Uttarpara Jaykrishna Public Library, Hooghly
Agun Niye Khela Ed.2
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
আগুন নিয়ে খেলা
No text on this page.
আগুন নিয়ে খেলা
২
শ্ৰীঅন্নদাশঙ্কর রায়
ডি, এম, লাইব্রেরী
৪২, কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা
দ্বিতীয় সংস্করণ, জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৬
দাম : এক টাকা বার আনা
Uttarpara daikrisana tun's Library
ne No...0.1 C_2
৪২, কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট, ডি. এম. লাইব্রেরী হইতে
গােপালদাস মজুমদার কর্তৃক প্রকাশিত
১৬নং হেমেন্দ্র সেন ধ্রুট, বাণী প্রেস হইতে
শ্ৰীসমরেন্দ্রভূষণ মল্লিক কর্তৃক মুদ্রিত
শ্ৰীমণীন্দ্রলাল বসু
সংশােধন
Bristol সহরের নদীটির নাম Avon বটে,
কিন্তু Shakespeareএর Avon নদী সে নয়
No text on this page.
শেষের দিন সমুদ্র, কিন্তু হ্রদের মতাে নিস্তরঙ্গ। আর, খালের মতাে সঙ্কীর্ণ। দু’দিকে শ্লেট-পাথরের উপর ঘেরাও-করা পােড়ড়া জমি। দু’দিকের জমি যেখানে এক হয়েছে সেখানে একটি অতি প্রাচীন দুর্গ, নান্ যুগের হবে। দুর্গের পাশ দিয়ে গ্রামের লােকে ঘােড়ায়-টানা কাটু নিয়ে সমুদ্রের কূলে আসে, কার্ট-এ বালি বােঝাই করে ফিরে যায়। তাদের বাদ দিলে জন মানব নেই। শুধু জল-পক্ষীরা বিহার করছে। পেগী উচ্ছ্বাস দমন করবার চেষ্টা করে বল্ল, “মনের মতাে। না, তার বেশী। ইংলণ্ডের সমুদ্রকূলে এত নির্জন জায়গা কখনাে সম্ভব ?” সেই দেশবৎসলাকে স্মরণ করিয়ে দিতে হল যে এটা দক্ষিণ ওয়ে—ইংলণ্ড নয়। পেগী একটুও অপ্রতিভ হল না। বল্ল, “একই কথা। কিন্তু দেখাে দেখাে, এর উপরে জল এল কেমন করে? সমুদ্রের ঢেউয়ের অবশেষ ?”
মাগুন নিয়ে খেলা
প্রকৃতি-নির্মিত শ্লেট পাথরের বাঁধ, তারই উপর পা ছড়িয়ে দিয়ে
বসেছিল পেগী আর তােম। পা দুলিয়ে দিয়েও।
সােম বল্ল, “না গাে, এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। সবটা জল
গড়িয়ে পড়বার পথ পায়নি।”
“বটে? আমি ভাবতেই পারিনি। তুমি কেমন করে পারলে?”
“এ আর শক্ত কী। এত উচুতে কখনাে ঢেউ উঠতে পারে—এক,
ঝড়ের সময় ছাড়া ? আর বৃষ্টির জল ছােট ছােট গর্ত থেকে কোন পথ
দিয়ে গড়িয়ে পড়বে শুনি?”
“তুমি বাস্তবিক চতুর।”
“তােমার মুখে এই প্রথম প্রশংসার বাণী শুলুম, পেগী।”
“ওটা তােমার স্মরণশক্তির ভুল, সােম।”
“আমার স্মরণশক্তির দোষ থাকলে ইংলণ্ড অবধি আসা হয়ে
উঠতে না এ জন্মে। মেধাবী ছাত্র বলে’ সাধ্যাতীতকেও সাধন করতে
'পারলুম।”
“ইস, কী অহঙ্কার!”
“মেয়েমানুষে খোঁচা দিলে পুরুষের অহঙ্কার কেশর ফোলায়।”
“ও মা, কী বিপদ! সিংহের মুখে পড়েছি!”
সােম হেসে বল্ল, “সিংহটি ভালাে। তার মুখের কাছে নির্ভয়ে
মুখ আনতে পার।”
“না, মশাই, অত দুঃসাহসী হয়ে কাজ নেই আমার।”
“আমার আছে। আমার ক্ষুধা পেয়েছে।”
৪
আগুন নিয়ে খেলা
।
(কৃত্রিম ভয়ের ভঙ্গী করে’) “আমাকে খাবে নাকি?”
“যদি খাই, কে ঠেকাবে?”
“চেঁচাব।”
“কার্টওয়ালারা কখন চলে গেছে। চেঁচানি শুনে সুন্দর পাখী-
গুলােই শুধু উড়ে পালাবে।”
“সমুদ্রে লাফ দিয়ে পড়।”
“ডাঙ্গার বাঘ জলের কুমীরও হতে পারে।”
( খিল খিল করে হেসে) “তা হলে কী করব বল না ডারলিং,
আকাশে উড়ে যাব ?”
“বল, হার মানলুম। ছেড়ে দেব।”
“কখনাে না।”
“কোনটা কখনাে না’ ; হার মানাটা, না, ছাড়া পাওয়াটা ?”
“দু’টোই।”
“জানি। মেয়েদের স্বভাব ওই।”
পেগী ও কথায় কান না দিয়ে সমুদ্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে’ বল্ল,
“দেখেছ! 0 Gee!” (আবিষ্কারের আহলাদে)।
ছােট ছােট গুহা কতকগুলাে ।
সােম তখনাে তার ক্ষুধার কথাই ভাবছিল। বল্ল, “আরেকটু বড়
গুহা হলে আমরা বাসা বাঁধ তুম।”
“সিংহ আর হরিণ ?”
“সিংহ আর সিংহী।”
আগুন নিয়ে খেলা
“তবু এতক্ষণে একটা শ্রদ্ধার বাণী শােনালে।”
“ওটা তােমার স্মণশক্তির ভুল, পেঙ্গু।”
“উঃ, কী ভয়ানক স্মরণশক্তি তােমার।”
“এই নিয়ে তুমি দু’বার আমাকে প্রশংসা করলে।”
“পাঁচ দিনে দু’বারই অনেক। নইলে পুরুষমানুষের বড় বড়
বাড়ে।”
“আর মেয়েদের ?”
“মেয়েরা তাে দু'বেলা প্রশংসা লুটছে। ওটা ওদের খােরাক।
যতক্ষণ জোটে ততক্ষণ সহজ ভাবে নেয় ; না জুটলেই ফ্যাসাদ।”
“দাড়াও, আমি তােমার খােরাক বন্ধ করে দিচ্ছি।”
“দোহাই, সােম, যতক্ষণ লণ্ডনে ফিরে না গেছি ততক্ষণ ভাতে মেরাে
না।” (কপটভয়ের সুরে)।
সােম বন্ধু, “লণ্ডনে ফিরতে তােমার ইচ্ছে করে, পেগ ?”
“এমন জায়গা ফেলে’! কিন্তু কী করব, তােমার মতাে প্রচুর ছুটি
কিম্বা রুটি তো আমার নেই। খেটে খেতে হয়।”
“বিয়ে কর না কেন ?”
“কাকে ? তােমাকে?”
“আমাকে।”
“ঠাট্টা করছ ?”
“সীরিয়াসলি বছি।”
“পাগল!”
১
আগুন নিয়ে খেলা
“পাগল নই, সীরিয়া।”
“অন্য কথা পাড়াে।”
“তুমি জান না আমি কী রকম জেদী। আমার দেশে বলে
‘বাঙালের গোঁ।”
“জান, তােমার সঙ্গে আমার পাঁচ দিনের আলাপ ?”
“এক দিনের আলাপকেও কেউ কেউ এক যুগের মন করে।”
“আবার এক যুগের আলাপকেও এক দিনে ভুলে যায়।”
“আমি তেমন নই।”
“এখনাে তার প্রমাণ হবার দেরি আছে।”
“বােকা মেয়ে। বর পাচ্ছিলে, ঘর পাচ্ছিলে, খাটুনির থেকে নিষ্কৃতি
পাচ্ছিলে—একটা তুচ্ছ কারণে হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে।”
“এক জনের কাছে যা তুচ্ছ অন্য জনের কাছে তা উচ্চ।”
“তুমি মাে। আমার সব স্বপ্ন ভেঙে দিলে। ভেবেছিলুম লণ্ডনে
যখন ফিরব তখন বৌ নিয়ে ফিরব। তখন দু’জনে মিলে একটি
ছােট ফ্ল্যাট নেব, তুমি রাঁধবে, আমি খাব, তুমি ঘরকন্না করবে
আমি কলেজ করব। টাকার ভাবনা? আমি যা স্কলারশিপ, পাই
তাতে দু’জনের শাক ভাত খেয়ে চলে।”
“প্রথমত আমি শাক ভাত খেতে চাইনে, দ্বিতীয়ত যা খাই তা নিজের
পয়সায় খেতে ভালােবাসি।
“আমার হৃদয় যদি তােমার হয়, পেগ, আমার পয়সা কী অপরাধ
করল ?”
আগুন নিয়ে খেলা
“না, না, ওটা আমাদের একেলে মেয়েদের প্রিন্সিপ্ল। স্বামীর
টুথ ব্রাশ দিয়ে দাঙ মাজতে যেমন ঘেন্না করে স্বামীর টাকা দিয়ে নিজের
অভাব মেটাতেও ঠিক তেমনি।”
“তােমরা একেলে মেয়েরা ময়রা। পৃথিবীতে সত্য যুগ ফিরে আসুক।”
( খিল খিল করে হেসে) “আমরা মলে তােমাদের বংশে বাতি
অলবে না গাে।” • একটু ভেবে),“না, তােমরা সেকেলে কুমারীদের বিয়ে
কবে।”
‘ধেৎ!”
“কেন, অসাধারণ কী করবে? আমি জানি আজকালকার অনেক
যুবক মা-কাকিমার সববয়সীদের বিয়ে করে শান্তি পায়। সেই সঙ্গে কিছু
টাকা-ও।”
সােম বল্ল, “ক’টা বেজেছে সে খেয়াল আছে? না, আজ তােমার
খাবার ইচ্ছে নেই?”
পেগী বল্ল, “এখান থেকে আমার উঠতে ইচ্ছে করছে না। তুমি
যাও, গ্রামে হােটেল নিশ্চয়ই আছে, আজকের মত ঘর নাও।”
“আর তুমি এই আকাশ-তলায় হাওয়ায় ভেসে-আসতে-থাকা ফেনা
খেয়ে থাকবে?”
“কেন, তুমি খাবার বয়ে দিয়ে যেতে পারবে না?”
“আর শােবার? বিছানও বয়ে দিয়ে যেতে হবে ?”
“উঃ, কী ভয়ানক তার্কিক!”
অগত্যা সােম বাসার আশায় একা চল। গ্রামের খানিকটে সমুদ্রের
আগুন নিয়ে খেলা
কূলে যাবার সময় অতিক্রম করেছিল। গ্রামের ভিতর দিয়েই,তাে পথ।
ষ্টেশন থেকে দুর্গ পৰ্যন্ত তার বিস্তার।
“গুড় মর্ণিং, স্যর।”
“র্ণিং। তুমি এই গ্রামের ফলওয়ালা?”
“আজ্ঞে না, আমি পেমব্রোকের লােক। রােজ এ গ্রামে মােটরে
করে’ ফল বেচতে আসি।
তার ভাঙা সেকেণ্ড হাও মালবাহী মােটরখানার উপর আপেল,
কমলালেবু, কলা ইত্যাদি সাজানাে। সােম ভাবল, ভাব করবার সহজ
উপায় পেগীর জন্যে কিছু আপেল কেনা। আপেল খেতে ভালােবাসে
বলে’ই বুঝি তার গাল দুটিতে আপেলের রং !
“বেশ, বেশ, চমৎকার গাড়ীখানা। ফলের বাজার কেমন ?”
“ভয়ঙ্কর মন্দা যাচ্ছে, স্যর। লােকে টিনে বন্ধ ফল কিনছে, বলছে
টাকা ফলের চাইতে খারাপ কিসে? টাটকা ফল তত দু' তিন
সপ্তাহের পুরননা। জাহাজে করে স্পেন্ থেকে জ্যামেকা থেকে
আমদানি। নামেই টাটকা।”
সােম সহানুভূতি দেখিয়ে বল্ল, “আরে, লােকের কি ছাই বুদ্ধিসুদ্ধি
আছে! ঠাকুমা ঠাকুরদা’দের সেই সত্যযুগ আর নেই।”
“ঠিকই বলেছেন, স্যর। তেমন সস্তার যুগ আর ফিরবে না ।
দোকানদারগুলাে যেন ডাকাত হয়েছে। শুনলে বিশ্বাস করবেন না,
স্তর, একটা আপেলের দাম নিয়েছে তিনি তিনটে পেনী।”
“আমি তােমাকে তার বেশী দিতে রাজি আছি হে—কী তােমার নাম ?”
আগুন নিয়ে খেলা
‘বি
বি টমস।”
“বেশ নাম। দাও দেখি আমাকে ভালাে দেখে চারটে আপেল।”
( তার দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি ক্ষেপণ করে’) “আমার গার্লের জন্যে কিনা।”
বি কার্পণ্য করল না। ক্ষিপ্রতার সহিত বাছা বাছা চারটে আপেল
দিয়ে বল্ল, “আর কিছু চাই, সর?”
“দাও, গােটা ছয়েক কমলা লেবু। আমার প্রিয় ফল।”
“হবেই তাে, হবেই তাে। আপনি যে স্পেনদেশের লােক সে কি
আমি জানিনে ? হাঁ, দেশ বটে স্পেন।” ('কমলা লেবু দিতে দিতে)
গেছলুম স্পেনের গা ঘেঁষে’ জিব্রাল্টার দিয়ে মহাযুদ্ধের সময়। তখন
আপনি খােকা-বয়সী।” ( দিয়ে ) “কিন্তু এখন তাে আর খােকা নন্।
এখন আপনার গার্ল হয়েছে। আহা! গার্ল!” (সুর নামিয়ে ) “অভয়
দেন তাে একটা কথা বলি। স্পেনের গার্লের মতাে গার্ল আর হয় না।”
{ জিভ দিয়ে চুক চুক শব্দ করতে লাগল, যেন ‘গার্ল’ মানে ‘রসগােল্লা
বা চকোলেট’।) “আর আমাদের ওয়েসের মেয়ে ! রাম, রাম !
গায়ে যেন গরম রক্ত নেই, বরফ জল। কী বলে ওই যে ওই
তারগুলােকে ?”
“টেলিগ্রাফের তার।”
“না, স্যর, ওর ভিতরে আগুনের স্রোতের মতাে যা বইছে—কী বলে
ওকে ?”
“ইলেকটি সিটি।”
“ইলেক্টি সিটি। স্পেনের গার্লের ছোঁয়া লাগলে তিড়িং করে উঠতে
১০
আগুন নিয়ে খেলা । হয়।” (প্রদর্শন।) “আহা, সে দিনকাল ‘গেছে স্যর! যুদ্ধটুও গার বাধে না।” সােম বল্ল, “আচ্ছা বলতে পারাে, বিল, কাছে কোনাে হােটেল পাওয়া যায় ?” “হােটেল ? এ গ্রামে হােটেল কবে হল? একটা inn আছে বটে। কী নাম—মনে পড়েছে, “The Elephant”! আপনাকে নড়তে হবে , স্যর, আমি নিজেই গিয়ে খবর দিচ্ছি।” এই বলে সে সােমের জিম্মায় তার ফল ( ও মাছ) ফেলে রেখে অত্যন্ত কাজের লােকের মতাে দৃঢ় পদক্ষেপে অদৃশ্য হয়ে গেল। গ্রামের পথটিও জনমানবশূন্য। ছােট ছােট মেয়েরা গল্প করতে করতে চলেছে। সােমকে দেখে তাদের কলরব মৃদু হয়ে এল। তারা কৌতূহলী হয়ে একবার ফিরে তাকায়, একবার মুখ ফিরিয়ে নেয়। সােমের সঙ্গে চোখাচোখি হলে কী তাদের হাবে ভাবে সঙ্কোচ আর মনে মনে ফুর্তি! দুটি ছােট ছেলে কী নিয়ে ঝগড়া করছিল, সােমকে দূরে পায়চারি করতে দেখে একেবারে বিস্ময়সূচক চিহ্ন। বি-এর সঙ্গে একটি ব্রাউন্-সু-পরা ছােকরা এসে bow করে’ দাঁড়াল। সােম বল্ল, “এই যে, তােমার ওখানে ঘর খালি আছে?” “আজ্ঞে, সবে হােটেল খুলছি। একটা হােটেলের বড় অভাব ছিল এ গ্রামে। কিন্তু এখনাে সব কটা ঘর সাজিয়ে ভােলা হয়নি। সাজানাে ঘর একটিমাত্র আছে।” একটিমাত্র আছে। দু তিন দিন আগে হলে পেগী ভারি আপত্তি ১১
আগুন নিয়ে খেলা
কত, হলই বা দুই স্বতন্ত্র বিছানা। তবু পুরুষমানুষের সঙ্গে এক
ঘরে শােওয়া ? মাগাে !
কিন্তু ঘটনাচক্রে দুই-বিছানাওয়ালা ঘরে তাকে শুতে হয়েছে কাল
পরশু। তার ফলে তার কিছু পয়সাও বেঁচেছে। ধৰ্ম্ম যে যায়নি তার
সাক্ষী স্বয়ং ধৰ্ম্ম।
সােম বল্ল, “উত্তম। তুমি দুজনের আহারের আয়ােজন করে।
আমরা সন্ধ্যা করে আধ।”
কে যেন বলেছেন উচ্চ ভাবনা ভাবতে ভাবতে মানুষ উচ্চ হয়।
সেই কথাটিকে জপমন্ত্র করে’ই বুঝি হােটেলওয়ালা একখানি ক্ষুদে বাড়ী
সম্বল করে হােটেলের নাম রেখেছে, “Lion Hotel.” অথবা প্রতিবেশী
“Elephant এর সঙ্গে প্রতিযােগিতাবশত।
একটি রক্তমসী-অঙ্কিত সিংহকে পিছনের দুই পায়ের উপর দাঁড়িয়ে
উদ্বাহু হয়ে থাকতে দেখে সােম বল্ল, “চিতে পেরেছ ?”
পেগী বল্ল, “পেরেছি। এইটেই Lion Hotel ?”
“না, গাে। এই সেই সিংহের বিবর, যে সিংহ আজ ক্ষুধা বােধ
করছিল।”
“কী ভয়ানক চক্রান্ত ! নিরীহ প্রাণী আমি, আমাকে আহার করবে
বলে’ এ কোন অপরূপ হােটেলে এনে তুলে !”
ম্যানেজার বলল মালিক বলল সেই ব্রাউন-রঙের-সুট-পরা অল্পবয়স্ক
যুবকটি দরজা খুলে দিল। এবং হাট ও ওভারকোট খুলে নিল। তার
১২
আগুন নিয়ে খেলা
।
}
সঙ্গে ছিল সেই ঝগড়াটে ছেলেদের থেকে একটা। এখন সে অত্যন্ত
লক্ষ্মী ছেলেটি বাপকে ভদ্রতা করতে সাহায্য করছে। তার মা’রও
উকি মারতে দেরি হলাে না এবং স্বামীর ডাক শুনে সে নেমে এল
পেগীর হুকুমের অপেক্ষা করতে।
মিষ্টার ও মিসেস হি। বাচ্চাটির নাম, বব।
“আপনাদের ঘরে পৌছে দেব ?”
“না, আমরা লাউঞ্জ-এ বসব। লাউঞ্জ, আশা করি আছে ?”
“আছে।
কিন্তু তৈরি নেই, স্যর। আপাতত খাবার ঘরটাতে
যদি বসেন।”
“কি বলল, পেগী ?”
“তাই করি চলল।”
গদিওয়ালা চেয়ারের অভাবে বসে আরাম হচ্ছিল না। সােম
বল্ল, “পেগ, এ হােটেলে এনে তােমাকে কষ্ট দিলুম। আর কোথাও
যাবে ?”
‘ক্ষেপেছ? আমরা কি এই ভেবে বেরইনি যে যত অসুবিধেই
ঘটুক কিছুতেই খিটখি করব না?”
“হিসেব যদি করাে, অসুবিধে কি কম ঘটেছে এই পাঁচ দিনে ?
ভগবান! কবে লণ্ডনে ফিরে যাব, আরাম করে বাঁচব।”
“কে তােমাকে ধরে রাখছে, সােম? আজই চলাে না?”
“সত্যি ?”
“সত্যি।”
১৩
আগুন নিয়ে খেলা
-তুমি একটি ছোেট মিথুক।”
“অমন কথা বলে নিজ মূর্তি ধারণ করব, সােম।”
“ছিঃ। এই নিয়ে রাগ করে ?”
“না, তুমি যা তা’ বলে’ ঠাট্টা করতে পারবে না আমাকে। মিথুকের
বাড়া গাল নেই।”
“তুমিও আমাকে যা তা বলাে না? শােধ বােধ হয়ে যাক্।”
পেগীর, চোখে জল চক্ চক্ করছিল। সে তার উপর হাসির
কিরণ ফুটিয়ে সােমের আরাে কাছে সরে এসে বল্ল, “আচ্ছা, আমার
উপর আর তােমার শ্রদ্ধা নেই ?”
“দুষ্ট পেগ !”
“না, না, সত্যি বলল। তােমার কাছে আমি খুব সুলভ হয়ে
গেছি, না?”
“কিসে তােমাকে এমন কথা ভাবাল ?”
“আমি ছেলেমানুষ নই।”
“কিন্তু ছেলেমানুষের মতাে আবােল তাবােল বক্ছ যে?”
“ডারলিং সােম, সত্যি করে বলল তােমার চোখে আমি কতখানি
নেমে গেছি।”
“ব?”
“বলো।”
“বলব?”
“বললা।”
১৪
আগুন নিয়ে খেলা
“আমার উপর তােমার একান্ত নির্ভরতা আর আমার প্রতি তােমা
একান্ত বিশ্বাসপরায়ণতা আমাকে তােমার চির-কনা করেছে, পেগ,
ডারলিং।
পেগী এইবার সশব্দ হাসি হেসে বল্ল, “ওসব নাটুকে কথা একেলে
ছেলেদের মুখে মিথ্যে শােনায়, সােম। হয় তত তােমাদের ওরিয়েন্টাল
মেয়েরা শুনে সত্য ভাবতে পারে।”
“তবে তুমি কী শুনলে সন্তুষ্ট হবে, পেগ ?”
“এই দেখ, তুমি নিজ মুখেই স্বীকার করলে যে আমাকে সন্তুষ্ট করতে
তুমি ব্যগ্র, সত্য কথা বলতে ব্যগ্র নয়।”
“তােমার আজ কী হয়েছে, পেগ ? এত বিরূপ কেন? সােজা
কথারও বাঁকা অর্থ করছ যে।”
“তাতে তােমার ভারি তাে আসে যায় !”
সােম সন্ধি করবার উপায় দেখল সকাল সকাল খেতে বসা। হিকে
ডেকে বল্ল, “আমরা তৈরি। অপর পক্ষ তৈরি কিনা।”
হিল্ রসিকতাটা আঁচতে না পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে বল্ল, “অপর পক্ষ কে
স্যর ?”
“আমরা খাদক, আমরা তৈরী। অপর পক্ষ খাদ্য, অপর পক্ষ তৈরী
কিনা ?”
“ওঃ হো হাে-মাপ করবেন ম্যাডাম।” সে হাসি চেপে বেরিয়ে
গেল।
পেগী হাতে হাতে বল্প, “কত রঙ্গ জান?”
১৫
Uttar para Jaikrishna Public Library
a, ২৩4 0>
আগুন নিয়ে খেলা 1 নােম ভেবেছিল ক্ষুৎপিপাসার শান্তি হলে পেগীর চিত্তশাস্তি হবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। পেগী আরম্ভ করল, “তুমি আমার ঈষ্টারের ছুটিটা মাটি করলে। তােমাকে সঙ্গী করা আমার ভুল হয়েছে।” সােম যথার্থ আহত হয়ে বল্ল, “তবে আমাকে যে দণ্ড দেবে আমি সেই দণ্ড নিতে প্রস্তুত আছি, পেগ,।” “প্রাণদণ্ড ?” “দিলে নেব তাও।” “আবার সেই নাটুকে মিথ্যে। আমি দু’চক্ষে দেখতে পারিনে এই ভণ্ডামি। সােজা বল, না, ঐটি পারব না। আমি খুসী হয়ে তােমাকে চুম্বন-দণ্ড দেব।” “কিন্তু ও যে আমার হৃদয়ের পক্ষে সত্য।” *তবু তােমার জিজীবিষার পক্ষে অসত্য। ভরা যৌবনে কেউ মরতে চাইলেও তার প্রকৃতি তাকে মরতে দিতে চায় না।” “এই যে এত যুবক যুদ্ধে প্রাণ বিলিয়ে দিতে ছুটে গেল।” “ওটা একটা দারুণ অত্যুক্তি। পরের প্রাণ লুট করতেও গেছল ওরা। শুধু মরতে নয়, মারতেও।” “তবু মরুতেও তাে?” “মারবার কথা মনে আলে মরবার কথা তলিয়ে যায়। অন্তত দুই ঘুলিয়ে যায় । তােমাকে যে প্রাণদণ্ড দিতে যাচ্ছিলুম সে যেন কোর্ট- মার্শালের হুকুমে দেয়ালের গায়ে পিট রেখে হাত পা বাঁধা অবস্থায় বুকের আগুন নিয়ে খেলা মধ্যিখানে গুলি খাওয়া।” সােম হেসে বল্ল, “দিতে যাচ্ছিলে? দিলে না তবে? আঃ, নিশ্বাস ফেলে বাঁচলুম।” “Live and let live-এর চেয়ে বড় ধর্মমত কী হতে পারে? তবু প্রতিদিন মানুষ এই তত্ত্বকে পদদলিত করছে।” সােম কপট আক্ষেপের সুরে বল্ল, “সত্যি। মানুষের ভবিষ্যৎ ভেবে আমি হতাশ হয়ে পড়েছি, পেগী। বিশ লাখ বছর পরে পৃথিবী যদি বরফ হয়ে যায় আর এই মানুষ জাঁতটা যদি fossil হয়ে যায় তবে আমার ভাবনা যায়।” পেগী কৌতুক বােধ করে’ বল্ল, “কত রঙ্গ জান! তােমার মতাে লােকের রঙ্গমঞ্চে যাওয়া উচিত।” “তুমি যাও তত আমি যাই।” “তুমি আমার কী জান ? রঙ্গমঞ্চে আমি দু’বছর কাটিয়েছি।” ‘ছেড়ে দিলে কেন ?” “তােমারি মত মানুষের জ্বালায়। তিনশাে পঁয়ষট্টি দিন তিনশাে পয়ষট্টি জন গায়ে পড়ে বলে, আমি তােমাকে ভালােবাসি। তুমি আমাকে বিয়ে করাে। শােনাে একবার কথা ! ভালােবেসেছেন তাে মাথা কিনেছেন। সেই আহলাদে বিয়ে করে’ গলায় দড়ি দিই।” “এতক্ষণে জালুম তােমার হৃৎপিণ্ডটা নেই, কারু কারু যেমন ফুসফুস থাকে না।” “আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি তােমাকে। তুমি তাে আমাকে ১৭ আগুন নিয়ে খেলা বিয়ে করবার আবদার ধরেছ। কাল যদি ডাক্তার দেখে বলে, এ মেয়ের একটা ফুসফুস্ নেই’, তবে তােমার প্রেম কোথায় থাকবে?” সােম উত্তর দিতে পারল না। তাকে অপ্রস্তুত দেখে পেগীর ফুর্তি বাড়ল। বল্ল, “এই তত পুরুষের -না, না, মানুষের প্রেম। তােমার ফুফুস্ না থাকা তাে দূরের কথা, তােমার একটা কান নেই দেখলে আমি তােমার ভালােবাসা প্রত্যাখ্যান কতুম।” “জলজ্যান্ত দু’দুটো কান দেখেও তাে কান দিচ্ছ না প্রস্তাবে।” “দিচ্ছি নে ? এইবার দিই। তুমি বলে যাও যা বব্বর। বলল, ‘তােমাকে আমি প্রাণের চেয়ে ভালােবাসি, মর্তের চেয়ে, স্বর্গের চেয়ে, সম্মানের চেয়ে, এমন কি কমলা লেবুর চেয়ে।” সােম পেগীর দুই গালে দুটি ঠোনা মেরে বল্ল, “আপেলের চেয়ে।” “বলল, “তুমি হেলেনের চেয়েও সুন্দর, তােমার জন্যে আমি ট্রয়ের যুদ্ধ জিৎতে পারি, হারকিউলিস্-এর মতাে বারাে বার অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারি। কী না করতে পারি ! কী না করতে পারি ! তােমার ব্যাগ থেকে টাকা নিয়ে সরে পড়তেও পারি।” সােম আহত হয়ে বল্ল, “পেগী ।” “মনে কষ্ট করছ ? কিন্তু এক পুরুষের পাপের ফল অন্য পুরুষকে ভুগতে হবে। সে হতভাগাকে তল্লাস করে পাইনি, তােমাকে পেয়েছি, তার প্রাপ্য শাস্তি তােমাকে দেব।” “হবুচন্দ্রের বিচার ! উদোর পিণ্ডি বুধাের ঘাড়ে।” ১৮ আগুন নিয়ে খেলা “জীবনে তাই হয়ে থাকে। যে লােকটা আমার ব্যাগের উপর হস্ত- কৌশল দেখাল তার উপর দিয়ে হয় তাে ডাকাতি হয়ে গেছে।” “ধন্য ধন্য পেগী। আমি তােমাকে সামান্য তরুণী ভেবেছিলুম, তুমি জ্ঞানবৃদ্ধা। চাই কি দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক হতে পার।” পেগী সােল্লাসে বল্ল, “তবে? বিয়ে করে আমার ভবিষ্যৎ মাটি করব? আমার ইচ্ছে আছে তােমার মতাে কলেজ পড়ব। অবিশ্যি অবস্থার উন্নতি হলে।” “পেগ, আমি মত বলতে রাজি আছি। অৰ্দ্ধং ত্যজতি পণ্ডিত। তুমি আর আমি দু’জনেই কলেজে যাব, ফ্ল্যাট নেওয়া নাই বা হল, আমার ল্যাণ্ডলেডী তােমারও ল্যাণ্ডলেডী হবে।” “তােমার বয়স কত ?” “তেইশ।” “এই বয়সে বিয়ের ভাবনা ভাব কেন?” “সকলেই ভাবে।” “অন্যায়। তিরিশ পর্যন্ত এ্যাডভেঞ্চার করতে হয়, তার পর বিয়ে।” “বিয়েটাও কি একটা এ্যাডভেঞ্চার নয় ?” “যারা ও-কথা বলে তাদের বিয়ে করতে আমি চাইনে ; বিয়ে আমার কাছে সেরেড়। একবার করলে শেষ বারের মত করলুম।” “তুমি রােমান ক্যাথলিক ? “আমি নমিষ্ট।” “তবে তােমার এ গোঁড়ামি কেন?”
আগুন নিয়ে খেলা
“গোঁড়া হলে তােত আজই তােমাকে বিয়ে করতুম গাে। নই বলে
আরাে আট বছর এ্যাডভেঞ্চারে কাটাব।”
সােম বক্স, “তুমি মরাে। আট বছর কেন আট মাসও আমার
ধৈৰ্য্য থাকবে না। হয় কাল আমরা বিয়ে করব নয় কোনাে দিন
।”
“কাল তত আম লণ্ডনে ফিছি। সারাদিন ট্রেনে।”
“তবে পরশু লণ্ডনে।”
“লণ্ডনে আমার ঠিকানা পাবে কোথায় ? ষ্টেশনে আমাদের প্রথম
দেখা, ষ্টেশনে হবে শেষ দেখা। ভিড়ের মধ্যে মাছের মতে তলিয়ে
যাব।
।
“তা হলে আজকেই আমাদের বিয়ে।”
“সে কী ।
“আজ তােমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে ?”
“বলপ্রয়ােগ করবে নাকি?”
“আমার ট্যাটি আমি ফাস করে দেব কেন?”
“ট্যাকটি আমারও আছে। এ রকম লােকের হাতে এই প্রথম
পড়িনি।”
“বেশ। আমি বসে আমার প্ল্যান্ কষি। তুমি বসে তােমার
অতীত কালের ব্রহ্মাস্ত্রে শান্ দাও।”
“তা হলে কফির ফরমাস করে। যুদ্ধে মব কি বাঁচব জানিনে।
তবু বল সংগ্রহ করে নিই।”
২০
আগুন নিয়ে খেলা
সােম টেবিল বাজাল। হিন্ ছুটে এল “ইয়েস স্যর ?”
“দু’ পেয়ালা কফি।. তােমার আর কিছু চাই ?
পেগী বল্ল, “আমার ঐ যথেষ্ট। তােমার আরাে বল দরকার হয় তাে
আরাে কিছু চাও।”
দু’জনে বল সংগ্রহ করতে থাকুক। ইত্যবসরে আমরা পাঠককে
তার আগের দিনের ব্যাপার জানিয়ে রাখি।
২১
তার আগের দিন পৰ্থকওলের প্রভাত। জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। মেঘলা করেছে বলে’ আকাশের রঙের সঙ্গে সমুদ্রের রং ম্যাচ করছে না। সােম বিছানায় শুয়ে ভাবছে, আমার তত ঘুম ভেঙেছে, পেগীর ভেঙেছে কি না। আমি যদি উঠতে গিয়ে শব্দ করি তার ঘুম অকালে ভাঙবে। অকালে নয় তােত কী! কাল রাত্রি মনে পড়ে না ? পড়ে। ওঃ, কী দুর্দিনই গেছে। কিছুতেই রাত্রের আশ্রয় খুঁজে পাইনে, যদি বা পেলুম কী লজ্জা! একটি ঘরে দু'জনের বিছানা। কখনাে এমন ঘটে কারুর জীবনে ? কোনাে দিন কল্পনা করতে পেরেছি ? সােম আকাশ ও সমুদ্র উভয়ের রাত্রিযাপন-রহস্য অনুধ্যান করছে। ভাবছে, কেমন করে আত্মসংবরণ করলুম? পাশের বিছানায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রলােভন। যুবতী নারী। তার বিনিময়ে ইংলণ্ডের রাজমুকুট তুচ্ছ, রকফেলারের ঐশ্বৰ্য্য ছার। ঘুম কি কিছুতেই আসে? তার প্রতিটি নিশ্বাসপতনের শব্দ গুছিলুম-যেন এক একটি ডলার। হঠাৎ এক সময় তার নিশ্বাস ফেলা থা। সে পাশ ফিরুল। ফিরে লেপটাকে আরেকটু উপরের দিকে টেনে নিল। রাত্রি অন্ধকার হলেও কাচের দেয়াল-জোড়া জানালা , যেন জানালা নয়, কাচের দেয়াল। ২২ আগুন নিয়ে খেলা বাড়ীর সব চেয়ে উচু ঘর, গ্যারেট, ছাদটা ঢালু হয়ে নেমেছে আমাদের পায়ের দিকে। বেশ . দেখতে পাচ্ছিলুম তার রব-করা চুল তার গাল বেয়ে তার মুখ ও চিবুক আড়াল করেছে। ইচ্ছে করছিল হাত বাড়িয়ে সরিয়ে দিই, তা হলে তার শুভ্র মুখখানি রজনীগন্ধার মত ফুটন্ত দেখায়। কিন্তু সে যে ভীষণ চমকে উঠত। হয় তাে চেঁচিয়ে উঠত ‘চোর’, ‘চোর’। অথবা তার চেয়ে যা খারাপ তাই অনুমান করুত। বস্ত, নাঃ, পুরুষমানুষকে এতটুকু বিশ্বাস করতে নেই। ওরা মার্জার বৈষ্ণব, সুযােগ পেলেই নখ দন্ত বের করে। সােমের বক্ষে নটরাজের তাণ্ডব চলেছিল যতক্ষণ না তার ঘুম এসেছে ততক্ষণ। কামনার ডম্বৰু ধ্বনি, কল্পিত সম্ভোগের তাত অসং্যমের ছন্দ। রাত্রে কয়েকবার ঘুম ভেঙে গেলে সােম খালি ভেবেছে, জীবনে এ সুযােগ ফিবে না, জীবনে এমন রাত আসবে না—too good, too good ! অত্যন্ত দ্রুত গতিতে রাজি প্রভাতের অভিমুখে ছুটেছে। মুমূর মত হতাশ হয়ে সােম জীবনের শেষ মুহূর্তগুলির মতাে পেগীর নিশ্বাসপতনের শব্দ গুতে থাকে, গুন্তে গুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়ে। এই মাত্র তার শেষবার ঘুম ভেঙেছে। এবার প্রভাত। কাপড় ছাড়তে হবে, প্রাতরাশ করতে হবে, তারপর সমুদ্রকূলে খানিক বেড়িয়ে লণ্ডনের ট্রেন ধরতে হবে। আবুহােসেনের আরব্যরজনী পােহাল। পেগীর ছুটি ফুরিয়েছে, পেগী কাল আপিস করবে। লণ্ডনের জনতার মধ্যে সােম তার কেউ নয়, সােমও তাকে খুঁজে নিরাশ হবে । আসন্ন বিরহের বেদনা তার সম্ভোগকামনাকে লজ্জা দিয়ে চুপ
আগুন নিয়ে খেলা
করিয়েছিল। আহা, চাইনেলভোগ, চাইনে আর কিছু সমস্ত জীবনটা
যদি এবারকার ঈষারের ছুটি হত তার এবং পেগীর! তারা শুধু
পরস্পরের সান্নিধ্যটুকু পেত, গল্প করত, তর্ক করত, এক সঙ্গে খেত,
একই ঘরে স্বতন্ত্র শয্যায় শুয়ে পরস্পরকে বলাবলি কবুত, “গুড় নাইট
মিষ্টার সােম”, “গুড নাইট মিস্ স্কট।”
“হ্যালাে।”
সােম পাশ ফিরে দেখল পেগী তখনন তেমনি নিশ্চল ভাবে পড়ে।
উঠবার নাম করছে না। নিদ্রা ও জাগরণের মাঝখানকার আলস্যটুকু
ভােগ করে নিচ্ছে। শুধু আল্গগাছে ডাকছে, “হালাে।”
সােম বল্ল, “ঘুম ভেঙেছে আপনার?”
“আপনার?”
“অনেকক্ষণ। সত্যি কথা বলতে কি আমার ঘুম ক্রমাগত ভেঙেছে
আৰু সেছে।”
“আমার নাকের গর্জনে ?”
“কখনাে না। আপনার নাক তাে কামান নয়।”
“ক’টা বাজল ?”
“আটটা বাজে।”
“উঠতে কান্না পাচ্ছে।”
“আরাে আট ঘণ্টা ঘুমন না?”
“উহু, ট্রেন ফেল্ করব।”
“কোথাকার ট্রেন ? লণ্ডনের, না, টেবীর ?”
২৪
আগুন নিয়ে খেলা
পেগী গা-ঝাড়া দিয়ে বল্ল, “ওমা, টেম্বী গেলে আমার চাকরি
থাকবে?”
“কিন্তু টেম্বী না গেলে আপনার আফশােষ থাকবে। কাল শুনলেন
টেবীর সুখ্যাতি ?”
“আমার দেশের সকলি সুন্দর। It is a dear old country. তা
বলে’ সব ঘুরে দেখবার মত আয়ু আমার নেই।”
সােম নীরব।
পেগী বল্ল, “আপনার উৎসাহে আমি বাধা দেব না, মিষ্টার সােম।”
সােম অভিমানের সুরে বল্ল, “আপনার যে উৎসাহ নেই এই আমার
উৎসাহের চরম বাধা।”
“অদ্ভুত মানুষ তাে? আমার চাকরিটি নেবেন ?”
“তা কি বলেছি ? আপনার চাকরি আপনি সারাজীবন রাখুন।
“পারিনে এমন মানুষকে নিয়ে। সবেরী থেকে টানলেন ব্রিষ্টলে।
ব্রিষ্টল থেকে পর্থকওলে। টেবী থেকে নিউ ইয়র্কে টাবেন নাকি?”
“নিউ ইয়র্ক থেকে ইণ্ডিয়ায়।”
“আশ্চৰ্য্য নয়। কী যাদু আছে আপনাতে! ব্ল্যাক ম্যাজিক জানেন
বুঝি?”
“তা যদি জানতুম তবে আমার দুঃখ ছিল কী! আপনাকে একদণ্ড
চোখের আড়াল হতে দিতুম না।”
“এরই মধ্যে এত ! আমি ভেবেছিলুম এই লােকটির যখন কালাে
চেহারা তখন এই হবে আমার একমাত্র পুরুষ-বন্ধু।”
২৫
আগুন নিয়ে খেলা
“তার মানে কি মিস্ স্ক?”
“আর ঘটা করেন কেন? যা বলে’ডাকতে মন চায় তাই বলে ডাকুন।”
“পেগী বলে ডাব ?”
(হেসে) “ডাকূলে জিভখানা কেটে ফেলব না?”
“তুমি তা হলে আমাকে কল্যাণ বলে ডাকবে?”
“কী নাম ? কলি ?”
“কল্যাণ।”
“কাল্যান্।”
“হয়েছে।”
“তা হােক। ও নামে ডাকা শক্ত। সােম বলে ডাকব।”
“কিন্তু একমাত্র পুরুষ-বন্ধু সম্বন্ধে কী বছিলে, পেগী।”
“বলছিলুম এমন একজন পুরুষ দেখলুম না যে বন্ধুতার মর্যাদা
রাখল। দুদিন পরে নর-নারীর সেই আদিম সম্পর্ক ! বন্ধু হয়ে উঠল
প্রেমিক। হতে চাইল স্বামী।
“স্বামী কি নারীর শ্রেষ্ঠ বন্ধু নয়?”
“চাইনে শ্রেষ্ঠ বন্ধু। চাই কতকগুলি পক্ষে যারা আমার তেমনি
দরদী বন্ধু হবে যেমন আমার বন্ধুনী ক্যাথরিন, ম্যারিয়ন, মেরী। আমার
অসুখ করলে তত্ত্ব নেবে, বলবে না যে কী হবে গাে ! তােমার অসুখ
আমাতে বৰ্তয় না? আমার সঙ্গে সিনেমায় গিয়ে হঠাৎ আমার গলাটা
জড়িয়ে ধরবে না, আমি গাল সরিয়ে নিলে আমার কানের উপর চুমু
খাবে না।”
আগুন নিয়ে খেলা
f
.
সােম হাতে হাতে বল্ল, “আচ্ছা, আমি সে গ্যারান্টি দিচ্ছি।
আমি ঠিক গালকেই তাক করবে—আমার লক্ষ্য অব্যর্থ।”
পেগী হেসে গড়াতে গড়াতে যেই খাটের প্রান্তরেখায় এল অমনি
লাফ দিয়ে বল্ল, “বন্ধু, চোখ বেজো। আমার কাপড় ছাড়া হয়ে গেলে
পরে চোখ খুলতে পাবে।
সােম চোখ ফিরিয়ে নিল সমুদ্রের দিকে। সেখান থেকে মাইল
খানেক দূর। তবু যারা সমুদ্রের ধারে বেড়াতে বেরিয়েছে, তাদের বেশ
দেখা যায়।
কাপড় ছেড়ে পেগী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বলে’ গেল, “নীচে
অপেক্ষা করছি। দেরি কোরাে না।”
খেতে খেতে পেগী বল্ল, “সােম, ভেবে দেখলুম, এত দূর যখন
এসেছি তখন টেবীটা দেখে যাওয়াই ভালাে। একদিনের ছুটির জন্যে
তার করে দিই।”
“উহু। তিন দিনের কমে আমি রাজি নই।”
“সােম, don't be silly.”
"6961, don't be rude."
“মাফ চাইছি, সােম।”
‘মাফ করবার কিছু নেই, পেঙ্গু।”
You are a dear.” (কোমল সুরে)
“পেগ, তােমার তিন দিনের মাইনে দেবার মত সঙ্গতি তােমার
বন্ধুর আছে।”
২৭
আগুন নিয়ে খেলা
।
“কিন্তু তােমার বন্ধুনী তা নৈবে না, সােম।”
“নি নাই নি, আমি আমার দাবী ছাড়ব না। তিনটি দিন
আমাকে দিতে হবে।”
“সােম, be reasonable, দু’দিন।”
“আচ্ছা, দু’দিন।
পেগী ও সােম রাত্রের ঘরভাড়া দিয়ে বিদায় নেবে এমন সময় বাড়ীর
কী এসে সােমকে একখানি অটোগ্রাফের খাতা দিয়ে বল্ল, “নিজের
ভাষায় আপনার নামটি লিখে দিয়ে যাবেন? কৃতার্থ হব।”
সােম বল্ল, “নিশ্চয় লিখে দেব।”
বুড়ী বল্ল, “ম্যাডাম, আপনি ?”
পেগী হেসে বল্ল, “আমার নিজের ভাষা কি আমি জানি ? সােম,
তুমি আমাদের নিজের ভাষায় লিখে দাও।”
বুড়ী তার কথা বিশ্বাস করল না। এদের রং আলাদা, ইংরেজীর
উচ্চারণ আলাদা।
কিন্তু পেগী কেন নিজের নামধাম লিখল না? কারণ সে কিছুতেই
লিখতে পারত না যে তার নাম পেপী সােম। যদি লিখত পেগী স্কট
তবে বুড়ী ভাবত, বটে? ডুবে ডুবে জল খাবার আর জায়গা পেলে
না? কাল বারােটা রাত্রে এসে বল্ল, “ঘরের সন্ধানে চার ঘণ্টা ঘুরেছি,
আজকের মত আশ্রয় দাও আইবুড় মেয়ের এই চক্রান্ত।
পৰ্থকওল থেকে টেবী যাবার পথে অনেকগুলাে চেঞ্জ। ক্রমাগত
২৮
আগুন নিয়ে খেলা ট্রেন বদল করতে করতে পাছে লাঞ্চ-এর সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায় এই ভেবে তারা মাঝপথে নেমে পড়ল সােয়ন্সী’তে। খুব বুদ্ধিমানের কাজ করল, কেননা সে রাত্রে উপবাস দিতে বাধ্য হওয়া তাদের অদৃষ্টে ছিল। অবশ্য সে কথা আগে থেকে জানলে তারা ডবল লাঞ্চ, খেত, এত খেত যে রাত্রে খাবার দরকার হত না। কিন্তু তারা ভবিতব্য ছিল না। সেইজন্যে সম্মুখে একটা রেস্তোর, দেখে ঢুকে পড়ল এবং ওয়ে, জাতীয় ওয়েট্রেসকে ফরমাস দিল যা সাধারণত খেয়ে থাকে তাই। পেগী বল্ল, “ওয়েরা কেমনতরাে funny. যেন ইংরেজই নয়।” সােম বল্ল, “ইংরেজ না হলেই funny হতে হবে তার মানে কী!” “আহা, তােমাকে গায়ে পেতে নিতে কে বলছে ? আমি শুধু বলতে চাই ওরা দেখতে আমাদের মত নয়।” আমার মতাে নয় সেকথা ঠিক। এবং তােমার মতাে নয় সেকথাও ঠি। অনেকটা কন্টিনেন্টালদের মতাে। ঐ ছেলেটিকে লক্ষ্য করাে। ঐ যুবকের দলটিকেও।” “বড় বক্ বক্ করে। শিষ্ট হয়ে এক জায়গায় বসে থাকতে পারে , নড়ছেই চড়ছেই উঠছেই বসছেই।” “আমার এই ভালাে লাগে। সর্বদা সব ক’টা অঙ্গ ব্যবহার করছে। আমার দেশের লােক তাই করে।” “তবে তােমার দেশে আমি যাব না।” “আমার দেশের দুর্ভাগ্য।” “শুনেছি তােমার দেশে সাপ আছে।” ২৯
আগুন নিয়ে খেলা
“শুধু সাপ ? বাঘ ভালুক কুমীর। তার চেয়েও যা মারাত্মক, মশা
মাছি ইদুর।”
(রুদ্ধ নিশ্বাসে) “সত্যি?”
“সত্যি।”
“তবে সে দেশে তুমি ছিলে কী করে?”
“আর তিরিশ কোটী মানুষ আছে।”
“সত্যি ?”
“বিশ্বাস হয় না ?”
“বইতে পড়াে নি?”
“বই আমি তেমন পড়িনে। I am not a great reader, you
know."
“তােমাদের সাম্রাজ্য। খবর রাখ না?”
“ইস্কুলে পড়েছিলুম বটে India is the brightest gem on the
British crown. আর ওখানকার সবাই ভেল্কি জানে। তুমি
জান ?”
“পাগল !”
“না, না, সত্যি বলল। লুকিয়াে না। লােহাকে সােনা করতে
পার?”
“তা জালে তাে আমরা জাত-কে-জাত বড় লােক হয়ে থাকতুম,
পেগী।”
আগুন নিয়ে খেলা
“আর কত বড়লােক হতে? শুনেছি তােমার দেশে অগুতি
মহারাজা। এই যে তুমি এত দূর দেশে এসেছ, বড়লােক বলেই তাে
পারলে?”
“এর জন্যে অনেক দুঃখ পেয়েছি, পেগ,। সে তুমি ভাবতে পারবে
, বন্ধু। তােমার দেশের ছেলেরা যে বয়সে যৌবনকে ভােগ দিয়ে
সার্থক করে সে বয়সে আমি ঘরে খিল দিয়ে বই মুখস্থ করেছি, কত বসন্ত
দোরে ঘা দিয়ে গেছে, সাড়া পায়নি। আমি যে যুবক সে আমি প্রথম
উপলব্ধি করলুম তােমার দেশে পা দিয়ে।”
এর পরে কিছুক্ষণ দু’জনেই নিস্তব্ধে পরস্পরকে নিরীক্ষণ করতে
লাগল। মুখে মৃদু-মিষ্টি হাসি।
পেগী বল্ল, “আচ্ছা, তােমার দেশে কুকুর আছে ?”
সােম অট্টহাস্য করে বল্ল, “অসভ্যতা মাফ করাে, পেগী। বললে
পারতে তােমার দেশে মেয়েমানুষ আছে ?”
“সে তত স্বতঃসিদ্ধ।”
মােটেই না। এমন দেশ আছে যেখানে মেয়ে মানুষ নেই।”
"Don't be ridiculous."
“ধরাে, এ্যান্টার্কটিকা একটা মহাদেশ। সেখানে মেয়েমানুষ নেই।”
পেগী হার মাল। বল্ল, “তাই তাে। তুমি
“তাই তাে। তুমি ভয়ানক চতুর।
কিন্তু আমার কথার উত্তর দিলে না যে। তােমার দেশে কুকুর আছে?”
“আছে। তুমি কুকুর ভালােবাসাে?”
“ভালােবাসি! I worship them
আগুন নিয়ে খেলা
“আশ্চৰ্য নম। কে যেন লিখেছে ইংরেজরা আগে Godকে পূজা
করত, আজ কাল Dogকে পূজা করে।
আরাে কয়েকবার ট্রেন বদল করে তারা টেবীর গাড়ীতে উঠল।
তখন সূৰ্যান্তের বেশী দেরি নেই। তবে ভরসা এই যে ইংলণ্ডের গােধূলি
বহুক্ষণব্যাপী।
গাড়ীতে নতুন আলাপীরা চিরন্তন বিষয় নিয়ে আলাপ জমিয়ে
তুলছিল। “এমন ওয়েদার কোনাে বছর হয় না।”...“যেমন করে’ হােক
ঈষ্টারের সময়টা বৃষ্টি হবেই। এবারকার ঈষ্টারটা ব্যতিক্রম।”...“প্রতিদিন
রৌদ্র। সারাদিন রৌদ্র।”
পেগী ও সােম পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে চোখে চোখে
হাসছিল। এই চারটি দিন তাহাদের দু'জনের পক্ষে সব দিক দিয়ে সুদিন।
এক বর্ষীয়সী সােমের সঙ্গে আলাপ করবার ছল খুঁজছিলেন।
বল্লেন, “আপনি আসছেন কোনাে গরম দেশ থেকে, না মশাই?”
“আজ্ঞে হ। ইণ্ডিয়া থেকে।”
“সঙ্গে করে এই সুন্দর ওয়েদারটি নিয়ে এসেছেন আমাদের জন্যে।
সকলে সায় দিয়ে বল্ল, “ঠিক ঠি।”
সােম সম্মিত প্রতিবাদ করল, “কিন্তু আমি এসেছি কবে ? দেড়
বছর আগে।”
“দেড় বছর আগে ?” (প্রতিবেশীদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময়
করে’) “সেইজন্যে এমন ইংরেজী বলতে পারছেন।”
আগুন নিয়ে খেলা
“ইংরেজী আমি দেশেই শিখেছি।”
“বটে! ইস্কুল আছে ও দেশে?”
“অজস্র।”
বর্ষীয়সী আর কথা খুঁজে পেলেন না। একটি মধ্যবয়সিনী জিজ্ঞাসা
করলেন, “ওয়েলস কেমন লাগছে?”
সােম বল্ল, “ইংলণ্ডের থেকে এমন কী তফাৎ।”
“আমিও তাই বলি। কিন্তু যারা ইংলণ্ডে গেছে তারা বলে অনেক
তফাৎ।”
আপনি ইংলণ্ডে যানি?”
“কবে আর গেলুম! যাই যাই করে যাওয়া হয়ে ওঠে না।”
সােম বল্ল, “আপনাকে কিন্তু দেখতে ওয়েশের মত নয়।”
“তা তাে হবেই। পেট্রোক অঞ্চলে এমন অনেক পরিবার আছে
যাদের পূর্বপুরুষ ছিল ফ্লেমিশ আগন্তুক।”
পথে মধ্যবয়সিনী নেমে গেলেন। যাবার সময় এমন ভাবে ও
এমন সুরে “গুড বাই” বল্লেন যেন বহু পুরাতন বন্ধুনী।
সােম পেগীর আরাে নিকটে সরে এলাে। পেগী বিনা বাক্যব্যয়ে
তার হাতে হাত রাখল। একান্ত নির্ভরের সহিত। সােম নিজেকে
ধন্য জ্ঞান কল। তার অন্তর কানায় কানায় পূর্ণ। সূৰ্যাস্তটি সুন্দর।
ট্রেনটি মন্থর।
প্রতিবেশীগুলি সহৃদয় আর তার সাথীটি ?
পােষ পাখীটির মতাে তার হাতের মুঠায় নিজের প্রাণটি ভরে
দিয়েছে।
আগুন নিয়ে খেলা
পেগী সােশের কাধে মাথা রেখে নিস্পন্দ হয়ে রইল। তার দৃষ্টি
জানালার ফাক দিয়ে সূর্যাস্তে নিলীন হয়েছে। সােম অনড় অচঞ্চল
ভাবে কঁাধ খাড়া রাখল। সে এক কঠোর পরীক্ষা।
অবশেষে ট্রেন টেম্বীতে পৌছল।
তখন গােধূলি লগন। দু’জনে হাত ধরাধরি ভাবে ছােট শহরটিতে
রাতের বাসার খোঁজে চল্ল।
গুটি দুই তিন হােটেল অতিক্রম করল। তাদের হাতের টাকা
ফুরিয়ে আসছে ক্ৰমে। হােটেলের খাই মেটানাে যায় না। যদি ঘােট
বাের্ডিং হাউস্ পায় তাে উত্তম হয়।
দু'এক জায়গায় বেল্ টিপল। জিজ্ঞাসা করে উত্তর পেল, এখানে
তাে ঘর খালি নেই, আর একটু এগিয়ে গেলে পেতে পারেন। আর
একটু এগিয়ে যেতে যেতে তারা যেখানে পৌছল সেখানে সমুদ্র সঙ্কীর্ণ
হয়ে শহরের মধ্যে প্রবেশ করেছে।
এক জনের সঙ্গে দেখা।
সােম বল্ল, “বতে পারেন, এখানে বাের্ডিং হাউস্ পাই কোথায়?”
কী ? আসল সমুদ্রটা কোন্ দিকে? সােজা দক্ষিণ মুখখা যা,
সমুদ্রে পড়বেন, বাঁধানাে ঘাট, বিস্তৃত promenade.”
“সে দিকে বাের্ডিং হাউস্ আছে?”
“একটা নতুন সিনেমা তৈরি হচ্ছে। আমরাই তৈরি করছি। তৈরি
শেষ হয়ে যাক্, আমরা ওখানে একটা মিটিং করব দেখবেন।
লেবার পার্টির মিটিং। জানেন, মশাই, জায়গাটা কত্সারভেটিভদের
৩৪
আগুন নিয়ে খেলা
পৈত্রিক সম্পতিবাছাধনরা নড়তে চান্ না সিংহাস থেকে। তা ওরা
চলে ডালে ডালে তাে আমরা চলি পাতায় পাতায়।”
লােকটা বদ্ধ কালা ও বাচাল। সােম বল্ল, “পেগী, কী করা যায় ?
পেগী বল্ল, “কালকের মতাে চার ঘণ্টা হাঁটুতে পারিনে বাপু।
আজকে ঈষ্টার সােমবার, সব জায়গা ভর্তি।”
সােম আরেকবার চেষ্টা করল। “ওহে, শুনছ? আমরা লণ্ডন
থেকে আসছি—
“আমি জানি আপনি টাইবেটা (Tibetan ), ঠিক কি না বলুন।
আমি বাডিজ (Buddhism) সম্বন্ধেও খবর রাখি মশাই।”
সােম হাল ছেড়ে দিয়ে বল্ল, “পেগ, তুমি এইখানে বসাে। আমি
খোজ করে আসছি।”
পেগী বল্ল, “ওকে হাত নেড়ে বােঝাতে পার না ইঙ্গিতে ?”
সােম বল্ল, “তা হলে ও ভাববে আমি ওকে কালা বলে উপহাস
করছি। রেগে আমার মাথা নেবে।”
যা হয় হােক সামনের টী-রুমসে ধাক্কা মারব। এই ভেবে সােম
পেগীকে পিছনে রেখে খানিক দূর এগিয়ে গেল।
টী-রুমসের দরজা খুলে একটি বুড়ী প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকাল।
সােম বল্ল, “দু’টি মানুষের জন্যে ঘর দরকার। হবে?”
সােম আশা করেনি যে “হ” শুনাবে। বুড়ী বল্ল, “দু’টি ছােট ঘর
খালি ছিল। আজই একটিতে লােক নিয়েছি। একটি ঘােট ও একটি
বড় ঘর খালি আছে। দেখবেন ?”
আগুন নিয়ে খেলা
সােম পরিদর্শন করল। ঘর দুটি স্বতন্ত্র তলায়। বুড়ীকে বল্ল, “পাঁচ
মিনিটের মধ্যে আছি। বেহাত কোরাে না।”
পেগীকে বল্ল, “তােমার পছন্দ হবে না জানি। তবু নাই ঘরের
চেয়ে যেমন তেমন ঘর ভালাে। এখন ভেবে বলল একটা বড় ঘর ও
একটা ছােট ঘর নেওয়া যাবে, না, কেবল একটা বড় ঘর ?”
“দুটো ঘর নিলে টাকা বেশী নেবে?”
“নেবে না? ঈষ্টারের মরসুম।”
“বুঝেছি। কিন্তু বড় ঘরটিও যথেষ্ট বড় নয়। তাতে একটা বড়
খাট ও একটা ছােট খাট। ঘােট খাটটাতে বিছানা পাতা নেই।”
“উপায় ?”
“বুড়ীটি ভালাে। বলে পেতে দেবে।”
বুড়ী বল্ল, “তার আর কী! ধােপা-খরচা দিতে রাজি থাকেন তাে
আরেক সাজ বিছানা পেতে দিচ্ছি।”
সােম বল্ল, “তা না হয় হল। আমি চার দিন স্নান করিনি মিসেস
উইকি। স্নানের ঘর আছে তাে?”
“দুঃখিত হলুম, স্যর। শশাবার ঘরে গরম জল দিয়ে আসতে পারি।
গালায় স্নান করবেন।”
“অভ্যাস নেই, মিসেস্ উইকিস্। তােমরা কোথায় স্নান করাে?”
“আমার কথা যদি জানতে চান্ আমি পঁয়ত্রিশ বছর এই বাড়ীতে
আছি। পঁয়ত্রিশ বছর গালায় স্নান করে আসছি স্যর।”
আগুন নিয়ে খেলা “সাবাস! বােধ হয় পঁয়ত্রিশ বারের বেশী স্নান করতে হয়নি, মিসেস উইলকি।” বুড়ী আপত্তি করে বল্ল, “না, না, সে কী হয়, শুর! সমুদ্র এত কাছে। গ্রীষ্মকালে সমুদ্রস্নান করেছি।” “ঠিক্ মিসেস্ উইলকি, তােমারও তত একদিন এর বয়স ও এর সৌন্দৰ্য্য ছিল।” স্নানের ব্যবস্থা হল। কিন্তু আহারের ব্যবস্থা করতে পারবে কি না শুনে বুড়ী ঘাড় নাড়ল। বুড়ী ও তার বুড়াে সন্ধ্যার আগে High Tea খায়, ইতিমধ্যে খাওয়া হয়ে গেছে। বাড়ীতে এমন কিছু নেই যাতে দু’জনের পেট ভরতে পারে। তবে এখানে হােটেলগুলােতে ডিনার-এর সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায় নি, হােটেলে ডিনার খেয়ে সমুদ্রের বাঁধের উপর বেড়িয়ে এলে যদি ক্ষুধা লাগে তবে কিছু ডিম ও রুটি বুড়ী জোগাতে পারবে। রেস্তোরা খােলা পাওয়া গেল না। ছােট শহর। ছ'টার আগে অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। খােলা ছিল কয়েকটি দামী ও নামী হােটেল। কিন্তু সেখানে খাবার খরচা অনেক। অত খরচ করতে পেগী কিম্বা সােম রাজি নয়। পেগী বেরিয়েছিল তিন দিনের বাসা খরচা সম্বল করে। তিন দিনের বদলে চার দিন তাে হলই, পাঁচ দিনও হবে। শুধু তাই নয়। সলবেরী পৰ্য্যন্ত রেলভাড়া সঙ্গে ছিল, তার চারগুণ দূরে এসেছে। সেই জন্য ৩৭ আগুন নিয়ে খেলা কত। পেগী আজ জর বাড়ীতে তার করেছে, “টেবীর ডাকঘরের ঠিকানায় তার করে টাকা পাঠাও।” টাকাটা কাল সকালে ডাকঘরে গেলে পাবে খুব সম্ভব। তবু বলা যায় না তাে। ডাকঘরওয়ালীরা যা দজ্জাল। যখন পুরুষ কেরাণী ছিল তখন সুন্দরী তরুণীর মুখ দেশে বিশ্বাস এখন ডাকঘরগুলাে মেয়ে-কেরাণীতে ঠাসা। তারা বিষম খুখুঁতে। হয় তাে বলবে, “তুমি যে পেগী স্কট তার প্রমাণ কী?” পেগী বলবে, “ক’জন পেগী স্কট এসে তােমার কাছে টাকা চেয়েছে শুনি?” মেয়েটা জবাব দিতে না পেরে চটে খাবে। সােম পনেরাে দিনের খরচা সঙ্গে এনেছিল, কিন্তু টেন্বী পৰ্য্যন্ত রেল- ভাড়া লাগবে, তার উদ্ভটতম কল্পনাও এতদূর যায় নি। যেন একজন কাতা ছাড়বার আগে ভেবেছিল হাজারীবাগ অবধি যাবে, কিন্তু ঘটনাচক্রে উপনীত হয়েছে রাওলপিণ্ডিতে। তার কল্পনার দৌড় ছিল গিল্ডফোর্ড পর্যন্ত, কিন্তু ভুল গাড়ীতে চড়ে’ সবেরী, তার পরে রামমােহন রায়ের কবর দেখতে ব্রিষ্টল। এতদূর যখন এসে পড়েছি তখন ওয়েলটা মাড়িয়ে গেলে ক্ষোভ থাকে না। তাই কার্ডিফ পৰ্য্যন্ত আসা। তারপর থেকে বিধাতার নির্দেশ। কেমন করে কী হয়ে গেল, হঠাৎ চলন্ত বাস ধরে’ পৰ্থকওল্ রওনা হওয়া, রবিবারের রাত্রি’ বাসা কিম্বা খাবার কোনােটাই খুঁজে না পাওয়া, অনেক কাণ্ড করে’ অদ্ভুত অবস্থায় রাত্রিবাস। বাঘ একবার মানুষের স্বাদ পেলে স্বাদ বদলাতে চায় না। আবােরা নির্জনে পেতে পেগীকে চাই, আরাে নির্জনে। পর্থকওলে বড় ভিড়, চলাে টেনবী। টেম্বীতেও ভিড় নেহাৎ কম আগুন নিয়ে খেলা পেগীকে নয়, চলাে অন্য কোথাও। সােম ইতিমধ্যে আবতে “আরম্ভ করেছে কাল পেগীকে নিয়ে কোন ঘুমন্ত পুরীতে যাবে—পেট্রোক, ফিশগার্ড, আয়াল্যাণ্ড? অন্তত সন্নিকটবর্তী ম্যানরবিয়ের, যেখানে নর্মান যুগের দুর্গ আছে? ম্যানরবিয়ের যদি যথেষ্ট জনবিরল না হয় তবে পেট্রোক, ফিশগার্ড, আয়ার্ল্যাণ্ড। টাকা চাই। যা অবশিষ্ট আছে তাকে সঞ্চয় করা বুদ্ধিমানের কাজ। আজ টাকার জন্যে তার করতে বারণ করেছে কত। সেই যখন পেগীকে দূর থেকে দূরত্বর দেশে নিয়ে চলেছে তখন টাকার ভাবনা পেগীর নয়, তার। কিন্তু পেগী বারণ মানেনি। বলেছে, সুখ যখন আমারও, সুখের দাম তখন আমিও দেব কেন? ঋণী হতে পারব না, সােম। সােম ভাবছিল, ভগবান করুন, পেগীর যেন বাড়ী থেকে কাল টাকা আসে। তা হলে আমার কাছে ধার নিতেই হবে তাকে। শােধ দেবার সময় আসার আগে পেগী আমার প্রিয়া। তখন আমরা শুধু অভিন্ন-হৃদয় নই, অভিম-পকেট। তা বলে’ পেগী কিম্বা সােম কারুর ইচ্ছে ছিল না যে আজকের রাতটা উপােস দেবে। ও কথা ওরা ভুলেও ভাবেনি। লণ্ডন-ব্রিষ্টলের মতাে একটা সস্তা রেস্তোরাঁ পাবেই। টেন্বীর এত সুখ্যাতি শুনেছে। এমন একটাও রেস্তোরাঁ পাবে না যেখানে অল্প খরচে নৈশ-ভভাজন করা যায় ? সমস্ত শহরটা তিন বার চষে বেড়াবার পর তাদের চেতনা হল যে ন'টা বাজে। এখন হােটেলগুলােতেও ডিনার-এর সময় উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। ইততা নষ্টস্ততাে ভ্রষ্টা।
আগুন নিয়ে খেলা
পেগী বল্ল “আমি আর শরীরের ভার বইতে পারছিনে, সােম।
আমার ক্ষুধাও কখন নষ্ট হয়ে গেছে।”
সােম বল্ল, “লক্ষ্মীটি, এখনাে দু’একটা হােটেলে ডিনার না হােক
সাপার পাওয়া যাবে। আমার কাধে ভর দাও।”
পেগী বল্ল, “আমি এইখানে বসে তােমার প্রতীক্ষায় রইলুম। তুমি
খেয়ে এসাে।”
“সে হয় না, দুষ্ট। এক যাত্রায় পৃথক ফল ?”
“আমার ক্ষুধা নেই বলে তুমি উপােস দেবে? বেশ তাে!”
“তােমাকে ফেলে রেখে আমি স্বর্গেও যেতে চাইনে, অমৃতও খেতে
চাইনে।”
( অতি কষ্টে খিল খিল করে হেসে) “যেমন অবলীলাক্রমে বলে,
শুনে মনে হল ও কথা অনেক বার প্র্যাকটীস করেছ। প্রেম করতে
করতে ঝানু হয়ে গেছ। না?”
“মুখে যা আসে বলল। কিন্তু পেট খালি রাখতে পাবে না বলে
দিলুম।
“জোর করে গেলাবে নাকি?”
“নিশ্চয়ই। তােমার দেহের উপর আমার অধিকার আছে।”
“ই।”
“ইস্ কি গাে? তুমি না খেয়ে রােগা হয়ে যাবে, আমি তাই দেখে
ও তাই স্পর্শ করে সুখ পাব ?”
“যেন তােমার সুখের জন্যে আমার সৃষ্টি ?”
৪ ০
আগুন নিয়ে খেলা
0
“নিশ্চয়ই। তােমার সুখের জন্য আমার। স্ত্রী পুরুষ পরস্পরের
ভােগের জন্যে।”
“যাও। তর্ক করার মত শক্তি নেই আমার।”
“তবে আমার কাঁধে ভর দিয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মতাে হাঁটো। ঐ যে
ফলের দোকানটা ওটা এখুনি বন্ধ হয়ে যাবে।”
বাস্তবিক দোকানটা বন্ধ হবার মুখে।
সােম ও পেগী এক মিনিট
পরে এলে পাত।
“ইয়েস্ ম্যাডাম ? ইয়েস স্যর ?”
পেগী বল্ল, “আমাকে দাও আপেল।”
সােম বল্ল, “আমাকে দাও কমলা লেবু।”
তারপর দু’জনে সমুদ্রের বাঁধের উপর একটি বেঞ্চিতে বসে
ফলগুলির সদ্ব্যবহার করুল। অন্ধকার রাত্রি। আকাশে একটিও
তারা অনুপস্থিত নেই। সমুদ্রের জল আকাশের মতাে কালাে অথচ
ফেন-ধবল। তারাগুলি যেন আকাশের ফেনা, সমুদ্রে ছিটিয়ে পড়ছে।
আপেল ও কমলা লেবু ওরা ভাগ করে খেল।
পেগী আধখানা
খায়, সােম বাকীটা শেষ করে। সােম কিছুটা খায়, বাকীটা পেগীকে
খাইয়ে দেয়। আদর করে তার মাথাটি বুকের কাছে আনে, একটি
হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে, অন্য হাতটি তার মুখের কাছে নেয়। পেগী
যখন হাঁ করে তখন দুষ্টুমি করে হাত সরিয়ে নেয়, পেগী চটে গিয়ে
বলে, চাইনে আমি খেতে। মুখে কুলুপ লাগায়। সােম তার মুখ
খুদার ভাণ করে গাল টিপে দেয়। পেগী হাসি চেপে থাকতে পারে
৪১
আগুন নিয়ে খেলা । মুখ খােলে। সেই সুযােগে সােম তার মুখে খাবার খুঁজে দেয়। পেগী বল্ল, “রাত অনেক হয়েছে। এবার পুলিশে পাড়াবে।” সােম বল্ল, “কেন, আমরা তাে কোনাে অপরাধ করছিনে?” “কে জানে, বাপু। তুমি যে রে-এ অগ্রসর হচ্ছ—” “বাকীটা শেষ করে ফেল। যে রেট্-এ অগ্রসর হচ্ছি” “মিস্ সাভিজ-এর মামলা মনে পড়ে? জিক্স, হাইড পার্কে এক- শাে’টা পাহারাওয়ালা অতিরিক্ত বসিয়েছে।” “টেবীতে তাে বসায়নি?” “কে জানে বাপু ; শুলে না, কন্সারভেটিভদের পৈত্রিক সম্পত্তি? বাবুরা বেকার সমস্যার সমাধান করতে যেয়ে হালে পানি পাচ্ছেন না, ঠাওরেছেন এই করলে বুড়ী ভােটারদের ভাে-এর জোরে অথই পাথার পার হবেন। সেটি আমরা হতে দিচ্ছিনে।” “তােমরা ফ্ল্যাপাররা তাে এবার ভাে-এর অধিকার পেয়েছ। কাকে ভােঢ় দিচ্ছ ?” “লেবার-কে।” “ইংলণ্ডের মেয়েদের আমি চিনি। ডাচে যেদিকে ওরাও সেইদিকে।” “না গাে মশাই। ওদের যথেষ্ট নিজত্ব আছে। ওরাও একটু আধটু চিন্তা করে থাকে।” “চিন্তাশক্তি থাকূলে তাে ?” ৪২
আগুন নিয়ে খেলা
“অমন যদি বল তােমাকে ধাক্কা দিয়ে সমুদ্রে ফেলে’ দেৱে।”
“তাতে করে এই প্রমাণ হয় যে তােমাদের বাহুম্বল আছে। কিন্তু
চিন্তাশক্তি ?”
“না মদি থাকে কেয়ার করিনে। রূপ যৌবন বাহুবলও বি—এই
মানুষের পক্ষে যথেষ্ট।”
“এই যদি তােমাদের ধারণা হয় তবে ভাবী যুগের ইংলণ্ডের কী দশা
হবে ভাবি।”
“ইংলণ্ডের দশা ভাবতে হবে না। ইংলণ্ড অমর। Her soul
goes marching on."
পেগী চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল। আর কালক্ষেপ করল না। বেঞ্চি
ছেড়ে দাড়িয়ে বল্ল, “তুমি না স্নান করবে, কথা দিয়েছ ?”
“যাঃ। ভুলে মেরে দিয়েছিলুম।”
“এই তাে তােমার চিন্তাশক্তির প্রমাণ। • এখন এসাে। চলং শক্তির
প্রমাণ দাও। মিসেস্ উইকি অভিশাপ দিতে থাকবে।”
শশাবার ঘরে স্নানের জল দিয়েছে। যে স্নান করবে সে ছাড়া আর
কেউ ঘরে ঢুকতে পারে না।
পেগী বল্ল, “তুমি উপরে যাও, স্নান করাে গে। আমি ততক্ষণ
মিসেস্ উইকিসের সঙ্গে গল্প করতে থাকি।”
পেগীকে একদণ্ড চোখের আড়াল করলে সােমের চোখ ছল ছল
করে, একদণ্ড কাছছাড়া করলে সােমের প্রাণ চলে যায়। সােম দশ
৪৩
আগুন নিয়ে খেলা মিনিটে “স্নান শেষ করে রাতের কাপড় পরে ঠাণ্ডা লাগবার ভয়ে বিছানায় উঠল। কিন্তু যতই অপেক্ষা করে পেগী আর আসে না। পেগী কি এ ঘরে শশাবে না ? নীচে গিয়ে পেগীকে পাকড়াও করে আনবে, সে উপায় নেই। তা হলে পােষাক পরতে হয়, অন্তত ড্রেসিং গাউন চড়াতে হয়। বাহুল্য মনে করে ড্রেসিং গাউন সােম আনে নি। সঙ্গে একটা হাত-ব্যাগ এনেছে, তাতে ধরে রাতের কাপড়, কামাবার সরঞ্জাম, অতিরিক্ত টাই- কলার মােজা গেঞ্জি শার্ট। আর দু’চারটে খুচরাে উপকরণ। যেটা পরে সেটার বেশী সুন্টু আনেনি। সােম বােঝা বাড়াতে ভালােবাসে । তাতে ভ্রমণের সুখ হ্রাস পায়। সােম দেখল পেগীরও মত তাই। পেগী অবশ্য এক বস্ত্রে আসেনি। তবু একটা সুটকেসে তার কুলিয়ে গেছে। সােম বয় পেগীর সুটকেস, পেগী ধরে সােমের হাত-ব্যাগ। কুলী করতে হয় না। ট্যাক্সি করতে হয় না। পথে চলার সুখ তারা যােল আনা ভােগ করছে। দরজায় টোকা পড়ল। “ভিতরে আসতে পারি ?” সােম বল্ল, “আমার জ্ঞান হয়ে গেছে কখন।” পেগী দুধের গেলাসটি সােমের মুখের কাছে এনে বল্ল, “Now be a good boy. এটুকু ঢ ঢক্ করে খেয়ে ফেললা দেখি, যাদু।” সােম বল্ল, “এ কী ?” “এর নাম দুধ। ছােট ছেলেরা এই খেয়ে ঘুময়।” “ছােট মেয়েটির খাওয়া হয়েছে ? ৪৪
আগুন নিয়ে খেলা
“ছােট মেয়েটি স্নান করেনি, গরম দুধের দরকার বােধ করে না।”
“ছােট ছেলেটির প্রতিজ্ঞা সে একা কোনাে জিনিষ খাবে না।”
“টং রাখে।। ওঠো, খাও'।”
“হুকুম?”
“হুকুম।”
“তবে দেখছি উঠতে হলাে। কিন্তু পেগ, তুমি একটি চুমুক খাও।”
“কী আবদারে ছেলে! এমনটি দেখিনি।”
“কী কড়ামেজাজী ঠাকুমা : এমনটি দেখিনি।”
দুধ খাওয়া শেষ হলে পেগী বল্ল, “লক্ষ্মী ছেলেরা এখন লেপ মুড়ি দিয়ে
ঘুময়। ঠাকুমার কাপড় ছাড়া দেখে না।”
সােম পাশ ফিরে চোখ বুজল। পেগী কাপড় ছেড়ে প্রথমে গ্যাসের
বাতি নিবিয়ে দিল, তার পরে নিজের বিছানায় লাফ দিয়ে উঠল। পেগীর
বড় খাট, সােমের খাট ঘােট।
“সােম, ঘুমুলে ?”
সােম গলার সাহায্যে নাক ডাকাতে লাল। সেই তার উত্তর।
“আমি একা জেগে থাকি কেন? আমি কিন্তু সত্যি সত্যি নাক
ডাকাব।”
সােম বল্ল, “চেষ্টা করলেও পারবে না।”
“ও কৌশলটা তােমার পেটেন্ট, ?”
“তুমি জাল করতে চাইলেও পার না।”
পেগী চেষ্টা করে’ হাস্যাস্পদ হল। তার নিজের হাস্যাস্পদ।
৪৫
আগুন নিয়ে খেলা
কতক্ষণ কেটে গেল।
পেগী হঠাৎ আর্তকণ্ঠে ডাকলে, “সােম!”
সােমের ঘুম লেগে আছিল। একটু ঝাঝের সঙ্গে সাড়া দিল।
“কী, পেঙ্গু।”
“ওটা কী ওখানে দাড়িয়ে ?”
সােম চোখ মেলে বলে, “কোনটা ?”
“ঐ যে জানালার কাছে। সােম, আমি মরে যাব। উঃ-উঃ-উঃ।”
সােম উঠে বল। জানালার কাছে একটা ছায়া। গাছের ছায়া
হবে। সােম জানালার কাছে গিয়ে স্কীন টেনে দিল। বাইরে থেকে
যেটুকু আলাে আসছিল-গ্যাস পােষ্টের আলো-সেটুকু গেল বন্ধ হয়ে।
তখন সােম মােমবাতি জালাল।
“পে।”
৪
“কী ?”
“জানালার দিকে তাকাও।”
“না গাে। আমার গা ছম ছম করছে।”
“ভূত নয়, পেঙ্গু। গাছের ছায়া।”
“তুমি আমার কাছে এসে বসাে।”
সােম তার শিয়রে বল। বল্ল, “এত সাহসী অথচ এত ভীতু
তুমি। সব মেয়েই তাই।”
সােম তার চুলগুলির ভিতর আঙুল বুলিয়ে দিতে লাগল। পেগী
নীরবে আদর উপভােগ করতে থাকল।
৪৬
আগুন নিয়ে খেলা
সােম বল্ল, “অনেকটা হেঁটেছ আজ। পা কন্ কন্ করছে?”
“করছে।”
সােম তার পায়ের কাছে উঠে গেল। পা’য় হাত বুলিয়ে দিল।
টিপে টিপে দিল।
পেগী বল্ল, “উ। লাগে।”
“একটু লাগবেই তাে। তা নইলে সারবে না।”
পেগী বল্ল, “বড় লাগছে।”
সােম বল, “আচ্ছা, আরেকটু আস্তে টিপছি।”
সােমের নিজেরই নেশা লেগে গেছল। পনের মিনিট কেটে
গেল। সে থাম্বার নাম করে না। বলে, “এবার উরু আর
কোমর।”
পেগী বলে, “আমি আপত্তি করলে কি তুমি শুনবে যে আপত্তি
করব ?”
অর্থাৎ সে সাহলাদে সম্মতি দিল।
তারপর সােম দাবী কল পিঠ।
পেগী বল্ল, “তােমার মাসাজ-এর হাত দেখছি পাকা। কোথায়
কোথায় প্র্যাক্টস্ করেছ?”
সােম বন্ধু, “ওটা আমাদের professional secret.”
সােমের শ্রান্তি ক্লান্তি ছিল না। পিঠের পরে হাত। একঘণ্টা
কেটে গেল। রাত তখন বােধ করি একটা।
পেগী বল্ল, “আমাকে ঘুমাতে দেবেনা?”
৪৭
আগুন নিয়ে খেলা
পেগী বল্প,
“আগে তােমাকে সুস্থ করে তুলি।”
“তুমি যেভাবে অগ্রসর হচ্ছ, আমার শরীরের কোন অঙ্গ বাদ দেবে
!”
“তাতে তােমার লােকসান ?”
“লােকসান? মেয়েমানুষের লজ্জা সরম বলে কি কিছু নেই?”
“ওটা একটা কুসংস্কার।”
“উঃ, আমাকে ডালকুলাের মততা ছিড়ে ফেলল না।”
“আচ্ছা, আরাে আস্তে।”
সােমের উৎসাহ ক্রমশ শ্লীলতার সীমা টপকাতে চায়। বুক।
“টি পারবে না। সরাও, সরাও, হাত সরাও।”
সােম অভিমানে খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। লক্ষপতি ছিল,
কোটীপতি হতে গিয়ে পড়বি তাে পড়, শূন্যের কোটায়। মষ্টি
কালোতে জুয়াে খেলতে গেছল। প্রায় সব পেয়েছিল, সব পাবার
লােভে সব খােয়াল। এখন তাকে গলাধাক্কা দিয়ে casinoর চৌহদ্দি
পার করে দিয়েছে।
সােমের মন গেল গলা ছেড়ে কাঁদতে। কিন্তু তার পৌরুষের
অহঙ্কার ছিল। তাইতে তাকে বাঁচাল। সে চুপটি করে বিছানায়
ফিরে আসার আগে এক ফুয়ে বাতিটি দিল নিবিয়ে। পেগীকে
“গুড নাইট” বলতেও অভিমানে তার মুখ ফুট ছিল না। সে ভাবছিল,
না, কালকেই লণ্ডনে রওয়ানা হবে, পেগী যা ভাবে ভাবুক।
তার সঙ্গে সােমের সম্পর্ক! পথে কুড়িয়ে পাওয়া একটা মেয়ে।
কী-ই বা
৪৮
আগুন নিয়ে খেলা সােমকে দিয়ে পা টিপিয়ে নিল পর্যন্ত। নিশ্চয়ই অন্ধকারে মুখ টিপে টিপে হাসছে। ভাবছে, প্রশ্রয় দিলুম, দিলুম, দিলুম। খেলিয়ে খেলিয়ে বুকের কাছ পর্যন্ত আলুম। তার পরে মারলুম ফটু করে একটা চড়। কুকুর! কুকু! কুকুর! মাথায় উঠত। সােম বােধ করি ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ জেগে বােধ করল কার উষ্ণ নিশ্বাস তার গালের উপর পড়ছে। কে যেন আদর করে তার চোখের পাতার উপর সুগন্ধিযুক্ত রুমাল বুলিয়ে দিচ্ছে। সােম জাগল বটে, কিন্তু অভিমানে কথাটি কইল না। পেগী জানতেই পারল না যে সােম জেগে আছে। সােম বুদ্ধি খাটিয়ে নিশ্বাস ফেলছিল ঠিক ঘুমন্ত মানুষের মতাে। পেগী সােমের কপালের উপর ঝুকে পড়ল। অনেকক্ষণ ধরে’ একটি চুমু খেল। খেল। যেন খাওয়া আর ফুরয় না। এক মিনিট যায়, দু’ মিনিট যায়, পাচ মিনিট যায়। সােম ভাল, পেগী ঘুমিয়ে পড়ল । নাকি ? সােম বল্ল, “পেগ ?” পেগী চমক দমন করে’ সহজ ভাবে বল্ল, “ডিয়ার ?”—ক্ষণেকের জন্যে মুখ তুলে আবার তেমনি ভাবে রাখল। না জানি কত মধু পেয়েছে। শেষ না করে উঠে যেতে চায় না। সােম বল্ল, “পেগ , স্বার্থপরের মত একা খেয়াে না। আমাকেও অংশী হতে দাও।” পেগী বদ্বার ভঙ্গী বদল করে’ সােমের ওষ্ঠের উপর ওষ্ঠ ও সােমের ৪৯
আগুন নিয়ে খেলা
•
অধরের উপর অধর স্থাপন করল। তার বুকের একাংশ সােমের বুকের
একাংশ চুম্বন করছিল।
সােম আনন্দের উত্তেজনায় মূচ্ছা গেল।
গেল। যখন চেতন হল তখন
পেগী উঠে গেছে। সােমের হৃদয় বছিল, আমি পূর্ণ, আমার খেদ
রবে না আজকে যদি মরি। দেহ বছিল, কী জ্বালা ! কী জ্বালা! আমার
শিরায় শিরায় মশাল জ্বছে। সমুদ্রে ডুব দিয়ে মরব।
সােম বিছানা ছেড়ে অনেকক্ষণ পায়চারি করল-ধীরে, অতি ধীরে
যাতে পেগীর ঘুম না চটে যায়। জানালার কাছে এসে স্ক্রীন খুলে
দিল। সমুদ্রের হাওয়া ঝির ঝির করে তার গায়ে এসে লাগল। তার
দেহ স্নিগ্ধ হল।
আবার বিছানায় ফিরে এল। ভাতে লাগল, কী আশ্চর্য
এই জগৎ, কী আশ্চর্য্য মানুষের জীবন ! পৃথিবীর এক কোণে তার
জন্ম, পেগীর জন্ম আর এক কোণে। তেইশ বছর তার খোঁজে কাটিয়ে
দিয়েছে, এতদিন পায়নি। অকস্মাৎ ভিক্টোরিয়ার ভুল ট্রেনে সাক্ষাৎ।
প্রথম রাত্রে সে স্বল্পপরিচিতা, সৌজন্যময়ী। দ্বিতীয় রাত্রে সে অবিজি
রহস্যময়ী। তৃতীয় রাত্রি পর্থকওলে। চতুর্থ রাত্রি এইখানে।
রাত্রি নয়, যেন চারটি যুগ।
সােম একে একে প্রত্যেক যুগের ইতিহাস মনে লিখতে লিখতে
কখন ঘুমিয়ে পড়ল।
।
।
তারও আগের দিন
ব্রিষ্টলের একটা residential হােটলের যে ঘরে লােকে খায় বসে
ও স্মােক্ করে সেই ঘরে সােম বসে’ পেগীর জন্য অপেক্ষা করছিল। পেগী
এলে দু’জনে প্রাতরাশ করবে।
ঘরটি লম্বা। একখানি মাত্র টেবিল। সেটিকে ঘিরে প্রায় বিশ
জনের আসন। টেবিলের উপর একতাল রুটি। দু’টি কি তিনটি পাত্রে
অনেকখানি জ্যাম। বােধ হয় হােটেলের নিজের তৈরি। মার্গারিনের
মতাে দেখতে খানিকটে সস্তা মাখনের অল্পই অবশিষ্ট আছে। কেননা
ইতিমধ্যে ব্রেকফাষ্ট খাওয়া হয়ে গেছে এবং দেরি করে যারা উঠেছে
তাদের খাওয়া চলেছে।
তাদের প্রত্যেকেই খেতে বদ্বার আগে একবার সােমকে বলেছে,
“খাওয়া হয়ে গেছে আপনার ?”
সােম বলেছে, “না।”
“আসুন, খেতে বসি।”
“ধন্যবাদ। আমি একজনকে অপেক্ষা করছি।”
প্রত্যেকের খাওয়া শেষ হয়ে যায়, আরেকবার সােমের সঙ্গে আলাপ
জমাবার ছল খোজে। বলে, “দিনটা চমৎকার।”
আগুন নিয়ে খেলা
সােম বলে, “মৎকার।”
“এবারকার মতাে ঈষ্টার আর হয় নি।”
“শুতে পাই।”
“কোথা থেকে আছেন?”
“লণ্ডন থেকে।”
“ওঃ, লণ্ডন। তা হলে আমাদের ব্ৰিষ্টলকে আপনার মনে ধরবে না।”
কেউ বলে, “আমি আছি কার্ডিফ থেকে।”
“কার্ডিফ ? সে কত দূর?
“এই তাে, চ্যানেলের ওপারে।”
“ওয়েল দেখতে ইচ্ছে করে।”
“দেখেন নি ? দেখবার মতাে। Wye Valleyর নাম শুনেছেন?”
“না।”
“সুন্দর।”
“কার্ডিফের কয়লার খনির কুলীদের ভারি দুর্দশা, না?”
“হবে না? ব্যাটারা গোঁয়ার। হিতবাক্য শুনবে না। ওদেরই তাে
দোষ।”
এ বিষয়ে একমত হতে পারলুম না।”
ঘরের একাংশে কয়েকখানা গাইড বই ও ডাইরেক্টরি ছিল। সােম
পাতা উল্টানােতে মন দিল। খুঁজে বের করতে হবে রামমােহন
রায়ের সমাধি-মন্দির শহরের কোন অঞ্চলে। জিজ্ঞাসাও কবুল
একজনকে।
৫২
আগুন নিয়ে খেলা
“বলতে পারেন রাজা রামমােহন রায়ের সমাধি কোনখানে?”
“কার, বলেন?”
“রাজা রামমােহন রায়ের। একজন প্রসিদ্ধ ভারতীয়ের।”
(Shrug করে’) “আমার তাে জানা নেই। এই এণ্ডজ, জানাে
একজন ইণ্ডিয়ান মহারাজার কবর এ শহরের কোনখানে?”
এণ্ডজ, জানে না। কিন্তু গােরস্থানগুলাের নাম করল। আজ
রবিবার, দু’টোর আগে কোন গােরস্থানে ঢুকতে দেবে না।
ইতিমধ্যে সােমের মন “ওয়েল-এর দিকে রওয়ানা হয়েছিল। কাল
রাত্রে ব্রিষ্টলের যতটুকু দেখেছে ততটুকু তাকে আকৃষ্ট করেনি। লণ্ডনেরই
সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। ভেবেছিল সমুদ্রের উপরে। তাও নয়। লণ্ডনের
একটা খেলাে সংস্করণ। যে নাটক লণ্ডনে বহুদিন অভিনীত হয়ে আর
চল না সেই নাটক এখানে স্থানান্তরিত হয়েছে। পেগীকে নিয়ে কোনাে
একটা থিয়েটারে যেত, কিন্তু প্রােগ্রাম দেখে পা সরেনি।
পেগীর প্রবেশ।
(চেয়ার ছেড়ে দাড়িয়ে) “গুড মর্ণিং, মিস্ স্কট।”
( সলজ্জে) “গুড মর্ণিং, মিষ্টার সােম। আমার খুব দেরি হয়ে গেছে ?”
“খুব না। মােটে দেড় ঘণ্টা।”
“মােটে দেড় ঘণ্টা ? আমি ভেবেছিলুম আপনার মুখে শুন্
দেড় শতাব্দী। নাঃ, আপনি poetও না, loverও না, ভুল ভেবেছিলুম।”
“বাকী থাকে lunatic; বােধ করি তাই ?”
“যাক, খাওয়া হয়েছে ?”
আগুন নিয়ে খেলা
“আপনার কী মনে হয় ?”
“হয় নি। কিন্তু কেন ?”
“সেটাও অনুমান করুন।”
“দি তা হলে আপনার হাত। তাই দেখে’ বম্ব। (তা দেখে’)
হাতে লিখেছে আপনি পেগী স্কট নাম্নী একটি মহিলার আসার পথ চেয়ে
বসে’ কড়িকাঠ গুছিলেন।”
“শেষটুকু ভুল। ডাইরেক্টরি ঘাটছিলুম। তার মানে কাজ গুছিয়ে
রাখছিলুম।”
“সেই কথাই তাে আমিও বলি। আপনি poetও না, loverও না,
আপনি কাজের মানুষ। আমাদের মতাে বিছানায় পড়ে পড়ে পাঁচ
মিনিট পর পর ভাবেন না যে, থাক্, আর পাঁচ মিনিট পরে উঠব।”
“পাঁচ মিনিট আগে উঠলে পাঁচ মিনিট আগে একজনকে দেখতে
পাব এমন যদি ভেবে থাকি সে কি আমার অপরাধ ?”
“তা হলে অন্তত দরজায় একটা টোকা মেরে জানিয়ে যেতে হয় যে
হুজুর দেখতে চান।
“মানুষের ঘুম ভাঙিয়ে দিলে মানুষ তেড়ে মারতে আসে।
আমি তেমন মানুষ।”
“না, না, আর দেরি নয়। আসুন, খেতে বসি। কই, এরা কি
কেউ কফি তৈরী করে দিয়ে যাবে না? কে আছে ?” (একজন
কফি দিয়ে গেল।) “মিষ্টার সােমের আজকের প্রােগ্রাম কী ?
“আপনার আগে বলুন।”
৫৪
আগুন নিয়ে খেলা
“আমি মাসিমার বাড়ী যাচ্ছি। সেইখানেই থাকব আজ। কালকের
ট্রেনে লণ্ডন।”
“আর আমি যাচ্ছি ওয়েলস। ব্রিষ্টলে আমার মন টিকছে না।”
“ও মা, তাই নাকি। আমি ভাবছিলুম কে আমাকে কাল ট্রেনে
বসিয়ে দেবে।”
“ট্রেনে বসিয়ে দিতে কেউ হয় তাে রাজি আছে, কিন্তু কার্ডিফ,
থেকে।
“এত চুলাে থকৃতে কার্ডিফ ? আমাদের কাজের মানুষটি কি কয়লার
আড়ৎদার ?”
“কয়লার কুলীদের দুরবস্থাটা একবার চাক্ষুষ দেখবার অভিপ্রায় আছে।”
“কুৎসিতের মধ্যে আপনাকে আমি যেতে দেব না। সে যে
আমার দেশের কলঙ্ক।”
( চমৎকৃত হয়ে) “তবে সৌন্দর্যের মধ্যে নিয়ে চলুন। Wye
Valleyতে ?”
“আজকেই ?”
“কাল তত আপনি লণ্ডনে চল্লেন ?”
“তবু মাসিমা আটকাবেন।”
“মাসিমার সঙ্গে দেখা নাই করলেন?
“বটে! যে কারণে এতদূর এলুম সেইটেকে বিসর্জন দেব ?”
“বলুন, ‘যে অছিলায় এতদূর এলুম।” (সােম মুখ টিপে টিপে
হাসছিল।)
আগুন নিয়ে খেলা
ভাবছেন আপনাকে ছাড়তে না পেরে এখানে এসেছি ?”
“কিম্বা আমি ছাড়তে চাইনি বলে’ এখানে এসেছেন।”
“কী ধৃষ্টতা!”
“কী কপট কোপ!”
“বেশী চটাবেন না। সবটা মাখন খেয়ে শেষ করে ফেস্ব।”
“মােটা হবার ভয় নেই ?”
“হলে তাে বেঁচে যাই। ছাড়তে চাইনে’—বলে’ কেউ পিসী মাসীর
প্রতি কর্তব্য ভুলিয়ে দেয় না।”
“কিন্তু মােটা হতে আপনাকে আমি দেব না। সে আমার
সৌন্দৰ্য্যবােধের উপর অত্যাচার। অতএব দি ওটুকু মাখন।”
পেগী তার মাসিমার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। একলাটি যাবে ?
মিষ্টার সােম তাকে পৌছে দেবেন না?
সােমের বড় সঙ্কোচ বােধ হচ্ছিল। পেগীর সঙ্গে তার পথে পরিচয়।
মাসিমা যদি জিজ্ঞাসা করেন, “আমাদের পেগীর সঙ্গে আপনার খুব
বন্ধুতা, না?” সােম কী বলে’ উত্তর করবে ? বলবে, “দু’দিনের
পরিচয়ে যতটা হয় তার বেশী নয়।” কিন্তু সত্যি তার বেশী নয় ?
সােম নিজের হৃদয়কে প্রশ্ন করল। হৃদয় উত্তর না করে’ লাজুক বন্ধুর
মতাে থর থর করে কাঁপতে লাগল।
কিম্বা ফুর্তি করে বলবে, “এত বন্ধুতা যে সেই জোরে আপনাকে
Auntie' বলে ডাকতে ইচ্ছে করছে।” কিন্তু ফুর্তির পরেই হৃদয়
আগুন নিয়ে খেলা
নিজ মূর্তি ধরবে।
হৃদয়ের কঁপুনি এত উত্তাল হবে যে কানে
বাজবে।
সােম বেঁকে বল্ল। ব্ৰিষ্টলে তার থাকতে রুচি নেই, সে বাৱােটার
ট্রেনে কার্ডিফ যেতে চায়। পেগীর কাছে যদি পেগীর মাসিমা-ই হয়
বড়, পেগীর বন্ধু কেউ না হয়—তবে পেগী একাই যাক্, একাই থাক্।
আশা করা যায় মেলােমশাই ট্রেনে তুলে দিতে পারবেন, দুই হাতে করে
তুলে দেবেন, ছােট খুকীটি কি না।
বলবেন, “Ninky deaf, আমাকে দু হাতে তুলে ট্রেনে চাপিয়ে
দাও না? আমি উঠতে গেলে পড়ে যাব যে। এমনি করে আব্দারের
সুরে বল্বেন।” (সােম সুরের নমুনা দিল।)
“উপদেশটা মাঠে মারা গেল। আমার মাসিমা সূতত কাটেন।”
“Spinster? তা হলে তাে বােন-ঝি’টিকে পেলে লুফে নেবেন।
ছেড়ে দেবেন না কালকের আগে। আমাকে খালি হাতে ফিরে আতে
হবে হােটেলে।”
“একা থাকতে পারবেন না ?”
“একা যদি থাকতেই হয়, ব্রিষ্টলে কেন?”
“বুঝেছি। পথে আরেকটি সঙ্গিনী পাবার আশা রাখেন।”
“একজন যুবকের পক্ষে কি সেটা অন্যায় আশা, মিস্ টু ?”
“অতি ন্যায়সঙ্গত আশা। কিন্তু আমাকে আপনি ভাবতে কারণ
দিয়েছিলেন যে আপনি সকলের মতাে ন।”
“কাদছেন?”
৫৭
আগুন নিয়ে খেলা
“কই, না? হাসছিই তাে।”
“তবে বুঝতে হবে হাসি ও কান্না একই জিনিষ। অনুমতি দেন তােত
চোখ মুছে দিই।”
“ধন্যবাদ। অত গ্যালান্ট-পন দেখাতে হবে না। বিদায়।”
(পেগী যাবার জন্য পা বাড়াল।)
“বিদায়।”
( হঠাৎ সশব্দে হেসে) “আসুন না আমার ট্যাক্সিতে ? আপনাকে
ষ্টেশনে নামিয়ে দিয়ে যাব।”
“ধন্যবাদ, মিস্ স্কট। কিন্তু আমার ট্রেনের দেরি আছে। পায়ে
হেঁটে শহর দেখতে দেখতে যাব।”
ট্যাক্সি চ'লে গেল। সােম ভগ্নহৃদয়ে নিজের ঘরে ফিরে এল।
হাত-ব্যাগটি নিয়ে এখুনি বেরিয়ে যাবে, যেদিকে দুই চোখ যায়।
তারপর ট্যাক্সিতে করে’ ষ্টেশনে যাবে।
দু’দিনের সান্নিধ্য মিস্ স্কটের প্রতি তাকে আসক্ত করেছিল। মিস
স্কট গেছে, কিন্তু আসক্তি থেকে গেছে। সােম বিছানায় শুয়ে পড়ে
খানিকক্ষণ কাদবে ভাবছিল, যদি আসক্তিটা জল হয়ে কেটে যায়।
স্মৃতির বােঝা বয়ে পথে চলা যায় না। পথিকের পক্ষে একটা হাতব্যাগই
থেষ্ট বােঝ।
কিন্তু বাসি বিছানায় শুতে তার প্রবৃত্তি হয় না। সে ব্যাগটা হাতে
করে’ করিডর দিয়ে সিড়ির দিকে যাচ্ছে, এমন সময় হােটেলওয়ালার
মেয়ের সঙ্গে দেখা। তার হাতের উপর একটা টিয়া পাখী।
আগুন নিয়ে খেলা
।
“আর ফিরে আসছেন না, মিষ্টার ?”
“না, মিস্।”
“আবার কখনাে এলে এইখানেই উঠবেন।”
“যদি কখনাে আসি। কিন্তু যদি কথাটা ‘আসি কথাটার থেকে
অনেক অনেক বড়াে।”
“কখনাে আসবেন না?”
“আপনার দেশ তত আমার দেশ নয়, মিস। আমার দেশে ফিরে
যেতে হবে না ?
“আপনার মা-বাবা এদেশে নেই ?”
“দেশে দেশে আর সব পাওয়া যায়। টিয়া পাখী পৰ্যন্ত। কিন্তু
মা-বাবা একটু দুষ্প্রাপ্য। না, মিস ?”
( সকৌতুকে) “টিয়া পাখী আপনার দেশে পাওয়া যায়?”
“ঝাঁকে ঝাঁকে। ক’টা চান্ ?”
“তা বলে আমার ‘জি’-এর মতাে টিয়ে কখনাে পাওয়া যাবে না।
যা বলেছেন, একটু দুষ্প্রাপ্য। দেখুন, দেখুন, কেমন দুষ্ট। কামড়াতে
চায়। আমি ওর মা, আমাকে ও কামড়াতে চায়। যেন আমি ওর
খাদ্য। লক্ষ্মীছাড়া ছেলে।”
সােম একটু আদর করল ‘টিয়াটিকে। আদর করলে কামড়াতে,
আসে। সােম মনে মনে বল্ল, “মেয়ে মানুষের মতাে।” মনে মনে
হা। উপমাটা ঠিক হয়নি বটে, কিন্তু নিষ্ঠুর হয়েছে। মিস্ স্কটুকে
শােনাতে পারলে গায়ের জ্বালা মিত। কিন্তু মিস্ স্কট ঠিকানা দিয়ে
আগুন নিয়ে খেলা যায় নি। এত বড় জগতে যাকে একদিন অকস্মাৎ পেয়েছিল আজ তাকে অকস্মাৎ হারিয়েছে। মিস্ স্কটু যেন একটা স্বপ্ন। “তা হলে বিদায়, মিস্।” “বিদায়। কিন্তু আসবেন, বুঝলেন ? দেশে যাবার আগে একবার আসবেন।” ‘আমার যাবার বেলায় পিছু ডাকে। সােম যখনি যেখানে গেছে সেখানে ভালােবেসেছে ভালাে বাসিয়েছে। কত জনকে কথা দিয়েছে, “হাঁ, আসব বৈকি, আবার একদিন আসব” কিন্তু পারে না যেতে। ওটা শুধু কথার কথা। উভয় পক্ষের সাময়িক সন্তোষের জন্য । সােম ট্রাম পেল না। রবিবারের সকাল বেলা ট্রাম-চলাচল বন্ধ থাকে ইংলণ্ডের সর্বত্র। পায়ে হেঁটে অলি-গলি ঘুরতে ঘুরতে একটা পার্কে গিয়ে পড়ল। সেখানে পলিটিক্যাল বক্তৃতা শুল। তারপর নদী দেখতে গেল। ছােট নদী। নাম বিশ্ববিদিত। শেল্পীয়ারের Avon. পরিশেষে ষ্টেশনে পৌছল। কি কার্ডিফের টিকিট। ট্রেন প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে। মিনিট পনেরাে পরে ছাড়বে। সােম একটি জায়গা দখল করে হাত ব্যাগটি নাখল। প্ল্যাটফর্মে নেমে পায়চারি করতে থাকল। রবিবারের কাগজ বিক্রী হচ্ছিল। খান দুয়েক কি। মিস্ স্কটের জন্য তার মন কেমন- করা কমে এসেছে, মন উন্মুখ হয়েছে Severn নদী দেখতে। Severn নদীর তলার সুড়ঙ্গ দিয়ে যেতে কতক্ষণ লাগবে সােম তার হিসাব আগুন নিয়ে খেলা করছে। Severn নদী যেখানে সমুদ্রে মিশেছে সেখানটা নদীর বহুগুণ চওড়া। সােমর কামরায় কারা কখন জায়গা নিয়েছে সােম লক্ষ্য করেনি। সােম ধেয়ানেSevern Tunnelএর ছবি ও নয়নে রবিবাসরীয় পত্রিকার ছবি দেখছিল। ট্রেন ছাড়বার সঙ্কেত শুনে কাগজ থেকে চোখ না তুলেই কামরায় উঠে বল্ল। তারপর অনেকক্ষণ ধরে Sunday Pictorialএ নিবিষ্ট রইল। হঠাৎ ভূত দেখলে কেমন বােধ হয় সে অভিজ্ঞতা আমাদের প্রত্যেকরই আছে। সােম প্রথমটা কাঠ হয়ে গেল। তার হৃৎস্পন্দন বন্ধ, নিশ্বাস প্রশ্বাস স্থগিত, দৃষ্টি পক্ষাহত। কয়েক মিনিট কয়েক ঘণ্টা—কেটে গেলে পরে লাফ দিয়ে দাঁড়াল। যেন স্প্রিংযুক্ত কলের পুতুল। সাহস হচ্ছিল না, তবু দুই হাত দিয়ে পেগীকে স্পর্শ করে’ জিজ্ঞাসা করল, “মাফ করবেন আমাকে। আপনি কি পেগী স্কট? না, আমার মতিভ্রম ?” কামরায় লােক ঠাসা। একটা কালাে মানুষের কাণ্ড দেখে সকলেরই চক্ষু স্থির। পেগী চট করে সােমের অবস্থাটা আন্দাজ করে নিল। পরম বিস্ময়ের ভাণ করে’ বল্ল, “হলাে ! আপনি এখানে ! আমার পাঁচ বছর পরে দেখতে পাওয়া বন্ধু মিষ্টার সােম! এতক্ষণ চিন্তে পারিনি বলে মাফ করবেন তাে ?” এই বলে’ পেগী তাকে হিড়হিড় করে কামরার বাইরে করিডরে নিয়ে গেল। সােম তখনাে অপ্রকৃতিস্থ। পাঁচ বছর আগে সে তত ভারতবর্ষে ছিল।
আগুন নিয়ে খেলা ৪ পেগী বল্প, অন্যমনস্ক মানুষ ঢের দেখেছি, কিন্তু এমনটি এই প্রথম। ছি-ছি, এক গাড়ী মানুষের সামনে কী রঙ্গই করলেন?” “কিন্তু আমি এখনাে বুঝতে পারছিনে, মিস্ স্কট—* “মাসিমাকে মিথ্যে বলে’ পালিয়ে এসেছি। বলেছি, কার্ডিফে আমার ইয়ং ম্যানের সঙ্গে যাচ্ছিলুম, পথে পড়ল ব্রিষ্টল, ভাবলুম আপন মাসিমার সঙ্গে দেখা না করে গেলে ঘাের অকৃতজ্ঞতা হবে। মাসিমা বল্লেন, তবে তােকে আটকাব না, পেগ। শেষকালে অভিশাপ দিবি। তােকে ষ্টেশনে দিয়ে আসব? বলুম, ধন্যবাদ, মাসিমা। কিন্তু আজকালকার মেয়েরা chaperon দরকার করে । তাতে করে আমার ইয়ং ম্যানকে অ-পদস্থ করা হয়। যার যা কাজ। মাসিমা খুব হাস্লেন। বল্লেন, তাকেও এখানে আনলিনে কেন, ঘুড়ি। আমি তার কী জবাব দিই বলুন! আপনি কি আমার মুখ রেখেছেন ? বন্ধুম, তারও এখানে একটি পিসীমা আছে।” সােমের হাসি আর থামে না। এদিকে Severn নদীর সুড়ঙ্গও আর আসে না। সােম সে কথা ভুলে গেছল। কিন্তু তার কামরায় যারা ছিল তারা ঐ পথ দিয়ে সকাল সকাল বাড়ী পৌছনাের জন্যে উৎকণ্ঠিত। ব্রিষ্টল থেকে কার্ডিফে যাবার দুটো রেলরাস্তা। একটা সুড়ঙ্গ দিয়ে সংক্ষেপে, অন্যটা নদী যেখানে সঙ্কীর্ণ সেইখান অবধি গিয়ে সেতুর উপর দিয়ে। সােমরা যখন কামরায় ফিরে এল তখন তাদের আচরণ সম্বন্ধে কারুর মুখভাবে কোন সন্দেহ বা কৌতূহল বা নিন্দা প্রকাশ পেল না।
আগুন নিয়ে খেলা সকলে ভাবছে ট্রেনের আচরণের কথা। সে যে এমন করে’ দাগা দেবে কেউ প্রত্যাশা করেনি। তারা তাই নিয়ে উত্তেজিত হয়ে তর্ক করছে। সােম ও পেগী তর্কের আসরে ভিড়ে গেল। সুড়ঙ্গটা ফস্কে গেল বলে সােমের আফশােষ সকলের আফশােষকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। অন্যদের আফশােষ তাে এই যে অন্যেরা যথাসময়ে মধ্যাহ্নভােজন করতে পাবে । একটি মেয়ে প্রত্যেকের কাছে একবার করে দুঃখ জানাচ্ছিল এই রকম যে, সুড়ঙ্গের ওপারের ষ্টেশনে তাকে নেবার জন্যে একজন (অর্থাৎ তার ইয়ং ম্যা) এসে নিরাশ হবে। আর এই যে ট্রেনটা এটাও ঘুরে ফিরে সেই ষ্টেশন দিয়েই কার্ডিফ যাবে। একেবারে ওদিক মাড়াবে না এমন নয়। কিন্তু অন্তত একটি ঘণ্টা দেরি করবে! কী জানি! সােমের সঙ্গে এক টেকো বুড়াের গল্প চছিল। বুড়াে, তার বুড়ী ও বন্ধুরা মিলে জ্যামেকা বেড়াতে গেছল। এই ফিরছে। সঙ্গে বিস্তর তােড়জোড়। ওরা শুধু হেঁটে বেড়ায়নি, সে তাদের গলফ খেলার বহুল উপকরণ দেখে অনুমান করা যায় । এও তাে ইণ্ডিজ, সেও তত ইণ্ডিয়া, তবে জ্যামেকার সঙ্গে ভারতবর্ষের তফাৎ কী! টেকোর প্রশ্নটা হল এই ভাবের। সােম থতমত খেয়ে বল্প, “তাই তাে।” সােম ভেবে বল, “ভারতবর্ষে আম হয়।” টেকো বাখানাে দাঁত বের করে বল্ল, “জ্যামেকাতেও আম হয়। আমরা খেয়ে এসেছি, না ডরাের্থী ?
আগুন নিয়ে খেলা স্ত্রী বল্লেন, “সঙ্গে করেও কিছু এনেছি। কার্ডিফে নেমে সােম ও ও পেগীর প্রথম ভাবনা হল এই অবেলায় কোনাে রেস্তোরাঁতে পেট ভরে খেতে পাওয়া যাবে কি যাবে না। কিন্তু পাওয়া গেল। ষ্টেশনের কাছেই রেস্তোর।। ক্ষুধার পরিমাণ অনুসারে খাদ্যের পরিমাণ স্থির করে ওয়েট্রেসকে বল্ল, “জদি করাে।” গল্প করবার মতাে শক্তি দু’জনের কারুর ছিল না। দু’জনে দু’জনের কথা ভাবছিল। আর মুচকে মুচকে হাছিল। কেই বা ভেবেছিল আবার তারা এক সঙ্গে খেতে ববে ? পরস্পরের সান্নিধ্য পাবে? পরস্পরের সাক্ষাৎ পাবে? কেউ কারুর ঠিকানা জান্ত না। ধরাে যদি বারােটার গাড়ীতে সােম না আন্ত, আত আগে কিম্বা পরে, তবে পেগী কি কোনােদিন তার দিশে পেত? সম্ভবত কোনাে ভারতীয় ছাত্রকে জিজ্ঞাসা কবুত, “মিষ্টার সােমকে চেনেন ?” কিন্তু ভারতীয় কি লণ্ডনে দশটি বিশটি আছে? আর মিষ্টার সােম যে দশ বিশ জন নেই তারই বা কোন স্থিরতা? সােমের ‘খ্রষ্টান নাম’টা পর্যন্ত পেগীর জানা নেই। পেগী হয় তত বুদ্ধি খাটিয়ে ‘টাইমস সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় faseteta fro: Shome. Meet me at Piccadilly circus on Saturday at 1-30-Peggy. কিন্তু সে বিজ্ঞাপন হয় তাে সােমের চোখ এড়িয়ে যেত। আর পেগী যে ‘টাইমস্ কাগজে বিজ্ঞাপন দিত এমন সম্ভাবনা অল্প। পেগীর প্রিয় কাগজ, ডেলী মিরার। ওখানা ৬৪ আগুন নিয়ে খেলা সােমের চোখে পড়ে না। তবু সােম হয় তত মা খানেক ‘ডেলি মিরার’-এর প্রত্যেকটি বিজ্ঞাপন অধ্যয়ন করত। পরিতােষপূৰ্ব্বক আহার সমাপন করে’ দু’জনে চল্প কার্ডিফ দেখতে। পরিষ্কার তক্তকে শহর। ব্ৰিষ্টলের চাইতে সুখদৃশ্য। সােম বল্ল, “কই, কুৎসিত নয় তাে?” পেগী বল্ল, “যেদিকটা গরীব লােকরা থাকে সেদিকটা কুৎসিত। কিন্তু সেদিকটা আপনি দেখতে পাবেন না।” এই বলে’ পেগী তাকে পেনাৰ্থ নামক উপকণ্ঠে যাবার বাএ তুলে দিয়ে নিজেও উঠে বল্ল। পেনার্থ, সমুদ্রের উপকূলে। তার অনতিদূরে বনানী। দিনটিও সেদিন ছিল রৌদ্রময়ী। সােম মুগ্ধ হয়ে গেল। বল্ল, “আমার যদি দেদার টাকা থাকৃত আমি সমুদ্রের থেকে ত্রিশ হাত দূরের ওরি একটা হােটেলে সাত দিন থাকতুম। কিন্তু যা আছে তাতে দুশাে হাত দূরের একটা বাের্ডিং হাউসেও কুলবে না। অতএব আমরা আজ রাত্রিটা পেনার্থে কাটালুম না, মিস্ স্কট।” পেনার্থ ত্যাগ করতে তাদের পা সবৃছিল না। কার্ডিফে ফিরে এল। সেখানে পেগী বল্ল, “ভালাে কথা। মাসিমা বছিল, “তাের ইয়ং ম্যানকে বলি পৰ্থকওল যেতে। কার্ডিফ থেকে বেশী দূর । নয়। ছােট গ্রাম, কিন্তু অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর।” সােম বল্ল, “তাই চলুন। হয় তাে অল্প খরচে সমুদ্রের ধারে বাসা পাব।”
আগুন নিয়ে খেলা
৫
পৰ্থকও-এর বাস্-এর অপেক্ষায় আছে এমন সময় চিরকুটপরা
একটি রােগা মানুষ তাদের সামনে হাত পাল। “একটি পেনী দি।”
পেগী বল্ল, “ভাগ। নইলে পুলিশে ধরিয়ে দেব। ভিক্ষা করি
কেন ?”
“রাত্রে মাথা গু জবার আশ্রয় চাই যে।”
“খেটে খানে কেন?”
“হা হা হা। তার উপায় কি আপনারা রেখেছেন ? কাজও
দেবেন না ভাতও দেবেন না, দিতে পারেন কেবল পুলিশে !”
সােম বল, “তুমি খনির কুলি ?”
“আমি খনির কুলি।”
পেগী বল্ল, “দেশের শত্রু।”
“কারা শত্রু তা বােঝা গেছে।”
সােম তাকে দু’জনের হয়ে দু’টো পেনী দিয়ে বল্ল, “তােমরা তাে
দেশের লােকের কাছ থেকে অনেক দান পাচ্ছ, তবু রাত্রে শােবার
জায়গা পাও না?”
*পেলে ভিক্ষা করি সাধে ?”
“কাগজে তাে লিখছে—
“কাগজওয়ালারা আমাদের শত্রু।”,
পেগী বল্ল, “যা, যা, বাজে বকিসনে। দেশশুদ্ধ তােদর শত্রু।”
“বিশ্বাস করছেন না। আমি অবিবাহিত বলে’ দানের অংশ আমাকে
নামমাত্র দেয়।”
আগুন নিয়ে খেলা
““তাই বল্। কিন্তু সবাইকে শক্ত ঠাওরানে।”
লােকটা চলে গেলে সােম বল্ল, “লােকটা কী তেজস্বী !”
পেগী বল্ল, “আমার দেশের সবাই তেজস্বী। তাই আমাদের ঘরােয়া
বিবাদ গেল না। দেখ না ওরা বাড়াবাড়ি করে কী ক্ষতিটাই করা’ল।
অবশ্য আমি খনির মালিকদেরও ক্ষমা করিনে। দু’পক্ষই দেশের শত্রুতা
করেছে।”
পৰ্থকওলএর বাস যখন এল তখন ছ'টা বেজে গেছে। অল্পক্ষণ
পরে গােধূলির আলােটুকুও রইল না। অন্ধকারে বা চলতে লাগল
ঘােট ঘােট গ্রাম ছাড়িয়ে। পেগী ও সােম খুব কাছাকাছি বসেছিল
হাতে হাত রেখে। তারা আজ উভয়ে উভয়ের জন্যে অনেক দুঃখ
পেয়েছে, বিচ্ছেদের দুঃখ। বিচ্ছেদের পরে মিলিত হয়ে অনেক সুখও
পেয়েছে। সুখ দুঃখের অতীত
একটি সহজ প্রাপ্তির ভাব তাদের
বিভাের করেছিল। তারা সঙ্গী ও সঙ্গিনী। এই সম্পর্কটি অন্য কোনাে
সম্পর্কের মতাে ধরাবাঁধা নয়। পরস্পরের কাছে তাদের কোনােরূপ
বাধ্যবাধকতা নেই। প্রেমের মধ্যে দায় আছে—দেবার ও পাবার
তাড়না। যারা ভালােবাসে তারা পরস্পরের অধীন। একেবারে
ক্রীতদাস। বন্ধুতাও প্রেমধর্মী। সেও এক প্রকার বাঁধন। কিন্তু
সাথীত্ব জিনিষটির মধ্যে মুক্তি আছে। ও যেন পদ্মপত্রের সঙ্গে বারিবিন্দুর
সম্পর্ক। কিম্বা তৃণের সঙ্গে শিশিরবিন্দুর।
কাল আমরা লণ্ডন ফিরব। সেখানে কেউ কারুর কথা ভুলেও
ভাবব না, কেউ কারুর নাম মনেও আন্ না। আমাদের নিজের
৬৭
আগুন নিয়ে খেলা নিজের কাজ আছে, দল আছে। আর লণ্ডন শহরটাও একটা গােলক ধাধা। কে কোন পাড়ায় থাকে ছ'মাসে একবার খবর নেওয়া হয়ে ওঠে না। আমি গেলুম তােমাকে দেখতে Crouch End, তুমি গেছ আর কাউকে দেখতে Golders Greenএ। ফোন করলুম, চিঠি লিখলুম, তবু তুমি জরুরি কারণে বাড়ী থাকলে না। সেই জন্যে লণ্ডনের বাইরে যে দু’টি মানুষ একত্র হওয়া মাত্র এক হয় লণ্ডনে ফিরে এলেই তারা আবার সেই একাকী। পৌনে এক কোটি লােকের মাঝখানেও একাকী। প্রত্যেকের দল আছে, কিন্তু একাকী একাকিনীর দল। কেউ কারুর সাথী নয়। লণ্ডনে প্রেম হয়, বন্ধুতা হয়, কিন্তু সাথীত্ব হয় না। অন্ধকার সন্ধ্যায় নির্জন প্রান্তর দিয়ে বাস ছুটেছে। পেগী ও সােম দু’টি দূর দেশের পাখীর মতাে আকাশের পথে পাশাপাশি ডানা চালাচ্ছে। কাল যখন সন্ধ্যা হবে তখন আজকের সন্ধ্যা জগতেও থাকৃবে না স্মরণেও থাকবে না। সােম হয় তত পেগীর সাথীত্বের লােভে লণ্ডনে ফিরবে, কিম্বা আরাে পশ্চিমে যাবে—এক ধাক্কায় আয়ারলণ্ডটাও কাবার করে আসবে। আবার যেন এত খরচ করে ওয়েল দিয়ে আয়ারলণ্ডে না যেতে হয়। ইকনমি বলে একটা কথা আছে তাে। বাস্ যখন পৰ্থকওলে থাল তখন আটটা বেজে গেছে। পেগী ও সােমের সাথীত্বের ঘাের কাটল। বােধ হয় একটু তন্দ্রাও এসেছিল। হঠাৎ এত আলাে দু’জনের চোখ ঝলসে দিল। দু'ঘণ্টা
আগুন নিয়ে খেলা
এক জায়গায় বসে তাদের পায়ে খিল ধরে’ গেছল। সােম পেগীকে
ধরে’ নামাল।
!
পেগী বল্ল “রােজ রােজ ভালাে লাগে না, মিষ্টার সােম।”
“কী ভালাে লাগে না, মিস স্কটু ?”
“যদি বলি আপনাকে ভালাে লাগে না?”
“তবে বলব মিথ্যা বলছেন।”
“ইস্! কী অহঙ্কার !”
“কেন, আমি কি সুপুরুষ নই ?”
“আলকারার মত কালাে যে !”
“বলুন, ওথেলাের মতাে।”
“ও মা, তা হলে যে আমার প্রাণটি যাবে।”
“আপনার প্রাণের উপর আমার লােভ নেই। আশ্বস্ত হতে পারেন।”
“তবে কিসের উপর ?”
“এই ধরুন সাথীত্বের উপর। আপনি দু’বেলা আমার সঙ্গে সঙ্গে
ঘুরবেন। এইতে ওথেলাে খুসী।”
“কী অসাধারণ দাবী ! চাকরের কাছেও এমন দাবী করলে সে জবাব
দিয়ে নিষ্কৃতি পায়।”
“নিষ্কৃতির জন্যে আপনাকে অত কষ্টও করতে হয় না। ট্যাক্সি ডাকান,
মাসির বাড়ী হাঁকা। চাকরও তত সাতদিনের নােটিশ না দিয়ে
ভাগে না।”
(আগুন নিয়ে খেলা
“ভারি রাগ করেছেন? না ?”
“রাগ করলে ঘরের ভাত বেশী করে খাব। আপনার তাতে
লােকসান ?”
“কী সাংঘাতিক লােক! ভেবেছিলুম আপনি সকাবেলার ঘটনা
ভুলেও গেছেন, ক্ষমাও করেছেন। কিন্তু মনে মনে এত ।”
সােম বল্ল, “যাক, কী বলছিলেন, বলুন। বােজ বােজ কী ভালাে
লাগে না?”
“না, মশাই, আর বলব না যে আপনাকে ভালাে লাগে না। চার
দিনের ছুটীতে বেরিয়েছি, একটু আনন্দ পেতে আর দিতে। কাউকে
যদি রাগিয়ে তুলি তবে তাে আমার ছুটীটা মাটি।”
“কী করবেন বলুন। আপনাদের ভাষায় ‘অভিমান' কথাটার
প্রতিশব্দ নেই। তাই বােঝতেও পারব না আমার হৃদয়ভাব।
সম্ভবত ইংরেজদের হৃদয়ে অভিমান বলে’ কোনাে ভাবই নেই। সেই
জন্যে আপনারা অমন অবস্থায় ‘cross' হন, sad' হন, আর কিছু
হন্ না।”
পেগী একটা দমকা হাসি হেসে প্রসঙ্গটাকে উড়িয়ে দিল। বল্ল,
“বলছিলুম রােজ রােজ রাতের বাসা খুজতে ভালাে লাগে না, মিষ্টার
সােম।”
“তবে আর এ্যাভেঞ্চার কী হল?”
“বােজ একই এ্যাডভেঞ্চার ? ভালাে লাগে না। আজ মাসির
বাড়ী থাকলে পারতুম।”
৭০
আগুন নিয়ে খেলা - “তবে আর দেরি করছেন কেন? মাসির বাড়ী ফিরে যান। দু’টোর আগে পৌছতে পারবেন।” ঘুরে ফিরে আবার সেই প্রসঙ্গ! পেগী আরেকটা দমকা হাসি দিয়ে আবার তাকে উড়িয়ে দিল। ভূলাের মতাে উড়ে যায়, উড়ে আসে। পেগী বল্ল, “দিনান্তে একখানি নির্দিষ্ট বাসা, এক বাটি গরম সুপ, একটি নরম বিছানা। এর বেশী কাম্য কী থাকতে পারে মানুষের ?” “রাত জেগে নাচতে ভালাে লাগে না?” “না। মন দৈয়া নেয়া অনেক করেছি। নেচেছি সারা জীবন। “যেন কতকালের বুড়ী ! বয়স তত উনিশ কি কুড়ি !” “না, না, অত কম নয়, মশাই। ঠিকৃ দুগ্ধ-পােষ নাবালিকা নই।” সােম কৌতুকের স্বরে বল্ল, “ ‘মাচিমার কাচে চোবাে। শুলেন না কেন মাসিমার কাছে ছছাট একটি বিছানায় ? সকাল হলে ‘tiny lot'টিকে মাসিমা ঠেলাগাড়ী করে বেড়াতে নিয়ে যেতেন।” ওরা বাসা খুঁজবার আগে একবার সমুদ্রতীরটি দেখে নিল। দীর্ঘ নয়। গুটি কয়েক হােটেল। বাকী সব বোর্ডিং হাউস। রবিবারের রাত্রি —দোকান পাট বন্ধ। সকলে হাওয়া খেতে বেরিয়েছে। কিম্বা সিনেমায় গেছে। পর্থকওলের বাইরে থেকে অসংখ্য লােক এসেছে ছুটী কাটাতে। পেগী ও সােম বাের্ডিং হাউসগুলিতে বেল্ টিপল। যেখানে মােয়, সেখানে ঐ একই কথা। “তিল ধারণের স্থান নেই।”...“একটু আগেও একখানা ঘর ছিল।”...“তিন দিন আগে থেকে প্রত্যেকটি ঘর বুক করা।*...“ও পাড়ায় ঘর থাকতে পারে, একবার চেষ্টা করুন না ?” ৭১
আগুন নিয়ে খেলা
এ
কোনাে পাড়াতেই চেষ্টার ত্রুটী হল না! কিন্তু কোনখানে এক
রাত্রের আশ্রয় জুটল না। এদিকে ক্ষুধাও বেশ পেয়েছে। রেস্তোরা
খােলা থাকলে তারা আগে খেয়ে নিত, পরে বাসা খুঁজত।
কী করা যায়, মিস টু ?”
“কী করা যায়, মিষ্টার সােম?”
“বিপদে একটা পরামর্শ দিতে পারেন না। কোনাে কাজের নন্।”
“কাজের মানুষ যে আমি নই, আপনি।
আসুন তবে একটা হােটেলে ঢুকে সাপার খাই, তারপর সে হােটেলে
পােয় অন্য হােটেলে জায়গা খুঁজব।”
কিন্তু সাড়ে নটা বেজে গেছল। কোনাে হােটেলে খাবার পাওয়া
গেল না। কোথাও সময় উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, কোথাও বাইরের লােককে
খাবার ঘরে ঢুকতে দেয় না।
সােম বল্ল, “তা যদি হয়, আমরা ভিতরের লােক হতে রাজি আছি।
হােটেলে জায়গা খালি আছে ?”
“খালি। স্নানের ঘরগুলাে খালি ছিল, শশাবার ঘরে পরিণত করা
হয়েছে। জায়গা।”
সােম বল্ল, “তবে আসুন, আমরা এদের সব চেয়ে যে বড় হােটেল
সেই হােটেলে যাই। হয় তত জনপিছু এক পাউণ্ড চেয়ে বসবে, তবু
তাই দেব। একটি রাত সমুদ্রের নিকটতম হব।”
পেগী বল্ল, “রাজি।”
কিন্তু ও হরি। সেখানে আরাে অনেক স্থানপ্রার্থী দাড়িয়ে। কেরাণী
=
৭২
আগুন নিয়ে খেলা
।
মেয়েটি বলছে, “এখনাে ছত্রিশ জনকে জায়গা দিয়ে উঠতে পারা যায়
নি। তাদের দাবী সর্বাগ্রে। নাম লিখে নিতে আমার আপত্তি নেই,
বলুন আপনাদের নাম।” সােম ও পেগী নাম লেখাল ।
সােম
বন্ধু,
“আমরা লণ্ডন থেকে এসে নিরাশ্রয় হয়ে পড়েছি, মিস্ ।
একটি রাত্রের মতাে জায়গা
“সর্বনাশ! আজ রাত্রের মতাে জায়গা !”
“, তাই তােক
“অনর্থক নাম লিখে নিলু। আমি ভেবেছিলুম কালকের রাত্রের
জন্যে স্থান প্রার্থনা করছেন। আজ আমার কিছু না হােক একশাে
জনকে ফিরিয়ে দিয়েছি। এই তাে একটু আগে এক দল লােক এ
গ্রামে রাত কাটাবার জায়গা না পেয়ে ব্রিজেণ্ড, চলে গেল। বােধ হয়
ব্রিজেণ্ডের ট্রেন কিম্বা বাও আর পাবেন না।”
“তবে কি আমরা না খেয়ে না শুয়ে সারারাত পায়চারি করে’
বেড়াব ?”
“একটি কাজ করুন। থানায় গিয়ে পুলিশকে ধরুন।
ধরুন। ওরা যা
হয় একটা বন্দোবস্ত করে দিতে পারবে।”
সােম ও পেগী থানার সন্ধানে চল।
পা আর চলতে চায় না।
শূন্য উদরের উপর রাগ করে’ অসইযােগ করবে।
থানা বলে’ চেম্বার উপায় ছিল না। আধখানা বাড়ী। বাইরে
একটা ল্যাম্পপােষ্ট বিহীন ল্যাম্প দেয়ালের গায়ে। সােম একটা
দুয়ারে বেল্ টিপে ও ধাক্কা দিয়ে সাড়া পেল না। অন্য দুয়ারটাতে
৭৩
আগুন নিয়ে খেলা
সফল হল। এক উনবিংশ শতাব্দীর বুড়ী দরজা খুলে দিয়ে বল্ল, “কাকে
চান ?”
“পুলিশকে।”
বুড়ীর বিরক্তির কারণ ছিল। পুলিসের খোঁজে বুড়ীর ঘুম চটিয়ে
দেওয়া বােধ হয় এই প্রথম নয়। প্রতিবেশিনী হিসাবে পুলিশের
পিণ্ডি বুড়ীর ঘাড়ে, এইটে বােধ হয় পৰ্থকওলের প্রবাদ।
উত্মার সঙ্গে বুড়ি বল্ল, “এ দরজা নয়, ও দরজা।”
“আমরা গেছলুম ওখানে। সাড়া পাইনি।”
“জঞ্জাল! বেষ্টাও ওদের বে-মেরামত। ধাক্কা দিলে ওরা ভাবে
কেউ আমার বাড়ী ধাক্কা দিচ্ছে। আচ্ছা আমি ভিতরে গিয়ে খবর
দিচ্ছি।”
পুলিশের লােক সােমকে ও পেগীকে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেল।
ব্যাপারটা কী লিখে নেবার জন্যে একজন কাগজ-কলম নিয়ে বসল।
ওঃ, এই ব্যাপার? আচ্ছা আমাদের কর্তাকে ডেকে আছি।
ইনেস্পক্টার রসিক লােক। সােমকে দেখে বল্ল, “কোন দেশের
লােক ? Wandering Jew?”
“ইণ্ডিয়ান।”
“ঠিক। ইণ্ডিয়ানেরই মতাে দেখতে। কিন্তু উনি ? ওঁকে তাে
দেখতে ইণ্ডিয়ানের মতাে নয় ?
পেগী বল্ল, “উনি রেড় ইণ্ডিয়ান। আর আমি হােয়াট্ ইণ্ডিয়ান।”
ইস্পেক্টার এর উত্তরে কী একটা রসিকতা করতে যাচ্ছিল, সােম
৭৪
আগুন নিয়ে খেলা বল্ল, “কাল করবেন। আমরা সাত ঘণ্টা খাইতি এত হেঁটেছি যে দাঁড়াতে পারছিনে। হয় আমাদের এইখানে খেতে দি, নয় কোথাও খাবার বন্দোবস্ত করে’ দিন আগে।” ইস্বােক্টার লজ্জিত হয়ে বল্ল, “সমস্ত বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি। ইণ্ডিয়ার মানুষ পৰ্থকওলে এসেছেন, সুখী হয়ে না ফেরেন তবে কী বলেছি। অমৃতের মতাে হাওয়া এখানকার। সমুদ্রতীরে গেছলেন?” সােম বল্ল, “ক’বার করে’ বধ্ব?” এইমাত্র আপনার, কষ্টেবলকে পর্থকওলের নাড়ী নক্ষত্রের খবর দিয়েছি।” ইস্পেক্টার একজনকে ডেকে বল্ল, “জন্।” “তিনটে বাের্ডিং হাউসের নাম দিচ্ছি। আমার নাম করে জায়গা চাইবে। একটাতে না হয় আরেকটাতে। নামগুলাে মনে থাকবে “নিশ্চয়, স্যর।” জন্ সােমকে ও পেগীকে নিয়ে সমুদ্র সন্নিকটবর্তী তিন তিনটে বাড়ীতে গেল। কেউ বলে জায়গা হয় তাে একজনের হবে, কিন্তু খাবার। কেউ বলে খাবার যৎসামান্য জোগাড় করা যায়, কিন্তু বিছানা! জনের সঙ্গে ইতিমধ্যে সােমের আলাপ চলেছিল। জন্ নাকি লণ্ডনে ট্রেনিং নিতে গেছল। লণ্ডনকে তার ভালাে লেগেছে। এখানে তার শরীর খুব ভালাে থাকছে বটে, কিন্তু বড্ড খাটুনি। অনেকের সঙ্গে বন্ধুতা হয়েছে। ৭৫ আগুন নিয়ে খেলা এসেছেন জন বল, “এসেছেন যখন পৰ্থকওলে, স্যর, তখন আপনাদের ফিরে যেতে দেব না। আমার একজনদের সঙ্গে জানাশুনা আছে। কিন্তু মাইল খানেক দূরে।” পেগী সােমের বাহুতে ভর দিয়ে সক্লেশে হাঁটছিল। • সােমেরও শরীর ভেঙে পড়ছিল। মাইল খানেক দূরে ! সেখানে যদি না হয়, তবে? হা ভগবান। জন্ বল্ল, “সেখানে জায়গা থাকবেই, স্যর। না থাকলেও তারা যেমন করে’ হােক দেবেই। তাদের সঙ্গে আমার বিশেষ খাতির। পেগী কথা বছিল না। মহিলার সঙ্গে কথা বলার সাহসও ছিল না গ্রাম্য কষ্টেবলের। একটা কাফে। গ্রামের সীমান্তদেশে তার অবস্থিতি। কাফে- ওয়ালীরা নিদ্রার আয়ােজন করছিল। অতিথি পেয়ে আহারের আয়ােজনে লেগে গেল। 'জকেও ছাড়ল না। জন যে তাদের ঘরের ছেলের মতাে। পাশের ঘরে তাকে নিয়ে একজন খেতে বল্ল। অপর জন পেগী ও সােমকে রুটি ও ডিম পরিবেশন করল। ফল তাদের কাফে সংলগ্ন দোকানে অপৰ্যাপ্ত ছিল। পরিশেষে কফি। তখন রাত্রি সাড়ে এগারােটা বেজে গেছে, বারােটা বাজে। ঘুমে চোখের পাতা জুড়ে আসছে। কাফেওয়ালীরা সােমকে ও পেগীকে নিয়ে সকলের উপরতলার যে গ্যারেট সেই ঘরে ছেড়ে দিল। পেগীর তখন খেয়াল ছিল না যে ঘরটাতে দুটো বিছানা এবং ঘরটা সােমেরও। কাফেওয়ালী যখন মােমবাতিটা ম্যান্ট-পীসের উপর রেখে ৭৬
আগুন নিয়ে খেলা
দিয়ে গুড্রাই জানিয়ে চলে গেল তখন পেগী বল্ল, “আপনার ঘরে
যাবেন না ?”
সােমও সেই কথা ভাবছিল। কষ্টেল কি দু’টো ঘরের কথা
বলেনি, না, দু’টো ঘর পাওয়া যায় নি ? কাফেওয়ালীকে সেকথা
জিজ্ঞাসা করতে সঙ্কোচ বােধ হচ্ছিল। কাফেওয়ালী হয় তােত ধরে
নিয়েছে যে এরা স্বামী স্ত্রী। তা নইলে এমন এক সঙ্গে বেড়ায়? চেহারা
ও রং থেকে তত মনে হয় না যে ভাই বােন।
সােম বল, “আমাকে তাে আলাদা ঘর দেয় নি ?”
পেগী ধপ করে একটা বিছানায় বসে পড়ে’ বল্ল, “সর্বনাশ!” তার
মুখে লজ্জা ভয় ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা।
সােম বল্ল, “যাব নীচে নেমে ? বলব আর একটা ঘর থাকে তাে
দিতে ?”
“থাকূলে ওরাই দিত। কেননা দুটো ঘর দিলে প্রায় ডবল লাভ
করত।”
এই বলে’ পেগী দুই হাতে মুখ ঢেকে ভাবতে কি কঁদতে কি হাসতে
লাগল তা সােম ঠাহর করতে পারল না। এমন সঙ্কটে সে কখনন
পড়েনি। তার জীবনে নারী-ঘটিত সঙ্কট ঘটেছে অনেক। কখনন
ট্রেনে কখনাে সরাইতে কখনাে তীর্থক্ষেত্রের ভিড়ের মধ্যে। কিন্তু তরুণী
নারীর সঙ্গে এক ঘরে রাত্রিযাপন—তাও সম্ভোগের জন্যে নয়, যে জন্যে
কলঙ্কভাগী হয়েও সুখ আছে।
ঢং ঢং করে বারটা বাজল শুনে পেগীর ধ্যান ভাঙল।
৭৭
আগুন নিয়ে খেলা পেগী বল্ল, “আঙনি তাে একজন man of honour—কেমন?” সােম একটু ক্ষুন্ন হয়ে বল্ল, “নিশ্চয়। “তবে আবার ভয় কাকে ? কাফেওয়ালী যা খুসী ভাবুক, যা মুখে আসে রটা। আপনি তাে অশ্রদ্ধা করবেন না, প্রচার করে বেড়াবেন ।” “নিশ্চিন্ত হতে পারেন, মিস্ স্কট! আপনি যে কে এবং কোথায় থাকেন, কার,কন্যা এবং কী করেন তাই এখনাে জালুম না।” “হয় তাে আমি পেগী স্কটই নই, এলিজাবেথ, সিন। কিম্বা জিনী জোনস্।” “ভগবান জানেন। “ভগবানকে ধন্যবাদ। মাসিমার ওখানে আপনাকে না নিয়ে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ বাঁচিয়েছি। না, না, অবিশ্বাস আপনাকে আমি করিনে, কিন্তু আপনিও তত পুরুষ। বিশ্বাসস নৈব কৰ্তব্যঃ পুরুষেষু।” পেগী উঠে দাড়িয়ে বল্ল, “লক্ষ্মীটি, একবার ঘরের বাইরে যান যদি তাে কাপড় ছেড়ে নিই। দেরি হবে না।” সােম অভিমান পরিপাক করতে নিঃশব্দে গৃহত্যাগ করল। তার একটুও অভিরুচি ছিল না পেগীর সঙ্গে এক ঘরে রাত কাটাতে। এত “ঢং কেন ? ন্যাকামির বেহদ্দ। সকাল বেলা যাকে নিজের ইয়ং ম্যান বলে’ প্রচার করেছে, যার জন্যে মাসিমাকে ধোকা দিয়ে পালিয়ে এসেছে, যার হাতে হাত রেখে সমস্ত গ্রামটাকে সাত পাক দিয়েছে তার সঙ্গে ঘটনাচক্রে এক ঘরে শুতে হচ্ছে—তাও বিভিন্ন বিছানায়। এই নিয়ে এত ফুটানি ! ৭৮
আগুন নিয়ে খেলা
সােম যদি অন্য ঘর পেত নিশ্চয়ই পেগীর ঘরে ফিত না। পেগী
সাধলেও না।
ভিতর থেকে পেগীর ডাক এল। সােম রাগ করে’ দু'তিন মিনিট
বাইরেই পায়চারি করতে থাকল, ভিতরে গেল না। তখন পেগী দরজা
খুলে মুখ বের করে সন্ত্রস্ত স্বরে বল্ল, “মিষ্টার সােম!”
সােম গাম্ভীর্যের সঙ্গে মৃদু কণ্ঠে বল্ল, “ইয়েস ?”
“আছেন তা হলে। আমি ভেবেছিলুম নীচে চলে গেছেন।”
“নীচে চলে গেলে নিষ্কণ্টক হন্ ?”
“ছিঃ ছিঃ। দেখুন এসে আপনার বিছানা কেমন নতুন করে
পেতেছি।”
সােম চমৎকৃত হল।
পেগী বল্ল, “এবার আপনাকে প্রাইভেসী দিয়ে আমি চলুম বাইরে।
কিন্তু বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না বলে যাচ্ছি। ক্লান্তিতে
আমার পা দু’গাছা ভেঙে পড়ছে, মিষ্টার সােম!”
সােমের মনে ক্ষোভলেশ রইল না। সে পেগীকে ক্ষমা করল।
৭৯
৪ আরাে আগের দিন সসবেরীর একটা অতি প্রাচীন হােটেলের অতি আধুনিক ধরণে সাজানাে খাবার ঘরে ব্রেকফাষ্ট পরিবেশিত হচ্ছিল। কোনাে টেবিলই খালি নেই দেখে সােম অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে ফিরে আসবে ভাবছে একজন ওয়েটার এসে তাকে চাপা গলায় বল্ল, “আমার সঙ্গে আসুন স্যর।” ওয়েটার তাকে যেখানে নিয়ে বসতে দিলে সেখানে সে কাল রাত্রে বসে’ ডিনার খেয়েছিল, সেই সূত্রে জায়গাটা তার হয়ে গেছে। এবং তার সম্মুখের আসনটা মিস্ স্কটের। মিস্ স্কট তার আগেই এসেছেন, তার খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এল। সােমকে দেখে মিস্ স্কট খাবার-মুখে-থাকা অবস্থায় bow করলেন। সােমও boy করে’ কী কী খেতে চায় ওয়েটারকে ফরমাস করল। ওয়েটার চলে গেল। সােম বিনীততাবে বল্ল, “কাল আপনাকে ভালাে করে ধন্যবাদ দেওয়া হয়নি, মিস্ স্কট।” “কী কারণে, মিষ্টার সােম? এমন কী অপরাধ করেছি যার দরুণ ধন্যবাদ আমার পাওনা ?”— কপট আতঙ্কের ভঙ্গীতে)
আগুন নিয়ে খেলা
“আপনি ভুলতে পারেন, কিন্তু আমি কি ভুলতে পারি কাল আপনি
যে উপকার করেছেন ?”
“বটে ?”—মিস্ স্কট মুচকি হেসে রুটির সঙ্গে মার্মালেড়, মাখাতে
লাগলেন।
সােমেরও পরিজ এসে গেছল। কিছুক্ষণ সােম নীরব রইল। মিস
স্কটের খাদ্য শেষ হয়েছিল, পানীয় ঈষৎ বাকী ছিল। তিনি কথা বলার
সুযােগ পেয়ে বল্লেন, “ঘর পছন্দ হয়েছে ?”
(খেতে খেতে) “হু।” •
“তা হলে এইখানেই কিছুদিন থেকে যাবেন ?”
“উহু ? তবে ঘর পছন্দ হয় নি?”
“ছিঃ ছিঃ, আমি কী অভদ্র! আপনার খাওয়াতে বাধা দিচ্ছি।”
কথা বলার সুযােগ পাবার জন্যে সােম এক নিশ্বাসে খাওয়া শেষ
করুল। প্লে থেকে হাত তুলে নিয়ে ও হাত থেকে চামচ নামিয়ে গলা
পরিষ্কার করে বল্ল, “না, না, না। বাধা আপনি দিতে যাবেন কেন ?
দিচ্ছিল ঐ পরিজটা। ওকে পরাস্ত করে’ উদরালয়ে পাঠিয়েছি। এখন
আমি শত্রুশূন্য।”
ঠিক এমনি সময়ে ওয়েটার আরেক শত্রুকে সমরক্ষেত্রে অবতীর্ণ
করুল নিজে সারথি হয়ে। মিস্ স্কটু মুচকি হাসি হাসলেন। সােম
অপদস্থের কাষ্ঠ হাসি।
আগুন নিয়ে খেলা নিজের খাওয়া শেষ হলেও মিস্ স্কট উঠে গেলেন না। সােমের খাতিরে অপেক্ষা করতে থাকলেন। সােম অনুযােগ জানিয়ে বল্ল, “আমার মতাে কুঁড়ে মানুষ কতক্ষণে উঠবে তার ঠিক নেই। মিথ্যে কেন একটি ঘণ্টা নষ্ট করবেন ?” মিস্ স্কট এর উত্তরে বল্লেন, “যেমন ক্ষিপ্রতার সঙ্গে খাচ্ছেন এক ঘণ্টা বসে থাকলে আপনি কড়ি-বরগাও বাকী রাখবেন না। আমি পাহারা বলুম।” . “কিন্তু যে মানুষ কড়ি-বরগা খেয়ে ক্ষুধা মেটাতে যায় সে সামনের মানুষকেও ছাড় বার পাত্র নয়। পাহারাওয়ালা, হুশিয়ার!” মিস স্কট তার নীল নয়নের কটাক্ষ হেনে বলেন, “ক্যানিবালাও নারীমাংস খায় না শুনেছি, ওরাও শিভ্যাী বােঝে।” সােম বল্ল, “কিন্তু একালের নারী যে শিভ্যান্ত্রীর অযােগ্য। ট্রেনে ট্রামে বাস্-এ নারীকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে’ও পুরুষ জায়গা ছাড়ে না, খবরের কাগজের উপর চোখ ফিরিয়ে নেয়।” (মিস্ স্কটের আরক্ত মুখ লক্ষ্য করে’) “বরঞ্চ বলতে পারা যায় নারীরা শিভ্যালরী দেখায় পুরুষদের জন্যে ট্রেনের দরজা খােলা রেখে, হােটেলে জায়গা জোগাড় করে’ দিয়ে।” মিস্ স্কট বল্লেন, “নি, ওটুকু খেয়ে নিন্। তাড়াতাড়ির কোন দরকার নেই। আমি পালাব না।” (তার মুখভাবে প্রসন্ন মমতা) দু’জনে লাউঞ্জে গিয়ে বল। ঘরটার অস্থিকঙ্কাল পুরােনাে, কোন যুগের। রক্তমাংস আধুনিক। আরাে অনেকে জটলা করছিলেন, কিম্বা ৮২ আগুন নিয়ে খেলা, চশমা চোখে দিয়ে খবরের কাগজে মন দিয়েছিলেন, কিম্বা চশমা চোখে দিয়ে পঞ্চাশবার সেলাই করা অকেজো মােজাকে অন্যমনস্ক হয়ে বিষ্ণু ছিলেন। সােম সিগরেট কেষ্টা মিস্ স্কটের সামনে ধরে নীরব অনুরােধ জানাল। মিস স্কট মৃদু হেসে একটি নিলেন। বল্লেন, “আগেকার যুগে পুরুষরা স্মােক্ করবার আগে নারীদের অনুমতি ভিক্ষা করতেন। এখন নারীদের ঘুষ দেন।” “যাই বলুন, ঘুষ খেতে মিষ্টি লাগে।” “খাওয়াতেও।” “সকলকে না। তেমন তেমন নারীকে।” “খাওয়াবেন তত একটা আধ পেনী দামের সিগারেট। তাও তেমন তেমন নারীকে ? আমি হলে charwomanকে ডেকে এক প্যাকেট সিগরেট এবং এক বাক্স দেশলাই উপহার দিতুম।” সােম কপট ধিক্কার দিয়ে বল্ল, “মি স্কট ! Charwoman কাকে বলছেন ? Charlady! সেও আপনাকে এক প্যাকেট সিগারেট, উপহার দেবার স্পর্ধা রাখে।” “ও হাে হাে। ভুল হয়ে গেছল। Charlady! শুবেন একটা গল্প ? এক ভদ্রমহিলার বাড়ী এক washer-woman কাপড় নিতে গেছে। বাইরে থেকে চেঁচিয়ে বলছে, “Maid! maid! house assistant! Is that woman at home? It is the washerlady calling'." ৮৩ আগুন নিয়ে খেলা সােম হাসতে লাগল। সিগারেটের ছাই ঝেড়ে বল্ল, “এ গল্পটা শুনে আরেকটা গল্প মনে পড়ল। বিশ্ববিখ্যাত নর্তকী প্যাভলােভ নিউ- ইয়র্কের কোনাে হােটেলে উঠেছেন, খাবার ঘরে খেতে বসেছেন। তাঁর একটু দূরে তার অর্কেষ্ট্রার কণ্ডাক্টার—কী নাম? মনে পড়ছে না, ধরে’ নিন্ Stier.—ওয়েটারের জন্যে অপেক্ষা করছেন, ওয়েটার আসেই না। বেশ একটু দেরি করে সেজে গুজে এল, এসে বল্ল, ‘হালাে, ম্যান্ কী দিতে হবে তােমাকে ? Stier লােকটা অষ্ট্ৰীয়া, ইউরােপের সব চেয়ে কেতা- দুরন্ত দেশের লােক। অবশ্য এখন অস্ত্রীয় সােখালিষ্ট হয়েছে। তখন অষ্ট্ৰীয়ার সম্রাটরা ইউরােপের অভিজাত-তম। মিস্ স্ক বাধা দিয়ে বল্লেন, “আমাদের রাজাদের চেয়ে !” সােম অপ্রতিভ হয়ে বল্ল, “আহা, এমন করে’ বাধা দিলে গল্প এগবে কেন?” মিস্ কটু আবার বাধা দিয়ে বল্লেন, “আর এগিয়ে কাজ নেই। অত লম্বা গল্প কে শুনতে চায় ?” গল্পটা সােমের পেটে গজগজ করছিল। মিস্ স্কটুকে শােনাবেই। পুনরায় আরম্ভ করল, “তা, Stier তাে হতভম্ব। কোথায় তাকে ‘স্যর’ বলে সম্বােধন করবে ও বিলম্বের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করবে— মিস স্কট বল্লেন, “আপনি আজ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন?” “আপনাকে তত আমি কথা দিইনি অমুক সময় আপনার সঙ্গে ব্রেকফাষ্ট, খাব?” ৮৪
আগুন নিয়ে খেলা
“তা হলে Stierকেও সেই ওয়েটার কথা দেয় নি যে অমুক সময়ে
ব্রেকফাষ্ট খাওয়াবে।”
“আহা, অমন করলে গল্পটা মাঠে মারা যাবে, মিস্ স্ক। শুনুন শেষ
পৰ্যন্ত। মজার কথা আছে শেষের দিকে।”
মিস্ স্কটু চোখ বুজে হাত পা অসাড় করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন।
যেন প্রাণের আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
সােম বল্ল, “আমি কি আপনার উপর অপারেশন করতে চাইছি?”
“আমার তন্ময় ভাব নষ্ট করবেন না, মিষ্টার সােম! গল্পটা একদৌড়ে
বলে’ যা।”
“ওয়েটার তার কার্ড খানা Stier-এর হাতে দিয়ে বল্ল, আমার নাম
জেরেমায়া ওয়াশিংটন স্মিথ। যখন আমাকে দরকার হবে তখন কারুর
হাতে এই কার্ডটা পাঠিয়ে দিলে আবার আমি আসব। ”
মিস্ স্কট সকৌতূহলে চোখ মেলে’ জিজ্ঞাসা করলেন, “সত্যি?”
“সত্যি। কিন্তু কার্ডের উপরকার নামটা আমার ঠিক মনে নেই।
বানিয়ে বল্লুম।”
মিস স্কটু আবার চোখ বুজলেন।
“যাবার সময় ওয়েটার বাবাজী প্যাভূলােভার দিকে আঙুল উঠিয়ে
বল্প, ঐ womanটাকে এতগুলাে মানুষ ঘিরে বসেছে। Womanটা
কেউ হবে টবে?”
মিস্ স্কটু লাফ দিয়ে উঠে বসলেন।
সােম বল্ল, “Stier নিজের অপমান সইতে পারেন, কিন্তু মনিবের
৮৫
আগুন নিয়ে খেলা
অপমান। বিশেষত তিনি যখন মহিলা, রাণীর মতাে সম্মানে অভ্যস্তা !
তারপর
মিস্ স্কট এবার দাড়িয়ে বল্লেন, “তারপর যা হল তা কাল শুন্, মিষ্টার
সােম। আপনি তাে এখানে কাল পর্যন্ত থাকছেন।”
সােম চেয়ার ছেড়ে বল্ল, “কে বল্ল, মিস স্কট ? আমি আজকেই
ব্রিষ্টল যাচ্ছি।”
“ওমা,, তখন যে বল্লেন থাক্ছেন।”
“বলেই যদি থাকি, তাই শেষ কথা নয়। এখানে আমার ভালাে
লাগছে না। বড় বেশী মানুষ এ বাড়ীতে।”
“ঈষ্টারের সময় কোনখানেই বা কম ?”
“তবু ব্রিষ্টল আমি যাব। ওখানে আমার দেশের একজন শ্রেষ্ঠ
মানুষের সমাধি আছে।”
“তিন দিন পরে গেলেও তাে থাকবে।”
“তিন দিন কার খাতিরে এখানে কাটাব ? আপনার ?”
বেশ ! আমার। আমার কী একটা কৃতজ্ঞতার দাবী নেই ভাবছেন?”
সােম পুলকিত হল।
মিস্ স্কট সােমের পুলক অনুমান করে’ কথাটাকে ঘুরিয়ে বল্লেন,“আমার
সঙ্গিনীর ঘরটা সঙ্গিনীর অনুপস্থিতি হেতু আপনি পেয়েছেন। আপনি
ছেড়ে দিলে ভাড়াটা আমার সঙ্গিনীর ঘাড়ে পড়বে। কাজেই আমার
স্বার্থ হচ্ছে আপনাকে আটকানে।”
“এতই সঙ্গিনীর প্রতি দরদ ?”
بط
আগুন নিয়ে খেলা
“দরদটা কি অস্বাভাবিক ?”
“তবু সবটা দরদ সঙ্গিনীটির পাওনা নয়। তিনি অনুপস্থিত যখন
হয়েছেন জেনে শুনে, ভাড়াও দিতে প্রস্তুত আছেন। আর আমি
বেচারা এক রাত্রি তার স্থানে officiate করেছি বলে আরাে তিন
রাত্রি করতে বাধ্য হব ?”
“সে কি আপনার কম সৌভাগ্য
“তবে সৌভাগ্যটাকে আরাে অপ্রত্যাশিত করুন। আসুন আমার
সঙ্গিনী হয়ে ব্রিষ্টলে।”
“ব্রিষ্টলে আমার এক মাসিমা থাকেন। সে কথা জানা আছে
মশাইয়ের ?”
“মাসিমা তত বাঘ ভালুক নয়।”
“সেই জাতীয়। ছুটীটা মাটি করতে চাইনে, মিষ্টার সােম।”
মিস্ স্কট চলে যাচ্ছিলেন। সােম বল্ল, “মাসিমার বাড়ী ফাসি যেতে
কে আপনাকে বলছে, মিস স্কটু ? ছছাটখাট হােটেল কি ব্ৰিষ্টলে নেই ?”
মিস্ স্কট উত্ত্যক্ত হয়ে বল্লেন, “পারব না আপনার সঙ্গে তর্ক করে।
ব্রিষ্টলের ট্রেন ও-বেলা ধরলেও চল্বে।
এখন কি আমার সঙ্গে বেরবেন
দয়া করে’, না, এই ঘরে বসে সবাইকে নিউ ইয়র্কের গল্প শশানাবেন ?
বাড়ী কোথায় আপনার ? নিউইয়র্কে ?”
“ইণ্ডিয়ায়।”
“তা হলে নিগার নন ?”
“নিগার না হই, নিগারেরই মতাে রঙীন। দেখে ঘৃণা হয় ?”
৮৭
আগুন নিয়ে খেলা “কখনাে না, বরঞ্চ শ্রদ্ধা হয়।” “হবেই তাে। সূৰ্য্যদেব কত যত্নে আমার দেহের চামড়া ট্যান্ করেছেন, আমি যেন মূর্তিমান সূৰ্য্যালােক। লােকে আমাদের বুদ্ধি বিদ্যার নিন্দা যত খুসী করুক, সভ্যতার অভাব দেখা, কিন্তু চামড়ার অগৌরব রটায় কেন বলুন তাে?” মিস্ স্কটু হেসে বল্লেন, “লােকণ্ডুলাে হিংসুটে। আপনাদের বর্ণাঢ্যতা দেখে ওদের গাত্রদাহ হয়।” “লাঙ্গুলহীন শৃগাল! নিজেরা শীত বরফেরদেশে বাস করে’ বর্ণসম্পদ খুইয়েছেন। যাদের আছে তাদের বলেন কি না রঙীন মানুষ। গৌরবের কথা নয়, যেন কত বড় একটা তামাসার কথা ।” দু’জনেই হাসতে লাগল। সােম জান্ত কালাে রঙের প্রতি সাদা মেয়ের সহজ পক্ষপাত। কিন্তু সমাজের চাপে এই পক্ষপাত বিরূপভাবে পরিণত হয়ে থাকে। মি স্কটের সহজ পক্ষপাতকে পাছে সবেরীর এই হােটেলের গণ্যমান্যদের সমাজ বিকৃত করে দেয়, পাছে মিস্ স্কট তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে মিশতে গিয়ে চোখে চোখে উপহসিত হন, সেই জন্যে সােম তাঁকে নিয়ে ব্রিষ্টলের মতাে বৃহৎ শহরের জনতায় অলক্ষিত ভাবে ফিরতে ও নির্জন বাের্ডিং হাউসে অনিন্দিত ভাবে থাকতে চায়। ইংলণ্ডের সবেরীর ক্যাথিড্রাল কুতবমিনারের সমসাময়িক। বৃহত্তম ক্যাথিড্রালদের অন্যতম। তার nave, তার choir, তার aisles ৮৮ আগুন নিয়ে খেলা ইত্যাদি পরিদর্শন করবার সময় মিস্ স্কটের উচ্ছ্বাস উদ্দাম হয়ে ওঠে —তাঁর স্বদেশের কীর্তি! কালের শাসনকে তুচ্ছ করে এসেছে সাত শত বছর ! সােমও, নীরব হয়ে ভাবে। ইংলণ্ড দেশটা ভারতবর্ষকে পেয়ে হঠাৎ বড় মানুষ হয়নি। তিনশাে বছর আগে তার শেল্পীয়ার ছিল, সাত শশা বছর আগে তার সূবেরী ও লিংকন ক্যাথিড্রাল ছিল। ভারতবর্ষকে পাবার আগে সে পাবার যােগ্য হয়েছে। সােম কাব্য করে’ বল “মিস স্কট, সবেরীর নির্মাতারা যেসময় ক্যাথিড্রালের ভিত্তিপাত করছিল নিজেদের অজ্ঞাতসারে সেই সময় সাম্রাজ্যেরও ভিত্তিপাত করছিল। যারা ক্যাথিড্রাল গড়তে সুরু করে তারা সাম্রাজ্য না গড়ে শেষ করে না।” কথাটা বলে ফেলেই সােম মনে মনে ভ্রম স্বীকার করল। ক্যাথিড্রাল বেজিয়মও গড়েছে, কই তার সাম্রাজ্য ? মিস্ স্কট বল্লেন, “একশাে বার! আমাদের সাম্রাজ্য কি একদিনের সৃষ্টি ! এই সব নাম-না-জানা স্থপতি তার পরিকল্পনা আমাদের তীয় মনের মধ্যে রােপণ করেছিল, সন্দেহ নেই। বৃহৎ কীর্তির অভিলাষ আমরা চিরকাল মনে রেখে এসেছি, মিষ্টার সােম।” মিস্ স্কটুকে ব্যথা দেবার ইচ্ছা ছিল না সােমের। নতুবা জ্ঞাপন কত যে বৌদ্ধ যুগের স্তুপ, হিন্দু যুগের মন্দির ও মুসলমান যুগের মজিদ ভারতবর্ষের অলিতে গলিতে আছে, এবং তাদের মধ্যে অন্তত হাজারটা সসবেরীর ক্যাথিড্রালকে আকারে ও সৌন্দর্য্যে লজ্জা দিতে পারে।
আগুন নিয়ে খেলা
সােমকে মুগ্ধ করছিল ইংরেজের স্বদেশপ্রীতি। ভারতবর্ষের লােক দিল্লীর
মজিদে দাঁড়িয়ে সম্প্রদায়কে স্মরণ করে, কালিদাস বাঙালী কিনা তারই
গবেষণায় জীবন ক্ষয় করে। ছােট ভাবনা ভাবতে ভাবতে মানুষগুলাে
খর্বকায় বামন হয়ে কুঁড়ে ঘরে বাসা বেঁধেছে। কীর্তিও
হয়েছে
সেই
অনুপাতে ক্ষীণ।
সােম বল্ল, “আসুন মিস্ স্কট, বেশীক্ষণ দেখলে শুলে ক্যাথিড্রালের
সঙ্গে প্রেমে পড়ে যাবেন। তা হলে পুরুষ জাতটা ঈর্ষায় বুক ফেটে
মরবে।”
“গােটা পুরুষ জাতটা ?”
“গােটা পুরুষ জাতটার প্রতিনিধি হিসাবে কোন একজন পুরুষ।”
“বটে ?”
“বটে!”
“ক্যাথিড্রালের উপর প্রেমিকের ঈর্ষা, এমন অদ্ভুত কথা জন্মে শুনিনি।”
( কল হাস্য)। “আপনি শুধু প্রেম করে বেড়ান, না, কাব্যও করে’
থাকেন?”
(Bow করে’) “না, ম্যাডাম। আমি অতটা সৌখীন নই। কাজের
মানুষ বলে আমার সুখ্যাতি আছে।”
“আমিও তাে কাজের মানুষ। কই, আমার তাে ও সব আসে না?”
“কী সব আসে না?”
( সরলতার ভাণ করে’) “ওই সব। প্রেম করা। কাব্য করা।
ক্যাথিড্রালকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে তার সঙ্গে ডুয়েল লড়তে চাওয়া।
আগুন নিয়ে খেলা
“আপনি এতই নিরীহ মানুষটি ? দেখি, দেখিএকবার আপনার
মুখখানা ? হাঁ, ছেলেমানুষের মুখ বটে।”
“যান্। ছেলেমানুষ বলে আমরা অপমান বােধ করি, জানেন ?”
“আপনারা কারা ?”
“আমরা একেলে মেয়েরা।
“তবে কি বুড়ােমানুষ বলব?”
“বুড়ােমানুষ বল্লে খুন করব বলে রাখছি।”
১
"TCT 'Bright young thing?."
“তা আপনাকে বলতে রাজি আছি, বল্লে মিথ্যে বলা হয় না। কিন্তু
সবাইকে—
“আপনি দেখছি মিষ্টি কথার ময়রা। চকোলেটের বদলে আপনার
compliment খেলেও চলে। আশা করি সবাইকে খাইয়ে থাকেন ?”
“আমি একনিষ্ঠ ময়রা।”
“আমাকে ছেড়ে ক’জনের কাছে একথা বলেছেন?”
“মিথ্যা বলব, না, সত্য বদ্ধ ?”
“আগে মিথ্যাটা শুনি।”
“কারুর কাছে না।”
“এবার সত্যটা।”
“জন পাঁচেকের কাছে।”
“আমি তা হলে আপনার ষষ্ঠ ?”
আগুন নিয়ে খেলা
“এবং শ্রেষ্ঠ।
“প্রত্যেকবারেই সেটা মনে হয়ে থাকে বটে।
“আপনার অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন?”
“যান্!”
“তবে কি এই আপনার প্রথম অভিজ্ঞতা ?”
“ভারি দুষ্টু তত! নিজের মনের কথা বোস করে ফেলেছেন।
তা বলে আমার মনের কথা কাড়তে পাচ্ছেন না। বুঝলেন ?”
“অনুমান করতে কতক্ষণ?”
“করুন না অনুমান?”
“এই কবুলুম। আমার ছয়, আপনার ছয় ছক ছত্রিশ।”
( উল্লাস গােপন করে’) “আমি কিন্তু অত্যন্ত অন্যায় করছি। একজন
অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে বিদেশীর সঙ্গে ইয়ার্কি দিচ্ছি। মা যদি
জানতে পান্ ভয়ানক ঠাট্টা করবেন।”
“আজকালকার মা’রা রাগ করেন না বুঝি?”
“রাগ করবেন। কেন, আমি কি তার খাই না ধারি? আমি তার
কোনাে ক্ষতি করছিনে। আমার যথেষ্ট বয়সও হয়েছে।”
“কত বয়স ? আঠারাে ?”
“ভারি বেয়াদব তাে? মেয়েমানুষের বয়স জাতে চায় !”
“Sorry, আমার প্রশ্নটা ফিরিয়ে নিচ্ছি।”—অভিনয়ের ভঙ্গীতে সােম
আবার bow করল।
ততক্ষণে তারা ক্যাথিড্রালের বাইরে এসেছে।
বাইরে থেকে
১২
আগুন নিয়ে খেলা ১ ক্যাথিড্রালটিকে কেমন দেখায় দু’জন মিলে তাই দেখতে লাগল। দু’জনের কারুর কাছেই ক্যামেরা ছিল না বলে তারা পরস্পরকে দুষতে গল। সােম বল্ল, “প্রেমিকের ছবি তুলে নিয়ে গেলেন না। বাড়ী ফিরে টেবিলের উপর কী সাজিয়ে রাখবেন?” মিস্ স্কট বল্লেন, “আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী। আপনারই কর্তব্য ছবি তুলে নিয়ে আয়নার কাছে রাখা এবং তুলনা করে দেখা কে কার চেয়ে সুন্দর।” “আমিই যে ওর চেয়ে সুন্দর এ সম্বন্ধে আমার তাে কোনাে সন্দেহ নেই। আপনার যদি থাকে আপনার উচিত একসঙ্গে ওর আর আমার ছবি তোেলা।” “বাস্তবিক ছবির পক্ষে আইডিয়াল ব্যাকগ্রাউণ্ড ! কে জান্ত আপনি আসবেন ক্যাথরিনের জায়গায় ; ক্যাথরিন হতভাগী শেষকালে প্ল্যান বদলে বসল।” “তাকে আমার গভীর কৃতজ্ঞতা জানাবেন। তিনি থাকলে আমার কি কোনাে আশা থাকত!”–সােম মিস স্কটের দুটি চোখের সঙ্গে দু’টি চোখ মিলাল। মিস্ স্কট চোখ নামিয়ে বল্লেন, “আচ্ছা, বলুন দেখি মেয়েরা মেয়েদের • এমন করে’ অপমান করে কেন? ক্যাথরিন কথা দিল আমার সঙ্গে ছুটীটা কাটাবে, দু’জনে কিছু আগাম দিয়ে হােটেলে ঘর বুক করে’ রাখলুম। পােড়ারমুখী আমাকে আর মুখ দেখায় নি-দেখালে দুই চড় মারতুম—ফোন করে জানিয়েছে আরেক জনের সঙ্গে ব্ল্যাকূপুল ১৩
আগুন নিয়ে খেলা
যাওয়া তার অতি অবশ্য দরকার। (ক্যাথরিনের স্বর অনুকরণ করে)
অতি অবশ্য দরকার !”
সােম বল্ল, “ক্যাথরিনকে আমি দোষ দিইনে। ধরুন, ক্যাথরিন যদি
আপনার ডান হাত ধরে টানে আর আমি টানি আপনার বাঁ হাত ধরে,
তবে আপনিই বলুন না আপনি কার সঙ্গে যাবেন?”
“ক্যাথরিনের সঙ্গে।
“সত্যি?”
“না, ক্যাথরিনের সঙ্গে আমার জন্মের মত আড়ি। ওর সঙ্গে যাব না।
কিন্তু আপনার সঙ্গে যে যাব একথা ভাবলেন কিসে?”
“আমি অন্তর্যামী।”
“কী অহঙ্কার!”
“অহঙ্কার নয়, ম্যাডাম। নিজের ক্ষমতায় বিশ্বাস। জানেন আমি
একজন self-made man
“আমিও self-made.”
“তবে তাে আমাকে আপনার ভুল বােঝবার কথা নয়, মিস স্ক।”
“আমি আপনার জীবনের কী জানি বলুন। ঐ ক্যাথিড্রালটার সম্বন্ধে
যা জানি তার চেয়ে ঢের কম।”
“তা হলে ক্যাথিড্রালেরই জিৎ ?”
“না। ক্যাথিড্রালটা self-made নয়। Self-made manএর উপর
আমার পক্ষপাত আছে।”
“আর আমার পক্ষপাত সুন্দরী নারীর উপর।” (চোখে চোখ মিলিয়ে)
?
৯৪
আগুন নিয়ে খেলা
“তা হলে আমার বাঁ হাত ধরে’ কেন অকারণে টানবেন?”
“আপনার ‘ভ্যানিটি ব্যাগে যদি আয়না না থাকে তবে আমার চোখে
আপনার মুখের প্রতিচ্ছায়া দেখতে পারেন। নিজের রূপ সম্বন্ধে সংশয়
টিকবে না।”
“আপনার ওটা মুখ নয় তাে, ময়রার দোকান।”
“ময়রার দোকানে মুখ দেবার নিমন্ত্রণ রইল। যখন আপনার
সুবিধে হবে তখন।” (মুখ টিপে টিপে হাসা।)
“যান্। আমার সুবিধে কোনাে দিন হবে না।”
“তা হলে দোকানদার তার মাল আপনার দ্বারে পৌছে দিতে
পারবে।”
“পেরে কাজ নেই। মিষ্টি জিনিষ প্রায়ই অন্তঃসারশূন্য হয়ে থাকে।”
“Proof of the pudding is in the eating. একবার পরখ
করে দেখুন না?”
“দেখে কাজ নেই, মশাই। ধন্যবাদ।
“আচ্ছা, দেখা যাবে ক’দিন আমার দাবী এড়াতে পারবেন !”
“ক’দিন কী, মশাই! আজকেই না আপনি ব্রিষ্টল যাচ্ছেন?”
“নিশ্চয়। কিন্তু একা যাচ্ছিনে।”
“জবরদস্ত মানুষ তাে! জোর করে টেনে নিয়ে যাবেন না কি ?”
“বা-হাতখানি বগলে পূরে।”—সােম মিস, স্কটের বাঁ-হাতখানি তুলে
নিয়ে বগলে পূরল।
মিস, স্কট বাধা দিলেন না।
আগুন নিয়ে খেলা
ব্রিষ্টল যাত্রী ট্রেনে দু’জনে মুখখামুখি বসেছিল। মিস স্কট বলছিলেন,
“এত দূর এসে ব্রিষ্টলে না গেলে মাসিমা মন খারাপ করতেন। সেই
জন্যেই যাওয়া।
সােম বছিল, “মাসিমা মহারাণী কী জয়! আমার জোরের সঙ্গে তার
জোর না মিলে থাকলে আমি কি সবেরীর ক্যাথিড্রালের সঙ্গে পেরে
উঠ তুম!”
“বহুকাল তাকে দেখিনি। বড় মন কেমন করছিল।”
“তাকে পেয়ে যেন সেই মানুষটিকে ভুলে যাবেন না যে তার পাণ্ডার
কাজ করেছে।”
“পাণ্ডার কাজ করেছে গুণ্ডার মতাে জবরদস্তি করে।”
“বলবেন সেকথা মাসিমাকে। হয় তাে কিছু বখশিষ মিলে যেতে
পারে।”
“বশিষ না কাণমলা। মাসিমার হাতের কামলা খানি কখনন,
?”
“না। আমার মাসিমা ছিলেন অত্যন্ত লক্ষ্মী। তার হাতের সন্দেশ
মােরব্বা ও ক্ষীরপুলি খাওয়া আজো মনে আছে।”
“আপনার বাড়ীর কথা জানতে ইচ্ছে করে। সেই মাসিমা এখনাে
আছেন ?”
সােমের মুখের উপর শােকের ছায়া পড়ল। মিস্ স্কটু বলেন, “যা
আছেন নিশ্চয় ?”
সােম মুখ ফিরিয়ে নিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।
আগুন নিয়ে খেলা মিস্ স্কট সমবেদনায় নির্বাক হয়ে পা দিয়ে সােমের পা স্পর্শ করলেন। পায়ে পায়ে বাণী বিনিময় চলতে লাগল। কিন্তু কখন এক সময় দেখা গেল পায়ে পায়ে লুকোচুরির খেলা চলেছে। দু’জনেরই দৃষ্টি বাতায়নের বাইরে চাষের জমির উপর, চাষার বাড়ীর উপর, বাচ বীচ, এলম ও পাইন গাছের উপর। কিন্তু দু’জনেরই মুখে ও চোখে দুষ্ট হাসি। যেন নিজেদের পাগুলাের জন্যে নিজেরা দায়ী নয়। গাড়ীতে এত লােক ছিল যে সকলে সকলের সঙ্গে গল্প করতে ও ছেলেপুলে সাল্লাতে ব্যস্ত। দু’টি মানুষ অন্যমনস্কভাবে বাতায়নের বাইরে চেয়ে আছে এই পৰ্য্যন্ত তারা দেখল। দু’টি মানুষের অতি মন্থর চরণ-লীলা তাদের চক্ষু এড়িয়ে গেল। ব্রিষ্টলে যখন গাড়ী দাঁড়াল সােম বুদ্ধি করে’ মিস্ স্কটের সুটকেস্টার ভার নিল। মিস স্কট ভাবলেন নিছক ভদ্রতা। তিনিও ভদ্রতা করে’ সােমের হাত-ব্যাগটির ভার নিলেন। সােমের আপত্তিতে কান দিলেন না। ষ্টেশনের বাইরে গিয়ে মিস কষ্ট বল্লেন, “মাসিমার ঠিকানাটা আপনাকে দিই। কাল সকালে একবার দেখা করলে খুসী হব, মিষ্টার সােম।” এই বলে তিনি একটা ট্যাক্সিকে আসতে ইঙ্গিত করলেন। সােম বল্ল, “আমার হাত-ব্যাগটা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেন, কিন্তু আপনার সুটকেসটি ফিরে পাচ্ছেন না।” “সে কী মিষ্টার সােম! দিনে দুপুরে ডাকাতি ?” ৭ আগুন নিয়ে খেলা “শুধু ডাকাতি করেই ক্ষান্ত হলুম। Abduction এরও ইচ্ছে ছিল, মিস্ কটু।” “কী ভয়ানক মানুষ। এখন ট্যাক্সিওয়ালাকে আমি কী বলে’ ফিরিয়ে দেব ?” “ফিরিয়ে দেবেন কেন? উঠে বসুন। আমিও উঠছি। এই শােননা তাে? একটা ছােট বাের্ডিং হাউসে নিয়ে যেতে পার ? আমরা বিদেশী। পার? ধন্যবাদ। বখশিষ পাবে।” ট্যাক্সিওয়ালা তার বন্ধুদের শুধাল। পুলিশের কষ্টেবল-এর কাছে পরামর্শ চাইল। তারপরে অনতিদূরস্থিত একটি বাের্ডিং হাউসে দু’জনকে পৌঁছে দিয়ে নিজেই এগিয়ে গেল মালিককে ডাকতে। বাের্ডিং হাউসটি খুব ছােট নয়। আসলে বাের্ডিং হাউসই নয়। একটা রেসিডেনসিয়াল হােটেল। তার দু’টি ঘরে দু’জনে জায়গা পেল। ঈষ্টারের মরুসুম। তাই ঘর দু’টি কিছু দামী। সস্তা ঘরগুলাে খালি নেই। সােম মনে মনে একটু ক্ষুন্ন হল। মিস্ স্কট, বিনা ব্যয়ে তার মাসিমার বাড়ী থাকতেন। তাকে অপহরণ করে এনে এতটা ব্যয় করান সােমের উচিত হয়নি। আহারাদির পর সােম কথাটা পাড়ল। বল্ল, “মিস্ স্কট, আমার প্রতি যদি আপনার কিছু মাত্র প্রীতি থাকে তবে আমাকে অনুমতি দিন, আমি আপনার এখানকার খরচটা বহন করি।” এর উত্তরে মিস্ স্কট, এমন একটা কথা বল্লেন যা সােমের মাথা ৯৮ আগুন নিয়ে খেলা, ঘুরিয়ে দিল। বল্লেন, “মিষ্টার সােম, আমি রাস্তার ছুড়ি নই, আমাকে কেনা যায় না।” তার পরে সােম একটিও কথা কইল না। উঠে বিদায় না নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। গিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ল। ভাবল, মেলামেশার একটা সীমা আছে। সেই সীমাটা যে ঠিক কোনখানে কিছুতেই সেটা আমার মালুম হয় না। সেইজন্যে যার সঙ্গে বেশী মিশতে গেছি তার কাছে গলাধাক্কা খেয়েছি। তবু আমার চেতনা হল না। সােম তার নিজের দুই হাতে নিজের দুই কান মল, বালিশের উপর নাক ঘষল। আজকেই সকাল বেলা সে ক্যাথিড্রল দেখবার সময় মনকে বছিল, আমার মতাে সাকসেসফুল ছেলে ক’জন আছে? জীবনে যখন যে পরীক্ষা দিয়েছি তখন তাতে ফাষ্ট হয়েছি। যখন যে মেয়েকে চেয়েছি তখন তাকে পেয়েছি। এই যে পেগী স্কট, মেয়েটি একেও তাে প্রায় পেয়েছি বল্লে হয়। দেখাে একে ব্রিষ্টলে নিয়ে যাই কিনা। তার পরে সত্যিই যখন ব্ৰিষ্টলের গাড়ীতে পেগী স্কটকে তুল তখন মনকে বল্ল, দেখলে তাে, মিষ্টার মন? যা মুখে বলি তা কাজে করি কি ? পেগী স্কটকে তার মাসির বাড়ী যদি যেতে দিয়েছি তবে আমার নাম কল্যাণকুমার সােম নয়। সােম নিজের ক্ষমতার প্রতি সন্দিহান হয়ে নিজেকে গালাগাল দিল। মনকে বল্ল, হালাে, শুনতে পাচ্ছ? মন বল্ল, পাচ্ছি। সােম বল্ল, দেখ, আমার অনুতাপ হচ্ছে। নিজেকে আমি অতিশয় ধূর্ত মনে করেছিলুম। সেট খারাপ। মন বল্ল, একটু কঁাদো। সােম বল্ল, আরেকটা দুর্বলতার ৩ আগুন নিয়ে খেলা কথা তােমাকে বলি। মেয়েটিকে আমার সত্যি সত্যি ভালাে লেগে গেছে। বল্তে পারব না কেন। সুন্দরী নয়, সুদর্শনা। তার বিশেষত্ব হচ্ছে সে খুব সপ্রতিভ। যেন কতকাল আমার সঙ্গে পরিচয়। অনেক মেয়ে আছে তারা ছ’মাসের পরিচয়কেও যথেষ্ট মনে করে না, ভয়ে ভয়ে কথা বলে, পাছে ভব্যতার সীমা লঙ্ঘন করে অশ্রদ্ধা পায়। এ মেয়েটি শ্রদ্ধার জন্যে কেয়ার করে না, অশ্রদ্ধা পেলেও কেয়ার করবে না। কেউ একে ভালােবাসুক না বাসুক বিয়ে করুক না করুক তাতে এর কিছুই আসে যায় না। সেই জন্যেই কি একে আমার ভালাে লেগে গেছে ? মন জবাব দিল না। কিন্তু দরজায় কে টোকা মারল বাইরে থেকে। সােম ভাবল, বােধ হয় হােটেলের বােধ হয় জিজ্ঞাসা করতে চায় কাল সকালে ঘুম ভাঙাতে হবে কি না। সােম উঠে বল্ল। “ভিতরে আসতে পার।” । মিস স্কটু। মিস স্কটু আগে জানালার কাচটা তুলে দিলেন। বল্লেন, “দিনটা যদিও বেশ উজ্জ্বল ও উত্তপ্ত ছিল রাতটাও তেমনি হবে এর মানে নেই।” তারপর সােমের হাত-ব্যাগটাকে টিপুনি দিয়ে খুলে তার ভিতরকার জিনিষগুলিকে একে একে বের করলেন। মুখ-হাত ধােবার টেবিলের উপর রাখলেন কামাবার সরঞ্জাম, চুলের ব্রাশ ও ক্রীম, দাঁতের ব্রাশ ও পেষ্ট। দেরাজের ভিতর রাখলেন শার্ট, গঞ্জি মােজা কলার টাই। কেউ হবে।
আগুন নিয়ে খেলা
নীচে গুজে দিলেন স্লিপিং সুট। চটি জোড়াটিকে রাখলেন খাটের
কাছে যে ষ্ট্যাণ্ড, থাকে তারই ভিতরে।
•তারপরে একটি চেয়ার টেনে নিয়ে সােমের দিকে মুখ করে’
বলেন।
সােমের রাগ পড়ে গেছল। রাগের স্থান অধিকার কছিল মমতা।
আহা, এই মেয়েটি যদি আমার ঘরণী হত। তবে আমার বইয়ের
টেবিলের উপর টাই, বিছানার উপর শার্ট, ও মেজের উপর মােজা
গড়াগড়ি যেত না, চটি জোড়াটাকে দরকারের সময় খুঁজে পাওয়া যেত।
তা হলে আমাকে আমার ল্যাণ্ডলেডি বুড়ীকে auntie বলে তােয়াজ
করতে হত না।
মিস্ স্কট বল্লেন, “কী ভাবা হচ্ছে।”
সােম অভিমানের সুরে বল্ল, “জেনে আপনার লাভ! আরেক দফা
অপমান করবেন ?”
“কবে আপনাকে অপমান করলুম, মশাই?”
“নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন।”
“সত্যি, আমি সজ্ঞানে অপমান করিনি। অজ্ঞানে যদি করে থাকি
তবে মাফ চাইছি, মিষ্টার সােম।”
সােমের অভিমান জল হয়ে গেল। সে বল্ল, “ঐ যে বল্লেন আপনাকে
কেনা যায় না!”
“সে তত ঠিকই। আমাকেও কেনা যায় না, আপনাকেও না।
কেউ কারুর খরচ দেবে কেন ?”
৪
১০১
'আগুন নিয়ে খেলা
“কিন্তু মিস্ স্কট, আমার জন্যেই যে আপনাকে খরচ কতে হল।
নইলে আপনার তাে মাসির বাড়ী রয়েছে।”
“খরচ করবার জন্যে ছুটীতে বেরিয়েছি, খরচ হল তাে বয়ে গেল।
ধরুন আজ যদি সবেরীতে থাকতুম।”
“সেখানেও তাে ক্যাথরিনকে ও আপনাকে জরিমানা দিতে হয়েছে
পূরাে তিনরাত থাকলেন না বলে।”
“না গাে মশাই, আমরা অত কঁচা মেয়ে নই। ঈষ্টারের ভিড়,
হােটেলওয়ালাকে জায়গার জন্যে যাত্রীরা চেপে ধরেছে। আমি ওদের
মধ্যে দু’জনকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলুম, আমার বন্ধুর ও আমার
দু’টো ঘর আমরা আপনাদের ছেড়ে দিতে পারি আপনারা যদি দু’রাত
থাকবেন প্রতিশ্রুতি দেন। ওরা আবেগের সঙ্গে বল্ল, “How kind of
you! How noble of you!'
সােম শেষের কথাগুলি শুনে সশব্দে হেসে উঠল। বল্ল, “আমাকে
ওকথা আগে বলেননি কেন? সেজন্যে আপনার উপর রাগ করব।”
“করুন রাগ। আমি বসে বসে দেখি।”
সােম বল্ল, “এতরাত্রে একজন ব্যাচলারের ঘরে বসে আছেন,
আপনার সাহস কম নয়।”
'কেন, ভয় করব কাকে ?”
“যদি বলি, লােকনিলাকে ?”
“লােকনিন্দার ভিৎ কঁচা, যতক্ষণ আমি নিজে খাটি আছি।”
“যদি বলি, আমাকে ?”
১০২
আগুন নিয়ে খেলা
( আতঙ্কের সঙ্গে) “আপনাকে ?”
( কৌতুকের সঙ্গে) “আমার হাতের কাছে সুইচ। আপনার হাতের
কাছে নয়। এই মুহূর্তে ঘর অন্ধকার করে দিতে পারি।”
(সাহস ফিরে পেয়ে) “চীৎকার করে রাজ্যের লােক জড়াে করব।”
“ভীরুরাই চীৎকার করে থাকে। ছিঃ ছিঃ, মিস্ স্ক।”
“আমার গায়ের জোর আপনার থেকে কম নয়, মিষ্টার সােম।”
“ছেলে মানুষের মতাে কথা হল মিস্ স্কট। জানেন না যে
অতিশয় দুর্বল মানুষও দুর্দান্ত হয়ে ওঠে যদি একতাল সােনা পড়ে
রয়েছে দেখে।”
( ফিক করে হেসে) “আমি কি একতাল সােনা?”
“নিশ্চয়, কিন্তু দেশ কাল পাত্র অনুসারে। অপরিসর ঘর, এগারােটা
রাত, যুবা পুরুষ। এমন সুযােগ জীবনে এক আধবার আসে। এ কথা
যখন ভাবা যায় তখন শশকের দেহতেও সিংহের বল সঞ্চার হয়,
মিস্ স্ক।”
“তা হলে আমি এই বেলা পালাই, মিষ্টার সােম।”
“না, না, আরেকটু বসুন।”
“না না, আমার আর সাহস থাক্ছে না।”
“সত্যি?”
“সত্যি।”
“কেলেঙ্কারি, মিস্ স্কট! ঠাট্টাও বােঝেন না!”
“এসব বিষয়ে ঠাট্টা যে গড়াতে গড়াতে কতদূর যায় তার দুয়েকটা
১০৩
আগুন নিয়ে খেলা
দৃষ্টান্ত জানা আছে, মিষ্টার সােম। দু’টো দিনের পরিচয়ে আমরা
বড় বেশী দূরে এগিয়েছি।”
“সে তাে শুধু বাক্যে। ফ্রান্সের মতাে দেশে যা ধূলার মতাে সত্য,
যা যে-কোনাে যুবক যে-কোনাে যুবতীকে দিতে পারে, আপনাকে
তাই আমি এ পর্যন্ত দিইনি—আমার এই সংযম, এই আত্মনিগ্রহ যেন
আমার উপর আপনার আস্থাকে অটুট রাখে, মিস্ স্ক।”
(লজ্জারুণ বদনে) “সেই মূল্যহীন উপঢৌকনটির নাম জাতে
পারি কি?”
“আপনিই আন্দাজ করুন না?”
“ফুল ?”
‘ফুলের তাে দাম আছে।
“তবে কী ?”
“চুম্বন।”
মিস্ স্কটু সরমে রাঙা হয়ে দু’হাতে মুখ ঢালেন। তৎক্ষণাৎ
সপ্রতিভ ভাব ফিরে পেয়ে উঠে দাড়ালেন। বল্লেন, “এর জন্যে
এত দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকা ?”
সােম কী বলবে ভেবে পেল না। সতৃষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।
মি স্কট তার পাশটিতে গিয়ে বলেন। বল্লেন, “আর দেরি
। ঘুম পাচ্ছে। দিন্।”
সােম ঘাবড়ে গেল। এতটা প্রসন্নতা প্রত্যাশা করে নি। তার
অত্যন্ত লজ্জা বােধ হচ্ছিল।
১০৪
আগুন নিয়ে খেলা
মিস্ স্কট, হাসতে হাসতে বল্লেন, “দি, দি, দিন্।”
সােম লজ্জায় জড়সড়। অপ্রস্তুতের একশেষ।
চিরকাল সে
যাচিত ভাবে দিয়েছে। কদাচিৎ অযাচিতভাবে পেয়েছে। কিন্তু
কোনাে দিন কেউ তার কাছে চুম্বন ভিক্ষা করেছে বলে তাে মনে
পড়ে না।
তখন মিস্ স্কট, স্প্রিংএর মত লাফ দিয়ে দাঁড়ালেন। বল্লেন,
“গুড নাইট, মিষ্টার সােম।” দরজার কাছ অবধি গেছেন এমন
সময় সােম দিল সুইচটা টিপেণ
সােমের বুক ঢিপ ঢিপ করছে। সে যে কী চায় স্পষ্ট করে বুঝতে
পারছে না। তবু মিস্ স্কটকে সে যেতে দেবে না। অন্ধকারে তার
লজ্জা সঙ্কোচ রইল না। সে কঁপতে কাঁপতে মিস্ স্কটের পিছনে গিয়ে
দাড়াল।
মিস্ স্কটের পলায়নের ত্বরা ছিল না। তিনি স্তম্ভের মতাে স্তব্ধ
হয়ে কী জানি কী ভাবছিলেন। সােম তাকে হিড়হিড় করে টেনে এনে
বিছানার উপরে বসাল ও বল। ঠিক সেই আগের জায়গা দু’টিতে।
কিন্তু সুইচ আর টিপল না।
অন্ধকার ঘর। হােটেল নিঃশব্দ। সােম ও মিস্ স্কট, কেউ কোনাে
কথা বলে না। পরস্পরকে স্পর্শ করে না পৰ্যন্ত। একজন থর থর করে’
কঁপছে, অন্যজন মৰ্ম্মর-মূর্তির মতাে নিঃস্পন্দ। পাঁচ মিনিট কেটে গেল।
যেন একটা যুগ।
মিস স্কট, উঠে দাঁড়ালেন। তখন সােমও উঠে দাড়াল। মিস
১০৫
আগুন নিয়ে খেলা স্কট দরজার দিকে পা বাড়ালেন। তখন সােম তার গতিরােধ করে’ তাকে দুই বাহু দিয়ে বাঁধল। তার মাথাটি তার গলার উপর ঢলে পড়ল। সােম তার কেশের উপর চুম্বন বৃষ্টি করে’ চল্ল। অনেকক্ষণ চলে গেলে পর তিনি মুখ তুল্লেন। বল্লেন, “Have you finished ?" এতক্ষণ যেন একটা বস্তুকে চুম্বন করছিল। মানুষের গলার সুর শুনে মানুষের সঙ্গে মুখােমুখি হয়ে সােম আবার লজ্জায় ম্রিয়মাণ হল। তখন তার বাহুপাশ খুলে মিস্ স্কট প্রশান্ত পদক্ষেপে ঘর থেকে বাহির হয়ে গেলেন। ১৬ সব আগের দিন নাম তার কল্যাণকুমার সােম। কিন্তু কিন্তু ইংলণ্ডের জল হাওয়ার গুণে তার ইংলণ্ড-স্থিত বাঙ্গালী বন্ধুরাও তাকে সােম বলে ডাকে। তার বাল্যবন্ধু প্রভাত তার ছর খানেক আগে ইংলণ্ড এসেছে, সেই এক বছর বন্ধুর নাম ভুলিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট, তাই ষ্টেশনে অভ্যর্থনা করতে এসে প্রভাত তাকে সম্বােধন করেছে, “এই যে, সােম।” কাজেই সেও প্রভাতকে ডাকছে দাশগুপ্ত বলে। দিন কয়েক আগে ঈষ্টারের ছুটীতে কলেজ বন্ধ হয়েছে। কিন্তু লণ্ডন ছাড়তে সােমের মায়া করছে। লণ্ডনকে সে ভালােবেসেছে, সেটা একটা কারণ। রােজ সন্ধ্যায় সােহাে অঞ্চলে না খেলে তার খেয়ে সুখ হয় না। সেখানে নানা দেশের রকমারি ললাকের সঙ্গে তার দোস্তি হয়। ওয়েট্রেসের সঙ্গে সকলের মতাে সেও ইয়ার্কি দেয়। মাঝে মাঝে ফ্লার্ট করবার মতাে বান্ধবীও পায়। তবে সােম হুশিয়ার ছেলে। দশটার আগে বাসায় ফিরবেই, এবং বারােটা অবধি বই খাতা নিয়ে বসবেই। সকাল সকাল কলেজে যেতে হয় বলে ঘুমের ঘরে যেটুকু ফাক পড়ে সেটুকু শনিবারে রবিবারে বুজিয়ে দেয়। রাত বারােটার থেকে ১০৭ আগুন নিয়ে খেলা বেলা বারােটা অবধি ঘুম। শনি ও রবি এই দু’টি বারের নাম “কুম্ভকর্ণ day." সম্প্রতি ঈষ্টারের ছুটী হয়ে এমন হয়েছে যে প্রত্যেক দিনই “কুম্ভকর্ণ দিন।” তাতে সােমের তত আনন্দ, কিন্তু তার ল্যাণ্ডলেডির আপত্তি। ল্যাণ্ড লেডি যেদিন থেকে তার আষ্টি হয়েছে সেদিন থেকে মায়ের চেয়ে দরদী হয়েছে। সকাল বেলা ব্রেকফাষ্ট না খেলে যে শরীর টিকবে না অর্থাৎ ল্যাণ্ডলেডির পক্ষে ব্রেকফাষ্টের বাবদ কিছু অর্থপ্রাপ্তি শক্ত হবে সেই জন্য আন্টি সােমের শশাবার ঘরের বাইরের করিডর দিয়ে খট খট করে’ দু’শাে বার চলা ফেরা করে, তবু ভাগ্নের ঘুম ভাঙে না বারােটার আগে। সােম রােজই ভাবে ঘুম থেকে উঠে সােজা কোনাে রেস্তোরাতে গিয়ে লাঞ্চ খাবে, কিন্তু বােজই আন্টির আবদার—“সােম, তােমার ব্রেকফাষ্ট কখন থেকে টেবিলের উপর পড়ে। তােমার আজকাল হল কী! বুধ বৃহস্পতি বারকেও তুমি শনি রবিবার করে তুলে। তােমার জন্যে তিনবার চায়ের জল গরম করেছি, পরিজ-এর দুধ গরম করেছি, ঘণ্টায় ঘণ্টায় ভেবেছি এইবার তুমি উঠবে।” সােম বল্ল, “ধন্যবাদ, আন্টি! কিন্তু কেন এত কষ্ট করলে !” “করব না? তুমি সকাল বেলাটা উপোস দেবে, তাতে তােমার শরীর টিকবে? দুষ্ট ছেলে ! থাকত যদি তােমার মা এখানে তােমাকে বিছানার থেকে টেনে তুত।” তারপর বুড়ীর আদর শুধু ব্রেকফাষ্ট খাইয়ে তৃপ্তি মানে না। বুড়ী Sob আগুন নিয়ে খেলং বলে, “অবেলার ব্রেকফাষ্ট। রােসস, কিছু বােষ্ট কিম্বা ই দিয়ে যাই। পেট ভরে খাও। আর বাজারের লাঞ্চ, খেয়ে কাজ নেই।” অতএব সােমের আর বাইরে গিয়ে লাঞ্চ খাওয়া আলাপ করা ফ্লার্ট করা হয়ে ওঠে না। সে কোনাে দিন সিনেমায় কোনাে দিন আর্ট গ্যালারীতে অপরাহুটা কাটিয়ে দেয়। কোনােদিন বাস্-এর মাথায় চড়ে শহর দেখে বেড়ায়। লণ্ডন ছাড়তে তার মায়া করে। কিন্তু যেদিন উডফ্রাইভে এল সেদিনকার ওয়েদারটি হল নিখুৎ। যেন ভারতবর্ষের বসন্ত দিন। সােমের শশাবার ঘর রৌদ্রে ঝলমল করল। সােম চোখ বুজে থাকতে পাল না। বাঁ-হাতের রিষ্ট ওয়াচটাতে দেখল তিনটে বেজে দশ মিনিটু। কানের কাছে নিয়ে বুঝল, বন্ধ। বেলা যে ক’টা হতে পারে আন্দাজ করা কঠিন। যেমন রৌদ্র উঠেছে, মনে হয় বারােটা বেজে একটা বেজে গেছে। সােম ঘড়িটাকে বার দুই নাড়া দিল। হাই তুলতে তুলতে বিছানার উপর উঠে বল । তাড়াতাড়ি পােষাক পরে’ নীচে নেমে এসে দেখল আন্টি কুকুর- সেবা করছে। ওটা তার প্রাতঃকালের প্রথম কর্ম। সােমকে দেখে বল্প, “এ কী অনাসৃষ্টি ব্যাপার! সাড়ে ছ'টার সময় পােষাক পরে কোথায় চল্লে ?” সােম বল্ল, “মােটে সাড়ে ছ'টা! তােমার ঘড়ি ঠিক চলছে তাে আন্টি ? আন্টির ঘড়ি অবশ্য সর্বদা আধ ঘণ্টা পেছিয়ে চলে। ওটা আন্টির ১০৯ আগুন নিয়ে খেলা পলিসি। ঠিক সময়ে খাবার দিতে পারে না, ঘড়ি দেখিয়ে বলে, “আমার অপরাধ কী! ঘড়িতে এখনাে ঠিক সময় হয় নি।” তখন সােম বলে, “তা হলে কাল থেকে আমাকে আধ ঘণ্টা আগে খাবার দিও।” তার ফলে বুড়ী ঘড়িটাকে এক ঘণ্টা পেছিয়ে রাখে। সােম বলে, “আন্টি, রক্ষা করাে। যদি বলি কাল থেকে আরাে আধ ঘণ্টা আগে খাব তা হলে তুমি ঘড়িটাকে আরাে আধ ঘণ্টা পেছিয়ে দেবে। শেষে একদিন আটটার সময় উঠে দেখব তােমার ঘড়িতে দুটো বেজেছে, আড়াইটে না বাজলে তুমি খাবার দেবে না ” অগত্যা সােম আধঘণ্টা আগে উঠতে ও উঠে বুড়ীকে তাড়া দিতে অভ্যাস করল। এ গেল ঘড়ির ইতিহাস। বুড়ী বল্ল, “সাড়ে ছটায় সময় কাজের েিদনও তােমার ঘুম ভাঙে না, এই ছুটীর দিনে তুমি চল্লে, কোথায়?” সােম চট করে বানিয়ে বল্ল, “তােমাকে বলিনি বুঝি, আন্টি অন্যায় হয়ে গেছে। কিন্তু তাতে তােমার লােকসান হবে না। আমি যে পনেরাে দিন বাইরে থাকব সে ক’দিনের বাসা ভাড়া ঠিক এমনি দিতে থাকব।” বুড়ী উত্তেজিত হয়ে বল্ল, “যাচ্ছ বাইরে পনেরাে দিনের মতাে। না খেতে পেয়ে রােগা হয়ে ফিরবে, সাবধান করে দিচ্ছি, সােম।” সােম বল্ল, ব্রেকফাষ্টের দামও যেমন দিচ্ছিলুম তেমনি দেব, আন্টি।” -বুঝতে পেরেছিল কী নিগূঢ় কারণে বুড়ী উত্তেজিত। মােটে সাতটা বেজেছে। কুকুর-সেবা শেষ হলে বুড়ী ব্রেকফাষ্টের ? ১১০ আগুন নিয়ে খেলা উদ্যোগ করবে। সােম ততক্ষণ কুকুরের সঙ্গে বল নিয়ে লােফালুফি খেতে থাকল। কোথায় যাবে, সে কথা সােম বুড়ীকে বলে নি। কারণ, সে নিজেই জানে না। একটা হাত-ব্যাগে গােটা কয়েক জিনিষ পূরে বেরিয়ে পড়ল। আগে পথ, তারপরে পথের চিন্তা। চলতে চলতে চলার লক্ষ্য স্থির করা যাবে। অক্সফোর্ড ষ্ট্রীট * ধরে হাঁটতে হাঁটতে মা আর্চ পর্যন্ত এল। তারপরে হাইড পার্কে ঢুকল। তখন ইচ্ছা হল সার্পেনটাইনে কিছুকাল বােটিং করে। যেখানে বােট ভাড়া করতে হয় সেখানে ভিড় জমেছে। যারা আগে এসেছে তাদের দাবী আগে। সােম ভিড়ের পিছনে ভিড়ে গেল। মিনিট কয়েকের মধ্যে দেখা গেল পাশের লােকের সঙ্গে তার ভাব হয়ে গেছে। তারা দু'জনে মিলে একটি বােট ভাড়া করল। সার্পেন্টাইনে নৌকা চালিয়ে সুখ নেই যদি না নৌকাতে কোনাে বান্ধবী থাকে। তবু সুখ না হােক, অর্ধ সুখ, যদি নব পরিচিত বান্ধব থাকে ও সমানে দাড় টানে। ঘণ্টা দুই দাড় টেনে যখন রীতিমত শ্রান্ত হল তখন পথিক-বন্ধুর কাছে বিদায় নিয়ে সোঁম আবার পথ ধরুল। হাঁটতে হাঁটতে কখন এক সময় ভিক্টোরিয়ায় এসে পড়ল। ষ্টেশন দেখলেই মনটা বিবাগী হয়ে যায়। বিশেষতঃ ভিক্টোরিয়া ষ্টেশন, যেখান থেকে ফ্রান্স জাৰ্মানী ইটালী অভিমুখে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ট্রেণ ছাড়ছে। ১১১ ৫ আগুন নিয়ে খেলা সােমের পকেটে যে টাকা ছিল তাতে প্যারিসে গিয়ে দশ দিন থাকা যায়, সুইজারলণ্ডে গিয়ে ছ’দিন, ভিয়েনাতে তিন দিন। কিন্তু বুড়ীকে বলেছে পনেরাে দিনের জন্যে যাচ্ছে। ইংলণ্ডের কোনাে পল্লীতে দিন পনেরাে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেবার নিঝঝাট আরাম তাকে প্রলুব্ধ করছিল। লণ্ডন থেকে দূরে নয়, অথচ বেশ নিরিবিলি। এমন কোনাে জায়গা পাওয়া যায় কি না তল্লাস করবার জন্যে সাদার্ন রেলওয়ে কোম্পানীর গাইড বই চেয়ে নিয়ে ষ্টেশন রেস্তোরাঁতে লাঞ্চ খেতে বল। গিল্ডফোর্ড নামটি ভাললা, ঐতিহাসিক স্মৃতিতে মুখর। ঐ স্থানটিকে রাত্রিকালের কেন্দ্র করে প্রতিদিন নতুন পথে নিক্রমণ করা যাবে। calcatfia Waverly Abbey, Getoantina Holt Forest, praat দিন Leith Hill. মানচিত্র খুলে দেখল গিলফোর্ড থেকে দিকে দিকে রাস্তা বেরিয়ে গেছে। সােম মনঃস্থির করে ফেল্ল। গিল্ডফোর্ডের টিকিট কি। যে প্ল্যাটফর্ম থেকে গাড়ী ছাড়ে ও যে সময়ে ছাড়ে সে সব কথা ষ্টেশনে উত্তোলিত ব্ল্যাকবাের্ডে লেখা ছিল, কিন্তু এতগুলাে নাম পাশাপাশি ছিল যে সােম ভুল পড়ল। প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করবার সময় টিকিট দেখে রেলের কর্মচারী বল, “গিল্ডফোর্ড ? এ গাড়ী তাে সােজা গিল্ড- ফোর্ড যাবে না। এক কাজ করতে পারেন। Wokingএ নেমে অন্য ট্রেণ ধরতে পারেন।” সােম বল, “ধন্যবাদ।” ১১২ আগুন নিয়ে খেলা , তখন ট্রেন ছেড়ে দেবার মুখে। লােকটি বল্প, “দৌড়ন। আধ মিনিট বাকী।” সােম দৌড়ল। কিন্তু যে কামরায় ঢুকতে যায় সে কামরায় গুড ফ্রাইডের জনতা। ট্রেণ ফেল করতে তার অনিচ্ছা ছিল , আধ ঘণ্টার মধ্যে আবার ট্রেন আছে। কিন্তু একবার প্ল্যাটফর্মে ঢুকে বিফল হয়ে বেরিয়ে যাওয়া বড় লজ্জার কথা! সােম হাঁপাতে হাঁপাতে এঞ্জিনের কাছের কামরাগুলােকে লক্ষ্য করে’ ছুটুল। তখন গাড়ী ছেড়ে দিয়েছে। সােম হাঁ করে 'পঁড়িয়ে সেই বৃহৎ সরিসৃপটির গতিলীলা নিরীক্ষণ করছে এমন সময় একটি দরজা খুলে দিয়ে একটি তরুণী হাতছানি সােম কালক্ষেপ না করে হাতব্যাগটা ট্রেনের ভিতর ছুঁড়ে ফেল্ল এবং দুই হাতে দুই পাশের লােহার শিক ধরে’ করিডরের উপর লাফ দিয়ে পড়ল। সেই বগিটিতে একটি কামরায় একটি জায়গা খালি ছিল। তরুণীটির পশ্চাদনুসরণ করে সােম সেই জায়গার সন্ধান ও অধিকার পেল। তখনও হৃৎকম্পন রহিত হয়নি। একটু বেকায়দায় পড়লে কাটা পড়ত। যা একটা ফঁাড়া গেছে। মেয়েটি সােমের সুমুখের সারিতে বসেছিল। একটা ব্রাউন রঙের হাই তার মাথায়, একটা ব্রাউন রঙের ওভারকোট তার গায়। নীল নয়ন, উন্নত নাসা, নিটোল গাল, রক্তিম অধর। ত্বক্ এত পাৎলা যে তুলনা দিতে হয় আঙুরের সঙ্গে। সে আঙুর সাদা হওয়া চাই—রক্তাভ দিল। ইংরেজরা যাকে blonde বলে মেয়েটি তাই। আমরা যাকে ১১৩ . আগুন নিয়ে খেলা ফরসা কিম্বা সুন্দর বলি তা নয়। তার কারণ আমরা ফরসাই হই আর শ্যামলই হই আমাদের গায়ের রং আমাদের চামড়ার নীচের রং নয়, চামড়ার উপরের রং। অর্থাৎ সূৰ্য্যদেব আমাদের চামড়ার উপর রং মাখিয়াছেন, সে রং দুধে আলতাই হােক আর হাঁড়ির কালিই হােক। অপর পক্ষে ইংরেজের গায়ের রং তার চামড়ার নীচের রং। তার চামড়া হচ্ছে জলের মতাে আলাের মতাে বর্ণহীন। তাই চামড়া ফুটে রক্ত মাংসেরই রং বাইরে থেকে দেখা যায়। মেয়েটি তার বয়সের মেয়েদের তুলনায় গম্ভীর। নতুবা হাত কিম্বা হাসির ভাণ করত কিম্বা হাসির ছল খুঁজত। হাতে মুখ রেখে চুপ করে’ কী যেন ভাবছে, মাঝে মাঝে একবার সােমকে চুরি করে দেখছে, চোখাচোখি হয়ে গেলে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। সােমের হাসি পাচ্ছে, সােম সে হাসি চাপছে। সােমের গাম্ভীৰ্য মেয়েটির গাম্ভীর্যকে খোঁচা দিচ্ছে। কামরাটিতে আরাে অনেক স্ত্রী-পুরুষ ছিল, কিন্তু কেউ কারুর সঙ্গে আলাপ সুরু করতে সাহস পাচ্ছিল না। বােবার মেলা। সােম জান্ত একবার যদি একজন একটি কথা বলে সকলের মৌন ভঙ্গ হয়। কিন্তু সেই প্রথম কথাটি কে কাকে সাহস করে বলবে? একজন আতা আন্তা করে বলেন, “আমার মনে হয় আজ বৃষ্টি হবে ।” আরেক জন তার উত্তরে বল্লেন, “আমার তত মনে হয় না। আপনার ?” (তৃতীয় একজনের প্রতি)। U ১১৪ আগুন নিয়ে খেলা । তৃতীয় জন বল্লেন, “বলা ভারি কঠিন। কখন কোথা দিয়ে একখানা মেঘ উড়ে আসবে— একজন বৃদ্ধা কথাটিকে সমাপ্ত করবার ভার নিলেন। বল্লেন, “আর এমন সুন্দর দিনটা মাটি করে দেবে।” কামরার সবাই একে একে কথাবার্তায় যােগ দিল ; দিল না কেবল সেই মেয়েটি ও সােম। তারা পরস্পরের দিকে চেয়ে কখন এক সময় চাপা হাসি হাতে আরম্ভ করে দিয়েছিল কামরার অন্য সকলের ভাব দেখে। কামরার সকলেই তাদের বয়ােজ্যষ্ঠ। বয়ােজ্যষ্ঠদের প্রতি এ যুগের বয়ঃকনিষ্ঠদের প্রচ্ছন্ন উপহাস ও অনুকম্পা যে কোনাে দু’জন অপরিচিত বয়ঃকনিষ্ঠকে নিকট করে তােলে। যেন ঐ কামরাটিতে দুটি দল -বয়ােজ্যষ্ঠদের ও বয়ঃকনিষ্ঠদের। মজা হল যখন জ্যেষ্ঠদের একজন সােমকে বল্লেন, “আরেকটু হলেই আপনি ট্রেনটা মিস্ করেছিলেন, না?” সােম বল্ল, “শুধু ট্রেনটা নয়, প্রাণটাও।” ( সােম সেই মেয়েটির দিকে চেয়ে হাসল।) যারা সােমকে লাফ দিতে দেখেছিল তারা শিউরে উঠল। যারা দেখেনি তারা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সােম বল, “আমি ভাবছি ভগবানকে ধন্যবাদ দেব, না, ব্যক্তি বিশেষকে ধন্যবাদ দেব।” (মেয়েটির বুকের রক্ত মুখে সঞ্চারিত হওয়ায় তাকে রক্ত গােলাপের মতাে দেখাল।) তখন সকলের দৃষ্টি পড়ল মেয়েটির উপরে। এতক্ষণ তার অস্তিত্ব ১১৫
আগুন নিয়ে খেলা
সকলে অবচেতনীর মধ্যে অনুভব করছিল, একটি ছােট কামরায় আট জন
থাকলে যেমন হয়ে থাকে। আমরা ক’জনা এক সঙ্গে আছি, মনকে এ
সত্য হয় ততী রাঙায়, হয় তাে রাঙায় না, কেননা অনেকের মন
সুদূরস্থিত প্রিয়জনের সঙ্গ পেতে থাকে। কিন্তু দেহের নৈকট্য দেহের
ফোটো-প্লেটের উপর ছাপ রাখবেই। যদিও সে ছাপকে
অনেকে
ডিভেলপ করে না, সে সম্বন্ধে সচেতন হয় না।
এক সঙ্গে সকলের দৃষ্টি তার উপরে পড়ায় মেয়েটি অপ্রতিভ হয়ে
সােমের উদ্দেশে বল্ল, “ব্যক্তিবিশেষটি যদি আমি হয়ে থাকি তবে ধন্যবাদটা
আমাকে দিয়ে কাজ নেই। বরঞ্চ নিজেকে দিন চিম্পাঞ্জির মতাে লাফ
দিতে পারেন বলে।”
মেয়েটির প্রথম সম্ভাষণ এই। প্রথম সম্ভাষণেই তাকে চিম্পাঞ্জির সঙ্গে
তুলনা করা। সােমের ভারি রাগ হচ্ছিল। কিন্তু Wokingএর দেরি
নেই, এখুনি নেমে যেতে হবে। সােম মনে মনে অনেকগুলি জবাব
তৈরি করতে লাগল। কিন্তু কোনােটাই যথেষ্ট কড়া অথচ
রসাল হয় না। তাই সােম রাগটাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে
পারে না।
সােম এক অদ্ভুত সঙ্কল্প করে বল্ল। Woking এ নামবে না।
মেয়েটি যে-ষ্টেশনে নামবে সেই ষ্টেশনে নামবে।
এ জন্যে যদি
দক্ষিণ পশ্চিমের শেষ সীমায় যেতে হয় তবু সােম যাবে। মেয়েটিকে
সে সহজে ছাড়বে না। মনকে জিজ্ঞাসা করল, কী শাস্তি দিলে শােধবােধ
হয় ? মন বল্ল, শাস্তির সেরা শান্তি
চুম্বন
। কিন্তু বহু ধৈর্য্যে বহু ভাগ্যে
ইংলণ্ডের
১১৬
আগুন নিয়ে খেলা সম্ভব হয়। সােম বল্ল, পনেরাে দিনেও সম্ভব হয় না? মন বল্ল, হয় । যদি তােমার মান অপমান অভিমান বােধটা কম হয়। যদি বুলগের মতাে গোঁ থাকে তােমার। Wokingএ সােম নামল না। জন দুয়েক নেমে গেল ৩ জন দুয়েক তাদের জায়গা দখল কবুল। তারপরেই সােম পড়ল মুস্কিলে। টিকিট-চেকার এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে হাঁকুল, “টিকিট! টিকিট। মেয়েটি কোন ষ্টেশনে নামবে সােম যদি তা জান্ত তবে নির্ভাবনায় বলত, “মত বদলেছি। গিল্ডফোর্ড যাব না। অমুক ষ্টেশনের ভাড়া নিয়ে রসিদ দাও।” ইংলণ্ড প্রভৃতি দেশে জরিমানা দিতে হয় না, ১০ মাইলের টিকিট কিনে ১০০ মাইল গেলে ৯০ মাইলের অতিরিক্ত দাম দিলেই গােলমাল চুকে গেল। সােম ভাবল, জিজ্ঞাসা করি ওঁকে কোন ষ্টেশনে উনি নাবেন। কিন্তু চরম অভদ্রতা হবে । টিকিট-চেকারকে বল্ল, “শােনন। আমি গিল্ডফোর্ড যাব না ঠিক করলুম, কিন্তু কোথায় যে যাব ঠিক করিনি। দরকার হলে Penzance যেতে পারি, আবার কাছেই কোথাও নেমে পড়তেও পারি। তুমি এক কাজ করাে, তুমি আবার যেখানে চেক করতে আসবে সেইখানকার ভাড়া নিয়ে রসিদ দাও।” চেকার বল্ল, “সে অনেক দূর। Axminster.* ১১৭ আগুন নিয়ে খেলা সােম বল্ল, “কুছ পরােয়া নেই।” চেকার বল্ল, “আচ্ছা, আপনার জন্যে আমি মাঝখানে দু’একবার আসব। আপাতত ভাড়া দিতে হবে Whitchurch পৰ্য্যন্ত।” সােম বল্ল, তথাস্তু।” বিদেশী মানুষের কাছে অদ্ভুত কিছু সকলেই প্রত্যাশা করে। সােমর কাণ্ড দেখে সকলেই একবার গম্ভীরভাবে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে কাল। সেই মেয়েটিও। সােম খুসী হলাে এই ভেবে যে মেয়েটি তার গােপন সঙ্কল্প টের পায়নি। পরে যখন এক ষ্টেশনে দু’জনে নামবে তখন মেয়েটিকে সােম চমকে দিয়ে অনুরােধ করবে, “আমাকে একটা হােটেলের সন্ধান দিতে পারেন ?” তারপরে বলবে, কাল যদি আমার হােটেলে একবার পায়ের ধূলাে দেন?” এই সব কাল্পনিক কথােপকথন বানাতে বানাতে সােমের সময় বেশ কেটে যাচ্ছিল, তার মুখে হাসি ফুটে উঠছিলও। সােম মাঝে মাঝে মেয়েটির চোখে চোখ রেখে তার মনের কথা ধরবার চেষ্টা করছিল। এখন আর মেয়েটি চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল না, বরঞ্চ সকৌতুকে সােমকে অধ্যয়ন করছিল, যেন সােম চিড়িয়াখানার চিম্পাঞ্জি। সােমের যতই রাগ হচ্ছিল ততই জেদ বাড়ছিল। এতগুলাে লােকের সাক্ষাতে অপরিচিত মেয়েকে ফস্ করে জিজ্ঞাসাও করতে পারে না যে কেন আমাকে গাড়ীতে উঠতে ইঙ্গিত করলেন ? চিম্পাঞ্জির সঙ্গে সময় কাটিয়ে আমােদ পাবেন বলে ? ১১৮ আগুন নিয়ে খেলা Whitchurch এল। সেই সঙ্গে এল সােমের পূর্বপরিচিত টিকিট- চেকার। বল, “কী ঠিক করলেন, স্যর ?” সােম লক্ষ্য করল মেয়েটি নাম্বার উদ্যোগ করছে না। তার সুটকেস নামানাে হয়নি, ওভারকোটের বােম আঁটা হয়নি। সােম বল্ল, “কিছুই ঠিক করিনি, চেকার। তুমি যা বলবে তাই হবে।” চেকার আপ্যায়িত হয়ে তাকে সবেরীর রসিদ দিল। সােম লক্ষ্য করল মেয়েটির মনের চমক মুখে ব্যক্ত হল। তবে কি মেয়েটি সবেরী যাচ্ছে? লােম ভাৱল, যেখানেই যা আমাকে এড়াবার জো নেই। চিম্পাঞ্জিকে যেচে সাথী করেছে, চিম্পাঞ্জিকে শেষ পর্যন্ত সাথীরূপে পাবে। এখনাে মেয়েটি সােমের সঙ্কল্প অনুমান করতে পারেনি ভেবে সােমের হাসি চেপে রাখা শক্ত হচ্ছিল। সে আরেকবার মনে মনে রিহার্সাল দিতে লাগল মেয়েটির পিছন পিছন নেমে গিয়ে কী ভাষায় ও কেমন ভদ্রতার সহিত সে তার অনুবােধটি জানাবে। মৃদু হেসে বলবে, Excuse me, এখানকার কোনাে হােটেলের সঙ্গে কি আপনার জানাশুনা আছে ?•••আছে ?•••ধন্যবাদ। কী নাম বল্লেন ? অমুক হােটেল ?••• কিছু না মনে করেন যদি তে একটি অনুরােধ পেশ করবার অনুমতি প্রার্থনা করব।•••অনুমতি মঞ্জুর করেছেন? ধন্যবাদ। কাল যদি আপনার সময় ও সুবিধে থাকে আমার সঙ্গে চা খেয়ে আমাকে অনুগৃহীত করবেন কি?"না? বড় দুঃখিত হলুম। অন্য কোনাে দিন ? অন্য কোনাে সময় ?•••অত্যন্ত সুখী হলুম। ১১৯ আগুন নিয়ে খেলা এমনি ভাবতে ভাবতে সসবেরী এল। তার আগেই মেয়েটি সুটকেস নামিয়েছিল। একবার কোটটা ঝেড়ে নিয়ে চুলটা সাজুড়ে নিয়ে মুখের উপর দু’বার রুমাল বুলিয়ে মেয়েটি করিডরে গিয়ে দাড়াল এবং জানালা দিয়ে দূর থেকে সবেরীর ক্যাথিড্রাল অন্বেষণ করল। সােম নামছে—টিকিট-চেকারের সঙ্গে মুখােমুখি। “কী স্যর, এইখানে নামছেন ?” “এইখানেই নামছি।” “অত তাড়াতাড়ি কিসের? একটু গল্প করা যাক। সসবেরী এই প্রথম দেখবেন ?” “এই প্রথম দেখব।” (সােমের ভারি অস্বস্তি বােধ হচ্ছিল। মেয়েটি অনেক দূর চলে গেছে। এদিকে এ লােকটাও ছাড়ে না।) “ভালাে কথা, চেকার। তােমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এই শিলিংটি তার নিদর্শন। সােম জাত লােকটা হঠাৎ গল্প করবার জন্যে এতটা উগ্রীব হল কেন। শিলিংটা পেয়ে তার গল্প করবার সাধ মিটুল। সে সেলাম করে সরে গেল। সােম মেয়েটির গতিবিধির খেই হারিয়ে ফেলেছিল। চেকারকে অভিশাপ দিতে দিতে দৌড়ল। আরেক গেরাে ষ্টেশনের গেট-এ। সেখানে ওরা সােমের রসিদ দুটোকে ও টিকিটটাকে বারম্বার উল্টেপাল্টে দেখে। গিল্ডফোর্ডের যাত্রী সবেরী এসেছে, ব্যাপারটা যেমন অদ্ভুত তেমনি সন্দেহাত্মক। ১২০
আগুন নিয়ে খেলা
কোনাে মতে ছাড়া পেল। কিন্তু কোথায় সেই মেয়েটি ? সােম
দু হাতে ট্যাক্সিওয়ালাদের ঠেলে সরিয়ে নিরাশ করে মেয়েটির সন্ধানে
চারিদিকে চাউনির চর পাঠাল।
অকস্মাৎ দেখল মেয়েটি একটি ট্যাকৃসিতে বসে’ তারই দিকে চেয়ে
আছে। সােম তীরের মত ছুটে গেল মেয়েটির কাছে। সােমের
রিহার্সাল দেওয়া ভূমিকার সমস্ত গােলমাল হয়ে গেছল। সে বল্ল,
“আমাকে কোনাে একটা হােটেলে পৌছে দিতে পারেন ?”
মেয়েটি বল্ল, “আসুন । আমিও একটা হােটেলে যাচ্ছি।”
সােম ধন্যবাদ দিতে ভুলে গেল। মেয়েটির পাশে জায়গা করে নিল।
বলে ফেল্ল, “ইস্! আপনাকে কত খুঁজেছি।”
মেয়েটি বিস্মিত হয়ে বল্ল, “আমাকে।”
“হাঁ, আপনাকেই। আপনার জন্যেই তাে সবেরী আসা।”
“সত্যি?”
“আশ্চর্যের কী আছে ; ছুটা কাটাতে বেরিয়েছি। আমার পক্ষে
গিল্ডফোর্ড, যা, সবেরীও তাই। অধিকন্তু সবেরীতে একজন
চেনা মানুষ পাব, যে মানুষ ট্রেনে উঠতে সাহায্য করেছেন, যার
কাছে আমি কৃতজ্ঞ।”
মেয়েটি নীরব রইল। সোেম এক নিঃশ্বাসে কত কথা বলে’ চল্ল।
সমস্ত পথ সে যত কিছু ভেবেছে ও মনে মনে বলেছে, সেই সব। কিন্তু
ট্যাক্সিটা বেরসিকের মতাে দশ মিনিটের মধ্যে হােটেলে পৌছে
গেল।
১২১
আগুন নিয়ে খেলা হােটেলের অফিসে গিয়ে মেয়েটি বল্ল, “আমার বন্ধু ক্যাথরিন ব্রাউন আসতে পারেন নি। আমার এই বন্ধুটি তার বদলে এসেছেন।” মেয়ে-কেরানী বল্ল, “কী নাম ? মেয়েটি সােমের মুখের দিকে তাকাল। সােম বল্ল, “সােম। তখন মেয়ে-কেরানী মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনার নাম মিস্ পেগী স্ক। কেমন ঠিক তত?” মেয়েটি বল্ল, “ঠি।” তখন সােমকে ও মিস্ স্কটকে নিজ নিজ ঘরের চাবী দিয়ে একটি চাকরের সঙ্গে উপর তলায় পাঠিয়ে দেওয়া হল। ঠিক lady- হােটেলটি প্রথম শ্রেণীর। পরন্তু ঐতিহাসিক। পরন্তু ঐতিহাসিক। সােম এমন হােটেলে স্থান পেয়ে খুসী হয়েছিল। এই হােটেলে অন্তত এক শতাব্দী ধরে’ কত লােক এসেছে গেছে, সম্ভবত তারই ঘরে বাস করেছে। পুরুষ, কত নারী। সােম মুখ হাত ধুয়ে আয়নার সামনে দাড়াল। killer না হােক সুপুরুষ বটে। বেশ একটু কালাে। ভালােই তাে সাদা মানুষের দেশে সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। এই যে মিস স্কটু আজ তাকে ট্রেনে উঠবার ইঙ্গিত করলেন, কোনাে সাদা মানুষকে তা করতেন কি ? দেশে থাকবার সময় সােম গোঁফ কামাত। কিন্তু ইংলণ্ডে এসে ১২২ আগুন নিয়ে খেলা দেখল সকলেই গোঁফ কামায়। তখন সােম অতি যত্নে গোঁফের চাষ করল, জার্মান কাইজারকে হার মানাবার মতাে স্পর্ধাব্যঞ্জক গোঁফ। অবছিল দাড়িও রাখবে, কিন্তু কাইজার-মার্ক। গোঁফের সঙ্গে কেমন ' দাড়ি মানায় সে সম্বন্ধে তার কোনাে ধারণা ছিল না, কেননা স্বয়ং কাইজারের দাড়ি নেই। আর জার্মান দার্শনিক কাইজারলিং-এর দাড়িটা চটকদার বটে, কিন্তু কাইজারলিং-এর দাড়ি রামছাগলের দাড়ির মতাে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সােম তার গোঁফের প্রসাধন করল। তার ভয় হচ্ছিল চেহারাটা ক্রমশ টিপু সুলতানের মতাে হয়ে উঠছে মনে করে। ইংলণ্ডে বেশ আছে, কিন্তু দেশে তাে একদিন ফিরতেই হবে, তখন আত্মীয় বন্ধুরা ছি ছি করবে। গোঁফটি যতই পুষ্ট হচ্ছে চুলগুলি ততই খাটো হচ্ছে। প্রায় জাৰ্মাণদের মতাে। ইংলণ্ডে দৃষ্টি আকর্ষণ করবার সেটাও একটা সঙ্কেত। চায়ের জন্যে সােম নীচের তলায় নেমে এল। দেখল মিস্ স্কট, তখনাে আসেন নি। তিনি যে আসবেনই সে কথা সােমকে বলেন নি। বস্তুত তিনি হােটেলে উঠে অবধি সােমকে একটি কথা বলেন নি। ট্যাক্সিতে ও ট্রেনে যা বলেছিলেন তা এত স্বল্প যে সােমের মুখস্থ হয়ে গেছল। তবু সােম tea for two ফরমাস করল। এবং চাকরকে ডেকে বল্ল, “যাও দেখি, আমার বন্ধুনীটিকে খবর দাও।” তারপর ভাল, চাকরের কাছে “বন্ধুনী” বলাটা কি সঙ্গত হয়েছে । হয়েছে ; “বন্ধুনী” কথাটিতে U ১২৩
আগুন নিয়ে খেলা
{
কত যে রহস্য, কথাটি কত যে aesthetic, নিম্নশ্রেণীর লােক তার কীই
বা বুঝবে? বরঞ্চ একটা moral প্রতিশব্দ ব্যবহার করলে কতকটা
বুঝত। “Friend” না বলে বলা উচিত ছিল “fiance.” অর্থাৎ
ভাবী বধূ।
মিস্ স্কট চায়ের আয়ােজন দেখে’ বল্লেন, “আমি তাে চা দিতে
বলিনি।”
সােম বল্ল, “আপনার হয়ে আমি বলেছি ধরে’ নিন।”
“অন্যায়! বড় অন্যায়।”
“সেজন্যে আমার উপর অবসর মতাে রাগ করবেন, কিন্তু এখন দয়া
করে’ mother হােন দেখি।” (ইংরেজ পরিবারে মা সবাইকে
খাবার বেঁটে দেন। সেই থেকে mother কথাটার এক্ষেত্রে অর্থ,
যিনি চা তৈরি করে দেন।)
মিস্ স্কট সােমের পেয়ালা টেনে নিয়ে বল্লেন, “চিনি খান ?”
“খুব খাই। না, না দুটোতে আমার কুলবে না, চারটে দিন।
কী! পাঁচটা—ছ’টা—সাতটা! (মিস্ স্কটের হাত চেপে ধরে’) মাফ
করবেন। সত্যি এত চিনি আমি খাইনে।”
মিস্ স্কট, হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সােমের পেয়ালার ভিতর চামচ পূরে
গােটা-তিন চিনির ঢেলা তুললেন ও কেলী থেকে পেয়ালায় চা
ঢালতে লাগলেন।
সােম বল্ল, “থাক, থাক, ঐ থাকু। আধ পেয়ালা চা আধ পেয়ালা
দুধ।. হাছেন ? কিন্তু কখনাে খেয়ে দেখেননি কী উপাদেয় পানীয়।
১২৪
আগুন নিয়ে খেলা
অবশ্য লােকে এ জিনিষকে চা বলে না। সেইজন্যে আমি এর নাম
দিয়েছি “Tilk. তার মানে Tea আর Milk ; ব্যাকরণ মানিনে ;
হয়ে গেল ‘Tilk কেমনে তা জানিনে।”
মিস্ স্কটু বল্লেন, “যেমন Joynson-Hicks থেকে Jix।”
সােম বল্ল, “যেমন Breakfast আর Lunch মিলে Brunch!”
দু’জনে হাসতে লাগল !
সােম বল্ল, “আপনি চিনি নিলেন না?”
মিস্ স্কটু বল্লেন, আমার চিনির দরকার করে না।”
“সেকথা সত্যি। যে নিজে মিষ্টি তার পক্ষে মিষ্টি বাহুল্য।
মিস্ স্কট কোনাে দিকে না চেয়ে আপন মনে মৃদু হাসলেন।
সােম তার দিকে রুটি মাখন কেক ইত্যাদি বাড়িয়ে দিয়ে বল্ল,
“আজ্ঞা করুন।”
তিনি তেমনি মৃদু হেসে একখানি crumpet নিলেন ও ছুরী দিয়ে
সেটিকে কাটলেন। বল্লেন, “ধন্যবাদ, মিষ্টার সােম।”
সােম বল্ল, “আমার নাম কী করে জানলেন?”
মিস স্কটু বলেন, “আপনার নিজ মুখে শুনে।”
“আপনি বেশ মনে রাখতে পারেন।
“আপনি বেশ compliment দিতে পারেন।”
কিছুক্ষণ চুপচাপ। চা খাওয়া এগতে লাগল। কিন্তু চুপ করে’
থাকা সােমের স্বভাবে নেই। সােম বল্প, “Trumpet খানা কেমন
লাগছে ?
১২৫
আগুন নিয়ে খেলা
মিস্ স্কট সবিস্ময়ে বল্লেন, “Trumpet!”
সােম বল্ল, “Crumpet কে আমি Trumpet বলি।”
আবার নীরবতা। সােম বাক্যালাপের উপলক্ষ্য খুঁজল। বল্প,
“আরেক খানা Trumpet নিন্।”
মিস্ স্কটু বল্লেন, “ধন্যবাদ।” তার মানে, “না।”
সােম একটু আহত বােধ করল। তখন তার মনে পড়ে গেল মান
অপমান অভিমান বােধটা এরূপ ক্ষেত্রে ন্ম থাকা ভালাে। কেননা
মেয়েরা পুরুষদের ইচ্ছে করে’ কষ্ট দিয়ে থাকে। বাজিয়ে নিতে
ভালােবাসে।
সােম নকল হাসি হেসে বল্ল, “Trumpet ভালাে লাগল না। তবে
কিছু Kiss-Fake নিয়ে দেখুন।”
মিস টু আসল নামটা আন্দাজ করতে চেষ্টা করলেন। পারলেন
না। কিন্তু সােম যখন জিনিষটা বাড়িয়ে দিল তখন জোরে হেসে
বল্লেন, “ওঃ! বুঝেছি ! Fish-Cake! হা হা হা।”
সােম বল্ল, “এই যে Fish-Cake কে বল্লুম Kiss-Fake এ ধরণের
উল্টো পাল্টা কথাকে বলে Spoonerism. ডক্টর স্পনারের গল্প
শুনেছেন ?”
মিস্ স্কটু সকৌতূহলে বলেন, “কই, না।”
“তবে শুনুন। ডক্টর স্পনার তাঁর Well-oiled bicycleএ চড়ে
কলেজে পড়াতে যেতেন। ছেলেরা একবার জিজ্ঞাসা করল, ‘স্যর,
১২৬
আগুন নিয়ে খেলা
আপনি কিসে করে, কলেজে আসেন ? তিনি অন্যমনস্ক ছিলেন। মুখ
দিয়ে বেরিয়ে গেল, আমার একটি Well-boiled icicle আছে।”
মিস্ স্কটের উচ্চ হাস্য।
সােম বল্ল, “তখন থেকে ছেলেরা মজার মজার কথা বানিয়ে তার
atay Statico enco i "Three cheers for the dear old
Queen' বলতে গিয়ে তিনি নাকি বলেছিলেন, ‘Three cheers for
the Queer old Dean."
মিস্ স্কটের উচ্চতর হাস্য। সােমের যােগদান।
যে ঘরে বসে তারা চা খাচ্ছিল সে ঘরে অনেকে ছিল। হাসির শব্দ
শুনে কালাে মানুষটির দিকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকাল। সােম জাত ওটা
কৃত্রিম গাম্ভীর্য্য। কৌতূহলকে চেপে রাখার নামান্তর। কিন্তু মিস
স্কট সম্ভবত ভাবলেন যে কালাে মানুষের সঙ্গে ইয়ার্কি দেওয়াটা সাদা
মহাপ্রভুদের পছন্দ হচ্ছে না।
তিনি তার মুখের হাসির সুইচ টিপে দিলেন। তাঁর মুখ অন্ধকার
হয়ে গেল। পাছে সােম কিছু মনে করে এই বিবেচনায় বল্লেন, “আরেক
পেয়ালা দিই ?”
সােম বল, “ধন্যবাদ।” অর্থাৎ, “না।”
সােমও “না” বলতে
জানে।
এর পরে মিস স্কট, উঠে দাঁড়ালেন। বল্লেন, “যাই। আমাকে
একখানা চিঠি লিখতে হবে।”
সােম নাছােড়বান্দার মতাে সঙ্গে সঙ্গে চল্ল। বল্প, “আমাকেও।”
০
১২৭
আগুন নিয়ে খেলা { লাউঞ্জে চিঠি লেখার সরঞ্জাম ছিল। মিস টু ও সােম দু’জনেই কিছু খাম ও কাগজ নিয়ে কলম কামড়াতে লাগল। চিঠি লেখা শেষ করে’ উঠতে তারা ঘণ্টাখানেক সময় নিল। সােম লিখল তার বন্ধু প্রভাতকে। মিস্ স্কটের সঙ্গে তার পরিচয় ও সম্বন্ধকে বাড়িয়ে লিখল। যেন সে ঈষ্টারের ছুটীতে দিগ্বিজয়ে বেরিয়েছে। প্রথম দিনেই একটি রাজ্যজয়। মিস্ স্কট লিখলেন তার বন্ধুনী ক্যাথরিনকে। কী লিখলেন বােঝ গেল না। কিন্তু লিখতে লিখতে হাসছিলেন। তাই দেখে’ সােমের মনে হচ্ছিল সােমের মুখ থেকে শােনা হাসির কথাগুলি টুকছিলেন। কিম্বা হয় তাে লিখছিলেন একটি চিম্পাঞ্জি আমার সঙ্গ নিয়েছে। মিস্ স্কট বল্লেন, “এবার চিঠি দু'খানা ডাকে দিয়ে আসা দরকার। দি, আমি দিয়ে আসি।” সােম বল্ল, “ধন্যবাদ ! চলুন, আমিও আপনার সঙ্গে চিঠির বাক্সট। চিনে রেখে আসি।” চিঠি দু'খানা হােটেলের চাকরকে দিলেই চত। কিন্তু তারা একটু বেড়িয়ে আসতে উৎসুক হয়েছিল। নতুন সহরে এসে পায়ে হেটে বেড়াতে ভারি ইচ্ছে করে। মিস্ স্কট, উপরে গেলেন তার হাট ও কোট পরে আতে! সােম ততক্ষণ নীচের তলায় পায়চারি করতে থাকল। চিঠির বাক্স কাছেই ছিল, তবু তারা ডাকঘরের বাক্সে চিঠি দেবে স্থির করে এগিয়ে চল্প। সহরটিতে একটি ঘােট খালের মত নদী ১২৮ আগুন নিয়ে খেলা -ইংলণ্ডের বহুতর নদীর মতাে এরও নাম Avon. সহরটি ঘােট। রাস্তাগুলির কাটাকুটি সহরটিকে দাবা খেলার ছকের মতাে করেছে। সােম খুসী হয়ে বল্ল, “লণ্ডনে থেকে আমার হাঁফ ধরে’ গেছে, মিস স্কট—যদিও লণ্ডন আমার কাছে স্বদেশের মতাে প্রিয়। সলস- বেরীতে যদি আমার বাড়ী থাকত, “আমি বােজ ডেলি-প্যাসেঞ্জার হয়ে লণ্ডন যাতায়াত করতুম।” মিস স্কট বল্লেন, “আমি হলে পারতুম না। বডড সকালে উঠতে হত।” “বেশী রাত করে ঘুমতে যান বুঝি?” “না, এগারােটায়। “তা হলে আরেকটু সকাল সকাল ঘুমতেন।” “ সবেরীতে থাকূলে? হা হা। বাড়ী পৌছতেই ন’টা বাজত। কাজ, আর কাজ করতে যাওয়া, আর কাজ করে ফেরা। নিজের বলে’ একটু সময় থাকত না।” “খুব খাটুনি বুঝি ?” “খুব। কিন্তু খাটুতে আমার ভালােই লাগে। আবার মাঝে মাঝে ছুটা নিয়ে পালাতেও সাধ যায়। কিন্তু রােজ ট্রেনে বসে’ আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে ঘেন্না ধরে’ যাবে বুঝি!” “আজকেও ঘেন্না ধরে গেছে বুঝি।” “বিলক্ষণ। ক্যাথরিনটা এমন করে’ দাগা দেবে কে জান্ত, বলুন। একসঙ্গে আমার সমস্ত ঠিকঠাক। আমি এলুম সবেরী, ও গেল ব্ল্যাকপুল।” ১২৯
আগুন নিয়ে খেলা
।
“বড় ভাবনার কথা বটে !”
“ঠাট্টা করছেন।”
“কে আমি? না। আমি ভাবছিলুম আপনি কেন ব্ল্যাকপুল গেলেন
। সেও তাে একসঙ্গে যাওয়া হত।”
“বা, রে, আমি কী করতে ওদের সঙ্গে যাব?”
“বুঝেছি। ক্যাথরিন নেহাৎ নিঃসঙ্গ ছিল না। মাঝখান থেকে
আপনিই নিঃসঙ্গ হলেন। কেমন ?”
মিস্ স্কট এর উত্তরে নতমুখী হলেন। বল্লেন, “আজ তাে নিঃসঙ্গ
নই। কাল কী হবে বলা যায় না।”
সােম কোমল কণ্ঠে বল্ল, “বলা যায়। কালও নিঃসঙ্গ হবেন না।”
মিস্ স্কট, নীরব। সােম বল্ল, “ভালাে কথা, আপনার উপর আমি
রাগ করেছি।”
( চমকে উঠে) “কেন?”
“অনুমান করুন।”
“করতে পারছিনে। সত্যি বলছি।”
“আমাকে চিম্পাঞ্জি বলেছেন।”
“চিম্পাঞ্জি বলেছি! কখন ?”
“মাত্র একটিবার আপনি কথা বলেছেন ট্রেনে। মনে পড়ে
?”
“সত্যি আমার স্মরণশক্তি ভাল নয়। ও কথা বলে থাকি তত ক্ষমা
চাইছি।”
১৩০
আগুন নিয়ে খেলা
“আপনি বড় ভালােমানুষ। আমি হলে ক্ষমা চাইতুম না, বলতুম
চিম্পাঞ্জির মতাে লাফ দিয়ে ট্রেনে ওঠা মানুষের পক্ষে প্রশংসার কথা।”
“বাস্তবিক। আপনার সাহসের সুখ্যাতি করতে হয়।”
“আবার ভালমানুষী করলেন! আমি হলে সুখ্যাতি করতুম না।
বতুম ওটা একটা বেআইনি কাজ। চোর ডাকাতের যােগ্য।”
“তাই তাে। অন্যায় করে ফেলেছেন।”
“অন্যায় কিসের? প্লাটফর্মে ঢুকবার সময় আমাকে একমিনিট
আটকে রেখেছিল কেন? তারপরে আমাকে
দৌড়তে
বলেছিল কেন ?
ট্রেনেরই উচিত ছিল আমার জন্যে দাড়াননা।”
“আমারও তাই মনে হয়।”
“কিন্তু তাতে অন্যান্য যাত্রীদের সময় নষ্ট হয়। তারা punctual
হয়েও পস্তাবে, এটা কি ন্যায়সঙ্গত ?”
“না, ন্যায়সঙ্গত নয়।”
“ন্যায়সঙ্গত না হলেও ভদ্রতার খাতিরে মাঝে মাঝে এক আধটা
ব্যতিক্রম মন্দ নয়। ধরুন আমি যদি একজন স্থূলকায় মহিলা হয়ে
থাকতুম!”
মিস্ স্কট, ভীষণ হাসতে লাগলেন। সােম তাকে আরেকটু হাসাবার
জন্যে বল্ল, “কিম্বা ধরুন সত্যিকারের চিম্পাঞ্জি!”
মিস্ স্কট, ক্লান্ত হয়ে বল্লেন, “Oh, dear ”
ডিনারের পরেই কেউ শােবার ঘরে যায় না। অতএব ওরা বার
১৩১
আগুন নিয়ে খেলা ঘরে গিয়ে তাসখেলা দেখতে বসল। ওরাও খেলায় যােগ দিত, কিন্তু মিস্ স্কট, ভালাে খেতে পারেন না বলে’ রাজি হলেন না এবং সােম এত ভালাে খেলতে পারে যে খেলা জিতে অনেক টাকা পেত—সেটা একজন বিদেশীর পক্ষে ভালাে দেখায় না। কাজেই তারা নিঃশব্দে অন্যান্যদের ব্রিজ, খেলার দর্শক হল। সােম একজনের হাত চেয়ে নিয়ে দেখল ও তার পরামর্শদাতা হল। মিস স্কট যে মেয়েটি dummy হয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে প্রবৃত্ত হলেন। খেলার সময় সময়জ্ঞান থাকে না। সােমের নেশা লেগে গেছল। সে মিস স্কটের উপস্থিতি বিস্তৃত হয়েছিল। প্রতিপক্ষের হাতে ক’টা ও কোন কোন রং আছে সেই কল্পনায় সে বিভাের। পরামর্শগ্রহীতার উৎসাহকেও তার উৎসাহ ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। তার হারজিৎ যেন তার নিজের হারজিতেরও বেশী। তিনি হারলে সােমের মুখ দেখানাে কঠিন হয়, সে যে পরামর্শ দিয়েছে। তিনি জিৎলে সােম সবাইকে সিগারেট বাড়িয়ে দেয়। বলে, “নিতে আজ্ঞা হােক।” অবশেষে এক সময় খেলার ব্যবধানে মিস্ স্কট, সকলকে এক সঙ্গে বল্লেন, “গুড নাইট।” সকলে সবিনয়ে বল্ল, “গুড নাইট।” দুটো একটা, ভদ্রতার কথাও বলা হল। যেমন, “কালকে তাে আপনাকে আমরা এই হােটেলে পাচ্ছি।” মিস্ স্কট, বিশেষ করে সােমকে “গুড নাইট” না বলে চলে গেলেন। এটা সােমের মৰ্ম্মে বিধ ল। তার আর খেলায় মন বল না। রাত্রে ১৩২ আগুন নিয়ে খেলা মিস স্কটের সঙ্গে এই শেষ দেখা, একথা ভাবতে তার মন কেমন করছিল। অথচ সাড়ে দশটা গেছে, দেখা হবার সুযােগও আর ঘবে না। কিছুক্ষণ যাব কি যাব না করে সােমও বিদায় নিল। তার পরামর্শ গ্রহীতা তাকে কৃতজ্ঞতা জানালেন এবং প্রতিপক্ষের ভদ্রলােক ও মহিলা বল্লেন, “কাল আপনাকে সম্মুখ সমরে নামতে হবে কিন্তু।” আর সেই যে মহিলাটি dummy হয়েছিলেন তিনি বলেন, “শুধু আপনাকে নয়, আপনার বন্ধুনীকেও।” আমার বন্ধুনী ! সােম দুঃখের হাসি হাল! উপরে গিয়ে কাপড় ছাড়ল, মুখ হাত ধুল, চুলে বুরুশ লাগাল, পা মুছল। তারপর বিছানায় উঠে আলােটা নিবিয়ে দিল, অত্যন্ত সকালে ঘুম থেকে উঠেছিল বলে তার বেশ ঘুম পেয়েছিল। সােম চোখ বুজে ঘুমের প্রতীক্ষা করছে। হঠাৎ শুনল কে যেন টোকা মারছে—টুক টুক টু। দরজায়, না, দেয়ালে ? দেয়ালে। কোন দেয়ালে ? সােম কান খাড়া করুল। বিছানার পাশের দেয়ালেই। টুক টুক টুক। ওপাশের খরটা মিস্ স্কটের মিস্ স্কট এখনাে ঘুমন নি? দুষ্ট, মেয়ে। আমাকে ফেলে পালিয়ে আসার কী দরকারটা ছিল! এতক্ষণ বুঝি আমারই জন্য জেগে থাকা গেছে ? সােম উত্তর দিল-ঠক্ ঠক্ ঠক। তার তত মেয়েমানুষের হাত নয়। তার আঙুলের আওয়াজ ঠক্ ঠক্ ঠক্।
আগুন নিয়ে খেলা তার উত্তরে দেয়ালের ওপারে শুধু যে টুক টুক টুক্ বেজে উঠল তাই নয়, দরজার ফাঁক দিয়ে হাসির শব্দ এল, খিল খিল খিল । দুষ্ট মেয়ে। সারাদিন মুখে রা ছিল না। কী কপট গাভী! ট্রেনে সেই যে চিম্পাঞ্জি বলা তার পরে আর কথা নেই। হােটেলে ও পথে আমি যত কথা বলেছি উনি তার সিকিও বলেন নি। সােম কী উপায়ে আনন্দ জ্ঞাপন করবে ভেবে পেল না। কতবার ঠক্ ঠক্ ঠক্ করতে থাকবে ? জোরে হেসে উঠতে তার সাহস হচ্ছিল । কেননা তার ঘরের একদিকে যেমন মিস স্কটের ঘর অপরদিকে তেমনি কোন এক অপরিচিত জনের। মিস স্কটের ঘরটাই হােটেলের এই দিকের শেষ ঘর বলে’ মিস স্কটের ভয় ছিল না। বিছানা ছেড়ে মিস্ স্কটের দরজায় টোকা মেরে তাকে ডাকবে? করিডরে কিছুক্ষণ পায়চারি করবে তাকে নিয়ে? হায়রে দুর্ভাগ্য ! সােম ড্রেসিং গ্রাউন আনেনি। এই কাপড়ে বাইরে যাওয়া যায় না, বেড়ানাে যায় না। মিস্ স্কট দেখলে নেহাৎ যদি মূৰ্ছা না যান একেলে মেয়ে বলে, তবু অন্য লােক দেখে ফেল্পে কী ভাবে ভেবে ‘দূর’ ‘দূর করে তাড়িয়ে দেবেন। বিছানার থেকে জানালা খুব কাছেই। এ ঘরের জানালা থেকে ও-ঘরের জানালাও খুব কাছে। সােম বিছানা ছেড়ে জানালার চৌকাঠের উপর বল। বসে’ মিস্ স্কটের জানালার কাচের গায় টোকা মারল। মিস্ স্কটু ধড়ফড়িয়ে জানালার কাছে এলেন। সভয়ে বলেন, “কে?” ১৩৪
আগুন নিয়ে খেলা
উত্তর হল,
“চিম্পাঞ্জি।”
“চিম্পাঞ্জি ? লাফ দিয়ে আসবেন না তাে?”
“যদি আসি ?”
“না, না।” (মিনতির স্বরে)।
“ভয় নেই, আমি চেষ্টা করলেও পারব না।”
মিস স্কট নীরব।
সােম ডাকল, “মিস্ স্ক?”
উত্তর হল, “ইয়েস?”
“পালিয়ে এলেন কেন?”
“ঘুম পাচ্ছিল বলে।”
“ঘুম আসেনি কেন?”
“ভাবছিলুম বলে।”
“কী ভাবছিলেন?”
“একজনের কথা।”
“ক্যাথরিনের কথা ?”
“না।”
“আপনার boyএর কথা?”
“Boy আমার নেই।”
“তবে কার কথা ?”
“চিম্পাঞ্জির।”
“চিম্পাঞ্জির এত ভাগ্য।”
আগুন নিয়ে খেলা
“ভাবছিলুম আজকের দিনটা কী অদ্ভুত।”
“আমিও তাই ভাবছিলুম।”
“আপনি খেলা ছেড়ে উঠে এলেন কেন?”
“আপনি উঠে এলেন কেন?”
“ঐ যে বলুম ঘুম পাচ্ছিল।”
“আমারও। আমি আজ ভােরে উঠেছি কি না।"
“আপনার কোথায় যেন যাবার কথা ছিল ?”
“গিল্ডফোর্ড।”
“গেলেন না কেন?”
“আপনিই বলুন।”
“সলসবেরীতে নামলেন কেন?”
“আপনাকে তাে ওকথা ট্যাক্সিতে বলেছি।”
“আপনি ভারি খাড়াপ লোক।”
“আমাকে আপনার ভয় করছে ?”
“কারুকে আমার ভয় করে না।”
“ধরুন যদি আমি লাফ দিয়ে ঘরে ঢুকি ?”
“চীকার করে পাড়া মাথায় করব।”
“যদি মুখ চেপে ধরি ?”
“কাড়াব।”
“তবে তােত আপনি চিম্পাঞ্জিকেও ছাড়িয়ে যান।”
“আমি সব পারি।”
আগুন নিয়ে খেলা
“লাফ দিয়ে এ ঘরে আসতে পারেন ?”
“পারি। কিন্তু তার দরকার নেই।”
“তবে আর রাত জাগেন কেন? ঘুমতে যান।”
“তাই যাই।”
“যাবার আগে একবার হাতটা বাড়িয়ে দিন, বিদায় ঝাঁকুনি
দিন।”
মিস্ স্কট হাত বাড়িয়ে দিলেন! সােম খপ করে মুখের কাছে
টেনে নিল। সােম চুম্বন করতেই
সােম চুম্বন করতেই মিস্ স্কট, অগ্নিস্পৃষ্টের মতাে ঝপ,
করে কেড়ে নিলেন।
সােমের সঙ্কল্প অক্ষরে অক্ষরে পূরণ হল।
সে মেয়েটির সঙ্গে
শেষ পর্যন্ত এল, মেয়েটিকে প্রকারান্তে চুম্বনও করল। সে আজ
উঠে কার মুখ দেখেছিল ? তখন কি ভাবতে পেরেছিল দিনটি এমন
সুখদ হবে? সােম সাধারণত যা করে না তাই কবুল। সেই ভগবানকে
স্মরণ করুল যিনি সুখীর ভগবান, সার্থকের ভগবান। দুঃখের দিনে
আমিই আমার বন্ধু, সুখের দিনে তিনি আমার অতিথি।
১৩৭
শেষের দিনের শেষ
কফি খাওয়া আর ফুরায় না। একবার চুমুক দেয় তাে দশ মিনিট
ভাবে। থেকে থেকে মুচকি হাসি হাসে। যেন শক্ত চাল চেলেছে।
তবু কোনাে চালেই কিস্তি মাৎ হয় না। নতুন করে চাল চালতে
এমনি করে সময় যায়। কফিও জুড়িয়ে কাদা। দু’জনের ধ্যান
ভাঙিয়ে দিয়ে হিল ঘরে ঢুকে বলে, “আরাে কিছু দিয়ে যেতে হবে,
ম্যাডাম ?”
পেগী ঘাড় নেড়ে অসম্মতি জানায়।
“স্যর ?”
সােম বলে, “না, ধন্যবাদ।
তখন কফির ভুক্তাবশেষ স্থানান্তরিত করে’ হিল বলে, “তবে কি
আমরা বিশ্রাম করতে যেতে পারি ?”
সােম পেগীর মুখে তাকায়।
পেগী ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়। কথা বল্লে যদি তার ভাবনার
খেই হারিয়ে যায়।
বিল bow করে বলে, “গুড নাইট, ম্যাডাম।
গুড়, নাইট,
স্যর।”
১৩৮
আগুন নিয়ে খেলা * অগত্যা পেগীকেও বলতে হয়, “গুড নাইট, মিষ্টার হিল।” সােম ততা বলেই। বাড়ীর সকলে ঘুমতে গেল। পাড়ার সকলে ঘুমিয়ে। এগারােটা বেজে গেছে। ছােট গ্রামের পক্ষে সেই অনেক রাত। চারিদিক নিঝুম। সামনে যে ছােট টেবিলটা ছিল তার উপর দুই হাতে মুখ ঢেকে পেগী নিদ্রার আয়ােজন করল। তার চোখ দুটি ঢুলু ঢুলু, তবু হাসি-হাসি। তার চুলগুলি আলু থালু, গালের উপর মুখের উপর পড়েছে। ডান হাত দিয়ে বাম বহুকে ও বাম হাত দিয়ে ডান বাহুকে জড়িয়ে ধরে’ পেগী মাথা গু জল। এই তার রণকৌশল। এই তার বহরচনা। সােমের সাধ্য কী যে তাকে স্থানচ্যুত করে ! যে চেয়ারে বসেছিল সেই চেয়ারের সামনের দু’টো পায়াকে পেগী দুই পা দিয়ে লতার মত করে জড়াল। সােম যদি তাঁর হাত ধরে টানাটানি করে’ কৃতকার্য হয় তবু চেয়ারকে উল্টে না ফেলে, বিকট আওয়াজ না করে, কার্পেটে আঁচড় না লাগিয়ে তাকে নড়াতে পারবে না। তার আগে হিল-দম্পতীর ঘুম ভাঙবে, বাড়ীতে চোর পড়েছে ভেবে তারা পাড়ার লােককে ডাক দিয়ে জাগাবে, সােমের অবস্থা হবে সঙীন এবং পেগীর মুখ হবে রঙীন। তখন যা হয় একটা মিথ্যে ঘটনা বানিয়ে বলা যাবে। পেগীর তন্দ্রা লেগে আছে এমন সময় সােম আচমকা উঠে দাড়াল ১৩৯ আগুন নিয়ে খেলা এবং পেগীর উদ্দেশে “গুডনাইট” বলে’ লঘু পদপাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। উপরতলায় তাদের ঘর। সােম মােমবাতিটা জ্বেলে দিয়ে ম্যাল- পীসের উপর রাখল। এসব অঞ্চলে ইলেকটিকের চলন হয় নি। হঠাৎ বিছানার দিকে চেয়ে তার চক্ষু চড়কগাছ। একটি মাত্র খাট—তাতে দু’জনের চারটে বালিশ। দুপুর বেলা ঘর দেখতে এসে সােম হিলকে বলেছিল, “এই বড় খাটা বের করে নিয়ে এর জায়গায় দু’টো ছােট খাট পেতে দিতে পারবে ?” হিল বলেছিল, “এত বড় খাটকে তত দরজা দিয়ে বের করা যায় না, স্যর। মিস্ত্রি ডেকে পায়া- গুলাে খােলাতে হয়।” সােম বলেছিল, “তা হলে এই সােফাটাকে সরিয়ে এর জায়গায় একটা ছােট খাট পাংতে হবে।” হিল কথা রাখেনি। হিলের বৌ দু’জনের বিছানা একসঙ্গে করা সােজা এবং স্বাভাবিক বলে তাই করে রেখেছে। সােম অতি কষ্টে বিরক্তি দমন করে’ সােফার উপর গােটা দুই বালিশ ও একখানা চাদর সহযােগে নিজের জন্যে স্বতন্ত্র শয্যা রচনা করল। নতুবা পেগীর কাছে মুখ দেখানাে যায় না। পেগী ভাববে, বিশ্বাসঘাতক! কুচক্রী ! সােম কাপড় ছেড়ে, মুখ ও মাথা ধুয়ে, চুলে ব্রাশ দিয়ে সঙ্কীর্ণ সােফাটিতে কায়ক্লেশে গা এলিয়ে দিল। মােমবাতিটি নিবিয়ে দিল । যদি পেগী এসে অন্ধকারে দেশলাই না খুঁজে পায়। সােমের ঘুম আসছিল না। তার দেহমন পেগীর আসার অপেক্ষা কছিল এবং পেগীর দেহমনকে আয়ত্তের মধ্যে পাবার উপায় উদ্ভাবন ১৪০ আগুন নিয়ে খেলা করছিল। তার কামনা বাগ মানছিল না, তবু তার আত্মসম্মানবােধ তীব্রতর হয়েছিল। পেগীকে সে আততায়ীর মত আক্রমণ করবে না, বাঞ্ছিতের মতাে অধিকার করবে—এই তার মনস্কামনা। কিন্তু পেগী এত বিমুখ কেন? আনন্দটা কি পেগীর ভাগে কিছু কম পড়বে? কিম্বা পেগী একটু খােসামদ চায়, হাতে পায়ে ধরে রাজি করানাে, আত্ম- হত্যার ভয় দেখানাে-সাধারণ কামুকদের যত কিছু উপচার ? সিড়িতে কার পায়ের শব্দ ? পেগীর? সােম চট করে চোখ বুজল, গভীর নিদ্রার অভিনয় করূতে হবে, পেগী জানুক যে সােম তার জন্যে কেয়ার করে না, পেশাদার প্রেমিকের মত রাত জাগে না। পেগী কপাটে দু’বার টোকা মারল। সাড়া না পেয়ে ঘরে ঢুকল। জানালাটাতে ফাক ছিল, সযত্নে বন্ধ করে দিল। তখনাে মােমবাতি মিট মিট করছিল। তার নির্বাণােম্মুখ অবস্থা। তারই আলােয় দেখল সােম সােফায় শুয়ে। খাটের দিকে চেয়ে দেখে বিরাট খাট। তাতে অনায়াসে দু’জনকে ধরে। এত বড় প্রলােভনকে উপেক্ষা করে সােম সােফায় কোনােমতে আড়ষ্ট হয়ে ঘুমিয়ে ঠিক ঘুমিয়েছে তাে? পেগী দুষ্টুমি করে মােমবাতিটি সােমের মুখের পরে তুলে ধরুল। এক ফোটা গলানাে মােম সােমের কপালের উপর টলে’ পড়ল, সােম একটুও “উহু’ করে’ উঠ না। কেবল ঈষৎ কুঞ্চিত করুল। পেগী সযত্নে ও সখেদে ওটুকু জমাট মােম সসামের কপাল থেকে নখ দিয়ে খুটে’ নিল। বাতিটি যথাস্থানে রেখে সে সসঙ্কোচে কাপড় ছাড়তে লাগল। তার ১৪১
আগুন নিয়ে খেলা
ভয় হচ্ছিল পাছে সােম খস্ খস্ শব্দ শুনে চোখ মেলে চায়, দেখে ফেলে।
সােম দু’বার খক্ খক্ করে’ কাশল। পেগী ত্রস্ত হয়ে এক ফুয়ে
বাতিটি নিবিয়ে দিল। সােম পাশ ফিরল। তার ঘুম ভাঙবার মুখে।
পেগী শশব্যস্ত হয়ে কাপড় ছাড়া শেষ করল।
সােম সহজ সুরে বল্ল, “বাতিটা নিবিয়ে ভালাে করােনি, পেগ ।
আমার চোখ তােমাকে দেখছে, তােমার চোখ টের পাচ্ছে না।”
পেগী লজ্জায় মরে গিয়ে বল্ল,
“তুমি ঘুমও
নি?”
“না।”
-
“আমি যখন এলুম জাতে পেরেছিলে ?
“নিশ্চয়।”
“তবে তােমার কপালে মােমের ফোটা পড়ে যাওয়াও অনুভব
করেছ ?”
“ভাবছিলুম তুমি ইচ্ছে করে ফেলেছ।”
“না গাে, সত্যি বলছি, ইচ্ছে করে ফেলিনি।”
“ইচ্ছে করে ফেলেছ ভেবে আমি কত খুসী হয়েছিলুম, পেগ ।
আমার দেশে বােনেরা ভাইদের কপালে ফোঁটা দিয়ে যমের দুয়ারে
কাঁটা দেয়। আমার যদি এদেশে একটি বােন থাকত!”
“বেশ, তাে ! আমিই তােমার বােন হব।”
“কখনাে না।”
“তবে কী হব ?”
১৪২
আগুন নিয়ে খেলা
“এখনাে তােমার সেই খেয়াল আছে ?”
“প্রবলভাবে আছে, পেগ।”
“পেগী এতক্ষণে বিছানায় আরাম করে শুয়েছিল। লেপটা বুক পর্যন্ত
টেনে নিয়ে সােমকে বল্ল, “বেচনা সােম! তােমার জন্যে আমার দুঃখ
হচ্ছে।”
সােম বল্ল, “হঠাৎ ?”
“তুমি সােফায় শুয়ে কষ্ট পাচ্ছ। একটা মােটা কম্বলও নেই গায়ে
দেবার। শীতে কাঁপৰে।”
“ বলে তুমি তাে তােমার সুখশয্যায় ঠাঁই দেবে না।”
“দিতুম, যদি তুমি ভাই হতে।”
“চাইনে ঠাই, যদি ভাই হতে হয়।”
“সারারাত কষ্ট পাবে ?”
“সারারাত কষ্ট পাব আর ভাবব মিথ্যা সম্বন্ধ পাতিয়ে সত্য সম্বন্ধের
পথ রুদ্ধ করিনি।”
“একটা রাতের জন্যে এত সত্যসন্ধ হবে ? কাল এতক্ষণে তুমি
কোথায় আর আমি কোথায়, সােম?”
“ভগবান জানেন। আমি আশা ছাড়ব না।”
“নিজেকে ভােলাতে চাও তাে ভােলাও। কিন্তু নির্বোধ তুমি;এমন
গরম এবং নরম বিছানা হারালে।”
সােম কথা কইল না।
পেগী বল্ল, “ঘুমুলে ?”
১৪৩
আগুন নিয়ে খেলা
“আমারও ঘুম আসছে না।”
“আমার ভয়ে? আমি অভয় দিচ্ছি পেগ, নিদ্রিতা নারীকে আমি
আক্রমণ করব না।”
“সােম।”
“কী ?”
“আমার মাথার কাছে বসাে এসে।”
“হঠাৎ?”
“এমনি।”
“পূর্বরাগ বুঝি ?”
“তবে আমি যাব না।”
“এসাে, লক্ষ্মীটি ।”
সোম সােফা ছেড়ে পেগীর শিয়রে বল্ল। পেগী তার একটি হাত
টেনে নিয়ে মুখে ছোঁয়াল। বল্প, “ডালিং।” কিছুক্ষণ কেটে গেল।
তখন পেগী বল্ল, “একটা কথা জিজ্ঞাসা করব, সত্যি বলবে ?”
“তােমার কাছে মিথ্যা বলতে পারি ?”
“বলল আমার পরে তােমার শ্রদ্ধার কণামাত্র বাকী আছে?”
“কেন ওকথা জিজ্ঞাসা করলে ?”
“তুমি বলল আগে।”
“তুমি আগে বলল।”
১৪৪
আগুন নিয়ে খেলা
“এই ধরাে তুমি আমাকে কাপড় ছাড়তে দেখলে। (লজ্জায় মুখ
ঢেকে) ছি ছি ছি।”
“তার জন্যে যদি অশ্রদ্ধা করতে হয় তবে বলতে হয় কোনাে স্বামী
তার স্ত্রীকে শ্রদ্ধা করে না।”
“করে না, সে তাে জানা কথা।”
“আমি এমন অনেক স্বামীর নাম করতে পারি যারা তাদের স্ত্রীদের
দেবতার মতাে ভক্তি করে।
“তা হলে বলতে হকে তারা এক ঘরে রাত কাটায় নি।”
“Silly! তাদের ছেলেপুলে আছে।”
“তা হলে দেবতার মতো ভক্তি করাটা তােক দেখানাে।”
“না গাে, তা নয়। সমুদ্রে আমরা সঁতার কাটি বলে, সমুদ্রকে কম
ভক্তি করিনে। দেহও সমুদ্রের মত প্রাকৃতিক বিস্ময়। তাকে দেখে
আনন্দ, স্পর্শ করে আনন্দ, সর্বাঙ্গে অনুভব করে আনন্দ।”
“আমার বিশ্বাস হয় না। ধরাে আজ যদি আমি নিজেকে দিই কাল
তুমি ভাববে, ওর মধ্যে রহস্য কি আছে! রহস্য না থাকে তাে শ্রদ্ধা
করবে কেন?”
“এক দিনে কি একজনকে নিঃশেষ করতে পারা যায় ?”
“এক দিনে না হােক দশ দিনে, বিল দিনে, এক বছরে, দু’বছরে ?”
“দু’বছর আমার ভক্তি পেয়েও তােমার তৃপ্তি হবে না, পেগ ?”
“না, সােম। আমার দাবী সারা জীবন।
“দু’বছর পরে দেখবে আমার ভক্তি পাও বা না পাও তাতে তােমার
১০
১৪৫
আগুন নিয়ে খেলা কিছু আসে যায় না। তখন তােমার অন্য কোনাে ভক্ত পাওয়া গেছে যার ভক্তি পেয়ে স্বর্গসুখ, না পেলে যন্ত্রণা।” “তবু আমি জীবনে একবার মাত্র বিয়ে করব, দু’বছর অন্তর একবার না।” “ওটা তােমার জেদ। যুক্তিসহ নয়।” “কিন্তু থাক্, এ নিয়ে তর্ক করব না। তুমি যখন সেই মানুষ নও যে আমাকে চিরকালের মতাে বিয়ে করবে ও শ্রদ্ধা করবে তখন আমি সেই মানুষের খাতিরে আজ তােমার হাত থেকে আত্মরক্ষা করব।” সােম এতক্ষণ পেগীর চুলগুলি নিয়ে খেলা করছিল। কঠিন হয়ে বলে, “এই তােমার মনের কথা ?” “এই আমার মনের কথা।” “আমার মনের কথা তােমাকে বলি। আমি গম্ভীরভাবে প্রগাঢ়ভাবে সত্য করে’ ভালােবাসতেও পারি, এবং ভালােবাসার ধনকে ভক্তি না করে পারিনে। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখেছি দু’বছর পরে না থাকে গভীরতা না থাকে গাঢ়তা। ভক্তি থাকে, মমতা থাকে, শুভকামনা থাকে। আমার ভূতপূর্ব প্রেমিকারা প্রত্যেকে আমার প্রিয় বন্ধু।” “কখনাে কারুকে সর্বস্ব দিয়েছ ?” “দিতে চেয়েছি।” দেওয়া এবং দিতে চাওয়া এক জিনিষ নয়, সােম। যদি দিতে তবে দেখতে জীবনে যেমন একবার মাত্র প্রাণ দেওয়া যায় তেমনি একবার মাত্র প্রেম দেওয়া যায়। দিয়ে বড় কিছু বাকী থাকে না, সােম, যে দু’বার করে দেবে।” ১৪৬
আগুন নিয়ে খেলা
সােম পেগীর গালের উপর গাল রাখল। “এ তত্ত্ব ঠেকে শেখা
দেখে শেখা ?”
“দেখে শেখা নিশ্চয়ই নয়। কেননা সংসারে প্রাণ যদিও দিতে পারে
লাখ জন, প্রেম দিতে পারে—সর্বস্ব দিতে পারে-লাখে এক জন।
ঠেকে শেখা ও নয়। এখন আমার জীবনে পরম লগ্ন আসে নি।”
“কখনাে কাউকে ভালােবাসােনি পেগ ?”
“কতবার কতজনকে ভালােবেসেছি। এই যেমন তােমাকে আজ
ভালােবাসছি। কিন্তু কখনাে এমন প্রেরণা পাইনি যে ভালােবাসার
জন্যে সর্বস্ব বিলিয়ে দেব-ভালােবাসার জনের কাছে সাড়া পাই কিম্বা
পাই। আজ যেমন তােমার কাছে শ্রদ্ধা পাবার কথাটাই বড় হয়ে
মনে জাগছে এমনি কিছু না কিছু একটা পাবার কথাই প্রত্যেক বার বড়
হয়ে মনে জেগেছে, সােম।”
সােমের কামনা ইতিমধ্যে মন্দ হয়ে এসেছিল। সে অভিভূত হয়ে পেগীর
মনের কথা শুনছিল। বল্ল, “প্রার্থনা করি পেগ, তােমার জীবনে সেই পরম
লগ্নটি যেন আসে। আমরা তােমার অকালের প্রেমিকরা তােমাকে তালিম
করে রেখে গেলুম, যিনি যথাকালে আসবেন তিনি তৈরি জিনিষটি পাবেন।”
পেগী বল্ল, “এখন থেকে তা হলে ভাই হবে?”
সােম বল, “এখন থেকে তা হলে ভাই হব।”
পেগী সােমের গালে ঠোনা মেরে বল্ল, “ওঠো, যাও, বালিশ দু’টো
সােফা থেকে নিয়ে এসাে।”
১৪৭
{ আগুন নিয়ে খেলা এক বিছানায় শশাওয়ার উত্তেজনায় দু’জনের কারুরই ঘুম আসছিল না। বারংবার পাশ ফেরা, উখুস করা। একজন লেপটাকে পা অবধি নামাতে চায়, অন্যজন বুক অবধি উঠাতে চায়। সােম বলে, “বড় গরম।” পেগী বলে, “বড় শীত।” আসল কারণ অবশ্য সােমের হৃদয়ের তাপাধিক্য, পেগীর নারীসুলভ লজ্জা। পেগী বল্ল, “সােম ডিয়ার, তােমার মনে কি বড় কষ্ট হয়েছে ?” সােম বল্ল, “অত্যন্ত। তুমি তাে জাতে না, ডারলিং, আমার মনের আকাশে কত শত কুসুম ফুটিয়েছিলে : জীবনে আমি কারুকে প্রাণ ভরে পাইনি, পেগু, তােমাকেও পেলুম না!” পেগী সােমের গোঁফের উপর হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বল্ল, “বেচারা সােম!” সােম বল্ল, “শুনে রাগ কোরাে না, পেগ। তােমার স্পর্শ এখন বিষের মত লাগছে। যদিও তুমি আমার বােন।” পেগী হাত সরিয়ে নিল ' না। আরাে নরম সুরে বল্ল, “দু’ একদিন বিষের মতাে লাগবেই, সােম। কিন্তু তারপর থেকে সহজ লাগবে। তােমাকে আমি রান্না করে খাওয়াব, বনভােজনে নিয়ে যাব, তােমার বাসায় এসে তােমার ঘর সাজিয়ে দেব, জিনিষ গুছিয়ে দেব। তুমি আমাকে থিয়েটারে ও নাচঘরে নিয়ে যাবে, তােমার টাকা কড়ির হিসাব দেবে, তােমার জীবনের আশা আকাঙ্ক্ষা শশানাবে।” সােম বল্ল, “স্ত্রীর সাধ বােনে মেটে না। বােন তত আমার কিছু না হােক বিশটি আছে।” ( সাশ্চর্যে) “বিশটি ।” ১৪৮ আগুন নিয়ে খেলা ( সহাস্যে) “সহােদরা গুটি তিনেক। তােমরা যাকে কাজিন বল আমরা তাকে সহােদরার সামিল জ্ঞান করি। তেমন বােন ডজন খানেক। তারপর পাতানাে বােন রাশি রাশি। তাদের মধ্যে বাছা বাছা জন পাঁচেক সহােদরার মতন প্রিয়।” “তবে আমি তােমার একবিংশতমা। তােমার ষষ্টী নই।” এই বলে’ পেগী হাল। “ষষ্ঠী হলে তােমার সপত্নী থাক্ত না, অদ্বিতীয়া হতে। এক- বিংশতমা হয়ে অন্য বিশজনের চেয়ে একটুও বেশী পাবে না মেহ।” এই বলে’ সােম গলাটা পরিষ্কার করল। পেগী বল্ল, “ঘুম তাে আজ হবে না, সােম। তােমার পঞ্চ কন্যার কাহিনী বলাে” সােম বল, “তা হলে সত্যি সত্যি রাত পােহাবে।” “পােহা। এই রাতটি সারা জীবন তােমারও মনে থাকবে, আমারও। এই নিয়ে একদিন তুমি একটা গল্প লিখতেও পার।” “গল্প আমি লিখতে ভালােবাসিনে, পেগু, live করতে ভালােবাসি। আমি জীবনশিল্পী, অপরে আমার জীবনীকার হােক।” “আবার সেই অহংকার ?” “অহংকার যার নেই সে হয় ভণ্ড, নয় ক্লীব। তবে অহংকারকে মেরুদণ্ডের মতাে ঢাকা দিতে হয়। নইলে কঙ্কালসার দেখায়।” পেগী সােমের বুকের পরে মাথা রেখে বল্ল, “এবার তােমার গল্প বলল।••• লাগ্ছে ? ১৪১ আগুন নিয়ে খেলা সােম বল্ল, “লাগবে না? হাড় যে। তােমাদের মতাে মাংস নয় তাে।” পেগী লজ্জায় শিউরে উঠে একটি বালিশ নিয়ে নিজের মাথার নীচে ও সােমের বুকের উপরে রাখল। বল্ল, “এখন কেমন লাগছে?” “এখন লাগছে রামমূর্তি পালােয়ানের মতাে।” “বেশ। এবার বলল তােমার প্রথম প্রেমের গল্প।” “কোনটা যে প্রথম প্রেম তা ঠিক বলতে পারব না, পেগ। কেননা প্রথম প্রেম মানুষের অনেকগুলােই হয়ে থাকে। পাঁচ বছর বয়সেও আমার একটি প্রেমিকা ছিল Freud" না পড়লে জান্তুম না যে ও আমার প্রেমিকা।” পেগী বল্ল, “Freud একজন দৈবজ্ঞ বুঝি? তােমার হাত দেখে বলে দিলেন ও তােমার প্রেমিকা।” সােম তার কান মলে দিয়ে বল্ল, “মুখ খু! Freudএর নাম শােন নি !” পেগ বল্ল, “আমি যে বিদুষী নই সে তত বলেইছি। লণ্ডনে গিয়ে তােমার ছাত্রী হব। কি বলে ?” সােম বল্ল, “গল্পটা বন্দুতে দাও। পাঁচ থেকে পনেরাে বছর বয়স আমার জীবনের প্রাণু ঐতিহাসিক যুগ। • ও যুগের প্রেমগুলাে গবেষণার বিষয়। আমার জীবনীকারের জন্য ভােলা রইল। প্রেম করেছি এই যথেষ্ট, তাকে মনে রাখবার মতাে অধ্যবসায় আমার নেই। যে প্রেমিকাটিকে অনায়াসে মনে পড়ছে তাকে ছােট বেলায় অজস্র মার দিয়েছি, তাকে নিয়ে সখের মাষ্টারি করেছি। কিন্তু সে যখন বানােয় পড়ল ১৫০ আগুন নিয়ে খেলা ঐ তখন আমাদের গরম দেশের প্রকৃতির চক্রান্তে সেই হয়ে উঠল অপূর্ব লােভনীয়।” পেগী বন্ধু, “ও মা, বারাে বছর বয়সে ?” সােম বল্ল, “গরম দেশের দস্তুর ও দেশের হাওয়াতে মদ, আকাশে যাই। তুমি আমি এক বিছানায় শুয়েও নিস্পাপ আছি একথা যদি ও দেশের কাউকে বলি সে বলবে, ‘আমাকে গাঁজাখাের ঠাওরেছ ?” পেগী বল্ল, “অকারণে নিজের দেশের নিন্দা কোরাে না, সােম। এদেশেও ঠিক ঐ কথাই বলবে। নেহাৎ অন্যায়ও ববে না, কেননা তােমার মতাে ক’টা পুরুষ এদেশে আছে যে তােমার মত জিতেন্দ্রিয় ? এদেশের পুরুষগুলাে সুন্দরী নারী দেখলে ভারি অনুগত হয়ে পড়ে, সােম। এত অনুগত হয়ে পড়ে যে যতক্ষণ না মিষ্টান্নের মতাে মুখে পূরছে ততক্ষণ ছাড়ে না। অবশ্য এও মানূতে হবে যে ভদ্রতার খাতিরে বিয়ে করে ও বিয়ে করবার পরে বুড়াে না হওয়া অবধি অবিশ্বাসীও হয় না।”—তার শেষ কথাগুলিতে শ্লেষের আমেজ ছিল। সােম হাল। সােম বল্ল, “তােমার পাঁটা তুমি যেমন করেই কাট, আমি কিছু বলব । তােমার দেশ সম্বন্ধে তােমার মত হয় তাে ঠিক। কিন্তু আমার সম্বন্ধে তােমার ঐ ধারণাটা ভুল যে আমি স্বভাবত জিতেন্দ্রিয়। আমার চতুর্থ প্রেমের গল্পটা আগে বলব কি?” “না, না, না। পরে বােলাে।” “তবে আমার সেই দ্বাদশবর্ষীয়া প্রিয়ার কথা বলে শেষ করি। সে যখন লােভনীয় রকম সুন্দরী হয়ে উঠল তখন আমার কাছে আসা ছেড়ে আগুন নিয়ে খেলা দিল। সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের স্বভাবত ভয় আছে বলেই হােক কিম্বা দূরত্বের দরুণই হােক আমি যখন তাকে মাঝে মাঝে রাস্তা দিয়ে তার বন্ধুনীর বাড়ী যাওয়া আসা করতে দেখতুম তখন আমার প্রথম বয়সের দুষ্ট, ক্ষুধা বােবা হয়ে থাকত, আমি তার সঙ্গে কথা কইবার সাহস খুঁজে পেতুম না, পাছে কী বলতে কী বলে ফেলি।” পেগী রঙ্গ করে বল্ল, “এদিকে আমার সঙ্গে ত তর্কপঞ্চানন বাক্য- বারিধি!” সােম বল্ল, “কতবার রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছি, তার অপেক্ষায়। ভেবেছি আজ সে যখন তার সইয়ের বাড়ী থেকে ফিরবে, আমি বলব, “একদিন আমার সঙ্গে দেখা করবে ?” কিছু সে পাশ দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেছে, আমি পাষাণের মতাে নির্বাক। তারপরে ঘরে ফিরে এসে পরদিনের বক্তৃতা তৈরী করে রেখেছি।” পেগী বল্ল, “আমার জন্যে তৈরি করেছ ?” সােম বল্ল, “করেছি বৈ কি। যেদিন প্রথম দেখা হয় সেদিন। কিন্তু গল্পটা শােননা। একদিন আমি কপাল ঠুকে’ প্রতিজ্ঞা করে ফেলুম যে আজ তাকে মনের কথা বই। সেদিন সত্যি সত্যিই সে মিনিট খানেক দাড়িয়ে আমার বক্তৃতা শুল। বল্লুম, তুমি সকলের চেয়ে সুন্দর। আমার বােনগুলাে তােমার তুলনায় পেত্নীর মত দেখতে। (পেগীর হাস্য) এখন, তার সঙ্গে আমার বােনদের রেশারেশির ভাব স্বভাবতই ছিল। আমার একটি বােন তাে আক্ষেপ করে বর্তই, ‘দাদা নিজের বােনদের দেখতে পারে না, পরের বােনদের আদর করে। (পেগীর ১৫২ আগুন নিয়ে খেলা হেসে গড়িয়ে পড়া ) যাক্, নির্দিষ্ট দিনে ও নির্দিষ্ট স্থানে মেয়েটি আমার সঙ্গে দেখা করল। একটু যদি ধৈৰ্য্য ধারণ করতুম তবে সেদিনকার ঘটনা ও আমার জীবন অন্যরকম হত। কিন্তু সৌভাগ্যে অস্থির হয়ে তাকে যেই বুকে টেনে এনেছি সে ভাবল আমি তাকে কাতুকুতু দিতে যাচ্ছি। সে ‘মা গাে’ বলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দিল এক দৌড়। পেগী হাসির চোট্টে হাঁফাতে হাঁফাতে বল্ল, “ও ড্রিয়ার!” তার চোখের কোণে জলণ্ডঠেছিল। সােম বল্ল, “তার পরে আমি প্রেমে পড়া ছেড়ে দিয়ে বই পড়া নিয়ে ক্ষেপে গেলুম। ও বয়সে মানুষের হাজারাে দিকে আকর্ষণ। ভাঙা হৃদয় ও ভাঙা হাড় দু’দিনে জোড়া লাগে। আর ওটা তে হৃদয়গত ব্যাপার ছিল না, ছিল সৌখীন দেহগত। (থেমে) দেহগত বলে’ এখন মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু তখন কি তাই ছিল ? কী জানি। অতীতকাল সম্বন্ধে আমরা অসংকোচে অবিচার করে থাকি গে।” পেগী বল্ল, “আমার তাে অতীতকালই নেই। আমার কাল নিত্য- প্রবৃত্ত বর্তমান। “তুমি তা হলে একটা গােৰু কি গাধা।” “অমর কথা বল তাে তােমাকে আস্ত খেয়ে ফে।” “কী দিয়ে খাবে? দাত দিয়ে তাে? তােমার ওগুলাে আসল দাত, , বাঁধানাে দাত ?” “কয়েকটা বাঁধানাে। সত্যি, সােম, তােমার দাতের মতাে দাঁত আগুন নিয়ে খেলা এদেশে হয় না। প্রথম দিনেই তােমার দাঁত দেখে আকৃষ্ট হয়েছি।” “কিন্তু এমন একসময় ছিল যখন আমার সঁতে ব্যথা হয়েছিল। চুল পড়ে যাচ্ছিল, দু'একটা পাকা চুলও দেখা দিয়েছিল। চোখে জ্যোতি ছিল না, দেহ ছিল অবসাদগ্রস্ত। সেই সময় আমার জীবনে এলেন আমার দ্বিতীয় বাঞ্চি। দেহে এতটা শক্তি ছিল না যে তাকে দেহ দিয়ে কামনা করব। তাই স্বভাবত আমি হলুম অশরীরী প্রেমিক —যাকে পণ্ডিতেরা বলেন platonic lover. তাছাড়া উনিশ কুড়ি বছর বয়সের ছেলেরা কেন কী জানি দেহের নাম শুনলে কানে আঙুল দেয়।” পেগী রঙ্গ করে বন্ধু, “তাই নাকি?” “হ গাে তাই। কোন এক কাল্পনিক মানসীর পায়ে তাদের জীবন মরণ বাঁধা। আমার মানসী একদিন তার মা’র সঙ্গে আমাদের বাড়ী এলেন। তঁারও তেমনি মুমূর চেহারা। রােগের পাণ্ডুরতাকে আমি মনে করলুম অন্তরের আভা। পরিচয়ের ঘণ্টা খানেকের মধ্যে আমি তার সঙ্গে Rossettiর কবিতা Blessed Damozel পড়লুম। জান কবিতাটা? “আমি কবিতা ভালােবাসিনে।” “কিন্তু আমার দ্বিতীয় প্রিয়া ভালােবাসতেন। স্বয়ং মিসেস্ ব্রাউ- নিঙের মতাে চেহারা তাঁর। নিজের কিছু ছাই পাশ লিখেছিলেন। কাজেই কাব্য চর্চাটা মন্দ জল না। তারপরে তিনি চলে গেলেন ১৫৪ আগুন নিয়ে খেলা আমাকে বেকার করে দিয়ে। আমার চিঠির জবাবে যেদিন তিনি আমার মা’কে চিঠি লিখলেন আমার উল্লেখ করে সেদিন আমার সাধ গেল সে চিঠিখানাকে ছবির মত বাঁধিয়ে রাখি। পরে তিনি আমাকে পােষ্টকার্ড লিখে দাতের ব্যাথায় সহানুভূতি জানিয়েছিলেন, তাই নিয়ে আমি এত উত্তেজিত হয়েছিলুম যে পাছে চিঠিতে জানালে তার আত্মীয়দের হাতে পড়বে তাই মাসিক পত্রে কবিতায় জানালুম। সে কবিতা তার চোখে পড়ল কি না জানিনে, মনে অশরীরী উন্মাদনা সঞ্চার করল কি না তাও জানিনে। কিন্তু একথা জানি তাই পড়ে আরেকটি মেয়ে আমার প্রেমে পড়ে গেল।” পেগী বল্ল, “কী রােম্যান্টিক! কিন্তু সত্যি ত?” সােম বল্ল, “সত্যি। মেয়েটি আমাকে চিঠি লিখে এমন শ্রদ্ধা জানাল যেমনটি আমাকে কেউ কোনােদিন জানায় নি। শ্রদ্ধা দাড়াল প্রেমে। চেহারা না দেখে প্রেম—তবু যেন সে আমাকে জন্মজন্মান্তর দেখে এসেছে। আমি যত জানাই আমার রং কালাে, আমার এরীর জীর্ণ, আমার দাত কন্ কন্ করে, আমার টাক পড়তে আরম্ভ করেছে, তার প্রেম তত উদ্বেলিত হয়ে উঠে। সে ভাবে কী বিনয়, কী মহত্ত্ব, দেহের প্রতি কবি-তপস্বীর কী অনাস্থাভাব! আমি যতই বলি আমার হৃদয় আমার মানসীকে দেওয়া, আমার সেই চোকে দেখা মুমূর্ষ মানসীকে, ততই আমার তৃতীয় প্রিয়া আমাকে রূপ দিয়ে জয় করতে বদ্ধপরিকর হয়। তার ফটো আসতে লাগল প্রত্যেক ডাকে। রূপসী বটে। কিন্তু আমি কি দেহের রূপে ভুলি? আমি বলি আর কাউকে আগুন নিয়ে খেলা দেহ দান করাে, আমাকে ধ্যানভ্রষ্ট কোরাে না। তার উত্তরে সে তার প্রতিজ্ঞ জানায়। তােমাকেই দেব, অপরকে না।” পেগী রুদ্ধনিঃশ্বাসে বল্ল “তার পরে ?” “তার পরে এই আলােছায়ার খেলা চল্প প্রতিদিনের ডাকে। আমি পালাই, সে পিছু নেয়। আমি ঘৃণা করি, সে শ্রদ্ধার বরাদ্দ বাড়িয়ে দেয়। সে এক মজার খেলা, তার তুলনায় ফুটুল হকী টেনিস কিছু নয়। আমার যেটুকু শারীরিক সামর্থ ছিল সেটুকু গেল। আমি একজনের উদ্দেশে লিখি কঁদুনি-কবিতা, অপর জনকে লিখি উপদেশাত্মক চিঠি। ক্লাস পালিয়ে অপথে বেড়াই, রােজ রাত্রে ফুল তুলে বিছানায় ছড়াই, রামধনু রঙের পােষাক পরি, বাবরী চুল রাখি। বন্ধুদের সঙ্গে মিশিনে, সবাইকে ভাবি ঘােরর সংসারী, শেলীর পক্ষ নিয়ে ওয়ার্ডওয়ার্থের ভক্তদের সঙ্গে লড়াই করি। সে এক বয়স গেছে। -এই বলে’ সােম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেল্ল। পেগী, “বেশী দিন আগে তাে নয়, মাত্র কয়েক বছর আগে।” সােম বল্ল, “মাত্র কয়েক বছর? যুগযুগান্তর ! এক একটি মাসে এক একটি বছর বাড়ি। সেই দু’টি বছরে আমি নিজেকে ক্রমে ক্রমে সকলের, সমবয়সী ভেবেছি—যুবকের, প্রৌঢ়ের, বর্ষীয়ানের। সমস্কন্ধ ভেবেছি-রবীন্দ্রনাথের, গ্যেটের, শেল্পীয়ারের। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বছর সেই দু’টি। তােমার তেমন কোনাে বছর সকলের নেই ?” “আমার শ্রেষ্ঠ বছর প্রতি বছর, শ্রেষ্ঠ দিন প্রতি দিন।”
আগুন নিয়ে খেলা
সােম বল্ল, “পাখীদের জিজ্ঞাসা করলে তারাও সেই কথা বলত।
তুমি একটা নাইটিংগেল কি লার্ক।”
পেগী পুলকিত হয়ে বল্ল, “যাও!”
সােম বল, “গােৰু কি গাধা বল্লে রাগ কর, নাইটিংগেল কি লার্ক
বল্লে খুসী হয়ে ওঠ-পশুর চেয়ে পাখী বড় হল কিসে? পণ্ডিতেরা
বলেন পাখীদের তুল্লায় পশুরা আমাদের নিকটতর কুটুম্ব।”
“তা বলুন। পশুদের মধ্যে কুকুরই যা মানুষের মততা, সিংহকেও
শ্রদ্ধা হয়, বাকীগুলাে নিতান্তই জানােয়ার।”
“তােমাকে কুকুর বল্লে তুমি খুসী হবে?”
“যদি বল terrier কি’ greyhound’ কি sheep dog, তা হলে
এমন কি যদি ‘pekingese’ বল তাহলেও কিছু মনে করব
, যদিও অত ছােট কুকুর আমার পছন্দ হয় না। যে কুকুর বল সেই
কুকুর হতে রাজি আছি কিন্তু পুরুষ কুকুর। মেয়ে কুকুর না।”
“স্বজাতির প্রতি এত অবজ্ঞা ?”
“লুকিয়ে কী হবে বল? পুরুষরা আমাদের মধ্যে যে সৌন্দৰ্য্য যে মহিমা
যে সুধা দেখে আমাদের তা নেই। বরঞ্চ পুরুষদের মধ্যে তা থাকতে পারে।”
“আমার মধ্যেও?”
“তুমি কার চেয়ে ছােট নও, সােম।”
“তবু তাে তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করলে।”
“তা নিয়ে মন খারাপ কোরো না, লক্ষ্মীটি। আমি তােমার সব
লােকসান পুষিয়ে দেব, এদেশে যতদিন থাকবে তােমার সঙ্গিনী হব, ঘরণী
খুসী হব।
১৫৭
আগুন নিয়ে খেলা
হব, সােম। তুমি আমাদের বাড়ী উঠে এসাে এবার, তােমার ঐ
ল্যাণ্ডলেডীকে ইস্তফা দিয়ে। মা তােমাকে পেয়ে খুসীই হবেন।”
“তােমার বাবা নেই।”
“না। যুদ্ধে মারা যান্।”
“ভাই নেই ?”
“না। যুদ্ধে মারা যায়।”
“তােমার মন কেমন করে না?”
“বছর বারাে আগের কথা। তখন আমার বয় মােটে দশ। মনে
থাকূলে তাে মন কেমন করবে ?”
“বােন আছে ?”
“না।”
"Poor darling!"
“Poor কিসের, সােম ? আমার স্বাস্থ্য আছে, চেহারাও নেহাৎ
বিশ্রী নয় বােধ হয়, হলে তুমি প্রেমে পড়তে না। আমার চাকুরীটিও
ভালল, উন্নতির আশা আছে—
“কী চাকরী, পেগ ?”
“Selfridgeদের খো বিভাগে কাজ করি। একদিন ঐ বিভাগের
ম্যানেজার হব।
যেয়াে একদিন, তােমাকে দেশে পাঠাবার মতাে পুতুল
কিনিয়ে দেব। Gamageদের সঙ্গে আমাদের জোর প্রতিযােগিতা
চলছে।•••কিন্তু কোন কথার থেকে কোন কথায় এলুম? তােমার গল্পের
খেই হারিয়ে গেল যে?”
১৫৮
আগুন নিয়ে খেলা সােম বল্ল, “থামাে ভেবে দেখি।••• আমার তৃতীয়ার কাহিনী সুরু করেছি কি ?•••করেছি ? তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের বর্ণনা দিয়েছি কি?•••দিইনি ? তবে শোেননা। যেদিন তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ সেদিন যার সঙ্গে গেছলুম তিনি তার ও আমার উভয়েরই প্রিয় বন্ধু। আমার প্রিয়তম বন্ধু। দেখা হবার পর একটি ঘন্টা আমরা পরস্পরের সঙ্গে কইবার মতাে কথা খুঁজে পেলুম না, তিনিও বন্ধুর সঙ্গে কথা কয়ে সংকোচ কাটান, আমিও বন্ধুর সঙ্গে কথা কয়ে সংকোচ কাটিয়ে উঠি। এমনি করে সংকোচু যখন কতকটা কাটল তখন বন্ধুও ছিলেন চতুর, বল্লেন, ‘আমি একটু কাজে বাইরে যাচ্ছি, খানিক পরে আস্ব। একটি ঘরে দুটি মানুষ, আট ন'মাস ধরে তারা চিঠিপত্রে পরস্পরের অন্তরাত্মা পর্যন্ত দেখেছে, দু’জনের জীবনের সকল কথা দু’জনে জানেবুঝতে পারছ, পেগ ? তারা অপরিচিত নয় যে প্রথম দেখায় স্বভাবত সংকোচ বােধ করবে। চিঠিতে একজন আরেকজনকে ‘প্রিয়তম’ বলে সম্বােধন করে আসছে। তবু মুখখামুখী ‘আপনি’ বলবে, না, ‘তুমি’ বলবে ঠিক করতে পারছে না। অদ্ভুত নয়?” “ভাগ্যিস আমাদের ভাষায় ‘আপনি’-তুমি’র ভেদ নেই। নইলে পর্থকওলের সেই সকালটিতে দ্বিধায় পড়া যেত।” “সত্যিই !•••আমাদের প্রথম কথাগুলি আমার মনে পড়ছে না। কিন্তু সেই সন্ধ্যাটি আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমরা একখানি তক্তপােষের উপর খুব কাছে কাছে বসেছিলুম। অন্ধকার হল। ঝি বল্ল, ‘আলাে দিয়ে যাব? সে বল্ল, ‘না। আমি বলুম, হাঁ। বেশ মনে পড়ে সে ৫৫ আগুন নিয়ে খেলা • । আমাকে ছােট ছেলেটির মতন করে খেজুর খাইয়ে দিয়েছিল। তেমন খেজুর তােমরা ইংলণ্ডে পাও না পেগ।” “যদি কোনােদিন পাই তােমাকে তেমনি করে খাইয়ে দেব, সােম।” “দিয়াে। কিন্তু সে আনন্দ আর ফিরে পাব না। তাকে যে প্রথ- দর্শনেই কামনা করেছিলুম স্ত্রীর মতাে করে। আর মজা এই যে প্রথম দর্শনেই সে আমাকে স্বামীর মতাে করে কামনা করা ছাড়ল। তার রূপ আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিল, আমার কুরূপ তার কল্পনাকে ধূলিসাৎ করল। তারপর থেকে আমাদের সম্বন্ধ গেল উন্টে। সে পালায়, আমি ধরতে ছুটে যাই। সেই আলােছায়ার খেলা। কিন্তু যে ছিল আলাে সে হল ছায়া, যে ছিল ছায়া সে হল আলাে। আমি বলি, ‘প্রিয়তমা’ ; সে বলে, ‘বন্ধু। অভিমানে আমার দেহ থেকে প্রাণ চলে যায়। আমি তার দেহ দাবী করি, সে আমারই শেখানাে platonism আওড়ায়। বলে, মনের মিলনই হচ্ছে স্থায়ী মিলন, দেহের মিলনে কেবল গ্লানি ও অবসাদ।” পেগী বল্ল, “কেমন জব্দ ?” সােম বল্ল, “আমারই শিল আমারই নােড়া, আমারই ভাঙে দাঁতের গােড়া। আমার মানসী হয়ে আমার কবিতার নায়িকা হতে চায়, আমার বনিত হয়ে আমার শুষ্ক জীবন মুঞ্জরিত করতে বল্লে কান দেয় না। আমার স্তুতি তার ভালাে লেগেছে, আমার স্পর্শ তাকে উদ্দীপিত করে নি। আমার কাব্যে অমর হবার লােভ আছে, আমার বংশকে অমর করবার বাঞ্ছা নেই। এ খেলা ক’দিন চালানাে যায় বল ? আমি ক্ষান্তি দিলুম।”. ১৬০
আগুন নিয়ে খেলা
“সে কী ভাবল ?”
“কাল। মুক্তি দিতে অনিচ্ছুক হল। তার নেশা লেগেছিল।”
“সে নেশা ভাঙিয়ে ভালােই করলে। ফ্লার্ট করা আমি দু’চক্ষে
দেখতে পারিনে।”
“আমি কিন্তু ফ্লার্ট করাকে একটা আর্ট মনে করে থাকি।
আজকাল তো আমি কাব্য লেখা ছেড়ে দিয়ে তার বদলে ফ্লার্ট করা
অভ্যাস করেছি।”
“আমি ও অভ্যাস ছাড়াব।”
“সে দেখা যাবে। কিন্তু আমার চতুর্থ প্রেমের কাহিনীটা একবার
শােননা। আমার উপর তােমার ঘৃণা হয় কি না বলল।”
“ঘৃণা তােমার উপর যদি হয় তবে আমি তােমার কেমনতর বােন ?
, ঘৃণা হবে না।”
“আচ্ছা গাে আচ্ছা। আগে শােনন। তৃতীয়াকে যখন ত্যাগ করলুম
তখন আমার চেতনা হয়েছে যে শরীরে সামর্থ্য থাকাটা প্রেন্যে বেশ
একটা বড় উপাদান। আমরা মুখে যাই বলি না কেন কায়মনে
সম্ভোগপিপাসু। মশারা যেমন রক্তপিপাসু। এ বিষয়ে আমি স্পষ্টবাদী
হতে শিখেছি অনেক দুঃখে, পেগ। ছিলুম গোঁড়া নিরাকারবাদী, এখন যে
গোঁড়া সাকারবাদী হয়েছি তা নয়, এখন আমি উদারতম সমন্বয়বাদী।”
পেগ মাথা নেড়ে বল্ল, “ওসব আমার মাথায় ঢুকবে না, সােম।”
সােম তার মাথায় হাত বুলিয়ে বল্ল, “তােমাকে আমি বিদুষী করে’
তুল, পেগ। কিন্তু ইংলণ্ডে আমার মেয়াদ আর একটি বছর।”
১১
১৬১
আগুন নিয়ে খেলা “মােটে ?” “দুঃখ কি পেগ ? আবার আমি আসব। হয় তাে আবার এই হােটেলে এসে এই ঘরে শােব।” “ভবিতব্যই জানে।” “ভবিতব্যকে আমরাই হওয়াই। ভগবানের viceroy আমরা।” “ভগবান আছেন কি না তাই ভালাে জানিনে।” তা হলে তােমার সঙ্গে তর্ক করব না, পেগ। ভগবান আছেন কি না এ নিয়ে অন্তত আড়াই হাজার বছর ধরে পণ্ডিতেরা কথা । কাটাকাটি ও মূর্খেরা মাথা কাটাকাটি করে আসছে। অতএব ভালল- বাসার গল্পই চলুক। যদিও রাত এখন তিনটে।” “তিনটে!” “তিনটে ! এখন ঘুমলে কাল ট্রেন পাবে না।” “গল্পই চলুক। কিন্তু ঘুম যা পাচ্ছে তােমাকে কী বলব!” “তুমি ঘুমও, আমি জাগি।” “সে হয় না, ডিয়ার।” *এখনাে অবিশ্বাস ?” “ছিঃ। তােমাকে অবিশ্বাস এই দেখ, প্রমাণ হয়ে গেল যে আমার নখ দন্ত নেই, প্রত্যেক পুরুষসিংহের যা থাকা আবশ্যক। পুরুষকে নারী বিশ্বাস করবে এইটেই তাে প্রকৃতির ইচ্ছাবিরুদ্ধ। স্ত্রী-পুরুষের মধ্যে প্রকৃত সম্বন্ধ হচ্ছে শত্রুতার। বিকৃত সম্বন্ধ হচ্ছে বন্ধুতার।” করতে পারি ?” ১৬২ আগুন নিয়ে খেলা “তর্ক রাখাে ! তর্ক করলে আমি সত্যি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ব। গল্প করে আমাকে জাগিয়ে রাখাে, সােম।” “আচ্ছা তবে আমার দেহতন্ত্র প্রেমের গল্প বলি । কিন্তু আগেই তােমাকে সতর্ক করে দিই, প্রেম কথাটা এ ক্ষেত্রে কাম কথাটার সমার্থক। একটি মেয়ে আমাকে seduce করল। মেয়েমানুষে কখনন seduce করে শুনেছ ?” “অমন মেয়ে এদেশে অগণ্য আছে।” “কিন্তু আমি এত ছেলেমানুষ ছিলুম যে একজন প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে তাই নিয়ে হাতাহাতি করেছি, বাক্যালাপ বন্ধ করেছি। তাকে বলেছি মিথ্যাবাদী, নারীদ্বেষী। তার অপরাধ সে বলেছিল যে পুরুষদের প্রস্তাবে মেয়েদের সায় থাকে বলেই আমাদের দেশে এত নারীহরণ হয়।” “এদেশে হয় পুরুষহরণ। তােমাকে কেউ একদিন পকেটে পূর্ববে, সাবধান থেকো।” “আমি তাে তা হলে কৃতার্থ হয়ে যাই। তবে নেহাৎ বেশ্যা-টো হলে আমি নারাজ। ইংলণ্ডে অবশ্য পুলিশের ভয়ে হাত ধরে টানে না, কিন্তু কন্টিনেন্টে ধ্বস্তাধ্বস্তি করেছে, তবু সায় দিই নি।” “সে তুমি বলে’ পালে।” “আবার প্রমাণ হল যে আমার নখ দন্ত নেই। আমি কাপুরুষ। ।” “ও-ক্ষেত্রে কাপুরুষতাই পৌরুষ।” “যাক, আমার গল্পটা কতদূরে ফেলে এলুম।•••যে আমাকে seduce করেছিল সে রূপসী ছিল না বলে তখন তার উপর রাগ করেছি। ১৬৩
আগুন নিয়ে খেলা
.
চরিত্রটি গেল, অথচ aesthetic আনন্দও পেলুম না—এ আমার জীবনের
ছােটখাট একটা ট্র্যাজেডী।”
“চরিত্রটি গেল, সােম!” পেগী কাতর সুরে বল।
“যাবে না? তবে seduce করা বলতে কি তুমি একটা নিরামিষ
ব্যাপার বুঝেছিলে?”
“ছি ছি ছি ছি।”—পেগী সােমের কাছ থেকে সরে গেল।
সােম কাষ্ঠ হাসি হেসে বল্ল, “ঘৃণা করলে তাে?”
পেগী কাতর সুরে বল্ল, “তুচ্ছ একটা মুহূর্ত্তের সুখ, তারই জন্যে
বিলিয়ে দিলে নিজেকে ?”
“নিজেকে নয়, পেগ। নিজেকে বিলানাে যায় না। আমার
স্বাস্থ্যের প্রয়ােজন ছিল, অভিজ্ঞতার প্রয়ােজন ছিল। তা ছাড়া
সত্যিকারের চরিত্র কখনাে ক্ষুধা মেটালে যায় না। ভূরিভােজন করলে
যায়, তা মানি। আবার অনশন করলেও যায়। ললাকে বলে
সংযম কলে। কিন্তু অনশনে তাে সংযম নেই, সংযম ভােজনে।
অসভোগে তাে সংযমের কথা উঠতে পারে না, সংযম সম্ভোগে। একথা
লােকেও মানে, কিন্তু মন্ত্র পড়া স্ত্রীপুরুষের বেলা। যারা মন্ত্র পড়েনি
তাদের প্রতি ব্যবস্থা নিবন্ধু একাদশী। অথচ একবার মন্ত্র পড়লে
বাপ-মা বলেন, নাতি চাই, নইলে মরতে পারছিনে। পাড়া পড়শীরা
অন্নপ্রাশনের দিন গুনতে থাকে বিয়ের পরদিন থেকে, তারা চায় আরেক
দফা ভােজ। Population ঠিক মততা বাড়ছে না বলে তােমার
নিজের দেশের মাতব্বররা কেমন অধৈৰ্য্য হয়ে পড়ছেন খবর রাখ ?”
১৬৪
আগুন নিয়ে খেলা পেগী বালিশে মুখ গুজে বােধ করি চোখের জল ঠেকিন্স রাখছিল। উত্তর দিল না। সােমের ইচ্ছা করছিল তার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেয়—কিন্তু তাকে স্পর্শ করলে সে যদি আরাে দূরে সরে যায়? সােম তা হলে কী উপায় করবে ? যুক্তিতথ্য দিয়ে তাে পেগীর অশ্রু রােধ করা যায় না। সােম প্রসঙ্গটাকে করুণ করে’ তুল্ল। অশ্রু দিয়ে অশ্রু রােধ করবে। বল্প, “সতী মেয়েদের দ্বার আমার কাছে চিরকালের মতাে বন্ধ হয়ে গেল, পেঙ্গু। একে আমি একটা ছােট খাট ট্র্যাজেডী বলে’ উপহাস করেছি একটু আগে, কিন্তু এই আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডী।” পেগীর ভাব দেখে মনে হল সে কুতূহলী। কিন্তু সে তেমনি নীরব রইল। সােম বল্ল, “আমার দেশে আমার বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে অনেকবার। আমার দেশের বিবাহ-প্রথা তােমার দেশের মতাে নয়। বিবাহযােগ্যা মেয়ের বাবা বিবাহযােগ্য ছেলের বাবাকে আবেদন জানান। ছেলের বাবা ছেলের মত জিজ্ঞাসা করেন। ছেলে একবারমাত্র মেয়েটিকে দেখে’ কি একবারও না দেখে’ ‘হ। কিম্বা ‘না’ বলে।” পেগী ক্রমে ক্রমে আগের মত সােমের কাছটিতে সরে’ আছিল। তেমনি করে সােমের বুকের পরে বালিশ ও বালিশের পরে মাথা রেখে বল্ল, “দক্ষিণ সমুদ্রের অসভ্যদের মধ্যে অমন প্রথা আছে শুনেছিলুম।” সােম বল্ল, “তােমার দেশের সুসভ্য রাজবংশেও অমন প্রথা ছিল, পেগ। ইউরােপে যখন আভিজাত্যের যুগ ছিল তখন ঐ প্রথাই ছিল অসভ্যতার নয় আভিজাত্যের লক্ষণ। ১৬৫ আগুন নিয়ে খেলা পেগী বল, “মেয়ের বাবা মেয়ের মত জিজ্ঞাসা করেন ?” সােম বল, “মেয়ে সাধারণত নাবালিকা। তার মত চাইলে সে লজ্জায় ‘না’ বলবেই তাে। ও বয়সে ‘না’ মানে ‘হ। বাপ জোর করে বিয়ে দিয়ে দেন, জোর করে ওষুধ খাওয়ানাের মত। ফলে মেয়ের শরীর মন ভালাে থাকে, যদি না দুর্ভাগ্যক্রমে অল্পকালের মধ্যে বারম্বার সন্তান হয়।” পেগী বল্ল, “মা গাে, আমি যদি তােমার ভারতবর্ষীয়া বােন হয়ে থাকতুম এতদিনে আমার তিন চারটি খােকা খুকী হয়ে থাকত। ইস!” “হয় তত একটিও হবার আগে তুমি বিধবা হতে। বিধবার বিয়ে আমরা দিইনে, দিতে চাইলেও বর পাওয়া যায় না। সারাজীবন নিঃসন্তান হতে।” “এও কি আভিজাত্যের লক্ষণ, সােম? না, নির্জলা অসভ্যতার ? “না গাে, ওটা হল আধ্যাত্মিকতার লক্ষণ। কিন্তু ও কথা আজ থা। যেননা তুমি খুব সম্ভব তর্ক করতে, ‘এক তরফা আধ্যাত্মিকতার মূল্য কী! বিপত্নীকরা তাে নিঃসন্তান থাকেন না।..বছিলুম আমার দেশে সকলের বৌ জুটবে, আমার কোনােদিন জুটবে না।” “কেন, সােম?” “আরাে স্পষ্ট করে বলতে হবে ? যাদের বিয়ে হয় তারা বিয়ের আগে প্রাণ খুলে কথা কইবার সুযােগ পায় না। তারা বড় জোর একবার চোখে দেখে পরস্পরকে ; বাক্যালাপ যা করে তা বহু লােকের উপস্থিতিতে। কাজেই আমার জীবনের সকল কথা বিয়ের পরে বলতে ! ১৬৬ আগুন নিয়ে খেলা হয়। তখন যদি আমার স্ত্রী বলেন, কেন তুমি আমাকে false pretence বিয়ে করলে। কোনাে সতী মেয়েকে বিয়ে না করাই তােমার উচিত ছিল। আমি তার উত্তরে কী বলে’ আত্মসমর্থন কব ? কাপুরুষের মতাে বলব, ‘রাণী আমার, একটা পাপ করে ফেলেছি বলে অনুতাপে আমার হৃদয় পুড়ে যাচ্ছে, তােমার ক্ষমা-সলিল সেচনে শীতল করে? কখনাে না। আমি অন্যায় করি নি যে অনুতপ্ত হব। যা করেছি on principle করেছি।” আবার পেগী বালিশে মুখ গুজল। কিন্তু এবার সােমের বুকের উপরকার বালিশে। সােম বলে’ চল্ল, “নিজের উপর যার কিছুমাত্র শ্রদ্ধা আছে সে বড় জোর বলে, ‘একটা ভুল চাল দিয়েছি, কিন্তু অনুতাপ করে মরে আত্ম- নিন্দুক আত্মঘাতীরা। আমার গায়ের চামড়ায় হাত দিয়ে দেখতে পার, পে। গণ্ডারের মতাে মােটা। লােকনিলা আমার গায়ে লাগবে না। কিন্তু তা বলে নিজের নিরীহ স্ত্রীটিকে আমি ঠকাতে পারব না। ঐটেই আসল দুর্নীতি। স্ত্রীকে ঠকিয়ে তার দেহ মন গ্রহণ করাটাই প্রকৃত ব্যভিচার।” পেগ মুখ তুলে বল্ল, “যাক্, তা হলে বিয়ে তুমি করছ না কোনদিন?” সােম হেসে বল্ল, “ও কথা কি আমি বলছি পেগ ? আমি বলেছি সতী মেয়েরা আমাকে বিয়ে করবে না জেনেশুনে। কিন্তু অসতী মেয়েরা প্রায়ই অনুদার হয় না। ‘প্রায়ই বলুম-কারণ সন্ন্যাসীদের উপর অসতীদের পক্ষপাত আমি অনেক স্থলে লক্ষ্য করেছি।” ১৬৭ আগুন নিয়ে খেলা পেগীর হৃৎস্পন্দন রহিত হয়েছিল বুছি বা। সােমটা যে এমন সর্বনেশে ছেলে, তাকে উদ্ধার করবার যে একেবারে আশা নেই, পেগী বােধ করি সেই কথা ভেবে মুহমান হয়েছিল। সব মেয়ের মতাে পেগীর প্রচ্ছন্ন অভিলাষ ছিল যে সে কোন একজন বা একাধিক পুরুষের Guardian Angel হবে। ফ্লার্ট, করা একটা নিরীহ অপরাধ, সােম তা যতখুসী করুক। কিন্তু সেই অনুচ্চারণীয় পাপটা ! ছি ছি ছি ! সােম কতকটা অনুমান করে, বল্ল, “ভয় নেই, পেগ। আমার মন পাবার মতাে অসতীও এত বড় পৃথিবীতে দুর্লভ।আর মন যাকে দিতে পারব না দেহও যে তাকে দেব না এও আমার পণ। ব্যতিক্রম হয়েছিল সেই মেয়েটির বেলা, কিন্তু তখনকার সেটা ছিল প্রতিক্রিয়ামূলক Platonic loveএর অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া। তখন যদি অমনটি না ঘটত তবে আজকে রাত্রে এমনটি ঘটত না, পেগ্। তােমার সতীত্বকে আমার আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছে সেই অসতী মেয়েটা।” পেগী বল্ল, “তাকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।” সােম বল্ল, “এবার আমার পঞ্চম প্রেমের বৃত্তান্ত বলে শেষ করি। পাঁচটা বাজে। একটু পরে হিরা উঠবে।” পেগী কান পেতে রইল। সােম বল্ল, “তার সঙ্গে লণ্ডনে সাক্ষাৎ। এক বন্ধুনীর বাড়ীতে। সেদিন আমি ভারতীয় পরিচ্ছদ পরে আগুন পােহাচ্ছি, কেননা ভারতীয় পরিচ্ছদ শীতের দেশের উপযুক্ত নয়।” পেগী কুতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “সে কেমন দেখতে?” ১৬৮ আগুন নিয়ে খেলা সােম বল্ল, “দেখাব তােমাকে একদিন। কিন্তু দেখে মূচ্ছ যেয়াে না। তাতে শরীরের সবটা ভালাে করে ঢাকে না।” পেগী বল্ল, “না ঢাকে তত ভারি আসে যায়।” সােম বল্ল, “আমি আগুন পােহাচ্ছি এমন সময় তিনি এসে আমাদের কাছে একটি কবিতা পড়ে শােনালেন, কবিতাটি একটি খুবই অল্পবয়সী গরীবের মেয়ের লেখা, তার বাপ তার মা’কে কি তার মা তার বাপকে ছেড়ে গেছে আমার মনে নেই। কবিতাটি বাস্তবিকই প্রতিভার পরিচয় দিচ্ছিল। কিন্তু কবিতাটির চেয়ে আমাকে আকৃষ্ট করছিল কবিতার পাঠিকাটি স্বয়ং। তার চোখের চাউনি এ সংসারের নয়, তার গলার সুর অন্য জগতের। তিনি যখন তার টুপীটা খুলে এক পাশে রেখে দিলেন তখন দেখলুম তাঁর কেশ অবিন্যস্ত। তিনি যখন তাঁর কোট খুলে ফেল্লেন তখন দেখলুম তাঁর বেশ বিস্রস্ত / আমি বিস্মিত হচ্ছিলুম, কিন্তু সাহস করে ভাবতে পারছিলুম না যে তিনি হয় একটি জিনিয়াস নয় একটি পাগল। ও ঘর থেকে অন্যেরা চলে গেলে পরে তিনি আমার কাছে সরে এসে আগুন পােহাতে লাগলেন। বল্লেন, ‘আপনি ইংরেজী কবিতা পছন্দ করেন কি ? আমি বল্লুম, একশাে বার । বল্লেন, ‘আপনাদের Tagoreকে আমার ভালাে লাগে। আচ্ছা, Tagoreএর সঙ্গে আমার দেখা হয় না? বল্লম,হয় বৈ কি। যদি কখনাে ভারতবর্ষে যান। কিম্বা Tagore এদেশে কবে আসবেন সে খবর রাখেন। তিনি যে কেন Tagore এর সঙ্গে দেখা করতে ব্যর্থ আমি আন্দাজ করতে পারি নি। তিনি বল্লেন, “কেউ না বুঝুক Tagore নিশ্চয়ই ১৬৯ আগুন নিয়ে খেলা বুঝবেন। আমি ভগবানের খোঁজ পেয়েছি বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক উপায়ে। আমি বল্লম, ‘সে কী রকম? তখন তিনি কাগজ পেন্সিল নিয়ে chart এঁকে অতি প্রাঞ্জল করে’ বােঝাতে লাগলেন এ যুগের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। বল্লেন, ‘লিখে উঠতে পারছিনে। লিখে উঠলে আপনাকে পড়তে দেব, দেখবেন অতীব সরল। অথচ এই নিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে’ এত চিন্তা এত অন্বেষণ এত তর্ক এত রক্তপাত ! তারপরে সংবাদ পেলুম উনি কিছুদিন পাগলা গারদে ছিলেন, তার আগে তাঁর fiance মারা যা, তার আগে তার মা বা। কবি যশ তাঁর ভাগ্যে জুটেছিল, কিন্তু কাব্যে মন দিতে পারেন নি, একখানাও দর্শন বিজ্ঞানের বই না পড়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ভগবানকে আবিষ্কার করা চলেছে। সে দিন যখন তিনি বিদায় নিলেন লক্ষ্য করলুম তাঁর কাপড় খুলে পড়ছে, সে দিকে লক্ষ্য নেই।” পেগী বল্ল, “এমন ভােলা মানুষকে গারদ থেকে ছেড়ে দেওয়াই ওদের অন্যায় হয়েছিল।” সােম বল্ল, “তার কারণ গারদের লােক তাঁর উপয় অতিমাত্র প্রসন্ন ছিল। পাগলের মতাে তার স্বভাবে রাগ ছিল না, তিনি জিনিষ পত্র ভাঙতেন না, কথাবার্তা করতেন প্রকৃতিস্থ মানুষের মতে, তাঁর ভাব দেখে বােধ হত অতবড় যুক্তিশীল মানুষটার উপর সমাজ অবিচার করে’ পাগলত্ব আরােপ করেছে।” পেগী বল্ল, “সে কথা যা। তােমার সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধ কতদূর গড়াল'?” ১৭০ আগুন নিয়ে খেলা সােম বল্ল, “আমি দিন কয়েক বাস্তবিক ভেবেছিলুম তাঁর ভার নেব কি না। প্রেম পেলে ও দিলে তার পাগলামি সাবুত, তিনি আবার আগের মতাে কাব্য চর্চা করতেন, তাঁর chart খানা আমি পুড়িয়ে ফেতুম। কিন্তু দিন কয়েক পরে কী ঘটুল জান? তিনি তার উপর তলার ঘরের জানালা দিয়ে গলে পড়লেন নীচের বাগানে। তখন তাকে নিয়ে যাওয়া হল প্রথমে হাসপাতালে ও পরে পাগলা গারদে। কাজেই আমার প্রেমের হল অকালমৃত্যু। গভীর আঘাত পেলুম, কিন্তু তা বলে’ নিত্যকার চার্ট, করা বন্ধ রইল না।” পেগী বল্ল, “তুমি খুব বেঁচে গেছ। পাগলের সঙ্গে থেকে পাগল হয়ে যেতে। আগুন নিয়ে খেলা করতে নেই, সােম।” সােম বল্ল, “কিন্তু পেগ, প্রেম মাত্রেই আগুন নিয়ে খেলা। আগুন স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানলে দাঁড়াতে পারে যে কোনাে মানুষের জীবনে। ধন, মান, কুলমৰ্য্যাদা, পারিবাকি সামঞ্জস্য, জীবনের কাজ, সকলই সে পুড়িয়ে ছারখার করতে পারে। কিন্তু হাজার পুড়লেও যা সােনার মত ঝক্ঝক্ করে তা আমাদের আত্মা। কোনাে যুগে কোনাে দেশে কোনাে মানুষের প্রেম তার আত্মাকে ক্ষুদ্র করে নি, পেগ —হােক না কেন সে জিনিষ প্রেম নামের অযােগ্য পাশবিক কাম।” পেগী শান্ত ভাবে সােমের চোখে চোখ রাখল। দুই হাতে সে সােমের বুকের উপরকার বালিশটাকে জড়িয়েছে। তার সােনালী চুল তার শুভ্র মুখখানিকে সচিত্র করেছে। তার চোখের কোলে আনিদ্রার চিহ্ন। ১৭১
আগুন নিয়ে খেলা
তখন ভােরের প্রথম আলাে দেয়াল জোড়া কাচের জানালা দিয়ে
ঘরে ঢুকছে।
সােম পেগীর চুলগুলিকে হাত দিয়ে ব্রাশ করে দিল। পেগী চোখ
বুজে সােহাগ সহ কবুল। সােম হাত সরিয়ে নিলে আবার চোখ
মেল।
সােম হেসে বল্ল, “আর মায়া বাড়িয়ে কী হবে? তুমি আমার নও।
আমার কালকের সন্ধ্যার সব চাল বে-চাল হল, তুমিই জিৎলে। এসাে
আমরা জানালার কাছে বসে ভাের হওয়া দেখি।”
আলস্য ভাঙতে পেগীর খানিকক্ষণ লাগল। সে নৈশ পরিচ্ছদটাকে
সন্থত করে চুলের ক্লিপ, দুটোকে খুলে ও এঁটে চোখে আঙুল বুলতে
বুলতে জানালার কাছে গিয়ে দাড়াল, জানালার স্ক্রীন তুলে দিল এবং
জানালার কাচে বাতাসের পথ করে দিল।
সােম বল্ল, “বুকে মাথা রেখে ব্যথা ধরিয়ে দিয়েছ। বাইরে ব্যথা,
ভিতরে ব্যথা, যেন একটা অপরটার সিম্ব।”
পেগী কথা বল্ল না। আমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
তখনাে পূর্ব আকাশে রং ধরবার দেরি আছে। ছবি আঁকবার আগে
ছবিকার তার ক্যানভাসকে যেমন নিৰ্বর্ণ করেন আকাশের দেবতা
আকাশকে করেছেন তেমনি।
পেগী আমনে সােমের একটি হাতকে নিজের কোলের উপর অতি
ধীরে ধীরে টেনে নিল।
১৭২
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.