Bally Sadharan Granthagar

Detinew

Gupta, Amalendu Das · 2009/09/5

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

ডেটিনিউ
--সরস্বতী লাইব্রে
কলেজ স্কোর ইষ্ট,

ঐকিরণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় কং সরস্বতী লাইব্রেরী, কলেজ স্কোয়ার ইষ্ট,
কলিকাতা হইতে প্রকাশিত।
দাম পাঁচ সিকা
গতী প্রেস লিমিটেড, ১নং রমানাথ মজুমদার ঐট, কলিকাতা হইতে
মহেন্দ্রনাথ দত্ত কক মুদ্রিত।

জেল-বন্ধুদের
দিলাম—
-আশ্বিন,
১৬

No text on this page.

'জানি মনে চিরঞ্জীবন সহায়হীন কাজে ?? সখ্য। ৫।s একটী সাথী আছেন হিয় মাঝে তাপস তিনি, তিনিও সদা একা, তাঁহার কা ধানের রূপ বাহিরে মেলে লেখা।” বড় একাকী বােধ করিতেছি। একাকী মানুষ যে এত ভয়ানক তা আনিতাম না। নিজেকে নিজেরই বেন কমন ভয়াবহ মনে হয়। যে লােক নিজের মধ্যে নিজে জয় পাইয়াছে, নির্জনতা বল তারই লােভনীয় ও সহনীয়। আমাদের মত সাধারণ মানুষকে মানুষের জি হইতে সরাইয়া আনিলে আমরা মৃতের সামিল হইয়া যাই। নির্জনতা ও একাকিত্বের মধ্যে গেলেই আমাদের অস্তিত্বের জম বন্ধ হইয়া যায়। মনে হয়, { সত্যই হারাইয়া গিয়াছি। এই নিঃসঙ্গ এক অনুভূতি আমার নিকট নুতন পরিচয় আনিয়াছে। { একাকিত্বের পীড়ন হইতে মুক্তি চাই, কিন্তু মুক্তি তাে স্কুল নহে। জানিত এ সৌভাগ্য ও সাধনা দুইই থাকা চাই। শাস্ত্রে নাকি আছে—অর্থে তিনি একাই ছিলেন, একক নিজেকে সাধ্যি দিবার জন্ধ তিনি সৃষ্টিকে বাহিরে অনিলেন। মাকড়সা যেমন নিজের মধ্য হইতে সূতার পর সূতা বাহির করিয়া জাল বুনিয়া থাকে, তিনিও ( যিনি অগ্রে একা ছিলেন) নিজের মধ্য হইতে সৃষ্টিটা বুনিয়া বাহিরে আনিতেছেন। তাঁর এই সৃষ্টিকৌশল কবিকে মুগ্ধ ও বিন্নিত করিয়াছিল, তিনিও জানিতে চাহিয়াছিলেন “তুমি কেমন করে গান করহে গুণি ?” মনে হয়, আমাদের ভিতরে একটা মাকড়সা আছে, সেও জাল বোৰেতি ও কল্পনা দিয়া। বিধাতার বাহা সৃষ্টি, আমাদের তাহা কল্পনা কল্পনা যখন শীতের দিকে মুখ ফিরায়, তখনই সে স্মৃতিতে রূপান্তুরিত হয়। বর্তমান হইতে মুক্তির পথ দুদিকে প্রসারিত-এটা গিয়াছে ভৰিল্পের ফিকে, অপয়টা গিয়াছে অতীতের অভিমুখে। স্মৃতির পথ ধৰিয়া অতীতের দিকে মন ভাই বারবার বাহির হইতে চায়—এই একাকিত্ব হইতে মুক্তির জয়। মাজুষের ব্যক্তিগত সীমানায় যাহা স্মৃতি, ইতিহাসের বিরাট পটভূমিকায় তাহাই অতীত। এই অতীতকে কবি মিনতি করিয়াছেন— ‘কথা কও, কথা কও।” পিছনে ফিরিলে দেখি, সাতবছরের মৃত দিনগুলির দীর্থ কঙ্কাল পড়িয়া রহিয়াছে। জেলখানায় এই দিনরাত্রিগুলির অপমৃত্যু ঘটিয়াছে। এই প্রেতদিবস- গুলি উদ্ধার কেমন করিয়া হইবে? কঙ্কালকে কথা কইতে পারেন, সে শবসাধক সন্ন্যাসী কি আমাদের মধ্যে আছেন ? আমরা শুধু পারি কবরের ধারে বসিয়া কাদিতে, আর পারি বলিতে-কথা কও, কথা কও।” কান পাতিলে হয়তাে ভিতরে কথা শোনা যায়। কিন্তু কানকে যে বাহির তে ভিতরের দিকে ফিরানাে দরকার সেজ। বৈষ্ণব কবি বলিয়াছিলেন- হির দুয়ারে কপাট লেগেছে ভিতর দুয়ার খােলা।” ভাগ্যবান ব্যক্তি। ঐ Lন দরজাটার দিকেই বােধ হয়—“মাধব তুয়া অভিসারকি লাগি।” দরজা তো । ঈশ্বরের ছেলে ভরসা দিয়াছেন—knock, কড়ানাড়া দাও; it shall be opened unto you“দেখ, দরজা খুলিল বলিয়া। কিন্তু এ কিসের দরজা? বাসর ঘরে দুয়ারে দাঁড়াইয়া “ওগাে বর, ওগাে বধু। “পালঙ্কে শয়ন বুজে বগলিত চীর অঙ্গে নি যাই মনের হরিষে-ছলনাময়ীর এ কপট নিত্ৰা ভাঙ্গাও। এখন বাহির দুয়ারে কপাট লেগেছে ভিতর দুয়ার খােলা।” প্রসিডেন্সি জেল ৬শে আষাঢ়-৪ —ডেটিনিউ জেলখানা তার কপাট দুইটা খুলিয়া একটা অতিকায় জন্তুর মত তার উদরে আমাদিগকে একদিন গিলিয়া লইয়াছিল। তখন মনে মনে ভরসা ছিল যে, কিছুদিনের মধ্যেই উদগার করিয়া বাহিরের জিনিষ বাহিরকে ফিরাইয়া দিবে। তখন কে সন্দেহ করিয়াছি, যে, অতিকায় জড় জন্তুট গিলিতে যত তৎপর গিলিতবস্তু উগায়ে সেই অনুপাতে ঢিলা ও অনিচ্ছুক। সাত বছর পার হইয়া গেল, মুখটা খুলিবার কোন লক্ষণই দেখা যাইতেছে না। ভিতরের জারকস যত্নের সহিত সারাদেহে মশলার মত মাখাইয়া লইয়া আমাদিগকে সে পরম পরিতােষের সহিত লেহন করিতেছে বৎসরের পর বৎসর। লেহনের মাঝে মাঝে দুএকটা চর্বণও সে দিয়া লয়। বুঝিতেছি, চর্বপৰ্যায়ভুক্ত বস্তু নাই, নতুবা চিবাইয়া শেষ করিতে এতদিন লাগিত না, দুদিনের দুকামড়েই আমাদের খাদ্য-জন্ম ঘুচাইয়া দিত। আমরা আসলে লেহ ও চোষ্যজাতীয় জীব, ভিতরে বােধ হয় শক্ত এমন কিছু নাই যাতে চর্বণের প্রয়ােজন হইবে। ভিতরে ঢুকিয়াছি একদিন, সরকারের বদনাম রটাইবার জন্য শত্রুতা করিয়া যদি না মরিয়া যাই, তবে বাহিরে যাইও একদিন।

ভেটিনিউ- কিন্তু সেই ঢুকিবার একদিন, আর বাহির হইবার একদিন-এ দুইটা দিন মিলাইয়া দেখিলেই ধরা পড়িবে-“মা কি ছিলেন, আর কি হইয়াছেন ।" হাতীতে-খাওয়া কয়েতবেলটা বাহ্যতঃ দেখিতে নিখুত, কিন্তু ভিতরে নাকি শূন্যকুম্ভইব। আমাদেরও একদিন পুণ্যবল ক্ষীণ হইবে, ভুক্ত কপিখের ন্যায় জেল-স্বর্গের ঐরাবত আমাদিগকে মর্ত্যের মাটীতে ছুড়িয়া ফেলিবে। আপন জনেরা উৰ্দ্ধশ্বাসে ছুটিয়া আসিয়া কুড়াইয়া লইবেন, নড়িয়া চাড়িয়া দেখিয়া মুখ বাঁকা করিবেন, ভাবিবেন,--দুধেজলে-মিশানাে পানীয় হইতে দুধটুকু গ্রহণ হইয়াছে দেখিতেছি, স্বর্গ হইতে রক্তমাংসের মানুষটার রক্তমাংস সবই ফেরৎ আসিয়াছে, কিন্তু মানুষটা কোথায় ! অতএব—“সে কোথায়, সে কোথায়। আমরা সরমে মরিব না, প্রাণে যদি তখনও বাচিয়া থাকি, তবে চিহি চিহি গলায় ক্ষীণস্বরে গর্জন করিব—“সে যে আমি, সেই আমি।" অভিনেতারা একই রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করে বটে, কিন্তু প্রত্যেকের প্রবেশভঙ্গী ও রকমসকম স্বতন্ত্র । ভীম যেমন করিয়া আসরে আসিবেন, তার বড় ভাই যুধিষ্ঠিরও সেই ভাবে আসিবেন---এ কেহ আশা আমরা যারা ধরা পড়িয়াছিলাম, তারা সবাই এক স্বভাবের লােক ছিলাম না। আমরা ছিলাম নানামুনির নানামতের মত । আমাদিগকে দেখিলে সৃষ্টিকর্তার বিরাট প্রদর্শনীর একটা বড় অংশই দেখা হইয়া যাইত—এত হরেক রকম, এত বিভিন্ন আকৃতি প্রকৃতির সমাবেশ ছিলাম আমরা।

-ডে মিট আমি জেলে ঢুকিলাম—যেন চুবড়ী হইতে মরা মাছ ক্রেতার থলির মধ্যে গিয়া প্রবেশ করিল। পরে জানিয়াছিলাম, আমার মত নিরীহ সবাই ছিলেন না। এই জেল-রঙ্গমঞ্চে বিভিন্ন অভিনেতা বিভিন্ন ভঙ্গীতে আগমন করিয়াছেন, যার যেমন রুচি আর কি। একজনের কথা বলি। লােকটীকে বসাতে গিয়ে দেখি। করাচীর মুসলমান, বয়সে যুবক, নাম বুখারী। অতিশয় চঞ্চল, চঞ্চল লােকও বুদ্ধিমান হয়, এই শ্রীমান্ তার একটা নমুনা। এসবও তার চরিত্রে ধর্তব্য নয়। তার চরিত্রের আকর্ষণীয় দিকটা অন্যত্র। এমন সহানুভূতি ও দরদসম্পন্ন হৃদয় সচরাচর দেখা যায় না। তাই এই জাতীয় লােৰু অতি অল্প সময়ের মধ্যেই অপরিচিতকে আপন করিয়া নেয়। করাচীর মুসলমান, বাংলায় কি কাজে আসিয়াছিল, তা জানে সে আর পুলিশের লােকে। আমরা শুধু জানি সেটা ত্রিশ সাল, একটা ‘ওলটপালট এর কি ওপার'-গগাছের লগ্ন সেটা ভারত- বর্ষের। আর বাংলার তো কথাই নাই—তার ভাগ্যাকাশে সেদিন সমস্ত কয়টা গ্রহই পূরারকমে কুপিত হইয়াছিল। করাচীর মুসলমান বাংলাতে! কেনরে বাপু, গণ্ডগােল করিতে টিকিট খরচ করিয়া এতদূরে আসা কেন! মরার মত জায়গার কি ও-বালির দেশে এতই অভাব ! কথা শুনিয়া প্রমান্ মৃদু মৃদু হাস্য করিত। এখানে উল্লেখ থাকে যে, বাংলাটা বুখারী বলিতে পারিত না, কিন্তু বুঝিতে কিছু কিছু পারিত। কলিকাতাতে পুলিশের লােক বুখারীকে সেইখাঁজা জিয়াছে, হারাইলে গৃহস্থেরা ঝােপজঙ্গল আদাড়পাঁদাড় যেমন করিয়া খোঁজে। এ হেন দিনে একটা বড় রাস্তার উপরে এই মুসলমানটা থাকিতেছে, পুলিশ খবর পাইয়া ফেলিল। পুলিশ আসিয়াছে, বাড়ী বেষ্টন করিয়াছে, বিশ্রামকারীদের মধ্যে এ সম্বাদ প্রচার হইয়া গেল। বুখারী অতি আস্তে একটা দরজা খুলিয়া বাহির হইল। পাতলা বােগা মানুষ, ধারণা ছিল যে, পুলিশের দৃষ্টির উপর দিয়া পিছলাইয়া যাইবে এবং সরিয়া পড়িবে। রাহুর দৃষ্টি এড়ানাে যায়, শনির দৃষ্টি এড়ানাে যায়—এই পৰ্য্যন্ত বিশ্বাস করিতে বাধা আছি। পীড়াপীড়ি করিলে, চাপিয়া ধরিলে এও বিশ্বাস করিতে স্বীকৃত থাকিব যে, মৃত্যুকেও ফাঁকি দেওয়া যায়। কিন্তু পুলিশের দৃষ্টিকে ফাকি ! শুনিয়া বলিতে ইচ্ছা করে না কি -“পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?” উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে ওস্তাদজী (দক্ষিণ কলকাতার অমর চাটার্জী) ছিলেন, তিনি দাত-মুখ খি চাইয়া বলিয়াছিলেন-“ব্যাটা করাচীর মুসলমান, একি তােমার দেশের পুলিশ পেয়েছ যে, ইচ্ছা হােল আর দেশ ছেড়ে ফাকি দিয়ে পালিয়ে এলে? নে ব্যাটা ব, তারপর কি হােল।” তারপর হইল পুলিশ-দর্শন। দরজা খুলিয়া রাস্তায় দাড়াইতেই দেখিল যে, এ পােড় মূল্পকে রাতদুপুরেও অন্ধকার নাই। আললাগুলি সমান উৎসাহে সানন্দে জলিতেছে। মাথার উপর পাগড়ী আর পায়ের তলায় ছায়া লইয়া পুলিশ এদিক ওদিক ও সৰ্বদিকে দাড়াইয়া আছে। শেষে কি এই পদছায়ায় শরণ নিতে হইবে । গ্রীষ্মকাল, একপাল কুলি ও ভিখিরী কাছেই ফুটপাতের উপর শুইয়া নিদ্রা যাইতেছিল। দেখিয়া বুখারীর নিদ্রা যাইবার ইচ্ছা হইল। এবং সঙ্গে সঙ্গে-“এস ভাই, ভােল হাই, শুয়ে পড় চিৎ।” বুখারী ঝাঁকের কই ঝাকে মিশিয়া গেল। এর পরের ইতিহাস অতি সহজেই অনুমেয়। মাথার উপরে লাল পাগড়ী, আর মগজের মধ্যে কালাে সন্দেহ—এই তত পুলিশের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। পুলিশের দৃষ্টিতে জাতিভেদ, শ্রেণীভেদ ইত্যাদি অনাবশ্যক আপদ-বালাই নাই। সে দৃষ্টি একেবারে মার্জিত, মুক্ত ও নিরাসক্ত সমস্ত পৃথিবীটাই সে দৃষ্টির নিকট একটা বড় রকম শয়তানের অজ্ঞা, আর মানুষগুলি সেই আড্ডায় ছােট-বড় এক একটী চেলাচামুণ্ডা। সৃষ্টি ও সমাজ সম্বন্ধে এতবড় একটা দার্শনিক দৃষ্টি পুলিশেরই সম্ভব। সেই পুলিশ, সন্দেহ যার চোখে স্বর্গীয় জ্যোতি জালাইয়াছে- বুখারী চাহিয়াছিল তাদের নাকের ডগাতেই আত্মগােপন করিতে । সে তখনও জানিত না যে, পুলিশ এমনই একটা প্রদীপ যার নীচে অন্ধকার থাকে না। কবি তত খামাকা বলেন নাই যে, “তােমার আলােয় নাই তাে ছায়া। “যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ ভাই”—বলিয়া পুলিশ দেখিতে লাগিয়া গেল। সে এক ডাকাতপড়া হৈ হৈ ব্যাপার আর কি! কুলি ও ভিক্ষুকের দল যেন জাগিয়াও স্বপ্ন দেখিতে লাগিল—চোখে মুখে এমনি ভূতে-পাওয়া দৃষ্টি। কিন্তু ভূতও পালায় তার চোটে। এখানে একটা শুভ-সম্বাদ দেই, যাতে প্রত্যেক দেশপ্রেমিকই আশ্বস্ত হইবেন। আমাদের দেশবাসীর প্লীহাগুলি আর আগের মত নরম নাই- অনেক মজবুত টেকসই হইয়াছে। সেদিন তাই বুটের ফুটবল- কিলি পেটের উপর অমন অনায়াসে তারা পাতিয়া লইতে পারিয়াছিল। বুখারীর প্লীহাও এই পরীক্ষায় পড়িয়াছিল কিনা, জিজ্ঞাসা করিয়া উত্তর পাওয়া যায় নাই। সে কথা থাক্। ছাই উড়াইয়া দেখিতে গিয়া র মিলিয়া গেল। ফলে, ‘রাধিকার মানে পুলিশের হৃদয়ে উল্লাস’—বঁধুয়া মিলালাে রাস্তায়। এইখানটায় ওস্তাদজী বুখারীকে বলিয়াছিলেন—“কেমন, দেখ লি তাে ব্যাটা, এ তােদের সিন্ধী পুলিশ নয়, খােদ টেগার্ট-সাহেবের পুলিশ। নে বলে যা, তারপর কি হল। ব্যাটা হারামজাদা, আচ্ছা বুদ্ধি করেছিলে বাবা, একেবারে কুলির মধ্যে ডুব?” এবং শেষে সান্ত্বনার সুরে কহিয়াছিলেন—“নে, দুঃখ করিনে। শেষটাতাে সেই ভদ্রলােকের দলেই এলি।” বলিয়া আমরা যত ভদ্রলােক উপস্থিত ছিলাম, তাদের উপর দিয়া দৃষ্টিটা ঝাটার মত মার্জনা করিয়া নিলেন। পরের দিন পুলিশের এক বড় সাহেবের নিকট বুশারীকে হাজির করা হইল। সাহেব চোখের কোণে দেখিয়া লইয়া কহিল—“এই সেই করাচীর পাখী ! শেষটা তবে ধরা পড়লে ?” ওস্তাদজী কহিলেন-“তুই কি বল্লি ? বল্লিনে কেন, প্রিয়তম, ভীরু পাখী পিঞ্জরে এসেছি ; দোহাই তােমার, দ্বার কোনাে রুদ্ধ কোরনা।” কথাট- ইংরেজী করিয়া বুঝাইয়া দিতে বুখারীও আমাদের মতই হাসিয়া উঠিল, পরে কহিল-“আহা, যদি জান্তাম।”

-ভেটিনিউ
সাহেব জানিতে
জানিতে চাহিল--বুখারীকে কোন্ শয়তানে
হইয়াছিল যে, সে করাচী ছাড়িয়া এই বাংলাতে আসিয়া ঢুকিয়াছে।
বুখারী বিনীতভাবে কহিয়াছিল যে, হুজুরকে যদি শয়তানে
সাতটি সমুদ্র এবং তেরটী নদী পার করিয়া এখানে আনিয়া ফেলিতে
পারে, তবে দেশেরই একস্থান হইতে অন্যত্র তাকে সরাইয়া আনিতে
পারা কি বেশী আশ্চর্যের বিষয়।
শুনিয়া সাহেব খুশী হইল, এবং ঘোষ করিয়া একটা আওয়াজ
ছাড়িল ; বলিল যে,-বাংলায় যখন আসিয়াছে, বেশ, তখন তার
পূরা মজাটা ভােগ করিয়া যাইতে হইবে।
এবার বুপারীর খুসী হইবার পালা। স্বর্গীয় হাসি হাসিয়া
সে যাহা কহিয়াছিল, তাহার কবিতায় তর্জমা এই--‘অত করুণ।
তােমার হৃদয়ে রহিবে গাথা।
কয়েক মাস বা দুর্গে কাটাইয়া অবশেষে তার মজ। ভােগটা
শেষ হয়। বাংলার পুলিশ তাকে বাংলার সীমানার বাহিরে
রাখিয়া আপদ বিদায় করিয়া আসে। এবং বিদায় অভিনন্দনে
শাসাইয়া দেয় যে, এ পাড়ায় ফের যদি সে পা দেয়, ৭-ঠ্যাং খোঁড়া
করিয়া তবে ছাড়িবে। বুখারী আশ্বস্ত হইয়াই ফিরিয়া গেল।
;
সাড়ে ছয় বৎসর আগের ব্যাপার, তবু ছবিটা পরিষ্কারই চোখের
উপর আসে।
সেই সন্ধ্যায় নীচে পাঁচ-নম্বর ব্যারাকে খাওারবার’ আসর
বসিয়াছে। গানের বস্ত্রপাতি সমুদ

ডেটিনিউ- চাটার্জী তবলার সামনে জাকিয়া বসিয়া এবং নেড়ামাথায় কক্ষটার জড়াইয়া লইয়া বিড়ি ফুকিয়া চলিয়াছেন। তাকিয়া ঠেস দিয়া ‘খাণ্ডারবাণী’ আসরের ওস্তাদ লক্ষেপােষাক-পরিহিত হইয়া নলিনী সেন বিরাজ করিতেছেন, অতি আমীরী ঢংএ আলবােলার নল মুখে টানিয়া লইয়া তিনি ধূম । উদগীরণ করিতেছেন, সুর্মাটানা- চোখ আবেশে স্তিমিত হইয়া আছে। দেখিলে সম উদয় হয়—মন এক ছুটে অতীতের সেই নবাব বাদশার সঙ্গীত-মজলিশে গিয়া প্রবেশ করিতে চাহে। ওস্তাদের পাশে তার খাস মুন্সী (Private Secretary) ভূপতিদা’ (মজুমদার। মাথায় লক্ষৌটুপি ও গায়ে জহরলালী-ফতুয়া পরিয়া অপেক্ষা করিতেছেন। অদূরে ‘খগরাজ পায় লাজ নাসিকা লইয়া দীর্ঘকায় খাসাহেব (মিঃ রেজাক) হাঁটুর উপর পা তুলিয়া লইয়া মৃদু মৃদু শরীর চুলাইতেছেন, আর তাম্বুল চর্বণ করিতেছেন; হাতে চুণের বোঁটাটী এমনভাবে ধৃত—যেন ছেলেদের ইতিহাস বইতে সম্রাট সাজাহান হাতে গােলাপ ফুল লইয়া বসিয়া আছেন। উপরের ব্যারাক হইতে প্রায় সকলেই নীচে আসিয়া পড়িয়াছেন। সভার মধ্যে একধারে ক্ষীণকায় মধুদা’ (সুরেন ঘােষ ) ওষ্ঠে অস্ফুট হাসি নিয়া প্রতীক্ষা করিতেছেন। তারই পাশে সুদর্শন প্রতুলবাবু (গাঙ্গুলী) চোখে শিদের কৌতুহল নিয়া একবার এটা আর একবার ওটার উপর চক্ষুকে ঘুরাইয়া নিয়া ফিরিতেছেন, আর মাঝে মাঝে সুরেনবাবুর সঙ্গে চুপে চুপে বাক্য-বিনিময় করিতেছেন। সভার মাঝখানে বিপুলদেহীষ্টার মহাশয় (যতীশ ঘােষ ) কাঁচাপাকা মাথা নিয়া বেশ এসক্ত হইয়া বসিয়াছেন, ভাবখানা এই যে—কিছুই আজ

ফাইতে পারিবে না, সতরঞ্চি উঠান ইস্তক দেখিয়া তবে ঘরে
ফিরিবেন। তারই প্রায় কাছে ততােধিক বিপুল দেহ লইয়া
রবিবাবু (সেন) প্রতিষ্ঠিত আছেন ; তার ভাবখানা এই যে
ইহারা এখনও কেন আরম্ভ করিতেছে না, আর দুমিনিট ধৈৰ্য্য
ধরিয়া দেখিব, তারপর সব লণ্ডভণ্ড করিয়া ছড়াইয়া দিয়া চলিয়া
যাইব।
সবাই প্রায় আসিয়া গিয়াছেন, এখন আরম্ভ করিলেই হয়।
অবলাদা’ (কর) অস্থির হইয়া জিজ্ঞাসা করিতেছেন—“ও মহেনর,
( গায়ক ব্যানার্জী) আর দেরী কর ক্যান্?”
মহেন্দর উত্তর দিবার আগে এক কোণা হইতে শােনা গেল কে
বলিতেছেন—“বিলম্বের আর দেরী কত ?”
সেই কোণা হইতেই উত্তর আসিল-“ব্যস্ত হন ক্যান্? আর
করলেই শুরু হবে।”
এমন সময় বঙ্গীন-পােষাক-পরিহিতা, অলঙ্কার-ভূষিতা, জরীর
নাগরা পায়, ওড়না গায় রূপসী বাইজী আসরে আসিলেন। সঙ্গীত
সম্প্রদায় সবাই উঠিয়া আসিয়া আ-ভূ কুর্ণিশ করিয়া দুইহাত
বারম্বার কপালে কিয়া বাইজীকে অভ্যর্থনা করিল। বাইজী
পায়ের ঘুঙ্গুর বাজাইয়া আসরের মধ্যখানে আসন গ্রহণ করিলেন।
ওস্তাদজী আলবােলার নল ফেলিয়া অর্ধোখিতভাবে দুই হাত
সামনে বাড়াইয়া দিয়া অভ্যর্থনা করিলেন—“আইয়ে বিবিসাব।”
সভার মধ্যে একটা আন্দোলন বহিয়া গেল। দেব-সভায় উর্বশী
যেন নাচিতে নাচিতে প্রবেশ করিলেন। আময়, সকলেই
নিজেদের এক একটা দেবতার ন্যায় বােধ করিতে লাগলাম।
১১

ভেটিনিউ
আনন্দের অমৃত যেন কলস উপুড় করিয়া পান করিয়া লইয়াছি,
এবার নেশা ও উত্তেজনা আমাদের প্রত্যেককেই আসিয়া
আক্রমণ করিল।
বুখারীকে বাইজী পােষাকে মানাইয়াছিল—স্বীকার করিতে
হইল। গানের ফাকে ফাকে বাইজী উঠিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া যখন
কয়েক পাক নাচিত-তখন আমাদের হৃদয়গুলি ঢেউ-খাওয়া নদীর
মত আথালিপাথালি করিতে ভুলিত না। সবচেয়ে বিষম হইত
যখন বাইজী বিশেষ বিশেষ পাত্র বাছিয়া অপাঙ্গ হইতে নয়ন-বাণ
নিক্ষেপ করিত।
আমিও কয়েকবার তার আঁখির প্রসাদ পাইলাম। তাতে
অনেকে ঈর্ষায় কাতর ও বিষে নীল হইল, তাদের দৃষ্টি ভীমরুলের
হুলের মত ঝাকে ঝাকে আমার উপর আসিয়া পড়িল। আমি নিজের
সৌভাগ্যে গর্বিতবােধ করিলাম এবং এদিকে আমার কর্ণমূলও ঘন
ঘন আরক্ত হইতে কোন ত্রুটি করিল না। বাইজীর সে-দৃষ্টি আজও
মনে আছে। লিখিতে সাধ যায়—“সেই দৃষ্টিখানি, কেমন করিয়া বলিব
সেই দৃষ্টিখানি।” সন্ন্যাসীর তৃতীয় নয়ন দগ্ধ করিতেই শিখিয়াছিল,
এ-রকম বিধিতে শেখে নাই। ভস্ম-হওয়া মদন আর বাণ-বিদ্ধ
হরিণ, মানে এই যেমন আমরা—এর মধ্যে কার অবস্থা বেশী কাহিল
ভাবিতেছি।
এদিকে দেব-সভায় আবার আনন্দধ্বনি ও হাসি উঠিল, বাইজী
বােধ হয় হাসির শান-দেওয়া মৃদু সঙ্কেতময় দৃষ্টি কোন ভাগ্যবানের
উপর নিষ্ণুে করিয়া থাকিবেন।
কর হইয়া কে কহিলেন—“সখি, অমন তেরছ নয়নে চেওনা।”

অমর চাটার্জী তবলার উপর হাত চালাইতে চালাইতেই বাইজীর দিকে একটু ঝুকিয়া কহিলেন—“ও হারামজাদা, তােমার এতও আসে।” কে একজন সংশোধন করিল-“হারামজাদা নয়, হারামজাদী।” বাইজী হারামজাদী কুঞ্চিত করিয়া ও জিভ বাহির করিয়া : ভেংচি কাটিল। সুন্দরীর ভেংচি দেখিয়া আমরা কেহই হাস্য- সংবরণ করিলাম না। সে-দিন হইতে সাড়ে ছয় বছর সরিয়া আসিয়াছি, রােজই আরও দূরে সরিয়া যাইতেছি। কিন্তু বাদুর্গের বন্দী-দিবসের এই সুখস্মৃতি হইতে দূরে সরিয়া যাইতে পারিতেছি না-তাহ। ছায়ার মতই মনের নিত্য-অনুগামী হইয়া চলিয়াছে। দূর করাচী হইতে লােকটী বাংলায় আসিয়া ধরা পড়িল, আমাদের সঙ্গে কিছুকাল সুখ-দুঃখে কাটাইয়া দেশে ফিরিয়া গেল। যাইবার সময় যে সে এ-দেশে এতগুলি মনে একটা স্থায়ী স্মৃতি রাখিয়া গেল- তা বােপ হয় সে-ও জানিতে পারে নাই। আজ জেলের গরাদ-দেওয়া জানালা দিয়া রাত্রির আকাশের দিকে চাহিয়া বসিয়া আছি, কাকে যেন ডাকিয়া বলিতে ইচ্ছা করিতেছে— “কত অজানারে জানাইলে তুমি।”— ডাক্তার গুরুগােবিন্দ সম্বন্ধে এ-গল্পটি প্রচলিত। ডাক্তারকেও প্রথম দেখি বসা কেল্লাতে তার কবশেষত্ব তার কদমফুলী কেশ-মাথার উপর যেন সজারুক্ষেত বােনায়াছে।

তাকে চিরুণী চালাইতে দেখিয়া কে নাকি গাহিয়াছিল-“কেন পান্থ, এ চঞ্চলতা।” ডাক্তারও হাসিয়া কহিয়াছিল—“ঠিক কইছরে ভাই, এ চিরুণী ফিরুণীর কম্ম নয়, রীতিমত মই দেয়া দরকার।” ডাক্তারের দ্বিতীয় বিশেষত্ব তার মুখের একটি টানিয়া টানিয়া- বলা বুলি-যেটী কোন ঘটনাস্থলে প্রবেশের মুখে সে ব্যবহার করিত-“কাজলা কিরে মশায়।” ডাক্তারের সর্বত্র—“ইয়েস- এ্যাডমিশন”। সকলের সঙ্গে মিশিবার সহজ শক্তি তার। এটা অর্জিত গুণ নয়, নিয়াই জন্মিয়াছে। ভাগ্য বলবান-তাই শক্ত জয় করিবার হাঙ্গামা তার নাই, কারণ তার শক্ত নাই বলিলেই হয়। এই গুরুগােবিন্দ ডাক্তার যখন টের পাইল যে, পুলিশে বাড়ী বেষ্টন করিয়াছে, তখন ‘উষা-ডাকে পাখী না ছাড়ে বাসা। গােবিন্দ বাসা ছাড়িবার মতলব করিল। এ কলিকাতার বাড়ী নয় যে, নিজের ব্যুহেই অভিম হইতে হইবে। এর সব দিক দিয়াই নির্গমন চলিতে পারে। পলায়নে পায়খানার পথও প্রশস্ত, আপদ্ধৰ্ম্মে লিখিত আছে। বাহির হইতেই উষার আলােতে দেখা গেল তত্রস্থানেও এক পুলিশ ব্যুহের নির্গমন- পথ আটকাইয়া দণ্ডায়মান। কানামাছি-ভোঁ করিয়া ডাক্তার দৌড় দিল। সিপাহী প্রস্তুত ছিল না, ব্যাপারটা মালুম হইল একটু দেরীতে। তখন কঁাধের উপর চার-হাতি বাঁশের লাঠি তুলিয়া লইল। তারপর “শালা ভাকু” বলিয়া মারণ-মন্ত্র হাঁকিয়া পশ্চাদ্ধাবন করিল। অগ্রে ধাইতেছে শালা ডাকু ডাক্তার গােবিন্দপশ্চাতে ধাইতেছে বংশ কখধংস সিং। ছবিখানা মনে মনে দেখিয়া লইয়া সুরপতি চক্রবর্তী ১৪ নাকি বলিয়াছিল—“এ যে দেখছি, আর কতদুর নিয়ে যাবে মােরে হে সুন্দরি।” বেশীদূর যাইতে হইল না। সামনেই পাটের ক্ষেত। প্রবেশ মুখ বুকসমান উচু বাঁশ দিয়া বন্ধ। গতি রুদ্ধ হইল। ক্ষেতের মধ্যে ঢুকিয়া পাটের ঘন অরণ্যে অজ্ঞাতবাস করিবার সাধ হইল; কিন্তু আগে দেখিয়া নেওয়া দরকার পুলিশটা কতদুর রহিয়াছে। ব্যাটা যা দৌড়াইতে পারে—যেন রেসের ঘােড়া। ঘাড় ফিরাইতেই গুরুগগাবিন্দ মজুমদার দেখিল যে, ধ্বংস সিংহ সিংহ-বিক্ৰমে মাথা তা করিয়া লাঠি উঠাইয়াছে। মুখে তার মন্ত্র হকিত হইতেছে—“শালা, ভাগতা লাঠি মাথায় পড়িল বলিয়া। সত্যই মাথায় লাঠি মারিবে নাকি। ব্যাটাদের বিশ্বাস নাই। মাথা বাঁচানাে আশু কর্তব্য হইল—পাটক্ষেতে প্রবেশের কথা পরে ভাবিলেও চলিবে। অতএব ডাক্তার গুরুগােবিন্দ রুখিয়া সঁাড়াইল, দাত-মুখে খিচুনী দিয়া কহিল—“হাম কি ডাকু আয় না চোর হয় যে তুমি লাঠি উঠাতা ব্যায়।” লাঠি নামাইয়া লইয়া পুলিশটী কহিল-“বাবু, তবে এমনভাবে দৌড় দিলে কেন?” —“তােমার বুদ্ধিভিতত বহুৎ দেখছি। দৌড় দিলেই যদি চোর আর ডাকু হােত ব্যায়, তবে খেলার মাঠমে দলে দলে চোর ডাক দৌড়া ব্যায়, লাঠি লেকর ওধার যাওনা কেন বাপু!” পুলিশ নাছােড়বান্দা, হটিতে চাহে না। কহিল-রাস্তাটা খেলার মাঠ নহে,আর বাবু যে খেলিতে বাহির হইয়াছেন, মন তাে বােধ হইল না। ১ - ডেটিনিউ- গুরুগগাবিন্দ সুর ঢিলা করিয়া লইয়া করুণ পর্দায় আনিল। কহিল-“দেখ সিপাইজী, পায়খানাকোবাস্তে দৌড় দিয়া।” সিপাইজী কি দেখিল সেই জানে, কিন্তু চোখদুটা তার কপালে ঠেলিয়া তুলিল। পরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া কহিল—নিজের বাড়ীর পায়খানা ছাড়িয়া এমনভাবে দৌড়াইয়া হয়রাণ হইবার আবশ্যকতা কি ছিল, খামাকা কষ্ট পাওয়া হইল। —“বহুত বেগ হুয়া থা, তাই একটু ভুল হাে গিয়া। চল বাবা, ফিরেই যাই। এ নিয়ে আর ডিবেট করে লাভ নেই।" -“চলিয়ে বাবু।” যে-রাস্তা দিয়া আসিয়াছিল, আবার সেই রাস্তায় ডাক্তার ফিরিয়া চলিল। ডাক্তার গােবিন্দ সেই হইতে ক্ষেতের মুখে বাঁশের বেড়া দেওয়ার ভয়ানক বিরুদ্ধে। ছাগল-গরু আটকাইবার ছলে কৃষক ব্যাটারা বেশ ফন্দী করিয়াছে, মানুষকে পৰ্য্যন্ত আটকাইয়া দিল। পশু-পৰ্য্যায়ে পড়িয়া গিয়া ডাক্তার গােবিন্দ অবরুদ্ধ পশুর মতই আক্রোশে ভিতরে ভিতরে সেদিন গুমরাইয়াছিল। ডাক্তার বলে-“হয় বাশ দিয়া ক্ষেতের বেড়া দেও, নয় পুলিশের লাঠি কর। দুটোর একটা কর—নইলে যে দেশে টেকা দায়। বাঁশ দিয়া সমুখ পিছন দুদিকেই আক্রমণকঁহাতক সহ্য করা যায়।” আইন-সভার দৃষ্টি যাতে এ দিকে আকৃষ্ট হয়—খালাস পাইলে সে চেষ্টা করাই ডাক্তার গােবিন্দের প্রথম কর্তব্য হইবে, আমাদের সে তা স্পষ্টভাবেই জানাইয়া দিল। স্বদেশী-ফদেশীর কথা পরে ডাক্তারকে কে একজন জিজ্ঞাসা করিয়াছিল—“ডাক্তারবাবু, ব্যাপারটা তা হােলে সত্য !” কিছুক্ষণ দৃষ্টি দিয়া বক্তাকে বিদ্ধ করিয়া পরে ডাক্তার গম্ভীর গলায় চিবাইয়া চিবাইয়া কহিল-“কেন, বাঁশ বিশ্বেস করেন না। বুঝি? খুব নাস্তিক হােয়েছেন দেখতে পাচ্ছি। বাঁশ না গেলে আপনাদের বিশ্বাস হবে না”—বলিয়া ডাক্তার উপস্থিত সকলের উপর চোক ঘুরাইয়া লইয়া দম ছাড়িল, এবং শান্ত ও তুফীভাব অবলম্বন করিল। আর একজনের ধরা-পড়ার কথা বলি। এ গল্পের যিনি নায়ক, নামে বা চেহারায় কোনটাতেই তিনি আমার পরিচিত নন্। যেমন শুনিয়াছি, তেমনই লিখিলাম। গল্প সত্য কি মিথ্যা, তা আমি জানিনা। শুধু জানি—এই জাতীয় গল্প ক্যাম্পে এত চতি ছিল যে, তা সত্যের মতই সম্মান পাইয়াছে। মিথ্যা হইলেও এরা আমাদের বন্দি-জীবনে যে রস যােগাইয়াছে, তা সত্য ঘটনাতেও সরবরাহ করিতে পারে নাই। যা ঘটে, তাই শুধু সত্য নয়। মানুষের কল্পনায় ও কামনায় যাহা ঘটিবার জন্য উন্মুখ হইয়া থাকে, অথচ ঘটে না, তাহাও কম সত্য নহে। হয়তাে জীবনের অন্তর-ইতিহাসের দিক দিয়া তাহারাই বেশী মূল্যবান ও সত্য। মােট কথা, যে-গল্পটা এখন বলি, তাহা সত্য কি মিথ্যা, সে ভাবনা আমার নয়। আমি আর দশজনের মত ইহা শুনিয়াছি, আরাম উপভােগ করিয়াছি এবং এই দীর্ঘদিনেও তাহা ভুলি নাই। 1 ১৭ জেডিনিউ জেলের সত্য অত্যাচারগুলি এতদিনে বেশ ঝাপসা হইয়া আসিয়াছে, জোর করিয়া তাদের মনে করিতে হয়। ভদ্রলােকটি কলিকাতাতেই ধৃত হন। তাকে আই-বি অফিসের এক বড় কর্মচারীর সম্মুখে হাজির করা হয়। সঙ্গে ছিল এক পুলিশ ইলাস্পেক্টর যিনি তাকে গ্রেপ্তার করিয়া আনেন। অফিসার চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করিয়া বলিলেন-“বসুন।” ভদ্রলােক বসিলেন। অফিসার জিজ্ঞাসা করিলেন-“আপনার নাম?” ভলােক সবে মাত্র বসিয়াছিলেন, প্রশ্নটা শুনিয়া চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দাড়াইলেন, পার্শ্ববর্তী ইনস্পেক্টরের দিকে ফিরিয়া বলিলেন- “কেমন দেখলেন তাে? কতবার আপনাকে বল্লুম, মশায় আমি সে লােক নয়। তবু নিয়ে এলেন?” তারপর অফিসারকে বলিলেন-“স্যার, তখনই ওঁকে বলেছিলুম। জিজ্ঞেস করে দেখুন, বলেছিলুম কিনা। উনিও আমার নাম জানেন না, আর আপনিও জানেন না। অথচ আমাকে টেনে নিয়ে এলেন। স্পষ্টই বুঝতে পারছি, কোথাও একটা মস্ত ভুল হয়েছে, আমাকে নিয়ে মিছিমিছি এ টানাটানি। কতবার বল্লাম, আমি সে-লােক নয়, তবু-না, যেতে হবে আপনাকে।” ভদ্রলােক ঘুরিয়া আবার ইনস্পেক্টরকে বলিতে লাগিলেন— “আপনার ধারণা, পুলিশের ভুল হতে পারে না, আর আমরা ভদ্রলােকের ছেলেরা সত্য কথা বলিনা।” পুনরায় অফিসারের দিকে আবস্যার, আমাকে তবে পাঠিয়ে দিন, আমার অনেক কাজ পড়েছে।” ১৮

ভেনিউ
অফিসার বলিলেন-“দিচ্ছি, বসুন।” ইনস্পেক্টরকে কহিলেন,
দেখুন তত গাড়ী আছে কিনা।”
গাড়ী আছে কিনা দেখিতে ইনস্পেক্টর বাহির হইয়া গেলেন।
অফিসার আপন কাজে মগ্ন হইলেন। ভদ্রলােকটীকে ‘বন’ এবং
'আপনার নাম কি, এ দুটী কথা ছাড়া এতক্ষণ কথা বলিবার
অবকাশ অফিসার বা তাহার ইনস্পেক্টর কেহই পান নাই।
ভদ্রলােককে সামনে বসাইয়া রাখিয়াই তিনি নিজের কাজ করিতে
লাগিলেন।
ভদ্রলােকটী অফিসারকে কহিলেন—“স্যার, যা ভয় পেয়েছলুম।
বুঝতেই পারেন, একে দিনকাল মােটই ভালােনা, তার উপর
পুলিশের হাঙ্গামা, কত বড় শক্ত নার্ভের দরকার, তা স্যার
আপনাকে আর কি বুঝাব।” বলিয়া হয়তাে আরও কিছু বুঝাইবার
আয়ােজন করিতেছিলেন, এমন সময় ইনস্পেক্টর ঘরে ঢুকিয়া
জানাইল যে গাড়ী আছে।
অফিসার কহিলেন-“একে তবে পৌছে দেবার বন্দোবস্ত
আর সেলে যে-দুজন আছে, তাদেরও নিয়ে যাবেন।
আচ্ছা, আপনি তবে আসুন।”
“নমস্কার”-বলিয়া সানন্দে ভদ্রলােক উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং
ইনস্পেক্টরের সঙ্গে নীচে নামিয়া আসিলেন। কিন্তু সেই গাড়ী
তাকে ও সেলে যে-দুজন আছে তাদের নিয়া আসিয়া থামিল
প্রেসিডেন্সিজেলগেটের সামনে। ভদ্রলোেক ঝাকের কইয়ের মত
ঝাঁকে মিশিয়া গেলেন।
তঁাকে একজন বলিয়াছিল-“ফাকি দিতে পারলেন না তবে !"

ডেনিউ- -“কোথায় শুনেছেন থিয়েটারে পুলিশ ভােলে? শান্তেই আছে, পাষাণে কঁাদা নাই। পুলিশকে চিন্‌তে আপনাদের ঢের বাকী আছে। বেদান্তের নিণ ব্ৰহ্মকে চেনা যায়, কিন্তু মর্ত্যের এই সগুণ জীবটীর সীমা শেষ করা—সে নৈব নৈবচ।” জীবনের রঙ্গমঞ্চে যে কত রকম অভিনয় চলিতেছে, তা ভুলিয়া থাকি। এই রকম দুই একটী লােকের কথাবার্তায় ও ব্যবহারে চেতনা সে-দিকে আকৃষ্ট হয়। তখন চোখের উপর হইতে পর্দা সরিয়া যায়, দেখিতে পাই যে বিরাট নাট্যশালায় আমরা সবাই অভিনেতা। কিন্তু নাট্যকারটা কে—তাহা কেহ বলিতে পারে কি? ২.

-ভেটিনিউ আমি ও আমার মত যারা নিরীহ, শুধু তাদেরই জেলখানায় প্রবেশ বিশেষত্বহীন। এই বিশেষত্বহীনদের বাদ দিলে যা থাকে, তাও সংখ্যায় নেহাৎ কম হইবে না। এরা প্রত্যেকেই অল্পবিস্তর কীর্তিমান। এদের জীবন আর দশজন বাঙ্গালীর মত ঢিমা-তালে বহে না, ঘটনা হইতে ঘটনায়,—তা ছােটই হউক বা বড়ই হউক, লক্ষ দিয়া বিষম চালে চলে। এদের জীবন দেখিতে ছােট হইলেও আসলে তাহা ইতিহাস জাতীয়। পৃথিবীতে ছােট নদীও আছে। জল থাকিতেও সরােবর- দীঘি-বিল তার আত্মীয় নয়, গঙ্গা-সিন্ধু-ব্ৰহ্মপুত্রের শােণিতই তার স্রোতে। ভােবা, পুকুর, দীঘি ইত্যাদির মত নিজ পাড়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকিয়া শান্ত স্বপ্নে দিন-যাপন এর রক্তে নাই। পাড়ার দুরন্ত ছেলেগুলি যখন স্নান করিতে সাঁতার কাটিতে নামে তখনই যা একটু অশান্তি বদ্ধ জলাশয়গুলিতে দেখা দেয়—ছােট ঘােট ঢেউগুলি ভাঙ্গিতে ভাঙ্গিতে তীর দুইবার আগেই মিলাইয়া যায়। এ ব্যতীত সেখানকার শান্তিতে কোন বি কখনও দেখা দেয় না। আর নদীতেহউক না কেন সে ছােট নদী, যখন উত্তরে পাহাড়ের মাথ । ভেটিভি বরফ গলিতে আরম্ভ হয়, তখনই এই নদীর ধমনীতে রক্ত চঞ্চল হইয়া উঠে। তারপর পাহাড়ের জলকে সমুদ্রে বহিয়া নিবার অন্য দিনরাত্র কী তার উন্মত্ততা ও প্রচণ্ডতা। তীর প্লাবিত করিয়া জলকে দিকে দিকে পাঠাইয়া দেয়—খাল-বিল-মাঠ ভরাইয়া ফেলে, এবং ফেনা ও ঘূর্ণাবর্ত লইয়া যুদ্ধের ঘােড়ার মত সে ছুটিয়া চলে। গ্রামের বৌ-ঝির স্নান সারিতে ও জল ভরিতে আসিয়া পাড়ে দাড়াইয়া চোখ মেলিয়া নদীটিকে দেখিয়া লয়, ভাবে—তাদের সেই পরিচিত শান্ত ছােট নদীটি এমন হইল কেন! কোথায় সুদূরে এর রক্কের যােগ রহিয়াছে -তাই আজ আর একে আপন ও আত্মীয় বলিয়া ধরা যাইতেছে না। নিশ্চয় রক্তে এর কোন অভিশাপ আছে, তাই এমন ক্ষিপ্ত ও ভয়াবহ আকার এর হইতে পারিয়াছে। তারপর স্নান সারিয়া ঘট ভরিয়া স্রোতের জল লইয়া ঘরে ফিরিয়া যায়। কিন্তু কলসের মধ্যে যে-স্রোতটুকু ভরিয়া লইয়া যায়, তাও শান্ত থাকিতে চায় না, প্রতি পায়ে উছলাইয়া পড়িতে থাকে, সুযােগ পাইলেই ঘরের মেঝেতে গড়াইয়া ছােট ছােট ধারায় আঁকাবাঁকা শিশু-স্বপ্নগুলিকে শােতে ভাসায়। নদী ছােট বটে, কিন্তু সে যে মহানদীগুলিরই স্তন্যপুষ্ট সন্তান—তা ভুলিতে দেয় না। নদী সেসে পুকুর-দীঘির, আত্মীয় নয়। এই সাত বছরে আমরা ধরা পড়িয়াছি তিন হাজারের মত। দরিদ্র বাংলার মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে আমরা। অভাব-অনটনের মধ্যেই আমদের জন্ম-মৃত্যু পর্যন্ত সে-দারিদ্র্য আমাদের ছায়ার মতই নিত্যসহচর। স্বাস্থ্যে আমরা ভারতের অন্য প্রদেশগুলির তুলনায় এত ক্ষীণ-সম্বল। সীমান্তের পাঠান, মরুভূমির রাজপুত, পাঞ্জাবের ।

শিখ-এদের পাশে দাড়াইতে আমরা সঙ্কোচ ও লজ্জাবােধ করি। মনে হয়, এই সংঘর্ষের পৃথিবীতে আমরা যেন বিধাতার পরিহাসের মতই আসিয়াছি। স্বাস্থ্য ও শরীরকে আশ্রয় করিয়া যে-প্রাণ আগুনের মত জলিতে থাকে, তার কোন রক্তাভাই তাে আমাদের দেহে প্রতিফলিত হয় না। একটা পাঠান বাচ্চাকে দেখিলে মনে হয়, বন্য পশুর প্রাণ-শক্তি এর শরীরে আটকা পড়িয়া ছটফট করিতেছে, দেহের সীমায় আর বুঝি এ প্রবল প্রাণ-বন্যাকে ধরিয়া রাখা যাইবে । কিন্তু আমাদের দিকে চাহিলে ও-রকম কোন কথা মনে হইবার হেতু থাকেনা—এই দুৰ্বল বােগা শরীরের মধ্যে কোথায় প্রাণ ধুক ধুক করিতেছে, তা যন্ত্র দিয়া আবিষ্কার করিতে হয়। (অথচ এই বাঙ্গালী নিজেকে আজু ভাৱতর শ্রেষ্ঠ অধিবাসী বলিয়া জানে, অন্যান্য প্রদেশও তাহ। বিনা, আপত্তিতে মানিয়া নেয়। এর কারণ কি হইতে পারে, এই শ্রেষ্ঠত্বের দাবী কিসের জোরে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে—তাহা আজ বুঝিতে পারিয়াছি। অন্য প্রদেশের সন্তানরা প্রাণ নিয়াই জন্ম লয়, যেমন প্রাণ-জগতের অন্যত্রও দেখা যায়। প্রাণ-প্রাচুর্যে পতকে পৰ্য্যন্ত পরাস্ত করিতে এরা পারে। কিন্তু জন্ম হইতে মৃত্যু পর্যন্ত এদের বারাে-আনারও উপরের অংশ নাবালক থাকিয়া যায়। প্রাণের পাথেয় জীবন-পথে নিতান্ত প্রয়ােজনীয় কি মানুষের অর্থ তাতে প্রতিষ্ঠিত হয় না। নূতন তীর্থে বা বন্দরে পেীছিবার জন্য প্রাণ ও বস মাত্র। এইখানেই আমরা অপরাপর প্রদেশ হইতে স্বতন্ত্র। তারা যেমন প্রাণ নিয়া জন্মগ্রহণ করে, আমরা তেমনি জন্ম লইবার সময় মন নিয়া আসি। মনের সম্বলেই আমরা এদের চেয়ে . * * l - পণ' * * **** 'এখন ৭১ গণ ধনী ও অন্যজাতের হইয়া পড়িয়াছি। প্রাণ দিয়া সৃষ্টিতে প্রাণী টিকিয়া থাকে, আর মন দিয়া মানুষ সৃষ্টির ঘােমটা খুলিয়া তার রহস্যের মুখােমুখী দাড়ায়। প্রাণ বাহন-মন সে-বাহনের সােয়ার। কোন দুর্গের দুয়ারে সে থামিবে এবং কোন বন্দিনীকে উদ্ধার করিয়া লইবে—মানুষের জীবন-নাট্যের এই তত সংক্ষিপ্ত অথচ ক্রমবর্ধমান ইতিহাস। সৃষ্টিতে প্রাণের প্রয়ােজন পরিত্যক্ত হইতে পারে কিনা-এই অসম্ভব স্বপ্ন নিয়াই মন আসিয়াছে, এবং প্রাণের উপর চাপিয়া বসিয়াছে। এই জোরেই ভারতের রঙ্গমঞ্চে আমরা নায়কের সহজাত অধিকার লইয়া আসিয়াছি। আমরা ক্ষীণকায় বাঙ্গালী সত্য। আমরা নিরীহ, আমরা ভেতােসবই সত্য বলিয়া মানিয়া লইতে আপত্তি করিব না। কিন্তু মরিয়া গেলেও, ইহার চেয়ে হততম যদি আরব বেদুইন’-এ-কথা মুখ দিয়া বাহির হইবে না। বাঙ্গালী মরুক—কত জাতিই স্রোতের শেওলার মত ভাসিয়া গেছে, কিন্তু সে যেন আত্মহত্যা না করে। আমার এ-মনােবৃত্তির কারণ, আমি এই দীর্ঘদিন জেল-জীবনে যাদের দেখিয়াছি, যাদের সঙ্গে এক রহিয়াছি—তাহারা। তাহাদের সান্নিধ্যে যে-অভিজ্ঞতা আমার হইয়াছে—তাতেই আমার এ-গৰ্ব্ব দিনে দিনে পুষ্ট হইয়াছে। • আজ একেলা জেলের জানালায় লােহার গরাদের উপর পা দুটা তুলিয়া লইয়া চেয়ার পাতিয়া বসিয়া আছি। আষাঢ়ের আকাশ মেঘে-ঢাকা রহিয়াছে। নীচে পৃথিবীতে এ দুপুরেও ছায়া নামিয়াছে। বাজিরের আকাশের দিকে দৃষ্টি আমার বাহির হইয়া পড়িয়াছে, ২৪ মার আমি একাকী এখানে সঙ্কীর্ণ কোণে পড়িয়া রহিয়াছি। মামার মন আজ অল্প-লােকে প্রবেশ করিয়াছে। মেঘের আড়ালে দিনের সূর্যকে দেখা যায় না। আজিকার বাঙ্গালীর উপরে বর্তমানের ও প্রাত্যহিকতার যে-ছায়া-আস্তরণ পড়িয়াছে, তার আড়ালে বাঙ্গালীকে আমি দেখিয়াছে। এ-দেখা আমার মিথ্যা নয় —হইতে পারে না। জানি না, জেল হইতে বাহির কোনদিন হইব কিনা। কিম্বা হইলে সে কবে এবং কি অবস্থায় বাহির হই, তাও জানিনা। কিন্তু যে-সত্য আমি জানিয়াছি, তাহা এখানে লিখিয়া গেলাম। সত্যই আমি স্বপ্নে ডুবিয়া যাই নাই। আষাঢ়ের ছায়ান্ধকারে বসিয়া আমি নিজেকে প্রভুশাপে-অভিশপ্ত নির্বাসিত মনে করিতেছি না। সৌন্দর্য্যের স্বপ্ন-আলয়ের দিকে আমার মন নতােচারী মেঘের মত বাহির হয় নাই। আমি স্বপ্ন-সাধক নহি। আমার মন আজ ধ্যান-মুগ্ধদৃষ্টির উপর হইতে আজ কিছুক্ষণের জন্ধ আবরণ সরিয়া গিয়াছে। বিশ্বাস করিও সত্য বলিতেছি। দৃষ্টির আচ্ছাদন সরিয়া যায়--দৃষ্টি মুক্ত হয়। যত অল্প সময়ের জন্যই হউক না কেন, অসীমের স্পর্শ তাতে লাগে, এবং সত্যকে দেখিয়া লওয়া যায়। জীবন আমার যেখানে যেভাবেই শেষ হউক না কেন, আমি নিঃসঙ্কোচে বলিয়া গেলাম—মানুষের, সমাজের ও সভ্যতার নূতন অর্থ ও রূপ দিবার দুরূহ দায়িত্ব এই বাঙ্গালীর। মহান অধিকার নিয়া সে আসিয়াছে। আমার একথা মিথ্যা হইবার নহে এবং মিথ্যা হইবে না। আমি সত্যকে দেখিয়াছি। ২৫ ভেনিউ- যত লােক ধরা পড়িয়াছে, তাদের সবার খবর জানি না, যাদেরও জানি তা-ও সব লেখা সম্ভব নহে। অনেক জিনিষ আছে যা স্বভাবতই গােপন । প্রকাশ্যে টানিয়া আনিলে তা কদৰ্য্য ও বিকৃত হয়। আমার বহুদিনের বিশ্বাস, মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা-ভালােবাসা-স্নেহ-দয়া ইত্যাদি জিনিষগুলি এই জাতীয় বস্তু। ভাষায় এদের প্রকাশ দেওয়া রুচিবিগঠিত। পূজারী যেমন সঙ্গোপনে পূজা করে এবং পূজার ভাবটি যেমন তার সারাদিনের কাজের উপর একটা পবিত্র ছায়া বিস্তার করে, হৃদয়ের প্রতিশ্রদ্ধাদিও নীরবে কাৰ্যে ও ব্যবহারে তেমনি একটা অশরীরী আলােকপাত করিবে তবে এর সত্য প্রকাশ হয়। আর এক জাতীয় জিনিষ আছে—যা স্বভাবতঃ গােপন নয়, যা মন হইতে মনে দেহহীন পা ফেলিয়া যাতায়াত করার ক্ষমতা ও স্বভাব পায় নাই। কিন্তু সমাজ-ব্যবস্থার মধ্যে এমনি একটা কঠিন সশস্ত্র নিষেধ ও শাসন রহিয়াছে, যার ফলে যা প্রকাশযােগ্য তা প্রকাশ পাইতে পারে না। সমাজ যে এইভাবে কত সত্য-ভাষণের মুখে পাথর চাপা দিয়া রাখিয়া নিজের কতবড় ক্ষতি করিয়াছে, তা তার হুস নাই। তাই অকপট সত্য-ভাষণ হইতে সমাজ বঞ্চিত হইয়াছে। উজ্জল, নির্মল ও শক্তিমান ভাষায় নিজের ছবি ও স্বপ্ন সে দেখিতে পারিতেছেনা। তীক্ষ, নির্মম ও কঠোর আঘাত দিয়া যে-কণ্ঠ সমাজের মধ্য হইতে ভীক কলুষিত মিথ্যা-ভাষণ ও চিন্তাকে মার্জিত করিয়া দিবে, নিজের সে-কণ্ঠ নিজ দোষেই সমাজ অবরুদ্ধ করিয়া বসিয়া আছে। এর মধ্যেও সমাজের সৌভাগ্যের মত মাঝে মাঝে মাষ আসে, যারা স্পর্কিত নয়-যারা তেজৰী, যাদের ভয় নাই। ২৬

? ? সত্য নিজ শব্দ অকস্মাৎ খুঁজিয়া পায়। কিন্তু সত্য
যাকে বাছিয়া নিয়া আশ্রয় করে, তাকে এ-জন্য ভয়াবহ দাম দিতে
হয়। ঈশ্বরের পুত্রকেও আমরা ক্রুশে বিদ্ধ করিয়াছি। সত্যকে
পরীক্ষা করার অন্য কোন উপায় এখনও আমরা পাই নাই।
তাই যা জানি, তা সব বলা সম্ভব হয় না,আর তা বলিবার
শক্তিও অর্জন করি নাই। যা সব চেয়ে প্রকাশযােগ্য ছিল, তা
আড়ালেই থাকিয়া গেল। শক্তিমান সাধক যদি কেহ আসেন,
এদের প্রকাশে পথ তিনিই দেখাইয়া আনিবেন। আমি আমার।
স্মৃতির হালকা পথ ধরিয়াই চলিলাম।
বসাতে গিয়া কিরণদাকে (মুখার্জী) পাই নাই, তিনি পরে
আসেন। তার চেনা-অচেনা সবাই তাঁর ভাইট-শ্রেণীর ছিল। অবশ্য
দু-একজন সম্মানজনক ব্যতিক্রমও ছিলেন। ভাইটীরা, বিশেষ
করিয়া তার বয়স্ক ভাইটার', কিরণদা সম্বন্ধে সত্যমিথ্যা যা-কিছু
বলিবার ও রটাইবার সুযােগ পাইলে তা ছাড়িতে বড়ই কষ্ট বােধ
করিতেন—অর্থাৎ কিরণদা সবারই আক্রমণের পাত্র ছিলেন।
পিতামহ-ভীষ্মের মত তিনি তার শাসন ও আক্রমণের স্নেহ কুরু-পাণ্ডব
সবাইকে সমানভাবে বণ্টন করিতেন। এ-বিষয়ে দল-বেল—এ
ভেদনীতি কিরণদার ছিল না। এ-রকমও দেখা যাইত যে, কিরণদা’
তার বয়স্ক ভাইটীদের পর্যন্ত লাঠি নিয়া খোড়াইয়া খোড়াইয়া তাড়া
করিয়াছেন। পলাতক ব্যক্তি অবশ্য তার প্রাপ্তির সীমানার মধ্যেই
থাকিতেন। ভাবখানা এই—গতিতে কিরণদাকে হটানাে কি যে
সে কন্ম। বাঁকা হাতের শাস্তি না পাইলে বুঝিতে হইবে কিরণদার
মেহের চাপরাশ তখনও অপরাধীর ভাগ্যে জুটে নাই।
২৭

ভেটিনিউ- কিরণদা’কে আলােচনার ক্ষেত্রে টানিয়া আনিয়া যখনই বলা যাইত-“কিরণদা আপনি কি বলেন?” তিনি উত্তর করিতেন- “এ-বিষয়ে মতামত না দেওয়াই ভালাে।” ‘মতামত না দেওয়াই ভালাে’-এ-কথাটী এক সময়ে বসাতে আমাদের মধ্যে খুব চলতি হইয়া গিয়াছিল এবং এই বাক্যটা যে কতবার কত সিরীয়স আবহাওয়ায় উচ্চারিত হইয়া আমাদিগকে সহজ ও সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়া আসিতে সাহায্য করিয়াছে, তা ভাবিতে গিয়া আশ্চর্য হই। কিরণদা’র কম্বলের ঘরে গিয়া উপস্থিত হইলাম। ব্যারাকের বারান্দায় কম্বল ইত্যাদি দিয়া তিনি একটা ঘরের মত করিয়া লইয়াছেন। দিবাভাগে এখানেই পড়াশুনা ইত্যাদি যাবতীয় কাজ তিনি করিতেন—শুধু শয়ন-কাৰ্যটীর জন্য ভিতরে যাইতেন। দেখিলাম, অনেকই উপস্থিত আছেন, এবং দেখিয়া বুঝিলাম কিরণদা’কে ইহারা কাহিল করিয়া তুলিয়াছেন। অথচ আশ্চৰ্য্য এই যে, উহারা যে-পরিমাণে হাসিতেছে, নিজে জব্দ ও কাহিল হইয়াও কিরণদা পরিমাণে তার চেয়ে কম হাসিতেছেন না। আনন্দে ইহারা তাঁহাকে হারাইয়া দিবে, এ যদি ইহারা কেহ ভাবিয়া থাকে, তবে সে ভুল ভালাে করিয়াই ভাঙ্গিয়াছে। স্থান নাই, স্থান নাই’—কারণ, কিরণদা’র ছােট সে-তরী ভাইটীরা কাণায় কানায় ভরিয়া ফেলিয়াছে। স্থানাভাবে বেণুবাবু (রায়) কিরণদা’র ডেক চোরের হাতলটাকে আসন বানাইয়া লইয়াছেন এবং সতীন রায়ের মত লােকও নিজের চেয়ারে যতীন দাশের জন্য উত্ত জায়গা তৈরী করিয়া দিতে বাধ্য হইয়াছিল। হমিওপ্যাথি ২৮

ডেটিলিউ
ওষুধের বড় বাক্সটা ঠেলিয়া সরাইয়া টেবিলের উপর জায়গা করিয়া
নিলাম। কিরণদা সােৎসাহে আমাকে অভ্যর্থনা করিলেন—“এই যে
( এক শূয়াের।”
এই জীবটীর সঙ্গে আমার চেহারায় বা চরিত্রে কোন উল্লেখযােগ্য
মিল ছিল বলিয়াই যে এ-সম্ভাষণ, তা নয়। কিরণদা’র স্নেহের
পরিভাষায় এটা অতি বনেদী সুভাষণ এবং সর্বক্ষেত্রেই এর প্রয়ােগ
অপ্রতিহত—ভাইটীদের বয়সের তারতম্য এক্ষেত্রে অবান্তর।
ঢুকিবার মুখেই শুনিতে
পাইয়াছিলাম যে, আমাদের।
বীরেনদা’কেই (চাটার্জী) তিনি কহিতেছেন—“ও শুয়াের, তুমিও
-দলে আছ। না বাপু, এ-রকম ক্ষেত্রে কোন মতামত না দেওয়াই
ভালাে।”
সবাই মত আদায় করিবেই, কিরণদা’ও তাহা প্রদান করিবেন
বীরেনদা কহিলেন-“ব্যাপারটা সত্য কি মিথ্যা, আপনি শুধু
এইটুকু বলুন।”
-“ও শূয়াের, তুমি কায়দা করে কথা বের করবে, তা আমি
বুঝতে পেরেছি।” বলিয়া মাথা নাড়িতে লাগিলেন। ভাবখানা এই
এত কঁচা লােক পাও নাই যে, সস্তাচালে মাৎ করিবে।
আমি কহিলাম--কায়দা করে কথা বের করব না, সােজাই
জিজ্ঞেস্ করছি।” কথা শেষ করিতে পারিলাম না। কিৰণা
সকলের দিকে দৃষ্টি ঘুরাইয়া লইয়া কহিলেন—“দেখলে, কথা বলার
কায়দা। লেখক মানুষ কিনা।”
“লেখক মানুষ”-এমনভাবে উচ্চারণ করিলেন যেন মস্ত একটা
গােপন খবর প্রকাশ করিয়া দিলেন এবং লােকের যদি লজ্জা থাকে,

- ডেটিনিউ- তবে এর পরে তার থামিয়া যাওয়া উচিত। আমিও থামিয়া চুপ করিলাম। কিন্তু বীরেনদা’ নাছােড়বান্দা। কহিলেন—“তবে আপনি বলতে চান যে আপনি স্বাধীনতা বিক্রী করেন নি ?” কিরণদা’র পক্ষ হইয়া যতীন দাশ কহিল-“না, কিরণদা’ তেমন কথা বলেন না।” —“মেয়ে দুটী ‘স্বাধীনতা কিনতে চাইলে কিরণদা’ তাদের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়ান নি?” -“না, পিছন ফিরে দাঁড়ান নি, মুখ ঘুরিয়ে দাড়িয়েছিলেন, যতীন দাশ উত্তর করিল। কিরণদা মৃদু মৃদু হাস্য করিতে করিতে উভয়ের এই সওয়াল-জবাব শুনিতে লাগিলেন। -“তিনি কি দুকাপি পত্রিকা টেবিলে ফেলে দেন নি?” -“তারা দুকাপিই চেয়েছিল।” উত্তর শুনিয়া কিরণদা সশব্দে হাসিয়া উঠিলেন। কহিলেন- “যতীন বলে ভালাে। বীরেন, তুমি ওর সঙ্গে পারবে না।” বীরেনদা’ কহিলেন--“মেয়ে দুটা বেরিয়ে গেলে পর তবে আপনি ঘুরে দাড়ালেন, এ ঠিক কিনা বলুন। —“নিশ্চয় ঠিক। সত্য বলতে কিরণদা’ পিছপা হন না।” যতীন দাশের সমর্থন পক্ষে যাইতেছে না দেখিয়া কিরণদা’ কহিলেন,-“শূয়াের, তুমি থাম। তােমার আর আমার পক্ষে ওকালতী করতে হবে না।” আমি আবৃত্তি করিলাম—“কিরণদা’, যতীন বলে ভালাে।” হাসির একটা দমকা বাতাস বহিয়া গেল।

-ভেটিনিউ
বীনদা’ কহিলেন-“কেন আপনি ঘুরে দাঁড়ালেন ? আর ওদের
েিছ শেষটা আপনি স্বাধীনতা বিক্রী করলেন?”
কিরণদা’ নিরুত্তর।
নয়নাঞ্জন-বাবু ( দাশ) আস্তে জিজ্ঞাসা করিলেন—“কিরণদা,
া পয়সা দিয়েছিল তাে?”
কিরণদা’ কহিলেন—“কেন দেবে না? তােদের মত লক্ষ্মীছাড়া?”
বাই হাততালি দিয়া সােৎসাহে হৈ-হৈ করিয়া উঠিল—“ও
রণদা, আপনি যে ধরা পড়ে গেলেন।”
কিরণদাও হাসিলেন—“ও শূয়ােরের দল, তােমাদের এ-মতলব
বীরেনদা’ কহিলেন,“আচ্ছা, মেয়েদের উপর আপনি এত চটা
কন? দেশে শুধু ছেলেই থাকবে—মেয়ে থাকবে না, এই বােধ হয়
পনি চান-না?”
-“না, কক্ষনাে না”
—“কি কক্ষণাে না?”
কিরণদা উত্তর দিলেন না। একটা ছেলে কহিল,-“কিরণদা,
মাহমুদগর-period আজ আর নাই, অবশ্য কোনকালেই ছিল
বৌদ্ধমঠে পৰ্য্যন্ত ভিক্ষুনী, আশ্রমে পৰ্যন্ত তপস্বিনী।
এবার সবাইকে নিয়ে দল করার পালা।”
-“শুয়াের, দাঁড়াও বার করছি তােমার পালা”—বলিয়া ৰুকিয়া
পড়িয়া মােহমুদগরকে একটী আঘাত প্রদান করিলেন। উপস্থিত
কিলে পরম পরিতােষ প্রাপ্ত হইল।
সতীন রায় কহিল-“দিতাে, আরও কয়েকটা দিন্।

মােহমুদগর বুঝাতে এসেছে। দি লাঠিটা আমার হাতে দি,
দেখিয়ে দিচ্ছি।”
সতীন রায়ের হাতে লাঠি থাকা বেণুবাবু সমর্থন করেন না তাই
সতীন রায়ের উদ্যত বাহকে ঠেলিয়া দিয়া কহিলেন—“না লাঠি
পাবে না! গাণ্ডীব এক অর্জুনের হাতেই থাকে—কি বলেন
কিরণদা’ ?”
-“তুই ঠিক বলেছিস ভাইটা। এ-লাঠি কেউ পাবে না।”
সতীন রায় কহিল--“লাঠি নয় পাবনা, তাই বলে তার খোঁচাও
পাবনা ?"
“খুব পাবে”—বলিয়া লাঠিটা নিজ হাতে বেণুবাবু তুলিয়া
সতীন রায়ের প্রার্থনা মিটাইলেন। খোঁচা খাইয়া সতীন রায় উঠিয়া
দাড়াইতেই একটা হৈ-হৈ ব্যাপার উপস্থিত হইল। বীররসের
অভিনয়ের জন্য আমরা উদগ্রীব হইয়া রহিলাম।
—“যাও বেণু, তােমাকে মার্জনা করে দিলাম”—বলিয়া সতীন
রায় হাতের মুঠা হইতে ব্রাহ্মণ যেমন ফুল-দূর্বা ছুড়িয়া মারে তেমনি
ভঙ্গীতে মার্জনাটাকে শূন্যে ছুড়িয়া দিল এবং বসিয়া পড়িল।
কিন্তু সতীন রায় বসিতেই যতীন দাশ চীৎকার করিয়া উঠিল,
“উহু, গেছি গেছি”। সতীন রায় তার বিরাট নিতম্বদেশ একটু
উত্তোলন করিলে যতীন দাশ সেই রােলারের তল হইতে নিজের
শরীরটাকে মুক্ত করিয়া লইয়া বলিল—“ব্যাটা গুজরাটী হাতী।”
সতীন রায় যতীন দাশের আহত স্থানে যতের সহিত হাত
বুলাইয়া দিতে দিতে কহিল—“বাবা, একটু খাওয়া-দাওয়া আর
একটু exercise করাে, বুঝলে?”
৩২

এমন সময় ধীরেন-মাষ্টারের ( নিমােগী) গলা বাহিরে শােনা গেল। শৈলেন-দাস ( অধিকাংশের রুণুদা) মহাশয় ধীরেন-মাষ্টারের নাম দিয়াছিল হিমেলষ্টস্। All Quiet-এর সৈনিকটীর সঙ্গে ধীরেন-মাষ্টারের মিল রুণুবাবু আবিষ্কার করেন। সেই হইতে ধীরেন-মাষ্টার হিমেলষ্টসের “ট” হইয়াই আখ্যাত হইত। প্যারেড-ভলান্টিয়ার ইত্যাদি বিষয়ে মেজর সত্য-গুপ্তের বিশ্বস্ত সহচর ছিল এই ধীরেন-মাষ্টার। লাঠি, ছােরা, কুন্তী ইত্যাদি বিষয়ে মাষ্টার শিক্ষা দিত ধরা-পড়ার আগে। মাষ্টার-নাম ব্যায়ামশালাতেই দৃঢ় ও হৃষ্টপুষ্ট শরীর লইয়া ধীরেন-মাষ্টার প্রবেশ করিল। বীরেনদা মােটা গলায় হুকুম করিলেন—“Halt, ধীরেন-মাষ্টার সত্যই দাড়াইয়া পড়িল। বীরেনদা’ কহিলেন-‘স্যালুউট—ডিমিস। কপালে হাত ঠেকাইয়া মিলিটারী কায়দায় স্যলুট সাৰিয়া মাষ্টার লেফট-রাই-লেফট পা ফেলিয়া আগাইয়া আসিয়া একটা জায়গা দখল করিল। ধীরেন-মাষ্টার ধরিয়া বসিল, কহিল---“কিরণদা, বলুন না, টেগার্ট- সাহেবের কাছে কি-ওয়ারেন্ট দেখতে চেয়েছিলেন। আপনার জানেন তাে ?” জানিতাম না। জানিবার জন্য উদগ্রীব হইলাম। নয়ান-বাবু কহিলেন—“জিজ্ঞেস করুন, কি-রকম ওয়ারেন্ট টেগার্ট- সাহেব দেখিয়েছিলেন।” আমরা কহিলাম—“বলুন না কিৰণদা’, ব্যাপারটা কি।” ৩৩ ভেটিনিউ- ধীরেন-মাষ্টারের সঙ্গে আমরা সকলেই কিরণদাকে চাপিয়া ধরিলাম এবং কিরণদা’ বলিতে বাধ্য হইলেন। কিরণদা’ বলিতে রাজী হইলেন বটে, কিন্তু বলিবার সময় বিশেষ কিছু বলিলেন না। পুরানাে আমলের লােক, নিজেদের বিষয়ে গল্প করিতে তেমন অভ্যস্ত হন নাই। সে-কালের শিক্ষা-মুখ বুজিয়া কাজ করিয়া যাওয়া। তাই অভ্যাসে এমন একটা সংযম কাজে ও ব্যবহারে এদের দেখা দিত, যার ফলে দরকার হইলেও দু’কথা তেমন করিয়া বলিতে পারেন না। মুখ বুজিয়া যে-জীবন আরম্ভ হয়, সে-জীবন তেমনি মুখ বুজিয়াই শেষ হয় ; জীবনে যেন একটা গােপন নীরবতাকে বহন করিয়া লইয়া মৃত্যুর নীরবতার দুয়ারে পৌছাইয়া দেওয়াই এদের একমাত্র কাজ। কত কী যে এইভাবে নিঃশব্দে কাজ করিতে করিতে শেষ হইয়াছে, বাহিরের লােকে তার খোঁজ রাখেনা, জানেও না। হয়তাে তাদের কথা তাদের বন্ধুরা-ই ভুলিয়া গিয়াছে, কিম্বা মনে করিতে হইলে জোর করিয়া মনে আনে। নিজেদের কোন দাবী- দাওয়া না রাখিয়া এ-ভাবে জীবন কাটাইয়া দিতে চরিত্রের যে-নিরাসক্তি ও দৃঢ়তার দরকার, তার জন্য সাধনার প্রয়ােজন হয়। ইচ্ছা হইলেই এই জাতীয় সৈনিক হওয়া যায় না। আর, মানুষের যে-কোন বড় কাজের জন্য এই রকম মহৎ সৈনিকের প্রাণই ভিত্তি- মূলে উৎসর্গীকৃত থাকে। সমাজের ভিত্তিভার-বহনক্ষম প্রাণ খুব বেশী আসে না। যারাও আসে, তাদের খবরও আমরা রাখি না; কারণ তাদের চিনিবার জন্য যে-দৃষ্টি দরকার আমরা সাধারণ সম্প্রদায় সে-দৃষ্টি হইতে বঞ্চিত। আমরা শুধু দধিচীর অস্থি-দেওয়ার ইতিহাসই -ডেনিষ্ট জানি; কারণ তাতে বস্ত্র তৈয়ারী হইয়াছিল এবং সে দেবতাদের কাজে লাগিয়াছিল। কিন্তু মানুষের জন্য যে-অন্থি গােপনে বক্সে রূপান্তরিত হইয়া যায়, দেবতাদের কথা দূরে থাক, মানুষ নিজেই তার খোঁজ রাখেনা ; বিপদে ও দুদ্দিনে তারই সাহায্যে যে জয়লাভ করে, তা’ও সে জানে না। শক্তি কে, কোথায় ও কেমন করিয়া সবার জন্য সঞ্চিত করিয়া রাখিয়া গেল—এ অজানাই থাকিয়া যায়। আর, সৃষ্টির নিয়মও বােধ হয় এই-শক্তি ব্যয় হয় প্রকাশ্যে, কিন্তু তার আয় ও সঞ্চয় হয় গােপনে। কথার-ও যে একটা নিজস্ব দাম আছে, আগের আমলের আছে, লােকেরা তা জানিলেও ব্যবহারে ও কাজে তা তেমন স্বীকার পান এমন কথাও-তো শুনিয়াছি, যা’ বুকের মধ্যে আগুন লাগাইয়া দেয়, ঝড় আনে, মনে সমুদ্রমন্থন করে। একটা দিনের কথা মনে হইল। ১৯২৪ সালে ফরিদপুরে গান্ধীজি Youth Conference-এ বক্তৃতা দিতেছেন। ভােরবেলা গােটা নয়ের সময় সভা হইতেছিল, প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সম্মেলনের তাঁবুতেই সে-সভা বসিয়াছিল। মহাত্মাজীর পাশে দেশবন্ধু বসিয়াছিলেন, অসুস্থ শরীর অল্প অল্প জ্বর, তাই নিয়াই উপস্থিত হইয়াছিলেন। মহাত্মাজী বসিয়াই বক্তৃতা দিতেছিলেন। সমস্ত সভা চুপ করিয়া শুনিতেছে। বােগা মানুষ, নােগা হাতের ক্ষীণ তর্জনীটি স্বভার দিকে তুলিয়া কথা বলিতেছেন-মুগ্ধ হইয়াই শুনিতেছিলাম। বলিতে বলিতে এক সময়ে কহিলেন-“জীবনের যে-কোন ক্ষেত্রে-ই যদি বড় কিছু করিবার ইচ্ছা তােমাদের হয়, তবে একটামাত্র বিষয়ের দিকে তােমাদের নজর দিতে হইবে। I have got one simple suggestion-private character.' তারপর থামিয়া বলিতে লাগিলেন—violence-এ স্বাধীনতা non-violence-এর চেয়ে আগে আসিবে, এ যদি প্রমাণ করিতে পারবে হয় আমি তােমাদের দলে আসিব, নয় পথ হইতে সরিয়া দাড়াইব। প্রসঙ্গক্রমে বলিলেন—'I can give my life this very moment if country wants that. শান্তভাবে বলিতেছেন, কোন চাঞ্চল্য নাই। শুনিয়া মনে হইলে যে, জীবন-দেওয়া জিনিষটা যে কি, তা ইনি যেন চোখের উপর দেখিতেছেন। এর উপরে যখন অতি ধীর ও শান্তভাবে একটা শব্দের পর আর একটা শব্দ উচ্চারণে অবকাশ রাখিয়া বলিলেন--Friends believe me, I do not fear death', তখন হঠাৎ টের পাইলাম যে, আমার বুকের মধ্যে কে যেন ভয়ানকভাবে কাঁপিতেছে। চাহিয়া দেখিলাম, ঐ অদূরে ক্ষীণকায় লােকটি যেন চোখের উপরে কাহাকে ভালাে করিয়া দেখিয়া লইতেছেন ; তাঁর চোখ ভােতাদের দিকে থাকিলেও দৃষ্টি আঁ’র অদৃশ্য-কিছুতে আবদ্ধ হইয়া আছে। কানে আসিল—'I fear God alone, আজও সে-কাপনের কথা ভুলি নাই। সত্য কথাই বলিব একাকী জানালায় বসিয়া যখন এই স্মৃতির কথা লিখিতে গিয়া কলম থামাইয়া গতদিনের সে-ছবি মনে আনিতেছিলাম, তখন সেই দিনের বুকের কম্পন আজ আবার টের পাইলাম। টের পাইলাম যে, শুধু, বুকই থর থর করিয়া কঁপিতেছে না, আমার সর্বশরীর রােমাঞ্চ দিয়া উঠিতেছে। I do not fear death-কী ক্ষণেই ক্ষীণকণ্ঠ হইতে বাহির হইয়াছিল যে, আমার বুকের মধ্যে তা চিরকালের জন্য বাসা ৩৬ ডেটিনিউ নিয়াছে। এখন যখনই ঐ ছবি ও কথা মনে হয়, বুকের মধ্যে একটা মানুষ তথনই থর থর করিয়া কাপিয়া উঠে। মৃত্যুকে আমি ভয় করি না—এই কথা কয়টীর মধ্যে গান্ধীজি তাঁর নিজের অস্তিত্বের অগ্নিময় অমর-অংশ নিশ্চয় কিছু ভরিয়া দিয়া থাকিবেন। তাইতো ঐ-আগুনকে জায়গা দিতে ভিতরে কে যেন আমার আজও ভয়ে এমন কঁপিয়া উঠে। জানিনা, কথায় এমন অমােয-শক্তি ও তার জ্বালা কেমন করিয়া কি সুকৌশলে তিনি ভরিয়া দিলেন। আজ আমি বিশ্বাস করি, মানুষের মনের গভীর-প্রদেশ হইতে এমন কথা বাহির হয়, যাতে অপরের মন চিরকালের মত জখম হইতে পারে, জ্বলিতে পারে বা আমূল বদলাইয়া যাইতে পারে। এ আমার নিজেরই অভিজ্ঞতা। কথা যে কত 'প্রচণ্ড ও ভয়ানক তা জানিতে পারিয়াছি। কিন্তু মনের কোন্ গহন-লােক হইতে এদের আনিতে হয়, তা আজও জানিতে পারি নাই। বােধ হয়, মনের সেই শক্তির রহস্য-ঘরের সন্ধান কোন দিন পাইবও না। মনের বাহির দুয়ারেই আমরা পড়িয়া আছি, সেখানেই আমরা জীবন কাটাইয়া দেইভিতর দুয়ার চিরকাল আবদ্ধ থাকিয়াই যায়। সবচেয়ে আশ্চৰ্য্য ও দুর্ভাগ্য এই যে, ভিতরের দিকে যাইবার যে একটা কপাট আছে, তা আমরা জানিও । এইজন্যই মহাপুরুষদের সঙ্গ প্রয়ােজন, কি বিশ্বাস নিয়া নিজের আপ্রাণ চেষ্টা দরকার। একবার কপাট খুলিতে পারিলে, মনের অমর- দিকের সন্ধান পাওয়া যায়, সমস্ত ভয় ঘুচিয়া যায়, জীবনের অর্থ একেবারে বদলাইয়া যায়। তখনই কথায় এত জোর হয় যে, পাহাড় পর্যন্ত টলিয়া যায় ।

ডেটিনিউ- কিরণদা’ যাহা বলিলেন, তাহাই নিজের মত করিয়া লিপিবদ্ধ করিতেছি। ঘরের দরজা তখনও বন্ধ ছিল। বাহিরে অনেকগুলি ভারী জুতার শব্দ শােনা গেল—সিড়ি দিয়া উপরে উঠিতেছে। গটগট শব্দ করি পায়ের শব্দ দরজার গােড়ায় আসিয়া থামিল, এবং সঙ্গে সঙ্গে সশকে কড়া নড়িয়া উঠিল। সাহেবী কণ্ঠে হুকুম শােনা গেল— "Open the door". বাহিরের লােকগুলির বােধ হয় অত্যন্ত জরুরী কাজ, তাই ত সহিতেছিল না। দরজা-খােলার অবসর না দিয়া এবার কড়ানাড়ার বদলে সশকে দরজায় ধাক্কা পড়িতে লাগিল। ধাক্কাগুলির জোর উত্তরােত্তর বাড়িতেছিল। মনে হইতে পারে যে, বদ্ধ দরজার পাশে আসিয়া অপেক্ষা করিতে হয়—এ সাধারণ নিয়ম আগন্তুকগণ তাহাদের ক্ষেত্রেও প্রযােজ্য হইবে, এ মােটেই পছন্দ করিতেছেন না। কিরণদা একটা ছেলেকে কহিলেন—“দেখ, তাে কারা, দরজাটা ভাঙ্গবে নাকি?” কাহারা-দেখিবার জন্য ছেলেটি দরজা খুলিয়া দিতেই হুড়মুড় করিয়া যাহারা ঢুকিয়া পড়িলেন, দেখা গেল তাহারা পুলিশের লােক— দেশী-বিদেশী সাদা-কালােয়-মিশানাে বাহিনী। যে-ভাবে ঢুকিল, তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, মানুষের প্রকৃতিতে বন্য পশুটা এখনও টিকিয়া আছে, সুযােগ পাইলেই কথায় বার্তায়, চলাফেরায় তা বাহির হইয়া পড়ে। ৬ এ-বাহিনীর নেতৃত্বে দেখা গেল স্বয়ং টেগার্ট-সাহেব নিজেই আসিয়াছেন। সঙ্গে নিয়া আসিয়াছেন শিষ্য কন্-সাহেবকে। কিছুদিন পরে গুরুর আসন শিষ্য দখল করিবে, তাই সঙ্গে সঙ্গে রাখিয়া হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়া পড়িয়া রাখিয়া যাইতেছেন। সাহেব, সর্জেন্ট, দারােগা ও পুলিশে ঘরটি ভরিয়া গেল। সাহেব প্রশ্ন করিলেন—“Who is Kiron Mukherjee ?” কিরণদা জানাইলেন যে, ওনামের মালিক তিনিই। টেগার্ট-সাহেব , কপাল ও চক্ষু কুঁচকাইয়া কিরণদা’কে কিছু ক্ষণের জন্য দেখিয়া লইলেন। এই বােগা, বেঁটে, ভগ্নহন্ত, খঞ্জ ও বিকলাঙ্গ নােকটীকে কিরণ-মুখার্জী বলিয়া বিশ্বাস করিতে তাঁর মন হয়তো চাহিতেছিল না। কিম্বা হয়তাে দেখিয়া লইতেছিলেন, এই লােকগুলির মধ্যে এমন কি থাকিতে পারে, যার জন্য সরকারকে হয়রাণ ও ভীত করিয়া তােলে। কর্কশ-ভাষায় জানাইলেন—“You are under arrest". -"Under arrest? Where is the warrant" ?" কিরণদা’ ওয়ারেন্টের কথা জিজ্ঞাসা করায় টেগার্ট-সাহেব বঁ-হাত দিয়া একটা পিস্তল বাহির করিয়া লইয়া সেটা কিরণদার মুখের কাছে তুলিয়া ধরিলেন, কহিলেন-“This is the warrant” দুই পাশ হইতে দুজন হিন্দুস্থানী কিরণদা’র দুই হাত চাপিয়া ধরিল। সামনের দেয়ালে একখানা বড় ছবি টাঙ্গানাে ছিল, টেগার্ট সাহেবের দৃষ্টি তার উপর গিয়া পড়িল। আগাইয়া ছবিখানা দেখিয়া লইয়াই তিনি ক্ষণমাত্র বিলম্ব করিলেন না। হাতের ছড়িটা দিয় ছবিটার উপর উপর্যুপৰি গােটাকতক বাড়ি দিতেই ঝন ঝন্ শব্দে কঁচ ভাঙ্গিয়া নীচে ছড়াইয়া পড়িল এবং ছবিটাও দেয়াল হইতে ছিন্ন হইয়া নীচে নামিয়া আসিল। নির্জীব ছবি কোন প্রতিবাদ করিল । কিন্তু যে-ছবির উপর টেগার্ট-সাহেবের এত আক্রোশ যে, এতগুলি লােকের সামনে রাগ চাপিয়া রাখিতে পারিলেন না, ছেলেমানুষের মত তা এইভাবে প্রকাশ করিয়া বসিলেন, এবং যে-ছবিটার উপর এই অত্যাচার ও অপমান দেখিয়া কিরণদার বয় চোখেও আগুন ঝিলিক দিয়া গেল-সে-ছবির পরিচয় দরকার। ছবিটি যতীন-মুখার্জীর। তাঁ’র চারজন সহকর্মীর সঙ্গে মিলিয়া তিনি সরকারের পুলিশ ও সৈন্যদের সাথে লড়াই করিতেছেন—যুদ্ধের এই ছবিটা একজন আর্টিষ্টকে দিয়া আঁকাইয়া লইয়া কিরণদা সযত্বে বাধাইয়া লইয়াছিলেন। বিপ্লবী নেতা যতীন-মুখার্জীকে টেগার্ট- সাহেব চিনিতেন। তাই ছবিটা দেখিয়াই চিনিয়াছিলেন এবং খেপিয়া গিয়া এমন কাজ করিয়াছিলেন। অথচ শােনা যায়, এই টেগার্ট- সাহেবই একদিন যতীন-মুখার্জী সম্বন্ধে সশ্রদ্ধভাবে বলিয়াছিলেন- "He is the only Bengali who fought from trench."- ১৯১৫ সালের ৯ই সেপ্টেম্বরের কথা। আজ তিনি বীরের জন্য সে-শ্রদ্ধা রাখিতে পারেন নাই, ইতর লােকের মনােবৃত্তি প্রকাশ করিয়া বসিলেন। বিবেকানন্দের ছাড়া এমন তেজোদীপ্ত ছবি আর কোন বাঙ্গালীর দেখা যায় না। বীরের এই তেজস্বী প্রতিকৃতির সম্মুখে শান্ত থাকাই ভঁ’র উচিত ছিল, এ- ছবিকে অপমান না করিলেও তিনি পারিতেন। টেগার্ট-সাহেব আজ যে-চেহারা দেখাইলেন, তাতে অনেক কথাই -জেভিনিউ মনে আসে। টেগার্ট-সাহেব নিজে সাধারণ ব্যক্তি নন, সামান্য অবস্থা হইতে আজ এত বড় হইতে পারিয়াছেন, কারণ তিনি সত্যই সামান্য ব্যক্তি ছিলেন না। বাংলা তাঁর নিকট ঋণী। কলিকাতাকে গুণ্ডার হাত হইতে মুক্তি তিনিই দিয়াছেন। Calcutta Police এক রকম তারই সৃষ্টি। সামান্য পুলিশ হইতে ইণ্ডিয়া-কাউন্সিলের মেম্বর পর্যন্ত তিনি পথ করিয়া গিয়াছেন। তারই মত লােকের চেষ্টা ও কর্ম-প্রতিভায় সামান্য একটা দ্বীপের অধিবাসীরা এত বড় হইয়াছে। • সমস্ত পৃথিবীতে ইংরেজ যে এত বড় সাম্রাজ্য গড়িয়া তুলিয়াছে, তা তাে মিথ্যার উপর দাড়ায় নাই। বহু সাহসী, অদম্য-উৎসাহশীল ইংরেজ-সন্তানের আপ্রাণ চেষ্টা এর পিছনে রহিয়াছে। মুখের কথায় বা আক্রোশে তো এ-জাতিকে ছােট করা যায় না। এ-জাতির প্রাপ্য সম্মান যা তা তাকে দিতেই হইবে। পৃথিবীর এত বৎসরের ইতিহাসের মধ্যে ইংরাজ-সাম্রাজ্যের মত বস্তু দ্বিতীয়টি দেখা দেয় নাই। ইংরেজ-জাতি বড়, তার মধ্যে বড় মানুষ আছে, তার মধ্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ-প্রতিভা আছে-এ স্বীকার না পাইলে মিথ্যা-বাবহার করা হইবে। কিন্তু সেই জাতিরই প্রতিনিধি-স্থানীয় টেগার্ট-সাহেবের আজিকার ব্যবহার—সত্যই আশ্চর্য হইতে হয়। বিকলাঙ্গ বৃদ্ধের মুখের উপর পিস্তল তুলিয়া ধরিয়া বীরত্ব এবং একটা ছবির উপর বিজাতীয় আক্রোশ-এ কি বড়র কাজ ! ইংরেজের মধ্যে যারা বড়-তারাও যদি মানুষের মানদণ্ড হইতে এত নীচে নামিয়া পড়েন, তবে সত্যিই ভাবিতে হয় যে, এই জাতির নীচে নামিবার দিন আসর ৪১ জেডিনিউ- হইয়া আসিয়াছে কিনা। মানুষের মধ্যে যারা বড়, তারা যে জাতিরই হোক, তাদের মধ্যে একটা দিক থাকে, যা ভূগােলের ও ইতিহাসের সঙ্কীর্ণ সীমা ডিঙ্গাইয়া যায় এবং সর্বমানুষের আত্মীয়তা ও শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে। টেগার্ট-সাহেব শশাচনীয়ভাবে সে-দিন ঐ সত্যিকার মানুষের পৰ্য্যায় হইতে চ্যুত হইয়াছেন। অথচ সেদিন তঁা’র কতবড় সুযােগ ছিল, মানুষের মহৎ-স্তরে উঠিবার । হয়তাে ভুল করিতেছি। একটি মানুষকে দিয়া যেমন গােটা একটা জাতিকে বিচার করা ভুল, একটামাত্র ঘটনাকে বাছিয়া নিয়া সমগ্র মানুষটাকে বিচার করাও তেমনি ভুল পদ্ধতি। তবু আমার ক্ষোভ থাকিয়া যায়। ইংরেজ যদি তার ভালাে দিকটা দেখাইত, আমার সঙ্গে ব্যবহারে তার বড় দিকটাই ব্যবহার করিত, তবে আমার সত্যিকার উপকার হইত, সেও লাভবান হইত আমাদিগকে বড় হইবার সুযােগ হইতে বঞ্চিত করিয়া সে-ও যে আসলে দুৰ্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে, একটু তলাইয়া দেখিলেই ত’ ধরা পড়িবে। ইংরেজ শত্রুতা করুক, তাতে আপত্তি করি না। তার নিজের স্বার্থ মরণ-কামড় দিয়া রক্ষা করিতে নির্মম ও কঠোর হউক, কিন্তু সে যেন মানুষের স্তর হইতে না নামিয়া যায়। মানুষের সভ্যতার জন্য তা’রও দায়িত্ব আছে। তার কর্তব্য সে না করিলে অপরের বােঝা আরও ভারি হইয়া উঠে। ইংরেজ ভারতবর্ষের সঙ্গে শত্রুতা করুক এবং সে-শত্রুতা চিরশত্রুত হইলেও আমি চিন্তিত হই না। কিন্তু ইংরেজ যখন ছোট হইয়া যায় তখন তার পাপে আমাদেরও সঙ্গে সঙ্গে নীচে নামিতে হয়, এবং মানুষের বদলে পশু সাজিয়া । ১২ -ডেটিনিউ মানুষের সমাজকে যে কোন্ ভয়ঙ্কর সর্বনাশের দিকে তথনই আমরা পিঠে বহন করিয়া আগাইয়া চলি—তা ইতিহাস-বিধাতাইজানেন। মানুষের সঙ্গে মানুষ হইয়া শত্রুতা কর—সভ্যতার অঙ্গ-হানি ও ক্ষতি হইবে না। কিন্তু পশুকে দিয়া মানুষকে ঠেকানন, তাতে যে সমস্ত সভ্যতা ও সমাজাকে হনন করার জন্য পশুকে লেলাইয়া দেওয়া হয়, তা বুঝিবার দিন কি আজও আসে নাই? ৪৩ ভেটিনিউ আমার মনের গঠনে নিশ্চয় কোথাও কোন বিষম ত্রুটি আছে, যার জন্য প্রত্যহের দৈনন্দিন ঘটনা আমার তেমন মনে থাকে না। এমন কি বড় বড় ঘটনা পর্যন্ত স্মৃতিতে কোন স্থায়ী দাগ রাখে নাই, এ আমি দেখিয়াছি। আমার মন যে-অংশটা দিয়া মনে রাখে, তা’র সেই স্মৃতির ভাঁড়ার-ঘরে নিশ্চয় বড় একটা সিধ আছে—সব সঞ্চয় সে-পথে সরিয়া পড়ে, সঞ্চিত কিছু হইতে পায় না। স্মরণ-শক্তি আর দশজনের চেয়ে যে আমার কম, ঠিক তা নয়। মনের গঠন-দোষে স্মৃতিশক্তির স্বভাবই এমন হইয়াছে যে, ঘটনা বা অভিজ্ঞতার শিকলে যে অতীতকে বাঁধিয়া রাখিবে, সে-রকম চেষ্টা-ই এখানে অতি কম। আমার মনে হয়, এই জন্যই আমার মধ্যে কিছু দানা বাঁধিতেছে না। আমার মধ্যে ইতিহাস নাই, কারণ সময়ের স্বভাব আমার স্মৃতিতে আসিয়া বিকৃত হইয়া যায়। আর সময়-ই তাে ইতিহাসের ভিত্তি। বহুবার অনুসন্ধান করিয়াছি এই মনে-রাখা ব্যাপারটা কি বুঝিবার জন্য। দেখিয়াছি—সময় ও স্মৃতি একই জায়গায় মিশিয়া গিয়াছে এবং উহাদের আমি একই বস্তু বলিয়া বােধ করিয়াছি। আর ৪৪ -ভেনিউ একটা বিষয়-ও লক্ষ্য করিয়াছি-সময়ের সত্যিকার ধারাবাহিকতা নাই। একটা স্থিতি, একটা ‘আছে-‘আছে’ ছাড়া অন্য কিছু দেখিতে পাই নাই। স্মৃতিকে সরাইলে অতীত বা বর্তমান কিছুই থাকে না। অধু থাকে একটা “থাকা” । এই “থাকাটা” হইতে সরিয়া আসিলেই মন একে ধরিতে বুঝিতে গিয়া স্মৃতি দিয়া যে-অংশটা পায়, তাই অতীত এবং আশঙ্কা ও কামনা দিয়া যা’ ধরিতে চায়, তাই ভবিষ্যং। আসলে অতীত বা ভবিষ্যৎ নাই, কারণ আমি তার কোন ভিত্তি-ভূমি ও আশ্রয়স্থান দেখিতে পাই নাই।-আমার ভুল-ও হইতে পারে, কারণ আমি নিজের মন দিয়াই নিজের মন বুঝিবার চেষ্টা করিয়াছি। এ এক অসম্ভব সমস্যা। মােট কথা, যে-কোন কারণেই হউক মনের একটা জায়গায় বেশ একটু মােচড় খাইয়া আমার স্মৃতিশক্তিতে ও তার স্বভাবে এরকম ঘটিয়াছে, যার ফলে জীবনের ঘটনাগুলি আসে যায় কিন্তু বাধা পড়ে । তাই এই বন্দি-জীবনের সব ঘটনা এমন ঝাপসা হইয়া গিয়াছে। ঘটিবার সময় ঘটনাগুলি আর দশজনের মত আমাকেও চঞ্চল করিয়াছে, উত্তেজিত করিয়াছে, এবং এমন কি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য পর্যন্ত করিয়াছে। কিন্তু সেই শক্তিমান একমাত্ৰ-সত্য ঘটনাগুলি এখন কোথায় ? ছায়ার মত কে তাদের এমন করিয়া সরাইয়া নিল? এও-তত কম আশ্চর্য নয়-একা একা বসিয়া যখন ভাবি, এখন যেমন লিখিতেছি, তখন বাহিরে পৃথিবী এত ছােট ও অকিঞ্চিৎকর হইয়া যায়। এই জেল তার সুবিধা-অসুবিধা ইত্যাদি নিয়া বেমালুম ০৫ ভেটিনিউ- সরিয়া গিয়াছে—পৃথিবী এত হালকা হইয়া দূরে পড়িয়া রহিয়াছে যে, কলম থামাইয়া নিয়া জানালা দিয়া বাহিরে তাকাইয়া তবে পৃথিবী সম্বন্ধে সচেতন ও সজাগ হইতেছি। কিন্তু বাহির তার এই জেলখানা- কয়েদী-সিপাহী-কর্মচারী ইত্যাদি সমস্ত নিয়া ছবির মত লাগিতেছে, এর সঙ্গে আমার তাে কোন যােগ-ই খুঁজিয়া পাই না! যখনই একা থাকি, একা ভাবনা-চিন্তা করি, তখনই টের পাই- মানুষ একটা জায়গায় বড় একা। জীবনের ও সংসারের কোনকিছুই সেই একক মানুষকে স্পর্শ করে না। বাহিরের সঙ্গে ভিতরের মানুষটীর যােগ সত্য ও স্থায়ী নয়—উভয়ের মাঝখানে মন্তবড় একটী বিদারণ-রেখা রহিয়া উভয়কে পৃথক করিয়া রাখিয়াছে। নিজের যে-একক চেহারা দেখিয়াছি, তাতে আজ 'আমার আর কোন সন্দেহ নাই, পরিষ্কার বুঝিয়াছি-- আমি ও আমার পৃথিবী এই-দুইয়ের সৃষ্টির মূলে দু'টা বিভিন্ন রহিয়াছে। একটীর সঙ্গে অপরীর গুণে ধর্শ্বে প্রকৃতিতে কোন সাদৃশ্য নাই, একটীকে দিয়া অপটীকে বুঝা যায় না। অথচ কোন গুঢ় কারণে এই পরস্পর-বিরুদ্ধ দু বস্তু এক মিলিয়া এই সৃষ্টিতে প্রকাশ পাইতেছে। এ-রহস্য উদঘাটন কে করিবে বা আদৌ এ-রহস্য উদঘাটিত হইবার কিনা—জানিনা। যে-মন দিয়া বাহিরের সঙ্গে এবারকার জীবনে লেন-দেন কারবার করিতেছি, সে-মনের স্বভাবের সব পরিচয় পাই নাই। চেষ্টাও করি নাই। কিন্তু এ-টুকু সম্বন্ধে স্থির-নিশ্চয় হইতে পারিয়াছি যে, বাহিরে যত ঘটনা ঘটে, তা বড়ই হৌক আর ছােটই হৌক, তার মূল্য ও অর্থ ঠিক অন্য দশজনের মত করিয়া আমি গ্রহণ করিতে পারিতেছি না। ৪৬ -ভেটিলিউ মনই আমার একস্থানে বিকল হইয়া গিয়াছে। সংঘর্ষ ও হানাহানির ঘটনাবহুল পৃথিবী আমাকে পরিত্যক্ত করিয়া রাখিয়াছে। আমার মন-ও পৃথিবীর কোন সম্বন্ধ সত্য-করিয়া গ্রহণ করে না। জেলখানায় ক্যাম্পে এত ঘটনা ঘটিয়াছে, যাতে আমাদের মন বিষাক্ত হইয়াছে। ছােটখাটো ঘটনায় ও ব্যবহারে সরকার ও তার কমচারীরা এমন প্রকৃতি দেখাইয়াছে যে, সম্মান নিয়া জীবন-ধারণ সম্ভব হয় নাই। মরীয়া হইয়া একটা-কিছু করিয়া ফেলিয়া এই নিত্যিকার অপমানের ও অসহ যন্ত্রণার শেষ দেখিবার জন্য মনে ইচ্ছা জাগে নাই এমন কাহাকেও খুঁজিয়া পাওয়া যাইবেন। আত্মহত্যা মীমংসার পথ নহে--ভীরুর মত পলায়নের পথ-ও তাকে বলা যায়। কিন্তু সে-পথের আভাস সুস্থ মানুষেরও চোখে ঝিলিক দিয়া গিয়াছে। ওই-পথই শেষে একমাত্র পথ-সবল বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি-ও সেই সিদ্ধান্তকে মাঝে মাঝে মনে আনাগ্নাে করিতে দেখিয়াছে। কিন্তু আত্মহত্যাকে অগ্রাহ বলিয়া মরীয়া হইয়া অন্য যে-উপায় মন গ্রহণ করিতে চাহিয়াছে—তা-ও আত্মহত্যার নামান্তর। সম্মানহীন জীবন অপমানে-দুৰ্ভর হইয়া যখন সঙ্কের প্রান্ত-সীমা স্পর্শ করে তখন বুদ্ধি এই পরামর্শই দিত, শুধু আমাকে একা নয়, সবাইকেই যে—মার ও মর। শুধু টিকিয়া-থাকায় যখন মন সায় দেয় না, তৃপ্ত হয় না, তখন প্রাণের উপর মমতা কমিয়া যায়। সম্মান চাই, মানুষের সহজাত অধিকার চাই, কিন্তু সংঘবদ্ধ শক্তি তা হইতে দিতেছেনা। মানুষকে যে মানুষের মত হইতে দিতেছে না, পশুর পর্যায়ে প্রায় ঠেলিয়া নিয়াছে, তাকে এ-পৃথিবী হইতে সরাইয়া দেও এবং তুমিও সর, কারণ ৪।

ভেটিনিউ- = তােমরা উভয়েই মানুষকে পশু করিবার জন্য দুই দিক দিয়া সাহায্য করিয়াছ-বুদ্ধি তখন চিন্তার এই-পথ ধরিয়াই চলিত। নিজে যখন মরিতেই বসিয়াছ, তবে আর মায়া কেন? সময় থাকিতে প্রাণটা দিয়া দাও এবং অপরপক্ষকে-ও সঙ্গে নিয়া যাও যাইবার সময় । -এই মানসিকতা অপরের বুঝিবার পক্ষে সুসম্ভব নহে। জেলখানায় এতগুলি লােক এক মিলিয়া দিন কাটাইতেছে। গল্প-গুজব-হাসি-ঠাট্টা-আড়া-হৈ-হৈ ইত্যাদি দিয়া জেলের দিনগুলি পার করিয়া চলিয়াছে। কেহ বা পড়াশুনা ইত্যাদিতে মগ্ন রহিয়াছে। সময় তাদের উপর দিয়া গড়াইয়া পার হইয়া যাইতেছে-পাথরের উপর দিয়া যেমন জলের ধারা যায়। বাহির হইতে দেখিলে বাহিরের লােকের জীবনযাত্রার সঙ্গে এর তেমন কোন পার্থক্য লক্ষিত নাও হইতে পারে। কিন্তু এর যে কোন একজনকে ধরিয়া পরীক্ষা করিলেই দেখা যাইবে পার্থক্য কোথায়, অত্যাচর, শারীরিক ও মানসিক দুই-ই, এদের উপর কতবড় চিহ্ন রাখিয়াছে। নিজের দেশ নিজের বলিয়া পাইতে যে কত কষ্ট ও লাঞ্ছনা পাইতে হয়--তা’ তখন চোখের উপর পরিষ্কার হইয়া উঠিবে। জন্মিলেই বাঁচার অধিকার জন্মে না- এ-কথা অসম্ভব ও আশ্চর্য শুনাইতে পারে, কিন্তু এ যে কত কঠোর সত্য তখন আর সন্দেহ থাকিবে না। সকলেরই জন্মভূমি আছে, সকলেরই স্বদেশ আছে, কিন্তু আমার তা থাকিতে পারিবে না-এ- কথা মানিতে পারে নাই, তাই শক্তিমানের কতবড় আক্রোশ যে এদের উপর পড়িয়াছে-তখন হয়তাে বুঝা যাইতে পারে। একা একা মন বড় বিষয় হইয়া উঠে, ভাবি—এতবড় পৃথিবীতে মানুষের জায়গা কুলাইতেছে, না, একজনের বাঁচা অপরের অন্তরায় ৪৮ -ডেনিউ হইতেছে। অমানুষিক এক অবস্থার সম্মুখে আমরা আসিয়া পড়িয়াছি পৃথিবী, যা’ কাৰু নিজস্ব সম্পত্তি নয়, বাসের জন্য যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়ু নিয়া মানুষ আসিতেছে সেখানে তার বাসের জায়গায় অভাব নাই, চেষ্টা করিলে অন্নবন্ত্রের-ও অভাব মিটিয়া যায়। কিন্তু মানুষের লােভকে জায়গা দিবে এত বিস্তৃতি এ-ক্ষুদ্র ভূমণ্ডলে নাই। আর সে-লােভ যখন শক্তিতে অন্ধ হয়, বুদ্ধি-বিজ্ঞান যখন সে- শক্তিতে আর-ও যােগান দেয়—তখনই ভয়ঙ্কর অবস্থা দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়। ইতিহাসের ইঙ্গিত চোখে আঙ্গুল দিয়া কতবড় সর্বনাশকে দেখাইতে চাহিতেছে, কি-পরিণাম যে অপেক্ষা করিতেছে— শক্তিমানের অসংযত লােভ ত’ গ্রাহ্য করে না বা দেখিতে পায় না। কিন্তু সৃষ্টির মূলে। অমােঘ-বিধান আছে, সেখানে সত্যই কোন ক্ষমা বা মার্জনা নাই। পৃথিবী এবং তার পৃষ্ঠোপরি যে-মানুষগুলি চলাফেরা করিতেছে, তার একটা পরিষ্কার ছবি মনে আনিতে গিয়া দেখি যে—চারিদিক রুদ্ধ, আলাে-বাতাস আসার ক্ষুদ্র ছিদ্র পর্যন্ত নাই, এমনই একটা আবদ্ধ-কামরার-মত পৃথিবী মানুষগুলিকে ভিতরে বােঝাই করিয়া লইয়া শূন্যে ছুটিতেছে। ভিতরের মানুষগুলি আলাের অভাবে একে অপরের মুখ দেখিতে পাইতেছে না। এই অন্ধকার-আবেষ্টনীর বাহিরে যে একটা বাহির আছে—তা তারা জানে না। আবদ্ধ অন্ধকারে শুধু অসংখ্য নখর দ-ঘর্ষণ হইতেছে, আর জানােয়ারের চীৎকার থাকিয়া থাকিয়া-উঠিতেছে। পশুদের কামড়া-কামড়ি-হানাহানি ইত্যাদির একপাশে কি এমন ৪১ ডেটিনিউ- কোন মানুষ বা শিশু বর্ধিত হইতেছে না, যে মানুষকে মুক্তি দিতে পারে? সে-ই হয়তাে একদিন প্রাচীর ভাঙ্গিয়া ফেলিবে, মাথার উপরের আচ্ছাদন সাইয়া দিবে—তখন বাহির হইতে আলাে আসিবে, মানুষ মানুষের মুখ দেখিতে পাইবে এবং পশুর নখ-দন্ত অন্ধকারের সঙ্গেই দূর হইয়া যাইবে। সমস্ত মন দিয়াই প্রার্থনা করি মানুষের সে-মুক্তিদাতা মানুষ আসুক। আজ এই জেলখানা আমার কাছে মিথ্যা হইয়া গিয়াছে। সমস্ত পৃথিবী হইতে এ বিচ্ছিন্ন নয়। জেলখানা হইতে বাহির হইয়া কোথায় যাইব-এ আবদ্ধ পৃথিবীতে-ই তত থাকিতে হইবে ! মনের মধ্যে প্রার্থনারত একটা মানুষকে দেখিতেছি—পৃথিবীর জন্য সে মুক্তি চাহিতেছে। কিন্তু ভিতরে-তাে দেবতার সেই মাভৈঃ- আশ্বাস শুনিতে পাইতেছি না। মনকে বলি—বিশ্বাস যেন না টলে, মানুষের মহান-ভবিষ্যতে বিশ্বাস যেন দৃঢ় থাকে। সময় হইলে দেবতার কাজ দেবতা-ই করিবেন। তীর্থে দেবতা-ই শুধু থাকেন না, পাণ্ডারা-ও থাকেন। প্রতাপে দেবতাকে ইহাৱা বহুগুণে ছাড়াইয়া যান এবং ইহাদের দৌরাত্ম্যের সীমা নাই বলিলে অত্যুক্তি-দোষ ঘটে না। দেবতার পাথরের শরীর, এতে হয়তাে তার কিছু যায় আসে না। কিন্তু মানুষের রক্ত- মাংসের শরীর--পাথরের দেবতার মত মুখ বুজিয়া সহ করার সুবিধা তার নাই। তাই পাণ্ডার প্রতাপে তীর্থযাত্রীর প্রাণ ওষ্ঠাগত হইতে বেশীক্ষণ লাগে না। ‘ইলিসিয়াম রাে আমাদের কাছে তেমনি একটা তীর্থস্থান— -ডেটিনিউ হিন্দুর কাছে কাশ যেমন, অবশ্য ভিন্ন অর্থে। এখানে তীর্থ-দেবতার সাক্ষাৎ মেলে না, মেলে পাণ্ডার দর্শন। কাশীতে বাবা বিশ্বনাথ অধিষ্ঠিত—“ইলিসিয়াম বােতে কোন্ নাথের অধিষ্ঠান, তা সঠিক বলা না গেলেও এটুকু বলা যায় যে, এখানে ‘বঙ্গ-নাথ’ মানে আই-বি অধিষ্ঠিত। ‘ইলিসিয়াম রাে’ তার বিদেশী নাম ছাড়িয়া আজ স্বদেশী নাম নিয়াছে—লর্ডসিংহ-রােড। আই-বি আফিসকে আমরা এই রাস্তার নামেই বুঝিতাম ও বুঝাইতাম। লর্ডসিংহ-রােডে কারু ডাক পড়িয়াছে, এ-সম্বাদে আমাদের মুখের যে-চেহারা হইত, তার সরল বাংলা-তর্জমা এই- সেরেছে রে। বাংলার সেটা সে-দিন, যে-দিন তা’র অদৃষ্টে শনির দৃষ্টি কূপিত হইয়াছিল ও পূর্ণ-প্রভাব বিস্তার করিয়া রাখিয়াছিল। লর্ড-আইনের গভমেন্ট দুর্বল ও ভীরু বলিয়া আখ্যাত হইয়াছে ; বণিকের হাতে রাজ-শক্তি আসিয়াছে । ক্লাইভ-স্ত্রীট হইতে তখন ভারতের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হইত। পুলিশের হাতে তখন যে-ক্ষমতা এরা দিয়াছিলেন, তাতে হিটলার মসসালিনি ষ্ট্যালিন পৰ্যন্ত ঈর্ষাতুর হইতে পারিতেন। বাংলার বেসরকারী ইংরেজ-মহল সেদিন বড় কুপিত হইয়া উঠিয়া- ছিলেন, সৈন্য-পুলিশ-সরকার ইত্যাদির উপর আস্থা রাখিতে না পারিয়া Royalist Party-গঠন করিয়া বাংলার সুখ, শান্তি ও শৃঙ্খলার ভার আপনাদের হাতে তুলিয়া লইয়াছিলেন। আর সর্বোপরি স্যার-এণ্ডারসনের লৌহ-হস্ত বরাভয় লইয়া প্রসারিত ছিল। Statesman-পত্রিকা খুলিয়া পড়িতাম—আমরা born crimi- জেটিনিউ nal, আমাদের রক্তে Criminal-দের ঐতিহ্য ধারাবাহিকভাবে বহিয়া আসিতেছে। অতএব, একদিনের Statesman-এ দেখিলাম, এই Criminal-দের সমূলে উচ্ছেদ করিয়া বাঙ্গালার সমাজের মহা ও স্থায়ী হিতসাধন আশু কর্তব্য। জনৈক ইংরেজ-কর্মচারীর হত্যার পর Statesman (ও ভারতবন্ধু’ )-পত্রিকায় দেখিলাম যে, Terrorist-দের উপর justice-ইত্যাদি দেখানাের কথা আর মুখে আনা উচিত নহে; ক্যাম্পে ও জেলে যারা আছে, সেই বন্দীদের মধ্যে বাছিয়া বাছিয়া আনা হউক, তাদের দেয়ালের দিকে পিঠ করিয়া গুলি করিয়া মারা হউক। কেন যে এ-ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয় নাই, তা জানি না। কিন্তু সে-দিন এ-ব্যবস্থা অবলম্বন করার কোন মানসিক বাধা বেসরকারী- ইংরেজের মনে ছিল না—এ আমরা সত্যই বিশ্বাস করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। আমাদের মনের আড়ালে একটা আশঙ্কা সর্বদাই প্রচ্ছন্ন রহিয়াছিল যে, যে-কোন সময়েই দেয়ালের দিকে পিঠ দিয়া দাড়াইবার জন্য ডাকিয়া নিতে পারে-তারপর বুক পাতিয়া গুলি লইতে হইবে। Statesman-এর আড়ালে সে-দিনের ইংরেজের সরকারী ও বেসরকারী-মনােভাবই গুপ্ত ছিল। বাছিয়া বাছিয়া গুলি করিয়া মারিবার পন্থা সরকার নেয় নাই, এ-সত্য অস্বীকার পাইব না। কিন্তু একদিন পত্রিকা পাইতে দেরী হওয়ায় অস্থির হইয়া Commandant-কে চিঠি দিতে তিনি আফিসে নেতৃস্থানীয় কয়েক- জনকে ডাকিয়া নিলেন। তাঁরা কিছুক্ষণ পরে ফিরিয়া আসিলেন। তাঁদের পিছনে পিছনে আফিসের গুর্থ-আন্দালী পত্রিকা লইয়া আসিল এবং যথাস্থানে রাখিয়া নিঃশব্দে প্রস্থান করিল।

-ডেটিনিষ্ট ক্ষণপরেই সারা ক্যাম্পে একটা বিষাদের ছায়া নামিয়া পড়িল। Commandant ডাকিয়া দুঃখের সহিত জানাইয়াছেন যে, কাগজ তিনি ভিতরে পাঠান নাই, কারণ পত্রিকাতে একটি ভয়ানক দুঃসম্বাদ আছে। হিজলী-ক্যাম্পে রাত্রিবেলা সিপাহীরা ভিতরে ঢুকিয়া গুলি চালাইয়াছে। দু’জন বন্দী মারা গিয়াছে, আহতদের মধ্যে জনদশেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ-সদে পাছে এ-ক্যাম্পের বন্দীরা উত্তেজিত হইয়া উঠে, সেইজন্যই পত্রিকা দিবার আগে নেতৃস্থানীয়দের তিনি ঢাকাইয়া পাঠাইয়াছেন। বক্সা-দুর্গের বারান্দায় বসিয়া সে-দিন কি ভাবিয়াছিলাম, আজ আর মনে নাই। শুধু মনে আছে-তখন পশ্চিমে পাহাড়ের আড়ালে বৈকালের সূৰ্য ঢাকা পড়িয়াছিল। দেখিয়াছিলাম—দক্ষিণে বিস্তীর্ণ বাংলাদেশ পড়িয়া আছে, উত্তরে ঘন অরণ্যে অন্ধকার হইয়াছে এবং আকাশে সন্ধ্যাবেলার রক্ত-রজে মেঘগুলি ছোেপাইয়া গিয়াছে। Statesman-পত্রিকা যাহা চাহিয়াছিল, তাহা তবে এই ভাবেই অনুষ্ঠিত হইবার ব্যবস্থা হইয়াছে। দিন আসে, দিন যায়। একদিন সম্বাদ দেখিলাম, চট্টগ্রামে দাঙ্গা হইয়াছে। বেসরকারী ইংরেজ ও এাংলােইণ্ডিয়ানগণ তাহার নায়ক এবং উত্তেজিত মুসলমান জনতা সে-riot-এ তাহাদের সহকর্মী। আশানুল্লা-হত্যার প্রতিশােধ চট্টগ্রাম সহরের উপর নেওয়া হইয়াছে। তারপর মেদিনীপুরতাে রহিয়াছেই। ঢাকা-ও বাদ যায় নাই। প্রতিহিংসা-প্রতিশোেধ দুইপায়ে বাংলাকে চষিয়া ফিরিতেছিল। এই সেই দিন। লউসিংহ-রােডে ডাক পড়িলে কাজেই আমাদের মুখের ছবি অমন হইত।

ডেভিনিউ- আজ সময়ে সে-সব ঘটনা হালকাভাবেই নিজেদের মধ্যে আলােচনা করিতে পারিতেছি। এমন কি লর্ভসিংহ-রােডে তীর্থ- যাত্রার অভিজ্ঞতা বেশ ঠাট্টা রসিকতার খােরাক ও বস্তু হইয়াছে। এ নিয়া আলাপ ও গল্প করিয়া জেল-জীবনটায় আরাম উপভােগ পৰ্য্যন্ত করিতে পারিতেছি। দুঃখ পৰ্যন্ত শেষে হাসির খােরাক যােগায়—সময়ে সবই সম্ভব হয়। একজনের অভিজ্ঞতার কথা বলি। লর্ডসিংহ-বােডে তার কৌতুককর অভিজ্ঞতা বলার আগে তার একটু পরিচয় দরকার । নাম ফণীভূষণ-দত্ত। বােগা-বাঙ্গালীর দেশে এ-রকম শরীর ও স্বাস্থ্য বড় নজরে পড়ে না। মনে হয়—এ-দেশে এ-শরীর যেন বিধাতার আর্য-প্রয়ােগ । অতবড় শরীর, চোখে-মুখে এমন একটা সজীব সরলতা রহিয়াছে যে, প্রথম-দর্শনেই আত্মীয়তার আকর্ষণ বােধ করা যায়। আর বিস্ময় লাগে যে, এই বয়সে-ও ঐ শরীরের আড়ালে একটা শিশু-মন টিকিয়া রহিয়াছে। সঙ্গী-হিসাবে ফণীর যুড়ি নাই। কথা বলিবার নিজস্ব একটা ভঙ্গী তার আছে যা সাধারণের থাকে না। রস-জ্ঞান তীক্ষ, নিজের রসিকতা-ঠাট্টা ইত্যাদিও মার্জিত ও সংযত। আলাপ-আলােচনা- আচ্ছা এ-সব সরস ও সজীব করিয়া রাখিবার শক্তি তার প্রচুর। ঈর্ষা হয় যে, এমনভাৱে বলিতে পারিলে অনেক দুঃখ-কষ্টই হালকা করিয়া লওয়া যাইত। এ গেল তার এমন দিক যা’ বাহিরের লােকের-ও জানিতে বেশী বিলম্ব হয় না। কিন্তু ফণীর আর একটা দিক আছে, যা সাধারণ ৪

দৃষ্টির বাহিরে। সে তার কষ্ট-সহিষ্ণু দৃঢ় দিক—যা’ ভাঙ্গা যায়, কিন্তু
নােয়ানাে চলে না!
দেউলীতে একদিন কথা হইতেছিল অনিদ্রা-বােগ নিয়া।
অনেকেই এ-রােগে কষ্ট পাইতেছিলেন।
জীবন-সরকার বলিল—“পঞ্চাদা’ আপনি এত দেরীতে উঠেন কেন?”
পঞ্চানন-বাবু কিছুক্ষণ হয় ঘুম হইতে উঠিয়া বিছানায়
বসিয়া ছিলেন, কহিলেন—“রাত তিনটার আগে ঘুম হয় না, কি
করব। যা-একটু ঘুম আসে ভােরের দিকে।”
ফণী পঞ্চানন-বাবুর
পাশে বসিয়াই একটা বইয়ের পাতা
উল্টাইতেছিল, বােধ হয় সঙ্গীত-বিষয়ে কোন বিশেষ পুস্তক-ই হইবে।
আস্তে কহিয়া উঠিল—“আমারও ইনসমনিয়া।”
শুনিয়া জীবন সশব্দে হাসিয়া উঠিল। বলার ভঙ্গীতে আমরাও
হাসিয়াছিলাম। কিন্তু জীবনের হাসির সঙ্গে আমাদের হাসির
তফাৎ ছিল, তা পরে বুঝিলাম ।
জীবন কহিল—“ফণি-বাবু, আপনার সেই ইনসমনিয়ার গল্পটা
বলুন না।”
পঞ্চানন-বাবু চাপিয়া ধরিলেন-“বলতাে গল্পটা।”
—“না, 'সে তেমন কিছু নয়। একদিন কথায় কথায় বলে
ফেলেছিলাম, এখন দেখছি ভাল করিনি! গােপন কথা যত কম
বলবেন ততই উপকার পাবেন।”
শেষের উপদেশটা জীবনকে উদ্দেশ্য করিয়া বলা হইল।
পঞ্চানন-বাবু জানালার দিকে ঝুঁকিয়া মুখ বাড়াইয়া ডাক
দিলেন-“এই মণ্ডল।

টেনিউ- সামনেই চৌকা, কয়েকজন ফালতু বঁটা পাতিয়া তরকারী কুটিতেছিল। মােটাসােটা বেঁটে হরষিত-মণ্ডল উঠিয়া আসিয়া জানালার ওধারে দাড়াইল । কহিল—“বাবু, ডাকৃতিছেন?” —“হ, ভাতিছি। ক' কাপ চা আনতে পার?” -“পারি। ক’ কাপ ?” -এই চার পাঁচ কাপ।” ফণী জিজ্ঞাসা করিল-মােশুল, তােমার বুঝি শরীর ভালাে নেই। নিশ্চয় মৌতাত জোটে নি ?” মণ্ডল হাসিয়া ফেলিল। সে চরস-সেবা করিয়া থাকে, বাবুদের কাছে এটা গােপন নাই। কহিল—“না বাবু, আজকাল পাই। কিন্তু পয়সা বড় বেশী লাগতিছে।” -“তা তাে লাগবেই মমণ্ডল, এ যে জেলখানা। কিন্তু মৌতাত পেয়েও তুমি এমন কথা বলছ ?” কি কথা—বুঝিতে না পারিয়া আমরাও তাকাইয়া রহিলাম। ফণী কহিল—“তা না হলে তুমি শুধু চা আনতে চাও।” বুঝিতে পারিয়া মণ্ডল হাসিয়া ফেলিল। কহিল-“এত বেলায় যে টিফিন কিছু আছে তা তাে মনে হয় না। দেখি, কি পাই।” -“কিছু না থাক ডিমতাে আছে? মামলেট হলেও চলবে। বেশী না, গােটা ছয়েক। তুমি কেমন ওস্তাদ আজ দেখা যাবে।” পঞ্চানন-বাবু কহিলেন-“ম্যানেজার-বাৰুকে গিয়ে আমার কথা বল। কিছু খাবার আর চা, বুঝলে?”

—ভেটিনিউ বুঝিয়া হরষিত-মণ্ডল প্রস্থান করিল। পঞ্চানন-বাৰু ফণীর দিকে ফিরিয়া কহিলেন—“কই, তােমার গল্প বক্সে না?” -“দুঃখ হয়, সে-রকম ইনসমনিয়া আজকাল আর নেই। উঃ- সে কী দিনই গেছে।” তারপর তার সেই-সে-দিনের গল্প শুরু করিল। ফণী তখন কলিকাতাতে মুক্তারামবাবু-স্ট্রীটের দিকে থাকিত। সময়টা গ্রীষ্মকাল, কিন্তু মাঝে মাঝে বর্ষা গ্রীষ্মের এলাকায় অনধিকার-প্রবেশ করিয়া আক্রমণ করিয়া থাকে। বদ্ধঘরের ভিতর শােয়া ফণীর ধাতে সয় না—তায় এই গ্রীষ্মের গরম। খাওয়া-দাওয়া সারিয়া একটা মাদুর ও বালিশ বগলে ফুটপাতে আসিয়া একটা জায়গা বাছিয়া বিছানা পাতিয়া সে শুইয়া পড়িত। ঘুমের জন্য বেশী সময় সে নষ্ট করিত না। বিছানায় গা দিয়াই ঘুমাইয়া পড়িতে পারিত। চোখ বুজিলে শুধু অন্ধকারই আসিত না, ঘুম-ও সঙ্গে সঙ্গে আসিয়া পড়িত। একটা গাড়ী-বারান্দার নীচে ফণী সে-দিন জায়গা বাছিয়া নিয়াছিল, রাত্রে বৃষ্টি আসিতে পারে এই আশঙ্কায়। পাশেই ফুটপাতের অন্যান্য সরিক গরীব ভিখারীর দলও রাত্রের মত বিশ্রাম করিতেছিল। একটা কুকুর-ও পাশে আসিয়া জায়গা নিয়াছিল। এক সময়ে একটা হৈ-হৈ শব্দ শুনিয়া ফণীর নিদ্রা ভাঙ্গিয়া যায় । চোখ মেলিবার আগেই কানে আসে-“গেছেরে গেছে।” কোথায় কে গেল—দেখিবার জন্য ফণী চোখ মেলিয়া দেখিল, ইতিমধ্যেই প্রায় ভাের হইয়া আসিয়াছে। এইমাত্র ঘুমাইতে আসিল, - ডেটনিউ আর শুইতে না শুইতেই রাত্র শেষ ! না, শেষে মনে হইল এগারােটার সময়ই সে শুইয়াছিল। কিন্তু হৈ-হৈ ব্যাপারটা কিসের ? পাশেই কয়েকটা ভিখারী জাগিয়া উঠিয়া বসিয়াছে, সামনে রাস্তার উপর গঙ্গা-নার্থী কয়েকটা বিধবা-তারাই হায়হায়-চীৎকার করিতেছিল। ফণী কিছু বুঝিতে পারিয়া উঠিয়া বসিল। তাকে উঠিয়া বসিতে দেখিয়া বিধবাদের একজন কহিল-“খুব বেঁচে গেছ বাবা! লাগেনি তাে?” ফণী জিজ্ঞাসু-মুখে চাহিয়া রহিল। বেঁচে গেছ, লাগেনি ত’- কিছুরই অর্থ সে বুঝিতে পারিতেছিল না। -“ষাড়ে যে তােমাকে মেরে ফেলেছিল।” বিধবার দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া দেখিতে পাইল যে, একটা বড় কিছুদূরে ফুটপাত ধরিয়া মন্তর গমনে চলিয়াছে। পথের মধ্যে ফণী পড়িয়া যায়—পাশ না কাটাইয়াই যাড়টী সােজা তার উপর পা ফেলিয়া গিয়াছে। এতক্ষণে ফণীর ব্যাপারটা মালুম হইল—এইজন্যই এরা এমন করিয়া চেঁচাইয়াছে। বিধবাটী অবাক হইয়া কহিল-“বাবা বিশ্বনাথ রক্ষা করেছেন। ষাঁড়টী দেখছি তােমাকে না মাড়িয়েই ডিঙ্গিয়ে গেছে।” বাবা বিশ্বনাথের বৃষের এত দয়া ! কিন্তু নিজের উরুর দিকে চাহিয়া দেখিল, ক্ষুরের চিহ্ন আঁকা, দাগ কাটিয়া বসিয়াছে। কহিল —“না, একটা পা বােধ হয় পড়েছিল। তেমন কিছু হয়নি।” পাশের এক দোকানদার সবেমাত্র জাগিয়া বাহিরে আসিয়াছিল। দুই হাত জোড় করিয়া কপালে ঠেকাইয়া পূব-দিকে সূর্যের উদ্দেশ্যে ৮ নমস্কারটা সারিয়া আসিয়া কাছে দাঁড়াইল। ফণীকে চিনিত, কহিল- “আপনি কিচ্ছু টের পাননি?” ফণী অপরাধীর মত হাসিয়া কহিল-“না।” -“এতেও আপনার ঘুম ভাঙ্গেনি?” -"চেঁচামেচি শুনে জেগেছি। এখন মনে হচ্ছে, ঘুমের মধ্যে যেন একটা চাপের মত বােধ করেছিলাম।” -“বােধ করেছিলেন?-অদ্ভুত! এমন ঘুমের কথা বাপের জমে শুনিনি, দেখাতাে দূরের কথা।” জখম হয় নাই জানিয়া গঙ্গাস্নানার্থীরা চলিয়া গিয়াছিল। কিন্তু ফণীর ঘুমের সহনশীলতা, যা বৃষের পদ-মর্দনেও টোল খায় না, তা নিয়া আশে-পাশে বেশ একটা আলােচনা চলিতে লাগিল। ফণী মাদুর গুটাইয়া লইয়া চলিয়া আসিল। সেযেন মস্ত বড় একটা অপরাধ করিয়া ফেলিয়াছে—এমনই তার মনে হইল। এই রকম ঘুম মানুষের শশাভা পায় না—দশজনে এ-ভাবটা তার মনে বেশ গাঁথিয়া দিয়াছিল। পঞ্চানন-বাবু একটু অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞাসা করিলেন—“সত্যি, তুমি একটুও টের পাওনি?” --“সত্যি। আশ্চর্য হয়ে যাই যে কেমন করে এ রকম হতে পারে। উরুতে খুরের দাগ পষ্ট রয়েছে, মাড়ায়নি বলে যে নিজেকে বুঝ দেব সে-পথও ছিল না।” তারপর হাসিয়া কহিল—“আজ বিশ্বেস হয়েছে যে, আমাকে খাটি ইন্মনিয়ায় পেয়েছিল। তা না হলে এ-রকম—বুঝতেই পারেন।”

ডেটিনিউ পর্দা সরাইয়া তিলক-সিং প্রবেশ করিল, হাতে চায়ের কেটলী ও খাবার। থালা হইতে দু’টা মামলেট তুলিয়া লইয়াই ফণী কহিল- “ উবেটা, একেবারে আগুন নিয়ে এসেছ।” জীবন-ও হাত বাড়াইয়া একটা মামলেট তুলিয়া লইল। কহিল- “আপনি যে দুটো নিলেন, এখন ভাগ হয় কি করে ?” —“নিজে না নিলেই বেশ ভাগ হয়, দুখানা করে দু’জনে পান।” পঞ্চানন-বাবু কহিলেন—“আমি চা খাব। তুমি মামলেট নেও।” জীবন প্রস্তুত ছিল না, ফণী হাত বাড়াইয়া পঞ্চানন-বাবুর ভাগের মামলেট তুলিয়া নিল। জীবন পারিলে যুদ্ধ-ঘােষণা করিত। কিন্তু ফল কি হইবে জানা-থাকায় আর কোন চেষ্টা করিল না । বিস্কুটের দিকে চাহিয়া ফণী কহিল—“জীবন-বাবু, একটু অনুপান আনান না।” -“না, আমি উঠতে পারব না।” -“কোথায় আছে, তাই বলুন। উঠতে হবে না।” -“বাকের উপর।” অনুপান কি বুঝিতে না পারিয়া চাহিয়া রহিলাম । ফণী ডাকিল—এই তিলক !” তিলক কাপ ধুইয়া ভিতরে ঢুকিল। —“যা তােমাখনের কৌটাটা নিয়ে আয়। বাবুর বাঙ্কের উপর আছে।” তিলক বা কি বুঝিতে না পারিয়া জিজ্ঞাসা করিল—“কোন বাবুর বাল্পে আছে ?

-“আরে বাক্সে নয়, বাঙ্কে।” তারপর তাকে বাৰু কি বুঝাইয়া
দেওয়া হইল।
-“যা, জলদি আসিস।”
চায়ে চুমুক দিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম—“ফণী, দাড়িয়ে ঘুমুতে
—“ঘােড়ার মত ? না—প্রাকটিস করিনি। তবে ক্লাশে বসে
বসে অনেক ঘুমিয়েছি।”
পঞ্চানন-বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন-“তুমি চা খাবে না?”
—“না, ও-তে পদার্থ নেই। পঞ্চাদা’, ইনিয়ার আর একটা
গল্প শুনুন।”
-“কার গল্প ?”
-“আমারই। জীবন-বাবুদের বলিনি। ঐ গাড়ী-বারান্দার
নীচেই শুয়ে ছিলাম। ষাঁড়-pass করার কয়েকদিন পরের
কথা। বেশ আরাম করে ঘুমিয়ে ছিলাম। এক সময়ে মনে
হ’ল, পা থেকে কোমর অবধি আমার বরফের মত ঠাণ্ডা হয়ে
গেছে। এত অবশ ও ভারী ঠেকছে যে কিছুতেই পা টানতে
পারিনে পা দুটো যেন আমার নয়। অথচ সে-পায়ের জন্যই এত
যন্ত্রণা বােধ করছি। এ-রকম নিশ্চয় আপনারাও ঘুমের মধ্যে টের
পেয়ে থাকবেন। খুব জোর করে পা টানতে গেলাম-ঘুম ভেঙ্গে গেল,
চমকে উঠলাম। দেখি, পা থেকে কোমর অবধি জলে ডুবে আছে।”
-“জলে ডুবে গেছে ?”
-“হ। প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। রাত্রে বৃষ্টি হয়ে রাস্তা
ডুবে যায়, তারপর ফুটপাত পৰ্য্যস্ত জল আসে। কখন কোমর অবধি

ডেটিনিউ- জলে ডুবে গেল-ঘুমের মধ্যে এই কাণ্ড। এত ঠাণ্ডা আমি কোনদিন টের পাইনি, যেন অর্ধেকটা শরীর বরফ হয়ে গিয়েছে এমনই লাগল।” জীবন কহিল—“জলের ছাটেও ঘুম ভাঙ্গেনি?” —“কথা শুনলেন?-বলছি, জলে ডুবে গিয়ে ঘুম ভাঙ্গেনি। আর উনি জিজ্ঞাসা করছেন, জলের ছাটেও ঘুম ভাঙ্গলাে না। গলা পৰ্যন্ত জল এলেও ভাঙ্গত না—শুধু নাকটা জেগে থাকলেই হােত। কিন্তু এমন অদ্ভুত ঠাণ্ডা জীবনে ভুগিনি!” কহিলাম-“ঘুমে তুমি সিদ্ধি লাভ করেছ।” -“না, জেলখানায় এসে আত্ম-বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে। এ-ইন- নিয়ার দেখা আর এ-জীবনে পাব না। এখন হাতে এত সময়—অথচ তার দেখা পাই না। দরকারের সময় দেখবেন কোন জিনিষ পাবেন । আর যখন দরকার নেই-তখন দেখবেন বােঝায়-বােঝায় এসে হাজির। কি যে নিয়ম এ-পৃথিবীর !” ঘরের মধ্যে কে ডাকিয়া বলিল—“পর্দা তুলুন, আ-গিয়া।” মধ্যে রােল কল। এসে গেল”—বলিয়া জীবন উঠিয়া পর্দাটা তুলিয়া দিল। বুটের শব্দ করিতে করিতে ও-ধারের দরজা দিয়া সিপাই ও রেলকল-অফিসার ঢুকিল, হাতে রেজিষ্টার খাতা ও লালনীল পেন্সিল। প্রত্যেক সিটের সামনে থামিয়া খাতায় দাগ দিতে দিতে আমাদের সীমানায় আসিয়া উপস্থিত হইল। কহিল—“ফণী-বাবু, ঘরে যাবেন না?” -“ঘরে-ই তাে আছি। আর হাঙ্গামা করেন কেন? এখান থেকেই দাগ মেরে দিন। পালাইনি—বিশ্বাস করবেন।” ৬২ -ভেটিনিউ লােকটী নিরীহ ও ভদ্ৰমানুষ, পুলিশের মেজাজ ও স্বভাব এখনও আয়ত্ত করিয়া উঠিতে পারে নাই। হাসিয়া কহিল—“নিয়ম জানেন -“তা’ আবার জানিনে। জান দিতে পারি, কিন্তু নিয়ম ভাঙ্গতে পারি না, তা জানেন ?” অফিসারটা হাসিয়া ফেলিল। পঞ্চানন-বাবুকে উদ্দেশ্য করিয়া কহিল-“আমাদের পিছনেও”—বলিয়া বাকী বক্তব্যটা চোখ ও মুখের ভাবে বুঝাইয়া দিল। পুলিশের লােক হইয়াও সন্ত্রস্ত থাকিতে হয়, কোথায় কে কি-রিপাের্ট করিয়া বসে। এ গােয়েন্দার জাল এমনই ছড়াইয়া ফেলা হইয়াছে। লােকটী নাম ডাকিয়া বাহির হইয়া অন্য ঘরের দিকে গেল। জীবন হাত বাড়াইয়া পদ্দাটা টানিয়া নামাইতেছিল, দেখিল খাতা হাতে অফিসারটী আবার দরজার গােড়ায় আসিয়া দাড়াইয়াছে। ডাকিয়া কহিল-“ফণী-বাবু, আপনার একটা অর্ডার এসেছে।” বলিয়া সিপাহীর হাত হইতে ফাইলটা নিয়া একটা কাগজ বাহির করিল। কহিল-“এটা সই করে অফিসে পাঠিয়ে দেন যেন। যার যার একাউন্ট থেকে টাকা যাবে তাদের সই দিতে ভুলবেন না।” জীবন অর্ধ-উখিত অবস্থায় ছিল, পর্দা ছাড়িয়া কাগজটার জন্য হাত বাড়াইয়া কহিল-“কিসের অর্ডার দেখি। ফণী তার আগে ছোঁ-মারিয়া কাগজটা নিয়া বাহির হইয়া গেল। জীবন জিজ্ঞাসা করিল—“ফণী-বাবু, কিসের অর্ডার?” ফণী না-থামিয়াই উত্তর দিল-বােমার।”

ভেটিনিউ অফিসারটা হাসিয়া কহিল-“গ্রামােফোন-কোম্পানীর অর্ডার। একটা গ্রামােফোন আতে দেননি? সেটা এসেছে।” জীবন-ও ফণী-দত্তের অনুসরণ করিল। যন্ত্রটা যাতে এখনই আনা যায় তাই চেষ্টা করিতে বলিল। এই ফণীদত্ত। গ্রেপ্তারের পর লর্ডসিংহ-রােডে নীত হয়। সেখানে গিয়া ফণীর মনের অবস্থা তেমন ভালাে ছিল না। আর ভালাে-থাকার কথা-ও নহে। এখানকার ব্যাপার সম্বন্ধে যাহা শােনা যাইত, তা'তে উৎসাহিত হইয়া উঠা চলিত না। সময়টাও ভালাে ছিল না। ঢাকায় গিয়া Lowman-সাহেব গুলিতে নিহত হইয়াছেন; টেগার্ট-সাহেবের উপর ভালহৌসি- স্কোয়ারে বােমা ছােড়া হইয়াছিল, করুণাময় ঈশ্বরের কৃপায় তিনি ফসকাইয়া গিয়া রক্ষা পাইয়াছেন, বিপ্লবীদের একজন নিজেদের নিক্ষিপ্ত বােমায় মারা গিয়াছেন।-বাংলার আকাশে তখন কড় ছিল। এ-দিনে লর্ড সিংহ-রােডে যাইতে হইলে মন খারাপ-হইয়া-পড়া অসঙ্গত নয়। সেখানে আদর-আপ্যায়নের যে-সব ব্যবস্থা হইত বলিয়া শােনা যাইত, তাতে গায়ে-কাটা দিত—কিন্তু তা আনন্দে নয়। অন্তিমকাল আসন্ন হইয়াছে, মনে মনে এ-জন্য প্রস্তুত হইয়া যাওয়ার দরকার সবাই বােধ করিত। আমাদের শায়েস্তা করিবার কাজে যিনি সব চেয়ে প্রসিদ্ধি ও দক্ষতা অর্জন করিয়াছিলেন, তাঁর সম্মুখে ফণীকে আনিয়া দাড় করানাে হইল। এ-বিষয়ে ভদ্রলােকটীভদ্রলােক বলিতে দ্বিধা -ভেটিনিউ হয়—প্রকৃত অধিকারী-পুরুষ ছিলেন। নাম ধরুন গিয়ে–থাক, নামে আর কাজ নাই, কর্তামশায় বলিয়াই কাজ চালানো যাইবে। টেবিলের সম্মুখে কামশায় চেয়ার পাতিয়া বসিয়া ছিলেন। ফণীকে দেখিয়া চোখ তুলিনেন, ঘাড় উচু করিবার প্রয়ােজন বােধ করিলেন না। দৃষ্টির ভঙ্গী দেখিয়া বুঝিতে বাকী থাকে যে, অনেক অভ্যাসে এ-ষ্টাইল আয়ত্ত হইয়াছে, সহজ সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ও-চোখে আর কোনদিন দেখা যাইবার সম্ভাংনা নাই। ভয়ানক লােকের সম্মুখে আজ সে আসিয়াছে, আলাপ-ব্যবহারের আগেই শুধু চোখের চাউনী দেখিয়াই ফণী বুঝিতে পারিল–মানুষের পরিচয় তার চোখেই লেখা থাকে, এ অতি খাটি কথা । ফণী চেয়ার টানিয়া বসিল। ঠিক করিল, বােবার যখন শত্রু নাই, তখন সম্ভব হইলে চুপ করিয়াই থাকিবে, বিশেষ কোন কথাবার্তা কহিবে না। কি জানি, কোন্ কথায় কি ফল ফলিয়া বসিবে। কৰ্ত্তামশায় প্রশ্ন করিলেন—“নাম কি ?” যার যা’ স্বভাব, সে তেমন ভাবেই চলিবে। খােদর উপর খােদগিরি করা চলে শুনিছি, কিন্তু স্বভাবের উপর হাত চালাইবার কথা আজ পর্যন্ত শুনি নাই। বুদ্ধি করিয়া বড়জোর স্বভাব- পরিবর্তনের ইচ্ছা ও চেষ্টা করা যাইতে পারে, কিন্তু ঐ পৰ্যন্তই- যে-স্বভাব সে-স্বভাবই থাকিয়া যায়। পূৰ্ব্ব-গামীরা স্বভাবকে অঙ্গারের সঙ্গে তুলনা করিয়াছেন, যত জলেই ধােয়া যাক তার রং নাকি মােছে না। অবশ্য আগুনে দিলে কালাে অারও লাল হয়, কিন্তু মানুষের স্বভাবে লাগাইবার মত আগুন কিছু আছে কি?

ভেটিনিউ- ফণী বাবার পার্ট প্লে করিবে ঠিক করিয়াছিল, কিন্তু পারিল না। কারণ তার ঐ-স্বভাব। স্বভাবের মধ্যে যে রসিক লােকটি রহিয়াছে, সে চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে রাজী হইল না। কাজেই ফণীকে জবাব দিতে হইল-ফণী দত্ত।” কর্তামশায় শ্রী’ শুনিলেন, চোখ-মুখের ভাব বির্ত করিয়া তা অগ্রাহ্য করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন-“কি দত্ত ?” ফণী নিজেকে সংযত করিয়া লইল, কহিল-“ফণী দত্ত”। -“হ”--কৰ্তামশায় নামটা বিশ্বাস করিলেন, না সন্দেহটা ঐ ভাবে মুক্ত করিলেন বুঝা গেলনা। *--বাড়ী কোথায় ?” -“মাদারীপুর ।” —“যত শালা বাঙ্গাল এসে জুটেছে-* জিহবা শাসন মানিল না, ফণীর মুখ দিয়া বাহির হইল-“যা বলেছেন।” —“মানে?” উচ্চারণে জোর ছিল না, কিন্তু কৰ্ত্তামশায়ের চাপা-কণ্ঠের প্রশ্ন ফণীর কানে বােমার ধমকের মত শুনাইল ফণী যেন প্রস্তুত হইয়াই ছিল, কহিল--“ঠিকই বলেছেন। এই বাঙ্গাল ব্যাটারাইতে দেশের পিছনে লেগেছে। সুখে থাকতে ওদের ভূতে কিলায়।” কামশায় বােধ হয় মনে মনে খুব একচোট হাসিয়া থাকিবেন, তাই নিজের এ দুৰ্বলতায় চটিয়া গিয়াছিলেন। নহিলে পরের কথা গুলি আসে কেমন করিয়া-“দেখ, এ-হাতে অনেক লােক সােজা হয়ে গ্যাছেন, তুমি তাে কোন চুননাপুটি।” ৬৬ -ভেটিনিউ ফণী চুপ করিয়া বৃহিল। চুনাে-পুটি বলিয়া চিনিয়াছেন, এখন অখাদ্য বলিয়া যদি ত্যাগ করেন, তবে এ-যাত্ৰা সে বাঁচিয়া যায়। কিন্তু বড়র চরিত্র বড়ই জটিল, হয়তাে এই বড় ব্যক্তিটীর রুই কাতলার দিকে তত ঝোঁক নাও থাকিতে পারে, চুনােপুটিতেই হয়তাে এর রসনায় বেশী রস আসিয়া থাকে। -“চুপ করে থাকলে চলবেনা, যা জান সব খুলে বল, যদি বাঁচতে চাও।” -বেশ, জিজ্ঞেস করুন, কি জানতে চান ?” ভাবখানা এই যে, নির্দোষী কেন প্রশ্নকে ভয় করিতে যাইবে, যার মনে পাপ আছে সে-ই কাপুক। তারপর চলিল প্রশ্নের পালা। প্রথম প্রশ্ন শুনিয়া ফণী উত্তর দিল যে, সে কিছু জানে না। দ্বিতীয় প্রশ্নেরও সেই একই উত্তর দিল। তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরেও ফণী তা’র অজ্ঞতা নিবেদন করিল। এর পরেও যখন প্রশ্ন আসিতে লাগিল, তখন ফণী থামাইয়া দিয়া কহিল- “খামােক প্রশ্ন করে পরিশ্রান্ত হচ্ছেন। যে-জাতীয় প্রশ্ন করছেন, তাতে আমার উত্তর “না”, এটা আপনি এখন অনায়াসে ধরে নিতে পারেন।” -“আচ্ছা, উত্তর পাওয়া যায় কি না, দেখব। কত ‘না’ ‘ই’ হতে দেখলাম। সবাই প্রথম প্রথম ও-রকম গােয়ার্তুমি দেখায় জানিনা। শেষটা দেখেছি সবই জানে। দেখতে তো ভদ্রলোক, ভদ্রলােকের মত উত্তর কয়টী দিয়ে দাও দেখি।” ফণী শেষেরটুকু বাদ দিয়ে আগের অংশের পদ-পূরণ করিল- *ছােটকালে দেখতে আরও ভালাে ছিলাম, মা বলেছেন।

ডেটিনিউ- কামশায় কহিলেন—“রস দেখি ধরে না। ও বস-টস কিছুই থাকবেনা, কমিয়ে দিচ্ছি।” ফণী রসের ব্যানাে হইতে আরােগ্য হইবার প্রতীক্ষায় চাহিয়া রহিল। -“চেহারাটা তাে দেখছি গুণ্ডার মত, গায়ে বুঝি খুব জোর?” ফণী হতাশ হইয়া কহিল—“খুব জোর থেকে আর লাভ হােল কৈ ?” হঠাৎ কৰ্ত্তামশায় চেয়ারে খাড়া হইয়া বসিলেন, ধমক দিয়া উঠিলেন—“নে ওঠ, বৈঠক নে।” ফণী বুঝিতে না পারিয়া জিজ্ঞাসা করিল-“বৈঠক ?” -“হাঁ, ডন-বৈঠক। নে, উঠে দাড়া।” ফণী উঠিয়া দাড়াইল না, বসিয়াই প্রশ্ন করিল—“ক’টা?* -“ক'টা নিতে পারিস?” —“আপনি ক’টা বলেন?” -“আমি ? আমি তাে বলি দু’শ। পারবি?” ফণী হাসিয়া ফেলিল। -“হাসছিস যে?” -“হাসছি, দু’শ’—সে তত দশ বছরের ছেলে-ও পারে।” -দশ বছরের ছেলে-ও পারে! তুই ক’শ’ পারিস শুনি?” *আপনার শ্রীচরণের আশীৰ্বাদ হােলে একসঙ্গে দেড় হাজার।” -“দেড় হাজার ? গামাকে হার মানালি দেখছি। যে গুণ্ডাৰ মত শরীর, পারতেও বা পারিস। এই হক শুনিয়া দরজার পাশে সিপাই চমকাইয়া উঠিল, কাছে আসিয়া ৩৮ সেলাম করিয়া দাড়াইল- -“হুজুর।” —“নে, টেনে তােল লে?” সিপাই কাছে গিয়া হুজুরের হুকুম মত ফণীকে টানিয়া তুলিতে হাত ধরিয়া উঠাইবার চেষ্টা করিল। আড়াই-মণ দেহ-ভারের নােঙ্গর ফেলিয়া ফণী চেয়ারে আটকাইয়া রহিল, সিপাহীর আকর্ষণে বিন্দুমাত্র টলিল না। সিপাই কহিল--“উন।” কিন্তু আকর্ষণে যে টলে নাই, অনুরােধেও সে অবিচলিত রহিল। কামশায় কহিলেন-“আর একজনকে ডাক।” ডাক পাইয়া আর একজন আসিল, দুই সিপাহী একযােগে দুই বাহুমূলে হাত রাখিয়া ফণীকে ধরিয়া বিস্তর চেষ্টার পরে পাড় করাইল। কিন্তু তারা ছাড়িয়া দিতেই ফণী স্প্রিং-এর মত গুটাইয়া বসিয়া পড়িল। কৰ্ত্তামশায় যেন একটা খেলা পাইলেন, কহিলেন—“ছেড়ে দিচ্ছিল কেন? নে, টেনে তােল, বৈঠক নেওয়াবি।” সিপাহীরা পূর্বের মতই অধ্যবসায়ের জোরে অবশেষে দাড় করাইল, তাহাকে ধরিয়া নিজেরাও পাশে দাড়াইল। এখন বৈঠক লইবার পালা উপস্থিত হইল। কিন্তু বৈঠক লইতে আর হইল না। বেয়ারা আসিয়া সেলাম দিয়া জানাইল, সাহেব সেলাম দিয়াছেন। সাহেবের সেলাম-কৰ্ত্তামশায় উঠিয়া দাড়াইলেন। কহিলেন-“যা, সেলে নিয়ে রেখে দে। কাল দেখব, তুমি কিছু জান কি না।”

ভেটিনিউ- কৰ্ত্তামশায় চলিয়া যান দেখিয়া ফণী তাড়াতাড়ি আবেদন জানাইল—“আমার খাবার কথাটা বলে দিন। না খেয়ে আমি বৈঠক নিতে পারব না বলে রাখলাম।” কৰ্ত্তামশায় সিপাহীদের কহিলেন-“এই, বাবুর খাবারের বন্দোবস্ত করে দিস। কি খাবে? রুটি? ক’ ডজন লাগবে? দেড় হাজার বৈঠকের জন্য দেড় ডজনের কমে কি হবে ?-যা, নিয়ে যা।” সিপাইদের সঙ্গে ফণী বারান্দায় আসিল। সন্ধ্যা হইতে তখন বড় বেশী বাকী নাই। সূৰ্য্য দেখা যায় না, পশ্চিমের গাছপালা বাড়ী-ছাদ ইত্যাদির আড়ালে সে নামিয়া গিয়াছে। আকাশে সন্ধ্যার লাল-রং অস্তগামী-সূৰ্য্যের আজিকার মত কাজ ফুরাইয়াছে জানাইয়া দিতেছে। সামনে আসন্ন রাত্রি। কলিকাতার আকাশ-ও রাত্রির জন্য প্রস্তুত হইয়াছে। এ আকাশে-ও অন্ধকারের সঙ্গে দলে-দলে তারা দেখা দিবে, সারা-রাত্র মহাশূন্যে তিমির-উৎসব চলিবে, যতক্ষণ না পূর্বদিকে সূর্যের মাভৈঃ আলােক-আশ্বাস আসিবে।আজিকার এই অবসন্ন পরাজিত সূৰ্য্যই এক সময়ে আবার নূতন দিন নিয়া দেখা দিবে। ফণীর চমক ভাঙ্গিল, সিপাই বলিল-“চলুন বাবু। “চল”—বলিয়া ফণী সিপাহীদের সঙ্গে চলিল। পাশাপাশি কয়েকটা কুঠরি, সিপাই পাহারা দিতেছে—ভিতরে লােক আছে বুঝা গেল। একটা কুঠরির ভিতরের অধিবাসীকে দেখা গেল, দরজার দিকে পিছন দিয়া ও-ধারের দেয়ালের সঙ্গে লাগিয়া দাঁড়াইয়া আছে, হাত দু’টা উপরের দিকে তােলা।. বাহিরে ৭ ডেটিনিউ থাকিতে ব্যায়াম করার অভ্যাস বােধ হয় ছিল, এখানে আসিয়া সে অভ্যাস বজায় রাখিতেছে। ফণী, মনে মনে না হাসিয়া পারিল না, মানুষ এমনই অভ্যাসের দাস, নইলে পুলিশের এই বদ্ধ খাচায় ঢুকিয়াও exercise করিতে উৎসাহ থাকে কেমন করিয়া ! মনের চিন্তা হঠাৎ মােচড় খাইয়া ভিন্ন লাইনের উপর পলকের জন্য সার্চ- লাইট ফেলিয়া গেল—সত্যই exercise করিতেছে, না আর কিছু! ফণী আগাইয়া চলিল, চিন্তাটাকে ঠেলিয়া সরাইয়া দিল—যে যা’র আপন ভাগ্যের সঙ্গে বােঝা-পড়া করিয়া লউক, অপরের ব্যাপারে তার এ মাথা-ব্যথার দরকার মােটেই নাই। সামনের সেলে একটী অল্প-বয়স্ক ছেলে কম্বলে পড়িয়া ঘুমাইতেছে, দেখা গেল। ঘুমের এমনই প্রয়ােজন হইয়াছে যে, সময়-অসময়ের ধার ধারে না, সন্ধ্যাবেলাও ঘুম চলিতেছে । ঘুমাও, সব কিছু ভুলাইয়া দিতে এমন জিনিষ আর নাই। কিন্তু এই শৈশবেই মনে ওর এমন কি হইল যে, ঘুমের বিস্মৃতির প্রয়ােজন দেখা গেল। থা, অন্যের ঘুমের মধ্যে নিজের চিন্তাকে হেতু-অন্বেষণে পাঠাইবার কোন প্রয়ােজন নাই, নিজের কুঠরীতে গিয়া এখন ঢুকিয়া পড়।-ফণী সেলে ঢুকিল, দরজা বন্ধ হইয়া গেল। ব্যস, নূতন-জগতের বাসিন্দা সে এখন। এ কী মানুষের জগতেরই একটা অংশ? যে-আকাশ কিছুক্ষণ আগে বারান্দায় দাড়াইয়া সে দেখিয়া আসিয়াছিল, এই অন্ধকার আবদ্ধ-শূন্যতায় তার কোন অস্তিত্ব আছে কি? আকাশ কি আটকা পড়িয়া বহুপূর্বেই এখানে মরিয়া শুকাইয়া কঙ্কাল হয় নাই? মানুষের আকাশ হইতে অবকাশ লুণ্ঠিত হইয়াছে, আলাে চুরি গিয়াছে—তবু ঘটাকাশ ৭১ ভেটিনিউ মহাকাশেরই আত্মীয়? মিথ্যা প্রচার করিয়াছ-প্রতারকের দল। আত্মা আত্মহত্যা করিয়াছে—অমৃতস্য পুত্ৰাঃ সে নয়, হইতে পারে না। উন্মত্ত দানবের বিকারের দুঃস্বপ্ন হইতে প্রলাপের মত তােমরা আসিতেছ।-উঃ, কি অন্ধকার! বাতাস যেন অন্ধকারের চাপে জমাট হইয়া আসিতেছে। একা জাগিয়া বসিয়া আছি। পাশের খাটগুলিতে বন্দী-বন্ধু- ঘুমে অচৈতন্য, অতল অন্ধকারে তারা তলাইয়া গিয়াছে। রাত্রি মধ্য-প্রহরের সিংহদরজা পার হইয়াছে, উপরে তারার আলােগুলি মহাশূন্যে জলিতেছে। লণ্ঠন-হাতে পুকুরের ও-পাড়ে জেলের সিপাই পাহারা দিতেছে-অন্ধকারের অন্ধ অনুচর। সব আলাে যদি নিভিয়া যায়, কোথাও যদি এক-ফোটা আলো না থাকে—তবে কি সব অন্ধকার হইয়া যাইবে ? তখন কি অন্ধকারের কোন দ্রষ্টা থাকিবে না ? এতকাল জানিয়া আসিয়াছি, আলাে না-দেখাই অন্ধকার দেখা, তাই চোখ বুঝিলেই অন্ধকার আসে। কিন্তু এ-ভাবে নয়, একান্ত অন্ধকারকেই দেখিতে পারা যায় মনে হইতেছে -যেমন আলােককে দেখা যায় ঠিক তেমনি। আলাে অন্ধকার দুইই দেখার বস্তু, ব্রষ্টা বা দর্শনের সঙ্গে বােধ হয় এর কোন যােগ নাই। এই আলাে অন্ধকার উভয়কেই প্রকাশ করে, সে-আলাে তবে কোথায় থাকে? বাহিরে তাহা নাই, তা জানি। কিন্তু বাহিরের এই আলাে-অন্ধকারের হাত এড়াইয়া কেমন করিয়া যে সে-ভিতরটায় যাওয়া যায় বুঝিতেছি না। १२

-ভেটিনিউ
ধু পিপাসাই রহিয়া গেল, সে গােপনে আলােককে কি কেহ
কোনদিন প্রকাশ্যে বাহির করিয়া আনিতে পারিবে না?—চোখ
মেলিয়াই অসহায়ের মত অন্ধকারের দিকে তাকাইয়া আছি।
রাত গভীর হইতে গভীরতর হইয়াছে। দূরের রাস্তায় হর্ণ
বাজাইয়া মােটর ছুটিয়া গেল। আলিপুরের পশুশালায় বাঘ ডাকিয়া
উঠিয়াছে-খাঁচায় থাকিয়া ঘুমের মধ্যে বােধ
দেখিয়াছিল।
জেলগেটে ঢং করিয়া শব্দ হইল। রাত্রি একটা বাজিয়াছে।
৩

ডেটিনিউ
আমাদের কবি বলিয়াছেন—আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া
ঘুরে মরি পলে পলে।-জেলখানায় আসিয়া এ-জিনিষটীর প্রকোপ
বড় বেশী দেখিতেছি। বাহিরে থাকিতে বহু-রকম মানুষের সঙ্গে
কারবার করিতে হইয়াছে, ছােট-বড় নানা সমস্যার সম্মুখীন হইতে
হইয়াছে। বহু-ব্যস্ততার মাঝে নিজেকে নিয়া দু’দণ্ড বসিবার ফুরসং
মেলে নাই।
কিন্তু এখানে অবসর প্রচুর—অনেকের নিকট তা অসহ। এই
অবসর নিয়া তারা কি করিবে ঠিক পায় না—রীতিমত হাপাইয়া
উঠে। এখন অবসর মিলিযাছে, বাহিরের পৃথিবী সৃষ্টি ও সমস্ত
মনােযােগ অবরােধ করিয়া নাই—সরিয়া গিয়াছে। মন্ত-বড় একটা
অবকাশের মধ্যে আমাদিগকে আমরা ছাড়া পাইয়াছি। এবং
আপনাকে ঘিরিয়াই ঘুরিতেছি।
কিন্তু এই আমি-বস্তুটি কিতা’ সঠিক বা বেঠিক কোনটাই
আমি অন্ততঃ জানিতে পারি নাই। চেষ্টা করি নাই-তাবলিতে
পারি না, কিন্তু কিছুতেই সফল হইতে পারিতেছি না। নিজেকে
নিজে ধরিতে পারিতেছি না। ব্যাকরণের-ভাষায়, কর্তাকে
৪

-ডেটিনিউ কর্ম-হিসাবে কিছুতেই প্রয়ােগ করিতে পারিতেছি না। যে-বস্তু দিয়া ধরিব—সে হইল আমার নিজের ইন্দ্রিয়। তা'র সম্মুখে যাহা থাকে, তাহাই সে ধরিতে পারে, গ্রহণ করিতে পারে। কিন্তু ইন্দ্রিয়ের যিনি কর্তা তিনি সর্বদাই ইন্দ্রিয়ের পিছনে থাকেন, ইন্দ্রিয়ের মুখ কখনও তার দিকে ফিরানাে যায় না। ইন্দ্রিয় ঘুরিয়া হয়রাণ হয়—কৰ্ত্তা কিন্তু সৰ্ব্বদাই কেন্দ্রে থাকেন। কোন কিছু জানা মানে তাকে ইন্দ্রিয়ের বিষয়বস্তু করা। ঐ করার জন্য যে-কৰ্ত্তাটির প্রয়ােজন, সে জানার আদিতে থাকে, অন্তে মানে সম্মুখে থাকে না। সুতরাং আমি-বস্তুটাকে ‘আমির’ পক্ষে জানা-ক্রিয়ার কর্মরূপে-পাওয়া কখনও সম্ভব হয় না। ইন্দ্রিয়ের অতীত অতীন্দ্রিয়-করণ যদি কিছু থাকে যাতে ‘আমি’ নিজেই আমার কর্ম হয় তবে সে আলাদা কথা। শুনিয়াছি, সে-জন্য অধিকার থাকা দরকার করে। শুধু তা’তেই হয় না-নিরন্তর সযত্ন-সাধনার বা অভ্যাসের-ও একান্ত প্রয়ােজন হয়। আমরা সাধারণ লোেক- অধিকার বা সাধনা কোনটাই আমাদের আয়ত্তে নাই। তবু আমরা আমাকে’ ঘেরিয়া ঘুরিয়া মরিতেছি। এতকাল সংসারের সংঘর্ষের মাঝখানে ছিলাম, শক্তি-সঞ্চয়ের জন্য পৃথকভাবে চেষ্টা করি নাই। লড়াই করিতে করিতে আঘাত পাইয়াছি ও দিয়াছি; এইভাবেই কাহারও শক্তি বাড়িয়াছে, কাহারও বা শক্তি হ্রাস হইয়াছে—এ ব্যতীত শক্তি-সঞ্চয়ের কোন পন্থা আমরা অনুসরণ করি নাই বা করিতে পারি নাই। এখন নিজের সম্বন্ধে একটা হিসাব-নিকাশ করিতে অনেকেই ব্যস্ত আছেন। ইচ্ছা করিয়াই যে আমরা এ-কাজ করিতেছি—তা নয়। ৭৫ ভেটিলিউ এই দীর্ঘ অবসরের চাপে চাপে নিজে নিজের একান্ত-মুখখামুখী দাড়াইয়া পড়িয়াছি। তাই আপনাকে ভালাে করিয়া দেখিয়া লইতে হইতেছে—অন্য কোন দর্শন-যােগ্য বস্তুর অভাব হইয়াছে বলিয়াই। নিজের পরিচয় নিজের জানা দরকার-এ-কথা এই অবকাশ আমাদিগকে বিষম-ভাবে জানাইয়া দিতেছে। নিজের পরিচয় লইতে গিয়া অনেকেরই অস্তিত্বের ভিত্তিমূলে নাড়া লাগিয়াছে। আমি নিজে সেই-অনেকের একজন। আমার চেহারাটী ইচ্ছা করিলে আয়নার সামনে দাড়াইলেই দেখিয়া লইতে পারি। কিন্তু ভিতরের চেহারা দেখিব সে-রকম কোন আয়না হাতের কাছে পাওয়া যায় না। যখনই নিজের সম্বন্ধে সজাগ হই, তখনই দেখিতে পাই যে, নিজের ইচ্ছা-কামনা ইত্যাদিতে নিজেকে প্রতিফলিত করিতেছি এবং নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্খা-বাসনা ইত্যাদিও কখন এক-ভাবে থাকে না, নিত্য এরা পরিবর্তিত হইতেছে। এই সর্বদা-পরিবর্তন-স্বভাব ইচ্ছাগুলির উপর আমার নিজের যে- প্রতিচ্ছবি পড়ে—তাহাও এক নহে, আমার সে ভিতরের রূপও কেবলই বদলাইয়া চলিয়াছে। ফলে, মনে একটা বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা জন্ম নিয়া দৃঢ় হইতে থাকে যে, আমার হয়তাে কোন স্থায়ী-রূপ নাই, হয়তাে আমি এক-বােঝ বাসনা কামনার সমষ্টিমাত্র। জমানাে-বরফ যেমন গলিয়া জলধারা হইয়া নামে, আমিও বােধ হয় ইচ্ছা-বাসনা সমূহে রূপান্তরিত হইয়া চলিয়াছি। মােটকথা, আমার চারিপাশে এমনই একটি পরিমণ্ডল রহিয়াছে, যে-পরিমণ্ডল কামনা-আকাথার নানা আলাে বাতাসে তৈরী, যাহা অতিক্রম করিয়া বাহির হইয়া যাওয়াও যায় না, কিম্বা যাহা ঠেলিয়া পথ করিয়া কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়াও যায় না। যতবার যে-ভাবে যে-দিক দিয়াই চেষ্টা করিয়াছি, এই একই অভিজ্ঞতা কেবল লাভ করিয়াছি যে, আপনাকে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে। নিজেকে জানার চেষ্টা যখন বারম্বার একই অভিজ্ঞতায় আসিয়া থামে, তখন সে-দিকের ব্যর্থ চেষ্টা হইতে বুদ্ধি নিবৃত্ত হয়, অন্তত হওয়া স্বাভাবিক ও উচিত। তখন দেখিতে পাই যে, বুদ্ধি যেন স্থির হইতে চায়, তা’র চঞ্চলতা কমিয়া আসিতে থাকে। আমার মনে হয় যে, তখন বুদ্ধির মধ্যে একটা উদ্বৃত্ত-জমি পাওয়া যায়- যেখানে স্থির হইয়া দাড়ানাে চলে। ফলে, শক্তি-বৃদ্ধি হয় এবং তখন জীবন-সম্বন্ধে ব্যবহার দ্বিধা ও কুণ্ঠাশূন্য হইয়া আসে। এতে এই লাভ হয়, আনন্দ না-মিলুক শান্তি অন্ততঃ পাওয়া যায়—যেখানে সুখ-দুঃখ আন্দোলন ও বিক্ষোভ না-তুলিয়াই তার দেয় যা তা’ দিয়া যায়। এর কারণ আছে। যখন নিশ্চিন্ত জানা যায় যে, আমিকে- ধরা সম্ভব নয়, মানে আমি আমার-বাহিরে যাইতে কখনই পারি না, পরিধি-পার হইতেও পারি না বা কেন্দ্রে-লগ্ন হইতেও পারি না। তখন এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দৃঢ়-বিশ্বাস হইয়া সমস্ত অস্তিত্বে সংক্রামিত হয়। নৃতন-তাজা রক্ত-বৃদ্ধি যেমন সবলতর স্বাস্থ আনে, এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাও তেমনি নৃতন-ব্যক্তিত্ব গড়িয়া তােলে । এ গেল নিজেকে জানার বিষয়ে যে-দিকটা অজ্ঞেয় বা অসম্ভব। আর বাকী থাকে পরিচিত দিকটা--যেখানে সংখ্যাহীন আশা- আকার সমষ্টি আমি। বুদ্ধির স্থিরতা-লাভের পরে এইগুলিকে অনিয়মিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করিতে তত বেগ আর পাটতে হয় ।

ডেভিনিউ নিজের জোরালাে কামনাগুলিকে প্রধান্য দিয়া disciplind ও organised করিয়া লইবার তাগিদ আসে তখনই। যে তাড়াতাড়ি তা সারিয়া নিতে পারে—জীবনের ক্ষেত্রে ভাগ্যকে জয় করিয়া লওয়া তা’রই পক্ষে সম্ভব হয়। যদি মানসিক গঠন অনুকূল হয়, বহুর জন্য সফলভাবে আত্ম-নিয়ােগ সেই ব্যক্তি-ই করিতে পারে। নতুবা নিজের ব্যক্তিগত জীবনকেই সুখী বা বড়-করিবার চেষ্টায় সে ব্যস্ত থাকে এবং সফল হয়ও। এ-সব ব্যক্তি চরিত্রবান বা মদ ইত্যাদি প্রশ্ন অবান্তর হইয়া পড়ে। এতকাল নিজের সঙ্গে নিজ জীবন-যাপন করিলাম, অথচ সেই নিজেকে জানিতে পারি না—এ আমার কাছে বড় আশ্চর্য্য মনে হয়। জন্ম হইতে এই এতদিন পর্যন্ত নিজেকে নিয়া কাটাইয়াছি, একটা ক্ষণ-ও নিজে নিজের সঙ্গ-ছাড়া থাকি নাই-এ সত্ত্বেও আমারই কাছে আমি অজ্ঞেয় থাকিয়া যাইতেছি—একটু যখন মনােযােগ দিয়া ভাবিতে বসি, সত্যই এ আমার নিকট রহস্যময় লাগে। কেমন- তর একটা অভূতপূৰ্ব্ব-রসে মন আবিষ্ট হইয়া আসে। আবার অনেক সময়ে একটা অন্ধ-আক্রোশেও উত্তেজিত ও অস্থির হইয়াছি। এই অস্তিত্বের-পর্দা ছিড়িয়া ফেলিয়া অন্তরালে কোন রহস্য রহিয়াছে, একবার দেখিয়া লইতে চাহিয়াছি। কিন্তু আমি আমার নিকট ভয়ানক-ভাবে বন্দী হইয়া রহিয়াছি, কোনদিক দিয়াই মুক্তির সামান্যতম ছিদ্র-পথ পৰ্যন্ত আবিষ্কার করিতে পারি নাই। নিজেকে নিজে নিজে ছাড়াইয়া উঠিব, নিজের-অতীত একটা আশ্রয় পাইব যেখান হইতে নিজেকে ভালাে করিয়া দেখিয়া লইতে পারিব—এ আমার নিকট আজ ৭৮ -ভেটিনিউ পৰ্য্যন্ত অসম্ভব চেষ্টা হইয়াই রহিয়াছে। অসম্ভব, তবু মন নিবৃত্ত হইতে পারিতেছে না। একটা কিনারা সে করিবেই, হার মানিবে না—মনের এই দৃঢ়তা আমাকে মুগ্ধ করিয়াছে। যতই দিন যাইতেছে এই দৃঢ়তা দৃঢ়তর হইয়া আসিতেছে। নিজের সত্য- পরিচয় কি—এ না জানিয়া মন তৃপ্তি বা শান্তি কোনটাই মানিবে না। আমি জ্ঞানতঃ কোন চেষ্টা না-করিলেও মনের এই চেষ্টা চলিতে থাকে—এও আমি লক্ষ্য করিয়াছি। নিজেকে জানা হয়তাে এ- অসম্ভব সম্ভব হইতেও পারে একদিন। নিজের কথা ভাবিতে বসিয়াছি। প্রায় একটা বাজে। Corridor-এ ইলেকটিক-আলাে জ্বলিতেছে-পর্ধা ঠেলিয়া তা ঘরে আসিতে পারিতেছেনা। সিলিং-এ খানিকটা জায়গায় সাদা-আলাে আসিয়া পড়িয়াছে। হারিকেন-লণ্ঠন জালিয়া নিয়া লিখিতেছি। রাত্রির ও ঘুমের গভীর-স্তব্ধতা ও প্রশান্তি জেলখানায় ব্যাপ্ত হইয়া আছে। নিজেকে নিজের চিন্তার বিষয়বস্তু করার এই তত উপযুক্ত নিজের কথা কত যে ভাবিয়াছি—তার সীমা নাই। নিজেকে নিয়া কি করিব, কি করিতে পারিলে মন তৃপ্ত হয়—বুঝিতে চাহিয়াছি। কি হইতে পারিলে নিজের চরম প্রকাশটা লাভ করা যায় এবং তেমনটী কোন-পথ ধরিয়া চলিলে হইয়া উঠা যায়- ভাবিয়া প্রান্ত হইয়াছি। এই ভাবেই দিনের পর দিন পার করিয়া জীবনের এতগুলি বৎসর অতিক্রম করিলাম। আয়ুর পূজিততা --- ৭ ভেটিনিউ- ইতিমধ্যে অর্ধেকটা ক্ষয় করিয়া আনিয়াছি। যাহা কাম্য ছিল, তাহা কি ছিল,-বুঝিতে কি পারিয়াছি বা পাইয়াছি? যাহা হইয়া উঠার লােভ ছিল—তাহা কি জানিতে পারিয়াছি বা হইয়া উঠিয়াছি ? কি-করিয়াছি এবং কি-হইয়াছি-এ-প্রশ্নের জবাব জীবনের মাঝামাঝি আসিয়াও দিতে পারিতেছি না। নিজের আদি নিজে দেখি নাই, তা’ সম্ভবনয় বলিয়াই—কারণ নিজের জন্মের-দ্রষ্টা নিজে হওয়া তাে কখনও সম্ভব হয় না। নিজের শেষ-ও নিজে দেখিতে পারিব না—কারণ নিজের মৃত্যুর-দ্রষ্টা নিজে হইব, সেও-ততা অসম্ভব। আমার আদি থাকিলে আমি তা’ জানিতাম, আমার অন্ত থাকিলে তাও আমার অজানা থাকিবে না- কারণ, যাহা আমার অভিজ্ঞতার বিষয় হয় না, আমার বিষয়ে তাহা কখনও ঘটে না। চিন্তা করিয়া বুঝিতে পারি—আমার আদি বা অন্ত কোনটাই নাই। কিন্তু এ যদি অভিজ্ঞতার বিষয় হইত, শুধু চিন্তার ও যুক্তির সীমায় আবদ্ধ না থাকিত, তবে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন হইতে মুক্ত হইতাম। সীমাবদ্ধ খণ্ডিত-জীবনে আমার অসীমত্বের আস্বাদন পাইতাম। তখন বুঝিতাম—একদিকে আমি পরির্তনশীল ও অস্তবিশিষ্ট, অন্যদিকে আমি শাশ্বত ও আদি-অন্তহীন। এই সীমায় ও অসীমে তখন ইচ্ছামত দোল খাইতে পারিতাম। কোন দুঃখ, কোন নালিশ, কোন জ্বালাই আর থাকিত না।—কি হইতে পারে, তা থাক। কি হইয়াছে ও হইতেছে—তাহাই আর একবার ভাবিতে বসি। কথাটা পুরাণাে কিন্তু সত্য। শৈশবে মানুষের জীবনে এমন -ভেটিনিউ কতকগুলি ছাপ পড়ে যা’ সমস্ত ভাবী-জীবনের গতি নির্দিষ্ট করে। যে-সমাজে আমরা বাস করি তার প্রভাব শিশু-মনে এমন দৃঢ় থাকে যে, তাহা ছাড়াইয়া-উঠা সম্ভব হয় না। জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে এই প্রভাবগুলি সমস্ত কাজ-কর্মে ও চিন্তায় নেতৃত্ব গ্রহণ করে। সমাজের চেয়ে যে-পরিবারে আমরা জন্মলাভ করি, লালিত ও পরিপুষ্ট হই, তারই প্রভাব বহুগুণে বেশী প্রবল ও স্থায়ী। পরিবারের প্রভাব যে কত বড় হইতে পারে তার উদাহরণ আমার জীবনেই রহিয়াছে। আমাদের পরিবারটা স্বদেশী পরিবার। সে ‘স্বদেশী’ উগ্রপন্থী। স্কুলে নীচের ক্লাশে পড়ি, তখন এক দাদা ধরা পড়েন। গ্রামসম্পর্কে এক দাদা, আমাদের বাসাতেই থাকিয়া পড়াশুনা করিতেন—তিনিও গ্রেপ্তার হন। গুখপুলিশ-দাবােগা-সাহেব ইত্যাদিতে বাড়ী বেষ্টন করিয়া রাজসিক সমারােহ ও দাপট দেখাইয়া গেল। সেদিনের বালকের মনে যে-ছবি আঁকা হইল আজও তা’ মুছিল না। শুনিলাম, বােমা-পিস্তল খুজিতে এরা আসিয়াছে। দাদারা নাকি সাহেব খুন করিবে, এ দেশ হইতে তাড়াইয়া দিবে—তাই বােমা-পিস্তল যােগাড় করিয়া মজুত করিয়াছেন। এমন কি, দাদারা নাকি টাকার জন্য ডাকাতি করিয়া থাকেন। একদিনেই দাদাদের চেহারা বদলাইয়া গেল। আমার দাদা-সে একদিনে অসামান্য হইয়া দেখা দিল, এমন কি অপরিচিত-প্ৰায়ের মত তাদের দেখিতে লাগিলাম। মানুষের এর চেয়ে বড় চেহারা সেদিন আমার কল্পনায় আর ছিল না। তারপর বালেশ্বৰ-লড়াইয়ে যতীন-মুখার্জী মারা গেলেন, দুই দাদারই ফাঁসি হইল। জীবনে এই একটা ঘটনা সে-দিন ঘটিল-মা’র ফলে আমার জীবন আগা-গােড়া বদল হইয়া গেল। আমার আজিকার জীবন সেই ঘটনারই পরিণতি। সেই মৃত্যুকে আমি বহন করিয়া চলিয়াছি এই দীর্ঘদিন যাবত। বহন করিতেছি বলা ঠিক হইবে না—সেই মৃত্যু আমাকে ঠেলিয়া নিয়া চলিয়াছে এবং আজিকার দিন পর্যন্ত আনিয়াছে। বাকী দিন কয়টাও ঐ একই ইঙ্গিতে চলিতে হইবে, এ-বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নাই। শৈশবের প্রভাব জীবনের মূলে থাকিয়া কিভাবে গােটা জীবনকে চালিত করে, তাহা একটু লক্ষ্য করিলে আমার মত সবাই বুঝিতে পারিবেন। নানাভাবে নানা-দিকে ছুটিয়াছি, কিন্তু শেষটা সেই একই পথে আসিতে হইয়াছে। মনের রক্তে যাহা মিশিয়াছে, তাহা হইতে মুক্তি পাওয়া বৃথা চেষ্টা ও পণ্ডশ্রম হইয়াছে বহুবার দেখিয়াছি। ব্যক্তিগত লােভে কামনায় যে-পথেই পা বাড়াইয়াছি, সব পথ-ই ঐ এক পথে আসিয়া মিশিতে দেখিয়াছি। শৈশবে অস্তিত্বের গােড়া-ঘরে যে-মূলধন সে-দিন সে-মৃত্যু সঞ্চিত করিয়া দিয়াছে, যক্ষের মত আমি তা পাহাড়া দিতেছি, জীবনে সেই একমাত্র মূল-ধন সম্বলেই কারবার চলিয়াছে। অন্য সব দান গ্রাহ্য হইতে পারিতেছে না। নিজের কথা বলা কচি-সম্মত নয়-জানি। এও জানি, নিজেকে যে লােপ করিতে পারে, সে নিজের বৃহত্তম ব্যক্তিত্বে প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু নিজেকে সত্য-সত্যই লােপ করা সহজ নয়, যারা একটু চেষ্টা করিয়াছেন তারাই তা টের পাইয়া থাকিবেন। ৮২ -ডেটিনিউ এ জানিয়া নিজের কথা লিখিতেছি, এর একমাত্র কারণ আমি আর দশজনের মতই রক্ত-মাংসের মানুষ। মানুষের যে-সব পতন- ক্রটি হইয়া থাকে, তা আমারও অল্পবিস্তর হইয়াছে। সাধারণের মতই কোন কোন বিষয়ে বা কোন কোন সময়ে আমি ভয়ানক দুর্বল ও অক্ষম প্রতিপন্ন হইয়াছি। আবার তাদের মতই কোন বিষয়ে বা কোন সময়ে হয়তাে চরিত্রে তেজের ও শক্তির পরিচয় দিয়াছি। আমার সম্বন্ধে আমার সন্দেহ নাই, বিশেষ মােহ নাই- আমি জানি, আমি যে-স্তরের মানুষ সেখানে দুর্বলতা, অক্ষমতা এমন কি হীনতা পৰ্য্যন্ত নিত্যকার বাপার । একাকী থাকিতে হয়, সঙ্গী সাথীর অভাবে নয়, মনের স্বভাবের জন্য। সময় কাটাইবার জন্য এক বকম খেয়াল-বশেই কলম লইয়াছি, স্মৃতির পাতায় তা’দিয়া দাগ বুলাইয়া চলিয়াছি। পড়া-শুনা ইত্যাদির অবসরে রাত্র যখন একটু বেশী হয়, পাশের অন্যান্য ঘরে বাতি নিভাইয়া সবাই যখন ঘুমাইয়া পড়ে, তখন কলম নিয়া স্মৃতির পথ ধরিয়া চলি। চলিতে চলিতে সে-পণ যদি এক সময় আমার ব্যাক্তিগত জীবনের দরজায় আসিয়া থামে-তবে পাশ কাটাইবার কোন কথা আমার মনে আসে না। যে-আমি একদিন ছিলাম, আজ আর নাই- সেই আমির দুয়ারে আজিকার আমি আসিয়া থামি। মৃত-আমিকে দেখিবার জন্য যদি দু'দণ্ড তার পাশে দাড়াইয়া যাই, তবে তাতে সত্যিই দোষের কিছু থাকে কি যাতে রুচিতে আঘাত লাগিতে পারে? আমার তো মনে হয় না। সাত বছর আগে একদিন বেলা এগারােটার সময় গ্রেপ্তার হইয়া জেলে আসি। ভাই-বােরা সকলে এবং সহরের অনেকে জেলগেট ভেনিউ পৰ্যন্ত সঙ্গে আসে। জেল-গেট বন্ধ হইলে তাহারা চলিয়া যায়। একটা ঘরে গিয়া নিজের জায়গা লই। জেল আমার কাছে নূতন নয়। নূতন হইলেও যে মন বিশেষ চঞ্চল হইত, এ আমার মনে হয় না। চুকিবার মুখে ভাই-বােনদের হাসিমুখেই বলিয়া দিয়াছি যে—যা, ভাবিসনে, ছ'মাসের মধ্যেই ফিরে আসছি।তখন ঐ রকম বিশ্বাসই ছিল। মাদারীপুরের এ ঘােট জেলে ঢুকিয়া মনে বিশেষ একটা ভাব বেশ কতক্ষণ স্থায়ী ছিল, সাত বছর পরেও তা আজ মনে করিতে পারিতেছি। দাদারা ষড়যন্ত্র-মামলায় ধরা পড়িয়া এই জেলে কয়েকদিন ছিলেন --১৯১৩ কি ১৪ সাল হইবে। স্কুলে যাইবার আগে বােজ বাসা হইতে তাঁদের খাবার এখানে পৌছাইয়া দিয়া যাইতাম। গাদের পাশে তখন তাহারা আসিয়া দাড়াইতেন। এই ছবি মনে আসিতেছিল, আর এই কথাই মন ভাবিতেছিল- সেই দিনের সে-বালক আজ বড় হইয়া নিজে জেলে আসিয়াছে, এবার তার জন্যই হয়তাে সন্ধ্যার সময় ছােটভাইরা খাবার নিয়া আসিবে। এবং সে-দিনে গরাদের পাশে যারা দাড়াইয়া থাকিতেন, তাহারা আজ এ-পৃথিবীতে নাই, জানে কোথাকার অদৃশ্য-জানালায় দাড়াইয়া তাঁরা নীচের পৃথিবীর জীবন-যাত্রা লক্ষ্য করিতেছেন। মনে একটু ভয়ের সঙ্গে কথাটা খেলিয়া গেল, তবে কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হইবে? আজ যে-ভাইরা খাবার নিয়া আসিবে, তারাও একদিন শেষে এই ভিতরে আসিবে এবং আমি পৃথিবী হইতে সড়িয়া পড়িয়া সেই অদৃশ্য-বাতায়নের ধারে গিয়া দাড়াইব? '৮৪ ঘৰে তখনও আলাে দিয়া যায় নাই। কিছুক্ষণ এই ভাবনাগুলিই মনকে দখল করিয়া ছিল—আজও তা স্মরণ করিতে পারিতেছি। মাদারীপুরের জেলে দু-রাত্রি যাপন করিয়াছিলাম, এ-কথাটা ভুলি নাই। আর মাদারীপুর ত্যাগ করিয়া আসার ছবিটিও মনে রাখিতে পারিয়াছি। আমি কবি নয়, কবিতা লিখিও নাই, কিন্তু সৌন্দৰ্য্য সঙ্গন্ধে আমার দৃষ্টি ও রুচি আছে। বিশেষ করিয়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে আমার মন আকৃষ্ট হয়, কারণ তাতে আমার মনের তলদেশ পর্যন্ত আলােড়ন পৌছায়। মানুষের মুখ, যত সুন্দরই হউক, আমাকে আকৃষ্ট করে না। যে-মুখ বা যে-অবস্থা বিশেষ ছবি ও রূপের প্রতীক হয়, বিশেষ ভাব বহন করে-তাহাতে অবশ্য মন আকৃষ্ট হয়। কিন্তু বাহির পৃথিবী যে-অনায়াসে আমার মন টানিয়া লয়, যে-অবস্থার মধ্যেই থাকি না কেন সরাসরি হৃদয়ের অন্দরমহলে যে-ভাবে চুকিয়া পড়ে, তাতে অনেক সময়ই আমি ভাবিত হইয়া পড়িয়াছি যে, এ ভালাে লক্ষণ নয়, গুরুতর কর্তব্য-পালনের সময় তাে এরা বি উপস্থিত করিতে পারে। মনকে তৈরী করা কর্তব্য, বাহিরে সৌন্দর্য্যের ফাদ পাতা হইলেই যে ধরা-পড়ার বদ অভ্যাস-এ মনের ব্যাধি-বিশেষ, এর চিকিৎসা প্রয়ােজন। কিন্তু আজও সে-রােগ সারে নাই, উত্তরােত্তর বৃদ্ধিই পাইয়াছে। সুযােগ ও অবসর যদি পাই তবে এ-বিষয়ে বিশদভাবেই বলিব, কারণ এ-দিক দিয়াই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সমুদ্রমন্থন মনে ঘটিয়া গিয়াছে। আজ সে- কথা থাক। সেদিনের প্রাকৃতিক আবেষ্টনটার জন্যই মাদারীপুর ত্যাগ করিবার ছবিটা আমার মনে রহিয়াছে।

ভেটিনিউ- রাত্র সাড়ে-ন’টার মত হইবে, খাওয়া-দাওয়া সারিয়া বিছানায় ওইয়া ছিলাম। এমন সময় সিপাহী আসিয়া ডাকিল। জিজ্ঞাসা করিলাম-“কি?” -“আপনাকে দারােগা-বাবু সেলাম দিয়েছেন।” -“কোন দাবােগাবাবু?” —“থানার বড় দারােগা-বাবু।” থানার বড় দারােগা-বাবু এই রাত্রিবেলা সেলাম দিতে আসিলেন কেন, জানিবার কৌতূহল হইল, কিন্তু উত্তর করিলাম—“বলগে যে, রাত্রে এখন উঠতে পারব না; ভােরে আসেন যেন।” অনুরােধ বহন করিয়া সিপাহী চলিয়া গেল। হাত বাড়াইয়া লণ্ঠনটা কমাইয়া দিতেছিলাম, চোখের উপর আলাে তীক্ষ্ণ লাগিতেছিল, এমন সময় সিপাহী বার্তা-বই হইয়া পুনরায় আসিয়া দরজায় দাড়াইল। আলােটা আর কমানাে হইল না। কহিলাম-“কি আবার এলে যে?” —“দাবােগাবাবু পাঠিয়ে দিলেন, খুব জরুরী দরকার, একবার গেটে যেতে হবে।” —“খুব জরুরী দরকার?” —“তাইতাে বল্লেন।” -“চল, যাই।” বলিয়া বালিশের তলা হইতে গেঞ্জিটা নিয়া গায়ে দিলাম। সিপাহী তালা খুলিয়া বাহির হইবার সুযােগ দিল। বাহিরে আসিতেই নজরে পড়িল যে, আকাশ ও পৃথিবী জ্যোছনায় ছাইয়া গিয়াছে। বদ্ধ ঘরের মধ্যে থাকিতে রাত্রির এ- আয়ােজনের খবর মােটেই পাই নাই। লণ্ঠনের আলাে বন্ধ

ঘরের অন্ধকারকে কোনমতে মড়ার মুখের মত ফ্যাকাশে করিতে
পারিয়াছিল। আর এদিকে যে আকাশের এক প্রান্ত হইতে অপর
প্রান্ত পৰ্য্যন্ত জ্যোছনার দখলে আলিয়া গিয়াছে—অন্ধকারের জীবের
মত নিজের গহ্বরে থাকিয়া তার খোঁজ রাখি নাই। অবশ্য রাখার
উপায়ও ছিল না ।
দিনের আকাশই যে রাত্রে এমন হইয়াছে, এ আমার বিশ্বাস
করিতে ইচ্ছা হইতেছিল না। এ-আকাশের জাতই আলাদা, রূপ তাে
আলাদা বটেই। দিনে মাথার উপর যে-আকাশ ছিল, এখন সে-
আকাশ নাই, অন্য আকাশ-আচ্ছাদন আমাদের উপর আসিয়াছে।
পক্ষী-মাতা যেমন নিবিড় স্নেহে ছানাকে পাখার আড়ালে ঢাকিয়া
লয়, আমাদের এই ভূমণ্ডলকেও কোন বিরাট-বিহঙ্গী আকাশ-পাখায়
আড়াল করিয়াছে—তাই গভীর প্রশান্তিতে সমস্তই স্তব্ধ ও নিশ্চিন্ত
হইয়া আছে।
গেটে আসিলাম। লােহার বড় দরজার ওপাশে বড় দারােগা-
বাবু দাড়াইয়া।
কহিলাম-“রাত্রে যে?”
-“দরকার পড়লে রাত্র আর দিন...”
—“দরকারটা কি শুনতে পারি?”
–“Transfer-order আছে। এই মেলে আপনাকে ফরিদপুর
যেতে হবে।”
শুনিয়া মন নাচিয়া উঠিল, ফরিদপুর জেলে বন্ধুরা সব জমায়েৎ
হইয়াছে, কাজেই-কিন্তু মনের নাচন থামাইয়া রাখিলাম।
-“ফরিদপুরে যেতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আমার তো

একটা সুবিধা অসুবিধা আছে। রাত সাড়ে-ন’টায় এসে বলবেন, চলুন এখনই যেতে হবে-এ কেমন করে হয় ?” -“কি করব বলুন, আমিও অর্ডার পেয়েছি আটটার পরে। আপনি তো এস-ডি-ওকে বলেছিলেন- -“তা বলেছিলাম। কিন্তু বেকার-সাহেব তাে বলেন নাই যে, আজই আমার যেতে হবে। বরং আমি পীড়াপীড়ি করায় শেষটা রাজী হলেন যে, দু'এক দিনের মধ্যে যাতে আমাকে পাঠাতে পারেন চেষ্টা করবেন।” দারােগা-বাবু বলিলেন—“আপনার তাে মাল-পত্তর বিশেষ কিছু নাই, ঝাড়া হাত-পা, যেতে হাঙ্গামা কি?” —“তা’ আপনি বুঝবেন না আমি আজ যেতে পারব না।” দাবােগা সত্যই ভদ্রমানুষ, ব্যবহারে তত তাহাই মনে হইল। এমন ভাবে অনুনয় করিয়া ধরিলেন যে, শেষটা রাজী হইয়া পড়িলাম। কিন্তু আজ যাইতেছি, বাসার ও এখানকার সকলকে তা জানানাে কথাটা জিজ্ঞাসা করিতেই দারােগা হাসিয়া ফেলিলেন-“ভাববেন , যারা খবর পাবার তারা পেয়েছেন। ষ্টেশনে গিয়েই দেখতে পাবেন।” আমার কিন্তু বিশ্বাস করিতে ইচ্ছা হইল না। পুলিশের লােক সত্য কথা বলে, নিতান্ত দায়ে না পড়িলে—এ-অভিজ্ঞতা আমার নাই। সত্যবাদী বলিয়া পুলিশের বদনাম আছে, পুলিশের ললাকেও স্বীকার পাইবে না। মিনিট পােনের মধ্যেই জেল হইতে বাহির হইয়া পড়িলাম।

—ডেলিষ্ট সঙ্গে দাবােগা ছাড়া সিপাহী কেহ নাই দেখিয়া একটু ভাবিলাম যে, ব্যাপারটা কি। যাহাকে খুজিবার জন্য ইউরােপীয়ান-অফিসার পৰ্যন্ত সাত আটবার বাসায় সদলবলে হানা দিয়াছে, ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার ভয়ঙ্করত্ব ও মর্যাদা এমন অনায়াসে এত কমিয়া গেল কিন্তু ষ্টেশনের রাস্তায় না গিয়া দারােগাবাবু যখন “ওদিকে নয়, এ রাস্তায় আসুন” বলিয়া সােজা নদীর ঘাটের দিকে মােড় ঘুরিলেন, আমি মােড়ের মাথায় দাড়াইয়া পড়িলাম। কহিলাম—ষ্টেশনে যাবেন তাে?” -“, ষ্টেশনেই তো যাচ্ছি। -“তবে নদীর ঘাটের দিকে কেন? সােজা রাস্তা দিয়েই চলুন।” পারে, আই-বি -“রাস্তা দিয়ে নিয়ে মেতে নিষেধ আছে।” -“কেন?” —পুলিশ-পাহারায় সদর রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন, তায় এখানকার লােক, একটা demonstration হতে চায় না। হাসিয়া ফেলিলাম, বলিলাম-“ভুল করেছেন, এত রাত্রে demonstration করার মত লােক রাস্তায় পাবেন না, খামাকা ভাবছেন। চলুন হেটেই যাই।” ---“খামাকা পরিশ্রম করবেন কেন? বড় পানসী-নৌকা আছে, এ-জ্যোছনায় যেতে আরামও পাবেন, ভালাে লাগবে। আর আপনি তত শুনেছি কবি মানুষ।”

ভেটিনিউ- রাজী হইয়া গেলাম। কবি-মানুষ বলিয়া চিনিয়াছেন, অতএব কবির মর্যাদা রাখিতে হইবে, সে জন্যও নয়। কিৰা প্ৰচ্ছন্ন-প্রশংসায় তুষ্ট হইয়াছি তাহাও নয়। এই রাত্রে নদীতে নৌকায় চড়িয়া যাইতে পারিব-মন লােভী হইয়া উঠিল। লােভকে পাপ বলা হয়, আর পাপে মৃত্যু তাে অবধারিত। আমারও মৃত্যু হইল—মানে বড় দারােগা-বাবুর কাছে হার মানিলাম, আমার ইচ্ছামত রাস্তায় যাওয়ার কথাটা টিকাইয়া রাখিতে পারিলাম না । নদীর ঘাটে আসিয়া দেখি পুলিশের বড় নৌকা, বন্দুক হাতে কয়েকজন সিপাহী দাড়াইয়া আমাদের প্রতীক্ষা করিতেছে। সিড়ি ফেলানােই ছিল, উঠিয়া ছাদে গিয়া বসিলাম। দারােগা-সাহেবও পাশে আসিয়া বসিলেন। নৌকা ছাড়িয়া দিয়া মাঝিরা পঁড় লইল। সবেমাত্র চৈত্র-মাস শেষ হইয়াছে। বাতাসে গ্রীষ্মের তাপ যা ছিল নদীর স্পর্শে তা' মুছিয়া গিয়াছে। আড়িয়ালখার এ-পার ও পার জ্যোছনায় ভরিয়া গিয়াছে। কি সুন্দরই যে লাগিতে লাগিল। ভুলিয়া গেলাম যে, আমি বন্দী,আমাকে ঘিরিয়া সশস্ত্র পুলিশ-পাহারা। আমাকে বন্দী করে কে? আমার মুক্তি যে আকাশ-পৃথিবী যুড়িয়া আছে। ঐ আকাশ, ঐ সাদা পাতলা মেঘগুলি, এই নদী, তার ঐ তীরের ঘুমন্ত গ্রাম ও বন, দাঁড়ের আঘাতে ভাঙ্গিয়া-পড়া হাজার- টুকরা-টাদ-নাচান ঘােট ঘােট ঢেউগুলি—এরা সমন্তে মিলিয়া সহস্র হাত দিয়া যে আমাকে আমার নিকট হইতে জোর করিয়া ছিনাইয়া লইয়া গিয়াছে, অসীমের মধ্যে আমাকে ছাড়িয়া দিয়া কৌতুক দেখিতেছে-এ-পবর এই এত কাছে বসিয়াও তাে পুলিশের কর্মচারী

-তেভিনিউ
জানিতে পারিল না। সে নিশ্চিন্ত হইয়াই আছে, মানুষটার শরীর
যখন নিজের জিম্মাতেই আছে, তখন আর বন্দী সম্বন্ধে ভাবনা কি।
কিন্তু আমি যে বন্দী নয়, আমি যে মুক্ত পলাতক—এ-সত্য জানার মত
শিক্ষা বা দৃষ্টি কোনটাই তার নাই।
শিক্ষিত উচ্চ-পদস্থ কর্মচারীর পর্যন্ত ধারণা যে, মানুষের মন
নিয়া মাথা ঘামাইবার দরকার করে না। জেলে আটকাইয়া রাখিয়া
ভাবে, বন্দী করিয়া বেশ নির্যাতন করিতেছে। কিন্তু কতবড় মিথ্যা
তা'দের এ-বিশ্বাস—আমাকে দেখিলেই বুঝিতে পারিত। যতদিন
আকাশ আমার চোখ হইতে না সরিবে, যতদিন দিনের-আলাে
আমার দৃষ্টি হইতে সরানাে না হইবে, কিম্বা যতদিন উগ্ধ হইতে
বৃষ্টির ধারা-পতন দেখা বন্ধ না করিতে পারিবে, অথবা দিন শেষ
হইলে রাত্রে অন্ধকার নামিয়া-আসা না আটকাইতে পারিবে-
ততদিন আমাকে বন্দী করার আশা দুরাশা, সে-আশা সরকারই
করুক বা আমার সংসারই করুক।
দারােগা-সাহেব আলাপ-আলােচনা চালাইতে কয়েকবার ব্যর্থ
চেষ্টা করিলেন। কিন্তু যে আলাপ করিবে, সে আমার মধ্যে বহুক্ষণ
অনুপস্থিত। এই আমার আড়িয়ালখা, ঐ আমার মাথার উপর
আমার জন্মভূমির আকাশ, আর আকাশে চাঁদ, তা’র দিগন্ত
বিস্তারিত জ্যোছনা—আমি সকলের সঙ্গে একাকার হইয়া মিশিয়া
গিয়াছিলাম।
ষ্টেশনে আসিয়া যখন নৌকা থামিল, তখন মনকে জোর করিয়া
ঘরে ফিরাইয়া আনিলাম, কহিলাম-“নামবেন না? চলুন, নীচে
নামি।”
১১

তেটিনিউ- -“নীচে নামবেন? কিন্তু পাড়ে যাবেন কি করে ?এই মাঝি, নৌকা পাড়ে নিতে পারবে?” মাঝি উত্তর করিল—“হুজুর, ষ্টীমারে তত এখান থেকে উঠতেই সুবিধা হবে। এত নৌকা ঠেলে পাডে-নেওয়া, আবার বের করা বিস্তর হাঙ্গামা।” দারােগা বাবুকে কহিলাম—“নৌকার ছইয়ের উপর দিয়েই চলন পাওয়া যাবে। দারােগা সাহেব ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন। এতদূর হইতে ছইয়ে-দুইয়ে কিনারা পর্যন্ত বিস্তারিত বটে—কিন্তু তাতে পতনের সম্ভাবনাও তত আছে। তা ছাড়া বয়স্ক মানুষ, সাবধান-সতর্ক হইয়া চলাফেরা করাই উচিত। দেখিলাম, তীর হইতে কয়েকজন লােক ছইয়ের উপর দিয়া হাঁটিয়া এদিকে অগ্রসর হইতেছে। সে-দিকে দাবােগা-সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া কহিলাম-- “ঐ দেখুন, ওরাও আসছে। চলুন নামি, আবার ষ্টীমার এসে পড়বে। কিন্তু নামিবার দরকার হইল না, যাহারা নৌকার ছইয়ের উপর দিয়া আসিতেছিল, তাহারা একটু অগ্রসর হইতেই পরিষ্কার জ্যোছনায় তাদের মুখ চিনিতে পারিলাম। ডাকিয়া বলিলাম-“এই, এ-দিকে।” ভাইদের মধ্যে দু’জন ও কয়েকটি বন্ধু আমাদের নৌকার ছাদে লাফাইয়া আসিল। জিজ্ঞাসা করিলাম-“তোরা খবর পেলি কি করে?”

-ভেটিনিউ হাসিয়া একজন সােজা-ভাবেই জবাব দিল-“যারা খবর দেবার তা'রাই দিয়েছে।” বলিয়া দারােগা-সাহেবের দিকে আড়চোখে চাহিয়া দেখিল। দাবােগা-সাহেব সত্য কথাই তবে বলিয়াছিলেন। তিনি বলিয়া- ছিলেন “খা’রা খবর পাবার তঁারা পাবেনই, ভাববেন না। আর এর বলিল “যারা খবর দেবার তারাই দিয়েছে। ব্যাপার মন্দ নয়। সে-দিন এ-রকম হইতে পারি, কিন্তু আজ এ একেবারে অসম্ভব। লােক-জনকে কাছে আসিতে দেওয়া তো দূরের কথা, আমাদের যাতায়াতের পথে প্লাটফর্মে ভিন্ন দরজা খােলা হয়, বড় ষ্টেশনে গাড়ী আসিবার আগে কিছুদূরে আমাদের গাড়ী কাটিয়া রাখা হয়। আমাদের মুখ-দর্শন যাতে না করিতে পারে, তাই আমাদিগকে দলে দলে বাংলার বাহিরে রাজপুতনার বালির দেশে নিয়া রাখা হইয়াছে। এদিকে চরমুগরিয়া হইতে বাঁশি বাজাইয়া ষ্টীমার রওয়ানা দিয়াছে, আসিয়া পড়িল বলিয়া। বক্তব্য যাহা তাহা সারিয়া নিলাম। দারােগা- সাহেব পাশেই মহা-মৌনীর মত চুপ করিয়াই বসিয়া কাটাইলেন, তিনি যে কিছু শশানেন বা দেখেন, তাহা তাহার মুখ দেখিয়া আবিষ্কার করা গেল না। ঈমার আসিলে আমরা উঠিয়া বসিলাম, এরা সব নীচে নামিয়া গেল। ইন্টার-ক্লাশের যাত্রী, ভিড়ের কোন ভয় ছিল না, তাছাড়া সঙ্গে পুলিশ আছে—নিশ্চিন্ত হইয়াই ছিলাম। ভাগ্যবানের বােঝা ভগবান । বহন করেন জানিতাম, কিন্তু সরকারও যে বােঝ-বহনে ভগবানের প্রতিদ্বন্দী তা’ এবার জানিলাম । ৩ ডেটিনিউ- প্রথম-শ্রেণীর সিড়ি দিয়া উপরে উঠিতেছিলাম। উপরে উঠিয়াই থামিয়া গেলাম। রেলিং-এর উপর ঝুকিয়া পড়িয়া এক ভদ্রলােক নদীর শােভা ও রাত্রির রূপ দেখিতেছিলেন। ভাবে মনে হইল, তিনি তন্ময় হইয়া আছেন। লােকটীকে চিনিলাম। একবার ভাবিলাম, কাছে গিয়া কথা বলি, আবার কি ভাবিয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। লােকটী বােধ হয় ভাবিয়াছিলেন যে, আমরা চলিয়া গিয়াছি, তাই ঘাড় ফিরাইয়া দাড়াইলেন। কিন্তু আমার সঙ্গে চোখাচোখী হইতেই মুখ অন্যদিকে ফিরাইয়া নিলেন। অন্যদিকে ফিরাইয়া নিলেন। ভদ্রলােকের লজ্জা আছে দেখিতেছি। আমার দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া দারােগা-সাহেবের দৃষ্টিও ভদ্রলােকের উপর গিয়া পড়িল । ডাকিয়া কহিলেন—“মনােমােহন-বাবু যে-” মনােমােহনবাবু কাছে আসিয়া পাড়াইলেন। আমাকে চিনিতেন, হাত তুলিয়া নমস্কার করিলেন। ইচ্ছা ছিল না, তবু ভদ্রতার খাতিরেই নমস্কারটা ফিরাইয়া দিতে হইল। মনােমােহন-বাৰু থানারই একজন দারােগা, জিজ্ঞাসা করিলেন- “ফরিদপুর যাচ্ছেন বুঝি ?” মাথা নাড়িয়া সায় দিলাম। —“শরীর কেমন আছে? তেমন ভালাে মনে হচ্ছে না, রােগা হয়ে গেছেন। - ১৪

-জেডিনিউ
ভদ্রলােক অস্থির হইয়া উঠিতেছিলেন, যাইবার জন্য ছটফট
করিতে লাগিলেন, কিন্তু ছল খুঁজিয়া পাইতেছিলেন না।
-“আসি তবে, নমস্কার।”
–দাড়ান, কথা আছে।”
যেন একটা আশ্চর্য কিছু শুনিলেন এমনভাবে চোখ মেলিয়া
চাহিলেন। কহিলেন-“আমার সঙ্গে ?”
-“হ, আপনার সঙ্গে। আপনি আমাদের গ্রামের বাড়ীতে
গিয়েছিলেন?”
-“হাঁ, ইনস্পেক্টর-বাবুর সঙ্গে খানাতল্লাসী করতে গিয়েছিলাম।
আর তখন তাে আপনি সেখানে ছিলেন।”
-“তা ছাড়া আর যান নি?”
মনােমােহন-বাবু চুপ করিয়া রহিলেন, উত্তর করিলেন না।
জিজ্ঞাসা করিলাম-“কেন গিয়েছিলেন, জানতে পারি
কি?”
উত্তরের জন্য অপেক্ষা করিয়া আবার প্রশ্ন করিলাম-“মাকে
গিয়ে কি বলেছিলেন? কি বলে আপনি আমার বাক্স খুলে চিঠি-
কাগজ-পত্র দেখতে চেয়েছিলেন? কি, উত্তর দিচ্ছেন না যে? আর
একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করব। আপনার সঙ্গে Search-warrant
ছিল যে, একবার সার্চ হয়ে যাবার দু’দিন পরেই একা গিয়ে
খানাতল্লাসী করলেন ?”
মনোেমােহন-বাবু এবার জবাব দিলেন-“আপনার কোন চিঠি
বা কাগজ-পত্র আমি আনিনি, বিশ্বেস করবেন।”
—“তা আমি জানি, মা আমাকে বলেছেন। কিন্তু এইভাবে

যাওয়া, কাগজ-পত্ৰ তল্লাসী করা, আপনার কি স্বার্থ ছিল? আর আপনি গেলেনই বা কিসের জোরে ?” মনােমােহন-বাবু আর অপেক্ষা করিতে পারিতেছিলেন না, যাইবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিলেন। কহিলাম—“দাড়ান, আপনাকে আর বেশীক্ষণ detain করাবাে না। দেখুন, বীরত্ব করা আমার স্বভাব নয়। মেজাজ গরম করতে আমার ঘৃণা হয়। এ মনে রাখলে আমার কথাটার অর্থ বুঝতে পারবেন। আমি আপনাকে বলতে চাই—মনােমােহনবাবু, আপনি অনেক দূর এগিয়ে গেছেন, আর এগুবেন না। আচ্ছা, you may go now." মনােমমাহন-বাবু নামিয়া গেলেন। তার যাওয়াটা লক্ষ্য করিতে ছিলাম। দারােগা-বাবু এতক্ষণ কোন কথা বলেন নাই, জিজ্ঞাসা করিলেন-“কি হােয়েচে ? ভদ্রলােকের পর আপনি এত চটেছেন আমার চোখে-মুখে তখন পর্যন্ত সহজতা ফিরিয়া আসে নাই। চলিতে চলিতে বলিলাম-“চলুন, ক্যাবিনে গিয়ে বসি, তারপর বলব।” ক্যাবিনে আসিয়া দেখি সিপাহীরা ইতিমধ্যে বিছানা পাতিয়া ঠিক করিয়া রাখিয়াছে। জামাটা খুলিয়া গেঞ্জি গায়ে বিছানায় গিয়া বসিলাম। ষ্টীমার তখনও ছাড়ে নাই। কিছুক্ষণ আগে মনােমােহন-বাবুর সঙ্গে কথা বলিয়া মনে যে- বিষাক্ত কালো ছায়া পড়িয়াছিল, তাহা আর ছিল না। যেটুকু বা ছিল, বাহিরের দিকে তাকাইয়া তাহাও মুছিয়া গেল। এমন কি একটা উদার আনন্দের ভাব মনে ধীরে ধীরে জাগিতেছিল। বাহিরে ১১ নদী জ্যোছনায় শান্ত হইয়া আছে-দূরের ঐ পাড় জ্যোছনায় অস্পষ্ট হইয়া স্বপ্নে-দেখা ছবির মত লাগিতেছিল। আকাশের যে-দিকটা দৃষ্টির সম্মুখে ছিল, সেখানে চাঁদ দেখা যাইতেছিল না—কিন্তু সমস্ত • আকাশ মার্জিত, স্নিগ্ধ ও স্বচ্ছ একটি রূপ নিয়া নিশীথ-রাত্রি জাগিতেছিল। দাবােগা-সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন-“মনােমােহন-বাবুর সঙ্গে কি হয়েছিল? এত চটলেন কেন?” ইচ্ছা হইতেছিল না যে, এ নিয়া আলােচনা করি। কথা দিয়াছি, তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও বলিতে হইল। কহিলাম-“দেখুন,ইংরেজ-সরকার বা ইংরেজ-জাতিকে আপনার ভালােবাসুন, আপন মনে করুন, তাতে বলবার কিছু আমার নাই। তার মুন খান, ঋণ শােধ করতে হবে—এও বুঝতে পারি। কিন্তু বিদেশী-সরকার ও বিজাতি-প্রীতি এও সম্ভব হয়—অথচ, আপনাদের পক্ষে সম্ভব হয় না এই নিজের দেশ ও লােককে ভালােবাসা, আপন মনে করা। এ-মনােভাব নিয়েও ঝগড়া করার প্রবৃত্তি আমার নাই। কিন্তু যখন এই মনােভাব উৎকটভাবে আত্মপ্রকাশ করে, স্বদেশ- বাসীকে পীড়ন ও তাদের ক্ষতি করতে যখন কিছুমাত্র দ্বিধা বা সঙ্কোচ আপনাদের মনে আসে না-তখন আপনাদের এই ইতর পৌরুষ আমার অসহ বােধ হয়। পুলিশ-কর্মচারি দেশ লােক হয়েও যে মাঝে মাঝে খুন হয়—তার এই কারণ। যারা খুন করে, জানবেন, তাদের সহ-শক্তি ও ধৈৰ্য্যর সীমা এই জাতীয় ব্যবহারে আপনারা শেষ করে আনেন। “এই মনােমােহন-বাবু আমাদের ভাড়াটিয়া, একটা বাসা নিয়া ১৭ ভেনিউ- থাকেন। ইংরেজ-প্রীতি বা সরকার-প্রীতি যাই বলুন, তা’ কত উগ্র তাঁর, তা আমরা বহুদিন যাবতই টের পেয়ে আসছি। বাসার ছেলেমেয়েদের ইচ্ছা ছিল যে, নােটিশ দিয়ে তুলে দেওয়া। কিন্তু কর্তার ভাবলেন, দাবােগা মানুষ, সরকারী চাকুরে, ভাড়াটা রীতিমত পাওয়া যাচ্ছে—কাজেই ভদ্রলােক এতদিন রয়ে গেছেন। সরকারের মুনের ঋণ-শােধ করতে তিনি কেন যে এত ভয়ানকভাবে ব্যস্ত ও চিন্তিত হয়ে থাকেন, তা সত্যি আশ্চর্যের বিষয়। দেশের বাড়ী আমাদের ইতিমধ্যে তিন-চারবার সার্চ হয়ে গেছে, তাতেও তঁার তৃপ্তি হয়নি। একদিন একা গিয়ে হাজির। মা তাকে চিনতেন। শুনলেন যে, তার ছেলের বাক্স-পেটরা আর একবার দেখতে তিনি এসেছেন। মেয়েমানুষ, তায় বাড়ীতে সেদিন পুরুষ- ছেলে কেউ ছিল না, রাজী হয়ে গেলেন। সার্চ-ওয়ারেন্ট দরকার, সাক্ষী দরকার, এসব কথা মার মনেও এল না। ভদ্রলােক ঘণ্টাকয়েক নির্বিঘ্নে কষ্ট স্বীকার করে কাগজপত্র ঘেঁটে এলেন। আচ্ছা, বলতে পারেন, সরকারের আদেশ-পালন নয়, তবু এ কেন তিনি করতে গেলেন? কি প্রয়ােজন ছিল তার? শুনতে পাই ইস্পেক্টর হবার লােভ আঁ’র, তা তার হওয়া চাই। বলতে লজ্জা করে, তবু বলছি, তাঁর স্ত্রীও স্বামীর এ-রােগে আক্রান্ত। স্বামীর কাজে সাহায্য করা উঁ’র ধৰ্ম্ম হয়ে উঠেছে। আমাদের বাসায় যখনই তিনি আসেন, সবাই ভাবিত হয়ে উঠেন। ধরাপড়ার কয়েকদিন আগের ব্যাপার-আপনাদের superintendent-সাহেব বার পাঁচেক বাসা খুজে গেছেন আমাকে পাবার জন্য। না পেয়ে তিনি যে ভয়ানক চটেছিলেন, তা তিনি নিজে গােপন করার দরকার বােধ ১৮ । করেন নি। তল্লাসীর যে-নমুনা দেখিয়েছিলেন তাতে সন্দেহের অবকাশ রাখেন নি। কিন্তু বেশী চটেছিলেন মনােমােহন-বাৰু দারােগার স্ত্রী এই ভেবে যে-লােকটাকে প্রায়ই তাে বাসায় দেখতে পাই, অথচ গ্রেপ্তার করার সময়ই তাকে বাসায় পাওয়া যায় না। সাহেব যদি শেষে তাদের আর বিশ্বাস না করেন, স্বামীর প্রমােশন হয়তাে রেগে চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিতে পারেন। কিন্তু ভদ্রমহিলা মাথা ঠাণ্ডা রেখে ওৎ পেতে রইলেন। সাহেবের কাছে মথ্যাবাদী নাম তিনি দূর করবেনই। “সেদিন অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়ে বেলা দেড়টায় বাসায় এসেছি। মাইল কুড়ি-পঁচিশের মত হাঁটতে হয়েছিল, তা ছাড়া গত রাত্রে বুমাবার সুযােগ পাইনি। স্নানটা সেরে কোনমতে কয়েক গ্রাস গিলে নতে পারলেই ঘুম দিতে পারি। পুকুরের ঘাটে গেলাম। সিড়ির উপরে কাপড় গেঞ্জি ও স্যাণ্ডাল নিয়ে এক বােন বসে ছিল। হঠাৎ সে বলে উঠল, সােনাদা’ এদিকে ঘুরে দাড়াও। তা’র দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখলাম, অন্য এক ঘাটে একটা মেয়েলােক কাজ করবার জন্য আসছেন। গলাজলে দাড়িয়ে গাত্র-মার্জনায় ব্যাপৃত ছিলাম। বােনের আদেশমত ও-ঘাটের দিকে পিছন ফিরে দাড়ালাম। শুনলাম—কুল, বােন উত্তর করল—আমার দাদা। -কে, তােমার সােনাদা’ ? -না, আমার মণিদা। ১ ভেটিনিউ- আমাকে বজ-তুমি তাড়াতাড়ি কর। আজ বােধ হয় তােমার কপালে ভাত নেই। জিজ্ঞাসা করলাম-কে রে? দারােগার বৌ। -ও, তাই। ইচ্ছা হােল বৌটিকে ভালাে করে দেখে নেই। বােনের নিষেধ সত্ত্বেও ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, বয়স বেশী নয়, বছর ছাব্বিশ-সাতাশের রােগা ও ফস। একটি স্ত্রীলােক। ঘাটে তঁার কি কাজ ছিল তা তিনিই জানেন। উঠে গেলাম। সােনাদা’ কিম্বা মণিদা’-এ-সন্দেহ যেটুকু ছিল, তা মিটে গেছে। ঘরের জানালা হ’তে আমাকে খেতে পাননি:সন্দেহ হবার জন্য ঘাটে আসেন এবং তা হয়ে ফিরে যান। খাওয়া-দাওয়া সেরে কোন ঘরে নিদ্রা যাব ভাবছিলাম। বােন বল্পবাসায় থাকতে পারবেনা, অন্য জায়গায় গিয়ে ঘুমাও। -এখন আর যেতে ইচ্ছে করছেনা। দাড়াতে পৰ্য্যন্ত পাচ্ছিনা। -না, তা হবে না। পুলিশ এল বলে—তুমি যাও। সােনাদা না মনিদা’ এ-প্রশ্নের পরেও তুমি থাকতে চাও? কথা শোেন। কথা শুনলাম না। আমার অবস্থা দেখে শেষে রাজী হল। পাশের বাসার ভাড়াটে ভদ্রলােক একাই আছেন, ছেলে-মেয়েরা সব দেশে, একটা খালি ঘরে বিছানা পেতে বার থেকে শিকল টেনে বােন চলে গেল। এক সময়ে ধাক্কা খেয়ে জেগে দেখি, ভাই-বােনেরা কয়েকজন ঘিরে দাড়িয়ে আছে, চোখ-মুখে উত্তেজনার চিহ্ন। ১।

-ভেটিনিউ
-কি, ব্যাপার কি?
-এই এতক্ষণে পুলিশ বিদায় নিল। তােমাকে ঘরে বন্ধ করে
ফিরে গিয়ে কেবল একখানা বই হাতে নিয়েছি, দেখি জ্যাঠামহাশয়,
বল্লেন-পুলিশ এসেছে, সার্চ করবে। পিছনে দেখি সুপারিন্টেনডেন্ট
নিজে দাঁড়িয়ে, সঙ্গে দারােগা-পুলিশ।
হেসে বল্লাম-কুন্দ, দারােগার বৌকে সান্ত্বনা দিয়ে আসিস।
হয়তাে আশা-ভঙ্গ হওয়ায় উনিও সাহেবের ভয়ে বিছানা নিয়েছেন।
-তা ভালাে করেই দিয়ে আসব।
এক ভাই থার্ড-ক্লাশে পড়ে, রাগটা তার অমনিই একটু বেশী, বল্প
-ওর স্পাইগিরি ছুটিয়ে দিচ্ছি, দাড়াও।
ধমক দিয়ে বাম-রাখ, বীরত্ব করতে হবেনা। যদি শুনি যে,
কোন কথা বলেছিস্ বা কোন খারাপ ব্যবহার করেছি, তবে জানবি
সেদিন থেকে তােদর মুখ দেখা আমি বন্ধ করব ।
বােন বল্ল--তুমি ইচ্ছে হয় মুখ দেখা বন্ধ করতে পার। কিন্তু
আমি কয়েকটি কথা না বলে পারবনা বলে রাখলাম।
ওদের শান্ত করতে আমার বেশী বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু যে-
ন্তু যে-
ঋণা আমার মনে জন্মেছে তা থেকে আমি আজও রেহাই পাইনি।
তা’তত কিছুক্ষণ আগেই দেখলেন।”
একটু থামিয়া কহিলাম-“সত্যি, আমার কাছে আশ্চর্য লাগে, এ
কেমন করে হয়। মেয়ে-মানুষ, স্নেহ-ভালবাসা যেখানে স্বভাবতই
বেশী থাকে, সেখানেও এরকম হয়-বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, দুঃখও
দারােগা-সাহেব চুপ করিয়া রহিলেন। জামাটা তুলিয়া পকেট

ভেটিভি-
হইতে সিগারেটের বাক্স বাহির করিয়া দেখি, তা খালি, সিগারেট
নাই।
দাবােগা-সাহেব উঠিয়া দাড়াইলেন, কহিলেন—“নিয়ে আসছি।
গাে-কে তাে?”
-“আপনি কেন যাচ্ছেন? ওদের দিন, এনে দেবে।”
-“তাতে কি। যাই, নিয়ে আসি। পান খান তাে?”
পান-খাওয়ার অভ্যাস নাই শুনিয়া অবাক হইলেন। সিগারেট
চলে অথচ পান খাইনা, হিসাব-মিলাননা বােধ হয় দারােগা-সাহেবের
কষ্টকর ঠেকিতেছিল।
স্টীমার বাশী বাজাইয়া ষ্টেশন ছাড়িল, কিছুক্ষণ পরে দারােগা-
সাহেব ফিরিয়া আসিলেন।
সিগারেট ও দেশলাই হাতে লইয়া বলিলাম-“ম্যাচ আমার
সঙ্গেই ছিল, আবার আনলেন কেন? রেখে দিন।”
দারােগা-পত্নীর কাহিনী বলিতে গিয়া মনে আবার কালাে ছায়া
নামিয়াছিল। সিগারেট মুখে লইয়া কাৎ হইয়া শুইয়া পড়িলাম।
খদ্দরের চাদরটায় কোমর পর্যন্ত ঢাকিয়া লইয়া বাহিরের দিকে
তাকাইয়া সিগারেট টানিতে লাগিলাম। ক্ষণপূৰ্ব্বে মনে যে উদার
আনন্দ ধরা দিয়াছিল, তার প্রতীক্ষায় উন্মুখ হইয়া রহিলাম। আমি
যেন একা বাসর জাগিতেছি, মনের পাশে আসিয়া যে বসিবে তাকে
শান্ত আকাশ ও নদীর কোথাও দেখিতে পাই কিনা, চোখ মেলিয়া
রহিলাম। এক সময়ে ঘুম আসিল কিন্তু সে-শান্তি আসিল না ।
-ঘুমাইয়া পড়িলাম।
এক সময় ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। চোখ মেলিতেই ইলেকটাকের
১০২

কড়া আলাে চোখের উপর আসিয়া পড়িল—যেন কার ক্রুদ্ধ দৃষ্টি। চোখ কয়েকবার বুজিয়া-মেলিয়া আলােটা সহাইয়া লইলাম। দেখিলাম সবুজ রংয়ের ছােট ঘােট অসংখ্য পােকা আলােটাকে ঘিরিয়া ঘুরিতেছে। উজ্জ্বল আলাে অন্ধকার হইতে অসংখ্য পতঙ্গকে টানিয়া আনিয়াছে। কাচের আবরণ না থাকিলে আলােক-পিপাসী এই সংখ্যাহীন পতঙ্গের দল বহুপূৰ্বেই অলিজা ছাই হইয়া যাইত। পায়ের কাছে দারােগা-সাহেব মুড়িশুড়ি দিয়া অঘােরে নিদ্রা যাইতেছেন। নীচে মেঝেতে সিপাহী কয়জনও ঘুমে অচৈতন্য পশেই বন্দুক কয়টা তাদেরই মত নির্জীব হইয়া পড়িয়া আছে। তাদের শিওরের কাছে এক ভদ্রলােক-যাত্রী বেঞ্চে স্থানাভাব দেখিয়া নীচে শতরঞ্জি বিছাইয়া জায়গা করিয়া লইয়াছিলেন, তিনিও নিদ্রিত। নদীর বাতাস ঠাণ্ডা লাগিতেছিল। উঠিয়া চাদরটা গায়ে দিয়া একটা সিগারেট ধরাইয়া বাহির হইলাম। বাহির হইয়া দেখিলাম—ঘুমন্তপুরী। নীচে ষ্টীমারের হৃদস্পন্দন ছাড়া কোথাও প্রাণের সাড়া-শব্দ নাই। পােটলা-পুটলী বাক্স-পেটরা ইত্যাদি নিয়া সবাই ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। জাগিলে এই মানুষগুলিই বিভিন্ন চরিত্র নিয়া সংসারে চড়িয়া বেড়ায়, এখন সমস্ত আশা-আকা, গুটাইয়া লইয়া মড়ার মত পড়িয়া আছে। একজনের সঙ্গে আর একজনের তফাৎ ও ব্যবধান বুঝিবার উপায় নাই। চরিত্রহীন লম্পট আর সংযত সাধুচরিত্র ব্যক্তি, কে ইহার মধ্য হইতে বাছিয়া বাহির করিতে পারে, সব সমান হইয়া গেছে। ঘুমন্ত মানুষ সত্যই অদ্ভুৎ লাগে। মনে যেন কেমনতর একটা ভাব হয়, এদের অপরিচিত বােধ হয়। একটু ভয়-ভয় ভাবও থাকে। ১০৩ ০ এখন রাত্র প্রায় দেড়টার মত হইবে, প্রসিডেন্সি-জেলের বন্দীরা সবাই ঘুমাইয়া আছে। পাশের সীটে যে-ভদ্রলােক ছিলেন, জর হওয়ায় আজ বিকালে তাকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হইয়াছে। কিছুক্ষণ আগে প্রস্রাবের ঘরে গিয়াছিলাম। করাইডর দিয়া স্যাণ্ডালে শব্দ না হয় এমনভাবে সন্তর্পণে গিয়াছি ও আসিয়াছি। সমস্ত জুড়িয়া ঘুমের এমন একটি আচ্ছাদন ছিল যে, আমার সামান্য নিঃশ্বাসেও যেন তা’ দুলিতে পারে। দুই ধারে সারি সারি ঘুম খাটে পড়িয়া আছে, আমিই একমাত্র জাগ্রত-চেতনা মধ্য দিয়া পথ করিয়া হাটিয়া গিয়াছি। করাইডরের আলােতে পর্দার ঘরের মধ্যে বন্ধুদের যে-ছবি দেখিয়াছি, তাতে এরাই যে দিনের বেলার লােকজন তা বিশ্বাস করিতে কষ্টকর হইতেছে। ঘুমন্ত মানুষ আমার কাছে সত্যই রহস্যের মত লাগে। এমন সব প্রশ্ন মনে আসে যা দিনের আলােতে সচরাচর আসে না। বাহিরে লণ্ঠন হাতে পুকুরপাড়ের রাস্তায় সীপাহী ঘুরিয়া ঘুরিয়া পাহাড় দিতেছে, তাকেও এখন অলৌকিক জগতের জীব বলিয়া মনে হয়। একে রাত গভীর এবং ভয়ানক অন্ধকার, তায় আবার চারিপাশে পুঞ্জীভূত নিদ্রা বিস্তৃত হইয়া আছে। মনকে কোন অদৃশ্য অন্ধকারের দিকে কে যেন টানিয়া নিতে চায়। কিন্তু রাত্রিবেলার এ অচেনা প্রশ্নকে অনুসরণ করিয়া অজানা অপার অন্ধকারে গিয়া প্রবেশ করিতে ভয় লাগিতেছে। মনকে ঝাঁকানি দিয়া আবার সাত বছর আগের রাত্রিতে নিয়া যাইমারের হৃদস্পন্দন, পাখায় জল-কাটার শব্দ মনের মধ্যে পুনরুজ্জীবিত করিয়া বর্তমানের এই বাস্তবতা হইতে নিজেকে মুক্ত করিয়া লই। ১০৪ -ডেটিনিউ সিগারেটটা প্রায় অর্ধেক আলিয়া মাথায় ছাই জমিয়া আছে- টোকা দিয়া ঝাড়িয়া ফেলি। পাশেই মেয়েদের ইন্টার-কেবিন, নীচে যাইবার সময় চোখে পড়িল সেখানেও ঘুম। একটা শিশু মায়ের স্তনে মুখ রাখিয়া ঘুমাইতেছে-মায়ের হাতটা ছেলেটাকে ঘুমের মধ্যেও বেষ্টন করিয়া বুকের কাছে ধরিয়া রাখিয়াছিল। ছবিটি চোখের উপর লইয়া সিড়ির মাথায় আসিলাম। নীচে নামিতে গিয়া দেখিলাম, ও-পাশে অন্ধকারে কে একজন বসিয়া আছে। ঠাহর করিয়া দেখিলাম—বুড়ামানুষ, হাতে একটা থলি, বােধ হয় মালা জপিতেছে। এই একটি মাত্র মানুষকে জাগা দেখিলাম। সবাই যখন ঘুমাইতেছে, তখন এ জাগিয়া বসিয়া নাম জপিতেছে। ঈশ্বর আছেন কি নাই, এ-শ্রম সফল বা পণ্ডশ্রম ইত্যাদি প্রশ্ন মনে উঠিল না। যে বিশ্বাস করিয়া অপেক্ষা করিতেছে, তা’কে মনে-মনেও বিচারের বস্তু করিয়া কৃপা দেখাইবার মত মানসিক অবস্থা আমার ছিল না। নীচে আসিয়া ষ্টীমারের কল-ঘরের সামনে রেলিংএ ভর দিয়া দাড়াইলাম। একটা চাকার সামনে টুল পাতিয়া একজন খালাসী তামাক টানিতেছিল। দরকার মত উঠিয়া চাকা দুই হাতে ঘুরাইয়া গতি মন্থর বা দ্রুত করিতে হইবে, তাই জাগিয়া বসিয়া আছে। ঈমারের প্রকাণ্ড পিষ্টন কয়টা কেবল উঠিতেছে আর পড়িতেছে প্রচণ্ড শক্তির নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মত । বয়লারের মুখের ঢাকনী খুলিতেই ভিতরের আগুনের আলােয় নীচের সবটা পরিষ্কার দেখা গেল। একজন খালাসী মাথায় কালাে একটা রুমাল জড়াইয়া ঈমারের বিরাট অগ্নিগর্ভ-উদরে কয়লা ঠেলিয়া দিল, বড় একটা ভেটিনিউ লৌহ অস্ত্র দিয়া ভিতরটা বেশ খুঁচিয়া দিয়া তারপর দরজা বন্ধ করিল। এখন কে বুঝিবে প্রচণ্ড আগুন ভিতরে জলিতেছে—বাহির হইতে সামান্য তাপ ছাড়া আর কিছু বুঝিবার যাে নাই। এই আগুন আর জলে মিলিয়া এই বিরাট কাণ্ড চালাইয়া যাইতেছে। মানুষের বুদ্ধি দু’টি অন্ধ-শক্তিকে এমন সম্পর্কে ও এমন প্রণালীতে আবদ্ধ করিয়া লইয়াছে যে, এতবড় একটা ষ্টীমারকে তা অনায়াসে জল ভাঙ্গিয়া ঠেলিয়া নিয়া যাইতেছে । শক্তিকে যদি বুদ্ধিতে সংযত করা যায় তবেই এই রকম অত্যাশ্চর্য কাজ পাওয়া যায়—কথাটা মনে সত্যের মত ধাক্কা দিল। অনেকক্ষণ হয় নীচে নামিয়াছিলাম। আবার উপরে উঠিয়া গেলাম। সিড়ীর ওধারে লােকটি তেমনি বসিয়া আছে। মেয়েদের ক্যাবিনেও ঘুমে সবাই অচৈতন্য। এদিকের যাত্রিরাও কেহ জাগ্রত বলিয়া মনে হইল না। ক্যাবিনে ঢুকিতেই দেথি এক সিপাহী উঠিয়া বসিয়া আছে। বুঝিলাম, জাগিয়া আমাকে না দেখিয়া চিন্তিত হইয়া পড়িয়াছে। তাদের নিতি দেখিয়া কোন ষ্টেশনে নামিয়া পলায়ন করিয়াছি কিনা এবং এজন্য দারগো-বাবুকে জানানাে উচিৎ কিনা বেচারার ইত্যাদি চিন্তার মাঝখানে মূর্তিমান মীমাংসার মতই আমি গিয়া উপস্থিত হইলাম। জিজ্ঞাসা করিল- কোথায় গিয়েছিলেন?” সুরে নিষ্কৃতি- বােধের আভাস “নীচে।”

-- “প্রস্রাব করতে বুঝি ?” -“আমিও একটু নীচে ঘুরে আসি”—বলিয়া সে বাহির হইয়া গেল। আমি আবার বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়া শুইয়া পড়িলাম। যখন জাগিলাম, তখন দেখি ষ্টীমার পদ্ম-নদীতে আসিয়া পড়িয়াছে। চারিদিক পরিষ্কার হইয়া আসিয়াছে। দূরে নদীর পূর্ব-পারে গ্রামের গাছের মাথায় আকাশে লাল-রংয়ের ছােপ লাগিয়াছে। অন্ধকার ঠেলিয়া যে প্রকাণ্ড বহ্নি-পিণ্ড আসিতেছে, আকাশ-মুখে ঐ তার পূৰ্বাভাস। শুকতারাকে দেখিবার জন্য চারিদিক তাকাইলাম, কিন্তু দেখিতে পাইলাম না। পদ্মার উপর প্রশান্ত প্রভাত ধীরে ধীরে ফুটিয়া উঠিয়াছে। দুই চোক মেলিয়া রাখিলাম—মনের আকাশে কি এমন করিয়া জ্যোতির্ময় কোন সত্য প্রকাশিত হইতে পারে না, যার আলােতে দৃষ্টি সৰ্ব্বত্র মুক্তি পায় এবং যে-আলাে কখনও নিষ্প্রভ বা অস্তমিত হয় না? ** গ আমাকে ফরিদপুর-জেলের অফিসের জিম্ম করিয়া দিয়া দারােগা-সাহেব বিদায় নিয়াছেন প্রায় আধঘণ্টা হয়। যাইবার সময় নমস্কার করিয়া জানাইয়া গিয়াছেন যে, পথে যদি কোন ত্রুটি- বিচ্যুতি তার ব্যবহারে হইয়া থাকে তা যেন মনে না রাখি। আমিও নমস্কার ফিরাইয়া দিয়া কথা দিয়াছি যে, তা মনে রাখিব না। এ দিকে রাত্র প্রায় সাড়ে দশটা, অফিসে আর কত বসিয়া থাকিব, ভিতরে যাইবার জন্য ছটফট করিতে লাগিলাম।

ডেলিভউ
জমাদার ও সিপাহী ছাড়া একটি মাত্র লােক অফিসে চেয়ারের
উপর পা তুলিয়া উবু হইয়া বসিয়া খাতা লিখিতেছিলেন। পদ-মৰ্য্যাদা
যে ত’র খুব বেশী তা আমার মনে হয় নাই।
তবু কহিলাম-“ আমার ভিতরে যাবার বন্দোবস্ত করে দিন,
আর কতক্ষণ বসে থাকব ?”
অর্ধদগ্ধ বিড়িটাকে আবার জ্বালাইয়া লইয়া তিনি জিজ্ঞাসা
করিলেন—“আপনার খাওয়া-দাওয়া হয়েছে ?”
—“সে কথা কতবার জিজ্ঞেস করবেন ? খাওয়া-দাওয়া আমার
হয়ে গেছে, সে-জন্য ভাববেন না। এখন ভিতরে পাঠাবার বন্দোবস্ত
করুন।”
—“বন না, যাবেনই তাে। ততক্ষণ একটু গল্প করা যাক!”
গল্প করিবার মত ধৈৰ্য্য আমার ছিল না, তাহা জানাইয়া দিতে
তিনি জমাদারকে কহিলেন—“বাবুকে ভিতরে নিয়ে যাও।”
জমাদার কি একটা প্রশ্ন তুলিল বুঝিলাম না। শুধু কানে
আসিল সেলে নিয়া যাইবার কথা।
কহিলাম—“আর যারা আছেন, তারা কোথায় থাকেন,
সেইখানেই আমাকে পাঠিয়ে দিন।”
-“সে আমি পারব না, জেলার বাবু আসুন।”
—“তিনি কখন আসবেন?”
-“ঠিক নেই। নাও আসতে পারেন।”
-“তিনি যদি না আসেন, তবে কি সারারাত এখানে বসে
কাটাব ?”
-“না, এগারােটা অবধি দেখব, তারপর আজ রাত্রের মত
১৮

-ডেটিনিউ একটা সেলে পাঠিয়ে দেব। ভােরে জেলারবাবু, সুপার এদের সঙ্গে কোথায় থাকবেন ঠিক করে নেবেন।” উষ্ণ হইয়া উঠিতেছিলাম। এমন সময় বােগা পাতলা একটা ভদ্রলােক ঢুকিলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন-“কি, ব্যাপার কি?” ভদ্রলােক একটু তােতলা। পরিচয় পাইলাম যে ইনিই ডেপুটি- জেলার। ব্যাপারটা বুঝাইয়া বলিতে তিনিও আমাকে বলিলেন- “আজ সেলেই চলুন, কাল ভােরে সব ঠিক করে দেওয়া যাবে।” আমি আমার আপত্তি জানাইলাম। ভদ্রলােক কহিলেন- “যখন ছাড়বেন না, তখন চলুন। কি আর করা যায়।” জেলের ভিতরে ঢুকিলাম, সঙ্গে ডেপুটী-জেলার ও এক জমাদার অবশেষে একটা ওয়ার্ডে ঢুকিয়া ডেপুটি-বাবু বড় বারান্দা-আলা এক ঘরের দরজায় কড়া নাড়া দিলেন। ডাকিয়া কহিলেন—“পঞ্চানন-বাবু, ঘুমুলেন নাকি?” -“না, কেন ?” —“আরে মশায় উঠুন। দেখুন, কি এনেছি।” ভিতরে অনেকগুলি পায়ের শব্দ পাইলাম এবং দরজার সামনে যে অনেকে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে বুঝিলাম। ভিতর হইতে উৎসুক কণ্ঠে প্রশ্ন হইল—“কি এনেছেন ?” —“তা’ বলব না, খুলেই দেখুন।” তালা খুলিয়া দিবার তর তাদের সহিতেছিল না। দরজা খুলিতেই ডেপুটি-জেলার বলিলেন-“নিন, আপনাদের জিনিষ আপনারা নিন।”

টেনিউ- অনেকগুলি হাত প্রসারিত হইয়া পড়িল। সে কী চীৎকার আর হা-যেন মদ খাইয়া মাতলামী শুরু হইয়াছে। উপেন-বাবু (দাস) হুলুধ্বনি দিয়া বরণ করিয়া নিলেন। এবং মেয়েরা যেমন জামাই-বরণ করে, তেমনি হাত ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া গান ধরিলেন—“এতদিন যে বসেছিলাম পথ চেয়ে আর কাল গুণে-* যতীনদা’ ( ভট্টাচাৰ্য) মুচকি মুচকি হাসিতে লাগিলেন। টেনা-বাবু বলিলেন—“ডেপুটির গলা শুনেই বুঝতে পারলাম যে তুই।” ফণী মজুমদার বলিল—“ভাইডী আইছস, ভাল করছ।” অভ্যর্থনা ও সম্বর্ধনার বেগ একটু প্রশমিত হইলে আমাকে ঘিরিয়া লইয়া সবাই বসিলেন। ইহারা আটজন অষ্ট-বজ্র হইয়া এতদিন ছিলেন, এখন আমি আসিয়া পড়ায় আট হইল নয় এবং সব মিলিয়া হইল নব-রত্নের সভা। বুড়া বয়সে মানুষ পিছনে ফিরিয়া তাকাইয়া যখন দেখে, তখন স্কুল-কলেজের ছাত্র-জীবনটাই জীবনে সব চাইতে সুখের ও শ্রেষ্ঠ মনে করে। হয়ত এমন অসম্ভব আশাও করে যে, আর একবার যদি সে-দিনগুলি ফিরিয়া পাওয়া যাইত তবে জীবন এবার এমন করিয়া সুরু করিত যে, ভুল-চুকগুলি ঘটিতে দিত না-যে-সব ভুলের জন্য জীবন মনের মত হইতে পারে নাই। বন্দিজীবনে এই দীর্ঘদিন অতিবাহিত করিয়া আসিয়া আজ আমার মনে হইতেছে যে, ফরিদপুর-জেলের দিনগুলিই আমার জেল-জীবনের সুখের ও শ্রেষ্ঠ দিন গিয়াছে।

ডেভিনিউ একতলা একটি বিলডিং-এ আমরা নয়জন থাকিতাম। দক্ষিণ-মূখী ঘর, খােলা লম্বা টানা-বারান্দা। রেলিং-এর ও-পারে জেলের পুকুর। তার পাড় ঘেঁষিয়া দক্ষিণে জেলের প্রাচীর। দেয়ালের ও-ধারেই সহরের রাজপথ, রাস্তার দক্ষিণে খেলার মাঠ—তারপর ফরিদপুর কলেজের বাড়ী। বারান্দায় বসিয়া কলেজের বাড়ীর চূড়া দেখা যাইত-তারপরেই দৃষ্টি আকাশের সীমায় শেষ হইত। আমাদের বিডিংটীকে বাংলাে-বাড়ীর মত মনে হইত। জেলখানায় এটা যেন কোন সৌখীন ধনীর স্বাস্থ্যনিবাস—সামনে একটু বাগান ও পরে পুকুরটী থাকায় এটি ঐরূপই দেখাইত। বর্ষাকালে পুকুরের জল কানায় কানায় ভরিয়া যায়। একদিন রাত্রে বেড়াইতে বেড়াইতে হঠাৎ নজরে পড়িল যে, আমাদের ঘরটার ছায়া পুকুরের জলে পড়িয়াছে, ছায়ার আললাগুলি জলে ঝিকিমিকি করিতেছে। সেদিন হইতে ঘরটাকে ভালােবাসিয়া ফেলিলাম। গ্রীষ্ম চলিয়া গেলে যখন বর্ষা আসিল, তখন সেই বারান্দায় চেয়ার পাতিয়া বসিয়া চোখের ও মনের তৃপ্তি মিটাইতাম। কত সন্ধ্যা ও রাত্রের প্রথম অংশ এইভাবে বসিয়া বর্ষার উৎসব দেখিয়াছি—এতদূর হইতে এখন তা স্বপ্নের মত মনে হয়। এমন যে কুৎসিত ব্যাং, তা’র কর্কশ গম্ভীর স্বর পর্যন্ত কান পাতিয়া শুনিতাম-বর্ষার অন্তর্নিহিত সুরের গাম্ভীর্ষ তারা আরও সঘন করিয়া তুলিত। আকাশ হইতে অবিরল জল-ধারা নামিতেছে। চারিদিক দিনের বেলাতেই ছায়া-অন্ধকারে আবৃত, আকাশে যতদূর দৃষ্টি যায় মেঘে- মেঘে সঘন হইয়া আছে ; মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ঝলক দিয়া যাইতেছে এ সমস্ত মিলিয়া বর্ষাকে পূর্ণাঙ্গ করিতে পারিত না যদি ব্যাংয়ের ভেটিনিউ- সেই একটানা গভীর ধ্বনিট না থাকিত। কেকা-ধ্বনিতে নয়, মেঘ গর্জনে নয়, কুটজ-কুসুমেও নয়—ব্যাংয়ের ডাকেই বর্ষার নিজস্ব সুর ও রূপ অভিব্যক্ত হইতে পারে। অন্ধকারে জেলের নর্দমায়, পুকুরের পাড়ে ব্যাং ডাকিত, রিমঝিম অবিরল পানি-বরিষণ-শুনিতে শুনিতে যে কতরাত্রি জাগিয়াছি, ভাবিলে হাসি পায় না, ছেলেমানুষী মনে হয় না, বরং মন তৃষার্ত হইয়া উঠে সে-বর্ষারাত্রিগুলির জন্য। মনে করিতে আজও জলে-ভেজা বিহগীর মত একটুখানি ছােট ভীরু-সুখ বুকের নীচে ডানা নাড়া দিয়া উঠে, শেষ জল-ফোটা ঝারিয়া ফেলিতে চঞ্চল হয়। বর্যা-রাত্রের একদিনের ছােট একটু ঘটনা মনে আসিয়াছে। সেদিন রাত্রে গুরু-ভােজনের ব্যবস্থা ছিল। আমের কাল গিয়াছে, কিন্তু দাম দিলে তখনও মিলিত। তদুপরি স্বর্ণ-বর্ণ বৃহৎ কদলীও সংগৃহীত ছিল। যে-সব বড় বড় ইলিশ-মৎস্য পদ্মার গভীর জলে বসবাস করে, তাহাদের কতিপয়কে ধীবরেরা জালে আটকাইয়া তুলিয়া ফেলিয়াছিল ; জলতল-বাসী বৃহদায়তন বন্দীদের কয়েকটি এই জেলখানার বন্দীদের রান্নাঘরে আনীত হইয়াছিল। আমরা নিরামিষ-ভােজী ছিলাম না, মাংসেও আমাদের রুচি ছিল, তাই খাদ্যতালিকায় তাহাও পড়িয়াছিল। দিনের বেলাতেই সূচনা দেখিয়া আশঙ্কা করা গিয়াছিল যে, রাত্রে বর্ষণটা একটু মুষলধারেই হইবে। সর্বোপরি, জেলখানায় আবব্ধ থাকায় কারু মনে কোন সুখ ছিল না। সেই জন্যই সব দিক ভাবিয়া গুরু-ভােজনেরই ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। রাত্রের ভােজনের জন্য বিকাল হইতেই দেখিলাম সবাই প্রস্তুত হইতেছেন। যতীনদা’ পৰ্যন্ত জেলগেট হইতে বানির পশু লাল-সুরকীর রাস্তা দ্রুতবেগে ভ্রমণ করিতেছেন, সঙ্গে মাষ্টার মশায় অশ্বিনী-স-গেঞ্জিটা ঘামে ভিজিয়া টুপটাপ না হওয়া পৰ্যন্ত বিশ্রাম করিবেন না, উভয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আছেন। একটু অধিক রাত্রে আমরা আসনে গিয়া বসিলাম। আমাদের কাজ-কর্ম করিবার জন্য যে কয়েকজন কয়েদী পাইয়াছিলাম, তার মধ্যে তিনজন আমাদের ঘরেই থাকিত, বাকী ক’জন ভাের হইলে নম্বর’ হইতে এখানে আসিত আর সন্ধ্যায় বন্ধ হইবার জন্য চলিয়া যাইত। জেলারের সঙ্গে কথা ছিল যে, তারা রাত দশটায় যাইবে। খাওয়া-দাওয়া সারিয়া তার তৈরী হইয়া ছিল—জমাদার আসিয়া তাদের লইয়া গিয়াছে। নেপাল, কাঙ্গালী ও সদানন্দ এই তিন জন পরিবেশনে লাগিল। ভােজনের বর্ণনা করিব না, কারণ সে বর্ণনার বস্তু নয়—চোখে দেখিবার জিনিষ। মানুষ যে এমন মরণ-পণ করিয়া খাইতে পারে, আগে বিশ্বাস করি নাই। এখন দেখিলাম, এ-বিষয়ে আমার জান কত স্বল্প । সেদিন প্রত্যয় হইল যে, মানুষের পক্ষে সবই সম্ভব। শেষের দিকে সবাই যখন ক্লান্ত হইয়া অম্মি'ছে, তখন জিজ্ঞাসা করিলাম-“কি ফণী, আর কিছু লাগবে?” -“লাগবে।” যতীনদা’ চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া চাহিলেন, ফণীর আহারের পরিমাণ ও নমুনা দেখিয়া তিনি আশঙ্কিত হইয়া উঠিতেছিলেন। চোখের উপর এইরকম আত্মঘাতী চেষ্টা দেখিয়া উদ্বেগ চাপিয়া রাখা ১১৩

ভেটিনিউ
সত্যই কষ্টকর। আশ্চৰ্য্য হইয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন-“কি
লাগবে ?”
সুরটা আমাদের কানে যে ভাবে ঠেকিল, তাতে প্রশ্নটার অর্থ
হয় যে, থাক আর লাগিয়া দরকার নাই, যথেষ্টের চেয়ে বেশী অনেক
আগেই হইয়াছে, আর না।
ফশী ঘাড় না তুলিয়াই জবাব দিল-“একটু সময় লাগবে।”
যতীনদা’ আশ্বস্ত হইয়া দম মুক্ত করিলেন, বুঝা গেল সময় দিতে
তাঁর আপত্তি নাই। যা মাল বােঝাই হইয়াছে তার ঠেলা সামলাইতে
পারিবে কি না, ফণী সম্বন্ধে এ-আশঙ্কা যতীনদা মনে মনে রাখিলেন
না, প্রকাশ্যেই বলিয়া ফেলিলেন।
ফণী এক সময়ে মাথা তুলিয়া কহিল—“আমরা পশুর চেয়ে
অনেক পিছনে পড়ে আছি।”
টেনা কহিল—“না পিছনে নয়, সমান সমান আছিস”
সব কথা কানে ভােলা ফণীর স্বভাব নয়। তা ছাড়া মন এখন
তা’র দুঃখে-ভরা।
কহিল—“গরু-মােয-ছাগল-ভেড়া সারাদিন মাঠ থেকে ঠেলে
ঘাস খেয়ে আসে, ঘরে এসে সারা রাত তার চিবুনি চলে। উট খলি
ভরে জল রাখে, ঠেকামত কাজ চালায়। আর আমরা-গলার
নীচে মাল ঠেলে দিয়েই খালাস। শুনতেই মানুষ—আসলে পশুদেরই
সুবিধে বেশী।”
দেখিলাম, এ-বিষয়ে ফণীর সঙ্গে প্রায় সকলেই একমত।
উপেন-কাস বেফাস কথা বলিয়া ফেলিলেন-“কিন্তু সাপ-ব্যাং
এরা তাে দু’মাল না খেয়ে থাকে।”
১১৪

-ভেটিনিউ
কথা শেষ করিতে অবসর তাকে দেওয়া হইল না।
-“তা’ হলেও নয় বুঝতাম যে, এদিক দিয়ে না যােক অন্য দিক
দিয়ে আছি। ছ'মাসের খাবার হাঙ্গামা থেকে বাচা যেত-সেও তাে
একটা লাভ হােত।” বলিয়া ফণী আহারে মনােনিবেশ করিল।
মাষ্টার-মহাশয় কহিলেন-“দেখতে নেপাল, দু’একটা ঠ্যাং পাও
কিনা।”
ফণী খাইতে খাইতেই কহিল—“কি, ঠ্যাং ? উহু, মুরগীতে
ঠ্যাং থাকে না, জানেন না বুঝি? বিশ্বাস না হয় টেনাকে আর
উপেনকে জিজ্ঞাসা করুন।”
যতীনদা’ জাগিয়া উঠিলেন-“ও তাই বলাে।
রান্নাঘরেই সারা সময় ছিল। কাজ এগিয়ে রেখেছে দেখছি।”
উপেন-দাস পঞ্চানন-বাবুর দিকে আড়চোখে চাহিতেই যতীনদা’
কহিলেন—“ও, তুমি ছিলে বুঝি ?”
ফণী চাপা-আক্রোশে কহিল-“না, উনি থাকবেন কেন, থাকব
আমি। রান্নাটা পৰ্যন্ত শেষ করবার তর সয়নি। পেয়েছেন যে
এই যথেষ্ট, আবার ঠ্যাংও”—বলিয়া মাষ্টার-মহাশয়কে সান্ত্বনা দিল।
পঞ্চানন-বাবু চোখে-মুখে নির্দোষীর ছবি আঁকিয়া লইয়া কহিলেন
-“বাঃ রে, আমি কি করব। ডেকে নিয়ে গেল যে
-“তা ঠিক, তােমাকে দোষ দেওয়া যায় না। ডেকে নিয়ে
গেলে কি আর করবে। সত্যই তাে, বিপদে পড়লে কিইবা করার।
থাকে।
বাইরে বৃষ্টির জোর উত্তরােত্তর বেশ বাড়িতেছিল। আকাশে
যে কত জল আছে, আজ ঢালিয়া বুঝাইয়া ছাড়িতেছে।

নেপাল টেনা-বাৰুকে কহিল-“বাৰু যে কিছুই খালেন না। আর একটু মাংস দেই—কেমন?” টেনা-বাবু কহিলেন—“নারে, আর জায়গা নেই।” ফণী কহিল-“এতক্ষণ যে ছিল, এই আশ্চর্য্য।” ন্যায়ত অঙ্কশাস্ত্রানুযায়ী যে-কয়খানা ঠ্যাং তার প্রাপ্য হইত, তাহা প্রাপ্ত না হওয়ায় ফণীর ক্ষোভ যে কত গভীর ছিল, তাহা আমরা বুঝিতে পারিলাম। ভােজন-পর্ব প্রায় শেষে আসিয়া ঠেকিয়াছে, সব যােদ্ধাই রীতিমত পরিশ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন, এখন উঠিয়া বিছানায় গিয়া পড়িতে পারিলেই বাঁচেন। তখন ক্ষিতীশ-বাবু (চক্রবর্তী) কহিলেন-“নেপাল, আছে -“আছে বাবু।” বুঝিতে না পারিয়া আমরা উৎসুক হইয়া রহিলাম। নেপাল বড় একটা বাটা দুধে ভরিয়া আনিয়া ক্ষিতীশ-বাবুর সম্মুখে ধরিয়া দিল। সকলেই রীতিমত আঁকাইয়া উঠিলেন—লােকটা খেপিল। নাকি, নইলে এ আত্মহত্যার সাহস কেন করিতেছে? টেনা-বাবু কহিলেন—“মাংসের পরে দুধ খাবেন ?” ক্ষিতীশ-বাবু জানাইলেন যে, সেইরূপই তাহার অভিপ্রায়। ক্ষিতীশবাবু শৈশবেই মা ও বাবা দু’জনকে হারান, তখন তার বয়স দিন কয়েক মাত্র। থাকার মধ্যে ঠাকুরদাদা ছিলেন। বয়স বাড়িতে পৌত্রের গুণাবলীতে মুগ্ধ হইয়া পিতামহ অত্তিষ্ঠ হইয়া প্রায়ই মন্তব্য করিতেন যে, কুঁড়ে গরু খইল খাবার যম। খইল- ভক্ষণে ক্ষিতীশবাবু সত্যই যম-সদৃশ কিনা, দেখিবার সুযােগ আমাদের হয় নাই। কিন্তু দুধে ও কদলীতে তাঁর আসক্তি ও রুচি সত্যই অদ্ভুত ছিল। কিন্তু তাই বলিয়া আজ রাত্রের আহারেও দুধ- খাওয়া—আমাদের যেন একটু বিশেষ বাড়াবাড়ি মনে হইল। দুধে ডুবাইয়া ক্ষিতীশবাবু সবেমাত্র আব্দুল কয়টি উপরে তুলিয়াছেন, ফণী আবিষ্কার করিলা, দুধ কোথায়? এ যে দেখছি ক্ষীর। ক্ষিতীশবাবু কহিলেন—“খাবেন? নিননা।” —“আবার দুধ খাব ? দিন, অদৃষ্টে কি আছে ভগবানই জানেন।”—বলিয়া ফণী একটা বাটী আগাইয়া দিল। কদলী কয়টী আয়তনে যেমন বৃহৎ ছিল, রংয়ে তেমনি মনােহর ছিল। দেখিয়া লােভ হয় বটে, কিন্তু গ্ৰহণ করিবার সাহস বা অবস্থা কোনটাই আমাদের ছিল না। ফণী ও ক্ষিতীশ-বাৰু তাহা নিয়া লড়িতে লাগিলেন—আমরা স্রষ্টা হইয়া বিস্মিত ও বিমুগ্ধ চোখ মেলিয়া বসিয়া রহিলাম। ক্ষিতীশবাবু অবশিষ্ট কদলীগুলির দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া ছােটখাটো একটা বক্তৃতা করিলেন। তার সারমর্ম ছিল- কোন্ গৃহস্থ-বাড়ীর ঘরের কোণে কোন্ কালী-বৃক্ষে ইহারা জন্মলাভ করিয়াছিল, তাহা আমরা অবগত নহি। কত বৃষ্টিতে ভিজিয়া এ রস-পুষ্ট হইয়াছে, রৌত্রে পুড়িয়া পরিপক হইয়া সােনার রং পাইয়াছে এবং ভিতরের রস দানা বঁধিয়া মিষ্টি হইয়াছে-ভাবুন দেখি। বাড়ীর ছেলে-মেয়েগুলি দিনরাত লােলুপ দৃষ্টি নিয়া একে চোখে-চোখে রাখিয়া পাহারা দিয়াছে। কিন্তু একদিন নিষ্ঠুর গৃহ একে ধারালাে ডেটিনিউ- অন্ত্রে কাটিয়া লইয়া শহরের বাজারে বিক্রয় করিয়া গেল, তারপরে ইতিহাস তাে আপনাদের সম্মুখেই বর্তমান। হায় সুন্দরী রম্ভা, কোন নিভৃত পল্লীর ততােধিক নিভৃত গৃহ-প্রাঙ্গণের একধারে তুমি ধীরে ধীরে যৌবনে পদার্পণ করিয়াছিলে, আর আজ লােভর লােত তােমাকে তােমার আশ্রয় হইতে ছিনাইয়া আনিয়া কোথায় কোন পরিণতি ও সর্বনাশের মধ্যে ফেলিয়া গেল। আমরা ‘হিয়ার-হিয়ার’ বলিয়া আনন্দ-ধ্বনি করিয়া উঠিলাম। ফনী উঠিতে উঠিত কহিল-“নেপাল, ওধারের জানালাটা দয়া করে খােলা রেথেচ তাে, যাতে বৃষ্টির জল বিছানা-পত্তর সব ধুইয়ে দিতে পারে ?” -“না বাবু, খােলা রাখব কেন? বৃষ্টি আসতেই বন্ধ করে দিয়েছি।” জেলগেটের ঘড়িতে বারােটা বাজিয়া গিয়াছে। বাহিরে বৃষ্টির বিরাম নাই-বিছানায় শুইয়া তার ধারাপতন-শব্দ শুনিতেছিলাম। চোখে ঘুম ছিল না। আকাশে মেঘে মেঘে ধাক্কা লাগিয়া গুরুগুরু- ধ্বনি উঠিতেছিল। থাকিয়া থাকিয়া বিদ্যুৎ আকাশে চমক দিতেছে, তা’র আলাে বন্ধ জানালার ফাক দিয়া ঘরে আসিয়া অন্ধকারকে পলকের জন্য ফ্যাকাশে করিয়া দিয়া যাইতেছিল। ব্যাংয়ের ডাকেরও ক্লান্তি ছিল না। বৃষ্টিতে ভিজিয়া উৎসাহ তাদের বাড়িয়াছিল, জানালার ওধারে ঘাসের উপর আসিয়াই বর্ষায় এ-গায়ককুল জমায়েৎ হইয়াছে বুঝিলাম। “এক দুই তিন আসামী জানালা-বাতি ঠিক আছে-আট নম্বর।” অর্থাৎ ঘােষণা করা হইতেছে যে, আট-নম্বরের এতজন ১১৮ লে কয়েদী ঠিক আছে ; বাতিও ঠিক আছে—কোন অগ্নিকাণ্ড বা অপকর্ম ঘটে নাই এবং জানালাও তেমনি ঠিক আছে, ভাঙ্গিয়া কেহ পলায়ন করে নাই। ঘুমের মধ্যেই কয়েদীদের সর্দার সমস্ত গণিয়া ও দেখিয়া লইবার অভ্যাস আয়ত্ত করিয়া লইয়াছে, তাই সতর্ক ও হুসিয়ার- নিয়মিত হাঁকিয়া লইতে কোন বাধা করিতেছে না। কান পাতিয়া ঐ টানিয়া-টানিয়া ও চেঁচাইয়া-বলা গণনা শুনি। পাশের লােহার খাটে মশারি ফেলিয়া উপেন-বাবু ঘুমাইতেছেন, জোয়ার-ভাটার মত তা’র নাসিকা-গর্জন বাতাসে দোল খাইতেছে। ভয় হইল, এই নাসিকা-ধ্বনিতে বাহিরের ভেককুল ঘরের মধ্যে আত্মীয়ের সন্ধানে না আসিয়া পড়ে। হঠাৎ তীক্ষ্ণ এক ঝলক আলােক ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। বাহিরের অন্ধকারের বুকে যেন বর্শা বিদ্ধ করিয়াছে, তাই রক্ত-ধারার মত আলােক পিচকারীর বেগে ছিটকাইয়া পড়িয়াছে। কিন্তু ক্ষণিকের জন্য মাত্ৰ-কারণ, পলকেই অন্ধকারের ক্ষত-মুখ বন্ধ হইয়া যায়। সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ বাজ-পড়ার মত শব্দ, লােহার খাটটা পর্যন্ত কাপিয়া উঠে। পাশ ফিরিয়া ভালাে করিয়া চাদরে গা মুড়িয়া লইয়া ঘুমের চেষ্টা করিলাম। এরা সবাই তাে বেশ ঘুমাইতেছে। একই ঘরের মধ্যে রহিয়াছি, আমার খাটের নিকট আসিতে নিদ্রার এমন ভয় বা লজ্জা কেন। মশারি ফেলা আছে, তাই ঢুকিতে পারে না? সকলেরই তাে মশারি কে ঘুমকে বন্দিনী করিয়াছে যে, আসিতে পারিতেছে না? কি আমার খাটের চারিপার্শ্বে মন্ত্র পড়িয়া কোন অদৃশ্য নিষেধ-রেখা কেহ কি অঙ্কিত করিয়া দিয়াছে যে, ঘুম এ-গী কিছুতেই পার হইতে ১১ পারিতেছে না? ঘুমের মাসী-পিসী এরা সব কোথায়, ঘুমের এ-দুর্দিনে বােনঝিকে সাহায্য করিতে অগ্রসর হন না কেন? কানে যেন কেমন একটা শব্দ আসে। কায়ার মতই মনে হয়। কে আবার কঁাদে? জেলের এ-ঘরটাও কি সেই ক্ষুধিত পাষাণ হইয়া আছে? অসম্ভব কি! কত হতভাগ্য এখানে অবরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ও কাৱা রাখিয়া গিয়াছে, তার ইয়ত্তা আছে নাকি! কান-খাড়া করিয়া কায়াটাকে ভালাে করিয়া ধরিতে গেলাম এবং ধরিতে পারিলাম। মশারি তুলিয়া বাহিরে আসিলাম। দেখি ও-ধারে একটা খােলা- জানালায় কে একজন গরাদ ধরিয়া দাঁড়াইয়া বাহিরের অন্ধকার ও বৃষ্টির দিকে চাহিয়া আছে। একটু অগ্রসর হইতেই ভুল বুঝিতে পারিলাম—এ কান্না নয়, গান। পদ পৰ্যন্ত বুঝা যাইতেছে—“বঁধুয়া নিদ নাহি আঁখি- পাতে।” ফণী জানালায় দাড়াইয়া গান করিতেছে। দিনের বেলা সাহস হয় নাই, রাত্রে সবাই ঘুমাইয়া পড়িয়াছে, তায় এই ভয়ানক বৃষ্টি-কেহই শুনিতে পাইবে না মনে করিয়া নিশ্চিন্ত মনে সঙ্গীত সাধনা করিতেছে। গানে হৃদয়ের ভাব আবেগ খুব ভালােভাবে মুক্তি পায়, সে বিশ্বাস আমারও আছে। কিন্তু এমন চাপা গলায়, মানে নাকে গাহিতেছে। কেন? ইহাতে আবেগগুলি বাহির হইতে সুবিধা পাইতেছে কি? পাশে গিয়া দাড়াইলাম, কহিলাম—“বেশ গা কিন্তু। আবহাওয়াটিও কেমন যুৎসই। উঃ, রাত্রির বুকফাটা কান্না যেন ..তোর গানে বেরুচ্ছে। শুয়ে শুয়ে শুনছিলাম, থাকতে পারলাম •

না, উঠে এলাম। কিন্তু আস্তে কেন, চেঁচিয়ে গলা ছেড়ে গা না।”
বলিয়া হাসিয়া ফেলিলাম।
শেষে কহিলাম-“তােকেও এ-রােগে ধরল ?”
ফণী খেপিয়া গেল, কহিল-“না ধরে উপায় আছে। দশজনে
তাে ষড়যন্ত্র করে ঢেকি গিলিয়ে ছেড়েছেন, এখন অনুরােধের ঠেলা
সামলাচ্ছি আমি। পেটের মধ্যে কোনমতে জায়গা করে আপােযে
শান্ত হয়ে থাক, তা না লড়াই লাগিয়েছেন কে কতটা বেশ জায়গা
দখল করতে পারেন। আরে, পেটটাতে আমার রবারের থলি নয়
বে, ভিতর থেকে যত তত মারবি ততই জায়গা বাড়বে। আজ
ঘুমের দফারফা। উঠে এসেছি, দেখি গান শুনে যদি শান্ত হয়ে
ঠাণ্ডা মারে।”
-“এ গানে ঠাণ্ডা না হয়ে উপায় আছে। জোর করে গা
দেখি, কেমন লড়াই না থামে।”
-“পাগল হয়েছিস, গানের কর্ম নয়। নিশ্বাস নেবার মত
জায়গা পর্যন্ত এরা ছাড়তে চায় না। কষ্টে কোনমতে বাতাস ভেতরে
নিচ্ছি, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ঠেলা মেরে ফিরিয়ে দিচ্ছে।”
হাসির শব্দ পাইলাম। পঞ্চানন-বাবুর গলা। কহিলাম-“তুমি
জেগে আছ, ঘুমুওনি?”
পঞ্চানন-বাবু উত্তর দিবার আগে ফণী কহিল-“ঘুমুলে যে অপূর্ব
সঙ্গীত শােনা হয় না। খোঁজ নিয়ে দেখ, মশারির তলে সবাই ও
পেতে আছেন। নিশ্চিন্দি হয়ে নিরিবিলি যে গান গাৰ ভাৰ
যে নাই।
দেখিলাম, সত্যই সবাই জাগিয়া আছেন এবং এই অগীয় সঙ্গীত

জেটিভিউ মুগ্ধ হইয়া শ্রবণ করিতেছিলেম। পঞ্চানন-বাবু কহিলেন-“তুই তাে সব মাটি করলি। আরম্ভ করতে না করতেই উঠে এলি।” অপরাধ স্বীকার করিলাম। সত্যই মন্ত ক্ষতি করিয়া ফেলিয়াছি। এই নাকি-সুরের বঁধুয়া নিদ নাহি আঁখিপাতে’—শনিবার সৌভাগ্য আর হইবে না। যােগ জীবনে কি বারবারই আসে? না, আসে না। একে একে সবাই বাহির হইয়া আসিলেন। আলাে কয়টা জ্বালা হইল। এতক্ষণে উপেন-দাস জাগিল, কহিল—“কি ব্যাপার কি? এই রাতদুপুরে পাশা? কি অলক্ষুণে কাণ্ড, বাবা”—বলিয়া শতরঞ্জির উপর আসিয়া চাপিয়া বসিল। এক সময়ে রাত তিনটার ঘণ্টা জেলগেটে বাজিল। এতক্ষণে চোখের পাতা আমাদের ভারী-ভারী ঠেকিতে লাগিল। খেলা বন্ধ করিয়া আলাে নিভাইয়া বিছানায় গিয়া সবাই টান হইলাম। এবার আর ঘুমের জন্য জাগিতে হইল না। ফণী পর্যন্ত গভীর ঘুমে অচৈতন্য হইয়া পড়িল। বাহিরে কিন্তু বৃষ্টি তেমনি অবিশ্রান্ত ঝরিতে লাগিল। ১৯৩০ সাল, ভারতবর্ষ সত্যাগ্রহ-আন্দোলনে উদ্বেলিত হইয়া উঠিয়াছে। সে-ঢেউএ ইতিমধ্যেই এ-জেলে শ’ আড়াই সত্যাগ্রহী কয়েদী আনিয়া ফেলিয়াছে। নিত্য নূতন লােক আসিতেছে-- জেলের যেন সে এক উৎসব দিন। বন্ধুদের কাজ জুটিয়া গেল। তার বন্দীদের নিয়া ব্যস্ত হইয়া রহিলেন, স্নানাহারের সময় পর্যন্ত তারা পান না। জেলের আইন রীতিমত শিথিল হইয়া উঠিল। আমরা রাত দশটায় বন্ধ হইতাম। জমাদার তালাবন্ধ করিতে আসিয়া দেখিত যে, নির্দিষ্ট সংখ্যা নাই। ১২২ -ভেটিনিউ জিজ্ঞাসা করিত—“পঞ্চা-বাৰু কিবার গিয়া।” ফণী কহিত—“পঞ্চা-বাৰু স্বদেশী করতে ওই ধারকা নম্বরমে গিয়া। দেখগে, জানালার বাইরে দাড়িয়ে স্বদেশী-বাৰুদের সঙ্গে আলাপ জমাদার হাসিয়া ফেলিত, বলিত—‘পঞ্চা-বাৰু হামার নকী খাইয়ে ছাড়বেন।” পঞ্চানন-বাৰু যখন ফিরিবেন তখন যেন তাকে খবর দেওয়া হয়, আসিয়া তালা খুলিয়া দিয়া যাইবে বলিয়া জমাদার চলিয়া যাইত। পঞ্চানন-বাবু কোনদিন রাত একটায় কোনদিন দু’টায় বন্দী হইবার জন্য ব্যারাকে ফিরিতেন। কিন্তু এ সুখ-সুবিধা শেষে আর ছিল না। সত্যাগ্রহীদের উপর মারপিট করা হয়, বাধা দিতে গিয়া ডেটিনিউরাও আহত হয়, পঞ্চানন-বাবুকে ঘণ্টাকয়েকের মধ্যেই জেল হইতে অন্য জেলে বদলী করা হয়-এসব ঘটনা আমি পরে জানিতে পারি, কারণ এর আগেই আমি সিউড়ী জেলে চালান হইয়া আসিয়াছিলাম। একটা ঘটনা এই প্রসঙ্গে মনে পড়িল। তখন পর্যন্ত জেলে সত্যাগ্রহী-বন্দী জনকতকের বেশী আসে নাই, আমরাও মাস দেড়েকের মত হয় আসিয়াছি। জামা-কাপড় ও অন্যান্য নিত্যব্যবহার্য জিনিষের জন্য তাগাদা দিয়া আমাদের ম্যানেজার ক্ষিতীশ-বাবু ক্লান্ত হইয়া হাইল ছাড়িয়া দিয়াছিলেন। জেলার দেখা হইলেই বলিতেন—এই আজকালের মধ্যেই সব আনিয়া দিবেন। আজ আর কাল গড়াইয়া মাসখানেক গেল। বিছানা-বালিশ ইত্যাদি না হয় নাই আসিল, খাটে কম্বল আর হাসপাতালের চাদর বিছাইয়াই কাজ যেমন চলিতেছে তেমন চলিতে পারে। কিন্তু কাপড়ের কাজতাে আর কম্বল পরিয়া চলিবে না। গা ঢাকিয়া ভদ্র হইবার জন্য কয়েকটা গেঞ্জিও ভাে আবশ্যক। জেলাৰ-বাৰু সবই বুঝিতে পারেন দেখিলাম। কিন্তু জিনিষগুলি আনাইয়া দিতে কেন যে পারিতেছেন না, এ-দ্রব্যগুলি বাজারে বিক্রয় বন্ধ হইয়াছে কিনা, কিম্বা এগুলি আমাদের হস্তগত হইলে ইংরেজ সরকারের আর রক্ষা থাকিবে না-এসব কোন কিছুই ঠাহর করিয়া উঠা গেল না। কিন্তু আমাদের ধৈর্যের সীমা ইতিমধ্যেই শেষ হইয়া উঠিল। ক্ষিতীশ-বাবু পরিষ্কারই জানাইলেন-“পারেন তত আপনারাই জিনিষ-পত্তর আদায় করে নেবেন, আমাকে দিয়ে ও-কাজ হবে না। কাহাতক পারা যায় গালাগালি দিলে পৰ্যন্ত স্থল হয় না। বিশেষ করবেন না, শালা পর্যন্ত বলেছি। কিন্তু কোন কাজেই এল না।” কয়েদী কাঙ্গালী পাশে দাড়াইয়া শুনিতেছিল। চটিয়া গিয়া জেলারের সঙ্গে বিশেষ সম্বন্ধ পাতাইয়া লইয়া যাহা কহিল, তাতে এত রাগের মধ্যে ক্ষিতীশ-বাবুও হাসিয়া ফেলিলেন। কাঙ্গালী জানিতে চাহিল যে, জিনিষগুলি কি জেলারের পিতার সম্পত্তি দিয়া কয় করিতে হইবে যে, সে এমনতর তালবাহানা করিতেছে। বলার মত বলিলে পিতা-পিতা বলিয়া জিনিষ পৌছাইয়া দিবার সময় পাইবে না। ভমানুষের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করি—তা’তে কাঙ্গালীর আপত্তি নাই। কিন্তু জেলার ভদ্রলােক নহে, আসলে সে চামার- এ গােপন সম্বাদও সে আমাদিগকে জানাইয়া দিল। পরদিন ভোেরর ব্যাপার। জেলের অন্যান্য অংশ পরিদর্শন শো ১২৪ করিয়া সুপারিন্টেন্টে আমাদের নম্বরে আসিলেন, সঙ্গে জেলায়, ডেপুটি জেলার, নায়েব, হাসপাতালের ডাক্তার, জমাদার ও কয়েকজন সিপাহী। বারান্দা হইতে কথা বলিতে বলিতে তিনি এক সময়ে ঘরের মধ্যে ঢুকিলেন। আমরা সুপারিন্টেণ্ডেন্টকে শ্রদ্ধা করিতাম। বয়স্ক মানুষ, চোখেমুখে একটা উদার শান্তভাব, যখনই আসিতেন তথনই আন্তরিকতার সহিত আমাদের সুখ-সুবিধার খোঁজ-খবর নিতেন। আমাদের জন্য তাঁর স্নেহ এমন অকপট ছিল যে, ব্যবহারে তাহা গােপন থাকিত না। সরল ও উদার এই বয়স্ক বাঙ্গালী সিভিল- সার্জেনের জন্য আমাদের শ্রদ্ধা কোন কারণেই নষ্ট হইবার সুযােগ ঘটে নাই। এর আলােচনা দীর্ঘদিন পরেও বক্সা ও দেউলীতে বসিয়া শ্রদ্ধার সহিতই আমরা করিতাম। সুপার দল-সহ ঘরে আসার সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চানন-বাৰু দরজাটা বন্ধ করিয়া দিলেন। এজন্য আমরা কেহই প্রস্তুত ছিলাম না, কারণ উঁ’র কি অভিসন্ধি ছিল তাহা পূর্বাহ্নে আমরা কেহই জানিতে পারি নাই। সুপার জিজ্ঞাসা করিলেন—“দরজা বন্ধ করলেন যে?” আমরাও কারণ জানিতাম না, তাই পঞ্চানন-বাবুর মুখের দিকে তাকাইয়া রহিলাম। পঞ্চানন-বাৰু কহিলেন-“স্যর, আপনার জেলার আমাদের এখানে confined থাকবেন।” -“আপনি জানেন না, স্যর, আপনার জেলার কি-জাতীয় লােক। একমাস তাগাদা দিয়েও কয়েক জোড়া কাপড় পৰ্যন্ত আদায় করতে পারিনি।”

ডেটিনিউ- -“কেন, আমি তাে অনেক আগেই আপনাদের অর্ডার সই করে দিয়ে দিয়েছি। আপনারা জিনিষ পান নি?” -“আপনার জেলারকেই জিজ্ঞাসা করুন।” সুপার জেলারের দিকে চাহিতেই জেলার-বাবু ঘরের মধ্যে উন্মাদের মত পায়চারী করিতে করিতে যাহা উত্তর দিলেন, তাহার সারমর্ম এই যে—অন্যের উপর ভার দিয়া তিনি অখাদ্য-ভক্ষনকারীর কাজ করিয়াছেন, আজই রাত্রের গাড়ীতে তিনি স্বয়ং কলিকাতা যাইবেন, পরশ্ব-তারিখ ভােরে এই সময়ে মাল আমাদের নম্বরে পৌছাইয়া দিয়া তবে তিনি জল-স্পর্শ করিবেন, এ যদি তিনি না করেন তবে তিনি ব্রাহ্মণের সন্তান নহেন ইত্যাদি ইত্যাদি। দেখিলাম, জেলার অত্যন্ত ভয় পাইয়া গিয়াছেন। ভয়-জিনিষটা এমনই সংক্রামক যে, এক সুপার ব্যতীত সবাই আশঙ্কিত হইয়া পড়িয়াছিল, সিপাহীদের মুখে পৰ্যন্ত ভয়ের চিহ্ন। বিশেষ করিয়া জেল-হাসপাতালের বেঁটেখাটো ভাক্তারটি দেখিলাম ঘাবড়াইয়াছেন বেশী, তিনি দরজার পাশে দাঁড়াইয়া রীতিমত কাপিতে- ছিলেন। সুপার পঞ্চানন-বাবুকে শুধু ভালােই বাসিতেন না, শ্রদ্ধাও করিতেন। কহিলেন—“পঞ্চানন-বাৰু আপনার জিনিষ পাবেন, আমাদের যেতে দিন।”–র একটু গম্ভীর ঠেকিল। পঞ্চানন-বাৰু কহিলেন—“স্যর আপনাকে detain করার ইচ্ছ। আমার মােটেই নাই। আপনার সামনে এটা ঘটে, এ আমার ইচ্ছা ছিল না।—ফণী দরজাটা খােল। স্যর, আমাকে বিশ্বাস করবেন, আপনাকে আমি ধরে রাখিনি।” ১২৬ ফণী দরজায় পিঠ দিয়া দাঁড়াইয়া ছিল, দরজাটা ঈষৎ উন্মুক্ত করিল। কিন্তু সুপার একটুও নড়িলেন না, শান্তভাবে বলিলেন-“পঞ্চানন- বাবু, want to take my Jailor with me. আমার জেলে আমাকে আপনি দশ মিনিট আটক করে রেখেছেন—আপনি কি মনে করেন না যে, you have gone too far?” পঞ্চানন-বাবু উত্তর দিলেন না। সুপার আবার বলিলেন-“আমার জীবনে এতবড় অসম্মান কেউ আমাকে করেনি, আপনি আজ যা করলেন। আমাকে ছেড়ে দিন, আমি যাই।” ভদ্রলােকের চোখে জল আসিয়া পড়িল । পঞ্চানন-বাবু কহিলেন—“স্যর, আপনাকে কেউ আটকায়নি। আপনার দরজা খােলা আছে, কেউ আপনাকে বাধা দেবে না।” -“না, আমি জেলারকে নিয়ে যেতে চাই।” -“আমাকে মাপ করবেন, আমি জেলারকে যেতে দিতে চাইনা। কয়েদীদের সঙ্গে ব্যবহার করে করে স্বভাব এদের এমন হয়েছে যে, মানুষ বলে কাউকেই মনে করেন না। এ ভুল-ধারণা ভাবার দরকার হয়েছে। আমাকে আপনি অনুরােধ করবেন না, জেলার এখানেই থাকবেন। জিনিষপত্তর পাওয়ার সঙ্গেই তিনি যেতে পারবেন, এক মিনিট বেশী আমি তাকে ধরে রাখব না।” অবস্থা সঙ্গীন হইয়া উঠিতেছিল। জেলার এই কথাবার্তার মধ্যেও ছটফট করিয়া ঘরের মধ্যে হাটাও বন্ধ করেন নাই, কি নিজের কথাও থামান নাই—কৈফিয়ৎ ও প্রতিশ্রুতি সমানভাবে দিয়া :২৭ চলিয়াছেন। সুপার গভীর হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। পঞ্চানন-বুও তেমনি চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। দুই পক্ষের একপক্ষ নরম হইলে এ-অবস্থার পরিণতি যে কি হইবে, ভাবিয়া আমরা চিন্তিত হইলাম। পঞ্চানন-বাবুকে চিনি, সেদিক দিয়া কোন সুবিধা হইবে । আর সুপারই বা জেলারকে এদের হাতে রাখিয়া কেমনে যান। যতীনদা অগ্রসর হইয়া কহিলেন-“স্যর, জেলার-বাবুর উপর বিশ্বস বা শ্রদ্ধা আমাদের নেই। আপনি যদি কথা দেন যে, আজ হােল সােমবার, সামনের বুধবার রাত্রের ভিতর আমরা আমাদের সরকারী জিনিষগুলি পাব, তবে আমি পঞ্চাননবাবুকে বলে দেখতে পারি।” সুপার কথা বলিবার আগেই জেলার আগাইয়া আসিয়া বলিলেন -“আমি ব্রাহ্মণ সন্তান, কথা দিচ্ছি, নিজে কলকাতা থেকে মাল এনে আপনাদের দিয়ে যাব।” যতীনদা’ তাহাকে নিরস্ত করিয়া কহিলেন-“থামুন, আপনার সঙ্গে অনেক কথাই হয়েছে, এর সঙ্গে কথা বলছি, আপনি চুপ করুন।” সুপার কহিলেন-“যতীনবাবু, you shall get your articles by Wednesday." যতীনা কহিলেন—“পঞ্চানন, তবে এরা যেতে পারেন, কি বল ?” পঞ্চানন-বাৰু কহিলেন-“স্যার, যতীনদা কথা দিয়েছেন, বাধ্য হয়েই আপনার জেলারকে ছেড়ে দিতে হােল। আপনার জেলারকে kindly একটু সতর্ক করে দেবেন যেন এরকম unpleasant কাজ আমাকে আর না করতে হয়।” ১

তারপর একটু থামিয়া কহিলেন—“আমি আপনার কাছে ক্ষমা
চাচ্ছি। বিশ্বেস করবেন যে, আপনাকে অসম্মান করার মত ইচ্ছা
আমাদের কাৰু নাই, কোনদিন হবে না। আপনাকে আমরা একা
করি।”
সুপার শেষের দিক হইতেই গম্ভীর হইয়া গিয়াছিলেন। কোন
কথা না বলিয়া নিঃশব্দে বাহির হইয়া গেলেন। বারান্দা হইতে
সিড়ি দিয়া নামিতে নামিতে বলিলেন-“আপনাদের articles
আপনারা ঠিক সময়েই পাবেন।”
জেলারকে বলিলেন-“যে কোন রকমেই হােক বুধবারের ভিতর
মাল পৌছে দেবেন,”—বলিয়া দল হইতে একটু আগে একাকী
আমাদের কম্পাউণ্ড হইতে বাহির হইয়া গেলেন।
বর্ষা শেষ হইয়া শরৎ আসিয়া পড়িল, পূজার আর মাসখানেক
বাকী, এমন সময় ফরিদপুর-জেল হইতে সিউড়ী-জেলে আমাকে
স্থানান্তরিত করা হয়। বন্ধুদের এই ভরা-হাটে আমিই প্রথম ভাঙ্গন
আনিলাম। বিদায় দিতে অনেকেই ব্যথা পাইলেন, কিন্তু পিছনে কেহ
ধরিয়া রাখিতে পারিলেন না। ম্লানমুখে জেলগেটে তাহারা দাড়াইয়া
রহিলেন, নৃতন গৃহের উদ্দেশ্যে আমি বাহির হইয়া পড়িলাম।
এক জেল হইতে অন্য জেলে যাইতে মনের যে-অবস্থা হয়, তাহা
অপরের আন্দাজ করিয়া বুঝা সম্ভব নহে। অনুমান প্রমাণের মধ্যে
গণ্য হয় শুনিয়াছি, কিন্তু প্রত্যক্ষের কিছু প্রতিধ্বনি না থাকিলে কোন
অনুমানই প্রমাণে উন্নীত হয় না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ছাড়া মনের
সে-অবস্থা জানার অন্তপথ নাই।

*. নি- এক ইংরেজ সাহিত্যিক জীবনকে একটা পাখীর সহিত তুলন করিয়াছেন—বাহিরের অন্ধকার হইতে এক দরজা দিয়া আলােকিত কক্ষে এ-পাখী আসে, কিছুক্ষণ পাখা ঝাপটাইয়া ঘরের মধ্যে ঘুরিয় বেড়ায়, পরে একসময়ে আর এক দরজা দিয়া বাহিরের তেমনি অন্ধকারে মিলাইয়া যায়। এর সঙ্গে আমাদের মিল আছে, কিন্তু অন্য রকমের। পাখীটি অনন্ত অন্ধকার হইতে ক্ষণিকের আলােকে আসে-আমরা খণ্ড আবদ্ধ আবেষ্টনী হইতে ক্ষণিকের অসীমতায় আসি, আবার এক সময়ে সেই লৌহ-আবেষ্টনীর ক্ষুদ্র আবদ্ধতায় গিয়া আশ্রয় নেই। পাখীটি মুক্তি হইতে বন্ধনে আসিয়া পড়ে আমরা বন্ধন হইতে উন্মুক্ততায় আসি। এই ক্ষণকালের মুক্তি- আস্বাদনে মনের যে-অবস্থা হয়, তাহা অপরের অনুমান করিয়া বুঝা সম্ভব নয়, এই আমার ধারণা। আমি নিজেও তত বহুবার ‘বন্ধন হইতে মুক্ত হইল এ জাতীয় কথা ব্যবহার করিয়াছি, কিন্তু আজ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বুঝিতে পারিয়াছি যে, আমরা যে-সমস্ত কথা ব্যবহার করি তার সঠিক অর্থ জানি না এবং যাহা সত্য বলিয়া জানি, তাহা আসল-জানা হইতে বহুক্ষেত্রেই স্বতন্ত্র ও ভুল-জানাই থাকিয়া যায়। জেলখানা হইতে বাহির হইয়া এই এতদিনের জানা-পৃথিবীকে একেবারে নূতন মনে হয়। বহুদিন যােগে ভুগিয়া একটা ঘরে যাকে থাকিতে হইয়াছে, সে যখন বাহিরে আসিয়া প্রথম সুস্থ চোখে পৃথিবীকে দেখে তা’রও তখন পৃথিবীকে একটু নূতন নূতন লাগে। কিন্তু তার সঙ্গে আমার অবস্থার ভয়ানক একটা ব্যবধান আছে। তার মনে কোন প্রচ্ছন্ন ও পীড়াদায়ক জ্ঞান থাকে না, তার সমস্ত ডেটিনিউ আস্বাদনের পিছনে কেহ বার বার একথা স্মরণ করাইয়া দেয় না যে -তাড়াতাড়ি কর, একে এখনই তােমার চোখের ও মনের আড়ালে সরাইয়া নেওয়া হইল বলিয়া। এক চোখে কেবল জল গড়াইয়া পড়িবে, অন্য চোখে হাসির আলােক খেলিয়া যাইবে—এমনই কঠিন সে মানসিক পরীক্ষা। মন যে কত লােভী ও পিপাসী হইয়া উঠিয়াছে, ধাত্রার এই অবকাশটুকুর মধ্যে তাহা টের পাই। এত লােভ যে এই মনেই গুপ্ত ছিল, জেলে থাকাকালীন একদিনও সন্দেহ করি নাই, কিন্তু বাহিরের মুখখামুখী আসিতেই এরা সব কোথা হইতে এত উগ্র ক্ষুধা নিয়া বাহির হইয়া আসে। মনে হয়, কতকাল যেন মানুষের সঙ্গ পাই নাই। ট্রেণের জানালা হইতে দেখিতে পাইয়াছিলাম যে, লাইনের পাশে খালের জলে কয়েকটী মেয়েছেলে মাছ ধরিতেছে, বােধ হয় সাওতাল হইবে। খােলা গা, কাপড় হাঁটু পর্যন্ত ভােলা। উপরের আকাশ ও নীচের এই নির্জন মাঠের মতই তারা সহজ ও নগ্ন। ট্রেণ লৌহ-পথে ক্ষিপ্তের মত ছুটিয়া চলিয়াছে, মৎস্য-শিকারীরা পিছনে সীমান্তে সরিয়া গেল। মানুষের মন-সাড়ে তিন-হাত শরীরের মধ্যে কোথায় যে সে বসিয়া আছে জানি না। সে-মনকে চোখে দেখা যায় না, হাতের মুঠায় ধরা যায় না—অথচ এই দেহেই সে রহিয়াছে। শরীরে থাকিয়াও সে শরীরী নয়। কিন্তু সেই অশরীরী মন এত লােভ, এত কামনাকে আশ্রয় দিয়া রাখে কেমনে, যার জন্য সমস্ত জীবন অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়া মানুষ ছুটিতে বাধ্য হয়! কোথায় কতদুরে ওরা মাছ ধরিতেছে, চোখের দেখায় তার শেষ হয় না, মনের কাছে সে- সম্বাদ পেীছিতেই একী অদ্ভুত ব্যাপার দেখি ! একপাল পশু যেন এতকাল শিকলে বাঁধা থাকিয়া অনাহারে উপবাসে একাইয়া নিলীৰ হইয়া পড়িয়াছিল। তাদের শিকল খুলিয়া লওয়া হইয়াছে, ছাড়া পাইয়াই ছুটিয়াছে, সম্মুখে যাহা পাইবে ধারালাে নখে ও দাঁতে কামড়াইয়া ছিড়িয়া লইবে। কিন্তু জানিতে ইচ্ছা করে, এক্ষুধার কোন অর্থ আছে কি? যে-লােভ মনের মধ্যে প্রেত-মূর্তির মত বিচরণ করিতেছে, সে-লােভ বাহিরের বস্তু দেখিয়া জিভ, বাহির করিতে চায় কেন? ভিতরের জিনিষ বাহিরে আসিতে পারে কি? মন নিজেই তাে শরীরে আবদ্ধ। নিজের চিন্তা, আশা, ইচ্ছা ইত্যাদির মধ্যেই সে বিচরণ করিতে পারে। সেই মন কিম্বা তা’র লােভ বাহিরে আসিবার জন্য এমন ছটফট করিয়া মরে, এ ব্যর্থ শক্তি-ব্যয় কেন হয়? আমার শত ইচ্ছা থাকিলেও তো আমার মন বাহিরে গিয়া ওদের সান্নিধ্য পাইতে পারে না। বস্তু-জগৎ পড়িয়া আছে, তার আড়ালে বা উপরে ইন্দ্রিয়- জগৎ থাকিতে পারে, মানে আমি বড়জোর চোখ মেলিয়া দেখিয়া থাকি। ইন্দ্রিয়ের বিষয় করাই কি তবে বস্তুকে আয়ত্ত করা? তাহা হইলেই কি দেহাবদ্ধ মন মুক্তি পায়, অশরীরী কামনাগুলি শরীরী হইয়া উঠে ? কে জানে!—আমি শুধু জানি কোথায় কোন দেখা-শােন-ছোঁয়ার জিনিষ রহিয়াছে— চোখ-কান এরাতত দেখিয়া শুনিয়াই খালাস, এর বেশী আগাইতে পারে না—আর এই শরীরের মধ্যে যে-জিনিষটার শরীর নাই, যাকে ‘আমি’ বলিয়া জানি, যাকে ‘মন’ বলিয়া বুঝাইয়া থাকি, সে ১৩২ -ভেটিকিট ক্ষিপ্ত হইয়া উঠে। সে কে, কি তার পরিচয়—এ আমি জানি না। চোখের আড়ালে থাকিয়া আমি পৃথিবীকে রূপময় দেখিয়া শান্ত থাকি না, চোখের জানালার ওধারে স্রষ্টা-আমার পাশেই একদল লােভ-আশা-কামনা মাতালের মত আসিয়া ভিড় করিয়া দাড়ায়। এই আমার শরীরে এতগুলি বিভিন্ন বস্তু আশ্রয় নিয়াছে, যেমন আমিও নিয়াছি। এ-রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলার সম্ভাবনা নাই—এ আমি মর্মে মৰ্মে বুঝিয়াছি। বুঝিয়াছি, এত ক্ষুধা, এত কামনা ও এত লােভ অশরীরী প্রেতের মত মনকে আশ্রয় করিয়া এই শরীরে বাসিন্দা হইয়াছে, এই শরীরকে ধবংস পর্যন্ত পৌছাইয়া দিবার আগে তারা বিদায় নিবে না। এই শরীর পুড়িয়া ছাই হইলে হয়ত অন্য কোন শরীরে এই প্রেতের দল ভর করিবে, কিম্বা এই দেহ-ভন্মেই অপেক্ষা করিবে। একদিন হয়তাে আকাশ হইতে আহ্বান আসিবে—ভশ- অপমান-শয্যা ছাড়, হে অতনু, বীরের তনুতে লহ তনু।” অতনু মন প্রেত-সঙ্গীদলকে নিয়া আবার উজ্জীবিত হইবে—আজ যেন খালের জলে ওদের দেখিতে পাইয়া এরা মৃত্যুশয্যা ছাড়িয়া উঠিয়া দাড়াইয়াছে। কে জানে, এই প্রকাও ভূমণ্ডলের প্রত্যেক পরমাণু-কণায় কোন বিরাট-মন তার প্রেতের দলসহ ছড়াইয়া আছে কিনা, যার জন্য ধূলিটীর পিছনে পর্যন্ত লােভকে গা নাড়া দিতে দেখি। কোন বিরাট-দেহের চিতার ছাইতে এ পৃথিবী গঠিত হইয়া থাকিবে, তাই প্রতি তনুতে অতনু মনগুলির তনু-পিপাসা দেহায় পায়। বােধ হয় অনাদি সময় হইতেই এ রকম হইতেছে। শুধু অনাদি যদি হইয়া থাকে, যদি অনন্ত না হয়-তবে এর বাহিরে যাইবার পথ থাকিলেও ১৩৩ থাকিতে পারে। কিন্তু যা’র আদি নাই, তা'র অন্ত থাকিবে এতবড় বিশ্বাস মানুষ কোন সাহসে করিবে ? আমরা তখন সিউড়ী-জেলে, এমন সময় গুজবটা আসিল। শােন গেল, সরকার সঙ্কল্প করিয়াছেন যে—জেলে আর সেই সব বন্দীদের রাখা হইবে না যারা ভয়ানক, যাদের জন্য জেলের আইন-কানুন ঢিলা হইয়া পড়ে, যারা সত্যাগ্রহীদের সঙ্গে মিশিয়া দল পুষ্ট করে এবং বাহিরে খবর দেওয়া-নেওয়া করে। তা'দের বাছিয়া নিয়া সরকার সরাইয়া রাখিবেন, জায়গাও ঠিক হইয়াছে। বাংলা ও ভূটানের সীমান্তে বসাতে পাহাড়ের উপর সরকারের একটা কেল্লা আছে, বন্দীদের জন্য তাহাই নিৰ্বাচিত হইয়াছে, সেই দুর্গের মিলিটারী- অফিসারের হাতে এদের ভার ন্যস্ত করা হইবে।—কিছুদিন পরে শুনিলাম, যেই কথা সেই কাজ, বাতে লােক নাকি চালান সুরু হইয়া গিয়াছে। ইতিমধ্যে কলিকাতা প্রেসিডেন্সি-জেল হইতে আমাদের জেলে বদলী হইয়া আসিলেন ডাক্তার জ্যোতির্ময় শৰ্মা। হউক না রং ধাের কৃষ্ণবর্ণ, তবু তিনি রাজধানীর প্রধান জেলের আমদানী বন্দী, পদ- মৰ্য্যাদা তার আছে বৈকি। আমরা নূতন সাথীকে ঘিরিয়া লইয়া বসিলাম-“কি বারতা রে দূত !” তিনি বক্সার যে-বর্ণনা আমাদিগকে শুনাইলেন, তাহাতে আমাদের শরীরের কোন কোন যন্ত্রপাতি চমকাইয়া উঠিল। লােকটার মতলব কি? ভয় দেখাইতে ভালবাসেন বুঝি? তবে তাে স্বভাব মােটেই ভাল নয় দেখিতেছি। উপরটা যেমন কালাে, ১৩৪ ৭। ভিতরটিও কি তপ ঘাের কৃষ্ণবর্ণ ? কিন্তু পুনঃ পুনঃ প্রশ্ন করিয়াও আমাদের ধারণা তেমনি দৃঢ় রহিয়া গেল যে, ডাক্তার শৰ্মা সত্য খবরই কহিতেছেন। কেন, মানুষ কি কোন ক্ষেত্রেই মিথ্যা কহিতে পারে না? সত্যি বলিতেছি যে, এ-ক্ষেত্রে যদি শৰ্ম্মাকে মিথ্যাবাদী বলিয়া জানিতে পারিতাম, তবেই আমরা খুসী হইতে পারিতাম। সত্য কথার মত কষ্টদায়ক ও দুঃখ-কারক আর কোন বস্তু নাই, এমনই একটা বিশ্বাস সেদিন আমাদের হইয়াছিল। অথচ আশ্চৰ্য্য এই যে-বসা যে ভয়ানক স্থান, সেখানে যে অবস্থা সঙ্গীন হইয়া উঠিতে একান্ত বাধ্য, অর্থাৎ তাহার ভীতি-জনকত্ব প্রমাণ হইতে পারে এমন কোন সঠিক কিছু খবর শৰ্ম্মাও বলিতে পারে নাই, আমরাও সংগ্রহ করিতে পারি নাই। কিন্তু তবু বক্তা ও শ্রোতা সকলেই আমরা এক বিষয়ে নিঃসন্দেহ হইয়া রহিলাম যে-ভিডি ঐ ঢল্লো।” ভয় যা’কে ধরে এমন করিয়াই ধরে যে, অবিশ্বাসের আর কোন জায়গা রাখে না। এমন কি, একদিন জেলার ভদ্রলােক পৰ্যন্ত বসার বিষয়ে এমন ভাবে বলিলেন যে, আমরা বুঝিতে পারিলাম যে বন্দীদের শায়েস্তা করিবার আয়ােজন সত্যই হইতেছে। চেয়ারে বসিয়া জেলার এক সময়ে জিজ্ঞাসা করিলেন-“বসার কথা শুনেছেন তাে? অদৃষ্টে অনেকের দুঃখ আছে।” তাহাকে জেরা করিয়া কিন্তু বুঝা গেল যে, তিনিও বিশেষ কিছু জানেন না, তবে শুনিয়াছেন সে নাকি ভয়ানক ব্যাপার। আমাদের একজন জিজ্ঞাসা করিল—“আচ্ছা জেলারবাবু, সৈন্যদের মত দু’বেলা প্যারেড় করাবে নাতাে?” জেলার চুরুটের ধোঁয়া ছাড়িয়া লইয়া কহিলেন—“তা'তে ১৫

করাবেই। নইলে কোর্টেই বা নেবে কেন, আর মিলিটারীর জিম্মায়ই
বা দেবে কেন।”
-“আচ্ছা, উঠতে বসতে দেখা হলেই বােধ হয় অফিসারদের
সেলাম করতে হবে?”
জেলার তেমনি দ্বিধাহীন জবাব দেন—“তাতাে হবেই।
মিলিটারীদের ডিসিপ্লিনই তাে সব,
ও ভাঙ্গবার যাে নাই।
গ হলে একেবারে কোর্ট মার্শাল।”
আর এক বন্ধু জানিতে চাহিল—“নিজেদেরই বােধ হয় পালা
করে পাহারা দিতে হবে?”
জেলার সামান্য এবটু ভাবিয়া লইয়া কহিলেন—“বাইরের গেটে
ওরাই থাকবে।
ভিতরে নিজেদের পাহারা দিতে হবে, সে তাে
ধরা কথা।”
ধরা-কথা শুনিয়া প্রশ্নকর্তা চুপ করিলে অপর একজন প্রশ্ন করিল
-“সেখানে বােধ হয় ঠাকুর চাকর বা কয়েদী নাই ?”
জেলার দুই চক্ষুর উপরের দুই ভ্র আরও একটু উপরে টানিয়া
লইয়া উত্তর দিলেন-“কি, ঠাকুর চাকর? পাগল হােয়েছেন, ওসব
থাকবে ওখানে! দুর্গের ভিতর কাক-চিলের পর্যন্ত ঢােকার নিয়ম
নাই।”
-“তবে রান্না-বান্না কাজ-কর্ম চলবে কেমন করে? তাও কি
নিজেদের করতে হবে?”
-“তবে কি না খেয়ে মরবেন? খেতে যখন হবেই, তখন রান্না
না করে উপায় কি?
ৰলিয়া জেলার-বাবু একমুখ-ধোয়া শূন্যের দিকে উব-মুখ হইয়া
১৩৬

মুক্ত করিলেন। এই জেলার লােকটিকে আমরা এতকাল ভালাে
বলিয়াই জানিতাম। এখন দেখিতেছি, তিনি রীতিমত ভয়ানক
লােক। অন্যের বিপদে এমন নিশ্চিন্ত হইয়া যিনি চুরুট টানিতে
পারেন—যাক, ভগবান আছেন, তার কাছে তােত কোন পাপ গােপন
থাকে না, তিনিই ব্যাটাকে দেখিয়া লইবেন।
জেলার-বাবু কহিলেন—“আমাদের এখান থেকে কেউ যাবেন
নাকি?”
-“কেন, কোন খবর পেয়েছেন নাকি?”—আমরা চাপিয়া
ধরিলাম।
জেলার উত্তর দিলেন-“খবর এলে জানতেই পাবেন, আমি
তাে আর যাচ্ছি না—আপনারাই যাবেন।”
বুঝিলাম, আস্ত সয়তানের পারায় পড়িয়াছি। তবু নাছােড়বান্দা
হইয়া আমাদের একজন প্রশ্ন করিলেন--“তাতে ঠিকই, যেতে হলে
অামরাই যাব, আপনাকে কেন আর টানা-হেঁচড়া করব। সত্যি বলুন,
কোন খবর পেয়েছেন কি না?”
এবার জেলার একটু হাসিলেন, কহিলেন-“না, আমরা কোন
খবর পাই নি। তবে পুলিশ-ক্লাবে কাল সন্ধ্যায় কথা হচ্ছিল,
শুনলাম যে, এখান থেকে আপনাদের মধ্যে কয়েকজন যেতেও হয়তাে
পারেন।
-“নাম শুনেছন?”—আমরা প্রশ্ন করিলাম।
-“না, নাম শুনি নি। ওরাও আমাদের মতই আন্দাজে ঢিল
চুড়ছে। যদি অর্ডার আসেই তবে আগেই জানতে পাবেন, কথা
দিচ্ছি।”
১৩৭

ডেটিনিউ ১ ভরসা দিয়া জেলার-বাবু উঠিয়া দাড়াইলেন। আফিসে কি কাজ আছে, যাইতে হইবে, তাই আর বিলম্ব করিলেন না। ‘সময় যখন আসিবে আপনি যাইব তােমার কুঞ্জে’-এই ভাব নিয়া আমরা দিন যাপন করিতে লাগিলাম। বলিতে লজ্জা নাই, আমােদে-আহলাদে গল্পে-গুজবে হৈ-হৈ করিয়া দিনগুলিকে আমরা দুই হাতে উড়াইয়া দিতে লাগিলাম। সময়ের যেন সে-দিন পাখা গজাইয়াছিল। আর আজ ? আজ সময় কাটিতেই চায় না, তার পাখাটা যেন কেমন করিয়া কাটা পড়িয়াছে। নদী আর কাল-গতি উভয়েই নাকি সমান। তা হইলে বুঝিতে হইবে, পৃথিবীর সমস্ত নদী এতদিনে পক্ষাঘাতগ্রস্তের মত মন্থর হইয়াছে, জল নিয়া আর চলিতে পারে না। কিম্বা--সমস্ত নদীর জল শুকাইয়া গিয়াছে, স্রোতও মরিয়া গিয়াছে, মরা-নদীর শুষ্ক বালু-কঙ্কালে গতি আর গতায়াত করে না। আজিকার সময়ের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকিলে নদীগুলির এছাড়া আর কিই বা পরিণতি হইতে পারে, আমি তাে বুঝি না। কিন্তু সাত বছর আগে এমন ছিল না। সময় যেন যুদ্ধের ঘােড়া, ধাইয়া চলিয়াছে—ক্ষুর-ঘর্ষণে ঋতু-আবর্তিত হইতেছে, আকাশে গ্রহ- উপগ্রহ পরস্পরকে ঘিরিয়া নাচিয়া ধাইয়া চলিয়াছে। সময়ের ঘােড়াকে সেদিন কে যেন কঠিন চাবুক মারিয়া ক্ষেপাইয়া লইয়া উন্মত্তের মত ছুটাইয়াছিলেন। আমাদেরও সে-নেশা লাগিয়াছিল। আমরা দুই হাতে দিন-রাত্রি আকাশে উড়াইয়া দিতাম। সিউড়ী-জেলে আমরা ছিলাম চৌদ্দজন। আর অন্য দিকে সত্যাগ্রহীর সংখ্যা ছিল শ’কয়েক। মেলা-মেশা আইনে নিষেধ ১৩৮ -ভেটিনিউ ছিল, কিন্তু কার্ষ্যে নিষেধ ছিল না। কারণ, সত্যাগ্রহীরা এ-নিষেধ মানিয়া চলিত না। আর, আমাদের তে নিষেধ মানিলে কাজ চলে না। ইতিমধ্যে পূজা আসিয়া পড়িল। কংগ্রেস-নেতা ডাক্তার শরচ্চন্দ্র-মুখার্জীর সাহায্যে ও অন্যান্য সকলের উৎসাহে সত্যাগ্রহীরা পূজার আয়ােজন করিয়া ফেলিলেন। পূজার ভােজ খাইলাম এবং সত্যাগ্রহীদের অনুষ্ঠিত থিয়েটার পর্যন্ত দেখিতে পাইলাম। থিয়েটারের কথা আজও বেশ পরিষ্কার মনে আছে। যে-পিস্তলটী দিয়া গােবিন্দ-লাল রাত্রে রােহিণীকে গুলি করিয়া মারিয়াছিল, পরের দিন ভােরে বন্ধুবর শচীশ-সরকারের হাতে সেই স্মরণীয় বস্তুটী দেখিতে পাইলাম । জানি না, জিনিষটি তিনি রক্ষা করিয়াছেন কি না। না করিয়া থাকিলে করা উচিৎ ছিল। নানা কারণেই সে-বস্তুটি সযতে রক্ষার যােগ্য ছিল। দেখিলাম, গাছের ছােট্ট একটি বাঁকা ভালই পিস্তলের কাজটা চালাইয়া দিয়াছে। কিন্তু কাজটা অপরের দোষে নিখুতভাবে হইতে পারে নাই, বি উপস্থিত হইয়াছিল। কেমন করিয়া, তাহাই বলিতেছি। ভয়ানক সময় উপস্থিত হইল। গােবিন্দ-লাল বুঝিল, রােহিণী পাপিঠা, পর-পুরুষে আসক্ত। তার জন্য খামােকা ভ্রমরকে ত্যাগ করিয়াছে, আমােক অকলঙ্ক-চরিত্রে কালি লাগাইয়াছে-দুঃখে ও কষ্টে গােবিন্দ-লালের বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। মানুষের বুকতাে, কিছু আর লােহা-পাথরে বানানাে নয়। ভিতরে তার যে-উত্তাপ ও জ্বালা, তাতে বুঝি লােহাও গলিয়া যাইত। कावा -- ক্রোধে-মিশানাে গলায় গােবিন্দ-লাল প্রশ্ন করিল—“তুমি কি-ই রােহিণী?” তারপর ডান হাতটা সামনের দিকে বাড়াইয়া লইয়া কহিল- “এই দেখ পিস্তল !” রােহিণী পিস্তল দেখিল। স্পষ্ট বােঝা গেল, দেখিয়াই রােহিণী ভয় পাইয়াছে। গগাবিন্দ-লাল তেমনি আছে, হাত একটুও বাঁকাইলনা, বরাবর টান রাখিয়াই জানিতে চাহিল—“কেমন, মরতে পারবে?” রােহিণী মরিতে পারিবে না, কারণ ভরা-যৌবন, নানা সাধ- আহলাদ ইত্যাদি বিস্তর অন্তরায় আছে।...না-না, তা’র বাচা হইবে না। রােহিণী বঁচিলে অনেক লােকের অসুবিধা হইবে, তাদেরও সাধ-আহলাদ তাকে (রােহিণীকে) দেখিয়া জাগিয়া বসিবে, যেমন তা'র (গােবিন্দ-লাল) জাগিয়াছিল। না—তা’র বাচা হইবে না, হইতে পারে না, গােবিন্দ লাল ঠিক করিয়া ফেলিয়াছে•••উহু, এর আর নট নড়ন, নটু চড়ন। গােবিন্দ-লাল ভানপা সামনে বাড়াইয়া লইল-পিস্তলশুদ্ধ ডান- হাত কিন্তু তেমনি রােহিণীর মুখের দিকে প্রসারিত আছে। গােবিন্দ- লাল আজ সত্যই ঘাতক। রােহিণী কাদিয়া ফেলিল। ভঙ্গীভরে উত্তোলিত দুইহাতে মুখের সম্মুখে একটা ভঙ্গুর আচ্ছাদন রচনা করিয়া কহিল—“না না, মেরাে না।” আমরা দম বন্ধ করিয়া রহিলাম। গাের্বিন্দ-লালের লাল চকুতে ক্ষমার চিহ্ন পৰ্যন্ত নাই। গগাবিন্দ লাল কহিল-“তুমি মর-ও,” বলিয়া পিস্তল টিপিয়া দিল।

কিন্তু আওয়াজ হইতেছে না কেন? কুদ্ধ গােবিন্দ-সাল উয়িংসের দিকে ঘাড় বাঁকা করিয়া চাহিল। পিস্তলের আওয়াজটা বােধ হয় সেখান হইতে আসার কথা, তার কাজ ছিল শুধু পিস্তলটা টিপিয়া দেওয়া। আওয়াজ আসিতেছে না-গােবিন্দ-লাল পিস্তল বাগাইয়া রাখিল। এবং দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া বােহিণী বজ্জাত ঘোড়ার মত খাড়া দাঁড়াইয়া রহিল, আওয়াজ-না-আসা পর্যন্ত যতটুকু পারে বাচিয়া লওয়ার মতলব তার। অবশেষে, যার উপর ভার ছিল, তিনি আওয়াজ ছাড়িলেন । রােহিণী ধপাস করিয়া আছাড় খাইয়া পড়িল এবং মরিয়া রহিল। পর্দাও ঝপাং করিম। নামিয়া পড়িল।—এতক্ষণে আমরা নিঃশ্বাস মুক্ত করিয়া কুম্ভকের কষ্ট হইতে বাঁচিলাম । বন্ধুবর শচীশ-সরকার দেখি উঠিয়া দাড়াইলেন। কহিলাম— “কোথায় যাচ্ছেন ? থিয়েটার শেষ হয়নি, আরও বাকী আছে, বসুন।” “আসছি”—বলিয়া তিনি গ্রীণ-রুমের দিকে চলিয়া গেলেন। থিয়েটার সুরু হইতে তিনি এক সময়ে আসিয়া নিঃশব্দে নিজের জায়গায় বসিলেন। কিন্তু কোথায় ও কেন গিয়াছিলেন, তখন আর জিজ্ঞাসা করিতে পারি নাই। ভােরে একটু বেলা করিয়া ঘুম ভাঙ্গিল, থিয়েটার শুনিয়া আসিয়া ঘুমাইতে অনেক রাত হইয়াছিল। ঘুম ভাঙ্গিয়া বিছানায় বসিয়া ছিলাম। কয়েদী আসিয়া মশারি তুলিয়া দিয়া গিয়াছিল। এমন সময়ে শচীশ-বাবু ঘরে ঢুকিলেন । আমার নাকের ডগার সামনে কি একটা বস্তু ধরিয়া কহিলেন- “এই দেখুন পিস্তল। কেমন মরতে পারবেন?” ১৪১ -“দেখি, আমার হাতে একটু দিন তো।” আবেদন গ্রাহ হইল না। অন্যান্য সকলের দিকে পিস্তলের মুখটা ঘুরাইয়া লইয়া শচীশ-বাবু কহিলেন-“আপনারা অনেক পিস্তল দেখেছেন, কিন্তু এ-রকমটী আর দেখেন নি, আমি জোর করে বলতে পারি। এর কত সুবিধে জানেন? এ-পিস্তল থাকে একজনের হাতে, শব্দ থাকে অপরের মুখে, শুধু মন্ত্রোচ্চারণ করতে হবে “রােহিণী তবে তুমি মরও,” সঙ্গে-সঙ্গেই কাৰ্য-সিদ্ধি, না মরে আর রক্ষা নাই। এ- রকম পিস্তল যদি আপনাদের থাকত, তবে এ-দেশের সাহেব সাবাড় করতে একটা মাসও লাগত না। এ-পিস্তল তাই আমি কাল স্বয়ং গিয়ে গ্রীণ-রুম থেকে কেড়ে নিয়ে এসেছি।” ধাঁকা ডাল-রূপী পিস্তলকে হস্তগত করিবার জন্য অনেকগুলি উর্ধ-বাহু দেখা গেল। অবশেষে সেটা সন্তোষ-গাঙ্গুলীর দখলে গিয়া সন্তোষ-বাবু সাহিত্যিক মানুষ ছিলেন, বলিতেও পারিতেন, কহিলেন-“হে পিস্তল, ত্রেতায় তুমি পরশুরামের কুড়ালের আছাড়ি ছিলে, এবার কলিতে গােবিন্দ-লালের ডালের পিস্তল হইয়াছ। পরশুরাম কুড়াল দিয়া কোপাইয়া মাকে মারিয়াছিলেন, গােবিন্দ-লাল তােমাকে দিয়া রােহিণীকে মারিলেন। কিন্তু রােহিণী কে ?” বলিয়া সন্তোষ-বাবু চারিদিকে জিজ্ঞাসু-চোখ ঘুরাইয়া লইলেন। এবং পরে নিজেই যােগ করিলেন—“রােহিণী কে ? পড়িল। ••••হে মাতা, নহৈ কন্যা, নহে বধু, শুধু সুন্দরী রূপসী। ১৪২ সিউড়ীর একটী সন্ধ্যার কথা বিশেষ করিয়া আমার মনে আছে। বেশ মনে পড়ে, সন্ধ্যার পর একটা বাঁধানাে ইদারার চত্বরের উপর বসিয়া আছি। পৃথিবীতে সন্ধ্যা নামিয়াছে, আকাশে কিন্তু তখনও রং মিলায় নাই। পশ্চিম দিকটার রং ধীরে ধীরে মরিয়া আসিতে দেখিলাম। একটা একটী করিয়া আকাশে তারা আসিল, তাও দেখিলাম। মাথার উপর দিয়া বাদুড় উড়িয়া গেল-বসিয়াই রহিলাম। ক্রমে আকাশ অন্ধকার হইয়া উঠিল, নীচে পৃথিবীতে রাত্র দেখা দিল। সিউড়ীর রাত্রির আকাশ সেদিন আমাকে মুগ্ধ করিয়াছিল। শরৎকালের আকাশ পূর্ব-বাংলায়ও পরিষ্কার কম নয়, কিন্তু এ- আকাশের সঙ্গে তুলনাই হয় না। যতদূর দৃষ্টি যাইতেছে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আকাশ ঝক ঝক্ করিতেছে। এমন আকাশে জ্বলন্ত তারা মুঠা মুঠা ছিটাইয়া দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু দেখিয়া সন্দেহ থাকেনা। যে, প্রত্যেকটি তারার পিছনে কোন্ এক অদৃশ্য শিল্পীর প্রেম-স্পর্শ রহিয়াছে। প্রিয়-সােহাগিনীকে কে যেন সযত্নে সাজাইয়া লইয়াছে- এখন পরম পরিতৃপ্তির সহিত সারা রাত্র ভরিয়া দেখিবে। আকাশের তুলনা নাই। ১৪৩ ভেটিনি- বছর দেড়েক দুই পরে আর এক আকাশ দেখিয়াছিলাম দেউলীতে গিয়া। তাও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কিন্তু এ-কথায় সে-মরুভূমির আকাশের কিছুই বােঝা যায় না। রাজপুতনার আকাশে কোথাও স্নিগ্ধতা নাই, সে-আকাশের সব শ্যামল লাবণ্য আগুণে পােড়াইয়া নিঃশেষে কাড়িয়া লওয়া হইয়াছে। কবি বলিয়াছিলেন, “রাজপুতানীর দেহে কোথাও নাই কি কোমলতা ?” কেমন করিয়া থাকিবে ? থাকিবার কথাও নহে। এমন নির্মম আকাশের তলে জন্মিয়া- ছিলেন, তারই আচ্ছাদন তলে দিনে দিনে বাড়িয়াছিলেন, তাই রাণী-পদ্মিণী সহস্র সখী নিয়া জহর-আগুনে স্নান করিতে ঝাঁপ দিতে পারিয়াছিলেন। সে-আকাশে দয়া নাই, মমতা নাই, চাহিলে চোখ পুড়িয়া যায়—অনন্তকাল ধরিয়া ওখানে যেন তপতী সীতার অগ্নি- পরীক্ষা চলিতেছে। আমার মাথার উপর সিউড়ীর আকাশ বহু পূর্বেই সন্ধ্যার কালাে জলে অবগাহন করিয়া দিনের দাহ ধুইয়া ফেলিয়াছিল। স্পর্শ করিবার প্রয়ােজন হয়না, সেই শ্যাম-স্নিগ্ধতার দিকে চাহিয়াই চক্ষু জুড়াইয়া যায়, মন তৃপ্তি-রসে আপনার মধ্যে আপনি সঘন হইয়া আসে। সমস্ত মনখানি আকাশের দিকে পেয়ালার মত ধরিয়া রাখিয়াছিলাম। মনের মধ্যে সে দিন এক অদ্ভুত ভিক্ষুককে দেখিয়া- ছিলাম, অনন্তের দিকে পিপাসার পাত্র বাড়াইয়া কি পানীয় সে প্রার্থনা করিতেছিল, তাহা বুঝাইব কেমন করিয়া ! আজ ভাবি আমারই মন, অথচ তার কতটুকু পরিচয়ই বা আমি জানি। মগ্ন হইয়া ছিলাম, বিশেষ কিছু ভাবিতেছিলাম, তাও নয়। বরং চিন্তা-স্রোত যেন স্তিমিত হইয়া আসিয়াছিল এবং কি এক অপূর্ব- ১৪৪ রস মনের অষ্ট্রে-বন্ধে সঞ্চারিত হইতেছিল। ধ্যান-রসের সম্বাদ রাখি , অথচ এযে কি-রস তার সংজ্ঞা আমার জানা নাই। এমন সময় আমার নাম ধরিয়া কে ডাকিতেছে, শুনিতে পাইলাম। সজাগ হইয়া চাহিতেই দেখি ঢাকার ঝুমু-বাবু (হীরেন-মজুমদার) পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন। অন্ধকারে তার মুখ পরিষ্কার দেখা যাইতেছিলনা, কিন্তু সুরে উত্তেজনার চিহ্ন এবং ভাবে খুব ব্যস্ত-সমস্ত। কহিলাম—“কি, ব্যাপার কি?” -“চলুন, তাড়াতাড়ি চলুন। অম্বিকা-চক্রবর্তীকে নিয়ে যাচ্ছে।” —“কা’কে নিয়ে যাচ্ছে?” বলিয়া উঠিয়া দাড়াইলাম। চলিতে চলিতে কহিলেন-“চাটগার অম্বিকা চক্রবর্তী-আম্মারী- রেইড কেসের ; অবস্থা খুব খারাপ। এই মাত্র এই জেলে নিয়ে এসেছে।” অম্বিকা-বাবুকে আমি চিনিতাম। তাড়াতাড়ি জেলগেটের দিকে দৌড়াইয়া গেলাম। কিছুদূর আগাইতেই দেখি যে, কয়েকটা লণ্ঠন লইয়া কাহারা থাইসিস-ওয়ার্ডের দিকে যাইতেছে। আগাইয়া গেলাম। দু’জন বাহক একটা স্ট্রেচার বহিয়া আস্তে আস্তে যাইতে- ছিল, সঙ্গে গুটিকয়েক সিপাই, জমাদার, ডাক্তার ও জেলার-বাবু। আমাদিগকে দেখিয়া জেলার ষ্ট্রোর পথের মধ্যে নামাইতে হুকুম দিলেন। দেখিলাম, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার-লুণ্ঠন মামলার বিখ্যাত আসামী অম্বিকা চক্রবর্তীর চামড়ায়-ঢাকা দীর্ঘ কঙ্কালখানি মাত্র শায়িত পড়িয়া আছে। অতি কষ্টে কথা কহিলেন। বলিলেন যে, শরীরের অবস্থা ভালাে নয়, সামান্য কাশ দিতেই গলা দিয়া রক্ত বাহির হয়। শেষে একটু হাসিয়া কহিলেন-“শেষকালে এইভাবে মর” কথাটা আর শেষ করেন নাই। আমাকে কহিলেন-“যান যেন।” বাহকেরা তাহাকে লইয়া যক্ষ্ম-ওয়ার্ডের দিকে চলিয়া গেল। এই জেলের মধ্যেই এক-ধারে দেয়াল দিয়া যক্ষ্মারােগীর ওয়ার্ড স্বতন্ত্র করিয়া রাখা হইয়াছে—জেলের মধ্যে আর একটী জেল যেন। যক্ষ্মারােগীর ওয়ার্ডে সিপাহী, ডাক্তার ও জেল-কর্মচারী ব্যতীত অপরের যাওয়া নিষেধ, উপায়ও নাই—গেটের দরজা বন্ধ করিয়া পাহারা সেখানে মােতায়েন থাকে। তাছাড়া আমরাও খারাপ চরিত্রের বন্দী, আমাদের গতিবিধি জেল-আইনে সীমাবদ্ধ। তবু আমরা সত্যাগ্রহীর আড্ডায় যাইতাম, তাঁরাও আসিতেন। একই জেল, দেয়ালের ব্যবধান ছিলনা, তাই যাতায়াত চলিতে পারিত। কিন্তু গেটে পাহারা, দরজা বন্ধ, তদুপরি দেয়াল দিয়া স্বতন্ত্র করিয়া রাখা থাইসি-ওয়ার্ড, সেখানে গিয়া কেমন করিয়া দেখা করিব, ভাবনা হইল। সর্বোপরি, আরমারী-রেইড মামলার আসামী, পাহারার কড়াকড়ি একটু বেশীই হইবে। ভাবনাটা, কাজেই, একটু হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কাৰ্য-কালে দেখিলাম, যত ভাবিয়াছিলাম, ততখানি না ভাবিলেও চলিত। সময়কালে দরজা খােলা পাওয়া গেল। বেলা গােটা নয়-দশের সময় পরদিন অম্বিকা-বাবুর ঘরে গিয়া উপস্থিত হইলাম। দেখি, বিছানার উপর বসিয়া আছেন। হাসিমুখে অভ্যর্থনা করিলেন—“বসুন।” চেয়ার টানিয়া বসিলাম। শরীরের অবস্থা জিজ্ঞাসা করিলাম। ১৪৬

শুনিলাম, সরকার তার বিচার স্থগিত রাখিয়াছেন, যদি সারিয়া সত্যই
একদিন উঠেন তখন বিচার করা হইবে। অম্বিকা-বাবু নিজে
জীবনের আশা রাখেন না। তার ধারণা যে, আয়ু ঠা’র প্রায় শেষ
হইয়া আসিয়াছে। স্বাস্থ্যের অবস্থা দেখিয়া আমারও তাই মনে
হইল। যদি এ-নােগ ও অবস্থা হইতে সারিয়া উঠেন, তবে সে
একটা আশ্চর্যের বিষয় হইবে।
কহিলাম-“জায়গাটা ভালাে, আর rest-ও পাবেন, দেখবেন
ভালাে হয়ে উঠছেন।”
শান্তভাবে কহিলেন—“শেষে এই ভাবে রােগে ভুগে শেষ হওয়া।
যদি মরতেই হয়, তবে এভাবে নয়। ফাসি দিলে তবু একটা
সান্ত্বনা থাকত, কিন্তু ভালাে না হয়ে উঠলে সে-সম্ভাবনা কই ?”
বুঝিলাম, রােগীর মৃত্যুতে তার ঘৃণা রহিয়াছে, সারা মন দিয়া
আজ একটা মাত্র জিনিষ তিনি কামনা করিতেছেন—তা বিদ্রোহীর
গৌরবজনক মৃত্যু।
কহিলাম-“আমরা খবর পেয়েছিলাম যে, আপনি মারা
গেছেন।
হাসিয়া কহিলেন—“আত্মীয়েরাও তাই মনে করে শ্রদ্ধাদি
কাজ সেরে রেখেছেন। সবাই মনে করেছেন যে, আমি মারা গেছি।
এ-ভুল সরকারও করেছিল। বাচাটা সত্যই একটা আশ্চর্য ব্যাপার
হয়েছে। কেমন করে বাঁচলাম তাই ভাবি।”
—“কেন, কি হয়েছিল?
উত্তরে যাহা বলিলেন এবং শরীরের যেসব চিহ্ন দেখাইলেন,
তা’তে বিস্মিত হইতে হয় যে, মৃত্যুর হাত তিনি এড়াইলেন কেমন
১৪৭

করিয়া। বাঁচাটা মস্ত একটা accident বলিয়াই আমার মনে
হইল।
বুকে কালাে কালো দাগ দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম-“এগুলি
কি?”
মুচকি হাসিয়া কহিলেন—“কালশিটে।”
--“তাতে দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কেমন করে হােল ?”
-“বুটের পেরেকে, আর বন্দুকের কুদায়।”
চাহিয়া থাকিতে দেখিয়া বলিলেন--“বুঝতে পারলেন না?
আচ্ছা বলছি,” বলিয়া হাঁটু ও উরুর কাপড় সরাইয়া দেখাইলেন,
কালশিটে সব ছাইয়া আছে।
-“আরও আছে, দেখাতে পারলাম না। ধরা-পড়ার পর
আক্রোশ মিটাবার জন্য বুট-পায়ে শরীরের উপর দিয়ে প্যারেড,
করেছে, বন্দুকের কুদাও ব্যবহৃত হয়েছে।-গলাদিয়ে রক্ত-পড়া সেই
থেকেই শুরু হয়েছে।”
—“কারা ? ইউরােপীয়ান-অফিসাররা করেছেন?”
—“তারাও ভালাে ব্যবহার করেন নি অব। কিন্তু এ-কীর্তি
কয়েকটি দেশী পুলিশ-কর্মচারীর। অনেক সময়ই ভাবি, বাঙ্গালী
হয়েও এ-রকম বিজাতীয় আক্রোশ তাঁদের আসে কি করে, তাদের
এ-মনােবৃত্তির হেতুই বা কি ? অজ্ঞান হয়ে গেছি, তবু বুট-পায়ে
সমান বুকের উপর দিয়ে মাড়িয়ে যাচ্ছেন। জঘন্য গালাগালির কথা
নয় ছেড়েই দিলাম। কিন্তু এ-ব্যবহার—আমি তাে কারণ ভেবে
পাইনা।”
চুপ করিয়া শুনিতেছিলাম। কিন্তু সেদিন ভিতরে রক্তে যে
১৪৮

জ্বালা বােধ করিয়াছিলাম, আজও ত’ মনে আছে। রক্তে কামড় লাগে—পােকায় যেন আগুনের বিষ ছড়ায়। মাথায় রক্ত চাপিলে মানুষের যে কি-খুনী চেহারা হয়, তা কতকটা সেই দিন জানিতে পারিয়াছিলাম। আজ আর মাথায় রক্ত উঠেনা, রাগও হয় না লজ্জা একটু হয়, তা’ও সাময়িক। স্বজাতীয়ের অধঃপতন ও চরিত্রহীনতায় লজ্জিত হই বটে কিন্তু বেশীক্ষণের জন্য সে-লজ্জা মনে থাকেনা। শুধু মনে ভাবনা গভীর হয় যে, আর কত নীচে নামিতে হইবে! যত ক্ষুদ্র ও হীন হওয়ার, তা'কি আমরা আজও হইতে পারি নাই। আর কত নামিব—উপরে উঠিবার আহ্বান-আসার সময় কবে আসিবে? মানুষের নিম্নতম পতনতাে দীর্ঘদিনই দেখিলাম। মানুষের উচ্চতা কত উর্কে উঠিতে পারে, এবার তার জন্য ডাক কি শুনিতে পাইব না ? পাইলে, সে কবে ? রাত্রে বিছানায় শুইয়া সে-দিন কিছুতেই ঘুম আসিতেছিল না। অম্বিকা-বাবুর নিকট যে-সব কথা শুনিয়াছিলাম, তাহাই রাত্রিবেলা একাকী পাইয়া মনের সামনে মূর্তি ধরিয়া বার বার দেখা দিতে লাগিল। নিশীথ-রাত্রে অতর্কিতে অস্ত্রাগার-আক্রমণ ও লুণ্ঠন-চোখ বুজিয়া ঘুমাইবার চেষ্টা করিলেই চোখের সামনে সে-ইতিহাসের পুনরভিনয় হইতে দেখি। কাদের মশালে আকাশের ভালে আগুন উঠেছে ফুটে’, অন্ধকার আকাশে আগুন ধরানাে হইয়াছে -চোখের সামনে এ-ছবি নিয়া ঘুমাইতে পারার মত নার্ভ সে-দিন আমার ছিলনা। ১৪১ আজ প্রশ্ন মনে আসিতেছে—আকাশের সে-আগুন নিভাননা হইয়াছে কিনা? কি, সে-আগুন ধীরে ধীরে সারা আকাশটা গ্রাস করিবে? রঞ্জিৎ-সিং নাকি বলিয়াছিলেন-“সব লাল হাে যায়গা।” ইতিহাসের কি সত্যই পুনরাবৃত্তি হয় ? অম্বিকাবাবুর মুখে সে-দিনের শােনা দুটা সামান্য খবর এখানে উল্লেখ করিব। সহরের অবস্থা এখন শান্ত হইয়াছে, সমুদ্রে জাহাজ-বাস ত্যাগ করিয়া সাহেবদের পরিবারবর্গ সহরে আসিয়া আগের মত বসবাস করিতেছেন। সাহেবদের ছেলে-মেয়েরাও কাদে,জানিনা কোন দুঃখে, এমনি এক ক্রন্দনরত শিশুকে তার মা বা আয়া কিছুতেই শান্ত করিতে পারিতেছিলনা। সমস্ত উপায় ব্যর্থ হইলে এক বুড়ী মেম ছেলেটার কাছে আসিয়া ভারী গলায় কহিল--“Hush up Baby, Sing is coming." সিং মানে অনন্ত-সিং। বেবি তৎক্ষণাৎ শান্ত হইয়াছিল। সিংয়ের নামে সাহেবদের দুষ্ট ছেলে-মেয়েরা শান্ত হইত। আমরাও একদিন ‘বর্গী এল দেশে’ শুনিয়া ঘুমাইতাম এবং পাড়া জুড়াইত। আচ্ছা, এমন কি কখনও সম্ভব হইতে পারে না যে, বেবিই শুধু ঘুমাইবে না, এ-দেশের নামে তার বয়স্ক বাবা-মারাও শান্ত হইবে, এ-পাড়াটা সত্যই জুড়াইবে। আজ যা’ স্বপ্ন বলিয়া লাগে, আগামীদিনে তাহা আর স্বপ্ন থাকে না, সত্য ও সম্ভব হইয়া দেখা দেয়-মানুষের ইতিহাসে এ-নজীরের ভাে অভাব নাই।. সে ইতিহাসের এ-দেশে সত্য হইতে বাধা কি? ১৫০ কয়েক মাস পরের ব্যাপার।-পলাতক বিপ্লবীদের ধরিবার জন্য সরকার উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছেন। সারা চট্টগ্রাম সৈন্যদের ছাউনী হইয়াছে। দেশে শান্তি-প্রতিষ্ঠার ধাক্কায় গ্রামে গ্রামে ‘ব্রাহি-ত্রাহি’ ডাক উঠিয়াছে। বিপ্লবীদের মাথার দাম চড়িয়া গেল—কা দশ-হাজার, কারু পাঁচ-হাজার, কাৰু বা হাজার টাকা। যে ঐ-মাথা ধরাইয়া দিতে পারিবে, মাথার উপরে নির্ধারিত তঙ্কা তাহার প্রাপ্য হইবে। এমন দিনে সন্ধ্যার পরে আশ্রয়ের জন্য অম্বিকা-বাবু এক গ্রামে আসেন, সঙ্গে দু’জন সঙ্গী। শরীর দুর্বল, ক্ষত-চিহ্নগুলি তখনও ভালো করিয়া শুকায় নাই, নিশ্চিত মৃত্যু হইতে কোন রকমে বাঁচিয়া উঠিয়াছেন—শ্রান্ত হইয়া এক গৃহস্থের ঘরের পাশে আসিয়া দাড়াইলেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিয়া পরে গন্তব্যস্থানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইবেন-ঘরের বেড়া ঘেসিয়া দাঁড়াইয়া অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। ঘরের মধ্যে মেয়েছেলের গলা শােনা যাইতেছিল। মনোেযােগ করিতেই বুঝিতে পারিলেন যে, কে একজন লক্ষ্মীর পুঁখি পড়িতেছে। বিষ্যৎবার, তাই গৃহস্থ-বধুদের লক্ষ্মীর ব্রত। পূথি শেষ হইল। বােধহয় এখন গলায় আঁচল দিয়া প্রণাম চলিতেছে। এমন সময় কানে আসিল কে একজন প্রার্থনা করিতেছেন-“মা লক্ষ্মী, অনন্ত সিংকে বাঁচিয়ে রাখ, সূৰ্য-সেনকে বাঁচিয়ে রাখ। মা, ওরা কেউ। যেন ধরা না পড়ে।”—অম্বিকা-বাবুর চোখে জল আসিয়া পড়িল। দরিদ্র গৃহস্থ ঘরের বধূ-ধন-ঐশ্বৰ্য্য প্রার্থনা করিল না, অভাব- অভিযােগ জানাইল না, কিম্বা সুখ-শান্তি কোনটাই চাহিল না।

দেবতার নিকট তাদের প্রাণ ভিক্ষা চাহিল, যাদের সে কোনদিন চোখে দেখে নাই, যাদের চেনেনা জানেনা, শুধু যাদের নাম ও কথা মাত্র শুনিয়াছে। তাদের প্রাণের জন্য এর এ মমতা-বােধ অম্বিকা-বাবুর ইচ্ছা হইল, ভিতরে গিয়া এদের একবার দেখিয়া আসেন। কিন্তু সে-ইচ্ছা দমন করিলেন। পুলিশের লােকের কানে যদি কোনরকমে এ-খবরটা পৌছায়, তবে এ-বাটীর অধিবাসীদের দুর্গতির আর অবধি থাকিবেনা। সঙ্গী দু’জনকে সঙ্গে নিয়া তিনি আবার ধীরে ধীরে অন্ধকারে গ্রামের পথ ধরিলেন। অবস্থাটা মন্দ নয়—নিজের দেশে রাত্ৰ-অন্ধকারে লুকাইয়া ফিরিতে হয়, হিংস্র-শ্বাপদের মত দলে দলে ক্ষুধার্ত বিদেশীরা সানুচর ঘুরিয়া ফিরিতেছে, অতর্কিতে ঘাড়ের উপর যে-কোন মুহূর্তে আসিয়া লাফাইয়া পড়িতে পারে। আর, অন্যদিকে গৃহ-দেবতার পায়ের তলায় একটা বেদনাতুর ক্রন্দন লুটাইয়া পড়িয়া প্রাণভিক্ষা প্রার্থনা করিতেছে। তবু গৃহে ফিরিয়া যাওয়া যাইতেছে না, ঐ খাপদ- বেষ্টিত অন্ধকারেই লুকাইয়া ফিরিতে হইবে।

-ডেটিনিউ সিউড়ী-জেলে এক সত্যাগ্রহী ভদ্রলােককে দেখিয়াছিলাম, তাহাকে ভুলিতে পারি নাই। জীবনে যে-কয়টা অদ্ভুত মানুষকে দেখিয়াছি—এই ভদ্রলােক তাহাদের একজন। আমরা যাহারা সাধারণ মানুষ, তাহারা যেন ঝাকের মাছ। একের সঙ্গে অপরের তেমন কোন পার্থক্য থাকে না, একটাকে ধরিয়া নাড়িয়া-চাড়িয়া দেখিলেই বাদ-বাকী সমস্তকেই চেনা ও জানা হইয়া যায়। এই ভীড়ের মধ্যে যাহারা একটু স্বতন্ত্র বিশেষ, তাহারাই মনের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে। তখন মনে হয়, এই পুরাণে পৃথিবীতে যেন নূতন কিছু দেখিলাম। পুরাণে যত প্রয়ােজনীয়ই হউক, অথবা যত গুণই তা’র থাকুক না কেন, মন কিন্তু কম্পাসের কাটার মত সেই অল-নূতনের দিকেই অহরহ ঝুকিয়া থাকে; নূতনের সাক্ষাৎ পাইলে আকৃষ্ট ও মুগ্ধ হইয়া রহে, যতদিন না সে-নূতন ব্যবহারে ও অতি-পরিচয়ে পুরাণের দলে গিয়া পড়ে। এই ভদ্রলােকের মধ্যে বিশেষ কিছু আমি দেখিয়াছিলাম এবং তাহাকে নূতন-কিছু বলিয়াই আমার মন গ্রহণ করিয়াছিল। ভদ্র- লােককে যে ভুলিতে পারি নাই, সে আমার কৃতিত্ব নয়, তিনি নিজ বৈশিষ্ট্যেই মনে পাকা-পােক্ত জায়গা করিয়া লইয়াছেন। ভদ্রলােকের নাম আমার মনে নাই, চেহারাটা মনে আছে। শঙ্করাচাৰ্য নাকি বলিয়াছেন যে, নাম ও রূপ দুইই মিথ্যা। আমি অতখানি যাইতে সাহস পাই নাই, অর্ধেকটা পর্যন্ত স্বীকার পাইতে পারি—অর্থাৎ নামটা মিথ্যা, এ-কথায় সায় দিতে পারি। জানি না, কোন দর্শনশাস্ত্রে নাম ও রূপকে অচ্ছেদ্য সম্বন্ধে বাঁধা বলিয়া মানা হয় কি না। যদি মানা হয়, তবে তার ঘােতর প্রতিবাদ এখানে করিয়া রাখা গেল। কথাটা যখন উঠিয়াই পড়িল, তখন আরও কিছুটা কথা যােগ করিতেছি- নাম ও রূপ অচ্ছেদ্য নয়। অনেক সময় নামটা অতি চেনা লাগে, কিন্তু মুখ কিছুতেই মনে আসে না। তখন নামটা একটা ফ্রেমের মত শূন্যে ঝুলিতে থাকে, কোন মুখের ছবি সেখানে ফুটিয়া উঠে না—রূপহীন নিঃসঙ্গ-নাম কেবল ভাসিয়া চলে, কোন রূপের কিনারায় গিয়া ঠেকে না। আবার এর উল্টাটিও হয়—যেমন বর্তমান ক্ষেত্রে। মুখগুলি মনের সামনে পরিষ্কার আসিয়া গিয়াছে, কিন্তু আসিবার কালে যুক্তি করিয়া নামগুলিকে ফেলিয়া রাখিয়া আসিয়াছে। চেনা-মুখ, জানা-মুখ —কিন্তু, কিছুতেই-তত নাম মনে আসিতে চায় না। তখন খোজা- খুঁজি পড়িয়া যায়, স্মৃতির রাস্তায় মন ছুটিয়া চলে, কোথায় পথের ধারে নামটা পড়িয়া আছে তুলিয়া আনিবার জন্য। কিন্তু বৃথা খোঁজা, যাহা নাই তাহা নাই। নামহীন-রূপ নগ্ন বিবসন মূর্তি ১৫৪ নিয়া পাড়াইয়া থাকে—যেন বৃন্তহীন পুষ্প চোখের সামনে ফুটিয়া মানুষের মন, কখনও নাম ফেলিয়া দিয়া মুখটা মনে রাখে । আবার কখনও নামটা শক্ত করিয়া ধরিয়া থাকে, মুখটা পিছলাইয়া কোথায় অলক্ষ্যে সরিয়া পড়ে। মােটকথা, মানুষ মনেও যেমন রাখে, আবার ভােলেও তেমনি। কাজেই, অর্ধেক-মনে-রাখা ও অর্ধেক ভােলা জিনিষে মিলাইয়া সে একটা অর্ধনারীশ্বর গােছের কিছু সৃষ্টি করিয়া লয়।-এর পরেও যিনি বলিবেন যে, নাম ও রূপ অচ্ছেদ্য, তিনি আস্ত একটা কুতার্কিক। এই ভদ্রলােকের একটামাত্র পরিচয় আমি জানি-তিনি সত্যাগ্রহ করিয়া জেলে আসিয়াছেন। বাহিরে তিনি কি করিতেন, সে খবর আমি রাখি না। তিনি উকীল হইতে পারেন, ডাক্তার হইতে পারেন, স্কুল-মাষ্টার হইতে পারেন, ব্যবসাদারও হইতে পারেন- সংক্ষেপে, তিনি সব কিছুই হইতে পারেন, কিম্বা আদতে কিছু নাও হইতে পারেন। হয়তাে-বা কর্মহীন ও উদ্দেশ্য-শূন্য জীবন কাটাইতে- ছিলেন, হাতের ধারে দেশ-স্বাধীন-করার কাজটা পাইয়া ঝোঁকের মাথায় গ্রহণ করিয়া থাকিবেন। প্রথমদিনে ভদ্রলােককে যেভাবে দেখি, তা’তে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলিতে লােভ হয় যে-সে যেন একটা আবির্ভাব। ভােরের টিফিন-পর্ব শেষ হইয়াছে, যে যাহার দিনের কাজে সবেমাত্র মন নিবেশ করিয়াছে। রুমের মধ্যস্থানে টেবিলের উপর ক্যারমবাের্ড রাখিয়া ধনেশ-ভট্টাচাৰ্য্য ও কেষ্ট-চক্রবর্তী দুই পাশে দাঁড়াইয়া প্রতিদ্বন্দ্বীতা-যুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। পাশে ১৫৫ দাড়াইয়া খেলা দেখিতেছিলাম। ধনেশ-বাবু মারাত্মক খেলােয়াড়, হাতে ‘স্ট্রাইকার’ গেলে সব গুটি গর্ভে নিয়া তবে থামেন। কেষ্টবাবু খেলার সঙ্গে সঙ্গে গানও গাহিতেছিলেন—আমারে ডাক দিলে হায় (এইখানে ঝোঁক দিতে হইবে) চোখ-ইসারায় (২য় ঝোঁক) কে গাে দরদী (৩য় ঝোঁক)। ওস্তাদ গাইয়ে সুরের বিস্তার করে, কেষ্টবাবুও কথার বিস্তার গাহিয়া দেখাইতেছিলেন-হে দরদী, তুমি কেগাে, তােমার দরদে যে সন্দেহ হয়। ডাক দিলে, তা ভালােই করেছ, কিন্তু সােজাসুজি ডাকলে না কেন? চোখ-ইসারায় ডাক দিলে-উছ, তােমার মতলবতাে মােটেই ভালাে না, তােমার স্বভাব- চরিতিরও কি তবে ভালাে না, ওগাে দরদী-ঈ-ঈ ঈ। মুগ্ধ হইয়া ধনেশ-ভট্টাচার্যের খেলা ও কেষ্ট-চক্রবর্তীর সঙ্গীত দেখিতে ও শুনিতেছিলাম। কেষ্টবাবুর হুস ছিল না যে, তাহার নূতন-চালের গান শুনিয়া ও-পাশের সীটে মাখম-বাবু মুচকি মুচকি হাস্য করিতেছেন। এমন সময় কানে আসিল—'May I come in? দরজার দিকে ঘাড় ফিরাইয়া চাহিতেই দেখিলাম—এক মুর্তি। জাইঙ্গা-পরা গােলগাল খাটো এক ভলােক একগাল দাড়ি লইয়া দরজায় দাড়াইয়া প্রবেশের অনুমতি চাহিতেছেন। আমরা কিছু বলিবার আগে তিনি নিজেই অনুমতি দিলেন- ‘Oh yes come in'—বলিয়া রাইটু-লেফট-রাইট’-মার্চের তালে পা ফেলিয়া ঘরে আসিয়া টেবিলের ধারে দাঁড়াইয়া খেলা দেখিতে লাগিলেন। ভদ্রলােককে ভালাে করিয়া দেখিবার সুযােগ মিলিল। থালি

গা, গােলগাল চেহারা, ললামে সৰ্ব্ব-শরীর আবৃত, দেখিয়াই মন ডাক
ছাড়িয়া উঠে—“বাবা, এ যে দেখছি আমাদের সেই লােমশ-মুনি
আধুনিক ভাষায় লালিষি-কম্বল। গলায় পৈতা ঝুলিতেছে, ইকা
দিবার সময় আর কষ্ট করিয়া জাত জিজ্ঞাসা করার দরকার হয় না।
চোখের দিকে চাহিয়া দেখিলাম, তা’ আয়তনে ক্ষুদ্র, আর একটু
বুলিয়া নামিয়া আসিলেই চোখ দু’টাকে ঢাকিতে পারিত। একটা
জিনিষ লক্ষ্য করিয়া অবাক হইয়া গেলাম যে, চোখে তাঁহার পলক
পড়ে না, পড়িলেও অতি কম। এ-রকম স্থির দৃষ্টি স্বাভাবিক মানুষের
থাকে না।
ভদ্রলােককে আসিতে দেখিয়া কেষ্ট-চক্রবর্তী তাহার সঙ্গীত
থামাইয়া কহিলেন—“আসুন।”
তিনি উত্তর করিলেন—“এসেছি। কি ছাই খেলেন! গর্তেই যদি
নিতে হয়, এত হাঙ্গামার দরকার কি? হাত দিয়ে ওগুলােকে জড়
করে গর্তে ঠেলে দেন না কেন?”
তারপর আমার দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন-“আপনি বুঝি
সেদিন এলেন?
মাথা নাড়িয়া সায় দিলাম।
কেষ্টবাবুকে জিজ্ঞাসা করিলেন-“এখন আপনারা ঘােটমাট
ক’জন হলেন ?”
-“চোদজন।”
-“চোন্দ ? বেশ—একের পিঠে চার চোদ্দ-সােনার কোট
ভরে ওঠ।”
১৫।

ভেটিনিউ- আমরা হাসিয়া ফেলিলাম। তিনি কিন্তু হাসিলেন না, ধীরে ধীরে মাখম-বাবুর সীটে গিয়া বসিলেন। প্রথম দিনেই ভাব-ভঙ্গী ও কথা-বার্তা শুনিয়া আমার সন্দেহ হইল যে, ভদ্রলােকের মাথায় ছিট আছে। এর কিছুদিন পরের ব্যাপার। জেলখানাতে আমাদের সপ্তাহে সাতটাই রবিবার। দিনকে টানিয়া রাত্র দেড়টা-দু’টা পর্যন্ত লম্বা করিয়া লইয়া আমরা জাগিতে পারিতাম, আবার রাত্রিকেও ঘুমে-ঘুমে দিনের অনেক খানি পর্যন্ত আগাইয়া আনিতেও পারিতাম। আমাদের দিন-রাত্রির বিভাগ আর দশজনের মত ছিল না। সে-দিন বেলা হইয়া গেলেও বিছানা ছাড়িয়া উঠি নাই। মশারির মধ্যে থাকিয়াই দিনের অগ্রগতি ও উন্নতির আভাষ পাইতে- ছিলাম। টিফিন্ সমাধা করিয়া চায়ের পেয়ালা টুনটুন বাজাইয়া বাবুরা শেষ করিয়াছেন—তা’ও তন্দ্রার মধ্যেই এক ফাকে চেতনায় জানা হইয়া গিয়াছিল। ধনেশ-ভট্টাচাৰ্য্য ও তার প্রতিপক্ষ কেষ্ট-চক্রবর্তী ক্যারম-যুদ্ধে নামিয়াছেন—ঠকঠক শব্দে তা প্রচারিত হইতেছিল। ও-কোনার ধারে বাক-যুদ্ধ চলিতেছিল, যােদ্ধা শচীশ-সরকার ও সন্তোষ-গাঙ্গুলী। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র ইত্যাদি শব্দ মাঝে মাঝে যুদ্ধের আসর হইতে এ-দিকেও ছিট্ৰাইয়া আসিয়া পড়িতেছিল। বুঝিলাম, সাহিত্য নিয়া এই ভয়ঙ্কর সংগ্রাম বাধিয়াছে। আমার পাশের খাটে নারয়ণ-চক্রবর্তী শুন্-গুন্ করিয়া গান গাহিতেছেন—তন্দ্রাচ্ছন্ন মনের উপর যেন কোথা হইতে টুপটাপ, করিয়া শিশিরে-ভেজা শিউলীফুল আলগােছে আসিয়া ঝরিয়া পড়িতেছে। বিপরীত দিকের খাটে ১৫৮ ম্যানেজার জুমু-মজুমদার বাজারের খাতা লিখিতেছেন, তাঁ’র গলা শােনা যাইতেছে—“কাৰু কিছু আনতে হবে নাকি, খাতা কিন্তু চলে -“এক বাক্স বম্মা-চুরুট লিখে দিন।” কোথা হইতে এ-অনুরােধ বাতাসে উড়িতে উড়িতে এ-ধারে আসিয়া ঝরা-পালকের মত নামিয়া পড়িল। চোখ বুজিয়া পড়িয়া ছিলাম। সমস্ত ঘরটার শুন্য ভরিয়া নানা- রকম শব্দ, কথা-বার্তা যাতায়াত করিতেছিল। তাদের ছায়া আমার মনের তন্দ্রার পাতলা পর্দার উপর আঁকা-বাঁকা রেখাপাত করিতে- ছিল। শূন্য-পথে যেন নানা পােষাকের অসংখ্য শব্দের মিছিল চলিয়াছে-আধ-ঘুমন্ত আধ-জাগা চেতনা লইয়া বিছানায় তেমনি পড়িয়া রহিলাম। হঠাৎ সমস্ত চুপ হইয়া গেল—কে যেন সুইচ, টিপিয়া দিয়াছে, তাই শব্দ নিভিয়া গিয়াছে। মনে হইল, ঘরের মধ্যে যেন একটা আকস্মিক নীরবতা আসিয়া ঢুকিয়াছে। মনের উপর হইতে হেঁচকা- টানে তার পাতলা চাদরটা সরিয়া গেল। ব্যাপারটা কি, বুঝিবার জন্য চোখ মেলিবার আগেই অপরিচিত গলা শুনিতে পাইলাম-‘জাগাে, মুসাফির। চোখ মেলিয়া দেখিলাম, ঘরের মধ্যে একদল সত্যাগ্রহী। আরও একদল দরজার কাছে আসিয়াছেন, এখনও ভিতরে ঢুকিতে পারেন নাই, তবে ঢুকিলেন বলিয়া। আর এদিকে আমার খাটের সামনেই ঘরের মধ্যে সেই ভদ্র- লােক। ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিলাম, মশারিটা তুলিয়া চাঁদোয়া করিয়া রাখিলাম। কাণ্ড দেখিয়া দু’চোখ আমার বিস্ময়ে যেন হাঁ করিয়া রহিল-ভদ্রলােক নৃত্য-সম্বলিত গান গাহিতেছেন! তিনি জেলের একখানি কম্বল বাউলের আলখাল্লার করিয়া পরিধান করিয়াছেন। কব-চায়ের বড় একটা কৌটা কিছু বাখারি ও তারের সংযােগে বাউলের একতারা হইয়াছে, সেটাকে একহাতে উচু করিয়া ধরিয়া নাচিয়া নাচিয়া এবং ঘুরিয়া ঘুরিয়া গান গাহিতেছেন। পােষাক-পরিচ্ছদ যেমন অপূৰ্ব্ব, একবার এ-পা আবার ও-পা তুলিয়া নৃত্যও তেমনি অনবদ্য। সাজ-পােষাকে কোন খুঁত ধরিবার ছিল না। এর সঙ্গে কর্কশ মােটা গলায় গান, তা’রও সৌন্দর্য্যের অবধি ছিল না, স্বর্গীয় বলিলেই চলে। গানের পদ আজ আর মনে নাই, কিন্তু সেই আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের ভাবটুকু মনে আছে। তিনি গাহিতেছিলেন- “হে মুসাফির, আর কত ঘুমাইবে? এখন জাগাে। অনেক দূর যে যাইতে হইবে, সে-খেয়াল নাই নাকি? নেও, উঠ—আর দেরী করিও না, জাগিয়া পড়, গাঁঠরী বাঁধ এবং পথে নাম, হে মুসাফির। ভদ্রলােকের দিকে চাহিয়াই আছি-গানও থামিতেছে না, উৰ্দ্ধ- বাহু নৃত্যও বিরাম হইতেছে না, গান ও নাচ দুইই সমান চলিয়াছে। এক সময়ে তিনি গান গাহিতে গাহিতে বাহির হইয়া গেলেন এবং সত্যাগ্রহীর দলও অধিকাংশই তার পিছনে পিছনে গেল। শিক্ষিত ও বয়স্ক ভদ্রলােকের এই কাণ্ড দেখিয়া আজও আবার মনে হইল যে, নিশ্চয় এ পাগল, কিম্বা এর মাথায় ছিটু আছে। কিন্তু স্বীকার পাইতে হইল যে, ইনি একাই সত্যাগ্রহীর আসর মাতাইয়া রাখিয়াছেন, জেলের কষ্ট মনে বােৰা হইয়া জমিতে, দিতেছেন না এবং হাসি ও আনন্দের হাওয়ায় একাই সব-মনের মেঘ উড়াইয়া খেদাইয়া ফিরিতেছেন। ইনি পাগল হউন ক্ষতি নাই, কিন্তু জেল-জীবনে সঙ্গী ও সাথী-হিসাবে এর দাম পরিমাপ হয় না। ভদ্রলােকের এ-জাতীয় বিচিত্র আনন্দ-আক্রমণ প্রায়ই হইত। তিনি আসিলেই আমরা তৈরী হইয়া উঠিতাম, মনের অঞ্জলি পাতিয়া অপেক্ষা করিতাম, না জানি কোন নূতন রসের পানীয় পরিবেষণ চলিবে। ভদ্রলােক আমাদিগকে লােভী বানাইয়া তুলিয়াছিলেন। কিছুদিন পরের ব্যাপার। দুপুরে দিবা-নিদ্রা উপভােগ করিয়া লইয়াছি। টিফিনও শেষ করিয়াছি। হাতে আর তখন জরুরী অবশ্যকর্তব্য কিছু ছিল না। জটলা করিয়া লােহার খাটে বসিয়া নানা কথা-বার্তায় আমরা ব্যাপৃত ছিলাম। দু’মিনিট দাড়াইয়া শুনিলে চমক লাগিয়া যাইবে যে, আসরে কত হরেক-রকমের আলােচনা চলিতে পারে। এমন বিষয় ছিল না, যা নিয়া আমরা দু’কথা না- কহিতে পারিতাম। কোন কিছু না-জানার মস্ত সুবিধাই এই যে, সবকিছু নিয়াই দ্বিধাহীন আলােচনা ও মন্তব্য করা যাইতে পারে। নতুবা, আমরা পাতঞ্জল-দর্শন নিয়াও গম্ভীর আলােচনা করিতে পারিয়াছিলাম, কে বিশ্বাস করিবে। অবশ্য, প্রকারান্তরে একথা বলি যে, আমরা সৰ্ব্বশাস্ত্ৰ-পারঙ্গম হইয়াছিলাম। আর বলিলে কে-ই বা বিশ্বাস করিবে—দেশ যে নাস্তিকে-ভরা। আলােচনা হইতেছিল যে, মরিলে প্রাণ থাকে কিনা। বিষয়টা অতীব দুরূহ, তাই মীমাংসা হইতেছিল না। কেষ্টবাবু কহিতে ১৬১ ১১ চাহিতেছিলেন—“মর পর আবার মানুষ থাকে কেমন করে? তবে মরার কি অর্থ হয় ? মরলেই তাে সব শেষ।” সন্তোষ-বাৰু কহিলেন—“না, সব শেষ নয়। মরার পর অনেকে ভূত হয়ে টিকে থাকে।” কেষ্ট-ৰাৰ চটিয়া গেলেন-“আপনি ভূত দেখেছেন যে ভুতের কথা বলছেন?” -“দেখেছি কি, আলাপ পৰ্যন্ত করছি।” আমরা হাসিয়া উঠিলাম। কেষ্ট-চক্রবর্তী হটিবার পাত্র নহেন, তপ্ত হইয়া কহিলেন— “আপনি একটা অদ্ভুত, আপনি কিন্তুত।” তত্ত্ব-আলােচনা হাতা-হাতিতে গিয়া না পাড়ায়, আমরা শঙ্কিত হইয়া উঠিলাম। কিন্তু দৈব আমাদের রক্ষা করিলেন। দেখিলাম, আমাদের আসরের সামনে ঘােমটা মাথায় কে দাঁড়াইয়া। এ-মূর্তি কি আর ভুল হইবার ! আজ আর ভদ্রলােক একপাল সত্যাগ্রহীকে ‘ফলাে-মি’ বলিয়া পিছনে টানিয়া আনেন নাই, একাই আসিয়া ঢুকিয়াছেন। পরিধানে জেলের জাইঙ্গা, অথচ একটা চাদরে মাথায় ঘােমটা দিয়া আসিয়াছেন। ব্যাপারটা আমরা সম্যক বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই, তাই অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। এমন সময় মেয়েলী-কণ্ঠে হুকুম আসিল—“দুর্গের দরজা বন্ধ বুঝিলাম, দাড়ি-গোঁফ যা দেখিতেছি, তা সব মিথ্যা-ঐ- ঘােটাই খাটি। তা’ নয় বুঝিলাম, কিন্তু কে এই বীৰ্য্যময়ী ঈষৎ- ! অবগুষ্ঠিত রমণী ! এবং কোন্ দুর্গের দরজাই ৰা বন্ধ করিতে হুকুম দিলেন!—চিন্তা নিয়া আমরা শূন্যে ঝুলিতে লাগিলাম। আবার সেই কণ্ঠ শােনা গেল-“কে? মহারাজা যশােবন্ত-সিংহ আসিয়াছেন? না-মিথ্যা কথা। এ মহারাজা যশােবন্ত-সিংহ নন। আমার স্বামী হয় যুদ্ধে মরেন, নয় যুদ্ধে জয়লাভ করেন। পরাজিত হইয়া ফিরিয়া যিনি আসিয়াছেন, তিনি মহারাজা যশােবন্ত সিংহ নন। যাও, দরজা বন্ধ কর।” হতভাগ্য যশােবন্ত-সিংহ, তােমার জন্য দুঃখ হয়। তুমি সিংহীর থাবার তলে পড়িয়াছ দেখিতেছি। ঘােমটা নামিয়া গেল, দেখা দিলেন যশােবন্ত-সিংহ। পুরুষের গলা শােনা গেল ; কত অনুনয় করিলেন, কঁাদ-কঁাদ হইয়া প্রায় পায়ে ধরিলেন। কিন্তু মহামায়া পাষাণী, স্বামী বলিয়া স্বীকার পাইবেন না, কিম্বা দুর্গেও চুকিতে দিবেন না। মহারাজা যশােবন্ত-সিংহ শেষটা খেপিয়া গেলেন। শত হউক, পুরুষ মানুষ তাে! নিজের স্ত্রীর এ-ব্যবহার! কাহাতক আর সহ্ন করা যায়। ক্ষত্রিয়-রক্ত টগবগ করিয়া ফুটিয়া উঠিল। কাল্পনিক তৰােয়ালের মুঠাটাকে শক্ত আঙ্গুলে চাপিয়া ধরিয়া কহিলেন—“বেশ, তবে তাই হউক। আমি চলিলাম। হয় যুদ্ধ জয় করিয়া ফিরিব, নয়, এই শেষ।” বলিয়াই সামরিক-কায়দায় আবর্তন এবং দীর্ঘ ও দৃঢ় পদক্ষেপে নিক্রমণ। ঘােটা তুলিয়া লইয়া মহামায়া ফিরিয়া আসিয়া পূর্বস্থানে একা দাড়াইয়া রহিলেন। ১৬৩ । কি মেয়েমানুষ, বাবা! এর চেয়ে পাথরও যে নরম। নিজের একমাত্র স্বামী, এত কাদাকাটি, এত অনুনয়-বিনয়, চোখের জল কিছুতেই এ-মেয়েমানুষকে কায়দা করা গেল না, কাহিল বা নরম হইবার ধাতুই নয়। আবদার ধরিলেন—যুদ্ধে যদি জয় না হয়, তবে সেখানে গিয়া মরিতে হইবে। স্ত্রীর কাছে হয় যুদ্ধ-জয় করিয়া ফিরিতে হইবে, নয় যুদ্ধে মরিয়া ফিরিতে হইবে। তবেই স্ত্রী পুরুষ ও স্বামী বলিয়া স্বীকার পাইবেন। ধন্য তুমি বীৰ্য্যময়ী ক্ষত্রিয়-ললনা! তুমি আদতেই একটা আস্ত সিঙ্গী। হঠাৎ আর এক সিঙ্গীর কথা মনে পড়িল। এই ক্ষেত্রেই তিনি হাজার বছর আগে লীলা করিয়া গিয়াছেন, তিনিও ক্ষত্রিয়-কন্যা ছিলেন। বনের মধ্যে পাঁচ স্বামীর সম্মুখে বসিয়া থাবাতে, মানে জিভে বিষ ছড়াইতেছেন। ভীমকে চাঙ্গা করিতে পুরা একটা খাবার আঁচড়ও দরকার হইল না। যত বিপদ ঐ বড় স্বামীটীকে নিয়া। তিনি কিছুতেই উত্তেজিত হইবেন না, এমনই তাঁর ধনুক-ভাঙ্গা জেদ। যুধিষ্ঠিরের শরীরে বােধ হয় বেলেমাছের রক্ত—নইলে সে-দিন সে-ক্ষত্রিয় মেয়েটার মুখ দিয়া যে-সব কথা বাহির হইয়াছিল, তাতে মানুষের রক্ত হইলে জ্বলিয়া উঠিত। কোনরকমেই যখন বড়-কর্তাকে কাবু করা গেলনা, তখন স্ত্রীটি মােক্ষম অস্ত্র ছাড়িলেন, মানে কান্না জুড়িয়া দিলেন। বিনাইয়া বিনাইয়া সে কী কান্না, আর বক্তব্য ও ভাষারই বা কী গাঁথুনী। একটা নয়, পাঁচ-পাঁচটা স্বামী উপস্থিত, রাজার মেয়ে, রাজার বৌ, তাকে প্রকাশ্য রাজসভায় বিবস্ত্র করিয়া অপমান করিল, চোখ মেলিয়া দেখিয়াও যারা প্রতিবাদ করিলনা, তাদের হাতেই পিতা ১৬৪ তা’কে দিয়াছেন, অদৃষ্টের এ-দুঃখ, ভগবান যদি ডাকিয়া না নেন, তবে যে আর সহ্য হয়না, এখন মরণই ভালাে--ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু যুধিষ্ঠির কম নাছােড়বান্দা নন। ভীম তত দাঁত কড়মড় সুরু করিয়া দিয়াছে, গরম নিশ্বাস ঘন ঘন বাহির হইতেছে-যেন ক্রুদ্ধ সাপ ফুসিতেছে। আর যুধিষ্ঠির, সেই যে হাঁটুর উপর পা তুলিয়া লইয়া যুৎ হইয়া বসিয়াছেন, কথাটা পর্যন্ত বলিতেছেননা। তিনি যেন বড় মজা দেখিতেছেন, এমনই ভাবে চাহিয়া আছেন। হঠাৎ কান্না শুনিতে পাইলাম। এ-যুধিষ্ঠিরও কাদে নাকি? ওঃ- , আমাদের সামনে-দাড়ানাে মহামায়া ঘােমটার তলে কঁদিতেছেন। তবে এ-দিকের সিংহীও নরম হইয়া আসিয়াছেন। কঁদিয়া ভগবানের বিরুদ্ধে তিনি নালিশ করিতেছেন—এত সৌভাগ্য যদি দিতে পারিলে, তবে সুখ দিলেনা কেন ? কেন ক্ষত্রিয়-কন্যা করিয়া কঠিন পরীক্ষায় ফেলিলে? ইত্যাদি। কথাটা মনে হইতেই শিহরিয়া উঠিলাম। যাক ভগবান রক্ষা করিয়াছেন। নিরীহ-বাঙ্গালীর পরিবারের মধ্যে যদি এ-জাতীয় দু’-একটা সিঙ্গী লেলাইয়া দিতেন—ভাবিতেও বুক শুকাইয়া উঠে। বাঙ্গালীদের উপর ঈশ্বরের দয়া আছে, বুক-ভরা-মধু বঙ্গের বধুরাই থাক, ও-সব ভীষণ সিংহী-ব্যাঘ্রী কি আমাদের পােয় । কঁদিতে কঁদিতে মহামায়া প্রস্থান করিলেন। ঘােমটা ফেলিয়া খালি গায়ে আমাদের লােমশ-মুনি ফিরিয়া আসিলেন। কহিলেন—“একটু তামাক খান দিকি।” মাখম-বাবু ডাকিয়া কহিলেন-“বসন্ত, তামাক দিয়ে যা।” বসন্ত পাশে দাঁড়াইয়াই মুগ্ধ হইয়া শুনিতেছিল, তামাক লইয়া ১৬৫ ফিরিয়া আসিল। ভদ্রলােক গড়গড়ার নল মুখে তুলিয়া লইয়া আরাম করিয়া টানিতে লাগিলেন এবং মুখ-ভরা ধোয়া চক্ষু অর্ধেক বন্ধ রাখিয়া ছাড়িতে লাগিলেন। চাহিয়া চাহিয়া সেই পুরাণে কথাটাই আবার মনে আসিলভদ্রলােক পাগল নয় তাে ? কিন্তু ভদ্রলােক পাগল ছিলেন না। সিউড়ী ছাড়িয়া আসার কয়েকদিন আগে ভদ্রলােককে ভালাে করিয়া জানার সুযােগ হইয়াছিল। বৈকালের দিকে ইদারার সেই চত্বরের উপর কয়েকজনে বসিয়া গল্প করিতেছিলাম । বেড়াইতে বেড়াইতে সেই ভদ্রলােকটা আমাদের ওখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। গায়ে সেদিন তার একটা লম্বা কোট ছিল, পরিধানে অবশ্য খাটো জাইঙ্গা। 'আমাদের দেখিয়া তিনি দাড়াইলেন। বসিতে বলিলাম, কিন্তু দাড়াইয়া থাকিয়াই কথা-বার্তা কহিতে লাগিলেন। হাল্কা কথা-বার্তা এক সময়ে যে কেমন করিয়া গুরুতর আলােচনায় পরিণত হইল, আমাদের খেয়াল ছিলনা। হিংসা ও অহিংসা-নীতি নিয়া দুই পক্ষের কথা কাটাকাটি চলিতেছিল। বন্ধুদের মধ্যে কে একজন ঠাট্টার সুরে অহিংসাকে আক্রমণ করিলেন। বৈষ্ণব, বৈরাগী, খড়ম-পূজা ইত্যাদি শৰ মৰ্ম্ম-পীড়াদায়ক অর্থে ভরিয়া ব্যবহার করিলেন। শুনিয়া এই পাগল ভদ্রলােকের চোখ অন্যরকম হইয়া গেল। তারপর তিনি যেভাবে কথা-বাৰ্তা কহিলেন, তাতে বিস্মিত হইয়া গেলাম। মনে হইল, তিনি যেন inspired হইয়া গিয়াছেন। তিনি অনেক কথাই বলিয়াছিলেন, সে-বক্তব্যের সমস্ত মনে নাই, ১৬ কিছুটা মনে আছে। আর মনে আছে তাঁর দ্বিধাহীন কুণ্ঠা- বলার ভঙ্গীটি। তিনি বলিয়াছিলেন, যে-কথা বহুবার বহু মানুষে বলিয়াছেন ও বলিতেছেন, যে-মানুষের মধ্যে প্রাণীই সবটুকু নয়। যে বাঁচে, সেই প্রাণ-ধৰ্মী পণ্ডই একমাত্র নয়। তার মধ্যে আর একটা ভিন্নধর্মী অংশ বা অস্তিত্ব আছে, যা জীব-জগতে তার অন্যান্য সরীকের নাই। সে হইল মানুষের অমর অস্তিত্ব—যেখানে তার সত্য-সন্ধান, সত্য- উপলব্ধি, সৌন্দৰ্য্য ও মূল্য-বােধ, ন্যায় ও ধৰ্ম্ম-বুদ্ধি। যখনই পশুর স্বভাবকে সে একমাত্র সম্বল ও আশ্রয় বলিয়া মানিয়াছে, তখনই তার মহৎ সৰ্ব্বনাশ উপস্থিত হইয়াছে। অতীতের সভ্যতা এই পশুর-পথ ধরিয়াই মরিয়াছে। বিজ্ঞান আজ মানুষের হাতে দেবতার অসীম শক্তি ও অস্ত্র দিয়াছে, কিন্তু দেবত্ব দিতে পারে নাই। বিজ্ঞানের সে-শক্তি মানুষের ভিতরকার পশুটার হাতে পড়িয়াছে, সে-ই তা ব্যবহার করিতেছে। বর্তমান সভ্যতাও তার অগ্রগামীদের পথ ধরিয়া সর্বনাশের সামনে আসিয়াছে, একই পরিণামে গিয়া তাকে শেষ হইতে হইবে, যদি না সে মানুষের সত্য-অর্থ জীবনে স্বীকার পায় এবং সামাজিক জীবনে তা কার্যকরী করিতে চেষ্টা করে। এই অবস্থার মধ্যেও মানুষের ভিতর মহা-মানুষ আসেন, তাঁরা হতাশ হননা, ভরসা হারাননা। প্রতিকূল অবস্থা ও পরিস্থিতির মধ্যে মানুষকে মানুষের পথ ঠা’রা দেখান, সে-দিকে চালিত করেন। সে-পথ এই অহিংসার পথ, প্রেমের পথ—ভিতরে যে-অন্তর্যামী পুরুষ আছেন, তার পথ। গান্ধী বুদ্ধ ও যীশুরই নূতন মুর্তি এ বিংশশতাব্দীতে। ইত্যাদির পরে কহিলেন-“যে-মানুষ একাকী ১৬৭ নিজের মুখােমুখী দাড়িয়েছে, নিজেকে নিজের মধ্যে খোঁজ করেছে, সেই জানে যে, গভীরে নেমে গেলে কেন প্রেম-করুণার উৎসের মুখ খুলে যায়, মানুষের সঙ্গে কেন তখন অন্য ব্যবহার মিথ্যা ও অসম্ভব বলে বােধ হয়।” হিংসাও অহিংসার মীমাংসা এই এক আসরেই শেষ হইবার নয়, এ আমি জানিতাম। এও জানিতাম যে, দুই পক্ষেরই যথেষ্ট বলিবার আছে। হিংসারও একটা ‘ফিলজফি’ আছে এবং সে যে অহিংসার চাইতে কম জোরালাে তা নয়। মানুষের খাটি টেকসই পরিচয় কি, কোন নীতিতে নির্ভর করিলে সমস্ত সমস্যার সহজ সমাধান হয়, এ নিয়া অতীতে বহু মনীষি চিন্তা করিয়াছেন, বর্তমানেও করিতে- ছেন। মানুষের জীবন-আকাশে অনন্ত জিজ্ঞাসার মতই এ-প্রশ্ন জলিতেছে।বৈকালের এই এক বৈঠকে সে-প্রশ্নের উত্তর আমি প্রত্যাশা করি নাই। আরও একটা কথা, এই জাতীয় আলােচনার কালে আমি মনে রাখিতে চেষ্টা করি যে, সকল বস্তুকেই তার ক্ষুদ্র গণ্ডী হইতে সরাইয়া একটা বড় পটভূমিকায় নিয়া দেখা দরকার, নতুবা বস্তুর স্বরূপ বােঝ। যায় না। দেখার এ-কৌশল আয়ত্তে না থাকিলে কথা শুধু কথাই থাকিয়া যায়, অনন্তকাল ধরিয়া চেষ্টা করিলেও ’ পণ্ড-এমের বেশ কিছু হয়না। ঘটনা ও বস্তুর পারিপার্শ্বিক আবেষ্টন হইতে অনন্তকালের ইতিহাসের ক্ষেত্রে অনায়াসে যাতায়াতের গােপন-পথ ইনি জানিবেন, এতবড় আশা এ-ভদ্রলােক সম্বন্ধে আমি রাখি নাই। কারণ, দেশে ১৬৮ ও কালে কদাচিৎ এ-জাতীয় সন্ধানী পথচারী আসিয়া থাকেন। আমি আশ্চর্য হইয়াছিলাম অন্য কারণে। মহাপুরুষের প্রতি এর বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা এত অকৃত্রিম ছিল যে, সত্যই তা আশ্চৰ্য-কিছুর মত আসিয়া আমাদের লাগিয়াছিল। তিনি এক সময়ে যখন প্রশ্নের উত্তরে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন- আপনারা কি তবে বলতে চান যে, বুদ্ধ-যীশু এরা মানুষ ঠকাবার জন্য এসেছিলেন ? কতগুলি মিথ্যা কথা দিয়ে যাবার জন্যে এত কষ্ট করলেন ?” তখন এর প্রতিদ্বন্দ্বীকে আমি থতমত খাইতে দেখিয়াছি। ভদ্রলােক যুক্তিকে বিশ্বাস দিয়া ঠেকাইতেছেন, এ জানিয়াও আমার বন্ধুদের সে-দিন বিচলিত হইতে হইয়াছিল। এ-বিশ্বাসের জোর যে কত অমােঘ, সে-সন্দেহ আমাদের কাহারও ছিল না। এত জোরালাে বিশ্বাস পাগলের থাকে না, কিম্বা থাকিলে হয়তাে শুধু পাগলেরই থাকে। নিজের জীবনে, অনেক বন্ধু-বান্ধবেরও, দেখিয়াছি যে, আমাদের বিশ্বাসের জোর কত কম। যুদ্ধে তাই পরান্ত হই, কিম্বা মাঝপথে কাজ : ও সঙ্কল্প ছাড়িয়া দেই। নিজের চরিত্রে এ-ক্রটি আছে, তাই ভদ্র- লােকের কথা ভুলিতে পারি নাই। যখনই মনে পড়িয়াছে, তখনই একটি অকপট সরল বিশ্বাসের ছবি দৃঢ় ভঙ্গিমায় চোখের সামনে খাড়া হইয়া উঠে দেখিয়াছি। আজ সত্যই পরিষ্কার দেখিতে পাই—অসীম সমুদ্রে ঢেউয়ের মত মানুষ উঠিতেছে, আবার নামিয়া মিলাইয়া যাইতেছে। সমস্তই জলে জল-ময়, শুধু একটা পাহাড় মাথা উচু করিয়া জাগিয়া আছে। মৃত্যু সমুদ্রের ঢেউ আঘাতের পর আঘাত করিতেছে, তাকে জলে ডুৰাই পারেনা, বিচলিত করিতে পারেনা, কি ক্ষয়ও করিতে না-মৃত্যু-জয়ী এ-বিশ্বাস। এ-বিশ্বাস অজানা সমুদ্রে আলােক-- মত খাড়া হইয়া আছে—জীবন-পােতগুলির দিক-নির্ণয়ের সাহায্যের জন্য। এ যেন সৃষ্টির নিজের কাছে নিজেরই মাভৈ-আশ্বাস বুদ্ধিতে নয়, প্রতিভাতে নয়, অদম্য-চেষ্টাতেও নয়—এই বিশ জোরেই মানুষ অসম্ভব সম্ভব করিয়াছে, ভবিষ্যতেও করিবে। মানুষে সমস্যাগুলির সমাধানের অন্য-পথ নাই। বিশ্বাস হারাইলে মানুষের বুদ্ধি অন্ধ হইয়া যাইত, সৃষ্টির আলােই নিভিত। কেবলই আজ মনে জিজ্ঞাসা আসিতেছে যে—আমাদের মধ্যে মানুষ কই, যার বিশ্বাসের সম্মুখে পাহাড় পর্যন্ত টলিয়া যাইবে এক মানুষের মুক্তির রাস্তা উন্মুক্ত হইবে। মানুষকে সে-বিশ্বাস কি ? আবার ফিরাইয়া আনিয়া দিবেনা? । ১৭ মাস আগে সে-দিন এ-লেখা আরম্ভ করিবার সময় বলিয়াছিলাম-বাহির কপাট লেগেছে ভিতর দুয়ার খােলা।' টা দু'দিক দিয়া সত্য ছিল। জেলের বাহির দরজায় সেই যে ঢুকিবার সময় পড়িয়াছে, এই এতদিন তাহা সমান ভাবেই অন্ধ আছে, শুধু নূতন আগন্তুকের প্রবেশের পথ খােলা। জৈর দিক দিয়াও কথাটা সত্য ছিল। কোন সম্মুখ ৰা বাহির মনের সামনে ছিলনা। একটা দিনকেই বছরের পর বছর অাবৃত্তির মত যাপন করিয়া । তাই লােভ হইয়াছিল নিজের ভিতরে প্রবেশ করিবার। যাহা দেখি তাহা ‘ভার কলমের উপর ছাড়িয়া দিয়াছিলাম। নিজেকে এইভাবে নিজের জানাও এন্নিধ্যও দেওয়া হইবে ভাবিয়াছিলাম। আসল উদ্দেশ্য ভুলিয়া শুধু স্মৃতির জাবর কাটিয়াছি এই লেখায়। মনের শষে নূতন দেশ আবিষ্কার করার কথা, নিজের সত্য-পরিচয় জানা এসৰ রাখিতে পারি নাই। এখন আর সে-সময় নাই। আজ ভিতর দুয়ারে কপাট পড়িল, বাহির লাখুলিবার শব্দ শুনিতেছি। আগামীকাল জেল হইতে আমাকে বাহির বে, চলনবিলের ধারে কোন এক গ্রামে অন্তরীণ হইবার হুকুম নাকি ছে। যেমন কলম লইয়া আমার সাথে সাথে ছিল, এখবরে সে সরিয়া ছে, তার আর দেখা পাইতেছি না। ভিতর আমাকে ছাড়িয়া দিল, বাহিরের কোরে গিয়া পড়িবার প্রতীক্ষায় এখন আছি। ১১ এবারকার জীবনের শ্রেষ্ঠ বছরগুলির এতগুলি দিন জেলখানায় ব্যাতে না গেলম। ছাড়িয়া যাইতে বড় মনে লাগে। এ-দিনগুলির উদ্ধার কি কোন সম্ভব নহে? •ীবনের ধন কিছুই যায়না ফেলা, ধূলায় তাদের যত হোক -এ- ক সত্য না মিথ্যা? বড় ভয় করিতেছে বাহিরে যাইতে। অপরিচিত পৃথিবী, জল ও ছায়ার আর মরুভূমির তপ্ত শুদ্ধ ছবি কেবল চোখের সামনে দেখি কেন? এ কী নির্মম ও ভবিষ্যৎ আ আমাকে সম্মুখে ডাকিতেছে? ভিতরটা আজ আমার বড়ই একদিকে। অশ্যদিকে দেখি, মনের নির্জন-গুহা হইতে কে বাহির হইয়া আসিল অস তারপর, ক্ষুরে সুরে তপ্ত বালু-ধূলি উড়িয়া চলিল। চলচ্চিত্রের ছায়া-ছ; মপরিচিত মৰু পৃথিবী ও সম্মুখ-ভবিষ্যৎ কেবল পিছনে সরিয়া মিলাইয়া যাইতেইে এ চাখর দৃষ্টির তল দিয়া। অশ্বারােহীর আর এক চোখে ধান দৃষ্টি-সমস্ত সন্মুখোম পার হইয়া কোন অসীশের নীড়ে গিয়া নিবন্ধ রহিয়াছে ? অসমাপ্ত লেখা মাঝখানেই সমাপ্ত করিলাম। শরতের আকাশ আলােতে আমাৰ শেষ-কথা জানাইবার এইতাে সু-সময়-- “আমার দেবত নিল তােমাদের সকলের নাম, রহিল পূজায় মােয় তােমাদের সবার প্রণাম।”

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Detinew

Author
Gupta, Amalendu Das
Title
Detinew
File name
Detinew
Text
OCR done
Citation
1939
Published
2009/09/5
Publisher
Sri Kiranchandra Mukhapadhay
Language
Sanskrit
Pages
182
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Essays, Articles
Keywords
Essays on Detenu
DLI number
512587
Barcode
4990010019648.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
F0OhDP6TQwu
Download PDF

Detinew