Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Galpa-benu Ed. 1
Front matter
No text on this page.
Withi|MlfIjWJk
ম
নৰ
“বসুমতী”র ভূতপূর্ব সহকারী সম্পাদক
লব্ধ-প্রতিষ্ঠ ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার
এm কির-৫
প্রাপ্তিস্থান
ইষ্টার্ণল
১৫, কলেজ কোয়ার
১০. কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ
মহালয়া, আশ্বিন
मन ७७ मान
চিত্রশিল্পী—শৈল চকবই
Printed & Published by G. B. Dey
at the Oriental Printing Works,
T8, Brindabun Bysack Street, Cal.
Engraved by N. Dey & Co.
150 & 1522, Manicktola St. Cal,
Y ཙའབ. ནས༌• • ས་ ཚitas; པ༌ནད་ ད་་༌་་་ ནུས་པ་༌༌པ་ལ་ཆ་ Tin- ས བs བ F.
অনুক্রম
| ০ ০ ০
১
২২
+ ০ ০
৫ ।
nt .
৪৫
কিয়রদেশের রাজকন্যা
আকৰ্য্য পালঙ্ক
ভীমের দর্পচুর্ণ
রকল্প গুলাে বর
ইলের পচুর্ণ
গােবি হাড়ী
রামচন্দ্র ও সারমেয়
০ ০ ০
৫ • •
•••
।
৫ ।
১৩২
W
}
এমন সময় শুনতে পেরেণকুমার অন্দরের বাগানে বেড়াচ্ছে,
এক রাজার তিন পুত্র। দুই পুত্রের বিয়ে হয়েছে। রাজা
ছােট ছেলের বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হবেন, কিন্তু বিয়েতে তার অমত
দেখে রাজার বড় দুঃখ।
কে যেন বলছে,-রাপুত্র, আমায়
বিয়ে কর।
কিরণে
রজন]
২
গল্পবেণু
হিরণকুমারের কানে কথাটা যেতেই এদিক ওদিক চেয়ে দেখলে,
কিন্তু কোথাও কাউকে দেখতে পেলে না। আবার ঐ কথা,-রাজপুত্র,
আমায় বিয়ে কর।
কথাটা কোত্থেকে আসছে জানবার জন্যে রাজপুত্র ওপর দিকে
চাইতেই দেখলে এক বানরী ডালে বসে আছে।
প্রথমে গ্রাহ্য না করে রাজপুত্র একমনেই চলেছে, বানরীটা তখন
গাছ থেকে নেমে হিরণকুমারের সামনে এসে ঐ কথা বলতে লাগল—
রাজপুত্র, আমায় বিয়ে কর !
বানরীকে দেখেই রাজপুত্রের আপাদমস্তক জ্বলে গেল। বললে,
দূর দূর এ আবার কি আপদ এসে জুটল !
আমি আপদ নই রাজপুত্র,--আমি তােমায় ভালবাসি, আমায়
বিয়ে কর !
কত বড় বড় রাজা আমার সঙ্গে তাদের সুন্দরী মেয়ের বিয়ে
দিতে সাধাসাধি করছে তাতে আমি রাজি নই, আর তুই একটা
বানরী তােকে বিয়ে করতে হবে ?
ভয় নেই আমার রূপের ছটা দেখে কেউ নিন্দে করবে না বরং
সুখ্যাতি করবে।
একটা সামান্য বানরীর মুখে এই সমস্ত অদ্ভুত কথা শুনে
হিরণকুমারের অন্তর কৌতূহলে ভরে গেল, বানরীর দিকে চেয়ে
বললে,-কেন বল দেখি?
আমার এই বানরী রূপ দেখছ বটে, আমি বানী নই।
৩
কিন্নরদেশের রাজকন্যা
তবে তুমি কে ?
আমি কিন্নর রাজকন্যা।
তুমি যে কিন্নর কন্যা তার প্রমাণ কি?
মূৰ্ত্তির মধ্য হতে এক অপূর্ব জ্যোতিঃ
আমার রূপ দেখে যদি পছন্দ হয়, আমায় বিয়ে করবে বল ?
পছন্দ হলে কেন করব না, নিশ্চয় বিয়ে করব।
সহসা সেই স্থান আলােকিত হয়ে উঠল। বিদ্যুৎ চমকালে
৪ গল্পবেণু যেমন একটা আলাের ছটা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি এক অসামান্যা সুন্দরীর মূৰ্ত্তির মধ্য হতে এক অপূর্ব জ্যোতিঃ বেরিয়ে আলােয় আলাে করে তুলল। রাজপুত্র বিমুগ্ধ নেত্রে সেই অতুলনীয় রূপসুধা পান ক'রে উন্মত্তবৎ হয়ে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সেই অলৌকিক সুন্দরীর রূপ বদলে গিয়ে কুৎসিত বানরী মূর্তিতে পরিণত হল। রাজপুত্র পাগলের মত হয়ে গেল, চিরজীবন অবিবাহিত থাবার পণ ভুলে গিয়ে বানরীকে উদ্দেশ করে বললে,—তুমি যক্ষ, রক্ষ, কিন্নর যেই হও না কেন, আজ অবধি তুমিই আমার সর্বস্ব,—তুমিই আমার জীবন-সঙ্গিনী! রাজপুত্র ! এত উতলা হােয়াে না! আমার দু-একটি সৰ্ত্ত আছে, যদি উহাতে সম্মত হও তবেই আমার সঙ্গে মিলন ঘটবে, নচেৎ আশা ত্যাগ কর ! বল, বল এমন কি কথা আছে। আমি তােমার সকল কথাই রাখব ! শুন রাজপুত্র ! আমাদের মিলনের পর সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি এই বানরী বেশে, তারপর সন্ধ্যার পর হ'তে সারা রজনী কিন্নরীর রূপ ধরে থাকব। এই সৰ্ত্তে যদি আমায় বিয়ে করতে রাজি ইও বল, নচেৎ আমি বিদায় হই। -না! আমি প্রতিজ্ঞা করছি, তােমার সৰ্তে আমি রাজি। এস, এই উদ্যানেই তােমায় গান্ধর্ব মতে বিয়ে করে অর্ধাঙ্গিনী করি।
কিন্নরদেশের রাজকন্যা ৫ এ বিয়েতে হিরণকুমারের বাড়ির কেহ সুখী নয়। রাজা-রাণী, ভাই-বন্ধু, সকলেই ভাবলে হিরণকুমারের মাথা বিকৃত হয়েছে। বিদ্বান্ ও বুদ্ধিমান হয়ে কেন সে এমন কাজ করলে, এর কারণ কেউ ভেবে ঠিক করতে পারলে না। করতে পারলে না। কি লজ্জা! কি, ঘৃণা! শেষে কি-না একটা বানরীকে বিয়ে করলে। রাজা তাকে ভায়েদের কাছ থেকে পৃথক করে রাজবাড়ির সংলগ্ন একটা মহলে তার থাকবার স্থান করে দিলেন, হিরণকুমার সেই মহলে বানরীকে নিয়ে রইল। একদিন দারুণ গ্রীষ্মের রাতে হিরণকুমার ঘরের জানলা খোলা রেখে শুয়ে আছে, বানরীও তার রূপ বদলে অপূৰ্ব্ব সাজে সজ্জিত হয়ে, অপূৰ্ব্ব রূপ লহরী বিকাশ করে শয়ান, এমন সময়ে রাজবাড়ির কক্ষ হ'তে বড় বৌয়ের সেই দিকে নজর পড়ল, দেখল, হিরণকুমারের ঘরের জানলার ফাঁক দিয়ে এক অপরূপ জ্যোতিঃ বেরুচ্ছে। জ্যোতিঃ দীপালােক হতে ভিন্ন রকম সন্দেহ হওয়ায়, বড় বৌ ধীরে ধীরে দেবরের গৃহের দিকে অগ্রসর হ’ল ;-দেখলে ঘুমন্ত দেবরের পাশে এক অলােকসামান্যা যুবতী ঘুমে অচেতন, সেই সুন্দরীর রূপে ঘর আলােকিত হয়ে জানলা হ'তে জ্যোতিঃ বিচ্ছুরিত হচ্ছে। বড় বৌ সেই অলৌকিক দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে, নিজের ঘরে এসে তার স্বামী বড় রাজকুমার এবং আর সকলকে দেখিয়ে এই সিদ্ধান্তে পরিণত হল যে, বানরী প্রকৃত বানরী নয়, ছদ্মবেশী অপ্সরী, কিন্নরী অথবা দেবকন্যা। হিরণকুমারের মস্তিষ্ক বিকৃত বলে মার কি ইচ্ছা নয় যে, অন্য জায়েদের মত বৌ হয়ে সেজে-গুজে গল্পবেণু সকলের যে ধারণা হয়েছিল, সে ধারণা তাদের মন থেকে একেবারে মুছে গেল। পরদিন প্রাতে বাড়ির মধ্যে ঐ নিয়ে হৈ চৈ পড়ে গেল। অন্যদিন বানরীকে দেখে বাড়িতে পরস্পরের মধ্যে প্রকাশ্যে না হােক অপ্রকাশ্যে কত ঠাট্টা, তামাসা, বিদ্রুপ হতে থাকত, কিন্তু সেই দিন থেকে সকলের মুখ একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। সকলে তাকে মহাসমে দেখতে লাগল, সেই সঙ্গে হিরণকুমারেরও মান বেড়ে গেল। যে ভায়েরা তাকে ঘৃণায় তফাৎ করে রেখেছিল, তারা আবার নিকটে টানতে আরম্ভ করলে। বানরীরও কপাল ফিরল, তার দুই ‘জা’ তার হাত ধরে কাছে বসিয়ে কত কি গল্প করতে লাগল। রাণীও আর চেপে থাকতে পারলেন না, বানরীর দু হাত ধরে বললেন,“দেখ বৌমা, তােমার যে বানরকুলে জন্ম নয় তা আমি বুঝেছি, আর গােপন করবার প্রয়ােজন নাই। তুমি মানুষ রূপ ধরে আমার ঘর উজ্জ্বল কর। তােমার ঘর আলাে করা রূপের ছটা দেখলে নয়ন মন সার্থক হয়, প্রাণ জুড়িয়ে যায়। তুমি বানরী বেশ ছাড়, মানবী বেশে ঘর আলাে করে আমাদের সকলকে সুখী কর। মা! আপনি যা বলছেন, সবই সত্য। রাজ-সংসারে এসে বানরী সাজে থাকি বলে আপনারা যে অসুখী তা আমি জানি। { থাকি। কিন্তু মা, তা আমার হবার যােটি নাই, আমি দিন-রাত বৌ সেজে থাকলেই, বিপদ মাথার শিওরে এসে দেখা দেবে, কিন্নরদেশের রাজকন্যা ৭ কখন যে বিপদ ঘটবে তার ঠিক ঠিকানা থাকবে না। তাই বলি মা, আমায় যদি এখানে রাখতে চান আমি যেমন আছি তেমনি থাকিলেই চল মা চল, পুষ্করিণীতে স্নান করে •••••• ভাল ; তবে যদি একান্তই বৌ সেজে থাকতে বলেন, আমাকে থাকতেই হবে, তবে অদৃষ্টে কি ঘটবে জানি না। তােমার অদৃষ্ট ভাল বলেই এ ঘরে এসেছ। তােমার মন ভােলান রূপ গােপন না করে যদি তুমি অন্য দু বৌয়ের মত সংসারের কাজ-কৰ্ম্ম গল্পবেণু নিয়ে থাক, তাহলে সব দিকেই ভাল হয়, তুমি ঐ বানরী বেশ ছাড় ভগবান তােমার ভালই করবেন। মা! আপনি যখন বলছেন, তখন আপনার কথা রাখতেই হবে। তবে একটা কথা বলে রাখি মা, যদি আমার এমন বিপদ ঘটে যাতে আমাকে ফিরে পাবার আশা না থাকে, সে ক্ষেত্রে আমাকে পেতে হলে আপনার ছেলেকে বলে দেবেন, তিনি যেন লােহার জুতাে পায়ে দিয়ে উত্তর দিকে সমান যান। যেখানে দেখবেন জুতাের তলা ক্ষয়ে গেছে, সেখানেই আমার দেখা পাবেন। এ কি অলুক্ষুণে কথা বলছো মা ! যা যা যেঠের বাছা, তুমি আমাদের ছেড়ে কোথা যাবে না ! চল মা চল, অনেক বেলা হয়েছে, পুষ্করিণীতে স্নান করে খেয়ে নেবে চল। রাণীর কথা শেষ হতে না হতেই, বানরী তার কদৰ্য্য রূপ পরিবর্তন করে এক অপূর্ব সুন্দরীর মূর্তি ধরলে। রাণী আপনভােলা হয়ে সেই অলৌকিক রূপসুধা পান করতে করতে বৌমার হাত ধরে পুকুরে স্নান করতে নামলেন। কিন্নরী একটি একটি করে সিড়ির ধাপে নামতে নামতে গলা জলে গিয়ে ডুব দিল। সেই যে ডুব দিল, আর উঠল না। রাণী প্রমাদ গণলেন। অনেক খোঁজাখুঁজি হ’ল ডুবুরি ডেকে পুকুর তােড়পাড় করা হ’লকিন্তু কিন্নরীকে পাওয়া গেল না। হিরণকুমার মাকে বললে,—মা, আর দুঃখ করলে কি হবে, যা হবার তা হয়েছে, ছােট বৌ কিছু বলে গেছে কি ?
কিন্নরদেশের রাজকন্যা
চোখের জল মুছে মা তখন বললেন,আর বাছা, যে কথা সে
বলে গেছে, সে কি তুই পারবি, সে বড় কঠিন কাজ ; সে কথা শুনে
কাজ নেই।
কি কঠিন কাজ মা, বলই না শুনি।
বৌমা বলে গেছে, তাকে পেতে হলে লােহার জুতাে পায়ে
দিয়ে উত্তরদিকে সােজাসুজি দুচোখ যেখানে যাবে সেই দিকে যেতে
যেতে যেতে যেখানে জুতাের তলা ক্ষয়ে যাবে সেইখানে
বৌমার দেখা পাবি। এই কটি কথা ছাড়া বৌমা আর কোন কথা
বলে যায় নি।
তবে মা, আশীৰ্বাদ কর, যেন সফল হয়ে ফিরে আসতে পারি।
তাই যা বাছা, অমন ঘর আলাে করা বৌ এমন করে চলে যাবে
স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। আশীৰ্বাদ করি তুই বৌমাকে নিয়ে
নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরে আয় !
হিরণকুমার লােহার জুতো পায়ে দিয়ে চলেছে, বিশ্রাম নাই।
অনেক পথ চলতে চলতে জুতোর তলা একেবারে ক্ষয়ে যাবার মত
হয়েছে। যখন একটু বাকি আছে, তখন এমন এক স্থানে এসে
পড়ল যেখানে আর পথ নাই,—সামনে বিশাল সমুদ্র, জল থৈ থৈ
করছে। এদিক ওদিক চাইতেই দেখলে, কিছু দূরে এক সন্ন্যাসী তার
দিকে চেয়ে মিটি মিটি হাসছেন। হিরণকুমার হাঁপাতে হাঁপাতে
সন্ন্যাসীর নিকট গিয়ে বললে,-সন্ন্যাসী ঠাকুর, এখানে কিন্নরীর বাস
কোথায় বলতে পারেন ?
চাই। গল্পবেণু কে, কিন্নরীকে তােমার কি প্রয়ােজন? কিন্নরী আমার স্ত্রী, তাকে আমি বিয়ে করেছি,—তাকে আমি সে আমায় বড় ভালবাসে, আমিও তাকে ভালবাসি, আমাদের দোষেই সে কঁকি দিয়ে চলে এসেছে, কিন্তু তার ভালবাসা ভুলতে পারিনি। মাকে বলে এসেছে,আপনার ছােট ছেলেকে লােহার জুতাে পায়ে দিয়ে উত্তর দিকে হাঁটতে বলবেন, যেখানে জুতাের তলা ক্ষয়ে যাবে, সেখানে আমার সঙ্গে দেখা হবে। ঠাকুর, এই দেখুন আমি লােহার জুতাে পায়ে দিয়ে এত পথ হেঁটে এসেছি, জুতাের তলা এত ক্ষয়ে গেছে যে, নাই বললেই হয়,যদি সামনে সমুদ্র না পড়ত তাহলে থামতাম না। এখন আর এগগাবার উপায় নাই, কিন্নরীকে কি করে পাব এখন সেই ভাবনাই হচ্ছে ; তাকে দেখবার জন্যে মন বড়ই কাতর হচ্ছে ; বলুন প্রভু বলুন! কি করে পাব বলুন। বলতে বলতে হিরণকুমার চীৎকার করে কেঁদে উঠল। 'সন্ন্যাসী, হিরণকুমারের কান্নায় ব্যথিত হয়ে বললেন, আমি তােমার অন্তর দিব্য চক্ষে দেখতে পাচ্ছি। রাজপুত্র হয়ে এত কঠোর পরিশ্রম করতে কখন দেখিনি,ধন্য তােমার ভালবাসা। এই ভালবাসার বলেই তুমি কিন্নরীকে পুনরায় লাভ করবে। এস বৎস এস! সুস্থ হও! কিছু জলযােগ কর। আমি তােমার সকল সাধ মেটাব। হিরণকুমার একটু সুস্থ হলে তাকে জলযােগ করিয়ে সন্ন্যাসী কানে মন্তর দিয়ে বললেন,—ঐ যে দূরে ভেড়ার পাল চরছে,
নিষেধ।
কিন্নরদেশের রাজকন্যা
১১
ঐ পালের ভেতর থেকে একটা ভেড়া ধরে নিয়ে আসবে এবং ভেড়াটার
গায়ের ছাল ছাড়িয়ে ঐ ছালের মধ্যে দেহটা মন্ত্র বলে ছােট ক'রে
ঢুকে পড়বে, তারপর কি করতে হবে সব উপদেশ দিয়ে হিরণকুমারকে
বিদায় দিলেন।
ঠাকুর, এখানে কিন্নরীর বাস কোথায় ?••••••
হিরণকুমার সন্ন্যাসীর কথা মত একটা ভেড়াকে ধরে, তার গায়ের
ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে তার মধ্যে মন্তরে শরীর ছােট করে ঢুকে মাটিতে
পড়ে রইল। আর অমনি একটা ঈগল পাখী সেটাকে ছোঁ মেরে
শুন্যে তুলে নিয়ে গিয়ে একটা পুকুর পাড়ে ফেলে দিল। হিরণকুমার
.
গল্পবেণু মাটিতে পড়তেই সন্ন্যাসীর উপদেশ মত ছালের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ে নিজের আকার ধরলে, পাখীটা তাকে দেখেই ভয়ে পালিয়ে গেল। হিরণকুমার ভেড়ার ছালের ভেতর থেকে বেরিয়ে দেখলে, কিন্নরী পুষ্করিণী থেকে উঠে, কক্ষে জলের কলসী নিয়ে ধীর ও মন্থর গতিতে চলেছে। হিরণকুমারকে দেখেই কিন্নরীর পা আর সরল না। অবাক্ বিমুগ্ধনেত্রে রাজকুমারকে দেখে আশ্চর্য হয়ে বললে, তুমি এখানে ! কে তােমায় আনলে ? কোন সাহসে এলে ? পালাও ! পালাও ! বাবা দেখতে পেলে মেরে ফেলবেন! পালাও বলছি পালাও। রাজকন্যে ! তুমি আমায় ছেড়ে পালিয়ে আসবে তা স্বপ্নেও ভাবিনি! তােমার সঙ্গে যে আবার দেখা হবে তাও যেন স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে! ভগবান যখন আমাদের উভয়ের মিলন করে দিয়েছেন, তখন আমার প্রাণ থাক্ আর যা তাতে দুঃখ নাই, তুমি ভাল থাকলেই আমার সুখ। রাজকুমার! আমায় বিয়ে করে অবধি একদিনের জন্যে তুমি সুখী হতে পারনি। তার ওপর যে অপমান সহ্য করেছ বলবার নয়! বলব কি, নিজের প্রাণকে তুচ্ছ করে আমার বাড়ি পৰ্য্যন্ত ছুটে এসেছ ! তবু তােমায় আমি সুখী করতে পারছি না, পাছে বাবা তােমায় প্রাণে মারেন! মাকে তোমার কথা : আগেই বলেছি। মা, তােমায় দেখলে সুখী হবেন, সেই এক ভরসা! চল আমার বাড়ি চল,বলে স্বামীর হাত ধরে বাড়ির মধ্যে মার কাছে নিয়ে গেল।
কিন্নরদেশের রাজকন্যা মা বললেন,-বাবা, এসেছ ভালই করেছ। এস বাবা—বস। পরে মেয়েকে জলখাবার আনতে বলে হিরণকুমারকে বললেন,-দেখ বাবা! তােমায় যে কথাগুলাে বলবাে, তাতে ভয় পেয়াে না। আমাদের কোন পুরুষে কেউ কখন মানুষকে বিয়ে করে নি, এই আমার মেয়েই যা করেছে। আমার মেয়ে যখন এ কাজটা করে ফেলেছে, তখন তুমি পর নও, বিশেষ আপনার। তবে তােমার শ্বশুর চিরকালটা মানুষের ওপর চটা, তার সামনে তােমায় বার করতে ভয় হয়, পাছে তােমার কোন অনিষ্ট করে বসেন, তাই তােমায় দু-চার দিন লুকিয়ে রাখা হবে, এজন্যে দুঃখ কর না বাবা ? নামা, এ আর রাগের কথা কি! আপনার মেয়ে আমায় বড় ভালবাসে বলেই তার সন্ধানে এতদূর এসেছি, এখন যদি এ প্রাণ যায়, তাতে দুঃখ নাই। উভয়ের নানা কথার মধ্যে কিন্নরী এসে দেখা দিল। হাতে তার নানাবিধ মিষ্টান্ন ও ফল-মূলের থালা। কিন্নরীর মাতা, হিরণকুমারকে উদ্দেশ করে বললে,-যাও বাবা ও-ঘরে যাও; অনেক কষ্ট পেয়ে এখানে এসেছ, আহারাদি করে সকাল সকাল শুয়ে পড়। হিরণকুমার আহার করে শুয়েছে, এমন সময় কিন্নরীর পিতা বাড়িতে প্রবেশ করলে। কিন্নরীর মাতা সুযােগ বুঝে স্বামীকে বললে-দেখ তােমার সঙ্গে একটা কথা আছে, যদি তুমি কিছু না মনে কর ত বলি। কি বলবে না বলবে, তা না জেনে একেবারে সত্যি করতে পারব
তবে মেয়েটা
১৪
গল্পবেণু
। তােমার কথা যদি মনের মত হয় ত কিছু মনে করব না, যদি না
হয় খুব মনে করব !
কথাটা ভাল।
তবে তুমি যদি উল্টো ভেবে নাও, তবেই গােল।
কথাটা অপর কারও নয় তােমারই মেয়ের।
মেয়ের কি হয়েছে, খাচ্ছে দাচ্ছে খেলে বেড়াচ্ছে তার এমন
কি কথা আছে, কিছুই ত বুঝতে পারছিনি।
বড় হয়েছে, এই যা কথা,-এ কথা ছাড়া আর ত কিছু ভেবে
পাই নি।
ঐ কথাই বটে, মেয়ের বিয়ের কথাই বটে।
তুমি কি মনে কর, আমি নিশ্চিন্ত হয়ে বসে আছি, তা নয়,
কত যে ছেলের সন্ধান করছি তা বলবার নয়, ভাল ছেলে পেলেই
বিয়ের সম্বন্ধ করে ফেলব।
তােমার পায়ে পড়ি রাগ করো না, হতভাগী মেয়েটা একজনকে
বিয়ে করে ফেলেছে।
কাকে ?
এক রাজপুত্তরকে।
সব মাটি করেছে। আমার মুখ দেখান ভার হবে। অমন
কাজ কেন করলে ?
রাজপুত্রের রূপে মুগ্ধ হয়ে।
বল কি ? মানুষ এত রূপবান হয় তা আমি জানতাম না।
তুমি নিজের চোখে দেখেছ না মেয়ের মুখে শুনে বলছ?
কিন্নরদেশের রাজকন্যা
শুনে বলিনি দেখেই বলছি। রূপ ত নয়, যেন স্বর্গের চাদ
মাটিতে খসে পড়েছে।
তা যতই রূপ থাক মানুষ ত বটে ! আমাদের জাতের ছেলে
ত নয় !
তা নাই বা হ’ল, আমাদের সঙ্গে খাপ খেলেই হল।
দু’জনে পায়রা হয়ে উড়ে যাচ্ছে-কিন্নররাজ বাজপাখী হয়ে
তা আমি শুনতে চাই নে,-জামাই হােল্ক আর যেই হােল্ক, আমি
ওকে নিকে করে তবে ছাড়ব !
তােমার পায়ে পড়ি অমন কাজ করাে না,-মেয়ের সর্বনাশ
করাে না।
গবেণু
করব না ত কি! আমাদের না জানিয়ে হতভাগী অমন কাজ
করে কেন ?
এ দোষ মেয়ের,-মেয়েকে যা ইচ্ছে তাই কর ; নির্দোষীকে
নিয়ে টানাটানি কেন? জামাই ত কোন দোষ করেনি।
মেয়েটা ত পালিয়ে এসেছিল, জামাইটা আবার গায়ে পড়ে
এল কেন ?
সেও মেয়ের ইচ্ছেয়। যখন দুজনারই এত ভাব ভালবাসা,
তখন বাপ-মায়ের উচিত নয় কি ওদের সুখে সুখী হওয়া।
তা ঠিক। তবে তােমার যখন ওদের ওপর খুব টান পড়েছে,
তখন একটা পরীক্ষা না করে জামাইকে ছাড়ব না।
তুমি স্বচ্ছন্দে পরীক্ষা করে দেখতে পার, কিন্তু খামকা মারবার
ফন্দী কর না, এই আমার ভিক্ষা ।
আচ্ছা তাই, পরীক্ষা সম্বন্ধে তােমাকে যা বলতে বলব ঠিক যেন
বলা হয়, এদিক-ওদিক হলেই টেরটি পাইয়ে দোব,-বুঝলে !
;
হিরণকুমার সমুদ্রের ধার দিয়ে চলেছে,চলতে চলতে গলদঘর্ম
হয়ে গেছে, দম্ বেরিয়ে যাবার মতন হয়েছে। এমন সময় এক
আশ্রমে সন্ন্যাসীর দেখা পেলে। সন্ন্যাসীকে দেখেই হিরণকুমার
পাগলের মত ছুটে গিয়ে তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ল। সন্ন্যাসী দয়ার্স
হয়ে তাকে দুহাতে তুলে ধরে বললেন,—এ. সুন্দর রূপ নিয়ে, এ
দুর্গম পথে কোথায় চলেছ,-কেনই বা চলেছ ?
তা মে, কিন্নরদেশের রাজকন্যা যাতে হিরণকুমার একে একে তার জীবনের সকল কথা,-- হতে আজ পর্যন্ত সকল কথা সন্ন্যাসীকে বললে। সন্ন্যাসী শুনে বললেন, দেখ রাজকুমার, তােমার শ্বশুর কিন্নররাজ তােমায় যে পরীক্ষায় ফেলেছে, সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বড় কঠিন। স্বয়ং কিম্নররাজ এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে কি না সন্দেহ, তুমি ত সামান্য মানুষ। তাই বলি ঘরে ফিরে যাও,-- কিন্নরীর আশা ত্যাগ কর। কেননা তােমায় যেখানে পাঠিয়েছে, সেখানে যেতে হলে, প্রথমে এই মহান সমুদ্র পার হতে হবে । তারপর যে ঢাকটা বাজাবার কথা বলেছে সে ঢাক বাজান বড় সহজ নয়। কারণ সেই ঢাক যাতে না কেউ বাজাতে পারে এজন্যে হাজার হাজার রাক্ষস সেই ঢাককে আগলে বসে আছে। শুধু ঢাক বাজালেই যে নিস্তার পাবে তা নয়, সেই ঢাকের সঙ্গে এক কাস্তে আছে, সেই কাস্তেখানা দিয়ে ঘাস ছুলে, সেই ঘাসে সাপ জড়িয়ে কিন্নররাজকে দিলে তবে তােমার পরীক্ষা শেষ হবে। এ পরীক্ষা বড় সােজা নয়, ভয়ানক পরীক্ষা। কথাটা কি জান, তােমায় মেয়ে দেবে না বলেই এই ফন্দি খাটিয়েছে, তা তুমি বুঝতে পারছ ত ! তা ত পারছি। ঠাকুর ! আমায় বল দিন। আপনি যােগী পুরুষ, আপনার শক্তি অসীম। আপনি মনে করলেই এ অধমকে উদ্ধার করতে পারেন, এ আমার বিশ্বাস আছে। হিরণকুমারের কাতরতায় মুগ্ধ হয়ে সন্ন্যাসী ঠাকুর বললেন, দেখ কুমার, এই যে মন্ত্র তােমায় দিচ্ছি, এই মন্ত্র উচ্চারণ করলেই
দারবে।
করব না ত
গল্পবেণু
করে কেন ?
<চ্ছামত যে কোন ‘রূপ ধারণ করে মানুষের মত কথা কইতে
এখন তােমায় যা বলি তা শুন। তুমি চিলের আকার ধরে
সমুদ্র পার হয়ে গেলেই রাক্ষস-বেষ্টিত ঢাক দেখতে পাবে। রাক্ষসদের
দেখে ভয় পেয়াে না। তুমি উড়ে গিয়ে ঢাকের ওপরে যে কাঠি আছে
সেই কাঠি ঠোটে করে নিয়ে, ঢাকটা বাজাবে। বাজিয়ে কাঠিটা ফেলে
দেবে। তারপর ঢাকের গা থেকে কাস্তেখানা নিয়ে ঘাস ছুলে তাইতে
একটা সাপ জড়িয়ে নিয়েই সাঁ করে উড়ে এসে তােমার শ্বশুর
কিন্নররাজকে দেবে।
সন্ন্যাসীর কৃপায় হিরণকুমার চিল হয়ে সমুদ্রের ওপারে উড়ে
গেল; ঢাক বাজালে, কাস্তে নিয়ে ঘাস ছুলে সেই ঘাস দিয়ে সাপ
জড়িয়ে কিরাজের সামনে উপস্থিত হল। কিন্নররাজ এই অসম
সাহসিক কাৰ্য্য দেখে থর থর করে কাপতে লাগল।
বললে,-হাঁ, তােমায় আমি মেয়ে দোব। বলাও যা, কাজেও তাই,
করলে। মেয়েকে ডেকে হিরণকুমারের হাতে সঁপে দিলে। উভয়ে
পরমানন্দে বাসর ঘরে গেল।
কিন্নররাজ ভয়ে ভয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়ে, পত্নীকে ডেকে বললে,
দেখ, তুমি যাই বল, ও জামাইকে বাঁচিয়ে রাখা হবে না।
পী শিউরে উঠে বললে,-কেন গাে। আবার কি হ'ল।
জামাই তােমার কি করলে?
কি করলে, আবার জিজ্ঞেস করছ, জামায়ের কা কারখানা
দেখে এখনও নিশ্চিন্ত রয়েছ।
কিন্নরদেশের রাজকন্যা
কেন কি হয়েছে, জামাই এমন কি খারাপ কাজ করেছে, যাতে
আমাদের প্রাণের ভয় আছে ?
আছে বৈ কি-না থাকলে বলব কেন ?
কেন বল দেখি? আমি কিছুই ভেবে ঠিক করতে পারছিনে।
আমি ওকে যে পরীক্ষায় ফেলেছিলাম, সে পরীক্ষা বড় সােজা
নয়, তা একবার ভেবে দেখেছ কি? আমি একজন কিন্নরকুলের
রাজা, আমাকে যদি কেউ ও কাজ করতে বলে, আমার সাহস হয় না,
আর ও করে ফেললে। তাইতে বুঝে নাও, ও মনে করলে আমাদের
দফা রফা করতে পারে।
অমন কথা বল না, ও এখন আমাদের জামাই, কত আপনার
লােক, কেন অনিষ্ট করবে ?
কি করবে না করবে তা কি বলা যায়। এই ত আমি বার বার
জামাইকে রাগ করে কত কথাই বলেছি, কত গাল-মন্দ করেছি, কত
বিপক্ষে লেগেছি, তা কি জামাই দেখছে না ! শেষে এমন পরী
ফেলেছি, তাতে ও যে রাক্ষসের মুখ থেকে ফিরে আসবে সে সম্ভাবনা
একেবারেই ছিল না। যখন ফিরে এসেছে তখন আমার ঐ সব কথা
মনে করে যদি শােধ তােলে, আমরা তখন কোথায় যাব ? সে কথা
কি একবার ভেবেছ ?
তাও কি কখন হয়? তবে মেয়েটার বড় কষ্ট হবে, হয়ত বা
আত্মহত্যা করে বসবে।
আত্মহত্যা করতে যাবে কেন ? দু-চার দিন কিছু কষ্ট হবে,
- '। ২০ গল্পবেণু তারপর একটা কিন্নরকে ধরে বিয়ে দিলেই সব দুঃখই ঘুচে যাবে। দেখ মানুষ জাতটা বড় ভাল বলে মনে কর না, বাগে পেলে আমাদের ঠিক নিকেস্ করবে। তা আমার ভাল রকম জানা আছে। তাই না কি! তবে আর কি বলব ! তােমার যা ইচ্ছে তাই কর, আমি আর কথা কব না ! যে সময়ে কিন্নররাজ ও তৎপত্নী দুজনের মধ্যে এই সব কথা হচ্ছিল, সেই সময়ে কিন্নরী দরজার আড়ালে পঁড়িয়ে সব কথা শুনছিল। যখন দেখলে তার মা-বাপ দুজনেই তাদের জামাইকে মারবার জন্যে একমত হয়েছে, তখন কিন্নরী স্বামীকে বাঁচাবার জন্যে ছুটে হিরণকুমারের কাছে উপস্থিত হ’ল, এবং সংক্ষেপে সব কথা বলে দুজনে পায়রা হয়ে বাড়ি ছেড়ে উড়ে গেল। এদিকে কিন্নররাজ জামাইকে বধ করতে এসে, ঘরের মধ্যে কন্যা ও হিরণকুমারকে দেখতে না পেয়ে এদিক ওদিক চাইতেই দেখলে, তারা দুজনে পায়রা হয়ে সাঁ সাঁ করে উড়ে যাচ্ছে। কিন্নররাজ অমনি বাজপাখী হয়ে পিছু নিলে। কিন্নরী বাপকে বাজপাখী হয়ে তাদের পিছনে আসতে দেখেই প্রাণ ভয়ে তারা.কখন চিল, কখন শকুনি, কখন ভেড়া, ছাগল, এইরূপ নানাজন্তুর আকার ধরে পালাতে লাগল। কিন্নররাজও কখন সিংহ, কখন ব্যাঘ, কখন ভাল্লুক, এই রকম নানা : আকার ধরে তাদের পিছু নিলে। তারা দুজনে প্রাণ ভয়ে এত জোরে দৌড়াতে লাগল যে, কিন্নররাজ তাদের কিছুতেই ধরতে পারে। শেষে তারা হিরণকুমারের রাজ্যে উপস্থিত হয়ে, রাজবাড়ির উদ্যানের কিন্নরদেশের রাজকন্যা ২১ নতুন গাছের দুটি ফল হয়ে বাগানের মালির সামনে পড়ল। মালি, নতুন গাছের ফল দেখে বড় রাজকুমারের নিকট নিয়ে গিয়ে বললে, বড়কুমার, বাগানের নতুন গাছের নতুন ফল এই প্রথম পেলাম, আপনি খেয়ে তারিফ করবেন। বড় রাজকুমার ফল দুটি হাতে করে ভারি খুশি হয়ে দেখছেন, এমন সময় কিন্নররাজ এক সাধুর বেশ ধরে, বড় রাজকুমারকে আশীর্বাদ করে বললে, রাজকুমার জয় হােক! ও ফল দুটি সাধু সেবায় দিন, মহা পুণ্য হবে ! অক্ষয় স্বর্গলাভ হবে ! ঠাকুর, এ নতুন গাছের নতুন ফল মালি আমায় খেতে দিয়েছে, এ ফল বাবাকে না দেখিয়ে কাকেও দেওয়া হবে না। এই বলে মালিকে অন্য ফল দিতে আদেশ করলে। মালি বড় রাজকুমারের আজ্ঞায় হরেক রকম সুস্বাদু ফল সাধুকে দিতে গেল। সাধুবেশধারী কিন্নররাজ তা গ্রহণ না করে, ঐ ফল দুটি নেবার জন্যে মহা জিদ ধরলে, কিন্তু বড় রাজকুমারের দিতে মন সরল না। সাধুকে বিমুখ হয়ে ফিরে যেতে দেখে, বড় রাজকুমার যেমন ফল দুটি সাধুকে দিতে হাত বাড়ালে, অমনি ফল দুটি সরষের আকার ধরে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল। পড়বামাত্রই সাধু পায়রা হয়ে যেমন সরষে খুঁটে খেতে যাবে, অমনি কনিষ্ঠ রাজপুত্র মানুষ হয়ে তাকে ধরে খাঁচায় পুরে ফেললে।
আশ্রয়
পালং
ন
এক ছুতাের, তারা তিন ভাই। দু-ভাই ছুতােরের কাজ করে,
আর ছােট ভাই ছুতােরের কাজ জেনেও কিছু করে না, খায় দায়
আর সাধু-সন্ন্যাসীর কাছে ঘুরে বেড়ায়। ভায়েরা কাজের জন্যে কত
সাধাসাধি করে, ছােট ভাই তা শােনে না, পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়।
একদিন দু-ভায়ের অসহ্য বােধ হওয়ায় ছােট ভাইকে বললে,
দে হরিহর, কাজ না করলে খাবি কি ? আমরা তােকে বসিয়ে
বসিয়ে আর খাওয়াতে পারব না,-কাজ-কৰ্ম্ম করিস্ ত খেতে পাবি,
নইলে বাড়ি থেকে দূর হয়ে যা!
হরিহর সােজা কথায় বললে,-আচ্ছা বেশ তাই হবে, আমাকে
যন্ত্রপাতি দাও।
দু-ভাই যন্ত্রের বাক্স হরিহরের সামনে ধরে বললে,-কি
নিৰি নে।
হরিহর দরকার মত গুটিকত যন্ত্র নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
আশ্চৰ্য পালঙ্ক খানিকদূর যেতেই সে এক মাঠে এসে পড়ল। মাঝামাঝি এসে দেখলে এক বৃদ্ধ মাঠ দিয়ে চলেছে। হরিহর পথ হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বৃদ্ধকে দেখে বললে,-আপনার নাক কোথা মশাই ? বৃদ্ধ খুব রেগে গিয়ে বললে, -তুমি অন্ধ ? দেখতে পাচ্ছ না! এই মুখের ওপর এত বড় একটা নাক উচু হয়ে রয়েছে। চোখের মাথা খেয়েছ না কি! বলে কিনা নাক কোথা ? বেকুব কোথাকার! বৃদ্ধ গাল মন্দ দিতে দিতে চলে গেল। হরিহর একটা কথাও বললে না, একটু হেসে অন্য দিকে চলে গেল। খানিক দূর যেতে যেতে সে দেখলে এক কিশােরী কলসী কাকে ক'রে যাচ্ছে। হরিহর কিশােরীর সামনে গিয়ে বললে,- হা গা তােমার নাক কোথা গা ? মেয়েটি হরিহরের মুখের দিকে চেয়ে আঙল বাড়িয়ে বললে, ঐ যে চালা ঘর দেখা যাচ্ছে ঐটে। বটে! তবে আমি গিয়ে বসতে পারি ? নিশ্চয়! সকলের বসবার জন্যই ত ঐ ঘর, বাড়ির বাইরে করা হয়েছে। হরিহর আর কোন কথা না ক'য়ে পা চালিয়ে সেই ঘরে গিয়ে বসে পড়ল। মেয়েটি জল নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকতেই পিছু পিছু তার বাপ এসে উপস্থিত হল। বললে,—বাবা! একটি বিদেশীকে বৈঠক- .
২৪
গল্পবেণু
খানায় বসতে বলেছি, আপনি একবার দেখুন যাতে তিনি চলে না যান,
—আমি কিছু জলখাবার তৈরী করি ।
পিতা বৈঠকখানায় গিয়ে দেখে নাক কোথা জিজ্ঞাসা করাতে
যে ছােকরাকে যা তা শুনিয়ে দিয়েছে সে-ই বৈঠকখানায় বসে আছে,
আর মেয়ে কিনা তার জলখাবারের বন্দোবস্ত করছে। এই সব দেখে
বুড়াে ভারি চটে গেল, বাড়ির ভেতর ঢুকে মেয়েকে বললে,-সুদি, তুই
কাকে বাড়ি ঢুকিয়েছিস্?
কেন বাবা, আপনি ওকে চেনেন না কি ?
চেনাচিনি কি আছে। সবাই কি সবাইকে চেনে, কথাবার্তায়
ধরা পড়ে যায়,লােকটার মাথার ছিট আছে।
আপনাকে এমন কি কথা বলেছে যাতে পাগল বলে ঠাওরেছেন ?
পাগল বলে পাগল ! ছােকরা আমায় দেখে বলে কি না
আপনার নাক কোথা ?
আমি তেমনি দুশাে কথা শুনিয়ে দিয়েছি। ছােকরার মুখে আর
কথা নাই,—মুখের মতন উত্তর পেয়ে মুখ বুজে চলে গেল।
বাবা, উনি ঠিকই জিজ্ঞেস্ করেছেন। আপনি কথার অর্থটা
বুঝতে না পেরে মিছিমিছি গালাগালি করেছেন।
কেন শুনি?
আমি দত্তদের পুকুর থেকে জল আনছিলাম, পথের মাঝে দেখি
বিদেশী তৃষ্ণায় কাতর হয়ে আমাকেও ঐ কথা জিজ্ঞেস্ করেছিলেন,
-তােমার নাক কোথা ?
আশ্চর্য পালঙ্ক
আমি তখুনি বুঝে নিয়ে বৈঠকখানা ঘর দেখিয়ে দিয়ে বসতে
বললাম। বিদেশী লােককে ঘরে বসতে দিয়ে খাবার না খাইয়ে কি
ছাড়া যায়।
আপনার নাক কোথা, মশাই ?
নাক মানে যে বৈঠকখানা ঘর, তা কি করে বুঝলি মা?
লােকে এই কথা বলে থাকে বলেই জানি।
তুই ঘরে বসে এত কথা কি করে জানলি মা ? শুনলিই বা
?
গল্পবেণু
কার কাছে? ছছাকরাটি বেশ ভদ্দর, আমি এত গালাগালি করলাম সে
কিন্তু একটা কথাও বললে না, বেশ সরল মনে চলে গেল। দেখতে
যেমন শিবতুল্য, মনটাও ঠিক শিবের মতন সাদা, দেখলে মায়া হয়।
তাছাড়া, আমার মানে হচ্ছে বাবা, ও জাতে ছুতাের।
কি করে জানলি ?
ওর কাছে রে দা, বাটালি, করাত আরও কত কি যন্ত্র দেখে।
তা আছে বটে। ও যাই হােক না কেন, ওর খোজ খবরে
তাের এত দরকার কি
এতে মেয়েটি লজ্জায় নত হ’ল। এতখানি আগ্রহ দেখান
ঠিক হয় নি। মুখ নত করেই বললে, “আমি ওঁকে বিয়ে করব।
কেমনতর মেয়ে তুই। ঘর, বাড়ি, জাত, কুল, কিছুই জানা নেই,
শুনা নেই, অমনি চোখের দেখা দেখেই বিয়ে করতে মত করলি,
এ কথা শুনলে লােকে বলবে কি ?
যে যাই বলুক বাবা, আমি ওকেই বিয়ে করব ।
ততার ওপর ত কখন কথা কই নি,—বিয়ে করবি কর, তবে
জাত, কুল জানা ত দরকার।
তা জানবার দরকার নাই বাবা, আমি সবই জেনেছি, আমাদের
স্বঘর, গৃহস্থ ভদ্রসন্তান। আমার কথা বিশ্বাস না হয় ওঁকে জিজ্ঞেস্
করে দেখতে পারেন। এই জলখাবার নিয়ে যান,জল খাইয়ে ঠাণ্ডা
করে পরে পরিচয় নেবেন।
পিতার হস্তে সুন্দরী, জল খাবারের থালাখানি দিলে ।
আশ্চর্য পালঙ্ক
২৭
বৃদ্ধ খাবারের থালা নিয়ে হরিহরের নিকটে গেল।
যত্ন করে জলখাবার খাওয়ালে। তারপর এটা ওটা কথার পর, তার
পরিচয় নিয়ে জানলে, হরিহর তার স্বঘর জাতে ছুতাের।
হরিহরের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করে, বুড়াে এতদূর তুষ্ট
হয়েছিল যে, হরিহর যখন বুড়াের কাছে বিদায় নিয়ে যেতে চাইলে,
তখন বুড়াের দুচোখ জলে ভরে গেল, দুহাত ধরে বললে,“দেখ বাবা?
তােমায় আমি ছাড়ছিনে, তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করে ঘর-কন্না
কর,—দেখে সুখী হই।
হরিহর খানিক কি ভাবলে, পরে বললে,—আমায় মেয়ে দিয়ে
কি লাভ হবে। আমি গতরে কুঁড়ে, ভােজনে দেড়ে, খেটে-খুটে যে
আপনার মেয়েকে খাওয়াব, তা আমি পারব না,--আমাকে জামাই
করে আপনার লাভ কি ?
এমন যদি হয় তবে নাচার। আমার এমন অবস্থা নয় যে, মেয়ে
জামাই দুজনকে পুষি। আমার যে দুই ছেলে আছে, তারাও কাচ্ছা-
বাচ্ছা নিয়ে ব্যস্ত ! কি করি তা ভেবে ঠিক করতে পারছি নি। তবে
তােমার সঙ্গে বিয়ে হলে মেয়ে আমার বড়ই সুখী হ'ত।
ভাবনার কথাই ত, কিন্তু কি করব বলুন। আমি ভেবে রেখেছি
এ জীবনে বিয়ে করব না। আপনি আপনার মেয়েকে এই কথা
বললেই সে বুঝে নেবে।
এই বলে সে অন্যমনস্ক হয়ে কি ভাবতে লাগল।
সুন্দরী, উভয়ের কথা-বার্তা আড়ি পেতে শুনছিল। সে ঠিক
২ গল্পবেণু ভেবে নিয়েছিল যে, তার বাপ যেরূপ কুৎসিত, সে কুৎসিত লােকের মেয়ে কখনই সুন্দর হতে পারে না, তাই বিয়েতে বােধ হয় অমত করছেন। যদি সে যুবককে তার রূপের আভাষ দিতে পারে, তা হলে যুবক যে বিয়েতে সম্মতি না দিয়ে থাকতে পারেন না এটা স্থির। আর যদি তিনি নাও কাজ কর্ম কৱেন, আমার ত গতর আছে, আমি ধান ভেনে, চাল কেঁড়ে যা করে তােক দুজনের পেট ভরাতে পারব। তার পর সুন্দরী একটা মতলব ঠিক করে নিলে। বাড়ির পেছনের খিড়কির পুকুর থেকে একটা পদ্মফুল ছিড়ে নিয়ে এল। সেই পদ্ম- ফুলের ডাটা একটা পাশের হাঁড়িতে পুঁতে বাপকে বললে,-বাবা এই ঘড়িটা অতিথিকে একবার দেখান ত। বৃদ্ধ এ হেঁয়ালির অর্থ বুঝতে না পেরে, মেয়ের কথামত হরিহরের কাছে ঐ হাঁড়িটা নিয়ে গিয়ে বললে,—আমার মেয়ে সুন্দরী, তােমায়। এইটি দিয়েছে। হরিহর ছাইয়ের হাঁড়িতে পদ্মফুল দেখে সুন্দরীর বুদ্ধির প্রশংসা করলে, বুঝলে সে সঙ্কেতে জানিয়েছে যে, ছায়ের গাদাতেও পদ্মফুল ফোটে, এতে বুড়াের মেয়ে যে খুব সুন্দরী তাতে কোন সন্দেহ ভেবে বললে,—আমি আপনার মেয়েকে এই সৰ্তে বিয়ে করতে পারি যদি সে আমায় বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ায়। বুড়াে গিয়ে মেয়েকে ঐ কথা বলে নিজের দুর্দশার কথা কয়ে বললে,“দেখ, একে ত আমাদের টানাটানির সংসার, এ অচল সংসারে খরচ বাড়লে কেমন করে চলবে মা, তুই বল ! এর ওপর দুটী কাচ্চা বাচ্চা হলে ত আর রক্ষা নাই! বিয়ে কি করে হয় । নাই।
আশ্চর্য পালঙ্ক
১৯
সে ভাবনা আপনাকে ভাবতে হবে না বাবা, পুরুষ -
কখনই নিষ্কৰ্ম্মা থাকতে পাবেন না । কি, ভগ যদি এই
t
বাবা, এই হাঁড়িটা অতিথিকে একবার দেখান ত ?
তখন আমি ধান ভেনে, চাল কেঁড়ে যা করে হােক খেটে নিজেদের
খাওয়া-পরা চালাব।
গল্পবেণু বেশ মা, তবে এ শুভ কাজে বিলম্বে কাজ কি, আজই যাতে বিয়েটা হয়ে যায় তার ঠিক করে ফেলিগে। বুড়াে, হরিহরের কাছে সব কথা জানালে এবং সেইদিনই শুভলগ্নে সকলের উপস্থিতিতে বুড়াে, সুন্দরী ও হরিহরের বিবাহ দিলে। সেই অবধি হরিহর বুডাের বাড়িতে রয়ে গেল। প্রথম প্রথম হরিহরের আদর-যত্ন দেখে কে ? পরে যত দিন যেতে লাগল আদর-যত্ন এমন কি খাওয়া-পরা সম্বন্ধে নানা গােল হতে লাগল। হরিহর নীরবে সব সহ্য করলেও সম্বন্ধীরা নানা ছলে নানা টিটকারি দিতে দিতে একদিন সত্য সত্যই ভগ্নী ও ভগ্নীপতিকে পৃথক করে দিলে। সেই অবধি সুন্দরী পাড়া প্রতিবেশীর ধান ভেনে, চাল কেঁড়ে, কষ্টে সৃষ্টে দিন কাটাতে লাগল। খেটে খেটে সুন্দরীর তেমন সুন্দর চেহারা কালীবর্ণ হয়ে গেল,কেবল হাড় কখানা সার হ’লকিন্তু একদিনের জন্যও কিন্তু একদিনের জন্যও স্বামীকে সে দুঃখ জানায় নি, মনের দুঃখ মনেই চেপে স্বামীর সেবায় রত থাকত। একদিন হরিহরের চোখ স্ত্রীর উপর পড়ল, চমকে উঠে বললে, তুমি এত রােগা হয়ে যাচ্ছ কেন? খাটুনি বড় বেড়েছে তা আমি বুঝতে পারছি ! কৈ একবারও ত’: কিছু বলনি, বললে কি মহাভারত অশুদ্ধ হত! আমি ত বলেই বিয়ে করেছি যে, তুমি যদি কোন কাজকৰ্ম্ম না কর, বসে থাক, আমি তােমায় খেটে খাওয়াব, এর ওপর আর কোন কথা চলে কি ?
আশ্চৰ্য্য পালঙ্ক
আমিও তাই কোন কথা কই নি, দেখি কতদূরের জল কতদূরে
মরে।
এখন দেখছি সত্যই তােমার মনের বল অসীম,—যা কথা সেই
কাজ। আমি তােমার দুঃখ আর দেখতে পারছি না, কালই ভগবানের
নাম করে কাজে বেরুব, ভগবান কি আমাদের দুমুঠো ভাতের সংস্থান
করবেন না।
পরদিন বেলা অবসানে হরিহর কুড়ল নিয়ে বনের ভেতর গাছ
কাটতে চলল। সে যখন গভীর বনের মধ্যে দিয়ে চলেছে, তখন
দুই সম্বন্ধীর সঙ্গে দেখা হ’ল। তারা নিজেদের গড়নমত কাট কেটে
নিয়ে ঘরে ফিরছিল। হরিহর গরীব বলে সম্বন্ধীরা তাকে দেখেও
দেখলে না, পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
হরিহর কোন ক্রুক্ষেপ না করে বনের ভেতর চলল। বনের
মাঝামাঝি গেছে, এমন সময়ে তার মনে হল, কে যেন ডাকছে।
হরিহর থামল। চারিদিক চেয়ে দেখে, একটা পেঁচা এক চোখ বুজে
তার দিকে চেয়ে আছে। পেঁচা বললে,-আমি তােমায় ডেকেছি,
মা লক্ষ্মী তােমার উপর সদয় হয়ে আমায় পাঠিয়ে দিয়েছেন, তােমার
অভিলাষ পূর্ণ করবার জন্যে।
হরিহর খুসী হয়ে একটা খুব বড় গাছের কাছে গিয়ে বললে,-
হে বৃক্ষ, আমায় এক হাত ডাল দাও। অমনি এক হাত একটি ডাল
তার সামনে পড়ল ।
ডালটি নিয়ে বাড়ি ফিরতেই সুন্দরী বললে,—কিছু উপায়
হল ?
রেগে
গল্পবেণু
হরিহর হেসে বললে,—উপায় না করে কি ফিরেছি।-এই দেখ,
ব’লে সেই এক হাত গাছের ডাল স্ত্রীর সামনে ধরলে।
এ দুঃসময়ে তামাসা করতে দেখে সুন্দরীর বড় রাগ হ’ল।
বললে,-এই এক হাত গরু বাঁধা খোঁটা এনে বাহাদুরি জানাতে
লজ্জা হচ্ছে না !
হরিহর পূর্বের ন্যায় হেসে বললে,—আমার কথা ঠিক কিনা
দেখে নিও! আজ ত মঙ্গলবার, আসছে বৃহস্পতিবার এই ডালটার কথা
মনে করে দিও সে দিন যা হ’ক একটা কিছু করা যাবে।
সুন্দরী কিছু না বলে, মাঝের কটা দিন খেটে সেই পয়সায়
দুজনে খেলে। বৃহস্পতিবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই স্বামীকে
বললে,—ওগাে শুনছ, আজ বৃহস্পতিবার মনে থাকে যেন,ডালটার
কথা তােমায় মনে করে দিচ্ছি।
বেশ করেছ, মনে করে, দিয়ে বড় ভাল করলে। দেখ, আজ
রাত্তিরে আমি ঘরের দাওয়ায় এই ডালটা নিয়ে কাজে বসব। তুমি
ঘরে খিল দিয়ে শােবে, আর বেরুতে পারবে না, বেরুলে কিন্তু সব পণ্ড
হয়ে যাবে,বুঝলে !
সেই দিন রাত্তিরে দুজনে আহারাদি করে নিলে। স্বামীর
কথা মত সুন্দরী নিজের ঘরে খিল দিয়ে শুল, হরিহর দালানে গাছের
ডাল ও যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজে বসল। সমস্ত রাত কাজ করে ভাের
হতেই কাজ শেষ করে উঠে পড়ল।
সুন্দরী ঘুম ভেঙ্গে উঠে, খিল খুলে দেখে, একটি চমৎকার ৭৮
আশ্চর্য পালঙ্ক
ফুট শােবার পালঙ্ক তৈরী রয়েছে। দেখে অবাক হয়ে গিয়ে
বললে,এত বড় পালঙ্ক কোত্থেকে এল ! কে করালে ?
)
{te
পেঁচা বললে—আমি তােমায় ডেকেছি
হরিহর বললে,—আমি কাল রাতে নিজের হাতে তৈরী
করেছি।
এত কাঠ কোথা পেলে ?
৩৪
গল্পবেণু
কেন, ঐ যে এক হাত গাছের ডাল যা বন থেকে এনেছি, ঐ
ডাল থেকেই এই পালঙ্কটা করেছি।
সুন্দরী আশ্চর্য হয়ে বললে,-বল কি! এমন
শুনিনি ! অবাক্ করে তুললে যে !
অবাক্ হও, আর বিশ্বাস নাই কর, ঐ এক হাত ডাল থেকেই
হয়েছে। এখন একে রাজার হাটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে এস।
কে বিক্রী করতে যাবে ?
কেন, তুমি !
আমি বৌ মানুষ, আমার কি যাওয়া ভাল দেখায় ?
পাড়ায় পাড়ায় ধান ভেনে, চাল কেঁড়ে, আসতে পার ! আর
যত লজ্জা রাজার হাটে যেতে।
তুমি যাও না কেন?
আমি খেটে করেছি, এই তােমার ভাগ্যি। টাকার দরকার
হয়, বিক্রি করতে নিয়ে যাবে, দরকার না হয় টান মেরে ফেলে
দেবে !
আচ্ছা, না হয় আমিই যাব, দর দস্তুর কে করবে ?
সে বিষয়ে চিন্তা নাই,—এই পালঙ্ককে দাম জিজ্ঞেস্ করলে,
সে নিজেই দাম বলবে।
সুন্দরী কৌতূহলী হয়ে বললে,—আচ্ছা পালঙ্কমশাই, তােমার
দাম কত ?
পালঙ্ক বললে,—আমার দাম হাজার এক টাকা।
আশ্চর্য পালঙ্ক
সুন্দরী, পালঙ্ককে উদ্দেশ করে বললে,—কার দায় পড়েছে যে
তোমায় এত দাম দিয়ে কিনবে ?
কিনবে গাে কিনবে, একবার হাটে নিয়ে গিয়ে দেখ না।
বটে পালঙ্ক মশাই, তবে চলুন রাজার হাটে যাই।
মুটে ডাকুন।
মুটে ডেকে সুন্দরীর সঙ্গে
সঙ্গে পালঙ্ককে
পালঙ্ককে রাজার হাটে নিয়ে
যাওয়া হল ।
বেলা পড়ে গেল, হেটো লােক হলে যে যার সামগ্রী বিক্রি করে
চলে গেল,-খদ্দেরের অভাবে পালঙ্কখানা অবিক্রি রয়ে গেল।
লােকজনকে রাজা হুকুম দিয়ে রেখেছেন, হাটে কোন জিনিস
বিক্রি না হলে রাজ সরকারে তা কিনে নােবে ।
বেলা শেষে রাজসরকারের লােক হাটে এসে দেখলে, একখানা
নতুন শােবার পালঙ্ক বিক্রি না হয়ে পড়ে আছে, আর একটি বৌ
পালঙ্কের পাশে ঘােমটা টেনে দাড়িয়ে আছে। রাজার লােক পালঙ্কের
কাছে এসে বৌটিকে বললে,—মা, এ পালঙ্কের দাম কত ?
পালঙ্ককে জিজ্ঞেস্ করুন।
এ রকম অদ্ভুত উত্তর শুনে লােকটি বললে,—মা, আমি তামাস
করতে আসিনি, সত্যিই এ পালঙ্কের দাম কত তাই জিজ্ঞেস্ করছি।
আমিও তামাসা করে বলি নি, পালঙ্ককে দাম জিজ্ঞেস্ করলে,
পালঙ্ক নিজেই তার উত্তর দেবে।
এ বড় আশ্চৰ্য্য কথা ত ! এমন ত কখন দেখিনি।
বটে !
গল্পবেণু
শুনিনি! দেখি পালঙ্ক কি বলে ? পালঙ্ক, তােমার দাম কত বল ত?
আমি রাজার লােক, রাজার তরফ থেকে আমি জিজ্ঞেস্ করছি, ঠিক
দাম বল ?
তখন পালঙ্ক মানুষের মতন কথা ক'য়ে বললে, রাজামশাইকে
বলবেন, আমার আসল দাম হাজার এক টাকা, এর কমে চাইলে
সেখানে যেতে আমি নারাজ।
হাজার এক টাকা দাম শুনে লােকটা ভাবলে, এত বেশি দাম
যখন, তখন রাজাকে বলে, তার অনুমতি নিয়ে কাজ করাই ভাল।
এই ভেবে সে রাজার কাছে ছুটে গেল। রাজাকে গিয়ে বললে,
মহারাজ। হাটে সব জিনিস বিক্রি হয়ে গেছে, থাকবার মধ্যে একখানা
অদ্ভুত শােবার পালঙ্ক বিক্রি না হয়ে পড়ে আছে। আশ্চর্য্যের
কথা কি বলব মহারাজ । সে পালঙ্ক মানুষের মত কথা কয়। একটি
বৌ সেই পালঙ্ক বিক্রির জন্যে এনেছে। বৌটিকে জিজ্ঞেস করলাম
পালঙ্কের দাম কত ? সে বললে,—এই পালঙ্ক নিজেই দাম বলবে।
আমি তাই করলাম। পালঙ্ক উত্তরে বললে,-আমার দাম
হাজার এক টাকা। অত দাম দিয়ে কিনতে আমার সাহস হল না,
তাই আপনার কাছে ছুটে এসেছি, আপনি যা অনুমতি করবেন
তাই হবে।
রাজা পালঙ্কের অদ্ভুত পরিচয় পেয়ে বললেন,—এমন ত কখন
দেখিনি শুনিনি, যে শােবার পালঙ্ক কথা কয়।
যে শােবার পালঙ্ক কথা কয়। আচ্ছা আমি নিজেই
যাচ্ছি,-পালঙ্ক কোথায় আছে আমায় নিয়ে চল।
t
আশ্চর্য পালঙ্ক
৩৭
লােকটি রাজাকে সঙ্গে করে পালঙ্কের কাছে নিয়ে এল।
দেখলেন হাট আলাে করে এক সুন্দর পালঙ্ক বিরাজ করছে। তার
পাশে এক গৃহস্থ বৌ মাথায় ঘােমটা টেনে দাড়িয়ে আছে।
রাজা বৌটিকে দেখে অতি সম্ভমে জিজ্ঞেস্ করলেন,--আচ্ছা মা,
এমন সুন্দর পালঙ্ক কে তৈরী করেছে ?
আমার স্বামী।
তােমরা কি জাত ?
আমরা জাতিতে সূত্রধর।
তােমাদের বাড়ি কোথায় ?
আপনার এই রাজতেই বাস করি। হলধর মিস্ত্রীর নাম বােধ
হয় শুনে থাকবেন, আমি তার কন্যা।
তুমি হলধর মিস্ত্রীর মেয়ে ! ও বুঝেছি ! আর বলতে হবে না ।
এই পালঙ্কের দাম কত মা ?
রাজাকে প্রণাম করে বৌটি অতি সসম্ভ্রমে বললে,-মহারাজ, এই
পালঙ্ক কথা কয়, একে দাম জিজ্ঞেস্ করলে উত্তর : পিনিই সে দেবে।
যেন স্বপ্ন বলে রাজার মনে হল। কাঠের পালঙ্ক কথা কয় এ
কি সম্ভব! কর্মচারীর মুখেও ঐ কথা, কিন্তু তিনি নিজে সত্যাসত্য
কিছু প্রমাণ পান নাই। একবার পরীক্ষা করা উচিত, এই ভেবে
বললেন,-পালঙ্ক, তােমার দাম কত
মহারাজ, আপনাকে অধিক আর কি বলব, আমার দাম হাজার
এক টাকা, এক পয়সা এদিক ওদিক নয় ।
গল্পবেণু
বেশ তাই, দাম কাকে দেব ?
পালঙ্কের মালিককে।
মালিকের ঠিকানা ?
আপনার এই লােক জানে। সেই সময়ে কর্মচারী বলে উঠল,
হা মহারাজ, আমি পূৰ্বে বৌটির কাছ থেকে সব জেনে নিয়েছি।
তখন রাজা সুন্দরীকে লক্ষ্য করে বললেন,—মা, আমি এই
পালঙ্ক নিয়ে চললাম, বাড়ি গিয়ে দাম পাঠিয়ে দেব।
পালঙ্কখানি রাজার বাড়িতে যাওয়ামাত্র, রাজার আদেশে হাজার
এক টাক। হরিহরের নামে হলধর মিস্ত্রীর বাড়িতে গিয়ে পৌছিল ।
সুন্দরীর আনন্দের আর সীমা নাই। এতদিনে তার ধান ভানা, চাল
কঁাড়া ঘুচল। একটা আলাদা বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীতে পরম সুখে বাস
করতে লাগল ।
এদিকে রাজা সেই পালঙ্ক কিনে নিয়ে গিয়ে, প্রাসাদের এক কক্ষে
রেখে শয্যাদি প্রস্তুত করিয়ে শােবার ব্যবস্থা করলেন।
প্রথম রাত্রে রাজা পালঙ্কে শয়ন করে আছেন,—নানা চিন্তা
এসে তার ঘুমের ব্যাঘাত করছে, এমন সময় পালঙ্কের এক দিককার
পায় কথা ক'য়ে অন্য তিন পায়াকে বললে,—কি গাে তােমরা ঘুমচ্ছ
জেগে আছ ?
অপর তিন পায়া অমনি বলে উঠল,-কেন গাে ! কি দরকার
তােমার ?
বলি কি, রাজা মশাই অন্দর মহল ছেড়ে
এই পালঙ্কে
৩৯
আশ্চর্য পালঙ্ক
ঘুমুচ্ছেন, এই সুযােগে একবার অন্দর মহল তদারক ক'রে আসি।
তােমরা এই কোণটা ধরে থেক, যেন ঝুলে পড়ে রাজার ঘুম না
ভেঙে যায়।
||
মহারাজ, এই পালঙ্ক কথা কয় :
অপর তিন পায়া বললে,-বেশ, তুমি যাও, আমরা তােমার
দিকটা ধরে থাকব।
পায়া খট খট শব্দ করে চলে গেল। খানিক বাদে এসে হাজির
হয়ে যেমন ছিল সেই রকম খট করে খাটে জুড়ে গেল।
80 গল্পবেণু অন্য তিন পায়। তাকে জিজ্ঞেস্ করলে,-শুনছ ? এই গেলে ও এলে, কিছু বললে না ত ? বলব কি,-বড় কুখবর বলবার যে নাই। এই নিশুতি রাত্তিরে কে শুনতে আসবে। রজ। মশাই ত ঘুমে অচেতন, এ সময় না বললে আর সময় হবে কখন,-বলে ফেল। তবে শােন বলি। আমি ত এ ঘর ছেড়ে অন্দরে গেলাম। সব ঘর ঘুরে দেখলাম, দাস-দাসী যে যেখানে সবাই ঘুমে ঘাের ; কিন্তু রাণীর ঘরে গিয়ে দেখলাম, রাণী রাজার বিরহে বিছানায় পড়ে ছটফট করছেন। আমি তাই দেখে রাণীকে মন্তরে অচেতন করে দরজায় তালা দিয়ে এসেছি। রাজা চুপটি করে সব শুনছিলেন। মনে মনে বললেন,যদি এ কথা সত্য হয়, তাহলে এ পালঙ্কের মিস্ত্রীকে হাজার এক টাকা দিয়ে পাঠাব। দ্বিতীয় পায় বললে,-ভাই-সব, আমি একবার রাজার কয়েদ- খানা দেখে আসি। তােমরা এই কোণটা তুলে ধর, যেন রাজার ঘুমের ব্যাঘাত না হয়। ব’লে পায়াটা খটাস করে পালঙ্ক ছেড়ে চলে গেল। খানিক বাদে এসে খটাস্ করে পালঙ্কে জোড়া লেগে গেল। পায়াগুলি বললে,—কি ভাই, কি দেখে এলে ? পায় বললে,-ভাগ্যি আমি গিয়ে পড়েছিলাম তাই রক্ষে, নইলে রাজার কয়েদখানা একেবারে শূন্য হয়ে যেত। কতকগুলো
আশ্চর্য পালঙ্ক
৪১
বস্ চোর ফিকির খাটিয়ে কয়েদ ঘরের তালা ভেঙে, পাঁচিল
ডিঙিয়ে পালাচ্ছেল, আমি সব চোরকে ধরে তাদের হাতে হাতকড়ি,
পায়ে বেড়ি দিয়ে একটা খালি ঘরে পূরে তালা বদ্ধ করে রেখে
এসেছি।
রাজা মনে মনে বললেন,
-যদি এ কথা সত্য হয়, এই ছুতােরকে
হাজার এক টাকা দিয়ে পাঠাব
তৃতীয় পায়া অন্য পায়াদের বললে,—ওগাে তােমরা শােন।
আমি একবার রাজার ধনাগার দেখবার জন্যে বাইরে যাব, তােমরা
এই পালঙ্কের দিকটা তুলে ধর, যেন রাজামশায়ের ঘুম না ভাঙে।
বলে খট করে পায়াটা চলে গেল। খানিক পরে এসে পায়াট।
পালঙ্কে জোড়া লেগে গেল।
পায়রা সব বললে,-তাত পাচ্ছ কেন? কি এমন বীরের
কাজ করে এলে যাতে তুমি দম্ ফেলতে পারছ না।
হাঁপাব না, বল কি ? প্রাণ নিয়ে যে পালিয়ে আসতে পেরেছি
এই মহাভাগ্যি! আমি না গিয়ে পড়লে রাজার ধনাগারে আর কিছু
থাকত না,-সব লুট হয়ে যেত। বলব কি একপাল চোর প্রহরীদের
হাত পা বেঁধে রাজার ধনাগারে ঢুকে ধন-রত্ন যা ছিল সব বার করে
নিয়ে পালাচ্ছেল। আমি তাদের সবাইকে মেরে ফেলে ধন-রত্নগুলো
একজায়গায় জড় করে মাটি চাপা দিয়ে রেখে এসেছি। (এ সাবের
খাটুনি বড় কম মনে কর না কি !—তাই এত হাঁপাচ্ছি বুঝলে ?
রাজা শুনে শিউরে উঠলেন। মনে মনে ঠিক করলেন,-যদি
!
৪২
গল্পবেণু
সত্যই এ রকম ঘটে থাকে, আমি এই পালঙ্কের মিস্ত্রীকে হাজার
এক টাকা দিয়ে পাঠবই পাঠাব।
চতুর্থ পায়া অপর তিন পায়াকে ডেকে বললে,-দেখ ভাইসব,
তােমরা তিনজনেই বাইরে বেরিয়ে যে সব কাণ্ড দেখলে, সে সব
বড় সােজা নয় । এসব সামলাতে না পারলে রাজার যে কি ক্ষতি
হত তা বলবার নয়, তাই আমারও একবার বাইরে যেতে ইচ্ছে
হচ্ছে। তােমরা আমার দিকটা দেখ আমি চললাম। বলেই খট
করে পালঙ্ক ছেড়ে পালিয়ে গেল।
অল্পক্ষণ পরে চুপে সাড়ে ঘরে এসে যেমন পালঙ্কের পায়া ছিল
তাই হল।
অন্য পায়াগুলাে তার রকম সকম দেখে বললে, -কি
ভায়া এত চুপচাপ্ কেন, কিছু দাও মেরে এলে না কি
দাও বলে দাও !
এত ধন-দৌলত সন্ধান করে এসেছি, যা
সাত রাজার ধন একত্র করলেও ওর তুলনায় কিছুই নয়।
কোথায় হে?
এই রাজ উদ্যানের দক্ষিণে যে বড় নারকেলগাছটিতে একটা
সাদা কাক বাস করেছে, ঐ গাছটার গােড়ায় রাশি রাশি হীরে জহরৎ
অনেক কাল ধরে পোঁতা আছে। এতকাল রাজামশাই যে সন্ধান
করেন নি, এই বড় আশ্চর্য্য! বলব কি ভাই, এত ধন দৌলত দেখলে
তােমরাও অবাক্ হয়ে যাবে ।
এদের কথাও শেষ হল, আর সেই সঙ্গে রাজাও পিঠ মােড়া দিয়ে
উঠে বসলেন, বললেন,-এখন রাত সাড়ে তিনটে, আর আধ ঘণ্টা
?
আশ্চর্য পালঙ্ক
৪৩
হ'লেই ভাের হবে, আর যােব না। এই কথা বলতে বলতে ঘরের
বার হলেন, আর মনে মনে বললেন,যদি কথাগুলো সত্য হয়
তাহলে ছুতােরকে এত টাকা দেব, যাতে সে ফেলে ছড়িয়ে খরচ
রলেও ফুরুবে না।
রাজা ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর, একটা পায়া হিহি করে
হেসে বলে উঠল,-দেখ ভাই, ভারি মজা হয়েছে ; রাজামশাই
আমাদের সব কথা শুনেছেন।
অন্য পায়াগুলো অমনি আল্লাদে আটখানা হয়ে বলে উঠল,
আমরা রাজাকে শুনিয়ে শুনিয়ে কথা কয়েছিলাম, রাজার তা কানে
গেছে দেখে বড়ই আহলাদ হ’ল। রাজা লােকও ভাল, তা না হলে
একটা কাঠের পালঙ্ককে দরদস্তুর না করে এক কথায় হাজার এক
টাকায় কিনে নেয়।
চতুর্থ পায় বলে উঠল,—মিলেছে ভাল,-মিলেছে ভাল।
হরিহর মিস্ত্রী যেমন চিরকাল সাধুর বাতাস পেয়ে উদাসীন ভাবে
কাটিয়েছে আদবেই টাকার লােভ করেন নি, ভগবান তেমনি তাকে
সংসারী করে রাশি রাশি টাকা পাইয়ে দিচ্ছেন। এখন তার অন্নপুর্ণ।
গৃহিণীও দু হাতে অকাতরে ধন বিতরণ ও দরিদ্রের দুঃখ মােচন করে
ধন্য হবেন।
রাজা ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েই রাণীর ঘরে উপস্থিত হলেন।
দেখলেন রাণীর জ্ঞান নাই, যেন নেশায় অচেতন।
রাজা রাত্রির
বৃত্তান্ত স্মরণ করে নিশ্চিন্ত মনে রাণীকে সেই অবস্থায় রেখে, উদ্যানের
88 গল্পবেণু দিকে চললেন। গিয়ে দেখেন ধনাগার শূন্য। কিছুদূরে একটা পেঁকে। পুষ্করিণীতে অনেকগুলাে লোক মরে পড়ে আছে, তার কাছেই একটা জায়গায় প্রভূত ধন-রত্ন মাটি চাপা মজুত রয়েছে। চাপা মজুত রয়েছে। রাজা লােক দিয়ে সেই সব ধন-রত্ন ধনাগারে রক্ষা করে প্রসাদ সংলগ্ন উদ্যানের মধ্যে লক্ষ্য করে দেখলেন, এক খুব বড় নারকেলগাছের মাথায় একটা সাদা কাক বাস করেছে। সেই নারকেলগাছের গােড়া খুঁড়তেই প্রচুর ধনরাশি বেরিয়ে পড়ল, রাজ। সেই সব ধন-রত্ন ধনাগারে তুলে রেখে তার অঙ্গীকার মত হরিহর মিস্ত্রীকে চার হাজার চার টাকার সঙ্গে একগাড়ি টাকা পুরস্কার স্বরূপ পাঠিয়ে দিলেন।
তারের
টন
&
মহাভারতের কথা।
পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির দুর্যোধনের কাছে হারিয়া গেলেন। বাজি
হইয়াছিল যে, যদি যুধিষ্ঠির হারিয়া যায়, তাহা হইলে পঞ্চপাণ্ডব ও
দ্রৌপদীকে বার বৎসর বনবাস ও এক বৎসর অজ্ঞাত বাস করিতে
হইবে।
বাধ্য হইয়া যুধিষ্ঠির প্রভৃতি পঞ্চভ্রাতা ও দ্রৌপদী রাজ্য-সুখ
ছাড়িয়া বনে বাস করিতে গেলেন। কত দেশ দেশান্তরে, কত বন
উপবনে, কত মুনি ঋষিদের তপােবনে তাহারা ভ্রমণ করিতে
লাগিলেন।
এমনি করিয়া একদা তাহার কাম্যকবনে উপস্থিত হইলেন।
একদিন উত্তর দিক হইতে বাতাসে উড়িয়া একটি পদ্ম দ্রৌপদীর সম্মুখে
পড়িল। দ্রৌপদী পদ্মের সৌরভে মুগ্ধ হইলেন। এমন পদ্ম ত তিনি
কখনও দেখেন নাই। কত বড় সে পদ্ম—হাজারটা তার পাপড়ি,
৪৬
গল্পবেণু
তাই তার নাম সহস্রদল পদ্ম। এ পদ্ম স্বর্গ ছাড়া কোথাও পাওয়া
যায় না।
দ্রৌপদী ভীমসেনকে বলিলেন,-দেখ দেখ কি চমৎকার পদ্ম।
দেখতেও যেমন সুন্দর, সৌরভও তেমনি মধুর। রংটি যেন প্রভাত
রবির মত রাঙা। আমি এ ফুল ধৰ্ম্মরাজকে দিব,আমাকে আরও
যে করে হােক আনিয়ে দাও।
ভীমসেন বলিলেন,—তথাস্তু।
গদা, তুণী প্রভৃতি অস্ত্রশস্ত্র লইয়া ভীমসেন চলিলেন,—উত্তর
দিকে এই পদ্ম আছে।
সেই সহস্রদল পদ্ম তঁাহার চাই।
বনের
পর বন, পাহাড়ের পর পাহাড় পার হইয়া চলিলেন ; বনের ব্যাঘ্র,
সিংহ প্রভৃতি হিংস্র জন্তুরা তাহাকে আক্রমণ করিতে আসিল,—কিন্তু
ভীমের গদার সামান্য আঘাতেই কেহবা মরিল, কেহবা পলাইয়া বাঁচিল ।
এমনি করিয়া অনেক দূর হাঁটিয়া তিনি একটি বিশাল পর্বতের সম্মুখে
আসিয়া দাড়াইলেন। এই পৰ্বতের নাম গন্ধমাদন।
ভীমসেন পর্বতের উপর উঠিতে লাগিলেন। পথের নানা বাধা
বিপ্ন কাটাইয়া অবশেষে এক সবােবর তীরে আসিয়া পৌঁছিলেন।
সেই সরােবরের চতুর্দিকে অসংখ্য কদলীবৃক্ষ বিস্তৃত রহিয়াছে।
কোথাও কাহাকেও দেখিতে না পাইয়া ভীমসেন শঙ্খনাদে দশদিক
কঁপাইয়া তুলিলেন।
ঐ কদলী বনে মহাবীর হনুমান বাস করিতেন। তিনি
ভীমের দাপট ও গর্জন শুনিয়া বুঝিলেন যে, ইনি তাহার ভাতা
ভীমের দর্পচূর্ণ ৪৭ ভিন্ন আর কেহ নহেন। ঐ বনে স্বর্গ গমনের এক অতি সঙ্কীর্ণ পথ ছিল। পাছে ভীমসেন ঐ পথে গিয়া শাপগ্রস্ত বা শত্রু কর্তৃক পরাজিত / দেখ দেখ, কি চমৎকার পদ্মা হন, এই আশঙ্কায় ভ্রাতার মান, সম্ভ্রম রক্ষা করিবার মানসে হনুমান সেই স্বর্গদ্বারের পথ অবরােধ করিয়া কপটে নিদ্রা যাইলেন, এবং মধ্যে মধ্যে ভূমিতে সজোরে লাঙ্গল আঘাত করিতে লাগিলেন। ভীমসেন সেই শব্দ শুনিয়া, উহার কারণ জানিবার জন্য শব্দ লক্ষ্য 88 গল্পবেণু করিয়া সেখানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, এক হনুমান শুইয়া ঘুমাইতেছে। স্বর্গরাজ্যের পথ তাহারই পশ্চাতে। ভীম বজ্রস্বরে বলিলেন,-কে তুই! স্বর্গরাজ্যের পথ আগলে শুয়ে আছি। ভাল চাস ত পথ ছাড় ! নইলে এখনই তাের মুণ্ডপাত করব ! হনুমান একটুও ভয় না পাইয়া হাসিয়া বলিলেন,—আমি পীড়িত, যােগের জ্বালায় অস্থির হয়ে পড়ে আছি, কে হে তুমি আমায় বিরক্ত করতে এসেছ? ছোট মুখে বড় কথা শুনিয়া ভীমের ক্রোধ দ্বিগুণ বদ্ধিত হইল, বলিলেন,—সামান্য হনুমানের স্পর্ধা দেখ ! উঠবি কি না বল। ভীম গজ্জিয়া উঠিলেন। ভীমের গর্জনে কিছুমাত্র ভীত না হইয়া হনুমান, বলিলেন,- আপনি মানুষ, সুতরাং জ্ঞানবান। অতএব দুৰ্ব্বলের প্রতি এমন কঠোর হওয়া কি উচিত? আমি অতি ক্ষুদ্র প্রাণী, বানরকুলে আমার জন্ম আমরা লােকালয় বা ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্মের কিছুই ধার ধারি না : আর সর্ব প্রাণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ যে মানুষ, সেই মানুষ কুলে আপনার জন্ম, আপনি আমাদিগের অপেক্ষা কত বড় তা বলবার নয় ; অতএব আপনার মুখে রুঢ় বাক্য শােভা পায় না। বােধ হয় আপনি ধৰ্ম্মের ধার ধারেন না, ভদ্রলােকের সহিত কখন মেলা-মেশা করেন নি, তাই অভদ্র স্বভাব প্রাপ্ত হয়েছেন, আমায় পীড়িত দেখেও দয়া প্রকাশ না করে অভদ্র ব্যবহার করছেন। আপনি কে ? কেনই বা এই নির্জন অরণ্যে এসেছেন? কোথায় গমন করবেন? এই
ভীমের দর্পচূর্ণ
৪৯
উদ্যানের পরেই যে পৰ্বত দেখছেন, উহাতে সিদ্ধ পুরুষ ভিন্ন অন্য কেহ
প্রবেশ করতে পারে না। যদি ভাল চান ত’ ফিরে যান, ওর ভেতরে
যাবার চেষ্টা করবেন না। গেলেই মৃত্যু।
ক্ষুদ্র বানরের মুখে পণ্ডিতের মত কথা শুনিয়া ভীম আশ্চর্যান্বিত
হইলেন, বলিলেন, তুমি কে ? কি নিমিত্তই বা বানর শরীর ধারণ
করেছ ? আমি ক্ষত্রিয়, সোমবংশীয় পাণ্ডুর পুত্র। নাম ভীমসেন।
হনুমান ভীমের বাক্যে ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন,-হে ভদ্র, পরিচয়ে
বুছি যে, আপনি ওপথে যাবার সম্পূর্ণ অযােগ্য, আমি পথ ছাড়ব
না,-অকারণে কেন প্রাণ হারাবেন, ঘরে ফিরে যান।
ভীমসেন বলিলেন—আমি মরি বা বাঁচি সে কথায় তােমার কাজ
নাই, তুমি পথ ছাড়বে কিনা বল ? যদি পথ না ছাড় তার প্রতিফল
এখনই হাতে হাতে পাবে।
হনুমান বলিলেন,--আমি রােগের জ্বালায় মরছি,-নড়বার শক্তি
নাই, আপনি আমায় ডিঙিয়ে যেতে পারেন।
ভীম বলিলেন,-কাকেও ডিঙিয়ে যেতে নাই। আমার ত
তােমার মতন বানর স্বভাব নয় যে, ডিঙিয়ে যাব। যেমন ত্রেতাযুগে
হনুমান সাগর লঙ্ঘন করেছিলেন। আমার যদি সে স্বভাব হত
তাহলে এখনই তােমার কথার অপেক্ষায় থাকতাম না।
হনুমান বলিলেন,-ভাল কথা, সেই হনুমানের বিষয় কিছু
জানেন না কি ? যদি জানা থাকে আমায় বলুন, আমার শুনতে বড়
ইচ্ছে হচ্ছে।
গল্পবেণু
ভীম বলিলেন,—সেই বানররাজ আমার ভ্রাতা। তার অশেষ
গুণ। তিনি যেমন বলবান, বুদ্ধিমান, তেমনি
তেমনি মহা ধার্মিক।
রামায়ণে তার অশেষ গুণব্যাখ্যা আছে। তিনি রামভাৰ্যা সীতার
উদ্ধারের জন্য এক লম্ফে সাগর লঙ্ঘন করেছিলেন। আমি তার
ভাই। তবেই বুঝ আমার বল কত। যদি মঙ্গল চাও পথ ছাড়,
নচেৎ মরবার জন্য প্রস্তুত হও।
হনুমান তাহাতে ভীত না হইয়া বলিলেন,-কথায় কাজ কি,
আমার লেজটা সরিয়ে যান না কেন ?
ভীম মনে মনে বিরক্ত হইলেন,-একটা বানরের আস্পর্ধার কথা
দেখ। এটাকে উচিত শিক্ষাই দেওয়া উচিত। লেজটা ধরে দু চার
বার ঘুরপাক খাইয়ে এক আছাড় মারলেই সাবাড়।
এই ভাবিয়া হনুমানের লেজটা ধরিয়া তুলিতে উদ্যত হইলেন;
কিন্তু কি আশ্চর্য্য ভীম কিছুতেই লেজ সরাইতে পারিলেন না। শেষে
গায়ের সমস্ত জোর দিয়া দুই হাতে তুলিতে গলদঘর্ম হইয়া গেলেন,
তবু লেজটাকে কিছুমাত্র সরাইতে পারিলেন না।
ভীম লজ্জিত হইয়া বলিলেন,—হে বানরশ্রেষ্ঠ আমার অপরাধ
নেবেন না, আমি না জেনে অনেক দুৰ্বাক্য বলেছি। আপনি
কে ? কি জন্যই বা বানররূপ ধারণ করেছেন, যদি বলবার বাধা না
থাকে আমায় বলুন, আমি শুনবার জন্য বড়ই ব্যস্ত হয়েছি।
হনুমান বলিলেন,—আমি পবনদেবের পুত্র, আমার মায়ের নাম
অঞ্জনা, আমার নাম হনুমান। সমগ্র বানরকুল পূর্বে যে, সূৰ্যপুত্র
ভীমের দর্পচর্ণ সুগ্রীব ও ইন্দ্রসুত বালীর উপাসনা করতেন তাদের সঙ্গে আন। বিশেষ বন্ধুত্ব ঘটে। কোন কারণে সুগ্রীব স্বীয় ভ্রাত বালীর নিকট অপমানিত হয়ে ঋষমূক্ পৰ্বতে আমার সহিত বহুদিন বাস করেছিলেন। । . E আমার লেজটা সরিয়ে যাও না কেন? সেই সময়ে ভগবান বিষ্ণু মনুষ্যরূপে রাজা দশরথের পুত্র রাম নামে ধরাতলে অবতীর্ণ হন। রাম পিতার সতপালনের নিমিত্ত, স্ত্রী সীতাদেবী ও অনুজ লক্ষণকে লয়ে দণ্ডকারণ্যে বাস করতেছিলেন। দুরাত্মা রাবণ, মারীচ-নিশাচরের দ্বারা রামকে বঞ্চনা করে সীতাকে ৫০ গল্পবেণু মণ করে। সীতা অপহৃতা হলে রাম ও লক্ষ্মণ সীতাকে অন্বেষণ করতে করতে শৈলশিখরে সুগ্রীবকে দেখতে পান। দৈবক্রমে রামের সহিত সুগ্রীবের বিশেষ বন্ধুত্ব হয়। সেই হেতু রাম বালীকে বধ করে সুগ্রীবকে রাজ্যে অভিষেক করেন। সুগ্রীব রাজ্যলাভ করে সীতার অন্বেষণে বহুশত বানর চারিদিকে পাঠান। সেই সময় আমিও অনুচর সঙ্গে সীতার অন্বেষণে দক্ষিণদিকে গমন করি। পথিমধ্যে পবির সম্পাতির সহিত সাক্ষাৎ হলে, তিনি আমাকে রাবণ কর্তৃক সীতা-হরণের কথা বলেন। এই কথা শুনে আমি সীতাকে উদ্ধারার্থ বিস্তীর্ণ সাগর উল্লঙ্ঘন করি ও রাক্ষসরাজ রাবণের রাজধানীতে উপনীত হই। তথায় সীতাকে দর্শন ও তাঁর পদধূলি মস্তকে লয়ে লঙ্কাপুরী দগ্ধ করে, রামের নিকট উপস্থিত হয়েছিলাম। পরমব্রহ্ম রাম আমার বাক্যে বিশ্বাসপূৰ্ব্বক সমুদ্রে সেতু বন্ধন করে বহু সংখ্যক বানর সমাবৃত হয়ে লঙ্কায় গমন করেন ; রাক্ষসরাজ, রাবণের ভ্রাতা, পুত্র ও বন্ধুবান্ধব যে যেখানে ছিল সকলকে সংহার করে স্বীয় ভক্ত পরম ধাৰ্মিক বিভীষণকে লঙ্কারাজ্যে অভিষিক্ত তৎপরে স্বীয় সহধম্মিণী সীতাকে উদ্ধার ও স্বীয় পুরী অযযাধ্যায় আগমন পূৰ্ব্বক সিংহাসনে আরূঢ় হন। অনন্তর আমি রামের নিকট এই বর প্রার্থনা করেছিলাম যে, হে প্রভু! এই সংসারে যতকাল আপনার নাম থাকবে, ততকাল আমি যেন জীবিত থাকি। রাজীবলােচন রাম “তথাস্তু” বলে অভিলষিত বর প্রদান করলেন। সীতাদেবীর প্রসাদে এই স্থানে আমার ইচ্ছানুসারে নানাবিধ দিব্য করেন।
ভীমের দর্পচূর্ণ ভােগ্যবস্তু উপস্থিত হয়। প্রভু শ্রীরামচন্দ্র একাদশ সহস্র বর্ষ রাজ্য- পালন করেছিলেন। অদ্যাবধি এই স্থানে তারা ও গন্ধৰ্ব্বগণ ত্রৈলােক্যপতি শ্রীরামচন্দ্রের পবিত্র চরিত্ৰ-গাথা গান করে আমাকে ভীমসেনকে আলিঙ্গন করিবামাত্র আনন্দ দান করেন। হে পাণ্ডুনন্দন, এই পথ মনুষ্যের অগম্য। পাছে আপনি এই পথে গিয়ে অপমানিত ও পরাভূত হন, এই কারণে আমি আপনার পথরােধ করেছি। এই পথে স্বর্গে গমন করা যায় ।
করি। ৫8 গল্পবেণু ইহাতে মনুষ্যের যাইবার অধিকার নাই। আপনি যাহার অন্বেষণে গমন করছেন, সেই সহস্রদল পদ্মের সরােবর এই স্থানেই আছে। মধ্যম পাণ্ডব ভীমসেন, মহাবীর হনুমানের মুখে সীতাহরণের সংবাদ শ্রবণ করিয়া পরম প্রীত হইলেন, বলিলেন,—মহাশয়, আপনার সাক্ষাৎ পেয়ে, কি পৰ্যন্ত আনন্দলাভ করলাম তা বলবার নয়। এক্ষণে একটি বিষয় আমার জিজ্ঞাস আছে, অনুগ্রহ করে বললে বড়ই কৃতার্থ হব। মহাসাগর উত্তীর্ণ হবার সময়ে আপনি যে বিরাট রূপ ধারণ করেছিলেন, সেই বিরাট রূপ আমি দর্শন করতে ইচ্ছ। হে বীর, সেই বিশাল কলেবর দেখবার জন্যে আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়েছি, অতএব আপনি সেই বিরাট রূপ দেখিয়ে আমার উদ্বেগ দূর করুন । হনুমান এই কথা শ্রবণ করিবামাত্ৰ সহাস্যে বলিলেন,-এক্ষণে আমার পূর্বকার রূপ দেখবার সুযােগ হবে না, কেননা, কাল মাহাত্ম্যে সবই বিপরীত ভাব ধারণ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে আকার প্রকারেরও পরিবর্তন ঘটেছে, পূর্বের ন্যায় বল ও বীৰ্য্য আর নাই। তাই বলি আমার পূর্বেকার সেই বিরাট শরীর দর্শনের আশা ত্যাগ করুন। ভীম বলিলেন,-হে কপিবর -হে কপিবর! এক্ষণে যুগ মাহাত্মের বিষয় কিছু বর্ণনা করুন, আমার শুনবার বড় বাসনা হয়েছে। হনুমান বলিলেন,-হে ভ্রাতঃ ! সত্যযুগে লােকসকল সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয় ও ধর্মপরায়ণ ছিলেন। তৎকালে সকলে নীলােগ, দীর্ঘজীবি ও স্বধর্মপরায়ণ হয়ে জীবন যাপন করতেন-দুঃখের লেশমাত্র ভীমের দর্পচূর্ণ ছিল না। সে সময়ে ধৰ্ম্ম চতুস্পদ বিশিষ্ট ছিল। ত্রেতা যুগে ধর্মের ক্ষয় হয়ে ত্রিপাদ বিশিষ্ট হয়েছে । দ্বাপরে দ্বিপদ ও কলিতে এক পাদ বিদ্যমান থাকায় ধৰ্ম্ম, কৰ্ম্ম, যজ্ঞ, ক্রিয়াকলাপ একরূপ বিলুপ্ত হয়েছে। যুগনাশে ধৰ্ম্মের নাশ হচ্ছে এবং ধৰ্ম্মের নাশে লােকসকল বিনষ্ট হচ্ছে। এইরূপে লােক বিনষ্ট হলে, তাদের অনুষ্ঠিত ধৰ্ম্ম- সমুদায়ও ক্ষয় পাচ্ছে। হে মধ্যম পাণ্ডব ভীম, তােমায় জিজ্ঞাসা করি, যখন কাল-প্রভাবে আমার দেহ, মন, প্রাণ সবই পরিবর্তিত হয়েছে, তখন আমার পূব্বেকার বিরাট মূর্তি দেখবার বাসনা পরিত্যাগ করে গৃহে প্রত্যাগমন কর । ভীম বলিলেন,—মহাত্মন্ ! আমি আপনার পূৰ্বরূপ অবলােকন না করে কদাচ গমন করব না ; অতএব অনুগ্রহপূর্বক আমায় আপনার প্রকৃত বিরাট আকৃতি দেখান এই আমার একান্ত প্রার্থনা। ভ্রাতা ভীমসেনের বিনয় বাক্যে হনুমান, ভীমের অভিলাষ পূর্ণ করিবার মানসে, সাগর লঙ্ঘন সময়ে যে বিরাট আকৃতি ধারণ করিয়াছিলেন সেই বিরাট আকৃতি ধারণ করিলেন। সেই ক্ষুদ্র শরীর ক্রমে ক্রমে বর্ধিত হইয়া পৰ্বত প্রমাণ হইল। সঙ্গে সঙ্গে মুখমণ্ডল তাম্রবর্ণ, নয়নদ্বয় বিঘূর্ণিত, দংষ্ট্রা তীক্ষ্ণ ও লাঙ্গুল চতুর্দিকে কুণ্ডলাকারে ব্যাপ্ত হইল। মহাবল ভীম, হনুমানের পৰ্বত প্রমাণ অতি ভীষণ শরীর সন্দর্শন করিয়া হর্ষ ও বিস্ময়ে অভিভূত হইলে হনুমান বলিলেন, ভ্রাতঃ! আমি ইচ্ছা করলে শরীর এতদূর বর্ধিত করতে পারি
গল্পবেণু
যে, তুমি পৰ্যন্ত ভয় পাবে, আর অন্যের ত কথাই নাই। এই বলিয়া
শরীর অধিকতর বর্ধিত করিলেন।
ভীমসেন হনুমানের অতি ভীষণ কলেবর দেখিয়া, ভয়বিহবল
চিত্তে বলিলেন,—আর না ! আর না! আর দেখতে পারছি না! দেহ
ছােট
করুন ! সহজ রূপ ধরুন ! আমার মনে হয়, রাম-রাবণের যুদ্ধে
আপনি একাই রাবণকে সবংশে নিধন করে সীতাদেবীকে উদ্ধার
করতে পারতেন! কেন করেন নি এটাই আশ্চর্য্য
হনুমান বলিলেন,-ভাই, তুমি ঠিকই বলেছ।
রাবণকে আমি
অতি সামান্যই জ্ঞান করতাম । না জানকীকে কেন উদ্ধার করিনি
জান ? তাহলে রঘুকুলপতি প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের কীর্তি লােপ পেত।
ত্রিভুবনবিজয়ী শ্রীরামচন্দ্র,-দশানন ও তার অনুচরগণের প্রাণসংহার
করে মা জানকীর উদ্ধার সাধন করেছিলেন বলেই তার যশােভাতি
চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হয়ে পড়েছে, নচেৎ হ'ত কি না সন্দেহ।
তুমিও স্বীয় ভ্রাতা ধৰ্ম্মরাজের হিতাভিলাষী তা আমি জানি।
এক্ষণে তুমি স্বকাৰ্য্য সাধন উদ্দেশে গমন কর, তােমার কোনরূপ
বিঘ্ন ঘটবে না। গমনকালে বায়ু তােমাকে রক্ষা করবেন।
সৌগন্ধিক বনে গমন করবার এই একমাত্র পথ। এই পথে গমন
করলে ধনপতি কুবেরের যক্ষ ও রাক্ষস রক্ষিত উদ্যান অবলোকন
করবে।
এই বলিয়া হনুমান তাহার কলেবর সংযত করিলেন।
দুই বাহু প্রসারিত করিয়া ভীমসেনকে আলিঙ্গন করিবামাত্র তাহার
এবং
ভীমের দর্পচূর্ণ
সমুদায় শ্রান্তি দূর হইল। তখন ভীম আপনাকে অদ্বিতীয় বলবান
বলিয়া বােধ করিলেন।
অনন্তর কপিরাজ আনন্দভরে সৌহার্দ্য প্রদর্শনপূৰ্ব্বক ভীমসেনকে
কহিলেন,“ভ্রাতঃ ! আপন আবাসে গমন কর । প্রয়ােজন হলে
আমি তাহা অবগত হয়েছি, অতএব
আমাকে স্মরণ কর, এবং আমি যে এস্থানে অবস্থান করছি তা
কা’কেও প্রকাশ ক’র না। আমি তােমাদের পশ্চাতে রইলাম
জানবে। হে মহাবাহে ! যদি তােমার অভিলাষ হয়, তবে
গল্পবেণু অদ্যই আমি হস্তিনানগরে গিয়ে প্রস্তরাঘাতে সমুদায় ধার্তরাষ্ট্রকে বিনষ্ট, নগর ধ্বংস এবং দুষ্ট দুর্যোধনকে বন্ধন করে তােমায় সমর্পণ করি। হনুমানের বাক্য শ্রবণ করিয়া ভীমসেন কহিলেন,-প্রভাে! আপনার ন্যায় প্রবল প্রতাপান্বিত বীরের সহায় সম্পন্ন লাভ করে কি পর্যন্ত যে আনন্দ লাভ করলাম তা বলবার নয়। আমি আপনারই তেজোবলে সমুদায় শত্রুগণকে পরাজয় ও বশীভূত করব ইহা নিশ্চিত। হনুমান কহিলেন,-হে ভ্ৰাতঃ ! সত্য সত্যই আমি তােমার এই উপকার করব যে, যখন তুমি অরাতিগণের মধ্যে প্রবেশ পূৰ্ব্বক সিংহনাদ করবে, তখন আমি তােমার সঙ্গে এমন প্রচণ্ড হুঙ্কার ছাড়ব যে, সেই হুঙ্কার শব্দে শত্রুদের গায়ের রক্ত শুকিয়ে গিয়ে সমরশায়ী হবে। হনুমান এইরূপ ভীমের সহিত নানাবিধ কথােপকথন করিয়া ধনকুবের প্রতিষ্ঠিত সরসীর পথ প্রদর্শন পূর্বক অন্তহিত হইলেন। অনন্তর ভীম ব্যাঘ্রগজাদিসেবিত অরণ্যমধ্যে পথ অতিক্রম করিয়া সরসীর সমীপবর্তী হইলেন। ঐ সরসী কৈল্পসশিখরে কুবের ভবন ও গিরিনিঝরের পাদমূলে অবস্থিত থাকায় যারপর নাই মনােহারিণী হইয়াছে। সরসীতটে তরু ও লতারাজি বিপুল ছায়া বিস্তার পূর্বক উহার সমধিক সৌন্দর্য বর্ধন করিতেছে। উহাতে নানাজাতীয় পুষ্প প্রস্ফুটিত হইয়া অপূর্ব শােভ ধারণ করিয়াছে।
ভীমের দর্পচূর্ণ উহার সলিল নিৰ্ম্মল, শীতল, লঘু ও অমৃতের ন্যায় সুস্বাদু। সােপান শ্রেণী শ্বেত প্রস্তর নিৰ্ম্মিত, কর্দম বিহীন, অবগাহনে ক্লেশ নাই। ভীম ইচ্ছামত জলপান করিয়া সৌগন্ধিক বনের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। দেখিলেন ঐ সরােবর রাজরাজের ক্রীড়া-স্থান। গন্ধৰ্ব্ব, অপ্সর, ঋষি, যক্ষ ও কিন্নরগণের পূজনীয়। ক্রোধবশনামক শতশত রাক্ষ উহার রক্ষক। ভীম মুনিবেশে খাদি বীর-পরিচ্ছদে নির্ভয়ে গমন করাতে, প্রহরী রাক্ষসগণ ভীমের বিরুদ্দবেশ অবলোকন করিয়া পরস্পর কহিতে লাগিল,—এই পুরুষবর মুনিবেশে যুদ্ধাস্ত্র গ্রহণ করিয়া এস্থানে কি নিমিত্ত আগমন করিয়াছে, জিজ্ঞাসা করা উচিত। ইহার পর তাহারা ভীমের সমীপে গমন করিয়া দর্পভরে জিজ্ঞাসা করিল, -হে পুরুষ ! তুমি কে ? তােমার মুনিবেশ ও বীরবেশ দুই বেশই দেখছি, অতএব তুমি কি নিমিত্ত এস্থানে আগমন করেছ বল ? ভীম কহিলেন,—হে রাক্ষসগণ! আমি মহারাজ পার নন্দন, যুধিষ্ঠিরের অনুজ, আমার নাম ভীমসেন। আমি ভ্রাতৃগণের সহিত বদরীতীর্থে আগমন করেছি। একদা প্রিয়তমা পাঞ্চালী আশ্রমে একটি সৌগন্ধিক পুষ্প অবলােকন করেন। বােধ পুষ্পটি এইস্থান থেকেই বায়ুবেগে তথায় নীত হয়েছে। পাঞ্চালী তদবধি ঐ পুষ্প অধিক পরিমাণে পাবার জন্য উৎসুক হয়েছেন। আমি তাঁহার প্রিয়কারী । এক্ষণে তাহার অভিলষিত পুষ্প চয়ন মানসে এইস্থানে আগমন করেছি। রাক্ষসগণ কহিল,--হে ভীমসেন, এই সরােবর যক্ষরাজের অতি ; গল্পবেণু প্রিয়তম ক্রীড়াস্থান। দেহীর এস্থানে প্রবেশ করবার অধিকার নাই। এমন কি দেব, ঋষি, যক্ষ, গন্ধৰ্ব্ব ও অগ্রগণ যক্ষরাজের বিনানুমতিতে জলপান বা বিচরণ করেন না। তুমি যদি ধনকুবেরকে অনাদর করে বলপূৰ্ব্বক সৌগন্ধিক হরণ করতে উৎসুক হও, তাহলে তুমি কদাচ ভদ্রলােক বলে বিবেচিত হবে না। তাই বলি হে বৃকোদর, তুমি যক্ষরাজের নিকট হতে অনুমতি নিয়ে এস এবং ইহার জলপান ও পদ্ম আহরণ কর ; নতুবা উহার প্রতি নেত্রপাত ক’র না। ভীম কহিলেন,হে রাক্ষসগণ এস্থানে ধনেশ্বর কুবেরকে অবলােকন করছি না, অতএব কাহাকে আমন্ত্রণ করব ? আর যদিও সাক্ষাৎ পাই, তার নিকট প্রার্থনা করতে পারব না। কারণ ভূপালগণের ঈদৃশ সনাতন ধর্ম প্রচলিত আছে যে, তারা কুত্রাপি যাঙ্ক্ষা করেন না। আমি কোন প্রকারে ক্ষাত্ৰধৰ্ম্ম পরিত্যাগ করতে অভিলাষী নহি। বিশেষতঃ এই সরােবর মহাত্মা কুবেরের ভবনে উৎপন্ন হয় নাই, ইহা পৰ্বত নিঝরে জন্মেছে। অতএব ইহাতে কুবেরের যেরূপ, সকল লােকেরই সেরূপ অধিকার আছে। এবংবিধ স্থলে কোন ব্যক্তি কা’র নিকটে যাজ্ঞা করে থাকে ? মহাবল ভীমসেন রাক্ষসগণকে এইরূপ প্রত্যুত্তর প্রদান পূর্বক সরােবরে অবগাহন করিলেন। রাক্ষসগণ বারংবার নিষেধ করিলেও ভীম তাহাতে কর্ণপাত করিলেন না। অনন্তর রাক্ষসগণ ভীমবিক্রমে ভীমসেনকে অস্ত্রশস্ত্র সহকারে যেমন আক্রমণ করিতে উদ্যত হইল, অমনি ভীম প্রচণ্ড গদা উত্তোলন করিয়া তাহাদের অভিমুখে ধাবমান ভীমের দর্পচূর্ণ হইলেন। উভয়ের মধ্যে তুমুল সংগ্রাম বাঁধিল। পবননন্দন ভীম অবলীলাক্রমে রাক্ষসগণের শরজাল সংহার পূর্বক সেই পুষ্করিণী সমীপে তাহাদিগের শত শত যােদ্ধাকে মৃত্যুমুখে পাতিত করিলেন; যাহার অবশিষ্ট ছিল, তাহারা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ও বিচেতন প্রায় হইয়া শূন্যপথে কৈলাসশৃঙ্গে পলায়ন করিল। অতঃপর ভীমসেন বিনা বাধায় সরােবরে অবগাহন পূৰ্ব্বক স্বেচ্ছানুসারে পুষ্প সঞ্চয় করিতে লাগিলেন ; এবং তাহার অমৃতসম সলিল পান করিয়া তেজস্বী হইয়া উঠিলেন। এদিকে ভীমবলতাড়িত রাক্ষসগণ সভয়চিত্তে ধনেশ্বর কুবেরের সমীপে আগমন পূৰ্ব্বক ভীমসেনের অমিত পরাক্রমের কথা আদ্যোপান্ত বিবৃত করিলেন। কুবেরদেব তাহা শ্রবণান্তর সহাস্যবদনে বলিলেন,-- হে রক্ষিগণ, ভীমসেন পাঞ্চালকুমারীর নিমিত্ত কমল চয়ন করছেন, আমি তাহা অবগত হয়েছি, অতএব তিনি স্বচ্ছন্দে সৌগন্ধিক গ্রহণ করুন। বিজয়ী ভীম পুনরায় ভ্রাতৃগণসহ মিলিত হইলেন। ;
রাজকন্যার গুলাের এক ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী । বড় গরীব। ব্রাহ্মণ যা উপায় করে তাতে ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণী ও একমাত্র কন্যা এই তিনটি প্রাণীর পেট ভরে না। ব্রাহ্মণী প্রত্যহ নানা গঞ্জনা দেয়। ব্রাহ্মণ বলে,-দেখ ব্রাহ্মণী, ভাগ্যে না থাকলে হয় না। আমার এখন ভাগ্য মন্দ তাই কিছু হচ্ছে না, যখন কপাল ফিরবে, তখন ধন-কড়ি আপনি এসে পড়বে। ব্রাহ্মণী বলে, তুমি কি একবারও তােমার ভাগ্য পরীক্ষা করে দেখেছ ? বােধ হয় দেখনি, দেখলে নিশ্চয় তার ফল পেতে। ঐ যে ও পাড়ার গুড়গুড়ে ভচার্য্যি কি বা লেখা পড়া জানে, কেমন রােজগার করছে। পরিবারের গায়ে গয়না দেখলে প্রাণ জুড়িয়ে যায় ; আর তুমি লেখা-পড়া শিখে এক পয়সা আনতে পার না। আমাদের দেশের রাজা কত লােককে, কত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকে কত কি দিচ্ছে, তুমি কি একবার রাজার কাছে গেছ, না কখন তার নাম করেছ। •• রাজকন্যার মুলােবর রাজার কাছে কেন যাইনি ব্রাহ্মণী তা শুনবে ? রাজার কাছে যাওয়া অমনি নয় ; সেই রকম সাজ-গােছ করে তবে যেতে হয়, ’তে পয়সা খরচ আছে ! আমার কি সে পয়সা আছে যে, হুট করে যা-তা পরে রাজার কাছে যাব,-তুমিই বল ? এই কথা! তা বললেই ত হত। আমি চেয়ে-চিন্তে এনে দিতাম। আচ্ছা আমি কালই রায়েদের বড় গিন্নির কাছ থেকে কাপড়-চোপড় যা কিছু সব নিয়ে আসব, তুমি যেতে রাজি ত ? রাজিত। তবে রাজার কাছে গিয়ে কি বলে দাঁড়াব। সে কথাও তােমায় বলে দিতে হবে। মেয়েটা বড় হয়েছে, বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে, গলায় জল গলে না, তার বিয়ের টাকা চাই, এ কথা আবার বলে দিতে হবে। পরদিন ব্রাহ্মণ সাজ-গােজ করলে, রাজ সভায় গেল, “মহারাজার জয় হাে”! বলে সামনে দাঁড়াল। রাজা, ব্রাহ্মণকে ভক্তিভরে প্রণাম করে কাছে বসিয়ে, আগমনের কারণ জিজ্ঞেস্ করলেন। ব্রাহ্মণ উত্তরে নিজের দুর্দশার কথা, তার কন্যাদায়ের কথা পেড়ে অনেক দুঃখ করতে লাগল। ব্রাহ্মণের দুর্দশা দেখে, রাজা ধন- ধ্যক্ষকে ডেকে এক থলে মােহর দিতে আজ্ঞা দিলেন। ব্রাহ্মণ রাজাকে প্রাণ খুলে আশীর্বাদ করে থলেটা মাথায় করে বাড়িতে ফিরল। বাড়িতে ব্রাহ্মণ হাসিমুখে প্ৰলেতে কি ? ঢুকতেই ব্রাহ্মণী বললে,
৬৪
গল্পবেণু
মােহর।
কোথা পেলে ?
রাজা মশাই দিয়েছেন।
কেন ?
মেয়ের বিয়েতে খরচ করতে ।
ভাগ্যিস আমার কথা শুনলে, তাই এক থলে মােহর পেলে।
এখন এককাজ কর, সেকরাকে ডাক, আগে আমার গা-ভরা গয়না
হােক্, তারপর তােমার মেয়ের বিয়েতে খরচ কর।
ব্রাহ্মণ চটে খুন, বললে,-আব্দার দেখে আর বাচিনে।
মেয়ের বিয়ের নাম করে মােহর নিয়ে এলাম,
মােহরে তুমি কি বলে ভাগ বসাতে চাও ? তা আমি
তা আমি কখনও
দোব না।
ব্রাহ্মণীর রাগ চরম সীমায় উঠল,রেগে বললে,-তােমার
ন্যাকাপনা কথা আমি শুনতে চাইনে,-আগে আমার গয়না চাই!
জান না ! আমার জন্যই এত সােণা পেলে ! এখন আমাকেই
ফাকি! তাহলে কখনই মেয়ের বিয়ে দিতে দেব না !—আর তুমিই
বা কেমন করে মেয়ের বিয়ে দাও, তা দেখে নােব ।
ব্রাহ্মণ আরও চটে গেল, বললে,—আমারও এক কথা,-মেয়ের
বিয়ে না দিয়ে তােমার একখানাও গয়না হবে না, তাতে তুমি যা
বেশ, তুমি মেয়ে নিয়ে থাক! আমি খাব না—দাব না কিছু
রাজকন্যার মুলােবর
করব না, এই চল্লাম বলে ব্রাহ্মণী ঘরে খিল দিয়ে শুয়ে রইল, আর
ব্রাহ্মণ থলে আগলে বসে রইল।
বেলা শেষে ব্রাহ্মণের রাগ পড়ে গেল সে দেখলে, ব্রাহ্মণী
হতেই মােহরের থলে
পেয়েছে। সে বড় কম
নয়। ব্রাহ্মণীর গয়না ও
মেয়ের বিয়ে ঘটা করে
দিয়েও সাত পুরুষ বসে
খেলেও ফুরুবে না। তখন
ব্রাহ্মণীকে চটিয়ে কাজ কি,
ওর গয়নাগুলো আগেই
হােক্ না কেন ? এই ভেবে
ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণীর ঘরের
দরুজায় গিয়ে ডাকতে শুরু
করলে,-ওঠ ব্রাহ্মণী ওঠ।
তােমারই জিৎ, তােমারই
গয়না আগে হবে।
ব্রাহ্মণী অভিমান করে বললে,---নি তামন গয়না চাইনে।
রাগ কর কেন ব্রাহ্মণী ! তােমার বুদ্ধিতে যখন মােহর পেয়েছি,
তখন তােমার ইচ্ছা আগে পূরণ করা দরকার। অভিমান ছাড়, রান্না-বান্না
কর, খাওয়া-দাওয়া সেরে সেরা ডেকে গয়নার ফর্দ করা যাবে।
গল্পবেণু
ব্রাহ্মণী হাসিমুখে রান্না করলে। পরে খাওয়া শেষ করে দেখে ।
মােহরের থলে নাই, কোথায় উধাও হয়ে গেছে।
তাইত, থলে গেল কোথা! বলে দুজনে চারদিক খুজতে
লাগল, কিন্তু কোথাও থলে পাওয়া গেল না।
ব্রাহ্মণী বললে,-চোরে নিয়ে গেছে।
ব্রাহ্মণ বললে,আমি ত থলে আগলে বসেছিলাম, চোর কখন
এল, থলে আপনা হতেই উধাও হয়ে গেছে।
ব্রাহ্মণী বললে—তাই হবে। কপাল মন্দ হ'লে পােড় শােল
মাছটাও পালিয়ে যায়।
তাই ত ব্রাহ্মণী ! এখন আমাদের দুঃখ ঘুচবার উপায় কি ?
চিরদিন কি এই রকম দুঃখে দুঃখেই কাটবে !
দেখ,--এক কাজ কর। যখন আমাদের ভাগ্য ভাল নয়, তখন
যাতে আমাদের ভাগ্য ফিরে আসে, তাই কর।
ভাগ্য ফিরিয়ে আনতে পারলে ত ভালই হয়,-আনব কি ক'রে,
কোথা গেলে ভাগ্য পাব, কে দেবে।
কেন, রাজার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে আসবে। রাজা যখন
যাচকের ইচ্ছা পূরণ না করে জল গ্রহণ করেন না, তখন রাজার কাছ
থেকে তার ভাগ্য চেয়ে নিলেই হবে ।
ব্রাহ্মণীর কথাটা ব্রাহ্মণের কানে সুধা বর্ষণ করলে, বললে,--
বলিহারি যাই ব্রাহ্মণী ! বড় তা বুঝে কথাটা বলেছ ! আচ্ছা কালই
রাজার কাছে গিয়ে একটা হেস্তনেস্ত করে আসব ।
রাজকন্যার মুলােবর
পরদিন যথাসময়ে ব্রাহ্মণ সেজে গুজে রাজসভায় গিয়ে উপস্থিত
হ’ল, দু হাত বিস্তার করে বললে,-“জয় হােক মহারাজ!”
রাজা মহাখুশি হয়ে ব্রাহ্মণকে কাছে বসিয়ে শারীরিক কুশল ও
সাংসারিক নানা কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। ব্রাহ্মণ মােহর মােহর
বলে কেঁদেই আকুল।
রাজা অনুমানে বুঝে নিলেন, তিনি যে মােহর ব্রাহ্মণকে দান
করেছেন, সেই মােহর সম্বন্ধে কিছু হবে, বললেন,-মােহর মােহর
কি বলছেন ? অশ্রু মুছে অতি কষ্টে ব্রাহ্মণ বললে,--হা মহারাজ !
সব মােহর খােয়া গেছে দুর্ভাগার সুখ কোথায় ?
দুভাগার সুখ কোথায় ? আপনার মত
ভাগ্যবান আর কে আছে ? আপনি যদি ঐ ভাগ্য আমাদের দান
করেন, তবেই সুখ হবে, নচেৎ এ পােড় অদোষ্টে সুখ হবে না। বলে
ব্রাহ্মণ আবার হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল।
রাজা বললেন,-ব্রাহ্মণ ! যদি আমার ভাগ্য নিয়ে আপনি
সুখী হন, আজ অবধি আমার সকল সৌভাগ্য আপনাকে দান
করলাম,-আপনি
সৌভাগ্যশালী হন, ভগবানের
নিকট আমার
এই প্রার্থনা।
ব্রাহ্মণ রাজার নিকট হতে ভাগ্য আদায় করে ঘরে ফিরলে ।
পথে দেখে একটি ৮৯ বছরের মেয়ে তার পিছু পিছু আসছে।
মেয়েটিকে দেখলে মনে হয় যেন স্বয়ং কমলা। প্রথমে ব্রাহ্মণ কিছু
বুঝতে পারেনি, কে আসছে ত কে আসছে। শেষে বাড়িতে ঢোকবার
সময় যখন দেখলে মেয়েটিও তার সঙ্গে বাড়িতে ঢুকছে, তখন
4 ৬৮ গল্পবেণু ব্রাহ্মণ বড়ই মুস্কিলে পড়ল, ভাবলে,—আমাদের দশ ত এই, আমাদেরই খেতে কুলােয় না, তার ওপর এ মেয়েটিকে যদি পুষতে হয়, দুঃখের অন্ত থাকবে না,-কাজ নেই বাড়িতে ঢুকিয়ে, এই বেলা তাড়িয়ে দেওয়াই ভাল। এই ভেবে ব্রাহ্মণ মেয়েটিকে বললে, দেখ না, আমাদের বড় কষ্ট এ বাড়িতে তােমার স্থান হবে না, অন্যত্র চেষ্টা দেখ। মেয়েটি তবু সরলে না, ব্রাহ্মণের কথা কানেই তুললে না, স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইল। ব্রাহ্মণী পূৰ্বেই একটা পিড়িতে আলপনা দিয়ে রেখেছিল, সেই পিঁড়িখানা নিয়ে এসে তার ওপর মেয়েটিকে অতি যত্নে বসিয়ে কিছু খাবার খাইয়ে দিলে। মেয়েটি খাবার খেয়ে “এই আসি” বলে অদৃশ্য হ’ল। ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী এই অবাক কাণ্ড দেখে, কমলার উদ্দেশ্যে শতকোটী প্রণাম করলে। সেই দিন হ'তে ব্রাহ্মণের উন্নতি দেখা দিল। চারিদিক হতে সিধেটা-আসটা, টাকা-কড়ি আসতে লাগল, দেখতে দেখতে ব্রাহ্মণ মহাধনী হয়ে উঠল। বড় বাড়ি, বড় জুড়ি, বড় লােকের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হয়ে দেশের মধ্যে একজন প্রধান ব্যক্তি হয়ে এখন ব্রাহ্মণের সঙ্গে কুটুম্বিতা করতে বড় বড় ঘর থেকে মেয়ের সম্বন্ধ আসতে লাগল। ব্রাহ্মণ দেখে শুনে এক বড় ঘরে মেয়েকে পাত্রস্থ করে নিশ্চিন্ত হল। একদিকে যেমন ব্রাহ্মণের দিন দিন উন্নতি, দিন দিন শ্রীবৃদ্ধি হ’তে লাগল, অপর দিকে, তেমনি রাজার দিন দিন অধােগতি ও উঠল।
রাজকন্যার কুলােবর রাজ্যের মধ্যে দুর্লক্ষণ দেখা দিল। আজ এ মুলুক লাটে চড়ল, কাল ও মুলুক লাটে চড়ল, এই রকমে একে একে সব লােপ পােতে লাগল । ক্রমে রাজা বলে পরিচয় দেবার আর কিছুই রইল না। রাজা এই সব দেখে শুনে পাগলের মত হয়ে গেলেন, রাজ্য ছেড়ে দীন দুঃখীর বেশে ইতস্ত প্রমণ করতে লাগলেন। একদিন রাজা অপর এক রাজার দেশে গিয়ে জঙ্গলের মধ্যে এক ভগ্ন কালী মন্দিরের চত্বরে চিন্তায় মগ্ন, এমন সময় একদল দত্যু মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করলে। দস্য-সর্দার নতজানু হয়ে প্রতিমার উদ্দেশে করযােড়ে বললে,—রক্ষা কর মা, রক্ষা কর! যেন লুঠ- তরাজে আমাদের মনস্কামনা সিদ্ধি হয়। যদি তেমন কিছু করতে পারি তােমায় ঘটা করে পূজো দেব, এই বলে সর্দার, -“জয় মা কালী! জয় মা কালী!” বলতে বলতে দলবল নিয়ে প্রস্থান - ডাকাতেরা বনভূমি পার হয়ে সেই দেশের রাজার বাড়িতে লুটপাট করতে ঢুকল। রাজার লােকবল বেশি থাকায় তেমন সুবিধে করতে পারলে না,-রাজার এক কচি ছেলের গলা থেকে হার ছিনিয়ে নিয়ে রণে ভঙ্গ দিল। রাজার লােকজন মার মার শব্দে ডাকাতদের পিছু নিলে। ডাকাতের দল যে যেদিকে পারলে পালাল। সর্দার দৌড়ে মন্দিরে ঢুকে কালী ঠাকুরের পায়ের তলায় হারছড়াটা ফেলে দিয়ে চম্পট দিলে ।
৭০ গল্পবেণু রাজার লােকেরা ডাকাতদের পেছনে পেছনে ছুটে মন্দির পর্যন্ত এসে দেখে, একটা ডাকাত মন্দিরে ঢুকেই বেরিয়ে গেল। মন্দিরের মধ্যে রাজকুমারের গলার হারছড়া পেয়ে ডাকাতের কেউ না কেউ নিকটে আছে জেনে চারদিক খুঁজতে লাগল। মন্দিরের চত্বরে ভাগ্যহীন রাজা ছিলেন, তাকেই দস্যু মনে করে রাজার কাছে বেঁধে নিয়ে গেল, বললে,—মহারাজ! এই দেখুন রাজকুমারের গলার হার,—সব ডাকাত পালিয়েছে, এটাকে অনেক কষ্টে ধরে এনেছি। রাজা কিছু খোজ খবর না করেই হুকুম দিলেন,—ওটার হাত- পা কেটে সদর রাস্তায় ফেলে দাও। রাজার আদেশে ভাগ্যহীন রাজার হাত-পা কেটে সদর রাস্তায় নিক্ষিপ্ত হল। দৈবক্রমে এক ধনী ব্যবসায়ী, শকটারােহণে সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দিব্যকান্তি এক পুরুষকে হাত-পা কাটা অবস্থায় দেখে দয়াপরবশ হয়ে বাড়িতে নিয়ে গেলেন,-চিকিৎসা করে তাকে বাঁচালেন। ধনীর অনেকগুলি তেলের ঘানি ছিল। তিনি মতলব করলেন, এই হাত-পা-কাটা মানুষটাকে যদি একটা ঘানির তক্তে বেঁধে রাখেন তাহলে অনেক কাজ পাবেন। লােকটার হাত-পা নাই বটে, কিন্তু মুখ ত আছে,—যে গরুটা ঘানি টানতে টানতে দাড়িয়ে থাকবে, বা ফাকি দেবে, তাকে ধমক দিলেই সে সাবধান হবে, কাজেই অনেক
রাজকন্যার মুলােবর
৭১
তেল উৎপন্ন হতে থাকবে। আর তিনি সেই অবসরে অন্য চেষ্টা
করে ব্যবসার উন্নতি করতে থাকবেন।
এই স্থির করে ধনী ভাগ্যহীন রাজাকে একটা ঘানির তক্তে বেঁধে
দিলেন। রাজা সেই
তর্কে বসে গরুদের ধমক
দিয়ে বেশ কাজ আদায়
করতে লাগলেন।
দুর্ভাগ
হাত-পা কেটেছিলেন
যে রাজা, সেই রাজার
তিন মেয়ে।
একদিন
তিনি
মেয়েকে
নিকটে ডেকে আদর
বললেন,-মা
বলত, তুমি কার ভাগ্যে
ভাগহীন রাজাকে একটি ঘানির তক্তে বেধে দিলেন।
খাও?
বড় মেয়ে বললে,-বাবা, একথা কি আবার জিজ্ঞেস্ করতে
হয়। আমাকে খাইয়ে পরিয়ে এত বড়টা করলেন আমি আপনার
ভাগ্যেই খাচ্ছি,--আপনি থাকলে। আমার
থাকত না।
হ’ল ?
৭২
গল্পবেণু
রাজা মেজ মেয়েকেও ঐ কথা জিজ্ঞেস করলেন। (মেজ মেয়ে
বড় বােনের মত বাপের দোহাই দিলে।
ছােট মেয়েকে ঐ কথা জিজ্ঞেস্ করায় সে বললে,-বাবা,
আমি অন্য কারও ভাগ্যে খাই না, আমি নিজের ভাগ্যে খাই।
রাজা ক্ষুন্ন হয়ে বললেন,--মা, তাের একথা বলা কি ঠিক
তাের বােনেরা সবাই আমার দোহাই দিলে, আর তুই মা
তাদের ঠিক উল্টো বলছি, এটা কি ঠিক হচ্ছে মা? বেশ ক'রে
ভেবে চিন্তে বল ?
বাবা, আমি বেশ করে ভেবেই বলছি। আমি কেন বাবা,
সবাই নিজের নিজের ভাগ্যে খায়, আমিও তেমনি নিজের ভাগ্যে
খাই-পরি।
রাজা মহা চটে উঠে বললেন,—দেখ, এই শেষবার তােকে
বলছি ! যদি তুই ও কথা না ছাড়ি, তাের এমন দুর্দশা করব
যা দেখে শেয়াল কুকুরও কঁদবে !
আপনি যাই শাস্তি দিন বাবা! আমি এখনও বলছি, আমার
ভাগ্যে যদি সুখ থাকে, সে সুখ কেউ ঘােচাতে পারবে না।
রাজা আর কোন কথা না বলে রাগে গ গ করতে করতে ঘর
থেকে বেরিয়ে গেলেন, মন্ত্রীকে ডেকে বললেন,—দেখ মন্ত্রী, আমার
ছােট মেয়েটার বড়ই বাড় বেড়েছে, আমাকে আর মানতে চায় না।
বলে কিনা, সে তার নিজের ভাগ্যে খায়—আমি ওকে দেখে নােব,
কেমন সে নিজের ভাগ্যে খায় । আমি মেয়েটার এক অকর্মণ্য
৭৩ রাজকন্যার মুলােবর লােকের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দোব, দেখি মেয়েটা কি করে খায় পরে। মন্ত্রী কি বলতে যাচ্ছিলেন, রাজা তাকে বাধা দিয়ে বললেন, আপনি মনে করেছেন মেয়েটাকে বুঝিয়ে তার মত ফেরাবেন, তা ফেরাতে কখনই পারবেন না, তা আমি খুব জেনেই বলছি, তাই বলি, কালই একটা অকর্মণ্য লােকের সন্ধানে চারদিকে লােক পাঠাবার বন্দোবস্ত করুন, যেন আমার কথার অন্যথা না হয়। রাজার কথা মত মন্ত্রী চারদিকে লােক পাঠালেন। লােকেরা সন্ধান করে ধনীর ঘানির তক্তে বসান সেই হাত-পা কাটা অকর্মণ্য লােকটার কথা মন্ত্রীকে জানাল, মন্ত্রী রাজাকে জানালেন। রাজা শুনে তাকেই নিতান্ত অকর্মণ্য জেনে সেই ভাগ্যহীন রাজার সঙ্গে ছােট মেয়ের বিয়ে দিলেন। পাছে ধনীর বাড়িতে রাখলে তিনি খেতে পরতে দেন, সেই ভেবে রাজা স্বতন্ত্র একটা কুঁড়ে ঘর বেঁধে তাইতে মেয়ে ও জামাই দুজনকে রেখে দিলেন। রাণী কিন্তু মেয়ে জামাইকে একেবারে পর করতে পারলেন না। লুকিয়ে লুকিয়ে ঝিকে দিয়ে তাদের দুজনের মত খাবার পাঠাতে লাগলেন। রাজা এ বিষয় বিন্দুবিসর্গও জানলেন না। কিছুদিন যায়, একদিন শনিরাজ ও ভাগ্যবিধাতা, উভয়ে রাজার কাছে উপস্থিত হলেন। রাজা পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে পূজো করে তাদের আগমনের কারণ জিজ্ঞেস্ করলেন। ভাগ্যবিধাতা ও শনিরাজ বললেন,-রাজা, আমাদের দুজনের
৭৪
গল্পবেণু
মধ্যে কে বড়, তুমি বল । এই বিচারের জন্য তােমার কাছে
এসেছি।
রাজা মুহা ভাবনায় পড়লেন। একদিকে ভাগ্যবিধাতা অন্যদিকে
শনিরাজ কেউ ছােট নন। ভাগ্যকে বড় করলে শনির কোপানলে
দগ্ধ হবেন, আর যদি শনিকে বড় করেন তাহলে ভাগ্য ছেড়ে
যাবেন। এই উভয় সঙ্কটে পড়ে রাজ! মহা ভাবনায় পড়লেন, কিন্তু কিছু
ঠিক করতে পারলেন না, বললেন, --আচ্ছা, আপনারা আমায় এক
মাসের সময় দিন, আমি ভেবে চিন্তে পরে বলব।
বেশ তাই হবে, আমরা একমাস পরে আসব, ব’লে উভয়ে
চলে গেলেন।
তাদের বিচার ভার নিয়ে রাজা মহা বিব্রত হয়ে পড়লেন।
রাজা ও রাণীর পেটে জল গলে না। এ কথা রাজমহলে রাষ্ট্র হয়ে
গেল। রাজবাড়ির সকলেই চিন্তিত হয়ে পড়ল।
রাজার ছােট মেয়ে ও নুলো জামাইকে খাবার দিতে গিয়ে ঝি
সে কথা রাজকন্যার কানে তুললে। রাজকন্যা সে কথা স্বামীকে
বলল । স্বামী বললেন,—ঝি এলে বলে দিও রাজামশাই যেন না
ভাবেন, আমি তার হয়ে উত্তর দোব–শাপ, বর, যা কিছু তা আমার
ওপর দিয়েই যাবে,—তার গায়ে আঁচ পৰ্যন্ত লাগবে না, এতে তিনি
যদি রাজি হন আমায় যেন খবর পাঠান।
ঝি গিয়ে রাণীমাকে বললে। রাণী পাকে প্রকারে সেই কথা
রাজাকে বললেন। রাজা শুনে ভাবলেন,-যা শক্ত পরে পরে।
রাজকন্যার মুলােবর
৭৫
ও অকর্মণ্য জামাইটা দেবতাদের কোপে ধ্বংস হলে, মেয়েটাকে বাধ্য
হ'য়ে আমার শরণ নিতে হবে। যেমন তার দর্প, সে দর্প চূর্ণ হবে,
নিজের ভুল হাড়ে হাড়ে বুঝবে।
কে বড়, কে ছােট, আপনারা নিজেরাই বিচার করুন।
রাজা রাণীকে বললেন,-মেয়েকে বলে পাঠিও জামাই যেন ঠিক
প্রস্তুত হয়ে থাকে, তাকে দিয়েই উত্তর দেওয়া হবে ।
এক মাস গত হতেই রাজা কনিষ্ঠ জামাতাকে নিজের
বাড়িতে নিয়ে এলেন, রাজবেশ পৱালেন, পােষাকে হাত-পা ঢেকে
গল্পবেণু সিংহাসনে বসিয়ে দিলেন, স্বয়ং রাজা সাধারণ বেশে কিছু তফাতে রইলেন। ভাগ্য ও শনি উভয়ে ঠিক সময়ে উপস্থিত হলেন, বললেন, আমাদের বিষয়ে কিছু স্থির হয়েছে কি ? তাদের উভয়কে যথাযযাগ্য সম্মান প্রদর্শন করে দুর্ভাগা রাজা ভাগ্যবিধাতাকে উদ্দেশ করে বললেন,-ভগবন! আপনি আমার আগা-গােড়া সবই জানেন। আমি সামান্য রাজা হলেও, আপনার কৃপায় আমার দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল । কিন্তু যেদিন হ’তে ব্রাহ্মণের হস্তে আপনাকে অর্পণ করলাম, সেইদিন হ’তেই আমার দুর্দশা আরম্ভ হয়েছে। শনির দশা পেয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পথের ভিখারি হয়েছি, পরে হাত-পা কাটা হ'য়ে, কি দুর্দশায় যে দিন কাটাচ্ছি, তা আপনার অবিদিত নাই। এস্থলে কে বড়, কে ছােট, আপনারা নিজেই বিচার করুন, আমি আর কি বলব। ভাগ্যহীন রাজার কথা শুনে, ভাগ্য ও শনি উভয়ে হেসে উঠলেন এবং রাজাকে আশীর্বাদ করে অদৃশ্য হলেন। দেখতে দেখতে নুলো রাজার হাত পা গজিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধি, মেধা, বল, বীৰ্য যা কিছু সবই দেখা দিল। শ্বশুর সবই শুনলেন, সবই দেখলেন। যে জামাতাকে তিনি একান্ত অকর্মণ্য তার হস্তে মেয়েকে সমর্পণ করে নিজের কথাটা বলবৎ করবার প্রয়াস পেয়েছিলেন, সে সবই পণ্ড হ’ল, শুধু পণ্ড নয়, সবই তার বুঝবার ভুল জেনে বড় দুঃখ হ’লতার দুই চোখে জল গড়াতে
রাজকন্যার মুলােবর
৭৭
লাগল। সেই অশ্রুমাখা চোখে রাজা, রাজ-জামাতার দু' হাত ধরে
কৃত অপরাধ মার্জনা করবার জন্যে বার বার অনুরােধ
লাগলেন।
কনিষ্ঠ রাজ-জামাতা, শ্বশুর-রাজাকে নানা প্রকারে সান্ত্বনা
করে বললেন,—“ভাগ্যং ফলতি সর্বত্র। যতদিন ভাগ্য সুপ্রসন্ন
থাকে ততদিন তার দিন ভাল যায়, তার বিপরীত হলে নানা বিপদ
এসে অশেষ দুঃখ দেয় ।
রাজার দুর্ভাগ্য কেটে গেল। পুনরায় নিজ সিংহাসনে
আরােহণ করে পত্নীকে লয়ে পরম সুখে ও স্বচ্ছন্দে রাজ্য পরিচালনা
করতে লাগলেন।
ইন্দ্রের দর্পচুর্ণ মহাভারতের কথা। মহর্ষি অঙ্গিরার দুই পুত্র। জ্যেষ্ঠ বৃহস্পতি ও কনিষ্ঠ সংবৰ্ত। দুই ভ্ৰাতাই পিতার ন্যায় ধাম্মিক ও জপ তপে অনুরক্ত। দুই ভ্ৰাতায় সর্ববিষয়ে মিল থাকিলেও জপ তপ লইয়া উভয়ের মধ্যে বিবাদ ঘটিত। একজন অপরকে হীন প্রতিপন্ন করায় উভয়ের মধ্যে বিবাদ বাধিয়া যাইত। শেষে সেই কলহ এমন গুরুতর হইয়া দাড়াইল যে, সংবর্ত জ্যেষ্ঠের নিকট হইতে নিষ্কৃতি পাইবার জন্য সামান্য কৌপীনমাত্র সম্বল করিয়া অরণ্যবাসী হইলেন। পূৰ্বে বৃহস্পতির পিতা মহর্ষি অঙ্গিরা ধার্মিক নরপতি করন্ধমের কুলপুরােহিত ছিলেন। করন্ধমের মরুত্ত নামে এক পুত্র ছিল। মরুত্তের প্রতি সসাগরা পৃথিবী একান্ত অনুরক্ত হইয়াছিলেন, ঐ মহীপাল মরুত্ত স্বীয় শৌর্য বীর্যে এতই প্রবল হইয়া উঠিয়াছিলেন যে, তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকেও ভ্রুক্ষেপ করিতেন না। এজন্য দেবরাজ ইন্দ্র মরুত্তের প্রভাব হ্রাস করিবার মানসে তাহার হিতকামী
ইন্দ্রের দর্পচূর্ণ
৭৯
কুলপুরােহিত বৃহস্পতিকে আহ্বান করিয়া দেবগণ সমক্ষে কহিলেন,
ভগবন্! যদি আপনি আমার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হন, তাহলে কখনও
মরুত্তের পৌরােহিত্য স্বীকার করতে পারবেন না।
কেননা আমি
স্বর্গ, মর্ত, পাতাল এই ত্রিলােকের অধীশ্বর, কিন্তু মরু কেবলমাত্র
মর্তলােকের অধিপতি। আমি অজর, অমর, আর মরুত্ত জন্মমৃত্যুর
অধীন। আমা হেন সুরপতিকে পরিত্যাগ করে কে কবে মর্তের
রাজা মরুত্তের যাজন ক্রিয়া করে থাকেন ?
অতএব আপনি যদি মরুত্তের পৌরােহিত্য যেমন করছেন তেমনি
করতে থাকেন, তবে তাই করতে থাকুন, কিন্তু মনে থাকে যেন
আমার আশা চিরদিনের মত ত্যাগ করতে হবে। সুতরাং আমার ও
মরুত্তের উভয়ের মধ্যে কাহার পৌরােহিত্য করবেন তাহা বলুন।
দেবরাজ ইন্দ্র এইকথা বলিলে তপােধন বৃহস্পতি ক্ষণকাল
চিন্তা করিয়া সুররাজকে বলিলেন,—দেবেন্দ্র, তুমি সমস্ত প্রাণীগণের
অধীশ্বর-হর্তা, কর্তা, বিধাতা। অতএব তােমাকে ছেড়ে মর্ত্যলােকে
মরুত্তের যাজন ক্রিয়া সম্পাদনে কোনই লাভ নাই। আর আমি
সর্বসমক্ষে প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, মরুত্ত কোন ছার—তােমাকে ছেড়ে
মর্তে কাহারও যাজন ক্রিয়া সম্পাদন করিব না।
সুররাজের সমক্ষে বৃহস্পতির প্রতিজ্ঞা মরুত্তের কর্ণে প্রবেশ
করিল। তিনি কাল বিলম্ব না করিয়া এক বৃহত্তর যজ্ঞের আয়ােজন
করিলেন, এবং বৃহস্পতি সমীপে উপস্থিত হইয়া বলিলেন—দেব,
আপনার বেশ স্মরণ আছে যে, পূৰ্বে আমি আপনার কথামত এক
গল্পবেণু যজ্ঞ করবার সঙ্কল্প করেছিলাম। এক্ষণে সেই যজ্ঞের যাবতীয় সামগ্রী আহরণ করেছি, যাহাতে ঐ যজ্ঞ সুসম্পন্ন হয় আপনি উপস্থিত থেকে তার ব্যবস্থা করুন। বৃহস্পতি বলিলেন,-বৎস, আমি কেবল দেবরাজ ইন্দ্রের পৌরােহিত্য করিব অন্য কারও করিব না বলে প্রতিজ্ঞা করেছি। অতএব তােমার যজ্ঞে কি করে যােগদান করি বল? তুমি অন্যত্র চেষ্টা দেখ। রাজা কহিলেন, আমি আপনার পৈত্রিক যজমান এবং আপনাকে যথেষ্ট সম্মান করে থাকি, আপনি যদি আমার যজ্ঞ সম্পাদন না করেন তবে কে করবে ? আপনাকে করতেই হবে। রাজার দৃঢ়বাক্যে বৃহস্পতি উষ্মা প্রকাশ পূৰ্ব্বক গর্বিত বচনে বলিলেন,--আমার এখন পদমর্যাদা যে কত, তা তুই মূখ কি করে জানবি বল্ ! যে ইন্দ্ৰত্ব পাবার জন্য মানুষ কত কঠোর সাধ্য-সাধনা দেবরাজ ইন্দ্র আমায় পৌরােহিত্যে বরণ করেছেন, আমি তোের সংস্পর্শে থাকতে চাই না,-ভাল চাস্ত দূর হ ! বৃহস্পতির রূঢ়বাকে। রাজা হতবুদ্ধি হইয়া গেলেন। তিনি ভাবিয়া ঠিক করিতে পারিলেন না কেন গুরুদেব তাহাকে অকারণে ভৎসনা করিলেন। নরপতি মরু বৃহস্পতির নিকট প্রত্যাখ্যাত, ভৎসিত ও লজ্জিত হইয়া গৃহে প্রত্যাগমন করিতেছেন, এমন সময়ে পথিমধ্যে দেবর্ষি নারদের সহিত সাক্ষাৎ হইল। নারদকে দেখিয়া রাজা তাহাকে করে, সেই ইন্দ্রের দর্পচূর্ণ ৮১ তুমি অভিবাদন করিয়া বিষন্ন মুখে দণ্ডায়মান রহিলেন। দেবর্ষি নারদ ইহার কারণ জানিবার জন্য বলিলেন,-রাজন্ ! আজ তােমার মুখ এত বিষ দেখছি কেন ? কেন ? কোন অমঙ্গল হয় নাই ত ? কোথায় গিয়াছিলে ? তােমার অপ্রসন্নতার কারণ কি ? যদি বলবার বাধা না থাকে, বল, আমি সাধ্যমত তােমার দুঃখ দূর করবার চেষ্টা করব। নারদ এই কথা বলিলে নরপতি মরুও তাহাকে বলিলেন,- দেবর্ষে ! আমি কুলগুরু বৃহস্পতির কথামত যজ্ঞের সমূদয় সামগ্রী আহরণ করে তাকে পৌরােহিত্যে বরণ করবার জন্যে তার নিকট গিয়াছিলাম, তিনি আমায় রূঢ়বাক্যে দূর করে দিয়েছেন, জানিনা প্রভু, তঁার শ্রীচরণে কি অপরাধ করেছি ! বলে অধােমুখে অত্যাগ করতে লাগলেন। মরুত্তের চক্ষে জলধারা নির্গত হইতে দেখিয়া নারদ বেশ বুঝিলেন যে, নরপতির প্রাণে কি বিষম আঘাত লাগিয়াছে। তিনি রাজাকে অভয় দিয়া বলিলেন, বৃহস্পতি যদি তােমার পৌরােহিত্য না করেন তাতে এত দুঃখিত হবার কারণ দেখিনা,কেননা তার ভাই সংবৰ্ত্ত তপস্যা এবং সৰ্ব্ব বিষয়ে বৃহস্পতির অপেক্ষা অনেক বড়। তিনি দাদার ব্যবহারে মর্মাহত হয়ে কৌপীনমাত্র সম্বল করে গৃহত্যাগ করেছেন, তার দ্বারা যজ্ঞ সম্পাদন করলে খুব ভালই হবে। নাই বা বৃহস্পতিকে পেলে ? তাই বলি তুমি সংবর্তের নিকট গিয়ে তাকে প্রসন্ন কর, তােমার কাৰ্যোদ্ধার হবে।
গল্পবেণু দেবর্ষি নারদের মুখে যজ্ঞ সম্পাদনের উপায় শুনিয়া, রাজা পুলকিত হইলেন বটে, কিন্তু পরক্ষণেই সে আনন্দ তিরােহিত হইল। তিনি বুঝিয়া উঠিতে পারিলেন না, কি প্রকারে অরণ্য নিবাসী তপােপরায়ণ সংবর্তের সাক্ষাৎ মিলিবে। এই কথা স্মরণ করিয়া রাজা নারদকে বলিলেন,-ঋষিবর ! আপনি যে সত্যুক্তি দিলেন, তাই শুনে আমার প্রাণে যে কি আনন্দ হচ্ছে তা বলবার নয়, তবে প্রভু সংবৰ্ত্ত কোথায় আছেন? কোথায় গেলে তার দেখা পাব, দেখা পেলেই বা কি বলব, এই সব আপনি দয়া করে বলে দিন, নচেৎ আমি তার কাছে যেতে সাহস পাচ্ছিনা। যদি তিনিও আমায় উপেক্ষা করেন, তাহলে জানবেন আমি এ প্রাণ আর রাখব না। দেবর্ষি নারদ রাজাকে স্তোকবাক্যে তাহার দুঃখ প্রশমিত করিয়া বলিলেন,-মহারাজ! সংবর্তের সাক্ষাৎ পাওয়া উপস্থিত অধিক কষ্টকর নয়। তিনি এতই শিবভক্ত হয়ে উঠেছেন যে, তিনি প্রত্যহ প্রাতঃকালে বিশ্বেশ্বরকে দর্শন করবার মানসে মন্দিরে প্রবেশ করেন। তুমি বারাণসীতে গিয়ে বিশ্বেশ্বরের মন্দিরের দ্বারে একটা মৃতদেহ রেখে দেবে। যাকে দেখবে সেই শবটা দেখে মন্দিরে না ঢুকে পালাচ্চে তুমি সেই লােকের পিছু নিবে, এবং তাঁকে নির্জনে পেয়ে সকল কথা বলবে। আমার কথা জিজ্ঞাসা করলে বলবে, দেবষি আপনার সন্ধান বলে তিনি অগ্নিমধ্যে প্রবেশ করেছেন। দেবর্ষি নারদ রাজাকে এইরূপ উপদেশ দান করিয়া প্রস্থান করিলে,
ইন্দের
দর্পচূর্ণ
মরুও তাহার বাক্য অনুযায়ী বারাণসীতে গমনপূৰ্ব্বক বিশ্বেশ্বরের মন্দিরের
দ্বারে এক মৃতদেহ স্থাপিত করিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে মহষি সংব
সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া শবদেহ দর্শনমাত্র প্রস্থানােদ্যত হইলে
নরুত্ত তাহার অনুগমন
করিলে ন। কিছু দূর
গমনের পর এক নির্জন
স্থানে সংবত্তের সম্মুখীন
হইলেন। সংবর্ত রাজাকে
দর্শনমাত্র অতিশয় ক্রুদ্ধ
হইয়া তাহার গাত্রে
কদম, শ্লেষ্মা ও নিষ্ঠাবন
নিক্ষেপ করিতে লাগি-
বলেন।
তথাপি মরুত্ত
হইল ন
তাহাকে প্রসন্ন করিবার
নিবৃত্ত
,
মানসে তাহার পশ্চাতে
পশ্চাতে গমন করিতে
তাহাকে প্রসন্ন করিবার মানসে পশ্চাতে পশ্চাতে
লাগিলেন। পরিশেষে
সংবর্ত অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হইয়া যখন এক বৃক্ষতলে আশ্রয়
করিলেন, তখন মহারাজ মরু করযােড়ে অতি দীনভাবে তাহার
সমীপে দণ্ডায়মান রহিলেন।
৮৪
গবেণু
রাজাকে তদবস্থ দেখিয়া মহষি সংবৰ্ত বলিলেন,-রাজ, আমার
নিকট আগমনের কারণ কি? কেই বা আমার সন্ধান বলে
দিল ! যদি সত্য সত্যই আমার সহিত সাক্ষাতের তােমার বিশেষ
প্রয়ােজন হয়, তাহলে তােমার সকল মনােরথ পূর্ণ হবেই হবে ;
আর যদি মিথ্যা করিয়া আমার সন্ধান জানতে এসে থাক, তাহলে
তােমার মৃত্যু নিশ্চিত জেনো।
মরুও বলিলেন,-ভগবন! আমি অকারণে আপনার নিকট
আসিনি, বিশেষ কাৰ্যবশতই এসেছি। আমার অন্তরের দুঃখ
ঋষিরাজ অবগত হয়ে, তিনি আপনার নির্দেশ বলে দেন তাতেই
আপনার সাক্ষাৎ পেয়ে যে, কি পৰ্য্যন্ত উপকৃত হয়েছি তা বলবার
নয়।
সংবৰ্ত্ত সহাস্যে বলিলেন, রাজন, তুমি যথার্থই বলেছ।
এক্ষণে নারদ কোন্ স্থানে অবস্থান করছেন বলতে পার ?
রাজা বলিলেন,-দেবষি, আপনার সন্ধান ও আপনার নিকট
আসতে বলে দিয়ে, অগ্নিমধ্যে প্রবেশ করেছেন।
ইহাতে সংবৰ্ত্ত রাজার প্রতি তুষ্ট না হইয়া রুষ্ট হইলেন।
বলিলেন, তুমি কি বলে আমার নিকট এলে? তুমি ত আমার
বিষয় সবই জান,জান যে আমার মনের ঠিক নাই, কখন কি করে
বসি তার ঠিক ঠিকানা নাই। এ লােককে নিয়ে তােমার কি কাজ
হবে ? তার চেয়ে আমার পরম পূজ্য, শ্রেষ্ঠ ও জ্যেষ্ঠ মহষি বৃহস্পতি
যিনি দেবরাজ ইন্দ্রের পৌরােহিত্য করছেন তাকে দিয়ে যজ্ঞ সমাপন
ইন্দ্রের দর্পচূর্ণ কর তাতে ফল খুব ভালই হবে। আমিও তার অনুমতি ব্যতীত কোন কাজে যােগ দিতে পারব না। অতএব তােমার যদি আমার দ্বারা যজ্ঞ করাবার ইচ্ছা হয়ে থাকে, দাদার অনুমতি নিয়ে এস তাতে আমি দ্বিরুক্তি করব না। রাজা বলিলেন,-ব্রাহ্মণ ! আপনার নিকট উচিত কথা বলতে দোষ কি, আমি আপনার দাদা কুলগুরু বৃহস্পতির নিকট গিয়াছিলাম। তিনি এক্ষণে দেবরাজ ইন্দ্রের পৌরােহিত্য করছেন--তিনি বলেছেন, মর্তে কারও যাজন ক্রিয়ায় যােগদান করবেন না, এমন কি আমারও । বিশেষ সুররাজ ইন্দ্র আমার প্রতি হিংসাপরবশ হয়ে তাকে আমার যজ্ঞে পৌরােহিত্য করতে নিষেধ করে দিয়েছেন ; আর আপনার ভ্রাতাও ইন্দ্রের সেই বাক্যে সম্মত হয়েছেন। আমি স্নেহবশতঃ তার নিকট গমন করেছিলাম, তিনি আমায় অকারণে লাঞ্ছিত করে বিতাড়িত করেছেন,তাই আপনার আশ্রয়ে এসেছি। ইন্দ্র যেমন আমার যজ্ঞে বিপ্ন উৎপাদন করতে বদ্ধপরিকর হয়েছেন, আমিও ইন্দ্রের দর্প চূর্ণ করবার জন্যে যথাসর্বস্ব দিয়ে আপনার দ্বারা যজ্ঞ সমাধা করবার মনন করেছি। মহাত্মন্ ! দয়া প্রকাশে আমায় এ দায় হতে উদ্ধার করুন। মহর্ষি সংবৰ্ত্ত বলিলেন,-রাজন, আমি যদি তােমার পক্ষ নি, তার পরিণাম একবার ভেবে দেখেছ কি? আমি পৌরােহিত্য করতে গেলেই, ইন্দ্র ও বৃহস্পতি তােমার ভয়ানক শত্রু হয়ে দাড়াবেন। সেই সময়ে ভয়ে তুমি আমায় ছেড়ে দিয়ে ওদের দলে গিয়ে পড়বে।
গল্পবেণু সেই ধাক্কা সামলাতে পারবে কি না সেইটিই ভাববার কথা ! আর যদি তাই হয়, তুমি জানবে, তােমারও নিস্তার নাই, তােমায় আমি সবংশে নিপাত করব তা তুমি জেন ! তাই বলি, যা বলতে হয় এই সময় ভেবে চিন্তে বল। রাজা বলিলেন,-ভগবন! আপনার কাছে আমার প্রতিজ্ঞা এবং চন্দ্র সূৰ্য্য সাক্ষী করে বলছি, আমি জীবনে কখনও আপনাকে পরিত্যাগ করব না,-এবং এ কথা যদি মনেও উদয় হয়, তাহলে যেন আমার নরক বাস হয়। রাজার এইরূপ প্রতিজ্ঞায় মহর্ষি সংবৰ্ত্ত মহা খুশি হইয়া বলিলেন,-রাজন্ ! তােমার সরল বাক্যে কি পর্যন্ত যে আনন্দ লাভ করলাম তা বলবার নয় । এক্ষণে যজ্ঞ কার্যে কি করা উচিত তাই উপদেশ দিতেছি মন দিয়ে শুন। হিমালয়ের অনতিদূরে মুঞ্জমান নামে এক পৰ্বত আছে। ঐ পৰ্বতের উচ্চ শিখরে হর-গৌরী ভূত, প্রেত প্রভৃতি সঙ্গী লয়ে বাস করছেন। তুমি অন্যান্য দেবতা যথা, কুবের, বরুণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয় প্রভৃতি প্রধান প্রধান দেবতাদিগের অনুকরণে দেবাদিদেবকে নমস্কার করে তঁার শরণাপন্ন হলে দেখবে কোথা হতে তাল তাল সােনা তােমার জন্য রক্ষিত হয়েছে,“তুমি সেই সােনা হতে যজ্ঞপাত্র নির্মাণ করবে। অতএব তুমি এই বেলা মুঞ্জমান পৰ্বতে সােনা আনতে লোক পাঠিয়ে স্বয়ং তথায় গমন কর । মহাত্মা সংবৰ্ত্ত এইরূপ উপদেশ প্রদান করিলে, মহারাজ মরুত্ত ক্ষণবিলম্ব না করিয়া মুগ্ধমান পৰ্বতে গমন পূৰ্ব্বক ভবানীপতির স্তব ইন্দ্রের দর্পচূর্ণ ৮৭ করিতে লাগিলেন। মহাদেব স্তবে তুষ্ট হইয়া রাশি রাশি সুবর্ণ রাজাকে প্রদান করিলেন। সেই সুবর্ণে শিল্পী কর্তৃক নানাবিধ পাত্র নির্মিত হইল। এদিকে বৃহস্পতি রাজা মরুত্তের যজ্ঞের সমারােহ ব্যাপারের কথা অবগত হইয়া যখন জানিলেন যে, ঐ সকল সুবর্ণ নিম্মিত সামগ্রী যজ্ঞের পুরােহিত তার ভ্রাতা সংবৰ্ত্তকে দান করা হইবে, তখন বৃহস্পতির ক্ষোভ ও দুঃখের সীমা রহিল না, ভ্রাতার ঐশ্বর্যের কথা চিন্তা করিয়া তাহার শরীর দিন দিন বিবর্ণ হইতে লাগিল। কুলগুরু বৃহস্পতিকে সন্তপ্ত দেখিয়া দেবরাজ সাঙ্গপাঙ্গ লইয়া বৃহস্পতিকে নিবেদন করিলেন,—মহাত্মন্ ! আপনার বিমর্ষভাবের কারণ কি? আমার লােকের দ্বারা আপনার যদি কিছু ত্রুটি হয়ে থাকে দয়া করে বলুন, আমি তৎক্ষণাৎ উহার খণ্ডন করব। আপনাকে দিন দিন ক্ষয় পেতে দেখে মনে হয়, আমার লােকেরা আপনার সেবা শুশ্রুষা ঠিক করতেছে না। বৃহস্পতি বলিলেন,-না দেবরাজ, আমার সেবা শুশ্রুষার কোন ত্রুটি হয় নাই ; তারা নিরন্তর আমার সেবায় নিযুক্ত থাকে, তাদের মঙ্গল হােক্। দেবেন্দ্র বলিলেন, তবে আপনার মুখশী দিন দিন মলিন ভাব ধারণ করতেছে এর কারণ কি ? নিশ্চয় এমন কিছু ঘটেছে যাতে আপনাকে পীড়িত করছে। এবং যারা আপনার মনােবেদনার কারণ তাদের আমি যৎপরােনাস্তি সাজা দিয়ে আপনাকে তুষ্ট করব। বৃহস্পতি বলিলেন,- দেবরাজ, আমি শুনেছি রাজা মরু প্রভূত ৮৮ গল্পবেণু দক্ষিণাদান দিবার ব্যবস্থা করে এক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেছে। আমার ভ্রাতা সংবৰ্ত্ত সেই যজ্ঞে পৌরােহিত্য করবেন । এক্ষণে আমার ইচ্ছ। এই যে, সংবৰ্ত মরুত্তের যাজন কাৰ্য্য না করে। সুররাজ ইন্দ্র বলিলেন,—প্রভু! এতে আপনার ক্ষোভের কারণ ত কিছু দেখি না। আপনি দেবগণের পুরােহিত, আপনার সকল কামনাই পূর্ণ হয়েছে ; সংবৰ্ত্ত আপনা হতে অনেক নিকৃষ্ট, তাকে ভয় করবার কি আছে ? বরং সেই আপনাকে ভয় করবে। বৃহস্পতি বলিলেন,-দেবরাজ, তুমি নিজের দিক হতে দেখ না কেন, যখন অসুরগণের মধ্যে কেহ প্রবল হয়ে উঠে, তুমি তখনই তাকে দমন কর, শত্রুকে বাড়তে দাও না। সংবৰ্ত্ত আমার মহা শত্ৰু, তার বৃদ্ধি আমার পক্ষে অসহ্য ! মরুত্তের যাজন ক্রিয়া করে, প্রভূত ঐশ্বৰ্য্য লাভ করে, সে যে আমায় অতিক্রম করবে, এ আমি কখনই বরদাস্ত করতে পারব না ! ঐ ভাবনাই আমার প্রবল হয়েছে, আমায় জীর্ণ শীর্ণ করে ফেলেছে! যদি আমার মঙ্গল চাও উভয়ের মধ্যে একজনকে নিপাত কর ! ., সুরগুরু বৃহস্পতি এ কথা কহিলে দেবেন্দ্র অগ্নিকে বলিলেন,- হুতাশন, তুমি গুরুদেবকে সঙ্গে ল'য়ে মরুত্ত রাজাকে গিয়ে বল, এই সুরগুরু তােমার যাজন ক্রিয়া সমাপন পূর্বক তােমায় অমরত্ব দান করবেন। দেবরাজের আজ্ঞামাত্র হুতাশন তঁাহার তেজোময় শরীর ধারণ পূর্বক প্রচণ্ড উল্কাপিণ্ডের ন্যায় বৃহস্পতির সহিত মরুত্তের নিকট
ইন্দ্রের দর্পচূর্ণ
উপস্থিত হইলেন। মরুও কর্তৃক বিবিধ প্রকারে সম্মানিত ও পাছ
অর্ঘ্য দিয়া সংপূজিত হইয়া বলিলেন,“রাজ, তােমার অভ্যর্থনায়
বড় আনন্দ লাভ করলাম।
মরু ও
ব লি -
লেন,অতি উত্তম।
দেবরাজ ইন্দ্রের সব
কুশল ত?
তিনি
আমাদিগের
সন্তুষ্ট আছেন ত ?
অগ্নি বলিলেন,-
রা জন, সু র রাজের
সব কুশল।
তিনি
তােমার শুভাকামী,
অন্য অন্য দেবতারাও
তােমাকে প্রীতির চক্ষে
দেখেন। তিনি কুল
বৃহস্পতিকে
তাে মা র
নিকট
যদি আমার মঙ্গল চাও, উভয়ের মধ্যে একজনকে
পাঠিয়েছেন, কারণ
এই যে, তােমার যজ্ঞের ভার এই বৃহস্পতিকে দিয়ে যাজন ক্রিয়া
সম্পাদন করে অমরত্ব লাভ কর।
গল্পবেণু মরুও বলিলেন,--মহাত্মন ! মহষি সংবৰ্ত্ত আমার যাজন ক্রিয়া সম্পাদনে ব্রতী হয়েছেন। আর বৃহস্পতিই বা অমর দেবরাজের পৌরােহিত্য ত্যাগ করে, মৃত্যুর বশবর্তী মরুত্তের যাজন ক্রিয়া কেমন করে করবেন। অগ্নি বলিলেন,-তা হােক, দেবরাজ তাতে কিছু অপমানিত বােধ করবেন না, বরং সন্তুষ্ট হবেন এবং আপনার যশ, মান, আয়ু বৃদ্ধি হয়ে অক্ষয় স্বর্গ লাভ হবে । এই রকমে অগ্নি মরুত্তকে বিবিধ বাক্যের দ্বারা প্রলােভিত করিতে লাগিলেন। সংবৰ্ত আর স্থির থাকিতে না পারিয়া ক্রোধে অগ্নিশর্মা হইয়া বলিলেন,-অনল ! তুমি এই দণ্ডেই প্রস্থান কর ! আর কখন বৃহস্পতিকে নিয়ে মরুত্ত রাজার কাছে এস না! যদি আবার দেখি ! তােমায় সেই দণ্ডেই ভস্ম করে ফেলব । হুতাশন একান্ত ভীত হইয়া কঁপিতে কাপিতে বৃহস্পতির সহিত সুররাজের নিকট উপস্থিত হইলেন। দেবরাজ উহাদিগকে প্রত্যাগত দেখিয়া বলিলেন, -হুতাশন, তােমার সঙ্গে বৃহস্পতিকে মরুত্ত রাজার নিকট পাঠিয়ে দিলাম, তুমি তাঁকে নিয়ে ফিরে এলে এর কারণ কি ? অগ্নি বলিলেন,-রাজন্ ! মরুত্তকে আপনার সকল কথাই বললাম। কিন্তু পূর্বেই তিনি সংবৰ্ত্তকে যজ্ঞের ভার অর্পণ করায় প্রত্যাখ্যান করলেন,--- আমার বারংবার অনুরােধ পারলেন না। সে বললে সংবৰ্তই আমার যাজন ক্রিয়া সম্পন্ন ইন্দ্রের দর্পচূর্ণ করবেন। তারপর বললে কি জানেন, -বৃহস্পতি যজ্ঞ করলে যদি আমি উৎকৃষ্ট মনুষ্যলােক ও সসাগরা পৃথিবীর রাজা হই, তবু আমি সুরগুরু দ্বারা যজ্ঞ সমাপন করব না। দেবরাজ ইন্দ্র তথাপি নিরস্ত হইলেন না, বলিলেন,-হুতাশন, তুমি পুনরায় মরুত্ত রাজার কাছে যাও। যদি এবারেও সে আমার কথা না রাখে, তাহলে তাকে বজ্র প্রহার করব। অগ্নি বলিলেন,-রাজেন্দ্র, আমি আর পারব না। সংবর্তের যে মূর্তি দেখে এসেছি, এবারে গেলে নিশ্চয় ভস্ম করে ফেলবেন। তিনি স্পষ্টই বলে দিয়েছেন, যদি তুমি পুনরায় বৃহস্পতিকে সঙ্গে নিয়ে এখানে এস, তাহলে তােমায় ভস্ম করে ফেলব, কেউ তােমায় রক্ষা করতে পারবে না। ইন্দ্র হাসিয়া বলিলেন,-বল কি ! তােমায় ভস্ম করবে । কি কখন সম্ভব! তুমিই ত সকলকে ভস্ম করে বেড়াও, তােমার ওপর কে আছে তা ত জানি না! তুমি নিতান্ত বাতুলের মত কথা ব’লছ, তােমার মুখে এ কথা শােভা পায় না। অগ্নি বলিলেন,—আচ্ছা, আপনার কথা ভেবে দেখুন দেখি। আপনি ত্রিলােকের অধীশ্বর, তেত্রিশ কোটি দেবতা আপনার অধীন, তবে কেন বিত্ৰাসুর আপনাকে পরাস্ত করে স্বর্গরাজ্য অধিকার করেছিল। দেবরাজ নিজের পরাক্রমের কথা উল্লেখ করিয়া আস্ফালন পূৰ্ব্বক..বলিতে লাগিলেন,সে কি জান, দুর্বলের প্রতি বলপ্রকাশ কাপুরুষের কাৰ্য। তুমি কি আমার বলের কথা - অবগত নও।
গল্পবেণু দুৰ্বত্ত কালকেয়গণ যখন অত্যন্ত অত্যাচারী হয়ে উঠে, তখন তাদের পৃথিবী থেকে বিতাড়িত করে কি দুর্দশা করেছিলাম তা তুমি জান । আর দানব কোন্ ছার, স্বর্গ হতে প্রহ্লাদকে পর্যন্ত দূরীভূত করেছি। মরুত্ত ত মর্তের লােক। ও আমার সঙ্গে শত্রুতা করে ক’ দিন বাঁচবে। অগ্নি বলিলেন,-দেব, শৰ্যাদি রাজার যজ্ঞকালে মহর্ষি চ্যবন যখন যজ্ঞভার গ্রহণ করে অশ্বিনীকুমারদিগের সহিত সােমরস পান করেন, তখন আপনি নিষেধ করেছিলেন। তিনি আপনার কথায় কর্ণপাত করেন নাই। আপনি রাগে বজ্র প্রহার করতে উদ্যত হয়েছিলেন, কিন্তু চ্যবন তাতে ভ্রুক্ষেপ না করে তপােবনে মদ নামে এক বিকটাকার অসুরের সৃষ্টি করেছিলেন। সেই অসুর যখন শূল উদ্যত করে আপনার প্রতি ধাবিত হয়, তখন আপনি প্রতিরোেধ করে তার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। অতএব, হে দেবেন্দ্র, এতে বেশ বুঝা যায় না কি যে, ক্ষত্রিয় বল অপেক্ষা ব্ৰহ্মবল শ্রেষ্ঠ, আর ব্রাহ্মণ অপেক্ষা বলবান আর কেহ নাই। আমি ব্ৰহ্মতেজ বিলক্ষণ অবগত আছি বলেই সংবৰ্ত্তকে ভয় করি। ইন্দ্র বলিলেন,-ব্ৰহ্মতেজ ক্ষত্রিয়বল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ইহা আমি অবগত হয়েও মরুত্ত রাজার দর্প চূর্ণ করবই করব। তাকে বজ্র প্রহার করে নিপাত করব তবে আমার নাম। পরে গন্ধর্বপতি ধৃতরাষ্ট্রকে বলিলেন,-তুমি শীঘ্র মরু রাজার নিকট যাও এবং তাকে বল, সে যদি বৃহস্পতিকে পৌরােহিত্যে বরণ না করে তাহলে দেবরাজ তােমায় বজ্রাঘাতে নিপাত করবে।
ইন্দ্রের দর্পচূর্ণ দেবরাজের আজ্ঞামাত্র ধৃতরাষ্ট্র মরুরাজের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেন,-মহারাজ আমার নাম ধৃতরাষ্ট্র, আমি গন্ধৰ্ব্বকুলে জন্মগ্রহণ করেছি,এক্ষণে দেবরাজ ইন্দ্র যে জন্য আপনার নিকট আমায় প্রেরণ করেছেন, তা বলি শুনুন। দেবেন্দ্র বলেছেন, যদি আপনি বৃহস্পতিকে পৌরােহিত্যে বরণ না করেন, তিনি নিশ্চয়ই আপনার প্রতি বর্জ প্রহার করবেন। মরুত্ত বলিলেন,-গন্ধৰ্ব্বরাজ, শুনে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি যে, দেবতাকুলে জন্মগ্রহণ করে এত নীচ প্রবৃত্তি কি করে হ’ল । তােমরা কি জাননা, যে-লােক মিত্রদ্রোহী,-সে ব্রহ্মহত্যা পাপে লিপ্ত হয়। এ কথা কি তােমার, কি ইন্দ্রের কি বস্তুগণের, কি অশ্বিনীকুমার দ্বয়ের কারও বিদিত নাই ? কিন্তু আমি কখনই আমার পরম মিত্র সংবৰ্ত্তকে পরিত্যাগ করে বৃহস্পতিকে পৌরােহিত্যে বরণ করব না। সুরগুরু বৃহস্পতি বজ্রধর দেবরাজের পৌরােহিত্য যেমন করেছেন তেমনি করতে থাকুন, আর মহর্ষি সংবৰ্ত্ত আমার যজ্ঞ সম্পাদন করুন, এই আমার শেষ কথা, ইহার অন্যথা আমি প্রাণ গেলেও করতে পারব না। এই কথা শেষ হইবামাত্র ধৃতরাষ্ট্র উর্ধদিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিলেন,-মহারাজ ঐ দেখুন ভগবান শতক্রতু আপনার প্রতি বজ্র নিক্ষেপ করবার জন্য আকাশ পথে ভীষণ সিংহনাদ কচ্ছেন। যদি নিজের মঙ্গল চান এখনও মতি পরিবর্তন করুন। গন্ধর্বরাজ এ কথা কহিলে, মরুত্ত অতিমাত্র ভীত হইয়া মহষি 5 4 ৪ ১৪ গল্পবেণু সংবৰ্ত্তকে বলিলেন,—ভগবন্! সুররাজ অনেক দূরে আছেন বলেই, আমরা দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু নিকটে এসে যদি বজ্রপ্রহার করেন, তাহলে আর নিস্তার নাই, আমরা এবং সভাস্থ সকলেই কাল কবলে পতিত হব। ঐ দেখুন দেবরাজ বজ ধারণ পূর্বক দশদিক আলােকিত করে আসছেন। উহার ভয়ঙ্কর নিনাদে সভাস্থ সকলেই সন্ত্রাসিত ও ব্যাকুলিত হচ্ছে। সংবৰ্ত্ত বলিলেন,-মহারাজ, ইন্দ্র হতে তােমার কিছুমাত্র ভয় নাই। আমি বিদ্যাপ্রভাবে উহার সমুদয় কাৰ্য পণ্ড করে দেব। হুতাশন তােমার মঙ্গল বিধান করুন আর নাই করুন, ইন্দ্র তােমার বিপক্ষে বজ্রপ্রহার করুন বা না করুন, তােমার কোন চিন্তা নাই, তুমি নিশ্চিন্ত চিত্তে থাক, তােমার কেশাগ্রও কেহ স্পর্শ করতে পারবে । এক্ষণে কি করলে তুমি সুখী হও বল, আমি তাই করব। মরুত্ত বলিলেন,-ভগবন্! আমার একান্ত ইচ্ছা দেবগণ সঙ্গে দেবরাজ এ যজ্ঞে উপস্থিত হন। সংবর্ত বলিলেন,-এই কথা !–ঐ দেখ, দেবরাজ সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে যজ্ঞে উপস্থিত হচ্ছেন। কথা শেষ হইতে না হইতে দেবরাজ, দেবগণ সঙ্গে যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হইয়া যজ্ঞীয় সােমরস পানে রত হইলেন; এবং সেই হইতে পরস্পরের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপিত হইল।
গােবিন্দ হাড়ী 5. jit এক ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী। সংসারে একমাত্র কন্যা ছাড়া আর কেহ ছিল না। বড় গরীব। কষ্টে-সৃষ্টে সংসার চলে। কন্যার বিবাহ কাল উপস্থিত। ব্রাহ্মণী ব্রাহ্মণকে উত্ত্যক্ত করে,তুমি বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে তাছ, মেয়ের বিয়ের নাম পর্যন্ত কর না, কেন বলত । ব্রাহ্মণ বলে,-দেখ ব্রাহ্মণী, আমি বসে নাই,—হেন জায়গা নেই যেখানে না গেছি, সকলেই টাকা চায়। তােমার মেয়ে রাধিকা রূপসী হলে কি হবে, রূপ কেউ চায় না, চায় টাকা ; আমাদের টাকার অভাব কি করে মেয়ের বিয়ে হবে, তাই ভেবে সারা হচ্ছি। ব্রাহ্মণীর তাতে রাগ পড়ল না, চোক মুখ ঘুরিয়ে বললে, তােমার ও কথা শুনতে চাই নে! রােজ রােজ ঐ এক কথা শুনে কান ঝালা ফালা হয়ে গেছে। এই বলে দিচ্ছি, তিন দিনের ভেতর যদি মেয়ের বিয়ে না দাও তাহলে আমি কি অনর্থ ঘটাব তা দেখে নিও। •
গল্পবেণু
ব্রাহ্মণও বললে,-দেখ ব্রাহ্মণী ! তিন দিন কেন, আমি প্রতিজ্ঞা
করছি, আজ প্রাতে বিছানা থেকে উঠে যার মুখ দেখব তারই সঙ্গে
রাধির বিয়ে দোব ;-জাত, কুল, মানব না, এই এক কথা দেখে নিও।
প্রাতে শয্যাত্যাগ করে চোক মুছতে মুছতে সদর দরজায় পা
দিতেই ব্রাহ্মণ দেখলে একুশ বাইশ বছরের এক যুবক গুটিকত
শূয়াের নিয়ে সামনের মাঠ দিয়ে চলেছে।
ব্রাহ্মণ তাকে বাড়িতে ডেকে বললে,-তােমার বিয়ে হয়েছে ?
এখনও হয় নি।
আমার একটি মেয়ে আছে, দেখতে খুব সুন্দরী, তাকে বিয়ে
করবে ?
গলায় পৈতে দেখে মনে হচ্ছে আপনি ব্রাহ্মণ,আপনার
কন্যাকে বিবাহ করব এ কেমন কথা!
তুমি কি ?
আমি জাতিতে হাড়ী, শূয়াের চরিয়ে বেড়াই।
তা হােল্ক আমি তােমাকেই মেয়ে দোব, তুমি আমার মেয়েকে
বিয়ে করবে কিনা বল ?
এই বলে ব্রাহ্মণ মেয়ে রাধিকাকে ডাকিয়ে যুবককে দেখিয়ে দিলে,
বললে,-এই আমার মেয়ে। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, আজ প্রথমে যার
সঙ্গে দেখা হবে সেই আমার জামাতা।
পরে ব্রাহ্মণ কাতর হয়ে বললে,-তুমি বিয়েতে অমত কর না
বাবা, এ ব্রাহ্মণকে কন্যাদায় হতে উদ্ধার কর ।
গােবিন্দ হাড়ী ৯৭ যুবক একটু চিন্তা করে বললে, আপনার ইচ্ছায় আমার ইচ্ছা। ব্রাহ্মণ স্বর্গ যেন হাতে পেলে, আহলাদে গদ গদ হয়ে বললে,- জয় হােক্ মঙ্গল হােক্, একশ বচ্ছর পরমায়ু হােক্ !-তােমার নাম কি বাবা ? আমার নাম গােবিন্দ হাড়ী। শ্রীকৃষ্ণের আর একটি নাম গােবিন্দ, আর আমার মেয়ের নাম রাধিকা, বেশ মিল খেয়েছে। এস বাবা এস, আজ আমার বাড়িতে খাওয়া দাওয়া কর, রাত্তিরে দুই হাত এক করে কন্যাদায় হতে উদ্ধার হয়ে গঙ্গা স্নান করে বাঁচব। এই বলে ব্রাহ্মণ ভাবী জামাতা গােবিন্দ হাড়ীর দুই হাত ধরে তাকে আদর করে ঘরে বসিয়ে, কুটুম্ব গৃহে নিমন্ত্রণ করতে ছুটল। কিন্তু ব্রাহ্মণের অনাচারে কেহই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন না, বরং ঐ বিবাহে সে যে সমাজচ্যুত হবে এই ভয় দেখালে। ব্রাহ্মণ তা'তে ভয় না পেয়ে, সেই রাত্রেই গােবিন্দের সহিত কন্যা রাধিকার উদ্বাহ ক্রিয়া সম্পন্ন করলে। পরদিন প্রাতে শুভকাৰ্য্য সম্পন্ন হবার পর বর ব্রাহ্মণকে বললে,-এইবার আমার গৃহে আপনার কন্যাকে নিয়ে যাবার অনুমতি পেতে পারি কি ? | নিশ্চয়। যখন তুমি আমার কন্যার পাণিগ্রহণ করেছ, তখন এ কন্যা এখন আর আমার নাই,তােমার। তুমি একে যথা ইচ্ছা নিয়ে যেতে পার, এতে আমার অমত থাকতে পারে না।
৯৮ গল্পবেণু ব্রাহ্মণের অনুমতি পেয়ে বর, এক হাতে কনে ও অপর হাতে শূকরদের গলার দড়ি ধরে মাঠের ওপর দিয়ে চলল । যতক্ষণ দৃষ্টি চলল ব্রাহ্মণ ততক্ষণ তাদের দিকে সতৃষ্ণ নয়নে চেয়ে রইল, তারপর যখন তার দেখা গেল না, তখন চোখের জল মুছতে মুছতে বাড়ির ভেতর ঢুকল। ঢুকতেই ব্রাহ্মণীর কর্কশ স্বর তার কানে গেল। নিকটে যেতে ব্রাহ্মণী ব্রাহ্মণকে বললে, জাত-কুল ক্ষুইয়ে বেশ নিশ্চিন্ত হলে, একটা হাড়ীর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়ে মেয়েটাকে একেবারে বনবাসী করলে। তারপর একবার ভাবলে না মেয়েটা কোথায় গেল । সে সব ত জানতে হয় ! মেয়ে খোঁজ খবর নিতে হলে জামায়ের ঘর দোর ত সব জানতে হয় ! শু মেয়ে পার করলেই হয় না। ব্রাহ্মণীর কথায় ব্রাহ্মণের টনক নড়ল । সে যে, জামায়ের বাড়ি, ঘর, দোরের কথা না জেনে ভাল করে নি তা বুঝল, বুঝে ব্রাহ্মণীকে মিষ্ট কথায় বললে,-বড় ভুল হয়ে গেছে ব্রাহ্মণী ! সত্যই ত, মেয়েটাকে যার হাতে সঁপে দিলাম, নামটা ছাড়া তার বাড়ি, ঘর দোরের কোন ঠিকানাই ত জিজ্ঞেস্ করিনি! আচ্ছা, তারা ত এই পথে গেছে, এক দৌড়ে আমি জিজ্ঞেস্ করে আসছি। ব’লে যেদিকে জামাই,-মেয়ে ও শূয়ােরগুলােকে নিয়ে চলেছে। সেই দিকে ছুটল। ব্রাহ্মণকে বেশি দূর ছুটতে হ’ল না। খানিক দূর যেতেই দেখলে, শুয়ােরগুলােকে নিয়ে একটা গাছতলায় বসে জামাই ও
গােবিন্দ হাড়ী
মেয়ে উভয়ে কথা-বার্তা কইছে।
ব্রাহ্মণ তাদের নিকট উপস্থিত
*** *** ***
অমনি গাছটা সা সা করে যেতে লাগল।
হতেই গােবিন্দ প্রণাম করে বললে,আপনি আমার নিকট যখন
ছুটে এসেছেন, তখন নিশ্চয় কিছু খবর আছে,—কি খবর বলুন?
১০০
গবেণু
দেখ বাপধন! তােমায় আমি আমার কথা সম্প্রদান করেছি
বটে, কিন্তু তােমার নাম ও জাতের পরিচয় ছাড়া অন্য পরিচয় তােমায়
আমি জিজ্ঞাসাও করিনি আর তুমিও আমায় বলনি। সেই ভুলটা
মনে পড়ায় তােমার বাড়ির ঠিকানা জানতে এসেছি।
তা ত বটেই, আমারও বলতে ভুল হয়ে গেছে, মাপ করবেন ।
আমার ঠিকানা আর কি দোব,--এই যে গাছের তলায় বসে আছি,
এই গাছকে বললেই হবে,—“বৃক্ষ ! গােবিন্দ হাড়ীর ঠিকানায় নিয়ে
চল।” এই কথা বললেই গাছের একটা মােটা ডাল মাটিতে নুইয়ে
পড়বে, আর আপনি সেই ডালে চড়ে চোখ বুজে বসে থাকবেন, গাছ
চলতে চলতে যেখানে থামবে, সেইখানে চোখ খুললেই একটা লােককে
দেখতে পাবেন, তাঁকে আমার ঠিকানা জিজ্ঞেস করলেই তিনি
বলে দেবেন।
জামায়ের বাড়ির এমন অদ্ভুত ঠিকানা জেনে ব্রাহ্মণ অবাক হয়ে
ঘরে ফিরল, ব্রাহ্মণীকে সব কথা বললে, ব্রাহ্মণীও ভাবলে, তাই
ত, কি ব্যাপার!
রাধিকার বিবাহের পর দেখতে দেখতে ছমাস কেটে গেল ।
ব্রাহ্মণী একদিন কষ্টে-সৃষ্টে গুটিকত সন্দেশ তৈরী করে ব্রাহ্মণকে
বললে,-দেখ আমি চেয়ে-চিন্তে ছানা চিনি যােগাড় করে এই
সন্দেশ মেয়ে জামায়ের জন্যে করেছি,
জন্যে করেছি, তুমি এই হাঁড়িটা
নিয়ে মেয়ের কাছে যাও এবং তারা কেমন আছে সেই খবর
নিয়ে এস।
গােবিন্দ হাড়ী
१०७
ব্রাহ্মণ সন্দেশের হাঁড়িটা নিয়ে সেই গাছের কাছে গিয়ে বললে,-
বৃক্ষ, আমায় গােবিন্দ হাড়ীর বাড়িতে নিয়ে চল ।
বলবামাত্র গাছের একটা মােটা ডাল মাটিতে নুয়ে পড়ল।
ব্রাহ্মণ সন্দেশের হাঁড়িটা মাথায় নিয়ে চোখ বুজে সেই গাছের ডালে
চুপটি করে বসে রইল। অমনি গাছটা সা সা ক'রে যেতে লাগল।
তানেকক্ষণ যাবার পর গাছটা থেমে গেল। ব্রাহ্মণ চোখ চেয়ে দেখি,
সে একটা মস্ত চৌমাথায় এসে পড়েছে। চারিদিকে বড় বড়
বাগানবাড়ি। বাগানে রাশি রাশি ফুল ফুটে রয়েছে সেগন্ধে
চারদিক আমােদিত। ব্রাহ্মণ হতবুদ্ধির ন্যায় দাড়িয়ে আছে, এমন
সময় একজন ভদ্রলােক একটা বাগান থেকে বেরিয়ে ব্রাহ্মণকে
জিজ্ঞেস্ করলেন, আপনি কোথা যাবেন ?
আমি গােবিন হাড়ীর বাড়িতে যাব।
বটে,-আপনি এই উত্তর দিকের বড় রাস্তা ধরে সমান চলে
যান। যেখানে এই রাস্তা শেষ হবে, আর যাবার পথ নাই দেখবেন,
সেই বাড়িখানা গােবিন্দ হাড়ীর ।
ব্রাহ্মণ উত্তর দিকে চলল। খানিক দূর গিয়ে দেখলে, দুটো
যমদূতের মত নােক একজনকে ধরে তার মুখখানা সজোরে পাথরে
ঘসছে, আর লােকটার মুখ পাথরে কেটে ঝুঝিয়ে রক্ত পড়ছে, কিন্তু
আশ্চৰ্য সেই লােকটা অত পেয়েও হিঃ হিঃ ক
হাসছে !
ব্রাহ্মণ স্বচক্ষে এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। নিকটে
১০২ গল্পবেণু গিয়ে জিজ্ঞেস্ করলে,-তােমরা একে এমন করে পীড়ন করছ কেন ? এ গেমাদের কি করেছে ? যমদূত দুটো রেগে বললে,—যাও যাও ঠাকুর ! আমরা কিছু বলতে পারব না ! তুমি যার কাছে যাচ্ছ তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করগে ! ব্রাহ্মণ ভয়ে জড়-সড় হয়ে সেখান থেকে সরে পড়ল, সমান রাস্তা ধরে চলতে লাগল। আবার খানিক দূর গিয়ে দেখলে, একজন ধনীলােককে চারজন বেহারায় পাল্কি করে নিয়ে যাচ্ছে ! পাল্কির সঙ্গে তকমাপরা এক দরােয়ান চলেছে। ধনী পাল্কিতে থাকবেন , তিনি পাল্কি থেকে রাস্তায় নেমে পড়ছেন, আর দরােয়ান তাকে জোর করে পাল্কিতে তুলে দিচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে ব্রাহ্মণের মনে বড়ই বিস্ময় জন্মাল। পাল্কির কাছে গিয়ে দারােয়ানকে বললে,-এ ওপর জোর জুলুম করছ কেন ? ব্রাহ্মণের কথায় দবােয়ান দুচোখ লাল করে কণ্ঠস্বর সপ্তমে তুলে বললে,-“যাও ঠাকুর ! যাহা যাতা হায়, উসিকো যাকে পুছছ!”. ব্রাহ্মণ তার মুর্তি দেখে বুঝলে, আর একটা কথা বললেই মেরে বসবে, তাই সে আর কোন কথা না বলে চুপ চাপ সােজ। পথে চলল। পথ চলেছে ত চলেছে, বিরাম নাই,—শেষে এমন এক স্থানে এসে পড়ল যেখানে পথ শেষ হয়েছে। দেখে সামনে একটা প্রকাণ্ড বাড়ি, দ্বারে এক মস্ত ভুড়িওলা দারােয়ান পাহারা দিচ্ছে। ব্রাহ্মণ, হতবুদ্ধির মতন দাড়িয়ে ভাবতে লাগল,-এ ত
গােবিন্দ হাড়ী
দেখছি রাজার
রাজার মত
মন্ত অট্টালিকা।
তার জামাই ত শুয়াের
যাও ঠাকুর, যাঁহ যাতা হ্যায় উচিকে। যাকে পুছে••••••
চরিয়ে বেড়ায়, জাতিতে হাড়ী, সেই গরীব হাড়ীর এত বড় বাড়ি
তা স্বপ্নের অতীত। আমি কোথায় এসে পড়েছি।
১০৪ গল্পবেণু নাই ত? তাই ত কি করি ! কোথা যাই! ব্রাহ্মণ এই রকম কত কি ভাবছে, এমন সময় দেখলে তার জামাই গােবিন্দ, পূৰ্ব্বের ন্যায় গুটিকত শূয়াের নিয়ে উপস্থিত। গগাবিন্দ, শ্বশুরকে দেখে তার পদধুলি নিয়ে, প্রণাম করে, অতি সম্রমে শ্বশুরকে বাড়ির ভেতর নিয়ে গেল। মহলের পর মহল চলেছে শেষ নাই। প্রত্যেক মহল সাদা পাথরের উপর নক্সা করা, দেখলে প্রাণ জুড়িয়ে যায় । ব্রাহ্মণ দেখতে দেখতে চলেছে, যেন ইন্দ্রভবনের মাঝ দিয়ে চলেছে। এই রকম, এক মহল, দু মহল করে সাত মহল পার হয়ে দেখে, একটা সুসজ্জিত ঘরে কন্যা রাধিকা বেশভূষা ও অলঙ্কারে ভূষিত হয়ে বসে আছে,-রূপ যেন ফেটে পড়ছে। পূৰ্ব্বে রাধিকার যে রূপ, যে সৌন্দৰ্য্য ছিল, এখন যেন সেই রূপ, সেই সৌন্দৰ্য্য শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাধিক। যে খুব যত্নে, খুব সুখে আছে তা ব্রাহ্মণের বুঝতে বিলম্ব হ’ল না। পিতাকে দেখেই রাধিকা শশব্যস্ত প্রণাম ও তাঁর পদধূলি মস্তকে নিয়ে বাড়ির কুশল সমাচার জিজ্ঞেস্ করলে। পিতাও কন্যার কুশল জিজ্ঞেস্ করে, সন্দেশের হাঁড়ি কন্যার সম্মুখে রেখে বিশ্রাম করতে বসল। খানিক বিশ্রাম ও জলযােগের পর, ব্রাহ্মণ ও জামাতার মধ্যে নানা আলাপ হতে লাগল। গাছ থেকে নেমে ব্রাহ্মণ পথে যেতে যেতে যে যে ঘটনা স্বচক্ষে দেখেছিল সব কথাই বললে। আর এও বললে, একটা লােকের মুখ পাথরে ঘসে রক্তপাত করলেও তার মুখে হাসি ধরছিল না, এর কারণ জিজ্ঞেস্ করাতে গােবিন্দ তার * গােবিন্দ হাড়ী ১০৫ উত্তরে বললে,—দেখুন, আপনি যে পথ ধরে এখানে আসছিলেন এটা বৈকুণ্ঠে যাবার পথ। ঐ লােকটা বৈকুণ্ঠেই যাচ্ছিল, কিন্তু একটা পাপে তার বৈকুণ্ঠে যাবার পথে বিঘ্ন ঘটল । কথা কি জানেন, লােকটা খুব দাতা এবং পরােপকারী ছিল । লােকের বিপদে প্রাণ দিয়ে উপকার করত, আর পিতৃ-মাতৃ দায়গ্রস্ত লােককে টাকা-কড়ি দিয়ে কত রকমে যে তাদের উদ্ধার করত ! বলবার নয়; কিন্তু তা হলে কি হয়, লােকটা বড় দুম্মুখ ছিল, দুৰ্ব্বাক্য না বলে কাকে সাহায্য করত না, তাই বৈকুণ্ঠেশ্বর নারায়ণ সেই পাপের ক্ষয়ের জন্য তার মুখখানাকে পাথরে ঘসে রক্তপাত করতে দৃতদের তাজ্ঞা দিয়েছিলেন। লােকটা জানে এই রক্তপাতে তার পাপ ক্ষয় হচ্ছে, ক্ষয় হলেই বৈকুণ্ঠ লাভ হবে। তাই এত কষ্টের মধ্যেও তার মুখে হাসি ফুটে বেরুচ্ছিল। আর কিছু দেখেছেন ? দেখেছি বৈ কি! বাবাজি, বাবাজি, সেও বড় অদ্ভূত। একজন সম্ভার ভদ্রলােক পাল্কি চড়ে যাচ্ছিলেন, এক চাপরাশ আঁট। দারােয়ান সঙ্গে চলেছে। বাবু কিন্তু পাল্কি চড়তে নারাজ, তাই তিনি পাপ্তি থেকে জোর করে রাস্তায় নেমে পালাতে যাচ্ছিলেন, দারােয়ান তাকে যে দিচ্ছিল , জোর করে ধরে রেখেছিল। এর কারণ জিজ্ঞেস্ করতে দরোয়ান আমায় তেড়ে মারতে এল, বললে,-“হা যাতা হ্যায় উসিকো যাকে পুছে।” তাই তােমায় জানাচ্ছি এ কথা বলবার কারণ কি? শুনুন তবে। যে লােকটা পাল্কি চড়ে যাচ্ছিলেন, তিনি মন্তু
•
গল্পবেণু
ধনী, বহু টাকার মালিক ; আবার অন্যদিকে খুব দাতা, বিশ্বস্ত ও
গরীবের মা-বাপ। অল্পদিন হ’ল তার প্রাণ বিয়ােগ হয়েছে। ধনী,
বৈকুণ্ঠে বাস করতে পাল্কিতে করে যাচ্ছিলেন। পথের মাঝে তিনি
শুনলেন, পুত্রদের পাপে তার নরক বাস হবে। পাছে বেয়ারার
পাল্কি ফিরিয়ে নিয়ে নরকের পথে যায়, তাই তিনি পালিয়ে যাচ্ছিলেন,
দরােয়ান তাকে যেতে না দিয়ে জোর করে ধরে রাখছিল।
পুত্রের। এমন কি দোষ করেছে যাতে তাদের পাপে এমন
পুণ্যাত্মার বৈকুণ্ঠ লাভ না হয়ে নরকে স্থান হচ্ছে ?
কারণ এই যে, ধনী লােকটা ধাম্মিক বলে, এক বিধবা তার
বিপুল সম্পতি ঐ ধনীর কাছে গচ্ছিত রাখে । এমন সময়ে ধনী
মারা যান। ছেলেরা বিধবার অনেক টাকার লােভ সামলাতে না
পেরে, রাতারাতি ঐ বিধবার প্রাণনাশ করে সব টাকা আত্মসাৎ
করতে ষড়যন্ত্র করে। ছেলেদের এই পাপেই পিতার নরক ভােগ
ব্যবস্থা হয়েছে।
আহা ! এমন সৎলােকেরও এমন অকাল কুম্মা পুত্রও
জন্মায়, যা দ্বারা ধাৰ্মিক বাপ নরকগামী হন।
তা হয় বৈ কি। আবার বংশে ধাৰ্মিক বা সুসন্তান জন্মালে সাত
পুরুষ নরক হতে উদ্ধার লাভ করেন।
তবে কি লােকটার উদ্ধারের উপায় নাই ?
উপায় আছে। যদি কেউ ছেলেদের বুঝিয়ে ঐ পাপ কাজে
নিবৃত্ত করতে পারে তবেই রক্ষা নচেৎ রক্ষা নাই।
গােবিন্দ হাড়ী १०१ আচ্ছা বাবাজি, যদি তােমার ঐ ছেলেদের ঠিকানা জানা থাকে ত আমায় বল, আমি তাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে যাতে ঐ পাপ কাজে রত না হয়, তাই করব। গােবিন্দ, ছেলেদের নাম ধাম ঠিকানা বলে একটা ঘর দেখিয়ে দিয়ে বললে,-ঐ ঘরে ঢুকে যা দেখবেন সেই দেখার পর আপনাকে যে স্থানে নিয়ে যাবে ঐ স্থানের লােককে জিজ্ঞেস করলেই আপনাকে ঐ ধনীর বাড়ি দেখিয়ে দেবে। আপনি তার ছেলেদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে বিধবাকে বাঁচাতে পারলেই ঐ ধনীর বৈকুণ্ঠ লাভ হবে। এই বলে গােবিন্দ অদৃশ্য হ'ল। গােবিন্দ অদৃশ্য হতেই, ব্রাহ্মণ যেন নব কলেবর ধারণ করলে,-- পাশের ঘরে প্রবেশ করে দেখলে, শ্রীকৃষ্ণ এ শ্ৰাৱাধিকার যুগল রূপ স্বর্ণ-সিংহাসনে উপবিষ্ট । রাহ্মণ দেখ, অব । শ্ৰীকৃষ্ণরূপী জামাতা গােবিন্দ, শ্রীরাধিকারূপিণী তার কন্যা রাধিকাকে বামে লয়ে উপবিষ্ট আছেন। সেই যুগল রূপ দর্শন করে ব্রাহ্মণ ভাবে গদ গদ হয়ে তার মাথা আপনা হতেই যেমন তাদের পায়ে নত হ’ল, অমনি দেখে সে এক বৃহৎ অট্টালিকার দ্বারে উপস্থিত । খবর নিয়ে জানলে ঐ ধনীর দুই পুত্র বর্তমান। উহাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পিতার দুর্দশার কথা বলে বিধবার টাকা ফেরৎ দিতে বলে । প্রথমে পুত্রদ্বয় ব্রাহ্মণকে মিথ্যাবাদী বলে অনেক গালি দিলে, পরে ব্রাহ্মণের মুখে গোপন কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল। তারা বুঝে ঠিক করতে পারলে না যে,
গল্পবেণু
যে সব গােপন কথা তারা দুভাই ভিন্ন অন্য কেহ জানে না, সে সব
গােপন কথা এই ব্রাহ্মণ কি করে জানলে। ফলে দুভাই বিধবার
সমস্ত গচ্ছিত সম্পত্তি ফেরৎ দিয়ে মুক্ত হ’ল, এবং সেই সঙ্গে
পিতাকেও
মুক্ত করলে।
পরে ব্রাহ্মণ নিজের বাড়িতে এসে ব্রাহ্মণীকে সব ঘটনা
বলবামাত্র, জামাতা গােবিন্দ ও কন্যা রাধিকা উভয়ে শ্রীকৃষ্ণ ও
শ্রীরাধিকা বেশে রথে চড়ে উপস্থিত হলেন, এবং ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণীকে
সেই রথে চড়িয়ে বৈকুণ্ঠে নিয়ে গেলেন।
এRINচও সারমেয় অযােধ্যাধিপতি শারামচ অত লনের প্রতি রাভার ন্যস্ত করিয়া, কয়েক দিবসের জন্য গুরুদেব মহ; প বশিদের সহিত ধর্মালােচনায় নিযুক্ত ছিলেন। রামচন্দ্রের সমীপে বিচারপ্রার্থী হইয়া উপস্থিত হয়। সিংহাসনে শ্রীরামচন্দ্রের পরিবর্তে লক্ষ-কে শেন করিয়া রাঙ্গা কোথায় এ কথা জিজ্ঞাসা করি । ল। বলিলেন, --- তিনি কয়েক দিনের জন্য আমার উপর রাজ্য পরিচালনাৱ ভাৰ্পণ করিয়া গুরু মহর্ষি বশিষ্ঠদেবের আশ্রমে ধর্মালোচনায় ব্যাপৃত আছেন। উপস্থিত বিচারভার আমার উপর ন্যস্ত হইয়াছে, যদি তােমার কিছু নালিশ থাকে আমায় বল, আমি সাধ্যমত উহার সুমীমাংসা করিতে যত্নবান্ হইব। লক্ষ্মণ এই কথা বলিলে, সারমেয় তাহাতে সন্তুষ্ট না হইয়া বলিল,-আমি লােক মুখে শুনিয়াছি শ্রীরামচন্দ্র মানবকুলে জন্মগ্রহণ গল্পবেণু করিলেও তিনি স্বয়ং ভগবান। এ কারণে সূক্ষ্ম বিচার আশায় অনেক দূরদেশ হইতে আগমন করিতেছি, যদি আপনি কৃপাপরবশ হইয়া এ হতভাগ্যের আবেদন রাজাকে জ্ঞাপন করেন, তাহা হইলে অত্যন্ত উপকৃত হইব। তখন রামানুজ লক্ষ্মণ সারমেয়কে সঙ্গে লইয়া মহষি বশিষ্ঠদেবের আশ্রমে শ্রীরামচন্দ্রের সমীপে সারমেয়ের সকল আবেদন ব্যক্ত করিলেন। শ্রীরামচন্দ্র সারমেয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া বলিলেন,—তােমার কি অভিযােগ আমায় অকপটে বল। সারমেয় সসম্ভমে রাজা শ্রীরামচন্দ্রকে অভিবাদন করিয়া বলিল,-- মহারাজ । আমি যে গ্রামে বাস করি, সেই গ্রামে একজন বেদজ্ঞ নূতন ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ ভিক্ষাৰ্থ আসেন। সারমেয়ের স্বভাব আপনি বিলক্ষণ জানেন, নূতন লােক দেখিলেই তাহার পশ্চাতে চীৎকার করা আমাদের স্বভাব। সেই স্বভাববশতঃ ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ যেখানে ভিক্ষা করিতে যান, আমিও তাহার পশ্চাতে পশ্চাতে যাইয়া বিকট চীৎকার করিতে থাকি। তিনি ক্রোধে অধীর হইয়া আমাকে এরূপ নির্দয়ভাবে প্রহার করেন যে, সেই প্রহারেই আমি অজ্ঞান হইয়া পড়ি, আমি যে বাঁচিয়া উঠিয়াছি উহা আমার পিতৃপুণ্য। আমার পিতৃপুণ্য। মহারাজ! আমার নালিশের কারণ এই যে, তিনি যদি সাধারণ লােক হইতেন, তাহা হইলে আমার দুঃখ করিবার কিছুই ছিল না, কেননা সাধারণত যাহারা ভিক্ষা করিয়া বেড়ায় তাহারা প্রায়ই মুখ হয়। মূর্থের অশেষ দোষ, এজন্য
শ্রীরামচন্দ্র ও সারমেয়
১১
তাহারা ক্ষমার পাত্র, কিন্তু এই ভিক্ষুক ব্ৰ বেদ, পণ্ডিত ও
ধর্মপরায়ণ। তাই জিজ্ঞাসা করি, ইন ধশিক হইয়া আমায় কেন
অযথা প্রহার করিলেন, এজন্য তাহাকে শাস্তি দেয় কি উচিত নয় ?
ইহার সূক্ষ্ম বিচারের
জন্য আপনার নিকট
আসিয়াছি,
আপনি
ই হার সু বি চা র
শ্রীরামচন্দ্র বলি-
লেন,-দেখ, সূ ক্ষু
বিচার করিতে হইলে,
দুই পক্ষের কথা না
শুনিলে বিচার করা
যায় না। অতএব
তুমি সেই
ব্রাহ্মণকে
নিকট উপস্থিত কর,
লক্ষণ সাৰনেকে সে কথা শিপনের পশমে.••
তােমাদের উভয়ের
বাদানুবাদ শুনিয়া বিচার নিষ্পত্তি করিতে সাধ্যমত চেষ্টা করিব।
সারমেয় তথাস্তু বলিয়া প্রস্থান করিয়া কিছুক্ষণ পরে বেদজ্ঞ
ব্রাহ্মণকে রাজসমীপে আনয়ন করিল ।
গল্পবেণু শ্রীরামচন্দ্র তখন উগ্রতপা বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণকে দর্শন করিয়া বশিষ্ঠ দেবকে বলিলেন,-গুরো ! দেখিতেছি এ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত তপােনিরত ও যােগী, এ হেন তপস্বীর বিচার কার্য সম্পন্ন করা আমার ন্যায় ক্ষুদ্রবুদ্ধি ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব। দেব ! আপনি এই বিচারের উপযুক্ত পাত্র, অতএব দয়া করিয়া আপনি ইহার বিচার ভার গ্রহণ করুন, ইহাই আমার ঐকান্তিক প্রার্থনা। বশিষ্ঠদেব তখন ব্রাহ্মণকে সারমেয়ের প্রতি কঠোর শাস্তির কথা কহিয়া বলিলেন,-সত্যই কি আপনি ক্রোধের বশবর্তী হইয়া, এই সারমেয়কে প্রহারে জর্জরিত করিয়াছিলেন ? হাঁ দেব। কারণ, একদিন গ্রীষ্মকালের মধ্যাহ্নে সূর্যের প্রখর উত্তাপে ভিক্ষাৰ্থ বহির্গত হইয়াছিলাম, নানাস্থানে পরিভ্রমণ করিয়া দিবাবসানেও যখন কিছু মিলিল না, তখন দারুণ শ্রম ও ক্ষুধা তৃষ্ণার তাড়নে এতই কাতর হইয়া পড়িয়াছিলাম যে, তাহা ব্যক্ত করা যায় সেই দারুণ মনােকষ্ট বহন করিয়া যখন ঘুরিতে ছিলাম, সেই সময়ে এই সারমেয় আমার পশ্চাতে থাকিয়া এরূপ বিকট চীৎকার করিতেছিল যে, আমি আর ধৈর্য্য ধরিতে পারিলাম না, ক্রোধে সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া উঠিল, দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হইয়া আমার হস্তস্থিত যষ্টিদণ্ড দ্বারা নির্দয়ভাবে প্রহার করিয়াছিলাম, ইহা আমার বেশ স্মরণ আছে। বটে ! আপনার রাগ এরূপ প্রবল ? হ দেব ।
শ্রীরামচন্দ্র ও সারমেয়
আপনি ধৰ্ম্ম ও মহাতপা, আপনাকে জ্বিাস! করি, ক্রোধ
যে মহাপাপ এ কথা স্বীকার করেন কি ?
নিশ্চয়।
তাই যদি
যখনই আপনার মধ্যে
ক্রোধের সঞ্চার হইয়াছে
তখনই আপনি মহান
পাপে লিপ্ত
হইয়াছেন,
এ কথা ঠিক কি না ?
ঠিক ত বটেই, এবং
আমিও মুক্তকণ্ঠে স্বীকার
ক রিতে ছি যে,
সারনে য়কে
নি দ ক ৭
প্রহার করিয়া অত্যন্ত
করিয়াছি,
অন্যায়ের জন্য আমায় কি
সামকে পর ক শ না করিয়াছি
শাস্তি দিতে হয় দিন।
দেখুন, এখানে আর একটি বিষয়ে বিশেষ সাক্ষ্য করিয়াছেন
কি ? বিষয়টি এই, মানুষের মধ্যে দুই শ্রেণী দেখা যায়। এক
শ্রেণী পণ্ডিত, আর এক শ্রেণী মূখ। এই দুই শ্রেণী লােকের
কার্যে বিস্তর প্রভেদ দেখা যায়, এবং উভয়ের পাপের ফলাফল
১১৪ গল্পবেণু ভিন্ন রকমের। পণ্ডিত যিনি, তিনি জ্ঞান-পাপী ও মূখ অজ্ঞানপাপী বলিয়া কথিত হয়। এ কারণে অজ্ঞানকৃত পাপী অপেক্ষা জ্ঞান কৃত পাপীর পাপ সহজে ক্ষয় হয় না, এজন্য তারা অধিক শাস্তি ভােগ করেন। আপনি পণ্ডিত ও ধাম্মিক শিরােমণি, আর এই সারমেয় এক অপকৃষ্ট জীব, নূতন লােক দেখিলেই চীৎকার করা ইহাদের স্বভাব। ইহাতে তাহাদের দোষ দেওয়া যায় না। বিষয় আপনি জ্ঞাত হইয়াও সারমেয়ের প্রতি অযথা পীড়নে আপনি দণ্ডাৰ্হ এই কথাই আমি বলিতে চাই। বশিষ্ঠদেবের বাক্য শেষ হইতে না হইতেই, ব্রাহ্মণ কৃতপাপের প্রায়শ্চিত্ত বিধান স্বরূপ বলিলেন,-দেব । আমি সারমেয়ের নিকটে বিশেষ অপরাধে অপরাধী, আপনি আমার প্রতি কঠোর শাস্তির বিধান করুন, আমি অম্লান বদনে সেই শাস্তি গ্রহণ করিব। ব্রাহ্মণের মুখে এই কথা শ্রুত হইয়া বশিষ্ঠদেব সারমেয়কে বলিলেন,-এ ব্রাহ্মণ যে অতি সৎ, ধাম্মিক ও পণ্ডিত সে বিষয়ে সন্দেহ নাই, কেননা স্বভাবতঃ কেহ নিজের দোষ স্বীকার করে না, কিন্তু এ ব্রাহ্মণ সে প্রকৃতির নহেন, ইহা তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ সরলতায় প্রকাশ পাইতেছে। এক্ষণে ইহার দণ্ড বিধান সম্বন্ধে তােমার উপর ভারাৰ্পণ করিলাম, তুমি উহাকে যে দণ্ড দিবে, আমিও সেই দণ্ড দিতে প্রতিশ্রুত রাহলাম। সারমেয় বলিল,-অযযাধ্যায় কপিল নামে যে বৃহৎ অতিথিশালা
শ্রীরামচন্দ্র ও সারমেয়
আছে সেই অতিথিশালার মহাপদ উঠকে প্রদান করা হউক,
আমার বিবেচনায় এই দণ্ডই উহার পক্ষে যথেষ্ট।
বশিষ্ঠদেব ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া বলিলেন,-সারমেয়, তুমি
ব্রাহ্মণকে যে দণ্ড প্রদান করিলে, তাই ও না পার, আমি বিয়া
স্থির করিতে পারিতেছি না।
সারমেয় বলিল,-“বে। বহিষ্টিতে পণ্ডের পর পুরস্কার
মনে হয় বটে, কিন্তু প্রকৃত কথা অবগত হই আমি শাশকে যে
কি কঠোর দণ্ড বিধান করিলাম তহবিলে হইয়া যাইবেন।
পূৰ্ব্বজন্মে আমিও বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ ছিলাম এবং ঐ বৃহং গতিথিশালার
মহান্তপদে অধিষ্ঠিত ছিলাম, নান প্রলোভন ও লি:সিতায় ডুবিয়া,
অতিথিদিগের সেব! ও য’র দিকে দে দুটি রাখি নাই। সেই
কর্তব্যের ত্রুটি হয়,—সেই হেতু মহান পাপে লিপ্ত হই। আমি
এ জন্মে জাতিস্মর হইয়া এই সারমেয় জন্ম পরিহ করিয়াছি। এখন
ভাবিয়া দেখুন ঐ ব্রাহ্মণকে যে
অভিষিক্ত করতে
বলিলাম, ঐ পদ লাভ করিলে উনি পুরস্কৃত কি দণ্ডিত হইলেন,
ইহা প্রণিধান করিয়া দেখিলেই বুঝিতে পারিনে।
সংসারের নানা প্রলােভনের মধ্যে থাকিয়া যিনি সর্শ্বপালনে
সমর্থ হয়েন, তিনিই প্রকৃত ধাম্মিক ও পন্থা।
----
দৈৰঙের
কৰ্ত্তি
রাজা বড়ই দৈবজ্ঞ-ভক্ত। প্রতি কাজ-কর্মে এমন কি ওঠা
বসা পর্যন্ত সকল ব্যাপারে দৈবজ্ঞ ভাস্করদেবের গণনা অনুসারে
চলতেন।
এতটা কিন্তু রাণীর সহ্য হয় না। দু-একটা কাজের ফলাফল
হয় জিজ্ঞাসা কর। বরং চলে। তা বলে প্রত্যেক কাজে রাজাকে
পরমুখাপেক্ষী হয়ে চলতে দেখলে, কোন্ রাণীর তা ভাল লাগে
বল ? শেষে রাণী একদিন অতিষ্ঠ হয়ে বলে উঠলেন,-আচ্ছা জ্যোতিষ
শাস্ত্র নিয়ে না হয় তােমার চলতে পারে, কিন্তু রাজকন্যার ত
চলবে না, তাকে উপযুক্ত পাত্র দেখে বিয়ে দিতে হবে, তার কি
ব্যবস্থা করলে ?
বল কি রাণী, চঞ্চলা কি এরই মধ্যে এত বড় হয়েছে ?
তুমি ত সংসারের সব খবরই রাখ,—রাখবার মধ্যে ঐ এক
গণকঠাকুর।
দৈবডের কীর্তি
১১৭
গণকঠাকুর ত
রাগ কেন ?
কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি ভনয়, তাই সাবধান করে দিই।
সংসার করতে গেলে শাস্ত্র মেনে চল • *
তুমি যা ভাল বুঝ কর। কি মেয়ে । বি এক বিচি
ব্যবস্থা করা দরকার নয় কি ?
এই কথা,--- আচ্ছ। তাই একুক কয় চলার
কোষ্ঠী গণনা করতে দেব ।
সেই দিনই রাজ। দৈবক কয় চপল কে 'খানি
হাতে দিয়ে বললেন,--খুন । ককুর, কে: মেয়ে কি
লক্ষণ রয়েছে ?
কোষ্ঠীখানি হাতে নিয়ে বললেন,---- মাসু: না, অঞ্জ
আমি এই কোষ্ট নিয়ে চলা, যত “ পাও ? না করে
আপনাকে জানাব।
দৈবজ্ঞঠাকুর কোষ্ট গণনা করে দেখলেন যে,--রাজকন্যাকে যে
বিয়ে করবে, সে ‘অত সামান্য ব্যক্তিই হো না কেন, ভাগ্যচক্র
পরিবর্তনে প্রবল প্রতাপান্বিত রাজচক্রব হওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা
রয়েছে। গণকঠাকুর রাশি রাশি কোঠী গণনা করেছেন, কিন্তু এই
রাজকন্যার ন্যায় সুলক্ষণ! কন্যা জীবনে কখন দেখেন নাই। তাই
রাজকন্যাকে বিয়ে করবার তার লেভি হ'ল।
গণকঠাকুরের চোখের সামনে ভেসে উঠল, রাজকুমারীকে বিয়ে
১১৮
গল্পবেণু
করে যেন তিনি রাজচক্রবর্তী হয়েছেন, কত বিশাল তাঁর রাজত্ব, কত
অফুরন্ত তার ঐশ্বৰ্য্য। নাঃ!—স্বপ্নকে সফল করতেই হবে, যে
প্রকারেই হােক্ না কেন।
ব্রাহ্মণ রাজার নিকট উপস্থিত হয়ে রাজকন্যার বিয়ের কথা তুলে
কপট দুঃখে বললেন,-মহারাজ, আপনার কন্যাকে দেখলে কতই
বুদ্ধিমতী ও সুলক্ষণ বলে মনে হয়, কিন্তু বিধাতা তার কপালে যে
কত দুঃখ লিখেছেন তা বলবার নয়, আর লক্ষণও এত খারাপ যে,
সে কথা আপনার না শােনাই ভাল ।
গণকের মুখে কন্যার দুর্ভাগ্যের কথা শুনে, রাজা মহাদুঃখিত
হলেন, বললেন,-ঠাকুর, কোষ্ঠীতে আমার কন্যার দুর্ভাগ্যের কথা
কি লিখেছে বলুন, আমি না শুনে স্থির হতে পারছি না।
গণকঠাকুর কপট দুঃখে বললেন,-বিবাহ-বাসরে বরের পঞ্চত্ব
প্রাপ্তির সম্ভাবনা ত আছেই, তা ছাড়া রাজ্য ছারে থারে যাবে, শকুল
আপনাকে ধরে নিয়ে গিয়ে শূলে চাপাবে।
রাজা প্রমাদ গণলেন। এ মেয়েকে ঘরে রাখা নিজের
সর্বনাশকে নিজে টেনে আনা। গণকঠাকুরের দুই হাত ধরে চোখের
জল মুছে বললেন,-ঠাকুর, এ বিপদ হতে উদ্ধার হবার কি
কোন উপায় নাই ? যদি থাকে সে যতই কঠিন হােক না কেন,
আমি এই দণ্ডেই তাই করে রাজ্য, দেশ, মান, সম্রম, সব বজায়
রাখব।
লােভী ব্রাহ্মণ দুঃখের ভান করে বলতে লাগলেন,-মহারাজ।
?
দৈবজ্ঞের কান্তি
বলব কি, বলতে বুক ফেটে যায়, তপনার কন্যাকে বাড়ি থেকে
বিদায় করা ছাড়া গতি নাই।
নদীর স্রোতে সিমে নিয়ে......
চমকে উঠলেন। কয়েক মহঃ মা নিস্তব্ধ থেকে
বললেন,-দেখুন, আর কোন উপায় নেই কি?-শান্তি স্বস্ত্যয়ন করলে
কি হবে না ?
গল্পবেণু
দৈবজ্ঞ কঠিন ভাবে কেবল মাথা নাড়লেন,-না। রাজা কোন
কুল কিনারা না পেয়ে অবশেষে বললেন,—কোথায়, এবং কেমন
করেইবা রাজকন্যাকে দূর করতে হবে উপায় বলে দিন।
দৈবজ্ঞ সুযােগ বুঝে বললেন,- রাজকন্যার মাপে একটা
কাঠের বাক্স তৈরী করা হােক্।
তাতে নিঃশ্বাস ফেলবার জন্যে
গুটিকত ছিদ্র রেখে, সেই বাক্সের মধ্যে সালঙ্কার চঞ্চলাকে শুইয়ে
নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হােক। এতে চঞ্চলার ভাগ্যে যা আছে
তাই হবে, আপনার দুর্ভোগ ঐখানেই কেটে যাবে, রাজ্য, দেশ, মান,
সম, এমন কি প্রাণ পর্যন্ত রক্ষা পাবে। কিন্তু সাবধান, রাণীকে
এ সব ঘুনাক্ষরে জানাবেন
আপনি উদ্যানবাটিতে সমস্ত
ব্যবস্থা করে জলে ভাসিয়ে দেবেন।
যথাসময়ে বা এসে উপস্থিত হল। রাজকুমারী চঞ্চলাকে
নানা অলঙ্কারে ভূষিত করে তাকে সেই বাক্সে লম্বভাবে শুইয়ে তালাবদ্ধ
করা হ’ল। তারপর তােক ডাকিয়ে নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিতে
আজ্ঞা দিলেন।
রাণীর কানে যখন এ কথা উঠল,
এ কথা উঠল, তখন রাণী কেঁদে বুক
ভাসালেন। তিনি চতুর্দিকে জেলে পাঠিয়ে দিলেন, ঘােষণা করলেন,
যে রাজকন্যাকে জল থেকে তুলে আনতে পারবে, সেই রাণীর
সমস্ত রত্ন মাণিক্য পুরস্কার পাবে ।
এদিকে বান্ন নদীর স্রোতে ভাসতে ভাসতে চলেছে। লােভী
গণকঠাকুর ভেতরে ভেতরে সব খবর রেখেছিলেন। তার কথা মত
দৈবজ্ঞের কীর্তি স্রোতে চঞ্চলাকে বাক্সে পূরে নদীতে ভাসিয়ে দিতেই, সেই বাক্সকে ধরবার জন্যে তিনি নদীর কিনারা দিয়ে চলতে লাগলেন। বাজটা কিনারায় এলেই সেটাকে বাড়িতে নিয়ে ফেলবেন, এবং চঞ্চলাকে বিয়ে করে একেবারে রাজচক্রবর্তী হয়ে বসবেন। কিন্তু ব্রাহ্মণের এমন দুর্ভাগ্য যে, সেদিন স্রোতের বেগ হ’ল খুব প্রবল বাকটা যেন তীরের মত ছুটেছে। ব্রাহ্মণ অনেক ছুটে ও সেটাকে ধরতে পারছেন না। দেখতে দেখতে বাক্সট। একটা বাক ফিরল। ব্রাহ্মণ সেইদিক লক্ষ্য করবার সময় কিছুক্ষণ সুব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলেন। এদিকে বাকাটা বাকের মুখে আটকে যাওয়াতে এক সম্ভ্রান্ত ভদ্র যুবকের চোখে সেটা পড়ে গেল। যুবক নদীর তীরবর্তী শীকার করতে এসেছিল, এবং সেই জঙ্গলে একটা ভালুক ধরে সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে সেই নদীর বাঁকের মুখে বিশ্রাম করছিল। লােকজনের। তার আদেশে সেটাকে ডাঙ্গায় তুলে যুবকের সামনে নিয়ে এল। যুবকের হুকুমে বাক্স খােলা হল, দেখে, এক পরমাসুন্দরী কন্যা যেন নিদ্রিত রয়েছে। কন্যাকে ডাকা হল, কোন সাড়া মিলল না। তার চোখে মুখে জলের ঝাপটা দেওয়ার পর রাজকন্যা জ্ঞান ফিরে পেল, ভয় হল, এ সে কোথায় এসেছে। যুবকটি তাকে সাহস দিয়ে বললে,-কে আপনি? কোথায় আপনার বাড়ি? জানলে সেখানে আপনাকে রেখে আসব। ধীরে ধীরে সমন্তু ঘটনা চঞ্চলার স্মরণ হ’ল। চঞ্চলার মুখে সকল বৃত্তান্ত শু,
১২২
গল্পবেণু
যুবকটি বললে,-আপনি এখন কোথায় যেতে চান বলুন, আপনি যা
বলবেন আমি তাই করতে প্রস্তুত।
আমার আর কে আছে ! আমি পিতার চক্ষুশূল হয়েছি। কেননা
এক দৈবজ্ঞের গণনার ফলে তিনি আমায় তাড়িয়ে দিয়েছেন। আমি
সেখানে গিয়ে আমার পিতার অনিষ্ট করতে পারব না, সেখানে
আমার স্থান নাই, তার চেয়ে এই বনেই আমি থাকব। বলে চঞ্চল।
কাদতে লাগল।
যুবক বললে,-“বেশ আমার গৃহেই চলুন, সেখানে আমার পিতা
মাতা আপনাকে আশ্রয় দেবেন।
, তা হয় না, কেননা, আমি যেখানেই যাব, তাদের অনিষ্ট
হবে। এই কথা গণকঠাকুর বলেছেন।
যুবক বললে, মিথ, মিথ। মানুষ মাত্রেই ভুল করে, আপনার
গণকঠাকুরের যে ভুল হয় নি, তারই বা প্রমাণ কি ?
সতিই যদি হয়। বলে চঞ্চলা কাদতে লাগল।
রাজকুমারীকে অত্যন্ত কাতর দেখে যুবকের অন্তর বেদনায় ভরে
গেল, বললে,---না-না---কিছু না ! আমার ওখানেই চলুন।
যুবক ভালুকটাকে বাক্সের ভেতর পূরল, তালা বদ্ধ করল, পরে
নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়ে চঞ্চলকে নিয়ে বাড়ি ফিরল।
দৈবজ্ঞ এ সব কিছুই জানলেন না। কিছুদূরে বাক্সটা নদীর
কিনারায় ভেসে যাচ্ছে দেখে, ছুটে এসে সেটাকে কঁাধে করে বাড়িতে
গেলেন, এবং চুপে সাড়ে একটা অন্ধকার খালি ঘরের মধ্যে রেখে দিলেন।
দৈবজ্ঞ ছেলেদের কাছে এ সকল কথা গােপন রেখে বললেন,-- দেখ, আজ রাত্রে আমি এই খালি ঘরে একটা ক্রিয়া করব, তাতে এক ভালুকটা ঘাড়ের রক্ত খেয়ে চীৎকার উঠবে, সে চীৎকার কানে গেলে সংসারের বড়ই অমঙ্গল হবে। তাই তােদর বলে দিচ্ছি, তােরা এই ঘরের বাইরে এমন জোরে কাসর বা বাজাবি যাতে ঘরের ভেতরের শৰু বাইরে থেকে না শােনা যায়।
১২৪
গল্পবেণু
এই বলে দৈবজ্ঞ ঘিয়ের প্রদীপ, কোষাকুষী, গঙ্গাজল, শাক,
ঘটা, ফুল, বিল্বপত্র নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে দরজায় খিল দিলেন।
এদিকে তার পাঁচ ছেলে কাসর ঘটা দিয়ে সকলের কান ঝালা-
ফালা করতে লাগল।
সন্ধ্যার পূৰ্ব্বে দৈবঠাকুর সেই যে ঘরে ঢুকেছেন, তার পরদিন
বেল। নটা বেজে গেল, তবুও তার বেরুবার নাম নাই। কঁাসর,
ঘটা বাজিয়ে বাজিয়ে ছােট ভায়েদের হাত ভেরে গেছে, হাতে
কড়া পড়ে গেছে, তবু বড়দাদার কাছে তাদের নিস্তার নাই
বলছে,- দাদা, আর পারি না, হাত ব্যথা হয়ে গেছে, হাতে কড়া
পড়ে গেছে, বড়দাদা ততই তাদের ধমক দিয়ে বলছে, বাজা!
বাজা। খুব জোরে বাজা!
অনেক বেলা হয়ে গেল, যােদ্দর ফুটে উঠল, তবু গণকঠাকুর
ঘর থেকে বেরুলেন না। এমন সময় দৈবজ্ঞ গৃহিণী “রক্ত-রক্ত”
বলে চীৎকার করে উঠলেন। সবাই দেখলে, ঘরের নর্দমা থেকে
রক্ত গড়িয়ে আসছে। যাই দেখা অমনি কাসর ঘন্টা সব থেমে গেল।
কি হ'ল । কি হল! রব পড়ে গেল।
বড় ছেলে বললে,-চুপ চুপ! হবে আবার কি ! বাবা ত
বলেই রেখেছেন, তিনি একটা ক্রিয়া কচ্ছেন,—নিশ্চয় এ
পঠার রক্ত।
দ্বিতীয় ছেলে বলে উঠল, -বাবা ত রক্ত দেখলে ভিরমি যান,
তিনি যে পাঁঠা কাটবেন এ কি কখন হতে পারে।
দৈবজ্ঞের কীর্তি তৃতীয় পুত্র বললে,—ও তালত। গােল না হয়ে যায় না। চতুর্থ পুত্র বললে, -কখনই নয় । আর্তগোলার রং কখন কালচে হয় না,-থােল থেল চাপ বাধে না। পঞ্চম পুত্র তখন হাত দিয়ে দেখে ভয়ে চীৎকার করে বলে উঠল,-রক্ত রক্ত ! ডাহা রক্ত ? সকলে মিলে বাবা! বাবা! বলে দরজা ঠেলতে লাগল । বাবার সাড়াও নাই শক্তও নাই। কি যেন এক টা ঘেং শব্দ তখন বাধ্য হয়ে ব্রাহ্মণীর দেশে দরজা ভাঙতই, ফাক পেয়ে, ভালুকটা সকলের সামনে দিয়ে ছুটে পালিয়ে গেল। ছেলেরা তখন ঘরে ঢুকে দেখে সৰ্ব্বনাশ !-ভকট। তাদের বাপের ঘাড়ের রক্ত খেয়ে একদম্ মেরে ফেলে পালিয়েছে। ঘরের মেঝে রক্ত- রক্তি হয়ে নর্দমায় গড়িয়ে এসেছে। ঘরের কোণে একটা মানুষ-সমান বাক্স ডালি খোলা পড়ে আছে। ছেলেদের কান্নার শব্দে ব্রাহ্মণী ও ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠলেন। আশে পাশের প্রতিবেশীরা হঠাৎ কান্নার রব শুনে, কান্নার রব শুনে, কি হয়েছে । কি হয়েছে! ব’লে ছুটে দেখতে এল, কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার কি কেউ কিছুই বুঝে উঠতে পারলে না। সকলেই বিস্ময়ে এ-ওর মুখ চাওয়াচায়ি করে যে যার স্থানে প্রস্থান করলে। শােক কিছু উপশম হ'লে, জ্যৈষ্ঠ পুত্র রাজসমীপে উপস্থিত হয়ে, আকস্মিক ঘটনার কথা বলে খুব দুঃখ করলে। এদিকে রাজকুমারী চঞ্চলাকে যুবক নদীতীর হ'তে তাঁর
গল্পবেণু
বাড়িতে নিয়ে গিয়ে অতি যত্নে রেখে দিলেন। পরে শুভদিন
শুভক্ষণে যুবকের সহিত চঞ্চলার বিবাহ অতি সমারােহে নিষ্পন্ন হল।
বিয়ের পর হতেই যুবকের দিন দিন শ্রীবৃদ্ধি হতে লাগল। দেখতে
দেখতে রাজসিংহাসন লাভ করে রাজচক্রবর্তী হয়ে রাজ্যশাসন
করতে লাগলেন।
যখন যুবকের এরূপ উন্নত অবস্থা, সেই সময় একদিন চঞ্চল।
স্বামীকে ধরে বসল,--বাপ-মাকে অনেক
অনেক দিন ছেড়ে এসেছি,
তাদের দেখবার জন্যে মনটা বড়ই অস্থির হয়েছে, তুমি
করে নিয়ে যাও বড় ভাল হয়।
যুবক হেসে বললে,—আমায় আবার কেন, তুমি একা গেলেই
ত পার।
যদি সঙ্গে
আমার এক যেতে লজ্জা করে ।
তার মানে আছে।
তোমায় ধরে রাখবে এই না ?
সম্ভব তাই।
তাতে ক্ষতি কি?
ক্ষতি আছে, তাইত তােমায় সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাচ্ছি।
আমি গেলে কি হবে ?
আমায় ধরে রাখতে পারবে না।
বুঝেছি, -তবে যাবার বন্দোবস্ত কিরূপ হবে ?
দৈবজ্ঞের কীত্তি
১২৭
অধীনস্থ রাজাকে যে ভাবে পত্র লিখতে হয়, সেই ভাবে
বাবাকে পত্র লিখবে।
আচ্ছা তাই করা যাবে।
চঞ্চলার পিতার রাজ্যে মহা ধূম পড়ে গেছে। প্রধান প্রধান
রাস্তায় বড় বড় তােরণ নিম্মিত হয়েছে, সেই সব তােরণ লতা-
পা ফল-ফুলে শােভিত করা হয়েছে, এব এনে স্থানে সানাইয়ের
মধুর ধ্বনির সঙ্গে কাড়া-নাকাড়া বাজছে। এই ধুমধামের মধ্যে
রাজচক্রবর্তী যুবক চঞ্চলকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরালয়ে উপস্থিত হল।
রাজা ও রাণী মহাসমাদারে উভয়কে অভ্যর্থনা করলেন। চঞ্চলার
মুখ অবগুণ্ঠনে আবৃত।
রাজা যুবকের হস্ত ধারণ করে সভাস্থলে
পণ্ডিতমণ্ডলী ও সমাগত সম্রা গণ্যমান্য ব্যক্তিদিগের মধ্যে নির্দিষ্ট
আসনে বসিয়ে যুবককে পরম আপ্যায়িত করতে লাগলেন ;
যুবকও যথাবিধি সৌজন্য দেখিয়ে সকলকে তুষ্ট করলেন।
বাহিরে এই, ভিতরে অন্দর মহলেও এই ব্যাপার চলেছে।
রাণী চঞ্চলাকে মিষ্ট কথায় নানাপ্রকারে তুষ্টি সম্পাদনে
ব্যগ্র, কিন্তু চঞ্চলার মুখে কথা নাই । সে যে-ভাবে অবগুণ্ঠনে
মুখ আবৃত করে অন্দরমহলে এসেছিল, ঠিক সেই ভাবেই সে
কালাতিপাত করতে লাগল, একটা কথা তার মুখ থেকে কেউ
করতে পারলে না। এ অভদ্রোচিত ব্যবহারে উপস্থিত
সকলেই ক্ষুন্ন হ’ল সন্দেহ নাই, কিন্তু সহসা এমন একটা ঘটনা
১২৮
গল্পবেণু
ঘটল যাতে সকলেরই ভ্রম ঘুচে গেল। সকলে দেখলে, সেই
অবগুণ্ঠনের মধ্য হ'তে নবাগত রাণীর চোখের জলে তার বহুমূল্য
পরিধেয় বস্ত্র আর্দ্র হয়ে গেছে। রাণী নিজেকে মহা অপরাধী মনে
ক'রে চঞ্চলার দুই হাত ধরে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বললেন,
আমরা গরীব,-নামে রাজা। আপনারা রাজচক্রবর্তী, সসাগরা
পৃথিবীর রাজা,-আপনাদের সঙ্গে আমাদের তুলনা ! আপনাদের
যােগ সম্রম দেবার ক্ষমতা আমাদের নাই। নিজগুণে দয়া করে
অপরাধ মার্জনা করুন।
ক্রন্দনরত মাতার এরূপ কাতর বাক্যে চঞ্চলা নিজেকে গােপন
রাখতে পারলে না। প্রাণের আবেগে বলতে লাগল,-মা।
মা! আমি তােমার সেই হতভাগিনী মেয়ে ! যাকে মা, বক্সের
মধ্যে পুরে নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলে ।
ব’লে অবগুণ্ঠন মােচন করে মার পায়ে লুটিয়ে পড়ল।
মা অবাক দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে চেয়ে রইলেন। তার বােধ
হতে লাগল, মেয়ে যেন স্বর্গরাজ্য থেকে নেমে এসেছে।
মা বুঝে
ঠিক করতে পারলেন না যে, যে-মেয়েকে তারা নিজ হস্তে নদীর জলে
ভাসিয়ে দিয়েছিল, সেই মেয়ে সাম্রাজ্ঞী কেমন করে হ’ল।
সঙ্গে রাজার কাছে খবর গেল। রাজা এসে মেয়েকে দেখেই তাঁর
দুচোখ দিয়ে অবিরত ধারে আনন্দাশ্রু পড়তে লাগল । অতি কষ্টে
চোখের জল মুছে বলতে লাগলেন, আমরা তাের সর্বনাশী মা-বাপ ।
তােকে বিসর্জন দেবার পর হতে আমাদের প্রাণে সুখ নাই! তুই
দৈবজ্ঞের কীর্তি
মা আমাদের লক্ষ্মী ছিলি ! তােকে পেয়ে আজ আমাদের বুকে বল
২৫
রাজা ও রাণী মহা সমাদরে উভয়কে অভ্যর্থনা করলেন••••
এল ! ব মা বল সত্যিই কি তুই আমাদের বুকের ধন চঞ্চল।
আমরা ত তােকে দৈবজ্ঞের কথায় বাক্সে পরে মারবার ফন্দিতে
গল্পবেণু
নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম। এখন কি করে বেঁচে উঠে
রাজরাজেশ্বরী হলি মা!
রাজার মুখ দিয়ে আর কথা সরল না,—দুচোখ দিয়ে জল
চড়াতে লাগল।
রাজা ও রাণী উভয়েই কেঁদে আকুল। পিতামাতার আকুল
ক্রন্দনে চঞ্চলাও কেঁদে আকুল। সে এতদিনে বুঝলে তার মা-বাপ
দৈবজ্ঞের হঠকারিতায় ভ্রান্তিবশে তাকে শত্রু ভেবে তার প্রাণনাশের
চেষ্টা করেছিলেন। তার দৈবজ্ঞের কুটবুদ্ধির পরিচয় কিছুই অবগত
ছিলেন না বলেই এই অনিষ্ট ঘটেছে। অতএব এ সময়ে পিতামাতাকে
সাবধান করে না দিলে, ভবিষ্যতে আরও অনিষ্ট হবার সম্ভাবনা। তাই
বললে,-বাবা, দৈবজ্ঞেকে বিশ্বাস করে আপনারা যে, আমার প্রাণ
নাশের চেষ্টা করেছিলেন, তা আমি বুঝেছি। দুষ্ট লােকের সংসর্গ
হতে দূরে থাকাই মঙ্গল,কেননা, কখন্ কোন্ দিন একটা নূতন বিপদ
এনে ফেলবে তার ঠিক নাই।
রাজা বললেন,-দৈবজ্ঞ তার প্রতিফল হাতে হাতে পেয়েছেন।
কি পেয়েছেন ?
বাক্সের মধ্যে একটা ভালুক ছিল, সেই ভালুক বাক্স থেকে বেরিয়ে
দৈবজ্ঞকে মেরে ফেলে পালিয়েছে।
এই বলে রাজা দৈবজ্ঞের পুত্রের মুখ থেকে যে সব বৃত্তান্ত
শুনেছিলেন, সেই সব ঘটনা ও দৈবজ্ঞের মৃত্যুকাহিনী আদ্যোপান্ত
বিবৃত করলেন।
দৈবজ্ঞের কীৰ্ত্তি ১৩১ বুদ্ধিমতী চঞ্চলা সব বুঝে নিলে, এবং ভালুক-শীকারী যুবকের সঙ্গে সাক্ষাতের পর যা যা ঘটেছিল, পিতাকে একে একে সব বললে । রাজা কন্যার মুখে সব কথা শুনে দৈবজ্ঞের আস্পর্ধার কথা ভেবে ঘৃণায় মুখ বাঁকালেন, বললেন,—ঐ হতভাগা বামুনটা তাের কোষ্ঠী গণনা করে, পরম ভাগ্যবতী দেখে তােকে বিয়ে করে রাজচক্রবর্তী হবার আশায় এই কূটজাল বিস্তার করেছিল । অতএব এর সবিশেষ বিবরণ না জেনে কিছুতেই মন স্থির হচ্ছে না। আগে থেকেই রাণী দৈবজ্ঞকে দুচোখে দেখতে পারতেন না, রাজাকে সাবধান করলেও রাজা রাণীর কথা শুনতেন না, রেগে উঠতেন। এখন দৈবজ্ঞের কাণ্ড কারখানা হাতে হাতে ধরা পড়ায়, রাগে রাণীর সৰ্বাঙ্গ জ্বলে উঠল, রাগ সামলাতে না পেরে বললেন, আমার কথা এখন ফলল ত! যতদূর ভোগবার তা ভুগলে ত ! ঠিক বলেছ রাণী ! কি ভােগটা না ভুগছি ! তবে, ভগবানের কৃপায় চঞ্চল মাকে যে পেয়েছি এই আমাদের পরম ভাগ্য! এখন আর একটু কাজ আছে, প্রথমে বাক্সটা দেখবার দরকার হয়েছে, কালই বাজটার সন্ধানে দৈবজ্ঞের ছেলেদের কাছে লােক পাঠাব। পরদিন রাজা দৈবজ্ঞের বাড়িতে ভালুকের বাক্সটি আনতে লােক পাঠালেন, বাক্স এসে হাজির হ’ল। সকলে আশ্চর্য হয়ে দেখলে, চঞ্চলাকে যে-বাক্স করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই বাক্স। যারা লােভী ও কুচক্রী তাদের পরিণাম কখনই ভাল হয় না।
তিলমুষ্টি সে অনেকদিনের কথা। ব্ৰহ্মদত্ত নামে এক রাজা বারাণসীতে রাজত্ব করতেন। তার একমাত্র পুত্র-ব্ৰহ্মদত্তকুমার-রাজারাণীর বড় আদরের। দিন যায়। বারাণসীর প্রধান পণ্ডিতের কাছে রাজপুত্রের হাতে খড়ি হ’ল। মাত্র যখন তার বয়স ষােল, তখন রাজ্যের প্রধান পণ্ডিতের কাছে বিদ্যাশিক্ষা শেষ হ’ল। এইবার রাজকুমারকে উচ্চ- শিক্ষার জন্য তক্ষশিলায় যেতে হবে। রাজজ্যোতিষী শুভদিন গণনা আরম্ভ করালেন। তখন তক্ষশিলা ছিল আর এক রাজার অধিকারে। কিন্তু তবুও নানাদেশের রাজপুত্রেরা এখানে শিক্ষালাভ করতে আসত। কারণ তক্ষশিলা ছিল তখনকার কালে এক বিখ্যাত বিদ্যাকেন্দ্র। পৃথিবীর এমন কোন শাস্ত্র ছিল না, যা এখানে শিক্ষা দেওয়া হত না। চীন, যবদ্বীপ, আরব, তুর্কীস্থান থেকে কত ছাত্র এখানে জ্ঞান আহরণ করতে আসত। তাই ভারতের রাজপুত্রেরাও আসত।
তিলমুষ্টি
ইহাতে রাজপুত্রেরা যেমন শারীরিক কষ্ট স্বীকার করতে শিখত,
তেমনি নানাদেশের লােকের সহিত মেলামেশায় লোকচরিত্রে অভিজ্ঞতা
সঞ্চয়ও করত।
11
-
রাজকুমার একমুঠো তিল মুখে পরশে,
এক শুভদিনে শুভযােগে ব্ৰহ্মদত্তকুমার মাতাপিতার আশীর্বাদ
শিরে ধারণ করে তক্ষশিলায় এল।
১৩8
গল্পবেণু
রাজকুমার তক্ষশিলার প্রধান আচাৰ্য্যকে প্রণাম করে বললে-
ভগব, আপনার নিকট বিদ্যালাভের জন্য এসেছি। বিদ্যাদান করে
আমায় কৃতার্থ করুন।
আচাৰ্য রাজকুমারের পরিচয় নিয়ে বললেন,-বৎস, দক্ষিণা বা
গুরু শুশ্রুষা কোনটির বিনিময়ে তুমি বিদ্যাশিক্ষা করতে চাও?
রাজপুত্র তখন আচার্যের পদতলে স্বর্ণমুদ্রা পরিপূর্ণ একটি থলি
রেখে বললে,ভগব, আমি গুরুদক্ষিণা এনেছি।
আচাৰ্য রাজকুমারকে আশীর্বাদ করলেন,-বৎস, তবুও তােমায়
সাধারণ ছাত্রের মতই থাকতে হবে, রাজভােগ এখানে পাবে না।
শুক্লপক্ষে যে যে দিনে শুভযােগ থাকত, সেই সেই দিনে
আচাৰ্য সমীপে রাজকুমার পাঠ গ্রহণ করত।
রাজকুমারের ছাত্রজীবন বেশ কাটে।
একদিন রাজকুমার আচার্যের সঙ্গে নদীতে স্নান করতে
যাচ্ছিল,-পথে এক কুঁড়েঘরের সামনে এক বৃদ্ধা তিলের খােসা
ছাড়িয়ে তিল রােদে দিচ্ছিল। বৃদ্ধাকে কিছু না বলে রাজকুমার
এক মুঠো তিল নিয়ে মুখে পূরল। বৃদ্ধা ভাবলে, বােধ হয় ছেলেটির
বড় ক্ষিধে পেয়েছে-সেজন্য চুপ করে রইল।
পরদিনও রাজকুমার আবার এক মুঠো তিল মুখে পূরল।
সেদিনও বৃদ্ধা তাকে কিছুই বললে না।
বাধা না পেয়ে রাজকুমারের লােভ ক্রমশঃ বাড়তে লাগল।
রাজকুমার ভাবলে, বােধ হয়, আমি রাজপুত্র বলে বৃদ্ধা ভয়ে কিছু
তিলযুষ্টি
বলছে না। তৃতীয় দিনে রাজকুমার যেই তিল মুখে পূরল, অমনি
বৃদ্ধা চীৎকার করে উঠল। আচাৰ্য্য পিছন ফিরে বললেন,-মা,
তােমার কি হয়েছে ?
বৃদ্ধা বললে,—প্রভু, আপনি কেমনতর আচাৰ্য। ছাত্রদের দিয়ে
আমার জিনিস লুঠ করাচ্ছেন।
আচাৰ্য বললেন,—মা, তােমার কি জিনিস আমার ছাত্র লুঠ
করেছে ?
বৃদ্ধা বললে,-প্রভু, আপনার এই ছাত্রটি আজ তিন দিন ধরে
আপনার সঙ্গে স্নানে যাবার পথে এক মুঠো করে তিলা মুখে পুরে ।
প্রথম দিন ভাবলাম, আহ বেছারির বড় ক্ষিদে পেয়েছে, তাই সে
বলে নিয়েছে। কালও যখন নিলে তখন ভাবলাম, আপনি বােধ
হয় ছাত্রদের পেট ভরে খেতে দেন না, তা না হলে চুরির লােভ
আসবে কি করে ? আজও যখন না বলে নিলে, ভাবলাম, আপনার
উপদেশেই ছাত্রটি এমন কাজ করেছে। আমি এ বিষয়ে রাজদ্বারে
নালিশ করব।
আচাৰ্য বৃদ্ধাকে বললেন,-মা, আমি এর বিন্দুবিসর্গও জানি
। বেশ, তুমি কেঁদ না, তােমার তিলের দাম দিচ্ছি।
বৃদ্ধা বললে,-না, আমি তিলের দাম চাই না। আমি চাই
আপনার এ ছাত্রের চরিত্র সংশােধন, এবং ছাত্রের চরিত্র সংশােধন
করা আচার্যের কর্তব্য নয় কি ?
আচাৰ্য বললেন,-মা, আমি তা জানি, গৃহে আমি উহাকে শাস্তি
গল্পবেণু
দিতাম। কিন্তু তবুও জিজ্ঞাসা করছি, তিলের মূল্যের পরিবর্তে কি
চাও বল ?
বৃদ্ধা ভাবলে, হয়ত, গৃহে আচার্য্য ছাত্রকে শাস্তি দিবেন না,
বললে,--আমার সামনে ইহাকে তিন বার বেত্রাঘাত করুন।
আচাৰ্য্য বেত্রাঘাত করলেন। রাজপুত্র এতখানি আশা করেনি।
রাগে, দুঃখে তার চোখ দুটি লাল হয়ে উঠল। আচার্যের দিকে সে
একবার তাকালে,—সে চোখে দোষ স্বীকারের নম্রতা নাই,আছে
প্রতিহিংসার ভীষণ ছায়া। রাজপুত্রের চোখের
ছায়া। রাজপুত্রের চোখের ভাষা আচাৰ্য্য
বুঝলেন।
রাজপুত্র দ্বিগুণ মনােযােগ দিয়ে নির্দিষ্ট কালের বহু পূৰ্বে পাঠ
সমাধা করলে।
পাঠশেষে বিদায়ের দিন এল। রাজকুমার আচার্যের পাদবন্দনা
করে বললে,-গুরুদেব, আমি রাজপদ লাভ করলে, আপনার নিকট
লােক পাঠাব, আশা করি, সে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে আমায় কৃতার্থ
করবেন।
এমন বিনয়ভাষণের অন্তরালে যে প্রতিহিংসার ছায়া তখনও
রাজপুত্রের মুখে ফুটে উঠল—তা আচার্যের দৃষ্টি এড়াল না। আচাৰ্য্য
বললেন,-বৎস! নিশ্চয়ই যাব, আশীর্বাদ করি, তােমার মন
নিৰ্ম্মল হােক্।
বারাণসীতে রাজপুত্র ফিল। রাজ্যে উৎসব আরম্ভ হ'ল—
ব্ৰহ্মদত্তকুমার এইবার যুবরাজপদে অভিষিক্ত হবে। দেশে দেশে
তিলমুষ্টি
নিমন্ত্রণ গেল । সকলেই এল, কিন্তু আচার্য্য এলেন না।
কুমার এ অপমানের প্রতিশােধ নেবার প্রতীক্ষায় রইল।
আচাৰ্য্য বেত্রাঘাত করলেন
-
দশ বৎসর পরের কথা। আচাৰ্য এখন খুবই বৃদ্ধ হয়েছেন,
তিনি ভাবলেন, এতদিনে ব্ৰহ্মদত্তকুমার সময়ের গুণে শান্ত হয়েছে
এইবার তঁার যাওয়া উচিত।
গল্পবেণু
একদিন বিনা নিমন্ত্রণে ব্ৰহ্মদত্তকুমারের প্রাসাদদ্বারে আচার্য্য
এলেন। রাজার কাছে সংবাদ গেল,—'তক্ষশিলার আচাৰ্য তাঁর
দর্শনপ্রার্থী।
অতি সমাদরে রাজসভায় আচার্য আনীত হলেন। কিন্তু
একি!--রাজ। তাকে দেখে -কুঞ্চিত করলেন কেন? সে দিনের
কথা কি তিনি এখনও ভুলেননি?
রাজা বললেন, হে আচার্য্য, আপনাকে দেখে সে বেত্রাঘাতের
জ্বালা আবার যেন নূতন করে জাগল । তা ছাড়া, আপনার এত
স্পর্ধা, আমার নিমন্ত্রণ আপনি উপেক্ষা করবার সাহস রাখেন।
আমি রাজা, দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, আপনার এমন দণ্ডের ব্যবস্থা করব, যাতে
ইহলােকে কেহ আপনার অস্তিত্ব খুঁজে পাবে না।-ঘাতক!
ঘাতক রাজার সামনে অভিবাদন করে বললে,--যা আজ্ঞা
মহারাজ।
আচাৰ্য ঈষৎ হাসলেন, বললেন—বৎস, দেখছি, তােমার এখনও
রাগ যায়নি। তখন নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিনি কেন যেন-প্রাণদণ্ডের
ভয়ে নহে--তােমার প্রাণহানির ভয়ে।
কি এত বড় স্পর্ধা! এমন অদ্ভুত কথাও কখন শুনিনি।
একজন সামান্য আচার্যের কাছে ব্ৰহ্মদত্তকুমার প্রাণনাশের আশঙ্কা
হােঃ হােঃ।
আচাৰ্য বললেন,—শান্ত হও ! সমস্ত ঘটনা খুলে বললে,
তুমি বুঝতে পারবে । শােন রাজা, আমি যদি তােমায় ছাত্রাবস্থায়
তিলমুষ্টি
এভাবে শাসন না করতাম, তাহলে তুমি ক্রমশ অন্য নানা
জিনিস চুরি আরম্ভ করতে। পরের জিনিস না বলে লওয়ার
নাম চুরি। তুমি বৃদ্ধাকে না বলে যে তিন মাঠে তিল নিয়েছিলে,
সেটাও চুরি।
চুরিব সামগ্র যত
সামান্য হে না
কেন, চুরি করার
চের
পাওয়া উচিত।
যদি তােমার চুরি
স। না বল
উপেক্ষা করতাম,
তোমায় একজন
রাঙ্গা রূপে না
দেখতাম
চর প।
বৎস, দেখছি তােমার এখনও রাগ বা নি
দোযের
মূলে উপযুক্ত শাস্তি দিলে, সে দোষ নিৰ্ম্মল হবার সম্ভাবনা বেশি।
তা ছাড়া তােমার মনে গর্ব ছিল, রাজপুত্র বলে সমাজ
তােমার দোষ উপেক্ষা করবে, কিংবা আমি তােমায় বেত্রাঘাত করতে
১৪০ গল্পবেণু পারি, এমন কথা তুমি কল্পনাও কর নি । কিন্তু তােমার জান উচিত,—শিক্ষালয়ে ছাত্রদের মধ্যে কোন সামাজিক ভেদ থাকতে পারে না, রাজার ছেলে আর সামান্য গৃহস্থের ছেলে দুজনেই শিক্ষকের কাছে সমান। রাজন! আশা করি তুমি এখন বুঝতে পারলে বেত্রাঘাত করায় আচার্যের কোন দোষ হয়নি। আমি জানতাম, রাজ্যাভিষেকে তুমি নিমন্ত্রণ করেছিলে, আমায় শ্রদ্ধা জানাবার জন্য নয়, আমায় হত্যা করবার জন্য । তখন তুমি ছিলে তরুণ-তরুণ ভেবে-চিন্তে কাজ করে না, আমি যদি আসতাম, আমায় হত্যা করতে বাধত না। এদিকে আমার প্রাণবধের প্রতিশােধ নেবার জন্য তক্ষশিলার রাজা তােমার রাজ্য আক্রমণ করত, এবং হয় ত তােমার প্রাণহানি হত। কিন্তু আমি দুঃখিত, তুমি এখনও ক্রোধের বশীভূত আছ। ক্রোধ মহাপাপের মূলধ্বংসের মূল। তাই ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, তােমার সুমতি হােন্। রাজার চোখের সামনে যেন কালাে একখানা পরদা সরে গেল,- ভেসে উঠল জ্ঞানের আলােক রশ্মি । রাজা নত মস্তকে আচার্যের চরণে প্রণাম করলেন, বললেন,-আপনার আশীৰ্বাদ অক্ষয় হাে। -
আজে বাজে বই
আমরা প্রকাশ করি না
পুস্তক তালিকা
পরপৃষ্ঠায় দেখুন
আমাদের বই নিঃশঙ্ক
চিত্তে ছেলেমেয়েদের
হাতে তুলে দেওয়া যায়
শিশু-সাহিত্যে নামকরা ক'খানা ব
সুবিনয় রায় চৌধুরী
বল তাে
ধাধার বই। চোখের ধাধা, শব্দের ধাধা, হেঁয়ালি, সমস্যা প্রভৃতির বই।
এ ধরণের বই শিশুসাহিত্যে এই প্রথম। ছেলেরা, বড়রা এ বই পড়ে বেশ আনন্দ
পাবে--সাধার ছবিও আছে।
দাম দশ আনা
শ্রীসুনির্মল বসু
লালন ফকিরের ভিটে
নাম করা বই। গল্পগুলির মধ্যে একটা হাল্কা সি ও রহস্যের স্রোত বয়ে
যাচ্ছেতাই বার বার পড়লে ও কখনও পুরোণো ঠেকে না। দ্বিতীয় সংস্করণ।
দাম ছয় আনা
শ্রীসুধাংশু দাশগুপ্ত
পরার গল্প
রূপ কথার গন। প্রত্যেকটি গল্প মধুময়। তােমাদের মনকে ধীরে ধীরে
বাস্তব থেকে কললােকে নিয়ে যাবে--ভুলে যাবে তুমি গল্প পড়ছ। মনে হবে
তুমিই যেন গল্পের নায়ক।
দাম ছয় আনা
শ্রীসুধাংশু দাশগুপ্ত
মায়াপুরীর ভুত
ভয়ের বদলে হাসির কল্পধারা প্রতি ছত্রে ছত্রে। দ্বিতীয় সংস্করণ।
দাম ছয় আনা
ইষ্টার্ণল-হাউস : ১৫, কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা।
শিশু-সাহিত্যে নামকরা ক'খানা বই
শ্ৰীহেমেন্দ্রকুমার রায়
আজব দেশে অলা
বg Ai it 01}{rialoct. একে বই পানি অশ, বনার
পর গটনায় পরিপূর্ণ --- তা'তে বােরখার ঃ এর এ টু এ
মিশে আছে। কাহিনা তব ও বাড়ির দিত , রণ সহ দেবে।
দাম আট আনা
দেব বসু
ঠাকুরদা
তোমাদের কত পূf • এ!, 1 ওয়া, পড়ার কেন ক ন |
মার গল্প ‘ড়ে গে, তা হয়ত তামাদের : ৬ , কি ?
মখে" সে শুনলে বা ৰে? বৰ---:
দাম দু জানা
শিবরাম চক্রবর্তী
মটর মাষ্টার
সামসিক পত্রিকার শিবরাম বরর লেখার সঙ্গে মােদের পরিচয় আছে।
সবচেয়ে বেশি হাসি যাতে আছে, এমন ব গ বেছে নিয়ে এই বইখানি বের
করা হল। হাসতে হাসতে পেটের নাড়ি ছিড়ে গেলে শিবরাম কিন্তু
দাম দুয় আনা
দায়ী নহেন।
ইষ্টার্ণ-ল-হাউসঃ ১৫, কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা।
শিশু-সাহিত্যে নামকরা কখানা বই
শিবরাম চক্রবর্তী ও শ্রীগৌরাঙ্গপ্রসাদ বসু
জীবনের সাফল্য
মন্টর মাষ্টারের মতই তেমনি চমৎকার, তেমনি মজার সব হাসির গল্প। তেমনি
প্রকাণ্ড বই, পাতায় পাতায় ছবি, শিবরামবাবুর সঙ্গে আবার যােগ দিয়েছেন,
গৌরাথবাবু, অল্পদিনেই হাসির গল্প লিখে নাম কিনেছেন যিনি ।
দাম ছয় আনা
শ্ৰীশৈলনারায়ণ চক্রবর্তী
বেজায় হাসি
হাসির কবিতা আর কাটুন ছবি। শিশুসাহিত্যে এমন বই এই প্রয়ুম।
দ্বিতীয় সংস্করণ।
দাম পাঁচ আনা
শ্রীযােগেশ বন্দ্যোপাধ্যায়
সােনার পাহাড়
এডভেঞ্চারের কাহিনী। কি কি ভয়াবহ বিপদে দুটি বাঙালী ছেলেকে
পড়তে হয়েছিল-শক্তি সাহসের দ্বারা কি ভাবে বিপদ কাটিয়ে উঠেছিল, তা, পড়লে
যেমন গায়ে কাঁটা দেয়, তেমনি উৎসাহে লাফাতে হয়। দাম দশ আনা
শ্ৰীসুনির্মল বসু সম্পাদিত
আৱতি
৪৫০, পাতার বিশাল বই, সব রকমের গল্প,
কবিতা, কাহিনী, নাটক প্রভৃতির মৌলিক
সংগ্রহ সমস্ত লেখাই মৌলিক। দাম ১০।
ইষ্টার্ণল-হাউস : ১৫, কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা।
No text on this page.
'শিশু-সাহিত্যে নামকরা ক'খানা বই
শ্রীশিবরাম চক্রবর্তী ও শ্রীগৌরাঙ্গপ্রসাদ বসু
জীবনের সাফল্য
মণ্টর মাষ্টারের মতই তেমনি চমৎকার, তেমনি মজার সব হাসির গল্প। তেমনি
প্রকাণ্ড বই, পাতায় পাতায় ছবি, শিবরামবাবুর সঙ্গে আবার যােগ দিয়েছেন,
গৌরাঙ্গবাবু, অল্পদিনেই হাসির গল্প লিখে নাম কিনেছেন যিনি।
দাম ছয় আনা।
শ্ৰাশৈলনারায়ণ চক্রবর্তী
বেজায় হাসি
হাসির কবিতা আর কাটুন ছবি। শিশুসাহিত্যে এমন বই এই প্রম।
দ্বিতীয় সংস্করণ।
দাম পঁাচ আনা
যােগেশ বন্দ্যোপাধ্যায়
সােনার পাহাড়
এ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী। কি কি ভয়াবহ বিপদে দুটি বাঙালী ছেলেকে
পড়তে হয়েছিল-শক্তি সাহসের দ্বারা কি ভাবে বিপদ কাটিয়ে উঠেছিল, তা, পড়লে
যেমন গায়ে কাঁটা দেয়, তেমনি উৎসাহে লাফাতে হয়। দাম দশ আনা
সুনির্মল বসু সম্পাদিত
আৱতি
৪৫ পাতার বিশাল বই, সব রকমের গল্প,
কবিতা, কাহিনী, নাটক প্রভৃতির মৌলিক
সংগ্রহ সমস্ত লেখাই মৌলিক। দাম ১।
ইষ্টার্ণ-ল-হাউস : ১৫, কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা।
No text on this page.