিতা শকুন্তলাকে গান্ধৰ্ব্ববিধানে বিবাহ করেছেন, তাহাতে তিনি পরমানন্দিত। তুল্যগুণসম্পন্ন বরবধূর সংযােজন হওয়াতে বড় সুখের বিষয়ই হয়েছে। এক্ষণে আন্তঃসত্বা শকুন্তলাকে গ্রহণ করে গৃহস্থধৰ্ম্মের আচরণ করুন। গৌতমী। আমিও কিছু বলতে চাই। তােমরা কেহই গুরুজনের অপেক্ষা পরস্পরের সম্মতিতে গােপনে বিবাহ করেছ। অন্যের তাতে কথা কহিবার কি আছে? এখন তােমার পত্নীকে তুমি গ্রহণ কর। আমরা স্বচ্ছন্দমনে আশ্রমে ফিরে যাই। রাজা। মহর্ষি করে পদে মিনতি আমার। কিন্তু হায়! একি বিড়ম্বনা বিধাতার । কনকবরণী এই রমণীরতন;- ইহাতে আমাতে কভু নাহি দরশন। পরিণয় দূরে থাক,-পরিচয় নাই -- স্মৃতিপথে অন্বেষিয়া কিছুতে না পাই এ আবার কি উপস্থিত। আপনারা কি প্রসঙ্গ উত্থাপন করছেন। আমিত কিছুই বুঝতে পাছি না। শকুন্তলা। (স্বগত) হা!-আমার অদৃষ্ট! একি কথা শুনছি। কথাগুল যেন জলন্ত অঙ্গারের মত হৃদয়ে লাগছে। শাঙ্গ রব। কি বিষয়ের প্রসঙ্গ, তা আবার জিজ্ঞাসা করছেন। আপনি লৌকিক ব্যবহার বিশেষ অবগত হয়েও এরূপ ব’লছেন কেন? আপনি কি জানেন না, যে পরিণীতা নারী যদি অত্যন্ত সৎস্বভাবও হয়, তথাপি সে নিয়ত পিতৃকুলে বাস করলে, লোকে নানা কথা বলে। এজন্য স্বামীর প্রিয় বা অপ্রিয় হলেও, পিতৃপক্ষ তাহাকে পতিগৃহবাসিনীই করতে চাহে। ৮ বিবাহিতা কন্যা-পিত্রালয়ে বাস- সুশীলা হ'লেও তবু লােকে উপহাস! রাজা। কি !-উনি আমার পরিণীত। ভাৰ্যা ? এই কথা আপনারা বলছেন। কই,আমি তো ইহার পাণিগ্রহণ করি নাই। শকুন্তলা। (স্বগত) হায়! হৃদয় যে আশঙ্কা করছিলে, তাই ঘটলাে। শারত। মহারাজ! স্বেচ্ছাকৃত কোনও কার্যের অপলাপ করা রাজোচিত ধৰ্ম্ম নহে। জগদীশ্বর আপনাকে ধৰ্ম্মসংস্থাপন কার্যে নিযুক্ত করেছেন, অন্যে অন্যায় করলে, আপনি দণ্ডবিধান করে থাকেন। এখন আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, রাজা হয়ে স্বকৃত কার্য্যের অপলাপ করলে, ধৰ্ম্মদ্রোহী হতে হয় কি না? রাজা। আপনি কি কারণে আমাকে এত অসৎ মনে করূছেন। শারব। (স্বক্রোধে) মহারাজ ! আপনার অপরাধ নাই। যাহারা ঐশ্বৰ্য্য মদে মত্ত হয়, তাহাদের এইরূপ চিত্তবিকার ও এইরূপ আচরণই হয়ে থাকে। রাজা। আপনি অন্যায় ভৎসনা করছেন। আমি কোনও ক্রমে এরূপ ভৎসনার যােগ্য নহি। । ( শকুন্তলার প্রতি } বাছা! লজ্জাত্যাগ করে ভাল করে চেয়ে দেখ’ দিকি। মুখের ঘােঠা খুলে দি, তা হলে তােমার স্বামী নিশ্চয়ই তোমাকে চিনতে পাবেন। [ অবগুণ্ঠন মােচন। শারব। মহারাজ! আপনি এরূপ মৌনভাবে রহিলেন কেন? আপনি নীরব হয়ে আছেন যে ? এখনও বিশ্বাস করতে বাকি আছে ? রাজা। দেখুন তপস্বিগণ, আমি নিতান্ত অন্যায্যভাবে তিরস্কৃত হচ্ছি। আমি অনেক চিন্তা করে দেখলে।কিন্তু ওর পানিগ্রহণ ক'রেছি ব'লে কিছুতেই আমার স্মরণ হচ্ছে না। বিশেষতঃ এই গর্ভলক্ষণাক্রান্তা রমণীকে কি প্রকারে পত্নী বলে গ্রহণ করি। পরনারীগ্রহণে যে মহাপাতক হবে, তাহার ফলভাগী হবে কে ? শকুন্তলা। (স্বগত) হা ধিক্‌! কি সর্বনাশ! একেবারে বিবাহে সন্দেহ! রাজধানীতে এসে, অমির আরাধ্য দেবতার চরণে স্থান পাব’—আমার গৌতমী।

শকুন্তলা। এই সুদীর্ঘ বিরহযাতনার অবসান হবে—আমার হৃদয়ের স্বালা নিবারণ হবে- তা দূরে থাক্‌—একেবারে বিবাহে পৰ্যন্ত সন্দেহ! হায়!—আমার সকল আশা একেবারে নিৰ্ম্মল হ’লল । শারব। মহারাজ! বিবেচনা করুন, মহর্ষি কেমন মহানুভবতা প্রদর্শন করেছেন। আপনি তাহার অগােচরে, তাহার কন্যার পানিগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তিনি তাহাতে অসন্তোষ প্রকাশ না করে বরং অনুমােদন করেছেন, এবং কন্যাকেও আপনার নিকট পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন প্রত্যাখান করে মহর্ষির অবমাননা করা কি আপনার কর্তব্য? এই কি রাজনীতি ? এই কি সত্য পালন? এই কি প্রতিজ্ঞরক্ষা ? শারদ্বত। শাঙ্গ রব! তুমি ক্ষান্ত হও। আমি এককথায় সব শেষ করছি। ( শকুন্তলার প্রতি) শকুন্তলে ! আমাদের যা বলবার ছিল সব বললেম। আর উনিও যা উত্তর দিবার তা দিয়েছেন। এখন তােমার যদি কিছু বলবার থাকে, যাতে ওঁর প্রত্যয় জন্মায়, তা বল। শকুন্তলা। (স্বগত) যখন সেরূপ অনুরাগ এরূপভাব ধারণ করেছে, তখন আর সেই পূর্বকথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ফল কি? (প্রকাশ্যে ) আৰ্যপুত্র ! ,-না—যখন পরিণয়েই সন্দেহ, তখন আর আর্যপুত্র সম্ভাষণ ঠিক নয়। পৌরবরাজ! আমি সরলহৃদয়া মুনিকন্যা! ভাল মন্দ কিছুই জানি না। সময়ে তপােবনে গিয়ে ধৰ্ম্মসাক্ষী ক'রে প্রতিজ্ঞা পাশে বদ্ধ হয়েছিলেন। আর এখন দুৰ্ব্বাক্য বলে আমাকে প্রত্যাখ্যান করা কি উচিত কাৰ্য । যাহাকে সরল ভেবে মন প্রাণ সঁপেছিলেম, কে জানিত সে অমৃত এ হলাহলে পরিণত হবে ! রাজা। ক্ষান্ত হও। ও পাপ কথা আর শুনতে চাই না। কুলধ্বংশী নদী যেমন তীরস্থিত তরুকে পাতিত ও আপনার প্রবাহকে পঙ্কিল করে, তুমিও তেমনই আমাকে পাতিত ও আপনার কুলকে ফিরতে উদ্যত হয়েছ। শকুন্তলা। যদি পরপত্নী বােধে যথার্থই পরিণয়ে সন্দেহ হয়ে থাকে তা হলে একটা চিন্তু দেখাচ্ছি। সেইটি দেখালেই আপনার সন্দেহ দূর হবে। রাঙ্গা। এ উত্তম প্রস্তাব। কি অভিজ্ঞান দেখাবে দেখাও।

শকুন্তলা। শকুন্তলা। (অঞ্চল স্পর্শ করিয়া) ওমা! একি হ'লাে-আমার আঁচলে তাে আংটা নাই। কোথায় পড়ে গেল? [ গৗতমীর মুখের প্রতি অবলােকন। গৌতমী। তবে নিশ্চয়ই শচীতীর্থে স্নান করবার সময়, আলগা হ'য়ে আংটীটি জলে পড়ে গেছে। রাজা। স্ত্রীজাতির উপস্থিত বুদ্ধি ইহাকেই বলে। শকুন্তলা। বিধাতার বিড়ম্বনায় এ চিনুটা দেখাতে পারলেন না। ভাল- আর একটা কথা মনে করিয়ে দি। রাজা। আচ্ছা, বল শুনি শকুন্তলা। একদিন আমরা দুজনে লতামণ্ডপে বসেছিলেম, সেই সময় দীর্ঘাপাঙ্গ নামে আমার পালিত হরিণশিশু এসে উপস্থিত হ’লাে। তুমি পদ্মপাতায় জল নিয়ে, তার সামনে ধরলে। তুমি অচেনা ব'লে, সে তােমার কাছে গেল না। পরে আমি হাতে করে দিলে, তবে সে পান করলে। তখন তুমি ঠাট্টা করে বল্লে,-“দুজনেই বুনন কিনা”—তাই তােমার উপর ওর বিশ্বাস। রাজা। জানি-কামিনীরা আপন কাৰ্যসাধনের জন্য এইরূপ মধুমাখা প্রবঞ্চনা বাক্যে বিষয়ী লােকদের মন মুগ্ধ করে থাকে। গৌতমী। মহাশয়! এরূপ কথা বলবেন না। এ জন্মাবধি তপােবন পালিত, ছলনা কাকে বলে তা জানে না। রাজা। অয়ি বৃন্ধতাপসি! প্রবঞ্চনা স্ত্রীলােকদের স্বভাবসিদ্ধ ধর্ম। শিখাইতে হয় না। মানুষের তো কথাই নাই—পশুপক্ষী ইতর প্রাণীদেরও বিনা শিক্ষায় প্রবঞ্চনানৈপুণ্য দেখতে পাওয়া যায়। দেখ’—কেহ শিখাইয়া দেয় না—অথচ কোকিলারা অন্য পক্ষী দ্বারা আপনাদের শাবক পালন করিয়ে লয় । শকুন্তলী কুমিপনি যেমন, অপরকেও সেইরূপ মনে কর। তুমি তৃণাচ্ছন্ন কুপের মত বিষম প্রবঞ্চক। অধাৰ্মিক ভণ্ড এখন থেকে কে আর তােমার চরিত্রের অনুসরণ করবে ? শারব। কি বললেন মহারাজ ! যাহা মনে আসে তাই বলেন। বে শান্ত- রসম্পদ তপোবনে প্রতিপালিত—যেখানে ছল-কল-কৌশল সম্পূর্ব অপরিজ্ঞাত - শকুন্তলা। যেখানে তপ-জপ-হােম-গাদি ধৰ্মকৰ্ম্ম নিরন্তর সম্পাদিত—যেখানে হিংস্র জন্তুগণ হিংসাৱেষবিবর্জিত—এরূপ স্থানে প্রতিপালিতা সরলাবালা প্রবঞ্চনায় অভ্যস্ত ও মিথ্যাবাদিনী! আর যাহাদের ছলনা ও পরপ্রতারণা বিদ্যা বলে শিক্ষা ও চিরব্যবসায়, তাহারা ধার্মিক ও সত্যবাদী! এই কথা আপনি বলতে চান্। রাজা। ভাল। আপনারা সত্যবাদী স্বীকার করলেম—আর প্রতারণা আমাদের বিদ্যা ও ব্যবসায় ! কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, এই রমণীকে প্রতারণা করে আমার লাভ কি ? শাঙ্গ বর । লাভ!—নিপাত, নিপাত । রাজা। পুরুবংশীয়েরা দুষ্কর্ম করে নিপাত লাভ করে এ কথা অশ্রদ্ধেয় । দুষ্মন্ত গােপনে কোনও কাৰ্য্য করে না। যখন যাহা করেছে, তাহা জগতে সর্বত্র প্রসিদ্ধ আছে। কই—কেহ বলুক দেখি, আমি উহার পাণিগ্রহণ করেছি। পুরােহিত। সত্যই,- দুষ্মন্তের সমস্ত ক্রিয়াকাণ্ডই সৰ্বজনবিদিত। বিবাহের অনুষ্ঠানটি যদি বাস্তবিক হতো, তাহা হলে কি আমাদের নিকট অবিদিত থাকতো। শকুন্তলা। (রাজার প্রতি) তুমি আমাকে স্পষ্টতঃ স্বেচ্ছাচারিণী ব’ললে। পুরুবংশীয় বলে আমি যাকে বিশ্বাস করেছিলেম, সেই কিনা এখন আমাকে পরস্ত্রী মনে করছে। মুখে-মধু, হৃদে-বিষ—এই খলের হাতে যখন আত্মসমর্পণ করেছি তখন আমার ভাগ্যে যে এই ঘটবে তার আর আশ্চৰ্য্য কি । গীত। আশাতরী ডুবে যায়, নিরাশার নীরে হায় ! সুমতি আমার ছিল কর্ণধার, ধৈর্য সমীর তায়, কুলের নিকট", ঘটিল সঙ্কট, কি করি উপায় । তুলি ফুলদলে, অতিকুতুহলে, গাঁথিরে সে হয়ে ভুজঙ্গ, দংশে মম অঙ্গ, বাঁচিনে জ্বালায়। পিয়াসা লাগিয়ে, কাতর হইয়ে, সেবিনু জলদবরে ; তৃষা না মিটিল, অশনি পড়িল, অভাগী মাথায় ॥ থিপরিমু হার;

শকুন্তলা। শারব। অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে কৰ্ম করলে, পরিণামে এই রূপ মনস্তাপ পেতে হয়। এই নিমিত্ত সকল কৰ্ম্মই—বিশেষতঃ যাহা নির্জনে করা যায় তাহা সবিশেষ পরীক্ষা না করে করা উচিত নয়। পরস্পরের মন না জেনে বন্ধুতা করলে, সেই বন্ধুত অবশেষে শত্রুতায় পরিণত হয়। রাজা। কেন আপনি স্ত্রীলােকের কথায় বিশ্বাস করে, আমার উপর অকারণ এরূপ দোষারােপ করছেন ? শারদ্বত। শাঙ্গ রব! আর উত্তর প্রত্যুত্তর করে ফল কি? গুরুদেবের যাহা বক্তব্য ছিল তাহাতে বলা হয়েছে এখন চল, আমরা ফিরে যাই। ( রাজার প্রতি) ইনি আপনার পত্নী,ইচ্ছা হয় গ্রহণ করুন, ইচ্ছা হয় ত্যাগ করুন। পত্নীর উপর পতির সর্বতােভাবে প্রভুত্ব আছে। আমরা চললেম। গৌতমী! তুমি অগ্রগামী হও। শকুন্তলা। ইনি আমাকে বঞ্চনা করলেন। আবার তােমরাও আমাকে ফেলে চললে। আমার গতি কি হবে? [ নােদন। হায়! গৌতমী। (গমনে বিরত হইয়া) বৎস শাঙ্গ রব! শকুন্তলা কঁাদতে কঁদতে আমাদের সঙ্গে আছে। রাজা নিষ্ঠুর হয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন। বাছা আমার এখানে থেকে আর কি করবে বল'। আমি বলি, আমাদের সঙ্গেই আসুক। গীত। জানি নৃমণি মন, কেন বা এমন হ’ল ; অমৃত সাগরে কেন, এ হেন গরল উঠিল। নাহি কোন অপরাধ’, তবে কেন পরমাদ', এর চেয়ে বজ্রাঘাত, তাের কপালে ভাল ছিল। হ’তে এসে রাজরাণী, কি দারুণ কথা শুনি, কি বলিবেন মহামুনি, হায়! আজি কি ঘটিল ।

শকুন্তলা। শারব। (সরােষে) পাপীয়সি ! স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করূতে চাও? রাজা যেরূপ বলছেন, যদি তুমি যথার্থই সেইরূপ হও, তা হলে তুমি স্বেচ্ছাচারিণী তােমাকে ল'য়ে আমরা কি করবাে? আর যদি তুমি আপনাকে পতিব্রতা ব'লে জানাে, তা হলে পতিগৃহে দাসীবৃত্তি করাও তোমার পক্ষে শ্রেয়। তুমি এই খানেই থাক’—আমরা চললেম - রাজা। তাপসগণ ! কেন ওঁকে বৃথা আশা দিয়ে বঞ্চনা করছে। পুরু- বংশীয়েরা প্রাণান্তেও পরস্ত্রীগ্রহণে প্রবৃত্ত হয় না। চন্দ্র কুমুদিনীকেই প্রফুল্ল করেন—সূৰ্য্য কমলিনীকেই উল্লাসিত করেন। শাঙ্গরব। আপনি যখন পূর্ব পরিণয়বৃত্তান্ত এককালেই অস্বীকার করছেন তখন আর আপনি ধর্মের কথা মুখেও আনবেন না। আপনার আবার ধর্মভয় কিসের ? [ গৌতমী, শারদ্বত ও শাঙ্গরবের প্রস্থান। রাজা। (পুরােহিতের প্রতি) আপনাকেই ব্যবস্থা জিজ্ঞাসা করি। বিষয়ের গুরু লঘু সম্বন্ধে বিচার করে, এখন কি কৰ্তব্য আদেশ করুন। আমি মােহবশে পূৰ্ববৃত্তান্ত বিস্তৃত হয়েছি—অথবা,-এই নারী মিথ্যা বলিতেছে। এমন সন্দেহস্থলে, আমি দারত্যাগী হই—অথবা পরস্ত্রী গ্রহণে পাতকী হই। পুরােহিত। ( চিন্তা করিয়া) ভাল মহারাজ! এক কাজ করলে হয় না? রাজা। আজ্ঞা করুন। পুরােহিত। ঋষিতনয়া প্রসবকাল পর্যন্ত আমার গৃহে অবস্থান করুন। যদি বলেন-এ কথা বলি কেন ? তাহার কারণ,-দৈবজ্ঞেরা বলেছেন আপনার প্রথম সন্তান চক্রবর্তী লক্ষণাক্রান্ত হবে। যদি মূনিদ্রৌহিত্র সেইরূপ হন, তবে সন্দেহের অার কোন কারণ থাকবে না। একে গ্রহণ করবেন,নতুবা পুনরায় পিতৃগৃহে প্রেরণ করাই শ্রেয়। রাজা। এ ভাল কথা। গুরুদেবের যথা অভিরুতি। পুরােহিত। (শকুন্তলার প্রতি) বৎসে ! সব শুনলে তো। এখন তবে আমার সঙ্গে এস। শকুন্তলা। হা বিধাতঃ! এই কি অভাগিনীর অদৃষ্টে ছিল ?

শকুন্তলা। গীত। হায়! কি হলো, এই ছিল, ললাটে লিখন। কি ঘটিল, সব ফুরাল, যেন নিশার (ও) স্বপন। কোথারে সখি! একবার আয় আয় দেখি, (আজ) তােদের শকুন্তলা, জুড়ায় সকল জ্বালা, জন্মের মত করি জীবন বিসর্জন। চাই না পরীক্ষা, ভাল দিলে শিক্ষা, এখন করি এই মিনতি, ওহে ধরপতি। রহে যেন সতীর সতীত্ব রতন ॥ শকুন্তলা। ভগবতি বন্ধুরে! বিদীর্ণ হও। আমি তোমার গর্ভে প্রবেশ করি। আর সহ্য হয় না। হা ধিক্ ! হা বিধাতঃ ! অভাগিনীর তদৃষ্টে অবশেষে এই ছিল? আর আমার জীবনধারণে সাধ নাই। আর আমার ছার প্রসবকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে ইচ্ছা নাই। এক ধর্মের ভয়। স্ত্রীলােকের সতীত্বই ধৰ্ম্ম। পতির কাছে—গুরুজনের কাছে—যদি : আজ সেই সতীত্বধন কলঙ্ক সাগরে ডুবলাে, তবে আর এ ছারজীবনে প্রয়ােজন কি ? লােকে মৃত্যুশঙ্কায় কাতর হয়—আমি সে ভয় করি না। পতির বাক্যবিষে সৰ্বাঙ্গ জেরে ফেলেছে, হৃদয় দগ্ধ হয়ে গেছে। প্রবঞ্চক মহারাজ! আর আমার রসনা তােমার সহিত বাক্যালাপ করতে চায় না—তােমার সহিত সম্পর্ক রাখতে আর বাসনা হয় না। পিতা আমার মত স্বেচ্ছাচারিণীর মুখ দর্শন করবেন না। মা নাই—যে সন্তানের মায়া বুঝবে। তবে, আর কার কাছে যাব ? কোথায় এ জ্বালা জুড়াব ? পতি ত্যাগ করলেন—বিছা দোষে ত্যাগ করলেন—আমার বড় আশায় নিরাশ করলেন-জীবনের সব সাধ আহ্লাদ জন্মের মত ঘুচিয়ে দিলেন। (কাদিতে কাদিতে) যখন সন্দেহ,-অস্বীকাররূপ শেল হৃদয়ে বিদ্ধ হল, তখনই কেন প্রাণ বহির্গত হলো না ? হায় ! অভাগিনীর কি কঠিন হৃদয় ? হা পিতঃ ! তােমার বিনানুমতিতে যে কাৰ্য করেছিলেম, তার উচিত শাস্তি হলাে। ঘাের শকুন্তলা। কলঙ্কের ডালি মাথায় লয়ে আর কি করে এ পাপ মুখ দেখাব ? হা ! প্রিয় সখি প্রিয়ংবদা! হা! সখি অনসূয়া ! তােমরা এ সময় কোথায় রহিলে? তােমাদের চির আদরের শকুন্তলা জন্মের মত বিদায় হলাে ! হায়। গীত। কোথা আছ মা! মা! মাগাে এখন। দুঃখানলে হৃদি জ্বলে, কত হবে মা,আর জ্বালাতন। 5. হেন,অপমানে, মায়া নাই আর প্রাণে, হলাে না। আর তব সনে, দেখা এ জনমের মতন। হ’ব রাজ্যেশ্বরী, এলাম আশা করি, । বাক্যবাণে বিদ্ধ করি, হৃদি করে বিদারণ। [ কাদিতে ২ পুরােহিতের পশ্চাগমন। [ নেপথ্যে ] কি আশ্চর্য ব্যাপার! কি আশ্চর্য্য ব্যাপার ! পুরােহিতের পুনঃ প্রবেশ। পুরােহিত। মহারাজ। বড় অদ্ভুত কাণ্ড হয়ে গেল। আমার সঙ্গে যেতে যেতে সেই বালা আপনার অদৃষ্টকে নিন্দা করে যােদন করতে লাগলাে। তৎক্ষণাৎ এক জ্যেতির্ময়ী মুক্তি নারী বেশে আবিভূত হ'য়ে, তাকে কোলে লয়ে অন্তর্হিত হলাে। রাজা। গুরুদেব! যাহা পূৰ্বেই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, আর সে বিষয়ের আলােচনা করে ফল কি? আপনি যান—এখন গৃহে গিয়া বিশ্রাম করুন। পুরােহিত। জয় হ’ মহারাজ! স্বস্তি ! অন্তি। [ প্রস্থান।

শকুন্তলা। রাজা। আমার মন বড় চঞ্চল হয়েছে। মুনিতনয়াকে যে বিবাহ করেছি, এ বিষয়ে এত চেষ্টা করেও আমার মনে আসছে না। তবে পরিতাপে হৃদয় এত সুগ্ধ হচ্ছে কেন?—তাই এক একবার সত্য বলে প্রত্যয় হচ্চে। চিত্তে তাে কিছুতেই, শান্তি আসছে না। যাই হক, এখন একটু বিশ্রামের চেষ্টা T = = করিগে।

ষষ্ঠ অঙ্ক। প্রথম গর্ভাঙ্ক। রাজপথ। এক ব্যক্তিকে বন্ধন করিয়া নগরপাল ও দুইজন রক্ষীর প্রবেশ। নগরপাল। ওরে ব্যাটা—তাের এই কাজ । সাহস তাে কম নয় দেখছি। আরে চোর কোথাকার! তুই রাজার নাম-খােদা মণির আংটা কোথ, থেকে পেলি বল দিকি। (চৌকিদারের প্রতি) বাঁধ ব্যাটাকে ক’সে কঁধ-দুর বােকারা, তােরা কোনও কাজের নয়। কেবল খেতে পারিস, আর বুক ফুলিয়ে বেড়া। এই দ্যাখ, আমি কেমন করে বাঁধি। [ পিছমােড়া করিয়া দৃঢ়বন্ধন। বন্ধব্যক্তি। দোহাই ধৰ্মাবতার-দোহাই বাবা–মুই চোর নই। মােরে কেন এমন করে বাঁধছে বাবা। মুই চুরি করিনি। উঃ! উঃ! বড় লাগছে। মােশাই গাে!-দোহাই, তােমাগার পায়ে গড় করি। নগরপাল। চুরি করিসনি। তবে কি সুব্রাহ্মণ দেখে মহারাজ তােকে দক্ষিণা দিয়েছেন। আরে ব্যাটা, এখন হয়েছে কি । বল ব্যাটা, এখনও ভালয় ভালয় সত্যি কথা বল। নইলে দেখবি, তাের কি হাল করি। বহুব্যক্তি। দোহাই মােশাই ! মিনি দোষে, কেন মােকে মারছেন মােশাই ১ নং চৌকি। অমনি কি সহজে বলবে? বাপ কি সহজে বলে। পেয়াদায় বাপ বলায়, বাবা। মুই রাজার চৌকিদার-রাতদিন খাটিতে থাকি হাত এড়িয়ে যায় এত’ সাধ্যি এখনও কারও হয়নি, বাবা। কি বলবাে-- গায়ে তেমন জোর নেই, তাই রক্ষে। না হলে, ভাল লােকই কি আমার হাতে শকুন্তলা। । এড়িয়ে যেতে পারে? বড় গােলমাল দেখলে, প্রাণান্তেও সে দিকে ঘেঁসিনে বাবা। তবে কিছু দক্ষিণেটা আশটা পেলে, আর চেয়েও দেখিনে। ২ নং চৌকি। এমন না হলে কি কোতােয়ালিতে চাকরি থাকে বাবা? ভাল মন্দ দেখা নেই—যারে পাই, তারে ধরি। (বদ্ধব্যক্তির প্রতি) এখনও ৰ, কোথা পেলি? ভাল চাতত, ঠিক কথা বল। নইলে বাবা-বালবাচ্ছা সব এক জায়গায় গড়িবাে। বদ্ধব্যক্তি। যাকে গাড়বে—তাকে গাড়বে। মুই কেন জানে মারা যাই- বাবা ! রক্ষে কবো-বাবা! নগরপাল। বাবাই বল—আর যাই বল, তােকে কেউ রক্ষা করতে পারবে । ( সক্রোধে ) শালার কথা যেন বাটালি-কাটা । বন্ধব্যক্তি। তবে তত ভালই হলাে। মাের বােনাই ছেলনা, এখন বােনাই পেলাম। আবার বােনাই বলে, বােনাই—জমাদার বাবা,বােনাই। আব মােরে পায় কে? তবে বােনাই বাবা-মােরে দয়া কবে ছেড়ে দাও বাবা। ১ নং চৌকি। (সক্রোধে ) মার’ ব্যাটাকে। যতবড় মুখ, ততবড় কথা। [ প্রহার। বন্ধব্যক্তি (চীৎকারস্বরে) মলুমরে বাবাবে—আর বলবাে না বাবা। মুই কি করে পেলুম, বছি বাবা-মােরে আর মেরােনা। মােশাই গাে ! মুই হতে দেশে। ২ নং চৌকি। ওয়ে ব্যাটা-তাের জেতের খবর কে জানতে চাচ্চে রে। নগরপাল। ওকে বাধা দিও না। আগাগােড়া সব বলতে দাও। বদ্ধব্যক্তি। আজ্ঞে কত্তা,মুই পিত্তিদিন জাল বঁড়শ নিয়ে খালে বিলে মাছ ধরে-বােঝলে কিনা!-বাজারে বিক্রী করে পরিবার পিত্তিপালন করি। নগরপাল। খুব উচু দরের ব্যবসা বটে। বদ্ধব্যক্তি। তা কত্তা যার যে ব্যবসা। ওই যে কথায় বলে ;- “যে আছে সে কাজে বাবা, তাহাই তারে সাজে, বাপ দাদাদের পেশা কেহ ছাড়তে নারে লাজে। জেলেতে মছলি ধরে, লাঙ্গল ধরে চাষা, আর বােমুন পশু মায়ে-মুখে দয়া ঠাসা।

শকুন্তলা। ১ নং চৌকি। আরে চোরটা খুব রসিক দেখছি যে। ২ নং চৌকি। হাড়কাঠে গেলেই সব রস গড়িয়ে পড়বে এখন। নগরপাল। ও সব কথা রেখে দে, এখন কি করে পেলি শীগগির বল দেখি। বদ্ধব্যক্তি। আজ সকালে মুই শচীতীত্তে এক ক্ষেপ'জাল ফেলেছিলুম, জাল ডাঙ্গায় টেনে দেখি, বড় একটা রুই মাছ পড়েছে। মনের মধ্যি বড্ড আহলাদ হলাে। অতবড় মাছটা কেউ কিতি পারবে না ভেবে, কেটে ব্যাচবাে মনে করে প্যাটা চিতি গিয়ে দেখি, মাণিকের মত কি একটা ঝক ঝক্ করে জ্বলতেছে। শেষে দেখি কিনা একটা আংটা। আর মােরে পায় কে ? আংটীটি নিয়ে এইমাত্র বেণের দোকানে বেচতি গিয়েছিনু—আর কত্তাবাবা তােমরা এসে মােকে ধৰূলে। এখন মােরে কাটতি হয় কাটুন, আর মাতি হয় মারুন- আসল কথা যা তা বলুম। মুই চুরি করিনি বাবা। নগরপাল। ( অঙ্গুবীয় আঘ্রান করিয়া) আংটীতে আঁশটে গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে—আর এ লােকটারও গা দিয়ে যে রকম আঁশটে গন্ধ বেরুচ্চে তাতে বােধ হচ্ছে ও নিশ্চয়ই জেলে তার কোন ভুল নেই। কিন্তু এ যে সে জিনিস নয়, মহারাজের আংটী। কে এখন গলায় ফাঁস নেবে বাবা ?—চ’ললা—ওকে আমরা রাজদরবারে নিয়ে যাই। ১ নং চৌকি। সেই ভাল-চলরে ব্যাটা গাঁটকাটা কোথাকার—চল। [ সকলের পরিক্রমন। নগরপাল। দেখ’-তােমরা সিংহদ্বারে ওকে ধরে রাখ’-সাবধান যেন পালায় না। আমি ব্যাপারটা মহারাজকে জানিয়ে আসি। তিনি যেরূপ আঙ্গ করবেন, সেইরূপ করা যাবে। ২ নং চৌকি। যে আজ্ঞা মশাই। মহারাজ খুসী হয়ে নিশ্চয়ই ককসিস, এবেন। [ নগরপালের প্রস্থান। ১ নং চৌকি। (ক্ষণিক অপেক্ষার পর। তাইতাে, কোতােয়াল মশায়ের আসতে এত দেরি হচ্ছে কেন?

শকুন্তলা। ২নং চৌকি। রাজা রাজড়াদের কাজ। তাদের সঙ্গে কি শগগির সাক্ষাত হয়? ফুরসত হলে তবে তােত ডেকে পাঠাবেন। ততক্ষণ আমরা এই সিংদরজায় বসে হাই তুলি, আর দুটো খােস, গল্প করি আয়। ১ নং চৌকি। সে কথা সত্য। দেখ, তােকে বলব কি? এর গলায় ফুলের মালা পরিতে হাড়কাঠে নিয়ে যেতে আমার হাতটা যেন নিসপিস ক’ছে। [ মারিতে উদ্যত। বন্ধব্যক্তি। মােরে মিনি দেবে আর মেয়ােনি বাবা-তােমাগার পায়ে গড় করি। ২ নং চৌকি। (নেপথ্যের দিকে দৃষ্টি করিয়া) ঐ যে আমাদের কত্তা মাজার হুকুম নিয়ে আসছেন। দেখচিস কি ব্যাটা ! তােরে এখনি হয় শনি-নয় কুকুরের পেটে নিশ্চয়ই যেতে হবে। নগরপাল। তােমরা ধীবরের বাঁধন খুলে দাও-ও চোর নয়। ও যা বলেছে বােধ হচ্ছে সবই সত্য। ১ নং চৌকি। । যে আজ্ঞে—ছেড়ে দিচ্ছি। ২ নং চৌকি। আরে ব্যাটা যমালয়ে যেতে যেতে ফিরে এলাে যে। [ ধীবরের বন্ধন মোচন। বদ্ধব্যক্তি। (প্রণাম পূৰ্ব্বক) এখন কত্তা জেনেছেন তাে, মাের পেশাটা কি? নগরপাল। হ! তুই জেলে বটে। এদিকে দ্যাখ, , মহারাজ আংটাটির মূল্য ধ'রে তোকে এই টাকা বকসিস দিয়েছেন। একেই বলে ভাগ্য !-বলিহারি যাই! এই নে । [ অর্থদান। ব্যক্তি। কত্তা মাের উপর খুব অনুগগেরাে করেছেন। ১ নং চৌকি। অনুগ্রহ বলে অনুগ্রহ। পূল থেকে নামিয়ে একেবারে হাতীর পিঠে চড়িয়ে দিয়েছেন। আবার অসুগগোেয় বাকী কি? ২নং চৌকি। এতেই বােঝা যাচ্ছে, আংচটা কি গামী জিনিস। নহিলে কি মহারাজ খপ করে ওকে এত টাকা বকসিস, দেন- শকুন্তলা। ৭১ নগরপাল। দামী বলে যে অত টাকা দিয়েছেন তা আমার মনে হয় না। ঐ আংটটা দেখে তার যেন কোনও পূৰ্ব্বকথা স্মরণ হ’লল। ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারুলেম না। আমাদের মহারাজ যদিও বড় রাশভারি লােক, কিন্তু আমি দেখলে আংটীটা দেখেই তার চোখ দিয়ে, ঝর ঝর ক'রে জল পড়তে লাগলাে। ১ নং চৌকি। তা হলে একটা ভারি কাজ হয়েছে বলতে হবে। ২ নং চৌকি। কাজ যদি কাহারও হয়ে থাকে, তবে ঐ জেলে ব্যাটারই [ বদ্ধব্যক্তির প্রতি সলােভ দৃষ্টি। বদ্ধব্যক্তি। মুই আর কি দে কত্তাদের তুষ্ট করবে । করবাে। এর অর্ধেক টাকা মােশাইরা নিন। ২ নং চৌকি। ভ্যালা মাের বাপ! এই তাে চাই। নগরপাল। জেলে বড় সরস লােক হে। চৌকি। তা আর বলতে। এমন লােককে কিনা চোর বলে সন্দেহ করা যাচ্ছিল। নগরপাল। দ্যাখ,--আজ থেকে তুই আমাদের বন্ধু হ’লি। চল, এখন শুড়ির দোকানে গিয়ে সকলে একত্রে বন্ধু পাতান যাক্। E [ সকলের প্রস্থান। দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। রাজবাটী। রাজার প্রবেশ। রাজা। অহহ! এই কি আমার সেই অঙ্গুরীয়! এই অঙ্গুরীয়ইতাে আমি স্বহস্তে প্রিয়ার অজুলীতে পরায়ে দিয়েছিলেম। হায়!তবে কেন এতদিন বিন্সিাগরে ডুবে ছিলে। কেন বিস্মৃত হ'লেম কিছুই বুঝতে পায়ছিনা।

শকুন্তলা। আহা! সে দিন প্রিয়া আমায় বুঝাবার জন্য কতই চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমার কেমন মতিচ্ছন্ন হয়েছিল আমার কিছুতেই স্মরণ হ'লো না। হায়! তাহাকে স্বেচ্ছাচারিণী মনে করে কত দুৰ্বাকই না বলেছি—অহহ! আমার ন্যায় নরাধমকে ধরণী কখনও বক্ষে ধারণ করেন নি। আমি মমতাশূন্য হয়ে,তাহার প্রতি কি দুর্ব্যবহারই করেছি।—( অঙ্গুরীয় বক্ষে ধারণ করিয়া রে পাষাণ হৃদয় ! তুই এখন এই অঙ্গুরীয়স্পর্শে, কথঞ্চিৎ তৃপ্তিলাভ কর। মাধব্যের প্রবেশ । মাধব্য। একি মহারাজ ! আজ এমন বিষণ্ণভাব দেখছি কেন? অকস্মাৎ এরূপ ভাবান্তরের কারণ কি ? রাজা। সখে! আর কি ব’লবাে? সেই ঋষিতনয়া শকুন্তলার কথা এখন সকলই মনে পড়ছে। ভাল-আমিই যেন বিস্মৃত হয়েছিলেম ; তােমায় তে সমুদয় বলেছিলেম। তুমিও তাে কোনও দিন শকুন্তলার কথা উত্থাপন করনি। তুমিও কি আমার মত বিস্মৃত হয়েছিলে ? মাধব্য। না মহারাজ! আমার দোষ নাই। আপনি সমস্ত কথা বলে, শেষে যে আবার বল্লেন-ও কেবল পরিহাস মাত্র। আমিও নির্বোধ—সেই কথাই বিশ্বাস করেছিলেন। বিশেষতঃ আপনি যে দিন প্রত্যাখান করেন আমি আপনার নিকটে ছিলেম না থাকলেও, যাহা হয় বলতে পারতেম । যাহা ভবিতব্য, তাহা হবেই। যাক্‌-এখন আর সে কথা ভেবে কি ফল ? রাজা। কার দোষ দেব’? সকলই আমার অদৃষ্টের দোষ। আর যে আমার সহ হয় না। মাধব্য। (স্বগত) আবার “শকুন্তলা” রােগে ধরলাে দেখছি। (প্রকাশ্যে ) মহারাজ ! ও কি কথা—ও কথা আপনার মুখে শোভা পায় না। মহৎ ব্যক্তিরা কখনও শােকমােহে কাতর হন না। লঘু চিত্তেরাই শশাকের ও মােহের বশীভূত হয়। যদি বায়ুবেগে উভয়ই বিচলিত হয় তবে বৃক্ষ ও পৰ্ব্বতে বিশেষ কি? ঝড় কি কখনও পর্বতকে টলাতে পারে ? রাজা। তুমি যা বলছে তা সত্য। আমি নিতান্ত অবােধ নহি। কিন্তু আমার মন কোনও ক্রমে প্রধােধ মানছে না। আমি প্রিয়ার প্রতি যেরূপ '৭৩ দুর্ব্যবহার করেছি—তা মনে করে আমার বক্ষে যেন শেল বিদ্ধ হচ্ছে। বিধাতা, হতভাগ্যের ললাটে যাহা অঙ্কিত করে দিয়েছেন, কাহার সাধ্য তাহা রোেধ করে? নতুবা আমার কেন এমন সর্বনাশ সংঘটিত হ'লাে। এখন আমার একে একে আদ্যোপান্ত সব মনে পড়েছে। সেই অনুপমা পতিপরায়ণ ঋষি- তনয়া—সেই শান্তিময় পােবন—সেই মনােহর বেতসকু—সেই হরিণশিশুর জলপান-সেই মৃণালবলয়—সেই লতামণ্ডপ —আর না—আর বলতে পারি না! কি নিষ্ঠুর -কি কঠোর হৃদয় ! বুঝি বিধাতা—এই অভাগাকে আজীবন কাদাবার জন্যেই এরূপ করেছিলেন। মরিলেও আমার এ দুঃখ যাবে না। গীত। কোথায় রহিলে প্রাণপ্রিয়ে! ত্যজিয়ে এ অভাগারে। তব বিচ্ছেদহন, সদা দহিছে জীবন, হৃদয়েরি জ্বালা জানাৰ কাহারে। মণিহারা ফণী উম্মাদেরি প্রায়, দশদিক’ শূন্য হেরি সমুদয় ; কুহকিনী আশা না ছাড়ে আমায়, প্রাণ যেতে চায়, রাখে আশা দিয়ে। নিরাশা রূপিণী ফণিনী দংশিছে, হুতাশে আমার জীবন শুষিছে ; সুধাবরিষণে সুধাংশু হাসিছে, বিষসম হায় দহে মম হিয়ে। মাধব্য। মহারাজ! করেন কি? ধৈৰ্য্যাবলম্বন করুন। অত কাতর হবেন না।'বৃথা আক্ষেপে ফল কি? রাজা। বয়স্ট! কি ব’লবাে-অহহ! হৃদয়—তুই বড় কঠিন উপাদানে গঠিত। নচেৎ এখনও বিদীর্ণ হচ্চি, না কেন? বুঝেছি,-বুঝেছি। তুই যে অন্যায় কাৰ্য্য করেছিল, এবং যে সব বিষমাখা বাক্য আমার মুখদিয়ে নি করিয়েছিস্ তথন তাের অসাধ্য কি ? ধিক—আমাকে! ধিক্ আমার রাজ্য- শাসনে! আমি সত্যের অপলাপ করেছি—গুরুজনের অবমাননা করেছি- নিষ্কলঙ্ক হৃদয়ে কলঙ্ক অর্পণ করেছি। বয়স্য। আর আমি প্রিয়ার দর্শন পাব না। নচেৎ আমার এরূপ দুৰ্ব্বদ্ধি ঘটলাে কেন ? মাধব্য। মহারাজ! একটু স্থির হন। কোনও বিষয়ে নিতান্ত হতাশ হওয়া উচিত নয়। দেখুন এই অঙ্গুরীয় যে পুনরায় আপনার হন্তে আসবে, এ কার মনে ছিল ? রাজা। (অঙ্গুরীয়ের প্রতি) অঙ্গুরীয় !-তুইও আমার মত হতভাগ্য। নতুবা প্রিয়ার কমনীয় অঙ্গুলীতে স্থান পেয়ে, কি নিমিত্ত সেই দুল্লভ স্থান হতে ভ্রষ্ট হ'লি ? মাধব্য। মহারাজ! ভাল, জিজ্ঞাসা করি। আংটাটি কি করে মাছের উদরে গেল। আমার জানতে বড় কৌতুহল হচ্চে। রাজা। হায়! প্রিয়া তাে বলে শচীতীর্থে স্নান করবার সময় অলক্ষ্যে তাহার অঞ্চল হ’তে জলে পড়ে গিয়েছিল। পতনকালে রােহিত মৎস্য আহারীয় ভেবে গ্রাস করেছিল। মাধব্য। হ ত হওয়া সম্ভব বটে। রাজা। এই অঙ্গুরীয়কে যথােচিত ভৎসনা করা উচিত। ওরে, তুই কি হতভাগ্য! প্রিয়ার কোমল করপল্লব ত্যাগ করে তুই কি সুখে জলমগ্ন হলি ? বােধ হয় তুই প্রিয়ার করে স্থান পেয়ে, আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলি, তাই পতনকালে তাের চৈতন্য ছিল না। প্রিয়ে। আমি তােমায় অকারণ পরিত্যাগ করেছি,-অনুতাপানলে হৃদয় দগ্ধ হচ্চে। একবার দর্শন দিয়ে প্রাণরক্ষা কর। গীত। কোথা গেলে প্রেয়সীর পাব আমি দরশন। প্রেয়সী বিহনে মম দহিতেছে সদা মন । কি কহিব হায় হায়, বিনা দোষে অবলায়, ত্যজেছি ;—এ দুঃখ তায়, প্রাণে বাঁচিনে এখন।

শকুন্তলা। মাধব্য। (স্বগত) ইনিতত শকুন্তল-শকুন্তলা করে একেবারে উন্মত্ত হয়েছেন। ইদিকে যে আমি গরিব ব্রাহ্মণ ক্ষুধার জ্বালায় মারা যাচ্চি। ( প্রকাশ্যে ) মহারাজ। নিরাশ হবেন না। এক সময়ে না এক সময়ে সেই ঋষিতনয়ায় সঙ্গে মিলন হবেই। তাতে কোন সন্দেহ নাই। এখন বিশ্রামাগারে গিয়ে শান্তি দূর করুন। আমিও চললেম। [ প্রস্থান। রাজা। সাক্ষাত প্রিয়ারে পেয়ে মােহবশে ত্যাগ করলেম। সৌভাগ্যলক্ষ্মী আপনা হতেই আমার নিকট এসে উপস্থিত হয়েছিল। আমি তার প্রত্যাখ্যান করেছি। আমি সম্মুখে সুশীতল জলপূর্ণ নদী ত্যাগ করে এখন শুষ্কক হয়ে মৃগতৃষ্ণিকায় প্রলুব্ধ হচ্ছি। মরীচিকায় পিপাসার শান্তি করতে উদ্যত হয়েছি। উপস্থিত ত্যাগ করে এখন অনুপস্থিতের প্রত্যাশা করা মূঢ়ের কৰ্ম্ম। ধিক্‌ আমাকে। [ নেপথ্যে ] ব্ৰহ্মহত্যা হ’লরে!-ব্রহ্মহত্যা হ’লল। রাজা। এ যে বয়স্যের আর্তস্বর শুনছি। অকস্মাৎ কি হলাে? কে আছ ওখানে.? কঞ্চুকীর প্রবেশ। কধুকী। মহারাজ! আপনার বয়সের প্রাণসংশয়তাকে রক্ষা করুন। রাজা। ব্রাহ্মণকে কে পীড়ন করছে ? কধুকী। মহারাজ! এক অদৃশ্য পুরুষ এসে মাধব্যকে ধরে প্রাসাদের উচ্চ চুড়ার উপর ল'য়ে গেছে। সেখান হতে পতনেই মৃত্যু হবে। তিনি সেই ভয়ে আর্তনাদ ক'ছেন। আপনি শীঘ্র গিয়ে তাকে রক্ষা করুন। রাজা । ভয় নাই,-ভয় নাই। আমি এই যাচ্চি। কি। রাজপুরীর মধ্যেও ভূত প্রেতের উৎপাত! হতেও পারে, এখন সকলই সম্ভব। ।

* : [ নেপথ্যে ] মাধব্য। মহারাজ! রক্ষা করুন—রক্ষা করুন। রা। ভয় নাই সখা,—ভয় নাই। [ নেপথ্যে ] মাধব্য। ভয় না করে, কি করি বলুন। আমার ঘাড়টা ধরে আকগাছটার মত মট মট করে ভাঙ্গছে—আর আমি ভয় ক’বাে না। মাতলি। উষ্ণ রক্ত তাের আজি সুখে করি পান, হনন করিব তােরে শাল সমান। আসুক দুষ্মন্ত রাজা ল’য়ে ধনুর্বাণ, দেখিব কেমনে তােরে করে পরিত্রাণ । রাজা। (সয়ােষে) কি এত বড় স্পর্ধা! আমার নাম করে এত বড় কথা ব’চে। প্রেতাধম?—থা। এইবার তােকে যমালয়ে পাঠাচ্ছি। এখানে কে আছ। এ অামার ধনুর্বাণ ল’য়ে এল। ধনুর্বাণ লইয়া প্রতীহারীর প্রবেশ । রাজা। (নেপথ্যের দিকে দৃষ্টি করিয়া) একি। কেহ কোথাও তাে নাই। [ নেপথ্যে ] মাধব্য। গেলুম, গেলুম ; রক্ষা কর—রক্ষা কর। আমি আপনাকে দেখতে পাচ্ছি, আপনি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন না। বিড়ালে ইদুর ধ’রলে ইদুরের যে দশা হয়, আমারও মহারাজ, সেইরূপ হয়েছে; যাচবার কোনও আশা নাই।

* রাজা। (শর প্রতি) তুই মনে করেছি-মন্ত্রবিাবুলে অলক্ষিত থেকে, আমার হাত হতে নিষ্কৃতি পাবি—মনেও করিস না। মনে করেছিল ব্রাহ্মণের সঙ্গে একত্র আছিস, বলে-পাছে ব্ৰহ্মহত্যা হয়,—এই ভয়ে তােক মারতে পারব না। বধ্যজনে বাছি লবে এই মাের বান, হংস যথা নীর ত্যজি ক্ষীর করে পান। [ বাণযােজন। মাতলি ও তৎপশ্চাৎ মাধব্যের প্রবেশ । মাতলি। মহারাজের জয় হক। রাজা। (সবিস্ময়ে) একি! অকস্মাৎ মাতলি যে? কি সৌভাগ্য। দেব- লােকের সব কুশল তাে ? মাতলি। আজ্ঞা,- মহারাজ। মাধব্য। যে আমাকে যজ্ঞের পশুর মত প্রহার ক’ৰূলে, তাকে কিনা আপনি আদর করে অভ্যর্থনা করছেন। উত্তম যা হক। মাতলি। দেবরাজ যে জন্য আমাকে প্রেরণ করেছেন, তাহা নিবেদন করি। একদল দুর্দান্ত দানব সুরলােকে ঘোর বিঘ্ন উৎপাদন করছে। সর্বদা সকলেই দানৰভয়ে ভীত। 'সুরপতি বলে পাঠিয়েছেন, রাজা দুষ্মন্ত ভিন্ন এই দুর্জয় দানবগণকে কেহই দমন করতে পারবে না। তার সবিনয় প্রার্থনা,-আপনি কিছু কালের জন্য সুরলােকে গিয়ে দেবগণের বিষ নিবারণ করুন। তলিমিত্ত আপনাকে লয়ে যেতে তাহার রথ প্রেরণ করেছেন। রাজা। দেবরাজের নিকট এই সম্মান লাভ করে আমি সবিশেষ অনুগৃহীত হ'লেম। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি,আপনি বয়স্যের প্রতি ওরূপ ব্যবহার করছিলেন কেন ? - মাতলি। কেন কয়ছিলেম—শুনবে।' দেখলে আপনি কোনও কারণে অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে আছেন, আর খেদ করছেন। এ সময়ে পায়ে আপনি বুয়ে যেতে অীকার করেন, সে অ যাতে আপনার ক্রোধ উত্তেজিত হয়, তাই উপায় অবলন করেছিলেন। 'এক অতি এজলিত হয় বছি ইন তাড়নে, ফণ উঠে ফণা ধরি দলিলে চরণে। সেইরূপ উত্তেজিত হলে বীরগণ, তবেই মহিমা নিজ করেন ধারণ। রাজ। (মাধব্যের প্রতি) দেখ’ বয়স্য, দেবরাজের আদেশ অলঘনীয়। তুমি মন্ত্রিবকে আমার নাম করে বল’গে,-আমি কিছু দিনের জন্য দেবকার্যে চলেম। আমার অনুপস্থিতিতে তিনি যেন রাজকাৰ্য ভালরূপে পৰ্যালােচনা করেন। আমি গুরুদেবের আশীর্বাদে ও সুরাজের সহায়তায় কাৰ্যনির্বাহ করে, যত শীঘ্র পারি ফিরে আসবে। মাধব্য। যে আজ মহারাজ! আমি এখনই গিয়ে তাঁকে নিবেদন করছি। [ প্রস্থান। মাতলি। মহারাজ। আর কালবিলৰে নিয়ােজন। রথে আরােহণ করুন। [ সকলের প্রস্থান।

. সপ্তম অঙ্ক। B- প্রথম গর্ভাঙ্ক। আকাশ পথ -হেমকূট পর্বত প্রদেশ রাজা ও মাতলির প্রবেশ। মাতলি। মহারা! আপনার প্রভাবেই আজ এই স্বর্গরাজ্য নিষ্কণ্টক হলাে। এই মহােপকারের জন্য দেবরাজ আপনার নিকট চিরঋণী রহিলেন। রাজা। আমি দেবরাজের সামান্য আদেশ পালন করেছি মাত্র। কিন্তু তিনি আমাকে যেরূপ সম্মান করেছেন তাহাতে. আমি কৃতার্থ হয়েছি। বিদায় কালে তিনি আমার যেরূপ সমাদর করেছিলেন তাহা আশাতীত। তিনি সমস্ত দেবতাদের সম্মুখে নিজ গলা হ’তে হরিচন্দনলাতি মন্দারমালা আমার গলায় পরায়ে দিয়ে, আমার উপবেশনের জন্য তার অর্ধেক আসন ছেড়ে দিয়েছিলেন। মাতলি। মহারাজ! আপনি তার যে উপকার করেছেন, তার জন্য তার নিকট আপনার কি না প্রত্যাশা করা যায় ? রাজা। মাতলি! রথ এখন কোন্ স্থানে উপস্থিত হয়েছে। এখানে এসে আমার মন বড় প্রসন্ন হলাে। মাতলি। আমরা এখন মেঘরাজ্যে এসে পড়েছি। অদুরে হেমকুট গিরিকে-তাপসদের সিদ্ধিক্ষেত্র। সুরাসুরগুরু মহর্ষি মারীচের আশ্রম আর দুরবর্তী নহে। রাজা। সত্য না কি? তবে শীঘ্র রথচালনা কর। মহর্বিকে সন্দর্শন করে আত্মাকে পবিত্র করি। মাতলি। মহারাজ! আমরা এইবার আশ্রমপ্রদেশে প্রবেশ করলেন। এখন আপনি রথ হ’তে অবতরণ করে, এস্থানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুন। মহর্ষি এখন কি কার্যে ব্যাপৃত আছেন,—সবিশেষ জেনে এসে, আপনাকে নিবেদন করছি। [ মাতলির প্রস্থান। ;

রাজা। এখানে তাে অভীষ্টসিদ্ধির কোনও সুচনা দেখছি না, তবে কেন আমার দক্ষিণ বাহ স্পন্দন হচ্ছে। এই পূণ্যভূমি তপােযনে সেরূপ অভীষ্টলাভের সবা কোথায়? [ নেপথ্যে ] ওরে। দুরন্তপান করিসূনে। তাের এই দুরন্তস্বভাব প্রকাশ না করে কোথাও বুঝি স্থির হয়ে থাকতে পারিসনে। রাজা। ( অগ্রসর হইয়া) এতে অবিনয়ের স্থান নহে। তবে কাহাকে না জানি এরূপ নিষেধ করছে। একটু অনুসন্ধান করে দেখা যাক্। (সবিস্ময়ে) একি । একটি বালক-না জানি বালকটি কার ? দুইজন তাপসকন্যা সঙ্গে আছেন, তবু কিছুতেই ধরে রাখতে পারছে না। তপােবনের কি অনির্বচনীয় মহিমা! ঐ বালক সিংহশিশুর জটা ধরে টানাটানি করছে,-সিংহশাবক স্থির হয়ে সেই অত্যাচার সহ্ করছে। তপস্বিনীদ্বয়েব সহিত বালকের প্রবেশ । শি। ( সিংহশিশুকে জড়াইয়া ধরিয়া) করুনা সিঙ্গী-হ করুন। হ কর, তাের দাত গুণি। ৯ম তাপসী। দুরন্ত ছেলে, কেন ওকে বিরক্ত করছি। তাের দুরন্তপনা দিন দিন বাড়ছে দেখছি। সাধে ঋষিরা তাের সর্বদমন নাম রেখেছেন। রাজা। (স্বগত) এই শিশুটিকে দেখে, আমার ঔরসজাত পুত্রের মত কেন ওর প্রতি স্নেহ হচ্ছে। বােধ হয়, আমি নিঃসন্তান বলে, যে কোনও শিশু দেখলেই আমার মনে এইরূপ ভাবের উদয় হয়। ২য় তাপসী। আমাদের কথা শোেন্। ক্ষান্ত হ। সিংহের বাছকে ছেড়ে নেও আপনার মার কাছে যা। তুই যদি ওকে না ছাড়িস, তবে সিংহ এসে এখনই তােকে কামড়াবে। শিত। (অধর দংশন করিয়া )—উঃ! তবে তাে আমার ভারি ভয়। কৈ, আৰু না সিংহী।

পিসী। সিংহের বাছাকে ছেড়ে দেও আপনার মার কাছে যাক।
৮০ পৃ।

No text on this page.

শকুন্তলা। ১ম তাপসী। সিংহের বাছাটিকে ছেড়ে দে, বাছা। আমি তােক আর একটা খেলনা এনে দিচ্ছি। শিশু। (হাত বাড়াইয়া )-কৈ দাও। রাজা। (স্বগত) কি আশ্চর্য্য! এই বালকের হাতে রাজচক্রবর্তীর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তােমরা খেলনা দিলে না। তবে আমি একে ছাড়বে না। ২য় তাপসী। সখি ! ও শুধু কথায় ভােলবার ছেলে নয়। তুমি কুটীরে গিয়ে ঋষিকুমারদের যে মাটির ময়ুরটি আছে সেটি নিয়ে এস’ দেখি । ১ম তাপসী। আচ্ছা, আমি সেইটি এনে দিচ্ছি। [ প্রস্থান। শিশু। ( হাস্য করিয়া) ততক্ষণ আম এর সঙ্গে খেলা করি। রাজা । ( স্বগত) আহা এই অপরিচিত শিশুকে কোলে কবুতে আমার মন কেন এত আকুল হচ্ছে। আহা! যাহার এই পুত্র, সে একে কোলে ল’য়ে যখন এর মুখচুম্বন করে—যখন এর মৃদুমধুর আধ আধ কথাগুলি শ্রবণ করে—তখন সে ভাগ্যবান্ ব্যক্তি না জানি কি অনির্বচনীয় প্রীতিলাভ করে । আমি অতি হতভাগ্য সংসারে এসে, এই পরম সুখে বঞ্চিত রহুিলেম। জন্মের মত আমার সে আশা নিৰ্ম্মল হ'য়েছে। ২য় তাপসী। ভারি দুরন্ত ছেলে—কিছুতেই কথা শুনছে না। এখানে ঋষিকুমারদের কেহ আছ কি? ( রাজার দিকে দৃষ্টি করিয়া )—মহাশয়! আপনি যদি এই বালকটির হাত থেকে, সিংহের বাচ্ছাটিকে ছাড়িয়ে দেন। রাজা। ( নিকটে আসিয়া) ওহে ঋষিকুমার ! তুমি কেন তপােবন- বিরুদ্ধ কাৰ্য্য করছে। মুনিকুমার হয়ে, এরূপ কাৰ্য করা তােমার ভাল দেখায় না। ২য় তাপসী। মহাশয় ! এই শিশুটি ঋষিকুমার নয়। রাজা। বালকের আকায় প্রকার ও আচরণ দেখে আমারও বােধ হ'চ্ছে ঋষিকুমার নয়। কিন্তু এস্থানে ঋষিকুমার ব্যতীত অন্য বালকের সমাগম সম্ভাবনা নাই, এই জন্যই আমি এরূপ বােধ করেছিলেম। ( সিংহশাবককে শিশুর হস্ত হইতে ছাড়াইয়া (স্বগত) আহা! পপুত্রের গাত্র স্পর্শ করে শকুন্তলা। আমায় এরূপ সুখানুভব হচ্ছে। যাহার পুত্র- না জানি--সে ব্যক্তি একে স্পর্শ করে কি অনুপম সুখই অনুভব করে। ২য় তাপসী। কি আশ্চর্য! কি আশ্চর্য ! রাজা। আৰ্য! কিসে আপনার এত আশ্চৰ্য্য বােধ হচ্ছে। ২য় তাপসী। এই শিশুটি অনেকটা আপনার মত দেখতে। আর দেখুন, অচেনা লােক বলে আদৌ ভয় করছে না। আপনার কথায় কেমন সুস্থির হয়ে আছে। রাজা। এই বালক যদি মুনিকুমার না হয়, তবে এর কোন বংশে জন্ম ? কার হৃদয়নিধি এই পােবনে ঋষিকুমারের ন্যায় পালিত হচ্ছে ? ২য় তাপসী। মহাশয়। এ পুরুবংশীয়। রাজা। (স্বগত) যে বংশে আমি জন্মেছি, ইহার সেই বংশে জন্ম। তাই বােধ হয় তাপসী শিশুটির আকৃতিতে কতকটা আমার সাদৃশ্য দেখতে পেয়েছে। (প্রকাশ্যে ) এ দেবভূমি !-মানবের অবস্থিতির স্থান নহে। বালক কি সূত্রে এখানে এল ? ২য় তাপসী। আপনি যা বলছে তা ঠিক কথা। এস্থান মানবের অগম্য। এ বালকের জননী অগ্রসম্পর্কে দেবগুরু মারীচের পােবনে এসে এই পুত্র রত্নটি প্রসব করেছেন। রাজ।। (স্বগত) আশ্চৰ্য্য! কথাটা শুনে মন বড় বিচলিত হ'লাে। ( প্রকাশ্যে) আৰ্য্যে । তিনি কোন রাজর্ষির পত্নী ? ২য় তাপসী। যে ব্যক্তি আপনার ধর্মপত্নীকে পরিত্যাগ করে, তার নাম মুখে আতেও পাপ স্পর্শ করে। রাজা। (স্বগত) এ কথা অনেকটা আমাকেই তাে লক্ষ্য করছে। আমিই তাে এই তিরস্কারের পাত্র। ভাল-এর মায়ের নাম জিজ্ঞাসা করি না কেন ? না-না-পরস্ত্রীর নাম জিজ্ঞাসা করা ভদ্ররীতি নহে। ময়ূর হস্তে প্রথমা তাপসীর প্রবেশ। ১ম তাপসী। সৰ্ব্বদমন! দেখ,-কেমন শকুন্তলাবণ্য দেখ। শিশু। {সােবসুকে দৃষ্টি করিয়া )—কৈ, কৈ, আমার মা কোথায় ?

শকুন্তলা। ১ম তাপসী। না বাছা। তাের মা এখানে আসেনি। এই ময়ুরটি কেমন সুন্দর দেখতে, তাই আমি বলছি। শিশু। দেখি, দেখি,-মাটির ময়ুরটি তত বেশ। [ ময়ূর গ্রহন। রাজা। (স্বগত) এর মায়ের নাম “শকুন্তলা* নয় তাে? কিন্তু ঐ নাম তো আরও অনেকের থাকতে পারে। কি আশ্চর্য! উত্তরােত্তর সকল কথাই অামার সম্বন্ধে মিলছে। অথবা,—আমি মৃগতৃষ্ণিকায় ভ্রান্ত হচ্ছি। নামের সাদৃশ্য শুনে, মনে মনে বৃথা আন্দোলন করছি। ১ম তাপসী। (উদ্বেগের সহিত) ওমা ! ওর হাতের রক্ষাকবচ কোথায় পড়ে গেল ? দেখতে পাচ্ছিনে তো। রাজা। এই যে,-কবচটি এখানে পড়ে রহেছে। সিংহশাবককে টানাটানি কবুবার সময়, বোধ হয় হাত হ'তে পড়ে গিয়ে থাকবে। [ উঠাইতে উদ্যত। ২য়,তাপসী। ওটা হাতে করবে না, হাতে করবে না। (বিস্মিতভাবে ) ওমা! আপনি হাতে তুলে নিয়েছেন যে ! [ দুই তাপসীতে পরস্পর মুখাবলােকন। রাজা। ওটি স্পর্শ করতে আপনারা কেন আমাকে নিষেধ করছিলেন ? ১ম তাপসী। শিশুর জাতকৰ্ম্মের সময় মহর্যি মারীচ “অপরাজিত” নামে ঐ কবচটি হাতে বেঁধে দিয়েছিলেন। ওর গুণ এই,-ভূমিতে প'ড়ে গেলে বাপ মা ছাড়া কেহ হাতে করে তুলতে পারবে না। যদি কেহ তােলে, তা হলে তখনই সর্প হয়ে তাকে দংশন করে। রাজা। আপনারা স্বচক্ষে কথনও সেরূপ দেখেছেন কি ২য় তাপসী। হা,কতবার দেখেছি। রাজা। (স্বগত) তবে তাে অমাব সকল আশাই পূর্ণ হলো। ( প্রকাশ্যে ) আজ বোধ হয় অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন। আহা! আজ আমার কি আনন্দের দিন। এত দুঃখের পর বুঝি সুখােদয় হ’! [ শিশুকে আলিঙ্গন।

২া তাপসী। (অপরা তাপসীকে) চলাে, আমরা দুজনে গিয়ে শকুন্তলাকে এই ঘটনা জানাইগে। [ উভয়ের প্রস্থান। শিশু। ( রাজার প্রতি আমাকে ছেড়ে দাও—ছেড়ে দাও। আমিও মার কাছে যাব। [ যাইতে উদ্যত। রাজা। চল’ বৎস! আমরা দুজনে একত্র গিয়ে তােমার মাকে করিগে। শিশু। তুমি কে?-তুমি তাে বাবা নও; রাজা দুষ্মন্ত তাে আমার বাবা। রাজা। এই প্রতিবাদে আমার সব সন্দেহ দূর হলাে। আর কোনও সন্দেহই নাই। [ পরিক্রমণ। দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক। তপােবনে প্রাঙ্গন—মারীচের আশ্রম। মলিনবেশ শকুন্তলার প্রবেশ। শকুনুত্র। (স্বগত) একজন অপরিচিত লােক এসে রক্ষাকবচটি হাতে করে তুলেছে, অথচ কবচটির রূপান্তর হয়নি। কি আশ্চর্য! যাহাই হক- আমি আর সুখের প্রত্যাশা করি না। রাজা।" ( শকুন্তলাকে দেখিয়া স্বগত) আহা, এই কি আমার সেই শকুন্তলা। মলিনবেশা,আলুলায়িতকুন্তলা,বিরহে জীর্ণশীর্ণকলেবরা!—একেবারেই বিবর্ণা হয়ে গেছে। চিনিতে পারা যাচ্ছে না।

গীত। ছিল যে আনন বালার্ক কিরণ সম, মােহিত মুনির মন, নাহিক সে শােভা হেন। বিরলে বসিয়ে বিধি, গড়েছিল হেন নিধি, আমি যে পাষাণহৃদি, করিনু তায় অযতন। যে দেহে ছিল বরণ, হেম জিনি সুবরণ, হয়েছে কেন এমন। নলিনী মলিনী হায়, নীহার পতনে যেন। শকুন্তলা। (স্বগত) ইনি কি আমার আপুত্র ! কিন্তু রক্ষাকবচ থাকতে একজন অজানিত শােক এসে, আমার বাছার গা স্পর্শ করবে কি সাহসে আর কবচও রূপান্তর হয় নাই। শিশু। ( মার নিকটে আসিয়া) মা দেখ,ময়ুরটি কেমন সুন্দর ! (ক্ষণিক পরে) ও কে মা? ওকে দেখে তুই কঁদছিস্ কেন রাজা। (স্বগত) প্রিয়ার প্রতি আমি কত নিষ্ঠুর আচরণ করেছি, তার পরিণাম যে এরূপ সুখের হবে, তাহা স্বপ্নেরও অগােচর । প্রিয়া কি আমাকে চিনিতে পেরেছে ? শকুন্তলা। (স্বগত) হৃদয় ! আশ্বস্ত হও। আমার উপর দৈব বুঝি আবার প্রসন্ন হয়েছেন। ইনি নিশ্চয়ই আমার আৰ্যপুত্র। শিশু। ও কে মা? ও আমাকে “বৎস” বলে আদর করছিল। শকুন্তলা। (গগ স্বরে) ওকথা আমাকে জিজ্ঞাসা করিসুনে তাের, ভাগ্যদেবতাকে জিজ্ঞাসা কর। রাজা। প্রিয়ে আমি তােমার প্রতি যে অসৰ্যবহার করেছি তাহা বলবার নয়। সে সময় আমার কি এক মােহ ও মতিচ্ছন্ন ঘটেছিল তাই অকারণে তােমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেম। আবার যে তােমার দর্শন:পাব অামার সে আশা ছিল না।হায়! আবার যে এই অসস্তাবিত মিলন হবে- শকুল। পরিণাম যে এরূপ সুখের হবে,—তাহা আমি মনে করি নাই। প্রিয়ে, এই অধমের অপরাধ মার্জনা কর। শকুন্তলা। আর্যপুত্র! নাথ! প্রাণেশ্বর!—সুখে থাক’-তােমার সকল কামনা পূর্ণ- [ পতন ও মুচ্ছা। গীত। আমরি হায়, হায়, জ্বালা যে সহেনা। হেরে মুখ, ফাটে বুক, দেহে প্রাণ আর রহে না। বিমল কমল আঁখি, আজ কেন মলিন দেখি, উঠ প্রিয়ে শশীমুখ, ধরাশষ্যা সাজে না। নিন্দিয়া বীণার ধ্বনি, ও মুখের মধুর বাণী, কতদিন নাহি শুনি, প্রবােধ মন মানে না । কি করে হায়, প্রাণ ধরে, ছিলে ভুলে অভাগারে, এস প্রিয়ে ত্বরা করে, ধৈর্য আর রহে না । ! রাজা। ওঠ ওঠ-জীবিতেশ্বরী আর এ কষ্ট সহ্য হয় না। সােণার কমল ধূলায় ধূসরিত -আর দেখতে পারি না। এই জীর্ণশীর্ণ কাঙ্গালিনী বেশ নয়নে যেন শূল বিদ্ধ করছে। অন্যায় অবিচারে,-নৃশংস ব্যবহারে,-কোমল প্রাণে কতই যাতনা দিয়েছি। এখন সব ভুলে যাও। সে পাপের অনেক প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে। না জানি কি ভাগ্যবশতঃ মােহ অন্তে আজ তােমাকে পুনরায় লাভ করলে। শকুন্তলা। (উথান করিয়া) আৰ্যপুত্র ! তােমার দোষ নাই। সকলই আমার অদৃষ্টের দোষ। এত দিনের পর দুঃখিনীকে যে স্মরণ করেছ, তাতেই আমার সকল দুঃখ দূর হয়েছে। নাথ! তুমি যে দুঃখিনীকে পুনরায় স্মরণ করবে সে আশা ছিল না। তোমার ভ্রান্তি যে ঘুচেছে, সেই পরম সৌভাগ্য । এই দুঃখিনীকে অাবার কি রকমে স্বরণ হলাে ?

শকুন্তলা। । রাজা। আমার হৃদয়ের সকল বেদনা দূর হয়েছে। এখন তােমাকে সমস্ত কথা বলছি। এস’,-তােমার চক্ষের জলধারা মুছিয়ে দিয়ে সকল আলা দুর করি। [ রাজা কর্তৃক শকুন্তলার অমােচন। প্রিয়ে! তুমি যে অঙ্গুরীয় দেখাতে পারনি—সেইটি আমার হাতে পড়াতে, আমার সকল কথা স্মরণ হলাে। এই সেই অঙ্গুরীয় । { অঙ্গুরীয় প্রদর্শন। শকুন্তলা। আর আমার ও অঙ্গুরীয়তে কাজ নাই। ঐ অঙ্গুরীয়ই যত অনর্থের মূল ;-ও তােমার অঙ্গুলীতেই থাকুক। আমি আর ওকে বিশ্বাস করি । নাথ! পূৰ্ব্বজন্মার্জিত পূণ্যফলে আজ যদি পতির পুনর্দশন পেলেম- এত যে কষ্ট পেয়েছি,এত যে দুঃখভােগ ক'রেছি--সে সব আর কষ্ট বলে মনে হচ্ছে না। তােমার পা দু'খানি হৃদয় সিংহাসনে বসিয়ে নিয়ত প্রীতিপুষ্প দিয়ে পূজা করেছি—সেই পুণ্যে বুঝি, বিধাতা সদয় হয়ে পুনরায় মিলিয়ে দিলেন। যখন প্রত্যাখ্যান করেছিলে, দুঃখের আবেগে সে সময় কত অকথ্য বলেছি নিজগুণে দাসীর সে অপরাধ ক্ষমা কর। [ পদযুগল ধারণ। গীত। দুঃখনিশি বুঝি আজি হল’ অবসান। তাই মােরে প্রাণনাথ দিলে দরশন। প্রণয়ের অপমানে, যে ব্যথা পেয়েছি প্রাণে, সাক্ষী রবিশশী সনে অনন্ত গগণ ॥ একান্ত অধিনী ব'লে, তাই নাথ নানা ছলে, এ দারুণ দুঃখ দিলে করিয়া বর্জন । স্বপনেও কভু মনে, ভাবি নাই এ কাননে, হেরিয়ে, ও চন্দ্রাননে, জুড়াব জীবন। অভাগীর হারনিধি, মিলাইল আজি বিধি, জুড়াই তাপিত হৃদি, পুজি ও চরণ :

মাতলির প্রবেশ। মাতলি। মহারাজ! ভাগ্যবলে এত দিনের পর ধর্মপত্নীর ১হিত মিন হলো-পুত্রমুখ দর্শন করলেন-এর অপেক্ষা আহলাদের বিষয় আর কি আছে ? মহর্ষি মারীচ আপনাদের মিলন সংবাদ পেয়ে, বড় প্রীত হ'য়ে, এই দিকে আসছেন। তাকে দর্শন করবার জন্য প্রতীক্ষা করুন। রাজা। প্রিয়ে! তুমি পুত্রকে কোলে লও। তােমার সঙ্গে একত্র হয়ে মহর্ষির চরণ দর্শন করে, আত্মাকে পবিত্র করি। শকুন্তলা। নাথ! ক্ষমা কর। তােমার সঙ্গে একত্র গুরুজনের নিকট যেতে আমার কেমন লজ্জা বােধ হচ্ছে। রাজা। না-না—প্রিয়ে। তাতে লজ্জা কি ? শুভ সময়ে এরূপ আচরণই প্রশস্ত। এস’ আমরা প্রস্তুত হয়ে থাকি। মহর্ষি মারীচের প্রবেশ। মাতলি। মহারাজ! দেখুন দেবতাদের জনক মহর্ষি মারীচ স্নেহদৃষ্টিতে আপনাদের দেখতে দেখতে এদিকে অগ্রসর হচ্চেন। রাজা। (মহর্ষির প্রতি ) ভগব । আমি দেবরাজের সেবক,আপনার চরণে দাসানুদাস দুষ্মন্ত,-আমার সাষ্টাঙ্গ প্রণাম গ্রহণ করুন। | প্রণাম করণ। মারীচ । বৎস! চিরজীবি হয়ে অপ্রতিহত প্রভাবে ভূমণ্ডলে একাধিপত্য ! শকুন্তলা। ভগব! পুত্রের সহিত আমিও আপনার চরণবন্দনা করি। ( প্রণাম করুণ। = মারীচ) বৎসে ! ইন্দ্রসম পতিলাভ করেছ—জয়ন্তসদৃশ " পুত্র পেয়েছ- তােমাকে অন্য আশীর্বাদ আর কি করবাে ? শচীর ন্যায় রাজরাণী হ'য়ে কাল- যাপন কর। বাছা! তােমাদের মিলনে বড় সুখী হ'লেম। পতির আদরিণী হও তোমার পুত্র দীর্ঘায়ু হ’বু- উভয় কুলের তানন্দ বর্জন করুক।

শকুন্তলা। রাজা। আমাদের প্রতি আপনার অসীম অনুগ্রহ। ফল ফলিবার পূর্বেই কুসুম ফুটে,-জল ঝরিবার পূর্বেই মেঘের উদয় হয়,—কিন্তু আপনি মনস্কামনা সিদ্ধ করে পরে দর্শন দিলেন,প্রার্থনার পূর্বেই ফল বিতরণ করলেন। ভগবন্! আমি মৃগয়াপ্রসঙ্গে পােবনে উপস্থিত হয়ে ইহাকে গান্ধর্ববিধানে বিবাহ করেছিলেম। কিছুদিন পরে, আমার স্মৃতি বিলুপ্ত হওয়ায়, উহাকে চিনিতে না পেরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেম। সে জন্য মহর্ষি কন্বের ও আপনাদের আচরণে আমি যারপরনাই অপরাধী হয়েছি। কৃপা করে, আমার অপরাধ ক্ষমা করুন। শেষে—এই অঙ্গুরীয়টি পেয়ে আমার সমস্ত স্মরণ হয়েছে। ব্যাপার বড় বিস্ময়- জনক বলে মনে হচ্ছে। মারীচ। বৎস! তুমি সেজন্য দুঃখিত হয় না। তােমার অনুমাত্র অপরাধ নাই। তোমার চিত্তমোহ হবারই কথা। তুমি পােবন হ'তে আসবার পর, দুর্বাসামুনি কুটীরে এসে উপস্থিত হন। শকুন্তলা তােমার বিরহে বাহানশূন্য হয়ে তাহার সৎকার করে নাই। তাহার শাপেই এরূপ চিত্তমােহ ঘটেছিল। অভিজ্ঞানস্বরূপ অঙ্গুরীয় দর্শনে সব স্বরণ হয়েছে। ইহার জননী মেনকা অপ্সরাতী হ’তে ফিরে আসবার সময়, দুহিতার কাতরবিলাপ শুনে উহাকে সঙ্গে করে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। রাজা। ভগবন্! আমার হৃদয়ের মােহন্ধকার দূর হলাে। এখন আমি সকল অপরাধ হ'তে মুক্ত হ'লেম। শকুন্তলা। (স্বগত) আমার অদৃষ্টে ছিল,—তাই আৰ্যপুত্র আমাকে ত্যাগ করেছিলেন। তাহা না হলে এমন মহৎ হৃদয় কেন অকারণে পত্নীকে পরিত্যাগ করবেন ? ঐ শাপই আমার সর্বনাশের মূল ! এই জন্যই তপােবন হতে বিদায়কালে সখীরাও বলেছিল—যদি তােমাকে দেখে রাজার স্বরণ না হয়, তবে ঐ অঙ্গুরীয়টি তাঁকে দেখাইও। আপুত্র যে আমাকে পরিত্যাগ করেছিলেন, আজ সে মর্মভেদী দুঃখের শাস্তি হলাে। মারীচ। বৎসে! এখন তাে সব অবগত হলে। আর তোমার পতির উপর অসন্তোষের কোন কারণ নাই। শাপবশে ভ্রান্ত হয়ে নিষ্ঠুরভাবে স্বামী তােমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এখন শাপমােচন হওয়াতে তুমি তাহা পত্নীরূপে পুনরায় গৃহীত হ'লে। দর্পণের কায়া মলিন হলে তাহাতে প্রতিদিন পড়ে না—কিন্তু বিশুদ্ধ নিৰ্ম্মল দর্পণে সহজেই ছায়া পড়ে।

শকুন্তলা। রাজা। ভগবন্! আপনি যাহা বললেন তাহা অতি যথার্থ কথা। মারীচ। বৎস! তুমি পুত্রকে যথাবিধি অভিবাদন কর। আমরা বিধি- মতে উহার জাতকৰ্ম্মাদি সম্পন্ন করেছি। এই পুত্র ভবিষ্যতে রাজচক্রবর্তী পদ- লাভ করবে—সসাগরা পৃথিবীর অধিপতি হবে। এখনই উহার দেহ তেজে পরিপূর্ণ,-জীবজন্তুকে অনায়াসে দমন করে। একারণ,-তাপসেরা উহার সমন” নাম রেখেছে। রাজা। আপনি যখন এই বালকের জাতকৰ্ম্মাদি সংস্কার করেছেন, তখন উহার নিকট হতে কি না আশা করা যায় ? শকুন্তলার সৌভাগ্যের কথা মহর্ষি কাকে বলে পাঠান কর্তব্য। শকুন্তলা। ভগবন্! আমারও তাই ইচ্ছা। মারীচ। তিনি তপঃপ্রভাবে সবই জানতে পেয়েছেন। তাঁকে য’লে পাঠান হল্যমাত্র। তথাপি এই আনন্দের সংবাদ কে বলে পাঠান আমাদের কর্তব্য বটে। (নেপথ্যাভিমুখে ) ওখানে কে উপস্থিত আছ? শিষ্যের প্রবেশ। } শিষ্য। ভগবন্! কি আদেশ হয় ? মারীচ পুত্রবতী শকুন্তলার শাপমােচন হওয়ায় দুষ্মন্তের স্মৃতিলাভ হয়েছে, এবং তিনি শকুন্তলাকে গ্রহণ করেছেন।-সুখের মিলন হয়েছে। তুমি মহর্ষি ককে এই শুভসংবাদ দিবার জন্য এখনই যাত্রা কর । শিষ্য। যে আজ্ঞা, গুরুদেব! আমি এখনই যাত্রা করিগে। [ প্রস্থান। ( রাজার প্রতি)-বৎস! তুমিও পত্নী ও পুত্র সমভিব্যাহায়ে রাজধানীতে প্রতিগমন কর। আশীর্বাদ করি—তুমি উহাদের ল’য়ে চিরজীবি হয়ে খোশদে কালপন এবং সােপু্য হয়ে অপত্যনির্বিশেষে প্রজাপালন কন। তােমার কীর্তি অক্ষর হক।

শকুন্তলা। রাজা ও শকুন্তলা। ইহা অপেক্ষা আর কি শুভবাসনা থাকতে পারে? আপনার আশীর্বাদ আমাদের শিরােধার্য। আমরা উভয়ে আপনার চরণৰন্দনা করে বিদায় হই। মারীচ। বক্তি-সন্তি-সন্তি ! গীত। মরি কি আনন্দ আজি, মন প্রাণ মােহিল ! বিরহ আঁধার নাশি, সুখরবি উদিল । ভ্রান্তি কুহক দুরে গেল, সত্যালােক প্রকাশিল, মধুর মিলন কিবা, দশদিক উজলিল। পুরুকুল শিরােমণি, সে দুষ্মন্ত নৃপমণি, শকুন্তলা রাজরাণী বামে কিবা শােভিল। পুষ্পবৃষ্টি ও দুন্দুভিধ্বনি। [ সকলের প্রস্থান।

No text on this page.

শকুন্তলা গীতাভিনয় সম্বন্ধে বিদজ্জনগণের ও সংবাদপত্রের অভিপ্রায় । . ভূতপূৰ্ব্ব হাইকোর্টের বিচারপতি স্যর শ্রীযুক্ত গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহােদয় লিখিয়াছেন। কল্যাণবরেযু- নারিকেলডাঙ্গা, ২০শে ভাদ্র, ১৩২৩ সাল । আপনার প্রদত্ত “শকুন্তলা-গীতাভিনয়" নামক পুস্তকখানি সমাদরে গ্রহণ করিয়াছি এবং ধন্যবাদের সহিত তাহার প্রাপ্তিস্বীকার করিতেছি। আপ- নারা শকুন্তলাকে” যে রূপে বঙ্গভাষা পরিচ্ছদে রঙ্গমঞ্চে উপস্থিত করিয়াছেন, “শকুন্তলার সৌন্দর্যের কিছুমাত্র লাঘব হয় নাই। তাহা মূলের সৌন্দর্য্যের গুণে অনেকটা বটে, কিন্তু পরিচ্ছদের গুণেও কতকট, একথা অবশ্যই স্বীকার করিতে হইবে । গ্রন্থখানি সুন্দর হইয়াছে এবং বঙ্গসাহিত্যসমাজে ইহা অবশ্যই সমাদৃত হইবে। শুভানুধ্যায়ী শ্রীগুরুদাস বন্দোপাধ্যায়। মাননীয় নাট্যকার শ্রীযুক্ত জ্যোতিরিনাথ ঠাকুর মহাশয় লিখিয়াছেন । সবিনয় নিবেদন। শান্তিধাম, ৯ আশ্বিন, ১৩২৩ সাল। “শকুন্তলা গীতাভিনয়” খানি বেশ হইয়াছে। গানগুলি সুন্দর ও মধুর সুর-সংযােগে উহার অভিনয় ভালই হইবে । ভবদীয় শ্রীজ্যাতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। কদমতলা, চুড়া।' ১৩২৩, ভাদ্রসংক্রান্তি। প্রবীন সাহিত্যৰথী শ্ৰীযুত অক্ষয়চন্দ্র সরকার মহাশয় লিখিয়াছেন। আপনাদের শকুন্তলা গীতাভিনয়” পাইয়া ধন্য হইলাম । প্রকৃত মন্তব্য লেখা সহজ নয়। মুক্তান্তঃকরণে বলিতে পারি, আপনারা অতি সুললিত গদ্যে অনুবাদ করিয়াছেন। গানগুলিও সুন্দর। সেই জন্য দিতেছি। মঙ্গলাকাঙ্খী শ্ৰীঅক্ষয়চন্দ্র সরকার।

1 Tagore Castle.--7th September 1916. My dear Sir, Many thanks for the copy of the Sakuntala Gitavinoy which you were kind enough to send me a few days ago. I have had a glance through each page and so far as I have been able to judge, the plot appears to be of a too high order to be appreciated by readers of average education and intelligence. Yours Sincerely. P. TAGORE. Amrita Bazar Patrica.--29th September, 1916. "Sakuntala"-an adaptation in Bengali of Kalidas's immortal drama, edited by Babu Sitanath Basu and Babu Pramathanath Biswas. Old Kalidasa will never grow old, nor pall on the taste of the reader or jar on the aesthetic faculty of the play-goer, Apart from its adaptability to the purposes of the Stage, it was indeed written expressly for a private stage where it was boarded. The book before us retains in a very large measure the spirit of the original, which for a translation is saying a great deal. la this connection, it is hardly hazardous to opine that the Bengali stage with its plethora of new plays will do nothing amiss, if it leads the way to a healthy revival of the dramas of India's own and the world's immortal favorite, and we could confidently point to Messrs Basu and Biswas's Sakuntala in Bengali, as one of the few pieces that could be appropriately chosen. The edition has been most careful and thorough throughout, the adaptation judicious, while the songs are little gems of beauty, pleasing to the ear and having hidden worth within. An introduction by the learned Pandit Tarakumar Kaviratna enhances considerably the value of the book. The book is well-printed and well got-up, and those who are ignorant of Sanskrit but would like to have a good taste of the flavour of Kalidasa's masterpiece in Bengali, could be safely advised to buy a copy.

বঙ্গবাসী-৭ই আশ্বিন, ১৩২৩ সাল। “শকুন্তলা” গীভিনয়ে বহু স্থানে আলােচ্য গ্রন্থের যশােবিস্তার হইয়াছে। না হইবে কেন ? গ্রস্থ পড়িয়া যখন অনলাভ হয় তখন ইহার অভিনয় দেখিলে এবং সরল সরস ভাষায় রচিত সুন্দর সুরলয়ে গঠিত গান শুনিলে কিরূপ আনন্দ হইতে পারে তারা সহজে অনুমেয়। নাটকের মূল তত্ত্বটা অক্ষুন্ন রাখিয়। আলােচ্য গ্রন্থখানিকে সত্য সত্য সাধারণের উপভােগ্য করা হইয়াছে। লাভ অনেক প্রকারে ;—যাহারা মূল সংস্কৃত “শকুন্তলা নাটক পড়েন নাই, তঁাহারা গ্রন্থপাঠে একটা তত্ত্বাভাস পাইবেন। তাহার পর, ভাষা সৌন্দর্য্যে এবং গানের মাধুর্যে এ গ্রন্থে সাহিত্য-রস সম্ভোগের সুযােগ ঘটিয়াছে । একাধারে এতগুণ যে গ্রন্থের, বলা বাহুল্য, বাঙ্গালী সাহিত্যসেবী পরন্তু পাঠক মাত্রের নিকট ইহার অদর হইবে। কবিরত্ন মহাশয়ের ভূমিকাটীতেই গ্রন্থের গৌরব সূচনা। সত্য সত্যই সম্পাদিকদ্বয় গ্রন্থখানিকে সাহিত্য সম্পদের একটা সম্বৰ্ধন সদুপায় করিয়া রাখিলেন। ইহার ছাপা ও কাগজ সুন্দর । বসুমতী--১ই ভাদ্র, ১৩২৩ সাল। আমরা শ্ৰীযুত সীতানাথ বসু ও শ্ৰীযুত প্রমথনাথ বিশ্বাস সম্পাদিত “শকুন্তলা গীতাভিনয়” সমালােচনাৰ্থ 'প্রাপ্ত হইয়াছি। পুস্তকখানি সরল ভাষায় রচিত, গল্পাংশ সুবিন্যস্ত,-গীত গুলি সুন্দর। বাঙ্গালায় “শকুন্তলার” অমর কবি কালিদাসের এই অক্ষয় কার্তির একাধিক অনুবাদ প্রকাশিত , হইয়াছে। কিন্তু কালিদাসের নাটকের সৌন্দৰ্য্য অক্ষুন্ন রাখিয়া সাধারণ বাঙ্গালী দর্শককে মূলের রস বুঝিবার এরূপ সুযােগ আর কোনও বাঙ্গালা নাটকে প্রদত্ত হইয়াছে কি না সন্দেহ। ইহা “যাত্রাগানের বিশেষ উপযােগী । আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই নাটকখানির আদর হইবে এবং বাঙ্গালাম ইহার অভিনয়ে সাধারণ বাঙ্গালী দর্শক কালিদাসের রচনার রসাস্বাদন করিতে পারিবেন। নায়ক—১০ই কার্তিক, ১৩২৩ সাল। “শকুন্তলার”কথা এদেশে সুপরিচিত। এই আখ্যামৰস্তু অবলম্বন করিয়া কালিদাসের অসামান্য প্রতিভা যে অমর নাটকের সৃষ্টি করিয়াছে, তাহার তুলনা নাই। সীতানাথ বাবু ও প্রমথনাথ বাবু সেই গল্প অবলম্বন করিয়া সাধারণ লােকের বােধগম্য ও উপভােগ্য গীতাভিনয়ের রচনা করিয়াছেন।

t, ভাষা মার্জিত, গান গুলিও মনােরম। এদেশে যে সকল সখের যাত্রার আছে, সকলে এই গীতাভিনয়ের অভিনয় করিলে ভাল, আমাদের বিশ্বাস, + গানগুলি যাত্রার আসরে গীত হইলে বাঙ্গালীর মনােহরণ করিবে। ভারতবর্ষ-পৌষ, ১৩২৩ সাল। মহাকবি কালিদাসের “অভিজ্ঞানশকুন্তল” নাটকের আখ্যানভাগ লইয়া এই নাটকখানি লিখিত হইয়াছে, কিন্তু ইহা অনুবাদ নহে। সম্পাদকদ্বয় মূল আখ্যানের সৌন্দর্য রক্ষা করিয়া ঠিক বাঙ্গালা ধরণে এই নাটকখানি লিখিয়াছেন। এ উদ্যম এই নূতন এবং ইহা সৰ্বাংশে প্রশংসনীয়। এই নাটকে বৈ কয়েকটা গান দেওয়া হইয়াছে, তাহাতে লেখকের কবিত্বশক্তি ও রসবোধের বিশেষ পরিচয় পাওয়া যায় । আমরা এই নাটকখানি পাঠ করিয়া প্রীতিলাভ করিয়াছি। আমরাও পূজনীয় পণ্ডিত প্রবর শ্ৰীযুত তারা কুমার কবিরত্ন মহাশয়ের কথায় বলিতেছি-“এরূপ অপূৰ্ব্ব নাটকের অনুবাদ ও অভিনয় দ্বারা বহুল প্রচার সহৃদয় মাত্রেরই প্রার্থনীয়।” মানসী--পৌষ, ১৩২৩ সাল। ইহা মূল ‘শকুন্তলার” অনুবাদ নহে। অভিনয় সৌকৰ্য্যৰ্থ স্বাধীন ভাবে রচিত। ভাষাটি বেশ সরল হইয়াছে, অভিনয় কালে সর্ব সাধারণে বুঝিতে পারিবে এবং রসও যে পাইবে, বলাই বাহুল্য। গান গুলিও সুরচিত। তিন খানি চিত্র দেওয়া হইয়াছে। । তাৰ্চ্চনা-মাঘ, ১৩২৩ সাল। বিদ্যাসাগর মহাশয় লিখিয়াছিলেন-“অভিজ্ঞানশকুন্তল” ভারতবর্ষের অদ্বিতীয় কবি কালিদাসের অমৃতময়ী লেখনীমুখ হইতে বিনির্গত অলৌকিক পদার্থ। ধন্য কালিদাস ! ধন্য অভিজ্ঞানশকুন্তল ! প্রলয়ের পূর্বে তােমালের বিলয় নাই।” এই পুস্তকখানি লেখকদ্বয় অভিজ্ঞানশকুন্তল অবলম্বনে বাঙ্গালায় রচনা করিয়াছেন। ঠিক অনুবাদ না হইলেও এই গ্রন্থে শকুন্তলার রসের পরিচয় দিবার প্রয়াস আছে। পুস্তকখানি সুলিখিত, ইহার ভাষা ও রুচি মার্জিত। এই গ্রন্থে লেখকদ্বয় যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিয়াছেন। t

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sakuntala Gitavinay

Author
Biswas,promothnath Ed.
Title
Sakuntala Gitavinay
File name
Sakuntala Gitavinay
Text
OCR done
Citation
1915
Published
2009/09/11
Publisher
Probodhchandra Basu,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
124
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Goutami
DLI number
513206
Barcode
4990010020205.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
EuneOhz49ky
Download PDF

Sakuntala Gitavinay