Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Janmotithi

Majumdar, Probodhkumar · 2009/09/15

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

জন্মতিথি
( নাটক)
নাট্য-নিকেতনে অভিনীত
প্রথম অভিনয়—শনিবার ১৬ই চৈত্র, ১৩৪১
শ্রীপ্রবােধকুমার মজুমদার
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস্ স্ক্রীট, কলিকাতা

একটাকা
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্সের পক্ষে ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্কা হইতে
শ্রীগােবিন্দপদ ভট্টাচাৰ্য দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত
২০৩-১১, কর্ণওয়ালিস্ট, কলিকাতা

উৎসর্গ
পরমকল্যাণীয়া
শ্রীমতী স্নেহলতা দেবী
শুচিস্মিতা।
রংপুর
৯ই বৈশাখ, ১৩৪২
গ্রন্থকার

No text on this page.

নিবেদন
এই নাটকের গান কয়খানি শ্ৰীযুক্ত হেমেন্দ্রকুমার রায় রচনা করিয়াছেন
ও শ্রীযুক্ত সুধামাধব সেনগুপ্ত তাহাতে সুরসংযােজনা করিয়াছেন।
নাটকটির রচনাকালে রংপুর নাট্যসমাজের বন্ধুবর্গ এবং নাট্য-নিকেতনের
প্রযােজক শ্রীযুক্ত প্রবােধচন্দ্র গুহ অশেষরূপে আমাকে সাহায্য করিয়াছেন।
সকৃত চিত্তে ইহাদের সকলের ঋণ স্বীকার করিতেছি।
রংপুর
৯ই বৈশাখ, ১৩৪২
গ্রন্থকার

No text on this page.

পরিচয়
ধনী ব্যবসায়ী
ক্ষিতীশের স্ত্রী
run
ঐ কন্যা
ক্ষিতীশ মিত্র
মনােরমা
উৰ্মিলা (মিলি)
উৎপলা (পলি )
উজ্জ্বল। (ডলি )
শিশির
পরিমল
मौशि
ভূদেব চৌধুরী
রঘুয়া
মিসেস হালদার
ধনী ও শিক্ষিত যুবক
তরুণ ব্যারিষ্টার
উৎপলার সখী
০
মনােরমার মাতুল
বালক ভৃত্য
নিমন্ত্রিতা মহিলা
সংযােগস্থল-কলিকাতা
সময়-অপরাহু ওটা হইতে রাত্রি ১০টা

নাট্য-নিকেতন
শনিবার --১৬ই চৈত্র ১৩৪১, ৩০শে মার্চ ১৯৩৫
প্রথম রজনীর অভিনেতৃবর্গ
প্রযােজক
ক্ষিতীশ
পরিমল
শযুক্ত প্রবােধচন্দ্র গুহ
নির্মলেন্দু লাহিড়ী
মণি ঘােষ
মনােরঞ্জন ভট্টাচার্য
সুবােধচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (এমেচার)
প্রভাতচন্দ্র ভট্টাচার্য
শ্ৰীমতী পুষ্পকুমারী
নীহারবালা
সরযূবালা
১)
বধুয়া
উর্মুিলা
উৎপলা
১১
দীপ্তি
মনােরমা
মিসেস্ হালদার
দুর্গারাণী
চারুশীলা
কুসুমকুমারী
A

জন্মতিথি প্রথম অঙ্ক মিঃ মিত্রের বাড়াতে তার অফিস-ঘর । একপাশে সেক্রেটারিয়েট টেবিল ও রিভলভ চেয়ার। টেবিলের নীচে ছেড়া কাগজের ঝুড়ি, উপরে আফিল-বাস্কেট, একগাদা ফাইল ও টেলিফোন। সম্মুখে দেওয়ালের মাঝখানে একটি দরজা, তাহার ওপাশে হলঘর। ঘরের ডানদিকে ও বাঁদিকে আরও দুইটি দরজা ; ডানদিকেরটি দিয়া পিছনের বাগানে যাওয়া যায়—বাঁদিকেরটি অন্য ঘরের প্রবেশপথ। দরজাগুলিতে পর্দা লাগানো। বরের মধ্যে একখানি ভ°জকরা কার্পেট, একটি টেবিল হারমােনিয়ম, দুখানা কোচ ও কয়েকখানি চেয়ার সাময়িক প্রয়োজনে আনিয়া রাখা হইয়াছে। মিঃ মিত্র একখানি খােল ফাইল সম্মুখে রাখিয়া নিবিষ্টমনে কি লিখিতেছেন। বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ হইলেও শরীরে যৌবনসুলভ কৰ্ম্মশক্তির পরিচয়ের অভাব নাই। হলঘরের পর্দা সরাইয়া মিসেস মিত্র ঘরে আসিলেন। আঁটসাঁট করিয়া কাপড় পরিয়াছেন, ব্যস্তসমস্তভাব। ঘরে ঢুকিয়া বাঁ দিকে যাইতেছিলেন, স্বামীকে তদবস্থ দেখিয়া বিস্ময়সূচক ভঙ্গী করিয়া থমকিয়া দাড়াইলেন। মনােরমা। ওগাে, ওগাে শুনছ! ক্ষিতীশ। (মুখ না তুলিয়া ) হু। মনােরমা। হু কি গাে ! ক’টা বেজেছে জানাে ? ক্ষিতীশ। (পূৰ্ব্ববৎ ) ও ঘরেই তাে ঘড়ি আছে। দেখগে’ না।

জন্মতিথি
.
মনােরমা। ভাল আলা ! আমায় আর ঘড়ি দেখতে হবে না। দুপুর
থেকে কম করেও একশ’বার ঘড়ি দেখেছি।
ক্ষিতীশ। (মুখ তুলিয়া অন্যমনস্কভাবে ) কি বলছ ?
মনােরমা । বলছি কি, পাঁচটা যে বেজে গেছে, তার খোঁজ আছে ?
ক্ষিতীশ। তাই, কি ?
মনােরমা। শােন কথা! তাই কি! আচ্ছা, ছুটির দিনেও কি ফাইল
মুখে করে না বসলে তােমার চলে না। দাড়াও, কালকে আমি
আপিসে লিখে পাঠাব, ফের যদি ঐ লক্ষ্মীছাড়া ফাইলগুলাে বাড়ীতে
পাঠায়, তাহলে বাস্কেটশুদ্ধ একেবারে লেকের ভেতরে ফেলে দিয়ে
আসব।
ক্ষিতীশ। (হাসিয়া) অত রাগ করছ কেন? কি বলবে বল না।
মনােরনা। বলব কাকে! ফাইলের ভেতর ডুব দিয়ে জগৎসংসার যে
একেবারে ভুলে বসে আছ।
ক্ষিতীশ। (ফাইল সরাইয়া) আচ্ছা, ফাইল এখন থাক। , কি
বলছিলে? পাচটা বেজেছে, তাই কি?
মনােরমা। ( গালে হাত দিয়া) ওমা, কি মানুষ তুমি ! সত্যিই
ভুলে গেছ ?
ক্ষিতীশ। (হঠাৎ মনে পড়াতে) না, না, ভুলব কেন! কি-যে বলে।
আজকে উৰ্মিলার জন্মতিথি, তাই বলছ তাে ? তা বুঝি আর
আমার মনে নেই।
মনাের। তবু ভাল। কথাটা মনে আছে। তা’ নেমন্তন্ন চিঠিতে
লেখা হয়েছে “সাতটা”•••আর এখন পাঁচটা, আর মােটে দু'ঘণ্টা
?
২

প্রথম অঙ্ক
생
দেরী। এদিকে কাজ কত বাকি আছে। আমি একলা হিমসিম খেয়ে
যাচ্ছি। আর তুমি•••••
ক্ষিতীশ। একলা কেন? মেয়েরা বাড়ীতে নেই ?
মনােরমা। আছে বই কি। তারাও কাজ করছে। কাজ
তাে আর একটা নয়। ডলি মালা গাঁথছে, পলি ঢুকেছে
রান্নাঘরে।
ক্ষিতীশ। আর মিলি ?
মনােরমা। সে ওপরে। ওরি জন্মদিন, ওকে বেশী খাটতে খুটতে বারণ
করেছি।
ক্ষিতীশ। ও আচ্ছা। তা’ আমায় এখন কি করতে হবে ?
মনােরমা। যা হয়, কিছু করলেই হয়। হলঘর সাফ করা হয়েছে ;
কার্পেটখানা পাতিয়ে, চেয়ার টেবিলগুলাে ঠিকঠাক করে সাজিয়ে
রাখাও। পরে আরাে কাজ আছে।
ক্ষিতীশ। আচ্ছা, যাচ্ছি। এই একটু••••••
মনােরমা। না, আর “একটু” নয় ; এখনি।
ক্ষিতীশ। আচ্ছা, চল ।
;
উঠিয়া পাড়াইতেই টেলিফোনের ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল
..
।
একটু দাড়াও। (রিসিভার কাণে লইয়া) হালো...হা...হা.
আছেন••আচ্ছা, ধরে থাকুন, ডেকে দিচ্ছি। (রিসিভার নামাইয়া )
এই নাও, তােমাকেই ডাকছে।
মনােরমা। কে ?

জন্মতিথি
ক্ষিতীশ। নাম বলেনি। মেয়েলি গলা।
মনােরমা। (ফোন ধরিয়া) হলাে,
ক্ষিতীশ আবার চেয়ারে বসিয়া ফাইলটি খুলিতে যাইবেন, এমন সময় মনােরম
এক হাতে ফাইলটি চাপিয়া ধরিলেন। পরে সেটি বাঁধিয়া
রাখিবার জন্য আদেশসুচক ইঙ্গিত করিলেন।
ক্ষিতীশ একটু হাসিয়া তথাবৎ করিলেন
হাঁ, কে চপলাদি’,••••••সে কি কেন?•••কার অসুখ ? কে
মণিকার ?•••তাইতাে, ভারি মুস্কিল হল না অসুখ করেছে, এতে
রাগ করব কেন। •••তবে সবাই ওর গান শুনবে বলে আশা করে
আছে•••আচ্ছা: হ, আচ্ছা, •••বলব•••আচ্ছা।
রিসিভার রাখিয়া দিলেন
==
দেখ দেখি, কি মুস্কিল।
ক্ষিতীশ। কি হয়েছে?
মনােরমা। মণিকার অসুখ করেছে। সে আসতে পারবে না।
(ডাকিলেন) রঘুয়া, রঘুয়া-
বসিলেন। রঘুরার প্রবেশ। চাপকান-উর্দি পরা বয়স বার তের।
কায়দা-দুরস্ত সেলাম করিয়া দাড়াইল
যা-তাে, তাের মেজদিদিমণিকে ডেকে আন্।
রঘুয়া। মিস্ পলি ?
মনােরমা। হাঁ, হ, মিস্ পলি। শীগগীর আসতে বলি।
রঘুয়া। ইয়ে ম্যাডাম, ভেরি গুড ম্যাডাম।
সেলাম করিয়া প্রস্থান
৪

প্রথম অঙ্ক
মনােরমা। সং! ছোড়াটাকে নিয়ে পলি বাঁদর নাচাচ্ছে।
ক্ষিতীশ। ও, এ সব বুঝি পলির কাণ্ড। তাইতাে বলি ছোঁড়াটা হঠাৎ
এত ইংরিজি শিখলে কোত্থেকে?
মনােরমা। ঐতাে। পলি রাতদিন ওর পেছনে লেগেই আছে। মুখে
মুখে ইংরিজি শেখায়।
ক্ষিতীশ। তাই নাকি? ছোঁড়াটারও তত উৎসাহ কম নয়।
মনােরমা। উৎসাহ হবে না। পলি ওকে বলেছে, ইংরিজি শিখলে আসল
সাহেবের বাড়ীতে চাকরি হবে।
ক্ষিতীশ। বটে। তাহলে ও বেচারীর আর দোষ কি?
কি? আসল
সাহেবের চাকরি পাবার লােভে ওর চাইতে অনেক বেশী পরিশ্রম
আমাদের মধ্যে অনেকেই করে থাকে।
রঘুয়ার হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া উৎপলার প্রবেশ। বয়স আঠার উনিশ
উৎপলা। মার্চ এলং, মার্চ এলং, হল্ট। মা, রঘুয়ার নতুন বিদ্যে
শােন।•••বয়, হােয়াট ইজ ইওর নেম ?
রঘুয়া। মাই নেম ইজ র্যাণ্ড ন ডস্।
উৎপলা। হােয়াট আর ইউ ?
রবুয়া। আই এম-এ ডাঞ্চি।
উৎপলা। ভেরি গুড। গাে এওয়ে ডাকি।
রঘুয়া প্রস্থানােত
A
মনােরমা। এই রঘুয়া, তাের দিদিমণি তােকে নিয়ে বাঁদর নাচায়, তা
বুঝতে পারি নে ?

জন্মতিথি
উৎপলা। দেখলি রঘুয়া, এরি মধ্যে তাের আদর বেড়ে গেছে। মা
ওকথা কেন বলছে বুঝলি তাে? সাহেবরা জানতে পারলেই তােকে
নিয়ে যাবে, সেই ভয়ে।
রঘুয়া। ইয়ে, ইয়েস্, মিস্ পলি ভেরি গুড। ম্যাডাম ভেরি ব্যাড।
সেলাম করিয়া প্রস্থান
উৎপলা। (মনােরমার প্রতি) কেমন, যাবে আর আমার নামে ভাঙচি
দিতে?
মনােরমা। না। তাের পােষা বাঁদর তরি থাক। কিন্তু পলি
এদিকে যে এক মুস্কিল বেধেছে।
উৎপলা। কি মুস্কিল ?
মনােরমা। এইমাত্র চপলাদি ফোন করছিলেন। মণিকার খুব অসুখ
করেছে, সে আসতে পারবে না।
উৎপলা। ( হতাশভাবে বসিয়া পড়িল । মণিকাদি আসবে না ! যাঃ,
তাহলে তাে সব মাটি।
মনােরমা। অমন করে বসে পড়লে তাে চলবেনা পলি। এখন কি করা
যায়, তাই বল।
উৎপলা। কি আর করা যাবে। সবাই মণিকাদির গান শুনবে বলে
আশা করে আছে। ওঁর ওপরেই সমস্ত ভরসা ছিল। আমার আর
কিছু ভাল লাগছে না।
ক্ষিতীশ। পলি, অত অল্পেই হাল ছেড়ে দিলে কি চলে। নিজেরাই
যা পারি তাই করগে। সংসারে সব জিনিস কিছু মনের মত
হয় না—যা হয় মনকেই তার মত করে তৈরী করে নিতে হয়।

প্রথম অঙ্ক
উৎপলা। এখন আর কি করব বাবা! আগে জানলেও না হয়। দেখি
( জামার ভিতর হইতে একখানি প্রােগ্রাম বাহির করিয়া দেখিল )
•••চারটে গান আর একটা আবৃত্তি•••প্রােগ্রামে অনেকখানি ফঁাক
থেকে যাবে।
মনােরমা। ফাঁক থাকলে তাে চলবে না। ও ফাক তােকেই ভরিয়ে
দিতে হবে।
উৎপলা। আমি! আমি কত গান গাইব! আর একঘেয়ে গান
গাইলেই বা লােকে শুনতে চাইবে কেন ? (একটু ভাবিয়া )
আচ্ছা, মা, এক কাজ করলে হয় না? দীপ্তিকে নেমন্তন্ন করে
পাঠানাে যাক।
ক্ষিতীশ। দীপ্তি কে?
উৎপলা। দীপ্তি রায়। ঐ যে সেদিন গুপ্ত সাহেবের পার্টিতে যার গান
শুনে তুমি বলেছিলে যে বেশ ফীলিং দিয়ে গায়।
ক্ষিতীশ। প্রফেসর সত্যেন রায়ের ভাইঝি ?
উৎপল। হাঁ।
অনােরমা। আচ্ছা বেশ। হলে দীপ্তিকেই বলে পাঠা। কিন্তু অতগুলাে
গান সে গাইতে রাজি হবে তত ?
উৎপল। না হয়, আমরা ভাগাভাগি করে নেব। আবৃত্তিটা আমি
করব। দুটো গান দীপ্তি গাইবে। আর, একটা গান, •••মা, তমার
তাে শুনেছি সেকালে গানের খুব নাম ছিল
মনােরমা। পলি, ও রকম দুষ্টমি করলে আমার হাতে একদিন মা’র
খাবি, তা বলে দিচ্ছি।

জন্মতিথি
উৎপলা। বা রে, তাতে আর দোষ কি? গান তাে আর কিছু নিদের
জিনিস নয় •••একটা গান গাইলেই বা•••
ক্ষিতীশ মনােরমার অগােচরে ইঙ্গিতে উৎপলাকে উৎসাহ দিতেছিলেন ;
উৎপলা হঠাৎ তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল
আচ্ছা বাবা, তাহলে তুমিই হয় তােমার সেই ইংরিজি হাসির
গানখানা-
ক্ষিতীশ। ( অপ্রতিভভাবে) দুর পাগলি ; সে কতদিনের কথা, সে
কি আর আমার এখন মনে আছে, আচ্ছা একখানা গান না হয়
বাদই থাক।
হলঘরের পরদা সরাইয়া ভুদেব চৌধুরি আসিলেন। বয়স সবে পঞ্চান্ন পার
হইয়াছে ; ছিপছিপে কিন্তু অটি সটি শরীর
ভূদেব। আমি আসতে পারি ?
উৎপল। এই যে দাদামশাই, ঠিক সময়ে এসে পড়েছ। আজ তােমাকে
ছাড়ছি নে’—কিছুতেই না।
ভূদেব। ছাড়লি আর কই দিদি, ধরেই তাে রেখেছি! শুধু ধরা—ঐ
চঁদমুখখানার টানে একেবারে বাঁধা পড়ে আছি। বােজ বােজ
শ্যামপুকুর আর লেক বােড় করে করে হয়রাণ হয়ে যাচ্ছি।
উৎপলা।
ও সব হেঁদো কথা রেখে দাও। তােমায় গান গাইতে হবে।
ভূদেব। বিলক্ষণ ! সে আর একটা বেশী কথা কি। আচ্ছা, তবে
শ্রবণ কর। (সুর জিয়া ).••আ.••
উৎপল। ফের দুষ্টমি ! ঠাট্টা নয় দাদামশাই। আজকের আসরে
৮

প্রথম অঙ্ক
আমাদের গান গাইবার লােক একজন কম পড়েছে। তার অভাব
পূরণ করবে তুমি।
ভূদেব। সৰ্ব্বনাশ! সে আমি পারব না ভাই।
ভাই। সে চাঁদের হাটের
মাঝখানে আমার মুখ দিয়ে কথাই ফুটবে না—তা গান ! আর আমার
ও সব সেঁইয়া-মেইয়ার গান তােদের ফ্যাশনেব মেয়েদের পছন্দ হবে
কেন ?
মনােরমা। পলি, আর বেশী সময় নেই, যা হয় একটা ঠিক করে
ফেল। না হয়, ডলিকে দিয়ে আর একখানা নাচ তৈরি করে
রাখ না।
ক্ষিতীশ। সেই ভাল। ডলিকে ডেকে একটু প্র্যাকটিস করে নে।
রঘুয়া, রঘুয়া•••
রঘুরার প্রবেশ
ডলিকে ডেকে দে।
রঘুয়ার বাঁ দিকে প্রস্থান
উৎপলা। দীপ্তিকে তাহলে শীগগীর করে আসতে বলে দি।
(টেলিফোন লইয়া) হালাে•••সাউথ টু-ওয়ান-সেভেন-ফাইভ-ইয়েস
প্লীজ হলােকে. দীপ্তি? আমি উৎপলা••শশা, আজকে দিদির
জন্মদিনের উৎসব। তােকে আসতে হবে। টেলিফোন-দ্বারা নিমন্ত্রণের
ত্রুটি মার্জনীয়—কারণ, যাবার সময় নেই।•••আর শশা, তােকে দুটো
গান গাইতে হবে। আমরাও সব গাইব।•••যাঃ, যাঃ, ন্যাকামি.••যা,

জন্মতিথি
শীগগীর করে কাপড় পরে আয় গে’।•••সন্ধ্যে সাতটা থেকে•••তা দেরী
থাক, তােকে এখনি আসতে হবে।•••তাহলে শীগগীর করে আয়।•••
৩০৫ নম্বর মেয়ে ইস্কুলটা দেখেছি তাে? তার দুখানা বাড়ীর পর•••
বিশ মিনিট ?•••আচ্ছা, আচ্ছা।
টেলিফোন রাখিয়া দিল
কই ডলি আসে নি’ এখনাে ?
ডলি ।
বাঁদিকে দরজার নিকট গিয়া ডাকিল ডলি, ডলি”। নেপথ্য হইতে উত্তর
আসিল “যাই”। বাঁ-দিকের দরজা দিয়া ডলির প্রবেশ।
বয়স দশ এগার ফ্রক পরা, বেণী দোলানাে
উৎপলা। ডলি, সেই দোলন-চাঁপার নাচটা আজকে নাচতে পারবি?
( মাথা অনেকখানি হেলাইয়া) হাঁ ••
উৎপলা। ইস্, অ্যানা প্যাভলােভা! কই নাচতে দেখি।
ডলি। তুমি শিখিয়ে দাও।
উৎপলা। ও, তাই বল। আচ্ছা, দিচ্ছি শিখিয়ে। আগে ফ্রকটা
বদলে একখানা শাড়ী পরে আয় ।
ডলি। সেই চাপারঙা ?
উৎপলা। না, সেটা এখন থাক। আর যাহােক কিছু পরে আয়।
ডলি। ( আবদারের সুরে) তুমি ভাল করে পরিয়ে দেবে চল না।
উৎপলা। আচ্ছা, চল্।
.
উভয়ে প্রস্থানােত। ডলি দরজার কাছে থমকিয়া দাড়াইল
ভলি। মেজদি, একটু দাড়াও।

প্রথম অঙ্ক
ছুটিয়া মনােরমার কাছে গিয়া তাহার কাণে-কাণে
কি বলিল। মনােরমা হাসিলেন
ভূদেব। (কিছুই
( কিছুই না বুঝিয়া ) না, না, অত চকোলেট খাওয়া
ভাল নয়।
ডলি। দূর! মা, কি বললুম বললা না যেন কাউকে, খবরদার!
মনােরমা। আচ্ছা, আচ্ছা, বলব না, যা।
ডলি ও উৎপলার বাঁ-দিকে প্রস্থান
মনােরমা। (ভূদেবের প্রতি) মামাবাবু, আপনি বসবেন এখানে?
আমাদের ওঘরে এখন অনেক কাজ বাকি আছে।
ভূদেব। আমিও যাই। বড়রাণীকে জন্মদিনের অভিনন্দন জানিয়ে
আসিগে। উৰ্মিলা কোথায় ?
মনােরমা। ওপরে বােধ হয়। আপনি বসুন, আমি ডেকে দিচ্চি।
( স্বামীর প্রতি) আর দাড়িয়ে থেকো না, এস।
মনোরমা যাইতে যাইতে থামিয়া টেবিলের উপর হইতে
ফাইলটি গুছাইয়া লইয়া বাস্কেটে রাখিয়া দিলেন।
ফাইলের নীচে একখানা চিঠি ছিল, তাহার প্রতি
দৃষ্টি পড়িল। উঠাইয়া
উঠাইয়া দেখিলেন
মনােরমা। (কণ্ঠস্বরে আসন্ন ঝটিকার আভাস ) এর মানে কি?
ক্ষিতীশ। (ধরা পড়িয়া) ওটা ? ও হাঁ, তােমাকে
মনে ছিল না, এখনি বলব ভেবেছিলুম।: পরিমল আজকে
আসবে।

জন্মতিথি
মনােরমা। আসবে তা তত তার চিঠিতেই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তাকে
আসতে লিখলে কে ?
ক্ষিতীশ। আমি লিখেছিলুম।
মনােরমা মুখ আধার করিয়া বসিয়া পড়িলেন
রাগ করাে না, আজ একটি দিন বই তাে নয়।
মনােরমা। একটি দিনই বা কেন! তুমি বেশ জান পরিমলের এ
বাড়ীতে আসা আমি পছন্দ করি নে। তবু "
ক্ষিতীশ। পছন্দ কর না, তাতে জানি। কিন্তু দেখ, সে মহীতােষের
ছেলে বাড়ীতে একটা উৎসবে
মনােরমা। বেশ তাে, তােমার বন্ধুর ছেলেকে তুমি বাড়ীতে ডাকিয়ে
যত ইচ্ছে আদর করাে। কিন্তু আগে মিলির বিয়েটা হয়ে যাক।
তারপর আমি কোন কথাই কইব না।
ভূদেব। কেন মা, পরিমল তত বেশ ভাল ছেলে বলেই জানতুম ; সে
এমন কি কিছু করেছে, যাতে ?
ক্ষিতীশ। কিছুই না। পরিমলের অপরাধের মধ্যে তার টাকা নেই।
মনােরমা। তুমি আবার সেই সব পুরণাে কথা খুঁচিয়ে তুলছ !
ক্ষিতীশ। কথা পুরণো হলেই তাে আর যুক্তিসঙ্গত হয়ে ওঠে না ;
অন্যায়টা অন্যায়ই থেকে যায়।
মনােরমা। অন্যায় ! আচ্ছা, মামাবাবু, আপনিই বলুন তাে, আমি
কী অন্যায় বলেছি। শিশিরের মত এমন সবদিক দিয়ে সুপাত্র
কোথায় পাওয়া যাবে। শিশিরের সঙ্গে উর্মিলার বিয়ে তো এতদিন
•

প্রথম অঙ্ক
শুধু
হয়েই যেতাে, কিন্তু পরিমল যখন থেকে এ বাড়ীতে আনাগােনা শুরু
করেছে, তখন থেকেই মিলি যেন কেমন ধারা হয়ে গেছে। বিয়ের
কথা বললেই বলে আরাে কিছুদিন যাক।
ক্ষিতীশ। তা মিলি যদি পরিমলকেই ভাল মনে করে••
মনােরমা। মিলি ভালমন্দের কি বােঝে । চাল নেই, চুলে নেই ;
নামেই ব্যারিষ্টার। এতদিন থেকে হাইকোর্টে বেরুচ্চে, কিন্তু কিছু
পসার হলাে না। কি করেই বা হবে চেষ্টা থাকলে তাে। আবার
আজকাল নাকি কবিতা লেখেও আবার বাংলায়। ইংরিজিতে
লিখলেও না হয় জজদের নজরে টজরে পড়তে পারত।
ক্ষিতীশ। সেটা এমন কিছু অপরাধ নয়, যার জন্যে তাকে সেদিন
অমন করে কথা শুনিয়ে দেওয়া তােমার উচিত হয়েছে।
মনােরমা। শােন কথা! কী এমন বলেছি আমি? তারই ভাল’র জন্যে
দুটো উপদেশ দিয়েছিলুম। তা’, আমাকে “কাকিমা বলে ডাকে,
আমি বলতে পারি নে ?
ক্ষিতীশ। উপদেশ দেবারও তাে রকম আছে। তার পর থেকেই তাে
সে রাগ করে আর আসে নি।
মনােরমা। তা না এসেছে ভালই হয়েছে। আমি আশা করে
আছি যে আজকে শিশিরের সঙ্গে বিয়েতে মিলি মন স্থির করে
ফেলবে, এর মধ্যে তুমি আবার কি ফ্যাসাদ বাধিয়ে বসে আছ
বল তাে।
ক্ষিতীশ। যাই হােক, অনেকদিন পর পরিমল আজকে আসছে।
আজকে যেন তাকে আর উপদেশ দিতে বলাে না।
.

জন্মতিথি
মনােরমা। আমার দরকার। আমার তার সঙ্গে কথাই কইবার অবসর
।
হবে না।
পরিমলের চিঠিখানি ছিড়িয়া বাস্কেটে ফেলিয়া উঠিয়া দাড়াইলেন।
হলঘরের দরজা দিয়া বধুয়ার প্রবেশ
রঘুরা। মিষ্টার পরিমল বােস্।
পরিমলের প্রবেশ। রঘুয়ার প্রস্থান
কয়েক মুহূর্ত আড়ষ্ট নিস্তব্ধতায় কাটিয়া গেল
ভূদেব। এস পরিমল, ভাল আছ তাে?
পরিম। এই যে দাদামশাই, এসেছেন। আমি ভাবছিলুম আমিই
বুঝি সবার আগে । (কৈফিয়তের সুরে) ভাবলুম, অনেকদিন আসা
হয়ে ওঠে নি’ ; একেবারে নেমন্তন্ন খাবার সময় হাজির হব !•••একটু
আগেই যাই।
ভূদেব। তা বেশ তাে’, বস।
পরিমল। হ বসচি। কাকিমা, আপনি দাড়িয়ে রইলেন•••
মনােরমা। না, আমি বসব না; একটু ব্যস্ত আছি।
মনােরমার প্রস্থান
----
পরিমল মনােরমার অবহেলা বুঝিল, কিন্তু গায়ে মাখিল না
পরিমল। কাকাবাবু, আমার চিঠি পান নি?
ক্ষিতীশ। হাঁ, পেয়েছি।
পরিমল। এরা সব কোথায় ? দাদামশাই, আপনার জুড়িদারকে
দেখছিনে’ যে ?
১৪

প্রথম অঙ্ক
ভূদেব। পলি এই একটু আগে ওপরে গেছে। ডলিকে নাচ শেখাবে তাই
কাপড় পরানাে হচ্ছে।
ক্ষিতীশ। পরিমল, তুমি আগে এসেছ, ভালই হয়েছে। তােমার কাকিমা
আমার ওপরে হলঘর সাজাবার ভার দিয়েছেন। আমায় একটু
সাহায্য করবে এস।
পরিমল। বেশ তাে, চলুন না ।
ক্ষিতীশ ও পরিমলের হলঘরের দিকে প্রস্থান
বাঁ-দিক হইতে উৎপনার প্রবেশ
উৎপল। দাদামশাই, পরিমলবাবুর গলা শুনলুম যেন ?
ভূদেব। হাঁ, ক্ষিতীশ তাকে আসতে লিখেছিল, তাের মা জানত না।
উৎপলা। তাই নাকি? দাদামশাই, তাহলে তােমার নেমন্তন্ন খাবার
দিন আবার পেছিয়ে গেল।
ভূদেব। পেছিয়ে গেল, না এগিয়ে এল ? *
উৎপল। কি করে ?
ভূদেব। প্রতিদ্বন্দ্বীকে আবার রণক্ষেত্রে দেখে শিশির এবার চটপট
যুদ্ধজয় করে নেবার চেষ্টা করবে।
উৎপলা। যুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে সাহসের দরকার যে। জানতাে,
“নান্ বাক্ দি ব্রেভ • ।” কিন্তু শিশিরবাবু যে লাজুক।
ভূদেব। তাবটে। তবে ভরসা এই যে ভালবাসা ভীরুকেও সাহসী
করে তােলে।
উৎপলা। আর যদি দিদি শিশিরবাবুকে না চায়।

জন্মতিথি
ভূদেব। তার মানে পরিমলের অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন। আমাদের ইতর
জনের পক্ষে মিষ্টান্ন একরকম করে এলেই হল।
উৎপলা। আচ্ছা দাদামশাই, তােমার কি মনে হয় ? কার অদৃষ্ট
সুপ্রসন্ন হবে ?
ভূদেব। কি জানি ভাই, তােদের চরিত্র ; দেবা ন জানন্তি কুতাে
মনুষা। তুই কিছু বুঝতে পারি?
উৎপলা। উহু। আমার মনে হয় দিদি নিজেই এখনাে নিজের মন
বুঝতে পারেনি ; দোটানায় পড়ে গেছে।
ভূদেব। আচ্ছা, বাজি ধরা যাক। আমি পরিমলের দিকে।
যদি হারি দশ টাকা দেব।
উৎপলা। আমি শিশিরবাবুর দিকে। কিন্তু আমার তত টাকা
নেই। দশটা কিল-রাজি থাকো ত বল।
ভূদেব। না বাপু, তােদের টেনিসখেলা মুঠোর কিল এ বুড়াে হাড়ে সইতে
পারব না। তাহলে বাজি ধরে কাজ নেই। পরিমল যদি আমার হয়ে
উৎপল। চুপ! ঐ দিদি আসছে।
উর্মিলার ডানদিক দিয়া প্রবেশ। বয়স কুড়ি, একুশ। প্রসাধন শেষ করিয়া একখানি
রঙীন শাড়ী পরিয়া আসিয়াছে। হাতে একখানি ইংরেজি বই, তর্জনী দ্বারা
পঠিত পৃষ্ঠা চিহ্নিত করা। একটু গাম্ভীৰ্য্যময় দূরত্ব রাখিয়া কথা বলা অভ্যাস
উৰ্মিলা। এই যে দাদামশাই। কতক্ষণ?
ভূদেব।
অনেকক্ষণ এসেছি দিদি। বড়-রাণি, জন্মদিনের অভিনন্দন
গ্রহণ করুন।

প্রথম অঙ্ক
উর্মিলা। ধন্যবাদ। (ভূদেবের পার্শ্বে বসিল) পলি, এখনাে তৈরি
হয়ে নিসনি যে ?
উৎপল। হাঁ, এই যাই। আবার ডলিকে একটা নাচ শেখাতে
হবে। মণিকাদি আসতে পারবে না।
উৰ্মিলা। মণিকা আসবে না? সে আমি আগেই জানতুম।
উৎপলা। না, এই একটু আগে তার মা ফোন করেছেন যে হঠাৎ
তার অসুখ করেছে।
উর্মিলা। অসুখ না ছাই। গান গেয়ে নাম হয়েছে কি না, এখন
নিজেকে শস্তা করতে চায় না।
উৎপলা। তাহলে দিদি, তুমি একবার তাকে ফোন করে দেখ না।
উৰ্মিলা। কক্ষণাে না। যে নিজে ইচ্ছে করে এলােনা, তাকে সাধতে
যাব আমি! এর জন্যে যদি উৎসব নাও হয়, তবু একটি কথাও
আমার মুখ থেকে বেরােবে না।
উৎপল। (প্রসঙ্গটা চাপা দিবার জন্য ) ভলিটা এত দেরী করছে কেন?
কাপড় পরা তাে কোন কালে হয়ে গেছে। ডলি...উলি-••
BE
ডাকিতে ডাকিতে বাঁ দিকে চলিয়া গেল
ভূদেব। ওখানা কি বই, দেখি।
উর্মিলা। (হাতে দিয়া) পড়েন নি ?
ভূদেব। না।
উৰ্মিলা। সে-কি, এত নাম।
ভূদেব। বই পড়বার অভ্যেস অনেককাল নেই ভাই; এখন আবার
১৭

জন্মতিথি
তােদের দেখাদেখি শিখতে হবে। পড়া হলে দিস্ তাে।
কেমন বই ?
উর্মিলা। রাম, না আছে প্লট, না আছে একটা ক্যারাক্টার।
কি করে যে এত নাম হয়, তাই ভাবি।
উৎপলা ও ডলির প্রবেশ
ডলি শাড়ি পরিয়া আসিয়াছে। উৎপলা টেবিল হারমােনিয়মের নিকট বসিল।
ডল নাচের জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিল
উৰ্মিলা। পলি, মিসেস্ হালদার আসছেন তাে আজ ?
উৎপলা। আসবার তাে কথা আছে।
উর্মিলা। তাহলে দাদামশাই, আজকে একটা মজার জিনিস দেখতে
পাবে। দেখাে হাসতে হাসতে পেটের নাড়ি না ছিড়ে যায়।
ভূদেব। কি জিনিস ?
উর্মিলা। ঐ মিসেস হালদার। বয়েস চল্লিশ পার হয়েছে, কিন্তু
সাজগােজের বাহার একটুও কমেনি। মুখে এত রং মাখেন যে দিনের
বেলা দেখলে মনে হয় যেন মুখােস পরেছেন। তাই না পলি ?
উৎপলা। হাঁ। কিন্তু দিদি, তােমরা একটু চুপ করনা ভাই ;
ডলির নাচটা শেখা হয়ে যাক।
উৎপলা গান গাহিতে আরম্ভ করিল। ডলি গানের ভাবানুযায়ী অঙ্গভঙ্গী
সহকারে নাচিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। উর্মিলা ও উৎপল
মাঝে মাঝে গান বন্ধ করিয়া ভলির ত্রুটি সংশােধন করিয়া
দিতে লাগিল। কিন্তু ডলির ঠিকমত হইল না
১৮

প্রথম অঙ্ক
উৰ্মিলা। ওর অমনি হবে না। সব ভুলে গেছে। পলি, তুই ওকে
দেখিয়ে দে। আমি গাইছি।
উৰ্মিলার গান ও উৎপলার নৃত্য। ডলি মনোযােগ সহকারে দেখিতে লাগিল
গান
।
পলাশের পালা গেয়ে মধুমাস কাছে আসে
মলয়া রচিয়া চলে কি কবিতা নীলাকাশে।
অপােকে দুলিয়ে দোলা
কে কুমারী:আপন ভােলা
নবীন রবির ছবি নদীর আমােদে হাসে।
সবুজ ঘাসের কোলে প্রজাপতি নাটে
ফুল তুলে খেলা করে সারা বেলা কাটে।
কুহুর বাঁশরীখানি
কে দিল ভুবনে আনি
ফোটালে প্রাণের বুড়ি মরম মরুর পাশে।
গানের শেষের দিকে হলঘর হইতে পরিমলের প্রবেশ
পরিমল। দাদামশাই, এ ঘরে আছেন ?
উর্মিলার গান তৎক্ষণাৎ বন্ধ হইয়া গেল। উৎপল। নত হইয়া একটা বিশেষ
ভঙ্গী-সহকারে মাথা নীচু করিয়াছিল। সেই ভঙ্গীটি চট করিয়া ঈষৎ
পরিবর্তিত করিয়া ভাব দেখাইল যেন ঘরের মেঝেতে কোন
হারানাে জিনিস খুজিতেছে।
ভূদেব মুখ
টিপিয়া হাসিতে লাগিলেন। পরিমল
একটু দাড়াইয়া ঘটনাটি
বুঝিয়া লইল

জন্মতিথি
পরিমল। কি খুজছ উৎপলা ?
উৎপলা। এই, আমার কাণের দুলটা কোথায় পড়ে গেছে দেখি তত
সােফার নীচেটায়।
পরিমল। আমি থাকলে বােধ হয় খুজবার অসুবিধে হবে ; আমি যাই,
কি বল ?
উৎপল। না না, আপনি বসুন না। আচ্ছা, পরে খুজলেই হবে।
উঠিয়া আসিল
পরিমল। তাইতে, দু’কাণ থেকে দুটোই যে পড়ে গেছে দেখছি।
নাচবার সময় ও সব গয়না কি পরতে আছে।
উৎপলা।
কে বললে আমি নাচছিলুম?
পরিমল। আহা, একটু বাদে যখন সবাই দেখতেই পাবে তখন অত
লজ্জাটা কিসের?
ভূদেব। না হে ভায়, উৎপলার নাচটা আজকের প্রােগ্রামে নেই। ওটুকু
আমার অদৃষ্টে উপরি লাভ হয়ে গেল।
পরিমল। তা” গাইতে তত আর কোন লজ্জা নেই ; উৰ্মিলা-দেবীর
গানটা থামল কেন ?
উৰ্মিলা। পলি, আমি চললুম। মা অনেকক্ষণ আগে আমাকে ডেকে
পাঠিয়েছিলেন।
পরিমল। ( অগ্রসর হইয়া) তাহলে এই অবকাশে আপনার জন্মদিনের
অভিনন্দনটা সেরে নিই।
উর্মিলা পরিমলের প্রতি দৃকপাত না করিয়া বাঁ-দিকে চলিয়া গেল

প্রথম অঙ্ক
ডলি। (কিয়া) বড়দি, আমার সেই চাপারঙ্গের শাড়ীখানা।
উর্মিলা। ( যাইতে যাইতে মুখ না ফিরাইয়া) আয়, নিয়ে যা।
উৰ্মিলা ও ডলির প্রস্থান
পরিমল। দাদামশাই, এটা কোন দেশী ভদ্রতা ?
ভূদেব। তােমার অদৃষ্ট ভাল ভায়া, যে এটা ভদ্রতা নয়, এর অন্য নাম
আছে।
পরিমল। কি নাম?
ভূদেব। এর নাম হচ্চে “রাগ”।
উৎপলা। আর বাইরে যেটা হচ্চে “রাগ”...
ভূদেব। ভেতরে তারই নাম “অনুরাগ”।
পরিমল। না না, দাদামশাই, কি-যে বলেন। আমি হয়তাে না জেনে
কোন অপরাধ করে ফেলেছি যার জন্যে • ••
ভূদেব। অপরাধ তাে একটু আগেই কবুল করেছ। অনেকদিন আস
নি’, সেইটেই তাে যথেষ্ট অপরাধ।
পরিমল। না, দাদামশাই, তার জন্যে কি এতটা রাগ হতে পারে! আমি
জন্মদিনের অভিনন্দন জানাতে গেলুম•••
ভূদেব। ভয় পেয়াে না পরিমল। বাইরের রাগটা যত বেশী দেখছ,
ভেতরের না-দেখা জিনিসটাও তেমনি বেশী ধরে নিতে হবে কি না।
পরিমল। এটা আমার ওপরে বড় অবিচার কিন্তু। আমাকে ক্ষমা
চাইবার সুয়ােগটাও দিলেন না।
ভূদেব। কিছু ভেবে না পরিমল। রাগটা একটু পাকতে দাও। দেখেছ
তত আমটি যখন পাকে তখন একটু হাওয়াতেই টুপ করে খসে

জন্মতিথি
যায়। রাগ পাকলে পর তােমায় আর বেশী পরিশ্রম করতে হবে না,
এক কথাতেই জল হয়ে যাবে।
পরিমল। না, দাদামশাই, সে ভরসা নিয়ে তাে থাকতে পারছি নে।
এর পর সব লােকজন এসে পড়লে কথা কইবার সুযােগটুকু পর্যন্ত
হারাব।
বঁ-দিকে প্রস্থান
উৎপলা। দাদামশাই, মানুষকে এরকম মিছিমিছি আশা দেওয়াটা কি
ভাল ?
ভূদেব। মিছিমিছি কে বললে? তাের দিদির ভদ্রতার অভাবটা তত
আর সত্যি নয়।
উৎপলা। কি জানি, এ রকমটা আর কখনাে দেখি নি। আমার
কিন্তু মনে হয়, পরিমলবাবুর এখানে আজকে আসাটা দিদি পছন্দ
করছে না।
ভূদেব। ওরে, মনে যদি তাই থাকত, তাহলে মুখের ভদ্রতায় কোন
ত্রুটি হত না। সেটুকু শিক্ষা তাের দিদির আছে।
রঘুয়ার সহিত দীপ্তির প্রবেশ
D
রঘুয়া। মিস্ দীপ্তি রায়।
রঘুয়ার প্রস্থান
উৎপলা। দীপ্তি, আয়। দেরী হ’ল যে? বাড়ী চিনতে কোন মুস্কিল
হয়নি’ তাে ?
২২

প্রথম অঙ্ক
দীপ্তি। তা একটু হয়েছিল বইকি। তােদের রাস্তার যা এলােমেলো
ভূদেবকে দেখিতে পাইয়া একটু সঙ্কুচিত হইল
উৎপলা।
ও, আয়, তােদর পরিচয় করে দিই। মিস্ দীপ্তি রায়
মিঃ ভূদেব চৌধুরী।
ভূদেব। দূর বােকা ! মিঃ চৌধুরী বললে ও কি-বুঝবে? (দীপ্তির
প্রতি) আমি উৎপলার দাদামশাই। (দীপ্তি নমস্কার করিল) বসুন
মিস্ রায়।
দীপ্তি। আপনার কাছে আমি “মিস্ রায়” নই দাদামশাই, শুধু দীপ্তি।
( বসিল)
ভূদেব। তথাস্তু। সত্যি কথা বলতে কি, ও মিস্ রায়-টায়গুলাে
আমি মােটেই মনে রাখতে পারি নে। মানুষের ব্যক্তিত্বের
ছাপটা তার নামের সঙ্গে যেমন বেশ জড়িয়ে যায়, পদবীর
সঙ্গে তেমন নয়। এর পর “মিস্ রায়” শুনলে হয়তাে অন্যমনস্ক
থাকতেও পারি, কিন্তু “দীপ্তি” নামটি একেবারে কাণের ভিতর দিয়া
পশিরে মরমে।
উৎপল। দাদামশাই, নাম শুনেই যে আকুল হয়ে উঠলে, তবু তাে
এখনাে গুণের পরিচয় পাও নি।
দীপ্তি। সুতরাং এইবেলা আমার সরে পড়াই ভাল। পরিচয় পেলেই
“পসার” একদম মাটি।
ভূদেব। ওরে, কারাে কারাে পরিচয় বইয়ের খােলা পাতার মত তাদের
li -

জন্মতিথি
:.
মুখের ওপরেই লেখা থাকে। যার চোখ আছে সেই পড়ে
নিতে পারে।
উৎপল। আচ্ছা দাদামশাই, বুঝব তােমার দৃষ্টিশক্তি ; বল দেখি
ওর পরিচয় ?
ভূদেব। বলছি, মিলিয়ে নে”। (দীপ্তির মুখের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া
বলিতে লাগিলেন ; দীপ্তি মুখ টিপিয়া হাসিতে লাগিল ) দীপ্তি
রায়--সুন্দরী...
উৎপলা। নিশ্চয়, সে তাে সবাই দেখতে পাচ্ছে-
কোকড়ানাে চুলঘেরা মুখখানি মিষ্টি
ভাসা ভাসা চোখ থেকে মনকাড়া দিষ্টি ।
ভূদেব। তরুণী
উৎপলা।
উৎপলা।
অবশ্য। এ হ’ল বর্ণনা। পরিচয় নয়।
ভূদেব। শিক্ষিতা ..
উৎপল। এটা ফঁাকি, তুমি আগেই জানতে।
ভূদেব। সঙ্গীতে নিপুণা ....
এও ফাকি। একটু আগেই তুমি শুনেছ।
ভূদেব। সরলতার আবরণে ঢাকা তীক্ষ্ণ বুদ্ধি•••••
যে কোন মেয়ের সম্বন্ধেই একথা বলা যেতে পারে। সবাই
ভাববে তার সঙ্গে ঠিক মিলে যাচ্ছে। তারপর ?
ভূদেব। অত্যন্তু কোমল স্বভাবা। কারাে মনে ব্যথা দিতে জানে না•••
উৎপলা। ভুল নম্বর এক। তার প্রমাণ, অন্ততঃ তিনচার জন ভদ্র
যুবক••••••
উৎপল।
.fr
২৪

প্রথম অঙ্ক
দীপ্তি। ( উঠিয়া ) পলি, আমি তবে চললুম।
উৎপলা। আচ্ছা, আচ্ছা, বলব না, তুই বস। দাদামশাই, প্রমাণ
দিতে বারণ। যাহােক, আমি বলছি, তুমি মেনে নিতে পার যে
এখানে তােমার ভুল হয়েছে। আচ্ছা, তারপর?
পিছন হইতে ক্ষিতীশের প্রবেশ
ক্ষিতীশ। (দীপ্তির উদ্দেশে ) এই যে উৰ্মিলা। মা, সেই রূপাের
ফুলদানিটে কোথায় জানিস্ ?
দীপ্তি বিস্মিত হইয়া মুখ ফিরাইতেই উৎপলা তাহাকে আড়াল
করিয়া পঁাড়াইল
উৎপল। হ, জানে, কিন্তু বলবে না।
ক্ষিতীশ। কাজের সময় দুষ্টমি করিসূনে’ পলি। (দীপ্তির প্রতি)
জানিস্ তাে বল না। তাের মা সেটা খুঁজে খুঁজে ••
ক্ষিতীশ অগ্রসর হইলেন। উৎপলা সরিয়া দাঁড়াইল। ক্ষিতীশ
দীপ্তিকে দেখিয়া অপ্রতিভ হইলেন
।
একি, উর্মিলা নয়। আমি ভেবেছি -
দীপ্তি। • না, আমি উৰ্মিলা নই। (উঠিলেন)
উৎপল। কাজেই ফুলদানি কোথায় তা জানে না।
দীপ্তি। তবে খুজবার সাহায্য করতে পারি।
উৎপলা। চিনতে পারলে না বাবা। ও দীপ্তি। ঐ যে সেদিন
গুপ্ত সাহেবের পার্টিতে...

জন্মতিথি
ক্ষিতীশ। হুঁ হুঁ আর বলতে হবে না। (দীপ্তির প্রতি) ব’স মা
ব’স। (দীপ্তি বসিলেন) কতক্ষণ এসেছ মা?
দীপ্তি। এই মিনিট দশেক হবে।
ক্ষিতীশ। প্রফেসর রায় ভাল আছেন ?
দীপ্তি। ।
ক্ষিতীশ। তুমি এসেছ, বেশ। আজকে আবার তােমার গান
শােনা যাবে। পলির কাছে শুনেছ বােধ হয় সেদিন তােমার গান
আমার খুব ভাল লেগেছিল।
উৎপলা। হাঁ, তাইতে তাে দেখে চিনতেও পার নি।
ক্ষিতীশ। তা কি করব। পেছন দুজনকে একই রকম
দেখতে। আর আজ উৰ্মিলাও এই রকম একখানা শাড়ী পড়েছে
তাই হঠাৎ দেখে ভুল হয়ে গিয়েছিল।
i.
রঘুয়ার প্রবেশ
রঘুয়া। মিসেস হালদার কাম।
উৎপলা। সৰ্ব্বনাশ! এত আগে! কই, কোথায় ?
রঘুয়া। সিট দি হল। কলিং বড়া সাব।
ক্ষিতীশ। পলি, তুই ওঁকে বলগে যা, আমি এখন ব্যস্ত আছি ;
একটু পরে যাব।
উৎপলা। সে কি হয় বাবা! তিনি ডাকছেন বড় সাহেবকে।
তােমার বদলে আমাকে দেখলেই চটে যাবেন।
ক্ষিতীশ। তাহলে তাের মাকে ডেকে দে না পলি।

প্রথম অঙ্ক
উৎপলা। তা দিচ্চি। দীপ্তি, এইবেলা পালাই চল। যদি এ ঘরে
এসে পড়েন, তবে আর রক্ষে থাকবে না।
দীপ্তিকে টানিয়া লইয়া বাঁ দিকে প্রস্থান
ক্ষিতীশ। (রঘুয়ার প্রতি) তুই বলগে যা, আমি এখনি যাচ্চি,
আপনি একটু বসুন।
রঘুয়া। অল রাইট, সার।
রঘুয়ার প্রস্থান
ভূদেব। মানুষটা কি সত্যিই ভয়ানক ?
ক্ষিতীশ। বিশ্বাস না হয়, পরীক্ষে করে দেখুন না।
দেখুন না। ঐ ঘরেই
তত আছেন।
ভূদেব। না, থাক, আমার কৌতূহল তত বেশী নয়। তবু তােমার
মুখে শুনি রকমটা ।
ক্ষিতীশ। তাহলে শুনুন। তাঁর ভয়ানকত্বের প্রথম দফা হচ্চে
অত্যন্ত বেশী কথা বলা। আর র প্রধান বলবার কথা হচ্চে লােকের
নাড়িনক্ষত্রের খবর—অবশ্যি শুধু মন্দ দিকটা। তার সঙ্গে মিশিয়ে
নেন যত ইচ্ছে জনশ্রুতি আর নিজস্ব কল্পনা।
ভূদেব। তাই নাকি? তা’ পেন নেবার পর থেকে আমারও
পেশা অনেকটা তাই হয়ে দাড়িয়েছে। আমার সঙ্গে মিলবে ভাল।
ক্ষিতীশ। কিন্তু দেখবেন, হঠাৎ যদি আপনাকে তার ভাল লেগে
যায়, তখন বিপদটা কিন্তু হয়ে উঠবে দুঃসহ রকমের।
ভূদেব। সে কি কথা? ভাল লাগলে আবার বিপদটা কিসের?
ক্ষিতীশ। আমি ঐটুকুই বললুম, এখন আপনি বুঝে নিন্।
২৭

জন্মতিথি
ক্ষিতীশ টেবিলের নিকট গিয়া একটা কাগজে নক্সা আঁকিতে লাগিলেন। উর্মিলা
বাঁ-দিকের দরজা দিয়া ত্বরিতপদে প্রবেশ করিয়াই থমকিয়া দাড়াইল।
তাহার পর নিজেকে সামলাইয়া লইয়া স্বাভাবিক ভাবে
আসিয়া ভূদেবের ডানদিকে সােফায় বসিল
ভূদেব। কি বড়-রাণি, অত হাঁপাচ্চিস্ যে।
উৰ্মিলা। না, কই, হাঁপাচ্চি আবার কোথায় ?
ভূদেব। তা হবে, আমারই দেখবার ভুল। কিন্তু যখন ঘরে ঢুকলি,
ঠিক মনে হল যেন বাঘের হাত থেকে পালিয়ে এলি।
উর্মিলা। তােমার যেমন কথা!•••এই যে বইখানা তােমার কাছে।
বইখানা খুঁজবার জন্যে তিনবার ওপর আর নীচ করে হায়রাণ হয়ে
পড়েছি, আমি কি জানি যে তুমি নিয়ে বসে আছ। দাও।
ভূদেব। এই নে’। এর যদি এতই দাম, তবে ফেলে গিয়েছিলি
বাঁ-দিক হইতে পরিমলের প্রবেশ। উর্মিলাকে দেখিয়া
তাহার মুখ উজ্জ্বল হইল
পরিমল। দাদামশাই, আপনি তখন যে বলছিলেন, সে কথাটা
আমার বেশ এ মনে হয়...( অগ্রসর হইল )
ভূদেব। কোন কথা?•••( পরিমলের ছল বুঝিতে পারিয়া) ও, হাঁ,
কেমন, বুঝে দেখ, ঠিক বলেছি কি না।•••এস, এস, বস ।
পরিমল ভূদেবের
বাঁ-দিকে বসিল
২৮

প্রথম অঙ্ক
উর্মিলা। দাদামশাই, তােমাদের কথাটা বােধ হয় গােপনীয় ?
ভূদেব। না, গােপনীয় আর কি। কি বল পরিমল ?
উৰ্মিলা। তা’ হােক, তােমরা কথা বল। আমি যাই বইখানা
শেষ করি গে’।
*
উৰ্মিলা উঠিয়া হলঘরের দিকে অগ্রসর হইল। পরিমল
কৌতুক মিনতির দৃষ্টিতে ভূদেবের দিকে চাহিল।
ততক্ষণে উৰ্মিলা দরজার নিকট পৌছিয়াছে
.
ভূদেব। বড়-রাণি, ওঘরে যাচ্ছ, ভালই। মিসেস হালদার অনেকক্ষণ
থেকে অপেক্ষা করছেন। তার কাছে একটু বস গে”।
উৰ্মিলা। (থমকিয়া দাড়াইল) তাই নাকি?
ফিরিয়া আসিয়া দূরে অন্য একটি সােফায় বসিল
পরিমল। ( কাছে গিয়া ক্ষিতীশের প্রতি) কাকাবাবু, সেই ফুলদানিটার
কথা উৰ্মিলা দেবীকে জিজ্ঞাসা করেছেন?
ক্ষিতীশ। ও, মিলি, সেই রূপাের বড় ফুলদানিটা কোথায় জানিস্ ?
উর্মিলা। হাঁ, এনে দিচ্চি।
উঠিয়া বাঁ-দিকে অগ্রসর হইল
পরিমল। (উঠিয়া ) আমিও যাই, ফুলগুলাে একেবারে সাজিয়েই নিয়ে
আসি গে’।
উৰ্মিলা। (থমকিয়া দাড়াইল) ও, সেটা তাে হলঘরেই আছে।
হলঘরের দিকে প্রস্থান। পরিমল তাহার অনুসরণ করিতে যাইতেছিল,
এমন সময় ক্ষিতীশ ডাকিলেন

জন্মতিথি
ক্ষিতীশ। পরিমল, এই যে, এই প্ল্যানটা দেখতে। ঘরখানা এমনি করে
সাজালে কেমন হবে? (পরিমলের নিকট আসিলেন) এই দেখ,
এটুকু হচ্চে ষ্টেজ। তার পর খানিকটে জায়গা খালি রাখতে হবে
পরিমল। হাঁ, তা তাে রাখতেই হবে।
ক্ষিতীশ। ডানদিকের এই কয় সার চেয়ার থাকবে মেয়েদের জন্যে।
পরিমল। হাঁ, ওই বেশ হবে, বেশ হবে। (পকেটে হাত দিয়া )
ওই যাঃ, আমার রুমালখানা বুঝি ও-ঘরে ফেলে এসেছি।•••আমি
আসছি এখনি।
৩
• ?
পরিমল হলের দরজা পর্যন্ত গিয়াছে এমন সময় নেপথ্যে মিসেস হালদারের সাড়া
পাওয়া গেল, “আমি আসতে পারি কি?” পরক্ষণেই পর্দা সরাইয়া মিসেস
হালদারের প্রবেশ। যৌবনের সীমা পার হইয়া গিয়াছে। বিধবার
বেশ ভূষার মধ্যে যতদূর পরিপাট্য সম্ভব তাহা করিয়াছেন।
মুখে পাউডারের প্রলেপ। হাতে ভ্যানিটি ব্যাগ
হালদার। মিষ্টার বাে, আগেই এসেছ দেখছি, কতক্ষণ?
পরিমল। এই খানিকটে আগে।
পাশ কাটাইয়া চলিয়া গেল
হালদার। (পলায়িত পরিমলের উদ্দেশে ভ্রুকুটি করিয়া) মাই গুনে,
দেখেছেন মিঃ মিত্র, আজকালকার ইয়ং ম্যানেদের ম্যানাস
দেখেছেন। একজন লেডির সঙ্গে দেখা, ত’ গুড ইভনিংটে পর্যন্ত
করলে না।
ক্ষিতীশ। গুড ইভনিং, গুড ইভনিং মিসেস্ হালদার।

প্রথম অঙ্ক
.
হালদার। গুড ইভনিং মিঃ মিত্র। আমি ভাবছিলুম, আপনি বুঝি
ওপরে। এখন মিলি বললে আপনি এ ঘরে আছেন। মিলি ভারি
বিজি দেখলুম ; বললুম, আয়, তাের জন্মদিনে তােকে কনগ্রাচুলেট
করি—তা’ একটু দাড়ালেও না।
ভূদেব। হাঁ, ওর ব্যস্ত হবার বিশেষ কারণ ছিল।
হালদার। ( ক্ষিতীশের প্রতি) ইনি...?
ক্ষিতীশ। ও, আসুন আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিই। মিঃ ভূদেব
চৌধুরী, আমার মামাশ্বশুর, রিটায়ার্ড সাবর্ডিনেট জজ-মিসেস্
হালদার, ব্যারিষ্টার মিঃ সরকারের বােন্।
চৌধুরী। গুড ইভনিং, মিসেস হালদার। হাউ ডু ইউ ডু ?
হালদার। গুড়, ইভনিং মিঃ চৌধুরী হাউ ডু ইউ ডু? আপনার
কথা আমি মিসেস্ মিত্রের কাছে শুনেছি। আপনি রিটায়ার
করেছেন কতদিন হল ?
ভূদেব। এই মাস ছয়েক হবে।
ক্ষিতীশ। মিসেস্ হালদার, আমায় একটু মাপ করতে হবে। মামাবাবু,
ততক্ষণ ওঁর সঙ্গে কথা বলুন, আমি মিসেস মিত্রকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
ক্ষিতীশের প্রস্থান
হালদার। রিটায়ার করবার পর সময় কাটানাে ভারী মুস্কিল বােধ
হচ্চে, না ?
ভূদেব। খুবই মুস্কিল। সময় কাটতেই চায় না। তাই উৰ্মিলাদের
সঙ্গে হাসি-তামাসা করে খানিকটে করে সময় কাটিয়ে যাই। বাসা
কাছে হলে এখানেই সারাদিন পড়ে থাকতুম।

জন্মতিথি
হালদার। কেন, আপনার বাসা কোথায় ?
ভূদেব। শ্যামপুকুরে।
হালদার। মাই গুডনে। শ্যামপুকুরে ! ঐ নােংরা পাড়ায় । কেন ?
ভূদেব। আমার ছেলের আফিস ওখান থেকে কাছে হয় কি না তাই।
হালদার। ও, আপনার কার নেই বুঝি ?
ভূদেব। না।
হালদার। তাইতাে ! দেখুন আমার কেমন অভ্যেস হয়ে গেছে, ও পাড়ায়
থাকবার কথা ভাবতেও পারি নে’। দু’দণ্ড গিয়ে থাকতে গেলেও
বিচ্ছিরি লাগে। এই তাে গেল পরশু মিঃ মল্লিকের ওখানে টা-পাটি
ছিল। তার বাড়ী ঐ শ্যামবাজারের দিকে কি একটা পার্ক
বন্ধু-টন্ধু না-কি নাম••••••
"ভূদেব। দেশবন্ধু পার্ক ?
হালদার। তা হবে।••• মিঃ মল্লিক আমার অভ্যর্থনা করলেন বেশ
গরম ভাবেই.•••••
ভূদেব। কেন, তার কি তখন মেজাজ ভাল ছিল না?
হালদার। না, না, তা নয়। ইংরিজিতে যাকে বলে বেশ ওয়া
রিসেপশান—খুব আদর যত্ন করলেন। কিন্তু আমি বেশীক্ষণ থাকতে
পারলুম না। যে নাটি কোয়ার্টার।
ভূদেব। তা তাে সত্যিই। আপনার হল রিফাইণ্ড টেষ্ট।
হালদার। আর দেখুন, অনেকদিনের অভ্যেস কি না ; বুঝেছেন
মিঃ চৌধুরী, আমার যখন বিয়ে হল, সে আজ প্রায় বিশ বছরের
কথা ; মিঃ হালদার তখন••••••
৩২

প্রথম অঙ্ক সৌভাগ্য ? ভূদেব। বিশ বছর! তাহলে আপনার খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল বলুন••• হালদার। না, তেমন অল্প বয়েস আর কি, এই উনিশ-কুড়ি বছর হবে। ভূদেব। না না বলেন কি? আপনার বয়েস কি অত হবে! আমার তাে দেখে মনে হচ্ছিল যে ত্রিশ পেরােয় নি। হালদার। ( খুসি হইয়া) কি যে বলেন! ত্রিশ পেরিয়েছে বই কি। দেখি, ( চিন্তা করিয়া) ও, আমার বলতে একটু ভুল হয়েছে। অতটা হবে না। হাঁ, কি বলছিলুম ? ভূদেব। মিঃ হালদারের সৌভাগ্যের কথা। হালদার। ভূদেব। আপনার বিয়ের কথা বলছিলেন। সেটা তার সৌভাগ্য নয় ? হালদার। ও, হাউ নটি ঘঁ, বলছিলুম কি, আমার যখন বিয়ে হয় তখন মিঃ হালদার ঐ পাড়ায় থাকতেন। আমি তাঁকে স্পষ্ট বললুম-কাউকে খাতির করবার মানুষ আমি নই.••যে, এ পাড়ায় যদি বাস করতে চাও, তবে একলা থাকতে হবে। হয় পাড়া ছাড়বে, নয় আমায় ছাড়বে। ভূদেব। তিনি কি করলেন? হালদার। তিনি তৎক্ষণাৎ ও পাড়া ছাড়লেন। ভূদেব। নিশ্চয়। যে ছাড়তেই হবে। পাড়াতে অল্প । ৩

জন্মতিথি
কথা। স্বৰ্গটা
একটু পুরাণে
হতে দিন। দেখবেন এর পর
তিনি স্বর্গ ছেড়ে দিয়ে অনন্তকাল আপনার কাছেই থাকতে
চাইবেন।
বাঁ-দিক হইতে উৰ্মিলার প্রবেশ
উৰ্মিলা। মিসেস্ হালদার, যদি কিছু মনে না করেন-মা আপনাকে
ও-ঘরে ডাকচেন। তিনি কাজে ব্যস্ত আছেন বলে নিজে আসতে
পারলেন না।
হালদার। ও, আচ্ছা ! মিঃ চৌধুরী, এক্সকিউজ মি ফর
মােমেন্ট। আমি মিসেস্
মিসেস্ মিত্রের
সঙ্গে দেখা করেই
আসছি। আপনার
আলাপ
বড়
পেলুম।
ভূদেবের প্রতি বিদায়সূচক সহাস্থ গ্রীবাভঙ্গী করিয়া বঁ-দিকে প্রস্থান
উৰ্মিলা। ব্যাপার কি দাদামশাই? ভারি ভাব যে! বস করলে
কি-মন্ত্রে ?
ভূদেব। মন্ত্র আর কি! দুটো স্তবস্তুতি—দেবীরা চিরদিনই যাতে
তুষ্ট হন।
উর্মিলা। বটে! তা তুমি বুঝি এখনাে টের পাও নি যে এদেবী রুষ্ট
হলেও যা বিপদ, তুষ্ট হলেও তার চাইতে বড় কম নয়। সময়
থাকতে পালাও।
ভূদেব। পালিয়ে যাব আর কোথায় ? বাঁচবার কি জায়গা
আছে ?
৩৪

প্রথম অঙ্ক
উৰ্মিলা। তবু দশজনের মাঝখানে বিপদ অনেক কম।
শীগগির
এস।
ভূদেব।
চল।
উভয়ের হলঘরের দিকে প্রস্থান
রঘুয়া আসিয়া সেলাম করিয়া দাড়াইল
রঘুয়া। মিষ্টার শিশির ভাট।
চারিদিকে চাহিয়া কাহাকেও না দেখিতে পাইয়া
আবার সেলাম করিয়া চলিয়া গেল
দৃশ্য শেষ

দ্বিতীয় অঙ্ক মিঃ মিত্রের বাড়ীর পিছনদিকের বাগান। দৃশ্যের পৃষ্ঠপট বাড়ির দেওয়াল। মাঝামাঝি একটা দরজা, তাহা হইতে সিড়ি নামিয়া আসিয়াছে। দরজার দু পাশে দুটি জানালা। ঘরে উজ্জ্বল আলাে জ্বলিতেছে, কিন্তু দরজা ও জানালায় পর্দা থাকাতে ঘরের ভিতরটা দৃষ্টিগােচর হইতেছে না। সম্মুখে বাগানের মাঝখানে একটি মার্বেল পাথরের নারীমুর্তি ; তাহার হাতে সুদৃশ্য আলােকাধারে আলাে জ্বলিতেছে; কিন্তু রাত্রির অন্ধকার তাহাতে সম্পূর্ণ দূর হয় নাই। মুর্তির নীচে সামনের দিকে একখানি হেলান-দেওয়া বেঞ্চ। দেওয়ালের কিনার দিয়া ফুলের কেয়ারি। সিড়ির উপর ও মূৰ্ত্তিকে ঘিরিয়া টবে সাজানাে নানারকমের গাছ। সম্মুখের বেঞ্চে বসিয়া উৎপলা ও দীপ্তি হাসিতেছিল। হাসি থামিলে উৎপলা। ওগগা মশাই, যদি কাউকে কখনাে সত্যি সত্যি ভালবেসে ফেলি, তখন বুঝবি এ-সব শুধু কথার কথা। দীপ্তি। কক্ষণাে না। এ কথা আমি কোনদিনই মানব না যে “ভালবাসা” মানুষের জীবনের চরম জিনিস”। উৎপলা। অন্ততঃ মেয়েমানুষের? জানিস্ তত বায়রণ কি বলেছেন। “পুরুষের ভালবাসা তার জীবন-যাত্রার মধ্যে একটা অধ্যায় মাত্র ; কিন্তু রমণীর ভালবাসা তার জীবন-সর্বস্ব।” দীপ্তি। বায়রণ পুরুষ বলেই ও-কথা লিখেছেন। যে-মেয়ের আত্মসম্মান

দ্বিতীয় অঙ্ক
বােধ আছে সেই ও-কথার প্রতিবাদ করবে। কোন পুরুষ আমার
কাছে যতখানি ভালবাসা কামনা করবে ঠিক ততখানি ভালবাসাই
তাকেও দিতে হবে।
উৎপলা। তাহলে তুই কখনাে ভালবাসতে পারবি নে। সত্যি সত্যি
ভালবাসলে মানুষ আত্মহারা হয়—হিসেব করবার মত মনের অবস্থা
থাকে না।
দীপ্তি। (হাসিয়া) তুই জানলি কি করে ? কাউকে সত্যি সত্যি
ভালবেসেছিস না কি?
উৎপল। না, কিন্তু আমার বিশ্বাস তাই।
দীপ্তি। তার কারণ তুই আমার চাইতে কাব্য উপন্যাস অনেক বেশী
পড়েছিস। উপন্যাসের ঘটনা যে বাস্তব জীবনে ঘটেনা, চোখ মেলে
দেখলেই তা বুঝতে পারবি।
উৎপলা। উপন্যাস তাে আর সৃষ্টিছাড়া কিছু নয়। আত্মহারা হয়ে কেউ
ভালবাসতে পারে বলে কি তাের মনে হয় না ?
দীপ্তি। আত্মহারা মানে, যদি আত্মসম্মান বিসর্জন হয়, তাহলে সে
ভালবাসা মদের নেশার চাইতেও খারাপ জিনিস। তাকে আমি
দূর থেকেই নমস্কার করি।
উৎপলা। কিন্তু সেই নেশা যদি একদিন মনকে পেয়ে বসে তাহলে ও-রকম
হাজারগণ্ডা কথা দিয়েও তাকে বেঁধে রাখতে পারবি নে’। একথা
ঠিক জানিস, মন্দিরে সত্যিই যেদিন দেবতা আসবে, সেদিন বলবি :-
গান
আমি দেবতা দুয়ারে দাসী...
৩৭

জন্মতিথি
দীপ্তি। ( গান শেষ করিতে না দিয়া ) এই কি তাের প্রেমের গান?
প্রেম হবে সমানে সমানে। একজন দেবতা, আর একজন তার দাসী,
এতে ভক্তি হতে পারে কিন্তু তাকে প্রেম বলিনে।
উৎপলা। দূর হতভাগি ! গানটা শেষ করতেও দিলিনে।
দীপ্তি। ঐ ন্যাকামিভরা প্রেমের গানগুলাে আমার একটুও ভাল
লাগে না। তুই আর কোন গান গা।
উৎপলা। আচ্ছা, তবে প্রেমের গান কি রকম হওয়া উচিত তাের মুখে
একটু শুনি।
দীপ্তি। এই শােন :-
গীত
মুখে মুখে বুকে বুকে ওগো সুখে দুখে তুমি থাকো
প্রেমের বাগানে বঁধু ফুলের পরাগ মাখাে ।
অ-ধর অধর ওযে ধরার আদর খোঁজে
স্বপনে গােপনে এসে আমার নয়নে অকে।
যায় দিবা যায় রাতি, তুমি আমি চির সাথী,
জীবনের মেঘে রােদে কোকিলের মত ডাকো।
ঘরের দরজা দিয়া বধুরীর প্রবেশ
রঘুয়া। মিস্ পলি, মাদার কলিং।
উৎপলা।
হােয়াই?
রঘুয়া। কলিং, কলিং••
কথা যােগাইল না, ইঙ্গিতে বুঝাইল যে সে জানে না। তারপর পরাভবের
লজ্জায় ছুটিয়া পলাইল। উৎপলা ও দীপ্তি হাসিল
৩৮

দ্বিতীয় অঙ্ক উৎপলা। তুই একটু বস ভাই। আমি শুনে এখনি আসছি। উৎপলার প্রস্থান ডানদিক হইতে মিসেস হালদারের প্রবেশ হালদার। মিস্ রায়, একলা বসে রয়েছ। দীপ্তি। ( উঠিয়া ) হাঁ, এই একটু আগে••••• হালদার। বেশ, বেশ। তুমি দেখছি আর সবার মত নও। আজকালকার মেয়েগুলাে যে কি—ছেলেদের সঙ্গে নইলে থাকতেই পারে না। সেদিন মিষ্টার ঘােষের পার্টিতে আমি বাগানে বেড়াচ্চি, দেখি কি, মাই গুডনেস ! বাগানে যতগুলাে বেঞ্চ ছিল- দীপ্তি। আপনি দাড়িয়ে রইলেন, বসুন না। হালদার। না, আমি এখনি যাব।•••আমি মিঃ চৌধুরীকে খুজছিলুম। এদিকে এসেছিলেন, বলতে পার ? দীপ্তি। না, কই। এদিকে তাে দেখিনি। ঘরেই আছেন, বােধ হয়। হালদার। নাঃ, ঘরগুলাে তত সব দেখে এসেছি। দেখি এই দিকটা••• বাঁ দিকে প্রস্থান । দীপ্তি বসিয়া গুন গুন করিয়া গান গাহিতে লাগিল। ঘরের দরজা দিয়া পরিমল বাহিরে আসিয়া পা টিপিয়া টিপিয়া অগ্রসর হইল। দীপ্তি ডান হাতখানি বেঞ্চের পিঠের উপর ছড়াইয়া বসিয়াছিল। পরিমল পিছন হইতে খপ করিয়া সেই হাতখানি চাপিয়া ধরিয়া বলিল, “এইবার”। দীপ্তি চমকিয়া ভয়বিকৃত গলায় চীৎকার করিয়া উঠিল । একি! কে আপনি? পরিমল নিজের ভুল বুঝিতে পারিয়া চমকিয়া দুই পা পিছু হটিয়া গেল।

জন্মতিথি
নেপথ্যে মিসেস হালদার। কি হ’লকি হল, কে চেঁচাল ?
পরিমল। সৰ্ব্বনাশ। ঐ মিসেস হালদার আসছেন। যা হয়ে গেছে
তার কৈফিয়ৎ আপনাকে পরে দেব—আগে ওঁর হাত থেকে আমায়
বাঁচান! নইলে আমার আর মুখ দেখাবার উপায় থাকবে না।
মিসেস হালদারের প্রবেশ
হালদার। মাই গুডনে, দীপ্তি! তুমি
গুডনে, দীপ্তি! তুমি চেঁচিয়ে উঠেছিলে ?
ব্যাপার কি ?
পরিমল। (মিসেস হালদারের আগমন যেন দেখিতেই পায় নাই ;
দীপ্তির প্রতি) হ, এইবার ঠিক হয়েছে। বেশ রিয়ালিষ্টিক। গলার
স্বরের ভেতর দিয়ে ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা বিস্ময়ের ভাব বেশ ফুটে
উঠেছে। কিন্তু দাড়ানােটা ঠিক হয়নি। চমকে আরাে একটু
পেছনে সরে যাবেন।•••হ, এইবার আমার কথা । ( নাটকের
ভঙ্গীতে) “কে আপনি।” এই প্রশ্ন শেষে তােমার মুখ থেকে আমায়
শুনতে হল। সে তত বেশীদিনের কথা নয় মাধুরী, এই নদীর তীরে,
এই বটগাছের তলায় অস্তগামী সূৰ্য্যকে সাক্ষী রেখে কি প্রতিজ্ঞা
করেছিলে, মনে পড়ে? (স্বাভাবিক কষ্ঠে) কই বলুন।
হালদার। ও, কিসের রিহার্শেল হচ্চে তােমাদের ?
পরিমল। (মিসেস হালদারকে ইঙ্গিতে চুপ করিতে বলিয়া দীপ্তির প্রতি)
কই বলুন, ‘কে সুধী দা?’
দীপ্তি। ( কলের পুতুলের মত) কে, সুধী-দা?
পরিমল। ( নাটকীয় ভঙ্গীতে ) তবু ভাল, চিনতে পেরেছ।•••••বলুন
‘সুধী-দা’, তুমি, তােমার এ কি চেহারা হয়েছে ?
৪০

দ্বিতীয় অঙ্ক দীপ্তি। (পূৰ্ব্ববৎ) সুধী-দা’, তুমি ! তােমার এ কি চেহারা হয়েছে ? পরিমল। বলে যা। দীপ্তি। (ঢাক গিলিয়া) ময়লা কাপড়-চোপড়, মাথার চুলে তেল নেই, শরীর রােগা। এতদিন কোথায় ছিলে ? পরিমল। উহু, এ কথাগুলাে ঠিক হল না।••বুঝেছি মিসেস হালদার আছেন বলে আপনার বাধ-বাধ ঠেকছে।•••মিসেস্ হালদার, একটু পরেই তাে, সব দেখতে পাবেন। দয়া করে যদি হালদার। (হাসিয়া ) আচ্ছা, আমি যাচ্চি। দীপ্তি যা করে চেঁচিয়ে উঠেছিল, আমি ভাবলুম, সত্যিই বা কি হল। তা তােমাদের এ অভিনয় কোথায় হবে ? পরিমল। বাঃ, তা জানেন না। উর্মিলা দেবীর জন্মদিন উপলক্ষে আমরা “বিনিময়” নাটক থেকে একটা দৃশ্য অভিনয় করছি যে। হালদার। আচ্ছা তােমরা রিহার্শেল দাও, আমি দেখি। ভুলটুল হলে আমি দেখিয়ে দিতে পারব এখন। তােমরা জাননা বােধ হয়•••আমি যখন অভিনয় করতুম, তখন আমার খুব নামডাক ছিল। এখনাে যে পারিনে, তা নয়। সংযুক্তা আর সূর্যসিংহের সীন তাে আমার একেবারে মুখস্থ। পরিমল। আপনি দেখিয়ে দিতে পারলে তাে খুব ভালই হত। কিন্তু আপনি কাজে যাচ্ছিলেন:•• হালদার। না, কাজ কিছু নয়, মিঃ চৌধুরীকে খুজছিলুম... পরিমল। কে দাদামশাই ? তিনি তাে গেটের কাছে দাড়িয়ে মিঃ মিত্রের সঙ্গে কথা কইছেন। ৪১

জন্মতিথি
হালদার। মাই গুডনেস্ ! আর আমি এদিকে সারা মুল্লুক খুজে
মরছি। আচ্ছা, তােমরা রিহার্শেল দাও, আমি যাই।
ডানদিকে দ্রুত প্রস্থান
পরিমল। (স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়া) যাক, বাঁচা গেছে। আপনাকে
অসংখ্য ধন্যবাদ। খুব বাঁচিয়ে দিয়েছেন, যাহােক।
দীপ্তি। আমি আর কি করেছি, যা বলবার আপনিই তাে বলেছেন।
পরিমল। তবু আপনি সঙ্গে সঙ্গে সায় না দিলে তাে মিথ্যেটা হাতে হাতে
ধরা পড়ে যেত।
দীপ্তি। অমন অনর্গল মিথ্যে কথাগুলাে বললেন কি করে ?
পরিমল। প্রাণের দায়ে। নইলে এ ঘটনাটা মিসেস হালদারের মুখে
পল্লবিত হয়ে কি আকারে লােকের কাছে প্রচার হত তা ভাবতেও
হৃৎকম্প হয়।
দীপ্তি। আপনার উপস্থিতবুদ্ধির প্রশংসা করি, কিন্তু আপনাকে শাস্তির
হাত থেকে বাঁচিয়ে ভাল করেছি কি মন্দ করেছি সেটা এখনও ঠিক
বুঝতে পারছি নে।
পরিমল। ওহহ, তাওত বটে। আমার আচরণটা ঠিক ভদ্রজনােচিত
হয়নি। আপনার কাছে আমার এখনাে যথেষ্ট জবাবদিহি বাকি
আছে। আচ্ছা..কিসে আপনার বিশ্বাস হবে বলুন?•••আচ্ছা,
আমার দিকে চেয়ে দেখুন তাে। আমাকে দেখে কি নারীর ওপর
অত্যাচারকারী গুণ্ডা বলে মনে হয়?
দীপ্তি।. ( স্বাভাবিক পরিহাসস্পৃহা দমন করিতে পারিল না। ঈষৎ
হাসিয়া বলিল) কি জানি।
৪২

দ্বিতীয় অঙ্ক
পরিমল। (হাসিয়া) এ তিরস্কারটুকু আমার ন্যায্য পাওনা। যাক,
চেহারা সম্বন্ধে আমার যা একটু অহঙ্কার ছিল, তাও ধূলিসাৎ হয়ে
গেল। তা যাকগে•••কিন্তু আপনি ব্যারিষ্টার পরিমল বােসের নাম
শুনেছেন ?
দীপ্তি। যিনি লেখেন?
পরিমল। ।
দীপ্তি। শুনেছি। তিনি আপনার কে?
পরিমল। তিনি আপনার সামনে দাড়িয়ে।
দীপ্তি। ও, মাপ করবেন, চিনতে পারি নি।
পরিমল। চিনতে না পারায় আপনার আর অপরাধ কি। আমি
ব্যারিষ্টারও বটে, লেখকও বটে কিন্তু মাসিকপত্রের সম্পাদক বা
এটর্ণির দালাল এরাই কেউ এখনাে আমায় চিনে উঠতে পারেন নি’
তা আপনি তাে তার কোনটাই নন।
দীপ্তি। (হাসিয়া) ব্যারিষ্টার বলে না হােক, কবি বলে আপনাকে
অনেক দিন থেকে চিনি। (গম্ভীর ভাবে) তা, একজন অচেনা
মেয়েকে এ রকম করে আক্র.•• চমকে দেওয়াটা হয়তাে বেশ কবি-
জনােচিত হতে পারে, কিন্তু ব্যারিষ্টার সাহেবের আইনের কেতাবে
এর কি-শান্তি লেখে ?
পরিমল। ঐ রে, আপনি দেখছি এখনাে আমার অপরাধটা ভুলতে
পারেন নি। আপনার মত বুদ্ধিমতী মেয়েকে কি এ কথা বুঝিয়ে
বলতে হবে যে আমার ভুল হয়েছিল?
দীপ্তি। ভুল ?
৪৩

জন্মতিথি
পরিমল। অর্থাৎ পেছন থেকে আপনাকে দেখে আমি এমন একজনকে
মনে করেছিলুম, যার হাত ঐ রকম করে ধরাটা আমার পক্ষে
নিন্দনীয় নয়।
দীপ্তি। (মুখ ঈষৎ গম্ভীর হইয়া গেল ) তিনি কে তা জানতে চাওয়াটা
আমার পক্ষে নিশ্চয়ই অনাবশ্যক কৌতূহল। তা তিনি যেই হােন,
নিশ্চয়ই তিনি আর কোথাও বসে আপনার হাত ধরবার প্রতীক্ষা
করছেন। অতএব নমস্কার।
মুখ ফিরাইয়া বেঞ্চের উপর বসিল
পরিমল। ( সহাস্য মুখে ).. কিন্তু আমাদের অভিনয়ের বাকিটুকু তৈরী
করে নিতে হবে যে। কাজেই যিনি যেখানেই প্রতীক্ষা করুন,
আপাততঃ আমাকে এইখানেই বসতে হবে।
বেঞ্চের আর এক পাশে বসিল
:
দীপ্তি। “বিনিময়” নামে সত্যিই কোন নাটক আছে নাকি?
পরিমল। তৈরী করে নিতে কতক্ষণ!
দীপ্তি। আমাকে দিয়ে তা হবে না।
পরিমল। হতেই হবে। নইলে এর পর মিসেস্ হালদারকে কি কৈফিয়ৎ
দেব ?
দীপ্তি। বলবেন, আমার পার্ট মুখস্থ হয় নি, তাই হল না। এইবারে
আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে চলে যেতে পারেন।
পরিমল। আপনার রাগ তাে কম নয় দেখছি। সত্যি বলছি, কেউ
কোথাও অামার জন্যে প্রতীক্ষা করে নেই। আমিই বরং তাকে
খুজবার জন্যে অনেকক্ষণ থেকে চেষ্টা করছি।
৪৪

দ্বিতীয় অঙ্ক
দীপ্তি। তাই নাকি? তাহলে আপনাকে আটকে রাখব না—আর
একবার চেষ্টা করে দেখুন গে’।
পরিমল। কি মুস্কিল। কি বললে যে আপনাকে খুশি করতে পারব,
তাও তাে বুঝতে পারছি নে।
দীপ্তি। (উঠিয়া) মিথ্যে দিয়ে কাউকে কখনাে খুসি করবার চেষ্টা
করবেন না।
প্রস্থানােত
পরিমল। ওকি, আপনি চললেন নাকি?
দীপ্তি। হাঁ যাই। উৎপলা হয়তো এখনি এসে পড়বে। তার কাছে
ততা আর অভিনয়ের কৈফিয়ৎ চলবে না।
পরিমল। তাহলে তাকে বলব যে এটা অভিনয় নয়, সত্যি।
দীপ্তি। (হাসিয়া ফেলিল ) আবার মিথ্যে কথা।
বাড়ীর দিকে দ্রুত চলিয়া গেল
পরিমল। (ব্যাকুল ভাবে আমাদের পরিচয়টা যে একতরফা হয়ে
রইল। অন্ততঃ আপনার নাম ?
দীপ্তি। ( যাইতে যাইতে মুখ ফিরাইয়া) সেটা জেনে নিতে আপনার
দেরী হবে না।
প্রস্থান। পরিমল একটুক্ষণ সেইদিকে চাহিয়া রহিল।
ডানদিক হইতে ব্যস্তভাবে ভুদেবের প্রবেশ
ভূদেব। এই যে পরিমল, ওহে আধ ঘণ্টাটাক লুকিয়ে থাকতে পারি
এ রকম কোন জায়গা এ বাড়ীতে আছে বলতে পার?
৪৫

জন্মতিথি
পরিমল। কেন দাদামশাই, কোথাও কোন ফৌজদারী বাধিয়ে এসেছেন
কি?
ভূদেব। বাধাইনি এখনাে। তবে একটু গা-ঢাকা না দিতে পারলে
শীগগীরই বাধবে বলে মনে হচ্চে।
পরিমল। ব্যাপারখানা কি, খুলে বলুন তাে।
ভূদেব। ঐ তােমাদের মিসেস্ হালদার। আমার অপরাধের মধ্যে তাকে
গােটাকতক মনরাখা কথা বলেছিলুম। তার পর থেকে তার ধারণা
হয়েছে যে এ সংসারে মানুষ যদি কেউ থাকে তােত সে ভূদেব
চৌধুরী।
পরিমল। তা বেশ তত দাদামশাই। আপনারও অনেক কাল
গৃহশূন্য আর তারও যতদূর জানি বিধবা বিয়েতে কোন আপত্তি
নেই...
ভূদেব। (কৃত্রিম কোপে ) দেখ পরিমল, এ সব জীবন মরণের কথা
নিয়ে ঠাট্টা ভাল নয়। এখন যদি বন্ধুর কাজ করতে চাও তাে যা
জিজ্ঞেস করলুম তার জবাব দাও।
পরিমল। লুকোবেন আর কোথায় ? তাঁর অগম্য জায়গা কি কোথাও
আছে। তবে আপনার এইখানেই বসা বােধহয় বেশী নিরাপদ,
কারণ একটু আগেই তিনি এ দিকটা খুজে গেছেন।
ভূদেব। সেই ভাল। এইখানটাতেই নিরিবিলি বসে থাকা যাক ;
উৎসবের কাজ আরম্ভ হলে ঘরে যাওয়া যাবে।
পরিমল। আচ্ছা, আপনি বসুন। আমি একটু দেখি-শুনি গে’। সময়
মত আপনাকে খবর দেব।
৪৬

দ্বিতীয় অঙ্ক
পরিমল ঘরের দিকে চলিয়া গেল। ভূদেব হাত-পা ছড়াইয়া আরাম করিয়া
বসিলেন। ডানদিক হইতে উৰ্মিলার প্রবেশ
উৰ্মিলা।
০ ০
উৰ্মিলা। দাদামশাই।
ভূদেব। ( চমকিয়া উঠিয়া) তবু ভাল। আমি চমকে গিয়েছিলুম।
শাড়ীপরা মানুষ দেখলেই ভয় হয়।
সে কি দাদামশাই, শাড়ীর আঁচলের ফাস গলায় বাঁধবার
বয়েস তােমার এখনাে আছে নাকি?
ভূদেব। তাই ভেবেই তাে নিশ্চিন্ত ছিলুম রাণী। কিন্তু তােরা তা
থাকতে দিচ্চি কই ?
উৰ্মিলা। তােরা অর্থাৎ•••?
ভূদেব। অর্থাৎ তুই, আর •
উৰ্মিলা। আর ?
ভূদেব। ঐ মিসেস হালদার।
উৰ্মিলা। সৰ্ব্বনাশ, দাদামশাই, করেছ কি? আমি তাে আগেই
তােমাকে সাবধান করে দিয়েছিলুম।
ভূদেব। সে যা হবার তা হয়ে গেছে রাণি, এখন আজকের মত
আমাকে বাঁচা।
উৰ্মিলা। কি করে ?
এখানে আছি কিছুতেই তাকে
তাকে জানতে
দিবিনে। আর এদিকে আসতে চাইলে ছলছুতাে করে আটকে
রাখবি।
উর্মিলা। আচ্ছা, আমার সাধ্যমত চেষ্টা করব। কিন্তু দাদামশাই, তুমি
৪৭
ভূদেব। আমি যে

জন্মতিথি
একলা যে? একটু আগে তােমার কাছে আর কে একজন ছিলেন
দেখেছিলুম না ?
ভূদেব। ওহহ, তাইতাে বলি ! তুমি কি আর আমার এই ভােবড়ান
মুখখানা দেখবার জন্যে ঘুরতে ঘুরতে এতদূর এসেছ ! তা দিদি,
যখন দেখেছিলি তখন এলেই তাে দেখাটা হয়ে যেত। দেরী করলি
কেন ?
উর্মিলা। আঃ, কি বচ, দাদামশাই। কে ছিল তােমার কাছে ?
ভূদেব। আহা, তা আর তুই মােটেই জানিস নে’ কিনা। কিন্তু
ব্যাপারখানা কি? একটু আগে তাে সেই তােকেই খুজে খুজে
বেড়াচ্ছিল দেখেছিলুম। পালা ঘুরে গেছে নাকি?
বেড়ে চাল
চেলেছে তাে পরিমল।
উৰ্মিলা। কিসের আবার চাল। তােমার কথা আমি কিছু বুঝতে
পারছি নে।
ভূদেব। দেখ, তােরা ছোড়াছুড়িরা মনে করি যে ওই বুড়ােনা কিছু
বােঝে না। ওরে, আমাদেরও একদিন তােদর মত বয়েস ছিল।
তাের ঠানদি’রও ওই দেখেছি-ধরতে গেলেই সরে যেতেন আর
পেছন ফিরলেই ছুটে আসতেন। তাই বলছিলুম, পরিমল এবারে ঠিক
চাল চেলেছে।
উৰ্মিলা। হাঁ, আমার খেয়েদেয়ে কাজ নেই কি না, তাই লােকের
পেছনে ছােটাছুটি করছি।•••এই আমি বসলুম তােমার কাছে।
(উপবেশন)।
ভূদেব। ওরে, রাগ করলে নিজেরই লােকসান। যেখানে যাচ্ছিলি যা।
৪৮

দ্বিতীয় অঙ্ক
,
উৰ্মিলা। দাদামশাই, তাড়িয়ে দিচ্চ?
ভূদেব। বিলক্ষণ ! আমার আর অমৃতে অরুচি কি। শুধু ভয় হয়
আর এক ব্যক্তির কোপানলে না পড়ে যাই
উর্মিলা।
কোন ব্যক্তির যদি সত্যিই কোন মাথাব্যথা থাকে, তবে
আপনিই আসবে, তার জন্যে তুমি ভেবাে না।
ডানদিক হইতে কথা বলিতে বলিতে ধীর পদক্ষেপে
ক্ষিতীশ ও শিশিরের প্রবেশ
শিশির। আমাদের নিজেদের চরিত্রের দুৰ্বলতাও অবশ্যি আছে, কিন্তু
বাইরের বাধাগুলােকেও আপনি ছােট করে দেখবেন না। ব্যবসার
ক্ষেত্রে যে আমরা ক্রমশঃ হটে যাচ্ছি, তার জন্যে শিক্ষাব্যবস্থা এবং
রাজনৈতিক অবস্থান কি অনেক পরিমাণে দায়ী নয় ?
ক্ষিতীশ। কিন্তু যথার্থ চেষ্টা আর অধ্যবসায় যদি থাকে ..
শিশির। তাহলে অবিশ্যি এ সব সত্ত্বেও বড় হওয়া যেতে পারে-সে
কথা ঠিক। কিন্তু আমার বক্তব্য তা নয়। আমি বলছি কি অন্য
দেশের লোেকদের এত বেশী প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়
ষ্টেট, আইন করে তাদের উৎসাহ দেয়, দেশের লােক
মূলধন জোগায়, তাছাড়া আরাে কত রকম.•••••
1
।
সহসা উৰ্মিলাকে দেখিয়া স্তব্ধ হইয়া গেল
ক্ষিতীশ। কত রকম?
শিশির। (ঢােক গিলিয়া) কত রকম..উৎসাহ-বলছিলুম কি, এসব
তাদের আছে।
৪৯
৪

জন্মতিথি
ভূদেব। কাদের কি আছে শিশির ?
ক্ষিতীশ। আমাদের ব্যবসাতে উন্নতি হয় না কেন, সেই কথা হচ্ছিল।
শিশির বলে তার কারণ হচ্চে বাইরের বাধা।
ভূদেব। তাই বলে বসে থাকলে তােত সে সব বাধা কোন দিনই দূর হবে না।
ক্ষিতীশ। আপনিও তবে দেখছি আমার দলে। তাহলে আমার হয়ে
ততক্ষণ শিশিরের সঙ্গে তর্ক করুন। আমি আসছি এখনি।
ঘরের দিকে প্রস্থান
ভূদেব। বস, শিশির, বস। ( শিশির ভূদেবের অপর পার্শ্বে বসিল)
তােমাদের তর্কটা কোন জায়গায় এসে ঠেকেছিল ?
শিশির। না, তর্ক আর কি। উনি আমার কথাটা•••আমিই আমার
বক্তব্যটা ওঁকে ঠিক বােঝাতে পারি নি।
ভূদেব। কি কথা, বল দেখি, আমি বুঝতে পারি কি না।
শিশির। ও, সে এমন কিছু নয় •••আর এক সময় হবে।
ভূদেব। বলই না শুনি। এখন তাে কোন গুরুতর কাজে ব্যস্ত নেই।
উৰ্মিলা। কেন দাদামশাই, মিছিমিছি ওঁকে পীড়াপীড়ি করছ? চিরদিন
চাকরি করে এলে, ও সব ব্যবসা বাণিজ্যের কথা তুমি কি বুঝবে ?
শিশির। না, সেজন্যে নয়। আচ্ছা, আমি বলছি। আমাদের দেশে...
ব্যবসা•••যুবকরা•••মানে যুবকদের একটা নিন্দে আছে•••
উৰ্মিলা। ওকি দাদামশাই, তুমি হঠাৎ পালা যে?
ভূদেব ইঙ্গিতে ডানদিক দেখাইয়া দিয়া দ্রুতগতিতে বাঁ দিকে চলিয়া গেলেন
নেপথ্যে মিসেস হালদার। মিঃ চৌধুরী, মিঃ চৌধুরী এদিকে আছেন?

দ্বিতীয় অঙ্ক
মিসেস হালদারের প্রবেশ
হালদার। এই যে মিস মিত্র। মিঃ চৌধুরী এদিকে এসেছিলেন বলতে
পার ?
উৰ্মিলা। হাঁ, এতক্ষণ তত তিনি এখানেই ছিলেন।
হালদার। মাই গুডনেস্ ! আর আমি তার জন্যে আধ ঘণ্টা গ্যেটের
কাছে দাড়িয়েছিলুম।
উর্মিলা। (নিরীহভাবে ) কেন, বিশেষ কোন কাজ আছে কি তার
সঙ্গে ?
হালদার। না, কাজ কিছু নয়। এমনিই আলাপ করবার জন্যে।
মানুষটি বেশ।
উৰ্মিলা। হাঁ, আবার তিনিও এতক্ষণ আপনার কথাই বলছিলেন।
হালদার। তাই নাকি? কি বলছিলেন আমার কথা ?
উর্মিলা। বলছিলেন যে আপনার সঙ্গে একটু পরিচয় হলে আর দূরে
থাকা অসম্ভব।
হালদার। বেশ মানুষ ! কোন দিকে গেলেন তিনি?
উর্মিলা। ( ঘরের দিক দেখাইয়া) এই দিকে ।
হালদার। ও, আচ্ছা, বস তােমরা।
হালদার ঘরের দিকে চলিয়া গেলেন। দুজনে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধভাবে অবস্থিতি
উৰ্মিলা। অদ্ভুত মানুষ!
শিশির। ( চমকিয়া) কে ?

জন্মতিথি
উর্মিলা। ওই মিসেস হালদারের কথা বলছিলুম।
শিশির। ও।
আবার নিস্তব্ধ। অনেক চেষ্টায় সঙ্কোচ কাটাইয়া শিশির বলিল—
শিশির। আমার একটা কথা বলবার ছিল••••••
উর্মিলা। ( বুঝিয়াও চাপা দিবার চেষ্টায়) ও সেই ব্যবসার কথা।
আমি কিন্তু ওসব কথা বুঝিনে। আচ্ছা, বলুন, আমি তর্ক করব
আপনার সঙ্গে।
শিশির। আপনি আমার কথাটা ঠিক বুঝতে পারেন নি•••
উৰ্মিলা। তা’ পারিনি’ বটে, কিন্তু তার জন্যে তর্ক করা আটকাবে না।
শিশির। না, সে ব্যবসার কথা নয়,•••আমি বলছিলুম•••
উর্মিলা। ওই যাঃ, মা যে আমাকে ফুলদানিটা বার করে দিতে বলেছিল,
তা তাে আমি একেবারেই ভূলে গেছি। কিছু মনে করবেন না
শিশিরবাবু, আমায় একবার যেতে হবে। (উঠিল)
শিশির। আমার একটা বিশেষ কথা ছিল। একটুখানি যদি ••
উৰ্মিলা। তা বেশ তাে। আপনিও আসুন না, ঘরে একটু বসবেন।
আমি ফুলদানিটা বার করে দিয়ে এসেই আপনার কথা শুনব।
শিশির। আচ্ছা, এখন না হয় থাক আপনার অবসর মত পরে বলব।
উৰ্মিলা। আচ্ছা। (যাইতে যাইতে ফিরিয়া) আপনি এখানে একলা
বসে থাকবেন।
ঘরে চলুন না।
শিশির। আচ্ছা চলুন।
উভয়ের প্রস্থান
৫২

দ্বিতীয় অঙ্ক
ডানদিক হইতে উৎপলার হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া দীপ্তির প্রবেশ
দীপ্তি। বস এইখানে।
উভয়ের উপবেশন
উৎপলা। কই, কি কথা বলবি, বল।
দীপ্তি। কথা কিছু নেই, এমনিই।
উৎপলা। সে কি রে, খুব দরকারী কথা আছে বলে অত লােকের
মাঝখান থেকে তুই আমায় ধরে আনলি...
দীপ্তি। তা নইলে কি তুই আসতিস্? যা গল্পে মেতে গিয়েছিলি।
যত রাজ্যের সব বাজে গল্প !
উৎপলা। তা’ তাের কাছেও তত খুব কাজের গল্প শুনছি বলে বােধ হচ্ছে না।
দীপ্তি। নাই বা হল গল্প।
উৎপল। তাের আজ কি হয়েছে বল দেখি?
দীপ্তি। আমার আবার কি হবে !
উৎপলা। উহু, চিরকেলে গম্ভীর মানুষ তুই। আর আজকে...
দীপ্তি। আজকে কি ?
উৎপল। ঠিক বলতে পারছি নে’, কিন্তু একটু নতুন রকম বটেই।•••
বােস্ দেখি।•••এক নম্বর ‘হাসি। ঘরে তাে এতক্ষণ যা তা কথায়
হেসে গড়িয়ে পড়ছিলি। আর এখনাে মুখখানা হাসচে না বটে কিন্তু
চোখ দুটো দিয়ে তার কাজ চলছে।
দীপ্তি। হাসব না ? খুব হাসব। তুই কি ভেবেছিস, যত হাসি তুই
একলা হাসবি ?
'

জন্মতিথি উৎপল। হু। দুই নম্বর ‘কথা। তাের কথা চিরদিনই ওজনে ভারি আর সংখ্যায় কম। আজ দেখছি তার দু’রকমেরই পরিবর্তন হয়েছে। দীপ্তি। তা হয়েছে ভাই সত্যিই। আমি নিজেই বুঝতে পারছি। উৎপলা। কিন্তু কিসে হল ? শুধু অকারণ পুলকে, না, আর কোন রহস্য আছে ? দীপ্তি। অকারণেও নয় -রহস্যও কিছু নেই। উৎসবের বাড়ী। চার- দিকে আনন্দের স্রোত বইছে। সবার মত আমার মনেও তার ছোঁয়াচ লেগেছে বােধ হয়। উৎপলা। তাহলে উৎসবের আসর ছেড়ে নিরালায় এলি কেন? বাইরে তাে আজ জ্যোৎসাও নেই, হাওয়াও নেই। দীপ্তি। জ্যোৎস্নায় দরকার কি ? উৎপলা। বলিস কি? চাদের আলাে তাের ভাল লাগে না ? দীপ্তি। লাগে, তবে সব সময় নয়। আজকে আমার আঁধারই বেশ লাগছে। (মােহাবিষ্ট কণ্ঠে) আলাে বড় বেশী স্পষ্ট। চারদিকের ঐ আঁধার যেন একটা মায়ালােক—কত কি অজানা সম্ভাবনা যেন ওর বুকে লুকিয়ে আছে। উৎপলা। ( কৌতুক বিস্ময়ে) আঁ, তাই নাকি?•••আর আজকে যে হাওয়া নেই, তারও নিশ্চয় একটা সুন্দর তাৎপর্য আছে। হাওয়া থাকাটাও নিশ্চয়ই খুব ভাল। কেন ভাল বল না ভাই ? দীপ্তি। কেন ভাল, জানিনে। আমার ভাল লাগছে, তাই ভাল। উৎপলা। তবে তাে সব গােল মিটেই গেল। কিন্তু আমার যদি ভাল লাগে ? ৫৪ দ্বিতীয় অঙ্ক দীপ্তি। ঠাট্টা নয় উৎপলা। মানুষের মন একটা অদ্ভুত জিনিস। চাঁদের আলাে আর দখিনে হাওয়ার যােগাযােগ, আমার জীবনে অনেকদিন হয়েছে কিন্তু আজকের এই আলাে-আঁধারের আবছায়া- ঘেরা সন্ধ্যাটি আমার জীবনে একটা আবির্ভাবের মত মনে হচ্চে। (কোমলস্বরে) উৎপল, আমার একটা কথা রাখবি ভাই? উৎপলা। ( অনুকরণ করিয়া) কি কথা বল না ভাই ? দীপ্তি। সেই গানখানা গা না। উৎপলা। তবু ভাল। ভঙ্গী শুনে মনে হচ্চিল অর্ধেক রাজত্ব আর রাজ- পুত্ৰই চাইবি বুঝি বা। কোন গানখানা? দীপ্তি। সেই যে একটু আগে আধখানা গেয়ে আর গা’স নি। সেই “দেবতা...” উৎপলা। আমি গাইনি’, না তুই গাইতে দিস নি ? দীপ্তি। তা হাে’ক। তুই গা’, সুরটা বেশ লাগছিল। উৎপলা। গান আমি দেবতা দুয়ারে দাসী প্রাণের দেবত প্রাণে এসে নাও প্রেমের কুসুমরাশি। যেথা চলে তব কায়া সেথা আমি হব ছায়া অশ্রু তােমার ও মাের চোখে তুমি নাও মাের হাসি।

জন্মতিথি
দীপ্তি। বেশ গানটি। আগে তাে কখনাে শুনেছি বলে মনে পড়ছে না।
উৎপল। না, এ একেবারে আনকোরা নতুন। পরিমল বাবুর লেখা।
কোন মাসিকে এখনাে বেরােয় নি।
বিপরীত দিক হইতে একসঙ্গে ভূদেব ও মিসেস হালদারের প্রবেশ
ভূদেব দেখিয়াই আবার ফিরিয়া যাইতেছিলেন
হালদার। মিঃ চৌধুরী, মিঃ চৌধুরী।
ভূদেব। ( ফিরিয়া আসিলেন) এই যে। আমি আপনাকেই খুঁজে
বেড়াচ্চি।
হালদার। তবে ফিরে যাচ্ছিলেন যে ।
ভূদেব। আঁধারে ঠিক দেখতে পাই নি। আপনি এখানে নেই মনে
করে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছিলুম।
হালদার। মাই গুডনেস! তাই নাকি? আমিও অনেকক্ষণ থেকে
আপনাকে খুজছিলুম মিঃ চৌধুরী।
ভূদেব। আমার কি সৌভাগ্য।
হালদার। আসুন না এখানে একটু বসি।
ভূদেব। আর এখানে বসে কাজ কি? ঘরেই চলুন না। এখানে দুই
সখীতে নিরিবিলি বসে। প্রাণের গােপন কথাটি বলাবলি হচ্চে।
উৎপলা। আচ্ছা, এইবার হােত তােমার পালা, আমরা যাই। (উঠিল)
ভূদেব। (আকুলস্বরে, জনান্তিকে) না না যানে, একটু থাক।
উৎপলা। (জনান্তিকে) আর অমন ঠাট্টা করবে ?
ভূদেব। (তদ্রুপ) না ।

দ্বিতীয় অঙ্ক
উৎপলা। নাকে খৎ?
ভূদেব। নাকে খৎ।
হালদার। মিঃ চৌধুরী, বসুন না।
ভূদেব। হাঁ, এই বসচি। উৎপল বস্।
সকলের উপবেশন
হালদার। এদের কতক্ষণে শেষ হবে বা। আবার মিঃ ভাদুড়ির বাড়ীতে
ডিনার-পার্টি আছে। পার্টিতে পার্টিতে জ্বালাতন! কোথাও কিছু
হলে আমায় তত কেউই ছাড়ে না কিনা। এক একবার ভাবি যে দূর
ছাই অত কি পারা যায় ।
ভূদেব। পপুলার হবার ঐতত মুস্কিল। আপনাকে দেখে যদি সবাই
আনন্দ পায়, তা থেকে তাদের কেন বঞ্চিত করবেন ?
হালদার। নিজেদের মােটর আছে বলেই পারি। নইলে এত কি
পােষায়! তাই কি খরচ কম! ট্যাক্স খালি বাড়ছেই, বাড়ছেই।
তিনখানা গাড়ী আছে, বুঝেছেন, মিঃ চৌধুরী, এখন হিসেব করে
দেখুন কত খরচ।
ভূদেব। তিনখানা ?
হালদার। তার কমে কি আর চলে ? ধরুন একখানা মিনার্ভা রয়েছে,
নইলে সমাজে মান থাকে না কিন্তু অত বড় গাড়ী সব সময় বার করা
চলে না তাই একখানা হিলম্যান রাখতে হয়েছে। আবার দেখুন বেশী
ঘােরাঘুরি করবার জন্যে একখানা বেবি অষ্টিন চাই। একখানা বড়
গাড়ী শুধু থাকলে পেট্রোল খরচাই হত মাসে পাঁচশাে টাকা ।
৫৭
।

৭। জন্মতিথি ভূদেব। (কপট চিন্তিতভাবে ) তাইতাে, আমি একখানা গাড়ী কিনব ভাবছিলুম, কিন্তু তিনখানা না কিনলে যদি না চলে হালদার। দু’থানা। কিন্তু দেখুন, মিনার্ভা-টিনার্ভা গুলাে কিনবেননা যেন। ওতে শুধু খালি পয়সার অপব্যয়। অত দাম দিয়ে কিনে শুধু শশা ছাড়া আর কিছু হয় না। আমাদের বনেদি ঘর- ঠাট বজায় রাখবার জন্যে সবই করতে হয়। ভূদেব। খুব বনেদি ঘর বুঝি ? হালদার। বেলপুকুরের হালদারদের নাম শােনেন নি ? ভূদেব। বিলক্ষণ ! তা’ আর শুনি নি। তালপুকুরের পাকড়াশিদের চাইতেও তাদের মান উচু। হালদার। (সগৌরবে) মিঃ হালদার ছিলেন সেই বংশের ছেলে। ভূদেব। বলেন কি! ওঃ তাহলে মিসেস হালদার, আর একবার আমার নমস্কার গ্রহণ করুন। বেলপুকুরের হালদার! (নিরীহ জিজ্ঞাসু- ভাবে ) আচ্ছা, ওঁদের হালদার পদবী হ’ল কি থেকে ? নৌকোর হাল না চাষের ? দীপ্তি ও উৎপল মুখ লুকাইয়া হাসিতে লাগিল হালদার। সে সব কিছু নয়। ওটা নবাবী উপাধি কিনা। ওঁদের এক পূৰ্বপুরুষ শুনেছি পলাশীর যুদ্ধের সময় নবাব সিরাজউদ্দৌলার অনেক সাহায্য করেছিলেন। ভূদেব। হাঁ হাঁ, তার কথা তাে ইতিহাসে পড়েছি। তিনি খুব ভাল ঘােড়া ছােটাতে পারতেন, না ?

দ্বিতীয় অঙ্ক
হালদার। (সন্দিগ্ধস্বরে) তা ঠিক জানি নে।
ভূদেব। হাঁ, শুনেছি পলাশীর যুদ্ধের পর সব্বার আগে তিনি মুর্শিদাবাদে
পৌঁছে গিয়েছিলেন।
হালদার। (সগর্বে ) , তাহলে তিনিই।
হাসি চাপিতে গিয়া উৎপলার বিষম লাগিল
মাই গুডনেস্ !
উৎপল। উঃ, আঃ, দাদামশাই, এখানে বড্ড ঠাণ্ডা। আমি পালাই,
আর বেশীক্ষণ থাকলে মারাই যাব।
ভূদেব। আর একটু বসনা। সবাই একসঙ্গেই যাব’খন।
হালদার।
পলির ঠাণ্ডা লাগছে—আমার কিন্তু মােটেই
ঠাণ্ডা বােধ হচ্ছে না। এ সম্বন্ধে ফ্রেঞ্চে একটা ভারি চমৎকার কথা
আছে। মিঃ চৌধুরী, আপনি ফ্রেঞ্চ জানেন?
ভূদেব। না।
হালদার। ফ্রেঞ্চ ভারি শক্ত ভাষা। অনেক কষ্টে শিখেছি। ফ্রেঞ্চ
বলে—“আ ফো দে-লা-স, ইদ্রেজ ভু” তার মানে হচ্চে-একজনের যা
খাদ্য, আর একজনের পক্ষে সেটা বিষ।
ভূদেব। পলির কাশিটা যে ঠিক ঠাণ্ডা লেগে হয়েছে তা আমার মনে হয়
। আপনি তিব্বতী জানেন?
হালদার। না।
ভূদেব।
এ সম্বন্ধে তিব্বতীতে একটা ভারি চমৎকার কথা আছে ।
“লি লি যাঞ্চা কাঞ্চা যাদু পিপিং ক্ৰং” অর্থাৎ-হাসি আর কাশি
এ দুটো হচ্চে অল্পবয়সের মেয়েদের লােগ।
** - * - -

জন্মতিথি
হালদার। তাই নাকি? তা দেখুন, আমাদেরও তাে বয়েস খুব বেশী
হয়নি’, তবু
ভূদেব। ও, তার অন্য কারণ আছে। আপনি তেলেগু জানেন ?
হালদার। না।
ভূদেব। এ সম্বন্ধে তেলেগুতে একটা ভারি চমৎকার কথা আছে ।
“হেতরে উণ্ডা গাডেড মাডেড তারাচুয়া পদম্পরম” তার ভাবার্থ হচ্ছে—
বয়সে কি বিজ্ঞ হয়, বিজ্ঞ হয় জ্ঞানে।”
হালদার। ( সবিস্ময়ে ) মাই গুডনেস্ ! আপনি তেলেগুও
জানেন ?
ভূদেব। অনেক পরিশ্রমে শিখতে হয়েছে মিসেস্ হালদার। আমার
বাড়ীতে এক মাদ্রাজি মিস্ত্রি কিছুদিন কাজ করেছিল। তার
অ্যাসিষ্টান্ট কাজে ভুল করলে তেলেগুতে তাকে গালাগালি করত।
তাই শুনে শুনে আমার শেখা।
হালদার। মাই গুডনেস্। ধন্য আপনার অধ্যবসায়।
ভূদেব। তা নইলে কি আর কোন বিদ্যে শেখা যায়। এ সম্বন্ধে
উর্দতে একটা ভারি চমৎকার কথা আছে। আপনি উর্দ,
জানেন ?
হালদার। জানি। আমি লক্ষৌতে অনেকদিন ছিলুম কিনা।
ও, নানা উর্দ নয়, উর্দ নয়। আমার ভুল হয়েছে। এ সম্বন্ধে
বাংলাতেই একটা চমৎকার শ্লোক আছে :-
মন দিয়া কর সবে বিদ্যা উপার্জন।
সকল ধনের সার বিদ্যা মহাধন।
ভূদেব।
=

দ্বিতীয় অঙ্ক
দাদামশাই, আমরা
চললুম।
সময়
উৎপলা। (হাসরুদ্ধকণ্ঠে )
হয়ে গেছে।
•
ভূদেবকে কোন কথা বলিবার অবসর না দিয়া; দীপ্তির হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া
হাসির আবেগে টলিতে টলিতে ছুটিয়া চলিয়া গেল
ভূদেব। এইবার আমরাও যাই চলুন।
হালদার। এইখানেই বসুন না মিঃ চৌধুরী। ও গানটান টের শােনা
গেছে—আর শুনতে ভাল লাগে না।
ভূদেব। না, না, সে কি হয় ! মেয়েরা এত কষ্ট করে সব করছে।
আপনি না শুনলে ওরা ভারি দুঃখিত হবে যে।
হালদার। আচ্ছা চলুন তাহলে। দুজনে পাশাপাশি বসব এখন,
কেমন ? আপনার সঙ্গে আমার আরাে অনেক কথা আছে।
উভয়ে উঠিলেন
ও এক্সকিউজ মি ফর এ মােমেন্ট। একটু দাড়াবেন মি
চৌধুরী:
পিছন ফিরিয়া ভ্যানিটি ব্যাগ হইতে আয়না ও কৌটা বাহির করিয়া মুখে পাউডার
লাগাইতে লাগিলেন। ইত্যবসরে ভূদেব চুপিচুপি ডানদিকে পলায়ন
করিলেন। প্রসাধন শেষে মুখ ফিরাইয়া হালদার ভুদেবের
অন্তর্ধান আবিষ্কার করলেন
হালদার। (আকুল স্বরে) মাই গুড় নন, মিঃ চৌধুরী, মিঃ চৌধুরী।
ঘরের দিকে প্রস্থান

তৃতীয় অঙ্ক
দৃশ্য সংস্থান প্রথম অঙ্কের ন্যায়। কেবল হারমােনিয়মটি নাই। ঘরের একপার্শ্বে
একটি টেবিলের উপর নানারূপ উপহার সামগ্রী সজ্জিত আছে।
উৎপলা ভূদেবকে সেগুলি দেখাইতেছিল
উৎপলা। মা দিয়েছেন এই মুক্তোর দুল। বাবা দিয়েছেন ক্যামেরা•••
ভূদেব। ও চিঠির কেষ্ট। কার দেওয়া ?
উৎপলা। মিসেস মুখার্জির। ভ্যানিটি ব্যাগটা দিয়েছেন মিসেস
হালদার। আচ্ছা, এই রূপাের ফটো-ফ্রেমটা কে দিয়েছে আন্দাজ
দেব। কই দেখি। ( দেখিলেন) নিশ্চয় শিশির। ঠিক বলিনি?
উৎপলা। ঠিক। কি করে জানলে ?
ভূদেব। নিজের ছবি ফ্রেমের ভেতরে দেখবার ইচ্ছে এর আড়ালে লুকিয়ে
আছে কিনা।
উৎপলা। সে তত পরিমলবাবুরও হতে পারত।
ভূদেব। পরিমস হলে নিজের ফটো একখানাও ঐ সঙ্গে দিত।
ধন্য মনস্তত্ত্ববিদ। এইটুকু থেকে আন্দাজ করে ফেললে ?
ভূদেব। আরাে একটু আছে।
উৎপল। কি?
ফ্রেমের পেছনদিকে 'দতির নামের আদ্য অক্ষর তিনটি।
উৎপলা।
২

তৃতীয় অঙ্ক
উৎপলা। (দেখিয়া ) তাইত, কি বােকা আমি! নামটা আগে
দেখিনি’, তাই খুব বাহাদুরি করে নিলে।
হাত পিছনে লুকাইয়া হলঘর হইতে উজ্জ্বলার প্রবেশ
উজ্জলা। মেজদি, ও মেজদি, তােমার জন্যে কি এনেছি বলতাে ?
উৎপল। (তৎক্ষণাৎ ) রূপাের গাছের সােণার ফল।
উজ্জল। দূর! দাদামশাই, তুমি বল তাে?
ভূদেব। আমার জন্ঠে তােত আর আনিনি। আমার জন্যে আনলে
আমি বলতুম।
ডলি। আচ্ছা, তুমিও পাবে। বল দেখিনি কি?
ভূদেব। নিশ্চয় আইসক্রীম। তাের কাছে তাে আইসক্রীম জগতের
সব চাইতে ভাল জিনিস।
উৎপলা। কিন্তু নিশ্চয় আইসক্রীম নয়। কারণ সে জিনিস ও প্রাণ
ধরে কাউকে দিতে পারবে না।
ডলি। যাও। খালি ঠাট্টা, তাহলে পাবে না।
প্রস্থানােন্বত। ভূদেব হাত ধরিয়া বন্দী করিলেন
ভূদেব। আচ্ছা, হার মানছি। কই, কি জিনিস দেখি।
ডলি দুইটি বাটনহােল দেখাইল
উৎপলা। ও, ফুল! আমি বলি আর কি ।
'ভূদেব। কেন, ফুল কি মন্দ জিনিস! বা, ভারি চমৎকার তত গােলাপ
দুটো। কোথায় পেলি?

জন্মতিথি
ডলি। একটা বাস্কেট-ভরা ফুল ছিল। মাকে আমি আগেই বলে
রেখেছিলুম। মা আমার কাছে দিয়েছিলেন। সবাইকে একটা
করে দিয়েছি। শুধু এই দুটো বাকি আছে। কাকে দেব খুঁজে
বেড়াচ্ছিলুম। একটা দাদামশাই আর একটা মেজদি।
ফুল দুটি দুজনকে দিল। বাঁ দিক হইতে দীপ্তির প্রবেশ
দীপ্তি। আর আমি? আমায় বুঝি ফঁাকি !
ডলি। ওই যাঃ, আপনি পান নি ? আর তােত নেই।
দীপ্তি। তা বললে তাে ছাড়ছি নে’
ডলি। (উৎপলার প্রতি মিনতিভরা দৃষ্টিতে চাহিয়া ) মেজদি !
উৎপলা। আমায় যা দিয়েছি তা আমি ছাড়বাে কেন?
ডলি। (সকাতরে ) দাদামশাই...
ভূদেব। আমি দিতে খুব প্রস্তুত। কিন্তু আমার কি সে সৌভাগ্য হবে ?
দীপ্তি। ( মাথা নাড়িয়া) আমি অন্যের প্রসাদী ফুল চাই নে।
ভূদেব। ঐ দেখ। আমি তাে আগেই বলেছিলুম।
ডলি। আপনি রাগ করবেন না দীপ্তিদি’, লক্ষ্মীটি। আচ্ছা, একটু
বসুন। আমি দেখে আসছি, মার কাছে বােধ হয় আরাে ফুল
আছে।
দীপ্তি। দূর পাগলি ! সত্যি সত্যি আর যেতে হবে না। তুই বস্।
আমি ঠাট্টা করছিলুম।
ডলি। তা হােক, আমি নিয়ে আসছি। এখনি আসব।
প্রস্থান
.৬৪

তৃতীয় অঙ্ক
হল ঘর হইতে পরিমলের প্রবেশ
দরজার নিকট উভয়ের দেখা হইল
পরিমল। কি ডলি। এত ব্যস্ত হয়ে ছুটছ কোথায় ?
ডলি। দীপ্তিদির জন্যে ফুল আনতে যাচ্চি। ওঁকে ফুল দেওয়া হয় নি’,ছি, ছি।
ভূলির প্রস্থান
পরিমল। ( অগ্রসর হইয়া) আমার ফুলটা দীপ্তি দেবীকে নিবেদন করতে
পারি কি?
ভূদেব। কিছুতেই না। উনি অন্যের প্রসাদী ফুল নেন না।
পরিমল। তাই নাকি?
দীপ্তি। ডলির সঙ্গে তামাসা করে ঐ কথা বলেছিলুম, দাদামশাই তাই
ধরে বসে আছেন।
ভূদেব। ও, তাহলে বােঝা গেল যে, ফুল প্রসাদী হলেও আপত্তি নেই
যদি দেবতা মনের মত হন।
দীপ্তি। দাদামশাইয়ের সব কথাতেই ঠাট্টা। আমি ফুল চাই নে।
পরিমল। একজনের অপরাধে আর একজনকে শাস্তি দেবেন না।
আমার ফুলটা তাে কোন দোষ করে নি’। এই নি।
দীপ্তি স্মিতমুখে হাত বাড়াইয়া ফুলটি লইল
উৎপলা।
তাের সঙ্গে কি পরিমলবাবুর আগে থাকতেই জানাশােনা
ছিল না কি ?
দীপ্তি। না, আজকে এই একটু আগে পরিচয় হয়েছে।
পরিমল। কিন্তু সে পরিচয় চিরদিন মনে রাখবার মত।
দীপ্তি। হাঁ, মাগাে, যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন।

জন্মতিথি
ভূদেব। সে কি রকম? পরিচয়ের মধ্যে আবার ভয় কিসের?
পরিমল। ড্রয়িং রুমে বসে, মধ্যস্থের সহায়তায় চায়ের পেয়ালায় চুমুক
দিতে দিতে তাে আর আমাদের পরিচয় হয় নি।
ভূদেব। তবে কি গভীর অরণ্যে, ‘পথিক, তুমি পথ হারিয়েছ’ বলে পরিচয়
হয়েছে ?
দীপ্তি। তাও নয়। আমি বাগানে বসেছিলুম, উনি পেছন থেকে
আচমকা এসে•••
ভূদেব। বাঃ, পরিচয়ের প্রণালীটা তত পরিমল বেশ বার করেছে।
ড্রয়িং রুমের চাইতে এ ঢের ভাল।
পরিমল। আঃ, আমি কি জানতুম যে উনি।
উৎপলা। তুই আবার কখন একলা বাগানে বসে ছিলি?
দীপ্তি। ঐ যে তুই গান গাইছিলি, তারপর রঘুয়া এসে তােকে ডেকে
নিয়ে গেল।
উৎপলা। ও, তারপর ?
পরিমল। তারপর, আমি বলছি।...উনি হাতখানা বেঞ্চের পিঠের
ওপর রেখে বসেছিলেন। হাতখানা তেমনি করে রাখুন তাে। হাঁ,
উনি ঠিক এই রকম করে বসেছিলেন। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে
এসে দূর থেকে দেখে ভাবলুম, তােমার দিদি। দুজনাই ঠিক।
একরকম শাড়ি পরেছেন কি না। একটু চমকে দেবার জন্যে আমি
পা টিপে টিপে এসে হাতখানা যেই এমনি করে ধরেছি
পরিমল দীপ্তির হাত ধরিতেই দীপ্তি হাসিহাসি মুখখানি তুলিয়া তাহার
দিকে চাহিয়া কয়েক মুহূর্ত চোখ ফিরাইতে পারিল না
#

তৃতীয় অঙ্ক
ভূদেব। দীপ্তির অবস্থাটা তখন নিশ্চয়ই এখনকার মত ছিল না।
দীপ্তি। ( আত্মসংবরণ করিয়া) আমি চমকে মুখ ফিরিয়েই দেখি
অচেনা লােক •••••
পরিমল। আর অমনি এক হৃদয়ভেদী আৰ্তনাদ।
দীপ্তি। ইস্ ! আর্তনাদ আবার কোথায়? একটু চেঁচিয়ে কথা
বলেছি, এই। তা ওরকম অবস্থায় হয় না?
ভূদেব। খুব হয়, খুব হয়। পরিমল যে রাঙ্গা হাতের চড়টা খায় নি’,
সেই ঢের। তারপর কি হল ?
পরিমল। তারপর আমি সব বুঝিয়ে বলতে যাচ্ছি, এমন সময় বঙ্গস্থলে
মিসেস্ হালদারের প্রবেশ।
ভূদেব। সৰ্ব্বনাশ! তারপর?
পরিমল। তখন দেখলুম, কাকেই বা কৈফিয়ৎ দেব, আর কেই বা বিশ্বাস
করবে। যা’ মুখে এল কতকগুলাে বানিয়ে বলে গেলুম মিসেস
হালদার বুঝলেন যে আমরা অভিনয়ে রিহার্সেল দিচ্ছিলুম।
উৎপলা। অভিনয় কি একলা হয় ?
পরিমল। তা কি আর হয়! কিন্তু দীপ্তি দেবী দয়া করে আমার সঙ্গে
সঙ্গে সায় দিয়ে গেলেন, তাইতে বেঁচে গেলুম।
কতকগুলি ছাপা প্রােগ্রাম হাতে ক্ষিতীশের প্রবেশ
ক্ষিতীশ। পলি’, এই যে প্রােগ্রামগুলাে ছেপে এসেছে তাের কাছে এখন
রাখ। সময়মত সবাইকে দি।
পরিমল। ( ঘড়ি দেখিয়া) কাকাবাবু, সময় তাে প্রায় হয়ে এসেছে।

জন্মতিথি
ক্ষিতীশ। আমাদেরও সব প্রস্তুত। নিমন্ত্রিতদের দু'এক জন এখনাে
এসে পৌঁছান নি।
তাই যা দেরী।
ভূদেব। আগে গান-টান হবে না আগে খাওয়া?
উৎপলা। ছি, ছি, মানুষ বুড়াে হলে কি এত লােভী হয়।
ক্ষিতীশ। বেশী কিছু তাে নয়। একটু চায়ের আয়ােজন ; সেটা আগেই
সেরে নেওয়া যাবে।
ভূদেব। সেই ভাল। মৌতাতের সময় চা না পেলে মেয়েগুলাে আবার
ছটফট করতে থাকবে।
উৎপলা। বটে? মৌতাত কার হয়েছে, সেটা বােঝাই যাচ্ছে।
ভূদেব। মেজরাণী, আমাকে একখানা প্রােগ্রাম দে তাে। ( দেখিয়া )
বাঃ, অভিনয়ও আছে দেখছি। এ সব হবে কোথায় ?
উৎপলা।
হলঘরের একপাশে যে ষ্টেজ তৈরী হয়েছে দেখ নি’?
ভূদেব। না।
উৎপলা। ওমা, দেখনি’ এখনাে ? ফুলের টব দিয়ে নানা রঙ্গের আলাে
দিয়ে কি চমৎকার করে সাজানাে হয়েছে, দেখবে চল।.. পরিমলবাবু
আপনিও আসুন না। দীপ্তি আয়।
ভূদেব হলঘরের দিকে যাইতেছিলেন
ওদিকে নয়, ওটা দর্শকদের বসবার জায়গা। ষ্টেজের ভেতরে
হবে এইদিক দিয়ে। এস আমার সঙ্গে। মামেকং
শরণং ব্রজ।
ক্ষিতীশ ব্যতীত সকলের বাঁ দিকে প্রস্থান

তৃতীয় অঙ্ক
ক্ষিতীশ অন্যমনস্কভাবে ঘরে পায়চারি করিতে লাগিলেন
মাঝের দরজা দিয়া উৰ্মিলার প্রবেশ
উম্মিলা। বাবা, আমায় ডেকেছিলে ?
ক্ষিতীশ। হাঁ মা, আয়।
উর্মিলা। কেন ?
ক্ষিতীশ। তাের জন্মদিনের আশীৰ্বাদটা যে এখনাে করা হয় নি।
উৰ্মিলা।
পদধূলি লইয়া প্রণাম করিল
ও ।
ক্ষিতীশ। চিরায়ুষ্মতী, চিরসৌভাগ্যবতী হও মা। এই জন্মদিন আরাে
একশােবার ফিরে আসুক।
উৰ্মিলা। একশােবার। না বাবা, তাহলে বুড়াে থুরথুরে হয়ে যাব, সে
দেখতে ভারি বিচ্ছিরি হবে।
ক্ষিতীশ। পাগলি ! তাের মার কাছে আশীৰ্বাদ নিয়েছিস্?
উৰ্মিলা। না। মা’র কি আর নিঃশ্বাস ফেলবার অবসর আছে!•••
যাই, মাকে জোর করে ধরে আশীৰ্বাদ আদায় করিগে।
ক্ষিতীশ। একটু দাড়া মা, আর একটু কথা আছে।
উর্মিলা। কি কথা?
ক্ষিতীশ। তাের জন্মদিন আজ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে তাের বয়েস আরাে
এক বছর বেড়ে গেল। এখন সংসারের আরাে সব কর্তব্য করবার
সময় এসেছে।
উৰ্মিলা। বা রে, তুমি আমায় বুড়ি বানিয়ে দিচ্ছ !

জন্মতিথি।
ক্ষিতীশ। তামাসার কথা নয় মা। আমার যতই কষ্ট হােক, এ কথা
তত বেশ জানি যে চিরদিন আমার এই ঘরটুকুর মধ্যে তােকে ধরে
রাখতে পারব না।•••আমার কথা বুঝতে পেরেছি মা?
উর্মিলা। বেশ বুঝেছি বাবা, তােমার মস্ত বড় ভূমিকা শুনে অনেকক্ষণ
আগেই বুঝেছি। আমাকে এখন পর করে দিতে চাও, এই তাে?
ক্ষিতীশ। আর সেই সঙ্গে পরকেও আপন করতে চাই। তােকে বেশী
বয়েস পর্যন্ত লেখাপড়া শিখিয়ে যেভাবে মানুষ করেছি, তার পর তাে
আর তাের অমতে কিছু হতে পারে না। তাের ইচ্ছা অনিচ্ছার
ওপরই সব নির্ভর করছে।
উৰ্মিলা। (নতমুখে) কখনাে কি তােমার কথার অবাধ্য হয়েছি বাবা,
যে আজ এমন করে বলছ।
ক্ষিতীশ। না মা, এত বড় একটা ব্যাপারে তুই সঙ্কোচ বা লজ্জা করে
যেন কিছু করিস নে। তাের মা যাই বলুন না কেন, এটা তুই ঠিক
জানি যে তাের মনের কোণে যদি একটুও আপত্তি থাকে তাহলে
আর কারাে মতে মত দিতে তােকে কক্ষণে বাধ্য করব না।
উৰ্মিলা। আচ্ছা বাবা, সে হবে এখন-( প্রস্থানােত )
ক্ষিতীশ। না মা, ওরকম করে কথাটা এড়িয়ে গেলে তােল চলবে না।
পরিমল আর শিশির দুজনেই তাদের প্রার্থনা আমাকে জানিয়ে
রেখেছে। তাের মতামতের অপেক্ষায় এতদিন তাদের কিছু বলি নি।
আমার ইচ্ছে যে আজ তাের এই শুভ জন্মদিনেই সবাইকে তাের
নতুন জীবনের শুভ সংবাদটা জানিয়ে রাখি।
উর্মিলা। (নতমুখে) বেশ বাবা, তুমি আজকেই আমার উত্তর পাবে।
৭০

তৃতীয় অঙ্ক
ক্ষিতীশ। বড় সুখী হলুম মা। তােদের ক’বােনকে হাসিমুখে ঘরকরণ
করতে দেখব এর বেশী উচ্চ আশা আর কিছু আমার নেই।••আর
একটা কথা মা, তাের মা পরিমলের বিরুদ্ধে অনেক কথাই হয়তাে
তােকে বলেছে। কিন্তু তার ওপরে আমার যথেষ্ট বিশ্বাস আছে।
পরিমল যাকে গ্রহণ করবে সে কখনাে অসুখী হবে না।
উৰ্মিলা। আচ্ছা, আচ্ছা, তােমায় আর কারু হয়ে ওকালতি করতে
হবে না।
ক্ষিতীশ। ওকালতি করছি নে। কিন্তু কথাটা তােকে বলা দরকার ;
কারণ তাের মা’র একটা অহেতুক বিরাগের ফলে পরিমল আজকে
যেন অপরাধীর মত এ বাড়ীতে এসেছে।•••তার পর তাের কাছ
থেকে যে রকম ব্যবহার প্রত্যাশা করছিলুম, ঠিক সে রকমটি যেন
দেখলুম না: মনে হল তাের মা’র মনের বিরক্তির ছোঁয়াচ যেন তাের
মনেও লেগেছে। পরিমল আসবার পর এ পর্যন্ত
( হাসিয়া ) বাবা, তুমি এসব কথা কিছু বােঝ না।
উৰ্মিলা।
হলঘরের দিকে দ্রুত প্রস্থান। দরজার কাছে ভুদেবের সহিত সাক্ষাৎ হইল
ভুদেবের প্রবেশ
ভূদেব। আরে এত ছােটাছুটি কেন ? আবার কেউ পেছু তাড়া করেছে
নাকি ?
উর্মিলা। চুপ! বাবা আছেন।
ভূদেব। বড়রাণী অমন করে পালালাে কেন ?
ক্ষিতীশ। ওর বিয়ের কথা বলছিলুম, তাই।
৭১

জন্মতিথি
ভূদেব। তা’ বটে। বি-এ-ই পাশ করুক আর বি-এসিই পাশ করুক
বিয়ের কথায় বাঙ্গালীর মেয়ের লজ্জা চিরদিনই। তার পর কিছু
"
স্থির হল ?
ক্ষিতীশ। ঐখানেই তাে গােল। আচ্ছা, মামাবাবু, আপনার সঙ্গে তাে
ওর সৰ্ব্বদাই নানারকম কথাবার্তা হয়। ওর মন কি কিছু বুঝতে
পেরেছেন কখনাে?
ভূদেব। কিচ্ছু না। কারণ আমার কাছে মুখে যা বলে মনের কথা
হয়তাে ঠিক তার উল্টো। গম্ভীরভাবে কিছু জিজ্ঞেস করলে ঠাট্টা-
তামাসা করেই উড়িয়ে দেয়।
ক্ষিতীশ। যাহােক, আজকেই সেটা ঠিক জানা যাবে। মিলি আমাকে
কথা দিয়েছে যে ওর যা’ মতামত আজকেই জানাবে। (উঠিলেন।
হলঘরের পর্দার আড়াল হইতে উৰ্মিলা মুখ বাড়াইল
উর্মিলা। দাদামশাই, এদিকে একটু আসবে? একটা কথা আছে
তােমার সঙ্গে।
ক্ষিতীশ। তুই-ই এখানে আয় মিলি, আমি যাচ্ছি।
ক্ষিতীশের প্রস্থান
উৰ্মিলার প্রবেশ
উৰ্মিলা। দাদামশাই, আমার একটা কথা তােমায় রাখতেই হবে।
ভূদেব। শুধু আদেশের অপেক্ষা।
উৰ্মিলা। আমার বন্ধুরা মিসেস্ হালদারকে নিয়ে একটু রঙ্গ করতে চায়,
তােমাকে তার সাহায্য করতে হবে।
৭২
;

জন্মতিথি
উৰ্মিলা।
ভূদেব। সৰ্ব্বনাশ ! আমি ওসবের মধ্যে নেই। কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানে
যেতে বল, একদমে তিনশ ঘণ্টা সাতার কাটতে বল, কর্পোরেশনের
সভার সভাপতি হতে বল, সে সব রাজি আছি ; কিন্তু ঐটি পারক
। তুই আমায় বাঁচা।
কেমন জব্দ। দিনরাত আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা কর, এবার শক্ত
লােকের পাল্লায় পড়েছ।•••তা তুমি আগেই এত ভয় পাচ্ছ কেন?
সুমিত্রা, ঊষা আর রুবি এরাই সব করবে, তুমি শুধু একটুখানি
ভূদেব। না ভাই, তাের বন্ধুদের কাছে আমি জোড় হাত করে মাপ চেয়ে
আসব ; আমায় আর এর মধ্যে জড়াস্ নে’।
উর্মিলা। ওরা যা মতলব এটেছে তাতে ইচ্ছেয় হােক আর অনিচ্ছায়
হােক তােমায় জড়িয়ে পড়তেই হবে, সে আমি তােমায় আগেই বলে
রাখছি।
ভূদেব। অনিচ্ছায় হলে আর কি করব। বেঁধে মারলে সবই সয়।
তখন মুক্তির উপায় খুঁজতে হবে। তােদর মতলবটা কি শুনি?
উৰ্মিলা। ইস! আমায় বুঝি তেমনি বিশ্বাসঘাতক পেয়েছ ?
ভূদেব। বলনা ভাই, লক্ষ্মীটি। তাহলে আমিও তােকে একটা গােপন
কথা বলব।
উর্মিলা। কি কথা?
ভূদেব। আগে তুই বল।
উৰ্মিলা। চালাকি। আমি চাইনে তােমার গােপন কথা শুনতে।
যদি সত্যি কিছু শুবার মত থাকে আমি নিজেই খুঁজে বার
করে নেব।

জন্মতিথি
ভূদেব। আচ্ছা, সে যাক। কিন্তু বড়রাণী, এদিকে স্বয়ম্বরসভা তােত
প্রস্তুত। বরমাল্য কে পাবে ঠিক হয়েছে ?
উৰ্মিলা। তুমি।
ভূদেব। বেশ। তাহলে বরমাল্য যখন আমার, আমি সেটা ইচ্ছামত
হস্তান্তর করতে পারি?
উৰ্মিলা। উহু, এ জিনিস হস্তান্তরযােগ্য নয়।
ভূদেব। (মন বুঝিবার জন্য ) শিশির ছেলেটি কিন্তু ভারি ভাল।
উৰ্মিলা। অস্বীকার করছি নে’
ভূদেব। যাকে বলে খুব স্মার্ট, তা না হতে পারে, কিন্তু বিদ্যেবুদ্ধিতে ও
কারাে চাইতে কম নয়।
উর্মিলা। না, জ্বালাতন করলে। একটু আগে বাবা আর একজনের
বিজ্ঞাপন দিচ্ছিলেন, এখন আবার তুমি সুরু করলে।
ভূদেব। (গম্ভীরভাবে ) দেখ, বড়রাণী, মানুষের বাইরেটা দেখে বিচার
শেষ করিস নে’। শিশিরকে আমি বেশ ভাল করেই চিনেছি
ওর মত ছেলেকে স্বামীরূপে পাওয়া যে-কোন মেয়ের পক্ষে সৌভাগ্যের
কথা।
উর্মিলা। এই তাে গেল একজনের কথা। আবার বাবাকে ডেকে
জিজ্ঞেস কর, দেখবে তিনি আর একজনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবেন।
তাই আমি কিছু ঠিক করতে না পেরে হাল ছেড়ে দিয়েছি
দাদামশাই।
ভূদেব। হাল ছেড়ে দিলে তাে চলবে না রাণী। তুই কথা দিয়েছিস,
আজকে রাত্তিরেই প্রশ্নের উত্তর দিবি।
•
৭৪

তৃতীয় অঙ্ক
উর্মিলা। (ব্যস্ততার ভাণ করিয়া ) তাই তাে, তাহলে কি করা যায়।•••
আচ্ছা, এক কাজ করি। সেকালের রাজকন্যাদের মত পণ করা
যাক। পণে যে জিতবে তারই জয়, কি বল ?
ভূদেব। বেশ ! কিন্তু পণটা কি হবে ?
উৰ্মিলা। দাড়াও, ভেবে দেখি।•••( চিন্তা করিয়া ): হয়েছে•
টেবিলের নিকট গিয়া উপহারগুলির মধ্য হইতে বাছিয়া কেসগুদ্ধ
একছড়া মুক্তার মালা লইয়া আসিল
এই মালাছড়া দেখছ ? এইটে যে আমার গলায় পরিয়ে দিতে
পারবে, তারই জিত। (ভূদেব কাড়িয়া লইবার চেষ্টা করিলেন)
ওকি তুমি হাত বাড়াও কেন? তুমি তাে আর উমেদার নও।
ভূদেব। কমিশনের লােভে। আমি উমেদারের এজেন্ট।
উৰ্মিলা। উহু, এজেন্ট দিয়ে চলবে না।
ভূদেব। আচ্ছা, আমি নেব না; কিন্তু ওটা থাকবে কোথায় ?
উৰ্মিলা। আমার কাছে।
ভূদেব। তাহলে রাজপুত্র পাবেন কি করে ?
উৰ্মিলা। ঐখানেই তাে বাহাদুরি, নইলে আর পণ কিসের।
হাসিয়া মাঝের দরজা দিয়া চলিয়া গেল
বাঁ দিক হইতে উৎপলার প্রবেশ
উৎপলা। বাঃ দাদামশাই, তুমি এখনও এখানে বসে রয়েছ।
ভূদেব। আগে আমার একটা কথার জবাব দে তাে উৎপল।
উৎপলা।
কি?

উৎপল।
তৃতীয় অঙ্ক
ভূদেব। উপহারগুলাের মধ্যে একটা মুক্তোর মালা ছিল, দেখেছিস্?
উৎপলা । ।
ভূদেব। সেটা কার দেওয়া ?
উৎপলা। ওটা আসল মুক্তোর নয়-সীনরা।
ভূদেব। সে যাই হােক! কিন্তু উপহারটা কার ?
উৎপলা। পরিমলবাবুর।
ভূদেব। (গম্ভীর ভাবে ) হু।
উৎপলা। কি ?
ভূদেব। অদৃষ্টের একটা লীলা চলছে। এর পরিণাম কি কে জানে।
ও কথা বল্লে যে দাদামশাই?..কি ভাবছ খুলেই বল না।
ভূদেব। নাঃ, এ নিয়ে আর আলােচনা করবার দরকার নেই। কি
জানি, ও শুধু আমার অনুমানও হতে পারে।
উৎপলা। কি, দীপ্তি-পরিমল সংবাদ ?
ভূদেব। ( সাগ্রহে ) তুইও তাহলে বুঝেছিস্?
উৎপলা। হাঁ।
ভূদেব। তখন ওদের মুখের ভাব লক্ষ্য করেছিলি ?
উৎপলা। করেছিলুম।
ভূদেব। তাহলে আমার অনুমান ঠিক ?
উৎপলা। তাইতাে মনে হয়। কিন্তু তার জন্যে তুমি অত ভাবছ কেন?
ভূদেব। ভাবছি উৰ্মিলার জন্যে।
উৎপলাসেজন্যে তােমাকে মােটেই ভাবতে হবে না। পরিমল বাবুর
সম্বন্ধে দিদির কোন মাথাব্যথা নেই।
৭৬

তৃতীয় অঙ্ক
ভূদেব। তাহলে তাের দিদিকে তুই এখনাে চিনতে পারি নি।
উৎপলা। ওগাে মশাই, আমার হাতে প্রমাণ আছে।
ভূদেব। কি প্রমাণ ?
উৎপলা। আজকে সন্ধ্যেবেলা দিদি আর শিশিরবাবু কতক্ষণ একলা
বাগানে বসে ছিল। আমি জানালা দিয়ে দেখেছি। দূর থেকে
কথা কিছু কাণে এলাে না কিন্তু বেশ বুঝলুম যে একটা বােঝাপড়া
হয়ে গেল।
ভূদেব। তা যদি হয়ে থাকে তত ভালই। কিন্তু
নাচের পােষাক পরিয়া বাঁ-দিক হইতে ভলির প্রবেশ
উৎপলা। দূর
ডলি। ও মেজদি, আমি নাচতে পারব না—ভারি ভয় করছে।
উৎপলা।
ভয় কি রে ? সবাই তাে আমাদের জানা লােক।
ডলি। জানা হলে কি হয়। হলঘর ভর্তি অত লােক। আমি ষ্টেজ
থেকে পর্দাটা একটু তুলে দেখেই ছুটে পালিয়ে এসেছি। আমার
পা কাপছে। আমি পারব না, মেজদি।
পাগলি। এখন পারব না বললে কি চলে? সবাই কি
ভাববে।•••ও কিছু নয়, একবার আরম্ভ করলেই আর ভয় থাকবে না।
ডলি। আমি আরম্ভই যে করতে পারব না।
উৎপলা। পারতেই হবে। আচ্ছা, এখন একবার করনা! তাহলেই
ভয় ভেঙ্গে যাবে।
ডলি। কোনটা করব ?
উৎপলা। প্রথমে যেটা আছে। সেই “জ্বলে ঐ চাদের বাতি”
৭৭

জন্মতিথি
উৎপলার গান ও ডলির নৃত্য
গান
জ্বলে ঐ দের বাতি, চঁাদিনীর হাসির বাতি।
মলয়ার মন দুলে যায়, বুকে আয় বুকের সাথী।
নয়নের কালাে তারা
করে প্রাণ আপন হারা
অধরে ফুটলে গােলাপ, নিয়ে তাই মালা গাঁখি।
কালাে যে আলােয় আলো
খালি আজ বাসব ভালাে
রেখেছি আদর করে হৃদয়ের আসন পাতি।
ভূদেব। বাঃ, এই তত খাসা হয়েছে। দেখে শতকরা নব্বই জন আধমরা
আর বাকি দশ জন মারাই যাবে।
ডলি। যা!
ভূদেব। যাব বই কি। সবার আগে যাব। একেবারে সামনে বসে
নৃত্য-সুধা পান করব ।
বাদিক হইতে রঘুয়ার প্রবেশ
উৎপলা।
রঘুয়া। মিস্ পলি, কাম কুইক।
হােয়াই।
রঘুয়া। অল রেডি।
উৎপলা। রাইট ও।
রঘুরার প্রস্থান
৭৮

তৃতীয় অঙ্ক
আয় ডলি। দাদামশাই, তুমিও দর্শকদের জায়গায় বস গে”।
ভূদেব। না না বাপরে, ওদিকে মিসেস হালদার আছেন যে। আরম্ভ
হলে আমি তােদের ষ্টেজের ভেতরেই গিয়ে বসব এখন।
ভূদেব ব্যতীত সকলের প্রস্থান
মিসেস হালদার হলঘর হইতে বাহির হইয়া ভুদেবের পার্শ্বে আসিয়া দাড়াইলেন
হালদার। সূৰ্যসিংহ।
ভূদেব। ( চমকিয়া উঠিয়া দাড়াইলেন) কাকে খুজছেন? মিঃ সিন্হা
তাে এ ঘরে আসেন নি।
হালদার। কোন্ প্রয়ােজনে মাগিয়াছ দর্শন আমার ?
ভূদেব। না, না, কই, আমি তাে
হালদার। নহি আর দোহে মােরা বালক বালিকা•••
নিভৃতে তােমার সনে হেন আলাপন,
আর নহে কৰ্তব্য আমার
ভূদেব। তা তাে নয়ই, আমি ওদের সবাইকে ডাকছি•••
প্রস্থানেগিত
হালদার। ওকি মিঃ চৌধুরী, আপনি, চললেন যে-আপনার কথাগুলাে
বলুন।
ভূদেব। কোন কথা ?
হালদার। সে কি! ওরা যে বললে আপনার সব তৈরী আছে।•••
আপনি সূৰ্যসিংহের পােজ নিয়ে বসে ছিলেন না ?
ভূদেব। কোন্ সূৰ্যসিংহ ?

জন্মতিথি
হালদার। সংযুক্তা আর সূর্যসিংহ।...ওরা যে বলছিল আপনি ঐ সিনটা
করতে পারেন, শুধু একটা সংযুক্তা পেলেই হয়। রেকর্ডে শুনে শুনে
ওটা আমার বেশ জানা আছে। আমি ঠিক পারব’খন। যেটুকু
শুনলেন, কেমন লাগল? ঠিক হয় নি?
ভূদেব। (বুঝিয়া) ও, , , ঠিক হয়েছে ঠিক হয়েছে। চমৎকার !
কিন্তু মিসেস্ হালদার, আমারি যে ওটা ঠিক মনে নেই। আচ্ছা,
আমি দেখছি, আর কেউ যদি...
হালদার। বাঃ রে, ওরা সবাই বললে আপনি জানেন,-ষ্টেজে করবার
আগে তাড়াতাড়ি একবার রিহার্শেল দিয়ে নিতে চান,আর আপনি
বলছেন, মনে নেই। তার চাইতে
বলুন না কেন যে সংযুক্তা আপনার
মনের মত হয় নি।
সাভিমানে মুখ ফিরাইলেন
;
ভূদেব। না না, সে-কি কথা । এর চাইতে ভাল সংযুক্তা আর কোখেকে
আসবে। কিন্তু দেখুন, ও দৃশ্যটা বড় পুরাণাে হয়ে গেছে ; সবাই
হয়তাে পছন্দ করবে না।
হালদার। কিন্তু আমি তত আর কিছু জানিনে। আপনার করবার
ইচ্ছে নেই, তাই বলুন।
ভূদেব। না, না, ইচ্ছে নেই, কে বললে। আচ্ছা, তবে ওই দৃশ্যই হােক।
কিন্তু ভুমিকা দুটো পালটে নেওয়া যাক, কি বলেন ? আপনি
হােন সূৰ্য্যসিংহ, আর আমি সংযুক্তা।•••তবু একটু নতুন রকম

তৃতীয় অঙ্ক হালদার। আচ্ছা বেশ, আমি তাহলে সূর্যসিংহের কথাগুলো বলি- পাষাণী, আমি তব ধাইব পশ্চাতে, সাথে লয়ে তপ্ত আঁখিজল, অনন্ত এ প্রেম মাের ডালি দিতে চরণে তােমার তুমি কিন্তু চলে যাবে ফিরায়ে বদন, বরষিয়া বিদ্রুপের হাসি••• ০ ০ ০ + ০ ০ ভূদেব। বাঃ চমৎকার ! কি ন্যাচারাল, কে বলবে যে অভিনয়। অবিকল সত্যি বলে মনে হচ্চে। হালদার। তার পর যেন কি, ঠিক মনে পড়ছে না। আচ্ছা, বইটে আনুক, তারপর হবে এখন। ভূদেব। আমি যাচ্ছি, বইটে আনছি গে’। ( প্রস্থানােত) হালদার। না, না, আপনি থাকুন। বই ওরাই আনবে। বরং ততক্ষণ যেটুকু মনে আছে, বলে নিই- নির্জন এ লতাকুঞ্জ মাঝে, করি যদি আমি তব অঙ্গ পরশন কি করিতে পার তুমি... ভূদেব। ভূদেব চৌধুরী। হালদার। ভূদেব চৌধুরী। কি করিতে পার তুমি ভূদেব চৌধুরী ? অগ্রসর হইলেন ৮১ ৩ .

জন্মতিথি
কি করিতে পারি আমি ?
হাঃ হাঃ হাঃ, হাঃ,
: চীৎকার করিয়া লােক জমাইতে পারি-
আছে জোর, ধাক্কা দিতে পারি
আর সর্বাপেক্ষা ভাল যাহা
উদ্ধশ্বাসে পলাইতে পারি
রঙ্গভূমি হতে•••
বাঁ দিকে দ্রুত প্রস্থান
হালদার। মাই গুডনেস্ ! মিঃ চৌধুরী, মিঃ চৌধুরী।
অনুসরণ করিলেন। নেপথ্যে পরদার আড়ালে মেয়েরা উকিঝুকি দিতেছিল।
তাহারা কলহাস্য করিয়া সরিয়া গেল
একটু পরে নেপথ্যে দীপ্তির গান শােনা যাইতে লাগিল। ডানদিক হইতে
মনােরমা ও শিশিরের প্রবেশ
মনাের। দেখ দেখি, ওদের গানটান সব আরম্ভ হয়ে গেছে। আমি
না ডাকলে হয়তাে আরাে কতক্ষণ বাগানে বসে থাকতে—কিছু দেখতে
পেতে না।
শিশির। ( সলজ্জভাবে ) আমি বুঝতে পারি নি।
মনােরমা হলের দরজার নিকট গিয়া দরজা খুলিয়া দেখিলেন,
পরে প্রােগ্রাম দেখিলেন
মনােরমা। কেবলি শুরু হয়েছে, যাও বসগে।
শিশির প্রস্থানােত
তােমার চা খাওয়া হয়েছে তাে?

তৃতীয় অঙ্ক
শিশির। না।
ওমা, সেকি! তাহলে তুমি এখন যেয়াে না। একটু বস।
আমি এখনি আসছি।
.
দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন। দরজা বন্ধ হইলে গানের শব্দ অনেকটা ক্ষীণ হইয়া গেল।
এই দৃশ্যের অবশিষ্ট সময় নেপথ্য হইতে গানবাজনা করতালি ইত্যাদির শব্দ আসিতে
লাগিল। সম্মুখের ঘরের কথাবার্তা চলিবার সময় শব্দ খুব মৃদু—প্রায় কর্ণগােছর
হয় না। কিন্তু কথাবার্তার অবকাশে মাঝে মাঝে বেশ স্পষ্ট ভাবেই শােনা যাইতে
লাগিল
শিশির। আপনি ব্যস্ত হবেন না। সে পরে হলেই চলবে এখন। আমি
যাই গানটা শুনি গে’।
মনােরমা। না না, এখন যাওয়া হবে না, বস। কি পাগল ছেলে।
সবার খাওয়া হয়ে গেল আর তুমি একলাটি চুপ করে বাগানে বসে
রয়েছে। এইখানেই বস একটু। আমি আসছি।
মনােরমার প্রস্থান
শিশির কৌচে বসিয়া অন্যমনস্কভাবে একখানি প্রােগ্রাম লইয়া নাড়াচাড়া
করিতে লাগিল। বাঁ-দিক হইতে উৰ্মিলার প্রবেশ।
হাতে মুক্তামালার কে
উৰ্মিলা। (ঈষৎ নৈরাশ্যের স্বরে) ও, আপনি।
টেবিলের উপর কেসটি রাখিয়া দিয়া শিশিরের
নিকটে আসিল
আপনি এখানে একলাটি বসে রয়েছেন যে ?

জন্মতিথি
শিশির। হাঁ, মানে এখানে নয় বাগানে বসেছিলুম। এখনি এই
একটু আগে, এখানে এসে বসেছি।
উৰ্মিলা। তা’ এখানে কেন ? ওদিকে সব গানটান হচ্চে শুনবেন না?
শিশির। শুনব বই কি।•••এই যাই। (উঠিল)
উর্মিলা। আপনি বসেছিলেন, কোন দরকার ছিল কি ?
শিশির। নাঃ, কিচ্ছু না। মানে, আপনার মা আমাকে বললেন যে খেতে
হবে...খাবার নিয়ে আসচেন তাই।তা দরকার নেই কিছু, আমি
তাঁকে বলেছি।
উর্মিলা। বেশ তত মানুষ। তবে আবার চলে যাচ্ছিলেন কেন?
আমি যাই, মাকে শীগগির করে আনতে বলিগে।
( প্রস্থানােত)
শিশির। ( হঠাৎ বলিয়া ফেলিল ] না, না, আপনি বসুন। আর কিছু
চাইনে, কিছু দরকার নেই আমার।
কণ্ঠস্বরে আকুলতার আভাস উৰ্মিলাকে চমকিত করিল। এ কথার
পর আর যাওয়া চলে না। উৰ্মিলা নিকটে একখানি চেয়ারে
বসিল। নেপথ্যে গান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে
করতালিধ্বনি শােনা গেল।
।
উৰ্মিলা। দীপ্তির গানটা শুনতে পেলেন না। বেশ গাইছিল।
শিশির। উনি তাে পরে আবাে গাইবেন, তখন শােনা যাবে।
(কম্পিতম্বরে) উর্মিলা দেবী: আমার সেই কথাটা•••তখন যে
কথাটা বলতে গিয়ে বলবার সুযােগ পাই নি।

তৃতীয় অঙ্ক
বাঁ-দিক হইতে পরিমলের প্রবেশ। উর্মিলার দিকে
অগ্রসর হইতে হইতে থামিয়া ..
পরিমল। ( শিশিরের প্রতি) এই যে, আপনিও রয়েছেন দেখছি।
দীপ্তিদেবী এদিকে এসেছিলেন কি ?
শিশির। না ।
পরিমল। ( কৈফিয়তের স্বরে) গানখানার জন্যে ওঁকে কনগ্রাচুলেট
করব। তা গান শেষ হইতে কোথায় যে পালিয়েছেন। আপনারা
শশানেন নি’ বুঝি ?
শিশির। না।
পরিমল। বেশ গানটি। ( দূরে বসিলেন) হােপ, আই অ্যাম নট
ইণ্টডিং ?
শিশির। ও ননা, নট অ্যাট অল।
উৰ্মিলা। শিশিরবাবু, আমার উপহারগুলাে আপনাকে এখন দেখাই
নি’ বুঝি। আসুন দেখবেন।
উভয়ে টেবিলের নিকট গেল। উর্মিলা অতিরিক্ত উৎসাহের সহিত
শিশিরকে দেখাইতে লাগিল এবং মাঝে মাঝে আড়চোখে
পরিমলকে লক্ষ্য করিতে লাগিল
এই যে এইটে দিয়েছেন মিঃ সরকার। এইটে বাবা। রুবি ছবি
আর শান্তা তিনজনে মিলে এইটে দিয়েছে। (ফটোফ্রেমটি হাতে
লইয়া লীলা-কোমল কণ্ঠে) আর এইটে কে দিয়েছে বলুন তাে?

জন্মতিথি
শিশির। আমার ও সামান্য জিনিসটে এত সব দামী জিনিসের মাঝখানে
মানাচ্ছে না। আমার দেখে লজ্জা হচ্চে।
উৰ্মিলা। ইস্, সামান্য বই কি! এর দাম কি কম! আর উপহারের
মূল্য কি তার দাম দেখে যাচাই করা চলে? আন্তরিকতায় ঘােট
জিনিসও বড় হয়।
শিশির। আপনার মন উচু। তাই ছােট জিনিসকেও বড় করে দেখতে
পারেন।
নেপথ্য হইতে পুনরায় নাচ-গানের শব্দ শােনা গেল
পরিমল। আচ্ছা, শিশিরবাবু, আমি চললুম। ডলির নাচটা দেখিগে।
কিছু মনে করবেন না যেন। ( শুষ্ক হাশ্যে ) অবশ্যি আমি গেলে
আপনারা যে খুব কাতর হয়ে পড়বেন, তা বােধ হচ্ছে না।•••থাকলেই
বরং•• কি বলেন, আঁ•••
প্রস্থান
সহসা উৰ্মিলার সমস্ত উৎসাহ নিবিয়া গেল
শিশির। আইভরির পাউডার কেষ্টা কে দিয়েছেন?
( উর্মিলা
নিরুত্তর) উৰ্মিলাদেবী, এই পাউডার কেষ্টা কে দিয়েছেন?
উৰ্মিলা। কি জানি, ঠিক মনে নেই।
উৰ্মিলা কৌচে গিয়া বসিল। শিশির আসিয়া ঐ কৌচের অন্য পার্শ্বে বসিল
শিশির। উর্মিলা দেবী, এইবার আমার কথাটা শুনতে হবে।
উৰ্মিলা। (অন্যমনস্কভাবে অন্য দিকে চাহিয়া) বলুন।

তৃতীয় অঙ্ক
শিশির। আমার বলা হয় তত অন্যায় হচ্চে•••আপনি কি ভাববেন
জানিনে। কিন্তু আমার সামান্য উপহারটিকে আপনি যে সমাদর
দেখিয়েছেন, তাইতেই আমার দুরাশা প্রশ্রয় পেয়ে বেড়ে উঠেছে।
আজ নইলে আর কখনাে আমি বলতে পারব না। কিন্তু, কি যে
বলব••ভাষা খুজে পাচ্ছি নে'।
উর্মিলা। (শান্তকণ্ঠে মুখ না ফিরাইয়া) আপনি যা বলবেন, তা আমি
জানি, শিশিরবাবু।
শিশির। আপনি জানেন ?
উৰ্মিলা। জানি, কোন মেয়ের কাছে কি একথা কখনাে অজানা
থাকে ?
শিশির। বাঁচলুম। মনের ভেতরে এ বােঝা বয়ে বেড়াবার দায় থেকে
আমি নিষ্কৃতি পেলুম।
উৰ্মিলা। (পূৰ্ব্ববৎ ) কিন্তু আমি যে এর যােগ্য নই শিশিরবাবু।
শিশির। ( আশান্বিত হইয়া) ও. কি কথা বলছেন উর্মিলা দেবী,
আমিই আপনার যােগ্য নই। শুধু এই আশা যে আমার তুচ্ছ
উপহারটির মত আমাকেও আপনি ••
উৰ্ম্মিল । ( ফিরিয়া) না, শিশিরবাবু, আপনি ভুল বুঝেছেন। আমি
বলছিলুম,
শিশির। কি?
উৰ্মিলা। আপনি আমায় যে সম্মান দিতে চাইছেন, তা আমার নেবার
সাধ্য নেই।
শিশির। সাধ্য নেই ? তবে কি আমার পূজা দেবী গ্রহণ করবেন না ?
6.}
৮৭

জন্মতিথি
উর্মিলা। আপনি অমন করে বলবেন না শিশিরবাবু। আপনার এ
প্রস্তাব যে-কোন মেয়ের পক্ষে গৌরবের কথা।
শিশির। তবে ?
উৰ্মিলা। কিন্তু ঐ যে বললুম, আমি অক্ষম।
শিশির। সত্যিই আমি অন্ধ। আকাশ-কুসুমের নেশায় আমার
কখনাে কখনাে মনে হত যে•••
উর্মিলা। যদি কখনাে আপনার মনে মিথ্যে আশা জাগিয়ে থাকি, তার
জন্যে আমায় ক্ষমা করবেন, শিশিরবাবু। কিন্তু আপনার প্রস্তাবে
সম্মতি দিতে না পারলেও, এটুকু বিশ্বাস করবেন যে আপনার
বন্ধুত্বের মর্যাদা আমি বুঝি আর চিরদিন আপনাকে বন্ধু বলে
মনে করব।
শিশির। বন্ধু !-আচ্ছা একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করি, ভবিষ্যতে
হয়তাে কোনদিন আপনার মতের পরিবর্তন হতে পারে, এ আশা
করা কি আমার পক্ষে দুরাশা হবে ?
উৰ্মিলা। এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কি আমার পক্ষে সম্ভব ?
শিশির। তা সম্ভব নয় সত্যি। আচ্ছা তবে বন্ধু বলেই মনের কোণে
একটু স্থান দেবেন, আর এর চেয়ে উচ্চ আশা যে কখনাে করেছিলুম
সে কথা ভুলে যাবেন। আজকে তা হলে আসি। (উঠিল )
উৰ্মিলা। সে কি, মার সঙ্গে দেখা না করে আপনি যেতে পারবেন
৩
।
শিশির। আচ্ছা, আমি ও-ঘরে বসচি। অভিনয় শেষ হলে তাঁদের সঙ্গে
দেখা করে যাব।
boleyen

তৃতীয় অঙ্ক
নেপথ্যে করতালিধ্বনি। শিশির হলঘরের দিকে চলিয়া গেল ।
বঁ-দিক হইতে উৎপলা ও ভূদেবের প্রবেশ
ভূদেব। বিরতি কতক্ষণ?
উৎপলা। দশ মিনিট।
ভূদেব। তাহলে আমি একটু বাগানে বসি গে’। সময় হলে আমাকে
ডেকে নিয়ে যা।
ভূদেবের ডানদিকে প্রস্থান
উৎপল। দিদি, মা এসেছিলেন এ ঘরে ?
উৰ্মিলা। না।
উৎপল। একটু আগে খাবারের ডিস হাতে করে এই দিকেই আসতে
দেখলুম যেন।
উর্মিলা। কই না । এ ঘরে আসেন নি তাে।
উৎপলা। ডলির নাচটা বেশ হয়েছে। ও আগে থাকতেই যা ঘাবড়ে
গিয়েছিল। আমার ভারি ভয় ছিল ওর জন্যে।
বঁ-দিক হইতে দীপ্তির প্রবেশ
দীপ্তি। এই যে তােমরা এখানে।
উৎপলা। হাঁ, আমরা এখানে। কিন্তু যাকে খুজছিস, তিনি এখানে
নেই।
দীপ্তি। কাকে আবার খুজছি। কি যা-তা বলছি।
উৎপলা। লুকানাে কি অত সােজা সখি! ফুলটি ফুটলে তার গন্ধ যে
আপনিই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

জন্মতিথি
দীপ্তি। ঐ এক কথা পেয়েছি। দেখতে, উর্মিলাদি, সব সময় কি
ঐ এক ঠাট্টা ভাল লাগে ?
উৰ্মিলা। কি হয়েছে পলি ? ওকে অমন করে জ্বালাতন করছিস্ কেন?
উৎপলা। বিচার যদি করবে দিদি, তবে দু’পক্ষের কথা শুনে বিচার
করাে।
উর্মিলা। আচ্ছা বেশ। তাের কথা কি বল।'
দীপ্তি। আগে আমার কথা শােন উর্মিলাদি’। আজ সন্ধ্যে থেকে ঐ
এক ঠাট্টা পেয়েছে। আমি নাকি কাকে খুজে বেড়াচ্ছি, আমি
নাকি হাবুডুবু খাচ্ছি, এই সব। দু-একবার বললি, বেশ। সব সময়
এক ঠাট্টা কি ভাল লাগে ?
উৎপলা। ঠাট্টা হলে একবারের বেশী বলতুম না। এ যে সত্যি গাে
সত্যি।
এমন আনন্দের কথা, একি না বলে থাকতে পারা যায় !
দীপ্তির মত এত বড় একটা ঠাণ্ডা মাথাওয়ালা মেয়ে, তার অহঙ্কার
আজ এমনি করে ধূলিসাৎ।
উৰ্মিলা। (হাসিয়া) সত্যি নাকি? তাহলে তাে বলবেই, এতে তুমি
রাগ করলে চলবে কেন ?
দীপ্তি। ওমা, এ কেমন এক চোখাে’ বিচার-কর্তা গাে। সত্যি মিথ্যে
যাচাই করা হ’ল না—অমনি রায় হয়ে গেল।
উৎপলা। আচ্ছা বেশ, আমি প্রমাণ করে দিচ্ছি। এক নম্বর, দু’জনে
একলা বাগানে দেখাশােনা
দীপ্তি। সে তাে আর ইচ্ছে করে নয়।
উৎপলা। দেখলে দিদি, ঘটনা অস্বীকার করছে না।
4,
''

তৃতীয় অঙ্ক
উর্মিলা। তাইতাে দেখছি। তা’ কে সেই ভাগ্যবান পুরুষ তার নাম
শুনতে পাই নে ?
উৎপলা। র নাম•••
দীপ্তি। (তাহার মুখ চাপিয়া ধরিয়া) না, পলি, এমনি ঠাট্টা করছি
কিন্তু সত্যি সত্যি কারাে নাম করে ঠাট্টা করলে আমি
কিছুতেই সহ্য করব না।
উৎপলা। (কৃত্রিম কোপে ) তবু বলবি ‘ঠাট্টা’!
দীপ্তি। (ঐরূপ স্বরে) ঠাট্টা নয় তত কি?
উৎপল। (কোমল কণ্ঠে । কিন্তু তােমার চোখ-মুখ যে অন্য কথা বলছে
সখি। ( স্বাভাবিক স্বরে) তারপর, একটু আগে এই ঘরের সেই
দৃশ্যটি। সে কি কখনাে ভুলতে পারি...
ওগাে, নয়নে নয়নে বুঝি কি-ভাষা জানে,
দেখ, নিমেষে প্রকাশে যাহা ছিল গােপনে ;
কাল ছিল যে দূরে,
আজ হৃদয় পুরে,
বিকশিত পরিমল কমলাসনে।
.
উৎপলা “পরিমল” কথাটির উপর জোর দিয়া আবৃত্তি করিল।
শুনিয়াই উৰ্মিলার মুখের হাসি নিবিয়া গেল
দীপ্তি। বড় বাড়াবাড়ি করছি উৎপল। আমায় আর এখানে থাকতে
দিলি নে। ( প্রস্থানােত)
উৎপলা। হাঁ হুঁ যাও, অনেকক্ষণ দেখ নি।

তৃতীয় অঙ্ক
একথা শুনিয়া দীপ্তি আবার দাড়াইয়া ইতস্ততঃ করিতেছে,
এমন সময় রঘুয়ার প্রবেশ
রঘুয়া। মিস্ পলি, টাইম আপ।
উৎপল। ( ঘড়ি দেখিয়া ) ওমা, তাইত। দীপ্তি ভাই, তুই শীগগীর
যা’। এবার তাের আছে। আমি দাদামশাইকে ডেকে নিয়ে
আসছি।
দীপ্তি ও রঘুয়ার বাঁ-দিকে ও উৎপলার ডান দিকে প্রস্থান
উৎপলা দরজার কাছ হইতে ডাকিল
“দাদামশাই, ও দাদামশাই, এস।”
উৎপলার পুনঃ প্রবেশ
.উৎপলা বা দিকে চলিয়া যাইতেছিল এমন সময় উন্মিলা ডাকিল
উর্মিলা। পলি, শােন্ ।
উৎপলা। কি ?
উর্মিলা। ( নির্লিপ্তকণ্ঠে) ও কবিতাটার শেষ লাইন কি বললি যেন ?
“নব বিকশিত পরিমল কমলাসনে” ?
উৎপলা। হাঁ।
উৰ্মিলা। আমার যেন মনে পড়ছে ওখানটায় অন্য কথা ছিল।
উৎপল। উর্মিলার সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত ছিল। এইবার তাহার মনের ভাব বুঝিয়া ভয়
পাইয়া গেল। মিথ্যা ঢাকিবার জন্য উচ্চকণ্ঠে বলিল—
উৎপলা। নাঃ, আমার বেশ মনে আছে।
উর্মিলা। তুই যা বললি তাতে কি কোন মানে হয়? “নব বিকশিত

তৃতীয় অঙ্ক
পরিমল”...উহু। ঘঁ, আমার এখন মনে পড়েছে। “নব বিকশিত
শতদল কমলাসনে।” তাই না?
উৎপল। (ধরা পড়িয়া) তা হবে। আমার ঠিক মনে ছিল না।
উৰ্মিলা। ( সহসা উত্তেজিত কণ্ঠে ) পলি, সত্যি কথা বল।
উৎপলা। কি বলব?
উৰ্মিলা। তুই ইচ্ছে করে “পরিমল” বলেছিলি ?
উৎপলা। হুঁ।
দুজনেই কয়েক মুহুর্ত নিস্তব্ধ
উম্মিল। দীপ্তিকে যা বলে ঠাট্টা করছিলি, সব কি সত্যি?
উৎপলাসবই কি আর সত্যি। কতকটা সত্যি, বেশীর ভাগই ঠাট্টা।
আমি যাই দিদি, ওদিকে সময় হয়ে গেছে।
উর্মিলা। আচ্ছা, যা।
উৎপলার বাঁ দিকে প্রস্থান
উর্মিলা চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া কয়েক মুহূর্ত কি ভাবিল। তারপর টেবিলের
নিকট গিয়া মুক্তামালার কেসটি খুলিয়া মালাটি তুলিয়া দেখিল।
আবার কে বন্ধ করিয়া রাখিয়া দিল। তাহার পর
বাঁ-দিকে চলিয়া গেল। নেপথ্যে দীপ্তির গানের
শব্দ শােনা যাইতে লাগিল

জন্মতিথি
কিছুক্ষণ পরে “জন্মতিথি”র উৎসব শেষ হইলে পর ক্ষিতীশ ও
মনােরমার হলঘর হইতে প্রবেশ
ক্ষিতীশ। যাক, আজকের উৎসবটা বেশ নির্বিঘ্নেই কেটে গেল বল।
যেতে পারে।
মনােরমা। হাঁ, এখন যে-জন্যে এত করা, সেইটে হলেই নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।
ক্ষিতীশ। তার জন্যে তুমি ভেবাে না। মিলি আমাকে কথা দিয়েছে।
যে আজকে রাত্তিরেই যা হয় জানাবে।
মনােরমা। তােমার সবই বাড়াবাড়ি। মেয়ের মুখ থেকে না শুনলে
আর চলবে না। আমরা যা ভাল মনে করে করব, মেয়ে আবার
তার ওপরে কি বলবে।
ক্ষিতীশ। আচ্ছা, তা হােক। আর কয়েক ঘণ্টা বই তাে নয়। এর
মধ্যেই তাে সব জানা যাবে। ওকে মনস্থির করতে দাও।
মনােরমা। মনস্থির করতে কতদিন লাগে। দেখ, আজ মিলি বলুক
আর না বলুক, শিশিরের সঙ্গে ওর বিয়ে আমি স্থির করে ফেলবই সে
আগেই বলে রাখছি।
ক্ষিতীশ। অত ব্যস্ত হচ্চ কেন? দেখাই যাক বলে কি না।
উভয়ের প্রস্থান
ডান দিক হইতে পরিমল আসিয়া নতমুখে একখানি কৌচে বসিল।
বাঁ-দিক হইতে দীপ্তির প্রবেশ
দীপ্তি। (ডাকিয়া) উৎপলা, উৎপল।
পরিমল। (উঠিয়া) সে তাে এখানে নেই। ডেকে দেব?
১৪

তৃতীয় অঙ্ক
দীপ্তি। (গম্ভীর মুখে না, থাক। ( প্রস্থানােত)
পরিমল। যদি কোন দরকার থাকে, আমাকে আদেশ করতে পারেন।
দীপ্তি। না, দরকার কিছু নেই। এইবার যাব, তাই বিদায় নেবার
জন্যে।
পরিমল। এখনি চলে যাবেন ?
দীপ্তি। হাঁ, অনেক রাত হয়ে গেছে।
পরিমল। (দীপ্তির মুখ ভাব লক্ষ্য করিয়া) আপনি হঠাৎ এত গম্ভীর
হয়েছেন কেন বলুন তাে ?
দীপ্তি। না, গম্ভীর আবার কোথায় ?
পরিমল। এই একটু আগেই কত হেসে হেসে কথা কইছিলেন, আর
এখন যেন একেবারে আলাদা মানুষ।
দীপ্তি। মানুষ কি হাসির কল যে সব সময়েই হাসবে।
পরিমল। তা নয় সত্যি, তবু হাসির আসা আর যাওয়ার একটা কারণ
ততা থাকা চাই। একটু আগে মুখে যে হাসিটুকু লেগেই ছিল, এখন
সে হাসি মিলিয়ে যাবার কারণ কি?
দীপ্তি। অভিনয় দিয়ে আমাদের পরিচয় হয়েছিল বলে যে বরাবরই
অভিনয় করতে হবে তারও কোন মানে নেই।
পরিমল। আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি নে। কোন
অপরাধ করেছি কি আমি? কি অপরাধ বলুন, আমার সাধ্যমত
তার প্রায়শ্চিত্ত করব।
দীপ্তি। কেন আপনি আমায় আগে সব কথা বলেন নি ?
পরিমল। কি বলি নি ?

জন্মতিথি
* ,
দীপ্তি। আমি একটু আগে উৎপলার কাছে সব শুনেছি।
পরিমল। কি শুনেছেন ?
দীপ্তি। উৰ্মিলা-দির কথা।
পরিমল। উর্মিলা দেবীর কথা ?
দীপ্তি। হ! কতদিন থেকে আপনাদের জানাশােনা—আপনাদের
বিয়ের কথাবার্তা এসব সত্যি নয় ?
পরিমল। সত্যি।
দীপ্তি। তবে ?
পরিমল। কিন্তু সে তাে হবার নয়। কাকিমার••উৰ্মিলা দেবীর মার
নিতান্ত অমত।
দীপ্তি। তা হােক। কিন্তু আপনাদের নিজেদের মধ্যে কি কোন
বােঝাপড়া হয়ে যায় নি ?
পরিমল। কিচ্ছু না। উৎপলা যদি তাই বলে থাকে তাহলে ভুল বুঝেছে ।
দীপ্তি। আপনারা দুজনে দুজনকে ভালবাসেন না ?
পরিমল। দেখুন, ওঁর কথা আমি বলতে পারব না। কখনাে হয়তাে
একরকম মনে হয়েছে, আবার তার পরমুহূর্তেই বুঝেছি যে তা’
আগাগােড়া ভুল।•••, তবে আজকে বেশ বুঝেছি, তিনি শিশির
বাবুকে চান।
দীপ্তি। আর আপনি ?
পরিমল। আমি ? সে কথায় আর কাজ কি? ( বিষঃ হাস্যে)
. সংসারে ভালবাসাটাই তাে বড় কথা নয়।
দীপ্তি। আমার কথার উত্তর তাে এখনাে পাই নি’ পরিমল বাবু।

তৃতীয় অঙ্ক
পরিমল। আমি খুবই বাসতুম, এখনাে বাসি।
দীপ্তি। তবে ?
পরিমল। কি তবে?
দীপ্তি।' তবে ইচ্ছা করেই আপনি আমায় অন্যরকম বুঝিয়েছিলেন?
(মুখ ফিরাইল )
পরিমল। (সবিস্ময়ে) আমি বুঝিয়েছিলুম ! আপনাকে ! ( দীপ্তির
মনােভাব বুঝিয়া) আমাকে ক্ষমা করবেন দীপ্তি দেবী। আমার
কোন ব্যবহারে যে এ কথা মনে হতে পারে তা আমার স্বপ্নেরও
অগােচর ছিল। আমাকে বিশ্বাস করুণ দীপ্তি দেবী। সত্যিই
বলচি :-(দীপ্তির হস্তধারণ )
বঁ দিক হইতে উৰ্মিলার প্রবেশ
ঠোটের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি। উৰ্মিলা আসিয়া
দুজনের মাঝখানে দাড়াইল
উৰ্মিলা।
( দীপ্তির প্রতি) বড় অসময়ে এসে পড়েছি ভাই,
না? মনে হচ্চে, একটা হৃদয়-গলানাে দৃশ্যের মাঝখানে বাধা
দিলুম যেন!
দীপ্তি। সে কি উর্মিলাদি ।
উৰ্মিলা। এই তাে জীবনের স্বাদ”, “আপন-হারা হয়ে নিজেকে বিলিয়ে
দেবার আনন”••
দীপ্তি। উর্মিলা-দি’•••
উৰ্মিলা। ( আত্মসংবরণ করিয়া-জোর করিয়া হাসিয়া হাসিয়া

জন্মতিথি
বলিতে লাগিল ) তুমি ভাবছ, আমার বুঝি হিংসে হয়েছে ?
রামঃ ।
মােটেও না। তুমিও যেন ভাই আমার ওপরে
রাগ করাে না।•••আর নয় ভাই। অনেকক্ষণ তােমাদের
মাঝখানে বাধা হয়ে দাড়িয়ে আছি। তােমরা সুখী হও,
আমি চললুম।
দ্রুতপদে যাইতে যাইতে ফিরিয়া আসিল
ও, আর একটা কথা।•••এই মালাছড়া••( কেস হইতে
মালা বাহির করিয়া হাতে
হাতে লইল)...এটা
লইল):••এটা ওঁরই দেওয়া...
জন্মদিনের উপহার! এটা যার গলায় মানাবে এস তাকেই
পরিয়ে দিই।
অগ্রসর হইতেই দীপ্তি মাথা নাড়িল
ও, আমার হাত থেকে নেবে না বুঝি! বেশ, এখানে রইল । যার
হাত থেকে পেলে খুসি হও, তিনিই পরিয়ে দেবেন।
হলের দিকে দ্রুত প্রস্থান
দীপ্তি। উৰ্মিলাদি! ভুল বুঝে না—পাগলামাে করাে না—(পশ্চাৎ অনুসরণ)
পরিমল স্তম্ভিতভাবে দাড়াইয়া রহিল।
ডান দিক হইতে উৎপলার প্রবেশ
উৎপলা। পরিমলবাবু, দিদি নেই এখানে?
পরিমল। (মুখ তুলিয়া না।

তৃতীয় অঙ্ক
উৎপলা। কোথায় গেল আবার। রুবিদি’রা সবাই এখন যাবে, তাই
ডাকছে।
উৎপলার হলের দিকে প্রস্থান
পরিমল উঠিয়া ডানদিকে চলিয়া গেল। একটু পরে বাঁ দিক
হইতে ক্ষিতীশ ও মনােরমা আসিলেন
মনােরমা। আমি ডেকে জিজ্ঞেস করছি। তােমার কিছু বলতে
হবে না।
ক্ষিতীশ। তা অত ব্যস্ত হচ্চ কেন ? মিলি নিজেই তাে বলবে
বলেছে।
মনােরমা। তুমিই তাে বলেছিলে যে আত্মীয়-স্বজন যারা এসেছেন তাদের
আজকেই শুভসংবাদটি জানাতে হবে। সেইজন্যে তাদের আমি
এখনাে যেতে দিই নি। আর কত রাত্তির তাদের আটকে রাখব।
ক্ষিতীশ। মিলি কোথায় ?
মনােরমা। ঠিক জানি নে। অনেকক্ষণ দেখিনি। পলি ডাকতে
গেছে।
ভুদেবের প্রবেশ
উভয়ে বসিলেন
ভূদেব। বড়মা, উৎসব তাে মিটে গেল। এখন আসল কাজের কতদূর?
উৰ্মিলা বলেছে কিছু?
মনােরমা। এইবার সেটা জানা যাবে। পলি লিলিকে ডেকে আনতে
গেছে।

জন্মতিথি
ব দিক হইতে উৎপলার প্রবেশ
কি রে পলি, মিলিকে পেলি।
উৎপল। মা, দিদি ওপরে তার নিজের ঘরে। দোর বন্ধ।
বললুম যে রুবিদি’রা যাচ্ছে—এস।''তা ভেতর থেকে বললে, এখন
আসতে পারবে না।
মনােরমা। আসতে পারবে না কি রকম। এমন খেয়ালী মেয়েও তত
দেখিনি কখনাে ! বলগে’ তো যে মা ডাকছে, শীগগীর এসাে।
ক্ষিতীশ। পলি’, বলিস যে বাবা আর মা দুজনেই তােমার জন্যে
অপেক্ষা করছে।
উৎপলার প্রস্থান
ক্ষিতীশ। তুমি ওকে কিছু বলেছ-টলেছ নাকি?
মনােরমা। আমি আবার কি বলতে যাব। মেয়ের যে কিসে থেকে কি
হয় তা কারু বােষবার সাধ্যি নেই। আদর দিয়ে দিয়ে মেয়েটির
মাথা খেয়েছ একেবারে।
ক্ষিতীশ। তা, দেখ, আজকে না হয় থাক। আজকে হয় তত ওর
শরীর ভাল নেই।
মনােরমা। আচ্ছা, সে আমি বুঝব এখন। তুমি
তুমি এখান থেকে
যাও তাে।
ক্ষিতীশ। দেখ, তুমি ওকে এ নিয়ে পীড়াপীড়ি করতে পারবে না কিন্তু।
মিলি যদি নিজে থেকে শিশিরের কথা না বলে
মনােরমা। নিজে থেকেই বলবে।

তৃতীয় অঙ্ক
ক্ষিতীশ। বলে সে তত ভালই। কিন্তু যদি না বলে তাহলে তুমি যে
জোর করে
মনােরমা। আহা, তুমি যাও না এখান থেকে। দেখ, তুমি থাকলে
ও হয়তাে লজ্জা করবে। ওর কাছে শুনে আমি তােমাকে বলে
আসব এখন।
ক্ষিতীশ। আচ্ছা, আমি যাচ্ছি
ক্ষিতীশের হলঘরের দিকে প্রস্থান
ভূদেব। বড়-মা, আমিও যাই না হয়।
মনােরমা। না না, আপনি থাকুন। যদি দরকার হয় আপনিও দুএক
কথা মিলিকে বুঝিয়ে বলতে পারবেন।•••আচ্ছা দেখুন তাে’, এসব
বাড়াবাড়ি নয়? উর্মিলা যদি একটা অন্যায় কথা বলে তাও কি
মেনে নিতে হবে ?
মাঝের দরজা দিয়া উৰ্মিলার প্রবেশ
হৃদয়ের উপর দিয়া যে ঝড় বহিয়া গিয়াছে তাহার চিহ্ন মুখে পরিস্ফুট। কপালের
উপর দিয়া চুল ঈষৎ এলােমেলো, চোখে কান্নার চিহ্ন
উৰ্মিলা। কি অন্যায় বলেছি মা?
মনােরমা। ও মা, এই যে মিলি। এখন আবার ওপরে গিয়ে শুয়েছিলি
কেন মা?
উৰ্মিলা। হঠাৎ মাথাটা কেমন করে উঠল, তাই
মনােরমা। তাই নাকি? তাহলে ঘরে কেন মা? বাগানে একটু
বস গে’ না বরং।

জন্মতিথি
উৰ্মিলা। দরকার নেই, এখন অনেকটা কমেছে। অন্যায়ের কথা কি
বলছিলে ?
মনােরমা। ও, বলছিলুম যে, তােরা যদি অন্যায় কিছু করি, তাই
মেনে নিতে হবে এমন কোন কথা নেই।
উর্মিলা। অন্যায় কি বলেছি কিছু ?
মনােরমা। না, তা বলছি নে’। এখন লেখাপড়া শিখেছিস, ভালমন্দ
বােঝবার বয়স হয়েছে। অন্যায় বলবি কেন ?
উৰ্মিলা। বাবা কোথায় ?
মনােরমা। উনি একটু বাইরে গেছেন।
উৰ্মিলা। আমাকে ডেকেছিলে কেন ?
মনােরমা। (খুব সতর্কতার সহিত কথাটি পাড়িলেন) উনি তত
বলেছিলেন যে থাক, ওর শরীর খারাপ করেছে, ডেকে কাজ নেই।
আমি বললুম, সে কি হয় ! সবাইকে বসিয়ে রেখেছি। একটুখানি
এসে একটা কথা বলা যাবে বইতাে নয়। এ আর মুস্কিলের কাজ
কি। এ তত আনন্দের কথা। শুভকাজে শুধু শুধু দেরী করাটা
আমি ভালবাসি নে।
উৰ্মিলা। বেশ। আমি তাে এসেছি, যা করবে করে ফেল।
মনােরমা। হাঁ, করব সব আমিই। তুই শুধু একটি কথা বলবি ।
উৰ্মিলা। কি বলব, তুমিই বলে দাও।
মনােরমা। এই তাে আমার মা-লক্ষ্মী। উনি আগে থেকে সাত-পাঁচ
ভেবেই অস্থির।
শুনলেন মামাবাবু মেয়ে আমার তেমন নয়।
আমাদের মতেই মেয়ের মত।•••তাহলে মা সবাইকে বলি গে’ যে
১০২

তৃতীয় অঙ্ক
সামনের মাসেই একটা ভাল দিন দেখে শিশিরের সঙ্গে তাের
শুভকাৰ্য্য সম্পন্ন হবে।
উর্মিলা। বেশ।
মনােরমা। তুই এখানেই থাকিস্ মা। আমি ওঁকে ডেকে আনছি।
আর সবাইকেও বলিগে যাই।•••উনি আগে থাকতেই ভেবে অস্থির।
প্রস্থান
উৰ্মিলা বসিল। ভূদেব উঠিয়া আসিয়া
তাহার পার্শ্বে বসিলেন
ভূদেব। ( আর্দষরে ) দিদি,
উৰ্মিলা। কি, দাদামশাই ?
ভূদেব। আমার একটা কথা রাখবি ?
উর্মিলা। কি, বল।
ভূদেব। তাের মনের কথা সব খুলে আমায় বল ।
উৰ্মিলা। মনের আবার কি কথা থাকবে দাদামশাই ?
ভূদেব। এমন একটা আনন্দের কথা কিন্তু তাের মুখে হাসি
নেই কেন ?
উৰ্মিলা। এই তাে হাসছি। (হাসিল )
ভূদেব। চোখ দুটো ফুলে-ফুলাে’-
উৰ্মিলা। চোখে একটা পােক পড়েছিল।
ভূদেব। মুখের ওপর দিয়ে যেন একটা ঝড় বয়ে গেছে...
উর্মিলা। তুমি স্বপন দেখছ।
ভূদেব। স্বপন আমি দেখছি নে’ দিদি, কিন্তু তুইও যেন ভুলে যাসনে

জন্মতিথি
৬
যে এটা স্বপ্ন নয়, বাস্তব জীবন ; এতে একদিনের ভুলে মানুষকে
হয়তাে চিরজীবন অনুতাপ করতে হয়।
উৰ্মিলা। আজকে কোন ভুল হয় নি’ দাদামশাই। এতদিন যা বুঝে
এসেছি সেইটেই ছিল ভুল।
ভূদেব। (একটু পরে ) ভুল যদি হয় তবে সে ভুল ভেঙ্গে ভালই হয়েছে।
কিন্তু দিদি, যেখানে নিজের হাত আছে সেখানেও যেন ভুল করে
বসি নে।
উৰ্মিলা। কি দাদামশাই ?
ভূদেব। শিশিরের সঙ্গে বিয়েতে সম্মতি দেবার আগে তুই নিজের মন
ভাল করে বুঝে দেখেছিস?
নিৰ্মলা। কিছু বুঝি নি’ দাদামশাই, বুঝতেও চাইও নে’। শুধু এইটুকু
বুঝেছি যে জগতের কোন কিছুতেই আমার আর কোন সুখ দুঃখ
নেই।
ভূদেব। তাহলে দিদি, আমার মনে হয় এটা ভাল হচ্ছে না।
উৰ্মিলা। ভাল মন জানি নে’ দাদামশাই, কিন্তু আমি যা চাই,
তা যখন হবেই না, তখন বাবা-মা যাতে সুখী হন, তাই
হােক!
ভূদেব। (একটু নিস্তব্ধ থাকিয়া) বেশ দিদি, এই পথই যদি বেছে নিয়ে
থাকি, তবে মনকেও তারি মত করে তৈরি করে নে। আর যেন
পেছন ফিরে তাকাস্ নে’।
উর্মিলা। আমার বুকের সবখানি শক্তি দিয়ে সেই চেষ্টাই করব
দাদামশাই।
১৪

তৃতীয় অঙ্ক
হলঘর হইতে ক্ষিতীশের প্রবেশ
ক্ষিতীশ। উৰ্ম্মি, মা, ••
উর্মিলা। ( উঠিয়া, হাসিমুখে) বাবা, এইবার তােমার দুর্ভাবনা ঘুচল।
আমার কথা রেখেছি শুনেছ তাে ?
ক্ষিতীশ। হাঁ, তাের মার কাছে শুনলুম। বড় সুখী হলুম মা। আমার
ভারি ভাবনা ছিল। এ নিয়ে তাের মার সঙ্গে কত ঝগড়াও
করেছি। এখন আর সত্যি কথা বলতে কি...আমার কেমন একটা
ধারণা ছিল যে পরিমলের ওপরে••••••
উৰ্মিলা। বাবা, তুমি এ সব কথা কিচ্ছু বােঝ না।
হাসিয়া মুখ ফিরাইল। উৎপলার প্রবেশ।
ছুটিয়া গিয়া ভূদেবের পার্শ্বে দাড়াইল
উৎপলা। দাদামশাই, টাকা ফেল।
ভূদেব। টাকা, কিসের ?
উৎপলা। রূপাের। ঝকঝকে দশটি টাকা তা নােট হলেও চলবে।
বাজি ধরেছ মনে নেই?
ভূদেব। ও, তা আমি তাে তখন বলেছিলুম ; তুই ধরতে চাইলি নে।
এখন টাকা দেব কেন ?
উৎপলা। ও, তাইতাে। বড্ড বেঁচে গেলে। কিন্তু হার মানতে হবে,
নইলে ছাড়ছি নে’। হা’র মান, হা’র মান, শীগগীর।
ভূদেব। আচ্ছা, হার মানছি।
উৎপলা। বল, তােমার চাইতে আমি ঢের ভাল বুঝি।

জন্মতিথি
ভূদেব। তােমার চাইতে আমি ঢের ভাল বুঝি।
উৎপলা। আঃ, কি জ্বালাতন! ঠিক করে বল শীগগীর, নইলে •••
( কীল দেখাইল)
ভূদেব। আচ্ছা, আচ্ছা, বলছি। আমার চাইতে তুই ঢের ভাল
বুঝি।
হ’ল ?
উৎপলা। আর কখনাে আমার কথার ওপরে কথা বলবে ?
ভূদেব। নাঃ। বাপ রে, কোথায় লাগে তৃতীয় পক্ষের পরিবার।
ক্ষিতীশ। তােরা নিজেরাই সব আনন্দ করছি, কিন্তু শিশির কোথায় ?
উৎপলা। হলঘরেই তাে দেখেছিলুম, একটু আগে।
ক্ষিতীশ। যাই, আমি শিশিরকে ডেকে আনি’ গে ।
প্রস্থান
ভূদেব। উৎপল, পরিমলের সঙ্গে তাের দেখা হয়েছিল এখন ?
উৎপলা। কই, না।
ভূদেব। তাহলে আমাকে ফেলে পালালাে বােধ হয়। দেখি, একখানা গাড়ীর
ব্যবস্থা করি গে’। পয়সাটা বাঁচাব ভেবেছিলুম, তা আর হল না।
উৎপলা। দাদামশাই—মিসেস্ হালদার এখনাে সংযুক্তার জন্যে অপেক্ষা
করছেন - সংযুক্ত হলে তিনিই আপনাকে পৌঁছে দেবেন।
ভূদেব। দেখ উৎপল-মরিয়া হলে মানুষ খুন করতে পারে তা জানি
ফের মিসেস্ হালদারের কথা তুললে—আমি মরিয়া হয়ে যা তা একটা
কাণ্ড করব বলে দিচ্ছি।
প্রস্থান
উৎপলা। যাই, দীপ্তিকে খবরটা দিয়ে আসি।
প্রস্থান
১০৬

তৃতীয় অঙ্ক শিশিরের প্রবেশ শিশির। আমি उन একটি কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছি। যা শুনলুম, তাতে কি আপনার সম্মতি আছে ? উৰ্মিলা। আছে। শিশির। আমায় ক্ষমা করবেন। একটু আগে এ কথা শুনলে আমি নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান মনে করতুম। কিন্তু দীপ্তি দেবীর কাছে যা শুনলুম তাতে আমাকে সত্যি বলুন, আপনার সম্মতি আপনি স্বেচ্ছায় দিয়েছেন তাে ? উৰ্মিলা। না। শিশির। তা হলে যারা আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আপনার সম্মতি আদায় করেছেন- উৰ্মিলা। আপনি ভুল বুঝেছেন। সম্মতি দিতে কেউ আমায় বাধ্য করেনি। শিশির। তবে যে বল্লেন “স্বেচ্ছায় নয়”। উৰ্মিলা। তার মানে এ প্রস্তাবে সম্মতির পেছনে আসল যে জিনিষটি থাকবার কথা, তা আমার নেই। শিশির। তা হলে দীপ্তি দেবী ঠিকই বলেছেন—আমাকে ক্ষমা করবেন আপনার এ সম্মতি আমি মেনে নিতে পারছিনে’। যা পরিমলবাবুর ন্যায্য পাওনা—তা থেকে তাকে বঞ্চিত করতে উৰ্মিলা। আপনার নিজের কথাই বলুন শিশিরবাবু। আপনার কথা যদি আপনি ফিরিয়ে নিতে চান কেউ আপনাকে আটকে রাখবে না। ১০৭

জন্মতিথি
শিশির। আপনি রাগ করতে পারেন, কিন্তু একটু আগেই আমাকে
যে বন্ধুত্বের অধিকার দিয়েছেন, তার দাবীতে এটুকু আপনাকে
বলব যে আপনি ভুল বুঝে পরিমলবাবুর উপরে অবিচার করছেন।
আমি দীপ্তি দেবীকে ডেকে আনছি। ঠাণ্ডা মাথায় তার কাছে
সব কথা শুনলে আপনার আর কোন সন্দেহ থাকবে না।
ইলরের দিকে স্থান
ভূদেব ও পরিমলের প্রবেশ
ভূদেব। উর্মিলা, ক্ষমা চা’, পরিমলের কাছে ক্ষমা চা শীগগীর।
পরিমল। ওঁকে ক্ষমা চাইতে হবে না দাদামশাই। পুরুষরা যাই করুক
কেন, চিরদিন তারাই অপরাধী সাব্যস্ত হয়ে এসেছে। সুতরাং
আমিই ক্ষমা চাইছি।
অগ্রসর হইয়া আবার ভূদেবের দিকে ফিরিয়া চাহিল
কিন্তু যে অপরাধ করিনি’, তার জন্যে ক্ষমা কি করে চাইতে হয়
দাদামশাই?
ভূদেব।
বল যে, “দেবি, অপরাধটাও তােমার সৃষ্টি ক্ষমাটাও তােমার।
এইবার তােমার লীলা পরিবর্তন কর।
উৰ্মিলা। অপরাধ যদি না হয়ে থাকে, তবে ক্ষমা চাইবারও কোন
দরকার নেই।
ভুদেব। ওরে, হয় নি’, হয় নি। একশাে’বার তাে বলছি যে অপরাধ
হয় নি। তবু তুই ঐ গো, ধরে বসে থাকবি।
Sot

তৃতীয় অঙ্ক
দীপ্তির সহিত শিশিরের প্রবেশ
দীপ্তি। দাদামশাই আপনি সব জেনেশুনেও এতবড় অন্যায়টা হতে
দিচ্চেন?
ভূদেব। কি করব বল। আমার সাধ্যমত চেষ্টা তত করছি। কিন্তু
দেবী যে কিছুতেই প্রসন্ন হচ্ছেন না।
দীপ্তি। উর্মিলা-দি’, এখন তােমার ভুল বুঝতে পারাে নি’? আচ্ছা,
কিসে তােমার বিশ্বাস হবে বল।
ইতস্ততঃ চাহিয়া টেবিলের উপর হইতে মুক্তামালাটি তুলিয়া লইল
এই যে সেই মালা। এ মালা তুমি আমায় দিতে চেয়েছিলে। এখন
আমিই আবার তােমায় গলায় পরিয়ে দিই। তা হলে তাে তােমার
বিশ্বাস হবে ?
অগ্রসর হইল
ভূদেব। দেখি, দেখি, মালাটা আমায় দাও তত দীপ্তি। ( লইলেন)
বড়রাণি, পণ করেছিলি মনে আছে তো? ‘এ মালা যে তাের
গলায় পরিয়ে দিতে পারবে তারই জিত।•••পরিমল,
=
ভূদেবের ইঙ্গিতে পরিমল মাল লইয়া উৰ্মিলার
গলায় পরাইয়া দিল ডানদিক হইতে
রঘুষার প্রবেশ
রঘুয়া। মিস্ রায়! মিঃ নিৰ্ম্মল রায় কাম। মােটর আউট সাইড।
এস্থান

জন্মতিথি দীপ্তি। ও ছােড়দা গাড়ী নিয়ে এসেছে। উর্মিলাদি’ আজকে তা হলে আসি। দাদামশাই মনে রাখবেন -নমস্কার- প্রস্থানােত শিশির। দীপ্তি দেবী যদি অনুমতি করেন, আপনাকে গাড়ীতে তুলে দিয়ে আসি। দীপ্তি। কেন আবার আপনি কষ্ট করবেন ? শিশির। এতে আর কষ্ট কি—চলুন— শিশিরের প্রস্থান ভূদেব। হা এস দিদি আজকের তিথিটা ভাল। দীপ্তি। তাই নাকি? তবে চলুন দাদামশাই আপনাকে আমরা বাড়ী পৌছে দিই। পরিমলবাবুর ত বিলম্ব হবে ? ভূদেব। এর মধ্যেও আমি? তবে, একটু অপেক্ষা কর দিদি আমি ক্ষিতীশকে বলে আসি। ক্ষিতীশের প্রবেশ ক্ষিতীশ। উৰ্মিলা, শিশির, তােমরা এ ঘরে একবার এস তাে। সবাই তােমাদের আশীৰ্বাদ করবেন। (নিকটে আসিয়া ) ও, আমার ভুল হয়েছে, এ যে পরিমল। ভূদেব। হাঁ, পরিমলই বটে। তবে ভুল কিছু হয় নি। আশীৰ্বাদটা পরিমলেরই পাওনা। ক্ষিতীশ। সে আবার কি! আমি তাে এর কিছুই বুঝতে পারছি নে। ভুদেব। বুঝে পরে। এখন খুসি হয়েছ কিনা তাই বলল। ১১০

* :
তৃতীয় অঙ্ক
ক্ষিতীশ। নিশ্চয় হয়েছি। কিন্তু আমার খুসি-অখুসির কথা তাে নয়-
উৰ্মিলা
ভূদেব সেটা বােধহয় ওর দিকে চাইলেই বুঝতে পারবে।
ক্ষিতীশ উৰ্মিলার দিকে চাহিলেন।
উৰ্মিলা সলজ্জহাশ্যে মুখ ফিরাইল
ক্ষিতীশ।
বেশ, বেশ, বড় খুসি হলুম মা। কিন্তু একটু আগেই তবে
কেন বলেছিলি যে পরিমলকে তাের পছন্দ নয় ?
উৰ্মিলা। বাবা, তুমি এ সব কথা কিছু বােঝ না।
মিসেস হালদারের প্রবেশ
হালদার। এই যে এখানে সব জটলা করছ। প্রােগ্রাম শেষ না হতেই
সব সরে পড়লে যে, ব্যাপার কি? এখনাে যে অভিনয় বাকী
রয়েছে। দীপ্তি, তােমাদের “বিনিময়” আগে হবে না “সংযুক্তা”
আগে হবে ?
উৎপলার প্রবেশ
উৎপলা। দাদামশায়—এইবার।
ভূদেব।
মাপ করবেন মিসেস হালদার “বিনিময়” ষ্টেজের ওপরে না হলেও
সত্যি-সত্যিই হয়ে গেছে। আর সংযুক্তা-সেটা, এখন এত রাত্তিরে
too late.
হালদার। (হতাশস্বরে ) গুডনে।
যবনিকা

জন্মতিথি”
-
সাময়িক পত্রাদির অভিমত
দেশ-২৩শে চৈত্র ১৩৪১
•••“নাট্যকার হিসাবে প্রবােধবাবু ইতিপূৰ্বেই বেশ সুনাম
অর্জন করিয়াছেন। এবং এই “জন্মতিথি” নাটকে তাঁহার
সেই সুনাম আরও বৃদ্ধি পাইয়াছে। তিনি যে প্রকৃতই রসজ্ঞ
তাঁহার লেখনীর মধ্য দিয়া সেই রস প্রকাশের ক্ষমতা যে যথেষ্ট
পরিমাণে আছে—তাহা এই “জন্মতিথি” অভিনয় দেখিলেই
বুঝিতে পারা যায়।•••
সমগ্র অভিনয়ের মধ্যে প্রচুর হাস্যরসের যথেষ্ট উপাদান
আছে এবং তাহা দর্শকের চিত্ত আনন্দাপ্লুত করিয়া রাখে।
সােনার বাংলা-২৩শে চৈত্র ১৩৪১
•••নাট্যকার শ্রীপ্রবােধ মজুমদারের রচনাশক্তির যে পরিচয়
গত শনিবার সন্ধ্যায় পেয়েছি তার জন্যে আশা করা নেহাৎ
অন্যায় হবে না যে অচিরে এই নবীন নাট্যকার তার আসন
নাট্য-আসরে সুদৃঢ় করতে পারবেন।
স্বদেশ-শুক্রবার ২২শে চৈত্র ১৩৪১
“নাট্য-নিকতনে অভিনীত ত্রয়াঙ্ক নাটক জন্মতিথি দেখে
আমরা একটি নির্মল সন্ধ্যা কাটিয়ে এসেছি।•• নাটকখানা
বেশ লাগল

০
অভিনয়ে স্থান হওয়া উচিত ছিল। তবে একথা ঠিক যে
নবশক্তি শুক্রবার ২২শে চৈত্র ১৩৪১
নাটকটি এবং নাট্যকারের আমরা প্রশংসা করি। উচ্চাঙ্গের
প্রাণখােলা হাসির মধ্যে দিয়ে নাটকটি অগ্রসর হয়েছে।
বাঙলা—শুক্রবার ২২শে চৈত্র ১৩৪১
•••নাট্যনিকেতনমঞ্চে...“শুভযাত্রা” নাটিকার নাট্যকার
শ্রীপ্রবােধকুমার মজুমদার এম-এ বি-এল প্রণীত নূতন
হাস্যরসােল নাটিকা “জন্মতিথি”র উদ্বোধন হইয়া গিয়াছে।•••
অভিনয়ের সমস্তক্ষণ ধরিয়াই প্রেক্ষাগৃহের আগাগােড়া অনাবিল
হাস্যরসে উচ্ছসিত হইয়াছিল। কিন্তু বর্তমান যুগের তথাকথিত
তারুণ্য বা অশ্লীলতা বা বিগত যুগের “মােটা রসিকতা” এই
হাস্যরসে বিন্দুমাত্র যােগান দেয় নাই, ইহা নাট্যকারের পক্ষে কম
কৃতিত্বের কথা নহে • মােট কথা “জন্মতিথি” রচনা এবং অভিনয়
উভয় দিক দিয়াই উপভােগ্য। ইহা নিতান্ত ‘মক্ষিকাবৃত্তিরও
মনােরঞ্জনে সমর্থ হইবে।
ভগ্নদূত—শুক্রবার ২২শে চৈত্র ১৩৪১
পশ্চিমে “ড্রয়িংরুম” থিয়েটার বলে একটা কথা আছে।
একটি বা দুটি দৃশ্যের একখানি নাটক থাকে—যা আগাগােড়াই
বিনা দৃশ্যপটে কোন ভদ্রলােকের বাড়ীর ড্রয়িংরুমে অভিনীত
হয়। কলারসজ্ঞ দর্শক এই ধরণের অভিনয় দেখে বিশেষ
আনন্দ উপভোেগ করেন।
“জন্মতিথি” ঠিক এই ধরণের নাটক। ড্রয়িংরুমেই এর

বঙ্গালয়ের প্রেক্ষাগারে বসে আমরাও কম উপভােগ করিনি।
নাটক আর তার অভিনয় দুইই আমাদের নিকট ভাল লেগেছে।
দীপালি-
নাট্যকারের কলমের মুন্সীয়ানা দেখে খুশি হয়েছি।
নাটকখানির মধ্যে সাহিত্যরস এত আছে যা যথার্থ বসিকের
চিত্তকে আনন্দাপ্লুত করে রাখবে। আবার গ্যালারীর
দেবতাদের জাগ্রত রাখবার উপাদানও এর মধ্যে আছে প্রচুর
পরিমাণে।
•••চটুল রসের মাঝে মাঝে গম্ভীররস পরিবেশন করে তিনি
আমাদের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন

বঙ্গশ্রী -
১ম বর্ষ-১ম সংখ্যা-মাঘ ১৩৩৯
পুস্তক ও পত্রিকা পরিচয়
‘প্রবাসী’-পৌষ ১৩৩৯
শুভযাত্রা”—ীপ্রবােধকুমার
মজুমদার রচিত কথানাট্য
‘প্রবাসীর এই সংখ্যার রত্নরাজির একটী মধ্যমণি। বাঙলার
নাটক পড়িয়া পড়িয়া যখন প্রায় হতাশ হইয়া পড়িয়াছিলাম
তখন “শুভযাত্রার শুভপ্রবেশ শুভলক্ষণ বলিতে হইবে। ভদ্র,
সংযত ভাষায়, সামান্য না হইলেও ঘটিতে পারে, ঘটিয়াছে এমন
একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া, নাটকের মধ্য দিয়া কি অপরূপ
শতদল বিকশিত হইতে পারে ; তাহা দেখাইবার জন্যই এক
অখ্যাতনামা নুতন লেখকের কণ্ঠে বীণাপাণি ভর করিয়াছিলেন।
নাটকের দরবারেও “শুভযাত্রার যাত্রা শুভ হউক ইহাই
কামনা করি।
;
এই নাটকের গল্পাংশ দিবনা ; নাটকটা সম্পূর্ণ না পড়িলে
রসােপলব্ধি হইবে না এবং এমন নাটক না পড়াটাও আমরা
দুর্ভাগ্য বলিয়া বিবেচনা করি।
গতকল্য প্রবাসী’তে আপনার
শুভযাত্রা” পড়িলাম। পড়িয়া মুগ্ধ হইলাম।

* আপনার আর কোনও নাটক পূৰ্বে পড়িয়াছি বলিয়া মনে পড়ে না। এই যদি আপনার প্রথম নাটক হয়, মুগ্ধ বিস্ময়ে আপনার পরবর্তী নাটকের প্রতীক্ষায় রহিলাম। “শুভযাত্রা” পড়িতে, পড়িতে চোখে জল আসিয়াছে স্বীকার করিয়া মানসিক দৌৰ্ব্বল্যের জন্য লজ্জা পাইতেছি না। একাঙ্ক নাটকের টেকনিকটা আপনি ভালভাবেই আয়ত্ত্ব করিয়াছেন। আপনি আমার সশ্রদ্ধ অভিনন্দন গ্রহণ করুন। আশাকরি আপনার লেখনী রসসৃষ্টি কার্যে বিরত হইবেনা। মন্মথ রায় গত শনিবার নাট্যনিকেতনে “শুভযাত্রা” নামক যে নূতন নাটিকাখানি’র উদ্বোধন হয়েছে তার রচয়িতা শ্ৰীযুক্ত প্রবােধ- কুমার মজুমদারের উদ্দেশ্যে আমরা প্রশস্তি উচ্চারণ করচি। প্রথম চেষ্টাতেই তিনি নাট্যরচনায় যে পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, অনেক প্রতিষ্ঠাবান নাট্যকারের রচনার মধ্যেও আমরা তা কচিৎ দেখেচি। মাত্র আড়াই ঘণ্টার ভিতরে ঘটনার ঘাত প্রতিঘাতে কয়েকটা নরনারী’র হৃদয়ে কি অরুন্তু ভাবাবেগের সৃষ্টি হ’ল এবং তার ফলে তা’ কি ভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল—নাটিকাখানির মধ্যে তারই একখানি মৰ্ম্মস্পশী ছবি ফুটিয়ে তােলা হয়েছে। নাটকের সমস্ত ঘটনা কেন্দ্রীভূত হয়েছে একটা দৃশ্যের মধ্যে এবং পাদপ্রদীপের সামনে এই দৃশ্যটীর অভিনয় করতে সময় লেগেচে মাত্র দেড়ঘণ্টা। স্বল্পায়তন হলেও ly সত্যিকার নাটকীয়তার সমাবেশে “শুভযাত্রা” পরম উপভােগ্য হয়ে উঠেছে। উঠেছে। নাটিকাখানি’র পরিণতিও হয়েচে যেমন রসােজ্জল তেমনি অপরিহার্য। গত পাঁচ সাত বছরের মধ্যে এ সুখ্যাতি আমরা পাঁচ-সাতখানি নাটক সম্বন্ধেও করতে পেরেছি কিনা সন্দেহ। “শুভযাত্রার নাট্যকার নাট্যজগতে প্রথম পা দিয়েই যে উচ্চশ্রেণীর নাট্যরসবােধের পরিচয় দিয়েছেন তাতে আশা করি অদূর ভবিষ্যতেই আমরা তাকে নব নব অবদানে নাট্য-ভারতী’র পূজোপচার সুসমৃদ্ধ করে তুলতে দেখব। “শুভযাত্রার সমস্ত নাটকীয় ক্রিয়া পরিস্ফুট হয়েছে মৃণালিনী’র চরিত্রটীকে কেন্দ্র করে। শ্ৰীমতী নীহারবালা এই চরিত্রটীকে যে অনিন্দ্যসুন্দর রূপ দিয়েছেন আমরা শীগগিরই তা” ভুলতে পারব বলে মনে করিনা। আমাদের নাট্য-সাহিত্যে এই ধরণের চরিত্র সম্পূর্ণ নূতন। শ্ৰীমতী নীহারবালার নাট্য- নৈপুণ্যে চরিত্রটা ততােধিক উপভােগ্য হয়ে উঠেছে। চরিত্রের অন্তর্নিহিত Pathos প্রত্যেক দর্শকের চোখকেই অশ্রু সজল করে তুলেচে। ছােট্ট একখানি ছােট্ট একখানি একাঙ্ক নাটিকার অভিনয়ে, দর্শকদের কঁদতে আমরা এই প্রথম দেখলুম। শেখ ( নবশক্তি ; শুক্রবার ২৯শে বৈশাখ, ১৩৪০ ) “শিশির ; শনিবার ৩০শে বৈশাখ, ১৩৪০” নাট্য-নিকেতনে—“শুভযাত্রা” . [ কৃপক্ষ সেদিন বিনা আড়ম্বরেনাট্যনিকেতনে-যে ঘােট একাঙ্ক নাটকখানি অভিনীত হয়ে গেল—তা যে সাহিত্যরসিক মাত্রকেই তৃপ্তি দেবে এ কথা সঙ্কোচের সঙ্গে বলবার কোন প্রয়ােজন নেই। “বিনা আড়ম্বরে” কথাটা বলবার মানে হচ্ছে এই যে নতুন বই খুলতে গিয়ে নাট্যনিকেতন যেভাবে প্রচার কার্য চালান- কি-যে আনুসঙ্গিক অনুষ্ঠান চারিদিককার আবহাওয়াকে চঞ্চল করে জানিয়ে দেয় “আজ একখানা নয়া নাটক অভিনীত হবে”—সে সব কিছুই সেদিন ছিল না। কিন্তু যার জন্য নাটক সত্যই জমে উঠে তার কিছুমাত্র অভাবও ছিল না-সে হচ্ছে আন্তরিকতা। নাটিকার বিষয় বস্তুটা আমাদের মন প্রাণকে সত্যই নাড়া দিয়েছে। * * * নাটিকাটীর সম্বন্ধে বিশেষ করে বাবার কথা এই যে-একটানা দেড় ঘণ্টার অভিনয়ে এর পরিসমাপ্তি এর মধ্যপথে কোন ছেদ কিম্বা যবনিকা পতন নেই। আমরা তরুণ নাট্যকার যুক্ত প্রবােধকুমার মজুমদারকে আমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

পরিচয় ৷
র।
শ্রাবণ, ১৩৪ ০
“পুস্তক-পরিচয়”
“শুভযাত্রা”, “প্রবােধকুমার মজুমদারের প্রথম প্রকাশিত
রচনা, অথচ, আধঘণ্টায় পড়িয়া ফেলা যায়। এই নাটিকা-
খানিতে প্রবােধবাবু বাংলাদেশের সমগ্র পাঠকচিত্ত জয় করিয়া
ফেলিয়াছেন। কিন্তু এই লােকপ্রিয়তার পিছনে কোন
কারসাজী, ব্যবসাদারী বুদ্ধি বা সাময়িক উত্তেজনার সংশ্রব
নাই। ইহাই তাহার সার্থক রূপষ্টির প্রকাশ্য পুরস্কার।
গ্রন্থকার আধুনিক ইউরােপীয় নাট্যকলাপদ্ধতির সহিত
সুপরিচিত, ও সেই শিল্পকৌশলের উপর তিনি যে কিরূপ
অনায়াসপ্রভুত্ব স্থাপন করিতে পারিয়াছেন, তাহার প্রকৃষ্ট
প্রমাণ, এই সুগঠিত দৃশ্যবিভাগহীন একাঙ্ক নাটিকাটী। সমস্ত
ঘটনাটা ঘটিতেছে—কলিকাতার এক মধ্যবিত্ত গৃহস্থের দোতালার
প্রকাণ্ড একটা কক্ষে ; আর সময়, বিকাল পাঁচটা হইতে সন্ধ্যা
সাড়ে সাতটা। এইটুকু পরিসরের মধ্যে নাট্যকার আঁটাইয়া-
ছেন বাঙালী পরিবারের একটা অতি করুণ মর্মস্পর্শী কাহিনী,
ঠিক যেমন করিয়া প্রকৃতি দেবী ফুল-ফল-বীজের ভিতর
আপন আয়ােজন-সম্ভার অব্যর্থ নিপুনতায় ঠাসিয়া দেন।
বাহুল্যের এই নির্মম বর্জনে কাহিনীটার রস হইয়া উঠিয়াছে

"M/ ভাবঘন, রূপনার অবিরত তাপে যাহা কিছু তরল সমস্ত উঠিয়া গিয়াছে। “শুভযাত্রা”য় এই রূপনার, মূর্তি-গড়নের ক্ষমতার পরিচয় দিয়া প্রবােধকুমার পাঠকবর্গকে বিস্মিত করিয়া দিয়াছেন। একাঙ্ক নাটকে চরিত্রের ক্রমিক বিকাশ সম্ভব নয় ; প্রবােধকুমারেরও তাহা অভীতি নয়। তিনি দেখাইয়াছেন, একটী বিশেষ ঘটনা বিভিন্নধর্মীর মনে কিরূপ প্রকৃতি অনুযায়ী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, আর এই ঘাত-প্রতিঘাতের ফলে জীবনে কেমন অলঘ্যভাবে মর্মন্তুদ ট্র্যাজেডির আবির্ভাব হয়। * “শুভযাত্রায় দেখা যায় ট্রাজেডি সম্বন্ধে এই ব্যক্তি নিরপেক্ষ উদার দার্শনিক দৃষ্টি নাট্যকারের আছে। সংক্ষিপ্তসার দিয়া প্রবােধকুমারের নাট্যরচনার কৃতিত্ব পূর্ণ প্রকটিত করা অসম্ভব। একটু একটু করিয়া টিপিয়া টিপিয়া, অথচ অনাবশ্যক ঘােরাঘুরি না করিয়া পাঠকের মনকে গল্পের দিকে টানিয়া লইবার অসাধারণ ক্ষমতা প্রবােধ- কুমার দেখাইয়াছেন। আর দেখাইয়াছেন নাটকে করুণ দৃশ্য ফুটাইতে হইলে, নাট্যকারকে কিরূপে নিষ্করুণ হইতে হয়। তাহার প্রত্যেকটা চরিত্র স্বধর্মের অখণ্ড প্রকাশে ভাস্বর। মীনীৱনাথ রায়

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Janmotithi

Author
Majumdar, Probodhkumar
Title
Natak
File name
Janmotithi
Text
OCR done
Citation
1935
Published
2009/09/15
Publisher
Gurudas Chattopadhyay,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
138
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Ujjwala
DLI number
512717
Barcode
4990010019764.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
FLbrP0gUGaT
Download PDF

Janmotithi