Makardah Saraswat Library, Howrah

Patita Keno Holum

Bandyopadhyay, Pradip · 2009/08/17

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

প্র দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
পতিতা কেন হলুম
কিশাের গ্রন্থালয়
কলিকাতা

প্রথম প্রকাশ :
আশ্বিন, ১৩৫২
প্রকাশ করেছেন :
নরেশচন্দ্র বস্তু
কিশাের গ্রন্থালয়
১৯৫১ বি, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
ছেপেছেন ?
যােগেন্দ্রচন্দ্র দাস
নিউ ক্রাউন প্রেস
৯নং বৈঠকখানা রােড, কলিকাতা।
দাম এক টাকা চারি আনা
লেখক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

নীরু,
আমি যখন সাহিত্য-আসরে চুপি চুপি অনধিকার প্রবেশ
করি, আমার চেনা ও জানার ভীড়ে একমাত্র তুই-ই দেখে
ফেলেছিলি। যদিও সাহিত্য-আসরে আসন এখনাে পাইনি,
তবে আশা আছে। জানিসতো মানুষের আশার শেষ নেই;
দুর্নিবার তার আশা, আকাশ স্পর্শি তার আকাঙ্খা।—থাক ওসব
কথা,—কি বলছিলাম, তাের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তিকে আমি
ফাকি দিতে পারিনি ; তাই সমাজ সম্বন্ধে কিছু শুনলেই, যাদের
কথা আমার সব চাইতে আগে মনে পড়ে, আজ তাদেরই
দুজনকে তুলে দিলাম তাের হাতে। আমার তাে জানা
নেই—ওদের ন্যায্য মূল্য একমাত্র তুই ছাড়া আর কেউ দেবে
কি না।—জানি ওদের অমৰ্যাদা তাের কাছে হবে না; ওদের
দেখিস—বড় হতভাগিণী রে।
;
কলিকাতা
তােরই
দীপু
১০-৭-৪৫

আমার এই ক্ষুদ্র বইখানিকে সুসাহিত্যিক সুনীল দাসগুপ্ত
ও অমর ভট্ট ; সাহিত্য সেবক যােগেন দাস ও নিতাই বস্তু
আমাকে নানাদিক দিয়ে যথেষ্ঠ সাহায্য করেছেন ; তাই
এদের দান অস্বীকার করবার নয়।
-লেখক।
;
==

পতিতা কেন হলুম
আমাদের বর্তমান সভ্য-সমাজের ভেতর প্রাচীন বর্বর যুগের
অসভ্যতা আজে। সভ্যতার মুখােস পরে লুকিয়ে আছে,
আর সে সমাজের উপর প্রতিপত্তি বিস্তারে
সফলও
হয়েছে ;
কিন্তু প্রকৃত
সভ্যতা আজো পাথরে মাথা
খুঁড়ে মরছে।

No text on this page.

এই মাত্র গির্জার ঘড়িতে রাত দেড়টা বাজলাে।
তুহিন হন্ হন্ করে এগিয়ে চল্ল। শ্যামবাজার সাইডে কোন
একটা বড় রাস্তার বুক চিরে ছােট্ট একটা গলি সাপের
মতো এঁকে বেঁকে চলে গেছে। গলিটা দেখে মনে হয়
যত রাজ্যের পাপ এখানে এসে বাসা বেঁধেছে। এখানে
বিভিন্ন শ্রেণীর লােকের বাস-অবশ্য বড় দরের নয়, ছােট
দরের। যেমন—গয়লা, মুচি, কুলি, মেথর, ধােপ, খবরের
কাগজের হকার, কুলপী বরফওয়ালা ইত্যাদি। তুহিন
এই গলির একটা জীর্ণ প্রায় মেসে থাকে কাজ করে একটা
প্রেসে।
রাত দেড়টা। কলিকাতা মহানগরীর কোলাহল বন্ধ
এসেছে। সমস্ত দিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর
প্রায় সবাই এখন সুপ্তির কোলে আশ্রয় নিয়েছে। নীরব
নিস্তব্দ রাত। মাঝে মাঝে কেবল দু-একটা রিক্সার ক্লান্ত
টুনটুন আওয়াজ শােনা যাচ্ছে। দূর-বহুদূর হতে দু-একটি
ক্ষুধিত কুকুরের করুণ আর্তনাদ রাতের মৌনতা ভঙ্গ করছে।
হয়ে

পতিতা কেন হলুম
১০
অ!ি
আরম্ভ করলাম—যে রাস্তার কথা বলছি সে রাস্তা
দিয়ে সাধারণতঃ “ভদ্রলােক” নামধারি কোন শিক্ষিত সুসন্তান
সচরাচর যাতায়াত করেন না; কারণ বিষাক্ত হাওয়া
লেগে তার শুচি মনকে অশুচি করে দিতে পারে, তার
মৰ্যাদার হানি হতে পারে—দুর্বল চিত্ত বলে। আর যদিও
যায় তাদের যাওয়া-আসা অন্ধকারের ভেতর দিয়ে, আলােকে
তারা ভয় করেন। কিন্তু কি আশ্চর্য্য দেখ
একদিন এই-ই রাস্তা দিয়ে আমাদের অসীমকে যেতে
দেখলাম। মনে পড়ে অসীমকে ?-লম্বা-ছিপছিপে, রংটা
ফর্সা, মাথাময় অযত্নে সজ্জিত বড় বড় চুল—চোখদুটো কিন্তু
ভারী সুন্দর—যাকে বার দাস বলতে—“That large
headed man with thin fingers is very ferocious'
—আমাদের সহপাঠী সেই অসীম রায় ; প্রফেসররা যার
উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আগে থেকেই foretell করে
ছিলেন—এম, এ-তে সে ফাষ্ট হবেই। যার বাবা সীমাহীন
গুণের জন্য তার নাম রেখেছিলেন অসীম! আজ সেই
অসীম ঘুরছে কতগুলো বই হাতে সামান্য আশ্রয় পাবার
জন্য এই কুৎসিত পল্লীতে। আজ তার এই অধঃপতন
কেন হােল অশ্রু বলতে পারাে ? –পারােনা। কারণ
মানুষের জীবনে মাঝে মাঝে এমন কতগুলাে দুৰ্বল
মুহূৰ্ত আসে, যখন মানুষ দুর্বল হয়ে পড়ে, তার বিবেক
বুদ্ধি লােপ পায়—আর সেই জন্যই তাে মানুষ আজ মানুষ

পতিতা কেন হলুম
অতি মানুষ তারা, যারা এদের এড়িয়ে যেতে পেরেছেন।
পথ শুধু ঘােরাতেই জানে, আশ্রয় দিতে জানে না।
ঘুরে মরছিল—শেষে আশ্রয় অসীম পেলে এক জনের
কাছে—সে মিনতি ! সে বাংলারই মেয়ে, আমাদেরই সমাজের
বুকে সে একদিন গড়ে উঠেছিল—তার রক্তের সঙ্গে
মিশে আছে আমাদের বাংলার ধুলি-পরমাণু যতকিছু সব।
কিন্তু এতবড় বাংলাদেশে একটু মাথা গোঁজবার স্থান তার
হােল না ; তাই তাকে আশ্রয় নিতে হােল এই গলীর
একটা বাড়ীর ছােট্ট ঘরে। যার জানলার পাশ দিয়ে সন্ধ্যে
থেকে আরম্ভ করে রাত একটা দুটো পৰ্য্যন্ত বেলফুলের মালা
ওয়ালারা হেঁকে যায়, কুলপি বরফওয়ালারা ডেকে চলে
“চাই মালাই বরফ—বাদাম পেস্তার রাবরির বরফ!” যার
বাড়ীর সামনের পানওয়ালটা সর্বদা শুনতে পায়—
পিয়ারী, পান আর দুটো সােডার বােতল দিয়ে যারে !”
মিনতি থাকে সেই বাড়ীতে যে বাড়ীর মালিক হচ্ছে
এপাড়ার বিখ্যাত ফিরােজা বাড়ীওয়ালী। বাড়ীওয়ালীর
পয়সা আছে, এ পাড়ায় নামও সে কিনেছে, তাই শরীরের
ওপর চামড়ার স্তরটা একটু বেশী পরিমাণে পড়ে গেছে।
আশ্রয় অসীম পেলাে এক অদ্ভূভাবে। ঘুরে মরছিল
এদিক-ওদিক ; হঠাৎ চোখে পড়ে গেল পাশের বাড়ীটা
ঢুকে পড়লাে, সামনেই পেলাে মিনতিকে। সুশ্ৰ কুশ্রী
বিচার করবার সময় বা ইচ্ছা তার ছিল না—সে শুধু
;

পতিতা কেন হলুম চেয়েছিল একটা নিরালা আশ্রয়। সদর দরজার পাশ দিয়ে যে বাঁকটা গেছে বাড়ীর ভেতর, সেখানে চি একটা ছােট্ট নমস্কার করে মিনতিকে অসীম জিজ্ঞাসা করলো— “আশ্রয় পাওয়া যাবে?” মিনতি একটা ছােট্ট নমস্কার ফিরিয়ে দিয়ে বল্লো “কত- ক্ষণের” ? “এক রাত্রির জন্য।”--অসীম ছােট্ট করে জবাব দেয়। আসুন।সংক্ষিপ্ত উত্তর। এর বেশী বলবার মিনতির আর কিছু ছিল না। ঘরে ঢুকে অসীম বল্ল,-“চমৎকার ঘরতাে!” মিনতি মনে করে, অসীম বােধ হয় তাকে ব্যঙ্গ করছে মুখােস পরা সভ্য সমাজের ব্যঙ্গ অসভ্য বর্বর সমাজের প্রতি। মিনতি রাগে জ্বলে ওঠে। দু-একটা কড়া কথা শুনিয়ে দেবে ভেবেছিল; কিন্তু পারলাে না। এ রাস্তার খাতায় একবার নাম লেখালে সম্মান অসম্মান জ্ঞান যে একেবারে ভুলে যেতে হয় মিনতি সেটা ভুলে যায় নি। তাই শুধু উত্তর দিল—“আমাদের মতাে লােক এর চাইতে সুন্দর ঘর আর কোথায় পাবে বলুন ?” “না, না। আমি তা বলছি না। আপনি কোথায় যেন ভুল করছেন। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে বল্ল, “দয়া করে দরজাটা দিয়ে দেবেন?” জানাে অশ্রু, এখানে এলে লােকের চোখের ওপর পর্দা পতিতা কেন হলুম ফেলে দরজা বন্ধ করতে হয়। দরজা বন্ধ করে মিনতি এগিয়ে এলো। কিন্তু কিন্তু করে অসীম বল্ল,—“মাপ, করবে, আর একটি বার আপনাকে বিরক্ত করবাে- বড় খিদে পেয়েছে, কিছু খাবার আনতে পারেন ?”-বলে অসীম একখানা দশ টাকার নােট এগিয়ে দিল। —কি খাবেন বলুন ? –বিশেষ কিছু নয় ; যা আপনার ভালাে লাগে•••••• --বাঃ, আপনি খাবেন, আর আমার ভাল লাগে মানে ? —আপনি বুঝি বাদ যাবেন ভেবেছেন ? -না, না, না, আমার এখন খিদে পায়নি—আপনি কী খাবেন বলুন ? —ও, আপনার আবার একটু জাতি বিচার আছে বােধ কারাে ছােয়া খান না, না ? --আমাদের আবার জাত-অজাত -আমরা যে সব জাতের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছি। মিনতি জানে আজ তার কোন জাত নেই—কিন্তু একদিন ছিল।যখন সে স্কুলে পড়তাে ; যখন মিনতি বাপ- মায়ের নিবিড় স্নেহ বন্ধনে বাঁধা ছিল – কিন্তু আজ তার পরিচয় শুধু “বারবনিতা” আর কিছুই নয়—আজ সে একাকার। খাবার এলাে—তার সদ্ব্যবহারও হােল। কিন্তু খাওয়ার পর একবার এক কাপ চা না হলে অসীমের চলে না। তাই

পতিতা কেন হলুম
১৪
তাকে সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বলতে হােল--দেখুন
খাওয়ার পর এক কাপ চা না হলে আমার কি রকম পেট
ভরে না•••••••••,
-অর্থাৎ এক কাপ চা চাই কেমন তাে ?
-ঠিক বলেছেন।ওই ছেলেটাকে আর একবার
ডাকুন না।
—ছেলেটাকে ডাকতে হবে না, চা আসবে—"বলে
মিনতি চায়ের কেটলিটায় করপােরেশনের ঠাণ্ডা জল ভরে
নিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল—গেল পাশের ঘরের প্রতি-
বেশিনীর কাছে, বল্ল,-লতিকাদি, এই চায়ের জলটা একটু
গরম করতে দিবি ভাই ?
কেন লা ?-এত রাত্রে আবার চায়ের নেশা জেগে
উঠলাে বুঝি ?
—তামার নেশা নয় ভাই, লােকের চাহিদা মেটাতে
হবে।
-ও তাের নতুন অতিথির বুঝি ?
—হ্যা একেবারে নতুন-brand new—ভেজাল নয়।
—যালাে যা, আর অত ইংরিজী ফলাতে হবে না—
জানিস তাে তাের মত আর লেখা পড়া শিখতে পারি নি-
নে নে তাড়াতাড়ি গরম করে নে।
লতিকাদির ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি।
চায়ের জলটা উনানে বসাতে বসাতে মিনতি বল্ল,

পতিতা কেন হলুম
কিন্তু
;
-সে কি গো, সকাল সন্ধ্যে তােমার ঘরে মিলিটারি
যাওয়া আসা করছে আর তুমি ইংরিজী শেখােনি ?
—কিন্তু তুই যতই ঠাট্টা কর মিনি, ওদের মতাে পয়সা
কেউ দেবে না—তবে বড় জ্বালাতন করে।
জানাে অশ্রু, লতিকাদির নাম সত্যিই লতিকা নয় ;
তার বাপমায়ের দেওয়া নাম ‘পুটি আধুনিক কালের
চাহিদা মেটাবার জন্য পুরনো নামটার ওপর প্পি দিয়ে
হয়েছে লতিকা, লতা, লতি, লতু ইত্যাদি ।
জল গরম করে মিনতি ঘরে ফিরে এলাে। তারপর
চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে বসে গেল চা করতে। অসীম একটু
হেসে বল্ল,-আপনারও চা খাওয়া অভ্যেস আছে নাকি ?
-কেন বলুন তো? —ঘাড়টা বেঁকিয়ে মিনতি
জিজ্ঞাসা করলাে।
—মানে চা তৈরীর সব সরঞ্জাম দেখছি কিনা।
-ওসব আপনাদের জন্য—ভীমনাগের সন্দেশ দিয়ে
তো আর আপনাদের অভ্যর্থনা করবার ক্ষমতা আমাদের
নেই-একদিকে য়্যারিস্টোক্রেসী ও বজায় রইল আর
সস্তায় কিস্তিমাৎ হােল—তাছাড়া বর্তমান যুগে চা না
খাওয়াইত অসভ্যতা, সত্যি কি না বলুন ?
—খাটি সত্য ! -ছােট্ট জবাব দেয় অসীম।
মিনতি একবার অসীমের দিকে আড় চোখে চেয়ে
চাপার কলির মতো আঙ্গুল দিয়ে চা তৈরী করতে ব্যস্ত
থাকে।

পতিতা কেন হলুম অনভিজ্ঞ অসীম হয়তাে ভেবেছিল—চা মিনতি পায় না কিংবা অল্পদিনের অভ্যাস এ রাস্তায় এসে। কিন্তু অসীম জানেনা যে চা-খাওয়া মিনতির ছােট বেলাকার অভ্যাস। তার ছােট বেলার সব স্মৃতিই মুছে গেছে, কেবল বেঁচে আছে তার চা খাওয়া। শীতের দেশেদার্জিলিংয়ে জন্ম তার। মিনতির বাবা ছিলেন “দাজ্জিলিং টি প্ল্যানটিং সােসাইটীর- ইন্সপেক্টর-ইন-চার্জ। তাই তাদের মাটির মায়া কাটিয়ে থাকতে হােত হিমালয়ের পায়ের নিচে–কাঠের বাড়ীতে। মিনতি বাবার কৰ্ম্মকুশলতা এবং কৰ্ম্মতৎপরতার জন্য চা-বাগানের নীচু থেকে উচ্চপদস্থ কৰ্ম্মচারীরা সকলেই তাকে অপরিসীম শ্রদ্ধা করতো—ভালবাসতাে। চা-বাগানের বড় সাহেবের মেম্ মিসেস্ থমসন প্রায় রােজই এসে মিনতির মাকে প্যাটিস, পুডিং থেকে আরম্ভ করে রুমালে ফুল তােলা—সবকিছু শেখাতেন। মাঝে মাঝে 712739 Ceca "Christ's Sermon upon the mount The eight beatitudes” বর্ণনা করতে করতে বলতেন- "And when thou dost alms, let not thy left hand know what thy right hand doth." মিনতি তখন ছেলেমানুষ এসব কথার কিছুই বুঝতাে না—তবু ভাল লাগতাে-ও হুঁ করে চেয়ে থাকতাে—সে সব কথা মিনতির আজো মনে আছে। মিসেস খসকে অভ্যর্থনা করতে চায়ের দরকার

১৭
পতিতা কেন হলুম
হােত; তাছাড়া শীতের দেশ—দু’বেলা তাদের চা না হলে
চলতাে না। তাই মিনতির এইটাই বেশী অভ্যাস হয়ে
গিয়েছিল।
সকাল এবং রাত্রে খাবার পর চা না খেলে তার
কি রকম পেট ভরতাে না। ওটা আজো তাই ছাড়তে
পারেনি।
অতীতের বিস্মৃত স্মৃতির মধ্যে এইটাই তার
আজকের একমাত্র সম্বল—যাকে ধরে সে আজো বেঁচে
আছে। যার জন্য
আজো মনে পড়ে যে সে
এই-সমাজের জন্যেই পৃথিবীর আলো দেখেনি। সে পৃথিবীর
প্রথম স্বাদ পেয়েছিল এক অভিজাত বংশে, কোন কালিমাই
যে বংশের মুখ পােড়ায়নি। হতভাগিনী মিনতির স্বর্গ থেকে
পতন নরকে। মিসেস্ থমসন্ বলতেন ;
'In the sweat of thy face shalt thou eat
bread till thou return to the earth, out of
which thou wast taken : for dust thou art, and
into dust thou shalt return."
চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে অসীম বল্ল,-
আপনাকে অনেকক্ষণ বােধ হয় আটকে রাখলাম, আর
ধরে রাখবাে না, আপনি যেতে পারেন।”
এরই মধ্যে প্রয়ােজন ফুরিয়ে গেল ? আচ্ছা স্বার্থপর
লােকতো আপনি।
না, না, না ; উপস্থিত প্রয়ােজন দেখছিনা, তবে পরে
হতে পারে। এই ধরুন, পড়তে পড়তে এক কাপ চাএর
---
!

পতিতা কেন হলুম
১৮
যদি দরকার হয়—আর এটা হবেই—তখন আপনি বিরক্ত
হলেও—I can't help-আপনাকে ডাকবােই।
মিনতি কথাগুলো হজম করে বেশ মােলায়েম সুরে
বল্ল, বেশ তাে! আপনাদের অর্ডার তামিল করতেই তত
এই জাতটার জন্ম।”—বলে নিজেকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে
দিলে।-“কিন্তু এছাড়া আপনার কি আর কোন প্রয়ােজন
নেই ?” -একটু আশ্চর্য হয়েই মিনতি কথাটা জিজ্ঞাসা
করলাে।
—আর তো প্রয়ােজন দেখছিনা। —ছােট্ট উত্তর
দেয় অসীম।
মিনতি অসীমের দিকে চেয়ে নিজের মনে মনে বলে-
অদ্ভুত।
তােমরা হয়তাে অশ্রু অসীমকে হস্তিমূখ বলেই আখ্যা
দেবে, কিন্তু ও ওই রকমই-একটু খাপছাড়া—একটু
এলােমেলাে সাধারণ গতানুগতিক নিয়মের গণ্ডীর বাইরে ও
চলাফেরা করে তাই ওকে আমার বেশ লাগে।
“একি! দাড়িয়ে রইলেন যে ?”—অসীম প্রশ্ন করে।
“ভাবছি লােকে আমাদের কাছে আসে অত্যাচার করতে,
অত্যাচারী হতে—আর আপনি এসেছেন শুধু লেখা-পড়া
করতে একটু যেন স্বতন্ত্র।”
হ্যা, আমি একটু শান্তি প্রিয়—অত্যাচার পছন্দ
করিনা-অত্যাচারের আসল
রূপটা জীবনে বহুবার
-

== পতিতা কেন হলুম দেখেছি কিনা—তাছাড় এটাতো জানেন ?—Many men many minds. মিনতি কথা বলে না ; মনটা শুধু ঘরে রেখে বাইরে বেড়িয়ে যায়। ঘরে অন্য কেউ নেই। অসীম একা। চেয়ার- টেবিল—আলো—একটা খাট-খাবার বাসন—একটা ইজি চেয়ার-টেবিলের ওপর একটা পুরনো আনন্দবাজার পত্রিকা মূক হয়ে পড়ে রয়েছে—এরা প্রাণহীন নির্জীব-জীবনের মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে এদের—অথচ সুন্দর, পরিষ্কার, ঝকঝকে। একবার এদের দিকে তাকিয়ে অসীম বইএর পাতায় মন দিল—পড়তে হবে পারিপার্শ্বিক অবস্থার কথা ভুলে। হঠাৎ সামনে কি পাশের ঘরের কোন এক দেহেপসারিনী বিকট চীৎকারে গান ধরলেন—“স্বপন প্ৰিয় এসাে এসো আমার বুকে।” অসীমের চমক ভাঙ্গলো-জানালাটা বন্ধ করে, একটা সিগারেট ধরিয়ে পড়ার পাতায় মন দিল। ( ২ ) আঁধারের ওপর প্রকৃতি আর এক পােচ কাল রং ঢেলে দিল—পাশের ঘরের ঘড়িতে রাত দুটো বাজলো। অসীমের খেয়াল নেই, সে পাতার পর পাতা উল্টে চলেছে- বিরাম নেই পড়ায়, ক্লান্তি নেই চোখে—পাশ তাকে করতেই হবে। সিগারেটের ছাই পাশে ফেলতে গিয়ে অসীম দেখলো—মিনতি ঠিক তার পাশে এসে কখন দাঁড়িয়েছে,

পতিতা কেন হলুম
ক্লান্তিতে সে নুয়ে পড়েছে, চোখ ছােট হয়ে এসেছে তন্দ্রায়,
এদেহকে আর সে বইতে পারছে না।
আর কতক্ষণ ? -মিনতি হাই তুলতে তুলতে জিজ্ঞাসা
করলো।
কি বলুনতাে ? -অসীম একটু হেসে প্রশ্ন করে।
মানে আপনার এই পড়া, রাত ক’টা হােল খেয়াল
আছে ?
-শুলে এখন চলবে না তো।
—কেন ?—ছােট্ট প্রশ্ন।
—কাল যে আমার পরীক্ষা।
—পরীক্ষা থাকলেও, পরীক্ষার্থি রাতে ঘুমােয়।
-তারা সব মা সরস্বতীর বরপুত্র—আমার কথা স্বতন্ত্র।
-ওসব স্বাতন্ত্র-টাতন্ত্র বাদ দিন—আপনাকে এবার
শুতে হবে।—মিনতির কণ্ঠে জেদের আভাষ পাওয়া গেল ।
—জোর?
;
-না, অনুরােধ।
অসীম একবার ঘরের চারিদিকে চেয়ে নিল ; তারপর
মিনতির মুখের দিকে চেয়ে বল্ল, কিন্তু পােব কোথায় ?
-শােবার স্থানটী কি চোখে পড়ছে না ?
—তা পড়ছে সত্যি! কিন্তু শােবার স্থানটীতে নয়
আমি শুলাম, কিন্তু আপনি ?
-কেন, আপনার পাশে,একটু জায়গা
জায়গা হলে

পতিতা কেন হলুম
চলবে।—দ্বিধা না করে মিনতি বল্ল ।
জানাে অশ্র, দ্বিধা করা ওদের সাজে না।
অসীম বল্ল,—না, সে বড় বিশ্রী দেখাবে।
বিশ৷ ?- মিনতি হাসলো, যেন spark—বিদ্যুৎ
চমকালাে।—কিন্তু ভুলে যাচ্ছেন কেন, কদৰ্য্যতা ঘাটতেই তো
আপনারা আমাদের কাছে আসেন।
-আপনার কোথায় যেন একটু ভুল হয়ে যাচ্ছে।
অসীম ব্যথিতস্বরে বল্ল।
-ও আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে আপনি একজন
স্বতন্ত্র পুরুষ। তবে আমার এ ভুলের জন্য আপনার
কাছে ক্ষমা চাইব না, কারণ নারী শাক অন্নে
আর পুরুষ নানা ব্যঞ্জনে অভ্যস্থ। আপনিও পুরুষ, তাই
আমার ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক।”—তারপর একটু ভেবে
মিনতি বল্ল,-“বেশ ; আপনি খাটটায় শুয়ে পড়ুন আমি
ইজি চেয়ারে যাই।”
—না না না, কি করে হয় ?—আমি পুরুষ মানুষ,
আমার কষ্ট সইবে, কিন্তু আপনি মেয়ে, এ আপনার সইবে
;
-আপনি বড় কঁদুলে, বড় ঝগড়া করেন। যুগযুগ ধরে
আপনারা আমাদের দাসী বলে আছেন এবং দাসী করে
রেখেছেন—সুতরাং সেবাটা আমাদের প্রাপ্য, তাই না?
এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হওয়া উচিত হবে কি?”

পতিতা কেন হলুম
২২
।
অসীম দেখলাে মিনতি শিক্ষিতা—কথা জানে, তাই
আর কোন তর্ক না করে বইটই বন্ধকরে খাটে গিয়ে শুয়ে
পড়লাে। কিছুক্ষণের মধ্যে অসীম ঘুমিয়ে পড়লো। কিন্তু
মিনতির চোখে ঘুম নেই। যতরাজ্যের উৎকট চিন্তা-রাশি
তার মস্তিষ্কে বুদবুদের মতাে একের পর এক ভেসে উঠতে
লাগলো। আজ মিনতির হােল কি ?—এ রােগ তাে তার
ছিল না।
কত লােক এসেছে আবার চলে গেছে তার
জীবনে এমনতাে কোনদিন হয়নি। তাদের প্রয়ােজন
ফুরিয়েছে তারা চলে গেছে মিনতির প্রাপ্য মিটিয়ে মিনতিও
তাদের ভুলে গেছে সময়ের পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু
অসীমকে ধরে রাখবার জন্য মিনতির প্রবল বাসনা কেন ?
মিনতি আর ভাবতে পারে না-ইজি চেয়ার থেকে উঠে
পড়ে—এবার সে পাগল হয়ে যাবে। উঠেই নজরে পড়ে
ঘরের খাটটা—উঠে যায় মিনতি খাটটার দিকে। অসীম
তখন গভীর সুসুপ্তির কোলে নিমগ্ন। এত ঘুম ও পেলাে
কোথায় ?-মিনতি ভাবে—তার সৃষ্টি-ছাড়া চোখে আজ
ঘুম নেই কেন ? অসীমতাে বেশ নিশ্চিন্তে ঘুমচ্ছে আর
ওর চোখে ঘুম নেই কেন ? মিনিত ভাবে অনেক কিন্তু
অকূল সে ভাবনা।
অর্ধেক বিছানার ওপর চাদের আলাে এসে পড়েছে
যেন লুকোচুরি খেলা করছে। মিনতি অসীমের বিছানার
আরাে কাছে এগিয়ে যায়। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে

পতিতা কেন হলুম
অসীমের ঘুমন্ত মুখের দিকে।—কি সুন্দর মুখ, নিস্পাপ
অবােধ শিশু, মানুষের এত রূপ হয় ?-মিনতির মনে প্রশ্ন
ওঠে। বিস্তৃত ললাটে ঘামে চিক্ চিক করছে, চোখে উদাস
চাহুনি যেন কি খুঁজছে, কিন্তু পাচ্ছে না তো, মুখে মৃদু
হাসি যেন সমগ্র বিশ্বের ওপর সুধা বর্ষণ করছে—গ্রীক
দেবতা—শিশু দেবতা আমার তােমার এ দুর্গতি কেন ?
পথে নেমে এলে কেন তুমি ? পথে তাে তোমার স্থান নয়।
তােমার মা তােমায় ছেড়ে দিল ?—পাষানী, পাষানী সে।
মিনতির সমস্ত করুণা অসীমের ওপর ঝড়ে পড়ে।
গভীর স্নেহে ব্যাগটা তার গায়ে দিয়ে দেয়—তারপর ?
তারপর মিনতি একে দিল তার ললাটে এক মৃদু চুম্বন।
ক্ষণিকের জন্য অসীম নড়ে ওঠে, মিনতির পা কঁপে।
অসীম আকাশের বুকে চাদটা খিলখিল করে হেসে ওঠে—
জ্যোৎস্না গুড়ো গুড়াে হয়ে ছড়িয়ে পড়ে অসীমের গায়ে
- দূরে একটা তারা খসে পড়ে পৃথিবীর বুকে।
মূক নগরী মুখর হােল ! রাতের স্তব্ধতা দিনের
ব্যস্ততায় পরিণত হােল-দিনের আলাে পৃথিবীর আনাচে
কানাচে ছড়িয়ে পড়লাে। বেলা প্রায় সাতটার সময় অসীমের
দুম ভাঙলো। উঠে একটু আলস্য ভেঙ্গে নিয়ে ঘরের
চারিদিকে চাইতেই দেখে পাশের টেবিলটার ওপর প্রাতঃরাশ
সাজানো রয়েছে আর মিনতি ঘরের কোণে চা তৈরী

পতিতা কেন হলুম
২৪
করতে ব্যস্ত। একটা সিগারেট ধরিয়ে অসীম পেছনে ফেলে
আসা জীবনের ছেড়া পাতা ওল্টাতে থাকে•••••••••••••••।
মিনতি পেছন ফিরতে দেখে—অসীম বসে আছে।
একটু হেসে মিনতি বল্ল,—ঘুম ভাঙলো?—কী ঘুম বাবা !
কুম্ভকর্ণের second edition.
—না ভেঙে উপায় নেই—কিন্তু টোষ্ট, ডিম এসব
আনালেন কেন ?
দরকার ছিল।—এই বলে মিনতি দু-কাপ চা নিয়ে
অসীমের কাছে এলো।
মিনতির পরনে ছিল একটা চওড়া লালপাড় শাড়ী।
সদ্য স্নান করা ভিজে চুল পেছনে খােলা রয়েছে। কপালে
একটা সুন্দর বড় সিদুরের টিপ—ভােরের শিশিরের মতােই
সুন্দর কমনীয় দেখাচ্ছে মিনতিকে। অসীম কোন কথা
না বলে এক সিপ, চা নিয়ে মুখটা কুলকুচি করে জানালা
দিয়ে ফেলে দিল। মিনতি চায়ে চুমুক দিয়ে অসীমের দিকে
দুষ্টুমি ভরা চোখে তাকিয়ে গত রাত্রের কথা ভাবছিল, আর
মুচকে মুচকে হাছিল। গতরাত্রে তার জীবনে যে অভিনয়
হয়ে গেছে তার স্মৃতি মিনতির মনে এক গভীর দাগ রেখে
গেছে। জীবন যুদ্ধে আজ দুজনেই ক্লান্ত, পরিশ্রান্তকার
ব্যথা কে বােঝে এই বােধ হয় সমস্যা। কিন্তু মৌনতা
ভঙ্গ কোলে মিনতিই প্রথম। একটু হেসে বল্ল,—আপনি
ভাবছেন কী মুস্কিলেই পড়লাম বাবা এই
মেয়েটার কাছে

পতিতা কেন হলুম
••
এসে—না?”-বলেই মিনতি বালিকাসুলভ খিল খিল করে
হেসে ওঠে।
ভাবছি— এবার আপনার পাওনা মিটিয়ে পথে,
নামতে হবে অসীম গম্ভীর হােয়ে বল্ল ।
—মানে ?-মিনতি আশ্চর্য হয়ে একটা কপালে
তুলে জিজ্ঞাসা করলাে।
মিনতির মুখের ওপর দৃষ্টি নিবন্ধ রেখে অসীম বল্ল,
এর মানে নেই, এর মানে আমি জানি না, এর মানে
থাকতে পারে না”-একটু থেমে বল্ল,-“আর তাছাড়া
আমার পরীক্ষা-যেতে তাে হবে?”
—সেতো বেলায়,-এখন কি ?
—তা ঠিক ; তবে পেটের তাে একটা ব্যবস্থা করতে
হবে ?—হাজার হােক বাঙালীর ছেলে, ভাত না হলে চলে?
—ও বেচারীর জন্য আপনার উপস্থিত মাথা না ঘামালেও
চলবে। তাছাড়া রান্নাঘরের ভারটা আমরাইত চির কাল
নিয়ে থাকি, এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হওয়া কি উচিত হবে ?
যদি আমার হাতে না খান।—মানে এই জাত-বিচারের কথা
বলছি••••••বলে মিনতি হেসে ফেল্ল।
অসীম হাসতে হাসতে জবাব দিল—“আপনার হাতে
খাবাে না খুব সত্যি কথা, তবে আপনার হাতে রান্না জিনিষ
খেতে পারি—তাছাড়া ও সব ঝাট করে লাভ কি বলুন ?”
—লাভ?—জীবনে
সময় ব্যক্তিগত লাভ

পতিতা কেন হলুম
;
লােকসানের হিসেব খতিয়ে দেখতে গেলে চলে না। তাছাড়া
এতে ঝাটেরই বা কী আছে?—একটু থেমে, অসীমের মুখের
দিকে নির্বাক বিস্ময়ে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলাে-“আচ্ছা
আপনি কী ?
-কেন মানুষ !-সে বিষয়েও আপানার সন্দেহ আছে
নাকি ?—হেসে সহজভাবে অসীম বল্ল।
—আপনি মানুষ সত্যি কিন্তু বড় ছেলেমানুষ।
অসীম কি যেন বলতে যাচ্ছিল ; মিনতি বাধা সৃষ্টি
করে আগের কথার জের টেনে
বল্ল,-তাছাড়া অতিথিকে
খাইয়ে বিদায় দিতে নেই— পাপ হয়, আপনি এটাও
জানেন না ? যান আমাকে আর বকাবেন
ছেলের মতাে স্নান করে আসুন আমি সব ঠিক করে রাখছি।”
আমি ত আপনার রাতের অতিথি, এখন পুরনাে বাসিন্দা
হয়ে গেছি—না খেয়ে গেলে পাপ আপনাকে স্পর্শ করবে না।
আর তাছাড়া ওটা মেয়েদের ধরে রাখবার একটা সহজ
উপায় বা অছিলা।”—মিনতির কথায় প্রতিবাদ করে
অসীম বল্ল।
“আজ্ঞে না মশাই ; পুরুষ মানুষ কি বােঝে জানি না,
তবে পুরুষ মানুষ বাড়ী থেকে না খেয়ে গেলে মেয়েরা বড় ব্যথা
পায়।-মিনতি একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বল্ল।
—ছাই পায়। সাত সকালে পুরুষ গুলােকে ছাই-ভস্ম
গিলিয়ে ঘানিতে জুড়ে দেয়। তারপর নিজেদের রুচি মতাে

২৭
পতিতা কেন হলুম
সহস্তে উৎকৃষ্ট বন্ধন করে নিজেদের লালসা চরিতার্থ করে ।
—যথা ঘাড়টা টেরচা করে দ্রুকুটি ভরা চোখে
সম্পূর্ণভাবে অসীমের দিকে তাকিয়ে হেসে মিনতি জিজ্ঞাসা
করলাে।
—যথা?—পিঁয়াজ কলির চচ্চরি, বাটী চচ্চরি, ঝাঁটা
চচ্চরি, ঝিঙে-পােস্ত তেঁতুলের টক্ ইত্যাদি।”......
আপনি এত-ও জানেন ?—অসীমের কথায় মিনতি
হেসে ওঠে। তারপর শাসিয়ে বল্ল,-দেখুন, ভালাে হচ্ছে
বছি, আপনি আমাদের ব্যক্তিগত খাবারে নজর
দিচ্ছেন।—এখনো দাড়িয়ে রইলেন ?—যান স্নান করুন গে।
—কিন্তু আমি যে চুল কাটবো••••••চুল যদি আজ না
কাটি পাগল বলে পরীক্ষা হল থেকে তাড়িয়ে দেবে যে।
-মাথার বড় বড় রুক্ষ চুলগুলাে দেখিয়ে বল্ল।
—বেশ ।-আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, শেষে সেলুনে
ঢুকতে ডাইংক্লিংয়ে ঢুকে পড়বেন ?
-আমাকে একদিনে এতটা বােকা ঠাওড়ালেন কি
করে—আচ্ছা মেয়েদের সাইকোলজি••••••
—এটা সাইকোলজি নয়, এটা আমার লজিক—আমার
সঙ্গে তর্কে পারবেন না। শুধু এটা যেনে রাখুন যে আপনি
বােকা নন, আপনি অবােধ আর দুর্বোধ্য। ভােলাকে
ডেকে দিচ্ছি; ওর সঙ্গে চুল কাটতে যান।” মিনতির ডাকে
ভােলা আসে।

কোন । পতিতা কেন হলুম ২৮ সেই গতরাত্রে যে ছেলেটি এদের খাবার এনে যুগিয়ে ছিল। ভােলা, ভােলাই—আর কিছু নয়। ওযে মায়ের ছেলে তাও কেউ জানে না অশ্রু। ও শুধু international—ও সকলের। ও এ বাড়ীতে কাজ করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত, যতক্ষণ না সকলের ডাকের পরিসমাপ্তি ঘটে। পারিশ্রমিকও পায় সকলের কৃপায় সকলে চাদা তুলে যা দেয় বােধ হয় তাতেই ওর চাওয়া পাওয়ার হিসেব শেষ হয়। তাছাড়া মাঝে মাঝে বাবুরা যে বশিস্ দেয় সেটায় ও লুকিয়ে লুকিয়ে বিড়ি ফেঁাকে আর মাঝে মাঝে তসবির মহলে বাহাদুরকা খেল, পিস্তলওয়ালী প্রভৃতি দেখে থাকে। ভােলার একটা মস্ত গুণ—ও কারো কথায় ‘না’ বলে না। তাই মাঝে মাঝে বাশি রুটী আর মাংস থেকেও বঞ্চিত হয় । তবে ভােলা যে এ বাড়ীর অন্যান্য ভাড়াটেদের অপেক্ষা মিনতিকে একটু বেশী ভালবাসে—কেন যে, জানি না। এসে একগাল হেসে জিজ্ঞাসা করলাে;-- —মিনি দি আমায় ডেকেছো ? —হঁ্যা, বাবুকে তুই ঐ ছট্টর দোকানে চুল কাটতে নিয়ে যান। ভাই-হ্যা, আর দেখিস বাবুর কাছে যেন ছ’আনার বেশী না নেয়। -আপনারো চুল কাটা অভ্যেস আছে নাকি ?—হেসে অসীম জিজ্ঞাসা করলাে। —অভ্যাস নেই তবে ছট্টর বিরাট সাইন বাের্ডের কৃপায়

১১
পতিতা কেন হলুম
জানতে পেরিছি। ও আবার বলে special ঘঁট, নাকি
দশ আনা। আপনি আবার যেন ওর ঐ special ছাঁটে
পড়ে যান, তাই সাবধান করে দিচ্ছি।
-না, আপনি লজিকের চেয়ে দেখছি ইকনমিক টা
ভালো জানেন।-বলে হাসতে হাসতে অসীম ভােলার
অনুসরণ করলাে।
( 8 )
অসীম চুল কেটে ফিরলাে। পেছনে মুটের মাথায়
এক বিরাট বােঝা—তাতে বাজারের কোন জিনিষ বাদ
পড়েনি এমনকি একট। আজকের আনন্দ বাজার পত্রিকাও
এসেছে।
-একি !—মিনতি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
“সংসার পাতবেন নাকি ?
অসীম ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,-া, তবে সেটা
ক্ষনিকের।
এটা কিন্তু আপনার ভারী অন্যায়।—মিনতি কুষ্ঠিত
জানাে অশ্রু মিনতি এমন একটা মেয়ে যে কোন দিন
দান পায় নি, চায়ও-নি-ওটা ওর স্বভাব নয়। কিন্তু আজ
অযাচিতভাবে যে দান তার দ্বারে এসে উপস্থিত হােল, তাকে
মিনতি অবহেলা করে দূরে ফেলে দিতে পারলাে না-
হয়তাে ওটা ওর দুর্বলতা।

পতিতা কেন হলুম
৩০
অসীম বল্ল-দেখুন, ন্যায় আর অন্যায় এই দুটো
মিলেই তাে আমাদের জীবনে এতে কেন’র সৃষ্টি করেছে—
ও দুটো থেকে দূরে থাকবার চেষ্টা করবেন।”—তারপর
টেবিলের ওপর রাখা টাইমপিষ্টার দিকে চেয়ে বল্ল,-
ঘড়ির সব কটা বেজে গেল, ভাত বাড়ুন, বড় খিদে পেয়েছে।
-স্নান করবেন না ?
—ওটা সেরেই এসেছি।
–কিরকম ?
—আপনার ছটু, যে আমায় হাফ বয়েল্ড করে দিল।
—সেটা আবার কি ?-মিনতি বিস্ময়ে অসীমের দিকে
তাকালাে।
—মানে, হাফ, বাথ, আর কি।
-সাধে কি আর আপনাকে দুর্বোধ্য বলি।—মিনতি
হে বল্ল এখন ভাত খাবেন কি ?
বিশল্যকরণী আতে
গিয়ে যে একেবারে গন্ধমাদন তুলে নিয়ে এলেন, সেগুলো
কি হবে শুনি?
-বিশল্যকরণীর ও দাওয়াই আমার জন্য নয়--ও সব
আপনার ; শুধু আমার ঐ মৎস্যকরণীটা—ওইটাতেই
উপস্থিত দয়া করে হাত দিন।”
ভাত খেতে খেতে অসীম থেমে যায় ; তাকিয়ে থাকে
পাশে বসে থাকা মিনতির দিকে।
-কি ভাবছেন ?-মিনতি জড়সড় হয়ে বসলো ;
;

৩১
পতিতা কেন হলুম
—ভাবছি-‘আতিথেয়তা’ বলে কথাটা আজো এই
পােড়া বাংলা দেশ থেকে মুছে যায় নি, আর ওটাকে আরাে
সুন্দর করে তােলে বাংলা দেশের মেয়েরা-আপনারা।
তারপর একটু থেমে বল্ল, আর সত্যি তাদের দেখলে মনে
হয় যে হয় তাে তাদের পাপ হবে—অতিথি বিমুখ হয়ে
ফিরে গেলে। আমি সকালে যে কথাটা বলে ছিলুম তুলে
নিচ্ছি মিনতি দেবী।-ওটা আপনাদের ছলনা বা অছিল।
নয়—ওটা একটা খাটি সত্য কথা—ওটা আপনাদের একটা
qualification.
মিনতি বর্তমান পারিপার্শ্বিক কথা ভুলে অসীমের দিকে
শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে ভাবে—অসীম তার আপনজন, অতি
আপনজন, প্রিয়। ভগবানের সৃষ্টি পাল্টেছে
কিন্তু তার
পা-টায়নি। ভগবানের ওরা একমাত্র সৃষ্টি। যুগযুগ ধরে
ওর পরিবর্তিত না হয়ে সৃষ্টি হয়ে এসেছে। ভগবানের ওরা
অনবদ্য সৃষ্টি, শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। অসীম সৃষ্টির প্রথম পিতা-
আদম ; আর ও সৃষ্টির প্রথম মাতা-ইভ ;—অসীম আদম
ও ইভ,। ওদের মধ্যে যদি একজন বিদায় নেয়, তা হলে
সৃষ্টির ক্ষয় হবে, সৃষ্টি রসাতলে যাবে। অসীম একাধারে
ভাই-বন্ধু-প্রিয়-চিরচলার সাথী। মিনতি ক্ষনিকের জন্য
সম্বিত ফিরে পেয়ে অস্পষ্ট স্বরে মনে মনে বলে-ভগবান
একি করলে তুমি ? এ বাসনা কেন ?—এ বাসনা কেন
আমার !–আমি যে পতিতা। নিষ্ঠুর দেবতা এটাকি তুমি
;

পতিতা কেন হলুম
বুঝেও বােঝ না ?
না? ও বাসনা যে আমার পূর্ণ হবার
নয়। এতদিন অন্তরের অন্তঃ কোণে যে মন্দির শূন্য
পড়ে ছিল সে মন্দিরে যে তুমি নিষ্ঠুর দেবতা শিকড় গেড়ে
বলে, তােমাকে তাড়াবাে কেমন করে বলে দাও।
তাড়াবার নয়। এ যে হৃদয়ের আরাধ্য দেবতা, সাধনার ধন।
তুমি সুন্দর, তুমি অপরূপ, কিন্তু তুমি এতাে নিষ্ঠুর কেন ?
কঠিন কেন ?
তােমার হৃদয়ের পবিত্রতা দিয়ে সকল
নারীকে মুগ্ধ করবে, চিত্ত জয় করবে, আর তাদের মনের
চিরন্তন কামনা-বাসনা শুবে না? চরিতার্থ করবে না ?
তােমার মােহনরূপ দিয়ে নারীর অন্তর দাহ কররে, তাদের
ধরা দেবে না? নিষ্ঠুরের মতাে পদদলিত করে চলে যাবে ?
যদি ধরাই না দেবে তবে দেখা দিলে কেন ? আমায় বলে
যাও তােমার এ জয় যাত্রার শেষ কোথায় ? তােমার চলার
শেষে গিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকবে যুগযুগ ধরে—শুধু
তােমারই অপেক্ষায়।
-আপনার কি মাথার গােলমাল আছে ? তখন থেকে
ডাকছি শুনতে পাচ্ছেন না ?-অসীম হেসে বল্ল ।
মিনতি লজ্জিত হয়ে বল্ল,-একটা কথা ভাবছিলাম
তাই শুনতে পাইনি।
—ভাবা বলে ভাবা ; এবার কলম ধরুন।
—হ্যা একটু আগে কি বলছিলেন ?--মাথা খারাপ ?
মাথা অবশ্য এখনাে খারাপ হয়নি তবে হবার উপক্রম।

পতিতা কেন হলুম
তারপর অসীম যাবার জন্য বিদায় নিল। বইগুলো
মিনতির হাতে দিয়ে বল্ল,-“বইগুলাে আপনার কাছে রইল
পরের বই, পরীক্ষা দিয়ে এসে নিয়ে যাবো।
নিয়ে যাবো। কি দেখছেন,
কিছু বলবেন ?”
--কিছু না।
--যাই তবে কি বলুন?
—যাই বলতে নেই—আসুন।
( ৫ )
পরীক্ষা শেষে অসীম ফের ফিরে এলো মিনতির কাছে।
মিনতি বিছানায় শুয়ে আজকের আনন্দবাজারটা দেখছিল—
দেখছিল আজকের পৃথিবীর রূপ—বাংলার সমাজ জীবনের
স্তরে স্তরে ভাঙ্গন-পেটের দায়ে দলে
দলে নারীর
আত্মবিক্রয় --মিত্রশক্তির সসম্মানে কক্স বাজার হইতে পশ্চাৎ
অপসরণ, আরাে কত কি।
অসীমের পায়ের শব্দে অসংযত
গাত্রাভরণকে ঠিক করে নিয়ে মিনতি উঠে বসলো।
হেসে
বল্ল,-- কি রকম পরীক্ষা দিলেন ?
—বেশ ভালই দিয়েছি।
-একটাও বাদ পড়েনি তাে?—ব্যগ্র হয়ে ওঠে
মিনতির স্বর।
চেয়ারে বসতে বসতে অসীম বল্ল,-না, একটাও বাদ
যায় নি।

পতিতা কেন হলুম
৩৪
মিনতি তাড়াতাড়ি চায়ের কেটলিটা নিয়ে ঘর থেকে
বেরিয়ে যেতে যেতে বল্ল,-
-আপনি
বসুন,
আমি আছি ।
-কোথায় যান ?
—হারাবাে না।—ছুটে মিনতি বেরিয়ে গেল ।
অসীম সমস্ত ঘরটার দিকে চেয়ে দেখলো, চেয়ে দেখলো
একবার সেই খাটটার দিকে । ভাবলো সব খেলার এখনই
শেষ হয়ে যাবে-যবনিকা পড়ে যাবে ছােট্ট জীবনের অভিনয়
শেষে। কষ্ট হলো মিনতিকে ছেড়ে যেতে। একদৃষ্টে চেয়ে
রইল আলনায় রাখা মিনতির একখানা শাড়ীর দিকে।
-মুখটা তাড়াতাড়ি একটু ধুয়ে নিনদিকি।
অসীম ফিরে দেখলো—এক হাতে খাবারের ঠোঙা আর
অন্য হাতে আচল দিয়ে কেটলিটা ধরে মিনতি ঘরে ঢুকলাে।
-এ সব আবার কেন আনালেন ? বড় অন্যায় হচ্ছে
কিন্তু
—দেখুন ন্যায় আর অন্যায় এ দুটো মিলেই তাে আমাদের
জীবনে এত কেন’র সৃষ্টি করেছে—ও দুটো থেকে দূরে
থাকবার চেষ্টা করবেন।-বলে মিনতি অসীমের দিকে চাইতেই
হেসে ফেল্ল।
খাওয়া শেষ করে অসীম একটা সিগারেট ধরালাে—
সামনে মিনতি বসে। একদৃষ্টে অসীম চেয়ে রইল মিনতির
দিকে।
-দেখছেন ?-হেসে মিনতি জিজ্ঞাসা করলো।

পতিতা কেন হলুম -না, ভাবছি। -কি ? —ভাবছি একটা পাহাড়ের বুকচিরে দুটো সঙ্কীর্ণ জলধারা নেমে এসে এক সময় তারা মিশে এক হয়ে যায়, তারপর তারা বয়ে চলে অবিরাম গতিতে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ; আবার এক সময় তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দুপথে চলে যায়। তাদের ক্ষণিক মিলনের স্মৃতি মুছে যায় সময়ের পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে। মিনতি কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে বলে ফেল্ল,-But nothing can resist the course of love. অসীম বিস্মিত হয়ে ভেবে বল্ল,—হয়তাে তাই – আচ্ছ। উঠি। অসীম উঠে পড়লাে। তার বইয়ের ভেতর থেকে কত- গুলো নোট বের করে দিল মিনতির হাতে। মিনতি ক্ষণিকের জন্য অসীমের স্পর্শানুভব করলো; মিনতির হাত কাঁপলে।। মিনতি অবাক হয়ে বল্ল,—মাগো মা, কি লােক আপনি । বইয়ের ভেতর ওরকম করে টাকা রাখে ? পড়ে যেতে পারতাে ত ? অসীম হেসে বল্ল,-পারতো, কিন্তু গেলে ক্ষতি নেই, থাকলে বােঝা বাড়ে। মিনতি অসীমের মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করলো—কোথায় যাবেন ?

পতিতা কেন হলুম
জান অশ্রু,
মিনতি নতমুখে বল্ল,
—আর একটা আশ্রয়ের খোঁজে।
-কেন, এখানে থাকতে আপনার অসুবিধা হচ্ছে ?
-অসুবিধে হচ্ছে না—আপনার ক্ষতি হচ্ছে বােধ হয়•••
মিনতি করুণ হাসি হেসে বল্ল,—যার সম্বল কিছুই নেই
তার আবার লাভ, তার আবার লােকসান ।
অসীম মিনতির কথায় কান না দিয়ে রুদ্ধকণ্ঠে বল্ল,—তবে
তােমার কথা আমার মনে থাকবে—তােমার উপকার আমি
চিরদিন মনে রাখবাে মিনতি।
ক্ষণিকের দুর্বলতার জন্য আপনি’ ‘তুমি’
পৰ্য্যায়ভুক্ত হলো।
নতমুখে বল্ল,-“লালসার প্রেরণায় তােমাকে আমি
আশ্রয় দিয়েছিলাম, উপকার করতে নয় । আমার উপকার
মনে রাখা প্রয়ােজন দেখি না; বরং আমার অজ্ঞাতে যদি
তােমার কোন অসন্মান হয়ে থাকে, আমায় ক্ষমা করাে।”
–মিনতি তার ধাবাহিক অশজল দমন করবার চেষ্টা
করলাে।
তারপর মিনতি টাকাটা ফেরত দিতে দিতে বল্ল,
টাকাতো আমি নেব’না••••••
—কেন ?—আশ্চর্য হয়ে অসীম প্রশ্ন করলো।
-সকলে জানে আমি একজন সাধারণ বেশ্যা—তা
জানুক ; শেষে তুমিও••••••” মিনতি আর বলতে পারে না,
তার দু-গাল বয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

৩৭
পতিতা কেন হলুম
তােমায় অসম্মান
করে টাকা দেবে এত বড়
অকৃতজ্ঞ আমি নই মিনতি। মনে কর’ এটা স্নেহের দান।
তাছাড়া আমার কাছে টাকা কটা থাকলে এক মিনিটেই
নিঃশেষ হয়ে যাবে—তােমার কাছে জমা রেখে গেলাম।
—যত অজুহাতই দেখাও তুমি, টাকা আমি নেবাে না।
—কিন্তু মিনতি স্নেহের দান দেবার অধিকার
সকলেরইত’ আছে—সে অধিকারটুকুও কি আমি তােমার
কাছে আশা করতে পারি না ?
মিনতি অশ্রুসজল মুখখানি অসীমের দিকে তুলে ধরে
প্রশ্ন করলাে,-“শুধু-শুধু স্নেহ, আর কিছু নয় ?”
-“হ্যা শুধু স্নেহ, আর কিছু নয়••••••।”
তুমি তাে জানাে অশ্রু যেখানে ভালবাসার গভীরতা
বাড়ে সেখানে ভাষা লােপ পায়। ক্ষণিকের জন্য দুজনের-ই
ভাষা লােপ পেলো। অসীম সচেতন হােল।
সকল দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করে
বল্লে,-ঝোড়াে হাওয়ার মতাে এসে দুদিন তােমায় খুব কষ্ট
দিয়ে গেলাম মিনতি।
মিনতি অশ্রু সম্বরণ করতে করতে বল্ল,-রােজ রােজ
তো আর দিতে আসবে না—দু-দিন নয় দিয়েই গেলে।
মনে মনে ওর দেবতাকে জানিয়ে বল্ল,–এরকম কষ্ট
আমায় যদি জীবন ভর দিতে ভগবান ?—একটু পরে মিনতি
রুদ্ধ কণ্ঠে বল্ল,—আবার কবে তােমার দেখা পাবাে ?
হৃদয়ের

পতিতা কেন হলুম
৩৮
আর যদি
—দেখা?-অসীম আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
—হা-মিনতি নিজেকে হারিয়ে ফেল ।
-জানিনা মিনতি আবার কবে এ দেখার যবনিক।
উঠবে। তবে যে দিন বুঝবাে
তোমাকে ছাড়া আর
কাউকেই আমার চারিধারে দেখতে পাচ্ছিনা সেদিন যেখানেই
থাকি, ফের ফিরে আসবো তােমার কাছে।
না আসি,- একটু থেমে বল্ল,ভুলে যেও আমাকে।—বলে
অসীম এক পা এগিয়ে যায় দরজার দিকে।
-একটু দাঁড়াও••••••
—একি হােল ?
-তােমায় বড় প্রণাম করতে ইচ্ছে হােল, কৈ
আশীর্বাদ করলে নাতাে?
আশীর্বাদ আমি কমিনা মিনতি। কারণ আমি হচ্ছি
একটা বড় রকমের হতচ্ছাড়া, ছন্নছাড়া—যতরাজ্যের অমঙ্গল
বাসা বেঁধে আমার সঙ্গে ঘােরে ; তাই ভয় হয় তার ছোঁয়া
লেগে যদি তোমার কোন অমঙ্গল ঘটে ।
মিনতি বিষাদের হাসি হেসে বল্ল,—আমি নিজেইত’
অমঙ্গলের বােঝা—বিষে বিষক্ষয় হবে—আমায় আশীর্বাদ
কর তুমি-”
অসীম মিনতির মাথায় হাত রাখলো; কি আশীর্বাদ
করলে। ঈশ্বরই জানেন। অসীম এগিয়ে চল্ল।
—আর একটা কথা......”

পতিতা কেন হলুম == অসীম ফিরে দাঁড়ালো। মিনতির মুখের দিকে চেয়ে বল্ল,-“বল” —দুদিনের পরিচয়ে তােমাকে দেখে যেটুকু বুঝলাম তাতে মনে হয়-আমারই মতাে এজগতে তােমার আপনজন কেউ নেই। তাই বলছি যদি কোন দিন তােমার চলার পথে তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়’ তখন বিশ্রামের দরকার হবে ; তখন আমারই কাছে ফিরে এসাে। আমি জানি মানুষ আমাকে ঘৃণা করলেও দেবতা আমাকে ঘৃণা করবেন না।" মিনতি অসীমকে মিনতি করে বল্ল। —সে কথাতো আমি আগেই বলেছি মিনতি-মিনতির মিনতি রাখবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে অসীম তাড়াতাড়ি পথে নেমে এলাে। যতক্ষণ দেখা যায় মিনতি চেয়ে রইল অসীমের দিকে। হাতে বই নিয়ে কি তাড়াতাড়ি অসীম চলেছে। এক সময় মিনতির চোখকে ফাকি দিয়ে রাস্তার অগণিত বিপুল জনস্রোত কোথায় হারিয়ে দিল তার অন্তরের অসীমকে। অসীম, অসীম পৃথিবীর বুকে মিলিয়ে গেল। তখনো মিনতি দরজার ধারে দাঁড়িয়ে অসীমের ফেলে যাওয়া পথের দিকে চেয়ে ভাবছে—সত্যি অসীম যেন একটা ঝােড়ে। হাওয়া; হঠাৎ ক্ষণিকের জন্য এসে সব কিছু ওলােট- পালােট করে দিয়ে চলে গেল—রেখে গেল এক বিরাট ধ্বংসের স্তৃপ, গভীর ক্ষতচিহ্ন।

পতিতা কেন হলুম ৪০ এই খানেই অসীমের তরুণ জীবনে যবনিকা পড়লো। তার মধ্যে জীবনের কাহিনী ইতিহাস রাখেনি—জগতের কেউই জানেনি-এমনকি আমিও জানিনা, অশ্রু। ( ৬ ) তারপর সুদীর্ঘ পনেরাে বছর পর অসীমের দেখা পেলাম। প্রথম দৃষ্টিতে আমি অসীমকে চিন্তে পারিনি। পরে চিলাম ওর চোখ দুটো দেখে। ওর ওই চোখ দুটো আমার বড় পরিচিত কিনা। দেখলাম সেদিনের অসীমের সঙ্গে আজকের অসীমের আকাশ-পাতাল প্রভেদ। যুগ- হাওয়ার প্রভাবে যে মানুষের এরকম আমুল পরিবর্তন হতে পারে আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি অশ। সেদিন দেখেছিলাম রিক্ত আজ দেখলাম ধনপতি, কোটীপতি অসীমকে। জানােত’ অশ, “প্রতিভা এমন একটা জিনিষ, ইহা যাহাকিছু স্পর্শ করে তাহাকেই সজীব করিয়া তােলে।” তাই আবার লিখতে সুরু করলাম। আবার সেই বহু বিখ্যাত এবং কুখ্যাত, অভদ্র, অপ্রশস্ত গলির পুনরাবৃত্তি – যে গলিতে পনেরো বছর আগে আমরা একদিন অসীমকে দেখিয়াছিলাম। কিন্তু এই কি সেই গলি? অনেক অনেক সংস্কার সাধন হয়েছে দেখছি। সেই সেলুনটা গেল কোথায় ?—এতে মুদির দোকান। আবার পিয়ারী পানওয়ালার দোকানের জায়গায় দেখি ডাইক্লিনিং- মহা বিভ্রাট তো! কিন্তু মিনতির বাড়ীটা ? বট গাছটার অসীমকে,

৪১
পতিতা কেন হলুম
দেখতে
পরেই ছিল না ?-হ্যা, ঠিকই হয়েছে—এই তাে সেই বাড়ী,
সেই দরজা--সেই তাে তারা আজো চূণকালি মেখে দাঁড়িয়ে
রয়েছে। সেদিন যারা ছিল যৌবনমদে মত্তা, আজ তারা
সময়ের পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে—খেয়াঘাটের
শেষ সীমায়—কিন্তু নিয়মের ব্যতিক্রম তাে
পাই না। বাড়ীটা তবে জীর্ণ হয়ে পড়েছে কত দিনের
বাড়ী জানিনা, তবে এই তাে পনেরােটা বছর এর বয়স
বেড়ে গেল।
মিনতিদের বাড়ীর সামনে একটা প্লিমাউথ, কার
এসে দাড়ালাে। গাড়ী থেকে নামলেন একজন সুট পরা
সাহেবী ধাচের লােক। বয়স আন্দাজ চল্লিশের কাছাকাছি।
কানের কাছের চুলে একটু একটু পা ধরেছে; গালের
মাংসও একটু লােল হয়ে পড়েছে—তবে ভদ্রলােকের মুখে
বেশ একটা ব্যক্তিত্বের ছাপ পাওয়া যায় ;
এবং সুস্থ। ভদ্রলােককে বাড়ীতে ঢুকতে দেখে অনেক
মেয়ে আশে পাশে সরে দাড়ালো। যুবতী যারা, তাদের
কেউ কেউ সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ওদের অভ্যস্থ
নানা প্রকার অস্ত্র প্রয়ােগ করতে লাগলাে। এদেরই
ভেতর ছিল প্রৌঢ়ত্বের দ্বারে এসে উপস্থিত লতিকাদি—
মিনতির সেই লতিকাদি। লােকটি লতিকাদির কাছে গিয়ে
থামলাে; চেয়ে রইল লতিকাদির মুখের দিকে কিছুক্ষণ ;
তারপর কিন্তু কিন্তু করে জিজ্ঞাসা করলাে,--“নমস্কার,
;
দেহ বেশ সবল
••

পতিতা কেন হলুম ৪২ আচ্ছা আপনিই কি মিনতির সেই লতিকাদি ? –আজ্ঞে হঁ্যা, কেন বলুন তাে?—বিস্ময়ে লতিকাদি প্রশ্ন করলাে। পেছন থেকে কে যেন টিপ্পনি কাটলাে—বুড়াে বুড়ি মিলেছে বেশ। অসীম বল্ল,—কারণ আছে, তার আগে আমায় চিনতে পারছেন কি না বলুন•••••• পনেরাে বছর আগে প্রথম যে জায়গায় দাড়িয়ে অসীমের সঙ্গে মিনতির কথা হয়েছিল, লতিকাদি নিজেকে লােক চক্ষুর আড়ালে রাখবার জন্য আজ ঠিক সেই জায়গাতেই সরে এলো। বল্ল,—আপনি এদিকে আসুন। অসীম লতিকাদির কথা রাখলাে, হেসে বল্ল,—“অনেক- গুলাে বছর কেটে গেছে। তাদের চলে যাওয়ার স্মৃতির ছাপগুলাে আমার দেহের ওপর রেখে গেছে, তাই আমায় চিতে পারছেন না লতিকাদি—কিন্তু আমার দৃষ্টিশক্তি, স্মরণ শক্তির ওপর চলে যাওয়া দিন গুলাের প্রভাব এসে পড়েনি তাই আপনাকে প্রথম দৃষ্টিতেই আজ আমি চিনতে ভুল করিনি।” পনেরাে বছর আগের দিন গুলাে লতিকাদি একের পর এক খুঁজে যেতে লাগলো—কত লােকের কথা মনে এলাে; যদিও ওদের জীবনে মনে রাখার মতো লােক খুব কমই আসে। তবুও যাদের কথা মনে পড়লো, আজ

৪৩
পতিতা কেন হলুম
সঙ্গে
মনে
অসীমের তাদের কোন সাদৃশ্যই লতিকাদি খুজে
পেলো না। লতিকাদিকে ভাবতে দেখে অসীম আবার
হেসে বল্ল,-“আচ্ছা লতিকাদি, মিনতির জীবনে আসা
এমন কোন লােককে কি আপনার মনে পড়ে যে শুধু একটা
রাত্রের আশ্রয় চেয়েছিল মিনতির কাছে—শুধু একটু
নিরালায় লেখাপড়া করবার জন্য ; মনে পড়ে না অসীমকে-
যে একদিন রাত্রে কত গুলো বই হাতে করে এসেছিল মিনতির
কাছে ?”—জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে অসীম চেয়ে থাকে।
পনেরাে বছর আগের স্মৃতির পাতা হাঁতরে লতিকাদির
পড়লাে অসীমকে। অসীমের চেহারা লতিকাদির
মনে না থাকলেও ‘অসীম’ নামটা লতিকাদির মনে ছিল ;
কারণ অসীম সম্বন্ধে সব ঘটনাই মিনতি লতিকাদির কাছে
খুলে বলেছিল। লতিকাদি বলেছিল,—ওলো এরকম লােক
আমাদের জীবনে আসে না, এরা হঠাৎ এসে পড়ে। ধরে
রাখলে সুখী হতিস ছুড়ি। মর সারাজীবন চূণকালি মেখে
ঐ চেষ্টা করেই কাটা। ওলো আমাদের তাে দিন শেষ
হয়ে এলাে, আমাদের কথা ছেড়ে দে—কিন্তু তাের জীবনের
অনেকটা পথ যে এখনাে বাকি—এখন কিছু গুছিয়ে না
নিলে—বয়স হলে শুধু চূণকালি মাখাই সার হবে, বুঝলি ?
পুরুষ মানুষকে ধরে রাখবার বীজমন্ত্র ও শিখিস নি ছুঁড়ি ?”
এখন লতিকাদি অসীমকে চিন্তে পারলাে হেসে
বল্ল,-চিন্তে পেরেছি ভাই, কতদিনের কথা বল তো?”

পতিতা কেন হলুম
48
—হঁা, অনেক দিনেরই কথা লতিকাদি, যাক্, মিনতি
কেমন আছে? এখানে আছে না অন্য কোথাও চলে গেছে ?
—তার থাকা না থাকার কোন মানেই হয় না ভাই,
চলে সে যাবেই শুধু তােমার জন্যে দিন গুনছে।
—মানে ?—বিস্ময়ে অসীম জিজ্ঞাসা করলো।
লতিকাদি বল্ল,-“এসাে আমার সঙ্গে।”
( ৭ )
লতিকাদিকে অনুসরণ করে অসীম একটা ঘরে এসে
দাড়ালাে। ঘরে একটি কালিপড়া হারিকেন জ্বলছে—তাই
ঘরের সব কিছু স্পষ্ট করে দেখা যায় না। লতিকাদি
অসীমকে একটা চেয়ার ঝেড়ে দিল বসতে—চেয়ারটার ওপর
কতদিনের যে ধূলাে জমেছিল তার ঠিক নেই—হারিকেনের
সল্লাললাকে যতদূর দেখা যায় তাতে অসীম বুঝলাে—ঘরে
আসবাব পত্র বল্‌তে আজ আর কিছু নেই। ঘরের চারি-
ধারেই যেন দীনতা এবং অনাহূত এক পুঞ্জিভূত বেদনা
রাশি বিরাজ করছে।
দূরে অপরিসর একটি তক্তার ওপর
মলিন-ছিন্ন বিছানায় কে যেন ঘুমচ্ছে। বিছানাটির অবস্থা
দেখে অসীম শিউরে উঠলো, এতেও মানুষ সুখে
নিদ্রা
যেতে পারে !
এ ঘরে তার যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে
লাগলাে। অধীর আগ্রহে জিজ্ঞাসা করল,—“লতিকাদি
মিনতিকে একবার তাড়াতাড়ি ডেকে আনুন না, আমায়
আবার যেতে হবে তাে••••••।”

৪৫
পতিতা কেন হলুম
লতিকাদির চোখে জল এলাে। মানুষের জীবনে
সময় সময় এমন একটা দুর্বল মুহূর্ত আসে যখন সে নিজকে
হারিয়ে ফেলে, তার সব কিছু প্রকাশ পায় দু স্টেট। অশর
সাহায্য নিয়ে। তাই যুগযুগ ধরে অশই হয়েছে নারীর
একমাত্র সম্বল—একমাত্র আপনার জন, আত্মীয়, বন্ধু,
সাথী-অসময়ের সব কিছু। লতিকাদিকে তবুও দাড়িয়ে
থাকতে দেখে অসীম অধৈৰ্য হয়ে বল্ল,-লতিকাদি,
একবারটি তাকে ডেকে দিন -- সত্যি বড় দরকার।"
লতিকাদির অন্তরের চিরন্তনী নারী কেঁদে উঠলে।
ধরা গলায় দূরে ছিন্নমলিন শয়ানে শায়িত মৃত্যু পথযাত্রী
মিনতির দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বল্ল,—“ওই তাে তােমার
মিনতি ; ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝি !”
-..মিনতি !--
--অসীম নির্বাক বিস্ময়ে চেয়ে দেখলো
রােগ শীর্ণ। মিনতির দিকে। তারপর দৌড়ে গেল নিরি
কাছে, বসলো তার পাশে—চেয়ে রইল মিনতির ক্লি পার
মুখের দিকে । যে মিনতির চোখের সৌন্দৰ্য্য একদিন তাকে
যশের উচ্চ শিখরে তুলেছিল, যে মিনতির সৌন্দর্য্য এ
বাড়ীর সকল দেহােপসারিনীদের ঈর্ষার বস্তু হয়ে উঠেছিল,
আজ সেই মিনতির সেই আঁখি-সৌন্দৰ্য্য, সেই তনু
কোথায় গেল? আজ কালের পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে রুপসী
মিনতি, রূপহীনা শীর্ণ। মিনতিতে পরিণত হয়ে তার ওপর
নিদ্রা যাচ্ছে। . জীর্ণ শরীর তার বিছানার সঙ্গে পাত হয়ে

পতিতা কেন হলুম
৪৬
গেছে। দেহের প্রত্যেকটি হাড় বােধ হয় একটি একটি
করে গােণা যায়। গায়ে তাে একটি গহনা বলতে কিছু
নেই-ই তার ওপর পরনে মলিন ছিন্নপ্রায় শাড়ীখানি তার
জীবনের দৈন্য এবং জীর্ণতাকে আরাে প্রকট ভাবে ফুটিয়ে
তুলেছে। চোখের কোলে মিনতির চিরকালই কালি মনে
হয়, কিন্তু তার এই কালির জন্যই আগে তার আঁখি সৌন্দৰ্য্য
এত আদরণীয় ছিল। কিন্তু আজ সেই কালি তার জীবনের
কুরূপটা এত বেশী প্রকট ভাবে দেখাচ্ছে যে অসীমের চোখে
জল এলো। কতদিন হয়তাে স্নান করেনি, গায়ে ময়লা
জমে রয়েছে, মাথাটি ঠিক পাখীর বাসার রূপ নিয়েছে -
সেদিনকার মিনতির সঙ্গে আজকের মিনতির কোন সাদৃশ্যই
অসীম খুঁজে পেলো না। একটা সিগারেট ধরিয়ে অসীম
জিজ্ঞাসা করলাে-“লতিকাদি, মিনতির চিকিৎসা কিরকম
হচ্ছে?”
—আর ভাই চিকিৎসা ! যতদিন ওর গায়ে কিছু
ছিল, ততদিন ভালই হচ্ছিল। তারপর একে একে যখন
ঘরের দামী আসবাবপত্র থেকে গায়ের গহনাগুলাে পর্যন্ত
গেল, তখন ডাক্তার বাবুকে মিনতি করে বলেছিলুম- ডাক্তার
বাবু, বড় গরীব, যদি ওষুধের দামটা কিংবা আপনার ফিট।
ছেড়ে দেন•••••তাতে ডাক্তার বাবু হেসে বল্লেন, -আমি
তাে আর দানছত্র খুলে বসে নেই, যেখানে বিনা পয়সায়
হয়, সেখানে দেখাগে যাও। তারপর থেকে আমিই মিনির

৪৭
পতিতা কেন হলুম
- -
সব ভার নিয়েছি ভাই। আমার ঘর তুলে দিলাম, দুটো
ঘরের তাে ভাড়া চালাতে পারবাে না। ঘরের জিনিষগুলােও
বিক্রি করে দিলাম। এখন এই ঘরেই আমরা দুজনে থাকি।
যাকগে, ডাক্তারটির নাম কি ?—অসীম জিজ্ঞাসা
করলাে।
—সত্য ঘঘাষাল, ন' কি, মুখপােড়া ঐ পুঁটির ঘরে
যায়।
তার আবার দেমাক কত ! তাও মাগিটার গায়ে
একটা গহনা দিতে পেরেছে ?-- মর আবাগীর বেটা।
অসীম ঘুমন্ত মিনতির দিকে চেয়ে ভাবলো—এরাও
আজ শিক্ষিত ডাক্তার বলে নিজেদের মনে করে। একটা
গরীবের জীবনের চাইতে তার ভিজিটের দুটাকার মূল্য
বেশী হােল-রাফিয়ান, স্কাউলে কোথাকার।
—যাদের পুঁজি অল্প তাদের রিক্ত হতেও বেশী দেরী
লাগে না লতিকাদি, এর জন্যে দুঃখ করবার কিছু নেই।
যাকগে মিনতির ওষুধ পত্র আছে ?
-না ভাই। কাল ডাক্তার বাবুকে
আনবার জন্যই
তো আজ আবার চূণকালি মেখে দাড়িয়ে ছিলাম।-লজ্জায়
লতিকাদি মাথা হেট করলো।
অসীম নির্বাক বিস্ময়ে লতিকাদির দিকে তাকিয়ে
রইল, তার চোখে তখন অশ্রু টলমল করছে ।
মনে মনে বল্ল,-লতিকাদি লােকে তােমাদের অস্পৃশ্য
সমাজচ্যুত, পাপকাৰ্য্যের প্রতিমূৰ্ত্তি, বলে ; তােমাদের ছায়া ,

পতিতা কেন হলুম
৪৮
মাড়ালে নাকি নরক বাস। কিন্তু আজ আমি বছি তােমরা
হচ্ছ সহিষ্ণুতার প্রতিমূর্তি। অবিচার, অত্যাচার, নির্যাতন,
লাঞ্ছনা তােমরা সহ্য কর বিনা প্রতিবাদে। যে সমাজে
লতিকাদি, তােমার মত মেয়ে বাস করে, সে সমাজ যে
আজ কত উচ্চে তা আজ তােমাকে দেখে আমি বুঝতে
পারছি। অসীম বল্ল,-একটু কাগজ আছে ?
ঐ টেবিলে দেখতো—একটা খবরের কাগজ আর
একটা গানের খাতা আছে বােধ হয়।
অসীম টেবিলের কাছে গিয়ে দেখলো একটা প্রায়
পনেরাে বছর আগেকার পুরনাে আনন্দবাজার পত্রিকা
ধূলিমলিন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অসীম কাগজটাকে
দেখতে লাগলো। লতিকাদি বল্ল,—“ও কাগজটা নাকি
অনেকদিনের, ওটা মিনির বড় প্রিয়, কিছুতেই ওটা ফেতে
দেয় নি, কেন যে জানি না।”
অসীম বুঝলাে, পনেরাে বছর আগে একদিন এই কাগজ
সে নিজেই কিনে এনেছিল মিনতির জন্য। অসীমের চোখে
নূতন করে জল এলাে। তাড়াতাড়ি গানের খাতা থেকে
একটা পাতা ছিড়ে তাতে লিখলাে—
প্রিয় রবি,
তুই এখুনি একবার আমার সােফারের সঙ্গে এখানে
চলে আসবি, সঙ্গে স্টেথিস্কোপ আর ডাক্তারি ব্যাগটা নিতে
ভুলিস নি যেন। রবি, আমার এ বিশ্বাস আছে, সােফার

৪৯ পতিতা কেন হলুম তােকে যেখানেই নিয়ে আসুক না কেন, আমি যখন ডেকেছি, তুই না এসে থাকতে পারবি না। তাড়াতাড়ি আবি ভাই- নইলে আমার সব চাইতে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে—পরে সব খুলে বলবাে। তোর ‘অসীম চিঠিটা নিয়ে অসীম গেল ওর সােফারের কাছে, বল্ল, “রামসিং, তুম তুরন্ত সে চৌডরী ডাঙ্গার সাবকে পাশ চল মাও—এ চিঠিঠে। উনকো দেনা, ওউর উনকো ভি হিয়া লেআনা—জদি।” রামসিং সম্মতি জানিয়ে গাড়ীতে স্টার্ট দিল । ( ৮ ) অসীম ফিরে এলো। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞাসা করলাে,- আচ্ছা লতিকাদি, নতির কোন দেন পত্তর আছে কি ? -দেনা বেশী নেই ; সব ভাই আমি প্রায় শােধ করে এনেছি। শুধু ঘরের ভাড়াটাই যা ওর ক’মাসের বাকী পড়েছে। —এ বাড়ীর মালিক কে ? —মালিক অবশ্য একজন আছে, সে শুধু নামেই মালিক, কাজে কিছু নয়। এ বাড়ীর সব কিছু দেখা শােনা করে ফিরােজা বাড়ীওয়ালী-বাড়ীওয়ালা মুখ পােড়ার•••••

পতিতা কেন হলুম
৫০
-থাক আর বলতে হবে না, তাকে একবার ডেকে
আতে পারেন ?
—এখুনি ডেকে আনছি, ওপরেই থাকে।-বলে
লতিকাদি ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। অসীম মিনতির দিকে
চেয়ে মূক হয়ে বসে থাকে।
—দিদি আছে নাকি ?—দোতলার একটা ঘরের
দরজার কাছে গিয়ে লতিকাদি ডাকলো।
—আছি, কেরে ?
–আমি লতি।
-একটু দাড়া। আয় ঘরে আয়। ফিরােজা বাড়ী-
ওয়ালী ঘরে বসে পান সাজছিলেন। তার সর্বাঙ্গে সদ্য
প্রসাধনের আলাে ঝিকিমিকি করছিল। একটা বিরাট পানের
খিলি মুখে পুরে জিজ্ঞাসা করলেন,—“হঠাৎ এ সময় যে ?
বিশেষ কোন দরকার আছে নাকি?” তিনি যে লতিকাদির
আগমনে সন্তুষ্ট হননি, তার মুখ দেখে বােঝা গেল ।
লতিকাদি কিন্তু কিন্তু করে বল্ল,-“না, আমি জানতে
এসেছি আমাদের ক’মাসের ঘর ভাড়া বাকী আছে।”
-এখনি শােধ করে দিবি নাকি ?—বাড়ীওয়ালীর
কণ্ঠে শ্লেষের সুর ধ্বনিত হােল।
হ্যা।
বাড়ীওয়ালা বাবুটী এতক্ষণ কোন কথা না বলে
তাসের পেসেন্স খেলাতেই মত্ত ছিলেন। হঠাৎ বাড়ীভাড়ার

পতিতা কেন হলুম
—“তা,
সালের
ভুল হতে
কথা কানে যেতে তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না,
বল্লেন,-“এ আর জানবার কি আছে তােমার সব ক’মাসের
ভাড়াই তাে বাকী।”
লতিকাদি চোখ কপালে তুলে বল্ল,—“সে কি বাড়ী-
ওয়ালাদা ! গেল মাসে যে আমি বােশেখ জষ্টির ভাড়া দিয়ে
দিলুম, তারপরের ক’মাসের ভাড়াতো শুধু আপনি পাবেন।”
সত্যি তবে সেটা কোন বছরের দেখো।
এটা হচ্ছে ১৩৫১ সাল, আর সেট। যে ১৩৪৯
ভাড়া দিদি। আমার নাম রসিকলাল, আমার কি
পারে ?” —বলে তিনি আবার তাস খেলায় মগ্ন হলেন।
বাড়ওয়ালী গিন্নি কি একটা কথা বল্‌তে যাচ্ছিল, লতিকাদি
বাধা দিয়ে বল্লেন,—বেশ অতাে কথা কাটাকাটির দরকার
নেই, যিনি ভাড়া দেবেন নীচে রয়েছেন, তা বাড়ীওয়ালাদ।
কি একবার আমার সঙ্গে নীচে যাবেন ?
-“হা হা, এখুনি এখুনি।” বাড়ওয়ালী গিন্নির কথার
অপেক্ষা না করে রসিক বাবু লতি কাদির অনুসরণ করলেন।
যাবার সময় বাড়ীওয়ালী গিন্নির দিকে আড় চোখে তাকাতে
কিন্তু ভুললেন না। নীরবে কি কথা হােল কে জানে।
অসীম তখনো মিনতির বিছানার দিকে স্থির নেত্রে
চেয়েছিলাে। পায়ের শব্দে সম্বিত ফিরে পেয়ে চেয়ে দেখলাে-
লতিকাদি আসছে আর তার পেছনে বাড়ীওয়ালা। বাড়ী-
ওয়ালাকে দেখে একট। নমস্কার করে অসীম জিজ্ঞাসা

পতিতা কেন হলুম
করলাে,-আপনিই কি এ বাড়ীর মালিক
—-আজ্ঞে হঁা, আর বলি কি করে বলুন। হাত
কচলাতে কচলাতে রসিকলাল জবাব দিল ।
অসীমের চেহারা এবং বেশভূষা দেখে রসিক বাবু
বুঝলেন-মক্কেল মালদার।
মালদার। তার
তার ধারণাই ছিন' যে
লতিকাদির ঘরে অসীমের মত লােকের শুভাগমন হ'তে
পারে। তাই মনে তার আশা হােল, যে ভাড়া আদায়ের
আশা। তিনি একেবারে ছেড়ে দিয়ে ছিলেন, আজ হয়তো
তা সুদে আসলে আদায় হয়ে যাবে। অনাদায় ভাড়ার
আদায়ের পুলক তাকে বিচলিত করে তুললো।
—আপনি দাড়িয়ে কেন,
ঐ চেয়ারটায় বসুন না।
রসিক বাবু জড়সড় হয়ে বলেন।
—দেখুন এদের ঘর ভাড়া ক’মাসের বাকী পড়েছে
আমাকে জানাতে পারেন কি ?
--“নিশ্চই, নিশ্চই, এখুনি।”—তারপর মনে মনে হিসেব
করে বল্লেন,—“তা আপনার বছর দুয়েকের বাকী পড়েছে।”
লতিকাদি প্রতিবাদ করে বল্ল,-“সে কি দাদা?
আপনি যে সেদিন বললেন আর ছ’মাসের ভাড়া দিলে সব
শােধ হয়ে যাবে, আর আজ•••••
-নারে পাগলী না; তুই ভুল শুনেছিস। রসিক
লালের ভুল হয় না। সে বলেছিলুম ১৩৪৯ সালের ভাড়া
শােধ হবে। আর এক বছরের ?
;

পতিতা কেন হলুম
-জানিনা দাদা তােমরা কত রকমে হিসেব কর ।
অসীম ব্যাপার কিছু বুঝতে না পেরে বল্ল,-“অত কথা
কাটাকাটির দরকার কি ? তােমার কাছে বিল আছে তো-
সেগুলাে দেখলেই বােঝা যাবে ক’মাসের কিংবা ক’বছরের
ভাড়া বাকী আছে।”
-ও আমার পােড়। কপাল !-লতিকাদি কপালে
করাঘাত করে বল্লেন,-“তাকি ছাই পেয়েছি নাকি?”
--এ কিরকম! টাকা দিয়েছ’ বিল তাে পা ওয়া
উচিত।
--বাড়ীওয়ালাদাকে তো কতদিন বলেছি—দাদা ভাড়া
দিলুম বিলটা দেবেন না? তা আপনিইত আজ দেবব, কাল
দেবাে, আজ বিল ছাপান নেই বলে এতদিন কাটিয়ে দিয়েছেন।
বাড়ীওয়ালা রসিক বাবু একটু বিপদে পড়লেন।
কিন্তু ঝানু লােক ; এ পাড়ায় থেকে লােক চরিয়ে মাথার
চুল পাকিয়ে ফেলেছেন। তাই নিজেকে সামলে নিয়ে
বল্লেন,—“সে কি কথারে লতি ! ভদ্রলােক সজ্জন ব্যক্তির
সামনে আমায় চোর বানাতে চাস? ভাড়া দিয়েছিস আর
বিল দেবােন সে কি হয়। তুই তো একদিন বলি—দাদা
বিল নিয়ে কি হবে, আপনি কি ভাড়া বেশী নেবেন—ওগুলাে
আপনার কাছে থাকাও যা আমার কাছেও তা। তা বেশ
বিল আমি এখুনি দিয়ে দিচ্ছি। এ পাড়ার মাগীদের আবার
মানুষে বিশ্বাস করে ?”

পতিতা কেন হলুম
৫৪
বাড়ীওয়ালার শেষের কথাটা শুনে বাড়ীওয়ালাকে চিন্তে
আর অসীমের বাকী রইল না। এমন সময় একটু ‘উঃ
করে মিনতি পাশ ফিরতেই অসীম বল্ল,-“বেশ আপনার
যতদিনের ভাড়া বাকী পড়েছে হিসেব করে তাড়াতাড়ি একটা
বিল নিয়ে আসুন।”
– কিন্তু টাকাটা কি এখনই পাওয়া যাবে ?-হাত
কচলাতে কচলাতে বাড়ীওয়ালা জিজ্ঞাসা করলাে।
অসীম মিনতির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বল্ল,-
‘বিল কি আপনি টাকা না পাবার আগেই দিয়ে দেন ?”
—না, না, আমি এমনি জিজ্ঞাসা করছিলাম।—বলে
রসিকলাল আনন্দিত হয়ে তড়িৎ পদক্ষেপে বেড়িয়ে গেল।
রসিকলালকে হুড়মুড় করে উঠতে দেখে ফিরােজা এক
গাল হেসে জিজ্ঞাসা করলো,—“হ্যা গা, সত্যি কি লতি সব
ভাড়া ঢুকিয়ে দিলে নাকি ?”
—মাগীর কথা শােন। বলি দেবেনাই বা কেন ?
এত’ আর তােদের চুনােপুটি বাবু নয়—একেবারে বৃহৎ
রােহিত মৎস্য, বুঝলি ? তবে জানিস, বড় ভুল হয়ে
গেল। ইস্ আরাে যদি বছর দুয়েক বাড়িয়ে বহুম তা
হলে—যা গতস্য শোচনা নাস্তি।
—আ মর মিসে; তা আমার কানের কাছে বকে মরলে
কি হবে ? কথায় বলে “চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে।”
;

পতিতা কেন হলুম
(৯)
বাড়ীওয়ালা রসিকলাল ভাড়া নিয়ে আনন্দিত এবং
হৃষ্ট মনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। অসীম মনে মনে
স্বস্তির নিশ্বাস ফেল্ল।
—দেখুন ন্যায় আর অন্যায়-এদুটো মিলেই তো
আমাদের জীবনে এত কেনর সৃষ্টি করেছে—ওদুটো থেকে
দূরে থাকবার চেষ্টা করবেন।-অসীম তাড়াতাড়ি ফিরে
চাইল মিনতির দিকে, দেখলো মিনতি কথাটা বলতে বলতে
হাসছে। অসীম বুঝলে ডিলিরিয়াম-এর ঘােরে মিনতির
মুখ দিয়ে আজ পনেরাে বছর আগের কথা ফুটে উঠছে।
অসীম একটু বিচলিত হয়ে উঠলো—লতিকাদি এ-সময়
গেল কোথায় ? অসীম একটু ব্যগ্রভাবে দরজার দিকে
তাকালাে। দেখলে। লতিকাদি এক কাপ চা নিয়ে আসছে।
লতিকাদি চায়ের কাপটা অসীমের হাতে দিতেই, অসীম
বাধা দিয়ে বল্ল,—চা আবার কেন লতিকাদি ?
—চা যে তুমি খেতে ভালবাস' ভাই—মিনতি আমায়
সব বলেছে। আজ ও ভাল থাকলে, তােমাকে আর
বাজারের তৈরী চা খেতে হােত না ভাই—তােমার মিনতিই
করে দিত।
মিনতি আবার ভুল বক’ছে-
- ভীমনাগের সন্দেশ দিয়েতাে আর
দিয়েতাে আর আপনাদের
অভ্যর্থনা করবার সামর্থ্য আমাদের নেই-তাই চা দিয়ে সস্তার

পতিতা কেন হলুম
ওপর কিস্তি মারা হােল, আর ওদিকে যারিস্টোক্রেসীও
বজায় রইল—মিনতির মুখে একটা করুন হাসি ফুটে উঠলো
যা অসীমের অন্তরের অন্তঃ কোণে একটা ব্যথার সঞ্চার
কোরলো।
—থাক লতিকাদি, পাখা করতে হবে না - জানালা
দিয়েইত’ বাতাস আসছে ।-চায়ে চুমুক দিয়ে অসীম বল্ল,
“এ রকম ভুল নতি কতদিন বছে ?”
লতিকাদির পাখা চালানাের বিরাম নেই। একটা চেয়ার
টেনে নিয়ে বসে বল্লে,-“এ রকম ভুলত’ অনেকদিন থেকেই
বছে-তােমার কথা সব সময় মুখে লেগে আছে।”
অসীম কিছু বল্ল না—বলবার কিছু তার ছিল না; শুধু
নীরবে বুকভরা ব্যথা নিয়ে চেয়ে রইল মরণােন্মুখ মিনতির
দিকে। দেখলে মিনতি হাত বাড়িয়ে কাকে ধরতে যাচ্ছে
—কিন্তু হাতটা শিথিল হয়ে পড়ে যেতেই বল্ল,-“লতিকাদি.••
—এই
যে ভাই
মিনি আমি তাের কাছেই বসে
আছি।-বলে লতিকাদি মিনতির কাছে এগিয়ে গেল।
-ও আজো এলােনা লতিকাদি—কিন্তু বলে গিয়েছিল যে
আসবে। যাবার সময় একবার দেখাও করে যেতে পারবাে
ওর সঙ্গেও যদি আসে, আমায় যে চা করে দিতে হবে
উঃ কি চা-ই না খেতে পারে, ঠিক আমার মতো-ও-ও
বােধ হয় আমার মতো দার্জিলিং এ জন্মেছিল, না লতিকাদি ?
–তাই হবে বােধ হয়।-লতিকাদির চোখ জলে ভরে

৫৭
পতিতা কেন হলুম
এলাে। অসীম শুধু জানলার ভেতর দিয়ে মূক হয়ে পথের
পানে তাকিয়ে রইলাে—এখনো রবি এলাে না ?
-একটু জল ! —মিনতি জল চাইল।
লতিকাদি মিনতির মুখে জল ঢেলে দিল। কিছুটা গলায়
গেল, কিছুটা কস্ বেয়ে গড়িয়ে পড়লাে। অসীম তাড়াতাড়ি
রুমাল দিয়ে মিনতির মুখ মুছিয়ে দিল।
-ও এলে আমায় ডেকে দিও লতিকাদি-বলে মিনতি
ফের অচৈতন্য হয়ে পড়লো।
-দেখলেত তােমাকে আজো ভুলতে পারলাে না।
বলে লতিকাদি অসীমের দিকে চাইলাে।
এমন সময় বাইরে মােটরের হর্ণ বেজে উঠলো।
“ঐ এলো বােধ হয় বলে অসীম তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে
গেল। সদর দরজার কাছে যারা চুণকালি মেখে দাড়িয়ে
ছিল, তারা একপাশে সরে দাড়ালো। অসীম গিয়ে তাড়া-
তাড়ি গাড়ীর দরজা খুলে রবিকে দেখে বল্ল,-“তুই এসেছিস
রবি ? আমি জানি তুই না এসে থাকতে পারবি না। তুই
যে ঝড়ের আগে এটো পাতা-আয়।”—বলে রবিনের ডাক্তারি
ব্যাগটা নামাতে নামাতে বল্ল,—“রামসিং তুমি বড় রাস্তায়
গাড়ী রাখো—আর বাজার থেকে কিছু খেয়ে নাও-এই
নাও টাকা-গাড়ীতেই থেকে যেন।”
—জি সরকার।-বলে রামসিং গাড়ী নিয়ে চলে গেল।
রবিনকে নিয়ে অসীম মিনতির ঘরে এলো।
ঘরে ঢুকতে

পতিতা কেন হলুম
৫৮
ঢুকতে অসীম বল্ল,-“কোন প্রশ্ন তুলিস না রবি।”
—কোন দিন তো প্রশ্ন তুলিনি সীমা, তবে আজ ও
কথা বলছিস কেন—আমি ডাক্তার, এ কথা আমি ক্ষণিকের
জন্যও ভুলিনারে, চল, চল।
রবিন অসীমের সঙ্গে ঘরে ঢুকলো। লতিকাদি মাথার
ঘােমটাটা আর একটু টেনে জড়সড় হ'য়ে একপাশে সরে
দাড়ালো। অসীম এবং রবিন মিনতির কাছে এগিয়ে গেল।
—রবি এতদিন জাৰ্মানী, সিকাগাে ঘুরে যা শিখেছিস,
তার সবগুলো খরচ করে ফেল ভাই আজ।
রবিন স্টেথিস্কোপটা কানে লাগাতে লাগাতে একবার
অসীমের দিকে চেয়ে দেখলাে। অসীম জানে রবি রােগীকে
পরীক্ষা করবার সময় বেশী কথা বলে না, তবু অসীম বল্ল,
“রবি ওকে বাঁচিয়ে তােল ভাই, ও গেলে আমার যে কত বড়
ক্ষতি হয়ে যাবে-একদিন তােকে তা বলব।”
রবিন কোন কথা বল্ল না। মিনতিকে সব রকম ভাবে
পরীক্ষা করে স্টেথিস্কোপ খুলে ফেল্ল।
অসীম' ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞাসা করলো—কি রকম দেখলি
রবি বাঁচবে তাে ?
চেয়ারে গাটা এলিয়ে দিতে দিতে রবি বল্ল-“Too
late ! অন্ততঃ আর কিছুদিন আগেও যদি আমায় জানাতিস,
তাহলে একে আমি জীবনের মতো ভাল করে দিতাম
অন্ততঃ এ রােগটা আর হােত না।”

পতিতা কেন হলুম
-
অসীম লতিকাদিকে বাইরে যেতে বলে রবিকে জিজ্ঞাসা
করলো—“রােগটা কি দেখলি ?”
—পেটে ক্যানসার হয়েছে। লিভারটা একেবারে নষ্ট
হয়ে গেছে।
অসীম স্তব্ধ বিস্ময়ে রবিনের মুখের দিকে চেয়ে রইল,
তার মুখ দিয়ে একটা কথাও বেরলােনা। অসীমকে দেখে
রবি তার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বল্ল,-“ভয় কিরে,
আমিতাে এসেছি—দেখা যাক্ কতদূর কি করতে পারি।”
ইনজেসনের সিরিঞ্জটা ঠিক করতে করতে রবি বল্ল,
“মেয়ে ছেলেটিকে ডাক এবার।”
অসীমের ডাকে লতিকাদি ঘরে এসে মিনতির একপাশে
গিয়ে বসলো।
অসীম মিনতির মাথার কাছে বসে তার
মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাে। রবিন একটা ইনজেকসন
দিল মিনতিকে।
(১০)
রবিনের ইনজেসন খুব ফলপ্রদ হােল—কিছুক্ষণের
মধ্যে মিনতি জ্ঞান ফিরে পেয়ে চোখ চাইল। অসীম এবং
লতিকাদির মুখে প্রফুল্লতা দেখা গেল—কিন্তু রবিনের মুখের
কোন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হােল না। মিনতি একবার
সকলের দিকে চেয়ে দেখলাে। তারপর লতিকাদিকে ইসারায়,
ডেকে তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।
লতিকাদি জিজ্ঞাসা করলে—“আমায় কিছু বলবে?”

পতিতা কেন হলুম
এলােনা লতিকাদি—সময় যে হয়ে এলো
লতিকাদি-যাবার সময় একবার•••
অসীম মিনতির মুখের কাছে ঝুকে পড়ে বল্ল,-
“আমি তাে এসেছি, আমায় চিন্তে পারছে না ?”
মিনতি উত্তেজিত হয়ে চীৎকার করে উঠলাে—“তুমি !
তুমি এসেছো, কে বলে ভগবান নেই কিন্তু কেন এত দেরী
করে এলে ? আর কিছুক্ষণ আগে আসতে পারলে না?”
মিনতি উত্তেজনায় হাঁপাতে লাগলাে। রবিন ছুটে এসে
মিনতিকে বাধা দিয়ে বল্ল,-“আপনি বেশী কথা বলবেন না—”
তারপর অসীমের দিকে চেয়ে বল্ল,—“সীমা তুই ওদিকে গিয়ে
বােস—যা।” অসীমের চোখে জল দেখা গেল।
অসীমের একটা হাত ধরে মিনতি রবিনের দিকে
কাতর নয়নে চেয়ে বল্ল,-“না-না। ও আমার কাছেই বস্তুক ।
অনেক-অনেক কথা বলবার আছে যে। আজ না বললে
আর তাে বলতে পারবে না—তুমি আমায় ফেলে চলে
যেও না।” –বলে অসীমের দিকে সজল চোখে চেয়ে রইল।
অসীম নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলােনা রুদ্ধ
আবেগে বল্ল,-“না না মিনতি, আর আমি তােমায় ফেলে
যাবে না—তাইতাে আবার ফিরে এসেছি তােমারই কাছে।”
মিনতি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বল্ল,-“তুমি যাবে না
আমায় ফেলে কোথাও যাবে না—বাঁচলাম আঃ কি আনন্দ
আজ, আমার। তুমি আমার কাছে আরাে সরে এসাে

পতিতা কেন হলুম
আরাে কাছে। আর আমার মরতে দুঃখ নেই—তােমার
কোলে মাথা রেখে যেতে পারবে—এই আশাই আমি
এতদিন করে এসেছি। একটু জল.•••••”
লতিকাদি মিনতিকে জল খাইয়ে দিলো। মিনতি জল
খেয়ে একবার ঘরের চারিদিকে চেয়ে বল্ল,—দেখে ঘরে কেউ
নেই তাে ?
-কেন বল ?
আজ আমি বলবাে-
-- কি নতি ? কি বলবে ?
-যা তুমি জানতে চাওনি-আমার পরিচয়ের কথা-
আমার অধঃপতনের কথা-আমার কলঙ্কের কথা।
-- সেতাে পেয়েছি নতি। আমি শুধু তােমাকেই
চেয়েছিলাম, তােমার পরিচয়তাে জানতে চাইনি।
জানতে চাওনি বলেই তো আজ আমার সব কিছু বলে
যাওয়া দরকার • • • • • •
রবিন উঠে এসে বল্ল,-“আপনি মানুষ, আপনি বাংলার
আপনি মিনতি দেবী- এই তাে আপনার সব চাইতে
বড় পরিচয়—এর চাইতে (ছাট পরিচয়ের প্রয়ােজন আছে
কি ? যাক্ আর আপনি বেশী কথা বলবেন না।”
মিনতি উত্তেজিত হয়ে বল্ল,-“কে ? কে তুমি?”
রবিন হেসে বল্ল,-“আমি ?—কেউ নই, কিছু নই !”
—ঐ দেখাে ও আমাদের মাঝে আসছে। ওকে যেতে
মেয়ে,

পতিতা কেন হলুম
;
বল, ওকে তাড়িয়ে দাও, ভাল হচ্ছে না বছি—তুমি চলে
যা ও–যাও। ওঃ বুঝেছি,তুমি ডাক্তার, না ?—তা
তুমি এখানে কেন ? তােমায় আমার প্রয়ােজন নেই।
আমার যাকে প্রয়ােজন তাকেতাে আমি পেয়েছি। তুমি
ততা সামান্য ডাক্তার, তুমি তাে দেবতা নও।
(১১)
মিনতির পরিচয় আমি পাইনি-অসীমও না; তাই
অশ্রু, মিনতির পরিচয়ের ধারাবাহিক ইতিহাস তােমাকে
জানাতে পারলাম না। এর জন্য রবি দায়ী কিনা তাও
বতে পারি না—এর বিচার তুমি করো; তাছাড়া ওদের
পরিচয় তাে জানবার দরকার করে না—ওদের কপালে
খােদাই করা থাকে ওদের পরিচয় আমরা পড়ে দেখবার
সময় পাই না। ওদের চাহুনিতে আমরা দেখি কামনার
বহ্নি শিখা, তাতে তা থাকে না, থাকে ক্ষুধার তীব্র জ্বালা।
ওদের হাসিতে আমরা দেখি আনন্দের উচ্ছ্বাস, কিন্তু তাতে
উচ্ছাস—থাকে না, থাকে বুক ফাটা আর্তনাদ। হাসির
মধ্যে যে, বােবা কান্না লুকনো থাকে, আমরা তা দেখতে
পাইনা, দেখবার প্রয়ােজনও মনে করি না। পতিতার ঘরে
যারা শুধু পতিতাকেই খুঁজতে আসে, তারা মস্ত বড় ভুল
করে অশ।
—দূরে
ওই যে দেখা যায় বিরাট গর্ব মাথা তুলে
সঁড়িয়ে আছে, ওর পায়ের তলায় •••••মনে আছে মংলু,

পতিতা কেন হলুম
১।
তােতে আর আমাতে দুপুর বেলায় সকলকে লুকিয়ে পাহাড়ি
খাদ দেখতে গিয়েছিলুম••••••তাের হয় তো মনে নেই, কিন্তু
আমার মনে আছে রে, আমি ভুলিন••••••সেদিন সূৰ্য্য
উঠেছিল, কিন্তু সে ছিল ক্ষণিকের জন্য••••••চারিদিকে ছােট
ছােট পাহাড় দিয়ে ঘেরা••••••হিমালয়ের বুক থেকে তাদের
কেটে নেওয়া হয়েছে তাই তারা হিমালয়ের মতােই সুন্দর।
এদের কোলে কোলে কালো কালো বড় বড় গাছ এমন
সুন্দর ভাবে সাজানাে রয়েছে•••আমার তাে ভাই মনে হয়।
যেন কোন অনাদি কালের শিল্পী তার নিপুণ হাতের ছোয়াচ
দিয়ে গেছে প্রকৃতির বুকে•••••
অসীম বুঝলে! মিনতি আবার ভুল বকতে সুরু করেছে।
রবিনকে বল্ল-“রবি আর একটা ইনজেকশন••••••” রবিন
বাধা দিয়ে বল্ল,-“hopeless-কোন ফল হবে না
শুধু শুধু কষ্ট বাড়বে—ওকে ছেড়ে দে সীমা।”-বতে
বতে রবির স্বর কেঁপে উঠলো।
অসীম অশ্র সংবরণ করতে করতে রুদ্ধ কণ্ঠে বল্ল,
“কিন্তু রবি......”
–আঃ সীমা—তুই সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস—doctors
can never give life.
—ভারী সুন্দর জায়গাটা না। আমার বড় ভালাে
লাগে। আয় আয় এখানে একটু বসা যাক। কি সুন্দর
জায়গাটা বলতো। এতদিন তুই আমায় কি করে ভুলে

পতিতা কেন হলুম
৬8
ছিলিরে মংলু, মন কেমন করতো না?••••••ঐ
দেখ,
ঐযে সেই গাছটা যে গাছটা থেকে তুই একদিন পড়ে
গিয়েছিলিমা আমায় কত বলেন—মনে নেই তাের ?
তুই একটা কিছু না। গাছটা কত বড় হয়েছে দেখ, সেদিন
ক—ত ছােট ছিল, না ?”
ভুল বকতে বকতে হঠাৎ মিনতি চীৎকার করে
উঠলাে –“জল, জল।” অসীম তাড়াতাড়ি জল নিয়ে
মিনতিকে খাইয়ে দিল ।
জল খেয়ে মিনতি বল্ল,-“আঃ কি শান্তি! আর একটু
জল দেবে ?—আর একটু কাছে এসে লক্ষিটী—আর
একটু।”
অসীম জল দিতে যাচ্ছিল। রবিন বাধা দিয়ে বল্ল,-
“আর জল দিসনা সীমা।”
মিনতি কোন কথা বল্ল না; শুধু অপলক দৃষ্টিতে
চেয়ে রইল রবিনের দিকে। তারপর নিজের মাথাটা
ধীরে ধীরে অসীমের কোলের ওপর রাখলো। অসীম
সযতে মিনতির মাথাটা নিজের কোলের ওপর রেখে ওর
মাথায়-গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। মিনতি ঘরের
চারিদিকে চাইতে চাইতে অসীমকে আঁকড়ে ধরে বল্ল,
“তুমি আমার কাছ থেকে যেওনা—আমার বড় ভয় করছে...”
--কিসের ভয় নতি ? - আমি তাে তােমার কাছেই
বসে আছি

৬৫
পতিতা কেন হলুম
-
-দেখাে না ওরা কিরকম করে আমায় ডাকছে-
-না-না, আমি যাবাে না—ওদের বলে দাও আমি
তােমাকে ছেড়ে যাবে না: •••••
আঁধারের বুকে প্রকৃতি আর এক পোঁচ কালাে রং
ঢেলে দিল। মিনতি ধীরে ধীরে অসীমের মুখের দিকে
তাকালাে। অসীম ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞাসা করলো—“কিছু
বলবে ?”
—ক’টা বাজে
–কটা বাজে ?—এই তো বারােটা বাজছে-নতি—
নতি-মিনতি—মিনি••••••?
রবিন-লতিকাদি ছুটে এলাে। কিন্তু সে ডাকে মিনতি
আর সাড়া দিল না। অসীমের ডাক—প্রতিধ্বনিত হয়ে
অসীম
শূন্যের বুকে মিলিয়ে গেল।
আকাশের বুক থেকে একটা তারা খসে পড়লো
পৃথিবীর বুকে, পৃথিবীর বুকের ওপর একটা অপরিসর জীর্ণ
ঘরে বসে আমি তা স্পষ্ট দেখতে পেলাম—আমার কলম
হোঁচট খেল’••••••••
-অর্বাচীন

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Patita Keno Holum

Author
Bandyopadhyay, Pradip
Title
Patita Keno Holum
File name
Patita Keno Holum
Text
OCR done
Citation
1945
Published
2009/08/17
Publisher
Narendrachandra Basu, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
69
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Essays
DLI number
513049
Barcode
4990010020063.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
F7uleo3NVzb
Download PDF

Patita Keno Holum